Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Monimala
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মণিমালা
(নাটক)
"Love is my religion, I can die for that".
Keats.
শ্ৰীযতীন্দ্রনাথ সমাদ্দার বি,এ, এম, আর, এ, এস
প্রকাশক
ধীরেন্দ্রনাথ লাহিড়ী
পৃথিবীর ইতিহাস কাৰ্যালয়
ক্ষীরতলা, হাওড়া।
এজেন্ট
হিল্টন এণ্ড কোং
১০৯, কলেজ স্ট্রীট, কলিকাতা
২ ০
কান্তিক প্রেস
কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
শ্রীহরিচরণ মান্না দ্বারা মুদ্রিত
মূল্য দশ মানা
মুখবন্ধ পূজ্যপাদ শ্রীযুক্ত বিজয়চন্দ্র মজুমদার বি, এস, এম, আর, এ, এস, মহােদয়ের কথানিবন্ধ” হইতে মণিমালার উপাখ্যানটী গ্রহণ করিয়াছি। কতিপয় স্থানে তাহার ভাষা পৰ্যন্তও নিজস্ব করিতে হইয়াছে। তিনি অনুগ্রহ পূর্বক অনুমতি দিয়া আমাকে বিশেষ ভক্তিঋণে আবদ্ধ করিয়াছেন। শ্রদ্ধেয় কাব্যামােদী শ্ৰীযুক্ত জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর মহােদয়ের সংস্কৃত নাটকের অনুবাদ হইতেও কতিশয় শ্লোক লইতে হইয়াছে। এ জন্য তাহার অনুমতি পাইয়া আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতেছি। মণিমালার উৎকৃষ্ট উপাখ্যানটীর সম্যক সার্থকতা করিতে পারি নাই। অনেক দিন পূর্বে বহিখানি লিখিত হয়, কিন্তু দুরদৃষ্টবশতঃ নষ্ট হইয়া যায়, সেই সময়ের ভাব ও উৎসাহ ব্যাধিযুক্ত দেহেতে আর কিছুই নাই, দুর্নিবার মায়ায় প্রলুব্ধ হইয়াই অসাধ্য সাধন চেষ্টা করিতেছি। খুলনা দশানীর জমীদার শ্ৰীযুত বাবু মহেন্দ্রনাথ বিশ্বাস মহাশয় এ পুস্তকেরও মুদ্রণ ব্যয় বহন করিয়াছেন। তাহার নিকট আমি কিরূপ ঋণি তাহা ভাষায় প্রকাশ করিতে অক্ষম। কচুবাড়িয়া, যশােহর আশ্বিন, ১৩১৯ শ্ৰীযতীন্দ্রনাথ সমদ্দার।
No text on this page.
চরিত্র
পুরুষ
মহারাজ রাজ্যবর্ধন,
মহারাজ হর্ষবর্ধন
অনন্ত কেশী-উৎকলরাজ পুলকেশী-চালুক্যরাজ
কলিঙ্গরাজ,
ধাবক-রাজ্যবর্ধন সভাকবি
বয়স্য
সােমদত্ত-সৈন্যাধ্যক্ষ
চিন্তামণি সােমদত্তের ভূত
ধনপতি—সিংহল দেশীয় শ্রেষ্ঠী
মালব রাজকুমার
সভাসদগণ ও নাগরিকগণ
শান্তনু-সিংহল দেশীয় শ্রেষ্ঠ
বিশ্বমুখ-শান্তনুর ভৃত্য
মাধবগুপ্ত,—মগধের বৌদ্ধ ভক্ত শৈব রাজা
থিয়েনসান—চীন দেশীয় বৌদ্ধ পর্যটক
নারী
মণিমালা—মহারাজ রাজ্যবর্ধনের বিধবা কন্যা
বাসন্তী-সিংহল দেশীয় ধনপতি শ্রেষ্ঠীর কন্যা
নিৰ্ম্মল
ঐ বাল্য সহচরী
কুমিতা
সুগতা--বৌদ্ধ ভিক্ষুণী
}
No text on this page.
মণিমালা
প্রথম অঙ্ক
প্রথম গর্ভাঙ্ক
তাম্রপর্ণী দ্বীপ—ধনপতি শ্রেষ্ঠীর উদ্যানবাটীকা।
( নির্মুলা ও কুসুমিতার প্রবেশ )
গান-লুম ঝিঝিট
দিন ফুরাল, সন্ধ্যা এল,
ফুটিবে সখি তারার মেলা ;
মুচকি হেসে, গলে যাবে,
দেখে মোদের পারের জ্বালা।
আঁধার পেয়ে ফুটিবে কলি,
ছুটবে বাতাস প্রেমে ঢলি,
মােদের আলাে যাবে চলি,
ফুরিয়ে এলাে পারের বেলা।
আঁধার যারা ভালবাসে,
থাকুক তারা তারি আশে,
সুগত দেও চরণ আলো,
ঘুচিয়ে দেও গাে ভবের জ্বালা।
মণিমালা
নিৰ্মলা। বেলা অবসান। সখীর দেখা পাইলে ঘরে ফিরিতে পারি।
কুসুমিতা। দেখা পাওয়া ভার ; তাহার চিত্র অঙ্কিত হইতেছে।
নি। শুনিলাম ত । আশ্রম হইতে ফিরিয়া দেখিয়াছি একভাব,
আর গত কয়দিন দেখিতেছি অন্যভাব।
‘কুসু। বুঝি আর আশ্রমে যাওয়া হইবে না।
নি। তাও কি হয় ! মাতাজী সখীর জন্মের পূৰ্ব্বরাত্রে স্বপ্ন
দেখিয়াছিলেন, যেন সুগত আসিয়া তাহার নিকট কি চাহিতেছেন।
তাই, সই আশ্রমবাসিনী ।
কুসু। তােমায় ইহা কে বলিল ?
নি। এ ঘটনা নাকি গুপ্ত ছিল। শেঠজীর ইচ্ছা কন্যার বিবাহ দেন,
কিন্তু মার ইচ্ছা সুগতের চরণ সাধনা।
কুসু। কি যেন হয় ! নিৰ্মলা, আমরা আশ্রম হইতে আসিয়া আর
কি লাভ করিলাম।
নি। শুধু সংসারের বােঝা।
তবে আশ্রম এই পর্যন্ত। পট চিত্রিত হইতেছে বিবাহের জন্য ,
বুঝি।
নি। শুনিলাম এ বাটীর সকলকে লইয়া সুগত জীবনের একটি
কাহিনী অঙ্কিত করা হইবে।
কুমু। তবেই হয়েছে। সই, এস, দুএকটী ফুল তুলি।
(প্রস্থান )
( সােমদত্তের প্রবেশ )
সােমদত্ত। কই, এই কি সে নির্দিষ্ট স্থান ? এই ত সেই কুসুমিতা
সুন্দরী-ছায়া! আহা কি মনােরম ! কি সুন্দর! আমার কি আসিতে
বিলম্ব হইয়াছে? না, আমি ব্যগ্রতাবশতঃ সময়ের পূর্বেই আসিয়াছি।
{
মণিমালা
৫
আমি শীতাঞ্চকনকজ্যোৎস্না-স্নাত সুন্দরী দেখিয়া আত্মা
হারাইয়াছি। হায় আমার প্রাণ, হায় আমার অদৃষ্ট, আজি কোথায় সে
মণিমালা ! আনি যেথা যাই বিপত্তির সৃষ্টি করিয়া লই। আজ এই
তিন বৎসর দেশত্যাগী, আমার মস্তিষ্ক উষ্ণ হইয়া উঠিতেছে, কোথায়
একটু বাতাস পাই দেখি।
(প্রস্থান)
(অপর দিক হইতে নিৰ্মলা ও কুসুমিতা ও বাসন্তীর প্রবেশ )
বাসন্তী। সই! তােমরা গাইতেছিলে। আমি সংবাদ পাইয়া-
ছিলাম, কিন্তু এক চিত্রকরের জন্য অপেক্ষা করিতেছিলাম।
নি। তুমি চীরবাস ত্যাগ করিলে।
বাস। ভাই, বাসত্যাগ ত মানবের অভ্যস্ত।
কুসু। আর আশ্রমে যাওয়া হইবে না, যা সংসার ধর্ম কর।
তুমি
অতুল ঐশ্বর্যের একমাত্র অধিকারিণী।
বাস। আমি ঐশ্বৰ্য্য চাহিনা সই। স্ত্রীলােক ঐশ্বর্যে কি সাধনা
করিবে।
কুসু। ঐশ্বর্যের কাণ্ডারী চাও।
বাস। তুই কাণ্ডারী পেয়ে আছিস কেমন ?
নি। বােঝা বহ, তা যেদিক্ যাও বহিতে হবে ত!
বাস। তুই বেশ সুখে বহিস—আমি চাহিনা।
কুসু। তা তােমার পটেই বুঝেছি।
বাস। আমি সেই চিত্রকরের অপেক্ষায় আছি, এস সখি আর
একটী গীত গাইবে।
নি। কিবা গাইব, চল।
{ প্রস্থান)
মণিমালা
•
হয় নাই।
(সােমদত্তের প্রবেশ)
সােম। এই ত তাহারা ছিলেন, কোথায় গেলেন। চিত্রে সার্থকতা
কেমন করিয়া হইবে? দেখি,-এ আঁখি আরও বিস্ফারিত
হইলে অসঙ্গত হয়, নতুবা ও অসীম স্নিগ্ধ জ্যোতির সম্যক বিকাশ অসম্ভব।
আমি উষার তরুণ কিরণ লইয়া এ গণ্ডদেশ আমােদিত করিতে চেষ্টা
করিয়াছি কিন্তু সফল হই নাই। তা হইবে কেন ? ঊষা গর্বিত।
আমি এ মুখখানি নিত্য দেখিব বলিয়া চিত্রাঙ্কনে সম্ভবাতীত বিলম্ব
করিয়াছি। প্রত্যহ এক প্রহর পর্যন্ত নানা ছলনায় তাহাকে সম্মুখে
রাখিয়াছি, কিন্তু তবু তৃপ্তি পাই নাই। নিত্য মণিমালাকে দেখিয়া কবে
আকাঙ্ক্ষার নিবৃত্তি করিতে পারিয়াছিলাম। না, আর সে বিষয় মনে
করিব না, যাহা গিয়াছে তাহা যাউক—আর আসিবেই বা কি ?
(সচকিতে ) এ কি আপনি এইখানে ?
(বাসন্তী প্রভৃতির প্রবেশ)
বাস। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করিয়াছেন, দোষ মার্জনা করিবেন।
চিত্র আনিয়াছেন কি ?
নি। নিস্তব্ধ রহিলেন যে।
সােম। আনিয়াছি, এই তরুতলে আছে। কিন্তু দেবি! শরতের
হিম জোছনায় রজত প্রান্তরে কলভাষিনী নিঝরিণীর হিরন্ময় স্রোত
রেখার অনুরাগ যদি কেহ তুলিতে আনিয়া দিতে পারে তবে ও মাধুরী
চিত্ৰন কতক সম্ভব। ক্ষুদ্র মানব আমি।
* নি ও কুসু। চিত্র অতি সুন্দর হইয়াছে।
বাস।
(স্বগতঃ ) এ কি আমি, না চিত্রকরের কোন উপাস্য
দেবী।
কুসু। সই তােমার যােগ্য চিত্র বটে। চিত্রকরকে সন্তুষ্ট কর।
-
মণিমালা হইল। বাস। (স্বগতঃ ) আমার অঙ্গ কঁপিতেছে। এ চিত্র আজি শেষ। নি। এ সুন্দরী কে সই! বাস। চিত্রের সৌন্দর্য অপেক্ষা আপনার সৌজন্য প্রশংসনীয়। আপনার প্রাপ্য বিষয়ে পিতা বিবেচনা করিবেন। তদ্ভিন্ন এই মণিমালা আপনার পরিতােষিক। আশাকরি সুগত আপনার কুশল করিবেন। আমরা আসি, এস সই কাৰ্য্য আছে। ( প্রস্থান) সােম। অর্থ অপেক্ষা সুখ্যাতি বরণীয়; রৌপ্য ও স্বর্ণ অপেক্ষা প্রসন্নতা ভাল। কিন্তু আমি সে সত্য আজি বিক্রয় করিলাম। রাত্রি আসিল, আমি কি যেন হারাইলাম। এ চিত্র আবার আমার কাল হয় যুগান্তর ব্যাপিয়া এ চিত্র অঙ্কন করিবার অবসর পাইতাম, হয় এ পথেও আসিতাম না। কিন্তু যাহা যায় তাহা আর আসে না। ভাল, আমি চিত্র দিবার জন্য এখানে আসিলাম কেন ? এখানে আহুত হইলাম কেন ? সে প্রিয়মুখী আমাকে কিছু বলিবে বলিয়া ? কি বলিবে ? আর আমার প্রাণই উদ্বেলিত হইতেছে। কিন্তু তবু যেন মনে হয় ইহার ভিতর কিছু আছে। কি আর থাকিবে ! একবার মণিমালাকে ভালবাসিয়া আপন পিতা কর্তৃক নির্বাসিত হইয়াছি। আর এ বিদেশে তদপেক্ষা হীন গতি ভিন্ন আর কি হইবে। তুমি আমায় মণিমালা উপহার দিলে, জাননা, অয়ি অয়ি সন্তোষিনী সন্তোষিনী ; তুমি নিৰ্বাপিত অগ্নি দ্বিগুণ প্রজ্বলিত করিলে। ও! কি ভীষণতা, আকাঙ্ক্ষার কি তীব্রতা, নৈরাশ্যের কি মলিনত!! যাহােক আমি ওকথা ভাবিব না। কিন্তু আমার ভরা হৃদয় যদি তােমাকে দেখাইতে পারিতাম, তবে তৃপ্ত হইতাম। নদী বহিতে না পারিয়া দুকূল ভাঙ্গে, বরষা ঝরিতে না পারিয়া ঝড় আনে, আমি প্রাণ সপিতে না পারিয়া নষ্ট হইলাম। ( প্রস্থান)
মণিমালা
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক
নিজ বাটীতে শান্তনু।
শান্তনু। কি করা যায়। লজ্জা আসিয়া বাধা দেয়। লজ্জায় আমি,
কিছু বলিতে পারিতেছি না। কিন্তু আমার বড় ইচ্ছা। বাসন্তী সুন্দরী,
আমার অর্থাভাব নাই, এ বিবাহে ধনপতির অমত হইবে না। আর
বিশেষতঃ আমা অপেক্ষা ধনী অন্য কোন শেঠ পুত্র এ সােনার লঙ্কায়
নাই। ধনপতি আমার পিতার বান্ধব, কোনই গােল নাই, তবে আমি
লজ্জা করি কেন ? যদি না হয়, না হইবার কারণ কি ? প্রথম এ
বিষয় ধনপতি আমায় কিছু বলেন না, দ্বিতীয়তঃ, বাসন্তী প্রেম কাহাকে
বলে জানে না; যদি কোন আভাষ দিই ; তার ডাগর ডাগর আঁখি যেন
আরও বিস্ফারিত করিয়া এ বিষয়ে একান্ত নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেয়।
তবে প্রথম কথার উত্তর এই, ধনপতি আমার নিকট প্রস্তাব করিতে
সাহসী নহেন। দ্বিতীয়তঃ, বাসন্তী আশ্রমে ছিল, এসব কিছু বুঝে না।
এ বিরক্তির ভাব নয়। দেখা যাক—আমিই বলিব।
• "
( বিশ্বমুখের প্রবেশ)
বিশ্বমুখ। চিত্রমুখের শিষ্য উপস্থিত।
শা। লইয়া আইস।
(সােমদত্তের প্রবেশ)
,
শা। আসুন, আসন গ্রহণ করুন।
সােম । আপনার সম্মুখে আমি বসিবার যােগ্য নহি, আপনি
আমার প্রতিপালক।
মণিমালা; শা। সংসারে কে কার প্রতিপালন করে, একমাত্র সুগত ভরসা, আপনি বিশ্রাম করুন। সােম। আমার সর্বক্ষণই বিশ্রাম। আমি বিদেশে আশ্রয়হীন হইয়া পড়িয়াছি। গুরুদেব নিৰ্ব্বাণ সময়ে আমাকে আপনার ! আশ্রয়ে সমর্পণ করিয়াছেন, আমি তাহাতেই আশ্বস্ত। শা। আপনি সেই সময় হইতেই আমার সুখ ঐশ্বর্যের তুল্যভাগী হইয়াছেন; যদি কখনও কোন অসুবিধা বােধ করেন, সানুগ্রহে জানাইবেন। এ প্রাসাদ ইত্যাদি আপনি যথেচ্ছরূপে ভােগ করিতে পারেন, আমাকে আপনার সােদর ভিন্ন অন্য কিছু জানিবেন না। সােম। কৃতার্থ আছি। শাস্ত্রে আছে, টিকটিকি হাত দিয়া চলে, তবু প্রাসাদে থাকে। মহতের আশ্রয় লাভে আমি আপনাকে ধন্য । জানিলাম । . শা। আর অত কথায় প্রয়ােজন কি ? স্নান আহারের সময় উপস্থিত, আপনি প্রস্তুত হইয়া আসুন, আমি আপনার অপেক্ষায় রহিব। সােম। আমায় আর প্রস্তুত হইতে হইবে না। গুরুদেব শেষ সময় তাঁহার যথাসর্বস্ব ভিক্ষুগণকে দান করিবার অভিপ্রায় প্রকাশ করিয়া গিয়াছেন। আমি আশীৰ্বাদপ্রার্থী, করে তুলিকা ও শিরে গুরুভার, এই আমার সমস্ত সম্পত্তি। শা। আপনার এ প্রসন্নতা সৰ্বাংশে বরণীয়, আপনি এদেশে কিরূপে আসিলেন ? সােম। আমি পিতৃকর্তৃক নির্বাসিত। তাই নিজ ইচ্ছায় ভারতের সীমা ত্যাগ করিয়াছি। দুই বৎসরের অধিক কাল যাবৎ চিত্রমুখের শিষ্যত্ব গ্রহণ করিয়াছি।
৮
মণিমালা
শা। আপনার দেহে বা মনে কোন পাপ থাকিতে পারে এমত
বােধ করি না। নির্বাসন কেন ? কোন সত্যে আবদ্ধ কি ?
সােম। সবিশেষ গুরুদেব কে বলিয়াছিলাম আপনাকেও বলিব।
ভাল, না বলিলে আপনি থাকিতে দিবেন কেন ? কথাটা গুরুতর বটে
আর অজ্ঞাত কুলশীলস্য—
শা। আমি সে সন্দেহ করিতেছি না, এবং তাহা আপনি এখন
বলিলেও শুনিব না, আপনি প্রকাশ করিবেন না। আসুন আহারাদির
উদ্যোগ করা যাউক।
সােম। যে আজ্ঞা।
শা। বিশ্বমুখ ? পূৰ্ব্ব হইতেই জানিয়াছ ইহাকে আমার সোদর-সম
দেখিবে, এবং সমস্ত দাসদাসী এবং লােকবর্গকে বিহিত জানাইয়া দিবে।
( বিশ্বমুখ ও সােমদত্তের প্রস্থান)
শা। আমি এ চিত্রকরের সাহায্যে বাসন্তীকে লাভ করিব।
তাহাকে প্রেম শিখাইবে। এ তাহার মুখ ফুটাইবে। যদি আবশ্যক হয়
চিত্রকরই আমার দূত হইতে পারিবে।
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক
শান্তনুর বাটী।
সােমদত্ত। আজ একবার জীবনের পুরাতন স্মৃতি আলােচনা
করিয়া দেখিতে ইচ্ছা হয়, কিন্তু তাহাতে যে কঠোর ও সুতীক্ষ্ণ
নৈরাশ্যের কশাঘাত তাহা মনে করিতেও প্রাণ শিহরিয়া উঠে। কিন্তু
ভুলিতেও ত পারি না। স্বপ্নেও ত ভুলিতে চাহি না। আমার প্রাণের
মণিমালা এমনি বৃত্তি যে যাহাতে বেদনা, যাহাতে দুঃখ, যাহাতে নৈরাশ্য তাহাতেই যেন অধিকতর তৃপ্তি। ইহাতে কি লাভ! কিন্তু প্রাণে প্রাণে প্রবােধ মানে না। আমি যে কি চাই তাহাও বুঝি না, প্রাণের এক অব্যক্ত অভিলাষ—কি যেন চাই—কি যেন চাই—কি যেন নাই—আমার নিজের প্রাণ যেন আমার পর হইয়া গিয়াছে। কোন আনন্দ নাই, ভাল করিয়া কঁদিতেও পারি না, কাহারো সহিত ঘনিষ্ঠতা করিতে ভয় হয়—আমি কোথায় গিয়া প্রাণ জুড়াইব—কে বলিয়া দিবে। মণিমালার সেই মুখখানির স্মৃতি আমি প্রাণে ধরিয়া সকল দুঃখ সহিতেছি। কিন্তু কি মােহ! কখনাে ত মিলন হইবে না। আবার এই চিত্রাঙ্কণের বিষম বিভ্রাট আসিয়া প্রাণকে আকুলিত করিয়া দিল। কেহই ত আমার নহে। আমার কি নিৰ্বদ্ধিতা। জগতের যত সুখ, যেখানে যতরূপ সবই কি বিধাতা আমার জন্য সৃষ্টি করিয়াছেন। মন, শান্ত হও, আমি আলস্যকে আশ্রয় করিয়াছি—তুমি তাহাতে অনেক কল্পনা সংগ্রহ করিতে পাইবে। (শান্তনুর প্রবেশ) শা। আপনি কি ভাবিতেছেন ? কি কোন অসুবিধা হইয়াছে। সােম। আপনার অনুগ্রহে আমি পরম সুখে আছি । শা। আমি বিষয়কৰ্ম্মে অনেক সময় ব্যাপৃত থাকি, নিজের সুখ নিজে করিয়া লইবেন। আমার সমস্তই আপনার আজ্ঞায় চলিবে। সােম। আমি যথেষ্ট অনুগৃহীত আছি। শা। আপনার আর কতকগুলি চিত্র অঙ্কণের সুবিধা সত্বরই করিয়া দিতে পারি। আমি প্রথমে সঙ্কল্প করিয়াছিলাম যে বিবাহ করিব না। কিন্তু এ ঐশ্বৰ্য্য বিত্তাদি ভােগ করিবার লােক পাই না।
মণিমালা -
সোম। জগতে কত অভাব আছে, আপনি অনেক পূরণ করিতে
পারেন।
শা। বিবাহের দ্বারা নিজের অভাবই প্রথমতঃ পূরণ করিব।
সােম। ইহা বেশ ; কারণ আপনার দয়া, আপনার বংশধরগণ
উত্তরােত্তর বৃদ্ধি করিতে থাকিবেন। আপনি একা যাহা করিবেন, তাহা
আপনাতেই লােপ হইবে।
শা। আমি নিঃস্বার্থ নই। আমার লালসা বৃদ্ধি হইয়াছে।
সােম। তাহার নিবৃত্তি করিতে কতক্ষণ?
শা। জগতে কেহ কি তাহা পারিয়াছে ?
সােম। সুগত।
শা। তিনি ঈশ্বরের অবতার। আমরা মানব। আমি মানবধর্ম
পালন করিব।
সোম। ইহাও উত্তম।
শা। আপনাকে সে পাত্রী খুজিতে হইবে। আমি যাহাকে
ভালবাসি সে সরলা, ভালবাসা বুঝেনা, প্রেম কি বুঝেনা, সে অত্যন্ত
সরলা না হইলে বলিতাম যে, সে আমার উপর বিরক্ত।
সােম। সেই তবে সব চেয়ে ভাল ; আপনার হৃদয়-ভরা প্রেম
তাহাকে সঁপিয়া দিবেন। ফুল ফুটিবেই।
শা। আপনি তাহাকে চিত্রবিদ্যা শিখাইতে পারেন ?
সোম। আপনার অনুমতি হইতে পারি। কিন্তু আমি কি জনি,
তার বিশেষতঃ তাহাতে আপনি কি সফলকাম হইবেন? আমি চিত্রবিদ্যা
শিখিয়াছিলাম ভ্রান্তির জন্য।
শা। সে ভ্রান্তিতেও আমার লাভ, কেন
নুতন কিছু শিখিবে।
না তবু
মণিমালা
সুখ পাইবে
সম। কোথায় কাৰ্য্য করিতে হইবে ?
শা। তাহা আপাততঃ বলিব না, যদি হাস্যাস্পদ হই। জানি আমি
তাহাকে চাহিলেই পাই। কিন্তু লাভ কি ? সে কি আমার হইবে।
সুবৰ্ণশৃঙ্খলাবদ্ধ বিহঙ্গিনী তাহাতে কি সুখ পাইবে ? আমিই বা
কি পাইব।
সােম। তবে এ ভালবাসা কেন ?
শা। আমি বুঝিনা। কিন্তু ভালবেসে দুঃখ পাওয়া এক সুখ,
ভালবেসে না পাওয়া তাও এক সুখ। প্রাণ তীক্ষ্ণ বাসনায় দিবানিশি
দগ্ধ হয় তাও বুঝি সুখ, তা না হলে কুসুমকলি পুষ্পকীট বুকে
লুকাইয়া রাখে কেমন করে! কেন এমন ভালবাসা হয়।
সােম। এ পৃথিবীর গতি বিচিত্র।
নর বলে ভালবাসি, ভালবাসা পাই না।
নারী বলে ভালবাসি, কেহ ভালবাসে না।
শা। আপনি তাহাকে চিত্র শিখাইবেন, সে প্রেম শিখিবে।
সােম। বিধির এ বিচিত্র সীলা। আমি প্রেম শিখাইব ? নিজে
কতটুকু জানি ! আমার
জানি ! আমার অদৃষ্ট মন্দ, আমি যাহা করিতে যাইব
তাহাতেই বিপত্তি ঘটিবে, আমার অদৃষ্টে আপনি নষ্ট হইবেন। ভগবান
আমার কপালে প্রেমের পুরস্কার লিখিয়াছেন নিৰ্বাসন।
শা। আপনি তবে মহাপ্রেমিক, আপনি আমার দূত হইবেন।
আমি সে বালিকার মত লইয়াছি, সে চিত্র শিখিতে অতিশয় আগ্রহান্বিতা।
তাহাদের পরিবারবর্গের মধ্যে কেহ আমার এ আগ্রহে অসম্মতি দেয় নাই।
আপনার সম্মতি হইলেই হয়।
সােম। আমার কোন অসম্মতি নাই।
শা। আমি অতিশয় সন্তোষলাভ করিলাম।
মারে
অg
মণিমালা
আমি সেখানে যাইয়া সৰু ঠিক করিয়া আসিব। চলুন একটু সমুদ্রের
ধারে বেড়াইয়া আসি। বেলা অবসান হইবে ।
সােম। চলুন, আমার কি ! . দিবারাত্রি সব সমান।
শ। আমি সামান্য একটু কাজ শেষ করিয়া লইব।
সােম। বেশ।
শা। আসিতেছি।
(প্রস্থান)
সােম। এ বিষম বিভ্রাট।
( প্রস্থান )
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক
সমুদ্র
তীর।
( বাসন্তী, কুসুমিতা ও নির্মল)
গীত।
বাসন্তী।
তমাল বনছায়ে,
আঁচল বিছায়ে,
আকাশ পানে চেয়ে রই।
যায়, ভেসে যায়,
মেঘ মেখে গায়
ঢেউয়ে ঢেউয়ে বায় সই।
এই বেলাভূমিতটে, শিকর নিকর
আসি, মুক্তাসম সাজিত চিকুরে। ঘাের
গজ্জনলােভী জলধি উপেক্ষিত ক্ষীণ
কণ্ঠে বালসুলভতা; শুভ্র বালুপ,
কোমলে বিছায়ে রেণু, শয্যা পেতে দিত।
মণিমালা
একদৃষ্টে দেখিতাম নীলছবি আমি ;
তমাল ছায়ার তলে, দেখিতাম চেয়ে,
পাখী উড়ে যেত, কত মেঘ ভেসে যেত
বৈশাখের খরতাপে ফুল্লদেহ খানি
কুসুম কোমল করে ; তারপর চেয়ে,
আকাশে মিলায়ে আঁখি, নীলিমায়
নীল মিশাইয়ে, শুধু ঢেউ, শুধু ঢেউ ;
আকাশ, বাতাস, সাগর, ভূধর, সব
ঢেউয়ে ভেসে যায় ;
আজি কোথা সেই দিন।
নি। দিন যায়, দিন আসে ; আবার দিন পাবে, আর তােমার কোন
দিনই বা মন্দ যায় ?
কুসু। আমার মনে হয় তােমার যেন কেমন ভাব হয়ে উঠেছে
আশ্রম ত্যাগ করেও তুমি বেশ ছিলে। এখন কি চাও বল দেখি,
কি বাসনা !
নি। সই বাসন্তীর বাসনার অন্ত নাই
বাস। কারই বা আছে! এই অনন্ত সমুদ্র, সেও তার অনন্ত কায়া
বিস্তার করে কুলভূমি গ্রাস করতে চায়।
তাত বুঝিলাম, তােমায় আবার কথা বলিতে ভয় হয়।
বল দেখি ভয়ে বলি না নির্ভয়ে বলি ।
বাস। কথা বলিতে? তা আবার তাের ভয় কি ?
কুসু। বলি শেঠজীকে কিছু বলতে হবে নাকি ?
বাস। সুখের কথা ভাবতে দুঃখ আসে ; বল সই, দুঃখের কথা
ভাবতে অত ভাল লাগে কেন? তা দেখ, পােড় মন কি বলিতে কি বলি।
মণিমালা
না পায়,
==
কুসু। বটে!
নি।
তােমার কোমল প্রাণ, ভাব যে পরে দুঃখ
তুমিই শুধু পাও।
কুসু। শুনেছি সুখের ইচ্ছায় দুঃখের ভাবনা আসে।
বাস। তা হবে।
যখন আশ্রমে বসি, বটতরুমূলে,
পাশে বসি তপস্বিনী, ভিক্ষুণীর মেলা,
হতে কত ধর্ম আলাপন ; বুদ্ধপদে
জনম সপিয়া দিয়া, নির্বাণের পথ,
কামনার বিসর্জন, ভিক্ষাব্রত লয়ে
মুক্তি ভিক্ষা পথে ;-সে সুখের ইচ্ছায়
বিষম বিষাদ সখি আসি দিত বাধা,
কবে—সুপথ ছাড়িয়া, সংসারের মাঝে
পড়ি, হবে সব ব্রত নিস্ফল কাহিনী।
নি। আশ্রম ত্যাগ করিলে কেন ?
কুসু। ফুল ফুটিতেই হবে, শুধু কলি হয়ে থাকা শুকাতে।
বাস। কলি হয়ে থাকা বরং ভাল।
কুসু। চাহনা ঝরিতে।
বাস। পথে দলিত হতে ?
কুসু। এ জ্ঞান কোথায় পেলে ?
বাস। তােমার আঁখিতে। কি বলিস নিৰ্মলা!
নি। উহাতে বুঝি তােমারই চিত্র।
বাস। এস ওই পুরাতন তমালতলায় অলসে বিশ্রাম করি।।
কুসু। রবি ডুবে যায়।
মণিমালা
• ১৫
বাস। আমি আঁধার বড় ভালবাসি।
কুসু। তবে
আঁধারে আলো দেখিয়াছ।
দেখিয়াছ। কে বল দেখি,
কেন ভাবিয়া কাহিল হইবে, এখনও বল ।
বাস। কেন? আমায় কি পাগল পাইয়াছি।
কুম্ভ। পাগলের রক্ত গরম থাকে, তুমি যে হিমাঙ্গ হইলে দেখিতেছি।
নি। তােমার বিবাহ যা হবে, তা ভালই হবে, তার জন্য কি ?
