Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Churanta
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
হঙ্গা মীনগেন্দ্রচন্দ্র সােম, বি-এ
কলিকাতা, ২৬ নং সীতারাম ঘােষ ধ্রুটস্থ,
সাহিত্য-ভবন প্রেস হইতে
বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী বি-এল কর্তৃক প্রকাশিত।
অগ্রহায়ণ, ১৩৪ ১
মূল্য—দশ আনা
কলিকাতা, ২৬ নং সীতারাম ঘােষ ধ্রুটস্থ,
সাহিত্য-ভবন প্রেসে
বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী কর্তৃক মুদ্রিত।
চরিত্র-পরিচয়
পুরুষগণ
লতিকার পিতা
গােস্বামী-লতিকার স্বামী
ক্ষেমঙ্কর ঐ ভ্রাতা
মিঃ সেনিয়েল-~~-ব্যারিষ্টার
সুযেণ-বিদুষীর ভাত।
মঞ্জরীর পিতা
সত্যেন্দ্রনাথ-মঞ্জরীর ভ্রাত
অভিনয়দর্শকগণ
স্ত্রীগণ
বিদুষী--আধুনিক-উচ্চশিক্ষাপ্রাপ্ত নৃত্যপটু মহিলা
লতিক-বিদুষীর সখী
মঞ্জরী-মিঃ সেনিয়েলের পত্নী
বিদুষীর মাত।
লতিকার মাতা
মঞ্জরীর মাতা
No text on this page.
জ
প্রথম অঙ্ক
১ম দৃশ্য
ফুলবাগানে বিদুষী ও লতিকা
(পুষ্পচয়নে উদ্যত হইয়া চমকিয়া পিছে হটিয়া)
বিদুষী।
একি মরমের বাণী শুনায় কুসুম
হাসির ভাষায় করে’ সখীত্ব জ্ঞাপন।
রামসনে বনবাসকালে সতী সীতা,
‘ফুলকুলে সখীছলে’ কৈত সম্ভাষণ,
সে ও কি ফুলের কথা পাইত শুনিতে
আমার মতন, কিংবা অন্য রমণীর
সঙ্গের অভাবে তার রমণীসুলভ
সখীত্ব-পিপাসা, শুধু স্বভাবের বশে,
চাহিত ফুলের সনে সখী-স্থাপন?
আমি ও তো জানিতাম ফুল সখী মাের,
কিন্তু প্রেম চাহে মাত্র এক প্রতিদান
যারে ভালােবাসে সেও বলে, “ভালােবাসি।”
চূড়ান্ত
[ প্রথম অক্ষ
এত দিন হেনভাবে সখী সম্ভাষণ,
করে নাই মােরে মাের এই ফুলসখী।
অহো কি আনন্দ আজ। এ কঠোর কর
ব্যথা বােধ করে তার অঙ্গ পরশিতে ;
নবনীকোমল তাহে কঠিন করের
পরশ বিষমঘাত বলে মনে হয়।
আরে, আরে সখি মাের, কি কথা শুনালি?
এত দিন কত ব্যথা দিয়াছিরে তােরে,
প্রায়শ্চিত্ত এবে তার কি করিব বল ?
কুসুমচয়ন ? সে যে আজি অসম্ভব।
সখিরে, লতিকা, মাের নৃত্যপটু তনু,
আনন্দের আতিশয্যে চাহিছে নাচিতে।
প্রেম রূপ ধরে পায় সৌন্দর্য্যে প্রকাশ,
সেইরূপ আনন্দের নৃত্যরূপ জানি।
( লতিকার প্রতি বিশেভাবে লক্ষ্য করিয়া )
গুৰি ওকি সই, কেন হলি অকস্মাৎ
বিরসবদন হেন? জানিতাম তােরে
মাের নৃত্য দেখিবারে সদ। অভিলাষী
আজি শোর আনন্দের এই শুভক্ষণে,
বিধাতার করুণার দান মানি বারে,
হেন বিপরীত ভাব কেন হ’ল তাের ?
হরিষে বিষাদ’ এ যে অতি মৰ্ম্মন্তুদ ।
প্রথম দৃশ্য ]
চূড়ান্ত
( লতিকার কাছে গিয়া তার চিবুকে হাত দিয়া মুখ উঠাইয়া )
ব, বল্ সই, মাের কিবা অপরাধ,
বুঝিয়া আমি তােরে কিবা দিনু ব্যথা?
লতিকা। তুই কি পারি মােরে ব্যথা দিতে কভু ?
তবু তাের কথা শুনে’ জাগে সুপ্ত ব্যথা।
কাল সন্ধ্যাবেল। উনি এসে উপস্থিত
আমাদেরে আগে কিছুমাত্র না জানা’য়ে।
শুইতে যাইয়া হ'তে প্রথম সাক্ষাৎ,
আনন্দউজ্জাসভরে বাহিরিল মুখে,
“তােমায় দেখিয়া এতকাল পরে মাের,
আহলাদে নাচিতে যেন হয় অভিলাষ।”
আগুনের ফুলকি যেন পড়িল বারুদে,
মহাক্রোধভরে তিনি কহিলা গজ্জিয়া,
“বিদুষীদেবীর কাছে নৃত্যকলা শিখে,
হেন বাক্য উচ্চারিতে আমার সকাশে,
সাহসী হইলি তুই ওরে পাপীয়সি ?”
আরও কত কি তিনি অশ্রাব্য ভাষায়,
স্থানকালজ্ঞানহীন হইয়া বলিলা
সারারাত হ’ল মাের মেঝেতে শয়ন
তন্দ্রাহীন ; ভাের হ’তে বাহিরে আসিয়া,
দাড়াইয়া ছিঃ আমি তাের প্রতীক্ষায়।
| প্রথম অল্প
চূড়ান্ত
বিদুষী। অহহ কি দারুণ বাণী শুনাইলি সখি ।
আমি তারে জানিতাম পরম বৈষ্ণব
তােদের বিবাহকালে প্রথম আলাপে,
আমার যে মনােভাব হয়েছিল, তাহা
তােরে আমি বলেছি সুস্পষ্ট ভাষায় ।
তুই তো জানিস মাের ধর্মদ্ধ্যে নাই,
গোঁড়ামি দেখিয়া তাঁর মাের অসন্তোষ
কিছুমাত্র হয় নাই তাহা ও জানি।
সত্যকার ধর্মভাব যদি থাকে কারাে,
মানবের শ্রেষ্ঠগুণ ব'লে তারে মানি :
এ গুণ পরমলক্ষ্য বিবাহ-ব্যাপারে।
এ বিচারে রে আমি মন্দ দেখি নাই।
বিদ্বেষ আমার প্রতি আছে অনেকের,
তারে শুধু দোষী করা না হয় উচিত ।
তাের প্রতি তাঁর এই কটু-উক্তি মূলে,
আছে এই বিদ্বেষের ভাব বৰ্তমান।
ক্রোধের কারণ তার শুধু এ বিদ্বেষ,
ভাবিবার অবসর যদি হত তাের,
ক্রোধপ্রশমনে তার যত্ন তোের হত।
বিরহীর তৃষ্ণা ল’য়ে আসি তাের ঠাই
সারা নিশি কাটালেন হা-হুতাস করে,
তুই কিনা হতভাগী অভিমানভরে,
প্রথম দৃশ্য।
চূড়ান্ত
প্রেমাভিনয়ের এই সুযােগ ছাড়িলি ?
আমি হলে ক্রোধকালে তারে বক্ষে ধরে
বলিতাম, “প্রাণেশ্বর, ক্ষম অপরাধ,
অবােধ আমার কথা গ্রাহ্য নাহি করে :
বিদুষীর কাছে কভু নাচ শিখি নাই,
ভালােকাপে জানি তাহা নাহি ভালােবাস,
যদিও তাহার নৃত্যে ফুর্তি পাই প্রাণে ;
আল্লদে নাচিতে ইচ্ছা হয় প্রচলিত
কথা মাত্র উচ্চারিনু, না ভেবে। অন্যথা।”
ক্রোধাগ্নি তাহার হত তখনই জল।
এই কি লো স্বামি-সেবা, তারে ভালোবাসা?
শুধু মিষ্টভাষা চায় ভালােবাসা তাের ?
স্বামী বশ করিবার একই কৌশল--
দোষগুণ নির্বিশেষে শুধু ভালােবাসা,
বিশ্বজনীন প্রেমের যা হতে উদ্ভব,
ভগবং প্রেম যার শেষ পরিণতি।
মাতৃস্নেহ সন্তানের দোষ নাহি দেখে,
পীপ্রেম স্বামিচ্ছিদ্র করে অন্বেষণ ?
স্বামিস্ত্রীসম্বন্ধ তবে এত ভিত্তিহীন,
একে নারে অন্য-দোয উপেক্ষা করিতে?
লতিকা। বিহু লাে, প্রাণের সখি, সাধে কি লো তােরে
এত ভালােবাসি? বল তবে প্রতীকার
{ প্ৰথম আৰু
চুড়ান্ত
কিসে হবে এবে? যদি তিনি ক্রোধভরে,
বাক্যালাপ মাত্র মাের সঙ্গে নাহি করে’,
চলে যান এইক্ষণে ?
তিনি বুদ্ধিহীন
তাের মতো কভু নন ; পাবি পরিচয়
তার, চল্ ত্বরা করি’, মানভঞ্জনের
প্রেমরসপূর্ণ পালা করিগে’ সম্ভোগ।
বিদুষী।
(চলিতে চলিতে)
লতিকা। বিয়ে তাের হয় নাই, বিয়ে না করিবি
( আমায় তো অকপটে বলেছিস্ তুই ?),
এ প্রেম-রহস্য তুই শিখিলি কোথায় ?
বিদুষী। তােদের বাসরে আর ফুলের বাগানে।
কে বলে বিবাহ মাের হয় নাই ? মনে
বরের সুঠাম মূর্তি গড়িয়া যতনে,
আমি তার পূজা করি সদা মনে-প্রাণে।
তাদের যে ফুলশয্যা মাত্র এক দিন,
নিত্য মাের ফুলশয্যা হয় ফুলবনে,
দয়িতে পরাই মালা গাঁথি’ নানা ফুলে :
মালাবদলের সঙ্গে তােদর সে সাধ
শেষ হয় দেখি, থাকে কবিত্বে কবির।
কল্পনাপ্রসূন ভালাে বনফুল হ’তে,
চন্দনের সহযােগ বিনা রক্তজবা
প্রথম দৃশ্য ]
চূড়ান্ত
সুগন্ধি হইয়া পড়ে আরাধ্য-চরণে।
নরসেবা তরে হয় নারীর জীবন ;
প্রত্যক্ষদেবতারূপিস্বামিলাভ হলে,
সে কাৰ্য্য সুকর হয় তাহা বেশ জানি ;
নারীর প্রবল জানি সন্তানকামনা :
কিন্তু সন্তানের ভাবিপরিণামচিন্তা-
তুহিনপরশে কাম-ফুলের কলিকা
উন্মেষেই বাধা পেয়ে শীর্ণ হয়ে যায় ;
দাসত্বশৃঙ্খলপরা মূর্তি সন্তানের,
নাহি পারি কল্পনায় দিতে আমি স্থান ;
দেশমাতৃকার পঙ্গু অগণ্য সন্তানে
দেখে’ প্রজননস্প হা পায় বড় লজ;
ধিক্কত লাঞ্ছিত এ জীবন প্রবাহ,
সন্তানে বিস্তৃতি লাভ যেন নাহি করে,
ভগবচ্চরণে মাের নিয়ত প্রার্থনা।
লতিকা। তাের সহ অধ্যয়নে, ভাের সঙ্গলাভে,
শিখেছি অনেক কিছু, কৃতজ্ঞহৃদয়
লুটায়ে পড়িতে চায় তাের পদতলে ;
কিন্তু লাে মরমসখি, এ অপূর্ব বাণী
পূৰ্বে শুনিনাই তাের সুধাস্রাবী মুখে ?
বিদুষী। প্রথমে দাম্পপ্রেম হৃদে ফুর্তি পায়,
বিবাহ-ব্যাপার হয় সংঘটিত পরে।
[ এখ
চূড়ান্ত
দেখিলাম তাের হৃদি নিষিক্ত সে রসে,
মাের স্তরে উত্তেলিতে তােরে শঙ্কা হ’ল ;
কুসুম-আস্তীর্ণ নহে আদর্শের পথ,
পদে পদে পতনের শঙ্কা আছে তায় ;
নির্ভীক হৃদয় মাের তাহে নাহি ভরে,
অপরে প্রেরণা দিতে চলিতে সে পথে,
সঙ্কুচিত কিন্তু মন স্বভাবতঃ হয় ।
ভগবৎ-কৃপা বিনা হেন দুঃসাহস
সাধারণে যেই পথ করে পরিহার,
আদর্শের রূপে সেই পথাবলম্বন--
কারো মনে কোন কালে নাহি পায় স্থান।
ভগবৎ-ইচ্ছাকৃত এ তাের বিবাহ,
এই ভেবে চেষ্টা কর করিতে সার্থক।
লতিকাদের বাটীর সম্মুখ।
{ লতিকা ও বিদুষী )
লতিকা। আছেন, আছেন তিনি, মেছেন মােরে,
নৈলে কেন হাহাকার-আভাস বাড়ীতে
কিছু নাহি পাই ? চল্ ত্বরিত গমনে,
তার মনে ব্যথা দিয়া অশান্ত হৃদয়।
বিতীয় দৃশ্য।
চূড়ান্ত
( লতিকার মাতার প্রবেশ)
ল-মাতা। এত দেরী করে', বিন্দু, কেন এলি বল্ ?
সকাল হইতে তাের খোঁজ করে’ করে,
জামাই আমায় যে, মা, অতিষ্ঠ করিল ?
বিদুষী। সত্য কাকী, ফাকি এর মধ্যে কিছু নাই ?
তিনি তো আমার প্রতি খুব খুশী নন,
হওয়া সম্ভব নয়, তাও সবে জান?
(স্বগত) এ আগ্রহ বড় অর্থপূর্ণ মনে হয়।
ল-মাতা। তা কেন, তা কেন ? বড় ভালো স্বভাবের
জামাইটি মাের, শুধু গোঁড়ামিটা বাদে।
অমন বংশের ছেলে, তা একটু নিষ্ঠা
চাই বৈ কি? বিদ্যাবুদ্ধি তােদের মতন,
তবু যে স্বধৰ্ম্মে মতি, খুব প্রশংসার
নয় কি? আমি তো দেখি সেই গোরাচঁাদ
তাের তাে সবই প্রায় জানা, তবু শােন,
উনি তো গৌরাঙ্গভক্ত আর সুসন্তান
দেশমাতৃকার বলে’ অর্জিলেন যশ :
একদা বেলুড়মঠে দেখে’ এ যুবায়
পদাবলী গানেরত, মুগ্ধ হইলেন।
লতিকার প্রতি ওর আকর্ষণ-হতু
এই পরিচয় জানি। নৈলে লতিকার
বিবাহ হইত এক দুরুহ ব্যাপার ।
১০
[ প্রথম
চূড়ান্ত
কেন না, উহার বর্তমান মনােভাবে,
বিলাতফেরৎ বর ওঁর চক্ষুশূল।
বিদুষী। ঠিক্ কথা কাকী, তাই আমারাে ধারণা।
গোঁড়ামিতে ওঁর নাই ভণ্ডামির লেশ।
আমাদের আধুনিক নৃত্যকলা শিক্ষা,
শুধু উনি নন, আমাদের কয়জন,
সমাজের বর্তমান দুরবস্থা দেখে,
সাহসী হইয়া পারে করিতে প্রচার ?
কিন্তু শ্রীগৌরাঙ্গ মাের হইলে সহায়,
জেনো স্থির, একদিন লতিকার সনে,
রাসরসে ওঁরে আমি নাচা’ব, নাচা’ব।
নীতিক্ষেত্রে অনুন্নত মানব-সমাজে,
ব্যভিচার এ বিদ্যার দেখি যথাতথা :
কিন্তু রাসসবেত্তা পবিত্ৰচরিত
ইহা হ’তে ব্যভিচার সম্ভাবনা কোথা?
আচ্ছা কাকী, ক্ষমি’ মাের নিলজ্জ ব্যভার,
বল দেখি, তােমাদের দাম্পত্যজীবনে,
যুগলে গােপনে নৃত্য করিবার সাধ
হয় নাই কোন দিন?
ল-মাতা।
অবশ্য হয়েছে।
ঠাকুরবাড়ীতে দেখে’ থিয়েটারে নাচ,
তাের কাকাবাবু বড় করেন আক্ষেপ,
দ্বিতীয় দৃশ্য।
১১
চূড়ান্ত
নাচিতে শিখিনি মােরা। কীর্তনের নাচে
যােগ দিয়া কিন্তু তিনি সেই অভিলাষ
পূর্ণ করেছেন কিছু ; আমি হতভাগী
তার এই মনঃসাধ নারিনু পূরা’তে।
বিদুষী। তোমার সরল উক্তি আরও সরল
হ’ত যদি, কাকী, তুমি করিতে স্বীকার,
প্রেমানন্দে নৃত্যসাধ হয় স্বভাবতঃ।
ময়ুরের নৃত্যচ্ছন্দে নাচিবেই সেই,
যার আছে বিশ্বগতিতালয়বােধ ;
উদ্বেলিত সমুদ্রের তরঙ্গের ভঙ্গে,
জন্ম লভে রুদ্ৰতালতাণ্ডব নর্তন ;
কালবৈশাখীর মত্ত মাতঙ্গের ভাবে,
তাথৈ তাথৈ নাচে প্রেমােন্মত্ত জন।
জলক্রীড়াসাপ তথা অতি স্বাভাবিক
মরলমিগুনে দেখে’ কেলিপরায়ণ,
সরসীর মৃদুবাতলীpনীলনীরে
অনুকারস্প হা জাগে প্রণয়িযুগলে।
লতিকা কোথায় গেল?
লতিকার স্থানে।
•
লতিকার গৃহ।
( লতিকা স্বামীর পাদস্পর্শ করিতে উদ্যত হইলে )
ল-স্বামী।
ও কি কর? অপরাধী আমি তব ঠাই,
ক্ষমা চাহিবার কিন্তু নহে এ সময়,
সকল কাজের আছে সময় বিহিত।
লতিকা। কালাকালজ্ঞানহীন আমি উন্মদিনী,
কালেরে ফেলিয়া পিছে এসেছি ছুটিয়া।
প্রেমের-অঞ্জনলিপু পত্নীর নয়ন,
স্বামিদোষ দেখা তার পক্ষে অসম্ভব।
দ্য, দাগাবাজ স্বামী সমাজের চক্ষে,
নিজ কক্ষে পঞ্জীবক্ষে প্রেমের প্রতিমা।
স্বামীর দুৰ্ব্বাক্যে রাষ অভিমান যার,
সেই নারী পত্নীনামযােগ্যা কভু নয়।
এসেছি করিতে ভিক্ষ। এই আশীৰ্বাদ,
এই রিপু মাের হ’ক সমূলে নিপাত
শাণিত তােমার ক্ষমা-খগের আঘাতে
তবে স্বামিদেবরূপে পূজিতে তােমায়,
থাকিতে তােমার পায়ে, হবে অধিকার ;
সখীজ্ঞানে আলিঙ্গন দিবে মােরে পরে,
সেবায় সন্তোষ লাভ হইলে তােমার।
তৃতীয় দৃশ্য।
১০
চূড়ান্ত
( বিদুষীর প্রবেশ)
বিদুষী। এরি মধ্যে শুরু মানভঞ্জনের পালা?
কুঞ্জদ্বার রক্ষণের জ্ঞানহারা দেহে।
ভাগ্যে ছিল মাের এই রস-উপভােগ
ব্রজগােপীভাবে, তাই সুযােগ ঘটিল,
মুক্ত দ্বার দিয়া কুঞ্জে প্রবেশিনু সােজা।
গোঁসাই মশায়, ক্ষম দস্যুতা আমার।
বিপরীত আচরণ দেখিলাম এ কি,
আহত ফণিনী নিজ হিংসাবৃত্তি ভুলে’
প্ৰহৰ্ত্তার পদাঙ্গুষ্ঠ করিল লেহন!
প্রেমের গহনা গতি কে করে নির্ণয়
- লতিকার স্বামী বিদুষীকে প্রণাম করিতে উদ্যত হইলে )
ওটা প্রাপ্য জানি মাের সমাজনিয়মে,
বয়সে কনিষ্ঠ। বলে’ না করি গ্রহণ :
আশীৰ্বাদ প্রাপ্য কিন্তু অবশ্যই পাবে-
পবিত্র দাম্পত্যপ্রেম ভুগ্ধ দেহে সুখে।
তপস্যা তােমার দেখি আছে বিলক্ষণ,
রাত্রিমাত্র অনিদ্রায় অনশনে যাপি
কষ্টাদেবীতুষ্টিলাভে হইলে সক্ষম।
জিজ্ঞাসিতে পারি কি হে সে দেবীর প্রতি
ক্রোধের কারণ ? আমি নাচি রঙ্গালয়ে,
গহিত-আচারী বলে’ দোষী তব ঠাই ;
!
১৪
[ প্রথম অঙ্ক
চূড়ান্ত
কিন্তু সেই দোষ স্পর্শে দেবীরে কি ন্যায়ে?
