Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Natun Uponibesh

Saraswati, Charubala · 2009/09/11

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

সূক্স উপনিবেশ)
“দময়ন্তীকথা” ও “সতুর মা” রচয়িত্রী
শ্রীমতী চারুবালা সরস্বতী প্রণীত।
কলিকাতা
মূল্য ছয় আনা

প্রকাশক
শ্ৰীঅনাথনাথ মুখােপাধ্যায়
৫নং বাগবাজার স্ট্রীট, ও ১১নং ক্লাইব রে
কলিকাতা।
Copyright Reserved by
the Publisher.
শ্রীগৌরাঙ্গ প্রেস,
প্রিন্টার-ঐসুরেশচন্দ্র মজুমদার।
১১নং মির্জাপুর থ্রট, কলিকাতা

+ + +
সতুর মা
(গল্প পুস্তক )
কয়েকটি অভিমত
“আমাদের অন্তঃপুরের মা-লক্ষ্মীরা যদি নিৰ্বেশেষে সকল রকমের
গল্পই গলাধঃকরণ না করিয়া এই শ্রেণীর গল্পের পক্ষপাতিনী হয়েন,
তাহা হইলে দেশের মঙ্গল হইবে, এবং গল্পসাহিত্যের বিপথগামিনী
গতি ক্রমে সুপথে ফিরিবে।
‘সতুর মার জীবনগ্রন্থ যে
প্রণালীতে লেখা হইয়াছে তাহার অভিনবতা অতি উপাদেয়।
যে তুলিতে আঁকা হইয়াছে সে তুলি নিপুণতার সহিত ব্যবহার করা
যে-সে চিত্রকরের কাজ নয়, * ঐ তুলিতে পুষ্পচন্দন বর্ষিত
হউক। * * *
*--“ভু-প্রদক্ষিণ” প্রণেতা ব্যারিষ্টার শ্রীযুক্ত
চন্দ্রশেখর সেন।
* * * রচনা গুলিতে মৌলিকতা, বর্ণনা বৈচিত্র্য ও আন্তরিকতার
সৌরভ আছে। বাঙ্গালীর ঘরে প্রতিদিন যে সব বেদনার কারণ দেখা
যায়—সেই সব কারণের কয়টি লইয়া লেখিকা গল্পের মধ্যে শিক্ষার
আদর্শ প্রদান করিয়াছেন। এমন গল্পের প্রচারে সমাজকে বুঝিবার
সুবিধা হয়।
*”-বসুমতী।
গল্পগুলি সুলিখিত ; আখ্যান ভাগ ভালাে এবং রচনাও
অনাবশ্যক উচ্ছাসের ভারে পীড়িত নয়। * সুখপাঠ্য।”-
ভারতী

ন
t
* * গল্পগুলি অতি সুন্দর * * ভাষা * * আবিলতা বিহীন
মিষ্ট * **কবিরাজ শ্ৰীযুক্ত প্রভাতচন্দ্র সেন কবিরঞ্জন।
** এই পুস্তকের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ একটি মধুর পবিত্র সংযত
ভাব। এইদই বিশেষভাবে উপভােগ্য। পড়িলে লেখিকার প্রতি
এন্ধার উদয় হয়। * **-উদ্বোধন।
* পাঠ করিয়া আমরা মুগ্ধ হইয়াছি। স্থানে স্থানে
অশ্রুবিসর্জন না করিয়া থাকিতে পারি নাই।
* * * সতুর মার’
চরিত্রে গ্রন্থকত্রী আমাদিগকে অমূল্য শিক্ষালাভের সৌভাগ্য ও সুযােগ
দান করিয়াছেন। বেশ সুখপাঠ্য ও স্বাভাবিক এবং চিত্তাকর্ষক
হইয়াছে।
-মানসী ও মর্মবাণী।
ইণ্ডিয়ান মিরর, কায়স্থ পত্রিকা প্রভৃতিতে বিশেষ ভাবে প্রশংসিত।
ভাল এন্টি কাগজে পরিপাটী ছাপা ; সােনার জলে
নাম লেখা; ভাল কাপড়ে বাঁধাই, ডবল ক্রাউন ১৬
পেজী, ২০৮ পৃষ্ঠা, মূল্য ১০ মাত্র।

No text on this page.

和
--
*

নুতন উপনিবেশ । বর্ষাকালের বৃষ্টি থামিয়াও থামিতে চায় না, আকাশ পরিষ্কার হইয়াও হয়না। একটু রৌদ্র দেখা দিয়াছে কি না দিয়াছে, অমনি খানকয়েক মেঘ জমা হইয়া আবার টুপটাপ, দেখিতে দেখিতেই ঝুপ ঝুপ, ঝমঝম্ শব্দে বর্ষণ আরম্ভ করে ; যেন অভিমানিনী মেয়ে ঠোট দুখানি ফুলাইয়াই আছেন, কি হইল না হইল, কে কি বলিল না বলিল অমনি মুখখানি ভার করিয়া দিতে বসিলেন। সবুজ লতা পাতা ঘাসের উপর প্রথম প্রথম সে কান্না বড় সুন্দর দেখায়, শুনিতে বেশ আমােদ বােধ হয়, সাধ্য সাধনা করিতেও ভাল লাগে, কিন্তু শেষে সে ধ্যাঘ্যানানি আর ভাল লাগেনা, একশাে বারই সেই একঘেয়ে টানাসুর শুনিতে শুনিতে, সে ম্লান- মুখ দেখিতে দেখিতে বিরক্তি ধরিয়া যায়, তখন কেবল মনে হয় একটু থামিলে বাঁচি। ১

নূতন
উপনিবেশ।
=
আজ সুবােধের তিনটী ছােট ভাই বােনের
তাহাই হইয়াছিল। প্রথমে যখন মঙ্গলবার দিন
ঠিক তাহাদের স্কুলে যাইবার সময়টীতে মাথার উপর
কয়েকখানা কাল মেঘ জমা হইয়া সূৰ্য্যকে ঢাকিয়া
ফেলিয়া গর্জন শব্দে প্রকৃতি দেবীর হাসিমুখ গম্ভীর
করিয়া তুলিল, তাহার নীল নয়নের কোলে কোলে
বৃষ্টির জল টল টল ছল ছল করিতে লাগিল ;-কয়টী
ভাই বােনে উপস্থিত স্কুল বন্ধের আশায় আনন্দিত
হইয়া তখন—“আয় বৃষ্টি চেপে, ধান দেব মেপে”---
বলিতে কিছুমাত্র আলস্য করে নাই, কিন্তু তারপর
যখন তিনদিন অনবরত বৃষ্টিতে চারিদিক ভিজে
সাৎসেতে হইয়া গেল, রাতদিন ঝন্ঝমানিতে কান
ঝালাপালা হইতে লাগিল, ঘর হইতে বাহির হওয়া
ভার হইল, একে একে সকলেরই মনে হইতে
লাগিল, বিনাদোষে এমন ভাবে অন্ধকার ঝুপ সি
ঘরের মধ্যে বন্দী হইয়া থাকার চেয়ে স্কুলে গিয়া
পড়া দেওয়া, এমন কি তাহা না পারিলে বেত খওয়াও
শতগুণে ভাল, তখন সকলেই আবার বৃষ্টির পায়ে
২

নূতন উপনিবেশ।
D
মাথা খুঁড়িয়া বলিতে বাধ্য হইল—“হে বৃষ্টি ছেড়ে
যা, নেবুর পাতা করমচা,”—বৃষ্টি তাহাদের অনুরােধে
কান দিলনা ; কেবল ঠাকুরমা তাঁহার আদরের
নাতি নাতিনীরা বাদলার হাওয়া গায়ে লাগাইয়া জ্বরে
পড়িবে এই ভয়ে সকল কাজ ফেলিয়া তাড়াতাড়ি
নিজের হাতে তাহাদের খাওয়াইয়া দিয়া ঘুমাইতে
বলিলেন। তখন রাত অল্প, কাহারও চোখে ঘুম
আসে নাই, ইহারই মধ্যে বিছানায় যাইবার ইচ্ছা
তাহাদের কাহারও ছিলনা; তবু ঠাকুরমার কথা
রাখিয়া কয়জনে কষ্টে সৃষ্টে চোখ বন্ধ করিয়া চুপ
করিয়া বিছানায় পড়িয়া রহিল।
বৃদ্ধ পিতামহী
সহজেই ভাবিলেন তাহার রতনমণিরা ঘুমাইয়া
পড়িয়াছে, সুতরাং আস্তে আস্তে তাহাদের বিছানা
ছাড়িয়া উঠিয়া, মশারি ফেলিয়া, ঘরের আলাে একটু
কম করিয়া দিয়া, তিনি নীচে নমিয়া গেলেন।
সুযােগ পাইয়াই শিশুরা একটু চঞ্চল হইয়া
উঠিল। অমলা চোখ খুলিবার সঙ্গে সঙ্গেই মুখ
খুলিল, কমলা সুধীরও নীরব রহিল না। তিন ভাই

নূতন উপনিবেশ।
বােনে ভয়ে ভয়ে চুপি চুপি দুই চারিটী কথা আরম্ভ
করিয়াছে এমন সময় দরজায় ঘা পড়িল, সঙ্গে সঙ্গে
কিসের একটা শব্দও শুনা গেল।
ছােট ভাই সুধীর ভয় পাইয়া বড়দিদি অমলার
কাছে আরো সরিয়া গিয়া বলিল-“ও কিসের
আওয়াজ দিদি ?” দিদির উত্তরের আগেই বাহির
হইতে আবার কে বলিল,-“বন্ধু ভয় করিও না,
আমি, দরজা খােল।”
“দেখাই যাক না, কে ? বলিয়া কমলা উঠিয়া
দরজাটা একটু খুলিতেই, তাহাদের নবাগত বন্ধু ঘরের
মাঝে আসিয়া, একটু হাসিয়া বলিল—“তােমরা কি
আমায় চেন ? বলিতে পার আমি কে ?” তিন
ভাই বােনে ঘাড় নাড়িয়া জানাইল-“না জানিনা।”
অপরিচিত বন্ধু ঘরের পরিষ্কার ঠাণ্ডা মেঝেয়
বসিয়া বলিল—“তােমরা আমায় না চিনিতে পার,
কিন্তু আমি তােমাদের চিনি, শুধু চেনা নয় খুব
ভালবাসি। তােমরা যখন কয় ভাই বােনে বই
শ্লেট লয়ে নানা দেশের গল্প করিতে করিতে স্কুলে
৪

নূতন উপনিবেশ।
যাও, আমার ইচ্ছা করে আমিও ওই রকম সাদাসিধা
পরিচ্ছন্ন বেশে শ্লেট বই লয়ে ঠিক তােমাদেরই মত
একটী ছােট ছাতায় ঝড় বৃষ্টি হইতে মাথাটীকে
বাঁচাইয়া, ইংলণ্ড, আমেরিকা, চীন জাপানের কথা
শুনিতে শুনিতে তােমাদের সঙ্গী হইয়া স্কুলে যাই।
বিকাল বেলার খেলার সময় তােমাদের সঙ্গে মনের
আনন্দে খুব লাফালাফি করিয়া খেলি, রাত্রে যখন
স্কুলের অর্ধেক পড়া তৈয়ার করিয়া লইয়া তােমাদের
ঠাকুরমাকে ঘিরিয়া বসিয়া অবাক হইয়া সেকালের
গল্প শােন, ইচ্ছা হয় আমিও তােমাদের পাশে বসিয়া
অনেক রাত অবধি সেই সকল মনােহর কাহিনী
শুনি।”
তিন ভাই বােনে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিয়া
ভাবিতে লাগিল—এ কে ? আগে আর কোনদিন
কি আমরা একে দেখেছি ?
তাদের মনের ভাব বুঝিতে পারিয়া অচেনা বন্ধু
বলিল—“তােমরা আমায় চেন না, জান না, এমন
কি আমি তােমাদের নিতান্ত কাছে এসে দাড়ালেও

