Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Halida Hanum Ed. 1st

Hilali, Golam Maksud · 2010/01/31

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

হালি হালুম
গােলাম মকসুদ হিলালী এম এ, বি এল,
অধ্যাপকসাদৎ কলেজ করটিয়া
এম্পায়ার বুক হাউস
১৫, কলেজ স্কোয়ার
কলিকাতা,

প্রকাশক:
মাহফুজার রহমান খান
এম্পায়ার বুক হাউস
১৫, কলেজ স্কোয়ার, কলিকাতা
প্রথম সংস্করণ
আশ্বিন, ১৩৪
বারাে না
নিউ সরস্বতী প্রেসে
শ্ৰমিহিরচন্দ্র ঘােষ দ্বারা মুদ্রিত
২৫এ, মেছুয়াবাজার থ্রট, কলিকাতা

নারীজাতিকে অবহেলা করে সকল কাজে কেবল পুরুষদেরই একচেটিয়া আধিপত্যের দিন আর নেই। নারীও যে শক্তি-সামর্থ্যে জ্ঞান-গরিমায় পুরুষের পাশাপাশি চলতে পারেন এবং সেই চলার ওপরেই যে মানুষের সর্বাঙ্গীন উন্নতি নির্ভর করে, বহু নারী তা প্রমাণ করে গেছেন তাদের গৌরবময় কর্ম জীবনের মধ্য দিয়ে। খদিজা, আয়েশা, ফাতেমা, রিজিয়া, নূরজাহান; চাঁদ সুলতানা প্রভৃতির নাম ইতিহাস চিরদিন বুকে ধরে রাখবে। এঁরা ছিলেন আমাদের নারীদের আদর্শ স্থানীয়া। এঁদের মহান আদর্শের উজ্জল বর্তিকা সামনে রেখে আমাদের মাতা, ভগ্নী, কন্যারা স্ব স্ব জীবন-পথকে আলােকিত করে’ নিতে পারেন। কিন্তু তারা এত আগেকার মানুষ যে, তাদের জীবন- কাহিনী আমাদের নিকট স্বপ্নের ন্যায় প্রতিভাত হয়। তাই আমাদের নারী-আদর্শ হিসাবে হালিদা আদীব হামের জীবনী খুবই অমূল্য। হালিদা বর্তমান যুগের। বিংশ শতাব্দীর বিশ্ব- রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে যে কয়জন স্ত্রী-পুরুষ আপন আপন অসাধারণ প্রতিভা ও ব্যক্তিত্বের বলে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পেরেছেন, হালিদা হনুম তাঁদের অন্যতম। হালিদার পুণ্যময় প্রেরণাময় জীবন-কাহিনী করটীয়া সাদৎ কলেজের তরুণ অধ্যাপক মৌলভী গােলাম মকসুদ হিলালী সাহেবের লেখনী-স্পর্শে আরও সুন্দর হয়ে উঠেছে। জনাব হিলালী সাহেব সাহিত্য ক্ষেত্রে নতুন হলেও তাঁর লেখবার শক্তি কিরূপ অসাধারণ, বাংলা সাহিত্যে তার এই প্রথম দানই তা প্রমাণ করেছে। -মাহফুজার রহমান খান

"She (Madame Halide Edib ) has a distinguished
career as a teacher, journalist, author, statesman,
social worker and soldier."
Edward Mead Earle.
Associate Professor of History in Barnard
College and Calumbia University.

সূচীপত্র পত্রাঙ্ক বিষয় সংক্ষিপ্ত পরিচয় ৪ •• জন্ম ও বাল্যকাল বাল্য শিক্ষা ••• ৭ • • • • • • ১৪ ১৮ কলেজে প্রবেশ বিবাহ ও সংসার জীবন সাংবাদিক জীবন প্রথম হিজরত শিক্ষক ও শিক্ষামতি নিখিল-তুরান সংহতি ‘তুর্কী জননী’ খেতাব কংগ্রেস ও কৌন্সিলে দ্বিতীয়বার বিলাত গমন তালি নিধান ক্লাব শিক্ষাপ্রচারে হালিদা সিরিয়ায় দ্বিতীয়বার २१ ২৭ ••• ২৮ ••• ••• ••• ৩৫ মুমূর্য তুরস্ক ৪৩ তুরস্কের নব-জীবন দ্বিতীয় হিজরত ••• ০ ০ ০ ৪৪

y০
পত্রাঙ্ক
৪৭
১ ৫২
৫৮
বিষয়
নূতন কর্মকেন্দ্র
প্রাণদণ্ডের আদেশ
জাতীয় মহাসভা
মিথ্যা রটনা
ঘনীভূত নৈরাশ্য
হিলালে আহমর
হাসপাতালে সেবিকা
যুদ্ধক্ষেত্রে হালিদা
বিজয়িনীর সম্মান
প্রাণী-প্রিয়তা
সাহিত্য বৈশিষ্ট্য
হালিদার গ্রন্থাবলী
নিরপেক্ষ সমালােচক
পরিশিষ্ট
৬ ০৬
৬৪
• •
•••
•••
१२
•••
৭৩

হালিদা হানুম
b)))
boy.
]]
,,
১১-

No text on this page.

হালিহাম সংক্ষিপ্ত পরিচয় জগত বরেণ্য বিদুষী হালিদা আদীব হানুম তুর্কীজাতির ইতিহাসে নূতন পুরাতন ভাঙ্গা-গড়ার সন্ধিক্ষণে, জাতির জীবন মরণ সমস্যার দিনে, আবিভূত হইয়াছেন,—জননীরূপে মেহ বিলাইয়া মৃতপ্রায় জাতিকে সঞ্জীবিত করিতে, জ্ঞান ও কৰ্ম্ম প্রেরণায় রণক্লান্ত হতাশ জাতির মস্তিষ্ক ও বাহুতে শক্তিদান করিতে, নৈরাশ্যের অন্ধকারে দিশাহারা জাতিকে পথ দেখাইতে, এবং বহু শতাব্দী-ব্যাপী ইউরােপের চক্ষুশূল, অবিচার পীড়িত জাতির পক্ষ হইতে সভ্য জগতকে দুইটী সত্য কথা শুনাইতে। হালিদ। একাধারে সাহিত্যিক, রাজনীতিক, সংস্কারক, বক্তা, সৈনিক, জাতীয় অন্দোলনের অন্যতম প্রধান কর্মী এবং আদর্শ গৃহিণী। অল্প দিনের মধ্যে ঔপন্যাসিক হিসাবে তাহার সুখ্যাতি চারিদিকে ছড়াইয়া হালিদা হানুম পড়িয়াছে। তিনি মাতৃ-ভাষা তুর্কী ব্যতীত ইংৰ্বেজী, ফরাসী, আরবী বং পারসী ভাষায় সুপণ্ডিত। এক সময়ে তিনি ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ে পাশ্চাত্য সাহিত্যের অধ্যাপনা করিতেন। ১৯০৮-৯ খৃষ্টাব্দের সংস্কার-প্রিয় নব্য তুর্কীদের “এত্তেহাদ ও তরী” বা “ঔক্য ও উন্নতি আন্দোলনে এবং ১৯১৯ হইতে ১৯২৪ খৃষ্টাব্দ ব্যাপী তুর্কীর অস্তিত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য জীবন-পণ রণে হালিদা যে ভাবে প্রাণ ঢালিয়া সাহায্য করিয়াছেন, তাহা নবীন তুরস্কের ইতিহাসে চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকিবে। দেশের রাষ্ট্রনীতিতে তিনি বরাবর উদারনীতিক (liberal) এবং বিশ্বের শাসন ব্যাপারে তিনি আন্তর্জাতিকতা বাদী (internationalist )। অক্লান্ত পরিশ্রম ও মানসিক চিন্তার ফলে বহুবার শােচনীয় ভাবে তাঁহার স্বাস্থ্য-ভঙ্গ হইয়াছে, তথাপি দেশের জন্য, জাতির জন্য, বিশ্বমানবের জন্য, তাহার চিন্তা, পরিশ্রম ও লেখনী বিরাম লাভ করিতে পারে নাই। স্বাধীন চিন্তা, মুক্তবিবেক, সত্যানুরাগ, অনুসন্ধিৎসা, স্বজাতিপ্রেম, ও বিশ্বহিতৈষণা তাহার জীবন ও কৰ্ম্ম-ধারার বৈশিষ্ট্য। সমাজ, ধর্ম ও রাজনীতি সম্বন্ধে সূক্ষ্ম দার্শনিক সমালােচনা তাহার জ্ঞানের গভীরতা, চিন্তা, ও গবেষণার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। তাহার ইংরেজী লেখার ধরণ ও ভঙ্গিমা দেখিয়া তাহাকে অন- ইংরেজ বলিয়া বিশ্বাস করিতে ইচ্ছা হয় না। কি সুন্দর স্বভার-সরল, চিত্তাকর্ষক ভাষার ভিতর দিয়া সহজ স্বচ্ছন্দ গতিতে তঁাহার ভাব লহরী হেলিয়া দুলিয়া নাচিয়া নাচিয়া চলিয়াছে। এক অনির্বচনীয় আনন্দ ও পবিত্রতার বেহেশতী-খােশবু তাঁহার লেখার প্রতি ছত্রে ছত্রে মাখানাে। ২ হালিদা হানুম নানা জটিল, হয়রানকারী, রক্ত-শােষক সমস্যা জীবনে তাঁহার সম্মুখীন হইয়াছে। তাহার জীবন বিনাশের ষড়যন্ত্র হইয়াছে ; সুধু তাহাই নহে, তাহার মৃত্যু দণ্ডের আদেশ পর্যন্ত প্রচারিত হইয়া গিয়াছে। কিন্তু অন্তর্নিহিত বিপুল শক্তি ও গভীর আত্মনির্ভরতা বলে তিনি সমস্ত বিপদকে তুচ্ছ করিয়া অবাধগতিতে কঠোর কর্তব্য পথে অগ্রসর হইয়াছেন। স্ত্রী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন মহিয়সী নেত্রীরূপে তিনি জগতকে দেখাইয়াছেন যে নারী অবলা নহে, অন্তঃপুরে পুরুষের দাসীবৃত্তি করাই তাহার সৃষ্টির উদ্দেশ্য নহে। মাতারূপে, পত্নীরূপে, ভগিনী ও কন্যারূপে সেবাকারা—সেত গৌরবের কথা। সেবা গুণে নর-নারী-নির্বিশেষে ভিতরের মানুষটী ফেরেশতা হইয়া আত্ম প্রকাশ করে। সুযােগ ও সুবিধা পাইলে দুনিয়ার প্রায় প্রত্যেক কাৰ্যে নারী পুরুষের পাশাপাশি ভাবে অগ্রসর হইতে পারে। খােদার-দেওয়া দুনিয়ার খােলা হাওয়া, সবুজ মাঠ, বাহিরের নানা মুক্ত সৌন্দৰ্য্য শুধু পুরুষের জন্য নহে। স্রষ্টা তাহা নারীর জন্য ও তুল্য রূপেই উদ্দিষ্ট করিয়া রাখিয়াছেন। সমাজ-বিধির হওঁ। কৰ্ত্তা পুরুষ এতকাল জ্ঞাত ও অজ্ঞাতসারে নারীর প্রতি যে অন্যায় করিয়াছে তাহা স্বীকার করিয়া তাহার যথাযযাগ্য প্রতিকার করিবার সময় আসিয়াছে। আমাদের দেশে নারী জাগরণ ও স্ত্রী শিক্ষা বিস্তারের এই শুভক্ষণে আমাদের মাতা-ভগিনীগণ এই আদর্শ বিদুষী মহিলার জীবনী হইতে যথেষ্ট প্রেরণা পাইবেন এবং তাঁহাদের মানসিক অনেক জটিল সমস্যার সমাধান হইবে বলিয়া বিশ্বাস করি।

