Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Shudhu Phanki Ed.1
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
শুধু ফাকি
ঢাকা, উয়ারী, কালচার হাউসে অভিনীত
প্রথম অভিনয় রজনী
৯ই পৌষ, ১৩৩৮ সন
শ্রীনরেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী
প্রণীত।
প্রথম সংস্করণ
মুল • আনা
OBRAS CASA
seee
প্রকাশক--
শ্ৰীনিকুঞ্জবিহারী দাশগুপ্ত
পার্শনে এসিষ্টেন্ট,
কালচার হাউস, উয়ারী, ঢাকা।
193906 MUGEGGERE
১eos
snadaadarpan
ভাকা-
নারায়ণ-মেশিন-প্রেসে,
শ্রীকালাচঁদ বসাকদ্বারা মুদ্রিত।
n
spapnasadar
পাত্র পাত্রী
মিস্ অনাবিলা দাস দুই ভগ্নীশিক্ষয়িত্ৰী-নন্দিতাও
মিস্ অনাকুল দাস বন্দিতার অভিভাবিকা।
নন্দিতা
) দুই ভগ্নী মাতৃহীনা-পিতা
বন্দিতা
প্রবাসে।
সুলভ
নন্দিতা ও বন্দিতার সখীদ্বর।
বিজলী
শ্ৰীমতী হিরন্ময়ী
শ্ৰীমতী তরল
শ্ৰীমতী লাবণ্য প্রভা••• বন্দিতা ও নন্দিতার দুর আত্মীয়।
সরলা
নন্দিতা ও বন্দিতার দাসী।
No text on this page.
শুধু ফাঁকি
প্রথম অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
শিক্ষয়িত্রীদের সুসজ্জিত বসিবার ঘর। যবনিকা উঠিলে একটু পরে
পা টিপিয়া টিপিয়া চাপা হাসি লইয়া নন্দিতা ও বন্দিতা প্রবেশ
করিয়া পর্দার আড়ালে লুকাইয়া রহিল। একটু পরে
অনাবিলার প্রবেশ–অনাবিলা বয়স্কা দৃঢ়চিত্তা স্ত্রীলােক,
হাতে বই ও অন্যান্য জিনস পত্র, টেবিলের কাছে
গিয়া বসিল। একটা পত্র লইয়া সরকার
প্রবেশ।
সরলা।
বড় ঠাকরুণ, ঐ রকম আর একটি চিঠি পেয়েছি
মাদুরের উপর।
অনাবিলা। (চমকিয়া উঠিয়া) আর একটা, সরল? (চিঠি
লইল) কি ধৃষ্টতা। কে দিয়ে যায় এগুলাে
কিছু আন্দাজ কর্তে পারি না?
২ শুধু ফাকি সরল। না, কাউকে তাে কোনদিন দেখিনি। যেন শূন্যে আসে, শূন্যে যায়। অনাবিলা। (ঘৃণার সহিত) শূন্যে আসে? মাথা! তুই এতদিন ধরে এদের সঙ্গে আছি, এখনাে টের পেলিনা ওরা কার সঙ্গে চিঠি পত্র লেখা লেখি করে ! ওদের প্রিয় পাত্ররা কারা, এ খবরটা এতদিনেও জানতে পারলিনা—আশ্চৰ্য্য! সরলা। (ঘৃণার সহিত) সে তাদের নিশ্চয় নেই। তারপর কে যাবে লুকিয়ে লুকিয়ে পাহারা দিতে। অনাবিলা। না, সে দরকার এখন। যাক, অন্ততঃ তাদের লেখা চিঠি গুলো যে করেই হােক আমাকে এনে দিবি। এমন দুঃসাহসের অর্থ বুঝছিনা। অনাকুলাকে বল, এখনি আসতে এখানে। (সরলা নিষ্ক্রান্ত--অনাবিলা ক্রোধের সহিত বাহিরটা কিছুক্ষণ দেখিয়া তাহা খুলিল এবং তাহা পড়িল, পড়িয়া 'ঘৃণা ও ক্রোধের সহিত পায়চারি করিতে লাগিল- অনাকুলার প্রবেশ, অনাকুলার ছােট মুখে সব সময় ক্লিষ্ট তিক্তভাব) অনাকুলা। (বিরক্তির সহিত) কি হলাে, দিদি ? এত তাড়াতাড়ি আবার কি ঘটেছে ! খারাপ
শুধু ফাঁকি
সংবাদ কিছু? আমার হৃদয় যে কাপছে।
(বুকে হাত দিল)
অনাবিলা। (বসিয়া) রেখে দে তাের বুক, আকুলি ।
তোর বয়সে আবার হৃদয় কিসের।
অনাকুলা। (চেয়ারে বসিয়া পড়িয়া ) থাক্বেনা ? হৃদয় না
থাকলে বাঁচব কি করে?
অনাবিলা। ( তীক্ষভাবে ) বাজে কথা ! অনেক লােকের
তা নেই জানি।
অনাকুলা। দিদি, হৃদয় ছাড়া লােকে ভালােবাতে
পারে ?
অনাবিলা। এখনি বললি বাঁচতে পারে—এখনি আবার
ভালােবাতে পারে ? সে চুলােয় যাক,
তােকে তাে আমি বাচবার বার আলােচনার
জন্যে ডেকে পাঠাইনি, আমি ডেকেছি এই
কথা বলতে যে সেই রকম আর একটা চিঠি
পাওয়া গেছে মাদুরের উপর।
অনাকুলা। (চমকিয়া) এ্যা! কাকে লেখা ?
অনাবিলা। উপরে শুধু একটি “ন” লেখা—পরিষ্কার
বােঝা যাচ্ছে নন্দিতাকে।
অনাকুলা। হাঁ—অন্যটিতে ছিল “ব”। এক হাতের ।
শুধু ফাকি
লেখাই কি ? কি আছে এতে। অবশ্য তুমি
পড়েছ ? (একটু খোঁচা দেওয়ার সুরে)
অনাবিলা। (গাম্ভীর্যের সহিত) অবশ্য পড়িছি। মেয়েদের
যখন আমাদের অভিভাবকত্বে রাখা হয়েছে
তখন এ আমার কর্তব্য।
অনাকুলা। (দুঃখ করিয়া) আঃ, মা নেই। পিতা চলে
গেছে সীমাহীন অনন্ত বারিরাশির ওপারে ।
অনাবিলা। কি সময় নষ্ট করিস! বিলেত বলতে
পারিনা? আমি বছিলাম যে মেয়েদেরে
আমাদের তত্বাবধানে রাখা হয়েছে তারা যাতে
যার তার সঙ্গে আলাপ পরিচয় করে মুস্কিলে না
পড়ে তা দেখা আমাদের কর্তব্য।
অনাকুলা। অবশ্য, দিদি। সে বুঝিয়ে বলতে হবেনা
আমাকে, আমি কচি খুকী নই।
অনাবিলা।
(গম্ভীর ভাবে চিন্তা করিয়া) কাদের কাছ থেকে
তারা চিঠি পায় ? যতদূর সম্ভব গােপনে
চৌকি দেওয়া গেছে, কিন্তু পরিষ্কার বােকা
বানিয়ে ছাড়ছে তারা আমাদেরে।
অনাকুলা। এ চিঠিতে কি আছে ? দেখাওনা আমাকে।
অনাবিলা। হাতের লেখা এক নয়, তাতে প্রমাণ হচ্ছে
শুধু ফাকি
প্রত্যেকেরই আলাদা প্রিয় পাত্র আছে।
পাকা ষড়যন্ত্র চলছে। আমরা সাবধান হয়ে
পড়লে গুরুতর হয়ে উঠতাে, কি লজ্জাস্কর
চিঠি।
অনাকুলা। লজ্জাস্কর ? আমার কি এটা পড়া উচিত,
দিদি ?
অনাবিলা। (বিরক্তির সহিত) অদ্ভুত! তাের মত এক
বুড়ী এই ভাবে কথা বলছে।
অনাকুলা। (প্রায় কাঁদিয়া ফেলিয়া) আমি তাে বুড়ী নই।
তুমি বরাবর আমাকে ঈর্ষা কর। যা উচিত
নয় এমন জিনস আমি পড়তে চাইনা।
অনাবিলা। ( তীক্ষ্ণ ভাবে ) এখনি পড় এটা আকুলি।
আমাদের কাজ কর্ভে হবে, কথা বল্লে চলবেনা।
( আবার ছিনাইয়া নিল) শোন্ আমি পড়ছি।
দেরির সময় নেই।
( পড়িল) “প্রিয়ে! প্রিয়ে,
প্রিয়তমে।"
অনাকুলা। (হাত তুলিয়া) ওঃ! দিদি।
অনাবিলা। “তোমাদের আত্মীয় লাবণ্য প্রভার বাড়ীতে
লুকিয়ে যাবে, এবং চারটার সময় সেখানে
আজ উপস্থিত থাকবে, তােমার এই প্রস্তাব
)
শুধু ফঁাকি
চমৎকার। তােমার বুদ্ধির উপর আমরা
সম্পূর্ণ নির্ভর কচ্ছি—সে বুদ্ধির প্রমাণ তুমি
ইতিমধ্যেই যথেষ্ট দিয়েছ। যে দুটো বুড়ী
ডাইনী তােমাদের উপর পাহারা দিচ্ছে,
তাদের চোখ এড়িয়ে দুজন মহিলার বেশ ধরে
আমরা সেখানে উপস্থিত হব, কি জানি পাছে
এবার আর তাদের চোখে ধূলি নিক্ষেপ না
কর্তে পার। “য” “ব” কে এই খবরই
দিচ্ছে। হাজার হাজার আলিঙ্গন এবং চুম্বনের
পর এখন তাহলে বিদায় নিচ্ছি। প্রেমসাগরে
আকণ্ঠ মগ্ন তােমারি “গ”।” শুলে ?
অনাকুলা। দিদি, কি ভীষণ ! সত্যি সত্যি তাহলে
আমাদের “বুড়ী ডাইনী” লিখেছে ?
অনাবিলা। লিখেছেই তাে! আর দেখােতাে মেয়ে
দুটো কেমন প্রবঞ্চনা করে এসেছে আমাদের
সঙ্গে। তবু ভালাে, চিঠিগুলাে ধরা পড়েছে।
অনাকুলা! আলিঙ্গন ও চুম্বন !
কি ভীষণ !
অভিজ্ঞতা আমাদের তাে হয়নি। কেমন,
এ
হয়েছে ।
অনাবিলা। ( তীক্ষ ভাবে) চুপ কর, আকুলি ।
মন্তক
শুধু ফাকি
করার সময় নেই আমাদের, কি করা যায় চিন্তা
কৰ্ত্তে হবে। ভয়ানক ব্যাপার।
অনাকুলা। ওদের বাপ, সীমাহীন অনন্ত বারিরাশির
ওপারে-
অনাবিলা। বিলেতে, আকুলি । কতবার বলব
আর এটা! দেশের নামটা মনে থাকছেনা,
কত বুড়ী হয়েছি দেখছিস্ তে।
অনাকুলা। দিদি, তুমি বড় নিষ্ঠর! (কাদিতে আরম্ভ করিল)
অনাবিলা। (উঠিয়া আর টেবিলের কাছে গিয়া) কঁদলেই ওদের
মিলন বন্ধ হবে না—কিন্তু সে বন্ধ করা চাই।
আমাদের আজ সহরে যাওয়া হবে না, সে
পরিষ্কার।
অনাকুলা। সহরে যাওয়া হবেনা কেন? কেন, দিদি
কেন ?
অনাবিলা। কেন, কারণ এক সময়ে দুই যায়গায় থাকা
সম্ভব নয়। তালতলা আর লাবণ্যপ্রভার
বাড়ী দুই বিপরীত দিকে।
অনাকুলা। বাস্তবিকই লাবণ্যপ্রভার বাড়ী যাবে নাকি ?
কি জন্যে ?
অনাবিলা। (অধীর ভাবে) দিন দিন তুই কি হচ্ছিস্?
দ্বিতীয় শৈশব এলো নাকি তাের ?
