Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Sudhakana

Chattopadhyay,lalitakumar · 2009/12/30

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

=
page-$0.wrfect
সুধাকণা

প্রকাশক
মােহিত কুমার চট্টোপাধ্যায়
কৃষ্ণনগর, (নদীয়া)
জ্যোতিষ চন্দ্র ঘােষ কর্তৃক মুদ্রিত
কটনপ্রেস
৩৭-৭ বেনিয়াটোলা লেন,
কলিকাতা

নিবেদন।
আমি কবি কিম্বা শিল্পী মই—সুতরাং কবিতা এবং গান
হিসাবে এ লেখা। লির মধ্যে ভুল ত্রুটী থাকিবারই কথা।
বিশেষতঃ এর সুরগুলি আমার দেওয়া নয়। তবুও শিল্পীর
কণ্ঠে এ গানগুলি অনেক সময় নিজের কাছে মধুর লাগিয়াছে।
তাই মনে হয় যে সুরসংযােগে এ লেখাগুলি হয়ত চিত্তাকর্ষক
হইবে। সেই আশাতেই এগুলি প্রকাশিত হইল। সাধারণের
কাছে ইহা ভাল লাগিলেই ধন্য হইব।
কুনগুর
২০শে আশ্বিন,
১৩৩১
এললিত কুমার চট্টোপাধ্যায়

No text on this page.

তাহাকে যাহাকে লক্ষ্য করিয়া অলক্ষ্য এই চিন্তার ধারা।

No text on this page.

সূচী পত্র। পৃষ্ঠা গান অন্তরেরি চোখে চোখে ১১ ১০১ ৯৮ ••• ৩২ অন্ধকারে নয়ন ঝরে অন্ধকারে পূজিস কারে আজ তােমার গলে পরাই প্রিয় আজ বাদলে কি যে বলে আজি এ ফাগুনে পলাশ বনে আমায় ডাক দিল কে গভীর রাতে ** • ৮৪ ৯০ ... ১৮ ... ৩০ ... ••• ৩৮ ৭৯ ১ আমার নয়নে করইে বাস আমার মরম জানিতে চায় আমার এ ব্যথা ভরা মন আমি পথের পানে রহি চাহিয়া , আমি গাহিয়া তােমারি গান আমি জানিনা কখন তােমার আসন আমি সকল মনের কামনা লইয়া আয়রে আঁধার আমায় দে ঢেকে একলা মনের সে যে মিলনসাথী ... একি অকরুণ করুণা তােমার প্রিয় 'এত যে কঁাদালে দিলে এত ব্যথা এ নয়ন জল দিয়া তব চরণ পুজিব ১৭ ২৭ ৪৭ ••• c [ ২ ] গান পৃষ্ঠা ৪৯ এমন করে চির তরে থাকবে যদি দূরে এযে তােমারই বাজান বাঁশী এল ঐ কোন অতিথি এস শারদ জননি ওই যে নিশীথ তারা ৮৭ ৭২ ওগাে তােমায় চোখের দেখা ৬৯ ওগাে আমার প্রাণের দেবতা ১০ ৫ ২৯ ১৫ ১১ ৯. ৩৪ ওগাে আমার অন্তর ধন ওগো মম দরদি ওগাে মানস সুন্দরি ওগাে মধুর দর্শন ও তার নিত্য করুণ গান ও দুটী ও কাল চোখে ওরে উতলা উদাস কই তােমারে তেমন করে কত যে মা বাসলি ভাল কত আপনার করিয়া তােমারে ... কত দিন পরে পাইব তােমারে কত দিন গেছে চাহি পথ তােমারি কত রজনীর মৌন আঁখি ধারা কমলা কল্যাণী কবে তুমি আসবে হিয়ার ভাসিয়ে দুকুল কবে আসিবে ওগো অতিথি ১০০ ১২ ••• ২৪ ৬০ ৫৭ ••• ৭৬ [ ৩ গান পৃষ্ঠা ৭০ ৪৬ ৭৭ ... ... ১৪ ••• # । ୫ ••• কবে আমায় পারের খেয়ায় কাটবে নাকি তাের এ ঘুমের ঘাের কার স্বপন চোখে ভাসে অহরহ কে জানে তাহারি মন কে আমারে চাওয়ায় পথ কেন পাও ব্যথা শুধু ভাবি তারে কেমন করে জানাই তােরে কোন মধুপ গুঞ্জরে আজ গানটা তােমার শুনে চরণ ছাড়া করিসনি মা চির তুষার মণ্ডিত গিরি জীবন পথে আলােক রথে জীবনের পরপার হতে তুমি জীবন নদীর এ পারেতে বসি জোছনার ঐ পাগলা বােরা তুমি এতই কি নিঠুর তুমি কত যে আমারে তুমি কি তাকিয়ে আছ তুমি দাঁড়াও নয়ন পরে তােমার তরে যেজন ঝুরে তােমার ঐ রূপের অনল তােমার ইচ্ছায় আমার মাথা নত করিবারে তােমারে ভাবিতে হায় ত ••• ২৮ ৩৫ ১৮ २२ ২৩ ৪১ ৩) ৫৪ [ ৪ ] গান পৃষ্ঠা তােমারে করিয়া লক্ষ্য ২০ ১৬ ••• ১৩ ৩১ ৪ তোমারে দেখব বলে নয়ন মেলে তােমারি পথে চলিয়া যেতে তৃষিত এত পথ চাওয়া দিওনা দিওনা আমার স্বপনে ভাঙ্গিয়া দিগন্তে বরণ টালি দেখেছি কি দেখি নাই দূর হতে আজ কি গান ওরে দুলিয়ে দিয়ে প্রাণটা আমার দ্বারে এল অতিথি ধরার বুকে ফুটিয়ে তুলি নয়ন মুদে যদি তোমায় না দেখার ব্যথা না আর আড়ালে থেকোনা ... নিমেষ হারা চোখে ••• ৩৬ ••• ৮৬ ••• ••• ... ১২ ৮৯ ••• ••• ৮০ ... নূতন পাতায় নূতন ফুলে প্রাণ কাদে যার মায়ের ভরে প্রাণের দুয়ার আজি ফাগুন তুই কখন এলি ভাবনা কেন করিস রে মন ভুলে যে ছিলে সখা সেই ত ভাল মনেরি আগল খুলিয়া কে দিল মম অন্তর প্রিয় তুমি এস গাে তখন ••• ৪ ৪৪ ৮২ [ ৫ ] গান পৃষ্ঠা ১৪ ৮৩ ৮ ৫৯ ৭১ ৮১ মা গো আর ত চরণ ছাড়ব না মা গাে তােমায় কেন থাকি ভুলি মুখ চেয়ে কে আছিস মায়ের মেঘের কোলে এলায়ে কেশ যদি না দেবে দেখা কেন সখা যদি আসিতে না বলে মন যদি সারাটা জীবন কাটিল কোন বঁধুয়া আজও কি রবে ছাড়িয়া বাজিয়ে বাঁশী কেওই আসি বেণু তুই নীরব হয়ে রইলি কেন সহেনা সহেনা আর সাজে কি আর তােমার প্রতি ... সাধে লয়ে আছি বুকে সে কি তােমার চরণ ধ্বনি সে যে তােমারি অরূপ দিয়া হেথা একি বন্ধুর পথ ক্ষণিকের ওই অতিথিরে ২১ ১১ ৭৮ ৩৯ ৬১ ••• ••• ৩ ... • ৬৪

No text on this page.

ক্ষুধাকণা..
সুধাকণা।
সুর-খাম্বাজ।
আমি গাহিয়া তােমারি গান+৮৮৫
তােমারই পূজা করি।
যদি ঝঙ্কারে মনে তান,
সে যে তােমারই মুখ স্মরি।
আমি জানিনা গাঁথিতে কথা,
শুধু অন্তর ব্যাকুলতা
পড়িতে ঝরি করিয়া চয়ন,
সপি গাে সাজিটী ভরি।
এতে জানি নাহি সৌরভ,
কোন বরণ বিভব।
তবু তােমার কাছে ইহার আদর
হবে যে মনেতে ধরি।
এই অকিঞ্চনের দান,
কোথা বল গগ। ইহার স্থান?
যত নয়নের জল হােক সুধাকণা
তােমার চরণ বরি।

সুধাকণা
সাড়া।
সুর-মিশ্র পলশ্রী।
সে কি তােমার চরণ-ধ্বনি।
(আমার) বিজন প্রাণের নীরব কুলে
নিশীথে উঠে রণি।
মগন থাকি আপন কাযে,
কখন আস, কখন না যে,
তােমার সাড়া প্রাণের মাঝে
কিছুতে নাহি গণি।
চলিয়া তুমি গেলে পরে,
ব্যথায় মােরে পাগল করে,
কেন নাহি দিলাম ওরে
পাতি হৃদয় খানি।
এমন করে না হারালে,
চোখের জলে না খুজিলে,
সরে’ বুঝি যায়না আড়াল
ওগাে নয়ন-মণি।

সুধাকণা
জীবন পথে।
সুর-বেহারি দাদা।
বিন পথে,
আলােক রথে,
কবে হেসে চলেছিলে মালাটী হাতে।
আঁখি-নিমেষে,
মেঘেতে মিশে,
কোথা যে হারায়ে গেলে গভীর রাতে ।
ধরার প্রাণে,
দূর বিমানে,
আর না পড়িলে ধরা নয়ন-পাতে।
শুধু স্বপনে,
পড়ে গাে মনে,
নিরাশ পথ চাওয়া নিশি প্রভাতে।
আজি বাহিরে,
টানে আমারে,
তারার ঝলকে ভরা ছায়ার পথে।
সন্ধ্যা-উষার
আলাে-আঁধার
বাজায় ব্যথার বাঁশী তােমার সাথে ।

সুধাকণা
সিন্ধু গর্জন।
সুর- ভীমপলশ্রী।
দূর হতে আজ, কি গান ওরে
শুনিস আমার মন!
কারে তুই পেয়ে কাছে ছুটি পিছে
করতে আলিঙ্গন।
দেখিস না ক বারেক চেয়ে
উঠছে কি গান গগন ছেয়ে,
কোন্ সাগরের পার হতে
আসে নুপুর-নিক্কন।
ছাপিয়ে উঠি জীবন-গীতি
লক্ষ বুকের করুণ স্তুতি,
মরণের ওই নীল জলধি
গর্জে ক্ষণে ক্ষণ ।
তাকি বুঝিস না রে মন!

