Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Dhrubo

Das, Satishchandra · 2010/02/13

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

NAGAR
कृय
Sy
or
गुना गार याना।

No text on this page.

১০৯
“তুমি রাজার কোলে বসিবার যােগ্য নও।”
-- পৃষ্ঠা

No text on this page.

(পৌরাণিক কাহিনী )
গৌহাটী কটন কলিজিয়েট স্কুলের শিক্ষক
শ্রীসতীশচন্দ্র দাস এম্-এ প্রণীত
“হয় দেব ধ্যানে,
ভৰুতের প্রাণে
দেবের আবির্ভাব।”
—শ্রীকামিন।
পঞ্চম সংস্করণ
কলিকাতা
৬৫ নং কলেজ স্ট্রীট, ভট্টাচাৰ্য এণ্ড সন্ত্রর
পুস্তকালয় হইতে শ্রীদেবেন্দ্রনাথ
ভট্টাচাৰ্য কর্তৃক প্রকাশিত
এবং
১০৭ নং মেছুয়াবাজার স্ট্রীট, স্বর্ণপ্রেসে
ঐদ্বিজেন্দ্রনাথ দে কর্তৃক মুদ্রিত।
১৯১৮
মূল্য চার আনা মাত্র

ভূমিকা। শ্রীমদ্ভাগবত ও বিষ্ণু পুরাণে উল্লিখিত উপাখ্যান অবলম্বনেই “ধ্রুব” রচিত হইল। এই পুস্তকের রচনা ও প্রকাশ বিষয়ে “ধৰ্ম্ম, সমাজ ও স্বাধীন চিন্তা”, “The present state of Sanskrit Learning in Bengal' প্রভৃতি গ্রন্থ প্রণেতা গৌহাটী কলেজের অধ্যাপক, ভক্তিভাজন শ্ৰীযুক্ত বন- মালী চক্রবর্তী এম, এ বেদান্ততীর্থ, বেদান্ত- রত্ন মহাশয়ের নিকট উৎসাহ ও সাহায্য পাই- য়াছি। ইতি। গৌহাটী । শ্রীসতীশচন্দ্র দাস। ভাদ্র ১৩১৮

(১)
অনেক দিন হইল আমাদের এই ভারত
বষে উত্তানপাদ নামে এক রাজা ছিলেন।
প্রজাদিগকে তিনি বড় ভাল বাসিতেন। কিন্তু
তাহার দুই রাণী ছিলেন। একজনের নাম
ছিল সুরুচি। আর একজনের নাম ছিল
সুনীতি। সুনীতি বড় ভাল মেয়ে ছিলেন।
তাঁহার একটুও অহঙ্কার গরিমা ছিল না।
কিন্তু সুরুচি বড় অহঙ্কারী ছিলেন।
কি জানি কেন সুরুচিকে খুব ভাল বাসিতেন।
সুনীতিকে তিনি তত একটা আদর যত্ন
করিতেন না।
সুরুচির এক ছেলে ছিল। তাহার নাম
ছিল উত্তম। সুনীতিরও এক ছেলে ছিল।

৪
3
তাহার নামই ছিল ধ্রুব। এই ধ্রুবের গল্পটাই
আজ তােমাদিগকে বলিব ।
উত্তানপাদ দুই ছেলেকেই ভালবাসিতেন।
কিন্তু সুরুচি ধ্রুবকে একেবারেই দেখিতে পারি-
তেন না। ধ্রুবের মা সুনীতিরাণী সুরুচির
সঙ্গে থাকিতে না পারিয়া রাজবাড়ী হইতে
কিছুদূরে একখানা ছােট্ট ঘরে ধ্রুবকে লইয়া
বাস করিতে লাগিলেন ।
ক্রমে ধ্রুব বড় হইল।
সে জানিতে
পারিল যে সেও রাজার ছেলে। একদিন
রাজা সিংহাসনে বসিয়া আছেন ।
সুরুচি
সিংহাসনের অল্প দূরে দাড়াইয়া। আর তাহার
পুত্র উত্তম রাজার কোলে । রাজা উত্তমকে
কতই না আদর করিতেছেন।
সেই সময়ে
ধ্রুবও খেলা করিতে করিতে সেই স্থানে
আসিয়া উপস্থিত হইল। উত্তমকে পিতার
কোলে দেখিতে পাইয়া ধ্রুবেরও সেই স্থানে
বসিবার ইচ্ছা হইল।
সিংহাসনের সম্মুখে
যাইয়া পিতার কোলে উঠিবার জন্য সে ছােট্ট

হাত দুই খানি বাড়াইয়া দিল। উত্তানপাদ
সুরুচিরাণীর ভয়ে তাহা দেখিয়াও দেখিলেন
। ধ্রুব ভাবিল পিতা বুঝি সত্য সত্যই
তাহার মনের ভাব বুঝিতে
ভাব বুঝিতে পারেন নাই।
আবার হাত বাড়াইল। এইবারও রাজা ছল
করিলেন। ধ্রুবও ভাবিল পিতা তাহার মনের
ভাব বুঝিতে পারেন নাই। সুতরাং সে বার
বার এইরূপ চেষ্টা করিতে লাগিল। তখন
রাজার মনেও বড় দুঃখ হইল। কিন্তু তথাপি
ধ্রুবকে কোলে তুলিয়া লইতে তাহার সাহস
হইল না। তিনি সুরুচির দিকে একবার
তাকাইলেন । সুরুচিও একমনে সেই সমস্ত
ব্যাপার দেখিতেছিলেন। তাঁহার ভাব-ভঙ্গী
দেখিয়া রাজা বুঝিতে পারিলেন যে ধ্রুবকে
কোলে করিলে একটা ভারি গােলমাল বাজিয়া
যাইবে। সুতরাং বেচারী ধ্রুব কিছুতেই পিতার
কোলে স্থান পাইল না।
ধ্রুব এখনও ছােট বালক। প্রথমে সে
এই সমস্ত ব্যাপারের কিছুই
বুঝিতে পারিল

। কিন্তু সুরুচিরাণী যাহা যাহা বলিলেন তাহাতে ক্রমে ক্রমে বুঝিবার কিছুই বাকী থাকিল না। সুরুচি দেখিলেন রাজা হাকে করেন। ইহাতে তাহার সাহস বাড়িয়া গেল। তিনি খুব গর্বের সহিত ধ্রুবকে বলিলেন- “বলি ধ্রুব ! তােমার ত খুব আস্পর্ধা দেখি- তেছি। তুমি কি জান না যে তুমি কে, আর উত্তমই বা কে ? মনে রাখিও উত্তম আমার পুত্র, আর তুমি সুনীতির পুত্র। তুমি রাজার কোলে বসিবার যােগ্য নও। আমার উত্তম একদিন এই সিংহাসনে বসিবে। সুতরাং একমাত্র সে-ই এই সিংহাসনে রাজার কোলে বসিবার যােগ্য। তবে, বাছা, তুমি কোন্ সাহসে উত্তমের সহিত এইরূপ এক আসনে বসিতে চাও? কেন বার বার মিছামিছি চেষ্টা করিতেছ? তুমি যে সুনতিরাণীর ছেলে তাহা কি তুমি জান না? তুমি ত আমার ছেলে নও?”