শুধু ফাকি
অনাকুলা। (রাগিয়া) তা আসেনি—কিন্তু আমি সহরে
যেতে চাই।
অনাবিলা। তাহলে একা যাবি। আমি সে বাড়ীতেই
যাব—দেখে আধ কি রকন প্রেমিক দুটির
কবলে পড়েছে মেয়ে দুটো।
অনাকুলা। ( হাতে মুখ ঢাকিয়া : ওঃ! ওদের বাবা সীমা-
হীন—
অনাবিলা। ( দৃঢ় ভাবে) বিলেতে, আকুলি। (টাইম টেবল
হাতে লইয়া) আমরা দুটোর গাড়ীতে বেরিয়ে পড়ে
এদিক সেদিক কিছু ঘুরে সেখানে গিয়ে
উপস্থিত হব। মেয়েগুলাে তিনটার গাড়ীতে
যাবে, কাজেই তাদের আগেই যাব আমরা।
হতভাগা পাজি ছুড়ীরা।
অনাকুলা। মেয়ে দুটো বাস্তবিক ভারি খারাপ।
অনাবিলা। (ঘড়ীর দিকে চাহিয়া) ওঃ! ভারি দেরী হয়ে
গেছে। যাবি কোথায়—সহরে, না,
বাড়ীতে ?
অনাকুলা। ( বিরক্তির সুরে) ঐ বাড়ীতে—এই সঙ্কটের
অবস্থায় তোমাকে ছেড়ে যাওয়া ভালো হবেনা।
অনাবিলা। ( শুদ্ধ ভাবে না। তােমার সাহায্য আমার
শুধু ফাকি পক্ষে মহামূল্যবান—বিশেষতঃ কঁদতে আরম্ভ করলে। অনাকুলা। নিশ্চয় তা করব না আমি অনাবিলা। আচ্ছা, যাই হােক, চোখ দুটো খুলে রাখিস। একজন একজন বেশী সাক্ষী হতে হবে। যুবকদের বদলে আমাদেরে সেখানে দেখে তারা অবাক হয়ে যাবে। দেখিস্ তাদের আবার বলে দি আমরা সেখানে যাচ্ছি--তাের পেটে তো কথা থাকে না। অনাকুলা। আমি কিছু বলি না। অনাবিলা। আয়, এখনি প্রস্তুত হতে হবে। অনাকুলা। (উঠিয়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া) ভারি অসত্য দেখাচ্ছে ব্যাপারটা। অনাবিলা। বাজে! সত্যে সত্যে তফাৎ আছে, এক এক যায়গায় এক এক রকম দরকার। ( উভয়ে নিষ্ক্রান্ত) (একটু পরেই নন্দিতা ও বন্দিতা পর্দার আড়াল হইতে আসিয়া হাসি চাপিয়া ধপ করিয়া চেয়ারে বসিয়া পড়িল- সরলার প্রবেশ) সরলা। (নীচু গলায়) কি গাে ! কি হয়েছে ? নন্দিতা। ওঃ! সরলা। চমৎকার, চমৎকার ! টোপ
শুধু ফঁাকি
১০
গিলেছে-সহরে না গিয়ে তারা ঐ বাড়ীতে
আমাদের প্রিয়জনদের ধরূতে যাচ্ছে।
বন্দিতা। (লাফাইয়া উঠিয়া সারা ঘরে নাচিতে নাচিতে ) বাঃ রে
বাঃ মজা, মজা!
সরলা। স্ স্ স্ ! তারা শুনবে ! আর এ মজা
কিছুই না আমিও এ তােমাদের কর্তে দিতুম না,
তবে মেয়ে মাষ্টার দুটো বডড বাড়াবাড়ি কচ্ছে
রাত দিন কড়া পাহার—যেন চোর এরা।
যে সে বাপ মায়ের বি তো নয় এরা।
বন্দিতা। (অনুকরণ করিয়া) যে বাপ সীমাহীন অনন্ত
বারিরাশির ওপারে আছে।
সরলা। সে বাপের কত গৰ্ব মেয়েদের নিয়ে !
নন্দিতা। কিন্তু এমন সুন্দরী মেয়ে দুটি যে ছেলে
ছােকরাদের সঙ্গে মিশে ভালাে থাকবে তার
প্রমাণ কি ?
সরলা। তা বড় দিদিমণি, কে বলে তুমি সুন্দরী ?
সৌন্দৰ্য্য জিনসটা তো শুধু চামড়ায় থাকে—
বন্দিত। (সরলার কাছে দৌড়িয়া আসিয়া তার মুখে হাত চাপিয়া )
থামো, থামাে। তারপর কি আমি জানি
“যার ভেতর সুন্দর সেই সুন্দর” “চক্ চক্
শুধু ফাঁকি
১১
করলেই সােণা হয় না” এই সব বুলি
আওড়াবিতো—তুই এত বড় আচাৰ্য হয়ে
উঠলি কি করে ?
সরল। (হাত সরাইয়া) দেখ বড় দিদিমণি, ছেলে
ছােকরার কথা ছেড়ে দাও। তােমাদের বাবা
এসে তােমাদের দুজনকে ভালাে দুটি স্বামী
দেখে দেবেন।
নন্দিতা। দুটো করে স্বামী তাে সামলাতে পারবাে না
এক সঙ্গে! অন্ততঃ একটির পর একটি--
সরলা। কি যে বল ! প্রত্যেকে দুটো করে কি বলেছি
আমি ? বরং এক কুড়ি শুয়র চরাবার ভার
নিতে পারি তবু দুটো স্বামী-
নন্দিতা। (হাসিয়া) সে সৌভাগ্য যখন আমাদের কখনাে
হবে না তখন তাদেরে কি করে সালাবে।
সেই নিয়ে মাথা ঘামিয়ে দরকার নেই ! সব
প্রস্তুত তাে ? দরকারী কাপড় চোপড় আর
গাড়ী ?
সরলা। সময় মত পাবে—কিন্তু জেনে রেখাে এসব
কিন্তু আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে হচ্ছে।
বন্দিতা। বেচারি সরলা দি—তা তােকে তাে এসবে
শুধু কঁকি
টেনে আছিনা কিন্তু ব্যাপারটা ভালােয় গিয়ে
দাড়ালে তুমি তাে খুসিই হবে।
নন্দিতা। গাড়ী আমাদের জন্য কোথায় অপেক্ষা করবে
পরিষ্কার করে বলে দিয়েছি তাে?
সরলা। ঠিক বলিছি, বড় দিদিমণি। সে সব চিন্তা
নেই। দেখবে সরলা যদিও বুড়ী হতে চল্লো,
কাজের বেলায় তার কিছুই ভুল হয় না।
নন্দিতা। বালাই! হাঁ, বুড়ী ! বাজে কথা বলি না।
দশ বছর আগের চাইতে এখন তুই নিশ্চয়
আরাে ছােট হয়ে গেছি। (দূরে কে ডাকিল
সরলা-সরলা !)
সরলা। ঐ ডাকছে। দেখি গিয়ে কি চায়।
( নিষ্ক্রান্ত)
বন্দিতা। এখন সুলভ আর বিজলী যদি সে বাড়ীতে
যায় তা হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
নন্দিতা। চুপ! তারা আসছে।
( প্রত্যেকে একটি বই লইয়া দুই বিপরীত দিকে পড়িতে
বল্মি। অনাবিলা ও অনাকুলার প্রবেশ। অনাবিলা
সন্দেহের চোখে উভয়কে লক্ষ্য করিয়া দেখিতে লাগিল।
দুজনেই বাহির হইয়া যাইবার জন্য প্রস্তুত হইয়া আসিয়াছে।
অনাবিলা। তােমরা পড়ায় খুব মন দিয়েছ দেখছি।
শুধু ফাকি আমরা এখন বেরিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু যাবার আগে তােমরা আজকের দিনটা কি করে কাটাবে শুনে যেতে চাই। নন্দিতা। কিন্তু এত সকালে যাচ্ছেন কোথায় ? তিনটের গাড়ীতে গেলেই তো হতাে। অনাকুলা। (দ্রুত) ওঃ! আমরা সে গাড়ীতে যাচ্ছিনা। বন্দিত। (আশ্চর্য্য হইয়া) তাহলে এত আগে কেন ? অনাবিলা। (রাগিয়া) কি বােকা তুই আকুলি। জানিস্ তো আমরা অন্যত্র যাচ্ছি। অনাকুলা। (নম্রভাবে ) ভুলে গেছিলুম দিদি। অনাবিলা। আমরা চলে গেলে তােমরা কি করে দিন কাটাবে বলতাে ? (নন্দিতা ও বন্দিতা পরস্পরের দিকে দোষীর দৃষ্টিতে চাহিবার ভাণ করিল) নন্দিতা। ওঃ! এ্যা, আমরা—আমরা একটু বেড়িয়ে আম্ব—আর—আর পড়ব- অনাবিলা। (বিদ্রুপের সুরে) প্রশংসার কথা। বন্দি। (ভ্রুকুটি করিয়া এবং নন্দিতাকে ইঙ্গিত করিয়া) আর সুলভাও বিজলীকে আমরা আসতে বলেছি- আপনারা চলে যাবেন, তাদের সঙ্গে দিনটা কাটানােনা যাবে।
১৪ :
শুধু কঁকি
নন্দিতা। হতাইতােতা আমরা ডেকেছি
তাদেরে।
অনাবিলা। তা আবার ভুলে গেছলে ! আশ্চর্য্য।
অনাকুলা। তােমরা—তােমরা—কোনো দুষ্টমি করোনা,
কেমন ?
বন্দিতা। (হাত তুলিয়া। এমন কথা কি করে কল্পনা
কচ্ছেন?
অনাবিলা। হাঁ, সে কল্পনা করা যে খুবই শক্ত।
(টেবিলের কাছে গিয়া কাগজপত্র গুছাইতে লাগিল ।
অনাকুলা। ( নিম্নস্বরে) মনে রেখাে তাঁর কথা যিনি
সীমাহীন অনন্ত বারি রাশির ও পারে-
অনাবিলা। (মাটিতে পদাঘাত করিয়া বিলেতে--আকুলি !
অনাকুলা। ( চমকিয়া তুমি শুনেছ মনে করিনি, দিদি।
অনাবিলা। চল, দেরী হয়ে যাচ্ছে।
নন্দিতা। আমার ঐ জিনসটা আনবেন মনে করে ?
বিষেশ দরকার।
বন্দিতা। আর আমার লেইশ আর ফিতা।
অনাবিলা। (দ্রুত) তার সময় পাব বলে মনে হয় না।
নন্দিতা। সময় পাবেন না ?
বন্দিতা। এত আগে গিয়েও ?
শুধু ফাঁকি
নন্দিতা। গতকল্য যে বলেন অনেক সময় থাকবে
হাতে।
অনাবিলা। ( তীক্ষ ভাবে) গতকল্য আর আজ এক কথা
নয়, হঠাৎ নূতন কাজ পড়েছে।
অনাকুলা। হুঁ, তাই আমরা-
অনাবিলা। ( তীক্ষ ভাবে) দোকানে ঘােরাঘুরি করবার
সময় পাব না। আয়, আকুলি, তাড়াতাড়ি।
নন্দিতা। (ঘড়ীর দিকে তাকাইয়া) দুটোর গাড়ীতে গেলেও
তাে যথেষ্ট সময় রয়েছে।
অনাকুলা। ( নিরুপায় ভাবে একবার তার বােন, একবার বন্দিতার
দিকে চাহিয়া) কিন্তু আমরা তো
অনাবিলা।
( মাটিতে পদাঘাত করিয়া এবং অনাকুলার বাহু ধরিয়া)
আয় আকুলি।
( উভয়ে নিষ্ক্রান্ত)
নন্দিতা। (হাসিয়া) বেচারী অনাকুলা !
সব ফাস করে
দিচ্ছিল আর কি!
বন্দিতা। বুড়ী ডাইনী দুটো! দিন রাত গুপ্তচরের মত
চৌকি দিচ্ছে। সত্যিকার কিছু দেখিয়ে দিতে
ইচ্ছা হয়।
নন্দিতা। এখন হাতে যে কাজ নিয়েছি সেই কথা ভাব,
শুধু ফাঁকি
এতে আমরা সফল হলে তাদের খুব শিক্ষাটা
হবে—বাকী দিন আর আমাদের জ্বালাবে না।
বন্দিতা। সফল যদি না হয় তাহলে বাস্তবিক সত্যি
সত্যি আমি কিছু করে বব, তা দিদি তুই
দেখে নিস্। (জানালা দিয়া বাহিরে চাহিল) চলে
গেছে দূরে—এখন যা করব সব ঠিক ঠাক
করে নিতে হচ্ছে। (দরজার দিকে গেল )
নন্দিতা। (অনুরােধ করিয়া) সে সব হয়ে যাবে।
(উভয়ে নিষ্ক্রান্ত )
।
দ্বিতীয় দৃশ্য
( লাবণ্যপ্রভার বাড়ী; টেবিল চেয়ার ইত্যাদি)
লাবণ্য। (ঘড়ীর দিকে চাহিয়া) তারা শীগগীরই এসে
পড়বে।
(জানালার কাছে গিয়া ) এখনাে দেখা
যাচ্ছে না। বুড়ীদের উপর এই উৎপাত
কচ্ছে শুনলে, ওদের বাবা কি বলবে !
