Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Umedar-darpan

Majumder, Shyamacharan · 2009/11/25

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

(উমেদার-দর্পণ।
(কাব্য।)
শ্ৰীশ্যামাচরণ মজুমদার
প্রণীত
* . . .
নহি ভবতি যন্ন ভাব্যং
ভবতি চ ভাবাং বিনাপি যজেন।
করতল গতমপি নশ্যতি
যস্য তু ভবিতব্য নাভি।
(পঞ্চতন্ত্র)
{ কলিকাতা, ৬ নং বাগবাজার ফ্রীট হইতে
গ্রন্থকার কর্তৃক প্রকাশিত। ]
হিন্দুপ্রেস,
৬১ নং আহরীটোলা স্ক্রট, কলিকাতা।
শ্রীহরিদাস দে দ্বারা মুদ্রিত।
বঙ্গাব্দ ১২১৭।
মূল্য ॥ আট আনা মাত্র

No text on this page.

ভ-মদার-দর্পণ।
(কাব্য)
শ্রীশ্যামাচরণ মজুমদার কর্তৃক
প্রণীত ও প্রকাশিত
[ ৬ নং বাগবাজার স্ট্রীট, কলিকাতা।]
RIN
হিন্দুপ্রেস,
৬১ নং আহরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।
শ্রীহরিদাস দে দ্বারা মুদ্রিত
বঙ্গাব্দ ১২১৭।

No text on this page.

উৎসর্গ পত্র।
দীন প্রতিপালক
শ্ৰীল যুক্ত মহারাজা গিরিজানাথ রায়
বাহাদুর সমীপেষু ।
মহারাজ।
দারিদ্র্য-দুঃখ-তমপরিপূর্ণ এ দীনের হৃদয়া-
কর হইতে এই “উমেদার-দর্পণ,” প্রথম সমু-
দ্রুত হইবামাত্র আপনি ইহার প্রতি যে প্রকার
সহানুভূতি প্রদর্শন করিয়াছিলেন, তদ্রুপ কোন
কোন মহাত্মাও ভবদীয় এই সদৃষ্টান্তের অনু-
করণ করায়, আমি এতদিনে এতন্মুদ্রাঙ্কণে
সাহসী ও সক্ষম হইলাম। এতন্নিবদ্ধন কৃতজ্ঞ।
তার চিহু স্বরূপ এই ক্ষুদ্র দর্পণ খানি ভবদীয়
কর-কমলে মহাসমাদরে সমর্পণ করিলাম। এক্ষণে
এতন্নিহিত প্রতিবিম্ব গুলির প্রতি মহারাজের
চিরাগত কৃপা-কটাক্ষপাত হইলেই গ্রন্থকারের
মনােরথ পূর্ণ হইবে। অলমিতি বিস্তরেণ ।
ঐশ্যামাচরণ শর্মা।

No text on this page.

মুখবন্ধ।
দুর্বিষহ বিষাদ-তমপূর্ণ “বঙ্গের আকর হইতে
অতি মলিনবেশে এই “উমেদার-দর্পণ” নিষ্কাশিত
হইল। হায়! বর্তমান উনবিংশ শতাব্দীর চরম
সীমায় যে ঈদৃশ দর্পণের প্রয়ােজন হইবে, কেহ
স্বপ্নেও তা একবার চিন্তা করেন নাই। কেবল
নিয়তির বশপন্নে ইহার অপ্রতিহত-বেগ সহসা
বর্ষাতরঙ্গিনীর প্রবল-প্রবাহের ন্যায় এ বঙ্গ-সাগরে
প্রধাবিত হইল। এক্ষণে এতন্নিবারনের উপায়
অবধারণ না করিলে ভবিষ্যতে হতভাগ্য বঙ্গের
প্রত্যেক গৃহে উত্তরােত্তর ইহার প্রতিরূপ প্রতি-
ফলিত হইবে, তাহার সন্দেহ নাই।
বঙ্গ সমাজস্থিত কি ধনী, কি নির্ধন কি মধ্যবিত
প্রত্যেক ব্যক্তি ইহার প্রতি একবার দৃষ্টি নিক্ষেপ
পূৰ্ব্বক কিঞ্চিৎ সতর্ক হইলেই আমি সমুদায় শ্রম
ফল বােধ করিব।
অতএব
পরিশেষে কৃতজ্ঞতা
সহকারে স্বীকার

•
করিতেছি যে, নিম্নলিখিত মহােদয়গণ তন্মুদ্রা-
স্কর্ণের যথেষ্ট সাহায্য প্রদান করিয়াছেন; ভরসা
করি, সকলেই এ হতভাগ্য গ্রন্থকারের প্রতি
সদয় ব্যবহারে চিরকৃতজ্ঞতাপাশে বদ্ধ রাখিবেন।
শ্ৰীল শ্ৰীযুক্ত মহারাজা গিরিজানাথ রায়
বাহাদুর দিনাজপুর
ভিতরবন্দের প্রসিদ্ধ ভূম্যধিকারী
শ্ৰীল শ্ৰীযুক্ত বাবু গােপাল দাস রায় চৌধুরী
সরদা কান্ত রায় চৌধুরি
হরিদাস রায় চৌধুরি
, বরদা কান্ত রায় চৌধুরি
৮)
৮)
৭৭
১
29
বাগ্‌বাজার ষ্ট্রীট, । শ্ৰীশ্যামাচরণ শৰ্মা
কলিকাতা।

শুদ্ধিপত্র।
পৃষ্ঠা পংক্তি অশুদ্ধ
১
লতে
নভে
২২
অব্যাহত
, উদ্মলিত।
৪৯
২০
৫৪
৫
অব্যাবিত
উম্মলিত
করিছে
ভবি
শক্তি
করেছে
৫৮
ভাবি
৮

No text on this page.

উমেদার-দর্পণ। (কাব্য।) ၀ယ် প্রথম-দর্পণ ; কোথা মা ভারতীশ্বরি! প্রণমি তােমায়, অধম-তনয়ে আসি, দেও দরশন- এ বিপত্তি কালে ; আশার কুহকে ভুলি বিষয় কারণ, ভ্রমি সদা দলে দলে উমেদার সনে। নিরখি তাদের দশা, নিজ-ভাগ্য অরি, দহিতেছি নিরন্তর বিষাদ-দহনে। নিবারিতে এ অনল— দুঃখ দুর্নিবার, রচিব অপূৰ্ব্ব-কাব্য তব কৃপাবলে ; সে আশয়ে ডাকি মাতঃ ! একান্ত-অন্তরে আজি, তুমি বিনা আর, হেন দৃঢ়-ব্রতে, অবলম্ব্য নাহি যার অম্বুজ বাসিনি। কি রূপে হইবে তার !

উমেদার দর্পণ
মানস সফল ?। তব কৃপা লভে যেই,
এমর্ত-ভবনে মাতঃ ! কি অভাব তার
“মহাকবি নাম তারে দেও সমাদরে।
কি ছার সুমেরু-শৃঙ্গ-কনক-মণ্ডিত ;
ইন্দ্রের অমরাপুরী-ত্রিলােক-বিখ্যাত ;
কে, বলে মানস-সরঃ-প্রসর-সুন্দর ;
এ সকল হ’তে, ভােগ্য ভােগে সেই নর।
নিয়ত করেন বাস যশের মন্দিরে ;
সুমেরু জিনিয়া উচ্চ-রত্নসন তার ;
কাব্য-সরােবর সুধা সদা করি পান,
অক্ষয়-অমর-পদ লভে সে অচিরে।
কাব্যের সরণী সেই—অতি মনােরম,
নানা ছন্দে সুকৌশলে বাঁধা চারিধার,
যতি যমকানুপ্রাস-জলচর গণ,
প্রতি পদক্ষেপে করে আনন্দ বর্ধন
নবরসে পরিপূর্ণ—সরােজ নিকর,
স্বর্গীয়-কমল নহে তার সমতুল।
জিনি দ্রুত-ইরন্মদে, পবনের বেগ
গানস-বিহঙ্গ যানে করি আরােহণ,
পলকে ত্রিলােক কবি করেন ভ্রমণ।
কল্পনা সুন্দরী তাঁর প্রিয় সহচরী,
কি দিব তুলনা তার,অতুল্যা জগতে

প্রথম সর্গ ।
গিরি গুহা অগণন বন উপবন,
নিমিষে কবিরে সব করায় দর্শন।
এ বঙ্গ ভূমিতে হায়! কত উমেদার
ভ্রমিতেছে নিরন্তর ধনীর আগারে,
প্রাণােপম পুত্র কন্যা সহ পরিজনে,
জনমের মত যেন দিয়া বিসর্জন।
সহিতে না পারি আর, এ নব-মুকুরে,
উমেদার প্রতিবিম্ব-করিব স্থাপন।
তব.অনুগ্রহে তায়, হবে বিভাসিত
মানব-প্রকৃতি কত—স্বভাব-সস্তৃত।
স্ততি কিম্বা নিন্দাবাদে নাহিক বাসনা
মম ; কিবা উচ্চ নীচ, মধ্যবিধ যত ;
সবার প্রকৃত-মূর্তি, রাখি এ দর্পণে
স্তরে স্তরে, একে একে করাব দর্শন।
রত্নাকর, ভবভূতি ব্যাস কালিদাস
মহাকাব্য কর ; না পেয়ে সন্ধান এর,
কাল-চক্র বশে এ রসে বঞ্চিত সবে
ছিলেন সর্বথা ; দৈব বশে এ অভাগ্য
হয়ে উমেদার, নিশীথে নিভৃতে বসি
তৃণের শয়নে, ধরিল লেখনী করে,
একাব্য সৃজনে শুভক্ষণে ; মুহু মুহুঃ
ঘাত প্রতিঘাতে, এতপ্ত-অয়স যথা
।

উমেদার দর্পণ ক্রমে প্রসারিত ; এ দগ্ধ হৃদয় তথা, এ সংসারে পুনঃ পুনঃ দুঃখ দণ্ডাঘাতে- ক্রমশঃ অয়স সম, হয়েছে প্রসর। উমেদার দশা যবে করি দরশন- নগরে প্রান্তরে মাতঃ ! সহসা অমনি, কারুণ্য রসের শ্রোতঃ পশিয়া অন্তরে, প্রধূমিত করে হায় ! সন্তপ্ত-হৃদয় মম, কে নিবারে তার। হায়! বৃথা আমি, নিবারিতে সে অনল করি এ আয়াস। উর দেবি । জগন্মাতঃ ! ত্রিলােক উজলি- বিজলী, উজলে যথা জলদ-প্রদেশে। মােহ-নিদ্রা অভিভূত এ মর্ত-ভূবন, চেতন পাইবে সবে বিমল-আভায়। প্রসূতির কর স্পর্শে, সন্তান যেমতি ভাঙ্গিলে ঘুমের ঘাের ব্যগ্র স্তন্য পানে। তদ্রুপ এ মূঢ়মতি-অধম-সন্তান, তব কাব্য-সুধা পানে হইবে বিভাের। উদর পূরিয়া শেষে পুলক অন্তরে, ছড়াব জগতে তাহা-(শ্রাবণের ধারা যথা বর্ষে অবিরল) তৃষাতুর জনে। বহিবে প্রবল-স্রোতঃ ভারত-ভিতর, আকীর্ণ হইবে বঙ্গ সে সুধা বর্ষণে।

প্রথম সর্গ ।
।
চাতক যেমতি-নব-বারিদ সঞ্চারে,
উৰ্দ্ধ-মুখে পানাশয়ে থাকে নিরন্তর ;
এ নব কবিতা যবে হইবে প্রকাশ,
প্রতি ঘরে ঘরে, উন্মুখ হইবে যত--
বঙ্গীয় যুবক তাহা, করিবারে পান।
যখন ইহার স্বাদ করিবে গ্রহণ
মহাসুখে; অনায়াসে মােহ-নিদ্রা হতে
সবে পাইবে চেতন তখন ঝরিবে
নেত্রে শত অশ্রু ধারা—অবিরল বেগে ;
বেপথু রােমাঞ্চ আদি দিবে দরশন ।
বহিবে পবন জিনি প্রবল-নিশ্বাস।
উমেদার দুঃখ দেখি, টলিবে ভু-ধর.
সম পাষাণ-মানব। কোমল-হৃদয়
যার-নবনীত প্রায়, অমনি গলিবে
খলু ইহার সন্তাপে, সে কোমল-হিয়া।
শুনি এ সঙ্গীত কত সরলা জননী
চমকিবে হায়! স্ব মৃতের পরিণাম
ভাবি মনে মনে--“দুঃখিনী উদরে বাছা
লভিল জনম, না জানি বিধাতা তার
লিখিলা কি ভালে হায় ! বুঝিতে না পারি”
হাসিবে বালক সবে দিয়া করতালি,
বিশ্বাস না হবে কার এ নব সঙ্গীত ;

উমেদার দর্পণ
অবােধ বালক তারা—সরল হৃদয় ;
জানেনা সংসার-গতি-ভীষণ কেমন।
ভুক্তভােগী নর—একান্তে করিবে পান
হেন ভাবি মনে, জীবন প্রবাহে তার
মিলে কি না মিলে ; প্রােষিতভর্তৃকা—যার
স্বামী উমেদার, শুনিলে এ গীত—হায় !
মরিবে বিষাদে ; ক্রমশঃ বাড়িবে তার
কুচিন্তা অন্তরে, সহচরী দলে ধনী
পশিবেনা আর কভু ঘণ লজ্জা ক্ষোভে।
কোন ধনী সগরবে কহিবে অপরে--
“মম স্বামী ভাগ্যবান বিধির প্রসাদে,
করে নাই উমেদারী; মুনিব আপনি,
সাদরে লইয়া তারে দিয়াছে দেওনী।”
ভিক্ষুক, শুনিয়া কত হাসিবে অন্তরে
‘মুষ্টি মেয় অনুতরে ফিরি দ্বারে দ্বারে,
উমেদার হতে মােরা পাই সমাদর।”
উদাসীন, উপহাসে দিবে উড়াইয়া
“হায় ! মুঢ় নর ! ইশ প্রেমাশয়ে যদি
কর উমেদারী, অতুল সম্পদ তুমি
লভিবে চরমে সেই তপস্যার বলে।”
বঙ্গের প্রদীপ সম কোন জমিদার
ঈষৎ হাসিবে স্মরি আপন গৌরব,

প্রথম সর্গ।
৭
বিচিস্তিবে মনে--“ধন্য আমি নরকুলে
বিধি কৃপাবলে, সামান্য অর্থেরতরে
উমেদারগণ, সতত আসিয়া দ্বারে
করিছে স্তবন”। কেহ বা বিষাদে স্মরি
তাদের দুর্দশা, সাধ্য অনুসারে সবে
করে উপকার। আর কি কহিব মাতঃ ।
যুগান্তর হবে বঙ্গে একাব্য সৃজনে।
দেখিবে ভারতবাসী আপন দুর্গতি
কল্পনায় কভু যাহা ভাবি নাই চিতে;
দুঃখের আগারে সবে, করিতেছি বাস
হায়! মহাসুখে ; হেন অমূলক-স্বপ্ন
ভাঙ্গিবে অচিরে ; মম এ গভীর নাদে।
তােমার সে প্রিয়সখী--কল্পনা সুন্দরী,
চাহিনা তাহারে মাতঃ ! হেন দৃঢ় ব্রতে।
নেত্ৰ তৃপ্তিকরী বটে—অন্তর তােষিণী,
সুকবির এক মাত্র পথ প্রদর্শিনী ;
অকবির প্রতি কিন্তু নহে অনুকূলা।
নাহিক কবিত্ব মম—মন মুগ্ধকর,
সে কারণে কল্পনাকে না করি আদর।
উমেদার আমি, পড়িব বিপদে ঘাের,
করিলে সঙ্গিনীতারে, এ নর সমাজে
কালধৰ্ম্মবশে। দর্শন শ্রবণ মাত্র
;
;

৮
উমেদার দর্পন।
সম্বল আমার, যেখানে যে উমেদারে
করিব দর্শন, সে চিত্র অঙ্কন করি,
লেখনী-তুলিতে অবিকল, এ দর্পণে
করিব স্থাপন ; সুচিত্রকরের করে
স্বভাবের শােভা যথা রম্য চিত্র পটে,
শােভে মনােহর ; তদ্রুপ এ কাব্যে যেন,
স্বভাবসম্ভত চিত্র, হয় প্রদর্শিত
মাতঃ ! তােমার প্রসাদে ; অধম তনয়,
এই ভিক্ষা যাচে আজি কৃতাঞ্জলি পুটে।
দ্বিতীয় সর্গ।
প্রাচীন ভারত এই, লীলানিকেতন
রতন-সম্ভব বলে, খ্যাত ধরাতলে ।
শত শত কীর্তিস্তম্ভ-(ভূতলে অতুল্য
রূপে), বিরাজে যথায়। অশ্বথ-পাদপ
যথা তরু কুলেশ্বর ; নগেন্দ্র বলিয়া
খ্যাত হিমাদ্রি যেমতি; বিহঙ্গম-কুলে
যথা বিনতা-নন্দন; কহিনুর মণি,
রতন নিকরে যথা লভে বহুমান।
গাভী-কুলে পূজ্যতমা কামদুঘা যথা;