সুরুচিরাণীর কথা শুনিয়া ধ্রুবের বুকটা যে ছিড়িয়া যাইতে লাগিল। সে আর সেই স্থানে থাকিতে পারিল না। তাড়াতাড়ি তাহার মায়ের কাছে ছুটিয়া গেল। তাহার চক্ষু দুইটি দিয়া দর দর জল পড়িতে লাগিল। ক্রোধে ও অপমানে ঠোট দুইখানি কঁপিতে লাগিল। ধ্রুবের এই প্রকার অবস্থা দেখিয়া সুনীতি অবাক হইয়া রহিলেন। কিছুই বুঝিতে না পারিয়া অনেকক্ষণ তাহার দিকে তাকাইয়া রহিলেন। পরে তাহাকে কোলে লইয়া স্নেহ- ভরে তাহার মুখচুম্বন করিলেন। মায়ের আদর পাইয়া বালকের দুঃখ যেন উছলিয়া উঠিল। সুনীতি দেখিলেন ধ্রুব কথা কহিতে পারিতেছে । তখন তিনি তাহাকে সস্নেহে জিজ্ঞাসা করিলেন—“বাবা! তুমি রাগ করিয়াছ কেন? কেহ কি তােমায় কটু কথা কহিয়াছে ? না, কেহ তােমার অপমান করিয়াছে ? বল ত, বাবা, কি হইয়াছে ?” কিন্তু ধ্রুবের মুখে কথা সরিল না। মায়ের

বল।
স্নেহমাখা কথায় সে আরাে কঁদিতে লাগিল।
সুনীতি বুঝিলেন কোনাে গুরুতর ব্যাপার
ঘটিয়াছে। তাই তিনি নিতান্ত অস্থির হইয়া
উঠিলেন। তিনি বার বার বলিতে লাগিলেন
—“বল বাবা! কি হইয়াছে। আমায় শী
তােমার ভাব দেখিয়া আমার মন যে
চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছে।”
ধ্রুব তথাপি কঁদিতে লাগিল। শেষে
কঁদিতে কঁদিতে সমস্ত ব্যাপার আগাগোড়া
বলিতে লাগিল।
ধ্রুবের কথা শুনিয়া সুনীতির বুক ফাটিয়া
যাইতে লাগিল। তিনি মাথায় হাত দিয়া কিছু
ক্ষণ চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন।
রাণী সুনীতি বহুদিন স্বামীর গৃহ হইতে
দূরে আছেন।
একমাত্র পুত্রের মুখ দেখিয়াই
সংসারের দুঃখ কষ্ট কতক ভুলিয়াছিলেন।
কিন্তু সেই প্রাণাধিক প্রিয় পুত্রের মলিন মুখ ও
অপূর্ণ চক্ষু দেখিয়া আজ তাহার দুঃখ শত গুণ
বাড়িয়া উঠিল! ভঁহারও চক্ষু দিয়া অবিরল

মুখের দিকে
জলধারা পড়িতে লাগিল। সেই জলধারা যেন
আর থামিতে চাহিল না!
অনেকক্ষণ পরে
ধ্রুবের মুখের
চাহিয়া রাণী ধীরে ধীরে কহিলেন—“বাবা!
দুঃখ করিও না। দুঃখ করিলে কি হইবে
বাছা! তােমার অদৃষ্ট নিতান্ত মন্দ! পূর্ব
জন্মে যাহারা ভাল কাজ করিয়াছে, এই
জন্মে তাহারাই নানান রকমের সুখ ও সম্মান
লাভ করিতেছে তােমার বিমাতা সুরুচি-
রাণী ও তাহার পুত্র উত্তম দুইজনই পূর্ব
কাজ করিয়াছিলেন। সেই
জন্যই রাজা তাহাদিগকে এত আদর ও স্নেহ
করেন। সেই জন্যই তাঁহারা এত সুখী।
সেই জন্যই ত সকলে তাহাদিগকে এত সম্মান
করে। কিন্তু বাছা! আমরা কেহই পূর্ব
জন্মে সেইরূপ কোনও পুণ্য কাজ করি নাই
বলিয়া রাজা আমাদিগকে ততটা যত্ন ও স্নেহ
করেন । তবে মিছামিছি কঁদিলে কি
হইবে ? অন্য লােকে আদরই করুক অথবা

অপমানই করুক সবটাতেই তােমার সন্তুষ্ট থাকা
উচিত। কঁদিলে অথবা রাগ করিলে কিছুই
লাভ হইবে না। আর যদি, বাছা, তােমার
মনে খুব দুঃখ হইয়া থাকে তবে আজ হইতে
ভাল কাজ করিতে থাক। তাহা হইলে অবশ্যই
সুখী হইতে পারিবে।”
ধ্রুব চুপ করিয়া থাকিয়া মায়ের সকল
কথা শুনিল। কিন্তু দুঃখের আবেগে সব কথা
মনে রাখিতে পারিল না। সুনীতি আবার
বলিতে লাগিলেন--“বাবা! সকলকে ভাল
বাসিবে ও মিষ্ট কথা বলিবে । আর বাছা!
যাহাতে সকল প্রাণীর মঙ্গল হয় এরূপ চিন্তা
ও কাজ করিবে। তবেই সুখী
হইতে
পারিবে।”
এইবার ধ্রুব কহিল—“মা! তুমি যাহা
বলিলে তাহাতে আমার কিছুমাত্রও সান্ত্বনা
হইতেছে না। পিতা রাণী সুরুচিকে অতিশয়
ভালবাসেন। তাই তাঁহার
পুত্র উত্তমকেও
কত আদর ও যত্ন করেন। তাঁহার গর্ভে

জন্মিয়াছে বলিয়াই উত্তম রাজ-সিংহাসনে বসিবে। আর তােমার গর্ভে জন্মিয়াছি বলিয়া রাজ- সিংহাসনে ত বসিতে পারিব না-ই পিতাও আমাকে কোলে করিলেন না। বেশ কথা । আচ্ছা, আমি উত্তমের বসিবার স্থান অর্থাৎ পিতার রাজ-সিংহাসন চাহি না, কিন্তু এমন এক স্থানে বসিতে চাই যাহা রাজার কোল অথবা রাজ-সিংহাসনের চাইতেও বড়। রাজার কোল অথবা রাজ-সিংহাসন কিছুইত আর নিরাপদ নহে। তাহাতে বিপদের রহিয়াছে। কিন্তু আমি এমন স্থানে বসিতে চাই যেখানে কখনও কোনাে বিপদ ঘটিতে পারে না। মা ! আমাকে শুধু বলিয়া দাও মা! কি করিলে আমি সেই স্থান পাইব। তাহা যত বড় কঠিন কাজই হউক না কেন আমি করিবই করিব।” সুনীতি কহিলেন-“বৎস! যদি তপস্যা দ্বারা দয়াময় হরিকে সন্তুষ্ট করিতে পার তাহা হইলে নিশ্চয়ই তােমার মনের সাধ পর্ণ হইবে।

তিনি তুষ্ট হইলে তুমি যাহা চাও তাহাই পাইবে। তিনি দিতে না পারেন এমন কিছুই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে নাই। আর কেহই তুমি যাহা চাও তাহা দিতে পারিবে না। অতএব বস! তাহারই কাছে প্রার্থনা কর। সরল ও ব্যাকুল- প্রাণে অবিশ্রান্ত তাঁহাকে ডাকিতে থাক। তােমার পূজায় তুষ্ট হইয়া দয়াময় হরি যখন দেখা দিবেন তখন তােমার মনের কথা তাহাকে জানাইবে।” ধ্রুব বলিল-“আচ্ছা মা ! তবে দয়াময় হরিকেই ডাকিব। তিনি যখন দেখা দিবেন তখন তাহার কাছে সব কথা খুলিয়া বলিব । আমার সমস্ত যাতনা তাহাকে জানাইব।” (২) রাত্রিতে সুনাতি ধ্রুবকে বুকে করিয়া শুইয়া আছেন। বালকের মুখে বিষাদের এক ঘনছায়া পড়িয়াছে। ধ্রুব আজ আর প্রফুল্ল শিশুটী কি যেন এক বিষম চিন্তা তাহার মনে নাই।

No text on this page.