( বাহিরে শব্দ শােনা গেল) ঐ এসেছে তারা।
(দরজা খুলিল) এই তাে আছি, নন্দিতা।
(নন্দিত ও বন্দিতার প্রবেশ ; নন্দিতার হাতে একটা
ব্যাথু তাহা টেবিলের উপর রাখিল )
নন্দিতা। তা বৌদি, এসে তাে পড়িছি।
পড়িছি। কেমন
চলুছে সব ?
( গায়ের আলােয়ান ইত্যাদি ছাড়িতে লাগিল।
এর আগেই
লাবণ্য। বেশ চলছে।
বন্দিতা। কেউ আসেনিতাে এখনাে ?
আসতে চেয়েছিলুম, পথে মটর গাড়ীর যা
দুর্দশা উপস্থিত হলাে।
লাবণ্য। কেউ আসেনি এখনােএখনাে অনেক সময়
১৮
শুধু ফঁাকি
আছে। রেল গাড়ী ঠিক আসলেও আরো
দশ মিনিট হবে তাদের।
বন্দিতা। ( ইতিমধ্যে তারা ব্যাগ হইতে খুলিয়া পুরুষােচিত পােষাক
বা বাকী ছিল তা পরিতে পরিতে এক জোড়া করিয়া গোঁফ
ও লাগাইল) তাহলে তােমার রামু ও মাধু
চাকরকে আজ ঠিক দূরে পাঠিয়ে দিয়েছ তাে?
দেখ তত বৌদি তােমাদের নূতন চাকর দুটিকে
কেমন দেখাচ্ছে ?
লাবণ্য। বাস্তবিক, একটুও চেনা যাচ্ছেনা! আমার
চাকর দুটো যদি তােদের মত এমন পরিষ্কার
পরিচ্ছন্ন হতে তাে কথাই ছিলনা।
শিক্ষয়িত্রীরা একবার এসেছে বটে এই বাড়ীতে
কিন্তু চাকরদেরে কয়েক মিনিটের মধ্যে
নিশ্চয় লক্ষ্য করে দেখেনি।
বন্দিতা। এখনাে শেষ হয়নি।
( উভয়ে সময়ােচিত মন্তব্য
করিতে করিতে তাহাদের ছদ্ম বেশ শেষ করিল );
লাবণ্য। কিন্তু, ভাই নন্দিতা, এমন সং সাজলি, কি
লজ্জার কথা !
বন্দিতা। ঠিক সেজেছি কিনা তাই বল।
নন্দিতা। শিক্ষয়িত্ৰী দুটির সঙ্গে যতদূর সম্ভব খারাপ
শুধু ফাঁকি
ব্যবহার করা যাবে, অন্যের সঙ্গে ভালো
ব্যবহার করে—দেখি তারা কি বলে।
বন্দিতা। তােমাদের নীচের দোকান দেখলুম বন্ধ—আমি
আজ মাধুর বদল বসে গিয়ে পুরুষদের কাছে।
জিনী বিক্ৰী করিবেশ মজা হবে!
লাবণ্য। ( আতঙ্কিত) না, না, এও কি হয় !
নন্দিত। দাওন, বৌদি, একদিনের জন্য দোকানদার
সেজে দেখিনা কেমন লাগে।
লাবণ্য। নন্দিতা, তােরা যে অবাক করলি ভাই!
তােদের বাবা যদি এসে শুতে পান তাহলে
বলবেন কি?
বন্দিত। দাওনা বৌদি দোকানটা খুলে।
লাবণ্য। না, সে হয় না !
নন্দিত। দেখ, রাগ করােনা, দেখাে তােমাদের খরিদদার
আমাদের ব্যবহারে খুবই বেড়ে যাবে।
বন্দিতা। (জানালা দিয়া চাহিয়) তারা আছে! তারা
আছে !
নাচিতে নাচিতে নন্দিতাকে জড়াইয়া
ধরিল) এই তাে মজা আরম্ভ হচ্ছে আর কি!
বৌদি, তুমি এই ব্যাগ আর কাপড় চোপড়-
গুলা সরিয়ে ফেল। (সকলে জিনীসগুলি দ্রুত সংগ্রহ
শুধু ফাকি
করিল-লাবণ্য সেগুলি সরাইয়া রাখিয়া তৎক্ষণাৎ কিরিয়া
আসিল)
নন্দিতা। আশা করি ঠিক ঠিক করে যেতে পারব সব
-কেমন যেন ভয় ভয় কচ্ছে! ( দূরে গাড়ীর
বেল)
বন্দিতা। ঐ এল ! তুই দরজায় যা, দিদি, দেখি
গলার আওয়াজটা কিন্তু বদলিয়ে ফেতে হবে।
( নন্দিতা নিষ্ক্রান্ত) খেতেতে বলা হবে কিছু
ওদেরে—কি কি করা হয়েছে বল তাে বৌদি?
লাবণ্য। ওঃ! আমার বুক যে কাপছে! তােদের
দাদা এসে জানলে কি বলবেন !
বন্দিতা।
সে ভেবােনা! তােমার কড়া শাসনে বেচারীর
মুখেতে রা’টিও দেখিনা। (বাহিরে কথার শব্দ)
ঐ তারা আছে!
লাবণ্য। (দ্রুত উঠিয়া ) চা আছে, সরবৎ আছে, কেইক
আছে, সবই তােদের নির্দেশ মত করে রাখা
হয়েছে। দেখি, বাপু আমি কিন্তু এ সবে
নেই।
ৰন্দিতা। এই তারা আসছে!
(দরজা খুলিয়া গেল—অনাবিলা অনাকুলার প্রবেশ,
লাবণ্য তাহাদিগকে অভিবাদন করিল)
শুধু ফঁাকি
২১
অনাবিলা। কেমন, ভাল তাে ? সব ফিট ফাট দেখছি
—কেউ আসবে নাকি ?
লাবণ্য। হাঁ, আসবার তাে কথা ছিল। আমি ছিলুমনা
বাড়ী। (বন্দিতার প্রতি) কি রে মাধু, দেখলি
কেউ এলাে কিনা ?
বন্দিতা। মটরমে দো ল্যাড়কি আয়া, উস্কোবাদ ঘােড়ে
পার আয় দো ছােরা, সব কঁহা চলা গিয়া
ফি লােটকে আনেকা বাত থা।
অনাবিলা। তাদের সঙ্গে আমাদের কথা আছে।
এখানেই অপেক্ষা কচ্ছি, আসলে জানাবে।
নন্দিতা। হিয়া আয়েগা, দেখা তাে হােবেই করবে।
লাবণ্য। আপনারা এসেছেন, একটু চা টা খেয়ে যাবেন।
( নিষ্ক্রান্ত)
নন্দিতা। আবি লা দেঙ্গে ?
অনাকুলা। ( বিরক্তির সুরে) ও তা আনাে না! ভারি
ক্লান্ত হয়েছি।
বন্দিত। বয়ঠিয়ে, বয়ঠিয়ে ! (বন্দিতা
(বন্দিতা একটা পা ভাঙ্গা চেয়ার
অনিয়া অনাবিলাকে বসিতে দিল, নন্দিতা একটা
তলাবিহীন কাপড় ঢাকা চেয়ার অনাকুলাকে বসিতে দিল।
উভয়ে বসিয়া পড়িয়া গেল )
২২
শুধু ফঁাকি
নন্দিতা
হারে, ভাঙ্গা কুরসি হায় !
ফেলিকা কাম
বন্দিতা হয়।
অনাকুলা। ( অন্য চেয়ারে বসিয়া) বাস্তবিক, বড় ক্লান্ত
হয়েছি।
অনাবিলা। ( বসিয়া) বাজে কথা। কি করে ক্লান্ত হলি ?
অনাকুলা। হয়েছি তো। টেনে হিচড়ে নিয়ে এলে।
অনাবিলা। আচ্ছা, একটু চা দিতে পার ওকে। আমি
চা খাইনা।
বন্দিত। ঘােড়া সরবৎ ?
অনাবিলা। তা চলে।
বন্দিতা। আউর ক্যায়া লায়েঙ্গে, কেইক ?
অনাবিলা। তা আনতে পার ?
অনাকুলা। কিসে তৈরী ?
বন্দিত। ইয়া অ্যাণ্ডা ময়দা-
অনাকুলা। না, না ও চলবে না। তুমি কেইক আনতে
বল্লে কেন, দিদি, জানাে তো এ আমার সয়না।
অনাবিলা। চুপ কর, আকুলি। আমি তাে আগে
বলিনি আনতে। সয়না! তাের আবার সয়না
কোন্টা। হজম শক্তিতে উট পক্ষীও হার
মানে তাের কাছে, আর সে জানিস্ তুই।
-
শুধু ফঁাকি
২৩
অনাকুলা। কে বল্লে ! ভারি নিষ্ঠুর তুমি! জানােনা
তাে ডাক্তার বল বলেছে আমার স্বাস্থ্য খুব
খারাপ।
অনাবিলা। ডাক্তার বল একটী বােকা—তােরি জুড়ি।
অনাকুলা। (রাগিয়া ) ওঃ! তুমি অমন বর্বরের মত
ভাষা ব্যবহার কর কেন? আর এই চাকর
দুটোর সামনে! ভারি অন্যায়, দেখ তারা
হাছে!
বন্দিতা। ক্যায়া দিলাগি কনে লাগা।
নন্দিতা। ক্যা মজাক কাররােহি তােম ।
অনাবিলা। কি অসভ্য চাকর দুটো।
অনাকুলা। হবে না ! যেমন দৃষ্টান্ত দেখাচ্ছে।
অনাবিলা। চুপ কর আকুলি। (ঘড়ী দেখিয়া ) ওরা
এখনাে আসছেনা কেন!-বা, নাকে চোখে
জল যে! তাের মত কাঁদতে দেখিনি কাউকে।
নিশ্চয় তুই আবার দ্বিতীয় শৈশবে উপস্থিত
হয়েছি।
অনাকুলা। তুমি ভারি—ভারি নিষ্ঠুর দিদি। (ফুফাইরা
কাদিয়া) তােমার সঙ্গে না এসে সহরে গেলেই
ভাল কৰ্ত্তম।
==
২৪ শুধু ফঁাকি অনাবিলা। তুই যে রকম জ্বালাচ্ছি, আমারে সেই ইচ্ছা হয়ে উঠবে দেখছি। ( নন্দিতা চা ও বন্দিতার সরবৎ লইয়া প্রবেশ) অনাকুলা। ( এক চুমুক চা খাইয়া পেয়ালা ছুড়িয়া ফেলিয়া লাফাইয়া উঠিয়া-পেয়ালা ভাঙ্গিয়া গেল ) এ্যা, ঝাল! লঙ্কার ঝাল! উঃ উঃ । অনাবিলা। (প্রায় একই সময়ে—এক চুমুক সরবৎ খাইয়া) এ্যা! ময়দা গুলা! ময়দার সরবৎ! ছিঃ ছিঃ ছিঃ ! (টেবিলে গ্লাস রাখিয়া দিল) বন্দিতা। আরে ফেলিকা সর্দি হুয়া, উস্কোওয়াস্তে চা কি সাথ মরুচা জ্বাল দিয়াথা, ভুলসে হাম ওহি লায়া। নন্দিত। পাকানেকো ওয়াস্তে ময়দা গােলকে রাখা, হাম সামান্ লিয়া ঘােলকা সরবৎ—ভুলসে ওহি লায়। ( অনাবিলা ও অনুকুলা চোখ কটু মট্ করিয়া চাহিল- বন্দিতা হাসিয়া বাহির হইয়া এক প্লেইট কেইক দিয়া উভয়ে নিষ্ক্রান্ত) অনাকুলা। কি ভয়ঙ্কর স্থান। দিদি, তুমি কেন এখানে আমাকে অপমান করাতে নিয়ে এলে ? আমি এক্ষনি- ।
শুধু ফঁাকি ২৫ অনাবিলা। চুপ কর ! গোল করিসূনে, ওদের মুনিবকে বলব। এখন চুপ করে আমাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ করে যেতে হবে তো! ওঃ! কি ভয়ানক পাজি চাকর দুটো। আবার হেসে চলে গেল। ( বাহিরে হােঃ হােঃ হাসি) অনাকুলা। কিন্তু ক্ষুধায় পেট জ্বলে যাচ্ছে যে! কেইকের তো বেশ ভাল গন্ধ বেরিয়েছে। ( অনাকুলা নিজের দিকে কেইকের প্লেট টানিয়া লইল- অনাবিলা উঠিয়া আবার তাহা নিজের দিকে নিয়া আসিল। উভয়ে তাড়াতাড়ি মুঠা ভরিয়া কেই লইয়া খাইতে প্রবৃত্ত। পিছনে বন্দিতা নন্দিতা প্রবেশ করিয়া চোখের ইসারা করিয়া হাসা হাসি করিতে লাগিল। অনাবিলা। এ্যা, ময়দার ভেতর বালি! খুব আকেলটা অনাকুলা হয়েছে আজ। ওঃ! পাজি। অনাবিলা। (নন্দিতা বন্দিতাকে দেখিয়া) কি এইবার । এগুলােওকি ফেলির ঘাড়ে পড়বে নাকি ? নন্দিতা। নেই, নেই। ফেলীকা তৈয়ারী নেহী ঠাকরুণ, বােনাইকো সাথ, দিলাগি করণেকোয়াস্তে বানায়া থা, হাম লােক নেহি জানতে থে। ( উভয়ে হাসিয়া নিষ্ক্রান্ত )
শুধু ফাঁকি
অনাকুল। আর নয়, যথেষ্ট হয়েছে, ওঃ! আমার
হৃদয় এবং রুচির পক্ষে যথেষ্ট হয়েছে।
ওঃ ।
অনাবিলা। ( দৃঢ়ভাবে ) দেখ, আকুলি, তাের দুর্বল হৃদয়
আর অরুচির কথাটা আর মুখে আনি না
বলছি। অধর বাবু যে দিন থেকে বলেছেন,
সুকুমার দেহ ও স্বাস্থ্য বিশিষ্টা, স্ত্রীলােককে
তাঁর বেশ লাগে, সে দিন থেকেই তুই এসব
বলতে সুরু করেছি।
অনাকুলা। এ সত্যি নয়।
অনাবিলা। হাঁ, সত্যি, জেনে রাখি, তাের মত বুড়ী
ডাইনীর দিকে অধর বাবু ফিরেও তাকাবেন না।
অনাকুলা। (ভীষণ ভাবে) দিদি, যা তা বলছ তুমি।
অনাবিলা। (শান্তভাবে) কাজেই তাকে ভুলােবার
জন্যে যে কেন তুই বৃথা সময় নষ্ট কচ্ছিস
জানি না।
অনাকুলা। (লাফাইয়া উঠিয়া) একেবারে অসহ্য হয়ে
উঠেছি! উঃ! শীগগীরই জলে ডুবে মরুব
আমি জানি।
অনাবিলা। দেখ, আকুলি, তাের হৃদয় আর তাের পে-
অনাকুলা। (চীৎকার দিয়া কাণে আঙ্গুল দিয়া) থাম, দিদি !