দ্বিতীয় সর্গ।
ঐরাবত ;
গজ-কুলে
অশ্বে
উচ্চৈঃশ্রবাঃ ।
জাবী, সরিত কুলে যথা পুণ্যবতী ;
নৃপকুল শিরােমণি শ্রীরাম যেমন ;
তদ্রুপ ভারত পূজ্য সৰ্ব্ব জন স্থানে
নাহিক তুলনা। প্রকৃতির প্রিয়ভূমি
করি এ ভারত; অপূৰ্ব্ব-কৌশলে বিধি
করেন নির্মাণ। অত্যুচ্চ প্রাচীর প্রায়
শােভে গিরি-শ্রেণী ; পয়ােধি, পরীখাকারে
নিযুত বেষ্টিত। হেরিয়া সুষমা হেন
সুন্দর-গঠন, প্রকৃতি-সুন্দরী ধরি,
পূর্ণ কলেবর, সতত করেন বাস
ভারত ভবনে ; রক্ষিতে সতীর মান ,
বিধাতা আপনি যেন ত্যজি সুরপুর,
নিবাসেন সদা এ ভারতে ; সে কারণে
“ভূস্বর্গ” বলিয়া খ্যাত ভারত ভূবনে।
উদীচি মণ্ডলে অই হিমগিরি বর—
অভেদ্য দুরতিক্রম্য অতি উচ্চতর,
প্ৰসর প্রাচীর সম পূৰ্ব্বাপর ভেদি,
নিয়ত বিরাজে। তদুপরি শ্বেত শৃঙ্গ
গিরি সমুন্নত, রক্ষিছে সতত যারে,
(প্রহরী যেমতি) রুদ্রবেশে; অভ্রভেদী
দেব ডাঙ্গা যেন, জলদ-নিনাদ—ছলে

উমেদার দর্পণ ; করিত জগতে যার বিজয় ঘােষণা। দক্ষিণে পয়ােধি অই পরীখা আকারে, নিয়ত রক্ষিত যারে অরিকুল হতে। প্রাচী ও প্রতীচি কুলে, শােভে গিরি কত- দুর্ভেদ্য প্রাচীর যেন। ঘাট গিরিদ্বয়— অসহ্য অর্ণব-বেগ সহি যার তরে, অনায়াসে সহ্য নাম লভিল জগতে। মধ্যস্থলে বিন্ধ্যগিরি ভেদিয়া অম্বর- “জয় স্তম্ভ” বলে যার দিত পরিচয় ; আৰ্যের মহত্ব আর বীরত্ব-অপার, নিয়ত করিত যেন জগতে প্রচার। কোথায় সে দিন হায়! হিন্দু হীনবল, যবনের সুখ-সূৰ্য্য চির অন্তর্গত। বিজিত ভারত তবু স্বভাবের গুণে, বিজয়ীর যশঃ এেবে করিছে ঘােষণ। কে, বলে ভারত-বাসী—অকৃতজ্ঞ হায় । অন্ধ যেই, জ্ঞান-চক্ষু করি উন্মীলন, নর দূরে থাক, দেখুক স্থাবরে তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ। দক্ষিণে ঐ নীলাচল বীর দর্প স্বরে, নিযেধিত পুনঃ পুনঃ বহিঃ শত্রু গণে যেন পশিতে ভারতে। যখন ভারত হায় ! ছিলরে স্বাধীন,

দ্বিতীয় সর্গ
১১
উড়িত বিজয় কেতু লভে অব্যাহত।
শুনিত তখন তাহা অরাতি মণ্ডল।
তথাপি এখন, বর্তমান রাজ-আজ্ঞা
করিছে জ্ঞাপন। পুষ্পিত ফলিত মরি,
তরুলতা কুল ; উন্নত-শীৰ্ষক-শস্য
জনমে যথায় ; নিয়ত বিহরে যাহে-
বিচিত্র-বিহঙ্গ কত বিবিধ প্রকার ;
নানা জাতি প্রজাপতি-শােভায় অতুল,
তুরগ-তুরঙ্গ ; আর কুরঙ্গ কুরঙ্গী,
যাহার অপাঙ্গ নেত্র হেরি কুলাঙ্গনা
শিখিল অনঙ্গ দৃষ্টি ; সে সবার মাঝে,
মাতঙ্গ প্রধান। বিহঙ্গম দলে শুন
কোকিল-কুজন; নর্তক নর্তকী অই
খঞ্জন খঞ্জনী কিবা নয়ন রঞ্জন।
বসন্ত আগমে-তরুলতাচয় কত
বিবিধ ভুষণে করে তনু আচ্ছাদন।
চম্পক বকুল বেলি হলে বিকসিত,
মলয় অনিল হরি পরিমল তার,
বিতরে সবায়। পুণ্যদা তােয়দা অই—
গঙ্গা ভাগীরথী-অকাতরে করিতেছে
যথা বারি দান। যার অন্নে পরিপুষ্ট
বিদেশীয় গণ, বিপুল বৈভব-সুখ

১২
উমেদার দর্পণ
লভিতেছে কত অকাতরে, সে ভারত
দীন এবে, হায় ! নিজ দোষে ; অন্নাভাবে
শীর্ণকায় মলিন বদনে, ভ্রমিতেছে
নিরন্তর উমেদার-বেশে ব্যগ্র চিতে।
হায়! এভারত যবে ছিলরে স্বাধীন
বাণিজ্য কারণে সবে পশিত সাগরে
অবহেলে ; জাতিধৰ্ম্ম রক্ষিয়া সাদরে ;
হিন্দু দড়ি কর্ণধর, হিন্দু সদাগর,
হিন্দুর আহাৰ্য মাত্র থাকিত সম্বল।
তখন ভারতে নাহি ছিল অপ্রতুল।
আবার যখন হায়! হ’ল পরাধীন ;
যদিও যবন তারে করিত পীড়ন ।
যদিও স্বধৰ্মচ্যুত হ'ত আৰ্য-সুত ।
তথাপি ভারতে নাহি ছিল এ ক্রন্দন।
এখন হয়েছি মােরা সৌভাগ্যের দাস,
সুখ্য সেব্য দ্রব্য কত করি উপভােগ,
যামিনীতে নিরাপদে সুখে নিদ্রা যাই ।
কোন অনাটন নাহি ভারত-সংসারে,
এক মাত্র অন্ন-দায়ে ভ্রমি দ্বারে দ্বারে।
“কেন এ দুর্দশা আজি নিরাখ ভারতে ?”
জিজ্ঞাসিলে, কোন নরে, দিবে এ উত্তর ?
অসঙ্কোচ চিতে—“বাণিজ্যের লােভে আসি
}

দ্বিতীয় সর্গ।
;
বণিকের দল, বৃথা পণ্য বিনিময়ে
হরিছে রতন ; তাহাদের নাম কত
বলিব এখন, আত্ম-দুঃখে স্মৃতি হারা
হইয়াছি হায় !; এদিকে বিলাস-প্রিয়
বঙ্গজ-সন্তান, বিলাসের তরে ক্রমে
বিসজ্জিল ধন ; “বাণিজ্যে বসতে লক্ষমীঃ”,
এমন্ত্র ভূলিয়া, উমেদার-বেশে সবে
অর্থের কারণ, ভ্রমিতেছে দ্বারে দ্বারে
ক্ষুন্ন ব্য-চিত্তে। অর্থের সংস্থান নাই
কে করে ব্যবসা; যার আছে, কি দুঃখে সে
যাবে হেন কাজে ; বিদেশী-বণিকে হেরি
এক বন্ধনে, বাণিজ্য-কারণে সৰে
সৃজিয়া কোম্পানী করে মূলধন ; কিন্তু
হায়! বলিতে বিদরে হিয়া—দুঃখাঘাতে ।
বঙ্গের সন্তান অহহ ! আজি অবিশ্বাসী,
অর্থের কারণে—পিতাপুত্রে নাহি হেরি
প্রকৃত সদ্ভাব। এদিকে শিক্ষিত-মােরা
নবীন-ভাষায়, নবীন-প্রবন্ধে করি
জ্ঞান উপার্জন, নব নব খাদ্য-বস্তু
করিয়া ভক্ষণ, সুসভ্য হয়েছি সবে
পিতামহ হ'তে। বঙ্গের সামান্য-জাতি
তুচ্ছ-মূলধনে, বহিছে মস্তকে ভার
;

১৪
উমেদার দর্পণ ।
ব্যবসা কারণ; অপ্রবাসী ঋণ-হীন
হইয়া তাহারা, সংসারে পরম-সুখে
করিতেছে বাস, দাসত্ব-শৃঙ্খল পদে
কভু নাহি পরে। বাজারে যাইতে মােরা
ঘৃণা করি মনে, কেমনে বহিব ভার
এ উষ্ণ-মন্তকে, যান বিনা ক্ৰোশাধিক
গমনে অক্ষম, কিরূপে করিব তাহে,
নীচ-জনােচিত কাৰ্য্য হাসিবে সকলে।
হায়! একারণে সবে হয়ে নিরুপায়,
দাসত্ব-শৃঙ্খল মাত্ৰ পরিতেছি গলে ;
ভােজনে বিশ্রাম নাই, শয়নে আরাম ;
প্রভুর কাৰ্যেতে সদা করি দেহ ক্ষয়।
এদিকে কুটীরে তব জনক জননী
ভকতি-আধার ; কিম্বা প্রিয়তমা-পত্নী,
সন্তান সন্ততি ; প্রাণােপম-সহােদর ;
সতত চিন্তিত তব স্বাস্থ্যের কারণে।
অথবা আবাসে যদি, অন্তিম-শয়নে
কেহ করেন শয়ন ; পাইলে সংবাদ
হেন চরম সময়ে। স্বদেশে যাইতে
তব মানস-বিহঙ্গ, উড়িবার তরে
কত করিল যতন । কিন্তু মূঢ় তুমি,
বাঁধিয়া রেখেছ তারে দাসত্ব-শৃঙ্খলে

দ্বিতীয় সর্গ। •• হায়! কঠিন-বন্ধনে। ছেদিতে নিগড় সেই, বিনয়-কৃপাণে, করিলে যতন । ব্যর্থ হল অভিলাষ, বাড়িল সন্তাপ। এদিকে সংসারে তব, শােক-হুতাশন- জ্বলিল প্রবল-বেগে ; কে নির্বাণে তায়। প্রবাসে রহিলে তুমি, পরিবারবর্গ তব শােকে অচেতন-অবসন্ন-কায়, তাদের সে শােক-অশ্রু কে করে যােচন। হায় রে ! যখন তুমি, সে শ্মশান-বাসে পুনঃ করিবে গমন ; বাড়িবে আশঙ্কা মনে—কেমনে দেখাব মুখ বন্ধু-গণে । জমিদার গৃহে যারা জীবিকা নির্বাহে, তাদের এহেন দশা চিৎ সম্ভবে। জমিদার গণ, আশ্রিত জনের প্রতি সদা অনুকূল ; একারণে তদায় লভিবার তরে, সবে করে আকিঞ্চন। পাঠক! শুনিলে তব বিদরিবে হিয়া, কোন কোন আদালত-পুলিশ বিভাগে, জ্বলন্ত-প্রমাণ তার করিলে দর্শন। যার গর্ভে জন্মি মােরা এ মহী-মণ্ডলে অন্য জীব হতে, উন্নত-মানব বলে করি অহঙ্কার ; যার স্তন্য ধারা বহে ==

উমেদার দর্পণ
•
অজীবন কায়ে; সে প্রসূতি পরলােকে
করিছে প্রয়াণ ; প্রবাসে সন্তান তার
দাসত্বে নিরত; হেরিলনা মূঢ় তারে
অন্তিম-শয়নে। অভাগিনী শেষ অশ্রু
করি বিমােচন হায়! মুদিল নয়ন।
এদিকে বিদায় তরে অভাগা সন্তান,
প্রভুর গােচরে করে বৃথা উমেদারী
নিরাশা হইয়া শেষে ত্যজি শােক-ভার,
কাচা পড়ি আদালতে করেন গমন।
কি করে অন্নের দায়ে ত্যজিতে না পারে
হেন দুল্লভ-চাকরী; সে কারণে এত,
হে মনস্তাপ। হায়রে দাসত্ব ! তােরে
ধন্য শত শত, কি কুহকে ভূলাইলি
বঙ্গীয় সন্তানে তাহা বুঝিতে না পারি ।
যাহারা শিক্ষিত, আছে সহায়, সম্বল,
উমেদার-বেশে তারা ভ্রমে কদাচিত;
অন্ন-কষ্ট নাহি যার কমলা-কৃপায়,
কি দুঃখে সে করিবে ভ্রমণ, হেন বেশে।
উপযুক্ত-পদ কোথা (ও) হলে অবসর,
সহায়তা বলে তার পূরে মনােথ
অনায়াসে। কিন্তু যারা সহায়-বিহীন,
কপর্দক মাত্র যার নাহিক সম্বল,

দ্বিতীয় সর্গ।
১৭
কি করে জঠর দায়ে ত্যজি দ্বারা সুত,
উমেদার হয়ে তারা ভ্ৰমিছে নিয়ত।
হায় রে ! দুঃখের কথা বলিব বা কারে,
সুযােগ্য হইলে কেহ সে সবার মাঝে,
তথাপি তাহারে, উপযুক্ত বুলি প্রভু
করেনা বিশ্বাস। কটিতে মলিন-বাস,
অংশে উত্তরীয় ; জামা কিম্বা ঘড়ী চেন
নাহি অভাগার, যােগ্যতার পরিচয়
দিবে সে কেমনে?। হেন উমেদার-দুঃ
নিরখি কেবল, কিম্বা হয়ে ভূত ভােগী,
ধরেছি লেখনী হায়! অতি মনােদুঃখে
হেন উমেদার-চিত্র করিতে অঙ্কণ—
শতবর্ষ পূৰ্ব্বে যার নাম উচ্চারণে।
ভারতের হৃৎকম্প হ’ত মুহু মুহুঃ ;
এখন সে উমেদার-ভারত-ভূষণ,
পথে পথে অবিরত করিছে ভ্রমণ।
যদ্যপি গৃহীর দ্বারে রহে সারমেয়,
গাহস্থ্য ধর্মের দায়ে, অন্ন-মুষ্টি মেয় ;
প্রদানে তাহায়। কিন্তু কোন উমেদার,
ক্ষুধাতুর হয়ে যদি সতের আবাসে
আসি দেয় দরশন; অন্ন দুরে থাক,
কটুভাষে উপহাসে সম্ভাষি তাহায়,

উমেদার দর্পণ। বিদূরিত করে হায় ! ফিরায়ে বদন। তবু ক্ষান্ত নহে সেই, ক্রমে অগ্রসর ঘণ লজ্জা অভিমান করি পরিহার । হায় “রে বিধাতঃ ! তুমি অতি নিদারুণ” এরম্য-সংসারে কেন সৃজিলে মায়ায় ; যার পরশে, ব্যাকুল-অন্তরে নর ভ্ৰমিছে ধরায়। পুত্র কন্যা পরিবার- স্নেহের আধার, গড়িয়া বিরলে পুনঃ সুখ দুঃখ নিরমিলে ভােগ্য বস্তু সহ। নতুবা বিষয়ী আর উমেদারে এত, আশ্রয় আশ্রিত ভাব থাকিত সংসারে ? কে জানে মানন্দ তব মহিমা—অপার, কিভাবে নির্মাণ কর মানব-প্রকৃতি ; থাকুক, সে উচ্চ ভাব তােমার অন্তরে, নিরখি সংসার-গতি নিন্দিব তােমায়।

দ্বিতীয় সর্গ।
তৃতীয় সর্গ।
বঙ্গে নিবাসেন যত রাজা জমিদার,
অতুল-বিভব করি, প্রভূত-সম্মান ;
দেবাৰ্চ্চনা, অভ্যাগত—অতিথি সৎকার,
প্রাত্যহিক সদাব্রতে বিখ্যাত সংসারে।
রাজ-কার্যে যবে হবে লােক প্রয়ােজন,
তখন তাহারা সবে করেন নিয়ােগ ।
উচ্চ, নীচ মধ্যবিধ বিবিধ মানব
প্রভুর কাৰ্যেতে করি আত্ম সমর্পণ,
জীবিকা নির্বাহ করে, সহ পরিজনে।
সে আশয়ে দলে দলে উমেদার গণ,
বিষয়ীর বাসে হায়! ধায় ব্য-চিতে।
লােভের কুহকে পড়ি করি-যুথ যথা,
কঠিন-নিগড় পরে আজীবন-তরে।
তদ্রুপ মানবগণ-লােভে অন্ধ-মন,
দাসত্ব স্বীকার করি, জীবিকা নির্বাহে।
হায় রে ! লজ্জার কথা বলিব কি আর,
চাকরীর সংখ্যাধিক হ’ল উমেদার ।
হেরি তাহ, জমিদার হয়ে নিরুপায়,
বিদায় করেন সবে দুঃখিত-অন্তরে।

২০
উমেদার দর্পণ
দেখিলে তাঁদের সেই উদারতা-ভাব,
ক্ষুধা তৃষ্ণা দুরে যায় ক্ষণ কাল তরে।
কিন্তু তাঁহাদের মধ্যে কোন ভাগ্য-ধর,
পরুফ-আচার হায়! করি প্রদর্শন,
কটু-ভাষে উপহাসে হরেন সম্মান,
হায় বিধে। সে কারণে ইচ্ছি মরিবারে।
যষ্টি-বিনা অন্ধ হায়! গতি-শক্তি-হীন,
পদে পদে বিচলিত হয় সে নিশ্চিত ;
একারণে সমাদরে রাখে তার মান।
চক্ষুয়ান হয়ে অহহ! জন্মান্ধ যেজন,
এক মাত্র নর-যষ্টি, অবলঘ্য যার ;
সে যদি অবজ্ঞা করে উমেদার-প্রতি,
তার সম মূঢ় বল কে আছে জগতে।
কর-গত যষ্টি যদি ভাঙ্গে একবার,
অপর যষ্টির তরে হইবে ব্যাকুল ;
অবজ্ঞা প্রকাশে যারে করিল বিদায়,
হতে পারে, তারি তরে হবে লালায়িত
যখন ছিলনা বঙ্গে এত উমেদার,
তখন তাদের অহহ! ছিল সমাদর।
অতিরিক্ত মিষ্ট-অন্নে, ঘৃণা জন্মে তায় ;
অতিরিক্ত বস্ত্র হলে, দলি পদতলে ;
অতিরিক্ত শস্য হলে দরে সস্তা হয় ;
।