ধ্রুব মনে মনে দয়াময় হরিকে ডাকিতে লাগিল।
কুব-১৩
| পৃষ্ঠা

উঠিল।
জাগিয়া আছে। তাহার সরল সুন্দর মুখমণ্ডলে
চিন্তার রেখা ফুটিয়া বাহির হইয়াছে।
রাত্রি প্রায় দুই প্রহর। সহসা ধ্রুব জাগিয়া
অমনি অশান্তির আগুন তাহার
মনে ধ ধ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল। কিন্তু
মা যে দয়াময় হরির কথা বলিয়াছিলেন তাহা
তাহার মনে
মনে পড়িল। ক্রমে সেই আগুন
নিভিল। ধ্রুব মনে মনে দয়াময় হরিকে ডাকিতে
লাগিল। কিন্তু কৈ ? হরি ত আসিলেন না।
আবার ডাকিল, অনেকক্ষণ ধরিয়া ডাকিল
-কিন্তু হরি আসিল কৈ ? সে তখন ভাবিল
হরি বুঝি ঘরের বাহিরে আছেন। তখনি
বাহিরে আসিল। ডাকিল “হরি দয়াময়!”
“তুমি কোথায় ?” কিন্তু হরি ত দেখা দিলেন
। তখন “হরি দয়াময়” “হরি দয়াময়”
ডাকিতে ডাকিতে সে নগরের বাহিরে আসিয়া
পড়িল।
সেই গভীর রাত্রে “হরি দয়াময়” “কোথায়
হরি দয়াময়” বলিয়া চীৎকার করিতে করিতে

১৪ বন জঙ্গলের ভিতর দিয়া আমাদের ধ্রুব চলি- লেন। কত বাঘ, কত ভালুক এবং আরাে কত হিংস্র জন্তু তাহার পথে ছিল। ইহাদিগ- কেই তিনি প্রেম-ভরে আলিঙ্গন করিতে লাগিলেন। তাহারাও স্নেহভরে তাহার গা চাটিতে লাগিল। তাহার কোনও অনিষ্ট করিল না। কিন্তু তিনি হরির দেখা পাইলেন না। এইরূপে “হরি দয়াময়” বলিয়া ডাকিতে ডাকিতে ধ্রুব যখন বহুদূর চলিয়া গেলেন তখন নারদ ঋষির সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ হইল। নারদ জিজ্ঞাসা করিলেন—“বৎস! তুমি কোথায় যাইতেছ ?” ধ্রুব বলিলেন—“ঠাকুর! আমি দয়াময় হরির সহিত সাক্ষাৎ করিতে চলিয়াছি।” নারদ বলিলেন—“কেন, বাছা ! হরির কাছে তােমার কি প্রয়ােজন ?” ধ্রুব বলিলেন-“মহাশয়! মা বলিয়াছেন হরি বড় দয়াময় ; তিনি দীন, দুঃখী আর

বালককে বড় ভালবাসেন। তাহাকে তুষ্ট
করিতে পারিলে যাহা চাহিব, তাহাই পাইব।”
নারদ বলিলেন—“তােমার আবার কি চাই,
বাবা ? তুমি যে রাজপুত্র ! তােমার ধন, জন,
রাজত্ব, পিতামাতা সবই ত আছে। তােমার
কিসের অভাব? হরির কাছে তুমি কি
চাহিবে ?”
ধ্রুব বলিলেন—“ঠাকুর ! আমার কিসের
অভাব ? কি চাহিব, শুনিবেন ? তবে বলিতেছি,
আমার ভাই উত্তম আমার বিমাতা
সুরুচিরাণীর ছেলে। বাবা আমার বিমাতাকে
খুব আদর ও যত্ন করেন। কিন্তু আমার
মাকে তিনি ততটা ভালবাসেন না। উত্তম
বাবার কোলে ছিল। আমিও কোলে উঠিতে
চাহিলাম। কিন্তু বাবা আমাকে কোলে
করিলেন না।
আর বিমাতা
বিমাতা সুরুচিরাণী
আমাকে ও আমার মাকে কতই না কটুকথা
বলিলেন! বিমাতা বলিলেন—আমি সুনীতির
ছেলে, সেই জন্য রাজার কোলে বসিবার যােগ্য

নহি। উত্তম তঁাহার ছেলে, সেই জন্য শুধু
সে-ই রাজার কোলে বসিবে! কিন্তু, মহাশয়,
আমার মাও ত রাণী। তাঁহার গর্ভে জন্মিয়াছি
বলিয়া রাজসিংহাসন ত দূরের
কথা-বাবার
কোলেও উঠিতে পাইব না? ইহাতে আমার মনে
যে কত কষ্ট হইয়াছে তাহা আর কি বলিব ।
যাহাই হউক, আমি এখন এমন স্থানে উঠিতে
চাই যাহার অপেক্ষা উচ্চ স্থান কোথাও নাই ।
ঠাকুর ! হরির সহিত দেখা হইলে আমি সেই
স্থানই চাহিব।”
বালকের তেজ দেখিয়া নারদ বিস্মিত
হইলেন। প্রকাশ্যে বলিলেন-“হাঁ, বৎস!
হরিকে যে ভালবাসে
হরিও নিশ্চয়ই তাহাকে
ভালবাসেন। তাঁহাকে তুষ্ট করিতে পারিলে
অবশ্যই তুমি সেই স্থান পাইবে। তিনি দয়াময়
সত্য সত্যই বাছা! তিনি দয়াময় । তিনি
দীন দুঃখীকে বড়ই ভালবাসেন।”
ধ্রুব বলিলেন—“ঠাকুর ! সত্যই কি তিনি
দীন দুঃখীকে ভালবাসেন? আমি ত বড় দুঃখী।

১৭
তাই হরিকে পাইবার জন্য মায়ের কথায় কত
চেষ্টা করিয়াছি, তাহাকে কত ডাকিয়াছি,
ডাকিতে ডাকিতে ঘর ছাড়িয়া এই বনের মধ্যে
এতদূর আসিয়াছি। কিন্তু কই ? তিনি ত আমায়
দেখা দিলেন না। কেমন করিয়া তাঁহার
সহিত সাক্ষাৎ হয়, কি করিলে তাহাকে পাওয়া
যায় ঠাকুর! আপনি
দয়া করিয়া
আমাকে
বলিয়া দিবেন কি ?”
নারদ বলিলেন-“বাছা ! তােমার মনের
একাগ্রতা দেখিয়া আমি বড়ই সুখী হইলাম।
তুমিই বাবা ধন্য ! আর ধন্য তােমার মাতা
রাণী সুনীতি ! বৎস!
যমুনা নদীর তীরে
মধুবন নামে একটি অতি সুন্দর স্থান আছে।
কালিন্দীর পবিত্র জলে স্নান করিয়া সেই
মধুবনে বসিয়া একমনে হরিকে ডাকিতে থাক।
নিশ্চয়ই তাঁহার দেখা পাইবে। তিনি সত্য সত্যই
দয়াময় । বাস্তবিক দীন দুঃখীকে তিনি বড়
ভালবাসেন। তাহাকে যাঁহারা ভালবাসেন,
তাহাদের জন্য তিনি সবই করিতে পারেন।”
২

১৮
ধ্রুব বলিলেন-“কিন্তু মহাশয় ! কি রূপে
তাহাকে ডাকিব আপনি দয়া করিয়া আমায়
বলিয়া দি।”
নারদ বলিলেন—“বৎস! বাহিরের কোনও
বস্তুর কথা মনে একেবারেই স্থান দিবে না।
বিশেষতঃ তােমার পিতা, বিমাতা অথবা অন্য
কাহারও উপর
উপর যদি তােমার ক্রোধ অথবা
হিংসার ভাব থাকে তবে তাহা তাড়াইতে হইবে।
শুধু হরির কথাই ভাবিবে আর হরির নাম জপ
করিবে। এইরূপ করিলেই হরি তােমার উপর
সন্তুষ্ট হইবেন। তখন তুমি তাহার সাক্ষাৎ
পাইবে। আর, তুমি যে উচ্চ স্থান চাও, তাহাও
পাইবে।”
ধ্রুব বলিলেন—“তাই করিব” ।
এই বলিয়া ধ্রুব নারদঋষিকে প্রণাম
করিলেন। নারদ “বৎস! তােমার মনাে-
বাঞ্ছা পূর্ণ হউক” বলিয়া ধ্রুবকে আশীর্বাদ
করিলেন।
তখন দুই
জনে দুই দিকে চলিয়া গেলেন।

(৩)
ওদিকে সুনীতি জাগরিত হইয়া দেখিলেন
ধ্রুব শয্যায় নাই। অমনি তাহার প্রাণ চমকিয়া
উঠিল।
ঘরের এদিক ওদিক—যেখানে ধ্রুবের
বসিবার, খেলিবার স্থান—তাহা বেশ করিয়া
আললা দিয়া দেখা হইল। তারপর প্রদীপ
হাতে রাণী সুনীতি বাহিরে আসিলেন, কিন্তু
কোথাও বালকের সাড়া সন্ধান পাইলেন না।
ফিরিয়া ঘরের ভিতরে গেলেন।
করিয়া গৃহের নিভৃত স্থানগুলি পরীক্ষা
করিলেন। আবার ঘরের বাহিরে আসিলেন।
এবার বেশ খানিকটা দূর গিয়া দেখিলেন।
কিন্তু কোথাও ধ্রুবকে দেখিতে পাইলেন না।
তাঁহার সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হইল । আবার
মনে হইল ঘরের ভিতর বুঝি ভাল রূপ
অনুসন্ধান করেন নাই। বালক হয়ত ঘরেই
রহিয়াছে। আবার ঘরের ভিতরে গেলেন। এক
জায়গায় একখানা কাপড় পড়িয়া রহিয়াছিল।

