Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Prabhatee
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
s
No text on this page.
প্রভাতী
প্রভাবতী দেবী
-
প্রকাশক-ঐহিরণকুমার মৈত্র।
২নং বেথুন ৰাে, কলিকাতা।
১৩৩৯
এক টাকা ।
কলিকাতা-২নং বেথুন রে, “ভারতমিহির প্রেসে
শ্ৰীসর্বেশ্বর ভট্টাচাৰ্য দ্বারা মুদ্রিত।
পরমারাধ্য পিতৃদেব
রায় বাহাদুর শ্রীযুক্ত দীননাথ মৈত্র বিশ্বাস
মহাশয়ের
ঐচরণ-কমলে
No text on this page.
যে রাগিণী এত দিন
বাজে নাই বীণাতে
যে সুর তােমারে, প্রভু,
পারি নাই শুনাতে,
সে যেন মূরতি ধরি’
আলােকে পুলকে ভরি’
ভাসিছে অ-রূপ পরী
মম হৃদি-গগনে ;
আসিয়াছি দিতে তাই,
আজি শুভ লগনে।
আজ এ জীন-সাঁঝে
পেয়েছি যা মরমে,
তােমারে তা দিতে, প্রভু,
বাধিবে কি সরমে ?
জীবন-সাঁঝের বেলা
যে ফুলে ভরিলে ডাল,
সে ফুল তােমারি পদে
সঁপে দিব যতনে,
সারাটী জীবন ভরে
দেখিনি যে রতনে।
No text on this page.
প্রভাতী অশ্রুসজ রুদ্ধস্বরে আমার প্রাণের গান- আধেক-প্রকাশ অপ্রকাশের ছিন্ন-তারের তান, ওগাে রাজা, তােমার সভায় কেমন করে শুনাই সবায়— পালন করি তােমার আদেশ, রাখি তােমার মান ? অরুসজল কুদ্ধস্বরে গাই কেমনে গান? আজ যে আমার কাতর বুকে কঁপছে আমার প্রাণ।
প্রভাতী
আদেশ, প্রভু, কেমন ধারা,
ভেবেই আমি হই যে সারা,
বক্ষে স্বতঃই উথলে উঠে
দুখের অভিমান।
অশ্রু তােমার, কণ্ঠ তােমার,
তােমারি, প্রভু, গান ;
সাজে কি, প্রভু, আমার তবে
তিলেক অভিমান?
আদেশ তব মাথায় নিয়া
-কাপেই যদি কাপুক হিয়া
যা পারি তাই শুনিয়ে যাব,
রাখব তােমার মান।
প্রভাতী
"
২
তােমার পানেই চাইব আমি,
চাইতে যদি দাও;
সব নিবেদন করব তােমায়,
দয়াল, যদি নাও।
যা-কিছু থাক্ ‘আমার’ বলে,
ঢালব তােমার চরণ-তলে ;
ধন্য হবে এ-অভাজন,
হেসেই যদি চাও।
প্রভাতী
৩
শিশুর মত সরল প্রাণে
রাজ গাে তুমি রাজ;
ফুলের মত গন্ধে রূপে
সাজ গাে তুমি সাজ।
হাসির মত, চিত্ত-সুখে,
কোমল ছবি জাগ এ বুকে ;
বাজের মত কঠিন কভু
বাজ গাে তুমি বাজ।
নিরাশ-দাহের দহন সম
জাগ’ হে সদা হৃদয়ে মম,
পাওয়ার মত তৃপ্তি তুমি
রাজ গো প্রাণে রাজ।
.
প্রভাতী
৪
মাের গােপন-মরমে সদা রহ জেগে,
সকল করমে থাক;
জনমে জনমে সরমে ধরমে
সতত আবরি’ রাখ।
ফুলের মত ফুটাইয়া তুলি
ঝরাও আমার সব দলগুলি,
ধূলায়—তােমারি চরণ-ধূলায়
হৃদয়-বৃন্ত ঢাক;
মাের গােপন-মরমে, হে প্রভু-আমার,
সতত জাগিয়া থাক।
-
প্রতী
নিশার আঁধার সরিয়ে দূরে,
পূর্ণ-স্নেহের আশীর্বাদের মত,
আসছে নেমে ভােরের-আলাের-ধারা-
ধরার বুকে ফুল ফুটিয়ে কত।
পাখীর বাসায় ঘুম-ভাঙ্গানী গান
কতই ভাষায় আকুল করে প্রাণ;
বক্ষে আমার অক্ষমতার ব্যথা
ততই জাগে, জাগিয়া উঠি যত ।
অরুণ-কিরণ শিশির-ভেজা-ঘাসে
মুক্তাহারের দ্যুতি পরকাশে,
সােণার আলাে সবুজ পাতার বুকে
হাওয়ার সনে খেলছে শিশুর মত।
আমার এই হৃদয়-দেউল মাঝে
কে যেন ওই উষার আলাের সাজে,
কি দিয়ে হায় ক’ব যে তার পূজা,
ভেবে আমার মুগ্ধ-নয়ন নত।
-
बछायों
তােমার পরশ লাগে আমার শিরে,
ক্ষণে আবার তপ্ত-আমার-বুকে ;
তােমার স্নেহ-দিঠির সুধা-ধারা
ঝরে আমার তৃষ্ণা-কাতর মুখে।
অহর্নিশি তােমার দয়ার দানে,
শূন্য-জীবন-পাত্রখানি মােয়
কানায়-কানায় যায় যে পূর্ণ হয়ে,
রস-ধারায় চিত্ত করে ভাের ;
দাও তো দয়াল, হারাই যে হে তবু,
মরুর-মত-সর্বনাশা-হিয়া
তোমার কাছেই রিক্ত-দু’হাত পেতে
রহে শুধু তােমায় নিরখিয়া ।
প্রভাতী
৭
আমার-আঁধার-নিশা
প্রভাত করিয়া দাও,
আশীষ-আলােক-ধারা
মাথায় ঝরিয়া দাও।
দাও ও-চরণ-রেণু,
বাজাও তােমার বেণু,
করুণ নয়ন মেলি
বারেক ফিরিয়া চাও।
বাসনার যত ব্যথা,
মরমের মলিনতা,
তােমারি—তােমারি করে
সকলি মুছিয়া দাও।
তবপদ-পরশনে এ-দীন-অধম-জনে
তােমারি দয়া-দানে
যােগ্য করিয়া নাও।
প্রভাতী
৮
বাঁধাে আমায়--আরো বাঁধে
দৃঢ়-কঠিন-পাশে,
কাদাও মােরে—আরাে দাও
সকল-আশা-নাশে।
আবাে-দৃঢ়-কঠিন-করে
জীবন-পাত্র দাও গাে ভরে
তীব্র জ্বালার গরল-দাহে
বজ্ৰ-অনল-ত্রাসে।
সকল দুঃখ সইবে যে মাের
তােমার-দেওয়া বলে,
সকল ব্যথাই বইব বুকে
রুদ্ধ-নয়ন-জলে ;
কান্না-হাসি জীবন-মরণ,
সবার মাঝে তুমিই শরণ,
তােমার-জ্যোতিঃই এদীন-প্রাণে
যেন হে পরকাশে।
चिलो
অমন ক'রে লুকিয়ে কেন থাক,
পরশ দিয়েও দাওনা কেন ধরা ?
শিশুর মত লুকোচুরি-খেলা
এ কি তােমার পরাণ-পাগল-করা
গােপন-হিয়ার বদ্ধ-আগল খুলি
বারেবারে চাও যে আনন তুলি;
দেখব ব’লে চাই গাে যদি ফিরে,
অমনি দুয়ার বন্ধ কর ত্বরা।
ওই চপলার-চমক সম
এই যে ক্ষণিক-দেখা,
আমার বুকে যায় যে লিখে
কি যে আলোক-লেখা।
এইটুকুতেই মত্ত আমার প্রাণ,
এই টুকুতেই যাই যে ভুলে’ ধরা :
এইটুকুতেই স্বর্গ-সুধা করে,
নন্দনেরি গন্ধে ভুবন-ভরা !
১০
প্রভাতী
লুকোচুরির এই যে খেলা তব,
বিশ্ব আমার চক্ষে নিতুই নব;
যে দিন আমার সত্য প্রকাশ হবে,
ভুলবাে যে গো স্বর্গ-নরক-ধরা,
ওগাে আমার ভুবন-আলােকরা।
প্রভাতী
-
নবীন ধানের শােভায় মুগ্ধ
দাড়ায়ে যখন একা,
কূজন-মুখর শারদ প্রভাতে
পেয়েছি তােমার দেখা,
কোন্ দিব্য তুলিতে লেখা।
তরুণ অরুণ সাঁতারি’ যখন
বালকের মত চলে-
ক্রীড়াশীল-করে পরশি’ পরশি
শত শত শতদলে,
এই দীঘিকার কালাে জলে ;
ধীরে দোলা দিয়ে শেফালি রাশিরে
মধুর সুবাস সনে
ঊষার সমীর চামর চুলায়
যখন আপন মনে
১২
প্রভাতী
এই শুভ্র কাশের বনে ;
অচল তােমার লুটে পড়েছিল
পূর্বগগন পাশে,
মালাটি তােমার টুটে’ পড়েছিল
শিশির-সিক্ত ঘাসে-
কোন্ অজানিত উচ্ছাসে ।
হাসিটি তােমার ফুটে উঠেছিল
কোমল-কমল-মুখে,
মমতা তােমার ঝরে পড়েছিল
তৃষিতধরার বুকে-
কোন্ বেদনা-বিধুর সুখে।
আঁধার পটেতে লিখিয়া নিয়েছি
আলাের-তুলিতে-লেখা
সৌম্য মৌন মূরতি তােমার,
পেয়েছি যখন দেখা-
এই শরৎ-প্রভাতে একা!
প্রভাতী ১১ আকাশপথে সােণার-রথে সােণার বেণু ল'য়ে হাতে, সােণার আলো অঙ্গে মাখি’ করুণ তােমার নয়ন-পাতে, যে দিন তুমি চেয়েছিলে, ওগাে দয়াল, আমার পানে, সান্ত্বনারি ফন্ধু-ধার। বহিয়ে দিয়ে প্রাণে প্রাণে ; তােমার চোখের সেই-যে-চাওয়া- সেই যে নীরব-দয়ার-ধারা, তপ্ত-মরু-এ-মাের-বুকে ঝরূল মন্দাকিনীর পারা; তোমার তরে সাজানাে মাের দেখলে চেয়ে পূজার থালা, সফল করে দীন-আয়ােজন- জুড়িয়ে দিয়ে সকল জ্বালা। ১
প্রভাতী
এতদিন যে জেনেছিলাম
জন্ম-জীবন আমার মিছে,
ভূতের বােঝ ব’য়েই যাব
পড়ে’ থেকে সবার পিছে ;
এমনি অশ্রু বইবে চোখে,
গুণব দুঃখ-সাগর-ঢেউ,
ব্যথার-ব্যথী আসবে না গো
আমার কাছে বারেক কেউ ;
এমনি ধূলায় রইব পড়ে
ছিন্ন-কন্থা মলিন-বেশ,
সবার ঘৃণা অবহেলায়
হবে আমার জীবন-শেষ ।
সেই যে দুখের-বাদল-ঘন,
অমানিশার-আঁধার-রাতি,
দূর করে আজ আসলে তুমি
পূর্ণিমারি পূর্ণ-ভাতি।
ধন্য আমার পথের ধূলা-
আজ যে তাহাই স্বর্ণ-রেণু ;
সার্থক মাের ব্যথা ও-বেদন,
বাজল তােমার নীরব-বেণু !
প্রভাতী
২
বক্ষে কিসের ঢেউ লাগে,
দোল খেয়ে তাই প্রাণ জাগে।
কোন্ অসীমের-মাঝখানে,
কো-অজানার-সন্ধানে,
মত্ত-আমার-মন-বীণা আজ
কোন্ অ-দেখার প্রেমরাগে ?