সুধাকণা
সাথী।
সুর-ভৈরবী।
ওগাে মরম-দরদি!
কাটবে কি আর অন্তরে মাের
আঁধার দুঃখ-রাতি।
একলা বাহি জীবন-ভেলা,
শেষ যে কবে হবে খেলা,
কবে আবার পাব তােমায়-
চির-আপন সাথী।
বারেক তােমায় দেখব বলে
হৃদয় আমার আশায় দোলে,
বিজন পারের এ অকূলে
কেমনে মন বাঁধি।

সুধণা
স্মৃতি।
সুর - বেহাগ।
তােমার ওই রূপের অনল
প্রাণে কেন ছড়িয়ে গেলে।
যদি না পরশ দানে
করবে শীতল জেনেছিলে ।
ফুলের বাসে শ্বাসটী তােমার
বহিয়া যায় বক্ষে আমার ;
কুহু-রবে কণ্ঠ তােমার
হৃদয়-কুঞ্জ ছেয়ে ফেলে।
লয়ে তােমার দৃষ্টি-ধারা
সন্ধ্যা-তারা নিমেষ-হারা,
ডাকে আমায় বিশসারা
তােমার স্মৃতির অন্তরালে।

সুধাকণা
পূজা।
সুর—আশাবরী।
একি অকরুণ করুণা তােমার প্রিয়।
যদি বেদনার দানে জাগ তুমি প্রাণে
দিও তবে ব্যথা দিও।
তােমারি বিরহে রচিব হৃদয়ে
অশ্রু-কুসুম-ডালি
তােমারই জ্বালা অনলে লইব
মরমের দীপ জ্বলি।
তুমি এমনি করেই মন্দিরে মম
পূজাটা আমার নিও।
জীবন সন্ধ্যা গগনে আজিও
বাসনা রক্ত রাগ,
আছে যা লাগিয়া তােমার স্নিগ্ধ
আলােকে মিলায়ে যাক
মম উছল বাসনা চরণে দলিয়া
অন্তরে তুমি আসিও।

৫
সুধাকণা
চিত চোরা।
সুর-মিত্র ভৈরবী।
(গজল দাদরা )
যদি না দেবে দেখা, কেন সখা
এ লুকোচুরি !
কত যে চেনা সুরে হৃদি পুরে,
শুনি বাঁশরী ।
শূন্য জীবন-বীথি মাঝে স্মৃতি
উঠে শিহরি।
উসর বেলা পরে দূর পারে
উথলে বারি।
জাগিয়া অনুক্ষণ কাটে দিন
সব বিসরি।
যদি বা দেও সাড়া, চিত চোরা,
যেওনা সরি।
কত যে ব্যাকুলতা লয়ে ব্যথা
খুজিয়া মরি।
নিশীথে বাঁশী দূরে, আঁখি-নীরে
তুলে
লহরী।

সুধাকণা
একা।
অর-বেহাগ খাবাজ।
কেন পাও ব্যথা শুধু ভাবি তারে,
জীবন ধরি না পাবে যারে !
বেলাটী যায় বসিয়া একা,
আঁধার ঢাকিছে দূর বনরেখা,
কি হবে চাহিয়া পরপারে।
জীবন ধরি না পাবে তারে।
ভাসায়ে যদি জীবন-তরী
পথ-মাঝে সে গাে গেল পাশরি।
কি ভয় অকূল পারাবারে,
রাখিও অটল আপনারে।
কেন পাও ব্যথা শুধু ভাবি তারে।

সুধাকণা
সমর্পণ
সুর-ভৈরবী।
ওগাে আমার প্রাণের দেবতা।
সফল কর জীবনে মাের যত দীনতা।
বাঁধন-হারা চিত্ত বিকল,
আঁধারে তার ঝরে যে দল,
রাখ সেথা চরণ-তল
মুছি' গাে ব্যথা।
তােমার মাঝে নীরব চিতে
আপনারে সঁপে দিতে
ডুবে প্রাণ কি সুখস্রোতে
ভুলি গাে কথা।

সুধাকণা নয়নতারা। সুর-পাহাড়ী। ও দুটী ও কাল চোখে কি আলাে জ্বলে। তরল বিদ্যুতে কে অঞ্জন পরালে । ছল-ছল চাওনিতে কি যে উছলে। নিমেষেতে হৃদিতল প্রকাশে দুলে । কাল কাল তারাদুটা কি সুধা ঢালে! হাসিতে উজ্জ্বল এই- ভরে সে জলে !! টানা ভূরু পরে রাঙা টীপটা ভালে! সাঝের তারাটা যেন নয়ন মেলে । পলকে আলােক ঝরে হীরক ফলে। চমকে কেবলি রহি আঁচল তলে !

সুধাকণা
আহবান।
সুর-ইমন।
কত আপনার করিয়া তােমারে
চাহে যে আমার প্রাণ!
দূরে থাকি তুমি এ প্রাণের তারে
আঘাত করিছ দান।
অন্তর ভরি ঝঙ্কার উঠি
তােমারে করে আহ্বান।
যাও তুমি সরে কোন্ দূর পারে
আঁধারিয়া দুনয়ান।
লভিয়া তব করুণা-পরশ
এ জীবন মরু ম্লান।
এস প্রিয়, এস মরম বীণায়
তুলিয়া গভীর তান।

সুধাকণা
১৩
আঁধারে।
সুর-সিন্ধু-ভৈরবী (গজল)
তােমারি পথে চলিয়া যেতে
যদি বা আসে আঁধার ঘন,
দীপটী আলি ধরিও তুলি
দেখায়ে পথ হাতে আপন।
ধ্রুবতারাটী গিয়াছে ঢাকি
নাহি উদিতে প্রভাতে কোন,
কেমনে নাথ হেরিব পথ,
সমুখে শূন্য ঘাের বিজন।
নিবিড় ব্যথা লইয়া কোথা
চলিব বল চাহি পিছন।
বেলাটী শেষে আকুল শ্বাসে
স্মরি তােমারে পুরিয়া প্রাণ।
নীরব সাঁঝে, তিমির মাঝে,
একলা পান্থ ডাকে করুণ
জ্বাল গাে জ্বল একটী আলো
পথেতে তার স্নেহ-নয়ন।

সুধাকণা
মুগ্ধ
সুর—পিলু
গানটী তােমার শুনে
আমি হারাই আপন মনে।
কেমন তুমি কর যে গান
করুণ মধুর তানে!
সুরটী তােমার রূপটী ধরে’
দাড়ায় মনের দ্বারে।
আমার বলে’ যা কিছু মাের
লয় গাে তারে হরে।
শুধু হিয়ার মাঝে সুদূর স্বপন
বাজে ক্ষণে ক্ষণে।
চোখের জলে যায়রে ধুয়ে
ধূলি-মলিনতা
জীবনে মাের দেয়রে আনি
কত সার্থকতা।
আমি নিতুই আবার পড়ি বাঁধা
নূতন
বাঁধনে।
* এইটী এবং ইহার পরবর্তী গানটী শ্রীমতী হায়ার গান শুনিয়া লিখিত

সুধাকণা
গানের দান।
সুর-মিশ্র খাম্বাজ।
ও তার নিত্য করুণ গান
কত দুলায় আমার প্রাণ!
জানিনা তার গানে আছে
কি যে দরদ টান ।
এমনি করে ভুলায় সে যে সকল ভুবন
(ও তার) গানের পথে আসে নেমে কি যে গুঞ্জরণ,
তার পরশে প্রাণ ভাসিয়া যায় সুদূর বিমান।
ব্যথায় যখন কাদে হৃদয় দুঃখে ভরি ডালা,
পাইনে সাড়া কারাে কাছে, ছায়ায় ঘেরে বেলা,
(ও তার) কণ্ঠে বাজে আশার বাণী মুছি দুনয়ান।
তার সুরের মেঘতলে মনময়ুর নাচে,
ক্লান্ত চিত-চাতক কত নীর যাচে,
(ও তার) বীণার তানে আপনি ঝরে স্নেহের প্রতিদান।

সুধাকণা
প্রতীক্ষা।
সুর-ঝি ঝিট-খাম্বাজ
তােমারে দেখব বলে’ নয়ন মেলে চেয়ে থাকি।
পলকে যাও পালিয়ে আমায় কেন দিয়ে কঁকি।
কাটে দিন কত আশায়,
কত ফুল ফুটে হিয়ায়,
সবই যে ভূমে লুটায়,
বারেক তােমায় নাহি দেখি।
তােমারে ভাবতে যদি
মরুতে ছুটুল নদী,
শুখায়েতা ও যাবে কি
মরমের খাস লাগি ।

সুধাকণা
১৭
হৃদয়াসনে।
সুর- বেহাগ-খাম্বাজ
আমি জানিনা কখন্ তােমার আসন
পেতেছি মনে।
চেয়ে দেখি তুমি বিরাজিছ সেথা
স্মিত আননে।
মরমের যত মধুর কামনা,
নিভৃতে তােমারে করে বন্দনা
আপন জ্ঞানে।
নিশীথ রাতের নিবিড় ব্যথায়
অ-মুকুতা গাঁথিয়া পরায়
রাঙা চরণে ॥
(তুমি) বুকের ভিতর আছ, তবু কেন
বাহিরে তােমায় খুজে এ নয়ন
রাত্রি-দিনে?
অন্তরে তুমি প্রিয় সম্পদ,
তােমারে না হেরি অহরহ চিত
দহে আগুনে।

সুধাকণা
নির্মম।
সুর আশাবরী।
তুমি এতই কি নিঠুর ।
দেখবে না ক চেয়ে, নাথ হৃদয় বিধুর।
কত যে তােমার তরে
শূন্য হিয়ায় কান্না ঝরে,
এত নিকট হয়েও তুমি
কেন এত দূর ॥
মিলন-আবেশ মাখি
বিরহে বিলীন থাকি ;
শুধু তব মুখ চাহি
জাগে ব্যথার সুর।
আর কি জীবনে পুনঃ
ব্যর্থ-বেদনা-গান
শেষে হবে উন্মেষ
আশার অঙ্কুর।
তােমারই দেওয়া ব্যথা,
নীরবে এ মালা গাঁথা,
তােমারি চরণে লহ
করিয়া নুপুর।

সুধাকণা
মানস-সুন্দরী।
সুর-মালকোষ।
ওগাে মানস-সুন্দরি !
পূজিতে ও রূপ জালিয়াছি ধূপ,
মরমে দিবস-শর্বরী।
তব বিলােল-যৌবন-ভাতি
স্নান করিল চম্পক-জ্যোতি,
তব সলাজ মধুর দিঠি
অন্তর সদা লয় বরি'।
যুব উজ্জ্বল নয়ন কাল,
খঞ্জন-আঁখি করে চঞ্চল,
তব সুঠাম স্নিগ্ধ গঠন
রাজে মন্দির আলাে করি।
তব অতল হৃদয়-প্রেম
বিকাশে শুষ্ক মরুতে কুসুম,
কত না গন্ধে-বরণ-ছন্দে
বিশ্ব-হৃদয় দেয় ভরি।

৪০
সুধাকণা
লক্ষ্য।
অর-সাহানা
তােমারে করিয়া লক্ষ্য
আজি ছুটিয়াছে মাের প্রাণ।
তবু পাতি দিয়া এই বক্ষ
কই নিতে পারি তব দান ?
আজিও যে, প্রভু, ত্যাগের বেদনা
মরমের মাঝে করে আনাগােনা,
অতীতের তরে শতব্যথা ঝরে
অন্তর করি ম্লান।
ছিন্ন করিয়া সকল বাঁধন
হাসিমুখে কই করিতে বরণ
পারি, প্রভু, পথ-কণ্টক যত
ভুলি বেদনার গান।
কি করিয়া বল পাইব তোমারে ?
সব ব্যথা দূব
করি অন্তরে,
কবে তুমি সেথা আসি দেবে দেখা
ও গাে চির-মহীয়ান।