২০
ধ্রুব
•
এইবার মনে কতকটা আশার সঞ্চার হইল
ভাবিলেন-বুঝি তাহার হারানিধিকে ফিরিয়া
পাইলেন। নিতান্ত উৎসুকচিত্তে সেই দিকে
চাহিলেন।
অল্প দূর গিয়াই দেখিলেন ইহা
তাহার মনের ভ্রম। এম গেল। সঙ্গে সঙ্গে
আশার মােহন বাঁশরীও নরব হইল।
সুনীতি হতাশপ্রাণে রাজবাড়ীর দিকে
চুটিলেন । দাস-দাসীদিগকে ডাকিলেন। তাহারা
কেহ উঠিল, কেহ বা উঠিল না। কেহ
কেহ গভীর নিদ্রার ভাণ করিল। সুনীতি
দুইটী দাসী সঙ্গে করিয়া রাজার শয়ন-গৃহের
দ্বারে দাড়াইলেন। সকলে মিলিয়া দ্বারে
আঘাত করিল। রাজা সহসা জাগিয়া জিজ্ঞাসা
করিলেন-“কে ও? কি হইয়াছে ?” তখনই
বাহির হইতে উত্তর হইল—“সর্বনাশ হইয়াছে,
শীঘ্র উনি, ধ্রুব ঘরে নাই!”
শুনিবা মাত্র রাজা বিছানা ছাড়িয়া বাহিরে
আসিলেন। রাত্রি অল্পই ছিল। এতক্ষণে
দাস-দাসী সকলেই উঠিয়াছে। বাড়ীর এ পাশে

২১
পাশে দৌড়াদৌড়ি হুড়াহুড়ি পড়িয়া
গেল। সমস্ত রাজবাড়ীতে এক মহাকোলাহল
উঠিল।
ক্রমে রাত্রি প্রভাত হইল। নগরের চারি-
দিকে খবর ছাইয়া পড়িল। প্রত্যেক স্থানে
অনুসন্ধান চলিতে লাগিল। কত লােক এই
কাজে লাগিয়া গেল। কত পুকুরে, কত কূপে
জাল পড়িল। কিন্তু কোথাও ধ্রুবের সন্ধান
মিলিল না।
(৪)
দেবর্ষি নারদ ধ্রুবের নিকট হইতে বিদায়
লইয়া রাজবাড়ীর দিকে রওয়ানা হইলেন। বেলা
প্রহর অতীত হইয়া গিয়াছে। রাজা
উত্তানপাদ, মন্ত্রী ও পারিষদবর্গে বেষ্টিত হইয়া
নানা
জল্পনা কল্পনা করিতেছেন।
রাজসভা তখন লােকে লােকারণ্য। সহসা
সকলের চক্ষু সভাগৃহের বাহিরে
আকৃষ্ট
হইল। তখনই “দেবর্ষি নারদ, দেবর্ষি নারদ”

২২ বলিয়া সভার মধ্য হইতে মৃদুধ্বনি উথিত হইল। রাজা, মন্ত্রী প্রভৃতি সকলেই উঠিয়া দাড়াইলেন। কুশল প্রশ্নাদির পর নারদ উত্তানপাদকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন—“মহারাজকে এই- রূপ বিমর্ষ দেখিতেছি কেন ? কোনও অমঙ্গল ঘটে নাই ত ?” উত্তানপাদ বলিলেন—“দেব! গত রাত্রি হইতে আমার সুশীল সুকুমার পুত্র ধ্রুব নিরু- দ্দেশ হইয়াছে। সুরুচিরাণীর পুত্র উত্তমকে আমার কোলে বসিতে দেখিয়া বাছাও কোলে উঠিতে চাহিয়াছিল। তাহাকে উত্তমের সহিত একই আসনে দেখিয়া পাছে সুরুচি-রাণী রাগ করেন, এই ভয়ে কোলে তুলিয়া লই নাই, কিছুমাত্র আদর করি নাই। আর সুরুিচিও তাহাকে নানা কটুকথা কহিয়াছিলেন। বালক বােধ হয় ক্রোধে অপমানে প্রাণ- ত্যাগ করিয়াছে।” এই বলিয়া রাজা দুঃখের আবেগে দুই হাতে মুখ ঢাকিলেন। তিনি

২৩
।। ।।।।।।।।।
আর কথা কহিতে পারিলেন না। মন্ত্রিগণ
ও সভার আর সমস্ত
সমস্ত লােক মস্তক অবনত
করিয়া রহিলেন। সভাস্থলে দুঃখের এক ঘন
ছায়া পড়িল।
রাজার কথা শেষ হইতে না হইতেই
দেবর্ষি নারদ কহিলেন-“মহারাজ!
বৃথা
চিন্তা করিবেন না। আজ প্রাতে সুশীল ধ্রুবের
সহিত আমার সাক্ষাৎ
সাক্ষাৎ হইয়াছিল। তাহার
নিকট আমি এই সমস্ত কথাই শুনিয়াছি। সে
হরির ভক্ত। ভগবানের সাধনায় সিদ্ধিলাভ
করিয়া শীঘ্রই সে ঘরে ফিরিবে । ধন্য সেই
বালক ! ধন্য রাণী সুনীতি ! আপনিও ধন্য ।
তাহার দ্বারা আপনার কুল পবিত্র হইবে।
আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।”
নারদ রাজাকে সান্ত্বনার কথা বলিয়া
হইতে চলিয়া গেলেন। কিন্তু
রাজার মন সান্ত্বনা মানিল না। নারদ চলিয়া
গেলে তিনি আদেশ দিলেন যে তৎক্ষণাৎ
ধ্রুবকে ফিরাইয়া আনা হউক। তখনই ঘােড়া,

২৪ রথ প্রভৃতি সাজান হইল। কিন্তু লােজন বাহির হইবে এমন সময়ে স্বয়ং সুনীতি-রাণী রাজ- সভায় প্রবেশ করিলেন। সকলেই তাহাকে দেখিয়া অবাক হইয়া গেল। সুনীতি বলিলেন -“মহারাজ! দাসীর একটী মাত্র অনুরােধ রাখিতে হইবে। শুনিলাম ঋষিবর নারদ আসিয়াছিলেন। তিনি নাকি বলিয়া গিয়াছেন যে আমাদের হৃদয়ের ধন ধ্রুব দয়াময় হরির সাধনায় বাহির হইয়াছে। তিনি নাকি আরও বলিয়াছেন যে ধ্রুব এই সাধনায় সিদ্ধিলাভ করিয়া আমাদের কুল পবিত্র করিবে। বাছা আমার ভগবানের ভক্ত হইয়াছে। তাহাকে পাইবার জন্য প্রাণ দিতেও প্রস্তুত হইয়াছে। মানুষের পক্ষে ইহার অপেক্ষা উত্তম কাজ আর কি হইতে পারে ? এইরূপ সুপুত্র লাভ করার চাইতে অধিক সৌভাগ্য আমাদেরই বা আর কি হইতে পারে ? এরূপ কাজে যদি বাছা প্রাণত্যাগও করে তথাপি ভাল। সকলকেইত একদিন না একদিন এই সংসার ছাড়িয়া যাইতে হইবে। আমার ধ্রুবও অমর হইয়া জন্মে নাই। কিন্তু মহারাজ! ধর্মের জন্য আত্ম- বিসৰ্জন করিবার ক্ষমতা সকলের ভাগ্যে ত আর ঘটে না! জগতের অধিকাংশ নরনারীই পশুপক্ষীর ন্যায় সংসারের সুখভােগ লইয়াই ব্যস্ত। তাই অনেকেই শৃগাল কুকুরের মত মৃত্যুমুখে পতিত হয়। কিন্তু আমাদের ধ্রুব যদি হরির সাধনায় প্রাণত্যাগ করে তাহা কি আনন্দের বিষয় হইবে ! আমরাও ধন্য হইব। আর এক কথা মহারাজ! ঋষির কথায় অশ্রদ্ধা করিবেন না ! মহাপুরুষেরা এমন সব কথা জানিতে পারেন যাহা সাধারণ লােকে অসম্ভব বলিয়া মনে করে এবং তাহাতে বিশ্বাস করিতে চায় না। আমার পুত্রের মঙ্গ- লের জন্যই আমি বলিতেছি যে নারদ যাহা বলিয়াছেন, তাহা কিছুই মিথ্যা নহে। অতএব ধ্রুবকে ফিরাইয়া আনিবার কিছুই প্রয়ােজন নাই। সেইজন্য মিছামিছি লােকজন পাঠাইবেন —কখনই পাঠাইবেন না।”