-বক্ষে আমার ঢেউ লাগে ।
মিলবে দরশ সেই অ-দেখার,
অ-ধরা সে-জন পড়বে ধরা,
কাণে-কাণে আজ আশার বাণী
বছে কে মাের পাগল-করা।
অন্তর মাের অশেষ-পথে
ছুটল যে তাই পুলক-রথে ;
বাঁধন-ব্যথা দূর করে সব
কোন্ অনাদির অনুরাগে
আজকে আমার প্রাণ জাগে।
প্রভাতী
পাখীর প্রভাত গানে
এ কি ব্যথা জাগে প্রাণে ।--
কে যেন আমার রয়েছে সুদূরে
কত-জনমের-জানা,
আসি-আসি করে শুধু বারে বারে
অন্তরে দেয় হানা।
আমি চমকিয়া ফিরে চাই,
সেথা নাই, নাই—কেহ নাই;
স্তম্ভিত ব্যোম, বিস্মিত ধরা,
পাখীর প্রভাত গানে
ব্যথা জেগে ওঠে প্রাণে।
কূজন-মুখর কুলায়ে যখন
অরুণ-কিরণ হাসে,
চঞ্চল বায়ু শিশুর মতন
যখন আমারে ভাষে,
মাের বেদনা-বিধুর-হিয়া
রহে তবু নিরখিয়া-
অজানা-সে-জনা আসিবে বলিয়া
তাহারি পথের পানে।
—এ কি ব্যথা জাগে প্রাণে।
প্রভাতী
১৪
গহন পথে
জ্যোতির রেখা
জ্বালাে, প্রভু, জ্বালে ;
এ মরু হৃদে মন্দাকিনী
ঢালল প্রভু, ঢালাে।
দৈন্যভরা এই জীবনে,
নিরাশ-অনল-দগ্ধ মনে,
গভীর আশার অভয় বাণী
ঢাললা, প্রভু, ঢালাে।
বদ্ধ হৃদি-অন্ধকারে
নন্দনেরি গন্ধ-ভারে
পূর্ণ করি’ ছড়াও তােমার
আলাে, প্রভু আলো।
১৮
बाजे
•
সেদিন তুমি বলেছিলে
আমার কাণে-
ভবে আমার শূন্য হিয়া
তােমার দানে
তােমার সােণার বীণা করে
আপনি তুমি দেবে ভরে
চির-উদাস চিত্ত আমার
তােমার গানে।
কখন যে সে ‘ক্ষণ’ হবে তা
বুঝতে নারি,
দিঠি যে মাের রুদ্ধ করে
অশ্রুবারি।
জীবন-তপন অস্তগামী,
আশায় তবু আছি, স্বামি,
তপ্ত ধরা চাহে যেমন
মেঘের পানে।
জাগছে প্রাণে,-ভ’রূবে প্রভু
তােমার দানে।
चलो
কি গান তুমি
শুনিয়ে গেলে
সেই যে প্রভাত বেলা,
ঊষা যখন
আপন মনে
খেছে ফুলের-খেলা,
নানান সুরে
বিহগ যত
বসায় গানের মেলা ;
কি গান তুমি
শুনিয়ে গেলে
তেমন প্রভাত বেলা।
যেই সুরেতে
ভাঙ্গল আমার
ভােরের ঘুমের ঘাের,
সেই যে সুরে
কেটে গেল
স্বপন-সুখের ভাের ;
উচ্ছলিত
সামনে ছড়ায় মাের—
নীল গগনের
নীলটুকু আজ
যেই হরষে ভাের,
উৎস সুরের
প্রভাতী
যে গানে আজ উঠছে কাপন
দেখছি গাছে গাছে,
যে গানে আজ
আসছে বাতাস
আমার বুকের কাছে,
জাল পথের
রশ্মিরেখা
যে গানে আজ নাচে,
যে গানে আজ
কাঁপছে ছায়া
আলাের পাছে পাছে।
সে কি যে গান
গাইলে তুমি
ধরে কেমন তান,
এ কি তােমার গান গাওয়া গাে
এ কি তােমার গান।
আকুল হ’ল
কেমন যেন
আমার হৃদয় প্রাণ,
কি সুরে আজ
প্রভাত বেলা
গাইলে তুমি গান।
প্রভাতী
১৭
জানিনি ত প্রভু আগে,
অন্তর মম গােপনে গােপনে
করুণা যে তব মাগে;
দিবস নিশায় মরু-পিপাসায়
তব আশা-পথে জাগে,
জানিনি ত আমি আগে।
- "
আজি শুনিয়াছি কণ্ঠ তােমার
বক্ষ-দুয়ারে বাজে,
মরম-বঁধুর চকিত চাহনি
হেরেছি জীবন সাঁঝে ;-
ক্ষণে ক্ষণে তাই তােম। পানে চাই
নির্ভর ভীতি-লাজে ।
সবার অধিক তােমারে যে চাই,
তিলেক জানিনি আগে;
চিত্ত-কুসুম বিকসিত আজি
তােমারি অরুণ রাগে,
এ প্রাণ-বীণায় ঝঙ্কার তুলি’
তােমারি রাগিণী জাগে,
জানিনি ত প্ৰভু আগে।
২২
बाजी
আকাশ-বীণায় বাজাও তােমার
আকাশ-বাণীর ঝঙ্কারে,
আকাশ সম অসীম উদার
আকাশ-ব্যাপী ওঙ্কারে।
সুরের কাপন আসুক ছুটে
জীবন জাগুক হৃদয়-পুটে
পুষ্পে যেমন পুলক ফুটে
অরুণ কিরণ সঞ্চারে।
রয়েছি ব'সে শ্রবণ পেতে
পারব কখন উঠতে মেতে
তােমার বীণার ঝঙ্কারেতে,
দূর করে সব শঙ্কারে।
আকাশ-বীণা বাজাও তােমার
আকাশ-ভরা ওঙ্কারে।
প্রভাতী
১৯
ওগাে সুন্দর অন্তর-তম,
আজি এ মুগ্ধ প্রাণ
এনেছি বহিয়া চরণে তােমার
অর্ঘ্য করিতে দান।
শােভন শারদ ঊষাতে,
ঝরা-শেফালির ভূষাতে,
তােমারে সাজাতে আসিয়াছি, করি’
প্রভাত-কিরণে স্নান।
তরুণ-অরুণ-আলােকে
শিশিরের মালা ঝলকে ;
কাশের গুচ্ছে বেঁধেছি ব্যজনী,
বীণায় বেঁধেছি গান,
তােমারি চরণে আসিয়াছি দিতে
মুগ্ধ এ দীন প্রাণ।
२४
প্রভাতী ২০ অন্তরের অন্তস্তলবাসী ওগাে মাের অন্তর-দেবতা। কেন আজি বাহিরিয়া এলে ? জানাইতে কিসের বারতা ? শুনি নাই কি আদেশ তব- কি ইঙ্গিত করিয়াছি হেলা? দেবতারে ঠেলে রাখি’ দূরে করেছি কি ধূলা ল’য়ে খেলা ? প্রকৃতিরে করি নাই পাঠ প্রাণ দিয়া ভকতের মত ? অন্তরের আসনে বসিয়া হই নাই সাধনায় রত ? ক্ষুদ্র ব্যর্থ শত আন কাজে দণ্ডে দণ্ডে কেটে যায় কাল, তাই আজি দেখা দিলে না কি হে আমার প্রসন্ন দয়াল।
প্রভাতী
ছাড়ি এই হৃদয়-মন্দির
ওগাে মাের জীবন-দেবতা,
বাহিরিয়া এলে আজি তুমি
জানাইতে কিসের বারতা?
ক্ষুদ্র হৃদি-পূজাগৃহে আর
ধরে না কি তােমার আসন।
বিশ্ব জুড়ে হেরি কিগাে তাই
তব রূপ বিশ্ব বিমােহন।
প্রভাতী
ধূলার মাঝেই তােমার সােণার দান,
জান্ত না তা কাঙ্গাল আমার প্রাণ।
বৃথাই আশার বােঝা বয়ে,
বেড়াত সে ব্যাকুল হয়ে,
জাগিয়ে শুধু জানিয়ে শুধু
আপন অভিমান।
আজ জীবনের আঁধার সাঁঝে
মিলেছে এই পথের মাঝে,
আপন হাতেই তােমার-দেওয়া
অমূল্য এই দান,
জাত না যা’ কাঙ্গাল আমার প্রাণ।
প্রভাতী
২২
কতই করিছ দান,
জীবন-পাত্র গেছে যে ভরিয়া
এতটুকু নাহি স্থান!
ঢালিছ কত যে সুধা,
মিটিয়া গিয়াছে ক্ষুধা,
আঁধারে আলােকে
পুলক ঝলকে
দুখ-ব্যথা অবসান ;
কতই করিছ দান।
অধম যােগ্য নয় ;
এ যে দান তব অহেতুক দয়া
করুণার পরিচয়।
সারাটি জীবন ভ'রে
একটী বারেরো তরে
ডাকি নি ত প্রভু,
চাহিনি ত কভু,
করিয়াছি শুধু ভয় ;
অধম যােগ্য নয়।
প্রভাতী
তপ্ত এ মাের শিরে
করুণা-শীতল তব স্নেহ-ধার
সতত ঢালিছ ধীরে।
বিজনে আঁধার রাতে
নিয়ত চলেছ সাথে
মরু-পিপাসায়
নাশিতেছ, হায়,
স্নিগ্ধ তুষার-নীরে।
তােমার মধুর তান
এ প্রাণ-যন্ত্ৰ দিয়াছে ভরিয়া
মঙ্গলময় গান।
বক্ষে শকতি দাও,
যােগ্য করিয়া নাও;
এ দীন হৃদয়
কেমনে বা বয়,
এত দান অফুরান।
প্রভাতী
আনন্দ আজ ছড়িয়ে দিলে কেন
বকুল ফুলের অঞ্জলিটির মত,
জ্যোছনা-বল ফাগুন সন্ধ্যাবেলা
সরিয়ে দিয়ে দুঃখ বিষাদ যত !
দখিন হাওয়া আনন্দেরি ভাষে
আনন্দ-হীন আমায় আজি ভাষে,
প্রাণ-সাগরে আনন্দেরি ঢেউ
কক্ষ-বেলায় আঘাত করে কত।
জগৎজোড়া আনন্দেরি মেলা
আমায় ঘিরে’ করছে যেন খেলা,
আনন্দের এই অন্তবিহীন দান
সইতে প্রভু পারবে কি এ প্রাণ।
তপ্ত কাচে তুষার পরশ সম
আচম্বিতে ভাঙ্গবে প্রিয়তম,
ক্ষণে ক্ষণে শঙ্কা জানে মনে;
—সকল আশা তােমার চরণগত।
৩০
প্রভাতী
২৪
নিঝুম ঘন গভীরতর,
রজনী ঘাের অন্ধকার,
বিশ্ব যখন সুপ্তি-মগন,
পুষ্পবুকে গন্ধ-ভার ;
পাখী যখন ঘুমায় নীড়ে,
ঝিল্লি মুখর কানন ঘিরে,
জোনাক-পােকার অযুত হীরায়
ঝিকিমিকি চন্দ্রহার ;
হাতের ধনও যায় না দেখা,
নিজের কাছেও নিজেই একা ;-
প্রাণ-উদাসী বাজাও বাঁশী
আমার চির-বাঞ্ছনার।
প্রাণ যে ছুটে গহন বনে
তােমার কাছেই সংগােপনে,
বাজলে বাঁশী যায় কি থাকা
রুদ্ধ করে হৃদয়-দ্বার ?
বিশ্ব যখন নিদ্রা-বিভাের,
রাত্রি যখন অন্ধকার।
প্রভাতী
২৫
প্রাণের মাঝে তােমায় যেন পাই,
যেমন করে তােমায় পেতে চাই,
শাঙণ-ধারায় ধৌত নত
স্নিগ্ধ অমল যুথীর মত,
ক্ষুদ্র শিশুর সরল মুখে
তােমার বিকাশটাই।
অসীম এস সসীম হয়ে,
অরূপ এস রূপটী ল’য়ে,
আমার এক্ষীণ দিঠির আগে
তােমার বিকাশ চাই।
একটী ছােট মধুর গানে,
দূর-আগত বাঁশীর তানে
হৃদয় ভ'রে জীবন ভ'রে
তােমায় যেন পাই।
ওগাে আমার চাওয়ার নিধি,
দাবী করে পাওয়ার নিধি,
তােমার পানে লও টেনে মাের
সকল বাসনাই।
প্রভাতী
সাতটি রঙ্গে রঙ্গীন করে তােলাে-
অন্ধকারের পর্দাখানি খােললা ।
তােমার তুলি বারেক টানি
ইন্দ্রধনুর বরণ খানি,
বুক থেকে আজ দিক সরিয়ে
সব নিরাশার কালাে।
রং ফলানােই কাজ যে তােমার,-
সূৰ্যে চাদে বর্ণ-বাহার,
দূর গগনে রংটী নীলের
তুমিই ব’সে ঢালাে ;
;
প্রভাতী
ধূমকেতুর
ঐ তীব্র শিখা
তােমার তুলির দীপ্ত লিখা ;
ঐ যে তারার স্নিগ্ধ ভাতি
সেও ত তুমিই জ্বালাে ;
সবুজ পাতার শ্যামল শােভা
তােমার করেই নয়ন-লােভা,
লক্ষ রঙ্গে লক্ষ পাখীর
পালক ভরে তােলে।
আঁধার আমার হৃদয়-পটে--
প্রাণ-প্রবাহের ভাঙ্গা তটে,
সেই তুলিকার ঈষদ্ টানে
ফুটাও অরুণ-আলাে-
পরাণ-প্লাবী নবীন আশার
কনক-কিরণ ঢাললাে।
২৪
প্রভাতী
২৭
তােমার বাতাস ডাকছে আজি
বাহির পানে;
তােমার আকাশ ডাকছে মােরে
গভীর তানে।
তােমার আলাে শিশুর মত
আঁচল ধরে টানছে কত,
খােলা তাহার খেলার মাঠে,
ভরা তাহার গাঙ্গের ঘাটে ;
ফুলগুলি সব হাতছানি দেয়
ফুল্ল প্রাণে।
আমিও যে গাে মাথার বােঝ
নামিয়ে ফেলে
জীবন-ভরা কান্না-রাশি
দু’হাতে ঠেলে
ভুলে গিয়ে সকল কথা,
ডুবিয়ে দিয়ে দৈন্য ব্যথা,
প্রভাতী
আনন্দেরি মেলার মাঝে,
আনন্দেরি সফল কাজে,
ছুটে গিয়ে চাই গাে দিতে
হৃদয় মেলে।
;
আমায় কে বা পিছন থেকে
রাখতে চায়,
অচেনা কোন্ শিকল দিয়ে
বাঁধতে চায়।
কোন সাগরের জোয়ার-জলে
সকল বাধা যায় গাে চলে
পুরানাে সেই বাঁকের কোণে
অন্ধকারের গহন বনে,
আশার চোখে চেয়ে আবার
হতাশ প্রাণে
তােমার সভার ডাক শুনি গাে
গভীর তানে।
अखाणे
বাজল না রে সেতার খানি,
বাঁধতে গিয়েই ছিল তার ;
ফুটুল না সে রাগ-রাগিনী
এ বুকে বই যাদের ভার ;
যে ব্যথা মাের গােপন প্রাণে,
যত্নে সুরে ছন্দে গানে
এই সভাতেই চেয়েছিলাম
একটুখানি প্রকাশ যা’র।
একটুখানি ছড়িয়ে দিতে,
একটুখানিই ভ’রে নিতে,
জীবন-ব্যাপী হাহাকারের
আকাশ-ব্যাপী শূন্যতার ;-
বাজল না সে সেতার আমার
বাঁধতে গিয়েই ছিল তার।
প্রভাতী
আনন্দেরি রাজসভাতে
এসেছে মাের ডাক।
ঘরের যা’ কাজ আছে ঘরে,
ঘরেই পড়ে থাক্ ;
অ-শেষ সে সব সাতে গেলে,
‘ক্ষণ’ যাবে যে আমায় ফেলে,
হৃদ-বীণাতে বাজবে না আর
বসন্তেরি রাগ।
পিছন ফিরে চাই যদি ত
হবে না মাের যাওয়া,
পাওয়ার-মত-পাওয়া আমার
হবে না আর পাওয়া।
হর্ষ-উছল গভীর রােলে
আমার হৃদয়-সিন্ধু দোলে,
প্লাবন যদি ভাসায় বেলা
ভেসেই তবে যাক।
--আনন্দেরি রাজসভাতে
এসেছে মাের ডাক।
প্রভাতী
তােমার পায়েই পৌঁছে দেব সব
যা কিছু মাের সুখের হাসি,
দুখের কলরব।
জীবন-ভরা অক্ষমতা,
ক্ষুদ্র বুকের বিরাট ব্যথা,
অশ্রু-নীরে তােমায় ঘিরে
কবে মহােৎসব।
চরণে পৌছে দেব সব।
সেই আশাতেই চলছি ছুটে
ভারি বােঝা মাথায় তুলে,
পথের শেষে চাও যদি গাে
বারেক দু’টি নয়ন খুলে ;
পড়িই যদি দিঠির তলে,
পাবে না ত যেতে চলে,
এগিয়ে এসে
শুবে শেষে
কান্না হাসির স্তব ;
—শ্রীচরণে পৌছে দেব সব।
৩৯
প্রভাতী একটা সুরে আকাশ ভরে ছাপিয়ে পড়ে তান- আমার বীণায় দাওনা বেঁধে এমনি ছােট গান। তুচ্ছ করে ভুলে গিয়ে দিবস রাতি বীণার সনে রইব মাতি সব দীনতা- তুলব ভ’রে প্রাণ, আমার বীণায় দাও না বেঁধে একটি ছােট গান। ৪০
প্রভাতী
যন্ত্রি ও গাে,
বীণায় আমার
পরাও নূতন তার,
ছিন্ন তারের
ক্ষিঃ বেদন
সয় না বুকে আর ;
নূতন ছন্দে
নূতন তারে, নূতন গানে,
দাওনা ভ’রে আমার প্রাণে,
দাও সাজিয়ে
নূতন সুরের হার,
বীণায় আমার
পরাও নূতন তার।
যন্ত্ৰী তুমি
৫১
প্রভাতী তুমি সেই সুরেতেই গাও- যে সুর তুমি আমার গানে ফুটিয়ে দিতে চাও। হােক না কেন বজ-কঠোর সইবে বীণে তাও; তুমি সেই সুরেতেই গাও। এযে তােমার বাঁধা বীণা, এ গান যে গাে তােমার চিনা, -এই কথাটা জানতে শুধু, বুঝতে শুধু দাও। তুমি আপন সুরেই গাও।
প্রভাতী
কখন ফুটিবে তােমার আলােক
কুহেলি-আঁধার কেটে ?