বাস। কোথাকার বােক। মেয়ে, তুই কি বিয়ের আগে ঘুমাতি না।
নি। অনিদ্রা তার পরে আসিয়াছে।
কুসু। সইএর চিত্রখানি একদিন দিও, বাড়ীতে দেখাইব।
বাস। সে চিত্র ভাল হয় নাই। আমি চিত্রকরকে পাইলে আর
কয়েকখানি আঁকাইতাম।
কুসু। তাের মরণ আর কি
বাস। সাথে যাইবি ?
কুসু। আমার দায় !
বাস। আমায় পথ দেখাইতে।
কুসু। এইবার নির্ভয়েই বলি—বলি চিত্রকর ত বেশ সুন্দর ?
বাস। দূর পােড়মুখী।
কুসু। তাের বাপের অতুল ঐশ্বৰ্য্য; অর্থের জন্য ত আর ভাবনা
নাই।
বাস। তুই গান গা”।
কুসু। সকলেই বলে স্বভাব সুন্দর।
বাস। আকাশে একটু মেঘ করেছে।
নি। উত্তর দিনা কেন?
বাস। ও পাগলীর কি উত্তর দিব।
মণিমালা
কুসু। হু-সই রাগ করিসনা।
বাস। চল তমাল তলায় যাই।
নি। আমি
আমি দু একটী ঝিনুক কুড়াইব।
কুসু। চল আমিও তাের সাথী।
নি। সই তুমি মুক্তা কুড়াইবে এস !
( প্রস্থান )
(সােমদত্ত ও শান্তনুর প্রবেশ )
সােম। দেখ, দেখ রবি ডুবে যায়।
শা। যায় যাক্ আর যেন নাহি আসে।
সোম। কেন সহেনা আলােক ?
শা। সহেনা, সত্য সহেনা। সারারাতি বসি
ভাবি, ভাবি, মনে গড়ি, মনে ফিরে ভাঙ্গি ;
আসিলে প্রভাত, তার সহস্র করেতে
দেয় দেখাইয়া সব মিথ্যা! সব মিথ্যা।
শুধু সত্য, বাসেনা সে ভাল, জানেনা সে
কিছু মাত্র ভালবাসা ; কারে বলে প্রেম
তার নাহি প্রয়ােজন।
সােম। (স্বগতঃ ) এ কি জানে জানিনা, কেবল আমি জানি
পুড়িয়া মরিতে। ( প্রকাশ্যে ) ইচ্ছা হয় ওই রবির মত ডুবিয়া শীতল
হইতে।
শা। যদি ডুবিয়া রত্ন পাই, তবে ডুবিতে পারি।
সােম। আগে ডুবিয়া দেখি যদি পাইত পাইলাম, না হয়
ফিরিবনা।
শা। তুমি আশ্চর্য্য লােক ; ফিরিব না কি দুঃখে ?
মণিমালা সােম। যদি ফিরিব তবে আর সুখ কি? বিসর্জন ত পাইলেও দিতে হইবে, না পাইলেও দিব। তোমার এ প্রেম বটে, আমায় কিছু শিখাও- সােম। ওই শুন কে গাইতেছে। নেপথ্যে সঙ্গীত শা। ঘন তমসায় ডুবে যায় ধরা। আসিল সন্ধ্যা শান্তি লয়ে আঁধার পরা। কপালে তারার টীপ, ঘরে ঘরে বধূ হাতে লয়ে দীপ- পিয়াল কুঞ্জে, তমাল পুঞ্জে, শুধু শান্তি শান্তিভরা। (বাসন্তী প্রভৃতির প্রবেশ ) শা। কি বাসন্তী, কুশল ত? বেড়াইতে আসিয়াছ ? বাস। অনেক দিন পুরাতন স্থানে আসি নাই। (সােম দত্তের প্রতি) আপনার কুশল ত ? চিত্রমুখের নির্বাণে আপনার সমুহ বিপদ গিয়েছে। সােম। আমি ইহার আশ্রয়ে সকল কষ্ট ভুলিয়াছি। আর আমার কষ্টই বা কি ? নি। তুমি ত এক দিনও সংবাদ লইলে না। এত কষ্ট করে তােমার চিত্র আঁকিয়াছেন। বাস। আমার পিতার দ্বারা সংবাদ লইয়াছিলাম জা নিতে পারিলাম স্থান পাইয়াছেন। সােম। আপনাদের কৃপায় আমি সুস্থ আছি। শা। ইনি তােমাকে চিত্রবিদ্যা শিখাইবেন। কুসু। সই আমার, চিত্রের কি শিখিবে ? ;
মণিমালা
শা।
t
বাস। না, আমার শিখিতে একটু বাসনা হইয়াছে।
কুসু। তবেই হয়েছে। প্রথম আশ্রম, তারপর ত্যাগ, তারপর
চিত্র, তারপর বিদ্যা, তােমার বর জুটিবেনা !
সে ভয় তোমার নাই।
সােম। দেখ কি প্রলয়ের মেঘ।
বাস। প্রকৃতির বিচিত্র গতি।
সোম। দেখ সাগর যেন স্তব্ধ, আর বাতাস নাই ; তরুরাজি
নিস্পন্দ, সকলে মস্তক ধূসর বর্ণ করিয়া কুটী করিতেছে।
শা। ঝড় আসিল।
বাস। সখি চল, ঝড় বহিবে ।
সােম। (স্বগতঃ ) ঝটিকা সর্বত্র।
বাস। চলুন, এ উন্মুক্ত বেলাভূমিতে ঝটিকা প্রবল বহিবে ।
বৃষ্টিও আসিল।
সােম। এ বরষা সর্বত্র নয়।
বাস। এ অবস্থায় আমাদের গৃহে চলুন, নিকট হইবে। পরে
দেখা যাইবে।
শা। তাই চল।
( সকলের প্রস্থানভাব )
(স্বগতঃ ) ঝটিকা আরও প্রবল হও, অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হইয়া
দেখ, কোথায় কি আছে।
( সকলের প্রস্থান)
মণিমালা
পঞ্চম গর্ভাঙ্ক
শান্তনুর বহির্বাটীকক্ষ মধ্যে ভৃত্য।
ভৃত্য। না, বড় গােল বাধালো। ঠক্ ঠক্ ঠক্, বিরাম নাই,
এই ভয়ঙ্কর বর্ষা, ঝড়, এর মধ্যেও ঠক্ ঠক্—বলি কেহে ?
নেপথ্যে। এখানে শ্রেষ্ঠীপুত্র আছেন ?
ভৃত্য। কি বলে বুঝবার যাে নাই, এ চোয়াড়ে গলা আমদানি হল
কোথা হতে, সােনার লঙ্কা রাজ্যে এমন নাই, বলি কে ?-
নেপথ্যে। বৃষ্টিতে ভিজে গেলাম, দোর খােল ।
ভৃত্য। গেলে গেলে বয়ে গেল, কেবল খরচ কেবল খরচ, আজ কৰ্ত্তা
বাড়ী নাই। কি চাও?
নেপথ্যে। দোর খােল না !
ভৃত্য। ওই এক ঘেয়ে সুর, না ঘুম হলেনা, দোর খুলতেই হলো।
ঠক্ ঠক্ করছে ঠগী নয় ত? ভাল একখান অস্ত্র হাতে রাখা ভাল।
( চিন্তামণির প্রবেশ )
ভৃত্য। তুমি কেহে বাপু ?
চিন্তামণি। আমি সােমদত্তের ভৃত্য ; তিনি কোথায় ?
ভৃত্য। তা পরে বােঝা যাবে, তুমি বলছাে ভৃত্য, আমিও যে এক
ভৃত্য। কই, বাবা, এযে আকাশ মাটী তফাৎ! তােমার রকমটা ভাল
বলে বােধ হচ্ছে না,
চিন্তামণি। কেন?
ভৃত্য। তােমার গলায় আওয়াজ নাই।
মণিমালা
চিন্তা। মাসাবধি পথশ্রমে, তারপর এই আকস্মিক ঝড়ে বড়ই
পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছি। আমার প্রভু কোথায় ?
ভৃত্য। কেন, কি দরকার?
চিন্তা। তার কাছেই বম্ব।
ভৃত্য। উহু, তবে হলো না।
চিন্তা। আমি তাকে দেশে নিয়ে যেতে এসেছি।
ভৃত্য। তাও হলো না, তার তিন কুলে ত কেউ নাই শুনেছি।
চিন্তা। সবই আছে। সে অনেক কথা। তাঁহার পিতার মৃত্যুতে
তিনি অতুল বৈভবের একমাত্র অধিকারী।
ভৃত্য। বাসরে ! সংসারে সবাই বড়, কেবল আমরা যাহা আছি
তাহাই থাকিয়া গেলাম।
চিন্তা। তার কাছে নিয়ে চল।
ভৃত্য। তিনি ত ধনপতি শ্ৰেষ্ঠীর বাড়ীতে আছেন। তা হবে ।
এখন কাপড় ছাড়, বিশ্রাম কর, কাল প্রতে দেখা হবে।
চিন্তা। তা হয় না। প্রাতেই একখানি পােত বন্দর ত্যাগ করবে।
সকলেই তার জন্য বড় উৎকন্ঠিত।
ভৃত্য। আর এতকাল
চিন্তা। তা যা হাে। তুমি সে বাড়ী জান ?
ভৃত্য। হু, এ বাড়ীতে থাকে কে, আচ্ছা লােক দেব। তা তিনি
কাল আর যেতে পাচ্ছেন না।
চিন্তা। সে বিষয় পরে বিবেচ্য, আগে ত দেখা হােক।
ভৃত্য। হু, ব্যাপারটা স্বপ্নের মত বােধ হচ্ছে। ভাল, দেখত আমি
ঘুমিয়ে নই ত?
চিন্তা। বল কি ?
:
মণিমালা
ভৃত্য। রাত্রে ঘুমিয়ে আছি সকালে উঠে দেখুি রাজা হয়েছি, এ যে
তাই!
চিন্তা। সে অনেক কথা, সব শুনতে পাবে।
ভৃত্য। না ভাই, আগে বল। ভাল, তােমার আহারাদির প্রয়ােজন।
তুমি একা?
চিন্তা। আমার সঙ্গীগণ বন্দরেই আছে সেথাই রাত্রে থাক। আমার
কোন আহারের প্রয়ােজন নাই।
ভৃত্য। তা হবে না, তা হবে না—এসো--কিন্তু তােমাকে বাড়ীর
মধ্যে যেতে দিচ্ছি না, কি জানি যদি কিছু মতলব থাকে।
( প্রস্থান)
ষষ্ঠ গর্ভাঙ্ক
ধনপতি শ্রেষ্ঠীর উদ্যান।
সােমদত্ত। সেই স্থান, যেথা আমি চিত্ৰ দিয়াছিনু।
দিন যায়, দুঃখ আসে ঘনীভূত হয়ে,
বৃদ্ধি হয় এ চিত্তের ক্ষুব্ধ চঞ্চলতা।
চমকে বিজলী, তীক্ষ্ণ বহে সমীরণ,
বহে ঝড় আপনার সর্বশক্তি ল’য়ে,
প্রাণে আন্দোলন মাের অধিক প্রবল !
বিধি বিড়ম্বনা, দারিদ্রে ছিলাম বেশ।
অকস্মাৎ ঘটিল ঘটনা, আশা হলাে,
২২
মণিমালা
ক
তারে পেতে পারি, আমি দীন নহি আর।
বাধা এল, যেতে হবে সব মায়া ত্যজি।
কোথা যাব? সেথা মণিমালা আছে। আমি
পাবনা তাহারে, মরিব জুলিয়া, সেও
হবে জ্বালাতন। ফিরে যাব, ফিরে হবে।
স্থির নির্বাসিত ; এবার রাজার আজ্ঞা।
যুদ্ধ বিদ্যা সব, প্রায় ভুলে আছি,
সামান্য সামন্ত হয়ে কাটাই কাল ।
তার চেয়ে এই ভাল। জ্বলিব, মরিব,
দেখিব কি হয় শেষ ! ভাল নিৰ্বদ্ধিতা !
আমার ঐশ্বৰ্য্য বলে প্রাপ্তি সম্ভাবনা,
নতুবা দরিদ্র মােরে কে দিবে সােহাগ।
যাব, আবার আসিব, আমি তারে চাই!
শৈশবের প্রেমে আছে ঘাের অভিশাপ ;-
তাই অপরাধ হীন, পিতৃ কোপানলে,
কি সামান্য তিরস্কারে, আত্ম অভিমানে
গৃহ ছাড়ি আসি ! কেহ জানিল না, কেহ
বুঝিল না। মণিমালা, মণিমালা, যেথা
যাই, সেথা তাের নাম, সেথা ভাগ্যে মাের
বিপরীত অদৃষ্ট পীড়ন।
(প্রস্থান )
( বাসন্তী ও কুসুমিতার প্রবেশ )
আমি অধীর হয়েছি সখি, তাই আসি
শরীর জুড়াতে। প্রভাত না হতে, মাের
মণিমালা ; বাস। হৃদয় পিঞ্জর ভাঙ্গি, চলে যাবে পাখী, দূরে, কত দুরে, সাগর ওপারে আর ফিরে আসিবে না। জানিবে না, বুঝিবে না, হেথা পড়ে র’ল অভাগিনী, সই, সই, শুধু ছায়া মাখা কায়া এত ভাল বাসিয়াছ, কেন বল নাই ? কে শুনিবে, কে বুঝিবে, চিত্ত দিমু তারে তৈল চিত্র গ্রহণ করিয়া ! তদবধি, সারা নিশি বসি জাগরণে কত কষ্টে হয়েছে বাহিত ; সারা দিবা অনাহারে, তাও সহিয়াছি, তারে দেখিবার আশে। ভাবিতাম মনে, যদি তারে পাই, সই, প্রচুর ঐশ্বৰ্য দিয়া বিত্তশালী করে আপনারি অঙ্কে টেনে লই। আজ শুনি সে যে মহা ধনী- কুমু। তবে আর ভাবনা কি? তােমার পিতার তাহলে অমত হবে না। বাস। তা হবে না; তবে তারে কোথা পাব ! কুসু। তিনি এখানেই আজ অতিথি বাস। কালি প্রাতেই তিনি কান্যকুঞ্জ যাত্রা করবেন। কুসু। আবশ্যক হলে বিলম্ব কতে পারেন ত ? বাস। সে আবশ্যকতা তাঁকে জানায় কে ? আমি যদি দেখা পাই-
২৪।
মণিমালা
(সােমদত্তের প্রবেশ)
সােম। তা হলে।
বাস। ও চরণে পরাণ সঁপিয়ে দিই।
সােম। ঝটিকা আরও প্রবল বহিতেছে।
'কুসু। আপনি কি বলিতেছেন ?
সােম। বলিবার কিছুই নাই, আপনি গৃহে প্রত্যাগমন করুন।
আমি আপনার জন্য আরও ৪৫ দিন এখানে অপেক্ষা করবো। আর
কিছু বলিবার আমার সাধ্য নাই। আমার মাথা ঘুরিতেছে, আমি যাই।
অপেক্ষা করবো, নিশ্চয় করবো, আর বলতে পারি না। আমি সেই প্রথম
দিন হতে তােমারই দাস। তুমি আমার জ্ঞান, তুমি আমার ধ্যান, তুমি
আমার চিত্র, তুমি আমার তুলিকা। আমি তােমার জন্য অপেক্ষা করুব।
( প্রস্থান)
কুসু। যাহা হইল ভালই। চল সই ঘরে যাই।
বাস। চল, গৃহেই যাব।
( প্রস্থান)
(শান্তনুর প্রবেশ )
শা। সােমদত্ত কোথায় গেল? এই পথে বােধ হয় এসেছে।
কিছু দেখা যায় না, বিদ্যুৎ আলােকে যেন আঁধার আরও ঘন হয়ে আসে।
এখন যদি তারে দেখা পাই, তবে প্রাণের কথা বলি। সে যদি শুনে
ভাল, না শুনে আগন্তুক ঘন বরষায় সব ধুয়ে যাবে।
নেপথ্যে—আমি নিশ্চয় অপেক্ষা করবাে।
শা। কেও? সােমদত্ত-কোথায় তুমি ?
নেপথ্যে। আমি আসিতেছি কিছু বলিব।
শা। কি বলিবে এস।
মণিমালা
সােম। তুমি ! তুমি এখানে কেন ?
শা। তোমায় অন্বেষণ করিতে। কেন? তুমি কার সঙ্গে কথা
বলছিলে।
সােম। সে কথা তােমায় বলিব। আমার প্রিয়তমের দেখা
পাইয়াছি।
শ। কোথা?
সােম। এইখানে।
শা। কে সে?
সােম। ধনপতির কন্যা, আমার হৃদয় সৰ্ব্বস্ব।
সোম। বাসন্তী
(স্বগতঃ) বাসন্তী? এ কি! তা হবে না, তুমি পাবে না।
না হয় আমিও পাব না। তাব’লে তুমি পাবে না তারে, তুমি বন্ধু ছিলে,
শত্রু হলে। আগে শোনা যাক।
সােম। কি ভাবছ ?
শা। কি বাতাস!—ও তােমার সৌভাগ্য। অনেক গাছ ভেঙ্গে
পড়েছে। সে কি বল্লে ?
সােম।
সে আমার। আমি প্রাতে চলে যাব শুনে সে দুঃখিত।
আমি তার কথা মত ৪৫ দিন অপেক্ষা কবাে। এর মধ্যে শ্রেষ্ঠিকে
সমস্ত প্রকাশ করা হবে, আমার ঐশ্বর্যে বােধ হয় তিনি আর আপত্তি
কবেন না।
শা। ধিক্ তােমার জীবনে! তুমি স্বার্থপর পিশাচ। কামান্ধ হয়ে
এখানে বিলম্ব করবে! বন্ধু, রাগ করো না।
সােম। তুমি আমার পরম হিতৈষী, ঠিক বলেছো।
২৬ ।
মণিমালা
শা। আগে পিতৃকার্য সম্পন্ন করে—এদিক্ আর কোন গােল হবে
না, আমি সব ঠিক করে রাখবে।
সােম। তবে আমি প্রাতেই যাব। তাকে বলল, তার সাথে
একবার দেখা করবাে।
শা। এ সাক্ষাৎ যদি অন্য কেহ দেখে কুভাবে গ্রহণ কবে।
কাৰ্যে বাধা হবে।
সােম। তাও বটে, তবে তুমি এই রত্নহার গ্রহণ কর, এ তারই
প্রদত্ত। এই নিদর্শন দেখিয়ে তাকে সবিশেষ বলো। পারবে?
শা। এক থা বাহুল্য।
সােম। তবে তাই ভাল। আমার ভৃত্যের সঙ্গে আমি এখনি দেখা
করবো। তুমি প্রাতে গৃহে যাবে ?
শা। চিন্তা নাই, তােমার সঙ্গে দেখা হবে।
সােম। আমি তবে এখন আসি।
।
( প্রস্থান)
শা। যাও আর ফিরিও না, এ' অভাব্য ভাবনায় আমার অঙ্গ
কাঁপিতেছে। বিধাতার কি অবিধি। আমি বাল্যাবধি পরিচিত, সুন্দর
ঐশ্বৰ্য্যশালী, আমার প্রতি কটাক্ষপাত নাই ; আর একে সামান্য চিত্রকর
জেনেও তার প্রতি আসক্ত, আমি জীবন্ত থাকিতে ইহা হইবে না।
প্রতিফল স্বরূপ আমি বাসন্তীকে লাভ করিব।
মণিমালা
সপ্তম গর্ভাঙ্ক।
বিশ্বমুখ। প্রভুর যেন কেমন কেমন ভাব দেখিতেছি, এতকাল ছিলাম
বেশ। আমার বােধ হচ্ছে, এই ধনপতির মেয়েটার জন্য প্রভুর এত কাণ্ড।
তা, আমায় দিয়ে ভূত ছাড়ান কেন ? নিজে গিয়ে বল্লেই হয়। এই এতক্ষণ
আমায় শিখিয়ে পড়িয়ে পাঠালেন, দরজা পার না হইতেই আবার ডাক।
আর পারি না।
(শান্তনুর প্রবেশ)
শা। যা বলেছি ঠিক মনে আছে! চোখের জলে মালাটি ধুয়ে
তবে তার হাতে দিতে হবে। কাদতে পারবি ?
বিশ্ব। এই দেখুন না।
শা। না এখন দেখাতে হবে না; প্রস্তুত থাকা চাই। অতি ব্যগ্রতা
প্রকাশ করো না।
বিশ্ব। তাহলে কি আর আমায় ডেকে ফেরাতে পাত্তেন! আমি
যাবত, আজও যাব, কালও যাব,-একটা কথা বলবো আর দুদণ্ড
কঁাদবাে। আপনি ভাবতে থাকুন, আমি যাই।
শা। কি হলো, কি কল্লেম। যে প্রশস্থ পাপের পথে চলেছি,
আমার সাধ্য কি সে পথ ক্ষুদ্র প্রাণের আয়ত্তাধীন রাখি। সামান্য ভুলে,
সামান্য ছিদ্রে সমস্ত প্রকাশ হতে পারে। তারপর-সােমদত্তকে যে
সমুদ্রে মিথ্যা ডুবাইলাম সেই সমুদ্রে আমাকেই ডুবিয়া মরিতে হইবে।
নচেৎ উপায় নাই, কি করবাে। এখনও ফিরা যায়, এখনও পথ আছে।
জীবনের প্রথম ভুল এখনও সংশােধন করা যায়। ইহাতে পাপ? পাপ,
তাহাত অনেকেই করে, কই তার পতন কোথায় ? অশান্তি কোথায় ?
২৮ মণিমালা এমন আমি শত মুদ্রায় যে মাণিক্য ক্রয় করি, তাহা সহস্র মুদ্রায় হয়ত অনেক সময় বিক্রয় করিয়া থাকি ; ইহাও পাপ, কিন্তু আমার ব্যবসায়ের ত পতন নাই, উত্তরােত্তর শ্রীবৃদ্ধি ! পাপ পুণ্য কাল্পনিক কথা। বিশেষতঃ ইঙ্গিত সামগ্ৰী লাভে কোন দ্বিধা পুরুষােচিত নয়। আমি যাকে দিবানিশি ভাল বেসেছি সে আমাকে চায় না, আমি যাকে দিবারাত্রি চাই সে আমার তত্ত্ব লয় না। ভগবানকে যদি এরূপ করে ধ্যান করতেন, তাকে যদি দিবারাত্রি করে ডাকতাম, শয়নে, স্বপ্নে, জাগরণে তাকে যদি এমন করে দেখতে পেতাম তবে তিনিও বােধ হয় দেখা দিতেন। আর এ সামান্য বালিকা ! আমি লাঞ্ছিত, ঘৃণিত, বাসন্তীর রূপে দগ্ধ, তাকে না পেয়ে জীবন্মত, আমি তাকে চাই। সােমদত্তকে পত্র দিব, বাসন্তী মরিয়াছে, সকলে মনে করিতেছে, তুমি কি যাদু করিয়াছ, আর এ দেশে আসিও না। ইতিমধ্যে আমি বিবাহ করিব। বাসন্তী যদি বিবাহ না করে ? আশ্রমে যায় ? যাক, আমার চোখের সামনে অমন করে চোখ অন্ধ করবে না। তাকে কেউ পাবে না। অষ্টন গর্ভাঙ্ক সাগর তট । বাসন্তী। সব ত ফুরাইয়াছে, তবে আর কেন ? প্রহেলিকার মত আমার প্রণয় সাধনা কোন অতীতে মিশিয়া গিয়াছে--তাহাকে ত আর পাইব না। জীবন দুঃসহ হইয়াছে। এ কোন্ বিধাতার লীলা? আমি ত কিছু চাহি নাই, আমাকে আশা দিয়া এ বঞ্চনা কেন? আমি ত কিছুতেই চিত্ত স্থির করিতে পারিতেছি না। এই সাগর জলে ডুরিয়া মরিলে জ্বালা মণিমালা জুড়াইবে কি? আর ত কিছুতেই তৃপ্তি নাই। বিনা মেঘে বজ্রাঘাত সম এ নিদারুণ বাৰ্তা আমাকে একেবারে দগ্ধ করিয়াছে। কি করিব ? কোথায় যাইব? সত্য মিথ্যা কে বলিয়া দিবে ? আমার প্রাণ বলিতেছে শান্তনুর কথা মিথ্যা, কিন্তু মালা ফিরাইয়া দিবার কারণ কি ? তাহাও যদি মিথ্যা হয়, মাল। যদি তিনি ভুল ক্রমেই ফেলিয়া দিয়া থাকেন—তবে! 'কোন সংবাদই ত আমাকে দিলেন না। ভারতীয় একখানি অর্ণবযান যে জলমগ্ন হইয়াছে তাহাও ত সত্য। শান্তনুর কথা, তিনি আমাকে উচ্ছ জ্বল কামােন্মত্তা নারী ভাবিয়া মালা ফিরাইয়া দিয়াছেন, পরে তাহারা পােতসহ জলমগ্ন হইয়াছেন। হায়-হায় আমি আর ভাবিতে পারি না। সুগত তােমার পুণ্য চরণে আমায় স্থান দেও। আমি আর সহিতে পারিব না। (শান্তনুর প্রবেশ ) শা। বাসন্তী, তুমি এখানে কেন ? সকলে তােমার অনুসন্ধান করিতেছে। এ তােমার কেমন স্বভাব। আমি ত সমস্তই অবগত আছি, যদি তুমি সংযত না হও, আমি সকল বিষয় প্রকাশ করিয়া দিব। বাস। তুমি পাষণ্ড! তুমি মিথ্যাবাদী ! তােমার ন্যায় দুরাচার পশু জগতে দ্বিতীয় নাই। শা। বাসন্তী সাবধান! আমি সব প্রকাশ করিয়া দিব। বাস। তুমি আমার সম্মুখ হইতে এখনি প্রস্থান না করিলে আমি এই সাগর জলে ডুবিয়া মরিব । শা। মরিবে কেন? মরিলে কি লাভ হইবে ? তােমার মত তুমি যাইবে, তাহাতে অপরের কি ? তােমার সহিত গুটিকতক কথা আছে, শুনিবে ? আমি তােমার জন্য সব বিসর্জন দিতে পারি, কিন্তু মণিমালা তােমাকে লাভের প্রতিজ্ঞা আমার অটল থাকিবে। বাসন্তী, আমি তােমাকে ভালবাসি, তুমি আমার হইবে? আমি তােমাকে চাই, এবং আমি প্রতিজ্ঞ। কথা নাই যে ? সমুদ্রে ডুবিতে দিব না। যদি তুমি সহজে স্বীকৃত না হও- কাস। দয়াময়, হে করুণ, হে সৰ্বশক্তির আধার, পাপ তাপ নাশন হে সুগত—আমায় গ্রহণ কর ? ওসব শেষে হইবে। তুমি কোথায় আছ আমি জানিতাম। আমি একখানি পােতে আমার অধিকাংশ সম্পদ সংস্থাপন করিয়াছি। বাসন্তী, চল দুই জনে দেশান্তরে যাই। পূৰ্বেই বলিয়াছি তুমি যদি সহজে স্বীকার না কর--আমি বল প্রকাশ করিব। আমার সঙ্গে লােক আছে। বাস। ভগবান, ভগবান ( সমুদ্রের দিকে অগ্রসর ) কোথায় যাইবে, হয় বাসন্তী, শা। আমি তেমন পিশাচ নই। হয় মরণ- ( ছুটিয়া বাসন্তীর হস্ত ধারণ ) বাস। ওগো হৃদয় স্বামী, কোথায় তুমি ! ( মূচ্ছা) ( বিশ্বমুখ ও অন্যান্য অনুচরের প্রবেশ ) বিশ্বমুখ। সাধু যাহার ইচ্ছা, ভগবান তাহার সহায়। বেশ হইয়াছে। সত্বর করুন। এই বেলা যথা কর্তব্য সমাধা করা যাক। ১ম অনুচর। আকাশের অবস্থা ভাল নয়। পােত কিছুক্ষণ তীর ত্যাগ করিতে পাবিবে না। শা। না হয় সমুদ্রে ডুবিব, এখানে থাকিলে সমূহ বিপদ সম্ভাবনা। বিশ্ব। তাইত। তাইত! তাইত।
মণিমালা
শা। কোন চিন্তা নাই। আমি ইস্পিত বস্তু লাভ করিয়াছি।
দেবতা আমার অনুকূল, আমি কোন বিপদ গ্রাহ্য করি না।
নাবিক অনুচর। প্রভু, আপনার আজ্ঞা শিরােধার্য কিন্তু বিশেষ
বিবেচনা করিয়া দেখুন।
শা। আর বিবেচনায় কাল নষ্ট করিতে পারি না। এখন কাৰ্য
চাই। না হয় সমুদ্রেই ডুবিব।
সমুদ্রেই ডুবিব। বাসন্তীকে আমি না পাই ত কেহ
পাইবে না। সত্বর কর।
(পটক্ষেপ )
দ্বিতীয় অঙ্ক প্রথম গর্ভাঙ্ক ; মণিমালা। মণিমালা। কি তীব্রতা ! আমি এমনই হইয়া পড়িয়াছি যে, তাহাতেই তৃপ্তির আশা করি ! নিদ্রা আসিতেছে না! কি করি, কোথায় যাই ; বাহিরে শীত, অন্তরে তাপ, আমি যেন অস্তিত্ববিহীন। আমার মনের গতি এমন কথন হয় নাই। কেন, আমার সােমদত্তকে দেখিয়া ? আবার বলিতে আমার বলিয়া ফেলি। সে আমার জন্য কত কষ্ট পাইয়াছে, কত দেশে কত দুঃখে কাল যাপন করিয়াছে। আমিই কি সুখে ছিলাম ? লােকে কত কি গােপনে বলিল, আমি ত তখন এত বুঝিতাম না। কষ্টের উপলব্ধি তখন ত হয় নাই। ভালবাসিতে জানিতাম, ভালবাসার এ অর্থ বুঝিতাম না। সােমদত্ত চলিয়া গেলে বুঝিলাম কষ্ট কি ? লােকের কথায় আমি লজ্জা পাইলাম না, সােমদত্তকে আরও ভালবাসিতে শিখিলাম। আমি তাহার মর্ম বুঝিলাম। ফুল ফুটিতে হয় জানিত না, জানিল ; নদী ক্ষীণ ছিল ভরিল ; বাতাস মন্দ ছিল, ঝড় আসিল। আমার খেলা ঘরের স্বপ্ন আমায় জাগ্রত করিয়া যেন এ বিশ্বের প্রকৃত সত্য দেখাইয়া দিল। আবার সােমদত্তকে পাইয়াছি। কই! আমি এ দীর্ঘ তিন বৎসর যাবৎ যাহার নাম জপ করিয়াছি, সে তপস্যা ত আমার বিফল হইতে ছিল! সােমদত্ত সিংহল হইতে তার পাত্রী খুঁজিয়া আনিয়াছে, বিধি
মণিমালা
বিরূপ তাই ; তাই বা কি ? আমি যেন অবিশ্বাসী হইয়া পড়িয়াছি
(জানু পাতিয়া )
পতিত পাবন দয়াময়, আমায় রক্ষা কর, আমায় সুমতি দাও, তাহার
দোষ কি ? দেশে যে ফিরিবে এমন আর সম্ভাবনা ছিল না। আসিয়া
অবধি সে আমার সহিত একরূপ বাক্যলাপ বন্ধ করিয়াছিল। আর
আসিত না, আমিই কয়দিন ডাকিয়া আনিয়াছি। আমার মন যদি সত্য
হয়, তবে তাহার বুকে ভার আছে। কিন্তু তাহা কি মণিমালার জন্য ?