জন্ম ও বাল্যকাল হালিদা আদীব হানুম সুলতান আবদুল হামীদের সেক্রেটারী আদীব বের কন্যা। ১৮৭৯ খৃষ্টাব্দে বফোরস প্রণালীর তীরবর্তী বেশিতাশ, গ্রামে তাহার জন্ম হয়। হজরত আয়ুব আত্সারীর (১) আর এক নাম ছিল খালিদ। হালিদা ভূমিষ্ঠ হওয়ার পূর্বে আদীব বে মনে মনে স্থির করিয়াছিলেন যে পুত্র সন্তান হইলে এই পুণ্যাত্মার নামানুসারে তাহার নাম করণ হইবে । পরে কন্যা জন্মগ্রহণ করিলে তাহাকেই এই নাম দেওয়া হইয়াছিল। আরবী বর্ণমালার খে অক্ষর তুর্কীরা ‘হ’ বলিয়া উচ্চারণ করেন। হালিদা আরবী শব্দ খালিদারই তুর্কী উচ্চারণ। পিতার নামের সহিত যুক্ত হইয়া হালিদা আদীব হইয়াছে। হালিদার পিতামহ আলী-আয়াতুল্লাহ, আনাতােলিয়ার খাটী তুর্ক বংশীয় ছিলেন। তিনি হালিদার বাল্যকালে শাহজাদা রশাদ ( পরবর্তী সুলতান পঞ্চম মােহম্মদ ) এর কাফী প্রস্তুতকারীদের অধ্যক্ষ ছিলেন। হালিদার পিতামহী কনষ্টান্টিনােপলের এক বড় ঘরের মেয়ে ছিলেন। এই পিতামহীর জীবনের সহিত হালিদার শৈশব, বাল্য (১) এই বিখ্যাত সাহাবী মদীনার অধিবাসী ছিলেন। মুআবিয়ার খিলাফত কালে মুসলমানেরা সর্ব প্রথম কনষ্টান্টিনােপল দখল করিতে চেষ্টা করেন। হজরত আয়ুব আনসারী এই অভিযানে সৈনিক রূপে কনষ্টান্টিনােপলে গমন করেন এবং সেখানেই তাহার মৃত্যু হয়। তাহার মাজার জিয়ারত করিবার জন্য দলে দলে লােক তথায় যাতায়াত করিয়া থাকেন। ৪ হালিদা হানুম ও যৌবনের অনেক স্মৃতি ওতপ্রােত ভাবে জড়িত। হালিদ তাহার জীবন-স্মৃতিতে বহুবার ভক্তি ও কৃতজ্ঞতায় গদগদ হইয়া এই দাদীমার কথা উল্লেখ করিয়াছেন। শৈশবেই হালিদা মাতৃহারা হন; স্নেহশীল পিতার আদর যত্নে তিনি মানুষ হইয়াছেন। বাড়ীতে দাস দাসীর অভাব ছিলনা। ঐশ্বর্যের কোমল কোলে পালিত হইয়াও তিনি যে দেশ ও জাতির জন্য স্বেচ্ছায় শারীরিক ও মানসিক শতকষ্ট বরণ করিয়া লইয়াছেন এইখানেই তাহার মহত্ব ও চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য। শৈশবের একটা ঘটনা হইতে তাহার সঙ্কল্পসিদ্ধির অদম্য স্পৃহা এবং অবিরাম ও দুৰ্ব্বার চেষ্টার পরিচয় পাওয়া যায়। তাহার এই প্রকৃতি অৰ্জিীবন প্রয়ােজন মত তাহাকে চালিত করিয়া অসম্ভব সম্ভব করিয়াছে। ঘটনাটা এই—রাত্রি অনেক হইয়াছে, চারিদিক নিস্তব্ধ। পিতা আদীব বে কাৰ্য্যোপলক্ষে রাজপ্রাসাদেই রহিয়া গিয়াছেন, রাত্রিতে বাসায় ফিরেন নাই। মেয়ে মেঝের মাঝখানে দাড়াইয়া কাঁদিয়া উঠিল ‘ বাবার কাছে যাব। তাহাকে কত বুঝান হইল ‘বাবা প্রাসাদে আছেন, এখন আসিতে পারিবেন না, রাত্রি কালে প্রাসাদের দরওয়াজা বন্ধ থাকে, প্রহরীরা পাহারা দেয়—তিনি কাল আসিবেন।” কিন্তু কিছুতেই কিছু হইল না। সে কঁদিয়া গলা ভাঙ্গিয়া ফেলিল, শ্বাস বােধ হইবার উপক্রম হইল। ইলদিজের রাস্তা বাহিয়া বাড়ীর একজন সার্কেশিয়ান যুবক প্রহরীদিগকে কৈফিয়ত দিয়া তাহাকে প্রাসাদে উপস্থিত করিল। মেয়ে বাবার কাছে গেল, তবে ছাড়িল। আদীব বে ইংরেজ জাতির প্রতি শ্রদ্ধাবান ছিলেন এবং তাহাদের সন্তান পালন পদ্ধতি বিশেষ ভাবে পছন্দ করিতেন। তাঁহার বিশ্বাস হালিদা হানুম ছিল যে এই সন্তান পালন রীতিই ইংরেজ জাতির শ্রেষ্ঠত্বের মূল কারণ। এ সম্বন্ধে যত দূর তিনি পুস্তকে পাঠ করিয়াছিলেন তাহা প্রথম কন্যা হালিদার বেলায় কার্যে পরিণত করিতে চেষ্টার ত্রুটি করেন নাই। হালিদার পােষাক পরিচ্ছদের দিকে তিনি নিজে তীক্ষ দৃষ্টি রাখিতেন। বাল্যকাল হইতেই হালিদার শরীর দুর্বল ছিল। তাহার খাদ্য দ্রব্যও নির্দিষ্ট ছিল। সামান্য গােশত, তরিতরকারী, আহার কালে কিছু ফল এবং বিকালে দুধ, এই ছিল বাল্যে তাহার সাধারণ খােরাক। হালিদা দুধ পছন্দ করিতেন না, কিন্তু সর্ব প্রকারের ফল প্রচুর পরিমাণে খাইতে ইচ্ছা প্রকাশ করিতেন। হালিদা পুতুল ভালবাসিতেন এবং তাহা লইয়া মনােমত নানারূপ খেলা করিতেন। বাল্যের এই পুতুল লইয়া খেলার ভিতরে তাঁহার ভবিষ্যৎ জীবনের উপন্যাস লেখার বীজ নিহিত ছিল। তাঁহার হৃদয় ছিল অতিশয় কোমল। কোন প্রাণীর ব্যথার দৃশ্যে তিনি স্থির থাকিতে পারিতেন না। একবার মেষ কুরবাণীর সময় নিঃসহায় প্রাণীগুলির কাতর আর্তনাদ তাঁহাকে অভিভূত করিয়াছিল ; আর একবার দেওয়াল ভাঙ্গিয়া একটী কুকুরের উপরে পড়ে, তাহা দেখিয়া হালিদার বুকের রক্ত শুকাইয়া গিয়াছিল। এই মানসিক ভাবই ভবিষ্যৎ জীবনে এক সময়ে তাহাকে বৌদ্ধ দর্শনের দিকে আকৃষ্ট করিয়াছিল। ৬ বাল্য-শিক্ষা আদীব বের ইচ্ছা ছিল সাত বৎসর বয়সে মেয়ের শিক্ষা আরম্ভ হইবে। কিন্তু হালিদার মনের মধ্যে লেখাপড়ার অত্যধিক আকাঙ্ক্ষা ততালপাড় করিত। তিনি দাদীমা ও বাবার কাছে লেখাপড়া শিখিবার আগ্রহ প্রকাশ করিতেন। ইহাতে বাধ্য হইয়া আদীব-বে ছয় বৎসর পূর্ণ হইবার পূর্বেই হালিদার “হাতে খড়ির অনুষ্ঠান করিলেন। তুর্কীরা ইহাকে ‘বাশলাম’ বলিয়া থাকেন। তুরস্কে হাতে খড়ি’র কাৰ্য্য অতি জাক-জমকের সহিত সম্পাদিত হয়। বাশলামকের পর হইতে নিয়ােজিত শিক্ষক প্রত্যহ বিকালে বাসায় আসিয়া কোরাণ-শরীফ পড়াইয়া যাইতেন। পাঠশালার গুরুমহাশয় বা মক্তবের আখােন্দজীকে তুরস্কে ‘হােজা’ বলে। হালিদার ‘হােজা’ ম্যাসিডােনিয়া হইতে আসিয়া সপরিবারে কনষ্টান্টিনােপলে বাস করিতেছিলেন। তিনি বেশিশের এক মক্তবে ও শিক্ষকতা করিতেন । ইতিপূর্বে একদিন রাজপ্রাসাদের এক শিক্ষয়িত্রীর নিকট আফ্রিকার সচিত্র ভ্রমণ বৃত্তান্ত দেখিয়া হালিদা মুগ্ধ হইয়াছিলেন। এই শিক্ষয়িত্ৰীকে তিনি “শুইজা’ বলিয়া ডাকিতেন। তইজা’ শব্দের অর্থ খালা বা মাসী। তিনি পুস্তকখানা পড়িয়া চিত্তাকর্ষক কাহিনীগুলি সকলকে বুঝাইয়া দিতেন। ইহাতে বিদ্যাশিক্ষার জন্য হালিদার মন ব্যাকুল হইয়া উঠে। হােজা সাহেবের নিকট বর্ণপরিচয় হইলে হালিদা ফিরিয়ার নামক দাসীকে সেই সচিত্র আফ্রিকা ভ্রমণ বইখানি মেঝেতে পাড়ি দিতে ৭ হালিদা হানুম বলিতেন। বইখানি খুব বড় ও ভারী ছিল বলিয়া তিনি নিজে উহা নাড়াচাড়া করিতে পারিতেন না। মেঝেতে পাড়িয়া দিলে হালিদা আরবী বর্ণপরিচয় জ্ঞানের সাহায্যে বহু কষ্টে তাহার পাঠ ও অর্থ উদ্ধার করিতে চেষ্টা করিতেন। কিছুকাল পরে আদীব-বে বেশিতাশের বাস পরিত্যাগ করিয়া সলামিয়া মহল্লায় বাস করিতে আরম্ভ করেন। এখানে হালিদার লেখাপড়ার জন্য সলীমিয়ার ইমাম সাহেব শিক্ষক নিযুক্ত হইলেন। তিনিও প্রত্যহ বিকালেই বাসায় আসিয়া পড়াইয়া যাইতেন। এই সময়ে আদীব-বে আহমদ আগা নামক একজন চতুর শিক্ষিত পরিচারক নিযুক্ত করেন। তাহার নিকট বসিয়া বসিয়া হালিদা তুর্কী জাতির আদিম কাহিনী শ্রবণ করিতেন। পিয়ানাে (Piano) বাদন শিক্ষাও এই সময়ে আরম্ভ হয়। তিন বৎসর ধরিয়া আহমদ আগা হালিদাকে তুর্কীজাতির গল্প পড়িয়া পড়িয়া শুনাইয়াছিল। ইহাতে তঁাহার কোমল মনের উপর তুর্কী সাহিত্যের একটা নতুন দিকের ছাপ পড়িয়া গিয়াছিল। তাহার ভবিষ্যৎ জীবনের সাহিত্য সাধনায় এই শিক্ষা অনেক সহায়তা করিয়াছে। ৮ কলেজে প্রবেশ ১৮৯৪ খৃষ্টাব্দে হালিদা কলেজে প্রবেশ করেন। কলেজের ছাত্রীদের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্ব কনিষ্ঠ। বয়স কম বলিয়া অনেক চেষ্টার ফলে কলেজে ভর্তি হইতে পারিলেও তিনি বাের্ডিংএ থাকার অনুমতি পান নাই। এই বিদ্যালয় তখন American College for Girls (মার্কিন বালিকা কলেজ) বলিয়া কথিত হইত। প্রাচ্যদেশে স্ত্রীশিক্ষা বিস্তারের জন্য মার্কিন পাদ্রীদের দ্বারা এই কলেজ স্থাপিত হইয়াছিল। হালিদা অতি অল্পকালের মধ্যে ইংরেজী ভাষা আয়ত্ত করিয়া ফেলিলেন। তাঁহার পিতৃবন্ধু উডস পাশা তাহার জন্য কতকগুলি বাল-বােধ্য গল্প বাছিয়া দিতেন। মূল ইংরেজীতে সেই সব আমােদজনক গল্প পড়িয়া ইংরেজী ভাষার প্রতি তাহার একটী অনুরাগ জন্মিয়া উঠে। উডস পাশা জাতিতে ইংরেজ ছিলেন। তিনি তুর্কী নৌ-বিভাগে কাৰ্য্য করিতেন। এখানে বৎসর খানেক বিদ্যাভ্যাসের পর সুলতান আবদুল হামীদের ‘ইরাদা বা হুকুম অনুসারে তাহাকে কলেজ পরিত্যাগ করিতে হইল। সুলতান তুর্কী বালক বালিকাদের বিদেশী ইস্কুল কলেজে পড়া পছন্দ করিতেন না। তাহার ভয় ছিল পাছে শিক্ষার্থীদের মত উদার হইয়া পড়ে। তিনি বলিতেন, তাহারা বাড়ীতে শিক্ষক রাখিয়া পড়াশুনা করুক। ইংরেজী শিখিতে নানা কারণে হালিদাকে যথেষ্ট বেগ পাইতে হইয়াছিল। অনেকই ইহা পছন্দ করিতেন না। ইংরেজী পুস্তকে সুন্দর সুন্দর ছবি থাকিত। বাড়ীর পরিচারক আহমদ আগা ছবিগুলির হালিদা হানুম চক্ষু নষ্ট করিয়া দিত। সে বিশ্বাস করিত ও বলিত যে মানুষের ছবি থাকা পাপজনক। হালিদা বাইবেল পড়েন বলিয়া তাহার বিমাতা ভয়ে ভীত হইয়া পড়িয়াছিলেন। তিনি একদিন হালিদাকে বলিয়াছিলেন, “তুমি কখন অজ্ঞাতসারে খৃষ্টান হইয়া যাইবে”। বাড়ীতে প্রায়ই তাহার বাইবেল চুরি যাইত। নতুন বাইবেল কিনিয়া আনিয়া বাসায় রাখিয়া দিলে, তাহা আর পাওয়া যাইত না। ইহাতে কলেজের পাঠ প্রস্তুত করিতে তাহার বড় অসুবিধা হইত। এই সময়ে হালিদার আরবী ভাষা শিক্ষার জন্য শুক্রী আফেন্দী নামে একজন বিখ্যাত মৌলবীকে ওস্তাদ নিযুক্ত করা হয়। তিনি আরবী ভাষার জটিল ও শক্ত ব্যাকরণ সহজরূপে শিক্ষা দিবার জন্য এক নূতন নিয়মের উদ্ভাবন করিয়াছিলেন। এই নূতন পদ্ধতি হালিদাকে লইয়াই প্রথম পরীক্ষিত হয়। পরীক্ষায় ইহা অতি উৎকৃষ্ট বলিয়া প্রতিপন্ন হইয়াছিল। হালিদাকে পড়াইবার সময় শুক্রী আফেন্দী বাহিরের অনেক ভদ্রলোক ডাকিয়া আনিয়া তাহার শিক্ষা প্রণালীর উপযােগিতা প্রদর্শন করিতেন। আরবী শিক্ষার সময়ে হাদী আফেন্দীর দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক আলােচনা হালিদার ভাব রাজ্যে এক নূতন চিন্তার দুয়ার খুলিয়া দেয়। ক্রমে কে যেন তঁাহার হৃদয়-মন্দির দুয়ারে এক অজানা রাজ্যের রহস্যময় সংবাদ আনিয়া দিতে থাকে। ফলে ধৰ্ম্ম সম্বন্ধীয় নানা গুরুতর চিন্তা ভঁহার মস্তিষ্ক আলােড়িত করিতে আরম্ভ করে । কলেজ ত্যাগ করিলেও হালিদার ইংরেজী শিক্ষা স্থগিত হয় নাই। তিনি একাদিক্রমে কয়েক জন ইংরেজ শিক্ষয়িত্রীর নিকট ইংরেজী শিক্ষা করিতে থাকেন। একজন শিক্ষয়িত্ৰী তঁাহার মনের উপর যথেষ্ট ১০ হালিদা হানুম প্রভাব বিস্তার করিয়াছিলেন। তিনি Shakespeare এবং George Elliot প্রভৃতি প্রভৃতি উচ্চশ্রেণীর ইংরেজী সাহিত্য গ্রন্থ পাঠে হালিদার অনুরাগ সৃষ্টি করেন। এই শিক্ষয়িত্রীর উপদেশানুসারে হালিদা The Mother' নামক একখানা ইংরেজী পুস্তকের তুর্কী অনুবাদ করেন। তখনকার বিখ্যাত লেখক ও মুসলিম আইনজ্ঞ মহমূদ আসদ আফেন্দী আসলের সহিত মিল করিয়া অনুবাদ সংশােধনচ্ছলে হালিদার সহজ সরল ভাষা পরিবর্তন করিয়া তদ্স্থানে কঠিন ও উচ্চ বাক্য বসাইয়া দিতেন। আফেন্দীর ভূমিকা সহ এই পুস্তক মুদ্রিত হইয়াছিল। ইহার প্রথম সংস্করণের সমস্ত পুস্তক ইলদিজ প্রদর্শনীতে বিক্রয় হয়; এবং লব্ধ অর্থ ১৮৯৭ খৃষ্টাব্দের গ্রীস-তুরস্ক যুদ্ধে শহীদ সৈন্যদের পরিবার প্রতি পালন উদ্দেশ্যে ব্যয়িত হয়। ইহাতে হালিদা সুলতানের পক্ষ হইতে সম্মানসূচক পারিতােষিক ( decoration) প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। পূর্বোক্ত ইংরেজ শিক্ষয়িত্রী চলিয়া গেলে রিজা তৌফীক হালিদার ফরাসী ও তুর্কী শিক্ষার ভার গ্রহণ করিলেন। তিনি দর্শনশাস্ত্র বিশেষভাবে ভাল বাসিতেন এবং Herbert Spencerএর খুব প্রশংসা করিতেন। কিন্তু তাঁহার প্রাচ্য অধাত্ম-জ্ঞান এবং প্রাচ্য কলা ও কবিতাই হালিদাকে বেশী মুগ্ধ করিত। ১৮৯৯ খৃষ্টাব্দে হালিদা পুনরায় কলেজে অধ্যয়ন করিবার অনুমতি প্রাপ্ত হন। এই সঙ্গে তাহার ভগিনী নীলুফরও কলেজে প্রবেশ করিলেন। এবার হালিদা বােডিংএ থাকিতে লাগিলেন। নীলুফরকে বাসা হইতে আসিয়াই কলেজ করিতে হইত। কলেজ জীবনে তাহার মুক্ত মানস ও হৃদয় ক্ষেত্রে চিন্তা ও ভাবের বন্যা আসিয়া প্লাবনের সৃষ্টি করে। স্বাধীন ১১ হালিদা হানুম চিন্তা এই সময় হইতে তাহার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত অনেক বিশ্বাসের মূল শিথিল করিতে আরম্ভ করে। সত্য ও আত্মার উৎকর্ষে ধৰ্ম্ম বিশেষের একাধিকারের দাবী তাহার মনে বিদ্রোহের সৃষ্টি করিয়া ছিল। কলেজ জীবনে তিনি ইম, ঈসায়ী ধৰ্ম্ম ও বৌদ্ধ ধর্ম তুলনামূলকভাবে অধ্যয়ন করিয়াছিলেন। বুদ্ধের অহিংস ও শান্তিপ্রিয় মত হালিদার বড়ই পছন্দ হইয়াছিল। কলেজ জীবনের শেষ বৎসরে ফিলিপ ব্রাউন নামক একজন পণ্ডিতের সহিত তাহার পরিচয় হয় এবং তিনি ফিটজেরাল্ড অনুদিত ওমর খয়্যামের রুবাইয়াতের দিকে তাহার মনোেযােগ আকর্ষণ করেন। এই সময় হইতে কয়েক বৎসর পর্যন্ত তিনি আনন্দের সহিত ওমর খয়ামের রুবাইয়াত পাঠ করিয়াছিলেন। এই মানসিক বিপ্লবের যুগে ফ্রান্সের সর্বজনীন ধর্ম প্রচারক পেয়র হিয়াসিন্থ ( Pire Hyacinthe) এবং ভারতের উদার হিন্দুমত প্রচারক স্বামী বিবেকানন্দ হালিদাদের কলেজ পরিদর্শন করিতে গিয়া বক্তৃতা করেন। দ্বিতীয়ােক্ত ব্যক্তি সম্বন্ধে হালিদ জীবন-স্মৃতিতে faferata-"Swami Vivicananda, a celebrated Brahmanist, also visited the college and gave one of his famous speeches, which had the reputation of hypnotising his audience. This dark, slender man was clad in a loose robe, the thin hands moving with a life which seemed distinct from the rest of his body; the expressiveness of his graceful physique and the mystic charm of Asia's voice, these were evident in him." ১২ হালিদা হানুম অর্থাৎ বিখ্যাত হিন্দুমত প্রচারক স্বামী বিবেকানন্দ ও আমাদের কলেজ পরিদর্শন করিয়া বক্তৃতা করেন। শ্রোতাগণকে মন্ত্রমুগ্ধ করিতে পারে বলিয়া তাহার বক্তৃতার খ্যাতি ছিল। এই ঢিলা পােক পরিহিত কশ, কৃষ্ণাঙ্গ লােকটীর দুল্যমান হাত দুইখানি এমন জীবনী শক্তির পরিচয় দিতেছিল যে সে শক্তি যেন তাহার অবশিষ্ট শরীর হইতে সম্পূর্ণ পৃথক। তাহার কান্তিযুক্ত দেহের ভাব ব্যঞ্জকতা এবং এশিয়ার বাণীর তত্ত্বাচ্ছন্ন ভাব-মাধুরী সকলকে মুগ্ধ করিয়াছিল। (১) কলেজে হালিদা সর্ববিষয়েই অন্য ছাত্রীদের সেরা ছিলেন। কিন্তু গণিতে তাঁহার সেরূপ রুচি ছিল না। হালিদার গণিত শিক্ষার জন্য তাঁহার পিতা সুবিখ্যাত গণিতজ্ঞ সালেহ জকী বেকে বিশেষ শিক্ষকরূপে নিযুক্ত করিলেন। সালেহ জকী বে তুরস্কের দুইটী সর্বোচ্চ বিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং Meteorological Observatory বা বায়ব্য মান- মন্দিরের ডাইরেক্টর ছিলেন। বিজ্ঞান ও দর্শন সম্বন্ধে তিনি অনেক গুলি পুস্তক প্রণয়ন করিয়াছিলেন। তিনি ওগাস্ত কঁত ( Auguste Comte) এর বিশেষ ভক্ত ছিলেন এবং তৎসম্বন্ধে তুর্কী ভাষায় অনেক কিছু প্রকাশ করিয়াছিলেন। তিনি যে সমস্ত জটিল বিষয়ের আলােচনা করিতেন তাহা অতি সহজ ভাবে বুঝাইয়া দিতে পারিতেন। এই শিক্ষকের নিকট অধ্যয়ন করিয়া হালিদার গণিত বিষয়ক দুর্বলতা দূর হইল। ১৯০১ খৃষ্টাব্দে তিনি আমেরিকান কলেজ হইতে গ্রাজুয়েট হইয়া বাহির হইলেন। (১) স্বামী বিবেকানন্দ তাঁহার পরিব্রাজক’ গ্রন্থে তুরস্ক ভ্রমণের কথা উল্লেখ করিয়াছেন।