কখন ঝরিবে তােমার পুলক
সুনীল গগন ফেটে ?
কখন তােমার সােণার বীণাটি
বাজিবে নূতন সুরে ?
অভয় বাণীটি ধ্বনিবে কখন
আমার জীবন-পুরে?
কখন বুলাবে স্নেহের পরশ
আমার ভিখারী শিরে?
করুণা-ধারায় ধােয়াবে কখন
দগধ হৃদয়টিরে ?
দিবস রজনী সে আশে আমার
মরম রয়েছে জাগি
শেফালি কুঁড়ির প্রাণের বাসনা
যেমন আলাের লাগি।
প্রভাতী
৩৪
অশ্রু-সাগর সরি’ চলেছি
আকুল লহরে দুলে,
দিবসের শেষে উঠিব ভরসা
তােমারি চরণ-কূলে।
ডুবে’ আসে ভানু, বহে যায় বেলা,
কখন পাইব তব পদ-ভেলা ?
অশেষ সাঁতার, পারি না যে আর
ধর’ প্রভু, লহ তুলে।
অবশ এ ক্ষীণ বাহু দু’টি ল’য়ে
আর কত কাল চলিব এ ভাবে
অশ্রু অপার ব’য়ে ?
আসিছে যামিনী,-যাবে কিগাে দেখা
তব পদ-তটে আলােকের রেখা ?
উঠিবারে যেন পারি দয়াময়
মােহ অবসাদ ভুলে’-
তােমারি চরণ-কূলে।
প্রভাতী
৩৫
নিকষ কালাে আকাশ-কোলে
কাচা সােণার বরণ-রেখা ;
মেঘের ফাকে তারার আলাে,
দেখা দিয়েই হয় অ-দেখা ;
রাত্রি যেন আঁধার-ভারে
নুইয়ে পড়ে ধরার বুকে,
ভিজে মাটির গন্ধ পরশ
চায় সে নিতে কি উৎসুকে ;
ঝিল্লি শুধু অন্ধকারে
ভাঙ্গছে নিশার নীরবতা ;
—ভাবছি বসে’ একলা আমি
অজানা সে কতই কথা,
ওই যে আঁধার আকাশ-পটে
এই যে অমার আঁধার রাতি,
আসবে ঊষা, প্রভাত হবে,
ফুটবে পুনঃ অরুণ-ভাতি ;
•
৪৫
প্রভাতী
;
তােমার গানে ভ’রুবে আবার
লক্ষ কোটী পাখীর বাসা,
আশার সুরে মায়ের বুকে
জাগবে কত শিশুর ভাষা
আমিই কিগাে রইব ডুবে’
হিয়ার তমাে-সিন্ধু-নীরে ?
তােমার চরণ-কিরণ-ধারা
ঝরবে নাকি আমার শিরে?
প্রভাতী
খােল গাে তােমার রুদ্ধ দুয়ার,
বিশ্ব-ভুবন-রাজ,
চির-উপেক্ষিত অনাদৃত যে গাে
অর্ঘ্য এনেছে আজ ;-
শূন্য তাহার ভিক্ষার ঝুলি,
দৈন্যে হৃদয় ভরা,
লুণ্ঠিত দেহে ধূলি-জঞ্জাল,
নয়নে অশ্রুঝরা।
ওগাে রাজ, ওগাে রাজ-অধিরাজ,
তােমারি পাঞ্চজন্য
ফুকারি’ ফিরিছে সারাটি বিশ্বে
ভকতে করিতে ধন্য ;-
শুধু ডাক, হায়! এলাে না আমার
একটী বারেরাে লাগি,
ক্ষীণ আশা বুকে রহিল এ দীন
পথের ধূলায় জাগি’ ;
৪৭
প্রভাতী
চির-অনাহুত অন্ধ এসেছি
সিংহ-দুয়ারে তব,
লৌহ-আগল করিয়া মুক্ত
দাও গাে নয়ন নব ;
অর্ঘ্য তােমার লহ গাে তুলিয়া,
কৃপা কর অনুরক্ত,
সব দুখ ব্যথা করিয়া সফল
ধন্য কর এ ভক্তে।
৪৮
প্রভাতী
৩৭
;
ফান্ধনেরি দমকা হাওয়ার মত
দিলে যে দিন তােমার পরশখানি,
শুনিয়ে গেলে হতাশ প্রাণে মাের
তােমার স্নেহের পূর্ণ-আশার বাণী,
যে দিন তােমার গভীর সুরে
বাজল বাঁশী হৃদয়-পুরে,
স্নিগ্ধ-উজল শুদ্ধ-সােণার-রেখা
নিকষ কালাে-বক্ষে দিলে টানি’
সে দিন আমি চমক ভেঙ্গে যাই
কোথায় তুমি তােমার পানে চাই,
অদর্শনে ভাবছি শুধু বসে
কে ভরা’ল আমার প্রাণের খালি।
ধরুব তােমার চরণ দু’টি,
ভাবছি তােমার পিছন ছুটি,
ভাবনা ছাড়া অভাব আমার সবই,
বুঝবে কেবা তােমার চতুরালি !
—শূন্য-ভরা হৃদয় আজি খালি।
১
প্রভাতী
সারাটি সকাল তুলিয়াছি ফুল,
সারাদিন বসে গেঁথেছি মালা,
সারাদিন ধরে পূজা-উপচারে
কতই যতনে ভরেছি ডালা।
কত যে যতনে সাজায়ে আসন,
তব আশা-পথে ফিরায়ে আনন,
সারাটি সন্ধ্যা রয়েছি বসিয়া,
ভুলিয়া সাঁঝের প্রদীপ জ্বালা ;
আঁধারে আমার পুড়ে গেছে ধূপ
উজ্জ্বল করি’ আঁধারের রূপ,
ধূসর জ্যোস্না বাতায়ন-পথে
পরশিল মাের পূজার থালা।
আঁধারে আসিয়া গিয়েছ কখন,
জানি নাই, ছিনু স্বপনে মগন ;
প্রহর-নিশায় জেগে দেখি, হায় !
পূজা-উপহার রয়েছে ঢালা,
চরণ-চিহ্ন আঁকিয়া আসনে
নিয়ে গেছ প্রভু আমার মালা।
প্রভাতী ৩৯ নবীন উষায় এলে যবে তুমি আমার কুটীর দ্বারে, নব অরুণিমা অঙ্গে মাখিয়া সাজিয়া পুষ্পহারে, নিদ্রা তখনাে ভাঙ্গে নাই কারাে জাগিয়া ওঠেনি গেহ, তব পথ চাহি’ দুয়ারে বসিয়া ছিল না তাে আর কেহ। শ্যামা দিল শিস, গাহিল দোয়েল, কপিল তরুণ শাখা, পুষ্পে মুকুলে ঝঙ্কারে অলি- পরাগে পক্ষ মাখা। তােমারি আশায় সারা নিশা জাগি তন্দ্রা-অলস আঁখি, এলােথেলাে কেশ, মুক্ত কবরী, চুলে পড়ি থাকি থাকি; চেতনা আমার- সুপ্তি আসিতে চায়, চমকি’ চমকি’ রােধি গাে তাহারে সাশ্রু নয়নে, হায় ! লুপ্ত হয় বা
প্রভাতী
।
এমনি সময়ে
এলে যবে তুমি
কমল-কোরক করে,
ভজন পূজন
সাধন আমার
সফল করণ তরে ;
তােমারে হেরিয়া
উঠিতে নারিনু-
কি যেন জড়তা আসি’
পাষাণের মত করে দিল মাের
হিয়ার শােণিত রাশি,
দু’হাত বাড়ায়ে
উঠি যখন,
তখন গিয়াছ ফিরে’
তােমারি প্রসাদী
কমল-কোরকটীরে !
সম্বল রাখি’
প্রভাতী
৪০
জীবনে আমার এসেছিল যে গাে
একটী ফাগুন রাতি,
উজল চন্দ্র-কিরণ-ধৌত,
পুষ্প-সুবাসে মাতি;
দখিণা মলয় বয়েছিল ধীরে
মুখরিত করি’ হৃদি-বীণাটিরে,
কোন্ অমরার প্রণয়-কাহিনী
গেয়ে কি প্রেমের গীতি ;-
জীবনে আমার এসেছিল শুধু
একটী ফাগুন রাতি।
সে দিন বিশ্ব হেরিনু রঙ্গীন
হরষে আপনা-হারা ;
পুষ্প-পরাগে রঞ্জিত অলি
গুঞ্জে পাগল-পারা-
কোকিলার কুহু,
পাপিয়ার তান,
কি এক আবেগে ভরে দিল প্রাণ,
গীতি-মুখরিত পুলকে নৃত্যে
ভুবন হাসিয়া সারা ;
জীবন আকাশে ফুটেছিল মাের
একটী ফাগুনী তারা ।
'-
প্রভাতী
ছিলাম স্তব্ধ বিস্মিত মূক
সারাটি সন্ধ্যাবেলা,
আবেশে অবশ করে ল’য়ে শুধু
অফোটা ফুলের মালা ;
চির-সাধনার প্রিয়া-মুখ পানে
চেয়েছিনু আমি কি যে এক ধ্যানে,
কি ধ্যানে জানি না কাটিল যামিনী,
ছিলাম আপনা-ভােলা ;
ফাগুন রাতিটি এসেছিল বুঝি
সকল-বাঁধন-খােলা।
;
চমকি সহসা জাগিনু যখন,
প্রভাত পৌণমাসী,
মালাখানি মাের হয়েছে বিফল
শুষ্ক মলিন বাসি
সারাটি রজনী আশায় জাগিয়া
ফুলরাণী মাের গিয়াছে ঝরিয়া,
হতাশ নয়নে হেরি’ গাে প্রিয়ার
মৃত্যু-মলিন হাসি ;-
—ফাগুন রাতিটি এসেছিল মাের
বিনাশেও অবিনাশী ।
৫৪
প্রভাতী
৪১
ফাগুন যেদিন এসেছিল
আমার জীবনে
অরুণ আৰীর অঙ্গে মাখি’
উজল চরণে,
যুথী বেলার হারটি বুকে
আপনি বিভাের আপন সুখে,
সবুজ চাদর উড়িয়ে দিয়ে
উতল পবনে ;-
ফাগুন যে দিন এসেছিল
আমার জীবনে।
প্রভাতী
---
ধরা তখন ভরা ছিল
লতা-বিতানে,
পাগল হাওয়ার দোলনা দুলি
হেসেই সারা কুসুমগুলি,
কঁপিয়ে কচি কোমল হিয়া
পুলক-সিনানে;
ধরা তখন ভরা ছিল
লতা বিতানে।
সােণার থালায় মিলন-মালা
সাজিয়ে যতনে,
স্বপন-পুরের সােণার বাতি
মাের নয়নের দিব্য ভাতি-
এসেছিল অমর সে যে
গন্ধে বরণে
ফাগুন যেদিন এসেছিল
তরুণ জীবনে।
==
;
প্রভাতী
সাতটী রঙের ছুটল ধারা
আকাশ-অঙ্গনে ;
হাজার সুরে ভুবন ছেয়ে
হাজার পাখী উঠল গেয়ে,
বুকটী আমার ভ’রে দিয়ে
মধুর মূচ্ছনে ;-
এসেছিল ফাগুন আমার
তরুণ জীবনে।
অতীত সে আজ-স্বপন-অতীত,
আমার জীবনে
নাই ফাগুনের পুলক আলাে,
আজ আষাঢ়ের আকাশ কালাে,
জ্বলছে হৃদয় অতীত সুখের
স্মৃতির দহনে।
ফুরিয়ে গেছে ফাগুন আজি
আমার জীবনে।
প্রভাতী
ওলাে
৪২
দিবস রজনী রয়েছি বসিয়া
পথ পানে চেয়ে তার ;
কত যে যতনে রােধিয় আমার
ঝর-ঝর আঁখি-ধার।
দীরঘ নিশাস গুমরি গুমরি’
ফিরিছে বুকের তলে,
আকুলিত ভাষা গিয়াছে ভাসিয়া
বিরহ-যমুনা-জলে।
মলয় পবন বয়েছে মৃদুল
বকুল-বীথির 'পরে,
সাঁঝের তারকা নিয়েছে বিদায়
শুক-তারকার করে।
গেছে কত উষা চেয়ে মাের পানে
জড়িমা-জড়িত চোখে,
কত নব রবি চুমেছে আদরে
শেফালির সােনা-মুখে
কত
মরি !
৫৮
প্রভাতী
এই
আকুলব্যাকুল হিয়াটী আমার
রুদ্ধ নিঝর মত
আমি বক্ষ-পাষানে রেখেছি বাঁধিয়া
অয়ন বরষ কত।
ওলল, বৃন্দাবিপিনে আসিবে না ফিরে
আমার নিঠুর কালা?
একি হবে না সফল তা’র-পথ-চাওয়া,
শীতল-বিরহ-জালা ?