তৃতীয় সর্গ।
২১
হায় রে দুঃখের কথা হায়রে এখন,
একাধারে উমেদার ধরে এ ত্রিগুণ।
কোন কোন জমিদারে না পেয়ে দর্শন,
হায়! গ্রহদোষে, অন্তর-বাসনা করি
অন্তরে গােপন ; বাহকর্তা মন্ত্রী তাঁর
হইলে সদয়, উমেদার-ভাগ্যে তবে
ফলিবে সুফ, নতুবা দুর্ভাগ্য তার।
কোন জমিদারে, নিয়ত আরূঢ় হেরি
সন্দেহ দোলায় ; জগতে কাহারে নাহি
করেন বিশ্বাস। স্বয়ং যদি ভগবান
সাক্ষ্য দেন তার, তথাপি সে ভ্রম দূর
হয় কদাচিত। এদিকে অমাত্য-গণ .
লুটিছে ভাণ্ডার, কে করে সন্ধান তার ।
কিম্বা ধৰ্ম্ম-ভয়ে, নাহি হয় প্রতিকার।
দরিদ্রের পক্ষে বিধি হইয়া সদয়,
প্রভুর প্রকৃতি হেন গড়েন বিরলে।
যেখানে স্ত্রীলােক কত্রী, মন্ত্রী সৰ্বেশ্বর ;
প্রায়শঃ তথায় আশা, নহে ফলবতী,
স্বার্থ মূর্তিমান সদা। স্বার্থপর-মন্ত্রী
কা’র হলে পরিচিত, পূরিবে বাসনা
পরব্ৰক্ষ-জ্ঞান তথা—এক অদ্বিতীয় ;
কিন্তু হায়! কি আশ্চৰ্য্য নাহি ভ্রাতৃ-ভাব।
;

২২
উমেদার দর্পণ ।
-
যােগ্যতার পরিচয় না হয় সে স্থানে।
পক্ষপাতহীন মন্ত্রী বিরাজেন যথা,
বিষয় কর্মের সুখ জন্মে সেই স্থানে।
কোথাও অমাত্য-চক্র অতি ভয়ঙ্কর ।
হেরিলে তাদের ভাব হেন জ্ঞান হয়-
স্বর্ণ-লঙ্কাপুরী যেন রক্ষে রক্ষোদল।
সাধ্য কি সহসা কেহ পশে অনায়াসে
রঘুবর-বর রূপ সােপারিশ বিনা ।
কোন জমিদার হায়! করেন প্রকাশ,
“অন্নদায়ে উমেদার আসিছে নিয়ত
মম সন্নিধানে; সে কারণে নিরুপায়ে
অমাত্যের পদ তারে করি সমর্পণ।”
এদিকে সে হতভাগ্য করি প্রাণ-পণ,
দাসত্ব স্বীকারে করে আত্মসমর্পণ।
যদি সে অমাত্য-পদ শূন্য না থাকিত ;
অথচ নুতন-পদ হত তার তরে,
তবে সে মনের ভাব উচ্চ ব’লে মানি।
বঙ্গের ভূষণ যারা ভরসার স্থল,
দরিদ্রের দুঃখ দূর করিবেন সদা,
হেন পর-উপকারী হত যদি সবে
এ বঙ্গে দারিদ্র্য-দুঃখ থাকিত না আর।
কোন কোন ঋদ্ধিমান-বঙ্গীয় সন্তান,

তৃতীয় সর্গ।
ধােদর পূরণে রত, নিত্য নব নব
বাড়িছে খরচ তাঁর ; হায়! একারণে,
পর উপকারে তিনি একান্ত বিমুখ।
কেহবা বিবাদ করি বিষয় রক্ষণে,
সৰ্বস্বান্ত হয়ে বৃথা করে অনুতাপ।
এরূপে উচ্ছিন্ন হ’ল কত জমিদার
হায় ! নিজ দোষে। এ হেতু স্বদেশ-প্রিয়
জমিদারগণ, জমিদারী-পঞ্চায়ত
করেন সৃজন;
কি ফল ফলিবে এতে
বুঝিতে না পারি, ভবিষ্যৎ গর্ভে তাহা,
আছে লুক্কায়িত ; এক বন্ধনে মােরা
নহি অগ্রসর, আত্মীয়-দুর্দশা সবে
হেরি দুর হতে মহাসুখে। সে কারণে,
ঘটিয়াছে বঙ্গে হায়! দশা-বিপৰ্যয়।
এখন স্বভাব-দোষে অবিশ্বাসী নর,
প্রকৃত-ধৰ্ম্মের তত্ত্ব জানেরে ক, জন। ?
বঙ্গের ভিতর, শতকে বিংশতি মাত্র
হয় কি না হয়। হেন উমেদার দলে
প্রকৃত-শিক্ষিত লােক অতীব বিরল।
একারণে অশিক্ষিত উমেদার যারা,
অশেষ প্রকারে করে কত অত্যাচার।
স্থানাভাবে কেহ করি বেশ্যালয়ে বাস,

২৪
উমেদার দর্পণ
চন-কৌশলে হরি অবলার মন,
হায় ! অনায়াসে; ক্রমশঃ সে নরাধম
পশি তার হৃদে, সৰ্বেশ্বর-কর্তা হয়
যথা পরিণয়ে ; সরলা বুঝিতে নারি,
শঠের হৃদয়, হারায়ে সম্বল শেষে
করে হায়! হায়! হরিয়া সৰ্ব্বস্ব তার
শঠ-শিরােমণি হায় ! গিয়াছে কোথায়।
কোন উমেদার হয়ে বেশ্যায় আসক্ত,
তুষিতে তাহার চিত হয়ে নিরুপায়,
পরস্ব হরণ করি, যায় কারাগারে।
হেন উমেদারে বল কে দিবে আশ্রয় ?
“উমেদার” নাম মাত্রে অবিশ্বাসে সবে ।
একারণে, ভদ্র যদি হয় উমেদার—
পড়ে সে সঙ্কটে ; বলিতে লজ্জিত হায় !
“আমি উমেদার”। একের পাপেতে ভােগে
অন্যে অপমান, এর নাহি প্রতিকার।
স্বভাব কাহারাে নাহি থাকে অপ্রকাশ,
সময়ানুকুলে-অবশ্য ঘােষিবে তাহা
এ নর সমাজে। দুৰ্জ্জন, চাকরী যদি
লভে দৈব-বশে, প্রভুর সে সর্বনাশে
হয়ে দৃঢ়-পণ, স্বােদর পূরণ করি
করে পলায়ন। সে কারণে জমিদার,

তৃতীয় সর্গ।
উমেদার প্রতি, বিশ্বাস স্থাপনে হায় !
নিতান্ত অক্ষম। উমেদার বলে কেহ
দিলে পরিচয়, অমনি তাদের হয়
ঘৃণার সঞ্চার হায় ! কাল-চক্র-বশে।
শেষে, পরিচয়ে কিম্বা সদালাপে তার,
সদসৎ-জ্ঞান চিতে করেন ধারণ ।
বহু অপচয় সহি জমিদারগণ,
ভাবি ভবিষ্যৎ, জামিনের প্রথা সবে
বন সৃজন। তদবধি জামিনের
এত বাড়াবাড়ি। জামিনব্যতীত কেহ,
কৰ্ম্ম নাহি পায় ; কাল-ধৰ্ম্ম অনুসারে
এপথ প্রশস্ত। কিন্তু তাহে এই মাত্র
দুঃখ হয়মনে, এক দরে বিকাইছে-
কাচ কহিনুর। যদিও কাৰ্যেতে তার
হয় পরিচয়, দরিদ্রের পক্ষে কিন্তু
নহে সুবিচার । সুবিশ্বাসী, কাৰ্যক্ষম—
সহায়-বিহীন, ভাগ্যে যদি ঘটে তার
উপযুক্ত পদ; নিজের সম্পত্তি নাই
কে, হবে জামিন ? হতাশ্বাসে হতভাগ্য
করয়ে প্রস্থান। সতের পরীক্ষা হয় ।
কে করে কোথায় ; কোথায় দরিদ্র-মান--
থাকে অব্যাবিত !। যথা যাবে হতভাগ্য

উমেদার দর্পণ
করিবে শ্রবণ-“জামিন সংগ্রহে যেই
হইবে সক্ষম, লভিবে এ যােগ্য-পদ
সেই ভাগ্যবান।” শুনিয়াছি দ্রৌপদীর
লক্ষ্যভেদী-পণ ; “ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য
শূদ্র নানা জাতি, যে বিন্ধিবে, পাইবে সে
কৃষ্ণা-গুণবতী।” তদ্রুপ জামিন দিতে
যে হবে পারগ, লভিবে ঐ পদ হায়।
সেই ভাগ্যধর। যেমন হয়েছে কাল,
তেমনি বিচার হায় ! ধনীর কি দোষ।
জমিদারাশ্রয় ভিন্ন ভারত-ভিতরে
আছে বহু স্থান, রেলওয়ে ট্রামওয়ে,
মহাজন ঘরে, ফৌজদারী আদালতে
হউসে, দোকানে কিম্বা পুলিশ-বিভাগে,
করিছে বিষয় কত, বঙ্গের সন্তান।
সৰ্ব্বস্থানে সমভাব উমেদার ভালে।
এক মাত্র জমিদার নহে লক্ষ্য স্থান;
দর্পণে, সে সব দৃশ্য পাইবে দেখিতে।
রেলওয়ে আদালতে কৰ্ম্ম খালি হলে,
হুসা তথায় কেহ প্রবেশিতে নারে।
প্রথমে অফিশে সবে কার্যশিক্ষা করে,
পদ শূন্য হলে তাহা পাইবে নিশ্চিত।
কত যে দুর্দশা তথা ভােগে উমেদার--

তৃতীয় সর্গ।
বর্ণিতে অক্ষম ; এপ্রেন্টিস্ খাতে যারা
লিখে নিজ নাম, হায় । আশার আশ্বাসে ;
সূৰ্য-ব্রতচারী সম থাকে উৰ্দ্ধপানে,
ত্যজিতে না পারে ব্রত, উভয় সঙ্কট।
কেবল গণিছে দিন হা হতােস্মিকরি ;
যতই পূর্বের পাপ হবে বিদুরিত,
ক্রমশঃ চাকরী তার হয় সন্নিকট।
পুলিশে বিশেষ বিধি আছে প্রচলিত,
সহসা তথায় কেহ ফল নাহি পায়,
অথবা সভয়ে আশু না চায় পশিতে।
শিক্ষা বিভাগেতে বটে ছিল সুনিয়ম,
যে যেমন উপযুক্ত ভিত সে পদ।
কিন্তু কি দুঃখের কথা সময়ানুসারে,
পশিয়াছে স্বার্থ তথা, সুযােগ্যের ভাগ্যে
কভু প্রসবে কুফল। অপর বিভাগে
শুনি (গবর্ণমেন্ট বিনা) সুজহস্ত করি
কেহ লভিছে সুফল। কোথাও সুবিধা
নাহি হেরি উমেদার, হয়ে নিরুপায়,
জমিদার গৃহে আসি করয়ে যােবন।
সেখানেও স্থানে স্থানে এরীতি চলিত ;
নিয়ােগ কর্তার ভাগ্যে ঘটে সে সকল ।
কোন স্থানে, খাঁটি মেকি চেনা নাহি যায়,
-

উমেদার দর্পণ
চিনিতে যে পারে, সেই ধন্য জমিদার।
স্বপ্ন-আয়ে শিক্ষকতা করি কিছু দিন,
পশিয়াছে কতলােক জমিদারাশ্রয়ে।
তথায় তাহারা স্বীয় কাৰ্যতার গুণে,
করিয়াছে সমুন্নতি উভয় পক্ষেতে।
তথাপি শিক্ষিত লােক হেয় সেই খানে।
বিশেষ, ইংরাজী যদি না জানে সেজন,
পাটয়ারি-যােগ্য হায়! হয় কোন স্থানে ;
এদিকে সে হতভাগ্য বাল্যকাল হতে,
জমিদারী; মহাজনী, সাহিত্য বিজ্ঞান
পাটীগণিত বীজগণিত পরিমিতি
আদি সারবে জ্যামিতি ; শনৈঃ শনৈঃ শিক্ষা
লভি অবশেষে ; নৰ্মালে উত্তীর্ণ হয়
তৃতীয় বর্ষেতে; বি, এর সমান প্রায়
পড়ি রীতিমত, জমিদারায়ে হায় !
পায় সম্মান। দৈব-বশে তথা কোন
পদ শূন্য হলে, প্রবেশিকা-পরীক্ষায়
উত্তীর্ণ যে জন ; পশ্চাত্য-ভাষার গুণে
অগ্রগণ্য হবে সেই, সে অভাগ্য হতে।
অথচ ইংরাজী তথা নাহি প্রয়ােজন,
জমা ওয়াশীল-লতা, রােকড়, শুমার—
পশেনাই কভু তার বিশদ-শ্রবণে।

তৃতীয় সর্গ।
২৯
কালের স্বধর্ম এটী বুঝিলাম সার।
সুবিশ্বাসী-জন লভে মহাজন-ঘরে
বহু সমাদর ; বিশ্বাস বিনষ্ট হলে
তিলেকের তরে, তথা পাইবেনা স্থান।
একাধারে কত ক্লেশ সহে উমেদার,
( বলিতে বিদরে হিয়া স্মরিলে সে দুখ )
দারিদ্র্য, বিষয়-চিন্তা, পথ-পৰ্যটন,
প্রবাস-জনিত-ক্লেশ, স্বজন- বিরহ
ক্ষুধা, তৃষ্ণা, সহিষ্ণুতা, অনিদ্রা, নিষ্ঠুণা
অপমান, একাদশ হলে সংঘটিত,
প্রকৃত সে উমেদার কালের নিয়মে।
তার মাঝে পশে যদি, চৌর্য-লম্পটতা,
মণি-কাঞ্চনের যােগ হয় অবশেষে।

৩০
উমেদার দর্পণ
চতুর্থ সর্গ।
আষাঢ়ে বরষা-ঋতু দিল দরশন,
আম, জাম, পনসাদি পাদপ-নিচয়,
সতেজ-শরীরে হ’ল ফল-ভারে নত।
গগন-ব্যাপিত সদা জলধর দল,
মুহু মুহুঃ বারিধারা বর্ষে অবিরল,
অভিষিক্ত হল ধরা ; এহেন সময়,
কার সাধ্য স্থানান্তরে যায় অনায়াসে।
সু-পথ, বিপথ হ’ল, কুপথ সু-পথ,
কলি-ধৰ্ম্ম যেন তারা মানবে দর্শায়।
বাপী, কূপ, সরােবর—পূর্ণ-কলেবরে,
প্রকাশিছে গৰ্ব্ব যেন নরে উপহাসি।
দ্বিগুণ-প্রবাহে যত নদ নদী চয়-
তীর অতিক্রমি ; চলিছে সাগরে যেন
প্রকাশি গৌরব। নিদাঘ-দুর্দিন হায় !
আসিবে যখন, তাদের এ মােহান্ধতা,
এহেন গৌরব খলু ঘুচিবে অচিরে।
ধন, মান পদ কা’র নহে চিরদিন ;
জানে নর,সুখ দুঃখ নিয়তি-অধীন ;
তবু ভ্রান্ত হয়ে সবে প্রকাশে গরিমা।
;

চতুর্থ সর্গ।
=
একালে নিরন্ন হয় শ্রমজীবিগণ
মজুরি ব্যবসা যার পল্লীতে নিবাস ;
অন্নাভাবে শীর্ণকায় বিশুষ্ক-বদন,
ভগ্ন-কুটীরেতে বারি ঝরে অবিরত,
তিল মাত্র স্থানাভাব থাকে নিরাপদে।
সিক্ত-বস্ত্র সিক্ত-কায় তাহে ম্যালেরিয়া,
নিষ্পেষিত করে তারে, প্রাণ ওষ্ঠাগত।
সন্তান সন্ততি যবে হয়ে ক্ষুধাতুর,
ধরাসনে পড়ি হায় ! করয়ে রােদন।
হেরিলে সে দশা তার, বিদরে হৃদয়।
কোন পল্লী জলাকীর্ণ হয় একেবারে,
শত শত জীব হে জীবন হারায়।
কত শস্য ভেসে যায় আশু-ধান্য তায়,
কৃষক-দস্পতি বসি করে হায়! হায়।
বরযিছে বারিধারা বারিদ-নিকর,
বাহিরে যাইতে পারে হেন সাধ্য কার।
এমন দুর্দিনে, অশ্বখ-পাদপমূলে,
বসিয়া বিরলে অ’ই এক উমেদার
কি ভাবিছে মনে মনে, কে বলিতে পারে।
গৌর-কান্তি-ধর-বপুঃ ছিল এককালে,
কুচিন্তা-অনলে এবে হয়েছে অঙ্গার।
বদন মলিন হায়! শীর্ণ-কলেবর,

