Makardah Saraswat Library, Howrah
Sagar Dolay Dheu
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
সাগর দোলায় ঢেউ
শ্রীনবগােপাল দাস
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স
২৩১১ কর্ণওয়ালিস্ ট্রীট, কলিকাতা
দেড়টাকা
আশ্বিন,--১৩৪১
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্সের পক্ষে ভারত প্রিন্টিং ওয়ার্কস হইতে
শ্রীগােবিন্দপদ ভট্টাচাৰ্য কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত
২০৩১১, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
Nilikut
সাগর দোলায় ঢেউ
দূরে
ডাঙার অস্তায়মান রেখাটুকু পর্যন্ত যখন সমুদ্রের কল্লোলের
সাথে মিশে গেল তখন মােহিত ছােট্ট একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ।
ষ্টীমারের রেলিংটা ছেড়ে ডেকের ভিতরে তার চেয়ারটির
খোঁজে গেল।
সমুদ্রের সাথে পরিচয় তার এই প্রথম দেশের মাটির কাছ
থেকে বিদায় নেওয়ার প্রয়ােজন এর আগে হয়নি। এই যে যাত্রা
শুরু হলাে এর শেষ কবে হবে? •••বারবার মােহিতের মন শুধু
এই কথাটাই জাগছিল।
ডে তখন যাত্রীদের ভীড়ে ভরে গেছে। সেকেণ্ড ক্লাশের
ডেক-খুব বড়েও নয়। মােহিত কিছুতেই তার ক্যাবিন নাম্বলের
অনুযায়ী চেয়ারটি খুজে পাচ্ছিল না।
তাকে অমন করে তাকাতে দেখে একটি ছেলে ইংরেজীতে
বলে উঠলাে, অপনি কি আপনার চেয়ারটি খুজছেন ?
সাগর দোলায় ঢেউ
মােহিত একটু লজ্জায়, একটু কৃতজ্ঞভাবে, বলে, হঁা, আমার
নম্বর হচ্ছে ৪ ৭৬•••
••এদিকে কোথাও হবে হয়ত
ছেলেটি হেলান দিয়ে শুয়ে শুয়ে রােদ উপভোগ করছিল।
একটুখানি উঠে বসে পিছনকার চেয়ারের উপরে ‘কার্ডটার দিকে
তাকিয়ে বলে, আমারই অন্যায় হয়ে গেছে। আপনার চেয়ারটি
যে আমিই অধিকার করে বসে আছি ! মুখে তার একটু
অপ্রস্তুতভাব।
মােহিত তাকে উঠতে দেখে একটুখানি লজিত বােধ করূলে।
আহা, বেচারী দিব্যি আরামে শুয়ে সমুদ্রের জলে। উপর সূর্যরশ্মির
খেলা দেখছিল ; তাকে বেদখল করতে তার যে বেশ খানিকটা
দ্বিধা বােধ হচ্ছিল।
ছেলেটি কিন্তু খুবই সপ্রতিভ। সে এক মুহূর্তে মােহিতের
মনের দ্বন্দ্ব বুঝে নিয়ে বলে, আপনি বসুন, আমি আপনার
পায়ের কাছে এই পা’দানটার উপর বধ্ব—আপনার আপত্তি
হবে না ত ?
পত্তি?-সমস্যার এমন একটা সহজ অথচ সুষ্ঠু সমাধান হয়ে
গেল বলে মােহিত ছেলেটির কাছে ভয়ানক-ভাবে কৃতজ্ঞ বােধ
কছিল। সে হেসে জবাব দিলে, মােটেই নয়--আপনার সাথে
গল্প করতে পারলে সময়টা কাটবে ভাল ।
-তাহলে পরিচয় শুরু হােক্, কী বলেন?
মােহিত তিমুখে ঘাড় নাড়লে।
-আমার নাম হচ্ছে যােণী:বম্বের -লােক তা বােধ হয় নাম
সাগর দোলায় ঢেউ থেকেই বুঝতে পাচ্ছেন। দেশে এসেছিলাম গরমের ছুটিটাতে বেড়াতে, আবার ফিরে চলেছি। মােহিত একটু সমভরা চোখে যােশর দিকে তাকালে। যে দেশের মণিমুক্তা সংগ্রহ করতে যাচ্ছে যােশীর কাছে তা” একেবারে পুরাতন! গল্প শুবার জন্য সে উদ্গ্রীব হয়ে উঠল। বললে, আমার নাম মােহিত সেন। আমি অবিশ্যি এই প্রথম যাচ্ছি বিলেতে—দেশটা সম্বন্ধে ধারণা আমার কিছুই নেই, দু’তিনটে ভ্রমণ-কাহিনী পড়ে আমার কল্পনাটাও যেন অনেকখা গুলিয়ে গেছে !.. আপনার সাথে আলাপ হয়ে বেশ ভালােই হলাে—অনেক কিছু শােনা যাবে ! যােশী হেসে বলে, কিন্তু আমার কথাগুলাে আপনার কল্পনাকে হয়ত একটুও সাহায্য করবে না, অথচ বাস্তব যা তার ছবিও হয়ত আমি ঠিক ফুটিয়ে তুলতে পাব না।••-কাজেই এসব নিয়ে গল্প না করাই ভালাে। মােহিত বুঝলে বেশী তার প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল। তার এই ভদ্র প্রত্যাখ্যান মােহিতের কাছে যেন বড় গর্বোদ্ধত : লে ঠেল। সে মর্মাহত হয়ে চুপ করে রইল। যােশী তার নীরবতা লক্ষ্য করে তাকে প্রশ্ন করলে, আপনি কোথায় যাচ্ছেন—লণ্ডন না কেম্বি জ ? মােহিত সংক্ষেপ জবাব দিলে, কেম্বি জ- যােশী উৎসাসূচক সুরে বলে,, আপনি ভয়ানক ভাগ্যবান,
সাগর দোলায় ঢেউ
যা’হােক-কেম্বি জে সীট পেয়েছেন !আমি ত দু’বছর চেষ্টা
করেও সেখানে সীট পেলুম না !-আমার না আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের
স্বর্ণাঙ্কিত ছাপ, না আছে আভিজাত্যের গৌরব !
মােহিত বলে, আমি আমার প্রােফেসারদের অনুগ্রহেই
সীট পেয়েছি বলতে হবে আপনি কি লণ্ডনেই পড়ছেন?
—হ্যা, বছর দুই হ’লল, আসছে জুনেই পরীক্ষাও দিতে হবে
সেই কথা মনে হলেই গায়ে জ্বর আসে !
মােহিত কিছু বলে না।
যােশী বলতে লাগলে, লণ্ডনে বসে কি আর পড়াশুনা চলে?
সেখানে চিত্তবিক্ষেপকারী জিনিষের অভা ত’ নেই—সনেমা,
থিয়েটার আর week engl পার্টি ত লেগেই আছে, তার ওপর
বন্ধুদের আবদার শুনতে শুনতেই সময় আর উৎসাহ চলে যায়।
আপনি কেম্বি জে গিয়ে ভালােই করলেন, তবু কটা মাস একটু
মন দিয়ে পড়াশুনা করূতে পাবেন।
মােহিত যােশার কথার তাৎপৰ্য ঠিক হৃদয়ঙ্গম করতে পারছিল
না। সে বিস্মিতভাবে বলে, কিন্তু লণ্ডনে থেকে ত কত ছেলে
পড়াশুনা করছে, নয় কি ?
একটুখানি মুচকি হেসে তাচ্ছিল্যের সুরে যাের্শী জবাব দিলে,
যারা করছে তারা একেবারে গ্রন্থকীট—জীবনে পড়া ছাড়া তারা
আর কিছুই জানে না !-লাইফ ব’লে যে মস্ত বড় জগৎ পড়াশুনার
গণ্ডীর বাইরেও পড়ে রয়েছে তার খবর কি তারা রাখে ?
আপনার কাছে আজ এসব কথা ভয়ানকভাবে বেসুরাে ঠেছে,
৪
সাগর দোলায় ঢেউ
কিন্তু আপনিও মাস ছয়েক পরে আমার সাথে একমত হবেন,
অবশ্য যদি গ্রন্থকীটদের দলে না ভিড়ে যান ।
মােহিত দু’একজন বন্ধুর কাছে এই বিশাল “জগৎ”টার কৃথ
একটু-আধটু শুনেছিল, মনে মনে খানিকটা কল্পনাও করে নিয়েছিল
সে, আর খুব দৃঢ়ভাবে মনের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিল যে এই
“জগৎ”এর ঘূর্ণিপাকে সে পড়বে না, পড়লেও হাবুডুবু খাবে না ।
কাজেই যােশীর কথায় সে একটুখানি সন্দিগ্ধ-হাসি হাসলে মাৰ ?
ক
চায়ের ঘণ্টা পড়ল। সমুদ্রের দোলানি তখনও বিশেষ আর
হয়নি’, যাত্রীরা বেশ সুস্থভাবেই চায়ের টেবিলে এসে বলে ।
ডেকের উপরই চায়ের টেবিলগুলাে সাজানো হয়েছিল ; "গা।
যাত্রার শুরু বলেই বােধ হয় অর্কে বাজছিল :
যােশী আর মােহিত ঠিক্ রেলিংএর ধারে একটি টেবিল
অধিকার করে বলে। যােশী তখনও বেশ বিজ্ঞতামাখা-সার
একটু মুরুব্বিয়ানার ভাবে মােহিতের সাথে গল্প কছিল, আর
মােহিত তার প্রথম কৌতূহল, অজ্ঞতা এবং অস্পষ্ট অভিজ্ঞতা নিয়ে।
সে-সব শুন্ছিল।
সমুদ্রের জলের উচ্ছ্বাস এসে জাহাজের গায়ে লাগছিল আর
জাহাজটি মাঝে মাঝে একটু দুলে উঠছিল। এই নতুন অনুভূতিটুকু
মােহিতের কাছে কিন্তু খুবই প্রীতিকর বলে মনে হচ্ছিল—শীকর
কণার শীতল স্পর্শ তাকে তার মায়ের স্নেহম্পর্শের কথাই মনে করি।
দিচ্ছিল।
সাগর দোলায় ঢেউ
মায়ের কথা মনের কোণে ভেসে উঠতেই তার চোখ অশ্রুসজল
হয়ে উঠল । সে তাড়াতাড়ি রুমাল দিয়ে চোখ মুছলে। যােশী
একটু বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলে, কী হল?
নিজের ক্ষণিক দুৰ্বলতায় একটু লজ্জিত হয়ে, মােহিত জবাব
দিলে, কিছু নয়। হঠাৎ কি জানি কেন চোখ দিয়ে জল এসে
পড়ল।
যােশী সহানুভূতিভরা স্বরে বলে, বাড়ীর কথা মনে হচ্ছে
বুঝি ?
ছুরী দিয়ে টোষ্টের উপর মাখন মাখাতে মাখাতে মােহিত জবাব
দিলে, হঁ্যা।
—তুমি বুঝি এর আগে বেশীদিন বাড়ীছাড়া হওনি?
—না, বাড়ীতেই থেকে আমি পড়তুম কি না!
বশী তার অন্যমনস্ক ভাবটা দূর করে দেবার প্রয়াস করে
বলে, অর্কেষ্ট্রায় কী বাজাচ্ছে জাননা?
-না•••আমি ত এর আগে ইংরেজী গান বিশেষ শুনিনি’•••
—ওরা Blue Danube বাজাচ্ছে।•••শােন, কী সুন্দর ওর
সঙ্গীত-ঝঙ্কার সুরের মূৰ্চ্চনার মধ্যে যেন ড্যানিয়ুব-এর নীল জলের
স্বচ্ছ প্রবাহ ভেসে আছে !
মােহিত মন দিয়ে সঙ্গীতের মাধুৰ্য্য উপভােগ করবার
চেষ্টা করলে। ভায়ােলিনের মধুর তালে তালে ড্যানিয়ুবএর
চঞ্চল অথচ নিৰ্ম্মল স্রোতের কল্লোল যেন শােনা যাচ্ছিল।
যদিও তার অনভ্যস্ত কানে সঙ্গীতের সব পদগুলাে ঠিক
সাগর দোলায় ঢেউ
ফুটে উঠছিল না তবু তার মাদকতা তার মনকে আবিষ্ট
করে তুলছিল। আর তার মনে আসছিল বাংলা একটা
গানের সুর—যেন কেউ “ গ্রামছাড়া ঐ রাঙামাটির পথ ...”
বাজাচ্ছে।
চায়ের পেয়ালা শেষ করতে করতে যােশী বলে, তুমি আমার
উপর রাগ কর নাই ত মােহিত ?
মােহিত বিস্ময়পূর্ণ চোখে প্রশান্ত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে
বলে, না-রাগ কব কেন ?
যােশী বলে, একটু আগেই তুমি বিলেতের গল্প শুনতে চেয়ে-
ছিলে, আমি তার কিছুই বলিনি’ বলে!
মােহিত যােশীর কথার আন্তরিকতায় আর্দ্র হয়ে বলে, কী
ছেলেমানুষ তুমি, ঘাের্শী:-এর জন্য আমি রাগ করতে যাব কেন ?
তুমি ঠিকই বলেছ হয়ত, আমার কল্পনাকে বাস্তবের নগ্নতা দিয়ে এত
শীগগীরই ভেঙে দিতে চাওনি’•••সে ত তােমার সহানুভূতির
পরিচায়ক, বন্ধু :
যােশী হেসে বলে, ঠিক সহানুভূতির ভাব থেকে যে আমি
তােমাকে বলতে চাইনি’ তা নয়। চোখের সামনে ওদেশের
কতগুলাে জিনিষ দেখে আমার শ্রদ্ধা অনেকখানি কমে গিয়েছে
বলেই আমি সে সব আঙুল দিয়ে তােমাকে দেখাতে চাইনি।
কল্পনার চোখে যদি তুমি দেখ তাহলে যা সাধারণ তাও সুন্দর
এবং মধুর বলে ঠেকবে...শুধু শুধু এই কল্পনার অনুভূতিকে নষ্ট করে
ত লাভ নেই।
৭
সাগর দোলায় ঢেউ
মােহিত একটু হেসে বলে, একেই ত সাধুভাষায় বলে,
সহানুভূতি
যাের্শী 'আনমনাভাবে বলে, হবে:
তখনও সন্ধ্যা হয়নি। সমুদ্রের দোলানি একটু একটু আরম্ভ
হয়েছে দুটি ছােট্ট ছেলে রেলিংএর কাছে দাড়িয়ে অস্বস্তি-সূচক
মুখভঙ্গী কছিল, আর একটি মহিলা, হয়ত বা তাদের মা হবেন,
কাছে রুমাল নিয়ে দাড়িয়েছিলেন। তার মুখের ভাব থেকেও
বেশ বােঝা যাচ্ছিল যে অনতিকালবিলম্বে তিনিও আক্রান্ত হয়ে
পড়বেন।
যােশী এই দৃশ্য থেকে চোখ এড়িয়ে নিয়ে মােহিতকে বলে,
এখানকার বাতাসটা বডড বদ্ধ হয়ে গেছে যেন। চলল ফাষ্ট ক্লাশের
ডেকে একটু বেড়িয়ে আসি।
মােহিত একটু সঙ্কুচিতভাবে বললে, আমাদের কোনরকম প্রশ্ন
করবে না ত ?
হেসে বােশী বলে, পাগল নাকি !...আমার ত’ আর সেখানে
আস্তানা গাড়তে যাচ্ছি না—সেখানে যাচ্ছি শুধু দু’একজন বন্ধু-
বান্ধবের খোঁজ করুতে।
--তােমার জানাশুনাে কেউ আছে নাকি ?
-ঠিক জানিনে, তবে শ’ দুই যাত্রীর মধ্যে কি দু'একজন
মিবে না? না হয় যেচে ভাব করে নেবৃ•••
মােহিত একটু শ্রদ্ধাভরে যােশর দিকে তাকালে।
সাগর দোলায় ঢেউ
সাহৰিকতা, তার খােলাখুলি উক্তির কাছে তার মনের নাত
জানালে।
এদিক ওদিক ঘুরে মােহিত আর বােশী ফাষ্ট ক্লাশের প্রশস্ত
ডেকের উপর গিয়ে হাজির। ডেকের উপর সবাই হয় শুয়ে আছে,
নয় পায়চারী করছে। স্বাস্থ্যকামীর দল একটি সন্ধ্যাও কামাই
করুতে রাজী নয়, তারা খাকী শর্টস্ এবং মােজা পরে বীরবিক্রমে
ডেকের উপর পরিক্রমণ করছে ; কাহারও মুখে পাইপ, কাহারও
হাত্তে বেতের ছড়ি।
: যাের্শী একটু হেসে বলে, এই যে সব বীরপুরুষদের দেখছ
এরাই জাহাজের সজীবতা বজায় রাখে ! এদের দৃঢ়প্রতিজ্ঞা আর
নিয়মানুবর্তিতা দেখলে মনে হয় নেপােলিয়নও বােধ হয় এদের কাছে
হাঁটু গেড়ে নিজের অক্ষমতা এবং দৈন্য জানাতেন !
মােহিত একটু হালে।
যােশা বলে, ঐ যে বিমার্কের মত শাদা গোঁফওয়ালা
বুড়ােটাকে দেখছ ও বােধ হয় একটা কর্ণেল গােছের কিছু হবে ।
আমি শপথ করে বলতে পারি বুড়াে অন্ততঃ একশ’টিবার জাহাজের
এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত পায়চারী করতে না পারুলে শান্তি
পাবে না তার এই পদচারণের সমাপ্তি হবে দু’পেগ হুইস্কী এবং
সােডায় !
মদের নাম উল্লেখ হতেই মােহিত ভয়ানক বিতৃষ্ণার বন
উঠলে, এরা কি সবাই মদের পিপে ?
৫
সাগর দোলায় ঢেউ
যােশী হেসে বলে, এই সব ভবঘুরে সৈনিকদলই হছে এ
বিষয়ে সব চেয়ে বড় ওস্তাদ ! কিন্তু এদের বাদ দিলেও তুমি এমন
একটি লােক বার কতে পারবে না যিনি এই স্বচ্ছ তরল পদার্থ টির
মধুতে মােহিত নন্ ।
মােহিত একটু তীব্রস্বরে বলে, অথচ এরাই আবার সভ্যতার
শ্ৰেছতার দাবী করে।
যােশী মােহিতের এই রাগে একটু আদে বােধ করে বললে,
এতে সভ্যতার আদর্শের কী ক্ষতি হল মােহিত? • তুমি যেটাকে
এত বিতৃষ্ণার চোখে দেখছ সেটা যে এদের কাছে লিন্ত
সাধারণ একটা পার্ণীয়।••এদের মাপকাঠ দিয়ে এদের বিচার
-
তবু, প্রতিবাদের সুরে মােহিত বলে, কিন্তু সত্যের একটা
মাপকাঠি আছে ত!
মদ খাওয়াটাকে আমি মােটেই কোন
নীতিসম্মত বলে মাতে পারি না ।
যােশী এর জবাব অনায়াসেই দিতে পাত, কিন্তু মােহিতের
উচ্ছ্বাসে বাধা দিয়ে একটা রূঢ় আঘাত দেবার ইচ্ছা তার ছিল না।
মােহিত পদচারিণী একটি মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে, আর
ওদের মেয়েদের এই পোেষাকটা আমার মােটেই বরদাস্ত হয় না...
এর মধ্যে না আছে শ্রী, না আছে হ্ৰী; এ যেন একটা বিরাট
নগ্নতাকে জোর করে গৰ্ব্বভরে লােকের চোখের সামনে তুলে
দেওয়া হচ্ছে!
এবার যােশী প্রতিবাদ করলে, বলে, তােমার এই অতি-
সাগর দোলায় ঢেউ
শয়োক্তি আমি মােটেই মানতে রাজী নই, মােহিত। তােমার
নতুন চোখে অনভ্যস্ত জিনিষটা হয়ত একটু দৃষ্টিকটু দেখাতে পারে,
কিন্তু তাই বলে এদের পােষাককে শ্ৰী বা হীহীন বলতে আমি
রাজী নই। এদের সাধারণ মেয়েরা বেশভূষার মধ্যে সৌন্দর্যের
যা কালচার জানে আমাদের গরীব সংস্কারভরা দেশে অনেক বড়
বড় লােকেরাও তা জানে না।
মােহিত একটুও না হঠে বলে, কিন্তু আমাদের দেশের মেয়েদের
শাড়ীর মত সুন্দর ও কোমল আর কিছু আছে কি যােশী ?
• যােশী বলে, এরকম তুলনামূলক সমালােচনা বড় অন্যায়,
মােহিত। আমাদের পারিপার্শ্বিক আবেষ্টনের মধ্যে শাড়ীটি
মেয়েদের অঙ্গে যেমন মানায় এদের জীবনযাত্রার মধ্যে এদের স্কার্ট,
ফ্রক বা গাউও তেম্নি মানায়...
মােহিত এর কোন জবাব দিতে না পেরে চুপ করে রইলো।
রেলিংএর উপর ঝুকে দুজনে সমুদ্রের উপর সূর্যাস্তের শােভা
দেখছিল। যেন লাল একটা অগ্নিগােলক ধীরে ধীরে সমুদ্রের
শীতল জলের স্পর্শ পাবার লােভে তার মধ্যে মিশে গেল,
আর তার চারিদিকে মেঘের কোলে পথটা আবীর-রাঙা হয়ে
রইল ।
মুগ্ধনেত্রে মােহিত এই অপূর্ব দৃশ্যটি দেখছিল, হঠাৎ কানের
কাছে একটি সম্বােধনের স্বরে সে স্বপ্লেখিতের মত ফিরে তাকালে ।
—হ্যালো, যােশী... :
১১
সাগর দোলায় ঢেউ
দেখলে, সুন্দরী একটি মেয়ে চাপা রংএর একটি ফ্রক গরে
যােশর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে•••মুখে তার মৃদু হাসি।
যােশী আচমকা এই সম্ভাষণে একটুখানি বিস্মিত হয়ে পেছন
ফিরে তাকালে। তারপর পরিচিত সুরে হাসিমুখে বলে, হলো,
মিস্ রজাস-“তুমিও কি অবশেষে এই জাহাজেই চলেছ ?
হেসে মিস রজাস জবাব দিলে, তাইত’ দেখ ছি••এখন জাহাজ
ডুবলেই বাঁচি!
যােশী উচ্চহাসির কল্লোলে ফোরু-ডেটা মুখরিত করে বলে,
তাহলে এমি জনসনের মত উড়ে পালালে না কেন?
তেমনি হাসিমুখে মিস্ রজাস জবাব দিলে, পাখাও ত’ ভেঙ্গে
যেতে পারত।
বােশী তখন মােহিতকে এগিয়ে দিয়ে মিস রজাসএর সাথে
পরিচয় করিয়ে দিলে। বললে, এটি আমার কয়েক ঘণ্টার বন্ধু,
মিস্ রজাস, কাজেই লম্বা সার্টিফিকেট দিতে ভরসা হচ্ছে না তবে
ইনি এখনও বিদেশের প্রতি একটা বিতৃষ্ণা, একটা তীব্রতার ভাব
কাটিয়ে উঠতে পারেন নি।
মােহিত যােদর এই গায়েপড়া গােছের বক্তৃতায় একটু
বিরক্তি বােধ করছিল। সে কোন কথা না বলে চুপ করে
:
রইলাে।
মিরজাস অভিবাদনসূচক একটা ভঙ্গী করে জিজ্ঞেস করূলে,
আপনি বুঝি এই প্রথম দেশছাড়া ?
মােহিত সংক্ষেপে জবাব দিলে, হঁ্যা 1:•• কী-জানি-কেন মিস
১২
সাগর দোলায় ঢেউ • • রজন্স আর যােশীর উচ্চহাসি আর কৌতুক তার চোখে কেমন যেন' ঠেছিল। মেয়েটি নাছােড়বান্দা। আবার প্রশ্ন করলে, আপনার নিশ্চয়ই ভয়ানক মন খারাপ লাগছে, নয় কি? মােহিত অনন্যোপায় হয়ে উত্তর দিলে, একটু-আধটু লাগছে বৈকি। সহানুভূতির সুরে মিস্ রজাস বলে, দুদিন ওরকম লাগবে, তারপর সেরে যাবে! 'তা ছাড়া সমুদ্রের হাওয়ার গুণ যাবে কোথায় ? মােহিত এর কোন জবাব দিলে না। যােশী চুপ করে এদের কথােপকথন শুনছিল। সে প্রতিবাদের সুরে বলে, আমার সরল বন্ধুটির কাছে সমুদ্রের হাওয়ার গুণ- ব্যাখ্যান কতে হবে না এখন! তােমরা মেয়েরা হচ্ছ শয়তানের প্রতীক, কাউকে দেখলেই তােমাদের স্বভাবগত বৃত্তিগুলাে জেগে ওঠে, তাকে তােমাদের ফিলসফির মধ্যে টেনে আনতে না পালে তােমাদের তৃপ্তি হয় না। মিস্ রজাস বলে, এ তােমার বড় অন্যায়, যােশী । আমাদের ফিলসফি খুবই সহজ এবং ঋজু। তােমরা পুরুষেরা' সব জিনিষের একটা বঙ্কিম ব্যাখ্যা করে সাধারণতঃ প্রমাণ করতে চাও যে তােমরা যা করে তার পেছনে থাকে একটা মহানুভবতা, একটা গভীর অনুবেদনা। কিন্তু ওরকম কৃত্রিমতার মুখােস পরে তা তা নিয়ে দা প্রকাশ করতে আমাদের মুরুচিতে বাধে।
সাগর দোলায় ঢেউ
মােহিত একমনে এদের আলােচনা শুনছিল। মিস রজাসএর
হাস্যচপল লীলাভঙ্গী তার কাছে প্রীতিকর না ঠেকলেও তার
কথাগুলাে শুনে তার মন বেশ একটু আকৃষ্ট হয়ে উঠছিল। কিন্তু
এসব মনস্তত্ত্বের সুক্ষ্ম ব্যাখ্যা তার জুরিসডিকশনের বাইরে, কাজেই
নীরব শ্রোতা হয়েই সে আনন্দ পাচ্ছিল বেশী।
যােণী মিস্ রজাসএর শ্লেষসূচক সুরে একটু অস্বস্তি করছি বােধ
করে বললে, কিন্তু তােমার এরকম একতরফা বিচার কি উচিত
হচ্ছে মিস্ বুজাস?
মিস্ রজাস একটু হেসে জবাব দিলে, একতরফা বিচার না
যােশী, একটুখানি ওকালতী করছি মাত্র। তােমাদের কৃত্রিমতারও
ব্যতিক্রম দেখতে পাওয়া যায় সময় সময় এবং ব্যতিক্রম আছে বলেই
তােমরা যে নকল সেটা জোরগলায় বলতে পারি।
যােশী চুপ করে রইলে।
মিস্ রজাস এবার মােহিতের মৌনতা ভাঙ্গবার উদ্দেশ্যে তাকে
লক্ষ্য করে প্রশ্ন করলে, আপনি নিশ্চয়ই এসব তর্ক শুনে মনে মনে
হাসছেন, না ?
মােহিত এর কী জবাব দেবে বুঝতে পারলে না। খানিকক্ষণ
চুপ করে থেকে আস্তে আস্তে লজ্জাবিনম্ৰসুরে বললে, আমার
অভিজ্ঞতা খুবই কম, তাই এসব মনস্তত্ত্বের সমস্যা সমাধান করবার
মত আস্পর্ধা আমার মনের কোণে স্থানই পায় না।
মুখে সুন্দর একটি হাসি ফুটিয়ে মিস্ রজার্স বললে, আপনি
দেখছি ভয়ানক সীরিয়স লােক! আমরাই বা কী আর জানি ?
১৪
সাগর দোলায় ঢেউ শুধু তর্কের খাতিরে, গল্প করবার অজুহাতে, আর সময় কাটার অছিলায় এসব দার্শনিক আলােচনা পেড়ে বসি, নয় কী যােশী ? যােশী সায় দিয়ে বলে, সত্যি। তারপর মােহিতের দিকে তাকিয়ে বললে, ওদেশে গিয়ে তুমি দেখবে, মােহিত, কলেজের কমনরূমটা হচ্ছে এ সব গভীর দার্শনিক আলােচনার একটা প্রকাণ্ড আডড। ছেলেমেয়েরা যে কী গভীর উৎসাহ নিয়ে নব্য জাৰ্মাণৰ সমস্যা বা রাশিয়ার পঞ্চবার্ষিক প্ল্যান নিয়ে আলােচনা করতে থাকে তা দেখে তুমি সত্যি অবাক হয়ে যাবে-তােমার যনে হবে যেন সমস্ত জাৰ্মাণী বা রাশিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে কমনরূমের ঐ গবেষণাটুকুর ফলাফলের ওপর। মিস রজাস তার হাতের ঘড়িটার দিকে একবার তাকালে, তারপর বলে, আমায় এখন নড়তে হচ্ছে সময়মত পােষাক পরে যদি তৈরী না হয়ে নেই তা হলে অভিভাবিকাটীর কান্নার সুরে আমি পাগল হয়ে যাব যােশী বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলে, তুমি আবার অভিভাবিকার সাথে এসেছ নাকি? অবাক করলে যা হােক ?... একটুখানি রাঙা হয়ে বললে, আমার স্বাধীন ইচ্ছামত কাজ করবার অবসর এখনও পাইনি, তাই এসব অত্যাচার সহ্য কতেই কায়। আমার বাবাটি তােমাদের দেশের উপর কী হাড় হাড়ে চটা তা তাে জান না। ভাবেন তােমরা সবাই বুঝি জংলী দেশের মানুষ, তাই আমাকে একা ছেড়ে দিয়ে তিনি মনের স্বস্তি হা' রয়ে বসেন। মােহিত মিস রজাসএর এই কথাটিতে ভয়ানক বে রুষ্ট হয়ে
সাগর দোলায় ঢেউ
বলে, আপনি তাহলে আমাদের মত জংলাদের সাথে কথাবার্তা কয়ে
আপনার অপমানের বােঝ না বাড়ালেই পারেন ।
মিস রজাস একটু আহতসুরে বললে, আপনাদের মহত্ত্ব আর
উদারতার মর্যাদা যদি আমি না বুঝতাম তা হলে কী যেচে
আপনাদের সাথে আলাপ করবার জন্য এত উন্মুখ হতাম মিঃ সেন?
বলে আর কোন উত্তরের অপেক্ষা না করে ক্ষুদ্র একটি
অভিবাদন করে সে দ্রুতগতিতে চলে গেল।
যােশী তার গতিশীল মূর্তিটির দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে
বললে, তুমি মিস রজাসকে ভয়ানক চটিয়ে দিলে, মােহিত।
তাচ্ছল্যভরাকণ্ঠে মােহিত জবাব দিলে, বেশ করেছি। ওরকম
দেমাকভরা কথা আমার মােটেই সহ্য হয় না।
তারপর যােশীর উপর যেন প্রতিশােধ নেবার উদ্দেশ্যেই একটু
তীব্ৰসুরে বলে, তুমি ওদেশের আদবকায়দা ভাল ভাবে জান,
যাের্শী, ওদের মিষ্টি হাসি, লীলায়িত ভঙ্গী আর মিহিসুর তােমার
কাছে উৰ্বশীতিলােত্তমাসম্ভব বলে মনে হতে পারে, কিন্তু আমার
চোখে ওদের হাসির পেছনে লুকানাে অহমিকার ছবিটাই বাজে
যােশী একটু হেসে মােহিতের পিঠ চাপড়ে বললে, তুমি আজ
যে মন্তব্য প্রকাশ করলে, মােহিত, এর জন্যে দুদিন পরে নিজেই
অনুতাপ বা করবে, কাজেই এসম্বন্ধে বেশী আর কিছু বলব না।
তবে এটুকু বলতেই হবে যে তুমি মিস রজাসকে মােটেই চেননি।
যেদিন চিনতে পারবে সেদিন দেখবে ওর মিষ্টি হাসি লীলায়িত
*
সাগর দোলায় ঢেউ
ভঙ্গী আর মিহিসুরের পেছনে শুধু অহমিকাই লুকিয়ে নেই, তার,
পেছনে একটা সরল উদার মনও উকিঝুকি মারছে।
মােহিত এর কোন জবাব দিলে না, শুধু একটুখানি অবিশ্বাসের
হাসি হাসলে।
তখন বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। যােশী আর মােহিত
ডিনারের জন্য তৈরী হবার উদ্দেশ্যে তাদের নিজেদের ক্যাবিন
অভিমুখে যাত্রা করলে।
সারাটি দিন মােহিত তার ঘরের ভেতর যায়নি। যােশীর
সাথে পরিচয় হবার পর থেকে তার সময়টা যে কখন কী ভাবে
কেটে গেছে সে নিজেই বুঝতে পারেনি। জাহাজের দোলানির
সাথে নিজের দেহটার ভারসাম্য রক্ষা করতে করতে সে
অপ্রশস্ত corridor দিয়ে যখন নিজের কামরায় ঢুকল তখন
সেখানকার বদ্ধ হাওয়ায় তার মেজাজের তীব্রতা আরও বেড়ে
উঠল।
ঘরে ঢুকে সুইচটা জ্বালাতেই দেখলে তার সহযাত্রী একটি
মাদ্রাজী ভদ্রলােক নীচের বার্থ এ শুয়ে আছে।
আলােটা চোখে পড়ায় সে একটু পাশ ফিরে তাকিয়ে বলে,
গুড ইভনিং ..
মােহিত বলে, গুড়, ঈভনিং—আপনি কী ভয়ানক কাতর
বােধ করছেন ?
ছেলেটী--তার নাম চিদম্বরম্-একটুখানি মলিন হেসে বলে,
১৭
সাগর দোলায় ঢেউ
আর বলবেন না, যাত্রার শুরুতেই যা আরম্ভ হল তাতে আর ভরসা
হচ্ছে না।
মােহিত তার শিয়রের কাছে বসে একটু আর্দসুরে বলে, এ
কালই সেরে যাবে আপনার। যা কিছু দুর্ভোগ আগে শেষ হয়ে
গেলেই ত ভালাে। তারপর দিব্যি চাঙা হয়ে বসে সমুদ্রের হাওয়া
খেতে পাবেন।
কাতরভাবে চিদম্বরম বললে, দুর্ভোগের শেষ হওয়া পর্যন্ত
উপভােগের ক্ষমতাটুকু বেঁচে থাকলেই নিয়তকে ধন্যবাদ দেব...
মােহিত একটু হেসে তার চুল কয়টা ঠিক করে নিলে, তারপর
চিদম্বরকে আর একবার গােটাকয়েক সান্ত্বনাসূচক কথা বলে
সুইচটা টিপে বার হয়ে গেল।
Sbo
* ভােরবেল মােহিতের যখন ঘুম ভাঙ্গল তখনও বেশ ক'রে ফস। হয়নি। পাের্টহােল্টা খােলা ছিল, আর তার ভিতর দিয়ে সমুদ্রের ফেনিল জলােজ্জাস চঞ্চল কিশােরীর মত ঢুক্রবার চেষ্টা কছিল, কিন্তু তার ছােট দুটি হাতে কিছুতেই নাগাল পাচ্ছিল না। মােহিত বিছানার উপর উঠে বসে পাের্ট হােটার মধ্য দিয়ে সমুদ্রের জলটা একবার দেখবার চেষ্টা ককূলে। : চোখ তার তখনও ঘুমে ভারাক্রান্ত। খানিকক্ষণ স্তব্ধভাবে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাক্তে তার চোখ যখন আবার ঘুমের আবেশে মুদে এলো তখন সে বালিশটা টেনে নিয়ে শুয়ে পড়ল। ঘুম যখন আবার ভাঙ্গল তখন অনেকখানি বেলা হয়ে গেছে। সূর্যোদয় দেখবার তার ইচ্ছা ছিল বেজায়, সেটা নিজের কুঁডেমির জন্য এমনিভাবে মাটি হয়ে গেল ! সে কোন ক্রমেই নিজেকে ক্ষমা করতে পাছিল না। ধড়মড়িয়ে উঠে সিড়ি বেয়ে সে মেজেতে নামূলে। চিদম্বরম্ তখন অঘােরে ঘুমুচ্চেতার মুখে শ্রান্তির রেখা । মােহিত কোনরকমে ড্রেসিংগাউনটা গায়ের উপর চাপিয়ে দিয়ে সিড়ি দিয়ে উপরে চলে গেল। পিছনের ডেকে তখন লােকের ভীড় কমে গেছে। সূর্যের নীলিমা কখন আকাশে মিশে গেছে, তার কিরণের প্রখরতা ক্রমশ ১৯
সাগর দোলায় ঢেউ
বেড়েই চলেছে!•••ছােট ঘােট groupএ যাত্রীরা দাড়িয়ে দাড়িয়ে
গল্প কছিল।
যােশী ছায়ার নীচে এক কোণে পঁড়িয়েছিল। মােহিতকে
উঠে আসতে দেখে বলে, এতক্ষণে বুঝি তােমার সূর্যোদয় দেখবার
সময় হলাে ।
মােহিত লজ্জিতভাবে বলে, আমি উঠেছিলাম অনেক আগেই,
আবার হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ভােরবেলার ঘুমটা এত মিষ্টি
লাগে ।
মাের্শী বলে, একটা জিনিষ miss করলে কিন্তু ।
-কী ?
-মিস্ রজাস তার আধঘুমন্ত চোখ আর ঝড়া ঝাঁড়া
এলাে চুল নিয়ে সূর্যোদয় দেখতে এখানে এসেছিল, ভারী চমৎকার
দেখাচ্ছিল তাকে।
মােহিত একটা বিরক্তিসূচক মুখভঙ্গী করূলে।
যােশী সেটা উপেক্ষা করে হাতে হাসতে বললে, শুধু
তাই
নয়, তােমার খোঁজ করছিল।
মােহিত বিশ্বাস না করে বললে, কেন ?
-কেন আমি কী করে বলব? মেয়েদের অন্তর রহস্য বােঝ বার
মত ক্ষমতা ত’ আমার নেই ! কালকে এমন খোঁচা দিলে তুমি,
অথচ আজ ভাের বেলা প্রথম প্রশ্নটি আমাকে তােমার সেই বন্ধুটি
কোথায় ?
মােহিত এবার একটু হেসে বলে, তােমার মন বড্ড খারাপ
২০
সাগর দোলায় ঢেউ
যাের্শী, সাধারণ ভদ্রতাসূচক একটা প্রশ্নের মধ্যে তুমি গভীর অর্থ,
খুঁজবার চেষ্টা করছ !
কাধটা বিচিত্রভঙ্গীতে নাড়িয়ে যােণী জবাব দিলে, গভীর অর্থ
খুজবার চেষ্টা করতুম না যদি তার পরই দ্বিতীয় প্রশ্নটি না হত,
“উনি কি আমার উপর ভয়ানক রাগ করেছেন ?”
মােহিত একটু কুপিত হয়ে বলে, তাকে বলে তিনি এমন
কিছু রাশভারি লােক নন্ যে তাঁকে নিয়ে সারাদিন আমার
মাথাব্যথা হবে !
যােশী মােহিতের কথায় আশ্চৰ্য্যাম্বিত ও রুষ্ট হয়ে বলে, ও
রকম বর্বরের মত ব্যবহার করূলে তুমি নিশ্চয়ই পরে অনুতপ্ত হবে
মােহিত!
এবার একটু শান্ত হয়ে মােহিত জবাব দিলে, কিন্তু আমাকে
নিয়ে এরকম মাথা ব্যথা কে তার?
—কেন তা যদি জানতে পারতুম তা হলে কি এমনি অলসভাবে
দাড়িয়ে থাকতুম ? তা হলে এতক্ষণে যবনিকা ভেদ করে নেপথ্যের
দৃশ্যটিকে সম্মুখে টেনে নিয়ে আম !
যােশীর রূপকভরা কথা শুনে মােহিত আর হাসি চেপে রাখতে
পালে না। বললে, বিলেত প্রবাসের ফলে বুঝি তােমার কল্পনা
শক্তি এমন অদ্ভুতভাবে বেড়ে উঠেছে?