ছি। আমি আর সহিতে পারি না। (করে শির স্থাপন করিয়া চিন্তা )
(সােমদত্তর প্রবেশ )
ও কি, তুমি আসিয়াছ ? আমি তােমার অপেক্ষায় বসিয়া আছি,
আজ মন ভাল নাই—তােমার কাছে বিদেশের গল্প শুনিব।
সােম।
হেমন্তের শিশির তােমার ক্ষতি করিবে যে।
মণিমালা। বেশ চঁাদ উঠিয়াছে, দেখিব বলিয়া আসিয়াছিলাম। দূরে
ঝাউ গাছগুলির আড়ালে থাকিয়া চঁাদ উকি দিতেছে। তার আভাখানি
যেন কত করুণার, কত কাতরতার! বেলাভূমিতে কেমন চাদ উঠে ?
সােম। বেলাভূমিতে চাদ বেশ।
তােমার অসুখ হইবে যে,
মণিমালা !
মণি। না আমার কিসের অসুখ, তুমি বল।
সােম। কই এমন চঁাদ ত দেখি নাই! থাকিতাম দীনতায়, চঁাদের
দিক্ দেখিয়াছি কি ?
মণি। তুমি আমায় ভুলাইবে? তুমি চাঁদ দেখ নাই ?
সােম। দেখিয়াছি।
মণি। আমার প্রতি 'এ কঠোরতা কেন ?
সােম। ছি মণি!
কাদিবে কেন ?
৩৪
মণিমালা
মণি। আমায় ফাঁকি দিবে ।
সােম। তুমি এখনও বালিকা ; সহজেই
মণি। আমি সহজেই কাতরা।
সােম। আমার প্রাণ দুশ্চিন্তাময় বলিয়া অন্য মনে থাকি, তাই।
মণি। তাই তুমি আমায় কিছু বলিবে না। আমি পরের মুখে তােমার
কষ্ট কাহিনী শুনিয়া তৃপ্ত হইতে পারি নাই। আমি নিজে যদি তােমার
কাছে শুনিতাম, তবে কঁদিয়া সে তৃপ্তি লাভ করিতাম।
সােম।
জগতে যদি প্রাণ থাকে তবে সে তােমার।
মণি। ছি ? তুমি কঁাদ কেন ? মহারাজ তােমার বিবাহ দিবার
উদ্যোগ করিতেছেন ; তুমি সুন্দরী ও লক্ষ্মী স্ত্রী পাইবে, তােমার দৈন্যদিন
দূরে গিয়াছে, ভাগ্যও সুপ্রসন্ন, মহারাজ ত তােম। বই জানেন না, তুমি
এ অসীম সাম্রাজ্যের নবীন কাণ্ডারী, তােমার হৃদয় অটল হউক।
সােম। মণিমালা, সহস্র বিশ্ব পাইলেও আমি অসুখী রহিব ।
কেন—যাহা গিয়াছে তাহা পাইবে না ?
সােম। জগতে আমি কিছুই পাইব না।
মণি। (স্বগতঃ ) আমি অবিকৃত রহিতে পারিতেছি কই
সােম। তুমি কি ভাবিতেছ, মণিমালা।
মণি। বাসন্তী কেমন ?
সােম। তুমি বাসন্তী নাম কিরূপে জানিলে ?
মণি। আমি কি জানিতে পারি না ?
সােম। তাহা বলিতেছি না। আমি ত কাহাকেও বলি নাই।
কোন ব্যথিত প্রাণে কি নামটির অস্ফুট উচ্চারণ হয় নাই ?
সােম। সত্য। কিন্তু সে অস্ফুট আৰ্তনাদ, আমার প্রাণ ভিন্ন অন্য
কেহ জানে না।
মণি।
মণিমালা মণি। আমি তােমার প্রাণ জানি। সােম। তবে আজ আসি। মণি। যাইও না। সােম। আমি সহিতে পারিব না। মণি। কি সহিতে পারিবে না সােমদত্ত ! সােম। মণিমালা! আমি তােমার নিকট পরাস্ত হইলাম। তুমি যাহা পার আমি তাহা পারি না। বলিতে হইলে বহু পুরাতন কথা আবৃত্তি করিতে হয়। সে জ্বালা সহিতে পারিব কি ? মনে পড়ে আমি এমনি ভাঙ্গা প্রাণে এ জন্ম ভূমির নিকট বিদায় লইয়া ছিলাম। নিবান আগুন আর জ্বালিতে চাহি না। মণি। (স্বগতঃ ) আগুন নিবিল কবে, আরও জ্বলিয়া উঠিতেছে। কি করিব, আমি কি বলিব ? যাহা বলিব ভাবিয়াছিলাম, সব কোথায় গেল! আমি সব সহিতে প্রস্তুত আছি, তােমার ম্লান মুখ আমার সহ্য হয় না। সােম। মণিমালা ! কি ভাবিতেছ! ভাবনার অন্ত কই! আমি চিত্ত দৃঢ় করিয়া আসিয়াছিলাম, কিন্তু সব মিথ্যা। আমি ত বেশ ছিলাম, নিৰ্বাসিত, দুর্দশাগ্রস্থ,-চিত্রাঙ্কনে আমি প্রাণের জ্বালা জুড়াইতাম, কিন্তু তাহাও মিথ্যা হইল। জগতে আমি যত বাধা লইয়া আসিয়াছিলাম এমন আর কে ? আমি আবার মরিলাম। মরিলাম ত বাচিলাম কেন? বাঁচিলাম ত পাইলাম না কেন? তবু আমি বেশ ছিলাম। সব বিসর্জন দিয়াছিলাম-ভূল কথা, তাহাও মিথ্যা। আমি দিবানিশি, জ্বলিতে ছিলাম। তবু নিজে পুড়িয়া মরি ক্ষতি নাই, অন্যে মরে কেন মণিমালা ! মণি। আমায় রক্ষা কর! আমি অবলা দুর্বল।
৩৬ মণিমালা সােম। সােমদত্ত স্বার্থপর হবে না। ভাল, একটী কথা জানিতে চাই। মণি। তুমি কি বাসন্তীকে ভুলিয়াছ ? সােম। বলিতেছি, আমার কথার উত্তর দিবে ত! মণি। কি বলিব। আমি এখন হইতে সংযত হইব। আমি তােমারই কথা ভাবিতেছি, তুমি দেখা দাও না আমি তােমায় দেখি ; তুমি কথা বল না কিন্তু আমি তােমার প্রতি বাক্যই শুনিতে পাই। আমাকে সংযত কর। সােম। আমি বাসন্তীকে ভূলি নাই, কিন্তু আমার দশা কি হইবে। মণিমালা, তুমি যে আমার সময়। ক্ষণেক অপেক্ষা কর—আমায়—ভ্রান্তি শিখাইবে ? সােম। আমি নিজে তাহা জানি না, তবে আর আসিব না। তাহা হইলে বােধ হয় উভয়েই শিখিব। মণি। আমায় ক্ষমা কর, আমি কি বলিতে কি বলিয়াছি। সােম। মণিমালা, জানিও, সােমদত্ত নিজে পুড়িবে, আর কাহাকেও পুড়িতে দিবে না। আমি বিদায় হই, তুমি গৃহে যাও। আমার পুনরায় নিৰ্বাসন হইবে। তাহাতে ভয় নাই ; তােমায় আর দেখিতে পাইব না, তাহা সহিতে পারিব না। মণিমালা, আমার কেমন আত্ম- বিস্মরণ হইতেছে। আর রহিব না, হায় এই আমার স্বার্থত্যাগ। মণি। (প্রস্থান) = মণি। তুমি রহিবে না? আমার একি হইল, ! আমি কি বলিতে কি বলি,-হে দয়াময়, অভাগার ধন, অবলার বল, এ তােমারই আত্মা; তােমারই দেহ, পাপ হােক্ পুণ্য হােক, হয় দাও, নতুবা, আর আমি, মণিমালা বলিতে পারি না। হে গুরাে! আমায় বল দাও, আমি আর যে সহিতে পারি না! দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক রাজপথ । ( ভিক্ষুণীবেশে বাসন্তী ও সুগত) বাসন্তী। (স্বগতঃ ) সুগত একি করিলে ! প্রত্যহ প্রাতে সোমদত্তর নূতন কোন গুণের কথা শুনিতে পাই, আর আমি তাহাতে হতাশ হইয়া পড়ি। কত বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করিয়া এখানে আসিলাম। একমাত্র ভয় ছিল, যদি তিনি বিবাহ করিয়া থাকেন। তবু তার পায় পড়িয়া থাকিতাম। চরণ ভিক্ষা লইয়া দাসীবৃত্তি করিতাম, আমি তাহার দাসী হইয়া থাকিতাম। কি করিব, কি হইবে ! সুগত উপায় দেও। বেশ, আমি সােমদত্তকে প্রেম শিখাইব। যে ভিক্ষুণী হইয়াছি তাহাই রহিব। আমি মণিমালাকে ভিক্ষুণী করিব, সােমদত্তকে সুগতের মােক্ষগতি দিব, নহিলে তাহার শান্তি নাই। সংবাদ দিতে পারিতাম, পরিচয় দিতে পারিতাম, হয় ত তিনি আমায় গ্রহণ করিতেন, কিন্তু শান্তি পাইতেন না। তাহার প্রাণে নিৰ্বাপিত অগ্নি জ্বলিয়া উঠিয়াছে, ইহা নিবিতনা। যে বাল্যবন্ধুতা পুনরায় অঙ্কুরিত হইয়াছে তাহা শুকাইলে সােমদত্ত বাচিতেন না। যদি সােমদত্ত তাহা ভুলিতে পারিতেন, তাহলে তাহার প্রেম কোথায় ?
৩৮
মণিমালা
(নাগরিকগণের প্রবেশ )
৪র্থ।
১ম। এই বৌদ্ধদের জন্য সব গেল, ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম আর থাকিবে কি ?
২য়। তাহাতে আবার যুবরাজ ইহাদের পক্ষে।
৩য়। কেন ইহাদের নিন্দা কর, ইহারা বিশেষ শিষ্ট ও পরােপকারী।
১ম। তা নয় ত কি ? কুল গেল, খ্যাতি গেল, তীর্থ গেল, বারাণসী
ধামের কি হতশ্রী হইয়াছে জান ?
মহাকাল মন্দিরে ভৈরবী মিলিতেছে না।
ও গুলো না মিলাই ভাল, তবে সকলের মধ্যেই ভাল মন্দ
আছে। আমার একটী আত্মীয় সম্প্রতি ভিক্ষুব্রত ধারণ করিয়াছেন,
স্বভাবের আশ্চৰ্য্য পরিবর্তন হইয়াছে।
৩য়। আমি ও ব্ৰত গ্ৰহণ করিব ভাবিতেছি। ওহে ভিক্ষুণি !
সুগত রক্ষা করিও। আপনার কি অজ্ঞা।
৩য়। তুমি এত অল্প বয়সে এই ব্রত গ্রহণ করিয়াছ কেন?
বাস। মৃত্যুর কি বয়স আছে।
১ম। এত অল্প বয়সে ধৰ্ম হয় ?
বাস। যদি বার্ধক্যে উপনীত হইবার পূর্বে মৃত্যু হয়, তবে ধর্ম
বাস।
হইবে কবে?
৩। ঠিক্ কথা। বঁচিলে ত বাণ প্রস্থে গিয়া ধৰ্ম্ম করিব।
২য়। যুবরাজও নাকি তাই বলেন।
৪র্থ। যাহার যাহাতে রুচি। বানপ্রস্থে যাইবার পূর্বে যে ধর্ম
করিতে নাই এমন কথা ত কেহ বলে না।
২য়। তাত বটেই।
১ম। ধৰ্ম্মের সূক্ষ্মাতি। এ বয়সে সে জ্ঞান ভাল হয় না।
মণিমালা
৩য়। শােনা যাক ভিক্ষুণী কি বলে।
বাস। ধৰ্ম্মের গতি সূক্ষ্ম বটে, কিন্তু মনের গতি সূক্ষ্ম তর।
সুগতা। পথ সূক্ষ্ম, কিন্তু পার-নিয়ন্তা অসীম শক্তিময়।
বাস। তঁাহার দয়া হইলে সব হইতে পারে।
৪র্থ। কথাটা চিন্তার বিষয় বটে।
১ম। ইহা আমাদের ধৰ্ম্মেরই কথা।
(অন্য কতিপয় নাগরিকের প্রবেশ )
প্রথম। স্ত্রী কি পুরুষ কিছু বােঝা যায় না।
দ্বিতীয়।
অত পথ কত ক্লেশে আসিয়াছেন।
১ম। কে ? কে ?
প্রথম। চীন হইতে এক বৌদ্ধ ভিক্ষু আসিয়াছেন -বৌদ্ধতীর্থ
পর্যটনে।
১ম। বৌদ্ধেরও আবার তীর্থ।
প্রথম। কি উজ্জ্বল তাহার জ্যোতি! দেবদুর্লভ।
দ্বিতীয়। অতি সদাশয়। মহারাজের নিকট তাহার মহাসম্মান।
২য়। বটে ?
৩য়। ধৰ্ম্মের কি প্রাণ, কি অসীম উদ্দীপনা ! এই ব্যক্তি দুল্ল ঘ্য পথ
অতিক্রম করিয়া আসিয়াছে। এস ইহাকে দেখিয়া ধন্য হইব।
প্রথম। তাহারা এই বুঝি আসিতেছেন।
১ম। কি জনতা।
২য়। তাই ত।
দ্বিতীয়। মহাপুরুষের পথ প্রশস্থ।
সুগতা। এখানে থাকিবে না যাইবে ?
৪০
মণিমালা
বাস। (স্বগতঃ) তিনি সঙ্গে আসিতে পারেন। দেখা যাক
অপেক্ষা কর—দেখিয়া যাই।
সুগতা। জনতার ভয় হইতেছে।
বাস। আমার সাহস আছে।
[ নেপথ্যে ] আপনারা গৃহে গমন করুন, আপনাদের আতিথ্যে
বিশেষ তৃপ্তিলাভ করিলাম। বেলা অধিক হইয়াছে, আপনারা আর কষ্ট
করিবেন না।
নেপথ্যে। “জয় সুগতের জয়।”
নেপথ্যে। সুগত আপনাদিগকে শান্তি দান করুন।
নেপথ্যে। সােমদত্ত আপনি জনতা নিবারণ করুন,আমরা
আশ্রম হইতে আসি।
নেপথ্যে। “জয় সুগতের জয়।” আমরা এই স্বানেই অপেক্ষা করিব।
(হর্ষবর্ধন ও থিয়েনসানের প্রবেশ )
থিয়েনসান। যিনি সৰ্বান্তৰ্য্যামী তাহাতে প্রীত হউন। সকলের
মঙ্গল হউক।
৪র্থ। মহাজনের আশীর্বাদ শিরােধার্য।
থিয়েন। ভিক্ষুণী দেখিতেছি যে।
সুগতা। আমরা আশ্রমবাসিনী।
হর্ষ। ইনি আশ্রমেই যাইতেছেন।
বাস। আপনাদের শুভাগমনে জীব পবিত্র হউক।
থিয়েন। বৎসে! তুমি কতদিন এ পুণ্যব্রত ধারণ করিয়াছ ?
তােমাতে কোন দিব্যজ্যোতিঃ লুক্কায়িত আছে দেখিতেছি, কিন্তু তুমি
বিষাদময়ী কেন ?
মণিমালা
•৪১:
=*
বাস। (স্বগতঃ ) এ কি অন্তর্যামী, আমার অন্তর বুঝিতে
পারিয়াছেন।
সুগতা। ইনি সম্প্রতি আসিয়াছেন। পথশ্রমে
পথশ্রমে ক্লান্ত ছিলেন,
এখনও সুস্থ হইতে পারেন নাই।
বাস। সুগত কৃপায় আমার স্বাস্থ্য ভাল আছে।
হর্ষ। ভিক্ষুণী তােমায় আমি দেখি নাই, শুনিয়াছি তােমার গীতগুলি
বড় মর্মস্পর্শী। তুমি তরুণী কিন্তু জ্ঞানে প্রবীণ সমা।
থিয়েন। সুগত তােমায় সুস্থ রাখুন।
বাসন্তী। (স্বগতঃ ) প্রাণে ইচ্ছা ত তাই, কিন্তু পাই কই।
হর্ষ। তুমি আমার প্রাসাদে যাইও, আমি তােমার গীত শুনিব।
বৌদ্ধ ভিক্ষুণীগণ সকলেই আমাকে তাহাদের সন্তানের মত দেখিয়া
থাকেন।
সুগতা। দুঃখিনীর সন্তানই মহারাজ হয়।
থিয়েন। বিশ্ব প্রীতিময় হউক।
হর্ষ। সুগতের ইচ্ছা পূর্ণ হউক। আসুন, আমরা অগ্রসর হই।
থিয়েন।
সকলের কুশল হউক।
(হষ, বাসন্তী প্রভৃতির প্রস্থান)
১ম। দেখিলে প্রাণ ভরে।
২য়। হু-
৩য়। আমি ভিক্ষু হইব।
প্রথম ও দ্বিতীয়। সাম্যের জয় হউক।
৪২
মণিমালা
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক
মণিমালা ও মুক্তভিক্ষুণী নামধারী বাসন্তী।
অণি। তােমার এত আনন্দ কিসে? এই বয়সে তুমি ভিক্ষুণী,
এ জগতের কিছুই জাননা বলিয়াই কি তােমার আনন্দ ?
মুক্ত। প্রাণে আনন্দের স্থান দিলেই আনন্দ আসে।
মণি। আহা, আশ্রমের কি
আশ্রমের কি সাধনা ? কোন বিফলতা নাই।
মুক্ত। বিফলতা থাকিলে যে আনন্দ আসে না, আমার ত এমন
বােধ হয় না। যদি একটা চিন্তা মনে স্থান না দিলে শান্তি পাওয়া যায়,
তবে সে চিন্তা করিব কেন ?
মণি। ভিক্ষুণী! তুমি কিসের চিন্তার কথা বলিতেছ ?
যে কোন চিন্তা হােক।
আমায় প্রতারণা করিও না। কিসের চিন্তা, আমাকে বল।
মুক্ত। রাজকুমারি ! আপনি চিন্তা বিসর্জন দিতে পারেন।
মণি। না।
কেহ কি পারে ?
মুক্ত। বলিতে পারি না, চেষ্টা করিবেন, প্রাণে শান্তি আসিবে।
মণি। তাহাতে সুখ ?
মুক্ত। শাস্তিই সুখ ?
মণি। মিথ্যা কথা। ভিক্ষুণি ! তুমি আশ্রমবাসিনী, সংসারের
কিছু জাননা।
মুক্ত। জানি। কিন্তু বুঝি না।
মণি। তুমি ধন্য বটে। কিন্তু আগুনে না পুড়িলে জলের
শৈত্য বুঝা যায় না; যা—তুমি একটা গীত গাও, আমি তােমার গানে
মণি।
মণিমালা
৪৩
বহু আনন্দ পাই।
আমার যেন আর কোন জ্ঞান থাকে না।
একটা গাও!
গীত
মণি।
নমাে নমাে নমো সুগত চরণে,
শ্রীপাদপদ্মে লও হে শরণ।
মনের, মােহের যত মলিনতা
ঘুচাইয়ে কর সফল জীবন।
মানব তোমারে করেছে বিধি,
পেয়েছ পরম বুদ্ধি বৃত্তি নিধি,
সে ধন হারাবে, কি ছার পাইবে,
কি কথা বলিবে শমন সদন ।
এ সুকণ্ঠ, এ তন্ময়তা, ঘুমন্ত বনচ্ছায়াসঞ্জীবনী উষার কনক
কান্তি, কোন্ সাধনার ভিক্ষায় লাভ করিয়াছ ভিক্ষুণি ! তুমি কোথায়
যাইবে ? আমার এই প্রাসাদে, আমার এই হৃদয় মন্দিরে, আমার এই
ক্ষুদ্র প্রাণের অসীম কামনায় তােমার আশ্রম প্রতিষ্ঠা কর। আমি
চিন্তা বিসর্জন দিতে পারিব না, কিন্তু তােমার সেবায় আমি চিন্তার
সহচরী পাইব। ভিক্ষুণি ! তুমি ত সবই ত্যাগ করিয়াছ? প্রাসাদ ও
আশ্রম তােমার তুল্য। কিন্তু আসন্নবর্ষী নীল মেঘের ন্যায় তােমার
দুটী চক্ষু ভরিয়া উঠিয়াছ কেন ? এস ভিক্ষুণি ! আমার এ দুঃখে
তুমিও কঁদিবে এস ? আমায় কাদা শিখাইবে এস? আমার প্রাণের
ভার লাঘব করিবে। ভিক্ষুণি! নিশ্চয় তােমার প্রাণে কোন ব্যথা আছে।
হায়, তুমি আমার কি বেদনা জুড়াইবে, তােমার প্রাণ ভরা, তুমি আমাকে
কোথায় স্থান দিবে?
৪৪
মণিমালা
মুক্ত। আপনি অধীরা হইতেছেন যে ?
মণি। তুমি ভিখারিণী কেন ?
মুক্ত। ভিক্ষার জন্য ।
মণি। তুমি সর্বস্ব ত্যাগিনী, তবু ভিক্ষা কর ? আমি কিছু ত্যাগ
করিনাই, আমি ভিক্ষা করিতে পারিব না।
মুক্ত। ভিক্ষায় কি সুখ আছে ?
মণি। তবে ভিক্ষা কর কেন ?
মুক্ত। সুখ বিসর্জন দিব বলিয়া।
মণি। আমিও সুখ বিসর্জন দিব বলিয়া প্রাণ সমর্পণ রূপ
ভিক্ষা চাই।
মুক্ত। ইহা অধিকতর সুখের আকাঙ্ক্ষা মাত্র।
মণি। তুমিই ত বলিয়াছ ইহাতে সুখ নাই।
মুক্ত। সুখ ও আকাঙ্ক্ষা সম্পূর্ণ পৃথক।
মণি। তােমার ত সুখ ত্যাগের আকাঙ্ক্ষা আছে।
রাজকন্যে ! চিত্ত সংযত করুন।
মণি। কেমন করিয়া।
মুক্ত। ভ্রান্তি।
মণি। লাভ?
মুক্ত। অধীর হইতে হইবে না, জ্বলিতে হইবে না, দুশ্চিন্তা থাকিবে
। প্রাণে শান্তি আসিবে।
মণি। তার পর।
মুক্ত। তারপর এ নশ্বর দেহ যাহার তাহাতে লয় পাইবে, এ
আত্মা যাহার তাহাতে মিশিয়া যাইবে। দুঃখের দীপ নিৰ্ব্বাণ লভিবে।
তবে এ দীপ জ্বলিল কেন ?
মুক্ত।
৩
'মণি।
মণিমালা
মুক্ত। গৃহস্বামীর ইচ্ছায় দীপ জ্বলিয়াছে, তাহারই ইচ্ছায় নিবিবে।
দীপের অত সংবাদ আবশ্যক কি ?
মণি। তুমি কোথা হতে এদেশে আসিলে ?
দেশ হতে দেশান্তরে, দেহ হতে দেহান্তরে, এই ত সকলেরই
পরিচয়।
মণি। তুমি একটা কিছু গাও।
মুক্ত। কি ভাবিতেছেন।
মণি।
ধূসর আকাশ, উদাস বহিছে বায়ু,
মাথাখানি ভার করি বিটপির কায়া
দাড়ায়ে নিথর ; কোথা যেন কিছু নাই,
কেহ যেন কিছু চাহে নাকো।
তাম্রবর্ণ রবিচ্ছবি যেন, চিত্রলেখা
চিত্রমত করেছে ধরণী। সব আছে,
প্রাণ নাই
মুক্ত। সুগত সুমতি দিন, আমি আসি।
মণি। এস, আমি দেখি আমার প্রাণ কই।
!
-
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক
সােমদত্তের গৃহ-সম্মুখ ।
সােমদত্ত। একটা কিছু চাই। আমি যে কি চাই তাহা নিজেই
বুঝি না। সারা দিন রাত্রি মণিমালার ধ্যান করি, অথচ তাহার কাছে
যখন থাকি, তখন যেন আমি কত দৃঢ়, অটল ও জিতেন্দ্রিয়। কেন
৪৬।
মণিমালা
এমন হয় ? বাসন্তীর কথা যেন মনেই আসে না।
কেন ? অথচ
আমার প্রাণ তার মাধুরীতে পরিপূর্ণ। আমি কোন্ কূল রাখি।
হায় আমার উন্মত্ততা ! কি পরিতাপ ! মানুষের এতটুকু প্রাণ,
সে আর কত সহিতে পারে? বাসন্তী কোথায় ? স্বর্গে! মণিমালা
কোথায় ? আমার প্রাণে ! এই পৃথিবীতে থাকিয়াও সে আমার পার্থিব
সম্পর্কের অতীত। এ জীবনে আর কোন আশা নাই। পর পারেই বা
কি আশা ! আমার ত কোন বৃত্তির স্থিরতা নাই। পর পারে যাহা চাই
তাহা আমার নাই। যে যাহা চায়, সে তাহা পায় না। না পাইলে
কষ্ট হয়, তবু মন প্রবােধ মানে না। না পাইয়া যে কষ্ট পাই তাহা যেন
কত মধুর! প্রাণ দিতে চাই, আর না দিতে পারিয়া আমার প্রাণ কত
কঁদিয়া উঠিতেছে। কি করিব। মণিমালা, আমার বেদনা তােমায়
জানাইতে পারিলাম না। যেদিন বাসন্তী আমায় মণিমালা উপহার
দিয়াছিল -হায়, হায়, আমার প্রাণ ভাঙ্গিয়া যায়।
(ধাবকের প্রবেশ )
ধাবক। তোমাকে অন্যমনা দেখিতেছি।
সােম। আসুন আসুন! চলুন ভিতরে যাই।
ধাবক। “ঘনঘাের তমােপুঞ্জ তালতরু কুঞ্জমম ছাইল গগন,
বসুমতী শেষ প্রান্ত নব জলধর সম আহা যেন হইল মগন।”
সােম। আপনি কবি ! তবে, এই স্থানেই বসুন, আপনি যাহাতে
তৃপ্তি পান আমি তাহাতেই প্রীত রহিব।
ধাবক। কি ভাবিতেছ হে,
যুদ্ধ বিগ্রহ।
ওটা তােমার পৈতৃক
ব্যবসা, কিন্তু তাহাতে কিছু লাভ নাই।
সােম। কিসে আছে ?
মণিমালা
৪৭
ধাবক। চুপ করে বসে কাব্য লিখ। জগতে কাহারো ধার ধারিতে
হইবে না।
সােম। সবাই যদি কাব্য লিখে, পড়িবে কে ?
ধাবক। কাব্য লিখিব নিজের জন্য, অন্যের কি যায় আসে। এতে
নিজের একটা বড় সুখ আছে।
সােম। সে স্বার্থপর সুখ ।
ধাবক। জগতের কোন্ সুখ নয় ?
সােম। তাও ত বটে।
ধাবক। আমি সভা হতে পালিয়ে এসেছি। তােমার অতৃপ্ত
বাসনায় আমি একটু তৃপ্তি পাব বলে।
সােম। আমার অতৃপ্ত বাসনা কে বলে ?
ধাবক। আমি একটা কাব্য লিখবো।
সােম। আপনি কি অন্তর্যামী ?
( হর্ষের প্রবেশ)
হর্ষ। এই যে, আমার যাত্রা সিদ্ধ হয়েছে, যাহা চাই সব হেথায়
দেখিতেছি।
সােম। আমার আজ সুপ্রভাত।
ধাবক। আমার এ মহাসন্ধি।
হর্ষ। কেন কবিবর, জীবনটা কি এতই দুঃসহ ?
ধাবক। জীবন যখন যায় গাে বয়ে
একলা তরীখানি,
কেউ চাহে না সঙ্গী হতে
ভরা প্রাণে রাণী।
৪৮
মণিমালা
আকুল হয়ে চাই গো যবে
সপে দিতে প্রাণ,
বিশ্বে যেন শুধুই এক
বিষম অভিমান।
সঙ্গী কেহ নাই বা হলে।
একলা বয়ে যাই,
প্রাণটি আমার যেতাম রেখে
নাই কি তারাে ঠাই ?
হর্ষ। সোমদত্ত কি বলে।
ধাবক। সুখ বল, দুঃখ বল, প্রেম, কি বিরহ,
বিষাদের অবসাদ, কিম্বা অহরহ
আল্লদের তীব্রতায় প্রাণে অস্থিরতা,
দিবানিশি আকাঙ্ক্ষার মিথ্যা একাগ্রতা,
যত কিছু বৃত্তি আছে, সকলের সাধ,
বিসর্জিয়া চিত্তে মাের দিতেছে প্রমাদ।
হর্ষ। অতি সুন্দর, কবি কি পুরস্কার চাও!
ধাবক। মহারাজ! আপনার উদ্যানে যে চন্দ্রমলী
প্রস্ফুটিত
হইয়াছে, তাহারই একটি দিবেন কি?
হর্ষ। সহস্র সহস্র দিব।
ধাবক। অত চাহি না। আমি আসি।
( প্রস্থান)
হর্ষ। তারপর, সেনাপতি।
সােম। আজ্ঞা করুন।
হর্ষ। আমি দেখিতেছি, তুমি
দেখিতেছি, তুমি সৰ্বকাৰ্যেই
সুপারগ। আমি
যখন তােমাকেই প্রধান সেনাপতি পদে বরণ করিবার জন্য মহারাজকে
মণিমালা
অনুরোধ
করিয়াছিলাম,
তখন। আমি স্বপ্নেও ভাবি নাই যে তুমি
সর্বকার্যেই এত বিচক্ষণ।
সােম। সমস্তই আপনার অনুগ্রহ ও শিক্ষামাত্র। কিন্তু কথা এই,
আপাততঃ কি কোন যুদ্ধ উপস্থিত ?
হর্ষ। কতকটা বটে। আমি তােমার বিবাহ দিতে চাই। পাত্রী
দেখিয়াছি, তােমার সহিত যুদ্ধ করিতে হইবে কি ?
সােম। আমি এমন স্পর্ধা রাখি না।
হর্ষ। তােমাকে আর অধিক দিন অবিবাহিত রাখা সঙ্গত বােধ
করি না।
সােম। মহারাজ! আমাকে আবার নির্বাসন দিন।
আমারও ইচ্ছ। তাহাই, তবে বিবাহটা দিয়া। পাত্রী
তােমার মনােমত হইবে—সে বিষয়ে তােমার চিন্তা নাই।
সােম। মহারাজ! বিশেষ স্নেহ করেন, তাই অপরাধ মার্জনা
করিবেন। আমার সিংহল বৃত্তান্ত ত সমুদয়ই অবগত আছেন।
হর্ষ। ভগবান কেন যে তােমায় কবি করেন নাই, বুঝিতে পারি
না। তাহা যাক, বিবাহটা তােমায় করিতে হইবে। সহজ হইবে না বটে।
সমাজ, ধৰ্ম্ম, দেশাচার, কুলাচার, রাজধৰ্ম্ম, সব বিসর্জন দিতে হইবে
সােম। মহারাজ! লঘু পাপে এত গুরু দণ্ড ব্যবস্থা কেন ?