বিবাহ ও সংসার জীবন পূৰ্বোল্লিখিত গণিতের বিশেষ শিক্ষক সালেহ জকী বের সহিত পত্র ব্যবহারে উভয়ে উভয়ের প্রতি আকৃষ্ট ও অনুরক্ত হইয়া পড়েন, এবং পরে ১৯০১ খৃষ্টাব্দে কলেজ ত্যাগের পর তাহাদের বিবাহ হয়। এই বিবাহকে আমরা ইংরেজী ভাষায় Love-marriage (প্রেম-পরিণয় ) বলিতে পারি। বিবাহের পর পুরাতন ধরণের গৃহিণীর মত তিনি অন্তঃপুরেই আবদ্ধ হইয়া পড়িলেন। পিতার যে সমস্ত বন্ধুকে তিনি শৈশব হইতে জানিতেন—চিনিতেন, তাহাদের সহিত সাক্ষাৎ বন্ধ হইয়া গেল। এখন তিনি সর্বপ্রকারে স্বামীর সেবা ও সাহায্য করিয়া গৃহখানিকে আনন্দময় ও শান্তিপূর্ণ করিয়া তুলিতেই সমস্ত শক্তি নিয়ােগ করিলেন । সালেহ জকী বে তুর্কী ভাষায় এক বিরাট গণিত অভিধান { Mathematical Dictionary) প্রণয়ন আরম্ভ করিলে হালিদা নানা ইংরেজী প্রামাণিক গ্রন্থ হইতে বড় বড় ইংরেজ গণিতবিদ ও দার্শনিকের জীবনী সংগ্রহ করিয়া স্বামীর কাৰ্য্যে সহায়তা করিতেন। এই সময় ইংরেজীতে Sherlock Holmes series বাহির হয়। হালিদা এই গল্পগুলি তুর্কীতে তর্জমা করিয়া পড়িয়া যাইতেন, আর ইংরেজী অনভিজ্ঞ আদীব বে ও সালেহ জকী বে শিশুর মত তন্ময় হইয়া তাহা শ্রবণ করিতেন। সংসারের নানা কার্যের মধ্যে থাকিয়া শত প্রকার লিপ্ততা ও ব্যস্ততা সত্বেও হালিদার সাহিত্য আলােচনার বিরাম ১৪ হালিদা হানুম ; হয় নাই। অবসর সময়ে তিনি গভীর মনােযােগের সহিত ফরাসী- সাহিত্য আলােচনা করিতেন। ফরাসী-সাহিত্যের ভাব ও ভাষা তাঁহাকে একেবারে মুগ্ধ করিয়া ফেলিয়াছিল। এই সাহিত্যের ভিতর দিয়া জোলা ( Zola) তাহার ভাব প্রবণ মনের উপর প্রবল প্রভাব বিস্তার করিয়াছিলেন। ১৯০২ খৃষ্টাব্দ হইতে ১৯০৫ খৃষ্টাব্দের মধ্যে হালিদার দুইটী পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে। প্রথম সন্তানের নাম হালিদার দাদাজানের নামানুসারে আলী আয়াতুল্লাহ, রাখা হইয়াছিল। দ্বিতীয় জনের জন্ম বৎসরে (১৯০৫ খৃষ্টাব্দে) রুস-জাপান যুদ্ধে সুবিখ্যাত জাপানী নৌ- সেনাপতি টোগাে অত্যাশ্চর্য বীরত্বের পরিচয় দিয়াছিলেন ; তাই প্রাচ্যের গৌরব টোগাের নামানুসারে তাহার নামকরণ হইয়াছিল হাসান হিকমতুল্লাহ, টোগাে। প্রসবের পর পুস্তক ও পিয়ানাে লইয়া তাহার সময় কাটিত । জোলা অধ্যয়নের পর হালিদা শেক্সপিয়র পাঠে মনােনিবেশ করেন। তিনি শুধু পাঠ করিয়াই ক্ষান্ত হইতেন না; তুর্কী ভাষায় অনুবাদও করিতেন। Hamlet লইয়া অনুবাদ কাৰ্য্য আরম্ভ হয়। হালিদা আরবী পারসী মিশন বর্জিত খাঁটি প্রাঞ্জল তুর্কী ব্যবহার করিতেন। তাঁহার স্বামী সালেহ জকী বে তাহা কাটিয়া উচ্চ আরবী শব্দ বসাইয়া দিতেন, এবং পাণ্ডিত্যের অভিমান করিয়া অনেক সময় হালিদাকে বকিতেন। কিন্তু হালিদা তাহাতে দমিত না হইয়া আপন মনে নিজের ভাবে অনুবাদ করিয়া যাইতেন। পূৰ্বে উল্লিখিত হইয়াছে যে সালেহ জকী বে ইংরেজী জানিতেন না। তিনি Hamletএর ফরাসী অনুবাদ ১৫ হালিদা হানুম পাঠ করিয়াছিলেন। হালিদা ক্রমে শেক্সপিয়রের অনেকগুলি গ্রন্থের অনুবাদ করেন। ১৯০৬ খৃষ্টাব্দে তিনি পূর্ণভাবে শেক্সপিয়রের অন্তরে প্রবেশ করিতে সমর্থ হন বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। হালিদার সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে শেক্সপিয়রের কলায় নরনারীর বৈশিষ্ট্য মূর্তিমান হইয়া ধরা পড়ে। তিনি জীবন-স্মৃতির একস্থানে লিখিয়াছেন যে কৰ্ম্ম ও ধর্ম জগতের মােহম্মদ আর কাব্য ও কলা জগতের শেক্সপিয়র এই দুই মহামানবের শিক্ষার ভিতরে এক সুন্দর সামঞ্জস্য বর্তমান রহিয়াছে। হালিদার স্বামী সালেহ জকী বে ক্রমে গলসরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর (Rector) এবং সাধারণ শিক্ষা বিভাগীয় মন্ত্রণা সভার উপদেষ্টা (Counsellor ) পদে উন্নীত হইলেন। এই সময়ে (১৯১০ খৃষ্টাব্দে হালিদার সংসার জীবনে এক মহাপরিবর্তন ঘটিল। সালেহ জকী বে একজন শিক্ষয়িত্রীর প্রতি গভীর ভাবে অনুরক্ত হইয়া তাহাকে বিবাহ করেন। হালিদা বহু বিবাহের পক্ষপাতী ছিলেন না। ফলে অনেক গােলমালের পর বিবাহ বন্ধন ছিন্ন হয়। দীর্ঘ নয় বৎসর যে সংসারকে তিনি সম্পূর্ণ আপন বলিয়া মনে করিয়াছিলেন ঘটনাচক্রের আবর্তনে তাহা পরিত্যাগ করিয়া দুইটী সন্তান লইয়া বাহির হইয়া গেলেন। হালিদার নিজের কথা...“The force of circumstances.••makes us like fragile leaves blown away from trees where they looked so green and happy only a moment before"-9955 সবুজ সুন্দর পাতা যেমন হঠাৎ প্রবল বাতাসে উড়িয়া যায় আমরাও সেইরূপ অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই উড়িয়া বেড়াই। ১৬

হালিদা হানুম
হালিদা ও তাহার দাদীমার অসুখের সময় বিখ্যাত ডাক্তার
আনান চিকিৎসা করিয়াছিলেন। তিনি ইহাদের পারিবারিক
চিকিৎসক ছিলেন। হালিদার দাদীমা তাহাকে সন্তানের মত স্নেহ
করিতেন। একবার হালিদা কঠিন অন্ত্র প্রদাহ (appendicitis)
রােগে আক্রান্ত হন। ইহাতে অস্ত্রোপচার করিতে হয়। এই সময়
ডাক্তার আদনান সহানুভূতি ও স্নেহের বশবর্তী হইয়া হালিদার শয্যা-
পার্শ্বে বসিয়া থাকিতেন। এই ব্যাপারে তাঁহার প্রতি কৃতজ্ঞতা-ভাবে
হালিদার মন অবনত হইয়া পড়ে এবং পরে ১৯১৭ খৃষ্টাব্দের ১৩ই এপ্রিল
তারিখে তাহারা পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন।
১৭
২

সাংবাদিক জীবন ১৯০৮ খৃষ্টাব্দের ভীষণ শাসন-সংস্কার আন্দোলনের যুগে ২০শে জুলাই তারিখে কবি ও কৰ্ম্মী তৌফীক ফিরৎ এবং ক্ষমতাশালী সমালােচক হুসায়ন জাহিদ অন্যান্য সুযােগ্য কর্মী ও লেখক গণের সাহায্যে ‘তানীন’ পত্রিকা বাহির করেন। “আদবিয়্যাতে জদীদ বা, নবীন সাহিত্য পন্থী সকলেই ইহাতে লেখা প্রকাশ করিতেন। হালিদা ডাক্তার রেজা তৌফীকের সহায়তায় ‘সরওতে ফুন’ নামক সাহিত্য পত্রিকার মারফতে এই নবীন সাহিত্য পন্থীদলের সহিত পরিচিত হইয়াছিলেন। সালেহ জকি বে ‘তানীন’ পত্রিকার বৈজ্ঞানিক আলােচনায় সহায়তা করিতেন। হালিদা ইহার সাহিত্য কলামে প্রবন্ধ লিখিতেন। এই সময় হইতে অস্থায়ী ভাবে তাঁহার লেখিকা জীবন আরম্ভ হইল। তুর্কী যুবকদের ভাব-রাজ্যের যুগান্তকারী নেতা তৌফীক ফিরতের সহিত তখন তাঁহার সাক্ষাৎ ছিল না। সালেহ জকী বের গৃহে থাকিয়া পিতা ও স্বামীর অন্তরঙ্গ বন্ধু ব্যতীত অতি অল্প লােকের সহিতই তাহার সাক্ষাৎকার ঘটিয়াছে। তিনি গৃহে অবস্থান করিয়াই তৌফীক ফিরতের ভাবধারা এবং তাহার জীবন ও কর্মের গতি লক্ষ্য করিয়াছিলেন। “তানীন’ নারী স্বাধীনতা প্রচার করিত, সমাজে ও শিক্ষায় নারীকে পুরুষের তুল্য স্থান দিতে বলিত; সেইজন্য রক্ষণশীল ও পুরাতন পন্থীরা ক্ষেপিয়া উঠিয়াছিলেন। ১৯০৮-৯ খৃষ্টাব্দের নব্য তুর্কীদের ‘ঐক্য ও উন্নতি’ আন্দোলনে ১৮ হালিদা হানুম হালিদা প্রধান কৰ্ম্মী ছিলেন। তিনি পত্রিকায় নানা প্রবন্ধ লিখিয়া জনমত গঠনে অক্লান্ত পরিশ্রম করিয়াছিলেন (১)। তাঁহার মত ছিল শিক্ষা সম্বন্ধীয় ক্রমিক পরিবর্তন, দেশের সামাজিক জটিল প্রশ্নের ধীর অনুধাবন ও সমাধান এবং শিক্ষা সংস্কারে সর্বাপেক্ষা অধিক মনোেযােগ প্রদান। তঁহাকে প্রচার কার্য হইতে বিরত করিবার জন্য কতকগুলি বেনামী পত্র লেখা হয়। ইহাতে নীন পত্রিকায় আর কোন প্রবন্ধ লিখিলে তাহাকে ভীষণ শাস্তি ভােগ করিতে হইবে বলিয়া ভয় প্রদর্শন করা হইয়াছিল। সরকারী ছাপা কাগজে তাহার প্রাণদণ্ডের কথা প্রকাশিত হয়। কিন্তু দেশের প্রতি তঁাহার কর্তব্যজ্ঞান এবং মানবের প্রতি তাহার প্রেম তাহাকে এক মুহূর্তও লেখনী বন্ধ করিয়া বসিয়া থাকিতে দেয় নাই। ‘তানীন’ ও অন্যান্য পত্রিকায় তিনি পূর্ববৎ নিজমত ব্যক্ত করিতেন। এই সময় তাহার বয়স হইয়াছিল মাত্র ২৪ বৎসর। এই সময়েই ইসাবেল ফ্রাই (Isabel Fry) নামক জনৈক বিদুষী (>) fufa farferat157-"I had become a very busy journalist and writer in three months; I received a great many letters in widely varied subjects. Sometimes my correspondents asked social questions, sometimes political ones, but each took care to send me a long exposition of his own views. Some of the letters were about family problems and secrets ; no catholic priest could have received further and more candid confession than I did during those three months."