তুমি যাহা ভালাে নাহি বাস বলে’ জানে,
তার প্রতি আকর্ষণ হবে লতিকার,
অসম্ভব তাহা, তুমি অবশ্য জেনেছ,
পূৰ্ব্বরাগ সঞ্চারের স্বল্পপরিচয়ে।
‘অক্রোধপরমানন্দ-নিত্যানন্দ’-বংশে
জন্মলাভ করিয়াছ তুমি, অতএব
ক্রোধজয়ী বীর বলে’ গৰ্বাভিনিবেশ
নহে অসম্ভব। ক্রোধবশবর্তী হয়ে
হেয় বলে প্রতিপন্ন হবে মোর কাছে,
সেই শঙ্কা নাহি করাে। জানি সবিশেষ,
এই রিপু নাহি আসে স্থানকালপাত্র
করিয়া বিচার ; এর সমূলে বিনাশ
যার অর্থ কামনার ঐকান্তিক লােপ,
যদিও বৈষ্ণব লক্ষ্য, দুরূহ ব্যাপার।
ষড়রিপুজয় সর্বধৰ্ম্মপরিণাম,
লক্ষ্য কৰ্ম্মজ্ঞানভক্তি-অধ্যাত্মযােগের।
ক্রোধপ্রশমনে চেষ্টা মানুষেরই থাকে,
তােমার বিশেষ আছে করি অনুমান ;
অতএব পরিতাপ বেশী নাহি কর।
লতিকা রমণীর, শিক্ষা বিজাতীয়
বংশগরিমায় তার মানিমা আনিতে
তৃতীয় দৃশ্য।
চূড়ান্ত
১৫
হয়নি সমর্থ মােটে; বংশের তিলক
তুমিও অপর পক্ষে ; সৎসাহসের
গুণগ্রাহিতার আর, তুলনারহিত
পরিচয় যা দিয়াছ বিবাহ করিয়া
এই পরিবারে, তার ভূয়সী প্রশংসা
করা ও যথেষ্ট নহে।
ভগিনী সমান
আমি যারে ভালােবাসি, সর্বান্তঃকরণে,
বল, ক্ষমিয়াছ তারে? কর আলিঙ্গন
আমার সাক্ষাতে, এতে কোন দোষ নাই।
নয়ন জুড়াই দেখে’ ; যুগল মিলন
অবিবাহব্ৰতী আমি বড় ভালােবাসি।
( লতিকার স্বামীর তথা করন)
( স্বগত) অসম্ভব এ আনন্দবেগসংবরণ !
সরে পড়ি।
( প্রকাশ্যে )
নাহি চাহি জন্মাতে ব্যাঘাত
নিবিড়মিলন পথে তব দোহাকার।
বড় অভিলাষ মাের, আর একদিন,
যােগ্য পাত্র তুমি বড়, শুনা’ব তােমায়
নৃত্যতত্ত্বব্যাখ্যা, মাের যথা আছে জ্ঞান ;
রাসের রহস্য ব্যাখ্যা শুনাবে আমায়
তুমি ; দুই কাজ হবে অবশ্য নির্জনে।
(প্রস্থান)
[ প্রথম ও
লতিকা।
চূড়ান্ত
লতিকা। বিদুষী যে দিল এত হঠাৎ চম্পটু,
বুঝিলে কারণ তার ?
ল-স্বামী।
তিনি তাে নিজেই
তাহা ব্যক্ত করিলেন? কাল তুমি মােরে
আশায় বঞ্চিত কৈলে, বুদ্ধিমতী তিনি,
যদিও নহেন নিজে মােটে ভুক্তভােগী,
বােঝেন বিশেষ।
তুমি বৈষ্ণব গোঁসাই,
নিবিড়মিলন লাগি’ দিনের বেলায়,
কতই যে ব্যগ্র তাও জানে সে বিশেষ,
খােচা দিয়ে কথা ক’য়ে বােকাটি বনিয়ে,
দে দৌড়, দে দৌড়, তুমি হা করে’ রহিলে।
ল-স্বামী। তার কাছে বােকা বন সুখের বিষয়।
লতিকা। কারণ কি জান? তুমি বেহায়ার মতাে
তাহার কথায় ভুলে’ করিয়াছ যাহা,
তাহাতে তাহার হেথা তিষ্ঠানে! যে দায়,
আনন্দে নাচিয়া ফেলা বিচিত্র না ছিল,
সরিয়া পড়িল তাই : বুঝিলে এখন ?
ল-স্বামী। তবে তাে ঠকেছি বড়, না দেখিনু নাচ ?
লতিকা। এমন বৈষ্ণব হয়ে দেখিবে কি তাহা ?
পাপের ভয়ে যে তুমি বড় জড়সড় !
তৃতীয় দৃশ্য )
চূড়ান্ত
গােস্বামী। এবে তুমি সরে পড়; মনে করিছেন
মা, জামাই এ যাত্রায় শায়েস্তা হয়েছে,
মেয়ের আচল ধরে দিনের বেলাও
থাকিতেই চায়। জানি, মায়েরা ইদানীং
এর চেয়ে না বােঝেন প্রেমের মর্যাদা।
লতিকা। মাকে তুমি এত নীচ করিলে নির্ণয় ?
সাধারণ্যে তার স্থান নহে কি বিশেষ ?
গােস্বামী। হওয়াই আশা করি, শুনে সুখী হনু।
পাশ্চাত্যপ্রভাবান্বিত স্ত্রীলোেকই বেশী,
করিবে না অস্বীকার ইহা তুমি জানি।
আমি ও স্বীকার করি, সরমের ভাব
অতিমাত্র প্রচলিত আধুনিক কালে
যাহা আমাদের দেশে, তাহা শুদ্ধভাব
নহে ; তাই পরিত্যাজ্য। আসলে কি জান?
এ সব ব্যাপারে মধ্যপন্থার আশ্রয়
সমীচীন, কিন্তু জনসাধারণ বড়
প্রবৃত্তির দাস, হিতাহিতজ্ঞানশূন্য ;
নিবৃত্তিমূলক শিক্ষা সেহেতু
উচিত।
লতিকা। তুমি স্নানাহ্নিক সার, আমি রাঁধি গিয়া।
বিদুষীর কাছে বসে রধিতে শিখেছি,
একথা চিঠিতে মাের জানিয়াও কেন
এবার আসিতে এত বিলম্ব করিলে ?
চূড়ান্ত
[ প্রথম
হঠাৎ আসিয়া মাের পরীক্ষা করিবে
তু’ বিষয়েনাচিতে ও রধিতে কেমন
পােক্ত হইয়াছি, তাই না জানায়ে এলে?
উত্তীর্ণ হয়েছি তাতে যে বিষয় বড়,
রন্ধনবিদ্যার ও শীঘ্র দিব পরিচয়।
কাল শুধু ফলমূল, দুধ খেয়ে ছিলে,
বাবা তত নন, কিন্তু মা তাতে দুঃখিত।
গােস্বামী। “টেরিয়ান্ডামেট” নামক পুস্তিকা,
খাদ্যাখাদ্যবিচারে যা তুলনারহিত,
তােমর পড়নি বুঝি ? ফল মানবের
স্বাভাবিক খাদ্য, রান্নাকরা খাদ্য মৃত,
প্রভৃতি বিষয় স্পষ্টরূপে প্রমাণিত
এই উপাদেয় গ্রন্থে। তবে তােমাদের
দুঃখের কারণ বেশী কি থাকিতে পারে ?
সৈন্ধব, কদলী, আমলকী, হরীতকী,
আ ও পনস, ধান্য, মুগ, তিল, যব,
গােক্ষীর, গােঘৃত, গণ্য আহাৰ্য্য সাত্ত্বিক :
আহার ব্যবস্থা নিজ হাতে না রাখিলে,
সাত্ত্বিক জীবন হয় দুঃসাধ্যযাপন।
শােন এ বিশেষ কথা—মা, ভগ্নী, স্ত্রী, কন্যা
ব্যতীত কে আর আছে স্বজন এমন
যে দরদ দিয়া করে আহাৰ্য্য প্রস্তুত ?
তৃতীয় দৃশ্য
চূড়ান্ত
এই কাৰ্যে আবশ্যক আয়াসস্বীকার
এই চারিজন ভিন্ন কে করিবে তাহা
জুষ্টচিত্তে ? অন্যে কষ্ট দেয়। অনুচিত।
প্রচারের কাৰ্যে যেতে হয় নানা স্থানে,
স্বপাকব্যবস্থা তাই অতি-আবশ্যক।
মাকে এই কথাগুলি বুঝায়ে বলিয়ে।
খাদ্যাদিতে অসুবিধা হবে জানিয়া,
স্বষ্টচিত্তে করিয়াছি বিবাহ তােমায়।
স্বপাকে অভ্যস্ত নিজে, আছি নির্ভয়,
তােমাদের অসুবিধা ভেবে ক্ষুব্ধ ছিঃ।
ইহা পরীক্ষিত সত্য, ‘ভাতেপােড়া খেলে
শক্তি বেশী হয়। নিরামিষ খাদ্য সহ
খাটি দুধ, টাটকা ফল থাকিলে, তাহাই
হয় সর্বশ্রেষ্ঠ খাদ্য ভারতবাসীর।
আধুনিক খাদ্যপ্ৰাণতত্ত্বানুমােদিত
খাদ্যতত্ত্ব পুরাকালাগত এ ভারতে।
নােংরামি ও ঢুকিয়াছে নারীর সমাজে,
স্বপাক ব্যতীত তাই গত্যন্তর নাই।
খাদ্যের শুদ্ধতা স্বাস্থ্যরক্ষার উপায়,
ধৰ্ম্মের সাধনোপায়, নাই বা বলি,
যদি ও ধর্মের নামে যে কোন সাধন
বেশী ফলপ্রদ হয়, ইহা নিঃসংশয়।
২০
এ সঙ্ক।
চূড়ান্ত
আর এক বড় সুবিধাও এতে আছে-
নিমন্ত্রণ খেতে কেহ সহজে না বলে ;
যারা ভালােবাসে—খাওয়ালে সুখী হয়,
এই দোষ পরিহারে তারা যত্নবান্।
৪র্থ দৃশ্য
-"
লতিকার মা খাস কামরায় অসীনা।
-মাতা। জামাই বেচারী কাল না খেয়েই ছিল—
খেয়েছিল যা তা না খাওয়ার সামিল।
এ বয়সে এ গোঁড়ামি, বাহাদুর বটে
ওদিকে ভাসিছে দেশ অনাচারস্রোতে।
এ কৃচ্ছসাধন এই সােনার শরীরে
দেখিয়া পরাণে পাই বিষম আঘাত;
মায়ের পরাণ ওর করে গাে কেমন?
আজ ও বেলা হ’ল, নাই চেষ্টা আহারের।
মেয়েটাও তার ঘরে সেই যে ঢুকিল,
বেরুতে না চায় ; বয়সের ধৰ্ম্ম এ যে,
এ বয়সে কি ছিলাম নিজে, তা তাে জানি ?
একটা ঝি নাই তাকে ডাকিতে পাঠাই।
বিদুরে ডাকাই ডেকে আনিতে লতিরে,
, নিজেই গিয়া করি অসঙ্গত কাজ ?
চতুর্থ দৃশ্য ]
২১
চূড়ান্ত
( সবেগে প্রবেশ করিয়া)
লতিকা। রান্নার যােগাড়, মাগাে, শীঘ্র করে দাও,
আমার হাতের রান্না খেতে তিনি রাজী।
কাল অসময়ে মাের কষ্ট হবে ভেবে
দেননি রধিতে ; বিশেযুত, ফলে, দুধে
পূরাতৃপ্তি আহারেতে হয় তার জেনাে।
বাঁধিতে যে কষ্ট তাহা আত্মীয় ব্যতীত
অপরে না দেয়। তিনি সঙ্গত ভাবেন,
স্বপাকে অভ্যস্ত তাই করেছেন নিজে,
কচ্ছের সাধন নহে উদ্দেশ্য ইহার ;
রসনাশাসন মূলে আছে কিছু জানি।
-মাতা। কি আনন্দ! সব ঠিক, নেয়ে নে শীগগির।
সােনার মানুষ এযে মাটীর মানুষ !
দ্বিতীয়
অঙ্ক
১ম দৃশ্য
লতিকার মাতাপিতা তাহাদের শয়নকক্ষে উপবিষ্ট
ল-মাতা। এবার জামাই দেখি অনেক দুরস্ত।
গ-পিতা। কি রকম শুনি? ভয় হয় কথা শুনে।
-মাতা। রকম আর কি ? এই, গোঁড়ামিটা কম,
লতির সহিত মেলামেশা স্বাভাবিক
বাগানে বেড়ান, দিনে আলাপ ব্যভার,
সবার যেমন হয়ে থাকে, সব চলে।
ল-পিতা। বিদু তাে সঙ্গেই থাকে ? তবে ভয় নাই।
ল-মাতা। সে না থাকিলেই বুঝি এতে দোষ হয় ?
ল-পিতা। নিশ্চয়, নহিলে পূরাদস্তুর সাহেবি
যে হয় তা বােঝ? এটা বােঝনা তােমরা,
কেন না, তােমরা কিছু বেশী অগ্রসর।
ঠেকিয়া শিখেছি বেশ, অতীত জীবনে
নিজের সাহেব-আনা বর্তমানে বড়
বাধা চলিবার পথে-শ্রদ্ধা-আকর্ষণে
লােকের সমর্থ নয়। এই শ্রদ্ধা বিনা
দেশহিতসাধনের কল্পনাই বৃথা
অথক দৃশ্য ] চূড়ান্ত বলে মনে হয় মাের। ভাব একবার, এ বয়সে আমাদের ছেলেখেলাকথা ; সেই ধূলাখেলা হবে প্রিয় ইহাদের, শুনিলে আমার মন পায় বড় ব্যথা। ভয় নাই, দেবােপম এরা তিন জন, মােদের যৌবনলীলা স্পহণীয় বলে গ্রাহ নাহি হবে ইহাদের। এ ধারণা প্রেরণা দেছিল মােরে, বিবাহবন্ধনে বাঁধিতে লতির সনে বৈষ্ণবপ্রবর, স্বভাবনিৰ্ম্মলফুলসম এ যুবায়। মহাপ্রভুবংশলােপে পাই মর্মপীড়া, দেখিলাম এ যুবায় তার প্রতিচ্ছায়া, কায়া দান কৈতে তীব্র মনােবাদায় তাই-এর বংশরক্ষাসঙ্কল্প হইতে, এ বিবাহ সংঘটন, নাহি যার মূলে রূপজকামজ মােহ ; উদ্দেশ্য যাহার সৎপুত্রলাভ ; সৃষ্টি ভগবৎ-লীলা, সৃষ্টিরক্ষা তাই জানি তার অভিপ্রেত। সন্তানকামনা বিনা পত্নীসহবাস ভক্তির বিরােধী ; ভগবদিচ্ছা মানি’ সৃষ্টিরক্ষা তার, মাত্র সংপুত্রলাভ- তরে যােনসম্মেলন, দাম্পত্যজীবন।
চুড়ান্ত
[ দ্বিতীয় এ
ভক্তিমান্ এ যুবক হইত সন্ন্যাসী,
অঘটনঘটনায় যিনি পটীয়সী,
অচিন্ত্যস্বরূপ৷ সেই মহামায়া যদি
আমারই
মুখ দিয়া যুক্তি এইরূপ
নাহি শুনাতেন তারে। শৈশব অবধি
লতির শিক্ষায় আমি ছিনু অবহিত,
তুমি বেশ জান, তবে কেন ভেবে মর
জামাতার গোঁড়ামিতে ? তার প্রয়ােজন
বর্তমানে খুব আছে, স্নেচ্ছের আচার
সাজসজ্জা করে’ যবে সমাজের দ্বারে
দিতেছে নিয়ত হানা। দেখিতে না পাও?
বিহু, লতি, দেখিতেচ্ছ, নহে সাধারণ,
জামাতা অসাধারণ এতে দুঃখ কেন ?
বিজেতৃ-জাতির অনুকরণ সৰ্ব্বথা
অৰ্ত্তব্য, বিশেষত ভাষা-পরিচ্ছদে।
ইংরেজীশিক্ষার প্রচলন-অবসরে,
ভারতীয়জাতিলােপ নিশ্চিত যেমন,
তেমন অপর হেতু নহে, জানি স্থির।
জাতীয় শিক্ষার আগে ব্যবস্থা না করে,
নিরক্ষর, তাই উদরান্নসংস্থানের
উপায়বিহীন, অগণিত পল্লীবাসী
যারা, তাহাদের প্রাথমিক শিক্ষাতরে
২৫
এম দৃশ্য ]
চূড়ান্ত
কোন চেষ্টা না করিয়া, এ কি করিলাম?
রাজনীতিচচ্চ, তাও বিজাতীয় ভাবে!
স্বরূপের উপলব্ধি জীবনসন্ধ্যায়।
মাতা। ও কি কথা বল তুমি, মৰ্ম্মঘাতী কথা?
পিতা। আয়ুষ্কাল পরিমিত, সাফল্যে কার্যের
লােকে থাকে পাসরিয়া ; কারণ তাহার,
জীবনের পরিমাপ কৰ্ম্ম দিয়া হয়।
সাফল্যে সন্দেহ আনে নৈরাশ্য জীবনে।
লমা। কেন পুনঃ হেন কথা? এই না বলিলে,
লতিকা, বিদুষী, দুই নহে সাধারণ,
জামাই তদ্রুপ ? তবে কর্মে সাফল্যের
চিন্তা এত কেন? তিনতিন জীবনের
নিয়ামক যেই, তার নৈরাশ্য না সাজে ?
পিতা। ভক্তি আছে যার তার নৈরাশ্য কোথায় ?
নিরাশ আমি তো নহি ? গৌরাঙ্গচরণে
বহুক অচলা ভক্তি, এ প্রার্থনা মাের।
নিজে জানি’ তাঁর দাস, ফলাকা ত্যজি
যাবৎজীবন, কৰ্ম্ম করিব নিয়ত।
২য় দৃশ্য লতিকার গৃহ। গােস্বামী। বিদুষীদিদির পেয়ে স্পষ্ট পরিচয় অতীব স্তম্ভিত আমি, লজ্জিত ও বড়। যে কোন লােকের প্রতি বিদ্বেষ-পােষণ বৈষ্ণবের অনুচিত, এ ক্ষেত্রে বিশেষ। বিবাহের কালে পেয়ে ওঁর পরিচয়, উনি যে সামান্য নন বুঝিতে আমার হয় নাই কিছুমাত্র ব্যাজ : আকর্ষণ ওঁর প্রতি যথেষ্টই হয়েছিল মাের ; নৃত্যে মতি দেখে ওঁর সংবরিনু নিজে। পরে যবে শুনিলাম, রঙ্গালয়ে উনি নৃত্যপটু অভিনেত্রী, কি যে মর্মপীড়া ভুগিলাম, জেনাে তাহা বর্ণনা-অতীত। ওঁর সাহচর্যে তব বিপথগমন- সম্ভাবনা-চিন্তা হ’ল ইন্ধনম্বরূপ প্রজ্বলিত হুতাশনে। অবশ্যই জান, অতিপ্রিয় পাত্র যেবা তাহারই ত্রুটি লােকের অসহ্য অতি, ধৈৰ্য্যচ্যুতিহেতু। বিকারকারণ বর্তমানে বিচলিত
দ্বিতীয় দৃশ্য।
চূড়ান্ত
হওয়া নিঃসন্দেহ ধীরের লক্ষণ ;
এ ব্যাপারে বুঝিলাম, সে শিক্ষা আমার
এখনও হয় নাই। তব দোহাকার
ক্ষমাভিক্ষা সেই জন্য কর্তব্য আমার।
চাহিতে ক্ষমা তুমি করিবে আমায়,
ইহা হিন্দু আদর্শের নহে অগােচর।
বিদুষীদিদির কিন্তু দেখিয়া সে গুণ,
স্থান দিই রে আমি উচ্চ বৈষ্ণবের
আসনে। তাঁহার শিক্ষা, করি অনুমান,
তােমার যেমন, তব পিতৃদেব-স্থানে।
শিক্ষাদানপটুতার যােগ্যমানদানে
কৃপণ না হয়ে, আমি অবশ্য করিব
শিক্ষাগ্রহীত্ৰীরে মহাগৌরব প্রদান।
লতিকা। এই অবসরে তবে আমিও করিব,
তব জ্ঞেয় এক বড় সত্যের প্রকাশ
বাবার গৌরাঙ্গভক্তি পরিণতিলাভ
না কৈত যদি না সেই 'প্রেমের ঠাকুর
তােমা হেন শিক্ষাগুরু আনি’ মিলাই।
এ নহে আমার উক্তি, বাবা শতমুখে
প্রকাশ করেন তাহা। প্রথম দিবস
শুনে’ সবে তব মুখে চৈতন্যচরিতা-
মৃত-ব্যাখ্যা হয়েছি মুগ্ধ সাতিশয় ।
२
চুড়ান্ত
[দ্বিতীয় অৰু
গােস্বামী। কিন্তু আমি কত ভ্রান্ত ছিনু এতকাল।
রাসের রহস্য ব্যাখ্যা করি যথাতথা,
নৃত্যতত্ত্বনিরূপণে ছিনু উদাসীন।
তার ব্যাখ্যা করে’ দিদি কৈলা জ্ঞানদান।
লতিকা, আমায় তিনি করিবেন ক্ষমা,
করিবেন তিনি মােরে নৃত্যানন্দ দান?
লতিকা। সে তােমায় ভালােবাসে, তুমি বােঝ নাই ?
গােস্বামী। সে কি কথা? তব মুখে হেন অপবাদ
তার ? শােভা নাহি পায় শত্রুরও মুখে ?
লতিকা। ইহা যদি অপবাদ, স্তুতিবাদ কারে
বলে শুনি? নহে কি সে নারী-শিরােমণি ?
শরীরসম্বন্ধস্পৃহা করে পরিহার,
হেন ভালােবাসা হৃদে করিতে পােষণ
কে হয় সমৰ্থ বিনা বিদুষীসদৃশ
নারী? অসম্ভব যাহা তারও সম্ভাব্যতা
প্রমাণ করিতে শুধু সেই শক্তি ধরে।
তাহার প্রমাণ তুমি অবশ্য পেয়েছ
অদ্যকার নৃত্যতত্ত্বব্যাখ্যা-অবসরে।
তর্কশাস্ত্রে সুপণ্ডিত যে পিতা আমার
তঁাহাকে পরাস্ত করে এই ব্যাখ্যাবলে,
দুন্তীৰ্য তরঙ্গাকুল পরীক্ষাসাগরে
নিক্ষেপিল আপনায়-রঙ্গালয়ে নাচি
দ্বিতীয় দৃশ্য।
চূড়ান্ত
নৃত্যের আনন্দদানশক্তি বুঝাইতে।
বস্তুতঃ, উহার নাচ দেখিলে বুঝিবে
অপার্থিব ভাব তার, সমক্ষে যাহার
কলুষিত ভাব রহে মন্ত্রৌষধিমুগ্ধ
বীৰ্য্যহীন নতশির বিষধরসম।
আর এক কথা, ভালােবাসা বলিতেই
তার সঙ্গে শরীরের সম্বন্ধকল্পনা,
ভােমা হেন বৈষ্ণবের না হয় উচিত।
কয়েক তােমার জানি আছে সহােদরা,
তাহাদের সঙ্গে, বল, এক তুলাদণ্ডে
বিদুষীর পরিমাপ যদি কর তুমি,
হবে সে গুরুত্বে কম ?