শুধু কঁকি
24
ঐ ভৗষণ বিশ্রী শব্দটা আর যেন আমাকে
শুনতে না হয় !
অনাবিলা। বেশ! তাের হৃদয় আর বক্ষ নিম্ন দেশ
কিছু মাত্র দুৰ্বল নয়। তাের মেজাজই যা
খারাপ!
অনাকুলা। তােমার চিরকালই আমার উপর ঈর্ষা।
তােমার মত বুড়ী হইনি কিনা ?
অনাবিলা। চুপ কর, আকুলি। বব করিসনে।
(ঘড়ীর দিকে চাহিয়া) সাড়ে তিনটা হয়েছে,
মেয়েরা এখনি এসে পড়বে। কে জানে তারা
আগেই এসে পড়েছে কিনা, এবং আমাদের
দেখে ফেলেছে কিনা। বাড়ীর গিন্নীও আসছে
যে ! কিই বা আবে, যা খাওয়ালে ! পাজি
চাকর দুটোই হয়ত-( বাহিরে শব্দ—“এদিকে
আসুন” } এই হয় মেয়েগুলো, নয় ছোকরা দুটো
এসেছে। এখন তাের কঁাদা থামাতাে। চোখ
মুখ মুছে ফেল।
(নন্দিতা দরজা খুলিল। শ্ৰীমতী হিরন্ময়ী ও শ্ৰীমতী
তরলার প্রবেশ, দু’জনের পুরুষােচিত চেহারা এবং গলার
স্বর। অনাবিলা এবং অনাকুলা পরস্পর পরস্পরকে ইঙ্গিতে
জানাইল “তারাই এসেছে”)
শুধু ফঁাকি
;
হিরন্ময়ী। নিমন্ত্রিতরা এসেছে সব ?
নন্দিতা। ই দোনাে আয়া, আউর কোই নাহি আয়া।
হিরন্ময়ী। আমরা তাে থাকতে পারব না বেশীক্ষণ, অন্যত্র
দরকার আছে। তাদের সঙ্গে ফিরে এসে
দেখা হবে।
বন্দিতা। আপ, লােকোয়াস্তে চা লে আতে।
(বন্দিতা ও নন্দিত গিয়া চা, কেইক ইত্যাদি নিয়া আসিল,
অতিথিরা তা আরামের সহিত খাইতে লাগিল; অনাবিলা
অনাকুলা পরস্পর চাওয়া চাওয়ি করিতে লাগিল)
হিরন্ময়ী। (বন্দিতার প্রতি)
(বন্দিতার প্রতি) দেখ, তরলার একটু বদ
অভ্যাস আছে—সিগারেট -একটা দেশলাই
এনে দাও তো।
(বন্দিতা দেশলাই দিল -তরল। সিগারেট ধরাইতে প্রবৃত্ত।
নন্দিতা বন্দিতা বাহির হইয়া আড়াল হইতে দেখিতে
লাগিল )
অনাবিলা। (উঠিয়া গম্ভীর ভাবে ) এসব হতে পারবে না।
ধূমপান সম্বন্ধে আমাদের দুজনেরই আপত্তি
আছে। (তরল অবাক হইয়া চাহিয়া রহিল।
হিরন্ময়ী। (চোখে চশমা আঁটিয়া বিশেষ ভাবে লক্ষ্য করিয়া
দেখিয়া ) আপনারা কে ?
অনাবিলা। (অগ্রসর হইয়া) তাতে তােমাদের কোন
শুধু ফঁাকি
২৯
দরকার নেই, অন্ততঃ বর্তমানে। আমি
তােমাদের বলছি যে সব কু অভিসন্ধি করেছ
তােমরা, আমি তা ভণ্ডুল করে দিতে এসেছি।
(আরাে উত্তেজিত হইয়া । তােমরা কে আমরা
জানি-কাজেই এখন যত শীঘ্র তােমাদের
পরচুলা এবং ছদ্মবেশ ত্যাগ কর ততই ভালো।
তরলা। (চীৎকার করিয়া হাসিয়া উঠিয়া) বেশ বলেছ বুড়ী!
পাগল নাকি ?
হিরণয়ী। (এখনাে চশমার ভিতর দেখিয়া) মৌলিকতা আছে
বুড়ীর। হয়তাে আমাকে চিনতেও পারেন—
আমি শ্ৰীমতী হিরন্ময়ী—বিলাসপুর হাউসের,
আর এটি হচ্ছে আমার ননদ।
অনাবিলা। মােটেই চিনিনা। তােমরা এসেছ আমার
ছাত্রী দুটির সঙ্গে গােপনে দেখা কর্তে। এখনি
যদি ছদ্মবেশ না ছাড় তােমরা তাহলে আমি
পুলিশ ডেকে তোমাদের কাপড় খুলব!
হিরন্ময়ী। মেয়ে লােকটা দেখছি আস্ত পাগল ! লাবণ্য
দিদি কোথায় ?
অনাবিলা। আমি আস্ত পাগল নই। আমি মিস্ অনাবিলা
দাস-নন্দিতা বন্দিতার অভিভাবিকা।
শুধু ফঁাকি
অনাকুলা। আমি এর ভগ্নী এবং সহকারী অভিভাবিকা।
তরল। কিন্তু আমি নন্দিতা বন্দিতার মধ্যে কেউ নই।
অনাবিলা। আমরা জানি যে তােমরা ছদ্মবেশী পুরুষ,
তাদের সঙ্গে মিলতেই এসেছ এখানে।
( সমুচ্চ হাসি) বাঃ রে ! হেঃ! হেঃ! হেঃ!
মজা বেড়ে যাচ্ছে যে!
হিরন্ময়ী। তুই যানা ভাই, লাবণ্যদি’কে ডেকে আন্।
তরলা। (চোখ মুছিয়) আরে এখনাে থামিয়াে না, বেশ
চলছে, চলুকনা আরাে !
তরলা।
(নন্দিত ও বন্দিতার প্রবেশ)
হিরন্ময়ী। ডাকো তো একজন লাবণ্য দিদিকে, আর
একজন এখানে থাকো।
অনাকুলা। দিদি, সাবধান ! হয়ত
হয়ত তাদের কাছে
পিস্তল আছে, আমাদের গুলি করবে!
অনাবিলা। চুপকর অকুলি। দুবৃত্ত হলেও এতটা
সাহস পাবেন তারা।
তরল। বুড়ী, সাবধান, একটু বাড়াবাড়ি হচ্ছে কিন্তু।
অনাবিলা। সাবধান হওয়া উচিত তােমারই, ছোড়া।
| তুমি মনে কর আমি এ সম্বন্ধে কিছু জানিনা!
শুধু ফাকি
৩১
তোমাদের চিঠি সব দেখেছি আমি।
(জোর দিয়া পৃথক পৃথক উচ্চারণ করিয়া বলিল ) কেমন
হয়েছে এখন! ( অবাক হইয়া হিরন্ময়ী ও তরল
পরস্পরের দিকে চাহিল) কি ?
বিস্মিত হচ্ছ ?
এতটা ভাবনি তােমরা, না? আমার বুদ্ধিটা
যে এত তীক্ষ্ণ তা মনে করনি। কিন্তু এবার
ধরা পড়েছ!
হিরন্ময়ী। (আতঙ্কে) বলে কি! কি করে বসবে ঠিক
নেই। ( লাবণ্যপ্রভার প্রবেশ) লাবণ্য দি, তুমি
এই ব্যক্তিটিকে অনুরােধ করে বলবে সে তার
চেয়ারে ফিরে যাক; এখানে দাঁড়িয়ে আমাদের
বিরক্ত করে না যেন।
অনাবিলা। (লাবণ্যের প্রতি) এই মহিলাবেশধারিণীরা
মহিলাই নয়, এরা একজোড়া বদমায়েস, লােক
ঠকাতে চাচ্ছে, আমাদের ছাত্রীদের সঙ্গে তারা
মিলতে এসেছে। আমি বলছি এখনি পুলিশ
ডাকা হােতূ এবং এদের কাপড় চোপড় খুলে
ফেলা হােক্। দেখবেন শাড়ীর নীচে ধুতি
কোট বেরিয়ে পড়বে!
অনাকুলা। আরে, দিদি, থামে, থামাে।
শুধু ফঁাকি
(নন্দিত ও বন্দিতা রঙ্গমঞ্চের পিছনে গিয়া হাসি
চাপিবার বৃথা চেষ্টা করিতেছে ! লাবণ্যের মুখে আতঙ্কে
কথা আটকাইয়া গেল। তরল হে হ করিয়া
হাসিতে লাগিল। অনাকুলা কাদিতে লাগিল। শ্ৰীমতী
হিরন্ময়ীকে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ দেখাইল)
হিরন্ময়ী। বুড়ীটা আস্ত পাগল, লাবণ্য দিদি। কে এ ?
লাবণ্য। (অত্যন্ত অসোয়াস্তি বােধ করিয়া) আগে একে দেখিনি,
আর নিশ্চয় কোন ভুল করেছেন ইনি। নিশ্চয়
তােমাকে অপমান করার তার ইচ্ছা ছিল না।
অনাবিলা। কোন ভুল হয়নি
বলছি আমি। (চিঠিটা
বাহির করিয়া পড়িতে লাগিল। “দুটি মেয়ের
ছদ্মবেশে আমরা সেখানে যাব, পাছে তাদের
এবার ঠকাতে না পার সেই আশঙ্কায়।”
চিঠিতে লেখা আছে তারা এখানে চারটার
সময় উপস্থিত থাকবে।
থাকবে। এখন জিজ্ঞেস
কচ্ছি, এরা কি স্ত্রীলােক ? স্ত্রীলােক আবার
সিগারেট খায় কবে থেকে? স্ত্রীলোেক এ
রকম ব্যবহার করে কে কবে দেখেছে ?