হালিদা হানুম ইংরেজ মহিলার সহিত হালিদার সখ্য জন্মে। নেশান (Nation) পত্রিকায় হালিদা একটী আপীল প্রকাশ করেন। ইহাতেই প্রথমে এই ইংরেজ মহিলার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। এই আকর্ষণই পরে সখীত্বে পরিণত হইয়াছিল। ১৯০৯ খৃষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারী মাসে মিস ফ্রাই তুরস্কে আগমন করেন এবং স্ত্রী-শিক্ষা সম্বন্ধে একটি সুচিন্তিত প্রবন্ধ ‘তানীন’ পত্রিকায় প্রকাশ করেন। ইতিমধ্যে তুরস্কের গৃহবিবাদ ভীষণাকার ধারণ করিল। ঐক্য ও উন্নতির বিরুদ্ধবাদীরা কঠোর দমন নীতি আরম্ভ করিয়া দিল। ক্ষিপ্ত সৈন্যেরা হুসায়ন জাহিদ ও আহমদ রেজা বে ভ্রমে লেবাননের ডেপুটী মােহম্মদ আরসলান এবং বিচার বিভাগীয় মন্ত্রী নাজিম পাশাকে হত্যা করিয়া ফেলিল। কোন ব্যক্তিকে উদার নীতিক বা সংস্কার পন্থী বলিয়া সন্দেহ করিলেই সৈন্যেরা তাহাকে নিহত করিতে লাগিল। २० প্রথম হিজরত হালিদার কয়েক জন হিতাকাঙ্ক্ষী বন্ধু সংবাদ দেন যে, হত্যা-যােগ্য ব্যক্তিদের তালিকায় তাহার নাম আছে, কাজেই তাহার অতি সত্বর কোন নিরাপদ স্থানে চলিয়া যাওয়া একান্ত দরকার। ইহাতে সন্তান দুইটী সহ হালিদাকে বাধ্য হইয়া মিসরে আশ্রয় লইতে হইয়াছিল। মিসরে আসিয়া তিনি আলেকজান্দ্রিয়ার এক হােটেলে অবস্থান করেন। একেত অপরিচিত স্থান, তার উপর অর্থের অনাটন ও পুত্র হাসানের অসুখের জন্য এখানে তাহাকে অনেক কষ্ট ও অশান্তি লােগ করিতে হয়। এই সময় পূর্ব পরিচিত মিস ইসাবেল ফ্রাই বিলাত যাইবার জন্য নিমন্ত্রণ করিয়া এক পত্র লেখেন। সালেহ জকী বে নিজে সন্তানদ্বয়ের ভার গ্রহণ করিয়া হালিদাকে বিলাত যাইবার জন্য পীড়াপীড়ি করেন। হালিদা একাকী বিলাত যাত্ৰা করিলেন। বিলাতে মিস্ ফ্রাই তাহার অনেক সাহায্য করিয়াছিলেন। এখানে কেব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবীর অধ্যাপক জগদ্বিখ্যাত প্রাচ্য ভাষাবিদ পণ্ডিত ই, জি, ব্রাউন ও তাঁহার স্ত্রীর সহিত হালিদার সাক্ষাৎ এবং পরিচয় হয়। ব্রাউন সাহেবের সৌজন্যের কথাতিনি জীবন স্মৃতিতে উল্লেখ করিয়াছেন। হালিদার আলেকজান্দ্রিয়া অবস্থান কালেই ‘ঐক্য ও উন্নতি’ পন্থীদের শত্রুগণের পতন হইয়াছিল। সুলতান আবদুল হামীদ সিংহাসনচ্যুত হইয়া সালােনকিতে নির্বাসিত হইয়াছিলেন এবং তাহার স্থানে পঞ্চম মােহম্মদ সুলতান পদে বরিত হইয়াছিলেন। হালিদা কয়েক মাস বিলাতে অবস্থান করিয়া তুরস্কে ফিরিয়া আসিলেন। ২১ হালিদা হানুম হালিদা বিলাত হইতে প্রত্যাগমন করিয়া একমুহুর্ত ও শান্তিতে কাটাইতে পারেন নাই। হাসানের টাইফয়েড জ্বর হইয়া পড়ে। সারারাত্রি জাগিয়া জাগিয়া তাহার শুশ্রুষা করিতে হইত। এই রাত্রি- জাগরণ কালে তিনি বসিয়া বসিয়া বই লিখিতেন। ইহারই ফল ‘সবী তালিব’ নামক গ্রন্থ। এই পুস্তকে তিনি প্রচলিত সামাজিক প্রথার দোষগুলি বাহির করিয়া লােকের দৃষ্টির সামনে খুলিয়া ধরেন। ইহার জন্য হালিদাকে তীব্র সমালােচনা সহ্য করিতে হইয়াছিল। তবে পুস্তকের কদরদানী ও গুণ উপলব্ধি করিবার লােকের ও অভাব ছিল না। এই সময়ে যুবরাজ মজীদ চামিলজার নিকটবর্তী তাহার বাড়ীতে হালিদাকে নিমন্ত্রণ করিয়া পাঠান। তিন বৎসর বয়স হইতে হালিদা যুবরাজ মজীদকে চিনিতেন এবং উভয়ের পরস্পর পরিচয় ছিল। মজীদ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে সুপণ্ডিত, সুগায়ক, সুচিত্রকর, নিপুণ ঘােড়-সােয়ার এবং মহানুভব ব্যক্তি ছিলেন। ২২ শিক্ষক ও শিক্ষান্নতি এই সময়ে হালিদা শিক্ষা সমস্যা সম্বন্ধে ধারাবাহিক প্রবন্ধ লিখিতে- ছিলেন। এই প্রবন্ধগুলি শিক্ষা-বিভাগীয় পরামর্শ দাতা সঈদ বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পরে তিনি হালিদাকে শিক্ষাকাৰ্যে কিছু সময় ব্যয় করিবার জন্য অনুরােধ করেন। তিনি বিশেষভাবে বালিকাদের নৰ্মাল ইস্কুল পরিদর্শন করিয়া প্রয়ােজন মত পরিবর্তনের প্রস্তাব করিতে বলেন। হালিদা নকীয়া হানুমকে সঙ্গে লইয়া নৰ্মাল ইস্কুল পরিদর্শন ও তাহার দোষ-গুণ বিচারের জন্য গমন করেন। নকীয়া হানুম এই নর্মাল ইস্কুলেরই একজন গ্রাজুয়েট ; তিনি কিছুকাল আমেরিকান্ কলেজে শিক্ষয়িত্রীর কাজ করিয়াছিলেন। শিক্ষকতা সম্বন্ধে তাহার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা ছিল। তিনি নর্মাল ইস্কুলের ডাইরেক্টর নিযুক্ত হইয়াছিলেন । হালিদা দেখিলেন নর্মাল ইস্কুলে আরবী, ফারসী, গার্হস্থ্য বিজ্ঞান এবং ধর্মপালনের নিয়মাবলী শিক্ষার প্রধান বিষয়। আধুনিক বৈজ্ঞানিক ভাবের সৃষ্টি, ইউরােপীয় জ্ঞান বিজ্ঞানের বাহন কোন ভাষাশিক্ষা, আধুনিক আবহাওয়ার ব্যবস্থা ও সাজসজ্জা, তুর্কী ছাত্রীদের প্রাণে নূতন ভাবের সঞ্চার, সম্মিলিতভাবে কাৰ্য্য করিবার স্পৃহা জাগরণ, দায়িত্ব বােধের বিকাশ, আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাসের সৃষ্টি, নিয়মানুবর্তিতা ও কর্তব্য পরায়ণতা শিক্ষা—এই সবের প্রয়ােজনীয়তা তীব্রভাবে উপলব্ধি করিয়া তিনি এক রিপাের্ট দেন এবং শিক্ষাবিভাগ এই রিপাের্ট সসম্মানে গ্রহণ করেন হালিদা হানুম হালিদা এইবার শিক্ষানীতির (Principles of Education) অধ্যাপনা লইয়া নর্মাল ইস্কুলে প্রবেশ করিলেন। দুই বৎসরের মধ্যে শিক্ষাবিভাগীয় কর্তৃপক্ষ বালিকা কলেজের আবশ্যকতা হৃদয়ঙ্গম করিলেন; ফলে এই নর্মাল ইস্কুল কলেজে পরিণত হইল। এই নূতন কলেজে পাঁচ বৎসরকাল ব্যাপিয়া হালিদা ইতিহাস, শিক্ষানীতি এবং নীতিশাস্ত্রের অধ্যাপনা করেন। এতদ্ব্যতীত জাতি গঠনের জন্য আবশ্যকীয় আরও অনেক বিষয় তিনি কারিকুলমের বাহিরে শিক্ষা দিতেন। এই সময়কার কয়েকজন ছাত্রীর সাহায্যেই হালিদা পরে মজিদ ইস্কুল গুলিকে নিয়ন্ত্রিত করিয়া আধুনিক ধরণের করিয়া তুলিতে পারিয়াছিলেন এবং সিরিয়ার এতীমখানা ও ইস্কুলগুলিকে সুশৃঙ্খল এবং সুগঠিত করিয়াছিলেন। ১৯১০ সালে জাতীয় প্রয়ােজনীয়তায় হালিদাকে শিক্ষকতা ও গ্রন্থ প্রণয়ন ব্যতীত জনসভায় ঘন ঘন বক্তৃতা দিতে হইত। পরে শুকরী বে শিক্ষামন্ত্রী হইলে তাহার সহিত শিক্ষানীতি লইয়া হালিদার মতানৈক্য ঘটে এবং তিনি পদত্যাগ করেন।