গােস্বামী।
কখনই নয়।
স্নেহশীলা, ক্ষমাময়ী দিদি জানি তরে,
প্রাণ ভরে যায় তাঁরে দিদি সম্ভাষিতে।
জন্মি’ বৈষ্ণবকুলে, বৈষ্ণব স্বভাব
এমন আমার চখে পড়ে নাই আর ।
লতিকা। বিদুষী, আমার মতাে, তবে জেনাে স্থির,
দেখিয়া তােমার দোষ কষ্ট কভু নয় ;
নাচ তার দেখিবার অভিলাষ তব
অবশ্য পরিবে।
গােস্বামী।
চূড়ান্ত
[ দ্বিতীয়
কালবিলম্ব না সয়।
তুমি তারে মাের তরে কর অনুরােধ,
এ নহে বাঞ্ছিত মাের ; তােমার ইচ্ছায়
সকলই তাঁহার সাধ্য। চাহি পরীক্ষিতে,
তােমারই মতো তিনি আমায় দেখেন
কি না, দূরত্বের অপগমে, মাের সনে
ঘনিষ্ঠতা হইয়াছে কত। আশা করি,
বুঝেছ মরম মাের। সুযােগ বুঝিয়া
আমিই বিনীতভাবে জানাব প্রার্থনা,
স্থানকালবিনির্ণয় মাত্র তব কাজ।
৩য় দৃশ্য
বিদুষীদের বাড়ী বা লতিকাদের বাড়ীর এক পৃথক্ অংশ।
সত্যেন্। বসে বসে’ কত কাল কাটাইবি বল?
এক সঙ্গে বি-এ পাশ করে আমি, দেখ,
উকীলের ‘ধড়াচূড়া’ শােভে কাছারিতে,
বারলাইব্রেরীতে যে গাঁজাখােরি সব
গল্প হয় তাতে করি চিত্তবিনােদন,
তাম্রকূটধূম্রে হয় জীবাণু-সংহার ;-
বৈজ্ঞানিক “মার, মা” করিছে হুঙ্কার,
তৃতীয় বৃ]
চূড়ান্ত
বিজ্ঞানের ছাত্র হয়ে চুপ থাকা যায় ?
দূর্গন্ধের অসুবিধা আছে যদি বল,
বিধাতার অবিচার, বিজ্ঞান নাচার ;
পলার চূর্ণসার পেতে যদি চাও,
দুর্গন্ধের অসুবিধা স্বীকাৰ্য্য তােমার ।
ফেনিল, দেখনা, নিজে দুর্গন্ধ কেমন,
অথচ দুর্গন্ধনাশ তার মুখ্য কাজ!
বিজ্ঞান, বিজ্ঞান, অহো বিজ্ঞান-মহিমা।
সুষেণ। তুমি বক্তা, তুমি শ্রোতা, এ যদি নিয়ম,
আপত্তির মাের নাই কিছুমাত্র হেতু ;
নচেৎ বাক্যের জাল গুটাইয়া রেখে,
সােজাসুজি প্রকাশহ বক্তব্য তােমার।
সত্যেন্। সােজা কথা, কর্তব্য কি করেছিস্ স্থির ?
সুষেণ। আমি কি করিব ? কাকা, ভালাে যা বােঝেন,
তাহাই কৰ্তব্য মাের, এটা বেশ জান ?
সত্যে। এ কথায় আমি সায় দিতে নাহি পারি ;
কাকা যাহা করিবার করে চুকেছেন,
তার মুখাপেক্ষী থাকা এখন অন্যায়,
গলগ্রহ থাকা আত্মমর্যাদানাশক।
নিজের পায়ের পর দাড়াইতে শেখ,
তিনি যে খেয়ালী কত তাহা তো জানিস?
মােটাকে বিলাতে না পাঠাইয়া মাটা
৩২
চূড়ান্ত
[ দ্বিতীয় জয়
করিলেন একেবারে। যাক, তার বেশ
বিদ্যাবুদ্ধি নয় বলে’ বিলাতে পাঠাতে
রাজী না হওয়া আমি খুব অসঙ্গত
মনে করি নাই ; কিন্তু তােকে পাঠাইতে
আছিল কি দোষ?
সুষেণ।
তাহা তিনিই জানেন,
আমার সে বিচারের নাহি অধিকার।
তােমাদের শুধু দেখি বৈদেশিক ভাব।
শৈশব অবধি যার অন্নে পুষ্ট আমি,
সন্তানের অপেক্ষাও সমধিক স্নেহে
যিনি মােরে করিছেন নিয়ত পালন,
তাঁর গলগ্রহ আমি? একথা ভাবাই
আমি পাপ মনে করি, কেন না, জানিলে
হেন মনােভাব তিনি, দুঃখিত হবেন ;
তাঁর মনে পীড়াদান পাপের সামিল।
ইংরেজীপড়ার ভূতে পায় যে মােদেরে,
তােমায় দূষিলে এতে নাহি কোন ফল।
যদিও নিজেই কাকা গেছেন বিলাত,
এখন বিলাতযাত্রা দূষ্য তাঁর কাছে,
তোমার পিতার ভাব হুবহু যেমন।
সত্যেন্। কি বলিস? চোরে চোরে মাসতুত ভাই ?
বাবাকে, কাকাকে তাের এক ভূতে পেল
তৃতীয় দৃশ্য ]
চূড়ান্ত
তবে? বাবাকে তো “বৃদ্ধবেশ্য! তপস্বিনী,
জানিতাম, তাের কাকা তলেতলে তাঁর
সঙ্গে মিলিলেন কবে ? চিন্তার বিষয়।
সুষেণ। কটু-উক্তি গুরুজনপ্রতি অসঙ্গত।
এ ব্যাপারে মিলনের নাহি প্রয়ােজন ;
নূতন হাওয়া এক বহিছে দেখনা ?
বিলাত হইতে যারা ফিরেছেন আগে,
তাহাদের অধিকাংশ বিলাতযাত্রার
আদৌ পক্ষপাতী নন। কারণ বিস্তর।
সত্যেন্। আমি জানিতাম উগ্র খেয়ালী বাবাকে।
তাের কাকা অনুরূপ খেয়ালে চলেন,
এটা (সত্য বলিতে কি ?) নাহি জানা ছিল।
বিদুষীর বিয়ে বন্ধ এ খেয়ালে বুঝি ?
সুষেণ। বলিতে পারি না ভাই। মাের মনে হয়,
আমাদের হীনাবস্থা দেখে যােগ্য কেহ
রাজী নয় বিদুষীরে বিবাহ করিতে।
সত্যেন্। বিলাত হইতে যারা প্রত্যাগত হন,
অর্থনীতি চচ্চা করে’, উহাদের এই
ভাব নহে অসম্ভব, কিন্তু বিদুষীর
বিয়ে বন্ধ এ কারণে, বিশ্বাস না হয়।
বাঙ্গালীযুবকবৃন্দে গুণগ্রাহী নাই ?
সুষেণ। অর্থ বিনা গুণগ্রাম অচল এখন,
৩৪
?
চূড়ান্ত
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
হিন্দুসমাজেই নহে, বিলাতীপ্রথায়
যারা আস্থাবান্ তাহাদের অভ্যন্তরে।
সত্যেন্। কি আশ্চর্য! কোন্ দলে ফেলি আমায় ?
সুযেণ। শেষ দলে।
সত্যেন।
বেশ, আমি যদি রাজী হই
বিদুরই জন্য তাকে বিবাহ করিতে ?
সুযেণ। ঠাট্টা কেন ভাই ? যেই বিহু আশৈশব
পর-অন্নে পুষ্ট, পর-অর্থেই শিগিতা,
তাকে তুমি পত্নীরূপে করিবে গ্রহণ ?
সত্যেন্। ঠাট্টা মােটে নয়, লিখে প্রতিশ্রুতি দিতে
এখনই প্রস্তুত।
সুযেণ।
তবে কাকাকে জানাব ?
সত্যে। বােকার মতন কথা না বলি ভাই,
তিনিই যে বিদুষীর বিবাহবিরােধী
নন, কে বলিতে পারে ?
সুযেণ।
না, না, অসম্ভব।
সত্যেন্। কল্পনাবিমানচারী, আর যে খেয়ালী,
একশ্রেণীভুক্ত; তাের কাক। ও মহাত্মা
সমান সমান।
সুযেণ।
কিন্তু কাকা এত বড়
হইতে না পারিতেন তবে। আমাদের
একমাত্র হিতাকাঙ্ক্ষী হয়ে, বিদুষীর
তৃতীয় দৃশ্য ]
চূড়ান্ত
বিবাহব্যাপারে তার ঔদাসীন্য
অতি অশােভন। আমাদের অর্থাভাব
বিদুষীর বিবাহের মাত্র অন্তরায়।
সত্যেন্। তাই যদি, ওর শিক্ষিকার শ্লাঘ্য কাজ
করাই সঙ্গত?
সুষেণ।
কাকা তাহাতে নারাজ।
সত্যেন্। কেন ?
সুষেণ।
তার মতে, প্রথমতঃ, মেয়েদের
অর্থাৰ্জন এক অতি-বিজাতীয় ভাব ;
দ্বিতীয়ত, বর্তমান শিক্ষাপ্রণালীর
সংস্কার ব্যতীত, বিদুষীর এই কাজ,
সামাজিক ব্যবস্থায় নহে নিরাপ।
সত্যেন্। কাকা তাের অদ্বিতীয় আদর্শপূজক।
নিন্দা নাহি করি, সমাজের বর্তমান
অবস্থার প্রতিদারিদ্র্যের প্রতি খুব
দৃষ্টি রেখে’, ইহাদের আদর্শকে আমি
সমাজকল্যাণকর ভাবিতে না পারি।
সুযেণ। যাক, তার গুণাগুণ বিচারের নহে
এ সময়, আমাদের সাজেওনা তাহা।
তিনি যাই হন, যদি তুমি বিদুষীরে
বিবাহ করিতে চাও, খুশীই হবেন,
এতে সন্দেহের নাহি মাত্র অবসর।
চূড়ান্ত
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
সত্যেন্। তবে তাঁর মত নিতে চেয়েছিলি কেন?
আমি তো এখানে মাঝে মাঝে এসে থাকি,
বিদুর সহিত মাের মেলামেশা, আর
ওর সঙ্গে আলাপের সুযােগসুবিধা
হয়, তার বন্দোবস্ত হইলেই মাের।
বুঝে নিব ভিতরের অবস্থা কেমন,
অর্থাৎ বিবাহে ওর মত আছে কি না।
তারপর সকলের অভিমত জানা
সহজেই হবে। বর হিসাবে আমাতে
অপছন্দ করিবার এমন কি আছে ?
সুষেণ। তাই হবে, মা ও শুনে খুশীই হবেন।
সত্যেন্। বিশেষ একটা কথা বলিবার আছে।
ক্লাশে মাের। অনেকেই বন্ধুভাবে থাকি
( ছাত্রজীবনের এই
মধুর
আস্বাদ
পায় লােকে জীবনের মিষ্টান্নভাণ্ডারে ? ),
পড়া ছেড়ে ভুলে যাই এ স্নেহবন্ধন।
যদি না এমন হত, কন্যাদায়গ্রস্ত
মমাদের সমাজে যদি আমার মতন,
দলেদলে যুবকেরা, কপর্দকপ্রাপ্তি-
মাত্র আশা না করিয়া, বাঞ্ছিত পাত্রীর
করিত সন্ধান বন্ধুদের পরিবারে,
সযত্নে, সাগ্রহে, এই গুরু সমস্যার
তৃতীয় দৃশ্য ]
চূড়ান্ত
সমাধান অবিলম্বে হইত সরল।
আমার এ উক্তি আত্মশ্লাঘা না ভাবিস,
সম্বন্ধনির্ণয়ে এটা বিচার্য বিষয়।
সুষেণ। হিন্দুরা মােদেরে মােটে ভাবেন আপন ;
যাহা কিছু করি মােরা হিতকামনায়
তাহাদের, তার মূল্য মাত্র ততটুকু
দেয় তারা, ইংরেজের দরদ যতট।
ভারতের হিতে পায়, তার বেশী নয়।
সত্যেন্। তােরাও তাদের চিত্ত কৈতে আকর্ষণ
হয়েছিস্ অপারগ ? আশ্চৰ্য্য সংবাদ !
সুষেণ। কেন না হইব? বিদুষীকে ধরা যা’
উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থল, কেন না, তাহার
তুল্য হিঁদুয়ানি চাল কাকারও নাই ;
সব নষ্ট তার এক দোষে-নৃত্যে মতি
ওর শুধু নয় রঙ্গমঞ্চে আবির্ভাবে।
নিষ্কাম রাসের নৃত্য এই সূক্ষ্মতত্ত্ব
লােকে বুঝাইতে ওর এই দুঃসাহস,
হতভম্ব হইয়াছি আমি তো দেখিয়া !
কাকার সম্মতি আছে তাই নিরুপায়।
স্ত্রীশিক্ষা যা প্রচলিত, হিন্দুকল্পনায়
বিসদৃশ তাহা, রঙ্গমঞ্চে মেয়েদের
নাচ, মৰ্ম্মঘাতী এক বীভৎস ব্যাপার।
৩৮
চূড়ান্ত
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
সত্যেন্। শুনি, গােস্বামীও এবে মেতেছে ইহাতে ?
সুষেণ। গােস্বামীর রাসরস ইহাতে যে আছে,
গােপনে আস্বাদ তার হয় সে রসের।
সাধারণ্যে সে রসের প্রচার তাহার
অভিপ্রেত, ইহ। বলা, আর নিন্দা করা
তার, তুল্য মনে করি। সমাজসংস্কারে
ব্রাহ্মেরাই বাড়াবাড়ি দেখায় প্রথমে,
এখন মহাত্মা-আদি সে পথেই যান।
কাকাকে ও এই দোষে দোষী মনে করি,
যেহেতু বিদুরে তিনি বাধা নাহি দেন।
সােয়ামী বিবেকানন্দ, সেই লােকোত্তর
ক্ষণজন্মা দেশভক্ত জন, দেখাইলা
যেই পথ, এরা যা’ন করে’ পরিহার ;
ইহাদের সাহসেরে বলিহারি যাই।
সত্যেন্। ফিরা’ব বিদুর গতি, ফিরা’ব নিশ্চয়,
আমার প্রণয়ে যদি সে আবদ্ধ হয়।
তাের প্রতি উদাসীন না ছিলাম কভু,
বেকার অবস্থা দেখে এবে চিন্তান্বিত।
বল্ ভাই কি করিবি, কিছু স্থির হল ?
সুষেণ। কাকা বলেছেন, দার্জিলিঙে বাছাবাছা
খরিদ্দার ঠিক করে’, বড় রকমের
একটা দোকান, ওর ঠিক্ কেন্দ্রস্থলে
তৃতীয় দৃশ্য।
চুড়ান্ত
স্থাপন করিতে চেষ্টা চলিতেছে তার।
বাণিজ্যব্যাপারে খাটি অভিজ্ঞতালাভ
যেমন করিলে হয়, তঅনুরূপ
শিক্ষাদানে অবহিত সৰ্ব্বদাই তিনি।
ক’বছর নানাস্থানে পর্যটন মাের
নিশ্চয় করেছ লক্ষ্য। বুকিপিং ছাড়া
এ বিষয়ে অন্যবিধ বইও পড়েছি।
সত্যেন্। এ বড় চমৎকার কথা শুনাইলি।
আমার মাথায় এই খেয়াল আসিলে
ওকালতি ঝকমারি করিতে কি যাই ?
ভূতলে কাকার তাের ভাব নেমে আসে,
সুউচ্চে উড্ডীয়মান পতত্রীর প্রায়,
খাদ্য-আহরণে হয় যথা প্রয়ােজন।
সুষেণ। এতদিনে এই জ্ঞান হইল তোমার ?
সত্যেন্। ভেবে দেখ, আলাতন হয়েছি বড়ই
অনুরূপ ভাব দেখে বাবার আমার,
সেহেতু ( স্বীকার করি) তাের কাকা, সম
বিদ্বেষের পাত্র হয়ে আছেন হৃদয়ে,
আমি খুব ভালো চখে দেখি নাই তঁারে ?
বস্তুত, বিদুর জন্য মাের প্রাণ কঁাদে,
এমন শিক্ষিত গুণবতী মেয়ে হয়ে,
সে কি না অবিবাহিত। এ ভরাযৌবনে ?
৪০
চূড়ান্ত
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
এ ধারণা এ পর্যন্ত আছিল আমার,
শুধু তাের কাকা দোষী, বিদু নিজে নয়,
কেন না, স্বদেশী অতি সকল বিষয়ে
স্বদেশী হওয়া তার বিবাহ বিষয়ে
স্বভাবসঙ্গত। শুধু নিজে বিদ্যাবতী
বলে’ নয়, বিজাতীয়শিক্ষাপ্রাপ্ত কেহ,
ভেক্ষীবাজি দেখাইয়া করিবে হরণ
ওর মন, অসম্ভব ইহা। যা বলিলি
তাহাই সঙ্গত বলে মনে হয় এবে।
সুযেণ। কিছু খাৰি ভাই ? বিহু, শীঘ্র আয় হেথা।
( প্রবেশ করিয়া )
বিদুষী। কেন দাদা? (সত্যেকে দেখিয়া )
আপনি যে, ভালাে তাে সবাই?
কাকা বাবু, ছেলেপীলে? কাকী মা কেমন?
এখন তােত কাকা বাবু, শুনেছি, তঁাহার
মনস্তুষ্টিসাধনেই সতত তৎপর।
সুষেণ। বিহু, সেই জিনিষ্টা শীঘ্র করে’ আন্।
ওরা পুডিং কেক খায়, জিহ্বার উন্নতি
হবারই কথা, তবু এটা চেখে যাক।
গরীব আমরা ভালােবেসে যাহা দিব,
ভালাে না হলেও ওর ভালােই লাগিবে।
কেমন না, ভাই ? ওকি, জবাব বন্ধ যে ?
৪।
তৃতীয় দৃশ্য
চূড়ান্ত
সত্যেন্। মিষ্টি করে’ গাল দিতে শিখেছি বেশ,
বিদুরই কাছে তাের এ বিদ্যাটা শেখা।
বিদুষী। আপনি যে ঠেস্ বড় করিলেন ফঁাকে,
জবাব তাহার আমি ফিরে এসে দিব,
চ করে তৈরী করে নে’ আসি খাবার।
( প্রস্থান)
সত্যেন্। (স্বগত) সেই আগেকার মতো,—নিৰ্ম্মল সলিল,
নিঝরিণীসমুদগত, ধরণীর তলে
প্রবাহের হেতু নাই মাত্র আবিলতা।
সমল-অঞ্জলি নহে যােগ্য এর পানে।
নরপশু পরিণয়ে হতে পারে দেব,
এ সত্য-আভাস প্রাণ পরশিছে আজ।
সুষেণ। এরূপ তো বহুকাল দেখিয়াছ তুমি,
এখন ধেয়ানে মত্ত হলে কি কারণ?
সত্যেন্। (একটু চমকিয়া উঠিয়া )
সত্যি ভাই, ব্যথা পাই তােমার কথায়।
তােমাদের তুল্য আমি দেশভক্ত নই,
একথা স্বীকাৰ্য্য, কিন্তু বাবা, সবে জানে,
তােমার কাকার কাছে স্বাদেশিকতায়
কম নন। ইচ্ছায় কি অনিচ্ছায় আমি,
তাহার মতেই এবে অভ্যস্ত চলিতে।
তিনি সব ছেড়েছুড়ে, যদিও তােমার
৪২
চূড়ান্ত
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
কাকার সদৃশ নন, বহুলাংশে তাই ;
তবে কেন দোষী আমি বিদেশী আহারে ?
আহারে ও পরিচ্ছদে বিদেশী হইলে,
শত চেষ্টাতে ও লােক স্বদেশী না হয়।
এটুকু সুশিক্ষা আমি পেয়েছি বাবার
কাছে, বর্তমান গোঁড়ামিতে তাঁর আমি
যদিও সম্পূর্ণরূপে সায় দিতে নারি।
আর এক কথা তুমি রাখিও স্মরণে,
আচারে ও ব্যবহারে তােমাদের মতাে
অনেকাংশে না হইয়া, বিদুষীর পাণি
প্রার্থনা করিনি।
( প্রবেশ করিয়া খাবার রেকাব রাখিয়া)
বিদুষী।
পানিপান আগে তবে
করুন এখন। চার আশা এ বাড়ীতে
কিন্তু ঠ ঠন ; জানা আছে আপনার।
অনুমতি পাইব কি বসিতে এবার,
দু’জন ব্যাপৃত বুঝি গুপ্তমন্ত্রণায় ?
সুষেণ। নে, নে, স্থির হয়ে বস্। বড়ই চালাক,
আড়ি পেতে কথা শুনে, এখন চালাকী।
বিদুষী। দাদা, ঘরে ঢুকিতে কি কাণে তুলা দিয়া
বন্ধ করে’ আসা আছে কোন দেশে রীতি?
বাড়ীতে জুতা ও পায়ে থাকে না আমার
যার শব্দে জানাইবে আমার প্রবেশ।
তৃতীয় দৃশ্য ]
৪৩
।
চূড়ান্ত
সুষেণ। তুই এবে কথা রেখে, অতিথির সেবা
সুস্থির হইয়া কর ; দেখ, ও হাঁ করে’
গিলিতেছে তাের কথা। (সত্যেনের প্রতি)
খাওনা যে বড় ?
সত্যেন্। (একটু লজ্জিত হইয়া) এই খাচ্ছি, (খাবার মুখে দিয়াই )
কি সুন্দর, সুন্দর খাবার।
এমন খাবার ছেড়ে কুরুচির দাস
আমরা কি খাই ? সাধে হিন্দু রমণীরা
স্বামীর সেবার তরে রন্ধনবিদ্যার
চর্চা বড় কর্তব্যের মধ্যে গণ্য করে ?
স্বামিসেবা তরে শুধু? সন্তানসন্ততি-
মুখে স্বীয়হস্তপক-অন্ন তুলে দিতে,
আছে কি এমন মা যে সাধ নাহি করে ?