হর্ষ। শুন, বাধা দিও না, জগতে কোথাও সুখ নাই।
প্রচলিত নিয়ম ভাঙ্গিয়া, এমন কি নিজেকেও নষ্ট করিয়া জগতে
একজনকেও সুখী দেখিতে পারি, তবে আমার জীবন সার্থক হইবে।
সােম। আপনি এমন কি গুরুতর কাৰ্যে প্রস্তুত, বুঝিতে
পারিতেছি না।
হর্ষ । আমি মণিমালাকে তােমার সহিত বিবাহ দিব।
যদি সব
৪
মণিমালা সােম। (নত জা) মহারাজ, রক্ষা করুন। হর্ষ। সােমদত্ত! তুমি কঁদিতেছ ? উঠ, উঠ। এ তোমার কেমন প্রকৃতি ! মুখ লুকাইও না, আমায় দেখিতে দাও। দেখি, তুমি পিশাচ কি দেবতা ! সােম। আমি পিশাচের অধম। আমায় ক্ষমা করুন। আমি যে কিসে সুখী হইব, আমি যে কি চাই তাহা নিজেই বুঝি না। সময় সময় ভাবি, মণিমালা যদি আমাকে প্রত্যাখ্যান করে, তবে সেই নিদারুণ মৰ্ম্মব্যথা আজীবন বহিতে পারিলেই বুঝি সুখ ; কখনাে ভাবি, যদি কখনও উভয়ের মিলন না হয়, দিবানিশি উভয়েই চিস্তারে জ্বলিত হই, তাহাতেই বুঝি সুখ ; জন্ম জন্ম মণিমালার জন্য নির্বাসন দণ্ড ভােগ করাই সুখ ; মণিমালা অটল রহিবে, আমি কেবল ক্ষিপ্ত হইয়া তাহারই সাধনা করিব-অথবা মণিমালার জন্য শুধু কষ্টই সহিব—তাহাতেই বুঝি সুখ। অন্য কোন সুখের আভাষ প্রাণে আসে না। হর্ষ। তুমি মানুষ নও। সােমদত্ত, তুমি বাসন্তীকে চাও ? সােমদত্ত। মহারাজ, পরীক্ষা করিবেন না। আমি মানুষ হর্ষ। তুমি দেবতা। তােমারি হাতে আমি মণিমালাকে সমৰ্পণ করিব। মহারাজকে আমি এবিষয় আভাষ দিয়াছি। তোমাকে উদ্ভ্রান্ত মত দেখিতেছি কেন ? সােম। সমস্ত সৃষ্টি যেন আপন আপন স্থানচ্যুত হইতেছে। আমি একবার মণিমালাকে দেখিব । হর্ষ। বেশ। এস, হাসিমুখে আমার সহিত দেখা করিয়া আসিও।
মণিমালা
পঞ্চম দৃশ্য
কান্যকুজ -প্রাসাদ
মণিমালা। গ্রীষ্মের প্রখরতার পর নবীন মেঘের সজলকাহিনী
বড় মধুর, কিন্তু আমার প্রাণে কিছুই শীতলতা আসিল না। ভিক্ষুণী যাহা
বলে, তাহার সত্য মিথ্যা কিছুই বুঝি না। সত্য হােক, মিথ্যা হােক,
বড় কঠোর। সোমদত্ত সুবর্ণ দ্বীপের সে নারীমুৰ্ত্তি ভুলিতে পারে নাই,
ভুলিবে কিরূপে ! সে ভুলিতে পারে না বলিয়াই ত আমি মরিয়া আছি,
সেই পায় আমি সমস্ত বিসর্জন দিয়াছি।
(সােমদত্তের প্রবেশ )
মণি।
সােম। মণিমালা !
মণি। কোন্ পাষাণী তােমার সর্বাঙ্গে কালিমা মাখিয়া দিয়াছে।
সােম। তুমি সচকিত কেন ?
তােমাকে অত্যন্ত বিষাদময় দেখাইতেছে।
সােম। কারণ আছে। বাতাস একটু শীতল হইয়াছে বরষার
আশায়, ফুলে সুগন্ধ অধিক হইয়াছে বরষার ভয়ে, তরুরাজি নিষ্পন্দ,
দামিনীর খেলা দেখিবে বলিয়া, আমার প্রাণ শূন্য হইয়াছে এই অপূর্ব
প্রকৃতির লীলায় আদরের কোন স্থান না পাইয়া। মণিমালা
মণিমালা। তােমার এ কোন্ ভাব দেখিতেছি।
সােম। আমার জীবন ধন্য হইয়াছে। মহারাজ শ্রীহর্ষ
বলিয়াছেন, তিনি ধৰ্ম্ম, কৰ্ম্ম, ন্যায়, তত্ত্ব সব বিসর্জন দিয়া আমাকে
সুখী করিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। মণিমালা, কিছু বুঝিতে পার ?
মণিমালা
দেখাইব?
মণি। শেঠজীর কন্যার কি কোন সংবাদ পাওয়া গিয়াছে। আমায়
ছুলনা করিও না, আমি সুখী হইব।
সােম। মণিমালা, আমি সেই সংবাদ জানিবার জন্য তােমার নিকট
আসিয়াছি।
•মণি। সেই ধন্য যে তােমাকে পাইয়াছে, তাহারই গৌরব
আকাঙ্ক্ষিত যে তােমাতে লয় হইয়াছে, তাহারই সাধনা সার্থক
যাহাকে তুমি দিবানিশি মনে রাখিয়াছ।
সােম। সে যদি কেহ থাকে তবে সে তুমি ! এ প্রাণ কাহাকে
এই যে আকাশভরা মেঘ, নীলকান্তি-বনরাজি-সঞ্চালিত
শীতলপবন, ঈষৎ তরঙ্গায়িতশস্যপূর্ণ প্রান্তরচুম্বিত কলভাষিণী স্রোতস্বতী,
কই, আমার এ অসহনীয়তা প্রশমন করিবার স্থান এ জগতে কোথায়ও
নাই ত !
বিপত্তিময় জীবনের কোথায়ও কোন শান্তি নাই ত!
মণিমালা !
মণি। তুমিই ধ্যান, তুমিই জ্ঞান, তুমি আমার মােক্ষ, তুমি আমার
সৰ্বস্ব। তােমার প্রাণে আমায় লয় হইতে দাও।
সােম। মণিমালা মহারাজ শ্রীহর্ষ বলিয়াছেন—
মণি। শুন। আমার প্রাণ বড় ব্যাকুল ছিল, তুমি দেখা দিলে
কেন? আমি কি ভাবিতেছি, কি করিতেছি, কেন এমন হইলাম
কিছুই বুঝিতে পারি না। আমি যেন অন্ধ, কিছু দেখিতে পাই না ;
আমার চিত্তবৃত্তি কেন এমন হইল ! আমি একাকিনী বসিয়া ভগবানের
নিকট কত প্রার্থনা করি, কত কাদি, কিন্তু কিছুতেই আমার
প্রাণের ভার লাঘব হয় না। এ বিশ্বে আমার এত আছে; কিন্তু
কিছুই যেন আমার নয়। কোন সুখেই আমার তৃপ্তি নাই, আমার
যেন কেমন শুধু কষ্ট পাইতেই ইচ্ছা হয়, দুঃখে যেন আমি ভাল থাকি,
;
মণিমালা-
এ তীব্র অবস্থায় আমি কালি সারা রাত্রি বিভাের ছিলাম, অকস্মাৎ
কাহার করুণ ক্রন্দন আমার প্রাণ চমকিয়া দিল। ভিক্ষুণী গাহিতেছিল।'
সােম। ভিক্ষুণী কে ? তাহার আদি নিবাস কোথায় ? কিছু
পরিচয় জান কি ? সে আমার সাক্ষাতে আসে না, আসিলেও আমি
যেন কেন মূচ্ছাপন্ন হই। আমি তাহাকে কোথায় দেখিয়াছি, সে যেন
আমার বহু পরিচিত, সে যেন আমার নিতান্তই আদরের কিছু, কে সে?
মণি। আমি ত কিছুই জানি না।
সােম। তুমি তাহাকে ভালবাস বলিয়াই কি আমি তাহাকে
প্রীতিময় দেখি, এ বিষয় কত চিন্তা করিয়াছি, কিন্তু কিছুই নির্ণয় করিতে
পারি নাই। আমি তাহার কথা ভাবিতে কত আনন্দ পাই। সে তােমাকে
দীক্ষা দিবে, আমিও কি তাহার নিকট শিক্ষা পাইতে পারি না?
মণি। আমি এ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিব।
সােম। আর একটা কথা জিজ্ঞাস্য আছে। মণিমালা, নগরে
দেখিলাম, আমি সুবর্ণদ্বীপে যে সমুদয় চিত্র অঙ্কিত করিয়াছিলাম
তাহার দুই একখানি এদেশেও আসিয়াছে। আরো সংবাদ পাইলাম
বাসন্তীর আত্মহত্যা বা ঐরূপ কোন কথা মিথ্যা, তাহার পিতার
দৃঢ়বিশ্বাস সে বাঁচিয়া আছে, অনুতপ্ত শান্তনুই আত্মহত্যা করিয়াছে,
আমি যত সংবাদ পাই তাহাতে বুঝি যে, বাসন্তী বাচিয়া আছে।
যে তােমায় ভালবাসিয়াছে, সে মরিতে পারিবে না।
সােম। তাহাকে যদি পাই, তুমি গ্রহণ করিবে ত ?
মণি। ইহাতে কোন সন্দেহ করিও না।
সােম। তবে আজ আমার অপার আনন্দ। সে তােমাকে
নিশ্চয়ই ভালবাসিবে। তােমাতে লয় হইয়া থাকা ভিন্ন আর তাহার
কোন জ্ঞান থাকিবে না, ইহা নিশ্চয়। তুমি কঁদিতেছ ?
মণি।
মণিমালা
মণি। তুমি সুখী হও, তাহাতেই আমি সুখী হইব।
( প্রস্থান)
সােম। মণিমালার এ কি ভাব! মণিমালা ভুল বুঝিয়াছে। কি
বুঝিয়াছে তাহা ত কিছু প্রকাশ করিল না। আমি কি বলিতে কি
বলিলাম ? শুধু ভাবিতেই জানি, কথা বলিতে জানি না। মণিমালা কি
ভাবিয়াছে ? আমি এখনো তাহাকে ভালবাসিতে শিখি নাই, নতুবা আমার
প্রাণ তাহার প্রাণের কথা বুঝিতে পারিল না কেন ?
(শ্রীহর্ষের প্রবেশ )
হর্ষ। কি সংবাদ ?
সােম। অকস্মাৎ কাল বৈশাখী কোথা হইতে আঁধার আনিয়া শঙ্কিত
করিয়া তুলিয়াছে। ইহাতে ঝটিকা বা তৃপ্তিদায়ী বরষা, কি হইবে জানি
।
হর্ষ। আমি এই পথেই আসিতেছিলাম। সহসা তাহার সহিত
দেখা। তাহার মুখ দেখিয়া আমি স্তম্ভিত হইয়া পড়িলাম। আমি
তাহার শিরচুম্বন করিয়া বলিলাম—সারা বিশ্ব আমার বিপক্ষ হইলেও,
আমি তােমাকে সুখী করিব। সে কঁদিল। তাহার আননে কি দৃঢ়
প্রতিজ্ঞা দুশ্চিন্তার ছায়া মাখাইয়া দিয়াছে, অথচ আনন্দের তুফান সারা
অঙ্গে ভরিয়া উঠিয়াছে। আমি ত কিছুই বুঝিলাম না।
সােম। মহারাজ, আমার অদৃষ্ট মেঘাচ্ছন্ন।
হর্ষ। তুমি কাতর হইতেছ ?
সােম। আমি বলিয়াছি, আমি দুঃখেই ভাল থাকি।
দুর্বোধ্য সমস্যাই আমার প্রাণের আকাঙ্খ।
হর্ষ। সােমদত্ত, আমি প্রকৃত তথ্য জানিবার জন্য অস্থির হইয়া
জটিল ও
মণিমালা
উঠিতেছি। কিন্তু মণিমালার সহিত তােমার বিবাহ দিব ইহা আমার স্থির
সঙ্কল্প।
( মুক্ত ভিক্ষুণীর প্রবেশ )
মুক্ত। মহারাজ ক্ষান্ত হউন।
সােম। তুমি বাসন্তী ! এ কি স্বপ্ন! ( অগ্রসর হইয়া) ভগবান
তুমি ধন্য।
(মূচ্ছা)
হর্ষ। ভিক্ষুণি, এ কি করিলে ?
মুক্ত। এ মুচ্ছা সহজে ভাঙ্গিবে না।
হর্ষ। কোথায় কে আছ !
( অন্যান্য লােকের প্রবেশ)
বাস। মহারাজ, আমি আর সহিতে পারিব না, আমি চলিলাম।
হর্ষ। ভিক্ষুণি, তুমি পাষাণী ।
মুক্ত। সময়ান্তরে এ কথার উত্তর দিব। এখানে থাকিলে এ পাষাণ
গলিয়া যাইবে।
( প্রস্থান)
হর্ষ। আচাৰ্য্য ও ভিষবরকে সত্বর আহ্বান কর।
চল ইহাকে
উন্মুক্ত বাতাসে লইয়া যাই।
( সকলে মুচ্ছিত সােমদত্তকে লইয়া প্রস্থান)
তৃতীয় অঙ্ক প্রথম গর্ভাঙ্ক পথ। ( ধাবক ও শ্রীহর্ষ ) ধাবক। দূরে থােক, বহু দূরে, অভিমত ধন- অনুকূল থাকে যদি অদৃষ্ট লিখন, মিলন হয় গাে শেষে ; বাধা নাহি তার মনােবৃত্তি নাহি করে দূরত্ব বিচার- হর্ষ। তা ঠিক বলেছ, বেশ হয়েছে তাতি সুন্দর সত্য কথা, এই আমার অঙ্গুরীয়ক এ শ্লোকের পুরস্কার। নাটিকা আদ্যোপান্ত অতি চমৎকার—তুমি যে নিষ্কর ভূমি সম্পত্তি পেয়েছ তাতে ভরণ পােষণ হবে ত? ধাবক। মহারাজের কৃপায় রাজ্যের ত কাহারও অভাব নাই, বিশেষতঃ সে রম্য উদ্যানে, ভবৎ সদৃশ স্নিগ্ধ মলয় আমােদ বিতরণে সদা প্রমােদিত। অলঙ্কার ঝঙ্কারে তােমার কাব্যোদ্যান মুখরিত হােক, আমায় দিলে তাহা প্রিয়সখীর বিরহানলে শূন্যে মিলাইয়া যাইয়া বিরহ দ্বিগুণ হইবে। ধাবক। ভাল যদি নাহি বাসো নাহি কোন ক্ষতি, ঘৃণা যদি কর মােরে তাহে সুখ অতি ; হর্ষ।
মণিমালা
ভালবেসে রাখে দূরে, জানায় ছনা,
অবহেলা করি যারে--ভুলিতে পারি না।
হর্ষ। ইহা হৃদয়ের কথা, একমাত্র কবির বীণায় প্রকাশ, আর কে
তাহা পারে, এ কথায় তােমায় আর কি দিব।
যে পুষ্পমাল্য, চিতের
চঞ্চলতা যাহাতে লােকে না দেখিতে পায়, সেই জন্যই যাহার বক্ষে
ধারণ, তুমি তাহাই লও। তাহার সহিত হৃদয়ের অতি ঘনিষ্টতা ছিল।
আমি এখন স্থির চিত্ত হইয়া তােমার বাক্যেই চিত্তবৃত্তির ভাবান্তর
সকল শুনিয়া অবহিত রহিব।
ধাবক। তা বটে,
তা বটে, তবে-
* -
হিয়ার মাঝারে-মদন তাড়ন
করেছে আকুল দেহ ;
শয়নেতে মন রহেনা মগন,
কেমনে ছাড়িব গেহ।
কোথা রসরাজ গােপনেতে আজ,
কোথা বা বাজায় বাঁশী,
কোন্ বন হতে সমীর সহিতে
সে কথা পরাণে আসি
করেছে আকুল ;
চামেলি চাপার বাসে
সারা নিশীথের
দুঃখ বহনের
মরণ ঘনায়ে আসে!
সেফালি বকুল
হর্ষ। আহ, অনেক দিন তােমার এ বিরহ ব্যাখ্যা শুনি নাই।
মণিমালা
(বয়স্যের প্রবেশ)
বয়স্থ। আমি তাহাই শনিবার জন্য আসিতেছি।
কি বলেন
মহারাজ! আমি কি ভাগ্যবান নই ?
হর্ষ। মহারাজ রাজ্যবর্ধন যাহারবচনে তুষ্ট, তিনি কেননা ভাগ্যবান
হবেন ?
বয়স্য। বস্তুতই আমার ভাগ্যে বান আসে, কিন্তু আবার সেই দণ্ডেই
তাহ নিৰ্ব্বাণ হইয়া যায়।
খাবক। সে কিরূপ?
বয়স্য। মহারাজ মণিমালার হাস্যমুখ দেখিয়া
দেখিয়া আশ্বস্ত হইয়া
আমায় বিশেষ সন্তুষ্ট করিলেন, আমিও সহাস্যে গৃহে আসিয়া কামিনী
কাঞ্চন যােগ করিলাম। আকাশে বাম্প
বাস্প হইলেই মেঘ ও সঙ্গে
সঙ্গে বৃষ্টি হয়। আমারও কামিনী কাঞ্চন যােগে যাহা হইবার তাহা
হইল। সবই তৃণসম ভস্মীভুত হইবার সুযােগ হইয়াছে, ব্রাহ্মণী
তাহা জঠোর ব্রতে নিঃশেষিত করিতেছেন। আবার ভিক্ষায় চলিলাম,
তাই বলি ভাগ্যে বান আসে, কিন্তু টিকে না।
হর্ষ। যাহা আসে তাহাই যায় ইহাই বিশ্বের রীতি, কিছুই চিরকাল
থাকে না, ইহাতেও আপনি সৌভাগ্যবান্ ।
হর্ষ। ভাল, ওহে কবিবর বয়স্যকে নায়ক করিয়া আর একখানি
রত্নাবলী লেখনা কেন। তােমাদের কাব্যে ত যাহা নাই তাহাও হয়, তবে
সাগরিকার বিহীনেও ত চলিতে পারে—যদি তাহাতে ব্রাহ্মণী শান্ত হয়েন।
বয়স্য। না, না তা চাহি না,-বেশ আছি, একটু গরমে থাকি।
ও সব লইয়া তােমরা থাক, আমি আঁধারে রয়েছি ভাল, চাহি না
আলােক। কি বল কবি।
ধাবক। বটে। যদি সে আলোক হয় শীতের প্রখরা ।
e
মণিমালা
!
হর্ষ। সহিতে নরেন শিব কি কথা আমরা ?
বাস্য। বাঃ মহারাজও কি কবি হইলেন।
হর্ষ। আমি রত্নাবলীর মত প্রিয়দর্শিকা-নামে নাটিকা রচনা
করিতেছি, কবি হইতে ইচ্ছা হয় ।
বয়স্য।
কেন ?
হর্ষ। প্রাপ্তির আশায় অপ্রাপ্তির অশান্তি লইয়া চিত্তবৃত্তি উচ্ছলিত
করিবার জন্য।
( মুক্ত ভিক্ষুণীর প্রবেশ )
গীত
কে যাবি তরিতে, আয় গাে ত্বরিতে,
এখনাে পারিতে যেতে ভব নদীপার।
গাঙ্গে বহিছে তুফান, তাহে নাহি ভয় প্রাণ,
সুবাতাস বহমান পাল দিব তার।
যে মাঝি পেয়েছি আজ, নাহি অলসতা কাজ,
চল দরিয়ার মাঝ, দেখিব ওপার ।
এ পারে বসিয়া রলে, বেলা যায় দূরে চলে,
এই বেলা নাহি গেলে, আসিবে আঁধার।
এ অলােক আর ফিরে আসিবে না আর।
বয়স্য। (স্বগত) ভিক্ষুণি, তুমি যে প্রেমে ভিক্ষুক এ জগত আর
তাহা কে দিবে (প্রকাশ্যে ) বাঃ বেশ গাও ত।
বাবক। আবৃত্তির অনুভাব যেন মরমে মরমে পশিয়া যায়।
হর্ষ। ভিক্ষুণি ! তােমার কোন প্রার্থনা জ্ঞাপন কর।
যুক্ত। মহারাজ কি দিতে পারেন ?
মণিমালা
৫
=
হর্ষ। তাহা কি আমার চেষ্টারও অসাধ্য ?
মুক্ত। এমন কি কিছু এ বিশ্বে আছে যাহা চেষ্টার অসাধ্য ?
হর্ষ। তুমি আমায় লজ্জা দিতেছ।
মুক্ত। আমি সামান্য। তাই আপনাকে সামান্যই দিতেছি। লজ্জা
অতি সামান্য, সকলেই পায়, সকলেই দেয়, কিন্তু কেহ ভাবিয়া
দেখে না।
হর্ষ। কি চাও ভিক্ষুণী ? তুমি অতি জ্ঞানবতী, যথার্থ ভিক্ষুণী।
মুক্ত। ভিক্ষায় আবার জ্ঞান কি মহারাজ, অজ্ঞানতা চাই, আমি
যাহা চাই দিবেন কি
হর্ষ। বল, অবশ্য দিব।
মুক্ত। তাহা এখন চাহি না, আবশ্যক হইলে প্রার্থনা জানাই।
বয়স্য। রামের বনবাস নয় ত ?
মুক্ত। তা না হলে আজ আপনার সীতায় কে জানিত। আমি
চলিলাম।
হর্ষ। কোথায় ?
পথে।
বয়স্য।
(প্রস্থান)
ধাবক। অদ্ভুত।
ভগবানের রাজ্যে কতই আছে।
হর্ষ। ভিক্ষুণী যাহার ভিখারী, আমার প্রাণও যেন সে ভিক্ষার
জন্য কেঁদে উঠছে। হিন্দুধ কত অবতার এল, খষ্টানের খৃষ্ট এল, মুসলমানের
মহহ্মদ এল, ভারতে অবার বুদ্ধ এল—কত আসিতেছে কিন্তু জগতের ভ্রান্তি
ঘুচিতেছে কই। দুদিনের জন্য আলােক আসে, ধৰ্ম্মের সংস্কার হয়—
ধর্ম বিপ্লব ঘটে, আবার যা তাই ; দুদিন পরে আবার ধৰ্ম্মের আত্মা রহিত
মণিমালা
করিয়া পরিবর্তনশীল ধৰ্ম্মের বাহদেহ লইয়া বিবাদ আরম্ভ করে। ধর্ম
কোথায় যায়। কবি, তুমি ত কই ধর্মের কথা কিছুই বল না।
ধাবক। মহারাজ! সব গােল হয়ে যাবে বলে ভয়ে কিছু বলি নাই ;
আর বুঝিও না তেমন। যাহাতে চিত্তের প্রবৃত্তি হয় ও যাহাতে অপরের
মুখে ম্লান ছবি না দেখিতে হয়, তাহাই করি।
বয়স্য।
স্ত্রীকে ত সবাই ভালবাসে—কেউ দেখায় চুম্বনে, কেহ
আঁখি ঠারে, কেহ বা মুখােমুখি বসে, কেহ বা সাড়ি দেয়, কেহ বা সি থি
দেয়, কেহবা চরণে লুটিয়া পড়ে—কিন্তু প্রধান ইচ্ছা ভালবাসা। আর
ওসব ছাই ভেবে কি হবে। লােকের হিত কর, দরিদ্রকে ভর, আর
এ ব্রাহ্মণকে পরিতােষ করে আহার করাও-মােক্ষ হবে।
হর্ষ। এ ঘাের কি ভাের হইবে না।
ধাবক। হবে—যেদিন প্রেম জগতের একমাত্র ধর্ম হবে।
তা ঠিক বলেছ । নিশি শেষে যখন একটু প্রেমাতুর হইয়া
নিদ্রায় বিভাের হইতে চাই, তখনই ব্রাহ্মণী উঠিয়া প্রাতঃস্নানের
ব্যবস্থা করিয়া আমায় নবমীর পশু করিয়া তুলেন।
বয়স্য।
(পরিচারক )
পরিচারক। মহারাজ, সভায় কবিবর ভবভূতি দেশপৰ্যটন ক্রমে
উপস্থিত।
এস সখা ! বয়স্য আসুন, চিত্ত অস্থির হইয়া উঠিতেছে
বিদেশী কবির অভ্যর্থনা করিবেন চলুন। কবি বলিয়াছেন, যাহােক,
তাহােক আমি রামের অঙ্গ স্পর্শ করিব, আমিও ভিক্ষাচরণ করিব।
বয়স্য। মা ফলেষু কদাচন। সুপক্ক ফল পাইলে ব্রাহ্মণকেই দিও।
ধাবক। তা বটে, যদি বাসবদত্তা অকাল বাতাবলী হইয়া না আসেন।
মণিমালা
হর্ষ। সখা, তুমি কি আমার হৃদয়ে ? অথবা ইহা তোমার
কবিত্বশক্তি।
( প্রস্থান)
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক
(রাজ্যবর্ধনের প্রাসাদকক্ষে মণিমালা পাঠে রত)
মণি। না, ভাল লাগে না, এতে নূতনত্ব কিছুই
এতে নূতনত্ব কিছুই নাই। ঐ
এক কথা, বাসনা নিৰ্বাণ কর। কেমন করে নির্বাণ করি, তা কেও
বলে না; শুধু বলে ভাবিও না, কেমন করে ভাবনার নিবৃত্তি হয় ? না এ
আর পারিব না। ( উঠিয়া গবাক্ষধারে গিয়া )
মুগ্ধনেত্রে সন্ধ্যা আসে,-মুগ্ধনেত্রে রবি
ডুবে যায় তরুর ছায়ায়, আকাশের
সারা অঙ্গ ভরি দিয়ে যায় হতাশ্বাসে
শেষ প্রীতিটুকু। এরও বাসনা আছে,
শেষ হয়, তবু ফিরে চায়।
পাতা কাপে সমীরণ আসিবে বলিয়া,
শাখা কাপে পাখী সব আসিবে কুলায়,
ফুটে ফুল সন্ধ্যায় আমােদ দিতে, কোথা
বাসনা অভাব ? যাহা সৰ্ব্ব সৃষ্টিময়-
তাহার নির্বাণে, কেমনে না জানি, হবে
মােক্ষ ফলােদয়,—তবে, সৃষ্টি কি লাগিয়া-
ওকে সােমদত্ত!-না ছি, আর চাহিব না।
মণিমালা
আমি ত নিৰ্ব্বাণ লোভী। দেখি,-দেখিব না।
অনিমেষ মাের পানে, আছে সে চাহিয়া।
ফিরে ভুলিলাম—আর দেখিব না। যাই
এখনও চাহিয়া-আছে। অমনিত চিরদিন
-এখনো ফিরিতে পারি।
কে গায় ?
সােমদত্ত সাম গান করে ভাল—ছি--না। দেখি এ পুস্তকে কি আছে।
কাষ্ঠ শেষ হইলে অগ্নি নিভিয়া যায়, তবে দেহ শেষ হইলে বাসনার নিবৃত্তি
হয়, কেমন-তবে দেহ থাকিতে নয় ?
(মুক্তার প্রবেশ )
মুক্ত। না কেন ?
মণি। ও—তুমি! তা গাও ত একটা গান শুনি-
গীত
অশােক কর সশােক হৃদি।
হৃদয় কর শান্ত রে।
আমি চরণে দলি বাসনাগুলি
নিৰ্ব্বাণ লভি অন্তরে।
মণি। ভিক্ষুণী তুমি গান গাইয়া কি সুখ পাও ?
মুক্ত। এক গান গাহিবার ইচ্ছ। ভিন্ন আর কোন বাসনা প্রাণে
থাকে না।
মণি। তবু একটা বাসনা থাকে।
এ বাসনা নিভিতে কতক্ষণ।
মণি। ভিক্ষুণি, তােমার পরিচয় দাও, তুমি প্রতিশ্রুত আছ।
৩৪,
মণিমালা
মুক্ত। সুগত তােমায় সুমতি দিন। পরে একদিন সময় মত
বলিব।
মণি। আমি সােমদত্তকে কি বলিব ?
মুক্ত। আমার পরিচয়ে তাহার কোনই আবশ্যকতা নাই, তিনি
অামায় ভালবাসেন, ভালই ; তাহার দয়াদ্র চিত্তে সুগত আরো
লােকহিতকর ধর্মসাধনা দিন। আমি কি কাহাকেও শিক্ষা দিবার
যােগ্যা!
মণি। তবে তুমি আমার এত করিতেছ কেন? আমাকে কোন
পথে লইয়া যাইবে গো।
মুক্ত। সুগত তােমাকে সুমতি দিবেন।
মণি। কেন, আমি কি কুমতির কাজ করিতেছি ? আমার বাসনা
আছে ? কাহার নাই ? আর সকলে যদি বাসনাহীন হয়, তবে সৃষ্টি
থাকিবে কোথায় ? বাসনা আমার জন্য নয় ? কেননা, আমি বিধবা ?
অদৃষ্টের কি উপহাস! যাহাকে প্রায় দেখি নাই, যার কথা কখনাে শুনি
নাই, যার আলাপনে কখনাে বুঝি নাই যে আমি কেমন সধবা, তাহার
বিহনে আমার জীবন, মরুভূমির মত শুধু দগ্ধ হইবার জন্য
পতিত রহিবে। নিজে জ্বলিব, অপরে মরিবে, লালসার মরীচিকায়
আমি বিশ্ব ধ্বংস করিবার জন্য জীবন ধারণ করিয়াছি কি ? আমিই না
হয় বাসনার বিসর্জন দিলাম, তাহাতে অপরের কি ?
মুক্ত। রাজকন্যে, আপনি যে পথে চলিয়াছেন, তাহাতে শান্তি নাই;
পাত মধুর সে পথ প্রচ্ছন্ন বিপদসঙ্কুল, বাহ্যত তাহা দৃষ্টিগােচর না
হইলেও পরিণামে অতি ভয়ানক। এ নর দেহ নষ্ট হইলে, প্রেম বা
লালসা কিছুই থাকিবে না। যাহা অবিনশ্বর, যাহাতে অনন্ত তৃপ্তি,
আপনি তাহাই লাভ করিবার চেষ্টা করুন।
মণিমালা
. ৬৫
==
মণি। (স্বগতঃ )
ঐ সেথা করতলে রাখি তার মাথা
একান্ত নয়নে চাহি আছে মাের পানে।
কে সে ? না না, আর চাহিব না, পারি কই!
—এই ফিরিলাম।
মুক্ত। যাহা কিছু চিন্তা করা যায়, তাহা কি সব বাস্তবিক সম্ভব ?
যাহা অলীক তাহার জন্য জীবনের অত মায়া করিয়া কি ফল হইবে।
আকাশ কুসুম আকাশেই ফুটে, পৃথিবীর সামান্য ধূলা স্পর্শ করিবারও
তাহার সাধ্য নাই ।
মণি। তুমি ঠিক বলিয়াছ। কিন্তু আমি যে মিথ্যায় ছিলাম বেশ।
নিজের স্বপ্নরাজ্য নিজে গড়িয়া, নিজে ভাঙ্গিম, তাহাতে বেশ সুখী
ছিলাম।
সে কথা মিথ্যা। আকাঙ্ক্ষার মরীচিকায় সুখ নাই, কেননা
তাহা আধার শূন্য, ছায়া মাত্র, তাহাতে আর কিছু নাই। তাহাতে ছায়ার
শীতলতা নাই, বরং তীব্র উত্তাপ আছে। তাহাতে কি সত্যই কোন সুখ
আছে?