সুনীতি সেখানে আর দাড়াইলেন না।
তখনই সভা ছাড়িয়া চলিয়া গেলেন।
কিছুক্ষণ চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন। তিনি
ভাবিতে লাগিলেন সুনীতিকে অবহেলা করাতেই
এই বিপদ ঘটিয়াছে। আবার তাহার কথায়
অবহেলা করিবেন কি ? অথচ ধ্রুবকে ফিরাইয়া
আনিলে অনাহারে, পথের কষ্টে অথবা
কোনও হিংস্ৰজন্তুর আক্রমণে তাহার মৃত্যুও
ঘটিতে পারে। রাজা এইরূপ উভয় সঙ্কটে
পড়িয়া কি করিবেন কিছুক্ষণ কিছুই স্থির করিতে
পারিলেন না। অনেক চিন্তার পর স্থির
করিলেন—সুনীতির কথায় অবহেলা
কিছুতেই উচিত নহে। কাজেই কাহাকেও
ধ্রুবের সন্ধানে পাঠাইলেন না।
(৫)
এদিকে ধ্রুব “হরি দয়াময়” “হরি দয়াময়”
বলিতে বলিতে ব্যাকুল প্রাণে চলিতে লাগি-
লেন। তাহার মনে এক অপূর্ব সঙ্গীতের তরঙ্গ

२१ উঠিল। তাঁহার প্রাণে কি এক সুন্দর শান্তির উদয় হইল। পথে হাঁটিতে হাঁটিতে মানুষের যে একটা ভয়ানক কষ্ট হয় তিনি তাহা একে- বারেই অনুভব করিলেন না। “হরি দয়াময়” বলিতে বলিতে তিনি আপনাকে ভুলিয়া গেলেন। তখন হরিনাম গাহিতে গাহিতে আনন্দে নাচিতে নাচিতে চলিলেন। পথে কত লােকের সহিত, কত বাঘ ভালুকের সহিত আবার তাঁহার সাক্ষাৎ হইল। মানুষের বালক সন্ন্যাসী দেখিয়া বিস্মিত হইল। বাঘ ভালুক স্নেহভরে তাহার শরীর আম্রাণ করিয়া সরিয়া পড়িল। ধ্রুবের মনেও ভয় অথবা হিংসার লেশ- মাত্রও ছিল না। তাঁহার মুখের স্বাভাবিক কান্তি, প্রেম ও আনন্দে, অধিকতর উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। তাহার চালচলনে একটা অলৌকিক সাহস ও তেজস্বিতা প্রকাশ পাইতে লাগিল। অনেক দিন এইরূপ চলিতে চলিতে আজ আমাদের ধ্রুব পবিত্র যমুনার তীরে উপস্থিত হইয়াছেন। নিকটেই সেই মধুবন। স্থানটি

২৮
অতিশয় সুন্দর ।
সেখানে লােকজনের কোলা-
হল একেবারেই নাই। কেবল পাখীর মধুর
গান ও যমুনার সুমিষ্ট কল কল ধ্বনি সেই
নীরবতা ভাঙ্গিয়া দিতেছে। আহা !
কি
মধুর ও পবিত্র ! সেখানে আম, বেল এবং
আরও
রকমের সুন্দর
গাছ
রহিয়াছে। তাহাতে সেই নিৰ্জ্জন স্থানের
সৌন্দৰ্য কত ‘বাড়িয়াছে !
উপর আবার কোনাে
কোনাে কোনাে স্থানে নানা
রঙ্গের সুন্দর সুন্দর ফুল ও পাতায় সুশােভিত
বিচিত্র লতাবলি গাছগুলিকে ঘেরিয়া রাখি-
য়াছে। তাহাতে অতি মনােহর কতকগুলি
কুঞ্জবন প্রস্তুত হইয়া রহিয়াছে। পবিত্র যমুনার
জলে স্নান করিয়া ধ্রুব সেই সুন্দর তপােবনে
দয়াময় হরির সাধনা করিতে উপবেশন করিলেন।
হার
সম্মুখে সুনীল সুন্দর কালিন্দী ও
সুবিস্তীর্ণ মাঠ। তথায় গ্রাম নাই, লােকের বসতি
কেবল সুন্দর সবুজ বৃক্ষ, লতা ও তৃণ।
আর উপরে সুন্দর, অনন্ত, নীল আকাশ।
নাই।

নারদ ঋষি যেমন উপদেশ
দিয়াছিলেন,
ধ্রুবও ঠিক তেম্নি ভাবে তপস্যা করিতে
লাগিলেন। এক দিন, দুই দিন, তিন দিন—
এইরূপে এক মাস কাটিয়া গেল।
গেল। তারপর
এক মাস, দুই মাস করিয়া পাঁচটী মাস ধীরে
ধীরে চলিয়া গেল। প্রথম প্রথম ধ্রুবের বড়ই
কষ্ট হইত। প্রথমে তিন দিন পরে পরে, তার
পর ছয় দিন, তার পর পনের দিন পরে এক
বার মাত্র সামান্য ফল মূলাদি আহার করিতেন।
কত ঝড়, কত বৃষ্টি, কত রৌদ্র তাহার উপর
দিয়া চলিয়া গেল। কিন্তু দয়াময় হরির সহিত
তাঁহার দেখা হইবে এই আশায় ও আনন্দে
তাঁহার
বুক
ভরিয়া উঠিল। কিছুতেই তাঁহাকে
টলাইতে পারিল না। তিনি একমনে হরির
ধ্যান করিতে লাগিলেন।
.
কবি গাহিয়াছেন :-
“উচ্চ আশাতরু হয় ফলবান,
হীন আশা রয় ধূলায় শয়ান,

৩০ হয় দেব ধ্যানে ভকতের প্রাণে, দেবের অধিষ্ঠান।” ছিল। দীর্ঘ পাঁচ মাস এইরূপ শ্রীহরির ধ্যান করিতে করিতে ভক্ত ধ্রুবের প্রাণে “দেবের অধিষ্ঠান” হইল। তখন তিনি উঠিয়া দাড়া- ইলেন এবং একখানি মাত্র পায়ের উপর দাড়া- ইয়া হরির ধ্যান করিতে লাগিলেন। সেই বালকের এক পায়ের ভারে নদী, পর্বত, এমন কি সমুদ্র পর্যন্ত নাকি কঁপিয়া উঠিয়া- আর স্বর্গে দেবতারা নাকি বড়ই ভীত হইয়া উঠিয়াছিলেন। তাঁহারা ভাবিলেন- তাহাদের শ্রেষ্ঠত্ব বুঝি আর থাকে না! একটা সামান্য, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মানব-শিশু তাহাদের চাইতে বড় হইয়া উঠিল । এখন কি উপায় ? সকল দেবতারা মিলিয়া একটা মস্ত সভা করিলেন। সভাতে স্থির হইল যেন্নি করিয়াই হউক, ধ্রুবের তপস্যা ভঙ্গ করিতে হইবে। কিন্তু কি রূপেই বা তাহা করা যায় ? সেই বিষয়ে নানা দেবতার নানা মত হইল। অবশেষে অনেক তর্কবিতর্কের পর সকলের মত হইল যে বালকের সম্মুখে নানাবিধ মায়ার সৃষ্টি করিতে হইবে। তাহা হইলেই সে তপস্যা ছাড়িয়া চলিয়া যাইবে। এইবার ধ্রুবের পরীক্ষা সুরু হইল। দেব- তারা তঁহার নিকটে নানা রকমের মায়ার সৃষ্টি করিতে লাগিলেন। তিনি প্রথমে দেখিলেন তাহার জননী সুনীতি সেই তপােবনে আসিয়া তাহার সম্মুখে দাড়াইয়া কঁদিতেছেন। দুঃখিনী মাতা কাদিতে কাদিতে বলিতেছেন, “বৎস!” এইমাত্র বলি- য়াই তিনি চুপ করিয়া রহিলেন। দুঃখের আবেগে তাঁহার মুখে আর কথা সরিল না। কিছুক্ষণ শুধু ধ্রুবের দিকে তাকাইয়া রহিলেন। তাঁহার চক্ষু দুইটী, ছল ছল্ করিতে লাগিল। আবার কথা বলিবার চেষ্টা করিলেন, কিন্তু বলিতে পারিলেন না। কিছুক্ষণ পরে অতি