বিদুষী। সত্যেন্ দা, আপনার প্রাকৃটি জমেছে ?
বক্তৃতা তাে আপনার বেশ আসে দেখি ?
সত্যে। (স্বগত) প্রথম দিনের খেলা, লাভ মন্দ নয়,
আর বেশী না খেলাই ভালাে, সরে পড়ি।
( প্রকাশ্যে ) আজ তবে আসি, সুষি, বিন্দু, নমস্কার ।
বিদুষী। (করযোড়ে প্রতিনমস্কার জানাইয়া )
আপনার ঠেস্ ছিল, মিষ্টি গাল দিই,
কবে ও কোথায় এই সৌভাগ্য-সম্ভোগ
হইয়াছে আপনার?
৪৪ চূড়ান্ত [ দ্বিতীয় অঙ্ক সত্যেন্। আমার হলে তো বৰ্ত্তে যাইতাম। শুনি মঞ্জরীর মুখে, এ গুণের প্রভাবেই তুমি নৃত্যগীত- শিক্ষাদান-অভিনয়সংসৃষ্টব্যাপারে করিয়াছ সকলের চিত্ত আকর্ষণ। (গমনােদ্যত ) ( বিদুষীর মায়ের প্রবেশ) বি-মাতা। চলিলে যে ? ও বাড়ীতে গেছিলাম আমি। সতত্যন্। বসেছি অনেকক্ষণ, আজ যাই, শীঘ্র পুনঃ এসে আপনার কথা শােনা যাবে। বিদুর হাতের তৈরী সুমিষ্ট খাবার পর্যন্ত হয়েছে আজ। বি-মাতা। তােমাদের মুখে ওসব কি ভালাে লাগে ? সত্যেন্। (প্রস্থান করিতে করিতে) বদনাম শুধু আমাদের। আপনারা যা মােরা তাহাই। বাবার কথা তো সব জানেন আপনি? বি-মাতা। তা বটে, তেমন হও আশীর্বাদ করি, ভগবান না করিলে হয় না কিছুই, ভগবানে ভক্তি রেখাে, আর যাই কর। ( সতত্যনের প্রস্থান )
৪৫
চতুর্থ দৃশ্য ]
চূড়ান্ত
(স্বগত) যদিই বাপের মতো মতিগতি হয় ?
সুষেণকে বরাবরই ও ভালােবাসে,
সেই সঙ্গে বিদুষীরে। সে ভালােবাসার
অর্থ অন্য। কিন্তু আজ বিদুষীর তৈরী
খাবারের স্তুতি কেন ? আশার কুহক,
হায়, এ কি ! ঠাকুর পো বিদুষীর বিয়ে
নিয়ে কথাটি না কন ; আমি কি এমন
কথা মনে দিব স্থান? না, না, ভগবান্,
আশা-আকাঙ্ক্ষার পারে নিয়ে যাও মােরে।
( প্রকাশ্যে ) কি কথা তােদের হ’ল সত্যেনের সাথে ?
সুষেণ। কাজের অনেক কথা, বলিব এখন।
৪র্থ দৃশ্য
বাগান বাড়ী।
গােস্বামী।
বিদুষী।
এ বাগানে তােমাদের ফুল তােলা বুঝি
নিষিদ্ধ, নহিলে কেন
তুমি লতিকারে
প্রাণভরে’ সাজাইতে না পাইছ ফুল ?
কেন হে গোঁসাই ? নিত্য ঘরে বসে ফুল
৪৬ চূড়ান্ত [ দ্বিতীয় অঙ্ক যথেষ্টই পাও তুমি, মালী তা যােগায়, এ খবর রাখি আমি। তার সবটাই ‘প্রেমের ঠাকুর’ তব নাহি পান জানি; লতিকা রচিয়৷ চারু বিনােদিয়া মালা। পরায় তােমার গলে, তুমিও কনক- চাপা কবরীতে তার সােহাগের ভরে গুজে দাও; সত্য কিনা, বল, এ সংবাদ ? গােস্বামী। আপনার পাদপূজা করিতে সুযােগ ঘটে যদি হেন তবে উপেক্ষা তাহার আমার কর্তব্য নয়, তাহা ও জানেন ? বিদুষী। আমরা তুলিনা ফুল বিনা প্রয়ােজনে, ফুল সখী আমাদের, কেন দিব ব্যথা? গােস্বামী। গােস্বামী বিজয়কৃষ্ণ বলিতেন জানি, গাছের পাতাটি ছেড়া বিনা প্রয়ােজনে হয় উচিত। ধন্য, ধন্য শিক্ষা তাঁর। বিদুষী। শাকের ডগাটি ছেড়া খাদ্যপ্রয়ােজনে নিজ হাতে অসম্ভব এবে দেখি আমি দুরবল চিত্ত বড় করি অনুমান। গােস্বামী। যথার্থ বৈষ্ণব ধন্য, ধন্য আপনারা, করে’ এ সংসর্গ লাভ ধন্য আমি নিজে। বিনা ফুলে পূজা মাের করুন গ্রহণ। (করযােড়ে প্রণাম করন )
৪৭
চতুর্থ দৃশ্য ]
চূড়ান্ত
বিদুষী। আচ্ছা, বল দেখি, যদি লতি না থাকিত,
স্বচ্ছন্দতা মাের সনে এ হেন ভ্রমণে
অনুভব করিতে কি, যেমন করিছ
এবে ?
গােস্বামী। বড় শক্ত প্রশ্ন, যথার্থ উত্তর,
আপনার মনঃপূত না হইতে পারে।
পত্নন্তর নারীসনে একান্তে মিলন,
আমার ধারণা দৃঢ়, সদা অসঙ্গত।
বিকারসঞ্চারসম্ভাবনা মাের মনে
হলেও, এ মিলন জনসাধারণ
ভালো চখে নাহি দেখে, দুষ্য ভাবে সদ।
বিদুষী। সত্য কথা। অনুন্নত মানবসমাজ
নৈতিক জগতে, ইহা করে অস্বীকার
শুধু সেই যার আত্মচিন্তামাত্র নাই।
নিজের দৌর্বল্য দেখে প্রতি পদক্ষেপে,
সমাজের দুরবস্থা করি অন্যমান।
নিত্য বলভিক্ষা তাই গৌরাঙ্গচরণে
চলিতে সুপথে, দেখে মাের আচরণ,
দুৰ্বলসমাজ যেন পেতে পারে বল।
৫ম দৃশ্য
বাগানবাড়ীর খাস্ কামরা
( তিনজনই বিশ্রামের জন্য উপবিষ্ট হইলে )
গােস্বামী। সে দিন তো বাদিপক্ষে ওকালতি করা
ছিল আপনার কাজ, প্রতিবাদী মাের
আত্মপক্ষসমর্থন ছিল অসম্ভব ;
কথাটিও বলিবার দেননি সুযােগ,
যদি তার কিছুমাত্র ছিল প্রয়ােজন ;
আসলে আপসে মাের। সব মিটমাট
পূর্বাহেই করেছি, আপনি হলেন
মাত্র মিষ্টান্নের ভাগী ; এ সব ব্যাপারে,
মিষ্টান্নভােজের প্রথা আছে আমাদের।
এখন কথাটা, দিদি হইতেছে এই
মিষ্টান্ন খাইয়ে শুধু আমার দোষের
হয় না ক্ষালন, যদি নাহি অকপটে,
আপনার কাছে, মৃত্যবিষয়ে আমার
যে ভ্রান্ত ধারণা ছিল, অপনীত প্রায়,
একথা স্বীকার করি।
চাক্ষুষ প্রমাণ
মাত্র কিছু আবশ্যক; অনুগ্রহ করে’
নৃত্যানন্দদানে মােরে কৃতার্থ করুন।
৪৯
পৃঞ্চম দৃশ্য ]
চূড়ান্ত
বিদুষী। অবাক্ করিলে তুমি বৈষ্ণবপ্রবর !
হেন অপকৰ্ম্ম, যার লাগি' মােরে ছাড়ি
( নিশ্চিত ধারণা মাের ), লতিকার পাণি-
গ্রহণ করিলে, তুমি প্রত্যক্ষ করিবে?
আমি বা প্রার্থনা মাত্র কেন হব রাজী ?
ভাগ্যিস্ লতিকা মোর প্রাণপ্রিয় সখী,
তার ভাগ্যে ভাগ্যবর্তী নিজে সদা জানি,
নহিলে হিংসায় মোর জ্বলে যেত দেহ,
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার নাহি হ’ত প্রয়ােজন।
হা ধিক্ অদৃষ্ট মাের, কুগ্রহের ফেরে,
বারেক এমন বরলাভসম্ভাবনা
না ভাবিয়া মতি হল নৃত্য শিখিবারে ।
কালসর্প শিশু শিখা, রুচির তিলক,
কস্তুকণ্ঠঅবরােধী তুলসীর মালা
করেন ধারণ, হেন দিব্য পতিলাভ
পােছা বিধি মাের ভাগ্যে তাই না লিখিলা।
সাপুড়ের বাহাদুরি দেখাতে যে ফণী
কণ্ঠে ধরিলাম, সেই দংশিল যে মোরে।
লোকে বলে, ও একটা বরধরা ফাদ
মেয়েদের গান আর নৃত্যকলা শেখ।
তােমায় ধরিতে নারি’ সেই ফাদ পেতে,
বিয়ে না করিব এই পণ নাকি মাের।
চূড়ান্ত
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
গােস্বামী। লােকের মুখেই বিষ, প্রচলিত কথা,
তাতে কিবা এসে যায় ভবতীসদৃশী
তেজস্বিনী মহিলার ? লােক নিন্দা গ্রাহ
করা, আর ভালাে কিছু করা, এই দেশে
একসঙ্গে অসম্ভব। কেন দুঃখ পান?
বিদুষী। বড়ই দুঃখিত আমি, ইহাই বুঝিলে?
নাচিতে লােকের কাছে হয়েছি কাতর ?
বেড়েছে বৈ ক্ষুত্তি মাের কমেছে কখন ?
সত্যের প্রচারে আমি হব পরাজুখ?
নৃত্যতত্ত্বব্যাখ্যা শুনে কিবা মনে হয় ?
গগাস্বামী। যত শুনি সেই ব্যাখ্যা তত মিঠা লাগে,
তাতে ভ্রান্তি হল দূর, হল জ্ঞানলাভ।
আনন্দের পরকাশ নৃত্যরূপ ধরে,
এ নহে নূতন কথা ; আনন্দে ও সুখে
ভেদ নাহি জানে লােকে ; ব্যাখ্যা আপনার
সুস্পষ্ট করিয়া তাহা সাধিল কল্যাণ।
অ-রতি আনন্দ দেয়, রতি মাত্র সুখ,
অবসাদ আর দুঃখ যার পরিণাম
রতিশক্তি বর্তমানে, ভােগ্যসন্নিধানে,
ভােগস্পােত্যাগ করে ভূমানন্দ দান ;
সে আনন্দ হতে হয় রাসের উদ্ভব
অতি অভিনব মানি এ ব্যাখ্যা রাসের।
পঞ্চম দৃশ্য ] চূড়ান্ত আমার ব্যাখ্যায় ছিল দেখাতে প্রয়াস, শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলা কামগন্ধহীন, ভগবল্লীলায় শুধু তাহার সম্ভব। আপনার ব্যখ্যা হ’তে এ তত্ত্ব শিখি, ভগবৎরলীলা লােকশিক্ষাহেতু মানবসমাজ নৃত্যে রাসের আস্বাদ পাইতে সমর্থ হয় হলে কামজিৎ ; পবিত্র দাম্পত্যপ্রেম হলে প্রতিষ্ঠিত, অর্থাৎ দাম্পত্যপ্রেম বিবর্জিতকাম, মানব মিথুনে দেয় নৃত্যের প্রেরণা। আর আর সারগর্ভ কথা আপনার দুঃখের সহনশক্তি আনন্দপ্রসব, যেহেতু দুঃখ ও হয় বিধাতৃবিধান ; পাপকৰ্ম্মফলভােগ দুঃখ নাম যার, সে কর্মের ক্ষয় ভােগে, দুঃখ কিবা তায়? জলক্রীড়ানৃত্য-আদি রহস্যের লীলা, কামজয়ে শক্তি দেয় প্রেমিকাপ্রেমিকে, অন্যথা উদ্দাম লীলা কামের কেবল। ধন্য ব্যাখ্যা আপনার, ধন্য আমি শ্রোতা। আমার পিপাসাশাস্তি করুন এখন? বিদুষী। সৰ্ত্ত তার চাই এক অতীব কঠিন- জানি, লতি বর্তমানে, কামের লালসা চূড়ান্ত [ দ্বিতীয় অঙ্ক তােমার আমার প্রতি অতি অসম্ভব ; নৈলে, করিবেনা কলুষিত দৃষ্টিপাত নৃত্যলীলায়িত কোন নগ্ন অঙ্গ প্রতি, এ প্রতিজ্ঞা কৈতে হত ধৰ্ম্ম সাক্ষী করে। এবে শুধু কর মােরে এই বাক্য দান- কথঞ্চিৎ নৃত্যশিক্ষা হলে তােমাদের ( শিক্ষাগুরু অবশ্যই হব আমি নিজে ), যুগলে করিবে নৃত্য আমার সকাশে ; পরীক্ষাগ্রহণ মাত্র মাের লক্ষ্য নয়, দেখে তৃপ্তিলাভ গুরুদক্ষিণা হইবে। গােস্বামী। করিলাম অঙ্গীকার এ কঠিন পণ । বিদুষী। (নূপুর পরিয়া) সাবধান গােস্বামিজী, মুণ্ড নাহি ঘােরে । নৃত্যকালে মােরে জেনাে কায়াজ্ঞানহীন, বিদুষীর ছায়া, কিংবা চিত্রাপিত রূপ। মাতৃমূর্তি, ইষ্টদেবে করহ স্মরণ। (ধ্যানস্থ হওয়া ) (ধ্যানভঙ্গে) মূকং করােতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিং। যৎকৃপা তমহং বন্দে পরমানন্দমাধবম । আনন্দের স্রোতে মােরে দাও ভাসাইয়া।
পঞ্চম দৃশ্য ]
চূড়ান্ত
৫৩
( নৃত্যসহকৃত গান )
আনন্দ, আনন্দ, পরম আনন্দ,
চিন্ময় সুন্দর,
রাসরসিক বর,
হৃদিবৃন্দাবনধামে।
কোয়েলের, দোয়েলের কলকণ্ঠে বসি’,
ময়ূরের পেকমের শিহরণে পশি,
আছি প্রাণে, আছ গানে,
আছ, আছ তালেমানে ॥
( গান ও নৃত্য অন্তে )
ও কি ও গোঁসাই, তব কি রকম ধ্যান ?
পলকবিহীন আঁখি, নহে তাে স্তিমিত ?
গােস্বামী। (দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া)
কি আনন্দ! আগে দেখি, ইন্দ্রের সভায়
অপ্সরার নৃত্য গীতবাদ্যসহকারে ;
শেষে দেখি, রাসেশ্বর রাসেশ্বরীসনে
রাসলীলারসে মত্ত ! স্বপ্ন ? জাগরণ ?
স্থলে আছি, কিংবা শূন্যে, কিছু স্থির নয়।
দিদি, ও কি? না, না। কোথা লতিকা আমার,
সেবাপরায়ণা সতি, ধরলো আমায়,
দেহটা অবশ বড়, ধর, ধর, ধর।
লতিকা। প্রাণেশ্বর, স্থির হও, ধরে আছি আমি।
[ তৃতীয় অঙ্ক
চুড়ান্ত
গােস্বামী। রঙ্গালয়ে পাই নাই যে রসের স্বাদ,
রাধাকৃষ্ণভূমিকার পটু অভিনয়ে,
কিবা যাদুবলে দিদি পিয়াইলা তাহা ?
লতিকা, এ হেন নৃত্য পারিবে শিখিতে?
লতিকা। তব সেবা অনুরােধে, তব আশীর্বাদে,
অবশ্য পারিব, সখী হইলে সহায়।
৩য় অঙ্ক
১ম দৃশ্য
বাগান বাড়ীর খাস কামরায় লতিকার
মাতাপিতা উপবিষ্ট
ল-মাতা। বাগানের পরিকল্পনার সার্থকতা।
এত দিনে হল বলে মনে হয় মাের।
আমি তাে তােমার সাধ পূরাতে নারি,
নৃত্যশিক্ষা জামাইর আর লতিকার
হইতেছে এইখানে বিদুষীর কাছে।
ল-পিতা। সত্য কথা বলিতে কি? ইহা বাড়াবাড়ি
বড় মনে হয় মাের ; যে কোন বিষয়ে
অতি বাড় কোন কালে ফলপ্রদ নয়।
প্রথম দৃশ্য ]
চূড়ান্ত
বিদুষীরে গােড়াতেই সাবধান করি
এই বলে’, কবীন্দ্রের পথানুসরণ
সব কাজে সমভাবে হবে অসঙ্গত ;
তত্ত্বের হিসাবে নৃত্য যদি ও নির্দোষ,
স্ত্রীপুরুষ মিলে’ নাচ লােকের গােচরে
সেরূপ অনিষ্টকর, যৌনসম্মিলন
যথা ; রহস্যের লীলা এ দুই ব্যাপার ।
অভিনেত্রীদের দলে পুরুষ প্রবেশ
নিষিদ্ধ হইল তাই, যদি ও মঞ্জরী
আর তার স্বামী বড় আছিল বিরােধী।
বিদুষীর কাছে নৃত্যশিক্ষা লতিকার,
অসঙ্গত না হইত, যদি তার স্বামী
বৈষ্ণব না হত গোঁড়া, গােপনে পত্নীর
সহ নৃত্যে তার স্বতঃ আগ্রহ থাকিত।
বিদুষীর তর্কশক্তি আছে বিলক্ষণ,
তাহাতেই পরাভূত হয়েছে জামাই,
কিংবা বিদুষীর চাল আছে এতে কিছু ।
নীতির পিচ্ছিল পথ কেবা নাহি জানে?
দু’য়ের উপরে পূর্ণ যৌবনাধিকার।
বড় চিন্তান্বিত আমি হনু এ সংবাদে।
তােমরা তাে জামতায় কন্যাপদানত
দেখিলেই আটখানা আহলাদেতে হও,
চূড়ান্ত
[ তৃতীয় অঙ্ক
আমি চাই স্বামী হয় সত্যকার স্বামী।
ল-মাতা। কোন চিন্তা নাই, আমি পরীক্ষা করেছি,
উভয়ের চরিত্রের বল খুব বেশী
বিদুষীর, ভেবে দেখ, সাহস দুর্জয় ;
আসলে ও ভগবানে বড় ভক্তিমতী।
এক দিন ও আমায় বলেছে এবার,
“গােস্বামীরে রাসরসে নাচাব নিশ্চয়
যদি শ্রীগৌরাঙ্গ মাের থাকেন সহায়।”
ল-পিতা। শুনিয়া আশ্বস্ত আমি। আসলে কি জান?
নিজেরা দুৰ্বল বড় আছি যৌবনে
(এরূপই আপামর সাধারণ লােক),
তাই পদে পদে ভয় চলিতে এখন ;
কবীরে দ্রুতগতি মােদেরে না সাজে।
বিশেষতঃ, সেনিয়ে বিষম অরাতি,
‘বে-চাল দেখিলে অম্নি ঘা’ল করে দিবে
দেখনা, বাগান বাড়ী আটঘাটবাঁধা,
আমােদপ্রমােদে যেতে না পায় লতিকা ?
ল-মাত। সেনিয়ে মঞ্জরীর পরিণয়বদ্ধ,
লতিকার কিবা ভয় তবে তাহা হ’তে ?
ল-পিতা। কিছুই বােঝনা তুমি, অথবা সরলা
এই দেশে জন্মহেতু। পরিণয়ডাের
অধুনা সহজচ্ছেদ্য, দেখনা ভাবিয়া ?
প্রথম দৃশ্য ]
চূড়ান্ত
পবিত্রানুষ্ঠান বলে’ বিবাহবন্ধনে
কয়জন মানে বল আমাদের দেশে ?
একপত্নীনিষ্ঠা, বল, আছে ক’জনার ?
একপতিনিষ্ঠাভিত্তি পৰ্য্যন্ত আক্রান্ত।
ল-মাত। আমার ধারণা ছিল, যেমন সকল
বিষয়ে এ দেশী চাল দেখিছি তােমার,
বাগানের বন্দোবস্ত ও সেই রকম।
নাথ, অজ্ঞানতা ক্ষমা করহ আমার।
ল-পিতা। ভেবে দেখ, শত্রু যবে ফিরে পায়পায়,
বৈষ্ণব জামাত নাচে লতিকার সনে,
এ কথা তাহার জানা নহে অসম্ভব,
তিলকে তাহার তাল করা কি বিচিত্র ?
বলনাচ দেখ নাই তুমি, শিহরিবে
ব্রাসে যদি দেখ তাহা। অপব্যবহার
নৃত্যেরই জেনে৷ তাহা, অথচ পাশ্চাত্য
নরনারী তার মােহে উন্মত্তের প্রায়।
মােদের বিলাতগত যুবকবৃন্দের
মস্তক চর্বণ কৈতে এ রাক্ষসীসম
আর কিছু আছে বলে’ নহি অবগত।
ভাগ্যিস্ বিদুষী জানে, নৃত্যজলক্রীড়া-
আদি রহস্যের লীলা লােকলােচনের
অন্তরালে অনুষ্ঠেয় । শ্রীগৌরাঙ্গকৃপা
[ তৃতীয় অফ
চূড়ান্ত
অজস্র ধারায় ওর পরে বরষিত।
রঙ্গমঞ্চে আবির্ভাব ওর যাহা দেখ,
তার মূলে আছে শুধু লােকহিতৈষণা,
নৃত্যের আনন্দদানশক্তিপ্রদর্শন,
বুঝান লােকেরে, যদি স্বামিস্ত্রী মিলিয়া
গােপনে নৃত্যের লীলা শুদ্ধমনে করে,
হ্রাস প্রাপ্ত হয় তবে কামপ্রবণতা।
২য় দৃশ্য
( মিঃ সেনিয়েলের আফিঘর )
মিঃ সে। অপমান ইহাপেক্ষা আর কি হয় ?