প্রভাতী
বক্ষ-পাঁজরে লুটিছে হৃদয়
আকুল মৌন লােদনে,
চূর্ণিত-কাচ আরসীর মত
বাঁধা সে পড়ে না বাঁধনে ;
বুক-ভরা হায় ! ছিল কত আশা,
কত যে বাসনা বেঁধেছিল বাসা,
সকলি অতীত সােনার স্বপন
স্মৃতি শুধু জাগে গােপনে ;
লুটিছে হৃদয় গুমরি’ গুমরি’
আকুল মৌন লােদনে।
খর রবিতাপে দগ্ধ সাহারা,
বেঁচে নাই—কিছু জেগে নাই ;
মরীচিকা পাছে হরিণীর মত
ছুটে না পরাণ ওগাে তাই।
প্রভাতী যে বাঁশরী-তানে পুলক-মুগ্ধ এ ঘাের মরুতে এসেছে লুব্ধ, সে বাঁশরী আজ হয়েছে নীরব, আশা নাই—আর আশা নাই, মরীচিকা পাছে হরিণীর মত ছুটে না পরাণ ওগাে তাই। যদিও সুখের হয়েছ সমাধি- স্মৃতি তাে এখনাে জাগিয়া, মন্দিরে জারি করে আরাধনা নিত্য করুণা মাগিয়া ; দিবানিশি ফেলি নয়নের জল, হা-হুতাশে প্রাণ কেবলি বিকল, তথাপি বিফল নহে গাে জীবন- আছে যে তাহারি লাগিয়া সুখের সমাধি হয়েছে যদিও, স্মৃতি তাে এখনাে জাগিয়া । ; বক্ষ-পাঁজরে আকুল হৃদয় লুটিছে নীরব রােদনে, চূণিত কাচ আরসীর মত বাঁধা সে পড়ে না বাঁধনে।
প্রভাতী
অখণ্ড মুকুরে হাসিত যে রবি,
শত খণ্ডে তা’র আজি শত ছবি,
আলােকে আলােকে সে স্মৃতি ঝলকে
নিরত যে তারি বােধনে ;
বুকের মাঝারে গুমরি’ হৃদয়
লুটিছে নীরব রােদনে।
প্রভাতী
৪৪
বকুল-বীথির
মধু-মাধবের
মানসমােহন
মাধবমােহিত কুঞ্জে,
মালতী-মুকুলে
মত্ত মধুপ
মধুরে আর না গুঞ্জে ;
কোকিল-কোকিলা কুহু-মুখরিত
কানন নিঝুম থির,
সুবাস বহিয়া
সমীর বহে না ধীর ;
নাচায়ে তরণী,
আকুলি’ গােকুল তীর,
আর সে যমুনা
বহে না উজান
নিথর সে নীল নীর।
সখী সনে আর আসে না তাে রাই
শূন্য গাগরী নিয়ে,
নাইতে সলিলে, চাইতে সলীলে,
বিজন এ পথ দিয়ে ;
প্রভাতী
বাঁকা চোখে আর
না চাহে ফিরিয়া
শিখীরে দেখার ছলে
আছে-কি-না-আছে প্রিয় বনমালী
অদূরে কদম তলে ;
চোখে চোখে সেই
মিলন-মাধুরী
উছলি’ পড়ে না আর,
বাজে না সে বাঁশী
‘রাধা বলে বার বার।
মম-উদাসী
প্রভাতী
৪৫
সখি, করে আয় ওরে মানা
সন্ধ্যা সকালে যমুনার তটে
ও যেন দেয় না হানা ;
ক’র আয় ওরে মানা।
জল নিতে মােরে যাইতে যে হয়,
কত লােকে তাই কত কথা কয়,
কত কানাকানি
আঁখি-হানাহানি
জটলা রটনা নানা ;
সখি, করে আয় ওরে মানা।
প্রভাতী
সখি, মানা করে আয় ওরে-
ও যেন আসে না যমুনার তটে
কোনাে কিছু ছল করে।
চাহে না অমন মিঠে মিঠে হেসে,
ভুলিয়ে আমারে সুমােহন বেশে,
কলস কি শেষে
চলে যাবে ভেসে
যমুনারি স্রোতাে-ভরে ?
সখি, মানা করে আয় ওরে।
সখি, মানা করে আয় তােরা,
কুল-বালা যে লাে আমরা সকলে,
কুল-বধূ সবে মােরা ;
মানা করে আয় তােরা।
ও বাঁকা নয়নে কি যে আছে আঁকা,
লজ্জা-সরম যায় না তাে রাখা,
শেষে কি
অকূলে
ভেসে যাব ভুলে
আপন-হৃদয়-হারা ;
সখি, মানা করে আয় তােরা।
প্রভাতী
৪৬
কুঞ্জে কুঞ্জে ফোটে না কুসুম,
ছােটে না গন্ধ-ভার,
পুঞ্জে পুঞ্জে আসে না মধুপ
গুঞ্জে’ গুঞ্জে’ আর।
ঢালিয়া কণ্ঠ-মধু
কুহু কুহু রণে ভরিয়া কুঞ্জ
গাহে না কোকিল-বধূ।
গাহে না দোয়েল শ্যামা কি পাপিয়া,
ময়ুর মেলে না পাখা,
ইন্দ্রধনুর বরণ-বাহার
আর তাে যায় না দেখা ;
সখি, তােরে কি কহিব আর ?
চির-আললাকিত ভবন ভুবন
সকলি অন্ধকার।
প্রভাতী
থামিয়া গিয়াছে বেণুবীণা-রব
বিনে সে বিপিন-রাজ।
ব্যাকুলি’ বক্ষ কে ডাকিবে আর
কুখ-কানন মাঝ ?
সে বাঁকা নয়ন দুটী
তমালের তলে তারকার মত
আর ত রহে না ফুটি”।
চরণ-নূপুর রণে না মধুর,
হেরি না সে পীত বাস,
মৰ্ম্মে-মৰ্ম্মে-শিহরণ-ঢালা
হেরি না সে মৃদু হাস।
সখি, তােরে কি কহিব আজ?
শ্যাম বিনা মাের ভবন ভুবন
পরেছে গেরুয়া সাজ।
প্রভাতী
আর তাে যমুনা নাহিক জুড়ায়
নিদাঘ-দহন-জ্বালা,
আর তাে যমুনা বহে না উজান
সরস-আবেগ-ঢালা।
বহে না মলয় বায়—
বীচি-মালা তুলি’ তটিনীর বুকে
জুড়ায়ে তাপিত কায়।
কূলে কূলে আর বাজে না বাঁশী
মধুর প্রভাত-সাঁঝে—
অজানিতে, ওগাে, কাড়িয়া আমার
সহজ সরম লাজে।
সখি, কি কব মরম-জ্বালা !
ভবন ভুবন সকলি মলিন
বিহনে প্রাণের কালা।
প্রভাতী
89
;
এই ত বাজালে বাঁশী
শাঙন-আঁধার নিঝুম নিশীথে
কুঞ্জ-কাননে আসি’
স্পন্দন আনি’ দেহ-মন-প্রাণে,
আকুলি’ এ হিয়া বাঁশরীর তানে,
বিজনে বিপথে আমারে আনিতে,
হে মাের বিজনবাসি,
এই ত বাজালে বাঁশী ।
হারা মনে আমি এসেছি ছুটিয়া
এ দূর কানন-বাসে;
মত্ত দাদুরী ডাহুকেরা শুধু
ডাকিছে পথের পাশে,
তরু মৰ্ম্মরে রহিয়া রহিয়া,
সিক্ত সমীর আসিছে বহিয়া
কেশে বেশে মােরে ফেলিছে জড়ায়ে
আকুল লতার ফাঁসে।
।
b
প্রভাত
নিকষ-আকাশে নাহি জ্যোতি-রেখা
আঁধারে পীড়িতা রাতি,
ক্ষণ-ক্ষীণালােক জ্বালিয়া জ্বালিয়া
জোনাকী হয়েছে সাথী ;
বরষণ-ভিজা মাটির গন্ধ,
ভরা যমুনার উছলানন্দ,
আকুলিত আরাে করেছে আমায়
উঠিয়াছি আরাে মাতি।
আসিয়াছি-ওগাে আসিয়াছি আমি
তোেমারি তােমারি রাধা,
‘আয়-আয়’ বলে ডাকিলে যাহারে-
যে রাধা তােমারি আধা
শিখিচূড়া যা’র লুটালে চরণে,
তারে ফেলে কোন্ গভীর গহনে,
লুকালে সহসা, নীরবিয়া বাঁশী
যে বাঁশী রাধায় সাধা ;
আসিয়াছি ওগাে বিজন বিপিনে-
এসেছি তােমারি রাধা।
প্রভাতী
৪৮
অমা-রাত্রির
আঁধারের শেষে
শুনেছি নূতন গান ;
নব প্রভাতের নবীন আলােকে
চলেছি করিতে স্নান।
পুলক-সিন্ধু
উথলি উঠিছে
আমার নয়ন আগে,
ফেনিলােচ্ছল
লহর-কিরীটে
অরুণ-কিরণ লাগে।
প্রতি ঢেউ যেন ডাকে, ‘আয় আয়’
আনন্দ লগন দেখ ব’য়ে যায়,
বিরাট প্রাণের আনন্দ-প্রবাহে
ঢেলে দে ঢেলে দে প্রাণ,
মিশে যা তাের পরাণে পরাণে
প্রভাতের নব গান।
ক্ষুদ্র প্রাণের
দুঃখ-অনল
নিভিয়া যাইবে আজ,
আনন্দ-সাগর
ধুয়ে দেবে তাের
যত ভয় দ্বিধা লাজ।
প্রভাতী
মহা প্রাণে তাের প্রাণ যাবে ভরে,
প্রসারি’ আয় রে বুক,
-
মৃত্যু অচিরে
অমৃত হইবে—
র’বে না রবে না দুখ।
সুখ-চঞ্চল তাই ছুটে যাই,
পিছনে চাহিতে নাই কিছু নাই,
শিরার শশাণিত নাচে দ্রুত তালে
মহা-মুকুতির মাঝ,
আনন্দ-সাগর উথলে আমার
নবীন জীবনে আজ!
প্রভাতী
৪৯
পথের মাঝে ভরা সাঁঝে
কা’র এ বাঁশীখানা,
কে দেবে রে আমায় বলে
কোথায় ঠিকানা ?
পথে চলে যেতে যেতে,
বাজিয়ে গেছে কি সুর এতে,
কি মােহময় পরশ দিয়ে,
কোন্ সে অজানা ;
কা’র এ বাঁশীখানা, ওগাে,
কা’র এ বাঁশীখানা ?
পথের পাশেই ভরা নদী
তরু-লতার ফাকে ফাকে
উজান ব’য়ে চাইছিল কি
সেই পথিকে বাঁকে বাঁকে ?
ছড়িয়ে দিয়ে সুরের ধারা,
বশী ফেলেই আপন-হারা,
কোন্ পথে সে কোথায় গেল
যায় না যে জানা।
কে দেবে রে আমায় বলে
তাহার ঠিকানা।
প্রভাতী
আমি ত চাই না যেতে,
বাঁশী ডাকে আয় আয় ;
বাঁশরী বাজিলে কভু
ঘরে কি-লাে থাকা যায় ?
ও বাঁশী পাগল-করা,
ও বাঁশী সকলহরা,
ও বাঁশী আঘাতে শুধু
হৃদয়েরি দরজায় ;
আমি ত চাই না যেতে,
বাঁশী ডাকে আয় আয়’!
আমি ত চাই না যেতে,
বাঁশী ডাকে আয় আয়।
আকাশ নিককালাে,
নাই তারা, নাই আলো,
চপলা চমকে শুধু
ধধিয়া আলােকাভায় ;
প্রভাতী
ঘন বারিধারা ঝরে,
আকুল ব্যাকুল করে,
মত্ত দাদুরী আজি
মনােসুখে গান গায়।
আমি ত চাই না যেতে,
বাঁশী ডাকে আয় আয়।
পাগলী বরষা মেয়ে
এলাে চুলে আসে ধেয়ে,
ভিজে বাতাসের সনে
ধরণীতে ছুটে’ ধায়।
উছলে যমুনা-জল,
শুনা যায় কল-কল,
মন খানি ছল-ছল
তারি সনে মুরছায়।
আমি ত চাই না যেতে,
বাঁশী ডাকে আয় আয়।
প্রভাতী
হৃদি-তটে কি যে ঢেউ,
বুঝিতে কি পারে কেউ ?
ভেঙ্গে-চুরে ছুটে নদী
ঘন ঘাের বরষায় ;
সাগরেই গতিহারা,
সাগরেই মিশে ধারা,
জুড়ায় সাগর-বুকে
বিরহ-ব্যথিত কায় ।
তাই বুঝি বাঁশী মােরে
ডাকে শুধু ‘আয় আয়।
সিক্ত শিথিল বাস,
এলানাে যে কেশ-পাশ,
চরণ জড়ায়ে ধরে
কাটা-ভরা লতিকায়,
শােণিত ঝরিছে দেহে,
তা’ বলে ফিরিব গেহে ?
শােণিতে করিব রাঙ্গা
সেই কালাে কালিয়ায়।
‘আয় আয় বাজে বাঁশী,
ঘরে কি-লাে থাকা যায় ?
প্রভাতী
তুই শ্যামরূপ ধরে আয় ;-
নহিলে যে, সখি, আজি রাধিকার
জীবন বাঁচাননা দায়।
ওলল, তাই শ্যামরূপ ধরে আয়।
সে যে অচেতন ভূতল-শয়ানে
সদা নিমীলিত নলিন-নয়নে,
দর দর দর অশ্রুধারায়
ধরণী তিতিয়া যায়।
এলো, তাই শ্যামরূপ ধরে আয়।
গােকুল ত্যজিয়া চলে গেছে কালা,
ছিড়ে ফেলে তার বনফুল-মালা,
মােহন বাঁশরী
গেছে সে পাশরি’,
রাজা হয়ে মথুরায় ;
সেই হ'তে আর কনক প্রভাতে
গাহে না পাখীরা
সবুজ
সভাতে,
ফোটে না কুসুম,
ছছাটে না সুবাস,
বহে না দখিণা বায় ;
ওলল, তুই শ্যামরূপ ধরে আয়।
৭৮
প্রভাতী
কদমতলায় নাহি চাহে কেউ,
গাগরীর ঘায় নাহি তুলে ঢেউ,
আবেগে শিহরি’
আসে না কিশােরী
জল নিতে যমুনায় ;
স্তব্ধ ময়ুর বদ্ধ পাখায়,
শাঙন-গগনে ফিরিয়া না চায়,
কাজল-নয়ন
মুদিয়া হরিণী
নিথর-অবশ-কায়।
রাধার পরাণ চরণে দলিয়া
আসিব বলিয়া গেছে সে ছলিয়া,
তবু তারি আসে
এ বিজন বাসে
রাধা তারি পথ চায়।
আসিল না সে যে নিঠুর পাষাণ,
নিরাশে কিশােরী ত্যজে বুঝি প্রাণ;
তাই বলি তােরে,
বাঁশরীটি ধরে
পীত বাসে ঢাকি’ কায়,
সখি, তুই শ্যামরূপ ধরে আয় ।
প্রভাতী
বিদায়ের বেলা একি সুর বল,
বাজিছে তােমার বাঁশীতে
পথে-চলা মন ফিরে’ কি আবার
পড়িবে উহারি ফাঁসিতে ?