*. কল্পনাশক্তি বেড়েছে কি কমেছে সেটা সে যেন নিজেই
বুঝতে পারছে না, এমনি একটা ভঙ্গীতে মাথাটি আন্দোলন করে
যােশী জবাব দিলে, এ ত কল্পনাশক্তির খেয়াল নয়, মােহিত, এ যে
সাগর দোলায় ঢেউ
ভয়ানক সত্যি কথা !•••হেসাে না মােহিত, আমার ভয়ানক সন্দেহ
হচ্ছে যে মিস্ রজাস তােমাকে একটুখানি পছন্দ করূতে আরম্ভ
করেছেন। অবশ্য, এর মধ্যে বিস্মিত হবার কিছুই নেই।
নােহিত যােশীর মুখের গভীরতা হাসির এক ঝলকে উড়িয়ে
দিয়ে বলে, তােমার এই গবেষণার জন্য তােমাকে নােবেল প্রাইজ,
আমি দিতুম যােণী, কিন্তু আপাততঃ খিদেয় নাড়ী চুইয়ে যাচ্ছে,
কাজেই আমি প্রস্তাব করছি এখন বাস্তব জগতে ফিরে এসে
ব্রেকফাষ্ট, খাবার বন্দোবস্ত করা যাক্।
ব্রেকফাষ্ট, সেরে মােহিত আর নাের্শী যখন আবার ডেকের
উপর এসে বসলে তখন হাট বসে গেছে। সমুদ্র অনেকখানি শান্ত
হয়ে এসেছে-দোলানিটা নাড়ভূড়িকে কোন রকম পীড়া না দিয়ে
ঘুমপাড়ানি গান গাইতে আরম্ভ করেছে।
চিদম্বরম্ উঠে বসেছিল। মােহিত আসতেই সে হাত নেড়ে
তাকে ডালে। মােহিত যােণীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে
চিরম্বর-এর কাছে এগিয়ে গেল।
চিদম্বরম্ তাকে পাশের ডেচেয়ারটায় বতে বলে তার
কানের কাছে মুখটা নিয়ে এসে খুব চুপি চুপি বলে,
আপনার সাহায্য একটু দরকার মিঃ
একটু
আগে একজন স্প্যানিয়ার্ড পাদ্রি ভয়ানকভাবে তর্ক শান্ত
করেছিলেন খৃষ্টধর্মের মাহাত্ম নিয়ে ; এই মাত্র নীচে তার
ক্যাবিনে চলে গেছেন কী একটা বই আতে•••আমি ত’ ওঁর
২২
সাগর দোলায় ঢেউ
সাথে এঠে উঠতে পারছি না...আপনি বসুন এখানে,
এলেন বলে !
মােহিত ত’ এই চায়! সে ভয়ানক উৎসাহের সুরে বলে,
ওর ধর্মান্ধতা যদি খানিকটা বােঢ়াতে পারি তা হলে আমি
ভয়ানক আনন্দলাভ করব, মিঃ চিদম্বরম্ ।
ততক্ষণে তার আভূমি বেশভূষা লুটাতে লুটাতে ফাদার
মাদারিয়াগা একখানা বই হাতে করে হাজির। যেন মস্ত বড়
একটা জেহাএ নাছেন এম্নি সুরে হাতের বইখানা চিদম্বরম এর
চোখের সামনে ধরে বলেন, এই দেখুন:
চিদম্বরম্ নিতান্ত অসহায় শিশুর মত মােহিতের দিকে তাকালে।
মােহিত বলে, আমি দেখতে পারি কি?
চশমার ফাক দিয়ে মােহিতের দিকে একটিবার তাকিয়ে
অবজ্ঞার সুরে ফাদার জবাব দিলেন, সমস্ত পৃথিবীর সামনে আমি
এই সত্য প্রচার করতে পারি জোর গলায় •
মােহিত একটু হেসে বলে, আমি সেই পৃথিবীরই এক কোন
আছি বলে আমার ধারণা।
বইটা হচ্ছে এক পাদ্রীর লেখা, তার প্রথম সংস্করণ হবে অন্তত
বছর কুড়ি আগে। বইখানার কাটতি এমন নে, তারপর প্রত্যেক
এক বছর দু’বছর অন্তর নতুন মুদ্রণ হয়েছে, এবং সংশােধন বা
প্রবর্তন না করাতেও তার পাঠকপাঠিকার সংখ্যা কমেনি।
মােহিত ফাদারের নির্দিষ্ট পৃষ্ঠাটার উপর একবার চোখ বুলিয়ে
উদ্ধতভাবে প্রশ্ন করলে, দেখলাম•••এর থেকে প্রমাণ হচ্ছে কী ?
}
সাগর দোলায় ঢেউ ক জোর গলায় ফাদার মাদারিয়াগা বললেন, প্রমাণ হচ্ছে এই যে তােমাদের দেশে যে এম্নি ধারা বাল্যবিবাহ আর আর শিশুমৃত্যু চলছে তার মূলে হচ্ছে তােমাদের ধর্মনীতির অন্ধতা। তােমরা একটা স্থবির নীতিহীন—শুধু নীতিহীন কেন, দুর্নীতি প্রশ্রয়কdogmaয় ডুবে আছে বলেই আজ তােমাদের এমন দুর্দশা ! ব্যঙ্গভরা সুরে মােহিত প্রশ্ন করলে, তা হলে আপনি কি বলতে চান যে আমাদের এই দুর্নীতিপ্ৰশ্ৰয়ক ধৰ্ম্মটা ছেড়ে দিয়ে আপনাদের সুনীতি এবং সুরুচিসম্পন্ন ধৰ্ম্মটা মেনে নিলেই আমাদের সব দুঃখ-দারিদ্র্যের অবসান হবে ? জোর গলায় ফাদার বললেন, নিশ্চয়ই তবে ! : তবে এর মধ্যেও একটা “কিন্তু” আছে...শুধু খৃষ্টধর্ম বলে ভুল করা হবে, হতে হবে রােমান ক্যাথলিক, যার প্রাচীনতা এবং সত্যতায় আজ পর্যন্ত কেউ সন্দেহ করেনি এবং যার প্রতীক হয়ে রয়েছেন আমাদের পােপ-তােমাদের দেশে খৃষ্টধৰ্ম্মের আলোেক যে ভালােভাবে পৌঁছয় নি’ তার প্রধান কারণ হচ্ছে যে রােম্যান্ ক্যাথলিক্ প্রচাররা উপযুক্ত সাহায্য বা সুবিধা পাননি সেখানে। নইলে আজ পােপের সিংহাসন অধিষ্ঠিত হ’ত দিলীতে ! মােহিত ইতিহাসের ছাত্র, সে একটুখানি ব্যঙ্গভরে বলে, Inquisitionটা হিন্দুস্থানে খাটাতে না পেরে বুঝি মনে আশােষ হচ্ছে ? ছেলেটির তরলতায় রুষ্ট হয়ে ফাদার বললেন, যাদের বিশ্বাসের অভাব তাদের কাছে সত্য প্রচার করাটা বাতুলতা মাত্র ! ২৪
সাগর দোলায় ঢেউ
মােহিত তেমনি সুরে জবাব দিলে, আপনি বুঝি শুধু বিশ্বাসীদের ,
নিয়েই একটা চার্চ গড়ে তুলতে চান, ফাদার?..সে মন্দ হবেনা কিন্তু।
ফাদার মাদারিয়াগা এবার চিদম্বরএর তাকিয়ে বলেন, আমার
আলােচনা হচ্ছিল তােমার সাথে, এর সাথে নয়...
পাছে আবার তাকে তর্কের গােলকধায় পড়ে বিব্রত হতে
হয় এই ভয়ে চিদম্বরম্ তাড়াতাড়ি বলে, হঁা, কিন্তু এ আমার
বহুদিনের পুরাণো বন্ধু এবং এর চিন্তাধারা আর মতিগতি সব
আমারই মত!...আমার শরীরটা তত ভালাে নেই বলে এ আমাদের
কথাবার্তায় যােগ দিয়েছে।
গম্ভীরভাবে “অবিশ্বাসীদের সাথে আলােচনা যে করে সে মুখ
এই মন্তব্য প্রকাশ করে ফাদার মাদারিয়াগা সেখান থেকে উঠে
গেলেন।
চিদম্বরম্ কৃতজ্ঞতাপূর্ণ নেত্রে মােহিতের দিকে তাকিয়ে বসে,
আপনি আজ আমাকে এই ধৰ্ম্মপাগলের হাত থেকে মুক্ত করে ।
উপকার করলেন তা আমি ভুনা, মিঃ সেন:
মােহিত হেসে জবাব দিলে, আনন্দটা হ’ল আমার, মিঃ চিদম্বরম,
এবং তার সুযােগ করে দিয়েছেন আপনি..কাজেই ধন্যবাদ যদি
কারও প্রাপ্য থাকে তাহলে সে আপনারই।
বলে সে উঠে দাঁড়ালে।
যােশী তখন সেকেণ্ডক্লাশ ডেক্ থেকে চলে গেছে। কোথায়
গেল?"বুঝি বা সে মিস্ ‘জার্সএর সাথে গল্প করতে গিয়েছে ।
২৫
সাগর দোলায় ঢেউ
কী জানি কেন তার মনে হচ্ছিল ধােণীর হাসিখুসীভাব আর
কৌতুকমেশানাে কথাবার্তার পেছনে আর একটি মানুষ লুকিয়ে
আছে—সেটা হচ্ছে প্রেমিকের মানুষ! মিস্ রজাসকে যােশীর
ভালাে লাগে এ বিষয়ে তার কোনই সংশই ছিল না।
ফাষ্ট ক্লাশ ডেকের বিশাল প্রসারতার মাঝে এসে দেখে সেখানে
ফাদার মাদারিয়াগা জাতীয় কোন উৎসাহী কারও ধৰ্ম্মপিপাসা
উদ্রেক করবার চেষ্টা করছেন না। শিখিল অঙ্গ এলিয়ে দিয়ে সবাই
ঈজিচেয়ারে শুয়ে আছে—জাহাজের 'গকার ঘর্ষণ আর জলের
উচ্ছাস এই দুটো মিলে একঘেয়ে একটা সুরের সৃষ্টি করছে।
মােহিতের উৎসুক চোখ দুটি বােশীকে খুজছিল। খানিকটা
অন্যমনস্থ হয়ে সে এগিয়ে যাচ্ছে এমন সম একটি মেয়ের মৃদু হাসির
ছটা তার মুখের উপর এসে পড়ায় সে হঠাৎ সচেতন হয়ে উঠল।
ঘাড়টা একটুখানি ফিরিয়ে দেখলে মিস্ রজাস একটা ছবি-
ওয়ালা ম্যাগাজিনের ফাক দিয়ে অভিবাদন সূচক হাসি হাসছে।
ভার পাশে একটা বর্ষীয়সী ক্ষীণকায়া মহিলা বসে গম্ভীর ভাবে
পশমের কী-একটা বুনছেন।
নুহর্তের জন্য মােহিতের মুখচোখ রাঙা হয়ে গেল। তারপর
সে কোন প্রকার শিষ্টাচার না করেই জোরে জোরে পা ফেলে
সম্মুখে এগিয়ে গেল।
ঘুরতে ঘুরতে দেখে যােশী ফাষ্ট ক্লাশ স্পাের্টশ ডেকে দাড়িযে
দাড়িয়ে খেলা দেখছে। ক্রীড়াশালা ছেলেমেয়ের হাসি আর কলরব
মিশে একটা অদ্ভুত স্পন্দনের সৃষ্টি করেছিল।
২৬
সাগর দোলায় ঢেউ
মােহিতকে দেখে যােশী বলে, ফাদারের সাথে ধৰ্ম্মালাপ শেষ
হলো ?
মােহিত হেসে বলে, আর বলাে না ভাই, এম্নি ছাচোল
ধৰ্ম্ম, তা নিয়ে আবার বাগাড়ম্বর করূতে আসে !.. আমার মত
এদের উপর বিতৃষ্ণায় ভরে উঠছে ধীরে ধীরে !
যােশী বলে, ফাদারকে দিয়ে তুমি সমস্ত ইউরোপকে বিচার
করতে যেয়াে না, মােহিত !.."আমাদের দেশের পুরতদের দিয়ে
যদি আমাদের ধর্মুকে কেউ বিচার করতে চায় তাহলে সেটাকে
ভুমি মান্বে ?
মোহিত এবার যােশীর উত্তির সত্যতা স্বীকার করূণে। বনে,
আনি ইউরােপকে বিচার কছিনা বােশ[ • • 'আমি শুধু ভাবুছি ।
এদের মত শিক্ষিত লােকও দেখতে পায় না যে বে-ধৰ্ম্ম সজীব মনের
তত্ত্বের সাথে না মেলে তার দাম অকিঞ্চিৎকর, তা কুশ্রী•••
বেশী কথার ধারাটা উটে নিয়ে বলে, মিস্ রজাসকে
দেখলে ?
অপ্রসন্নসুরে মােহিত বলে, দেখ লুন। আমাকে দেখে তার
ঠোট দুটো একটু ফাক করে ছোট্ট একটী হাসি খালেন। ওজন।
করা হাসির ফাক দিয়ে তার ঝকঝকে দাঁতগুলাে ঝলক্ দিয়ে উঠল,
আমার মনে জাগল সেই টুথপেষ্টএর বিজ্ঞাপনের ছবিটী !
মােহিতের পিঠে একটা চাপড় মেরে বাের্ণা বলে, তুমি কিন্তু
ভয়ানক দুষ্ট হয়ে উঠছ, মােহিত ভদ্র মেয়েদের সম্বন্ধে এরকম
যা’ তা’ মন্তব্য প্রকাশ করা কিন্তু তােমার মােটেই উচিত হচ্ছে না।
২৭
সাগর দোলায় ঢেউ
একটুও না দমে মােহিত বলে, ম্যাগাজিনের পাতার ফাক
দিয়ে বুড়ি অভিভাবিকার চোখ এড়িয়ে ওরকম ফিক্ ক'রে একটি
হাসি যদি আমায় বিজ্ঞাপনের ছবির কথা মনে করিয়ে দেয় তাহলে
সে কি আমার মনের দোষ ?
যােশ এবার মােহিতকে বাধা দিয়ে বলে, যথেষ্ট হয়েছে...
তােমার মনের যা ছবি আমি দেখছি তাতে অবাক হয়ে যাচ্ছি।
যাক্•••সত্যি বলছি, মােহিত, মেয়েটী বড় ভালাে—ওকে আমি ছয়
সাত মাস ধরে দেখছি ত
-কোথায় ? লণ্ডনে ?
“হ্যা লণ্ডনে।
ওর পূরাে নাম হচ্ছে শীলা রজার্স: ভারী
মিষ্টি নামটী, না ?
—হবে: ::
-তুমি ভয়ানক Cynical; জানাে আমি নামটী দেখেই ওর
প্রেমে পড়ে যাচ্ছিলুম আর কি!
পড়লে না কেন ?
হেসে যােশী জবাব দিলে, ভালাে ভাবে পড়তে হলে দুদিকেরই
টান থাকা চাই যে-প্রেম হচ্ছে চুম্বকের মত আকর্ষণ বিকর্ষণের
সাথী...
মােহিত যােণীর প্রেমের সংজ্ঞায় না হেসে থাকতে পারলে না।
বলে, তােমার কথাটী ভয়ানক মূল্যবান, ভাই...মনের গীতায়
শাদা কালীতে আমি নােট্ করে রাখছি।
তার উপহাসটা গায়ে না মেখে খােশী বলে, কিংস্ কলেজে ও
২৮
সাগর দোলায় ঢেউ পড়ে। আমার পাশেই বসেছিল। একটা কাগজে আমাদের সব নাম লিখতে হয়—ও লিখলে, তার পরই আমার হাতে দিলে। আমি দেখলুম লেখা আছে, শীলা রজাস। আমার নাম দস্তখত শেষ করেই মরিয়া হয়ে প্রশ্ন করলুম, তুমি কি হিন্দুস্থানে জন্মেছিলে ? 'অবাক হয়ে সে জবাব দিলে, না•••। তারপর আস্তে আস্তে বলে, কিন্তু সে দেশটা দেখবার ইচ্ছে আমার খুবই আছে ! আমি ভাবলুম এটা বুঝি একটা ইঙ্গিত, ভয়ানক উৎফুল্ল হয়ে উঠলুম। তখন ত’ প্রােফেসার এসে পড়লে, তাই আলাপ আর বেশী এগােল না।...ক্লাশ শেষ হবার পর শীলার পেছনে পেছনে ছুটলুম, চায়ে নেমন্তন্ন পৰ্য্যন্ত কলুম, কিন্তু কী ভয়ানক serve মেয়েটার ! হাসি খুসী ঠাট্টাতে সে অনেক ফ্লাটকেও হারিয়ে দিতে পারে, তবু শীলতার সীমারেখার বাইরে ওকে কিছুতেই আনা যায় না। মােহিত যােশীর গল্পে একটুখানি interesteti বােধ করছিল, প্রশ্ন করলে, লণ্ডনে কি শীলতার সীমারেখার বাইরে অনেকেই আসতে রাজী তা হলে? সেটা নির্ভর করে শীলতার সংজ্ঞার উপরে। আমাদের দেশের অভিধানে যাকে শীলতা বলে তা নিয়ে ত ওদের বিচার করা চলে না। ওরা যাকে শীলতা বলে তার দাম কম নয়, মােহিত! তার বাইরেও অনেকে আসে, কিন্তু সে হচ্ছে এক বিশিষ্ট শ্রেণীর মেয়েরা। কলেজ যারা আসে তারা ভদ্র, শিক্ষিত-তারা ভয়ানক ভাবে elusive, ছেলেদের সাথে সেক্স নিয়ে কত তুমুল আলােচনা সাগর দোলায় ঢেউ করে চলেছে, কিন্তু তাদের মনের মধ্যে কোন আলােড়ন বা চঞ্চলতার সৃষ্টি হচ্ছে কি না তা বাইরে থেকে বুঝ বার জোটি পর্যন্ত নেই। -তুমি শীলাকে, মিস্ রজার্সকে, এই দলের মধ্যে ফেলতে চাও? —হ্যা, এবং এর খুবই উচু স্তরে। মিস রজার্স এর সাথে আমার কত গল্পগুজব হয়েছে, কিন্তু আমাকে তার প্রথম নামটি ধরে ডাক্বার সুযােগ একটিবারও দেয়নি। একদিন আমি এই নিয়ে বলেছিলুম, এত বড় গাল ভরা “মিস্ রজার্স” পলার চেয়ে শুধু “শীলা” বললে লােকের কষ্টের লাঘব হবে। তাতে উত্তর পেয়েছিলুম, জগৎ শুদ্ধ লােকের কষ্টের লাঘব করতে হলে যে আমি একেবারে নিঃস্ব হয়ে যাব ! অথচ আমার নামের আগে “মিঃ”টা পছন্দ করে বলে “সোশা” এই ডাকটুকু আদায় করে নিয়েছে ! মােহিত হেসে বললে, একতরফা বিচার ত হতে পারে না, বেশী ...বাকীটাও আসবে আবে শীগগীরই! দুঃখসূচক একটা অস্ফুট শব্দ করে যােশী বলে, এ ত’ আর দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ নয় যে যতই টান মারূবে ততই অফুরণ হয়ে বেরিয়ে আৰে। উপমাটিতে ভয়ানক খুশী হয়ে মােহিত বলে, নামটা দিয়েছ ভালােই..তা তুমি বুঝি অর্জুনের সাথে ডুয়েল লড়তে চাও ? -অর্জুন থাকলে ত লড়ব !•••এ পর্যন্ত কাউকে ও মন দিয়েছে বলে ত আনার বােধ হয় না !...তােমার দিকে একটু ঝুকছে বলে মনে হচ্ছে, তুমি এবার হাত গুটিয়ে নাও, আমি তােমায় দু'চারটে মন্তর শিখিয়ে দিচ্ছি।
সাগর দোলায় ঢেউ
যেন ভয়ানক ভয় পেয়েছে এম্নি সুরে মােহিত বলে, দরকার
নেই যাের্শী, তােমার সাথে ডুয়েল লড়তে হলে আমার এই মাছ
ভাত খেকো শরীরটা চুরমার হয়ে যাবে একটি আবাতেই ! : তার
চেয়ে বসে বসে সমুদ্রের শােভা দেখা অনেক ভালো।
বােশী বলে, কিন্তু তুমি ভুল বুঝছ, মােহিত! তােমাকে যদি
মিস্ রজাস’ বরণ করে নেয় তাহলে আমি একটুও ঈর্ষান্বিত হব না,
আমার বরং আনন্দ হবে এই দেখে যে আমারই একজন বন্ধু এই
গর্বিতা মেয়েটীকে মাটিতে লুটিয়েছে।
কথা হচ্ছিল দুজনের ইংরেজীতে। মিস্ রজার্সকে নিয়ে
আলােচনা করূতে দুজনে যখন মশগুল তখন হঠাৎ কানের কাছে
মেয়েলি সুর একটি এসে বাজল, সুপ্রভাত মিঃ সেন
মােহিত চম্কে পেছন ফিরে দাড়ালে। যশীও একটু লজ্জিত
ভাবে তাকালে। ছিঃ ছিঃ মিস রজার্স বুঝিবা তাদের কথাগুলাে
শুনেছেন এবং মনে মনে না জানি কী ভীষণ ভাবে হেসেছেন।
মিস্ রজাস এর সম্ভাষণের মধ্যে কিন্তু তার কোনই পরিচয়
পাওয়া গেল না। হাসি মুখে মােহিতের দিকে তাকিয়ে বলে,
আপনি আজ অনেক বেলা পর্যন্ত বিছানায় শুয়েছিলেন বুঝি ?
কথাটা খুবই সাধারণ--শুধু একটা কথােপকঘনের অবতারণা
করবারই চেষ্টা। তবু মােহিত একটু ঝাঁঝের সহিত জব দিলে, ছােট্ট
ছেলের মত ভাের বেলায় উঠেই আকাশের লালিমা দেখ বার
জন্য পাগল হওয়াটা আমি : সুধীজনােচিত মনে করি না মিস
রজাস!...
সাগর দোলায় ঢেউ
মিস্ রজার্স ত’ অবাক। তবু আবার হেসে প্রশ্ন করলে,
আপনার কালকের রাগটা বুছি এখনও পড়েনি?
মােহিত কোন জবাব দিলে না। যােণী মােহিতের হয়ে বললে,
রােদ যেরকম বাড়ছে তাতে আমার বন্ধুটির রাগ কমবার ত কোনই
সম্ভাবনা দেখছিনা, মিস্ রজাস...
মিস্ রজাস একটু অনুতপ্ত সুরে বললে, আসলে কিন্তু অন্যায়টা
হয়েছিল আমারই বাের্শী। বাবা যে ভাষা ব্যবহার করেন সেটা
আমার মুখে আনাই উচিত হয় নি। আমাকে কী এর জন্য ক্ষমা
করতে পারবেন না মিঃ সেন।
মােহিত মিস রজাসএর কথায় একটু বিব্রত হয়ে বললে, আমি
ঠিক রাগ করি নি মিস রজার্স', আমার তরুণ মনের সবুজের উপর
একটুখানি কালােছায়া এসে পড়েছিল মাত্র। বা হােক, আমার
মনের সব গ্লানি এখন কেটে গেছে।
মিস রজাস ভয়ানক ভাবে খুসী হয়ে মােহিতের হাতটি ধরে
বললে, তাহলে আমরা এখন বন্ধু কেমন ?
মােহিত মিস রজাস এর করস্পর্শে সঙ্কুচিত হয়ে উঠল।
স্বাধীন দেশের আদবকায়দা আবহাওয়ার সাথে সে তখনও নিজেকে
খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি, তাই শীলা রজাসএর আবেগ ভরা
আহ্বানের যে কোন উপযুক্ত উত্তর দিতে পারলে না, একটুখানি
অপ্রস্তুতয় আড়ষ্ট ভাবে দাড়িয়ে রইল ।
মিস রজাস চকিতের মধ্যে মােহিতের মনের বিতৃষ্ণটুকু বুঝে
নিয়েছিল। সে নিজের এই প্রগলভতায় নিজেই লজ্জিত হয়ে
৩২
সাগর দোলায় ঢেউ
হাতটা সরিয়ে নিয়ে বললে, অবিশ্যি আপনি যদি এখনও রাগ করে
থাকেন তাহলে আমার বলার কিছুই নেই।
মােহিত শশব্যস্তে বলে উঠল, না, না, আমি রাগ করিনি’
এখন, তবে•••
যােশী এতক্ষণ চুপ করে এদের কলহলীলা দেখছিল।
মােহিতের কথাটুকু পূর্ণ করে বলে, তবে বন্ধুত্ব মানে যদি এরকম
প্রগলভতা হয় তাহলে মোহিতের আপত্তি আছে।
মােহিত ভয়ানক ভাবে অপ্রস্তুত হয়ে মুখচোরার মত বলে, না,
, আমি তা বলতে যাচ্ছিলুম না। আমি বলছিলুম এই যে
“আমরা বন্ধু হব” এ রকম গৌরচন্দ্রিকা করবার ত কোনাে দরকার
নেই। আমাদের মধ্যে বন্ধুতা যদি সত্যই গড়ে উঠবার হয়
হলে তা উঠবেই, তার জন্যে কোনাে রকম আয়ােজন করবার
দরকার হবে না।
মিস্ রজাস বলে, তা মানি। কিন্তু তর আগে কৃত্রিম
ব্যবধানগুলাে দূর করে দেওয়া উচিত নয় কি ?- ভুল বােঝার
সম্ভাবনা ত’ আছে, শুধু আছে কেন, হয়েছেও—তাই সে সব
হওয়ার সুযােগ আগে থেকেই বন্ধ করে দেওয়া দরকার নয় কী ?
মােহিত এর উত্তরে কী বলবে খুঁজে পাচ্ছিল না। যাের্শী তার
হয়ে জবাব দিলে, সব খােলাখুলি ত’ এখন হয়ে গেছে লাইন্ ক্লিয়ার,
সিগন্যাল ডাউন...এখন বন্ধুত্বের রকেট চালিয়ে ও.••দেখ
কোথায় গিয়ে ঠেকে।
মিস রভ সি একটু তর্জন করে বললে, তুমি ভয়ানক উদ্ধত ছেলে,
সাগর দোলায় ঢেউ
যােশী •••আরেকটু হলেই আমি তােমার সাথে আড়ি কম,
কিন্তু তাহলে মিঃ সেন দুঃখিত হবেন বলে আজও সেটা মুলতুবী
রাখ লুম।
যােশী একটুখানি কুর্ণিশ করার ভঙ্গীতে বলে, ধন্যবাদ,
মাদামােয়াসেল•••
সেদিন বিকালবেলা চা খাবার পর মােহিত চুপ করে বসে
Sherlock Holmcs-এর গল্প পড় ছিল আর মনে মনে হাসছিল।
যােশ গিয়েছিল জাহাজের কাপ্তেনের সাথে ভাব করতে আর
জাহাজখানা আরবসাগরের কোন্ জলরেখা বিদীর্ণ করে অগ্রসর
হচ্ছে এই অমূল্য তথ্য সংগ্রহ কতে। চিরম্বরম্ অঘাের ঘুমুচ্ছিল,
আর ফাদার মাদারিয়াগা বােধ হয় শীকারের উদ্দেশে ঘুরছিলেন
এদিক ওদিক কোথাও।
খানিকক্ষণ পর শ্রান্তিবােধ করায় মােহিত বইটা মুড়ে উঠে
দাড়াল। যারপর কী করা যায় ভাবতে ভাবতে তার মনে হল
একবার মিন্ রজাস-এর সাথে খানিকটা গল্প করে আসা যায়।
সকালবেলার আজোচনার পর তার মনের মেঘ অনেকখানি কেটে
গিয়েছিল এবং ঋরে ধীরে এই তরলভাষী হাস্যবিলাসনিপুণা মেয়েটির
প্রতি তার বি ফা কমে আসছিল।
ফালস ডেকে এসে দেখে মিস্ রজাস-এর প্রিয় স্থানটিতে
কেউ নেই—দুটো চেয়ারই খালি। একটুখানি হতাশ হয়ে সে ফিরে
যাচ্ছিল, কিন্তু কী মনে করে পাশেই স্মােকিং-রুমে সে ঢুকূল।
৩৪
সাগর দোলায় ঢেউ
* দেখলে এক কোণে একটি টেবিল অধিকার করে মিস ‘রজাস:
একমনে কী লিখছে।
লেখার সময় বিরক্ত করা উচিত নয় এই ভেবে সে বেরিয়ে
যাচ্ছিল এমন সময় আহ্বান শুতে পেল, মিঃ সেন..
বিস্ময়ের সহিত মােহিত অনুভব কলে যে মিস রজাসএর এই
ডাকে তার মনের মধ্যে পুলকের একটা ঢেউ খেলে গেল।
আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল।
মিস রজাস হেসে জিজ্ঞেস করলে, বন্ধুর খোঁজে এসেছিলেন
সে
বুঝি ?.
ফস্ করে মিথ্যা কথাটা মােহিতের মুখ দিয়ে বাহির হল না।
সে একটু ইতস্ততঃ করে বললে, না, এই আপনারই খোঁজে
এসেছিলুম
মিস রজাস-এর মুখ আভায় দীপ্ত হয়ে উঠ। বলে, ঠাট্টা
করূছেন না ত ?
-না, সত্যি...
—তাহলে বসুন•••
মােহিত পাশে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বল। মিস্ রজাস
তার সানের কাগজপত্রগুলাে গুছাতে গুছাতে মােহিতের
সেদিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি লক্ষ্য করে বলে, এলো আমার
অবসর সময়ের ছেলেখেলা, মিঃ সেন। যখন কিছু 'কবার
থাকে না আর শরীর আলস্যে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে তখন
এই কাগজগুলাের উপর আঁচড় কাটি। আমার বন্ধুরা অবশ্য
সাগর দোলায় ঢেউ
এর মস্ত একটা গালভরা নাম দেন, বলেন এ নাকি আমার ,
ডায়েরী:..
মােহিত মিস্ রজাস-এর কথার ভঙ্গী আর ছন্দ বেশ উপভােগ
করছিল। মেয়েটির ব্রীড়ার অভাব থাকতে পারে, কিন্তু তার
ব্রীড়াহীনতার মধ্যে একটা লীলায়িত স্বাচ্ছন্দ্য আছে যাকে উপেক্ষা
করা চলে না।
বলে, ডায়েরী লেখা ত খুবই ভালাে জিনিষ, মিস্ রজাস...
একটু তাচ্ছিল্যের সুরে মিস্ রজার্স বলে, ছাই ভালাে!•••
আমার ডায়েরী ত’ আর আসল ডায়েরী নয়, এ হচ্ছে এলােমেলাে
কতকগুলো কথা বা ভাবের সমষ্টি..
মােহিত হেসে বলে, ঐখানেই ত ডায়েরীর যথার্থ মৰ্য্যাদা।
যদি কাঠখােট্টা কতকগুলাে ঘটনার সমাবেশ হ'লেই ডায়েরী হত
তাহ'লে জগতের বড় বড় চিন্তাশীলদের ডায়েরী আজ বিস্মৃতির
অতলগর্ভে ডুবে যে !
ডায়েরীর কথা। উটিয়ে নিয়ে মিস্ রজাস প্রশ্ন কলে, আচ্ছা
মিঃ সেন, আপনাকে যদি গুটিকয়েক প্রশ্ন করি তাহলে রাগ
করূবেন কি?
—না, রাগ করব কেন ?
-তাহলে প্রথম প্রশ্ন কছি এই, আপনি আমাদের দেশের
উপর ভনকভাবে চটা, নয় কি?
– চটা ঠিক বললে ভুল করা হবে, তবে আপনাদের সভ্যতার
অনেকগুলাে আচরণই আমার কাছে ভয়ানকভাবে মেকী ঠেকে।
সাগর দোলায় ঢেউ
তাই যখন দেখি সে সব মেকী জিনিষ নিয়ে লােকে গৰ্ব .কছে,
তখন আমার প্রতিবাদের স্পৃহা জেগে ওঠে।
খুব শান্ত অথচ গভীরভাবে মিস্ রজাস প্রশ্ন করূলে, এ
আপনার অন্যায় নয় কি ?
-অন্যায় কিসে?
-আপনি আমাদের দেশের কীই বা দেখছেন বা শুনেছেন।
যা কিছু আপনার অভিজ্ঞতা তা পুথিপড়া, হয়ত বা একটা বিশিষ্ট
মতবাদের পােষক এক শ্রেণীর পুথি তা’!... আপনি আগে থেকেই
এ রকম সংস্কারান্ধ মন নিয়ে একটা দেশে যাচ্ছেন, এ কি আপনার
শিক্ষা বা জ্ঞানের সহায়তা কবে ?
মােহিত জবাব দিলে, আমি সঙ্কীর্ণতা নিয়ে যাচ্ছি না, মিস
রজাস.আমার মধ্যে অন্ধভক্তির ছায়া নেই এইটুকুই আমি বুঝিয়ে
দিতে চাই।
হেসে মিস রজাস বলে, তা যদি হয়ে থাকে তাহলে আমার
ঝগড়া করবার কিছু নেই—কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে আপনি আপনার
গলদ কোথায় ঠিক বুঝতে পারছেন না।...আপ ন যাকে অন্ধভক্তির
অভাব বলছেন তাকে আমি বলব অতি সুলভ রকমের একটা
গোঁড়ামি।•••আমায় মাপ করূবেন, মিঃ সেন, কিন্তু মিস্ মেয়ে যদি
তাঁর বই সম্বন্ধে বলেন যে তিনি যা বলেছেন তা শুধু । ‘অন্ধভক্তির
ছায়া তার উপর পড়ে নি’ এর পরিচায়ক, তাহলে আপনার রক্ত
কি গরম হয়ে উঠবে না ?
মােহিত এবার বলে উঠল, আপনি কার সঙ্গে কার তুলনা
সাগর দোলায় ঢেউ
করূছেন, মিস্ রজাস? মিস মেয়াের সেই পলি আবর্জনাময়
গালিগালাজের কি ভুলনা হয় কখনও ?
—মেনে নিলুম না হয় আপনার কথা। কিন্তু বাইরে থেকে
আপনার এই অনভিজ্ঞ মন থেকে উৎসারিত কথা শুনে যদি সাধারণ
লােকে—আমাদের দেশের লােকে-আপনাকে এমন ভাবে
তাহলে তাদের কি অন্যায় হবে ?
অন্য সময় হলে হয়ত মােহিত এর তীক্ষ এক জবাব দিত,
কিন্তু আজ তার মুখ দিয়ে সেরকম কোন কথা বেরুল না । সে
একটুখানি চিন্তিতসুরে বলে, এটা অবিশ্যি আমি ভেবে দেখি নি,
মিস্ রজাস...
হেসে মিস্ রজাস বলে, আচ্ছা, আমার প্রথম প্রশ্নটির
সমাধান ত একরকম হ’ল। এখন আমার দ্বিতীয় প্রশ্নটি করছি...
আপনাদের দে'র বর্তমান রাজনৈতিক আন্দোলন সম্বন্ধে আপনার
মত কি ?
মুহূর্তের জন্য যে হিতের চোখ দুটো জলে উঠল, তারপর শান্ত
অথচ দৃঢ়সুরে বললে, মাপ করবেন, ওটা হচ্ছে আমাদের গভীর
অনুবেদনার বস্তু, তা নিয়ে আমি এখানে মতামত প্রকাশ করতে
চাইনে’!
মলিন হাসি হেসে মিস্ রজাস বলে, আমার গায়ের রং আর
নাড়ীর ঝ3 বােধ হয় আপনার স্বাধীন মত প্রকাশে বাধা দিচ্ছে।
কিন্তু আপনাকে বলছি, যতই অপ্রিয় হােল্ক না কেন, আমি একটুও
অসন্তুষ্ট হব না !..আর একটি কথা ভুলে যাবেন না, আমি স্বাধীন
1.
সাগর দোলায় ঢেউ দেশেরই মেয়ে, স্বাতন্ত্র এবং সাম্যের দাম কী তা আমার কাছে অজ্ঞাত নেই। মােহিত আগেরই মত শান্তভাবে বললে, আজ থাক, আর একদিন বল্ব। দু’জনেই খানিক্ষণ চুপ করে রইল। অস্তায় সূর্যের লাল রশ্মি স্মােকিং-রুমের জাল্লা দিয়ে শীলা রজাস-এর মুখের উপর এসে পড়েছিল, আর তার মুখ চোখ এক অপূর্ব আলোকে প্রতিভাত হয়ে উঠছিল। মােহিত একটুখানি মুগ্ধভাবে তার দিকে ণেকের জন্য তাকিয়ে ছিল, তার পর হঠাৎ যেন ভয়ানক- একটা-অন্যায় করেছে এম্নি একটা ভঙ্গীতে তার দৃষ্টি সরিয়ে নিল। শীলা রজাস স্তব্ধভাবে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল। সূর্যের লালিমা দেখে বােধ হচ্ছিল যেন তার মনের কঞ্জেও আবীর লেগেছে ছােট্ট একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে সে উঠে ভুল। মাহিতও সাথে সাথে উঠে পড়ল। শী। একটুখানি হেসে বলে, আপনার অনেকখানি সময় নষ্ট করলুম, আশা করি কিছু মনে করবেন না। মােহিত একটুখানি মৃদুহসি হলে। * ৩৯ শীলার ডায়েরী হইতে । বুধবার, সকালবেলা। আজ আমার এত ভালাে লাগছে যে কী বন্ধ! জাহাজটার প্রত্যেকটি অঙ্গ যেন মধুতে স্নাত বলে মনে হচ্ছে।সূর্যোদয় ত রােজই দেখি, রােজই সুন্দর লাগে, কিন্তু আজকের সৌন্দর্য যেন সব সৌন্দৰ্য-গরিমা ছাপিয়ে উঠেছিল। মনটা হয়ে উঠেছে খুতখুতে ছেলের মত, কিছুতেই শান্ত হতে চাচ্ছে। ...অথচ একটুখানি চাঞ্চল্যের পরই কী জানি কেন ফেনিয়ে ওঠা মদের মত শান্ত-সমাহিত হয়ে পড়ছে। কাল ডিনারের পর নাচ হ’ল। নাচটা চিরকালই আমার ভালাে লাগে...'রের মূৰ্চ্চনা আর সমুদ্রের বাতাস এই দুই মিশে ভারী রােম্যান্টিক একটা আবহাওয়ার সৃষ্টি করেছিল। আমি সুন্দর নীলরঙের একটা গাউন পরেছিলুম, আর আমার গলায় ছিল নীল পাথরের ছােট্ট একটি টুকরাে। কর্ণেল গ্রীণ ত সারাটা সময় আমাকে কমপ্লিমেন্ট দিতেই ব্যস্ত ছিলেন ! বুড়ােকে আমার বড় ভালাে লাগে, ভয়ানক আমুদে ও রসিক লােক কিন্তু ! আর কী ভীষণ হুইস্কি আর সােড়া খেতে পারে! আমি ওকে বছিলুম, এবার কিন্তু তুমি আর টাল সাম্লাতে পাবে না, শেষে তােমার বাহুতে বদ্ধ হয়ে আমিও কি সমুদ্রের জলে পড়ে যাব ?...কর্ণেল ৪০
সাগর দোলায় ঢেউ
তাতে একটুখানি হেসে বলেছিলেন, এ ওস্তাদ বহুদিন এর মধু খেয়ে
খেয়ে নীলকণ্ঠ হয়ে গেছে, এ ভাঙ্গবে তবু নড়বে না !
নাচের মাঝখানে হঠাৎ একবার সেনের কথা মনে হয়েছিল।
ভাবছিলুম, ও যদি আমায় এম্নি ভাবে নাচতে দেখে তাহলে কী
ভাববে?•••ওর যা মন তাতে হয়ত বিচ্ছিরি একটা কিছু ভেবে
বসবে, আর আমার সাথে জীবনেও কথা কইবে না! অবশি ওকে
দোষও দেওয়া যায় না:: নাচের মধ্যে না হােল্ক, নাচের পর অনেক
সময় যা সব কাণ্ড হয় তাতে যে-কেউ শক্ পেতে পারে !••
প্যাটিশিয়ার যৌবন বােধ হয় প্রৌঢ়ত্বের কোঠায় এসে ঠেকেছে, তবু
সে কী ঢলাঢলিটা না করলে ! সবাই একটুখানি হালে তাদের
উপরের ডেকে চলে যেতে দেখে। কর্ণেল গ্রীণ আমার কানে
অস্ফুটস্বরে বলেন, ওদের সী-সিনেস্ হয়েছে:
কাল রাতে অনেকক্ষণ পর্যন্ত ঘুম হয়নি’, বােধ হয় নাচের
উত্তেজনার ফলে !