সুধাকণা
রাধার মরম।
সুর-গজল
বাজিয়ে বাঁশী কে এই আসি ডাকে গাে আমায়।
হৃদয়-বারি উথলে তারি সুর অমিয়ায়।
কুসুমপুঞ্জ জীবনকুঞ্জ মুঞ্জরিয়া দেয়।
গন্ধে, বরণে শিহর আনে হিয়ায় হিয়ায়।
কি সুধান আকুলি প্রাণ কোথা যে লুকায়।
বন-আড়ালে কোয়েলা-বােলে সে সুর মিলায়।
আপন-হারা আবেগ-ধারা ছুটে তার পায় ।
কোথা দোসর নয়ন-লাের যমুনা বহায়।
দিয়া দেখা, বাঁশীতে বাঁকা ডাকে কেন, আয়।
কোথা গাে শ্যাম ! রাধামরম শুধু তােমায় চায়।

২২
সুধাকণা
শান্তি।
সর- বেহাগ।
তুমি কত যে আমারে
ডাক বারে বারে,
আমি কই পারি ছিড়িবারে ডাের।
আমি কেবলি অকূলে
ভাসি তােমা ভুলে,
তবু নাহি কাটে এ ভুলের ঘাের।
কবে বঙ্গ টুটি’ সকল স্বপন,
তব স্নেহতলে হব নিমগন,
থাকিবে না আর পথের বন্ধন,
আকুল নয়ন-লাের ॥
এস, প্রিয় এস, লও হাতে ধরে,
শান্ত করে দেও এতদিন পরে
যে তরঙ্গ হায় চির কলম্বরে
উঠে অন্তরে মাের ।

সুধাকণা
২৬
রিক্ত হিয়া।
সুর-বাউল।
তুমি কি তাকিয়ে আছ
আকাশের তারার মাঝে।
ভােমারই কণ্ঠ যেন গাহে গান
বিহগ সাথে সকাল সাঝে।
নিয়ে শুধু মাটি ধুলি
কি যে আপন খেলা খেলি ;
ব্যথার-ব্যথী গিয়া ভুলি
তােমার পানে চাহিনা যে।
থাকি থাকি অবসাদে,
প্রাণের মাঝে কি যে বাধে ;
জীবন বােঝা লয়ে কঁাধে
দিনটা যখন কাটে কাযে।
আঁধার যখন ঘনায় বনে,
কেউ থাকে না সঙ্গোপনে
তােমার কথা আসি মনে,
রিক্ত হিয়ার ব্যথা বাজে।

২০
সুধাকণা
আকিঞ্চন।
সুর-ইমন।
কত দিন পরে পাইব তােমারে
বল গাে জীবন-নাথ।
হৃদয় হইতে যাইবে সরিয়া
দুঃখের আঁধার-রাত।
শুধু আশা নয় দরশ তােমার
আনিবে সুপ্রভাত।
জীবনের পরে হইবে নূতন
অরুণ কিরণ পাত ।
মরমের কোণে উঠিবে ফুটিয়া
কুসুম শিশিরস্নাত।
ওই মুখ চাহি আনন্দে তাহারা
ঝরিবে আমার সাথ।
তােমারে ছাড়িয়া আছি আজীবন
ভুলিব রে সে আঘাত।
যে দিন আমারে ধরিবে তুলিয়া
তােমার স্নেহের হাত।

সুধাকণা
পথিক।
সুর কীর্তন।
হেথা একি বন্ধুর পথ !
হেথা নাহি ছায়াবীথি, কুসুম-বিস্তৃতি,
চলে অরুণ-রথ ।
হেথা ডাকে না বিহগ, আনেনা পুলক,
জোছনা-বিহ্বল নিশি;
হেথা পল্লী-বধূর কঁাকন মধুর
মুখর করে না দিশি।
হেথা ঝড়ের কাল মেঘের কোলেতে
বরষে অশনি শত।
হেথা কণ্টক-বনে রক্ত চরণে
আঁধারে একাকী ফিরি ;
হেথা সিন্ধু-কিনারে বসি অন্তরে
তৃষ্ণা পুষিয়া মরি।
হেথা পথের মত্ত-ধূলিতে কেবলি
দৃষ্টি হয়রে হত।

সুধাকণা
পরপারে।
সুর -মিশ্র ভীমপলশ্রী-দেশ।
জীবনের পরপার হতে তুমি
নীরবে বাজাও বীণা।
আমি প্রাণের নিতলে পাতিয়া কান গাে
শুনি তার মূচ্ছনা।
লক্ষ তারার দীপ্ত নয়ন,
পার হয়ে কোন সুদুর ভুবন,
স্বপন আমার ফিরে যে শূন্যে
অর্সীমে ব্যর্থ বিমনা ।
গগনের ঐ নিবিড় আঁধারে,
মরণের ব্যথা বিশ্ববুক জুড়ে,
জানায় আজিকে কি করুণ সুরে
চিরবিস্মৃতি-বেদনা।

সুধাকণা অঞ্জলি। আমি সকল মনের কামনা লইয়া কত যে তোমারে ডাকি। তুমি অন্তরযামী হয়ে অন্তর- বেদনা বুঝিবে না কি ? কি বা স্বপ্ন জাগরণে- তােমার আসন আমার প্রাণে, আজীবন ধরি নয়ন-বারিতে ধৌত করিয়া রাখি। এস মুর্তি পরকাশি, আমায় ধন্য করহে আসি, মরণ আমার জীবন আজিও লইতে রেখেছে বাকি ॥ তােমার রূপের পারাবারে, আমার নয়ন ডুবিয়া মরে, ছিন্ন আশার কুড়ান দলে চরণ দিইরে ঢাকি।

২৮
সুধাকণা
চক্রবাক্।
সুর - বাগে
উপকূল
জীবন নদীর এ পারেতে বসি
যাপিয়া দুঃখের নিশি
কবে পরপারে দেখিব আবার
তােমার উজল হাসি।
আঁধারের ব্যবধানে
কাদি তৃষাকুল প্রাণে ;
অন্তহীন কোন দূর
হ’তে ভেসে আসে বাঁশী।
পিছে ফেলি সুখ-দুঃখ
মুখ স্মরি কাপে বুক ;
প্রভাতে কখন্ উঠিবে নয়ন
তব রূপে উদ্ভাসি।
তব পারে শত টানে
অসীম আকুল গানে
মরণের দিকে ধায়রে জীবন
সব বন্ধন নাশি।

সুধাকণা
२३
রূপ-মধুর
সুর --কীর্তন
ওগাে মধুর-দর্শন!
অন্তর মাের করিল মধুর তােমার মধুর চাওন।
মধুর তােমার স্ফুরিত অধর, মধুর তােমার আনন,
মধুর তােমার কণ্ঠস্বর, মধুর তােমার ভাষণ।
মধুর তােমার হাসি মনােহর, মধুর তােমার ভূষণ,
মধুর তােমার সুকোমল কর, মধুর তােমার চরণ ॥
মধুর তােমার পদ বিক্ষেপ, মধুর তােমার চলন,
মধুর তােমার তনুগ্রীবা রূপ, মধুর তােমার বরণ ।
মধুর তােমার চারু কাল-কেশ, মধুর তােমার নয়ন,
মধুর তােমার পীতনীলবেশ, মধুর তােমার বসন।
মধুর তােমার বিলীন সুপ্তি, মধুর তােমার শয়ন,
মধুর তােমার প্রেমাকুলগীতি, মধুর তােমার ছলন।
মধুর তােমার করুণ হৃদয়, মধুর তােমার স্বপন,
মধুর তােমার পরশ অজেয়, মধুর তােমার মিলন।
নূতন
করিয়া পরাণ-হরণ,
মধুর তুমি গাে আমার আপন, মধুর তােমার শরণ।
মধুর তােমার নিত্য
“মধুরাষ্টকম” তোত্রাবলম্বনে লিখিত।

সুধাকণা
বিকাশ।
সুর বি বিট - খাম্বাজ
আমার নয়নে করহে বাস।
আমি অপলক আঁখি লইয়া নিরখি
ওরূপ-আভাস !!
মরমে আঘাত করে কত দুঃখ,
কেননা দিলে গাে নয়ন-শতক,
তবে ত তাহাতে উছলি উঠিত
তােমার দীপ্ত হাস !
উজ্জল করি দুনয়ন মাের,
খােল ও রূপের স্বর্ণ দুয়ার,
হৃদয়ের ব্যথা হােক প্রতিভাত
নয়নে পুরায়ে আশ ।
এস তুমি লয়ে মধুরতা নব,
আঁখি-পল্লবে ওরূপ বিভব
তুলাে বিকশিয়া যেমনে করছে।
কুসুমে তব বিকাশ ।

সুধাকণা
পান্থ।
সুর-পূরবী
দিগন্তে বরণ ঢালি
তপন ডুবিল তীরে।
দূর হতে কে গাে পথে
ডাকে খেয়া আন ফিরে ॥
রক্ত আলােক রেখা
ঝলকি বিহগ পাখা
মিশে গেল দূর পারে,
বলাকা ফিরিল নীড়ে।
সাঁঝের অলক-জাল
ছড়ায়ে পড়িল কাল,
পথশ্রান্ত একা পান্থ,
সমুখে আঁধার ঘিরে।

৩২
সুধাকণা
মালা।
সুর-ভৈরবী
আজ তােমার গলে পরাই, প্রিয়,
নাই যে এমন মালা।
এ যে রক্ত জবার দলে গাঁথা
রিক্ত হিয়ার জ্বালা !
সিক্ত যে ফুল
শিশির-জলে,
বসি উষর মরুর তলে,
কোথায় পাব তাহার দলে
সাজাতে মাের ডালা ।
শুভ্র কোমল যুঁই বকুলে
নাই যদি এ মালা দুলে-
তবু এতে চরণ-মূলে
আছে পরাণ ঢালা ।

সুধাকণা
মরম ব্যথা।
সুর—মিশ্র।
আমার মরম জানিতে চায়
ব্যথা যত তার ব্যথী যে ব্যথার
বাজে কিনা বাজে তায়।
গানের পরে আপনি ভেসে
আকাশে সুর লাগে।
ব্যথার ধ্বনি কই আপনি
আরেক প্রাণে জাগে ?
সে যে নীরব
মুখে আপন
বুকে
আপনি মিলায়।
গুঢ় ব্যথার উৰ্ম্মি যত,
কেন না তার প্রতিঘাত
স্পর্শে অপরেরে ?
ভাষার মাঝে ব্যক্ত করা
যায় কি বেদনারে ?
সে যে কথায় তার সকল ভার
জানাতে না পায়।

৩৪
সুধাকণা
বঞ্চনা।
সুর-বাউল।
কৈ তােমারে তেমন করে
চাহে আমার মন ?
তাই কি মােরে অন্ধকারে
রাখলে আজীবন।
সত্যি যদি তােমারে চাই,
কেন না ও পায়ে বিকাই,
অন্ধ হয়ে না ফিরায়ে
কিছুতে নয়ন ?
মিছে ভয়ে অন্তরে যে
মরি মিছে লােক লাজে,
আপনারে বঞ্চি সে যে
হারাই নিজ ধন।

