Bally Sadharan Granthagar

Poush Parban

Mukhopadhyay, Sri Sailajananda · 2009/08/5

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

পৌষ-পারুণ
উপন্যাস
শ্রীশৈলজানন্দ মুখােপাধ্যায়
দাম দুই টাকা

শ্রীভুবনমােহন মজুমদার রি-এস, সি
শ্রীগুরু লাইব্রেরী
২৪নং কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট
কলিকাতা
All rights reserved to Maya Bagclio
ভাদ্র ১৩৩৮ সাল
প্রিন্টার-ঐমিহিরচন্দ্র ঘোষ
নিউ সরস্বতী প্রেস
২৫। মেছুয়াবাজার ঐট,
কলিকাতা।

পৌষ-পার্বণ প্রথম পরিচ্ছেদ কয়লা-কুঠির পৌষ-পার্বণ। তিনদিন ধরিয়া সাঁওতাল কুলিদের ‘বাদ’ উৎসব চলিতেছিল। প্রবাদ আছে, এইদিন দামােদর নদীতে স্নান করিলে নাকি তাহাদের সমস্ত পাপক্ষয় হয় ; তাই গত রাত্রে যাহার। দামােদরে গিয়াছিল, রাত্রি তৃতীয় প্রহরে স্নান করিয়া এতক্ষণে ‘সিরিং' গান গাহিতে গাহিতে তাহারা ফিরিয়া আসিল। যাহার দামােদরে যায় নাই, তাহারা খা-পুকুরের ঠাণ্ডাজলে স্নান করিয়া উঠানে বসিয়া মদ খাওয়া শুরু করিয়াছে। দূরে চার-নম্বর কুলি- ধাওড়ার কোড়া কুলি গুলা, মেয়েদের হাত ধরাধরি করিয়া

২
পৌষ-পার্বণ
মাদল বাজাইয়া গান গাহিতেছে।
-বােম্ ভেলা ভােলানাথ,
সব কাজেই করে বসে ভুল রে-
সব কাজেই করে বসে ভুল !
সঙ্গে আছে মড়ার মাথা,
বাঘ-ছালের আসন পাতা,
কানে গোঁজা ধুতুরারি ফুল গাে-
( ও তার) কানে গোঁজা ধুতুরারি ফুল ।
নেশা খেয়ে আঁখি ঢুলু চুল গাে
নেশা খেয়ে আঁখি ঢুলু ঢুল!
বাস ,
সাওতাল-কুলিদের বাগান-ধাওড়ার পাশে একঘর বাউরী
করিত। সেখানে থাকিত লখাই, তার স্ত্রী আমােদী,
আর একটা কুড়াইয়া-পাওয়া মেয়ে-লাটুনী। একটা ছেলে
ছিল, সেও আবার গত বৎসর কলা-খাদে কাজ করিতে গিয়
মরিয়াছে। লখাই ভাবিয়াছিল, ললাটুনীর সঙ্গে ছেলেটার
বিবাহ দিয়া তাহারা চারজনে বেশ সুখে-স্বচ্ছন্দে বাস করিবে,
কিন্তু বিধাতা বাধ সাধিলেন। ছেলেটা মরিবার পর হইতে
তাহাদের সংসারের অবস্থাও বেশ একটু অসচ্ছল হইয়া

পৌষ-পার্বণ
পডিয়াছিল। লখাই দিনরাত মনের দুঃখেই থাকে ; খাদে
‘টালােয়ানী’ করিয়া যাহা রােজগার করে, তাহাতে কোনরকমে
তাহাদের দিন চলিয়া যায়।
লােটনী কাল হইতে সাঁওতালদের ‘
বন-পরব’ দেখিবার
জন্য ব্যানার্জি-সন্তানের কুলি-ধাওড়ায় চলিয়া গেছে। ছেলেটা
যখন বাচিয়া ছিল, আমােদী তখন এই পৌষ-সংক্রান্তির মকর
উৎসবে কং না ফুর্তি করিয়াছে, এখন আর সে-সবে তাহার
মনও নাই, তাহার উপর কয়েকদিন ধরিয়া লখাই এর জ্বর
আসিতেছিল, কাজেই সে ঘরের বাহির হইতেও পায় নাই।
সকালে উঠিয়া মনে করিয়াছিল, উনানে একথালা ভাত ফুটাইয়া
লইয়া সম্বৎসরের সাধ, আজ একটু আমােদ-আলাদ করিবে।
সাঁওতালদের গান শুনিতে শুনিতে কয়লায় আগুন, ধরাইয়া
ঘরের ভিতর চাল আনিতে যাইবে, এমন সময় দেখিল, জরের
তাড়নায় লখাই বেহুস হইয়া পড়িয়া আছে এবং বিছানার
উপরেই খানিকটা বমি করিয়া রাখিয়াছে।-আমােদী তাড়াতাড়ি
বিছানাটা পরিষ্কার করিয়া, স্বামীকে একটু সরাইয়া দিয়া বলিল,
—এই! ওদিকে সরে’ ৩।
লখাই একবার আ: বলিয়া পাশ ফিরিল।

৪।
পৌষ-পার্বণ
আমোদী চীৎকার করিয়া বলিল,-ই এক জ্বালা হলে।
দেখছি। তুই এবারে মরে গেলেই খালাস্ পাই আমি।
আর সে লুটনী হারামজাদীও তেমনি। কাল থেকে গেল,
এখনও ফিবার নাম নাই।... আসুক একবার, দেখাচ্ছি
মজা।
আমােদর চোখ-মুখের ভাব দেখিয়া মনে হইল, লােটনীকে
পাইলে সে হয়ত খুন করিয়া ফেলিবে।
হাঁড়িতে চাল আনিতে গিয়া দেখিল, চাল নাই।
ক’দিনই বা থাকিবে ? চারদিন লখাই কাজ করিতে যায়
নাই, তাহার উপর একজনের রােজগারে দু’জন বসিয়া বসিয়া
খাইতেছে।
আমােদী বাহিরে আসিয়া দেখিল, সাওতাল, কোড়া
ইত্যাদি তাহার প্রতিবেশীরা আমােদ-আহ্লাদ করিতেছে, মদ
খাইতেছে, নাচিতেছে এবং গান গাহিতেছে। তাহার কাছে
এ-সব বিষের মত মনে হইতেছিল।
আমােদী ধীরে-ধীরে কুঠির ডাক্তারখানায় গিয়া বসন্তবাবুর
কাছ হইতে স্বামীর জন্য একশিশি ‘দাওয়াই’ চাহিয়া বলিল,-
একদিনেই ভাল করে দিতে হবে ডাক্তারবাবু। তুর পায়ে
পড় ছি ডাক্তার, ভাল ওষুধ দিস।

পৌষ-পার্বণ ঔষধ লইয়া আমােদী ঘরে ফিরিতেছিল, পথে মনে পড়িল, স্বামী, না-হয় অাজ কিছু খাইবে না, কিন্তু তাহার নিজের পেটটা তো কোন রকমে ভরাইতে হইবে । আবার সে লােটনী হারামজানী যদি আসিয়া হাজির হয়, তাহারও পিণ্ডি চটকাইবার ভার যে তাহারই উপর !......কি করিবে সে ? পরবের দিনে কাহার কাছে গিয়াই বা সে হাত পাতিবে? আর হাত পাতিলেই যদি পাওয়া যাইত, তাহা হইলে ভাবন। ছিল না। ছিল । বাবুদের সরকারী বাসায় নরু বলিয়া বহুকালের এক চাকর সে তাহাকে চিনিত। আমােদী তাহার কাছে গিয়া নিতান্ত ভিখারিণীর মতই কহিল, নরু ভাই, আমাকে আধসের- খানে চাল দিতে পারি ? কুঠির ম্যানেজার বাবু সুমুখের ঘরের মেঝের উপর একটা ‘ইজি চেয়ারে হেলান্ দিয়া শুইয়াছিলেন। তিনি বােধহয় কথাটা। শুনিতে পাইলেন, কহিলেন,–নরো, कि বলছে রে ? -আপসেটা চাল চাইছে। কুঠির হর্তাকর্তা বিধাতা স্বয়ং ম্যানেজারবাবু চোখের সুমুখে বসিয়া রহিয়াছে, অথচ মাগী কি না তাহাকে কিছু না বলিয়া

পৌষ-পার্বণ
ভৃত্যের নিকট চাহিতে গেল। তিনি চীৎকার করিয়া বলিয়া
উঠিলেন,-খবরুদার নরাে, আমার হুকুম ছাড়া কাউকে এক
ছটাক চাল দাতব্য করতে পাবি না। এটা দানছত্র পেয়ে
গেছি বুঝি? বলিয়া একটুখানি থামিয়া তিনি আবার
বলিলেন, লখা হারামজাদা তাে আজ পাঁচদিন খাদের পাশ
ঘেসেনি আর, সেদিন ওই লুটুনী-হারামজাদীকে বলুম
আমার বাসার এটো বাসন ক’টা মেজে দিয়ে যা, তা আর
দেওয়া হলো না। আজ কিনা এসেছেন চাল চাইতে,-এ্যা!
তিনি দাত-মুখ খিচাইয়া আরও কি যেন বলিতে যাইতে-
ছিলেন। অভিমানে আমােদর চোখ দিয়া তখন
গড়াইতেছে। গরীব হইলেও সে এমন করিয়া কোনদিন
কাহারও কাছে ভিক্ষা চাহিতে আসে নাই। আজ নিতান্ত
দায়ে পড়িয়াই তাহাকে আসিতে হইয়াছিল । সে কোন
কথার প্রতিবাদ না করিয়া লজ্জায় জড়সড় হইয়া ধীরে ধীরে
সেখান হইতে চলিয়া গেল।
ঘরে আসিয়া দেখিল, লখাই বিকারের ঘরে সারাঘর
গড়াইয়া গড়াইয়া ছটফট করিতেছে আর আপন-মনে কত কি
বলিয়া যাইতেছে।

পৌষ-পার্বণ
৭
শিশি হইতে কঁাসার বাটিতে একদাগ ঔষধ ঢালিয়া,
অমােদী তাহার মুখে দিতেই ঔষধটা চোয়াল বাহিয়া গড়াইয়া
আসিল, পেট পর্য্যন্ত পৌছিল না।
আমােদী ভাবিল, একবার ডাক্তারবাবুকে দেখাইলে ভাল
ডাক্তারবাবু বাইসাইকে লইয়া অন্যত্রে যাইবার ব্যবস্থা
করিতেছিলেন, এমন সময় আমােদী আসিয়া ধরিয়া বসিল,
একবার যেতে হবে ডাক্তারবাবু।
বসন্ত-ডাক্তার নিজের
কাজ সারিয়া মাতলা-ধাওড়ায়
আরও দুইটা রােগী দেখিয়া অপরাহু-বেলায় যখন আমােদর
ঘরের উঠানে আসিয়া দাড়াইল, তখন আমােদী লপাইয়ের
জীবনের আশা একেবারে ছাড়িয়া দিয়া, বিছানার পাশে
বসিয়া বসিয়া কাদিতেছে। ডাক্তার দেখিল, তাহার শাস
উঠিতেছে ।
এবং কিছুক্ষণ পরে ডাক্তার দাড়াইয়া থাকিতে
থাকিতেই, লখাই তাহার মাথাটা বারকক এদিক-ওদিক করিয়া
একবার ডাক্তারের দিকে একবার আমােদর দিকে তাকাইয়া
স্তির দৃষ্টিতে তাকাইয়া খাপ চি খাইতে লাগিল। নিষ্প্রভ চোখের
কোণ বহিয়া দ দ করিয়া অঞর ধারা নামিয়া আসিল এবং
পরক্ষণেই বক্ষের স্পন্দন বন্ধ হইয়া গেল।

পৌষ-পার্বণ
আমােদী নিরুপায়। ডাক্তারবাবুর পা-দুইটা জড়াইয়া
ধরিয়া কাদিতে কাদতে বলিয়া উঠিল, আমি কি করব বাবু,
আমার যে আর কেউ নাই।
এই নিঃসহায় কুলি-রমণীর কাতর ক্রন্দন শুনিয়া ডাক্তারের
চোখ দু'টা জলে ভরিয়া আসিল। শবদাহের
করিবার জন্য কয়েকজন কেঁড়া ও সাঁওতাল কুলিকে বলা
হইল, কিন্তু আজ উৎসবের দিন, তাহারা কেহই যাইতে রাজি
হইল না। অবশেষে বসন্তবাবু নিজে বাইকে চড়িয়া এদিক
ওদিক ছুটাছুটি করিয়া জনকতক চামার মাল-কাট। দিয়া
লখাইএর শবদাহের ব্যবস্থা করিয়া দিল।
আমােদী তাহাদের সঙ্গে নিজেও একবার শ্মশানে যাইতে
চাহিল, কিন্তু ডাক্তারবাবু তাহাকে যাইতে দিল না।
আমােদী নিজের অদৃষ্টকে ধিক্কার দিয়া বসিয়া বসিয়া
কাদিতে লাগিল।
রাত্রিটা কোনরকমে কাদিয়া পার হইল কিন্তু পরদিন কিছু
খাইয়া তাহার আর উঠিবার ক্ষমতা রহিল না। অথচ, ঘরে
এক মুঠা চাল নাই,-কি করিবে? খাদে কাজ সে কোন দিনই

পৌষ-পাৰ্বণ
করে নাই। সে যদি-বা কাজ করিতে চাহিয়াছে, লখাই তাহাকে
কোনদিন কাজ করিতে দেয় নাই।
ঘরে একটা কাসার থালা আর গােটাকতক পিতল-কাসার
ভাঙ্গ’ গেলাস বাটি ছাড়া কিছু ছিল না। থালাটা বিনােদ
মরার দোকানে আট আনায় বন্ধ ক রাখিয়া আমােদী চার
আনার চাল কিনিল। বাকী চার আনা পয়সা বিনােদ তাহার
আগেকার পাওনা দরুণ কাটিয়া লইল।
আধসের চালে তাহার না হয় একটা পেট দুবেল। চলিতে
পারে, কিন্তু লােটনী আসিলে তে। চলিবে ন!! তাহাকে
ছাড়িয়াও তো সে থাকিতে পারিবে না,-আহা, সে তার মা-বাপ
জানে না, কোথায় হয়ত এতদিন না খাইয়াই মারা যাইত।
সে যে তাহাকে নিজের মেয়ের মত আদর-যত্নে এত বড়টি করিয়া
তুলিয়াছে। মায়ের স্নেহ দিয়া যাহাকে সে ভালােবাঙ্গিয়াছে,
তাহাকে ভুলিতে পারা বড় সহজ কথা নয়।
সন্ধ্যার সময় বাকী একপােয় চাল উনানে চড়াইয়া দিয়া,
আমােদী কঁদিতেছিল আর ভাবিতেছিল, যে-স্বামীকে সে
চিরকাল গালাগালি দিয়াছে, এমন-কি মরণের পূৰ্বদিন পর্যন্ত

পৌষ-পার্বণ
যাহাকে মরিয়া যা বলিয়া ভৎসনা করিয়াছে, তাহার অভাব
আজ তাহাকে যে এমন করিয়া পথের কাঙালিনী সাজাইয়া
এতখানি আঘাত দিতে পারে, সে-কথা তো সে একটি দিনের
জন্যও ভাবিতে পারে নাই।
ভাতগুলা ফুটিয়া উঠিয়াছিল ; এমন সময় দেখিল, সুমুখে
বড় ধনা ক্ষেতের পাশ দিয়া আধ আলো-অন্ধকারে গা ঢাকিয়!
হাসিতে হাসিতে হেলিয়া দুলিয়া লোটনী সেই দিকে অগ্রসর
হইতেছে।
তাহাকে হাসিতে দেখিয়া আমােদীর সর্বাঙ্গ জ্বলিয়া উঠিল ।
রাগে অধৈর্য হইয়া উঠানের উর হইতে একটা বড় কয়লার
ঢেল তুলিয়া লইয়া তাহার দিকে ছুড়িয়া দিয়া সে বলিয়া
উঠিল,-ঘর ঢুকতে হবে নাই হারামজাদী,-বেরো বলছি।
বাড়ীতে ঢুকিবার পূর্বেই লােটনী যে এমন অভ্যর্থনা পাইবে,
তাহা সে আশা করে নাই। কলার চাংড়াটা তাহার বুকের
উপর এমন জোরে আসিয়া লাগিল যে, সে ‘উ: মা গো’ বলিয়া,
বুকে হাত দিয়া সেইখানেই বসিয়া পড়িল।কিন্তু আমােদী
তখনও থামে নাই। আবার আর-একটা চ্যালা কাঠ লই।
তাহারই দিকে সে অগ্রসর হইতেছে দেখিয়া লোটনী তাড়াতাড়ি
সেখান হইতে উঠিয়া ছুটিয়া পলাইয়া গেল।

পৌষ-পাৰ্বণ
১১
উনান হইতে ভাতের হাঁড়িটা নামাইয়া কয়েকটা শালপাতায়
টালিয়া, সেই এক পােয় চালের ভাত, দুই ভাগ করিয়া আমােদী
ডাকিল, লােট।
ভাবিয়াছিল, লােটনী হয়ত অন্ধকারে ঘরের পাশেই কোথাও
শুকাইয়া আছে, খাইবার সময় ডাকিলে নিজে হইতেই
আসিবে। কিন্তু তাহার কোন সাড়াশব্দ না পাইয়া আমােদী
ভাবিল, মার খাইয়া হয়ত তাহার অভিমান হইয়াছে, তাই সে
সাড়া দিল না।
কেরােসিনের ডিবেটা হাতে লইয়া আমােদা তাহার ঘরের
চারপাশ ভাল করিয়া দেখিল, আম-বাগানট। তন্ন-তন্ন করিয়া
সন্ধান করিল, কোথাৎ লোটনীকে দেখিতে পাইল না। তিন
চার বার তাহার নাম ধরিয়া চীৎকার করিয়া ডাকিল, কোন
উত্তর পাইল না।
অবশেষে নিরাশ হইয়া ঘরে ফিরিতেই হা দেখিল, তাহাতে
তাহার মনে হইল, নিজের মাথাটা পাথরের উপর কিয়া
ভাঙ্গিয়া ফেলে। লােটনীকে খুজিতে যাইবার সময় এমনি
অন্যমনস্ক হইয়া বাহির হইয়া গিয়াছিল যে, ঘরে ভাত বাড়িয়াছে,
অথচ শিকলটা টানিয়া দরজাটা বন্ধ করিয়া যায় নাই। দেখিল,

পৌষ-পার্বণ
ইহারই মধ্যে, সাঁওতালদের একটা কালো কুকুর কোন সময়
ঘরে ঢুকিয়া পাতা-দুইটা একেবারে পরিষ্কার করিয়া দিয়া মুখ
চাটিতে চাটিতে বাহির হইয়া আসিতেছে।
--ওমা, এই রাক্ষুসে খাভরা কল্লে কি গাে'—বলিয়া
আমােদী তাহার হাতের জলন্ত ল্যাম্প টা তাহার দিকে ছুড়িয়া
দিতেই ডিবের সমস্ত কেরােসিনটুকু উঠানে পড়িয়া দপ, করিয়া
জলিয়া উঠিল। কুকুরটা কাই কঁাই করিয়া ছুটিয়া পলাইল ।
আমােদী অন্ধকারেই মাটির কলসি হইতে ফুট। একটা বাটির
উপর কয়েক বাটি জল ঢালিয়া পেটের জ্বালায় ঢক ঢক করিয়া গিলিয়া
ফেলিয়া ছেড়া কাথা মুড়ি দিয়া জড়সড় হইয়া শুইয়া পড়িল ।
পরদিন প্রভাতে আমােদী কি করিবে তাহাই ভাবিতেছে ।
বাবুদের চাকর নৰু সেই পথ দিয়া পার হইয়া যাইতেছিল,
আমােদীকে বসিয়া থাকিতে দেখিয়া হঠাৎ থমকিয়া দাড়াইয়া
পড়িল। জিজ্ঞাসা করিল,-লােটনী কোথা, আমােদী ?
-কেনে?
-আজ থেকে সে আমাদের বাসায় কাজ করবে বলেছে।
আমােদী একটা ঢোক গিলিয়া বলিল, কথ বললে ?
—কাল সন্ধ্যাবেলায় বলে এলো যে !•••পাঠাই দিস তাকে,
ভাত দিব ।

পৌষ-পার্বণ
আমােদী জিজ্ঞাসা করিল, আমি গেলে চলবে নাই
রেন ?
তবে তঁই-ই যাস, বলিয়া নৰু চলিয়া গেল।
•••এদিকে সারারাত্রি উপবাস করিয়া, এচৌধুরীর একটা
কুলি-ধাওড়ার চালায় লােটনী কোন রকমে শীতের রাত্রিটা
কাটাইয়া পরদিন ভাবিতেছিল, সে ঘরে ফিরিয়া যাইবে, কি
যাইবে না। অবশেষে যাওয়াই স্থির করিয়া এদিক-ওদিক
থুরিয়া ফিরিয়া, বেলা তৃতীয় প্রহরের সময় সে তাহাদের দরজায়
আসিয়া দাড়াইল। দেখিল, বাহির হইতে শিকলটা বন্ধ
রহিয়াছে। রােদের দিকে পিঠ করিয়া উঠানে একবার বসিল ;
ভাবিল, আমােদী হয়ত কোথাও বেড়াইতে গেছে, আর লােখাই
টব গাড়ী ঠেলিতেছে। বেশীক্ষণ বসিয়া থাকিতে ভাল লাগিল
মনে পড়িল, ম্যানেজারের বাড়ী চাকরীর কথা।
বাবুদের বাসার ভাঙা প্রাচীরের পাশে উকি মারিয়া নরুকে
ডাকিতে গিয়া সুমুখেই দেখিল, আমােদী হেঁটমুখে বসিয়া বসিয়া
এটো বাসন মাজিতেছে ! তাড়াতাড়ি সেখান হইতে সরিয়া
আসিয়া লােটনী বাড়ী ফিরিতেছিল, হঠাৎ মনে হইল, আমােদী
যে তাহাকে কয়লা ছুড়িয়া মারিয়াছে এবং রাত্রে থাইতে দেয়
নাই সে-কথা তাহার বাবাকে জানাইয়া আসে।
না।

১৪
পৌষ-পার্বণ
লখাই খাদের মুখ হইতে ডিপাে পর্যন্ত ট্রাম-লাইনের উপর
কয়লা-বােঝাই টবগাড়ী ঠেলিত। এখন সে যে টব-গাড়ী ঠেলে
এবং এই টালােয়ানী কাজে চিরদিনের মত ইস্তফা দিয়া
কোথায় চলিয়া গেছে, সে-খবর সে জানিত না। একটা নিম
গাছের নীচে দাড়াইয়া লােটনী দেখিল, চার পাচ বার ঘুরিয়া
টবগাড়ী গুলা পার হইয়া গেল, তবু লখাইএর দেখা আর মিলিল
না। সে অতিষ্ঠ হইয়া তাহাদেরই প্রতিবেশী এক সাঁওতালকে
জিজ্ঞাসা করিল,-বাবা কোথা, কালিন্দী ?
-বাহারে ! তুই ছিলি কোথা ! পরশু তাের বাবা মরেছে,
সে খবর জানিস না ?
ললাটনী বিস্ময়াহত হইয়া তাহার মুখের পানে তাকাই
বলিল, কি বল্লি ? কে মরেছে ?
—তুর বাবা, লখাই।
লােটনী যে গাছের নীচে দাড়াইয়াছিন, সেই গাছটার গায়ে
হেলান্ দিয়া দাড়াইল।
তাহারা গাড়ী ঠেলিতে ঠেলিতে চলিয়া গেল।
লােটনী একটু পরে ধীরে-ধীরে চলিতে আরম্ভ করিল।
কোথায় যাইতেছে নিজেই জানে না। তবু চলিল। তিন নম্বর

পৌষ-পার্বণ
খদের আগুনের পাশ দিয়! চলিতে চলিতে বড় রাস্তায় গিয়া
উঠিল।
নাই।
বরাবর আপন মনে চলিতে চলিতে বেলা পড়িয়া আসিল।
ক্রমে প্রান্তরের উপর অন্ধকার নামিল। তবু, তাহার চলার শেষ
শেষে যখন অন্ধ কাবে আর পথ চিনিতে পারা গেল
• তখন সে দেখিল, জামুড়িয়া হাটের কাছে আসিয়া
পৌছিয়াছে। হাটের ফেরত কুলি-কামিনগুলা তখন পথের
উপর দিয়া বাড়ী ফিরিতেছিল। হাটের কয়েকটা দোকানে
মিট মিট করিয়া আলো জ্বলিতেছে। পথের পাশেই কয়েকটা
ইট-পাজা তখনও কুয়াসার মত ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। অন্ধকারে
কিছুই ভাল দেখা যায় না। পশ্চাতে মাত্র সমস্ত কোলাহল ভেদ
করিয়া জামুড়িয়া কুঠির ইঞ্জিনটার সাঁই সাঁই ঘড় ঘড় শব্দ
কাণে আসিয়া বাজে।
লােটনীর হঠাৎ মনে পড়িল, ভক্ত-সাহেবের মেলা দেখিতে
গয়া কাল একট। বাউরী-ছোকর। তাহাকে চার আনা পয়স।
দিয়াছে,সিকিটা এখনও আঁচলে বাধা। কিন্তু এতক্ষণ
সে কথা তাহার মনেই ছিল না। ভাবিল, হাটে কিছু কিনিয়।
খাইবে। দোকান খুজিতে গিয়া সুমুখে দেখিল, এক মদের
দোকান। এখানে-সেখানে কয়েকজন মাতাল টলিয়া টলিয়।

পৌষ-পার্বণ
ঘুরিতেছে, কত কি বলিতেছে! দোকানের ভিতর একটা
ল্যাম্প জ্বলিতেছিল-সুমুখে একটা ছােট জানালার ভিতর
দিয়া দোকানী মন বেচিতেছে।-লােটনী বীরে-ধীরে সিকিট।
সেই দিকে বাড়াইয়া নিয়া বলিল—মদ চার আনার।
চার আনার মদ কতটুকুই-বা ! লােটনী ঢক ঢক করিয়া
এক নিশ্বাসে সবটা খাইয়া ফেলিল। গত রাত্রি হইতে পেটে
কিছু পড়ে নাই। নেশা ধরিতে দেরি হইল না। হু হু করিয়া
শীতের বাতাস বহিতেছিল। লােটনী টলিতে টলিতে একটা
গাছের নীচে আসিয়া হোঁচট খাইয়া পড়িল । তখন আর তাহার
উঠিবার সামর্থ্য ছিল না।
এদিকে ঠিক সেই সময়ে জোড়জানকী কুঠিতে ম্যানেজার
বাবু নরুকে ধমক দিতেছিলেন,-হারামজাদা বেটা পাজী,
আমাদের জাত-জন্ম আর রাখলি না দেখছি। এই আমােদী
হারামজাদীর স্বামী লখা বাউরী মারা গেছে, এখনও তিন দিন
পেরােয় নি, তার এখনাে পুরাে অশৌচ, আর তুই কিনা তাকেই
আলি এটো বাসন মাজতে, হারামজাদা!...কাল থেকে
খবর্দার বছি ওকে বাসন ছুতে দিসনে।
নরু হাতজোড় করিয়া বলিল, আমি জান্তুম না হুজুর !

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
কেলেঙ্কারী
শীতকালের রাত্রি প্রায় বিপ্রহর উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে।
উন্মুক্ত পল্লী-প্রান্তরের উপর অন্ধকার ঝিম্ ঝিম্ করিতেছিল।
শুষ্ক প্রায় সিঙ্গারণ নদীর মৃদু কলধ্বনি, আর পরিপক শস্য
ক্ষেত্রের এক প্রান্ত হইতে
হইতে একটা কলা-কুঠির ইঞ্জিনের
সাই-সাই শব্দ ছাড়া আর কিছুই শােনা যায় না।
নীল-বনের ঘন-বিন্যস্ত গাছপালার মধ্য দিয়া, রাঙা মাটির
পাকা রাস্তা ধরিয়া ল্যাথরা মাঝি হন্ হন্ করিয়া চলিতেছিল ।
তাহার হাতে একটা বাশের লাঠি, মাথায় বাবরি চুলের
উপর একটা গামছা জড়ানাে।
হু হু করিয়া শীতের বাতাস
বহিতেছে। গাছের পাতায় পাতায় ঝির ঝির করিয়া শব্দ
হইতেছিল।
ল্যাথরা জাতিতে সাঁওতাল, তার উপর মদ খাইয়াছে,
সমস্ত শরীর তাহার গরম।
তাই শীতের বাতাসটা তাহার
খালি গায়ে লাগিলেও বিশেষ কিছু ক্ষতি করিতেছিল বলিয়া

১৮
পৌষ-পার্বণ
মনে হয় না। পিঠের শিরদাড়াটা এক-একবার চম্ চম
করিয়া তাহাকে কঁপাইয়া তুলিতেছিল মা ত্র।
কিন্তু
এ-সবের দিকে লক্ষ্য না করিয়া সে তখন তাহার হাতের
লাঠিটা সজোরে চাপিয়া ধরিয়া আরও জোরে জোরে রাস্ত
শটিতে লাগিল।
গ্রামে পৌছিয়া ল্যাথ রা একেবারে জমিদার বাড়ীর সদর
ফটকের কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। চারিদিক নিঝঝুম্ ।
কিল, বাবু, অ বড়বাবু, ঘরে আছিস ?
কয়েকটা ডাকের পর দারােয়ান বাহির হইয়া আসিল ।
বলিল,-কোন্ হয় ?
-আমি রে আমি! কুঠির ল্যাথ ব; মাঝি ।
এত রাত্রে যে ?
ল্যাথরা দারােয়ানের কাছে সে-সবের জবাবদিহি করিতে
আসে নাই। বলিল—তাের অত-সব শুনে কাজ নাই, লে ।
বাবুকে একবার ডাক্ ! বল, জোড়-জানকী থেকে ল্যাথর।
সদ্দার এসেছে।
এতরাত্রে সর্দার কুঠি হইতে কি সংবাদ লইয়া আসিয়াছে
জানিবার জন্য শরৎ বাবুকে উঠিতে হইল। তিনি ভাবিয়া-
ছিলেন, খাদের ভিতর হয়তাে কোনও কুলি-মজুর খুন হইয়াছে,

পৌষ-পার্বণ
তাই তাড়াতাড়ি গায়ে গরম কাপড় জড়াইয়া বাবু নামিয়া
আসিলেন।
লাথর। হাতের লাঠিটা মাটিতে নামাইয়া ফটকের একপাশে
চুপ করিয়া বসিয়াছিল, বাবুর পায়ের শব্দ পাইয়া সচকিতে
উঠিয়া দাড়াইল। বাবুকে কোন কথা জিজ্ঞাসা করিবার
অবসর না দিয়াই বলিয়া উঠিল,—চ বাবু, তােকে একবার
এখনি কুঠি যেতে হবে।
-কেন বল দেখি ল্যাথরা? খুন- কিছু
-না বাবু, খুন-জখম্‌ কিছু নয়। যেতে হবে ।
খুনজখম্‌ কিছু হয় নাই শুনিয়া বাবু হাফ ছাড়িয়া বাঁচিলেন।
কিন্তু এ নাছােড়বান্দা সাঁওতাল যখন ধরিয়া বসিয়াছে,
তখন সে তাহাকে লইয়া যাইবেই।
তিনি পুনরায় প্রশ্ন
করিয়া বসিলেন, তবে কি জন্যে যেতে হবে বল দেখি?—কাল
গেলে হবে না?
ল্যাথরা মিনতির সুরে বলি, না বাবু, তাের পায়ে ধরছি,
চল। কেনে যেতে হবে বললে হয়ত বাবি নাই। তুই
হাওয়াগাড়ীতে উঠ, তবে বলব।
এই সাঁওতাল পােষ্যগুলিকে রাখিবার জন্য সময়-অসময়
এরূপ বহু অত্যাচার কলাকুঠির মালিকদের
সহ করিতে

পোষ-পার্বণ
-
হয়, তাই অনন্যোপায় হইয়া বাবু সম্মতি দিতে বাধ্য হইলেন।
দরােয়ান টান হাতে নিকটেই দাড়াইয়াছিল, বলিলেন,-
ড্রাইভারকে মােটর বের করতে বল, আমি আসি।••••••তুই
ততক্ষণ এইখানে বসে থাক ল্যাথর।
ল্যাথরা একটা তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলি বাবুর মুখের
পানে একবার সকরুণ দৃষ্টিতে তাকাইল এবং পরক্ষণেই ফটকের
পাশে জড়সড় হইয়া বসিয়া পড়িয়া বলিল, হঁ বাবু, তুই আয়
আমি বসে রইল।
বাবু মােটরে উঠিয়া ল্যাথ রাকে ড্রাইভারের পাশে বসিতে
হুকুম করিলেন ।
সে অতি সঙ্কুচিত ভাবে ধীরে-ধীরে আসনের
নীচে চুপ করিয়া বসিয়া পড়িল। মােটরে চড়িবার সৌভাগ্য
জীবনে তাহার কোনদিনই হয় নাই , আজ সেই আশাতীত
সৌভাগ্যলাভ করিয়াও সে বেশী-কিছু বলিতে পারিল না ;
মনে-মনেই বলিল,-তাের ঢের পমাই হােক্ বাবু, তাের
দৌলতে জম্মের সাধ হাওয়াগাড়ীতে চাপল।
মােটর চলিয়াছে। সেই জমাট অন্ধকারের ভিতর দুইটা
গােলাকার চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া মনে হইতেছে যেন একটা
ক্রক দানব ছুটিয়া চলিতেছে।

পৌষ-পার্বণ
এতক্ষণে প্রবল বাতাসের বেগে ল্যখ কার সব্বাঙ্গ কঁপিতে
হি। মাথার গামছাখানা খুলিয়া সে তাহার গায়ে জড়াই
নইল ।
কুঠির প্রায় কাছাকাছি আসিয়া বা জিজ্ঞাসা করিলেন,
এবার বল দেখি ল্যাথ রা, কি হয়েছে?
ল্যাথরা বলিল -ঠিকাদার জোয়ান্ সিংকে কুঠি থেকে ’
তেড়ে’ দিবি চল, তা যদি না দিস ত’ আমরা কেউ তাের কুঠিতে
কাজ কব নাই। লিজের চোখে সব দ্যাখগ। তুই। আমি
২তে লাছি বাবু, আমাকে আর শুধস না।
আম-বাগানের পাশে সাঁওতাল কুলিদের এক-নম্বর ধাওড়ার
কাছে গাড়ীখানা আসিয়া পৌছিতেই ল্যাথ র ড্রাইভারকে বলিল,
আমাদের বাড়ার কাছে দাবি বার।
মােটরখানা ঘচ, মচ, করিয়া দাড়াইবার কালে তালে
সে বলিয়া উঠিল,এ, এ্যা,--, এ-এ-এইখানে ।
ল্যাথ বা গাড়ী হইতে ঝাপাইয়া পড়িয়া বাবুকে বলিল,-
আয় দেখ সে, আয় বাবু, আমার সর্বনাশ দেখবি আয়।
রাগে ও দুঃখে তখন তাহার কণ্ঠরােধ হইয়া আসিয়াছে।
বার দেখিলেন, তাহাদের খড়াে ঘরগুলার পাশে যে

২২
পৌষ-পার্বণ
অপরিসর উঠানটুকু আছে, তাহারই একধারে কতকগুলা কয়লা
জালাইয়া, আগুনের চারিপাশে কয়েকজন মাল্কাটা সাঁওতাল
কুলি চুপ করিয়া বসিয়া বসিয়া গল্প করিতেছে এবং অদূরে
পাশাপাশি দুইট। আম গাছের গুড়িতে দুইটা লােককে বেশ
শক্ত করিয়া বাঁধিয়া রাখা হইয়াছে। বনাবস্থায় যাহারা
নতমুখে দাড়াইয়াছিল, বাবু তাহাদের দেখিবামাত্র চিনিলেন।
একজন তাহারই খাদের ঠিকাদার জোয়ান সিং এবং অপর
একজন ল্যাথ ব্রা সর্দারের যুবতী কন্যা-বেবী।
ব্যাপারটা বুঝিতে অধিক বিলম্ব হইল না।
বাবু চুপ করিয়া দাড়াইয়াছিলেন। একজন মাতব্বর
গােছের সাঁওতাল বলিয়া উঠিল, পচিশ নম্বর কঁথি থেকে
উয়াদিকে ধরে এনেছি বাবু । কি দণ্ড কছিস ক উয়াদের ।
না হয়, বলিস্ ত’ ওই র্যা গাড়ীতে আমরা জোয়ান সিংকে
চাপাই দিয়ে আসি,—উ ঘর যাক্।
বাবু বলিলেন,-না রে মাঝি, আমি ওর দশটাকা জরিমানা
কলুম। হলে ত ?••••••দে ওদের খুলে দে ।
দশটা টাকা তাহাদের বিবেচনায় কম নয়?—আচ্ছা জরিমানা
হয় ঠিকই হইয়াছে, কিন্তু