৩২ উমেদার দর্পণ = কখন ভাবিছে মনে, কভু মৃদুস্বরে, প্রকাশিছে হায়! হেন অন্তর-বেদন। “বিধি যার প্রতিকূল এমরত-ধামে কে করে তাহার ভাগ্যে সুখ সঞ্চালন। রাজ-দ্বারে দোষী যেই, স্বকরম-ফলে ; ঘাতক, তাহার শিরে তুলে যদি অসি, কে নিবার তায়। দুঃখের আগারে লভি মানব-জনম, (জীব-ভাগ্যে মর্ত্যে যাহা অতি সুদুল্লভ); অজ্ঞান-তমসে যবে ছিলাম আবৃত, ভাবি নাই কভু হেন সংসারের গতি,-কালের নিয়তি আর মানর-প্রকৃতি; যৌবন প্রারম্ভে হল, জ্ঞান অঙ্কুরিত; হেন কালে অকস্মাৎ ললাট-গগনে, আবরিল কালমেঘ- অতি ভয়ঙ্কর ; দুর্নিবার-বাত্যা আসি । উৎক্ষিপ্ত করিল মােরে, দূরদেশান্তরে। বাড়িল সৌভাগ্যে তথা ভােগ্য-বস্তু সনে- সুখ অহরহঃ ; ভূলিল অন্তর মম সে মােহ-মায়ায়, অমনি হেলায় হায় । সুখ-সেব্য মাতৃভূমি ঠেলিলাম পদে ; সে পাপে ঘটিল বুঝি দশা-বিপৰ্যয়, কালের দশনে হায় ! সংসার-বন্ধন,

চতুর্থ সর্গ।
৩৩
অকালে বিছিন্ন হ’ল জম্মের মতন।
টলিল আশ্রয়-তরু-আত্মীয় স্বজন,
অহে! ঘাের আর্তনাদে, সেবন্ধনচ্ছেদে।
ভাঙ্গিল সুখের স্বপ্ন, মােহ-নিদ্রাসনে—
সে ভীম-নিনাদে। অমনি উড়িল নভে,
এমৃঢ় বিহগ-আশ্রয়ান্বেষণে হেন,
উমেদার-বেশে। জানিনা সাঁতার হায় ।
সংসার-সাগরে, কে দিবে আশ্রয় আজি,
এ অভাগ্য-জনে—বিধাতা বিমুখ যার।
কেহ বা চিন্তিবে--“আশ্রয়-পাদপ যার
ছিল উচ্চতর, সে সুখের স্থান মূঢ়
তজে কি কারণে ; অবশ্য হইবে দোষী।
নতুবা কি হেন দশা কখন সবে ?”
আপাত দর্শনে বটে, চিস্তিবে এমন ;
অন্তর-গগণে যদি পশে সে সুজন,
বুবিবে মরম মম; নতুবা অজ্ঞানে-
বলুক, জগত-জনে, নাহি ডরি তায় ।
দোমী কি নির্দোষী আমি, জানে অন্তর্যামী।
চতুর্দিকে অন্ধকার নিরখি কেবল,
শূন্য-নভস্তলে; শীতল-সমীর নাহি
স্পর্শে এ শরীরে, অনল সদৃশ তাপ .
বহে অনুক্ষণ, নিবারিতে সে সন্তাপ,
•
;

৩৪
উমেদার দর্পণ
•
স্মৃতির সহায়ে ভাবি, কত গত-সুখ,
হায় মূঢ় আমি ; অমনি জ্বলিয়া উঠে
হৃদয়-নিলয় ; অশ্রু-বারি বরিষণে,
হয় নিৰ্ব্বাণ ; হায় রে আশ্রয়-তরু।
দেখ আসি হেথা, তােমার সে প্রিয়পাখী
যাহার সুস্বরে হায়! মজি এক দিন,
দিয়াছিলে তবাশ্রয়ে নিৰ্মাণিয়া নীড়।
বিষাদ-বিমানে আজি, অনন্তকালের
স্রোতে চলিছে ভাসিয়া ; কি দোষে ত্যজিলে
তারে, বল এবে, শুনিলে সে মৰ্ম্ম-কথা,
এ দগ্ধ-হৃদয় আশু হইবে শীতল।
সগুণে, নিগুণ ভাবি ত্যজিলে হেলায় ।
দেখ বিচরিয়া মনে-অভাগার করে,
কোন্ কাৰ্য্য অসম্পন্ন ছিল আপনার ?
যখন যে আজ্ঞা মােরে করেছ রাজন।
হয় না স্মরণ, বিমুখ হয়েছি কি না
সে কাৰ্য্য সাধনে; তবে কেন হায়! আজি,
উপেক্ষা করিলে মােরে বুঝিতে না পারি।
আর কি হেরিব, তব প্রশান্ত-মূরতি।
আর কি শুনিব, সেই সস্নেহ-বচন ।
অষ্টাদশ-বর্ষ পরে, মিটিল সে সাধ।”
এতেক ভাবিয়া মনে উমেদার হায় !

চতুর্থ সর্গ ।
বিগলিত অশ্রুধারা করিয়া মােচন,
ধীরে ধীরে তথা হতে, করিল প্রস্থান।
হতভাগ্য-উমেদার ক্ষণকাল পরে,
জমিদার-দ্বারে শেষে, হয়ে উপনীত,
কহিছে অন্তরে—“এইত সে সু-বিস্তৃত
সুন্দর-প্রাসাদ, মরি! শােভা-মনােহর ;
যার তরে এত পথ করেছি অটন।
ঐশ্বর্যের খনি যেন, বাহদৃশ্যে তার
দেয় পরিচয় ; মম মন প্রাণ কেন,
করে আকর্ষণ, বিধাতা সুদিন বুঝি
দিবেন এখানে। অহাে ভাগ্য! নিষেধিছে,
নিরাশা আসিয়া হার! যাইতে আমায়
হেন দরবারে। কি ফল দিবেন বিধি,
বুঝিতে না পারি ; সারমাত্র বিড়ম্বনা।
আবার করিছে অই অঙ্গুলি-সঙ্কেত
আশা-কুহকিনী ; যাই তবে, বিলম্বের
নাহি প্রয়ােজন। মন্ত্রের সাধন কিম্বা
শরীর পতন, এর, হবে একতর।”
এত ভাবি উমেদার স্মরিয়া শ্রীহরি,
প্রবেশিল সােৎসাহে প্রাসাদ-ভিতর ।
দেখিল সম্মুখে এক সৌধ-মনােহর,
দ্বিতল উপরে, জমিদারী কাৰ্যতথা

৩৬
উমেদার দর্পণ।
হয় সম্পাদন ; দৌবারিক সাবধানে
ফিরিছে নিয়ত, তবু অবারিত দ্বার।
বিষয়ী, কি ব্যবসায়ী-বণিক, ভিক্ষুক,
কাৰ্য অনুরােধে সবে পশে অনায়াসে।
স্থানে স্থানে খাতা পত্র আছে স্তুপাকারে,
সারি সারি মস্যাধার—বিবিধ গঠন ;
লেখনী সহিত শােভে, অমাত্য-সম্মুখে ;
বিধির আদেশে, সুখ দুঃখ তাহে যেন
আছে লুক্কায়িত লেখকের করে ক্রমে
হয় প্রকাশিত। সৰ্বোচ্চ-আসনে বলি
অমাত্য প্রধান, গম্ভীর ভাবেতে নিজ
কাৰ্য্যে নিযােজিত। অধীনস্থ কর্মচারী,
যথা যােগ্য স্থানে, সযতনে সাধিতেছে
কাৰ্য আপনার। করেতে লেখনী দ্রুত
চলিছে সবার, কাহারাে অপাঙ্গে দৃষ্টি
অতি খরতর ; খেলিতেছে তাহে যেন
স্বার্থের লহরী, ভাবুক ব্যতীত তার
কে, বুঝে কারণ। মরিলে সে ভাব হায় !
অন্তরে উপজে ঘৃণা; যাহার আশ্রয়ে,
সম্পদে বিপদে কত লভি উপকার,
সে হেন প্রভূর স্বার্থ করিয়া বিনাশ,
স্বীয় স্বার্থেত নর ফিরে নিরন্তর।
•

চতুর্থ সর্গ ।
৩৭
সমাগত প্রজাগণ সভয় অন্তরে
কপি থর থর, স্ব স্ব আবেদন তথা
করিছে জ্ঞাপন। শুনিয়া তাদের বাণী,
কিম্বা অভিযােগ, প্রধান অমাত্য তার
করেন বিচার। প্রজার প্রার্থনা পত্র,
নিকাশ, নিশস্ত আদি প্রয়ােজন মতে,
সে সব সময়ে পেশ করেন পেষ্কার।
জমা-নবিশের করে কাৰ্য গুরুতর,
জমা জমি হস্তযুদ—আয় সংঘটিত,
নিকাশাদি কাগজাত করেন শিজিল।
সেজন ধার্মিক হলে, প্রভুর মঙ্গল ;
নতুবা সতত তিনি পান মনস্তাপ।
তহবিল জিম্বা থাকে খাজাঞ্চীর করে,
আগত চালান জমা করিয়া রােকড়ে,
প্রভুর আদেশ মাত্র করেন খরচ।
তহবিল মিল যদি থাকে প্রতি দিন,
উপযুক্ত খাজাঞ্চী সে প্রভুর গােচরে।
শুমার-নবিশ বসি লিখিছে শুমার,
প্রতিমাসে যে বাবদে যত ব্যয় হয়,
মান্তে হিসাব তার করিকে প্রস্তুত।
মুনসী লিখিয়া লিপি আনতবদনে-
মন্ত্রীর আদেশে, মপঃসলে হুকুমাদি

উমেদার দর্পণ ।
.
•
।
করিছে প্রেরণ। বক্সীর একাধারে
শােভে কত গুণ তাহা বর্ণিতে অক্ষম।
ইমারত কারখানা অতিথির সেবা,
যখন যে প্রয়ােজন করে সম্পাদন।
দলিল, দাখিলা, চিঠা, নক্সা ফয়শালা,
সেরেস্তায়, মহাফেজ, রাখেন যতনে,
অগােচরে ভার, কার সাধ্য অনায়াসে
করিবে সন্ধান। নিকাশ গ্রহণ করে,
নিকাশ-নবিশ ; কভু অতি উচ্চৈঃস্বরে—
তর্জন গর্জন; কখন মধুর-বাণী
কহে জনান্তিকে ; কে জানে ইহার মর্ম,
মৰ্ম্ম-ভেদী বিনা। ভিন্ন ভিন্ন সেরেস্তায়
মুহুরী প্রচুর ; সবে নিজ কাৰ্যে রত।
তাদের দুর্দশা হায়! করিলে স্মরণ,
পক্ষপাত আসি যেন দেয় দরশন।
চাকরীর সুখ যাহা লভে অন্যজনে,
কেবল লিখিছে তারা বিনম্র-বদনে।
চলিছে কাছারি হেন মহাধুমধামে ?
হেনকালে, উমেদার তথা উপনীত।
ধীরে ধীরে এক ধারে বসিলেন গিয়া।
কুহকিনী-আশা তার হৃদয়-গগণে,
খেলিছে, বিজলী যথা বিমানে প্রকাশে,

চতুর্থ সর্গ।
ভাবী সুখ অভিলাষ, উপজিছে মনে,
কখন নিরাশা আসি, দেয় দরশন,
অমনি বিষাদে তনু, হয় আচ্ছাদিত।
এখানে বঞ্চিত হলে কি হবে উপায়,
কোথায় যাইব তার, না পাই সন্ধান।
অন্তরে চিন্তিয়া হেন অতি মদু-স্বরে,
নাম ধাম স্বজাতির দিয়া পরিচয়
রাজ প্রতিনিধি পাশে কহিল কাতরে—
“নিতান্ত দরিদ্র আমি-সহায়-বিহীন
দুর্ভাগ্যের বশে, আপনি সুবিজ্ঞ শুনি
লােক পরম্পরা, আসিয়াছি তবপাশে
হয়ে উমেদার, যােগ্যতার পরিচয়
দিব বহুতর ; যদি কোন সদুপায়
করেন বিধান; চিরঋণে বদ্ধ আমি
রহিব জীবনে।” শুনি সে কাতর-বাণী
স্বগুণ কীৰ্ত্তন, হয়ে মহা অভিমানী
অমাত্য প্রধান, কহেন হাসিয়া তারে।
“আপনি সদ্বংশ জাত, অতি কার্যক্ষম,
বৃথা আকিঞ্চন কেন,করেন অন্তরে।
সম্প্রতি এখানে কোন কার্য খালি নাই,
থাকিলেও আশু তার নাহি প্রয়ােজন।”
এত বলি হয়। স্বকার্য সাধনে মন

উমেদার দর্পণ
,
করেন অর্পণ। জিনিয়া জীমূত-ধ্বনি,
সে বাণী সহিত, পশিল অমনি যেন
উমেদার-হৃদে হায় ! বিষাদ-অশনি।
চকিত-নয়নে চাহি অমাত্য-মণ্ডলী
( জ্ঞাতি শত্রু সম যারা) কি ভাবি অন্তরে,
ঈষৎ হাসিল-প্রকাশে বিদ্রুপ যেন
আপন গৌরবে কেহ। কি বলিব হায় !
যে জন বিদ্রুপ হাসি হাসিল এখন,
যখন এদশা তার ছিল এক দিন,
হেসেছিল কত নর, পড়িল কি মনে?।
কালের মাহাত্ম অহহ! কে বুঝিতে পারে,
সম্পদে, বিপদ কারাে থাকে কি স্মরণ ?।
সামান্য এ নর, কিন্তু রাজ-প্রতিনিধি-
প্রভূত-সম্মান যাঁর, কি উত্তর দানে,
প্রত্যাখ্যান করিলেন এই উমেদারে।
“সম্প্রতি এখানে কোন কর্ম খালি নাই,
থাকিলেও আশু তার নাহি প্রয়ােজন।”
শুনিলে পাঠক! হায়! বিদরে হৃদয়,
একেবারে নিরুত্তর মুখ-উমেদার ।
মহাকবি কালিদাস কত শক্তি ধরে,
ইহার সমস্যা পূর্ণ করে সেই ক্ষণে।
নিগূঢ় কারণ এর, শুন মন দিয়া
ক
!

চতুর্থ সর্গ। ৪১ পদ শূন্য আছে বটে, কেহ না পাইবে, স্বকীয় আত্মীয় তরে আছে সুসজ্জিত। অযােগ্য কি যােগ্য পাত্র, হউক সেজন কে করে বিচার ; বসিবে সে সমাদরে এ উচ্চ-আসনে ; ইহার বিরুদ্ধে কে, করে প্রতিবাদ, স্বেচ্ছায় নাশের তরে। তুমি যদি কাৰ্যদক্ষ হও সুচতুর, হায় রে ! এ ক্ষেত্রে তাহা কে’করে শ্রবণ। সে কারণে সুকৌশলে হইল উত্তর- “থাকিলেও আশু তার নাহি প্রয়ােজন।” অহহ কিবা পরিতাপ! এ সব ঘটনা, কভু না জানিতে পারে প্রভু ঘুণাক্ষরে ? কিম্বা কোন জমিদার জানি সবিশেষ, উপেক্ষা করেন তাহ, স্বভাবের গুণে ; ক্রমশঃ সে কালসর্প হয়ে অগ্রসর,- মন্ত্রী-বেশে স্বদল-সহিত; অবশেষে হায়! র করে সর্বনাশ। একারণে হেরি কত মহা-জমিদার, অচিরে সে হতভাগ্য হারায় সম্বল নিজ-দোষে। স্বার্থপূর্ণ এ সংসার, যিনি তার দাস, ন্যায়-পথ ভ্রষ্ট তিনি প্রতিপাদ-ক্ষেপে, অনুমাত্র ধর্ম-ভয় থাকেনা অন্তরে।

৪৫
উমেদার দর্পণ ।
নীচ-কুলে, ততােধিক দোষ কে সন্ধানে।
“ভদ্র” আখ্যা ধারী যারা সম্পদে সম্মানী,
সতের আদর্শ হয়ে দেখাবেন পথ,
যদ্যপি বিপথে তারা করেন ভ্রমণ,
এ বঙ্গে, উন্নতি তবে কি রূপে সম্ভবে।
থাকিয়া কি ফল আর” হেন ভাবি মনে,
ধীরে ধীরে উমেদার করিল প্রস্থান।
হায় রে ! চরণ তার চলিতে না চায়,
চিত্ত—সচঞ্চল, দুঃখের সাগরে যেন
শুষ্ক-লঘু-তৃণ; নিরখিছে নেত্রে যেন
সব শূন্যময় ; কোথায় গিয়াছে চলি
আশা-সৌদামিনী, নিবিড়-বিষাদ-মেঘে
লুকাইল বুঝি এবে শরমের দায়ে।
দুঃখিনী-জননী, দারা, আত্মীয় স্বজন,
একে একে আসি কভু দেয় দরশন।
মরুভূমে তৃষাতুরে যথা মরীচিকা
কখন নিকটে হায়! কভু অন্তর্হিত ;
স্মৃতির সে খেলা আর বিস্মৃতির গুণ।
উমেদার হায় ! কখন চলিছে দ্রুত,
কখন থমকি, উন্নত-নয়নে হেন।
ভাবিতেছে মনে—“কোথায় যাইব আর
নাহি গম স্থান, কপর্দক মাত্র মম
-