তরল। (চোখ মুছিয়) ওঃ, ওঃ, ওঃ, কি মজার বুড়ী!
হয় তােমার এই মাত্র জন্ম হয়েছে, নয়,
স্ত্রীলােকই দেখনি তুমি কোনদিন।
শুধু ফাকি
লাবণ্য। (গাম্ভীর্যের সহিত ) ইনি হচ্ছেন বিলাসপুরের
জমিদারের স্ত্রী, আর এটি সেই বাড়ীরই একটি
মেয়ে। আমার বাধ্য হয়ে বলতে হচ্ছে আপনি
তাদের আর বিরক্ত করবেন না, নইলে এ
বাড়ী ছেড়ে যাবেন আশা করি।
অনাবিলা।
(ভীষণ ভাবে। আমি তাদের বিরক্ত কচ্ছি
বটে! উল্টো, তারাই যে কচ্ছে! তারাই
অামার ছাত্রীদের সঙ্গে প্রেম কচ্ছিল এবং
আমাদের চোখে ধূলাে দিয়ে তাদের সঙ্গে
এখানে মিলতে এসেছে।
হিরন্ময়ী। (উঠিয়া) লাবণ্য দিদি, এ বেচারি দেখছি সম্পূর্ণ
পাগল, আমরা অন্য ঘরে বসূতে চাই।
(দরজার দিকে গেল)
অনাবিলা। (দরজার দিকে ধাবিত হইয়া) না! না! যেতে
পাচ্ছনা এ ঘর ছেড়ে ! তােমরা আমার
ছাত্রীদের কাছে গিয়ে তাদেরে জানিয়ে দিতে
চাচ্ছ যে আমরা এখানে এসেছি।
লাবণ্য। দেখুন আপনাকে বলছি আমি, আপনি ভয়ানক
একটা ভুল কচ্ছেন, আমি এই দুটি ভদ্র
মহিলাকেই বিশেষরূপে জানি আমার
নিমন্ত্রণেই তারা এখানে এসেছেন।
৩৪
শুধু কি
আপনি
অনাবিলা। আমি বিশ্বাস করি না আপনার কথা।
অনাকুলা। দিদি, কথাটা বুঝে দেখ।
অনাবিলা। চুপ কর, আকুলি !
লাবণ্য। দেখুন ওরা নিমন্ত্রিতা, আর আপনি এখানে
এসেছেন না ডাকা সত্ত্বেও তাদের আপনি
অপমান করবেন এ আমি দাড়িয়ে দেখব
ভাবছেন আপনি?
বেরিয়ে যান
এখান থেকে! (অনাবিলা নড়িল না) কি, যাবেন
? রামু, মধু, বের করে দে একে!
(রামু মাধু তাহাকে দুই দিকে ধরিয়া টানিয়া এবং
তরলা পিছন হইতে ঠেলিয়া সারা রঙ্গমঞ্চে তাহাকে
ঘুরাইল। অনাবিলা শেষে একটা চেয়ারে বসিয়া
দুই হাতে তাহা আঁকড়াইয়া রহিল। অনাকুল
ভয়ানক ভাবে চীৎকার করিয়া উঠিল)
তরলা। কেমন গাে বুড়ী, অপমান করার আকেলট।
কেমন হয়েছে এখন ? (অনাবিলা বসিয়া হাঁপাইতে
লাগিল, হিরন্ময়ী তরল ও লাবণ্য নিষ্ক্রান্ত,অনাকুলা চীৎকার
করিতে লাগিল।
অনাবিলা। (ভীষণ ভাবে.) চুপ কর, শুনলি ?
অনাকুলা। পারি না, আমার যে ফিট হবে। মূচ্ছ।
যাব আমি। (নন্দিতা ও বন্দিতা দৌড়িয়া অনাকুলার
নিকট গেল—একজন তায় ছােখে মুখে জল ছিটাইয়া তাকে
।
শুধু ফাঁকি
একরূপ ভিজাইয়া দিল, আর একজন খবর কাগজ দিয়া
ভীষণ ভাবে পাখা করিতে লাগিল) ওঃ! ওঃ!
থামাে! থামাে ! তােমরা আমার অবস্থা আরাে
খারাপ করে দিচ্ছ।
বন্দিতা। আবি আচ্ছা হাে যাগা ।
নন্দিতা। হাওয়া লাগনেসে আচ্ছা হাে যাগা।
অনাকুলা। আরে ! একেবারে সর্বাঙ্গ ভিজিয়ে দিলে
যে ! সব গেছে-কাপড় চোপড়! ওঃ!
থামাে ! থামাে ।
অনাবিলা।
(এখনাে এত অভিভূত যে নড়িতে পারিল না) চুপ
করবি তুই আকুলি ?
অনাকুলা। বাঁচাও আমাকে, দিদি। ওরা যে আমাকে
মেরে ফেলে।
অনাবিলা। চুপ কর আকুলি, বলছি আমি। ( বাহিরে
ডাক—“রামু”, “মাধু” !)
নন্দিতা। (দরজায় দৌড়িয়া গিয়া আকস্মিক ভাবে তাহা খুলিয়া খুব
ভীত হইয়াছে সেরূপ ভাণ করিল) আপলােকন কে
ইধার নেহি আনা চাহি। ( বাহিরে শব্দ—“নয়
কেন, সে দুটি এসেছে ?” স স স ! ( বাহিরে
ক্রুদ্ধ ভাবে শব্দ—“কি, এসেছে তার ?” অনাবিলা
উঠিয়া চুপি চুপি দরজার কাছে গেল। আরে আয়
৩৬
শুধু ফঁাকি
নেহি, হাম তােক বলতে। ( বাহিরে শব্দ “তারা
ততা লিখেছে চারটায় এখানে উপস্থিত
থাকূবাে, চল্ ঢুকে পড়ি।”) নেহি, নেহি।
অনাবিলা। ( জোর করিয়া দরজা খুলিয়া ফেলিল) আসুক
তারা। এই লক্ষীছাড়া দুটোর জন্যেই আমি
অপেক্ষা কচ্ছি। (সুলভ এবং বিজলীর প্রবেশ,
অনাবিলা বিস্মিত হইয়। হাঁ করিয়া রহিল। সুলভা।
বিজলী!
সুলভ। (বিস্ময়ের ভাণ করিয়া) আপনি এখানে ?
বিজলী। (অনাকুলার প্রতি) আর আপনিও ! এখানে কি
কর্তে এলেন? আমি ভেবেছিলুম সহরে
গেছেন।
অনাকুলা। দিদি কিছুতেই গেলনা, তার শাস্তিটা আমার
হয়েছে।
সুলভা। নন্দিতা ও বন্দিতা এসেছে কি এখানে ?
অনাবিলা। ( ৰূকে বাহু বদ্ধ করিয়া সোজা দাড়াইয়া) না,
আসেনি, কিন্তু এই এলাে বলে।
সুলভা। এলাে বলে ? তারা কি ভুলে গেছে যে আরাে
আগেই আমাদের আতে লিখেছে ?
অনাকুলা। দিদি, যেমনটি হয়ে থাকে—আমাদের ভুলই
হয়েছে, তুমি বরাবর ভুল করে থাক। এই
শুধু ফাঁকি
৩৭
ভীষণ স্থানে না থেকে এতক্ষণ আমরা সহরে
থাকতুম।
অনাবিলা। আকুলি ! চুকর।
বিজলী।
এ ঘরে আমাদের আতে বাধা দেওয়া হয়েছে,
এ কি রকম! লাবণ্য দিদির কাছে বলতে
হবে।
বন্দিতা। মাপ কিজিয়ে, বড়ি আজব তারেক
জেনানা-
অনাবিলা। কি বলতে চাচ্ছিস তােরা ?
(নন্দিতা তার কপাল ছুইল এবং বিজলীকে ইঙ্গিত করিল)
বিজলী। বেশ, সুলভা, চল দেখি গিয়ে বন্দিতা ও
নন্দিতা অন্যত্র আমাদেরে খুঁজছে কিনা।
অনাবিলা।
অন্যত্র পাবে না তাদের।
সুলভ। নয় কেন?
অনাবিলা। নয় কেন? কারণ তারা দুটি যুবকের
সঙ্গে এখানে দেখা কর্তে আসবে, সেই কথা
অাছে। কিন্তু আমরা এসেছি এখানে তাদের
ধরুতে
সুলভ
(কৃত্রিম ভীতির সহিত) কি!! অসম্ভব ।
বিজলী
শুধু ফাকি
অনাবিলা। (রাগিয়া ) অসম্ভব নয় ! এ সত্যি। চিঠি
রয়েছে আমার কাছে।
বিজলী। সত্যি হােতূ আর না হােক, আমরা যাচ্ছি
আপনার বাড়ীতে। আমি বলছি এখন বাড়ী
ফিরে যান—ফিরে গিয়ে দেখতেও পাবেন
আমরা সেখানে আমােদ কচ্ছি। মিছামিছি
সন্দেহ আপনাদের।
অনাকুলা। বাস্তবিক, তাই কর তুমি, দিদি। বরাবর
আমি এই কথাই বলি।
অনাবিলা। আকুলি, চুপ কর ! মিছামিছি সন্দেহই
বটে! অকাট্য প্রমাণ রয়েছে, হাতের লেখা !
পড় এটা। (চিঠি দিল।
সুলভা। (পড়িয়া) এটা! আপনি কি বলতে চান ?
(চিঠি ছুড়িয়া ফেলিল) এতেই আপনারা ঠকছেন।
হয়ত কোনাে দাসীকে লেখা এটা। তাদের
সম্বন্ধে এমন সন্দেহ করে আপনাদের লজ্জিত
হওয়া উচিত। নিশ্চয় জানি তাদের পিতা
এসে এসব জানতে পেলে আপনাদের উপর
মােটেই সন্তুষ্ট হবেন না।
অনাকুলা। সেই অন্তহীন অসীম বারিরাশির ওপার
থেকে এসে !
শুধু ফাঁকি অনাবিলা। বিলেত থেকে, আকুলি! (সুলভার প্রতি) আমাদের কর্তব্য কি, বলে দেওয়া তোমার ধৃষ্টতা। অভিভাবকতা কৰ্ত্তে হয় কি করে সে আর আমাকে এসে তােমার শেখাতে হবেনা। সুলভ। আয় বিজলী! এখানে কথা কাটাকাটি করে দরকার নেই। ওঁরা নন্দিতা বন্দিতা এবং তাদের কাল্পনিক প্রিয় পাত্রদের জন্যে সারা দিন রাত অপেক্ষা করুন না কেন, আমরা এখানে মিছামিছি সময় নষ্ট কর্তে চাইনা। ( দরজার কাছে গেল—পুনঃ অনুসরণ করিয়া) আমার কথা শুনুন, এই গাড়ীতে বাড়ী ফিরে যান, গিয়ে দেখুন তারা বাড়ীতে কিনা। গুপ্তচর- গিরি করা আর সন্দেহ করা ছেড়ে দিন। আমরা মটরে যাচ্ছি, আমাদের সঙ্গে যায়গা হবেনা—আপনি রেলেই যান। ( উভয়ে নিান্ত) অনাকুলা। হাঁ, হাঁ, তাই কর দিদি, চল এখনাে গাড়ীর সময় আছে। ( ধীরে ধীরে চল বাড়ী, গিয়ে যদি সেখানে অনাবিলা।
শুধু ফাঁকি
তাদের না পাই তাহলে তাদের রাখতে
পারবনা, তাদের পিতাকে এ কথা পরিষ্কার
জানিয়ে দেব।
অনাকুলা। কিন্তু সেই সীমাহীন অনন্ত বারিরাশির
ওপারে তাে তাদের
অনাবিলা। বিলেতে, আকুলি ! যদি দেখি তারা
আমাদিগকে ঠকিয়েছে, অন্য কোথাও ঠিক
করে তাদেরে সেখানে দিয়ে দেবাে।
{ লাবণ্যপ্রভার প্রবেশ)
লাবণ্য। শ্ৰীমতী হিরণয়ী আপনার অদ্ভুত ব্যবহারে
ভারি রেগেছেন, তিনি পুলিশের হাতে দেবেন
বলে শাসিয়ে গেছেন।
অনাকুলা। (চীৎকার করিয়া) পুলিশ! দিদি, হয়েছে তাে৷
এখন জেলে যাবে।
অনাবিলা। চুপ কর আকুলি।
অনাকুলা। ওঃ তুমি যে জেলেই যাবে, ঠিক যাবে ।
সকলের সঙ্গে এমন ব্যবহার করার ফল।
ঠিক হয়েছে এবার।
অনাবিলা। ( ভীষণভাবে) চুপ কর, আকুলি। অদ্ভুত
৪১
শুধু ফাঁকি
বাড়ী এটা। চাকর দুটোর কথা আর কি
বস্তু।
লাবণ্য। এই অদ্ভুত বাড়ীতে তাে কেউ আপনাকে
নিমন্ত্রণ করে আনেন নি।
অনাবিলা। আর গিন্নীটিও তেমনি।
অনাকুলা। হু-উ-উ। দিদি, থামাে, শেষে আর
এক ফাসাদ বাঁধিয়ে বৰে। তাড়াতাড়ি
চল, শেষে গাড়ী ধরা যাবে না।
অনাবিলা। চুপ ক আকুলি। কথা বলবার অধিকার
আমার আছে।
লাবণ্য। হাঁ, নিজের বাড়ীতে দাড়িয়ে।
অনাবিলা। (দরজার কাছে গিয়া) যাচ্ছি। সেখানে
গিয়েই বম্ব।
লাবণ্য। বাধিত হলুম। (অনাবিলা নিষ্ক্রান্ত)
অনাকুলা। আছি ! ওর কথা কাণে তুলবেন না।
এই রকমই ও!