পৌষ-পার্বণ
তৎক্ষণাৎ আর-একজন সাঁওতাল বলিয়া উঠিল,-আর
রেবী ? আমরা ত’ উয়াকে আর ঘর ঢুকতে দিব নাই।
জোয়ান্ সিং বলু-উয়াকে বিয়ে করে ঘরে রাখবে।
বাবু জোয়ান্ সিংএর দিকে লক্ষ্য করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,
–কি বােছ জোয়ান্?
সে ঘাড় নাড়িয়া সম্মতি জানাইল এবং ইহাও বলিল যে,
সে আজই রেবীকে নিজের ঘরে লইয়া যাইতে রাজি আছে।
জোয়ান্ সিংকে সমুচিত শাস্তি দিবার জন্যই ল্যাথরা মাঝি
এতক্ষণ উদ্গ্রীব হইয়াছিল। রেবীকে যে তাহার হাতে চিরতরে
সমৰ্পণ করিয়া দিতে হইবে, এবং সে-কাজটা যে তাহার পক্ষে
কত কঠোর, সে কথা ত সে একটিবারের জন্য ভুলিয়াও ভাবে
নাই! না-না, তার চেয়ে সে নিজেও বরং সমাজ পরিত্যক্ত
হইয়া থাকিবে তবু তার একমাত্র কন্যাকে শত্রুর হাতে তুলিয়া
দিতে পারিবে না
রেবী অধােমুখে লজ্জায় জড়সড় হইয়া দাঁড়াইয়াছিল, বাবু
জিজ্ঞাসা করিলেন, কি রেবী ! জোয়ান্ সিংএর ঘরে যাবি?
রেবী নিরুত্তর।
পুনরায় প্রশ্ন হইল, বল্ না কি বলছিস্?
দণ্ডাজ্ঞার অপেক্ষা করিয়া অসামী যেমন ভাবে বিচারকের

২৪
পৌষ-পার্বণ
মুখের পানে তাকায়, ল্যাথর মাঝি তেমনি উদগ্রীব হইয়া
কন্যার মুখের পানে তাকাইল।
রেবী অস্ফুট কণ্ঠে কহিল,-হাঁ, যাব।
উত্তরটা স্বকর্ণে শুনিয়া ও ল্যাথ রার মনে হইল, ভুল
শুনিয়াছে। আগ্রহাতিশয্যে তাড়াতাড়ি জিজ্ঞাসা করিয়া
ফেলিল,-এ, ঐ, কি বল্লে বাবু ?...উ কি বল্লে ?
বাবু বলিলেন, রেবীও যেতে চায় ।
প্রস্তর-মূর্তির মত নিশ্চলভাবে ল্যাথরা মাথায় হাত দিয়া
বসিয়া রহিল । •••এতক্ষণ পরে হিমে তাহার সর্বশরীর
আড়ষ্ট হইয়া উঠিতেছিল, হাঁটু দুইটা অসম্ভব রকম কঁপিতে
আরম্ভ করিল।
তাহাদের মধ্যে একজনকে ইঙ্গিত করিয়া বাবু কহিলেন,
ওদের বাঁধন খুলে দে মাঝি ! যা, তােরা চলে যা।
ল্যার অতি কষ্টে মৃদু অথচ কম্পিত কণ্ঠে বলিল,-বাবু,
তুই এবারে ঘর যা।
জোয়ান সিং রেবীকে লইয়া চলিয়া গেলে, অন্যান্য যাহারা
উপস্থিত ছিল, সকলেই আপন আপন ধাওড়ায় ফিরিয়া গেল।
ল্যাথ, রা কিন্তু সে স্থান হইতে নড়িল না।

পৌষ-পাৰ্বণ
মনে
অনেকেই বলিল,-চল্ মাবি ঘরে চল, ভেবে কি হবে ?
সে মৃদুস্বরে কহিল, যাই। কিন্তু উঠিতে পারিল না।
হইল, তাহার সমস্ত শরীর-মন অবসন্ন অসাড় হইয়া গেছে।
কি হইল তার? মুহূর্তের মধ্যে যে এমন করিয়া সব ওলটপালট
হইয়া যাইবে তাহা সে জানিত না!••••••• বেবী! মা
আমার !
এত নিষ্ঠুরতা তুই কখন শিখিয়াছিস্?
সে আজ অনেকদিনের কথা। রেবীর মা তাহাকে
ল্যাথার কাছে সেই কত ছােটটি রাখিয়া মরিয়া গিয়াছে
ল্যাথরা তাহাকে কোলে-পিঠে করিয়া এত বড়টি করিয়া
তুলিয়াছে, আর আজ কি না সেই রেবীই এমনি করিয়া
চলিয়া গেল !
ল্যাথ রার মনে পড়িতেছিল,—সে কোন্ সুদূর জঙ্গলের ধারে,
লাউ আর কুমড়ো-লতায়-ঘেরা তাহাদের বহুকালের ছােট্ট কুঁড়ে
ঘরখানি। রাঙা-ফুলে-ভরা শিমূলগাছের তলায় রেবীকে মাটিতে
শশায়াইয়া দিয়া, রেবীর মা বনে বনে ঝরা পাতা কুড়াইয়া
বেড়াইত। আর ল্যাথরা তীর-ধনুক লইয়া মনের আনন্দে মহুয়া
বনের ধারে ধারে পাখী শিকার করিত। যদি কোনদিন পাখীর
পিছু ছুটিতে ছুটিতে ল্যাথরা নদীর কিনারে কিনারে বহুদূরে

২৬
পৌষ-পার্বণ
গিয়া পড়িত, তাহা হইলে রেবীর মা’র চিন্তার আর অন্ত থাকিত
। সে প্রাণপণে চাংকার করিয়া ডাকিত,—মাঝি, ফিরে আয় ।
সে আহ্বান কোনােদিন-বা গহন বনের পাতার ভিড় ঠেলিয়া
হার কাছে পৌছিতে পারিত না, আবার কোন-কোন্‌দিন
নদীতট প্রতিধ্বনিত করিয়া প্রিয়তমের ডাক কাণে আসিয়া
বাজিলেই সে শিকার ফেলিয়া ছুটিয়া আসিত। দেখিত, মাথা
ভরা কালাে চুলের ফাকে ফাকে রাঙা-রাঙা শিমূল ফুল ওঁ জিয়া
রেবীকে কোলে তুলিয়া সে গাছের নীচে দাঁড়াইয়া হাে হাে করিয়া
হাসিতেছে,কেমন মাঝি । ফিরে এলি তাে!
ল্যাথরা, স্ত্রী ও কন্যাকে লইয়া বাড়ী ফিরিত।
সে আনন্দের খেলা বেশীদিন চলিল না। একদা এক
অন্ধকার রজনীর শেষ প্রহরে, তাহার বড় আদরের কন্যা রেবীকে
তাহারই কোলে ফেলিয়া দিয়া, তাহার মা মরণ-ঘুম ঘুমাইল।
রেবীর মুখে তখন আধ-আধ কথা। সবেমাত্র চলিতে সুরু
করিয়াছে।
প্রিয়াহীন শূন্য কুটীরে ল্যাথরার মন টি কিল না। রেবীকে
লইয়া সে কয়লা-কুঠিতে কাজ করিতে আসিল। আজ উনিশটি

পৌষ-পার্বণ
২৭
বছর তাহাকে কোলে-পিঠে করিয়া মানুষ করিবার পর আজ এ
কি হইল !
যে-জাতিটার মনের কথা আজ পর্যন্ত কেহই টের পায় নাই,
ল্যাথরা তাহাই বুঝিবার বৃথা চেষ্টা করিয়া অবশেষে ক্লান্ত
পরিশ্রান্ত হইয়। মনের দুঃখে সেখান হইতে উঠিয়া তাহার
অন্ধকার ঘরের দুয়ারে আসিয়া দাড়াইল । ঘরে আজ আলোটি
পর্যন্ত জ্বলে নাই! কে-ই বা জালিবে? পিতার স্নেহার্ত মন
আবার রেবীর জন্য হাহাকার করিয়া উঠিল। বুকের উপর
এ কি নিদারুণ অপমানের গুরুভার চাপাইয়া গেলি মা ! কাল
সে লােকের কাছে মুখ দেখাইবে কেমন করিয়া?
ছেড়া কঁাথাখানা সর্বাঙ্গে জড়াইয়া ল্যাথরা অন্ধকার ঘরের
মেঝের উপর শুইয়া পড়িল। ঘুম হইল না। দূরে গাছপালা-
গুলা ঘন কুয়াসার মত ধোঁয়ায় ভরিয়া গেছে। প্রভাত হইতে
বিলম্ব নাই। এতক্ষণে তাহার মনে হইল, কাল সমস্তদিন খাদের
নীচে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের পর রাত্রে কিছুই সে খাইতে পায়
নাই। ক্ষুধায় তখন তাহার পেটের নাড়ী-কয়টা পা দিয়া
উঠিতেছিল। এ পেটের জ্বালা হয়ত দুমুঠা শুকনাে চাল
চিবাইলেই নিভিতে পারে, কিন্তু তাহার মনের এ দুঃসহ বেদনার

পৌষ-পার্বণ
!
রেবীই সে আজ তাহাকে
নিবৃত্তি হইবে কেমন করিয়া ।
পরিত্যাগ করিয়া গেছে।
ঘুটঘুটে’ আঁধার রাত কবে বতে পারিস্ বাবু?
••মাসখানেক পরের কথা। অ াল ষ্টেশনে ভাড়ার টাকা
জমা দিতে গিয়া ফিরিতে একটু রাত্রি হইয়াছিল বলিয়া শ্যামবাবু
বাগান ধাওড়ার পাশ দিয়া অন্ধকারেই যথাসম্ভব দ্রুতগতিতে কুঠি
ফিরিতেছিল । কথাটা কাণে যাইতেই থমকিয়া দাড়াইল ।
অন্ধকারে প্রশ্নকর্তাকে ভাল চিনিতে পারা গেল না; বলিল,-
কে রে ? কি বছিস্?
আমি গঃ ! তুদেরই ল্যাথ বা মাঝি ! এই শুধােছিল যে
আমাবস্যার রাত কবে ?
-ও, ল্যাথরা! শ্যামবাবু একটু ভাবিয়া বলিল, আজ
এয়ােদশী, তাহ'লে পরশু অমাবস্যা।...কেন রে? অমাবস্যার
রাত নিয়ে কি হবে তাের ? • রেবী কোথা রে? ঠিকাদারের
বাসায়।
কথাটা কুঠির সকলেই জানিত।
—ই বাবু, যা তুই। বলিয়া ল্যাথরা ধীরে-ধীরে অন্ধকারে
পাশ কাটিয়া চলিয়া গেল।

পৌষ-পার্বণ
পরদিন প্রভাতে ল্যাথরা কাজে গেল না। বহুদিন পূর্বের
প্রায় অব্যবহাৰ্য্য অবস্থাতেই তাহার ঘরে একটা তীর-ধনুক
পড়িয়া ছিল। সেইটা নূতন করিয়া কাজে লাগাইবার জন্য
সমস্তটা দিন বাঁশের ছিল কাটিয়া এবং নীল-বনের জঙ্গলে
নানারকম গাছের পাতা সংগ্রহ করিয়াই কাটাইয়া দিল।
কি-সব গাছের পাতার রস মাখাইয়া লৌহ নির্মিত তীরের
ফল বিষাক্ত করিবার প্রণালী ল্যাথরা শিখিয়াছিল। সে কোন
মধুর
যৌবনের গতদিনে বনে-জঙ্গলে এই সব বিষের ফলা দিয়া সে
বাঘ পর্ষন্ত শিকার করিয়াছে। সেদিনও তাই হঠাৎ কি-একটা
কথা মনে হইতেই সমস্ত দিন পরিশ্রম করিয়া কয়েকটা বিষ-বাণ
ও একটা ধনুক সে নূতন করিয়া প্রস্তুত করিয়া ফেলিল।
পরদিন বৈকালে একটা কুকুরের গায়ে বিষ-বাণ পরীক্ষা
করিতে গিয়া ল্যাথরা দেখিল, কুকুরটা কিছুক্ষণ আর্তনাদ
করিয়া পেটে তীর লইয়াই মরিয়া গেল।
কুকুরের পেট হইতে তীরটা বাহির করিয়া ল্যাথরা ভাবিল
ঠিকই হইয়াছে। এমনি এক অন্ধকার রাত্রে একটা মানুষের
বুকের উপর এই তীর বিঁধিতে হইবে ! তীর-ধনুকটা সযত্বে
ঘরের একপাশে নামাইয়া রাখিতেই দুঃখে অনুশশাচনায় ল্যাথ রার
মুখে একটা তীব্র তীক্ষ্ণ হাসি ফুটিয়া উঠিল।• •••সাঁওতল

পৌষ-পার্বণ
সে ! অপমান সহিবার ক্ষমতা তাহার নাই ! জোয়ান্ সিংএর
জান্ লইবে
দুই হাতের শিথিল-মুষ্ঠি একবার প্রাণপণ চেষ্টায় শক্ত করিয়া
লইয়া নিজের বুকের উপরেই ঠাই ঠাই করিয়া দুইটা ঘুসি
বসাইয়া অন্ধকার ঘরের মধ্যেই ল্যাথরা উন্মাদের মত চীৎকার
করিয়া উঠিল,রেবী
বৃদ্ধের দুই চোখ বাহিয়া অশ্রুর ধারা গড়াইয়া আসিল।
!
সেদিন গভীর দ্বিপ্রহর রজনীতে কোলের মানুষ চেনা যায়
-এত অন্ধকার।
ল্যাথরা মাঝি সন্ধ্যা হইতে মদ খাইতেছিল, কিন্তু কিছুতেই
তাহার জমকালাে-রকমের নেশা জমিতেছিল না। অবশেষে
মাটির পানপাত্রটা সে দূরে ছুড়িয়া দিয়া তীর-ধনুক লইয়া জোয়ান
সিংএর ঘরের উদ্দেশে বাহির হইয়া পড়িল। আজ তাহার
বহুদিনের শিক্ষা সফল হইবে। যে-শত্রু তাহার বুকে অতৃপ্তির
বহ্নি জ্বালাইয়াছে, এই বিষবাণে তাহাকে বিনাশ করিয়াই আজ
তাহার তৃপ্তি!
রেবী যতদিন জোয়ান্ সিংএর বাড়ীতে গিয়াছে, ততদিন
ল্যাথরা ভুলিয়াও একবার সে-পথ দিয়া হাঁটে নাই, তাই আজ

পৌষ পার্বণ
এই একটি মাসের মধ্যেই তার বহুকালের চেনা পথটা একটু
অপরিচিত বলিয়াই মনে হইতেছিল ।
ট্রাম লাইনের একটু দূরেই অড়হর ক্ষেতের পাশে জোয়ান্
সিং এর খড়ে-ঘর দেখা যাইতেছিল। অন্ধকারের মধ্যে পথ
চলিতে চলিতে কখনও-বা কঁাট গাছের বনে ল্যাথরার পা
ছড়িয়া যায়, কখনও-বা শুনে অড়হরের ডালে হোঁচো খাইয়া
পুনরায় নিজেকে সানাইয়া লয় । এমনি করিয়া অতি সন্তর্পণে
সে জোয়ান্ সিংএর ঘরের জানালার কাছে আসিয়া দাড়াইতেই
দেখিল, ঘরের মধ্যে একটা হ্যারিকে লণ্ঠন জ্বলিতেছে এবং সে
আলােকের ছটা জানালার বাহিরেও খানিকটা আসিয়া পড়িয়াছে।
পাশের অন্ধকারে একটু সরিয়া গিয়া ভাবিল, ঠিক, জানালার
ফাকে তীর ছুড়িলেই চলিবে। বাঁ-হাতের মুঠার মধ্যে ধনুকের
বোঁটাটা বেশ শক্ত করিয়া ধরিয়া লইল। চারিদিকের প্রান্তরের
উপর ঝিল্লীর ঝি ঝি রব এবং অদূরে চৌধুরিদের কুঠির জল মারা
পাম্পের ঘচ, ঘচ, শব্দ শােনা যাইতেছিল।
এ শব্দটাও তাহার
ভাল লাগিতেছিল না। মনে হইতেছিল, দৌড়িয়া গিয়া পম্পের
ইঞ্জিনটা বন্ধ করিয়া দিয়া আসে।
চোরের মত ধীরে ধীরে হামাগুড়ি দিয়া জানালার কাছে
তীর লক্ষ্য করিয়া, ঘরের মধ্যে তীক্ষ দৃষ্টিতে একবার তাকাইতেই
23।

পৌষ-পার্বণ
দেখিল, অদূরে একটা খাটের উপর জোয়ান সিং ঘুমাইয়া
পড়িয়াছে। তাহার বুকের মাঝে তীর লক্ষ্য করিয়া টানিয়া সেটা
সে ছাড়িতে যাইবে এমন সময় দেখিল, একি! তাহার বুকের
পাশে আর-একখান। এ কার মুখ ! আজ উনিশটি বছর ধরিয়া
যে-মুখখানি সে দিবারাত্রি চোখে চোখে রাখিয়া ও তৃপ্ত হইতে
পারে নাই,—যাহার একদণ্ডের অদর্শনে সে অধীর হইয়া ছুটিয়া
বেড়াইত, এ যে তাহার সেই বড় আদরের রেবীর ঘুমন্ত মুখখানি !
•••মাগাে ! তােকে যে আজ একটি মাস দেখি নাই ।
ল্যাথরার বুকের উপর অলক্ষিতে কে যেন সজোরে
এক পদাঘাত করিল। তাহার হস্ত শিথিল হইয়া আসিল।
হাতের বিষাক্ত তীরখানা দূরে অড়হর ক্ষেতের মাঝে ছুড়িয়া
দিয়া, তাহার একমাত্র কন্যার মুখখানা সে একবার দেখিয়া লইল।
কলঙ্কের চিহ্ন তো সেখানে কোথাও নাই। দেখিল, নিশ্চিত
আরামে সে নিদ্রা যাইতেছে।
ল্যাথরা জোর করিয়া নিজের চোখ দুইটা সেদিক হইতে
ফিরাইয়া লইয়া উৰ্দ্ধশ্বাসে সেখান হইতে ছুটিয়া পলাইয়া গেল।
ঘটনার দিন-চার পরে, একদিন সন্ধ্যায় বেবী নিজের মনকে
আর কোন প্রকারেই বুঝাইতে পারিতেছিল না। পিতাকে

পৌষ-পার্বণ
জাতিচ্যুত হইবার কলঙ্ক হইতে বাঁচাইয়া সে যতটুকু শান্তি
পাইবার আশা করিয়াছিল তাহা তাে সে পায় নাই। জোয়ান
সিংএর বাড়ীতে আসিয়া সে ভাবিয়াছিল, পিতার সহিত বাস
করিবার আনন্দটুকু হইতে বঞ্চিত হইলেও তাহার সহিত দেখা
করিবার সুযােগ তাহার প্রত্যহই মিলিবে। কিন্তু জোয়ান্ সিং
তাহাকে দিবারাত্রি এম্‌নি কড়া পাহারায় ঘিরিয়া রাখিয়াছিল
যে, সে একদণ্ডের জন্য বাড়ীর বাহির হইতে পাইত না।
জোয়ান্ সিংএর নিষেধ-আজ্ঞা উপেক্ষা করিয়াই রেবী সেদিন
সন্ধ্যায় ঘরের বাহির হইয়া পড়িল। বাগান-ধাওড়ায় পৌছিয়া
তাহাদের বহুকালের পরিচিত কুঁড়ে ঘরখানির দুয়ারে আসিয়া
ডাকিল,-বাবা!
ভিতর হইতে কোন সাড়া শব্দ আসিল না।
আর-একটু অগ্রসর হইয়া গিয়া আবার ডাকিল,-বাবা!
কোথাও কোন শব্দ নাই।
দরজার কাছে আসিয়া দেখিল, বাহির হইতে শিকল
বন্ধ। রেবীর বুকটা ধড়াস করিয়া উঠিল। শিকল খুলিয়া
ঘরে ঢুকিতেই একটা সেদো মাটির ভ্যাপসা গন্ধ তাহার নাকে
আসিয়া লাগিল।

৩৪
পৌষ-পার্বণ
সেই অন্ধকার শূন্য কুটীরের নিস্তব্ধতার মধ্যে দাঁড়াইয়া
রেবীর বুকের স্পন্দন যেন ক্রমশ ভয় ও ভাবনায় দ্রুত হইয়া
আসিতেছিল। গণ্ড বাহিয়া তাহার অশ্রুধারা গড়াইয়া পড়িল ।
উত্তর পাইবে না জানিয়াও রেবী ভাঙা-ভাঙা স্বরে আর
একবার ডাকিল,-বাবা !
কাহারও কোনও জবাব পাওয়া গেলনা। বড় ধনা ক্ষেতের
ভিতর হইতে একটা টিকটিকি টিকটিক করিয়া
সড়।
দিয়া উঠিল।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ ‘সারি-পাঁচি পেতাপ, পৌষ-সংক্রান্তির হিম-আড়ষ্ট অপরাহু-বেলায় বাউরীর উঠানে ‘সারি-পাঁচির মজলিস্ বসিয়াছিল। আজ দু’তিন দিন তাহারা কয়লা-খাদে কাজ করতে যায় নাই, যত সব নষ্ট-চরিত্রা মেয়েদের কাছে টাকা আদায় করিয়া মদ খাইতেছে এবং নাচ গান করিয়া আমােদ-আহলাদে দিনগুলা যে কেমন করিয়া তাহারা পার করিতেছে কাহারও খেয়াল নাই! পেতাপের উঠানের একপাশে একটা ছেড়া চাটাইএর উপর তাহারা বসিয়াছিল। দু'তিনটা মদের হাড় প্রায় শেষ হইয়া আসিল। মুড়ি কড়াইভাজা এবং বেগুনির চাট সমস্ত উঠান জুড়িয়া ইতস্তত বিক্ষিপ্ত রহিয়াছে। মধ্যাহ্ন-বেলায় যখন উঠান- ময় রৌদ্র ছিল, তখন হইতে একটু একটু করিয়া মদ চলিতেছে, এখন পড়ন্ত বেলায় শীতের প্রকোপও একটু বেশী হইয়া আসিল, গাছের পাতাগুলা নাড়িয়া বাতাস বহিয়া তাহাদের সর্বাঙ্গে কাপন ধরাইতেছিল ; পেতাপ, তাহার পরনের কাপড়খানা বেশ করিয়া গায়ে জড়াইয়া লইয়া বলিল,-গরবী, তাের বাপ, কই ?

পৌষ-পার্বণ
এক যুবতী বাউরীর মেয়ে, উঠানের একপাশে একটা
পত্রবিহীন কুলগাছের নীচে হেঁটমূখে দাড়াইয়াছিল, পেতাপের
ডাক শুনিয়া, অদূরে লছু বাউরীর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া
ধীরে ধীরে কহিল, এই যে !
লছু একটুখানি আগাইয়া আসিয়া বলিল,- এই যে আমি
রইছি হে সদ্দার !
পোেপ, সর্দারের জবাফুলের মত রাঙা চক্ষু দুইটি তখন
অৰ্দ্ধমুক্ত। ঝিমাইতে ঝিমাইতে বলিল,- •••বছিল কি,
তুদের গরবী তাে শ্বশুরঘর যায় না।...হঁ। একটু চুপ করিয়া
ঘাড়টা ইতস্তত সঞ্চালন করিতে করিতে পুনরায় বলিল,-বল
বেটে কি না লয় ?...হেঁ-হেঁ।
লছু ধীরে-ধীরে বলিল,-মাতা বেটে ।
স্বীকারােক্তি পাইয়া অপেক্ষাকৃত জোর গলায় পেতাপ,
বলিল,-তবে,—হু...হু। বুঝলি,-দশটাকা!—গরবী, শুন্।
কাল সকালেই দশ টাকা...বাস, সম্বচ্ছর আর কেউ ‘রাটি
কাড়বে নাই।
লছু একবার চোখ দুইটা তুলিল বটে কিন্তু গরবীর মুখের
পানে তাকাইতে পারিল না, অনুযােগের সুরে বলিল,-বড়
বেশী হলাে সর্দার, উ ছেলেমানুষ, কোথায় পাবে বল?

পৌষ-পার্বণ
৩৭
পেতাপ, চক্ষু মুদ্রিত করিয়াই হাত বাড়াইল, মদ্যপাত্র রূপে
বহৃত কঁাশার একটা বড় বাটি হাতে ঠেকিভেই সেইটা তুলিয়া
লইয়া জোরে জোরে মাটিতে ঠুকিতে ঠুকিতে কহিল,বেটে
বেটে ? লিজের বেলায় তা হবে ৰৈ কি !..••••বাহারে লছু!
মাখনীর না-হয় বয়েস উয়ার চেয়ে দু-বছর কম, কম্পাস’বাবুর
ঘরেই না হয় কাজ করে, সে যখন পঁচিশ টাকা দিলে, তখন
গরবীকে দিতে হয় তিরিশ, টাকা ! না না উ-সব না হবে
নাই লছু, দশ টাকার কম কাল ঘেগেনের দিনে কিছুই হবেক
নাই।...হঁ, ঠি, ঠি, লে বাবু লে, আর কথা ক’স না। চট
করে আর-এক বাটি মদ ঢা—গরম ধরু। বাবাঃ যে জাড় !
বলিয়া পেতাপ, মদের জন্য হাতের বাটিটা অগ্রসর করিয়া দিয়া
বেশ জমকাইয়া বসিল।
আর-এক ‘চ’ করিয়া মদ চলিবার পর পেতাপ, এক গ্রাস
শুকনো মুড়ি ও একটা কঁাচা লঙ্কা চিবাইতে চিবাইতে গরবীর
দিকে একবার তাকাইল। গরবী তখন কুলগাছের তলায় বসিয়া
বসিয়া পাত্রের অবশিষ্ট মদটুকু পান করিতেছিল। পেতাপ,
বলিল,-যা তবে উই গরবী, তাগাদা দে তাের বাবুকে, যা।
গরবী চলিয়া গেল।
সন্ধ্যা তখন উত্তীর্ণ হইয়া গেছে।

৩৮
পৌষ-পার্বণ
সাঁওতালদের কুলি-ধাওড়ায় তখন ‘বােঙাবুঙির’ পূজা এবং
মুর্গি বলিদান চলিতেছিল।
গরবী সেই রাস্তা দিয়া পার হইয়া কয়লা-কুঠির বহুকালের
জরাজীর্ণ আফিস-ঘরটার পাশে আসিয়া দাঁড়াইল। দেখিল,
একটা হাতভাঙা চেয়ারের উপর বসিয়া বড়বাবু নন্দলাল
কপালের উপর চশমাটা তুলিয়া রাখিয়া একখানা বড় খাতার
উপর কি যেন লিখিতেছে। টেবিলের একধারে একটা ধুম-মলিন
হারিকেন লণ্ঠন মিটমিট করিয়া জ্বলিতেছিল। অফিস-ঘরের
আসবাবপত্রের মধ্যে দেওয়ালের গায়ে একট। জাপানী ‘ক্লক
বহুকাল ধরিয়া, ছয়টার ঘরে বারােটা, এবং বারােটার ঘরে
ছুটা বাজিয়া আসিতেছে। ঘরের এক কোনে একটা
কাঠের ‘বুক-সেফের’ উপর ধূলি-মলিন খাতাপত্র বােঝাই
করা আছে। সেখানে ইস্ত কুঠির আরম্ভ হইতে আজ পর্যন্ত
সমস্ত খাতাই খুজিলে পাওয়া যায়। তাহারই একপাশে একটা
আলমারি-বড়-ছােট, ভাঙা-গােটা,
ভাঙা-গােটা, নানারকমের শিশিতে
বােতলে পরিপূর্ণ। ডাক্তারবাবু ছাড়া আর কাহারও সে
আমারিতে হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ হইলেও, তাহার প্রত্যেকটি কাচ
ভাঙিয়া যাওয়ায় সম্প্রতি তাহার ভিতরের ঔষধগুলি কুলি-মজুর
হইতে আরম্ভ করিয়া ইতরবর্ণ নির্বিশেষে সকলেরই করুণায়
যুন্ধরা

পৌষ-পার্বণ
আত্মসমর্পণ করিয়াছে। পেরেকের উপর লােহার শিকে-ঝোলানো
চিঠির বােঝায় চারিটি দেওয়ালের কোথাও এতটুকু অংশ খালি
পড়িয়া নাই।
প্রত্যেকদিন সন্ধ্যার ঠিক এই সময়টায় বড়-বাবু, নন্দলাল
তাহার উপরি-পাওনার হিসাব ইত্যাদি খাতায় তুলিয়া লয় ।
ইহার পূর্বে কুঠিতে যে বাঙ্গালী ম্যানেজার ছিলেন, তাহার
আমলে নন্দলালকে এত-সব কিছুই করিতে হইত না। ম্যানেজার
বাবু তাহাকে একটু নেকনজরে দেখিতেন এবং সময় অসময়
তাহার ফরমা-মত বস্তু জোগাইতে পারিলে নানাপ্রকারে
সহজ রােজগারের পন্থা বাতলাইয়াও দিতেন, কিন্তু দুঃখের বিষয়,
কমিশনের লােভে রেজিং বাড়াইতে গিয়া নাকি অন্যায় উপায়ে
তিনি একমাসের মধ্যে পাঁচটি মাল-কাটা কুলি খুন করিয়া
ফেলিলেন এবং সেই অপরাধে ‘মাই-ইন্সপেক্ট-সাহেবের
আদেশে তাহাকে কয়লা-কুঠির ম্যানেজারির কাজে চিরদিনের
মত ইস্তফা দিতে হইল। এখন তাহার জায়গায় আসিয়াছেন
একজন ইংরাজ ম্যানেজার। সাহেবকে নিজের হাতের
মুঠার মধ্যে আনিবার জন্য নন্দলাল চেষ্টার ত্রুটি করে নাই,
বহু তােষামােদ করিয়াছে, অনেক প্রকার প্রলােভন দেখাইয়াছে
কিন্তু এখনও পর্যন্ত অর্বাচীন শ্বেতাঙ্গটিকে কিছুতেই সে

৪০
পৌষ-পার্বণ
বুঝাইয়া উঠিতে পারিতেছিল না যে, কয়লা-কুঠির ম্যানেজারি
চাকরীটা কত সুখের ; কাজেই তাহার কষ্টের আর অন্ত ছিল
। উপরি-পাওনার হারটাও কমিয়া আসিয়াছিল। এই সব
নানা কারণে আজ কাল তাহার মেজাজটাও প্রায় সকল সময়েই
বেশ রুক্ষ হইয়া থাকে।
হঠাৎ হাতের চুড়ির ঝুন ঝুন্ শব্দ পাইয়া নন্দলাল খাতা
হইতে মুখ তুলিয়া দরজার দিকে তাকাইতেই দেখিল, গরবী
দাড়াইয়া আছে। তাহাকে আজ অফিস-ঘরের দরজায় আসিয়া
দাড়াইতে দেখিয়া নন্দলাল একটু বিচলিত হইয়া উঠিল ।
তাড়াতাড়ি চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া দরজার কাছে আসিতেই
গরবী বলিল,—আমাদের সারি-পাঁচি' মজলিসে সদ্দার আমার
নামে দশ টাকা চাদা ধরেছে,—দিতে হবে।
নন্দলাল ভাবিল, দু’একদিন পরে দিলেও চলিবে,
বলিল,-কবে ?
—আজই। দিলে চলবে নাই। দাও। বলিয়া গরবী
হাত পাতিয়া বসিল ।
বাঃ, গাছের ফল পেয়েছিস নাকি? নাড়া দিলেই পড়বে
ভাবিস্যা...এখন যা তুই গরবী, পরে হবে।
উত্তরে গরবী একটু রাগের ভাণ করিয়া চৌকাঠ

পৌষ-পাৰ্বণ
৪১
ধরিয়া বসিয়া পড়িয়া বলিল,-বাহ-রে! সম্বচ্ছরে দশটা
টাকা, তাও যদি দিতে লারবি, তবে ওর অত সখে কাজ কি
উনােন্-মুখাে !
গরবীর কাছ হইতে তাহার এই আদরের গালাগালি শুধু
আজ বলিয়া নয়, সেটা ছিল তাহার নিত্যনৈমিত্তিক। কাজেই
নন্দলাল তাহাতে রুষ্ট না হইয়া, চকিত-নয়নে একবার দরজার
এদিক-ওদিক দেখিয়! লইয়া খপ করিয়া হাতটা তাহার ধরিয়া
ফেলিয়া বলিল,-যাও গরব, যাও, আজ না হয় কাল সকালে
এসো, আমি টাকা দেবে।
গরবী এইবার একটু জোর গলায় বলিল,-অতসব মিষ্টি
কথায় আমি ভুছি না বাবু, আজ লিব তবে উঠব।
-বটে! তবে তাের যা খুশী তাই করগে যা,আমি
দিতে পারব না।
গরবীর সত্য-সত্যই রাগ হইল। যে-লােকটা তাহাকে
পথভ্রষ্টা করিয়াছে, এবং গত তিন বৎসর ধরিয়া বহু লােকের
বহু প্রলােভন সে যাহার জন্য এড়াইয়া আসিয়াছে, যাহার জন্য
সমাজে তাহার ও বৃদ্ধ পিতার লাঞ্ছনার আর অন্ত নাই, আজ
তাহারই কাছে সম্বৎসরের পাওনা মাত্র দশটি টাকা চাহিতে
আসিয়া তাহাকে যে এমন করিয়া বিমুখ হইয়া ফিরিয়া যাইতে

৪২ পৌষ-পার্বণ হইবে তাহা সে জানিত না। গরবী উঠিয়া দাড়াইল, বলিল,- না দিস্ খাল ভরা, এই আমি চলুম সায়েবের কাছে বলতে, দেখি কেমন করে না দিয়ে পারি। এইবার নন্দলালের ভয় হইল। তাহাদের ম্যানেজার-সাহেব লােকটি যে তেমন সুবিধার নয়, তাহা সে বেশ ভাল করিয়াই জানিত। গরবী যদি আজ রাগের মাথায় তাহাকে সমস্ত কথাই বলিয়া ফেলে, তাহা হইলে সাহেব না-জানি কি করিয়া বসিবে । নন্দলাল তাড়াতাড়ি গরবীর পিছু পিছু ছুটিয়া গিয়া ডাকিল -- গরবী, শােন্ ! গরবী একবার ফিরিয়াও চাহিল না দেখিয়া নন্দলাল আর- একটু তাড়াতাড়ি চলিয়া পিছন হইতে তাহাকে ধরিয়া ফেলিল, বলিল,—থা, গরব, আজ বাজে-রােজগার মােটে সাড়ে চোদ্দ গণ্ডা পয়সা। মাইরি বলছি, না হয় তুই দেখ, পকেটে হাত দিয়ে।••• যাক্, যা হবার তা’ত হয়েছেই, তুই এই পথের বাঁকে কদম্ গাছের তলায় দাড়া, আমি চট করে বাড়ী থেকে দেখে আসি কিছু পাই কি না! গরবী এইবার একটু নরম হইয়া গেল ; পথের পাশে অন্ধকারে গা ঢাকিয়া সত্যই সে দাড়াইয়া রহিল। গরবীর বিবাহের সময় শ্বশুরবাড়ী হইতে সে একটা রূপার

পৌষ-পার্বণ
৪৩
সাতনরী হার পাইয়াছিল। সে তাহাকে অতি যত্নে একট।
কাপড় জড়াইয়া হাঁড়ির ভিতর রাখিয়া দিত এং পূজা, পাৰ্বন
মেলা ইত্যাদি হইলে বাহির করিয়া পরিত। আজ তাহার
সেই মূল্যবান গহনাখানি বাহির করিয়া, তাহার পরিবর্তে
খাজাঞ্চিবাবুর নিকট হইতে ঝুমঝুমির বালাখানি ছাড়াইয়া
লইয়া আসিল।
ভাবিল, ঝুমঝুমির হাতে ফিরাইয়া দিবে, কিন্তু প্রকাশ্যভাবে
তো দেওয়া চলিবে না।
সন্ধ্যার কিছু পূৰ্বেই, বালাখানি অঞ্চলে বাঁধিয়া পেটের
নীচে লুকাইয়া গরবী নন্দলালের বাসায় আসিয়া উপস্থিত
হইল। নন্দলাল বাড়ীতে ছিল না, নন্ট, ও ঝুমঝুমি সুমুখের
অপরিসর প্রাঙ্গণের উপর ছুটিয়া বেড়াইতেছিল, রন্ধনশালায়
বসিয়া সাবিত্রী একমনে তরকারী কুটিতেছিল।
গরবীকে দেখিয়া সাবিত্রী বলিয়া উঠিল,-এ বেলায় এলে
যে বাউরী-বৌ?
সাবিত্রী তাহাকে বাউরী-বউ বলিয়াই ডাকিত।
গরবী প্রথমে বুঝিতেই পারিল না—কি উত্তর দিবে।
একটু ভাবিয়া বলিল,-কাজ ছিল নাই তাই দেখতে

৪৪
পৌষ-পার্বণ
এলম-তােমার উনােন ধরানাে হলাে কি না-ধরাই দিব
কি ?
-না, উনােন্ আমার ধরে গেছে—আর ধরাতে হবে না।
গরবী ধীরে-ধীরে বালাখানি বাহির করিয়া নন্ট ও
ঝুমঝুমির সহিত কথা কহিতে কহিতে ঘরের উপর গিয়া উঠিল ।
ভাবিল, বিছানার তলায় রাখিয়া দিবে।
তাহার অনভ্যস্ত হাতখানা বাড়াইয়া বিছানার নীচে রাখিতে
যাইবে, এমন সময় সেদিকে সাবিত্রীর হঠাৎ নজর পড়িয়া গেল
সাবিত্রী তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিল, ওকি বাউরী-বৌ, বিছানাট।
ছুয়ে ফেললে যে ! ও কি রাখলে কি ওখানে?
গরবীর মুখখানা নিমেষেই ধরা-পড়া চোরের মত বিবর্ণ
হইয়া গেল। মুখে কিছুই বলিতে পারিল না, এক পা
নড়িতেও পারিল না-চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল।
সাবিত্রী তাড়াতাড়ি বিছানাটা উল্টাইয়া দেখিল,-ঝুমঝুমির
বালা। নির্বাক বিস্ময়াহত হইয়া সেও কিয়ৎক্ষণ তাহার
রক্তহীন মুখের পানে তাকাইয়া, কহিল,-তুই তো আজ কদিন
আসিস নি ?—কখন নিয়েছিলি?
হেঁটমুখে ধীরে ধীরে গরবী উভর দিল—হ, নিয়েছিলাম ।

পৌষ-পার্বণ
৪৫
;
সাবিত্রী আর ধৈর্য্য ধরিয়া থাকিতে পারিল না। বলিল,
-তুই এমন তা আমি জান্তুম্ না—ছি, ছি-দুধ কলা দিয়ে
সাপ পােষা হয়েছিল এতদিন যা•••বেরাে আমার সুমুখ।
থেকে। তােকে কাজ করতে হবে না আর।
গরবী কলঙ্কের বােঝা লইয়া তেমনি হেঁটমুখে ধীরে ধীরে
বাহির হইয়া গেল। মায়ের কথা শুনিয়া নণ্ট ও ঝুমঝুমি খেলা
বন্ধ করিয়া ছুটিয়া আসিয়াছিল। নন্ট, গরবীর মুখের পানে
তাকাইয়া বলিল, “তবে রে চোর !
গরবী ট্রাম লাইনের পাশ দিয়া বাড়ী ফিরিতেছিল ; দেখিল,
একটা লণ্ঠন হাতে লইয়া মদের নেশায় টলিতে টলিতে নন্দলাল
সেই দিকেই আসিতেছে।
তাহার সহিত কথা কহিতেও গরবীর ঘণ। বােধ হইতেছিল।
ভাবিয়াছিল, পাশ কাটিয়া চলিয়া যাইবে, কিন্তু নন্দলাল তাহাকে
চিনিতে পারিয়া খপ, করিয়া গরবীর অঞ্চলের একটা প্রান্ত
ধরিয়া ফেলিয়া জড়িতস্বরে কহিল,—কি গো গরব-সুন্দরী,
সন্ধ্যাবেলা কোথা থেকে ?
একটা হেঁচকা টান্ মারিয়া তাহার হাত হইতে কাপড়টা
জোর করিয়া ছাড়াইয়া লইয়া গরবী শুধু বলিল,-যাঃ!•••
বেইমান কোথাকার!