চতুর্থ সর্গ। ৩; নাহিক সম্বল। ভিক্ষা সদুপায় এবে, তাই কোথা মিলে ; যাহার নিকটে যাই, উমেদার বলে হায় ! উপহাসে কত ; কীটাণু কীটের সম ভাবে মনে মনে। যাপিতে যামিনী এক নাহি পাই স্থান, দু-সন্ধ্যা উদরে অন্ন মিলে কদাচিত। যখন সম্পদ মম ছিল এক দিন খাদ্যের বিচার হায় ! করেছি বিস্তর ;- দুগ্ধ-ফেণ-নিভ শয্যা, থাকিত সজ্জিত ; এখন সে খাদ্যাখাদ্যে কে’করে বিচার ; ভৃণের শয্যায় করি রজনী যাপন। কত উমেদার আসি এঅধম-বাসে, নিয়ত করেছে বাস কতই যতনে আজি লােকে ঘণ্য আমি নিয়তির বশে। কোন উমেদার তরে প্রভুর গােচরে, স্তুতি অনুনয় আমি করিয়াছি কত- লােকতঃ ধৰ্ম্মতঃ পুণ্য লভিবার তরে। সম্প্রতি তদ্রুপ মােরে করে উপকার হেন পর উপকারী, না হেরি সংসারে, হায় ! ভাগ্য দোষে ; কিবা এর পরিণাম কে” বলিতে পারে, অন্তুরের দাবানল রহিল অন্তরে হায় ! মম এ জীবনে। ---

33
উমেদার দর্পণ
এত বলি উমেদার ত্যজি দীর্ঘশ্বাস,
ভাবিতে ভাবিতে পুনঃ করিল গমন।
পঞ্চম সর্গ।
উত্তরবঙ্গেতে এক প্রকাণ্ড ষ্টেশন
স্বনামে বিখ্যাত; কত যাত্রী যাতায়াত
করে রাত্রি দিন ; কে, করে গণনা তার।
রহিয়াছে কত লােক ট্রেণ প্রতীক্ষায় ;
বিলম্ব না সহে কার, ফিরে অবিরত,
কখন, লাইন প্রতি চাহে বারবার।
বাজিল টিকিট-ঘণ্টা—ঘন ঘাের রােলে ।
রেলওয়ে কর্মচারী কাৰ্য পরতায়,
করিতেছে ছুটাছুটিী; লগেজের ঘরে
বিছানা বালিশ লেপ-কম্বলে জড়িত
কা’র, কাহারাে বা চটে; তুরুম তলপী
কা’র, কাহার পেটরা, লগেজ কারণ,
স্তুপাকারে রহিয়াছে কম্পাসের ধারে।
সাবধান করে কেহ পুত্র-পরিবারে,
কেহ বা চাহিছে ফিরে সতৃষ্ণ-নয়নে।
কত ব্যাগ পােট মেন্ট, ঘটী বাটী ঝারি,
;

পঞ্চম সর্গ।
৪৫
স্থানে স্থানে পড়ি অই, জায় গড়াগড়ি ।
মালিক নিকটে তাই রয়েছে তথায় ;
নতুবা নিমিষে তাহা হত অপহৃত।
কেহ বা গাঠরী বাঁধে, অতি সাবধানে,
ছাতা লাঠি রাখে কেহ অন্যের জিম্বায়।
কলকী হারায়ে কেহ, করি হায় হায় !
করে অন্বেষণ, শূন্য-হুকা হেরি আরাে
বাড়িছে সন্তাপ তার-না হয় নির্বাণ।
এদিকে কেহ বা রােষেটীকা গুড় হল”
বলে, করিতেছে গােল, স্থানে স্থানে কত
লােক, বর্তুল আকারে বসি তাম্রকূট
পানে মত্ত ; কেহ বা করিছে গলাবাজী।
ঘুরে ফিরে ফেরিয়ালা,ফুকারে গভীর
“মিঠাই কচুরি লুচি, চাই ছানাবড়া”
অপর দিকেতে কোই ছাচিপান”
“চাই বিলাতি চুরট”—কেহবা হাকিছে।
পলকে পুলিশ-ম্যান ঘুরায়ে নয়ন,
চলিছে গরবে যেন-গজ-যুথ-পতি।
টেলি গ্রাফ-গৃহে শুন-খটা খট খট,
কভু খিটি মিটি, পুনঃ টরে টক্কা টরে।
প্রেরিছে সংবাদ এবে, সম্মুখ ষ্টেশনে
অহহ! কি কৌশলে। উপনীত গাড়ী আশু,

৪৬
উমেদার দর্পণ
লাইন ক্লিয়ার বলি পড়ে গেল ডাক।
অদূরে বিজয়ধ্বনি করিল ইঞ্জিন ;
আবার বাজিল ঘণ্টা, সাজিল অমনি
ব্যাগ, বােকা লয়ে যাত্রী—শােভায় অতুল
আসিল ইঞ্জিন তথা অতি দর্প-ভরে,
ক্রোধে গরজিয়া যেন অন্তর-দাহনে।
কত যাত্রী উতরিল, কত যাত্রী গেল,
কে করিবে সংখ্যা তার, হেন গােলযােগে ।
স্টেশন বাহিরে অই, রাজপথ-ধারে,
কঙ্কাল-আকারে হের! এক উমেদারে ;
নয়ন, কোটর-গত, কুক্ষি, অক্ষি প্রায় ;
বক্ষস্থলে অস্থিগুলি ক্রমে প্রকাশিত
অশীতি-বয়স্ক নর গণিতে সক্ষম।
জীর্ণ-ছত্র জীর্ণ-ব্যাগ প্রলম্বিত করে,
পরিধানে জীর্ণ-বাস-শত গ্রন্থি তায়।
শ্রাবণের ধারা যেন সহিতে না পারি,
আশ্রয় লভিল আসি হেন তরুতলে।
কৰ্ম্ম-ফলে ভাগ্যদোষে হয়ে উমেদার,
কত বিড়ম্বনা হায়! ভুঞ্জিতেছে এবে।
প্রথমে ষ্টেশনে কাজ করে কিছুদিন,
সামান্য কারণে শেষে হ’ল পদচ্যুত ;
ট্রফিক-অফিশে আসি করি উমেদারী,

পঞ্চম সর্গ।.
০৭
পাইল আদেশ হেন—“আগামী এপ্রিল
মাসে পরীক্ষা প্রদানে, উপযুক্ত হলে
তব পৃরিবে বাসনা পাইয়া আদেশ,
বহু কষ্ট সহি মূঢ় ষ্টেশনে থাকিয়া,
রীতি মত শিক্ষা করে কাৰ্য্য আপনার।
তার সহ পরীক্ষার্থী জুটিল অনেক,
দৈববশে হতভাগ্য হইল নিস্ফল।
মন-দুঃখে অবশেষে করি দৃঢ়-পণ,
জমিদারী, মহাজনী, পুলিশ-বিভাগে,
বিষয়ান্বেষণে করে জীবনের শে।
গমনে শকতি নাই, শরীর দুর্বল,
তাই মূঢ় ভাবিতেছে হয়ে নিরুপায়।
নয়ন-যুগলে ঝরে শত অশ্রু-ধারা,
উদ্বেলিত-সিন্ধু সম—হৃদয় চঞ্চল ;
জ্বলিছে অন্তরে কত ভাবনা-অনল,
নিশ্বাস-পবন ক্রমে হইল প্রবল ;
জগতে নাহিক আজি সহায় এমন
সহায়তা করে আসি এ হেন বিপদে।
যথা যায় তথা হায় ! না পায় আশ্বাস,
কেবল অন্তরে বাড়ে অন্তর-পিপাসা।
ক্ষুধায় আকুল হায় ! ওষ্ঠাগত প্রাণ,
চতুর্দিকে তমঃ বুঝি নিরখি নয়নে,
-

৪
উমেদার দর্পণ
তায় ;
সহিতে না পারি আর অঙ্গ-যষ্টি ভার,
বসিয়া পড়িল দেখ অবসন্নকায়ে ।
অন্তরে কুচিন্তা আরাে বাড়িল দ্বিগুণ
জীবনের আশা যেন শুষ্ক মরুভূমি ;
প্রমাদ গণিছে হেন পুত্র কন্যা তরে
হায় বিধে। জীবনের শেষ বুঝি হল
এতদিনে, তুমি বিনা আর, কে রক্ষিবে
মােরে এবিপদে ; মরি আমি, নাহি খেদ
চিরস্থায়ী নহে কেহ এমরতে ।
কিন্তু বিধে ! অভাগার পুত্র কন্যা তরে,
করেছ বিধান কিবা বুঝিতে না পারি ;
জানি আমি,-এরও তরুর বীজে নহে
জন্মে শাল; তবু এ পরাণ কেন কঁাদে
অনিবার, কহ মােরে। মায়াময় তব
এ সংসার, তাহে নর মগ্ন মােহ-বশে ;
সেকারণে পাই আজি হেন মনস্তাপ।
অবােধসন্তান তারা না জানে তােমায়,
করিল কি অপরাধ এ নব বয়সে।
মম সুখে সুখী যারা,—বিপন্ন বিপদে ;
তবে কেন হলে বাম, তাহাদের প্রতি।
নাজানি তাহারা হায়! ক্ষুধার জ্বালায়,
জীবনে, মরণ জ্ঞান করিছে নিয়ত,

পঞ্চম সর্গ।
৪১
অথবা অস্তিত্ব বুঝি পাইয়াছে লােপ।
জীবনের সহচরী-অন্তর, দর্পণে,
কভু আসে কভু যায়, যথা সৌদামিনী।
হায় প্রিয়ে ! তব ভাগ্যে বিধাতা বিমুখ,
সহকার-তরু ভ্রমে নিম্ব-তরু গলে,
পরায়েছ বরমাল্য ; হতভাগ্য আমি;
দিনেকের তরে তুমি, লভিলেনা সুখ।
কত আশা ছিল মনে উপার্জিয়া ধন,
বরমাল্য বিনিময়ে পূরাব বাসনা ;
সে সাধে বঞ্চিত বিধি করিল আমায়,
জানি তােমার মনে আশা-কুহকিনী,
ভুলাইছে নিরন্তর প্রবােধ বচনে-
“বিদেশে গিয়াছে স্বামী শিক্ষিত সুজন,
মাস ত্রয় গত হ’ল অবশ্য এখন,
দিবেন খরচ তাঁর পুত্র কন্যা তরে ;
অসহ্য অন্নের জ্বালা সহেনা এ প্রাণে,
কমলার কৃপা বুঝি হবে এতদিনে।”
হায় মুগ্ধে! বসিয়া বিরলে, আশা-বশে~-
কতই জল্পনা তুমি করিতেছ মনে।
এদিকে, সে আশা-লতা উলি প্রায়,
ফিরিব যে দেশে হেন নাহিক সম্বল।
“সম্মুখে শরত কাল—অতি মনােহর ;
;

tv
উমেদার দর্পণ ।
মহামায়া অবতীর্ণ হইবেন যবে
এমরত-ধামে ; বহিবে আনন্দ-শ্রোতঃ
বঙ্গের ভিতর ; যুবক যুবতী বৃদ্ধ,
হয়ে এক মন, সুসজ্জিত করিতেছে
আবাস ভবন। বালক বালিকা মনে
কতই উল্লাস-পরিবে নুতন বাস
হেন ভাবি মনে। মম পুত্র, কন্যা হায় !
(স্মরিলে বিদরে হিয়া) তাহাদের সহ,
করিতেছে আশা কত বস্ত্র অলঙ্কারে।
বিদেশে গিয়াছে পিতা বান কারণ
আসিলে অমনি পরি, দেখাইব সবে।
হায়রে বিধাতঃ ! অবােধ সন্তান তারা,
জানেনা সংসার-গতি—ভীষণ কেমন।
উথলিছে শােক-সিন্ধু প্রসুতির হৃদে,
বাড়িছে আশঙ্কা মনে ক্রমে দিন গতে।
কি বলে, বুঝাবে হায় ! অবােধ কুমারে,
হাতে নাই কপর্দক, যােগাবে বন ;
প্রতিবাদী যবে হবে আনন্দে মগন,
সহ বন্ধু গণে; মম অভাগিনী হায়!,
বসিয়া বিরলে অশ্রু করিবে মােচন।
আর কি সুদিন হবে, মুছিব সে ধারা; ?
আর কি তাহার সেই স্মিত-মুখ-শশী

পঞ্চম সর্গ ।.
ভাতিবে এ হৃদাকাশে ?; নয়ন-চকোর,
আনন্দে করিবে পান, সে বিমল-সুধা ? ;
হায় প্রিয়ে ! আর কি পাইবে হেন ধনে ?
আর কি হেরিবে তব আরাধ্য দেবেরে ?-
যাহার সেবায়, আত্ম-সুখ অভিলাষ
দিতে বিসর্জন ; কিঞ্চিৎ অসুস্থ যারে
নিরখিলে তুমি, কায়-মনাে-বাক্যে সদা
করিতে শুশ্রুষা ; আজি সেই হত ভাগ্য
ভাবিতে ভাবিতে বুঝি, হারায় জীবন
তৈল বিনা বাতি হায়! রহে কতক্ষণ” !!!
হেন কালে অস্তাচলে পশিল তপন
উমেদার দশা যেন সহিতে না পারি
তমঃ আসি আবরিল সমস্ত মেদিনী,
উমেদার-দুঃখ যেন হয়ে মূর্তিমান
দেখায় মানবে। গগনে নক্ষত্র রাশি,
হইল প্রকাশ; কুবের ভাণ্ডার হতে,
অসংখ্য রতন হায়! করি পরিহাস,
প্রলােভন দেয় যেন উমেদার গণে।
ফুকারিছে ফেরুপাল অতি উচ্চ রবে,
“কাহুয়া, কাহুয়া” বলে ব্যাথিত অন্তরে,
জিজ্ঞাসিছে উমেদারে কারণ তাহার ;
কে দিবে উত্তর তার, নীরবে পশিল

উমেদার দর্পণ।
তারা বিজন কাননে, কেহ লােকালয়ে।
নিরখি দোষ-কাল মানব নিচয়,
পশিল আপন বাসে; কিন্তু কোন নর,
উমেদার দশা হায়! ভাবিলনা মনে।
তখন সে হতভাগ্য না দেখি উপায়,
প্রবেশিল লােকালয়ে লভিতে আশ্রয়।
অদূরে ছিলেন এক মােক্তার প্রধান
অতি দয়াবান; অনাথের নাথ বলে
খ্যাত এ সংসারে। জগতে ঐশ্বৰ্যশালী
হেরি যত নরে, প্রকৃত সদ্ব্যয় তার
করে কত জন?; দয়া ধৰ্ম্ম হীন যারা
স্বভাবে কৃপণ, গুপ্ত ধন রক্ষে সেই
পরম যতনে। ভুক্ত ধনে ধনী যিনি
স্বকরম ফলে, দীন হীন জনে দয়া
প্রকাশে সে জন, স্বেচ্ছায় কমলা নাহি
ত্যজেন তাহায়। অথবা বিলাসী হলে,
বিপুল বৈভব তার রহে কত দিন?
অসৎ কাৰ্যেতে যায় অসতের ধন।
মােক্তার স্বভাব গুণে আপন বাসায়,
আশ্রয় প্রদান করি, নিরাশ্রয় জনে,
সাধ্য অনুসারে সবে যােগান অশন।
সে কারণে দলে দলে উমেদার গণ,

পঞ্চম পর্গ।
৫৩
আশ্রয় লভিয়া তথা করে উমেদারী;
লােক মুখে শুনি এই বারিক বার---
অবারিত দ্বার তার, নাহি রােধে গতি ;
উপায় না হেরি আর সেই উমেদার,
রন্ধনশালায় নাম লিখিলেন গিয়া।
সেখানে যেরূপ মিলে অশন শয়ন,
হায়! ভাগ্য দোষে, বৰ্ণন করিব তাহা
চাহি ধৰ্ম্মপানে। এখন সে সব হায় !
করিলে স্মরণ, বিদরে হৃদয় ক্ষোভে।
পূৰ্ব জন্মজ্জিত পাপ ভুঞ্জিবার তরে,
জনম লভেছে হেন উমেদার গণ।
কদলী পত্রেতে অনু—কোটরা আকারে
সারি সারি সুবিন্যস্ত অতীব কৌশলে,
কি দিব উপমা তার, না পাই খুজিয়া
এ নশ্বর ধামে ; রণক্ষেত্রে শ্রেণীবদ্ধ
পদাতিক যথা, অথবা হাওড়া পুলে
তরণী সঙ্কুল। তাহার হৃদয়ে মরি ।
বিরাজেন সূপ দেব-সূক্ষম দরশনে।
অপার মহিমা তার—অবিরাম গতি,
বাহিরিছে বারিরূপে পাত্রে পাত্ৰান্তরে ।
(বিষ্ণু পদে সমুদ্ভুল জাবী যেমতি)।
মরি কি আশ্চর্য শােভা ধরিয়াছে তায়,