সুধাকণা
মরুছায়া।
সুর-ভৈরবী।
ওগাে আমার অন্তর-ধন
বন-মরুর ছায়া।
জীবন ভরে দেও গাে মােরে,
দেও গাে তােমার দয়া !!
জুড়াবার আর স্থান কি আছে ?
তাইতে ছুটি তােমার কাছে
আছে যা, তা সকলি গাে
মরীচিকা মায়া।
আপন বলে যাদের নিয়ে
পূর্ণ করে ছিলাম হিয়ে,
শূন্য করে কোথা তারা
লুকাইল কায়া!
তােমায় দিয়ে তাইত আজি,
পূর্ণ করি পূজার সাজি
তোমার করুণ নয়ন-পানে
রহি গাে চাহিয়া ॥
।

সুধাকণা
আহুতি।
সুর-পিলু বারোয়া।
দ্বারে এল অতিথি
জীবন ভরা স্বপন যে তাের
ধরে মুরতি !! ·
এখনও কি অশ্রু ফেলে,
অন্ধ হয়ে রইবি ভুলে ?
হৃদয়-শতদল খুলে
দিবি না পাতি।
বিজন দেউলে দীপ
জ্বালি, লয়ে গন্ধ-ধূপ
মুগ্ধ নয়নে তারে
কর আরতি ।
একে একে হৃদি-দলে
দেও ছি ড়ি পদ-তলে
তার পরে আপনারে
পূর্ণ আহুতি।

সুধাকণা
৩৭
তৃষিত।
কর-কল্যাণ।
তােমার ইচ্ছায় আমার মাথা
নত করিবারে ।
শিখাও তুমি আমারে।
নিরাশ কামনা তাপে যেন নাহি
জ্বলে প্রাণ বারে বারে ।
যতটুকূ তুমি করুণা করিয়া
দিয়াছ দিতেছ করেতে তুলিয়া,
করি যেন নাহি আরও গাে চাহিয়া
কলুষিত আপনারে।
যদিও এ প্রাণ তােমারে ভুলিয়া
দূরে সরে যায় তৃষিত ছুটিয়া,
সে যে শুধু আরাে নিকট করিয়া
তােমাকেই পাইবারে।

সুধাকণা
যাচনা।
সুর–মিশ্র ইমন।
আমার এ ব্যথা-ভরা মন
তােমায় চাহে অনুক্ষণ।
কোথা আর স্থান এর
এমন আপন ?
যে কঁাটা বিধে যেখানে
ঢাকা নাহি ও নয়নে
তার তরে কেন প্রাণে
রাখা আবরণ ?
আর কেহ নাহি তারে
হৃদয়ের দুঃখ-ভারে
তাই আজি অন্ধকারে
মাগি ও চরণ।

সুধাকণা
অভিমান।
সুর মিশ্র আশাবরী ।
সাজে কি আর তােমার প্রতি
আমার অভিমান ?
এ যে শুধু দীন প্রাণের
বেদনা জানান।
সফল হবে সকল আশা,
সে যে প্রাণের ঘাের দুরাশা,
মিছে কেন এ লালসা
হয়না তিরােধান ?
যদি কভু মনের কোনে
ছায়া ফেলে ও গগনে,
জেন তাহা প্রাণে-প্রাণে
ব্যথার অভিযান।
অভিমানের ছলে, প্রিয়,
দুঃখ যদি জানাই স’য়াে ;
তােমা হতে না করিও
দূর ব্যবধান।

সুধাকণা
ভাবনা।
সুর—বাউল
ভাবনা কেন করিস রে মন
ছেড়ে দে সকল ভাবনা।
কূল কিনারা নাইক যার
ভেবে তুই করবি তার কি ঠিকানা !
চিন্তার কি অন্ত আছে ?
ভেবে কেন মরিস মিছে ?
তরঙ্গ যা আগে-পিছে
আসে, মাথা পেতে দে না!
যা হবার তা হবে সে যে,
মন কেন না তাহা বুঝে ?
আতঙ্কেতে উঠল বেজে
নাহি মেনে কোন মানা।
পদ্মপত্রের জলে
আছিস ভেসে, গেলি ভুলে ;
শুধু তুই আকুল হলে
পাবি কি আর সে করুণা ?

সুধাকণা
৪১
প্রার্থনা
সুর-বেহাগ খাত্বাজ।
তুমি দাড়াও নয়ন-পরে !
আমি, ললাকের চোখের অন্তরালে
দেখিগাে তােমারে!
তব করুণার পরিচয়
তুমি কত যে দিয়াছ হায়!
তবু এ অন্ধ নয়ন কেবলি
ফিরিছে অন্ধকারে।
ব্যর্থ জীবন-বােঝার ভার
নাহি বহিতে পারিয়া আর,
হৃদয় আমার পড়িছে লুটায়ে
তােমার করুণা-দ্বারে।
আজি ব্যাকুল হইয়া ডাকি,
তুমি চাহিয়া দেখিবে না কি ?
জীবন আমার নিরাশে পূর্ণ
হইবে কি বারে বারে ?

৪২
সুধাকণা
ছলনা
সুর–মিশ্র ভৈরবী
না আর আড়ালে থেকনা !
কত যে ব্যথা পেয়ে তুলেছি বেদনা।
যে হতে গেছ দূরে
নয়ন গেছে ঝুরে
সুখ দুঃখ বুকে দুলেছে কামনা !
স্মৃতির ফুল বনে বিরহী ভ্রমর
আছে মুখ চাহি তােমারি, হে চির
ক্ষণিক স্বপনে
আজি নিশিশেষে করনা ছলনা ।
* রবীন্দ্রনাথের “না গো না করনা ভাবনা” গানের সুর ও ছন্দাবলম্বনে লিখিত।

৪৩
সুধাকণা
কামনা
সুর—মিশ্র খাম্বাজ।
এ নয়ন-জলদিয়া তব চরণ পূজিব।
দিও, প্রিয় দিওগাে অন্তরে নিত্য ব্যথা নব।
আমি ত কাঙাল চির,
আছি লয়ে আঁখি নীর
চরণে ঢালিয়া তাহা, পূত ধন্য হব।
আমার মনের মাঝে,
ব্যথার যে সুর বাজে,
তােমার রাগিনী তাহে পূর্ণ করি লব ।
দিন শেষে দুঃখ-যামি
আসিলে প্রাণেতে নামি
আঁধার আড়াল টানি শুধু চাহি রব ।

০৪
সুধাকণা
দুঃখ।
সুর-ইমন কল্যাণ।
ভুলে যে ছিলে সখা সেই ত ভাল।
আদরে আনিলে শুধু নয়নে জল!
পরিতে ও বাহুডাের
কঁদিয়াছে কণ্ঠ মাের
আজি গলে ফুল হার বিঁধিছে শেল!
কত আশা-স্বপ্নে মিশি
পথ চেয়ে গেছে নিশি
আজি ও পরশে ঝরে শিথিল দল।
ভুলে যে গিয়াছি সুখ
হেরিয়া তাহার মুখ
আজি এ জীবন শেষে কি হবে বল ।

সুধাকণা
৪৫
পথ-চাওয়া।
সু-গজল
নিমেষ-হারা চোখে পােহাল রাতি
কত চাহিয়া পথ হৃদে আসন পাতি।
কঁদে আকুল হিয়া কোথা পরাণ-পিয়া
কেবা মুছাবে আঁখি নাহি ব্যথার-ব্যথী।
বুকে পরশি জ্বালা দুলে কুসুম মালা
হল নিশীথ দীপ প্রাতে মলিন ভাতি।
তব প্রেমের বারি কবে তৃষ্ণা নিবারি
দিবে চাতক চিতে আছে নিদাঘে তাতি।
যদি এমনি করি যাবে প্রভাতে ঝরি
নিতি মরমে কেন ফুটে কুসুম পাতি।
কত রহিব আর স্মরি মিলন তার
জাগি নিরাশ নিশি মিছে আশায় মাতি।
সে যে দুঃখের ধরা করে সুধায় ভরা
চাহি তাইত তারে চির জীবন সাথী।

সুধাকণা
প্রেমাস্পদ।
সুর-বেহাগ
কার স্বপন চোখে ভাসে অহরহ
কহ গাে কহ।
মালাটী গাঁথিয়া কার আশায় রহ?
ওগাে কহগাে কহ।
কেবা ও দেবতা প্রাণে
কাহারে আপনা দানে
মরম নিতলে সদা চমকি চাহ ?
কহগে কহ !
সকল কাযের মাঝে
কার রূপ মনে রাজে
কার ব্যথা হাসি
মুখে
কহগো কহ।
কার নামে সব ভুলে
তােমার হৃদয় দুলে
কাহার মিলন স্মরি ধর বিরহ ?
কই গাে কহ!
কার কথা ক্ষণে ক্ষণে
শিহর জাগায় মনে
কারে ভাবি জীবনেরি আঁধার বহ?
কই গাে কহ।
নীরবে সহ ?
কোন ধ্রুবতারা হতে
সন্ধ্যা সকাল রাতে
প্রাণের আকাশে কর আলাে সংগ্রহ ?
ওগাে কহ গাে কহ।

সুধাকণা
৪৭
=
আঁধার।
সুর-কানাডা।
আয়রে আধার আমায় দে ঢেকে!
এ প্রাণের আঁধার নিয়ে আমি
তলিয়ে যাইরে তোর বুকে।
ভুবনব্যাপী গভীরতায় আসিস যখন তুই নেমে
ও রূপের তলে লুকায়ে মুখ ভাষা আমার যায় থেমে
তাের ঐ কাল স্নিগ্ধ ছবি প্রাণের মাঝে লই একে!
ওরে আঁধার আমায় থাক ঢেকে।
লক্ষ তারার নয়ন খুলে থাকিস যে তুই মুখ চেয়ে
নীরবেতে ঝরে ঐ তাের নিবিড় ছায়ার রূপ বেয়ে
শান্তিধারা প্রাণে যখন পাইনা কাছে কারে ডেকে।
}
ওরে আঁধার আমায় থাক ঢেকে ।

৮
সুধাকণা
বিদায়
সুর—ভৈরবী।
আমায় ডাক দিল কে গভীর রাতে ?
প্রাণ আমার দুরু দুরু দুলিল তাতে !!
কানন মাঝে ব্যাকুল পাখী
কিসের লাগি ছিল জাগি- সে রাতে ;
কণ্ঠ তার দিল সাড়া কত ব্যথাতে !
বাঁধন যত, পরাণ জুড়ি চিরতরে
ছিল সবই, পলে-পলে পড়িল ঝরে
তার ডাকের করুণ রেশ
মরম তলে মিলাল শেষ,
কি ছবি তার একে দিয়ে আঁখির পাতে।
* রবীন্দ্রনাথের “আমার রাত পােহাল শারদ প্রাতে” গানটীর সুর ও ছন্দাবলম্বনে
লিখিত।
।

সুধাকণা
বাঁশী।
সুর-খাম্বাজ।
এ যে তোমারই বাজান বাঁশী
তােমারি প্রাণের সুরে
সাধা তার দুঃখ হাসি।
কতদিন গেছে চলে,
লহনি ত হাতে তুলে,
জানিনা গাে কোন্ ছলে
আজি তারে লবে আসি।
ধূলিতে লুটায়ে দূরে
ধ্বনি তার গেছে ঝুরে,
শুধু অতীতের সুরে
উঠে তার প্রাণােচ্ছাসি।
৪

সুধাকণা
আশা।
সুর-মিশ্র খাম্বাজ।
কোন্ মধুপ গুঞ্জরে আজ
প্রাণেরি এ পুষ্পবনে ?
কারে চাহি উঠল ফুটি
এত ফুল এ মুগ্ধমনে !
ডুবেছিল যেদিন বেলা,
আঁধার করি প্রাণের মেলা,
সেদিন কি আর ভেবে ছিলাম
গাহিব গান এ জীবনে ?
দুঃখ-নিশি নয়ত চির,
তাই ত মুছি আঁখি-নীর
কোন্ প্রভাতের আলাে পুন
রাঙিয়ে তুলে ঐ গগনে!

