Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Europe-bhraman

Basu,narendrakumar · 2010/04/24

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

য়ুরােপ-ভ্রমণ।
নরেন্দ্রকুমার বসু
প্রণীত।
কলিকা।
১৩১৯

২১ নং কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা ;
বেঙ্গল মেডিক্যাল লাইব্রেরী হইতে
প্রকাশিত।
কলিকাতা, ৬৪১, ৬৪২, সুকিয়া ধ্রুট,
লক্ষ্মী প্রিন্টিং ওয়ার্কস হইতে
শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র ঘােয় কর্তৃক মুদ্রিত।

---

No text on this page.

মুখবন্ধ।
১৩১৭ সালের পূজার ছুটীতে ঘূৰােপ-ভ্রমণে যাই।
নিজের চক্ষু ও মনের তৃপ্তি ভিন্ন ভ্রমণের আর কোনও উদ্দেশ্য
ছিল না। ভ্রমণ-বৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ করিবার কোনও কারণও
ছিল না। তবে বিদেশে বিজাতীয় ভাষার ঘাতপ্রতিঘাতে
স্বভাবতঃই মাতৃভাষা শ্রবণের বা কথনের জন্য-ন আকুল
হইত। সেই অভাব কিঞ্চিৎ পূরণের জন্য প্রায় প্রত্যহ রাত্রিতে
পিতৃদেবকে একখানি পত্র লিখিতাম। তাহাতে প্রত্যহ যাহা
দেখিতাম তাহার সারাংশ বিবৃত হইত। তাঁহার সেগুলি
বড় ভাল লাগিয়াছিল, তাই দেশে ফিরিবার পর সেইগুলি
প্রকাশ করিতে আমাকে আদেশ করেন। কিঞ্চিৎ পরিবর্ধিত
আকারে সেই পত্রগুলি ‘আৰ্যাবৰ্তে প্রকাশিত হয়।
প্রবন্ধগুলি পুস্তকাকার প্রাপ্ত হইল।
ইহা প্রকৃত প্রমণবৃত্তান্ত’ নহে, নিজে যাহা দেখিয়াছি
তাহারই কতকগুলি অনিপুণ চিত্র।
শ্রদ্ধেয় ‘আৰ্য্যাবর্ত’-সম্পাদক মহাশয় প্রবন্ধগুলি পুন
মুদ্রিত করিবার অনুমতি দিয়াছেন; সেজন্য আমি কৃতজ্ঞ ।
শ্রীনরেন্দ্রকুমার বসু।
মহালয়া, ১৩১৯।

No text on this page.

য়ুরােপ-ভ্রমণ। যাত্রা। ৪ঠা সেপ্টেম্বর, ১৯১০। বেলা ১১টার সময় বন্ধুবর সু-, চুও মি-বাবুদিগের সহিত ভিক্টোরিয়ায় চড়িয়া বােম্বাইয়ের রাজপথে বাহির হইলাম। পথে এক পশলা বৃষ্টি হইয়া গেল ; বােধ হয়, সূৰ্য্যদেব য়ুরােপের আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিলেন। জেটীতে পৌছিয়া শুনিলাম, জাহাজ কুলে আসিতে পারে নাই, দূরে সমুদ্রে দাঁড়াইয়া আছে ; কারণ, তরঙ্গ বড় ভীষণ। কিছুক্ষণ পরে একজন পুলিশ কর্মচারী সমস্ত ভারতবর্ষীয় যাত্রীদিগের নাম, ধাম, গমস্থান ও য়ুরােপ-যাত্রার কারণ লিখিয়া লইল । অনেক পার্শি যাত্রী দেখিলাম, কাহারও কাহারও গলায় বন্ধুরা ফুলের মালা দোলাইয়া দিতেছেন। বাঙ্গালীও অনেক দেখিলাম, কিন্তু সকলেই তরুণবয়স্ক। কিছুক্ষণ পরে ডাক্তারের পরীক্ষা আবদ্ধ হইল। ডাক্তার এক টেবলের সম্মুখে বসিয়া আছেন, পার্শ্বে ঐকজন ভারতবাসী, বােধ হয় কম্পাউন্ডার। ঘরে প্রবেশ করিবামাত্র প্রশ্ন হইল, “নাম কি ?" নাম বলিবার সময়ে ‘সাহেব’ সম্মুখস্থিত একখানা chartএ নাম মিলাইয়া লইলেন; ভারতীয় ভদ্রলােকটি কজির কাছে হাত দিয়া বলিলেন, “All right ইহাই নাম পরীক্ষা। লঞ্চে উঠিলাম। ঠিক ১২টা ১৫ মিনিটের সময় লঞ্চ ছাড়িল। বন্ধুরা তীরে দাঁড়াইয়া রুমাল ঘুরাইতে লাগিলেন। প্রায় কুড়ি মিনিট পরে গিয়া জাহাজে পেীছিলাম। জাহাজে উঠিবামাত্র একজন লােক স • २ য়ুরােপ-ভ্রমণ। পরে জানিলাম Chief seward ) আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কো Steward শ্রেণী ?” আমি বলিলাম “প্রথম।” সে পথ দেখাইয়া তাহার কক্ষে লইয়া গিয়া বলিল, “একটু অপেক্ষা করুন, কামরা দেখাইয়া দিতেছি। সে জাহাজের একখানা চিত্র ফেলিয়া দিয়া চলিয়া গেল। দেখিলাম, প্রথম শ্রেণীতে ৮৮ জনের স্থান আছে ; আমরা মাত্র ছয়জন যাত্রী এবং দুইটি ছেলে মেয়ে। আমার কামরায় তিন জনের স্থান হয় ; অধিকারী আমি একাকী! আর একটি স্থানে বন্ধু মন্মথনাথের নাম লিখ। ছিল ; কিন্তু তিনি যাত্রার অব্যবহিত পূর্বে গৃহিণীর মনােকষ্টের দোহাই দিয়া পৃষ্ঠভঙ্গ দিয়াছিলেন। জাহাজে উঠিবার পূর্ব হইতেই সমুদ্রের মূর্তি দেখিয়া চিন্তিত হইতে হইয়াছিল। জাহাজ ঠিক ২ টার সময় ছাড়িল, আমিও কেবিন ছাড়িয়া ডেকে আসিলাম। আসিয়া দেখি, ডেকে খুব গােলমাল, জিনিষপত্র তখনও কামরায় পৌছে নাই, সবই প্রায় স্তু পাকার হইয়া রহিয়াছে। আমি ডেক চেয়ারটি খুজিয়া লইয়া বিছাইয়া ফেলিলাম । কিন্তু অল্পক্ষণ পরেই বেশ মাথা ঘুরিতে লাগিল ও এক অননুভূতপূর্ব ভাব অনুভূত হইতে লাগিল। বুঝিলাম, সমুদ্র পীড়ার উপক্রম। পেটে নাড়িভূড়ি যেন গলায় উঠিতেছে, মস্তিষ্ক প্রভৃতি যেন উদরে প্রবেশ করিতেছে ইত্যাদি। বড় চমৎকার ভাব। আমি গিয়া কেবিনে চক্ষু মুদিয়া শুইয়া পড়িলাম ; আর ভাবিতে লাগিলাম, কেন ইচ্ছা করিয়া এ বিপদ টানিয়া আনিলাম। এখন যদি জাহাজ ফিরায়, লক্ষ্মটির মত ঘরের ছেলে ঘরে যাই, আমার আর বিলাত বেড়াইয়া কাষ নাই । অপরাহ্ন ৪টার সময় চায়ের ঘণ্টা দিল, চা পান করিয়া আবার মাইয়া শুইলাম। সুবিধা এই যে, আমার কেবিনের দরজা খুলিলেই আহারের পর। চিরকাল পুকে পড়িয়াছি যে, সমুদ্র পীড়ার সময় ২৯ ** যাত্রা। . • ঘরে থাকা বিধেয় নহে; ডেকে যাওয়া হল। কিন্তু আমি ত দেখি- লাম উণ্টা, ঘরে আমি খুব ভাল থাকিতাম। বৈকালে একবার ডেকে গেলাম; কিন্তু থাকিতে পারিলাম না। ৭টায় ডিনার। কি কষ্টে যে সে দিন আধঘণ্টা টেবলে বসিয়া ছিলাম তাহা ভুক্তভােগী ব্যতীত কেহই বুঝিবে না। তাড়াতাড়ি কোনও রকমে ফিরিয়া যাইয়া শয়ন করিলাম। ঘুমটা চিরকালই আমার খুব সাধা আছে। বােধ হয় ৮টার মধ্যেই ঘুমাইয়াছিলাম। যখন উঠিলাম, তখন তাের ৫ টা। উঠিয়াই ডেকে যাইলাম। কিছুক্ষণ পরে দেখি, দুই বৎসরের হইতে পাঁচ বৎসরের ৪৫টি বালক বালিকা খুব ছুটাছুটি করিতেছে। দেপিয়া মনে মনে বড় ঘণা হইল; ভাবিলাম, কি, আমার নিজের ছেলে মেয়ের চেয়ে ছােট, উহারা খেলা করিয়া বেড়াইতেছে আর আমি এত কাতর! ইহাই মনে করিয়া আমি হটিতে আরম্ভ করিলাম, আধ ঘণ্টার মধ্যে অনেকটা ভাল বােধ হইল। বৈকাল পর্যন্ত সুস্থ হইলাম। যাইবার সময় আর অসুখ বােধ হয় নাই। দ্বিতীয় দিন বৈকালে ডেকে চেয়ারে শুইয়া আছি, এমন সময় একজন বাঙ্গালী যুবক আসিয়া আলাপ করিলেন; বলিলেন, তাহাদের সকলেরই খুব অসুখ হইয়াছে। যাইয়া দেখি, ৮৯ জন বাঙ্গালী যুবক যাত্রী । সকলেই প্রায় তৃতীয় শ্রেণীতে যাইতেছেন। অসুখ প্রায় সকলে- তুই হইয়াছে। একজন তৃতীয় বার যাইতেছেন, কেবল তিনি ভাল আছেন ও সকলের সেবা করিতেছেন। সমুদ্র আমাদের উপর বড় নিৰ্দষ্ট ; প্রায় সমস্ত রাস্তাই অতি ভীষণ মূর্তি ধারণ করিয়া ছিলেন । প্রায় পাঁচ ছয় দিন সকলেই অসুস্থ ছিলেন। প্রথম শ্রেণীতে তিন দিন আমি একক আহারের টেবলে উপস্থিত ছিলাম। ক্রমে বালালী যুবকদিগের সঙ্গে আলাপ হইল। দেখিলাম, ; ।

৪ য়ুরােপ-ভ্রমণ। তাহারা সকলেই খুব স্বভাব। কেহ কেহ আমাকে চিনি- তেন। সকলেই আমাকে যথেষ্ট খাতির ও যত্ন করিতে লাগিলেন। এমন কি আমার জন্য সকলেই ব্যস্ত—কিসে আমার সুবিধা করিবেন। বাড়ীর বাহিরে এত আদর ও যত্ন অপ্রত্যাশিত ভাবে পাইয়া যে কি আনন্দ বােধ করিলাম, তাহা আর বলা যায় না। সকলেই আমাকে জ্যেষ্ঠ সহােদরের ন্যায় দেখিতেন। জাহাজে সমস্ত দিনের কাষ ছিল এই, সকালে ৬টার সময় উঠিয়া প্রাতঃকৃত্য সারিয়া কফি পান (কফি বা চা, কোকো, রুটি, মাখন, বিস্কুট ও ফল দিত) তাহার পরে উপরে যাইয়া কিছুক্ষণ পায়চারি ও গল্প । ১০ টায় স্নান ; ১১ টায় ভােঙন ( প্রায় দশ বারটা ডিস্ ও ফলমূল ); ৪টায় চা { সমেত কেক বিস্কুট প্রভৃতি }; পুনরায় পায়চারি ও গল্প । ৬ টায় ডিনার (প্রায় ১২।১৩টা ডিস ও অপৰ্যাপ্ত ফলমূল; পরে পুনরায় গল্প ও পায়চারি এবং ৯ টায় কফি বা চা। ৩৪ দিনের পর হইতেই আমরা সময়ে অসময়ে তাস খেলা আরম্ভ করিয়াছিলাম। ইংব্লাজ সহযাত্রীদিগের মধ্যে কাহারও কাহারও সঙ্গে আলাপ হইয়াছিল বটে, কিন্তু অনেকগুলি বাঙ্গালী পাইয়া তাহাদের সঙ্গে বড় ভিড়িতাম ৮১০ টি ফরাসী মহিলা ছিলেন, তাহাদের সঙ্গেও সামান্য আলাপ হইয়াছিল। এডেন পৰ্য্যন্ত সমুদ্র অতিশয় চঞ্চল ছিল। প্রায়ই মাঝে মাঝে জাহাজের ডেকের উপর ঢেউ আসিয়া কাহাকেও না কাহাকেও ভিজাইয়া দিত। পাের্টহােল খুলিবার উপায় ছিল না। টেবলে দড়ি বাঁধিয়া প্লেট রাখিয়া খাইতে হইত। আর জাহাজ ক্রমাগত roll ও pitch করিত, পাশাপাশি দোলার নাম roll করা, লম্বালখি দোলার নাম pitch কর। জাহাজ যখন pitch করে তখন হাঁটা বড় কষ্টকর ; ক্রমাগত পড়িবার সম্ভাবনা, কিন্তু ২১ দিন অভ্যাস যাত্রা। করিলে বেশ সহজ হইয়া যায়; কিছু কষ্ট হয় না। আমি প্রত্যহ নিয়মিত ৩৪ মাইল হাঁটিতাম। বাঙ্গালী যুবকদিগের মধ্যে একজন বড় ভাল মানুষ’, তাহাকে আর সব ছেলেরা ভারি ক্ষেপাইত, আর তিনি আসিয়া আমার কাছে অভিযােগ করিতেন ; বলিতেন, “ওদের বলেছি, বাস, ও হবে তবু আমায় বিরক্ত কচ্ছে।” তাঁহার বিশ্বাস, যে জিনিৰে “বাস” বলা গেল, হা সেই স্থানেই শেষ হওয়া উচিত। ইনি বড় সুক; মধ্যে মধ্যে গান শুনাইয়া আমাদের মােহিত করিতেন। ১০ই অরিখে বেলা ৬টায় এডেনে পৌছিলাম। কয়দিন পরে জমী দেখিয়া যে আলাদ হইল তাহা লিখিয়া জানান দুঃসাধ্য। দেখিলাম, ভাঙ্গায় গাড়ি চড়িয়া পাৰ্শি ভদ্রলােকরা বায়ু সেবন করিতেছেন। আমি এডেনে নামি নাই। সন্ধ্যার পর ভয়ানক গরম বােধ হইল। কিছুমাত্র হাওয়া ছিল না, এত ঘাম হইতে লাগিল যে, সমস্ত কাপড় ভিজিয়া গেল। কেবিনে থাকা অসম্ভব। ভেকে অনেক মহিলা-অর্ধনগ্ন অবস্থায় তথায় যাওয়া যায় না। বড়ই কষ্ট হইতে লাগিল। প্রায় ১২টার সময় খাইবার ঘরে বৈদ্যুতিক পাখা খুলিয়া একটা টেবলের উপর শুইয়া পড়িলাম। সকালে উঠিয়া দেখি, কাহাজ বাবেলমাণ্ডেব প্রণালী পার হই- তেছে। কি চমৎকার দৃশ্য ! অতি সঙ্কীর্ণ জলপথ, বােধ হয় কয়েক শত গজ মাত্র। পাহাড়ের চূড়ায় আলােক-গৃহ,—দুই এক জন লোেক দেখ যাইতেছে। কি বণবৈচিত্র্য! আমি সমুদ্রে ও গিরিগারে পাঁচটি বিভিন্ন বর্ণ লক্ষ্য করিলাম। লােহিত সাগরে প্রবেশ করিয়া লােহিতত্ত্ব কিছুই দেখিতে পাইলাম এক পার্শ্বে ডাঙ্গা দেখা যায়, এবং মাঝে মাঝে ছােট ছােট য়ুরােপ-ভ্রমণ। { পাহাড় এবং তাহার উপর আলােক-গৃহ । সমুদ্র অনেকটা শান্ত ছিলেন এবং একটু একটু হাওয়া ছিল ; কাযেই গরমে অত্যন্ত অধিক কষ্ট হয় নাই। এডেন ছাড়িবার পরদিন একটা মজা হইয়াছিল। একজন আলো- ইণ্ডিয়ান আমাকে বলিতেছিলেন যে, তিনি এডেনে নামিয়াছিলেন। তথায় হােটলে একটা ভারতবর্ষীয় ভৃত্য টুপি মাথায় দিয়াই তঁহাদের খাদ্য বণ্টন করিতেছিল। তিনি হিন্দীতে গালি দিলে সে টুপি খুলিল। আমি তখন কথা বললাম না। বিধির বিধানে সেই দিনই বৈকালে তাহার ভৃত্য (ক্যাবিন বয়) তাহার সঙ্গে কি কথাবার্তা বলিয়া তাঁহার পিঠ চাপাড়াইয়া দিল। আমি সে স্থানে উপস্থিত। ভৃত্য চলিয়া যাইলে আমি বলিলাম, “কি মহাশয়, কোনও ভারতবাসী চাকর আপনার পিঠ চাপড়াইলে আপনি কি করিতেন ?” তিনি আর কোন কথা বলিলেন না। বাস্তবিক এডেনের পূর্বে আর পশ্চিমে ইংরাজ একেবারে দুই বিভিন্ন জাতি । ১৫ই তাৰিখে বেলা প্রায় ১২টার সময় জাহাজ সুয়েজ খালের সম্মুখে যাইয়া দাঁড়াইল। কিছুক্ষণ পরে একজন ডাক্তার আসিলেন। তিনি আসিয়া একবার আমাদের ঘরে দাঁড় করাইয়া “Thank you বলিলেন। ইহার নাম প্লেগ-পরীক্ষা। কিছুক্ষণ পরে জাহাজ খালে প্রবেশ করিল। খালের দৃশ্য বড় চমৎকার। দক্ষিণে এসিয়া ; একেবারে মরুভূমি ধূ ধূ করিতেছে। বামে আফরিকার প্রশস্ত পথ, পাইন গাছের সারি। খাল প্রায় ৯০০ মাইল লম্বা, চওড়া খুব কম ; একখানা জাহাজ যাইতে পারে। মধ্যে মধ্যে এক এক স্থানে চওড়া করিয়া ষ্টেশন করিয়াছে, সম্মুখে জাহাজ আসিলে বিপরীতগামী জাহাজ দাঁড় করায় এবং দুই জন লোক কাছি যাত্রা। ৭ ধরিয়া ডাঙ্গায় বসিয়া থাকে, একখানা পার হইয়া গেলে অপরনি ছাড়ে। ঘণ্টায় ৫ মাইলের অধিক গতিতে জাহাজ যাইবার নিয়ম নাই; কারণ, কুল বঁাধান নহে, পাছে ধসিয়া যায়। প্রায় সকল ষ্টেশনেই মাটি- কাটা কল আছে, ক্রমাগত মাটি কাটিতেছে। আফরিকার দিকে খালের ধারে রেলপথ। 'ট্রেন চলিবার সময় আরােহীদিগের মুখ পৰ্য্যন্ত দেখা যায়। চালােকে খালের দৃশ্য বড় চমৎকার। তদ্ভিন্ন জাহাজের মাথায় search light দেয়, তাহাতে বাহার আরও বাড়ে। মধ্যে মধ্যে ২:৩টি বড় বড় হ্রদ আছে, তথায় জাহাজ দ্রুত যাইতে পারে । এই খাল য়ুরােপের স্থপতি বিদ্যার এক বিস্ময়কর উদাহরণ। প্রভাতে পাের্ট সৈয়দে পোঁছিলাম। কিং কোম্পানীর লােক আসিয়া আমার চিঠি পত্র দিলেন ও কিছু করিতে হইবে কি না জিজ্ঞাসা করি- লেন। আমি তাঁহাকে ধন্যবাদ দিয়া বিদায় করিলাম। আমরা কয়জন বাঙ্গালী মিলিয়া সহর দেখিতে গেলাম। স্থান, কেবল কতকগুলি দোকান, হােটেল ও গণিকাগৃহ ব্যতীত আর কিছুই নাই। ভাল বাড়ীর মধ্যে এক কনাল কোম্পানীর কাৰ্যালয়। আর দ্রষ্টব্য কেনালের স্থপতি লেশেপসের প্রকাণ্ড মূর্তি। গ্রামটি খুব সাৰ্বজনীন, এ স্থানে সব দেশের বদমায়েস লােকের আড্ডা। দূরে আরবী গ্রাম ;-আমাদের পশ্চিমের গ্রামের মত অপরিচ্ছন্ন ও কদৰ্য্য। ভালর মধ্যে সিগারেট খুব সস্তা ; কলিকাতার দামের প্রায় এক তৃতীয় দাম। বেলা ১২টায় জাহাজ ছাড়িল। এইবার আমরা য়ুরােপে প্রবেশ করিলাম। শুনিয়াছিলাম, ভূমধ্য সাগর এ সময়ে খুব প্রশান্ত থাকে, কিন্তু বড় প্রশান্ত দেখিলাম না। আমাদের কপাল ! তবে আজ সূৰ্যাস্ত বড় চমৎকার। পরদিন সূর্যোদয়ও দেখিলাম। ইহার পূর্বে এক দিনও আকাশ মেঘমুক্ত ছিল না।

য়ুরােপ-ভ্রমণ। একটা বড় আশ্চর্য ব্যাপার। মানুষ যেমন আমাদের দেশে শ্যাম ও য়ুরােপে গৌর, সি-গাল পক্ষীও সেইরূপ ! আরব সাগরে যেগুলি দেখা যায়, সেগুলি একেবারে ধূসর বর্ণ, ক্রমে সাদা হইয়া ইংলিশ চ্যানেলে দেখি, একেবারেই সাদা, কেবল ডানায় একটু একটু ধূসর পাের্ট সৈয়দ পার হইবার পরদিন সমুদ্র আবার বড় চঞ্চল হইয়া- ছিল। অনেকে পুনরায় অসুস্থ হইয়া পড়েন। তাহার পরদিন বৈকালে মেসিনা প্রণালী পার হইলাম । সুন্দর দৃশ্য। ইতালির দিকে গ্রামগুলি বড় সুন্দর। পাহাড়ের মধ্যে মধ্যে ছােট ছােট সাদা সাদা গ্রাম দেখা যায়। মাঝে মাঝে নদী আসিয়া সমুদ্রে পড়িয়াছে। গ্রামের লােকও দেখা যায়। ট্রেণ চলিতেছে, কখনও সুরঙ্গে প্রবেশ করিতেছে, দেখিতে চমৎকার। সিসিলির দিকে মেসিনার ভয়ঙ্কর ভুমিকম্পের চিহ্ন স্পষ্ট বুঝা যায়। অনেক সংস্কার হইয়াছে, এখনও সংস্কার চলিতেছে, তবে ধ্বংসাবশেষও অনেক। প্রণালীটা খুব সরু; বােধ হয় ২৫০ গজ হইবে। জল খুব চকচকে পরিষ্কার। আর অনেক আবৰ্ত ও ঢেউ নানা রকমের। এই সময় আবার এক রাশি শুশুক আমাদের জাহাজের পার্শ্বে পার্শ্বে জাহাজের সঙ্গে পাল্লা দিয়া প্রায় এক মাইল গেল। বড়ই চমৎকার দৃশ্য। রাত্রিকালে শিপারী দ্বীপপুঞ্জ পার হইলাম। বিশেষ কিছু দেখা গেল না, লােকের বসতি অতি সামা বলিয়া মনে হইল। জাহাজে আমরা জনাদশেক বাঙ্গালী ব্যতীত আরও ৩৪০ জন ভারতবর্ষীয় ছিলেন, অধিকাংশই পঞ্চনদবাসী। ইহাদের মধ্যে একজন এক দিন ধুতি পৰিয়া গেঞ্জি গায় দিয়া ডেকে উপস্থিত। তথায় মহি- লার পলায়নপর', য়ুরােপীয়গণ “মারমুখাে”। অনেক কষ্টে ভদ্রলােক- টিকে নিয়ে পাঠাইয়া দেওয়া হয়। h যাত্রা। মেসিনা পার হইবার পর একজন হিন্দুস্থানী যুবক বলিলেন যে, উঁহার নিকট গড়গড়া ও তামাক আছে। বাহির করিয়া তামাক সাজিয়া ধূমপান করা গেল। কলিকাতা ছাড়িবার পর এই প্রথম ধূমপান যে কত ভাল লাগিয়াছিল তাহা ঐ পথের পথিকরাই বুঝিবেন। ২১শে বেলা ২টার সময় মার্শেল বন্দরের বাহিরে জাহাজ থামিল। সমুদ্র তখনও বিরূপ, বন্দরে যাওয়া গেল না। শেষবার তামাক টানিয়া লইলাম। এই নামি এই নামি করিয়া সন্ধ্যা ৬টায় নৌকায় নামাইয়া দিল। জেটীতে পৌছিতে ঠিক ৭টা বাজিল। তথায় কি কোম্পানীর লােক আমাকে অভ্যর্থনা করিবার জন্য উপস্থিত ছিলেন; চিঠিপত্র দিয়া,জিনিষগুলি Customs পার করিয়া ষ্টেশনে লইয়া গেলেন। তথায় বাড়ীতে টেলিগ্রাম করিলাম। তাহার পর আমাকে গাড়িতে উঠাইয়া দিয়া লােকটি বিদায় হইলেন। ট্রেনে উঠিয়া দেখি যে, গাড়িগুলি আমাদের দেশের গাড়ির মত হে। প্রত্যেক গাড়ির দুই সীমায় ধার এবং লম্বালম্বিভাবে corridor ( বারান্দা) রহিয়াছে। প্রত্যেক গাড়িতে গুটিপচেক কামরা,. এক কামরায় দুইটি বেঞ্চ, ভাল গদি ও লেস্ দিয়া মােড়া। প্রত্যেক বেঞ্চে তিনজন যাত্রীর বসিবার কথা। একটা কামরা মহিলাদিগের জন্য ও একটা কামরা ধুমপায়ীদিগের জন্য ; অবশিষ্ট তিনটা Nonsmokers; জানালায় কাচ দেওয়া এবং পর্দা দেওয়া ; কাষ্ঠের জানালা বা খড়খড়ি নাই। ধূমপায়ীদিগের গাড়িতে জানালার নিয়ে ছাই ফেলিবার জন্য কৌটার মত একটা পাত্র বসান। এ ট্রেণে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তিন শ্রেণীরই গাড়ি ছিল; কিন্তু অনেক ট্রেণে দ্বিতীয় শ্রেণী থাকে না, বিশেষ ইংলও সে কথা পরে বলিব। আম্ িযখন গাড়িতে উঠিলাম, তখন সে কামরায় আর কেহ ;

১০ য়ুরােপ-ভ্রমণ। ছিলেন না। জাহাজের সঙ্গীদিগের মধ্যে দুই জনের সঙ্গে দেখা হইল। তাহারা বলিলেন, সে রাত্রি মার্শেসেই থাকিবেন। গাড়ি ছাড়িবার কিছু পূর্বে একজন ফরাসী যুবক আসিয়া উঠিলেন। একটি যুবতী ও একজন বালক তাহাকে তুলিয়া দিতে আসিয়াছিলেন। জিনিষপত্ৰ তুলিয়া দিয়া তাহারা দুইজনে প্লাটফর্মে যাইয়া দাঁড়াইলেন, আর যাত্রীটি corridorএর জানালা নামাইয়া তাঁহাদের সঙ্গে কথাবার্তা আরম্ভ করিলেন। যখন গাড়ি ছাড়িবার সময় হইল তখন তিনি সেই জানালা দিয়া ঝুকিয়া যুবতীটিকে সেই লােকারণ্যের মণ্য ক্রমাগত প্রগাঢ়ভাবে চুম্বন করিতে লাগিলেন। দেখিয়া মনে হইল, ই ফরাসীদেশ বটে । ষ্টেশনে একটা খাবারের বাক্স কিনিয়াছিলাম । পুরু কাগজের বাক্স ; তাহার মধ্যে তিন টুকর। তিন প্রকার মাংস, একখানা কুটি, কিছু মাখন, কিছু পনির, একটা আপেল, একখানা চকোলেট, এব একটি ছুরী, একটা কাটা, একখানা পেট, এক বােতল জল, এক বােতল ক্লারেট একটা কাচের গ্লাস • একটা কর্ক ভ্রু ; দাম মাত্র ৪ ফ্রাঙ্ক অর্থাৎ ১০ টাকার কিছু কম। গাড়ি ছাড়িবার পর আমি সেই বাক্স খুলিয়া আহার করিতে লাগিলাম। সহ যাত্রীটি আমার সহিত আলাপ করিলেন।তিনি ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরাজী জানিতেন, কথাবার্তায় খুব ভদ্রলােক বলিয়াই মনে হইল। তিনি আমাকে সমস্ত খবর দিয়া ফেলিলেন। বলিলেন, যে যুবতীটি তাহ'কে তুলিয়া দিতে আসিয়াছিলেন তিনি তাঁহার fiancee; দুই মাস পরে বিবাহের কথা ঠিক হইয়াছে। আমাকে বিদেশী দেখিয়া তিনি খুব যত্ন ও আপ্যায়িত করিতে লাগিলেন। য়ুরােপের গাড়িতে শয়নের স্থান পাওয়া যায় না। কোন কোন যাত্রা। ১১ ট্রেণে sleeping car থাকে, প্রথম শ্রেণীর ভাড়ার উপর প্রায় ১৫২০ টাকা অধিক দিলে এক রাত্রির জন্য শয়নের স্থান পাওয়া যায়। আমাদের ট্রেনে sleeping car ছিল না; থাকিলেও অতগুলি টাকা অপব্যয় করিতাম কি না সন্দেহ। দুইজনে দুই বেঞ্চে শুইয়া রাত্রি কাটাইয়া দেওয়া গেল। প্রভাতে উঠিয়া দেখি, দুই ধারে কেবল ছােট ছােট পাহাড়, ধারে ধারে দ্রাক্ষাক্ষেত্র; গাছপালা সবই নূতন ধরণের ; মাঝে মাঝে মাঠ ও ঘর দেখা যায়, সেও আমাদের দেশের মত নহে; বাড়ীর ছাত সবই ঢালু। গ্রাম, মাঠ সবই অতি পরিপাটিভাবে সাজান। অনেক নদী ও দেখা গেল, সবই ছােট। আমাদের ট্রেণ rapide অর্থাৎ খুব কম ষ্টেশনে দাড়ায়। প্রায় ৭" টায় ট্রেণ লাবােস (Laroche) ষ্টেশনে দাড়াইল। তথায় চা পান করিতে নামিলাম। দেখি, বুফেতে (buffet ) চ নাই, আছে কফি এবং চোকোলাত বা কোকো। অগত্যা কোকো পান করা গেল। দাম মাত্র ১০ ! আমাদের দেশের তিন গুণ !! একটু পরেই সেন নদী দেখিলাম। এই সেন ( Seine) যাহার নাম বাল্যকালে বিদ্যা- লয়ে এত করিয়া মুখস্থ করিয়াছিলাম ? আমাদের দেশের খালের অপেক্ষাও ছােট। পাহাড় আদৌ উচচ নহে, জল হইতে ৩। ৪ হাত মাত্র হইবে ; দুইধারে বেশ জঙ্গল, মধ্যে গজ ত্রিশেক চওড়া এক নদী, ইহাই নাম সেন। প্রায় সাড়ে দশটায় প্যারিসে পেীছিলাম। আমার একজন বাঙ্গালী বন্ধু লণ্ডন হইতে প্যারিসে আসিয়া অামার জন্য ষ্টেশনে উপস্থিত থাকিবেন, কথা ছিল। মার্শেল হইতে তাহাকে টেলিগ্রাফ করিয়াছিলাম। ট্রেণ যখন গর ভুলিয়' ( Gare du lyrol) নামক ষ্টেশনে আসিয়া দাঁড়াইল তখন আমি উৎসুক হইয়া তাকে খুজিতে লাগিলাম, কিন্তু তাহার কোনও চিহ্ন পাইলাম ১২ য়ুরােপ-ভ্রমণ। ; ভাবিলাম, এখন কি করি? সে যাহা হউক, মুটে ( facteur) আসিয়া জিনিষপত্র নামাইল। এ দেশের মুটেরা মাথায় মােট বহে হয় ঠেলাগাড়ীতে জিনিষ তুলিয়া হাত দিয়া ঠেলিয়া লইয়া যায়, নহে ত একটা চামড়ার দল দিয়া জিনিষগুলি বাঁধিয়া স্কন্ধে ফেলিয়া লয়। মুটেরা সকলেই রেল কোম্পানীর নিকট মাহিয়ানা পায়, কাষেই যাত্রীদিগের নিকট যেটা পায় সেটা সবই “উপরি লাভ” । ষ্টেশনটি খুবই বড়। এরূপ ষ্টেশন প্যারিসে আরও আটটি আছে। ষ্টেশনে সর্বত্রই ফরাসী, ইংরাজী প্রভৃতি ভাষায় লিখা “Beware of Pickpockets” অর্থাৎ গাঁটকাটার ভয় ; সাবধান। ইংলণ্ডে এ রকম বিজ্ঞাপন ট্রাম, টিউব, ডাকঘর প্রভৃতি সর্বত্র দেখা যায় ; কোথাও কোথাও আবার আছে “male and female” অর্থাৎ পুরুষ ও স্ত্রী দুই জাতীয় গাঁটকাটা; সাবধান। ষ্টেশনের বাহিরে আসিয়াই বুঝিলাম, এ আমাদের দেশ নহে। রাস্তা পরিষ্কার ও পাতৰ দিয়া বাধান। বাহিরে বড় বড় হােটেলের অনিব গাড়ি অপেক্ষা করিতেছে ও অনেক ভাড়াটে গাড়ি রহিয়াছে। অমনিব ও গাড়ি দুই রকম, ঘােড়ায় টানা ও মােটর (বৈদ্যুতিক), ভাড়াটে ঘোড়ার গাড়ীতে Taximeter বসান; ভাড়ার জন্য গাড়ােয়ানের সহিত বকাবকি করিবার প্রয়ােজন হয় না। অবশ্য mete এ যে ভাড়া লিখে তাহার উপর যৎকিঞ্চিৎ ( Tip) গাড়াে- য়ানকে দেওয়া নিয়ম; টিপ, অথবা পুরবােয়ার (lourboire ) য়ুরােপে অত্যন্ত চলিত; উঠিতে বসিতে খাইতে শুইতে সকলকেই টিপ দিতে হয়। হােটেলেও এই পাপ ; শুনিয়াছি, কম টিপ, দিলে হােটেলের লােকা মালপত্রের উপর গুপ্ত সঙ্কেত,লিখিয়া দেয়, অন্য হােটেলে যত্ন পাওয়া যায় না। তবে সব দেশের চেয়ে ইংলণ্ডে টিপের প্রচলন কম। তথাও দুই একটি হােটেল আছে যথায় ওয়েটারদের ;

যাত্রা। ; থানার পর স্বর্ণ মুদ্রা টিপ দিতে হয় ; তাহাই নিয়ম। প্যারিস, লণ্ডন প্রভৃতির বড় বড় হােটেলে ওয়েটাররা বেতন ত পায়ই না; অধিকন্তু অধিকারীকে অনেক টাকা দিয়া (Premium) চাকরী পায় । আমি একখানা গাড়ি ভাড়া করিয়া টমাস কুকের অফিসে বন্ধুর সন্ধানে চলিলান! বলিতে ভুলিয়াছি, ভাড়াটে গাড়ি সবই খােল, ফিটন জাতীয়। কুকের অফিসে কর্মচারীরা বলিল, “লােকদের ঠিকানা আমরা কাহাকেও বলি না।” অনেকক্ষণ বকাবকি করার পর ঠিকানা বলিয়া দিলে, গাড়ােয়ানকে সেই ঠিকানায় যাইতে বলিলাম । সে অনেক ঘুরিয়া প্রায় ১২০ টার সময় বন্ধুদিগের হােটেলের সম্মুখে লইয়া গেল। যাইয়া দেখি, তিন জন বাঙ্গালী আমার জন্য লণ্ডন হইতে আসিয়া- ছেন। একজন বাসায় আমার জন্য অপেক্ষা করিতেছেন; আর দুইজন আমাকে খুজিতে বাহির হইয়াছেন। প্রায় অর্ধঘণ্টা পরে প্যারিসের সব কয়টা ষ্টেশন Taxiতে ঘুরিয়া তাহারা আসিয়া উপস্থিত হইলেন। প্রায় ১৪ ফ্রাঙ্ক (৮৫০) ট্যাক্সি ভাড়া আক্কেল সেলামি দিতে হইল। যাহা হউক, একটার পর সকলে মেশা গেল এবং প্রাতরাশ সমাপন করা হইল।

প্যারিস্। ; প্যারিসে অষ্টাই বাস করিয়াছিলাম। কত সহর দেখিয়াছি, প্যারিসের ন্যায় সুন্দরী নগরী আর কোথাও দেখি নাই। আমাদের জাহাজে যিনি পাসার ছিলেন, তিনি একজন প্যারিসবাসী। পাসার জাহাজের Executive head কাপ্তেন যেমন জাহাজ চালান বিষয়ে একচ্ছত্র নরপতি, পাসার সেইরূপ জাহাজের আভ্যন্তরীণ বন্দোবস্তের সর্বময় কৰ্ত্তা। যাত্রীদিগের সুখস্বচ্ছন্দতা তাহার উপর বিশেষ রূপে নির্ভর করে। ভদ্রলােক ১৮ মাস ভারতবর্ষ ভ্রমণ করিয়াছিলেন, কাশীধামের ও জয়পুরের অনাবিল প্রশংসা তাঁহার মুখে শ্রুত হইত। তিনি আমাকে বলিয়াছিলেন, “শুনিলাম আপনি বেড়াইতে যাইতে- ছেন। তাহা হইলে প্রথমে প্যারিসে যাওয়া আপনার পক্ষে অত্যন্ত ভুলুহইতেছে। কারণ, প্যারিস দেখিলে আপনার আর কোনও শহরই ভাল লাগিবে না; হয় ত আর কোথাও যাইবার ইচ্ছাই হইবে না।” কথাটি বাস্তবিকই বড় ঠিক। এমন সহর ত আর দেখিলাম না। প্রত্যেক রাস্তা প্রতেক বাড়ী দেখিলেই চক্ষু জুড়ায় । আমাদের দেশ অথবা বিলাতে যেরূপ যে কোনও রকমে বাসােপযােগী করিয়া বাড়ী গড়িতে পারিলেই হইল, প্যারিসে সেরূপ বলিয়া বােধ হইল না। সব বাড়ী দেখিলেই মনে হয়, কিসে সুন্দর দেখাবে তাহার জন্য বিশেষ চেষ্টা প্রকাশ। রাস্তাও সেইরূপ--খুব সােজ। সােজা পরিষ্কার রাস্তা। ভুবনবিখ্যাত বুলভার্ডগুলি দেখিলে দিল্লীর উঁদনী চকের কথা মনে পড়ে। ফুটপাথের উপর গাছের সারি ;