মণি। না। তােমার সব কথাই ঠিক। তুমি একটী গান গাও।
আমি চিত্ত স্থির করিব।
মুক্ত। মহারাজ আসিতেছেন।
মণি। কই,কোথায় ?
মুক্ত।
(রাজ্যবর্ধনের প্রবেশ )
রাজ্য। এই মা, আমি এসেছি।
মণি। পিতঃ, এক ভিক্ষা চাই।
মণিমালা
রাজ্য। তুমি ভিক্ষা ল’বে ? কি আছে অদেয় তােমা?
মণি। মােরে ফিরাবে না, কহিবে না, না !
রাজ্য।
এ কথা অধিক মাত্র। সরলা বালিকা,
জানে না পিতার মায়া।
মণি। আমি ভিক্ষাব্ৰত ল’ব, পিতঃ !
রাজ্য। বিনামেঘে বজ্রাঘাত, তাও সম্ভব,
বাছা, তাের এ কথার চেয়ে ! ছলনায়
একথা, ওঃ, তাও শেল সম হানে প্রাণে!
মণি। আমি সত্যই তাই চাই।
রাজ্য। এ তাের কোন ভাব ? আঁখি দুটী জলে ভরে আছে, তবু
যেন তাহাতে কি দৃঢ় সঙ্কল্পের আভাষ পাইতেছি। তাের প্রশ্বাস কত
খর বহিতেছে, শুধু অনভ্যস্ত বলিয়া অবশে মৃদু হইয়া আসিতেছে।
কোথা যাবি ? কেন যাবি ? হতভাগিনি, জন্মাবধি মাতৃহীনা ; বিবাহ
না হইতেই বিধবা ; আমি তােরে বুকে ধরে পালন করেছি, আজ
কোথা যাবি? আমি শুনিতেছি তাের কেমন ভাবান্তর হইয়াছে। গৃহে
বসিয়া যথেচ্ছ ধর্মাচরণ কর।
ভিক্ষুণি !
এসব তােমারি কাজ।
তুমি কি পাষাণির মেয়ে ? তুমিও কাদিতেছ। মণিমালা, কোথায়
যাইবি !
মণি।
এক দিন ত সকলেই যাইবে। কেহই এ জগতে চিরকাল
রহিবে না ! অনিত্য মায়া ও মােহ এই মহামুল্য জীবনকে নষ্ট করিবে
কেন ? আপনার যদি এত দিন স্বর্গলাভ হইত, আমি আজ কোথায়
থাকিতাম,—কি করিতাম—ইহার কিছুই ত আপনাকে কোন শােক দিতে
পারিত না। একে একে সকলেই যাইবে, ধৰ্ম্মপথে পথ শীঘ্র হইবে
বলিয়াই আমি ভিক্ষাব্রত গ্রহণ করিতে প্রয়াসী।
মণিমালা রাজ্য। সে পথ বড়ই কঠিন। তাহাতে কত বাধা, কত বিঘ্ন, কত প্রলােভন ! সৎগুরু চাই, সে পথের শিক্ষা চাই, শরীরে সামর্থ চাই, ইহা অনায়াস লব্ধ নহে, বাছা। বিশেষতঃ গৃহে অবস্থান করিয়া ধৰ্ম্ম- যাজনা সৰ্ব্বাপেক্ষা শ্রেয়। মণি। তাহাতে বাসনার সম্যক নিৰ্বাণ কই ? রাজ্য। ভিক্ষুণি, আমার সােণার পুত্তলিকা কোথায় লইয়া যাইবি ! মুক্ত। মহারাজ, পুত্তলিকা বিদায় দিতে অত অধীর হইবেন না। রাজ্য। তুমি ঠিক বলিয়াছ। কিন্তু তােমর নবীন বয়স, তুমি সংসারের কিছু জান না। মায়া বলিয়া যে বিধাতার একটা আশ্চৰ্য্য সৃষ্টি আছে, তাহার রেখা তােমাতে কোন কষ্ট দিতে পারে নাই। তুমি আমার প্রাণ বুঝিবে না। ভাল, আমি কালি প্রাতে এ বিষয় স্থির নিশ্চয় করিব। মণি। পিতঃ ! রাজ্য। বিষম সমস্যা। মুক্ত। তাহা ত জীবন ভরিয়াই আছে। কিন্তু এত দিনে তাহার কোন বিষয়ের কিছু মীমাংসা হইল কি? রাজ্য। না। মুক্ত। তবে আর কেন ? মণি। (স্বগতঃ ) সে এখনো বসিয়া আছে। আমি এখনাে ভুলি নাই। হায়, এইবার নিশ্চয় কি বলিতেছি তাহাকে ভুলা যে অসম্ভব! (প্রকাশ্যে ) পিতঃ, আমাকে বিদায় দিন। এই বিশাল রাজ্য, সম্পদ ইহার কিছুই আমার নহে। আমি তাহা জীবনে স্বপ্নেও বােধ হয় আকাঙ্ক্ষা করি নাই। আমি বিধবা, কোন সুখে আমার স্পৃহা নাই। বৈদিক ধৰ্ম্মে আমি শান্তি পাইব না বলিয়াই ভিক্ষাচরণ করিব।
মণিমালা রাজ্য। আমি এ প্রার্থনার জন্য যে একেবারে প্রস্তুত ছিলাম না, তাহা নয়। তবু, তবু যে কি তাহা তােমাকে কি করিয়া বুঝাইব। যাহার সন্তান আছে, সে বুঝে। আমি মহারাজ রাজচক্রবর্তী, আর আমার কন্যা ভিক্ষুণি ! আমার এই বৃদ্ধ বয়স, আমি একমাত্র সন্তান হারা! এ কি স্বপ্ন ? এ কি প্রহেলিকা ? এ কোন্ মায়াবীর খেলা ? আমি নিজেকে বিশ্বাস করিতে পারিতেছি না! এক রাজকুমারের ধর্মসাধনায় আজ অর্ধজগৎ আলােকিত, তুই মা কি তেমনি পুণ্যবতী! তাের ধৰ্ম্মমহিমায় জগতের সামান্য একটু মলিনতাও দূর হইবে কি? আমার প্রাণ আনন্দে ভরিয়া উঠিতেছে। আয়, মা। আমি তােকে নিজে সাজাইয়া দিব। ভিক্ষুণি, তােমার চোখে জল কেন ? আমার বিশ্বাস তােমার রূপান্তর আছে, কিন্তু তুমি স্নেহশীলা। আমি তােমার হস্তে আমার এই জীবন সৰ্ব্বস্বকে অর্পণ করিলাম। ভগবানের ইচ্ছা পূর্ণ হউক। মুক্ত। মহারাজ, আপনার আশীৰ্বাদ মঙ্গলময় হউক মণি। (স্বগতঃ ) কই, আমি এখনো প্রাণ ফিরাইতে পারি নাই, সে এখনাে বসিয়া আছে। রাজ্য। কে কোথায় আছ, শ্রীহর্ষকে সত্বর আহ্বান কর, আমার পুনরায় সংসার আরম্ভ হইল। জীবনের এক অঙ্ক শেষ হইয়া নূতন অঙ্কে আমাকে নূতন প্রাণ আনিয়া দিল। তুমি বাসনা নিবৃত্তি করিবে, আমি কৰ্ম্মবীরের বাসনা প্রাণে স্থান দিব। নতুবা আমার উপায় নাই। এস মা! (প্রস্থান)
মণিমালা
'৬৯
তৃতীয় দৃশ্য
বয়স্য ও ধাবক
বয়স্ক। মন্দ হয় নাই, যঃ পলায়তি সঃ প্রাপ্নোতি, এ প্রেমময় জীবন
যে ছাড়তে পারে তারই লাভ। এ সব কবিতায় আসে না, জীবনে ঘটে ।
ধাবক। তবু ব্যাপারটা কিছু কাব্যময় হইয়া পড়িয়াছে, কোথাও
কিছু নাই হঠাৎ এ পরিবর্তন ?
বয়স্য। হলে অমনিই হয় ; কোথাও কিছু ছিল না, সব ছিল
আঁধার ; আলাে হলো, আকাশ হলো, পাতাল হলো, কত কি হলো, কাঠে
থাকে চিনি, মাঠে লতায় থাকে গম, গরুর পেটে থাকে দুধ, হতে হতে
কিন্তু পাকা ফলাহার হয়ে যায়।
ধাবক। মহারাজ অবশ্য কত কষ্ট পেয়েছেন।
বয়স্ক। কিছু না। গৃহে ভাৰ্যা নাই সুতরাং ও গৃহ ত গৃহই নয়।
যা দুটো একটা ঘুটী ছিল তাও গেল, এখন একদিন ফাগুনে বাতাসেই সব
সারা হয়ে যাবে।
ধাবক। আহা সব কথাই তােমরা উটো বুঝবে।
বয়স্য। সে টুক উভয়তঃ, আমরা মুখে তােমরা কাজে।
ধাবক। শ্ৰীকবি ভবভূতির পুস্তকখানি লইয়া আসি।
বয়স্য। আর কেন ? এখন গৃহে যাওয়াই শ্রেয়। রাজ দরবারে
আজ আর আবশ্যকতা নাই।
ধাবক। আমারও দরবার ভালই লাগে না।
( শ্রীহর্ষের প্রবেশ )
বয়স্য। তা আজ ত বােধ হয় আর দরবার হবে না।
হর্ষ। হবে, আজ অপরাহ্নে দরবার হবে। মহারাজ রাজ্যের
৭৩ মণিমালা ; প্রতি সামন্ত, সেনাপতি, সৈন্য, প্রজা, সবাইকে আজ দরবারে আহ্বান করেছেন। ধাবক। কিছু বিশেষ একটা আছে। বয়স্ক। হিন্দুর শেষ যা—বানপ্রস্থ। যখন দেখে জীবনে আর কিছু হবে না, সব রসটুকু নিঙড়ান সারা হয়েছে, তখন যায় বনে ; সংসারে থাকলে চারদিক দেখে শুনে আর ভােগ করতে পারিনে বলে যে খেদ হয়, বনে গেলে সব পাকা হাড়, চোক্ পুড়ে না। হর্ষ। না কিছু বিশেষ কাৰ্য্য আছে। বস্ত। হয় ত দেখ খেয়ালের মাথায় আমাকেই বা রাজত্ব দিয়ে বসেন! হর্ষ। বেশ তাে, কিন্তু যুদ্ধে যেতে হবে। বয়স্য। কিগো কবি—একটা শ্লোক আওড়াও না। ধাবক। সমরে না যেয়ে বীর ঘরে বসে থেকো। প্রিয়ার সে মুখখানি বুকে ধরে রেখো। তাহলে যুদ্ধটা কিছু না—এ ধাবক। যদি যাও, ফিরে এস বুঝিয়া সুযােগ, প্রাণ দিলে নাহি ফিরে সমর সুষােগ। বয়স্ক। তাই ভাল। যদিই যাও তবে পলায়নই শ্রেয়। বেঁচে এলে তবু আবার অন্য সময় যুদ্ধে যাওয়া যায়। মলে ত সবই গেল। হর্ষ। এতেই মহারাজকে বলা হয় তিনি শিকারে যাননা কেন ? বলিহারি বীর ! বয়স্য। আমার ঘরে নথ নাড়া আছে জান-তবু “সে ভয়ে কম্পিত নয় আমার শরীর। হ। সােমদত্ত-
মণিমালা
৭১
ধাবক। না এ পথে এল না।
বয়স্য। পাখী পালিয়েছে, এখন এপথ ওপথে তারতম্য নাই।
ধাবক। কার পাখী পালাল ?
বয়স্য। শেঠজীর মেয়ের।
হর্ষ। শেঠজীর আবার মেয়ে কই।
বয়স্য। তবে বুঝি তার স্ত্রীর।
হর্ষ।
সেও ত অনেক দিন মরেছে।
বয়স্য। তবে বুঝি তােমার আর আমার ।
হর্ষ। কবি ভবভূতি রচিত এই পুস্তকখানি শীঘ্র সােমদত্তকে দিয়ে
এস। আমার কথা বলো যেন পুস্তকখানি আদ্যোপান্ত পড়ে দেখে।
(ধাবকের প্রস্থান)
বয়স্য। ওখানি কি ?
হর্ষ। মালতী মাধব। ভবিতব্য কে খণ্ডাইবে ? ও ! বেলাও হয়েছে,
তরুচ্ছায়া প্রায় মূলদেশে আবদ্ধ হইবার জন্য প্রস্তুত হইতেছে।
বয়স্য। চলুন, আমরাও মুলে যাই।
( প্রস্থান)
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক
রাজ দরবার
(মহারাজ ও অন্যান্য সকলে আসীন )
রাজ্যবর্ধন। কই, বৎস সােমদত্ত কই ?
(সােমদত্তের প্রবেশ)
সােম। এই মহারাজ, প্রণত চরণে দাস।
৭২,
।
মণিমালা
আশীর্বাদ করি পদে যােগ্যমতি থােক।
শ্রীহর্ষ, আমি আর কতদিন রব।
দিন যায়, দিন আসে ;
মানবের দিন
কেবলি ফুরায়,—দিয়ে যায় অতীতের
বিফলতা স্মৃতি ; তাই লয়ে দগ্ধ হই ।
নির্ভরিয়া বর্তমান অদৃষ্টের কাছে
ভবিষ্যতে চাই, তাও কবে আসে যায়
দেখিনা চাহিয়া, এমনি পুতলিমত
শুধু যেন খেলা ঘরে করি ধূলাখেলা।
তবু, সে খেলা খেলিতে হয় সত্য মনে
করি, না হইলে সৃষ্টি ব্যর্থ হয়।
হর্ষ। এই উপদেশ শিরে ন্যস্ত করি ভিক্ষা চাই চরণ আশিষ ।
রাজ্য। সােমদত্ত!
জগতের কত আছে ক্লেশ,
কত আছে দুঃখ, শােক, তাপ।
কেহ নাহি কিছু পায়, কাহার দুয়ারে,
উচ্ছিষ্ট অন্নের ভরে পথ নাহি রয়।
কারো স্বামী আছে, পুত্র আছে, আছে তার
প্রিয় পরিজন, অনাথা বিধবা কেহ
হারায়ে অঞ্চল নিধি ফিরে কেঁদে কেঁদে।
এ বাহ বৈষম্য মাঝে, আছে সে স্রষ্টার
অতি সুকৌশল নীতি। হম্ম মাঝে কেহ
অতৃপ্তির-অপ্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষায়—দহে,
কুটীরে লবণ হীন অন্নে সুখী কেহ।
তাই বলি দুঃখময় ভেবােনা জগৎ।
মণিমালা
হর্ষ।
বয়স্য। মহারাজ, আমায় কিছু বলুন।
রাজ্য। সখা, যুদ্ধে যাব আমি, তুমি সঙ্গে যাবে,
ব্রাহ্মণীরে বলে এস আসিব ফিরিয়া ।
বয়স্য। যদি না আসি ।
রাজ্য। তারে যেতে বলল।
বয়স্য। চিত্রগুপ্তের কাছে, তা মন্দ নয় । মহারাজ, ব্রাহ্মণী যদি
সেখানে গিয়ে বলেন আসি বলে কেন এলােনা, আমি বলবো এই তােমার
জন্য ঘর বাড়ী তৈয়ার করে রাখছি, তাই দেরী হচ্ছে। আচ্ছা আমি যুদ্ধে
যাব, তবে কোথায় ?
রাজ্য। সে কথা বলিতেই এ দরবার। আমি দিগ্বিজয়ে বাহির হইব।
কি বল ভাই।
মহারাজ, দিগ্বিজয়ে কি আবশ্যকতা, আপনার অপর্যাপ্ত
সম্পত্তি, প্রজাগণ ত বেশ কুশলে আছে, শত্রুও কেহ নাই, তবে?
রাজ্য। মন্ত্রী কি বলেন ?
সােম। অধুনা হিন্দুরাজগণের মধ্যে আপনিই শীর্ষ, ইহা সব রাজাই
স্বীকার করেন।
তবে যদি রাজ্যলাভের বাসনা হইয়া থাকে, তবে
আপনার অপরিসীম দয়া ও ন্যায়ের গুণে যে অক্ষয় রাজত্ব স্বর্গে স্থাপন
করেছেন তাহাই কি যথেষ্ট নয় ?
রাজ্য।
বয়স্য কি বল ?
বয়স্য। বুড়ো হয়েছেন, দুদিন পরে সব যাবে, আর বেখাপ্পা সথে কাজ
কি? চারিদিকে বেশ শান্তি, আর মিছে হাহাকার করিয়ে কাজ কি ? কত,
লােক্ মরুবে, কত জল ঝরূবে ; কত সনাথ অনাথ হবে, রাজ্যময় বিশৃঙ্খলা
হবে। ধন রত্নাদি যা কিছু আবেন তাতে ত এই প্রজাদের দান, আর
আমার ঘােড়ােশপচারে পূজা? তা প্রজাদের যা আছে তাতেই আনা
৭৪ মণিমালা আরনা হয়ে গেছে, আর আমার বাড়ীতে দেখেছি দুটো কুমড়ােগাছ হয়েছে তাতেই যথেষ্ট হবে। রাজ্য। সােমদত্ত কি বল ? সােম। যদি রাজ্য ও অর্থলাভ ভিন্ন অন্য কোন কারণ থাকে, মহারাজ, আশীৰ্বাদ দিন, আমি প্রফুল্লচিত্তে সৈন্য শৃঙ্খলা করিতে যাই। রাজ্য। তুমি দীর্ঘজীবি হও। দিগ্বিজয় ইচ্ছার কারণ বলিতেছি, ভারতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্য অনেক আছে, শান্তিও আছে, সম্পদও আছে, কিন্তু একতা নাই; ভারতে একতা না হইলে সব মিথ্যা, যে কোন মূহুর্তেই কোন বহিঃ শত্রু আসিয়া ভারতে প্রবেশ লাভ করিতে পারিবে এবং এই একতার হীনতায় ক্রমে ভারত বিজয় করিতে পারিবে। আমি ভারতকে একছত্ৰী করিতে চাই। এক রাজা ভারতের অধিকারী হইবেন অপরে তাহার অধীন থাকিয়া একতায় আবদ্ধ থাকিবে। তাহাতেই ভারতের মঙ্গল। মন্ত্রীবর কি বলেন ? মন্ত্রী। ইহাতে দুটি আপত্তি। প্রথমতঃ ভারতের অন্তর্গত ভিন্ন ভিন্ন দেশের প্রকৃতি অনুসারে প্রজাবর্গের প্রকৃতির বিভিন্নতা। রাজ্য। তাহা হইতেই ভারতের অনিষ্ট হইবে। আমি সব এক প্রকৃতি চাই। কিম্বা তাহা না হইলেও এক রাজার কর্তৃত্বে থাকিলে রীতি নীতি শিক্ষার ক্রমান্বয়ে সমতা হইলে একই জাতীয় ভাবের উদ্দীপনায় ভারত গৌরবান্বিত হইবে। মন্ত্রী। তারপর, আপনি যে এ কাৰ্যে সমর্থ হইবেন তাহার স্থিরতা কি? রাজ্য তাহা নিশ্চয়ই অস্থির, তবে আমি অশক্ত হইলে আম অপেক্ষা পরাক্রান্ত অন্য কোন রাজা এ কাৰ্যে অগ্রসর হইবেন। এবং তিনিই সৰ্বশ্রেষ্ঠ হইবেন। ইহাতে রাজ্যে আশু অশান্তি হইবে বটে কিন্তু দেশময় সাময়িক ভাব জাগ্রত হইবে। এবং রাজগণ আলস্য ত্যাগ করিবেন।
মণিমালা
মন্ত্রী। মহারাজের উচ্চ আশা আপনারই উপযুক্ত।
রাজ্য। ভ্রাতার কি মত?
হর্ষ। আপনার ইচ্ছা প্রকৃতই অতি উচ্চ কিন্তু ও পথে হইবে কি ।
রাজ্য। অন্য পথ নিরুপণ কর।
হর্ষ। আর সুপথ ত পাই না।
রাজ্য। তবে এস, এ পথেই কাৰ্য্য করি, আমাদের যদি ভুল হয় যােগ্যতর
অন্য কেহ এ দৃষ্টান্তে উপকৃত হইবেন সন্দেহ নাই। সেনাপতির কি মত।
সােম। তাহা কাৰ্য্যক্ষেত্র সাপেক্ষ।
রাজ্য। ইহাই বীরােচিত ধৰ্ম্ম ।
রাজ্যের সমস্ত শ্ৰেষ্ঠী, মণিকার, নৌব্যবসায়ী এবং বিলাসিনীদিগকে
এ বিষয় প্রথম হইতেই জানান আবশ্যক, বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ে
তাহাদের নিজ কর্তব্য স্থিরতার আবশ্যক। তৎপরে প্রকাশ্য সভায়
ঘোষণা প্রচার করা যাইবে।
মন্ত্রী। আমি এ বিষয় এখনি সুবিহিত করিব।
পঞ্চম গর্ভাঙ্ক
রাজপথ।
( চিত্রকর, শ্রেষ্ঠী ও নৌব্যবসায়ী )
চিত্রকর। চিত্রাঙ্কনের পক্ষে এ সুযােগ লাভ করিয়া আমি কৃতার্থ
হইয়াছি। মহারাজ আমাকে নূতন জীবন দান করিয়াছেন। প্রকৃত
যুদ্ধের একখানি চিত্র আঁকিতে পারিলে আমার জীবনের যথেষ্ট কাৰ্য্য
করিলাম বলিয়া মনে করিব।
শ্ৰেষ্ঠী। বঙ্গেশ্বরের নিকট আমার অনেক রত্নের মূল্য প্রাপ্য আছে।
মণিমালা
তাম্রপর্ণীজাত প্রবাল মুক্ত। যাহা বঙ্গেই অধিক আইসে তাহাও কিছু
সুবিধা মত ক্রয়ের সুবিধা হইবে।
নো। মহারাজ প্রথমতঃ কলিঙ্গ দেশ বিজয়ে যাত্রা করিলে আমরা
অনেক সাহায্য করিতে পারিতাম। সেই স্থান হইতে বঙ্গদেশ যাত্রা
বিশেষ লাভের হইত। আমরা এ বিষয় অনেক আলােচনা করিয়া
দেখিলাম, যিনি বঙ্গোপসাগর হইতে জয় আরম্ভ করিবেন, সমগ্ৰ আৰ্যস্থান
তাহার করায়ত্ত হইবে।
শ্ৰেষ্ঠী। তাহা বটে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গেশ্বর মহারাজের চির শত্রু,
উৎকল রাজ তাহার মিত্র। প্রথম বঙ্গজয় করিয়া উৎকল পথে অগ্রসর
হইয়া দাক্ষিণাত্য জয় করা যাইবে।
নো। ভাল, ভাল।
আমরা সকলেই প্রস্তুত আছি।
চিত্র। বঙ্গ ও কলিঙ্গ দেশের শস্যশ্যামলা প্রকৃতির বিচিত্রতা অঙ্কনের
তৃপ্তি লাভ করিবার জন্য আমার প্রাণ আকুল হইয়া উঠিতেছে।
( শিল্পীর প্রবেশ)
আসুন, আসুন। আপনিও ত আমাদের সঙ্গী।
শিল্পী। মহারাজের বিশেষ অনুগ্রহ। উৎকলের শিল্পচাতুর্য আমাকে
অনুকরণ করিতে হইবে।
এ আনন্দের দিনে কিছু আমােদ প্রমােদ করা যাক গে।
চিত্র। মেঘ না চাহিতেই জল ! প্রফুল্ল মকরন্দবাসিত মৃদু সমীরণে
পীতাঞ্চলখানি দুলাইয়া প্রিয় সখি চন্দ্রাবলী সাথী বেষ্টিত হইয়া এদিকেই
সান্ধ্য ভ্রমণে আসিতেছেন।
নৌ। আমি সিন্ধুতীর হইতে যে সােমরস আনিয়া দিয়াছি তাহা
প্রিয়সখীর বড়ই প্রীতিকর হইয়াছে।
শিল্পী। আমাৰ গৃহিণীও তাহার অনেক সুখ্যাতি করিয়াছেন।
শ্ৰেষ্ঠী।
মণিমালা
চিত্র।
নৌ। সুখী হইলাম।
সন্ধ্যায় রবিচ্ছবির স্নান জ্যোতিটুকু ওই গণ্ডদেশ কেমন,
কাঞ্চনা করিয়া তুলিয়াছে ! পীত বসনে সুন্দরীকে অতি মধুরকান্তি
করিয়াছে। চরণের অলক্তরসে রাজপথ ধন্য ; চরণ ধূলি গায় মাখিয়া
সন্ধ্যা ধূসর হইয়াছে, আর কণক-ঘুঘুর-মুখরিত প্রকৃতি যেন অললে
নিদ্রাবতী হইতেছে।
শ্ৰেষ্ঠী। কবিবর এ সময় উপস্থিত থাকিলে একটা কিছু শ্লোক
রচনা করিতে পারিতেন।
নৌ। তিনি ত সঙ্গেই আছেন।
শিল্পী। তবে মণিকাঞ্চন যােগ হইয়াছে।
নৌ। খুব রঙ্গ রস চলিতেছে।
শ্ৰেষ্ঠী। চলুন, আমরা অগ্রসর হইয়া অভ্যর্থনা করি।
( সকলের প্রস্থান )
(অন্যপথে ডঙ্কাসহ রাজকর্মচারী ও কতিপয় নাগরিকের প্রবেশ)
নাগরিকগণ। কি হয়েছে, কি হয়েছে।
মহারাজ দিগ্বিজয়ে যাবেন, তাই রাজ্যের প্রজাগণকে বলছেন
যে, তারা যেন তার অনুপস্থিতে বেশ শান্ত হয়ে থাকে, ধৰ্ম্ম কাৰ্য্য করে।
তার অনুপস্থিতি জন্য কোন গােলযােগ না হয়। সকলেই শিষ্ট ভাবে
থাকে, আর মহারাজ শ্রীহর্ষ থাকবেন তাকে সব রাজার মত দেখাে বুঝলে।
১ম। হাঁ ভাই, তাতে গােল হবে কিসে?
২য়। তবু যদি কিছু হয়, তাই মহারাজ বলছেন যে ভাল হয়ে
থেকো।
৩য়। চল যাই মহারাজার কল্যাণে পূজা দিয়ে আসি।
সকলে। চল চল।
ছলের প্রস্থান ।
৮,
মণিমালা
(অন্য পথে অন্য কতিপয় নাগরিকের প্রবেশ )
১ম। মহারাজ বুড়ো হয়েছেন আর কেন কষ্ট করতে যাবেন,
রাজ্যে ত কারও আর কিছু অভাব নাই যে তার জন্য অর্থ আতে
হবে।
২য়। ওরে বুঝিস না তবু সম্মান কত, মােলকলা পূর্ণ হবে, রাজা
মানুষ চুপ করে বসে থাকবে, যুদ্ধটুদ্ধ করতে হয় বৈকি
৩য়। মহারাজ তবু এতদিন রাজকুমারীকে নিয়ে এক রকম ছিলেন,
ওই এক সুখ ছিল, তাও যখন রৈল না তখন বসে বসে আর দিন কতক্ষণ
?
কাটে।
১ম। তবু এত দিন যাওয়া ভাল ছিল, সৈন্যরা সব দলে দলে
যাচ্ছে, ওরা এদিক্ আসছে না ? ওদের মুখে যেন কত ফুৰ্ত্তি।
৩য়। ক্ষত্রিয়ের ওর চেয়ে আর ধৰ্ম্ম কি আছে। বেশ গান
গেয়ে গেয়ে চলছে।
(সৈন্যগণের প্রবেশ)
সৈন্যগণ। কি ভাই, সকলে আমাদের হাসি মুখে বিদায় দেও,
আর দেবতার কাছে বিজয় প্রার্থনা কর।
পৌরগণ। এই ত আমরা পূজা দিয়ে আছি, ভাই দেশের মুখ
উজ্জ্বল কর।
সকলের গান
সবে আনন্দে আনন্দে মহানন্দে কর গান,
আদরে অধরে ধর ঐক্যতান,
সদা দেশের নাম জয়নাম হৃদে জপ অবিরাম
সম্মুখ সমরে পাবে সুখমােক্ষধাম।
মাৰ
মণিমালা
৭৯
ষষ্ঠ গর্ভাঙ্ক
গঙ্গাতীরস্থ উদ্যান।
(মণি ও মুক্ত )
মুক্ত। বহিন্ কি ভাবছি।
মণি। তুমি কতদিন এ ব্রত গ্রহণ করেছ ?
মুক্ত।
শুধু এই ?
মণি। তাহা নয়, আরও কিছু। তবে যা জিজ্ঞাসা করিলাম--
মুক্ত। তােমার কি পছন্দ হয় ?
মণি। আবার তুমি কেন ?
মুক্ত। ভাল, ভুল হয়েছিল।
মণি। তোমার সবই ভুল।
এ ব্ৰতটা ?
মণি। সেটী ত সকলের আগে।
মুক্ত। কিসে ?
মণি। এতে কি সুখ ?
মুক্ত। কি সুখ সংসারে ?
মণি। তবে সংসার হলো কেন? সকলেই যদি এমন ব্রত গ্রহণ করে,
তাহলে মানব কদিন থাকবে? সৃষ্টির উদ্দেশ্য কি তাই ? সুগতও কি
তাহাই চান।
মুক্ত। না তাহার উদ্দেশ্য ঠিক্ তাই নয়। গৃহী হওয়ায় কোন আপত্তি নাই।
মণি। তবে তিনি নিজে গৃহত্যাগ কল্লেন কেন ?
মুক্ত। নিজে জ্ঞান পেয়ে অপরকে জ্ঞানবান কবার
মণি। তবে জ্ঞান পেয়ে গৃহস্থাশ্রম গ্রহণ করুলেন ;
}
৮০ মণিমালা t . মণি। মুক্ত। তাহাতে বাসনার নির্বাণ হয় না। মণি। তাহলেই জ্ঞানী হয়ে সংসার ত্যাগ করূবে। যে তাহার জ্ঞান লাভ কবে সেই সংসার ত্যাগ করবে ? তাহলে আমি যা বলিলাম সংসার থাকে কোথায় ? মুক্ত। গৃহস্থ হয়েও সেরূপ জ্ঞানী হওয়া যায় । গৃহীর পক্ষেও বিধি আছে, ভিক্ষুরও বিধি আছে। মণি। কোষ্টী ভাল। মুক্ত। ব্যক্তি বিশেষে। তােমার পক্ষে কি ? মুক্ত। এই ব্রত। মণি। কেন? ওকি ! তােমার চক্ষে জল আসিল, থাক্ আমি আর কিছু জিজ্ঞাসা করিব না, মুক্তা তুমি কঁদিছে ! মুক্ত। এই নিবৃত্ত হইলাম। মণি। তুমি এখনও পাকা হও নাই। মুক্ত। তাই ত দেখিতেছি। মণি। তবে অামায় সঙ্গে লইবে কেমনে ? মাঝি পাকা আছে, না হয় দুজনে মিলিয়া মিশিয়া যাইব। একার চেয়ে ত ভাল। চল যখন পথে বাহির হইয়াছি, হইয়াছি, তখন আর থামিব না। একবার দূরত্ব পরীক্ষা করিয়া লইব। মুক্ত। চিত্ত স্থির কর। তােমার সুলভতায় আমারও ব্ৰত নষ্ট হইবে। অত খেদান্বিত হইওনা। মণি। পুরাতন স্মৃতি কিসে নষ্ট হয় ? মণি। মাৰ স্মৃতি?