( লাবণ্য দরজা খুলিয়া ধরিল,
তারা চলিয়া গেলে দরজা বন্ধ করিয়া দিল )
(চেয়ারে বসিয়া খুব হাসিয়া) হােঃ! হােঃ! মেয়ে
দুটো আজ কি খেলাই দেখালে, ঠিক যেন
বাঁদর নাচিয়ে ছাড়লে!
তবে ভয় হচ্ছে উনি
এসে শুনে না জানি কি বলেন।
লাবণ্য।
৪২
শুধু ফঁাকি
( নন্দিতা ও বনিতা সাবধানে চারিদিক চাহিয়া প্রবেশ করিল)
বন্দিতা। তারা চলে গেছে, বৌদি ?
লাবণ্য। উঠিয়া) হাঁ, গেছে ; দেখলুম এই অদ্ভুত
জোড়াটিকে—আর একবার নাকি এসেছিল,
তখন শুধু বাবুর সঙ্গেই দেখা হয়েছিল ।
নন্দিতা। আমাদের এখন তাড়াতাড়ি সরে পড়তে
হবে। সুলভ বিজলীও যাচ্ছে। আমাদের
জিনীসপত্রগুলো সব কই?
লাবণ্য। ঐ ঘরে নিয়ে রেখেছি।
নন্দিতা। বেশ, আসছি।
(নন্দিতা ও বন্দিতা নিষ্ক্রান্ত এবং ছদ্মবেশ পরিবর্তন করিয়া
পুনঃ প্রবেশ)
বন্দিতা। ধন্যবাদ বৌদি—তােমার সাহায্যের জন্য
কৃতজ্ঞ রইলুম। খুব মজা ভােগ করা গেছে।
নন্দিতা। হিরন্ময়ী শুণে কি হাসিটাই হেসে গেলেন।
কিন্তু সুবিধা হলে ওদের আতঙ্ক সৃষ্টি করে
তুলবেন বলেও বলে গেলেন।
লাবণ্য। কিন্তু ভাই, তাদের বাবা শুনতে পেলে কি
বলবেন ?
শুধু ফাকি
৪৩
বন্দিত। সীমাহীন অনন্ত বারিরাশির ওপার থেকে ?
শুনবেন না। শুনলেও হাসতে হাসতে বাবার
দম আটকিয়ে যাবে। চল্ দিদি, আর দেরী
করলে চলে না ! ( সকলে দরজার গেল )
লাবণ্য। কিন্তু ভাই, তােদের দাদা এসে কি বলবেন
তাই ভাবছি।
( সকলে নিষ্ক্রান্ত)
তৃতীয় দৃশ্য
( মিস্ অনাবিলা দাসের বৈঠকখানা। নন্দিতা ও বন্দিতা বসিয়া
কাজ করিতেছে ; সুলভ ও বিজলী কথা বলিতেছে)
সুলভ। তারা এখনি ফিরবে। সব ঠিক করে এসেছি
আমরা।
নন্দিতা। জানি না এ সবের জবাব কি দেবে তারা।
শ্ৰীমতী হিরন্ময়ীকে আক্রমণ করবার সময়
অনাবিলা দাসের মুখটি যা দেখতে হয়েছিল
সে কখনও ভুলব না আমি। ব্যাপারটা
রীতিমত নাটকীয় হয়ে উঠেছে।
বন্দিতা। (হাসিয়া) একটা নাটক লিখে ফেল্লে হয়।
( কাণ পাতিয়া) ঐ আসছে তারা ! ( সকলে কাণ
পাতিল—দূরে গলার আওয়াজ )
নন্দিত। ( উঠিয়া দরজার কাছে গিয়া) হাঁ, তারাই, এখন
একটু মজা হবে।
( দ্রুত কাজে প্রবৃত্ত)
(অনাবিলা ও অনাকুলার প্রবেশ )
অনাকুলা। ঐ তো তারা, দিদি। আমি তাে বলেইছি
ওরা বাড়ীতেই।
অনাবিলা। (দ্রুত) চুপ, কৃর, আকুলি! আমি কাণা
বিজলী।
নই।
শুধু ফাঁকি
৪৫
নন্দিতা। সুলভ ও বিজলী অদ্ভুত কথা সব বলছিল !
আপনারা নাকি সহরে না গিয়ে একস্থানে
গিয়েছিলেন দুটি যুবকের সঙ্গে আমাদের
মিলনে বাধা দিতে। (হাসিয়া) এর মাথা মুণ্ডু
আমরা কিছুই বুঝলুম না।
অনাবিলা। (চেয়ারে বসিয়া পড়িরা) এই সব বাজে কথা
বিশ্বাস করােনা।
বন্দিতা। (মেয়েদের দিকে ফিরিয়া) তাহলে এ সত্যি নয় ?
ভেবেছিলুম এ হতে পারে না, দুষ্ট মেয়েরা
বানিয়ে গল্প করে !
অনাকুলা। না, সত্যি তাে !
অনাবিলা। চুপ কর, আকুলি।
অনাকুলা। সত্যি কথা, কেন চুপ করব আমি?
কচি খুকী নই যে যা বলবে তাই করব।
এ আর আমি সহ্য করে থাকবে না। (রাগিয়া )
আমি ভেবেছিলুম সহরে যেতে উনি নিয়ে
গেলেন কোথায় ! সেখানে ভীষণ পাজি
দুটো চাকর লঙ্কার ঝাল দিয়ে আমাকে চা
খাওয়ালে, আর ময়দার ভেতরে বালি দিয়ে
ভারি কে খাওয়ালে।
৪৬
শুধু কঁকি
শ্রীঘর
অনাবিলা। বলে যা, আকুলি, খুব জমে উঠেছে।
অনাকুলা। (দ্রুত) আর দিদি দুটি স্ত্রীলোেককে অপমান
করলে, তারা গেছে পুলিশ ডাকতে-শীগগীরই
বাস হবে বলিছি ওকে। ( বসিয়া )
কেমন, হয়েছে তো ? বলে দিলুম সমস্ত
কাহিনী।
নন্দিতা। আমরা যে আরাে হতবুদ্ধি হয়ে গেলুম,
সেখানে আপনারা গেলেন কি কৰ্তে ?
অনাবিলা। (নাটকীয় ভাবে এই কর্তে! (চিঠি বাহির
করিয়া দিল ; নন্দিতা তাহা অনেকটা হতবুদ্ধি ভাবে
পড়িল।
নন্দিতা। পড়িল) “প্রিয়ে, প্রিয়ে, প্রিয়তমে ! তােমাদের
আত্মীয়া লাবণ্যপ্রভার বাড়ীতে আজ লুকিয়ে
যাবে এবং চারটার সময় সেখানে আজ উপস্থিত
থাকবে—তােমার এই প্রস্তাব
প্রস্তাব চমৎকার,
তােমার বুদ্ধির উপর আমরা সম্পূর্ণ নির্ভর
কচ্ছি—সে বুদ্ধির প্রমাণ তুমি ইতিমধ্যেই
দিয়েছ, যে দুইটী বুড়ী ডাইনী তােমাদের উপর
পাহারা দিচ্ছে, তাদের চোখ এড়িয়ে, দুজন
মহিলার বেশ ধরে, আমরা সেখানে উপস্থিত
শুধু ফাঁকি
৪৭
হব, কি জানি পাছে এবার আর তাদের চোখে
ধূলি নিক্ষেপ না কর্তে পার সেই আশঙ্কায়।
“য” “ব”কেও এই খবরই দিচ্ছে। হাজার
হাজার আলিঙ্গন এবং চুম্বনের পর এখন
তাহলে বিদায় নিচ্ছি। প্রেমসাগরে আকণ্ঠ
মগ্ন তােমারি “গ”।” (সব মেয়েরা হাসিয়া ফাটিয়া
পড়িতে লাগিল)
সুলভা।
ওঃ! কি চমৎকার। আমাকে যদি এমন কেউ
লিখতে তত বেশ হতাে!
বিজলী। হাজার হাজার চুম্বন আর আলিঙ্গন পাঠায়নি
কেউ আমাকে এই পর্যন্ত। ওঃ, তােদের
ভাই কি সৌভাগ্য।
নন্দিতা। খুব চমৎকার। কিন্তু এর মানে কি ?
( বাহিরের দিকে চাহিয়া চিঠি ফিরাইয়া দিল ) লেখা
কেউ চেন কি ? (সকলে মাথা নাড়াইয়া জানাইল
চিনে না)
অনাবিলা। (রাগিয়া) কিছুই যেন জাননা এ ভাণ করে
কি ফল ! এই চিঠি কোনাে পুরুষে লিখেছে
তােমাকে, আর এটা (আর একটা বাহির করিয়া)
অন্য পুরুষে লিখেছে বন্দিতাকে।
৪৮
শুধু ফাকি
বন্দিতা। (রাগিয়া) তাহলে আমরা আমাদের চিঠি পেলুম
কেন, শুনি? আমাদের চিঠি পত্র পর্যন্ত
খুলে পড়া হয়, এর চেয়ে নীচতা আর কি হতে
পারে!
অনাকুলা। কেমন, বলিনি দিদি ?
অনাবিলা। চুপ কর আকুলি ! কোন চিঠি খুলে পড়তে
আমি চাই না, কিন্তু তােমার পিতার প্রতি এ
আমার কর্তব্য, যিনি
অনাকুলা। (দ্রুত কথা কারিয়া নিয়া) এখনাে সীমাহীন
অনন্ত বারিরাশির ওপারে।
অনাবিলা। (মাটিতে পদাঘাত করিয়া) বিলেতে। যিনি
তােমাদিগকে আমার অভিভাবকত্বে রেখে
গেছেন; তার এবং আমার অজ্ঞাতে কোনো
পুরুষের সঙ্গে তােমর পত্রালাপ না কর এ
দেখা আমার কর্তব্য।
বন্দিতা। (রাগিয়া) বাবা ছাড়া কোনাে পুরুষ আমার
সঙ্গে পত্রালাপ করে না।
নন্দিতা। আমার সঙ্গেও না, তা ছাড়া এ সব চিঠি
আমাদের কাছে লেখা হলেওঁতা হলেও
আমরা বিশ্বাস করি না। তা হলেও কোনো
পুরুষের লেখা নয় এ গুলাে।
শুধু ফাকি
৪৯
;
অনাকুলা। দিদি, বলিছি তাে আমি ; কিন্তু তবু তােমার
সন্দেহ।
অনাবিলা। চুপ কর, আকুলি ! (মেয়েদের প্রতি) মনে
করােনা এই সব বাজে কথা আমি বিশ্বাস
করব। নন্দিতা আর বন্দিতা ছাড়া “ন” “ব”
আবার কারা, শুনি? আচ্ছা প্রবঞ্চক দুটি।
তােমাদের পিতা তােমাদের আমার কাছে
রেখে
অনাকুলা। গেছেন সীমাহীন অনন্ত বারিরাশির ওপারে ।
অনাবিলা।
( তার দিকে তাকাইয়া) বিলেতে ; গেছেন
বলেই ভাবছ তােমরা যা খুশি তাই কর্তে পার।
নন্দিতা। (রাগিয়া) না, আপনিই ভাবছেন যা খুসী
তাই কর্তে পারেন আপনি! মনে কচ্ছেন
আমরা দেখিনি, আপনারা যে কেমন চর-গিরি
কচ্ছেন আমাদের উপর ? কিন্তু পাননি তো
কিছুই এখনো ! ( দূরে দূরে সরিয়া গিয়া ঘৃণার
ভাব ফুটাইয়া রহিল)
অনাকুলা। বলিনি দিদি ?