প্যারিস্। রাস্তার মধ্যস্থল দিয়া আর একটা চওড়া ফুটপাথ, তাহার উপর দুই সারি গাছ। অন্যান্য রাস্তাও বেশ চওড়া ; একেবারে সরু গলি খুবই কম। প্রত্যেক চৌমাথার উপর চারিধারে চারিটি সুন্দর বাড়ী ; কিছু না কিছু একটা স্থাপত্য সৌন্দৰ্য্য আছেই। দক্ষিণে বামে রাস্তা সরল ভাবে গিয়াছে ; দেখিলে বাস্তবিকই চক্ষু জুড়ায়। সর্বত্রই মনে হয়, স্থাপত্য সৌন্দর্য্যের জন্য বিশেষ চেষ্টা করা হইয়াছে। রাস্তায় ধূলার একান্ত অভাব; প্রায় সকল রাস্তাই পাতর দিয়া বাঁধন ; দুই একটা রাস্তা কাঠ দিয়া বাধানও আছে। প্যারিসে দুইটি জিনিষ প্রথমেই আগন্তুকের দৃষ্টি আকৃষ্ট করে, প্রথম প্যারিসের স্মৃত্তি—প্যারিস যেন সদাই আনন্দময়ী। রাস্তায় লােক জন ব্যস্ত সমস্ত ভাবে চলিতেছে ; কিন্তু সকলেরই মুখে যেন হাসি লাগিয়া আছে। সকলেরই পরিধেয় অতি পরিপাটি, সাজ সজ্জা হাবভাব সবই যেন holiday garb। এ সহরে কেহ যে দুঃখী আছে তাহা বােধই হয় না; বিশেষ সন্ধ্যার পর। উজ্জ্বল আলােকমালায় শােভিত রাস্তায় দলে দলে শত শত নরনারী কেবল হাসিমুখে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। দেখিলে বাস্তবিকই মনে এক অপূর্ব আনন্দের অবিভাব হয়। দ্বিতীয়, রাস্তায় বসিয়া কফি বা অন্য পানীয় সেবন। সব রাস্তার ধারেই অনেকগুলি কাফে { Cafe) বা রেস্তরাঁ। ( Restaurant) আছে। ফুটপাথের উপর অনেকগুলি চেয়ার ও ছােট ছােট পাতরের টেবল। বৈকালে ৪টা ৫টার পর হইতে রাত্রি ১২টা ১টা পর্যন্ত এই সব চেয়ার লােক-পূর্ণ থাকে। এইরূপ রাস্তায় বসিয়া কফি পান প্যারিস সহরের একটা অঙ্গবিশেষ। কেহ হয়ত এক পেয়ালা কফি চাহিয়া সেই স্থানে ৩৪ ঘণ্টা বসিয়া ক্রমাগত লােকজনের যাতায়াত দেখিতেছেন বা নিজের পত্রাদিই লিখিতেছেন; তবে অধিকাংশই যুগলমূর্তি। এইরূপ ভাবে রাস্তায় ; থিয়েটার, ; য়ুরােপ-ভ্রমণ। বসিয়া সময় কাটান আর কোন সহরে এরূপ ভাবে নাই। ইংলণ্ডে এ প্রথা একেবারেই নাই। য়ুরােপের অন্য দুই একটি দেশে এইরূপ কতকটা আছে বটে; কিন্তু সে খুব কম। প্যারিস সহর সন্ধ্যার প্রাক্কালে জাগিয়া উঠে, ও রাত্রি ২৩টা পর্যন্ত খুব প্রফুল্ল থাকে। রাস্তায় খুব ভীড় ; সকলেই সহাস্য মুখে গমনাগমন করিতেছে অপেরা, মিউজিক হল প্রভৃতি হইতে বাদ্যধ্বনি শুনা যাইতেছে। সকলেই যথাসম্ভব ফ্যান করিয়া কাপড় চোপড় পরিয়া বাহির হইয়াছে। বাস্তবিকই প্যারিসের পরিচ্ছদে একটি মাধুরী আছে। যদিও ভারতবাসী আমি ও বিষয়ের বড় কিছু ধার ধারি না, তবুও প্যারিসের পরিচ্ছদে যে একটা মনােহারিত্ব দেখিয়াছিলাম, তাহা আর কোনও দেশে দেখিলাম না। প্যারিসের স্ত্রীলােকের মুখে ( বােধ হয় এই পােষাকের জন্যই ) যে কমনীয়তা দেখা যায়, ইংলণ্ডে তাহা নিতান্তই দুলাভ। প্যারিসের আর একটা বিশেষত্ব, প্যারিসবাসীর সৌজন্য। কোনও লােককে রাস্তায় যদি পথ জিজ্ঞাসা করেন, তিনি তখনই আপনার সহিত কিছু দূর যাইয়া আপনাকে পথ দেখাইয়া দিবেন। লণ্ডনে কাহাকেও পথ জিজ্ঞাসা করিলে সে ব্যক্তি তখনই বলিবে,আমি এ সহর অথবা এ পল্লী চিনি না; অথচ সম্ভবতঃ সে সেই পল্লীতেই আজন্ম বাস করিতেছে । তবে লণ্ডনে পুলিশম্যানরা এত সজ্জন এবং তাহাদের রাস্তাঘাটও এত ভাল না থাকে যে অন্য লােককে জিজ্ঞাসা করিবার প্রয়ােজন বড় হয় না। সে কথা পরে বলি। প্যারিসে আমার এই বিশেষ সুবিধা হইয়াছিল যে, যে কয়জন বাঙ্গালী ভদ্রলােক আমার অপেক্ষায় প্যারিসে আসিয়াছিলেন তাহাদের মধ্যে একজন খুব ভাল ফরাসী জানেন। এমন কি কেহ কেহ বিশ্বাসই করিত না যে, তিনি পূর্বে কখনও প্যারিসে আইসেন প্যারিস্। নাই। তাহার ফরাসী ভাষার উচ্চারণ প্রভৃতি একেবারে অনিন্দ্য সুন্দর। তঁাহার গুণে আমরা অল্প খরচে ও অল্প সময়ে প্যারিসে যেরূপ সমস্ত দেখিতে পাইয়াছিলাম, তাহা তিনি না থাকিলে কিছুতেই হইত না। আমি তাহার কাছে নিতান্তই কৃতজ্ঞ ; কারণ, যদিও আমরা কলিকাতায় খুব কাছাকাছি থাকিতাম, স্বদেশে তাহার সহিত আমার আলাপ ছিল না এবং তিনি অনেক সময়ে নিজের অসুবিধা করিয়া আমার জন্য প্যারিসে ঘুরিয়া বেড়াইয়াছেন। তখন ধন্যবাদ দেওয়া হইয়া উঠে নাই; কারণ, উহাতে আমি অনভ্যস্ত। আজ এই সুযােগে শ্রীশ বাবুর গুণগান করিয়া লইলাম, যদি তাঁহার দৃষ্টিতে পড়ে। এ পৰ্যন্ত প্যারিসের দ্রষ্টব্য বিষয়গুলির কথা কিছু বলি নাই । বােধ হয়, পাঠকের ধৈর্য্যচ্যুতি হইতেছে। এইবার প্রধান প্রধান দ্রষ্টব্য বিষয়গুলির কথা কিছু বলিব। প্যারিসে দেখিবার জিনিষ বাস্তবিকই সংখ্যাতীত, সকলের বিশদ বর্ণনা করিতে হইলে মহাভারতের ন্যায় একখানি পুস্তকের অবতারণা করিতে হয় ; আবার কোটা ছাড়িয়া কোটার বিষয় লিখিব, ভাবিয়া পাওয়া কঠিন। ভারতবাসীর নিকট সবই অপূৰ্ব্ব, সবই সুন্দর লাগিছিল । তবে এই পুস্তকের কলেবর বিবেচনা করিয়া আমি এই কয়টি মাত্রের সামান্য বিবরণ দিব - (১) লুভর প্রাসাদ, (২) ভাসেল প্রাসাদ (৩) ঈফেল টাওয়ার, (৪) বােয়া ডি বুল, (৫) পাশে ডু জুষ্টি, এবং (৬) নেপােলিয়ন বােনাপার্টের সমাধি-মন্দির। {১} লুভর প্রাসাদ পৃথিবীতে অতুলনীয়। দেড় শত বিঘা জমীর উপর এক প্রকাণ্ড রাজবাটী, ঘরের সংখ্যা প্রায় ১২০০, শুধু ঘরগুলি অতিক্রম করিতে দুই ঘণ্টা সময় লাগে। এই প্রকাণ্ড বাড়ীতে আছে য়ুরােপ-ভ্রমণ। কেবল পুস্তক, চিত্র ও মৰ্ম্মর-পুত্তলিকা। সহজেই অনুমিত হইবে যে, এত বড় পুস্তকাগার বা চিত্রশালা বা ভাস্করকীর্তিগৃহ পৃথিবীতে আর কোথাও থাকা সহজ নহে। কেবল পুস্তকাগার হিসাবে, বােধ হয়, লণ্ডনের British Museum লুভর অপেক্ষা বৃহৎ, কিন্তু এত ছবি ও এত মৰ্ম্মর-মূর্তি বাস্তবিকই আর কোথাও নাই। য়ুরােপ জয় করিয়া নেপােলিয়ন যে স্থানে যে উৎকৃষ্ট চিত্র বা উৎকৃষ্ট মৰ্ম্ম-মৃত্তি পইয়া- ছিলেন, সবই এই স্থানে আনিয়া রাখিয়াছিলেন । তাহার রাজব- সানের পর সামান্য কিছু কিছু পূৰ্বাধিকারীদিগকে প্রত্যর্পণ করা হইয়াছিল বটে ; কিন্তু অধিকাংশই প্যারিসে রহিয়া গিয়াছে এবং প্রায় সমস্তই এই লুভর প্রাসাদে সংরক্ষিত। য়ুরােপের যত বিখ্যাত চিত্র- করে বা মৰ্ম্ম র-শিল্পীর নাম শুনা যায়, সকলেরই কীৰ্ত্তি এক লুভরে আসিলেই দেখা যায় । এই প্রাসাদে চিত্রের সংখ্যা প্রায় চারি সহস্র। ইহার মধ্যে এমন অনেক ছ৭ি অছে, যাহার প্রত্যেকটির মূল্য এক কোটি টাকা অপেক্ষাও অধিক। প্যাফেল, টিসিয়ান, পেরুজিনাে, বেলিনি, লেনার্সে। ভিঞ্চি কোরেজিও, মুরিলাে, ভেলাজকে, ভ্যান ডাইক, রুনেস, টেনিয়ার, রেন্ট, হােল বাইন, প্রভৃতি ইতালীয়, স্পেন দেশীয়, ফ্লেমিস, ওলন্দাজ, জর্মাণ প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন দেশের প্রধান প্রধান চিত্রকরের শত শত তুল্য কীর্তি লুভর প্রাসাদের শােভা বর্জিত করিতেছে। এক একখানি চিত্রের দিকে চাহিলে বাস্তবিকই চক্ষু জুড়ায়। চারি পাঁচ শত বৎসর পূৰ্ব্বে চিত্র অঙ্ক ;—দেখিলে মনে হয়, চিত্রকর যেন এই মাত্র তুলিকাহস্তে উঠিয়া গিয়াছেন; ছবির বর্ণ এমনই সুন্দর মৰ্ম্মর মুক্তি যত গুলি আছে, ত হার মধ্যে Venus de Milo এবং হােমাৰ সৰ্ব্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ। প্রথমটির বিষয় অনেকেই শুনিয়া থাকি- প্যারিস্। বেন। উহা খৃষ্টপূৰ্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে কোনও অজ্ঞাতনামা গ্রীক শিল্পীর গুঠিত। মূর্তিটি ১৮২০ খৃষ্টাব্দে মাইলাে নামক ক্ষুদ্র দ্বীপে ভগ্ন অবস্থায় পাওয়া যায়। যদিও ইহার হস্ত দুইটি নাই, তথাপি এই সুন্দরীর মুরে ভাব ও অঙ্গসৌষ্ঠব জগতে অতুলনীয়। হস্ত দুইটি কি অবস্থায় ছিল, সে সম্বন্ধে বহু শিল্পী অজস্র জল্পনা প্রচার করিয়াছেন; কিন্তু তাহার আলোচনা নিষ্প্রয়ােজন। {২ য়ুরােপে যতগুলি রাজাবাস দেখিয়াছিলাম, তাহার মধ্যে ভাসেল (বা ফরাসি ভাষায় ভেয়ারসাই) প্রাসাদ গাম্ভীর্যে ও সম্পদে সব্বশ্রেষ্ঠ বলিয়া বােধ হয়। প্রকাণ্ড গৃহ ;-অতি সুন্দর সুন্দর বহু মল। আসবাবে পরিপূর্ণ, দেখিলে বাস্তবিকই ফ্রান্সের রাজাদিগের ঐশ্বর্যের একটু আভাস মনে অইসে। তাহারা যে কিরূপ বিলাসী ছিলেন, তাহা এই স্থানে আসিলে বুঝা যায়। আগ্রায় ও দিল্লীতে প্রাসাদগুলি খুব বৃহৎ বটে, কিন্তু বাসভবনের কক্ষগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র। আর এই প্রাসাদে প্রত্যেক কক্ষ অতি প্রকাণ্ড । এ প্রাসাদেও অনেক চিত্র ও মৰ্ম্মর-মূর্তি আছে। অধিকাংশই ফ্রান্সের ইতিহাস কীৰ্ত্তন করি- তেছে ; ফ্রান্সের ইতিহাসের প্রধান প্রধান ব্যক্তির ও প্রধান প্রধান ঘটনার প্রতিকৃতি। গৃহসংলগ্ন বাগানটি এক আশ্চর্য ব্যাপার । বাগানের দিকে রাজবাড়ীর দেওয়াল ১২৭ হাত লম্বা, তাহাতে প্রায় চার শত জানালা দেখা যায়। তাহার পরে ত্রিতল উদ্যান। মধ্যে মধ্যে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড ফোয়ারা (দুই একটির জল ৭৫ ফুট ঊর্ধে উঠে) এবং অসংখ্য প্রস্তর-মূর্তি। সর্বনিমতলে এক প্রকাণ্ড ঝিল, অন্ধ মাইল অপেক্ষা অধিক দীর্ঘ এবং ২৫০ গজ বিস্তৃত। তাহার পরে আবার বাগান। ঝিলের দুই ধারে বড় বড় ও ছোট ছােট অনেক ফুলের গাছ। গাছগুলি মাথায় সরু ও ক্রমে মােটা ভাবে ছাটা। • চারি দিকে অসংখ্য ফুলের গাছ অতি সুশােভনভাবে ২০ য়ুরােপ-ভ্রমণ। সজ্জিত। দেখিতে যে সুন্দর, তাহা বর্ণনা করা দুঃসাধ্য। ছবি আঁকিয়াও সে সৌন্দর্যের একাংশ দেখান কঠিন। প্রাসাদের চারি পার্শ্বে পার দিয়া বঁাধান উঠান এবং উঠানে, অনেক প্রস্তর মূর্তি। বাস্তবিক এই ভেয়ারসাই প্রাসাদ ঐশ্বর্যের, বিলাসের ও সুরুচির লীলাভূমি। বাগানের মধ্য দিয়া টিয়ানন নামক দুইটি উপবনবাটীকায় যাওয়া যায়। সে দুইটি অতি মনােহর। রাজা চতুর্দশ এবং পঞ্চদশ লুই তাহাদের দুইজন প্রিয়পাত্রের (Favourite) জন্য এই বাটী দুইটি নির্মাণ করান। ছােট বাড়ী-বিচিত্র কারুকার্যময়। গৃহসংলগ্ন বাগানগুলিও অতি পরিপাটি (৩) ঈফেল টাওয়ারের প্রতিমূর্তি বা প্রতিকৃতি অনেকেই দেখিয়া থাকিবেন। চারি কোণে চারিটি পায়ার উপর এক বিরাট স্তম্ভ বিরাজমান । সমস্তটাই ইস্পাতে গঠিত ; কেবল পায়াগুলির নিম্নের ভিত্তি চূণসুরকীতে প্রস্তুত। শুম্ভটির আয়তন এই পায়াগুলির মধ্যবর্তী স্থানের পরিমাণ হইতেও বুঝিতে পারা যাইবে । সেই চতুষ্কোণ ভূমিৰ্থণ্ডের প্রত্যেক পার্শ্ব তিন শত হস্ত দীর্ব। স্তম্ভটি ৯৮৪ ফুট উচ্চ-কলিকাতার অক্টালোনি মনুমেন্টের সাত গুণ । এই স্তম্ভটি চারিতুল। প্রত্যেক তলে খাবার ও বিচিত্র দ্রব্যের ( (Curios) দোকান, ডাকঘর প্রভৃতি আছে। প্রথম তল ভূমি হইতে ১৯০ ফুট উচ্চে ; তাহার পর আর ১৯০ ফুট উপরে দ্বিতীয় তল ; ৯০৫ ফুট উচ্চে তৃতীয় তল। এই তলে একটি চতুষ্কোণ বারণ্ডা আছে, তাহার চারিদিকে কাচ দেওয়া। এই বারাণ্ডায় ৮০ শত লােক দাড়াইবার স্থান হয়। ইহার উপর আর এক তল। তথায়ও একটি গােল বারাঙা আছে, তদূর্কে প্রকাণ্ড বৈদ্যুতিক আলােক, রাত্রি কালে ৪৫ মাইল দূর হইতে দেখা যায়। এই টাওয়ারে উঠিবার প্যারিস্। সােপান ত আছেই,অধিকন্তু এক প্রকার রেলও আছে। একটা দোতলা বা চাকায় বসান এবং তলা দিয়া প্রকাণ্ড লােহার শিকল লাগান। কলে এই শিকল টানা হয় এবং আরােহিসহ বাক্স চাকার উপর গড় গড় করিয়া উর্দ্ধে উঠে। আমি এই রেলেই উঠিয়াছিলাম। দোতলা পর্যন্ত সিড়ির সংখ্যা ৭৩০। আমার সঙ্গী দুইজন এই সিড়ি দিয়া নামিয়াছিলেন। টাওয়ারের উপর হইতে চতুর্দিকের শােতা অতি অপূর্ব। প্রায় ৫০ মাইলের অধিক দেখা যায়। এই ডাকঘরে প্রিয়জনকে চিঠি লিখিলে স্বচ্ছন্দে বলা যায় যে, স্বর্গের অর্জপথ হইতে চিঠি লিখিলাম। বােধ হয় রাজা হরিশ্চন্দ্র ইহার নিয়ে বাস করেন। উপরের দোকানে টাওয়ারের মূৰ্ত্তি-সম্বলিত পােষ্টকার্ড, দেশলাই, ঘড়ি, লকেট, ঘণ্টা, নদানি প্রভৃতি অনেক জিনিষ পাওয়া যায়। আহার ও পানীয়ের ত কথাই নাই। দোতলায় একটি থিয়েটারও আছে। (৪) বোয়া ডি বুকে বন বলিব কি বাগান বলিব, জানি না। ৭০০০ হাজার বিঘা পরিমিত একটি পার্ক। গাছ অবশ্য পূৰ্ব্ব হইতেই ছিল, প্যারিস নিসিপালিটি ৩৩ লক্ষ মুদ্রা ব্যয় করিয়া ইহাকে নাগ- রিকদিগের সান্ধ্য বায়ু সেবনের স্থানে পরিণত করিয়াছেন। নগর-সংলগ্ন এত বড় কান পরিষ্কত অবস্থায় রাখা আর কোনও দেশে সম্ভব কি না বলিতে পারি না। অপরাহ্রে প্যারিসের আবালবৃদ্ধবনিতা সকলেই এই স্থানে বেড়াইতে আইসেন। ইহার ভিতর ২৪ টি হ্রদ, ২১টি রেস্তরও ঘােড়দৌড়ের মাঠও আছে। এই স্থানে বেড়াইতে গিয়া সাড়ী-পরিহিতা দুইজন পাশি রমণীকে দেখিয়াছিলাম। (৫) পালে ডু জুষ্টি অথবা হাইকোর্ট প্রসিদ্ধ নােটারডাম নামক গির্জার সন্নিকটে ও সেন নদীর মধ্যে এক দ্বীপে নিৰ্ম্মি হ। অন্যান্য প্রাসাদের ন্যায় ইহাও অতি বিশাল। ব্যারিষ্টারবর্গ যে ২২ য়ুরােপ-প্রমণ। হলে মক্কেলের সহিত কথাবার্তা বলেন, তাহাই প্রায় সুট লম্বা। এই বাটীতে প্যারিসের নিম্নতর বিচারালয় ও ব্যতীত উচ্চতম আদালত কুর ডে ক্যাসাসিয় (Cour de Cassation) অবস্থিত। তাহার প্রধান বিচারপতিকে দেখিতে ঠিক বােম্বাই হাইকোর্টের পাশি জজ ডাভারের ন্যায়। এই আদালতে দেখিলাম, সাক্ষীর কাটরা ঘরের মধ্যস্থলে অবস্থিত। সাক্ষী প্রথম আসিয়া দক্ষিণ বাহু উত্তোলিত করিয়া হলপ, পাঠ করেন, তাহার পর হাত নামাইয়া সাক্ষ্য দেন। অন্যান্য কামরা যদিও খুব বড়, কিন্তু এজলাসগুলি আমাদের কলিকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির এজলাস অপেক্ষা ক্ষুদ্রায়তন বােধ হইল। (৬) নেপােলিয়র সমাধি। আঁভালিদে (Invalides) সংলগ্ন বৃহৎ গম্বুজের নিয়ে বিশ্ববিজয়ী মহাপরাক্রমশালী নেপােলিয়ন বােনাপার্টের মৰ্ম্ম-চিত সমাধি। এই স্থানে আসিলে বাস্তবিকই মনে এক অপূৰ্ব্ব ভাবের উদয় হয়। এই স্থানে দাঁড়াইয়া নগ্নমস্তকে ঐ বীরবরের সমাধির দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলে মনুষ্য-জীবনের অসারতাসম্বন্ধে বিশেষ সন্দেহ থাকে না। কুড়ি ফিট নিয়ে, ছত্রিশ ফিট পরিধি-বিশিষ্ট এক গােলাকার স্থানে সম্রাটের purple মার্বেলের প্রকাণ্ড সমাধি। চতুর্দিকে তাঁহার বিজয়পতাকা সকল উডডায়মান। উপরে তাহার ভ্রাতার, পুত্রের এবং সেনানীগণের সমাধি এবং তাহার স্ত্রীর হৃৎপিণ্ড রক্ষিত। চারি দিকে বন্ধুবর্গ- বেষ্টিত হইয়া ও তাহার প্রধান প্রধান যুদ্ধের বিজয়-কীর্তিস্তম্ভের মধ্যে মহাীর মহানিদ্রায় কীৰ্ত্তিতগুলি মৰ্ম্ম-নিশ্মিত। ধ জেরু উপরিভাগ নীলকামণ্ডিত। সূর্যালােক গিগ্ধভাবে সমাধিতে পতিত হয়। ইহাতে স্থানটি আরও গাম্ভীৰ্যগৌরবম হইয়াছে। যাহার বীরত্বগৌরব য়ুরােপের ইতিহাস উজ্জ্বল' করিয়াছে নিমগ্ন।

প্যারিস্। তাহার শেষ ভূমিশয়ন—“গৌরবের পথ শুধু মৃত্যুর সােপান?” পূৰ্বেই বলিয়াছি, প্যারিসে দ্রষ্টব্য জিনিষ অসংখ্য। অধিক বর্ণনা করিতে চাহি না। তবে প্যারিসে একটি ব্যাপার দেখিয়া- ছিলাম, তাহা পৃথিবীতে আর কোথাও দেখা যায় কি না, জানি না। সেই সম্বন্ধে দুই একটি কথা বলিয়া প্যারিসের কথা শেষ করিব। বােধ হয় অনেকেই জানেন যে, প্যারিস আটিষ্টদিগের প্রিয় আবাসভূমি। আটিষ্ট বলিতে শুধু চিত্রকর বুঝায় না; চিত্ৰ, গীত, বাদ্য, সাহিত্য, সৰ্ব্ববিধ বিদ্যার উপাসকদিগকেই Artist 1691 এই সব যাহারা চৰ্চ্চা করেন বা শিখেন তাঁহারাই শিল্পশিক্ষার্থী। ইহাদের অধিকাংশই অতি দরিদ্র। পুরুষ উভয়বিধ শিল্পশিক্ষার্থী শিল্পশিক্ষার্থী প্রায় এক সঙ্গে বাস, আহার, বিদ্যাচর্চা প্রভৃতি করেন। Bohemial life এর কথা অনেকে শুনিয়া থাকিবেন। কাহারও কাহারও বিশ্বাস, এই Bohemian life অতি কদৰ্য্য ও পাপপঙ্কিল। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে আমি Bohemian lifeএর একাংশ যাহা দেখিয়াছিলাম, তাহা বাস্তবিকই বিস্ময়কর এবং স্বর্গীয়। দুইজন দরিদ্র শিল্পী বন্ধুর সহিত এক রেস্তরায় আহার করিতে গিয়াছিলাম। দেখিলাম, ছয় সাত জন শিল্পী উপস্থিত, দুইজন স্ত্রীলােক-আর সব পুরুষ ; একজন পুরুষের ভাব দেখিলাম, অর্ধক্ষিপ্ত প্রায়। লােকটির বড় বড় দাড়িচল, মলিন অর্ধছিন্ন পােষাক, কোটের অর্ধেক বােতামনাই ও অঙ্গে রঙ মাখা; পকেটে সিকি পয়সাও নাই। রেস্তরার অধিকারী ও অধিকারিণী সকলকেই চিনেন, পয়সা কাহারও নিকট চাহেন না; জানেন, যাহার যে দিন পয়সা হইবে, সে সে দিন সমস্ত দেনা শােধ করিবেই। ইহার মধ্যে একজন স্ত্রীলােক গায়িকা; তিনি একজন সংবাদপত্র লেখকের ২৪ য়ুরােপ-ভ্রমণ। বাগদত্তা। তাঁহার নিকট সে দিন কিছু পয়সা ছিল। তিনি অধিকা- রিণীকে ডাকিয়া ঐ ক্ষিপ্তপ্রায় ভদ্রলােকের পয়সা দিলেন এবং উঠিয়া যাইবার সময় তাহাকে জড়াইয়া চুম্বন করিলেন ও সেই সময় দেখিলাম, হাতে কয়টি টাকা লইয়া ঐ ভদ্রলােকের অজ্ঞাতে ধীরে ধীরে তাহার পকেটে রাখিয়া দিয়া চলিয়া গেলেন ; যে যে দেখিতে পাইল তাহাকে তাহাকে চোখ টিপিয়া নিষেধ করিলেন, কেহ কিছু না বলে। এই অপার্থিব দৃশ্য দেখিয়া মুগ্ধ হইয়াছিলাম। পরদিন প্রাতে প্যারিস ত্যাগ করি।

ইংলণ্ড। প্যারিস হইতে যে দিন ইংলণ্ডে আসিলাম, সূৰ্য্যদেব সে দিন বড়ই সদয়। ইংলিশ-চ্যানেল পার হইবার সময় আকাশ মধ্যে মধ্যে একেবারে মেঘমুক্ত ছিল। এমন কি, কিছুক্ষণ বাস্তবিকই রৌদ্রে কষ্ট হইয়াছিল। ক্যালে হইতে ডােভার আসিতে প্রায় দেড় কি দুই ঘণ্টা লাগে। ষ্টীমাগুলি খুবই ছােট। নিম্নে আহারের ঘর প্রভৃতি আছে; কিন্তু যাত্রীরা প্রায় সকলেই ডেকে থাকেন। আকাশ পরিষ্কার, সমুদ্র শাস্ত, কাযেই কাহারও সমুদ্রপীড়া হয় নাই। ডেকের উপর চেয়ার বছাইয়া খবরের কাগজ পড়িতে লাগিলাম। মনে তখন অত্যন্ত কৌতূহল, এখনই ইংলও দেখিব, না জানি, সে কেমন ! কিছুক্ষণ পরে যখন দূরে ইংলণ্ডের প্রসিদ্ধ চকশৃঙ্গ (Chalk Cliffs) ধূমবৎ দেখা যাইতে লাগিল, তথন অত্যন্ত ঔৎসুক্যের সহিত উঠিয়া দেখিতে লাগিলাম। সেই সময় একজন ইংরাজ আসিয়া আমায় সহিত আলাপ করিলেন। তিনি এককালে এ দেশে লাট ছিলেন, দেশে ফিরিয়া অনেক উচ্চ রাজপদ অলঙ্কৃত করিয়াছেন। তিনি আমাকে বাঙ্গালী দেখিয়া বাঙ্গালা দেশের অনেক সংবাদ জিজ্ঞাসা করিলেন ও ডােভা- রেয় বন্দরে যে যে স্থানে দুর্গাদি আছে, তাহা দেখাইয়া দিতে লাগিলেন। জাহাজের উপর Customs পরীক্ষা হইল। একজন কর্মচারী আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “এই কি আপনার ব্যাগ ?” আমি বলিলাম, “হ।” তিনি ব্যাগের উপর একটি টিকিট লাগাইয়া দিলেন ; ঐ পৰ্যন্ত।

{ য়ুরােপ-ভ্রমণ। ডােভার হইতে লণ্ডন পর্যন্ত ফ্লোরেন্স নামক পুলম্যান গাড়িতে গিয়াছিলাম। গাড়ির এক দিকে অনুচরদিগের টেবল ও হলমারি, অবশিষ্ট অংশে ছােট ছােট টেবল এবং প্রত্যেক টেবলের দুই পার্শ্বে এক এক খানা খুব বড় চেয়ার। চেয়ারের নিকটেই ইলেকটিক ঘণ্টার বােতাম। বােতাম টিপিলেই অনুচর আসিয়া আদেশ প্রতীক্ষা করে। গাড়িতে বৈদ্যুতিক পাখা ও আলােক। গাড়িতে উঠিয়া ইংলণ্ডের ধনী- দিগের ঐশ্বর্যের আভাস পাওয়া গেল। যত লােক ঐ গাড়িতে ছিলেন, চুরুটের ও দেশলাইয়ের বাক্স সকলেরই দেখিলাম—সুবর্ণনিৰ্ম্মিত। দেখিয়া শুনিয়া আমি আর আমার চামড়ার চুরুটের খাপটি বাহির করিলাম না। অনুচরের নিকট সিগারেট কিনিয়া লইলাম। গাড়িতে এক পেয়াল চায়ের দাম অবশ্য ২। ১ খানা কেক সহ ) ২• শিলি এবং টা সিগারেটের দাম এক শিলিং (৬০ আনা )। ডােভারের জেটীর উপরেই ট্রেণে তখনও ইংলণ্ডের মাটিতে পা দিই নাই। ডােভার হইতে লণ্ডন ৭৫ মাইল । আমাদের ট্রেণ কোথাও না থামিয়া বরাবর ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিটে লণ্ডন পৌছিল । ভূগােল পড়িয়া ও কথাবার্তা শুনিয়া মনে একটা ধারণা ছিল যে, ইংলণ্ড এমনই জনবহুল যে, খােলা জায়গা বুঝি মােটেই নাই। এখন দেখিলাম, সে ধারণা বড়ই ভুল ! আমাদের দেশেরই মত রেলের দুই ধারে কেবলই মাঠ, মধ্যে মধ্যে কেবল শােকের বাসভূমি, গ্রাম ও সহর। তবে এভদের মধ্যে এই যে, মাঠগুলি সবই কৰ্ষিত এবং বিজ্ঞাপনে পরিপূর্ণ। মাঠের মধ্যে যেখানে সেখানে প্রকাণ্ড ভার খাড়া করিয়া তাহার উপর চা, মদ, চুরুট, বিস্কুট প্রভৃতির বিজ্ঞাপন ; আর কোথাও কোথাও জমীভাড়ার বিজ্ঞাপন। আর একটা জিনিষ বড় দৃষ্টি আকৃষ্ট করে। ছােট ছােট গ্রামগুলিতে ছােট ছােট বাড়ী গুলির মধ্যে ব্যবধান বেশ পরিষ্কার। উঠিলাম।

ইংলণ্ড। মাঠে যে সকল জানােয়ার বেড়াইভেছে—গরু, ভেড়া, মুরগী, হাঁস, গোড়া প্রভৃতি—সবই আমাদের দেশের জীবজন্তু অপেক্ষা অনেক বড় বড়। বলিতে কি, প্রথম দর্শনে আমার এক পাল তেড়াকে গরুই মনে হইয়াছিল। ডাের ছাড়াইয়া রেল প্রথমে কয়েক মাইল সমুদ্রের খুব কাছ দিয়াই যায়, পাহাড়ের উপর ও ভিতর দিয়া যাইতে যাইতে বামে সমুদ্র উকিঝুকি মারিতেছে, বাস্তবিকই বড় মনােরম। পথে অনেক গুলি সুরঙ্গ আছে। যেটি সর্বাপেক্ষা বড় সেটি পার হইতে ৪ মিনিট ৪৫ সেকেণ্ড লাগিল। সাড়ে পাঁচটার সময় চেয়ারিং-ক্রশ ষ্টেশনে পৌছিলাম। তাহার কিছু পূর্বেই লণ্ডনে টেণ প্রবেশ করিয়াছে। কেবল বাড়ীর পর বাড়ী ভিন্ন আর কিছুই দেখা যায় না। টেন্স পার হইয়া ষ্টেশনে পৌছিতে হয়। পুলের উপর হইতে পালমেন্ট গৃহ দেখিলাম ; খুব গাম্ভীৰ্য-গৰ্বময় বােধ হইল। যখন লণ্ডনে পৌছিলাম, তখনও বেলা আছে। ভ্রাতা ষ্টেশনে অপেক্ষা করিতেছিলেন। তিনি সেই স্থানে হ্যাট খুলিয়া সাষ্টাঙ্গ, প্রণামপূৰ্ব্বক পদধূলি লইলেন। সহযাত্রী ও অন্যান্য লােক হঁ করিয়া থাকিল ; বােধ হয় মনে করি, আমি একটা ছােট খাট দেবতার মধ্যে। ব্রেকে যে মাল ছিল, তাহা বাহির করিয়া লইয়া একটি Taxicab চড় গেল। ভায়া বলিলেন, কিছুক্ষণ সহর দেখিয়া বাসায় যাওয়া যাই। ষ্টেশন হইতে বাহির হইয়া প্রথমেই বামে টাফারার স্কোয়ার ও নেলসনের মনুমেন্ট দেখিলাম। তাহার পর পালায়েন্টের নিকট দিয়া সেন্টজেমস পার্ক, হাইড পার্ক প্রভৃতি দেখিতে দেখিতে বিজেন্ট ২৮ য়ুরােপ-ভ্রমণ। স্ট্রীট প্রভৃতি প্রসিদ্ধ রাস্তা পার হইয়া লণ্ডনের উত্তরে ফিন্সবেরী নামক স্থানে বাসায় উপনীত হইলাম। তথায় প্রবাসী বাঙ্গালী যুবকদিগের শীর্ষস্থানীয় মান ফণী আমার জন্য অপেক্ষা করিতে ছিলেন। সে রাত্রিতে আর কোথাও যাওয়া হয় নাই। আহারাদির পর ভ্রাতার সঙ্গে গল্প গুজবেই ১টা পর্যন্ত কাটাইয়া দেওয়া গেল। প্রথম দৃষ্টিতে লণ্ডনের দুইটি জিনিষ খুব নুতন বুলিয়া বােধ হয় ; এক, ইহার ঐশ্বৰ্য্য এবং দ্বিতীয়, লােকের ব্যস্ত-সমস্ত ভাব। কেহই যেন আমাদের দেশের ন্যায় ধীরে চলে না; সকলেরই পদক্ষেপ খুব দ্রুত, সকলেরই মুখে ব্যস্ততার লক্ষণ। আর বিস্ময়কর-বোধ হয় লণ্ডনের পার্কগুলি। এত জনবহুল এবং ব্যয়বহুল সহরের মধ্যে এত বড় বড় পার্ক, এমন সুন্দরভাবে সাজাইয়া রাখিয়াছে। ছােট পার্কগুলি প্রত্যেকটি কলিকাতার ঘােড়দৌড়ের মাঠের সমান; হাইড পার্ক ত গড়ের মাঠ অপেক্ষা কোন অংশেই ছােট হইবে না। আমি যে বাসাতে ছিলাম, তথায় একটা শুইবার ও একটা বসিবার ঘর ভাড়া লইয়াছিলাম। গৃহকত্রী আমার প্রাতরাশের ব্যবস্থা করিতেন। অন্যান্য সময় আমি যখন যে স্থানে থাকিতাম, সেই স্থানে খাইতাম। দুইটি ঘর ও প্রাতরাশের জন্য সাপ্তাহিক ২১ শিলিং বা ১৫০০ টাকা ভাড়া দিতে হইত অবশ্য বড়মানুষ-পাড়ায় খরচ খুব বেশী। আমার একটি বন্ধু শুধু ঘরভাড়া সাপ্তাহিক ৪ গিনি বা ৬৩ টাকা দিতেন। তবে গৃহস্থ লােকের পক্ষে আমার যায়গা বেশ ছিল। ঘর দুইটি অবশ্য আবশ্যক আসবাবে পূর্ণ। বসিবার ঘরে একটা বড় টেবল, একটা ছােট টেবল, পাঁচখানা চেয়ার, আর্শি, কোচ, এবং শয়নকক্ষে দুইটা আলমারি, একটা দেরাজ, একটা সজ্জা টেবল প্রভৃতি ছিল।

ইংলণ্ড। ; বলা উচিত, ইংলণ্ডে ‘ছােটা হাজৰি নাই ; প্রাতরাশই দিনের প্রথম ‘আহার। ও সব দেশে আহাৰ্যের ভাবনা কিছু নাই। বেড়াইতে গিয়া যে স্থানেই খাবার সময় হউক, সর্বত্রই হােটেল বা রেস্তর পাওয়া যায়, যাইয়া খাইলেই হইল। পৰ্যটকের পক্ষে ইহা কম সুবিধা নহে। প্রাতে প্রাতরাশ খাইয়া ৯টায় বাহির হইতাম, সমস্ত দিন টোটো করিয়া রাত্রিতে থিয়েটারাদির পর ১২টা বা ১টায় বাসায় ফিরিতাম ; কোনও গােল নাই। যদি বাসায় আসিয়া লাঞ্চ ও ডিনার খাইতে হইত তবে আমাকে অনেক জিনিষ না দেখিয় ফিরিতে হইত; কারণ, সহরের কেন্দ্র হইতে আমার বাসস্থান ৩। ৪ মাইল দূরে অবস্থিত ছিল। লণ্ডনে মানুষের সুবিধার অন্ত নাই । অল্প খরচে এরূপ সুখ- স্বচ্ছন্দ আর কোথাও পাওয়া যায় বলিয়া বােধ হয় না। প্রথম যান, আণ্ডারগ্রাউও রেলওয়েতে (ভূমধ্যস্থ রেল) সহরের এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত অতি শীঘ্র যাওয়া যায় ; তদ্ভিন্ন রেল, টুম, অনিব, ঘােড়ার গাড়ি, মটর গাড়ি প্রভৃতি প্রচুর। অণ্ডারগ্রাউণ্ড রেলওয়ে ট্রেণ মাটির নিম্ন দিয়া বৈদ্যুতিক বলে চলে। যন্ত্রে যাত্রীদিগকে ভূগর্ভে নাবায় ও উঠায়। নিম্নে প্রশস্ত প্ল্যাটফর্ম ; গাড়ি দুই মিনিট অন্তর আইসে; সেগুলি বৈদ্যুতিক আলােকে বিভাসিত। দুইখানি মাত্র গাড়ি-একখানি ধূমপায়ীদিগের জন্য ; অপরখানি সাধারণের। শ্রেণীবিভাগ নাই। ভাড়া দুরত্বানুসারে-এক পেনি হইতে তিন পেনি পর্যন্ত ; প্রত্যেক গাড়িতে একজন পরিচালক থাকে, সে গাড়ি ছাড়িবা মাত্র গাড়ি কোন্ ষ্টেশনে দাড়াইবে বলিয়া দেয়। ৮। ৯টি ভিন্ন ভিন্ন লাইন লণ্ডনে আছে। এক লাইন হইতে অন্য লাইনে যাইবার বদল টিকিট পাওয়া যায়। দ্বিতীয় সুবিধা, টেলিফে। প্রায় সব বাড়ীতেই টেলিফে। বসান । ;

য়ুরােপ-ভ্রমণ। তদ্ভিন্ন রাস্তায় রাস্তায় টেলিফের আফিস আছে। তথায় যাইয়া ২ পেনি দিলে ৩মিনিট কথা বলিয়া লওয়া চলে। টেলিফের : ব্যবস্থা লগুনে ৪ ৫ টি কোম্পানীর আছে; কিন্তু পরস্পরের মধ্যে অদল বদল চলে, কাযেই কিছুমাত্র অসুবিধা নাই। তৃতীয়, কোথাও কোন জিনিষ কিনিলে, ক্ষুদ্র হউক বৃহৎ হউক, বলিলেই বিনা খরচে বাড়ী পাঠাইয়া দেয়। বাজার করিয়া হয় ত মাইল দূরস্থিত বাটীতে আসিয়া দেখিবেন, ক্রীত জিনিষ আসিয়া পৌছিয়াছে। চতুর্থ, পৃথিবীতে যত কিছু দ্রব্য প্রস্তুত হয়, লণ্ডনে সবই পাওয়া যায়। এত দোকান আর কোথাও নাই। স্থানবিশেষে খুব সস্তায়ও জিনিষ পাওয়া যায়। আর যে সব বড় বড় দোকানে জুতা শেলাই হইতে চণ্ডীপাঠ পর্য্যন্ত হয়, সে রকম দোকান ৮৯টা আছে । তাহাদের ভিতর ডাকঘর, রেস্তর, বিশ্রামাগার, এমন কি -- ক্রেতাদিগের জন্য স্নানাগার ও পাঠগৃহ পৰ্যন্ত আছে । সাধারণের জন্য স্নানাগার প্রভৃতি প্রায় সকল রাস্তাতেই আছে । সেগুলি প্রায়ই রাস্তার নিয়ে। সিড়ি দিয়া নামিয়া একটি বাটার মধ্যে গিয়া দেখা যায়, তথায় স্নানের জন্য ঠাণ্ডা ও গরম জল, পরিষ্কার কাচা তােয়ালে, সাবান প্রভৃতি রহিয়াছে। কোনও কোনও স্থানে অবগাহন স্নান ও সত্তরণের বন্দোবস্ত পর্যন্ত আছে। সৰ্ব্বাপেক্ষা আশ্চর্য ব্যাপার, লণ্ডনের পুলিশম্যান। মােড় একজন পুলিশমান থাকে, বড় বড় চৌমাথায় ২৩ থাকে। রাস্তায় গাড়ির অত্যন্ত হুড়াহুড়ি, পদব্রজে রাস্তা পার হওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। রাস্তার ঠিক মধ্যস্থলে পুলিশম্যান অটলভাবে দণ্ডায়মান। গাড়ি যে দিক হইতেই আসুক, তাহাকে দক্ষিণে রাখিয়া যাইতে হইবে। সে যখন দেখে, অনেকগুলি পদচারী ইংলণ্ড। রাস্তা পার হইবার আশায় অপেক্ষা করিতেছে, তখন গম্ভীর ভাবে এক হস্তু উত্তোলিত করে। সে দিকের যত গাড়ি মন্ত্রমুগ্ধবৎ একেবারে যুগপৎ যে যেরূপ অবস্থায় থাকে, থামিয়া যায়। পুলিশম্যান সঙ্কেতে পাল যাত্রীদিগকে রাস্তা পার হইতে বলে; সমবেত সকলেই পার হইয়া গেলে সে হাত নামাইয়া দিলে গাড়িগুলি আবার চলিতে আরম্ভ করে। এ ব্যাপার প্রত্যেক রাস্তায় ক্রমাগতই চলিতেছে এং বিদেশীর হর্ষ ও বিস্ময় উত্তেজিত করিতেছে। বাহাদুরী অধিক কাহার, পুলিশম্যানেয় না ইঙ্গিত মাত্রে পরিচালিত শকটচালকদিগের ? লণ্ডনের পুলিশম্যানের আর এক অদ্ভুত ক্ষমতা রাস্তাঘাটের অবস্থান জ্ঞান। যত দূরস্থ হউক না কেন, যে কোন স্থানের কথা জিজ্ঞাসা- মাত্র কোন্ দিকে কয়টা মোেড় ফিরিয়া সে স্থানে উপনীত হওয়া যাইবে একেবারে কলের ন্যায় বলিয়া দিবে। সময়ে সময়ে তাহাদের কথিত বিবরণ যাত্রীর মনে করিয়া রাখাও দুষ্কর হয়। এতদ্ভিন্ন অনেক লােক অনেকরূপ অদ্ভুত অদ্ভুত প্রশ্নও জিজ্ঞাসা করে ; পুলিশ- ম্যানও যথাসম্ভব সকলের কথার উত্তর দেয়। মাথা ও মেজাজ ঠাণ্ডা রাখে তাহা বাস্তবিকই বিস্ময়কর। ইংলণ্ডের আর এক চমৎকার ব্যাপার, দাসদাসী! চাকর খুবই কম; কারণ, একে বেতন বেশী, তাহাতে চাকর রাখিলে টেক্স দিতে হয়। অধিকাংশ বাড়ীতে শুধু চাকরাণী থাকে। একটা বাড়ীতে ৫ জন লােক, একটি মাত্র দাসী। সেই দাসী রান্নার জোগাড়, ঘর ঝট, কাপড় চোপড় ঝাড়া, বিছানা পাতা, জুতা বুরুষ, বাজার করা, উনান ধরান-সমস্ত কাৰ্য্যই করিবে, অথচ কখন তাহার মুখে একটি কথা শুনা যায় না! তদ্ভিন্ন সকলেই হয় ত ভিন্ন ভিন্ন সময়ে আহাৰ্য্য চাহেন বা কোন জিনিষ চাহেন ; ঠিক সময়ে প্রত্যেকের আদেশ পলিত হইবে, এক মিনিটের উহারা যে ভাবে ৩২ য়ুরােপ-ভ্রমণ। নড়চড় হইবে না। ইহাদের বেতনও এমন কিছু অধিক নহে; বােধ হয় মাসিক ১ পাউণ্ড আন্দাজ। এ স্থানে বলা উচিত যে, সে দেশের এক পেনি যদিও আমাদের দেশের কথায় এক আনা বা চারি পয়সা, তথাপি তথায় এক পেনি এক পয়সা মাত্র। ভিখারীকে পয়সা দিতে হইলে এক পেনি, একটি দেশলাই কিনিতে হইলে এক পনি, রেলে তৃতীয় শ্রেণীর ভাড়া প্রতি মাইল এক পেনি প্রভৃতি হইতে বুঝা যায় যে, পেনি তাথায় পয়সা মাত্র, আনি নহে। বিলাতের সুবিধার কথা কিছু বলিয়াছি, অসুবিধার কথাও কিছু বলিব। প্রধান অসুবিধার বিষয়ের আভাস পূর্বেই দিয়াছি- তথায় পয়সার মূল্য বড় কম। আমাদের দেশে সচরাচর যাহাদিগকে বড়মানুষ বলা যায়, ইংলণ্ডের অধিবাসীদিগের তুলনায় তাহারা গরীব ভিন্ন কিছুই নহেন। যে দেশে একটা দেশলাইয়ের বাক্সের দাম চারি পয়সা, সে দেশে আমাদের মত মধ্যবিত্ত লােক যে দরিদ্র বলিয়া পরিগণিত হইবে তাহাতে আর সন্দেহ কি ? এতদ্ভিন্ন সে দেশে বিনামূল্যে কিছু পাওয়া যায় না। আমরা এ দেশে কত কাষ বিনা খরচে চালাই ; তথায় সব জিনিষেরই মূল্য আছে। দরজায় গাড়ি থামিলে কোথা হইতে একজন ছুটিয়া আসিয়া দরজা খুলিয়া দিবে, তাহাকে অন্তত এক পেনি বা চারি পয়সা দাও। কাহাকেও একখানা গাড়ি ডাকিয়া দিতে বল, সে এক পেনি পাইবার আশা করিবে। তাহা না দিলে নিন্দিত হইতে হয়। থিটোর প্রভৃতি স্থানে বাস্তবিকই শারীরিক ক্রিয়ার জন্য পয়সা দিতে হয়। কোথাও গিয়া ওভারকোট খুলিয়াছ, আসিবার সময় ভৃত্য কোটটি ধরিয়া পরাইয়া দিল, তাহার ও কিছু প্রত্যাশা।