সুধাকণা
আড়ালে।
সুর-ভৈরবী।
এমন করে চিরতরে থাকবে যদি দূরে
তবে কেন আছ, প্রিয়, সারাটী বুক জুড়ে।
তােমার ছায়া সকল কাযে
পড়ে যে ঐ প্রাণের মাঝে
তবু কেন না পাই দেখা, দুনয়ন ব্যুরে?
পথের দিকে চাওয়াও কত, শুনাও নীরব গীতি
স্বপন তব রচিতে মন মুগ্ধ নিতি নিতি,
কেন নিঠুর আড়াল খানি
যাও যে তুমি দিয়া টানি!
মরম মাের লুটিয়ে পড়ে তাইত ব্যথার সুরে।

সুধাণকা
দেখা।
সুর-মিশ্র খাবাজ ভৈরবী
নয়ন মুদে যদি তােমায় দেখতে আমি পাই,
নয়ন খুলে কেন নাথ তােমারে হারাই ।
মরমের ধন তুমি আমার আছ মরম মাঝে,
তােমায় ছাড়ি জীবন আমায় লাগবে কোন কাযে ?
তাই তােমারে আঁখি পাতে রাখতে সদা চাই।
মধুর তব করুণা মােরে শীতল করে যত
তােমার দেওয়া আর কিছু চাহেনা এ চিত,
বিনিময়ে তাইত পায়ে আপনা বিকাই।
দুর্দিনেরি আঁধার যখন ঢাকবে আকাশ আলাে
চোখের পরে বুনিবে জাল কি যে নিবিড়-কাল,
জীবন-তারা তােমায় যেন হারায়ে না যাই।
আঁধার মাঝে ডালে কাছে এস আমার প্রিয়
বেলা শেষে আপনি এসে হাতটা ধরে নিও,
তুমি যদি না দেও দেখা, কোথা মাের ঠাই ?

সুধাকণা
প্রতিধ্বনি।
সুর-সিঙ্গু খাম্বাজ
সে যে তােমারি অরূপ দিয়া
আমার শূন্য অন্তর লই নিমেষে পুরিয়া ।
যত না মিথ্যা দিয়া আপনারে
রাখি নিশিদিন ঢাকিয়া বাহিরে,
তােমারি আনন প্রকাশে কেমন
এ মরম পরশিয়া ॥
আশা-নিরাশার যত কিছু ধ্বনি
মরমের মাঝে উঠে রণরণি,
ঢাকি সব কথা কি যে নীরবতা
দেও অন্তরে ঢালিয়া ।
জীবনের এই মরীচিকা কূলে
ছুটে চলি যদা যাহা কিছু ভুলে,
কোথা হতে বাজে সব কায মাঝে
হিয়াতে তােমার হিয়া!

৫৪
সুধাকণা
অন্তর-পূজা।
সুর—ঝি ঝিট-খাম্বাজ
তােমারে ভাবিতে হায় কি যে সুধা উপচয়,
তুমি কি জান গাে তায় এ চিত কি তােমাময়!
তােমারি কল্পনা বুকে
লয়ে দিন কাটে সুখে
তােমারি স্বপন প্রাণে বসন্ত বাতাস বয় !
তুমি ত গাে চিরতরে
কোন দূরে আছ সরে
তােমারে হেরিতে তবু আঁখি কত চেয়ে রয়।
বাহিরে তােমারে খুঁজি
অন্তরে তােমারে পূজি
নীরবে পরাণ কত হাসিমুখে ব্যথা সয়।

সুধাকণা
অরূপ ।
সুর ঝিঝিট-খাম্বাজ
কে আমারে চাওয়ায় পথ
ভাষায় নয়ন জলে!
কে তুলে তরঙ্গ এত
প্রাণের নিগুঢ় তলে !
সুখ দুঃখ বুকে লয়ে
দিনগুলি যায় বয়ে
কবে কোন শুভক্ষণে
চরণে বিকাব বলে।
জীবনে বসি একেলা
গাঁথিনু যে ফুলমালা
প্রাণের সঞ্চয় দিয়া
পরাইতে কার গলে।
চাহিয়া যে সিন্ধুকুলে
রহিনু পিয়াস ভুলে
পেয়ালা ভরিয়া কিরে
লইবারে হলাহলে।
সে আমার চিতচোরা
নাই যদি দেয় ধরা
ঝরুক অরূপ তার
এ প্রাণের ঝরা দলে।

সুধাকণা
নয়নহারা।
সুর - সিন্ধু গজল
এত যে কঁাদালে দিলে এত ব্যথা
তবু প্রিয় কই দিলে, তুমি দেখা!
তব রূপ শুধু ধেয়ানে স্বপনে
মানস-পটে রহিল লেখা!
তুমি ত হে প্রিয় চিরপ্রিয়তম
রয়েছ আমার পরশি মরম
ধরিবারে তবু ছুটে আঁখি মম
নিতি নিতি তব অরূপ-রেখা।
আঁখি হতে, প্রিয় রয়েছ সরিয়া
তাই বুঝি আরাে নিকট করিয়া
আছ তুমি মাের সকল জুড়িয়া
বাহিরে মােরে রাখিয়া একা।

সুধাকণা
মরম নিবেদন।
সুর-ইমন
কত রজনীর মৌন অখি-ধারা
ধােয়ায়েছে ও, চরণ।
মিছে হয়ে যত সকলি যাবে কি
মরমের নিবেদন ?
কত যে নিবিড়-ব্যথাভরা গীতি
ব্যাকুল মিনতি কত নিতি নিতি
জানায়েছি তােমা তবু টলিল না
তােমার সিংহাসন।
আছি আজীবন চাহি তব পথ
কোন্ অভিমানে আজি বল, নাথ
গলি শতধারে উছলিয়া পড়ে
মানি বারন মন।
কবে প্রিয় আসি পরশিবে চিতে
জানাতে আমি আপনা হইতে
জানিবে তুমি যে কত প্রিয় মাের
কত সাধনার ধন।

সুধাকণা
মিলন-সাথী।
সুর-- বেহাগ।
একলা মনের সে যে মিলন-সাথী।
তারই কথা মনে জাগে দিবস রাতি।
নাহি সঙ্গী যখন
চুপে চুপে সে তখন
মনের কোণেতে আসি বিকাশে ভাতি
নিতি না ভাঙ্গিতে ঘুম
ভরি সুবাসে কুসুম
প্রাণের নিকুঞ্জে সে যে গাহে প্রভাতী।
সে সুখ-অতিথি
শুনায় কি সুখ গীতি
প্রাণের গােপন তারে মৃদু আঘাতি।
তার প্রেম মদিরা
পিতে জীবন-সারা
রহিনু কি মাতােয়ারা আশায় মাতি ॥

সুধাকণা
চিরস্মরণ।
সুর বেহাগ।
যদি আসিতে না বলে মন
এসনা কখন!
কি হবে গাে দিয়ে দেখা
শুধু অকারণ।
আমার প্রাণের কথা
বলিতে চাহিনা কোথ।
আপন ব্যথাতে রব আপনি মগন ।
বারেক না দিলে দেখা
কি তুমি বুঝিবে সখা
কত যে তােমার তরে ব্যথিত এ মন ।
যদি নাই দেখা দেও
যাও যেথা সুখ পাও
এ চিত তােমারে চির করিবে স্মরণ।

সুধাকণা
অদর্শনে।
সুর—মিশ্র সাহান।
সারা বুকে
কতদিন গেছে চাহি পথ তােমারি।
বিনা তব দেখা, নাথ কিসে ব্যথা নিবারি।
তব স্মৃতি
ধূ ধূ করে দিবারাতি
কবে তার শেষ মােরে চিতাপর ডারি।
তােমার চরণ পরি
যাইতে জীবনে ঝরি
আজিও নিমেষে আশা উঠে ফুকারি ।

সুধাকণা
সুখস্মৃতি।
সুর--মিশ্র সাহা।
সাধে লয়ে আছি বুকে সুখ সে স্মৃতি!
হৃদি মাঝে পাই আমি তারে ভাবি যে নিতি ।
বাহিরে সে কতদূরে
কত কাছে সে অন্তরে
দেয় সাড়া, তবু আখি ঝুরে একি রীতি।
দেখার যত ব্যথা
জানিনা বিলীন কোথা
প্রাণের তন্ত্রীতে তুলি তারি মুরগীতি।

সুধাকণা
ব্যথার নিমন্ত্রণ।
সর-বেহাগ খাম্বাজ।
মম অন্তর-প্রিয়, তুমি এসগাে তখন
বাহির কঁদাবে মাের অন্তর যখন !
যখন আঁধার মাঝে
শ্রাবণ মেঘে উঠবে বেজে
ব্যথার বাঁশী দিবানিশি হবে বরিষণ।
দুরু দুরু হিয়া তােমায় ডাবে অনুক্ষণ,
অন্তর-প্রিয় মম, এসগাে তখন।
শরতের জ্যোছনা-তলে
শিউলি যখন পড়বে ঢলে
সুবাসেতে উঠবে ভরে’ কুটীর প্রাঙ্গন!
তােমার তরে লুটিয়ে পড়ে কঁদবে আমার মন,
ওগাে প্রিয়, দেখা দিও, এসগাে তখন।
বসন্ত প্রভাতে যবে
দিকে দিকে সৌরভে
ছেয়ে দেবে ফুলপাতায়, বিহগ কুজন
ধ্বনিত করিবে দিক, আমারে উন্মন,
ওগাে অন্তপ্রিয়, এসগাে তখন।

সুধাকণা
দেখার ব্যথা।
সুর-খাম্বাজ।
দেখার ব্যথা কেন দিয়া দেখা
বাড়াইলে, সখা আনিলে আশ!
গিয়াছে ত কাটি সারাটা জীবন
যাপিয়া দুঃখের বরষ মাস !!
কত না নিশীথে দূর হতে ভাসি
আসিয়াছে প্রাণে তােমারই বাঁশী,
তুমি ত আসনি চরণে তােমার
জানায়েছি কাদি কত তিয়াব।
এলে যদি সখা সকরুণ-ভরে
আপন করিয়া লহ তুলে মােরে,
দেও মুছাইয়া চিরজীবনের
ব্যথার তাপিত আকুল শ্বাস ।

*
৩৪
সুধাকণা
ক্ষণিকের অতিথি।
সু-বেহাগ খাম্বাজ। (হিন্দুস্থানী)
ক্ষণিকের ওই অতিথিরে
চোখের জলে বাঁধবি কিরে ।
আপন পথে সে যে চলে
যাবে সকল বাঁধন ছিড়ে !
নিমেষ-হারা নয়ন লয়ে
তুই কেবলি রইবি চেয়ে !
মরমের ঢেউগুলি তাের
আছড়ে শুধু পড়বে তীরে।
সুদূর-পারের প্রতিধ্বনি
কতদিন আর রইবি গণি,
ফিরিয়ে এবার নেরে নয়ন
ফেরে মুছি আকুল নীরে।