৪৬
পৌষ-পার্বণ
গরবীর রাগের কারণটা যে কি, নন্দলাল তাহা বুঝিতে না
পারিয়া ফ্যাল ফ্যাল করিয়া তাকাইয়া রহিল।
গরণী আর কোন কথা না বলিয়া দ্রুতপদে সেখান হইতে
চলিয়া গেল।
নন্দলাল বাসায় ফিরিয়া সাবিত্রীর নিকট আদ্যোপান্ত সমস্ত
শুনিয়া যেন আকাশ হইতে পড়িল ; বলিল,-এ। এমনতর
ব্যাপার ! কাল থেকে ও চোর হারামজাদীকে বাড়ী ঢুকতে
দিও না আর ।
গ
দিন-কয়েক পরে, নন্দলাল নিজে হইতে একদিন গরবীর
অনুসন্ধান করিতে গিয়া শুনিল, সে শ্বশুরবাড়ী চলিয়া গেছে ।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ
ইস্তফা
পুরাতন ম্যানেজারের জবাব হইয়া গেলে, বামনদাস বাবুর
ডােন। কয়লা-কুঠিতে একজন ছােকরা-বয়সের নৃতন সাহেব
ম্যানেজার বহাল হইয়া আসিলেন।
প্রথমে কুঠিতে আসিয়াই সাহেব বড়বাবুকে ডাকিয়া
পাঠাইলেন।
নৃতন ম্যানেজার আসিবে জানিয়া, বড়বাবু তখন নিবিষ্ট
মনে পেছলি কাজ সারিয়া লইতেছিল। বেয়ারা আসিয়া
সংবাদ দিতেই, তাড়াতাড়ি কলমটা কাণে গুজিয়া, চটি
চটুপটাইয়া সাহেবের নিকট আসিয়া সে এক লম্বা সালাম ঠুকিয়া
চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। ইংরাজীতে সে ভাল করিয়া কথা
বলিতে পারিত না, মাইনর স্কুলের ফাষ্টক্লাস পর্যন্ত বিদ্যায়
সেটা একপ্রকার অসম্ভবও ছিল, কাজেই তার চুপ করিয়া
দাড়াইয়া থাকা ছাড়া উপায় ছিল না।
বড়বাবুর চেহারাখানি বেশ নাদুশনুদুশ,অর্ধ বৃদ্ধ, বাঙালী
ভদ্রলােক। মাথার চুল ছােট করিয়া কাটা, গোঁফ-জোড়াটি
কুণ্ডলিকৃত হইয়া মুখের ভিতর আসিয়া ঢুকিয়াছে, উপরের

৪৮
পৌষ-পার্বণ
পাটির দাত একটিও নাই। চশমাখান। কপালের উপর তখনও
তােলা রহিয়াছে, তাড়াতাড়িতে সেটা নামাইয়া রাখিতে
ভুলিয়া গিয়াছিল।
সাহেব বেশ ভাল বাঙলা জানিতেন ; তাহাকে দাড়াইয়া
থাকিতে দেখিয়া বলিলেন,-বসাে বাবু, বসাে।
বড়বাবু বসিলে,
সাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন,তুমিই
বড়বাবু? আচ্ছা, কুঠির অবস্থা কি, আমায় সব কথা বল
দেখি।
বড়বাবুর এক যুবক পুত্র আজ কয়েক বৎসর ধরিয়া গ্রামের
যতসব বদমায়ে ছেলেদের সঙ্গে 'বােম্বেটেগিরি করিয়া, মদ
গাঁজা খাইয়া, যাত্রার দলে বক্তৃতা করিয়া এবং এমনি আরও-সব
কত কি করিয়া, পিতার বদন দগ্ধ করিতেছিল ; তাই বড়-বাবু
বহুদিন হইতে মনে করিয়াছিল, কোনপ্রকারে কুঠির কোন
একটা বাবুকে তাড়াইয়া তাহার স্থানে পুত্ররত্নকে বহাল করিয়া
দিতে পারিলেও বা কোন রকমে ছেলেটা মানুষ হইয়া যায়,
কিন্তু পুরাতন ম্যানেজারের আমলে সে সুবিধাটুকু ঘটিয়া উঠে
নাই এবং সেইজন্য আজ কার্যারম্ভের প্রথমেই ম্যানেজার
সাহেবের নিকট গৌরচন্দ্রিকা করিয়া রাখিল,কুঠির অন্যান্য
অবস্থা বিশেষ মন্দ নয় সাহেব, কিন্তু গুদামের অবস্থা তেমন

পৌষ-পার্বণ
৪৯
সুবিধা নয়। গুদামবাবু কারও কথা শােনে না,-ষ্টোরের
জিনিস বেপরােয়া চুরি করে। গুদোমটা প্রায় সাবাড় হতে
চলেছে। সুতরাং পুরাতন ‘কের সঙ্গে present stockটা
একবার ‘চেক করে নেওয়া বিশেষ প্রয়ােজন।
—তা বেশ, তারপর--অফিস ?
—হুজুর, অফিসের খাতা-পত্র সব দুরস্ত আছে।
‘রেজিং কত ?
মাসে চার-হাজার, সাড়ে চার হাজার।
সাহেব অফিসের খাতাপত্র একবার ভালাে করিয়া দেখিয়া
লইয়া ‘খাদে নামিবার পূৰ্ব্বে বড়বাবুর কথামত গুদামবাবু
নরেশকে একবার ডাকিয়া পাঠাইলেন।
নরেশ নেহাৎ নিরীহ গাে-বেচারা। কম্পিতপদে কাছে
আসিয়া দাঁড়াইল। বড়বাবু ভ্রুকুটি করিয়া বলিল, ওহে শুনছাে
নরেশ, সাহেব কি বছেন একবার ভাল করে শােন।
সাহেব নরেশের মুখের পানে তাকাইয়া কহিলেন—তােমার
‘ষ্টোরে সব জিনিস আছে ত’ ?
নরেশ ভয়ে-ভয়ে হাত জোড় করিয়া বলিল,-আজ্ঞে হ্যাঁ,
আছে।
সাহেব বলিলেন, অাই তােমাকে একটা present
০

পৌষ-পার্বণ
stock list করে দিতে হবে।—দু একদিনের মধ্যেই।
বড়বাবুর কাছে দিও।
যাও!
নরেশ চলিয়া যাইতেছিল, বড়বাবু হাতের ইসারা করিয়া
বলিল, শুলে হে নরেশ ? শুলে—কোথায় submit কবৃতে
হবে শুনলে তাে ?
-আজ্ঞে হঁা, বলিয়া নরেশ চলিয়া গেল।
নরেশকে সাহায্য করিবার জন্য গুদামে অন্য-কোন কর্মচারী
ছিল না, কাজেই কুলি-কামিনদের কেরােসিন তেল মাপিয়া
দেওয়া হইতে আরম্ভ করিয়া যাবতীয় কাজ তাহাকে একা
করিতে হইত। সকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত খাটিয়াও সে
দিনের কাজ শেষ করিয়া উঠিতে পারি না। তাহার উপর
একটি-একটি করিয়া গুদামের প্রত্যেকটি জিনিসের তালিকা
করিবার ভার তাহারই উপর পড়ায়, সে বড় ব্যতিব্যস্ত হইয়া
পড়িল।
বড়বাবু প্রত্যেক দিন তাহাকে তাড়াহুড়া দিতে আরম্ভ
করিল। সাহেব কিছুই বলিত না, অথচ বড়বাবুর কাছে তাড়া
খাইয়া সে একদিন বলিয়া বসিল,-আমি এই কাজটাই একজন
‘এসিষ্টেন্ট ছাড়া পেরে উঠছি না, তার ওপর Stock-list

পৌষ-পার্বণ
তৈরী কখন করি বলুন তাে? আমাকে দয়া করে একটি
হপ্তার সময় দিন, আমি Stock-list দিয়ে কাজ ছেড়ে দেব।
বড়বাবু বলিল—তার মানে ?
—আজ্ঞে আমি জবাব দিতে চাই—আর পারছি না।
-তবে তাই দাও না হে!...এসাে তুমি সাহেবের কাছে,
আমার কাছে বলে কি হবে বাপু !-বলিয়া বড়বাবু তাহাকে
একপ্রকার টানিতে টানিতে সাহেবের নিকট লইয়া হাজির
করিল।
সাহেব মুখ তুলিয়া বলিলেন—কি ?
নরেশ বলিল,-আমায় এক হপ্তার সময়.•••••
বড়বাবু বাধা দিয়া তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিল, আসল
কথাটাই বল না হে কি বলছিলে। অমন টা-ঢাক গুড়-গুড়
কেন ?
নরেশ শঙ্কিত হইয়া বলিল, বলছিলুম, আমার একজন
'এসিষ্টেন্ট না হলে-
বড়বাবু মুখ-বিকৃতি করিয়া বলিয়া উঠিল, এ, ওর আবার
এসিষ্টেন্ট, না আবাে-কিছু! লাটসাহেব এলেন আর কি।
সাহেবের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া বলিল—এই যে আমাদের
সাহেব, ওঁকে একা এই কলিয়ারীর সব কাজ দেখতে হয় জানাে

পৌষ-পার্বণ
ততা ? তােমার চেয়ে ওর বয়েস তো কম বই বেশী নয়।••••
আমাদের বাঙ্গালী জাতটাই এম্‌নি আলসে-কুঁড়ে, খেতে পেলে
শুতে চায়।--বুঝলে সাহেব ?
সাহেব কোনও কথা না বলিয়া চুপ করিয়া রহিলেন। এদিকে
বাহিরে তখন কতকগুলা কুলি তেল লইবার জন্য গুদামের উঠানে
দাড়াইয়া চীৎকার করিতেছিল। সাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন,
বাইরে ও কিসের হলা ?
বড়বাবু বলিল, ও দেখছেন কি, কুলিরা চেঁচাচ্ছে তেল
নেবার জন্যে।
সাহেব নরেশের দিকে চাহিয়া বলিলেন—এখন যাও, কাজ
করগে, এর পর ভেবে দেখা যাবে।
নরেশ চলিয়া গেলে, বড়বাবু সাহেবকে বলিল, ও হচ্ছে
পাকা শয়তান ! Stock চেক করতে গেলেই ধরা পড়বে কি
না, তাই ইচ্ছে করেই দেরী করছে সাহেব ! ওকে জবাব
দেওয়াই উচিত।
সাহেব বলিলেন—এ তােমাদের ভুল সন্দেহ। ও যদি চুরি
না করে থাকে। আর জবাব দিলেই বা তুমি এখনই গুদামে
লােক কোথায় পাবে বড়বাবু?
বড়বাবু ঈষৎ হাসিয়া বলিল, ললাকের ভাবনা সাহেব?

পৌষ-পার্বণ
আজই বলুন, কত গণ্ডা পাকা ষ্টোর-কিপার চাই। আমি
গেরেন্টি দিচ্ছি, সাহেব। আমার একজন চেনা লােক আছে
-এইখানে কোথা এক কোম্পানীর ঘরে কাজ করে, Expert
an-বলেন তাে সন্ধান করে তাকেই আনিয়ে দিই।
সাহেব বলিলেন, তা বেশ । তােমার কয়লার stock-বুক
খানা up-to-date করে রেখেছ তাে বাবু?
বড়বাবু সাহেবের একটু কাছে আগাইয়া গিয়া বলিল,
জানুয়ারী, ফেব্রুয়ারী, সব complete,-বাকী শুধু March. .
ডিপো-সরকারের কাছ থেকে এক বার Balance পেয়েছি কি
মেরে দিয়েছি ! তবে কাল পাবে না সাহেব, এ কথা ঠিক।
আজ office hour এর পর আমাকে একবার বাড়ী যেতে হবে,
সত্য-নারাণের পূজো আছে। দেখ না সাহেব আমাদের বাপ
চোদ্দ-পুরুষের কাজ দেখ না। বার মাসে তের দুগুণে
সাঁইত্রিশটা! সেরিমণি বাড়ী আমাদের খুবই কাছে সাহেব।
within two miles.
সাহেব চুপ করিয়া খাতায় কি লিখিতে আরম্ভ করিলেন।
বড়বাবু প্রসন্নচিত্তে বাহির হইয়া আসিল।
গুদামবাবুকে তাড়াইবার জন্য বড় বাবুকে আর বেশী কিছু

৫৪ পৌষ-পার্বণ কষ্ট পাইতে হইল না। শনিবার দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত সুস্থ শরীরে গুদামের সমস্ত কাজ সারিয়া রবিবার সে বাড়ী গিয়াছিল । সােমবার সকালে বড়বাবু কাজে আসিয়া দেখিল, গুদাম তখনও বন্ধ, গুদামবাবু কাজে আসে নাই। গুদামের উঠান দাড়াইয়া কুলি-কামিনের গাইতি সাবল লইবার দাড়াইয়া আছে। বড়বাবু সুযােগ বুঝিয়া সাহেবের কাছে নালিশ করিল, দেখছ সাহেব-বেলা ন’টা বাজতে যাচ্ছে এখনও তােমার গুদাম- বাবুর দেখা নাই। এরকম unpunctual লােক নিয়ে কঁহাতক কাজ চলে বল ত ? আর সেই stock-list সে আজ হপ্তা- খানেক্• কেও ? ডাক্তারবাবু? আসুন। ডাক্তারবাবুকে প্রবেশ করিতে দেখিয়া বড়বাবু চুপ করিল। ডাক্তারবাবু আসিয়া জানাইলেন গত রবিবার প্রাতে গুদামবাবুর কলেরা হইয়াছিল, রাত্রি সাড়ে দশটার সময় সে মারা গিয়াছে। বড়বাবু তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিল—আঁ মারা গেছে ? বল কি ডাক্তার? নরেশের এই আকস্মিক মৃত্যু-সংবাদে তহার বুকের ভিতরট।

পৌষ-পার্বণ কেমন যেন করিতে লাগিল। সাহেব হতবুদ্ধির মত নিৰ্বাক- ভাবে ডাক্তারের মুখের পানে চাহিয়া বসিয়া রহিল। চাপরাশীর কাছে চাবি লইয়া সাহেব নিজে গুদাম-ঘর খুলিয়া দিয়া বড়বাবুকে বলিলেন,-আজকার মত তােমাকেই কাজটা চালিয়ে দিতে হবে বড়বাবু। কি করবে বল আর তাে spare লােক দেখছি না। বড়বাবু মহাবিপদে পড়িল । গুদামে কাজ করিবার ইচ্ছা তাহর ছিল না। শুনিতেছে সে নাকি কলেরায় মারা গেছে। কাজ কি বাপু! একই জায়গায় বসিয়া কাজ করিতে গিয়া তাহারও যদি অমনি একটা কিছু বড়বাবু আর ভাবিতে পারিল না। মনিবকে ফাকি দিয়া সে আজ পঁচিশ বৎসর কাজ করিতেছিল এবং তাহার এই বহুদিনব্যাপী গােলামীর কল্যাণে সে আর-কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করুক আর না-ই করুক, উপস্থিত-বুদ্ধিটুকু তাহার যথেষ্ট জন্মিয়াছিল। চট্ করিয়া বলিয়া ফেলিল, সাহেব, এখনো আমার ঢের কাজ বাকী। তার চেয়ে এক কাজ কর। Wagon supply বন্ধ বলে আমার ডেসপেচ-ক্লার্ক হরেন-ছােকরা আজ ক’দিন ধরে বসে আছে। তাকেই দিই এখানে, আজকার মত চালিয়ে দিক, তারপর অন্য ব্যবস্থা করা যাবে।

পৌষ-পার্বণ
অফিসের কোন বাবুর সহিত বড়বাবুর মনের মিল ছিল না,
তবে এই হরেন ছােকরার সহিত যেন একটু বেশী রকমের
অসম্ভাব,—উভয়ে ঝগড়া-ঝাটি প্রায় প্রত্যহই হইত।
হরেনকে তাড়াইবার চেষ্টাও সে সাধ্য পক্ষে কম করে নাই, তবে
আজ পর্যন্ত তাহার চাকরিটি নষ্ট করিবার সুযােগ মিলে নাই
বলিয়াই সে কোনরকমে টিকিয়া আছে। ইহাদের উভয়ের
মনােমালিন্যের একটু কারণও ছিল। অফিসের কাগজ কলম
পেন্সিল ডাক-টিকিট ইত্যাদি থাকিত হরেনের গচ্ছিত।
বড়বাবুর দুইটি ছােট ছেলে স্কুলে পড়িত, তাই সময় সময়
পেন্সিল কাগজ ইত্যাদি ফাক পাইলেই নির্বিচারে সে বাড়ী
লইয়া যাইত। প্রথমে হরেন খাতির করিয়া বড় একটা কিছু
বলিত না, পরে যখন মাত্রা অতিরিক্ত হইয়া উঠিল তখন সে
আর না বলিয়া থাকিতে পারিল না।
একদিন সন্ধ্যার অন্ধকারে গা ঢাকিয়া, বড়বাবু তাহার গায়ের
কাপড়ের নীচে দিস্তা পাঁচ ছয় কাগজ লুকাইয়া লইয়া বাড়া
যাইতেছিল। পথে দেখা হইল,
হরেনের সঙ্গে। একটা
সঙ্কীর্ণ রাস্তার মধ্য দিয়া উভয়ে চলিতেছিল, কাজেই হরেনের
গায়ের ধাক্কা লাগিয়া কাগজগুলা অসামাল হইয়া গিয়া হঠাৎ
কাপড়ের নীচে হইতে মাটিতে পড়িয়া গেল।
গেল। হরেন

পৌষ-পার্বণ
৫৭
বুঝিতে পারিয়া বলিল, এগুলাে কি বড়বাবু-এ যে অফিসের
কাগজ।
বড়বাবু পুনরায় সেগুলা তুলিয়া লইয়া বলিল,-হা, খাবে
তুমি, তােমার বাবার ।
হরেন আর নিজেকে ঠিক রাখিতে পারিল না, মুহূর্তেই
রাগিয়া উঠিয়া বলিল -খবরদার বলছি বড়বাবু, মুখ সামলে
কথা বলবেন। আমি জানি, আপনি রোজ-রােজ এমনি করে’
আফিসের জিনিস চুরি করে নিয়ে যান। আমি আজ সাহেবকে
না বলি, ত’--
ঝগড়া করিবে কি, বড়বাবু তখন চলিয়া যাইতে পারিলে
ধাঁচে।
-বলে তুমি আমার যা করে নিতে পার, কোরাে।
বলিয়া সে তাড়াতাড়ি পলায়ন করিল।
কথাটা হরেন অফিসময় রাষ্ট্র করিয়া দিতে ছাড়িল না।
সেইদিন হইতে হরেনের সহিত বড়বাবুর ঝগড়া। আজ
সুযােগ বুঝিয়া সেইজন্যই সে গুদোমের কাজ করিতে নরেশের
জায়গায় তাহাকেই পাঠাইবার জন্য সাহেবকে বিশেষভাবে
অনুরােধ করিল। সে ভাবিল, যদি মরে তাে সেই মরুক।
সাহেবের আদেশ-মত হরেন গুদামে কাজ করিতে গেল।

৫৮
পৌষ-পার্বণ
সেদিন সন্ধ্যায় সাহেব বলিলেন, বড়বাবু, সেই যে তুমি
কে একজন Expert গুদামবাবুর কথা বলেছিলে, তাহাকে
এনে দিতে পার না ?
বড়বাবুর এই Expert গুদামবাবুটি আর কেহই নয় তাহার
বােয়াটে পুত্র-রত্ন। কিন্তু এই অশুভ স্থানে ছেলেকে সে পাঠায়
কেমন করিয়া? বলিল—আমি তার সন্ধান নিয়েছিলুম সাহেব,
তার অসুখ হয়েছে, দিনকতক পরে আসবে।
হরেন বেশ চালাক ছােরা। গুদামবাবুর কাজ সে বেশ
ভালই চালাইতেছে দেখিয়া একদিন সাহেব বললেন, তােমার
Despatch Clerk তে গুদামের কাজ বেশ চালাচ্ছে, এইবার
একটা Despatch Clerk দেখ।
বড়বাবু মহা আনন্দিত হইয়া বলিল,-কালই নিয়ে আসছি
সাহেব, লােকের ভাবনা কি?
পরদিন বড়বাবু তাহার পুত্র রাখহরিকে লইয়া আসিয়া
সাহেবকে বলিল, সাহেব! এই নাও তােমার লােক—যার
কথা বলেছিলুম, ভেপেচের কাজ ও বেশ ভালাে জানে।
রাখহরি ডেসপেচের কাজে ভর্তি হইল।
কয়েকদিন পরে, কি-একটা কাজের জন্য রাখরি সাহেবের

পৌষ-পার্বণ
কাছে গিয়া কথাবার্তা আরম্ভ করিল। সাহেব জিজ্ঞাসা করিল,
coata at fø Despatch Babu ?
-আমার নাম রাখহরি ব্যানার্জি।
—আমার বড়বাবুর সঙ্গে তােমার পরিচয় হ’ল কেমন করে ?
-আজ্ঞে, আমি তাঁরই ছেলে।
সাহেব সে-কথা জানিতেন না এবং বড়বাবুও সে-সম্বাদ
তাহার নিকট গােপন করিয়া, কোন-এক পরিচিত ভদ্রলােক
বলিয়াই তাহার পরিচয় দিয়াছিল। এতক্ষণে সাহেব ভিতরের
ব্যাপার সবই বুঝিতে পারিলেন।
সে দিন কথায়-কথায় সাহেব বলিয়া ফেলিলেন, রাখহরি
তোমার ছেলে,--কই, সে-কথা আমায় কোনদিন
বল নাই ?
বড়বাবু পুত্রকে মনে-মনে গালাগালি দিয়া বেশ একটু
অপ্রতিভ হইয়া বলিয়া ফেলিল, আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি তার step
father.
সাহেব আশ্চর্য্য হইয়া বলিলেন, সে আবার কি? হিদুর
মেয়েদের তাে দু’বার বিয়ে হয় না !
এতক্ষণে বড়বাবুর স্মরণ হইল যে, সে ইংরাজী কথাটা ভুল

পৌষ-পার্বণ
বলিয়া ফেলিয়াছে। বলিল,-না, না, সাহেব I mistake, সে
আমার Second wife এর Son. .
সাহেব না হাসিয়া থাকিতে পারিলেন না। মুখে হাসিলেন
বটে, কিন্তু বড়বাবুর এই মিথ্যা চাকুরীর জন্য মনে-মনে বেশ
একটু অসন্তুষ্ট হইলেন।
যাহাহউক, ডেপেচের কাজের চেয়ে গুদামের কাজ অধিক
লাভবান হইলেও বড়বাবু রাখহরিকে ডেপেচের কাজেই
রাখিল, কারণ সে মনে
মনে আঁচিয়া
আঁচিয়া রাখিয়াছিল, যে
গুদামবাবুর কাজে যে ব্যক্তিকে সে পাঠাইয়াছে, সে নিশ্চয়ই
মারা যাইবে।
দিন-পনর পরে, একদিন এক অদ্ভুত ঘটনা শুনিতে পাওয়া
গেল। বড়বাবু সে দিন কঁদিতে কাদিতে প্রায় উন্মত্তের মত
আফিসে প্রবেশ করিয়া সাহেবকে জানাইল, যে, তাহার পুল
কখহরির সর্পদংশনে হঠাৎ মৃত্যু হইয়াছে।
পুত্র শােকাতুর বড়বাবুর কাছে এই ঘটনাটা যেমন আকস্মিক
তেমনি বিস্ময়কর বলিয়া বােধ হইতে লাগিল। তাহার মনে
দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিয়াছিল, যে, হরেনকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলিয়া
দিয়া পুত্রকে সে বিপদ হইতে বাঁচাইয়াছে এবং প্রতিনিয়তই
সে তাহার শত্রুরূপী হরেনের মৃত্যুসংবাদ শুনিবার জন্য উদগ্রীব

পৌষ-পার্বণ
হইয়াও থাকিত—এমন সময় যে তাহার সম্পূর্ণ বিপরীত ঘটনাও
ঘটিতে পারে, এ বিশ্বাস তাহার মােটেই ছিল না।
পুত্রের মৃত্যুর জন্য দিনকতক অফিস কামাই করিয়া বড়বাবু
পুনরায় কাজে আসিয়া দেখিল, হরেন গুদামের চেয়ারে বসিয়া
নিবিষ্টমনে কাজ করিতেছে। তাহার মুখের পানে বড়বাবু
তাকাইতে পারিল না। তাহার মনে হইতে লাগিল, হরেনই
তাহার পুত্রকে হত্যা করিয়াছে।
বড়বাবু একদিন সাহেবের কাছে একখানা দরখাস্ত পেশ,
করিল। সাহেব দেখিলেন, বড়বাবু চাকরীতে ইস্তফা দিতে চায় ।
অনেক ভাবিয়া সাহেব দরখাস্তটা না-মঞ্জুর করিয়া ফেরত
পাঠাইলেন।
বড়বাবু বস্থিয়া কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া ভাবিতেছিল।
ভগবানের এ কি অন্যায় অবিচার !••••••পুত্রের চেয়ারখানা শূন্য
পড়িয়া রহিয়াছে।
সাহেব হরেনকে বলিলেন, তুমি গুদোমের কাজ ছাড়িয়া
Despatchএর কাজে যাও। আমি গুদামবাবুর জন্য advertise
করে দিচ্ছি।
বড়বাবু ও ডেপেচবাবু একটা ঘরের দুইটা কামরায়
পৃথক পৃথক্ কাজ করিত। সাহেব হুকুম দিলেন, পাশাপাশি

পৌষ-পার্বণ দুইখানা টেবিল দিয়া এখন হইতে তাহারা মুখখামুখি বসিয়া কাজ করিবে। বড়বাবু প্রমাদ গণিল। এ যে আরও বেশী ভয়াবহ; পুত্রের মুখের পরিবর্তে অনুক্ষণ তাহাকে শত্রুর মুখখানাই---না, না, সে পারিবে না ! পুরাতন কাগজপত্র উল্টাইতে গিয়া রাখহরির হাতের লেখ। ও সহিগুলা দেখিয়া বড়বাবুর চোখ-মুখ লাল হইয়া উঠিল- বেদনার্ত বুকখানা হাহাকার করিতে লাগিল। চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া সাহেবের কাছে গিয়া বলিল, না সাহেব, আমি আর কাজ করিতে পারিনা। আমায় জবাব দাও। সাহেব বলিলেন, পাঁচ টাকা মাইনে বাড়িয়ে দিচ্ছি তােমার । তােমায় ওই কাজেই থাকতে হবে বাবু। বড়বাবু ভাবিল, সাহেব তাহার একান্ত হিতৈষী। তাহা হইলে কি হয়, এযে তাহার মৃত্যুর চেয়েও ভয়ানক। সাহেব মনে মনে বলিল, এতদিনেও তােমাদের যদি না চিনিতে পারিয়া থাকি তবে আমার এতকাল ভারতবর্ষে থাকাই বৃথা হইয়াছে । ইহাই তােমার উপযুক্ত শান্তি শয়তান। ৩

পঞ্চম পরিচ্ছেদ,
অশ্রু-জল
-“আঃ, মাথা নেই, মুণ্ডু নেই,—কি বলছ ছাই ! তার
চেয়ে চুপ করে শশাও।
—এই শুয়েছি কিন্তু ঘুম যে আসে না গাে, তার চেয়ে
একটা গল্প বল না—আমি শুনি।
-গল্প জানি না।
-ইস! জান না?.•••••না,-ব-লাে!
স্বামী চুপ করিয়া রহিল। স্ত্রী কিছুতেই ছাড়িবে না।
বলিল, সেই যে কি লিখছিলে, দাড়াও, খাতাটা নিয়ে আসি।
তুমি পড়। আমি শুনি।
বলিয়া সে খাতাখানা আনিয়া তাহার হাতে দিল।
স্বামী পড়িতে সুরু করিল। স্ত্রী তাহার গলা জড়াইয়া ধরিয়া
চুপ করিয়া শুনিতে লাগিল।
জয়ন্ত ছিল আমার বন্ধু। দেখতেও যেমন সুপুরুষ, লেখা-
পড়াও জান্তাে তেমনি। কিন্তু বড় গরীব।
হ্যা, লেখাপড়া জালে আবার গরীব হয় ?