নূতন উপনিবেশ ।
একটিবার ফিরে চাওনা, তবু, তােমাদের আমি
ভালবাসি বলে আমার অন্য বন্ধুরা, আমার আত্মীয়
স্বজনেরা আমার শত্রুর খােশামুদে বলিয়া নিন্দা
করে, কত ঠাট্টা তামাসা করে, কিন্তু তােমাদের
তিন ভাই বােনের মধুমাখা কথা আমার কানে ।
গেলে তােমাদের হাসিমুখ দেখিলেই সব ভুলে যাই।
কোন মতেই তােমাদের আমি শত্রু বলিয়া মনে
করিতে পারিনা, কিন্তু
তিন ভাই বােনের এই অচেনা বন্ধু আরও কি
বলিতে যাইতেছিল কিন্তু মুখের কথা মুখেই রহিল,
কি যেন দুঃখের কথা তাহার মনে পড়িয়া গেল,
দু’ ফোঁটা চোখের জল যেন মাটীতে পড়িল, সে
ব্যস্ত হইয়া অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া চুপ করিয়া
রহিল, কিছুক্ষণ মুখে একটাও কথা বাহির হইল না।
বিস্মিত হইয়া সুধীর তাহার মুখের দিকে
চাহিয়া রহিল, অমলা ও কমলা দুই চারিটী মিষ্ট
কথায় তাহাকে তুষ্ট করিয়া, সে কে ? কোথায়
থাকে? কি জন্য এই বর্ষার রাতে অন্ধকারে জল

নূতন উপনিবেশ।
কাদা ভাঙ্গিয়া তাহাদের কাছে আসিয়াছে ?-তাহা
জানিতে চাহিল ।
অচেনা বন্ধু তখন ধীরে ধীরে বলিল—“তবে
শােন বন্ধুরা,
আজ তােমাদের তিন জনকে
আমি আমার দুঃখময় জীবনের কাহিনী শুনাই,
আর, কেন
যে এই
এই অন্ধকারে
জল কাদা
ভাঙ্গিয়া আজ তােমাদের কাছে আসিয়াছি তাহাও
বলি।
সে অনেক দিনের কথা। মায়ের কাছে শুনিয়াছি
বন্ধু অমলা তুমি তখন ভাই নিতান্ত ছােট, চলিতে
বলিতে কিছুই শিখ নাই, তখন তােমার শুধু দোলনায়
শুইয়া কঁাদিয়া হাসিয়া নিজের অভাব আনন্দ প্রকাশ
করিবার শক্তিটুকু হইয়াছিল মাত্র। কমলা ও সুধীর
তখন জন্মায় নাই। সেই সময় ডাক্তারদের বাঁধা
ঘাটের নীচে পুকুরের নরম ঠাণ্ডা শেওলার পাশে
সরু একগাছি মালার মত হইয়া সাবুদানার আকারে
আমরা হাজার কয়েক ভাই বােন একসঙ্গে শুইয়া-
ছিলাম, তখন আমাদের সুখ দুঃখ বােধ করিবার শক্তি
৭

নূতন উপনিবেশ।
ছিল না, এমন সুন্দর এত বড় পৃথিবীটাকে দেখিবার
চোখ ছিল না, আমাদের দেখিলে জড় কি চেতন তাই
বুঝা যাইত না। মাঝখানে একটী কালাে বিন্দু,
আর বিন্দুটীকে ঘিরিয়া একটা চটচটে সাদা আবরণ।
ঠিক যেন কতকগুলি ভিজা তােকমারি একটীর পর
একটী করিয়া সাজাইয়া আস্তে আস্তে জলের উপর
ফেলিয়া রাখা হইয়াছে, উপরের সেই লালার মত
চটচটে আবরণটী না থাকিলে আমাদের ত একটু
হাওয়া কি একটু খানি জলের তাড়ায় চারিদিকে
ছড়াইয়া পড়িতে হইত, কিন্তু ঐ জিনিসটা আমাদের
বিন্দু দেহকে চারিদিক হইতে এমন ভাবে ঢাকিয়া ও
পরস্পরের সহিত যুক্ত করিয়া রাখিত যে ইচ্ছা
করিলেও কেহ সহজে আমাদের কোন অনিষ্ট
করিতে, একটীর নিকট হইতে আর একটীকে দূরে
সরাইয়া দিতে পারিত না।
মায়ের ভাগ্যদোষে আমাদের সেই নিরুপায়
অবস্থায় একদিন জেলেরা পুকুর পরিষ্কার করিতে
আসিয়া বিধাতার হাতে গাঁথা সেই মিনি সূতার

নূতন
উপনিবেশ
মালাটী পুকুরের পানা ঝাঝির সঙ্গে তুলিয়া ফেলিয়া
দিল। নিকটে থাকিয়াও মা আমার কোনমতে
তাহাদের হাত হইতে সেটীকে রক্ষা করিতে পারিলেন
, চোখের নিমেষে সব নষ্ট হইয়া গেল ! কেবল
‘আমি একখানা পানার নীচে পড়িয়া নাকি কোন
গতিকে রক্ষা পাইয়াছিলাম।
পাইয়াছিলাম। পাছে আমাকেও
হারাইতে হয়, সেই ভয়ে মা আমায় বুকে করিয়া
কয়দিন আহার নিদ্রা ছাড়িয়া একটা গর্তের কাছে
লুকাইয়া রহিলেন।
আমার জীবনের দ্বিতীয় অবস্থা পর্যন্ত আমি
মায়ের কোলে লুকাইয়া রহিলাম। শুনিয়াছি
আমাদের মধ্যে এ সৌভাগ্য নাকি আর কাহারও
হয় না। যাহােক, কয়েক দিন পরে জীবনের আরও
দুই একটী দুঃখজনক অসম্পূর্ণ অবস্থার পর একদিন
আমাদের কাক-জ্যোতিষীর নিকট হইতে আমার
শুভাশুভ জানিয়া দিন ক্ষণ দেখিয়া মা আমায় অনেক
সাবধান করিয়া অনেক উপদেশ দিয়া বাহিরে আনিয়া
একা ছাড়িয়া দিলেন। তখন আমার প্রথম ও প্রধান

নূতন উপনিবেশ।
কাজ হইল নিজের খাবার খুঁজিয়া লওয়া।
ক্ষুধাও যেমন প্রবল, খাবারও তেমনি অজস্র, কিন্তু
খাবার জিনিসের অভাব না থাকিলে কি হয়,
শত্রুর হাত হইতে প্রাণ বাঁচাইয়া খাবারের খোঁজে
যাওয়া আর ভাল মন্দ খাদ্য অখাদ্য চিনিয়া খাওয়া
-সে এক বিষম ব্যাপার ; পেটে রাক্ষসী ক্ষুধা, আর
খালে বিলে, পুকুরে, জলার মাঝে রাশি রাশি টাকা
বাসি, পচা পাকো
কত রকমের খাবার জিনিস,
দেখিয়া লােভ সামলানাে যায় না; আবার ঠিক
বুঝিয়া খাইতে না পারিলে মরিতে হয়। কেননা
ডিম হইতে বাহির হইবার পর হইতেই আমাদের
খাওয়াটাই,—মরা পচা ঘােট খাট পােকা মাকড়,
উদ্ভিদ, চোখের সুমুখে যা কিছু পাওয়া যায়
নির্বিচারে গলাধঃকরণ করাটাই তখন আমাদের
প্রধান কাজ। . আমাদের সেই রাক্ষসী বৃত্তিতে
জলাশয় বিষমুক্ত ও পরিষ্কার হওয়ায় আর সকলের
উপকার হয়, কিন্তু আমাদের পেটুকতা ও নির্বুদ্ধিতা
আমাদেরই মৃত্যুর কারণ হয়। বলিতে কি আমাদের

নূতন উপনিবেশ।
তখনকার সেই আহারের ঠেলা সামলাইয়া যে কয়টী
পারে বঁচিয়া থাকে।”
( ২ )
“জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষে আমি যখন বহু কষ্ঠে
দুবেলা সামান্য খাবারের যােগাড় করিতে শিখিয়াছি,
সেই সময়, আমার মা ও কাকিমারা আবার হাজার
কয়েক ডিম পাড়িলেন। ঝঝির পাশে পাশে খুব
ঘােট ঘােট গােল গােল দানার বড় বড় মালাগুলি
জলের উপর ছড়াইয়া রহিল। কে জানে হঠাৎ
আবার কোনদিন জেলেরা পুকুর পরিষ্কার করিবার
ছলে আসিয়া সব ডিমগুলি নষ্ট করিয়া ফেলিবে
সেই ভয় ভাবনায় মা কাকিমারা সব শিউরে রহিলেন
কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে সেবার খুব শীঘ্রই বর্ষা নামিল,
পথ ঘাট জলে কাদায় ভরিয়া গেল, খানা ডােবা
হইতে ছােট বড় পুকুর গুলা কানায় কানায় পূরিয়া
উঠিল। গ্রামে জ্বর দেখা দিল, আগে গায়ে হাতে
ব্যথা, তারপর শীত, শেষে দারুণ কম্প দিয়ে

নূতন উপনিবেশ। ম্যালেরিয়া জ্বরে গ্রামের অনেককেই বিছানায় ফেলিল। ডাক্তারদের মৌসুম পড়িল, সহরের পাউরুটি বিস্কুট- ওয়ালা পল্লীতে দেখা দিল। দোকানিকে ঘি ময়দার চেয়ে সাবু মিছরির ওজনটাই দিনে বেশীবার করিতে হইল, খই, মুড়কি আর মিছরি বাতাসার দর সন্দেশ রসগােল্লার মত হইয়া উঠিল। কাজেই জেলেরা আর জলে নাবিয়া পানা ঝাঝি তুলিতে সাহস করিল না। ভগবানের কৃপায় আমার ভায়েরা সে যাত্রা তাই বাঁচিয়া গেল। ক্রমে তাহাদের চোখ ফুটিল, ল্যাজ বাহির হইল। আমার লক্ষ লক্ষ ভাই বােন পুকুর পূর্ণ করিয়া ফেলিল। দু’চার দিনের মধ্যেই তাহারা খুব সাঁতারপটু হইয়া উঠিল, দেখিয়া আমাদের আহলাদের আর সীমা রহিল না! বন্ধু, জীবনে আমার সে কি আনন্দের দিন! বাদলের মেঘ আকাশ ছেয়ে ফেলিয়াছে, থাকিয়া থাকিয়া চিমি ঝিকৃমি করিয়া বিদ্যুৎ হানিতেছে, সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর শব্দে মেঘ ডাকিতেছে, আর পৃথিবীকে ঠাণ্ডা করিয়া চাষার শস্যের ক্ষেতে আশীর্বাদ ছড়াইয়া শ্রাবণের ১২ নূতন উপনিবেশ। ; ধারা ঝ ঝর ঝরিতেছে ; ডাক্তারদের বাগানের সদ্য ফোটা যুঁই, কামিনী, রজনীগন্ধা ফুলের সুবাসে পুকুর- ধারটি আমােদিত হইতেছে ; আর আমার মা, মামি, খুড়ি, জ্যাঠাই, মাসি, পিসি, দিদি, বৌদিদিরা সকলে মিলিয়া এক সুরে বর্ষা মঙ্গল গাইতেছেন, আর তারই তালে তালে আমরা অযুত লক্ষ ভাই বােন পুকুরের জলের উপর বৃষ্টির ফোঁটার নীচে ঘুরিয়া ঘুরিয়া নৃত্য করিতেছি।—আহা, সে কি সুন্দর কি সাধের নাচ! এখন ভাবিলে মনে হয় সে যেন কোন্ এক আনন্দের রাজ্যের সুখের স্বপন! আমােদে আহ্লাদে আমাদের পাঁচ ছয় দিন কাটিল। তারপর,—“ওঃ!” অমলার বন্ধু একটী দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া একটু চুপ করিয়া থাকিয়া ভাঙ্গা গলায় বলিল “কে জানিত যে সেই আনন্দই আমাদের শেষ আনন্দ হইবে ? কয়দিনের পর বৃষ্টি ছাড়িয়া গিয়া আকাশ পরিষ্কার হইয়া গিয়াছে ; চোখ ধাঁধান মেঘা- খেকো বােদ চকচকে পালিস করা রূপার পাতের