বারােটার সময় নাচ শেষ হবার পর অনেকক্ষণ
আমি ডেকে দাড়িয়েছিলুম, কর্ণেল গ্রীণ 'মামার পাশে দাড়িয়ে
গল্প করছিলেন। আমাকে জিজ্ঞেস করছিলেন, ইণ্ডিয়া কেমন
লাগল। আমি কী জবাব দেব বুঝতে পাছিলুম না। যেভাবে
দেশটা দেখেছি তা না দেখারই সমান। গেলুম একটা নতুন
দেশ দেখতে, কিন্তু সব সময় রইলুম আমার রং এবং রক্তের
মৰ্যাদা নিয়ে দেশের লােকদের এড়িয়ে। মিস্ হিলকে কত করে
বলুম, চলল, এসব বড় বড় হােটেল ছেড়ে দিয়ে ছােট্ট একটি
সহরে দিশী কোন একটা ধৰ্ম্মশালায় জাতীয় জায়গায় গিয়ে বসি।...
৪১
সাগর দোলায় ঢেউ
শুনে মিস্ হিলের মূচ্ছা হয় আর কি! তঁার ক্ষীণ বপু, ঋজু দেহ
আর চশমার ভিতর দিয়ে জুলজু চাউনি নিয়ে তিনি বলেন,
তােমাকে শয়তানে পেয়েছে নাকি?
সত্যি, এত বড় একটা দেশ, এর মধ্যে যে কোন মৰ্ম্মভেদী
বেদনা প্রচ্ছন্ন আছে তা আমরা বাইরের পথিকেরা কতটুকুই বা
বুঝতে পারি ?••"আসি, বড় বড় হোটেলে থাক, তাজমহল,
উদয়পুর, দার্জিলিং আর কঙ্কা তা দেখি, তারপর দেশে ফিরে
একটা ইম্প্রেশ-এ বই লিখে বাস... The myst:cous last
...Ths glitinurl: East! কিন্তু এই রহস্য, এই বৈভবের
পেছনে যে কতাে বড়াে যন্ত্রণা লুকানাে আছে সেটা আমাদের চোখে
আলে না, এলেও তার কুশ্রী আমাদের মনে ভাবলাম্যকে
এতখানি চঞ্চল করে দেয় যে তা কোন রকমে বিদায় করতে
পারলে বাচি।
কর্ণেল গ্রীণ বখ৯ সাড়ে বারােটার সময় আন্দাজ বিদায় নিয়ে
তার ক্যাবিনের শুতে !.লে গেলেন তখনও আমি ডেকের উপর দাঁড়িয়ে
রইলু। কালো নিষ্ঠুর জল ভেদ করে আমাদের জাহাজ চলছিল,
আর ট্রপিক্যাল আকাশে তার শােভা বেন শাজাহানের
হারেমের রূপসীদের হীরকখচিত শাড়ীর আঁচলের কথা মনে করিয়ে
দিচ্ছিল। আমি শুধু ইণ্ডিয়ার কথা ভাবছিলুন ; যতদিন সেখানে
ছিলুম আমার মনের গােপন অন্তঃপুর মথিত করে একটা
অসোয়াস্তির ভাব জেগে উঠেছিল, কিন্তু তার বেশী কিছু আলােড়ন
হয়নি। এখানে এসে সেনের সাথে দু' চারটি কথাবার্তা হওয়াতে
৪২
সাগর দোলায় ঢেউ
.যেন একটা বিপ্লবের নৃত্য শুরু হ’ল ! তার শান্ত দৃঢ়তা আর
আবেগময়ী চাউনিতে দেশের সব অর্ধস্ফুট ভাব যেন সর্বক ভাষা
হয়ে ফুটে বেরুল !
আজ সকালবেলা যখন সেনাদের ডেকে গিয়েছিলুন তখন
কেউই ছিল না সেখানে। কাল একটু ঠাণ্ডা পড়েছিল কিনা,
তাই ডেকের উপর শােবার সাহস কেউ করেনি এবং ভোরের
আলাে ফুটে ওঠা সত্ত্বেও কম্বলের সুখস্পর্শ ছেড়ে কেউ বাইরে
বেরিয়ে আসতে চায় নি।
আমি প্রতীক্ষমা মূৰ্তিতে ডেবের উপর একটা চেয়ার নিয়ে
রেলিংএর সাথে গালটি ঘেসে বসেছিলুম। 'অং সাল "মলাে
আগশনের ঔৎসুক্য আনার সব ইন্দ্রিয় কটাকে চ ৩ বার
চেষ্টা কছিলুম, এমন সময় শ্লিপারের মৃদুশব্দ শুনে পেছন ফিরে
তাকালু। দেখলুম, সেল, পালা এক কিনে পরে এসেছে।
চোখে তার তখনও ঘুঘাের, ঠোট দুটো আলস্য ভা, চুল গুলাে
দুষ্ট ছেলের মত বেপরােয়া।
বেশ কনে ঠাণ্ডা ছিল কিন্তু সূৰ্য্য উঠবার আগে। মি
ওকে জিজ্ঞেস করলুম, আপনার শীত করছে না? এ4x i খুল
একটা কিমােনাে পরে আছেন !
সে আমাকে প্রথমে দেখতে পায়নি, আমার পা শুনে
একটুখানি চমকে উঠে বলে, ওঃ, আপনি বসে আছেন •••,
ঠাণ্ডা আর এমন কি !
বেশ হাসি মুখেই সে কথাক’টি বলে, কিন্তু তার পরই
৪৩
সাগর দোলায় ঢেউ
পলকের মধ্যে তার মুখ ভয়ানক ভাবে গম্ভীর হয়ে গেল, সে বলে,
আমি ত তবু দিব্যি এখানে কিমােনাে গায়ে ঘুরছি, কিন্তু আমার
দেশের লােকেরা একটি হেঁড়াঝাথার অভাবে ঠক্ঠক্ করে কাঁপছে !
মনটা চঞ্চল হয়ে উঠল। সেনের কথার সুরে মনে হল যেন
আমাকে খোঁচা দেবার জন্যেই ও এম্নি করে বলে। আমি
একটু ক্ষুব্ধ হয়ে বললুম, আমার সাধারণ একটা কথার উত্তরে
এরকম জবাব দেবার উদ্দেশ্য কি আমার রক্ত তার রংএর কথাটি
স্মরণ করিয়ে দেওয়া, মিঃ সেন?
মিঃ সেন এর উত্তরে মাত্র একটি কথা বলে, সেটা সত্যি হত,
যদি একথাটি শুতেন কাল বিকেলের আগে, মিস্ রজার্স এখন
এটা যে বললুম তা বিবাদ বা অভিযােগের অভিপ্রায়ে নয়, আপনি
আপনার সমবেদনা দিয়ে বুঝতে পারবেন এই বিশ্বাসে
মুহূর্তের জন্য অবগুণ্ঠন সরে গেল ! বিদ্যুতের ঝিলিকে যে
আমি একটি মনের ছবি দেখতে পেলুম তার জন্যে আমি আমার
নিয়তিকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
তাই আমার মন আজ সকালবেলাটা এত খুসীতে ভরে আছে ।
বুধবার, চায়ের আগে। মিস্ হিল কি আমায় শান্তিতে
থাকতে দেবেন না? কাল থেকেই লক্ষ্য করছিলুম তার মুখখানা
যেন শ্রবণ-মেঘের ছায়ায় আচ্ছন্ন। আজ লাঞ্চ এর পর আমি
সেকেণ্ডক্লাস ডেকে যাব এমন সময় আমায় ডেকে গুরুগম্ভীরস্বরে
প্রশ্ন কলেন, কোথায় যাচ্ছ ?
৪৪
সাগর দোলায় ঢেউ • আমি জবাব দিলুম, একটি বন্ধুর সাথে দেখা করূতে। জফুটিকুটিল চক্ষে প্রশ্ন করলেন, সেই ভারতীয় ছােরা দুটো বুঝি ? তার কথার ভঙ্গীতেই আমার মেজাজ খিচড়ে গিয়েছিল। আমি সােজা জবাব দিলুম, যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে ক্ষতি আছে কি ? হঠাৎ পায়ের সামনে সাপ দেখলে মানুষের মুখের চেহারা কেমন হয় কেউ দেখেছ কি ? মিস্ হিলের মুখের বর্ণ বৈচিত্র্য ও ঠিক তেমনি হ’ল। আমার মত শান্ত সুবােধ মেয়ের কাছ থেকে বােধহয় এরকম জবাব তিনি স্বপ্নেও আশা করেন নি’.. তিনি খানিকটা স্তব্ধ হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন•••তার সে সময়কার চাউনি আমি কখনও ভুলতে পাব না ! পরে একটু ত্রুর হাসি হেসে বলেন, সাগরজলের হাওয়া লেগেছে কি না, তাই একটুখানি স্বেচ্ছাচারের স্পৃহা জেগে উঠেছে, ?মন্দ নয়, যদি সীমানা ছাড়িয়ে না যায়। মিস্ হিলের এই বক্র ইঙ্গিতে আমি ধৈৰ্য্য হারিয়ে ফেলুন। তীব্রকণ্ঠে বললুম, নিজের স্বৈরিতা দিয়ে অপর লােকের ভদ্র- ব্যবহারকে বিচার করুতে যাওয়াটা তােমার মত ইতর মেয়েরই পরিচায়ক। রাগে আমার মাথার শিরাগুলাে দপ দপ করে ছিল। মিস্ হিলের সানে আর দাড়াতে পারছিলুম না, কেবলই ভয় হচ্ছিল হয়ত অসম্ভব একটা চমৎকার করে একটা সী করে বস্ব ! ৪৫ সাগর দোলায় ঢেউ মনটা বড় অবসন্ন হয়ে গেছে। মিস হিল যে বাবার কতখানি বিশ্বাসের পাত্রী তা আমি একেবারেই ভুলে গিয়েছিলুম। লণ্ডনে পৌছবার সাথে সাথেই ত সব ঘটনা বাবার কাছে রিপাের্ট হয়ে যাবে, আর তার স্বভাব ত’ আমি জানি। খাঁটি ব্রিটিশার ছাড়া আর কারাে ছায়া মাড়ালেও যার আভিজাত্যের গৰ্ব ক্ষুন্ন হয় তিনি আমার এই মাের্শী আর সেনের সাথে বন্ধুতাকে কখনই সচক্ষে দেখতে পাবেন না ! দূর হােগে ছাই। কী সব আজগুবি ব্যাপার ভাবছি!••• লণ্ডনে পৌছে কী হবে তা নিয়ে এখন মাথা ঘামিয়ে লাভ কি ? যা ভালাে এবং সঙ্গত বলে মনে হচ্ছে তা করে যাই, পরের ভাবনা পরে হবে !...অনুতাপ করাটা আমার প্রকৃতির বিরুদ্ধে, কাজেই মিস হিলের সাথে আজকের এই বচসা বা সেনের প্রতি আমার একটুখানি আকর্ষণ এর কোনটার জন্যেই অনুশােচনা আমার কোনদিন হবে না! বার্নার্ড শ’ না কে যেন বলেছিলেন, অনুতাপ করে মূর্থেরা, যাদের মনের দৃঢ়তা নেই, সত্যে নিষ্ঠা এবং বিশ্বাসের অভাব যাদের অণুপরমাণুতে। বুধবার, ডিনারের পর। সবাই সিনেমা দেখতে চলে গেছে, আর আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে লিখছি। মিস্ হিলের শ্যেনদৃষ্টির বিভীষিকা থেকে কয়েকটি ঘণ্টার জন্য যে বেঁচেছি এই আমার আনন্দ। এমন নীরস, কল্পনাবােধহীন মেয়েমানুষ আমি আর দেখিনিআমার এ ডায়েরী লেখাকে মিস্ হিল দু’চক্ষে দেখতে ৪৬
সাগর দোলায় ঢেউ
পারেন না, বােঝেন না যে এ আমার মনের একটা অভিব্যক্তি মাত্র,
এর মধ্যে যুক্তি বা বুদ্ধি নেই। রক্ত যখন যুক্তির নিগড় ছাড়িয়ে
উচ্ছলিত হয়ে ওঠে এবং তার উপর সাগরের দোলা এসে লাগে
তখনই আমি আমার এলােমেলাে কাগজের টুকরােগুলো নিয়ে বসি।
সাগরদোলার মধ্যে নিশ্চয়ই একটা উচ্ছ জ্বল বাশার সুর
আছে। নইলে সেনের মত লােকও আস্তে আস্তে আমার পাশে
সােফাটির উপর এসে বলে! সন্ধ্যার ঠিক আগে ফাষ্টক্লাশ
ডেকে একবার ঢু মারাটা যেন ওর নিত্যনৈমিত্তিক কাজ হয়ে
গেছে। আজও সে স্মােকিংরুমে ঢুকেছিল, চলে যাবার ছলও
করেছিল, কাজেই আমাকে ডাকতে হ’ল। সে ফিরে এল, এসে
খানিকক্ষণ নীরবে আমার দিকে তাকিয়ে রইলে ; তারপর ছােট্ট
একটি কমপ্লিমেন্ট দিলে, আপনাকে আজ ভারী সুন্দর দেখাচ্ছে !...
তার পর অনুমতির অপেক্ষা না রেখে আমার ডান পাশে সােফার
উপর বসে পড়লে।
আমি একটু খুসী যে হলুম তা বলাই বাহুল্য। এতদিন যেন
ওর ধরা-ছোঁয়া পাচ্ছিলুম না, ওর মনের আলাে-আঁধারের ইসারায়
আমার বুদ্ধি ধাঁধার মধ্যে ঘুরছিল ; আজ সন্ধ্যায় ইসারাটা যেন
একটু সহজ হয়ে উঠল।
এরপর ঘণ্টাখানেক যা’ হ’ল তাকে সােজা ভাষার ব্য—
tate-i-tetc. মােস। যখন এর মাধুর্যের ব্যঞ্জনা করেছিলেন
তখন আমি হেসেছিলুম মনে মনে; কিন্তু আজ সন্ধ্যার প্রাক্কালে
সেনের পাশাপাশি বসে আমি ওর প্রাণের প্রত্যেকটি স্পন্দন যেন
৪৭
সাগর দোলায় ঢেউ নুভব করছিলুম, ওর কথার মূৰ্চ্চনায় আমার মন তালে তালে নেচে উঠছিল.. আমার মনের গুটি থেকে আনন্দের দ্যুতি বেরিয়ে আছিল প্রজাপতির মত! সে কথা বলে কম, একটু লাজুক স্বভাব কি না! কিন্তু দু’ একটি টুকরাে যা বলে তাতেই মনের বাঁধন খুলে যায়। মাঝে মাঝে তার চোখে অস্বাভাবিক এক দীপ্তি ফুটে ওঠে। দেশকে ও যে কী প্রাণ দিয়ে ভালােবাসে তা ওর সাথে খানিকক্ষণ নিবিড়ভাবে আলােচনা না করূলে বােঝা অসম্ভব ; ও হচ্ছে অথই জলের মাছ, ভাসাভাসা স্তুতি বা উচ্ছাস ওর মনের গভীরতার কাছে সাগর- জলের বুদবুদের মত। তবু দেখতে পাই মাঝে মাঝে সে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। সে বােধ হয় আমার সান্নিধ্যের জন্যে। সে কখনই আমায় ভুলতে দেয়না যে আমি হচ্ছি তার শাসকদেরই জাতের মেয়ে, তাই নিবিড়তা আদ্বার পথে বাধা ফুটে ওঠে, ব্যবধানের পাটীল এসে সহজতার মাঝেও একটা অস্বাভাবিকতার সৃষ্টি করে। আমি সেনকে তার আগের দিনকার প্রতিজ্ঞার কথা মনে করিয়ে দিলুম। সে ভুলেই গেছল প্রায়। আমি বললুম, আপনি আপনার দেশের কথা আমাকে বল্বেন কাল প্রতিশ্রুতি করেছেন, আজ বলতেই হবে: সে কথাটি এড়িয়ে জবাব দিলে, আপনি ত’ নিজেই দেখে এসেছেন, আমায় আবার প্রশ্ন করূছেন কেন? আমি বললুম, আমি কিছুই দেখিনি আপনার দেশের। আমি ৪৮
সাগর দোলায় ঢেউ
দেখেছি শুধু গুটিকয়েক প্রাসাদ আর স্তুপ...আপনাদের জীবন্ত
দেশ একেবারে এড়িয়ে এসেছি।
মলিন হাসি হেসে মােহিত বলে, আমাদের দেশ জীবন্ত নয়,
ও হচ্ছে মৃত্যুপথের যাত্রী
আমি নাছােড়বান্দা হয়ে আবার বলুন, তারই একটু ছবি
আমায় বলে দিন না !
বােধ হয় আমার কণ্ঠের মধ্যে সত্যিকারের আগ্রহের সুর ফুটে
উঠেছিল, সে আর কোন প্রকার দ্বিধা করলে না। অতি সংক্ষেপে
দু’চারটি কথায় আমার চোখের সামনে এমন একটি ছবি একে
ভুলে যে আমি ওর ক্ষমতাকে মনে মনে প্রশংসা না করে পালুম
। কথা যখন শেষ হল তখন দেখলুম অন্তর-নিংড়ানাে আবেগে
সে অবশ হয়ে পড়েছে !
আমি প্রশ্ন করলুম, ক্লান্তি লাগছে? আপনাকে কষ্ট দিলুম?
বলে, না ••একটুখানি বিস্ময় বােধ কছি মাত্র--আপনার
কাছে এসবকথা এমন আগ্রহভরে বন্ধ এ আমি কখনও ভাবিনি
কিন্তু!
আমি ভয়ানক ভাবে পুলকিত হয়ে উঠলুম, জয়ের গৌরবে
আমার মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।
%
মিস্ হিল সিনেমা দেখে ফিরে এসেছেন, মুখখানি খুব হাসি-
হাসি। কর্ণেল গ্রীণ বােধ হয় ওঁর গাউনটার প্রশংসা করেছেন
আজ !• কর্ণেল গ্রীণ খুব লোকভুলাননা পুরুষ বটে!
৪৯
৪
সাগর দোলায় ঢেউ
আমি মিস্ গ্রীণকে প্রশ্ন করলুম, কেমন ছবি দেখলে ?
—বেশ হয়েছিল, তুমি গেলে না, কর্ণেল এবং আরাে অনেকে
তােমার কথা জিজ্ঞেস্ করলেন।
আরও অনেকের মধ্যে কারা আছেন ?
জিমি, ব্ল্যাকি এরা সবাই।
জিমিকে আমি বেশ ভালােরকমই জানি। আমার দুর্ভাগ্য
হয়েছিল দিল্লীতে ওর ওখানে আতিথ্য গ্রহণ করেছিলুম, তারপর
থেকে সে যে আমার পেছনে লেগেছে আমার একদণ্ডও শান্তি
নেই ! আমারই জন্যে সে ছুটি নিয়ে দেশে যাচ্ছে !..কিন্তু কাল
ওকে আমি বেশ শক্তরকম দাবড়ানি দিয়েছি, তার ফলে আজ
সারাদিন আমায় বিরক্ত করতে আসেনি।
মিস হিল আমার মৌনতায় খুব প্রসন্ন হলেন না। আমাকে
শুনিয়ে শুনিয়ে বলেন, ওরা তােমার কথা নিয়ে যেন একটু
হাসাহাসি কছিল বলে মনে হল আর ওদেরও দোষ দেওয়া
যায় না !
আমি বুঝতে পারলুম মিস্ হিল কোন্ বিষয়ে ইঙ্গিত করূছেন।
ওর সাথে এসব নিয়ে তর্ক করাটাও আমার কাছে অপমান বলে
মনে হচ্ছিল, আমি কিছু জবাব দিলুম না।
মিস্ হিল আপন মনে অস্ফুটস্বরে গজগজ করতে লাগলেন,
কিন্তু দেখলেন আমার গাম্ভীর্য অটল এবং দুর্ভেদ্য। শােবার
পােষাক পরে আমাকে প্রশ্ন করলেন, রাত হ’ল, শােবে না ?
আমি বুঝলুম, আলােটাতেই মিস হিলের আপত্তি। আমি
সাগর দোলায় ঢেউ
বেড়সুইচের আলােতে লিখছিলুম, কিন্তু ঝাল মেটাতে হলে একটা
বস্তু চাই! মিস্ হিলের সমস্ত আক্রোশ গিয়ে পড়ল আমার
শিয়রের কাছের বাতিটার উপর।
সারাদিন ডায়েরী লিখে লিখে আমারও চোখ জড়িয়ে আসছে,
আমি আর কিছু না বলে বাতিটা নিবিয়ে দিচ্ছি।
বিষ্যৎবার, সন্ধ্যার পর। আজ সারাটি দিন ডায়েরী
লিখবার অবসর পাইনি। সকালবেলায় যখন শুলুম যে আমরা
আজ বিকেলে এডেন পৌছব তখনই মনটা কেমন যেন চঞ্চল হয়ে
উঠল। এতদিন শুধু জলের রাশি দেথে আর সাগরের দোলা
খেয়ে মনটা ক্লান্ত হয়ে উঠেছিল। তাই মাটির স্নেহস্পর্শ পাবার
আশায় খোলী আমি আনন্দোন্মুখ হয়ে উঠলুম।
সারাটা সকাল ছুটোছুটি করে বেড়িয়েছি। খানিকক্ষণ
কর্ণেল গ্রীণ-এর সাথে গল্প করূলুম। কর্ণেল গ্রীণ বেশ একটুখানি
চোখের ভঙ্গী করে আমাকে প্রশ্ন করুলেন, নতুন বন্ধুদের কেমন
লাগছে ?
আমি ওঁর ইঙ্গিত বুঝলুম। কর্ণেলের কথার ভঙ্গীটির মধ্যে
কিন্তু কোনই বিষ নেই, তাই হাসিমুখে বলুম, মন্দ লাগছে না,
কর্ণেল, তবে জানই ত’, পুরাণা জিনিষ হচ্ছে সব চেয়ে সেরা, তার
সাথে কিছুরই তুলনা হয় না।
কর্ণেল হেসে বলেন, কথাটা কিন্তু মাত্র আংশিকভাবে সত্যি।
এই ধর না, যদি আমার ছেলেবেলাকার একটি মিসেস্ গ্রীণ এখন
সাগর দোলায় ঢেউ পর্যন্ত বেঁচে থাকতেন তাহলে কি আর আজ তাঁর সাথে প্রেম করতে পারতুম ?"তরুণী যুবতী শীলা রজার্স যেমন মিষ্টি প্রৌঢ়া বর্ষীয়সী মিসেস গ্রীণ কি তেমন মিষ্টি হতে পারেন ? এখানে বলে রাখি, কর্ণেল গ্রীণ হচ্ছেন কুমার। তাই তাঁর মুখে রসের ফোয়ারার কখনও কতি নেই। আমি কর্ণেলের কথায় একটুখানি তর্জন করে বলুম, তুমি তরুণী যুবতীদের মধুই দেখছ, কর্ণেল, মধুর পেছনে যে হুল আছে সেটা ভুলে যেয়ােনা যেন! কর্ণেল বলেন, কিন্তু মধুভরা হল ত? মধুর খাতিরে সে হুলটুকু সহ্য করা যায়। আমি দেখলুম কর্ণেলের সাথে কথায় পাবার যো নেই। তার আগেকার প্রশ্নের সােজা উত্তর দেই নাই সেটা মনে হ’ল। বলুম, কর্ণেল, তােমরা ভারতীয় ছেলেদের সাথে আমাদের মিশতে দেখলে এমন আঁৎকে ওঠ কেন, বল ত ? কর্ণেল আমার প্রশ্নে খুবই প্রীত হলেন বলে বােধ হল। বলেন, যারা বুদ্ধিমান্ তারা কখনই আঁৎকে উঠবে না••"কারণ এদেশের শিক্ষিত ছেলেরা যথার্থ ভদ্রতায় আমাদের শিক্ষিত ছেলেদেরও ছাড়িয়ে যায়। তবে কি জাননা, আমাদের একটা কমপ্লেক্স, আছে, সেটা হচ্ছে রংএর, রক্তের, মিথ্যা আভিজাত্যের। পাছে তার কোন হানি হয় এই ভয়ে আমরা সৰ্ব্বদাই সজাগ থাকি যেন! বুঝি, এরকম কপ্লেক্স, অন্যায়, অন্ধ...কিন্তু সংস্কারের স্বভাবই এই, বুদ্ধি দিয়ে মানুষ তার বিচার করে না, তার বিচার করে নিজের কতকগুলাে প্রবৃত্তি দিয়ে।
সাগর দোলায় ঢেউ
—কিন্তু আমরা যারা শিক্ষিত তারাও যদি এমন করি তাহলে
আমাদের শিক্ষার দাম কতটুকু?
হেসে কর্ণেল বললেন, সেইজন্যই ত আমি বলি, আমরা
ব্রিটিশরা সব চেয়ে বেশী অর্ক-শিক্ষিত জাত।
কর্ণেল ভয়ানক চালাক কিন্তু ! কোন একটা সমস্যা উঠলেই
ভারী চমৎকারভাবে সেটা এড়িয়ে যান। অথচ এমন ভাবে সেটা
করেন যে কেউ তাতে রাগ করবার অবকাশও পায়না, তঁার আমুদে
কথায় প্রীত হয় বেশী ।
কর্ণেল গ্রীণের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে গেলুম সেকেণ্ডক্লাশ
ডেকে।, যােশী আর আর-একটি ছেলে দাড়িয়ে কী যেন গল্প
কছিল। আমাকে দেখে যােশী একটু হালে, কিন্তু তখ, খুনই
সরে এল না। বুঝলুম অভিমান হয়েছে।
চোখের ইঙ্গিতে ডাকলুম, আমার ভাষা যােশী বুঝলে।
ছেলেটির কাছে বিদায় নিয়ে এগিয়ে এল।
প্রশ্ন করলে, মিস্ রজাস'-এর হুকুম ?
যােশীর কথা বলবার ভঙ্গীটি ভারী চমৎকার—ওর মধ্যে
প্রাচ্যের লজ্জা বা আড়ষ্টতা নেই, অথচ মাধুৰ্য আছে বেশ। লণ্ডনে
ও আমার সাথে ভাব জমাবার জন্যে কী কম চেষ্টা করেছিল ! মুস্কিল
হচ্ছে এই যে এরকম ভাব জমানাে আমার ধাতে সয় না। আমি
চাই সবার বন্ধু হতে—যারা আমার সংসর্গ এবং সাহচর্য্য কামনা
করে তাদের মধ্যে কোনপ্রকার পার্থক্য করাটা আমার ভয়ানক
খারাপ লাগে।
সাগর দোলায় ঢেউ
আমি যাের্শীর কথার জবাব দিলুম, বহুদিন তােমার দেখাশুনাে
নেই, ভাব লুম এডেন পৌছবার মুখে সী-সিনেস্ হ’ল নাকি ?
যােশী বলে, যদি হত তাহলেও কি আর মিস্ রজার্স দয়া
করে এই রােগীকে দেখতে আসতেন ?
আমি ওর বাহুতে একটা ঠোনা মেরে বম, তুমি ভয়ানক
আদুরে হয়ে উঠছ, যােশী । তুমি ভুলেই যাচ্ছ যে আদর পাবার
বােগ্য ভুমি মােটেই নও!•••উচ্ছলতার শিখা যাদের রক্তের
শিরায় শিরায় তারা আদর চাইবে কেন ?
আমি জাম ঐখানেই যাের্শীর দুর্বলতা। ওকে যদি কেউ
উচ্ছল বলে তাহলে সে ভয়ানক মুষড়ে পড়ে। অথচ মনে
প্রাণে আমি জানি যাকে উচ্ছল বলে ও তা নয়, ও হচ্ছে একটু
খেয়ালের চরম সুরে গাঁথা।
যােশী মুখখানা একটু ভার কলে। আমি প্রশ্ন কলুম,
তােমার সুবােধ বন্ধুট কোথায় ?
একটা জিনিষ লক্ষ্য করেছি, যােশীর মধ্যে শেষ রিপুটার বিষ
খুবই কম। ও আমাকে খানিকটা ভালােবাসে তা আমি জানি,
কিন্তু এটা ও জানে যে আমি ওর বন্ধুকে পছন্দ কতে আরম্ভ
করেছি। তার জন্যে একটুও ঈর্ষান্বিত ও হয়নি।
আমার প্রশ্নের উত্তরে বলে, কুকের গাইড, দেখছে-এডেন
সম্বন্ধে।
প্রশ্ন কলুম, কোথায় ?
উপরে, স্পাের্ট, ডেকে।
৫৪
সাগর দোলায় ঢেউ
বলুম, এসাে না, সেনকে দেখে আসি••
যাের্শী ভারী সুন্দর একটি হাসি হাসলে, তারপর বলে, 'আমার
এই বন্ধুটির সাথে গল্প কছিলুম, তা শেষ হয়নি’ ত এখনও ?
কী সহজ ও সরলভাবে বােশী নিজেকে মুক্ত করে নিলে ! আমি
মনে মনে তাকে ধন্যবাদ না দিয়ে পারলুম না।
স্পাের্টশ, ডেকে সেন গভীর অভিনিবেশের সহিত
কুকের
পড়ছিল—আর ঘণ্টা কয়েক পরেই জাহাজ ডাঙায় ভিড়বে কি
। কিন্তু ওর মুখের ভঙ্গী দেখেই বুঝতে পারছিলুম যে মনের
সঙ্গে বইএর আলাপ পূরােপূরি ঘনিয়ে উঠছে না!
আমি যে এগিয়ে আছি সেটা ওর চোখ এড়ায়নি’, যেন
আমারই অপেক্ষায় বসেছিল ! পরিচিত হাসি হেসে সে আমাকে
অভিনন্দন জানালে।
আদবকায়দা যে ও শেখেনি’ এখনও তার পরিচয় হল এইতে
যে সে আমাকে আসতে দেখে উঠে দাড়ালে না। আমার কিন্তু
সেনের এই সহজ স্বাভাবিক অভদ্রতাটুকুই ভালাে লাগে।
আমি কাছে গিয়ে রেলিংটায় হেলান দিয়ে দাড়ালুম। বলুম,
এডেন দেখতে যাবেন ত ?
—হ্যা, সেইজন্যেই ত আগেই একটুখানি খবর সংগ্রহ করে
রাখছি।•••আপনাদের বাহাদুরি আছে যাহােক্ : পথের আনাচে-
কানাচে আপনারা ঘাঁটি বেঁধে রেখেছেন, আপনাদের নিশানের
কাছে একবার মাথা না নুইয়ে যাবার যে কি আর আছে ?
কথার মধ্যে একটুখানি শ্লেষের সুর বােধ হয় ছিল, কিন্তু
সাগর দোলায় ঢেউ এতদিনে সেটা আমার গা’ সহা হয়ে গেছে, কাজেই আমি রাগ করলুম না। আমার মনের ক্ষোভ বা বিরক্তি যা কিছু ছিল তা আগেই স্থির হয়ে জমে গিয়েছে কি না ? বলুম, আপনার জন্য দুঃখ হচ্ছে কিন্তু কাজের কথা বলছি, আমি যদি আপনার সহযাত্রী হই তাহলে কি আপনার আপত্তি হবে ? পলকের জন্য সেনের মুখ রাঙা হয়ে উঠল, সে কী ববে যেন ভেবে পেলে না। আমার সহযাত্রী হবার প্রস্তাবটা শুনে সে কী ভাবলৈ সেই জানে। মনে হল আমার উপর ওর শ্রদ্ধা অনেকখানি কমে গেল। আস্তে আস্তে সে বলে, যােশী যাচ্ছে ত ? আমি বলুম, জানিনে—যেতেও বা পারে! আর যােশী গেলে কি আপনার সাথে আমার যাবার পক্ষে কোন বাধা হতে পারে ? আমি খুব তীক্ষভাবে সেনের মুখের ভাব লক্ষ্য কছিলুম- যেন একটা নতুন গ্রহের মধ্যে এসে পড়েছে সে, সেখানকার আলােছায়ার লুকোচুরি যেন পৃথিবীর নিয়মে চলে না, বাতাসের গুরুত্ব যেন সেখানে কম, মাটির আকর্ষণ যেন নতুন ছাদে বাঁধা। অবশেষে বলে, বাধা হতে যাবে কেন ? আমার মনটা শঙ্কায় ঝাপসা হয়ে উঠছিল, সেনের একটি কথায় আলাের প্রবাহ এসে সব আবিলতা ধুইয়ে দিলে।
সাগর দোলায় ঢেউ
জাহাজ যখন এডেনে পৌছল তখন সন্ধ্যা হতে আরম্ভ করেছে।
•••এডেনে সেনের সাথী ছিলুম শুধু আমিই ; এই সন্ধ্যাটির কথা
আমি ডায়েরীতে লিখব না, কারণ এ ডায়েরী হচ্ছে সাগরের দোলার
একটি ছােট্ট ঢেউ, আর এর তুলনায় এই সন্ধ্যাটি হচ্ছে অনেক বড়
অমর্ত্য জগতের একটা অব্যক্ত ধ্বনি।
* মােহিত একদৃষ্টিতে লােহিত সাগরের ঘােলাটে জলের দিকে তাকিয়েছিল।•••এডেনের কাছে বিদায় নিয়ে আবার তারা চলা সুরু করে দিয়েছে. অপরিচিত সিন্ধুপারগামী পাখীর মত তার মন ঘুরে বেড়াচ্ছিল সাম্নের দিনগুলাের দিকে। এডেনের স্মৃতি তার মনে যতই জাগছিল ততই তার হাত থেকে মুক্তি পাবার জন্যে সে এগিয়ে চলার চেষ্টা করছিল। যেন স্বপ্লেখিত সে, স্বপ্নের স্পর্শ- টুকুর মাধুর্যের চেয়ে তার অস্বাভাবিক অতীন্দ্রিয়তায়ই যেন সে শিউরে উঠছিল। এডেনের শুষ্ক কঠোর পাহাড়ের মাঝে কী মাদকতা ছিল মােহিত জানেনা, তবে যা’ কাণ্ড ঘটে গেল তাতে সে বিস্ময়ের চেয়ে ব্যথা অনুভব করছিল বেশী । ব্যথা হচ্ছিল এই ভেবে যে সে নিজেকে বিসর্জন দিয়ে ফেলেছে একটি বিদেশিনী মেয়ের দুর্দান্ত উচ্ছ্বাসের সম্মুখে। শীলা আর মােহিত একে বেঁকে এডেনের মরুপাহাড় ধরে ধরে উঠছিল। শীলা ছিল আগে, আর পেছনে ছিল মােহিত। শালা বর্ষার সদ্যোজাত ঝরূণার মত উচ্ছসিত ভাবে আপন মনে বকে চলছিল, আর পেছনে পেছনে মােহিত শুধু দু একটি “হু-হ।” বলে কথােপকথনটাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছিল। অনেকখানি উচুতে উঠে তারা একবার সাগর পানে তাকালে।
সাগর দোলায় ঢেউ f দেখলে, তাদের জাহাজের বাতিগুলো আছে, যেন বহুদূরে কোন্ গ্রহের অপরিচিত অধিবাসীরা সঙ্কেতের নিশান উচিয়ে রেখেছে- পৃথিবীর পথিকের পদধূলির প্রতীক্ষায়। শীলা চুপটি করে তাকিয়ে থেকে বলে, কী সুন্দর! মােহিত প্রথমে কোন কথা বলে না। দেশ ছেড়েছে সে মাত্র পাঁচ দিন, এরই মধ্যে যে সে একটি বিদেশিনী মেয়ের সাথে এনি ভাবে ঘুরে বেড়াবে সে তার স্বপ্নেরও অগােচর !...ফস্ করে তার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, তােমার নামের চেয়েও সুন্দর কি ? শীলা মােহিতের কাছ থেকে এমন জবাব মোটেই প্রত্যাশা করেনি। ক্ষণিকের জন্য তার মধ্যে একটা ইচ্ছা অশান্ত হয়ে উঠল, সে বলে, তাহলে সুন্দরকে উপেক্ষা কর কেন? আমার নাম ধরে ডাকলেই ত পার ! দিনের পর দিন নীরবে চলে যায়, কিন্তু মনের রুদ্ধ ভাষা যখন দুয়ারে এসে আঘাত করে তখন তার আকস্মিকতায় নিজেই বিস্মিত হয়ে যেতে হয়।...মােহিত গভীর ভাবে বললে, তাই ডাক্ব, শীলা••• পুলকে শীলার মনটি নেচে উঠল। সে বলে, তোমার নামটিও আমায় বলতে হবে সেন।...একতরফা স্বাধীনতায় আমি কিন্তু কিছুতেই রাজী নই । নামটি জেনে নিয়ে শীলা যখন পাহাড় থেকে নামলে তখন সমস্ত পৃথিবীকে ডেকে তার খবর দিতে ইচ্ছা হচ্ছিল, ওগাে, তােমরা সবাই শােন, আমি মােহিতের মনের স্নেহ পেয়েছি তার স্থির অটল গাম্ভীর্যের মধ্যেও দোলার চাঞ্চল্য এনেছি:..
সাগর দোলায় ঢেউ মােহিত এই ঘটনাটির কথাই ভাবছিল, এবং এর পর শীলার, সম্মুখীন কী করে হবে তা চিন্তা করে আকুল হয়ে উঠছিল !..গভীর একটা অবসাদ, নিবিড় একটা নৈরাশ্যে তার মন ভরে উঠছিল। যাের্শী এসে প্রশ্ন করলে, কাল এডেন কেমন দেখলে ? যেন অপরাধ করেছে এমনি এক চাউনি নিয়ে মােহিত নতমুখে জবাব দিলে, মন্দ নয়। যােশী হেসে প্রশ্ন করলে, তা অমন গম্ভীর যে ? শীলা রজাস- এর সাহচর্য কি ভালাে লাগল না? মােহিত প্রথমে কোন জবাব দিলে না। তার মনে হচ্ছিল যাের্শী সব কথাই জানে•••ইয়ত বা শীলা রজাসই কৌতুকভরা সুরে যােণীকে তার পরাভবের কথা বলেছে! একটু তীব্রকণ্ঠে বলে, তােমার নিজের অভিজ্ঞতা এ সম্বন্ধে কী বলে? তাহার কথার তীব্রতায় যােশী অবাক হয়ে বলে, হঠাৎ এমন ধারা চটছ কেন ?...আমার অভিজ্ঞতার মাপকাঠি দিয়ে ত তােমার আনন্দ বা বিষাদের বিচার হবে না ! একটুখানি নরম হয়ে মােহিত জবাব দিলে, কাল একটা কাণ্ড হয়ে গেছে, যােশী • মিস্ রজাস আর আমি আমাদের পরস্পরের নাম ধরে ডাব এরকম একটা understandingএ এসেছি। যেন কিছুই হয় নাই এমনি একটা তাচ্ছিল্যভরা সুরে যােশী বলে, ওঃ, এই! আর এরই জন্যে তুমি এতখানি ভাবছ !••• তােমার মনের শুচিতায় আঘাত লেগেছে বুঝি?
সাগর দোলায় ঢেউ
আসলে কিন্তু যাের্শী একটু বিস্মিতই হয়ে উঠেছিল। যে শালা
রজাস সহজে কাউকে তার নাম ধরে ডাবার অধিকার দেয় না
সে শুধু তিন দিনের পরিচয়েই কী করে মােহিতকে এতখানি
আপনার করে নিলে তা ভেবে সে অবাক্ হয়ে গেল । সাগর
সম্মােহনে অনেক কিছু সম্ভব হয় সে জান্ত, কিন্তু এতকাল
শীলা রজাসকে সে সেই সম্ভাবনীয় সমষ্টি থেকে পৃথক্ করেই
রেখেছিল।
মােহিত কিন্তু ভয়ানক ভাবে অস্বস্তিবােধ করছিল। অলজ্যনীয়
এক নিস্তব্ধতা যেন তার আর যাের্শীর মাঝে পাঁচিল ভুছিল, সমস্ত
শক্তি সংহত করেও মােহিত তাকে ভাঙ্গতে পারছিল না।
খানিকক্ষণ পরে সে হাই তুলে বলে, বড় ঘুম পাচ্ছে আজ
যােশী•••
যােণী বুঝলে মােহিতের চিত্ত একটু বিক্ষিপ্ত, ভাববার অবসর
চায় সে। কিছু না বলে সে চিদম্বরএর খোঁজে চলে গেল।
মােহিত চোখ মুদে অসাড়ের মত পড়ে রইল। তার মনের
মধ্যে কালের প্রবাহ যেন থম্কে গিয়েছিল, চিন্তা করবার শক্তিটুকু
পৰ্যন্ত যেন সে হারিয়ে ফেলেছিল।
চিদম্বরম্ তখন মহােৎসাহে ব্রিজ খেলতে আরম্ভ করেছে।
যােশী খানিকক্ষণ দাড়িয়ে দাড়িয়ে তার খেলা লক্ষ্য করলে, তারপর
বিরক্ত হয়ে ফাষ্ট ক্লাশ ডেকের দিকে চলে গেল।
শীলা রজাস যাের্শীর প্রতীক্ষায়ই যেন ছিল। যােশীকে আসতে
সাগর দোলায় ঢেউ
| ০ ০
দেখে তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলে, এসাে, তােমাকে .