নিখিল-তুরান সংহতি ঊনবিংশ শতাব্দীতে সয়্যেদ জামালুদ্দীন আফগানী যেমন সমগ্র মুসলিম জগৎকে সঘবব্ধ করিয়া পাশ্চাত্যের অগ্রগতি হইতে রক্ষা করিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন এবং বিগত মহাযুদ্ধের কিছুকাল পূৰ্ব্ব হইতে আন্ওয়ার পাশা যেমন প্রাচ্যের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য নিখিল মুসলিম সঘ বাদ ( Pan-Islamism) প্রচার করিয়াছিলেন ; তুরস্কের সমাজ তত্ত্ববিদ মহাপণ্ডিত কেউক আল্পজিয়া এবং রুসের আহমদ আগায়েফ বে এবং য়ুসুফ আখ চুরাবে ও সেইরূপ সমস্ত তুরাণী জাতি গুলিকে সবব্ধ করিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন। এই প্রচারকদের সহিত প্রথম পরিচয়ের ফলে হালিদা বিশেষভাবে কেউআল্প, জিয়ার চিন্তা ধারা দ্বারা প্রভাবান্বিত হইয়া ওসমানী যুগ অপেক্ষা জাতিগত আদিম কালের দিকেই বেশী ঝুকিয়া পড়েন। তুর্কী জাতির আদিম কালের পৌরাণিক গল্প ও সহজ সরল সাধারণ সাহিত্য তাহাকে আকৃষ্ট করে। কিন্তু পরে শিক্ষা বিষয়ক ও রাজনৈতিক মতানৈক্যে চিন্তা ও ভাবের দিক দিয়া উভয়ে সরিয়া পড়েন। (১).. (১) রাজনৈতিক মত পার্থক্য সম্বন্ধে হালিদা বলেন-“I differed from Keuk Alp Zia in his political conception for uniting the Turks. believed and believe that nationalism is cultural and regional in Turkey, and that it would not be possible to unite the Turks in ২৫ হালিদা হানুম Russia to us politically in the way we then thought was possible.. Thy themselves follow distinct and natioual lines, and differ from. us very much. Besides they would object to being interfered with by the Ottoman Turks, however much they may admire our literature. The elements and influences which are building their culture, are distinctly Russian while those of the Ottoman Turks are distinctly Western. The utmost possible political connection. and perhaps the most desirable political connection in the far future between the Turks up to the Caspian sea and the Ottoman. Turks would be that of federal states, giving a large and free margin to both elements to realise their individual culture and progress. But if such a time ever comes, I am not sure that Armenia and Georgia and even Persia will not be ripe to join the Turkish united states and form a strong whole to protect their integrity from Russia as well as from European invasions and. domination." ২৬ ‘ কী জননী খেতাব ১৯১০ খৃষ্টাব্দে তুর্কী যুবকেরা জেনে (Geneva) নগরীতে সাহিত্য ও কৰ্ষণা মূলক এক ক্লাব স্থাপন করেন। ইহা তুর্কীদের জাতিত্ব বাদের বহিঃপ্রকাশ। এই যুবকদের মধ্যে অনেক রুসীয় তুর্কীও ছিলেন। ইহারা সকলেই নিখিল তুরাণবাদের পক্ষপাতী ছিলেন। এই ক্লাব এক প্রস্তাব করিয়া হালিদা আদীব হানুমকে “তুর্কী জননী” (The Mother of the Turks) আখ্যা প্রদান করেন। কংগ্রেস ও কৌখিলে ১৯১২ খৃষ্টাব্দে হালিদা তুরস্কের সাধারণ সভার (General Congress এর) নারী সভ্য নির্বাচিত হন। এই সভার গঠন (Constitution) পরিবর্তন করিবার জন্য ১৯১৮ খৃষ্টাব্দে ১১ জন মেম্বর লইয়া একটা কৌন্সিল বসে। হালিদা তাহাতেও মেম্বর ছিলেন। কংগ্রেসের গঠন পরিবর্তন করার সহিত একটা নূতন কথা যােগ করা হয় যে কংগ্রেসে নারী সভ্য নির্বাচিত হইতে পারিবেন। ২৭ দ্বিতীয়বার বিলাত গমন হালিদা ১৯১২ খৃষ্টাব্দের জুন মাসে মিস ইসাবেল ফ্রাইকে দেখিবার জন্য দ্বিতীয়বার বিলাত গমন করেন। এই ভ্রমণের সময়ে তিনি ‘নবীন তুরাণ’ নামক পুস্তক লিখিয়াছিলেন। হালিদা জীবনস্মৃতিতে লিখিয়াছেন সে অপরিচিত তরুণ গ্রন্থকারের পক্ষে নূতন সৃষ্টির জন্য অন্য কোন দেশের আবহাওয়া লণ্ডনের মত শান্ত ও অনুকুল নহে। এই সহরটী নির্জনে থাকিয়া জ্ঞানচর্চা করিবার পক্ষে বিশেষ উপযােগী। গ্রন্থকীর মতানুসারে ‘নবীন তুরাণ’ বইখানি রাজনৈতিক ও জাতীয় কল্পনা রাজ্য (Utopia ), কিন্তু তাই বলিয়া বাস্তবতায় পরিণত হইতে পারে না এমন অসম্ভব কিছুই ইহাতে স্থান পায় নাই। এই পুস্তকে তুরস্কের ‘ঐক্য ও উন্নতি’ মূলক এমন এক শাসন-প্রণালী রচিত হইয়াছে—যাহাতে নারীদের ভােটের অধিকার আছে ; যেখানে নারী মস্তিষ্ক ও হৃদয়ের শক্তি লইয়া সর্বপ্রকার কাৰ্য্য করিয়া থাকেন; এবং যেখানে কর্ম ও সরলতাই জীবনের আদর্শ। এই তুরস্কের জাতীয়তা- মূলক রাজনীতিতে উদারতা ও সমান অধিকার বিরাজ করে। এখানে অতি দেশ প্রীতির ক্ষিপ্ততা ( Chauvinism ) নাই। ২৫ তালি নিসবান ক্লাব ১৯১২ খৃষ্টাব্দের আগষ্ট মাসের শেষভাগে বলকান যুদ্ধ আরম্ভ হয়। এই সময়ে হালিদা কয়েকজন উচ্চশিক্ষিত মহিলা লইয়া তালি নিসন ক্লাব নামে নারীদের সর্বপ্রথম ক্লাব স্থাপন করেন। সভ্যদের জ্ঞানানুশীলনই ইহার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। ইহাতে ফরাসী ও ইংরেজী শিক্ষার সুব্যবস্থা ছিল। তুর্কী সাহিত্য, গার্হস্থ্য বিজ্ঞান এবং শিশু পালন শিক্ষার জন্য স্বতন্ত্র ক্লাব ছিল। বলকান যুদ্ধের আহত সৈন্যদের শুশ্রষার জন্য এই ক্লাব হইতে একটা ছােট হাসপাতাল খােলা হইয়াছিল। আহত সৈন্যদের সেবা শুশ্রুষার জন্য নারীদের কাৰ্য্যক্ষেত্রে অবতরণ তুরস্কের ইতিহাসে এই প্রথম। এই ক্লাবের পক্ষ হইতে পলাতকদিগকে সাহায্য করিবার জন্য চাঁদাতােলা হইয়াছিল এবং ক্ষিপ্ত বলকান শক্তিদের দ্বারা যুদ্ধ সংববিহীন তুর্কী ও মাসিভােনিয়ার মুসলমানদিগের নৃশংস হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করিয়া ইউরােপের রাণীদিগকে এই অমানুষিক হত্যা কাণ্ড নিবারণের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করিতে অনুরােধ করা হইয়াছিল। ২৯ শিক্ষাপ্রচারে হালিদা পূর্বে বলা হইয়াছে যে হালিদা শিক্ষা বিভাগীয় পদ ত্যাগ করেন। ইহার কয়েক মাস পরে নকীয়া হানুম ও পদত্যাগ করেন। নকীয়া হানুম ইতিপূর্বে এক বালিকা কলেজ স্থাপন করিয়াছিলেন এবং শিক্ষা বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ বলিয়া পরিগণিত হইয়াছিলেন। এই সময়ে মাদ্রাসা ও মজিদ সংলগ্ন মক্তবগুলির সংস্কার ও আধুনিকভাবে পুনর্গঠন আরম্ভ হয়, এই সমস্ত বিদ্যালয় ‘ওয়াক বিভাগের অধীন ছিল। বালক বিদ্যালয়গুলির গঠনের ভার সুযােগ্য শিক্ষাকর্মী আলীবের উপর ন্যস্ত হয়, আর বালিকা বিদ্যালয়ও মিশ্ৰবিদ্যালয় গুলির নিয়ন্ত্রনের দায়িত্ব নকীয়া হামের উপর অর্পিত হয়। নকীয়া হানুম এই বিদ্যালয় গুলির জেনারেল ডাইরেক্টর ছিলেন। হালিদা ইহার ইস্পেক্টর জেনারেল এবং পরামর্শদাতা হিসাবে নিযুক্ত হন। নকীয়া হামের বিদ্যালয়গুলি অল্পকালের মধ্যেই ইস্তাম্বুলের সেরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরিণত হইল। তাহার চেষ্টায় সুযােগ্য ও উপযুক্ত শিক্ষকগণ আন্তরিক আগ্রহে শিক্ষা দান করিতে লাগিলেন। এই শিক্ষকগণকে ট্রেনিং দিবার জন্য দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা বিশেষজ্ঞগণ অযাচিতভাবে কাৰ্য্য করিতে লাগিলেন। হুসায়ন জাহিদ, ডাক্তার আদনান, হালিদা আদীব, য়ুসুফ আখচুরা প্রভৃতি পণ্ডিতগণ শিক্ষকদিগের নিকট নিয়মিতভাবে বক্তৃতা দিতেন। বিদ্যালয় পরিদর্শক হিসাবে হালিদা নানা ইস্কুলের বালক বালিকাদিগকে হালিদা হানুম পরীক্ষা করিতেন এবং তাহাদের পিতামাতা ও অভিভাবক গণের সহিত আলাপ পরিচয় করিতেন। হালিদার কাজ করিয়া অবসর জুটিত না। শিক্ষকতা ও বক্তৃতা করিতে অনেক সময় যাইত, ক্লাবের কাৰ্য্যে ও অনেক সময় ব্যয়িত হইত। বন্ধু বান্ধবের নানা কাজে সাহায্য করিতে সময় অতিবাহিত হইত। রাত্রি দশটার পরে সকলে ঘুমাইলে নিজ কামরায় যাইয়া তিনি বই লিখিতেন। এই সময়ে হালিদার আশী বৎসরের বৃদ্ধ স্নেহশীলা দাদীমা তাঁহার সহিত একত্র বাস করিতেন। একদিন তিনি হালিদার লিখিবার ঘরে প্রবেশ করিয়া বলিলেন, “হালিদা এস, একটু কথাবার্তা বলি, ক’দিন যাবৎ একটি কথাও বলতে পারিনি।” ইহা হইতে হালিদার অবিরাম ব্যস্ততার বিষয় অনুমান করা যাইতে পারে। ইহার কিছুকাল পরে এই দাদীমা মৃগীরােগে ইহলােক ত্যাগ করেন। এই ঘটনার পরই হালিদা অন্ত্র প্রদাহ রােগে আক্রান্ত হন এবং তজ্জন্য অস্ত্র প্রয়ােগ করিতে হয়। এই সময়ে ডাক্তার আদনান খুব সমবেদনা দেখাইয়া সেবা শুশ্রুষা করিয়াছিলেন। ১৯১৪ খৃষ্টাব্দে সেপ্টেম্বর মাসে ওয়াক্‌ফ, ইস্কুল খােলার পর হালিদা ইস্কুলে কতকগুলি পরিবর্তন প্রবর্তন সম্বন্ধে আলােচনা করিবার জন্য শয়খুল ইসলাম হয়রী (খয়রী) আফেন্দীর নিকট গমন করেন । এই আলােচনায় হয়রী আফেন্দী যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তা ও বাস্তব জীবনের গভীর জ্ঞানের পরিচয় দিয়াছিলেন। তিনি কারণ দেখাইয়া হালিদার কোন কোন্ প্রস্তাব গ্রহণযােগ্য ও কোনগুলি নহে, তাহা স্পষ্ট কথায় বলিয়া দেন। বিদ্যালয় পরিদর্শক হিসাবে ইস্তাম্বুলের সুদূর প্রান্তে হালিদা হানুম প্রান্তে বেড়াইবার সময় হালিদা চুল ও ঘাড় ঢাকিয়া রাখিতেন, মুখ সর্বদা খােলা থাকিত। এই বৎসর (১৯১৪ খৃষ্টাব্দে ) নকীয়া হামের ছেলে মেয়েদের জন্য হালিদা ‘কানানের মেষ পালকগণ’ নাম দিয়া এক ক্ষুদ্র নাটক লেখেন। ইহা একদিন বিকাল বেলায় মাত্র ছয় ঘণ্টা পরিশ্রমের ফল। য়ুসুফ ও তাহার ভাইদের কথা ইহার আলােচ্য বিষয় ছিল। বিখ্যাত অভিনায়ক আরভােগরুল মুহসিনের সহিত হালিদা ষ্টেজ ও পােশাকাদির ডিজাইন (design) ঠিক করিয়া দেন। যুবকদের তুর্ক ওজাক’ নামক জাতীয় ক্লাবে এই নাটক অভিনীত হয়। বহু দর্শকের সমাগম হইয়াছিল। এই ক্লাবে হালিদা এক বিরাট জনসভায় বক্তৃতা দিয়াছিলেন ; ইহার পর এক বৎসর অতীত হইতে না হইতে তাহাকে ক্লাবে এবং অন্যত্র নানা শ্রেণীর লােকের সামনে বহুবার বহু বক্তৃতা করিতে হইয়াছিল। ১৯১৬ খৃষ্টাব্দে হালিদা ‘তুক ওজাকে’ শত শত লােকের সম্মুখে আর্মেনিয়া-সমস্যা ও জাতীয় অর্থনীতি সম্বন্ধে এক বক্তৃতা প্রদান করেন। ; ৩২ সিরিয়ায় ১৯১৬ খৃষ্টাব্দে যুদ্ধের সময় জামাল পাশা সিরিয়ার ফরাসী ইস্কুল ও মঠগুলি রাজনৈতিক কারণে বন্ধ করিতে বাধ্য হন। সাধারণ শিক্ষা বিভাগের দ্বারা স্থাপিত ইস্কুলের সংখ্যা অপ্রচুর ছিল বলিয়া সিরিয়ার স্থানীয় গভর্নমেন্ট কতকগুলি ইস্কুল স্থাপনে মনােনিবেশ করেন। জামাল পাশা হালিদার নিকট এক পত্র দেন যে তিনি নিজে তথায় যাইয়া কাজ আরম্ভ করিলে অথবা কৰ্মী-শিক্ষক পাঠাইতে পারিলে খুব ভাল হয়। এই প্রস্তাবে হালিদার ভগ্নী নিগিআর হানুম স্বেচ্ছা কৰ্মীরূপে কয়েকজন শিক্ষক সহ সিরিয়া যাত্রা করেন। নিগিআর হানুম ১৯১২ খষ্টাব্দে গ্রাজুয়েট হন। তিনি নকীয়া হামের ইস্কুলে শিক্ষকতা করিতেন। নিগিআর হানুম ছয় শ্রেণী বিশিষ্ট এক প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। ইহার পরে হালিদা জামাল পাশার আর এক পত্ৰ পান। ইহাতে নকীয়া হানুমকে সঙ্গে লইয়া সিরিয়া যাইয়া অবস্থা বুঝিয়া দামঙ্কস, বয়রুত, এবং লেবাননে আরও অধিক সংখ্যক ইস্কুল নির্মাণের প্ল্যান (plan) তৈয়ার করিবার জন্য অনুরােধ করা হইয়াছিল। এবার হালিদা নকীয়া হানুমকে সঙ্গে লইয়া সিরিয়া গমন করিলেন। তাহারা সিরিয়ার ইস্কুল গুলি ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিশেষ ভাবে পৰ্যবেক্ষণ করিয়া যে রিপাের্ট দেন তাহার সারমর্ম এই :- বয়রুত, লেবানন এবং দামস্কাসকে একসঙ্গে লইয়া বয়রুতে একটা ক হালিদা হানুম সাধারণ কলেজ ও নর্মাল ইস্কুল প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে। প্রত্যেক প্রদেশে ছয় শ্রেণী সম্বলিত একটী করিয়া আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকিবে। এখানে কলেজ ও নর্মাল ইস্কুলের জন্য ছাত্র তৈয়ার হইবে। তুর্কী, আরবী এবং ফরাসী এই তিনটী ভাষা শিক্ষা দেওয়া হইবে। হালিদা সিরিয়ায় মহাত্মা ঈসার কর্মক্ষেত্র, হজরত ওমরের মসজিদ প্রভৃতি নানা প্রাচীন দৃশ্য এবং লেবাননস্থিত আইনতুরা নামক স্থানের এতীমখানা দর্শন করেন। একবার এক জৰ্মাণ হাওয়া-কর্মচারী এর- লিঙ্গর ( Erlinger) এর সঙ্গে হালিদা এরােপ্লেনে উঠিয়া মরুভূমির দৃশ্য দেখিতে গিয়াছিলেন। সিরিয়ার বহুলােকের সহিত তাঁহার আলাপ পরিচয় ও ভাবের আদান প্রদান হয়। পরে ১৯১৬ খৃষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি কনষ্টান্টিনােপলে ফিরিয়া আসেন। ৩৪ দ্বিতীয় বার ফিরিয়া আসিয়া হালিদার মন বড় অশান্ত হইয়া উঠিল। মহাযুদ্ধে তুরস্কের ভাগ্যে কি হইবে এবং জগতের বিভিন্ন জাতিরই বা কি হইবে -এত লােকক্ষয়, এত রক্তপাত—এসব ভাবিয়া হালিদা কোন কূল কিনারা পাইলেন না। লিখিবার মতও হার মানসিক স্থৈর্য ছিলনা। এই সময়ে আবার জামাল পাশার পত্ৰ আসিল যে আইন তুরা এতীমখানাসহ সিরিয়ার ইস্কুলগুলি সুগঠিত করিবার জন্য তাঁহার তথায় উপস্থিত হওয়া দরকার। হালিদা ইস্কুলগুলি নিয়ন্ত্রিত করিবার ভার গ্রহণ করিলেন। আইনতুরা এতীমখানার জন্য একজন উপযুক্ত ডাইরেক্টর নিযুক্ত করিয়া নিজে পরিদর্শকের পদ গ্রহণ করিলেন। লেবানন ও দামস্কাসে আধুনিক ধরণের ছয়শ্রেনীর দুইটী প্রাথমিক বাের্ডিং-ইস্কুল খােলা স্থির হইল । যাইবার সময় এই দুই বিদ্যালয় এবং নর্মাল ইস্কুলের শিক্ষকতার জন্য ৫০ জন স্ত্রীলােক ও কয়েকজন পুরুষ সঙ্গে লইয়া যান। ইহাদের মধ্যে অধিকাংশই হালিদার ছাত্র ও ছাত্রী ছিলেন। ১৯১৬ খৃষ্টাব্দে ডিসেম্বর মাসের শেষ ভাগে হালিদা দ্বিতীয় বার সিরিয়া যাত্রা করেন। সিরিয়া রওয়ানা হইবার দুই দিন পূর্বে হালিদা পিতার সহিত সাক্ষাৎ করিবার জন্য সা গমন করেন। এই সময় গলতা ষ্টেশনে এক ঘটনা ঘটে। যুদ্ধের সময় অনেকে বে-আইনী ভাবে সােণা রাণী করিত। সেই জন্য ষ্টেশনে যাত্রীদের কাপড় চোপড় পরীক্ষা করিয়া ৩৫ হালিদা হানুম দেখিবার বন্দোবস্ত হইয়াছিল। ষ্টেশনের একজন স্ত্রী ইনস্পেক্টর হালিদাকে পরীক্ষার জন্য তাহার আফিসের এক কামরায় লইয়া যায়। তথায় আরও এক জন পুরুষ উপস্থিত ছিল। পুরুষটীর সামনেই ইনস্পেক্টর সাহেবা হালিদাকে বিশেষ ভাবে পরীক্ষা করিতে প্রস্তুত হয়। হালিদা ধীর ভাবে তাহাকে বলেন যে পুরুষটীকে বাহিরে যাইতে হইবে। তাহাতে স্ত্রীলােকটী উত্তেজিত হইয়া বলে যে ইনি একজন উচ্চপদস্থ লােক, উহার সামনে পরীক্ষিত হওয়া গৌরবের কথা; তােমাদের-তুর্কী নারীদের ব্যবহার অসহ। তখন হালিদা উত্তর দেন-“আচ্ছা তবে তুর্কী নারীদের কাছে না ঘেঁসিলেই পার। ইহাতে পুরুষটাও উত্তেজিত হইয়া বিদ্রুপাত্মক স্বরে বলে “ইনি উচ্চবংশীয় অষ্ট্রিয়ান, এখানে হুকুমের ভার আমার উপর। সাবধান হইয়া কথা বলিও”। হালিদা সগর্বে ও তেজস্বিতার সহিত উত্তর দেন, তুমি যদি স্বয়ং সুলতান হও, আর সে যদি অষ্ট্ৰীয়ার রাজ কুমারীও হয়, তবুও তুমি বাহিরে না গেলে আমার শরীর পরীক্ষা করিতে দিবনা।” ইহার পর ইনস্পেক্টর সাহেবা বল প্রয়ােগ করিয়া হালিদার কাপড় খুলিতে উদ্যত ইহাতে বীর-নারী হালিদা মাননীয় ইনস্পেক্টর সাহেবাকে সজোরে চপেটাঘাত করেন। এই ব্যাপার, সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ-মূলক-বাক্যোচ্চারণ করা, অষ্ট্রিয়ার উচ্চবংশীয় ইনস্পেক্টারকে প্রহার করা, এবং আরও ইত্যাকার ভীষণ কাণ্ডের রূপ ধারণ করিয়া পুলিশের নিকট ইজহার রূপে উপস্থিত হয়। পরে পুলিস কর্তৃপক্ষ প্রকৃত ব্যাপার অবগত হইয়া টী স্বীকার করেন এবং গবর্ণমেন্টের অজ্ঞাতসারে যে এরূপ অন্যায় ব্যবহার করা হালিদা হানুম হইতেছে তাহা তাহাদের গােচরীভূত করার জন্য তাঁহাকে ধন্যবাদ প্রদান করেন। বলা বাহুল্য যে কর্তৃপক্ষ প্রকৃত ব্যাপার অবগত হওয়া মাত্রই উক্ত নিয়ম ও ইনস্পেক্টর পরিবর্তিত হয়। হালিদা দ্বিতীয় বার সিরিয়া পৌছিয়া শিক্ষার সুব্যবস্থা, নূতন নিয়ম প্ৰবৰ্ত্তন, বিদ্যালয় স্থাপন, গৃহ নির্মাণ, প্রভৃতি নানা কাৰ্য্যে এত ব্যস্ত হইয়া পড়েন যে চা খাওয়ার সময় ছাড়া লােকের সহিত কথা বলিবার আর বিশেষ অবসর জুটিতনা। প্রত্যেক ছাত্র ছাত্রী যাহাতে নিজ দেশের ভাষা, সভ্যতা ও কষণার ইতিহাস জানিতে ও শিখিতে পারে, সেবিষয়ে হালিদার বিশেষ লক্ষ্য ছিল। বাস্তবিক পক্ষে ফরাসী ইস্কুলের বালিকারা স্বদেশের কথা কিছুই শিখিতনা এবং নিজেদের মাতৃভাষাকে ফরাসীর তুলনায় অনুন্নত বলিয়া ঘৃণা করিত। নূতন ইস্কুল গুলিতে অত্যন্ত আগ্রহের সহিত আরবী শিক্ষার সুবন্দোবস্ত হইল। হালিদা সেলাই এবং ফরাসী ও তুর্কী ভাষা শিক্ষার জন্যও ক্লাস খুলিয়া দিলেন। আইনতুরা এতীমখানার অবস্থা অত্যন্ত শশাচনীয় ছিল। আট শত বালক বালিকার মধ্যে পাঁচ শতের অধিক অসুস্থ ছিল। কোনরূপ কাজের শৃঙ্খলা ছিলনা। বিছানা গুলি ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত ছিল। প্রত্যেকের শরীরে ও বিছানায় ছারপােকা.পূর্ণ ছিল। ডাইরেক্টর লুতফী বে এবং হালিদার চেষ্টায় অল্প সময়ের মধ্যে ঔষধপত্র ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার পূর্ণ ব্যবস্থা হইল। বড় বড় ছাত্রদিগকে বুন, সুতারী ও জুতা তৈয়ার শিক্ষা দেওয়া হইতে লাগিল, দুই মাসের মধ্যেই তাহাদের সকলের জন্য যথেষ্ট জামা, জুতা, খাট এবং টেবিল প্রস্তুত হইয়া গেল। প্রতি দশজন ঘােট ঘােট বালক বালিকার তত্ত্বাবধানের হালিদা হানুম জন্য তাহাদের মধ্য হইতেই বড় একজন বালিকা ‘আবলা’ নিযুক্ত হইল। তুর্কী ভাষায় ‘ আলা’ বলিলে বড় ভগিনী বুঝায়। সে তাহার অধীনস্থ বালক বালিকাগণকে কাপড় পরা, স্নান করা, ক্লাসে যাওয়া প্রভৃতি সর্ব প্রকার কাৰ্যে সাহায্য করিত। এইরূপ প্রত্যেক ২৫জন বড় বড় বালকের উপর তাহাদের মধ্য হইতে একজন সার্জেন্ট নিযুক্ত হইত। লেখাপড়া, শিল্প, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, খেলা, গান ইত্যাদি শিখিতে শিখিতে অতি আনন্দে ও ফুর্তিতে সকলের সময় কাটিত। ক্রমে নর্দমা, পানির কল, বৈদ্যুতিক আলাে ইত্যাদির বন্দোবস্ত হইয়াছিল। হালিদা অনবরত অক্লান্ত ভাবে পরিশ্রম করিতেন। জুতা খুলিয়া চেয়ারে পা তুলিয়া একটু বসিবার অবসরও খুব কম জুটিত। নানাদিকে নানা বন্দোবস্তের ব্যস্ততার ভিতরে আবার প্রতিষ্ঠানগুলির ব্যয় নির্বাহ ও আবশ্যকীয় দ্রব্যাদি সরবরাহের জন্য হেডকোয়ার্টারে ও প্রদেশে চিঠি পত্রের আদান প্রদান করিতে হইত। হালিদার চেষ্টায় এতীমখানা ও ইস্কুলের অশেষ উন্নতি হইয়াছিল। সিরিয়ার সকলেই তাহার কাৰ্য্য ও ব্যবহারে মুগ্ধ হইয়া গিয়াছিলেন। তথাকার আরব বন্ধুরা নানা প্রকার ফুল আনিয়া হালিদার কামরা বােঝাই করিয়া ফেলিতেন। কর্তব্য শেষ হইলে তিনি সিরিয়াবাসীদের আন্তরিক ধন্যবাদ ও অশ্রুঝরার মধ্যে বিদায় লইয়া কনষ্টান্টিনোেপলে ফিরিয়া আসিলেন।