৫৪;
উমেদার দর্পণ।
শৃঙ্খল সংযােগে, স্টেশনের ট্রেণ যথা
রহে সজ্জীভূত। কোথাও সে বারি শ্রোতঃ,
অর্প পথ হতে হয় বিলুপ্ত ধরায়।
ব্রাহ্মণের ধৰ্ম বুঝি যায় রসাতলে-
হেন ভাবি মনে, সংক্রোধে করিছে পান
জহুমুনি যেন। এ হেন মুখের গ্রাস
( উমেদার ভাগ্যে যাহা নিতান্ত দুর্লভ)
মক্ষিকা নিকর, করিছে আবৃত আসি
হরিতে সে গ্রাস। কিন্তু উমেদার গণ
পরাভব করি সবে খেদাইয়া দুরে,
মহা সমাদরে তাহা করিছে অদন।
আদর কি অনাদর নাহি সেই স্থানে,
দাতার সুসাধ্য যাহা করেন প্রদান।
শয়নে মাদুর চট, যখন যা পাও,
দ্বিরুক্তি না করি তাহে করিবে শয়ন।
এরূপ শয়নে কিম্বা ভােজনে তােমার,
যদ্যপি অসহ্য বােধ হয় মনে মনে,
মূখ তুমি-উমেদার-গ্লানি যাও তবে
ফিরে নিজালয়ে; ব্যর্থ মনােরথ তুমি
হলে এত দিনে। রত্ন লভিবারে যদি
করহ কামনা, দুঃখ-পারাবারে দেহ
কর নিমজ্জন। সম্মুখে দুর্গম-পথ
;
;

পঞ্চম পর্গ।
ভাবিয়া অন্তরে, যদি হও হে শঙ্কিত,
কি রূপে সে লক্ষ্য স্থানে হবে উপনীত।
এমন আশ্রয়ে থাকি উমেদার গণ,
করে অত্যাচার কত ; কভু পরস্পরে,
কলহ করিয়া হায়! যায় কারাগারে।
একের হইলে কৰ্ম অন্যের অন্তরে,
পশে যেন শেল সম বিদ্বেষ অমনি।
কত যে অশুভ তাহে ঘটিছে নিয়ত,
সে সব বর্নিতে কার, নাহিক শকতি ;
স্বজাতি বিদ্বেষী হায়! বাঙ্গালি যেমন,
অপর জাতিতে তাহা কভু না সম্ভবে।
কোন কোন ভাগ্যধর আপন বাসায়
কিম্বা নিজালয়ে; পরিচিত উমেদারে
রাখেন যতনে; হতভাগ্য উমেদার,
করি উমেদারী, ফিরিছে নগরে সদা
বিষয়ান্বেষণে ; কোথাও না হয় তার
আশা ফলবতী। এদিকে আশ্রয় দাতা
পড়িল সঙ্কটে, কত দিন যােগাবেন
অশন তাহার। ছলে কি কৌশলে তারে
করিতে বিদায়, অনাদর ভাৰ কত
করে প্রদর্শন। দরিদ্রের পক্ষে বটে,
এভাব সম্ভবে। বিষয় যে জন হায়।

৬
উমেদার দর্পণ।
লভিবারে যশঃ, বৃথকাৰ্যে অর্থ ব্যয়
করি অকাতরে লভিতেছে বাহাদুরী।
সে যদি এরীতি হায়! করি প্রদর্শন,
চব্য চোষ্য লেহ পেয় খাদ্য নানাবিধ,
সাজায়ে সুবর্ণ থালে, করেন প্রদান ।
সে ঘৃণ্য ভােজন পাত্রে করি পদাঘাত,
ভিক্ষা মাগি দ্বারে দ্বারে করিব ভ্রমণ।
কোথায় গিয়াছে হায় ! আৰ্যসুত গণ !!
অতিথি সৎকারে যারা লভিত সন্তোষ
এখন অষ্কাৰ্য্য করি আৰ্যসুত গণ,
ধৰ্ম্মের কপট ভাব করে প্রদর্শন।

যষ্ঠ সর্গ।
যষ্ঠ সর্গ।
আগত শরত-কাল—উঠিল গগণে,
অপার আনন্দ-ধ্বনি প্রতি ঘরে ঘরে ;
বিষয়ী, বিষয় হেতু সুদুর প্রদেশে
থাকি বহুদিন, এখন উল্লাসে তারা
স্বদেশানুরাগে সবে ফিরিছে আবাসে ।
নব নব সুখ কেহ করে উপভােগ
কল্পনার বশে ; নিঃসম্বল হয়ে কেহ
ক্ষুব্ধ মনে মনে, সংসার চিন্তায় তার
অন্তুর মগন। এ সময়ে স্থানে স্থানে।
যত উমেদার, আশার আশ্বাসে হায় !
ছিল পরাশ্রয়ে, তাদের দুর্দশা এবে
করিলে দর্শন, পাষাণ হৃদয় নর,
হয় বিগলিত। যাদের আশ্রয়ে সবে
ছিল এত দিন, এখন স্বদেশে তারা
করিল প্রয়াণ; নিরাশ্রয় হয়ে এবে
উমেদার গণ, মুহু মুহুঃ অশ্রুধারা
করিছে মােচন। কে, ভাবে তাদের সেই
দুঃখ-দুর্নিবার, স্ব স্ব সুখ দুঃখে হায় !
নিমগ্ন সবাই; কে দিবে আশ্রয় এবে

উমেদার দর্পণ ।
যােগাবে অশন, নাহিক সম্বল কার,
ফিরিবে স্বদেশে। সে কারণে দ্বারে দ্বারে
উমেদার গণ, নিরাশা-সাগরে যেন
ভাসিছে নিয়ত ; যথা সেই হতভাগ্য
হয় উপনীত, নিরখে নয়নে যেন
এ বঙ্গের দুঃখ রাশি দিয়া উমেদারে,
সকলে ভুজিছে সুখ সহ পরিজনে।
কোন উমেদার এবে চিন্তিছে অন্তরে--
চাহি শূন্য পানে, আরক্ত-নয়ন তার
হেরি ভর্ধি মনে—দহিবে এ বিশ্ব যেন,
(হর-কোপানলে দগ্ধ মদন যেমতি );
“দিনত্রয় গত হল এসেছি এখানে,
কোথাও আশ্রয় নাহি মিলিল আমার ;
স্বদেশীয় বন্ধু যারা ছিল এ প্রদেশে,
সকলে স্বদেশে হায়! করিল প্রস্থান,
কি করি উপায়, বিদেশী বলিয়া কেহ,
নাহি দেয় স্থান হায় ! মম ভাগ্য দোষে।
পরিধানে জীর্ণ-বাস—অতীব মলিন,
হয়না স্মরণ, প্রবাসে রজকালয়ে
দিয়াছি কখন ; বস্ত্রাভাবে লােকালয়ে
যাই কোন লাজে ; ষাঙ্ক্ষা করিলেও
কেহ করেনা বিশ্বাস ; মাতাল বলিয়া

যষ্ঠ সর্গ ।
অহহ ! সবে ঘৃণা করে ; হায় রে বিধাতঃ !
বিবস্ত্র জনেরে কত দিয়াছি বসন,
তার প্রতিফল মােরে দিলে এত দিনে।
আর যে সহেনা প্রাণে, এ বিষম-ক্লেশ ।
জঠর-জ্বালায় একে দগ্ধ দিবানিশি,
নিদ্রার আবেশ নাই দুশ্চিন্তা-শয়নে ;
তাহে হেন লােক লজ্জা আরাে বিড়ম্বন ।
উপায় হীনের এক আছে সদুপায়,
কিন্তু তাহা ঘুণাকরনহে ভদ্রোচিত ;
নীচ-কুল জনে বটে, কভু শােভা পায়।”
এতেক চিত্তিয়া মূঢ় আরম্ভিল পুনঃ-
“জন্মেছে মানবকুল সুখ ভােগ তরে
এ মহী-মণ্ডলে ; তবে বিসদৃশ কেন
নিরখি সংসারে ? কেহ উচ্চ, কেহ নীচ,
কেহ ধনবান, রাজ-ভােগ্য ভােগে কেহ,
কেহ শীর্ণকায়-অন্নাভাবে? ; কেহ কার
পদতলে দুলি অনায়াসে, লভিতেছে
যশমান ধন এজাতে; অহাে ভাগ্য।
তব অনুগত নর বিধির প্রসাদে,
এই কি বিধির বিধি ? ধিক্‌সে বিধানে।
ছলে কি কৌশলে আমি হব ভাগ্যবান ;
কলি ধৰ্ম্মে এ সংসার-নরক সমান,

উমেদার দর্পণ
;
পাপ পুণ্য এ নরকে কে’ করে বিচার ?
মূঢ় যেই-ধৰ্ম্মজ্ঞানী; আমি কেন তবে
সহি হেন ক্লেশ ? এত দিন ধৰ্ম পথে
থাকি এ দুর্মতি, এই কি লভিল ফল !!
যাক ধৰ্ম রসাতলে--বিস্মৃতি-সলিলে,
মান লজ্জা দয়া আজি করুক প্রস্থান,
নীচ জমােচিত কাৰ্য্য করি এ সংসারে,
পালিব এ দৃঢ় ব্ৰত অধৰ্ম্মের বলে।”
এত বলি উমেদার চলিল সােদ্বেগে।
বিপদে পড়িলে নর বুদ্ধি ভ্রষ্ট হয়,
হায়! গ্রহ-দোষে ; হিতাহিত জ্ঞান তার
থাকেনা তখন। সে দশায় উমেদার
পড়িয়াছে এবে। আত্মীয় নিকটে নাই
কে, করে সান্তনা ; কুকাৰ্য করিয়া শেষে
পড়িবে বিপদে। অনেকে অকাৰ্য্য করে
স্বভাবের দোষে, কেহ বা বিপদে পড়ি
হয়ে নিরুপায়, অসঙ্গত কাৰ্য্য করি
যার কারাগারে। এতক্ষণ যে যুকতি
করিল নির্বোধ, রাজদ্বারে দণ্ডনীয়
হলে একবার, অচিরে ঘুচিবে তার
ভ্রম অন্ধকার। উমেদারী ক্ষেত্রে হায় !
জন্মিছে এ হেন কত বঙ্গ-কুলাঙ্গার।
;

ষষ্ঠ সর্গ।
.
সে কারণে উমেদার অবিশ্বাসী লােকে।
আজীবন বঙ্গবাসী ভুঞ্জিবে যে ফল,
হায়! তার মূলে, অবিশ্বাস-বারি যদি
করহ সিঞ্চন, জীবন-পাদপে তব
ফলিবে কুফল ; তখন অমৃত-কুম্ভ
আনি ভারে ভারে, পরিপূর্ণ কর যদি
আল্বাল তাহার, তথাপি পীযুয ফল
ফলিবেনা তায়। অতএব উমেদার ।
হও সাবধান, একের পাপেতে কেন
ডুবাও সবারে হায় ! ত্যজি ধৰ্ম্মপথ ।
অই এক উমেদার—সরসীর তীরে,
রহিয়াছে ক্ষুব্ধ-চিতে চাহি সরঃপানে ।
ফুটিয়াছে সরােবরে সরােজ-নিকর,--
মরি ! শােভায় অতুল ; মকরন্দ-লােভে
অলি ভ্ৰমিছে চৌদিকে; কভু উর্ধে, কভু
দলে কভু কর্ণিকারে। গুণ গুণ রবে
যেন মাতায় জগত। কুসুম-উদ্যান,
তীরে কত শােভা ধরে, বিবিধ প্রসূন
তায়, হয়ে প্রস্ফুটিত, দর্শকের আঁখি
মুগ্ধ করিছে নিয়ত ; সুমন্দ সমীর
মরি ! স্বচ্ছ সরােজলে, ঈষৎ উৰ্ম্মির
সহ করিতেছে খেলা। যে জন যাহার
=

৬২
উমেদার দর্পণ
চিন্তা করে অনুক্ষণ, নিয়ত নিমগ্ন
সেই, সে ভাব-সাগরে ; উমেদার বসি
হেন সরসীর তীরে, চিন্তিছে অন্তরে
তথা দশা আপনার,—“এ বঙ্গে বিরাজে
কত রাজা জমিদার, প্রস্ফ
প্রস্ফুটিত-পদ্ম
যথা স্বচ্ছ সরােবরে ; মধু গন্ধে অন্ধ
হয়ে উমেদার-অলি, ভ্ৰমিছে নিয়ত
অহহ! সে পদ্ম সকাশে; তােষামােদ-স্বরে,
তুষিছে অন্তর তার মকরন্দ-আশে ;
কিন্তু সকলের আশা পূর্ণ নাহি হয়।
এ অলি যেমন পশিতে কমল-কোষে
করিছে যতন, অমনি মলয় আসি
আন্দোলিত করি হায় ! পঙ্কজ-মৃণালে ; .
বিদূরিত করে তারে, হতভাগ্য অলি,
আশাচ্যুত হয়ে শেষে যায় পুষ্পস্তরে।
কি স্বার্থ তাহার, এ দিকে সে হরি বাস
বিতরে অপরে ; তবে কেন বৈর-ভাব
অলি প্রতি এত হায়! বুঝিতে না পারি।
জমিদার গৃহে এবে নিরখি সে ভাব
কোন উমেদার যদি যায় মধু আশে
গুণ গুণ স্বরে কভু তােষে প্রভু চিত।
অমাত্য-অনিল তাহে হয়ে প্রতিবাদী,
-

যষ্ঠ সর্গ ।
সন্দেহ-দোলায় তুলে মুনিবে অচিরে।
নিরাশা হইয়া শেষে উমেদার-অলি,
মধু অন্বেষণে ত্বরা ধায় পুস্পারে।
ইতর প্রাণীতে সদা নিরখি যে ভাব,
মানব-সমাজে তাহা পশিয়াছে হায়!
গৃধ শারমেয় আদি খাদ্য যদি পায়,
অমনি উপজে হিংসা তাহাদের মনে ;
তখন তাহারা স্বীয় স্বার্থ সাধনায়,
সরােষে আক্ৰমে হায় । সম লােভী জীবে ।
আমার ভাগ্যেতে আজি ঘটিল তাহাই ;
রাজবাটী ছিল বটে লােক প্রয়ােজন,
উপযুক্ত পদ সেটা উন্নতি-সােপান ; ,
লভিলে সে কৰ্ম্ম মম দুচিত যন্ত্রনা ;
কর্তার অমত নাহি ছিল আমা প্রতি,
পরিচয় দানে তার পেয়েছি প্রমাণ।
হায়! হত বিধি মম হ’ল প্রতিবাদী,
অমাত্য-চক্রেতে পড়ি হারালেম তায়।
স্বার্থ-পূর্ণ এ সংসার—মানব জীবন,
সে স্বার্থ ত্যজিতে পারে, হেন কোন নর
আছে কি ধরায় ?। সংসার অসার জ্ঞানে,
ঈশ্বর-প্রেমিক, দলে পদতলে সেই
বিষয়-কামনা-তুচ্ছ ক্ষুদ্র তৃণসম ;

৬৪ উমেদার দর্পণ। এক মাত্র স্বার্থ তার জগদীশ-প্রেমে, কিরূপে পাইব তাহা করেন চিন্তন।” ভাবিতে ভাবিতে ত্যজি সুদীর্ঘনিশ্বাস, চলিল সে উমেদার ; কোথায় যাইবে ? নাহি গম্য স্থান ; একবার চতুর্দিক চাহি সচকিতে, স্তম্ভিত হইল পুনঃ ; আবার কি ভাবি মনে, হ’ল অগ্রসর । বসেছেন উচ্চাসনে এক জমিদার-- গম্ভীর-মূরতি, ললাটে চিন্তার রেখ। প্রকাশিছে তার ; বসেছে চৌদিকে, অমাত্য-মণ্ডলী হায়! বিমর্ষ বদনে। বিষয় কাৰ্যেতে কোন ঘটেছে বিভ্রাট, তাই সবে একাসনে করিছে চিন্তন। হেন কালে আসি তথা এক উমেদার, উপনীত হ’ল তার দুরভাগ্য-বশে, গললগ্নীকৃত বাসে দণ্ডায় সম্মুখে। (বিচারক পুরােভাগে আসামী যেমতি) সহসা তাহার সেই ভাব দরশনে, হেন জ্ঞান হয়, না জানি কি মহাপাপ করেছে পামর, দণ্ডাই হয়েছে তাই রাজার গোচরে। সকরুণ-স্বরে কত করিতেছে স্তুতি ; পাষাণ-হৃদয় নর-

যষ্ঠ সর্গ।
হয় বিগলিত তার সে বাণী শ্রবণে।
কভূ স্বীয় যােগ্যতার দিয়া পরিচয়,
যথাযােগ্য পদ সেই করিল প্রার্থনা।
ভূপতি আরক্ত নেত্রে চাহি তার পানে,
বিরক্তি প্রকাশে হায়! কহিলেন তারে।-~-
“কোথায় নিবাস তব, জ্ঞান-চক্ষু হীন,
কাণ্ডাকাণ্ড বােধ তব নাহি এক রতি ;
সরকারে আশু কোন কর্ম খালি নাই,
বিফল আয়াস কেন কর এই স্থানে।”
শুনি সে নিরাশ-বাণী মুঢ়-উমেদার
করযুগ জুড়ি পুনঃ কহিল কাতরে—
“বিশাল-পাদপাশ্রয়ে নিদাঘ-পীড়িত,
কত জাতি বিহঙ্গম বিবিধ-ভূচর,
লভয়ে আশ্রয় তথা আসি অনায়াসে;
তদ্রুপ এ ধরাধামে নৃপেন্দ্র আপনি,
অসংখ্য দরিদ্র হেথা জঠর জ্বালায়,
নিরুপায় হয়ে শেষে ভেছে আশ্রয় ।
এ নব-পথিক প্রতি কৃপা বিতরণে,
কিঞ্চিৎ আশ্রয় স্থান করুন প্রদান।”
উমেদার বাক্য শুনি নৃপতি মনে,
ক্রোধবহি আলি যেন দিল দরশন ;
অমনি কহিলা রােযে-“যাও এথ হতে,