ভয়ানক দরকার কিন্তু••
যাের্শী কাছে এসে বসলে, তারপর বলে, আমার বন্ধুটির কী
অবস্থা তুমি করেছ তা একবার ভেবে দেখেছ কি মিস্ রজার্স ? :
এডেনের বাতাস তার মনের উপর ইডেনএর কাজ যে করেনি’ তা”
আমি হলপ নিয়ে বলতে পারি !
নীলা মােহিতের সংবাদের প্রত্যাশায়ই বসেছিল। সে আগ্রহের
সুরে বলে, কী হয়েছে ?
হবে আবার কী! যা হবার তা হয়েছে ! ছিল বেশ, কী
মােহিনীশক্তিতেই যে তুমি ওকে ভুলােলে, সে এখন চুপটি করে
চোখ মুদে স্বপ্ন দেখছে। বােধ হয় শীলা 'রজাসএর মুখখানি ধ্যান
করবার চেষ্টা করছে!
কথাটা শীলার বিশ্বাস করতে সাহস হচ্ছিল না, কিন্তু মনের
মধ্যে কৌতূহল তার দুর্দমনীয় হয়ে উঠছিল। ঘরে যদি নানা
জিনিষ ভিড় করে থাকে তাহলে তার মধ্যে সুন্দর একখানা ছবিও
শুধু একখানা আসবাবের চেয়ে বেশী মৰ্যাদা পায় না; কিন্তু
রিক্ততার মাঝে ছবির সৌন্দৰ্য ফুটে ওঠে।---শীলা কল্পনা করছিল,
ঠিক তেম্নি বােধ হয় মােহিতের মনের অন্দরে তার মুখচ্ছবির
জ্যোতি প্রকাশিত হয়ে উঠছে।
যােণীকে প্রশ্ন করলে, আমার কথা কিছু বলে সে ?
—ঐখানেই ত গলদ, মিস্ রজাস"যদি কিছু বত তাহলে
না হয় বুঝলুম ব্যাধি কোথায়, প্ৰতীকারের চেষ্টাও দেখতুম। কিন্তু
৬২
সাগর দোলায় ঢেউ
হতভাগা যে মনের মধ্যে গুমরে গুমরে মরতে চায়, কাউকে তার
অংশটুকুও দিতে সে ভয়ানক ভাবে নারাজ !
—কিছুই বলেনি’ মােহিত ?
—বলেছিল, কাকে নাকি কী একটা কাণ্ড হয়েছে ডোমাদের
••তােমরা পরস্পরের সম্বােধনটাকে নাকি একটু সংক্ষিপ্ত এবং সু-
উচ্চাৰ্য করে নিয়েছ।
হেসে শীলা বলে, যদি শুধু এই ঘটে থাকে তাহলে এর জন্যে
এতখানি ব্যাকুলতার প্রয়ােজন যে কী সে ত আমি বুঝতে পাছি
, যােশী...
—ব্যাকুলতা আমার হতনা, যদি সেন আমার মত ছন্নছাড়া
উদাসী হত!
প্রতিবাদ করে শীলা বলে, নিজের প্রতি অবিচার করােনা,
যােশী - "তুমি যদি ছন্নছাড়া উদাসী, তাহ'লে ভােগকামী কে ?
কথােপকথনে তাদের উপস্থিত সমস্যা সেনের মনের রহস্য
উদঘাটনের কোনই সমাধান হ’ল না। অবশেষে শীলা বলে,
আমি একবার দেখে আসিগে মােহিতের কী হয়েছে, কী বল ?
যােণী বললে, কী আর বলব ?...ওষুদও তুমি, বিবও তুমি ;
তােমার একটা বিয়ে যদি আরেকটা বিষ ছাড়ে তাহলে আমি
আমার বন্ধুর হয়ে তােমার কাছে চিরদিনের জন্যে কেনা হয়ে
থাব !
হেসে শীলা বলে, শুধু বিষে বিষ ছাড়ে না, যােশী, ওযুদেও
বিষ ছাড়ে!
সাগর দোলায় ঢেউ পথে নিস্ হিলের সাথে দেখা। এডেনে সে যে কালাে ছেলে, দের একজনের সাথে গিয়েছিল তা মিস হিলের নজর এড়ায়নি। রাত্রিবেলা শীলা খুব দেরীতে শুতে আসায় এবং ভােরবেলায় সকলের আগে বিছানা ছেড়ে উঠে যাওয়ায় মিস্ হিল শীলার সাথে একবার বােঝাপড়া করতে পারেননি। এখন শীলাকে দ্রুতগতিতে সেকেণ্ড- ক্লাসের দিকে যেতে দেখে পথ রুখে দাঁড়িয়ে মিস্ হিল বলেন, শীলা, তােমার সাথে আমার খুব দরকারী এবং জরুরী একটা কথা আছে। কথাটা যে কী শীলা তা’ মিস্ হিলের মুখভঙ্গী থেকেই খানিকটা আঁচ করে নিয়েছিল। শ্রাবণ গগনের থথমে মেঘভরা মিস্ হিলের মুখ—যেন কোন একটা উচ্ছ্বাসে নিজেকে নিষ্কাশিত করে ফেতে পাকূলে বাঁচে। শীলা প্রতীক্ষমানা মুখে তাকালে। মিস্ হিল প্রশ্ন কলেন, কাল এডেনে কার সাথে যাওয়া হয়েছিল শুনি? খুবই শান্তসুরে গম্ভীর ভাবে শীলা বলে, আমার এক ভারতীয় বন্ধুর সাথে••• মিস্ হিল দপ্ করে জ্বলে উঠে বললেন, তােমার হয়ত আত্ম- সম্মান জ্ঞান থাকতে না পারে, শীলা, কিন্তু চোখের সামনে আমি আমাদের সবাকার এই অপমানভরা প্রহসনের খেলা ঘটতে দেব না। দৃঢ়সুরে শীলা জবাব দিলে, অপমান বােধ যদি তােমাদের ৬৪
সাগর দোলায় ঢেউ
থাত, মিস্ হিল, তাহলে এমন নির্লজ্জের মত এমন কথা আজ
তুমি বনূতে না ! আমার ব্যবহারের মধ্যে তুমি অন্যায়টা দেখলে
কোথায় শুনি ?...যােশী, সেন এরা তােমার জিমি আর ব্লাকির
চেয়ে কোন্ অংশে ছােট? আমি যদি আজ সারারাত জমির
সাথে ঢলাঢলি করি তাতে আমার বা তােমার মর্যাদা ও হী
একটুও ক্ষুন্ন হবে না, অথচ যােশী বা সেনের সাথে খানিকক্ষণ
বেড়ালে বা গল্প করলে তােমাদের সবার মুখে ঢুণকালি পড়বে !
রাগে মুখ চোখ লাল করে মিস্ হিল বলেন, সাবধান হয়ে
কথা বললা, শীলা: কাদের সাথে কাদের তুলনা করছ একবার
ভেবে দেখ।
তীব্রকণ্ঠে শীলা জবাব দিলে, তুলনায় ভুল হয়েছে সে আমি স্বীকার
করছি !..মানুষের সাথে বাঁদরের তুলনা কখনও শােভা পায়না।
ব’লে আর উত্তরের অপেক্ষা না করে শীল গট গট করে তার
গন্তব্যপথে চলে গেল।
মােহিত তখনও ডেচেয়ারে নিমীলিত চোখে শুয়েছিল।
শীলা এসে মুগ্ধনেত্রে খানিকক্ষণ মােহিতের তালস মুখটির দিকে
তাকিয়ে রইল, তারপর আস্তে আস্তে তার কপালে হাতটি দিয়ে
কূলে, মােহিত...
মােহিতের কাছে এই আহ্বান ঠেকল দূরাগত বাঁশীর ডাকের
মত। সুরের রেশটি তার অর্ধচেতন মনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মৃদু এক
মৃতের সুরু করে দিলে।
সাগর দোলায় ঢেউ
শীলা আবার ডাকলে, মােহিত ••
এবার মােহিতের তন্দ্রা ভাঙ্গল। চোখ খুলে সম্মুখে 'শীলাকে
দেখে সে প্রথমে একটুখানি চমকে উঠলে, আর তার দৃষ্টি গেল
ডেকটার একটা survey দিতে: কেউ শীলার এই স্নেহভরা ডাক
শুনেছে কিনা !
ডেক্ লােকের ভীড়ে জমকালাে না হলেও দর্শক এবং শ্রোতার
অভাব ছিলনা। মােহিত কিংকর্তব্যবিমূঢ়র মত এদিক ওদিক্
তাকালে, কিন্তু শীলা একটুও হৃক্ষেপ না করে মােহিতের পাশে
বসে প্রশ্ন করলে, শরীর খারাপ বােধ হচ্ছে কি, মোহিত ?
মােহিত এর কী জবাব দিবে বুঝতে পারলে না। ঘাড়টি নেড়ে
জানালে যে শারীরিক সে বেশ সুস্থই আছে।
শীলা আবার প্রশ্ন করলে তাহলে কি মন ভার হয়েছে তােমার ?
দেশের কথা মনে পড়েছে ?
শীলার এই প্রশ্নে মােহিতের চোখ দিয়ে হু হু করে জলধারা
বেরিয়ে এল। সে কোন ক্রমে অশ্রু সংবরণ করে বলে, আমাকে
প্রশ্ন করােনা, শালা...
শালা আস্তে আস্তে দরদমাখা ভঙ্গীতে তার মাথাটীর উপর হাত
রাখলে, তার অসত চুলগুলাের মধ্যে চাপার কলির মত
আঙ্গুলগুলো একবার চালিয়ে দিলে।
মােহিত খানিকক্ষণ নীরবে শীলার স্পর্শটুকু উপভােগ করছিল,
তারপর আস্তে আস্তে বলে, আমার মন বে এত কোমল তা
আমি জাম না:
৬৬
সাগর দোলায় ঢেউ
শীলাও তেমনি সুরে, যেন আর কেউ শুনতে না পায় এনি
ভঙ্গীতে 'বলে, তাতে লজ্জার কি আছে মােহিত ?
একটি অদ্ভুত হাসি হেসে মােহিত বলে, লজ্জার কিছু আছে
তা’ ত’ আমি বলিনি, শীলা।•••আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি শুধু এই
ভেবে যে এ কয়দিনের পরিচয়ে তুমি কী করে আমার এতখানি
আপন করে নিলে !...আর যে আমি তােমাদের জাতকে কখনও
ভালােবাতে পারব এই কল্পনাটাকেই স্বপ্নেরও অতীত বলে ভাবতুম
সেই আমিও কী করে তােমার কাছে এত শীগগীর ধরা দিলুম !
মৃদুকণ্ঠে শীলা বলে, সাগরের দোলানিতেই এসব অদ্ভুত কাণ্ড
ঘটেছে, মোহিত। তুমি ভেবােনা, দোলানি যেই থাৰে তােমার
মনের নাচও বন্ধ হবে !
আহতকণ্ঠে মােহিত বলে, তুমি ভুল বুঝছ, শীলা, দোলানিকে
আমি খারাপ বলছি না মােটেই, শুধু ভাবছি, দোলানি ত বন্ধ
হবে, কিন্তু মনের নাচ যদি বন্ধ না হয়।
হেসে শীলা বলে, তােমার অন্তর স্পন্দনের উৎস হচ্ছে এই
দোলানি ; উৎস যখন শান্ত হয়ে যাবে, স্পন্দন বন্ধ হতে বাধ্য !
দুপুরবেলা সেকেণ্ডক্লাশ স্মােকিং-রূমে এককোণে খুব জটলা
হচ্ছিল। শীলা আর মােহিতের নিবিড় আলােচনার দৃশ্যটুকু
অনেকের চোখই এড়ায়নি; এরকম ঘটনা সেকেণ্ডক্লাশ
ডেকে সচরাচর ঘটেনা, তাই আলােচনা আর মন্তব্যের প্রস্রবণ
ছুটেছিল অবাধে।
৬৭
;
সাগর দোলায় ঢেউ
ডাক্তার বর্মণ খুব বিজ্ঞের হাসি হেসে বলছিলেন, অভিনয় এ
জাহাজে অনেক দেখেছি, মশাই, কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, এমন
সাদাসিধে গােবেচারীকে এমন ফাদে পড়তে কখনও দেখিনি।
আহম্মদ প্রতিবাদ করে বলে, সাদাসিধে বলবেন না,
ডাক্তার •••ণ্ডর পেছনে অনেকখানি দুষ্টবুদ্ধি লুকাতে আছে এ আমি
জোর করে করতে পারি।
চিদম্বরম্ এতক্ষণ চুপ করে ছিল ; একটা নতুন কিছু বলার
জন্যে তার মন উৎসুক হয়েছিল। সে তাড়াতাড় বলে উঠলে, ও
ত আমারই ক্যাবি-মেট, আমি ওর খবর বেশ জানি! কালকে
দু’জনে একা গিয়েছিল এডেনের পাহাড়ে বেড়াতে
ডাক্তার বর্মণ একটু ক্র্যর হাসি হেসে বলেন, শুধু বেড়াতে নয়,
মশাই!"বলুন, চোখ টিপতে, মুচকে হাতে, মাথায় হাত বুলাতে,
আরাে কত কি!
সবাই ডাক্তার বক্ষ্মণের কথার হো হাে করে হেসে উঠল।
ডাক্তার বৰ্ম্মণ বলেন, আর একটা ছােকরা যে আছে, যাের্শী
ফোণী কী নাম ওর, সে ভয়ানক ধুরন্ধর কিন্তু !••ওর চেহারা
দেখলেই বােঝা যায় বেশ কিছু স্মৃৰ্ত্তি করে নিয়েছে মেয়েটার
সাথে, তারপর বুদ্ধিমানের মত সরে পড়েছে!
চিদম্বরম্ বলে, তাইত সেনের জন্যে দুঃখ হয়, মশাই! যােণীর
সাথে আমারও আলাপ আছে, সেনের গভীর বন্ধু সে, তাই ওর
কাছ থেকে কথা বার করা মুস্কিল। কিন্তু আগুন তাে আর
লুকানাে থাকে না। যােশর সাথে মেয়েটার পরিচয় বহুদিনের...
৬৮
সাগর দোলায় ঢেউ
আহম্মদ হাই তুলে বলে, সে যাই হােক, সেনকে একটু হিংসে না
করে পাচ্ছি না, ডাক্তার বর্মণ। এই ত আমরাও যাচ্ছি, আমাদের
ভাগ্যে ত এমন তুষারনিন্দিত শুভ্রকোমল হাতের স্পর্শ জুটুল না !
ডাক্তার বর্মণ একটু অবজ্ঞার হাসি হেসে বলেন, ভারী ত
ভাগ্য! এমন ভাগ্যের মুখে আগুন !•••কোথাকার কোন এক
ল্যাণ্ডলেডীর মেয়ে, সে আমার প্রেমে পড়ল না বলে বুঝি আমার
গুম হবে না? •••ছেঃ !
চিদম্বরম্ প্রতিবাদ করে বলে, ওখানে ভুল করলেন, ডাক্তার।
ও ল্যাণ্ডলেডীর মেয়ে যে নয় তা’ ওর চালচলন থেকেই বােঝা
যায়। তাছাড়া যাের্শী আশায় বলেছে, মেয়েটার সাথে তার
আলাপ হয় কলেজে, যেখানে যােণী পড়ত।
আহম্মদের এই প্রথম বিলাত যাত্রা, এর আগে সে কখনও
বিলাতফেরত সমাজের সংস্পর্শে আসেনি। ল্যাণ্ডলেডী এবং
অভিজাতের মধ্যে তফাৎটা কোথায় তা তার বিচারের অতীত।
সে চুপ করে রইলে।
ডাক্তার বৰ্ম্মণ আগেরই মত তাচ্ছিল্যের সুরে বলেন, আপনিও
যেমন, যােশর কথা বিশ্বাস করেন!... আর, আমি নিজেই কতবার
আমার মেয়ে-বন্ধুদের সম্বন্ধে বলে বেড়িয়েছি যে তারা অমুক ব্যার
বা নাইটএর দৌহিত্রী বা ভাইঝি ! তাই বলে কি সত্যিই তারা
তাই ছিল ?
অকাট্য যুক্তি। নিজের ব্যবহারগত অভিজ্ঞতার দোহাই,
এর সাথে আর তর্ক চলে না।
৬৯
সাগর দোলায় ঢেউ
আহম্মদ বলে, মেয়েটির চেহারার মধ্যে লালিত্য আছে
কিন্তু বেশ !
ডাক্তার বর্মণ জবাব দিলেন, ওরকম চেহাৱা 'অনেক দেখতে
পাবেন, মশাই ; একবার বিলিতি ডাঙায় ৭ দিন ! তখন
আপনাকে খুজে পেলে হয়!'ভারী ত’ চেহারা, যেন আদুরে
খুকী আর !ি
চিদম্বরম্ সায় দিয়ে বলে, আর কেমন চিনিয়ে বিনিয়ে কথা
বলে ! আমি একটুখানি শুছিলুম, সাগর দোলা সম্বন্ধে কী
যেন বছিল !
প্রান্ডের মত ডাক্তার বর্মণ বললেন, বলছিল বোধ হয়, আমাদের
এই ভাবটুকু সাগর দোলারই মত-- তােমাকে খানিকটা চঞ্চল
করে রেখে আমি অন্য নৌকায় দোল দিতে যাব ।
শীলা চলে যাবার পরও মােহিত চুপ করে শুয়ে রইলে। তার
অস্পষ্ট ভাবনাগুলাের উপর ঝরে পড় ছিল সমুদ্রের ছন্ছন্ শব্দ•••
ধারা হয়ে। নিবিড় তরুপল্লবের শ্যামলতায় আবিষ্ট ছােট্ট একটি
দ্বীপের মত সে সর্বান্তঃকরণে নিজকে উপলব্ধি করার চেষ্টা
কছিল ।••শীলার স্নেহম্পর্শে তার মনের সঙ্কোচ অনেকখানি কেটে
গিয়েছিল•••তার সমস্ত অন্তর ছাপিয়ে একটি ঘনীভূত অনুভব
জেগে উঠছিল, যার নাম দেওয়া যায়, তৃপ্তি। অনবচ্ছিন্ন এক
গভীর ভাবে তার মন পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল।
চুপটি করে সে লােহিত সাগরের বুকে ছােট্ট ছােট্ট ঢেউগুলাের
१०
সাগর দোলায় ঢেউ খেলা দেখছিল। রূপে, রং-এ, আলােয় সেগুলাে তার মনের অস্ফুট অথচ পরিপূর্ণ ভাষার প্রতীক বলে মনে হচ্ছিল। সে ভাবছিল, সংসার কি বিচিত্র ! যে বিরাট শূন্যতা তার মধ্যে এতদিন ছিল, যার কথা সে এতদিন চিন্তাই করেনি, তা যেন ধীরে ধীরে সমুদ্রের কল্লোলে পূর্ণ এবং সমগ্র হয়ে উঠছি।। সমুদ্রের এই দুঃসাহসিক স্পর্ধায় তার মনে গভীর বিয়ের সুর বেজে উঠছিল। যে ব্যথার ভাবটা তাকে এতক্ষণ পীড়া দিচ্ছিল তা আস্তে আস্তে কমে আসছিল। শীলার সাথে তার মনের সম্বন্ধটা সে একটু নিরপেক্ষভাবে বিচার করবার চেষ্টা কছিল। শীলার সাহচর্য তার ভালাে লাগে এটা মনের কাছে স্বীকার করতে সে আর দ্বিধাবােধ করছিল না।••এটা ভালাে লাগাটা কোথায় গিয়ে দাড়াবে তা নিয়ে এখনই গবেষণা করাটা সমীচীন নয় এ সিদ্ধান্তে সে এসে পড়েছিল। ভালো লাগে, এই যথেষ্ট নয় কি? মানুষ ত’ আর একটা জায়গায় স্থির হয়ে দাড়িয়ে থাকে না—প্রবহমান ঘটনার সাথে সাথে পরিচয়ের দ্বার সে উদঘাটন করতে থাকে । মনকে সুস্থ এবং স্বাভাবিক করে নিয়ে মােহিত উঠে দাড়ালে। রেলিং-এর সামনে এসে একবার ঝুকে জলের দিকে তাকিয়ে দেখলে মধ্যাহ্ন সূর্যের প্রখর কিরণ-সম্পাতে জলটা ঝলসে উঠেছে। শীলা যখন মােহিতকে ওষুদ দিতে চলে গেল তখন যাের্শী খানিকক্ষণ চুপটি ক'রে শীলার চেয়ারে বসে রইলাে। অন্যমনস্কভাবে ৭১
সাগর দোলায় ঢেউ
সে শীলার পরিত্যক্ত একখানা মাসিক কাগজের পাতা উল্টাচ্ছিল
এমন সময় কর্ণেল গ্রীণ এসে হঠাৎ বলেন, মাপ করবেন, আপনার
সাথে একটু আলাপ করতে পারি কি?
যাের্শী মুখ তুলে তাকিয়ে দেখলে আগন্তুককে সে চেনে না।
একটু বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে বলে, নিশ্চয়ই ••
--- আমার নাম হচ্ছে কর্ণেল গ্রীণ, আমি কিছুদিনের ছুটি নিয়ে
দেশে যাচ্ছি...আপনি বােধ হয় এই প্রথম ইণ্ডিয়া ছাড়ছেন ?
যােশী এর আগে কর্ণেল গ্রীণের নাম শােনেনি...শীলা এর
কথা গল্পচ্ছলেও কখনও বলেনি। বলে, Oh nt), আমি দু’বছর
বিলেতে ছিলুম, ছুটিতে দেশে বেড়াতে এসেছিল, আবার ফিরে
যাচ্ছি..আমার নাম হচ্ছে যােশী...
কর্ণেল একটুখানি দমে গেলেন। তারপর লেন, আপনার
সাথে শীলা রজার্স বলে একটি প্যাসেঞ্জারের পরিচয় আছে ?
যােশ ধীরে ধীরে ব্যাপারটা আঁচ করে নিচ্ছিল। বলে, সে
সম্বন্ধে আপনার সাথে আলােচনা করতে আমি বাধ্য কি ?
কর্ণেল দেখলেন যােশী খুব সােজা প্রকৃতির ছেলে নয়। বেশ
মােলায়েম সুরে বলেন, অবশ্যি আপনি বাধ্য না, তবু জিজ্ঞেস
করছি এই জন্যে যে মেয়েটি আমাদেরই সহযাত্ৰিনী, আমি তার
একপ্রকার অভিভাবক বললেই চলে এবং আইন অনুসারে সে
এখনও নাবালিকা...'
যােশ খুবই শান্তসুরে বলে, এসব বলার তাৎপৰ্য?
-তাৎপৰ্য বিশেষ কিছুই নয় ; তবে ব্যাপারটা হচ্ছে কি, মিঃ
৭২
সাগর দোলায় ঢেউ যােশী, মেয়েটির বাবা যদি শুনতে পান যে সে তার অভিভাবকদের কথা শুনছে না, আর যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে তাহলে তার অনেক দুর্গতি হবার সম্ভাবনা আছে। যােণী বেশ শান্তসুরে বললে, তার মানে আপনি বলতে চান যে মিস্ রজাস আমার এবং আমার বন্ধুর সাথে মাঝে মাঝে আলাপ করেন বলে তার বাবা তাকে লাঞ্ছনা এবং অবমাননায় ফেলবেন, এবং প্রকারান্তরে তার জন্যে আমরাই হব দায়ী। কর্ণেল গ্রীণ মনে মনে যােশীর বুদ্ধির প্রশংসা না করে থাকতে পারছিলেন না। বলেন, আপনি সংক্ষেপে বিষয়টা ঠিকই বর্ণনা করেছেন.মিঃ খাের্শী... যােশী বলে, মিস্ রজার্স এর অবমাননা বা লাঞ্ছনার কারণ আমরা কেউই হতে চাইনে, কর্ণেল গ্রীণ, এটা আপনি তাকে খুব বিশদভাবে বুঝিয়ে দিতে পারেন। আর, স্বেচ্ছাপ্রণােদিত হয়ে তাকে অপমানের মুখে ফের জন্যে আমাদের কারােরই আগ্রহ নেই। তার চেয়ে সময় কাটাবার মত উপযােগী কাজ আমাদের অনেক আছে। শান্তভাবে কথাটা বললেও তার মধ্যে খোঁচা ছিল অনেকখানি। কর্ণেল গ্রীণ একটুখানি লজ্জিত হয়ে বলেন, আপনারা ইচ্ছা করে মিস রজাসকে অপমানের মুখে ফেতে চাচ্ছেন এমন ইঙ্গিত আমি করিনে’, মিঃ যােণী ।•••সত্যি কথা বলতে কি, মিস রজাস যদি আমার মেয়ে হত তাহলে আমি এরকম ভাবে আপনার কাছে এ তুচ্ছ বিষয় নিয়ে উপস্থিত হতুম না।•••মানুষে মানুষে সম্বন্ধের মর্যাদা
সাগর দোলায় ঢেউ
আমিও একটু বুঝি, মিঃ বােশী ; কেবল মেয়েটার ভবিষ্যৎ লাঞ্ছনার
কথা ভেবেই আপনার সাথে এ আলাপটুকু করলুম, আপনি কিছু
মনে রবেন না।
বােশা হাসিমুখে বলে, মনে কিছু করি আর নাই করি, কর্ণেল,
আপনাদের এই বর্ণ-সমস্যার সমাধান ত’ তাতে হবেনা।
ফাষ্ট ক্লাশ নোকিং-রূমেও আলােচনা হচ্ছি? মন্দ নয়। মিস্
হিল ছিলেন তার উদ্যোক্তা। যেন ভয়ানক একটা কাণ্ড ঘটেছে
এনি ভাবে জল্পনা হচ্ছিল আর প্রতীকার নির্ধাণের চেষ্টা হচ্ছিল।
জিমি আর ব্ল্যাকি দলের মধ্যে যে ছিল সেটা নিশ্চয়ই আর বিশেষ
করে বলে দিতে হবে না ••আর অপবিত্রতার সাথে তার সাম্য রক্ষা
কবার জন্যে ছিলো দু’জন মেয়ে মিশনারী যাত্রী।
শালা জাসকে যে কিছুতেই উচ্ছন্নের পথে যেতে দেওয়া হবে না
এ বিষয়ে তারা সবাই একমত হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু কী করে
স্রোতকে রােধ করা যায় সেটা তারা কিছুতেই স্থির করে উঠতে
পারছিল না।
‘মিস্ হিল বললেন, আমি ওকে অনেক ভয় দেখিয়েছি, বাপু,
কিন্তু এখন লক্ষ্মীছাড়া মেয়ে, একটুখানিও কঁপে না !
জিনি বলে, আমার মনে হয় এর মধ্যে সেই কালাে ছেলে
দুটোর যােগ আছে। শালাকে আমি খুব ভালাে রকমই জানি,
নিজে ওর এতখানি সাহস হবে না যে আমাদের সকলের বিরুদ্ধে
যায়।
৭৪
সাগর দোলায় ঢেউ ব্লাকি প্রস্তাব করলে, একবারটি ওদের একটুখানি নাকানি- চুবানি দিলে কেমন হয় ?..বলেই সে আস্তিন গুটালে, তার স্ফীত মাংসপেশীগুলাের দিকে প্রশংসাসূচক চোখ কয়েক জোড়া পড়বে এই আশায়। জিমি দুঃখভরা সুরে বলে, মুস্কিল হচ্ছে এই যে এটা একটা জাহাজ, এবং এর মধ্যে যা কিছু করতে হয় সাবধানে করতে হবে। কর্ণেল গ্রীণ এমন সময় যােণীর সাথে কথাবার্তা শেষ করে তার ক্যাবিনের দিকে যাচ্ছিলেন। মিস্ হিল তাঁকে দেখতে পেয়ে ডালেন, কর্ণেল, এখানে এসে, বডড জরুরী কাজ আছে। কর্ণেল এগিয়ে এলেন। মিস্ হিল বললেন, আশা বড় সমস্যার মধ্যে পড়েছি শলাকে নিয়ে, কর্ণেল। তুমি ত’ অনেক ফালী জান, কী করে ওকে ঠিক আগেরটির মত করে নেওয়া যায় বলা দেখি। খুবই গম্ভীরভাবে কর্ণেল গ্রীণ বলেন, মিস্ হিল, অনার উপদেশ আপনারা শুনবেন না জানি..তবু আমি বলছ, শালা জাস এর এই ব্যাপারে আপনারা হস্তক্ষেপ না করে তাকে তার স্বাধীনতাসহ ছেড়ে দেওয়াই বােধ হয় সুরুচিসঙ্গত হত ? তার উপদেশ কারো মনঃপূত হবেনা তা কালো জানতেন। মিস হিলের আহবানের জবাব দিয়ে তিনি আর কোন প্রকার আলােচনার অপেক্ষা না রেখে চলে গেলেন। ভিজিল্যাস, কমিটির সভা ভাল লাঞ্চের ঘণ্টার সাথে সাথে। ৭৫ সাগর দোলায় ঢেউ কর্ণেল গ্রীণের সাথে যে কথােপকথন হ’ল তা মােহিতকে বলা সঙ্গত কিনা বেশী বার কয়েক ভাবলে। তারপর স্থির কলে সব ঘটনা মােহিতকে জানিয়ে রাখাই ভালাে। ঘটনার সমাবেশ যা’ হয়েছে তাতে কখন কী হয় তা বলা যায় না, তখন : দি মােহিত বেচারীকে দ্বিধা এবং দ্বন্দ্বের মাঝখানে পড়তে হয় তার জন্যে দায়ী হবে যােশ নিজে। মােহিত খুব গভীরভাবে বােশীর কথাগুলাে শুলে। প্রথমে কর্ণেল গ্রাণের উপর সে অনেকখানি কষ্ট হয়ে উঠেছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে সে ব্যাপারটা তলিয়ে দেখ বার চেষ্টা করল। অবশেষে সে স্থির করলে সে যা হবার হয়েছে, বেশীদূর আর সে এগােবেনা: মিস্ বজাসএর সান্নিধ্য সে এড়িয়ে চলবে।•••এত’ সাগরদোলায় ঢেউ, বাতাসের গতি বদলে গেলে ঢেউএর উত্থান পতনও নতুন এক সীমারেখার দিকে ছুটবে ! মনকে বোঝান কিন্তু শক্ত। সারা দিন মনের সাথে তার বােঝাপড়া চল। যােশীর কথার এক ধাক্কায় তার মনের বেড়া গেল ভেদে। দেখলে, এতদিন সে যাকে ভেবেছিল শুধু ভালোলাগা, ত’ তার অজ্ঞাতে কোন্ এক ফাক দিয়ে এনে জড়িয়েছে তার সমস্ত সত্বাকে—বেদন এবং আনন্দ নিবিড়ভাবে মিশে মনটাকে করে দিয়েছে এলােমেলাে। ঈজিপ্ট থেকে বন্ধু শশাভনলালকে কল্কাতায় সে চিঠি লিখতে প্রতিশ্রুত হয়েছিল। সে লিখলে :- “ভাই শােভনলাল,
সাগর দোলায় ঢেউ
যদিও দেশের মাটি ছেড়েছি আজ হপ্তাখানেকের বেশী হয়নি,
তবু যেন মনে হচ্ছে দেশ ছেড়ে এসেছি যুগযুগান্তর জাগে। একটা
ধূমকেতুর ধাক্কায় দেশের বুক থেকে ছিটকে পড়েছি, মাধ্যাকর্ষণটা
কেটে গেছে, তাই ফিবার আর পথ খুঁজে পাচ্ছিনা।মাটির
বাধন ত’ খুলেই গিয়েছিল, চলার বাঁধনও বুঝি এবার পুতে চ।
পথহারা আমি ভাবছি মিশরের মরূদ্যানের মধ্যেই আমার আস্তান
গাড়ব কি না!
তুমি তােমার নৃতত্ত্বের রসের মধ্যে বসে বসে হাসবে তা আমি
জানি। এসব বাঁধনের খবর তােমার পাথরে গড়া মনের ত্রিসীমানার
মধ্যেও পৌঁছায় না। আমি মিশরের যেখানেই বাস করিনা কেন,
তুলি ভাববে ভালােই আছে সেখানকার মামি এবং ফারাওদের
মধ্যে। এদের বাদ দিয়ে শুধু আমার কথাটি যদি কখনও তােমার
মনে উকি মারে সে আমার সৌভাগ্য।
তুমি ভাবছ, বন্ধুটির আমার হ’ল কী? হ’বার মত যদি
কিছু হত তাহলে তবু একটা সান্ত্বনা থা!-না হওয়ার
অতৃপ্তি আমায় পেয়ে বসেছে, শােভনলাল! বাশির সুর
কানে এসে পৌছেছিল, সুরের অধিনায়িকার স্পর্শ টুকু কিন্তু
পেলুম না।
কানে না আসতে আসতে এই হারিয়ে যাওয়ার জন্যে দুঃখ
একটু হচ্ছে বৈ কি! ভুমি বলবে, মেলানেশিয়ার অনেক দ্বীপপুঞ্জেই
সেখানকার আদিম অধিবাসীদের কানে এমন অনেক সুর এসে
লাগে, আবার হারিয়ে যায়..তাতে তারা ঐক্ষেপও করে না।
৭৭
সাগর দোলায় ঢেউ
তারা নিজেদের প্রাণের স্পন্দনে চলতে থাকে, মনের গানের তালে
তালে—বাইরের সুরের প্রতীক্ষায় নয়।
সে যাই হােক, বন্ধু, এই আলাে-ছায়ার মাঝখানে অস্পষ্ট
আঘাতেরও দাম আছে, তাই আমি ব্যথার মধ্যেও আলাের রেখা
দেখতে পাচ্ছি।
মনে কী হচ্ছে তা বােধ হয় ঠিক বােঝাতে পারলুম না।•••
তােমার ল্যাবরেটারী হচ্ছে বিশ্বজোড়া মানুষের মন আর তার
ব্যাপকতা ইচ্ছে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে। আমার চিঠিখানা
তােমার ল্যাবরেটারীর মধ্যে যদি তােমার সাধনায় একটুও বিঘ্ন
ঘটায় তাহলে আমার আনন্দ হবে অপরিসীম।
-তােমার মােহিত।”
চিঠি লেখা ত’ শেষ হ'ল, কিন্তু ঈজিপ্টে পোঁছবার যে তখনও
আরাে আড়াই দিন বাকী। চিঠিখানা নিয়ে মােহিত খানিকক্ষণ
নাড়াচাড়া করলে, তারপর আস্তে আস্তে উঠে গিয়ে স্টীমারের ডাক
বাক্সে ফেলে দিলে। যদিও সে জান্ত, ইচ্ছা করলেই স্টুয়ার্ডকে
ব’লে সে চিঠিখানা আবার তুলে নিতে পারে, তবু সেটা ফেলার সাথে
সাথেই তার এক স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরুল, যেন সে তার মনের রুদ্ধ
আবেগ পরিচিত কারও কাছে বলে ফেলে।
সারাটা দিন মােহিত একটু অন্যমনস্কভাবে উদভ্রান্তের মত
ঘুরে বেড়ালে। যােশী মােহিতকে খানিকটা ভাববার অবসর
দিয়ে অন্য কোথাও চলে গিয়েছিল। চিদম্বরম, ডাক্তার বক্ষ্মণ
৭৮
সাগর দোলায় ঢেউ
প্রমুখ সহযাত্রীরা নিজেদের মধ্যে খুব হাসি ঠাট্টা করছিলেন :বােধ
হয় মােহিতকে নিয়েও খানিকটা !
শীলা রজাস সেই বে ফাষ্ট ক্লাশ ডেকের মধ্যে আত্মগােপন
করেছিল তার আর পাত্তাই ছিল না। এক একবার মােহিতের
মনে দুর্দমনীয় একটা আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠছিল শীলা রজাসএর
মুখােমুখী হয়ে তাকে প্রশ্ন করে, এমন প্রহসন কবার প্রয়ােজনটা
কী ছিল ?..তীব্রম্বরে সে শুধােবে, তরুণ একটা মন নিয়ে না
খেলে কী চত না? বলে তার মুখের উপর রেখার বিন্যাস
দেখবে, তার আঁখির পাতা নড়ে কি না লক্ষ্য করূবে•••
"...;;
৭৯
পরের দিনও অভ্যাসমত মােহিত সেকেণ্ডক্লাশের ডেকের নির্দিষ্ট
কোণটিতে বসেছিল—সূর্যোদয় দেখতে। লোহিত সাগরে এসে
অবধি সূর্যোদয়ের দিক্ গিয়েছিল বলে, ফাষ্ট ক্লাসের যাত্রীরা তাই
বড় একটা সেকেণ্ডক্লাশে আত না। গরমের জন্য মােহিত সেদিন
ডেকের উপরই শুয়েছিল। ঘুম যখন ভাঙ্গল তখনও আঁধার
অনেকখানি রয়েছে-দূর থেকে প্রভাতী তারার আলাে তখনও
ভেসে আছিল বাতাসে।
চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকতে তার ইচ্ছা হচ্ছিল না। উঠে
গিয়ে তাই সে রেলিংটার পাশে বলে। আধ-আলাের ছায়ায়
সাগরের জল মথিত করে চছিল বিশাল জাহাজমালার মত
জাহাজের আলােগুলাে জ্বছিল, যেন মানুষের ইতিহাসের প্রতীক
ধারাবাহিক একটা সমাবেশ।
হঠাৎ দেখতে পেলে অদূরে ফাষ্টক্লাশ ডেকের উপর বসে রেলিং
ধরে একটি নারীমূৰ্ত্তি এক দৃষ্টিতে সাগরের জলে তাকিয়ে আছে
যেন ঢেউ গুণছে।
মুহূর্তের জন্যে মােহিতের বুকটা ধ্বক করে উঠল। একটু
ভালােভাবে নিরীক্ষণ করে মােহিত, দেখলে মেয়েটি আর কেউ
নয়•• শীলা রজাস...
bro
সাগর দোলায় ঢেউ মােহিতের একবার খেয়াল হ’ল শীলাকে ডাকে। নিস্তব্ধ জলরেখা, তার মাঝে এঞ্জিনের অস্ফুট শব্দ আর বিদাৰ্যমান সাগরের চাপা কান্নার সুর। একটুখানি সাহস করে ডাকলেই হয়ত উত্তর দিবে । শীলা কিন্তু মােহিতকে দেখেনি। সে আপন মনে স্তব্ধনেত্রে জলের ফেণারাশির উচ্ছ্বাস এবং বিকাশ লক্ষ্য করছিল। মিস হিল আগের দিন রাত্রিতে তাকে তাদের তরফের চরম-বাণী শুনিয়ে দিয়েছিলেন এবং খুবই গম্ভীর ভাবে শাসিয়ে বলেছিলেন, যদি সে তার স্বভাব না শােধরায় তাহলে যে শুধু তার বিপদ হবে তাই নয়, যাদের নিয়ে এই বিপ্লব তাদেরই লাঞ্ছনা হবে সবচেয়ে বেশী এবং সকলের আগে। এই শেষের কথাটিতেই তার মন এত বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। যােণীর সহজ কথাবার্তা তার অপছন্দ হয়না, আর মােহিতের সলজ্জ অথচ দৃঢ়তাব্যঞ্জক ভঙ্গী তার কাছে বেশ মধুর বলেই ঠেকে, কিন্তু তার এই ভালাে লাগার জন্যে যদি তাদের বিপদ বা লাঞ্ছনার শুরু হয় তাহলে সে কি নিজের তুচ্ছ একটা আনন্দকে বড় করে দেখতে পারে ? তার চোখের দু’ কোণ ছাপিয়ে অশ্রুজল গড়িয়ে পড়ছিল, কিন্তু সে তা মনের দৃঢ়তা দিয়ে রােধ করবার চেষ্টা করূছিল। অন্যমনস্ক ভাবে শীলা একবার সেকেণ্ডক্লাশ ডেকের দিকে তাকালে। তার চোখ কিন্তু মােহিতের দিকে গেল না। মােহিতকেও অতিক্রম করে সে দেখছিল শাদা ঢেউগুলাে, যা চূর্ণবিচূর্ণ করে তাদের জাহাজ চলছিল মিশরের পথে • খেইহারা ৮১ সাগর দোলায় ঢেউ সমুদ্র যেন উদয়রশ্মি উদ্ভাসিত আকাশের দিকে নিঃশব্দে আপনার মুখ তুলে ধরেছে! ছােট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেলে শীলা রজাস সেখানে থেকে উঠে গেল। দুপুর বেলা মােহিত ভাবলো দূর হােগে ছাই, এমন ক'রে চুপচাপ বসে থাকা কি আমার শােভা পায় ?•••খুব গম্ভীর ভাবে সে Sherlock IIolmesএর চমকপ্রদ কাহিনীর মধ্যে মনােনিবেশ করবার প্রয়াস কলে। ডিটেটিভ, উপন্যাসের রসের মধ্যে তার মন ডুবে আছিল এবং তার অন্তর্নিহিত বুদ্ধি চলেছিল Sherlock Holmesএর সাথে মৃত্যু-রহস্য উদঘাটন কয়ুতে, এমন সময় যােশ এসে বলে, চল মােহিত, আজ জাহাজটার টপােগ্রাফী একবার ভালাে করে দেখে নেওয়া যাক। জাহাজের খুটিনাটি দেখা এবং তার সম্বন্ধে মন্তব্য প্রকাশ করা যােণীর একটা বাতিক। বিলেতে সে অনেক বড় বড় জাহাজের অভ্যন্তর সুদক্ষ expert এর মত পৰ্যবেক্ষণ করে এসেছে, উচিত- অনুচিত মত প্রকাশ করূতে একটুও কার্পণ্য করেনি’ সে ; আজ ছােট্ট এবং সাধারণ এই জাহাজখানার টপােগ্রাফী জাম্বার জন্যে তার হঠাৎ এমন আগ্রহ কেন মােহিত বুঝতে পারূলে না। কিন্তু সে আপত্তি করূলে না। চুপচাপ বসে থেকে থেকে এবং একই বিষয় নিয়ে চিন্তা করে তার বিরক্তি ধরে গিয়েছিল । এখন ৮২ সাগর দোলায় ঢেউ এই অলস কৰ্ম্মহীনতা থেকে খানিকক্ষণের জন্যেও মুক্তি পাবার সুযােগ পেয়ে সে নিঃশ্বাস ছেড়ে বাঁচলে। Sherlock Holinesটা হাতেই রেখে সে উঠে বলে, চল, প্রথমে তারা ঢুকলে এঞ্জিন-রূমে। যােশী অনেক রকমের এঞ্জিন দেখেছে, এর খুটিনাটি সম্বন্ধেও সে অনেক কিছু জানে। বেশ অভিজ্ঞ চোখ দিয়ে সে এঞ্জিনের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পৰ্যবেক্ষণ করছিল আর তার প্রশ্নে সেখানকার লোেকদের বিব্রত করে তুলছিল। মােহিতের কাছে এসব দুর্বোধ্য ; এঞ্জিন-রূমের শব্দে এবং কলকজাগুলাের বিশালতায় তার মনে হচ্ছিল আরব্যোপন্যাসের সেই দৈত্যের কথা যে প্রদীপাধিকারীর একটি মাত্র আদেশে সব মূল পদার্থকে বাঁধতে পাত-দূর দূরান্তর থেকে স্বপ্নপুরীর রাজকন্যাকে এনে দিত আলাদিনের সম্মুখে, আবার নিমিষের মধ্যে তাকে গিরি-পর্বতের উপর দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে চলে যেত। ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজীতে ইটালিয়ান্ এঞ্জিনিয়ারটি যােশীকে জানালে যে তাদের লাইনে এটাই হচ্ছে সবচেয়ে নতুন এঞ্জিন ; এর গতি বেশী এই এর একমাত্র গুণ ভয়, এর প্রতিবন্ধও সাধারণ এঞ্জিনের চেয়ে ভালাে। যােশী খুব গম্ভীরভাবে মন্তব্য প্রকাশ করূলে, কিন্তু ট্রান্স-অ্যাটলান্টিক লাইনে আপনাদের এবং জার্মান কোম্পানীর যে সব ষ্টীমার আছে সে গুলাের তুলনায় এ ‘এঞ্জিন খেলার কল বই আর কিছুই নয় !