মণিমালা ৮১ মণি। ভালবাসার। কেমন ভালবাসা ? ভক্তি, স্নেহ প্রেম অথবা ঘনিষ্টতা প্রীতি ও ইচ্ছার আকাঙ্ক্ষা। মণি। ভিক্ষুণী, তুমি প্রেম কিছু বােঝ ? মুক্ত। কিছু কিছু বুঝি বই কি ? কেমন করে ? মণি। মুক্ত। দেখে শুনে। মণি। তাহলে প্রাণে প্রাণে বুঝে না। মুক্ত। হাঁ তাতেও একটু অধিকার আছে, কিসের ঔষধ চাই ? মণি। ওই প্রেমের। মুক্ত। তাতে তােমার কি ? তুমি ত ভিক্ষুণী। মণি। না হয় শিখিয়া রাখিলাম। মুক্ত। ভ্রান্তি। মুক্ত। মণি। তােমার জীবনটাই ভুল। আজ তােমার বিশ্বের শেষবন্ধনের শেষ। মণি। কেমন ! মুক্ত। মহারাজকে দেখিবে ? মণি। কোথায় ? মুক্ত। এই গঙ্গাতীরে। তিনি দিগ্বিজয়ে বহির্গত বহির্গত হয়েছেন। কর্ণসুবর্ণাধিপতি শশাঙ্ক নরেন্দ্র গুপ্তের সহিত যুদ্ধ হইতেছে। মণি। কি ফল ? মুক্ত। মহারাজের জয় ও ক্ষয়। যুদ্ধে জয়ী হইয়া নরেন্দ্র গুপ্ত বন্দী, কিন্তু মহারাজ আহত হইয়া কল্য অবধি শিবিরে উ রহিত। চল তােমায় সেথা লইয়া যাইব।
৮২
মণিমালা
মণি। তুমি এ সংবাদ কখন পাইলে ?
মুক্ত। তুমি তখনও নিদ্রিতা ছিলে।
মণি। আমায় ডাক নাই কেন?
মুক্ত। আবশ্যকতা ছিল না। সন্ধ্যার প্রাক্কালে তুমি তাহার
দেখা পাইবে। তার পরই আমরা রাজগৃহে প্রস্থান করিব।
মণি। মহারাজের সাথে আর কে কে এসেছেন।
মনে রেখ তুমি
তুমি বৌদ্ধ ভিক্ষুণী, বাসনার নির্বাণ দিতে
এসেছ।
মণি। চল বহি—আমি আর বিকৃত হইব না।
( প্রস্থান)
সপ্তম গর্ভাঙ্ক
সােমদত্ত,-উদ্ভ্রান্ত ভাবে প্রবেশ
সােমদত্ত।
চাহিতে আমার পানে
সে সাধে বাধিল সাধ ভঙ্গে ভিক্ষুণী,
আঁখি উর্ধ্বে উঠি অমনি হইল নত,
দীর্ঘশ্বাস বক্ষে মিশে গেল,
( অন্যমনে বিচরণ)
আমি কি ভাবিতেছি! আমার নিদ্রা নাই, কখনাে যে ঘুমাইয়াছি
এমন বো
না। ভােরের আলাের ঘুম ভাঙ্গে নাই, এখনো আকাশে
তারা ফু মাবছ, এখনো পাখীরা ঘুমে অচেতন, প্রভাতের—সেফালি-
চাথায় মরিয়া আছে—একমাত্র আমি দুর্বিষহ যাতনায়
সিক্ত স;
মণিমালা
জ্বলিয়া মরিতেছি। আমায় কে শান্তি দিবে ? এক মুহূর্তও তাহার
চিন্তা হইতে বিরত হইতে পারি না। একমাত্র সে ছাড়া যেন আমার
আর কেহ নাই-আর কোন কাজ নাই—আর কোন চিন্তা নাই-আর
'কোন আদর নাই। আমার শিরে গুরুতর কার্যভার ন্যস্ত রহিয়াছে-
আর আমি কি করিতেছি। না, আর ভাবিব না—শিবিরে যাই।
আমি কি অকৃতজ্ঞ -মহারাজ কেমন আছেন তাহাও জানি না। ধিক
আমাকে—শুধু অসার চিন্তা ও স্বপ্ন লইয়া আমাকে পিশাচ করিয়া
তুলিলাম—দূরে হাহাকার কেন ? কি হয়েছে? যেন বিশ্বে প্রলয়ের
আৰ্তনাদ উঠিয়াছে—
(বেগে প্রস্থান)
(মণি ও মুক্তর প্রবেশ )
মুক্ত। আর মহারাজের চিতা দেখতে গিয়ে কি হবে।
শেষ হয়ে গেছে ; যাহা বহমান তাহাতেই তাহা বহিয়া গিয়াছে, এখন
তাহা শূন্য। শূন্যতা যত দেখিবে, তাহার ত সীমা নাই।
মণি। তবু একবার শেষ দেখে যাই, আজ কোন্ তিথি ?
মুক্ত। শুক্লপক্ষের সপ্তমী।
মণি। কৃষ্ণপক্ষে সপ্তমীতে চাদ উঠিলে আমি ব্ৰত গ্রহণ করেছি
সেদিন চঁাদ উঠিতেছিল, আজ ডুবিতেছে। এখন ব্রত ভঙ্গ করা যায় ?
আমি ব্ৰত ত্যাগ করিব।
মুক্ত। এখানে থাকিলে চিত্ত আরও উদ্বেলিত হইবে, চল যাই।
মণি। তুমি যাও আমার আর যাইবার ইচ্ছা নাই।
মুক্ত। যদি এই করিবে তবে মহারাজকে ত্যাগ
তাহলে আজ তাহার এখানে মৃত্যু হইত না।
আজ
কেন ?
৮৪
মণিমালা
।
মণি।
যখন তােমায় সন্তুষ্টা দেখিয়া আশীৰ্বাদ করিয়া তিনিও সন্তুষ্টচিত্তে নির্বাণ
লাভ করূলেন, তখন তাহাকে বলিলে না কেন ?
মণি।
ক্ষমা কর। জীবনের অনেক মায়া সহজে ভুলা যায় না।
তাই সময় সময় চঞ্চল হইয়া উঠি। তুমি একটা গান গাও তােমার গানে'
আমি বেশ নির্লিপ্ত থাকি।
মুক্ত। তা বেশ।
কে যেন আছে।
মুক্ত। তবে চল।
মণি। না, দেখি এত রাত্রে এ কোন্ প্রেমিক।
মুক্ত। না, আর দেখিয়া কাজ নাই। কখন কি বিপদ ঘটিবে।
বিশেষতঃ তুমি স্থির থাকিতে পারিবে না।
মণি। আমি বেশ আছি।
মুক্ত। উহা লালসার তন্ময়তা মাত্র।
তাহাতে তােমার চোখ জলে ভরিয়া উঠিল কেন ?
এস, একটু আড়ালে যাই।
মণি।
( প্রস্থান )
(সােমদত্তের পুনঃ প্রবেশ )
সােম। কিসের যুদ্ধ, কিসের যশস্পৃহা, সসাগরা ধরণীর অধীশ্বর
"আজ ধূলায় লুষ্ঠিত। মণিমালা ঠিক বুঝিয়াছে, এ জীবনের মিলন ত
চিরস্থায়ী হইবে না বুঝিয়াই প্রেমময়ী মােক্ষপথের সাধনা করিতেছে।
আমি ?
থে যাই
মাবল যাই।
র একটু শুনি।
মণিমালা
মণি।
মুক্ত। তােমার ওষ্ঠ কঁপিতেছে, তুমি কথা কহিয়া ফেলিবে।
মণি। তােমার ভয় নাই।
সোম। সে ভালবাসে ইহাই আমার পক্ষে যথেষ্ট নহে কি ? সে
যদি ভালই বাসে, তবে আমাকে ত্যাগ করিয়া সন্যাসিনী হইল কেন ?
কাহারও ত কোন আপত্তি ছিল না। ভিক্ষুণির জন্য ? ভিক্ষুণী তাহার
কে ? বেশ, সে সুখে থাকলেই সুখী হইব।
মুক্ত। তুমি কঁপিতেছ ।
মণি। তা হােক, একটু অপেক্ষা কর।
মুক্ত। না—আমি যে পারি না।
কেমন ?
চল -আমি আর থাকিব না ।
মণি। আর একটু থাক।
সােম। মেঘ আরাে আঁধার হইতেছে, আমার জীবনও যেন সেইরূপ
মণিমালা বিহনে দুশ্চিন্তাময় হইতেছে। আমার প্রাণ চলিয়া গিয়াছে ;
নশ্বর দেহ, নিজেকে বিনষ্ট করিবার এমন সুযােগ কোথায় পাইবে ?
আর নয়। তুমি যে পড়িয়া গেলে !
মণি। আমায় ধর।
মুক্ত। বহিন, এ কি করিলে ?
সােম। (সচকিতে) একি! কোথায়! কে ? মণিমালা ?
মুক্ত। কথার অবসর নাই, শীঘ্র একটু জল আনুন।
মুক্ত।
(সােমদত্তের প্রস্থান)
মণি। শীঘ্র চল, আমি স্থির হইয়াছি।
মুক্ত। যাইতে পারিবে ?
মণিমালা
মণি। উভয়তঃ মরণ।
চল।
( উভয়ের প্রস্থান)
(সােমদত্তের প্রবেশ)
সােম। কোথাও কেহ নাই ত ! আমি কি স্বপ্ন দেখিতেছি ?
একি ভ্রান্তি ? যাও, যাও মণিমালা—আমিও আসিতেছি। আমি?
ভিক্ষাব্ৰত গ্ৰহণ করিলাম। আমি তােমার, তুমিও আমার হইবে।
( প্রস্থান )
চতুর্থ অঙ্ক
প্রথম গর্ভাঙ্ক
কাননে ।
সােম। “সরসি শীতল জল কিম্বা স্নিগ্ধ চন্দ্র জোছনায়,
হৃদয়ের এ সন্তাপ কিছুতেই নাহিক জুড়ায়
নিষ্ঠাশূন্য হয় মন ভ্রমে ইতস্ততঃ
কত কি কল্পনা রচে নিজ ইচ্ছা মত।”
তবু মাধব মালতীকে পায় না। একদিন ত পেয়েছিল, আমিও
কি পাব না ? এত ভালবাসি তবু পাব না? যদি পাব না তবে
এমন হলো
কেন ?
কেন সে সন্ধ্যায় বাতায়নে করতলে মাথা
রাখি আমার পানে অনিমেষে চেয়ে থাকতো ; কেন দীর্ঘ রজনীতে শয়নে
কণ্টক বােধ করিলে, আমি যখন মুখরা প্রকৃতির নিশিথমরণ দেখিতে
উঠিতাম তখনও দেখিতাম সে জাগরিত। কেন সে তখন তার চাময়ী
স্নিগ্ধ রূপরাশি লয়ে বাতায়ন একেবারে উন্মুক্ত করে দিত, কেন
আমি সে সুধা পানে ক্লান্ত হয়ে বৃক্ষতলেই নিদ্রিত হয়ে পড়তেন।
“সেই মূর্তি হেরি আমি হেথা সেথা সম্মুখে পশ্চাতে,
অন্তরে বাহিরে সে যে চারিদিকে ফিরে সাথে সাথে।”
(কতিপয় ভিক্ষুর প্রবেশ)
কই-সে-কোথায়।
৮৮ মণিমালা ১ম। সন্তোষ ক্ষেত্রে, প্রয়াগ তীর্থে। কেন আপনি সেখানে যান নাই ? সােম। সন্তোষ ক্ষেত্রে ? কে বলে। ২য়। অপূৰ্ব দান। আমরা ছিলাম। ছত্রপতি মহারাজ হর্ষবর্ধন জাতিধর্ম নির্বিবাদে অকাতরে দান করছেন, রাজকোষের সমস্ত অর্থ, ভাণ্ডারের সমস্ত খাদ্য, অবশেষে পরিধেয় পর্যন্ত দান করে তিনি ভিক্ষু বেশে অঙ্গে ধূলা মেখে নাম কীর্তন করছেন। আপনি যান নাই। দান সামগ্রী আমরা বহন করে আনতে পারি নাই। পথে আমরাও বিতরণ কত্তে কত্তে আছি। সােম। হবে, যাও। কেরে ? কোন পাগল। ভিক্ষু। ১ম। চল, জয় মহারাজ হর্ষবর্ধনের জয়। ( প্রস্থান) ; সোম। মহারাজ হর্ষবর্ধন রাজা, কেন মহারাজ কোথায়—স্বর্গে, মণিমালা কোথায় আমার অন্তরে ! খুঁজে দেখি, নাই ; মূৰ্ত্তি নাই, কায়া নাই, কি আছে ? যেমন ঈশ্বর নিরাকার সৰ্ব্বভূতময়, তুমি তেমনি আমার সৰ্ব্ব হৃদয়ময়। আজ সিংহল দেশের কথা মনে পড়েছে কেন? কি তার নাম ছিল, বেশ প্রেমিক, আমি। বাসন্তী ? সেত সাগর জলে ডুবে মরেছে, আমার জন্য ! মণিমালা জীবন্ম ত ; ভিক্ষুণী হয়েছে আমার জন্য। আমি পরশমণি, যা স্পর্শ কব দুঃখ আনবে। ( মুক্তর প্রবেশ) অনেক বিলম্ব হয়ে গেছে। মুক্ত। ম ! একলা রয়েছে। মা "
মণিমালা
মুক্ত।
আমি বাসনা বিসর্জন দিতে এসে মণিমালার বাসনায় পড়েছি। একি
সােমদত্ত ওখানে ?
সােম।
“তুমি ভাল বাস মােরে এই মনে করি,
এত দিন প্রাণ আমি রহিয়াছি ধরি ।”
এ এক ভালবাসা।
সােম। বাসন্তী ছিল বেশ ।
আজ কেন মনে পড়ে ? এত ভালবেসে ভুলে থাকে ?
সােম। আমি কারে চাই ।
মুক্ত। আমি এমন হইলাম কেন ? যাইতে পারিতেছিনা ত ?
সােম। কোথা পাব মণিমালা ?
(সম্মুথে অগ্রসর হইয়া) আমি দেখাইয়া দিব।
সােম। তুমি কে ?
মুক্ত। আমি ভিক্ষুণী।
সােম। এখানে কেন ?
মুক্ত। আপনি মণিমালাকে দেখিবেন ?
সােম। দেখিব। পাইব কি ?
মুক্ত।
।
সোম।
তবে এখন দেখিব না।
তবে কখন ?
।
সােম। যখন পাব।
পেয়ে কি সুখ?
সােম। তুমি বুঝিবে না।
মুক্ত। আপনি ভিক্ষু, আপনার এ লালসা কেন ?
সােম। তােমার আঁখি প্রান্তে অশ্রু কেন ?
মণিমালা
মুক্ত। আপনার অধৰ্ম্ম আচরণে।
সােম।
ধৰ্ম্ম কি ?
মুক্ত। ভিক্ষু হইয়াছেন, লালসার বিসর্জন দিন।
সোম। কে পারিয়াছে ? তুমি পারিয়াছ? আমি ভাল বাসিয়াছি
ভাল বাসিব, তাহাকে পাইব।
মুক্ত। যদি না পান ভুলিতে পারেন না ?
সােম। ।
মুক্ত। আর কি ভালবাসেন নাই ?
সোম। কে তুমি !
মুক্ত। বলিয়াছি ত আমি ভিক্ষুণী।
ভাল বাসিয়াছিলাম সত্য, পাইলাম না।
মুক্ত। অন্বেষণ করিয়াছিলেন।
সােম। সে সাগর জলে ডুবিয়াছে।
মুক্ত। যদি সে বাঁচিয়া থাকে ?
সােম। তুমি কে ?
মুক্ত। একটা কথার কথা বলিতেছি, যদি সে না মরিয়া থাকে।
সােম। তুমি তর্ক চাও।
মুক্ত।
বেশ ত।
সােম। তাহাকেও চাই।
মুক্ত। মণিমালা।
সােম।
সোম।
মুক্ত। যদি মণিমালার 'অনভিপ্রায় হয় ?
সােম। তাহার অনিচ্ছা নাই।
স্বীকার করে ?
মাব ।
মণিমালা সােম। আমি তােমার কথা বেশ বুঝিতেছি না, তুমি যাও আমি মণিমালাকে ভাবিতেছিলাম তাহাকেই ভাবিব। মুক্ত। সে অবলা বালিকা ; কেন তাকে মজাইবেন। সােম। এই তরু মুলে সে যদি বসিত অাসি, ওই নিঝরিণী হতে, স্বচ্ছ বারি আনি বিন্দু বিন্দু বসাতাম চিবুকে তাহার, তারা গলে যেত- মুক্ত। ভিক্ষু, তােমার প্রায়শ্চিত্ত আবশ্যক। ( প্রস্থান) সােম। “সে চন্দ্র বদন মনে ভাবি নিশি দিন, এখন ফিরান চিত্ত বড়ই কঠিন। লজ্জায় করিয়া জয় অতিক্রমি সংযমের ভাব ধৈর্য্যেরে উচ্ছিন্ন করি শিথিলিয়া বিবেক প্রভাব। সহসা একি এ মােহ চিত্ত মাঝে হলো আবিভাব।” যথার্থ আমার প্রায়শ্চিত্ত চাই। আমি বাসন্তীকে জলে ডুবিয়েছি। মণিমালাকে বনচারী করেছি, তাতেও আমার স্বস্তি নাই। সে যদি ভিক্ষায় শান্তি পায়, আমি তাও সহিতে পারি না; তাকে ও ডুবাইতে চাই। দ্বিতীয়:গর্ভাঙ্ক কাননের অপর পার্শ্ব। মণিমালা। এ গীতগুলি বেশ ; প্রাণে বড় শান্তি আনে। মুক্ত ফল অন্বেষণে গেছে। আমি আপন মনে বেশ গাইতেছিলাম। ভিক্ষু ভিক্ষুণী কেন এল। আমি পালিয়ে ; : আহা সে, যখন
মণিমালা
গায় “তােমারি দুয়ারে রাখিও আমারে, তােমারই চরণ ধোয়াতে” আমি
বেশ শুনি, তার পর তন্ময় হয়ে ভাবি সােমদত্তের চরণ আমার অশ্রুতে
ধৌত করিতেছি।
গীত
তােমারি দুয়ারে রাখিও আমারে
তােমারি চরণ ধােয়াতে,
আঁখি ভরা আছে জল
দিও চরণ যুগলে সঁপিতে।
আমি রহিব মগ্ন তোমারি কাজে,
নাহি কোন কাজ বিশ্বমাঝে,
অন্তর মাের হইবে অন্ত,
কায়া ছায়া হবে তােমাতে।
আমার কায়াও অনেক দিন হইল ছায়াতে মিশাইয়াছি ; কাহার
ছায়াতে, হায় তােমায় ভুলিতে পারিলাম না। কেন, কোন্ দিন ভুলিতে
চাহিয়াছি ? মুখে হয় ত বলিয়া থাকিব। তবু ভুলিবার কথা—সম্পূর্ণ
ভুলিবার কথা বলিতে পারিয়াছি কি ? ছি! আমি ভিক্ষুণী। কেন?
বাসনা বিসর্জন দিব বলিয়া ? তা বাসনা কি গেল ? কই এই ভুলিবার
ও ত বাসনা ? তপ্ত কটাহ হইতে দীপ্ত বহ্নিতে পড়িয়াছি মাত্র। বাসনার
রূপান্তর, বাসনার নিৰ্ব্বাণ নয়। দীপ সূত্র ক্ষয় হইতেছিল, আর একটি
নূতন তাহাতে দিলাম। এই মাত্র, ইহাতে কি সুখ ?
(সােমদত্তের প্রবেশ)
সােম। মণিমালা ? তুমি-
তােমায় এ ভিক্ষুবেশ কেন ?
মাৰ ?
মণি। তুমি চুমাবা
মণিমালা সােম। “চন্দ্রকান্ত মণি যথা মহীধরে দ্রবকরে জ্যোতিঃ বরিষণে, এ হৃদি পাষাণ মাের বিগলিত হলাে আজি হেরি চন্দ্রাননে।” আমি তােমার জন্য বনচারী। মণি। আমি বিধবা, আমি আত্মসুখের জন্য নিন্দা কুড়াইব না বলিয়া সংসার ত্যাগ করিলাম। তুমি আমায় দেখা দিলে কেন! তুমি কোথা হইতে আসিলে? কতবার বলিয়াছি আমি তােমার দাসী, আমি তােমার, তুমি জানিয়া, নিরপরাধিনী রমণীর ব্রহ্মচর্যে বাধা দেও কেন ? জীবন ধন! প্রাণের প্রাণ! তুমি পুরুষ—আমি নারী ; তুমি দেবতা,--আমি সন্ন্যাসিনী ; তুমি শক্তিবান,—আমি দুৰ্বল, আমাকে সদ্গতি দেখাও। সােম। তুমি আমার মােক্ষ, তুমি আমার নির্বাণ, তােমাকে ত্যাগ করিলে আমার সঙ্গতি কোথায় ? আমি আৰ্ত্ত, আমায় কৃপাকর ; তাহাতেই তােমার সদ্গতি। ধন জন সম্পদ মান প্রতিপত্তি সব ত্যাগ করেছি ; তােমার জন্য জীবন উদ্ভ্রান্ত করেছি। অনাহারে, অনিদ্রায়, বনে বনে, পথে পথে, শরীর ক্ষয় করেছি ; আর তুমি আমায় ভুলিবে ? তুমি মােক্ষ চাও, তােমার পদতলে আৰ্ত্ত ক্লান্ত ক্লিষ্ট, ইহা যদি না দেখ কিসের তােমার নির্বাণ, কিসের তােমার সাধনা। মণি। আমি বাসনা বিনাশ করিবার জন্য এই ব্রত গ্রহণ করেছি ; তােমাকে ভুলিবার জন্য নিৰ্ব্বাণ সাধনা করিব। তুমি আৰ্ত্ত কে বলে, আমার চেয়ে নও! জ্বলন্ত অগ্নিতে শুষ্ক তৃণ রাখিয়াছ, তৃণগুচ্ছ পুড়িতে চাহে না অথচ অঙ্গার হইয়া পড়িতেছে। জ্বালা ক', বেশী, সােমুদত্ত, তৃণের না অগ্নির ? চিত্ত ফিরান কঠিন কি ? ;
৯৪
মণিমালা
সােম।
ও চন্দ্রবদন মনে ভাবি নিশিদিন।
এখন ফিরান চিত্ত বড়ই কঠিন।
( অগ্রসর হওন)
মণি। আমাকে স্পর্শ করো না; আমি অবলা রমণী ; আমি
আত্মসংবরণ করিতে পারিব না; আমি বিধবা।
সােম। শুনে হাসি পায়, তুমি যখন বৈদিক ধর্ম মাননা, বিধবা
বিবাহ হবে না একথা স্বীকার করিব না।
মণি। আমি ভিক্ষুণী। আমি তর্ক জানি না।
সােম। মণিমালা! তােমার আশ্চৰ্য্য চরিত্র। তােমার এ ব্ৰতে
তােমার বিশ্বাস কতটু।
মণি। বিন্দু মাত্র নয়।
সােম। তবে ?
মণি। চেষ্টা
সােম। প্রশংসনীয় বটে। লাভ।
মণি। অব্যবসায়ীর অদৃষ্ট। আমি বিধবা, অবলা; আমার পক্ষে
সুখ স্পৃহা লোকাচার বিরুদ্ধ ; আমায় মজাইও না।
(মণিমালার প্রস্থান)
;
(সদাভিক্ষুর প্রবেশ )
৯
সদাভিক্ষু। বিহার পতির আদেশে তােমার প্রায়শ্চিত্ত আবশ্যক।
আপাততঃ নির্জন বাস।
সােম। চল একবার তােমার নির্জন বাসই দেখিব।
মণিমালা
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক
রাজগৃহ
(মণিমালা ও মুক্ত)
মণি।
তােমায় খুজিতেছিলাম।
মুক্ত। আমিও তাই।
মণি। তােমার ব্রত এ পর্যন্ত।
মুক্ত। দূর, পােড়ামুখী, চিত্ত স্থির কর।
মণি। চিত্ত স্থির করা অসম্ভব। বাক্য এবং কার্য সমান হইলে
সংসার রহিত না। আমি এ ভাবে আর দিন যাপন করিতে পারিতেছি না।
আমার একটা গতি কর।
মুক্ত। সুপথেই আছ, গতি অবশ্য হইবে।
মণি। তাহা হয় না। তুমি ভাবিতেছ, আমি বেশ আছি। ভিক্ষুণি,
তুমি এ কষ্টের কি বুঝিবে!
এক দিনত বলিয়াছি, ইহাও বুঝি। আজিও বুঝি। চিত্ত
স্থির কর, নইলে উপায় নাই, পুড়িয়া মরিবে।
মণি। পুড়িতেছি ! অগ্নির নির্বাণ নাই, অকস্মাৎ বাত্যায় আবার
জ্বলিয়া উঠে। আজ সােমদত্ত
মুক্ত। তাহা জানি। তিনি বিহারপতি কর্তৃক আদিষ্ট হইয়া নির্জন
বাসে প্রায়শ্চিত্ত করিবেন।
মণি। তিনি ইচ্ছা করিলে বিহার
পতিকে এই দণ্ডে রাজ্যচ্যুত
করিতে পারেন। তাহার কারাবাস যদিও অসম্ভব তবু তিনি কি ইচ্ছায়
কি করিয়াছেন বলিতে পারি না।
মণিমালা
মুক্ত। আমি সত্যই বলিয়াছি-
মণি। নির্জনতা কোথা পাই ; যেথা যাই আমি,
যেথা থাকি, চিন্তাগুতি শৃঙ্গাকাশ মাঝে
করে লয় সৃষ্টি আপনার
মুক্ত। অনিষ্টের
মণি। যাও, আমি আর কথা বলিব না।
মুক্ত। আজি ভুবনেশ্বর যাইতে হইবে, চল প্রস্তুত হইয়া থাকি।
ভিক্ষুগণ রাত্রেই যাত্রা করিবেন।
মণি। আমি ত যাইব না।
দেখ কেমন রবিচ্ছবি ম্লান হইতেছে।
মণি।
কোথা যাব, কে দেখাবে পথ, কে ডাকিয়া
লবে কার কাছে। রবি ডুবে যায়, আসে
শাখে পাখী ; কপালে তারার টিপ, সন্ধ্যা
এল লজ্জাময়ী, আঁধার অঞ্চলে ঢাকি
সারা অঙ্গখানি। কোথা যাব, কেবা আছে ?
প্রাণ ভেঙ্গে যায়, কত কেঁদে উঠে প্রাণ--
ধৈর্যের ভরাডালা বহিতে অক্ষম।
বরষার নদী বহে ভাসায়ে দুকুল
‘অপরে জানায়ে ব্যথা শান্ত করে লয়
আপনার বিক্ষোভিত প্রাণ। আমি কারে কব ?
দেখ বােন্ আলােকের শেষ প্রাণটুকু
নিভাইয়া দিল তাের সাধের আঁধার।
মণি।
মণিমালা
এমনি নিশীথে এক দীপ্ত আলো পাশে,
উঠিল দাঁড়ায়ে প্রভু শয়ন ত্যজিয়া।
কত মায়া, কত দয়া, কত স্নেহ পাশ
বিচ্ছেদ করিয়া হলো আঁধার নির্বাণ,
চিররশ্মি পাইবার আশে। তাের চেয়ে
কত জ্বালা লয়ে, কত তাপে ক্লিষ্ট, তবু,
জগৎ মঙ্গল তরে ভিক্ষা ব্ৰত রাজপুত্র
করেন গ্রহণ।—তুমি পারিবে না তাহা ।
মুক্ত।
মণি। আমি রাজকন্যা! ভিক্ষুণি, লাভ কিছু দেখিতেছিনা।
অনন্ত প্রেম। সােমদও ও তােমাতে যে ভালবাসা তাহা
কোন আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করিবার স্পৃহা মাত্র। কিন্তু আমি যে প্রেমের
কথা বলিতেছি, তাহাতে অনন্ত মিলন-অনন্ত ভরিয়া সব একাত্মা।
সােমদত্তকে ত পাইবেই, অধিক, সারা বিশ্ব তােমার আপন হইবে।
মণি। তাহাতে বুঝি সুখ নাই।
তােমার সুখ নশ্বর দেহের সুখ। রক্ত মাংসের পিশাচ
প্রবৃত্তির সুখ, সামান্য মুহুর্তের। বহি, কোন মুখে এই সুখের কথা
বলিস।
মণি। চল ভুবনেশ্বরে যাই।
বেশ।
মণিমালা
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক
কান্যকুজ
( ধাবক ও বয়স্য )
বয়স্য। কবিতা আর একটা শুনাও; বিরহের।
ধাবক।
তুমি বসে আছ কোথায় কে জানে।
হায়, প্রাণটা বেশ হয়েছিল
ভালবাসার মত,
আর মনের মধ্যে এসেছিল
হা হতাশ্বাস কত,
প্রেমের কথা সবই হতো কানে—
এমন ভরা মলয় কাঁদিয়ে দিল প্রাণে।
বয়স্য।
তা আমি কঁদিতেও পারি না। ব্রাহ্মণী বলেন যেন ওটার
ভাতার মরেছে !