ইংলও। তাহার পর লণ্ডনে রবিবারে ডাক বিলি হয় না। সভ্যজগতে আর কোথাও এ নিয়ম আছে কি না জানি না, কিন্তু পূর্ণ এক দিন ডাক বন্ধ রাখা যে কত অসুবিধাজনক তাহা বেশ বুঝা যায়। বিশেষ মনে করুন, যদি ভারতবর্ষীয় ডাক শনিবার রাত্রিতে বিলম্বে পৌছায়, তবে লণ্ডনস্থ সকলে সােয়বারের পূর্বে চিঠি পাইবে না, কিন্তু লণ্ডনের পার্শ্ববর্তী স্থানসমুহে রবিবারেই ডাক বিলি হইবে। বড় চমৎকার ব্যবস্থা। ধােপা ও নাপিতের খরচ লণ্ডনে অত্যন্ত অধিক। সাধারণতঃ একটি সার্ট কাচিতেy• আনা, একখানি রুমাল কাচিতে ১০ আনা, একখানি কলার কাচিতে • আনা লাগে। নাপিত দাড়ি কামাইতে।• আনা ও চুল ছাটিতে ॥ ॥• লয়। বড় ক্যাসানেবল জায়গায় অবশ্য ইহার অপেক্ষা অনেক অধিক খরচ। ইংলণ্ডের থিয়েটারের প্রশংসা অনেকদিন হইতে শুনিতাম। পূর্বেই এত অধিক প্রশংসা শুনিয়াছিলাম যে, প্রথম দিন বাস্তবিকই হতাশ হইয়াছিলাম। কারণ, কল্পিত আদর্শটাকে এত উচ্চ রয়? ফেলিয়াছিলাম যে, বাস্তবটা কিছুতেই তাহার নিকট পৌছিতে পারে না। তবে ক্রমে উপলব্ধি হইয়াছিল যে, বাস্তবিকই লণ্ডনের থিয়েটার প্রশংসনীয়। থিয়েটারের কিছু বিবরণ দিব। কিন্তু পূৰ্ব্বাহ্নে একটা কথা বলিয়া রাখি ; থিয়েটার দেখিতে গিয়া ইংরা জাতির সহজ সরলতায় মুগ্ধ হইতে হয়। উহারা যেরুপ সব simple situationsএ অত্যন্ত বিচলিত হইয়া পড়ে, তাহাতে বেশ বুঝা যায় যে, উহাদের রূক্ষ ভাবটা একেবারেই বাহিক অত্যন্ত খুবই কোমল। আর থিয়েটার দেখিতে গিয়া লক্ষ্য করা যায়, বয়সের বিপরীত অনুপাতে রমণীর বেশভুষা। যাহার বয়স অল্প, * তাহার পােষাক তত সাদাসিধা। অতি বর্ষীয়সী + টিকিটের মূল্য ১ ৩৪ য়ুরােপ-ভ্রমণ। রমণীদের প্রায়ই রেশমের পােক; স্বর্ণয়োপ্যবিমণ্ডিত। ইহাতে কি তাহারা নিতান্তই আপনাদের বয়সের দিকে লোকের চিত্ত আকৃষ্ট করেন না ? লণ্ডনে প্রায় ত্রিশটি থিয়েটার আছে। তদ্ভিন্ন প্রায় ১০ টি মিউজিক হল। থিয়েটারে রবিবার. ভিন্ন প্রত্যহ অভিনয়। বুধ ও শনিবারে প্রায়ই দুই বার অভিনয় হয়। রাত্রি ৮টা কি ৮০ টায় আরম্ভ হইয়া ১১ টায় অভিনয় বন্ধ হয়। বুধ ও শনিবারে অতিরিক্ত অভিনয় ২টা ৩টা হইতে ৫টা ৬টা পর্যন্ত চলে। নিত্য নূতন পুস্ত- কের অভিনয় হয় না। প্রায় একই নাটক প্রত্যহ অভিনীত হয়। হয়ত কোনও একথানি নাটক এক বৎসর দেড় বৎসর ধরিয়া প্রত্যহই অভিনীত হইতেছে, অথচ প্রত্যহই লােকারণ্য, পূর্বাহ্নে আসন সংগ্রহ না করিলে স্থানাভাবে ফিরিতে হয়। শিলিং হইতে ১০ | • শিলিং। অবশ্য বক্সের আরও অধিক দাম, দুই, তিন, পঁচ গিনি! সর্বনিম্ন দুই শ্রেণী (গ্যালারি ১ শিলিং ও পিট ২ • শিলি) ভিন্ন সর্বত্রই অগ্রে স্থান ভাড়া করা যায় । এই ভাড়া করার জায়গা লওনের প্রত্যেক রাস্তায় অনেকগুলি করিয়া আছে। ভাল ভাল অর্থাৎ বেশ popular অভিনয়ের জন্য ৪৫ দিন অথবা তাহারও পূর্বে স্থান ভাড়া না করিলে আসন পাওয়া যায় না। টিকিটে নম্বর দেওয়া থাকে, সেই নম্বর দেখিয়া চেয়ারে বসিতে হয়। অনেক সময় কত লােক অনেকগুলি টিকিট কিনিয়া রাখে, পরে অভিনয়ের রাত্রিতে হয় ত দ্বিগুণ বা চতুগুণ দামে দর্শকদিগণের নিকট বিক্রয় করে। . থিয়েটারে দর্শকদিগের জন্য অনেক Opera glass রক্ষিত থাকে। প্রত্যেক সারির দর্শকদিগের জন্য সম্মুখের সারির চেয়ারের পশ্চাদ্ভাগে কোটার ন্যায় আধারে Opera glass সংরক্ষিত। একটি ছয় পেনি ইংলণ্ড। ফেলিয়া দিলে কৌটা আপনিই খুলিয়া যায়। পরে অভিনয়ান্তে দর্শক Opera glass যথাস্থানে রাখিয়া থাকেন। প্রােগ্রাম দাম দিয়া কিনিতে হয়, বিনামূল্যে দেয় না। দাম আবার একই প্রােগ্রামের সর্বত্র সমান নহে। যে প্রােগ্রাম গ্যালারিতে এক পেনিতে পাওয়া যায়, ষ্টলে তাহারই দাম ছয় পেনি। বক্সে কত দাম জানি না। অভিনয়ের সময়ে দর্শকদিগের বসিবার স্থানে আলােক থাকে না। প্রত্যেক অঙ্কের অভিনয়ের পূর্বে অালােক নৰ্বাপিত হয়। কাযেই দর্শকদিগের পরস্পরের কথােপকথনের গুঞ্জন খুব কমই শ্রুত হয়। দুই অঙ্কের অভিনয়ের অবকাশকালে শুভ্রবেশপরিহিতা পরিচারিকাগণ চা, কফি, চকোলেট প্রভৃতি বিক্রয় করে। এতদ্ভিঃ মষ্ট ও ধূমপানের ব্যবস্থা আছে। চকোলেট খাওয়াটা ইংরাজ জাতির বিশেষতঃ স্ত্রীলােকদের একটা রােগের মধ্যে। যখন তখন এবং যত ইচ্ছা চকোলেট ইহারা খায় এবং খাইতে পারে, ইহাতে বয়সে কিছু বাধে না। আবালবৃদ্ধ সকলেই চকোলেট খায়। এক একটা থিয়েটারে আমাদের দেশের রঙ্গালয় অপেক্ষা অনেক অধিক দর্শকের স্থান হয়। পিট ও গ্যালারিতে স্থান পাইতে হইলে অন্ততঃ ৩৪ ঘন্টা আগে আসিয়া দাড়াইয়া থাকিতে হয়। পুলিশ দুইজন করিয়া সার গাথিয়া দাঁড় করাইয়া দেয়। টিকিট ঘর খুলিলে একে একে গিয়; টিকিট কিনিয়া স্থান । অধিকার করিতে হয়। হয় ত টিকিট-ঘর হইতে আরম্ভ করিয়া সার সে রাস্তা পার হইয়। অন্য রাস্তা পৰ্য্যন্ত প্রকাণ্ড সর্পের ব্যয় ওষমান। এই সারকে queue বলে। শুনিয়াছি, কোন কোন নাটকের প্রথম অভিনয় উপলক্ষে লােক ২৪ ঘণ্টা পূৰ্ব্ব হইতে সার গাঁথে, সেই রাস্তার মধ্যে দাড়াইয়া পান ভােজন সবই সমাধা করে, কেহ কেহ বা বাড়ী হইতে ক্যাম্প টুল প্রভৃতি লইয়া গিয়া য়ুরােপ-ভ্রমণ। শ্রান্তি অপনােদন করে, কেহ বা লোেক ভাড়া করিয়া দাঁড় করাইয়া রাখে, পরে নিতে যথাকালে উপস্থিত হয়। থিয়েটারের মঞ্চগুলিও অতি প্রকাণ্ড ; একসঙ্গে বহু লােকের স্থান হয়। আমি একটা অভিনয় দেখিয়াছিলাম, তাহাতে একখানি মােটরগাড়ি আনিয়া দেখায়, দশ বারটা ঘােড়া রঙ্গমঞ্চের উপর ঘােড়দৌড় করে এবং একটা রেলওয়ে এঞ্জিন একটা পুরাদস্তুর Horse-boxএর উপর আসিয়া পড়ে এবং সমস্ত চুরমার হইয়া যায়। সত্যমিথ্যা জানি ল, শুনিয়াছিলাম এই অভিনয়ে প্রতি রজনীতে ১২০০, ১৫০০ টাকা খরচ হয়। বাস্তবিক দৃশ্যসৌন্দৰ্য্য অতি অসাধারণ ও অনিন্দ্যসুন্দর। আমি সেক্সপিয়ারের Henry VIII. অভিনয় দেখিয়াছিলাম। যে সময়ের ঘটনা অভিনীত পরিচ্ছদ প্রভৃতি ঠিক সেই সময়ের ; এবং যে সব অভিনেতা ও অভিনেত্রী ঐতিহাসিক ব্যক্তিবর্গের ভূমিকা অভিনয় করিয়াছিলেন তাঁহারা সেই সেই ব্যক্তির ন্যায় চেহারাও করিয়াছিলেন। বাস্তবিক রঙ্গমঞ্চে রাজা হেন্রীকে যেন ন্যাশনাল গ্যালারী চিত্রালয়ের হেনরীর সজীব সংস্করণ বলিয়া বােধ হইতেছিল। যত দিন অভিনয় দেখিয়াছিলাম, দুইটি গার্হস্থ্য নাটক আমার নিকট সর্বাপেক্ষা ভাল লাগিয়াছিল । কিন্তু সে দুইটিতে দর্শকের তত ভিড় দেখিলাম না। ইংরাজজাতি স্নিগ্ধ গম্ভীর অভিনয় ভালবাসে বলিয়া বোধ হইল না। আমি ইংলণ্ডের প্রসিদ্ধ অভিনেতাদিগের অনেকেরই অভিনয় দেখিয়াছিলাম। তন্মধ্যে সার চালস উইগুহাম, সার হাবার্ট টি , বুর- শিয়ার এবং ডুমরিয়ারের অভিনয় আমার নিকট সৰ্বোত্তম মনে হইয়া- ছিল বিশেষতঃ উইণ্ডহামের। এমন সহজ সুন্দর অভিনয় আমি খুব কমই দেখিয়াছি। দেখিলে অভিনয় বলিয়া বােধ হয় না। আমাদের দেশের এক. ষ্টার থিয়েটারের শ্রীযুক্ত অমৃতলাল বসুর অভিনয়ে ঐ ইংলণ্ড। ৩৭ P সহজ? ভাব পরিলক্ষিত হয়। পনর ষােল বৎসর পূর্বে অমৃতবাবুর অভিনয় দেখিতাম। উইগুহামকে দেখিয়া অমৃতবাবুর কথা খুব মনে পড়ে। Mannerismএর একান্ত অভাব, যাহা আছে তাহা ঠিক অমৃতবাবুর মত। যুবরাপে থিয়েটার ভিন্ন মিউজিক হল নামক আর একরূপ প্রমােদ-গৃহ আছে। তথায় নাটক অভিনীত হয় না, যাহা কিছু অভিনয় হয় তাহাও কেবল ভাবভঙ্গীতে; অতিনেতা অভিনেত্রী বাক্যস্ফুরণ করে না, শুধু হাবভাবে ব্যাপারটা বুঝাইয়া দেয়। তদ্ভিন্ন মিউজিক হলে গান, নাচ, ম্যাজিক, জিমন্যাষ্টিক প্রভৃতি দেখায়। এই জন্য উহার আর এক নাম, variety Stage-বৈচিত্র্য মঞ্চ। এই সব স্থানে দর্শকদিগের বসিবার ও বেড়াইবার স্থান থাকে, অনেকে সমস্তক্ষণ পদচারণ করে। এই মিউজিক হলগুলি কুপথগামী স্ত্রী পুরুষের সম্মিলনস্থান। সে চিত্রের পরিচয়ে আর কায নাই। এই থিয়েটারের প্রসঙ্গে আলবার্ট হলের বর্ণনা করিতে হয়। মহারাণী ভিক্টোরিয়ার স্বামী প্রিন্স আলবার্টের স্মৃতিচিহূস্বরূপ ত্রিশ লক্ষ মুদ্রাব্যয়ে এই প্রকাণ্ড গােলাকার হল নির্মিত। দশ হাজার লােক ইহাতে স্বচ্ছন্দে বসিতে পারে। লণ্ডনের বড় বড় রাজনৈতিক সভা এবং সঙ্গীতবৈঠক 'এই হলে হয়। এই দালানে প্রায় ১০০ পাইপযুক্ত একটি প্রকাণ্ড অর্গান আছে। সমবেত ব্যক্তিবর্গের পদচারণের স্থানও আছে। রাজার প্রবেশদ্বার, বসিবার ঘর প্রভৃতি এই হল দেখিতে তিন পেনি দর্শনী দিতে হয়। পৃথিবীতে এত বড় সভাগৃহ খুব কমই আছে। অথচ ইহা এরূপ কৌশলে নিৰ্ম্মিত যে, মঞ্চের উপর বক্তৃতা করিলে অল্প আয়াসে সকল শ্রোতাই বক্তার কথা শুনিতে পায় ; আমাদের সেনেট হাউসের মত নহে। মঞ্চটির উপরে সহস্র ব্যক্তির স্থান হয়। দর্শকদিগের জ বসিবার ৩৮ য়ুরােপ-ভ্রমণ। আসন আছে। রক্ষীর নিকট শুনিলাম যে, বল নাচ বা Cjarity performance উপলক্ষে আসন সরাইয়া ফেলা হয়; তখন বার হাজার লােকের স্থানসকুলান হয় । আলবার্ট হলের সম্মুখেই কেনসিংটন উদ্যানের এক অংশে Albert Memorial বিদ্যমান। প্রকাণ্ড চাপের নিম্নে প্রিন্স আলবাটের ১৩ ফুট উচ্চ ব্রোঞ্জ-নির্মিত প্রতিমূর্তি। তাহার চতুপার্শ্বে নানাদেশীয় কবি, চিত্রকর, শিল্পী প্রভৃতির প্রতিমূর্তি ; চারি কোণে কৃষি, বাণিজ্য, স্থাপত্য ও উৎপাদক শিল্পের কল্পিত মূর্তি। নিম্নে মৰ্ম্মসােপান ও সর্বনিম্নে য়ুরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকার রূপক মূর্তি। ১৮ লক্ষ মুদ্রাব্যয়ে এই স্মৃতিচিহু নিৰ্ম্মিত। অন্য কিছু বলিবার পূর্বে ইংলণ্ডের যানাদি সম্বন্ধে কিছু বলি : টিউব রেলওয়ে বা ভূমধ্যস্থিত বৈদ্যুতিক গাড়ি সম্বন্ধে কিছু বলিয়াছি। ইহাই লণ্ডনের সর্বাপেক্ষা অধিক ব্যবহৃত যান এবং ইহার দ্বারা এক স্থান হইতে অন্য স্থানে যাওয়া সৰ্ব্বাপেক্ষা সুলভ ও স্বল্পসময়সাপেক্ষ। সকলেই জানেন যে, লণ্ডন খুব বড় সহর এবং ইহার প্রসার ক্রমশঃই বাড়িতেছে। এখন ভূমধ্যস্থিত গাড়ির ৮১ টি লাইন লণ্ডনে আছে এবং তাহাদের মােট দৈর্ঘ্য প্রায় ৬০ মাইল। সহজেই বুঝা যায়, লণ্ডনের এক অংশ হইতে অংশান্তরে যাওয়ার ইহাই প্রকৃষ্ট উপায়। লণ্ডন অবশ্য টেমস নদীর দুই তীরেই বিস্তৃত। কিন্তু টেমসের দক্ষিণ বা সরের (Surrey) দিকের অংশ অপেক্ষাকৃত অল্প কৰ্ম্মকোলাহলকলয়িত। ঐদিকে দুইটি মাত্র টিউব রেলওয়ে আছে। দুই টিরই অবশ্য স্বতন্ত্র tunnel বা সুরঙ্গ আছে। তদ্ভিন্ন ‘পদ্যপারে' সেই “উপরে জাহাজ চলে নীচে চলে নর” সে সুরঙ্গ 'ত আছেই। মােট এই তিনটি সুরঙ্গ নদীর নিয়ে আছে। এই স্কুলে বলা উচিত যে, প্যারিসেও এইরূপ ভুমধ্যস্থিত রেলওয়ে ।

ইংলণ্ড আছে, এবং তথাকার লাইন সমস্তই বৈদুতিক আলােকমালায় আলােকিত। লণ্ডনের রেলপথগুলি অন্ধকার, কেবল গাড়ির মধ্যে খুব আলাে থাকে। দুই একটি লাইনে অত্যন্ত শব্দ হয়, গাড়ির তিতর কথােপকথন একরূপ অসম্ভব, তবে সব লাইনে এরূপ নহে। কেহ কেহ বলেন যে, এই সব ভূমধ্যস্থিত গাড়িতে দম আটকানর মত ভাব হয়। আমার সৈরূপ কিছু হয় নাই ? তাহার পর রেলগাড়ি। রেলওয়ে সম্বন্ধে প্রধান কথা এই যে,লগুনে যত গুলি লাইন আছে, সকলেরই সীমান্ত ষ্টেশন লণ্ডনের খুব জনাকীর্ণ ও কৰ্ম্মবহুল অংশে; আমাদের দেশের ন্যায় সহরের এক প্রান্তে নহে। কোথাও সুরঙ্গ কাটিয়া কোথাও বা রাস্তার খুব উর্দ্ধে পুলের ন্যায় গাঁথিয়া তাহার উপর দিয়া রেলওয়ে লাইন সহরের মধ্যে আনিয়াছে। লণ্ডন হইতে ১০/১২ টি বড় বড় রেলওয়ে লাইন ইংলণ্ডের সর্বত্র গিয়াছে। ইহাদের সকলেরই ভিন্ন ভিন্ন সীমান্ত ষ্টেশন আছে, তন্মধ্যে ৮৯টি প্রধান। ইংলণ্ডের বাহিরে য়ুরােপীয় মহাদেশে যাইবার প্রধান ষ্টেশন তিনটি—চেয়ারিং ক্ৰশ, ভিক্টোরিয়া ও ওয়াটালু। এই তিনটি পরস্পর খুব সন্নিকট। সব ষ্টেশনই খুব প্রকাণ্ড ; প্রায় সকল ষ্টেশনেই ১২১৪টি প্ল্যাটফর্ম এবং পাঁচ সাত মিনিট অন্তরই ট্রেণ ছাড়ে। আমাদের দেশে ষ্টেশনের বাহিরে মাত্র দুইটি লাইন , একটি আপ ট্রেণ ও একটি ডাউন ট্রেণের জন্য। বিলাতে প্রায়ই ৫টি লাইন ; একসঙ্গে ২৩থানা আপট্রেণ ও ২৩খানা ডাউন ট্রেণ লাইনের উপর চলে। অবশ্য লগুন হইতে দূরে গেলে প্রায়ই দুইটিমাত্র লাইন। কিন্তু এই ভয়ানক ট্রেণের ঘেষাঘেসিতে লণ্ডনের কাছাকাছি জায়গায় লাইনের অবস্থান ঠিক রাখা যে কি সাবধানতার পরিচায়ক তাহসহজেই অনুমেয়। বড় বড় গ্রাম বা সহরের জন্য অনেক বিশেষ ট্রেণ আছে। সব টেগ লণ্ডন হইতে বহির্গত হইয়া একেবারে সেই সব স্থানে ৪০ য়ুরােপপ্রমণ। থামে; কখনও কখনও বা দুই একখানা গাড়ি চলন্ত টেণের পশ্চাদ্ভাগ হইতে কোনও গ্রামে কাটিয়া রাখিয়া যায়। বার্মিংহামগামী এইরূপ টেণের গাড়িতে আমি স্ট্রাটফোর্ড-অন-অ্যাভনে গিয়াছিলাম। যখন পথে এক ষ্টেশনে আমাদের গাড়ি থামি তথন ট্রেণের এঞ্জিন ও পূৰ্ব্বাংশ অনেক দূরে চলিয়া গিয়াছে। রেলে কেবল তিন শ্রেণী। তন্মধ্যে তৃতীয় শ্রেণীতে প্রায় সব যাত্রী যাওয়া আসা করে। ধনীরা বা যাহারা একাকী গমনাগমন করিতে ভালবাসেন, তাহারা প্রথম শ্রেণীতে যাওয়া আসা করেন। দ্বিতীয় শ্রেণীর যাত্রি-সংখ্যা সর্বাপেক্ষা অল্প। সে জন্য অনেক ট্রেণে দ্বিতীয় শ্রেণীর গাড়ী প্রায়ই থাকে না। সব শ্রেণীর গাড়িরই বসিবার বন্দোবস্ত একরূপ, কেবল গদীর চামড়ার বর্ণ ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের ; তবে যে সব গাড়ি খুব অল্প দূর যায়, তাহাতে আমাদের দেশের suburban বা নগরােপকণ্ঠগামী ট্রেণের মত বেঞ্চ বেত্ৰ দিয়া হাওয়া। অন্য গাড়ি ফ্রান্সের গাড়ি যেরূপ লিখিয়াছি সেইরূপ। যে সব টুণ এক বেশী দূর যায় অথবা যেগুলি খাওয়া দাওয়ার নির্দিষ্ট সময়ে চলে, সেগুলিতেই আহ্বারের জন্য গাড়ি থাকে। রাত্রিতে সে সব ট্রেপ একটু বেশী দুরে যায় তাহাতে ঘুমাইবার গাড়ি থাকে; এ ব্যবস্থা প্রথম শ্রেণীর জন্য এবং তাহাতে ১৫ টাকা অধিক দিতে হয়। অন্য শ্রেণীতে কেব বসিবার ব্যবস্থা; তবে নির্দিষ্ট সংখ্যার অধিক যাত্রী কোনও কামরায় লয় না। গাড়ির স্নানাগারে ঠাণ্ডা ও গরম জল, সাবান, তােয়ালে, শৌচাৰ্থ কাগজ সবই পাওয়া যায়। ট্রেণের তৃতীয় শ্রেণীর ভাড়া মাইল পিছু এক আনা (আমাদের দেশের দ্বিতীয় শ্রেণীর রিটার্ণ ভাড়ার সমান)। রিটার্ন টিকিট সব শ্রেণীতেই পাওয়া যায়, তবে প্রায়ই ভাড়ার কিছু সুবিধা হয় না। দুই এক স্থলে মাত্র রিটার্ণ টিকি- টের ভাড়া যাতায়াতের সাধারণ ভাড়ার কিছু কম। অনেক যাত্রী ইংলণ্ড। ৪১ তৃতীয় শ্রেণীতে যাতায়াত করেন বলিয়া তৃতীয় শ্রেণীতে খুব ভাল বন্দোবস্ত। পালামেন্টের অনেক সভ্যও তৃতীয় শ্রেণীতে যাওয়া আসা করেন। তৃতীয় শ্রেণীর আর একটি নাম পালমেন্টারি (Parliamentary Class) শ্রেণী। ছুটা অথবা পৰ্ব্বদিন উপলক্ষে লণ্ডন হইতে অথবা লণ্ডন পর্যন্ত Excursion Trains ছাড়ে, তাহার ভাড়া অতিশয় অল্প ; যাতায়াতে অনেক সময় একবারের ভাড়ার অপেক্ষাও কম। এই ত গেল ট্রেণের অবস্থা। এতদ্ভিন্ন ট্রাম বা অনিব (চলিত- কথায় ‘বাস’) আছে। দেশের অনেক জায়গায় সেগুলি চলে। লণ্ডনে হিসাবে জানা গিয়ছে যে, বৎসরে লণ্ডনের প্রত্যেক অধিবাসা গড়ে এক শত বারেরও অধিক ট্রামে বা বাসে চড়ে। এগুলি প্রায় আমা- দের দেশের গাড়িরই মত। তবে প্রায়ই দ্বিতল ও ছাতে। উপর যাহারা বসে তাহারাই ধূমপান করিতে পায়। সব গাড়িরই পশ্চা- ভাগে দরজা ও তাহার পার্শ্বে ই ছাতে উঠিবার ঘুরাণ সিড়ি। দূরত্বা- নুসারে, মাইল খানেকের ভাড়া অন্ধ পেনি বা দুই পয়সা। বাস ও * ট্রামের ছাত হইতে সহর দেখার বড় সুবিধা। ট্রামে, টিউবে, রেল ষ্টেশনে সর্বত্রই বিজ্ঞাপনের খুব ছড়াছড়ি। বিজ্ঞাপনের জ্বালায় নবা- গতের পক্ষে ট্রাম কোথায় যাইবে জানা অনেক সময় কষ্টকর। তবে যে সব নির্দিষ্ট স্থানে ট্রাম থামে, সেই সব স্থানে কাটার গন্তব্য স্থানের নাম হাকিয়া জানাইয়া দেয়। বিজ্ঞাপনের মধ্যে ব্রান্ট ও মের দেশলাইয়ের বিজ্ঞাপনই অধিক। তাহাদের বিজ্ঞাপনের বয়ান Support Home Industries-স্বদেশী শিল্প পােষণকর। টেস্ নদীতে অনেক ষ্টীম-বােট আছে, তাহাতেও অনেক যাত্রী যাতায়াত করেন। ভাড়াও খুব কম। তাহার পর লণ্ডনের দোকানের কথা। বড় বড় দোকান অতি সুন্দর ভাবে সাজান। অনেক নিষ্কর্মা লােক শুধু রাস্তা হইতে দোকান ৪২ য়ুরােপ-প্রমণ। দেখিয়া সময় কাটান ও সখ মিটান। বাস্তবিক রাত্রিতে যখন, সব দোকান বন্ধ হয়, তখনও বড় বড় জানালার (plate glass windows) ভিতর দিয়া বিদ্যুতালােকবিভাসিত সুসজ্জিত দোকান পাট দেখিতে অতি সুন্দর। পথিকের মন আপনা আপনি তাহার দিকে আকৃষ্ট হয়। পূর্বেই বলিয়াছি যে, Stores বা জুতা শেলাই হইতে চণ্ডীপাঠ পৰ্য্যন্ত হয় (অথবা ইংরাজী ভাষায় বলতে গেলে সূচ হইতে হস্তী পর্যন্ত বিক্রীত হয়) এ রকম দোকান গুনে অনেক গুলি আছে। এই সব দোকানের শােভা ও ঐশ্বৰ্য্য বাস্তবিকই দেখিবার মত। দোকানে ঢুকিলে ইংরাজ যে দোকানদারের জাতি তাহা বেশ বুঝা যায়। একটা সামান্য কিছু জিনিষ চাহিলেও তৎ ক্ষণাৎ খরিদ্দারের মনের মত জিনিষ যােগাইবার জন্য বিশেষ আগ্রহ দেখা যায়। আমাদের দেশে ভদ্রলােকের দোকানে জিনিষ কিনিতে গেলে বিক্রেতা যেন ক্রেতাকে যথেষ্ট অনুগ্ৰহ করিতেছেন, এ ভাব প্রায়ই দেখা যায় ; বিলাতে ঠিক তাহার বিপরীত ভাব। একটা চারি পয়সার জিনিষ কিনিতে গেলেও বত বড় দোকানই হউক, বিক্রেতা এরূপ ভাব দেখায় যেন সমস্ত দোকান ধন্য হইতেছে ; তাহার পর যদি খরিদ্দারের মনের মত জিনিষ না দিতে পারে তাহ হইলে ক্রেতার মাইস মত দ্রব্য তৈয়ার করাইয়া দিতেও সচেষ্ট হয়। পরে জিনিষ কিনা হইলে আবার তাহা বাটীতে পাঠাইয়া দিবে । তজ্জন্য কোনও আদায় নাই। পূর্বেই বলিয়াছি যে, বিলাত আমাদের দেশের দেশের ন্যায় সমতল নহে, খুব অসমান ; কাযেই সব গাড়িতেই ব্রেক থাকে ; ঘােড়ার গাড়িতেও গাড়োয়ানের হাতের হাতের কাছে ব্রেকের হাত থাকে। উপর হইতে নীচে যাওয়ার সময় সেই হাতল টানিয়া ব্রেক আঁটে। য়ুরােপে এক মিলানাে (ইটালির অন্তঃপাতী মিলান।

ইংলণ্ড। ৪৩ সহরে গাড়িতে ব্রেক দেখি নাই ; তদ্ভিন্ন সর্বত্র আছে। এই অসম তার জন্য মধ্যে মধ্যে বড় মজা দেখা যায়। লণ্ডনে একটা খুব লম্বা রাস্তা আছে, তাহার কতক কতক অংশ বিভিন্ন নামে পরিচিত। এক অংশের নাম Holborn Viaduct (এই রাস্তার উপর প্রসিদ্ধ Tabloid মার্কা ঔষধ-বিক্রেতা Burroughs Vellcome কোম্পা- নীর দোকান) ইহার নীচৈ দিয়া খুব চওড়া অন্য এক রাস্তা চলিয়া গিয়াছে। উপর হইতে নীচে নামিবার সিড়ি আছে। গাড়িতে গেলে অনেক ঘুরিয়া যাইতে হয়। এই অসমতলতার জন্যই বিলাতে গাড়ির ঘােড়াগুলি খুব বৃহদা- কার ও বলবান। আমাদের দেশের ভাড়া গাড়ির ঘােড়ার ন্যায় অস্থিচর্মসার পক্ষিরাজনন্দন ফুরােপে কোথায়ও দেখা যায় না। ইংলণ্ড-প্রবাসী ভারতবর্ষীয়ের পক্ষে পালমেন্ট গৃহ দেখিবার ইচ্ছা স্বভাবতই প্রবল হয়। দুর্ভাগ্যবশতঃ আমি যে সময়ে ইংলণ্ডে ছিলাম সে সময় মহাসভার অধিবেশন বন্ধ ছিল, তাই আমার সভা দেখিবার *সুযােগ হয় নাই। কিন্তু আমি দুই দিন ভিতরে যাইয়া সভাগৃহ দেখিয়া আসিয়াছিলাম। সেই কথা কিছু লিখিতেছি পূর্বে বলিয়াছি, চেয়ারিং ক্রশ ষ্টেশনে ট্রেণ ঢুকিবার পূর্বেই সেতুর উপর হইতে নদীতীরস্থ পালামেন্ট গৃহ দৃষ্টিগােচর হয়। নদীর তীরেই পালামেন্টের প্রকাণ্ড বারাণ্ডা বা Terract, প্রায় ৪০০ গজল। ইহাই সভ্যদিগের এবং Seasonএর সময়ে fashionable মহিলা দিগের বৈকালিক মিলনস্থান। আমি অবশ্য সে দৃশ্য দেখি নাই। রাজ। যখন মহাসভায় আইসেন, তখন তাহার জন্য যে প্রবেশদ্বার আছে, সাধারণের প্রবেশদ্বার তাহার পাশ্বে ই। এই দ্বার দিয়া ঢুকিয়া Royal Gallery, Prince's Chamber, হাউস অব লর্ডস, লবি, সেন্ট্রাল হল, হাউন্স অব কমন্স, সেন্ট ষ্টিফেনস হল ও ওয়েষ্টমিষ্টার হল, মা ৪৪ য়ুরােপ-ভ্রমণ। এই কয়টি ঘর সাধারণ দেখিতে পায়। হাউস অব লর্ডস ও উস অব কমন্স ভিন্ন প্রত্যেক ঘরেই দেওয়ালে ও ছাতে অতি সুন্দর সুন্দর ছবি আছে। অনেকগুলি মৰ্ম্মর মূৰ্ত্তিও এই সব ঘরের শােভাবর্ধন করিতেছে। Royal Galleryতে প্রকাণ্ড দুইখানি ছবি—নেলসনের মৃত্যু ও ওয়াটালুযুদ্ধের পর ওয়েলিংটন ব্লগারের সাক্ষাৎ। এই দুইখানিই খুব প্রসিদ্ধ চিত্র। মুমূযু নেলসনের মুখের ভাব অতি নিপুণতাসহকারে চিত্রিত। ইহার পরে Prince's (Chamber। তথায় মহারাণী ভিক্টোরিয়ার একটি মর্মর মূৰ্ত্তি। তাহার পরেই হাউস অব লর্ডস, প্রথমে দুই খানি রাজসিংহাসন-সম্মুখে সুপ্রসিদ্ধ Woolsack এবং তাহার পর অভিজাতদিগের আসন। সমস্ত আসন লাল মক্কাচৰ্ম্মে আবৃত, দেখিতে বাস্তবিকই খুব মহিমামণ্ডিত। উলস্যাকটিতে বসলে আরামের অত্যন্ত অভাব হয় বলিয়া মনে হইল। একটা উচ্চ বৃহৎ জলচৌকির ন্যায় আসন, তাহার ঠিক মধ্যস্থলে একটা চতুষ্কোণ তাকি- যার ষ্ঠায় চিবি। ইহার উপর বসিলে কিছুমাত্র আরাম পাওয়া যায় বলিয়া বােধ হয় না। চৌকিটা দেখিলে মনে হয় যে, উহাতে বসিলে পা মাটীতে ঠেকে না ঝুলিয়া থাকে। রাজসিংহাসন দুইটি রৌপ্যনির্মিত এবং চন্দ্রাতপযুক্ত। গুটিকতক ধাপের উপর সিংহাসন স্থাপিত, এই সব ধাপে সভাধিবেশনের সময় যে সব Privy Councillor লর্ড নহেন, তঁাহারা বসিতে পায়েন। লর্ডদিগের আসনের পর একটা ছােট খােয়াড়ের বা আসামীর কাঠগড়ার মত রেঙ্গিং দেওয়া স্থান। কমন্স সভায় বক্তা (Seaker) এবং সত্যর। এই স্থানে দাড়াইয়া রাজাদেশ এবং রাজার বক্তৃতা শুনেন। স্থানটি অতি সঙ্কীর্ণ; বােধ হয় কষ্টে ৮১০ জনের স্থান হয়।

ইংলণ্ড। ৪৫ কাযেই বিশেষ বিশেষ আবশ্যক অধিবেশনের সময় ভদ্রলােকের নিগ্রহের সীমা থাকে না। হাউস অব লর্ডসের পরেই Peers' Lobby বা antecliamber তথায় লর্ড রা তাহাদের ওভার কোট এবং টুপি রাখেন, প্রত্যেকের কার্ডসংযুক্ত একটি করিয়া খোঁটা আছে। তাহার পর সরু পথক। ইহার দুই পাশে কয়েকটি সুন্দর সুন্দর ছবি। তাহার পরে মধ্যস্থ হল-অতি সুন্দর ও শুভ্র। এই হলে গ্ল্যাডষ্টোন, সার উইলিয়ম হারকোর্ট, লঙ জন রাসেল প্রভৃতির প্রতিমূর্তি স্থাপিত। কয়েকটি স্থান এখনও অনধিকৃত; ভবিষ্যতে বােধ হয় অ্যাসকুইথ, ব্যালফোর প্রভৃতির মূর্তি স্থাপিত হইবে। ইহার পর আর একটি সরু পথকক্ষ; এই স্থানেও খানকতক সুন্দর ছবি আছে, তাহার মধ্যে The last sleep of Argyll সুপ্রসিদ্ধ। অতঃপর Commons সবি এবং তৎপরেই House of Commons ; প্রথম দেখিলে মনে একটা প্রকাণ্ড হতাশার ভাব আইসে। এই ক্ষুদ্র, স্বল্পালােকিত কক্ষ এত বড় সাম্রাজ্যের প্রধানতম শাসন ও অধিবেশনের স্থান! বাস্তবিকই ঘরটি *অত ক্ষুদ্রায়তন। এক ধারে ও মধ্যে স্পিকারের চন্দ্রাতপমণ্ডিত আসন. সম্মুখে কেরাণীদিগের টেবল এবং দুইপাশ্বে চারিখানি করিয়া বেঞ্চ। বেঞ্চগুলি অবশ্য সবুজবৰ্ণ চামড়ায় মণ্ডিত ; Green Benches of 1vestminster সকলেই জানেন। বেঞ্চগুলি ঘরে লম্বা লম্বি সাজান, মধ্যে একটা রাস্তা, তাহারই নাম (Gangway ঘরে আন্দাজ ৪৫০ জন সত্যের অতি কষ্টে স্থান হয়, অথচ সভ্যের সংখ্যা ৬৭। উপরে গ্যালারি, পুরুষ ও স্ত্রীলােক দর্শকদিগের স্থান। স্ত্রীদর্শকের নির্দিষ্ট স্থানের সম্মুখে অতি অস্বচ্ছ আবরণ। যুবরাপের মধ্যে এই এক স্থানে মাত্র পর্দা আছে বলিয়াই বােধ হয় এই স্থানে পর্দার এত বেশ কড়াকড়ি। ঘরে ঢুকিবার দরজার উপরেই একটি ঘড়ি এবং এই দ্বার উপরে যুবরাজের আসন। ছাতে প্রকাণ্ড আলােকাপার-স্ফটিক য়ুরােপ-ভ্রমণ। নির্মিত। রক্ষীর নিকট শুনিলাম, এই আলােক প্রজ্জ্বলিত কইলে ঘরের শােভা খুব মনােরম হয়। St. Stephen's Ilall অতি সুন্দর প্রশস্ত-শুভ্ৰমৰ্ম্মরনির্মিত দীর্ঘ কক্ষ। দুই ধারে অনেক রাজা রাণী ও হম্পিডেন প্রভৃতি প্রসিদ্ধ জনগণের মর্মর-মূৰ্ত্তি। তৎপরে গুটকতক সিড়ি দিয় দর্শক ওয়েষ্ট- মিষ্টার হলে পৌছিবেন-হলটি অতি প্রকাণ্ড এবং স্তম্ভশূন্য। পৃথি- বীতে এত বড় স্তম্ভবিহীন হল আর আছে কি না সন্দেহ। ইহা দৈর্ঘ্যে প্রায় ২৫০ ফুট এবং উচ্চে ৯০ ফুট। ছাতের খিয়ান ওককাষ্ঠমণ্ডিত। হলের এক পাশ্ব বেদীর ন্যায় একটু উচ্চ। হলে ঢুকিলে একটা গাম্ভীৰ্য্য অনুভূত হয় এবং মেকলের সেই প্রসিদ্ধ বিবরণ মনে পড়ে । কত প্রসিদ্ধ রাজনৈতিক ঘটনা এই হলে সম্পন্ন হইয়াছে ! প্রথম চালস, সার টমাস মুর, ওয়ারেণ হেষ্টিংস প্রভৃতি কত সম্রান্ত লােকের বিচার এই স্থানে হইয়াছে। হলের দুই পাশ্বে ইংলণ্ডের জনকতক রাজা রাণীর মর্মর-মুৰ্ত্তি। হলের হৰ্ম্মতলােপরি খানকতক ক্ষোদিত ফলক ; যে স্থানে বিচারের সময় রাজা প্রথম চালস দাঁড়াইয়াছিলেন, গ্লাডষ্টোনের এবং রাজা সপ্তম এডওয়ার্ডের শবদেহ যে যে স্থানে রক্ষিত হইয়াছিল এবং আল অব স্ট্র্যাফোর্ডের বিচারের সময় তিনি যে স্থানে দাঁড়াইয়াছিলেন, সেই সকল স্থানে এই সকল ফলক প্রােথিত হল হইতে বাহির হইয়া প্রকাণ্ড উঠান New Palace Yard এবং সম্মুখে উত্তরের কোণে প্রসিদ্ধ Clock Tover এবং Big Ben নামক ঘণ্টা ঘড়িটি অতি উচ্চে বসান; স্তম্ভটি বােধ হয় ৩০০ ফুট উচ্চ। একদিন দেখি- লাম,কতকগুলি মিস্ত্রি স্তম্ভগাত্রে ভারা বাধিয়া মেরামত করিতেছে। নিম্ন হইতে লােকগুলিকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পিপীলিকাবৎ প্রতীয়মান হইতেছিল। বলিতে ভুলিয়াছি, Vestminster all এর সম্মুখেই অলিভার ক্রমওয়েলের প্রস্তরমূর্তি দণ্ডায়মান।