মুমূর্ষ-ভুৱষ্ক ইউরােপীয় মহাযুদ্ধের সময় তুরস্কের ভবিষ্যতের কথা ভাবিয়া হালিদার উদ্বিগ্নতার সীমা ছিলনা। ১৯১৮ খৃষ্টাব্দের ৩০শে অক্টোবর তারিখে মুদ্রসের (Mudros) সন্ধি দ্বারা তুরস্ক মহাযুদ্ধ হইতে অবসর গ্রহণ করে। ইহার পরেই মিত্রশক্তিদের প্রভুত্ব চরমে উঠিয়া যায় এবং তুর্কীরা, নর নারী নির্বিশেষে ভীষণ ভাবে নির্যাতিত হইতে থাকে। ন্যায় ও মানবতার মাথা খাইয়া গ্রীক ও আর্মেণিয়ানগণ যে অমানুষিক দানব লীলা আরম্ভ করিয়াছিল তাহা শ্রবণ করিলেও শরীর শিহরিয়া উঠে, এবং পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রতি ঘৃণা, অবজ্ঞা এবং ক্ষোভে মন সঙ্কুচিত হইয়া পড়ে (১)। চোখের সামনে এই পৈশাচিক কাণ্ড দেখিয়া সুসভ্য ইংরেজ ও ফরাসী সরকার তাহা নিবারণের জন্য কোন চেষ্টা করেন নাই। তাঁহারা বরং পূৰ্ব আনাতােলিয়ায় এক আর্মেনিয়া সৃষ্টি ও স্মার্ণা অঞ্চলে গ্রীক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করিয়া ওসমানীয় সাম্রাজ্যের অবশিষ্ট অংশ নিজেদের মধ্যে বিভাগ করিয়া লইবার স্বপ্ন দেখিতে ছিলেন। দেশের এই দারুণ দুর্দিনে আনাতােলিয়া অঞ্চলে কিয়াজিম কারা বাকির পাশা সৈন্য সংগ্রহ ও গঠন করিতেছিলেন। তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল মিত্র শক্তি আর্মেণিয়া সৃষ্টির চেষ্টা করিলে, তাহাতে প্রাণপণ বাধা প্রদান করা। মুদ্রস সন্ধির পর সুলতান ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষা করিবার (১) হালিদা আদীব হামের Turkish Ordeal গ্রন্থ দ্রষ্টব্য।

হালিদা হানুম জন্য দেশ ও জাতিকে পরিত্যাগ করিয়া মিত্রশক্তির হাতের পুতুল সাজিয়াছিলেন। কিয়াজিম কারা বাকির পাশার বিদ্রোহ মূলক প্রচেষ্টা দমন করিবার জন্য সুলতান ১৯১৯ সালের মে মাসে মুস্তফা কামাল পাশাকে প্রাচ্য সৈন্যের জেনারেল ইনস্পেক্টর স্বরূপ প্রেরণ করেন। ১৯০৮ খৃষ্টাব্দ হইতে দেশের মঙ্গলকামী প্রায় সমস্ত নেতা ও বিপ্লব- বাদীর সহিত হালিদার পরিচয় ছিল এবং জাতীয় দলের নেতাদের সহিত প্রত্যহ তিনি নানা বিপদকে তুচ্ছ জ্ঞান করিয়া কাজ করিতেন । এই সময়ে দেশের নানা স্থানে বহু সমিতি স্থাপিত হইয়াছিল। তন্মধ্যে ‘কারা কোল’ বা ‘রক্ষক’ নামক গুপ্ত সমিতি বিশেষ ভাবে উল্লেখ যােগ্য। হালিদ। এই সমিতির সভাপতি কারা ওয়াসিফ বের সহিত পরামর্শ করিয়া জাতির সেবায় সমিতির উদ্দেশ্য এই বলিয়া নির্দেশ করেন যে তুর্কী সংখ্যাধিক্য বিশিষ্ট জেলা গুলির স্বাধীনতা রক্ষা করিতে হইবে। মিত্র শক্তি ভাগ বণ্টন শুরূ করিলে, তাহাদিগকে বাধা দিবার জন্য জন সাধারণকে প্রস্তুত করিয়া রাখাই এই সমিতির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। এই উদ্দেশ্য কাৰ্য্যে পরিণত করিবার জন্য যুবকগণ দলে দলে আনাতােলিয়ায় ছড়াইয়া পড়ে। ১৯১৯ খৃষ্টাব্দের মে মাসের ১৬ই তারিখে মিত্রশক্তির রণ পােতের সম্মুখে গ্রীক সৈন্য স্মার্ণা অধিকার করিবার জন্য অবতরণ করে। গ্রীকদের এই সময়কার দানবিক আচরণের কথা বর্ণনা করিতে লেখনী অশক্ত। ১৯২২ খৃষ্টাব্দে স্মার্ণা পুনরুদ্ধার পর্যন্ত হালিদার ব্যক্তিগত অস্তিত্ব ছিলনা। তিনি দেশ ও জাতির ভিতরে ডুবিয়া গিয়াছিলেন। এই জাতীয় সঙ্কট কালে হালিদাকে অনেক বড় বড় সভায় বক্তৃতা দিতে হালিদা হানুম হইয়াছিল। তখনকার দিনে জাতির হতাশ প্রাণে এই প্রেরণাময়ী নারীর বাক্যে আশার সঞ্চার হইত। বালিকা কলেজে শিক্ষা সম্বন্ধে এক বক্তৃতা দান কালে তিনি বলিয়াছিলেন যে, যে শিক্ষা মানুষের প্রতি মানুষের ব্যবহারের উৎকর্ষ সাধন করেনা সে শিক্ষার কোন সার্থকতা ও মূল্য নাই। ওজাক’ হইতে হালিদাকে বক্তৃতার জন্য টেলিফোন যােগে নিমন্ত্রণ করা হয়। ছাত্রদের প্রতিষ্ঠান গুলি ইহাতে যােগ দিয়াছিল। এই সভার উদ্দেশ্য ছিল স্মার্ণার হত্যাকাণ্ড সম্বন্ধে প্রতিবাদ করা। এই সভায় ৫০,০০০ লােক যােগদান করিয়াছিল। সমবেত ভাবে সকলে এই সভার পক্ষ হইতে সুলতানের নিকট প্রতিনিধি পাঠাইয়া তাহাকে জনসাধারণের পক্ষ অবলম্বনের জন্য অনুরােধ করিতে প্রস্তাব করেন। সুলতানের নিকট এই অনুরােধ জানাইবার জন্য দুইজন ছাত্র ও হালিদা আদীব হানুম প্রতিনিধি নিযুক্ত হন। সুলতান অসুস্থতা নিবন্ধন সাক্ষাৎ করিতে অপারগ হইয়া বলিয়া পাঠান যে ছেলেদের ইচ্ছা তিনি বিবেচনা করিবেন। ইহার পর হায়দর পাশার ডাক্তারী ইস্কুলের ছাত্রগণ আর এক বিরাট প্রতিবাদ সভা আহবান করেন। সুলতান আহমদ’ নামক স্থানে এই সভার অধিবেশন হয়। এখানে Staff officer দের মতে হালিদা দুই লক্ষ সমবেত তুর্কীকে তাহাদের কর্তব্য বিষয়ে প্রেরণা দান করেন । হালিদার ইঙ্গিতে সমস্বরে সমবেত লােক তিন বার প্রতিজ্ঞা করেন যে তঁাহারা ন্যায় ও মানবতার নীতি পালন করিবেন এবং কিছুতেই পাশবিক শক্তির নিকট মাথা নত করিবেন না। এই সময় মন্ত্রমুগ্ধ জন- সমুদ্রের উপর মিত্র শক্তির এরােপ্লেন শূন্যে ঘুরিয়া ঘুরিয়া পাহাড় দিতেছিল। ৪১ ১১ হালিদা হানুম ইতিপূর্বেই তৌফীক পাশা পার্লিয়মেন্ট বন্ধ করিয়া দিয়াছিলেন। ইহাতে দেশবাসী ভয়ানক অসন্তুষ্ট হইয়া উঠে। এই বিষয়ের আলােচনার জন্য ৩৫টী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিগণ সমবেত হন। তাঁহারা স্থির করেন যে পুনরায় পার্লিমেন্ট পার্লিমেন্ট খুলিবার জন্য জন নিৰ্বাচিত লােক একযােগে কাৰ্য করিবেন। এই ১১ জনের মধ্যে হালিদা আদীব হানুমও ছিলেন একজন। ইহার পরই National Block সমিতির এক বৈঠক হয়। ভূতপূৰ্ব প্রধান মন্ত্রী ও প্রধান সেনাপতি প্রভৃতি কীর্তি-গৌরব মণ্ডিত ৩০ জন বিশিষ্ট তুর্কী সন্তান লইয়া এই সমিতি গঠিত ছিল। হালিদা অনুরুদ্ধ হইয়া এই সমিতির বৈঠকে যােগ দিয়াছিলেন। এখানেও অনেক আলােচনার পর স্থির হয় যে দুই জন প্রতিনিধি যাইয়া সুলতানকে পুনরায় পার্লিমেন্ট খুলিতে অনুরােধ করিবেন। মৃতপ্রায় জাতিকে সঞ্জীবিত করিতে হালিদার এইরূপ অক্লান্ত পরিশ্রম এবং দেশবাসীর উপর তাহার বিপুল প্রভাব লক্ষ্য করিয়া মিত্র শক্তির পক্ষ হইতে তাহাকে গ্রেপ্তার করিবার প্রস্তাব হয়। চারিদিকে গুজব রটিয়া যায় যে হালিদাকে বন্দী করা হইয়াছে। ৪২ তুরস্কের নবজীবন মুস্তফা কামাল পাশা ১৬ই মে তারিখে আনাতােলিয়া অভিমুখে যাত্রা করেন। তিনি ইতিপূর্বেই আগোরার বিংশ-সেনাদলের নেতা আলী ফুয়াদ পাশা এবং আর্জমের নবম সেনাদলের নেতা কিয়াজিম কারা বাকির পাশা ও রৌফ বের সহিত যুক্তি করিয়া কর্তব্য স্থির করিয়াছিলেন। কর্ণেল রফাত এবং লেফটেনান্ট কর্ণেল মুহম্মদ আরিফ কামাল পাশার সঙ্গে গমন করেন। মুস্তফা কামাল পাশা আঙ্গোরা পৌছিয়া হালিদা আদীব প্রমুখ জাতির মুক্তিকামী সহযােগীগণের সহিত নানা গুরুতর বিষয়ে পত্র ব্যবহার দ্বারা পরামর্শ করিতেন। কেন্দ্রীয় সরকার অর্থাৎ সুলতানের গভর্ণমেন্ট সম্পূর্ণরূপে বিদেশী শাসনাধীন হইয়া পড়িয়াছিল। তুর্কীজাতি বিদেশী-প্রভুত্ব বিদূরিত করিতে বদ্ধ পরিকর হইয়া নানা প্রতিষ্ঠান দ্বারা তুমুল আন্দোলন ও কাৰ্য্য আরম্ভ করিল। মুস্তফা কামাল পাশার উদ্দেশ্য বুঝিতে পারিয়া সুলতানের যুদ্ধমন্ত্রী তাহার পরিবর্তে কিয়াজিম কারা বাকির পাশাকে পূৰ্ব্ব-আনা- তােলিয়ার সামরিক শক্তির ইনস্পেক্টর জেনারেল নিযুক্ত করিয়া মুস্তফা কামাল পাশা এবং রৌফ বেকে গ্রেপ্তার করিবার জন্য আদেশ করেন। কিয়াজিম কারা বাকির পাশা ইস্তাম্বুলের এই হুকুম অন্যায় মনে করিয়া তাহা অমান্য করিলেন। এবং মুস্তফা কামাল পাশাকে স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা বলিয়া মানিয়া লইয়া, তাহারই আদেশ পালন করিতে লাগিলেন। মুস্তফা কামাল পাশাও সুলতানী-সৈন্য- বিভাগের চাকুরী ইস্তাফা দিলেন। এইরূপে তুরস্কের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য স্বতন্ত্র জাতীয় আন্দোলন আরম্ভ হইল। ৪৩ দ্বিতীয় হিজরত এই সময় হালিদা শত বিপদ ও শারীরিক কষ্ট তুচ্ছ করিয়া মিত্র শক্তির সতর্ক সজাগ পাহাড়া এড়াইয়া সুরক্ষিত রাস্তাঘাটের ভিতর দিয়া ছদ্মবেশে ইস্তাম্বুল হইতে সুদূর আঙ্গোরায় গমন করেন। এই ভ্রমণ ব্যাপারে তাহার অসীম সাহস, অদম্য উৎসাহ, অসাধারণ ধৈৰ্য্য ও কষ্টসহিষ্ণুতা, অতুলনীয় বুদ্ধি-খ এবং অবর্ণনীয় উপস্থিত বুদ্ধির কথা পাঠ করিলে, তাহা বাস্তব বলিয়া মনে হয় না, বরং কাল্পনিক উপন্যাসের কহিনী বলিয়াই ধারণা জন্মে (১)। রণক্লান্ত তুর্কী জাতির প্রাণে সঞ্জীবনী-সুধা ঢালিবার জন্য আজোরায় এই প্রেরণাময়ী নারীর প্রয়ােজন ছিল। তুর্কীদের এই নব-জীবন লাভের যুগে হালিদা আদীব হানুম ফ্রান্সের জঁ দার্ক (Jeanne d'Arc) এর সহিত তুলনীয়। এই সময়ে মহাবীর ও রাজনীতিক ইমত পাশা, বিচক্ষণ রাষ্ট্রজ্ঞ ডাক্তার আদনান এবং আরও কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি আঙ্গোরা গমন করেন। এই সময় জাতীয় দলের কোন ব্যক্তিকে কেহ আশ্রয় দিলে তাহার প্রাণদণ্ড হইবে বলিয়া মিত্র শক্তির পক্ষ হইতে বিজ্ঞাপন প্রচারিত আঙ্গোরা গমন কালে এরূপও গুজব রটিয়াছিল যে, যে ব্যক্তি হালিদা ইত্যাদির ঠিকানা বলিয়া দিতে পারিবে, সে পাঁচ শত ইংরেজী পাউণ্ড পুরষ্কার পাইবে। হয়। (১) হালিদা Turkish Ordeal গ্রন্থে তাহার আঙ্গোরা গমন বৃত্তান্ত চিত্তাকর্ষক ভাষায় লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। ৪৪ হালিদা হানুম আঙ্গোরা যাত্রাকালে মিষ্টার চার্লস ক্রেন ( Mr. Charles Crane ) নামক একজন আমেরিকান ভদ্রলােককে তাঁহার হিজরতের কথা অকপটে খুলিয়া বলিয়া তাহার সন্তান দুইটিকে আমেরিকায় লইয়া গিয়া রক্ষণাবেক্ষণ এবং শিক্ষাদান করিতে অনুরােধ করিয়া যান । ১৯১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইস্তাম্বুলে যে কিং-ক্রেন (King- Crane) কমিশন আসে, ইনি তাহার অন্যতম সভ্য ছিলেন । কাৰ্যোপলক্ষে হালিদাকে এই কমিশনের নিকট দোভাষীর কাৰ্য্য করিতে হয় এবং সেই সময়ে ক্রেন সাহেবের সহিত তাঁহার পরিচয় ঘটে। ক্রেন সাহেব তখন ছয় জন তুর্কী বালক বালিকা ছাত্ররূপে আমেরিকায় পাঠাইবার প্রস্তাব করিয়াছিলেন। বলা বাহুল্য যে হালিদার অনুরােধ ব্যর্থ হয় নাই। ক্রেনসাহেব তাহার সন্তান দুইটীকে পরম যত্নের সহিত লইয়া গিয়া তাহাদের শারীরিক ও মানসিক উন্নতির সম্যক্ ব্যবস্থা করিয়া দেন। হালিদআঙ্গোরার পথে আকহিসারে একঘণ্টার জন্য থামিয়া ইস্তাম্বুলের ‘য়েণীগুণ’ পত্রিকার সম্পাদক রুনুস নদীব বের সহিত জাতীয় দলের মুখপত্র স্বরূপ আনাতােলিয়ায় একখানা পত্রিকা বাহির করিবার প্রয়ােজনীয়তা এবং আরও অন্যান্য বিষয়ের আলােচনা করেন। নদীব বেও এই একই উদ্দেশ্য লইয়া ইস্তাম্বুল হইতে আনাতােলিয়ায় আসিয়াছিলেন। ১৯২০ খৃষ্টাব্দের ২রা এপ্রিল তারিখে হালিদা জাতীয় আন্দোলনের কাবা ভূমি আজোরায় উপস্থিত হন। ষ্টেশনে পৌঁছিবা মাত্র মুস্তফা কামাল পাশা নিজে হাত ধরিয়া তাহাকে রেলগাড়ী হইতে নামাইয়া লইয়া কুশলাদি জিজ্ঞাসা করেন; এবং আমীন বের স্ত্রী দীদার ১৫ হালিদা হানুম হাম হালিদার অভ্যর্থনা ও সেরাত্রিতে তাহার আতিথ্য গ্রহণ জন্য নিমন্ত্রণ করিতে উপস্থিত হন। ষ্টেশনে বিরাট জনতা। এদিকে য়ুমুস নদীব বে আসিয়া জানাইলেন যে ষ্টেশনে বক্তৃতা হইবে। হাজার ক্লান্তি লইয়াও হালিদা তাঁহার প্রিয় ভাইদের আবদার উপেক্ষা করিতে পারিলেন না। তুর্কীজাতি গুণের আদর করিতে জানেন। হালিদার সম্মান করিতে তাহারা কখনও কার্পণ্য করে নাই। আনাতােলিয়ায় “হালিদা আদীব সমষ্টি” ( Halide Edib Group) নামে এক কৰ্ম্মীদল গঠিত হইয়াছিল এবং ‘ কিরসুন্দ’ ( Kire sund) নামক স্থানে ‘হালিদা-হাতুন নামে এক বালিকা বিদ্যালয় স্থাপিত হইয়াছিল। ৪৬ নুতন কর্মকে আজোরার ৬ কিলােমিটার উত্তরে একটী পাহাড়ের উপর জাতীয় দলের হেডকোয়ার্টার স্থাপিত হইয়াছিল। ইহা একটি পরিত্যক্ত কৃষি ইস্কুল। কে জানিত যে এইস্থানে এক নূতন গবর্নমেন্ট এবং নূতন গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপিত হইবে ? হেড কোয়ার্টারে গিয়া মুস্তফা কামাল পাশার সহিত তাহার সাক্ষাৎ হয়। তিনি আন্তরিকতার সহিত হালিদার কর-চুম্বন করিয়া কথাবার্তা আরম্ভ করেন। হালিদা প্রথমেই সংবাদ আদান প্রদানের ব্যবস্থার কথা তােলেন। য়ুমুস নদীব বের সঙ্গে এ সম্বন্ধে যে সব কথা হইয়াছিল তাহা প্রকাশ করিয়া বলেন যে নদীব বের সঙ্গে তিনি ইহার ভার লইবেন। হালিদা আঙ্গোরা আসিবার সময় জাতীয় দলের কাৰ্যের উদ্দেশ্য ও গতি সম্বন্ধে সাধারণ লােকের অজ্ঞতা এবং অসুবিধার কথা মুস্তফা কামাল পাশাকে জ্ঞাপন করেন। তিনি আরও বলেন যে, যে সমস্ত স্থানে টেলিগ্রাফ আফিস আছে তথায় সংবাদ প্রেরণ করিবেন; সংবাদ কাগজে লিখিয়া মসজিদ ও টেলিগ্রাফ আফিসের দেওয়ালে লাগাইয়া দেওয়া হইবে; ইহাতে নিজেদের ভিতরে প্রকৃত তথ্য প্রচারিত হইবে এবং ইহার দ্বারা বহির্জগতের দৃষ্টি ও আকৃষ্ট হইবার সম্ভাবনা। শক্তিপুঞ্জ ও জগতের চিন্তার গতি বুঝিবার জন্য অবিলম্বে ইংরেজী ও ফরাসী কাগজ রাখিতে হইবে। Times, Manchester Guardian এবং Daily Herald পত্রিকার নাম উল্লেখ হইল। কারণ, এই তিনখানা কাগজ, তিনটা বিভিন্ন রাজনৈতিক ৪৭ হালিদা হানুম দলের মুখপত্র । Daily Chronicleও রাখা দরকার, কারণ, উহা মিষ্টার লয়েড জর্জের মতামত ব্যক্ত করে বলিয়া প্রকাশ। এই সময়ে ঝুনুস নদীব বে ‘হাকিমিয়তে মিল্লিয়া নামে এক পত্রিকা বাহির করিতেছিলেন। মুস্তফা কামাল পাশা হালিদাকে ইহাতেও সাহায্য করিতে অনুরােধ করেন। হালিদা একজন ‘টাইপ রাইটারের প্রয়ােজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। হালিদা আঙ্গোরা পৌছিবার পঞ্চমদিনে হেডকোয়ার্টারে নিয়মিতরূপে কাৰ্য্য আরম্ভ করেন। তিনি ইংরেজী কাগজগুলির অনুবাদ করিতেন, তাহার বিশেষ মতগুলি নােট করিতেন, এবং মুস্তফা কামাল পাশার সেক্রেটারী হায়াতী বের দেওয়া তারের সংবাদগুলি পড়িয়া বুঝাইয়া দিতেন। আনাতােলিয়ার মুখপত্রের জন্য হালিদা সংবাদ সংগ্রহ করিতেন, য়ুমুস নদীব বের ‘হাকিমিয়ত' পত্রিকা পরিচালনে সাহায্য করিতেন এবং হেডকোয়ার্টার মুস্তফা কামাল পাশার প্রয়ােজন মত অন্য লেখা-পড়ার কাৰ্য্য করিতেন। আবদুর রহমান নামে আলীগড় কলেজের একজন আফগান যুবক এই সময়ে টাইপ-লেখা প্রভৃতি কতকগুলি কার্যে হালিদার সাহায্য করিতেন রাত্রিতে আহার কালে মুস্তফা কামাল পাশা, ডাক্তার আদনান, ইসমত পাশা প্রভৃতি আন্দোলনের বিশিষ্ট নায়কগণ আসিয়া জুটিতেন। কামাল পাশা খাইবার সময় নানা বিষয়ের আলােচনা ও গল্প করিতেন। আহারান্তে আবার সে রাত্রের গুরুতর কার্যাদি সম্বন্ধে আলােচনার জন্য সকলে কেন্দ্রীয় মহলে সমবেত হইতেন। হালিদা আঙ্গোরা পৌছিবার কিছুদিন পূর্বে, ১৯২০ খৃষ্টাব্দের ১৫ই মার্চ তারিখে, ইংরেজ সৈন্য কৌশলে কনষ্টান্টিনােপল নগর { ৪৮ হালিদা হানুম অধিকার করিয়া লয়। ইহার পূর্বেই বিচক্ষণ রাজনৈতিকগণ এরূপ ঘটনার সম্ভাবনা অনুমান করিতে পারিয়াছিলেন। কারা ওয়াসিফ বে মুস্তফা কামাল পাশার নিকট এক পত্র লিখিয়াছিলেন ; তাহাতে একথার উল্লেখ ছিল। পত্রে আরও লিখিত ছিল—“খুব সম্ভব পাৰ্লিমেন্ট ভাঙ্গিয়া যাইবে। তখন আপনার নেতৃত্বে আনাতােলিয়ায় এক অস্থায়ী গবর্নমেন্ট গঠিত করিতে হইবে; এই নূতন গবর্নমেন্ট তৈয়ার করিতে যে সমস্ত লােকের দরকার, তাহাদের নাম জানাইলে তাহাদের নিরাপদে ও সময়মত আনাতােলিয়ায় পৌছিবার ব্যবস্থা করিব।” কিন্তু কামাল পাশার উত্তর দেওয়ার পূর্বেই আশঙ্কিত ঘটনা ঘটিয়াছিল। তবে আরও অনেক স্বদেশভক্ত স্বাধীনতাকামী বীর-তুর্কীসন্তান আঙ্গোরায় পৌছিয়াছিলেন। এই সময়ে আনাতােলিয়ার গবর্ণমেণ্ট কি ভাবে গঠিত ও চালিত হইবে তাহা লইয়া বহু আলােচনা ও বিবেচনার পর এক খসড়া তৈয়ার হয়। ইহাতে কামাল পাশার মতই শেষ পর্যন্ত বজায় ছিল। সব কথা বুঝাইয়া দিবার জন্য তিনি এক বিস্তৃত অভিভাষণ প্রস্তুত করেন। বক্তৃতা দিবার পূর্বদিন মুস্তফা কামাল পাশা হালিদাকে তাঁহার নিজ পাঠাগারে যাইয়া লিখিত অভিভাষণ পাঠ করিতে বলেন । সেইদিন কামাল পাশা, হালিদা আদীব হানুম এবং হক্কী বীজ বে এই ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা পাঠ ও আলােচনা করিয়া সারা দিন অতিবাহিত করেন। তিনজনে বক্তৃতার পাণ্ডুলিপি পাঠে রত আছেন এমন সময় আমেরিকার চিকাগাে টিবিউন পত্রিকার পক্ষ হইতে উইলিয়ম নামে একজন তরুণ সাংবাদিক আঙ্গোরা আসিয়া কামাল পাশার সহিত সাক্ষাৎ করেন। হালিদাকে তাহাদের মধ্যে দোভাষীর ৪৯ ৪