সাগর দোলায় ঢেউ
ইট্যালিয়া যুবকটি খুবই সন্ত্রমভরা সুরে স্বীকার কলে যে
যােশীর কথা সত্যি।
এঞ্জিন রূম থেকে তারা খালাসীদের আব্বার জায়গা, তাদের
রান্নাঘর, জাহাজের সার্জারী প্রভৃতি দেখে ফাষ্ট ক্লাশ corridor
দিয়ে ফাষ্ট ক্লাশ eoungeএ ঢুকূলে। সেখানে বসেছিলেন কর্ণেল
গ্রীণ, মিস্ হিল এবং আরও অনেকে। কর্ণেল যােশীকে দেখে
একটু স্মিতহাসি হাসলেন, যােণীও মাথাটি হেলিয়ে তাকে
অভিবাদন জানালে।
মােহিত জিজ্ঞেস করলে, ভদ্রলােকটি কে?
—সেই কর্ণেল, যার কথা তােমায় বলেছিলাম।
মােহিত একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কর্ণেল গ্রীণের দিকে তাকালে।
মুখখানা বেশ শান্ত আর হাসিভরা। মােহিত ভেবেছিল তাকে
দেখেই তার মনে বিজাতীয় একটা ঘৃণার উদ্রেক হবে, কিন্তু
আসলে কর্ণেলের স্মিতহাসিটি তার কাছে বেশ ভালােই
লাগল।
হঠাৎ যােশী বলে, ওই যাঃ—আসল জায়গাটাই যে দেখা
হল না !
-সে আবার কি?
-নীচে, এঞ্জিন-রূমের পাশ দিয়ে যেতে হয়, যেখানে
ডেক্প্যাসেঞ্জাররা থাকে।
এই জাহাজে যে ডেপ্যাসেঞ্জার বলে এক শ্রেণীর যাত্রী আছে
৮৪
সাগর দোলায় ঢেউ
যােশী বলে,
তা’ মােহিত জাত না। সে বলে, এখানে আবার
ডেক্প্যাসেঞ্জার আবে কোত্থেকে?
যােশী বলে, আছে হে, মােহিত, আছে...। সবাই ত
আমাদের মত পয়সাওয়ালা এবং catholic নয়, ডেকে আশ্রয়
করেই তাদের গতি!
চকিতের মত মােহিতের মনে ভেসে উঠল শরৎবাবুর বর্ণিত
রেঙ্গুনষ্টীমারে ডেক্ প্যাসেঞ্জারদের কোলাহলের ছবি..। মনে
হতেই তার proletarian মনও একটুখানি শিউরে উঠল।
বলে, কী আর হবে ওসব দেখে, তার চেয়ে আমাদের নিজেদের
ডেকে ফিরে যাই।
সে কি হয় ?•••ওখানে অনেক কিছু
interesting জিনিষ নিতে পারে ! চাই কি, কিছু দিশী হালুয়া
আর পুরীও পেতে পার।
হালুয়া বা পুরীর প্রতি মােহিতের বিশেষ লােভ ছিল না। তবু,
বন্ধুর অনুরােধে এবং ডোত্রীদের অবস্থাটা নিজের চোখে পরখ
করে নেবার কৌতূহলে সে যােশীর অনুগমন করলে।
অতি অপ্রসর সিঁড়ি বেয়ে তারা সােজা নীচে নেমে চলে গেল।
লােটাকম্বল নিয়ে একজন বিশালকায় সিন্ধুদেশীয় ভদ্রলােক হেলান
দিয়ে শুয়েছিলেন, যােশী আর মােহিতকে আসতে দেখে একটু
সন্ত্রস্ত হয়ে উঠে বসলেন।
যােশী হাসিমুখে প্রশ্ন করূলে, এখানে আপনার কেমন লাগছে,
জী?
৮৫
সাগর দোলায় ঢেউ
সিন্ধুদেশীয় ভদ্রলােকটি, নাম তার কৃপালানি, বলেন,
আপনাদের মত আলােবাতাস পাইনে বটে, বাবুজী, কিন্তু কোন
অসুবিধা বােধ হচ্ছেন—সমুদ্র শান্ত আছে বলে ।.. তা ছাড়া
স্টুয়ার্ডের সাথে ভাব করে নিয়েছি, মাঝে মাঝে ডিম আর আলুসেদ্ধ
দিয়ে যায়, তাতে মদ খাওয়া হয়না।
মােহিত বলে, ঝড় উঠলে আপনার ভয়ানক কষ্ট হবে কিন্তু।
হেসে কৃপালানি বলেন, ওরকম কষ্ট আমাদের সওয়া আছে,
বাবুজী ! তবুও দিব্যি আরমে পা ছাড়িয়ে যাচ্ছি, কিন্তু আগুদের
দেশে যারা করাচী থেকে বম্বে বা বসা যায় তাদের অবস্থা কি
দেখেছেন কখনও?
মােহিতের অভিজ্ঞতা খুবই অল্প। সে ঘাড় নেড়ে জানালে
সে দেখে নাই। কিন্তু তার চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই
রেঙ্গুনগামী জাহাজের ছবি.. সেই মুরগীগুলাের কঁাক্টা শব্দ,
টগরের কলহ, জাহাজের আবদ্ধ খােলের মধ্যে সারা ভারতবর্ষ হতে
আগত যাত্রীদের মহা-সঙ্গীতের সমবেত অনুশীলন•••
যােণী কৃপালানির সাথে বেশ জমিয়ে নিলে। তার
লােটা-বাসন সম্বন্ধে গােটাকয়েক প্রশংসাসূচক মন্তব্য প্রকাশ করে
সে তার কম্বলটার উপর দিব্যি আঁটসাঁট হয়ে বলে।
কৃপালানি যাচ্ছে দক্ষিণ ফ্রান্সে, সেখানে তার জাতভাই
কয়েকজন আছে তারা মুক্তোর ব্যবসা করে। সেখানে সে তার
ভাগ্যপরীক্ষা করবে। ইংরেজী ভাষার উপর দখল তার সামান্য,
ফরাসীর বিন্দুবিসর্গও সে জানেনা, তবু সে চলেছিল অনিশ্চিতের
৮৬
সাগর দোলায় ঢেউ
ডাকে, কারণ তার কাছে নিশ্চয়তাও অনিশ্চয়তার মতই দুর্বোধ্য
এবং চঞ্চল হয়ে দাড়িয়েছিল ।
মােহিত চুপটি করে আগ্রহভরা চোখে কৃপালানির কথাগুলাে
শুনছিল। কিছুকালের জন্য তার সমস্ত মনটি গিয়েছিল তার
কাহিনীতে আচ্ছন্ন হয়ে উঠছিল, তার নিজের দেশেও অনাগতের
আহ্বানে উত্তর দেয় এমন লােকের অভাব নেই। শ্রদ্ধায়, সম্ভ্রমে
তার চিত্ত ভরপূর হয়ে উঠছিল।
কৃপালানি ডেকের অপর প্রান্তে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলেন,
ওই যে ওদিকে দুটো লােক শুয়ে আছে, বাবুজী, ওরা আসছে
বিহার থেকে। ওরা এসেছিল খুবই উৎসাহ নিয়ে, কিন্তু জাহাজের
দোলানি খেয়ে ওদের মন গিয়েছে ভেঙ্গে। ওরা যাচ্ছিল
জার্মাণিতে, হামবুর্গ, না কোথায় কি ; এখন বলছে পাের্ট সেডে
পৌছেই ওরা দেশে ফিরে যাবে...এসব কষ্ট নাকি ওদের সহ
হয় না ।
যােশী একটুখানি কৃপাপূর্ণ চক্ষে লােকদুটোর দিকে তাকালে।
কম্বলমুড়ি দিয়ে জড়সড় হয়ে তারা আচ্ছন্নের মত পড়ে রয়েছিল ।
কৃপালানি বলতে লাগলেন, আরে দেশ থেকে যখন বেরিয়েছি
তখন এরকম সৌখীন হলে কি চলে? সাধে কি আর
আমাদের দেশের নাম খারাপ ?•••কিছু মনে করূবেন না,
বাবুজী, এক পঞ্জাব আর সিন্ধ, ছাড়া কোথাও মরদকা-বাচ্চা ত
দেখলুম না !
কথাটা হয়ত সত্যি নয়, কিন্তু এমনই আগ্রহ এবং বিশ্বাসের
৮৭
সাগর দোলায় ঢেউ
সুরে কৃপালানি কথাটি বললেন যে মােহিত বা বােশা কেউই
প্রতিবাদ করবার ইচ্ছা পৰ্য্যন্ত মনে আনতে পারূলে না।
কৃপালানি বলেন, বাবুজী, তােমরা এসেছ; আমি ভারী খুসী
হয়েছি কিন্তু।••তােমাদের কী দিয়ে যে অভ্যর্থনা করব বুঝতে
পারছি না; আমার সাথে আমার বহু’র দেওয়া কিছু মেওয়া
আছে, কিন্তু সে ত তােমাদের ভালাে লাগবে না ! তবে, কিছু
মশলা আছে, খাবে কি ?
যাের্শী এবং মােহিত আগ্রহভরা সুরে বলে, মশলা খানিকটা
পেলেত বেঁচে যাই, কৃপালানির্জী !••এখানকার বিলিতি খাবার
খেয়ে অরুচি ধরে গেছে, একটুখানি মুখশুদ্ধি হওয়া ত’ দরকার !
কৃপালানি বলেন, ঐ ত তােমাদের দোষ, বাবুর্জ ; তােমরা
বডড injpulsive, যেই আমি মশলার নাম উল্লেখ করলুম অনি
এমন করে তােমরা তার স্তুতিগান আরম্ভ করে দিলে যে কেউ
শুনলে মনে কবে এর অভাবে তােমাদের সারারাত ঘুম হচ্ছিল
!...অথচ, আমি জানি, এই মশলার কথা যাক্, দেশের কথাটি
একটিবারও তােমাদের মনে হয়নি।
বাের্শী কী যেন বলতে যাচ্ছিল, কৃপালানি বাধা দিয়ে বলেন,
আমি তােমাদের মন্দ বছি না, বাবুজী, এ হচ্ছে এই সমুদ্রের গুণ।
কী যে আছে এর মাঝে বলা শক্ত, কিন্তু এর হাতে পড়ে আমরা
যেন হয়ে যাই এর খেলনার মত, আমাদের মন, আমাদের প্রবৃত্তি,
আমাদের সমস্ত সত্ত্বাকে নিয়ে সমুদ্র ছিনিমিনি খেলে••• অনুভূতির
গভীরতা কমে যায়, তার প্রসারতা বেড়ে ওঠে•••
bobo
সাগর দোলায় ঢেউ
মােহিত কৃপালানির কথাগুলাের মধ্যে তার নিজের মনের
দেখতে পাচ্ছিল। এই নিরক্ষর ব্যবসাৰ্মীর
বিচারক্ষমতা ও চিন্তাশক্তি দেখে সে বিস্ময়ে আপ্লুত হয়ে
সুরের ছন্দ
উঠছিল।
যােশী বললে, কৃপালানির্জী, আমি দেশ-বিদেশ একটু আধটু
ঘুরেছি, নানাদেশের লােকের সংস্পর্শে আসার সৌভাগ্যও আমার
হয়েছে.. আমি দেখেছি আমাদের দেশের লােক যদি অবসর পায়
তবে যেমন ভাবতে পারে অনেক দেশের লােকই তেমন ভাবতে
পারেনা।
ঐখানেই।
কৃপালানি হেসে বললেন, ঐখানেই ত আমাদের মস্ত দোষ,
বাবুজী। ভাবতে আমরা জানি বেশ, ভাবুক বলে আমাদের
খ্যাতিও আছে যথেষ্ট। কিন্তু আমাদের শক্তির অবসান হয়
ভাবতে আমরা এতখানি পারি বলেই কাজ
করবার সময় যখন আসে তখন একেবারে গুলিয়ে যায়
স, কাজের বিশালতা আর জটিলতা দেখে আমাদের মন হয়ে
যায় বিকল ।
বলতে বলতে কৃপালানি তার পুটলী খুলে একটা শিশি বার
করে তার থেকে খানিকটা মশলা মােহিত আর বেশীর হাতে
দিলেন। অভ্যাসমত মােহিত আর যােশী তাকে ধন্যবাদ দিতে
যাচ্ছিল, কৃপালানি বাধা দিয়ে বলেন, বিলিতী সুরে ঐকথাটি
বলে আমার এই তুচ্ছ জিনিষটুকুর মর্যাদার হানি করােনা,
বাবুর্জী !•••সত্যি কথা বতে কি, বাবুজী, এদের অনেক কিছুই
সাগর দোলায় ঢেউ
আমার ভালাে লাগে, কেবল এই ছলে-অছিলায় ধন্যবাদ দেবার
বাড়াবাড়িটা ছাড়া!
এই কথা যদি কৃপালানির মুখ থেকে না বেরিয়ে ডাঃ বৰ্ম্মণ বা
চিদম্বরএর মুখ দিয়ে বেরুত তাহলে বােশীর সাথে তাদের একপ্রস্থ
খণ্ডযুদ্ধের অভিনয় হয়ে যেত, কিন্তু কী জানি কেন কৃপালানির
গভীরতা এবং সরলতার সামনে যােশীর মুখ দিয়ে কোন কথা
বেরু না।
মােহিত বলে, ধন্যবাদ দেওয়াটা আমিও পছন্দ কভুম না,
কৃপালানির্জী, কিন্তু এখানে এসে দেখতে পাচ্ছি জিনিষটা আগে "
যতটা শ্রুতিকটু ঠেকৃত আজকাল যেন আর তা মনে হয়না। এর
পেছনে যে সৌজন্যটুকু প্রচ্ছন্ন আছে তা আমাদের মনকে একটু
স্পর্শ করে বৈ কি!
কৃপালানি সায় দিয়ে বলেন, সে কি আমি বুঝিনা, বাবুর্জী ?
•••তবে ব্যাপারটা হচ্ছে এই যে আমাদের মধ্যে ওটার প্রয়ােজন
নিঃশেষ হয়ে গেছে। মুখের ভাষাতে আমাদের মধ্যে মনের
আদানপ্রদান হয়না, তার চেয়ে বড়াে আমাদের চোখের ভাষা,
আমাদের অঙ্গভঙ্গী গতিটুকুর তাৎপৰ্য •••
এনিধারা কথাবার্তায় কখন যে লাঞ্চের সময় হয়ে এল তা
দু’জনের কারােরই খেয়াল ছিলনা। হঠাৎ উপরে সতর্ককারী
ঘণ্টার শব্দে তারা একটু আত্মস্থ হয়ে উঠল। কৃপালানি বলেন,
আপনাদের সময় হলাে, বাবুজী:ঘড়ি বলছে, খিদের সময় হয়েছে,
খেতে এসাে•••
সাগর দোলায় ঢেউ
যােশী আর মােহিত উঠতে উঠতে বললে, আপনাকে মাঝে
মাঝে এরকম বিরক্ত করূতে আস্ব হয়ত, আপনি কিছু মনে
করবেন না যেন।
অভিবাদন করে কৃপালানি বলেন, বলাে কি বাবুজী ?
তােমরা এরকম মাঝে মাঝে আসলে যে কী আনন্দ পাই তা কী
করে বােঝাব? • তােমাদের তরুণ সরল মনের সংস্পর্শে এলে
বুঝতে পাই যে জরা আমায় এখনও এসে ধরেনি’!
ডাইনিংরূপে যেতে যেতে যােণী জিজ্ঞেস করলে, কৃপালানিকে
কেমন লাগল, মােহিত ?
উচ্ছসিত স্বরে মােহিত বলে, ভারী চমৎকার লােক, যােশী ।
আমাদের দেশের অর্ধশিক্ষিত অশিক্ষিত লােকদের মাঝেও যে
এমন সুষ্ঠু অথচ সরলমনা লােক আছে তা আমি জানতুম না।•••
দেশটাকে আজ নতুন করে ভালােবাসতে ইচ্ছা হচ্ছে কৃপালানির
মত লােককে জন্ম দিয়েছে বলে !
যােশী বলে, আমি ত এই পথে এবার নিয়ে চারবার
আনাগােনা করছি । প্রত্যেকবারই এই ডেপ্যাসেঞ্জারদের সাথে
পরিচিত হবার চেষ্টা করি, আর আশ্চর্যের বিষয় এই প্রত্যেকবারই
এদের মধ্যে এমন লােকের সাথে আলাপ হয় যে আমার মনে গভীর
একটা দাগ রেখে যায় !
মােহিত সায় দিয়ে বললে, তােমার কথা একটুও অবিশ্বাস
হচ্ছেনা, যােশী..কপালানিকে, যে ভাবে আবিষ্কার কলুম আমরা,
সাগর দোলায় ঢেউ
তাতে আমার মনে হয় আমাদের আশেপাশে অজ্ঞাত অবজ্ঞাত
অনেক কৃপালানি পড়ে আছে যাদের আমরা কোন খবরই রাখিনা
বা খোঁজ নেই না।
যােশী বলে, তাহলে ডোত্রীদের আস্তানাটা দেখতে যাওয়া
নেহাৎ ব্যর্থ হয়নি’?
গভীর সুরে মােহিত জবাব দিলে, পাগল !...
লাঞ্চের পর Sherlock Holmes টা খুলে নােহিত ঈজি-
চেয়ারে শুয়ে ঝিমুচ্ছিল। সকালবেলাতেও যে অবসাদ তার
তরুণ মনকে পীড়া দিচ্ছিল তা আস্তে আস্তে যেন কেটে যাচ্ছিল।
বেদনার বিরাট পুঞ্জীভূত একটা ইতিহাস যে ধীরে ধীরে গড়ে
উঠেছিল তা বাইরের নানা জিনিষের সংঘাতে আস্তে আস্তে হাল্কা
হয়ে আছিল—অল্প কয়েকদিনের অতীতকে সরিয়ে দিয়ে
অন্যরকমের একটা নিবিড় বৰ্তমান তার মধ্যে উকিঝুকি মারছিল।
••বন্ধুবর যােশী পাশেই বসে ছিল, সে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে মােহিতের মনের
লীলা বুঝবার চেষ্টা কছিল।
যােণী বলে, ফাষ্ট ক্লাশের দু’ একটা জিনিষ কিন্তু আজ সকালে
দেখা হ’ল না !
-কী ?
—সেখানকার জিন্যাসিয়াম আর সুইমিং বাথ•••
জিন্যাসিয়ামের সম্বন্ধে মােহিতের ধারণা থানিকটা ছিল,
কল্কাতার কলেজে সে জিমন্যাসিয়ামে মাঝে মাঝে ডন-বৈঠকও
৯২
সাগর দোলায় ঢেউ
করেছে। ধরে নিলে যে জাহাজের জিন্যাসিয়াও সেই গােছের
একটা জিনিষেরই ছােটখাট সংস্করণ হবে। সুইমিং বাথের সম্বন্ধে
কিন্তু তার ধারণার চেয়ে কল্পনাই ছিল বেশী, আমেরিক্যান
ফিল্এর কল্যাণে। কল্পনা যা ছিল তাতে সে খুব উৎসাহিত
বােধ কলে না, বলে, কী হবে আর ঐসব ছাইভস্ম দেখে ?...
তার চেয়ে না হয় কৃপালানির সাথে একটু গল্প করিগে..বেচারী
একলাটি পড়ে আছে।
যােশী বলে, সেখানে ত যাবই, তার আগে একটা অছিলায়
ফাষ্ট ক্লাশের এই দুটো জিনিষ দেখে নিতে পারলে মন্দ হত না ।
মােহিত জাত, সম্মতি আদায় করতে যােশী সিদ্ধহস্ত। কাজেই
সে আর কোন প্রতিবাদ করলেনা।
চা’এর পর যাবে স্থির হল। মােহিত আবার Sherlock
Holmes এ মনােনিবেশ করলে।
চা’এর ঘণ্টা যখন পড়ল তখন মােহিতের বই প্রায় শেষ হয়ে
এসেছে। এক নিংশ্বাসে গল্পগুলাে শেষ করে তার মনে ভারী
আনন্দ হচ্ছিল—যােশীকে দু'একটা জায়গা সে পড়িয়ে শােনাচ্ছিল।
মােহিতের মনের অবস্থা সাধারণ গতিতে ফিরে এসেছে দেখে
যােশীও একটু আশ্বস্ত বােধ কছিল, এবং ফাষ্ট ক্লাশ ডেকে একবার
শীলা রজার্স এর মুখােমুখি হয়ে সে মােহিতের মনের এই
প্রকৃতিস্থতাটা দৃঢ় করে তুলবে কিনা ভাবছিল।
চা’এর পর দুপুরবেলার প্রােগ্রাম মত তারা গেল ফাষ্টকাশ
সাগর দোলায় ঢেউ
জিন্যাসিয়াম আর সুইমিং বাথ দেখতে। জিন্যাসিয়াম ছিল
তখন খালি, মােহিত আর যােশী মহা উৎসাহে সেখানকার
সাজসরঞ্জাম নেড়ে চেড়ে পরীক্ষা করে দেখলে।কলের ঘােড়া
দেখে মােহিতের যা’ হাসি! বলে, সমুদ্রের বুকে বুঝি এম্নি
করে দুধের সাধ ঘােলে মেটাতে হয় ?
তারপর সুইমিং বাথ এর পালা। যােশী বলে, এবার হয়ত
কিছু রঙীন্ জিনিষ চোখে পড়বে।...মােহিত একটু বিরক্তিসূচক
জভঙ্গী করলে।
আসলে কিন্তু সেরকম রঙীন্ কিছুই চোখে পড়ল না। স্নানের
পালা আরম্ভ হয় সন্ধ্যার ঠিক আগে, তাই এখনও প্রার্থী।
নার্থিনী বড় কেউ ছিল না। মােহিত আর যাের্শী কাছেই একটি
রেলিংএর উপর ভর দিয়ে দাড়ালে।
মােহিত বললে, চল, এবার কৃপালানির কাছে যাই।
যােশী বাধা দিয়ে বলে, আর একটু অপেক্ষা করবেশ সুন্দর
বাতাস বইছে এখানে:
খানিকক্ষণ পর তারা যখন নীচের ডেকের দিকে রওনা দিবে
এমন সময় পথে একটা কাণ্ড ঘটে গেল যার জন্য পরে যােশীর
মনস্তাপের অবধিমাত্র ছিলনা।
সুইমিং ডেকের সিড়ি দিয়ে দু’জনে নাবছিল, মােহিত আগে
আর মাের্শী পেছনে। এমন সময় তারা দেখলে সিড়ির পায়ের
কাছে দাঁড়িয়ে একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে—দুজনেই সুইমিং
৯৪
সাগর দোলায় ঢেউ কষ্টিউম্ পরা। মেয়েটি আর কেউ নয়—শীলা রজাস। সুইমিং কষ্টিউম্ এর উপর একটা বাথ, গাউন জড়ানাে—নিতান্ত বেপরােয়া ভাবে কষ্টিউএর আঁটসাঁট বাঁধুনীতে তার দেহের প্রত্যেক রেখা যেন ফুটে উঠেছিল অগ্নিশিখার মত•••আর তার হটবার লীলায়িত ভঙ্গীটি মােহিতের মনে তাণ্ডবনৃত্য সুরু করে দিয়েছিল। সঙ্গের লােকটিকে মােহিত চিতে পারেনি’, কিন্তু যাের্শী দেখেই চিনেছিল—সে হচ্ছে কর্ণেল গ্রীণ। খুব হাসতে হাতে কর্ণেল গ্রীণ শীলার পাশাপাশি আছিলেন। শীলা আর কর্ণেল সিড়ি দিয়ে উঠতে যাবে এমন সময় লক্ষ্য করলে দুটি ছেলে সিড়ির আগায় দাড়িয়ে আছে—নামবার প্রতীক্ষায়। মােহিত পলকের জন্য থতমত খেয়ে গিয়েছিল, কিন্তু বাের্শী তার বাহুটি ধরে তাকে সিড়ির এপাশে টেনে আন্লে, আগন্তুক এবং তার সহচরীকে পথ ছেড়ে দেবার জন্যে। শীলা মােহিত এবং যােশীকে দেখে মুহুর্তের জন্য রাঙা হয়ে উঠেছিল হয়ত বা তার একবার ইচ্ছা হয়েছিল সাহসভরে সত্যকে সম্পূর্ণ করে স্বীকার করে নেয়। সিড়ি দিয়ে উঠবার আগে তাই সে একটু থমকে দাড়িয়ে গিয়েছিল। কর্ণেল গ্রীণ শীলার কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা লক্ষ্য করছিলেন। অবস্থাটা যে একটু অস্বাভাবিক এবং অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে সেটা তার তীক্ষ্ণ চোখ এড়ায়নি। ব্যাপারটাকে সহজ করে নেবার
সাগর দোলায় ঢেউ
জন্যে তিনি বলেন, দেরী হয়ে যাচ্ছে, মিস্ রজাস, চটপট
উঠে পড়াে•••
কর্নেলের কথায় শীলার চেতনা যেন ফিরে এল। দম্কা একটা
হাওয়ার মত সিড়ি দিয়ে উঠে সে সুইমিং বাথের দিকে ছুটে
পালালে। যােণী বা মােহিতকে একটা সম্ভাষণ করবার সাহস
পৰ্য্যন্ত তার হ’লনা ; অশান্ত মন নিয়ে সদ্যোজাত ঋণার গতিতে
সে অদৃশ্য হয়ে গেল।
কর্ণেল গ্রীণ অপেক্ষাকৃত শান্তভাবে সিড়ি দিয়ে উঠলেন।
যােশীকে দেখে সান্ধ্য-সম্ভাষণ জানালেন। যােশী অস্ফুটস্বরে তার
প্রতি-উত্তর করলে।
মােহিত এতক্ষণ যেন কাঠ হয়ে দাড়িয়েছিল। কর্ণেল গ্রীণ
দৃষ্টির বহিভূত হতেই সে দাতে দাত চেপে শীলার উদ্দেশে উচ্চারণ
করলে, স্বৈরিণি !•••
ডেপ্যাসেঞ্জারদের আস্তানায় যাবার সিড়ির সম্মুখে আসতেই
মােহিত হঠাৎ থমকে দাড়িয়ে বললে, তুমি একা যাও এখন, যােণী,
আমি একটু পরে আছি।
যােশী বুঝলে মােহিত খানিকক্ষণের জন্যে নিজের মধ্যে আশ্রয়
নিতে চায়। সে আর কোন আপত্তি না করে নীচে চলে গেল।
কৃপালানি তার আগের জায়গাটিতে ছিলেন না। তাঁর
ললাটাকম্বল পুৱাণ জায়গায়ই পড়ে ছিল, কিন্তু তিনি গিয়েছিলেন
জাহাজের সম্মুখভাগে। যােশী তাকে অতি সহজেই খুজে নিলে।
সাগর দোলায় ঢেউ
যােশীকে আসতে দেখে কৃপানালির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
একটা লােহার নঙ্গরের উপর চাদর ছড়িয়ে বসেছিলেন, বােশীকে
দেখে অভ্যর্থনা করে বললেন, আইয়ে বাবুজী...
যােশী বলে, বেশ জায়গাটি খুঁজে বার করে নিয়েছেন
কিন্তু!
হেসে কৃপালানি বললেন, আমাদের ত সৌখীন আরাম কেদারা
আর অর্কেষ্ট্রার গান জুটবেনা, বাবুজী, আমাদের কোন রকমে
টিকে থাকলেই হল! তবে ভগবানের দয়ার কণা থেকে আমরাও
বঞ্চিত হইনে-সমুদ্রের জল, ফুরফুরে হাওয়া আর আকাশের গায়ে
হােরিখেলার ছবি কারােরই একচেটে নয় বলে এই জায়গায় বসেও
তার আস্বাদ আমরা মাঝে মাঝে পাই।
জায়গাটা মােটেই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন নয়, এদিকে ওদিকে নঙ্গর,
লােহার শিকল, দড়িদড়া, অ্যালুমিনিয়ামের ডেকচি প্রভৃতি
ছড়ানাে...কিন্তু একটা বৈশিষ্ট্য ছিল সেখানে, সেখানকার গভীর
নীরবতা ভাঙ্গতে কোন লােকেরই সমাগম ছিল না! দূরে উপরে
কাষ্টক্লাশ ডেক থেকে হাসির লহরী ভেসে আসছিল বাতাসের
সাথে !
কৃপালানি একবার পিছন ফিরে তাকিয়ে বললেন, ওরা চোখের
উপর দূরবীণ লাগিয়ে মেঘ আর জলের বিশ্লেষণ করছে, বাবুজী, আর
আমি আমার শাদা চোখ দিয়ে দেখছি ঝাপসা একটা রেখা।
ওদের মনে কৌতূহল আছে প্রচুর, সময়ের দামও ওদের বেশী আর
আমি আমার নিরবচ্ছিন্ন অবসর নিয়ে মুহূর্তের পর মুহূর্ত কাটিয়ে
সাগর দোলায় ঢেউ
চলেছি একটি আকাশকুসুমের দিকে তাকিয়ে, বিশ্লেষণ করবার
উত্তেজনা আমার মনের ত্রিসীমানায়ও ঠাই পাচ্ছেনা।
যােশী চুপ করে শুনছিল কৃপালানির কথার স্রোতে বাধা
দিতে তার মােটেই ইচ্ছা হচ্ছিল না।
কৃপালানি প্রশ্ন করলেন, তােমার সেই বন্ধুটী কোথায় গেল,
বাবুজী ?
-ও আমার সাথেই আসছিল, হঠাৎ কী মনে হওয়ায় থম্কে
দাড়াল, বলে, একটুখানি পরে আসবে
একটুখানি চিন্তিতসুরে কৃপালানি বলেন, ছেলেমানুষী ভাবটা"
তােমার বন্ধুর মন থেকে এখনও যায়নি’ বাবুজী।•••ওঁর সর্বাঙ্গে
যেন একটা উচ্ছাস—এতদিন ছিল তা রুদ্ধ জাহাজে উঠে
বােধ হয় সাগরের বাতাস লেগে তা’ উঠেছে ফেনিল হয়ে।•••মনের
উপর যে কৃত্রিম একটা যবনিকা ছিল সেটা গেছে সরে, তার ভিতর
থেকে ফুটে উঠেছে তার কল্পপ্রবণতা, নয় কি বাবুর্জী ?
যােশী কৃপালানির চরিত্র বিশ্লেষণের ক্ষমতা দেখে অবাক হয়ে
গিয়েছিল, বললে, আপনি কী ভীষণ প্রাজ্ঞ, কৃপালানিজী!
হেসে কৃপালানি বলেন, পাগল !...আমি কতটুকুই বা
দেখিছি বা পড়েছি ?•••তােমাদের জ্ঞান আমাদের চেয়ে, কত
বেশী ।
গভীরসুরে যােশী বলে, অমন কথা বলবেন না, কৃপালানিজী!
•• আমার দুঃখ হচ্ছে শুধু এই ভেবে যে কেন এতদিন আপনাকে
খুজে বার করিনি..ক’টা দিন শুধু শুধু নষ্ট হয়ে গেছে!
সাগর দোলায় ঢেউ
যােশীর হাতের উপর একটা চাপড় মেরে কৃপালানি বলেন,
তুমিও ছেলেমানুষী আরম্ভ করলে, বাবুজী ! নতুনের মাধুৰ্য বড়
ভয়ানক—সেটা তােমায় পেয়ে বসেছে এখন!
কথাটা আংশিকভাবে হয়ত সত্যি, তবু যােশী প্রতিবাদ করে
বলে, কিন্তু এমন অনেক নতুনত্ব আছে যা কখনও পুরাণে
হয়না!
হেসে কৃপালানি বলেন, সেটা বিচার করবার সময় এখনও
আসেনি, বাবুজীপুরাণাে হবার মুহূর্ত যখন আসবে তখন সেটা
পরখ করে দেখাে।
কী একটা কথা মনে হওয়ায় যােশী প্রশ্ন করলে, আচ্ছা,
আপনার বয়স কত, কৃপালানির্জী ?
--আন্দাজ কর, দেখি...
-পঞ্চাশ ?
—আমাকে কি ততখানি বুড়াে দেখায়, বাবুজী ?
একটুখানি লজ্জিত হয়ে যােণী বলে, না, ঠিক নয়•••আপনার
বয়স পঁয়তাল্লিশ হবে বােধ হয়, নয় কি ?
হেসে কৃপালানি বলেন, হ’লনা, বাবুজী: আমার একটি
ধমকেই তুমি কক্ষভ্রষ্ট হয়ে গেলে !...আমার বয়স এখন পঁয়ষট্টি
ছাড়িয়ে গেছে:••দেশে আমার বড় ছেলে আছে, দোকান করছে,
তার বয়সই ত প্রায় পঁয়তাল্লিশ হতে চ!
সন্ত্রম এবং বিস্ময়ভরা চোখে ' যােশী বসলে, আপনি আমায়
কক্ষভ্রষ্ট করেছেন বলে আমার’একটুও লজ্জা হচ্ছে না, কৃপালানির্জী
সাগর দোলায় ঢেউ
• আমার চেয়ে অনেক বেশী অভিজ্ঞ লােককেও আপনি কক্ষচ্যুত
করতে পারেন।
এমন সময় হাসিমুখে মােহিত এসে হাজির হল। কৃপালানির
দিকে তাকিয়ে বলে, মনটা একটু বেপরােয়া হয়ে গিয়েছিল,
কৃপালানিজী, তাই খােলা বাতাসে সেটাকে সুস্থ করে
আনলুম..
কৃপালানি সস্নেহদৃষ্টিতে মােহিতের দিকে তাকিয়ে বলেন,
তােমার জন্য কেন। যেন আমার ভয়ানক ভয় হয়,
বাবুজী ! তােমাকে দেখলে আমার নাতিটার কথা মনে
পড়ে, সে তােমারই বয়সী হবে, কিংবা হয়ত তােমার চেয়ে
বছরখানেকের ছােট...তােমার মত অন্যমনস্ক কল্পনাপ্রবণ
মন তারও ••
মােহিত বলে, জানাইত, কৃপালানিজী, এ হচ্ছে বাতাসের
দোষ•••বাতাস যদি মনকে চঞ্চল করে দেয় তবে আমি আর কী
করতে পারি ?
তিরস্কারভরা কণ্ঠে কৃপালানি বলেন, এ আমি কখনই
মাতে রাজী নই, বাবুজীবাতাস বইবেই, সমুদ্রের দোলা গায়ে
এসে ত লাগবেই, তাই বলে কি তাতে মন এলিয়ে দিয়ে থাকাটা খুব
সমীচীন ?
মােহিতের তর্কের স্পৃহা চেপে উঠেছিল। কৃপালানির মনের
স্বচ্ছতা তাকে স্পর্শ করেছিল এবং সে বুঝতে পেরেছিল যে তর্ক যদি
১০০
সাগর দোলায় ঢেউ
সে করে তবুও কৃপালানির মনের ছড়িয়ে-পড়া আলাে তাতে একটুও
কবেনা। বলে, তুমি আগে থেকেই ধরে নিচ্ছ, কৃপালানিজী,
যে বাতাস এবং সমুদ্রের এই চঞ্চল করিয়ে-দেওয়া স্বভাবটা খারাপ,
অন্ততঃ কৃত্রিম—তাই তুমি উপদেশ দিচ্ছ, সাবধানে চলাে !•••আমি
যদি সেটা না মানি ?
রূপালিনি বলেন, তােমার ইঙ্গিত আমি বুঝতে পাছি,
বাবুজী, তােমার কথা যে একেবারে ভুল সেও আমি বলতে
পারিনে, কারণ যা স্বভাবজ তার সাথে আমার ঝগড়া কোনদিনই
'নেই। তবু আমার মনে হয় তুমি যখন আকাশ-বাতাসের
এই প্রকৃতি থেকে নিজকে মুক্ত করবার চেষ্টা করছ তখন এই
চেষ্টাটাই তােমার স্বভাব, চঞ্চল-হয়ে-যাওয়াটা তােমার স্বভাবের
বাইরে !
হেসে মােহিত বলে, কিন্তু এমনও ত’ হতে পারে যে আমার
স্বভাব হচ্ছে দুটো এবং তাতে সংঘাত লেগেছে আজ !..
তাদের সামঞ্জস্য করতে পাছি না বলেই নিজের খেয়ালমত
একটাকে বড় করে আর একটাকে নির্মুল কবার চেষ্টা
করছি!