নূতন
উপনিবেশ।
মত চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িয়াছে ; পাখীরা সব
ডানা ঝাড়া দিয়া গাছের ডালে বসিয়া গান সুরু
করিয়াছে; কয়দিনের পর রােদ পাইয়া ছােট ছেলে
মেয়েরা মনের আনন্দে ছুটাছুটি খেলায় মাতিয়াছে।
সেই সময় পাড়ার একদল গিন্নী, মেয়ে ও বৌদের
সঙ্গে করিয়া ঘাটে স্নান করিতে, জল লইতে আসিল।
তাদের হাতের তাড়া খাইয়া জলের ঢেউয়ের সঙ্গে
আমরা ( বয়সে বড়রা) গভীর জলে সরিয়া গেলাম,
কিন্তু আমার শিশু ভাই বােনেরা নির্বোধের মত
খেলা করিতে করিতে তাহাদের গায়ে কাপড়ে উঠিল,
কতক বা জলের সঙ্গে তাহাদের ঘড়া গাড়র ভিতর
গিয়া পড়িল। রােজই যেমন আসে তাহারা তেমনি
আসিতে লাগিল, আমার ভাই বােনেরাও তাদের
নিতান্ত চেনা লােক ভাবিয়া তাহাদের পায়ের নীচে,
হাতের কাছে, কাপড়ের মাঝে ছুটিয়া ছুটিয়া খেলা
করিতে লাগিল। অনেকটা ভয় ভাঙ্গা হইয়া গেল,
কিন্তু হায়, হতভাগ্যরা তখন স্বপনেও ভাবে নাই এই
ছেলে খেলা হইতে তাহাদের কি সর্বনাশ হইবে।
১৪

নূতন উপনিবেশ।
আর আমরা বুঝিতে পারি নাই ওই ঘােমটা টানা
বোগুলাে মনে মনে তাদের উপর বিরক্ত হইয়া কি
বিষম শাস্তির আয়োজন করিয়াছে।
সকালে ঘুম হইতে উঠিয়া আমার শিশু ভাই
' বােনেরা জলে সাঁতারকাটিয়া খেলা করিতেছে, মা,
খুড়িমা প্রভৃতি বাড়ীর মেয়েরা ঘরকন্নার কাজ আরম্ভ
করিয়াছেন, বাবা, কাকা প্রভৃতি কৰ্ম্মক্ষম পুরুষেরা
পােকা মাকড়ের সন্ধানে দিকে দিকে বাহির হইয়াছেন।
আমার সেদিন শরীরটা বড় ভাল ছিল না বলিয়া
কোথাও যাই নাই, আমার পিসতুতাে ভাই আপা
গাছে বসিয়া তাহার ফেকাসে রংঙের লম্বা লম্বা হাত
দুখানি নাড়িয়া বলিতেছিল, আগের দিনে একটা
বক বাঁড়ুয্যেদের পুকুরে শিকার করিতে গিয়া কেমন
করিয়া নিজেই একটা বড় শালমাছের শিকার হইয়া
পড়িয়া চীৎকার করিতে করিতে উড়িয়া গাছে
বসিয়াছিল । আমি গাছের তলায় বসিয়া সেই বক
মহাশয়ের মজার শিকার কাহিনী শুনিতেছি এমন
সময় মনে হইল দূরে পুকুরের ভিতর হইতে

নূতন
উপনিবেশ।
আমাদের বাড়ীর সকলে যেন এক সঙ্গে কাঁদিয়া
উঠিল।
বাগানের পথ দিয়া এক নিশ্বাসে ছুটিয়া গিয়া
দেখি—সর্বনাশ! পাড়ার সেই বোগুলাে দল বাঁধিয়া
আসিয়া এক হাঁটু জলে নামিয়া এক একটা চুপড়ি
দিয়া আমার ছােট ভাই বােনগুলিকে ছাকিয়া তুলিয়া
ছুড়িয়া ছুড়িয়া ফেলিয়া দিতেছে ! আহা, সেই কচি
শিশুদেহে সে বিষম আঘাত সহ্য করতে না পারিয়া
হতভাগ্যরা একজন আর একজনের উপরে পড়িয়া
মৃত্যু যাতনায় ছটফট করিতেছে ! মায়েরা সকলে
হাহাকার করিয়া কাদিতেছেন। বড় দিদিরা চীৎকার
করিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে স্নেহের ভাই বােনদের
প্রাণ বাঁচাইবার জন্য বৃথা ছুটাছুটি করিতেছে। রাগে
দুঃখে পাগলের মত হইয়া শত্রুদের হাত হইতে
তাহাদের বাঁচাইবার জন্য জলের উপর ঝাঁপাইয়া
পড়িলাম।
আমার মরণাপন্ন ভাই বােনেরা ‘সােনাদাদা
বাঁচাও এদের হাত থেকে আমাদের রক্ষা কর
১৬

নূতন উপনিবেশ।
০
সােনদাদ।'—বলিয়া কাতরস্বরে চারিদিক হইতে
আমায় ডাকিতে লাগিল।
আমি প্রাণপণ চেষ্টা করিয়াও তাহাদের বাঁচাইতে
পারিলাম না, একই মুহূর্তে দশ-বারখানি হাত
আমাকে ধরিবার জন্য উদ্যত হইল। আমি কিছুক্ষণ
যােঝযুঝির পর কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে সপ্তরথি-ঘেরা
অভিমন্যুর মত ঘাটের সিড়ির উপর অজ্ঞান হইয়া
পড়িলাম।
কিছুক্ষণ পরে জ্ঞান হইল, কিন্তু আমি আর
উঠিতে পারিলাম না। আমাদের সেই দুঃখজনক
অবস্থা দেখিয়া দুঃখবােধ না করিয়া কতকগুলি ছেলে
মেয়ে হাততালি দিয়া নিষ্ঠুর-হাসি হাসিয়া উঠিল।
সে হাসি আমার বুকে শেলের মত বিধিল, আর
সেই সময় তাহাদের মাথার উপর গাছে একটা
টিকটিকি পড়িল। সেই তুচ্ছতম সরীসৃপটাও যেন
মানবশিশুকে লজ্জা দিয়া ঘৃণার সহিত বলিয়া উঠিল
—“ধিক ! ধিক্ ! ধিক।”
আমাকে একটু নড়িতে দেখিয়া বৌদের মধ্যে
১৭

নূতন উপনিবেশ।
একজন—ও ভাই ওটা মরেনি ! এখনও মিচকে
সয়তান মটকা মেরে পড়ে আছে'—বলিয়া আমার
জীবনটুকু নিঃশেষ করিবার জন্য একখানা ইট আনিতে
গেল। আর একজন বল্লে “থাক থাক্ ওকে আর
মারে না, ওর জন্য ত আর আমাদের জ্বালাতন হ’তে ,
হয় না ? ঘাটে আসিয়া সারাদিন যাহারা জ্বালাতন
করিয়া মারিত, তাহাদের চারভাগের তিন ভাগকে
নিকাশ করা গিয়াছে, চল এইবার ঘরে যাওয়া
যাক।
এক গা গহনা পরা একটা বড় মানুষের বৌ
বলিল-“না না ওকেও মেরে ফেল। বেটাদের
একঘেয়ে টানাসুরে চেঁচানির জ্বালায় রাত্রে ঘুম হয়
; হতভাগাদের দেখ-মার করিলে তবে রাগ যায়।
যে বৌটি ইট আনিতে ছুটিয়াছিল, মস্ত একখানি
থান ইট লইয়া ফিরিয়া আসিয়াছে, আমি আমার
অভাগী মায়ের যন্ত্রণা ভাবিতে ভাবিতে হতাশ ভাবে
মরণের জন্য প্রস্তুত হইতেছি, সেই সময় তােমার
মা-আহা, যেন মূর্তিমতী দয়া—‘ওকি দিদি নিরীহ
১৮

নূতন উপনিবেশ। প্রাণীকে অমন করে মেরনা মেরনা’ বলিতে বলিতে তাহাদের মাঝে হাঁ-হঁ করিয়া আসিয়া পড়িলেন। তাহার হাতের ইট হাতে রহিল, কেহ আর আমার দিকে এগিয়ে আসিতে সাহস করিল না। পুকর পাড়ের ইট-পাটকেল, ভাঙ্গা ঝিনুক গুলির উপর আমার ভাই বােনদের রাশিকৃত মৃতদেহ দেখিয়া দস্য- প্রকৃতি নিষ্ঠুর বৌগুলােকে তিনি ছি ছি করিতে লাগিলেন, আর আমার গায়ে আস্তে আস্তে জলের ছিটা দিয়া আমায় বাঁচাইলেন। বন্ধু কমলা তােমার মায়ের হাতের সেই জলের ছিটাগুলি ক্রমে আমার চেতনা, শক্তি, সাহস একে একে ফিরাইয়া আনিল । তাঁহার সেই যত্নের জন্য তাঁহার পায়ে লুটাইয়া পড়িয়া আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতে ইচ্ছা হইতে লাগিল। তাঁহার সে দিনের সে দয়ার কথা আমি জীবনে কখনও ভুলিব না, আর যতদিন আমার দেহে প্রাণ থাকিবে ভগবানের কাছে তােমার মায়ের আর তােমাদের মঙ্গল কামনা করিব। রাত্রে যখন সকলের খাবার জন্য বিস্তর পােকা ১৯

নূতন উপনিবেশ।
মাকড় মশা মাছি সংগ্রহ করিয়া বাবা ও কাকার
হাসিমুখে ঘরে ফিরে এলেন, আমাদের পুকুর-ঘর
তখন একেবারে আনন্দশূন্য নিস্তব্ধ ।
খুড়ী জ্যেঠাইমাদের চোখের জল তখনও শুকায়নি,
বুড়ী ঠাকুমা অসহ শশাকে জ্ঞানহারা হইয়া পাঁকে মুখ
জড়ে পড়িয়া আছেন। মা পাষাণে বুক বাঁধিয়া
আমাকে কোলে করিয়া, আমার দেহের যে যে স্থান
কাটিয়া গিয়া ভয়ানক ব্যথা হইয়াছিল, বনচাদার
পাতা বাটিয়া সেই সেই স্থানে দিয়া বাধিয়া দিতেছেন।
আমি জ্বরের ঘােরে কখন কঁদিতেছি,
হাসিতেছি। কখনও বা মা মা করিয়া চীৎকার
করিয়া উঠিতেছি।
সকালে যাহাদের হাসি খেলা দেখিয়া বাহির
হইয়াছিলেন সন্ধ্যায় ঘরে ফিরিয়া তাহাদের এই
অবস্থা দেখিয়া, বাবা ও জ্যেঠা খুড়াদের মনের ভাব
কিরূপ হইল বুঝিতেই পার, ব’লে আর কি জানাব?”,
অপরিচিত বন্ধুর পুরান দিনের দুঃখের কথা
মনে করিয়া চোখে জল আসিল।
২০