হালিদা হানুম
কাৰ্য্য করিতে হয়। আমেরিকান মেহমান, কামাল ও হালিদা উভয়ের
ফটোগ্রাফ গ্রহণ করেন। ফিল্ম বড় করিবার সময় হালিদার ছবি
কামাল পাশার পিছনে উঠিয়া যায়। উইলিয়ম সাহেব তাহা হালিদাকে
দেখাইয়া হাসিয়া বলেন যে আপনি কামালের পিছনের নারী
( The woman behind Kemal) পরে আমেরিকার কয়েক
খানা পত্রিকায় এই ছবি ‘কামালের পিছনের নারী’–পরিচয় লইয়া
প্রকাশিত হয়।
৫০

প্রাণদণ্ডের আদেশ এই সময়ে কনষ্টান্টিনােপলের সুলতানের আদেশে কুর্দ মুস্তফা পাশার বিশেষ বিচারে মুস্তফা কামাল, ডাক্তার আনান, কারা ওয়াসিফ এবং হালিদা আদীব প্রভৃতি সাতজনের প্রতি বিদ্রোহী ও দেশত্যাগী অপরাধে প্রাণদণ্ডের আদেশ হয়। শয়খুল ইস্লাম ধর্মের দোহাই দিয়া এই আদেশ পত্র স্বাক্ষরিত করেন। এই হুকুম নামায় এক সময়ের ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ্চাত্য সাহিত্যের অধ্যাপক হালিদাকে সুলতানের শাসনের বিরুদ্ধে তুর্কীজাতিকে বিদ্রোহী করিয়া ভােলা এবং সমগ্র দেশে সামাজিক বিপ্লব ও রক্তপাতের সৃষ্টি করার অপরাধে অভিযুক্ত করা হইয়াছিল। এই ঘােষণা ‘আঁত আঁত লিবারল’ ( Entente Liberale) দলের কাগজ ‘পয়ামে সুবহ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছিল। সফবত বে এই পত্রিকাখানা আনিয়া হালিদার হাতে দেন। তিনি সবেমাত্র ইস্তাম্বুল হইতে আসিয়াছিলেন। তিনি বলেন, “আপনার বাসবাড়ী গমণমেণ্ট অধিকার করিয়াছেন এবং আপনাদের মাথার জন্য বড় রকমের পুরস্কার ঘােষিত হইয়াছে। এই সংবাদে স্বাধীনতার মূর্ত প্রতীক হালিদা ভাবিয়াছিলেন শুধু তাঁহার সাধের পুস্তকগুলির কথা—যাহা ক্রমে ক্রমে তিনি সংগ্রহ করিয়াছিলেন। হাতে কতলের হুকুম লইয়াও তিনি স্বাধীনতার জন্য উন্মাদ। ছেলেদের কথা ভাবিবার তাহার অবসর কোথায় ?

জাতীয় মহাসভা হইল। এই চরম দণ্ডাজ্ঞা পাঠ করিয়া বিকাল বেলা সকলে বসিলেন নূতন জাতীয় সভার নাম করণের জন্য। স্থির হইল “বুঝুক মিল্লৎ মজলিসী” অর্থাৎ জাতীয় মহা-সভা। ১১ জন সভ্য লইয়া মন্ত্রণা সভা (Cabinet) এবং মুস্তফা কামাল পাশার জাতীয় মহাসভার সভাপতি হওয়া স্থির ১৯২০ খৃষ্টাব্দের ২৩শে এপ্রিল তারিখে জাতীয় মহা সভার প্রথম অধিবেশন হইল এবং সমস্ত সভ্য গণের দায়িত্বের উপর গবর্ণমেন্ট প্রতিষ্ঠিত হইল। মুস্তফা কামাল পাশা তাহার পূর্ব প্রস্তুত অভিভাষণ পাঠ করিয়া বিস্তৃত ভাবে সকল কথা উপস্থিত জনমণ্ডলীকে বুঝাইয়া দিলেন। Foreign Commissariat স্থাপিত না হওয়া পর্যন্ত হালিদার ক্ষুদ্র অফিসেই বৈদেশিক সমস্ত কাৰ্য্য নিৰ্বাহ হইত। অবিরত বসিয়া বসিয়া টাইপকরা ও দলিলাদি নকল করার অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফলে হালিদা পিঠে ব্যথা অনুভব করিতেন।