ওগাে, বাজিও না আর বাঁশরী ;
চলে যেতে দাও—ছুটে যেতে দাও
সব সুখ-দুখ পাশরি’ ;
বন্ধন যত ফেলিয়াছি খুলে,
আজি মন মাের ভাসিবে অকূলে,
ক্ষত হৃদয়ের শােণিত-প্রবাহ
বক্ষ-পাঁজরে আবরি’
বাজিও না আর বাঁশরী ।
।
প্রভাতী
নিশিগন্ধার মৃদু বাসটুকু
ভাসিয়া আসিছে বাতাসে,
অসীমের কথা জানায়ে যেতেছে
প্রাণে প্রাণে মাের আভাসে ;
চঞ্চল তাই হিয়া মন প্রাণ ;
রাখ’ রাখ’ তবু বাঁশরীর তান,
চলে যেতে দাও সুদূরের পথে
মিশে যেতে দাও অকূলে ;
বিদায়ের বেলা এই সুর আর
ঢালিও না মনন-গােকুলে।
৮১
প্রভাতী
ও উদাসী ফাগুন হাওয়া।
বৃনের পথে, মনের পথে,
কোন্ পথে তাের আসা-যাওয়া ?
ও উদাসী ফাগুন হাওয়া।
অশােক ফুলের রঙ্গীন্ পথে,
সহকারের সঙ্গী পথে,
কোন্ পথে তাের আসা-যাওয়া ?
কোন্ ফুলে তাের পথটী ছাওয়া।
মুকুল-ভরা আম্র-শাখে
কোকিল যখন কুহু ডাকে,
কোন্ বিরহীর চিত্ত করি
বাতায়নের-পথটী-চাওয়া ?
আগল-ভাঙ্গা পাগল পথিক
ও উদাসী ফাগুন হাওয়া ।
প্রভাতী
সুধু-ডাকা দুপুর বেলা
উড়িয়ে ধূলা করিস্ খেলা,
পথিক সাজে পথের মাঝে
অশেষ পথের পথটা বাওয়া।
সন্ধ্যা বেলায় শান্ত বেশে
বন্ধু সম পড়ি এসে
নৃত্য-দোদুল চরণ ফেলে,
পুষ্প-বাসে অঙ্গ ছাওয়া।
এসে গােপন মনের দোরে,
কোন্ বীণা তুই বাজাস্ ওরে ।
কঁপন লাগি পরাণ জাগে,
কোন্ পাওয়া তার হয়নি পাওয়া ?
উদাস-করা ও উদাসী
ওরে আমার ফাগুন হাওয়া !
প্রভাতী
৫৪
তােমায় আমি ভুলব না ;
ভাবি মনে, ক্ষণে ক্ষণে
দ্বিধার দোলায় দুলব না।
মায়ার ঘন-গহন তলে,
কাকরকাটায় অশ্রু-জলে,
মিথ্যা-ডালা ভরে ভরে
বাসনা-ফুল তুলব না ;
দ্বিধার দোলায় দুলব না;
তোমায় কভু ভুলুব না।
আবার হঠাৎ কোন্ যাদুকর
পরশ করে যাদুর করে,
দুরাশারই ইন্দ্রধনু
দেখায় একে আঁখির পরে।
সব ভুল আজ ভুলাও ত্বরা,
ওগাে সকল ভ্রান্তি-হরা !
তুমি বিনে রাত্রি দিনে
নয়ন আমি খুব না;
তােমায় কভু ভুলব না।
প্রভাতী
.
যখন আসিলে তুমি সরযুর তীরে
আবেগ-চঞ্চল করি’ অযােধ্যাবাসীরে
দশরথাত্মজ রূপে, শ্যাম কলেবর,
প্রেমে সত্যে সমুজ্জ্বল, ত্যাগে মনােহর,
পিতার আদর্শ ভক্ত, ভ্রাতৃস্নেহে ভরা,
সতীর বিশ্বস্ত পতি, করুণায় গড়া,
আমি কি তখন, প্রভু, দেখিনি তােমারে,
স্থাপন করিনি তােমা এ হৃদি মাঝারে ?
পবিত্র মূরতি তব নিই নাই এঁকে
পাপ-তাপ-গ্লানি-দূষ্ট এ ধরায় থেকে ?
আবার আসিলে যবে যমুনার ধারে
নন্দগােপ-সুত-রূপে ঢাকি’ আপনারে,
দেখালে মায়ের স্নেহে স্বরগের সুধা,
দূর করে অন্তহীন অন্তরের ক্ষুধা,
মােহন মধুর প্রেমে বাঁশী তব সাধা,
উন্মাদিনী তব প্রেমে প্রেমময়ী রাধা-
প্রভাতী
লুপ্ত য’র হয়েছিল বিশ্ব চরাচর,
‘ঘর যে বাহির কৈল বাহির কৈল ঘর।
প্রেমের সে সুখ-স্বপ্ন রাখি’ মৰ্ম্ম মাঝে
ঝাঁপায়ে পড়িলে তুমি জগতের কাজে,
বহাইলে শান্তি-ধারা শান্ত গীতা-গানে
হিংসা-ক্লান্ত ধৰ্ম্ম-হীন মানবের প্রাণে ;
তব পদতলে বসি’ সে দিব্য সঙ্গীতে
আমারাে কি শান্তি-স্রোত বহে নাই চিতে ?
প্রাণ ভরি’ তােমারে কি দেখিনি সে যুগে ?
মােহন মুরতি লিখে নিই নি এ বুকে ?
আবার যখন এলে হিমালয়-কোলে
লুম্বিনীর উপবনে, মলয় হিল্লোলে,
বাসন্তী পূর্ণিমা রাতে ফুলদল মাঝে,
রাজার জীবনাধিক রাজপুত্র সাজে
করুণা-মণ্ডিত মুখে জ্ঞান-জ্যোতি ভরা
উজ্জ্বল যুগল আঁখি বিশ্ব-আলােকরা,
বিস্ময়ে জগৎ স্তব্ধ ত্যাগ-মন্ত্রে তব,
মুমুক্ষুর বক্ষে জাগে প্রাণ অভিনব।
বলি-পশু বিনিময়ে যবে নিজ শির
দিলে ঘূপ-কাষ্ঠ মাঝে করুণা-অধীর,
প্রভাতী
বিদ্যুৎ-পরশে যেন জগতের মাঝে
বৈদিকের যজ্ঞ-বলি’স্তব্ধ সব লাজে ।
স্নিগ্ধ নিরঞ্জনা-তীরে বােধিম-তলে
নির্বাণ লভিয়া যবে প্রেম-অশ্রুজলে
সমগ্র ধরণী মাঝে করিলে প্রচার
“অহিংসা পরম ধৰ্ম্ম” সকলের সার,
তখন কি নব-ধৰ্ম্ম-রবি-কর-পাতে
তুষার-জীবন মাের ঝরেনি ধারাতে?
আমি কি নিই নি লিখে প্রাণ-যন্ত্র তলে
অমিতাভ-মূৰ্ত্তি তব অনুরাগ বলে ?
পুনরায় এলে যবে জাবীর কূলে
শচীর নন্দন রূপে আপনারে ভুলে,
দুঃখময় জগতের মঙ্গলের লাগি
নবীন-সন্ন্যাসি-বেশে, তুমি সর্বত্যাগী
বিশ্বপ্রেম মহামন্ত্র করিলে প্রচার,
বাঙ্গলার-মহাপ্রভু, গােরা নদীয়ার !
হে সুন্দর, জনমিয়া ভারতের গেহে
নরজন্মে, অবতীর্ণ হয়ে নরদেহে
পতিতপাবন তুমি বারে বারে আসি
আমারেও তরিতেছ করুণা প্রকাশি;
{
প্রভাতী
আবার আসিবে বলে চেয়ে পথ পানে
জনমে জনমে পুরি আকুলিত প্রাণে।
কখন তােমার দিন হবে, দয়াময় ।
এ চিত্ত এ-যুগ-রাত্রি তাই জেগে রয়।
৮৮
প্রভাতী
ক্লান্ত দেহে আয়ু-রবি চলে অস্তাচল,
ধীরে ধীরে মুদে’ আসে প্রাণ-পদ্ম-দল।
সুখ-দুঃখ-পরিপূর্ণ জীবনের দিন
আঁধারের পারাবারে হতেছে বিলীন।
কতই বিচিত্র চিত্র কত রঙ্গ মাখি’
অমর-আত্মার-পটে দিয়াছে যে আঁকি’
নিপুণ বাসনা-তুলি ; ক্ষুদ্র রেখা তার
ক্ষয় বিনা মুছিবার কিবা সাধ্য আর ?
ক্লান্ত দেহে, ক্ষিন্ন ক্লিষ্ট অবসন্ন প্রাণে,
খেয়া-ঘাটে বসে একা ; পশে এসে কাণে
পারের মধুর বাঁশী, শিরা ধমনীতে
নেচে ছােটে রক্ত-ধারা অপূর্ব সঙ্গীতে।
প্রভাতী
আশার উজ্জ্বল আলাে তােলে উলসিয়া,
নবীন উৎসাহে পুন দুলে উঠে হিয়া ;
মনে হয়, রাত্রিশেষে অরুণ-উদয়ে
দীর্ঘ বিশ্রামের পরে নব বার্তা ল’য়ে
আবার উঠিব জাগি। ওই পার হতে
সােনার তরীর বুকে, অনুকূল স্রোতে
এ পারে আসিয়া, আহা! মেলিয়া নয়ন
দু’ধারের ফুল-রাশি করিয়া চয়ন
আবার গাঁথিব মালা। আত্মহারা চিতে
ছুটে যাই পার হয়ে খেয়া-তরণীতে,
যেতে আপনার দেশে; নিদ্রালস আঁখি,
মাঝি কোথা ? সবি বুঝি কল্পনার ফাঁকি।
যে ছিল পারের কড়ি কোথা গেছে প'ড়ে,
অন্ধকারে নিঃসম্বল, চোখে অশ্রু ঝরে।
প্রভাতী
৫৭
পথে ;
মিথ্যা সাধনা করেছি যে আমি,
চলিয়াছি
ভুল
কম্পিত হিয়া দু’হাতে ধরিয়া
আবরি’ মরম ক্ষতে।
আলেয়ার পাছে ভ্রান্ত পথিক
অমা-রজনীতে হারায়েছি দিক,
আকুল তিয়াসে মরুপানে এ যে
চলিয়াছি মােহ-রথে ;
মিথ্যা সাধনা করেছি যে আমি,
আসিয়াছি
ভুল পথে।
প্রভাতী
ভ্রান্তির পিছে ঘুরে’ মরি’ মিছে
জীবন করিনু ক্ষয় ;
‘দিয়েছি যে সব’–এ মিছা গৌরব
করিল কি অপচয় ?
দিয়েছি ত সব ;—তবে কেন, হায় ।
প্রাণ কেঁদে উঠে দুখে বেদনায় ?
‘অভাব অভাব’ ধ্বনি উঠে শুধু
জীবন-যন্ত্রময়।
ভ্রান্তির পিছে ঘুরে’ মরি’ মিছে
জীবন করিনু ক্ষয়!
সব সুখ দুখ ভরে আছে বুক,
সীমাহীন অভিমান
ভস্মাবরিত বহ্নির মত
হৃদি মাঝে দহে প্রাণ।
আপনার কাছে আপনারি ফাঁকি,
অমৃতে মরণ আনিয়াছি ডাকি,
ভরা সন্ধ্যায় বিফল যে, হায়।
দিবসের অভিযান ;
দিতে পারি নাই, শুধু পেতে চাই,
শুধু জাগে অভিমান।
প্রভাতী
ধূসর বেশে
;
;
দিনের আলাে
সব নিভিল
সাগর-তীরে,
সন্ধ্যা হেসে
নাল্ল ধীরে ;
পারাবারের ওপার থেকে
বাতাস এল গন্ধ মেখে,
ফুটল তারা, পড়ল ছায়া
সুনীল নীরে ;
দিনের আলাে সব নিভিল
সাগর-তীরে।
পাল-ভরে ঐ ছােট্ট তরী
খেলার ছলে সাগর তরি’
খেয়া-শেষের যাত্রী নিয়ে
গেছে যে ফিরে
পারের আশায় ঘাটে এসে
বিজন বেলায় আছি বসে
নিরাশ-নিশাস সিক্ত করি’
নয়ন-নীরে।
গভীর কালাে রাত্রি এল
সাগর তীরে।।
;
প্রভাতী
৫৯
খুলে দাও, খুলে দাও;
মিছার বাঁধনে কেন
বেঁধে রাখিবারে চাও?
মােহময় উপকূলে
অলীক স্বপন-ভুলে
ভুলাইয়া রাখ কেন ?
ভুল মাের ভেঙ্গে দাও!
বালু দিয়ে বাঁধি’ ঘর
সারা দিন করি খেলা ;
জানি নাই বুঝি নাই
ফুরিয়ে যে এলাে বেলা :
আকাশে সিঁদূর-ছবি-
অস্তে চলেছে রবি,
শেষ বাঁশী আসে ভাসি’ ;-
‘তীরে তরী সামলাও।”
প্রভাত
হয়ে গেছে অসময়,
আঁধার আসিছে ভরি;
তবু ও যে যেতে হবে
তমসা-সাগর তরি;
অকূলেতে কূল চাহি’
তরীখানি যাব বাহি’5,
এ কূলের যাহা কিছু
নাও তুমি সব নাও।
মিছার বাঁধন যত
নিজ হাতে খুলে দাও
প্রভাতী
;
লাগিছে তরীতে
প্রভাত বেলার
মৃদুল মধুর বায়
খরতর স্রোতে
তর তর টানে
কোথা নিয়ে যেতে চায় ?
(আমি) বুঝিতে নারি যে, হায়!
অ-দেখা কাহার
পরশ লাগিছে
তরীর পালের গায়।
ঐ পার হতে কি-যেন যন্ত্রে,
কে আজি গাহিছে মােহন মন্ত্রে,
কি মােহন ঐ সঙ্গীত-সুধা
মরম পরশি’ যায়।
এ পারে কত না কাজ
কা’র ডাক আসি’ করিছে উদাসী
সকলি ভুলায়ে আজ।
আকুল হিয়ায় তরী বেয়ে চলি,
তারে দিতে বুঝি যা-কিছু সকলি,
শুধু তারি গীতে
বুক ভরে নিতে,
পাড়ি দিয়ে দরিয়ায়।
;
প্রভাতী
ওই আসে ঢেউ,
গরজি’ গরজি’
খুলে দে, খুলে দে তরী,
কেন তরী বেঁধে
মরিস্ রে কেঁদে
অকূল সাগর স্মরি।
ঢেউয়ে ঢেউয়ে লাগে ঘাত-প্রতিঘাত,
বঁধা তরী তাের হবে জলসাৎ,
কোথা যেতে শেষে
কোথা যাবি ভেসে
সকল বাঁধন ছিড়ি।
খুলে দে, খুলে দে তরী।
ম
১৭
প্রভাতী
যাবি বলে যদি এসেছি আজ,
ফেলে সব বোেঝা শেষ করে কাজ,
ঊষার আলােকে
নবীন পুলকে
চল না জলধি তরি’ ;
খুলে দে, খুলে দে তরী।
পরপারে তােরে নিয়ে যাবে বলে,
ভােরের বাতাস ‘আয় আয় বলে,
সফেন তরঙ্গ
করিছে রঙ্গ
অরুণ-কিরণ পরি।
খুলে দে, খুলে দে তরী।
তরণীতে বসে তরিবারে ভয় ?