৩২
কষ্টে আত্মসংবরণ করিয়া করুণস্বরে বলিতে
লাগিলেন-“বাছা! তােমার শরীর দিন দিন
কৃশ হইতেছে।
যদি আরাে
দুই এক দিন
এইরূপে তপস্যায় থাক তবে তুমি নিশ্চয়ই
মরিবে । আমি কত কষ্টে তােমাকে লালন
পালন করিয়াছি। এখনও তুমি আছ বলিয়াই
প্রাণে বাঁচিয়া আছি। তােমার কোনাে অমঙ্গল।
ঘটিলে আমার কি উপায় হইবে ? তুমি
নিতান্ত বালক। তােমার এখন খেলা ধূলার
সময়। ইহার পর অনেক বৎসর তােমাকে
পড়াশুনা করিতে হইবে। তারপর সংসারের
সুখভােগ করিয়া সর্বশেষে বৃদ্ধবয়সে তপস্যা
করিবে। শাস্ত্র ত এইরূপই বলে। তুমি
সেই শাস্ত্রের আদেশ অবহেলা করিতেছ কেন ?
ইহার ফল কি ভাল হইবে ? আমার যাহাতে
সুখ হয় এখন তুমি তাই কর। এই কচি
বয়সে তপস্যা করা অধৰ্ম্ম বই কিছুই নহে।
অতএব তােমাকে বার বার বলিতেছি তুমি
এখন চলিয়া আইস। তাহা হইলে

আমি এখনই তােমার সম্মুখে প্রাণত্যাগ
প্রাণ
করিব।”
কিন্তু তাহাতে ধ্রুবের প্রাণ একটুও টলিল
—মায়ের দিকে তিনি চাহিয়াও চাহিলেন
-মায়ের কথা শুনিয়াও শুনিলেন না।
তখন “ঐ দেখ বৎস! ভীষণ রাক্ষসেরা তােমায়
বধ করিবার নিমিত্ত আসিতেছে। অতএব
পালাও, এখনই পালাও” এই বলিয়া সুনীতি
চলিয়া গেলেন।
ধ্রুব চক্ষু মেলিয়া দেখি-
লেন, রাক্ষসও নাই, মাও নাই—বুঝিলেন,
এ সব দেবতাদের চালাকি বই আর কিছুই
নহে। তখন তিনি আরও গভীর ধ্যানে মগ্ন
হইলেন। দেবতারা মনে করিয়াছিলেন মাতৃ-
স্নেহ-স্রোতে বালকের সাধন ভজন সব ভাঙ্গিয়া
যাইবে। কিন্তু তাহা হইল কই ? ধ্রুব ভগবানে
নিজকে সমাহিত করিয়া অটলভাবে ধ্যানে
বসিয়া রহিলেন।
কিন্তু আবার একি !
একি! শত শত
শত শৃগাল
সঙ্গে লইয়া শত শত রাক্ষ ধ্রুবের সম্মুখে

৩৪ উপস্থিত হইতেছে। ইহাদের কোনােটার মুখ সিংহের, লেজ সাপের ! কোনাে কোনােটার শরীর ছাগলের, মুখখানা উষ্ট্রের ! কোনাে কোনােটার মুখ আবার মকরের মত! কোনাে কোনােটার রহিয়াছে। ভয়ানক! মাথার এক এক গাছি চুল এক একটা সাপ ! সেই সাপগুলি ভীষণ ফণা বিস্তার করিয়া ফোস্ ফোস্ করিতেছে ! সেই- গুলি যে ধ্রুবকে ঘেরিয়া ফেলিয়াছে! আবার ঐ দেখ, সামনে যমুনার জলেও কয়েকটা সাপ ফণা তুলিয়া রহিয়াছে ! তাহাদেরই বা কি ভীষণ আকৃতি ! উহাদের এক একটার দশ দশ খানা মুখ ! কোনও কোনও রাক্ষসের হাতে তীক্ষ্ণ বর্শা, তরবারি প্রভৃতি ভীষণ অস্ত্র ! অস্ত্রগুলি এতই তীক্ষ যে সূর্যের কিরণে ঝ ঝ করিতেছে ! রাক্ষসেরা সেই সকল অস্ত্র ধ্রুবের সম্মুখে ঘুরাইতেছে, আর ভীষণ চীৎ- কারে সমস্ত মধুবন কাপাইয়া তুলিয়াছে ! আবার কতকগুলি রাক্ষস, ঐ দেখ, মুখ দিয়া

আগুন বাহির করিতে করিতে ছুটিয়াছে ! আর
ঐ চীৎকার করিয়া বলিতেছে-“মার, এই
ছেলেটাকে মারিয়া ফেল।” অপর কতকগুলি
বলিতেছে—“এই ছেলেটাকে খাইয়া ফেল,
এইক্ষণই খাইয়া ফেল।” আবার শত শত
শৃগাল মুখে আগুন লইয়া এবং পিশাচের মত
শব্দ করিতে করিতে একই সঙ্গে ধ্রুবকে
আক্রমণ করিতে ছুটিয়াছে ! ওখানে কয়েকটা
রাক্ষস মস্ত লম্বা একখানি তরবারি দ্বারা
যমুনার সাপগুলি কাটিতেছে। আর কি
আশ্চর্য ! একটা সাপকে
যত খণ্ডে কাটা
হইতেছে তাহা হইতে আবার সেইরূপই ভীষণ
ততটা সাপ জন্মিতেছে। দেখিতে দেখিতে
যমুনার সুনীল জল ভয়ানক কালাে হইয়া
গেল ! আরাে কতকগুলি সর্প ভীষণ ফণা
বিস্তার করিয়া তীব্র গতিতে ধ্রুবের দিকে ছুটিয়া
চলিল। এইরূপে সহসা সেই শান্ত, মনােহর
তপােবন শ্মশান অপেক্ষাও ভয়ঙ্কর হইয়া উঠিল।
সেই ভীষণ শ্মশানে ধ্রুব অচল পর্বতের

ন্যায় স্থিরভাবে একাকী বসিয়া রহিয়াছেন। তাঁহার কিছুমাত্রও ভয় হইল না। দেবতাদের চালাকি তাহার কাছে খাটিল না। তিনি এক মনে বিপদবারণ, দয়াময় হরির ধ্যান করিতে লাগিলেন। আর নিমিষের মধ্যে সমস্ত মায়া মিলাইয়া গেল। তখন দেবতারা নিতান্ত ক্ষুন্ন হইয়া আবার একটা বিরাট সভা ডাকিলেন। সেই সভায় স্থির হইল যে করুণাময় হরির শরণ ব্যতীত অন্য উপায় নাই। তখন সকলে মিলিয়া বিষ্ণুর স্তবস্তুতি আরম্ভ করিলেন। বিষ্ণু বলিলেন- “তােমাদের কোনাে ভয় নাই। কেন বৃথা ভয় করিতেছ? কেনই বা ধ্রুবকে ঈর্ষা করিতেছ? ধ্রুব ত আর স্বর্গে অথবা পৃথিবীতে কোথাও রাজা হইতে ঢাহে অতএব বৃথা ভয় ত্যাগ কর।” বিষ্ণুর কথায় নিশ্চিন্ত হইয়া দেবতারা চলিয়া গেলেন। এ দিকে বিষ্ণু তাঁহার শ, চক্র, গদা ও পদ্ম লইয়া ধ্রুবের নিকটে ।

No text on this page.