৬৪
পৌষ-পার্বণ
বছো কেন? শুনেই যাও না।-হ্যা, গরীবই ছিল।
নিজের বলতে কেউ ছিল না তার—বাপও না, মা’ও না।
অতিকষ্টে এক বড়লােকের বাড়ী মানুষ হয়েছিল। তারপর, সে
যখন এম্-এ পাশ করলাে, তখন সেই বড়লােক, জোর করে’
একরকম আর-এক বড়লােকের বাড়ী তার বিয়ে দিয়ে দিলেন ।
ছেলের বােঝাটা হয়ত তিনি আর বইতে পারছিলেন
, তাই আর একজনের ঘাড়ে সেটা চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত
হলেন। নিজেই রােজগার করতে পারে না, তার উপর বিয়ে
করে আর একজনের দায়িত্ব গ্রহণ করবার ইচ্ছা জয়ন্তর ছিল না ।
ভেবেছিল, যতদিন পর্যন্ত না তার নিজের একট -কিছু সংস্থান
করে নিতে পাছে ততদিন বিয়ে করবে না, কিন্তু কি আর
অনিচ্ছাসত্ত্বেও বিয়েটা হয়ে গেল।
স্ত্রীর নাম নন্দরাণী ! মস্ত এক বড়লােকের একটিমাত্র
আদরিণী মেয়ে ! জয়ন্ত নিতান্ত ছন্নছাড়া পথের কাঙাল
হলে কি হয়,-সাধ ছিল, বৌটি হবে সুন্দরী এবং সুশিক্ষিত।
--ঠিক তার মনের মতন। কেউ যখন নেই তার, তখন
তাকেই সে তার মাথার মণি করে রাখবে,আরও কত কি
সে করবে।
সে-সব ছিল
ছিল তার
স্বপ্ন!---কিন্তু হায়,
শুভদৃষ্টির সময় তার ব্যগ্র ব্যাকুল চোখদুটি তুলেই দেখলে
করে,

পৌষ-পার্বণ
—যাকে (म প্রাণ-মন দিয়ে চেয়েছিল, এ সে নয় ।
এর মুখের পানে তাকাতেও ভয় করে।
কল্পনার বিচিত্র জগৎ
আকাশকুসুমে পরিণত
হয়ে গেল !
জয়ন্তর নূতন জীবন শুরু হলাে,—দুর্গম কাটাভরা পথে
নিরুদ্যম এক যাত্রীর মতন।
জয়ন্ত দেখলে নন্দরাণী নিতান্ত অশিক্ষিত। এক পাড়া-
গায়ের মেয়ে। কতক গুলা কুসংস্কার নিয়ে বেড়ে উঠেছে মাত্র।
সংশিক্ষা সে কোনদিনই পায় নি। জয়ন্ত বই নিয়ে বসতাে,
আর নন্দরাণী তার খেলার সাথীদের নিয়ে, নিতান্ত ছেলে
মানুষের
এঘর-ওঘর করে ছুটে বেড়াতে। তাদের
উভয়ের মধ্যে এই নিদারুণ অসামঞ্জস্য জয়ন্তকে বড় বেশী পীড়িত
করে তুতো, তবু সে কোনদিন স্ত্রীর কাছে জানতে দিত না,
যে, সে তাকে ভালােবাসে না। কিন্তু এমন ভালােবাসার
অভিনয় করে আর কতদিন কাটে! এ যে মিথ্যা দিয়ে
প্রাণের সত্যকে গােপন ব্রাখা।..... গভীর নিশীথে হয়ত কোন
কোন দিন জয়ন্তর ব্যাকুল বক্ষ আলােড়িত করে’
চুম্বন
তৃষাতুর ওষ্ঠ দুটি কেঁপে কেঁপে উঠত,-স্ত্রীর নিদ্রিত মুখের
কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে, দুহাতে বুক চেপে নিজের মুখখানা শেষে
মত
৪

পৌষ-পার্বণ
সরিয়ে নিয়ে আসতো।—শিয়রে প্রদীপের ক্ষীণ শিখা কেঁপে কেঁপে
উঠতে। দাতে দাত দিয়ে প্রাণপণে নিজের ঠোটদুটি
চেপে ভাবতে-হায়, হায় ! একি প্রবঞ্চনা! এযে অবলার
সাথে মিথ্যা চাতুরী ! অভাগী তাই জয়ন্তর কাছ থেকে পেতে,
মাত্র একটু করুণা,-অসহায়ার প্রতি একটুখানি সহানুভূতি !
জয়ন্তর ক্রমাগত মনে হতো, এর থেকে কি অব্যাহতি নেই ?
কে যেন তার কানে-কানে বততা,-না,-নেই,নেই !
ধরাে, তুমি যদি কুরূপ, কুৎসিত, মুখ হতে, আর সে হতো
নন্দনের পারিজাত ! •••তাই কি? তবে কি তাই ? হা
ভগবান্ ! জয়ন্ত ভেবে কিছু কূল-কিনারা পেতাে না।
এমন দিনে তার এক সহপাঠি বন্ধুর বিবাহ-সভায় যােগদান
করবার জন্যে কলকাতা থেকে একখানি নিমন্ত্রণপত্র আসতেই,
জয়ন্ত আর এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে কলকাতা রওনা হলো,
ন্যার পরদিনই ।
আলােকোজ্জল বিবাহ-সভায় নববধূকে নিয়ে আসা হলো,
জয়ন্ত মন্ত্রমুগ্ধের মত একদৃষ্টে তাকিয়ে দেখ লে—তার সহপাঠা
যােগেশের
স্ত্রী বিভার লজ্জাবনত সুন্দর মুখখানির
পানে ! বাসস্তা রঙের খদ্দর বিভূষিতা নবােদ্ভিন্ন-যৌবনা কন্যার
সারা অঙ্গে সে কি অপূৰ্ব্ব রূপ-মাধুরী! বেশীক্ষণ তার দিকে

পৌষ-পার্বণ
তাকিয়ে থাকতে পারলে না সে, বিভার চম্পক অঙ্গুলিগুলি
যখন যােগেশের হস্তবন্ধনীর মধ্যে বাঁধা পড়লো, জয়ন্তের
সারা অঙ্গে তখন কঁাটা দিয়ে উঠেছে,-নীচের দিকে মুখ
রেখে সে ভাবছিল, অদৃষ্টের একি নিষ্ঠুর পরিহাস! তার
নন্দরাণী কি এমনটি হতে পারতাে না। এমন কি অপরাধ
করেছে সে,যার জন্যে সে এমন করে বঞ্চিত ?
পরদিন যােগেশ ইত্যাদি পরিচিত বন্ধুরা যখন জয়ন্তকে
‘জজ্ঞাসা করে বসলাে,-লুকিয়ে লুকিয়ে বিয়েটা সেরে ফেলে,
অথচ বৌ দেখালে না—কখন দেখাবে বল ?••••• তখন যদি
জয়ন্তর মাথায় বজ্রাঘাত হতো, তাহলেও সে তত বেশী দুঃখিত
হতাে না। নীরবেই কিয়ৎক্ষণ কাটিয়ে সে উত্তর দিল,-হ্যা,
দেখাব একদিন ভাই.••
কল্কাতায় থাকবার মত কোন সংস্থান তার ছিল না,
বু জয়ন্ত আর শ্বশুরের বাড়ীতে ফিরে না গিয়ে এক বন্ধুর
মেসে’ দিনকতক থেকে তাকে জানালে, একটা চাকরী-বাকরী
জুটিয়ে দাও ভাই, আমি এইখানেই থাকুববা।

পৌষ-পার্বণ
মার্চেন্ট-অফিসে একটা কাজ জুটলো।
জয়ন্ত সেই অবধি
কাউকে কোন কথা না জানিয়ে কল্কাতাতেই থেকে গেল।
মনটা তার কেবলই ছুটে যেততরুণী সুন্দরীদের পানে।
কেন যে তার এমন হলাে, সে নিজেই বুঝতে পারতো না।
যে-পাপ সে কোনদিন করেনি, আজ নিজে বঞ্চিত হয়ে সেই
পাপেই মন তার লিপ্ত হতে চায়। কেবলই যেখানে-সেখানে
তার তৃষিত ব্যাকুল চোখের দৃষ্টি ঘুরে বেড়ায় সেই না-পাওয়ার
গােপন-সন্ধানে!
অবশেষে তার না-পাওয়ার ব্যথা এমনি অসহ্য হয়ে উঠলো।
যে সে নিরুপায়ের উপায় ভেবে দু-একদিন রূপ-ব্যবসায়ীদের
দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ানাে শুরু করে দিলে। মাসের শেষে
অফিসের বেতন পেয়ে জয়ন্ত সেদিন এনি একটা কদৰ্য্য পল্লীতে
ঘুরে বেড়াচ্ছে, এমন সময় দোতালার উপর থেকে রমণী
কষ্টের একটা গানের সুর তাকে প্রলােভনের হাতছানি দিয়ে
ডেকে নিয়ে গেল। কম্পিত পদে ধীরে ধীরে সে ওপরে উঠে
যেতেই, রূপসী তরুণী, তার ভরা-যৌবনের ডালি নিয়ে তাকে
সাদর অভ্যর্থনা করে দুটো গান শােনালে। মুগ্ধ পতঙ্গের বেশী
দেরী হলো না সে আগুনে ঝাঁপ দিতে। সে তাে প্রস্তুত হয়েই
ছিল। ক্রমে একদিন নয়, দু’দিন নয়, প্রত্যহ সেই পাপপুরীতে

পৌষ-পার্বণ
তার নৈশ-বাসর বেশ জমে উঠতে লাগলাে এবং একদা কোন্
এক নিভৃত নিশীথে সেই সুন্দরী হস্তের উপহার তরল মদিরা
গলধঃকরণ করে নেশায় মশগুল হয়ে জয়ন্ত জেনেশুনেই সেই
অতল তলে ডুবে গেল চিরজনমের মত ।
কিন্তু রূপের সঙ্গে তীব্র মদিরার মােহে যখন সে ভরপুর
হয়ে গেছে, তখনও তার মন থেকে ঘৃণাহতা নন্দরাণীকে
বিদায় দিতে সে কোন প্রকারেই
প্রকারেই পারলো না। ধিকি
ধিকি করে আগুনের মতন জ্বলতে লাগলাে তার ব্যথিত
স্মৃতিটুকু !
পুরাে পাঁচটি বছর এমনি করে’ জয়ন্ত তার পাপের
প্রায়শ্চিত্ত সেরে যখন ফিরে দাড়ালাে, তখন আর সে-জয়ঙ্কর
কিছু বাকি নেই। অসৎ সংসর্গে থেকে, রাত্রি জাগরণ,
মদ্যপান এবং নানাবিধ অত্যাচারে তখন তার শরীর ভেঙে
গেছে, মনে ঘূৰ্ত্তি নেই, দুশ্চিন্তা এবং কুৎসিত ব্যাধিতে সমস্ত
দেহ-মন জর্জরিত হয়ে গেছে। একবার মনে হলাে,নিজের
ওপর এই নিষ্ঠুর প্রতিশােধ নেবার দরুণ ইচ্ছা তার কেন
হয়েছিল, এবং যদিই বা হয়েছিল, তবে আমরণ সে তাতেই
ডুবে থাকতে পারছে না কেন ?..••••কে যেন ডাকে, পিছন

৭০
পৌষ-পার্বণ
থেকে কার আর্তন যেন তাকে বারেবারে শুধু ফিরে যেতে
বলে।-কে,—সে কে ?•••
এতদিন পরে আবার জয়ন্ত নন্দরাণীর কাছে ফিরে গেল।
তার দেবতার মত চরিত্র সে তখন হারিয়ে ফেলেছে। এখন
তাে তার কোনও গন্ধ নেই—সব যে চোখের জলে ডুবে গেল !
নন্দরাণীকে সে তাে আর ঘৃণায় পায়ে ঠেলে দিতে পারে না-
সে-ই যে এখন তার অযােগ্য স্বামী ! স্বামীত্বের গৌরব এবং
অধিকার নিয়ে কেমন করে কোন মুখে গিয়ে সে দাড়াবে
তার চোখের সুমুখে ?
যাক, তবু সে গেল।
বছরখানেক পরে দেখা গেল, নন্দরাণীর একটি ছেলে
হয়েছে। কিন্তু সে-ছেলে প্রায় পাঁচ ছ মাস রােগ ভােগ করে’
গেল মরে
-তারপর ?
স্বামী কিয়ৎক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া কহিল,তারপর
আর কি? নন্দরাণীও মরে গেল দু তিন সপ্তাহের পর !
স্ত্রী একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া হঠাৎ সচকিতভাবে জিজ্ঞাসা
করিল,-, মরে গেল ?-তারপর ?

পৌষ-পার্বণ
৭১
—আবার কি?—আর কিছু না।
-ভােমার সেই বন্ধু জয়ন্ত তাহলে আবার দেখে-নে
একটি বিয়ে কলে?
স্বামী আর কোন কথা না বলিয়া নীরবে খােলা জানালার
পনে একদৃষ্টে তাকাইয়া রহিল। বর্ষাকাল। কখন্ যে হঠাৎ
বৃষ্টি নামিয়াছে তাহারা বুঝিতে পারে নাই। বাহিরে তখন
বাদলের ধারা যেন আকাশ ভাঙ্গিয়া তৃষ্ণার্ত তপ্ত পৃথিবীর বুকে
ঝম ঝম করিয়া অজস্র ধারায় ঝরিয়া পড়িতেছে ।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
পতি-দেবতা
শীত কিছু বেশী পড়েছে, নয় অনিল ?
অনিলার কোন সাড়াশব্দ না পাইয়া ললিতা আবার বলিল,
-অনিলা ? বেরিয়ে গেছি বুঝি?
অনিল সন্ধ্যাপ্রদীপটি তুলসীতলায় নামাইয়া যুক্তকরে
দাড়াইয়াছিল। ভগবানের কাছে প্রণাম করিতে গিয়া, প্রার্থনা
করিবার মত কথা খুঁজিয়া পাইল না। অমঙ্গল তাহাদের
নিত্য-সহচর। মঙ্গলকামনা যাহাদের জন্য, তাহারা সকলেই
যখন একে-একে বিদায় লইয়াছে, তখন আর কাহার জন্য কি
প্রার্থনা করিবে ?—কিশােরীর বুকের তলা হইতে একটা গভীর
দীর্ঘনিশ্বাস পড়িল। চোখের অশ্রু দু চোখ ভরিয়া ছল ছল
করিয়া উঠিল ।
অনিলা বাহিরে চলিয়া, গেছে ভাবিয়া ললিতা চুপ করিয়া
বসিয়া রহিল। তাহার চোখের দৃষ্টি আজকাল ঝাপসা
হইয়া গেছে, তাই অনিল কখন্ যে ঘরের বাহির হইয়া
গিয়াছিল, দেখিতে পায় নাই। দৃষ্টি ঘােলাটে হইবার একটু
কারণও ছিল। বাল্যজীবন হইতে আরম্ভ করিয়া আজ এই

পৌষ-পার্বণ
পঞ্চাশ বৎসর পর্যন্ত জীবনের হিসাব খইয়া দেখিতে গেলে
দেখা যায়, শুধু আঘাতে আঘাতে ললিতার নারী-জীবন ক্ষত
বিক্ষত হইয়া গেছে। স্বামী যে দিন হইতে তাহাকে এই
পল্লী-কুটীরে সামান্য একটা মাসহারা দিয়া নির্বাসিত করিয়া,
নিজে একটা বার-নারীর গুণমুগ্ধ হইয়া কলিকাতায় রাজার
হালে বাস করিতেছেন, সেই দিন হইতে তাহার কান্না শুরু
ইয়াছে, আজও সে চোখের জলের অবসান হয় নাই
একটা মেয়ে ছিল,—মাত্র অনিলাকে রাখিয়া সেও আজ প্রায়
দশ বৎসর পূর্বে চিকিৎসা অভাবে মরিয়া গেছে। একটা
ছেলে ছিল, সে থাকিত পিতার কাছে কলিকাতায় ।
তিন মাস হইল, গত ভাদ্রের এক নিস্তব্ধ সন্ধ্যায় সেখান হইতে
সংবাদ আসিল, সে-ও তার দুঃখিনী মাতার মায়া কাটাইয়া
দিদির কাছেই চলিয়া গেছে! কলিকাতা হইতে ললিতার
সপত্নী মহােদয়া করুণা করিয়া একখানি পােষ্টকার্ডের 'পিঠে এই
সংবাদটি লিখিয়া পাঠাইয়াছিলেন। মরিবার সময় ছেলেটাকে
একবার সে চোখের দেখা দেখিবারও অনুমতি পায় নাই।
ইহার পরেও যে সে মাত্র চোখের দৃষ্টিটুকু হারাইয়া বাঁচিয়া
আছে, ইহাই তাহার চরম দুর্ভাগ্য!
কন্যার মৃত্যুর পর নিজের অলঙ্কার বিক্রয় করিয়া ললিত

পৌষ-পার্বণ অনিলার বিবাহ, দিয়াছিল, কিন্তু কুলিনের মেয়ে বলিয়া শ্বশুরবাড়ীর মুখ তাহাকে জীবনে কোনদিনই দেখিতে হইল না। অনিলাকে আহুতি দিবার পূর্বেই কৌলিন্যাভিমানী তাহার প্রৌঢ় স্বামী-দেবতা আরও তিন-চারিটি অনাথার কন্যাকে বিবাহ করিয়া তাহাদের জাতি রক্ষা করিয়াছিল। অনিল জানিত, নিঃসহায় কুলিন-কন্যার স্বামীভাগ্য ইহা অপেক্ষা আর বেশী কিছু হইতে পারে না, তাই কোনরকমে নিজের বুকের আগুন বুকেই চাপিয়া রাখিয়া, তাহার আশ্রয়দাত্ৰী সৰ্বস্বহারা এই বৃদ্ধা মাতামহীর সেবা-যত্ন করিয়াই দিনগুলা তাহার পার করিতেছিল। একমাত্র পুত্রের মৃত্যুর পরেও, ললিতার বৃদ্ধ স্বামী শ্যাম- সুদরবাবু কেমন করিয়া যে সেই বার-বনিতাকে লইয়া কলিকাতায় সুখে-স্বচ্ছন্দে কাল কাটাইতে ছিলেন, এইটাই ললিতার সব চেয়ে আশৰ্য বলিয়া মনে হইত। মনের যখন এইরূপ অবস্থা, তখন স্বামীকেও একটিবারের জন্য চোখে দেখিতে পাইলেও বা তাহার মনের দুঃখ কতক পরিমাণে কমিতে পারি, কিন্তু আজ তিন মাসের মধ্যে তাহার দেখা পাওয়া দুরের কথা, গত একমাস তাহার মাস-হারার পনরটি- টাকাও বন্ধ হইয়া গেছে।

পৌষ-পার্বণ
৭৫
বুদ্ধ। মাতামহীর নিষেধ সত্ত্বেও অনিল। ভয়েভয়ে তাহার
কলিকাতা-প্রবাসী মাতামহের নিকট একখানি চিঠি লিখিয়া-
ছিল। চিঠির জবাবের প্রত্যাশা সে করে নাই, তথাপি উত্তরে
যে দুটি কথা ফিরিয়া আসিল, তাহা মহাদের একেবারে
অপ্রত্যাশিত। তিনি লিখিলেন, একটু বেশী শীত পড়িলেই
পৌষ-মাসের মধ্যে তিনি একবার আসিবেন।
পৌষের প্রথম হইতেই ললিতা তাহার স্বামীর আগমন
প্রতীক্ষা করিতেছে। শীত একটু বেশী পড়িলেই তিনি
আসিবেন লিখিয়াছেন, কাজেই প্রতিদিন প্রাতে ও সন্ধ্যায়
অনিলাকে সে প্রশ্ন করে, এবার কিছু বেশী শীত পড়েছে,
নয় অনিলা ?
অনিলা বলে, হ্যা এইবার দাদু আসবেন বােধ হয় ।
তাছাড়া এই কিশােরী নাতনীটির সঙ্গে ললিতার অনেক
কথাই হয়। শীতের হিম-আড়ষ্ট পড়ন্ত বেলায় উভয়ে
মুখােমুখি হইয়া বসিয়া থাকে। অনিলা তাহার মৃতা মাতা
ও মামার বাল্যকাহিনী স্বপ্নাবিষ্টের মত শুনিয়া যায়, বলিতে
বলিতে দিদিমার ঝাপ সা চোখে অশ্রুর ধার গড়াইয়া আসিলে,
সে নিজেও খানিক কাদে, আবার তাহাকেও সাসুনা দেয়।
এতদিনের পর তাহার নিষ্ঠুর স্বামী করুণা করিয়া তাহার

‘৭৬
পৌষ-পার্বণ
নিকট আসিলে, ললিত যে তাহাকে কি বলিবে, প্রত্যহই
একটির পর একটি করিয়া কথা সাজাইয়া সেগুলি ঠিক করিয়া
লয়—আবার ভুলিয়া যায়, আবার ঠিক করে ।
অনিলাকে বলে, তুই তাকে কিছু বল্‌তে পারবি না
অনিল?
জানি না পারব কি না, তাকে দেখলেই আমার কেমন
যেন ভয়-ভয় করে।
একান্ত আপনজনের নিকট হইতে স্নেহ-ভালবাসায় বঞ্চিত
হইয়া জীবনযাত্রা নির্বাহ করা যে কত বড় দুর্ভোগ তাহা সে
নিজে বেশ ভাল করিয়াই জানে এবং তাহার সহিত কথা
বলিতে অনিলার যে ভয় হইবে, ইহা তো অস্বাভাবিক নয় !
তাই ললিতা একথার উত্তরে কিছুই বলিতে পারে না,
কিয়ৎক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া অন্য কথা পাড়ে।
একখানা কাপড় লইয়া সেদিন কথা উঠিল। ললিতা বলিল,
জানিস্ অনিলা, এ কাপড়খানি তাের মামার। তার বয়স যখন
বারাে-বছর, তখন এই কাপড়খানি তার বাবা তাকে এনে
দিয়েছিল। শুধু এইটি ছাড়া তার চিহ্ন আমার কাছে কিছু নেই ।

পৌষ-পার্বণ
৭৭
হারানাে ছেলেমেয়ের স্মৃতিচিহ্নগুলি দেখিলেই ললিতা
হা হুতাশ করে আর অনিলাকে কত-কালের কত পুরাতন
কাহিনী শুনায়। এমনি করিয়া দুই নাতনী ঠাকুমার দিনগুলা
কোন রকমে পার হয়।
সেদিন ললিত। বলিল, চল অনিল, আমরা কাশী চলে
যাই।
অনিলা একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, সেই ভাল
দিদিমা।
ললিতার চোখদুইটা জলে ভরিয়া আসিয়াছিল । সে আজ
বহুদিনের কথা,-বধূবেশে যখন সে এই অভিভাবকহীন সংসারে
প্রবেশ করিয়াছিল, তখন তাহার কত না আনন্দ ! তার পর
একটি ছেলে ও মেয়ের মা হইয়া ভবিষ্যতের জন্য কত কল্পনাই
সে করিয়াছিল ! একদিন সংসারে যখন অভাব-অনাটন ছিল,
তখন সে ছিল তাহার সর্বময়ী কত্রী, আর আজ তার স্বামীর
অগাধ ঐশ্বৰ্য্য, আজ সে কি না সর্বহারা কাঙালিনীর মত
স্বামীর ভিটা পরিত্যাগ করিয়া কাশী বাস করিবার সঙ্কল্প ,
করিতেছে।

৭৮
পৌষ-পার্বণ
ধরা-ধরা গলায় সে আবার বলিল, কিন্তু অনিল, আমাদের
খাবার সংস্থান সেখানে কেমন করে হবে ?
অনিলা বলিল, সে জন্যে ভাবনা কি দিদিমা, আমার যে-কটা
গয়না আছে, তাতে তাে একটা বছর চলে যাবে। তারপর
কত বড় বড় লােক আছে সেখানে,-কারও বাড়ীতে রান্না
করেও কি তােমাকে দু মুঠো খাওয়াতে পারব না ? খুব
পারব দিদিমা।
সুদীর্ঘ চারটি মাস পরে, একদা এক প্রাতে শ্যামসুন্দর
বাবু করুণা করিয়া কলিকাতা হইতে গ্রামে আসিয়া পৌছিলেন,
পুত্ৰ-শােকাতুরা পত্নী ললিতাকে সান্ত্বনা দিবার জন্য। এতদিন
পরে স্বামী আসিয়াছেন শুনিয়া ললিতার মনে হইতেছিল,
“তাহার পায়ের তলায় নিজের মাথাটা ভাঙিয়া চুরমার করিয়া
ফেলে। কিন্তু সে সুখের
মরণেও হয়ত আজ আর তাহার
অধিকার নাই ।
রান্নাঘরের বাহিরে যে আটচালাটুকু ছিল, সেইখানেই
একটা আসন পাতিয়া অনিলা তাহার নবাগত দাদামশাইএর

পৌষ-পার্বণ
৭৯
আহারের স্থান করিয়া দিয়াছিল। খাইতে বসিয়া শ্যামসুন্দরবাবু
বলিলেন, তাের দিদিমাকে একবার ডাক্ তাে অনিলা !
ললিত; এখনও পর্যন্ত স্বামীর সহিত দেখা করে নাই,
কেমন করিয়া তাহার সম্মুখে গিয়া দাড়াইবে ?
অনিলা ধরে আসিয়া বলিল, দিদিমা, চল দাদু ডাকচেন
তােমায়।
ললিতার পা হইতে মাথা পর্যন্ত দুরু দুরু করিয়া কঁপিয়া
উঠিল। বলিল,—ওঁর খাওয়া হােক, তারপর যাব। এক্ষুনি কাছে
গিয়েই হয় তাে কেঁদে ফেলব অনিল, তার খাওয়া হবে না।
আহারাদির পর শ্যামসুন্দর বাবু বসিয়াছিলেন। ললিতা
ধীরে-ধীরে কাছে আসিয়া দাড়াইল। সে মনে করিয়াছিল,
চোখের জলে হয়ত তাহার বুক ভাসিয়া যাইবে, কি কথা
বলিতে কি বলিয়া ফেলিবে, কিন্তু চোখ দিয়া তাহার এক
ফোটা জলও গড়াইয়া পড়িল না, মুখ দিয়া একটা কথাও
বাহির হইল না। সে আর দাড়াইয়া থাকিতে পারিতেছিল
,-তাড়াতাড়ি সেইখানেই বসিয়া পড়িল।
কত কথা সে বলিবে ভাবিয়াছিল, কিন্তু এ-সময় একটাও

পৌষ-পার্বণ
তাহার মনে পড়িল
পড়িল না। বলিল, ছেলেটাকে কোথায়
রেখে এলে ?
বলিয়াই কান্না !
শ্যামসুন্দরবাবু বুঝাইলেন, কি করবে বল,—অমন
লােকের ছেলে মারা যায়। মহেশপুরের বাজার একটি মাত্র
সন্তান, যুবরাজ,-সেও সেদিন মারা গেল।•••এমনি-সব অনেক
রাজা মহারাজার সন্তানের মৃত্যুর কথা বলিয়া তিনি এই
অশিক্ষিতা নারীকে ভুলাইবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন।
ললিতা থামিতে পারিল না। বলিল,-ছেলেটাকে অমন করে,
মেরে ফেললেই ত’ হতাে। সে তার দুঃখিনী মা’র কাছে
বেশ থাকতাে, কেন তুমি তাকে সে রাক্ষসীর কাছে নিয়ে গেলে?
কোনদিনই এমন কটু কথা ললিতার মুখ দিয়া বাহির
হয় নাই, কিন্তু আজ এই সন্তানহারা জননীর মুখ দিয়া
যে দুস্মাক্য বাহির হইল, তাহাই শুনিয়া শ্যাম সুন্দর বাবু একটু
বিচলিত হইয়া উঠিলেন। বলিলেন, ছিছি ! অমন কথা
বলাে না, বুঝলে, সে তাকে মায়ের মতই সেবা করেছিল ।
মা’র মত সেবা করিয়াছিল ।
ললিতা আর স্থির থাকিতে পারিল না, কাদিতে কাদিতে
কহিল,-তুমি তােমার বুকে হাত দিয়ে সত্যি কথা বল

পৌষ-পার্বণ
১
দেখি, সে কি মরবার সময় একটিবারও তার এই মাকে দেখতে
চায় নি ?—নিশ্চয় চেয়েছিল, তবু তুমি আমায় খবর দাও নি !
এমনি নিষ্ঠুর তুমি।•••••••••যাক, তােমার কাছে আমি অনেক
সুখভােগ করেছি, আর চাই না। আমাকে বিদায় দাও, আমি
অনিলাকে নিয়ে কাশী যাব।
শ্যামসুন্দরবাবু বলিলেন, কাশী ? কেন কাশী যাবে কেন ?...
তা যদি একান্তই যাবার ইচ্ছে হয়ে থাকে আমি সব বন্দোবস্ত
করে দিতে পারি, তবে কি না...আমার বিবেচনায়••• দ্যাখ,
লােকে বলবে কি ?
ললিতা আবার কথা কহিল, বলিল,-হ্যা, তা জানি।
ওই লােকে যদি কিছু না বতাে, তাহলে তুমি হয়ত তাকে
ছেড়ে চার মাস কেন,-চার যুগ পরেও আমায় দেখা দিতে
আসতে না।•••ওই লােকেরাই তাে হয়েছে যত নষ্টের মূল।...না,
না, লােকে কিছু বলবে না,আমি তােমার দুটি পায়ে ধরি,
আমায় অনুমতি দাও, আমি কাশী যাব। বলিয়াই ললিতা
স্বামীর পায়ের উপর লুটাইয়া পড়িয়া পা দুইটা জড়াইয়া ধরিতেই
চোখের জল হু হু করিয়া গড়াইয়া আসিল।
শ্যামসুন্দরবাবু মনিব্যাগ খুলিয়া একখানা একশ টাকার
নােট বাহির করিয়া তাহার হাতে দিতে গেলেন, ললিতা তখনও

৮২
পৌষ-পার্বণ
পা দুইটা জড়াইয়া ধরিয়া ছিল, বলিল, অনিলার হাতে
দাও।•••••••••বুঝেছি, যা হারিয়েছি, তার দাম দিতে আসছ,
আমি ও চাইনা
ললিতা একটু থামিয়া আবার বলিল, আমি চলে গেলে,
তাকে নিয়ে সুখে বাস কোরাে।
শ্যামসুন্দরবাবু হঠাৎ একটু অন্যমনস্ক হইয়া কি যেন ভাবিতে-
ছিলেন, কথাটা ভাল শুনিতে পান নাই, বলিলেন,-কি ?
আমি তারই কথা বছিলুম, যাকে পেয়ে তুমি সবাইকে
ছেড়েছ,—নিজের ছেলেটাকেও খুন কলে-
শ্যামসুন্দর-বাবুর আপাদ-মস্তক এইবার জ্বলিয়া উঠিল ।
জোরে জোরে চীৎকার করিয়া উঠিলেন, বেশ করেছি,বেরােও
তুমি অসভ্য,-ভৃত কোথাকার!
এই অপবাদ ললিতার চিরকালের।
পায়ের ধাক্কা খাইয়া দৃষ্টিশক্তিহীনা ললিতা ঘুরিয়া পড়িয়া
গেল । দেওয়ালের গায়ে মাথায় আঘাত লাগিতেই একেবারে
মাটিতে পড়িয়া গিয়া অস্ফুট আর্তনাদ করিয়া উঠিল। স্বামী
তখন জুতার শব্দে ঘর কাপাইয়া কাপিতে কঁপিতে বাহিরে
আসিয়া দাড়াইয়াছেন। যে-গাড়ীতে তিনি আসিয়াছিলেন,
রাস্তার উপর সেই ঘােড়ার গাড়ীটা অপেক্ষা করিতেছিল ;

পৌষ-পার্বণ
শ্যামসুন্দরবাবু তাহাতে চড়িয়া বসিয়া কোচ ম্যানকে হুকুম
করিলেন, হকাও।
অনিলা অন্যঘরে দাদামশাইএর জন্য পান সাজিতেছিল।
তাহাকে বাহির হইয়া যাইতে দেখিয়া তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকিয়া
দেখিল, দিদিম খাটের নীচে উপুড় হইয়া পড়িয়া আছেন।
কপালে রক্তের ধারা গড়াইয়া নিষ্প্রভ অন্ধ চক্ষুদুইটির উপর
আসিয়া পড়িয়াছে। ডাকিল,-দিদিমা !...মা !
ললিতা ধীরে-ধীরে অত্যন্ত করুণ-কণ্ঠে কহিল, হঁা, তুমি যাও,
আমাদের কাশী যাবার সব জিনিসপত্র ঠিক করে নাওগে দিদি,
আমি অনুমতি পেয়েছি।
...সন্ধ্যার পরেই একটু অন্ধকার হইলে, সকলের অগােচরে
অনিলার হাত ধরিয়া ললিতা তাহার বহুদিনের স্বামীর ভিটা
পরিত্যাগ করিয়া ষ্টেশনের পথে আসিয়া দাড়াইল। • তাহার
কাশী যাইবে ।
:
দিন-পনর পরে দেখা গেল, একখানা মােটর আসিয়া সেই
বাড়ীর সুমুখে দাড়াইল। মােটর হইতে শ্যামসুন্দরবাবু এবং
তাহার রক্ষিতা সেই মেয়েটি নামিলেন।

৮৪
পৌষ-পার্বণ
পাড়ার দু’-একজন ইতর-ভদ্র আসিয়া তাহাকে নমস্কার
করিয়া কুশলপ্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতেই তিনি কহিলেন,—ওঁর
স্বাস্থ্য একটু খারাপ হয়েছে, তাই ডাক্তারের পরামর্শে পাড়াগাঁয়ে
এলুম চেঞ্জে।
সহর ছাড়িয়া এমন অকস্মাৎ কেন যে তাহারা পল্লীগ্রামে
আসিলেন, তাহার ইতিহাস আমরা জানি না।
শুধু এইটুকু মাত্র জানি যে, শ্যামসুন্দরবাবুর ভয় ছিল,
জাতিচ্যুত হইবার। কিন্তু দেখা গেল, উদার পল্লী-সমাজ
সে-সম্বন্ধে কোন কথাই উত্থাপন করিল না। অনর্থক তিনি
ভয়ে মরিতেছিলেন। তাঁহাকে জাতিচ্যুত যে করিবে না
সেকথা আমরা বহুপূৰ্বেই জানিতাম। অর্থবানের নামে মিথ্যা
কলঙ্ক রটাইয়া তাহাকে জাতিচ্যুত করিবার মত সঙ্কীর্ণ মন
লইয়া পল্লীবাসী হিন্দুগণ সমাজ গঠন করে না।

সপ্তম পরিচ্ছেদ
বেলা তিনটা হইতে সন্ধ্যা ছ'টা পর্যন্ত ষ্টেশনে গাড়ী আসে না।
ষ্টেশন খা-খা করে।
ষ্টেশন-মাষ্টার বাসায় চলিয়া যান। এসিষ্ট্যান্ট, যিনি, তাঁহার
না থাকিলে নয়। টেলিগ্রাফের যন্ত্র-সাজানাে টেবিলটির কাছে
একটি টুলের উপর তাহাকে বসিয়া থাকিতে হয়।
খালাসীদের মধ্যে কেহ কেহ বা এই সময়টায় গ্রামের ভিতর
চাল-ডাল কিনিতে যায়, কেহ-বা ঘুমায়, আবার কেহ-বা আধ
মাইল-খানেক দুরে ফটকের কাছে গিয়া জটলা করে।
এই ফটকটি রেল-কোম্পানীর ফটক। পাকা একটি শড়ক
এখানে রেললাইনের উপর দিয়া পার হইয়া গেছে। শড়কের
উপর গাড়ী-ঘােড়া লােকজনের যাতায়াত। আজকাল আবার
মােটর-‘বাস’ চলিতেছে। ট্রেণের সঙ্গে ধাক্কা লাগিবার সম্ভাবনা।
কাজেই রেল-কোম্পানীকে এখানে একটি ফটক তৈরী করিতে
হইয়াছে।
এবং শুধূ ফটক নয়—ফটকের কাছে টালির একখানি
ছােট ঘর। ফটক রক্ষী রামসিংএর জন্য ।

৮৬
পৌষ-পার্বণ
খালাসীদের, মজলিস বসে রাম-সিংএর এই ঘরখানির
মধ্যে। মজলিসের প্রধান আকর্ষণ-রঞ্জন। কালোেরঙের
পালা ছিপছিপে ঢ্যাঙ্গা এবং কুঁজো একটি লােক। কাজকর্ম
কোথাও কিছু করে না। ষ্টেশনেই ঘরবাড়ী, আত্মীয়-স্বজন,
কেহ তাহার কোথাও আছে কিনা কে জানে, ট্রেণ আসিয়া
দাড়াইলে যাত্রীদের কাছে ভিক্ষা করিয়া কাদিয়া-কাটিয়া হাত
পাতিয়া যাহা পায়—তাহাই লইয়া গিয়া রামসিং-এর কাছে
গচ্ছিত রাখে, রাম সিং-এর হাতে-গড়া রুটি খাইয়া তাহার দিন
কাটে, রাত্রে ওই ফটকের ঘরের মধ্যে রাম সিং-এর কাছে
অদ্ভুত এই রঞ্জন!
খালাসীরা সুবিধা পাইলেই তাহাকে লইয়া জটলা পাকায়।
রঞ্জন ভারি মজার মজার গল্প বলে। তাহারা শােনে।
রঞ্জন বলে, তাহার সাহস নাকি অত্যন্ত বেশী ।
বলিয়া
করে,-একদিন-অমাবস্যার
চারিদিকে ঘুটঘুটে আঁধার। কোলের মানুষ চেনা যায় না।
আছি শ্বশুর-বাড়ীতে; বৌ-এর সঙ্গে কয়েকদিন ধরেই ঝগড়া
চছিল। হঠাৎ সেদিন রাগারাগি হলাে। রাত তখন দুপুর।
এমন রাগারাগি হলাে যে, বাড়ী থেকে বেরিয়ে পড়লাম।

পৌষ-পার্বণ
বেরিয়ে পড়ে যাই কোথায় ?
বাইরে এসে ভাবলাম—বাড়ী যাওয়া যাক।
বাড়ী সেখান থেকে পাঁচ ক্রোশ দূরে। সেই অন্ধকার রাত।
হাতে না আছে লণ্ঠন, না আছে একটা ছড়ি ।
চলতে লাগলাম।
চলেছি ত’ চলেইছি। ধানের মাঠে-মাঠে রাস্তা। বর্ষাকাল ।
মাঠে কাদা হয়েছে। ছপ, চুপ করে মাঠগুলাে পার হয়ে
উঠলাম গিয়ে পাকা-রাস্তায়। পাকা-রাস্তার দুপাশে বাঁশের
ঝড়ে বাতাস লেগে কটু কটু করে শব্দ হচ্ছে, জঙ্গলের মাঝখানে
শেয়ালগুলাে মাঝে মাঝে চেঁচিয়ে উঠছে। রাস্তায় জনপ্রাণী
নেই। অন্য লােক হ'লে হয়ত মরেই যেতাে। আমার সাহস
খুব বেশী, তাই সে-সব কিছু গ্রাহ্য না করে’ হন হন করে’
এগিয়ে চললাম।
কিছু দূর গিয়ে রাস্তাটা ছেড়ে দিয়ে ডানহাতি একটা
নদী পেরােতে হয়। প্রকাণ্ড নদী। ওপারে হয়ত জল
একটুখানি আছে, কিন্তু এপারে শুধু বালি।
নালাম নদীতে।
জায়গাটার নাম
শশা-ঘাট।
আশ-পাশের গাঁয়ের লােক সেখানে মড়া পােড়ায়। দিনের
বেলা সে-পথ দিয়ে হেঁটে যেতে লােকে ভয় করে। আমারও

পৌষ-পার্বণ জ্বেলে মড়া। গা’টা একবার ছম্‌ করে উঠলো। কিন্তু ওই পর্যন্তই। কিসের ? বালির ওপর দিয়ে হেঁটে চলেছি। মদ মস করে’ শব্দ হচ্ছে। হঠাৎ কি যেন একটা নরম জিনিষের গায়ে পা ঠেকূলে। থমকে দাড়ালাম। দেশাই থাকূলে দেখতাম। কিন্তু কিছু নেই ! পা দিয়ে নেড়ে-চেড়ে বুঝলাম- হাত, পা, মাথা, চুল—সবই রয়েছে, একটা আস্ত মানুষ ! হঠাৎ মনে পড়লো, কিছুদিন আগে শুনেছিলাম, নদীর ধারে দু’তিনখানা গায়ে ভয়ানক কলেরা হচ্ছে। হয়ত সেই কলেরার পুড়িয়ে শ্মশানে ফেলে দিয়ে গেছে। তা হাে। পাশ কাটিয়ে চলে গেলাম। কিন্তু যেতে গিয়ে, দেখি—চলা দায়। যেদিকে যাই, সেইদিকেই হয়ত কারও হাত মাড়িয়ে ফেলি, কারও পা, কারও-বা মাথার খুলিতে হোঁচট খেয়ে পড়তে পড়তে সামলে নিই। সুমুখেই দেখি, কয়েকটা শেয়াল খ্যাক খ্যা করে’ চীৎকার করতে করতে ছুটোছুটি করছে, মড়া নিয়ে টানাটানি করে তারা ঝগড়া বাধিয়েছে হয়ত। আরও খানিকটা এগিয়ে যেতেই মনে হলাে যেন সেই নদীর মাঝখানে জনকয়েক কালাে কালাে লােক বসে বসে ফিস ফিস্ করে’ গল্প করছে। ভাবলাম হয়ত তারা গ্রাম থেকে মড়া নিয়ে এসেছে। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কে ?