পিতৃবন্ধু ব্যারিষ্টার তুমি, রূপবতী
সুশিক্ষিত কন্যা তব, বরের সন্ধানে
‘হা হতােহস্মি করে’ যবে ফিরিতে আছিল,
তখন বিলাত হ'তে প্রত্যাগত আমি।
অভ্যর্থনা তরে মম না গেলে ষ্টেশনে
তুমি, বুঝি এই মনে করে, ব্যারিষ্টার
হয়ে আসা, বাহাদুরি কিবা আছে তায় ?
ধনীর সন্তান আমি, সে কথাটাও না
চিন্তার বিষয় হল। এসব অগ্রাহ
দ্বিতীয় দৃশ্য!
চূড়ান্ত
করিয়াও, পিতৃবন্ধুযােগ্য মান দিতে
গেলাম তােমার বাড়ী ; বৈঠকখানায়
প্ৰদানি’ আসন মােরে, কাসার রেকাবে,
রসগােল্লা ও সন্দেশ-অখাদ্য আমার
খেতে দিলে মােরে ; যাক, চা-পরিবেষণে
ভেজিলে দুহিতায়। নিরুপায় হয়ে
জিজ্ঞাসিনু, সে কোথায়? পাই উত্তর,
বাগানে বেড়াতে গেছে। মােটরে বাগানে
গিয়া দেখি, লেখা আছে ফটকের গায়ে
‘প্রাইভেট’। প্রাইভেট গার্ডেন, অদ্ভুত
ব্যাপার দেখিয়া ফিরিলাম সেই দিন।
পরদিন পূর্বাহ্রেই অতর্কিতে গিয়া,
ইডেন গার্ডেনে যেতে আমার মােটরে
অনুরােধ করিতেই কৈল অস্বীকার ।
গোঁসাইট। বরাবর ছিল সহাধ্যায়ী,
ত্ৰিকণ্ঠশিখণ্ডধারী বিংশশতাব্দীতে
ব্যারিষ্টারপুঙ্গবের দুহিতার মন
করিবে হরণ, ইহা ভাবিতে নারি।
মাদ্ৰাজীরা ত্যায়াগিল খোঁপা, মহাত্মার
কৌপীন ধারণ, বেণী চীনারা ত্যজিল,
এসব বিস্ময়কর চিরকাল মাের ;
রেডিও, বিমানযান, সম্ভাব্য ব্যাপার,
চূড়ান্ত
[ তৃতীয় অঙ্ক
প্রকৃতির দ্বার উদ্ঘাটিলেই মিলে ;
পরন্তু ওসব কবিকল্পনাদুলভ।
বিস্ময়াভিভূত থাকা আর না পােয়,
“প্রতিহিংসা, প্রতিহিংসা, প্রতিহিংসা সার।”
(মঞ্জরীর প্রবেশ)
মঞ্জরী। অপারসান্ত্বনাদানশক্তি মাের আছে,
কেন তবে বল, বৎস, উত্তেজিত এত ?
লতিকা নাচিতে নারে, আমি তো নাচি না
শুধু, ‘মাই বয়’-আদি বিড়ালাক্ষীদের
প্রিয়সম্ভাষণগুলি আয়ত্ত করেছি,
তার সােফা আক্ষরিক অনুবাদ সহ।
আর কিছুদিন পরে, ইংরেজী বুলিটা
শুধু নয়, বিবি-অনা ষােলআনা পাবে
মোর কাছে, বনাচশিক্ষা পূর্ণ হলে।
মিঃ সে। ও কথাটা কাণে বড় বেসুরাে বাজিল !
বিলাতে ও কন্টিনেন্টে থেকে বহুকাল
কাণের দফা তো রফা নিশ্চয় হয়েছে,
তবু এই তর্জমাটা ভালাে নাহি লাগে।
মঞ্জরী। কেন গা আজি এ তব অপরূপ ভাব ?
প্রেমের যতটা সুর এ কথায় বাজে,
মা ছেলেরে যতখানি প্রাণ দিয়া চায়,
ওয়াইফ, হাজব্যাণ্ডে কভু ভালােবাসে তত ?
দ্বিতীয় দৃশ্য ।
চূড়ান্ত
মিঃ সে। নৃত্যগীতগুণগ্রামে যদিও ভূষিত
তুমি, তব মুখে শুনে এই তত্ত্বকথা,
লভটভ, মন থেকে উবে যেতে চায় ।
মঞ্জরী। উবে যাবে, সে কি কথা? ধরে রাখি দেখ।
(চুম্বন করন।
ব্রীফের বিরহে কেন থাক গাে কাতর ?
নিশিদিন মাের সনে প্রেমের মদিরা-
পানে শুধু রহ ভাের, অন্যনারীচিন্তা,
অর্থ, ভুলে যাও মাের সনে বনাচে।
পিতার অগাধ অর্থ, তুমি অধিকারী,
অর্থচিন্তা ছেড়ে এবে কামে দাও মন।
শােননি কবির গানে, যৌবন বারেক
গেলে ফিরেনাক আর জোয়ারের মতো ?
এস, এস, এক চোট মেতে নাচা যাক।
মিঃ সে। কোর্টে যেতে আজ তবে নাহি দিবে তুমি?
মঞ্জরী। শুনিছন। ঝমাঝম হইছে কেমন
বৃষ্টিতে ধরার শান্তি বিরহিণীতাপ।
তােমায় কিছুতে আজ যেতে নাহি দিব,
যাও যদি এই তাপে জ্বলিয়া মরিব।
মি: সে। পাশ্চাত্য প্রেমের তত্ত্বে খুব দিয়া মন,
“সুরবালা” আদি গল্পে, “চখের বালি”-তে,
সর্বোপরি টেক্কা দিয়া “ঘরে বাইরে”-তে
চুড়ান্ত
[তৃতীয় অঙ্ক
আমাদের সেরা কবি, বিলাতী নাচের
রস ছিটাফোটা পেয়ে, বিশেষ করুণা-
বশে বিতরিলা তারও কিছু পােড়া দেশে ;
কিন্তু নিজে অবশেষে, হাওয়ার দোষে,
মন দিলা বাউলের নাচে আর গানে।
এ দেখে দমিয়া আমি গিয়াছিনু বড়,
বিলাতের নাচ শেখা ব্যর্থ হল ভেবে।
রসিকা তােমায় পেয়ে প্রেয়সীর রূপে
অবশেষে মনে খুব পাইয়াছি বল ।
নাচিব তােমার সনে, কোর্টে না যাইব,
এক প্রতিশ্রুতি যদি দাও মােরে তুমি,
যাইয়া ওদের বাড়ী জানিবে সত্বর,
লতিকা সত্যই ভালােবাসে গােস্বামীরে,
, ওটা পিতার মন রাখা মাত্র সার ?
আমি জানি সত্যকার বৈষ্ণব গােস্বামী,
গৃহধৰ্ম্মে কোনকালে হবে ওর মতি,
ভাবিনি সম্ভব মােটে। তারে ভালােবাসা
তবে লতিকার পক্ষে কিরূপে সম্ভবে ?
নারীর প্রেমের নাম কাম, শুধু কাম।
বিদুষী ও গােস্বামীর সম্বন্ধ কিরূপ,
গােপনে থাকিয়া লক্ষ্য অবশ্য করিবে।
মরী। (স্বগত) বিলাতী শিক্ষার এই অপকৃষ্ট ফল।
তৃতীয় দৃশ্য ]
চুড়ান্ত
এ হীন দূতীর কাজ করিতে হইল।
পরিণামচিন্তা মােরে করয়ে ব্যাকুল।
বিদুষীর নিষ্কলঙ্ক চরিত্রের প্রতি
কটাক্ষ করিতে ওর বাধিলনা মােটে।
( প্রকাশ্যে ) এ অতি সহজ কাজ, হনু প্রতিশ্রুত।
মিঃ সে। কামানলে আগে করি আহুতি প্রদান।
( বলিয়াই দুই জনে মিলিয়া সুরাপান)
মঃ। (স্বগত) এ স্বামীর মন পেতে কি না করিলাম ?
তবু কি পেয়েছি, কেহ পেয়েছে এরূপে ?
শতকে একোনশত, কিংবা ততােধিক,
স্ত্রীলোেক পতঙ্গপ্রায় নরকামানলে
জীবন আহুতি দিয়া বুঝায় মনেরে,
“স্বামী বড় ভালােবাসে, মজেছে আমাতে।”
( সুরাপানান্তে দুইজনে মিলিয়া বনাম )
৩য় দৃশ্য
লতিকাদের বাড়ী, লতিকা এক কামরায় পাঠরতা
বিদুষীকে লইয় মঞ্জরীর প্রবেশ
লতিকা। পথ ভুলে এলি ভাই ? বর তাের ক্ষমা
করেছেন আমাদেরে ? বােধ হয় তাে না ?
৬৪
এমন জীবটি
=
চুড়ান্ত
[ তৃতীয় অঙ্ক
মঞ্জরী। একটা নাচের কথা বিদুষীর সনে
আলোচনা করিবার ছিল প্রয়ােজন।
এসে শুনি, বর তাের আসিয়া এবার,
বেশ যেতে বসেছেন, বৈষ্ণব হয়ে ও
নৃত্যে দিয়াছেন মন।
দেখিতে বড়ই লােভ হইল আমার।
তাের মতো সাধু নই, রূপের বর্ণনা
শুনিয়া বিদুর মুখে আইনু ছুটিয়া,
স্বামীর নিযেধবাক্য গ্রাহ্য নাহি করে।
লতিকা। তিনি তাে তোদের রুচিসম্মত নহেন ?
মঞ্জরী। বিদুটা বিয়ে না করে ক্ষেপেছে ও রূপে,
( বিদুষীর মৃদুহাস্য)
পুরুষের স্বাদ পেয়ে ক্ষেপিবন আমি
কিম্ভূত কিমাকার যদিও আমরা,
এ দেশের জলবায়ুঅশনবসনে
পুষ্ট বলে, এ দেশের মেয়েলী স্বভাব
একেবারে পরিহার করা কি সম্ভব ?
দেখিতে সখীর বর সাধ স্বভাবতঃ।
লতিকা। এ দেবমন্দিরদ্বার দিনে নাহি খােলে,
বিদু বলে নাই তােরে ?
বলিলে কে শােনে ?
ভক্ত যেই হয় দার ভাঙ্গিতেও জানে।
?
/
মঞ্জরী।
চতুর্থ দৃশ্য ]
চূড়ান্ত
লতিকা। তবে তাই হক, বিদু সঙ্গে যাবে তাের।
মঞ্জরী।
একা যেতে দিতে বুঝি পাস্ বড় ভয়?
লতিকা। আমার কি ভয়? নারীসঙ্গ নিরিবিলি
সত্যই ভয়ের বস্তু বলে গণ্য ভার।
মঞ্জরী। বিদুরে বরাত কেন? তুই তবে চল,
যুগল দেখিতে মােরা চির-অভিলাষী।
নিয়মের ব্যতিক্রম মাত্র এক দিন
গোড়ার ধৈর্য্যের চ্যুতি ঘটাবেনা জানি।
৪র্থ দৃশ্য।
লতিকার খাস্ কামরায় অধ্যয়ননিরত গােস্বামী
( একাকী প্রবেশ করিয়া)
বিদুষী। সহচরী এক মাের আর লতিকার
আকাক্ষিণী তােমাদেরে যুগলে দেখিতে।
গােস্বামী। এর জন্য অনুমতি আবশ্যক কেন?
(বলিতেই লতিকা ও মঞ্জরী প্রবেশ করিলে )
মঞ্জরী।একি মানুষের রূপ ? একটা পলক
পুলকে ভরিয়া দিল সর্ব অব্দ মাের ।
গােস্বামী। ওখানে দাঁড়ায়ে কেন, এগিয়ে বসুন ?
মঞ্জরী। কাজ মাের বসা নয় যুগল দর্শন।
চূড়ান্ত
{ তৃতীয় অৰু
গােস্বামীর বামে লতি পঁাড়া একবার।
(স্বগত) এই কর ভগবান,
এই কর ভগবান, জীবনের সব
সঞ্চিতকরমক্ষয় হ’ক পুণ্যে এই।
( লতিকা স্বামীর পার্শ্বে দাড়াইলে )
বসিতেই হল শেষে, ঈড়ান যে দায়।
( বলিয়াই মেঝের উপর বসিয়া পড়িল ।
বিদুষী। ও কি ভাই, উঠে বস, শুধু মেঝে কেন ?
মঞ্জরী। এ কোর উত্তর তো খুঁজিয়া না পাই,
মার্বেলের মেঝে ভালো, বুঝে নেন। নিজে।
(স্বগত) কি পাপে বাধিল রাঙা চরণ ছুইতে ?
বিদ্বেষী স্বামীর পুঃ পাৰ অনুমতি
এমুখো হইতে ? কেন, কেন মরি ভেবে ?
হাত বাঁধে, যদ্যপি পা বাঁধে সে নিঠুর,
মন বাঁধিবার শক্তি কে ধরে সংসারে ?
(প্রকাশ্যে ) গােস্বামিজী, আজ যাই, আসিব আবার
দেখিতে তােমায়, নহে অন্য অভিপ্রায়ে ।
(বেগে প্রস্থান করিতে করিতে)
(স্বগত) আমার স্বামীর কাজ বেশ হল তবে !
এবে চট করে গিয়ে বলিব তাহারে,
হুবহু যা দেখিলাম! চৈতন্থসঞ্চার
যদি হয় এতে ভালাে না হলে ও ভালো।
গোস্বামী। আমি ও কি ভাবে যেন আবিষ্ট হই।
••
পঞ্চম দৃশ্য ]
চূড়ান্ত
মনের কথাটা কেড়ে নিলে তুমি দিদি,
তা ভেবে কতক শান্তি পাইতেছি মনে ;
নহিলে রমণী এক মাতৃস্বরূপিণী
উপবিষ্টা পাদপ্রান্তে, কেমনে সহি
এই দৃশ্য ? না পাই মাত্র অবসর
ক্ষমা চাহিবার। (উৎক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে)
ক্ষমা করহ ঠাকুর।
৫ম দৃশ্য
মিঃ সেনিয়েলের বৈঠকখানা।
মিঃ সে। লতিকার পরিবর্তে মঞ্জরীকে লাভ,
অদৃষ্টের পরিহাস আর কারে বলে ?
নামে খুব লাভ, কামে শুধু ফক্কাকার,
ধিক্কার জীবনে ; কভু ভাবিনি স্বপনে।
বর্ণ, সর্ব অঙ্গ তন্ন তন্ন করে দেখ,
শ্বেতাঙ্গিনী পরাভব মানে মঞ্জরীর
কাছে। তাই মাের মতো করিয়াছে খেলা
যারাতের বামে গুলি নিয়া,
তারা মোরে বুঝাইল, বিবাহ করিলে
ইহারে, হইবে উপযুক্ত প্রতিশোধ।
চুড়ান্ত
[ তৃতীয়
কিন্তু, হায়, দুগ্ধতৃষ্ণা মিটে কভু জলে ?
জগতের কোমলত্ব কবিত্ব ছানিয়া,
খাটি বাঙ্গালিনী বিধি গড়িলা লতিকা।
পরুষ দেশের নারী, পুরুষালি ভাব
তার সহজাত জানি ; মঞ্জরীতে তাহা
প্রকৃতির খেয়ালে কি ? না, ইহা আমার
ভ্রম, লতিকার সনে তুলনাজনিত ?
কামের ইন্ধন কিন্তু যােগায়েছে খুব
সে বেচারা, যথা কৈত বারমেড়গুলি ;
সে জন্য কৃতজ্ঞ আমি আছি তার কাছে।
দৌত্যকাৰ্যে আজ তায় করেছি নিয়ােগ,
ফলাফল জানিবারে আমি সমুৎসুক।
( মঞ্জরীর প্রবেশ ; তাহার মুখের অস্বাভাবিক
গাম্ভীৰ্য লক্ষ্য করিয়া)
পেঁচামুখী করিল কে তােমারে আবার?
(স্বগত) নিশ্চয় অশুভবার্তা বহিছে ও মুখ।
তাই হক, ধীরভাবে শুনিব কি বলে।
প্রতিহিংসা ব্যর্থ হয় অধৈর্য্যের
হেতু।
(প্রকাশ্যে) অমঙ্গল লেখা দেখি সুস্পষ্ট অক্ষরে
বদনমণ্ডলে তব, দিলাম অভয়,
অকপটে বল যাহা বলিবার আছে।
মঞ্জরী। (স্বগত) আমি যেন ওর ভয়ে শঙ্কিত আজও।
পঞ্চম দৃশ্য ]
চূড়ান্ত
(প্রকাশ্যে) শুনিলাম, বহুদিন গােস্বামী ওখানে-
মিঃ সে। বহুদিন? ভালােবাসে উহারে লতিকা ?
লতিকা। সে ভালােবাসার তুল্য নাহিক সংসারে।
মিঃ সে। (স্বগত) বৃশ্চিক দংশন। বড় আশা ছিল মনে,
গােস্বামীকে দিয়া নাহি মিটিবে লতির
প্রেমসাধ, ফাদ পেতে মিটাইব সাধ,
অসংখ্য প্রেমের ফাদ মাের জানা আছে।
গােস্বামীর কিবা গুণে ভুলিবে লতিকা?
উৎকৃষ্ট ছিল রূপ, তাহাও বিনষ্ট
ত্ৰিকণ্ঠশিখণ্ডে করিয়াছে একেবারে।
শুধু রূপে কোন্ দেশে ভুলেছে রমণী ?
বেয়াড়া বৈষ্ণব বলে’ গােস্বামীরে জানি।
পাজিরা ও ধৰ্ম্মজী আমাদের যারা,
সস্তানের জন্মদিতে সবিশেষ পটু,
গােস্বামী সে দলভুক্ত মােটে নহে জানি।
সমস্যার মীমাংসায় হইনু ফাপর ।
আচ্ছা, কামশূন্য প্রেম সােনার পাথর
বাটী নয়? ভগবানে ভক্তি হয় মানি,
বুজরুকি সার এই নরনারীপ্রেম।
( মঞ্জরীর প্রতি দৃষ্টি পড়িলে )
(প্রকাশ্যে) এখনও তবে তুমি আছ দাড়াইয়া,
আড়ি পেতে শুনিতে কি মাের গুপ্ত কথা ?
৭
চুড়ান্ত
[ তৃতীয় অঙ্ক
না, বুঝেছি আরও কিছু আছে বলিবার,
বিদুষীর মনােভাব গােস্বামীর প্রতি
জানান তােমার অন্য কর্তব্য যে আছে।
দরকার নাই, যাও, মরিতে আমায়
দাও, প্রতিহিংসাজালা দহুক আমারে।
মঞ্জরী। যে স্বামীর জনা আমি কি না করিলাম
তার আজ, হায়, এই নিষ্ঠুরাচরণ !
কাল যদি শুনিতাম হেন রূঢ় কথা
পিত্রালয়ে হন্ হন্ যাইতাম চলে।
আর আজ ? এক নরে দেবরূপ দেখে,
নিজেও হয়েছি নারী, চিনিয়াছি স্বামী।
তার মুখে মৃত্যুকথা শুনে শিহরিয়া
উঠিছে পরাশ! ভগবান্, কে রক্ষিবে
মােরে তুমি বিনা, ঋরে নাহি দি স্থান
মনে, পুরুষের চিন্তাগ্রস্ত দিবানিশি ?
আহারেবিহারে, পথে চলিতে চলিতে,
হয় স্বামী নয় অন্য পুরুষচিন্তন
থাকিত যে সাথে সাথে প্রিয় বস্তু মাের।
স্বামীতে তুমিই আছ, বুঝিয়াছি আজ
আমি, কিন্তু নিজে নাহি মােটে বােঝে স্বামী।
কাতর পরাণে তাই আকুল প্রার্থনা,
{ করযােড়ে ললাট স্পর্শ করিয়া উৰ্দ্ধমুখে)
প্রতিহিংসাবৃত্তিনাশ করহ স্বামীর।
পম দৃ) চূড়ান্ত মি নে। যাবে না? যাবে না? মুঠায় চুল ধরিয়া তাড়াতে হবে? আমি চাই এৰে থাকিতে নির্জনে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করিবার পথ- নিরূপণে, তুমি বাধা খাড়া রবে পথে? আঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে শুধু শাপিবে আমায়? মঞ্জরী। নাথ-- মি সে। এ দেশী সেকেলে একি স্বামিসভাষণ, নাহি ভালােবাসি যাহা বরাবর জান ? ‘মাইবয়’ মুখে আসিবে না আর, স্বামীর আসনে স্থান দিয়াছি তােমায়। মঞ্জরী। তবু মিঃ সে। এত দিন সে আসনে ছিল কোন্ জন? মঞ্জরী। ইংরেজীতে হাজব্যাণ্ড যারে বলে সবে। মিঃ সে। তত্ত্বকথা শুনিবার নহে এ সময়, ঘর ছেড়ে যাবে কি না সােজাসুজি বল। মঞ্জরী। তােমায় এখন ছেড়ে যাইতে না পারি, তােমায় সানাদান কর্তব্য আমার। মিঃ সে। লাথি নাহি মেরে পায়ে চালাতে তা পারি। ( বলিতে বলিতে সবেগে প্রস্থান) মঞ্জরী। হায় হায়, কি করিলে ওহে ভগবান! বিশ্বজোড়া তুমি শুনি, শুনিতে কি পাও? হিংস্রপশুসম স্বামী, হিতাহিত জন
;
চুড়ান্ত
[ তৃতীয় গরু
তার নাই ; প্রতিহিংসা তার কি আকার
করিবে ধারণ, অবসন্ন দেহ মাের
হয় তা ভাবিতে। রক্ষা কর ভগবান্।
(বলিয়াই মেঝের উপর বসিয়াই একেবারে শুইয়া পড়িল)
( মঞ্জরীর পিতার প্রবেশ )
পিতা। মঞ্জু মা, মেঝের ‘পরে পড়ে যে আছিস?
মঞ্জরী। (ক্ষীণস্বরে) কে, বাবা? মাথা যে খাড়া করিতে না পারি।
পিতা। কেন, মা, হঠাৎ এই শরীরের হাল ?
মঞ্জরী। বাবা, তুমি আসিয়াছ কোন ভয় নাই ;
( চতুর্দিকে নিরীক্ষণ করিয়া )
সে কি বাড়ী থেকে গেছে ?