ইংলণ্ড। ৪৭ New Palace Yard এর পার্শ্বেই সুবিখ্যাত ওয়েষ্টমিষ্টারের সেতু এবং সেই স্থান হইতে Victoria Embankment নামক সুবিশাল নুতন রাস্তা টেমস নদীর ধার দিয়া প্রায় ১৷৷ মাইল চলিয়া গিয়াছে। প্রথমেই ইংলণ্ডের কাহিনী প্র; রাণী বােডিসিয়ার বুথে দণ্ডায়মান প্রতিমূর্তি। পার্লামেন্টের পরেই ওয়েষ্টমিষ্টার অ্যাবির কথা মনে হয়। অনেকের ধারণা আছে—অন্ততঃ আমার ছিল—যে, আমাদের দেশে যেমন গির্জার সন্নিকটস্থ ভূমিতে মুক্ত আকাশতলে মৃতের কবর থাকে অ্যাবিতেও বুঝি সেইরূপ । কিন্তু দেখিলাম, তাহা নহে। এই জাবিতে এবং য়ুরােপের সমস্ত প্রধান ভজনালয়ে ঘরের ভিতর হতলে মৃতের সমাধি ; দর্শক ও জনসাধারণ সেই সব সমাধির উপর দিয়া ইতস্ততঃ পদচারণ করেন। প্রধান প্রধান ইতিহাস- প্রসিদ্ধ লােকের সমাধির উপর দিয়া পদক্ষেপ করিতে কাহাকেও কুষ্ঠিত হইতে দেখি নাই। কিন্তু আমার বাস্তবিকই অত্যন্ত দ্বিধা বােধ হইত। আবির স্তম্ভের ও দেওয়ালের গাত্রে প্রসিদ্ধ লােকদিগের স্মৃতিফলক, কাহারও কাহার ও প্রতিমূর্তি। সমব্যবসায়ীলােকদিগের স্মৃতিফলক যথাসম্ভব একই স্থানে সংরক্ষিত এবং সেই অনুসারে fa eficacata l'oets' Corner, Little Poets' Coruer, Statesmens' Aisle প্রভৃতি। হয় ত মৃতদেহ যে স্থানে সমাহিত আছে, স্মৃতিফলক তথা হইতে দূরে স্থাপিত। অবির অংশবিশেষ, যথায় ,রাজারাণীদিগের শব সমাহিত, তাহার নাম Chape of flery VII (সপ্তম হেনরীর ট্যাপেল)। এই অংশ দেখিতে সােম ও মঙ্গলবার ভিন্ন প্রত্যহ ৬ পেনি দর্শনী দিতে হয় ও একজন পাদ্রী দর্শকদিগকে সইয়া সমস্ত অংশ বেশ করিয়া দেখাইয়া, • ও তাহার ইতিহাস বুঝাইয়া দেন। ইহার এক পার্শ্বে ৪ য়ুরােপ-ভ্রমণ। প্রসিদ্ধ অভিষেকের আসন ; একটি অতি সামান্য ভগ্নপ্রায় অজীর্ণ কাষ্ঠাসন, তাহার নিয়ে একখানা প্রকাণ্ড ময়লা পাতর। এই চেয়ারে প্রথম এডওয়ার্ড হইতে পঞ্চম জর্জ পর্যন্ত ইংলণ্ডের সমস্ত রাজারাণীর অভিষেক হইয়াছে। চেয়ারখানি পূৰ্ব্বে খােলা থাতি কিন্তু অনেকে তাহার গাত্রে নাম ক্ষোদিত করায় এক্ষণে রিয়া রাখিয়াছে, সাধারণে তাহা স্পর্শ করিতে পায় না। ওয়েষ্টমিষ্টার অ্যাবিতে কত প্রসিদ্ধ লােকের সমাধি ! এই স্থানে কিছুক্ষণ থাকিলে মনে এক অননুভূতপূর্ব ভাবের উদয় হয়। রাজা রাণীর কথা ছাড়িয়া দিলেও এইস্থানে চসার, মিল্টন, বেজনসন, সেক্সপীয়ার, ডিকেন্স, থ্যাকারে, মেকলে, স্কুট, টেনিসন, বার্ণ, ব্রাউনিং, রাস্কিন, প্রভৃতি সাহিত্যিক ; ষ্টিফেনসন, ব্রুনেল, কেলভিন, নিউটন, হার্শেল, ড্যরউইন, প্রভৃতি বিজ্ঞানাচাৰ্য ; পিট পীল, কবডেন, বার্ক, গ্ল্যাডষ্টোন, ডিসরেলি প্রভৃতি রাজনীতিবিশারদ ও ভারত-ইতিহাসে প্রসিদ্ধ ওয়ারেন হেষ্টিংস, আউট র্যাম, লরেন্থ প্রভৃতির মৃতদেহ সমাহিত বা স্মৃতিফলক স্থাপিত। বাস্তবিকই ইহা ঐতিহাসিক মায়ের পক্ষে এক মহাপীঠস্থান । লণ্ডনের অন্যান্য দ্রষ্টব্য স্থানগুলির বিশদ বর্ণনা দেওয়া নিষ্প্রয়ােজন । ব্রিটিশ মুজিয়ম, বা ন্যাশনাল গ্যালারি বা টেট গ্যালারির বর্ণন, করিয়া তাহাদের চিত্র পাঠকের সম্মুখে স্থাপিত করা আমার পক্ষে সম্ভব নহে। বিশেষ চিত্রশালাগুলির বর্ণনা লিখিয়া কোনও লাভ নাই। যদি চিত্রের প্রতিকৃতি প্রদর্শন করিতে পারিতাম, তাহ হইলে বরং পাঠকের ধৈৰ্য থাকিত। তবে মুজিমগুলির মধ্যে South kensington মুজিয়মের কথা কিছু বলতে হয়। তথা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সমস্ত অংশের খনিজ কৃষিজ প্রভৃতি উৎপন্ন দ্রব্যের নমুনা সংরক্ষিত। ভারতবর্ষীয় বিভাগে ভারতের যাবতীয় খনিজ h ইংলও। ৪১ পদার্থের নমুনা আছে। বঙ্গদেশের পাটের পাছ হইতে দড়ী পর্যন্ত আছে। কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল আছে। আর আছে, আমাদের রাজা ও তাঁহার পিতা যখন ভারতবর্ষে আইসেন তখন যে সকল অভিনন্দনপত্র পাইয়াছিলেন সেই সমস্ত অভিনন্দনপত্র। এতদ্ভিন্ন কতকগুলি সিংহাসন প্রভৃতি যাহা তাহারা উপহার পাইয়াছিলেন, সে সকলও এই স্থানে সংরক্ষিত। এই স্থলে বলা উচিত যে, ব্রিটিশ জিয়মে একখানি প্রকাণ্ড রথ আছে। লণ্ডনের প্রধান জাবাস বকিংহাম প্রাসাদে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। তবে রাজা বৎসরের অধিকাংশ সময় যে স্থানে থাকেন সেই উইণ্ডসর প্রাসাদ রাজা অনুপস্থিত থাকিলে সাধারণে দেখিতে পায়, দর্শনী সাধারণতঃ এক শিলিং, বুধবারে দর্শনী লাগে না। আমি অবশ্য একটা বুধবারেই গিয়াছিলাম। লণ্ডন হইতে রেলে বাইশ মাইল যাইয়া প্রাসাদের অতি নিকটেই ষ্টেশনে নামতে হয়। প্রবেশদ্বার দিয়া ঢুকিয়া প্রথমেই St. George's Chanel দেখা যায়। ইহার ভিতর যত Knights of the Garter এর পতাকা দোদুল্যমান এবং চতুংপার্থে আলবার্ট ভিক্টর প্রভৃতির সমাধি। চ্যাপেল হইতে বহির্গত হইয়া লর্ড চেম্বারলেনের আফিসে টিকিট লইতে হয়। তাহার পর দ্বারদেশে টিকিট দেখাইলে জন কুড়িক দর্শককে লইয়া এক এক জন রাজভৃত্য ঘরগুলি দেখায়। বরগুলি অবশ্য মহামূল্য আসবাবে ও চিত্রে পরিপূর্ণ। দেখিলে মনে হয়, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধিপতির যােগ্য আবাস বটে। একটা ঘর ওয়েলিংটন ও তাহার সমসাময়িক লােকের ও ঘটনার চিত্রসম্বলিত ; আর এক ঘারে যুদ্ধে জিত অনেক পতাকা লম্বমা; তাহার মধ্যে সিপাহীবিদ্রোহে জিত কতকগুলি পতাকাও আছে। ভারতবর্ষ হইতে নীত্র অনেক মহামুল্য দ্রব্যসামগ্রী এই প্রাসাদে স্থান পাইয়াছে।

য়ুরােপ-ভ্রমণ। প্রাসাদের পার্শ্বে প্রকাণ্ড পার্ক, প্রায় পাঁচ মাইল লম্বা। দুরে তৃতীয় জর্জের প্রতিমূর্তি। এক কোণে ফ্রগমাের স্মৃতিমন্দির। তথায় মহারাণী ভিক্টোরিয়া ও তাহার স্বামীর মৃতদেহ সমাহিত। আমি যে দিন গিয়াছিলাম সে দিন তথায় সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। উইণ্ডসরের নিকটে টেমস নদীর অপর পারে ইটন কলেজ। বলিয়া রাখা উচিত যে, এই স্থানে টেমস সামান্য খালের মত। এই ইটন বিদ্যালয়ে ইংলণ্ডের অভিজাত বংশীয় অনেকেই পাঠাভ্যাস করেন। বিদ্যালয়ে ছাত্রসংখ্যা নির্দিষ্ট ; কযেই বহুদিন পূৰ্ব্ব হইতে প্রবেশের আবেদন পাঠাইতে হয়। শুনিলাম, দশ বার বৎসর পরে যে সকল বালক বিদ্যালয়ে ভর্তি হইবে তাহাদের নামেও এখন হইতে আবেদন করা হইতেছে। একটি ঘরে ছাত্ররা নিজ নিজ নাম ক্ষোদিত করিয়া রাখিয়াছে, তাহার মধ্যে অনেক ইতিহাস প্রসিদ্ধ লােকের নাম দেখা যায় ; ২। ১টি ভারতবর্ষীয় রাজপুত্রের নামও আছে। বিদ্যালয়ের সম্মুথেই একটি নূতন শ্বেত বর্ণের বাটী। এইটি এই বিদ্যালয়ের যে সকল ভূতপূর্ব ছাত্র বােয়ার যুদ্ধে প্রাণত্যাগ করেন তাঁহাদের স্মৃতিচিহ্ন। লণ্ডনের নিকটবর্তী দ্রষ্টব্য স্থানের মধ্যে Hampton Court অন্যতম। এই প্রাসাদে অবশ্য রাজা অধুনা বাস করেন না; কিন্তু রাজকীয় কক্ষগুলি অতি সুন্দর ভাবে সজ্জিত। অনেকগুলি বহুমূল্য চিত্রে এই প্রাসাদ সুশশাভিত। প্রাসাদসংলগ্ন উদ্যানে একটি দেড়শত বৎসরের পুরাতন স্বাক্ষা লতা আছে। আমি যে দিন দেখিয়াছিলাম সে দিনও তাতে গুচ্ছ গুচ্ছ আর কলিয়াছিল। সমস্ত গাছটি একটি কাচের ঘরে স্থাপিত। উদ্যানে আর একটি কৌতুকজনক ব্যাপার আছে—সেটি গােলকধাধা। অনেকে বর্ধমানের গােলাপ ইংলণ্ড। বাগে গােলক ধাধা দেখিয়া থাকিবেন। ইহাও সেই জাতীয়। প্রবেশ অতি সহজ, নিগম বড় কঠিন। আমি প্রায় অর্ধবটা ঘুরপাক খাইয়াছিলাম। কিন্তু পরে বৃষ্টি আরম্ভ হইল, নাকালের একশেষ। একজন রক্ষী দ্বারের নিকট মঞ্চে দাঁড়াইয়া ছিল, তাহাকে খুব নিকটেই দেখিতে পাইতেছিলাম, কিন্তু তাহার নিকট পৌঁছিতে পারিতেছিলাম না; বড় মজা। প্রাসাদের একটি গেটের উপর একটি প্রকাশ জ্যোতিষিক ক্লকঘড়ি আছে। আর একটি বর্ণনা স্থান Crystal Palace বা স্ফটক প্রাসাদ। সকলেই জানেন, ১৮৫১ খৃষ্টাব্দে যখন প্রথম লণ্ডন প্রদর্শনী হয় তখন ইহা নির্মিত হয়। প্রকাও লম্বা একটি হল (প্রায় ১০০ ফুট) ছাত ও দেওয়াল সমস্তই কাচনিৰ্ম্মিত। ধূমে ও লণ্ডনের কুটকায় কাচ খুব মলিন হইয়াছে; কিন্তু এখনও ঘঁহার শো তা অতুলনীয়। হলের ভিতর অনেকরূপ ক্রীড়াকৌতুকের স্থান আছে। একটি প্রকাণ্ড রঙ্গমঞ্চ অাছে, অর আছে একটি অতি বৃহৎ অ্যান বাদ্যযন্ত্র - প্রায় ৪৫০+ পাইপ। হলের বাহিরে দুইটি বড় বড় মিনার। কৃষ্টাল প্যালেসের প্রাঙ্গণ বড় সুশােভন! প্রকাণ্ড দ্বিতল বাগান, কোথাও ক্রীকেট ফুটবল খেলার স্থান, কোথাও উড়িবার কল বেলুন প্রভৃতি উড়িবার স্থান, কোথাও সন্তরণাগার; সবই বৃহৎ ও সুরক্ষিত। একটি রেলওয়ে ষ্টেশন নিম্নতলের নিকটে এবং আর একটি হলের সমতল ; তাহাদের নাম যথাক্রমে Lowlevel ও Highlevel ষ্টেশন। 'একদিন লণ্ডনের হাইকোর্ট দেখিতে গিয়াছিলাম। বাটীটি খুব প্রকাণ্ড বটে; কিন্তু আদালতকক্ষগুলি আমাদের কলিকাতা হাইকোর্টের কক্ষ অপেক্ষা ক্ষুদ্র বােধ হইল। তদ্ভিন্ন আলােকও কম বােধ হইল। সুবিধার মধ্যে দেখিলাম, সাধারণ দর্শকের স্থান গ্যালারিতে ; • য়ুরােপ-ভ্রমণ। কাষেই ব্যবহারালীদিগের গতিবিধির অসুবিধা তত হয় না। কিন্তু বিস্ময়কর দেখিলাম, কৌলিদিগের আসন। চেয়ার নাই, সরু সরু বেঞ্চ ও সরু সরু টেবল, ইস্কুলের Form এর ন্যায়। সম্মুখের সারি K. c. দিগের জন্য নির্দিষ্ট। পশ্চাতে আর সব বসিবার ব্যবস্থা। নথিপত্র ও নজিরের পুস্তকাদি রাখার অত্যন্ত অসুবিধা। আমি যে দিন গিয়াছিলাম তিনটি আদালতে বিয়র ঘটিত মােকর্দমা চলিতেছিল। লণ্ডন টাওয়ার সম্বন্ধে দুই এক কথা বসিয়া লণ্ডনের প্রসঙ্গ শেষ করিব। সকলেই জানেন, টাওয়ার একটি দুর্গ এবং পুরাকালে রানৈতিক ত পরাধীদিগকে এই স্থানে বদ্ধ করিয়া রাখা হইত। তথাকথিত গােখাদক Beefeater নামক টাওয়াররক্ষীদের এবং তাহাদের বিচিত্র পােষাকের কথাও অনেকে শুনিয়াছেন। এই দুর্গের দক্ষিণে টেস্ নদী ও অন্য তিন দিকে পরিখা। টেমসের দিকে এক টি সুরঙ্গ ও সুরঙ্গের লৌহময় কপাট আছে, এই দরজার নাম Traitors' Gate বা রাজদ্রোহীর কপাট। এই মদিয়া উপথে অপরাধীদিগকে টাওয়ারে আনয়ন করিত। সম্মুখেই Bloody Tcw er; ইহার এক বক্ষে তৃতীয় রিচার্ড তাহার ভ্রাতুদ্বয়ের প্রাণসংহার করেন। সেই জন্য ইহার এই নামকরণ। দুর্গের মধ্যে অনেকগুলি বাটী আছে; কিন্তু বিশেষ দ্রষ্টব্য তিনটি–হায়াইট টাওয়ার, ওয়েকফিল্ড টাওয়ার ও বিচাম টাওয়ার। প্রথমে টির মধ্যে অস্ত্রাগাব স্থাপিত। এই স্থানে বহুপুরাকালীন হইতে আধুনিক পর্যন্ত প্রকার প্রশস্ত্র ও বাদি রক্ষিত, তদ্ভিন্ন সপ্তম এডওয়ার্ড ও তাঁহার মহিষীর অভিষেক-সজ্জাও আছে। কফিল্ড টাওয়ারের সম্মুখে মহারাণী ভিক্টোরিয়ার শবাধারবাহী কানের গাড়িখানি দেখা যায়। ভিতরে রাজার : মণিমুক্তাদি ইংলণ্ড। আছে। কিন্তু আমার ভাগ্যে তাহা দেখা হয় নাই। সংস্কার উপলক্ষে সে গৃহ তখন বন্ধ। বিচাম টাওয়ারের সন্নিকটে অল্প একটু স্থান বাঁধান রহিয়াছে। সেই ভীষণ স্থানে পূর্বে অপরাধীদিগের মস্তকচ্ছেদ হইত। এলিজাবেথের মাতা এন বোলিনের মস্তক এই স্থলেই স্কন্ধচ্যুত হইয়াছিল। এই টাওয়ারের ঘরেই অপরাধীদিগের কারাক ছিল। অনেক হতভাগার হস্তলিপি প্রাচীরগাত্রে বিদ্যমান। ওয়াণ্টার ব্যালে-ধূমপায়ীদিগের patron saint-তন্মধ্যে একজন। লিখা প্রায়ই খুব অস্পষ্ট; তবে পুরাতত্ত্ববিদরা অনেক পাঠ উদ্ধার ( বা আবিষ্কার করিয়াছেন। লণ্ডনে অবস্থানকালে দুই দিন জাপান-ব্রিটিশ প্রদর্শনী দেখিতে গিয়াছিলাম। অতি প্রকাণ্ড প্রদর্শনী; কয়েক ঘণ্টায় তাহার কিছুই এক স্থানে কতকগুলি (বােধ হয় ১৬টি) মােম- নির্মিত পুত্তলিকার দ্বারা অতি পুরাকাল হইতে আধুনিক কাল পর্যন্ত জাপানের বেশভূষা ও হাব ভাব চিত্রিত ছিল। আর এক স্থলে কিছুদুর পর্যন্ত জাপানের প্রাকৃতিক সৌন্দৰ্য্য অঙ্কিত। রজনীতে এরুপ ভাবে সেই স্থান আলােকিত থাকিত যে, দেখিলে ভ্রম হইত যেন বাস্তবিকই জাপানে আছি। এই দুইটি চিত্র আমার নিকট বড় ভাল লাগিয়াছিল। আর এক ঘরে কি করিয়া কাচ প্রস্তুত হয় এবং এক দলা গান কাচ হইতে কিরূপে সুন্দর বােতল, গাল, ফুলদানি প্রভৃতি হয় প্রত্যক্ষ দেখাইতেছিল, সে হিও বড় কৌতুহলােদ্দীপক। এক দিন ট্রেণে গুটকতক জুয়াচোর উঠি: তেতাস খেলিতে আরম্ভ করে এবং আমাদিগকেও যােগ দিতে বলে। আমাদের সঙ্গী একটি যুবক তাহাদের প্রবঞ্চনায় মুগ্ধ হইয়া গেলিতে চাহেন; কি আমি কিছুতেই তাহাকে খেলতে দিলাম না। ইহা দেখিয়া

।
ফুয়ােপ-ভ্রমণ।
জুয়াচোররা আমার উপর অত্যন্ত বিরক্ত ও ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিল।
ব্যাপার কত দূর ‘ড়াইত ওনি না, উপ (শনে আসি পড়তে
গুহারা পলায়ন করিল।
ম্যাচ টুসাের (Tussa:d' প্রদর্শনী একটি উল্লেখযােগ্য স্থান।
এই স্থানে ইতিহাস-প্রসিদ্ধ নরনারীর মােমে গত মুত্তি আছে। অনেক
পাপী নরহত্যাকারী : হিও আছে। ভিন্ন আছে, জুয়াড়ির দৃশ্য,
আত্মঘাতীর দৃশ্য, জাল মুদ্রা ও তার বর দৃশ্য, ঐগর
গিলোটিনের দৃশ্য ও একটি টুকরা, ফ্রান্স রাষ্ট্রবিপ্লবে হত রাজ।
রাণীর কাটা মুঙে? cast © ভৃতি অনেক বীভৎস জিনিষ।
আমি যখন ইংলণ্ডে ছিলাম তখন অনেকগুলি ভারতবাসী
অল্পদিনের জন্য বিলাতে গিয়াছিলেন। তাই বিয়ার দিন লণ্ডনপ্রবাসী
ভারতবর্ষীয়গণ তাহাদের নাৰ্থ এক ভােজের আয়ােজন করেন।
নিমন্ত্রিতদিগের মধ্যে আমিও ছিলাম । সুর হেনরি কটন সভাপতি
ছিলেন; কারণ, তাঁহার সে দিনের উক্তিতে, তিনি ভারতবর্ষে
দত্তক পুত্র।
এই ভােজনের পরদিন আমি লণ্ডন ত্যাগ করি।

ফ্র্যাটফোর্ড-অন-এভন। ইংরাজী ভাষায় অভিজ্ঞ লােক মাত্রেরই পক্ষে স্ট্রাটফোর্ড একটি মহা পীঠস্থান। এই গ্রামে শেক্সপীয়ার জন্মগ্রহণ করেন, পার্শ্বস্থ গ্রামে তিনি বিবাহ করেন ও শেষ বয়সে তিনি এই গ্রামে আসিয়া বাস করেন। ষ্টেশনে নানিয়া একটু আসিলেই একটি সুন্দর ফোয়ারা দেখা যায়। ইহা সেক্সপীয়ারের মাণি ভক্তদিগের দান। গ্রামে ঢুকিলেই কেমন একটু পুরাতনের ভাব মনে আইসে। যদিও অনেক বাটী আধুনিক, তথাপি মনে হয় যেন অধিবাসীরা এখনও বােড় শতাব্দির ভাবে বিভাের, আর যেন সকলেই সেক্সপীয়ারের স্বগ্রামস্থ বলিয়া মনে মনে গৌরব অনুভব করেন। যে বাটাতে সেক্সপীয়ার জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, তাহা সেই পুরাতন ভাবেই সংরক্ষিত। বলা আবশ্যক যে, একজন মার্কিন ধনী এই আবাসটি ক্রয় করিয়া স্বদেশে সংস্থাপিত করিবার সঙ্কল্প করেন। তখন ইংলণ্ডের লােক ব্যস্ত হইয়া সভা ডাকিয়া টাকা তুলিয়া ৪৫০০০ টাকা মূল্যে বাটটি ক্রয় করেন। এখন Trustees and Guardians of Shakespeare's Birthplace" Got (766- ৪ারি করা সভা। এই সভা সেক্সপীয়ারের জন্মভবন ব্যতীত তাহার স্ত্রীর পৈতৃক কুটীর এবং New Place নামক তাহার শেষ বয়সের আবাসগৃহও ক্রয় করিয়া রক্ষা করিতেছেন। যে বাটীতে মহাকবি জন্মগ্রহণ করেন, তাহা এখন মুজিয়মে পরিণত। অতি সামান্য একটি দ্বিতল কাঠের বাড়ী, নিম্নে ৪টি ও উপরে ৪টি ঘর । উপরের যে ঘরে শিশু সেক্সপীয়ার প্রসূত হইয়া- য়ুরােপ-ভ্রমণ। ছিলেন, সিড়ির পার্শ্বেই সেই ছােট ঘরে এখন সাবধানে ঢুকিতে হয় । পাছে খসিয়া পড়ে। বাড়ীটি অনেক কষ্টে দাড় করাই । রাখা হই- আছে, অনেক স্থানে কড়ি দিয়া চাড়া দিয়া সােজা রাখিতে হইয়াছে। এই বাটীতে সেক্সপীয়ার সম্বন্ধে যত কিছু পুস্তক, চিত্র প্রভৃতি পাওয়া গিয়াছে সে সকল, তাঁহার ও তঁাহার নিকট আত্মীয়দিগের হস্তলিপি, তাঁহার সমসাময়িক মুদ্রা, তখনকার কালের বাতি, তাহার অঙ্গুরীয়ক ও তাহার পুস্তকের যতপ সংস্করণ আছে, সবই সংরক্ষিত। এই বাটীতে ঢুকিলে মনে যে এক অপূৰ্ব্ব ভাবে, উদয় হয় তাহা বলাই বাহুল্য। উপরে উত্তরদিকে একটি ছােট ঘর। তাহার এক ধারে একটি জানালার মত। সেই স্থানে কবির একখানি তৈলচিত্র রক্ষিত ; দেখিলে মনে হয় যেন কবি স্বশরীরে উপস্থিত। বাটীর পশ্চাতে ( উত্তরে) একটি সুন্দর উদ্যান। এই স্থানে তাঁহার পুস্তকালীতে যত প্রকার গাছ বা ফুলের কথা আছে, সে সব রাখা হইয়াছে। প্রত্যেকের গাত্রে একটি করিয়া ফলক, কোন নাটকের কোন অঙ্কে, কোন গর্ভাঙ্কে এবং কোন্ ছত্রে সেই লতা বা বৃক্ষের কথা আছে, 'তাহা ফোদিত। এই বাটী দেখিয়া আমি পার্শ্বস্থ সটারি গ্রামে কবির স্ত্রীর কুটীর Anne Flathaway's Cottage-দেখিতে যাই। পথে পরিচিত পল্লীদৃশ্য-শ্যামল ক্ষেত্র ; কৃষকরা কাষ করিতেছে; আকাশও সেদিন মেঘমুক্ত পরিষ্কার, যেন বঙ্গের শ্যামল দৃশ্য। গ্রাম্য রাস্তা দিয়া যানসম ক্যাবে চড়িয়া গম্য স্থানে উপস্থিত হইয়া দেখি, খড়ের চাল দেওয়া পুরাতন ছােট কুটীর ; সম্মুখে ক্ষুদ্র বাগান। নিকটে কাহা- কেও দেখিলাম না। স্বয়ং হুড়কা খুলিয়া ভিতরে গিয়া দেখি, একজন শ্রীলােক রক্ষিভাবে আছেন। দ্রষ্টব্য জিনিষের মধ্যে সেকালের গুটিকতক চেয়ার টেবল প্রভৃতি। অগ্নিকুপ্তের (fireplace) কাছে • -কেউ-ম-এ ন। একটি চওড়া কুলুঙ্গির মত স্থান। সেই স্থানে বসিয়া বােধ হয় কবিবর স্ত্রীর সহিত গল্প করিতেন। মেঠো রাস্তা দিয়া গ্রামে ফিরিয়া পুরাতন গির্জা দেখিতে গেলাম। এই স্থানে কবির Christening, বিবাহ ও অন্ত্যেষ্টিক্রি হইয়াছিল। তঁাহার নাম-সম্বলিত সেই পুরাতন খাতার সেই সেই পৃষ্ঠা উন্মুক্ত করিয়া কাচের আধারে সংরক্ষিত। এই গির্জার High altar এর বামে কবি মহানিদ্রায় শয়ান। কি ভাগ্য, দেখিলাম তাহার কবর রেলিং দিয়া ঘেরা। তাহার পার্থেই কবির স্মৃতিচিহ্ন বা মনুমেন্ট গােয়ের উপর সেই পরিচিত inscription—“Good friend for Jesus love forbeare &c” স্ট্রাটফোর্ড গ্রামের রাস্তা পারবধান, তবে পাতরগুলি কত কালের বলিতে পারি না, অনেক ক্ষয় হইয়াছে। নিউ প্লেসে ( New Place) কবির যে বাসস্থান ছিল, তাহা আর নাই; তবে পার্শ্বে খনন করিয়া সেই বাটীর ভিত্তি অনেক স্থলে পাওয়া গিয়াছে, এবং একটি পুরাতন কূপ—বােধ হয় কবি যাহার জল ব্যবহার করিতেন-আবিষ্ক হই য়াছে। বাটীর পার্শ্বে কবির বন্ধু ন্যাশের ( Thomas Nash) বাড়ী এখন ক্রয় করিয়া সুরক্ষিত হইয়াছে। তথায় কবির বাটীর যে সণ অংশ পাওয়া গিয়াছে তাহা ও কবির বকুবর্গের, অনেকের চিত্র প্রদর্শিত হয়। বলিতে ভুলিয়াছি, সর্বত্রই—গির্জায় পর্যন্ত দর্শকের নাম ও ঠিকানা লিখবার জন্য প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড পুস্তক রক্ষিত আছে। New Place এর পার্শ্বে ই একটি সাধারণের প্রমণ-উদ্যান। তথায় একটি mulberry গাছ আছে। কথিত আছে, ইহা কবির স্বহস্ত-প্রােথিত একটি বৃক্ষের চারা। তাহার পর পূতসলিলা এভনের তীরে নুতন জিয়ম এবং রঙ্গালয় দেখিতে গেলাম। অনেকেই জানেন, সুপ্রসিদ্ধ লেখিকা মেরি য়ুরােপ-ভ্রমণ। কৱেলির যত্নে ও চেষ্টায় ইহা স্থাপিত। প্রতি বৎসর ইংলণ্ডের প্রসিদ্ধ অভিনেতা ও অভিনেত্রীবর্গ কর্তৃক এই রঙ্গালয়ে সেক্সপীয়ারের নাটক অভিনীত হয়। মেরি করেলি এই গ্রামেই বাস করেন। বেশ বড় লাল পাহরের বাটী। নিম্নে প্রকাণ্ড পুস্তকালয়, সিড়িতে এবং উপরে চিত্রশালা এবং প্রকাণ্ড রঙ্গালয়। পার্শ্বের উদ্যান, তাহাতে কবির ব্রোঞ্জনিৰ্মিত মৃত্তি। কিরূপ যত্নে ও কি ভক্তির সহিত ইংলণ্ডবাসী তাহাদের শ্রেষ্ঠ কবির স্মৃতিচিহ্ন জাগরুক রাখিয়াছেন। আমাদের দেশের কবিদিগের প্ৰতি আমরা কি ভাবে রক্ষা করিতেছি।

বার্মিংহাম। স্ট্রাটফোর্ড হইতে আমি বার্মিংহামে যাই। যে ট্রেণে যাই তাহা অনেকটা সেকালের খিদিরপুর যাইবার ট্রামের ন্যায়, দুইখানি গাড়ি ও একটি এঞ্জিন; তবে গাড়িগুলির অবশ্য দুই ধারেই কাচ আঁটা। পথে ইংলণ্ডের বন দেখিলাম। রেলের পার্শ্বে গ্রাম খুব কম, কেবল জঙ্গল, তবে জঙ্গলও যেন সুরক্ষিত বলিয়া মনে হইল। লণ্ডনে একটি ভদ্রলােকের সঙ্গে এক দিন কথা হইতেছিল। তিনি আমাকে কথাপ্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করিলেন, বার্মিংহাম যাইতেছেন কেন? আমি বলিলাম, ইংলণ্ডের একটি Manufacturing town দেখিবার ইচ্ছা আছে। তিনি বলিলেন, যদি শিল্প কোথায় স্বভাবের সৌন্দৰ্য্য হরণ করিয়াছে তাহাই দেখিতে চাহেন (Nature absolutely spoilt by art) তবে লিডসএ ( Leeds ) যাউন। বাস্তবিকই বার্মিংহামকে সুন্দর বলা যায় না, কেবল চিনি ও ধুম। অবশ্য সহরের পার্শ্বে বেশ খােলা যায়গা আছে এবং কয়েকটি সুন্দর পার্ক আছে। একটি-ক্যাননহিল পার্ক—আমি দেখিয়াছিলাম। তথাপি Town properএর প্রশংসা আমি করিতে পারি না। ইহাকে বগুনের একটি ছােট ও অপরিষ্কার সংস্করণ বলা যাইতে পারে। এই স্থানের বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকটি বাঙ্গালী ছাত্র পড়িতেছেন। সকলের সঙ্গেই আলাপ হইল। একজন আবার কলিকাতায় আমার ছাত্র ছিলেন। আর দেখিলাম, এ স্থানের প্রাচ্য সভা (Oriental Association); ভারতবর্ষীয়, তুরস্ক, মিশরদেশীয়, ব্ৰহ্মদেশীয় ও

য়ুরােপ-ভ্রমণ।
চীনদেশীয় ছাত্ররা ইহার সভ্য। একজন ভারবর্ষীয় তদ্রলােক
বার্মিংহামে ডাক্তারি করিতেছেন, তিনি ইহার সভাপতি। শুনিলাম,
একটি ভারতসভাও আছে; কিন্তু আমি তাহার অধিবেশনে যাইতে
পারি নাই।
বার্মিংহামে একদিন কতকগুলি বালক ম্যাকি’ ‘ব্ল্যাকি' বলিয়া
কিছু দুর আমার পশ্চাদ্ধাবন করিয়াছিল, আর কোথাও এ ভােগ
ভুগিতে হয় নাই।

এডিনবরা ; স্কটল্যাণ্ডের রাজধানী এডিনবরা অতি সুশােভন ক্ষুদ্র নগর ; তিন দিক্‌ পাহাড়ে বেষ্টিত। সহর অতি পরিষ্কার। প্রধান রাস্তা প্রিন্সেস স্ট্রীট ; এক ধারে অতি সুন্দর বাগান এবং অন্য পার্শ্বে মনাের সৌধাবলী—দেখিতে বড়ই চমৎকার। কথিত আছে যে, য়ুরােপের মধ্যে ইহাই সুন্দরতম রাস্তা। মনে করুন, কলিকাতার চৌরঙ্গী রাস্তার বাটীগুলা যদি সবই সুশ্রী হইত এবং সম্মুখের ময়দান যদি পত্র- পুষ্পশােভিত সুন্দর উদ্যানে পরিণত হইত, তাহা হইলে কি সুন্দর শােভা হইত। প্রিন্সেস স্ট্রীট অনেকটা ইহারই অনুরূপ। বাগানটি ( Prince's Garden) রাস্তা হইতে খানিকটা নীচু, এবং এই স্থানে একটি অতি মনােরম ঘড়ি আছে। ঘড়িটি বাগানের এক কোণে, যেন একটা প্রকাণ্ড ডালাহীন ( openface) ওয়াচ শায়িত রহিয়াছে, ঘড়ির কাটা এবং অঙ্কগুলি সমস্তই কুসুমে রচিত—বিদ্যুৎ-সংযােগে ঘড়ি চালিত হয়। এই রাস্তার পার্শ্বে সহরের প্রধান প্রধান বিপণিশ্রেণী দেখা যায়। উদ্যানের পাশ্বে এক প্রকাণ্ড সৌধ—স্যার ওয়াল্টার স্কটের মকুমেন্ট। ইহা একটি মন্দিরের ন্যায় বাটী ; তাহাতে স্কটের প্রতিমূর্তি বসান ; আছে। এডিনবরার এক পার্শ্বে শম্পাস্তৃত গুটিকতক সুন্দর পাহাড়, তাহাদের মাম Blackford Hills এবং The Braids এই দুইটি প্রাতঃকাল ও সন্ধ্যায় এডিনবরাবাসীদিগের—বিশেষতঃ প্রণয়ীদিগের য়ুরােপ-ভ্রমণ। সমীরণ সেবনের প্রিয় স্থান। এই পাহাড়ের উচ্চতম শিখরে মানমন্দির স্থাপিত। অন্য পার্শ্বে সুপ্রসিদ্ধ Holyrood Castle এর পার্শ্বে ইতিহাস- প্রসিদ্ধ Arthur's Seat নামক পাহাড়। ইহাতে তৃণাদি বড় নাই। পাহাড়টি দেখিতে যেন একটি বৃহৎ চৌকির ন্যায়--সেই জন্যই এ নাম। এডিনবরা পার্বত্য সহর; ক্রমাগতই উচু নীচু। তবে, সহরের মধ্যে Prince's Garden ভিন্ন আরও একটি প্রকাণ্ড পার্ক আছে, তাহারই ধারে এডিনবরার সুপ্রসিদ্ধ য়ুনিভার্সিটি এবং চিকিৎসালয়- পৃথিবীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা বৃহৎ Infirmary—স্থাপিত। সহরের মধ্যে দেখিবার জিনিষ অনেকগুলি আছে, তবে সেগুলির বর্ণনা করিবার পূর্বে এডিনবরা হইতে কিছু দূরে অবস্থিত দুইটি স্থানের কথা কিছু বলিব। প্রথম, ইতিহাস-প্রসিদ্ধ ও স্কটের উপন্যাসপাঠকের সুপরিচিত পুরাতন রসলিন কাসূল (Rosslyn Castle)। ইহা এখন ধ্বংসাব- শেষে পরিণত। দুই একটি ঘর খাড়া আছে। একটির দরজার উপর বাটা নির্মাণের তারিখ পড়া যায়—খৃষ্টাব্দ ১৩০৪। নিয়ে অন্ধকার কারা- গৃহগুলি অনেকটা অভয় আছে। দুর্গের পার্শ্বেই প্রকাণ্ড পাহাড় ও নিবিড় জঙ্গল। সেই জঙ্গলের মধ্যে ছোট একটি নদী এবং নিকটস্থ পার্বত্য রাস্তা। Glens দেখিতে বাস্তবিকই বড় সুন্দর। তিন দিকে এই পাহাড় ও জঙ্গল, এক ধারে সুগভীর পরিখা ; এ দুর্গ যে বাস্তবিকই দুর্ভেস্থ ছিল, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নাই। দ্বিতীয়, এডিনবরার নিকটে সমুদ্রের উপর সেতু Firth of Forth Bridge। শুনিয়াছি, গ্যাসগাে শহরের নিকটস্থ টে (Tay) সেতু ইহা অপেক্ষাও বড়; কিন্তু তাহা আমি দেখি নাই। এই ফার্থ এর এভিনবরা। ফোর্থ ব্রিজ স্থপতিবিদ্যার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। পাঁচ সহস্র লােকের সাত বৎসৰ অহােরাত্ৰব্যাপী পরিশ্রমের ফলে ও পাঁচ কোটীর অধিক টাকা খরচ করিয়া এই সেতু নির্মিত। সেতুর উপর ডবল লাইন রেল পাতা। জলের নিকট দাড়াইয়া সেতুটি অত্যন্ত উচ্চ দেখায় এবং অপর কূল ভালরূর নজরে আইসে না। আমি যে দিন সেতু দেখিতে গিয়াছিলাম ইংলণ্ডের নৌবাহিনীর এক অংশ--খ্যাতনামা ড্রেড { Dreadriought) প্রভৃতি ১০/১২ থানা যুদ্ধ জাহাজ সে দিন সেতুর নিকট ছিল। এডিনববার দ্রষ্টব্য স্থানগুলির কথা বলিবার পূর্বে তথাকার অধিবাসীদিগের একটা কথা বলিব। অনেকেই জানেন, স্কটল্যতে ধর্মভাব অতিশয় প্রবল, এবং রবিবারে কেহ কোনরূপ কার্য করেন , অর্থাৎ Sabbathkeeping পূরা মাত্রায় প্রবল; কিন্তু শুনিলে চমৎকৃত হইবেন যে, রবিবারে বালকবালিকাদিগকে পৰ্যন্ত খেলিতে দেওয়া হয় না—অন্ততঃ বাটীর বাহিরে এই ব্যবস্থা। বালক বালিকা- দিগের ক্রীড়াস্থল পর্যন্ত সে দিন বন্ধ। হয় ত বৈকালের দিকে কেহ কেহ বেড়াইতে পায়, কিন্তু সে দিন খেলাধুলা একেবারে নিষিদ্ধ। এডিনবরার দ্রষ্টব্য স্থানগুলির মধ্যে প্রধান তিনটি—১) হােলি- রুড প্রাসাদ (২) এডিনবরা ক্যাসল এবং (৩) ক্যালট হিল। হােলিরুড-স্কটলণ্ডের ইতিহাসে খুব প্রসিদ্ধ স্থান। অতি প্রাচীন কাল হইতে শেষ পর্যন্ত স্কটল্যণ্ডের রাজাদের ইহাই আবাস ছিল। অতি বৃহৎ প্রান্তরের মধ্যে এবং Arthur's Seat নামক পাহাড়ের গাত্রে এই প্রাসাদ। প্রাসাদের সম্মুখে একটি অবিশাল প্রাঙ্গণ, তাহাতে একটি মুকুট-শশাভিত ফোয়ারা। প্রাসাদের মধ্যে কতকগুলি ঘর এখনও রাজা এডিনবরায় আসিলে ব্যবহৃত হয়। সে সব প্রকোষ্ঠে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। তবে ইতিহাস-এসি য়ুরােপ-ভ্রমণ। মেরী-কুই অব, স্কটসের বাসগৃহগুলি সবই দেখা যায়। দুই একটি ধর বেশ বড় ; প্রায় আর সব কক্ষই ক্ষুদ্রায়তন। বিশেষতঃ যে কক্ষে রাণী মেরী আহার করিতেন এবং যথা হইতে তাঁহার প্রিয়পাত্র রিচি- ওকে ধরিয়া আনিয়া পার্শ্বস্থ কক্ষে হত্যা করা হয়, সে কক্ষটি অতিশয় ক্ষুদ্র একটি রেলগাড়ির কামরার ন্যায়। প্রায় সব ঘরেই স্কটল্যণ্ডের ইতিহাসে খ্যাত ব্যক্তিদিগের প্রতিমূৰ্ত্তি রক্ষিত এবং ছাতগুলি অনেক Heraldic inscriptionsএ সুশােভিত। যে কক্ষে রাণীর সভাধি- বেশন হইত, সে কক্ষটি কিছু বড় এবং তাহার দরজার নিকট একটি পিলফলকে লিখা আছে, সেই স্থানে রিঙিও হত হয়েন। বলিয়া রাখা উচিত যে, ঘরের মেঝে কাষ্ঠমণ্ডিত, ছাতও তাহাই। প্রাসাদের পূর্বগাত্রে পুরাতন চ্যাপেলের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। এই স্থানে সেকালের অনেক রাজা রাণী ও প্রধান প্রধান লােকের দেহ সমাহিত ; কিন্তু এখন সমাধিগুলি একেবারে নষ্ট হইয়া গিয়াছে। এডিনবরা ক্যাসল বা দুর্গ— সমুচ্চ পাহাড়ের একটি শৃঙ্গ কাটিয়া সমতল করিয়া তাহার উপর নির্মিত। প্রবেশদ্বার দেখিলে শিমলাশৈলে বড়লাটের প্রাসাদের প্রবেশদ্বার পড়ে। ভিতরে অন্যান্য দুর্গেরই মত অনেকগুলি ফটক। কোনও কোনও ফটকের উপরিস্থ কক্ষ কারাকক্ষরূপে ব্যবহৃত হইত। আবাসগৃহগুলি অতি ক্ষুদ্রায়তন। একটি ঘরে স্কটল্যণ্ডের রাজমুকুট ও রাজকীয় মণিরত্ন রক্ষিত রহিয়াছে। যদিও ইংলণ্ডের রাজাই স্কটল্যণ্ডের রাজা তথাপি স্কটল্যৎের রাজকীয় পরিচ্ছদ, মুকুট, মণিমুক্তা প্রভৃতি গুনে লইবার নিয়ম নাই। তাহা এই ক্যাসলে রক্ষিত থাকে ; রাজা স্কটলণ্ডে আসিলে তাহা ব্যবহার করিতে পারেন। এই কক্ষের পার্শ্বে একটি সামান্য কক্ষ। তথায় মেরীর পুত্র গ্রেটব্রিটেনের যুক্তরাজ্যের প্রথম অধিপতি স্কটল্যণ্ডের ষষ্ঠ ও ইংলণ্ডের প্রথম জেমস ভূমিষ্ঠ হয়েন।