উমেদার দর্পন
তােমার কারণে পদ করিব সৃজন ?,
দুষ্কর্মে সঞ্চিত ধন করিয়া বিনাশ
এখন সংসার দায়ে উমেদার-বেশে
ভ্ৰমিছ ধরায়! রেল অনর্থের মূল,
নতুবা কি এত লােক আসিত হেথায়।”
কি দোষ ইহার হায় ! বল ভাগ্যধর !
বিনা দোষে তিরস্কার করিলেন যারে
থাকুক, তােমার মনে ভাবনা-অপার,
কিরূপে বুঝিবে তাহা, সহসা এ নর ;
সামান্য আঘাতে যদি টলিত ভূধর,
তবে কি মহত্ব তার ঘােষিত জগতে ?।
জানেনা অবােধ এই, নব- উমেদার,
একাৰ্যে নুতন ব্ৰতী ; হেরিয়া আকৃতি,
হেন বােধ হয়, পিতা পিতামহ এর
করে নাই কভু হায়! হেন উমেদারী।
বুঝেনা সময়, সৈ কারণে হায়! মূঢ়
পাইল সন্তাপ। সূচ্যগ্র বিষাক্তশূল
পশে যদি হৃদে ; যদ্যপি অশনি পাত
হয় তার শিরে, সহ্য বুঝি হত তাহা।
কিন্তু হেন বাক্যবাণে ভেদিল অন্তর ;
রুধির রূপেতে বারি বহিল নয়নে।
অমনি চলিল হায়! অশ্রু সম্বরিয়া।
•