মিছে এই কঁদা প্রাণে নাহি সয়।
কোথা যাবি আজি ?
ডাক তাের মাঝি,
তুলে নে রে দড়াদড়ি।
খুলে দে খুলে দে তরী।
৯
প্রভাতী
ওগাে, অকূলে ভাসাও তরী।
কেন তরণী বাঁধিয়া তীরেতে বসিয়া
পিছনে চাহিছ ফিরি’?
গুরু গুরু ডাকে দেয়া,
এই ত শেষের খেয়া,
প্রলয়-ঝঞা আসিলে গরজি,
আঁধার আসিবে ঘিরি’ ;-
ভাসাও ভাসাও তরী।
১৯
প্রভাতী মুখখানি কার ভাবাে বার বার ?- বাসনা-তুলির টানে, প্রেম প্রীতি মাখি’ কোন্ স্মৃতি আঁকি নিতেছ গােপন প্রাণে ? ফণিফণা তুলি উঠিবে উথলি’ সাগরে ডাকিল বান, সে অকূল তরি’ কূলে নিতে তরী কঁদিবে ক্লান্ত প্রাণ। কি কাজ পিছনে চাহি’ ? ত্বরিতে তরীতে কর আরােহণ - ত্বরায় চল গাে বাহি'। চির-জীবনের প্রেমের সাধন- মন্ত্র স্মরণ করি’ আজি অকূলে ভাসাও তরী। ১০০
প্রভাতী
.
ঢেউ তোেল, ওরে, ঢেউ তােল,
সাগর-হৃদয়ে দে রে দোল।
আন্ রে প্রলয়-ঝঞ্ঝা-
সিন্ধুর বুকে উত্থিত কর
মৃত্যুর নীল পঞ্জা,
কড় কড় কড়, আন্ রে অশনি
চিরিয়া আকাশ-কোল ;
—ঢেউ তােল, ওরে, ঢেউ তােল্।
সকলি হয়েছে সারা ;
বলিবার আর কিছু নাই, ভাই,
আজি যে বাঁধন-হারা ।
সলিল-স্তম্ভ ঘূর্ণী
আছাড়ি’ ফেলুক তুষার-পাহাড়
তরী খানি মাের চূর্ণি'।
অনির্দেশ এই যাত্রা,
অতল শীতল সিন্ধু-হৃদয়ে
নির্দেশ হােতূ মাত্রা ;
শ্রবণে করুক নৃত্য
কলকল ঘাের কল্লোল।
ঢেউ তোেল, ওরে ঢেউ তোেল।
১০
প্রভাতী
৬৪
'
নিভে যাক ওই আলাে
কেন বারে বারে নিবু নিবু ওরে
মিছাই জীয়ায়ে তােলাে ?
ঝড়াে হাওয়া এসে লাগে ওর গায়,
শেষশিখাটুকু মিলাইতে চায়,
আঁধারের কালাে পারাবারে, হায় !
বাড়ায়ে আঁধার কালাে।
আলাে দেওয়া তার হয়ে গেছে শেষ,
স্নেহ-ভরা বুকে নাহি অবশেষ,
দিতে একটুকু তােমাদেরে আর,
যতই তাহারে জ্বালাে ;
নিভে যেতে দাও আলাে।
১০২
প্রভাতী
নিভে যেতে দাও ওরে,
মৃদু জ্যোতি-লিখা ওই ক্ষীণ শিখা
ক্ষীণতর রূপ ধরে।
কেন এ যতন বল না উহারে
হাতের আড়ালে রাখি বারে বারে,
দাও দাও দীপ নিভে যেতে আজ
চির জনমের তরে।
দেখ প্রভাহীন কি কাতর মুখ,
কি মহাশূন্য-ভরা ওর বুক,
জ্বালিও না আর মিছে বার বার
স্তিমিত প্রদীপটিরে ;-
নিভে যেতে দাও ধীরে।
প্রভাতী
এ জীবন-ব্যাপী
সাধনা কি মাের
সফল হ’ল না, নাথ !
মিছার স্বপনে
করিলাম কি গাে
এ ছার জীবন পাত।
মরীচিকা হেরি
হরিণীর মত
মরু সাহারায় ঘুরে’ মরি কত,
তপ্ত বালুতে
দগ্ধ চরণ
হৃদে ঘাত প্রতিঘাত;
বৃথার সাধনে
করিলাম কি গাে
সারাটা জীবন পাত!
তপন-তাপিত
দীপ্ত-দুপুরে
এ কি এ অমার রাত,
আজি আচম্বিতে মিটিল কি প্রভাে।
সারা জীবনের সাধ ?
১০
প্রভাতী
বুঝিতাম যাহা,
মানিতাম যাহা,
জীবন ভরিয়া জানিতাম যাহা,
সে কি হে মিথ্যা ? সে কি হে ছলনা ?
সে ছলা আমারি সাথ ?
বৃথার সাধনে
করিলাম কি গাে
সারাটা জীবন পাত ?
সত্য তুমি হে,
সুন্দর তুমি,
শিব তুমি হে প্রভু,
তােমার উপরে
জাগিতে পারে কি কভু ? ·
সন্দেহ দ্বিধা
আমি যে তােমারে সারাটা জীবন
জানি তুমি চির আপনার-জন,
মায়ার ছলনে মােহের বিকারে,
সে কথা ভুলি যে নাথ,
দুস্থ জীবনে কর দেব আজি
করুণ নয়ন পাত।
প্রভাতী
ব্যর্থ এ মাের হৃদয়-শােণিতে
অর্ঘ্য রাঙিয়ে নিয়া
রুদ্ধ তােমার দুয়ারে দাঁড়ানাে,
হে মাের পাষাণী প্রিয়া
বদ্ধ আগল চাহি অনুদিন,
স্তব্ধ দিঠি যে হয়ে এল ক্ষীণ,
আর কত দিন রহিবে এ দীন
পূজা উপচার নিয়া,
হে মাের পাষাণী প্রিয়া ।
প্রভাতী
মর্মরে গড়া মৰ্ম্মের দেবী
হে মাের পাষাণী প্রিয়া ।
আবাহন বুঝি করিতে নারিনু
এ মাের পরাণ দিয়া।
আমার এ হৃদি কোথা আজি বহে,
সে কথা কে জানে, সে কথা কে কহে,
বুঝ না, বুঝি না, পাগলের মত
আছি ওগাে দাঁড়াইয়া,
আকুলিত চিতে নিরাশ আশায়
হে মাের পাষাণী প্রিয়া ।
কত যুগ ধরি’ চেয়েছি তােমারে
হে মাের প্রাণের প্রিয়া ।
করুণ বেদনা জাগে না কি বুকে
এ সাধনা নিরখিয়া ?
পশিবে না কাণে এ করুণ তান ?
স্পন্দিত কভু হবে না কি প্রাণ?
আমার জীবন হবে অবসান
এমনি হতাশা নিয়া,
হে মাের পাষাণী প্রিয়া ।
১০
প্রভাতী
৬৭
।
দুয়ারে আসি’
দাঁড়ালে হাসি’
মুখের পানে চাই;
কাজের ছলে
গেলাম চলে
কহিনু-চিনি নাই।
এগিয়ে এসে
কহিলে হেসে-
দেখ না মেলে আঁখি,
আমি গাে আমি, জীবন-স্বামী,
তবুও চেন না কি ?
বিজন গেহ,
ছিল না কেহ,
কহিনু রােষ-ভরে--
চিনিনে কভু,
এসেছ তবু
কিসের ছল করে ?
অশ্রু সজল
সান্ধ্য-কমল
মলিন হাসি মুখে
ফিরিয়া গেলে
চরণ ফেলে
গভীর কত দুখে।
১০
প্রভাতী
কাদিল হেন,
প্রাণটা কেন
কিসের ব্যথা লাগি’ ?
অচিন সে যে
চলিয়া গেছে,
তারেই বুঝি মাগি ?
এলাে কি আজ রাজাধিরাজ
চিনিনি তারে, হায় !
চরণ-ধূলি
নিইনি তুলি
আত্ম-হারার প্রায় !
যদি-ই দেখা দিলে হে সখা-
জন্ম-যুগের ধন !
ভুলেই শুধু
ডুবি বঁধু
বহিয়ে দিয়ে ‘ক্ষণ।
প্রভাতী
৬৮
বেদনায় ভরা জীবন-পাত্র
দিলাম তােমারি করে ;
আপন ইচ্ছা-ভরে,
পান কর কিবা
ঢেলে ফেলে দাও
ধরার ধূলার পরে।
অথবা তাহারে ছুড়ে ফেলি’ দূরে
করে ফেল শত খান,
কঁদিবে না তবু প্রাণ ;
কানায় কানায়
পূর্ণ-পাত্রে
কোথা আর হবে স্থান ।
১১০
প্রভাতী
হৃদয়-সিন্ধু মথিয়া আমার
তুলিয়াছ আজি যাহা
কি যে হলাহল আহা!
মৃত্যু-বিজয়ী
কর-যুগ মেলি
নিতে যে হইবে তাহা।
কানায়-কানায় বিষ-বেদনায়
জীবন-পাত্র ভরে,
দিলাম তােমারি করে।
পান কর কিবা
ঢেলে ফেলে দাও,
আপন ইচ্ছা-ভরে।
প্রভাতী
এ প্রাণ-পাত্র ভরিয়া,
যা ছিল আমার
রয়েছি তােমার
তৃষিত অধরে ধরিয়া ;
কর পান-ওগাে কর পান,
মনাে-বীণা মাের মীড় দিয়ে আজ
অনাহত ধ'রে উঠুক তান ;
যত দুখ হােক অবসান,
সপ্ত স্বর্গ আসুক ভেদিয়া
মূৰ্ত্ত হইয়া অগীত গান।
সময় যে যায় বহিয়া,
হৃদয়ের তীরে
ঢেউ তুলে’ ধীরে
সুখের স্বপনে মােহিয়া।
কত রব আশা করিয়া,
মুখ পানে তব চেয়ে অনিমিষ
এ প্রাণ-পাত্ৰ ধরিয়া।
যুগ যুগ ধরে
সঞ্চিত করে
রেখেছি যে প্রিয় বঁধু হে!
তােমারি লাগিয়া পরাণ ভরিয়া
প্রাণ-পারিজাত-মধু হে!
কর পান, ওগাে কর পান,
চির তরে আজি নিঃশেষ কর
চির-জাগ্রত অভিমান ;
চির-দুখ হােক্ অবসান
সপ্ত স্বর্গ আসুক ভেদিয়া
বাণী-বীণা-ঝরা অ-গীত গান ;
আঁধার জীবনে উকি জাগিয়া
নবালােক-ভরা নূতন প্রাণ।
;
প্রভাতী
৭০
আকণ্ঠ পূরিয়া কর পান ;
চির-তৃষা হােকঅবসান।
থাকে যদি থাকে যদি সুধা,
দূর কর তাহে তব ক্ষুধা ;
রাখিও না সীমা পরিমাণ,
আকণ্ঠ পূরিয়া কর পান।
যত দিন যত বার আস,
মুখ পানে চেয়ে চেয়ে হাস;
সে হাসি সে চাহনি তােমার
বেদনায় বিদ্ধ করে প্রাণ।
কি
মুখর
চির-মৌন ভাষা !
হক সম বুকভরা আশা
ঢেলে দাও তাঁখি-পথ দিয়া
সুতরল সুবর্ণ সমান।
১১৪
প্রভাতী
ভাস্করের তীক্ষ্ণ অস্ত্রখানি
পাষাণেতে রেখা যায় টানি,
তেমনি ও-হাসিটী তােমার
মৰ্ম্মে মাের টানে শত টান।
ও আঁখির অন্তরাল, হায়!
শত বাহু মেলি’ কিবা চায় ;
কি দিব ভাবিয়া মরি যে গাে
সারা চিত্ত করিয়া সন্ধান।
এ যে ঘাের মরুভূ ঊষর,
অশেষ এ বালুকা ধূসর ;
হেথা কোথা শ্যামশস্পতীরা
সুশীতল তটিনীর তান ?
তবু যদি ঘুরি কাছে কাছে,
মূক ভাষে বল—আছে আছে,
অমৃতের স্নিগ্ধ উৎস-বারি,
সীমাহীন শ্যামল উদ্যান।
তৃষিত অধর তব জানি ;
ধর মাের প্রাণ-পাত্র খানি,
রাখিয়া সীমা পরিমাণ,
আকণ্ঠ পূরিয়া কর পান।
প্রভাতী
৭১
আমারে কেন আনিলে ডাকি
এই দেউলের দুয়ারে ?
কেমনে আমি পূজিব বল’
উহারে ?
কি আছে, বল’, পূজার সাজ ?
কি দিয়ে অর্ঘ্য রচিব আজ ?
অসীম ব্যথা, অশেষ লাজ
দিলে যে শুধু আমারে।
কি দিয়ে আমি পূজিব বল
উহারে ?
প্রভাতী
“কি আছে, বল’, সম্বল মাের,
কি আছে আমার ভরসা।
চক্ষে শুধুই উথলে অশ্রু-
বরষা।
কণ্ঠে ফুটে না স্তোত্র-তান,
ভগ্ন বীণায় বাজে না গান,
জাগে না সুপ্ত অসাড় প্রাণ
ভক্তি-পরশে সরসা ;
চক্ষে শুধুই উথলে অশ্রু
আমি যে কিসের অঞ্জলি দিব
বিশ্ব-পূজিত চরণে ?
বরিয়া লব কেমনে মৃত্যু-
হরণে?
কেমনে ধূলা-মলিন করে
পুষ্প-পত্ৰ চয়ন করে
গাঁথিব মালা, পরাণ ভরে’
ডাকিব অধম-শরণে?
কি দিয়ে আমি বরিব মৃত্যু
হরণে?
প্রভাতী
অসীম তারে কেমনে হেরি
সসীম আমার আঁখিতে ?
সান্ত মৰ্ম্ম পারে কি রে
আঁকিতে ?
বিন্দু শিশির বক্ষস্থলে ;
সিন্ধু-সলিল কোথা উছলে ?
পারে কি অমা তিমির-তলে
সূৰ্য-কিরণ মাখিতে ?
অনন্তে হেরি কেমনে সান্ত
অাঁখিতে ?
আমারে কেন আনিলে ডাকি’
এই দেউলের দুয়ারে ?
কি দিয়ে আমি পূজিব, বল,
উহারে ?
কি আছে, বল, পূজার সাজ ?
কি দিয়ে অর্ঘ্য রচিব আজ ?
অসীম ব্যথা, অশেষ লাজ
দিলে যে শুধু আমারে !