নূতন উপনিবেশ।
দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া শিশুরা জিজ্ঞাসা করিল
বন্ধু তারপর ?”
বন্ধু বলিল—“আমার অবস্থা খুব খারাপ হইলেও
দয়াময় ঈশ্বরের আশীর্বাদে সে যাত্রা আমি বাঁচিয়া
গেলাম। ক্রমে আমাদের ভাঙ্গা সংসার আবার
ধীরে ধীরে গড়িয়া উঠিতে লাগিল, হাসি খুসীতে দিন
কাটিতে লাগিল। সংসারে আগেকার এ আবার
ফিরিয়া আসিল। আগেকার দুঃখের কথা আমরা
একরকম ভুলিয়াই গেলাম। আমার নিজের বােন
ছিল না, জ্ঞাতি ভগিনীরা সুপাত্রের হাতে পড়িয়া
মানুষের ঘরের কোণ আশ্রয় করিয়া মনের সুখে
দিন কাটাইতে লাগিল। আমার বাবা ও জ্যেঠা
খুড়ারা সকলেই বুড়া হইয়াছিলেন, নিয়মিত আহার
সংগ্রহ করিতে যাইতে পারিতেন না। আমরা
পাঁচদিক হইতে পােকা মাকড় ধরিয়া আনিয়া
তাঁহাদের দিতাম।
একদিন ভায়েদের সঙ্গে এক বােঝা ছােট ছােট
পতঙ্গ লইয়া বাড়ী ফিরিতেছি,শুনিতে পাইলাম,

নূতন
উপনিবেশ।
মােটা ভুড়িওয়ালা লােক একজন আমার দিকে
চাহিয়া বলিল—‘ইস্ ব্যাটা রাশ রাশ পােকা মাকড়
খেয়ে মুটিয়েছে দেখ ! এখনি যদি ওর কলিজাটা
পাই কলার ভিতর করিয়া সেই হাঁপানি রােগীটাকে
খাওয়াইয়া দেখি তার সে বিষম রােগ ভাল হয়
কিনা।
কথাটা শুনিয়াই আমার বুকটা কেমন ছাঁত,
করিয়া উঠিল। ভায়েদের আগাইয়া দিয়া নিজে
একটু হন্ হন্ করিয়া চলিতে লাগিলাম।
ঘরে আসিয়া মাকে বলাতে মা বলিলেন ; “হ্যা
হা শুনিয়াছি বটে আমাদের কলিজাটা কাটিয়া তিন
ভাগ করিয়া তিনদিন কলার ভিতর করিয়া হাঁপানী
রােগীকে খাওয়াইলে তাহার রােগ ভাল হয়, মানুষেরা
একথা বলিয়া থাকে। তা যা হােক বাছারা ও পথ
দিয়া আর যানে, কে জানে কোন্ দিন কার হাতে
বিপদে পড়িতে হইবে। একেই আমার ভাঙ্গা
ভালয় ভালয় তােদের কয়টীকে রাখিয়া এখন
মরিতে পারিলে বাঁচি।”
কপাল,
২২

নূতন উপনিবেশ।
মায়ের মানা শুনিয়া আমরা আর সে পথে
গেলাম না।”
( 3 )
ধূমধাম দেখিয়া
“শরৎকাল, আকাশ পরিষ্কার, দিনটী বড় সুন্দর,
আমার মনটাও প্রফুল্ল। আমার পিসিমার ছােট
জামাই যাহাদের ঘরের কোণে বাসা লইয়া ছিলেন
তাহাদের বাড়ী খুব ঘটার দুর্গাপূজা হয়। আমার
ছােট বোন তাই দেখিবার জন্য আমায় কয় দিনের
নিমন্ত্রণ করিয়াছিলেন। আমি সেখান হইতে পূজার
শুনিয়া, পূজার
বাড়ীতে ভাল মন্দ
পাঁচটা জিনিস খাইয়া খুসী মনে বাড়ী ফিরিতেছি,
দেখি পথে একটা লােক চলিয়া যাইতেছে, তাহার
মাথার উপর প্রকাণ্ড একটা ঝুড়ি। ঝুড়ির ভিতর
হইতে যেন গোঁ গোঁ শব্দ আমার কানে গেল।
পেটুক যেমন করিয়া সন্দেশের দিকে চায়, লােকটা
আমার দিকে তেমনি ভাবে চাহিতে চাহিতে চলিয়া
গেল। দুর্দান্ত ডাকাতের মত কদাকার লােকটার

নূতন উপনিবেশ।
সেই চাহনি দেখিয়া আমার সর্বাঙ্গ জুলিয়া গেল।
কিন্তু হায়, তখন আমি ভ্রমেও ভাবি নাই যে সেই
লােকটাই সাক্ষাৎ যম হইয়া . আসিয়া আমাদের
সর্বনাশ করিয়া ফিরিয়া যাইতেছে ।
পুকুরধারে পা দিয়াই দেখি আমার বাড়ীর
সকল মেয়ে পুরুষ এক সঙ্গে জলের উপর আছড়া
আছড়ি করিয়া চীৎকার স্বরে কঁদিতেছে। বিপদের
খবর পাইয়া আমার ভগ্নীপতিদের মধ্যে অনেকেই
ছুটিয়া আসিয়াছেন। মা আমার কিছুতেই প্রবােধ
মানিতেছেন না, সন্তানদের শােকে তাহার বুক
যাইতেছে । আমায় দেখিয়া দ্বিগুণ জোরে
কঁদিয়া উঠিয়া বলিলেন, ‘বাছারা, এ হতভাগীর গর্ভে
জন্মে তােদের এই দুঃখ। এবার মরিয়া যেন নিঃ-
সন্তান হই; চোখের সামনে বার বার ছেলে মেয়ে-
দের এত কষ্টের মরণ যেন আর দেখিতে না হয়।
হায় হায়, বাছাদের আমার কি কষ্টেই প্রাণ বাহির
হইয়াছে। হে ভগবান, দয়া করে আমাকেও নাও
ফাটিয়,
আর সহ্য হয় না।
২৪

নূতন উপনিবেশ।
শােকের বেগ অসহ্য হওয়ায় মা অজ্ঞান হইয়া
পড়িলেন।
ইহা আর কিছু নহে, পথে যাহাকে দেখিয়া-
ছিলাম সেই পাষণ্ড পাগলা গারদে বেচিবার জন্য
• সেই প্রকাণ্ড ঝুড়ি ভরিয়া আমার অনেকগুলি ভাই
বােন কাকা কাকিমা প্রভৃতিকে লইয়া গিয়াছে।
তাহাদের মাংসের ঝােল রাঁধিয়া পাগলা গারদের
পাগলদের খাওয়াইবে। কৰ্ত্তা গিন্নীদের মধ্যে আমার
জ্যেঠা, বাবা, ঠাকুমা ও মা ভিন্ন আর সকলকেই
মুখে কাপড় বাঁধিয়া লইয়া গিয়াছে ! রাগে, দুঃখে,
শোকে আমি যেন পাগলের মত হইয়া উঠিলাম।
আমার সর্বাঙ্গ থর থর করিয়া কঁপিতে লাগিল।
আমাদের উপর সাপ ও মানুষের অত্যাচার জন্মাবধি
দেখিয়া আসিতেছি ; অনেক সহ্য করিয়াছি। কিন্তু
আর নয়—জগত শুদ্ধ লােক জানে আমরা দুর্বল,
নিরীহ, প্রবলের অত্যাচার আমরা মুখ বুজিয়া সহ
করি। কিন্তু হাজার দুর্বল বা নিরীহ হই, সহেরও
ত একটা সীমা আছে। রাগে দাতে দাত ঘসিয়া
২৫

নূতন উপনিবেশ।
সকলকে বলিলাম-দেখি আজ হইতে এক বৎসরের
মধ্যে যদি তােমাদের নিরাপদ করিতে, সকলের
অত্যাচার হইতে রক্ষা করিতে পারি তবে, ঘরে
ফিরিব, নহিলে এই শেষ, এ জগতে সােনা নামের
চিহ্নও থাকিবে না।
কাহারও দিকে না চাহিয়া, কাহারও কথায় কান
দিয়া ভয়ঙ্কর একটা আগুনের গােলার মত বেগে
আমি বাহির হইয়া গেলাম।
( ৪ )
দিন নাই রাত নাই অনাহারে অনিদ্রায় অনেক
কষ্টে গ্রাম, নগর, নদী পার হইয়া আমি এক গভীর
জঙ্গলে আসিয়া পড়িলাম। বারে, সে কি ভয়ানক
ঘন জঙ্গল ! দিনের বেলাও সেখানে রােদের মুখ
দেখিতে পাওয়া যায় না। গাছ পালার ফাঁকে ফাঁকে
কোথাও একটু আধটু আলাে আসে, তা সে আলােতে
অত বড় জঙ্গলের অন্ধকার যায় না। সেখানে
যাইবার সময় অতটা বুঝিতে পারিনাই কিন্তু বাহির
২৬

নূতন উপনিবেশ।
হইবার সময় দেখি মহা বিপদ। যত যাই গভীর
বনের মাঝে ঢুকিরা পড়ি, বাহিরে যাইবার পথ আর
পাই না।
অনেকক্ষণ ছুটাছুটির পর আমি হতাশ
ভাবে বসিয়া পড়িলাম।
দেখিতে দেখিতে সেই বনের আঁধার গাঢ়তম
করিয়া রাত্রি আসিল। তখন শুধু ঝি ঝি পােকার
ঝি ঝি রব, সাপের ফোঁসফোঁসানি, আর মাঝে
মাঝে জোট ছােট জন্তু জানােয়ারদের এধার ওধার
আনাগােনার আওয়াজ ছাড়া আর কিছু কানে
যাইতেছিল না, চোখেও কিছু দেখিবার উপায় ছিল
। ভাগ্যিস সে বনে বাঘ সিংহের বাস ছিল না,
তাই রক্ষা, নহিলে তাহাদের গর্জন শব্দে ভয়েই ত
প্রাণ বাহির হইয়া যাইত।
যাহােক দুঃখে কষ্টে রাত্রিটা ত কোন রকমে
কাটিয়া গেল। তখন সাহসে ভর করিয়া আবার সেই
বন হইতে বাহিরে যাইবার পথ খুঁজিতে উঠিলাম,
ভগবানের দয়া হইল, পথ মিলিল, বহু কষ্টে সন্ধ্যার
একটু আগে জঙ্গলের বাহিরে আসিয়া হাঁফ ছাড়িলাম।
২৭

নূতন উপনিবেশ ।
যত কষ্টই হােক, যত দুঃখই পাই, উদ্দেশ্য
ভুল নাই। দিনের পর দিন রাত্রির পর রাত্রি
পরিশ্রম করিয়া, নানা স্থানে যাইয়া, নানা ৰন
জঙ্গল ঘুরিয়া সুন্দর একটী উপনিবেশের স্থান ঠিক
করিলাম।
তারপর, মানুষের অত্যাচারে যারা যারা
ব্যতিব্যস্ত, সেই সব প্রাণীদের একত্র করিবার জন্য
আবার ছুটিলাম।
চেষ্টার অসাধ্য কিছুই নাই। কিছুদিনের চেষ্টায়
এমন অনেককেই খ জিয়া বাহির করিলাম যাহারা
আমার ইচ্ছামত একটী উপনিবেশ স্থাপন করিবার
জন্য আমার সঙ্গে হাসিমুখে দিনরাত খাটিতে রাজি
হইল। তাহাদের সহিত আমি প্রাণপণে খাটিয়া,
—সকলে স্বচ্ছন্দে বাস করিতে পারা যায়, যাহার
যাহা দরকার সে সকলের কোন অভাব না হয়,
বাহিরের কোন শত্রু হঠাৎ আসিয়া কোন অনিষ্ট
করিতে না পারে, এমন ভাবে সেই বনটী জুড়িয়া
স্থান প্রস্তুত করিলাম। যেখানে যেটীর দরকার,
২৮