সন্ধ্যার ছায়ায় মােহিত এবং যােশী যখন উপরে নিজেদের ডেকে
ফিরে এল তখন মােহিতের মন অনেকখানি প্রফুল্ল হয়ে উঠেছে।
সারাটা পথ সে যােশর সাথে কৃপালানির কথা আলােচনা
কছিল, কৃপালানির সাথে পরিচয় তার মৰ্ম্মের একটা
সাগর দোলায় ঢেউ
অধ্যায় খুলে দিয়েছিল। প্রকৃত সাহিত্যিকের অনুভূতি
নিয়ে এই অভিজ্ঞতাটুকু সে নানা রংএ রাঙিয়ে দেখছিল..মনে
এক অভূতপূর্ব অনুবেদনার সঞ্চার সে উপলব্ধি করতে
পাচ্ছিল...
১০২
সসামবার জাহাজ সুয়েজে যখন পৌছল তখন ভাের হয়ে গেছে। এর আগের সােমবারটিতে মােহিত দেশের মাটির কাছ থেকে বিদায় নিয়েছিল—এবার তার বিদায় নিতে হবে শুধু দেশ থেকে নয়, সমস্ত প্রাচ্যভূমির স্নেহ-আলিঙ্গনের বন্ধন থেকে।' অজানা দেশে সে চলেছে, কতদিনের জন্য কে জানে?...জলে ভাসা অবধি জাহাজের দোলানি থামেনি’, উত্থানপতনের বেগ মাঝে মাঝে মন্দীভূত হয়ে এসেছে, কিন্তু স্তব্ধ হয়নি। শীলার সাথে এ কয়দিন তার দেখা হয়নি। সেই যে সেদিন সুইমিংবাথের সিড়ির কাছে একটা খণ্ডদৃশ্যের অভিনয় হয়ে গেল তার পর সে যেন একেবারে চিরদিনের জন্য নেপথ্যে সরে গেল ভুলেও সে সেকেণ্ডক্লাশের সীমানায় আর পা দিল না। যােশীর এক একবার তীব্র ইচ্ছা হচ্ছিল শীল রজাসএর সাথে গিয়ে আলাপ করে, মােহিতের প্রতি তার ক্ষণিক উচ্ছ্বাসের বেগ কোথায় গেল প্রশ্ন করে। কিন্তু সে যে সেদিন তাদের না চিম্বার ভাণ করে সম্ভাষণটুকু পর্যন্ত করেনি’ তার অপমানবেদনা তার মনে ভীষণভাবে বেজেছিল। তারপর যখন সে দেখলে মােহিতের বিক্ষুব্ধ মনও শান্ত হয়ে এসেছে তখন সে ভাবলে, যা হয়ে গেছে তা নিয়ে আর বেশী ঘাঁটাঘাঁটি করে কী লাভ? ক্ষতকে নেড়ে চেড়ে তা’ নতুন করে দেওয়ায় ত কোন সার্থকতা নেই।
সাগর দোলায় ঢেউ ..বিক্ষুব্ধ চিত্ত যদি সত্যি সত্যিই শান্ত হয়ে গিয়ে থাকত তাহলে কোন কথাই ছিলনা, কিন্তু মােহিত নিজেই বুঝতে পাছিল না তার মন শান্ত হয়ে গেছে কি না। বাইরের সমতাতে ত আর অন্তরের সমতার পরীক্ষা হয়না, আর অন্তরের সমতা বিচার করবার মত শক্তিও বেন সে হারিয়ে ফেলেছিল !..সাগর দোলায় যে ঢেউ ওঠে তা কি শুধু জলের উপরেই খেলে, না তার অভ্যন্তরেও দোলানি লেগে একটা ফয়ুস্রোত বয় ? তবু সে নিজেকে বােঝাবার চেষ্টা করলে যে তার মনের মধ্যে কোন চাঞ্চল্য নেই। তাই যােণী যখন কৃপালানির কাছে প্রস্তাব করূলে যে তিনজনে একটা ট্যাক্সিভাড়া করে মিশরের পিরামিড আর Sphyx দেখে না আসাটা ভয়ানক একটা নির্বুদ্ধিতার কাজ হবে তখন সে গভীর উৎসাহে তাতে সম্মতি দিলে। কৃপালানি বলেন, বাবুজী, আমি মুখখু সুখখু মানুষ, তােমাদের বিদ্যা নিয়ে ত’ ওসব জিনিষ আমি দেখব না, আমি দেখব আমার সহজ বুদ্ধি নিয়ে। আমার সাধারণ চোখ দিয়ে দেখব একটা সভ্যতার বিকাশ যার আলাে বহু শতাব্দী আগে আমাদের দেশের মত আরেক দেশে ফুটে উঠেছিল।•••আর তােমাদের সংসর্গ এই বুড়াে বয়সে ভালাে লাগে দেখতেই পাচ্ছ লােভ সামলানাে দায়। সুয়েজ, থেকে পাের্ট সেড পর্যন্ত জাহাজ যেতে ঠিক আঠারাে ঘণ্টা লাগে। ঠিক হলাে, যােশী, মােহিত আর কৃপালানি তিনজনে ট্যাক্সি করে যাবে মরুভূমির ভিতর দিয়ে। প্রথম কায়রাে সহরটা দেখে সেখানে কোন একটা রেস্তরায় লাঞ্চ খেয়ে বিকালের দিকে ১০৪ সাগর দোলায় ঢেউ যাবে পিরামিড, আর Sphynx দেখতে••কায়াের উপকণ্ঠে। সেখান থেকে ট্রেনে করে তারা আবে পাের্ট সেডে, জাহাজ ধরূবে সেখানে। সুয়েজে জাহাজ ভিড় বার আগেই যােশী ষ্টুয়ার্ডকে গিয়ে তাদের প্রােগ্রাম জানালে। স্টুয়ার্ড বলে, ট্যাক্সি পেতে তাদের কোন অসুবিধা হবেনা, তারা যদি বড় একটা পার্টি করে তাহলে মােটর বারও বন্দোবস্ত করা যেতে পারে। মােহিত প্রশ্ন করূলে, পথে যদি কোন ব্রোউন্ হয় তাহলে কী উপায় হবে? ইয়ার্ড একটু হালে ; বলে, তার উপায় করবে ড্রাইভার•••আমাদের জাহাজ নির্দিষ্ট সময়টিতে পাের্ট সেড, ছাড়বেই। মােহিত ক্ষণেকের জন্য একটু উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল, ষ্টুয়ার্ড হেসে তাকে আশ্বাস দিয়ে বলে, ব্রোউন খুব কচিৎ হয়, আর যদিও বা হয় তার জন্যে কারাের.পাের্ট সেড়ে জাহাজ ধরাটা আটকে থাকেনা। কৃপালানি কথােপকথনের মর্ম শুনে বললেন, ব্রেকডাউন হলে কোনই ভয় নেই, বাবুজী...আমি কলকঞ্জার বিষয় একটু আধটু জানি•••আর যদি কপালে মিশরের ভাত লিখে থাকে তাহলে না হয় তার স্বাদটুকু নেওয়া যাবে • কী বল? ট্যাক্সি করে তারা রওনা হ’ল মরুভূমির মধ্য দিয়ে। কৃপালানির কাছে মরুভূমি নতুন জিনিষ কিছুই নয়, রাজপুতানা আর সিন্ধ,এ
সাগর দোলায় ঢেউ
এর খানিকটা আভাষ সে দেখেছে। যােণী আর মােহিত কিন্তু
দেখে ভয়ানক পুলকিত হয়ে উঠল।
একটা ছােটখাট ওয়েসিএর পাশ দিয়ে তারা যখন যাচ্ছে
তখন যােশী হঠাৎ বলে উঠলে, আজ অনেকগুলাে দল কিন্তু এপথ
দিয়ে যাবে, মােহিত•••আমাদের শীলা রজার্স এর সাথে যদি হঠাৎ
দেখা হয় তাহলে চমকে উঠো না কিন্তু•••
তাচ্ছিল্যভরা সুরে মােহিত জবাব দিলে, তুমিও যেমন!•• যেন
শীলা রজাসএর ভাবনায় আমার ঘুম হয়না ।
কৃপালানি এদের কথােপকথন শুছিলেন, একটু ঔৎসুক্যভরা
সুরে প্রশ্ন কলেন, শীলা রজার্সটী কে?
যােশী কিছু বদ্বার আগেই মােহিত বলে, একটি মেয়ে, পশ্চিম
দেশের type বললেও চলে..বিদ্যুৎ আছে যথেষ্ট, তার গুণগুলাে
তার মধ্যে পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান্..
কৃপালানি ঠিক বুঝতে না পেরে প্রশ্ন করলেন, তার মানে ?
-মানে আর কিছুই নয়—তিনি বিদ্যুতের মত একটুখানি
চমক দেখান মাঝে মাঝে, ভাবেন তার ঝলকে সবাই উদ্ভাসিত হয়ে
যাবে ! কিন্তু তার ক্ষণিক ঝলকের ফল হয় এই যে মুহূর্তের
আলাের পর সবই হয়ে আসে অন্ধকার। যারা উদ্ভাসিত হন
তাঁদের চোখে তার ছবি কতক্ষণ থাকে জানা যায়নি, তবে অনেকের
মধ্যে তা স্থায়ী হয়না একথা আমি শুনেছি।
মােহিতের কথার ঝঝ দেখে যােশী একটু হাসলে। কৃপালানি
গম্ভীর ভাবে চুপ করে রইলেন।
সাগর দোলায় ঢেউ কায়রাের দর্শনীয় জায়গাগুলাে দেখে তারা ট্যাক্সিওয়ালাকে বললে, একটা মিশরীয় কোন রেস্তোঁরায় নিয়ে যেতে। প্রস্তাবটা এল কৃপালানির কাছ থেকে। বলেন, যে দেশের এত সব প্রাসাদ, দুর্গ আর মজিদ দেখলুম সেখানকার আহার আর পানীয় কেমন দেখা যাক। কায়রাে বাজারের বিসর্পগতি গলিগুলাের মধ্য দিয়া একে- বেঁকে typical একটা মিশরীর রেস্তরায় গিয়ে তারা উপস্থিত হল। যােশী একটু আধটু ফরাসী জান্ত, সে menu বাছ বার ভার নিলে। রিচিত্র মিশরীয় পােষাকপরিহিত ওয়েটার এসে জানালে যে খাবার তৈরী হতে প্রায় আধঘণ্টা দেরী হবে। যােশী ভয়ানক বিরক্ত হয়ে বলে, এরাও কি আমাদের দেশেরই মত ? সামান্য খাবার তৈরী হতে লাগবে একযুগ ? কৃপালানি সান্ত্বনার সুরে বলেন, রাগ করােনা, বাবুজী, পূর্ব- দেশের আবহাওয়ার শেষ ত এখানেই, সেটুকু না হয় প্রসন্ন মনে মেনে নাও! তারপর যখন উদ্দাম গতির ঘূর্ণিপাকের মধ্যে পড়বে তখন এই আলস্যভরা গতিহীনতার অভাব অনুভব করে হয়ত মনে দুঃখও পাবে ! মােহিত বাইরে জনপ্রবাহ এবং তার কোলাহল লক্ষ্য করছিল । খাবার তৈরী হতে দেরী হবে শুনে সে প্রস্তাব করলে যে ইতিমধ্যে মিশরের বাজারের মধ্যে একবার ঘুরে আসা যেতে পারে। তারপর একটুখানি আরক্তমুখে সে বলে, তাছাড়া এদের মেয়েদের ১০৭ সাগর দোলায় ঢেউ অবগুণ্ঠনের ফাক দিয়ে কালাে চোখের যা’ চাউনী দেখছি তাতে আমার মনটা চঞ্চল হয়ে উঠছে সেটা আমি অসঙ্কোচে স্বীকার কছি। যােশী আর কৃপালানি কিন্তু তখনই সেখান থেকে উঠতে রাজী হ’লনা। বলে, মিশরসুন্দরীদের কটাক্ষ আর মিশরসুন্দরদের বাজার ত এখনই শেষ হয়ে যাচ্ছে না ; ফেরবার পথে সে সব ভালাে করে দেখা যাবে। মােহিতের চুপ করে বসে থাকতে ইচ্ছা কছিল না। সে কিছুক্ষণ পরে উঠে বলে, আমি একটু ঘুরে আসি বােশী •••আধ- ঘণ্টা শেষ হবার আগেই ফিরে আধ অবশ্যি ! যােশী এবং কৃপালানি বলে, দেখাে, পথ হারিয়ে যেয়ােনা কিন্তু এখানকার সুন্দরীদের ছেলে ভুলাবার সুনাম আছে মােহিত••• মােহিত হেসে বললে, যদি পথ হারিয়েই যাই তাহলে পিরা- মিডের মরুর সম্মুখে দেখা হবে অবশ্যই। কথাটা সে বলেছিল উপহাসের সুরেই...সেটা যে সত্যি সত্যি ঘটবে তা সে ভাবেনি। রেস্তরা থেকে বেরিয়ে মােহিত সােজা স্বা-দিকে চলে গেল। খানিক দূরে গিয়েই প্রকাণ্ড বাজার, তার গােলক ধাঁধার মধ্যে সােজা ঢুকে পড়লে সে, কোন রকম অগ্র-পশ্চাৎ বিবেচনা না করেই! ১০৮
সাগর দোলায় ঢেউ
একটা দোকানের সাে-কেএর বাইরে সে মিশরের গৃহশিল্পের
অর্ঘ্যসম্ভার মুগ্ধনেত্রে নিরীক্ষণ কছিল এমন সময় ভেতর হতে
একজন লােক এসে পরিষ্কার ইংরেজীতে তাকে বললে, দয়া করে
একবার ভেতরে আবেন কি? আপনার ভালাে-লাগতে পারে
এমন দু একটা জিনিষ আপনাকে দেখাতে পারি...
প্রথমে মােহিত ভালে যে দোকানের ভেতর ঢুকূলেই অসম্ভব
রকম দেরী হয়ে যাবে, ওদিকে রেস্তরায় হয়ত খাবার সম্মুখে নিয়ে
যােশী আর কৃপালানি বসে থাক্বে। কিন্তু কতকটা নিজের
কৌতুহলে, কতকটা দোকানদারের আগ্রহে সে ভেতরে ঢুকে গেল।
দোধনি ত ছােটখাট নানা জিনিষ তার সম্মুখে খুলে বলে।
মােহিত প্রশংসমান চোখে সে সব পরীক্ষা কছিল এবং মনে মনে
ভাবছিল সুভেনিয় স্বরূপ ছােট একটা কিছু কিনে নিয়ে যাবে
কিনা, এমন সময় সে ভয়ানক ভাবে চমকে উঠলে তার বাঁ-পাশে
একটি মেয়ে-কণ্ঠে অভিনন্দন শুনে কেমন আছ, মােহিত ?
পাশ ফিরে দেখলে, শীলা রজাস...একা •
মুহূর্তের মধ্যে মােহিতের মনের এতদিনকার রুদ্ধ আবেগ হাল্কা
হয়ে গেল-আর-সমস্ত কিছু সরিয়ে দিয়ে অত্যন্ত নিকটের একটা
নিবিড় বৰ্তমান ওর মৰ্ম্মের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে ঝঙ্কার ফুটিয়ে তুলে।
একটা অস্বাভাবিক এবং অসাময়িক ঘুম থেকে যেন সে জেগে
উঠলে নিজের মনের মুখােমুখি হয়ে সে দাড়ালে।
কী যে বলবে মােহিত প্রথমে ঠিক করে উঠতে পালে না।
শীলা বােধ হয় তার মনের অবস্থা বুঝতে পেরেছিল, তাই প্রথম
সাগর দোলায় ঢেউ প্রশ্নেধ উত্তরের অপেক্ষা আর না করে সে আবার প্রশ্ন করূলে, সুভেনিয়রের খোঁজে আছ বুঝি ? এবার মােহিত কথা বলার মত ভাষা খুঁজে পেলে, অৰ্দ্ধস্ফুট কণ্ঠে বলে, হ্যা...এতগুলাে জিনিষ সম্মুখে ফেলে দিয়েছে, এর কোষ্টা যে নেব ঠিক করতে পাছিনা... শীলা ডানদিকে একটু ঝুকে জিনিষগুলাে গভীর উৎসাহের সহিত পরীক্ষা করূতে আরম্ভ কলে। সিগারেটের 'নল, সিগা- রেটের কে, কলম, ছুরী, প্রবালের এবং কাচের মালা, পাউডার- বক্স, আয়না, মেয়েদের ভ্যানিটি-ব্যাগ, রং-বেরংএর পাথরের cube, টাই, মােজা—অসংখ্য এবং অগুণতি, সবগুলাের মধ্যেই মিশরের কোন বিশেষ ঐতিহাসিক বা প্রত্নতাত্ত্বিক ছাপ... শীলা হেসে বলে, আমার পছন্দ কি তােমার মনে ধরূবে ? -কেন ধরূবে না ? —তাহলে এইটি নাও।•••বলে সে ফ্রেমে বাঁধানাে ঘােট্ট একটি পিরামিড আর sphynxএর ছবি তুলে ধরূলে।...মিশরীয় এক আর্টিষ্ট এর আঁকা, মরুভূমির আকাশ হয়ে এসেছে কালাে, বাতাসে ধরেছে গুমােট...যেন প্রলয়ের আবাহন আর তারি মাঝখানে sphynxএর ভ্রুকুটি-কুটিল মূৰ্ত্তি পথ আগলে বসে আছে বিশ্বস্ত প্রতিহারীর মত-মিশর-সম্রাটদের সমাধিগুলাে আগলে ! ছবিটি মােহিতের খুবই পছন্দ হ’ল । সে দাম জিজ্ঞেস্ করূতে যাচ্ছিল, এমন সময় শীলা তাকে বাধা দিয়ে বলে, এবার ১১?
সাগর দোলায় ঢেউ
তােমার পালা, মােহিত"তুমি আমার জন্যে একটা সুভেনিয়র
বেছে দেও দেখি...
মােহিত ভয়ানক মুস্কিলে পড়লে, বলে, কিন্তু তােমার কোষ্টা
পছন্দ-অপছন্দ হবে তা যে আমি জানিনে ..
যেন ভয়ানক ছেলেমানুষের মত মােহিত প্রতিবাদটা করেছে
এনি একটা ভাব দেখিয়ে শীলা বলে, বাঃ রে ! আমি তােমার
সুভেনিয় পছন্দ করলুম কী করে?
সত্যিই ত ! এর জবাব দিবার কিছু মােহিতের ছিল না।
সে নতশিরে জিনিষগুলাে নাড়াচাড়া করে একটুখানি ইতস্ততঃ
করে ছোউ একটা পাউডার-বক্স এগিয়ে ধরূলে। তার ঢানার
উপর প্রাগৈতিহাসিক যুগের ছবিওয়ালা ভাষায় লেখা দুটো লাইন,
আর নাই নদের ছবি—সবটা এনামেলের কাজ করা।
শীলা প্রস্তাব করলে যে মােহিতের ছবিটির দাম দিবে সে, আর
মােহিত দেবে তার পাউডার-বক্সটির দাম। মােহিত তার প্রস্তাবে
অবাক হয়ে প্রশ্ন করূলে, কেন?
-একটুখানি খুসীর কাছে আত্মসমর্পণ এ...
মােহিত আর কোন আপত্তি করলে না।
দাম চুকিয়ে দিয়ে দু’জনে দোকান থেকে বেরিয়ে তখন এল
তখন মােহিতের মনে পড়ল বােশী আর কৃপালানি তার অপেক্ষায়
হয়ত রেস্তরায় বসে আছে। তাড়াতাড়ি ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে
দেখলে দোকানের হাওয়ায় এবং শীলার সংসর্গে কখন যে একটি
ঘণ্টা কেটে গেছে সে টেরও পায়নি।
১১১
সাগর দোলায় ঢেউ
* * *
শেশব্যস্তে সে বলে, আমায় এখ, খুনি যেতে হবে, শীলা,
যােণী আর আর একটি বন্ধু আমার জন্যে এক রেস্তরায় বসে
আছে••
শীলা বললে, রেস্তরায় ? কোথায় সেটা ?
-এই বাজারের বাইরেই—একটা মিশরীয় রেস্তরা
-বাজারের বাইরেই ত ? একটা জুয়েলারের দোকানের
পাশে? আমার ট্যাক্সিও সেখানে দাড়িয়ে আছে, চল..
—তুমিও কি সেখানেই যাচ্ছ, শীলা ?
-হঁা, তােমার আপত্তি নেই ত ?
মােহিত একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললে, না, না, আপত্তির কথা
বছি•••তােমার সঙ্গীসাথীরা সব কোথায় ?
ভারী চমৎকার একটি হাসি হেসে শীলা জবাব দিলে, আজ
আমি সঙ্গীসাথীর বন্ধন এড়িয়ে বেরিয়ে পড়েছি, মােহিত...
মরুভূমির মাঝ থেকে একটি সহচর খুজে নিতে, বেদুইন বা
fellahin যেই হােক্ সে
বাজারের গােলকধাঁধার মধ্য দিয়ে শীলা রজাস যখন তাকে
জুয়েলারের দোকানের পাশে এক মিশরীয় রেস্তরার সানে এনে
হাজির করলে তখন মােহিত দেখলে বােশী আর কৃপালানি যেখানে
ছিল এ সে নয়।•••কায়রাের বাজারের সামনে জুয়েলারের
দোকানের পাশে যে এত মিশরীয় রেস্তরা রয়েছে তা কে জান্ত?
সে শীলাকে জানালে যে সে ভুল জায়গায় এসেছে।
১১২
সাগর দোলায় ঢেউ তাই ত, এখন কী করা যায় ? ট্যাক্সিওয়ালাকে মােহিত প্রশ্ন করলে। ট্যাক্সিওয়ালা বলে বাজারের আশেপাশে এরকম অন্ততঃ পঞ্চাশটা রেস্তরা আছে, রাস্তার নাম না জালে খুজে বার করা মুস্কিল। মােহিত রাস্তার নাম মুখস্থ করে রাখেনি’, সে অসহায় ভাবে শীলা রজাসএর দিকে তাকালে। শীলা চিন্তিতসুরে বলে, আমারই অন্যায় হয়ে গেল, মােহিত.. তােমার বন্ধুরা ভাববো কী ? মােহিত বললে, এস, একটু খোঁজা যাক্, যদি ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকে তাহলে দেখা মিলেও যেতে পারে ত ! ট্যাক্সিওয়ালা তাদের নির্দেশমত এদিক ওদিক প্রায় আধ- ঘণ্টাখানেক ঘুরলে, কিন্তু মােহিতের পরিচিত রেস্তরার সন্ধান আর মিল না। ঘুণাক্ষরেও মােহিতের মনেই হ'লনা যে তারা খুঁজছে সম্পূর্ণ উল্টো দিকে, যাের্শী আর কৃপালানি বসে আছে বাজারের অপর সীমান্তে। শীলা বললে, তাহলে কী করবে, মােহিত ? মােহিত বর্তমানের স্রোতে সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করে বলে, কী আর করব ?•••ওরা ত পিরামিড় দেখতে যাচ্ছেই.•• আমিও একটা ট্যাক্সি নিয়ে সেখানে চলে যাই—দেখা সেখানে নিশ্চয় মিলবে শীলা একটুখানি সঙ্কোচের সহিত বলে, আমার সাথে আস্ত তােমার আপত্তি আছে, মােহিত? আমিও ত সেখানে বাব: একটুখানি ভেবে মােহিত বলে, আপত্তি থাকলেও আপত্তি ১১৩ ৮
সাগর দোলায় ঢেউ
কনা, শীলা। যার উপর হাত নেই সেই ভবিতব্য বলে পদার্থ টা
যখন আমায় এমন ঘােরাচ্ছে তখন তার সাথে সন্ধি করাই
ভালাে:
শীলা প্রস্তাব করলে, তাহলে কোথাও খেয়ে নেই, কী বল ?•••
তােমার খিদে পেয়েছে নিশ্চয়...
খিদে ত বেশ পেয়েছে, শীলা, তবে খুব বেশী দেরী করা
উচিত হবেনা, ওদের সাথে দেখা হওয়া চাইই কিন্তু...নইলে বিষম
একটা গােলমাল হয়ে যাবে !
-বেশী দেরী হবেনা, মােহিত। আর, তােমার বন্ধুরা কি
রােটা একটু না পড়লে সেই মরুভূমির মাঝখানে যাবেন?•••
শুনেছি সেখানে আশে পাশে এক বিন্দুও জল নাকি নেই, সব
ওয়েসিস্ শুকিয়ে গেছে বালুর ঝড়ে
কথাটা সঙ্গত। পাের্ট সেডে পৌছবার ট্রেন ত’ ছাড়বে
সন্ধ্যায়•••এত শীগগীর করে তারা নিশ্চয়ই পিরামিড় দেখতে
যাবেনা ইয়ত বা বাজারের মধ্যে তার জন্যে একটু ঘােরাফেরাও
করবে !
রেস্তরায় বসে মােহিত অবাক হয়ে ভাবছিল কী করে এমন
আচমকা দেখার পরও তার আর শীলার কথাবার্তা এত সহজ এবং
স্বাভাবিক হয়ে এল। যেন কিছুই হয়নি’: দুজন বন্ধু যেন
অপরিচিত কোলাহলের মাঝখানে পরস্পরের সুর চিনতে পেরে
নিজেদের নিগূঢ় বন্ধনটি নিবিড় করে নিয়েছে !
১১৪
সাগর দোলায় ঢেউ
হঠাৎ শীলা রজাস প্রশ্ন করুলে, তুমি আমার উপর ভয়ানক
রাগ করেছিলে মােহিত, নয় কি?
স্বপ্লেখিতের মত তাজড়িতসুরে মােহিত বলে, ভয়ানক
করেছিলুম কি না বলতে পারিনা, শীলা, তবে একটু করেছিলুম
এবং সেটা বােধ হয় রাগ নয়-বেদনা-মেশানাে অভিমান:..
খুবই খােলাখুলিভাবে মােহিত নিজের মনটি শীলার সম্মুখে তুলে
ধরূলে। এরকম করে তুলে ধরূতে আর কেউই বােধ হয় পায়ুতনা,
অন্ততঃ সাহস হতনা অনেকেরই।•••শীলা গভীরসুরে বললে,
অভিমান কখন হয়, জানাে ?
—জানি•••
ছােট্ট একটি উত্তর। এর মধ্যে না আছে উচ্ছাস, না আছে
দীপ্তি। কিন্তু অনুভূতির গভীরতার রঙীন্ আলােয় ছােট্ট কথাটি
ঠিকরে যেন স্নেহ ঝরে পড়ছিল।
শীলা তার সদ্য-কেনা পাউডার-বক্সটি নিয়ে নাড়াচাড়া কতে
করতে বলে, তােমার এই উপহারটি আমার কাছে চির-অমূল্য
হয়ে থাকবে, মােহিত ••
মােহিত কোন জবাব দিলে না।
শীলা বলতে লাগলে, জানি তুমি আমার সম্বন্ধে অনেক কিছুই
ভেবেছ। সেসব প্রতিবাদ করবার মত শক্তি বা সাহস আমার
নেই। তবে একটি অনুরােধ, সে সব আজকের কয়েকটি ঘণ্টার
মত ভুলে যাও..হঠাৎ-পাওয়া এমন অবসরটুকু নিৰ্ম্মল এবং ক্লেদহীন
করে তােলে।
১১৫
সাগর দোলায় ঢেউ
৫
মােহিত বলে, তােমার উপর খানিকটা শ্রদ্ধা এবং প্রীতি যদি
অটুট না থাত, শীলা, তবে অভিমানের রেখাটুকু পর্যন্ত আমার
মনে স্থান পেতনা, এটা ভুলে যাচ্ছ কেন ?
শালার মুখ দীপ্ত হয়ে উঠল।
লাঞ্চের পর ট্যাক্সি করে তারা পিরামিড, অভিমুখে রওনা হল।
ট্যাক্সিওয়ালা তাদের নির্দেশমত নাইলের পাশ দিয়ে গাড়ী চালিয়ে
নিয়ে গেল। নয়নাভিরাম ঘনসবুজ গাছের শ্রেণী দুধারে, পাশে
নাইলের স্রোত বয়ে চলেছে।
শীলা মুগ্ধভাবে বলে, কী সুন্দর!
মােহিত বলে, এদেশের লােকে নাইকে দেবতার মত পূজো
করে--এর জল হচ্ছে চাষীদের প্রাণ, এর গভীরতা আছে বাণিজ্যের
ট্যাক্সি নাইলের উপর বিশাল ব্রিজ, অতিক্রম করে চল
পিরামিডের দিকে-মরুভূমির পথে। মােহিত বলে, বেজায়
গরম লাগছে না ?
–হ্যা,এদেশে যদি এই নাইল না থাকত তাহলে এদের কী
অবস্থা হত।
মরুভূমির মধ্য দিয়ে ট্যাক্সি চলেছে। হঠাৎ ট্যাক্সিওয়ালা বলে
উঠলে, ঐ দেখুন, বা-দিকে একটা জলের রেখা বলে মনে হচ্ছে,
ওখানে আসলে কিন্তু বালুও হচ্ছে inirage !
Mirage! মরীচিকা !–ছেলেবেলায় ভূগােলে এর সংজ্ঞা
১১৬
সাগর দোলায় ঢেউ
পড়েছে, কল্পনার চোখে তখন কত কী ছবিই না একেছে ।••
এই সেই!
শীল প্রশ্ন কলে, সত্যিই ওখানে জল নেই, মােহিত ?...আমি
যে দিব্যি দেখতে পাচ্ছি জলের উপর ঢেউএর রেখা !
মােহিত হেসে বলে, তােমার দিব্যচক্ষুও যে নির্ভুল নয় তার
প্রমাণ হচ্ছে এখানেই...
—তুমি আমায় খোঁচা দিতে পালে খুব খুসী হও, না মােহিত ?
শীলা মােহিতের দিকে তাকিয়ে এই প্রশ্নটি কলে।
মােহিত একটু সন্ত্রস্ত হয়ে বলে, এই দেখ—আবার অভিমান
হ’ল !..যাই বল, শীলা, তােমাদের মনের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া ভার।
মুখ হাসিতে উদ্ভাসিত করে তার হাতের পকেট গাইড বুকটা
মােহিতের কোলের উপর ফেলে দিয়ে শীলা বলে, এখনও বলবে
অভিমান করেছি ?
৩
ট্যাক্সি যখন পিরামিডের সম্মুখে রাস্তায় এসে দাড়াল তখন
একপাল গাইড, শীলা আর মােহিতকে হেঁকে ধলে। শীলা আর
মােহিত গম্ভীরভাবে ঘাড় নেড়ে তাদের এড়িয়ে এগিয়ে চলে যেন
তাদের ভাষা কিছুই বুঝতে পারছেনা ! একটা গাইড কিন্তু
নাছােড়বান্দা, সে ইংরেজী, ফরাসী, জাৰ্মাণ, ইটালীয়ান, ডাচ,
স্প্যানিশ, অ্যারেবি সব ক’টা ভাষায় প্রশ্ন করেও যখন কোন
জবাব পেলেনা তখন তার শেষ অস্ত্র ছাড়লে মুখ এবং হাতের
ভঙ্গী দিয়ে ভাবপ্রকাশ। মােহিত ভয়ানকভাবে খুসী হয়ে
১১৭
সাগর দোলায় ঢেউ
লােকটাকে বকশিস দিয়ে বিদায় করলে, বলে, এর পরও যদি
আমরা বলি যে ওর ভাষা বুঝতে পারিনি তাহলে • ভয়ানক
ভণ্ডামি করা হবে ।
রােদ যদিও তখন পড়ে এসেছে তবু মরুভূমির বালু একেবারে
তেতে রয়েছে, কিন্তু পিরামিড় দেখবার উৎসাহ দু’জনেরই এত
প্রবল যে সব অগ্রাহ্য করে তারা এগিয়ে গেল।
Sphynxএর সম্মুখে এসে শীলা মুগ্ধনেত্রে দাড়িয়ে রইলে।
মােহিত বলে, এই যে Sphynx দেখছ এ হচ্ছে এখানকার
প্রহরী•••শান্তিসুপ্ত আত্মাদের বিশ্রামে যাতে কেউ বিঘ্ন না ঘটায়
তারই জন্য এর স্থাপনা:
শীলা প্রশ্ন করলে, তুমি এসব বিশ্বাস কর, মােহিত ?
—আমি যে দেশের মানুষ, শীলা, সেদেশে লােকে এরকম
অনেক জিনিষই বিশ্বাস করে...
—আমি লােকের কথা জিজ্ঞেস্ করছিনা, মােহিত, তােমার
কথা জিজ্ঞেস্ কছি•••
-বিশ্বাস করি কি না জানিনে, তবে যারা সত্যি বিশ্বাস করে
তাদের অন্তরের গভীরতার কাছে আমার শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করতে আমি
একটুও ইতস্ততঃ করিনে।
বড় পিরামিডের সম্মুখে এসে মােহিত প্রস্তাব কলে যে সে
ভেতরে ঢুকবে-তার অভ্যন্তরে রাজা এবং রাণীর ঘরগুলাে দেখে
আবে:
উঠ বার পথ আছে, মােহিত ? •
১১৮
সাগর দোলায় ঢেউ
-গাইড বুক ত বছে, আছে..তবে একটুখানি কষ্ট হবে
তােমা...
-তুমি যাচ্ছ ত?
-“হা.••
-তাহলে আমিও যাব ! তুমি কি মনে কর আমার সাহস
তােমার চেয়ে কম ? তাছাড়া দরকার হলে তুমি সাহায্য করতে
পাবে ত ?-
সঙ্কীর্ণ সিড়ির উপর দিয়ে প্রায় হামাগুড়ি কাটতে কাটতে
উভয়ে রাজা এবং রাণীর ঘর দুটিতে প্রবেশ করলে। মােহিত
শীলার হাত ধরে তাকে প্রায় টানতে টানতে নিয়ে উঠল। ঘরে
এসে শীলা নিঃশ্বাস ফেলে বলে, মাগাে! কী যে সখ তােমার ?
স্তব্ধ গাম্ভীর্যে ভরা ঘর।•••কবে কত সহস্র বর্য আগে মানুষ
তৈরী করে রেখে গিয়েছে—দেয়ালের গায়ে তার রেখা এখনও
বৰ্তমান! মােহিত বললে, জানাে, এই ঘর যখন প্রথম আবিষ্কার
হ’ল তখন এর মেঝেতে লােকে ছয় হাজার বছর আগেকার পায়ের
দাগ দেথতে পেয়েছিল—আর তা দেখে প্রথম আবিষ্কারক আনন্দে
মূচ্ছা গিয়েছিলেন।
—সত্যি ?...শীলা বলে।
তার মন কিন্তু তখন মােহিতের কথার দিকে ছিলনা।
মনের
দুঃসহ আবেগ ফেটে বেরিয়ে পড়তে চাচ্ছিল সহস্রধারায় আজ
সমস্ত পৃথিবীর বাইরে এই অর্জ-আলােকিত কক্ষাভ্যন্তরে যেন সে
দেখতে পাচ্ছিল নিজের আসল ছবিটি। তার সমস্ত সত্ত্বা লুপ্ত
১১৯
সাগর দোলায় ঢেউ
হয়ে যেন একটি অনুবেদনার শিখায় রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিল, এ
যেন এক নতুন 'আরম্ভ, এর শেষ যে কোনদিন আবে " তার
চিন্তার গণ্ডীরেখার মধ্যে আছিল না।
শীলা বলে, আজ যদি তােমার সাথে এমন আচম্কা দেখা
হ’ত মােহিত, তাহলে তুমি আমার সম্বন্ধে কত বিশ্রী ধারণাই
পােষণ করতে !
সহানুভূতিভরা কণ্ঠে মােহিত জবাব দিলে, আর তা মনে
হয়না, শীলা..তােমার সম্বন্ধে অনেক কিছু খারাপ ভাববার চেষ্টা
করেছি, কিন্তু সেসব ধারণা মরীচিকার মতই গেছে মিলিয়ে।•••
কী জানি কে, পেছনের অন্ধকারের উপর আলাের ছবিটাই জ্বলে
উঠেছে তীব্রভাবে
খুব মৃদুকণ্ঠে শীলা বলে, সে তােমার মহানুভবতা, মােহিত ••
একটুখানি ইতস্ততঃ করে গভীর স্নেহভরে শীলার হাত দুখানি
নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে তাতে একটুখানি চাপ দিয়ে মােহিত
বলে, আমার মহানুভবতা নয়, শীলা: তােমার প্রাণের তরঙ্গধ্বনি
এর জন্যে দায়ী:-এর উত্থান-পতনের মধ্যে কী রহস্য লুকানাে
রয়েছে তা আমি জানিনা, তবে তার যে ছন্দটুকু কানে শুতে
পাই মাঝে মাঝে—•••
বাধ্যদিয়ে হঠাৎ শীল। প্রশ্ন করলে, আমরা ত এখন সাগরের
বুকে দাড়িয়ে নই, মােহিত, নয় কি?
-না•••
তুমি কি মনে কর যে আমাদের মনের এই জানাজানিটুকু
১২০
সাগর দোলায় ঢেউ
.
সম্ভব হয়েছে এই সাগরদোলায় শুধু, মােহিত ? না, এছাড়াও বড়
সত্য এরূপেছনে আছে ?
একটুখানি চিন্তিতসুরে মােহিত বলে, ভেবে দেখিনি’, শীলা•••
এর জবাব দেব পরে•••
শীলা আর কিছু বলেন, ছােট্ট একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে
চুপ করে রইলে।
বাইরে এসে মােহিত বলে, তাইত, ঘাের্শীদের দেখা যে পেলাম
না ! কী করি বলত, শীলা !
-ওরা কি তাহলে পিরামিড, দেখতে আসেনি’?
-আসা ত’ উচিত ছিল। এত শীগগীরই দেখে চলে গেল,
আমারই খোঁজে কোথাও গিয়েছে কিছুই বুঝতে পারছিনা যে !
পিরামিডের নিকটেই ছােট্ট একটি কাফেতে বলে তারা লেবুর
রস খাচ্ছিল এমন সময় মােহিত প্রশ্ন করলে, আজ তুমি হঠাৎ এক।
চলে এলে কেন, শীলা ?
একটুখানি দুষ্টামিভরা হাসি হেসে শীলা বলে, তােমার
খোঁজে...
–না, সত্যি, ঠাট্টা নয়,বলনা:••
—সত্যি বব ?
বল:
—কেন যেন আজ সকাল থেকেই আমার মনে হচ্ছিল যে
একটু মুক্তির হাওয়া আমার পক্ষে ভয়ানকভাবে দরকার। মিস
১২১
সাগর দোলায় ঢেউ
হিত আর কর্ণেল গ্রীণএর সংসর্গে আমি হাঁপিয়ে উঠেছিলুম,
মােহিত •|•••ওর যেন ঘন অন্ধকারের প্রতীক, আমার মনের
নানারংএর পাপড়ীগুলাে ওদের ছায়ায় বদ্ধ হয়ে আছিল এবং
রুত্ব আবেগে সেগুলাে যেন গুরে গুরে উঠছিল। তুমি আমার
অবস্থাটা বিবেচনা করে আমায় ক্ষমা করাে, মােহিত...
আজ্রকণ্ঠে মােহিত বলে, তােমাকে ত’ আগেই বলেছি, শীলা,
তােমার উপর হয়েছিল আমার অভিমান। সেটা কেন হয়েছিল তুমি
জানাে এবং তা হতে পাতনা যদি তােমার সম্বন্ধে আমার মনের
কোণে একটু ছাপ না থাকত। সে অভিমান অনেকক্ষণ কেটে
গেছে—মনের সব ফঁাক এখন সুগভীর এক আনন্দে ভরে উঠছে।
শীল প্রশ্ন কলে, সেদিন যখন তােমায় না চিন্বার ভাণ করে
চলে গিয়েছিলুম তখন তুমি খুব রাগ করেছিলে, না ?
-রাগ বিশেষ হয়নি, শীলা, হয়েছিল একটু ব্যথা।•••একটা
মূৰ্ত্তিকে যদি বহু অনুষ্ঠান দিয়ে গড়ে তােলার পর হঠাৎ টের পাওয়া
যায় যে সেটা শুধু পাথরের, তার মধ্যে প্রাণ নেই, তখন মনে
লাগে বিষম একটা ধাক্কা শিল্পীর চোখ দিয়েও দু এক ফোটা
জল গড়িয়ে পড়ে।
—তুমি চোখের জলও ফেলেছিলে, মােহিত ?
একটুখানি•••
স্তব্ধবিস্ময়ে শীলা চুপ করে রইলে। সে ভাবতেও পারেনি’
যে তার কল্পনার অন্তরালে মােহিত তাকে এতখানি ভালােবেসেছে।
অথচ, মােহিতের স্বভাবই এই যে সহজে সে তার মনের কথা
১২২
সাগর দোলায় ঢেউ
মুখের ভাষায় প্রকাশ করে বলে না—নিজেকে নিয়ে নিজের সাথেই
খেলা করুতে ভালােবাসে বেশী:..