সুধাকণা
অন্তর্ধান।
সুৱ-ভৈরবী।
দুলিয়ে দিয়ে প্রাণটী আমার
কোথায় তুমি যাও যে চলে’!
অন্তরেতে ফ বহে
কতদিনের তুষার গলে’!
রিক্ত হিয়ার ল’য়ে ডালি,
তােমার পূজার দীপটী জ্বালি,
রইনু বসে, সে কি তােমার
দুয়ার হতে ফিরব বলে?
জীবনের এ আলো ছায়ায়
চিত্ত আমার পেতে যে চায়
আজি তােমার পূর্ণ সাড়া
নিবিড় করে প্রাণের তলে।
আমায় তুমি নও ত ছাড়া,
তাই ত এ প্রাণ বাঁধন হারা
ছুটে আজি তােমার পানে
ভাষায়ে তার দুকুল জলে।

সুধাকণা
কাঙাল।
সুর–মিশ্র পূরবী কানাড়া
তৃষিত এত পথ চাওয়া
কবে ফুরাবে বল জীবনে।
যদি না দেখা দিবে গাে নাথ,
কেন রাখ গাে দূরে মরণে ?
যদি নিবিতে নাহি জানি
জ্বলে কামনার দীপ খানি;
নিরাশ এত তিমিরে কেন
ঢাক প্রাণের চির স্বপনে।
না পাওয়ার ব্যথা কখন
যদি জানিতে, হে অকরুণ,
তবে করিতে নাহি কাঙাল
চির বঞ্চি’ তব চরণে।

সুধাকণা
বরষ-গতে।
সুর-আশাবরী।
দেখেছি কি, দেখি নাই
তাহারে কবে!
শুনিনি অনেক, তবু
চিনি সে রবে !
দুলায়ে বুকের মাঝ
উঠে সে ধ্বনি।
চলেছি, জীবন-গীতি
গাহি আপনি।
জানি পথের শেষ
কোথা যে হবে ।
চাহি অবেলায় দেখি
বরষ কত
শুধু পথ-চাওয়া লয়ে
হ’ল যে গত!
ভাঙ্গিবে স্বপন চির
আজি কি তবে।

সুধাকণা
স্বপন
সুর-আশাবরী।
দিওনা দিওনা আমার স্বপনে ভাঙ্গিয়া
জীবনে গহন রাতি কাটিবে কি দিয়া ?
তৃষিত মনের পরি
স্মৃতির নিঝর ঝরি
দেয় সে সবুজ করি ঊষর এ হিয়া।
কি হবে মেলি নয়নে,
ব্যথা শুধু জাগরণে,
কাটে দিন পথ পানে আকুল চাহিয়া।
পেয়েছি যে আঘাত,
স্বপনে ভুলেছি তা ত,
চাহিনা জাগাতে ক্ষত আর ত জাগিয়া।

সুধাকণা
পথের শেষে।
সুর–মিশ্র ভীম পলশ্রী ভৈরবী ও সিন্ধু।
ওগাে তােমায় চোখের দেখা
যদি পাইনি জীবনে।
আমার সকল ব্যথা ভুলিয়ে দিও
দিয়া দেখা সেইক্ষণে ॥
যখন ডুববে বেলা, আবে আঁধার ঘনিয়ে তীরে,
পারের পাখী সুদূর পথে চাহিবে ফিরে,
তখন প্রিয় প্রকাশিও এই আঁধার নয়নে।
সকল-হারা কাঙাল যে জন চাহি তােমার পায়,
পথের শেষে দেখিও এসে তারে অবেলায়,
প্রতিদানে এই করুণা কর’ অকিঞ্চনে।

৭৩
সুধাকণা
পারের পথে।
সুর-ভৈরবী।
কবে আমায় পারের খেয়ায়
লবে তুলিয়া ?
শ্রান্ত আজি বিজন মরুপথ বাহিয়া।
পর-পারের ঐ যে রেখা
আঁধার ঘন কুহেলি ঢাকা
পিয়াসে কোন্ অসীম পানে রহি চাহিয়া।
একলা সাগর’ পরি
কাঙাল জীবন-তরী
দেখিও যেন আঁধারে নাহি যায় ডুবিয়া।
হেরি তােমারে চোখে,
তবু তােমায় ধরি যে বুকে
চলেছি আমি তােমারি পথে শুধু ভাসিয়া ॥

সুধাকণা
৭১
বন্দনা।
সুর-বেহাগ খাম্বাজ।
যদি সারাটা জীবন কাটিল কোন্ নিরাশ-ক্রন্দনে !
তবে পােহা’লে রাত নিওগাে, নাথ, তােমারি নন্দনে।
ভুলি তৃষিত অন্তর-জ্বালা,
তােমার চরণে পরাব মালা,
হবে স্বপন আমার সফল প্রাণে তােমারি বন্দনে।
তােমার বাঁশীতে হৃদয় ভরি
দিও গাে আমায় পূর্ণ করি
তব প্রেমের চিরশান্ত মধুর মধূপ-গুঞ্জনে।

৭২
সুধাকণা
নিশীথ-তারা।
সুর -মিশ্র বাগে
ওই যে নিশীথ-তারা, সে কি তব আঁখি-তারা।
দূর হতে কারে চাহি ঢালে সে কি স্নেহ-ধারা ।
সেই যদি তুমি হও
সারা নিশি চেয়ে রও
করুণা-পরশে দেও
ভরি শূন্য বক্ষ সারা !!
তব স্থির মৌন বাণী
কোথা মােরে লয় টানি ?
তােমার চাওনি মােরে
করে চির মাতােয়ারা।
তব স্নেহে অবগাহি
এ জীবন যায় বাহি,
আমার নয়ন শুধু
তােমাতে নিমেষ-হারা ।

সুধাকণা
প্রত্যাখ্যান।
সুর-ইমন কল্যাণ।
তােমার তরে যে জন বুরে
দেখা কি দেবেনা তারে ?
তােমায় সে যে বেড়ায় খুজে
জীবনের অন্ধকারে।
তব স্নেহ-আলিঙ্গনে
বাঁধা পড়ি ক্ষণে-ক্ষণে
তবু তােমায় এ জীবনে
হারাই কেন বারেবারে।
কত যে আপন করে
এ প্রাণ চাহে তােমারে,
কেন চির তরে
কাদি’ ফিরি তব দ্বারে।

৭০
সুধাকণা
আত্মনিবেদন।
সুর- সাহানা।
কবে আসিবে ওগাে অতিথি।
তােমার তরে কুটীর আমার
দীপখানি তার জ্বালে নিতি-নিতি ।
কাটিয়াছে দিন চাহি পথপানে,
আর এ পরাণ মানা নাহি মানে,
আসিয়া এবার বেদনার গানে
এনে দেও সুখ-স্মৃতি।
কত ফুল ফুটি ঝরে কতদিন,
আশার রেখাটী হয়ে আসে ক্ষীণ,
চাহি যে এখন ও চরণে লীন
করিতে জীবন-গীতি
তুমি আস-আস করে সব ভুলি,
নয়নের জলে ধুয়ে দিছি ধুলি,
রাখিয়াছি শুধু তব তরে তুলি
এ প্রাণের চিরপ্রতি।

সুধাকণা
৭৫
বৈশাখী-পূর্ণিমা।
সুর-ভৈরবী।
জোছনার ঐ পালাঝােরা ঝরে আকুল, ঝরে আকুল,
ঝরে আকুল!
ভুবন ব্যাপী শুক্ল পারাবার আনে কি ভুল, আনে কি ভুল,
আনে কি ভুল!
উছল ওই আলােপরে রূপহাসি কোন্
সারা প্রাণ ভরি ছড়ায় এত ঝরা কি ফুল, ঝরা কি ফুল,
ঝরা কি
ফুল!
স্বচ্ছ সাগরের ঐ অতল-মাঝে
ঘুমঘােরে আসে মুদে তারার নয়ান।
ভরি নীরব বিমান উঠে কি গান,
দূরপারে কার পায়ে নুপুর বাজে ।
আকুল কি যে স্বপনে ঐ
ব্যাকুল
নিশি।
অসীমে ভাসে আজি মন পেতে কি কুল, পেতে কি কুল,
পেতে কি
কুল!!
কাজি নজরুলের “ঘুমঘােরে এলে মনােহর” গানটীর সুর ও ছন্দাবলম্বনে লিখিত।

সুধাকণা
আশাপথে।
সুর—ঝিঝিট-খাম্বাজ
কবে তুমি আসবে হিয়ার ভাসিয়ে দুকুল।
আমার সকল ব্যথা রঙীন হয়ে উঠবে ফুটে ফুল।
উজাড় করে সারাটী প্রাণ,
ভােমার পায়ে করেছি দান,
এ জনমে চাহিনা আর ভাঙ্গিতে সে ভুল।

সুধাকণা
প্রেমের জাগরণ।
সুর--মিশ্র দেশ।
কে জানে তাহারি মন
চাহে কি না চাহে মােরে ।
ব্যাকুল আমার কেন
প্রাণ এত তারি তরে ?
যে হতে দেখিনু তারে,
ভাসি সুখ পারাবারে,
জাগিল যে সুপ্ত প্রেম
প্রথম এ অন্তরে।
বারেক হেরিলে তারে
হারাই যে আপনারে,
হৃদিতল উঠে কেঁপে
দূর হতে কণ্ঠস্বরে।
ভাবি কেন তারি কথা
জাগে প্রাণে এত ব্যথা
কি যেন অভাবে কোথা
নিভৃতে এ আঁখি ঝরে।

৮
সুধাকণা
চিররতা।
সুর-বেহাগ খাম্বাজ।
সহেনা সহেনা আর দিওন৷ ব্যথা।
শুনায়ে শুধু দুটী আশার কথা।
সারাটা দিন চাহিয়া পথ,
বিফল কত যে মনােরথ,
আছে হৃদে মম সব শেল গাঁথা।
অবহেলি অন্তরেরি ডাক,
নাহি আস যদি ভুলে থাক,
রব তব পদে তবু চিররতা।
লয়ে বুকে তব সুখস্মৃতি
আসিবে প্রভাত নিতি নিতি
বিফল করিয়া সব ব্যাকুলতা।

সুধাকণা
৭E
ব্যর্থতা।
সুর-মিশ খাম্বাজ।
আমি পথের পানে রহি চাহিয়া,
কখন্ সে যে দেবে দেখা এসে হাসিয়া।
দুলে প্রাণ দিবানিশি
আশার দোলায়,
সুখের কল্পনা মাঝে
মন ভেসে যায়,
হৃদয় উছলে তারি ধ্বনি শুনিয়া ।
থাকি থাকি মন প্রাণ
আঁখিতে ঢালি,
আসিছে ভাবিয়া সে যে
চাহি কেবলি,
নিমেষে চমকি উঠি কি যে স্মরিয়া ।
এত আশা যার তরে
জানি কেমনে
ব্যর্থ করে দেয় সে গাে
সব স্বপনে !
অন্তর তবুও তারে রাখি সপিয়া।