পিতা।
এসেই দেখিনি।
কদিন দু’জন তােরা কেউ যাস নাই,
তাই আজ এসে শুনি, এ অবস্থা তাের।
চাকরবাকর সবে তােরে ভালােবাসে,
আমায় খবর দিতে আছিল প্রস্তুত।
তারা যা বলিল তাতে মাের মনে হয়,
মারধর করিয়াছে খুব সে বাঁদর।
মঞ্জরী। যদিও ততটা নয় তবু কাছাকাছি।
দুখিত তাতেও নই, ভয়ের কারণ,
প্রতিহিংসাবশে খুনখারাবী না করে।
পিতা। লতিকার গায়ে হাত সে দ তুলিবে?
চূড়ান্ত
মঞ্জরী। আমার আশঙ্কা তাই। অন্তরালে থেকে
সকলই সম্ভব তার।
পিতা।
অসম্ভব ইহা।
লতিকার পিতা নহে আহাম্মক তত,
যথেচ্ছ বিহার পথ বন্ধ লতিকার ;
বিদুষী নাচিতে যায়, লতিকারে কভু
দেখেছিস, যোেগ দিতে আমােদপ্রমােদে ?
তার কেশাগ্রও ছুঁতে পাইবেনা কেহ।
মঞ্জরী। একমাত্র অবসর আছে আমি দেখি,
লতিকা বেড়াতে যায় তাদের বাগানে,
বােধ হয় জান, অন্য লােক তথা যেতে
যদি ও নাহিক পায়, দ্য সেই মানা
মানিবে কি? বাবা, আমি ভেবে হনু সারা।
খুনের আশঙ্কা কথা যদি ছেড়ে দিই,
শ্লীলতার নি, সে যে আরও ভয়ানক।
পিতা।
এ কথায় গা আমার ঝিম ঝিম করে।
আমার ওখানে তুই যেতে নাহি চাস?
মঞ্জরী। না বাবা, উহার দেখে উন্মাদের ভাব,
আমার ছাড়িয়া যেতে মন নাহি সরে।
পিতা। (স্বগত) এত বিজাতীয় শিক্ষা, প্রভাব তাহার
তবু প্রতিহত করে হিন্দু রমণীর
এ ভাব কেমনে স্থান পেল ওর মনে ?
৭ঃ
চূড়ান্ত
( প্রকাশ্যে) না, না, যাইবার কোন নাহি প্রয়ােজন,
যাই, তোর মাকে গিয়া পাঠাই এখনই।
মঞ্জরী। তাই কর বাবা, আর কোন সদুপায়
চিন্তা কর রক্ষিবারে তব জামাতায়।
পিতা। জামাতা বলিয়া ওরে করে’ অভিহিত
লজ্জা না বাড়াস মাের। গত জীবনের
লজ্জাভার জগদল পাথরের মতাে
চেপে আছে বুকে, ব, আর কত সহি ?
চ তােরে শােবার ঘরে রেখে যাই তবে।
(স্বগত) ছেলেটাৰে বিলাতে না যাইতে দিলাম
যা ভাবিয়া সেই কাণ্ড করে সে বসিল।
কুমাও, বাপের দশা দেখে না শিখিলি ?
বিলাতযাত্রার লক্ষ্য শুধু অর্থাৰ্জন ;
হয় ব্যারিষ্টারী করে’, নয় বাণিজ্ঞের
জুয়াচুরি শিখে। রাজনীতি, অর্থনীতি
(এক বড়, অন্য ছােট ভাই। উভয়েই
মাকালফলের লাভ, দেখিতে সুন্দর,
অন্তঃসারহীন, জানে ভুক্তভােগী যারা।
যে জানে পাঠায় সে ও ছেলেরে বিলাত,
বুড়ার খােরাক হাসি নৈলে মিলে কিসে?
বদরের নাচ দেখে কে না, বল, হাসে?
ব দৃশ্য।
চূড়ান্ত
( একটু হাসিয়া )
বড় রগড়ের কথা পড়িল যে মনে।
বিদেশিরাজের যাহা মাত্র নামান্তর,
একাকার ব্রাহ্মরাজ হলে হতে পারে,
কবীন্দ্র গুরুর পদ পেলে মহাত্মার,
মুখে নয়, মনে! মহাত্মার মন মুখ
এক ; তবে এ মাকালফলআস্বাদন
আছে কি ভারতবাসী তােমার কপালে ?
जलेश
লতিকাদের বাগানে যাইবার সরু পথের মােড়ে মােটর হইতে
নামিয়া একটু গা ঢাকা দিয়া মিঃ সেনিয়েলর অবস্থান।
মিঃ সে। প্রেম করা আর প্রতিহিংসার সাধন
তড়িঘড়ি না করিলে ব্যর্থতাই সার।
বিলাতের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট আমার
অবসর প্রাপ্তি মাত্র (যথেচ্ছ বিহার
রমণীর যেই দেশে অবসর তথ।
খুঁজিতে না হয়) কর ওষ্ঠা প্রয়ােগ,
হাজারে নয় * নিরনব্বই যুবতী
করায়ত্ত হবে, কালা আদমী বলেও
শঙ্কার কারণ নাই, ধনীর সন্তান
চূড়ান্ত
[ তৃতীয় অঙ্ক
বলে’ প্রতিপন্ন যদি হও তুমি আগে।
অর্থাৎ ধনেরই মান সর্বাগ্রে সে দেশে।
এ পোড়া দেশের কথা বলিতে কি হবে ?
রাস্তায় চলিতে পরপুরুষপরশ
নারীরে সমাজে ত্যাজ্য করে যেইখানে,
সেখানে নির্ভয়ে কর এ অস্ত্র প্রয়ােগ,
সমাজ জুজুর ভয়ে শঙ্কিতা রমণী
টু-শব্দটি না করিয়া হইবে তােমার,
ইহাতে সন্দেহ কোথা? বিলম্বের হেতু,
পক্ষান্তরে, হাত ছাড়া হবার আশঙ্ক
আছয়ে প্রচুর ; তার হেতু, শিক্ষিতার
যুবকবৃন্দের হয় বস্তু লালসার ;
ইংরেজী শিক্ষার লেপে মাধুৰ্য্য নারীর
বৃদ্ধি পায় যাদুবলে তাহাদের চখে ;
এ বিদ্যা প্রভাবে যুবা হয়েও কুরূপ,
ভুলাতে সমর্থ হয় যুবতীর মন।
‘স্বদেশীর’ বড় কাজ অচল কি হেতু ?
যুববৃনে আস্থল বলিয়া কীর্তন
বাক্যবীর প্রবীণেরা যত না করুন,
নরনারীসম্মিলনসুযােগ বিহনে,
যুবকের ‘স্বদেশীর কাজে না লাগিবে ।
খুব বড়গল করে’ বলিব সকলৈ,
৭
৭৭
যষ্ঠ দৃশ্য
চূড়ান্ত
মহাত্মার খাতিরেও তঁারে না ছাড়িয়া
সমাজের দুরবস্থা ঈদৃশী যখন
অতিমাত্র রিরংসায় জর্জরিত দেশ,
যুবজনে বিশ্বাস না করিয়াে স্থাপন ;
বৰ্তমানশিক্ষাপ্রাপ্ত যুবকযুবতী,
নরনারীসঙ্গধ্যান যাদের কেবল
পাশ্চাত্য জাতির করে’ শুধু অনুকার,
তাহাদের আশা সবে ছাড়, ছাড়, ছাড়,
অথবা তাদের শিক্ষাতরে কিছু কর।
বনিয়া ঠিক নাই ইমারত, খাড়া,
এরূপে কি হয় কভু স্বরাজ-সাধনা ?
সত্য করে বলে নাই ধারণা যাদের,
সত্যাগ্রহ তাহাদের উদ্ভট সাধনা।
অনর্থের
भून অর্থ দেয় যে শিক্ষায়,
তার জোরে হয়ে সবে বক্তা, বিত্তশালী,
শবৃত্তি আরাবে আর উচ্ছিষ্টভােজনে,
চুরচুর হয়ে “কঙ্গরসের” নেশায়,
কাটাইলে বহুকাল, আর কেন, বল ?
শিক্ষানামে বিষ পান করিছে দেশের
যুবকযুবতীগণ, নিজেও সে বিষ
পান করে বিষক্রিয়া বুঝিছনা হায় !
বােধশক্তি এখনও যদি থাকে কিছু
চূড়ান্ত
প্রচলিতশিক্ষাধ্বংসে আগে দাও মন,
সত্যকার দেশহিত কাম্য বস্তু যদি।
আমি তত লতিকাধনে বঞ্চিত হইয়া
গােল্লায় যেতেই ঠিক হবে বসে আছি,
পােড়া এ দেশের দুঃখে তবু কাদে প্রাণ ।
প্রতিহিংসা বিচারের অবসর সহে
কি কখন? মঞ্জুরীরে করিয়া চুম্বন
মনে করি, লতিকার বিদােঠের সুধা
করি আমি পান--যাতে বঞ্চিত হইয়া
প্রতিহিংসা বিষে দিগ্ধ অন্তর আমার,
এরূপে সে বিষক্রিয়া মন্দীভূত হয়।
আর না, এবার হক এম্পার কি ওম্পার।
রক্ষিতে কন্যায় পিতা করেছে প্রস্তুত
আচ্ছা কেল্লা, সুরক্ষিত এ পুষ্পবাটিকা।
দেখাব তাহারে এই দুর্গ অধিকার
কেমনে করিতে হয়।
( ফটকের দিকে লক্ষ্য করিয়া) কে থােলে ফটক?
মালী, মালী
মালীর এ চেহারা অভূত।
অদ্ভুত, অদ্ভুত এই উদ্যানাধিপতি।
কেহে তুমি এ বাগানে যেতে অধিকারী ?
(উচ্চৈঃস্বরে একথা বলিয়াই ফটকের কাছে দ্রুতপদে গমন)
যুবক। আপনি কি চান ?
?
চুড়ান্ত
মিঃ সে।
চাই তােমার মস্তক।
এতক্ষণ খাড়া আছি, ঢুকিতে পায়িনি,
তবু প্রশ্ন, “আপনি কি চান ?” আজব।
যুবক। আজ্ঞে, এ বাগানে সবে চুকিতে না পায়।
মিঃ সে। সবিশেষ অবগত আছি আমি তাহা।
আগে বল কিবা কাজ তােমার বাগানে,
ফটকের চাবি তুমি পাইলে কোথায় ?
যুবক। আমি মালী। (স্বগত) বেশে বুঝি বাধায়েছে গােল।
মিঃ সে। (স্বগত) সত্য অনুমান। (প্রকাশ্যে) কত মাহিয়ানা পাও?
যুবক। খােরপােষ মালিকের, আর ত্রিশ টাকা।
মিঃ সে। কি কাজ? মালীর শুধু, না, আরও কিছু ?
যুবক। আর কিছু নয়।
মিঃ সে।
তুমি ভদ্রবেশধারী?
যুবক। শুধু তাই নয়, কিছু লেখাপড়া জানি।
মিঃ সে। মনে হয়, কিছু নয়, বেশ জানি তুমি।
যুবক। আজ্ঞে আমি গ্রাজুয়েট, মালিকই কৃপা
করে শিখাইয়া নিজে দিয়াছেন কাজ।
উড়ে ও পশ্চিমা গালী বিশ্বস্ত না হয়,
তা ছাড়া, তাহার মতে এ রকম কাজ,
বেকার যুবকদের উপার্জনােপায়।
মিঃ সে। (স্বগত) আবার সে লােকটার প্রশংসার কথা,
প্রতিহিংসাটারে যাতে গলা টিপে মারে।
চূড়ান্ত
[তৃতীয়
(প্রকাশ্যে) মাফ কর, কটু কথা বলেছি তােমায়।
এ সামান্য আয়ে বল চলে কি তােমার ?
যুবক। বেশ চলে, উন্নতিরও আশা আছে বেশ ;
চারাগাছ লালনের প্রচুর সুযােগ,
পড়াশুনা করিবার সময় ও পাই।
মিঃ সে। আমায় ভিতরে যেতে দিতে বাধা আছে ?
যুবক। বাধা কি? আপনি ভদ্রলােক, মেয়েরাও
এ সময় না আসেন হেথা, উছুপের
কোন রূপ সম্ভাবনা আপনা হইতে
নাই, তবে আর বাধা কি থাকিতে পারে ?
বাবুর বাড়ীতে যারা অতিথি আসেন,
তাদের মতন, মনে করি, আপনার
বাগানে প্রবেশে নাই বাধার কারণ।
মি সে। না হে, এটা হবে বড় অসঙ্গত কাজ,
যাকেকে ভিতরে না যেতে দিয়ে তুমি।
(স্বগত) এ কাজ মঞ্জরী এলে হবে অনায়াসে,
আমি শুধু জেনে যাই লতিকা প্রভৃতি
কখন আসে ও হেথা কতক্ষণ থাকে।
(প্রকাশ্যে) রােজ হেথা কে কে আসে? বাবুর মেয়ে, না,
বিদুষীও যারে জানি সহচরী তার ?
বুবক। আপনি জানেন সব, তাহাই সম্ভব,
নৈলে কেন ইচ্ছা হবে বাগানে আসিতে ?
৮১
যষ্ঠ দৃশ্য ]
চূড়ান্ত
দিদিমণি, তার বর, আর সে মেয়েটি
(নাচিতে সরেস তিনি অবশ্য জানেন ),
ভােরে আসে, নাচ গান চলিতে থাকিলে,
কোন দিন দুই এক ঘণ্টা কেটে যায়।
মিঃ সে। বিদুষীর নাচ দেখে বড় খুশী মােরা,
লতিকারে নাচিতে না দেখে দুঃখী তত।
যুবক। দুঃখের কারণ আর থাকিবেনা কারাে,
দিদিমণি, তার বর, শিখিছেন বেশ।
মিঃ সে। (স্বগত) আরে ঘুঘু, কীৰ্ত্তনেতে লাফালাফি
নহে, এ যে নিন্দনীয় নাচ গান শেখা।
ডুব দিয়া জল খাও, রটিয়ে বেড়াও,
কঠোর নির্জলা একাদশীব্রত পাল।
প্রতিহিংসারাক্ষসী রে, পুষিয়াছি তােরে
স্বীয় স্বল্পরক্তে এতকাল, এবে ভূরি
রক্ত তােরে প্রাণ ভরি’ করাইব পান।
(প্রকাশ্যে) সরল, উদ্যোগী, তুমি শিক্ষিত যুবক,
এই লও উপযুক্ত তব পুরষ্কার।
(একখানি ১০ টাকার নােট প্রদান)
এই কাজ যদি কভু ভালাে নাহি লাগে,
সেনিয়ে ব্যারিষ্টারে করিয়াে স্মরণ। (প্রস্থান)
যুবক। (স্বগত) এই সেই যার নাম শােনা আছে খুব।
একটা ধরিতে দুই মুরুব্বি জুটিল।
৭ম দৃশ্য
মঞ্জরী শয়নকক্ষে পালঙ্কের উপর শায়িত।
মঞ্জরী। লাথি মারিয়াও যদি ঘরেই থাকিত,
তবে বুঝি এই দশা না হইত মাের।
বিদুষীর পবিত্রতা বিদিত সবার,
আমার প্রত্যক্ষীকৃত লতিকার তাহা ;
একের সংসর্গজাত ফল বিলম্বিত,
অপরে দর্শন মাত্র পবিত্র হইতে
প্রবলআকাক্ষানল জ্বলিল হৃদয়ে।
শুনি, সতী পত্নী, পতি যাইলে বিপথে
সুপথে আনিতে পারে। সে ভাগ্য আমার
ভালে লিখেছেন বিধি ? ভাবিতে পারিনা
আর ।
শফার। (নেপথ্যে) হুশিয়ার, মৈভী সাথ আউ ?
মিঃ সে।
(নেপথ্যে বিকৃত স্বরে )
নেহি।
মঞ্জরী।
ফিরে এল বুঝি ? (স্বামী ঘরে প্রবেশ করিলে )
(স্বগত)
এ কি বিকট চেহারা ।
( প্রকাশ্যে ) এলে নাথ ? মনে হল রাগ করে গেলে,
বুঝি আজ ফিরিবেনা। যদি বা ফিরিলে,
কি অবস্থা এ তােমার? বাহিরে না খাও
মদ, বলিয়াছ মােরে, বিপরীত একি
দেখি আচরণ আজ ?
৮৩
সপ্তম দৃশ্য ]
চূড়ান্ত
মিঃ সে। ( বিকৃত স্বরে)
মদপাের আমি ?
ও কথা বলিলে ফের মার খাবে তুমি।
মঞ্জরী। মা গাে !
(দ্রুতপদে মঞ্জরীর মাতার প্রবেশ)
ম-মাতা। (কাতরস্বরে) কি হয়েছে, মঞ্জু, জামাই মেরেছে ?
মঞ্জরী। না মা, দেখিছনা ওর অবস্থা কেমন ?
ম-মাত।। লুকোচ্ছিস্ তুই। হাগা বাবা, তােমাদের
সব গুণ আছে জানি, কিন্তু স্ত্রীর গায়ে
হাত ভােলা মন্দ বল ; তােমাদের গুরু
যারা তারা স্ত্রীজাতির বড় মান্যি করে ;
একি সামান্যির কাজ করলে বাপধন?
মিঃ সে। এ বুডটা মামিকে৷ হিঁয়া তুনে বােলায়া?
মঞ্জরী। না গো না, বেড়াতে এসে দেখে গিয়ে মোরে,
বাবা পাঠালেন ওঁরে।
লাগিয়েছ খুব
মাের নামে বাপ মা’র কাছে ?
ম-মাতা।
ও নাগালে
সতে এসে হাড়গােড় চুরাত তােমার।
মিঃ সে। সতত্যন্ বাবুর কথা বলছেন আপনি?
| জবরদস্ত হ্যায়, লেকেন আমি তো
উকো তারিফ, খুব হামেশাই করি,
ওঁ কিঁয়ো ডাটেলে হাম্কো বলুন আপনি?
মিঃ সে।
৮৪
চূড়ান্ত
[ তৃতীয় অঙ্ক
মঞ্জরী। (জনান্তিকে) , দাদার নামে ভয় পাইয়াছে বড়,
আর না, বুঝায়ে মিষ্টি কথায় উহারে,
আমি তােমাদেরে ওর কথা বলি নাই,
তােমরা আপনা থেকে এসেছ দেখিতে
মােরে, ফিরে গিয়ে তারে কিছু না বলিবে।
ম-মাতা। আমি এটা কিছুতেই সইতে না পারি ;
এ একটা জানােয়ার, তার ঘর করা?
মঞ্জরী। বেহুস নেশায় ও যে এখন দেখনা ?
নেশায় এমন হয়, ঝগড়া করােনা,
তার এ সময় নয়, বল মিষ্টি কথা ।
ম-মাতা। তবে ওরা ওজাতের গুণ গায় কেন?
এটা মােটে বরদাস্ত হয় না আমার।
(সত্যেন্দ্রনাথের প্রবেশ)
সত্যেন্। মঞ্জু, মা’র আঁতে কভু ঘা না দিবি তুই।
জানিস, পাশ্চাত্যদের মন্দ ছাড়া ভালাে
কিছু যে থাকিতে পারে সে বিশ্বাসটুকু
ঔর নাই; এ অবস্থা বাবারই দোষে,
বিলাতযাত্রার তঁার ফল খুব ভুগে।
রগড়ের কথা ওঁর, পদ্মার চড়ায়
চণ্ডালমুসলমানআদি নিঃস্ব লােক
যথা করে বাস, তেমি, লােকের কথায়
যারা মাখেদানােবাপতাড়ানাের দলে,
সপ্তম দৃশ্য ]
চূড়ান্ত
তারাই এ দেশ থেকে খুব তাড়া খেয়ে,
করেছিল সমুদ্রের গর্ভে বাসস্থান,
তাদের আক্রোশ তাই এ দেশের প্রতি।
( মিঃ সেনিয়েল পলায়নের উপক্রম করিতেই সত্যে সজোরে
তাহার হাত ধরিয়া)
হাত ছাড়াবার চেষ্টা বৃথা নাহি কর,
ব’স, ভয় নাই, শান্ত হয়ে শােন কথা।
মঞ্জরী। দাদা, পায়ে পড়ি, ওর হাত ছেড়ে দাও।
সত্যেন্। আমি কি উহার মতাে হয়েছি মাতাল
তােরই সাক্ষাতে তাের স্বামীকে লাঞ্ছিব ?
প্রণয়ে নিরাশ হলে মানুষ কি হয়,
মঞ্জু রে, জেনেছি আমি ভুক্তভােগী হয়ে।
মিঃ সে। (স্বগত) ওঝায় দেখেই ভূতনেশা ছেড়ে গেছে,
মুখের দুর্গন্ধ দূর করিব কেমনে?
( প্রকাশ্যে ) মা, দাদা, সকলে ক্ষমা করুন আমায়,
আমি যে উন্মত্ত অতি উত্তেজনাবশে।
সত্যেন্। আমি তাহে শান্তিবারি করিব সিঞ্চন,
একটু বেরিয়ে শােন কথা যাহা বলি।
মঞ্জু, কোন ভয় নাই, অগাধ বিশ্বাস
আমার উপর তাের চিরকাল আছে।
(উভয়ের প্রস্থান)
ম-মাতা। ব্যাপারটা থােলাখুলি বল্ তাে আমায় ?
৮৩
চূড়ান্ত
তৃতীয় অঙ্ক
?
মঞ্জরী। তুমি কি জাননা ওর বড় ইচ্ছা ছিল
লতিকারে বিয়ে করে ? তা না হওয়ায়,
এখন উন্মত্ত প্রায়, শুনিলে তাে কথা ?
ম-মাতা। ঐ বাঁদরদের সব দেশেই এ ভাব,
এই দেশে আমদানী হয়েছে তাহার,
সাধে কি লে আমি তার পর হাড়ে চটা
সতেও পােল্লায় গেছে, শুনেছি কি না?