কি দিয়ে এ দীন পূজিবে, বল,
উহারে ?
s
১১r
প্রভাতী
৭২
ফেলে রখাে ওই বীণ।
ছিড়ে গেছে তার ; মিছে কেন আর
গুঞ্জরাে রিণ রিণ ?
শ্রবণ-মধুর
বাজে না তাে সুর,
ও যে রােদনের ধ্বনি।
আকুল হুতাশে
প্রতি-নিশ্বাসে
মৃত্যুর ক্ষণ গণি ।
সর্বহারার
দুখ-হাহাকার
ভরা যে হৃদয়-পুর ;
সুরের সুধায়
প্রাণের ক্ষুধায়
কেমনে সে করে দূর ?
প্রভাতী
ছিল গান যত
গাহিয়া নিয়ত
নিঃশেষ করি’ দান,
পিছু চাহিবার রাখে নাই আর
শূন্য সকল প্রাণ।
ধরার ধুলায়
সুখে ও লুটায় ;
কেন মিছে আন’ তুলি’ ?
ছিন্ন তন্ত্রী,
কেন হে যন্ত্রি !
সে কথা যেতেছ ভুলি’ ?
এই সন্ধ্যায়
ও যে চাহে হায়।
হইতে সমাধি-লীন ;
ছিড়ে গেছে তার ;- মিছে কেন আর ?
ফেলে রখাে ওই বীণ।
প্রভাতী
৭৩
থেকে থেকে ডেকে ডেকে
আঘাত করে রুদ্ধ দ্বারে,
অনাহূত হাওয়ার মত
যাও যে ফিরে বারে বারে ?
কি এক মধুর অঙ্গ-বাসে
আঁধার গৃহ ভরে আসে,
মিষ্টি হাসির ঝরণা যেন
ঝরে পড়ে হাজার ধারে।
প্রভাতী
মাঝে মাঝে ঐ যে বাজে--
ঐ যে নূপুর রিণি-রিণি,
এই যে হাসি, ঐ যে বাঁশী,
চিনিই বুঝি—চিনি চিনি !
চিনি চিনিই ভাবছি, তবু,
ভুলে’ যে যাই, ওগাে প্রভু!
এ মরু-মনে দাও বহিয়ে
তােমার কৃপা-মন্দাকিনী !
তােমায় আমি চাইনি, স্বামি ।
প্রাণটা যে মাের পাষাণ সম ;
উৎস খুঁজি’ বেড়াও বুঝি,
তাই আস যাও, প্রভু মম !
তােমার তৃষা, আমার কাছে
এমন সুধা কি-ই বা আছে ?
থাকেই যদি, পান কর” ”
প্রাণের মাঝেই প্রিয়তম ।
।
প্রভাতী
৭৪
জেগে ওঠ, জেগে ওঠ, প্রাণ!
অলসতা হােক-অবসান।
রাত্রি হয়েছে ভাের -ভাঙ্গিবে না ঘুম ঘাের ?
শুয়ে থেকে শকতিরে
করিবি কি অপমান ?
ওই তাের চারিপাশে ফুলগুলি ফুটে’ হাসে,
মুখরিছে বনভূমি
পিক পাপিয়ার তান।
জেগে ওঠ, জেগে ওঠ, প্রাণ।
প্রভাতী
বারে বারে আসে যায় প্রভাতের মৃদু বায়
শীতল পরশ দিয়ে,
করে এসে সিন্ধু-স্নান।
জাগ্রত জগৎখানি ঘােষিছে কর্মের বাণী,
পশে না শ্রবণে তাের
বিশ্ব-প্রকৃতির গান?
জেগে ওঠ, জেগে ওঠ, প্রাণ ।
চেয়ে দেখতাের বুকে দেবতা রাজেন সুখে ;
করিবি না পূজা তার,
রাখিবি না তার মান ?
প্রতি শিরা ধমনীতে শশাণিত-প্রবাহ-গীতে,
প্রতি ক্ষণে মহাক্ষণ
হয় তাের অবসান।
জেগে ওঠ, জেগে ওঠ, প্রাণ ।
প্রভাতী
যাহা কিছু ভাঙ্গাগড়া যাহা কিছু বােঝা-পড়া
করিবি কি বহে’ গেলে
এই দীপ্ত দিনমান ?
সাজি না মিছে মরা, জাগিয়া ওঠ রে ত্বরা,
মৃত্যু ত মুহূৰ্ত্ত গােণে
শিয়রেতে—সাবধান।
জেগে ওঠ, জেগে ওঠ, প্রাণ।
সম্মুখে অশেষ পথ,
সাজানাে সােনার রথ,
বাতাসে ভাসিয়া আসে
শােন্ কার আহ্বান।
তাের ত সকলি আছে তবে কেন পড়ে পাছে ?
মােহ টুটে’ চল্ ছুটে
আগে আগে গেয়ে গান।
জেগে ওঠ, জেগে ওঠ ,প্রাণ ।
প্রভাতী
৭৫
চিররুদ্ধ কারাগৃহ মাঝে
অতি ক্ষুদ্র বাতায়ন-পথে
প্রতিদিন উদয়ের ক্ষণে,
রবি আসি অরুণের রথে,
অতি ধীরে অতি সঙ্গোপনে
সুউজল কর প্রসারিয়া
দেহ মন তুলে উলসিয়া,
প্রতিদিন ডেকে যায় মােরে
বাহিরিতে বাহির জগতে।
প্রভাতী
পাখী গায়-দেখ একবার
বাহিরের শােভা চমৎকার,
আলােভরা রামধনু-আঁকা
গাঢ়নীল আকাশ উদার।
সুদূরের কত কথা ক'য়ে
ক্ষুদ্র পথে বায়ু যায় ব’য়ে,
ভূলুণ্ঠিত অঞ্চল আমার
কাপাইয়া দিয়া বার বার।
ভুলে যাই—রুদ্ধ মাের দ্বার,
ভুলে যাই—বদ্ধ কারাগার,
ছুটে যেতে লুটে পড়ি ভূয়ে—
ক্ষত-মুখে ছুটে রক্তধারা ;
বেদনায় কেঁদে উঠে প্রাণ,
ছুটে স্বপ্ন, মােহ অবসান,
তবু শুনি’ বাহিরের ডাক
ক্ষণে ক্ষণে চিত্ত আত্মহারা।
প্রভাতী
৭৬
কভু বা করিছে
ওগাে ফিরাইয়া লহ
বিদ্যুৎভরা
আঁখির দৃষ্টি-টুক,
ক্ষণে ক্ষণে যাহা
বিধিছে আমার
ক্লিষ্ট কাতর বুক ;
ক্ষণে ক্ষণে যাহা
উথলি’ তুলিছে
বুকের শােণিতধারা ;
স্তম্ভিত প্রাণ
উদাসী আপনা-হারা।
শুনি নাই কথা,
জানি না পরশ,
শুধু দেখি—থাকো চেয়ে ;
বাঁকা নয়নের
সে দিঠি তােমার
ফেলে যে আমারে ছেয়ে !
অবশ বিহ্বল
কম্পিত পদে
পথ বয়ে চলে যাই,
যমুনার জলে
ভরিতে গাগরী
ভুল হয়ে যায় তাই।
প্রভাতী
শূন্য কলস,
গমন অলস,
আন-মনে ফিরে’ চলি ;
রােষে গুরু জন,
হাসে সখীগণ,
কি বলে দেরে ছলি ?
চাহনি তােমার কি যে বলে, ওগাে ।
নীরব মৌন ভাষে,
উতলা আমারে করে তােলে শুধু,
থাকিতে নারি যে বাসে।
লহ ফিরে’ লহ
যে দিঠি তােমার
পাগল করে গাে হিয়া,
অথবা লহ এ
দাসীরে তােমার
সকল পরাণ দিয়া।
প্রভাতী
৭৭
তােমারি চরণ-তলে
পড়িব লুটে,
রয়েছে গােপন আশা
হৃদয়-পুটে।
অরুণ-কিরণ-পাতে
শতদল যথা প্রাতে,
তােমারি প্রসাদে প্রভু
তেমনি ফুটে
পড়িবে এ দীন হিয়া
চরণে লুটে।
ধূলা মাটী জমেছে যা
আমারে ঘিরে,
ধুয়ে নিতে হবে তব
করুণা-নীরে।
শ্রান্ত শিশু দিনশেষে
জড়ায়ে ধরিলে এসে,
১৩০
প্রভাতী
ন
ধূলি মাটী মুছে নেয়
জননী ধীরে,
তেমনি আমারে নিও,
চুমিয়া শিরে।
;
অবসান হয়ে আসে
দিবস খানি,
লােক আকাশে যা
বিদায়-বাণী ;
পথে পথে ঘুরি’ কত,
হাস* কাদি’ অবিরত,
এসেছি ও-পড়ে দিতে
হৃদৰ খানি;
হ প্রভু দয়া করে
অধম জানি।
*
প্রভাতী
৭৮
জীবনের যত ব্যথা
লুকাইয়া যতনে
রেখেছিনু এত দিন
দীন যথা রতনে ;
ভেবেছিনু-কভু তারে
জানিবে না একেবারে,
আঁধারের পারাবারে
ঢেলে দিব গােপনে,
সঞ্চিত ব্যথা শত
ছিল প্রভু এ মনে।
সাধনার ধন মাের
সারাদিন ধরিয়া
আপনার ব’লে তােমা
নিইনি ত বরিয়া ;
প্রেম-প্রীতি-ফুল-দলে
ও রাজীব পদতলে
দিই নি ত কোন ছলে
এক দিনাে ধরিয়া ;
আপনার ব’লে তােমা
নিই নি ত বরিয়া।
আজ তাই চেয়ে চেয়ে
সন্ধ্যার গগনে,
দুলে দুলে উঠে হিয়া
নিশ্বাসি’ সঘনে ;
কোন্ মুখে কোন্ লাজে
ডাকিব আমার মাঝে
তামসী-জীবন-সাঝে
শেষ এই লগনে ;
দুলে উঠে হিয়া মাের
নিশ্বাসি’ সঘনে।
প্রভাতী
৭৯
;
ভেবেছিনু মাের
আঁধার হৃদয়
তব রূপে গেছে ভরিয়া ;
ভেবেছিনু মাের
অবােধ বাসনা
কেঁদে কেঁদে গেছে মরিয়া।
ভেবেছিনু—কিছু নাহি চাহিবার,
পিছনে ফিরিয়া চাহিব না আর,
বাঁধন কাদন
কুহেলি স্বপন
ভেঙ্গে খসে গেছে সরিয়া ;
অবুঝ বাসনা,
অশেষ কামনা,
ভেবেছিনু-গেছে মরিয়া।
১৩৪
প্রভাতী
বেলা শেষে, তাই,
সমীরণ যাই
ক’য়ে গেল কাণে কাণে-
‘ঘন ডাকে দেয়া,
ওই শেষ খেয়া
যায় ওপারের পানে।
চমকিত চিতে তরণীতে উঠি
দেখি–দীন হিয়া পড়িয়াছে লুটি,
ব্যর্থতা তার
আনে হাহাকার
স্বপনের স্মৃতি স্মরিয়া ;
ভেবেছিনু--শেষ,
দেখি যে অশেষ
রহিয়াছে হৃদি জুড়িয়া !
•
প্রভাতী
সুন্দর সেজেছ আজি
হে চির সুন্দর !
আমার ব্যথার রঙে
রঞ্জিত অম্বর।
কনক-কীরিট পরে
অশ্রুজল মম
মহার্ঘ মুকুত সম
ওগাে প্রিয়তম
আদরে পরেছ যে গাে ;
বকুলের মত
বিফল বাসনা মাের
ঝরেছিল যত
মরমের এক পাশে,
নব উষালােকে
মােহন মালার মত
আজি যে ঝলকে !
প্রভাতী
এ দীর্ণ হৃদয় বুঝি
তব পদতলে
ঢাকিয়াছে রাগারুণ
শত শতদলে।
ছিনু দুখে অচেতন,
জানি নাই আগে-
আমার বেদনা তব
এত ভাল লাগে ।
তা হলে কি দুঃখ বলে
করি’ এত হেলা
কাটায়ে দিতাম এই
জীবনের বেলা?
প্রভাতী
৮১
সারাটা জনম ভরে
আছিনু কি শয়নে ?
কুহেলি কি ঘিরে’ ছিল
এত দিন নয়নে ?
আজ এই ভরা সাঁঝে
পেয়েছি যা পথ-মাঝে,
আসিয়াছি দিতে তাই
তব রাঙ্গা চরণে,
সারাটা জনমে মাের
পড়ে নি যা’ নয়নে।
প্রভাতী
যে প্রাণ ঘুমিয়ে ছিল
বুকখানি জুড়িয়া,
চিনি নাই এত দিন
যারে ধরা ঘুরিয়া ;
তােমারি পরশ লাগি
সে যে গাে উঠেছে জাগি”,
—মূরলীর রবে যথা
গােপ-বধূ শয়নে,-
সারাটী জনমে মাের
পড়ে নি যা’ নয়নে।
১৩
প্রভাতী
৮২
যা পেয়েছি তােমার এ ভবে,
সব নাকি ফেলে যেতে হবে ;-
এই দুখ-সুখ-রাশি,
এই অশ্রু, এই হাসি,
প্রাণে-প্রাণে এই পাওয়া,
বুকেবুকে ঢেলে দেওয়া,
তােমার এ ধরণীর ধূলাতেই রবে।
-~-সৰ নাকি ফেলে যেতে হবে ।
যাদেরে আপনা ভুলি’
হৃদয়ে নিয়েছি তুলি’,
স্নেহ, প্রেম, ভালবাসা,
বুক-ভরা এত আশা,
উছলিত প্রীতিরাশি
আনন্দ-উৎসবে ;
—সব নাকি ফেলে যেতে হবে।
৪০
প্রভাতী
কোন্ সে অশেষ পথে,
কোন্ বিস্মৃতির রথে,
কোন্ অ-জানার পানে,
কোন্ অ-জানার গানে,
মুগ্ধ হয়ে অ-জানিত
বাঁশরীর রবে,
সব নাকি ফেলে ফেলে যেতে হবে ।
মিছ হাসি, মিছা বাঁশী,
মিছা ঝরে অশ্রুরাশি,
আমি ত জানিনা তাহা,
আমি ত মানিনা তাহা ;
মরমে যা’ মিশে গেছে
মরণে তা’ রবে,
যা পেয়েছি তােমায় এ ভবে!
ন
কত যুগ যুগান্তর,
কত জন্ম জন্মান্তর,
তাই নিয়ে কাদা-হাসা,
তাই নিয়ে বাঁধা বাসা
দিয়ে নিয়ে যাওয়া-আসা
কে ছেড়েছে কবে ?
সব যুদি ফেলে যেতে হবে ।
প্রভাতী
যাওয়ার তরেই আসা শুধু
আসার তরেই যাওয়া,
কাল-সাগরে জীবন-তরী
অনন্তকাল বাওয়া।
এই কি তােমার বিধান, প্রভু
মিলবে না কূল-কিনার কভু ;
সার হবে কি আকুল চোখে
তীরের পানে চাওয়া ?