নূতন উপনিবেশ ।
কত দূর দূরান্তর হইতে বহু কষ্টে সেখানে সেটী
আনিয়া রাখিলাম।
দেখিতে দেখিতে নূতন উপনিবেশ মানুষের
অত্যাচারে ব্যতিব্যস্ত লক্ষ লক্ষ ইতর প্রাণীতে
ভরিয়া গেল।
আমি আমার চেষ্টার সফলতায় খুসী হইয়া
হাসিমুখে আমার আপনার জনদের আনিবার জন্য
সেই পুকুরে আবার ফিরিয়া আসিলাম।
অত্যন্ত পরিশ্রম ও ভাবনায় আমার চেহারা এত
খারাপ হইয়া গিয়াছিল যে নিতান্ত আপনার লােক
হইলে কেউ আমায় চিনিতে পারিত না। মা
আমার চেহারা দেখিয়া হায় হায় করিয়া উঠিলেন।
আমি তাঁহাকে প্রবােধ দিয়া বলিলাম-‘ভয়
নাই মা, কিছু ভয় নাই, আমি ভালই আছি।”
( ৫ )
“অতি সাবধানে শত্রুদের দৃষ্টি এড়াইয়া বনের
পথ দিয়া আমি সকলকে লইয়া চলিয়াছি। বাতাসে
২৯

নূতন
উপনিবেশ।
পাতাটী নড়িতেছে, কুটাটী পড়িতেছে ত চমকিয়া
উঠিতেছি। আমাদের চিরশত্রু সাপের ভয়ে আমার
বুক কাঁপিতেছে।
মা, বাবা, জ্যেঠা
ও ঠাকুমাকে সকলের মাঝে
লইয়া চারিদিকে নজর রাখিয়া আমি আগে আগে
পথ দেখাইয়া চলিয়াছি। হঠাৎ দেখি সেই ঘাের
অন্ধকারের ভিতর হইতে আগুনের ফিকির মত
কাহার আটটা চোখ যেন আমাদের দিকে বেগে
ছুটিয়া আসিতেছে ।
ভয়ে আমার ‘আত্মাপুরুষ’ শুকাইয়া গেল।
ভাবিলাম ত্রিভুবনে এক পিতামহ ব্রহ্মা ভিন্ন আর
কোন দেবতা মানুষ বা ইতর প্রাণীর আটটা চোখ
আছে বলিয়া ত শুনি নাই। তবে কি বাপ
পিতামহের ভিটা ছাড়িয়া বহু দিনের বাস উঠাইয়া
চলিয়া যাইতেছি বলিয়া উনি আমাদের ভস্ম করিতে
আসিতেছেন ?
আগুনের ফিকিগুলা আরাে নিকটে আসিতেছে
দেখিয়া আমি ভয়ে তিন হাত পিছাইয়া পড়িলাম,

নূতন
উপনিবেশ।
আমার ঠেলা খাইয়া যাহারা আমার ঠিক পিছনে ছিল
তাহাদের মাথায় মাথায় ঠোকাঠুকি হইয়া গেল।
আমি যাহা দেখিয়া ভয় পাইয়াছিলাম আমার
ভায়েরাও তাহা দেখিতে পাইয়া চীৎকার করিয়া
উঠিল। সেই সময়ে শুনিতে পাইলাম কে গম্ভীরস্বরে
জিজ্ঞাসা করিল—“তােরা কে রে ? রাত্রে এই বনের
পথ দিয়া যাস্ ?
সে ভীষণ স্বরে আমাদের প্রাণ সঁপিয়া উঠিল।
চাহিতে সাহস হইল না, দুহাতে চোখ ঢাকিয়া মনে
মনে হরিকে ডাকিয়া বলিলাম-‘হে অনাথনাথ হরি,
দুর্বল অসহায়দের রক্ষা কর।
আবার সেই বিকট স্বর আমাদের কানে গেল।
মনে হইল যেন আমাদের ঠিক সামনে সে আসিয়া
পড়িয়াছে। ভয়ে ভয়ে চোখ খুলিয়া দেখি অন্য
কেহ নয়—বিকট আকারের বড় বড় চারটে বুনো
কুকুর আমাদের পথ আগুলিয়া দাঁড়াইয়াছে,আর
তাহাদেরই আটটা চোখ রাত্রির অন্ধকারে আগুনের
ফিকির মত জ্বল জ্বল করিতেছে। যদিও তখন

নূতন
উপনিবেশ।
আমি ভয়ে নিতান্ত কাতর হইয়াছিলাম তবু সকলের
মুখ চাহিয়া সাহসে ভর করিয়া তাহাদের পায়ে
লুটাইয়া জোড়হাতে মিনতি করিয়া আমাদের পথ
ছাড়িয়া সরিয়া দাড়াইতে বলিলাম।
তাহাদের মধ্যে দুটী আমার কথায় কান দিল না,
একটী বলিল ‘সারাদিন আজ আমাদের খাওয়া হয়নি
ক্ষুধায় অস্থির হইয়াছি, হাতের কাছে যখন পাইয়াছি
চারজনে আজ তােদের মাংস খাইয়াই ক্ষুধা শান্তি
করিব। তাহার কথা শেষ না হইতেই আর দুটীতে
আমাদের মাঝে লাফাইয়া পড়িবার উদ্যোগ করিল,
আমি নিমিষের মধ্যে তাহাদের সামনের পা দুটী
জড়াইয়া ধরিয়া কঁদিতে কাঁদিতে বলিলাম-“যদি
এ হতভাগাদের নিতান্তই প্রাণে মার, আগে আমাকে
খাইয়া ফেল তারপর যাহা হয় করিও, আর দোহাই
তােমাদের আমার ঠাকুরমা ও ছােট ভাইটীকে
খেও না।
চারটীতে এক সঙ্গে বলিয়া উঠিল ‘হাঁ হাঁ তাই
হবে তাই হবে। সেই ভাল, এই বেটাকেই আগে।
৩২

Phoe

No text on this page.

নূতন উপনিবেশ। ; খাওয়া যাক তাহলে আর কেউ এমন মায়া কান্না কেঁদে বাধা দিতে পারবে না। আমি নিরাশ হইলাম না, নিজের প্রাণের আশা ছাড়িয়া আর সকলকে বাঁচাইবার জন্য অনেক কাকুতি মিনতি করিলাম কিন্তু তাহাদের কঠিন প্রাণ কিছুতেই নরম হইল না। চোখের জলে ভাসিয়া ভাবিলাম হায় হায় এততেও নিষ্ঠুরদের দয়া হইল দয়াময়ের রাজ্যে কি তবে দয়া বলিয়া কিছুই নাই । জগতের সমস্ত জীবের প্রাণে আমাদের মত হতভাগাদের জন্য একটুও স্নেহ নাই ? স্নেহ নাই ? সকলের দিকে চাহিয়া হতাশভাবে বলিলাম—তােমাদের ভাল করিতে গিয়া মন্দই করিলাম, আমার বুদ্ধিতে আজ তােমাদের সকলকে এক সঙ্গে প্রাণ হারাইতে হইল ! হা অদৃষ্ট! এক সঙ্গে সকলে হাহাকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল। খাইবার জন্য কুকুরেরা আমায় ধরিতে উদ্যত হইয়াছে, সেই সময় দলের ভিতর হইতে আমার মা দৌড়িয়া আসিয়া তাহাদের পায়ে ধরিয়া কাঁদিয়া নূতন উপনিবেশ। বলিলেন ‘বাছারা নিতান্তই যদি আমাদের খাও, ঈশ্বরের দি একবার আমার জীবন কাহিনীটা দয়া করিয়া শুন তারপর ইহাদের আগে আমাকে খাও।” কি ভাবিয়া আবার তাহারা বিকট স্বরে বলিল, -“তবে বল্ দেরী করিস নি, দেরী করিলে আর কোন কথা না শুনিয়া আমরা এক সঙ্গে সব কটাকে খেয়ে সাবাড় করিব। মা ভয়ে কাঁপিতে কঁপিতে তাহার দুঃখময় জীব- নের কাহিনী বলিতে লাগিলেন। আমরা যেন মরণের অপেক্ষা করিয়াই সকলে স্তব্ধ হইয়া রহি- লাম। আর ঠাকুমা সেই ভয়ানক বনে অন্ধকারের মধ্যে বসিয়া একমনে বিপদভঞ্জন হরিকে ডাকিতে লাগিলেন। তিনি ভিন্ন এ বিপদে আর কে রক্ষা করিবে ? জানিনা কেন আমাদের কাহিনী শুনিতে শুনিতে ক্রমে তাহাদের উগ্রমূৰ্ত্তি অনেকটা শান্ত হইয়া আসিল। প্রথম দুটী মায়ের দিকে চাহিয়া বলিল- ৩৪ নূতন উপনিবেশ। ‘যা বুড়ী যা আর কাদিসনি, তাের জন্যই আজ এরা বাঁচিয়া গেল। শেষের দুটী বলিল ‘মনে করিসনি তাের দুঃখ কাহিনী শুনিয়াই ছাড়িয়া দিলাম, মানুষের অত্যাচারে বিব্রত হইয়া লােকালয় ছাড়িয়া পলা- ইতেছিস শুনিয়াই তােদের আর কিছু বললাম না। আমরা যদিও বনে স্বাধীনভাবে আছি, আমাদেরই অনেক জ্ঞাতি ভাই মানুষের বাড়ীতে আছে। তাহা- দের মুখে শুনিতে পাই সমস্ত দিন বাঁধা থাকিয়া, একবেলা খাইয়া, সারারাত জাগিয়া বাড়ী চৌকি দিতেছে, প্রাণপণে তাহাদের ধন প্রাণ রক্ষা করি- তেছে ; কোন কোন জায়গার পুলিসে বিনা মাহিনায় চাকরী করিয়া বড় বড় চোর ডাকাত খুনিকে ধরিয়া দিতেছে ; দারুণ শীতে কনকনে বরফের উপর দিয়া গিয়া বরফের ভিতর হইতে আধমরা মানুষকে টানিয়া বাহির করিয়া সন্ন্যাসীদের আশ্রমে লইয়া গিয়া বাঁচাইতেছে ; ভয়ানক সমুদ্রে নিজের প্রাণের মায়া ছাড়িয়া সাঁতরাইয়া গিয়া প্রভুর আজ্ঞা পালন করি- তেছে; মনিবের ভেড়ার পাল রক্ষা করিতে গিয়া ;