এডিনবরা। সেই কক্ষে এখন একজন স্ত্রীলােক বসিয়া Picture Post Card বিক্রয় করেন। যে রী রাজমুকুট প্রভৃতির প্রহরী, সেও Picture Post Card, কাগজচাপা প্রভৃতি বিক্রয় করে। ক্যাল এখনও সেনাবাসের জন্য ব্যবহৃত। ক্যাটন হিল ( Galton Hill)-এডিনবরা সহরের ভিতর একটি পাহাড়। ইহার উপর কবি বাসের মনুমেন্ট আছে, নেলসনের মনুমেন্ট আছে, একটি জ্যোতিষিক মানমন্দির আছে, আর আছে একটি অর্ধসমাপ্ত গৃহ, তাহাকে স্কটল্যণ্ডের গৰ্ব ও দারি- দ্রের প্রতিমূৰ্ত্তি বলে (the pride and poverty of Scotland) ওয়াটার যুদ্ধে যে সকল স্কচ সৈন্য হত হয়, তাহাদের সম্মানার্থ এই গৃহ বা মনুমেন্ট আবদ্ধ হইয়াছিল। কিন্তু অর্থাভাবে ইহা সমাপ্ত হয় নাই, তাই এই নাম। এডিনবরার মুনিসিপাল মুজিয়ম, Market Cross ( বাজারের মধ্যস্থ ক্রুশ কাষ্ঠ) প্রভৃতি দেখিবার জিনিস বটে। তথাকার হাইকোর্ট অতি ক্ষুদ্র, নিম্নতলেই আদালতগৃহ। নূতন ও পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয় দেখিবার জিনিষ। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকগুলি ভারতবর্ষীয় ছাত্র অধ্যয়ন করেন, অধিকাংশই চিকিৎসাবিদ্যার্থী। একটি কথা শুনিয়া বড় দুঃখিত হইয়াছিলাম। দক্ষিণ আফরিকাবাসী অনেক বৃটিশ ছাত্র এডিনবরায় আছেন। তাঁহাদের প্রভাবে এডিনবরায় নেটিভ ছাত্ররা ভারতবর্ষীয় ছাত্রদিগের সহিত সদ্ব্যবহার করে না। এমন কি শুনিলাম, যদি কোনও বৃটিশ ছাত্রের আহারকালে কোনও ভারতবর্ষীয় ছাত্র সেই টেবলে গিয়া বলেন, তবে প্রথমােক্ত ছাত্র আহার ত্যাগ করিয়া উঠিয়া যায়েন। আরও শুনিতে পাইলাম যে, ছাত্ররা নিয়ম করিতে চাহিয়াছিল যে, যুনিভার্সিটির সন্তরণসভায় কোনও কালাে ছাত্র সভ্য ইতে পারিবে না। সুখের বিষয়, অধ্যক্ষ এ নিয়ম বহিত য়ুরােপ-ভ্রমণ। করিয়া দিয়াছেন। তবে বলা উচিত যে, সব ছাত্ৰই এই বিদ্বেষভাৰ পােবণ করে না; এবং ক্রমে ইহা কমিতেছে। আরও সুখেধ বিষয়, ইং- লঞ্চের কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে এরূপ ভাবের কথা কিছু শুনি নাই। লণ্ডন, কেম্বুিজ, অক্সফোর্ড প্রভৃতি স্থানে ইহা সম্পূর্ণ অজ্ঞাত; কিন্তু ব্যারিষ্টারি পীঠস্থানে Inns of Courtএ এ ভাবে কিছু আছে, অন্তত: একটি স্বলে আমি দেখিয়াছি, বৃটিশ ও কৃষ্ণকায় ছাত্রদিগের বসিবার ঘর (Common Room) 2001 ;

কেজি। এডিনবরা হইতে টেণে কেম্বুিজ আসিতে পথে কালাইলের এলিফোন ( Ecciefechan) এবং বিবাহার্থী যুবকযুবতীর তীর্থস্থান গ্রেটনা দেখা যায়। রেল হইতে যতটা বুঝা যায়, দুইটিই অতি ক্ষুদ্র গম। স্কটল্যণ্ড ও ইংলণ্ডের প্রাকৃতিক বৈলক্ষণ্য সহজেই বুঝা যায়। ইংলণ্ডের প্রথম ষ্টেশন ক্লবিষ্টন ( Floriston) দেখিলে মনে হয়, হ। গাছপালা ও সমতল ক্ষেত্র আছে বটে; Caledonia বাস্তবিকই stern and wild। পথে একটা আমাদের দেশের নদীর মত নদী দেখা যায়, বােধ হয় টাই (Tyne}! রেলের দুই ধারে অনেক লবণের ও কয়লার খনি দেখা যায় ; আর Oxenholme নামক ষ্টেশন হইতে কল্পনায় ওয়াডসওয়ার্থের লেক ডিষ্ট্রীটসের ছবি দেখা যায়। দূরে পাহাড়গুলি বেশ দেখা যায়, হ্রদের কিছুই দেখা যায় না। পথে দুই ধারে অনেক শস্যক্ষেত্র, গােমেয়াদি চরিতেছে। দেখিলাম, একটি মেয়ের লেঙ্গ গরুর লেজের ন্যায় লম্বা ! রাগবি ( Rugby ) ষ্টেশনে প্রায় ৪০ মিনিট অপেক্ষা করিয়া গাড়ি বদল করিতে হইয়াছিল। ইচ্ছা ছিল, রাগবি ইস্কুল দেখিয়া যাইধ ; কিন্তু শুনিলাম, স্কুল ষ্টেশন হইতে দুরে; সাধ অপূর্ণ রহিল। সন্ধ্যার পর কেম্বি জে পৌছিলাম। ভ্রাতা সঙ্গে করিয়া বাসায় লইয়া গেলেন। তাঁহার আবাসস্থল হইতে বাসা প্রায় ১ মাইল দূর। ছাত্রাবাসে, অবশ্য বাহিরের লােক থাকিতে পায় না; কিন্তু তাহার য়ুরােপ-ভ্রমণ। শাখাসস্থানের নিকটেও আমার জন্য বাটী পারেন নাই; কারণ, আনাগারে আমার নিতান্ত প্রয়ােজন এবং কেৰিছে অধিকাংশ বাটীতেই মানাগারের একান্ত অভাব। কেজি এ অতি ছােট শহর, কলেজগুলি এবং ছাত্রাবাস বাদ দিলে এয় কিছুই থাকে না। যে নদীর নামে কেম্বুিজ খ্যাত সেই ক্যাম আমাদের দেশের সাধারণ খাল অপেক্ষাও সরু; প্রায় দশ হাত চওড়া হইবে। আবার গ্র্যান্ট নামে যে নদী আসিয়া ক্যামে পড়িয়াছেন তিনি এত বড় যে, একটি পাইপেয় ভিতর দিয়া ক্যামে প্রবেশ করিয়াছেন। ছাত্ররা কেহ কেহ কলেজে বাস করেন; কিন্তু স্থানাভাববশতঃ অনেকেই বােডিং হাউসে থাকেন। এই সব বাটী রেজেষ্টারি করা । গৃহকর্মীদিগকে কলেজের নিয়ম মানিয়া চলিতে হয়। প্রত্যেক ছাত্রের দুইটি করিয়া ঘর ; একটি শয়নের এবং অন্যটি বসিবার। ছােট ছােট বাড়ী, প্রত্যেক বাড়ীতে ২,৩ বা ৪ জন ছাত্র বাস করেন। সন্ধ্যা ৮টায় দরজায় চাবি পড়ে, ৮টার পর ১০টার মধ্যে বাটা ফিরিলে ২ পেনি অরিমানা দিতে হয়, ১০টা হইতে ১২টা পর্যন্ত ৩ পেনি, ১২টার পর প্রবেশ নিষেধ। গৃহকর্জীকে খাতা রাখিতে হয়,—তাহার গৃহস্থ ছাত্ররা কে কখন বাড়ী ফিরে লিখিয়া রাখতে হয়, আবার অন্য বাটীর কোন ছাত্র ৮টার পর তঁাহার বাটতে থাকিলে কতক্ষণ ছিল তাহাও লিখিতে হৰু। এত ভন্ন ত্রিতে এক একজন শিক্ষক ( Proctor) দুইজন অনুচর (হাদিগকে Bulldog বলে) লইয়া সহরের রাস্তায় ঘুরিয়া বেড়ান ; ছেলেদেরদেখা পাইলে নাম ও কলেজের নাম লিখিয়া পয়েন। অপরাধীর জরিমানা হয়। সকা হইতে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ছেলেদের তত্ত্বাবধান কিছুই হয় না। চর শুনিতে না গেলে কেহ.কিছু বলে না। সপ্তাহে কয়েক ;

ন ৩ কেজি। দিন কলেজে ডিনার খাইতে হয়। যদি কেহ নিম মত ডিনার খায় এবং ৮টার পুর্বে বাসায় আইসে তবে সে লিখা পড়া করুক বা না করুক পরীক্ষায় উপস্থিত হউক বা না হউক কেহ বর রাখিবেন না। কলেজে যিনি tutor থাকেন তাহার নিকট লিখা পড়ার কথা কি জিজ্ঞাসা করিলে তিনি অবশ্য বলিয়া দিবেন; কিন্তু না জিজ্ঞাসা করিলে বিশেষ ক্ষতি নাই। ফলকথা সবই আপনার চেষ্টার উপর নির্ভর করে এবং এসব স্থানে self-help বা আত্মনির্ভরতা যথেষ্ট শিক্ষা হয়। কেন্ধুিজের কলেজগুলি অবশ্য খুব পুরাতন। অনেকগুলি কলেজ ক্যামের ধারে অবস্থিত এবং নদীর অপর পারে উদ্যানসৰুলিত। কলেজের নদীর ধারের অংশকে Backs বলে। এ অংশ বেশ উপবনের স্যায় ; নিলাম, খ্রীষ্মকালে বড় সুন্দর দেখায়। King's College নামক কলেজের চাপেল বেশ সুন্দর illuminated বাতায়নশােভিত। কলেজ ভিন্ন কেন্ধুিজে দেখিবার জিনিষ (১) মুজিয়মস্থিত চিত্রশালা, অনেক উৎকৃষ্ট চিত্রে শােভিত (২) পুস্তকাগার, ইহাতে ইংরাজী ভাষার প্রকাশিত সময় পুস্তকই আছে। এখন আইন হইয়াছে যে, ইংলণ্ডে প্রকাশিত সব পুস্তকের ১ খানি ব্রিটিশ মুক্তি মুমে, ১ থান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ও ১ খানি কেজি বিশ্ববিদ্যা- লয়ে দিতেই হইবে। (৩) বােট্যানিকাল গার্ডেন,--যদিও ছোট তথাপি সংগ্রহসম্পদে উল্লেখযােগ্য, এবং (৪) ইউনিয়ন বা ছাত্ৰসতা। এই সভায় ছাত্রদিগের পড়বার জন্য পুস্তকাগার, খেলিবার জায়গা, ধুমপানের স্থান এবং সভাসমিতির স্থান আছে। ছাত্র ভিন্ন শিক্ষকরা। অনেক সময় এই স্থানে আইসেন। ছাত্ৰসটি পালমেন্টের একটি ক্ষু সংস্করণ বলিলেও চলে। ইংলতের অনেক রাজমন্ত্রীর বক্ততার হাতেখড়ি এই স্থানে হইয়াছে।

য়ুরােপ-ভ্রমণ। কেজি ইংলণ্ডের জলাভূমিতে (Fen country) অবস্থিত, কাষেই অপেক্ষাকৃত অস্বাস্থ্যকর। কেম্বি জে আহারের পর আমাদের দেশের মত নিদ্রাকর্ষণ হয়, এবং আমাদের দেশের মত এ স্থানে আরও হয়। } কেন্ধুিজের চতুঃপাশ্বে অনেক বেড়াইবার স্থান আছে ; একটু দূরে দুইটি ঘােট পাহাড় দেখা যায়, তাহাদিগকে ছাত্ৰভাষায় Gog এ। Magog বলে। কেম্বি জের নিকটে ঈলি (Ely) নামক পুরাতন গির্জা। ঈলির গির্জাটি অবশ্য খুবই সুবৃহৎ এবং সুন্দর ভাবে সক্ষিত । Illuminated জানালার বাহাদুরি এই যে, ঘরের ভিতর হইতে দেখিলে মনে হয় যেন সূর্যকিরণে ছবি হাসিতেছে, কিন্তু বাহিরে আসিয়া দেখুন, সূর্যের মুখও দেখা যায় না, আকাশ মেঘাবৃত। যত এইরূপ জানালা দেখিয়াছি সবই এই জাতীয় ।

ব্ৰসেলস। লণ্ডন হইতে অনেক পথে ব্ৰসেলসে যাওয়া যায়। তবে ডােভার পৰ্য্যন্ত ট্রেনে যাইয়া তাহার পর Royal Belgian Mail Packet অষ্টেণ্ড পৰ্যন্ত এবং অষ্টেণ্ড হইতে সেলস রেলে যাইবার পথই সৰ্বা- পেক্ষা অল্প দূর। মেল বােটগুলি ঘােট ঘােট ; ডোভার-ক্যালের মধ্যে যেরূপ জাহাজ চলে সেই প্রকার। সমুদ্র শান্ত থাকলে ২• ঘণ্টা, ৩ ঘণ্টায় ডােভার হইতে অষ্টেও পোঁছান যায়। আমি যে দিন যাই সে দিন সমুদ্র বড় সুবিধামত ছিলেন না। আকাশ মেধাবৃত, সমুদ্র কিঞ্চিৎ তরঙ্গায়িত, কাযেই ছােট জাহাজ বেশ নৃত্য আরম্ভ করি- লেন। প্রথমে বেশ আমােদ হইতেছিল ; অৰ্দ্ধধন্টা পরে যখন অহা- রান্বেষণে নিয়ে যাইলাম, তখনও বেশ। কিন্তু কিছু আহারের পরেই একটা মাংসের ডিসে অতি ভয়ানক দুর্গন্ধ পাইলাম। প্রথমে মনে হইল, বুঝি মাংস পচা ; কিন্তু পরক্ষণেই বুঝিলাম, রােগ খাদ্যে নহে, খাদকে ; আমাকে সমুদ্র পীড়ায় ধরিয়াছে। মনটা বড় খারাপ হইল। দুস্তর আরব সাগর প্রভৃতি অবলীলাক্রমে কাটাইয়া শেষে কিনা ক্ষুদ্র North Seaতে বিপাকে পড়লাম। যাহা হউক, কিঞ্চিৎ উদগীর। করিয়া দেহ অনেকটা সুস্থ হইল। অষ্টেও পৌছিতে চারি ঘন্টা লাগিল। কপালের ভােগ, কে থাইবে? সমুদ্রের ধারেই রেল ষ্টেশন। প্রথমে নামাযাত্ৰ কাষ্টম পরীক্ষা করিয়া রেলে উঠিতে দিল। দুই ঘণ্টা পরে সন্ধ্যার পর ৬টার সময় সেলস সেন্টাল ষ্টেশনে পৌছি- লাম। "ক্টোবরের শেষ, প্রায় ৪টায় সূৰ্যাস্ত হয় ; কাষেই ৬টা ;

আমি ও ৭২ যুনােপ-ভ্রমণ। বেশ রাত্রি, তদুপরি অল্প অল্প বৃষ্টি পড়িতেছিল। হােটলে পৌছয়া হাত ধুইয়া আহার-কক্ষে যাইলাম। গিয়া দেখি, হােটলে যাত্রীর সংখ্যা অনেক। সেলসে তখন প্রদর্শনী চলিতেছে। যদিও প্রদর্শ- নীর প্রায় শেষ তথাপি অনেক লােক তখনও আসিতেছেন। টেবলে য়ুরােপের অনেক দেশবাসী লােকই দেখিলাম। এসিয়ার অধিবাসী একজন জাপানী যুবক। জাপানীটির সহিত সামান্য পরিচয় হইল। তিনি বলিলেন, আগামী বর্ষে তাহার ভারতবর্ষ দেখিবার অভিলাষ আছে। আহারের পর হােটেল আফিল হইতে একজন “সেখাে” সংগ্রহ করিয়া প্রদর্শনী দেথিতে গেলাম। রাত্রিতে ঘণ্টা দুই ঘুরা গেল, বিশেষ ভাল লাগিল না। তখন অনেক জায়গাই বন্ধু এবং বৃষ্টি তখনও চলিতেছে। যে স্থান অগ্নিদাহে ভস্মীভূত হইয়াছিল, দেখিলাম সে স্থলে লতাপাতা দিয়া সব ঢাকিয়া দিয়াছে। প্রদর্শনীয় স্থান খুব প্রকাণ্ড বলিয়াই বােধ হইল। ট্রামে হােটেলে ফিরিলাম। সহরের যেটুকু দেখিলাম অনেকটা প্যারিসের ন্যায় সুশােভন এবং প্যারিসেরই ন্যায় পাপপলি মনে হইল। সকালে কুক কোম্পানির প্রেরিত গাড়ি ও পরিদর্শক আসিল। তাহার সহিত ভ্রমণে বাহির হইয়া দেখিলাম, সেলসের রাস্তা অতি চমৎকার। অনেকগুলি রাস্তা খুব চওড়া। প্রথম দুই ধারে ফুটপাথ, তাহার পর দুই ধারে গাড়ির রাস্তা, তাহার পর দুই ধারে সারি করিয়া বশােভিত প্রকাণ্ড avenue সংযুক্ত ফুটপাথ এবং সমধ্যে পুনরায় চাওড়া গাড়ির রাস্তা। এত প্রশস্ত রাস্তা ইংলণ্ডে বা ফ্রান্সে দেখি নাই। এরূপ রাক্ত সেলসে ও এটওয়ার্কে অনেকগুলি আছে। সেলসের এইরূপ একটি রাস্তা ২ মাইল লম্বা, তাহারই শেষ সীমায় প্রদর্শনী ছিল।

১৩ সেল। বলা উচিত, বেলজিয়ম খুব সমতল দেশ। তবে সেস (দেশীয় ভাষায় ব্রুজেল ) পার্বত্য বটে। সহরের সর্বাপেক্ষা উচ্চ স্থানে রাজবাটীর নিকটে বিচারালয় (Palais du Justice)। সমস্ত যুবরাপে এত বড় বিচারগৃহ আর নাই। দেশটি খুব ছোেট, তাই হাইকোর্টটি [রােপে বৃহত্তম। প্রবেশপথের নিকটে সিড়ির দুই ধারে দুইট প্রকাণ্ড মূৰ্ত্তি, একটি ডিমসূথুিনিদের, আর একটি কাহার মনে নাই। সঙ্গীকে জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘মূৰ্ত্তি কি মর্মরের?” তিনি বলিলেন, তা আমাদের গরীব দেশ, প্রস্তর-মূৰ্ত্তি কোথায় পাইব?” বিচারার দেখিয়া ত দেৰ কিছুমাত্রদরিদ্র বলিয়া বােধ হইল না। যে স্থানে { কক্ষ বলিতে ভয় হয়) ব্যবহারাজীবিগণ মােয়াকেলের. সহিত দেখা সাক্ষাৎ করেন সেটি ত প্রায় আমাদের কলিকাতা হাইকোর্টের Quadtangleএর ন্যায় প্রশস্ত বলিয়া মনে হইল। অনেক ব্যারিষ্টার দেখিলাম, গাউনে ফর (fur) লাগান। বােধ হয়, তাহারা অপেক্ষাকৃত বড়দরের-King's Counsel জাতীয়। দুই একজন বিচারপতি দেখিলাম, মাবার ছােট ছোট টুপি পরিয়া বি১ারসন বসিয়া আছেন। ভাষা অজ্ঞাত থাকায় অবশ্য মােকর্দমার কিছুই বুঝিতে পারিলাম না। আমার বাসস্থানের নিকটেই সেলসের টাউনহল বা Hotel de Ville অবস্থিত। চকমিলান প্রকাণ্ড বাড়া ; ১৪৪ খৃষ্টাব্দে নিশ্চিত। সম্মুখে বাঁধান উঠান; তথায় শাক সবজি প্রভৃতি বিক্রীত হইতেছে। এই বাটীতে মনিসিপাল আফিস অবস্থিত। সেলসের ন্যাশন্যাল গ্যালারিতে অনেক ভাল ভাল চিত্র আছে, তবে ভ্যান ডাইক (Van Dyck) চিত্রিত ছবিই কিছু আধিপত্য। আর এক ভয়ানক চিত্রশালা অাছে, Weirtz নামক একজন চিত্রকর নিজের অঙ্কিত কতকগুলি চিত্র মৃত্যুর পর সাধারণকে দান করিয়া ; ৭8 য়ুরােপ-ভ্রমণ। গিয়াছেন। তাহারই বাটীতে সেগুলি রক্ষিত। চিত্রগুলি অত্যন্ত ভীতিপ্রদ। পাপের, রােগের ও মানসিক বিকারের চিত্র তিনি অঙ্কিত করিয়াছেন। তাঁহার জীবদ্দশায় তিনি নাকি কাহাকেও এ সব চিত্র দেখান নাই। লােকটির শিক্ষা ও শিল্পদক্ষতা অসাধারণ। কিন্তু কি জন্য যে তিনি এ সব ভয়ানক চিত্র অঙ্কিত করিয়াছেন বলা কঠিন । এক কোণে একটি কুকুর বদ্ধ রহিয়াছে ; প্রথম দৃষ্টিতে মনে হয় এখনই কামড়াইবে, ভাল করিয়া দেখিলে বুঝা যায়, জীবন্ত নহে, অঙ্কিত। একটা প্রকাণ্ড চিত্র আছে, মৃত্যুর পর পাপীর শাঞ্চি। চিত্র দেখিলে অনেক দিন সুনিদ্রা হওয়া কঠিন। বৈকালে পুনরায় প্রদর্শনী দেখিতে গেলাম। অতি প্রকাণ্ড ব্যাপার। ভিন্ন ভিন্ন দেশের দ্রব্য ভিন্ন ভিন্ন স্থানে সংরক্ষিত। প্রত্যেক গৃহ বা কোর্ট দেখিতে একাধিক সপ্তাহ লাগে। যন্ত্রবিভাগে যাইয়া ভাবিলাম, একটা কোনরূপ যন্ত্র বিশেষ করিয়া দেখিব। কিন্তু সম্ভব হইল না; প্রত্যেক প্রকারের অনেকগুলি যন্ত্র বর্তমান। বিশে- যজ্ঞ লােকের সাহায্য ব্যতীত কিছুই বুঝা যায় না। প্রদর্শনীস্থান হইতে সেক্সপীয়ার-পাঠকের সুপরিচিত আর্ডেন কানন ( Forest of Ardenes) নয়নগগাচর হয়। অতি সন্তর্পণে বলিতে হয়, সেলসবাসিনীদিগের মুখে কমনীয়তা, ও কোমলতা বড় কম দেখিলাম ।

য়্যান্টওয়াপ। যান্টওয়ার্প ( দেশীয় ভাষায় যাভাস। য়ুরােপের দ্বিতীয় বৃহৎ বন্দর। শুনিলাম যে, জণির একটি বন্দর ইহার অপেক্ষা বড়। নানাদেশীয় বৃহৎ বৃহৎ জাহাজে বন্দর পরিপূর্ণ। য়ুরােপের প্রায় সকল দেশের ও আমেরিকার পােত তথায় রহিয়াছে। এই স্থানেও ব্ৰসেলসের ন্যায় অনেকগুলি অতি প্রশস্ত রাস্তা দেখা যায়। একটি খুব বড় পার্ক আছে ; তাহার মধ্যে একটি হ্রদে একটি ভাসমান উদ্যান। এই পার্ক য়্যান্টওয়ার্পাসীর কাম্য স্থান। ইহার নিকটস্থ রাস্তায় একটি ভদ্রলােক কয়েকটি বাটী তৈয়ার করিয়াছেন, প্রত্যেকটি য়ুরােপের ভিন্ন ভিন্ন দেশের স্থাপত্যাদর্শে নিম্মিত। মােটের উপর দেখিতে বেশ সুন্দর হইয়াছে। য়্যান্টওয়ার্পে রুবেসের ( Rubels) অত্যন্ত প্রভাব। রুবেসের মম্মর মূর্তি ও বিখ্যাত কৰ্ম্মকার চিত্রকর কুইনটিন ম্যাসিসের (Kuintin Matsys) মৰ্ম্মর মূর্তি আছে। ন্যাশনাল গ্যালারিতে অতি সুন্দর চিত্র ও মৰ্ম্মর-মুৰ্ত্তির সমাবেশ, অধিকাংশই রুবেন্স ও তাঁহার ছাত্রদ্বয় ভ্যান ডাইক ও জর্ডানের (Jordanies) অঙ্কিত। এ স্থানের কেথিড্রাল বা গির্জা অতি প্রসিদ্ধ। তথায় টিসিয়ানের ( Titian! অঙ্কিত কয়েকটি সুন্দর তৈলচিত্র রক্ষিত আছে, রুবেনসের চিত্রের ত কথাই নাই। তদ্ভিন্ন তথায় একটি আশ্চর্য বস্তু আছে। অন্টারের ( Altar ) ঠিক পশ্চাতে তিনটি চিত্র আছে। দেখিলে মনে হয় যেন, মৰ্ম্মর-মুৰ্ত্তি (Sculpture in relief) কিন্তু হাত দিলে বুঝা য়ুরােপ-ভ্রমণ। যায়, Black and white painting মাত্র। আবার সরিয়া দাড়াইলে মনে করা যায় না যে, মৰ্ম্মরগঠিত নহে। কেথিড্রালের stained glass windows গুলিও বড় চমৎকার ; অতি সুন্দর চিত্রে পরি- শাভিত। কেথিড্রাল ভিন্ন সেন্টপলের গির্জা নামধেয় একটি ভজনালয়ের সুন্নিকটে Calvary বা শ্মশান চিত্রিত আছে। তথায় মর্মরে একটি পরিত্যক্ত শ্মশান গঠিত ও নরকের দৃশ্য প্রদর্শিত। স্থানটি বিভী- বিকাময় ।

এমষ্টারডাম। সবই অপছন্দ স্থান্টওয়ার্প হইতে হলণ্ডের রাজধানী এমষ্টারডামে আসিতে পথের শােভা অতি মুনােম। বেলজিয়মে রেলের দুই ধারে জঙ্গল ও ঘন বন। রােসেনডাল নামক স্টেশনে Custoins পরীক্ষা হয় ও বড়ি কুড়ি মিনিট বাড়াইয়া লইতে হয়। ইহাই হলাণ্ডের প্রথম ষ্টেশন। তাহার পর দুই ধারে কেবল জল ও জলাভূমি। জলের মধ্যে কাঠের বড় বড় গুড়ি ফেলিয়া মাটি চাপা দিয়া তাহার উপর বেল বসান। আমি যে গাড়িতে ছিলাম, তাহাতে দুইটি ইংরাজ ছিলেন। ইহারা পিতাপুত্ৰ-পিতার বয়ঃক্রম ৯০, পুত্রের ৫•। পিতা বােধ হয় ইংলণ্ডের বাহিরে খুব কমই আসিয়াছেন। তিনি বিদেশে করিতেছিলেন। পথে কোনও ষ্টেশনে চা পাওয়া গেল ; বৃদ্ধ বড়ই বিরক্ত হইলেন। পুত্রের পিতৃভক্তি অনন্যসুলত; তিনি পিতার সুস্বাচ্ছন্দ্যের জন্য অত্যন্ত ব্যস্ত দেখিলাম সমস্ত এষ্টারডাম সহরটাই দলের উপর অবস্থিত। বড় বড় গাছের ডাল সােজা জলের মধ্যে প্রােথিত করিয়া পার্শ্বস্থ দিয়া ভরাট করিয়া সেই স্থানে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড সৌ নির্মিত। কি রাজবাড়ীও এইরূপ। রাণী খুব কমই বাস করেন। কিন্তু আবাসভবনটি খুব জমকালাে ; মর্মরের অত্যন্ত ছড়াছড়ি। প্রায় সকল কক্ষেই মর্মরের উপর সুন্দর কারুকাৰ্য্য ( frieze)। ১৬৪২ খৃষ্টাব্দে এই প্রাসাদ নির্মিত হয়। তলস্থ বৃক্ষকাণ্ডগুলি এতকাল পচে নাই কেন, বুঝিতে পারিলাম না। রাজ- খান ইট এমন ৭ য়ুরােপ-ভ্রমণ। বাটীর এক পার্শ্বে একটি Squareএর মত। সেই দিকে একটি Balcony বা বারাণ্ডা। সেই স্থান হইতে রাণী (বা রাজা) প্রজাদের দর্শন দেন। এষ্টারডামে অনেক খাল ; তবে রাস্তাও আছে, কিন্তু অপ্রশস্ত --- আমাদের দেশের গ্রাম্য রাস্তার মত। কাযেই দুই ধার দিয় গাড়ি চলিতে দেয় না। কোনও রাস্তায় হয় ত উত্তর হইতে দক্ষিণে গাড়ি যাইতে পায় না, সব শকটই উত্তরগামী। এইজন্য অতি নিকটস্থ স্থানেও যানারােহণে যাইতে হইলে অনেক সময় লাগে। ষ্টেশন হইতে আমি যে হােটেলে উঠিয়াছিলাম থায় যাইতে দশ মিনিট লাগিয়াছিল, কিন্তু আসিবার দিন হােটেল হইতে ষ্টেশনে আসিতে প্রায় অর্ধ ঘণ্টা লাগিল। তবে বলা উচিত যে, সহরের এক অংশ বেশ প্রশস্ত রাস্তায় সুশােভিত। যুরােপে এক হণ্ডে তামাকের স্ক নাই, কাযেই চুরুট অত্যন্ত সন্ধা ও ভাল। Holland Havannas এর নাম সকল ধুমপায়ীই জানেন। এষ্টারডাম য়ুরােপের সর্বাপেক্ষা পরিচ্ছন্ন সহর বলিয়া খ্যাত। বাস্তবিকই সহরটি অতি পরিষ্কার। অত্যন্ত দরিদ্র পল্লীতেও ময়লা বা আবর্জনা দেখা যায় না। অনেক জায়গায় জলের মধ্যে pine logs পুতিয়া reclaim করা হইতেছে দেখিলাম। দৃশ্য বড়ই শৌতুকাবহ। এমৃষ্টারডামে আমার যে প্রদর্শক জুটিয়াছিলেন তিন অনেক দিন ভারতবর্ষে বাস করিয়াছিলেন। তিনি বলেন, সাধারণ লােক বিশ্বাস করে না যে, ভারতবর্ষে ব্যাস্ত্র সর্প ভিন্ন সত্য মনুষের বসবাস আছে। বেচারা রাত্রিতে জানালা বন্ধ করিয়া গুইতে পারেন না ও ঘরে অগ্নি সহ করিতে পারেন না বলিয়া তাঁহার স্বদেশবাসীরা তাঁহাকে বিদ্রুপ এমষ্টারডামে একটি প্রকাণ্ড জিয়ম আছে। তথায় হলাণ্ডের ৪ এষ্টারডাম। বিভিন্ন দেশের অধিবাসীদিগের পরিচ্ছদ সেই সেই প্রদেশের অধি- বাসীর মুও গঠিত করিয়া পরাইয়া রাখিয়াছে। দেখিতে বড় চমৎকার। তদ্ভিন্ন চিত্র, মৰ্ম্মর-মুৰ্ত্তি, অস্ত্রশস্ত্র, বৰ্ম প্রভৃতি অনেক রক্ষিত। চির অধিকাংশই রেমব্রান্ট বা তাহার অনুকারগণের অঙ্কিত। Holland seems to be as much under the spell of Rembrandt as Antwerp is of Rubens and Brussels of Van Dyck. এমষ্টারডাম যদিও নামে রাজধানী, রাজকীয় সমস্ত অফিস ও জাতীয় সভার অধিবেশনস্থান হাগে (La Haag বা Hague)। রাণীও অধিকাংশ সময় এমষ্টারডামে বাস করেন না।

কলােন।
শ
ভিকলোনের ( Eas-de-cologne) কৃপায় ৰ্ম্মাণ দেশ
কলােনের নাম আমাদের দেশে সুপরিচিত।
এমষ্টারডাম হইতে কােেন আসিতে পথে জানেনবুর্গ নামক স্থানে
জাণির আরম্ভ। এই স্থলেই Customs পরীক্ষা হয় ও ঘড়ি ৪০
মিনিট বাড়াইয়া লইতে হয়।
নিয়াছি, কলা অতি সুন্দর নগর। কিন্তু বিধি বাম ; আমি
ক্ষণ তথায় ছিলাম, ঐ গত ষ্টি হওয়ায় আমার নিকট কমান
মােটেই ভাল লা৫ে নাই ভিন্ন ভার্ষ ত্যাগের পর প্রেম কলােন
মশার উপদ্রবে গতিতে নিদ্রার ব্যাঘাত হইয়াছিল।
কলােনের কেথিড্রাল খুব প্রসিদ্ধ। ইহা আয়তনে প্রতি বৃহৎ ;
এতন্নি আর বড় কিছু দেখিলাম না। অবশ্য অতি গবা
(Illuminated windows) অনেক গুলি আছে; কিন্তু তাহাও খুব
ভাল বােধ হইল না।
ওয়ালহ, ও বিকাষ্ট নামীয় দুইটি ভদ্রলােকের প্রতিষ্ঠিত একটি
বৃহৎ যুক্তি মম আছে। বাহিরে হরে মৰ্ম্মর-ত্তি সন্নিবেশিত, ভিতরে
অবশ্য অনেক tিত্র। কিন্তু আমার নিকট প্রায় ছবিই অতি সাধারণ
বলিয়া মনে হইল। কেবল জাণির রাণী লুইস এবং ইংলতের রাজী
এলিজাবেথ মেরী কুইন অব কটসের বাচ্চা দস্তখত করিতেছেন এই
দুইটি চিত্র বিশেষ উল্লেখযােগ্য, বিশেষতঃ দ্বিতীয়টি। এলিজাবেথের
মুখে একাধারে ২, সাফল্য ও লোকদেখান বিবাদের ভাব অতি

এষ্টারডাম।
৮১
নিপুণতার সহিত চিত্রিত। চিত্রকরের নাম মনে নাই। কিন্তু তিনি
যে কৃতী সেবিষয়ে সন্দেহ নাই।
কলােনের Town Hallএর যে ঘরে চারি শত বর্ষ পূর্বে Hansa
League সম্পাদিত হইয়াছিল, সেই কক্ষে এখন মনিসিপালিটির
অধিবেশন হয়। দেওয়ালে গুপ্ত niches আছে। তাহার ভিতর
স্বর্ণরৌপ্যনির্মিত casket প্রভৃতি রহিয়াছে। রক্ষী বাহির করিয়া
দেখাইল।

হাইডলবার্গ। লতাপাদপপরিপূর্ণ পৰ্ব্ব পরিবেষ্টিত খরস্রোত নেকারের (Neckaar) উভয় কূলে অবস্থিত প্রসিদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়াক্কত হাইডলবার্গ বাস্তবিকই অতি মনােম স্থান। পরিশ্রান্ত জীবনের শোভাগে পৃথিবীর কোলা- হল হইতে অপমৃত হইয়া ভগবচ্চিন্তায় মনোনিবেশ করিয়া অবশিষ্ট জীবন ক্ষেপণ কারবার পক্ষে এমন উপযােগী স্থান অধিক দেখা বায় না। কলােন হইতে খাইডলবার্গ যাইতে রেলে প্রায় ৪ • ঘণ্টা সময় লাগে। এই পথটি অতি সুদৃশ্য। প্রায় সমস্ত ক্ষুণই রাইন নদীর তাঁর দিয়া ট্রেণ চলে। নদীর তীরেই পাহাড়, কোথাও বা দুই ধারেই পাহাড়, কোথাও জঙ্গল, পাহাড়ের গাত্র দ্রাক্ষাক্ষেত্রময় --- সুন্দর সুন্দর গাছ বড় চমৎকার দেখায় , আমি যখন গিয়াছিলাম তখন নভেম্বর মাস। গ্রীষ্মকালে যখন উভয় কুল ফুলপুষ্পে মণ্ডিত থাকে তখন এই নদীর উপর দিয়া ছোট ষ্টীমারে (pleasure steamcr) বেড়াইতে কি আনন্দ হয় তাহা সহজেই অনুমান করা যায়। নদীর মধ্যে এ স্থানে এক পাহাড়ের উপর একটা সেকেলে Castle দেখিলাম, স্বতঃই Griinin's Fairy Talesএর দৈত্যদের । astle এর কথা মনে হইল। জম্মাণিতে আমাদের দেশের ন্যায় রেলে চারি শ্রেণী--তবে মধ্যম শ্রেণী নাই, একেবারে খােলাখুলি ভাবে ১ম, ২য়, ৩য়, ও ৪র্থ। আর একটা উল্লেখযােগ্য ব্যাপার—রেলের কর্মচারীরা সন্ধ্যার পর , স্ব বক্ষে লণ্ঠন ঝুলান। রেলওয়ে ষ্টেশনগুলিও অতি বৃহৎ ও প্রকাণ্ড .

হইলবাগ লক্ষ্মী প্রিন্টিং ওয়ার্কস

No text on this page.

হাইডলবার্গ। ৮৩ ব্যাপার। ওয়েটিংরুমগুলি প্রায়ই মর্মরমণ্ডিত ও অতি সুন্দর কারু কাৰ্যময়। ইহা শুধু জৰ্ম্মাণিতে নহে, য়ুরােপের প্রায় সৰ্ব্বত্রই—বিশেষ এন্টওয়ার্পে ও এমৃষ্টারডামে রেলওয়ে ষ্টেশন দুইটিতে। সূর্যাস্তের অব্যবহিত পরে আমি যখন হাইডবার্গে পৌছিলাম তখন এক পশলা বৃষ্টি হইয়া ধরিত্রী স্নিগ্ধ হইয়াছে। হােটেলে জিনিস পত্র ফেলিয়াই একাকী বেড়াইতে বাহির হইলাম। সহরটি ক্ষুদ্র। হাটিতে হাঁটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌছিলাম। তথায় একজন অধ্যা- পকের সহিত সাক্ষাৎ হইল। তিনি অতি সদাশয় ; বললেন, “এখন রাত হইয়াছে আপনি কল দশটার পর আসিলে আপনাকে সমস্ত দেখাইয়া দিবে ; আমি বলিয়া রাখিব।” পরদিন প্রথমে সহরের পার্শ্বস্থ দুইটি পাহাড়ের উপর বেড়াতে যাইলাম। নদীর ধারেই পাহাড়। অল্প দূর পর্য্যন্ত কয়েকটি বাড়া আছে, উচ্চে কেবল গাছপালা। প্রায় শিখর পর্যন্ত গাড়িতে যাওয়া যায়। ঘােড়াগুলি কি ভাবে উপর পয্যন্ত উঠে দেখিলে চমৎকৃত হইতে হয়। সর্বোচ্চ শিখরে বিনমার্কের স্মৃতিস্তম্ভ অবস্থিত। এই স্থানে বৎসরে এক দিন খুব উৎসব হয়। পাহাড়ের গাত্রে এক পার্শ্বে একটি ছোট গৃহ। তথায় ছাত্ররা দ্বৈরথ যুদ্ধ (Duel) করেন। স্থানে ছাত্ৰীগের অনেকেরই মুখে ও মাথায় তরবারির আঘাতচিহ্ন। কাহারও বা আঘাত আ৩ অল্প দিনের মাথায় ও মুথে sticking plaster লাগান। ইহা একরূপ সম্মানের চিহ্ন বলিয়া পরগণত। কোন কোন ছাত্র কলেজে পাঠাভ্যাস কালেও plaster লাগাইয়া রহিয়াছেন দেখা যায়। পাহাড়ের উপর ও নদীর কুলে অতি সুন্দর বন অনেক দুর পর্যন্ত গিয়াছে। বাস্তবিক হাইড লবার্গে পাহাড়, নদী ও বনের অতি আশ্চৰ্য সমাবেশ। নদীর ধারে সহরের দিকে একটি পুরাতন দুর্গ দেখা যায়। তথায় য়ুরােপ-প্রমণ। দুইটি মদের পিপা আছে। একটিতে ৬০,০০০ বােতল ও অন্যটিতে ৩,••••• বােতল মদ ধরে। সিড়ি দিয়া বড় পিপাটির উপর উঠিলাম ; একটি প্রকাণ্ড ঘরের ন্যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসিতে এই দুর্গ হইতে funicular railway আছে। ঈফেল টাওয়ারের প্রসঙ্গে যেরূপ রেলের কথা বলিয়াছি ইহা তদ্রুপই।' এই রেলে বার্লিনবাসী মধুমাসষাপনকারী এক দম্পতির সহিত আলাপ হইল। তাহারা ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরাজী জানেন। শুনিয়াছি, এখন জাণির স্কুলে ইংরাজী ভাষা অবশ্য পাঠ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ দেখিবার জিনিষ হাদিগের কারাগৃহ। ছাত্ররা কোনও অপরাধ করিলে বা সহরের মধ্যে গােলমাল করিলে তাহাদিগকে এই কারাগারে বন্ধ রাখে। দুইটি ঘর নির্জন কারাবাসের জন্য নির্দিষ্ট ; দরজায় অনেক ছাত্র অপ- রাধীর ফটোগ্রাফ রক্ষিত। তাহার হয় ত এখন খুব গণ্য মান্য ব্যক্তি। আবার ঘরের ভিতর অনেক কবিতা প্রভৃতি লিখিয়া রাখিয়াছেন। একটির অনুবাদ এই “এ স্থানে আমি বেশ আছি। কারাগারের বাহিরে আমি অতি নগন্য ছিলাম। করাগারে আমাকে অনেক সুন্দরী ও মাঝিণ প্রমণকারী দেখিতে আসিতেছেন।” অনেকে আবার পেন্সিল বা কয়লা দিয়া দেওয়ালে অনেক ছবি আঁকিয়া রাখিয়াছেন। হাইডলবার্গে বিশেষ উল্লেখযােগ্য একটি গির্জা আছে। তাহার মাম Church of the Holy Ghost। একই ভজনালয়ে এক পার্শ্বে প্রােটেষ্টান্টরা এবং অপর পার্শ্বে রােমান ক্যাথলিকরা ভজনা করেন। মাঝে একটা সামান্য সৰু দেওয়াল ব্যবধান। এই উদারতা মুরােপে আর কোথাও দেখি নাই।

মুনিক জাণির অন্তর্গত ব্যাভেরিয়া রাজ্যের রাজধানী মুনিক খুব বড় সহর। ইহা ইজার নদীর তীরে অবস্থিত। কবি ক্যাম্বেলের Hohenlinden av foto afcatfenta, “Isır, rolling rapidly” দেখিলামও তাহাই। নদীট খুব ক্ষুদ্র ; আবার অ্যানিকের নিকট দুই অংশে বিভক্ত, কিন্তু অত্যন্ত দ্রুতগতি; বহু উপলে শীর্ণ। নদীর বক্ষ অস্তৃত—কিন্তু কি খববেগে হােত চলিয়াছে দেখিলে আশ্চৰ্য মনে হয়। মুনিকে দ্রষ্টব্য স্থান অনেক, বিশেষ এ স্থানে চিত্রশালার বাহুল্য। সহস্র সহস্র বহুমুল্য তৈলচিত্রে যুনিক বিভূষিত। এক ফ্লরেন্স তিঃ আর কোথাও এত চিত্র আছে বলিয়া মনে হয় না। বাস্তবিকই মুনিকের চিত্র-সম্পদ অতি মহার্ঘ্য ও অনন্যসাধারণ। এত চিত্রের মধ্যে কোনটা ছাড়িয়া কোটা দেখি অল্পসময়ক্ষেপণকারী যাত্রীর পক্ষে তাহা স্থির করা দুষ্কর; ঠিক “বাঁশবনে ডােম কাণ।” এই জন্যই বােধ হয় আমার নিকট ম্যাক্সিমিলিনিউম (Maximilianeum) নামক মাত্র ত্রিশখানি ছবিযুক্ত এক ট গ্যালারি সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট মনে হইয়াছিল। সে কথা পরে বলিব। মুনিকে আসিলে প্রথমেই এই স্থানের লােকের পােষাক দর্শকের দৃষ্টি আকৃষ্ট করে। অনেক রকম পোষাক এ দেশে দেখা যায়। 'ব্যাভেরিয় কৃষকের, পুরুষ ও রমণী উভয়েরই, পরিচ্ছদ বড় সু- picturesque। প্রায় লোকেরই টুপিতে হয় হরিণের লেজ না হয় * .