পৌষ-পাৰ্বণ
একটা লােক যেন কথা বল্‌তে যাচ্ছিল, মনে হলাে বাকি
লােকগুলাে এক সঙ্গে ফিস্ ফিস্ করে তাকে নিষেধ করলে।
ব্যাপার কি বুঝতে পারলাম না।
‘কে হে তােমরা কথা কইছ না যে!' বলে যেই একটুখানি
এগিয়ে গেছি, দেখি না, সবাই মিলে একসঙ্গে কঁক- গ-গ
করতে করতে বালির ওপর থপ থপ করে লাফিয়ে লাফিয়ে
দূরে সরে গেল।
বুঝলাম, মানুষ নয়, মানুষ বলে ভুল করেছিলাম।
শকুনি ।
ভাবলাম, ভূতপ্রেত কত-কি থাকতে পরে, কাজ নেই আর
বেশিক্ষণ শ্মশানে থেকে। তাড়াতাড়ি নদীটা পার হয়ে যাই।
তাড়াতাড়ি নদী পার হচ্ছি। সুমুখে জল । জলে নাতেই
দেখি, আমার আগে-আগে জলের ওপর ছপ ছপ, করে’ কে
যেন এগিয়ে যাচ্ছে। এবার আর ভাল করে না দেখে কথা
কইব না ভেবে আমিও তাড়াতাড়ি এগিয়ে চললাম ।
কাছাকাছি আসতেই অন্ধকারেও চিতে পারা গেল—কালো
মত লম্বা একটা মানুষ। ভয়ে ভয়ে বল্লাম,-“কে?
‘আমি।
যাক, বাঁচা গেল। তবু একটা সঙ্গী মিলেছে।

পৌষ-পাৰ্বণ
বললাম, কোথেকে আছ ? যাবে কোথায় ?
কোখেকে আছে সে-কথা আর বলে না। বললে, ‘যাব
পাথরকুচি।
বললাম, ‘চা তােমার সঙ্গেই যাই। ভালই হলাে।
পাথরকুচি থেকে আমাদের গ্রাম প্রায় ক্রোশখানেক্‌ দূরে !
দু’জনে নদী পার হলাম।
ওপারে গিয়ে—সে যায় আগে-আগে আমি যাই পিছু-পিছু।
চলা-পথে অনেকদিন হাটিনি, ভাবলাম, পাথরকুচির লােক,
পথ সে চেনে নিশ্চয়ই। চলুক যেদিকে যাচ্ছে।
দু’একটা কথা জিজ্ঞেস্ করলাম । জবাব দেয় না।
বললাম, তুমি কি জা’ত?
বললে, বাউরি।
তা হবে। গরীব লােক। সারাদিন খেটেখুটে সন্ধ্যেয়
হয়ত মদ খেয়ে কোথাও পড়েছিল। জ্ঞান ২’তেই আবার
উঠে সে বাড়ী চলেছে।
নেশা হয়ত এখনও ঠিক কাটেনি, তাই
ভাল করে কথা বলছে না।
দু’জনে চলেছি ত’ চলেইছি। পথ আর ফুরােয় না।
বল্লাম, এ কিরে, কোন্‌দিকে চলেছিস? পথ ঠিক
চিনিস্ ত ?

পৌষ-পাৰ্বণ
৯১
বললে, হ্যা।
ক’ঘণ্টা চলেছি ঠিক মনে নেই। দু'জনে একটা বাগানের
ভেতর গিয়ে ঢুকলাম। পাশেই একটা ইটের পাঁজা। হঠাৎ
একটা শব্দ হতেই দেখি, ইটের পাজার কাছে সাদা একটা বাছুর
যেন ছুটোছুটি করছে। পাশেই একটা গাছের কাছে যেন সুড়ং
করে আর-একটা শব্দ হলো। সেদিকে তাকাতেই দেখলাম,
তিনটি ছােট ছােট বেঁটে বামনের মত মানুষ আমাদেরই দিকে
এগিয়ে আসছে। মানুষ তিনটে অদ্ভুত রকমের। তিনজনেরই
মাথায় ঝাঁকুড়া ঝাড়া চুল, পা-গুলো উল্টো দিকে বাঁকানো :
ভূতের পা শুনেছি ওইরকম হয়। তবে কি ভূত নাকি ?
এতক্ষণে আমার গায়ের লােমগুলাে খাড়া হয়ে উঠলো।
খুব জোরে জোরে বলে উঠলাম,রাম ! রাম ?
বাস্, যেই ‘রাম’ ‘রাম’ বলা, আমার সঙ্গের সেই লােকটা
দেখতে দেখতে ওই বামন তিনটের মত ছোট হয়ে
গেল। এতক্ষণে বুঝলাম-ওরে শালা, তুমি মানুষ নও,
তুমিও ভূত !
আমি দেখলাম, ছুটে সেখান থেকে পালিয়ে যদি যাই ত
বেটারা পেয়ে বসবে। আর অন্ধকারে সেই অজানা রাস্তায়
যাবই বা কোথায় ? বুক ফুলিয়ে সেইখানেই দাড়িয়ে দাড়িয়ে

পৌষ-পার্বণ
রাম-নাম উচ্চারণ করিতে লাগলাম। ভূত চারটে তখন ইটের
পাজার কাছে সরে গেছে। সেই যে বাছুরের মত যেটাকে
দেখেছিলাম, সেটাও ঠিক তাদেরই মত হয়ে সঙ্গীদের কাছে
এসে দাড়ালো। সেটার রঙটা কিন্তু সাদাই রইলাে। সে-ব্যাটা
বােধ হয় সাহেব-ভূত। এই পাচটা ভূত তখন সারি দিয়ে
দাড়িয়ে পাচ-দুগুনে দশটা প্রকাণ্ড লম্বা লম্বা হাত বের করে
আমায় ডাকতে লাগলো—‘আঁয় । আঁয় ! আঁয় !
রাম-নাম কছি আর কি করব ভাবছি, হঠাৎ দূরের গায়ে
একটা মােরগ ডেকে উঠলাে। ঠাণ্ডা বাতাস অনেকক্ষণ থেকেই
বইছিল। বুঝলাম—সকাল হয়ে গেছে।
বাচা গেল।
চারিদিক ফরসা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভূতগুলাে হঠাৎ আমার
চোখের সুমুখ থেকে একে-একে কেমন করে যে কোন্‌দিক দিয়ে
উধাও হয়ে গেল বুঝতে পারলাম না।
।
এমনি একটি-দুটি নয়,-কত গল্প ।
গল্প শুনিয়া শুনিয়া শেষে এমন হইল যে, খালাসীগুলা রঞ্জনের
কাছে গল্প শুনিতেও ছাড়ে না, অথচ অন্ধকারে একা কোথাও
যাইতে হইলে ভয়ে মরে।

পৌষ-পার্বণ
দু’একজন খালাসী রঞ্জনকে জিজ্ঞাসা করে, “আচ্ছা, এত এত
কাণ্ড যে করেছ রঞ্জন, তােমার ভয় কোনােদিন পায়নি ?
কথাটা রঞ্জন হাসিয়া উড়াইয়া দেয়। বলে ‘পাগল ! নিজে
ভয় পেলে কি এত-সব করতে পারি, তাহলে এতদিন মরেই
যেতাম।
‘তা বটে।
সে কথা সত্যি।
সেদিন সায়েব-ভূতের গল্প চলিতেছিল।
একটা সায়েব-ভূত কেমন করিয়া রঞ্জনের হাত হইতে
একদিন একটা পাঁঠার মুণ্ডু কাড়িয়া লইতে আসিয়াছিল—
তাহারই গল্প।
রাত্রি তখন প্রায় এগারােটা। সন্ধ্যায় একটুখানি জ্যোৎস্না
উঠিয়াছিল। তাহার পর চঁদ ডুবিয়া গিয়া আবার . চারিদিক
অন্ধকার হইয়া গেছে।
রামসিং বাহিরে লাইনের ধারে বসিয়া গাঁজা টানিতেছিল।
মানও গাঁজা খায়।
নিজের খাওয়া শেষ হইলে রামসিং ডাকিল, এসাে রঞ্জন,
টানবে ত’ এসাে।

পৌষ-পার্বণ
রঞ্জন এদিক-ওদিক তাকাইয়া বলিল, ‘নিয়েই এসাে না
ককেটা এইখানে।
রামসিং বলিল, ‘গাড়ী পেরােবে, আমার যাবার উপায় নেই।
তুমি এসো।
চারজন খালাসী বসিয়া বসিয়া গল্প শুনিতেছিল।
তাহাদেরই একজনকে বলিল, যা না ভাই, নিয়ে আয়
ককেটা।”
কেহই আর যাইতে চায় না। এ-উহার মুখ চাওয়া-চাওয়ি
করিতে থাকে।
বুঞ্জনও ওঠে না।
সকলেরই মনে কেমন যেন সন্দেহ হইল। একজন খালাসী
বলিয়া উঠিল, ‘কেন, তােমারও ভয় পাচ্ছে নাকি রঞ্জন ?
রঞ্জন খুব জোরে হাে হাে করিয়া খানিকটা হাসিয়া বলিল,
দূর বােকা ! হাতী-ঘােড় গেল তল্ •••••শেষকালে কিনা এই
ককে আন্‌তে যেতে আমার ভয় ! তােরা সব হলি কি রে !
আমি এত এত কাণ্ড করলাম আর তাের এই সমান্য ঘর থেকে
বেরিয়ে ককেটা এনে দিতে পারিস না?
রঞ্জন আর কিছুতেই উঠে না। বলে, ‘শােন্, তারপর কি
হলো শােন ! বলিয়া তাহার অর্ধসমাপ্ত গল্পটি আবার আরম্ভ

পৌষ-পার্বণ
করিবার আগে একবার গলাটা তাহার পরিষ্কার করিয়া লয়।
এদিকে গজার কলিকার আগুন হয়ত নিভিয়া গেল ; মন তাহার
পড়িয়া থাকে সেইখানেই। অথচ সেখানেও যাইতে পারে না,
গল্প ও তেমন জমে না।
অবশেষে রামসিং নিজেই উঠিয়া আসিয়া কলিকাটা বুঞ্জনের
হাতে দিয়া তাহাকে এই অবস্থা-সঙ্কট হইতে বাঁচায়।
কিন্তু তাহার এই অনুরক্ত শ্রোতাকয়টির সেইদিন হইতে
মনে কেমন যেন একটা খটকা লাগিয়া থাকে।
তবে কি রঞ্জনের সব বানানাে গল্প নাকি ?
সত্য গােপন করিয়া চিরকাল ধরিয়া একটা মানুষ কখনও
পৃথিবীর আর-সকলকে ঠকাইতে পারে না। সত্য একদিন
প্রকাশ হইয়। পড়ে। সে নিজে ঠকে।
রঞ্জনের বেলাও তাহাই হইল।
একটু একটু করিয়া একদিন সকলে জানিয়া ফেলিল যে, রঞ্জন
অত্যন্ত ভীতু। তাহাই সে গােপন করিয়া এতদিন সকলকে
উল্টা বুঝাইয়াছে।
তখন আর যায় কোথা!

৯৬
পৌষ-পার্বণ
খালাসীরা তাহাকে ক্ষেপাইতে থাকে। যে তাহাকে
দেখিতে পায় সেই একটুখানি বলিতে কসুর করে না।
‘কি হে, রঞ্জন যে ! বল না তােমার সেই মাদো-ভূতের
গল্পটা, বল না শুনি।
‘আচ্ছ। রঞ্জন, কেমন
করে' তুমি ভূতের সঙ্গে যুদ্ধ
করেছিলে?
‘ক’বার করেছিলে মনে আছে ?
রঞ্জনের কালো মুখও লাল হইয়া উঠে। কখনও-বা তাহাদের
ধমক দিয়া সরাইয়া দেয়, কখনও-বা নিজেই সরিয়া পড়ে।
ক্ষেপায় না শুধু রামসিং। সে-ই তাহার একমাত্র আশ্রয় ।
ফটকের ঘরে গল্প বলার মজলিস এখন ভাঙ্গিয়াছে।
বেলা তিনটা হইতে ছ’টা পর্যন্ত সময়টা এখন যেন তাহার
আর কাটিতেই চায় না। রামসিং-এর কাছে চুপ করিয়া
বসিয়া থাকে। কখনও-বা বসিয়া বসিয়া গাঁজা টানে।
জা টানিতে টানিতে তাহাদের সুখ-দুঃখের কথা হয়।
রামসিং বলে, তাহার আপনার বলিতে আর কেহ নাই।
রঞ্জনও একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলে, আমারও। একটি

পৌষ-পার্বণ
৯৭
মেয়ে ছিল তার শ্বশুরবাড়ীতে। কচি একটি মেয়ে রেখে
শুনছি সেটাও মরেছে।
এমনি করিয়া এই দুই আত্মীয়-স্বজন-বন্ধুবান্ধবহীন প্রৌঢ়ের
দিন কাটিতে থাকে।
রামসিং বলে, আমি আর বাঁচব না ভাই।
রঞ্জন বলে ‘আমিও।
কিন্তু মা-বাচার কৰ্ত্তা যিনি, তিনি হয়ত ইহাদের এই
কথাবার্তা শুনিয়া অলক্ষ্যে থাকিয়া একটুখানি হাসেন।
মরিব বলিলেই মরা হয় না।
মৃত্যু যখন আসে তখন একেবারে অকস্মাৎ আসিয়া পড়ে।
কাহারও মুখ চাহিয়া কখনও সে থমকিয়া দাড়ায় না।
বছরখানেক পরে রামসিং সত্যই একদিন শয্যা গ্রহণ করিল
এবং সাতদিন ক্রমাগত জ্বর-ভােগের পর একদিন সকালে সে
ক্ষীণ কণ্ঠে ডাকিল ‘রঞ্জন।
রঞ্জন কাছেই বসিয়াছিল। বলিল, ‘কি।
রামসিং বলিল, “চললাম।
সে কি রামসিং! ছি, ওকথা বলতে নেই।

১৮
পৌষ-পার্বণ
বলিয়া বন্ধুকে সান্ত্বনা দিতে গিয়া রঞ্জন কঁাদিয়া ফেলিল।
চোখের জল,গােপন করিবার জন্য যেমনি সে মুখ ফিরাইয়াছে
রামসিং আবার ডাকিল, রঞ্জন!
চোখ মুছিয়া রঞ্জন বলিল, “কি! কি হয়েছে তোমার
বল ত’ রামসিং ?
রামসিং বলিল, ‘বুকের ভেতরটা আমার কেমন যেন করছে
রঞ্জন। কেউ আমার নেই জানি, তবু আজ মরতে কেমন যেন
কষ্ট হচ্ছে ভাই।
শিয়রের কাছে রঞ্জন চুপ করিয়া বসিয়াই রহিল।
রামসিং তাহাকে আরও কাছে সরিয়া আসিতে বলিয়া চুপি
চুপি বলিল, “কিছু টাকা আছে। অনেক দিন থেকে জুগিয়ে
রেখেছিলাম। তােমাকেই দিয়ে গেলাম, তুমি খরচ কোরাে।
বলিয়া সে তাহার বালিসের তলাটি দেখাইয়া দিয়া হাঁপাইতে
লাগিল।
তাহার পরও সে আধঘণ্টা বাঁচিয়া ছিল, কিন্তু তাহাকে
ঠিক বাঁচিয়া থাকা বলে না, সে যেন মৃত্যুকে প্রাণপণে ঠেকাইয়া
রাখিবার ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র।
চেষ্টা সফল হইল না।

পৌষ-পার্বণ
আরও দশজন ঠিক যেমন করিয়া মরে রামসিংও মরিল
ঠিক তেমনি করিয়াই।
রাত্রি তখন প্রভাত হইয়াছে।
ষ্টেশন-মাষ্টার নিজে কয়েকজন খালাসী এবং রঞ্জনকে সঙ্গে
লইয়া শবদাহ করিয়া ষ্টেশনে ফিরিয়া যখন আসিলেন বেলা তখন
প্রায় দুইটা।
সকলেই বলিতে লাগিল, বুড়ার টাকা ছিল।
ষ্টেশন-মাষ্টার রঞ্জনকে কাছে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,
‘তুমি ত’ শেষ পর্যন্ত কাছেই ছিলে ওর, টাকা-কড়িগুলি কি
করলে বল দেখি ?
রঞ্জন এদিক-ওদিক তাকাইয়া ঢোক গিলিয়া বলিল, কই
টাকাকড়ির কথা ত’ কিছু আজ্ঞে,জানিনা আমি !
কথাটা রঞ্জন গােপন করিল।
ভাবিয়াছিল, দুনিয়ায় তাহার আর নিজের বলিতে কেই-বা
আছে, খাইতে পরিতে দিবারও কেহ নাই, সুতরাং রামসিংএর
এই টাকার কথা কাহাকেও সে বলিবে না। তাহাই লইয়া
সে যেখানে হাে চলিয়া যাইবে এবং এই টাকাগুলি ভাঙ্গিয়াই
জীবনের বাকি কয়টা দিন কাটাইয়া দিবে ।
ষ্টেশন-মাষ্টার বিশ্বাস করিলেন না।

পৌষ-পার্বণ
বলিলেন, এখন তুই কি করবি ভেবেচিস? থাকবি
কোথায় ?
রঞ্জন বলিল, এই খানে যেখানে-হে পড়ে থাকব হুজুর।
‘খাবি কি ? গাঁজার পয়সা কে জোগাবে ?
রঞ্জন কি জবাব দিবে প্রথমে ভাবিয়া না পাইয়া হাত-জোড়
করিয়া ভয়ে থর থর করিয়া কাপিতে কাপিতে কাঁদিয়া ফেলিল।
বলিল, 'গাড়ীতে গাড়ীতে ভিক্ষে করব হুজুর, দু-এক পয়সা
যা পাই...
তাহার কান্না দেখিয়া মাষ্টারের দয়া হইল। বলিলেন, ‘তার
চেয়ে তুই এক কাজ কর রঞ্জন। রামসিং-এর কাজটা তুই নে।
ওই ঘরে গিয়ে থাক, আঠারাে টাকা মাইনে, মন্দ কি, তাের
ভালই হবে।
কিন্তু তাহাতে রঞ্জনের আপত্তি আছে।
দিনের বেলা কাজ করিতে আপত্তি নাই, কিন্তু রাত্রে
ওখানে ওই নিরিবিলি জায়গায় একা, তাহার উপর রামসিং যে
ঘরে তাহার চোখের সুমুখে মরিয়াছে, সেই ঘরে বাস করা
তাহার পক্ষে অসম্ভব।
ষ্টেশন-মাষ্টার হাসিলেন। রঞ্জনের সাহসের কথা তখন
জানাজানি হইয়া গেছে। তিনি জানিতেন। বলিলেন,

পৌষ-পার্বণ
১০১
‘চুপ করে রইলি যে? ভয় পাবে? দূর বােকা! ভয় কিসের?
এমন সময় ঘরের ভিতর ক্রিং ক্রিং করিয়া টেলিগ্রাফের ঘণ্টা
বাজিল। মাষ্টারমশাই ভিতরে চলিয়া গেলেন।
তাহার স্থির সিদ্ধান্ত কিছুই আর সেদিন হইল না। একজন
খালাসী গিয়া রামসিংএর কাজ করিতে লাগিল।
ষ্টেশন-ঘরের বাহিরের বারান্দায় ওজন-করা লােহার যন্ত্রটার
উপর কাপড় গায়ে দিয়া জড়ােসড়ো হইয়া রঞ্জন দিবারাত্রি
শুইয়া থাকে।
মাষ্টারমশাই লােকটি খুব ভাল মানুষ। প্রথম দিন তাহাকে
তিনি বাসায় ডাকিয়া লইয়া গিয়া এক পাতা ভাত দিয়াছিলেন ।
দ্বিতীয় দিন কেহ আর তাহাকে ডাকে নাই।
টেণের কয়েকজন যাত্রীর কাছে ভিক্ষা করিয়া তিন আনা
পয়সা পাইয়াছিল। তাই দিয়া দুপুরে সে গাঁজা কিনিয়া
আনিয়া ফটকের কাছে বসিয়া বসিয়া সারাদিন সে গাঁজাই
খাইয়াছে আর ভাবিয়াছে—কি করা যায়!
খালি-পেটে গাঁজা টানিয়া নেশা তাহার বেশ ভালই
ধরিয়াছিল, সন্ধ্যার আগেই সে ফটকের কাছ হইতে উঠিয়া
আসিয়া আবার তাহার সেই নির্দিষ্ট স্থানটিতে আসিয়া বসিল।

১০২
পৌষ-পার্বণ
কখন ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল মনে নাই। সকালে ঘুম
ভাঙ্গিতেই রঞ্জন তাহার কোমরে হাত দিয়াই চমকিয়া উঠিল
এদিক-ওদিক হাতড়াইয়া, কাপড় ছাড়িয়া, উঠিয়া দাঁড়াইয়া
দেখিল, রামসিং-এর-দেওয়া তাহার সেই টাকার থলেটি উধাও!
কে লইয়াছে, কেমন করিয়া লইয়াছে কিছুই সে বুঝিতে
পারিল না।
এ সম্বন্ধে কাহাকেও কিছু কিজ্ঞাসা করিবার
উপায় নাই, চেঁচাইয়া কঁাদিয়া ছুটিয়া বেড়াইতে পারে না,
কি যে করিবে বুঝিতে না পারিয়া হতভম্বের মত রঞ্জন
ফ্যাল ফ্যাল্ করিয়া তাকাইয়া মাথায় হাত দিয়া চুপ করিয়া
বসিয়া পড়িল।
মাথাটা তাহার ঘুরিতেছিল, সঙ্গে সঙ্গে মনে হইল, তাহার
চোখের সুমুখে সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডও যেন ঘুরিতেছে !
একটি দিনের মধ্যেই রঞ্জনের অবস্থা হইল ঠিক পাগলের
মত। 'দেখিয়া মনে হইতে লাগিল, এই একটি দিনেই তাহার
বয়স যেন বাড়িয়া গেছে। চোখ দুইটা কোটরে ঢুকিয়াছে, গাল
দুইটি বসা, চুলগুলাে উস্কোখুস্কো, দৃষ্টি উদাস! একদিকে যাইতে
আর-একদিকে যায়, ডাকিলে সাড়া দেয় না, কি বলিতে যে কি
বলে নিজেই তাহা বুঝিতে পারে না।
টাকার শশাকে পুরা দু’টি দিন সে জলগ্ৰহণ করিল না।

পৌষ-পার্বণ
১০৩
তিন দিনের দিন গলা দিয়া আর কথা বাহির হয় না।
একেবারে মরিবার মত অবস্থা।
ষ্টেশন-মাষ্টার তঁাহার বাসা হইতে ষ্টেশনে আসিতেছিলেন,
হঠাৎ পথের মাঝখানে হাতজোড় করিয়া টলিতে টলিতে রঞ্জন
তাহার পথ আগলাইয়া দাড়াইল-হুজুর।
“কিরে ! এ কি চেহারা তাের ?
রঞ্জন বলিল, ফটকের চাকরিটি আমায় দিন।
মাষ্টারমশাই বলিলেন, ‘দিতেই ত’ চেয়েছিলাম রে গাধা!
রঞ্জন বলিল, “আজ তাহলে আমি আমার ছােট নানীটিকে
নিয়ে আসি হুজুর। তাকেই কাছে রাখব।
মাষ্টারের দয়া হইল। বলিলেন, ‘তাই যা। আমার বাসায়
খেয়ে যাস।
দু’দিন না খাইয়া অন্তরাত্মা তাহার কঁদিতেছিল; খাবার
নামে মাষ্টারমশাই-এর পায়ের কাছে একেবারে ভূলুণ্ঠিত হইয়া
একটি প্রণাম করিয়া বলি, যে-আজ্ঞে ।
ফটকের চাকরিটি করিবার ইচ্ছা তাহার মােটেই ছিল না,
তবু তাহাকে করিতে হয়।
পেটের জ্বালা বড় জ্বালা !

১০৪
পৌষ-পার্বণ
মানুষ দেয় ত বিধাতা দেয় না। টাকাগুলি থাকিলে একষ্ট
আর সহ্য করিতে হইত না।
সাত বছরের ছােট নানীটি। নাম কালী, পায়ে মল,
নাকে নােলক,চব্বিশঘণ্টা দাদামশাই-এর কাছে-কাছে থাকে,
রান্নার সময়ে এটা-সেটা যােগাড় করিয়া দেয়, শুকনাে কাঠ
কুড়াইয়া আনে, ফু দিয়া দিয়া উনান ধরায়, এক-একদিন তরি-
তরকারি আনিবার জন্য একলাই সে হাটে যায়। দূর হইলেও
হাটে যাওয়ার কষ্ট কিছুই নাই। যাইবার সময় রঞ্জন তাহাকে
‘বাসে চড়াইয়া দেয়, পানিহাটির হাটের কাছে পথের ধারে গিয়া
নামে, আসিবার সময় আবার ‘বাসে’ চড়িয়া চলিয়া আসে। বাস
ওয়ালারা সকলেই তাহাকে চেনে। টিকিট করিতে হয় না।
রঞ্জন দিনের বেলা বলে, ‘কালী, ঘুমে।
তাহার পর সন্ধ্যা হইতে তাহার জাগিবার পালা। ঘুম
পাইলেও রঞ্জন তাহাকে ঘুমাইতে দেয় না। গল্প বলিয়া বলিয়া
জাগাইয়া রাখে, কোনােদিন যদি-বা ঢুলিয়া ঢুলিয়া পড়ে ত’ রঞ্জন
তাহাকে সজোরে একটা চিটি কাটিয়া দেয়, শেয়াল ডাকিলে
ভয় দেখায়, গাছের তলার অন্ধকারটাকে দেখাইয়া বলে,
‘ওইখানে ভূত আছে, ঘুমােলেই ধরে নিয়ে যাবে।' বলিয়া
নিজেই সে চোখ বুজিয়া তাহাকে জড়াইয়া ধরে।

পৌষ-পার্বণ
কিন্তু কালীর সে এক অদ্ভুত ব্যাপার! দিনের বেলা যতই
সে ঘুমাক না কেন, সন্ধ্যা হইলে রাজ্যের ঘুম আসিয়া তাহাকে
জড়াইয়া ধরে, চোখ দুইটা ছােট হইয়া আসে। রঞ্জনের পায়ের
কাছে মাটির উপরেই সে ঘুমাইয়া পড়িতে চায়।
রঞ্জন বলে, ‘আসুক তবে রামসিং, ধরুকু তােকে!
রামসিংএর আসা তেমন আশ্চর্য কিছু নয় !
সেদিন সে রাত্রের ট্রেণখানা পার করিয়া উত্তর দিকের
ফটকটা বন্ধ করিবে, এমন সময় রাস্তার ধারের ওই বঁশগাছের
তলা হইতে এমন একটা শব্দ তাহার কানে আসিয়া ঢুকিল যে,
সে না পারিল ছুটিয়া পলাইতে, না পারিল সাহস করিয়া আগাইয়া
দেখিতে!—অবিকল রামসিং-এর গলার কাশির খুকখুক শব্দ?
কালী ছিল দূরে দাড়াইয়া, তাহাকেও কাছে ডাকিবার মত
সামর্থ্য নাই, রঞ্জনের আপাদ-মস্তক তখন শিহরিয়া উঠিয়াছে,
মাথার ভিতরটা ঝিম্ ঝিম্ করিতেছে, পা-দুইটার অবস্থা নিতান্ত
খারাপ,—সে যেন কাঠের পা ! না পারে আগাইতে, না পারে
পিছাইতে।
আর-একদিন অনিরাত্রি তখন দুইটা বাজিয়া গেছে,
সাড়ে-তিনটার গাড়ীটা পার করিবার জন্য রঞ্জনের ঘুম
ভাঙিয়াছে। অন্ধকার রাত্রি। কালী আর কিছুতেই উঠে না !

১০৬
পৌষ-পার্বণ
ওঠে।
যত উঠাইবার চেষ্টা করে, ততই সে হাউ-মাউ করিয়া কাদিয়া
অবশেষে ভাবিল, সে নিজেই বাহির হইবে। হাতে
লণ্ঠন—ভাবনা কি! রামসিং তাহার অনিষ্ট কিছু করিবে না।
সাহসে ভর করিয়া হড়ম্ করিয়া দরজা খুলিয়া যেমন বাহির
হওয়া আর অনি—
‘বাপ রে !
বলিয়া লণ্ঠন-সমেত ডিগবাজি খাইয়া গড়াইতে গড়াইতে
রঞ্জন একেবারে ফটকের কাছে।
মরে নাই—এই তাহার চৌদ্দপুরুষের ভাগ্য!
হাত ফুটিয়াছে, নাক ফুটিয়াছে, পায়ের খানিকটা ছড়িয়া
গিয়া রক্ত পড়িয়াছে। লণ্ঠনের কাচটা অত্যন্ত পুরু, ছিটকাইয়া
দূরে পড়িয়াও সেটা ভাঙ্গে নাই ।
সেইদিন হইতে তাহার ধ্রুব বিশ্বাস—রামসিং এখনও সে
জায়গাটার মায়া পরিত্যাগ করিতে পারে নাই। এখনও সে
রােজই সেখানে আসে। সাদা ধপধপে কাপড় পরিয়া খড়ম্
পায়ে দিয়া দরজার কাছে হাত পাতিয়া সে গাঁজা খাইতে চায় ।
সেদিন তাহাকে সে স্বচক্ষে দেখিয়াছে।
রনকে সে অত্যন্ত ভালবাসিত, এবং ভালবাসিত বলিয়াই
বােধ করি সেদিন সে তাহাকে ভয় পাইয়া পড়িয়া যাইতে দেখিয়া

পৌষ-পার্বণ
১০৭
তৎক্ষণাৎ অদৃশ্য হইয়া গেল, তাহা না হইলে কলিকাটা হয়ত
চাহিয়াই বসিত।
রঞ্জন ভাবে তাহার সাহস আজকাল অত্যন্ত বাড়িয়াছে
বলিয়াই এখানে সে কাজ করিতে পারে, অন্য লােক হইলে কবে
পালাইত তাহার ঠিক নাই।
অন্ধকার রাত্রে একটুখানি বাতাস বহিলেই রাস্তার পাশে
বাঁশ-ঝাড়গুলা ঝড়, ঝড়, কট কটু করিয়া নানারকম শব্দ করিতে
থাকে, বাস চলাচল থামিবামাত্র শেয়াল-ডাকা শুরু হয়, তাহার
উপর ভূতের উৎপাত!
যে তাহার টাকা চুরি করিয়াছে রঞ্জন তাহাকে মনে-মনে
অভিসম্পাৎ করে। আজ যদি তাহার সে টাকাগুলি থাকিত।
হায় হায়, বৃথাই তাহা হইলে এ লাঞ্ছনা তাহাকে আর সহ
করিতে হইত না।
হে ভগবান্ ! যে তাহার টাকা লইয়াছে
সে যেন মরে। ওই টাকা তাহার যেন শ্রাদ্ধে খরচ হয়।
বলিতে বলিতে ঝ ঝর করিয়া সে কঁদিয়া ফেলে ।
এমনি করিয়াই দিন চলে।
কালী এখন বেশ বড় হইয়াছে। রান্নাবান্না নিজেই করে।
কিন্তু ঘুম তাহার এখনও ঠিক তেমনিই আছে।

১০৮
পৌষ-পার্বণ
রঞ্জন তাহাকে গালাগালি দেয়।‘মর হারামজাদী, ওই
ঘুমিয়ে-ঘুমিয়েই মর তুই।
কালী হাসে। বলে, 'এত গালাগালি কেন দাও বলত’
তুমি, লােকে শুনলে যে হাসে !
রঞ্জন আজকাল সমস্ত দুনিয়াটার উপরেই সৰ্ব্বদা চটিয়াই
থাকে। বলে, ‘
হাসে ত’ তাের কি হারামজাদী! তুই ম না!
মলেই ত’ আমি বাঁচি।
‘আমিও বাঁচি।' বলিয়া কালী রাগ করিয়া ঘরের কাজ-কর্ম
ফেলিয়া চুপ করিয়া বসিয়া থাকে।
রঞ্জন তখন আবার নিজেই ধীরে-ধীরে উঠিয়া যায়। গায়ে
হাত দিয়া বলে, “রাগ করেছিস দিদি? ছি! বুড়াের উপর
রাগ করতে আছে ?
বলিয়া নিজেই খানিকটা কঁাদে। বলে, আমার কপাল !
নইলে এত লােক মরে, আর আমি বেঁচে থাকি।
ফটকের দক্ষিণ দিকে মাইলখানেক দূরে ছােট্ট একখানি
গ্রাম, নাম—হরিশপুর।
হরিশপুরে সেদিন এক মহা অঘটন ঘটিল। বিদেশী এক

পৌষ-পার্বণ
১০৯
ভদ্রলােক আসিয়াছিলেন—গ্রামে হােমিওপ্যাথী ডাক্তারী
করিতে। ভাবিয়াছিলেন, ছােট গ্রাম, ওখানে বসিলে হয়ত
পয়সা-কড়ি হইতে পারে। তাই শহর ছাড়িয়া একা আসিয়া
হরিশপুরে তিনি বাস করিয়াছিলেন। ইচ্ছা ছিল—ভবিষ্যতে
উন্নতি যদি কোনােদিন করিতে পারেন তখন মেয়েছেলে
আনিবেন।
কিন্তু এম্‌নি বিধির নির্বন্ধ যে, মেয়েছেলে তাহাকে আনিতে
হইল না, হঠাৎ সকালে একদিন তাহার কলেরা হইল এবং
সেই নিৰ্বান্ধব অবস্থায় স্ত্রী-পুত্র-কন্যা আত্মীয়-স্বজন হইতে
বহুদূরে রাত্রি আটটার সময় হরিশপুর গ্রামেই তিনি প্রাণত্যাগ
করিলেন ।
কলেরা হইবার পর হইতেই গ্রামের লােক সেবা-যত্বের
ক্রটি কিছুই করে নাই। দুপুরে তাঁহার বাড়ীতে একখানা
টেলিগ্রামও করিয়াছে কিন্তু তখনও পর্যন্ত দেশ হইতে কেহ
আসিয়া পৌছে নাই।
মুস্কিল বাধিল সৎকারের ব্যবস্থা লইয়া। মৃতদেহ এমন
করিয়া ঘরের মধ্যে ফেলিয়া রাখা চলে না, তাহার উপর কলেরা
রােগী, গ্রাম হইতে যত শীঘ্র বাহির করিয়া দেওয়া যায় ততই
ভালাে, অথচ মুখাগ্নি করিবার লােক একজন দেশ হইতে না

১১০
পৌষ-পাৰ্বণ
আসা পর্যন্ত কি-ই বা করা যায়—এই লইয়া সকলেই অত্যন্ত
চিন্তিত হইয়া পড়িল ।
শীতকাল। এমনিই সহজে লােকজন ঘরের বাহির হইতে
চায় না, তায় আবার রাত্রিকালে ক্রোশখানেক পথ অতিক্রম
করিয়া শ্মশানে যাইতে কেহই প্রথমে রাজি হইল না। পরে
জনকয়েক ছােকরাকে অতিকষ্টে রাজি করাইয়া ডাকিয়া আনা
হইল। বাড়ী-বাড়ী কাঠ-কয়লা সংগ্রহ করিয়া গাড়ী বােঝাই
দিয়া একজন চাষার ছেলে সেগুলা সর্বাগ্রে শ্মশানে ফেলিয়া
দিয়া আসিল। যে চারজন লােক দয়া করিয়া শবদাহের জন্য
প্রস্তুত হইয়া আসিয়াছিল, কথা হইল, মৃতদেহটিকে তাহারা
গ্রাম হইতে বাহির করিয়া লইয়া গিয়া ফটকের কাছে কোথাও
নামাইয়া রাখিয়া অপেক্ষা করিবে। এখনও যখন লােকজন
কেহ তাঁহার দেশ হইতে আসিল না, রাত্রি সাড়ে বারােটা
কিম্বা দেড়টার ট্রেণে নিশ্চয়ই আসিবে, এবং আসিলে তাহাকে
ওই ফটকের পাশ দিয়াই গ্রামে আসিতে হইবে, সুতরাং ওই পথে
তাহাকে একেবারে শ্মশানে লইয়া যাওয়াই ভালো।
সেদিন বােধকরি অমাবস্যার রাত্রি। কোলের মানুষ চেনা
যায় নাএত অন্ধকার। একজন লণ্ঠন লইয়া আগে আগে
চলিল, আর বাকি চারজনে ছােট একটি দড়ির খাটিয়ায় মৃতদেহ

পৌষ-পার্বণ
১১১
T
লইয়া পশ্চাতে চলিতে লাগিল। চারজনে ভারি মৃতদেহ
অতখানা পথ বহিয়া লইয়া যাওয়া শক্ত। মাঝে মাঝে নামাইয়া
কঁাধ পাল্টাইয়া ফটকের কাছে তাহারা যখন আসিয়া পৌছিল,
সাড়ে-বারােটার গাড়ীটা তখনও আসে নাই। সবেমাত্র
একটা ‘বাস পার হইয়া গেল বলিয়া ফটক তখনও খােলা।
রঞ্জনের ঘরে আলাে জ্বলিতেছিল! দেখা গেল, সে খাইতে
বসিয়াছে।
শব-বাহকেরা পরামর্শ করিল যে, জানিতে পারিলে রঞ্জন
হয়ত মৃতদেহ এখানে নামাইতে দিবে না সুতরাং তাহাকে
কিছু না জানানােই উচিত।
এই ভাবিয়া নীরবে তাহারা ফটক পার হইয়া খাটিয়াটাকে
ধীরে-ধীরে লাইনের পাশে নামাইয়া রাখিয়া সকলে মিলিয়া
রঞ্জনের ঘরের দরজার কাছে গিয়া ডাকিল, কি করছ রঞ্জন,
খেতে বসেছ নাকি ?
এত রাত্রে লােকজন দেখিয়া রঞ্জন অবাক হইয়া একবার
তাহাদের মুখের পানে তাকাইল। কিন্তু কাহাকেও ভাল
চিনিতে না পারিয়া বলিল, কে ?
গুরুপদ বলিল, ‘আমি গুরুপদ-হরিশপুরের। চিতে
পারছ না ?