নূতন উপনিবেশ। ; প্রাণপণে বাঘের সঙ্গে লড়াই করিতেছে ; মনিবের ছেলে মেয়েকে বাঁচাইবার জন্য গােখরো কেউটের কামড়ে প্রাণ হারাইতেছে কেনা চাকরের মত সারা জীবন শত রকমে প্রভুর সেবা করিতেছে, তবুও, নিষ্ঠুর মানুষ তাহাদের কুকুর বলিয়া ঘৃণা করিতে ছাড়ে না, একটু দোষ পাইলেই আচ্ছা রকম শাস্তি দিতে ভােলে না। বেশী কথা কি ? এমন এমন দেশও আছে যেখানে মানুষ কুকুরের কাছ থেকে সেবা নেয় কিন্তু অশুচি হইবার ভয়ে তাহাদের ছোয় , দৈবাৎ ছুঁইয়া ফেলিলে কাপড় কাচিয়া বা স্নান করিয়া শুদ্ধ হয়। সবচেয়ে মন্দ ও বেহায়া মানুষকে তাহারা কুকুর বলিয়া গালি দেয়। কত আর বলিব ? আমাদের জ্ঞাতি ভাইদের উপর এই সকল অত্যা- চারের কথা শুনিয়া আমরাও মানুষদের উপর খুব চটিয়া আছি। তােমরা যদি কোন দিন ইহার প্রতিশােধ দিবার সুবিধা করিতে পার আমাদের খবর দিও, আমরাও কিছু সাহায্য করিব। কুকুরেরা আর কিছু না বলিয়া আমাদের কৃত- নূতন উপনিবেশ। জ্ঞতা জানাইবারও অবসর না দিয়া, আহার অন্বেষণে বনের অন্য দিকে ছুটিয়া গেল। ( ৬ ) আমাদের তখনও একেবারে ভয় ভাঙ্গে নাই, কাপিতে কঁপিতে আমরা সামনে পা বাড়াইলাম, খানিক দূর যাইতেই আবার এক বিপদ। পথের পাশে সাপের ফোঁসফোসানি শুনিয়া সকলে ভয়ে আড়ষ্ট হইল, আর এক পা অগ্রসর হইবার সাহস কাহারও রহিল না। আমি সকলের রকম দেখিয়া মহা ভাবনায় পড়িলাম। একলার প্রাণ নয় যে ছুটিয়া পলাইব, সকল গুলিকে লইয়া প্রবল শত্রুর হাত হইতে পালান বড় সহজ নয়। তাহা ছাড়া একটু আগেই একটা বিপদে পড়িয়া সকলেই অনেকটা সাহসহীন হইয়া পড়িয়াছে। এতটা পথ চলিতে চলিতে পায়ের জোরও কমিয়া আসিয়াছে। তবু আমি হতাশ হইলাম না ; সকলকে সাহস দিয়া বলিলাম—ভয় কি ? যদিই এসে পড়ে, এক টানে ৩৭ নূতন উপনিবেশ। ; একটা সাপ ত আর আমাদের সকলকে একেবারে এক গ্রাসে গিলিতে পারিবে না; কোন মতে একটীকে মুখে করিলে কিছুক্ষণ তাকে ফেলিতেও পারিবে না সহজে গিলিতেও পারিবে না, দাতে আটকাইয়া যাইবে; সেই তর্কে আমরা সবাই পালা- বার পথ খুঁজিব; আর, কোন সাড়া শব্দ না করিয়া চুপি চুপি যদি চলিয়া যাইতে পারি, হয়ত সে জানিতে পারিবে না। চল, ভয় করিয়া এক জায়গায় দাঁড়াইয়া থাকিও না। বিপদের সময় ভয় না করিয়া সাহসের সহিত বিপদ হইতে মুক্ত হইবার চেষ্টা করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কোথাও একটু না থামিয়া, একটু না জিরাইয়া লাফাইতে লাফাইতে আমরা ভােরের সময় আমাদের নূতন উপনিবেশে আসিয়া পৌঁছিলাম। এতক্ষণে আমার সকল কষ্ট সার্থক হইল। সকলের মুখে হাসি দেখিয়া মনে সাহস দেহে বল আরও বাড়িল ।