৮
সুধাকণা
বৈশাখী সাঁঝে।
সুর-বেহাগ।
প্রাণের দুয়ার আজি গেলরে খুলে।
কাহার তরেতে ওগাে কিসের ভুলে?
ভাসিয়া আসিল ধীরে
দখিন হাওয়া,
তাহার পরশে কান্
করুণ চাওয়া
জাগিল হৃদয়-তলে আবেশে দুলে।
জোছনা-রজনী আজি
করিছে বিহ্বল,
কারু রূপখানি তাতে
ভাসে ঢল ঢল,
সুবাস ছড়ায় প্রাণে সাঁঝের ফুলে।
বিজন কুটীরখানি,
সুনীল গগন,
সবি চেয়ে আছে লয়ে
আশার নয়ন,
‘চোক গেল’ ডাকি শুধু উচ্ছাস তুলে।

সুধাকণা
৮১
বাদল-বেদনা।
সুর-বেহাগ।
বঁধুয়া, আজও কি রবে ছাড়িয়া।
আজি এ বাদলে, নয়নের জলে,
কত আর রাখি রুধিয়া।
আঁধার ঢাকিছে আকাশে কেবল,
সিক্ত ধরণীর শ্যামল-অঞ্চল,
রজনীগন্ধার গন্ধ বিল
মূরছে
রহিয়া-রহিয়া।
আজি এ দিবসে নিবিড় পিয়াসে
মরি যে মরমে মরিয়া।
নীরব আজিকে পাখীরা কুলায়
কি উদাস গান পূরব-হাওয়ায়,
তােমার সঙ্গ যাচিয়া হৃদয়
উঠিছে ব্যথায় ভরিয়া ।
এস গাে আমার বাঞ্ছিত মম
জীবন-স্বপন মথিয়া ।

সুধাকণা
বাদল-সাঝে।
সুরকাজরী।
মনেরি আগল
খুলিয়া কে দিল
আজি এ বাদল-সাঁঝে।
পিয়ার নাগাল
না পাই পাগল,
বিহবল নিঠুর লাজে ।
আকাশ সজল
মেঘেতে কাজল
একা গৃহকোণ-মাঝে
ঝর-ঝর জল
করিল উতল
হিয়া দুরুদুরু বাজে।
বিজুরী হানিল বিজনে কঁপিল
নীপ-বীথি আওয়াজে,
নয়নে সলিল
নীরবে ঝরিল
মরম-দুলাল খােজে।
তবুও অচল,
অবশ, শিথিল কাজে।
পরাণ মাতল
টুটিতে শিকল
কোন অভিসার সাজে।
আজি এ বাদল সাঝে ।
চিত চঞ্চল,

সুধাকণা
৮৩
শ্রাবণ-ধারা।
মেঘের কোলে এলায়ে কেশ
ঐ
সুদূর পারে।
ও তার সজল আঁখি হতে একি
ঝরে করুণ-ধারে।
সে যে ঝরছে আমার উষর প্রাণে
একলা কুটীর-কোণে
ও সে ঝরছে আমার ভিতর-বাহির
সকল দেহ মনে।
তার অশ্রু আমার দুনয়নে নিবিড় অন্ধকারে।
সে কি এমনি করে ঝরবে শুধু
সকাল সন্ধ্যায়
কাজল-টানা
দূর
বিমানে
উতল হাওয়ায়
ও তার প্রাণের ধারা আমার প্রাণে মিশুক একাধারে !
সে কি দুঃখের ভারে এমনি করে’
দিনের শেষে আসি
জানায় ব্যথা সজল-মুরে
অন্তর পরশি
ও তার ব্যথার ধারা ঝরুক আমার অকূল পারাবারে।

৮৪
সুধাকণা
বরষায়।
সুরকারী ।
1
আজ বাদলে কি যে বলে
প্রাণের ভিতরে।
সকল হিয়া গলিয়ে দিয়ে
সে কি গান করে ।
কাননঘেরা পথের পরে
নামে উতল ধার,
উদাস সুরে আপনারে
করে সে উজাড় ।
বিলিয়ে-দেওয়া-ধারাতে তার কি ব্যথা ঝরে।
বিজন কুটীর-দ্বারে তাহার
বাজে সজল বাঁশী,
কাহার আনন আঁখি-তারা
জলদ উদ্ভাসি’
কঁদিয়া ফিরে আজি দূরে কি স্মৃতি ভরে !

সুধাকণা
৮৫
শারদ-জননী।
সুর-মালকোষ।
এস শারদ-জননি।
মুছি আঁখি-নীর নভ আজি নীল
গাহে তব আগমনি।
উজ্জ্বল ধরা ফেলি প্রীতিশ্বাস
বুকে টেনে লয় ধান্য-হেমবাস
শেফালি-বিছান অঙ্গন-দ্বারে
উঠিছে শঙ্খধ্বনি।
শ্বেত শতদল কহলা বনে
অধীর মধুপ মৃদু গুঞ্জনে
তােমার চরণমঞ্জীর ওই
উঠে নিরালায় রণি।
ভরা নদীকুলে জোছনা আকুল
দিশি দিশি ওই কাশ-বনফুল
বিকাশে আজিকে বিমল শুভ্র
তােমার দুকুলখানি।

সুধাকণা
শরতে।
সুরভীমপলশ্রী।
ধরার বুকে ফুটিয়ে তুলি
কোন্ অতিথির শুভ্র-হাসি।
আঙ্গিনায় শেফালি ওই
ঝরে আজি রাশি রাশি।
প্রভাতের স্নিগ্ধ আলাে
বিছায় প্রাণে মায়ার জাল
অরুণের স্বর্ণ-বীণায়
বেজে উঠে করুণ বাণী ।
সাদা মেঘের ছায়া তলে
রক্ত কুমুদ ভাসে জলে
আজি প্রাণের বিজন দ্বারে
নীরবে কে দাড়ায় আসি !

৮
সুধাকণা
ফাগুন-অতিথি।
র বসন্ত।
এল ওই কোন্ অতিথি
পরে’ মাথায় ফুলের সি থি।
মধুপ তার পেয়ে সাড়া
গুণ-গুণিয়ে গাহে গীতি ।
দখি হাওয়া দুলায় তার রঙীন ওড়না
নয়ন হতে ছড়িয়ে পড়ে আলাের ঝরণা।
গন্ধ বরণ তার আনে কি প্রীতি।
পরশে তার কানন তলে শিথিল বকুল
অশােক পিয়াল করবী ঐ আবেশে আকুল
মনের কোণে জাগিয়ে তুলে মধুর স্মৃতি।

সুধাকণা
ফাগুন-উৎসব।
সুর-মিশ্র খাম্বাজ।
ফাগুন তুই কখন্ এলি
খেলতে হােলি বনে-বনে।
হিমানী ও পাতা-ঝরা চরণ-সাড়া
পেয়ে ঢাকে নিজ আননে।
কচিপাতার বসন খানি
কঁপে যে তের হাওয়ার সনে
করবীর কপােল রাঙে
কাহার পরশ পড়ি মনে।
অশােক পলাশ অঙ্গ ঝাপি
ফাগ, ছড়াল নীল গগনে
সােনার আঁচল লুটিয়ে শাখে
চাপা বিভাের কোন্ স্বপনে।
মুকুলের দুকুল উড়ে
সুবাস ঢালি দূর বিমানে
ঝরে বকুল অশ্রু যেন
বনভূমির নয়ন-কোণে।
দিকে-দিকে কি উৎসবে
বাজে বাঁশী ভাের কাননে,
খুলে যায় প্রাণের দুয়ার
লভিতে কোন চিরন্তনে।

সুধাকণা
৮
বসন্তের বনভূমি।
সুর -মিশ্র ভৈরবী।
নূতন পাতায় নূতন ফুলে
নূতন তারে করবে বলে
লও কি তার কেড়ে সকল ধন ।
সে যে ঐ পাতা ঝরা উদাস-করা
রূপটী লয়ে আছে চেয়ে
হয়ে অকিঞ্চন।
দেও গাে তারে দেও গাে সাড়া,
ডাকে সে যে আত্মহারা,
কবে তাহার বুকটা ভরে
ফুটিয়ে দেবে আকুল করে’
অশােক-কাঞ্চন।
হারান-ধন লভিয়া সে
ঊঠক আবার উঠুক হেসে
তার সকল পাতায় সকল ডালে
ছড়িয়ে পড়ুক আকাশতলে
রংএর শােভন।

সুধাকণা হােলী। সুর-কীৰ্ত্তন। আজি এ ফাগুনে করবী, অশােক আবির ঝুরে শিমূলে অদুরে চ্যুত-মুকুলে পলাশ বনে কে খেলে হাের ছুড়িল ফাগ কানন ভরি। দিক্‌ আলাে করি শাখাতে মিলে খেলে পিচকারী মাখিয়া রেণু গাহে ভ্রমরী বিতানে লতা বাঁধে কবরী। পিঙ্গল তনু কুসুম-নমিতা তরুর প্রাণে সারা কাননে সবুজ লহরী পরশে কিশাের কুসুমশর বন শিহরি। কণ্ঠ ছাড়িয়া গাহে পাপিয়া আবেগ ধরি মাতাল হাওয়া মাতায় হিয়া বাস বিতরি। রঙ্গের খেলা আকাশ পরি কি মধু মেলা অমিয় ঝরে পিয়ে বিভােরে মন-চকোরী।

সুধাকণা
বসন্তে।
সর-মিশ খাবাজ।
বেণু তুই নীরব হয়ে
রইলি কেন অন্তরেতে!
বেজে যে উঠল বাঁশী
সবার প্রাণে বসন্তেতে ॥
জীর্ণ-বাস দূরে ফেলি
বনস্থলী সবুজেতে
দুলায় আঁচল কলস্বরে
মলয়ের পরশেতে।
আনন্দের বান ডেকে যায়
ফুলপাতার বরণ-স্রোতে
স্নিগ্ধ প্রাতে দিবালাগণ
গাহে কিরণ-বীণা হাতে
জাগে না আজ কোন সুরে
সুপ্ত-পরাণ কোন মতে
আঘাত করে ফিরে সে কোন্
চিররুদ্ধ দুয়ারেতে।
বেদনার মৌন ধারা
ঝরে প্রাণ-পেয়ালাতে
ভরা পাত্র লয়ে কার
মুখ চেয়ে নীরবেতে।

সুধাকণা
ফানবাতাস।
সুর-বারোয়া।
ওরে উতলা উদাস!
ওরে ফাগুন বাতাস।
প্রাণের ভিতর কি দীনতা
জানিয়ে যে তুই যা।
দিনমানে রৌদ্রতাপে
রুদ্ধ বাতায়নে
হাহাকারে কহিস কথা
উতলা এক টানে ;
তাের ও গানে মরম মাঝে
আনে হা হুতাশ।
ওরে উতল উদাস।
কানে কানে ব্যথার বাণী
কহি নিরন্তর
উদাস সুরে শূন্য করে’
দিস যে অন্তর
কোন চির-বিরহীর তুই
আকুল নিশ্বাস ।
ওরে উতল উদাস ।
ওরে ফাল্গুন বাতাস।