অনেক ৮৬ য়ুরােপ-ভ্রমণ। পাখীর পালক প্রভৃতি বসান। আর কত রকম বেরকমের আচ্ছা-- নবাস ( cloak)! স্ত্রীলােকদিকের মুখ লাল লাল ফুলা ফুলা; কিন্তু সৌন্দৰ্য্য বিশেষ আছে বলিয়া বােধ হইল না। বাস্তবিক সমস্ত য়ুরােপের মধ্যে এক প্যারিসের মহিলাদিগের মুকেমনীয়তা ও লবণ। কিয়ৎপরিমাণে বর্তমান, আর কোথাও তাহা চক্ষুতে পড়িল না। নিশ্চয়ই আমার নয়নের দোষ। মনিকে রাজারাজড়ার অত্যন্ত ছড়াছড়ি। অনেক বাড়ীর সম্মুখে সান্ত্রি দণ্ডায়মান। প্রশ্ন করিলে জানা যায়, অমুক প্রিন্সের বাড়ী। রাজাই আমাদের দেশের রাজাদিগের ন্যায় ভূমিশন্য। দেশের প্রকৃত অধিপতি উন্মাদ, তাঁহার পিতৃব্য Regent বা রাজপ্রতিভূ, তিনিই কাৰ্যতঃ রাজা। মানিক আল্পস পর্বতের অতি নিকটে অবস্থিত। বৈকালে বেড়া- ইতে যাইয়া তুষারমণ্ডিত পাহাড়ের সুস্পষ্ট দৃশ্য দেখিতে পাওয়া গেল। প্রদর্শক বলিল, পাহাড় যখন এত স্পষ্ট ‘দখা যাইতেছে, কল্য নিশ্চয় বৃষ্টি হইবে। ঘটিলও তাহাই। মুনিকের দ্রষ্টব্য স্থানগুলির মধ্যে (১) ও (২) পিনকোথেকদ্বয় (৩) ম্যাক্সিমিলিনিউম (৪) মজিয়ম (৫) ব্যাভিরিয়ার মূর্তি, ও Ha}} of Tame এবং (৬) বিয়র গৃহ। এই কয়টির মাত্র সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিব। এতদ্ভিন্ন বিশেষ উল্লেখযােগ্য আর একটি জিনিষ আছে ; Rathaus বা মনিসিপাল আপিসের ঘড়ি। বেলা ১১টার সময় এই ঘড়িতে প্রথমে কতকগুলি পূর্ণাবয়ব স্ত্রীপুরুষ ত শ্বসাদি প্রভৃতি নৃত্য ও যুদ্ধ প্রদর্শন করে, তাহার পর অতি সুন্দর ভাবে Chimes বাজে, সর্বশেষে একটি কুকুট বহির্গত হইয়া তিন বার শব্দ করে। সৰ্ব্ব সমেত প্রায় ১৫ মিনিট এই সব চলে। প্রত্যহ ইহার জন্য লােকের ভিড় হয়। খুব অদ্ভুত! (১) পুরাতন পিনাকোথেক-পিনাকোথেক শব্দের অর্থ চিত্র- .

মুনিক। ৮৭ ভাণ্ডার। এই পুরাতন ভাণ্ডার ১৮২৬ খৃষ্টাব্দে নির্মিত। মর্মর মূর্তি ব্যতীত এ স্থানে প্রায় দুই সহস্র সুন্দর সুন্দর চিত্র আছে। ফেল, বটিচেলি, কেনেজিও, রুবে, ভ্যানডাইক, রেমব্রান্ট, ডুরে, হােল- ইন, সিয়ান প্রভূত প্রসিদ্ধ সমস্ত চিত্রকরেরই অঙ্কিত চিত্র এ স্থানে দেখা যায়। এতদ্ভিন্ন সর্বনিম্নতলে বহু পুরাতন মৃৎপাত্র (Old Vases) রক্ষিত আছে। বৰ্ণনা করিয়া সে চিত্র পাঠকের সম্মুখে উপস্থিত করা আমার সাধ্যাতীত। (২ নুতন পিনাকোথেক—এ স্থানে আধুনিক চিত্রকদিগের চিত্র সংরক্ষিত। চিত্রে লিখিত বিষয়গুলি অধিকাংশই আধুনিক য়ুরােপীয় ইতিহাসবর্ণিত। এতদ্ভিন্ন জাণির প্রধান প্রধান ব্যক্তির তৈল চিত্র এবং মানিকের ও পার্শ্ববর্তী স্থানের অনেক চিত্র আছে। (৩) ম্যাক্সিমিলিনিউম-সহরের ঠিক বহির্ভাগে এক উচ্চ ভূখণ্ডের উপর এই গৃহ দণ্ডায়মান। দুই পার্শ্বের অর্ধচন্দ্রাকার পথে উঠিয়া আসিতে হয়। দুইটি প্রকাণ্ড হল ও দুইটি বারাণ্ডা। হল দুইটিতে মলি ত্রিশ খানি তৈলচিত্র। আদম ইভের স্বর্গচ্যুতি হইতে আরম্ভ করিয়া জর্জ ওয়াশিংটনের জীবন ও লাইপজিগের যুদ্ধ পর্যন্ত মান- বেতিহাসের ত্রিশটি প্রধান প্রধান ঘটনা এই চিত্র কয়টিতে লিখিত। অবশ্য ইতিহাস বলাতে য়ুরােপের ইতিহাসই বুঝিতে হইবে। এসিয়ার ইতিহাসবিষয়ক চিত্রের মধ্যে কেবল মহম্মদের মক্কাভিগমন এবং হরুণ- অল-বৃসিদের চিত্র দেখা যায়। বারাণ্ডা দুইটিতে জগতের প্রধান প্রধান প্রায় দুই শত লােকের চিত্র ও মৰ্ম্মৰৱচিত আবক্ষ মূৰ্ত্তি আছে। বাস্ত- বিক য়ুরােপের চিত্রশালার মধ্যে এই গ্যালারিটিই আমার সৰ্ব্বাপেক্ষা সুন্দর বােধ হইয়াছিল। নভেম্বর মাসে ইহা বন্ধ থাকে, তাই বুক্ষীকে কিঞ্চিৎ উৎকোচ দিয়া দেখিতে হইয়াছিল। (৪) শ্যাশনাল মুজিয়ম-এই স্থানে আমাদের কলিকাতার জিয়- • মুখােপভ্রমণ। মেরই মত প্রাগৈতিহাসিক ও ঐতিহাসিক যুগের অনেক অস্ত্রশস্ত্র, বাসন, পুস্তক, মৰ্ম্মর-মূৰ্ত্তি, প্রভৃতি রক্ষিত; অবশ্য অনেক চিত্রও আছে। ততিম ব্যাভেরিয়াবাসীদিগের পুরাতন ও আধুনিক বসন প্রতিও Ceramic শিল্পের অনেক নিদর্শন রক্ষিত আছে। (৫) ব্যাভেরিয়ার মূর্তি এবং যশােমন্দির একটি প্রান্তরের এক পার্শ্বে ৬২ ফুট উচ্চ প্রকাণ্ড এক ব্রোঞ্জ-নির্মিত স্বীমুর্তি ফুলের মালা হাতে লইয়া দণ্ডায়মান। ইহাই ব্যাভিরিয়া'অধিষ্ঠাত্রী দেবীর মূর্তি। একটি দরদালান (Colonnade); তথায় ব্যাভেরিয়ার প্রসিদ্ধ ব্যক্তি দিগের আবক্ষ মূর্তি-ইহাই ব্যাভেরিয় শােমন্দির। আমি ত অনেকেরই নাম শত ছিলাম না, কেবল শেলিঙ (Schelling) এবং বিটার (lean Paul Richter) এই দুইটি পরিচিত নাম দেখিলাম। (৬) বিষ্ণুর গৃহ {Hofbrauhaus) -আমরা যেরূপ জল থাই, জম্মাণির লােক তাহা অপেক্ষাও অবাধে ও ঘন ঘন বিয়র পান করে। বিয়রই জৰ্ম্মাণির National drink। বিয়র সর্বত্রই প্রস্তুত হয়, তবে নিকের বিয়র খুব প্রসিদ্ধ। এই বিতল গৃহটি গভর্ণমেন্টের প্রস্তুত। নিয়ে দুইটি লম্বা হল ; কতকগুলি টেবল ও তাহার চতুঃপার্শে বেঞ্চ। তাহাতে নানা পরিচ্ছদ পরিহিত শত শত স্ত্রীপুরুষ বিষপান ও ধূম- পান করিতেছে। উপরেও ঠিক ঐরূপ, তবে তথায় টেবল গুলি ছােট ছােট ও বেঞ্চের পরিবর্তে চেয়ার রক্ষিত। তথায় অপেক্ষাকৃত উচ্চ শ্রেণীর লােক আইসেন। নিয়ে যে বিয়রের দাম এক বােতল তিন আনা, তাহাই উপরে ছয় আনা মূল্যে বিক্রীত হয়। এ স্থানটি সহরের প্রায় মধ্যস্থলে অবস্থিত ও সৰ্ব্বদাই খুব সরগরম। মুনিকে একটি প্রকাণ্ড পার্ক আছে। তাহার নাম English Garden। এ নাম হইল বুঝিতে পারিলাম না। প্রদর্শক বলিলেন একজন ।

৮
মুনিক।
ইংরা এই উদ্যান রচনা করিয়াছিলেন, তাই এই নাম; কি ঘুরিতে
ঘুরিতে স্থপতির সৃতিতে দেখিলাম, তিনি মার্কিবাসী। তবে এ
নাম কেন ?

নয়হাউসেন । বেলা দশটার সময় যখন মুনিক হইতে যাত্রা করি, তখন আকাশ প্রায় পরিষ্কার, রৌদ্র হাসিতেছে। মাত্র মিনিট দশেক পরেই আকাশ স্বেরত হই। রেলের কাচমণ্ডিত জানালার ভিতর দিয়া পথে দেখি ম, • ড়িয়া রহিয়াছ । চৰ্দক নিরীক্ষণ করিয়া কোথাও শিমুল গাছ দেখিতে পাইলাম না। সহযাত্রী কেহই ইংরাজী বিশ ছিলেন না, তিতাসও করিতে পারি । পরে জানলাতেও সেইরূপ (দখিয়া আমায় মব জি ল, এ তুলা নাহ কারপাত! দেখিতে থিতে সব ধলাকার, অতি চমৎকার দৃশ্য। তুষারধবল কথা পূৰ্ব্বে অনেক স্থানে পাঠ করিয়াছিলাম, কিন্তু ভাৰহণ ব নিতে পারি নাই। আজ বুবিলমা, তুষারপুৰ ল এ তে এ দুইটিতে কত পার্থক্য। খােকা বাড়ীর উপর বরফ ওড়িয়া ঢাল ভাগ জমা হইতেছে, দেখিলে মনে হয় যেন গােল চুণ ঢালি চুণকাম করিতেছে। বেলা প্রায় দুইটা সময় Lalse if (nstance নামক হ্রদের ধাব উপনীত হইলাম। চতুর্দিকে পাহাড় ; মধ্যে প্রকাণ্ড হ্রদ। পাহাড়ের অঙ্কে কানে স্থানে ছোট ছোট গ্রাম, সে আর এক সুন্দর দৃশ্য। ক্ষুদ্র ঈম- কেটে হ্রদের অপর পারে আছিলাম। এখন আমি এখন আমি সুইটজারল্যাও { দল। এক রাস্তার ধারে বােট হইতে নামাইয়া দিল। সেই স্থানেই (ণ আসিবে। কিছুক্ষণ পরে ট্রেণ আসিয়া দাঁড়াইল। প্রায় ট্রামে মত, তবে অনেক গুলি গাডি। প্রত্যেক গাড়ির মধ্যস্থল দিয়া যাত যাতে গু, দুই পার্শ্বে বেতমােড়া বেঞ্চ, জিনিষ পত্র গাড়িতে লইবার:

নয়হাউসেন। নিয়ম নাই। প্রত্যেক বেঞ্চে মাত্র দুইজনের বসিবার স্থান। কেবল প্রথম শ্রেণীর গড়িতে বেঞ্চগুলি গদি-আঁটা। দুইটিমাত্র ষ্টেশন পরে আমাকে গাড়ি বদল করিতে হইল। নুতন গাড়িতে উঠিয়া দেখি, অত্যন্ত স্থানাভাব। দুঃখের বিষয় আমার দ্বিতীয় শ্রেণীর টিকিট ছিল, সে শ্রেণী পূৰ্ব্ব হইতে পূর্ণ হইয়া আসিয়াছে। আমার সঙ্গে দুইতিনটি ব্যাগ, সে দেশের ভাষা জানি না ---সময়ের অল্পনিবন্ধন ব্রেকে দিতে পারিলাম না, কার্ষেই মােট লইয়া একখানা গাড়িতে কণ্ডাক্টারের নিষেধ অগ্রাহ্য করিয়া গিয়া উঠিলাম। মধ্যে যে সামান্য সরু রাস্তা তাহাই অবরােধ করিয়া অবাপে দাড়াইয়া রহিলাম ; যাত্রীরা কলরব করিতে লাগিল, গাড বকাবকি করিতে আরম্ভ করিল; আমি ভাষা বুঝি না, প্রক্ষেপ না করিয়া দাঁড়াইয়া রহিলাম। বেগতিক দেখিয়া কণ্ডাকটার আমাকে অঙ্গুলিসঙ্কেতে ডাকিয়া তাহার সহিত যাইতে বলিল। তখন গাড়ি চলিতেছে ; খুব জোরে বরফ পডিতে সুরু করি- আছে। গাড় আমাকে প্রথম শ্রেণীর কক্ষে লইয়া গেল। তথায় দেখি, একজন ইংবাঙ্গ। তাহাকে পাইয়া বড়ই আনন্দ হইল। তবু কিছু- ক্ষণ কথা বলা যাবে। তিনিও আমাকে পাইয়া আদিত। সেই বিদেশে আমরা যেন একদেশবাসী। গাড' তাঁহাকে বলিয়া গেল, আমি যেন কিছুক্ষণ পরে স্থান হইলে দ্বিতীয় শ্রেণীতে যাই। তথাস্তু বলিয়া দুইজ্জনে গল্প আরম্ভ করিলাম। প্রায় ঘণ্টখানেক পরে সহযাত্রী নামিয়া গেলেন, এ সময়টা বড় সুখে কাটিল। দুই ধারে কাল ও নীল পাহাড়, তাহার উপরে বরফ জমিয়া রহিয়াছে, কোথাও কোথাও খামল তরুলতা, কোথাও বা হ্রদ দেখা যাইতেছে, চারিপাশ্বে ধবল হিমানী-বড় সুন্দর দৃশ্য। অল্পক্ষণ পরে যখন সন্ধ্যা হইল, পাহাড়ের গাত্রে বাড়ীতে বাড়ীতে আলাে জ্বলিয়া দিল তখন নয়নসমক্ষে অতি অপূর্ব দৃশ্য প্রতিভাত হইল। সন্ধ্যার পরে সুইজারল্যাণ্ডের রাজধানী য়ুরােপ-ভ্রমণ। জিওরি (Zurich) এ পৌঁছিলাম। এ স্থানে অর্ধ ঘণ্টা অবস্থানের পর পুনরায় অন্য টেণে যাত্রা করিলাম। তখন তুষারপাত বন্ধ হইয়াছে; কিন্তু বেশ বৃষ্টি পড়িতেছে। রাত্রি অত্যন্ত অন্ধকার, পথে কিছুই দেখা গেল না। তবে ষ্টেশনে আমাদের দেশে পরিচিত রে পর ঘণ্টার শব্দ শুনিলাম। য়ুরােপে আর কোথাও রেলে ঘণ্টা বাজান শুনি নাই। প্রায় এক ঘণ্টা পরে নয়হাউসেনে পৌছিলাম। এটি সুইজারল্যাণ্ডের উত্তর সীমায় একটি অতি ক্ষুদ্র গ্রাম। বিলাতে আসিবার পূর্বে ইহার নাম শুনি নাই। আমি যখন লণ্ডনে বসিয়া য়ুরােপ ভ্রমণের ব্যবস্থা করিতেছিলাম, তখন আমাদের হাইকোর্টের জজ বন্ধুবর মিষ্টার সর- ফুদ্দিন পরামর্শ দেন, নয়হাউসেন না দেখিয়া যাইও না। এ স্থানে রাইন নদীর একটি প্রপাত আছে। নদী এ স্থানে মাত্র ১২৫ গজ চওড়া, কিন্তু খুব খরস্রোতা। কতকগুলি পাতরের গাৱে আহত হইয়া জল প্রায় একশত ফুট উপর হইতে লাফাইয়া পড়িতেছে। অতি গম্ভীর দৃশ্য। চতুর্দিকে জল আঘাতে চূর্ণ হইয়া শত ধারায় উঠিয়া ছড়াইয়া পড়িতেছে । প্রপাতের শব্দও খুব গুরু গম্ভীর। ঠিক মধ্যস্থলে একটি অপেক্ষাকৃত উচ্চ চওড়া পাত আছে। ক্ষুদ্র নৌকায় প্রাণ হাতে করিয়া সেই প্রপাতের ভিতর দিয়া তাহার উপর উঠিয়া তথায় চা-পান করা একটা অবশ্যকর্তব্য কাৰ্য। বাতাসে জলের কণা রেনুর ন্যায় অঙ্গে পড়ে, কাযেই তথায় যাইতে হইলে ওয়াটার প্রুফ গাৱে দিয়া যাইতে হয়। গ্রীষ্মকালে চতুর্দিক আলােক- মালায় সুসজ্জিত করে, তখন নিশ্চয়ই বড় সুন্দর দেখতে হয়। আমি শীতকালে গিয়াছিলাম, সে সব কিছু দেখি নাই এই নয়হাউসেনে বড় কৌতুক হইয়াছিল। বলা উচিত যে, সুইট- জারল্যাণ্ডে সৰ্ব্বত্রই হােটেল, অন্য দেশবাসীরা বলেন, সুইজারল্যাণ্ড বলিয়া হােটেলল্যাণ্ড বলা উচিত এবং ইহার জাতীয় বীমের নাম রাইন-প্রপাত। লক্ষ্মী প্রিন্টিং ওয়ার্ক

No text on this page.

নয়হাউসেন। William Tell ( উইলিয়ম টেল) না হইয়া উইলিয়ম হােটেল হওয়া উচিত। সে যাহা হউক বড় বড় কয়েকটি স্থান ভিন্ন অন্যত্র নির্দিষ্ট সময় ( Season আছে। বৎসরের মধ্যে সেই কয় মাস এই সব স্থান আমােদ আহাদে ও যাত্রীদিগের কলহাস্যে মুখরিত, অন্য সময়ে প্রায় সমস্ত হােটো বন্ধ থাকে, এক আধটা যাহাও বা খােলা থাকে সে সকলে দাসদাসীর একান্ত অভাব। আমি যখন নয়হাউসেনে পৌছিলাম তখন সে স্থানের Season শেষ হইয়া গিয়াছে। বে হােটেলে যাইলাম, তথায় অন্য অতিথি কেহই ছিলেন না; কর্তৃপক্ষের মধ্যে দুইজন রমণী ও একটি দাসী ; তাহারা কেহই ইংরাজী জানিতেন না, আমারও ইংরাজী ভিন্ন অন্য য়ুরােপীয় ভাষা জানা নাই। কাষেই কথাবার্তা আকার ইঙ্গিতেই চলিল। যখন ভাষার নিতান্ত দরকার, তথন বাঙ্গালার ব্যবহার করিতে লাগিলাম, কারণ তাঁহাদের পক্ষে ইংরাজী ও বাঙ্গালা দুইই সমান। শ্রোত্রীবর্গ হাসিয়া কুট পাট। আমার জানিবার প্রয়ােজন হইল যে, ভারতবর্ষের ডাক কবে যায়। ইহা আর ত ইঙ্গিতে বুঝান যায় না! কাগজে লিখিয়া অনেক কষ্টে একজনকে বুঝাইলাম যে, কাগজখানা ডাক ঘরে পাঠান প্রয়ােজন। দেড় ঘণ্টা পরে অনেক চেষ্টার পর পােষ্ট-মাষ্টার একজন ইংরাজী- নবিশকে বাহির করিয়া আমার চিঠি পড়াইয়া জবাব লিখিয়া দিলেন। এ ভােগ আর কোথাও ভুগিতে হয় নাই। অন্য সব স্থানেই ইংরাজী- জানা লােক হােটেলে পাইয়াছিলাম। পরদিন বৈকালে লুসার্ণ যাত্ৰা করিলাম। সুইজারল্যাণ্ডে কোনও মাল বিনা মাশুলে রেলে লইতে দেয় না। ছােট ব্যাগেরও মাশুল দিতে হয়। অন্য দেশের তুলনায় মাশুলও খুব বেশী। রেল জিওরিক পৰ্য্যন্ত প্রায় পাহাড়ের উপর দিয়া গিয়াছে। পথে পায় লি মাইল একটি আঁকা বাঁকা নদীর ধারে ধারে সর্পাকৃতি ১৫ য়ুরােপ-ভ্রমণ। লাইন। দেখিলাম, নদীর একেবারে কিনারা পৰ্য্যন্ত কৰ্ষিত, কেবল দুই পাহাড় মাত্র পাইনাদি বৃক্ষে শােভিত। রেলের দুই পার্শ্বে পৰ্বত- গাত্র তৃণমণ্ডিত ; উচ্চ শিখরগুলি পাদপহীন ও তুষারমণ্ডিত। পাইন গাছগুলিতে সুন্দর গন্ধ পাওয়া যায়। পথে সমস্ত দিন সূৰ্য্যদেব বৃষ্টির সহিত লুকোচুরি খেলিতেছিলেন, তাই দুই ধারে দৃশ্য আরও সুন্দর দেখাইতেছিল। পথে চাম { (Charm ) নামক গ্রাম দেখা গেল। তথায় “গােয়- লিনী মার্কা গাঢ় দুগ্ধের” (Milkmaid Brand Condensed Milk) কারখানা। গ্রামটিতে ঐ কারখানার অধিবাসী ব্যতীত আর বিশেষ কোন অধিবাসী আছে বলিয়া মনে হইল না। তবে একটি গির্জা দেখিলাম, তার চূড়া ব্রোঞ্জমণ্ডিত। সন্ধ্যার প্রাক্কালে ৪০ টাৰ সময় লুসার্ণ পৌছিলাম।

No text on this page.

ন
BE
লুসার্ন
লক্ষ্মী প্রিন্টিং ওয়ার্কস।

লুসার্ন সুইজারল্যাণ্ড কতিপয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রদেশে বিভক্ত , প্রত্যেকটি বিভিন্ন ভাবে শাসিত; আবার সবগুলি মিলিয়া এই সমগ্র দেশের প্রজাসভা গঠিত। ফলতঃ গোটাকয়েক স্কুল বিষয় (শুল্ক সৈন্যবল প্রভৃতি। ভিন্ন অন্যান্য বিষয়ে এই সব প্রদেশ স্বস্ব প্রধান। এই প্রদেশগুলি ক্যান্টন নামে অভিহিত। চারিটি ক্যান্টনের মধ্যে স্থিত বিশাল হ্রদের -যাহার ইংরাজী নাম লুসার্ণ হ্রদ এবং দেশীয় নাম vারি ক্যান্টনের হ্রদ–উপর লুসার্ণ নগর অতি মনোরম । হ্রদ হইতে খরস্রোতা বয়েস্ নামক নদী নির্গত হইয়াছে। এই নদীর উৎপত্তিস্থানে ও তার দুই পার্শ্বে এই নগর। দুইটজারল্যাণ্ডের প্রায় সকল হ্রদই অতি সুন্দর; কিন্তু বােব – হয় লুসাণ হ্রদ সৰ্ব্বাপেক্ষা সুন্দর। হা প্রান ২৪ ২৫ মা ল দৗধ ও ১ কি ১ • মাইল প্রশস্ত ; জলের বর্ণ গাঢ় হরিৎ, কিন্তু অতি পরিষ্কার, নৌকার উপর হইতে ৩০s • ফুট নিয়ে মৎস্য সপ্ত রণ করিয়া বেড়াইতেছে বেশ স্পষ্ট দেখা যায়। তাহার পর আবার চতুঃপাশে অতি উচ্চ গিরিশৃঙ্গ সকল দণ্ডায়মান; কেহ বা { পিলটুস ) একেবারে বৃক্ষতৃণহীন-তুষারমণ্ডিত, কেহ বা (রিগি) বৃক্ষছায়া- সমাকুল এবং হােটেলপরিশােভিত। মধ্যে মধ্যে দুই একটি দ্বীপ রহিয়াছে ; একটি দ্বীপের উপর পুরাতন, দুর্গের ধ্বংসাবশেষ অবস্থিত। বাস্তবিকই এই হ্রদ নয়নমননামুগ্ধকর। লুসার্ণ ষ্টেশনে নামিলেই সম্মুখে হ্রদ দৃষ্টিগােচর হয়। হ্রদের ১৬ য়ুরােপ-ভ্রমণ। পার্শ্বেই প্রস্তরনির্শিত রয়েসের প্রকাও সেতু। অপর কুলে হ্রদের তীর দিয়া প্রায় ১০০ মাইল দীর্ঘ পথ ; দুই পার্শ্বে বাদামগাছ। এই পথ বড় মনােরম। পথের অপর পার্শ্বে অতি প্রশস্ত রাস্তা--তাহাতে নানারূপ যানাদি চলিতেছে এবং রাস্তার উপর অনেক সুন্দর সুন্দর হ ও বাগান দেখা যাইতেছে। এক যাইতেছে। এক প্লটে এইরূপ হরিবর্ণ প্লজ এইরূপ হরিৎবণ হ্রদ অপর ধারে এইরূপ বাড়ী ও বাগান দেখিতে কিরূপ সুন্দর তাহা সহজেই অনুমেয়। এই বাটীগুলির অধিকাংশই হােটেল এবং খেলাধুলার আড়া ক্লাবগৃহ (Kursaal) প্রভৃতি। পূৰ্ব্বকথিত সেতুর ঠিক মধ্যভাগে একটি প্রকাণ্ড তাপমান যন্ত্র বসান। এই সেতু ভিন্ন রয়েসের উপর আরও ৫/৬টি সেতু আছে। তাহার মধ্যে দুইটি কাষ্ঠনিৰ্ম্মিত, এবং আচ্ছাদিত। এ দুইটি সেতুর ভিতরের দিকে গাত্রে ও ছাতে নানারূপ চিত্র অঙ্কিত। যদিও চিত্রগুলি এখন মলিন হইয়া আসিয়াছে, তথাপি দেখিতে মন্দ নহে। প্রথম কাষ্ঠ-সেতুর মধ্যস্থলে জলমধ্যে একটি কাষ্ঠমর গােলঘর দেখা যায়। এই ঘরে নাকি নিসিপাল কাগজপত্র সংরক্ষিত। অতি মনােরম প্রাকৃতিক সৌন্দৰ্য্য ভিন্ন লুসার্ণে দেখিবার জিনিষ দুইটি : (১) সিংহমূর্তি—সুইস সৈন্য প্রাচীন ফরাসী রাজাদিগের শরীর- বশী ছিল। ফ্রান্সের রাষ্ট্রবিপ্লবের সময় প্রায় ৮০০ প্রভুভক্ত সুইস সৈন্য রাজাকে রক্ষা করিতে গিয়া হত হয়েন। তাহাদের স্মরণার্থ এই মনুমেন্ট। একটি পাহাড়ের গাত্রে গুহা নিৰ্ম্মিত, সেই গুহায় প্রায় ত্রিশ ফুট দীর্ঘ এক সিংহ শলবিদ্ধ অবস্থায় পতিত, হস্তপদদ্বারা পদ্ম (ফ্রান্সের রাজী) সংরক্ষণে সচেষ্ট। এই প্রকাণ্ড মূৰ্ত্তি ঐ পাহাড় হইতেই ক্ষোদিত, অন্যত্র গঠিত হইয়া এই স্থানে স্থাপিত নহে। (২) গ্লেসিয়ার গার্ডেন—এই স্থানে বহু পুরাতনকালে গ্নেসিয়ার

4.127
ন
লুসার্ণ
লক্ষ্মী প্রিন্টিং ওয়র্কস।

No text on this page.

সুসাণ। বা তুষারবাহ হইতে কিরূপে পাতর ঘসিয়া শিলা বাহির হইত তাহা দেখা যায়। কোনও প্রত্নতত্ত্ববিৎ এই স্থানে ৩টি Glacier mills আবিষ্কার করিয়াছেন, তাহাতে এখন জল দিয়া তুষারবার স্বরূপ দেখান হয়। তদ্ভিন্ন এই স্থলে আল্পস পর্বতের সর্ববিধ প্রাণী ও বৃক্ষাদি দেখান হয়, পশুপক্ষীগুলি অবশ্য সবই মৃত—stuffed; তদ্ভিন্ন আল্পসের উপর যাত্রীদিগের জন্য যে সকল কুটীর নির্মিত আছে । chalet) তাহারও একটি এই স্থানে রহিয়াছে। সেই চতুর্দিকে প্রায় উন্মুক্ত—সামান্য তৃণমণ্ডিত একটি সামান্য কুঁড়ে দেখিয়া সন্ধ্যাগমশঙ্কাকুল , পথহারা পথিকের মনে কি সুখেই উদয় হয় ! এইরূপ কুটীর পাহাড়ের উপর অনেক স্থানেই আছে ; থাকিলে পাহাড়ে রাত্রিবাস করিলে সে রাত্রির আর অবসান নাই। লুসার্ণ হইতে এক দিন গিরিশৃঙ্গে গিয়াছিলাম। হ্রদের উপর দিয়া প্রায় এক ঘণ্টা এক ছােট ষ্টীমারে যাইয়া ভিউ (Vitznau) নামক স্থানে নামিতে হয়। এই স্থান হইতে পার্বত্য Rick and Pinion রেলওয়ে। ব্যাপারটা চমৎকার। সব রেপথে যেমন দুইখানা রেল পাতা থাকে তাহা ত আছেই, তদ্ভিন্ন মধ্যে আর একখানা রেল, তাহাতে কাটা কাটা মত ধাঁজ আছে। গাড়ির সাধারণ চাকা ভিন্ন মধ্যে আর একখানা ঘােট চাকা; সেই ছােট চাকাখানা মাঝের রেলের কাটায় জড়াইয়া জড়াইয়া উঠে, পাছে গড়াইয়া পড়ে। একখানামাত্র গাড়ি, দুইটা কামরা, ২৪ জনের স্থান হয়। এঞ্জিন পশ্চাতে থাকে, গাড়িখানা ঠেলিয়া উঠে। সম্মুখে একজন লােক কোদালী হস্তে বসিয়া পথের বরফ কাটিতে লাইন অত্যন্ত খাড়া, Gradient প্রায় I in 4. গাড়িতে বুসিতে কিছু কষ্ট হয়। এইরূপ ভাবে প্রায় সার্ক চারি কপতে যায়।