নূতন উপনিবেশ। আমাদের দেখিয়া আমার নূতন উপনিবেশের বন্ধুরা আনন্দে জয়ধ্বনি করিয়া উঠিল। যাহার দয়ায় এত বিপদ কাটাইয়া আমরা এমন নিরাপদ স্থানে আসিয়া পৌঁছিতে পারিলাম সেই দয়াময় জগৎপতির চরণে প্রণাম করিয়া, আমরা আমাদের হেলাফুলে ঘেরা, পদ্মফুলে ভরা নূতন পুকুর-ঘরে গিয়া বসিলাম। ছােট ছেলে মেয়েরা এতক্ষণে জল পাইয়া আল্লদে লাফাইয়া উঠিল। উপনিবেশের বন্ধুরা আমাদের জন্য অনেক পােকা মাকড় জড় করিয়া রাখিয়াছিল তাহাই আমাদের খাইতে দিল। এইখানে তােমাদের বলিয়া রাখি, আমাদের জিত, আর খাইবার ধরন বড় মজার। তােমাদের মত আমরা আমাদের খাদ্য হাতে করিয়া মুখে তুলিয়া দিই না, গােগ্রাসেও খাই না, আবার পাখীদের মত ঠোঁট দিয়া ঠোকরাইয়া ঠোকরাইয়া বা ইন্দুর আরসুলা প্রভৃতির মত কুরিয়া কুরিয়া খাই । আমাদের জিভ সহজে ও শীঘ্র শিকার ধরিয়া মুখে পুরিবার এক অদ্ভুত যন্ত্রবিশেষ। তােমাদের নূতন উপনিবেশ। জিভ যেমন ভিতর দিকে আটকানাে আর সামনের দিকে আলগা, ইচ্ছামত বাহির করিতে বা মুখের ভিতর টানিয়া লইতে পার, আমাদের জিভ ঠিক তার বিপরীত। সাপের জিভের মত আমাদের লম্বা চেরা জিভ মুখের ভিতর দিকে আলগা আর সামনের দিকে আটকানাে থাকে। খাদ্য নজরে পড়িলেই জিভটী একবার উল্টাইয়া মুখের বাহিরে আনিয়া তাহার উপর ফেলিতে পারিলেই হইল, আর সে যায় কোথায় ? যেমন জিভটী তাতে ঠেকা আর জিভের ডগায় যে চটচটে লালা থাকে সেই লালায় আটকাইয়া নিমেষে মুখের ভিতর গিয়া পড়া! খাদ্য সম্মুখে আসিয়া পড়ার যা দেরী ভােজনে আমাদের কিছুমাত্র দেরী লাগে না, সে চোখের পলক ফেলিতে ফেলিতে শেষ হইয়া যায়। আহার শেষে আমরা ঘুমাইতে গেলাম। আঃ, সে কি আরামের ঘুম! (৭) তিন দিন তিন রাত্রের পর সেই ঘুম ভাঙ্গিল। উঠিয়া দেখি নূতন উপনিবেশের সকলের সঙ্গেই ৪০ নূতন উপনিবেশ। ৪ আমার বাড়ীর সকলের বেশ আলাপ পরিচয় হই- আছে, মনের আনন্দ চোখে মুখে ফুটিয়া পড়িতেছে। স্বাধীনতা সুখে এই তিন দিনেই যেন সকলের চেহারা ফিরিয়া গিয়াছে। শুনিলাম ঠাকুমা আমার বাবাকে বলিতেছেন ‘বাছা আজ তাের ছেলে সােনা হতে আমরা স্বাধীন হইতে পাইলাম। তাই লােক সৎ- পুত্রের কামনা করে। অসৎ পুত্র হইতে যেমন দুঃখ ও মনকষ্ট পাইতে হয়, সৎপুত্র হইতে তেমনি বাপ মা জীবনে সুখী হয় আর পরকালে স্বর্গ পায়। আহা, সােনা আমার বেঁচে থাক, একশ বছর পরমায়ু হােক, যাহা কখন ভাবিতেও পারি নাই সােনার কল্যাণে আজ আমাদের সে সৌভাগ্য হইল।” অমলার নূতন বন্ধু থামিল। তাহার চক্ষু দুটী আনন্দে উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। অমলা জিজ্ঞাসা করিল—“তারপর ?” বন্ধু বলিল—“তারপর আর কি, সেই অবধি আমরা নিরাপদে সেখানে স্বাধীন ভাবে বাস করি- তেছি। অনেক দিন হইল ঠাকুমা স্বর্গে গিয়াছেন। । ৪১ নূতন উপনিবেশ। তাঁহার ছেলেরা আর আমরা তাহার নাতিরা মিলিয়া খুব ঘটা করিয়া শ্ৰাদ্ধশান্তি করিয়াছি। ঠাকুমার, শ্রাদ্ধ সে আবার এক মস্ত কাহিনী। যদি শুনিতে চাও ত আর একদিন বলিব। জ্যেঠা মহাশয় তাল- সাল হইয়া বাঁচিয়া আছেন। মা বাবাও খুব বুড়ো হইয়া থপথপে হইয়া পড়িয়াছেন। তারা আর ঘর- সংসারের কিছু করিতে পারেন না, আমাদের হাজার- কত ভায়ের লক্ষ-কয়েক ছেলে মেয়ে লইয়া বসিয়া আদর আহলদি করেন। স্ত্রী আমার খুব মনের মত, রূপের চেয়ে তাহার গুণই বেশী। নূতন উপ- নিবেশের সকলেই তাহার গুণে মুগ্ধ, মিষ্ট কথায় অমলা আনন্দিত হইয়া বলিল—“তবে বন্ধু তুমি এখন বেশ সুখে আছি ?” বন্ধু উত্তর করিল-“হাঁ ভাই প্রথম জীবনে অনেক দুঃখ কষ্ট সহ্য করিয়া ভগবানের আশীর্বাদে আমি এখন খুব সুখী হইয়াছি।” “কিন্তু সে যাহােক, জীবন কাহিনী বলিতেই ত ৪২ নূতন উপনিবেশ। সময় গেল যে জন্য আমি তােমার কাছে আসিয়াছি : তাহা ত বলা হইল না বন্ধু ?” অমলা বলিল—“তাইত ! সে কথা জিজ্ঞাসা করিতে ত আমি ভুলিয়াই গিয়াছি।” অমলার বন্ধু বলিল- বন্ধু বলিল—“আগামী রবিবারে আমাদের নূতন উপনিবেশে নূতন মহাসভার প্রথম অধিবেশন হইবে ; দেশ বিদেশ গ্রাম নগর ও বন হইতে ইতর প্রাণীরা আসিয়া এ মহাসভায় যােগ দিবে। ইহারই মধ্যে অনেকে আসিয়াছে আরও আসিবে। আর সকল বন্দোবস্তই ঠিক হইয়াছে কেবল তােমাদের একটু সাহায্য পাইলেই কাজ আরম্ভ করিতে পারি।” অমলা আশ্চৰ্য্য হইয়া বলিল—“বন্ধু আমাদের হতে তােমাদের কি সাহায্য হইবে ভাই ?” বন্ধু হাসিমুখে উত্তর করিল—“তােমাদের হ'তে কি সাহায্য হবে ? শােন—জগৎপাতা জগদীশ্বরের নিম্নে পৃথিবীর মধ্যে আমরা সমস্ত ইতর প্রাণী এক মানব জাতিকেই আমাদের সম্রাট বলিয়া ৪৩ নূতন উপনিবেশ। মানি। তােমরা আমাদের মনে বড় কষ্ট দাও বলিয়াই সময়ে সময়ে আমরা তােমাদের কাছ থেকে। দূরে চলিয়া যাইতে চাই; কিন্তু তোমরা যদি আমাদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার কর, আমরা ইতর প্রাণী হইলেও আমাদের প্রাণ নাই সুখ দুঃখ বােধ নাই মনে না কর, যদি এটা মনে রাখ যে ইতর বা মহৎ যেই হােক প্রাণী মাত্রেরই সমান প্রাণ আছে সুখ দুঃখ বােধ করিবার শক্তি আছে—রাগ দুঃখ, আনন্দ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিবার সকলেরই আলাদা আলাদা ভাষা আছে, কেবল তােমাদেরই তাহা বুঝিবার মত বুদ্ধি ও ক্ষমতা নাই, তাহা হইলে তােমরা দেখিতে পাও আমরা জগতে তােমাদের যত ভক্তি করি ও ভালবাসি এমন আর কাহাকেও নয়। সেইজন্য আমাদের বড় ইচ্ছা তােমাদের মধ্যে একজনকে আমাদের সভার প্রথম সভাপতি করি। বন্ধু অমলা! তুমি যদি আমার কথা রাখিয়া সভাপতি হও আমরা বড় খুসী হব। সুধীর তােমাকেও ভাই অভ্যর্থনার ভারটা ৪৪ নূতন উপনিবেশ। । লইতে হবে। আর বন্ধু কমলা আমি শুনেছি তােমার গলা খুব মিষ্ট। সভা আরম্ভে তােমায় একটী গান করতে হবে। আশা করি, আমার এ অনুরােধ রক্ষা করতে কুষ্ঠিত হবে না।” নূতন বন্ধুর অনুরােধ শুনিয়া তিন ভাই বােনে কিছু চিন্তিত হইল। একটু পরে বড় বােন অমলা বলিল “বন্ধু তােমার অনুরােধে খুব খুসী হ’লাম, কিন্তু ভাই আমরা ত কখন সভা সমিতিতে যাই নাই, হয়ত থতমত খাইয়া বােকা বনিয়া বসিয়া থাকিতে হবে। তাছাড়া তােমার সঙ্গে আমাদের এই প্রথম আলাপ তােমার নাম কি ? কোথায় তােমাদের উপনিবেশ ? কোটা তােমার বাড়ী; এ সকল কিছুই জানিনা, হঠাৎ কেমন করিয়া যাইব ? এবারের মত মাপ কর ভাই, অন্যবারে আমরা যাইব।” “হাঃ হাঃ হাঃ—আমার নাম জাননা, বাড়ী চেননা তাই ভাবিতেছ ? তােমাদের গােয়ালের গরুকে, পুকুরের মাছেদের জিজ্ঞাসা করিলে তাহার যে তখনি বলিয়া দিবে।” ৪৫ নূতন উপনিবেশ। অমলা আশ্চর্য্য হইয়া বলিল “সে কি! তাহারা কেমন করিয়া জানিবে ? তাহারা কি তোমায় চেনে? কোনদিন কি তাহারা তােমার বাড়ী গিয়াছে ? বন্ধু উত্তর দিল—“আহা, তবে আর বলিতেছি কি ? ঠিক তােমাদের গরুটী না যা তার আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধবরা ত অনেকেই সভায় যােগ দিবার জন্য গিয়াছে, যাহারা বাকি আছে সেইদিনে সব যাবে, মাছেরা প্রায় সকলেই গিয়াছে। যায়গায় যায়গায় এখনও যাহারা আছে, তাহারাও সেদিন যাবে। তােমরা চারিদিকে মাছ নাই মাছ নাই শুনিয়াও বুঝিতেছ না, তারা তােমাদের দেশ ছাড়িয়া কোথাও গিয়াছে ? বলিতে কি, মাছেদের উপর তােমরা বড় বেশী অত্যাচার কর। তােমাদের মাছের লােভটা এত বেশী যে কিছুতেই অল্পে মন উঠেনা এমন মাছ নাই যাহা তােমরা খাও না ছােট্ট থেকে আরম্ভ করিয়া রুই, কাতলা, শাল, বােয়াল, বান, এমন কি কড মাছটিকে পৰ্যন্ত ছাড়না। ; মেতি চুননা ৪৬ নূতন উপনিবেশ। তােমাদের জ্বালায় মাছের বংশ বাড়িতে না পাইয়া বরং দিন দিন কমিতে সুরু হইয়াছে। জেলেরা পয়সার লােভে জাল বােঝাই করিয়া করিয়া মাছ ধরিতেছে আর তােমরা ঘরে বসিয়া মনের সাথে সেই মাছের ঝোল, অম্বল, পােলাও, কালিয়া রাঁধিয়া পেটটী ভরিয়া খাইতেছ, আর, চারিদিকে বলিয়া বেড়াইতেছ—“মাছের মায়ের পুত্রশােক নাই।” কিন্তু মাছের মায়ের প্রাণের কাছে যদি একটু কান পাতিয়া শুনিতে জানিতে তাহা হইলেই বুঝিতে যে মাছের মা পুত্রশােকে কতখানি কাতর ; দিনরাত তাহাদের চোখের জল রােজ কত দেশ দেশান্তরের নদী, হ্রদ, খাল বিলের জলের ভিতর দিয়া সমুদ্রের জলে গিয়া মিশিতেছে, কত যুগ যুগান্তর হইতে চোখের জল মিশিয়া মিশিয়া সমুদ্রের জল লােনা হইয়া গেল তবু এখনও তােমরা বুঝিলে না ! হায় হায়, মানুষ এমনি নিষ্ঠুর !! তােমরা হয়ত বলিবে খাবার জিনিস খাব না ? ঈশ্বর ত ওই জন্যই ওদের সৃষ্টি করিয়াছেন। আচ্ছা ; ৪৭ নূতন উপনিবেশ। তাই না হয় ধরিয়া লইলাম, কিন্তু তােমরা খাইবে বলিয়াই ঈশ্বর যদি ওদের সৃষ্টি করিয়া থাকেন, তাহা হইলে ছারপােকা মশাও তােমাদের রক্ত খাইয়া বাঁচিবে এই রকম বুদ্ধি দিয়া তিনি মশা ছারপােকার সৃষ্টি করিয়াছেন মনে করিয়া তােমাদের চুপ করিয়া থাকা উচিত। তােমরা মানুষ সবল, বুদ্ধিমান, কাজেই তারা নিজেদের প্রাণ বাঁচাবার জন্য অমন প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড দেহ থেকে দু-দশ ফোঁটা রক্ত খায় বলিয়া তাদের তােমরা দেখ, মার কর। তারা পালাইয়াও নিস্তার পায় না, খাট বিছানা বালিশের কোণ মশারির ধারে খুঁজিয়া খুঁজিয়া তাদের টিপিয়া মার, গন্ধকের ধোঁয়ায় দম আটকাইয়া, কত রকম কত রকম পােকা-নাশক পাউডার, কপূর, টার্পিন আরও কত কি বিছানায় ছড়াইয়া তাদের প্রাণ লও। আর মাছেরা দুর্বল ইতর প্রাণী তাই তােমাদের সকল অত্যাচার নীরবে সহ্য করে। তােমাদের কোন শাস্তিই দিতে পারে না। জাওলা মাছগুলো অন্যের চেয়ে একটু বেশী তেজাল ৪৮ নূতন উপনিবেশ। বলিয়া হাত ছাড়াইবার চেষ্টা করে কিন্তু তােমাদের হাত ছাড়াইয়া পালাইবার কারই বা সাধ্য আছে, অমন যে বাঘ, সিংহ, হাতী তাহারাও তােমাদের ভয়ে জুজু। আর ভারি মদ্দ জাওলামাছ তাহারা আর করিবে কি? শীঘ্র করিয়া মারিয়া ফেলিবার জন্য যখন একটাকে আছড়াও আর একটা কেবল হতাশ হইয়া চাহিয়া থাকে, ভাবে আমারও আর দেরী নাই। ( ৮ ) নূতন বন্ধুর কথা শুনিতে শুনিতে ইতর প্রাণীদের উপর মানুষের নিষ্ঠুরতা হৃদয়হীনতার অনেক কথা আজ তিন ভাই বােনের মনে পড়িয়া গেল। সে সকল ত তাহারা কতদিন চোখের সুমুখে দেখিয়াছে কিন্তু এমন করিয়া ত কখন ভাবে নাই, ভাল মন্দ কিছুই বােঝে নাই ! চোখের সামনে তাহারা যােহা দেখিয়াও দেখে নাই শুনিয়াও শুনে নাই সেই রকম কতদিনের কত ঘটনা মনে করিয়া আজ তাহাদের ৪৯ নূতন উপনিবেশ। হােট তিনটী বুক ইতর প্রাণীদের প্রতি করুণায় সহানুভূতিতে ভরিয়া উঠিল। সুধীরের সদা প্রফুল্ল কচি মুখখানি মলিন হইয়া পড়িল। তিনজনে কিছুক্ষণ নীরব থাকিবার পর অমলা বলিল—“ ভাই আমরা অনেক সময় ইতর প্রাণী দের প্রতি অন্যায় করিয়া থাকি বটে কিন্তু তারাও যে আমাদের সঙ্গে সব সময় খুব ভাল ব্যবহার করে তা নয়। এমন ছােট খাট অনেক জীব আছে যারা মানুষের অপকার না করিয়া থাকিতে পারে না, যেখানে যতটুকু পারে তারা মানুষের অনিষ্ট করিতে ছাড়ে না। তার সাক্ষী দেখনা উই আর ইঁদুর।” সুধীর হঠাৎ দিদির এই কথায় উৎসাহিত হইয়া বলিল সত্যই ত আমরা তাহাদের কোন মন্দ করিনা তবু তারা আমাদের ক্ষতি করে। এই বলিয়া সুধীর বন্ধুকে শুনাইয়া শুনাইয়া ধীরে ধীরে সে পদ্যপাঠের সেই “উই আর ইন্দুরের দেখ ব্যবহার, যাহা পায় তাই কেটে করে ছারখার” ইত্যাদি পদ্যটী আওড়াইতে লাগিল। ৫০ নূতন উপনিবেশ। কমলা ধীরে ধীরে বলিল—“কিন্তু যাই বল বন্ধু শুধু শুধু ইচ্ছা করিয়া মানুষরা কাকেও কষ্ট দেয় । মাছ মাংস আমাদের খাবার জিনিস, খেতে ভাল লাগে, কেউ খেতে মানা করে না তাই খাই, নইলে আমরা খাইতাম না, ধরিতামও না মারিতামও ।” বােনের কথায় সায় দিয়া অমলা আবার বলিল “মানুষকেই শুধু নিষ্ঠুর বলিতেছ কেন ভাই? ইতর প্রাণীরাও ত নিজের প্রাণ বাঁচাইবার, পেট ভরাইবার জন্য এ ওর প্রাণ নষ্ট করে ; সে সময় ত কেউ কাকেও মায়া করে না। বরং ইতর প্রাণীদের মধ্যে অনেকে বিনা কারণে বিনা দোষেও কত প্রাণীর প্রাণনাশ করে, কিন্তু মানুষ কখন তাহা করে না। বন্ধু দিদির কথার কি উত্তর দেয় শুনিবার জন্য কমলা ও সুধীর ব্যগ্র হইয়া রহিল। বন্ধু হাসিয়া বলিল-“রাগ কোনাে বন্ধু বলিতে কি সে গুণেও তােমাদের ঘাট নাই। আমরা যে সকল অন্যায় করি, তাহা ত করই, তা ছাড়া তােমরা নূতন উপনিবেশ। অনেক বেশী অন্যায় কর। তাহা না হইলে মনে কর বেচারি কাঁচপােকা—তা দোষের মধ্যে তাহারা বড় সুন্দর তাহাদের ডানা রঙ্গিন, কিন্তু তােমাদের কিছু খায়ও না, লয়ও না, কোন অহিতও করে না, কেবল নিজেদের কোন কাজে-কর্মে মাঝে মাঝে তােমাদের বাড়ীর দিকে আসে। তােমরা সেই সুযােগে তাহাকে ধরিয়া তাহার তাহার হুলটী কাটিয়া তাহাকে বিষম যন্ত্রণা দিয়া মার। কাঁচপােকা শুধু নয় সােনা পােকা, পাথর পােকারও তােমরা ঐ দশা তােমাদের হাতে পড়িলে আর তাহাদের নিস্তার নাই। নিরীহ নিরপরাধী বেচারিদের প্রাণ লইয়া তােমরা লাভ কর কি ? না খানকয়েক তুচ্ছ টিপ! যাহা না হইলেও তােমাদের বেশ দিন যায়, কোন কষ্ট বা ক্ষতি হয় না। হাঁ একথা মানি যে তােমাদের ফোটা আধফোটা ফুলের মত সুন্দর মুখ সে টিপে আরও সুন্দর দেখায়, কিন্তু, তাই বলিয়া এত বড় একটা পাপ এমন নিষ্ঠুরতা করা কি বুদ্ধিমান মানব শিশুর উচিত ?