মঞ্জর। তঁাহার কথার ভাবে কিছু বুঝিলাম,
বিশেষ জানিনা কিছু।
ম-মাতা।
জেনে কাজ নেই,
ওসব বিলিতী কেলেঙ্কারীর কাহিনী।
বুড়ো তাে তাতেই চটে একেবারে লাল ।
বিষয়আশয় সব অন্তে দিয়ে দেবে,
যদি এর হেস্তনেস্ত একটা না হয় ।
তােরে বুড়ো ভালােবাসে, তুই কিছু পাবি,
সতেটা নিজের দোষে বঞ্চিতই হলে।
মঞ্জরী। মা, আর ভাবিতে আমি পারিনা, পারিনা।
৮ম দৃশ্য
মিঃ সেনিয়েলের বৈঠকখানা।
সতত্য। বিদুষী ছুড়ীটা মােরে বড় দাগা দেছে ।
তােমার আমার সনে, হীনাবস্থা হেন
অষ্টম দৃশ্য।
চূড়ান্ত
৮৭
মিঃ সে।
পাত্রী হয়ে, শত গুণ থাকিলেও তার,
বিবাহের কল্পনাও যে করিতে নারে,
তার পাণিপ্রার্থী হয়ে আমি প্রত্যাখ্যাত ;
আশ্চৰ্য্য না ?
বিলাতে না গিয়াও দাদার
প্রেমকরাটা যে বেশ অভ্যস্ত হয়েছে।
গুয়ের এপিট আর ওপিট সমান
কি না বল ?
সত্য।
জানিলাম কল্পনাতীত
কথা, ওটা গােস্বামীর প্রণয়-আবদ্ধ,
তার সঙ্গে সঙ্গে নৃত্যাদিও করে,
কিন্তু প্রণয়ের অর্থ তুমি আমি বুঝি
যাহা, এই ক্ষেত্রে নাই তার পরিচয়।
মিঃ সে। এসব নিছক বুজরুকি, এদেশের
হিন্দুদের গাঁজাখােরি দেবতাকল্পনা !
আজ সবে আমি তার পেয়েছি সন্ধান,
বাগানে গােপনে রাসলীলা উহাদের
গােস্বামীরে কৃষ্ণ করে।
সত্যেন ।
যদিও ততটা
সত্য না হতেও পারে, কল্পনায় প্রেম
আস্বাদন করা মূলে অসম্ভব নয়,
অগ্নিসহযােগে ঘৃত গলিবেই কি না,
স
চূড়ান্ত
[ তৃতীয় অঙ্ক
এ পরীক্ষা আবশ্যক বিবেচিত হয়।
ভেবে দেখ, বৈজ্ঞানিক ঘৃতের সহিত
এমন পদার্থযােগ সঙ্কেতে ঘটাল,
যাহার প্রভাবে তাহা সাধারণ তাপে
গলে না, পরন্তু তাপাধিক্য হলে গলে।
বিদুষীর দর্প চূর্ণ করা আবশ্যক।
লতিকা বেচারা কোন দোষে দোষী নয়,
তার প্রতি প্রতিহিংসা তােমার না সাজে ;
অথচ বিদুষী জব্দ হইলে সকলে,
লতিকা, তাহার স্বামী, আর তার পিতা
এককালে কাবু হয়। একই গুলিতে
দুই বক শিকারের কথা শােনা আছে,
এই ক্ষেত্রে চারি বক হবে ভূপতিত।
মিঃ সে। উকীলেরবুদ্ধি, দাদা, খেলিয়েছ খুব,
বাহবা, বাহবা ! আমি হাটে মাত্র হাড়ী
ভেঙ্গে প্রতিহিংসা নিতে ছিলাম উদ্যত।
সত্যেন্। এর নাম প্রতিহিংসা ? আমার প্রস্তাব
শতগুণে শ্রেষ্ঠ নয় কি না? পবিত্রতা
গৰ্ব উহাদের, তাহা যে কোন কৌশলে,
ছলে, বলে, চুর্ণ করা প্রতিহিংসা বটে।
মিঃ সে। তােমার ফন্দিটা তবে খুলিয়াই বল ?
সত্যেন্। ব্যারিষ্টারী কর, না, ও শুধু ঝকুমারি ?
অষ্টম দৃশ্য ]
চূড়ান্ত
নাচিতে জানি না আমি, তুমি তাতে পটু,
নৃত্যচ্ছলে বিদুষীর কর সর্বনাশ ।
মিঃ সে। তােমার বােনের কাছে শুনিয়াছি আমি,
নৃত্যকালে তার নাহি থাকে দেহবােধ।
সত্যেন্। বেশ ভাে, পরীক্ষা তারই কর না কৌশলে ?
জগতে রহস্যজাল ভেদ করা প্রাণ
দিয়াও কৰ্ত্তব্য লােকহিতকামনায়।
মিঃ সে। (স্বগত) রঙ্গমঞ্চে বিদুষীরে অল্প বলিয়া
ভ্রম হয়, কামানলে জ্বলে পুড়ে মরি।
(প্রকাশ্যে) তােমার অভীষ্ট কাৰ্য্য করিব সাধন।
৪র্থ অঙ্ক
১ম দৃশ্য
লতিকার মায়ের কক্ষ
ল-মা। কেন যে এমন হয় ! লােকে মনে করে,
আমি বড় ভাগ্যবতী, স্বামীর অতুল
যশ, ঐশ্বর্যের তার নাহিক অবধি
কন্যা মাের লতিকার স্বভাব চরিত্রে
সবাকার প্রাণমন করয়ে হরণ।
;
১০
চূড়ান্ত
[ চতুর্থ অঙ্ক
অথচ তাহারা জানে, আমি কি লাঞ্ছনা
ভুগিয়াছি এ স্বামীর প্রথম বয়সে।
বিলাত হইতে এসে বিবাহ করিয়া
আমায় যৌবনােচ্ছাসে, ওদেশের প্রথা-
অনুসারে, পূৰ্ব্বরাগসঞ্চার হইলে,
বাহত আমায় ভালােবাসিতে তঁাহার
চেষ্টার না ছিল ত্রুটি ; কিন্তু শিক্ষাদীক্ষা
মাের যাহা হক, জন্ম লভি’ এই দেশে,
যােল আনা প্রাণ দেন নাই তিনি মােরে,
বুঝিলাম অচিরাৎ। পরীক্ষার দিন,
যাহা হক, কেটে গেল শেষে, স্বদেশের
প্রতি প্রীতি, যাহা ছিল অন্তরনিহিত
ঔর, তাহা কালক্রমে বিকশিত হলে।
উদার, ভাবুক উনি ছিলা চিরকাল,
বিশ্বপ্রেমে মাের ভাগ কেন না মিলিবে ?
কিন্তু কে খাবে বল বিধাতৃবিধান ?
রূপান্তর ধরে’ দুঃখ পুনঃ দেখা দিল,
ছেলেটা চরিত্রহীন হইতে লাগিল।
প্রচলিত শিক্ষা প্রতি মােরা শ্রদ্ধাহীন
বরাবর ছিঃ, তার প্রতি বীতরাগ
দেখে ওরে কিছুমাত্র দুঃখ নাহি ছিল ;
মানুষ করিতে ওরে আছি প্রয়াসী।
প্রথম দৃশ্য ]
চূড়ান্ত
সঙ্কল্পের ফলদাতা কিন্তু ভগবানু।
বিলাত যাইতে ওর দুৰ্ম্মতি হইল,
যার পর খড়গহস্ত আছিলেন উনি।
ও যত যাইতে জি করিতে লাগিল,
উনি তত উল্টাদিকে বাঁকিয়া রহিলা।
আমি মাতা হতভাগী পরীক্ষা বিষম
আমার সম্মুখে একি! বুঝিবে মরম
এর মাত্র সেই জুন যেই ভুক্তভােগী।
তবু বুঝালেম ওরে ; ও বলিল মােরে
সহজ সরল কথা, “বিলাত না গেলে
কে বিয়ে করিবে মােরে? তােমাদের দেখি,
সৃষ্টিছাড়া সমাজের সৃষ্টিছাড়া প্রথা,
বাঁদুরে ইংরেজী বুলি মুখে না ফুটিলে,
সুন্দরীরা মুখ তুলে কথাটি না কন!”
উত্তর করিমু আমি, “কেহ না করিলে
নিশ্চয় করিবে বিদু” (কৌমার্য্যের পণ
তাহার তথনও কারাে নাহি জানা ছিল)।
একথার উত্তরে ও অবাক্ করিয়া
বলিল, “বিদুরে বিয়ে করা, লতিকারে
বিয়ে করা তুল্য ধৰ্ম্মবিগর্হিত কাজ।
তােমাদের বিলাতী এ প্রেম নাহি বুঝি!
বিদুরে শৈশবাবধি কনিষ্ঠভগিনী-
চূড়ান্ত
[ চতুর্থ অঙ্ক
প্রাপ্য স্নেহ দিয়া পরে তারে পত্নীরূপে
গ্রহণ করার নাম প্রেম নহে, পাপ।
তােমরা বা কোন্ প্রাণে বিদুষীর ঘাড়ে
চাপাইবে আমাহেন গুণধর বরে ?”
এমন সুবােধ ছেলে ক্ষেমঙ্কর মাের,
কেন গো এমন হল ? উনিতাে নিশ্চিন্ত,
ছেলের বে-চাল দেখে বিচলিত নন ;
বলেন, “সংস্কার মাত্র প্রভাব বিস্তার
করে মানবের পরে, শিক্ষা দীক্ষা তার
গতিরােধ করিবারে সমর্থ না হয়।”
ইহাতে মায়ের প্রাণ প্রবােধ কি মানে ?
( বিদুষীর মায়ের প্রবেশ)
এস দিদি, এস, এস, ক’দিন দেখিনি ?
ঘরসংসারের কাজে ব্যস্ত থাক তুমি
জানি, তবু ইচ্ছা হয় ঘনঘন দেখি ।
বিদু-মা। সংসারের কাজ ? কই ? তেমন কিছু না,
নিজে দু’টি বেঁধে খাই, তাই বুঝি বড়
বেশী কাজ মনে কর? আমাদের দেশে
এভাব তাে কোনাে দিন ছিলনাক বােন্?
ঠাকুরের রান্না, বল, খেয়েছি ক’দিন ?
এ পােড়াজীবনকথা বলি কিছু শােন,
দুঃখের কাহিনী বলে’ সুখ পাই মনে।
প্রথম দৃশ্য ]
চূড়ান্ত
তােমার ভাসুর, আমাদের বিবাহের
বছর দেড়েক পর, তখনও ছােট্টটি
আমি-ভালােবাসা, ভালােবাসা নােকমুখে
শুনি, কিন্তু নিজে ঠিক পারি না বুঝিতে,
স্বামীর সােহাগ পেলে কিন্তু গলে যাই
এমন সময় ঠিকূগেলেন বিলাত।
বাবা রাগ করে মােরে নিলেন নিজের
কাছে ; হিন্দু আচারেই বছর তিনেক
আরও কাটিল, রান্নাবাড়া আদি কাজে
থাকিলাম যেন ডুবে। এদিকে তােমার
ভাসুর জাঁকিয়ে খুব শেষ পাশ দিয়ে
ফিরিলেন দেশে, ধন্যি ধন্যি পড়ে গেল।
আমি তাে তখন বেশ হয়েছি ডাগর,
ইচ্ছে হল পাখা ধরে’ বােষে চলে যাই।
বাবা এ খবর পেয়ে, বাঁচালেন মােরে
নিজেই জিজ্ঞাসা করে, “গােখাদক স্বামী
যেই তার কাছে তাের যেতে ইচ্ছা হয় ?”
মুখে না বাধিল মাের বলিতে এ কথা,
“তােমার এতে না যদি কোন ক্ষতি হয়।”
বাবা বলিলেন, “এতে মাের ক্ষতি কি রে ?
জা’ত যাবে তাের ধৰ্মকৰ্ম্ম নষ্ট হবে।”
চট করে কি খেয়াল মাথায় আসিল,
৯। [ চতুর্থ অঙ্ক চূড়ান্ত বলিলাম, “আচ্ছা বাবা, ধােপায় ধােপায় চাড়ালে চড়ালে দেখি যে বিবাহ হয়, তারা তো হিন্দুই ? ম্লেচ্ছ কি মুসলমান, ধৰ্ম্ম এক সকলের আছে ; স্ত্রীলােকের স্বামীর ধর্মই ধৰ্ম্ম।” বাবা শুনে চুপ। লতি-মা। আচ্ছা দিদি, জিজ্ঞাসিব, গােপনীয় যদি , কথাটা পাড়িব না, দুঃখের সে কথা। বিদু-মা। হ’ক না দুঃখের কথা? তা বলেই সুখ, কি কথা তােমার বােন্? বল, বাধা নেই। লতি-মা। বিলাতে থাকিতে বঠাকুর তােমায় চিঠিপত্র লিখিতেন? বিদু-মা। শুধু লেখা? কত দুঃখু করে লেখা-বাবা যদি না ছাড়েন মােরে, তবে দেশে ফিরে, চাকরী করেও আর বিবাহ না করে চির-সন্ন্যাসীর মতাে কাটিবে জীবন- এ সব প্রাণের কথা লিখিতেন তিনি। বিদ্যেসাধ্যি মাের সবে দেখিতেই পাও, অতবড় তার যুগ্যি কিছুই ছিল না, তবু তাঁর ছিল সদা আমাগত প্রাণ। শহরে পা দিয়ে ছুটে আসিলেন হেথা, বাবারে না ছুয়ে হাত বুড়ে’ বলিলেন, “অনুমতি পেলে তবে পাদস্পর্শ করি,
প্রথম দৃশ্য ]
চুড়ান্ত
করুন বিশ্বাস, আমি অখাদ্য আহার
কখনও করিনি আপনার কথা ভেবে,
প্রায়শ্চিত্ত যথারীতি তথাপি করিব।
যে কয়েক দিন সেই কাজ না হইবে,
আপনার কন্যা রবে আপনার কাছে,
কিন্তু প্রতিদিন চাই সাক্ষাৎ বারেক।”
বাবা তো আহলাদে আটখানা কথা শুনে,
বলিলেন, “অবিশ্বাস্য তােমার কথায়
কিছু নাই, প্রতি বর্ণ সত্য ও সঙ্গত।
তিন দিন পরে প্রায়শ্চিত্ত করা হয়,
এই তিন দিন রােজ আমাদের বাড়ী
এসে কাটাতেন
শুধু আমারই কাছে,
কি যে করিতেন, কি যে বলিতেন, যেন
উন্মাদের মতো। তাই চিন্তার খােরাক
করে বেঁচে আছি ছেড়ে তারে কত কাল !
লতি-মা। তিনি তবে পুরাপুরি হিন্দুই ছিলেন ?
বিদু-মা। তােমাদের মতাে ঠিক ধরে নিতে পার,
যদি ও এতটা নিষ্ঠা দেখিনি তাহার ;
আর কিছুকাল বেঁচে থাকিলে কি হত
বলিতে পারি না। পাণ থেকে চূণ খসা,
বারব্রত, পূজা, পালপাৰ্বণে আমার,
বরদাস্ত হইত না তার, পাছে আমি
চূড়ান্ত
[ চতুর্থ অঙ্ক
কোন দুঃখ পাই মনে, বুঝি এই ভেবে।
আফিসে সাহেব পূরা ঘরে ভােলফেরা।
লতি-মা। নিত্য তবে তার কথা করহ স্মরণ ?
বিদু-মা। বিস্মরণ হন নাই তিনি দিনেকের
তরে, স্মরণের কথা বলিছ কি তুমি ?
লতি-মা। স্বপ্নে তঁার দেখা পাও?
বিদু-মা।
ইচ্ছা হইলেই।
এখন যে কথা বলি শােন মন দিয়া,
শুনিবার বা কি প্রয়ােজন ? এই দেখ ।
(বলিয়াই একখানি চিঠি প্রদান )
সত্যেকে একটু কড়কে দিতে আমি নিজে,
হয়নি এমুখে আর। আবার উৎপাত
একি হল দেখ। বিদু নিজে নির্বিকার,
চিঠিটা খুলেই এক ছতর না পড়ে
দিয়াছে আমায়, বােধ হয় ইচ্ছা, আমি
তােমাদের পরামর্শ লয়ে কিছু করি।
বেনামি এ চিঠি, অতি কদৰ্য্য ভাষায়
কুচ্ছিত ইঙ্গিতে ভরা।
লতি-মা।
সে দুষ্টেরই কাজ,
এতে মাের কিছুমাত্র নাহিক সন্দেহ।
খারাপ কথার দ্বারা খারাপ মনের
ভাব জাগাইতে ওর প্রয়াস কেবল।
প্রথম দৃশ্য ]
চূড়ান্ত
হাতের লেখাটা ক্ষেমা চিনিবে নিশ্চয়,
(পুত্রকে আহ্বান) ক্ষেমা, বাবা, একবার আয় তাে এখানে।
দুষ্টের শাসন মােরা করি কোন্ মুখে
আমাদের ঘরে যবে পুত্ররত্ন হেন ?
বিদু-মা। মেয়েদের বিবাহই ভালাে মনে করি,
এমন হোম তবে পােয়াতে না হয়।
ল-মাতা। কামুক বরের হাতে আত্মসমর্পণ
বিদুষীর মতাে মেয়ে করিতে না পারে।
তুমি তাে হিন্দুর মেয়ে জানা আছে সব,
ব্রাহ্মদের ভিতরেও প্রাবলা কামের
এত আমাদের কালে নাহি ছিল জানি।
পাশ্চাত্য প্রভাবান্বিত যুবক যুবতী,
উদ্ধৃঙ্খলস্বাধীনতালিপ সাপরবশে,
এভাব যে অতিদুষ সে জ্ঞান হারায়ে,
দেশের ও সমাজের অনিষ্ট অশেষ
করিছে সাধন ; মােরা ভেবে চিন্তাকুল।
বিদু-মা। সত্য কথা বােন, আমি এতটা ভাবিনি।
(ক্ষেমঙ্কর আসিলে তাহাকে চিঠিটা দিয়া )
ল-মাতা। বলতো বেশ করে পড়ে কে লিখেছে এটা?
ক্ষেম। (পড়িয়া) শালাকে জুতিয়ে জব্দ করে তবে কথা।
ল-মাতা। দেখ, মাতলামি করা এখানে না সাজে,
আমি ছাড়া জেঠাইমা তাের উপস্থিত
ভদ্রভাবে কথা বলা না হয় উচিত ?
চূড়ান্ত
মা তুমি জেঠাইমার কাছেই বলিলে
আমি মদপাের ? বাবা মাের সর্বনাশ
করিল সাধন, শেষে তােমারও সে কাজ?
বিহু-মা। না বাবা, তােমায় এমি কথা বলতে পারে
মা তােমার ? আমি ও কি পারি? বড় ভুল
বুঝিলে যে ; ওর মানে, যে কথাই বল,
ভদ্রভাবে বলা চাই, চটে ও খারাপ
কথা মুখে আনিবেনা। তুমি অতি প্রিয়
আমাদের, এই ত্রুটি দেখিলে তােমার
আমাদের কষ্ট হয়।
তােমরা কি চাও
তবে সত্যেন্ উকীলে মারিবনা আমি,
ওর এই শয়তানি দেখে চুপ মেরে
যাব ? এতবড় বৈষ্ণবতা মাের নাই।
মূর্থের ঔষধ লাঠী, জান তো সকলে ?
বিদু-মা। বাবা, শান্ত হও, মারধরে কাজ নাই,
বাবার মতন হতে চেষ্টা করা চাই।
বাবাই তাে সৰ্ব্বনাশ করেছে আমার,
এত দিনে কি মানুষ হয়ে ফিরিতাম!
বিদু-মা। তােমার এ কথা, বাবা, মানিতে না পারি ;
টাকা রােজগার হত, হয় তঅ হতনা,
চরিত্রটি ভালাে রাখা খুব শক্ত হত।
প্রথম দৃ]
চূড়ান্ত
শ।
বাবার ও আদি লীলা মাের জানা আছে।
-মাতা। (জনান্তিকে) বিদায় করনা ওকে যেমি করে হয়।
বি-মা। ছিঃ বাবা, বাপের দোষ ছেলে দেখে কভু ?
তুমি তবে যাও, দেখাে, ঝগড়া করােনা।
তােমার বাবার সাথে এই চিঠি নিয়া
বুঝাপড়া যাহা হয় আমরা করিব।
তুমি তো আমার কথা বরাবর শােন,
কেমন, আমার কথা এখনও রাখিবে?
নি। বিদুর নিন্দা শুনিতে না পারি,
তাই চটেমটে শেষে মার মনে ব্যথা
দিয়া বাবারও নিন্দা মার কাছে করা
বই অন্যায় হল। (স্বগত) হও সাবধান!
বিলাতে না যেতে পেয়ে জাহান্নমে তুমি
যাইতে কি বসিয়াছ ? হও সাবধান!
(প্রস্থান)
ল-মাতা। (স্বগত) ঠাকুর, মােরে মাের ভালাে করে দাও।
বিহু-মা। (বাহিরে মােটরের শব্দ শুনিয়া)
ঠাকুরপাে আসিলেন, আমি তবে যাই।
মীমাংসা কি হয় শীঘ্র জানাবে আমায়।
২য় দৃশ্য
লতিকার পিতা আসনপিড়ি হইয়া বসিয়া জলযােগে নিযুক্ত
লতিকার মাতা পার্শ্বে আসনে উপবিষ্টা
-মা। জরুরি সংবাদ দিয়া এইমাত্র দিদি
গেলেন, তােমার আসিবার আঁচ পেয়ে।
ল-পিতা।
আগে বলিলেনা কেন? ওঁদের বাড়ীতে
গিয়া কাজ একেবারে সেরে এলে হত।
ল-মাতা। কাছারিতে জল স্পর্শ পর্যন্ত করনা
জানি, জলখাবার না খেয়ে যেতে পার ?
ল-পিতা। খুব পারি, খুব পারি, পারাই উচিত।
লা-মাতা। আমার পরাণে তাহা সহিতে কি পারে?
ল-পিত। তা বটে। সংবাদটা কি জেনে রাখা ভালাে।
ল-মাতা। কে-না-কে বিদুকে এক চিঠি লিখিয়াছে
নামধাম নাহি দিয়া, লেখাটা চিনিতে
ক্ষেমাকে ডাকান হল, সে বলিল, এর
মূলে সত্যেটাই আছে, যদি ও লেখাটা
তার নয়। বলিয়াই উন্মত্তের মতাে
ধাইল মারিবে বলে, মােরা থামালেম।
দ্বিতীয় দৃ]
চূড়ান্ত
ল-পিত। তােমার যেমন বুদ্ধি! ওকে ডাকা কেন?