১১২
পৌষ-পার্বণ
গুরুপদকে রঞ্জন চেনে। বাজারের ফেরত ‘বাস’ হইতে
নামিয়া প্রায়ই সে রঞ্জনের কাছে গাঁজা খাইয়া যায় ।
গুরুপদ বলিল, ‘খাও, ততক্ষণ আমরা তামাকটা তৈরি
করি। সাড়ে-বাৰােটার গাড়ীতে একজন লােক আসবে
ভাই, কে আর যায় ষ্টেশন পর্যন্ত, ভাবলাম, এই পথেই ত’
আসবে, তার চেয়ে এইখানে বসে বসে তামাকটাও খাওয়া
যাক, গল্পও করা যাক।
এত রাত্রে গল্প করিবার লােক পাইয়া রঞ্জন অত্যন্ত খুশী
হইয়াই তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করিয়া বাহিরে আসিল।
গাজা খাইয়া গল্প করিতে করিতে ট্রেণ আসিয়া পৌছিল।
কিন্তু বসিয়া বসিয়া আরও এক ছিলিম গাঁজা খাইয়া
তাহারা বহুক্ষণ অপেক্ষা করিয়াও দেখিল, হরিশপুরের কোনও
লােক সে-পথ দিয়া পার হইল না। এ ট্রেণেও কেহ
আসে নাই।
আবার সেই রাত্রি দেড়টায় ট্রেণ।
তাহার পর তিনটায়
রঞ্জন বলিল, ‘নিয়মকানুন সব ঘন-ঘন বদলাচ্ছে। বুঝলে
গুরুপদ, আগে বেশ ছিল। আমার হয়েছে মুস্কিল। রাত
জেগে-জেগে হয়রাণ হয়ে গেলাম ভাই।

পৌষ-পার্বণ
১১৩
গুরুপদ জিজ্ঞাসা করিল, তাহলে ত’ সারারাতই তুমি এক
রকম জেগে রইবে বল ?
বাহাদুরী করিয়া রঞ্জন বলিল, “জেগে কি রকম ?
এই শীতকালে ঠায় এই পথের ধারে বসে বসে আমায়
পাহারা দিতে হয় সেই তিনটে পর্যন্ত। তিনটের পর একটু
গড়িয়ে নিই।
অভ্যেস হয়ে গেছে, বুঝলে গুরুপদ, অভ্যেস
হয়ে গেছে।
গুরুপদ তাহার সঙ্গীদের চোখের ইসারা করিয়া বলিল,
‘আর কেন, ওঠো তাহলে ! উঠি রঞ্জন।
এতক্ষণ বেশ ছিল। রঞ্জন বলিল, ‘বসােই না। দেড়টার
ট্রেণ আর কতক্ষণ ! দেখেই যাও।
‘না, সে আর আসবে না বােধ হয়। বলিয়া গুরুপদ
তাহার সঙ্গীদের ফটকের বাহিরে লইয়া গিয়া চুপি-চুপি বলিল,
‘যাহয় হবে এবার, দেখা যাবে কাল সকালে। শীতে আর
আমাদের কর্মভােগ কেন, চল বাড়ী যাই।
বাড়ী যাইবার ইচ্ছা সকলেরই। কিন্তু তবু এ ব্যাপারটা
কেমন যেন কাহারও উচিত বলিয়া মনে হইল না।
মৃতদেহ
পড়িয়া রহিল পথের পাশে—তাহারা বাড়ী চলিল—
অনুচিত বুঝিয়াও এক-পা এক-পা করিয়া আগাইতে

১১৪
পৌষ-পার্বণ
আগাইতে তাহারা মাঠের মাঝে অনেকখানি পথ চলিয়া
আসিল।
হঠাৎ সেই ঘন অন্ধকার শীত-রাত্রির নিস্তব্ধতা ভেদ
করিয়া পাদ্দিক হইতে কাহার যেন একটা বিকট চীৎকার
তাহাদের কানে আসিয়া বাজিতেই সকলেই একসঙ্গে থমকিয়া
দাড়াইয়াপড়িল।
উৎকর্ণ হইয়া আবার তাহারা শুনিবার চেষ্টা করিল কিন্তু
আর-কিছুই শােনা গেল না।
গুরুপদ হো হো করিয়া
করিয়া হাসিয়া উঠিল। বলিল,
‘ব্যাটা দেখেছে এইবার। দেখেই হয়ত আঁৎকে চেচিয়ে উঠেছে।
বুঝলি ?
সকলেই একটুখানি কৌতুক অনুভব করিল। বলিল,
‘ঠিক। তাই বটে।
বলিয়াই আর সেদিকে কর্ণপাত না করিয়া আবার তাহার
পথ চলিতে লাগিল।
পথের ধারে একটা চণ্ডীমণ্ডপে আলো জ্বলিয়া আগা-গােড়া
মুড়ি দিয়া বসিয়া তখনও পর্যন্ত জনকয়েক মুরুব্বি-মাতব্বরগােছের
লােক ডাক্তারবাবুর এই আকস্মিক মৃত্যুর কথা লইয়াই
আলােচনা করিতেছিল, এত শীঘ্র তাহাদের শ্মশান হইতে

পৌষ-পার্বণ ১১৫ ফিরিয়া আসিতে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল, হয়ে গেল এরই মধ্যে ? সে কি রে ? আগাগােড়া ব্যাপারটা গুরুপদ তাহাদের জানাইয়া বলিল, ‘আমরা আর পারব না বাপু এই শীতের রাতে মড়া আগলে বসে থাকতে, তােমরা যাহােক এর ব্যবস্থা-টেবস্থা কর। কিন্তু সকলেই তাহাদের দোষ দিতে লাগিল। ‘ছি ছি, তােরা করেছি কি লােক না এলাে, অপেক্ষা করতে না পারলি,-তােরা দাহ করেই ফিরে’ এলি না কেন? রাত্রিকাল—মড়া ফেলে দিয়ে এলি, শেয়ালে-কুকুরে টানাটানি করবে। ছি বাবা ছি, চ-আমরাও যাই, চল হে চল, আহা বিদেশী ব্রাহ্মণ বলিতে বলিতে সেই পথেই তাহাদের আবার ফিরাইয়া লইয়া বুদ্ধেরাও চলিল। গুরুপদ সারারাস্তা শুধু এই কথা বলিতে বলিতে চলিল ৰে, না, এত বােকা-বেকুব, তাহারা নয়, মড়াটাকে শেয়াল- কুকুরে টানাটানি কখনই করিবে না। মৃতদেহ তাহারা নিরাপদ স্থানেই রাখিয়া আসিয়াছে, রঞ্জন সারারাত জাগিয়া সেখানে পাহারা দিবে। তাহারা ফটক পার হইয়া লাইনের ধারে গিয়া দেখিল,

১১৬
পৌষ-পার্বণ
তাহার। যাহা বলিয়াছিল ঠিক তাই। রঞ্জন পাহারা দিতেছে
কি না কে জানে, তবে দেখা গেল, মৃতদেহের অত্যন্ত সন্নিকটে
সে শুইয়া রহিয়াছে।
শুইয়া থাকিবার কারণ অনুসন্ধান করিতে গিয়া হাতের লণ্ঠন
দুইটা তুলিয়া তাহারা যাহা দেখিল, তাহা যেমন বিস্ময়কর
তেমনি ভয়াবহ ! রঞ্জন বােধকরি মৃতদেহের ঢাকা খুলিয়া
দেখিতে গিয়াছিল, এবং দেখিতে গিয়া ভয়ে সে আঁকাইয়া
চীৎকার করিয়া ঘুরিয়া পড়িয়াছে।
ঘুরিয়া পড়িয়া আর উঠিতে পারে নাই।
দারুণ ভয়ে তাহার হৃৎস্পন্দন সহসা বন্ধ হইয়া গেছে।
বন্ধু গুরুপদ ঈষৎ হাসিয়া বলিল, ‘সেই যে শব্দ-বলেছিলাম
না!—আমার অনুমান কখনও ব্যর্থ হয় না।
রঞ্জন বলিত, ‘নাংনীটা শুধূ ঘুমােতেই এসেছে।
সে-কথা সত্য।
কালীর ঘুম তখনও ভাঙ্গে নাই। বাহিরে যে এতবড় একটা
কাণ্ড ঘটিয়া গেছে তাহার বিন্দুবিসর্গও সে জানে না।
জানাই ভালাে।
আহা ঘুমােক ।

অষ্টম পরিচ্ছেদ
খােলার বস্তি। বাশের ব্যাকারির উপর মাটি-লেপা দেওয়াল ।
মানুষের খোঁয়াড় বলিলেও চলে।
গদার বড় ছেলেটা মােটর-কারখানায় গাড়ী ধােয়ার কাজ
করে, মেজটা যায় বিড়ির কারখানায় । সকালে তাহাদের চা
তৈরী করিয়া দিতে হয়। গাঁদা উনান ধরায়।
কয়লার ধোয়া তাহার ছােট খুপরিটি ছাড়াইয়া আমার
ঘরেও আসিয়া জমিতেছিল। উঠানেও নজর চলে না। শীতের
সকালে, রাজ্যের ধোয়া এই বস্তির চারি ধারে কুণ্ডলী পাকাইয়া
ঘুরিয়া বেড়ায়। রাম-রসিকের চালার চুল্লিতে কড়াই চাপে,
তেলের জিলিপি তৈরী করিয়া কোথায় কোন্ দোকানে সে বিক্রি
করিয়া আসে।
রােজ দেখি, হরমনের মেয়েটার চোখ দিয়া
জল ঝরে,কাচা কয়লার চুল্লি সে বােজ-বােজ ধরাইতে পারিবে
বলিয়া বাপের সঙ্গে বচসা করে।
হমম্ একটা নল-বসানো পিতলের কলসি হাতে ঝুলায়,
মাটীর বাটিগুলা ঝােলায় পুরিয়া কঁাধে ফেলে, তাহার পর মুঙ্গেরি-
নাগরাই পায়ে দিয়া, শহরের একটা বড় রাস্তার ধারে—গাড়ীর

১১৮
পৌষ-পাৰ্বণ
আড়র পাশে গিয়া বসে ; বস্তির গুজব নাকি সে চা বিক্রি
করিয়া দশ-দশ রােপিয়া রােজ কামায়।
ধোঁয়ার মধ্যে দম বন্ধ হইয়া আসে। শহরের পথে-পথে
ঘুরিয়া বেড়াইবার জন্য আমিও বাহির হইয়া পড়ি।
গাঁদার তিনটা হাঁস ছিল। একটা হাস সেদিন চুরি গেছে।
গাঁদা তাই আজকাল একটুখানি সতর্ক হইয়া চলে। দুইটি
হাঁসের পায়ে-পায়ে দড়ির ছাদ লাগাইয়া দরজার পাশে একটা
খুটিতে তাহাদের বাঁধিয়া রাখে। খুটিটা ঠিক তাহার দরজার
সুমুখেই থাকে বটে, কিন্তু হাঁস দুইটাকে সারাদিন আমার
দোরের গােড়ায় মরার মত মুখ থুব ড়াইয়া পড়িয়া থাকিতে
দেখি ।
আর একটু হইলেই সেদিন তাহাদের মাড়াইয়া ফেলিয়া-
ছিলাম।
পিছন হইতে ডাক শােনা গেল
‘ঠাকুন্দা।
বেহারীর গলার আওয়াজ।
আমার বাঁ-পাশের খুপরিটি দখল করিয়া সে আজ নাকি
বহুকাল এখানে বাস করিতেছে। বয়স প্রায় পঁয়ত্রিশের কাছা-
কাছি, বেশ মােটাসােটা গাট্টগােট্টা চেহারা। প্রথম যেদিন

পৌষ-পার্বণ ১১৯ আমার সঙ্গে দেখা—সে এক গাল হাসিয়া বলিয়াছিল, এইখানে আমার জন্ম ঠাকুদ্দা। বিশ্বাস করি নাই। ভাবিয়াছিলাম, পাগল। কিন্তু তৎক্ষণাৎ সে আবার হাসিয়া আমাকে বুঝাইয়া দেয় যে, না, এখানে তাহার জন্ম নয়,-কথাট। সে ‘হাসি-রহস্তি করিয়া বলিয়াছে। বলে, ‘ইস্তক এই বস্তির গোড়াপত্তন দাদা-ঠাউর,আমি তত দিনের। দেখতে দেখতে ওই কেওড়ানী মাগীর তিনটে ছেলে হলাে—আমার এই চোখের সামনে। চোখের গৰ্ব সে করিতে পারে। লাল রঙের দুইটা গােল- গােল চোখ মাথার ঝাড়া-ঝাকড়া চুলের নীচে হইতে যেন ঠেলিয়া বাহির হইতেছে বলিয়াই মনে হয়। ‘পুকুর ছিল, দাদা, পুকুর ছিল। এই যে এই জমি—এই বস্তি—এইখানে একটা পেরকাণ্ড পুকুর। আর ওই যে ওই থােপানী, আমাদের বাড়ীউলি গো— দুটি চরণে ওর কুটিকুটি পেন্নাম- মাগীর তেখন যৈবন-কাল দাদা,-এই পুকুরে ‘হিসসস, হিসাে’ করে কাপড় কাচ তো। রূপ? মরি, মরি, ১২০ পৌষ-পার্বণ চোখের দিষ্টি ঠিকরে পড়তো। আর—এই দুটি হাত দিয়ে বুঝলেন কি না—লুটুতাে-পয়সা লুটতাে। হাতের মুঠা শূন্যে তুলিয়া পয়সা লুণ্ঠনের ইঙ্গিতটা দেখাইয়া বেহারী বলিল, ‘আর সেই পয়সার জোরে আজ সে পুকুর গেল উড়ে’ ওই যে দেখছেন বেটা হম পাপী-বেটা পুরােনাে পাপী—বহু কালের। আর এই যে, এধারে এই জিলিপি-ওয়ালা, ও-বেটার আগে,-ওই শূয়াের-খুপরিটায় থাক্তাে এক বেটা দোসাদ। সে বচ্ছর শীতকালে—অসহি শীত মশাই বলেন কি, আগুনের একটা খাপ রা জেলে ঘরের মেজেয় পড়ে পড়ে বেটা চেঁচাতে। বেটার না-ছিল গায়ে একটা জামা-না-ছিল বিছানা। বুঝলেন ? ভেবেছিলুম, বিছানা একটা দোব বেটাকে। বেটার কপালে নাইকো ঘি-ঠক্ঠকালে হবে কি ? তার আগেই বেটা একদিন অক্কা পেয়ে গেল। হঁা-এখন থেকে’ বলে রাখি, আর- এক-বেটা আদ্দিকালের বুড়ো আছে আপনার ওই ডান-ধারে, আপনার ওই গাঁদা-কেওড়ানীর ভাসুর হয়। বেটা খক খক করে কাশে--আর মুখ দিয়ে রক্ত ওঠে। সাবধান করে দেবেন-কাশতে কাশতে কিছু বলা যায় না মশাই, বেটা পৌষ-পার্বণ ১২১ এনি বেসামাল হয়ে যায়-পটু করে’ কেদিন বসে পড়বে আপনার ওই দোরগােড়াতেই। বুঝলেন ? বেহারীর সঙ্গে আমার প্রথম দিনের পরিচয়েই এত কথা। তাহার পর আমার সহিত তাহার ‘ঠাকুরদাদা সম্পর্কের ব্যাখ্যা শুনিলাম । আমি ব্রাহ্মণ,-বেহারী শুদ্র। কাজেই বয়সে ছােট হইলেও আমি তাহার ঠাকুরদাদা হই। সে কথা আমাকে সে জোর করিয়া বুঝাইয়া দিল । বেহারী কোথায় কোন বাবুর বাড়ী মােটর চালায়। কখনও এইখানেই তাহাকে নিজে রাঁধিয়া খাইতে দেখি, কখনও বলে সে হােটেলে খাইতে শুরু করিয়াছে। যার যা কাজ তাকেই সাজে; হাতা-বেড়ি-খুন্তি, সে সব চুড়ি-পরা হাতের জন্যে। আর আমাদের এই হাত— হাতের তালু দুইটি দেখাইয়া বলে, ‘এই কড়া-পড়া হাতে শুধু—“ষ্টিরিং-হু’ (Staringwheel ).-মােটর? আমার মত কে চালায় এই কলকেতা

১২২
পৌষ-পার্বণ
কই, বলুন?
পাশ-বুকে
একটা
খুন-জখমের
‘রেপাে’ কই দেখান দেখি?
ডাক শুনিয়া সেদিন তাহার খুপরিতে গিয়া দেখি, বেহারী
তখন সবেমাত্র শয্যা ত্যাগ করিতেছে,—মাথার চুল উস্কো
খুস্কো, মুখখানি শুকনাে।
ধরা ধরা গলায় বেহারা কহিল, 'আসুন ঠাকুরদাদা, কাল
রাত্তিরেই ভাবলুম ডাকি, কিন্তু একটুখানি ‘ডিবি’ করা
গেছল দাদা, সাহস হলাে না। বসুন—অনেক কথা আছে,
বহন ওই মাদুরের ওপর চেপে বসুন্।
বেহারী বলিতে লাগিল, “সেই যে পেরেস্ট সায়েবের
মােটর চালায়, সেই যে কালু বলে একটি ছােরার কথা
বলেছিলুম সেদিন,-আমতায় বাড়ী,—সেই তারই পিসতুত
বােন্, দেখে এলুম, মন্দ নয়, চাই, বেশ ডাগর-ডােগর
গড়ন, মন্দ হবে না,-সব ঠিক করেই এলুম ঠাকুদ্দা, আপনাকে
যেতে হবে। বিয়ের দিনটা হলে গিয়ে তেইশে,-এই
মাসেরই তেইশে। ওরা বলছিল আটাশে হােক, আমি
বলুম না, আটাশে মঙ্গলবার আমার জন্মবার, তার চেয়ে
তেইশেই ভাল। কি বলেন ? ঠিক হয়নি? জন্মবারে বিয়ে
করাটা ঠিক নয়।

পৌষ-পার্বণ
এই বলিয়া জবাবের জন্য একটুখানি থামিয়া বেহারী উঠিয়া
দাড়াইল, এবং দেওয়ালের গায়ে পেরেকে-টাঙানাে তাহার
জামার পকেট হইতে ভাঁজ-করা একখানি পােষ্টকার্ড আমার
হাতে দিয়া বলিল, “এই চিঠিখানি আমাকে লিখে দিতে হবে
দা’ঠাউর, নিজের বের নেওস্তন্নের চিঠি-ও সব নিজের হাতে
লিখতে কেমন যেন বাদো-বাদো ঠেকে।•••••ঠিকানা হচ্ছে
গিয়ে-রজনীবাবুর কাষ্টো গুদাম, আমেনিয়া ইষ্টিরি বিশ
লম্বর-শম্ভুনাথ দাস সূত্রধরের নিকটে পৌছে।••••• শাড়ী
একখানা কিতে হলে দাদা, দেখাই আপনাকে,-ঠকুলুম
জিতলুম্ কে জানে। তা খরচটি নেহাৎ কম হবে না
ঠাকুরদাদা, কি বলেন ? হেণ্ডো-নােট লিখে একশ’টি টাকা
কর্জ নিতে হলাে।
পােষ্টকাৰ্ডখানা আমার হাতেই ছিল, জিজ্ঞাসা করিলাম,
‘কালি কলম আছে তােমার ঘরে? লিখব কিসে?
‘আজ্ঞে না, কালি কলম ত’ দাদাঠাকুর,—তবে একটা
খাটো-মতন রুড পেসিল না কি একটা সেদিন দেখছিলুম
এইখানে—এই বাক্সটার নীচে...
বেহারী এদিক-ওদিক হাতড়াইতে লাগিল।
‘আবার ওঠালে দেখছি।

১২৪
পৌষ-পার্বণ
দোয়াত-কলম আনিয়া বলিলাম,-
‘বল এবার কি লিখতে হবে বল?
‘বলেই যদি দেবব তবে আর নিজে লিখবার কি দোষ
ছিল ঠাকুর-দা।
জিজ্ঞাসা করিলাম, শ্বশুরের নাম কি ?
শ্বশুরের নাম--?
বেহারী ঘাড় নাড়িয়া বলিল, “উহু, সেটি ত’ জিজ্ঞেস
করা হয়নি।
বৌএর নাম?
বেহারী হাসিয়া উঠিল। বলিল, ‘শন্তোকে অত-সব
লিখতে হয় না ঠাকুরদা,—লিখে দিন—তেইশে আমার বে
হবে, তিনটের সময় ট্রেণে চড়তে হবে গিয়ে,-বুঝলেন ?
তুই আসবি। অতি অবশ্যি-অবশ্যি আসি যেন। বা...
আসে-আসে না-আসে না-আসে। বৌএর নামটি ? আহা
হা হা হা, দাড়ান, দাড়ান......'
বেহারী চোখ বুজিয়া বৌএর নাম স্মরণ করিতে লাগিল।
তেইশে তারিখেই বেহারীর বিবাহ হইয়া গেল। আমি
কিন্তু যাইতে পারিলাম না।

পৌষ-পার্বণ
১২৫
ফিরিয়া আসিলে জিজ্ঞাসা করিলাম, কি রকম বেহারী,
মঙ্গল ত ?
‘আর
দিয়ে
এলুম কোনো রকমে
সেরে !
আপনার দেহি ভাল আছে।
সন্ধ্যার পরেই বস্তিটা আমাদের অন্ধকারে থম্ থম্ করে।
কেরােসিন পােড়াইয়া রাত্রি জাগিবার প্রয়োজন বিশেষ
কাহারও হয় না।
বস্তির এই অন্ধকার উঠানের উপর হঠাৎ সেদিন বেহারীর
সঙ্গে আমার মুখোমুখি হইয়া গেল। প্রশ্ন করিতে যাইতেছিলাম,
বেহারীই সর্বপ্রথমে একটুখানি থতমত খাইয়া জবাব দিল ।
‘চাপকে ডাকছিলুম,--- বলি, মাছ রাধা আছে ওবেল।
থেকে খানিকট।--নিয়ে যা।
জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘চাপা কে ?
একটুখানি চাপা-গলায় বেহারী আস্তে-আস্তে কহিল,
‘জানেন না? ওই যে আপনার পাশের ঘরে থাকে-গাঁদার
বােন। বেঁটে-সেটে সেই আঁট-সার্ট মেয়েটি—উ-ই বাবুদের
বাড়ী চাকরী করে।
বেহারী চলিয়া গেল ।

পৌষ-পার্বণ
সেদিন নৈহাটি যাইব বলিয়া বাহির হইতেছি, বেহারী
আমার দরজায় আসিয়া ডাকিল, ‘ঠাকুরদাদা!
খবর কি জিজ্ঞাসা করিলাম।
হাসিতে হাসিতে পকেট হইতে একখানা খামের চিঠি
বাহির করিয়া বেহারী আমার হাতে দিল, বলিল, 'পড়ুন।
মেয়ে-মানূষের হাতের লেখা, আখগুলাে সব ওঠাতে
পারলুম না ঠিক।
দেখিলাম, না উঠাইবার মত অক্ষর চিঠিতে একটিও নাই।
বেশ ধরিয়া ধরিয়া বিনাইয়া বিনাইয়া অনেক কথাই লেখা
হইয়াছে। বেহারীর বৌএর চিঠি । মনে হল, কোনও
ছােট ছেলেকে দিয়া লেখানো হইয়াছে।
‘বেশ, বেশ, এইবার একটি জবাব লিখে দাও।”
চিঠিখানি তাহার হাতেই ফিরাইয়া দিতে গেলাম।
বেহারী বলিল, আমার কি আর সময় আছে ঠাকুরদা,
আপনাকেই লিখতে হবে। রাখুন, চিঠিখানি আপনার কাছেই
রেখে দিন।
বলিলাম, আমারও সময় নেই বেরী, নৈহাটি যাচ্ছি-
ফিরতে দেরি হবে।

পৌষ-পার্বণ
১২৭
‘তা হােক। ফিরে এসেই লিখে দেবেন ঠাকুরদা,
চিঠিখানি রাখুন।
ফিরিতে আমার দিন-পনর দেরি হইয়া গেল।
সন্ধ্যায় সেদিন বেহারী আমার ঘরে আসিয়া দাড়াইল।
‘উণ্ডবৎ ঠাকুরদা ! আপনার দেহি ভাল ত ?
বলিলাম, বসাে।
বেহারী বসিল না। পকেট হাতড়াইয়া দুখানি চিঠি
বাহির করিয়া বলিল, আবার দুখানা এসেছে ঠাকুরদা! আমি
লিখেছিলুম দু’খানা চিঠি,কিন্তু ঠিকানাটা বােধ হয় গােলমাল
হয়ে গেছল না কি কিছুই বুঝলুম না। দেখুন ত’ পড়ে।
বার-বার এমন করিয়া তাহার স্ত্রীর চিঠি পড়িতে একটুখানি
বাধ-বাধ ঠেকিতেছিল। বেহারী বলিল, ‘পড়ুন না, পড়েই
ফেলুন না দাদা-ঠাউর, নিজে ত একবার পড়েইছি, তাহলেও
আপনার মুখে একবার শুনি।
দেখিলাম, একখানি চিঠি তাহার স্ত্রীর, অপরখানি
লিখিয়াছে বেহারীর সেই কাষ্ঠো-গুদামের বন্ধু শম্ভুনাথ দাস
সূত্রধর।
লিখিয়াছে, কুড়ি টাকার ব্যাণ্ড-নােট তােমার

১২৮
পৌষ-পার্বণ
তামাদী হইয়া যাইতেছে। আমি আর রাখিতে পারিব না।
এইবার নালিশ করিব।
বেহারীর ডাগর চোখ দুইট। হঠাৎ আরও বড় হইয়া গেল।
বলিল, 'কোন্ চিঠিটা,-কোটা ওর? এইটা না এইটে ?
শম্ভুর চিঠিখানি তাহার হাতে তুলিয়া দিলাম।
বেহারী তৎক্ষণাৎ চিঠিখানি টুকরা টুকরা করিয়া ছিড়িয়া
ফেলিয়া বলিল, করুক, শালা নালিশই করুক আমার নামে।
কই, পড়ুন ত, আর-একখানা, কি লিখছে শুনি।
হস্তাক্ষর বিভিন্ন হইলেও চিঠিখানি বেহারীর স্ত্রী লিখিয়াছে।
‘পানের সর’ ‘হিদয়েশ্বর' এমনি-সব নানা সম্বােধনের পর
যে-কথাগুলি লেখা হইয়াছে মনে-মনে পড়িতেও লজ্জাবোেধ
হইতেছিল। বেহারী কিন্তু জোরে না পড়াইয়া ছাড়িল না।
হাসিতে হাসিতে বলিল, “লিখে দিন, জবাব লিখে দিন
একখানি--বেশ ভাল করে।
বিপদে পড়িলাম। বলিলাম, আমি আর এর জবাব
কি লিখে দেব বেহারী, তার চেয়ে তুমিই লিখাে-ভাল হবে।
বেহারী হাসিতে লাগিল।
‘আমার কি আর লিখবার ফুরসুৎ আছে ঠাকুরদাদা, তবে
আর বলছি কেন আপনাকে ?

পৌষ-পার্বণ
১২৯
লেখাইয়া সে ক্ষান্ত হইল না। বলিল, ‘পড়ুন-শুনি।
শুনিয়া মনে হইল লেখাটা তাহার পছন্দ হয় নাই। জিজ্ঞাসা
করিল, ‘বিয়ে হয়েছে ঠাকুরদাদার ?
বলিলাম, কেন ?
বেহারী আমার মুখের উপর তাহার কদাকার দন্তপাটি
বিকসিত করিয়া হি হি করিয়া হাসিতে লাগিল, তাহার পর
হাসি থামাইয়া কহিল, “
পানেশ্বরী কথাটি ত’ কই লিখলেন না
ঠাকুরদা, হেঁহেঁ-ভুল ধরেছি কিনা, হেঁহেঁ-বলুন?
তাহার হাত হইতে নিষ্কৃতি পাইবার জন্য তাহাই লিখিয়া
দিলাম।
বেহারী জিজ্ঞাসা করিল, “আমার নামটি কি লিখলেন, পড়ুন
ত’ ঠাকুরদাদা!
‘তােমার নাম লিখে দিলাম বিহারীলাল দাস।
ঘাড় নাড়িয়া বেহারী বলিল, “উহু, দাস নয়, রায় লিখুন।
দাসটি কেটে দিন দাদা!
ঘরে
দিনকতক পরে আর-এক সন্ধ্যায় বেহারী আমার
আসিয়া ঢুকিল ।
চুপি-চুপি বলিল, “ঠাকুরদাদা শুনুন্। ওকে ত আমি

১৬০ পােষ-পার্বণ কোনও বদ-মতলবে ডাকিনি ঠাকুরদা ! ডাকলুম,—বলি, বাসি মাছ-তরকারি আছে-নিয়ে যা। দুদিন এসে’-এসে’ নিয়ে গেল। আজ আবার বলে কিনা,-তুমি এইখানে দিয়ে যাও। কেন ? আমি কি বেটীর চাকর ? ডেকে ডেকে দিচ্ছি এই খুৰ, তা না আজকে আবার আঁচল ফকে চলে যাওয়া হলো। শুনুন দাদাঠাকুর!--ওর এই দিদি-টিদি, ভাই-টাইগুলো আসবে এক্ষুনি, গােলমাল যদি বেশী-কিছু করে দাদাঠাকুর,-আপনাকে আমি সাক্ষী মানব কিন্তু, এই আমি বলে রাখছি— বলিলাম, আমাকে আর ও-সবে জড়িয়ে না বেহারী, এখান থেকে তাহলে আমায় উঠতে হবে দেখছি-- বেহারী বলিল, “আচ্ছা, আচ্ছা, আপনাকে না হয়, আর কী এমন...অমন চাপা আমি ঢের দেখেছি এই দেখুন দাদা...হা হা, ভুলে যাচ্ছিলুম, আজ আবার ফের আর- একটা। পকেট হইতে বেহারী একখানি किमि বাহির করিল। বৌএর চিঠির জবাব আসিয়াছে। হস্তাক্ষর এবার আর- একজনের। মনে হইল চিঠিখানি কোনও মেয়ের লেখা। অনেক করিয়া বেহারীকে সে যাইতে লিখিয়াছে।

পৌষ-পার্বণ
১৩১
বলিলাম, “
যাও বেহারী, তুমি একবার শ্বশুরবাড়ী যাও।
অনেক করে যেতে লিখেছে।
‘লিখেছে তা জানি।
বেহারী উঠিল । অন্ধকার বস্তির উঠানের এদিক-ওদিক
তাকাইয়া পুনরায় সে ফিরিয়া আসিল।
যাবে। যাবে কার কাছে শুনি ? জোচ্চোর পাজি
শালারা! ভালমানুষ পেয়ে সবাই ঠকায়। লজ্জায় এতদিন
বতে পারিনি দা’ ঠাকুর।
বেহারী একটু থামিল।
‘দেখে এলুম দিব্যি সােমত্ত মেয়ে—দিব্যি জোয়ান ।
দুদিনের জ্বরে একেবারে কাঠা-সুদ্দ, বদলে গেল ? আমি
কি ঘাস খাই ?
বেহারী চলিয়া গেল।
দরজায় তাহার তালা বন্ধ করিবার শব্দ পাইলাম।
-চিঠির জবাবটা কাল আমার চাইই ঠাকুরদা

নবম পরিচ্ছেদ
টোটা তাহার ডাক নাম । ভাল নাম না-ই বা বলিলাম।
বয়স বেশি নয়, বারাে কি তের, দেখিতেও সুন্দর, কিন্তু দুষ্টবুদ্ধি
তাহার হাড়ে হাড়ে। জনপ্রবাদ নাকি এমন ছেলে সচরাচর
মেলা ভার।
পাশের বাড়ী জামাই আসিয়াছে,—টোট। দিবারাত্রি
সেইখানে। তাহার সমবয়সী
তাহার সম বয়সী মেয়েল। তাহাকে ডাকিয়া
লইয়া যায় ; জামাইকে নানাপ্রকারে অপদস্থ করিবার নিত্য
নব নব কৌশল উদ্ভাবন করিতে একমাত্র সেই ওস্তাদ।
একটা খেজুর গাছের তলায় দাড়াইয়া টোটা ঢিল ছুড়িয়া
খেজুর পাড়িতেছিল, একদল মেয়ে আসিয়া তাহাকে ধরিয়া
বসিল, চল্ টোটা, জামাই দেখে আসি।
হাতের ঢিলটা সে তখন সবেমাত্র চুড়িতে উদ্যত হইয়াছে,
সেকথার কোনও জবাব না দিয়া বলিল, সরে যা, পালা,পাল।
বলছি টেবি, মাথায় লেগে গেলে আমি জানি না কিন্তু
বলিয়াই ঢিলটা সে উপরের দিকে ছুড়িয়া দিল। টেবি
সরিয়া দাড়াইল।

পৌষ-পার্বণ
সেতী বলিল, আয় না ভাই টোটা, আয় শীগগির আয়,
আর পড়তে হবে না।
খেজুরগুলা কুড়াইতে কুড়াইতে টোটা বলিল, জামাই
ঠকাতেও জানিনে ? তােরা এক একটি আস্ত বােকার ডিম।
তােদের কারও বিয়ে হবে না।-যাঃ, অমন সুন্দর পাকা
খেজুরটা পড়ে গেল গুয়ের উপর। নে টেবি তুই এইটে
কুড়িয়ে খা।
টেবি মুখ বিকৃত করিয়া হাসিল ।
সেতী বলিল, হু ! বিয়ে হবে না। এই যে এর হয়েছে,
-এই যে খেদির, এই যে বরুণীর
টোটা হাসিতে হাসিতে তাহার দিকে মুখ ফিরাইয়া বলিল,
বরুণীর বরের নাকটা কেমন ভাই ? এমনি—বলিয়া টোটা
তাহার নিজের নাকের ডগায় হাত দিয়া তাহাই দেখাইয়া
দিল ।
লজ্জায় বরুণী তখন মুখ ফিরাইয়া দাড়াইয়াছে।
টোটা বলিল, নয় বরুণী,—সত্যি বল?
বরুণী রাগিয়া বলিল, তাই বলে ত’ কেউ কারো বাঁশীর
মত নাকটা কেড়ে নিতে যায় নি !--আয় লাে আয় সেতী,
আয়, ও যাবে না।