নূতন উপনিবেশ। এই রকম আরও কত আছে, কত আর বলিব ? সভায় যাইবে; সেখানে মানুষেরা যে যে জন্তুর উপর • যা যা অন্যায় অত্যাচার করে সকলি তাদের নিজেদের মুখ থেকে শুনিতে পাইবে। বন্ধুর কথার আর কেহ প্রতিবাদ করিতে পারিল না। সত্যই ত বেচারী কাচপােক বিনাদোষে তাদের কাছে কত লাঞ্ছনা সহ করে। তাদের সখ মিটাইবার জন্য অসময়ে প্রাণ হারায়।” তিন ভাই বােনের মুখ লজ্জায় রাঙা হইয়া উঠিল। “যাহােক, যেও বন্ধু ভুলােনা”—বলিয়া নূতন বন্ধু উঠিল । অস্পষ্ট স্বরে কমলা বলিল “কিন্তু নামটী ? বন্ধুর নামটী ত_ বন্ধু বলিল—“ওঃ নামটা যে বলা হয়নি, নাম আমার অনেক। বাড়ীতে আমায় সকলে সােনা বেঙ বলিয়াই ডাকে; তবে অন্য সকলে ভেক, মণ্ডুক, বর্ষাভূ, শালুর, প্লব, দদুর প্রভৃতি নামে নূতন উপনিবেশ। আমায় ডাকে, তা ছাড়া সুন্দর কচুবনের মাঝে আমার বৈঠকখানা, সেখানে বসিয়া রােজ আমি আমার নূতন উপনিবেশের ভাল মন্দ ন্যায় অন্যায়ের বিচার, ব্যবস্থা, যুক্তি পরামর্শ করি বলিয়া আমুদে লােকেরা আমায় “কচুবনের কালাচঁাদ” ও বলে। সুধীর বলিল—“দিদি মনে থাকিবে কি তার চেয়ে লিখে নাও।” বন্ধু বাধা দিয়া বলিল—“থাক থাক আর লিখিতে হইবে না, আমার কাছে—আমার ঠিকানা লেখা কার্ড আছে দিতেছি। কিন্তু তিনজনে যেও ভাই ভুল না। আগামী রবিবার বল ত না হয় সঙ্গে করিয়া লইয়া যাইবার জন্য আবার আমি আসিব।” তিন ভাই বােনে বলিল—না আর কষ্ট করিয়া আসিতে হইবে না। তুমি যখন নিতান্তই ছাড়িবে না আমাদের যাইতেই হইবে পথটা একটু বলিয়া দাও কি দেখিয়া চিনিয়া লইব ? আর সভায় কি ৫৪ নূতন উপনিবেশ। কি বিষয়ের আলােচনা হইবে একটু আগে হতে জানিতে পারিলে ভাল হইত না ?” বন্ধু বলিলেন-“হাঁ হাঁ জানিয়া রাখা দরকার বৈ কি- প্রথমতঃ, আমার বাড়ীর কথা,-তা সে চিনিয়া লওয়া বড় শক্ত নয়। তােমাদের স্কুলের তােমাদের স্কুলের ঠিক একশ হাত আগে একটা সরু রাস্তা, রাস্তাটা পার হইয়াই মাঠ, মাঠের পরেই প্রথমে মানুষে যাহাতে সহজে যাইতে না পারে এমনি ভাবে খুব ঘন কাটা গাছের বেড়ায় চারিদিক ঘেরা। বেড়ার পরেই সবুজ শেওলা ঢাকা একশত হাত গভীর জল। যাহাতে শত্রু যদি কাটার খোঁচা সহ্য করিয়াও কোন রকমে যায়, সবুজ মাঠ ভাবিয়া যেমন পা দিবে অমনি একশ হাত নীচে জলে পড়িয়া প্রাণ হারাইবে। তারপর তারপর শুন বেল কাটায় ঘেরা বেড়ায় ইষের মুলের সবুজ লতা জড়ানাে। বেঙ জাতির চিরশত্রু সাপ সে বেড়া ডিঙ্গান দূরের কথা, তার ত্রিসীমানায় যাইতে না পারে। বেড়ার ৫৫ নূতন উপনিবেশ। ওদিকে জগতের সকল রকম মনােহর সুগন্ধি ফুলের গাছ। তাহারই মাঝে আমার সুন্দর সুবিস্তৃত ‘নূতন উপনিবেশ। সেখানে রকম রকম জন্তুর । বাসের উপযােগী বাড়ীর মাঝে আমার সব চেয়ে বড় সবচেয়ে সুন্দর বাড়ী দেখিলেই বুঝিতে পারিবে। বাড়ীর পাশে প্রকাণ্ড ময়দানে খুব পুরু সবুজ শেওলার মকমল বিছানাে কংগ্রেস মণ্ডপটী যে সকল মনােহর কচুগাছে ঘেরা তাহার প্রত্যেক পাতাটীতে এক এক ফোঁটা বৃষ্টির জল মুক্তার মত চক্ চক্ ঝক ঝক্ করিতেছে আর তাহারই পরে সারি সারি রজনীগন্ধার গাছ, তার প্রত্যেক ফুলটীর উপর এক একটী উজ্জ্বল জোনাকির আলাে। সভার ঠিক মাঝখানে সভাপতির উঁচু আসনের কাছে একটী কৃত্রিম পাহাড়ের গায়ে এক একটী বাতির আলাের মত উজ্জ্বল কয়েক হাজার পাহাড়ী পােক সাজান। সেই লক্ষ লক্ষ জোনাকি ও পাহাড়ী পােকার আলােতে কংগ্রেস মণ্ডপ আললাময় হইবে চিনিয়া লইতে একটুও কষ্ট হইবে না।

No text on this page.

No text on this page.

নূতন উপনিবেশ। মােটামুটি সব বলিয়া গেলাম তারপর গিয়া আর সব দেখিবে। তারপর—আলােচনার বিষয় বলি- ১। ইতর প্রাণীর প্রতি মানুষের অযথা অত্যাচারের প্রতিবাদ-প্রধান ও প্রথম বিষয়। ২। আমাদের স্বাধীনতা লাভের উপায় নির্ধারণ। সবলের হাত হইতে দুর্বলদের রক্ষা করিবার উপায় নির্ধারণ। ৪। এখনকার মত ভৃত্য ভাবে নয় কিন্তু বন্ধু ভাবে মানুষের সাহায্য করিবার প্রস্তাব। ৫। আমাদের শারীরিক শক্তি বৃদ্ধির উপায় নির্ধারণ। ৬। ইতর প্রাণীদের মধ্যে ধর্মের প্রচার। ৭। নূতন উপনিবেশ চিরস্থায়ী ও দৃঢ় করিবার উপায় চিন্তা প্রভৃতি আমাদের প্রধান আলােচনার বিষয়। তারপর উপস্থিত মত কথাবার্তা হইবে।” কথা শেষ হইলে নমস্কার করিয়া বন্ধু উঠিয়া দাঁড়াইল। বন্ধুর পাকা সােনার মত উজ্জ্বল ৫৭ নূতন উপনিবেশ। হলদে রং ঘরের বাতির আলােয় আরাে উজ্জ্বল দেখাইতে লাগিল, মনের আনন্দ তাহার লম্বা তারা- যুক্ত চোখ দুটীতে ফুটিয়া উঠিল। অমলা, কমলা ও সুধীর প্রতি-নমস্কার করিয়া বলিল—“বন্ধু তােমার সঙ্গে আলাপ হওয়ায় বড় সুখী হইলাম।” “গ্যাঙ গ্যাং” “গ্যাঙ গ্যাং”—আমি ও বন্ধু আমিও”-বলিয়া সােনাব্যাঙ ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। (৯) কমলা ও সুধীর দুই তিনবার ডাকিয়াও অমলার ঘুম ভাঙ্গাইতে না পারিয়া একটা ঠেলা দিয়া বলিল —“এত বেলা হইল, ঘরে রােদ আসিয়া গেল, আরও কতক্ষণ ঘুমাইবে দিদি ? ওঠ স্কুলের পড়া করিতে হইবে, কয়দিন পরে বৃষ্টি থামিয়া এমন সুন্দর নােদ উঠিয়াছি আজ স্কুলে যাইতেই হইবে।” ছােট ভাই বােনের ডাকা ডাকিতে অমলার ঘুম ভাঙ্গিল। সে হতভম্বর মত বাহিরের দিকে চাহিয়া ৫ নূতন উপনিবেশ। বসিয়া রহিল। বারবার কমলার জিজ্ঞাসার উত্তরে বলিল “সারারাত ধরিয়া বড় আশ্চর্য একটা স্বপ্ন দেখিতেছিলাম, তাই এত বেলা হইয়াছে, রােদ উঠিয়া গিয়াছে কিছুই টের পাই নাই”। কমলা ও সুধীর দিদিকে ধরিয়া বসিল-“কি স্বপন দিদি বল, বলিতেই হইবে এখনি।” বেলা হইয়া গিয়াছে, স্কুলে যাইবার জন্য প্রস্তুত হইতে হইবে বুঝিয়াও ছােট ভাই বােনের অনুরােধে পড়িয়া সেই বিছানায় বসিয়াই অমলা তার দীর্ঘ স্বপন এক নিঃশ্বাসে সবটুকু বলিয়া ফেলিল। তাহারা শুনিয়া বলিল বাঃ বড় মজার স্বপন ত! ঠিক যেন সত্যি। অমলা বলিল “হ্যা ঠিক সত্যির মতই ত ভাই। সেই থপ থপ করিয়া আসা যাওয়া যেন চোখের সামনে দেখিতেছি, সেই জীবন কাহিনী এখনও যেন শুনিতেছি।” সুধীর বলিল—“আচ্ছা দিদি সত্যি হইলেও হইতে পারে ত?”

নূতন উপনিবেশ । কমলা বলিল—“দূর পাগল তা কখন হয় ? ব্যাঙে কখন মানুষের মত কথা কয়?” অমলা বলিল—“আচ্ছা থাম দেখি সে কার্ডখানা আছে কিনা, তাহা হইলেই বুঝিতে পারিব সত্য কি মিথ্যা।” একটু খুঁজিতেই কার্ডের মত একখানা কি চাদরের ভিতর হইতে পাওয়া গেল। অতিমাত্র আগ্রহের সহিত তিন ভাই বােনে সেখানি পড়িয়া দেখিল, তাহাতে লেখা রহিয়াছে- লােনা ব্যাং। পদ্মপুকুর, কচুন, নূতন উপনিবেশ। বিস্মিত হইয়া তিনজনে মুখ চাওয়া চাওয়ি করিয়া বলিল—“একি ভাই!—এ তবে স্বপন? সত্যি ?”

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Natun Uponibesh

Author
Saraswati, Charubala
Title
Natun Uponibesh
File name
Natun Uponibesh
Text
OCR done
Citation
1919
Published
2009/09/11
Publisher
Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
79
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Fiction
Keywords
Durgapuja
DLI number
512986
Barcode
4990010020007.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
FXjdViUby9C
Download PDF

Natun Uponibesh