ধ্রুব বলিলেন--“ঠাকুর। তুমিই কি আমার দরাময় হরি ?”
ব.. ৩৭
পৃষ্ঠা

= আবির্ভূত হইলেন। এতদিনে ধ্রুবের তপস্যা সার্থক হইল। শ্রীহরিকে দেখিয়া তাহার সমস্ত শরীরে কি এক আনন্দ রসের সঞ্চার হইল। তিনি সমস্ত শরীর মাটীতে লুটাইয়া শ্রীহরিকে প্রণাম করিলেন। তঁাহার বড় সাধ হইল তিনি ভগবান শ্রীহরির স্তব করেন। কিন্তু কি বলিয়া স্তব করিবেন কিছুই ঠিক করিয়া উঠিতে পারিলেন না। হরি বলিলেন— “বাছা ধ্রুব ! কেন আমায় ডাকিয়াছ ?” ধ্রুব বলিলেন—“ঠাকুর ! তুমিই কি আমার দয়াময় হরি ? হরি হে ! যদি আমার তপস্যায় তুমি প্রসন্ন হইয়া থাক, তবে কি করিয়া তােমার স্তব করিতে হয় তাহা আমাকে শিখাইয়া দাও। আমি অবােধ বালক। কেমন করিয়া তােমার স্তব করিতে হয় কিছুই ত জানি না ঠাকুর। অথচ আমার মনের বড়ই সাধ তােমার স্তব করি।” তখন দয়াময় হরি তাহার হাতের শঙ্খ- দ্বারা ধ্রুবের শরীর স্পর্শ করিলেন। অমি

৩৮
তাঁহার মুখ হইতে একটী স্তব ছুটিয়া বাহির
হইল :-
“তােমারি মধুর রূপে ভরেছে ভুবন,
মুগ্ধ নয়ন মম পুলকিত মােহিত মন।
তরুণ অরুণ নবীন ভাতি,
পূর্ণিমা প্রসন্ন রাতি,
রূপ-রাশি-বিকশিত-তনু কুসুম বন।
তােমা পানে চাহি সকলে সুন্দর,
রূপ হেরি আকুল অন্তর,
তােমারে ঘিরিয়া ফিরে নিরন্তর,
তােমার প্রেম চাহি।
উঠে সঙ্গীত তােমার পানে,
গগন পূর্ণ প্রেম গানে,
তােমার চরণ করেছে বরণ নিখিল জনে।”
ভগবান্ বিষ্ণু ধ্রুবের স্তবে প্রীত হইয়া
বলিলেন—“তােমার কি চাই, ধ্রুব ! তুমি
যাহা চাহিবে তাহাই পাইবে। উঠ,
তুমি
সাধনায় সিদ্ধিলাভ করিলে।”

হরিকে দেখিয়া ধ্রুব সব দুঃখ কষ্ট একে- বারেই ভুলিয়া গিয়াছিলেন। এখন বলিলেন -“দয়াময় ! আমার তপস্যা সম্পূর্ণ সফল হইয়াছে। তােমার দেখা পাইলাম। আবার কি চাই ?” বিষ্ণু বলিলেন—“না বৎস! তােমার একটা কিছু বর চাহিতেই হইবে।” ধ্রুব বলিলেন—“প্রভো! ভাই উত্তমকে পিতার কোলে দেখিয়া আমারও সেইখানে বসিবার ইচ্ছা হইয়াছিল। কিন্তু বিমাতার ভয়ে পিতা আমায় কোলে করিলেন না। আর বিমাতা বলিলেন, সুনীতির গর্ভে জন্মি- যাছি বলিয়া আমি পিতার কোলে অথবা রাজ- সিংহাসনে বসিবার যােগ্য নহি। ঠাকুর! আমি পিতার কোল অথবা তুচ্ছ রাজ- সিংহাসন চাহি না। আমি এমন স্থান চাহি যাহা সকল সকল স্থানের উপরে এবং যে স্থান হইতে পতনের কোনও সম্ভাবনা নাই। প্রভাে! তুমি আমাকে সেই স্থান দাও।”

৪০
বিষ্ণু কহিলেন—“আচ্ছা, তাহাই হইবে।
বৎস! পূর্বজন্মে তুমি আমার পরমভক্ত ছিলে
এবং তােমার মন অতিশয় পবিত্র ছিল। তুমি
যত্নের সহিত পিতামাতার সেবা
করিতে।
কিন্তু ক্রমে এক সুন্দর ধনী রাজপুত্র তােমার
বন্ধু হইলেন ! ভঁহার ধন সম্পত্তি দেখিয়া
তােমারও রাজপুত্র হইবার সাধ গেল।
তুমি যে ব্রাহ্মণকুমার তাহা তুমি ভুলিয়া
গেলে। সেই জন্যই এইবার তুমি ক্ষত্রিয়কুলে
জন্মিয়াছ। তােমার ইচ্ছা পূর্ণ হইয়াছে। যাহা
হউক, এখন তুমি এমন সুন্দর এক স্থানে বাস
করিবে যাহা কোনাে মানুষ, এমন কি কোনাে
দেবতাও কখনও লাভ করেন নাই। তােমার
স্নেহময়ী মাতা সুনীতিও তােমার সহিত সেই
স্থানে বাস করিবেন । সেই স্থানের নাম
হইবে ধ্রুবতােক। ব্রহ্মার যাবতীয় সৃষ্টির
মধ্যে সেই স্থান হইবে সর্বাপেক্ষা উচ্চ।
আর
এই পৃথিবীতেও তুমি ছত্রিশ হাজার বৎসর কাল
সুখে রাজত্ব করিবে।”

৪১ ধ্রুব ভক্তিভরে দয়াময় হরিকে প্রণাম করিলেন। তখন বিষ্ণু অন্তর্হিত হইলেন। (৬) ওদিকে উত্তানপাদ কিছুতেই সান্ত্বনা লাভ করিতে না পারিয়া শশাকে ও অনুতাপে কৃশ ও জর্জরিত হইয়া উঠিলেন। শান্তিলাভের আশায় তিনি নানা তীর্থস্থান পর্যটন করিয়া বেড়াইলেন। কত অদ্ভুত দেশ, কত নগর ও জনপদ দেখিলেন, কিন্তু কিছুতেই মনে শান্তি পাইলেন না। ক্রমে রাজা রাজ- কার্যে অবহেলা আরম্ভ করিলেন। मलौ ७ কর্মচারীরা নিজেদের স্বার্থ : সিদ্ধির সুযােগ পাইয়া প্রজাদের উপর উৎপীড়ন করিতে লাগিল। রাজ্যে ঘাের অশান্তির সূচনা হইল সকল স্থানেই অন্যায় আচরণ, অবিচার কলহ সগর্বে মাথা তুলিয়া আস্ফালন আরম্ভ করিয়া দিল। রাজকর্মচারীরা প্রজার ধন রাজকোষ উভয়ই শােষণ করিতে ৪২ ধ্রুব । ৩ । * ক +++ লাগিল। উত্তানপাদ পাগলের মত হইয়া পড়িলেন। সহসা এক দিন সংবাদ আসিল, ফিরিয়া আসিতেছেন। প্রথম লােকের কথায় রাজার বিশ্বাস হইল না। তিনি মনে মনে স্থির করিয়াছিলেন যে অনাহারে, পথের পরিশ্রমে অথবা হিংস্ৰজন্তুর আক্রমণে ধ্রুব হয়ত প্রাণ হারাইয়াছেন। তিনি যে এত দিন জীবিত আছেন তাহা রাজা কদাচ মনে স্থানও দিতে পারেন নাই। অবশেষে যখন আপনার দূতের মুখে এই সুসংবাদ প্রাপ্ত হইলেন, তখন রাজার হর্ষের সামা রহিল না। শুনিবামাত্র আপনার গলার বহুমূল্য মুক্তাহার পুরস্কার দিয়া দূতকে বিদায় দিলেন এবং তৎক্ষণাৎ ধ্রুবকে দেখিতে যাইবার জন্য অশ্বরথাদি সজ্জিত করাইলেন। বহুলােকে পরিবেষ্টিত হইয়া রাজা উত্তান- পাদ বহুদিনের হারানিধিকে দেখিবার জন্য যাত্রা করিলেন। বালক, বৃদ্ধ, ব্রাহ্মণ, শূদ্র, ৪৩ স্ত্রী, পুরুষ ক্রমে সকলেই আজ রাজকুমারকে দেখিয়া চক্ষু জুড়াইবে। ব্রাহ্মণের কণ্ঠ হইতে পবিত্র বেদধ্বনি উচ্চারিত হইল। শঙ্খ, কঁাসর, ঘণ্টা, বেণু, জয়ঢাক বাজিয়া উঠিল। স্ত্রী- লােকেরা হুলুধ্বনি করিল। সমস্ত নগরব্যাপী এক মহা আনন্দ কোলাহল উঠিল। জন প্রবাহ বাড়িয়া উঠিল। কত রথ, অশ্ব, কত শিবিকা উত্তানপাদের অগ্রে ও পশ্চাতে চলিল। সুনীতি, সুরুচি ও উত্তম শিবিকারােহণে রাজার অনুসরণ করিলেন। অধিক দূর যাইতে না যাইতেই উত্তান- পাদের রথ থমকিয়া দাড়াইল। সঙ্গে সঙ্গেই অপরাপর অশ্ব, রথ ও শিবিকাদির গতিরােধ হইল। সকলে উদ্গ্রীব হইয়া উৎসুকনেত্রে সম্মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করিতে লাগিল। নগরের অনতিদূরে অতি সুন্দর একটা উপবন ছিল। সেই উপবনের সন্নিকটে ধ্রুবের সহিত সকলের প্রথম সাক্ষাৎ হইল। রাজা শশব্যস্তে রথ হইতে নামিয়া পুত্রকে গাঢ় ৪৪ তাহার চক্ষু আলিঙ্গন করিলেন ও আনন্দে আত্মহারা হইয়া ঘন ঘন দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া ধ্রুবের মস্তকাঘ্রাণ করিতে লাগিলেন। দুইটী দিয়া অনবরত অশ্রু পড়িতে লাগিল। তিনি স্নেহভরে বারংবার পুত্রের মস্তক আঘ্রাণ করিতে লাগিলেন। ধ্রুবও ভক্তিভরে পিতার চরণ বন্দনা করিলেন। সুনীতি ও সুরুচি এতক্ষণ রাজার নিকটেই দাড়াইয়া রহিয়াছিলেন। তাঁহাদিগকে প্রণাম করিলে সুরুচি তাঁহাকে সস্নেহে কোলে তুলিয়া লইলেন এবং “বৎস! দীর্ঘজীবী হও” এই বলিয়া আশীর্বাদ করিলেন । উত্তম ও ধ্রুব প্রেম-বিহ্বল-চিত্তে পরস্পরকে আলিঙ্গন করিলেন। সুনীতি তাহার হারানিধিকে পুনঃ প্রাপ্ত হইয়া অপার আনন্দ-সাগরে ভাসিলেন-স্নেহ- ভরে পুত্রকে আলিঙ্গন করিলেন । তাঁহার স্তন দিয়া দুগ্ধ ধারা ক্ষরিতে লাগিল। লােকে সুনীতিকে সম্বােধন করিয়া বলিল,