১৮ য়ুরােপ-ভ্রমণ। শেষের ১০ মাইল একেবারে একেবারে বরফে মাইল যাইতে হয়। ভিউ ছাড়িয়া একটু উঠিলেই বামে লুসার্ণ হ্রদের শােভা নয়নগােচর হয়। প্রত্যেক সেকেণ্ডে হ্রদ সরিয়া যাইতেছে ও নূতন নূতন সৌন্দৰ্য দৃষ্ট হইতেছে! ভিউ ছাড়িয়া মিনিট পনের পরেই দেখি, লাইনের ধারে ধারে গাঁজলার মত কি রহিয়াছে, জমে বুঝিলাম ইহাই তুষার। শৃঙ্গোপরি যখন উঠিলাম তখন দেখি, চতুর্দিক একেবারে তুষারমণ্ডিত। প্রথমে হোটেলে ঢুকিয়া কিছু খাইয়া লইলাম, তাহার পর হােটেল হইতে পার্বত্য যষ্টি { Ajpenstock) সংগ্রহ করিয়া স্থানদর্শনে বাহির হইলাম। হােটেল শৃঙ্গের উপর অবস্থিত, তবে একেবারে সর্বোচ্চ স্থানে নহে। সর্বোচ্চ স্থানে একটি কাষ্ঠের মঞ্চ নিৰ্ম্মিত ; তাহার উপর দাঁড়াইয়া বিখ্যাত Panorama দেখিতে হয়। যখন হােটেল হইতে বহির্গত হইলাম তখন ঝুপ ঝুপ করিয়া বরফ পড়িতেছে ; ভাবিয়াম, এত চেষ্টা বৃথা হইল, আমার ভাগ্যে Panorama দর্শন নাই। কিন্তু জগদীশ্বরের কৃপায় কিছুক্ষণ পরেই বরফ পড়া থামিল ও কুঁজঝটিকা কাটিয়া গেল। প্রায় কুড়ি মিনিট আকাশ বেশ পরিষ্কার রহিল। চতুর্দিকে তুষারাবৃত পর্বতশ্রেণী, নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন হ্রদ, কোথাও বা শস্যক্ষেত্র, কোথাও বা শুধু গাছপালা, কোথাও বা পিপীলিকাশ্রেণীবৎ রেলগাড়ি চলিতেছে । কোনও পাহাড় হয় ত একেবারে তৃণহীন, শুধু বরফ, কোনও পাহাড়বা বৃক্ষলতাসুশােভিত অথচ বরফমণ্ডিত। চারি শত মাইলব্যাপী এই দৃশ্যের সম্যক বর্ণনা করা বা সে চিত্র 'চক্ষুর সম্মুখে প্রতিফলিত করা চিত্রশিল্পীর পক্ষেও সহজসাধ্য নহে, আমি ত কোন্ ছার। এই স্বর্গীয় দৃশ্য দেখিলে অতি পাযখেরও মন ভক্তিরসাপ্লত হয়। মিনিট কতক পরে খুব বক্ষ পড়িতে লুসার্ণ। লাগিল।' আমি Alpestock এর ফলা দিয়া সেই মঞ্চের উপর N. K. B. ক্ষোদিত করিয়া ঘুরিয়া বেড়াইতে আরম্ভ করিলাম। হােটেল অতি নিকটে ; পথ হারাইবার কোনই ভয় নাই; আর একটু গা ঝাড়া দিলেই বরফ সব পড়িয়া যায়, ঠাণ্ডা লাগিবার কোনও আশঙ্কা নাই। বরফ লইয়া পিণ্ড— Snowball করা প্রভৃতি যাহা সব পড়া ছিল, খােদ মিটান গেল। কিছুক্ষণ পরে হােটলে ফিরিলাম। তথা হইতে বাটীতে ও বন্ধুবান্ধবদিগকে Picture Postcaord পাঠান গেল । যখন গাড়ির সময় হইল তখন বরফ আরও বেগে পড়িতেছে ও আকাশ প্রায় কুজঝটিকামণ্ডিত। যদিও হােটেলের নিম্নেই রেলের ষ্টেশন কুটীরমাত্র) এবং পথও সরল তবুও সেই সময়ে অনেকটা ঘুরিতে হইয়াছিল। পুনরায় সেই পথে লুসার্ণে ফিরিয়া আসিলাম। বলিতে ভুলিয়াছি, হ্রদের ধারে এক স্থানে এক কাষ্টময় ॥eird ৰ্তি ঠিক জলের ধারে অবস্থিত আছে। শুনিলাম, যীশুর মূর্তি। সুইটজারল্যান্ডের যত গির্জার ঘড়ি সব এক বঁটা-বড় কাটাটা নাই। বোধ হয়, ইহারা তত বেশী ব্যস্ত নহে। য়ুরােপের অন্যদেশবাসীরা সদাই ব্যস্ত, পাছে এক মিনিট সময় বৃথা ক্ষেপণ হয়। সুইটজারল্যাণ্ডবাসীরা নাকি প্রধানতঃ কৃষিজীবী; তাই ইহাদের অত ব্যস্ততা নাই। সুইটজারল্যাণ্ড কৃষিপ্রধান দেশ শুনিয়া হয় ত অনেকে বিস্ময়াপন্ন ইবেন। এ দেশের সাধারণ লােকের কৃষিই একমাত্র ব্যবসায়। যেখানে সেখানেই দেখা যায়, বড় বড় শস্য-ক্ষেত্র না হয় ঘাসেব জমী। বাস খুব বড় বড় পাহাড়ের গাত্রে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড সবুজ ক্ষেত্র, দৈখিতে খুব সুন্দর। তদ্ভিন্ন এ দেশের গরু খুব বৃহদাকার এবং খুব * মুল্যবান। শুনিলাম, দেড়মাস বয়সের গােবৎস ১২০০ হইতে ১৫ টাকা মূল্যে বিক্রীত হয়। এ দেশের লােকের অবস্থা খুব সচ্ছল নহে, য়ুরােপ-ভ্রমণ। অন্য য়ুরােপীয় দেশের তুলনায় ইহারা খুব দরিদ্র, তবে হােটেলের কৃপায় ধনী ইংরাজ—বিশেষতঃ মার্কিণ যাত্রীর পয়সায় অনেক লোক প্রতিপালিত হয়। এ দেশের আর এক অদ্ভুত ব্যাপার সুইটজারল্যাণ্ডের জাতীয় কোনও ভাষা নাই। কতক লােকের মাতৃভাষা অৰ্ম্মাণ, কতকের ফরাসী এবং কতকের ইতালীয়। একজন সুই ভদ্রলোকের মুখে শুনিলাম যে, কতকগুলি আদিম নিবাসী নাকি পৰ্বতে বাস করে, তাহাদের একটি বিভিন্ন ভাষা আছে। অষ্ণ য়ুরােপীয় দেশের ন্যায় এ দেশেও শিক্ষা সাধারণ ও অবৈত- নিক। মেয়েদের ৮ বৎসর বয়স হইতে ১৮ বৎসর পর্যন্ত ইস্কুলে পড়িতে হয়। সকালে আটটা হইতে বারটা ও অপরাহ্নে দুইটা হইতে পাঁচটা পর্যন্ত ইস্কুল বসে। এই গরীব দেশে আয়কর শতকরা ৮• আনা দিতে হয় ; আর আমাদের দেশে সর্বাপেক্ষা অধিক ২/১৫মাত্র। উকিলের অবস্থা এ দেশে বড় ভাল নহে। রাজশানীর' কথা জানি না, কিন্তু অন্যান্য সহরে কোথাও বাৎসরিক ১০০০ পাউণ্ডের বেশী আয়ের উকিল নাই। তবে বলা উচিত, লােকসংখ্যার অনুপাতে গোবর্দমার সংখ্যায় ইহারা আমাদিগকে হারাইয়াছেন। রিগি হইতে ফিরিবার সময় ইমবােটে এক মার্কিণ ভদ্রলােকের সহিত আলাপ হইল। তিনি আমার নিকট ভারতবর্ষের অনেক তথ্য সংগ্রহ করিলেন এবং বিনিময়ে আমাকে মার্কিণ রাজনীতির কথা। কিছু বুঝাইয়া দিলেন। লুসাণ হইতে ইন্টারলাকেন. (Interlaken) নামক গ্রামে বেড়া ইতে গিয়াছিলাম। লুসার্ণ হইতে রেলে ও ষ্টীমবােটে প্রায় ৫ ঘণ্টার- রাস্তা। মানুষ কি রকম ঘটনাচক্রের ক্রীড়নক তাহা এই দিন যথেষ্ট ; লুসার্ন। ১০১ উপলব্ধ হইয়াছিল। যখন লুসার্ণ হইতে যাত্ৰা করি তখন খুব ঠাণ্ডা ; সবেমাত্র বরফ পড়া বন্ধ হইয়া sleet পড়িতেছে ( Sleet যতক্ষণ আকাশে থাকে ততক্ষণ বরফ মাটীতে পড়ে জল)। এ দেশের সব রেলে গরম করার যন্ত্র ও তাপমান যন্ত্র থাকে। গাড়িতে আমি একা, কাযেই নির্বিবাদে গরম করা যন্ত্রটি খুলিয়া দিলাম। ট্রেণ মৃদু মন্দ গতিতে পাহাড়ের উপর উঠিতেছে ; ঝুপ ঝুপ করিয়া বরফ পড়িতেছে। হঠাৎ অসহনীয় গরম বােধ হইল। চাহিয়া দেখি, তাপ মাত্র ২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড,। কষ্ট এত অধিক হইতে লাগিল যে, কল বন্ধ করিয়া কোট খুলিয়াও তাহার নিবৃত্তি হইল না! ষ্টেশনে অনেক আকার ইঙ্গিতে তৃষ্ণা জানাইয়া দুই গেলাস সেই কনকনে জল পান করিয়া তবে ধড়ে প্রাণ আইসে। সেই ঠাণ্ডায় শীতল জল পান করা দেখিয়া ষ্টেশনের লােকগুলা বিস্ময়ে চাহিয়া ছিল। সুস্থ হইয়া পথের শােতা দেখিতে লাগিলাম। তখনও পাহাড়ের উপর রেল উঠিতেছে, দুই ধারে কেবল পাহাড়, বরফ, পাইন গাছের সারি ও অসংখ্য ঝরণা। পাইনগাছের একরকম সুন্দর গন্ধ পাওয়া যায়। মাটীর উপর দিয়া কোথাও কোথাও পার্বত্য শ্রোতস্বতী বহিয়া যাইতেছে। পাহাড়ে যায়গা, মধ্যে মধ্যে জল বেশ স্তরে স্তরে নামি- তেছে দেখিতে বড় সুন্দর। পথের ধারে Lungern নামক ক্ষুদ্র গ্রামের বড় চমৎকার শোভা। চতুর্দিকে পৰ্বতবেষ্টিত একটি বাটির ন্যায় (Cupshaped)স্থান, মধ্য দিয়া ক্ষুদ্র একটি নদী আঁকিয়া বাঁকিয়া চলিয়া গিয়াছে। প্রায় সব বাটীরই খােলার চাল,-সমস্ত বরফে মণ্ডিত, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কৃষিক্ষেত্রগুলি তুষারাবৃত, দেখিতে বড়ই সুন্দর। গ্রামে মাত্র দুইটি একটু বড় গােছের বাড়ী দৈখিলাম, বলা বাহুল্য দুইটিই হােটেল। Lungern এর কাছে লাইন অত্যন্ত খাড়া এবং ট্রেণ পূর্ববর্ণিত ১০২ য়ুরােপ-ভ্রমণ। Rack and Pinion systemএ চলে। ইহার পরের ষ্টেশন নিগ এই লাইনের সর্বোচ্চ স্থান। তথায় দেখিলাম, লাইনের উপর প্রায় ২৩ হাত বরফ জমিয়াছে। দুইজন মজুর ষ্টেশনের সম্মুখভাগ কোদালী দিয়া পরিষ্কার করিতেছে। এই স্থান হইতে লাইন নামিয়া প্রিয়েন্স ( Brienz) গিয়াছে। তথায় ষ্টীমবােটে চড়িতে হয়। হ্রদের নাম Brienzer See ( প্রিয়ে- ব্দের জি) অর্থাৎ রয়েন্সের হ্রদ ( ঠিক যেন বাঙ্গালা সম্বন্ধপদ )। ইহারও তিন পার্শ্বে পাহাড়ের গাত্রে অসংখ্য ঝরণা, কোন কোনটি বা হ্রদে পৌছিবার পূর্বেই অর্ধেক পথে জমিয়া গিয়াছে, নিম্নের দিকে চিহ্নমাত্র নাই। অতি আশ্চর্য ব্যাপার। এই হ্রদের এক ষ্টেশনে (Oberried ) একটি যুবক নামিল, তাহাকে অভ্যর্থনা করিতে তাহার প্রণয়িনী ঘাটে উপস্থিত। ইহাদের মিলনদৃশ্য দেখিয়া তথায় উপস্থিত ব্যক্তি মাত্রই অত্যন্ত উৎফুল্ল হহয়া পড়িলেন। যতক্ষণ দেখা গেল, তাহারা হাত ধরিধার করিয়া গলা- গলি রাস্তা দিয়া চলিয়াছে, যেন পৃথিবীতে তাহারা দুইজন ব্যতীত অন্য প্রাণী নাই। Brienzer seeর পার্শ্বেই Thuner See (থুনের জি) নামক আর একটি হ্রদ। উভয়ের মধ্যবর্তী ক্ষুদ্র ভূখণ্ডে Interlaken ( ইন্টারলাকেন হ্রদমধ্যস্থান) অবস্থিত। এই গ্রাম হইতে আল্পসের প্রসিদ্ধ শিখর Jungfrau বা ফুফাউ খুব নিকটে ; দেখিলে মনে হয় যেন গ্রামের Guardian Angelএর ন্যায় গ্রামখানি য়ুং ফ্রাউয়ের ধিকারস্যন্ত। এই জন্য এবং স্বাস্থ্যকর স্থান বলিয়া Interlaken খুব. প্রসিদ্ধ। আমি এই স্থানে দুই দিন বাস করিয়াছিলাম। ক্ষুদ্র পার্বত্য গ্রাম, গুটি দুইতিন বিদ্যালয়, একটি হাসপাতাল, গুটি ৪৫ রেল ও ষ্টীমার ষ্টেশন এবং রাশিকৃত হােটেল। অধিবাসীর নংখ্যা খুবই • - লুসার্ণ। কম, বােধহয় ৫৬ সহস্র মাত্র। স্থানটি আমি যখন গিয়াছিলাম তখন খুবই নিরালা ও শান্ত ছিল, Seasonএর সময় অবশ্য অসংখ্য যাত্রী- বর্গের কলনিনাদে মুখরিত হইয়া উঠে। একটা কথা বলিয়া রাখি, সুইজারল্যাণ্ডের রেল পার্বত্য প্রদে- শে, কাযেই Tunnel বা সুরঙ্গ অসংখ্য। ১মাইল ১০ মাইল সুরঙ্গ সুইজারল্যাণ্ডের যে অংশে আমি ঘুরিয়াছিলাম, তাহাতে শতাধিক পার হইয়াছি, তদপেক্ষা ঘােটর ত “লেখা থােকা নাই।” Interlaken হইতে ফিরিয়া লুসার্ণের পথে লুগানাে যাইতাম। পথিমধ্যে প্রসিদ্ধ St. Gotthard's Tunnel (সেন্ট গটহার্ট সুরঙ্গ) এর ভিতর দিয়া রেল আসিল। এই সুরঙ্গটি সওয়া নয় মাইল লম্বা । ট্রেণে পার হইতে ১৯ মিনিট লাগিল। সুরঙ্গের ভিতর বায়ু বিশুদ্ধ বােধ হইল। Simflot Tunnel এই সুরঙ্গ অপেক্ষাও তিন মাইল আধক দীর্ঘ। পথে উইলিয়ম টেলের গ্রাম এটডফ Altdorf) দেখিলাম। লুগানােতে মাত্র এক রাত্রি বাস করিয়াছিলাম। তথায় কিছু দেখি নাই। লুগানােও একটি হ্রদের ধারে অবস্থিত, এই হ্রদের নাম Lag() di Lugano বা লুগানাের হ্রদ। লুগানাে যদিও সুইজার ল্যাণ্ড দেশে, এই হ্রদটি ইটালির অন্তর্বর্তী। হ্রদটি যে সুইস নহে তাহা জলের বর্ণে প্রমাণ। জল আমাদের দেশের জলের ন্যায়,-সবুজশ্নহে। এই হ্রদের উপর ষ্টীমারে ইটালি দেশস্থ Customs Examination হইল। এই আমার সপ্তম Customs, পরীক্ষা। কোনও বারে কিছু লাগে নাই ; কিন্তু এবার ছাড়িল না। সঙ্গে হল্যাণ্ডে ক্রীত ত্রিশটি চুরুট ছিল, তাহার জন্য ৭ ফ্রাঙ্ক ১০ রুমি (৪০) আদায় করিল! এত করিয়া বলিলাম যে, চুরুটের দাম অত নহে, না হয় চুরুট জলে ফেলিয়া দিতেছি; কিছুতেই কিছু হইল না, টাকা গণিয়া ;

১০৪ য়ুরােপ-ভ্রমণ। দিতে হইল। তখন নিছক বাঙ্গালা ভাষায় গালাগালি দিয়া মনের ঝাল ঝাড়িলাম, লােকটি হাঁ করিয়া চাহিয়া রহিল। যখন এই ব্যাপারে Customs Office এর সহিত কলহ করিতে, ছিলাম, তখন একজন সৌম্যমুৰ্ত্তি ভদ্রলােক দোভাষীর কাৰ্য্য করিতে- ছিলেন। কিছুক্ষণ পরে গােলমাল চুকিলে তাহার সহিত আলাপ হইল, তিনি ইংরাজ ও ডাক্তার; ইটালিতে নিকবর্তী এক স্থানে বসবাস করেন। লােকটি অতিশয় ভদ্র, নাম এলিয়ট ; বলিলেন, তাহার মাতামহ মাদ্রাজে জজ ছিলেন। এই হ্রদের চতুঃপার্শ্বও পাহাড়-মণ্ডিত, তবে বরফ নাই। অনেক সুন্দর সুন্দর গৃহ্ন পাহাড়ের গাত্রে দেখা যায়। ষ্টীমবােটে পরলো (Porlezza) পৰ্য্যন্ত যাইলাম । তথা হইতে মেনাজিয়াে (Menaggio) পৰ্য্যন্ত ছােট রেল, ষ্টীম ট্রামওয়ে বলিলেও চলে। এই মেনাজিয়ােতে ডাক্তার এলিয়ট বাস করেন। কিন্তু তিনি ট্রেণ পৌছিলে বাটী না যাইয়া অগ্রে আমাকে সঙ্গে করিয়া লইয়া আমার গন্তব্য ষ্টীমবেটে তুলিয়া দিলেন, তাহার পর আমার জিনিষ পত্ৰ উঠিলে করমর্দন করিয়া টুপি তুলিয়া বিদায় লইলেন। এই মেনাজিয়াে Lago di Como বা কমাে হ্রদের ধারে অবস্থিত। এই স্থান হইতে ষ্টীমারে কমো খাইলাম। ষ্টীমার ষ্টেশন হইতে কমে রেলওয়ে ষ্টেশন প্রায় ১ মাইল ; ভাষা জানি না, গাড়ি ভাড়া করা বড় মুস্কি, যাহা হউক অনেক কষ্টে ১৯• ফ্রাঙ্ক দিয়া গাড়ী ভাড়া করিয়া ষ্টেশনে আসিলাম । ষ্টেশনে আসিয়া শুনিলাম, ট্রেণ আসিবার অব্যবহিত পূর্ব পর্যন্ত ওয়েটিং রুমে থাকিতে হইবে, প্ল্যাটফর্মে যাইবার নিয়ম নাই। কি করি, বসিবারও স্থান নাই, দাড়াইয়া সময় কাটাইতে হইল।

- লুসার্ণ। ট্রেণের ঘণ্টা পড়িলে ভিতরে যাইতে দিল। শুনিলাম, প্ল্যাট- ফৰ্ম্মের পার্শ্বস্থ লাইনে গাড়ি আসিবে না, নামিয়া দুই লাইনের মধ্যে যাইয়া দাঁড়াইয়া রহিলাম; পরে ট্রেপ আসিলে তাহাতে চড়িয়া সন্ধ্যা ৫ টায় মিশানাে (Milan )পেীছিলাম।

মিলান। ? মিলন বাণিজ্যপ্রধান প্রকাণ্ড সহর। সহরের বাহিরে কিছু কিছু খােলা জায়গা আছে বটে, কিন্তু সহরের ভিতর অত্যন্ত ঘন বসতি ও দোকানপাট। রাস্তা প্রায়ই খুব সরু, আমাদের দেশের পশ্চিমােন্তর প্রদেশের সহরের রাস্তার ন্যায়। f7790: Corso Vittorio Emanuele {কসে। ভিটোরিও এমানুয়েল) নামক যে রাস্তার এক মুখে প্রসিদ্ধ মিলান কেথিড্রাল এবং যাহার দুই ধারে মিলানের প্রধান প্রধান বিপণিশ্রেণী তাহা একেবারেই সরু রাস্তা। এই পথের ধারেই একটি হােটেলে আমি ছিলাম। সন্ধ্যার পর এই পথের শােভ অতি সুন্দর ; অসংখ্য বিদ্যুতালােকে সজ্জিত বিপণিশ্রেণী এবং ক্রেতা ও দর্শকের সমাবেশে পথটি অত্যন্ত জাঁকালাে দেখায়। মিলানের বড় ষ্টেশনে রেল পৌছিবার পূর্বে অনেকগুলি কারখানা নয়নগগাচর হয় এবং ষ্টেশনের অব্যবহিত পূর্বে বাম পার্শ্বে একটি প্রকাণ্ড বিদ্যালয় (Elementary and Technical school) দেখা যায়। ষ্টেশনের বাহিরেই একটি প্রকাণ্ড উদ্যান (Public Gardens)। ইহা ষ্টেশন ও চতুঃপার্শ্বস্থ রাক্কা হইতে কিছু উচ্চ। এই বাগানের মধ্যে অনেক মেলা প্রভৃতি বসে এবং অপরাহ্নে ও সন্ধ্যায় মিলান- বাসীরা এই স্থানে আসিয়া বিশ্রামসুখ লাভ করেন। এতদ্ভিন্ন সহরে, মূতন পার্ক (Nuovo Parco) নামক একটি প্রকাণ্ড উদ্যান আছে, আমি:তথায় যাই নাই।

মিলান। মিলানে দেখিবার জিনিষ অনেক, কতকগুলির সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিব। কিন্তু সকলের অপেক্ষা মিলান যে জন্য প্রসিদ্ধ সেই কেথি- ড্রালের কথা সর্বাগ্রে বলা উচিত। মিলান কেথিড্রাল বা ডুওমাে (Duomo) মর্মরে রচিত এক প্রকাণ্ড মন্দির। যদিও ইহাতে তাজের সরল সৌন্দর্য্যের অভাব তথাপি ইহার সামঞ্জস্য অতি বিস্ময়কর। পৃথিবীতে এক রােমের সেন্ট পিটার্স ব্যতীত এত বড় ভজনালয় আর নাই; কিন্তু ইহা এমনই চমৎকার ভাবে গঠিত যে, ভিতরে প্রবেশ করিলে প্রথম মনেই হয় না যে, বিশেষ একটা বড় হলে ঢুকিয়াছি। ভিতরে ঘুরিলে তবে বুঝা যায়, কত বড় ব্যাপার। দেড় শত গজ লম্বা ও এক শত গজ চওড়া একটি প্রকাণ্ড মাৰ্বলের হল। ভিতরে, বাহিরে ও ছাতের উপর অসংখ্য মৰ্ম্মরগঠিত প্রতিমূর্তি, ছাতের উপর শত শত turrets-- প্রত্যেকটির গঠনকৌশল অতি চমৎকার। যে স্থানেই দাড়াও চারি দিকেই সমান বােধ হয়, সমস্তই অতি সামঞ্জস্য সহকারে গঠিত। প্রত্যেক জানালার প্রত্যেক খিলানে, প্রত্যেক স্তম্ভে মৰ্ম্মরে ক্ষোদিত অতি সুন্দর কারুকার্য দেখা যায়। ছাতের উপর হইতে অনেক দুর পর্যন্ত দৃশ্য দৃষ্টিগােচর হয়। এই মন্দিরে মনে যে সৌন্দর্যের ভাব সঞ্চারিত হয় তাহা অনির্বচনীয় সুন্দর। ইহাকে “মৰ্ম্মরে গঠিত প্রেম” বলা যায় না; কিন্তু মৰ্ম্মর গঠিত পরিরাজ্য নাম বােধ হয় অসঙ্গত হইবে না। এই কেথিড্রাল ব্যতীত মিলানে দ্রষ্টব্য স্থান অনেকগুলি, তাহার মধ্যে (১) ব্রেরা (২) অনেকগুলি অতি প্রাচীন গির্জা (৩) যিশুর •Last Supper নামক চিত্র (৪) পিয়াসা স্কালা (Piazza della Scala) এবং (৫) গােরস্থান বিশেষ উল্লেখযােগ্য। এতঙিন নেপােলিয়ন বােনাপার্টের আদেশে প্রস্তুত Arena বা ঘােড় দৌড়ের ১০৮ য়ুরােপ-ভ্রমণ। স্থান ও Arch of Triumph বা মর্মরমুক্তিপরিশােতিত প্ৰকাণ্ড মৰ্ম্মরখিলানও দেখিবার জিনিব । মিলান হইতে আল্পসের উপর পৰ্যন্ত Simplon নােড নামক রাস্তা শেষ করিয়া নেপােলিয়ন এই খিলান প্রস্তুত করাইয়াছিলেন। (১) ব্রেরা (Brera) একটি প্রাসাদ। এই প্রাসাদে পুস্তকাগার, মানমন্দির ও চিত্রশালা আছে। পুস্তকাগার ও মানমন্দির আমি দেখি নাই। চিত্রশালা অতি প্রকাণ্ড। ইটালির বিখ্যাত সকল চিত্রকরের চিত্ৰই চিত্রশালায় আছে। তন্মধ্যে তিনটি বিশেষ উল্লেখযােগ্য,-ব্যাফেলের অঙ্কিত মেরি মাতার বিবাহ, গিডাে রেণির অঙ্কিত পিটার ও পল এবং এলবাননার অঙ্কিত প্রেমের নৃত্য (Dance of the Cupids)। টিসিয়ান, মুরিলাে প্রভৃতি অনেক প্রসিদ্ধ চিত্রকরের চিত্র এই স্থানে দেখা যায়। এই চিত্রশালার চিত্রের এক বিশেষত্ব দেখিলাম যে, অধিকাংশ চিত্ৰই মাতৃমূৰ্ত্তি, Madonnaর ছবির কিছু ছড়াছড়ি। ব্রেবার উঠানে নেপােলিয়ন বােনাপার্টের ব্রোঞ্জ-নিৰ্ম্মিত এক রােমান মূর্তি আছে। রােমান মূৰ্ত্তি অর্থে রােমক সম্রাটদিগের স্যায় বেশপরিহিত মুত্তি। এই মূর্তি ক্যানােভার (Canova) রচিত। (২) প্রথমেই বলা উচিত যে, ইটালিতে ভজনালয়ের অত্যন্ত আধিক্য; এক এক সহরে এত গির্জা আছে যে, দেখিলে বিস্মিত হইতে হয়। মিলানের পুরাতন গির্জার মধ্যে দুইটি বিষেশভাবে উল্লেখযােগ্য, একটির নাম ইউর্জিও (Sant Eustorgio) ইহা নাকি ৩২০ খৃষ্টাব্দে নির্মিত এবং দ্বিতীয়টি এব্রোজিও (Ambrogio or St. Ambrose) ইহাও খৃষ্টীয় ৪র্থ শতাব্দীতে প্রস্তুত এবং অগষ্টাইন এই স্থানে দীক্ষিত হইয়াছিলেন। চকমিলান বাড়ী, একটি বারাণ্ডায় বহু পুরাতন সমাধি, দেওয়ালের উপরিস্থিত, কারুকার্য প্রভৃতির চিহ্ন ; মিলান। ১০৯ রাখিয়া দিয়াছে। আর বিশেষ উল্লেখযােগ্য ভজনালয় Santa Maria Delle Grazie vette (৩) Leonardo da Vinci Last Supper চিত্র অবস্থিত। একটি ছােট রকম হল ; তাহার এক পার্শ্বের একটি দেওয়াল সম্পূর্ণ জুড়িয়া এই প্রসিদ্ধ চিত্র। কাগজে নহে, কাপড়ে নহে, দেওয়ালের গাত্রে এই চিত্র অঙ্কিত। মধ্যে যিশু, দুই পার্শ্বে তাহার শিষ্যরা। আহারে বসিয়াছেন। যিশু বলিয়াছেন, “তােমাদের মধ্যে একজন আমাকে শক্তহস্তে নিক্ষিপ্ত করিবে” ঠিক সেই সময়ের ভাব অঙ্কিত। ভিন্ন ভিন্ন শিষ্যের মনােব ও পরস্পরের প্রতি সন্দেহ ও যুডাসের মুখভঙ্গী অতি সুন্দর ভাবে চিত্রিত। ১৪৯৯ খৃষ্টাব্দে এই চিত্র অঙ্কিত। দেওয়ালে ঠাণ্ডা লাগিয়া চিত্র অস্পষ্ট হইয়া আসিতেছিল, একজন ইহার সংস্কার করিয়াছেন। চিত্রখানি অতি সুন্দর। এই ছবির আদর্শে অঙ্কিত অনেক চিত্র ইটালির চিত্রশালায় দেখা যায় ; এমন কি মিলানেই আর দুইখানি আছে। '৪) কেথিড্রালের সম্মুখেই ইটালির রাজা দ্বিতীয় ভিক্টর ইমা- নুয়েলের প্রকাণ্ড অশ্বারােহী মূর্তি। তাহার পর গ্যালারি ভিটোৰিও ইমানুয়েল নামক অতি সুন্দর বাজার। কলিকাতায় আজকাল হােয়া- ইট্যায়ের যেরূপ দোকান হইয়াছে অনেকটা ঐরূপ প্রকাণ্ড কাচম গুত বাড়ী। মধ্যে প্রকাণ্ড উঠান, চতুঃপার্শ্বে দোকান, সটাই কাচে মণ্ডিত। এই স্থানের নাম পিয়াসা স্কালা এবং এই স্থানে লেনার্ডো ডা ভিঞ্চির এক মূর্তি স্থাপিতু। (৫) গােরস্থান খুব বৃহৎ একটি মাঠ, চতুর্দিকে বৃতিবেষ্টিত ; “তাহাতে মিলানবাসী যত বড় বড় পরিবারের সমাধিস্থান। প্রত্যেক গােরের উপর অতি সুন্দর মৰ্ম্মর-মুত্তি। কত রকমের মূৰ্ত্তি ও কত রূপক যে এই স্থানে রক্ষিত তাহা আর কি বলিব। মৰ্ম্মর ভিন্ন ব্রোঞ্জের মূর্তিও ১১০ য়ুরােপ-ভ্রমণ। কতকগুলি আছে। আবার শব দাহের ব্যবস্থাও আছে। প্রায় দেড়শত বিঘা ব্যাপী এই গােরস্থান বাকিই অতি গম্ভীরভাবব্যঞ্জক। পূর্বেই বলিয়াছি, মিলান খুব বড় সহর। ইহার অধিবাসীর সংখ্যা প্রায় ছয় লক্ষ। ইহা একটি খুব প্রাচীন নগরও বটে। রােমক সাম্রাজ্যের সময়ও মিলান খুব সমৃদ্ধিশালী নগর ছিল। তাহার চিহ্ন এখনও বৰ্ত্তমান। এক স্থানে ১৬টি বৃহৎ কোরিন্থিয়ান স্তম্ভ দণ্ডায়মান, সেই স্থানে প্রাচীন মিলানের ফটক ছিল। ফটক আরও দুই তিনটি দেখা যায়। মিলানের চতুঃপার্শ্বে সঙ্কীর্ণ পয়ঃপ্রণালীর ন্যায় আছে, ইহা খাল কি পুরাতন গড়খাই তাহা বলিতে পারি না। ইহার অল অত্যন্ত দুর্গন্ধ। প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড সৌধ মিলানে অনেক ; প্রায়ই অভিজাত বংশায়দিগের আবাসস্থান, এখনও কোন কোনটি ব্যক্তি বিশেষের বাসগৃহ, কোনটি বা সরকারী অফিস। এইরূপ একটি প্রাসাদের চত্বরে তৃতীয় নেপালিয়নের ব্রোঞ্জ নির্মিত প্রতিমূর্তি সংরক্ষিত।

রােম। গড়া ১৭ রাত্রি নয়টায় মিলান ছাড়িয়া তাহার পরদিন প্রাতঃকালে রােমে ইতালীয় ভাষায় বােম) পৌছিতে হয়। মিলানের রেলওয়ে ষ্টেশনটি অতি বৃহৎ ; টিকিট প্রভৃতির আফিস হইতে প্ল্যাটফর্মে যাইতে ভূগর্ভস্থ রাস্তা দিয়া যাইতে হয়। গাড়িতে উঠিয়া দেখিলাম, বেশ ভিড়। 'শুইবার কোনও সম্ভাবনা নাই। ১৭ টাকা খরচ করিয়া একরাত্রি নিদ্রা যাইবার ব্যবস্থা করিতে ইচ্ছা হইল না. (মিলান হইতে নােম পৰ্যন্ত Sleeping Carএর টাকা) কাযেই বসিয়া বসিয়া ঢুলিতে লাগিলাম। মধ্য- রাত্রিতে বলইন (Bologna) নামক স্থানে আর একজন যাত্রী ব্যতীত সকলে নামিয়া গেলেন, তখন বেশ ঘুমান গেল । প্রভাতে উঠিয়া দেখি, মেঘমুক্ত নির্মল আকাশ, সূৰ্য্য হাসিতেছে। য়ুরােপে আসিয়া আর এ দৃশ্য দেখি নাই। ষ্টেশনে ছােট ছােট মেয়েরা সুর করিয়া জর্ণালি (Giornali বা খবরের কাগজ) বেচি- তেছে, সে সুরও যেন আমাদের দেশের মেয়েদের গলার সুৱ। অভিন্ন পথের ধারে দেখি, গরুতে লাঙ্গল টানিতেছে। য়ুয়ােপে আর কোথায় এ দৃশ্য নাই। •রােমে পৌঁছিবার প্রায় বিশ মাইল পূৰ্বে একটা ছােট খালের যত দেখিলাম; রেলের পাশ দিয়া যাইতেছে, লােক গৰু ভেড়া লইয়া হাঁটিয়া পার হইতেছে। শুনিলাম, ইনিই টাইবার ; সেই Father Tiber to whom the Romans pray.

১১২ য়ুরােপ-ভ্রমণ। দশ মাইল দূর হইতে সেন্ট পিটাস গির্জার গম্বুজ নয়নগােচর হয়। মনে পড়ে,আগ্রার তাজমহল প্রায় ১•১২ মাইল দূর হইতে প্রথম দেখা যায়। ট্রেণ য়ােম সহর প্রায় পরিক্রমণ করিয়া সেন্টাল ষ্টেশনে আসিল। গেছির কথা বেল নয়টায়, পৌছিল প্রায় সাড়ে দশটায়। ব্রেকে মালের খোঁজ কঠিতে যাইয়া নিলাম,মাল তখনও আসিয়া পোঁছায় নাই, আরও ২/৩ ঘণ্টা পরে পুনরায় গাড়ি আসিবে, তাহাতে মাল আসিবে। হােটলে যাইয়া শুনিলাম কুক কোম্পানির প্রেরিত “সেথােঠাকুর” গাড়ি লইয়া বসিয়া ছিলেন ; দশটার পর কেহ খবর দিয়াছে যে, ট্রেণ পৌছিয়াছে, তাহাই শুনিয়া আমি আসিলাম না মনে করিয়া তিনি চলিয়া গিয়াছেন। প্রদর্শককে আসিতে টেলিফেঁা করিয়া স্নান করিয়া লইলাম। তিনি আসিয়া বলিলেন, আমার জন্য নির্দিষ্ট গাড়ি ছাড়িয়া দেওয়া হইয়াছে, এ বেলা আর পাওয়া যাইবে না। কাযেই সাধারণ ভাড়াটিয়া গাড়ির শরণাপন্ন হইতে হইল। প্রথমেই প্যান্থিয়ন ( Panthcon ) দেখিতে গেলাম। পথে বাহির হইলেই রােম দর্শককে মুগ্ধ করে। অসমতল, সরু সরু পুরাতন পাতঃবধান রাস্তা। রাস্তার দুই ধারে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড প্রাসাদ, মাঝে মাঝে বাগান পথের মধ্যে দুই চার শত ফুট অন্তর প্রকা প্রকাণ্ড ফোয়ায় ব্রোঞ্জ বা মাৰ্বলনিৰ্ম্মিত—প্রসিদ্ধ প্রসিদ্ধ শিল্পীর মূর্তিগুচ্ছসম্বলিত,-কোথাও বা Triton blowing his horr, কোনও বা Horsetamer এর মূর্তিগুচ্ছ। সর্বোপরি রোমের প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক স্মৃতি। এই সমস্ত মিলিয়া বাস্তবিকই পৰ্যটকের মনে এক অননুভূতপূৰ্ব ভাবের সঞ্চার করে। প্যান্থিয়ন একটি বৃত্তাকার হল। মাৰ্বলের দেওয়াল-বাইশ ফুট চওড়া, গম্বুজ তামণ্ডিত ; গম্বুজের ঠিক মধ্যস্থলে ত্রিশ ফুট এব টি ১১৬ ছিদ্র। এই ছিদ্রপথে ও একমাত্র ভারপথে গৃহে আলােক প্রবেশ করে। খার ব্রোঞ্জনিৰ্মিত। গম্বুজ সুগােল উহার উচ্চতা ও পরিধি উভয়ই সমান; প্রায় ১৫ শত ফুট। এই প্যান্থিয়নের স্তম্ভগুলিতে অতি সুন্দর কারুকার্য ক্ষোদিত। প্যান্থিয়নে রাজা দ্বিতীয় ভিক্টর ইমানুয়েল ও রাজা হার্টের সমাধি বিদ্যমান। এতদ্ভিন্ন ভুবনবিখ্যাত চিত্রশিল্পী রাফেল এই স্থানে মহানিদ্রায় নিতি। প্যান্থিয়ন হইতে “স্যান জোভানি লেটারাগাের গির্জা (San Giovanni in Laterano) দেখিতে গেলাম। বলা বাহুল্য, রােমে সহস্র সহস্র গির্জা আছে, প্রত্যেকটিই সুন্দর এবং প্রত্যেকটিতেই কিছু না কিছু চিত্রশিল্প বা মৰ্ম্মরশিল্পের প্রকৃষ্ট আদর্শ বিদ্যমান। কিন্তু পৰ্যটকের পক্ষে সে সমস্ত দেখা সম্ভব নহে; আমি যে কয়টি দেখিয়াছিলাম সব কয়টির কথা আমার বিশেষ মনে নাই। যতদূর স্মরণ হয় লিখিতেছি। রােমের সমস্ত ভজনালয় দেখিতে বােধ হয় বর্ষাধিককাল অতিবাহিত হয়। এই লেটারালাে গির্জার বিশেষত্ব, ইহাতে বরােমিনি (Borromine) কৃত খুষ্টের দ্বাদশ শিষ্যের প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড প্রতিমূর্তি। এতনি ইহাতে একটি বেদী আছে, তাহার মধ্যে নাকি সেন্ট পিটার ও সেন্ট পলের মস্তক নিহিত। এই স্থান হইতে “পবিত্র সিড়ি” দেখিতে গেলাম। ইহা পন্টিয়াম পাইলেটের বাড়ীর সিড়ি যে সিড়ি দিয়া নামিয়া যিশু ক্রুশস্থানে গিয়াছিলেন, সেই ২১টা ধাপসম্বলিত সিড়ি নাকি এই। ক্যাথলিক হাঁটিয়া এই সিড়িতে উঠেন না, হাঁটু গাড়িয়া উঠেন। সিড়ির নিয়ে পােপের এক হুকুমনামা রহিয়াছে, হাঁটু গাড়িয়া এই সিড়িতে উঠিলে কয় পুরুষ মুক্ত হইবে তাহারই আদেশপত্র। রােমের কোলিসিয়মের নাম সকলেই ত আছেন।

১১৪ য়ুরােপ-ভ্রমণ। সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধিসময়ে এই স্থানে বহুপ্রকার মল্লযুদ্ধ, হিংস্র জন্তুর সহিত যুদ্ধ প্রভৃতি হইত এবং সম্রাট ও স্ত্রীপুরুষ সকলে তাহাদেখিতেন। কোলিসিয়মে মৃতপ্রায় গ্লাডিয়েটরের দর্শকের অঙ্কুষ্ঠের প্রতি ক্ষীণ দৃষ্টি অনেক কবিতার ও চিত্রের বিষয়ীভূত হইয়াছে। রমণীরা অসুঠ নিম্নমুখী করিলে পরাজিত ব্যক্তি হত হইত। সেই কোলিসিয়মের ভগ্নাবশেষ এখনও বিদ্যমান। তিন দিকে ৫৭ তল উচ্চ গ্যালারির মত (Tiers of galleries) মধ্যে মধ্যে পথ এবং এক দিকে হিংস্র জন্তু ও দাসদিগের থাকিবার অন্ধকার কক্ষগুলি। এই প্রকাণ্ড স্থানে এক সঙ্গে ৪০৫০ হাজার দর্শকের স্থান হইত। সম্রাটের বসিবার স্থানের নিকটে কতকগুলি গৰ্ত্ত দেখা যায়—তাহাতে খুটি লাগাইয়া চন্দ্রাতপ খাটান হইত, পাছে রাজার রৌদ্র লাগে। এই কেলিসিয়মের বসিবার আসন দেখিয়া লওনের Albert Hall এর বসিবার ব্যবস্থা মনে পড়ে এবং হিংস্র জন্তুগুলির জন্য নিৰ্ম্মিত বিবরাদি দেখিয়া আগ্রার দুর্গের একাংশ স্মৃতিপটে উদিত হয়। কোলিসিয়ম পরিভ্রমণ করিতে যাইয়া দেখি, এক স্থানে কতকগুলি বালক খেলা করিতেছে। একটু দাড়াইয়া দেখিলাম, আমাদের দেশের সেই সনাতন ডাণ্ডাগুলি খেলা ; দেখিয়া অত্যন্ত চমৎকৃত হইলাম। কোলিসিমের নিকটেই Roman Forum বা প্রাচীন রােমের ধ্বংসাবশেষ। এখনও ইহার খনন কাৰ্য্য চলিতেছে ও নিত্য নুতন স্থান আবিষ্কৃত ও প্রত্নতত্ত্ববিদৃগণের দ্বারা ইতিহাসখ্যাত স্থান বলিয়া নির্দিষ্ট হইতেছে। যে স্থানে ব্রুটাসের বক্তৃতা হইয়াছিল, যে স্থানে মার্ক এন্টনি রােমকদিগের প্রতিহিংসানল প্রজ্জ্বলিত করিয়া- ছিলেন, যে স্থানে জুলিয়াস সিজারের শবদাহ হইয়াছিল, যে সব রাস্তা বাহিয়া খােমক সেনানীগণের বিজয় অভিযান ( Triumphs) আসিত সেই সকল স্থান দেখিতে দেখিতে মনে কতরূপ ভাবের উদয় হয়।

=
||
||
زه .
রোমন ফারাম
লক্ষ্মী প্রিন্টিং ওয়ার্কস।

No text on this page.

রােম। এই স্থান হইতে সেন্ট পিটার্স দেখিতে গেলাম। সকলেই জানেন, ইহা পৃথিবীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা বৃহৎ ভজনালয়। মন্দিরের সম্মুখে একটা প্রকাণ্ড চাতালের মত। এই চাতাল শত শত স্তম্ভে সজ্জিত এবং সেই স্তম্ভগুলির উপর ছাত দিয়া রাস্তার মত করিয়াছে। সেই রাস্তায় দুইখানা গাড়ি পাশাপাশি যাইতে পারে। উপরে প্রায় ১৫০ সেন্টদিগের প্রতিমূর্তি। এই চাতালের মধ্যভাগে একটি প্রকাণ্ড Obelisk স্থাপিত ও দুই পার্শ্বে দুই প্রকাণ্ড ফোয়ারা। এই চাতালের পার্শ্বে পােপের রাজ্য তেটিকানের (Vatican) প্রবেশদ্বার। এই চাতাল পার হইয়া কতকগুলি সিড়ি উঠিয়া ভজনালয়ের বারাণ্ডা পাওয়া যায়। মন্দিরের পাঁচটি ঘর, সৰ্বমধ্যস্থিত দ্বার বদ্ধ থাকে, মাত্র পঁচিশ বৎসর অন্তর একবার খুলা হয়। বারাণ্ডার দুই পার্শ্বে দুইটি মূর্তি, একটি ইতিহাস প্রসিদ্ধ সালেমেনের ও অন্যটি কন্সট্যান্টাইন দি গ্রেটের। এই গির্জা যে কত বড় তাহা প্রথম ঢুকিয়া বােধগম্য হয় না। আমার সেথে তাহা বুঝিতে পারিয়া দরজার নিকট দাড়াইয়া আমাকে সর্বনিকটস্থ স্তম্ভ ও তদুপরিস্থ বালমুক্তি দেখাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “এ মূর্তি গুলি কত বড় বােধ হয় ?” আমি আন্দাজ করিয়া বলিলাম, “বােধ হয় তিন ফুট হইবে।” তখন তিনি বলিলেন, “আচ্ছা, নিকটে যাইয়া দেখুন। আমি যতই অগ্রসর হই মনে হয় যেন স্তম্ভ পিছুই “তেছে ও মূর্তিগুলি বড় হইতেছে! ক্রমে নিকটে যাইয়া দেখিলাম, মূৰ্ত্তিগুলি ছয় ফুট অপেক্ষাও অধিক উচ্চ। দেখিয়া চমৎকৃত হইয়া গেলাম। এই মন্দিরে যে কত সুন্দর সুন্দর চিত্র, কত সুন্দর মৰ্ম্মর- মুৰ্ত্তি রহিয়াছে তাহা আর কি বলিব । ছাতে অনেক চিত্র ও যিশুশিষ্য- গির মূৰ্তি লিখিত আছে। গম্বুজটি অতি প্রকাণ্ড। চারিটি স্তম্ভের উপর এই দুগজ নির্মিত। প্রত্যেক স্তম্ভের পরিধি ২৫০ শত ফুট।

১১৬ য়ুরােপ-ভ্রমণ। এই গম্বুজের মধ্যে অনেক Mosaics আছে; ঠিক মধ্যস্থলে God the Father অঙ্কিত। গম্বুজের গাত্রে লাটিন ভাবায় একটা লিপি আছে; শুনিলাম, প্রত্যেক অক্ষর • ফুট উচ্চ। নিম্ন হইতে দেখিলে সাধারণ ছাপার অক্ষর অপেক্ষা বিশেষ বড় মনে হয় না। ইহাতেই উপলব্ধি হইবে, গম্বুজ কত উচ্চ। মন্দিরের মধ্যস্থ প্রতিমূর্তিগুলির মধ্যে সেন্ট পিটারের একটি উপবিষ্ট মূৰ্ত্তি আছে। ইহা ব্রোঞ্জ-নির্মিত। খৃষ্টীয় ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে এই মূৰ্ত্তি নির্শিত। সেকাল হইতে একাল পর্যন্ত উপাসকরা ইহার দক্ষিণ পদ চুম্বন করিয়া আসিতেছেন। বাস্তবিকই দক্ষিণ পদ কিছু ক্ষয়প্রাপ্ত হইয়াছে। এই মন্দিরে অনেক পােপের সমাধি ও প্রতিচিহ্ন আছে। ক্যানােভা, মিকেলেঞ্জেলাে প্রভৃতি প্রসিদ্ধ মৰ্ম্মর-শিল্পীর রচনা অনেক মূৰ্ত্তিও দেখা যায়। এই মন্দিরের সৌন্দৰ্য্য এবং অদ্ভুত সামঞ্জস্য-শােত বহুক্ষণ না দেখিলে উপলব্ধ হয় না। It grows upon one; কিছুক্ষণ মেপন করিয়া এই স্থান হইতে চলিয়া আসিতে বড়ই সেন্ট পিটাসের পরেই সেন্ট পালের গির্জার কথা বলিতে হয়। আধুনিক সহরের বহির্ভাগে এক নির্জন স্থানে এই মন্দির। ইহাতে বহুমূল্য অ্যালাব্যাষ্টার ও ম্যালাকাইট প্রস্তরে নির্মিত অনেকগুলি শুক্ত আছে। আর আছে, ইহার ছাতে সেকাল হইতে একাল পর্যন্ত প্রত্যেক পােপর চিত্র ও প্রত্যেকের রাজত্বকাল লিখিত। অনেকে ৮৯ মাস মাত্র রাজত্ব করিয়াছেন। একজন দেখিলাম, মাত্র তিন দিন রাজত্ব করিয়াছিলেন। ইহার চেহারাটাও কিছু অদ্ভুত মন্তকে প্রকাণ্ড টাক-মুখে প্রকাণ্ড দাড়ি। এতনি এই গির্জায় সেন্ট পিটার, সেন্ট পল ও পােপ গ্রেসরির বৃহৎ মূৰ্ত্তি সংক্ষিত। আর দুইটি হােট গির্জা উল্লেখযােগ্য। যে স্থানে রােম। ১১৭ যিশু সেন্ট পিটারের সম্মুখে উপনীত হইয়া “কোথা যাও ?” বলিয়া তাঁহার সন্দিগ্ধ চিত্তকে আশ্বস্ত করেন প্রথমটি সেই স্থানে এবং যে স্থান হইতে নির্গত হইয়া সেন্ট অগনি ব্রিটেনে খুইধৰ্ম্ম প্রচার করিতে ৰায়েন দ্বিতীয়টি সেই স্থানে। দ্বিতীয়টি অতি ক্ষুদ্র। মােমের এক পার্শ্বে একটু উচ্চ স্থান আছে, সেই স্থানে ১৮৪৮ খৃষ্টাব্দে মহা যুদ্ধ হয়। সেই স্থানে এখন গ্যারিবন্ডির এক প্রকা মূৰ্ত্তি স্থাপিত। এই পাহাড়ের উপর হইতে পুরাতন রােমের সপ্ত। গিরি বেশ দেখা যায় এবং রােমের দৃশ্য বড় সুন্দর দেখায়। সন্ধ্য- কালে এই স্থান হইতে রােম• দেখিতে বড় চমৎকার। এই পাহাড় হইতে নামিবার পথে দুই পার্শ্বে আধুনিক ইতালীয় ও রােমক ইতি হাসে প্রসিদ্ধ ব্যক্তিদিগের আবক্ষ মূৰ্ত্তি রক্ষিত। বলা উচিত, গ্যারিবন্ডির মূর্তি ও তাহার নামে রাস্তা নাই এরূপ কোনও সহর ইটালিতে নাই। এই পাহাড়ের উপর হইতে Roman Campagna অর্থাৎ চতুঃপার্শ্বস্থ এদেশ বেশ ভাল দেখা যায়। পােপের প্রাসাদস্থ পুস্তকাগার এবং শিল্পাগার সম্বন্ধে অধিক লিখা বাহুল্য। এত মৰ্ম্মর-মুর্তি আর কোথাও আছে কি না, জানি ; আমি ত দেখি নাই। পােপ এখন এই ভেটিকানে বন্দিভাবে বাস করেন। রাজত্ব অবসান হওয়া পর্যন্ত কোনও পােপ ভেটি- কানের বাহিরে আগমন করেন না। কেপিটোল নামক পাহাড়ের উপর পুরাতন রােমক সেনেটের স্থান। অনেক মৰ্ম্ম-মূৰ্তি ও পুরাতন কবরের আবরণ (Sarcophagi) দেখা যায়। এই যে সব মৰ্ম্মরশিল্প ইহাতে একটা বড় ভাবি- বার বিষয় আছে ; দুই একটি ভিন্ন নগ্নমূৰ্ত্তি সবই পুরুষের। কেন? শ্রীজাতির রূপ মৰ্ম্ম-শিল্পীরা অঙ্কিত করেন নাই কেন? আমার ত ১১৮ য়ুরােপ-ভ্রমণ। মনে হয়, তাহাদের বিবেচনায় সুগঠিত পুরুষ-মূৰ্ত্তিই অধিকতর রূপবান ; স্ত্রীলােকের রূপ কেবল সজ্জায় ও দর্শকের মনে। রােমের ভিতর দেখিবার স্থান অসংখ্য। সে সকলের বর্ণনা করিবার সাধ্যও আমার নাই, স্থানও নাই। সব আমি দেখিও নাই। কতকগুলি বিশেষ বিশেষ ইতিহাস প্রসিদ্ধ স্থান মাত্র নির্দেশ করিব। জুলিয়াস সিজার যে স্থানে হত হয়েন সেই স্থানটি আমি দেখিতে গিয়াছিলাম। পম্পের মূৰ্ত্তির নিয়ে সিজার হত হয়েন, সে মূর্তিটি এখন অন্য স্থানে রক্ষিত। এতদ্ভিন্ন টেজানের ফোরাম, ভাইক্লিটিয়ানের ফোরাম, ক্যারাকালার স্নানাগার বিশেষ উল্লেখ যােগ্য। এই স্নানাগারে তৎসাময়িক প্রসিদ্ধ সকল লােকই আসিতেন। এই স্নানাগার কবি, যােদ্ধা, দার্শনিক প্রভৃতির সম্মিলনস্থান ছিল। আধুনিক রােম নগরের বাহিরে Appian IVay নামক পুরাতন সড়ক এখনও বিদ্যমান। তাহার দুই পার্শ্বে ক্রমাগত প্রচীন রাঙ্গের ধ্বংসাবশেষ ; দেখিলেই দিল্লীর কথা মনে পড়ে। ইহার নিকটে অনেকগুলি Catacombs বা ভূগর্ভস্থ বাসস্থান আছে। রােগের সম্রাট- গণ যখন খৃষ্টবিদ্বেষী ছিলেন, তখন তাহাদের উৎপাত হইতে রক্ষা পাইবার জন্য খৃষ্টীয়ানরা এই সব ভূগর্ভস্থ স্থানে বাস করিতেন। আমি একটিতে নামিয়াছিলাম। একজন পাদরী পথিপ্রদর্শক ছিলেন। হাতে বাতি লইয়া নামিতে হয় ; কারণ, সে স্থানে সুৰ্যালোেক প্রবেশ করে না। ফুট মাটীর নিয়ে মাইলের পর মাইল পাতরের ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইষ্টকের গ্যালারি চলিয়াছে,অনেকটা দেওয়ালের গাত্রে তাকের মত। এই সব তাকে সেকালের খৃষ্টীয়ানদিগের ১ম মৃত্যু বিবাহ সবই হইত। কোথাও গাের রহিয়াছে, কোথাও বা চ্যাপেল বা ভজনালয়। দুই একটি কবরে এখনও কঙ্কাল রাহিয়াছে দেখা যায়। দুই একটা মামির ( Mummy) ন্যায় দৈখিলাম;