(শ্রীহর্ষের প্রবেশ)
হর্ষ। তবে আজ ব্রাহ্মণ বাড়ীতে প্রসাদ পাব। সেত বহু পুণ্যফলের
কথা।
বয়স্য। মহারাজ, সে কামনা আমি নিত্য নিত্য করি। কেন না
মহারাজের যথাসর্বস্ব ব্রাহ্মণেরই। তাহলে, নিত্য নিত্য ব্রাহ্মণীর পিণ্ড
আমায় গলাধকরণ করিতে হয় না।
হর্ষ। ব্রাহ্মণীর হস্তের পাক তবে মুখরােচক নয়।
বয়স শােধক বটে। পাক তিনি অনেক জানেন—সব চেয়ে
মণিমালা ৯৯ ভাল যখন তিনি নির্বাক থাকেন—কেননা ঝড়ের প্রারম্ভে মুখর। প্রকৃতি স্তব্ধ থাকে। কি বল, কবি ? হর্ষ। বলুনত! কিছু। ধাবক। ওই আকাশ পানে চেয়ে দেখি উছুল ছায়াপথে, কত কাপছে আঁচল রুপসীর এমন মধুর রাতে ; পড়ছে খসে ফুটলে কলিহার,- আমায় কে এনে দেয় একটু কণা তার ! বয়স্য। কেন, তােমার গৃহিনী সঙ্গে থাকলে কি আকাশের তারা হাতে পাও? কবিগুলো কথায় অমন হয়, কাজে কিছু নয়। হর্ষ। যাহাই হােক—আমার সন্তোষক্ষেত্রের উপলব্ধি প্রিয় কবির অন্তর উদ্ভূত। আমি সে জন্য চিরকৃতজ্ঞ। বয়স্য। তাইত মহারাজ, আপনার সন্তোষক্ষেত্র সুক্ষেত্র হইলেও, দাক্ষিণাত্য জয় বিহীনে সুসঙ্গত হইতেছে না। হর্ষ। সেথা প্রবল পরাক্রান্ত চালুক্যরাজ পুলকেশী আমার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হইবে। আমি সােমদত্তের ন্যায় সেনাপতি পাইলে চেষ্টা করিতাম। আজি সে কোথায় খাবক। বিজ্ঞ কবি বলিয়াছেন- “তুমি ভালবাস মােরে এই মনে করি এত দিন প্রাণ আমি রাখিয়াছি ধরি* তিনি নিশ্চয় বাঁচিয়া আছেন।
১০০ মণিমালা হর্ষ। হর্ষ। আর মণিমালা? বয়স্ক। একই কথা। শুন বয়স্য, মণিমালা বিহনে আমার এই রাজ্য প্রতিহীন, সােমদত্ত বিহনে রাজ্য বলহীন। আমার ইচ্ছা হয়, যদি তাহাদের পাই, আমি তাহাদের বিবাহ দিয়া রাজ্যভার অর্পণ করি। সংসারের আসক্তি, চেষ্টা, উদ্যম আমাতে যেন আর নাই । যে হর্ষবর্ধন একদিন মহারাজ রাজ্যবর্ধনের চরণ স্মরণ করিয়া দিগ্বিজয় করিয়াছিল, সে আর আমি নাই। যদি বল আমি নিজে বাসনা নিৰ্বাণ করিতে প্রয়াসী অথচ অন্যের বাসনার প্রশ্রয় দিই-কিরূপে? আমি দেখিতেছি নির্বাণের একটী সময় আছে, নহিলে সৃষ্টি ব্যর্থ হয়। বয়স্ক। তাহা সত্য- হর্ষ। বয়স্ক, আমার চিত্ত স্থির নাই। সমগ্র ভারতময় চর পাঠান যাউক, সােমদত্ত মণিমালা যেখানে থাকে—আমার নামে কঁদিয়া বলিবে আমি তাহাদের বিহনে সব শূন্য দেখিতেছি। ( প্রস্থান) বয়স্য.। মহারাজ কোন দিন পরম শৈব, কোন দিন বা পরম বৌদ্ধ! ব্রাহ্মণগণ সন্তোষক্ষেত্রে এবং প্রায় প্রত্যহই যথেষ্টরূপ দান সামগ্রী পাইয়াও তৃপ্ত নহে, দিকে বিজেতা বৌদ্ধ রাজগণও আন্তরিক স্বাধীনতাপ্রয়াসী। দেশে সম্প্রীতির অভাব, বিশেষতঃ এই সময় সত্যই যদি মণিমালার বিবাহ হয়, অনেকে শিখা উন্নত করিয়া উঠিবে ধাবক। আমি এ বিবাহের সম্পূর্ণ পক্ষপাতী। কিন্তু তবু কেন যেন আমার মন মলিন হইয়া উঠিতেছে। মহারাজ যখন দিগ্বিজয়ে বহির্গত হন, তখজএমন ভাব কখনো আসে নাই যে মহারাজ পরাস্ত হইবেন। অন্য
মণিমালা
বয়স্য। ঠিক আমারও মনে তাহাই জাগিতেছে। দেশময় ত কেবল
যুদ্ধ, শান্তি কই ! মাত্র অনায়াসলব্ধ প্রচুর শস্যশালিনী ভারত বলিয়া
প্রজারা বাচিয়া আছে।
ও কি ? ও!
(নেপথ্যে মন্ত্রধ্বনি)
ধাবক। যাহা বলিয়াছেন, মহারাজ শৈব হইয়াছেন। ব্রাহ্মণগণ
স্তব পাঠ করিতে করিতে ঠাকুর লইয়া সভায় যাইতেছেন। চলুন, দেখি।
বয়স্য।
চল।
পঞ্চম গর্ভাঙ্ক
ভুবনেশ্বর।
(মুক্ত ও মণিমালা)
মণি। আমার অন্তঃকরণ বাসনাময়, আমি নির্বাণ ধ্যান করিতে
পারিতেছি না।
মুক্ত। বিহারপতির সহিত সােমদত্তের যে তর্ক হয়, তাহার ফলে
তিনি ভিক্ষুশ্রেণী হইতে অন্তর্হিত হইয়াছেন। তিনি কামিনী-কাঞ্চন
প্রয়াসী।
মণি। যে একথা তােমায় বলিয়াছে সে মিথ্যাবাদী। যদি সমগ্র
বৌদ্ধজগতে কাঞ্চন লােভশূন্য কেহ থাকে তবে সে সােমদত্ত। যদি কেহ
পরম সৌগতের মত জিতেন্দ্রিয় থাকে তবে সে সােমদত্ত।
মুক্ত। তােমার অন্তঃকরণ সােমদত্তময়, সে তােমার নির্বাণ ধ্যানের
বি। তুমি সুগতের চরণ ধ্যান কর, সােমদত্তকে ভুলিয়া যাও। যাও,
মণিমালা
মণি।
রাণী গুহার সম্মুখে যে প্রস্তরময় সুগত মূর্তি আছে, সেখানে বসিয়া
ধ্যান কর।
আমার জ্ঞানেন্মষের সঙ্গে সঙ্গে যৌবনপ্রভাতে যাহাকে ভাল
বাসিয়াছি, তাহাকে ভুলিতে পারিব না। আমি আজ পর্যন্তও কখনো
নিৰ্বাণ ধ্যান করিতে পারি নাই, জাগরণে ও স্বপ্নে সেই পবিত্র মূর্তি ধ্যান
করিতেছি।
চল নগর ভ্রমণে যাই।
মণি। কোথাও গিয়া শান্তি নাই তােমার নিরাকার ঈশ্বরে আর
আমার প্রাণ ভরিতেছে না।
যে আকাশে জ্যোৎস্না ফুটে বারেক হাসিতে,
যে প্রাণেতে প্রেম ফুটেছে বারেক দেখাতে,
যে ঝরণার জল পেয়েছে কে তারে রােখিবে—
লক্ষ তারা পেলে রাতির সাধ কি মিটিবে ?
গীত
তুমি থাকগগা হৃদয় মাঝে হৃদয় সখা প্রাণপতি,
মুদিয়া আঁখি নিরখি আমি প্রেমময় ও মূরতি।
আমি পাষাণে তােমারে নাথ, গড়িতে পারিবনাত
কোমল অতি তােমার চিত, পাষাণে গড়া আমার মতি।
মুক্ত। ছিঃ বহিন, এত করিয়াও কিছু হইল না।
মণি। তুমি আছ বলিয়াই আছি, নতুবা থাকিতে পারিতাম না।
আমি যেন জগতে তোমাকেই সব চেয়ে ভালবাসি।
মুক্ত। যদি তাই হয় তবে ভগবানকেই ভালবাস।
মণিমালা
t
মণি। ভগবান কই, তুমি যে সাক্ষাৎ ; তাই বলিতেছিলাম, নিরাকারে
আর প্রাণ ভরিতেছে না।
এস, সাকার ঈশ্বর দেখাইব। ঈষৎ তরঙ্গায়িত শ্যামল
শস্যপ্রান্তরে দিনান্তের পদ্মরাগ-ব্লানরবিচ্ছবিখানি কেমন শােভা পাইয়াছে।
শীতকান্তি তরুলতাশােভিত গিরি উপত্যকায় খরস্রোতা জলরেখা
যেন সন্ধ্যার শাস্তির আভাষ পাইয়া আনন্দে গা ঢালিয়া দিয়াছে, উদয় গিরিয়
শিখর দেশে নীললোহিতধূসরলিখিত কি এক আভা ফুটিয়া উঠিয়াছে
মন্দ সমীরে বনপুষ্প কেমন তাহার আদর মাখাইয়া দিয়াছে ; এই
হাস্যমন্ত্রী প্রকৃতি—এই তাের সাক্ষাৎ ঈশ্বর—এমন আর কোথাও নাই।
মানুষ কি দিবে ; আয় আয় ইহাতে লয় হইতে পারি বি কি ?
মণি। মানুষকে ভালবাসিয়া কি ইহাকে ভালবাসা যায় না ?
যে মানুষকে ভালবাসেনা, সে ইহাকেও ভালবাসিতে পারে
। কিন্তু ভালবাসা কি ? রিপুর চরিতার্থতাই কি ভালবাসা?
প্রবৃত্তির দাসত্বই কি প্রেম ? কামনার মত্ততাই কি জীবনের সাধনা ?
কামের বশ্যতাই যদি ভালবাসা হয়—তবে সংসারে ত কিছুই পাপ
নয়।
মণি। গৃহীর ধৰ্ম্ম মাত্রেই পাপ নহে।
মুক্ত। বরং সেই ধৰ্মই সৰ্ব্বাপেক্ষা বরণীয় ।
মণি। তবে আমার দোষ কি ?
মুক্ত। বহিন, তােমার এ লালসা, প্রেম নয়।
মণি। তুমি একটা গান গাও; চল, দেখি সাধুগণ কি ভাবে ধ্যান
করিতেছেন।
মুক্ত। সুগত সুমতি দিন।
মণিমালা ৫ ষষ্ঠ গর্ভাঙ্ক (ধাবক ও বয়স্য ) বয়স্য। মহারাজ কখনাে বৌদ্ধ, কখনো হিন্দু। যখন যে ভাবে থাকেন। আজ প্রাতেই সােমদত্ত ও মণিমালাকে অন্বেষণ করিতে শত শত চর প্রেরণ করা হইয়াছে। বীরসিংহ আসিয়া গােপনে ব্রাহ্মণগণকে বশ করিয়া যখনি মহারাজকে বলিয়াছে, মণিমালা তাহার ভ্রাতৃবধূ- তাহাকে দেশে লওয়া আবশ্যক—আর যখনি ব্রাহ্মণগণ বলিয়াছেন—ঠিক ঠিক—অমনি মহারাজের মত পরিবর্তন হইল। মহারাজ যখন সভায় থাকেন তখন হিন্দু, যখন একলা থাকেন সম্পূর্ণ বৌদ্ধ । ধাবক। মহারাণীর কি মত। বয়স্য। তিনি বলেন মালব কুমারকে তাড়াইয়া দেও। আমাদের মেয়ে, যাহা ইচ্ছা তাহাই করিব, বেশী কোন কথা বলে মালব দেশটীকেও নিজের রাজ্যের মধ্যে টানিয়া লও। বাবক। বাহব-এ ঠিক রাজরাণীর মতই কথা হইয়াছে। বয়স্য। কিন্তু তঁাহার কথাটা থাকিতেছে না। তা না থাকুক আমি সব ঠিক করিয়া লইব। ধাবক। পারিবে ঠাকুর। বয়স্ত। আমি ব্রাহ্মণ, আমার বুদ্ধি আছে। এই সব চরের সহিত আমার নিজের লােক পাঠাইব। এরা সব কোথায় যায়। ওহে নাগরিক- গণ। এই পথে এস। ( কতিপয় নাগরিকের প্রবেশ ) সকলে। প্রণাম চরণে। বয়স্ক। কুশল হউক। কোথায় যাইতেছ ?
মণিমালা
১.৫
বয়।
সকলে। আমরা মহারাজের নিকট বিচারপ্রার্থী।
বয়স্য। তাহাত এ সময়ে হইবে না। অসময়ে তােমাদের এমন
কি প্রয়ােছন ?
১ম। ঠাকুর! সব যায় যে । এমন সােণার রাজ্য, এত ঐশ্বৰ্য্য,
রত্ন প্রসূ ভারতের সর্ববিধ পণ্য, বহুপুরুষের অনন্ত গৌরব সব যায় যে। •
কেন? কি হইয়াছে, কি চাও! প্রতি পল্লীতে দেব
মন্দিরের অমূল্য ভাণ্ডার অনাথ আতুরের জন্য সদা উন্মুক্ত, রাজপথ
স্নিগ্ধ বিটপী ছায়াযুক্ত স্থানে স্থানে পিপাসার্তর জন্য জলছত্র, সময়
অসময়ের জন্য সর্বত্রই পান্থশালা, নগরে নগরে প্রতি পথে পথে ঐশ্বৰ্য্য ও
পরিতৃপ্তির কি জীবন্ত ছবি ; একজন বিলাসিনীর বৈভবের সহিত
অন্যত্র একটী রাজত্বের তুলনা লজ্জিত হইয়া পড়ে—কি চাও ?
সকলে। সুখ নাই। শান্তি নাই—
বয়স্য। কেন ? কেন ?
১ম। দাক্ষিণাত্যে বাণিজ্য বন্ধ হইবার উপক্র হইয়াছে। সে দেশে
আর আমাদের মান সম্রম কিছু মাত্র নাই ; তার পর আমাদের মধ্যে
যাহারা হিন্দু, তাহারা অপর বৌদ্ধ রাজার নিকট হইতে মূল্য পায় না,
যাহারা বৌদ্ধ তাহারা হিন্দুর নিকট হইতে পায় না; দেশেও ভয়ানক
ব্যাপার, মহারাজ আজ হিন্দু, কাল বৌদ্ধ, আমরাও তাই ; যে বাণিজ্য
বিস্তারের জন্য এই রাজ্যের সমৃদ্ধি, তাহাত যায়।
বয়স্য। শুনিলে কবি ।
ধাবক। চলুন মহারাজের কাছে যাই।
সকলে। আপনার জয় হউক।
বয়স্য। তােমরা অগ্রসর হও, আমরা আসিতেছি।
(নাগরিকগণের প্রস্থান)
মণিমালা
বয়স্ক। ইহার জন্য পুনরায় দিগ্বিজয় চাই।
ধাবক। সােমদত্তকে চাই।
বস্ত। ঠিক বলিয়াছ। এস, আমি তাহাকে আনিব।
ধাবক। কিরূপে?
। বয়স্য। মানুষ ডাকিলে ভগবানকে পায়, আর মানুষ পাইব না ।
এস।
( প্রস্থান )
সপ্তম গর্ভাঙ্ক
ভুবনেশ্বর, একটী গুম্ফার সম্মুখ
সােমদত্ত।
“এ জগতে ইচ্ছামত ভ্রমিতে ভ্রমিতে
যদি কভু প্রিয়া পড়ে তােমার দৃষ্টিতে।
প্রথমে আশ্বাস দিয়া বলো তারে
মাধবের দশা,
বলিতে সে কথা কিন্তু দেখে। যেন
ভেঙ্গো নাকো আশা।”
সব সহিতে প্রস্তুত আছি, কিন্তু তােমাকে আর পাইবনা, তােমাকে
আর দেখিবনা, ইহা সহ করিতে পারি না।
আমার কি উপায় হইবে । কেহ কি প্রিয়ার দেখা পাইবে না,
এ জগতে কি আর সাক্ষাৎ হইবে না, মৃত্যুর পর ভিন্ন তাহাকে কি আর
পাইব না। কি নিদারুণ নৈরাশ্য, প্রাণ ভাঙ্গিয়া যায়।
(প্রস্থান)
মণিমালা
(মণিমালার প্রবেশ)
মণি। আমি যাহাকে চাই, তাহাকে ত পাই না। এত লােক
এই ভিক্ষুসম্মিলনী দেখিতে আসিয়াছে, আমার প্রাণের প্রাণ সে
সােমদত্ত কই। এত যাত্রী আসে, আমার এ প্রেমতীর্থে কোন যাত্রী
আসে না। আমি ক্রমেই হতাশ হইতেছি।
( মুক্তর প্রবেশ)
মুক্ত। আজি তাের নির্বাণ সাধনা সফল করিয়া দিব। সুখী
হইবি।
মণি।
মণ। তাের চোখে জল কেন ? আমি তাের চোখের জল লইয়া
কোন সুখ চাহিনা।
মুক্ত। আয়, আজি এ ভিক্ষুণীর বেশ ত্যাগ করাইয়া দিব, রুক্ষ্য কেশ
বাঁধিয়া দিব ; কপােলে, আমার সমস্ত প্রাণের সঞ্চিত কত সােহাগের
টিপ মাখাইয়া দিব।
এ কোন হেয়ালী, ভিক্ষুণি !
মুক্ত। আজি তােকে স্বামী সােহাগিনী করিব। এই দেখ, ভিক্ষা
করিয়া সব আনিয়াছি। তাের জন্য দেশ বিদেশে দূত ঘুরিতেছে। কেহ
বলে, মহারাজ তাের সাথে সােমদত্তর বিবাহ দিবেন ; কেহ বলে, তিনি
তােকে মালব দেশে পাঠাইবেন। ভয় নাই, বােন, ভয় নাই। আমি
তােকে সােমদত্তর হাতে দিব। সন্দেহ করি না। সােমদত্ত এখানে
আছে, মূচ্ছ। যাবি কেন ? মুখখানি আমায় দেখিতে দে। আজ তােকে
সুখী দেখিয়া আমি নির্বাণ লাভ করিব।
মণি। একবার দেখা।
মুক্ত। দেখাইব। আগে তােকে সাজাইয়া লই ও দিকে ও কি
১০৮
মণিমালা
গােল হইতেছে, আমি দেখিয়া আসি, এই তরুমূলে শান্ত হইয়া বসো,
বহিন।
মণি। না, না, আমায় একা রাখিয়া যাইও না।
আজ ভয় নাই ; সােমদত্ত এখানে আছে।
( প্রস্থান )
মণি। এস, জীবনসৰ্বস্ব, আমার প্রাণ যে যায় !
( উৎকলরাজের কতিপয় অনুচর)
১ম। ইনি কান্যকুজের রাজকুমারী।
২য়। মহারাজ হর্ষবর্ধনের আদেশ অনুসায়ে মহারাজ উৎকলাধিপতি
আপনাকে সসম্রমে জানাইতেছেন যে আপনাকে সসম্মানে কান্যকুজে যাইতে
হইবে। আমাদের সাথে মহারাজের তাম্বুলবাহিনী সব উপস্থিত।
মণি। হে বিপদবারণ—তুমি কোথায় ?
( মূচ্ছ।)
(তাম্বুলবাহিনীগণের প্রবেশ)
১ম। রাজকুমারী মুচ্ছিতা, ত্বরায় শিবিকা আনয়ন কর।
অনুচরগণের গােলযােগ ইত্যাদি।
( দৃশ্য পরিবর্তন)
মণিমালা অষ্টম গর্ভাঙ্ক ভুবনেশ্বর (সােমদত্ত বাসন্তীর হস্তধারণ করিয়া ) সােমদত্ত। আর ভুলিব না, তুমি বাসন্তী মুক্ত। ছাড়, ছাড় ; মণিমালার বিপদ। নীচ কামাতুরের ন্যায় ব্যবহার করিবার কি এই সময় । সােম। মণিমালা—কোথায় মণিমালা—কিসের বিপদ ? মুক্ত। এতক্ষণ যাহা বলিলাম কিছুই শুন নাই! হায়, হায়, উৎকল- রাজের সব লােক জন তাহাকে লইয়া গিয়াছে,-দেশে পাঠাইবে— মহারাজের মতি স্থির নাই,—তিনি হয়ত মণিমালাকে মালবদেশে পাঠাইবেন—হায় হায় কি হইবে। সােমদত্ত যুদ্ধ কর, উদ্ধার কর— সােম। তুমি এখনো সেই বালিকা। ( বয়স্যের প্রবেশ) বয়স্য। যুদ্ধ কর, উদ্ধার কর। কলিঙ্গাধিপতির সমস্ত সৈন্য দিতেছি, উদ্ধার কর। সােম। কই অস্ত্র দেও, আমি বাসন্তীর জন্য সমস্ত উৎকল দেশ উচ্ছন্ন করিব। (অনুচরসহ ক্ষিপ্ৰ কলিঙ্গরাজের প্রবেশ) কলিঙ্গ। আমি স্বল্প সৈন্য লইয়া সঙ্ঘ দেখিতে আসিয়াছিলাম। আপনার বীরপণা আমার বিদিত আছে। আসুন, অস্ত্র ও সৈন্য লইয়া বিপন্নাকে উদ্ধার করুন। সােম। অস্ত্র দিন,সৈন্য যাহা আছে দিন। বাসন্তী,তােমায় ছাড়িব না। কলিঙ্গ। আসুন, আসুন—আর বিলম্ব সহিবে না।
পঞ্চম অঙ্ক
প্রথম গর্ভাঙ্ক
চিল্কা তট ।
(মণিমালা শিলাপরি শায়িত, পার্শ্বে সােমদত্ত )
সােম। তুমি যে তাহাকে গ্রহণ করিতে, সে কথা আমি জানি।
তোমাকে একদিন আভাষ দিয়াছিলাম, তুমিও আপত্তি কর নাই।
মণি।
সে দিন আমার ভ্রম হইয়াছিল। আমি ভাবিয়াছিলাম, তুমি
বাসন্তী-উদ্দেশী, তাই তােমাকে পাইব না বলিয়া ভিক্ষুণী হইয়াছিলাম।
কিন্তু আমার ভ্রম হউক আর যাহাই হউক, আমি তাহাতে কোন বাধা
দিব না এ কথা নিশ্চয় ও আমার সমস্ত প্রাণ ভরিয়া এ কথা তােমায়
বলিতে পারিয়া আমার অপার আনন্দ হইতেছে। আমি ভিক্ষা ব্ৰত গ্ৰহণ
না করিলে আজ বাসন্তীকে হারাইতে না। আমার জন্য এত অন্বেষণ
করিয়াছ, চেষ্টা করিলে বাসন্তীকেও পাওয়া যাইবে।
সােম। তুমি বিশেষ অসুস্থ, বিচলিত হইও না।
তােমার ভয় নাই, এখন আমার মরণে অনেক সুখ।
সােম। এই জন্য বুঝি সারাবিশ্ব তােমায় খুঁজিয়াছি, পাষাণি !
মণি। আমার সাধ মিটিয়াছে, আমি তােমায় পাইয়াছি, আমার
নির্বাণ লাভ হইয়াছে।
সােম। এমন হারানিধি আমি ছাড়িতে পারি কি ? এই দেখ, নীল,
মণি।
মণিমালা
-
ঘন নীল, অনন্ত জলরাশি ; তরঙ্গায়িত কিন্তু প্রাণে উদ্বেলিত উচ্ছাস নাই
পরিতৃপ্ত সাধনা প্রাণে শান্তি আনে। এস, কাছে এস ; মৃদু মরুত
হিল্লোলে তােমার অলকাবলী সচঞ্চল হইবে, আমি তাহা দেখিতে দেখিতে
এ আকাঙ্ক্ষিত অশান্ত প্রাণের সাধনা সার্থক করিব ; আর এমনি
চুম্বন
করিয়া তােমার সমস্ত ব্যাধি দূর করিব।
মণি। তুমি আমার প্রাণের প্রাণ, তােমার ও চুম্বনে আমায় লয়
হইতে দেও।
সােম। মণিমালা, তােমার ক্লিষ্টতায় আমি বড় ব্যথা পাই
মণি। তবে আর বলিব না।
সােম। ওই তােমার বি প্রবর আসিতেছেন।
(বয়স্যের প্রবেশ )
তুমি উঠিও না।
বয় স্য। বেশ আছ মা, বেশ আছ। আমার জীবন সার্থক হইয়াছে।
শােম। কি সংবাদ।
বয়স্য। ভাল ; আবার যুদ্ধ !
মণি। যুদ্ধ কর, বাসন্তীকে আন।
বয়স্য। এ সে যুদ্ধ নয়।
মণি। আপনি বাসন্তীকে আনুন, নতুবা সুখ নাই ।
বয়স্য।
তােমার ?
মণি। উভয়ের।
বয়স্ক। সেনাপতি নির্বাক কেন ?
সােম। আমার আশা মিটিয়াছে।
মণি। বাসন্তী নহিলে নয়।
বয়স্য। সপত্নীতে এত সাধ কেন মা !
১১২ মণিমালা মণি। সে আমার নিতান্তই আপনার জন। আমি তাহাকে পাইলে সুখী হইব না। বয়স্য। তাহাই পাইবে, উঠিও না। এখন নিশ্চিন্ত আমিও ব্রাহ্মণীর জন্য বড় চিন্তিত অছি, দেশে যাইবার সুযােগও হইয়াছে। মণি। } কি কি রূপ সােম বয়স্য। তাহাই বলিতে আসিয়াছি। মহারাজ দ্বিগ্বিজয়ে বহির্গত হইয়াছেন। চালুক্যরাজ পুলকেশীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ; এদিক কলিঙ্গরাজ তাহার অধীন, এবং উৎকলরাজ চালুক্যের প্রাধান্য অস্বীকার করতঃ আমাদের মহারাজকেই সার্বভৌম স্বীকার করিয়াছেন। সুতরাং চালুক্যরাজকে সাহায্য করিতে যাইয়া আমাদিগের মহারাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিতে হইবে। এ বিবাদটা যুদ্ধক্ষেত্রে তােমার দ্বারাই একরূপ মীমাংসা হইয়া যাইবে। আমরাও স্বচ্ছন্দে গৃহে যাইব। সােম। বড়ই জটীল সমস্যা। মণিমালার যে অবস্থা—অতদূর লইয়া যাওয়াই অসম্ভব। মণি। আমি তাহা পারিব। কিন্তু মহারাজ- বয়স্য। তােমায় যে মহারাজ সাদরে গ্রহণ গ্রহণ করিবেন তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। মণি। তবে তাই চল, কিন্তু বাসন্তীকে আনিয়া দেও। বয়স্য। তুমি যে তাহার জন্য পাগল হইলে। সবই পাওয়া যাইবে। তােমার বাসন্তী সােমদত্ত হারা থাকিতে পারিবে না। যেথা সােমদত্ত যাইবে, সেথায় সে যাইবেই।
মণিমালা
১১৩
মণি। যে একবার ভালবাসিয়াছে, সে ভুলিতে পারিবে না।
সােম। এই
এই যুদ্ধটী একটা সমস্যার বিষয় হইল। মহারাজের
কোন জয়ের আশা দেখিতেছি না। তিনি নর্মদা পার হইতে পারিবেন
কিনা সন্দেহ। আপনি যেরূপ আশ্বস্ত হইয়াছেন, আমি কিছুই হইতে
পারিতেছি না। ভবিষ্যৎ অন্ধকারময় দেখিতেছি।
( দাসীর প্রবেশ )
সী। মহারাজ আপনার সহিত দেখা করিবেন, কখন আপনার
অবসর হইবে জানিতে চাহেন।
সােম।
গৃহে প্রত্যাবর্তন করিয়া তাহার সহিত দেখা করিতে যাইব।
(দাসীর প্রস্থান)
মণি। চল, তবে গৃহে যাই।
সােম। এখনি যাইবে কেন ? অপরত্নের ধূসর ছায়া হ্রদের
সারাগাত্র আরো নীলাভ করিয়া তুলিয়াছে, গিরিশিখরে কণক কিরীটের
অলস ছবিখানি বিচিত্র শশাভা পাইতেছে, আগন্তুক শান্তির আভাষে
নলবনরাজি স্নেহকম্পিতদেহে কি এক অস্ফুট ধ্বনি তুলিয়াছে; প্রকৃতির
উদার আনন্দের গেহে তােমার দেহ নিরাময় হইবে।
(দাসীর পুনঃ প্রবেশ)
দাসী। মহারাজ অত্যন্ত চিন্তাকুল হইয়াছেন। আপনি ভিন্ন
অন্য গতি নাই—কেবল এই বলিতেছেন।
মণি।
চল প্রভু; আমি তােম রাখিব না ধরে।
বিশাল এ প্রকৃতির বিশ্বভরা কাজ ;
বিশাল এ পুরুষের সর্বসিদ্ধি সাজ।
৮
5รอ
'মণিমালা
সকলেরি আগ্রহের কেন্দ্র তুমি আজি
আমাতে রহিবে বাধা? আমি সহিব না।
বয়। এক মাত্র তুমি নারী যােগ্য। এরি সাথে।
সােম। যত কিছু একাগ্রতা, বাধা আছে যত,
সকলেরি এক পণ—প্রিয়ার সহিত
অমিল করিতে হবে আমারি মিলন ?
এস তবে।
মণি। প্রাণ কেঁপে উঠে, সখা।
সােম। দেখ হিয়া মাের।
কোথা যেন যেতে চায়—বাধা নাহি মানে !
মণি। যেথা যাবে সাথে যাব আমি।
বয়স্য। (স্বগত)
হে অন্তর্যামী, তুমি জান ভবিষ্যৎ।
রক্ষা করাে তুমি।
( সকলের প্রস্থান)
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক
চিল্কাতটস্থ শিবির।
( কলিঙ্গরাজ ও মন্ত্রী )
মন্ত্রী। উভয়তঃ বিপদ। কতক সৈন্য চালুক্যরাজকে না দিলেও নয়,
আবার উৎকলরাজের বিরুদ্ধে আমরা স্বল্পসৈন্যে কিরূপে দেশ রক্ষা করিব ?
আপনি নবীন সেনাপতির কথা যাহা বলিতেছেন, সত্য হওয়াই সম্ভব,
আমিও তাহার পরাক্রমের বিষয় শুনিয়াছি বটে, কিন্তু
মণিমালা
কলিঙ্গ। আর বিপদ হইতে উদ্ধারলাভের অন্য উপায় কি ?
(সােমদত্তের প্রবেশ )
আসুন, আসুন-এখন উপায় কি?
সােম। উপায় কি তাহা যে ঠিক বলিতে পারিব এ বিশ্বাস
আমার নাই। তবে এইমাত্র বলিতে পারি উৎকালরাজকে পরাস্ত করা
সম্ভব হইবে, কিন্তু মহারাজ চক্রবর্ত্তী হর্ষবর্ধনের বিপক্ষতা শ্রেয় হইবে না।
মন্ত্রী। আমরা যে চালুক্যরাজের প্রধান্য স্বীকার করিয়াছি,
আর তাহার বিপক্ষা করিবেন কিরূপে?
সােম। চালুক্যরাজ পরাক্রান্ত সন্দেহ নাই। কিন্তু আমরা যদি
মহারাজ হর্ষবর্ধনের সহায়তা করি—আর উৎকলরাজ যদি আমাদের
পক্ষেই যোগ দেন, তবে চালুক্যের জয়ের আশা নাই
কলিঙ্গ। উৎকলরাজ আমার চিরশত্রু এবং আপনারও বােধ হয়
মিত্র নহেন।
সােম। যদি দেশের মঙ্গল চান তবে এ সব শত্রুতা ভুলিতে হইবে।
মহারাজ হর্ষবর্ধন শুধু যে পরাক্রমশীল তাহা নয় —তিনি আদর্শ নৃপতি।
তিনি ভারতের একছত্র অধিপতি হইলে ভারতবাসীর শ্লাঘার বিষয়
হইবে।
মন্ত্রী। আপনি তাহার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করিতে বােধ হয়
অনিচ্ছুক।
সােম। আপনিই বা কেন ইচ্ছুক হইবেন?