১৩৪
পৌষ-পার্বণ
সেতী জিজ্ঞাসা করিল, যাবি নে টোটা? তবে কি কতে
হবে বল।
টোটার একটুখানি কাছে সরিয়া গিয়া খেদি বলিল, সেই
ভাই সেই সেদিন কেমন, পানের ডিবের ভেতর আরসুলা--
বলিয়া সে ফিক ফিক করিয়া হাসিতে লাগিল। ইচ্ছা, তাহার
বরের সম্বন্ধে টোটা কিছু বলে। বর তাহার দেখিতে
ভারি সুন্দর।
টোটা বলিল, খানিকটা গােবর নিয়ে আজ ওর জুতাের
ভেতর ঢুকিয়ে দিগে যা-জানতে পারবে না।
খেদি তেনি হাসিতে হাসিতে বলিল, পা দেবে আর
প্যাচ
খুসী হইয়া তাহাই পরীক্ষা করিবার জন্য সকলে চলিয়া
যাইতেছিল, খেদি ফিরিয়া দাড়াইয়া বলিল, আর, আর
একটা ?
একটা খেজুর মুখে দিয়া চিবাইতে চিবাইতে টোটা তাহার
মাথার উপর সজোরে একটা চড় মারিয়া বলিল, আর তাের
মাথা!
খেদি ছুটিয়া পলায়ন করিল।
কিন্তু টোটা সেদিন তাহাদের সঙ্গে না যাওয়ার জন্যই হউক,

পৌষ-পার্বণ
কি সেই ছােট মেয়েগুলার নিৰ্ব দ্ধিতার জন্যই
হউক,
জামাই এর জুতায় গােবর পুরিতে গিয়া সেদিন তাহার হাতে-
হাতে ধরা পড়িয়া গেল।
বরুণী বলিয়া দিল, তাহারা কিছুই জানে না, যত দোষ
টোটার। সেই তাহাদের প্রতিদিন শিখাইয়া দেয়।
কথাটা অতিরঞ্জিত হইয়া টোটার বাবার
কানে গিয়া
পৌছিল। সে বড় শক্ত লােক, কি শক্ত হইলে কি হয়,
মারিয়া মারিয়া ছেলেটাকেও সে শক্ত করিয়া তুলিতেছিল,
আর কিছুই করিতে পারে নাই। টোটা সেদিন তাহার এই
দুষ্কর্মের জন্য পিতার হাত হইতে পরিত্রাণ পাইল না, সন্ধ্যায়
বাড়ী ফিরিলে সে যৎপরােনাপ্তি মার খাইল । মার খাইয়া
অবশেষে ঘুমাইয়া পড়িল।
পরদিন বৈকালে টোটা নিজেই সেই জামাইবাবুর কাছে
গিয়া হাজির। ছোট ছােট কয়েকটা মেয়ে তাহাকে বিরক্ত
করিতেছিল। চড়াইয়া চাপড়াইয়া ভয় দেখাইয়া টোটা
প্রথমেই তাহাদের সেখান হইতে তাড়াইয়া দিল ।
জামাইবাবু জিজ্ঞাসা করিল, টোটা, কাল তুমি আমার
জুতাের ভেতর গোবর দিয়েছিলে
টোটা নিতান্ত ভালমানুষের মত বলিল, না জামাইবাবু,

পৌষ-পার্বণ
কখনাে না।-এম্‌নি ভাব দেখাইল যেন সে ইহার বিন্দু-
বিসর্গও জানে না।
একটুখানি থামিয়া টোটা বলিল, ওরা ভারি বজ্জাত
জামাইবাবু, খালি-খালি আমায় গিয়ে বলে, চল্ ভাই টোটা,
জামাই ঠকাতে যাবি না,-চল ভাই লক্ষ্মীটি ! আমি বলি যাব
, ওরা খালি টেনে টেনে নিয়ে আসে। আর ওই যে
খেদি—হেই এনি-পারা মুখ, ওই কুঁইলি পেচি হারামজাদি
ভারি বজ্জাত। একটা বলে দিলে হয় না, বলে আর-একটা
আর-একটা বল, আর কেমন করে ঠকাতে হবে বলে দে।
জামাইবাবু বলিল,-তুমি নিজে না থাকলেও কাল তােমার
ও-বুদ্ধিটি শিখিয়ে দেওয়া সত্যি, না? কি বল টোটা?
টোটা জামাইবাবুর কাছ ঘেসিয়া বসিয়া হাসিয়া ফেলিল।
এবং পরক্ষণেই জামাইএর একখানি হাত ধরিয়া নিতান্ত
অনুনয়ের সুরে বলিল, চলুন জামাই বাবু বেড়াতে যাবেন না?
চলুন না ওই বনের দিকে।
জামাইবাবু বলিল, না তুমি ভাই দুষ্টু, তােমার সঙ্গে গেলেই
বিপদে পড়তে হয়।
চট্‌ করিয়া টোটা বলিয়া উঠিল, মাইরি বছি জামাইবাবু
আপনার পা ছুঁয়ে বলছি কাল থেকে আমি আর কিছু করি না,

পৌষ-পার্বণ
১৩৭
আমি খুব ভাল ছেলে হয়ে গেছি। বাবাঃ ! যে মার খেয়েছি
কাকে ! না, চলুন জামাইবাবু, দেখবেন আপনি, আজ আমি
কিছু করি কি-না! করি ত’-~-বলিয়া সে কি-একটা শপথ
করিতে যাইতেছিল, হঠাৎ থামিয়া গিয়া বলিল, কিছু না করি
যদি, আজ আমায় একটি পয়সা দিবেন ত ? সেই দিনের মত ?
হ দেব-বলিয়া জামাইবাবু উঠিয়া দাড়াইল ।
গ্রামের পশ্চিমপ্রান্তে প্রকাণ্ড একটা শালের বন। বৎসরান্তের
এই সময়টিতে ছােট-বড় শালের গাছে চিক কচি পাতা গজায়,
—ফুলের গন্ধে বনপ্রান্ত আমােদিত হইয়া থাকে, মাঝে-মাঝে
সাঁওতালের বস্তি। জামাইবাবু কলিকাতা অঞ্চলের সহুরে মানুষ
তাহার উপর সামান্য কি একটা চাকরি করিয়া দিন চলে, কাজেই
তাহার সেই ইট-পাথরের বেড়াজালেবদ্ধজীবনে প্রকৃতির এই
অবাধ-মুক্ত শােভা সৌন্দর্য দেখিবার অবসর বড় একটা থাকে
। দুদিন বাদেই তাহাকে আবার চলিয়া যাইতে হইবে।
তাই সেই মক্ষিকা-গুঞ্জন-মুখরিত তৃণ-পুষ্প-সুরভিত অনতিপ্রশস্ত
বনপথটি আর একবার দেখিবার জন্য মন তাহার অজান্তে অত্যন্ত
চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছিল, শুধু সেই কারণেই টোটাকে সঙ্গে লইয়া
যাইতে সে আর কোনরূপ দ্বিধাবােধ করিল না।
সন্ধ্যার পূর্বেই সেখান হইতে তাহার বাড়ী ফিরিতেছিল।

১৩
পােষ-পার্বণ
বড় একটা দীঘির পাড়ের উপর দিয়া গ্রামে ঢুকিবার পথ ।
মেয়েরা কলসী লইয়া ঘাটে জল লইতে আসিয়াছে, একদল
সারি বাধিয়া এইমাত্র চলিয়া গেল, আর একদল ঘাট হইতে
উঠিতেছে। সেই পথ দিয়াই তাহাদের যাইতে হইবে ।
জামাইবাবু থমকিয়া দাড়াইয়া পড়িল ; বলিল, টোটা, অন্য
কোনদিকে যাবার পথ নেই?
টোটা আগে-আগে চলিতেছিল, মুখ ফিরাইয়া বলিল, ধেৎ।
আসুন না আমার সঙ্গে,—দিব্যি পাশ কেটে বেরিয়ে যাব
আমরা।
জামাইবাবু নতমুখে টোটার পিছন ধরিয়া চলিতে লাগিল।
কিন্তু মেয়েদের ঠিক পিছনে আসিয়া টোটা যে কাণ্ডটা করিয়া
বসিল,-এমন যে করিবে জামাইবাবু স্বপ্নেও তাহা ভাবিতে
পারে নাই।
সকলের পশ্চাতে যাইতেছিল ঘােষালদের মেজবৌ, দেখিতে
খুব সুন্দরী, বয়স আঠারাে ঊনিশের বেশি নয়। টোটা
তাড়াতাড়ি আগাইয়া গিয়া বা হাতটি নিজের বুকের উপর
রাখিয়া ডান হাত দিয়া ঘােষালদের বৌএর পিঠের
উপর ডুগি-তবলা বাজাইতে শুরু করিয়া দিল,-গুকগুক
তেরিখিটি-তা।

পৌষ-পার্বণ
১৩৯
ভয়-চকিত বধূটি পিছন ফিরিয়া টোটাকে দেখিয়াই
তাড়াতাড়ি হোঁচট খাইয়া দলের ভিতর ঢুকিয়া গােলমাল
বাধাইয়া দিল। টোটা তখন নিৰ্বিঘ্নে তাহার কৰ্ম্ম সমাধা
করিয়া দিয়া জামাইবাবুর কাছে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। সেও
তখন ভয়ে লজ্জায় একেবারে মাটির সঙ্গে মিশিয়া গিয়াছিল।
মেয়েরা বেশি কিছু বাড়াবাড়ি করিল না। প্রফুল-বৌ
বলিল, আয় টোটা তাের মায়ের কাছে আয় একবার, দেখি তুই
কত বড় শয়তান। বলিয়াই তাহার একটুখানি দ্রুতগতিতে
চলিয়া গেল।
জামাইবাবু ফ্যাল ফ্যাল করিয়া টোটার মুখের পানে
তাকাইয়া তাহাকে তিরস্কার করিবার উদ্যোগ করিতেছিল কিন্তু
তাহার মুখ দিয়া কথা বাহির হইতেছিল না।
টোটা নিজেই বলিল, মাইরি জামাইবাবু, ও ত’ একবার,
আজ সারাদিনের মধ্যে এই একবার,—ও হয়ে গেল এনি,
আমি আর থাকতে পালাম না,আর কখখনাে হয় যদিত’
এই—রাম, দুই, সাড়ে-তিন,-বলিয়া সে তাহার দক্ষিণ কর্ণটি
নিজের হাতেই বার-কত মর্দন করিয়া দাড়াইয়া দাড়াইয়া
হাসিতে লাগিল।

১৪০
পৌষ-পার্বণ
}
জামাইবাবুর মুখ দিয়া এতক্ষণে কথা ফুটিল। বলিল,
পাজি ! ষ্টুপিড, !
টোটা সবিনয়ে বলিল, নাঃ আর কখখনো এসব করব না
দেখে নেবেন।-কই জামাইবাবু, দিন্ না একটা পয়সা, আমি
আর যাৰ না আপনার সঙ্গে, এই দিক দিয়ে চলে যাই।
জামাইবাবু, বলিল, না, তােমার মত ছেলেকে পয়সা
দিতে নেই।
দিন্ না জামাই বাবু !
।
দি না আপনার কত পয়সা। হু-
ঘাড় নাড়িয়া জামাইবাবু বলিল, না, কিছুতেই না।
দিন্ না একটা
ফের !
আর কোনও কথা না বলিয়া টোটা চেঁ করিয়া সােজা
খানিকটা দৌড়িয়া গেল। মেয়েরা তখনও মুমুখের পথ ধরিয়া
চলিতেছিল। তাহাদের পাশে দাঁড়াইয়া টোটা একবার পিছন্
ফিরিয়া তাকাইল,জামাইবাবু তখনও সেইখানে দাঁড়াইয়া।
তাহার পর, মেয়েদের শুনাইয়া শুনাইয়া উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার
করিয়া জামাইবাবুর উদ্দেশে বলিতে লাগিল এ ! আমাকে

পৌষ-পার্বণ ১৪১ শিখিয়ে দিয়ে আবার এতক্ষণে চালাকি 'দ্যাখ গাে তােমরা সবাই দ্যাখ একবার, নিজে শিখিয়ে দিয়ে আমায় ও আবার মারতে আসছে উল্টো। এই বলিয়া টোটা আর সেখানে দাড়াইল না, হনহন করিয়া দৌড়িয়া গ্রামের ভিতর গিয়া প্রবেশ করিল। সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে দূর হইতে তখন বুঝিতে পারা গেল না জামাইবান্ধু কি করিতেছে। গ্রামের বারােয়ারি-তলায় কয়েকদিন ধরিয়া হরিনাম- সংকীৰ্ত্তন চলিতেছিল,-কাল শেষ হইবে । সেরাত্রে টোটার ভাল ঘুম হইল না, পরদিন অতি প্রত্যুষে শয্যাত্যাগ করিয়াই হাবা, নারী ও মন্ট-গ্রামের মধ্যে তাহার বিশ্বস্ত অনুচরকে ডাকিয়া আনিল। হাবা বলিল বারােয়ারি-তলায় চল্ কীৰ্ত্তন শুনে আসি । নারা বলিল, লােকে আজ মেলা বাতাসা ছুড়বে ভাই, আজ ধূলােট। বাতাসার নামে মন্টর জিবে জল সরিতেছিল, সে আর কোনও কথা বলিতে পারিল না। তাহাদের সঙ্গে লইয়া টোট। পথ চলিতেছিল, ফিরিয়া

১৪২
পৌষ-পার্বণ
দাড়াইয়া বলিল, সে যখন ছুড়বে তখন ছুড়বে। চ’না আজ
একটা ভারি মজা করা যাবে চল্।
পথের পাশে বিষ্ণু চাটুজ্যের পড়াে বাড়ীটার ভাঙ্গা একটা
দেওয়ালের আড়ালে লােহার দুইটা সাবল লুকান ছিল, চুপি চুপি
সে দুটা বাহির করিয়া হাবা ও নারীর হাতে দিয়া টোটা বলিল,
এই নরু স্যাকরার দোরের সামনে একটা আর ওই বােনােয়ারি
লাএকের দরজার পাশে একটা—এই দুটো জায়গায় পথের
উপরে বেশ ভাল করে দুটো গর্ত খোঁড়া যাক।
মন্ট বলিল, একেবারে পথের উপরেই, না ওই এক
পাশ-চেপে ?
ঘাড় নাড়িয়া টোটা বলিল, না পথের ঠিক মাঝখানে।
নে—চটপটু।
মণ্ট ছেলেটার ভয় একটুখানি বেশি। বলিল, আর ভাই
কেউ যদি দেথতে পায় আর বকে ?
বলিল, হাঃ! দেখতে পেলেই ত? বলব,খেলা
,
হাবা বলিল, বলেই হলাে কিনা ! কারও বাবার পথ ?
টোটা বলিল, লাগা, লাগা, জদি লাগা, নইলে দে আমাকে
দে সাবটা।

পৌষ-পার্বণ ১৪৩ নারা তখন খুড়িতে আরম্ভ করিয়াছিল, বলিল, এই দ্যাখৃ-না কত বড় গর্ত খুঁড়ে ফেলছি চটা করে। হাবা বলিল, আমার এই গর্তটাতে পড়ে শাল ওই ক্ষুদে তিলি, তাহলে ভারি মজা হয়। সেদিন আমাদের সেই ছাগলটার জন্যে পালা কাটছিলাম ওর ওই সার-ডােবার অশখ- গাছটায়, ওর সেই বৌ-শালী ট্যাকৃট্যাক করে বেরিয়ে এসে বলে কি-না যা নেমে যা, পালা কাটলে গাছ বাড়বে না আমাদের। টোট। বলিল, দাড়া বাড়াচ্ছি,—গাছটাকে মুড়িয়ে কেটে নিয়ে যেতে হবে একদিন। দেখিতে দেখিতে দুইটা বেশ বড় বড় গর্ত তৈরী হইল। মণ্টর উপর ভার ছিল এটো শালের পাতা ও সৰু-সৰু কাটি কুড়াইয়া আনিবার। সমস্তই আসিয়া পৌছিলে টোটা নিজের হাতে শাল পাতা কাটি ও তাহার উপর বালি দিয়া গর্ত দুইটি এমন ভাবে বন্ধ করিয়া দিল যে, সেখানে গর্ত আছে বলিয়া সহজে আর-কা’রও টের পাইবার উপায় রহিল না। তাহার পর তাহারা সকলে মিলিয়া রাস্তার উপর ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল। ভিন্ন গ্রামের একটা লােক সেই পথ দিয়া আসিতে আসিতে হঠাৎ একটা গর্তে পা দিতে যাইতেছিল,

১৪৪
পৌষ-পার্বণ
টোটা তাহাকে হুঁ হাঁ করিয়া সাবধান করিয়া দিল, বলিল,
এই দিক দিয়ে সােজা চলে যাও, ওখানে কে খানিকটা গু
চাপা দিয়ে রেখেছে।
লােকটা চলিয়া গেলে হাব। বলিল, পড়তো ত’ পড়তােই,
বারণ কলি যে?
মুরুব্বির মত ভারিক্কি চালে টোটা বলিল, জানিনে তুই।
ও ভি-গাঁয়ের লােক—ওকে ফেলে কি হবে ? তার চেয়ে
আর একটু পরে দেখবি মজা। গাঁয়ের লােক সব ধুলাে-কাদা
মেখে নাচতে নাচতে আসবে দেখিস ঠিক এই পথ দিয়ে,
বাস ! ধূপ, ধাপ, পড়বে আর চেঁচাবে ।
এই বলিয়া সে একটুখানি থামিয়া আবার বলিল, কিন্তু এই
বলে রাখছি তােদের, খবরদার কেউ হাসিস নে যেন। হেসেছ
কি মরেছ।
বেলা প্রায় আটটার সময় কীৰ্ত্তন ভাঙ্গিয়া গেল,। ধুলাে
শুরু হইল। গ্রামের ছেলে-বুড়াে ইতর-ভদ্র সকলে মিলিয়া
নাচিতে নাচিতে বারােয়ারি তলায় গিয়া জড় হইতে লাগিল।
দেখিতে দেখিতে আধঘণ্টা খানেকের মধ্যেই খােল করতাল
এবং অন্যান্য নানাবিধ বাদ্যযন্ত্রের শব্দে সমস্ত গ্রামখানা যেন
মুখরিত হইয়া উঠিল। মনে হইতে লাগিল যেন কিসের একটা

পৌষ-পার্বণ
১৪৫
তীব্র মাদকতায় গ্রামের আবাল-বৃদ্ধ সকলকে মাতাইয়া
তুলিয়াছে! কত রকমের নাচ, কত রকমের গান, কত হাসি,
কত আনন্দ ! সে এক বিরাট ব্যাপার ! শত্ৰুমিত্র, দলাদলি,
জাতিভেদ, সব যেন মিলিয়া মিশিয়া একাকার হইয়া গেল,
মুচি-মেথর, চামার-চণ্ডাল কাদা-মাটি মাখিয়া একসঙ্গে নাচিতে
সুরু করিল।
বৎসরের মধ্যে শুধু এই একটি দিন ! তাও আবার কোনও
বৎসর অর্থের সঙ্কুলান হয় না। আজিকার দিনে এই প্রাণবন্ত
সজীবতাটুকু তাহাদের অর্ধমৃত শুষ্ক দগ্ধ হৃদয় হইতে সহসা
কেমন করিয়া যে উৎসারিত হইয়া ওঠে কে জানে! মনে
হয় না যে বৎসরের সকল দিবসে, দিবসের
সকল প্রহরে
ইহারাই আবার উপেক্ষিত পল্লীর ঘরে-ঘরে হিংস্র শ্বাপদের
মত চার পায়ে হাঁটিয়া বেড়ায়, নিজেদের মধ্যে ধাওয়া-খাওয়ি
মারামারি করিয়া মরে। করুণা হয়,-অন্ধতমসাচ্ছন্ন অধঃপতিত
এই বিরাট জনসঙ্ঘ যে কত বড় অসহায় সেই কথাটাই
সর্বপ্রথমে মনে হইতে থাকে ।
বাবােয়ারিতলা হইতে মাদল বাজাইয়া বাগদিদের প্রথম
যে দলটা বাহির হইল তাহারা চলিয়া গেল পশ্চিমপাড়ার
দিকে। দরবেশী বাউল গান করিবার জন্য ভিন্নগ্রাম হইতে

১৪৬
পৌষ-পার্বণ
একদল নেড়ানেড়ী আসিয়াছিল, আনন্দলহরী বাজাইয়া গান
করিতে করিতে দক্ষিণপাড়ার একটা রাস্তায় গিয়া তাহারা
ঢুকিল। কয়েকটা দল বায়ােপিতলার আসর জমাইতে
লাগিল, এবং বামুনপাড়ার দলটা আসিল টোটার সেই গর্তখােড়া
পথের উপর দিয়া।
বিষ্ণু চাটুজ্যের পড়ােবাড়ীর দেওয়ালের আড়ালে নিতান্ত
গােবেচারির মত টোটা দাড়াইয়া রহিল। সঙ্গীদের বলিল,
যা তােরা নাচগে যা।
কিন্তু আনন্দের এত আয়ােজন, এত কষ্ট করা সত্ত্বেও বিধি
বাধ সাধিলেন। হাসিতে গিয়া টোটার মুখের হাসি সহসা
বন্ধ হইয়া গেল। প্রথম নম্বরেই গর্তে পা দিয়া খোড়া হইল
রাধু মল্লিক—টোটার বাবা। সঙ্গে-সঙ্গে তাহাদের মধ্যে একটা
হৈ চৈ গােলমাল উঠিল। দেখিতে দেখিতে দ্বিতীয় গর্তে
পড়িয়া পেতাপ, বাগদির ডা-পাটা মুচকাইয়া গেল। তাহার
পর কাহার যে কি হইল গােলমালে আর-কিছুই ঠিক-ঠাহর
পাওয়া গেল না। টোটা তখন সকলের অলক্ষ্যে ধীরে ধীরে
সেখান হইতে অদৃশ্য হইয়া গেছে।
টোটা যখন বাড়ী ফিরিতেছিল, পল্লীপথে দুপহরের রৌদ্র
তখন ঝা-ঝ। করিতেছে। গত কয়েক দিন ধরিয়া বারােয়ারি

পৌষ-পার্বণ
১৪৭
তলায় যে সমারােহ চলিতেছিল, উৎসব-শেষে আজ আর
তাহার কোনও চিহ্ন পৰ্য্যন্ত নাই। পূর্বের মত সমস্ত গ্রামখানা
ইহারই মধ্যে আবার নিঝঝুম হইয়া গেল। পেতাপ, বাগদির
পায়ের অবস্থা কিরূপ আছে দেখিবার জন্য টোটা একবার
তাহার বাড়ীর দিকে গিয়াছিল কিন্তু তাহার দেখা পাওয়া যায়
নাই। রাজার কাছারীতে কি একটা কাজের বেকার দিবার
জন্য নায়েবের পেয়াদা আসিয়া সমস্ত বাগদিপাড়ার লােকগুলাকে
মার-ধাের করিয়া ডাকিয়া লইয়া গেছে।
বারােয়ারিতলার সুমুখে টোটা একবার থকিয়া দাঁড়াইল।
চারিদিকে তাকাইয়া দেখিল লােকজন কেহ কোথাও নাই,
গেঁয়াে দুইটা কঙ্কালসার কুকুর ভােগ-মন্দিরের আশে-পাশে
ঘুরিয়া বেড়াইতেছে মাত্র। লাট-শালার পরেই সারি-সারি
তিনটি মন্দির-একটি মনসার, দুইটি শিবের। কিন্তু মন্দিরের
চত্বর দুপুরের রৌদ্রে এত বেশি উত্তপ্ত হইয়া উঠিয়াছে যে,
সেখানে পা দিয়া দাড়ানো চলে না। টোটা সেই তপ্ত শানের
উপর দিয়া মনসা-মন্দিরের চৌকাঠের সমুখে গিয়া দাড়াইল।
আর-একবার এদিক-ওদিক তাকাইল ; দেখিল, পথে তখনও
জনমানব নাই। ধীরে ধীরে সেইখানে সে হাঁটু গাড়িয়া
বসিল, মনসা-মন্দিরের চৌকাঠে মাথাটা ঠেকাইয়া মনে-মনে কি

১৪৮ পােষ-পার্বণ যেন কামনাও করিল, তাহার পর সেখান হইতে উঠিয়া সে আবার পথ ধরিয়া চলিতে লাগিল। পথের গর্ত দুইটা তখনও তেনি রহিয়াছে। টোটা আবার থকিয়া দাড়াইল। তপ্ত বালির উত্তাপে পা তখন পুড়িয়া যাইতেছে। কয়েকটা ইট- পাটকেল আনিয়া তাড়াতাড়ি সে গর্ত দুইটা নিজের হাতে আবার বন্ধ করিয়া দিল । ঘরের কাছাকাছি আসিয়াও টোটা বাড়া ঢুকিতে পারিতে- ছিল না, দরজার পাশে দাড়াইয়া উকি মারিতে লাগিল। সেখান হইতে যদিও কাহাকেও দেখিতে পাওয়া গেল না, তবু তাহার মায়ের তীব্র কর্কশ কণ্ঠস্বর শুনিয়া ইহা তাহার বুঝিতে বাকি রহিল না যে, ভিতরে একটা গণ্ডগোেল নিশ্চয়ই বাধিয়াছে। বাবার সঙ্গে মায়ের ঝগড়া শুরু হইয়াছে ;—এবং ইহা তাহাদের চিরাভ্যস্ত অভ্যাস,প্রতিদিনের মধ্যে অন্ততঃ ঘণ্টাখানেকের জন্য না হইলেই নয় । মা বলিড়েছে, চাল ডাল মুন তেল কিছু নেই বাড়ীতে, আর বাবু এলেন এতক্ষণে নেচে পা ভাঙিয়ে। বাপ, বলিল, আঃ! তাতে আর হয়েছে কি ? এনে ত’ দিলাম এই ভাঙা পা নিয়েই। ) পৌষ-পার্বণ ১৪৯ এই বলিয়া একটুখানি থামিয়াই সে আবার বলিল, বছরের সাধ একটা দিন নাচতে যাব না—ফুর্তি করতে? তীক্ষকণ্ঠে জবাব আসিল, না। যার ঘরে নাই ভাত, তার অত সখ কিসের? কাজ-কি নাচানাচিতে ? তাই বেশ বাপু বেশ, আর যাব না। ঝগড়া এইবার আর অগ্রসর হয় না দেখিয়া টোটার মা কাদিয়া ফেলিল।-বাবারে বাবা! আমার হয়েছে মরণ- মুস্কিল! শেষে জ্বলে, পুড়ে’ মতে যে হয় আমাকেই । হাঃ! উনি-ই যেন মরছেন জ্বলে-পুড়ে’? আর-কেউ মরে না ? টোটার মা বলিল, তাহ'লে আর ভাবনা ছিল না। এমনি কোন্‌দিন দেবে আর-কি ভাসিয়ে সবাইকে,-আমার হাড়ে হলুদ দিয়ে যাবে হয়ত কোনদিন মরে’-বাস! স্ত্রীর মুখে নিজের মরণের কথা শুনিয়া রাধু মল্লিক একটুখানি রাগিয়া উঠিল। বলিল, আমার মরণ তাকিয়ে তুই ত’ মাছ- পােড়া হাতে নিয়ে বসে আছিস। তা কি-আর আমি জানি না? রান্নাঘর হইতে আবার কান্নার সুরে জবাব আসিল,-দেখ,

১৫০
পৌষ-পার্বণ
ওই-সব কথাগুলাে বােলো না বছি। দেব আখুনি মাথা খুড়ে
আধসের রক্ত বের করে তােমার পায়ে।
রাধু বলিল, না, আমার পা অত সস্তা নয়।
নাও, হাসি-ঠাট্টা রাখ। খুব হয়েছে-মরদ !
একটুখানি চুপ করিয়া থাকিয়া রাধু বলিল, পায়ে চুণ-হলুদ
লাগাব বলে’ এতক্ষণ ধরে বসে আছি,-কই দিলিনে যে?
আমি পারব না। বলিয়া স্পষ্ট জবাব দিয়া সে আবার
কহিল, নিজেই বা নিলে! কেন, কুঠে ত' নও!
রাধু মল্লিক খোঁড়াইতে খোড়াইতে উঠিল। এবং নিজেই
খানিকটা চুণ ও হলুদ আনিয়া মাটির একটা পাত্রের উপর
উনানের একপাশে গরম করিতে দিল।
চুণ-হলুদ গরম হইতে দেরি হইল না। কিন্তু উত্তপ্ত সেই
মাটির পাত্রটা উনান হইতে তুলিতে গিয়া হাতে তাহার হঠাৎ
ছ্যাকা লাগিয়া গেল। একে ত’ নাচিয়া গাহিয়া খােড়া হইয়া
ক্লান্ত সে হইয়াই ছিল, তাহার উপর এত বেলা পর্যন্ত না
খাইয়া কলহ-কিচ কিচি করিয়া মনটাও তাহার ভাল ছিল না,
হাতে আগুনের আঁচ লাগিতেই সৰ্বা তাহার আলিয়া গেল।
টোটার মা তখন তাহার কাছে বসিয়াই রান্না করিতেছিল।
তাড়াতাড়ি চুণ-হলুদ-সমেত গরম খােলাটা রাগের চোটে রাধু
-

পৌষ-পার্বণ
মরি-বাঁচি করিয়া হাতে তুলিয়া লইল এবং সেটাকে সে
একটুখানি উদ্ধে তুলিয়া তৎক্ষণাৎ স্ত্রীর পায়ের উপর তাহা
ফুটাইয়া দিয়া সরােষে চীৎকার করিয়া উঠিল, তবে নে শালী
এই রইলাে এইখানে। হারাম-জা-দী—ইহার বেশি রাগে
তাহার মুখ দিয়া আর কথা বাহির হইল না, আবার তেমনি
খোড়াইতে খোড়াইতে সে বাহিরে চলিয়া গেল।
দরজার বাহিরে তাহাদের আস্তাকুঁড়ের পাশে টোটা
এতক্ষণ আধ-উড়ন্ত একটা শালিক পাখীকে ধরিবার চেষ্টা
করিতেছিল,-ঘরের ভিতরের কোলাহল কতকটা সুমা
হইয়াছে দেখিয়া শালিক পাখীর আশা সম্প্রতি সে পরিত্যাগ
করিয়া ঘরে ঢুকিল। বাবা তখন সুমুখ হইতে সরিয়া গেছে,
সরাসর সে তাহার মায়ের কাছে গিয়া বলিল, দে ভাত দে,-
ক্ষিদে পেয়েছে।
পায়ের উপর গরম চুণ-হলদি পড়িয়া ফোস্কা না উঠিলেও
আলা করিতেছিল। বলিল, ভাত নেই আজ, যা পালা সব
আমার মুখ থেকে।
ব্যাপার যে কতদূর গড়াইয়াছে টোটা তাহার কিছুই
জানিত না, বলিল, বাঃ সকাল থেকে কিছু খেয়েছি। জিদে
পায়নি আমার ?

১৫২
পৌষ-পার্বণ
টোটার মা বলিল, সে তাের বাপকে ডাক্রাঁধু বাড়ুক
খা’ খাওয়া—আমি কিছু জানিনে।
এই বলিয়া সেখান হইতে উঠিয়া সে অন্যত্র চলিয়া
যাইবার উদ্যোগ করিতেছিল, টোটা তাহার আঁচল ধরিয়া
বলিল, দিয়ে যা ভাত! ক্ষিদে পায়নি ?
কথার কোনও জবাব না দিয়া আঁচলটা টানিয়া লইয়া তাহার
মা চলিয়া গেল। টোটা তাহার পিছনে পিছনে চলিতে-চলিতে
বলিতে লাগিল, উনােনে ওই যে কি চড়ানাে রইলাে, ওটা পুড়ে
যাক তাহলে মুড়ি কোথায় আছে বল আমি নিজেই
নিই-গে।
রান্নাঘরের পাশেই টেকি-শালের কাছে বসিয়া তাহার বাবা
যে তামাক সাজিতেছিল টোটা তাহা দেখিতে পায় নাই।
রাধু তাহার রাগ ঝাড়িবার আর লােক পাইতেছিল না, টোটাকে
দেখিতে পাইবামাত্র সে তাহার কাণে ধরিয়া হিড়হিড় করিয়া
টানিয়া আনিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ভাত খাবার জন্যে চেঁচাচ্ছি
যে ? ভাত হয়েছে জানিস ?
টোটা চুপ করিয়া রহিল।
এতক্ষণ কোথা ছিলি,—ছিলি কোথা হতভাগা? বলিয়া
সে তাহার গালের উপর ঠাস্ করিয়া একটা চড় মারিয়া দিল।

পৌষ-পার্বণ
১৫৩
টোটা ফ্যাল ফ্যাল করিয়া তাকাইয়া রহিল, কোনও জবাব
দিল না।
রাধু এইবার তাহার পেটের উপর এক লাথি মারিয়া
তাহাকে উল্টাইয়া ফেলিয়া দিয়া বলিল, বেরাে হারামজাদা
বেরাে ঘর থেকে। পড়া নেই, শােনা নেই, এতক্ষণে এলেন
ওঁকে বিরক্ত করতে!
এই বলিয়া সে একটুখানি থামিয়া পুনরায় তাহার কলিকাটা
সাজিতে সাজিতে মুখ ভ্যাংচাইয়া বলিতে লাগিল,-এ ! ভাত
খাব-ভাত খাব, পিণ্ডি খেগে, আখার ছাই খেগে যা-
টোটা কাদিল না, কিছু বলিল না, মুখ ভার করিয়া সেখান
হইতে উঠিয়া সে ধীরে ধীরে বাহির হইয়া গেল।
এতক্ষণে ঘরের ভিতর হইতে তাহার মা ডাকিল, টোটা,
টোটা, যানে
কিন্তু তাহাতে তাহার অভিমান যেন আরও খানিকটা
বাড়িল বই কমিল না।
সরাসর গ্রামের পথ ধরিয়া বােধকরি সে তাহার কোনও
অনুচরের কাছেই যাইতেছিল।—বারােয়ারি-তলার কাছাকাছি
একটা ছেলের সঙ্গে দেখা। নাম-ডেলাই ঠাকুর। ছেলেটা

১৫৪
পৌষ-পার্বণ
তাহারই সমবয়সী কি এক-আধ বছরের ছােটই হইবে।
‘ঠাকুর’ তাহাদের উপাধি-পূজা-পৌরােহিত্য করিয়া দিন চলে।
ফুলের একটা সাজি ও একটা গাড়, হাতে লইয়া সে বারােয়ারি-
তলার দিকে যাইতেছিল। মনসা ও শিবের পূজা তাহারাই
করে, এবং তাহার জন্য বিঘাকত দেখােত্তর জমির ফসল
তাহারা পায়।
টোটা জিজ্ঞাসা করিল, কোথা যাচ্ছি ডেলে ?
পুজো করতে। কেন?
এত দেরি হলাে যে?
ডেলাই ঈষৎ হাসিয়া চুপি-চুপি বলিল, পূজো বলে কার
মনেই ছিল না,-বাবা ঘুমােচ্ছ।
টোটা বলিল, তুই পূজো করতে জানিস?
হা জানি। বাঃ, কতদিন থেকে করছি।
কই বল দেখি মন্তর।
ডেলাই একটা ঢোক গিলিয়া বলিল, পেরথমে একবার
এই ধর গাড় র জলে সব চা-টা করিয়ে দিলাম, তারপর
গাত্তি জপতে হয় দশবার; বাস, আবার কি? আতপ
চাল, ফুল আর বেলপাতা নিয়ে তিনবার,-শিব হলে, ওং
শিবায় নম, ওং শিবায় নম; আর মনসার বেলায়, ওং মা

পৌষ-পার্বণ
মনসায় নম, ওং মা মনসায় নম। শেষে উঠে আসবার সময়,
গাড়র জল নিয়ে ওং রিং রিং ফটুওং রিং রিং ফটু।
টোটা জিজ্ঞাসা করিল, তুই ভাত খেয়েছিস্ ডেলো?
ডেলাই প্রথমে ‘না’ বলিতে গিয়াছিল, পরে থতমত খাইয়া
বলিয়া ফেলিল, ‘। আমি ত জানি না ভাই, যে আমাকেই
পূজো করতে হবে।
টোটা কহিল, ভাত খেয়ে পূজো হয় ?
ঘাড় নাড়িয়া ডেলাই বলিল, হ, মা বলে, হয় ।
কই দেখি কি আছে তাের সাজিতে? বলিয়া টোটা
উকি মারিয়া ফুলের সাজিটা দেখিতে যাইতেছিল, ডেলাই
বলিল, চান্ করেছিস ত টোটা? তা নইলে বাবা হে-হেঁ,
জান না ত?
হা করেছি। বলিয়া টোটা দেখিল, সাজির মধ্যে কয়েকটি
রক্তকরবীর ফুল, ধান-দশ-বারাে বেল-পাতা আর একটি
পিতলের ছােট রেকাবের উপর একমুঠা আতপ চাউল ছাড়া
আর-কিছুই নাই।
টোটা জিজ্ঞাসা করিল, মনসা ঠাকুরটার পূজো করবি নে ?
ওই মনসার ?
হাঁ, করব।

পৌষ-পার্বণ তবে, হেঁইও! বলিয়া টোট। অতর্কিতে সেই সাজিটার নীচে হাত দিয়া এমনভাবে তাহা উল্টাইয়া ফেলিয়া দিল যে, ফুল, বেলপাতা, রেকাবি ও আতপ চাল পথের ধুলামাটির উপর তৎক্ষণাৎ ছড়াইয়া পড়িল। ব্যাপার দেখিয়া ছেলেটা প্রথমে অবাক হইয়া পথের মাঝে থকিয়া দাঁড়াইয়া পড়িল এবং পরক্ষণেই ভয়ে দুঃখে কাদিয়া ফেলিয়া বলিতে লাগিল, এ্যা—এই চললাম আমি বাবাকে বতে, শাল- আপ-মনে চলিতে চলিতে টোটা একবার পিছন্ ফিরিয়া বলিয়া উঠিল, যা যা !