সুধাকণা
কমলা।
সুর -মিশ্র মালকোষ ।
উঠিলে গগনে
কমলা কল্যাণি ।
হৃদয়-কমলে রাখ রাজীব চরণ খানি।
সিন্ধু মন্থনে
মেলিলে নয়ন, জ্যোতিৰ্ম্মালিণি!
সুধার পাত্র
রত্ন বিচিত্র
ধরিল বিশ্বে তব হেমপানি।
নিখিল চিত্ত
মােহিয়া নিত্য
শেভিলে কাঞ্চন-বরণ ধারিণি।
চঞ্চল চরণে
ফিরিলে
ভূবনে
জগ-জন প্রাণে সুখ দুঃখ আনি।
পদযুগ বরি
যুগ যুগ ধরি
নূতন হইল জগত কাহিনী।
নমঃ নারায়ণী
হেমাভ-হাসিনী
বিতর কৰুণা প্রসাদ দানি।

সুধাকণা
করুণা।
সুর-টৌড়ী ভৈরবী।
কেমন করে জানাই তােরে
কত ভাল বাসিস, শ্যামা!
আমার মন প্রাণে শুধুই জানে
কোথা ও করুণার সীমা।
কত অন্ধকার পথে
টানে মােরে দিনে রাতে
বঞ্চি আমার বাসনাকে
বিপদেতে বাঁচা যে মা।
কত অভিমান ভরে
বুঝিয়া দোষি তােরে
শেষে নাহি পাই ভাষা
অন্তরে যাচিতে ক্ষমা ।

সুধাকণা
চরণতলে।
সর-মিশ্র খাম্বাজ।
মা গাে আর ত চরণ ছাড়ব না
জীবন ধরে আপনারে
এলাম করে বঞ্চনা।
মিছে মরীচিকা-আশে
ছুটালি মা উদ্ধশ্বাসে
অর্ধপথে এনে শেষে
দিলি অনুশােচনা ।
এবার মা তাের পদতলে
ভােলার মত পড়ব ভুলে,
লুব্ধ চিতে নয়ন মেলে
অন্য দিকে চাইব না ।

৯৬,
সুধাকণা
অবােধ ছেলে।
সুর-সিন্ধু খাম্বাজ।
মা গাে, তােমায় কেন থাকি ভুলি
তুমি ত ভােল না মােরে
আছ চেয়ে দুয়ার খুলি !
বারেবারে বিপথেতে
পড়ি কত বিপদেতে
তবু মাগাে স্নেহ হাতে
দিতেছ মুছায়ে ধুলি।
আমি যে অবােধ ছেলে
ও করুণা যাই ভুলে,
তাই ত মা সিন্ধুজলে
একাকী তুফানে দুলি ।
আর আমায় বাসনা-অন্ধ
রাখিস্ না মা কারাবন্ধ
ঘুচিয়ে দিয়ে মনের দ্বন্দ্ব
নে মা এবার কোলে তুলি।

সুধাকণা
অনুতাপ।
সুর ঝি ঝিটখাম্বাজ
অন্ধকারে নয়ন ঝরে
চেয়ে কি দেখবি না মা।
অপরধের বােঝা প্রাণে
আর ত টেনে বাঁচি না, মা।
ক্ষণিকের মােহ-বশে
না বুঝি করম দোষে
যদি পঙ্কে ডুবিয়াছি,
তাহার কি নাহি ক্ষমা ॥
তাপ-দগ্ধ প্রাণে আ
ডাকি তােমায় সব ত্যজি,
অপরাধ ভুলে মাের
দাও প্রাণে বল, শ্যামা।
তােমার করুণা ছাড়ি
আধারে যে ভেঙ্গে পড়ি,
এ পাপ-প্রাণের কথায়
কর্ণ কি আর দিবি না মা।
৭

১৮
সুধাকণ।
দীপান্বিতা।
সুর-সিন্ধু ভৈরবী
অন্ধকারে পূঙিস্ কারে
করি তারে দীপান্বিতা।
ওরে সকল আলাের আলাে সে যে
এ জীবনে জালিনি তা।
তুই যে শুধু ভিতর বাহির
বহি বােঝ আঁধার রাশির,
আঁখি তুলে কোনকালে
দেখলি নারে সে সবিতা ।
হেরি রক্তমাখা অসি করে,
মুক্ত কেশ পৃষ্ঠ পরে,
ভাবলি বুঝি মা কেবলি
সংহারেরি রূপে স্থিতা।
কেনরে তুই ভাবিস ভীষণ,
মায়ের রূপটী নয়রে তেমন,
ঢালে সে যে স্নেহধারা
যেখানে জ্বলেরে চিত।
ও তাের সব হতে ফিরিয়ে নয়ন,
প্রাণের দীপটা জ্বালরে নূতন,
মায়ের রাঙা পায়ে পাবি
চির শান্তির মন্ত্রগীতা ॥

সুধাকণা
চরণ-ছাড়া।
সুর-টোড়ী ভৈরবী।
চরণ-ছাড়া করিস নি মা অভাগা সন্তানে আর
পেলে ও রাঙা চরণ কেমনে মা হব পার
যে জন আছে চরণ চেয়ে
তারে যদি না দেখবি চেয়ে
জীবনে তার পড়বে ছেয়ে
চিরদুঃখ অন্ধকার।
মা তাের চরণের আলো
ঘুচায় মনে সকল কাল
হবে কি মাের সব বিফল
ব্যথা শুধু করি সার।
বাসনার এ অকুল
তীরে
বাণবিদ্ধ বিহগ কি রে
জীবন সাঁঝে আপন নীড়ে
যাবে মা ফিরে আবার।

সুধাকণা
স্নেহআলাে।
সুর-সিন্ধু খাম্বাজ।
কত যে মা বালি ভাল।
এ জীবনে তার ঋণ
ধব কি আর কোনকাল ।
জীবনের ঝঞ্চাবাতে
হাত ধরে মা সাথে সাথে
দেখালি কি সুন্দর তাের
স্নেহ করুণার আলাে।
তবু মা তাের অবােধ ছেলে
পারিল না সকল ফেলে
কাটিতে জীবনে তার
সংসার-মায়ার জাল।

সুধাকণা
মাতৃস্মরণ।
সুর—টোড়ী ভেরবী।
অন্তরেরি চোখে চোখে
এবার মাগাে-রাখবাে তোকে
হারিয়ে তাের ঐ চরণ আলাে
ডুবিব না আঁধার শশাকে।
তাের অপার করুণার রেখা
আসি যখন দেয় মা দেখা
বিপদেতে তখন বুঝি,
তুই না হলে রাখিত কে।
আমি মা গাে এমনি পাপী
ততাকেই
ভুলে
দিন যাপি
উকি তাই মা নিজগুণে
রাখ আমায় পদনখে।

সুধাকণা
ভারত জননী।
সুর-ইমন কল্যাণ।
চির-তুষার
মণ্ডিত গিরি
গৌরবে শিরে ধরি
রয়েছ জননি জ্যোতির্ময়ী
হীরক কিরীট পরি।
নিত্য প্রভাতে পরায় অরুণ
ললাটে সিন্দুর-বিন্দু
কস্তু-কণ্ঠে দুলিতেছে হার
গঙ্গা-যমুনা-সিন্ধু।
শস্য-শ্যামল অঞ্চল বাহি
পড়িছে অমৃত ঝরি।
বিন্ধ্য রচেছে মঞ্জু মেখলা
হৃদি পুষ্পিত ফুলে
বনস্পতির ঘন কুন্তল
পৃষ্ঠে তােমার দুলে।
নীল জলধি লভিতেছে কূল
রাজীব চরণ বরি’ ।
মস্তকে তব চির নীল নভ
নীলিম-ছত্র ধরে
যুগ যুগ ধরি রহিয়াছ স্থির
দাড়ায়ে উৰ্মি পরে।
চাহি ও আনন বিশ্বনয়ন
গেছে বিস্ময়ে ভরি।

সুধাকণা
জাগরনী।
সুর : বিভাস।
কাটবে না কি তাের এ ঘুমের ঘাের।
ডেকে আকুল নিদ্রাহারা জননী যে তাের।
পূব-গগনে আলাের রেখা,
কি যে কলধ্বনি।
দ্বারে দ্বারে প্রভাত সুরে
বাজছে জাগরনী।
স্বপন ভুলি মেলরে নয়ন,
রাত্রি যােকরে তাের।
কবে তাের কাটবে ঘুমের ঘাের ?
তুই যদি না মায়ের দুঃখে
দাড়াবি বুক বেঁধে,
সাগর ছোঁচে আবি মাণিক
গ্রহতারা ছেদে,
কে পরাবে মুকুট শিরে
মুছি নয়ন লাের ?
কাটবে নাকি তােরই ঘুমের ঘাের !!
সত্যি যদি মায়ের তরে
মরমে নিশ্বাস
ফেলে থাকিস, কভু প্রাণে
জাগে পুণ্য আশ,
তন্দ্রা ত্যজি উঠরে আজি
দেখরে মুখ আলাের।
ও তাের কাটুক ঘুমের ঘাের।

১৫
সুধাকণা
ঝড়ের অাধার ।
সুর মিশ্র বাউল।
মুখ চেয়ে কে আছিস্ মায়ের
দাড়ারে ফিরে।
দেখিস্ কি আর ঝড়ের আঁধার -
গগন ঘিরে।
যদি যেতে হয়রে পার,
দ্বিধা আছে কিরে তার ?
এই বেলা দে খুলে তরী
বাহি অচিরে।
পালে লাগবে হাওয়ার দোল,
ওরে সবাই তাতে দোল,
রে ভাই সবাই দে রে দোল,
তবে ত সে তুফান কেটে
যাবিরে তীরে।
দেখে সাগর দুওর
যদি কঁপেরে অন্তর
মরবি ডুবে মাঝ দরিয়ায়
অগাধ নীরে।
তাই হােকনা যতই ঢেউ,
ওরে ভয় করিস না কেউ,
রে ভাই ভয় করিস না কেউ,
ও সে ঢেউর তালে বাজিয়ে ভেরী
চলে যা ধীরে।

সুধাকণা
বাঁধন।
সুর - বেহাগ।
প্রাণ কঁদে যার মায়ের তরে
তারে কি কেউ বাঁধতে পারে ?
দেহটী তার বন্দী হলেও
সে যে ফিরে মায়ের দ্বারে ।
যে মায়ের করুণ আভাষ
মায়ের আকাশ মায়ের বাতাস
ভাকে অশ্রুধারে ।
মায়ের মুক্তি আসিছে রথ
থারে চেয়ে ব্যাকুল সে পথ
আলো অন্ধকারে।
মায়ের
বুকের ব্যথার বাঁশী
শুন্‌বি কবে রে উদাসি,
সপি আপনারে ?
টুটিয়ে আঁখির অলীক স্বপন
দেখবি ভীতির সকল বাঁধন
ছিন্ন পারাপারে !

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Sudhakana

Author
Chattopadhyay,lalitakumar
Title
Sudhakana
File name
Sudhakana
Text
OCR done
Citation
1932
Published
2009/12/30
Publisher
Mohitakumar Chattopadhyay,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
124
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Chattopadhyay,Lalitakumar
DLI number
511495
Barcode
4990010018635.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
FmKDYSrIkac
Download PDF

Sudhakana