৪৫
“ভাগ্যে আপনার দুঃখ-হারী পুত্র ফিরিয়া
আসিয়াছেন। এখন তিনিই পৃথিবী রক্ষা ও
পালন করিবেন। আপনি ভগবানের আরাধনা
করিয়াছিলেন, তাই এরূপ ঘটিয়াছে।”
এইরূপ কথা-বার্তার পর উত্তানপাদ ধ্রুব
ও উত্তমকে একটা হাতীতে তুলিয়া লইলেন।
এইবার সেই বিশাল জনতা দ্বিগুণাকার ধারণ
করিয়া রাজপুরীর দিকে ছুটিল। গীত, বাদ্য,
বেদপাঠ পূর্বের ন্যায় চলিল।
ইতিমধ্যে ধ্রুবের সাদর অভ্যর্থনার নিমিত্ত
রাজপুরীর তােরণ বিচিত্র-সাজে সজ্জিত
হইয়াছে। সারি সারি কলাগাছ ও ঘােট ঘােট
সুপারি গাছ অতি পরিপাটীরূপে প্রােথিত
হইয়াছে। তাহাদের ফল, বৃন্ত ও মঞ্জরী সেই
তােরণকে এক প্রকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে
ভূষিত করিয়াছে।
প্রত্যেক সারিতে মুক্তামালা
অতুল প্রভা বিকীর্ণ করিতেছে।
স্থানে পূর্ণ কলসী, আম্রপত্র ও বস্ত্র স্থাপিত
রহিয়াছে।

৪৬
এইরূপ সুসজ্জিত তােরণ
দ্বার দিয়া
ধ্রুবের সহিত সকলে পুরী প্রবেশ করিল।
রাজপুরীও আজ এক অভিনব সৌন্দর্য্যে
শশাভিত হইয়াছে ।
তােরণপথ ও তাহার দুই পার্শ্বের আঙ্গিনা
অতি যত্নে মাজ্জিত ও পরিষ্কৃত করা হইয়াছে
তােরণ দ্বারের বৃক্ষবীথিকা রাজবাটী পর্যন্ত
বিস্তৃত। আঙ্গিনায় খৈ, ফুল, ফল ও আতপ
চাউল ছড়ানাে।
ধ্রুবকে দেখিয়া সতী পুরস্ত্রীরা
সরিষা, যব, দই, ফুল, ফল প্রভৃতি উপহার
দিতেছে। চারি দিকে ধ্রুবের গুণগান। সেই
গান শুনিতে শুনিতে ও সেই অভূতপূর্ব দৃশ্য
দেখিতে দেখিতে ধ্রুব রাজবাটীতে প্রবেশ
করিলেন।
রাজবাটীর শােভা অতুলনীয়। পরিখা-
বেষ্টিত রাজপুরী বিচিত্র মণিমাণিক্যখচিত
প্রাসাদাবলীতে পরিপূর্ণ। রাজপ্রাসাদের
শিরােভাগে উডডীন পতাকা বহু দূর হইতে
পরিদৃষ্ট হইতেছে। রাজপুরী সরােবর ও

৪৭
পদ্ম
উদ্যানে সুশােভিত। সরােবরে কুমুদ, কহলার,
প্রভৃতি সুশােভন পুষ্প প্রস্ফুটিত।
সরােবরের জল স্ফটিকবৎ স্বচ্ছ।
রাজহংস,
কলহংস, চক্রবাক, সারস প্রভৃতি জলচর
পক্ষিগণ নিরন্তর তথায় মহােল্লাসে ক্রীড়া
করিয়া থাকে। উদ্যানের এক পার্শ্বে ফল ও
ফুলের গাছ সারি সারি দণ্ডায়মান ; অপর পার্শ্বে
দেবদারু, বট, অশ্বথ ৪ অন্যান্য বন্য বৃক্ষসমূহ
উপবনের শােভা ধারণ করিয়াছে। সেই সকল
বৃক্ষ ময়ুর, কোকিল, ময়না, কাকাতুয়া প্রভৃতি
পক্ষীতে পরিপূর্ণ। মধুরকণ্ঠ বিহঙ্গকুলের কূজনে
উদ্যান সদা সর্বদাই মুখরিত।
ধ্রুব এইরূপ সৌন্দৰ্য্য ও আনন্দের মধ্যে
পিতামাতা ও দাসদাসী পরিবেষ্টিত হইয়া অতি
সুখে বাস করিতে লাগিলেন। ধ্রুবের আগমনের
পর রাজ্যে শান্তি স্থাপিত হইল এবং কালক্রমে
প্রজাদের ইচ্ছানুসারে তিনিই রাজা হইলেন।
উত্তানপাদ সংসারবিরাগী হইয়া বাণপ্রস্থাশ্রম
অবলম্বন করিলেন ।

১৮
পৃথিবীতে ছত্রিশ হাজার বৎসরকাল রাজত্ব
করিয়া অবশেষে তিনি ধ্রুবলােকে চলিয়া
গেলেন। এখনও তঁাহার জননী সুনীতির
সহিত তিনি সেই ধ্রুবলােকে বাস করিতেছেন।
আজও বিপন্ন ব্যক্তিরা বিপদসাগর উত্তীর্ণ
হইবার নিমিত্ত সেই ধ্রুবতারাকে লক্ষ্য করে ।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Dhrubo

Author
Das, Satishchandra
Title
Dhrubo
File name
Dhrubo
Text
OCR done
Citation
1918
Published
2010/02/13
Publisher
Sri Debendranath Bhattacharyya , Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
64
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Epic.
Keywords
Suruchi
DLI number
511028
Barcode
4990010018214.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
GbkaCjLwfzF
Download PDF

Dhrubo