মােহিত বলে, এবার আমাদের উঠতে হবে, শীলা, নইলে
ট্রেন ফেল করব কিন্তু...
কায়রাে ষ্টেশনে গিয়ে দু’জনে একটা সেকেণ্ডক্লাশ কামরায়
উঠতে যাবে, এমন সময় সানের এক গাড়ী থেকে যাের্শী তাদের
ডাকলে। মােহিত এগিয়ে যেতেই যাের্শী হেসে বলে, বেশ যা’
হােক্ ! মিস্ রজাসএর মােহিনীশক্তি আছে তা না হয় মালুম,
কিন্তু তাই বলে কি ক্ষুধিত বন্ধুদের অমন করে রেস্তরায় ফেলে
পালিয়ে যেতে হয় ?
ভয়ানক ভাবে লজ্জিত হয়ে মােহিত বলে, আমার 'অন্যায় ।
গেছে, যােণী •••কিন্তু মিস্ রজাসএর সাথে আমার আচমকা দেখা
হয়ে যাওয়াতেই এই গােলমাল হয়েছে !
শীলা মােহিতের কথায় সায় দিয়ে বললে, ওর কোনই দোষ
নেই, যােশী, সুভেনিয়র কিতে গিয়ে আমিই ওকে আটকে
রাখি, তারপর পথ ভুলে যাওয়ায় তােমাদের খুঁজে বার করতে
আমরা পারিনি।
বলে সে সমস্ত ঘটনার সংক্ষিপ্ত একটা বিবরণ বলে।
যােশী বলে, এবারকার মত তােমাদের মাপ কছি, মিস্
রজাস আর মােহিত, কিন্তু ভবিষ্যতে এত সহজে ক্ষমা মিলবেনা
তা’ বলে রাখছি।
১২৩
সাগর দোলায় ঢেউ
মােহিত এবার প্রশ্ন করলে, আমায় খুব খুজেছিলে কি,
যাের্শী ? ·
—আমাদের সৌভাগ্য যে বেশী খুজতে হয়নি। জান্তুম
বাজারে গিয়েছ—সেখানে একটা দোকানের বাইরে উকিঝুকি
মাছি এমন সময় একটি ছােরা বেরিয়ে এসে প্রশ্ন করলে আমরা
কিছু কিতে চাই কিনা।•••আমরা বলুম আমরা এক বন্ধুর খোঁজ
করছি। রংটা ত দেখছ, ভুল কবার জো নেই • ছােকরাটি
বলে উঠল, ওঃ, আপনার বন্ধু ?...তিনি ত খানিকক্ষণ আগে
এখান থেকে জিনিষ নিয়ে গেছেন, তিনি থাকতে থাকতেই
আরেকজন মহিলা এলেন, তাঁর সাথে বেরিয়ে গেলেন। আমরা
তখন আঁচ করে নিলুম ব্যাপারটা কী। তােমার সন্ধানে ঘােরা
তখন আলেয়ার পেছনে ছােটার চেয়েও বেশী অনিশ্চিত মনে করে
সােজা চলে গেলুন পিরামিড়, আর sphynx দেখতে।
-ওঃ, তাই আমরা তােমাদের দেখা পাইনি সেখানে !•••
আমরা গিয়েছিলুম চারটের ওপরে•••
কৃপালানি এতক্ষণ গাড়ীর কামরার ভেতরে বসে এদের
কথােপকথন শুছিলেন। এবার মুখটা জানালার কাছে এনে
বলেন, বাবুজী, অনাদিকালের এই সব রহস্যভরা লুকোচুরির
সাথে আমাদেরও কিছু পরিচয় আছে তাই আমরা নিশ্চিন্ত
মনে এখানে বসে আছি আপনাদের প্রতীক্ষায়:..
শীলা আরক্তমুখে একটু দূরে দাঁড়িয়েছিল। মােহিত তাকে
ডেকে কৃপালানির সাথে পরিচয় করিয়ে দিলে। বলে, এর
১২৪
NAKARDAH-HOWRAH.
সাগর দোলায় ঢেউ
মুখের কথাগুলাে হ’ল পাহারওয়ালার চোরধরা বৃষ-চক্ষু লঙ্গলের
মত—ঘাবড়ে যেয়ােনা কিন্তু•••
শীলা হাসিমুখে কৃপালানিকে অভিবাদন করবে : কৃপালানি
তাকে প্রতি-অভিবাদন করে তার ভাঙ্গা-ভাঙ্গা ইংরেজীতে বললেন,
বাবুজীর কথায় বিশ্বাস করবেন না আপনি ; আমি বুড়ােহুড়াে
মানুষ, অহিংস্র এবং নিতান্ত নির্জীব চেহারা আমার••
শীলা একটু হলে।
ASWAT
AT LIBRARIES
SAD
Es:919.
১২৫
শীলার ডায়েরী হতে : মঙ্গলবার, দুপুরবেলা। কাল রাতের শেষভাগেই আমরা পূর্ব- দেশের সীমানা ছেড়ে চলে এসেছি। কর্ণেল গ্রীণ ত মুহূর্তে মুহূর্তে এসে আমায় প্রশ্ন করূছেন, দেশের হাওয়া আমার কেমন লাগছে।তার মনটা ভয়ানকভাবে উৎফুল্ল, বহুদিন পরে দেশে, ফিরে আসছেন বলে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করছিলুম, কর্ণেল, তুমি ত’ দেশে ফিরে যাচ্ছ সেখানে তােমাকে অভ্যর্থনা করবার কে আছে? হেসে কর্ণেল বলেন, অভ্যর্থনা করবার কি আবার লােকের দরকার হবে না কি ? দেশের আকাশ-বাতাস, আলাে-আঁধার সবই যে আমার প্রত্যুগমন করতে উৎসুক হয়ে উঠবে। বললুম, মাছি ; তবু প্রশ্ন কছি, কর্ণেল.••তােমার আত্মীয় কি কেউ নেই কর্ণেল ? একটুখানি চিন্তা করে কর্ণেল বলেন, আছে—আমার দিদির এক নাতনী আছে, বয়স বােধ হয় তােমারই মত হবে।•••সে যদি আমার অভ্যর্থনা করূতে এসে আমার এই থুবড়াে গালে গােটা দুই উষ্ণ চুমাে খায় তাহলে আমি তার পায়ে লুটিয়ে পড়ব একবারে ::. কর্ণেলের রসিকতা সবসময় গেলেই আছে। দোষ আছে তাঁর যথেষ্ট, কিন্তু এই স্বচ্ছ হাসিখুসী ব্যবহারের জন্য আমি তার সব ১২৬
সাগর দোলায় ঢেউ
দোষ ভুলে যাই।•••আমার নিজের দেশের পরিচিত পুরুষদে যদি
কাবাের সঙ্গ আমি কামনা করি তাহলে সে এই কর্ণেল গ্রীণ-এর।
কর্ণেল আজ ভােরবেলা আমাকে প্রথম প্রশ্নটি করলেন কালকের
দিনটি সম্বন্ধে। বললেন, কাল একা একা কেমন লাগল মিস
রজাস ?
আমি বলুম, বেরিয়েছিলুম একা কর্ণেল, কিন্তু পথে হঠাৎ
সাথী জুটে গেল !
-কে সেই ভাগ্যবান্ পুরুষটি ?
-তুমি তাকে চেন, কর্ণেল—যাকে নিয়ে দু'দিন আগে তােমরা
সভা আর মিটিং বসিয়েছিলে এখানে...
আহতস্বরে কর্ণেল বললেন, আমাকে তুমি এর মধ্যে টেনে
এনােনা, মি রজাস। তুমি জাননা এর মধ্যে আমার কোনই
সংশ্রব ছিল না। একবারটি মাত্র তােমার বন্ধুদের একজনের সাথে
আমি এ বিষয় নিয়ে আলাপ করেছিলুন, তাদের সাথে পরিচয়
করবার জন্যে, তাদের মধ্যে যথার্থ মানুষকে দেখবার জন্যে।...মুগ্ধ
এবং প্রীত হয়ে আমি ফিরে এসেছি।
আমি সান্ত্বনাভরা সুরে বলুম, তুমি ব্যথিত হয়ােনা, কর্ণেল,
তােমাকে কি আমার জাতে বাকি আছে ?•••আমি ব্যক্তিগত
ভাবে তােমাকে কখনােই কিছু বলিনি, যা কিছু বলেছি তা
আমাদের এই অসাড় দম্ভতাপূর্ণ সভ্যতার খােলসটার প্রতি
সত্যি, নিজের দেশের সাগরের মধ্যে এসে পড়েছি বলে আমার
মনে একটুও আনন্দ হচ্ছে না, কিন্তু ! বরং একটা অজানিত
১২৭
সাগর দোলায় ঢেউ
আগঙ্গায় আমার বুক কেঁপে উঠছে। দেশের এই আবাহন, এ ত’
আবাহন নয়, এযে অন্য একটা বিদায়ের সূচনা !
কায়রাে থেকে পাের্ট সেড, পৰ্যন্ত সারাটা পথ মােহিত একটিও
কথা বলেনি। সেকেণ্ডক্লাশের যে কামরাটিতে আমরা উঠেছিলুম
সেখানে আর কেউই ছিলনা•••আমার জাহাজের সব বন্ধুরাই
ফাষ্ট ক্লাশে যাচ্ছিলেন। শুধু গাড়ীর শব্দ হচ্ছিল, আর তার
চাকাগুলাে পিষে পিষে চছিল লােহার লাইনের উপর দিয়ে।
জ্যোৎস্নধৌত রাত্রিতে মরুভূমির ছবি ভারী সুন্দর দেখাচ্ছিল—
শাদা বালুর উপর যেন আলাের ঝণা বয়ে যাচ্ছিল আর অদূরে
সুয়েজখালের স্তব্ধশীতল রেখা মরুরূপসীর শাড়ীর রূপালী একটা
পাড়ের মত দেখাচ্ছিল।
মােহিত চুপ করে সীটের কুশনে হেলান দিয়ে বসেছিল, আমি
ছিলুম ওরই পাশে। সারাদিন ঘােরার শান্তিতে আমার শরীর
অবশ হয়ে আছিল, তাই আমি আমার শিথিল মাথাটি ওর
কাধের উপর রেখেছিলুম। মােহিত তবু একটুও সাড়া দেয়নি’••
সে যেমন স্তব্ধভাবে বাইরের আলাের দিকে তাকিয়ে ছিল তেমন
করেই তাকিয়ে রইল।
কতক্ষণ আমি সেভাবে ছিলুম জানিনা, তবে ক্লান্তিতে আমার
চোখ যে মুদে আছিল সেটা সত্যি।সেই তাস্বপ্ন থেকে
আমি মুহূর্তের জন্য জেগে উঠেছিলুম কার স্নেহ-অঙ্গুলীস্পর্শে ••
ক্ষণিকের জন্য চোখ মেলে তাকিয়ে দেখেছিলুম, মােহিত আমার
মাথাটি স্নেহভরে চেপে ধরে আমার, আধাসােনালী চুলগুলাে নিয়ে
১২৮
সাগর দোলায় ঢেউ
খেলা করছে। সুখের নিবিড় আবেশে আমি আবার ঘুমিয়ে পড়ে।
ছিলুম-সে ঘুম যখন ভাঙ্গল তখন গাড়ীর বেগ মন্দীভূত হয়ে
আছে, পাের্ট সেড, ষ্টেশনে এসে গাড়ী থাম্বার উপক্রম করেছে।
ক্ষণিকের জন্য আমার মনে দুঃখ হয়েছিল এমন সােনার
সুবােগটুকু এনিধারা ঘুমে কাটিয়ে দিলুম বলে। তারপরই ভাবলুম,
দুঃখ করা আমার শােভা পায় না—যেটুকু পেয়েছি তার জন্যেই
নিজের ভাগ্যকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত। ••এও যদি আমার
অদৃষ্টে না জুটত তাহ'লে অভিযােগ করূবার সুযােগটুকুও
পেতুম কি ?
ষ্টীমারে উঠে ডেকের উপর যখন রাত্রির মত বিদায় নিলুম
তখনও সে কিছু বলে না, শুধু আমার ডান হাতটি দু’ হাতে
একবার চেপে ধরে আমার দিকে তাকিয়ে একটু হলে।
তার ক্যাবিনের দিকে চলে গেল।
সারারাত আমার ঘুম হয়নি কাল। জাহাজ যখন ধীরে ধীরে
আবার সাগরের বুকে পড়বার জন্যে নড়তে আরম্ভ করেছে তখনও
আমি অন্ধকার ক্যাবিনের জানালা দিয়ে স্তব্ধ অতল জলের দিকে
তাকিয়ে আছি। মিস্ হিল অঘােরে ঘুমুচ্ছিলেন, তার সাথে
আমার শেষবারের মত বােঝাপড়া হয়ে গেছে, তিনি শুধু ডাঙ্গায়
পা দেবার অপেক্ষায় আছেন যে কখন এরােপ্লেনেরও সাথে পাল্লা
দিয়ে লণ্ডনে পৌছে বাবার কাছে আমার স্বেচ্ছাচারিতা, অবাধ্যতা
এবং অসভ্যতার কাহিনী বলবেন।
১২৯
'
সাগর দোলায় ঢেউ
'ধীরে ধীরে পোর্ট সেডের আলােগুলাে মিলিয়ে গেল—আমরা
যে , শুধু পথিক তা তীব্রভাবে মনে করিয়ে দিলে আরেকবার !
নির্জন নিঃসঙ্গতার একখানি ভেলায় ভেসে যেন চলেছি, তীরে
দেখতে পাচ্ছি লােকালয়ের আলাে, আশে আশে শুতে পাচ্ছি
জনতার কোলাহল, ক্ষণে ক্ষণে মাটির শুশ্রুষাও পাচ্ছি, কিন্তু
কোনখানেই নিবিড়ভাবে বদ্বার সুযােগ পেলুম না।
নির্জন নিঃসঙ্গ ভেলায়ও সাথী জুটেছিল, তার সাথে পরিচয়
হয়েছিল সমুদ্রেরই কল্লোলের সাথে, এরই দোলায় ঢেউয়ের
মাঝখানে। এ বাঁধন শীগগীরই যাবে ছিড়ে—সমুদ্রের দোলানি
থাবে না, তার বুকের উপর ঢেউএর খেলাও কম্ব না...কিন্তু
তারই সুরে বাঁধা একটি পরিচয়, একটি সাথীত্ব বুদবুদের মত
যাবে মিশে !
কাল নিদ্রাহীন চোখ নিয়ে সারারাত যখন ছাই-পাশ সব
ভাবছিলুম তখন একবার মনে হয়েছিল মােহিতও আমারই মত
নিদ্রাহীন চোখ নিয়ে বিছানায় বসে আছে কিনা ! আমার মনে
যে সব সুরের বাঁশী বেজে উঠছে ওর মনে কি তা একটুও সাড়া
দিচ্ছে না ? কে জানে ?
বুধবার, সকালবেলা। কাল বিকাল অবধি যখন মােহিত এল
না তখন আমি ভাবলুম আমাকেই খোঁজ নিতে হবে। একটুখানি
আশঙ্কায় মনটাও কেঁপে উঠল, কায়রােতে রােদে রােদে তেতে
পুড়ে অসুখ হয় নি ত ?
সাগর দোলায় ঢেউ
সেকেণ্ড ক্লাস ডেকে যােণীর সাথে দেখা। বন্ধুর কথা জিজ্ঞেস
করতেই বলে, সে নীচে ডেক্প্যাসেঞ্জারদের কোয়ার্টারে গিয়েছে।
ডেপ্যাসেঞ্জার বলে এক শ্রেণীর যাত্রী আছে জান্তুম,
তাদের আস্তানা দেখবার সুযােগ আমার কখনও হয়নি। আজি
কৌতূহল প্রকাশ করূলুম।
যােশী আমাকে নিবৃত্ত করবার উদ্দেশ্যে বলে, সে বড় নােংরা
জায়গা, মিস রজার্স...ফাষ্ট ক্লাস লাউঞ্জ এর পর সেখানে তােমার
গা বমি বমি করবে!
—কিন্তু মােহিত ত সেখানে গিয়েছে ?
—আমাদের কথা আলাদা, মিস্ রজাস •••আমরা সব কিছু
দারিদ্র্য, মলিনতা এবঃ জীর্ণতায় অভ্যস্ত। তােমাদের সে শিক্ষা
হয় নি, তুমি কষ্ট পাবে।
আমি লক্ষ্য করে দেখেছি যােশী এবং মােহিত এরা দু’জনে
অবসর পেলেই আমাকে আমার জন্ম, জীবন-প্রণালী এবং
আভিজাত্য নিয়ে খোঁচা দেয়। অবশ্য মােহিত আমাকে আজকাল
এ সব বিষয় নিয়ে আলােচনা করে না, তার মনের তীব্রতা যেন
অনেকখানি শান্ত হয়ে এসেছে আমার সংসর্গে।
আমি বেশ কড়াসুরেই জবাব দিলুম, আমার কী শিক্ষা হয়েছে
হয়েছে সে নিয়ে আমি আলােচনা করূতে যাবনা, যােণী, কিন্তু
তােমার এটা মনে থাকা উচিত যে যুগে যুগে আমার দেশের দু’
একটি ছেলেমেয়েও পৃথিবীর নানা প্রান্তে সব চেয়ে বড়াে রকমের
দুঃখ, দারিদ্র্য এবং মলিনতা বরণ করে নিয়েছে।
সাগর দোলায় ঢেউ
• সত্যের সাথে বিবাদ চলে না। যােশী লজ্জিত মুখে মাথা হেঁট
করূলে। আমি বল্লুম, আমায় পথটি দেখিয়ে দেবে কি?
যােশী আমার সাথে সিড়ি পর্যন্ত এগিয়ে এল।
সিড়ি দিয়ে নেমে গিয়ে দেখি কোথাও কেউ নেই—শুধু
নীলকুর্তি-পরা জন কয়েক Florentine খালাসী কাজ করছে-
এদিক্ ওদিকে দু একটা কম্বল এবং ময়লা বিছানা আধগুটানাে
ভাবে পড়ে রয়েছে। পূৰ্ব্বদেশ থেকে আসার পর অবধি এসব
জিনিষের তাৎপর্য বুঝতে আমার দেরী হয় না..বুঝলুম এই হচ্ছে
ডেপ্যাসেঞ্জারদের আশ্রয়-ভূমি।
খানিকটা খুজে মােহিতের দেখা পেলুম ডেকটার সম্মুখ ভাগে।
সে এবং কায়রাে-ষ্টেশনে-দেখা আর একটি ভারতীয় ভদ্রলােক
পাশাপাশি দুটো লােহার থামের উপর বসে গল্প করছে।
বােধ হয় তারা আমার সম্বন্ধেই গল্প করছিল, কারণ দেখলুম
আমার পায়ের শব্দ শুনে পেছন ফিরে তাকিয়ে তারা দুজনেই
ভয়ানকভাবে’ চমকে উঠল •••আর মােহিতের মুখে লজ্জার একটা
রক্তিমাভ ছােপ কে যেন বসিয়ে দিলে।
আমি বল্লম, তােমার খোঁজে কোথায় চলে এসেছি মােহিত
দেখ•••
মােহিত কী যেন বলতে যাচ্ছিল, তাকে বাধা দিয়ে অপর
ভদ্রলােকটি বলেন, অপরাধ খানিকটা আমারই...আমিই
বাবুজীকে আটকে রেখে দিয়েছি অনেকটা স্বার্থপরতার বশে...
বুঝলম না, জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে রইলুম।
সাগর দোলায় ঢেউ
ভদ্রলােকটি বললেন, দেখছেন ত কেমন একাটি এখানে থাকতে
হয়, তাই মােহিতের সঙ্গটুকু একেবারে একচেটে করে নিয়েছি।
বললুম, আমি আপনাদের গল্পে বাধা দিতে আসিনি,
আপনারা গল্প করুন না, আমি একটুখানি দেখছি জাহাজটা
ঘুরে ঘুরে
বলে আমি ডেকের এদিকে সরে এলুম। মনে ভয়ানক
অভিমান হ’লমােহিত আমাকে দেখে একটুখানিও সরে এলনা,
আমায় একটু সম্ভাষণও কল্পনা সে। কিন্তু পরে বুঝতে
পেরেছিলুম এই সম্ভাষণ-না-করাটাই হচ্ছে আমাদের সম্বন্ধের
মাধুৰ্য, এই অপূর্ণতাটুকুই হচ্ছে পূর্ণতার প্রতীক...
এদিক ওদিক খানিকক্ষণ পায়চারী করে সিড়িতে উঠতে
যাচ্ছি এমন সময় মােহিত ছুটে এল, বলে, তুমি নিশ্চয় এখনই
চলে যাচ্ছ না?
আমি অভিমান-ভরা সুরে বললুম, চুপ করে ত আর বেশীক্ষণ
দাড়িয়ে থাকা যায় না।
অনুতপ্ত হয়ে আমার হাতটি ধরে মােহিত বলে, রাগ করাে
: তােমার সাথে অনেক কিছু গল্প কবার আছে:
একটি স্পর্শ আমার সব অভিমান-ব্যথা ধুয়ে মুছে নিয়ে গেল।
ফি করে হেসে বলুম, তােমার উপর কি রাগ করতে পারি
মােহিত ? সে যে নিজের উপরই রাগ করা হবে ।
সে আমার হাতটি ধরে সিড়ির কাছ থেকে টেনে নিয়ে বললে,
এদিকে এস
সাগর দোলায় ঢেউ
মন্ত্রমুগ্ধার মত আমি তার অনুসরণ করলুম। ডেপ্যাসেঞ্জারদের
আশ্রম..আলাের স্তিমিত আভা অন্ধকারের সাথে মিশে, স্থানটাকে
যেন রহস্যময় করে তুছিল। মােহিত বলে, এতক্ষণ তােমার
কথাই হচ্ছিল...
আমি চুপ করে রইলুম, এর পর কী বলবে তারই প্রতীক্ষায়।
মােহিত বলতে লাগলে, ওঁর নাম হচ্ছে কৃপালানি, সিন্ধ থেকে
আসছেন•••এই ডেকেরই একজন যাত্রী।•••ভারী চমৎকার লােক
—ওঁর সাথে পরিচয় হয়েছে মাত্র দু’দিন হ’লএরই মধ্যে ওঁর মাঝে
মস্ত বড় একটি বন্ধুর প্রাণ খুজে পেয়েছি
বললুম, ওঁর চোখ দুটিতে আমি সেটা বুঝতে পেরেছি...
—আমি ওঁকে আমার কাহিনী বলছিলুম আর আসন্ন বিদায়ের
দিনটির কথা আলােচনা কছিলুম•••
আমি আহতভাবে বন্দুম, সে কথা এখন আলােচনা করে কী
হবে মােহিত? সে এখন থাক্•••
মােহিত আর কিছু বলে না, স্তব্ধভাবে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর অস্ফুটস্বরে বলে, একটি শিক্ষা আমার লাভ হয়েছে
তােমার সাথে পরিচয়ে, শীলা: সেটা না বলে পারছি না ••
-বলাে•••
—সহজ মানুষের সত্যটি অজ্ঞতা এবং সামাজিক বিভিন্নতার
কুয়াশায় ঢাকা পড়ে থাকে, তাই মানুষ মানুষকে অনেক সময় ভুল
বােঝে, শীলা...
আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলুম, এর তাৎপৰ্য •••
১৩৪
সাগর দোলায় ঢেউ মােহিত প্রথমে একটু থতমত খেয়ে গিয়েছিল, তারপর বললে, , বছিলুম এই যে তােমাকে আগে কী ভয়ানক গবে ভুল ভেবেছিলুম ! মােহিতের কথায় আমার সমস্ত হৃদয় মথিত করে উঠল একটা চাপাকান্নার হাসি। আমাদের সম্বন্ধটিকে সে দেখেছে শুধু বৈজ্ঞানিকের চোখে, এক অভিজ্ঞতার সােপান এই ধারণা নিয়ে। মুখ্যভাবে আমার কাছে যা অন্তর-নিংড়ানাে বেদনা, সেটা ওর কাছে শুধু একটা ভুল-ভাঙানাে বাণী ; আমার কাছে বা অনুভূতির কঙ্কণ, ওর কাছে তা অভিজ্ঞতার সাঁজোয়া... আমি কোন ক্রমে অশ্রুরােধ করতে করতে উপরে চলে এলুম। ওর কাছে থেকে ভালাে ভাবে বিদায় নেবার অবসরটুকু পর্যন্ত আমার হ’ল না। কাল রাত্রিতেও আমার ঘুম হয়নি। বুধবার, রাত দুপুর। আমি ভুলেই গিয়েছিলুম যে মােহিতের মনটিকে সাধারণ ভুলাদণ্ডে মাপতে গেলে ওর প্রতি ভয়ানক একটা অবিচার করা হবে। কাল ওকে দেখছিলুম নিতান্ত সঙ্কীর্ণ একটা পরিপ্রেক্ষিতের মধ্য দিয়ে ওর মনের বিপুলতা এবং অনুভূতির অজস্র চঞ্চল ছায়ালােকপাত আমার পৰ্যবেক্ষণের গণ্ডীর মধ্যেই আসেনি। মানুষকে ভালাে ভাবে বুঝতে হলে নিজেকে তার অনুবেদনার সাথে নিবিড় ভাবে মিশিয়ে ফের চেষ্টা করা দরকার। প্রাণের
সাগর দোলায় ঢেউ
যােগ যতক্ষণ না হচ্ছে কল্পনাশক্তির সাথে, ততক্ষণ একটা নুযের
মন সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত কখনই হতে পারে না।
সন্ধ্যার পর আমি নিথরভাবে বসে ছিলুম আমার ডেক্-
চেয়ারটির উপর, কালকের রাত্রিটির কথা মনে হয়ে আমার সব
অশ্রু জমাট হয়ে বুকের উপর চেপে বসেছিল, এমন সময় মােহিত
এসে মৃদুস্বরে বলে, তােমার সাথে একটা কথা আছে, শুনে যাও...
আমি অবাক হয়ে গেলুন—আবার হলো কী?
মােহিতের গেছনে পেছনে আমি সােজা চলে গেলুন স্পাের্ট,
ডেকে। তখন আমার সিসিলীর সম্মুখীন হচ্ছি-দূরে পাহাড়ের
উপর দু একটা আলো স্তব্ধ নিশীথের প্রহরী স্বরূপ জেগে অহে।
কোন প্রকার ভূনিকা না করেই মােহিত আমাকে প্রশ্ন করে
ব, তুমি আমাকে ভালোবাস, বল ?
এ কী প্রশ্ন!..•এর জবাব কি কখনও দেওয়া যায় ?
আমার নীরবতায় অস্থির এবং চঞ্চল হয়ে মােহিত বলে, আজ
চুপ করে থাকলে তােমার চলবে না শীলা আমি তােমার ঠোট
দুটির মাঝ থেকে একটা উত্তর চাই।
আনি অক্ষুটস্বরে বলুন, তােমায় কী মনে হয়, মােহিত ?
আবার প্রশ্ন শেষ করতে পারলুম না। আমার মুখের উপর
এসে পড়ল মােহিতের স্নেহ-উচ্ছাস-ভরা উষ্ণ নিঃশ্বাস ; আমার
ঠোট দুটির উপর এল ওর ঠোটদুটির প্রেমনিবেদন..আমাকে সে
নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরলে।
কতক্ষণ এই ভাবে দাড়িয়েছিলুম জানি না•••সে যেন একটা
সাগর দোলায় ঢেউ
স্বপ্নময় যুগ। আমার চক্ষুদুটি বদ্ধ করে আমি তৃষিত মরুভূমির মত
তার চুম্বন এবং আদর উপভােগ করছিলুম। দিগন্তে ফুটে
উঠেছিল সিসিলীর লাইট-হাউসের আলাে-মনের সব বন্ধন
গিয়েছিল টুটে, ফুলের মঞ্জরীতে যেন ভরে উঠছিল সব গাছ।
আমার সমস্ত হৃদয় মথিত করে জেগে উঠছিল শুধু একটি প্রার্থনা।
ওগাে রূপদক্ষ, এ শুভ সুযােগ হারিয়ে না.. অন্ধকারে আবরণ
গিয়েছে খুলে, অবসাদ গিয়েছে দূরে তােমার তুলিতে আমাদের
মনের আনন্দের গান ফুটিয়ে তােলল...
নীচে সাগরজলের উচ্ছাস আমি শুতে পাচ্ছিলুম। ঢেউগুলো
বােধ হয় জাহাজের গায়ে এসে লাগছিলো আর থেকে থেকে
আমাদের জাহাজটি কেঁপে উঠছিল ।
মােহিত ধীরে ধীরে আমাকে মুক্তি দিয়ে বললে, এই কটা দিনের
স্মৃতি আমি কখনও ভুলতে পারব না শীলা•••
আমি বললুম, ভুলবে কেন ?.. তােমার সাথে এই ত আমার
শেষ দেখা নয়।
একটুখানি মলিন হাসি হেসে বলে, না কিন্তু শেষের দিন ত
ঘনিয়ে আসছে
প্রতিবাদ করতে পারতুম, বলতে পান্তুম, এ যে আরম্ভ
গাে ! এরই উপর তুমি যবনিকা কেন ঠেনে দিচ্ছ?•• তুমি আর
আমি যাচ্ছি একই দেশে, সেখানে আমাদের দেখাশােনার
অবসরের অভাব হবে কেন ?
কিন্তু কী-জানি-কেন মুখের মধ্য দিয়ে সে ভাষা আর বেরুল না ।
১৩৭
সাগর দোলায় ঢেউ
অশরীরী অদৃশ্য এক শক্তি যেন আমার কানে কানে বললে, এ যে
সাগর দোলার ঢেউ ..সাগরের বাইরে এ সম্বিৎ হারিয়ে ফেলবে,
মাটির কোলাহলের মধ্যে এ কোথায় মিশিয়ে যাবে ! চেউ আছাড়
খাবে সৈকত ভূমিতে ফুটে উঠবে শুধু ফেণা হয়ে, আর মিশিয়ে
বাবে তার সিক্ত গায়ে•••
মােহিত বলে, তুমি কাল আমায় ঠিক বুঝতে পারনি,
শালা:..
ব্যাখ্যার কোন প্রয়ােজন ছিল না, মােহিতের স্পর্শ আজ
আমার কাছে সবই স্বচ্ছ, সরল করে দিয়েছিল। তবু আমি ওর
কথায় কোন বাধা দিলুম না।
বতে লাগ্ল, ভুল-ভাঙার কথা যে কাল বৰােছিলুম সেটাই
আমার বম্বার সবটুকু ছিল না।•••আমার মনের পরিণতির দিকে
তাকিয়ে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলুম—সেই বিস্ময়েরই একটুখানি
কণা তােমাকে দিতে যাচ্ছিলুম•••
আমি দু’হাতে তার মুখটি চেপে ধরে বল্লম, বুঝেছি, আর
বতে হবে না...
সে আস্তে আস্তে আমার হাতদুটি সরিয়ে নিয়ে তার
হতদুটির মধ্যে রাখলে, বলে, জানাে, সময় সময় আমার কী
মনে হয় ?
-কী ?
-যে তুমি যাদু জানাে!"কতবার আমি তােমার সান্নিধ্য
এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছি, তােমার সাথে বেশী মেশামেশি করা
১৩৮
সাগর দোলায় ঢেউ উচিত নয় সে কথা মনকে বােঝাতে চেয়েছি, কিন্তু কী এক দুৰ্ব্বার আকর্ষণে আবার ফিরে এসেছি। আমি একটুখানি তৃপ্তিভরা হাসি হাসলুম। এষে আমার প্রতি ওর সম্ভ্রম নিবেদন! মেয়ের মন এ শুলে আনন্দে ফুলে উঠবে বৈ কি! সে বলে, তাই ভয় হয়, এ যাদুর মায়া যদি না কাটে তাহলে কী উপায় হবে ! আমি হেসে বলুম, ভয় নেই, তুমি যখন এখনই এ যাদুর মায়া কাবার কথা ভাবছ তথন কাটুতে আর দেরী হবে না ! আমরা পাশাপাশি দাড়িয়েছিলুম সেখানে বােধ হয় ঘণ্টা দুয়েকেরও বেশী হবে। কত কী অর্থহীন কথা যে আমরা বলুম- তার না ছিল রীতি, না ছিল সঙ্গতি!.. সৃষ্টির আদি কাল থেকেই বােধ হয় এমনি হয়ে আসছে! সাগর প্রবাহের প্রবাহিনীর কলধ্বনি রক্তের তালে তালে বাজছিল। আমি যেন হয়ে গিয়েছিলুম শিশু—যা কিছু সাধারণ যা কিছু নগণ্য সবই দেখছিলুম প্রবল করে, •••আমার ঔৎসুক্য হয়ে উঠেছিল অক্লান্ত, আনন্দ হয়ে উঠেছিল গভীর এবং অপূর্ণ... গ মােহিতের চিঠি- বুধবার রাত দুপুরে লেখা ? “ভাই শশাভনলাল, তােমাকে শেষ চিঠি লিখেছি আরব আর মিশরের মরুভূমির মাঝখানে বসে। এবার মরুভূমি ছাড়িয়ে ঠাণ্ডার দেশের দিকে ১৩৯ সাগর দোলায় ঢেউ চলছি, যদিও কাল সকালবেলা ভিসুভিয়এর সাথে সাক্ষাৎ হবার সম্ভাবনা আছে !'আকাশ যদি পরিষ্কার থাকে তবে নাকি জাহাজ থেকেই ওর মুখে ধোঁয়ার রেখা দেখা যাবে ! সে যাক্, তােমাকে একটি নতুন খবর দিচ্ছি যে বাঁশীর সুরের কথা তােমাকে ঈজিপ্ট থেকে লিখেছিলুম তার স্পর্শ অবশেষে মিলেছে—খুবই অজান্তা ভাবে, মিশরের মরুভূমির মাঝে। তারপর আজ তার সাথে আমার সুরটি মেলানােও হয়ে গেছে, সাগর- ঢেউএর নৃত্যদোদুল ছন্দের সাথে মিশে গেছে বেশ! তখনকার অনুভূতিটি হচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন ধরণের, ভাই! •••এর আগে তােমাকে লিখেছিলুম অস্পষ্ট আঘাতের কথা, এখন লিখছি পূর্ণ রিক্ততার বাণী । এ রিক্ততার শূন্যতা নেই, আছে অসামান্য গভীরতা আর অতলস্পর্শী স্তব্ধতা। ভুমি নিশ্চয়ই ভয়ানক ভাবে উদগ্রীব হয়ে উঠেছ। অ্যাফ্রিকার জঙ্গল আর অ্যামেরিকার কদর ছেড়ে তােমার মনটি নিশ্চয় আমার চিঠির পেছনে লুকানাে অর্থের দিকে ঝুঁকে পড়েছে !•••ভাবছ এসব কবিত্ব-মেশানো কথার মানে কী? মানে অবশ্য খুবই সােজা—আমি প্রেমে পড়েছি। আমি কিন্তু কল্পনার চোখে দেখতে পাচ্ছি এইটুকু পড়েই তােমার মুখ হয়ে উঠছে কুটি-কুটিল, তুমি আমার ভবিষ্যতের কথা ভেবে হতাশ হয়ে পড়েছ।...আমার ভয়ানক আনন্দ হচ্ছে কিন্তু তােমার অবস্থাটি কল্পনা করে..•কাছে যদি এখন তােমায় ১৪ ০
সাগর দোলায় ঢেউ
সে যাক্-এখন আমার প্রিয়ার একটুখানি পরিচয় দেই,
কী বল ?
প্রিয়ার বয়স হবে উনিশ•••কুড়ি পার হ'লে বুড়ী হবেন কিনা
জানি না, কিন্তু আমার কাছে তিনি থাকবেন চির-যৌবনা উৰ্বশী ।
তার সাহচর্যে আমার অন্তর রাগে-অনুরাগে বিচিত্র হয়ে ঠিকরে
পড়ে: প্রভাতে সন্ধ্যায় দিক্-দিগন্তে গান বেজে ওঠে সৃষ্টির লীলা
তরঙ্গের সাথে আমার অন্তর দুলতে থাকে।
ভুমি নৃতত্ত্বের পুরােহিত, তাই প্রিয়ার জাতীয়তার পরিচয়
তােমায় দেব না। শুধু তার বাইরের দুএকটি অঙ্গ এবং অঙ্গাণুর
বর্ণনা করব, যদি তুমি সেই ছবি থেকে আমার প্রিয়াকে চিনে নিতে
পার তাহলে তােমায় বব বাহাদুর
প্রথমেই চোখ দুটির কথা বলি...স্তব্ধ-চঞ্চল নীল..সাগর আর
আকাশের রংএর সাথে মিশে আছে যেন অন্তগুঢ় রহস্যে ভরা
আমার মানসী।
আর একটি জিনিষ আমার চোখে পড়েছে প্রথমেই, সেটি হচ্ছে
একটি কালাে তিল।•••সত্যিকারের রাঙা-ঠোট দেখেছ কখনাে?
•••আমার প্রিয়ায় ঠোট সহজ-রক্তিম-রাগে রাঙাবিলিতি কবি
হলে বতুম, চেরীফলের মত। গালে আপেলের রং আর তারই
উপর ঠোটের বাঁ-পাশে ছােট্ট একটি তিল, যেন সমস্ত বিশ্বের
সৌন্দৰ্য্য মথিত করে একটুখানি এসেন্স•••
চুলের বর্ণনা চাও ?•••আধা-সােনালী: শাড়ীর ঘােটাতে যদি
এর আক্র হয় তাহলে বােধ হয় এর স্রোতে ছন্দের নাচ বয়ে চলে।
১৪১
সাগর দোলায় ঢেউ আরাে লিখতে হবে কি? এখন ইতিহাসের একটুখানি ছোঁয়াচ, তােমায় দেই। ঘাত- প্রতিঘাত আরম্ভ যে হয়েছে সাগরের দোলা থেকে সে তুমি এর মধ্যে নিশ্চয়ই বুঝে নিয়েছ।...কেমন করে সুরু হলাে সেটা প্রশ্ন করাে না, কারণ সুরের মধ্যে না ছিল আকস্মিকতা, না ছিল অসাধারণ! সচরাচর যেমনি ভাবে পরিচয় হয়ে থাকে আমাদের পরিচয়ও সেই ভাবেই হয়েছে ! কিন্তু খুব সহজে আমরা ধরা দিই নি। লুকোচুরী খেলা হয়েছে যথেষ্ট এবং তার অস্বাভাবিকতার কথা মনে হলে এখন আমার নিজেরই হাসি পায় !...অভিমান এবং বেদনা আমার মনকে আচ্ছন্ন করে তুলেছে অনেকবার, কিন্তু আজ সন্ধ্যার আঁধারে আমাদের সন্ধি হয়ে গেছে । তুমি প্রশ্ন করবে, সে ত বুঝলুম, তখন হবে কী ?—কী যে হবে সে আমিও জানি না। আর দুদিনের মধ্যেই সাগরের কাছ থেকে বিদায় নিতে হবে আমাদের এত দিনকার সহচর, সাথী এবং সাক্ষী থাকবে পড়ে আমরা চলে যাব কে কোথায় ! মনের স্পন্দন দোলার বিরামের সাথে সাথে থাবে কি না জানি না; যদি থামে তবে ভাবনা নেই—কিন্তু যদি না থামে ? একটা কথা তােমায় না বলে থাকতে পারছি না, শােভন'- তুমি আমায় ছেলে মানুষ ভেবাে না যেন!•••দু'জোড়া ঠোটে যখন স্নেহের আলাপ শুরু হয় এবং তার সমাপ্তি হয় নিবিড় স্পর্শে, তখন শরীরের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে বেজে ওঠে, প্রাণমাতানাে গান ! সে ১৪২ সাগর দোলায় ঢেউ গানের মূচ্ছনা যে কতখানি পাগল-করা তা আমি চিঠিতে তােমায় বােঝাতে পারব না—তবে এটুকু বলতে পারি যে তখন নিত্য-কালের আলােও হয়ে যায় আচ্ছন্ন আর বিশ্বের সকল বাণী সরে যায় দূরে। এই যে চিঠি লিখছি এখন রাত কটা বেজেছে জানাে?--- রাত একটা! চোখের পাতায় ঘুম একটুও নেই—আমার শিরায় শিরায় রক্তের প্রবাহ যেন অস্বাভাবিক রকম দ্রুতগতিতে বইছে। আমার চিঠি পড়ে তুমি কী মন্তব্য প্রকাশ করবে জানি না, তবে খানিকটা আঁচ করে নিচ্ছি। বলবে, আমার চিঠিটা হয়েছে একটা আলাের ঝিকিমিকি, এর কোন্ খানে রূপক কোন্ খানে শাদ। কথা বুঝবার যাে নেই। কিন্তু এই আলাে-ছায়ার মাঝখান দিয়ে যদি আমার চেনা মুখখানা বার করে নিতে তােমার কোন কষ্ট পেতে না হয় তাহলেই আমি নিজেকে ধন্য মনে করব । একটা প্রস্তাব করব তােমায় ? তুমিও কেন চলে এস না ! তুমি যে সেই কোন্ স্কলারশিপের জন্যে চেষ্টা করবে বলেছিলে তার কী হ’ল ?•••ভাই শােভন, আমি জোর করে বছি, তােমার ষ্টাডির বদ্ধ হওয়া থেকে যদি তুমি এক বারটি বেরিয়ে পড়তে সাগরের বুকে পাড়ি দেবার জন্যে, তাহলে দেখতে এর ঢেউএর ফাকে ফাকে কত রামধনুর খেলা...আর তার বাণী আকাশ বাতাসের কণ্ঠের ভিতর দিয়ে কত রূপে রূপে বিচিত্র হয়ে ওঠে। অবশ্যি আমার বলা বৃথা ; তুমি হচ্ছ অদ্বিতীয় cynic, তুমি বলবে, সাগরের বুকে শুধু রামধনুর খেলাই মেলে না, টাইফুনের ১৪৩
সাগর দোলায় ঢেউ
ভীষণ নৃত্যের উৎসও সেখানে। সাগরের বাণীর মধ্যে তুমি
দেখবে ধ্বংসের লীলা-বিক্ষিপ্ত কোলাহল •••সম্বরণহীন উচ্ছাস...