অনাবিলা। চুপ কর, আকুলি! পাইনি কিছুই।
এসব তাহলে কি ?
শুধু কঁকি
*
নন্দিতা। কিছুই না
বন্দিতা। কিছুনার চাইতেও কম!
অনাবিলা। (ভীষণ ভাবে) কিছুনার
চাইতেও কম!
এসব অত্যন কিছুই না এসব আলিঙ্গন ও
চুম্বন কিছুই না ?
অনাকুলা। দিদি, অশ্লীল কথা বলাে না!
অনাবিলা। চুপ কর, আকুলি ! আমি বলছি—এই
চিঠিগুলো তােমাদের নিকট লেখা হয়েছে,
তােমরা যাই বলনা কেন।
নন্দিতা। (কাধ নাড়িয়া) বেশ, যা খুশী তাই মনে করে
বসে থাকুন আপনি।
(সরলার প্রবেশ)
সরলা। ঠাকরুণ, “ন” এবং “ব” কে লেখা দুটো চিঠি
নাকি ভুল করে এ বাড়ীতে ফেলে গেছে, একটা
ছোঁড়া তাই বছে আর কাঁদছে ! (সকলে চুপ)
আনাকুলা। (বিজয় গর্বে ) কেমন দিদি ! বলিনি আমি
তােমাকে ?
অনাবিলা। চুপ কর আকুলি ! (সরলার প্রতি) তুই
ঠিক বলছিস্, সে যা বলছে তা সত্যি?
~
শুধু কঁকি
সরলা। সম্পূর্ণ সত্যি। আপনি নিজেই এসে তাকে
দেখুন না।
অনাবিলা। দেখব, যাচ্ছি। (অনাবিলা ও সরলা নিষ্ক্রান্ত)
নন্দিত। (অনাকুলার প্রতি) আপনিও যান না কেন?
নিঃসন্দেহ হয়ে আসবেন।
অনাকুলা। তা যাই, দিদি ভারি ভুল করে।
( নিষ্ক্রান্ত।
(মেয়েরা সবেই চাপা রহস্যের ভাণে ভরপূর ।
বন্দিতা। (চোখ মুছিয়া ) ওঃ, কি মজা।
সুলভা। ছেলেটা কে ?
বন্দিতা। একটা ছােট্ট বেশ চালাক ছােকরা, শিখিয়ে
পড়িয়ে নিয়েছি। কি জন্য যে হচ্ছে কিছুই
না বুঝেও সে চমৎকার অভিনয় কর্তে
পেরেছে। ভেবেছিলুম এ দিয়েই মধুরেণ
সমাপয়েৎ করা যাবে। ওঃ, কি দিনটা
আমাদের যাচ্ছে !
এ পর্যন্ত কোথাও এসে এতটুকুও ঠেকৃতে
নন্দিত।
হয়নি।
বিজলি। আশা করি এতেই উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়ে যাবে।
বন্দিতা। নিশ্চয় হবে, এমন বোকাই বনেছে যে আর
শুধু কঁকি
দ্বিতীয়বার চেষ্টা করবে কোন্ মুখে। আর
করলেও আজকের কথাই মনে করিয়ে দেবাে।
নন্দিতা। এখন কি হচ্ছে দেখতে পারলে হতাে।
বন্দিত। আশা করি ফটকে আমাদের মুখ রাখবে।
ও যদি ধরা পড়ে তাহলে আর আমাদের
রক্ষা নেই।
( দ্রুত অনাকুলার প্রবেশ)
অনাকুলা। (উত্তেজিত ভাবে ) কেমন !
পরের চিঠি
খুলে বিপদে পড়বে বলিনি এ কথা দিদিকে
আগেই।
বন্দিতা। ওঃ! তাহলে এগুলাে পরের চিঠি এটা
স্থির করেছেন আপনারা।
অনাকুলা। নিশ্চয় ! আমি বরাবর তাই স্থির করেছিলুম।
( অনাবিলার প্রবেশ) আমি তো বলিছি, দিদি,
এদের চিঠি নয় এসব।
অনাবিলা। চুপ কর, আকুলি ! বলিস্ নি তুই,
আমারি মত তুইও মনে করেছিলি ? এখন
আমার উপর
ফেলছিস্ সব, তাের জন্যে
লজ্জা হয়।
অনাকুলা। বেশ, সেই ভীষণ বাড়ীতে যেতে বলেছিলুম
শুধু ফঁাকি
-
বিজলি।
আমি? আমি সহরে যাবার কথা বলিনি?
ঐ নির্দোষ মহিলাদের অপমান আমি করিছি ?
অনাবিলা। চুপ কর আকুলি !
চুপ কর আকুলি! (মেয়েদের প্রতি) দেখা
যাচ্ছে চিঠিগুলো তােমাদিগকে লেখা হয়নি।
নন্দিতা। কি আশ্চৰ্য্য!
অনাবিলা। কাজেই সে সব কথা থাক্ এখন।
বন্দিতা। (শান্ত ভাবে) সে-কি-করে-হবে।
যে-সব ঘটেছে তার সাক্ষী আমরা।
সুলভা। আর যে ভাবে এদের সঙ্গে ব্যবহার করেছেন
আপনার, সে সম্বন্ধে আমরা আমাদের অভিমত
দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
অনাবিলা। তােমাদের অভিমত এখনাে চাওয়া হয়নি।
(বন্দিতার প্রতি। আমি যা কর্তব্য ভেবেছি তা
নিয়ে আশা করি তোমরা নির্বোধের মত
ব্যবহার কর্তে চাচ্ছন।
( সরলার প্রবেশ)
সরলা। (বুকে হাত দিয়া হাঁপাইতে হাঁপাইতে ) ওঃ ঠাকরুণ,
নীচে একজন পুলিশ দাড়িয়ে—আপনাদের
দুজনেরই জন্যে এসেছে। (ভীষণ ভাবে অনাকুল।
চীৎকার করিতে লাগিল।
৫৪
শুধু ফঁাকি
অনাবিলা। চুপ কর আকুলি! সে কি চাচ্ছে, সরলা ?
সরলা।
সে বলছে আজ বিকেলে লাবণ্যপ্রভার বাড়ীতে
যে স্ত্রীলােক দুটী গিয়েছিল তাদের চাচ্ছে সে।
অনাকুলা। ( লাফাইয়া উঠিয়া) আমি যাবনা, আমি যাবনা।
এর সঙ্গে আমার কোনাে সম্পর্ক নেই।
অনাবিলা। (ভীষণ ভাবে মাটিতে পদাঘাত করিয়া) চুপ কর
আকুলি।
অনাকুলা। চুপ করব না। সব তােমারি দোষ। তুমি
যাবেই, শেষে স্ত্রীলোক দুটিকে অপমান
করলে ! এর সঙ্গে আমার কোনাে সম্পর্ক
নেই, আমি কিছুতেই যাব না। (বেগে ধাবিত
হইয়া পর্দার আড়ালে নিজকে অধিষ্ঠিত করিয়াকাদিয়া ও
বিলাপ করিয়া যাইতে লাগিল)
অনাবিলা। নীচে গিয়ে পুলিশকে বল যে সে ভুল
বাড়ীতে এসেছে। (সরলা নিষ্ক্রান্ত—সমস্ত নীরব,
অনাকুলার ফোপানি আর বিলাপ ছাড়া। অনাবিলাকে
ভীষণ ক্রুদ্ধ দেখাইল, সে আঙ্গুলে আঁচল পাচাইতে লাগিল।
মেয়েরা ভয়ের ভাণ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল )
নন্দিতা। (অনাবিলার প্রতি) ব্যাপার যে গুরুতর হয়ে
উঠলো মনে হচ্ছে।
অনাকুলা।
( পর্দার আড়াল হইতে) সব ওরি দোষ।
শুধু ফাকি
অনাবিলা। চুপ কর আকুলি! (শান্ত ভাব ধারণ করিয়া)
ব্যাপার গুরুতর কিসে হলাে তাতো বুঝিনা
সব বাজে, লােকটাকে শীগগীরই
ফিরিয়ে দেওয়া যায়।
আমি।
(সরলার প্রবেশ)
সরলা। (দৃশ্যতঃ অত্যন্ত শঙ্কিত) ওঃ! ঠাকরুণ ।
বলছে এই বাড়ীই খানাতল্লাস কৰ্তে অছে সে।
অনাকুলা। (ভীষণ ভাবে) দরজা বন্ধ করে দাও, বন্ধ
করে দাও।
অনাবিলা। চুপ কর আকুলি। বল তাকে, দশটি
টাকা দেওয়া যাবে—সে চলে যা।
(সরলা নিষ্ক্রান্ত—সব চুপ চাপ )
দীর্ঘশ্বাস গ্রহণ করিয়া) মনে হচ্ছে, ভারি
ভারি গুরুতর হয়ে উঠছে ব্যাপার।
।
বন্দিতা। (
সরলা।
( সরলার প্রবেশ)
ওঃ ঠাকৃরুণ, এতে আরাে খারাপ হলো।
সে ভারি ক্ষেপে উঠেছে—বলছে ঘুষ দিবার
অভিযােগ আবে আপনার বিরুদ্ধে।
অনাকুলা। বলিনি, দিদি-সব তােমার দোষ?
শুধু ফঁাকি
অনাবিলা। চুপ কর আকুলি! কি জন্য চাচ্ছে সে
আমাদের।
সরলা। তার সঙ্গে যেতে হবে আপনাদের, গাড়ী
দাড়িয়ে আছে—স্বেচ্ছায় না গেলে হাতকড়ী
দেখালে—পরিয়ে নেবে। অনাকুলার চীৎকার,
মেয়েরা উঠিয়া পরস্পর পরস্পরকে জড়াজড়ি করিতে লাগিল।
ভীতির ভাণ করিল)
অনাবিলা। (চেয়ারে ধপ করিয়া বসিয়া পড়িয়া চাপিয়া ধরিল )
আমি যাব না।
সরলা। যেতেই হবে-নইলে বাঁশী বাজিয়ে অন্য লােক
এনে টেনে নিয়ে যাবে বছে ! সে নিজেও
কম জোয়ান না !
অনাবিলা। আমি যাব না। (শক্ত করিয়া চেয়ার চাপিয়া
ধরিল)
সরলা।
সে বল্ছে যেতেই হবে।
অনাবিলা। আমি বছি যাবই না !
সরলা। ( মাথা নাড়িয়া) শেষে টেনে হিচড়ে নেবে সেটা
ভালাে হবে না, ঠাকরুণ ।
অনাবিলা। কোনাে পুরুষ ছুঁতে পারবে না আমাকে।
অনাকুলা। ছুঁবেই ! যেতে হবে তােমাকে, দিদি।
তুমি গেলে আমার না গেলেও চল্বে, আমি
. ***,
শুধু ফঁাকি
৫৭
তো কিছু করি নি। এমন স্বার্থপর হয়ােনা
দিদি।
অনাবিলা। চুপ কর, আকুলি।
নন্দিত। আমরা চার জনেই নীচে গিয়ে পুলিশের
লােকের সঙ্গে দেখা করব, দেখি কি জন্যে
এসব হচ্ছে। আপনারা আপনারা সে বাড়ী
থেকে কিছু নিয়ে আসেন নি তাে –অবিশ্যি
ভুল করে ?
অনাবিলা। নন্দিতা !