ঘষ্ঠ সর্গ।
ক্ষুধার্ত পথিক ধায়, বারি অন্বেষণে ;
শীতার্ত যে জন, করে বস্ত্র আকিঞ্চন,
অসহ গ্ৰীয়ের জ্বালা সহিতে না পারি, }
সুশীতল ছায়া সবে করে অন্বেষণ।
তদ্রুপ দরিদ্র জন হয়ে উমেদার,
বিষয় আশয়ে যায় ধনীর আবাসে,
হায় দাসত্বের তরে। হলে প্রয়ােজন,
রাখেন যতনে, তারে দরিদ্র-পালক ;
অথবা সে হতভাগ্য যায় স্থানান্তরে।
অশনে বসনে যার নাহি অনাটন,
হেন বেশ ধরি বিষয় কারণে কভু
করেনা ভ্রমণ ; বিধাতা নিতান্ত যার .
হন প্রতিকুল, সহায় সম্পদ হীন
হায় যেই জন, নিশ্চয় জানিবে সেই
হেন উমেদার ; একে নিষ্পেষিত সদা
দুঃখ-দণ্ডাঘাতে, বাক্যবাণে পুনঃ তার
ভেদিলে হৃদয় হায়! কি পৌরুষ তায় ।
যদ্যপি না প্রয়ােজন থাকে হেন জনে,
মিষ্ট-বাক্যে তুষ্ট করি করিলে বিদায়,
যুগ কুল রক্ষা পায় এই বিধান।
~~~।

উমেদার দর্পণ সপ্তম সর্গ। বাজিল বিবিধ বাদ্য নগরে পল্লীতে, শঙ্খ ঘণ্টা ঢাক ঢােল শানাই করি, মহামায়া অবতীর্ণা দিনত্রয় তরে, বিদূরিতে দুঃখ-তমঃ এমরত ধামে, সে কারণে আজি, উঠিছে আনন্দ-ধ্বনি গগন বিদারি। সচন্দন পুষ্পাঞ্জলি বিল্বদল সহ, অপিয়া সাদরে সবে মায়ের চরণে; অন্তর-বেদন ভারে করিছে জ্ঞাপন। (অবােধ সন্তান যথা ভুলাতে মাতারে হায় ! করে কত ছলা) হেন মহােৎসব দিনে এক উমেদার,- বিমর্ষ বদনে, প্রান্তরের প্রান্তে আসি প্রকাও তরুর মূলে শীতল-ছায়ায়, বসিলেন তৃণাসনে চিন্তা-সখীসনে। সৰ্ব্বভূতে সমদশী মলয়-অনিল, নাশিছে সন্তাপ তার ; উমেদার বলে, মনে করিলনা ঘণা। চিন্তে উমেদার- “কে বলে, মানব-জন্ম দুর্লভ সংসারে ; কত পুণ্য ফলে জীব লভে নর-যােনি”

সপ্তম সর্গ।
৬৯
।
এ ভ্রান্তি তাহার ; কে বিশ্বাসে হেন যুক্তি
অসার মূলক ; তাই যদি হবে, তবে
কেন মােরা সবে করি ছুটা ছুটি হায় !
অন্তর সন্তাপে ; ক্ষণেকের তরে শাস্তি
পাই সংসারে। অন্য জীব যত, খাদ্য
অন্বেষণে মাত্র করে বিচরণ সদা
পূরিলে স্বােদর, স্বর্গ রাজ্যে যেন তারা
শক্তি লভে কত। আহার, মৈথুন, নিদ্রা
চতুর্বিধ—বৃত্তি মাত্র ভােগে তারা।
ততােধিক বৃত্তি মােরা করি উপভােগ,
পাই এত ক্লেশ। এখন স্মরিলে হায় !
স্বেচ্ছায় মনুষ্য জন্ম কেকরে কামনা।
জন্মাবধি এ জীবনে করেছি কি পাপ,
সে কারণে আজি হায়! এ সুখের দিনে,
বসিয়া বিরলে হেন করি আর্তনাদ।
হায়! মহামায়ে ! বিষয় মদেতে মাতি
ভুলিয়া তােমায়, ভ্রমিতেছি এ সংসারে,
ভ্রান্ত-জীব সনে; সেই পাপে পাই বুঝি
এত মনস্তাপ; মাতার, সমান সেই
সকল সন্তানে; তবে কেন মণতঃ ! কেহ
সুখে নিদ্রা যায়, তব শান্তি কোলে, অহহ!
কেহ বা প্রান্তরে হেন যায় গড়াগড়ি ।

উমেদার দর্পণ
•
ক্ষুধায় আকুল প্রাণ, দগ্ধ চিন্তানলে,
নয়নে না হেরি পথ, পূর্ণ অশ্রু-নীরে।
কে নিবারে হেন বারি তুমি বিনা আর।
দুঃখ বিনাশিনী তুমি—অভয়দায়িনী।
দেও মা! অভয় সুতে; হরিয়া দুঃখের
ভার দেও শান্তি মােরে ; শক্তি স্বরূপিনি!
দেও শক্তি হেন-লভিতে সংসারে সুখ
কিম্বা তবপদে ; তব মায়াবলে হায়।
ভ্রমি নিরন্তর, এভব যন্ত্রনা আর
সহেনা এ প্রাণে। কে বুঝে তােমার মায়া-
অনন্ত, অপার ; ক্ষণকাল তরে মাতঃ !
সংহর সে মায়া, ও পদ-কমল হেরি
জুড়াব জীবন, হবে সফল নয়ন।
হায়রে সে দিন--গ্ৰহ যবে সুপ্রসন্ন
ছিল অভাগার, পূজিয়াছি মহামায়ে
এ হেন শরতে, হবিষ্যাশী-উপবাসী
থাকি যথাবিধি, স্বহস্তে অৰ্চ্চনা তারে
করিয়াছি সুখে বসি, ভক্তি-উপচারে।
কি সাধ্য আমার, ভারে ভারে উপাদেয়
ভোগ্য আহরণে, তুষিব মায়ের চিত ।
মূর্খ যারা, তাহে তারা করে আকিঞ্চন।
বনজ-কুসুম বিল্ব জলজ-কমলে,

সপ্তম সর্গ।
৭১
।
যথা সাধ্য পূজিয়াছি মায়ের চরণ।
কতই আনন্দ তাহে লভিয়াছি মনে।
এখন স্মরিলে হায় ! বিদরে হৃদয়
আর কি সে সুখ পুনঃ পাইব জীবনে ?
আর কি পূজিব মায়ে ভক্তি উপহারে।
হায়! কেন পূৰ্ব্ব-স্মৃতি হল জাগরিত,
ঘৃণা লজ্জা সুসম্মান সম্পদ গৌরব,
করেছে প্রস্থান সবে ত্যজিয়া আমায়,
স্মৃতি কেন মুহুঃ আসি করে উদ্বোধন,
(শার্দল পশ্চাতে হায়! ফেরুপাল যথা)।
পড়েছি বিপদে ঘাের কে নিৰারে তায়,
দোখলে আত্মীয় দূরে করে পলায়ন।
বিপদ, মান-নেত্রে দর্পণের প্রায়,
অদ্ভুত-মূরতি তাহে করি দরশন।
সুসময়ে বন্ধু যারা ছিল এক দিন,
(হায় ! রে সেদিন পুনঃ আসিবে কি ফিরে)।
এখন যদ্যপি আমি যাই তার বাসে,
“স্থানাভাব” বলে মােরে করিছে বিদায়।
কেহ বা আপন স্কন্ধে চাপিব ভাবিয়া,
দৃষ্টি মাত্র জিজ্ঞাসেন, “আছেন কোথায় ?”
যদি বলি স্থির নাই, রহিব কোথায়,
অমনি বদন তার হয় অবনত।

१२
উমেদার দর্পণ।
প্রথমে কুশল-বার্তা—ছিল এই রীতি,
ভাগ্য-দোষে হায় ! তারাে দেখি বিপরীত।
কেহ বা আশ্রয় দিয়া আপন বাসায়,
আপন ভাবিয়া মােরে করেন যতন।
যদ্যপি সকল স্থানে হেন বন্ধু পাই,
আজীবন উমেদারী করিতাম সুখে।
আবার জ্বলিল হায়! হৃদয়-নিলয়,
মনশ্চক্ষু প্রতিবাদী হইল এবার,
অভাগী-জননী, বসি দুঃখ পারাবারে,
আমার কারণে চিন্তা করেন অন্তরে ;
অপার অনন্ত তাহা, ভাবিয়া না পাই।
যখন পূজার বাদ্য পশিছে শ্রবণে,
প্রাণ-পাখী ছট ফট করিছে অমনি
তার হৃদয় পিঞ্জরে। তাই বুঝি হায় !
কতই করুণ করি, লিখিলেন লিপি
মােরে, যাইতে আবাসে । হায়! মূঢ় আমি,
বুঝিয়া মৰ্ম্ম তার রহিলাম হেথা।
সকলে আনন্দ-রসে হয়েছে মগন,
কেবল অন্তরে তার বাড়িছে সন্তাপ—
হায়! মম আঁদর্শনে। এ দিকে প্রেয়সী,
বসিয়া বিরলে চিন্তা করিতেছে কত ;
কভু সুখ নাহি তার তিলেকের তরে ;

সপ্তম সর্গ।
৭৩
সতত সন্তাপ তারে করিছে দাহন ;
কখন নিরাশা-সরে ভাসিতেছে হায় ।।
সন্তান সন্ততি যদি থাকিত আমার,
এ হেন চিন্তার নাহি পাইত সময়।
বয়স্যা নাহিক তার, অথবা থাকিলে,
গুরুজন-ভয়ে তাহা প্রকাশিতে নারি,
অন্তর-বেদন করে অন্তরে গােপন।”
জ্বলিছে পথিক হেন চিন্তার দহনে,
মুহুর্মুহুঃ বাষ্পবারি করি বিমােচন ।
হেনকালে আসি তথা অন্য উমেদার,
ধূলি-ধূসরিত পদে তথা উপনীত।
বসিলেন দুৰ্ব্বাদলে সে পাদপ-মূলে।
উমেদারে উমেদারে হইল মিলন,
পরিচয়ে পরস্পরে জন্মিল সদ্ভাব।
কিন্তু তাহে উভয়ের ঘটিল না সুখ ;
একের দুঃখের কথা কহি সে অপরে,
অন্তরের তাপ হায় ! বাড়ায় দ্বিগুণ।
আগন্তুক উমেদার প্রকাশি আগ্রহ,
কহিতে লাগিল হেন.আত্ম-বিবরণ।
সদ্বংশে জন্মেছি আমি পিতা জমিদার,
বিষয় সামান্য বটে, তথাপি কখন,
অশন বনে কষ্ট ছিল না সংসারে।

৭
উমেদার দর্পণ
বিষয় রক্ষার হেতু মােকদ্দমা করি,
সর্বস্বান্ত হয়ে পিতা, হায় রে অকালে,
পশিলেন পরলােকে ত্যজিয়া মমতা
তখন পড়িয়া আমি সংসার-সাগরে,
বিপদ-উৰ্ম্মির মালা পরিলাম গলে।
নাহি জানি সন্তরণ কিসে পাব কুল,
করিলাম কত যত্ন বিষয়-রক্ষণে।
ব্যর্থ হল মনােরথ দুর্ভাগ্যের বশে
পাঠের ব্যাঘাত হায় ! হ’ল এ জীবনে,
এ’লে পাশ করি শেষে হয়ে উমেদার,
ভ্রমিতেছি দেশে দেশে ষান্মাসিক প্রায় ।
প্রথমতঃ এপ্রেণ্ঠিস্ করি আদালতে
? আশা-বশে। মাসত্রয় গত হলে,
কালেক্টর মােরে, দিলেন চাকরী এক
সুদূর প্রদেশে। তথায় যাইতে আমি
করি অস্বীকার, সে কারণে তথা হতে
হই বিদূরিত। হতাশ্বাস হয়ে শেষে,
জমিদারাশ্রয়ে, বিষয় কারণে হায় !
ভ্ৰমিলাম কত ; অবশেষে গ্রহদোষে
পুলিশের ফাঁদে হায়! ভােগী কত দুখ।
শুন বলি সবিশেষ সে সব ঘটনা
“ব”নাম জেলায় এক উকীলের রাসা
হায়

সপ্তম সর্গ।
তথায় ছিলাম আমি; দিনত্রয় গতে,
হায়! ভাগ্যদোষে, বাসায় হইল চুরি
অতি ভয়ানক ; সকলে চিন্তিত অহহ !
কে করিল হেন। পুলিশ আসিয়া আশু
বিধি অনুসারে, চোরের সন্ধানে রত ।
যে পড়ে সম্মুখে, তাহারে ধরিয়া হায় !
করে টানাটানি। হ’ল তার সুরথাল
(হায় ! মূঢ় আমি, কেন উমেদারী হেতু
গিয়াছিলাম তথা)। সকলে আমারে শােভা
করিলেন হায় !, পুলিশে চালান মােরে
দিল অনায়াসে। কে আছে সহায় তথা,
রক্ষিবে আমায়। ঈশ্বর কৃপায় আর
পিতৃ পুণ্য-ফলে, পাই অব্যাহতি শেষে।
ত্যজি হেন উমেদারী করিয়াছি স্থির,
যাইব স্বদেশে আশু রক্ষিতে সম্মান।”
এত বলি উমেদার ত্যজি দীর্ঘশ্বাস
কহিতে লাগিল পুনঃ গদ গদ স্বরে।
“কালচক্র-গতি ভাই অতি ভয়ঙ্কর
অনিবাৰ্য ভবে ; স্থগিত না হয় কভু
নিয়তির সনে অহহ ! ভ্ৰমিছে নিয়ত।
নরের অদৃষ্ট-ননমি তাহে সংযােজিত,
কখন উন্নত হায়! কভু অবনত।

উমেদার দর্পণ
ছিলাম কি সুখে অহাে; কি দশা এখন,
যুগান্তর হ’ল যেন আমার ভাগ্যেতে।
যাইব আবাসে বটে, ভাবিতেছি মনে,
কিরূপে স্বজনে হায়! দেখাইব মুখ ।
কি বলে প্রবােধ দিব জননীর চিতে;
আশা-পথ পানে চেয়ে আছেন নিয়ত।
আমার উপায় হলে হবে দুঃখ দূর ;
দুঃখ দূর দূরে থাক, বাড়িবে দ্বিগুণ
সে অনল হায় !—রিক্ত হস্তে যবে আমি
দিব দরশন ও বিধি প্রতিকূলে যার,
সংসারে তাহার সুখ কভু কি সম্ভবে ?।
কি দিয়া তুষিব ছােট ভাই ভগ্নী দ্বয়ে ।
পূজায় নুতন-বস্ত্র পেলনা এবার,
কতই ক্রন্দন বুঝি করে সে কারণে।
হায় ! বিধি একি দায়ে ফেলিল আমায়।
এই যে বিবিধ বাদ্য-শ্রবণ-বধির,
নাচিছে ধমনী যার, সুখী সেই জন।
আমার হৃদয়ে যেন বিন্ধিতেছে শুল।
চতুর্দিকে শূন্যময় নিরখি কেবল।”
বলিতে বলিতে হায় ! ঝরিল অমনি
নেত্রে অশ্রু-ধারা, প্রবাহিত হয়ে গণ্ডে
পড়িল উরসে ; কণ্ঠ রুদ্ধ হ’ল, আর

সপ্তম সর্গ। ; রে না বচন। নীরব হইল যুবা চাহি ধরা পানে; প্রবল ঝটিকা অন্তে, নিস্তব্ধ ভূতল যথা শান্ত দরশন। “ভয় কি ভােমার” কহিল সদর্পে সেই পূর্ব উমেদার ; “ভয় কি তােমার ভাই। নবীন যুবক তুমি তাহে সুশিক্ষিত, কি অভাব তব এ জগতে; কেন হও অকারণে হতাশ্বাস এবে। ত্যজ ক্ষোভ- পরিতাপ হেন। বিপদ কাহার নহে, চির সহচর, সাহসে নির্ভর করি, হও অগ্রসর, অবশ্য হইবে তব মানস সফল। তােমা আমা ছাড়া নহে কভু এ সংসার ; কিম্বা এ জগত কভু নহে চিরস্থায়ী; এখনি কহিলে তুমি অদৃষ্ট রূপেতে নেমি কাল-চক্রে ভ্রমে। সুখন্তে ঘটেছে তব দুঃখ-দুর্বিষহ, কে বলিবে এ অনল রবে চিরদিন ; মম দশা তােমা সম ছিল এক কালে, কাল-চক্রে ভ্রমিতেছি সংসার-কাননে। থাক, এবে পূর্ব কথা কি ফল স্মরণে, কহিব সে সব বসি সময়ানুসারে। মুখশ্রী দর্শনে তব হেন বােধ হয়,

উমেদার দর্পণ।
অভুক্ত রয়েছ তুমি আমিও তাহাই ;
চল যাই স্থানান্তরে আহারান্বেষণে।
অষ্টম সর্গ
অই, এক উমেদার ত্যজি উমেদারী,
পথের ভিকারী, হেন নবীন বয়সে ;
যৌবন-সুকান্তি হায় ! ভস্মে আচ্ছাদিত,
কটিতে গৈরিক-বাস, অংশে উত্তরীয়,
গলায় রুদ্রাক্ষ-মালা কিবা শােভা ধরে।
জনক জননী তার ত্যজিয়া মায়ায়,
পশিয়াছে পরলােকে আঁধারি সংসার ;
বিষয় বৈভব নাই বিষয় কারণে,
বহু দিন উমেদারী করে দেশে দেশে।
এক মাত্র প্রিয়তমা পত্নী তার ঘরে,
তারি সুখ অন্বেষণে ফিরিছে অভাগা।
হায়! ভাগ্য-দোষে, ছিন্ন হল আশা-লতা-
প্রণয় বন্ধন, হরিল করাল তার,
সুখের আগার ; এবে সে সংসারী নহে
গিয়াছে সংসার, বিবেক আসিয়া মনে

অষ্টম সর্গ।
করিল আশ্রয় ; উমেদার জমিদারে
তুল্য জ্ঞান এবে, বিষয়ে আসক্তি নাই,
বিষাদে উল্লাস ; শুনিলে রােদন-নি
ধাবিত তথায়। যেখানে সন্ন্যাসী বাসে
সেই খানে বাস। আনন্দের ধনি কভু
পশিলে শ্রবণে, রােধিবে অঙ্গুলি দ্বয়ে
কর্ণ-পুটে ; অতুরে হেরিলে নিজে
হইয়া কাতর, করিবে শুশ্রুষা তারে
করি প্রাণপণ। যদি শুনে বিভুগান
ফেলে নেত্ৰ-নীর; এমন সৌভাগ্য, অহহ!
লভে কোন নর। ভ্ৰমিছে নিয়ত যুবা
নগরে বন্দরে, লক্ষ্য স্থান নাহি, যেন
পবনের বেগ। হেরিলে তাহার ভাব
হেন জ্ঞান হয়, উত্তান্ত প্রেমের মূর্তি
ভ্ৰমিছে ধরায় যেন উন্মাদের বেশে।
তথায় বন্দরে এক সামান্য কুটীর,
অতি জীর্ণ ভগ্নকায়ে সদা প্রকম্পিত ;
কখন পড়িবে যেন এই ভয় মনে।
পান্থাবাস” বলি তাহা বিখ্যাত বন্দরে
কিম্বা চরাচরে, দিবাচর নিশাচর
যত নর চরে, “পান্থশালা” নাম তার
জানে জগজ্জন। ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য

উমেদার দর্পণ
এ
শুদ্র নানা জাতি লভিবে বিশ্রাম তথা
যবন ব্যতীত; চতুর্দিকে আবর্জনা
আছে শুপাকারে, উচ্ছিষ্ট কদলী-পত্র,
দধি ভাণ্ড কত, তৃণ ভস্ম পাকস্থলী
বিবিধ মূরতি ; অৰ্দ্ধ দগ্ধ কাষ্ঠ তাহে
হরিহর বেশে, অভিন্ন প্রণয়ভাব
দেখায় পথিকে যেন এ পান্থ-মন্দিরে।
তথাপি হেরিলে তাহা হেন জ্ঞান হয়,
দ্বিতীয় নরক যেন এমর্ত ভূমিতে।
ভ্রমিতে ভ্রমিতে সেই উত্তান্ত যুবক,
দিলেন দর্শন আসি, সে পান্থ আবাসে
যেন বিধির আদেশে। দেখেন তথায়,
এক মুমূর্ষ, মানব, তৃণ-শয্যাতলে
হায়! আছে নিপতিত। বয়সে প্রাচীন
নহে—বিগত যৌবন ; গৃহেতে দ্বিতীয়
নাই একাকী শয়নে। নিরখি তাহার
দশা ভাবেন যুবক,-“চিনিতে না পারি
হেন দুর্ভাগারে ; তথাপি নিরখি কেন
কাদে প্রাণ মম ; পূৰ্ব্বজন্মে বন্ধু বুঝি
ছিল এ অতুর, বান্ধব বলিয়া'তাই
জানায় অন্তরে মম। জানেন বিধাতা;
জন্মেছি জগতে আমি এ দুঃখ দেখিতে ;
•

অষ্টম সর্গ।
সংসারের সুখ আমি দিয়াছি বিদায়,
করিব সাহায্য এর যথা সাধ্য মম।”
পাঠক! বিধির চক্র কে বুঝিতে পারে ;
দয়া করি দীননাথ দিলেন দর্শন,
যুবকের বেশে আজি, মুমুর্মুর ভাগ্যে
যেন এ ঘাের দুর্দিনে। সমদুখী বিনা
কে বুঝে মরম তার, তাই এ যুবক,
কাদিল অন্তরে হায় ! হেন দশা হেরি।
হতভাগ্য উমেদার ভ্রমি নানা স্থান,
লভিল চাকরী এক দৈব-অনুকূলে ;
দুর্ভাগার সুখ হায়! রহে কত দিন !!
অঙ্কুর হইবামাত্র অঙ্কুরেই লয়।
রমার অকৃপা হলে ধন কোথা মিলে,
হায়! এ সংসারে ; করগত হলে তাও,
ভােগে নাহি আসে। পাইয়া নিয়ােগ পত্র,
প্রয়ােজন মতে, চলিল আবাসে মূঢ়,
আসিবে সত্বর। পথি মধ্যে জ্বর রােগে
হইয়া কাতর, এ পান্থ নিবাসে ত্বরা
লভিল আশ্রয় । এ যদি আশ্রয় হয়
নামের কৃপায়, নিরাশ্রয় এ জগতে
পাই খুজিয়া ; ক্রমশঃ বিকার আসি,
দিল দরশন; কখন চেতনা পায়
।

৮২
উমেদার দর্পণ
কভু জ্ঞান হত। নয়ন আরক্ত বর্ণ .
বহে ঘন শ্বাস কে বিশ্বাসে হেন নর
বাচিবে জীবনে। হায় রে বিধাতঃ ! তব
এ কেমন বিধি, চাকরীর শেষে সবে
প্রদানে নিকাশ, হায়! এর ভাগ্যে বুঝি
পূৰ্বেই নিকাশ। এ নিকাশ তুচ্ছ নহে—
অতি ভয়ঙ্কর, খাতের কি দয়া মায়া
নাহি এ নিকাশে। জন্মাবধি এ সংসারে,
করেছ যে কাজ, জীবন নিঃশেষে তার
( কিবা পাপ কিবা পুণ্য) হইবে বিচার।
দিনে দিনে যেই জন তহবিল দেখে,
নিকাশে উত্তীর্ণ সেই হয় অনায়াসে।
নতুবা অন্তিমে ভােগে, দণ্ড—দুর্নিবার।
বিষয়-মদেতে মজি মূঢ় যেই জন,
অপব্যয় করে সদা না রাখে সম্বল।
যখন গিদ হবে আসিবে শমন,
“হা হতােস্মি ! করি শেষে করিবে ক্রন্দন।
করিতেছ উমেদারী করি বাহাদুরী,
সতত এ সব কথা থাকে যেন মনে ;
নিকাশে যদ্যপি তুমি তরিবারে পার,
সমুন্নত-পদ প্রভূ দিবেন তােমায়।
এই যে সম্মুখে তব তৃণের শয্যায়,

অষ্টম সর্গ।
অন্তিম-শয়নে যেই করেছে শয়ন ।
জীবন সংশয় ভাবি হায়! হতাশ্বাসে,
শেষের নিকাশ তরে হয়েছে ব্যাকুল।
দারা পুত্র পরিজন আছে নিজালয়ে
মহাসুখে; এখন লভিল মূঢ় কিবা
ফল তাহে। হায়! অশনে বনে যারে,
করিল পােষণ ; যাদের সুখের তরে
হইত ব্যাকুল, যাদের কারণে এই
মৃত্যু-শশাচনীয়। কোথায় রহিল তারা
এ হেন সময়ে ; কিবা প্রতি-উপকার
করিল তাহারা। কোন মূঢ় ভাবে হায় !
“এ সুখের বাসে, দারা পুত্র কন্যা হতে,
ভিব সদগতি আমি চরম সময়ে।”
করুক দর্শন আসি এ শেষ শয়নে।
ভাঙ্গিবে সুখের স্বপ্ন, আনায়াসে তার।
হায় ! অভাগার পিপাসায় শুকণ্ঠ,
কেবা দেয় জল; মল মূত্রে বিলুণ্ঠিত,
কে দেখে এখন। তথাপি মায়ার বশে
(হায় রে সংসার!) তাহাদের ভাবী দুঃখ
করিছে চিন্তন। কভু উন্মীলিত—নেত্র,
কভু নিমীলিত। খদ্যোত যেমতি হয়।
তামসী-নিশায়। দুই গণ্ডে অশ্রু-ধারা,

৮৪
উমেদার দর্পণ।
হ’ল প্ৰধাবিত, ক্ষণে ক্ষণে আর্তনাদ
করে ক্ষীণ-স্বরে। কভু হায় ! বারি চায়,
চাহি বারি পানে। অদূরে মৃন্ময়-পাত্রে
আছে তার জল, কে দিবে এখন তাহা
হেন ভাবি মনে, তাই বিধি মিলায়েছে
উদ্ভান্ত যুবকে। রােগীর সে ভাব যুবা
বুঝি অনুমানে, ব্যর্থতা প্রকাশি বারি
দিলেন বদনে। অসময়ে হেন বন্ধু
কার ভাগ্যে ঘটে ? পিপাসায় শুষ্ককণ্ঠ
ছিল এতক্ষণ, এখন স্ফরিল বাক্য
অতি ক্ষীণতর। যুবকের চিত্ত অহহ!
দয়া, উপজিল, অতি কষ্টে পাইলেন—
পরিচয় তার ; উমেদার জানি তারে
ভাবিলেন মনে,—“হায় রে ! ভবের খেলা
একি চমৎকার, কেহ ইয় আশা-চ্যুত,
কারাে মূল নাশে, অপার দুঃখের নীরে,
ভাসিছে কেবল ; সন্তান সন্ততি যদি
থাকে কেহ এর, কি হবে তাদের দশা
ভাবি তাহা মনে। স্বধৰ্ম আশ্রিত দ্বিজ,
নাহিক সন্দেহ; ইহার অন্তিম কাৰ্য
করিব সাধন। বিলম্ব না দেখি আর
হয়েছে চরম ; জীবনের আশা যদি
;

অষ্টম সর্গ ।
থাকিত কিঞ্চিৎ কায়মনে সযতনে
প্রতিকার করিতাম এ অসাধ্য রােগে।
হতভাগ্য আমি । কোন উপকার নাহি
পেলনা অতুর হায় আজি আমা হতে।
জনক জননী আর জগৎ সংসার,
যাদের কৃপায় এই ইন্দ্রিয় আধার—
কায় লভিয়াছি ভবে। কাম ক্রোধ লােভ
মােহ মদ অহঙ্কার, বাক মন প্রাণ,
কৰ্ম্মেন্দ্রিয় জ্ঞানেন্দ্রিয় বলবীৰ্য আদি
ধর্মাধর্ম পাপ পুণ্য অজ্ঞান-তিমির
বিজ্ঞতা বিবেক বুদ্ধি নিহিত যাছায়।
এ হেন শরীর ধরি এ নশ্বর-ধামে
কৃতজ্ঞতা প্রকাশিতে ন্ম পেলেম স্থান
হায়! এজীবনে। জনক জননী মম,
পশিল স্বলোকে সুখে ত্যজিয়া মমতা ;
বিমুখ হলেম হায় ! শােধিতে সে ধর।
ত্যজিল সংসার মােরে কিন্তু মূঢ় আমি,
ত্যজিতে না পারি কভু এ শূন্য সংসার।
একদিন হায় ! জনণ ভুমির তরে
কঁাদিল না হিয়া ; দরিদ্রের দুঃখ দূর
করি একরে, সামান্য উদর তরে
সতত আহাৰ্য্য মাত্র করি আহরণ ।

উমেদার দর্পণ
;
এতবলি শয্যাপাশে বসিল যুবক।
জলপানে কথঞ্চিৎ সুস্থ হ’ল বটে,
জ্ঞানের বিভ্রম যেন, হয় ক্ষণে ক্ষণে।
হেরিয়া যুবকে রােগী নিজ সুত জ্ঞানে,
কহে মৃদুস্বরে তারে—“বাছা ভগবান।
এস মম পাশে ; জ্বলিছে হৃদয়ে যেন,
প্রবল অনল, তােমার ও কর স্পর্শে
হইবে শীতল ; এ যাত্রায় রক্ষা নাহি
পাইব জীবনে ; চিরজীবি নহে কেহ
এমর্ত ভুবনে, একে একে মৃত্যুমুখে
পশিবে সকলে, নাম মাত্র রবে তার
কিছু দিন তরে ; তুমিত বালক হায়
জাননা সংসার ক্ষেত্র, ভীষণ কেমন।
আপাত দর্শনে সুখ উপজয়ে বটে,
কিন্তু বিষতুল্য ইহা প্রত্যেক জীবনে।
আর কি বলিব হায় ! স্বরেনা বচন,
মুহুর্মুহঃ করুদ্ধ হইতেছে মম।
আবার কিঞ্চিৎ জল দেও মােরমুখে,
নিকটে বসিয়া ছিল ভগবান তার
যুবকের বেশে; অমনি আনিয়া জল,
দিল তার মুখে।
কথঞ্চিৎ সুস্থ হয়ে
আরম্ভিল পুনঃ-“চিরদিন কারাে পিতা
.

অষ্টম সর্গ।
৮৭
রহেনা ধরায় ; আমার অভাবে কভু
করিও না শােক, যাহাতে সংসারে সুখ
লভিবারে পার, ধৰ্ম পথে থাকি তার,
করিবে উপায় ; প্রসূতি তােমার হায় !
কিছু দিন তরে দুঃখ ভুঞ্জিবে অভাগী,
সতত বুঝাবে তারে, ভক্তিসহকারে।
হায়! প্রিয়ে ! এবে কেন বসিয়া অন্তরে
করই রােদন। এস মম কাছে, হায় !
জনমের মত হেরি জুড়াই নয়ন।
দুর্ভাগ্যের ভাগ্যে পড়ি লভিলেনা সুখ ;
কিন্তু তব সৌভাগ্যেতে ভগবান সুত,
রহিল অঞ্চলে বাধা—যেন কহিনুর।
জীবন-প্রদীপ মম—হইব নিৰ্ব্বাণ
বিলম্ব নাহিক আর দেও গঙ্গাজল
প্রিয়ে। বাসনা পূরিয়া। বাছা ভগবান।
বদন ভরিয়া সুখে বল হরি হরি ;
দেখিতে দেখিতে শ্বাস নাভিমূল হতে,
উদ্ধা মুখে ক্রমে হায়! হইল ধাবিত।
ইন্দ্রিয় বিলুপ্ত হ’ল—জ্ঞান অনুহিত,
শ্রবণ দর্শন আদি করিল প্রস্থান।
সংসারের মায়াজাল (হায় রে বাহার
ফাঁদে ছিল বিজড়িত ক্ষণকাল আগে)
•

উমেদার দর্পণ
লুকায় কোথায় তাহা হেরি রবি-সুতে,
কোয়াশা যেমতি অহাে অরুণ-উদয়ে।
ফুরাল বাসনা তার—হায় উমেদারী,
বিষয় কারণে আর ভ্রমিবেন। হায় ।
পুত্র কন্যা। পরিবারে দেখিবেনা পুনঃ,
জনমের মত আজি লভিছে বিদায়।
চতুর্দিকে এ সংসারে হেরি অন্ধকার
হতভাগ্য উমেদার—মুদিল নয়ন।!!
সম্পূর্ণ।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Umedar-darpan

Author
Majumder, Shyamacharan
Title
Kabya
File name
Umedar-darpan
Text
OCR done
Citation
1890
Published
2009/11/25
Publisher
Shyamacharan Majumder, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
108
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Poems
DLI number
513434
Barcode
4990010020412.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
Fr654OdPDmi
Download PDF

Umedar-darpan