তবু তােমায় বছি, একবারটি তােমার অনাদিকালের স্ত্রী-
বিসর্জন দিয়ে পা বাড়িয়ে দাও •••
-তােমার মােহিত।”
১৪৪
+১৮, " • E এ।
২.RA
:
মােহিত শেষ রাত্রিতে ঘুমিয়ে পড়েছিল তার ক্যাবিনের ভিতর।
হঠাৎ তার ঘুম ভাঙ্গল চিদম্বরএর কলরবে। আলস্য ভরা চোখ
দুটি একবার খুলতেই পােটহােল দিয়ে তার মুখের উপর এক ঝলক
আলাে এসে পড়ল একটু বিরক্ত হয়ে চোখ আবার বন্ধ করে সে
জড়িত কণ্ঠে প্রশ্ন করলে, কী হয়েছে মিঃ চিদম্বরম্ ? এরকম
চেঁচামেচি কেন ?
সােৎসাহে চিদম্বরম্ জবাব দিলে, ভিসুভিয়স দেখা যাচ্ছে,
মিঃ সেন•••
ভিসুভিয়স !•• মােহিত তড়াক করে লাফিয়ে উঠল !
বার্থ থেকে কোনক্রমে নেবে চোখে একটু জল দিয়ে সে ঊর্ধ্বশ্বাসে
বেরিয়ে পড়ল ক্যাবিন থেকে ।
ভিসুভিয়স দেখতে তার যতটা না আগ্রহ তার চেয়ে বেশী
আগ্রহ ছিল তার শীলার সাথে ভােরবেলাটিতে দেখা করবার। ..
আগের দিন সন্ধ্যায় সে শীলার কাছে প্রতিশ্রুতি করেছিল যে
ভােরবেলাতে ভিসুভিয়সের ছবি যখন ফুটে উঠবে তখন সে শীলার
কাছে থাকবে।
তড়তড় করে সিড়ি বেয়ে সে ফাষ্ট ক্লাস স্পাের্টশ, ডেকে উঠে
চলে গেল। সেখানে এক পাল ছেলে মেয়ে জড় হয়ে চেঁচামেচি
১৪৫
সাগর দোলায় ঢেউ
করছিল। মােহিত খুঁজছিল শীলাকে, তার দৃষ্টি সারা ডেকময় ঘুরে
বেড়াচ্ছিল।
শীলাকে কিন্তু কোখাও দেখা গেল না। যে ছেলেমেয়ের দল
তাদের আনন্দ কলরবে ডেকটাকে মাতিয়ে তুলছিল তাদের একটিকে
মােহিত বেশ ভালােভাবেই জান্ত—তাকে দেখেছিল শীলার সাথে
অনেক সময়ই সে।...ইচ্ছা হল তাকে প্রশ্ন করে, শীলা কোথায় ?...
কিন্তু কী যেন এক লজ্জায় সে চুপ করে রইল।
ভিসুভিয়স দেখা যাচ্ছিল : ধূসর একটা রেখার মত..তার
শিখরটা মনে হচ্ছিল যেন কালাে একটা মেঘের ঢেউ।...মােহিত
কিন্তু ভিসুভিয় দেখে খুব উৎসাহিত বােধ করছিল না, তার মন
ছিল একটি ছন্দ-ভরা সুরের প্রতীক্ষায়•••
সুরের সাথে সাক্ষাৎ অবশেষে হ’ল। লজ্জারুণ মুখে শীলা এসে
মৃদু হেসে বলে, ঘুমিয়ে পড়েছিলুম, মােহিত, তাই দেরী
হয়ে গেল ••
-আমি যে তােমারই অপেক্ষায় দাড়িয়ে আছি এখানে ।
-সত্যি ?
-সত্যি না ত’ কি মিথ্যে বলছি ? • এই যে ধূম-জ্যোতিতে
গড়া পাহাড়ের রূপ-সৃষ্টি এও আমার কাছে নিতান্ত সাধারণ মনে
হচ্ছিল তুমি আছ না দেখে !
শীলা মােহিতের বাহুতে মৃদু তর্জনীর আঘাত করে বলে,
শেষ ক’দিনে তােমার মুখের ফোয়ারা ছুটে গেছে যে !
হেসে বলে, দীপ, নিভ বার আগে দপ করে জ্বলে ওঠে
১৪৬
সাগর দোলায় ঢেউ শেষবারটির মত ..কল্লোল শেষ হবার আগে ভাসিয়ে নিয়ে যায় পূর্ণমাত্রায় শীলা একটুখানি অন্যমনস্কভাবে বললে, সত্যি কি মােহিত আমাদের বিদায় নেবার সময় ঘনিয়ে আছে ?...আমি কিন্তু কিছুতেই সেটা কল্পনার মধ্যে আতে পারছিনা। —কিন্তু যা সত্য এবং অবশ্যম্ভাবী তাকে জোর করে এড়িয়ে ত কোন লাভ নেই। শীলা একটুখানি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে। মােহিত, তাকে আশ্বাস দিয়ে বলে, কিন্তু সে নিয়ে এখনই মন খারাপ করে দরকার কী, শীলা ? যা হবার তা হবে—তাই নিয়ে এখনকার ভিসুভিয়স দেখাটা মাটি করাে না। শীলা সচেতন হয়ে বললে, সত্যি, আমার বড় অন্যায় হয়ে হাচ্ছে, মােহিত। তােমার আজকের সকালবেলাটায় আমি বিষাদের ছায়া এনে দিলুম। মােহিত যেন শীলার কথা শুতেই পায়নি এমনিভাবে বললে, বাস্তবিক দূরথেকে ভিসুভিয়এর এমন শান্ত সমাহিত মূর্তি দেখে কে মনে করবে যে এরই প্রতাপে দু'হাজার বছর আগে রােমান্ সভ্যতার কতকগুলাে বিশিষ্ট আত্মপ্রকাশ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল !••• এর রুদ্র লেলিহান শিখার আবাহন কেউ শুনতে পায়নি’ আকস্মিক- তার প্রচণ্ডতায় সবাই হয়ে গিয়েছিল জড়, প্রবুদ্ধ... শীলা বলে নামবে’—গিয়ে একবারটি দেখে আসবে? -না, আজ মাটির স্পর্শের কথাটি মনে হলে শিউরে উঠছি। ১৪৭
সাগর দোলায় ঢেউ
মনে হচ্ছে এই ত’ আমাদের বিচ্ছেদের বিমান : সাগরদোলা
আমাদের এনে দিয়েছিল নিবিড় করে, এই মাটি এনে দেবে
বিনাশের দুর্দম
দুর্দম বন্যা।•••মাটিকে আমি আর ভালবাসতে
পারবনা, শীলা।
শীলা বললে, তাইত বছি মােহিত, শেষ কটা ঘণ্টা সম্পূর্ণভাবে
উপভােগ করে নেই। পরিচয় ত শেষ হয় না কখনাে, নব নব
বিস্ময়ে নতুন অজানার ভেতর দিয়ে নিজেদের জানার চেষ্টা
করি।•••আসবে ?
মােহিত হেসে বলে, অর্থাৎ তুমি বলতে চাও যে বিদায়ের
মুহূর্ত যখন 'আবে তখন তার আগেকার গভীর অনুভূতির আনন্দ
আমাদের মনটিকে করে রাখবে আচ্ছন্ন, মােহগ্রস্ত—শেষ কথাটি
বলবার নিষ্ঠুরতাও যেন আমাদের চৈতন্যের দুয়ারে অস্পষ্টভাবে
ঘা’ দিতে না পারে।
ঠিক হ’ল যে তারা দু’জনে নেপএ নাবে। মােহিত শীলার
কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কৃপালানির সাথে দেখা করতে গেল।
কৃপালানি সেকেণ্ডক্লাস ডেকে এসে যাের্শীর সাথে গল্প
করছিলেন। মােহিত তাকে সম্ভাষণ করে বলে, আপনারা কি
নেপলস্ দেখতে নামূবেন, কৃপালানিজী ?
কৃপালানি বলেন, ভাবছি- আপনি যাচ্ছেন কি ?
--হ, আজি বাবাে-মিস্ রজার্স এর সাথে এই মাত্র সেটা
ঠিক করে এলুম।
১৪৮
সাগর দোলায় ঢেউ কৃপালানি একটু মুচকে হেসে বললেন, তাহলে আমাকে খুজছেন কেন বাবুজী ?•••গাইড ভাবে ? মােহিত একটু লজ্জিত হয়ে বলে, না আপনার কাছে বিদায় নিতে এসেছি কৃপালানি বিস্মিত হয়ে বলেন, বিদায় ? সে কী বাবুর্জী মােহিতের নিজের অসতর্কতায় প্রায় ধরা পড়ে গিয়েছিল। সে কথাটা ঘুরিয়ে নিয়ে একটুখানি কৌতুকের সুরে বলে, বল ত যায় না, রূপালানীজী ! ভিসুভিয় দেখতে গিয়ে যদি তার দগ্ধ-গলিত আগুনের মধ্যে পড়ে যাই তাহলে বিদায় নেবার অবসর আর নাও হতে পারে। যােশী এতক্ষণ চুপ করে শুছিল, সে বলে, তােমার দূর- দর্শিতার বাহাদুরী আছে, মােহিত।•••খবরটা পেলে কোথায়, stato siesmography ? মােহিত বলে, জাহাজে নয়, মনে কথার ধারাটা যেন চছিল একটা হাসিমেশানাে বিদায়- পালার মত। কৃপালানি একটু ব্যস্ত হয়ে বলেন, তােমাকে আমার বড় ভয় হয়, বাবুজী''কখন কী করে বস! মােহিত হেসে বললে, সত্যি। -ঠাট্টার কথা নয়, বাবুজী: তুমি হচ্ছ ভয়ানকভাবে ভাবুক। তােমার মন ত ফটোগ্রাফের প্লেটের মত নয়, তাতে অদৃশ্য চিত্রকরের তুলির অনেক রংও এসে পড়ে। ভয়ের কথা এই যে এই রংগুলাে আমাদের মত সাধারণ লোকের পরিধির মধ্যে আসে না। ১৪৯
সাগর দোলায় ঢেউ
..মােহিত আশ্বাস দিয়ে বলে, তুমি ভেবাে না, কৃপালানির্জী !
আমার মন তুমি যেমনটি বছ তেমনটি যদি সত্যি সত্যি হয়ে
থাকে তাহলে আমি ক্ষত শরীর নিয়ে ফিরে আস্ব ।
বলে মােহিত তার ক্যাবিনের দিকে চলে গেল। কপালানী
একটুখানি ঘাড় নেড়ে যােশর দিকে তাকিয়ে বলেন, আমার
কিন্তু মনে হচ্ছে, বাবুজী, এই জাহাজে তােমার বন্ধুটি আর কিরুবে
। পুরাণে ঘাটে পুরাণাে মালমসলার মাঝখান থেকে সে
কিছু দিনের জন্যে রেহাই চায়, তার মনটাকে ভাল করে পরখ
করে দেখবার জন্যে।
ক্যাবিনে গিয়ে মােহিত তার জিনিষ-পত্তরগুলাে সব গুছিয়ে
রাখলে। চিদম্বরম্ ছিল না, তাই সে নির্বিবাদে এবং নিরুপদ্রবে
তার কাজকর্ম সেরে গুটিকয়েক জিনিষ নিয়ে ফাষ্ট, ক্লাশ ড্রইং-রূমে
হাজির হল।
শীলা সেখানে তার জন্যে অপেক্ষা করছিল। মােহিত হেসে
তাকে বলে, নেপল এর ভবঘুরে গায়কদের inauncloline
বাজানাে শুনেছি খুবই নাকি সুন্দর•••গােধূলির আঁধারের সাথে
তার ছায়া ঘুরে ঘুরে মরে, আলাের কিরণ রেখায় তা
ভাস্বর হয়ে ওঠে...
নেপস্ এ নেমে মােহিত বলে, আজ আর কোথাও ঘুরূব
না শীলা...ভিসুভিয়এর সামনে যাবার আমার একটুও ইচ্ছা নেই।
১৫০
সাগর দোলায় ঢেউ
শীলা বিস্মিত সুরে প্রশ্ন করূলে, কেন?
দূর থেকে যা দেখেছি তার গভীরতা নষ্ট হয়ে যাবে ওর
সামনে গেলে। ওর ধ্বংসলীলার কথা মনে হবে বারবার; ওর
পেছনে যে সব-ছড়িয়ে-
যাওয়া একটা অনুপম রহস্য আছে সেটার
দ্বার যাবে খুলে। সে আমি চাইনে, শীলা...
-কেন মহিত ?
-কেন, জানি না। আজ শুধু স্তব্ধভাবে প্রত্যেকটি মুহূর্ত
নিবিড় করে অনুভব করে নিতে চাই.. বাইরের কোন প্রকার
বাতাসকে আমার মানস-সরােবরে একটুও ঢেউ তুলতে দেব
আমি.।
-তাহলে কোথায় যাবে ?
-যেদিকে দুচোখ যায়•••
কথাটা বলা খুবই সহজ, কিন্তু বাস্তবের নগ্নতায় তার মাধুৰ্য্য
অনেকখানিই নষ্ট হয়ে যায়। শীলা কিন্তু কোনই প্রতিবাদ করলে
—সে স্থিরই করে এসেছিল আজ সে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে
দেবে মােহিতের কাছে...আত্মবিসর্জনের যে সুখ তা সে গভীর
ভাবে উপভােগ করে নিবে নেপএ-মােহিতের সাহচর্য্যে।
পথ-ঘাট মােহিত কিছুই চিনে না। দল ছাড়া এই দুটি
তরুণ-তরুণী কী-কবে ঠিক করূতে না পেরে অনির্দিষ্ট ভাবে ঘুরে
বেড়াচ্ছিল সমুদ্রের ধারে বিশাল promemadeএর পাশ দিয়ে।
দূরে জাহাজের ছবি ক্রমশঃ ক্ষীণ হয়ে আসছিল।
সাগর দোলায় ঢেউ
শীলা বলে, আমরা যে সহর ছেড়ে চলে আসছি মােহিত ?
মােহিত জবাব দিলে, সহরের মাঝেই যে থাকতে হবে তার কি
কোন মানে আছে।
শীলা চুপ করে রইল।
মােহিত তখনও promenade ধরে হাঁটছে। শী। একটু
ক্লান্ত বােধ করছিল, সে আস্তে আস্তে মােহিতের বাঁ-বাহুর মধ্যে
নিজের ডান হাতটি গলিয়ে দিলে।
এতক্ষণ মােহিতের যেন কোন খেয়ালই ছিল না, শীলার
হাতের স্পর্শে সে একটুখানি সচকিত হয়ে বলে, তােমার ক্লান্তি
বােধ হচ্ছে শীলা ?
শীলা ঘাড় নাড়লে।
মােহিত বললে, আমার বড় অন্যায় হয়ে গেছে, শীলা •••আর
একটুখানি চলাে, কোলাহল থেকে আরও দূরে চলে যাই,
তারপর বস্ব কোথাও।
একটু পরে শীলা মৃদুস্বরে প্রশ্ন কলে, আমাদের ষ্টিমার ছাড়বে
তিনটায় সেটা ভুলে যাওনি ত ?
হেসে মােহিত উত্তর দিলে, ভুলতে চাইলেও ষ্টিমার কি ভুলতে
দিবে? তার বাঁশী বেজে উঠবে দৈত্যের হুঙ্কারের মত.••জানাবে,
ওগাে, এসাে, আমার বিশাল ছায়ার মধ্যে আবার আশ্রয় নাও...
খানিকটা দূর গিয়ে মােহিত দাড়ালে...সমুদ্রের নীল রেখা
সেখানে অর্ধচন্দ্রাকার হয়ে দিগন্তে মিশে গেছে:::ঢেউএর উদ্দাম
উচ্ছ্বাস সেখানে নেই বললেই চলে, মাঝে মাঝে দুই একটা স্রোত
সাগর দোলায় ঢেউ
মাটিতে এসে লাগছে, যেন লুব্ধ প্রেমিক এদিক ওদিক তাকিয়ে
প্রেয়সীকে লুকানাে চুমু খাচ্ছে, আবার লজ্জারুণ মুখে সরে যাচ্ছে,
শীলা বলে, ভারী সুন্দর এখানকার জলটা না মােহিত ?
মােহিত বলে, আমার কী মনে হচ্ছে জানাে।
-কী ?
জীবন-পথের আশেপাশে সুধায় ভরা কত ফল পাতার
আড়ালে ঢাকা থাকে, আমাদের চোখ নেই বলে আমরা তা
এড়িয়ে যাই, উপবাসী ক্ষুধা নিয়ে ঘুরে বেড়াই অনিশ্চিন্তের
পেছনে। তার ফল হয় এই যে শ্রান্তি এবং অবসাদে আমাদের
মন পূর্ণ হয়ে ওঠে।
এখনও কি তুমি অনিশ্চিতের পেছনে ঘুরছ ?
—না । কিন্তু সেই ব্যর্থ ঘােরাটির কথা বিশেষ করে মনে হচ্ছে
আজ, যেহেতু অজাতে সহসা সুধার রস আমার মিলেছে।
শীলা নতমুখে দাড়িয়ে রইল।
মােহিত তার বাঁ-বাহুতে আবদ্ধ শীলার ডান হাতটি নিজের
হাতের দুটি মুঠোর মধ্যে নিয়ে ঠোটের কাছে এনে তাতে ছােট্ট
একটি চুম্বন করে বলে, দেশ থেকে যখন বেরিয়েছিলুম তখন কি
আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারতুম এনি অকস্মাৎ সাগর দোলার
ঢেউএর সাথে সাথে আমার মনের ছন্দ প্রকাশিত হয়ে উঠবে
সজীব একটি মুর্তিতে, যে আমার স্বপ্ন-প্রিয়ার সাক্ষাৎ মিলবে
পৃথিবীর মাটির বাইরে ?
শীলা অসহ পুলকে-ব্যথায় চুপ করে রইল। তারপর আস্তে
সাগর দোলায় ঢেউ
আস্তে বলে, কিন্তু, মােহিত, মাটির সাথে যার সম্বন্ধ নেই তাত
বুদবুদের মত সাগরের বুকেই মিশে যাবে ! ঢেউ ত কখনও স্থির নয়,
সে যে চিরচঞ্চল ।
গভীর ভাবে খানিকক্ষণ চিন্তা করে মােহিত হঠাৎ বললে,
শীলা, আজ আমার মাথার ঠিক নেই...কত কথাই যে মনে
আছে কী বম্ব! যদি অন্যায় কিছু করে বা বলে বসি তাহলে
'আমার মা করাে ।
এ আবার কী কথা ?—গভীর বিস্ময়ে শীলা মােহিতের দিকে
তাকালে। মােহিত তার ভীতত্রস্ত চাউনী দেখে আশ্বাসের সুরে “
তাকে বলে, ভয় পাবার কিছু নেই আমার খেয়ালগুলাে শুধু
তুমি আজকের দিনটির মত মাপ করে নিয়ে।
খুব ধীরস্বরে শীলা বলে, কিন্তু তুমি আজ এত অস্থির হয়ে
উঠ ছ কে?
–অস্থির হয়ে উঠছি কি ?
—কেন, ভুমি নিজে কি সেটা বুঝতে পারূছ না, মােহিত ?
হবে ! বলে মােহিত হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল। শীলা বলে,
অমন করে গম্ভীর হয়ে থেকোনা এখন।•••এই না তুমি বছিলে
আজকের সময়টুকুর প্রত্যেকটি মুহূর্ত ভরে দিবে নিবিড় আনন্দের
ছটায়? আর এখ, খুনি তােমার মুখ হয়ে আছে বর্ষার থথমে
আকাশের মত!
মােহিত জবাব দিলে, সত্যি শীলা, আমার এমন গম্ভীর হয়ে
খাকাটা উচিত হচ্ছে না !...বলে সে শীলাকে দু’বাহুতে জড়িয়ে
৫
১৫৪
সাগর দোলায় ঢেউ
ধরে তার রক্ত অধরে চুমু খেলে.তারপর হেসে বলে, এবার আর
নালিশ করবে না ত?
শীলা কিন্তু সন্তুষ্ট হ’ল না, বললে, কিন্তু তােমার সব ভাবভঙ্গীর
মাঝে কেমন একটা অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করছি আজ।
এর কোন জবাব মােহিত দিতে পারূলে না। কথাটা এড়িয়ে
যাবার জন্যে বলে, চুপ করে এখানে দাড়িয়ে থাকতে আমার
মােটেই ভালাে লাগছে না, শীলা এসাে, ছায়ায় কোথাও বসি।
সমুদ্রের ধারেই পাহাড় উঠে গেছে আকাশের দিকে, স্তরে
অঙ্গে তার সবুজ ঘাসের আঁচল: সােজা ঢালু পাহাড় নয়,
তার মধ্যেও যেন ঢেউ খেছে, সাগরের ঢেউএর সাথে পাল্লা
দিয়ে। পাহাড়ে উঠে ছায়া সুশীতল একটি কোণ খুজে মােহিত
বলে, এখানে বসা বা এখন •
শীলা বল্ল। মােহিত আর কোন কথাটি না বলে তার
কোলের উপর মাথাটি রেখে সটান শুয়ে পড়ল।
শীলা প্রথমে একটু অবাক হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু কিছু না বলে
গভীর স্নেহ ভরে মােহিতের মাথার কালাে চুলগুলো নিয়ে খেলা
করতে করতে বলে, তুমি কিন্তু ভয়ানক খেয়ালী হয়ে উঠছে
আজ, মােহিত।
মােহিত তন্দ্রাচ্ছন্নভাবে জবাব দিলে, হু...
-হু নয়, সত্যি ••
মােহিত প্রশ্ন করূলে, তুমি আমার খেয়ালীপনা ভালােবাস
, শীলা ?
সাগর দোলায় ঢেউ
তার কথায় অভিমানের সুর। শীলা মােহিতের চুলগুলাের
মধ্যে দ্রুতবেগে অঙ্গুলী চালনা করে বললে, ভালােবাসি বৈ কি...
তােমার খেয়াল যে এ•••
মােহিত চুপ করে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।
খানিক পরে প্রশ্ন করুলে, তােমাদের দেশে আকাশ বােধ হয় এমন
নীল নয়, নয় কি শীলা ?
শীলা বলে, না.. শাদা কুয়াসা আর কালাে ধোঁয়াই যে
আকাশকে ছেয়ে রাখে সেখানে। সােনার আলাে সেখানে
যদি কখনও দেখা যায় তাহলে আনন্দের ফোয়ার: ছােটে
সকলের প্রাণে।
মােহিত প্রশ্ন করলে, তােমার দেশে পৌঁছে ভুমি সবই ভুলে
যাবে শীলা, নয় কি ?
একটুখানি ইতস্ততঃ করে নত হয়ে মােহিতের কপালের উপর
চুলের কাছটায় একটি চুমু খেয়ে শীলা বলে, ভুলতে পারতুম,
মােহিত, যদি এর সাথে গভীর অনুবেদনার যােগ না থাকত।
তুমি একটা জিনিষ ভুলে যেয়ােনা যে আমরা হচ্ছি মেয়ে,
আমাদের অনুভূতির তন্ত্রীতে যদি একবারটি আঘাত লাগে তবে
তার মূৰ্চ্চনা সমস্ত চৈতন্যকে দেয় আচ্ছন্ন করে সে কি কখনও
ভােলা যায়, মােহিত ?
—কিন্তু দেশের মাটিতে পা দিতেই ত সবাই তােমাকে ছেকে
ধরবেন চারিদিক থেকে। তখন কি আর সাগর দোলায়
ঢেউখানির কথা তােমার মনে থাকবে শীলা ?
সাগর দোলায় ঢেউ
গভীর ভাবে শীলা জবাব দিলে, তুমি ভুলে যাচ্ছ কেন, মােহিত,
সমুদ্র অন্তরে অন্তরে নিস্তব্ধ হয়েই আছে—শুধু উপরে উপরে
ঢেউ উঠছে, জোয়ার-ভাটা চলছে।•••সমুদ্রের আসলরূপ দেখতে
পাবে অভ্যন্তরে, যেখানে আছে এক রহস্যময় জগৎ::"বাইরে ত’
শুধু ফেনিল উচ্ছাস মাত্র !
মােহিত শান্তভাবে শীলার কথাগুলি মনের মধ্যে গ্রহণ কবার
চেষ্টা কছিল। খানিক পরে বলে, আমার কিন্তু ভয় হয়,
শীলা...
বিস্মিত হয়ে শীলা প্রশ্ন করলে, ভয় ? কেন গাে ?
-ভয় হয় এই ভেবে যে সমুদ্রের অন্তরের রহস্য বড় গভীর,
অতলস্পর্শী। তােমার ভালােবাসা যদি সেরকম না হয়ে তার
উপরকার টেলএর মত চঞ্চল এবং ক্ষণিক হত তাহলে বােধ
হয় ভালো হত••
গভীর বিস্ময়ে শীলা বলে, এ কী খছ তুমি, মােহিত ?
-একটুখানি কেমন ঠেছে, না?•••আসল কথাটি হচ্ছে এই
যে তােমার ভালােবাসার গভীরতা আমায় করে দিচ্ছে এস্ত।
আমার মন তাই বলছে উভয়ের মুক্তির জন্যে যত শীগগির বিদায়ের
মুহূৰ্ত্ত চলে আসে ততই বােধ হয় হবে ভালাে।
—কিন্তু তােমার অনুবেদনাও যদি আমারই মত গভীর হয়ে
থাকে তাহলে বিচ্ছেদে ত সান্ত্বনা মিলবে না, মােহিত ••
—মানি, কিন্তু এক্ষেত্রে বিচ্ছেদ ছাড়া উপায় কৃী শীলা ?"যা’
অবশ্যম্ভাবী তাকে উপেক্ষা করে ত কোন লাভ নেই। তাই বছি,
১৫৭
সাগর দোলায় ঢেউ
জোর করেও মনকে বিশ্বাস করাতে হবে যে এ সাগরদোলায় ঢেউ
ছাড়া আর কিছুই নয় ! সাগর-অন্তঃপুরের নিস্তব্ধতার কথা ইচ্ছা
করেই যাব ভুলে !
পাবে ?
—না পারলেও চেষ্টা করতে হবে, শীলা।•••এবং সেই জন্যেই
বিদায়টাকে করে তুলতে হবে অকস্মাৎ, যাতে চিন্তা করবার
অবসরটুকু পৰ্য্যন্ত মন না পায়-••ভাববার অবসর পেলেই মন যাবে
ঢেউএর নীচেকার রহস্য আবিষ্কারের লােভে।
শীলা কিছু বলে না। মােহিতের মনের দ্বন্দ্ব সে অন্তর দিয়ে
উপলব্ধি করছিল..বুঝতে তার কোনই কষ্ট হচ্ছিল না, কারণ তার
মনের মধ্যেও যে সেই একই ছন্দে গাঁথা বিক্ষোভের প্রবাহিণী
চলছিল। সে ধীরে ধীরে মােহিতের কপালটির উপর তার ডান
হাতটি রাখলে।
মােহিত এই স্নেহস্পৰ্শ উপভােগ করূতে করতে বলে, যদি
আমাদের এমনি বিচিত্রভাবে দেখা না হত তাহলে কোন ক্ষতি
হত কি ?
শীলা বলে, না••অনুভূতি না থাকলে অভাবের কথা যে
উঠতেই পারেনা !
খানিকক্ষণ নীরব থেকে মােহিত বলে, জানাে, এক একবার
ব্রাউনিংএর মত আমার বলতে ইচ্ছা হয়, এই যে বেদনাপূর্ণ
আনন্দের ছোঁয়াচটুকু পেয়েছি এই বা কম কি? এর দামও ত’
নগণ্য নয় !•••কিন্তু নিজের জীবনের ছন্দের সাথে ব্রাউনিংএর
১৫৮
সাগর দোলায় ঢেউ
ফিলসফি মিলাতে গিয়ে দেখি, ব্রাউনিংএর মত দৃঢ়তা এবং বিশ্বাস
আমার নেই।
সান্ত্বনামিশ্রিত ভাষায় শীলা বলে, সে অভাব শুধু
তােমার একা নয়, মােহিত...বিশ্বজোড়া লােকের সম্বন্ধেই এই
কথা খাটে ।
অনেকক্ষণ মােহিত চুপ করে শীলার কোলে মাথা রেখে শুয়ে
রইল। তারপর হঠাৎ উঠে শীলার মাথাটি নিজের বুকের উপর
চেপে ধরে বলে, কেন যে তােমায় ভালােবেসেছি, শালা, আমি
নিজেই বুঝতে পারছিনা আমার সমস্ত শিক্ষাদীক্ষা ছিল তােমাকে
ভালােলাগার বিরুদ্ধে, কিন্তু মনের খেলা এমনই বিচিত্র যে সে
কোন বাঁধা আইন-কানুন মেনে চলেনা--সে চলে তার নিজের
খুসীতে খেয়াল মত•••
="।
দুপুর পড়ে আসছিল তখন। মােহিত মৃদুস্বরে বললে, খিদে
পেয়েছে, শীলা, না ?
শীলা একটুখানি হালে।
মােহিত বলে, কিন্তু আজ তােমায় উপপাসী থাকতে হবে
শীলা•••এখান থেকে আমি এখন নড় ছিনা—আর এ জায়গায় বসে
খাবার ত মিলবে না।
শীলা শুধু বলে, দরকার নেই কিছু
মােহিত বললে, আচ্ছা, শীলা, যদি তােমার সাথে আর দেখা না
হয় তাহলে তুমি আমার সম্বন্ধে যা তা ভাবে কি ?
সাগর দোলায় ঢেউ
অবাক হয়ে শীলা বললে, তােমার মনের মধ্যে দুরন্ত একটা
খেয়াল ঘুরে বেড়াচ্ছে, মােহিত, আমার কাছে তুমি লুকোবার চেষ্টা
করাে না !
ম্লানহাসি হেসে মােহিত বললে, খেয়াল কিছুই নেই, শীলা•••
মনে আসছে তাই
বলছি:
মােহিতের বুকে মুখ লুকিয়ে শীলা প্রশ্ন করলে, আমায় তুমি
বলােনা কী প্ল্যান্ তােমার মনের মধ্যে তােলপাড় করছে এখন
তেমনি হেসে মােহিত জবাব দিলে, প্ল্যান থাকলে ত বস্তু,
শীলা !..মনটা হয়ে উঠেছে ভবঘুরে, বাঁধন মাছে না, নিয়ম
শুনছেনা, তাই মুখের ভাষার মধ্য দিয়ে যা-খুসী-তাই বলাচ্ছে !
ঘড়িতে দুটো ৰখন বাজল তখন শীলা বলে, এবার ত
উঠতে হবে মােহিত • জাহাজ ছাড়বে আর ঘণ্টাখানেকের
মধ্যেই।
মােহিত তার হাতের ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বলে, হাঁ, এবার
তােমায় ষ্টীমারে পৌছিয়ে দিতে হবে ••
উঠল। সাগরপার ধরে আবার তারা হাঁটা সুরু করলে,
নেপএর জনকোলাহলের অভিমুখে। পথে
তারা শুনলে
জাহাজের প্রথম বাণী বাজল।
মােহিত বলে, বড় দেরী হয়ে গেছে, শীলা, জাহাজে পা দেবার
সাথে সাথেই চলা শুরু হবে কিন্তু...
Miss করব না ত ?
-না...ঠিক সময়ে আমরা গিয়ে পৌছ, ব।
১৬০
সাগর দোলায় ঢেউ
জাহাজের কাছে যখন তারা গিয়ে পৌঁছল তখন সিড়ি তুলে
নেবার মাত্র মিনিট দশেক বাকী। শীলা আর মােহিত তাড়াতাড়ি
উপরে উঠে চলে গেল ।
যােশী আর কৃপালানি ফাষ্ট ক্লাশ ডেকের সামনেই দাড়িয়ে-
ছিল-এই যাত্রী-দুটির আগমন প্রতীক্ষায়। তাদের আসতে দেখে
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে যােশী বলে, আমাদের যা ভাবনা হয়েছিল,
মিস্ রজাস ভাবলুম আজ মােহিতের পাল্লায় পড়ে বুঝি
ভিসুভিয়সের আগুনের চারদিকে ঘুরেবেড়াতে আরম্ভ করেছ
আলেয়ার মত!
শীলা বলে, আমরা ত ভিসুভিয় দেখতে যাইনি’, যােশী।
আমরা ওইদিক দিয়ে হেঁটে চলে গিয়েছিলুম অনেক দূর পাহাড়ের
মধ্যে •••
মােহিত এমন সময় “এই এখ খুনি আসছি” বলে বিদায় নিয়ে
চলে গেল।
কৃপালানি বললেন, বাবুজী—মিঃ সেন-কোনরকম পাগলামি
করেননি’ ত ?
রাঙা হয়ে শীলা জবাব দিলে, না•••তবে আজ তার মনটা খুবই
চঞ্চল বলে মনে হচ্ছিল।
কথা বলতে বতে তারা রেলিং থেকে সরে এসে দঁাড়ালে।
জাহাজের শেষ বাঁশী বাজবার সাথে সাথে সিড়ি উঠিয়ে নেওয়া
হ’ল। ভিসুভিয়স্ এবং পম্পিয়াই দেখে প্রত্যাগত যাত্রীরা এখানে
ওখানে জটলা করে খুব গভীর তর্ক এবং আলােচনা করুবার চেষ্টা
১৬১
সাগর দোলায় ঢেউ
করছিল। একটি সুন্দরী তরুণীকে ঘিরে কয়েকটি যুবক ভীষণ
উৎসাহের সহিত রােম্যান্ যুগের চিত্রকলা সম্বন্ধে ম-প্রকাশ
কছি এবং রােম্যান্ যুগের মেয়েদের সৌন্দৰ্যজ্ঞানের চেয়ে তাদের
সম্মুখের প্রতিমাটির বিচারবুদ্ধি অনেক বেশী তা’ নানাভাবে ভঙ্গীতে
বলছিল।
শীলা ভাবছিল মােহিত কোথায় গেল। হঠাৎ তার চোখ
পড়ল তীরের দিকে। নেপলস্ বন্দরের জেটির উপর দাড়িয়ে
মােহিত ; মুখে প্রসন্ন একটি হাসি, শীলার দিকে তাকিয়ে রুমাল
নাড়ছে।
যােশী, কৃপালানি এবং শীল যখন মােহিতের খেয়াল নিয়ে
আলােচনায় ব্যস্ত তখন মােহিত সবার অজ্ঞাতে সরে পড়েছিল, এবং
জাহাজ না-ছাড়া পর্যন্ত সে জেটির ভীড়ের মধ্যে লুকিয়ে ছিল, যাতে
তাকে কেউ দেখতে না পায়।
শীলা অস্ফুট চীৎকার করে যােশী আর কৃপালানির দৃষ্টি
আকর্ষণ করে বলে, দেখ, দেখ, মােহিত যে পড়ে রইল ।
কৃপালানি আর যােশী দেখলে তারা তাকাতেই মােহিত দুটি
হাত জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে তাদের নমস্কার করলে। তারপর
শীলার দিকে তাকিয়ে আবার রুমাল নাড়লে।
একটি মুহূর্তের জন্য শীলা কী যেন ভাবলে। যােণী এবং
কৃপালানির দিকে একবারটি তাকালে, তারপর নিজের রুমাল নিয়ে
ঠোটে একবার স্পর্শ করে নাড়লে। তার সমস্ত অন্তর মথিত করে
উঠল একটা চাপাকান্নার সুর-তার কানের কাছে বেজে উঠল
১৬২
সাগর দোলায় ঢেউ
মােহিতের শেষ কথা ক’টি, মনটা হয়ে উঠেছে ভবঘুরে, বাঁধন
মাছেন, নিয়ম শুনছেনা, তাই মুখের ভাষার মধ্য দিয়ে যা-খুসী-
তাই বলাচ্ছে
মনে মনে সে বলে, তুমি তােমার মনকে শান্ত করবার পথ
খুজে নিয়েছ, প্রার্থনা করি তুমি সফল হও।•• যৌবনের প্রারম্ভে
আমার মত তুচ্ছ একটা মেয়ের জন্যে তােমার জীবন, শিক্ষা, দীক্ষা
বিসর্জন দেবার বিরুদ্ধে যে তুমি যুঝছ তার জন্যে তােমাকে আমার
মনের শ্রদ্ধা ও প্রীতি জ্ঞাপন করছি।
কৃপালানি আস্তে আস্তে শীলাকে প্রশ্ন কলেন, আপনি কিছুই
জানতেন না এ প্ল্যানের কথা ?
শীলা কোনক্রমে অশ্রুরােধ করে ঘাড় নেড়ে জানালে, না।
কৃপালানি একটু অবাক হয়ে গেল।
জাহাজ তখন ধীরে ধীরে বন্দর ছাড়িয়ে উন্মুক্ত সাগরে এসে
পড়ছে। দূরে নেপলস্-এর জেটির ছবি তখনও দেখা যাচ্ছিল—
মােহিতের প্রস্তরসম মূৰ্ত্তি তখনও দৃষ্টির বহিভূত হয়নি, তার হাতের
রুমাল তখনও নড়ছিল। রুমালের প্রত্যেকটি স্পন্দনের সাথে যেন
মােহিতের গভীর অনুবেদনা ঝরে পড়ছিল---যেন সে বলছিল,
সমুদ্র অন্তরে অন্তরে নিস্তব্ধ এবং গম্ভীর হয়ে আছে এবং থাকবেও,
কিন্তু বাইরে তার ফেনিল উচ্ছ্বাসে সে তা দৃঢ়ভাবে গােপন করে
রাখবে, কারণ সে পূর্ণতলাভ করেছে, অনুভূতির চরমসীমায়
তার অন্তর যে পৌচেছে।
১৬৩
কর আ
MAKAR6kj- ijYight,
সাগর দোলায় ঢেউ
উন্মুক্ত সাগরের মধ্যে জাহাজ এসে পড়তেই আবার সেই
আগের মত দোলানির সুরু হল। আরম্ভ হ’ল ঢেউএর সেই নিষ্ঠুর
খেলা, খা’ অনাদিকাল থেকে চলছে এবং যা’ অনাদিকাল ধরে
মানুষের মন নিয়ে যা-খুসী-তাই করছে।
শীলা ধীরে ধীরে রেলিং থেকে সরে দাড়াল--তার মুখ নীরব
অশ্রুতে সজল।
Etd:-1915,
১৫ ৪ ?
LIGRARIA
SARASWA
এই লেখকের লেখা
ছিন্ন পাপড়ী
নতুন রকমের কথাবস্তুভরা গল্পের বই
কথাসাহিত্যের অপূৰ্ব্ব সৃষ্টি
দাম দেড় টাকা
চতিপথের বাঁশী
তরুণ যুবক অসিত ও কিশােরী মীরার প্রেমকাহিনী
অভিনব উপন্যাস
দাম দেড় টাকা
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.