রােম। ১১৯ ০ একটি দেহের মন্তকে কৃষ্ণ কেশ দেখা গেল। আলােকের জন্য আমাদের পল্লীগ্রামে ব্যবহৃত মৃৎপ্রদীপের ন্যায় প্রদীপ ব্যবহৃত হইত। এক স্থানে কতকগুলি সংগৃহীত রহিয়াছে, দেখিলাম। স্থানে স্থানে কিছু কিছু কারুকার্যও আছে। অনেক স্থানে মৎস্য অঙ্কিত আছে, যিশুর সহিত ইহার কি একটা Symbolical সম্বন্ধ আছে প্রদর্শক পাদ্রি বলিয়া দিয়াছিলেন, ভুলিয়া গিয়াছি। এত নিয়েও বাতাস বেশ শুষ্ক মনে হইল, আর্দ্রতা নাই। বরং দুই এক স্থানে যথায় নূতন মেরামত হইয়াছে ভ্যাম্প ( Damp ) মনে হইল। এই- রূপ ভূগর্ভস্থ রাঙা নাকি ৩ মাইল আছে। রােমের চতুঃপার্শ্বস্থ স্থানে বসতি বড়ই কম, প্রায়ই খােলা মাঠ। শুনিলাম, ম্যালেরিয়ার অত্যন্ত প্রকোপ। এই প্রাচীন সহরে আর একটি জিনিষ দেখিয়াছিলাম, যাহা য়ুরােপে আর কোথাও বোধ হয় নাই। আমি যে হােটেলে ছিলাম তাহার পার্শ্বেই রাজমাতা মার্গেরিটার প্রাসাদ। একদিন দ্বিপ্রহরে দেখি, রাণীর প্রাসাদে অন্নসত্ৰ বসিয়াছে। ম্যাকারােণী বঁধিয়া বিতরণ করা হইতেছে, যত দরিদ্র লােক টিন ভড় প্রভৃতি পুরিয়া সেই অন্ন লইয়া কেহ নিকটে রাস্তার উপর বসিয়াই আহার করি, তেছে, কেহ বা গৃহে যাইতেছে। এই ম্যাকাররাণী ইতালীয়দিগের সাধারণ খাদ্য। ব্যাপারটা কি বােধ হয় অনেকেই জানেন। চাউল, গােধূম, যব প্রভৃতি শস্য চুর্ণ করিয়া তাহাই অল্প ভিজাইয়া সূতার স্থায় পাকাইয়া রাখে (আমাসের শেহাকে চষি বলে) পরে তাহাই সিদ্ধ করিয়া পণিরের গুড়া প্রভৃতি সহযােগে পরম পরিতােষ পূৰ্ব্বক আহার করে। খাইতে নাকি বড়ই ভাল। আমি ত কিছুতেই গলাধঃকরণ করিতে পারিতাম না।

ফ্লরেন্স। প্রাতে ১০টায় বােম হইতে বহির্গত হইয়া বেলা ২ টার সময় ক্লরেন্স পৌছিতে হয়। পথে রেলের দুই ধারে পাহাড় ও জঙ্গল, মাঝে মাঝে কর্ষিত প্রান্তর ও দ্রাক্ষাক্ষেত্র। পাহাড়গুলি সবই লতা- পাদপমণ্ডিত, মধ্যে মধ্যে পাহাড়ের নিমগ অঙ্গে দ্রাক্ষাক্ষেত্র। ফ্লরেন্সের অনেক দূর হইতে আর্ণো নদী রেলের পাশে পাশে উকি ঝুকি মারিয়া চলিতেছে, দেখা যায়। আমার সহিত গাড়িতে সহযাত্রী একজন জৰ্মাণ চিকিৎসক ছিলেন। ভদ্রলােক প্রাচীন ও প্রবীণ। তাহার ইংরাজী ভাষাতে ব্যুৎপত্তিও যথেষ্ট। নানা সদালাপে সময় কাটিল । রেঙ্গ অতি সমৃদ্ধিশালী ও অতি সুন্দর নগর। বাস্তবিক ফ্লরেন্সে একটি মাধুরী ও Holiday garbএর ভাব আছে যাহা আর কোনও স্থানে দেখি নাই। সহরটি বেশ বড়, কিন্তু এ সহরে যে লােক দৈনন্দিন কার্যকলাপ করে বা অন্নের চেষ্টায় ব্যস্ত থাকে তাহা সহজে মুভব করা যায় না। ক্লরেন্সে প্রাসাদ অনেক, বাস্তবিকই কলিকাতা অপেক্ষা ফ্লরেন্সই বােধ হয় City of Palaces নামের অধিক উপযুক্ত। বহু পুরা- কালীন প্রাসাদে বড় বড় কড়া লাগান আছে, তাহাতে সেকালে মশালধারীরা মশাল, আটকাইয়া রাখিত। ফ্লরেন্স শিল্পকলাসদ্ধ ইটালির মধ্যে শিল্পকলার জন্য সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ। শিল্প বলিঙে আহা কিছু বুঝায় ক্লরেন্সে সে সমস্তই খুব উৎকর্ষ লাভ করিয়ছিল। ।

ফুরেন্স। এই প্রাসাদগুলিও স্থাপত্য হিসাবে বিশেষ উল্লেখযােগ্য। চিত্রবিদ্যা, "ভাঙ্কৰ্য্য, সাহিত্য সকলই ফ্লরেন্সে অত্যন্ত উন্নতিলাভ করিয়াছিল। রাজনৈতিক হিসাবেও ফ্লরেন্সে সানােয়ােলা গদেশভক্তির যে সৰ উদাহরণ রাখিয়া গিয়াছেন তাহা ইংরাজী ভাষাভিজ্ঞ ব্যক্তি মাত্রেরই জানা আছে। চিত্রসম্বন্ধে ফ্লরেন্সে Pitti ও Uffizzi প্রাসায়ন্থিত গ্যালারি দুইটি জগদ্বিখ্যাত। য়ুরােপে আমি অনেক উৎকৃষ্ট চিত্র দেখিয়াছি ; প্যারিস, লণ্ডন, সেলস, এনভাস', এমষ্টারডাম, কলােন, মিলান, রােম সর্বত্রই গ্যালারি, প্রায় অনেক স্থানেই একাধিক গ্যালারি, অনেক চিত্র ; কিন্তু এক ফ্লরেন্সে এই দুইটি গ্যালারিতে যত ভাল ভাল ছবি আছে অন্যত্র সর্ব সংগ্রহের সমষ্টি তদপেক্ষা অধিক হইবে না। এই দুইটি গ্যালারি আর্ণে। নদীর দুই ধারে স্থিত, নদীর উপর দিয়া সেতু বাঁধিয়া ইহাদিগকে যুক্ত করা হইয়াছে। এই সেতুর দুই পার্শ্বে দেওয়ালে ক্রমাগত ছবি। তদ্ভিন্ন গ্যালারি দুইটির কক্ষগুলি পাশাপাশি রাখিলে বােধ হয় প্রায় এক মাইল লম্বা হইবে। প্রত্যেক ঘরে অনেক ছবি, মধ্যে মধ্যে অনিন্দ্যসুন্দর প্রস্তরমূৰ্ত্তি। ব্যাফেল, টিশিয়ান প্রভৃতি চিত্রকরের অধিকাংশ চিত্ৰই এই গ্যালারিয়ে রক্ষিত; আর ইতিহাস-প্রসিদ্ধ মেদিচি পরিবারের (Medicis) সংগৃহীত অনেক চিত্র ও প্রস্তর মূর্তি সংরক্ষিত। একটি অষ্টকোণ কক্ষে এই দুই গ্যালারির সর্বোৎকৃষ্ট চিত্রগুলি রঙ্গিত। তন্মধ্যে Venus de Medici, Group of Wrestlers and Satyr ঢামিক প্রস্তরমূৰ্ত্তি এবং ব্যাফেলের Madonna with the Goldknch, এবং Pope Julius II, টিশিয়ানের Venus of -6 bino এবং Venus and Cupid এবং ডুরারের Adoration of the Mag নামক শিল্পকীর্তির কথা সকলেই শ্রুত আছেন।

১২২ য়ুরােপ-ভ্রমণ । র্যাফেলের অঙ্কিত অনেক চিত্র এই দুইটি গ্যালারিতে দেখা যায়। কতকগুলি স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র কক্ষে একক রক্ষিত। এই সব চিত্রের বর্ণ অতি আশ্চৰ্য্য রকম ফলান; দেখিলে কিছুতেই বুঝা যায় না যে, এই মাত্র অঙ্কিত নহে। এই সব বর্ণের উপাদান নাকি আজকাল কেহ জানেন না। শুনিতে পাইলাম, প্রসিদ্ধ মার্কিণ ধনকুবের পিয়ারত মর্গান নাকি এই গ্যালারির একখানি চিত্রের জন্য তিন কোটী মুদ্রা দিতে চাহিয়াছিলেন; কিন্তু ইতালীয় গভর্ণমেন্ট চিত্র বিক্রয় করিতে স্বীকৃত হয়েন নাই। আজকাল আইন হইয়াছে যে, পুরাতন কোনও চিত্ৰ ইটালি দেশ হইতে রপ্তানি করা যাইবে না। এই সব চিত্র এত মনােহর যে, বােধ হয় যদি প্রতিদিন নিয়ত দেখা যায় তবুও বিরক্তি বােধ হয় না এবং নূতনত্ব যায় না। ক্লরেন্সের ইতালীয় নাম ফাইরেনসে (Firenze) একটি প্রাসাদ (Palazzo Vccchio) আজকাল টাউনহল রূপে ব্যবহৃত। রমলা পাঠকের নিকট এই প্রাসাদ সুপরিচিত। এই স্থানে ডিউক Cosiinoর আবাসগৃহ ছিল এবং দ্বিতলের এক গৃহে সাভানাে- রােলার বিচার হয়। প্রবেশদ্বারের দুই পার্শ্বে দুইটি অতি বৃহৎ মর্মর মূর্তি স্থাপিত এবং সম্মুখের সানবাঁধান উঠানে যে স্থানে সাভানােনােলাকে জীয়ন্তে দাহ করা হইয়াছিল সেই স্থানে একটি সুন্দর প্রস্রবণ স্থাপিত। প্রাসাদে সাভানােপােলার মৰ্ম্মর-মূৰ্ত্তি বিদ্যমান। প্রাসাদ ভিন্ন স্থাপত্য বিদ্যার পরাকাষ্ঠা ফ্লরেন্সে অনেক ভজনালয়ে দেখা যায়। পূর্বেই বলিয়াছি, ইটালিতে গির্জা অনেক। ক্লরেন্সের গির্জা যতগুলি আমি দেখিয়াছিলাম সবগুলিই অতি সুন্দর মৰ্ম্ম- নির্মিত এবং দুলত কারুকার্যমণ্ডিত। দুইটি দেখিয়াছিলাম, অপরি- মিত অর্থ ব্যয় করিয়া বহুমূল্য মণিমুক্তাবিমণ্ডিত। ফ্লরেন্সের কেথিড্রাল বা প্রধান ভজনালয়টি খুব বৃহৎ এবং ব্রুণে- ক্লরেন্স। ১২ লেকি’(Brunelleschi) নামক প্রসিদ্ধ স্থপতি-নির্মিত গম্বুজবিশি অনেক ভাস্করের নির্মিত মূৰ্ত্তি এই স্থানে স্থাপিত। প্রকাও দরজা দুইটি ব্রোঞ্জনিৰ্মিত। ইহার সম্মুখে ক্যাম্পেনাইল নামক প্রসিদ্ধ উচ্চ স্তম্ভ। এই স্তম্ভটি কত উচ্চ তাহা এক কথায় বুঝাইতে হইলে বলা যায় যে, কুতবমিনার অপেক্ষা ইহা তিনগুণের অধিক উচ্চ। প্রস্তর-নির্মিত এত উচ্চ স্তম্ভ পৃথিবীতে আর নাই। এক লৌহনির্মিত ঈফেল টাওয়ার ইহার অপেক্ষা উচ্চ । অন্য পার্শ্বে ব্যাটিষ্টেরাে নামক প্রসিদ্ধ অষ্টকোণ গৃহ। ইহার তিনজোড়া লােঞ্জনিশ্মিত দ্বার অতি সুন্দর Relief worla বিভূষিত। ইটালিতে ভিক্ষুক ও সচিত্র পােষ্টকার্ডবিক্রেতার অত্যন্ত উৎপাত। আমি যখন নিবিষ্টচিত্তে ব্যাটিষ্টেরাের দ্বার দেখিতেছিলাম তখন একজন সচিত্র পােষ্টকার্ডবিক্রেতা আসিয়া ক্রমাগত বিরক্ত করিতেছিল। hhe Jle রাগিয়া লাঠি ধরিলাম, সে চীৎকার করিয়া লােক জড় করিল। আমার সেথাের পরামর্শে আমরা সরিয়া পড়িলাম। নচেৎ বােধ হয় বিপদে পড়িতে হইত। কারণ, ইতালীয় ইতর লােক ছুরিকা ব্যবহার করিতে সিদ্ধহস্ত। স্যানলরেঞ্জো নামক গির্জায় প্রসিদ্ধ মেডিচি পরিবারের সমাধি- স্থান। একটি প্রকাণ্ড গােলাকার গৃহে তাঁহাদের শবাধার সংরক্ষিত, অনেকের প্রস্তর-মূৰ্ত্তি ও অনেক অতি সুন্দর মৰ্ম্মর-মূর্তিতে এই সমাধি- স্থল সুসজ্জিত। দেখিলে মনে অতি গম্ভীর ও পবিত্র ভাবের উদয় সটা ক্রোসে (Santa Croce) নামক আর একটি পুরাতন গির্জা উলেখযােগ্য। বাহির হইতে দেখিতে বিশেষ ভাল নহে। ঢুকিয়া প্রথমে একটি দরদালানের মত দেখা যায়, তাহার হাতে অনেক চিত্র; এখন প্রায় মুছিয়া গিয়াছে। ভিতরে অনেক প্রসিদ্ধ ইতালীয়ের গাের ১২৪ য়ুরােপ-ভ্রমণ। * তিস্তম্ভ বিরাজমান। মিকেলেঞ্জেলাে, আফিয়েরি, ম্যাকিয়াভেলি প্রভৃতি এই স্থানে মহানিদ্রায় শয়ান। তত্তি এই স্থানে দান্তে ও গ্যালেলিয়াে প্রভৃতির মল-মূর্তি প্রতিষ্ঠিত ; এতভিন্ন প্রসিদ্ধ সঙ্গীত- রচয়িতা রসিনিরও সমাধি আছে। অনেক সুন্দর Frescoe ও মৰ্ম্ম- রের রূপক মূর্তিগুচ্ছ আছে। বলা উচিত, ক্লরেন্সের সকল প্রাসাদে ও গির্জায় Msoaicsএর অত্যন্ত ছড়াছড়ি। সান্টা মেরিয়া নােভেলা (Santa Maria Povella) নামক আর একটি গির্জা বিশেষ উল্লেখযােগ্য। ইহার এক পার্শ্বে Old Cloisters দেখা যায়। ক্যাথলিক সন্ন্যাসী ও সন্যাসিনীরা কিরূপ ভাবে বাস করিতেন এই স্থানে তাহা দেখা যায়। ঘােট ঘােট অন্ধকার ঘর, কোনও রূপ শিল্পকাৰ্য্য নাই; অথচ পার্শ্বে ই সুন্দর ভজনালয়, বহুমূল্য চিত্ৰ মূৰ্ত্তি প্রভৃতির দ্বারা পরিশােভিত। আর্ণো নদীর দুই ধারেই ফ্লরেন্স নগর অবস্থিত। নদীর উপর অনেকগুলি সেতু বিদ্যমান। পিটি প্রাসাদ হইতে উফিজি প্রাসাদ পৰ্যন্ত যে সেতুর কথা পূর্বে বলিয়াছি তাহা অবশ্য আবৃত এবং রাস্তা হইতে তাহাতে যাওয়া যায় না। তাহার পার্শ্বে ই পন্টিভিচিও (Ponte vecchio) নামক সেতু। তাহার দুই পার্শ্বে অনেক সুন্দর সুন্দর মণিকারের দোকান। সহরের উপকণ্ঠে অনেক সুন্দর সুন্দর উপবনবাটীকা দেখা যায়। এই সব স্থানে বিভিন্ন দেশীয় অনেক লােক স্থায়িভাবে বাস করেন। আমি যখন যাই, টুথ’ পত্রিকার ল্যাবুসিয়ার একটি বাটীতে বাস করিতেছিলেন। পিটি প্রাসাদের পার্শ্বে ববােলি উদ্যান ( Boboli Gardens) প্রতি রম্য কানন। কিছু দূরে একটি উচ্চ ভূখণ্ডে Piazza le Michelangelo নামক একটি Square এর ন্যায় স্থান আছে। তথ হইতে ; পরিদৃশ্যমান ফ্লরেন্স চতুঃপার্শ্বস্থ পাহাড় প্রভৃতির দৃশ্য অতি মনােহর। ফ্লরেন্সে এখনও অতি সুন্দর Mosaic প্রস্তুত হয়। শ্বেত পারে নানা বর্ণের প্রস্তরখণ্ড বসাইয়া চিত্র অঙ্কিত করে। আমি এইরূপ একটি কারখানা দেখিতে গিয়াছিলাম। স্বত্বাধিকারী অতি যত্নসহ- কারে আমাকে সমস্ত দেখাইলেন। র্যাফেল প্রভৃতি প্রসিদ্ধ চিত্র- করের ছবি পাতরে ক্ষৈাদাই হইতেছে। একথানি চিত্র পরবৎসর রােমের প্রদর্শনীতে পাঠাইবার জন্য প্রস্তুত হইয়াছে। শুনিলাম, চারি জন লােক তিন বৎসর পরিশ্রম করিয়া ছবিটি ক্ষোদাই করিয়াছে। দাম আমাদের মুদ্রায় ৯০,০০০ টাকা। ছােট ছােট টি টেবল (Tea Table } অনেক রহিয়াছে সাধারণ মূল্য পাঁচ ছয় শত মুদ্রা। আগ্রায় যেরূপ ফল ফুল অঙ্কিত রেকাবি পাওয়া যায় সেইরূপ রেকাবির মূল্য ৭৮ টাকা। ফ্লরেন্সের গাড়ােয়ানরা এক অদ্ভুত ছাতা ব্যবহার করে। ছাতা- গুলি অতিবৃহৎ ও বট অতি ছােট। পূৰ্বেই বলিয়াছি, য়ুরােপের ভাড়াগাড়ি সবই ফেটিন জাতীয়। এই ছাতার বাঁট কোচম্যানের পৃষ্ঠস্থিত রেলে দড়ি দিয়া বাধিয়া রাখে। তখন ইহার দ্বারা গাড়ির আবরণ হইতে ঘােড়ার পৃষ্ঠের মধ্যস্থল পৰ্যন্ত ঢাকা পড়ে; কাষেই আমাদের দেশে ফিটনে যেরূপ আরােহীর সম্মুখভাগ অয়েল। দিয়' চাপা দিতে হয়, বৃষ্টির সময়ে যেরূপ কিছুরই প্রয়ােজন হয় না। ক্লরেন্সের সরকারী উদ্যানে একজন ভারতবর্ষীয় রাজপুত রাজার সমাধি ও স্মৃতিস্তুম্ভ আছে শুনিয়াছিলাম, আমি দেখি নাই। রঙ্গের সর্বাপেক্ষা গৌরবস্থল দান্তের বাসগৃহের কথা বলিয়া 'ফুরেন্সের বিবরণ শেষ করিব। ছােট একটি সাদা চু পাতরের ( White limestone) সৰু ত্রিতল গৃহ। বােধ হয় প্রত্যেক য়ুরােপ-প্রমণ। তলে একটি কি জোর দুইটি কক্ষ। গলির মােড়ে বাড়া। দরজায় ইতালীয় ভাষায় লিখিত রহিয়াছে, “এই বাড়ীতে স্বর্গীয় কবি, আসি- ঘেরির পুত্র জন্মগ্রহণ করেন” (Here was born the Divine Poet, the son of Alligheri ).

ভেনিস। ক্লরেন্স হইতে বেলা ২টার সময় যখন যাত্ৰা করি তখন খুব বৃষ্টি হইতেছে। এই দিন গাড়িতে আমার অত্যন্ত দুর্গতি হইয়াছিল। এই ট্রেণ বরাবর রাম হইতে মিলান যায়, কেবল একখানা গাড়ি ভেনিস যায়, সেই গাড়িতে চড়িতে না পারিলে পথে ট্রেণ বদলাইতে এখন ইটালির গাড়ির অসুবিধা এই যে, একই গাড়ির দুইটি কামরা প্রথম শ্রেণী এবং অবশিষ্ট তিনটি কামরা দ্বিতীয় শ্ৰেণী। পূৰ্বেই বলিয়াছি, য়ুরােপে সবই Corridor carriages; গাড়ির দুই দিক দিয়া উঠা যায়। ভিতরে গিয়া প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর কামরায় বিশেষ কিছু পার্থক্য নাই, কেবল গদির বর্ণ বিভিন্ন ; তাহাও ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্ন প্রকার। আমার ছিল দ্বিতীয় শ্রেণীর টিকিট। গাড়ি যখন আসিল, ভেনিসের Through carriageএ গিয়া উঠিলাম । একটি কক্ষে একটি স্থান ছিল, সেই স্থানে বসিলাম ও জিনিষ পত্র তুলিতে বলিলাম। মুটিয়া কি বলিল, বুঝিতে পারিলাম না। টেণ ছাড়িলে যখন কণ্ডাক্টার গার্ড আসিয়া টিকিট দেখিল তখন বুঝিলাম, আমি প্রথম শ্রেণীর কক্ষে উঠিয়াছি। উঠিয়া যাইয়া দ্বিতীয় শ্ৰেণীতে, দেখি, নির্দিষ্ট সংখ্যক যাত্রীতে কক্ষগুলি পূর্ণ। পূর্বেই বলিয়া ছি, য়ুরােপে নির্দিষ্ট সংখ্যার. অতিরিক্ত যাত্রীকে গাড়িতে স্থান দেয় না। কি করি? বড়ই মুস্কিলে পড়িলাম। আরও বিপদ যোনও সহযাত্রী বা কাটার কেহই ইংরাজীনবিস নহে।

১২৮ য়ুরােপ-ভ্রমণ। কি বলে কিছুই বুঝি না। কিছুক্ষণ পরে গার্ড কি বলিল। আমি বুঝিলাম যে, সে আমাকে অন্য কামরায় যাইতে বলিতেছে এবং আরও বােধ হইল যে, যে গাড়িতে লইয়া গেল তাহাও ভেনিস যাইবে। আজাদের সহিত সেই গাড়িতে গিয়া বসিলাম। ঘণ্টা দুই পরে একজন ইংরাজীভাষাবিৎ সেই গাড়িতে উঠিলেন, তাঁহার সহিত কথােপকথনে বুঝিলাম যে, গাড়ি ভেনিসগামী নহে। কি আর করি, গাড়ি বদলাইতেই হইবে। বলেইনা ( Bologna) ষ্টেশনে যখন ট্রেণ পেীছিল তখন ভেনিসের ট্রেণ ছাড়িবার মাত্র পাঁচ মিনিট সময় আছে। শুনিলাম, তিনটা প্ল্যাটফর্ম পার হইয়া ভেনিসের গাড়ি পাওয়া যাইবে। অনেক কষ্টে মুটিয়াকে বুঝাইলাম যে, লাইনের উপর দিয়াই যাইব। গিয়া দেখি, ট্রেণে সমস্ত দ্বিতীয় শ্রেণীর কক্ষ পরিপূর্ণ। আর বৃথা না ভাবিয়া এক প্রথম শ্রেণীর গাড়িতে উঠিলাম। গাড়ি ছাড়িবার পূর্বেই গার্ড আসিয়া বকাবকি আরম্ভ করিল। ভাগ্যক্রমে গাড়িতে একজন ইংরাজীজানা লােক ছিলেন। তাহার মধ্যস্থতায় অতিরিক্ত ভাড়া দিয়া তবে নিশ্চিত হই- লাম। তিন ঘণ্টার পথের অতিরিক্ত ভাড়া লাগিল ৩y• আনা। রাত্রি প্রায় দশটায় ভেনিস পৌছিলাম। গিয়া শুনিলাম যে, অত্যন্ত বর্ষায় সহরের প্রধান স্থান পিয়াসা সান মার্কো (Piazza Sati Marco) ভাসিয়া গিয়াছে। সে পর্যন্ত জলপথে যাওয়া যাইবে না। অর্থপথ হইতে হাঁটিতে হইবে। বৃষ্টি খুব চলিতেছে। কি করা যায়, সেই বৃষ্টিতে কলের মধ্যে প্রায় দশ মিনিট হাঁটিয়া হােটেলে গিয়া উঠিলাম। হােটেলটি Piazzaর উপরই অবস্থিত। রাত্রি ১১টার সময় দেখি, তখনও খুব জল। মুনিসিপালিটির নােক Piazzaষ বেঞ্চ পাতিয়া দিতেছে, পথিকরা তাহার উপর দিয়া এবং কেহ কেহ লােকের পৃষ্ঠে উঠিয়া যাতায়াত করিতেছে। ভাবনা ভেমিস। ; হইল যে, আমার কপালে বুঝি ভেনিস দেখা ঘটে না। সৌভাগ্যক্রমে পরদিন প্রভাতে উঠিয়া দেখি, জল সমস্ত সরিয়া গিয়াছে ও সূৰ্য্যদেব হাসিতেছেন। ভেনিস (ইতালীয় নাম ভিনিসিয়া Venezia) দেখিলে মনে হয় যে, বিংশ শতাব্দী এ স্থানে প্রবেশ করিতে পারে নাই। অধুনাতন যুগের প্রধান উপাদান, বিশেষতঃ য়ুরােপের—ব্যস্তভাব ( hustle) এ স্থানে, আদৌ নাই; থাকিবার উপায় নাই। স্থানে গাড়ি ঘােড়া একেবারে নাই। প্রধান রাস্তা কেনাল বা জল- প্রণালী এবং প্রধান যান গগোল (Gondola) বা নাতিবৃহৎ জেলেডিঙ্গি—একজন মাত্র নাবিক একটি লগি দিয়া চালায়। স্থলপথে যে সব রাস্তা সে সব অত্যন্ত সরু; অধিকাংশ রাস্তায় তিনজন লােক পাশাপাশি চল। প্রায় অসম্ভব। খালগুলি প্রায়ই খুব সরু, অনেক স্কুলে দুই থানা ডিঙ্গি পাশাপাশি যায় না। বাঁকের নিকটে মাঝিরা একরূপ অদ্ভুত চীৎকার করিয়া অপর দিকের মাঝিকে সাবধান করে, নচেৎ ধাক্কা লাগিবার সম্ভাবনা। তবে ভেনিসের প্রধান গৌরব Grand Canal বেশ চওড়া। প্রায় ২০ মাইল লম্বা সর্পাকৃতি উল্টা Sএর ন্যায় চেহারা এই প্রণালীর উভয় পার্শ্বে অভিজাত বংশীয়দিগের প্রাসাদ বিরাজমান। জল হইতে বাড়ীগুলি উঠিয়াছে, প্রবেশদ্বারের উভয় পার্শ্বে খুটি পােতা। তাহাতে গণ্ডোলা আটকান। সকলেরই আপন আপন গণ্ডোলা আছে; বেশ বড় বড় নৌকা আছে এবং একাধিক নাবিকও আছে, তাহাদের বেশভূষা অতি অদ্ভুত রকমের। এই কেনালগুলি কেবল রাজা নহে, সহরের ড্রেণও বটে। জোয়া- রের সময় সমুদ্রের জলে কতক আবর্জনা ভাসাইয়া লইয়া যায় বটে, কিন্তু তবুও এত পুতিগন্ধ যে লােক কি করিয়া নিরােগী হইয়া এ স্থানে বাস করে বুঝা যায় না। ভেনিসে এই জন্য মশাও যথেষ্ট।

যুরােপ-প্রমণ। পূৰ্বেই বলিয়াছি, সহরের প্রধান স্থান পিয়াসা সান মার্কো। ইহা কতকটা ABCDEF ধরণের স্থান। A B প্রায় ৬০ গজ এবং E F A F Cathedral San Marco B Doges Palace Bridge of Sighs. Prison DE Grand Cana! ৯০ গজ। এই সমগ্র পিয়াসা মৰ্ম্মরে মণ্ডিত। এই স্থানে লক্ষ লক্ষ পারাবত থাকে; সমস্ত দিন লােক তাহাদের কড়াইভাজা প্রভৃতি খাইতে দেয়। খাবার দেখিলে তাহারা লােকের সমস্ত অঙ্গে আসিয়া উড়িয়া বসে, হাতের উপর টুপির উপর হইতে খাবার তুলিয়া লয়। সেই অবস্থায় ফটোগ্রাফ ভােলান এখানকার ফ্যাসান। পিয়াসায় সমস্ত দিন ভিড়—বিশেষ রাত্রিতে। এত বেকার লােকও ভেনিসে আছে। গ্রাণ্ড কেনালের ঠিক মধ্যস্থলে সেই রিয়ান্টো বিজ ( Rialto Bridge) একটি মাত্র খিলান। খিলানটি বেশ চওড়া, দুই ধারে বিপণি- শ্ৰেণী, মধ্যে যাতায়াতের রাস্তা। পূর্বে এই সেতু কাষ্ঠনিৰ্ম্মিত ছিল, এখন মাৰ্বল পাতরে প্রস্তুত। সেক্সপীয়র পাঠকের নিকট এই সেতু চিরপরিচিত। এই সেতুর নিয়েই পুরাকালের বণিকদিগের মিলন- স্থান ও তৎপার্শ্বে একটি ক্ষুদ্র দ্বিতল গৃহ সাইলকের গৃহ বলি খ্যাত।

ভেনিস। ১৩১ তাহার অল্প দূরেই মোেেহাটা, তথায় নানারূপ মৎস্য দেখিতে পাওয়া যায়। এতদ্ভিন্ন ডেভিমােনার গৃহ, অ্যান্টোনিওর গৃহ প্রভৃতি যাত্রীদের দেখান হয়। সবই অবশ্য Apocryphal, পিয়াসার এক পার্শ্বে সানমার্কো কেথিড্রাল দ্রষ্টব্য। এই মন্দিরে মৰ্ম্মর-স্তম্ভের বাহুল্য ; প্রায় ৫০০ স্তম্ভ আছে, সব গুলিই সুবর্ণ কারু কাৰ্য্যে মণ্ডিত। তত্তির এই কেথিড্রালের ছাত প্রায় ৪০০ ফুট কাচের Mosaicsএ মণ্ডিত। একটুও পাতরের কায নাই, সমস্ত কাচের কাৰুকাৰ্য,। দেখিতে বড়, চমৎকার। কেথিড্রালের পার্শ্বে Doges Palace বা ভেনিসের পুরকালের অধিপতিদিগের আবাস। অতি প্রকাও প্রাসাদ। দ্বিতলভাগ অতি জমকালাে। যে সব ঘরে সেকালে রাজসভা বসিত, তাহাদের ছাতেও অতি সুন্দর সুন্দর চিত্র অঙ্কিত। যে কক্ষে সাধারণ বিচারগৃহ ছিল, পাের্শিয়া যথায় বক্ততা করিয়াছিলেন সেই কক্ষে দেওয়ালে দুইটি প্রকাণ্ড ঘড়ি আছে, প্রত্যেকটিতে একটি কাটা, একটিতে ঘণ্টা দেখায় অন্যটিতে মিনিট। আর একটি বড় কক্ষে পৃথিবীর বৃহত্তম তৈলচিত্র দেখা যায়। ৭২ ফুট লম্বা ও ২৫ ফুট চওড়া চিত্রে লিখিত বিষয় “স্বর্গ।” টিনটোরেটো- ; লিখিত এই চিত্রে ৭০০ মূর্তি বিদ্যমান। এই কক্ষে দুইটি গোলক আছে। চতুর্দশ শতাব্দীতে য়ুরােপীয়গণের নিকট পৃথিবীর কতটুকু অংশ জ্ঞাত ছিল এই গােলক দুইটিতে তাহা বুঝা যায়। তদ্ভিন্ন এই কক্ষে সমস্ত Doges বা ডিউকদিগের প্রতিকৃতি অঙ্কিত আছে, কেবল একটি স্থান শূন্য, সেই ডিউকের প্রাণদও হয়। প্রাসাদের গুপ্ত মন্ত্রণাগৃহও বেশ সুসজ্জিত, কেবল Council of Three যে ঘরটিতে অধিবেশন হইত তথায় চিত্রাদি নাই। Coun- য়ুরােপ-ভ্রমণ। cil of Ten এবং Council of Three অতি নৃশংস বিচারাধিকরণ ছিল, তাহাদের হস্তে কখনও অভিযুক্ত ব্যক্তি মুক্তি পাইত না। প্রাসা- দের নিয়তলে একটি কুলুঙ্গির ন্যায় স্থান আছে। তাহাকে ব্যাঘ্রমুখ ( Tiger's mouth) আখ্যা দিয়াছিল। কোনও ব্যক্তির নামে তথায় অপবাদপত্র দিয়া আসিলে সে তৎক্ষণাৎ কারাগারে নিহত হইত। কারাগার হইতে বিচারালয়ের পথ একটি সরু খালের উপর দ্বিতল সেতু। একতলে রাজকীয় অপরাধীর পথ, দ্বিতীয়ে সাধারণ অপরাধীর। এই সেতুর নাম Bridge of Sighs; কারণ,এই সেতুর পথে গিয়া কেহ কখনও মুক্তি পায় নাই। সেতু এখনও বিদ্যমান এবং প্রাসাদ হইতে কারাগারের সেই পথই সহজ, কিন্তু অপরাধীরা সে পথে নীত হয় না । Frari নামক একটি গির্জা দেখিতে গিয়াছিলাম। তথায় ক্যানােভা, টিশিয়ান প্রভৃতি প্রসিদ্ধ ইতালীয়দিগের গোর বা স্মৃতিস্তম্ভ আছে ; প্রসিদ্ধ শিল্পী কর্তৃক অঙ্কিত চিত্র ত আছেই। আর একটি গির্জা দেখিয়া- ছিলাম Santa Maria della Salute সান্টামেরিয়া ডেলা সালুটে ইহা প্লেগমুক্ত ভিনিসিয়দিগের ধন্যবাদচিহ্ন। এই গির্জায়ও সুন্দর সুন্দর চিত্র ও Mosaics আছে। যুবােপে এই একটি মাত্র গােলাকৃতি গির্জা দেখিয়াছিলাম। আর সবই ক্রুশাকারে নির্মিত। ভেনিসের সাধারণ উদ্যানটি অতি সুন্দর ও নানা মৰ্ম্মর-মূৰ্ত্তিতে সজ্জিত। অবশ্য গ্যারিবন্ডির একটি প্রকাণ্ড মূর্তি আছে। পূর্বেই বলিয়াছি, গ্যারিবন্ডির মূর্তি নাই এরূপ সহর ইটালিতে নাই। ভেনিস কতকগুলি দ্বীপের সমষ্টি। ভূখণ্ড হইতে ভেনিস পৰ্যন্ত সৰু যােক নিৰ্মাণ করিয়া তাহার উপর দিয়া রেল চালাইয়াছে। প্রায় দুই মাইল পর্যন্ত এই ব্যবস্থা, দুই ধারে জল-কেবল রেলের লাইনটি মটীর উপর স্থাপিত। ভেনিস হইতে রেলে অষ্ট্ৰীয়াদেশস্থ ট্ৰীয়েষ্ট নগরে (Tieste) W4 காயம்பாக்கம்

No text on this page.

ভেনিস। ১৩ ; অসিলাম। এই বন্দর হইতে জাহাজে উঠতে হইবে। হােটেলটি সমুদ্রের ধারে প্রকাণ্ড Strand এর পার্শ্বে অবস্থিত। স্থানটি অতি সুন্দর। বিশেষ কিছু দেখি নাই; কারণ, রাত্রিতে পেীছিয়া তৎপরদিন প্রাতেই জাহাজে উঠতে হইল। জাহাজ দুইটার পরে ছাড়িবার কথা; কিন্তু সকালে সমুদ্রের জল বাড়িয়া রাস্তাঘাট প্লাবিত করিতে আরম্ভ করিল, দশটার মধ্যে হোটেলের একতলে বেশ জল দাড়াইল। কাষেই জাহাজে পাইতে হইল। এ জাহাজে অনেক যাত্রী, সবই প্রায় য়ুরােপীয়, কেবল মাত্র তিনজন পার্শি; আমিই একক বাঙ্গালী। এই পথে আসিতে প্রথম দিনকয়েক প্রায়ই ডাঙ্গা দেখা যায়, কেফালােনিয়া, জ্যান্টি, গ্রীসীয় দ্বীপপুঞ্জ প্রভৃতি দেখিতে দেখিতে পাের্ট সৈয়দে আসিলাম। পথের বর্ণনার আর প্রয়ােজন নাই, যাত্রার সময়েই সে কথা বলিয়াছি। এবার এডেনে নামিয়াছিলাম। বন্দরের নিকট গােটাকতক দোকানঘর ও সৈন্তাবাস ও গােরস্থান এবং বন্দর হইতে মাইল কয়েক দূরে প্রাচীন জলাশয়। এডেনে বৃষ্টি হয় না। বৃক্ষাদি নাই, একটি বাড়ীতে একটা বটগাছ টবে করিয়া রাখিয়াছে; জলাশয়গুলি অতি প্রকা, কিন্তু বিন্দুমাত্র জল নাই। লােক সমুদ্রের জল লইয়া Condense করিয়া তাহাই পানাদির জন্য ব্যবহার করে। এডেন ছাড়িয়া আরব সমুদ্রে একটা তিমি মং দেখিয়াছিলাম। উল্লেখযােগ্য ঘটনা আর কিছু দেখি না। যে দিন প্রভাতে হাবড়ায় আসিয়া পোঁছিলাম, আমার দুই কন্যা আর সকলের সঙ্গে ষ্টেশনে উপস্থিত। হাট মন্তকে, টাইকার পরিহিত এক অদ্ভুত চেহারা দেখিয়া ঘােটট (বস ৫ বৎসর বড়কে প্রশ্ন করিল “ও কে ভাই?” সম্পূর্ণ।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Europe-bhraman

Author
Basu,narendrakumar
Title
Europe-bhraman
File name
Europe-bhraman
Text
OCR done
Citation
1912
Published
2010/04/24
Publisher
N.a
Language
Sanskrit
Pages
158
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Travel
Keywords
Holborn Viaduct
DLI number
515549
Barcode
4990010016254.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
FkSoI6h8p4O
Download PDF

Europe-bhraman