দশম পরিচ্ছেদ
ভূতের কাহিনী
=
বয়স বৎসর-চল্লিশের কাছাকাছি কিন্তু দৈব দুর্বিপাকে এই
বয়সেই দাঁতগুলি সব পড়িয়া গিয়াছে বলিয়া সকলেই তাহাকে
ফোকলা-হরি বলিয়া ডাকিত। একাধিক্রমে উনিশ বৎসর
লােহার কারখানায় কেরাণীগিরি করিয়া, আপিষ-মাষ্টারের
লাথি-জুতা খাইয়া তােষামােদি করিয়া তাহার মেজাজটা হইয়া
গিয়াছিল অমানুষিক ।
যখন-তখন যার-তার নামে নালিশ করিয়া ফোলা হরি,
একদিকে যেমন সাহেবের প্রিয় হইয়া উঠিয়াছিল, অন্যদিকে
সহকর্মী বন্ধুগণ তেমনি ঘৃণায় ও ভয়ে তাহার পাশ ঘেসিত না।
তবে একটা ছােকরা ছিল, যাহাকে বাধ্য হইয়া সর্বক্ষণ তাহার
কাছে থাকিতে হইত। সে তাহারই শ্যালক-পরেশ। নিতান্ত
নিরীহ গােবেচারী। বয়স সতেরাে কি আঠারাে, শরীরে
অপরিমিত ক্ষমতা, কিন্তু নিরক্ষর। নিরক্ষর হইলেও, পিতৃদত্ত
বিঘা চল্লিশেক জমির উৎপন্ন ফসল হইতে তাহার একটা পেট
বেশ ভাল করিয়াই চলিতে পারি, কিন্তু চলুক আর নাই চলুক,
একদা হরিহর বলিল, চল্ পরেশ—আমার সঙ্গে কারখানায়

১৫
পৌষ-পার্বণ
একটা চাকরি করবি চল। এমনভাবে বসে থাকলে আর
চলবে না। তুই ত’ বিধবা মেয়ে ন’ যে ঘরে বসে ভাত
মাবি।
দিদির যখন বিবাহ হয়, পরেশ তখন নিতান্ত ছেলেমানুষ।
এবং সেই অবধি হরিহর তাহার উপর অভিভাবকত্ব করিতেছে।
কাজেই কথাটার কোনরূপ প্রতিবাদ না করিয়া একটা নূতন
জীবনের মােহে, নূতন দেশ দেখিবার আশায়, পরেশ তাহার
সহিত কারখানায় আসিল।
এত বড় লােহার কারখানা-এত সব কল-কজা এত বড়
আপিস, এত বাবু এত সাহেব-মেম সে জীবনে কোনদিন
দেখে নাই। তাই এ নৃতন স্থানে আসিয়া প্রথমে দিনকতক
সে নির্বাক বিস্ময়ে এই সব দেখিতে লাগিল।
কিন্তু বসিয়া বসিয়া অনর্থক ‘মেসের ভাত ধ্বংস করিয়া
এসব দেখাইবার জন্য হরিহর তাহাকে আনে নাই। তিন
দিনের পর ঢালাই-খানায় হেড-মিস্ত্রীর নিকট পরেশ চাকরিতে
নিযুক্ত হইল। ফারনে হইতে অগ্নি-শিখার মত তপ্ত
কাঞ্চন বর্ণের গলিত লৌহ গড়াইয়া আসিত, মিস্ত্রির আদেশ
মত কুলি-মজুরের বড় বড় কটাহে তাহা ধরিয়া লইয়া
' ছাচে ঢালিয়া দিত। পরেশকে ওই কুলি-মজুরদের সঙ্গে

পৌষ-পার্বণ
খাটিতে হইত। কৰ্ম্মশেষে প্রতিদিন দশ আনা হাজিরা
মিলিত।
প্রত্যেকটি কাজ নিয়ম শৃঙ্খলা বজায় রাখিয়া ধীরে-সুস্থিরে
করা প্রথমতঃ এই উচ্ছঙ্খল পল্লী-যুবকের পক্ষে এক প্রকার
অসম্ভব হইয়া উঠিয়াছিল, ক্রমে মিস্ত্রি ও সাহেবের মার
খাইয়া কাজটা তাহার করায়ত্ত হইয়া উঠিল।
সেদিন শীতের সন্ধ্যা। গায়ে গরম কাপড় জড়াইয়া ফোলা
হৰি কঁপিতে কাপিতে আপিস হইতে ‘মেসে ফিরিয়া দেখিল,
পরেশ তালা-বন্ধ দরজার বাহিরে বসিয়া বসিয়া শীতে
কাপিতেছে। অগ্নিজালাময় কারখানার মধ্যে কাজ করিত
বলিয়া দিনের বেলা তাহার গরম কাপড়ের প্রয়ােজন হইত না,
গায়ে শতচ্ছিন্ন মলিন গেঞ্জি। পরনের কাপড়খানা ততােধিক
মলিন। সর্বাঙ্গে কালি মাখা। হাত-পা পরিষ্কার করিবার
জন্য কারখানা হইতে যে সাবানের টুকরা টুকু পাইত তাহাও
আবার হরিহরের জামা-কাপড় পরিষ্কার করিতেই ফুরাইয়া
যাইত। কাজেই শুধু সরকারি কলের জলে পরেশের অঙ্গের
মলিনত্ব ক্রমশই বৃদ্ধি পাইতেছিল।
পরেশ এত সকালে চলিয়া আসিয়াছে দেখিয়া হরিহর
উত্তেজিত কণ্ঠে কহিল,আজ যে বড় আগেই চলে এসেছিস ?

১৬০
পৌষ-পার্বণ
কাল রাতের বেলা খেটেছিলুম।
হরিহর তালা খুলিবার জন্য অগ্রসর হইতেই পরেশ
সসমে উঠিয়া এক পাশে সরিয়া দাড়াইল। হরিহর বলিল, কাল
রেতে খেটেছিলি ত আজ কি বটে শুয়ার। ধীরে ধীরে পরেশ
বলিল গাটা কেমন করছে।
মুখ বিকৃতি করিয়া হরিহর কহিল, এ বলে কিনা গাটা
কেমন করছে। সােনার অঙ্গ তাই কালি হয়ে গেল
হতভাগার, দে কত পেয়েছিস, দে। বলিয়া হরিহর হাত
পাতিল।
টাক্ হইতে দিনের রােজগার একটি আধুলি বাহির করিয়া
হরিহরের হাতে দিয়া পরেশ বলিল, আট আনা।
আধুলিটা পকেটে ফেলিয়া দিয়া ঘরের ভিতর তক্তাপােষের
উপর বসিয়া বলিল, নে তামাক সাজ।
পরেশ তামাক সাজিতে বসিলে হরিহর কহিল, ওভার
টাইমে খাটতে যাবিত, ক’টা বাজল এখন ?
আজ আর যাব না মনে করছি। বলিয়া হুকাটা সে তাহার
হাতের কাছে ধরিয়া দিল।
হরিহর হুকাটা হাতে লইয়া টানিতে টানিতে বলিল, যাবি
।......তবে আজ রেতের খােরাক বন্ধ—খাবি কি, পাড়া-

পৌষ-পার্বণ
১৬১
ঠাকুরকে বলে দিই-ঠাকুর!‘অ ঠাকুর।
ঠাকুরের সাড়া-শব্দ না পাইয়া হরিহর বলিল, ডাক ঠাকুরকে।
পরেশের আহারের জন্য ঠাকুরের কাছে পেট-ঠিকা
বন্দোবস্ত হইয়াছিল। বেলা ছয়টার পর রাত্রি শট। পৰ্য্য
পরেশ উপরি খাটিয়া যাহা রােজগার করিত তাহা হইতে মাসে
সাতটি করিয়া টাকা ঠাকুর পাইত। তাহার পরিবর্তে ঠিক নির্দিষ্ট
পরিমাণে ভাত ডাল তরকারি পরেশকে দেওয়া হইত, একবারের
বেশী চাহিলে পাইবার হুকুম ছিল না। তাহাতে তাহার
পেট ভরুক আর নাই ভরুক। এক বেলা না খাইলে ছয়টা পয়সা
ফেরত।
ঠাকুর তরকারি কুটিতেছিল।
পরেশ বলিল, ডাকছে
তোমাকে ।
কেন রে-
-
নিজের আহার বন্ধ করিবার জন্য সে যে নিজেই তাহাকে
ডাকিতে আসিয়াছে, এ-কথাটা তাহার মুখ দিয়া বাহির হইল
। পরেশের অশ্রু-ভারাক্রান্ত চোখ-মুখের দিকে নজর পড়িতেই
ঠাকুর সমস্তই বুঝিল। বলিল, আজও তাই? তাের ভাবনা নেই
পরেশ, আমি খেতে দেব তােকে, চল ।

১৬২
পৌষ-পার্বণ
ঠাকুর উঠিয়া হরিহরের কাছে গিয়া বলিল, কি বছেন
হরিহর-বাবু?
হরিহর অন্যমনস্ক হইয়া বসিয়াছিল-বলিল, না কিছুই
বলিনি যাও।
ঠাকুর চলিয়া গেলে পরেশকে ইসারা করিয়া হরিহর বলিল,
-শােন্।
অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সহিত পকেট হইতে তাহারই রােজগারের
আধুলিটা বাহির করিয়া তাহার হাতে দিয়া বলিল, যা তােকে
করিমগঞ্জে যেতে হবে একবার। গাঁজা ফুরিয়ে গেছে, একদম
নাই। যা, দৌড়ে যাবি আর আবি! এই শীতের রাত, না
পেলে সর্বনাশ হবে।
করিমগঞ্জ সেখান হইতে দুই ক্রোশের কম নয়—এই প্রচণ্ড
শীতের অন্ধকার রাত্রে উন্মুক্ত মাঠের উপর দিয়া একটা শতচ্ছিন্ন
গেঞ্জি মাত্র গায়ে দিয়া কেমন করিয়া যাইবে, আর আসিবেই-বা
কেমন করিয়া ? কিন্তু সে-ভাবনা ভাবিবার অবসর হার ছিল
। বাহিরে বিরাট অন্ধকার তাল পাকাইয়া উঠিতেছিল।
পরেশ ঘরের কোণ হইতে হারিকেন লণ্ঠনটা তুলিয়া লইতে যাইবে
এমন সময় হরিহর চীৎকার করিয়া উঠিল, বাঃ লণ্ঠন নিয়ে যাবি

পোষ-পার্বণ
আর আমি অন্ধকারে জুজু-বুড়ীর মতন বসে থাকুব বুঝি ? ভূতের
আবার জন্ম-মাস! লণ্ঠনের দরকার নেই, অমনি যা-।
সােজা রাস্তা, যা যা শীগগির যা বাপু-
পরেশ কঁাপিতে কাপিতে বাহির হইয়া গেল।
মধ্যে
ঘন্টা-দেড়েকের পরেশ করিমগঞ্জ হইতে ফিরিয়া
দেখিল, মেসের বাবুর। সকলে খাইতে বসিয়াছে। একমাত্র
হরিহর বাকি। পরেশের আসার প্রতীক্ষায় সে তখন উগ্রীব
হইয়া সর্বাঙ্গে কাপড় জড়াইয়া বিছানার এক পাশে চুপটি
করিয়া বসিয়া ছিল।
পরেশ ঘরে ঢুকিতেই আগ্রহাতিশয্যে বিছানা হইতে
তাড়াতাড়ি উঠিয়া পরেশের হাত হইতে গাজার পোটলাটি
লইয়া বলিল, দেখি, বেটার তোকে আনাড়ি ঠাউরে ফাকি দিয়েছে
ঠিক ঠিক ওজন করেছে। বলিয়া হরিহর অত্যন্ত মনযােগের
সহিত বস্তুটা পৰ্যবেক্ষণ করিতে লাগিল।
কিয়ৎক্ষণ পরে কতকটা গঁৰা বাম হতে রাখিয়া বাকিটুকু
অতি যত্বসহকারে বাক্সবন্দী করিয়া হরিহর বলিল, জাত পরেশ,
ওই পুরােনাে জুতোজোড়াটার ভেতর একটা ছােট কোলকে
পরেশ কলিকাটা আনিয়া তাহার হাতে দিল। গাঁজাটা

১৪
পৌষ-পার্বণ
কিয়ৎক্ষ উত্তমরূপে হস্তে মর্দন করিয়া তাহাতে আগুন দিয়া
বলিল, দরজা বন্ধ করে তুই বাইরে দাড়া।
দরজা বন্ধ করিয়া পরেশ বাহিরে চলিয়া গেল, হরিহর
তাহার উভয় হত একত্র সংযােগ করিয়া সে এক অদ্ভুত কৌশলে
ছোট কলিকাটি ধরিয়া প্রাণপণে কয়েক দম টানি পুনরায়
কলিকাটি লুকাইয়া রাখিল। ডাকিল, পরেশ! ঠাকুরকে
আমার ভাত দিতে বন্ত এবার।
কিৎক্ষণ পরে পরেশ আসিয়া জানাইল, ঠাকুর ভাত দিয়েছে
আপনি যান।
হরিহরের বেশ নেশা জমিয়াছিল। খড়-জোড়াটা পায়ে
দিতে দিতে বলিল, হে-হে, বলছি যে বাবা চিরদিনের অভ্যেস
এক টান না টালে কি আর খিদে পায় !
থালা অভাবে পরেশকে সকলের শেষে খাইতে হইত। হরিহর
চলিয়া গেল।
অন্ধকার শূন্য ঘরটায় একাকী বসিয়া বসিয়া পরেশ
নিজের দুরদুষ্টের কথা ভাবিতে লাগিল।
পরেশের খাওয়া শেষ হতে না হইতে হরিহর ডাকিল,
পরেশ, অ পরেশ !–ঠাকুর, পরেশটা এখনও করছে কি? তার
কি ভাত খাওয়া আজ আর শেষ হবে না নাকি?
এই যে, হয়ে গেছে। বলিয়া পরেশ যথাসম্ভব ক্ষিপ্রতার

পৌষ-পার্বণ
সহিত আহারাদি শেষ করিয়া তাহার কাছে গিয়া বলিল,
কি জন্যে ভাকছিলেন ?
হরিহর বলিল, আমি ভুলে গিয়েছিলাম –কাল ত শনিবার ?
বাড়ী যেতে হবে, অথচ কাপড়চোপড় গুলো ময়লার একশেষ।
বসে বসে একটুখানি পরিষ্কার
পরিষ্কার করে দিতে
পারবি না?
অপরিষ্কার তিনখানা কাপড় ও খান-দু:এক জামা হতে
লইয়া পরেশ কলতলার দিকে চলিয়া গেল। কেন পারিবে না ?
সবই যখন পারিতেছে তখন একটুখানির জন্য বদনাম কিনিতে
তাহার ইচ্ছা হইল না।
পরেশ কলতলায় বসিয়া কাপড়-জামায় সাবান দিতে দিতে
দেখিল, মেসের দরজাগুলো একে একে সকলেই বন্ধ করিল।
আলাে নিবিল। সম্মুখের ঘরে জনকয়েক আফিসের কেরাণী
আহারাদির পর হাসি-তামাসা গল্প-গুজব
চীৎকার
করিতেছিল, তাহারাও চুপ করিয়া একে একে বিছানায় শুইয়া
পড়িল। বামুন-ঠাকুর, ঝি, লণ্ঠন হাতে লইয়া বাহির হইয়া
গেল। যাইবার সময় ঠাকুর বলিল, সদর দরজাটা বন্ধ করিস
পরেশ-আ, তুই-শালারও কপাল ! রাত-দুপুরে কাপড় কেচে
মরছিস?
এবং

পৌষ-পার্বণ
শীতের কনে বাতাস সারাগায়ে তীরের মত বিঁধিতেছিল
ঠাণ্ডা জলে তাহার হাত দুইটা ক্রমেই যত আডষ্ট হইয়া
পড়িতেছিল, সে তত বেশ শক্তি সঞ্চয় করিয়া প্রাণপণে খদ্দরের
মােটা মােটা কাপড়গুলা কাচিতে আরম্ভ করিল। তাহাকে
কষ্ট দিবার জন্যই বুঝি এ কাপড় কেনা হইয়াছে। পরেশ
শুনিয়াছিল, সাহেবদের অত্যাচার হইতে পরিত্রাণ পাইবার
জন্যই নাকি এসব জিনিসের আমদানি হইয়াছে। মােটা খদ্দরের
কাপড় পরিয়া তাহাদের যে কিরূপে জব্দ করা যাইবে, সে-সবের
ইতিহাস তাহাকে কেহ ভাল করিয়া বুঝাইয়া দেয় নাই।
না বুঝা। সে-সব বড় বড় বাহিরের খবর রাখিতে সে তত
বেশী উৎসুক ছিল না; তবে, একথাটা তাহার অনুক্ষণ মনে হইত
যে, পৃথিবীতে কি এমন কোন ব্যক্তি নাই,যে তাহার এই একান্ত
হিতৈষী আত্মীয়ের অত্যাচার নিবারণ করিয়া দিতে পারে ?
দূরে প্রকাণ্ড চিনিগুলা হইতে গাঢ় রক্তাভ ধুম নির্গত
হইতেছিল। পরেশ একবার আকাশের দিকে চাহিল। মাথার
উপরের আকাশটা তারায় তারায় ভরাট হইয়া আছে। আজ যদি
কারখানায় যাইত তাহা হইলে ভাল হইত। সেখানে
জলের সঙ্গে সম্বন্ধ নাই। চারিদিকে শুধু আগুন আর বিদ্যুৎ।
এখন যাহারা সেখানে কাজ করিতেছে, তাহারা হয় ত

পােষ-পার্বণ
১৬৭
এতক্ষণ আগুনের গরমে গলঘৰ্ম্ম হইয়া উঠিতেছে-গলিত
লৌহের অগ্নি-উত্তাপ ভেদ করিয়া শীত সেখানে প্রবেশ করিতে
পারে না। ভাবিল, একদিন সে কাহাকেও কিছু না জানাইয়া
পালাইয়া যাইবে ।
কোনও দূরদেশে গিয়া বরং সে মাটি কাটিয়া
খাইবে সেও ভালো, তবু আর এ নির্মম অত্যাচার সহ্ করিবে
। এমন হিতৈষী আত্মীয়-স্বজন থাকার চেয়ে না থাকাই ভাল।
সােমবার প্রাতে হরিহর বাড়ী হইতে ফিরিয়া আসিল।
দেখিল—পরেশ শয্যাগত। কারণ জিজ্ঞাসা করিয়া জানি,
তাহার রক্ত-আমাশয় হইয়াছে।
হরিহর বলিল, কিছু খাসনে, উপােস দে দিন কতক।
কিন্তু, উপবাস দিয়া সারিয়া যাওয়া দূরে থাক, রােগটা
ক্রমশই বাড়িয়া চলিতে লাগিল। পাচ ছয় দিন পরে হরিহর
বলিল, যা তুই বাড়ী ৰা। এমন করে তোর থাকা চলবে না;
তাের পেছনে একটা লােক আমি রাখতে পারব না বাপু।
পরেশের শরীরটা এই কয়দিনেই এত বেশী দুর্বল হইয়া
পড়িয়াছিল যে, বিছানা ছাড়িয়া একটু উঠিতে গেলেই তাহার
মাথা ঘুরিত সেদিন সন্ধ্যায় হরিহর তাহাকে একখানা

পােব-পার্বণ
টিকিট কিনিয়া দিয়া টুণে চড়াইয়া দিল—বলিল, ঘরে গিয়ে
চুরি-টুরি করে কিছু খানে যেন পরেশ—একদম উপােস দিবি,
বুঝলি ?
হ্যা না কিছু না বলিয়া পরেশ শুধু ঘাড় নাড়িয়া কি যে
উত্তর দিল, ভাল বুঝা গেল না।
গাড়ীখানা যখন ষ্টেশন অতিক্রম করিয়া সশব্দে তাহাদের
গ্রামের দিকে ছুটিতেছিল, তখন পরেশ যে কি-রকম উগ্রীব
হইয়া সেই অংখ্য যাত্রীর মাঝে গাড়ীর একটি কোণ ঘে সিয়া
চুপটি করিয়া বসিয়া ছিল তাহা একমাত্র সে-ই জানে। অতিকষ্টে
পথ হাঁটিয়া পরেশ যখন বাড়ী আসিয়া পৌছিল, তখন রাত্রি
প্রভাত হইয়াছে।
দিদি ঝঙ্কার দিয়া বলিয়া উঠিল, তাের এমন অসুখ, এখানে
কি জন্যে এলি ?
পরেশের বড় রাগ হইল। ক্ষীণকণ্ঠে বলিল, বেশ করলাম
তাের কি ?
পর-সপ্তাহে হরিহর বাড়ী আসিয়া দেখিল, প্রবেশের ব্যায়াম
তখনও সারে নাই। অধিকন্তু হাত-পাগুলা ফুলিয়া উঠিয়াছে।
যাইবার সময় স্ত্রীকে ডাকিয়া বলিল—ভাইকে ভালবেসে
ভালমন্দ কিছু খাওয়াচ্ছ না ত ? মরবে তাহলে।

পৌষ-পার্বণ
সে বলিল, অ। মােলো যা-ভালমন্দ খাওয়ার সময়টি
বেশ ! নিজের কাচ্চা-বাচ্ছা নিয়ে চব্বিশঘণ্টা অস্থির।
ওকে একবার ডাক্তার দেখালে হতো না, হ্যাগা?
ধ্যে! ডাক্তার না অারে-কি ! সামান্য অসুখ, তার জন্যে
আবার দশ-বিশ টাকা ভাপি ! বলিয়া হরিহর কম্মস্থানে
চলিয়া গেল।
তিন চার দিন পরে, একদা অপরত্নে দেশ হইতে হরিহরের
জ্যেষ্ঠ পুত্র কমল হঠাৎ পিতার মেসে গিয়া উপস্থিত হইল।
রাত্রে ছেলেকে লইয়া হরিহর খাইতে বসিয়াছে। ঠাকুর
জিজ্ঞাসা করিল, এটি কে হরিহর-বাবু?
আমার ছেলে হে, বেশ ভাল করে মাছ-টাছ দাও ওকে।
বরং কিছু বেশী লাগে আমি দেবাে না-হয় ।
বােসো। বলিয়া ঠাকুর ফিরিয়া যাইতেছিল, হঠাৎ থমকিয়া
দাড়াইয়া জিজ্ঞাসা করিল, আচ্ছা, পরেশ যে অসুখ নিয়ে বাড়ী
গিয়েছিল, কেমন আছে ?
হরিহর বলিল, শুছি ত কাল রাত্রে সে হয়ে গেছে।

পৌষ-পার্বণ
১৭০
বঁচে যে খাবার ধূম । আবার একথা কখনও শুনেছ ঠাকুর, ওই
রােগা মানুষটাকে পােড়াতে দশ মণ কয়লা আর এক-গাড়ী কাঠ
খরচ হয় ?
যারা শ্মশানে গিয়েছিল, তারা শুনছি আজ সকালে
ফিরেছে। হু:! এটা কি আর মানুষ ছিল যে, একটা ভূত
ভূত-কোথাকার ভূত এসে জন্মেছিল আর কি!

১০ ২। ০ ২, , ২. ১৭ শ্রাশৈলজানন্দ মুখােপাধ্যায়ের লেখা- বপুবরণ- নারীমেধ অতসী জোয়ার-ভাট। ছায়াছবি মাটির ঘর রক্ত-লেখা বাংলার মেয়ে ঝড়াে হাওয়া ষােল-আনা বানভাসি পূর্ণচ্ছেদ মাটির রাজা নীহারিকা ওয়াচ কোং- ২বচন কয়লা-কুই মহাযুদ্ধের ইতিহাস আমাদের প্রকাশিত কয়েকখানি ভাল ভাল বই উষা দার্শনিক পণ্ডিত সুরেন্দ্রমােহন ভট্টাচাৰ্য প্রণীত বাসরে মিলন শান্তি-সৌরীন্দ্র মুখােপাধ্যায় প্রণীত নিশির ডাক বিনােদ হালদার উপন্যাস) নারীতীর্থ-রমেশ চট্টোপাধ্যায় প্রণীত বিধু ভূষণ বসু প্রণীত লক্ষ্মী বৌ, লক্ষ্মী মা, লক্ষ্মী মেয়ে, সতী লক্ষ্মী, স্বয়ম্বয়া, প্রখরা, অমৃতে গরল প্রত্যেক পানার মূল্য জলধর বাবুর নাটক রাঙা—( মিনার্তায় অভিনীত ) শচীন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত প্রণীত গৈরিক পতাকা-মনােমােহনে অভিনীত ) শ্রীগুরু লাইব্রেরী ২৪ কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা। * * * * ১১ মতীবনলতা দেবী প্রণীত লক্ষ্যীশ্রী 376; ; Approved as a prize books for Schools book for girls in School in Bengal, & prize & Library No 2 133182; 24 তৃতীয় সংস্করণে গ্রন্থ কলেবর প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়াছে কিন্তু মূল্য বাড়ে নাই এই পুস্তকখানি প্রত্যেক কুল-মহিলার পক্ষে কিরূপ অত্যাবশ্যকীয় তাহা সামান্য বিজ্ঞাপনের দ্বারা বুঝানাে অসম্ভব। সামান্য অন্ন-রন্ধন হইতে পােলাও, কালিয়া, মাছ, মাংস, পিষ্টক, সন্দেশ, মিঠাই, আচার, চাটনি, জেম, জেলি, মােরব্বা প্রভৃতি আধুনিক ধরণের খাদ্য প্রস্তুত-প্রণালী বৰ্ত্ত- মান সময়ােপযােগী করিয়া লিখিত ও সন্নিবেশিত হইয়াছে । এ পর্যন্ত যত প্রকার দেশী ও বিলাতী রন্ধন প্রচলন হইয়াছে তাহার উল্লেখযােগ্য প্রায় ৬•• শত প্রকার রন্ধনই ইহাতে সহজ ভাষায় বিষদরূপে লিখিত হইয়াছে সে সকল নৃতন বন্ধনের বিষয় অপর কোন পুস্তকে নাই। পাক-প্রণালী বহু আছে-তবে “লক্ষ্মীশ্ৰী” কিনিবেন কেন? কারণ- ইহাতে ত সর্বপ্রকার রন্ধন ও জল খাবার তৈয়ারী শিক্ষা আছেই, তদ্ব্যতীত ইহাতে কোনমাসে কি কি আনাজ তরকারী রােপণ করিতে হয়, সর্বপ্রকার ফল ও চারা রােপণ-প্রণালী, সার দেওয়া প্রভৃতি চাষের বিস্তারিত বিবরণ, রােগীচর্চা, রােগীর পথ্য তৈয়ারী, গৃহকাৰ্য প্রভৃতি সাংসারিক খুটিনাটি, সময়ের সদ্ব্যবহার শিক্ষা, পিতামাতা শ্বশুর, শাশুড়ী, গুরুজন, আত্মীয়স্বজন, অতিথি, দাসদাসী প্রভৃতির প্রতি কর্তব্য ও ব্যব- হার, পত্রাদি লিখিবার নিয়ম, শিরােনামা লিখিবার নিয়ম, পত্রলিখিবার আদর্শ, জমা খরচ, ধােপর হিসাব, ডিপ থিরিয়া, হাম, পাচরা, কৃমি, দাত উঠা, সর্দিকাশি, আমাশা প্রভৃতি চিকিৎসা বিষয়, গৃহশৃঙ্খলা, শিশুপালন রােগীর সেবা, একান্নবর্তী পরিবার ইত্যাদি এত অধিক শিক্ষণীয় বিষয় কুললক্ষ্মীদিগের জন্য আর কোনও বাংলা পুস্তকে লিখিত হয় নাই। খানি লক্ষ্মী শ্রী” থাকিলে সংসার লক্ষ্মীশ্ৰীতে ভরিয়া উঠিবে। প্রত্যেক বধুকে প্রকৃত গৃহিণীতে পরিণত করিবে। মেয়েদের উপহার দিতে পূজার বাজারে বিবাহের উপহারে, স্কুলের প্রাইজে লক্ষ্মীশ্রী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ পুস্তক আর নাই। ইহার কাছে বাজে উপন্যাস কিছুই নহে, ছাপা কাগজ, বাঁধা প্রথম শ্রেণীর, প্রকাণ্ড পুস্তক মূল্য দুই টাকা মাত্র। এই গ্রন্থকীর লিখিত দর্পচুর্ণ-১,রত্ন-মন্দির-১, সহধর্মিণী-১ গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এও সন্স, ২•৩১১নং কর্ণওয়ালিস স্ট্রীট, কলিকাতা এক প্রাণনাথ মল্লিক ও ব্রাহ্মসমাজ শ্ৰীমতীবনলতা দেবী তদীয়া দাখিশুরের এই জীবনচরিতখানি লিখিয়া দেশের প্রভুত উপকার করিয়াছেন। ইহাতে প্রায় ১০০ বৎসরের পুৰ্ব্বেকার ব্রাহ্মসমাজের ও এদিগের বহু অবশ্য জ্ঞাতব্য পটনা লিপিবদ্ধ করিয়াছেন যাহা ৫০ বছর পূর্বে লিপিবদ্ধ হওয়া দরকার ছিল কিম্বা আর কিছুকাল পরে সংগ্রহ করা সম্পূর্ণই অসম্ভব হয় । হইয়া পড়িত। “প্রাণনাথ মল্লিকের চেষ্টা যত্ন ও উদ্যোগে ইহার জ্ঞাতি ও স্বজন মিলিয়া প্রায় ৪০ ঘর বাগআঁচড়া নিবাসী ব্রাহ্মণ, পবিত্র ব্রাহ্মধৰ্ম্ম গ্রহণ করেন। তদ্বারা ব্রহ্মসমাজের যে মহান উপকার ও পুষ্টি সাধন হইয়াছে তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। পূর্বে ব্রাহ্মসমাজে উপনয়ন সংস্কার ও জাতিভেদ প্রথা বৰ্তমান ছিল। প্রাণনাথ মল্লিকই ব্রাহ্মদিগের উপবীত ৩াগের ও বেদীতে বসিয়া অব্রাহ্মণের পক্ষে আচায্যের কৰ্য্য করার অধিকার সম্বন্ধে ব্রাহ্মসমাজে আন্দোলন ও বিপ্লব আনয়ন করেন। প্রবঠকে এ সম্বন্ধে যুক্ত বিপিনচন্দ্র পাল অষ্টমবর্ষ য় সংখ্যা ১১• পৃষ্ঠা ও ৪র্থ সংখ্যা ২৬ পৃষ্ঠায় লিখিতেছেন ?---“গাঢ়ড়া হইতেই ক্ষমা প্রথম স্বাধীনতার গ্রামের সূত্রপাত হয়। ‘প্রাণনাথ মলিক একজন আত্রণ বা ছিলেন। তিনি কহিলেন উপবীত রাখা কপটতার ডি ও মহাপাপ * কলকাতা ব্রা- সমাজের উপাচাৰ্য বেদান্তবাগীশ মহাশয় ও বেচারাম বাবু উপবীত পরিত্যাগ না করিয়া বর্দীর কার্য করেন কেন?" কথাটা গোস্বামী মহাশয়ের ধম্মবুদ্ধিতে যাইয়া আঘাত করিল। তিনি মনে মনে স্থির করিলেন "গদি ব্রাহ্মসমাজের এই রীতি সংশােধিত না, তাহা হইলে যে সমাজে অসত্যের প্রশ্রয় দেয় তাহার সহিত যােগ দিব না।” ইহার পরই বিজয়কৃষ্ণ গােস্বামী মহাশয় উপবীত ত্যাগ করেন। “উপবীতধারী আচার্যের ব্রাহ্মসমাজের বেদী হইতে ব্রহ্মাপান বা ধৰ্মাপদেশ দেওয়া কৰ্তব্য নহে, তমনি তিনি ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদক মহাশয়কে এই কথা লিখিয়া জানাইলেন। ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র তখন কলিকাতা ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদক ছিলেন। এই প্রতিবাদ পত্রে গোসাই কেশবচন্দ্রকে ইহাও জানাইলেন যে যদি কলিকাতা ব্রাহ্মসমাজের উপাচার্য্যগণ উপবীত- ধারী হন, তবে আমি অসত্যের আলয় বলিয়া সমাজকে পরিত্যাগ করিব।” “কেশবচন্দ্র গােস্বামী মহাশয়ের প্রতিবাদ পত্ৰ মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথকে দিলেন। মহর্ষি গােস্বামী মহাশয়ের মতের অনুমােদন করিয়া * * * গােস্বামী মহাশয় এবং তন্নদাপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় মহাশয় ব্রাহ্মসমাজের উপাচার্য মনােনীত হইলে সমাজের আচার্য্যগণের পক্ষে উপবীত ধারণ নিষিদ্ধ হইল।” এই উপবীত ত্যাগ উপলক্ষে মহগিকে ত্যাগ করিয়া মেছুয়াবাজারে ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ নামে নুতন সমাজ প্রতিষ্ঠা হয়। বিজয় গােস্বামীর জীবনী, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের জীবনী, সদগুরুসঙ্গ, বিজয় কপামুত History Brahmo Samaj 1871 ) . এই বহিতে সেকালের বহু ঘটনার সঙ্গে প্রবীণ লেখক লেখিকাদের লিখিত অ লেখা যােগ করা হইয়াছে যেমন প্রাণনাথ মল্লিকের পুত্র রজনীকান্ত মল্লিক সন্তু শ্ৰীযুক্ত দীনেন্দ্রকুমার রায় লিখিতেছেন :—“তিনি সহৃদয় ছিলেন, আমাদের সতি সরল ভাবে মিশিতেন, আমরা তাহাকে সম্মান করিতাম।” ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রাণন মল্লিকের জামাতা সম্বন্ধে ভারতবর্ষ সম্পাদক শ্রীযুক্ত জলধর সেন রায় বাহাদুর লিখিয় ছেন:-আমার পরম পূজনীয় বন্ধু পরলােকগত কৈলাসচন্দ্র বাগচি মহাশয়ের সম্বধে দুই একটি কথা আমার নিকট শুনিতে চাহিয়াছ। আমি আনন্দের সহিত আম" পুরাতন স্মৃতির দ্বার উদটন করিয়া এই সামান্য দুই চারি পংক্তি লিখিতেছি।” বতি তখনকার পুরাতন ঘটনা সম্বন্ধে একটি সুদুল্লভপ্রবন্ধ লিখিয়াছেন। শ্রীযুক্ত উল্লাসক মহাশয়ের পিতা শ্রীযুক্ত দ্বিজদাস দত্ত এম-এ মহাশয় প্রায় ৬০ বৎসর পূর্বের ঘট কথা লিখে লিখিতেছেন স্বর্গীয় কৈলাসচন্দ্র বাগচি মহাশয় আমার সমবয়স্ক ছিলে তিনি আমার অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন।••••••তিনি অতি সরল এবং সত্যনিষ্ঠ ছিলেন নিয়মিত ব্ৰহ্মোপসনাতেও তাহার বিশেষ নিষ্ঠা লক্ষ্য করিয়াছিলাম।” ইত্যাদি ইত্যা পণ্ডিত সীতানাথ তত্ত্বভূষণ, প্রভৃতির প্রবন্ধ ও বহুলােকের চিঠি ইহাতে আছে । প্রাণনাথ মল্লিক ব্রাহ্মসমাজের মধ্যেই সর্বপ্রথম উপবীত ও জাতির প্র রহিত করার যে চেষ্টা করিয়াছিলেন তাহার প্রভাব ও ফল আজ হিন্দুসমাজও ভাে করিতেছেন। মূল্য ১০ টাকা। সব বড় বহির দোকানে ও সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ আফিসে প্রাপ্তব্য

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Poush Parban

Author
Mukhopadhyay, Sri Sailajananda
Title
Poush Parban
File name
Poush Parban
Text
OCR done
Citation
1931
Published
2009/08/5
Publisher
Sri Bhuban Mohan Majumdar, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
182
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Fiction, Prose Narrative
Keywords
Novel
DLI number
513066
Barcode
4990010020079.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
G0qywLRWvXV
Download PDF

Poush Parban