কলিঙ্গ। আপনি যাহা বলিতেছেন সত্য ; আমাদের অবস্থা
বিবেচনা করিয়া যাহা হয় নির্ধারণ করুন।
সােম। আপনি বৌদ্ধ ; মহারাজও বৌদ্ধদিগের প্রধান আশ্রয় দাতা ;
মণিমা আপনি তাহাকে সাহায্য করিলে আপনার স্বধৰ্মীর অনেক উপকার হইবে। কলিঙ্গ। যাহা হয় সিদ্ধান্ত করুন। সােম। উৎকলরাজের নিকট দূত প্রেরণ করা যাক—আমরা দুই রাজ্য মিলিত হইয়া চালুক্যের বিপক্ষতা করিলে মহারাজ হর্ষবর্ধনের জয়লাভের কোন সন্দেহ নাই মন্ত্রী। মহারাজের আজ্ঞা সাপেক্ষ। কলিঙ্গ। মন্ত্রী আমার প্রাণ, সেনাপতি আমার শিরস্ত্রাণ, যখন উভয়ের এক মত তখন আর আপত্তি কি? মহারাজ শ্রীহর্ষের নিকটও দূত প্রেরণ করা যাক। ( অনুচরের প্রবেশ) অনুচর। উৎকলরাজ স্বয়ং সসৈন্তে স্থলপথে অগ্রসর হইতেছেন, জলপথেও সৈন্য আসিতেছে। নৌ-সেনাপতি সংবাদ দিয়াছেন, রম্ভাই শত্রুপক্ষের উদ্দিষ্ট গতি। সােম। উত্তম হইয়াছে। আমরা চালুক্যরাজকে অথবা হর্ষবর্ধনকে সাহায্য করিব, এই জটিল সমস্যা হইতে উদ্ধার পাওয়া গিয়াছে। প্রথমতঃ নিজের শত্রুকে খর্ব করা যাইবে। কলিঙ্গ। ইচ্ছামত সৈন্য লইয়া আপনি রন্তায় অগ্রসর হউন, আমিও কিছু সৈন্য লইয়া শত্রুকে পার্শ্বদেশ হইতে আক্রমণ করিব। শত্রুকে জল- পথে বাধা দিবার কোন আবশ্যকতা নাই, তাহারা হ্রদের মধ্যে প্রবেশ করিলে সুক্ষ্মপথ অবরুদ্ধ করা যাইবে। মন্ত্রী। আমিও একটা সদুপায় দেখি । ।
মণিমালা
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক
হর্ষ।
নম্মদা তীরস্থ হর্ষবর্ধনের শিবির
(শ্ৰহর্ষ ও মালবরাজকুমার)
মালব। আপনার সাদর আহ্বানে আমি কৃতার্থ হইয়াছি। আপনি
যে ধৰ্ম্ম মতাবলম্বীই হউন না কেন, আমি শৈব, আমার কুলাচার রক্ষা করা
আমার কর্তব্য। আমার ভ্রাতৃবধূ ভিক্ষুণি হইবেন, বা বিধবা হইয়াও
পুনরায় বিবাহ করিবেন, ইহা আমরা সহ করিতে পারিব না।
হর্ষ। আপনি উপায় নিরুপণ করুন।
মালব। আপনি উৎকলরাজকে আজ্ঞা করুন, তাহার সাহায্যে
আমরা মণিমালাকে পাইতে পারিব।
একবার ত সে চেষ্টা হইয়াছিল।
মালব। পুনরায় হইতে পারে।
হর্ষ। চালুক্যরাজ অত্যন্ত ক্ষমতাপন্ন। কিন্তু উৎকল ও কলিঙ্গ
আমার সপক্ষ হইলে আমি তাহাকে নিশ্চয় পরাজিত করিতে পারি।
নতুবা কিছুই সাধ্য নাই।
মালব। তবে আর আমাতে আপনার আবশ্যকতা নাই।
আমাকে বিদায় দিন।
হর্ষ। কাৰ্য্যটী বিশেষ বিবেচনা সাপেক্ষ। আপনার নিকট হইতে
আমি যথেষ্ট সাহায্য পাইয়াছি।
মালব। আমি স্বেচ্ছায় আপনার শিবিরে আসিয়াছি, আপনি
যদৃচ্ছা ব্যবহার করিতে পারেন।
হর্ষ। আপনি আমাকে অতি হীন ভাবিতেছেন, আপনাকে
ক্ষমা করিলাম।
১১৮।
মণিমালা.
মালব। ইহা আপনার মহত্ত্ব। কিন্তু আমার ধৰ্ম্ম যদি না রহিল
তবে আর আমার জীবনে প্রয়ােজন কি ?
হর্ষ। কিছুই স্থির করিতে পারিতেছি না।
মালব। আপনার সেনাপতি আপনার বিপক্ষ, আপনারই বয়স্ক
আপনার ধর্মনষ্ট করিতেছে ; ভারতে ক্রমশঃই বৌদ্ধধর্ম প্রাধান্য লাভ
করিতেছে, আপনার এ বিশালরাজ্যে বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণে বিপ্লব উপস্থিত
হইয়াছে। যদি হিন্দু ধৰ্ম্ম নষ্ট হয়, আপনিই বা কোথায় থাকিবেন,
আমিই বা কোথায় থাকিব?
হর্ষ। আপনার যুক্তি উত্তম বটে।
মালব। মণিমালার প্রলােভন না থাকিলে সােমদত্তর সেনাপতিত্ব
নষ্টপ্রভাব হইবে; কলিঙ্গ যদি উৎকলের নিকট পরাস্ত হয়—তবে আর
তাহার পুলকেশীকে সাহায্য করিবার সামর্থ থাকিবে না। উৎকলের
যথেষ্ট চর কলিঙ্গদেশে বিরাজ করিতেছে, শুধু আপনার আজ্ঞা সাপেক্ষ।
মণিমালা যেরূপ অতর্কিত ভাবে আছে, তাহাকে লাভ করিতে আমাদের
কোন কষ্ট হইবে না।
হর্ষ। আমি আর কিছু শুনিতে চাহি না। আপনি যথাবিহিত
••
মালব। আমি কৃতার্থ হইলাম।
( প্রস্থান)
হর্ষ। আজ হইতে আমার গৌরবরবি অস্তমিত হইল। জীবনে
আজ প্রথম পরের কুপরামর্শে স্বীকৃত হইলাম। অৰ্দ্ধ ভারতের অধিপতি
আমি আজ নগণ্য সামন্তের বশীভূত।
বশীভূত। কেন ?
বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণের
বিবাদেই আমি সর্বস্বান্ত হইলাম। ভিন্ন জাতি হােক, ভিন্ন ধৰ্ম্ম হােক,
কেহই দেখিবে না যে সকলেই এক ভারতবাসী। ভারতের পতন
সুনিশ্চিৎ, অন্ধকার ঘন হইয়া আসিয়াছে।
-
মণিমালা
(সৈনিকের প্রবেশ)
সৈনিক। মহারাজ, এই মাত্র উৎকল হইতে সংবাদ আসিয়াছে-
আপনার আজ্ঞা সুনিশ্চিৎ জানিয়া তিনি কলিঙ্গ দেশ
দেশ আক্রমণে
যাত্রা করিয়াছেন।
হর্ষ। সব মিথ্যা, সব প্রবঞ্চনা। কুলাচার,-ধৰ্ম্মাচার-সব পাপাচার।
এখনি কলিঙ্গরাজের নিকট সংবাদ দেও তিনি সােমদত্ত ও মণিমালার
বিবাহ দিন। আমি মালবের সাহায্য চাহি না। যদি ন্যায় যুদ্ধে
সকলকে বশে আনিতে পারি, তবে সকলকে শিখাইব যে ধৰ্ম্ম কি ?
আমি যে প্রাণ চাই, তাহা কোথাও পাইলাম না। ভারতে যে প্রাণ ছিল,
তাহা গেল কোথায়!
( প্রস্থান)
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক
বয়স্য ও মণিমালা
বয়স্ক। তুমি বুদ্ধিমতীর মতই কাষ করিয়াছ। তুমি সঙ্গী হইলে
সােমদত্তর যুদ্ধ করা হইত না।
মণি। কিন্তু আমার মন কিছুতেই প্রবােধ মানিতেছে না। আমি
আর বাঁচিব না, এসময় বাসন্তী থাকিলে কতক শান্তি পাইতাম।
বয়স্য। তাহাকে পাইলে বাচিবি ?
মণি। দেও, তাহাকে আনিয়া দেও। (নতজানু হইয়া) তুমি -
ব্রাহ্মণ, সর্বজ্ঞ, তুমিই সাক্ষাৎ দেবতা। দেও, তাহাকে আনিয়া দেও।
মণিমালা
বয়স্য। উঠ, বাসন্তী আসিবে। ভালবাসিয়া যে সন্ন্যাসিনী হইয়াছে,
তাহার সে ব্ৰত কতক্ষণ?
মণি। আহা, বাসন্তী যখন গাহিত—“অশোক কর সশেক হৃদি”-
আমি যেন সারাবিশ্ব সােমদত্তময় দেখিতাম। তাহার প্রাণের শােক
লাঘব কর, তাহাকে তাহার প্রার্থিত বস্তু দেও, ভগবান, আর দুঃখ
দিও না।
(নেপথ্যে গীত )
ওই আমার বাসন্তী! কই, আয় আমার প্রাণের সাথী । দুঃখের
সাথী সুখের সাথী হইবি, আয় ! কই, কই তুমি !
( বাসন্তীর প্রবেশ)
গীত
আজি তরী ধরি ধরি কুল ছাড়ি চলি যায়
অনুকূল বহে বায়ু-সব ব্যথা মুছে দেয়।
ভাল যদি বেসে থাকো, হাসি মুখে চলে যাবো,
কাঁদিতে যেটুকু হবে আপনাতে লব তাই।
ঢেউ যদি উঠে গাঙ্গে, বলিব না থামিতে,
মরু যদি ঘিরে ধরে অভাগীর পথেতে,
আপনারি বােঝা লয়ে—আপনারি পথ বয়ে-
স্বপন ভুলিয়া আজি—আঁখি মেলি চলে যাই।
মণি।
!
তুমি সুখী হও।
বাসন্তী
বাস।
ভগবান তােমার মঙ্গল করিয়াছেন।
একি, তুমি এমন হতশ্রী হইয়া পড়িয়াছ !
| বয়স্য। তােমাকে না পাইয়া।
মণিমালা
১২১
মণি। তুমি আসিয়াছ, আমি এখন ভাল হইব। আর যাইও না।
তুমি বলিতে যে সুখ পরকে না বিলাইলে তৃপ্তি হয় না আমার সুখ
তােমাকে না দিলে আমি সুখী হইব না।
বয়স্য। আমি আসি।
(প্রস্থান)
বাস।
বাস। আমি সুখ পাইয়াছি, শান্তি পাইয়াছি, আমার সাধনা
পূর্ণ হইয়াছে।
মণি। তুমি এই জন্য আসিয়াছিলে ? না, আমার ভুল হইয়াছে।
একবার বল, লজ্জা, সরম, অভিমান-তােমার কোন্ বাধা আমি
কোন মন্ত্রে অপসারিত করিব, আমাকে তাহা শিখাইয়া দেও।
কোন বাধা নাই। তােমাকে দেখিতে
আসিয়াছিলাম।
মণি। আর কাহাকেও দেখিতে চাও না।
বাস। দেখিব।
মণি। কি বলিবে ?
বাস। বলিবার কথা
তাহা আপাততঃ থাকুক।
আবার আমি পিতৃদেশেই ফিরিয়া যাইব। যে আশ্রমে শৈশবের
শান্তি রাখিয়া আসিয়াছি সেইখানেই যৌবনের খরতাকে শান্ত করিব।
মণি। তুমি নিৰ্ম্মম, নিষ্ঠুর। এখানেই থাক। যদি তাহাকে
দেখিয়া যাইতে পার, যাইও।
কেন উতলা হইবে ? আশা পূর্ণ
পূর্ণ হইয়াছে, এখন
চিত্ত সংযম কর।
মণি। আমি সত্যই হতভাগিনী।
অনন্ত।
বাস।
১২২।
মণিমালা
কই ?
মণি।
বাস। মণিমালা, এতকাল একত্রে বাস করিয়াছি, আজ বিদায়ের
দিনে তােমার মধুর মুখে হাসি দেখিয়া যাইব বলিয়া আসিয়াছিলাম।
মণি। আমার সারা অঙ্গে মৃত্যুর ছায়া পড়িয়াছে, আর সে মাধুরী
তুমি যদি দাও—বল, তুমি একবার বল, তােমার সব কথাই
মিথ্যা।
বাস। উদ্বিগ্নতা তােমার নিত্য সহচর।
কাহার নয়। তাম্রপর্ণী ত্যাগ করিয়া আসিয়াছ, কাহার
জন্য ? সন্ন্যাসিনী হইয়াছে কাহার জন্য ? আমাকে ভিক্ষুণি করিলে
কাহার জন্য ?
বাস। তুমি ঠিক বলিয়াছ। সেই জন্যই আজ প্রাণের তরী
ভাসাইয়া দিব স্থির করিয়াছি। অকুলে পড়িয়া দেখিব, কত দূরে কোন
জীবনের পারে সে কুল আছে। যেখানে লালসা নাই, তন্ময়তা নাই,
মােহ নাই, বিচ্ছেদ নাই, সেই কূলে গিয়া আমি তােমার সহিত মিশিব।
নতুবা, মণিমালা, শান্তি নাই।
মণি। আমি মরিতেছি। তােমাদের জন্য সেই পুণ্যতীর্থে আসন
পাতিয়া রাখিব। এস।
বাস। তােমার প্রাণ, অনন্ত, অসীম ভগবৎ প্রেমের আধার
স্বরূপ। আমি ইহার যােগ্য নই।
মণি। (নতজানু হইয়া)
ভগবান, এ প্রাণ ক্ষুদ্র, কিন্তু স্বার্থপর নহে।
কিন্তু স্বার্থপর নহে। আমার বাসনা
মিটিয়াছে, আমি সুখী হইয়াছি। আমাকে তােমার চরণে আশ্রয় দেও।
সুগত, বাসন্তীর সুমতি দেও। বহিন, তবে বিদায় দে, আমিই আগে
যাই।
(বাসন্তীর দেহে মুর্ভূিত ভাবে পতন )
মণিমালা
বাসন্তী। সুগত এ কি করিলে ।
( বয়স্কের প্রবেশ)
বয়স্ট। একি সর্বনাশ ! হায়, হায় ভিক্ষুণি তুমি কি করিলে?
মহারাজ হর্ষবর্ধন পরাজিত হইয়াছেন, কলিঙ্গরাজ বিপন্নরূপে আবদ্ধ,
সােমদত্তর অবস্থা সঙ্কটাপন্ন।
মণি। (উন্মাদ ভাবে উঠিয়া) কি হইয়াছে। কোথায় সােমদত্ত।
আমি যুদ্ধক্ষেত্রে যাইব। আমি ক্ষত্রিয় কন্যা, আমাকে কে রােধিবে ?
বাসন্তী সাথে যাইবি ?
বাস। যাইব।
মণি। কোথায় কে পথ দেখাইবে ?
বয়স্য। যাহা অদৃষ্টে থাকে চল—পথ আমি দেখাইব।
মণি। বাসন্তী সােমদত্তকে ত্যাগ করিয়া মুক্তির সুখ চায়—আমি
সে পদপ্রান্তে মরিয়া তাহাতেই লয় হইতে চাই।
চল।
( প্রস্থান)
পঞ্চম গর্ভাঙ্ক
যুদ্ধক্ষেত্র
(সােমদত্ত ও দূত পরস্পর ভিন্ন দিক হইতে )
সােম। কি সংবাদ।
দূত। মহারাজ বৃহ ভেদ করিয়াছেন।
সােম। উত্তম সংবাদ !
১২৪
মণিমালা
( দ্বিতীয় দূত প্রবেশ)
২য় দূত। উৎকল সৈন্য পলায়নপর হইয়াছে।
সােম। সাধু যাহার ইচ্ছা ভগবান তাহার সহায়, এ আনন্দ সংবাদে
আমার মস্তিষ্ক উত্তপ্ত হইয়া উঠিতেছে।
(তৃতীয় দূতের প্রবেশ)
৩য় দূত। আমি সংবাদ আনিয়াছি, শ্রেষ্ঠী কন্যাকে পাওয়া গিয়াছে।
সােম। মণিমালা কুশলে আছে !
২য় দূত। সকলেই কুশল ।
( বয়স্যের প্রবেশ )
বয়স্য। মণিমালা ও বাসন্তী শত্রু হন্তে পড়িয়াছে। রক্ষা কর,
রক্ষা কর।
সােম। আমি কি উন্মত্ত
বয়। সব যায়, সত্বর হও। তাহার নৌকায় লইয়া যাইবে এইরূপ
বােধ হয়।
সোম। কোথায়--কোন পথে—সেই মায়াবিনী যেথা যায় সেথায়ই
অনর্থের সৃষ্টি।
( সােমদত্ত ও বয়স্যের প্রস্থান)
২য় দূত। ব্যাপার কি পৃথিবী যেন অধীর হইয়া ছুটিতেছে।
১ম দূত। তাই ত !
৩য় দূত। মহারাজ আসিতেছেন।
১ম দূত। তাহারা বােধ হয় এ সংবাদ পান নাই।
মণিমালা
১২৫
(কলিঙ্গরাজ ও অনুচরগণের প্রবেশ )
কলিঙ্গ। আমি বুঝিয়াছি। আমার ও সেনাপতির বিপদ শুনিয়া
তাহারা যুদ্ধক্ষেত্রে আসিতেছিলেন আমি মহারাজ হর্ষবর্ধনের সংবাদ ও
মালবের চক্রান্তের কথা বলিবার অবসর পাই নাই। তাহাতেই এ বিপদ
ঘটিয়াছে। চিন্তা নাই চতুর্দিকেই আমাদের সৈন্য ধাবিত হইয়াছে।
১ম দূত। কিন্তু শত্রুপক্ষ তাহাদিগকে নৌকায় লইয়া যাইবে
এইরূপ সংবাদ পাওয়া গেল।
কলিঙ্গ। ইহা বিশেষ চিন্তার কথা। বিপক্ষের নৌকা দেখিলে
আমাদের বিজয়ী নাবিকেরা নৌকাখানি ডুবাইয়া দিবে। এ যে ভয়ানক
ব্যাপার হইল। ত্বরান্বিত হও, নৌ সেনাপতিকে সংবাদ দেও।
(১ম দূতের প্রস্থান )
আমি নিজে এ বিষয় অনেকটা উপেক্ষা করিয়াছি। ধিক আমাকে।
আমার অশ্ব লইয়া আইস, আমি নিজে যাইব।
( সকলের প্রস্থান)
ষষ্ঠ গর্ভাঙ্ক
চিল্কা হ্রদে ; একখানি ভগ্নতরী।
(বাসন্তী ও মণিমালা)
বাসন্তী।
আর ভয় নাই। কুল নিকটে বােধ হইতেছে, কিন্তু
আমি ভাল দেখিতে পাইতেছি না।
মণি। আমি ত আর ধরিয়া রাখিতে পারি না। তুমি পারত তীরে
উঠ। তুমি বাঁচিয়া থাকিলে আমি সুখী হইব।
মণিমালা
বাস। একটু সাহস, কর, হতশ্বাস হইও না। শত্রুর অস্ত্রে
শক্রই বিনষ্ট হইয়াছে, সব মরিয়াছে, ভগবান যে আমাদের বাঁচাইয়া
রাখিয়াছেন নিশ্চয় তাহার কোন মহিমা সিদ্ধ হইবে।
মণি। যাহাই হউক, তাহার সহিত আর দেখা হইবে না।
তাহাকে বলিও,-আমার সমস্ত প্রাণ, আবেগ উদ্বেগজনিত তাহারি
ধ্যান,
তাহারি জ্ঞান আমি সব তােমাতেই সপিয়া দিলাম।
বাস। তুমি একটু যদি সাহস করিতে তবে
আমি একবার
দেখিতাম তল কত দূর।
মণি। অামায় ভয় করে। এক মুহুৰ্ত্ত তােমা হারা হইলে আমার
রক্ষা নাই। মরিবার ভয়ে বলিতেছি না। মরিবার সময় তােমায়
দেখিয়া মরিলে সুখ পাইব না।
বাস। অত কাতর হইতেছে কেন ?
মণি। আমি তােমারি জন্য কাতর, বাসন্তী। তােমার সহিত
কিক্ষণে দেখা হইয়াছে জানি না, দুজনেই এক পথের যাত্রী, এক প্রেমের
ভিখারী। তুমি ভিক্ষায় যাহা পাইয়াছ, আমাকেই দিলে; পথের
যত কষ্ট সব নিজে সহিয়া, নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়া আমারই স্বার্থে
তন্ময় হইলে। আমি তােমারি জন্য কাতর।
বাস। যাহা অদৃষ্টে ছিল, ঘটিয়াছে,
এই সাগর জলে ত একদিন ডুবিয়াছিলাম, সেদিন বাঁচিলাম কেন ?
তােমাকে ভিক্ষুণি সাজাইবার নির্ধ্ব দ্ধিতা আমার অসিল কেন?
তােমাকে কত কষ্ট দিয়াছি। কিন্তু আর কষ্ট নাই, এইবার তুমি
নিরাপদ হইবে।
মণি। আর তুমি ?
যে পথে সুগত পথ দেখাইবেন তাহাতেই চলিব।
বাসন্তী।
মণিমালা
১২৭
মণি। আমি তীরে উঠিব না, এইখানেই ডুবিব ।
বাসন্তী। পারিবে ?
মণি। যদি তুমি একটা কথা প্রতিশ্রুত হও।
বাসন্তী। কি ?
মণি। আমার সােমদত্তর প্রাণে আমার স্থান অধিকার করিবে ?
বাস। চল, তীরে উঠি
মণি। তুমি পাষাণি !
বাস। তাহা অপেক্ষাও কঠিন, নতুবা আমার প্রাণ এত দিন
থাকতে পারে ? কত বিপদ গিয়াছে, কই, জীবন ত নষ্ট হয় নাই
সুখে বঞ্চিত হইয়াছি, তবুও আৰ্ত্ত হই নাই, অথচ মােহ নিদ্রা ত কিছুতেই
ভাঙ্গে না। এবার ডুবিয়া দেখি-তাহাতে কি আছে।
মণি আমি ত প্রস্তুত।
বাস। আমি এত ভীত হইতেছি কেন ? জীবনের কি এত মায়া ?
তাহাতে কি আছে ? দয়াময়, তােমার এত ছলনা, এত পরীক্ষা?
মণিমালা, আমি ডুবিতে পারিলাম না।
মণি। তুমি থাক, আমি যাই। ঐ দেখ, ভীষণ ঝড় উঠিয়াছে—
ভয়ানক তুফান হইতেছে। আর রক্ষা নাই—দুজনকেই মরিতে হইবে,
তুমি পার ত তীরে উঠ।
বাস। সাবধান। খুব জোর করিয়া ধর। ভয়ানক তুফান
আসিতেছে। এই মালা গাছ গলায় পর, কোন ভয় নাই।
মণি। প্রভু, হৃদয় স্বামী-
বাস। মণিমালা, আমি দেখিতেছি আমার প্রাণ সােমদত্তময়।
মণি। বহিন, এ কথা আগে বলিস্ নাই ? দেখ, কুলে যাইতে পার
কিনা ?
১২৮
মণিমালা
বাস।
এ কূলে কিছু নাই। মণিমালা, ওপারে দেখা হইবে
(তুফান দেখিয়া উভয়ের ভয়জনিত চিৎকার। তুফানের আঘাতে উভয়ের
জলমগ্নহওন। সােমদত্ত ও সঙ্গীগণের কূলে আগমন)
সােম। যায়যায়কি দেখ—আমিও ওই সাথে যাইব
(জলে ঝম্পদান )
সকলে। দেখ, দেখ।
(সকলের জলে অবতরণ )
দৃশ্য পরিবর্তন
সপ্তম গর্ভাঙ্ক
চিল্কাতটে
দুই জন সৈনিক ভিন্ন ভিন্ন দিক হইতে প্রবেশ
১ম। যাহা ভাবিয়াছিলাম তাহাই হইয়াছে। সব ডুবিয়াছে।
২য়। হরিষে বিষাদ। যেরূপ ঝড় ও তুফান তাহাতে ঠিক করিয়া কিছু
বুঝিবার উপায় নাই।
১ম। ওই সিংহল দেশের মেয়েটাই যত অনিষ্টের মূল ! শুনেছি ও
যখনি আসে তখনই একটা বিপদ ঘটে।
২য়।
তা হবে ।
ওকে ত মানুষ বলে বােধ হয় না।
১ম। মুক্তা ফুটে বের হয়েছে, তাই ওর নাম মুক্তা- আরও কত
নাম আছে !
হয়।
তা হবে!
ও সব করিতে পারে । এ দেশে এমন ঝড় ত
কখনাে দেখি নাই! ঘাের কলি, তার আর সন্দেহ নাই। এই বৌদ্ধ
ধর্মেই প্রলয় আসিবে। শুনেছি এ মেয়েটা ত বৌদ্ধ।
মণিমালা
১২৯
১ম। ঠি, ঠিক আমাদের মহারাজ আবার ওদের বড় ভালবাসেন।
আর রক্ষা নাই। কোথায় যাবে?
কোথায় বা যাবাে, আর কি বা খুঁজিব? এ সব দানব
দৈত্যের কাণ্ড। কোথায় চল, দেখি আর সকলে কোথায়।
১ম। তাই চল।
অষ্টম গর্ভাঙ্ক
চিল্কা হ্রদ
(কাষ্ঠখণ্ড ধরিয়া বাসন্তী ও সােমদত্ত)
সােম। বাসন্তী ?
বাস। তুমি আমার প্রাণের প্রাণ, সকল তপস্যার সাধনা, কিন্তু
আমি ভিক্ষুণি !
সােম। আমি ভাবিলাম আজ জীবনের সব শেষ, সব এই সাগর
জলে বিসর্জন দিতে হইল! আমিও স্বেচ্ছায় ডুবিতেছিলাম, সহসা
ভিক্ষুণীর বেশ কাহাকে দেখিয়া আবার জীবনে মায়া করিলাম।
আমাকে পাষাণে গড়িয়াছে ? নারী মূর্তি কে এত দয়ামায়াহীন করিয়া
মর্তে পাঠাইয়াছে ? বাসন্তী, আর কিছু চাহি না-তােমার সম্মুখে হ্রদের
ক্ষুব্ধ হৃদয়ে ডুবিয়া সব জ্বালা দূর করিতে দাও। আর প্রলােভন দিও না।
তুমি কি সেই বাসন্তী, না তাহার প্রেতাত্মা! মানুষ এমন কঠিন হইতে
পারে না। তুমি যথা ইচ্ছা যাও, মণিমালা মরিয়াছে, আমি তাহার কাছেই
যাইব।
মণিমালা
বাস। যে মণিমালা তুমি প্রত্যাখ্যান করিয়াছিলে তাহা আমি
তাহার গলায় পরাইয়া দিয়াছি—তাহাতে দৈবশক্তি আছে—মণিমালা,
নিশ্চয় তীরে উঠিতে পারিবে। আমি মরিতে পারিতাম, কিন্তু তােমার স্মৃতি
অধিকক্ষণ বুকে ধরিয়া রাখিতে পারিব বলিয়া মরিলাম না, ভাবিলাম,
মরণে যদি সে অনুভব শক্তি না থাকে ! তােমাকে মনে করিয়া দিন
কাটাইব, যথা সাধ্য দীন দুঃখীর সেবা করিব, বিশাল প্রকৃতির সারা অঙ্গ
ব্যাপিয়া আমার প্রাণটী মুগ্ধ রহিবে !
সােম। তাই যদি চাও, তবে চল, সংসারে কাজ নাই, তােমার
সেবাব্রতে আমাকে সাথী করিবে—আমার আর কোন বাসনা নাই।
বাস। তাহা হয় না।
সােম। তােমার সব মিথ্যা! মণিমালা, কোথায় তুমি, আমায়
সাথে লও।
বাস। তুমি ভ্রান্ত হইতেছ !
সােম। আমার বুদ্ধি অভ্রান্ত হইল কবে? সবই যে স্বপ্ন—তুমি
সেই স্বপ্ননিৰ্মিতা কোন মায়াবিনী! কে তুমি ?
বাস। আমি বাসন্তী। এ জীবনে যাহা হইবার হইল, মৃত্যুর পর
যাহাতে আমি তােমাতে লয় হইতে পারি আর যাহাতে বিচ্ছেদ না হয়
সেই পথের অন্বেষণে যাইব। তুমিই ত বলিয়াছ—সুখ হ’তে দুঃখ ভাল,
আমি সেই দুঃখের সন্ধানে যাইব যাহাতে অনন্ত সূখ মিলে।
সােম। আমার সাথে লও। পারিবে না? আমার এ প্রাণে
তােমার আসন হইবে না! আমায় সুখী হইতে দিবে না ?
বাস। দয়াময়, রক্ষা কর।
সােম। কেন? কি চাও? কি পাইবে ? আমাকে ত্যাগ করিয়া
কি সুখ পাইবে? আমার প্রাণ ভাঙ্গিয়া কি আনন্দ হইবে? বাসন্তী
A
মণিমালা
৩১
• •
কই,
বাস। তােমার কাছে থাকিয়া মরিতে পারিলাম, আর কিছু চাইনা
আমার সব ব্ৰত সফল হইয়াছে।
(জলে নিমজ্জন)
সােম। কই, বাসন্তী কই ? ওই দুরে—ওই তীরে-
কই? জলে
স্থলে সর্বত্রই বাসন্তীময়—কিছু ত দেখিতে পাই না! তীরে উঠিয়া
দেখি-
( সন্তরণপূৰ্ব্বক তীরে আগমন )
কোথায় বাসন্তী ? ওই, ওই, ওই—দেখা যায়—ওই
পাহাড়ের কাছে
(প্রস্থান ও অন্যপথে মণিমালা)
মণি। এই যে দেখা যাইতেছিল! কে যেন ওই পাহাড়ের কাছে
তীরে উঠিল ! ওই যে বাসন্তী জলে! বাসন্তীকে ছাড়িয়া সােমদত্ত
নিশ্চয় তীরে উঠিবে না। আমার সব গিয়াছে—আর কেন ? হে প্রভু,
হে স্বামী-যে পথে তুমি গিয়াছ আমার সাথে লও।
( জলে ঝম্প দিতে উদ্যত ভাব)
(বেগে সােমদত্তের প্রবেশ ও মণিমালাকে বক্ষে ধারণ)
সােম। মণিমালা, কোথা যাবি-
মণি। তুমি-তুমি-বাসন্তী ?
সােম। তুমিই আমার প্রাণ-আর কাহাকেও চাহি না—আর কেহ
আসিবে না।
(কলিঙ্গরাজ ও অন্যান্য সকালর প্রবেশ)
কলিঙ্গ। সেনাপতি, যেখানে প্রেম সেইখানেই জয়।
মণি। ওই—দূরে--
১৩২ মণিমালা 1 সােম। মহারাজ, আপনার জয় হউক, আমি মণিমালা পাইয়াছি। বাসন্তী যে স্মৃতি রাখিয়া গিয়াছে—তাহা আমাদের জীবনের ভ্রান্তি দূর করিবে। মণিমালা আর ভয় নাই। মণি। আর তুমি আমাকে ছাড়িয়া কোথাও যাইও না। • কলিঙ্গ। যে এ প্রেমের যুদ্ধে জয়ী হইয়াছে তাহার আর ভয় নাই। আমি এই স্থানে এই প্রেমের কাহিনী লিপিবদ্ধ করিয়া স্তম্ভ স্থাপন করিব। ( বয়স্য ও ধাবকের প্রবেশ ) সােম। আজ সবই স্বপ্নের মত । বয়স্য। মিলনের সময় দেখিতে পাই নাই, আর এই পাগল কবি সময় মত না আসিলে জীবনের লীলাই শেষ হইত। বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের আশীর্বাদে তােমরা মঙ্গলযুক্ত হও। ধাবক। মহারাজের দেশ হইতে পলাইয়াছি, সেথায় আর কাব্য নাই, যাহা চাই ঠিক তাহাই মিলিয়াছে। মণি ও সোম। মহারাজের কুশল ত ! মহারাজ এত জানেন না, জানাইবার আবশ্যকতা নাই- নবদম্পতীকে আশীৰ্বাদ পত্র দিয়াছেন। দিগ্বিজয়ে যাহা হইবার হইয়াছে —এখন দেশে যাইতে হইবে। সে কথা পরে বিবেচ্য। এখন আসুন-আপনি শিলা- স্তম্ভের শ্লোক রচনা করিবেন। কলিঙ্গ। ধাবক। প্রেমে ধৰ্ম্ম, প্রেমে মুক্তি ; প্রেমের সাধনা নির্বাণের মােক্ষগতি,-মােক্ষ আরাধনা। (পটক্ষেপণ )
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.