কত যুগ আর কত জনম
তরী আমার সাগর বুকে
ঢেউয়ের তালে উঠে-পড়ে
ছুটবে অনির্দেশের মুখে ?
মাঝে মাঝে তোমার বাঁশী
আকুল আরাে কৰে আসি’ ;
বাঁধতে তরী দেবে না কি
বাসনারই হাওয়া ?
যাওয়ার তরেই আসা শুধু
আসার তরেই যাওয়া ।
•
১৪২
প্রভাতী
৮৪
আমার এ ধরণীর দেওয়া নেওয়া
নাহি মান অভিমান, প্রাণে আর
লাজ-লশ !
কোনাে কথা কহিবার,
কোনাে ব্যথা বুহিবার,
পিছনেতে নাহি পড়ে কোন কাজ
অবশেষ।
সম্মুখে অপার সিন্ধু রয়েছে
শয়ান পাতি';
গরজিয়া গাহে আজি ‘তাের যে
পয়াণ-রাতি;
আধাে-ঢাকা তারাগুলি
চাহে কভু মুখ তুলি’,
মেঘ-তপােৰনে শশী রয়েছে
ধেয়ানে মাতি।
প্রভাতী
গভীর আঁধার রাতি, নাহি
কারাে দরশন ;
চপলা চমকে ঘন, ঘন
দেয়া-গরজন ;
তবু ভয় নাহি আর,
একা আজি হব পার,
পেয়েছি অ-দেখা তা’র অভয়
সে পরশন।
দেওয়া-নেওয়া চুকে গেছে,
বাকী নাহি কোনাে কাজ ।
কে ডাকে বুকের মাঝে,
শােত্ ওরে শােন্ আজ
ডুবে যদি যায় তরী
তবু নাহি তা’য় ডরি,
ভয়-ভাঙ্গা ডাক-টুকু
শুনেছি যে মনােমা।
প্রভাতী
.
;
তপ্ত ধরণী হইল শীতল
বিমল স্নিগ্ধ বায়ে,
জগৎ যখন ভরিল সান্ধ্য ছায়ে,
চাষীরা যখন ফিরে এল ঘরে
শ্রান্ত মাঠের-কাজে,
আরতি-শঙ্খ ধ্বনিয়া উঠিল
দেবের দেউল মাঝে
বনানী যখন আঁধারে হইল হারা,
মেঘের আড়ালে দু একটী করে
উঠিতে লাগিল তারা,
ক্লান্ত-হৃদয়ে জীবন-তরণী
ফিরিবারে চাহে কূলে ;
আঁধারে ঢেকেছে তটিনীর তট—
পথ ত গিয়াছি ভুলে।
প্রভাতী
ܕܫ
;
ছুটিছে লহর শাওন নদীর বুকে ;
দিক্-হারা হায়! যাব আমি কোন্ দিকে
পিছে কি সম্মুখে ?
গুরু গুরু গুরু গরজিছে দেয়া,
চপল চমক হানে,
জল-কল্লোল পশিছে স্তব্ধ প্রাণে;
এ জীবন-তরী
হেরিবে না বুঝি
আবার নবীন উষা—
তরুণ অরুণে কনক-কিরণ-ভূষা।
আঁধারে আজিকে বিদায়, ধরণি।
আঁধারেই শেষ দেখা,
খুঁজিতে চলি
নূতন পথের রেখা।
প্রভাতী
আলােক-পুণকে ঝলমল করে
সোনা যাত্রাপথ ।
পাখীর বাসায় নবজাগরণ,
নূতন আলােকে ভরেছে ভুবন,
তুষার-কীরিটে সােণার ঝলক
হাসে যত বন পর্বত
* ১
এসেছে অরুণ-থ।
প্রভাতী
সুনীল সাগরে উঠিছে ফুটিয়া
সােণার কমল-দল,
লহরে লহরে দোলাইছে তারে
সমীরণ চঞ্চল।
পুঞ্জ-ফেনের শুভ্র মরাল
চঞ্চুতে ধরি’ পদ্ম সনাল
দলে দলে দলে ছুটে তীর পানে
উদ্দাম উচ্ছল ।
ছুটে চলে মাের মানস-তরণী
কোন্ সুদূরের পানে,
কূল-হারা-নাহি দিক্-নিরূপণ,
কোন্ অজানার গানে।
পালে লাগে শুধু সাগরের হাওয়া;
কোথা হবে শেষ এ তরণী বাওয়া?
যাত্রাপথে ত রবে এ আলোেক
পূর্ণ তাহারি তানে?
প্রভাতী
৮৭
মহা-সিন্ধুর দোদুল-বুকে
শুভ্র অমল পালট তুলে
তােমার সুরের সােণার-তরী
দাও গাে এবার দাও গাে খুলে।
দূর সাগরের বাতাস আসি’
ভিজে গায়েই নাচছে হাসি,
কল্লোলেরি নূপুর পায়ে
ঢেউগুলি ধায় দুলে দুলে।
দাও গাে তরী দাও গাে খুলে।
প্রভাতী
তরুণ অরুণ কনক-করে
নীল সাগরের বক্ষ’পরে
আঁকছে ছবি কতই ভাবের,
রেখার ভাষায় মন যে ভুলে।
সব-ভুলানো ডাকটি যে কা’র
বুকের মাঝে আছে আমার,
তরীর পাশেই ঘুরছি যে তাই
ভ্রমর যেমন বিভাের ফুলে।
ওই অসীমের সীমার শেষে
প্রাণ যে আমার যাচ্ছে ভেসে,
তােমার সুরের তরীর 'পরে
নাও গাে মোরে নাও তুলে।
মহা-সিন্ধুর দোদুল-বুকে
দাও গো তরী দাও খুলে।
প্রভাতী
স,
এই তুফান ভরা মাঝ-গাঙে
টমস্ টন্ জীবন-তরী
শুধুই কেবল ঢেউ ভাঙে।
শেষ পহরের ভাদর বেলা
মেঘের সনে করছে খেলা,
ক্ষণিক ধারায় ঝাপসা দিঠি,
কূল-কিনারা কোন্ খানে?
অপার তরি’ সােণার তীরে
ঠেকবে কবে আমার তরী,
নিশার শেষে উজল উষা
জীবন দেবে ধন্য করি’ ?
বুঝিয়ে দিয়ে সকল বােঝ
তার চরণেই পড়ব সােজা,
সেই সে আশার রামধনু যে
আজকে আমার মন রাঙে,
এই তুফান-ভরা মাঝ-গাঙে।
প্রভাতী ৮৯ শেষ-বিদায়ের বাণী আমার বল রে তােরা বল, ত্বরায় তােরা ফেল্ রে মুছে’ নয়ন-ভরা জল। সাগর-বুকে বান এসেছে, তরীর বুকে পাল তুলে দে, দে খুলে দে বাঁধন খুটার- বেঁধে কি আর ফল? বিদায়-ক্ষণের বাণী তােরা বলরে এবার বল। অচিন-দেশের আসছে হাওয়া, লাগছে আমার গায়। শিরা যে সব শিউরে উঠে, আর কি থাকা যায় ?
প্রভাতী
পাহাড়ভাঙ্গা আছে যে ঢেউ,
রুতে তারে পারুবি কি কেউ ?
কল কল কল্ আছে ডেকে
জোরে জোয়ার-জল ;
যাবার সময় নিকট এখন
বিদায়-বাণী বল্।
প্রভাতী
শেষ বিদায়ের গান
বারেক তুমি গাও না, শুনি’
ভরু আমার প্রাণ।
পান্থ আমি যাচ্ছি দূরে,
বুক ভরে নিই তােমার সুরে,
বিজন পথে
একলা যেতে
শুনব তােমার তান ;
গাও না তুমি গান।
কাটা ফুটে’ পেলেও সাজা,
ওগাে আমার গানের রাজা।
মুগ্ধ তােমার মােহন সুরে
করব অভিযান
গাও না তুমি গান।
;
আমার শূন্য হৃদয়-ভূমি
গানে ভরে দাও না তুমি,
আকাশ-নীলে দীপ জ্বেলে
দাও গাে শেষের দান,
আমার শেষ-বিদায়ের গান।
==
১৫০
প্রভাতী
ষত কথা ছিল,
হে প্রভু আমার!
হৃদয়ের মাঝে ছড়ায়ে,
যত ব্যথা ছিল
লতিকার মত
মৰ্ম্মে মর্মে জড়ায়ে,
ভেবেছিনু মনে তােমারি চরণে তাহা
বিদায়ের কালে নিবেদি’ যাইব, আহা !
আপনারে আমি
লুকায়ে ফেলিব
}
আলাের, আড়ালে সরায়ে।
v
প্রভাতী
লুটিছে আজিকে ব্যাকুল পরাণ,
পূরিল না সেই আশা;
কণ্ঠে আমার
ফুটিল না সুর,
মৌন রহিল ভাষা;
তবু—তবু এই আধ-খানি গাঁথা মালা,
দীন-হৃদয়ের-আকুল-আবেগ-ঢালা,
চির করুণায়
লইও তুলিয়া
শিব করযুগ বাড়ায়ে ?
প্রথম পংক্তির বর্ণানুক্রমিক সুচী। ১০০ ১০ ০০৫ ৮ pc ৫৫ ৮ ৭২ ৫ ১ ••• ••• ৪৪ ••• ৮০০ ১১৪ ৩৪ ০ ১৪ ২৩ ••• ৩০ # অন্তরের অন্তস্তলবাসী অমন করে লুকিয়ে কেন অমার আঁধার নিশা অমারাত্রির আঁধারের শেষে অশ্রুসজল কুদ্ধ স্বরে অশ্রু-সাগর সতারি চলেছি আকণ্ঠ পূরিয়া কর পান আকাশ-পথে সােণর রথে আকাশ-বীণায় বাজাও তােমার আনন্দ আজ ছড়িয়ে দিলে কেন আনন্দেরি রাজসভাতে আমার এ ধরণীর দেওয়া নেওয়া আমারে কেন আনিলে ডাকি আমি চাই না যেতে আলােকপুলকে ঝলমল করে এই তাে বাজালে বাঁশী এই তুফান-ভরা মাঝ-গাঙে একটি সুরে আকাশ ভরে এ জীবন-ব্যাপী সাধনা কি মাের এ প্রাণ-পাত্র ভরিয়া • ০ ৩৮ ••• ৮০ ১৪৩ ৯০ । ৫৫০ ১৪৭ ০০ ••• ৭০ . •• ৪০ ১০৪ ০৮ • । '১১২ ৮২ + + ৮০ ১২৮ २8 *** ৪৩ .. ২৮ • ৫৮ ••• ২০০ २० ••• - ৫০ ৬৭ •• ৮৯ ১০ ১৪ ০ ০ । ••• ৪৭ ও উদাসী ফাগুন হাওয়া ওগাে অকূলে ভাসাও তরী ওগাে ফিরাইয়া লই ওগাে সুন্দর অন্তরতম কখন ফুটিবে তােমার আলােক কতই করিছ দান কত দিবস রজনী রয়েছি কি গান তুমি শুনিয়ে গেলে কুঞ্জে কুঞ্জে ফুটে না কুসুম ক্লান্ত দেহে আয়ু-রবি খুলে দাও খুলে দাও খােল গাে তােমার রুদ্ধ দুয়ার গরজি গরজি ওই আসে গহন পথে জ্যোতির রেখা ••• চিররুদ্ধ কারাগৃহ মাঝে জানি নি তত প্রভু আগে জীবনে আমার এসেছিল জীবনের যত ব্যথা জেগে ওঠ জেগে ওঠ প্রাণ ঢেউ তােল ওরে ঢেউ তােল তপ্ত ধরণী হইল শীতল তুই শ্যামরূপ ধ'রে আয় তুমি সেই সুরেতেই গাও তােমায় আমি ভুলব না ৯৭ ••• ১৮ ••• ৮০০ pe ••• ক ১৩২ ৫০ ৪ ৫ ৬ ০ ০ ০ ••• ১০১ ১৪৫ ১০০ ৭৮ ••• 82 ৮৪ ০ ০০০ ০৮ ••• • ১৩০ ১২ ০৫ ১d, *** ২? ••• ৫১ ১২ ৫০০ '} ৪৫ তােমার পরশ লাগে আমার তােমার পানেই চাইব আমি তােমার পায়েই পৌঁছে দেব ••• তােমার বাতাস ডাক্ছে আজি তােমারি চরণ-তলে পড়িব লুটে থেকে থেকে ডেকে ডেকে দিনের আলাে সব নিভিল দুয়ারে আসি দাড়ালে হাসি ধূলার মাঝেই তােমার সােণর নবীন উষায় এলে যবে নবীন ধানের শােভায় মুগ্ধ নিকষ-কালাে আকাশ-কোলে নিঝুম ঘন গভীরতর নিভে যা ওই আলাে নিশার আঁধার সরিয়ে দুরে পথের মাঝে ভরা সাঁঝে পাখীর প্রভাত গানে প্রাণের মাঝে তােমায় যেন ফাগুন যে দিন এসেছিল ফান্ধনেরি দমকা হাওয়ার ফেলে রাখ ওই বীণ বক্ষ-পাঁজরে লুটিছে হৃদয় বক্ষে ফিসের ঢেউ লাগে বাজল না রে সেতারবানি ।। । ০ ০ ••• ১০২ ৫. ৭৪ ••• ১৭ ܕ•• •• : ৪১ ০ ••• ৬০ ব এ ৩৭ ৮০ * . ৩. • ১১০ • ৮০ • ১৩৪ ০ ০ ০ ৮ #p ১৪৯ # । ৯১ *** ••• বাঁধাে আমায় আরাে বাঁধে !... বিদায়ের বেলা একি সুর বেদনায় ভরা জীবন-পাত্র ব্যর্থ এ মাের হৃদয়-শােণিতে ভেবেছিনু মাের আঁধাৰ হৃদয় মধু মাধবের মানসমােহন মহা সিন্ধুর দোদুল বুকে মাের গােন মরমে মিথ্যা সাধনা করেছি যে যখন আসিলে তুমি যত কথা ছিল হে প্রভু আমার যাওয়ার তরেই আসা শুধু যা পেয়েছি তােমার এ ভবে লাগিছে তরীতে প্রভাত বেলার শেষ বিদায়ের গান শেষ বিদায়ের বাণী আমার শিশুর মত সরল প্রাণে সখি করে আর ওরে মানা সাতটি রঙে রঙ্গীন করে সারাটি জনম ভরে সারাটি সকাল সুন্দর সেজেছ আজি সে দিন তুমি বলেছিলে ১৪২ r # , ১৪০ *** ৫ ১৫৪ ৫৮ ••• ৫০ ৪ s ৬৫ । s ৩৩ ০০ ১৫ । t ০ ০ ১৩৮ ••• ১৩৬ } ক ৪)
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.