ও তাে জান বিদুষীরে লতিকার চেয়ে
ভালােবাসে? ওর এটা সহিবে না, ইহা
তােমাদের আগে জান আছিল উচিত।
হিতাহিত জ্ঞান ওর মােটে নাই। যাক,
ঠাণ্ডা যে হয়েছে, ভালাে। চিঠিতে কি লেখা ?
ল-মাতা। বিদুষীর প্রেমাকাকা গােস্বামীকে দিয়া
মিটিবার নয়, বিশ্রী বিশ্রী কথা দিয়া
ইহা প্রতিপন্ন কৈতে চেষ্টা আগাগােড়া।
-পিতা। বৌদিদি দুখিতা খুব?
-মাতা।
খুব বেশী মনে
হইল, আসিয়াই কথার মাথায়
স্বামি-বিষয়ক এক অতীত কাহিনী
বর্ণনা করিতে তিনি সুখ অনুভব
সবিশেষ করিলেন, লক্ষ্য করিলাম।
আরও বুঝি তিনি তােমার উপর
সত্যই নির্ভরশীলা সকল বিষয়ে।
ভােমার মীমাংসা তারে শীঘ্র জানাইতে
অনুরােধ করিলেন যাইবার বেলা,
ইহাতেই বুঝা যায় ব্যাপারটা তার
মনে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করিয়াছে কিছু।
চূড়ান্ত
[এ
পিতা। কিছু নয় গাে, বিশেষ। যাই, শীব্র যাই।
দেখিলে, কেমন শক্ত ছিদ্র বার করে ?
দেখাে, জামাতার কাণে না ওঠ একথা ।
শুনিলেও ওর শান্তিভঙ্গ নাহি হবে,
তথাপি না শােনা ভালাে, ক্ষেমা না প্রকাশে।
ল-মাতা। তােমার একথা ওকে বুঝায়ে বলিব।
ও তত বলে, এ মূর্থের লাঠীই ঔষধ,
কোর্টে মােকদ্দমা করা কেলেঙ্কারী সার।
পিতা। বৌদিদিকে শান্ত করা মাত্র মাের কাজ,
বিদুর দরুণ চিন্তা মােটে নাই মাের।
বিদুষীদের বাড়ী
(জলযােগের বেশেই প্রবেশ করিয়া)
পিত। বৌদি, এই মাত্র বাড়ী এসে শুনিলাম,
আপনি বিশেষ কাজে আমাদের বাড়ী
গেছিলেন। কাজটা যে জরুরি সন্দেহ
নাই, ভাবার আছে যথেষ্ট কারণ।
বি-মা। বিছু, হাতপাখাখানি শীত্র নিয়ে আয়।
চূড়ান্ত
পিতা। হাওয়ার দরকার নাই, আপনাতে
আমাতে যে কথা হবে তাহা গােপনীয়,
বিদুর না থাকা হেথা ভালাে মনে করি।
বিদু-মা। তা কি হয়? আপনার বড় কষ্ট হবে,
এই কাজ তবে আমি নিজেই করিব।
*পিতা। সৰ্ব্বনাশ! পাপকে যে বড়ই ভাই।
অন্থে না জানুক, বেশ জানেন আপনি,
এমন মানুষ আমি না ছিলাম আগে,
পাপবােধ তবে ছিল কুজব ঝটিকাময়,
জ্ঞানসূৰ্যালােকে এবে প্রকট আকার।
দিবানিদ্রা, অতিনিদ্রা, সন্তানকামনা
বিনা পত্নীসহবাস, পাপ বলে গণ্য
নাহি ছিল, এবে দেখি সব বড় পাপ।
বলুন, একাজ নিজে করিতে পারিনা,
এটা কি দোষের নয় ? চাকরের কাজ
আছে অবশ্যই জানি, কিন্তু তা এরূপ
বলে মনে নাহি হয় ; আত্মসেবা তরে
অন্যের অপেক্ষা করা সৰ্ব্বথা অন্যায়।
তবে, প্রণিধানযােগ্য এক কথা আছে,
বির ও আমাদের মনের ভিতর
গােপনীয় কিছু থাকা সঙ্গত ও নয়।
রহস্যের গুপ্তিমৰ্ম্ম ওর জানা আছে,
চূড়ান্ত
[ চতুর্থ
মন্ত্রণা দানের শক্তি, বুদ্ধিমত্তা প্রাণ
যার, আছে কিনা ওর, চাই পরীক্ষিতে।
উপস্থিত ব্যাপারের মীমাংসার শেষে
সুখের সংবাদ এক করিব জ্ঞাপন,
বিদুর ও পরামর্শ তাতে আবশ্যক।
বিদুষী। বকে’ বকে’ আয়ুক্ষয় কেন কর কাকা,
যবে কোর্টে নাহি রও? তুমি বলিলেই
অম্নি পাখাখানি রেখে ঘর ছেড়ে যাব ?
বারিষ্টারী ফলাবার এ জায়গা নয়।
তার পর, স্থান দিতে রাজী হলে তুমি,
যেহেতু আমার পরামর্শ আবশ্যক
হবে পরে। বাঃ রে যুক্তি ! আমি ততক্ষণ
বাহিরে যাবনা কেন বলিতে কি পার ?
পার খুব, খুব জান, কিছুতে যাবনা।
এখন বল তাে সুখ কিসে বেশী হয়,
আমার সেবায় বেশী, না, আত্মসেবায় ?
যা’ক উত্তরের আমি প্রত্যাশা করিনা,
শীঘ্র শীঘ্র স্বীয় কাজে তুমি দাও মন।
পিতা। উপদেশ শিরােধার্য্য করিলাম আমি।
চিঠি কার তাহা ধর শক্ত কিছু নয়,
যেহেতু নিজেই তাহা করেছে স্বীকার
তার মতাে ভালােবাসা অপর কাহারও
তৃতীয় দৃ]
চূড়ান্ত
সাধ্য নয়। তবে কেন গােপন করিল
নাম? তার হেতু, আমি করি অনুমান,
দোষের আরােপ আছে চরিত্রে বিদুর,
লতির বরের সনে সাহচর্য ওর
সুস্পষ্টকটাক্ষপূর্ণ ভাষায় বর্ণিত।
ক্ষেমা ঠিক বলিয়াছে, মূখের ঔষধ
লাঠী, মনে হয় তার হবে প্রয়ােজন,
এরূপ ইঙ্গিত যদি করে ভবিষ্যতে।
ক্ষমা করা এইবার সর্বথা উচিত,
অভিযােগ অকৰ্তব্য মানহানিহেতু,
আমার বিচারে সদা, সৰ্ব্ব অবস্থায়।
কেননা, মানের দাবী অবৈষ্ণববাচিত,
তার হানি জানি মােরা অলীক ব্যাপার।
কৌমার্যব্রতীর প্রতি কটাক্ষের হানি
প্রাকৃতজনের অতি সম্ভাব্য ব্যাপার,
তাতে ক্ষুন্ন হওয়াই হীনতা স্বীকার ;
বিদুষীরে এত হীন আমি নাহি ভাবি।
কুৎসিত ভাষার ব্যাখ্যা লতিকার মাতা
করিয়াছে, বেশী বলা নহে আবশ্যক।
শেষ কথা, বৌদি যেন দুঃখিত না হন,
আপনি, আমরা এটা গ্রাহ না করিলে
শক্রতাসাধনচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাবে।
;
চূড়ান্ত
এখন মুন এক সুখের সংবাদ।
সুষেণ দোকান তার চালাইছে বেশ,
দেখে’ এক বন্ধু মাের ওর বিবাহের
এক প্রস্তাবনা লয়ে আজ উপস্থিত।
দার্জিলিঙে সুষেণের দোকানের পাশে
বাস তার, সরকারী চাকরী জীবিকা ;
নিজে মােটা মাহিয়ানা পান; ভ্রাতুস্পুত্রী
পাত্রী, তার পিতা নাই, মাতা বর্তমান।
পাত্রীটি দেখিতে ভালো, পাড়াগাঁয়ে থাকে,
তাই আশা করি, আপনাকে দুটি বেঁধে
দিবে, বিদুষীর কিছু হবে অবসর
অপর অপর গুরুকৰ্ত্তবপালনে।
বন্ধুটির এ যাবৎ এ ধারণা ছিল,
দাদা দেহত্যাগকালে প্রচুর অর্থই
রাখিয়া গেছেন ; শেষে শুনে সব কথা,
এ পাত্রেই কন্যাদান করিতে ইচ্ছুক।
বলুন, পাত্রীটি হেথা আনিতে বলিব ?
আপনার দেখিবার সুযােগ যাহাতে
হয়; ভদ্রলােক তাহা করিতে প্রস্তুত।
কি বলেন মন্ত্রির বিদুষী বিদুষী?
আনন্দে কি নৃত্যারম্ভ করিবেন তিনি?
বিদুষী। মশায়ের রঙ্গ দেখে’ রসভঙ্গ হয়,
চূড়ান্ত
অঙ্গভঙ্গী তা হইলে হইবে কেমনে?
নাচিবার সাধ কিন্তু পূরাপূরি হয়।
বিবাহ না করে নিজে মার মনে ব্যথা
দিয়াছি বিস্তর আমি, তাই আজ মাের
আনন্দ অপার। কাকা, এত কাজ সত্বে
আমাদের জন্য তুমি এতখানি ভাব,
ইহা ভেবে আনন্দে যে গলে যাই আমি,
নাচিবার শক্তিটুকু পৰ্য্যন্ত হারাই।
তােমার একটা কথা বেসুরে বাজিল
কিন্তু কাণে।
মেয়েদের রান্নার কাজটা
অবজ্ঞার চখে তুমি দেখিতেছ কেন ?
মাকে রেধে খাওয়ান কর্তব্য আমার
মাত্র নয়, অতিবড় আনন্দের কাজ।
পিত। খুব জানা আছে তাহা, বিরত ছিলাম
তাই বাধাদানে। তবে কি জানিস্ বিহু ?
আমরা অভ্যস্ত নই বলে, কষ্টকর
মনে হয়, সাধ হয় আমরা করিনা
যাহা তােকে যেন তাহা করিতে না হয়।
বিদু রে, আমি যে তােরে লতিকার মতাে
প্রাণ দিয়া ভালােবাসি; দাদার দেহান্ত
কালে তাের আধআধ কাকাকাকা সেই
মিষ্ট বােল এখনও বাজিতেছে কাণে,
চূড়ান্ত
[ চতুর্থ
হৃদয়তন্ত্রীতে মাের তুলিছে ঝঙ্কার !
ঠাকুর পাে, আপনার ঋণপরিশােধ
হইবেন৷ এজীবনে ভালাে করে জানি।
পাত্রী দেখিবার ভার আমার উপর
দিতেছেন কেন ? নিজে দেখিলে না হয় ?
ল-পিতা। আমি নিজে দেখি নাই এমন পাত্রীর
সঙ্গে বিবাহের কথা মাত্ৰ উত্থাপন
করি নাই, এইটুকু শুধু বুঝে নিন।
আপনার যে রূপের ঘোরে বিলাতেও
দাদার আমার মাথা ঘূরিতে থাকিত,
তেমন রূপের কথা অবশ্য বলিনা,
পাত্রীটি সুন্দরী তৰু। এখানে আসিলে,
স্ত্রীলােকের যােগ্য চখে দেখিতে পাবেন
নিজে, বিদু বিদ্যাবতী পরীক্ষা করিবে
তার বিদ্যা—নৃত্য আদি, কেমন না, বিহু ?
বিদুষী। তােমার ঠেসের, কাকা, বালাই নে’ মরি।
নিজে গিলিয়েছ তাই গিলেছি বিস্তর
ইংরেজী কিতাব, এবে কিন্তু বিমমিষা
পীড়া দেয় মােরে, ভাবি সংস্কৃত না পড়ে,
অমূল্য সময় নষ্ট করিয়াছি কত।
পরীক্ষা করিব তুমি যেমনটি চাও,
নিজে নৃত্যে মত্ত বলে দুজ্ঞেয় কারণে,
তৃতীয় দৃ}
চড়ান্ত
পল্লীগ্রামে লালিতা যে স্বভাব-বালিকা,
তার নৃত্যবিদ্য| আমি পরীক্ষা করিব,
আমি কি সত্যই তবে লঘুচিত্ত এত,
কাণ্ডজ্ঞানহীন ? তুমি অন্ততঃ আমায়
এতদূর হীনচেতা মনে নাহি ভাব ?
-পিতা। তবে তােতা জানিস্ ঠিক, মিটে গেল গােল।
“দুজ্ঞেয় কারণে” কেন? খুলে বলি বি কি?
তুইতাে আমায় বলেছিলি, কবীন্দ্রের
বাড়াবাড়ি এ বিষয়ে দেখে ইচ্ছা তাের
বুঝাইতে লােকে খাটি নৃত্যের স্বরূপ ?
বিদুষী। ইহাকেই বলি আমি দুজ্ঞেয় কারণ,
‘আমার ইচ্ছার অর্থ ইচ্ছ। গৌরাঙ্গের।
-পিতা। তর্কে হা’র আর বার করিছি স্বীকার,
ধন্য মেয়ে তুই বিহু, ধন্য মেয়ে তুই।
আমি তবে যাই এবে, এক কথা বলে-
আমার নিজের প্রিয় পল্লীবাসভুমি,
পল্লীর কুটীর শ্রেণী ; কুগ্রহের ফেরে
অট্টালিকা নির্মাণের কল্পনা নগরে
হয়েছিল মাের, (সেই সঙ্গে তােমাদের
জন্য ও সামান্য এই ব্যবস্থা করেছি ),
ঠাকুরের দরশন পাইনি যখন।
দূতা ইহার মৰ্ম্মে মর্মে বুঝি এবে।
•
[চতুর্থ ও
চূড়ান্ত
ঠাকুর সহায় হলে যাব ফিরে গ্রামে
তােমাদের সঙ্গে লয়ে, থাকিব নির্জনে।
রাজী আছ কি না বল অকপটে মােরে।
বিহু-মা। আমাদের মত ও যে জানিতে চাহেন,
মাহাত্ম্যির পরিচয় ইহাতে ও পাই।
৪র্থ দৃশ্য
শয়নকক্ষে সেনিয়েল ও মঞ্জরী
মি সে। দিন দিন তুমি যেন হইছ কেমন,
নাচে আর সে উৎসাহ দেখিনা তােমার।
পুনঃ পুনঃ বলিয়াছি আমি সার কথা,
বাচ এবিদ্যার সেরা, তাহা বিনা
উন্মাদনা আসিতে না পারে। বিদুষীরে
এ কথা বলেছ কি না নহি অবগত।
বলাে তারে, শিক্ষাদাতা উপযুক্ত আমি
থাকিতে, সুযােগ তার করিতে গ্রহণ
শৈথিল্য ধীমতী তার শােভা নাহি পায়।
মঞ্জরী। সর্বনাশ! স্ত্রী পুরুষ মিলিয়া যে নাচ
তাহা শিখিবার কথা বলিব তাহাকে ?
১১১
চতুর্থ ].
চূড়ান্ত
মিঃ সে। পুরুষের ভূমিকায় তােমরা হামেশা
অভিনয় কর, তেম্নি পুরুষ সাজিয়।
বনাচে কিবা দোষ বলিতে কি পার ?
মঞ্জরী। বিদুষী পুরুষবেশ করে না ধারণ,
এটা বুঝি তুমি মােটে লক্ষ্য কর নাই ?
মিঃ সে। স্ত্রীবেশেই সাজিবে সে, দোসর পুরুষ
সাজিবে তুমিই নিজে ; সমস্যার এই
নহে দিব্য সমাধান ? আপত্তি এখন
হইবেনা, উপরন্তু আগ্রহ বাড়িবে।
মঞ্জরী। নাচেই উৎসাহ তার পাইতেছে হ্রাস,
সে বলে, উদ্দেশ্য তার ব্যর্থ হইয়াছে
যেহেতু, সকলে মােরা তাহার ভাবের
গাম্ভীৰ্য্য রক্ষিতে মােটে নহি চেষ্টাবতী।
উন্নতিলক্ষণ কিছু দেখে সে আমাতে,
পরন্তু, অপর সকলের আচরণ
আনন্দময়ীর মনে ব্যথা দেয় বড়।
মি সে। মারাত্মক এসংবাদ ! ভাবিতে উচিত
ছিল এই পরিণাম, দলগঠনের
সমকালে ; কে না জানে এসব ব্যাপারে
ভাবের লঘুতাপ্রাপ্তি ঘটে অহরহ ?
( স্বগত) মহাত্মাদি—“আত্মবৎ মতে জগৎ”-
কাৰ্য্যক্ষেত্রে নামিলেন, শিক্ষার সংস্কার
১১২
চূড়ান্ত
[ চতুর্থ অফ
করে’ জাতি গঠনের চেষ্টা না করিয়া
(ইংরেজী শিক্ষার ফল অর্থগৃধ মুতা,
কামুকতা—ভারতের জাতীয়তানাশ );
ব্যর্থতা অবশ্যম্ভাবী তাঁদের যেমন,
বিদুষী ও ব্যর্থকাম হইবে তেমনই।
(প্রকাশ্যে) সঙ্গদোষভয়ে ভীতা কেন সে হইবে ?
নিজে তাে সে নির্বিকার, তা হলেই হল।
মঞ্জরী। ভয় কারে বলে বিন্দু জানেনা কখন,
আদর্শের অমৰ্য্যাদা মনঃকষ্টহেতু!
মিঃ সে। এ সময়ে বাচমন্ত্র দাও কাণে,
নিজে না পারিলে তারে আন মাের কাছে।
মরী। (স্বগত) হায় ! ভ্রান্ত স্বামী মাের এখনও বোঝেনা,
তাঁহারই চরিত্রদোষে অপবিত্ৰীকৃত
এ গৃহ, বিদুর পদার্পণযােগ্য নয়।
( প্রকাশ্যে ) তােমার কি মনে হয় আসিবে এখানে?
বহুদিন আসে নাই লক্ষ্য কর নাই ?
মিঃ সে। না আসার কি কারণ? (স্বগত) লতিকার পিতা
করেছে বারণ ? প্রতিহিংসানল,জ
ধ ধ! ( প্রকাশ্যে ) বাচ শিখিবার কথা
শুনে আসিবেনা ? তবে তার নৃত্যোৎসাহ
ভণ্ডামিরই এক নাম।
মঞ্জরী।
নিষ্ঠুর তাহার
১১৩
চতুর্থ দৃশ্য ]
চূড়ান্ত
প্রতি তুমি নাথ, এত হয়ােনা, হয়ােনা।
বিদুষীর নিন্দা শেলসম বাজে বুকে!
মিঃ সে। নিন্দা কে করিতে চায়? নিন্দা যে করায়ো।
বলিবে আমার কথা তাহারে সত্বর ?
মঞ্জরী। (স্বগত) ভগবা, পরীক্ষায় ফেলিলে আবার !
সে যে এ নাচের কথা শুনে ত্রাসে কাপে,
তা জেনে একথা তারে বলিব কেমনে?
আসিবেনা হেথা ত ও বলিতে না পারি,
বলিলে তাহার প্রতি হইবে আক্রোশ।
( প্রকাশ্যে ) বলিব তােমার কথা।
মিঃ সে।
তা হলেই হল,
বুদ্ধিমতী তার তবে আসাই নিশ্চিত।
(স্বগত) সত্যেনু বাবুকে দিয়া সেই প্রতিশ্রুতি
ভাবিনি সামান্য কাজে বিঘ্ন হবে হেন।
বিদুষী যে আসিবে না হেথ। এই কথা
স্বপ্নেও ভাবিনি কভু ! যদি নাই আসে,
তবে কি উপায় ? মাথা কাটা যে যাইবে
দারুণ লজ্জায় ! কারে বলি মনােব্যথা।
৫ম অঙ্ক
১ম দৃশ্য
বিদুষী প্রমুখ মহিলাগণের রাসলীলা”-অভিনয়ে প্রস্তাবনা
বিদুষী।
( নৃত্যসহকৃত গান)
পূর্ণচন্দ্রহাস্যরসে ধরায় হল প্লাবন,
রাসহরষরভসে মিলে স্কুঞ্জে গােপীগণ।
বসিয়া হাসিয়া বলে, "প্রিয়তম কৃষ্ণ,
তুমি বড় রাধাধর ধাপানতৃষ্ণ;
স্বধর্মপালনে নাই লজ্জার কারণ,
রসিক নাগর কর নির্ভয়ে চুম্বন।
সরস মানস এই যুগলমিলন
উপভােগ তরে যারা বিহীনমনন
পশুপক্ষিকীট, তরু-লতা-গুম, জড়,
তারাও দেখুকু যারা কুঞ্জের ভিতর।”
( বিদুষী নাচিতে নাচিতে দর্শকমণ্ডলীর পুনরাবর্তী মিঃ সেনিয়েলের
সম্মুখে আসিতেই তিনি লাফ দিয়া রঙ্গমঞ্চে উঠিয়া তাহাকে ধরিয়া নাচিতে
লাগিলেন। মঞ্জরী স্বামীকে বাধা দিতে সাজঘর হইতে বাহির হইতে না
হইতেই ক্ষেমঙ্করপ্রমুখ দর্শকগণ ‘মার শালাকে মার’ বলিয়া চীৎকার করিয়া
উঠিল ; ক্ষেমঙ্কর ষ্টেজে উঠিয়াই স্বামীর অভিমুখে ধাবমান। মঞ্জরীকে বাহুবদ্ধ
প্রথম দৃশ্য } চূড়ান্ত করিয়া চুম্বন করিতে লাগিল ; মঞ্জরীর চীৎকারে মিঃ সেনিয়ে সেই দিকে ফিরিতেই ক্ষেমঙ্কর তাহাকে মারিতে উদ্যত হই। এদিকে বিদুষীও নাচ শেষ করিয়া দেখিল এই দৃশ্য, আর তমুহূর্তে সংজ্ঞা হারাইয়া পড়িয়া গেল। প্রাথমিক চিকিৎসায় ফল হইতে বিলম্ব দেখিয়া ক্ষেমঙ্কর পিতাকে ফোন করিল। তিনি একজন প্রবীণ ডাক্তার, স্ত্রী, লতিকা, গোস্বামী ও বিদুষীর মাকে সঙ্গে করিয়া আসিয়া বিদুষীর চৈতন্যসম্পাদন করাইলেন) ( যবনিকা)
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.