সরলা। ওঁরা নাকি দুটি বড় ঘরের স্ত্রীলােক—অপমান
করে এসেছেন, তারি জন্যে।
অনাকুলা। (চীৎকার করিয়া)
আমি করিনি, আমি
করিনি। ওকে বল আমি একটি কথাও
বলিনি। দিদিই সব করেছে।
অনাবিলা। চুপ কর, আকুলি।
নন্দিতা। যাক, আমরা দেখি গিয়ে কি করা যায়।
(বালিকা চারিটী এবং সরলা নিষ্ফাও)
( অনাবিলা চেয়ারে রহিল ; অনাকুলা পর্দার আড়াল
হইতে কাদিতে কাদিতে তার দিদিকে গালি দিতে লাগিল।
অনাবিলা শুধু মাঝে মাঝে “চুপ কর, আকুলি” বলিতে
শুধু ফঁাকি লাগিল। শেষে অনাবিলা উঠিয়া সরলাকে : ডাকিল, এবং আবার বসিল। অত্যন্ত ভীত অবস্থায় সরকার প্রবেশ) অনাবিলা। কি হচ্ছে ? কি হলো বলছি না কেন এসে ? সরলা। ঠাকৃরুণ ! ভয়ঙ্কর অবস্থা! তিনজন পুলিশের লােক এসে উপস্থিত হয়েছে—কত কথা- ওরা বলছে তােমাদের দুজনকেই নিয়ে যাবে- ( অনাকুলার বিলাপ) শেষে নন্দিতা আর বন্দিতা দিদিমণি কেমন ভালাে মেয়েরা! চোখে জল নিয়ে, প্রায় মাটিতে জানু পেতে, জোড় হাত করে কত সাধাসাধি। ওরা বলে যে—না, সেই স্ত্রীলােক দুটি—কোন জমিদারের বৌ নাকি—ভীষণ ক্ষেপেছে, কিছুতেই ছাড়বে না, ঐ সময়ই আপনি ডাক দিলেন তাই চলে এলুম। অনাবিলা। যা, সরলা, আবার দেখ গিয়ে কি হলাে- তাড়াতাড়ি জেনে আয়। ( সয়লা নিষ্ক্রান্ত অনাবিলা উঠিয়া পায়চারি করিতে লাগিল ) অনাকুলা। দিদি, কি নিষ্ঠুর ধূৰ্ত্ত তুমি। এই বিপদ ; এনেছ ডেকে ! স্বার্থপর! কুটিল। বিদ্বেষ- পরায়ণ !
শুধু ফাঁকি
*;
অনাবিলা। (গম্ভীর স্বরে) আকুলি, তুই যদি এক্ষনি চুপ
না করি তাহলে আমি নিজেই পুলিশ ডেকে
উপরে আনব। (অনাকুলা সম্পূর্ণ নীরব, শুধু মাঝে
মাঝে নাকের শব্দ শোনা যাইতে লাগিল-সরলার প্রবেশ
কি সরলা ?
সরলা। ওঃ! মনে হচ্ছে বন্দিতা আর নন্দিতা দিদিমণি
-ওঃ! কি ভালো মেয়ে তারা-দয়ার
শরীর—তারা বলে কয়ে মনে হচ্ছে একটা
ঠিক করে এনেছে। আমি তাদের বলতে
শুনেছি—“আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ রইলুম,
কৃতজ্ঞ রইলুম”। তারপর তারা কি জানি
কি লিখতে লাগছে। ঐ তারা আছে !
(মেয়েদের প্রবেশ, অত্যন্ত অভিভূত হইয়াছে মুখে তাহাদের
সেই ভাব, নন্দিতা ছাড়া সকলে চেয়ারে গা ছাড়িয়া বসিয়া
পড়িল ; নন্দিতা হাতে কাগজ লইয়া টেবিল হেলান দিয়া
প্রায় হাঁপাইতে হাঁপাইতে বলিল)
নন্দিতা। (অনাবিলার প্রতি পুলিশের লােকেরা চলে
গেছে।
অনাকুলা। (পর্দার আড়াল হইতে মাথা বাহির করিয়া) চলে
গেছে? ঠিক চলে গেছে ? আবার ফিরে
আসবে না তাে ?
শুধু ফঁাকি নন্দিতা। না, এখন বেরিয়ে আসতে পারেন। (অনাকুলা আসিল) অনেক বেগ পেতে হয়েছেন, বন্দিতা ? বন্দিতা। বেগ বলে বেগ! সুলভ। এই মেয়ে দুটো আজ এমন বুদ্ধি এবং সাহস দেখলে আজ আপনাদের যে কি দশা হতাে তাই ভাবি। বিজলী। বাস্তবিক, ধন্যবাদ দিতে হয় এদেরে। অনাবিলা। আমি কৃতজ্ঞতা স্বীকার কচ্ছি। কি হলো ? নন্দিতা। ওরা বল্লে যে জমিদারের স্ত্রী একেবারে ক্ষেপে গিয়েছে, স্বয়ং বিলাসপুরের জমিদার নাকি পুলিশের কাছে গিয়েছেন, বল্লে ওঁরা ঠিক করেছেন—যে করেই হােতূ ঐ নীচ স্বভাবের মাগী দুটোকে শাস্তি দিতেই হবে। অনাকুলা। “নীচ স্বভাবের মাগী” বলেছে আমাদের ? শুনলে দিদি, কি অবস্থায় এনেছ তুমি আমাদের। অনাবিলা। (হঁপাইতে হাঁপাইতে) চুপ কর, আকুলি । নন্দিত। বল্লে এমন ভীষণ প্রকৃতির স্ত্রীলােকদের শাস্তি দেওয়াই উচিত। তা ছাড়া বিলাস-
শুধু ফাঁকি
পুরের জমিদার তিনি। যা ইচ্ছা তাই কর্তে
পারেন।
অনাবিলা। তারপর কি হলাে ?
নন্দিত। আমি অনুরােধ উপরােধ কৰ্তে লাগলুম।
সরলা। হাঁ, তা তুমি করেছ—পুলিশের লােকের সঙ্গে
এমন কথা কাটাকাটি, তােমার সাহসওতো
কম নয়, বড় দিদিমণি ! খুব করেছ তুমি
আমি তাে এতটা কৰ্ত্তম না, আমাকে যদি
কেউ এমন সন্দেহ কর্তো তো তাকে জেলে
পাঠিয়ে ছাড়তুম। আমি সে পরিষ্কার বলে
দিচ্ছি।
নন্দিতা। ( দৃঢ় ভাবে ) সরলা, তাের মুখে সাজে না
এ কথা! চুপ কর তুই। শেষে লােকটী
নরম হলাে, বল্লে এখন যদি আপনি শ্ৰীমতী
হিরন্ময়ীর কাছে বিনীতভাবে লিখিত ত্রুটী
স্বীকার করেন, তাহলে বিলাসপুরের
জমীদারকে তারা বলে কয়ে বুঝিয়ে রাখবেন।
অনাকুলা। যাও, এখনি লিখে দাও! আমিও লিখব,
জানিয়ে দেব যে আমি এতে ছিলুম না !
অনাবিলা। চুপ কর আকুলি !
শুধু ফাকি
'।
নন্দিতা। পুলিশের লােকটী কি লিখতে হবে তাও
বলে দিলে। (কাগজ হইতে পড়িল) “মহামান্য
শ্ৰীমতী হিরন্ময়ী রায় চৌধুরাণী বরাবরেষু ,আমি
সুগভীর অনুতাপের সহিত বিনীতভাবে মহা-
শয়ার কাছে এই ক্ৰটী স্বীকার করিতেছি যে
আমি সেদিন আপনাদের সঙ্গে যে ব্যবহার
করেছি তাহা আমার পক্ষে ঘােরতর অন্যায়
এবং নীচ জনােচিত হইয়াছে”।
অনাবিলা। এ রকম ত্রুটী স্বীকার আমি কিছুতেই
করব না।
নন্দিত। ( কঁাধ নাড়িয়া) বেশ, না করেন না কৰ্বেন।
বন্দিতা ! ওঃ! তাহলে মিছামিছি এত কষ্ট করলুম।
অনাকুলা। তােমাকে এ লিখতেই হবে, লিখতেই হবে
দিদি।
অনাবিলা। চুপ কর আকুলি, বলে যাও নন্দিতা।
নন্দিতা। (পড়িতে লাগিল) “আমি স্বীকার করিতেছি
যে আমার প্রকৃতি অত্যন্ত সন্দেহপরায়ণ,
সেই জন্য আমার সঙ্গে যারা বাস করে
তাহাদের পক্ষে তাহা"
অনাবিলা। (রাগিয়া) এ আমি লিখবই না
শুধু ফাঁকি
অনাকুলা। এ সত্যি,দিদি, এ সত্যি, তােমাকে লিখতেই
হবে এ কথা।
{
অনাবিলা। চুপ কর আকুলি। আরাে কিছু আছে নাকি?
নন্দিত। আর বেশী নয়! (পড়িতে লাগিল ) অত্যন্ত
কষ্টদায়ক হইয়া উঠে। অদ্যই আমি
অত্যন্ত অন্যায়, সন্দেহের বশীভূত হইয়া,
আপনাদিগকে, দুজন ছদ্মবেশী পুরুষ মনে
করিয়াছিলাম। কি নিলজ্জার কাজ আমি
করিয়াছি—আমার দুটি ছাত্রী এবং আপনাদের
সম্বন্ধে তাহা এখন আমি সম্পূর্ণ হৃদয়ঙ্গম
করিতেছি। আমি এখন করজোড়ে প্রার্থনা
করিতেছি, আপনি আমাকে ক্ষমা করিয়া
আমার এই ক্ৰটী স্বীকার গ্রহণ করতঃ আপনার
পরিবারােচিত মহত্ব দেখাইবেন। তারপর
অবশ্যি আপনার স্বাক্ষর থাকবে।
অনাবিলা। ( দৃঢ়ভাবে ); না, এ সব কিছুতেই আমি
লিখব না।
অনাকুলা। লিখবেই তুমি, লিখতেই হবে, আর এও
লিখবে তোমার বােনের এতে কোন দোষ
নেই।
অনাবিলা। কিছু লিখব আমি এর—সব লিখব না।
বন্দিতা। (উঠিয়া) আপনি যদি এ সব না লেখেন তাহলে
বাবার কাছে লিখে দেব তিনি যেন আমাদের
অন্যত্র থাকবার বন্দোবস্ত করেন। আর যদি
লেখেন তাহলে এটাকেই আমাদের কাছে ও
প্রকাশ্য ক্ৰটী স্বীকার বলে গ্রহণ করব আমরা।
সরলা। আর যদি না লেখেন তাহলে নিশ্চয়ই
আপনাদের ধরে নিয়ে যাবে।
অনাকুলা। (অনাবিলাকে ধরিয়া) লিখবই, লিখতেই হবে
তােমাকে দিদি।
(সকলে কিছুক্ষণ চুপ চাপ। অনাবিলা দাঁড়াইয়া মনস্থির
করিতে লাগিল ; সকলে স্থির হইয়া তাহার দিকে চাহিয়া
রহিল।
অনাবিলা। (নন্দিতার নিকট হইতে কাগজ ছিনাইয়া লইয়া)
বেশ! (দরজার দিকে ধাবিত হইল; অনাকুলা অনুসরণ
করিল) তাের এসে দরকার নেই, আকুলি।
অনাকুলা। ওঃ! আমি যাবই। আমি দেখ আমার
কথাটা লিখছ কিনা! (উভয়ে নিষ্ক্রান্ত-মেয়ের
হাসি চাপিয়া রাখিল )
সরলা। ওঃ! বড় দিদিমণি, এই সব দুষ্টমির কথা
শুনে তোমাদের বাবা কি বলবেন ! আমার
;
শুধু ফাঁকি
৬৫
ভয় কচ্ছিল বুঝি নেবে গিয়ে নিজেই পুলিশের
সঙ্গে কথা কবে।
সুলভ। এমন আমােদ ভােগ করিনি কোনাে দিন
জীবনে! সব ফাকি জানলে কি জানি বলবে
তারা।
নন্দিতা।
বন্দিতা। সে কখনাে টের পাবে না।
বিজলী। (উঠিয়া) চল সুলভ, বাড়ী যাই আমরা।
আর হাসি চেপে গম্ভীর হয়ে থাকতে পারছিনা
এখানে-বাড়ী গিয়ে একবার মন খুলে হাসি।
এত ভালোয় ভালােয় শেষ হবে জানতুম না।
একেবারে আশাতীত।
সুলভা। সরলা, মটর ঠিক করতে বল। ওরা ফিরে
আসবার আগেই পালাই।
সরলা। তােমরা সব দেখে গেলে ভালােই, কোনাে
মুস্কিল উপস্থিত হলে এদের হয়ে বলতে
পারবে।
বন্দিতা। মুস্কিলের কোনো আশঙ্কা নেই, সরলা ;
এইবার তাদের শিক্ষা হয়ে যাবে সে দেখে
নিস্। (সরলা নিষ্ক্রান্ত)
বিজলী। চল্ ভাই।
শুধু ফাঁকি সুলভ। খুব মজা ভোগ করে যাওয়া গেল আজ। বন্দিত। একেবারে রীতিমত । নন্দিতা। (তার দরজার দিকে যাইতেছে তখন) শ্ৰীমতী হির- স্ময়ীর সঙ্গে দেখা হলে বলো সব—আর এ কথাও বলাে এরা আজকের কথা আর ভুলতে পারবে না কখনাে। ( সকলে হাসিয়া উঠিল—কিন্তু চাপা ভাবে—নিষ্ক্রান্ত) যবনিকা
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.