মিথ্যা রটনা এইরূপ কাৰ্য্য করিয়া একদিন সন্ধ্যার পরে চেয়ারে বসিয়া হালিদা হানুম বিশ্রাম করিতেছেন, আর সকলে কাগজ পড়িতেছেন, এমন সময় ইস্তাম্বুলের কাগজে প্রকাশিত এক কৌতুহলােদ্দীপক সংবাদের উপর মুস্তফা কামাল পাশার দৃষ্টি পড়িল। একজন তাহা হালিদাকে পড়িয়া শুনাইলেন। লেখা আছে যে আনাতােলিয়ার মন্ত্রণা সভায় (Cabinet) হালিদা আদীব হানুম শিক্ষা মন্ত্রীর পদ লাভ করিয়াছেন। প্রকৃত পক্ষে এটা ছিল ইংরেজাশ্রিত কনষ্টান্টিনােপল গবর্ণমেন্টের কারসাজী। তাহারা ভাবিয়াছিলেন যে নারী শিক্ষা মন্ত্রী হইয়াছে ইহা শুনিলে ধর্মভীরু মুসলমানেরা আজোরার কাৰ্য পদ্ধতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ হইয়া পড়িবে। এ সম্বন্ধে হালিদা প্রণীত-Turkish Ordeal (১) গ্রন্থের ১৪৭ পৃষ্ঠায় লিখিত আছে—“It was announced that my name appeared in the list of members of the Anatolian Cabinet as that of the mininster of education, and there were added some caustic remarks meant to arouse the suspicions of the fanatical Moslem East: a rebel, an outlaw, and a woman to be a cabinet minister ! And the fanatical Moslems used it with such enthusiasm that the sham John Murray, Albemarle street, London 1928 হালিদা হানুম • title stuck to me, and I have been unable to shake it of.” অর্থাৎ ঘােষিত হয় যে আনাতােলিয়ার মন্ত্রণা সভার সভ্যদের তালিকায় শিক্ষামন্ত্রী হিসাবে আমার নাম প্রকাশিত হইয়াছে; ধৰ্ম্ম-পাগল মুসলিম প্রাচ্যকে ক্ষেপাইয়া তুলিবার জন্য বিদ্রোহী, নিৰ্বাসন-দণ্ডিত, একজন নারী মন্ত্রণা সভার সভ্য ইত্যাদি বিদ্রুপাত্মক কথাও তাহাতে সন্নিবেশিত হয়। ধৰ্ম্মোন্মত্ত মুসলমানেরা এত আগ্রহের সহিত এই ভিত্তিহীন আখ্যার ব্যবহার করিয়াছে যে আমি তাহা হইতে মুক্ত হইতে পারি নাই। এই বিষয়টীর ভালরূপ প্রতিবাদ হয় নাই বলিয়া ভারতীয় নানা ভাষার পত্রিকা ও পুস্তকে হালিদাকে বহুবার শিক্ষামন্ত্রী ভাবে পরিচিত করান হইয়াছে এবং এখনও হইতেছে। অধ্যাপক আর্ণ জে, টয়নবী তাহার Turkey গ্রন্থের ২৫৪ পৃষ্ঠায় লিখিয়ছেন—In view of a frequent mis-statement appearing in many recent books and articles on Turkey, to the effect that Khalida Khanum was Minister of Education in the first Turkish Cabinet, it may be pointed out here that, on her own statement, she never held that position, but was stated to have done so by the Constantinople Government, which wanted to injure the Nationalists' prestige by spreading the report that they had appointed as Minister a woman who had previously been condemned to death as a rebel. অর্থাৎ তুরস্ক সম্বন্ধীয়-বর্তমান অনেক পুস্তকও প্রবন্ধে খালিদা ৫ ৫৪ হালিদা হাম খানুম তুর্কীদের প্রথম মন্ত্রণা সভায় শিক্ষামন্ত্রী হইয়াছেন এই মর্মে একটা মিথ্যাকথা বারবার প্রকাশিত হইয়াছে। এই সম্বন্ধে বলা যাইতে পারে যে তাহার নিজ বর্ণনা অনুসারে তিনি কখনও উক্ত পদে বরিত হন নাই, অথচ কনষ্টান্টিনােপল গভর্ণমেন্ট এই ভিত্তিহীন কথা ঘােষণা করিয়াছিল। তাহাদের উদ্দেশ্য ছিল—বিদ্রোহী বলিয়া দণ্ডাদেশ প্রাপ্ত একজন নারীকে মন্ত্রী নিযুক্ত করিয়াছে—এই অপবাদ দিয়া জাতীয় দলের মর্যাদা হানি করা। এই টয়নবী ও তাঁহার সহযােগী অধ্যাপক লিবিয়র সম্বন্ধে হালিদা Turkish Ordeal গ্রন্থের ৬১ পৃষ্ঠায় লিখিয়াছেন—•••••*Professor Albert H. Lybyer and Professor Arnold J. Toynbee are the two most dependable and fair minded writers on the impossibly difficult tangle of Near East."--Tarp আলবার্ট এইচ লিবিয়র এবং অধ্যাপক আর্নল্ড জে টয়নবী এই দুইজন লেখক ‘নিকট প্রাচ্যের অসাধারণরূপ জটিল সমস্যা সম্বন্ধে খুব নির্ভর যােগ্য ও ন্যায়বাদী।

ঘনীভূত নৈরাশ্য এদিকে তুর্কীর স্বাধীনতার আশা-কিরণ ক্ষীণ হইতে ক্ষীণতর হইয়া পড়িতে লাগিল। সুলতানের গবর্নমেন্ট নানা সুযােগে জাতীয় আন্দোলন দমন করিতে প্রয়াস পাইতে ছিল। ইংরেজগণ ইস্তাম্বুল দখল করিয়া নানাভাবে তুর্কীদিগকে নিৰ্যাতন করিতেছিল। ফরাসীরা কিলিকিয়া দখল করিয়া আর্মেনিয়ান সৈন্য পাঠাইয়া তুর্কীদের উপর ভীষণ জুলুম করিতেছিল। গ্রীকগণ ইউরােপের উৎসাহে ও সাহায্যে স্মার্ণার নানাদিকে ক্ষিপ্ত ব্যাঘ্রের ন্যায় নৃশংস হত্যাকাণ্ডের অনুষ্ঠান করিয়াছিল। শুধু তাহাই নহে, তুর্কীদের বাড়ী ঘর, আসবাব পত্র, জ্বালাইয়া দিয়া, লুট পাট করিয়া, নারীর উপর অমানুষিক অত্যাচার করিয়া নিজেদের সভ্য মানসিকতার ও উদার মানবতার পরিচয় দিতে ছিল। তুর্কী সৈন্যদের মধ্যে ও বহুদল জাতীয় দলের বিরুদ্ধে খিলাফতী সৈন্যের সহিত যােগ দিয়াছিল। অনেকে আবার দোদুল্যমান ছিল- জাতীয় দলে যােগ দিবে, কি বিদেশীর হাতের পুতুল সুলতানের পক্ষ অবলম্বন করিবে তাহা স্থির করিতে পারিতেছিল না। চারিদিকে বিদ্রোহ, প্রতিদিন জিলার পর জিলা জাতীয়দলের বিপক্ষে দাঁড়াইতেছে। দুই এক স্থানে জাতীয়দলের সৈন্যগণও জয়লাভ করিতেছে। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত ; জাতির স্বাধীনতা অন্ধকারে; নিজেদের জীবন বিপন্ন ; খাটুনিও অত্যন্ত অধিক। সারারাত বিনিদ্র অবস্থায় কাজ করিয়া কাটাইতে হয়। সকালে কয়েক ঘণ্টা মাত্র ঘুম। ঘুমাইতে যাইয়াও শান্তি নাই ;

হালিদা হানুম কখন যে সুলতানী দলের সৈন্য আসিয়া সব শেষ করিয়া ফেলে। এই সময়ে সকলের মনেই সন্দেহ জাগিয়াছিল। বিপদ যদি বাস্তবিকই ঘনাইয়া আসে, আঙ্গোরা যদি পরিত্যাগই করিতে হয়, তাহা হইলে কি করিতে হইবে তাহাও স্থির হইয়াছিল। প্রয়ােজন বুঝিলে আঙ্গোরা হইতে সিবাস ( Sivas) যাইতে হইবে। এই নৈরাশ্যের দিনে হালিদা বন্দুক ছােড়া শিক্ষা করেন। হেড কোয়ার্টারের নিকটেই একটা স্থানে তিনি গােলন্দাজী অভ্যাস করিতেন। হেড কোয়ার্টারের কাৰ্য কিছু কমিলে হালিদা সকাল বেলা তঁাহার প্রকৃতিগত প্রিয় কাৰ্য্য সাহিত্য সেবা করিতেন আর বিকাল বেলায় ঘােড়ায় চড়িয়া নানা স্থানে ভ্রমণ করিয়া নানা দৃশ্য দেখিতেন। ৫৭ হিলালে আহমৱ ই-এউনুর (Inn Eunu) প্রথম যুদ্ধে কর্ণেল ইসমতের নেতৃত্বে তুর্কীরা গ্রীকদিগের উপর জয়যুক্ত হইলে আগোরার হিলালে আহমর । Red Crescent) সমিতি এসকি শহরের হাসপাতালে যাইয়া আহতদিগকে দেখিবার জন্য হালিদাকে, অনুরােধ করেন। হালিদা আহতদের জন্য কতকগুলি সওগাত লইয়া যান। মূর্তিমতী মমতার উপস্থিতিতে মুমূষুদের মুখে হাসি ও প্রাণে আনন্দ দেখা দিয়াছিল। ইহার পর ১৯২১ খৃষ্টাব্দের ৩১শে মার্চ তারিখে ইন্-এইনুর দ্বিতীয় যুদ্ধেও তুর্কীরা জয়লাভ করেন। এই সময়ে আঙ্গোরার নারী সমাজ বিগত মহা যুদ্ধকালের মত হিলাল আহমরের এক নারী বিভাগ খুলিবার জন্য প্রস্তাব করেন। ইহার সমিতি গঠন লইয়া ইস্তাম্বুল ও আজোরার নারীদের ভিতরে এক গােলমাল উপস্থিত হয়। পরে হালিদার চেষ্টায় দুই দলের মিলন হইয়া যায়। সকলে একবাক্যে হালিদাকে সমিতির সভানেত্রী মনােনীত করেন। সমিতির কার্য চালাইবার জন্য অর্থের প্রয়ােজন অনুভূত হয়। তখন হালিদা এক বিরাট জনসভা আহ্বান করিয়া জ্বলন্ত ভাষায় বক্তৃতা দিয়া সকলকে এই স্বাধীনতা সমরের উদ্দেশ্য ও প্রয়ােজন এবং সমিতির কার্যের কথা বুঝাইয়া দেন। বক্তৃতা বিশেষ কাৰ্যকরি হইয়াছিল। সমিতির উদ্দেশ্য উপলব্ধি করিয়া সকলেই চারিদিকে প্রচারকার্যে যােগ দেন। ফলে আঙ্গোরার নারীদের নিকট ৫৮ হালিদা হানুম হইতেই এক হাজার পাউণ্ড দা উঠিয়াছিল। পুরুষদের দানের সমষ্টি সব মিলিয়া এক হাজার পাউণ্ড হইয়াছিল। এই স্থানে বলিয়া রাখা আবশ্যক যে, জাতির এই অতি বড় দুর্দিনে আনাতােলিয়ার নারীরা শুধু অর্থ সাহায্য করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই। তাঁহারা পুরুষের পাশাপাশি দাঁড়াইয়া যুদ্ধও করিয়াছেন। রহীমা নামে এক বীরনারী ১৯২০ সালে অসামান্য সাহস ও ক্ষমতা দেখাইয়া সকলকে স্তম্ভিত করিয়াছিলেন। তিনি নিজের জীবন বিপন্ন করিয়া শত্রুদের সম্মুখ হইতে দুইজন আহত তুর্কীকে পিঠে করিয়া আনিয়াছিলেন। তাঁহার বীরত্বের গৌরব ও সম্মান রক্ষা করিয়া তাহাকে ‘তায়্যার’ (উড়ােপাখী ) উপাধি দেওয়া হইয়াছিল। ওসমানিয়ার সুরক্ষিত ফরাসী হেডকোয়ার্টার আক্রমণকালে এই নারী পুরুষদিগকে এই বলিয়া উৎসাহিত করিয়া- ছিলেন, আমি একজন নারী, আমি দাড়াইয়া যুদ্ধ করিতেছি, আর তােমরা পুরুষ হইয়া লুকাইয়া থাকিতে এবং মাটিতে হামাগুড়ি দিয়া চলিতে লজ্জাবােধ কর না?” ফরাসী হেডকোয়ার্টারের দরজার সামনে রহীমা গুলির আঘাতে প্রাণ বিসর্জন করেন।

হাসপাতালে সেবিকা ১৯২১ সালের ২রা জুন তারিখে এস্কি শহরের হাসপাতালে যাইয়া- হালিদা রীতিমত সেবিকার (nurse) কাৰ্য্য আরম্ভ করেন। সেবিকার কাৰ্যকালে তিনি বাস্তবিক ‘তুর্কী-জননী’ আখ্যার সার্থকতা প্রদর্শন করিয়াছিলেন। মায়ের মত, যুদ্ধক্ষেত্র হইতে আনীত আহত সৈন্যদের রক্ত কাদা ধুইয়া বেণ্ডেজ বাঁধিয়া দিতেন। একভাবে থাকিতে থাকিতে কাহারও হাত পা লাগিয়া গেলে, আবার সরাইয়া যাহাতে একটু আরাম পায়, সেইরূপ করিয়া রাখিতেন। নানাভাবে সমবেদনা জানাইয়া, জিজ্ঞাসাবাদ করিয়া, উৎসাহ দিয়া, জীবনের আশা দিয়া, তাহাদিগকে সান্ত্বনা দিতেন। নিজহাতে পানীয় মুখে তুলিয়া দিতেন। কাহার কি অভাব অভিযােগ তাহার সন্ধান নিতেন। ঘা ধুইয়া, বেজে বাঁধিয়া, আবার বিছানায় ঠিকভাবে পােয়াইয়া দিতেন। হাসপাতালের কাৰ্যকালে একদিন ইস্তাম্বুলের এক কাগজে তাহার প্রথম স্বামী সালেহ জকী বের মৃত্যুসংবাদ পাইয়া হালিদার মনে অগনিত চিন্তা ও পুরাতন স্মৃতির আবর্তন আসিয়া তাহাকে আকুল করিয়া তুলিল। ঠিক এই সময়ে এস্কি শহরের যুদ্ধে তুর্কীরা পরাজিত হইল। গ্রীকরা ক্রমেই অগ্রসর হইতে লাগিল ; চতুর্দিকে ভয়ানক আতঙ্কের সৃষ্টি হইল। সংবাদ আসিল একি শহর পরিত্যাগ করিতে হইবে। সব বন্দোবস্ত ঠিক। যাইবার পূর্ব মুহূর্তে হাসপাতালের আহত ও আশ্রিতদের সুব্যবস্থা করিয়া হালিদা আজোরায় ফিরিয়া আসিলেন। .

বুদ্ধক্ষেত্রে হালিদা গ্রীকদের অগ্রগতি রােধ করিবার জন্য তুর্কীরা প্রাণপণে সাজসজ্জা করিতে লাগিল। গ্রীকদের সৈন্যসংখ্যা প্রায় একলক্ষ, আর তুর্কীরা মাত্র পঁচিশ হাজার। তাহাতেও আবার রসদপত্র, অস্ত্রশস্ত্র সব কিছুর অভাব। ১৯২১ সালের ৫ই আগষ্ট সকলে মিলিয়া মুস্তফা কামাল পাশাকে ‘বাশা কমান্দান (প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করিলেন। হালিদা আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইয়া নিজের প্রাণ দিয়া জাতির সেবা করিবার জন্য অধীর হইয়া পড়িলেন। কামাল পাশার প্রধান সেনাপতি হওয়ার দুই সপ্তাহ অতিবাহিত না হইতেই হালিদা তাহাকে টেলিগ্রাফ করিয়া জানান যে তিনি স্বেচ্ছাসেবিকা হইয়া যুদ্ধে যাইবেন। মুস্তফা কামাল পাশা তাহাকে ধন্যবাদ দিয়া আহলাদের সহিত অতি সত্বর যাত্রা করিতে লিখিলেন। যুদ্ধে যাইয়া প্রথমে ইসমত পাশার অধীন প্রথম বিভাগে ( First Section) এ ভর্তি হইলেন। তাহার কাৰ্য্য স্থির হইল—তিনি বিভিন্ন সৈন্যদল, যুদ্ধের সহায়ক লােক, অস্ত্রশস্ত্র, গােলাবারুদ প্রভৃতি যুদ্ধের যাবতীয় সরঞ্জামের সংখ্যা বা পরিমাণ নির্ণয় করিয়া দৈনিক বিস্তৃত তালিকা প্রস্তুত করিবেন। অফিসারদের নিকট হইতে প্রাপ্ত রিপাের্ট অনুসারে তিনি প্রত্যহ এই গুরুত্বপূর্ণ কার্যে লিপ্ত থাকিতেন। এইরূপে প্রস্তুত তালিকা প্রত্যহ বিকালে কামাল পাশার নিকট পেশ করিতে হালিদা হানুম •• হইত। পরে প্রথম বিভাগ হইতে দ্বিতীয় বিভাগে কার্যের গুরুত্ব বাড়িয়া যাওয়ায় হালিদাকে দ্বিতীয় বিভাগে যােগ দিতে হইল। হালিদা-কৰ্পরাল * Corporal) হইলেন। এদিকে বিপদ ভীষণ হইয়া দাড়াইয়াছিল। আঙ্গোরা বুঝি গ্রীকদের দ্বারা অধিকৃত হয়, এরূপ ভীতি অনেকের মনেই স্থান পাইয়াছিল। সময় একভাবে যায় না। সত্যকে লক্ষ্য করিয়া, ন্যায়কে আশ্রয় করিয়া একাগ্র চিত্তে সাধনা করিলে তাহা কখনও ব্যর্থ হয় না। তুর্কীদের জীবন-পণ রণ ও ব্যর্থ হইল না। সাকারিয়ার বিখ্যাত যুদ্ধে গ্রীকগণ পরাস্ত হইয়া স্মার্ণার দিকে হটিয়া যাইতে লাগিল। পলায়নপর গ্রীকসৈন্য সামনে যাহা পাইয়াছিল তাহাই ধ্বংস করিয়াছিল ; গ্রামের পর গ্রাম জ্বালাইয়া গাে অশ্বাদি হত্যা করিয়া গিয়াছিল। ইসমত পাশার অনুরােধে হালিদাকে মধ্য আনাতােলিয়ায় গ্রীকদের নিষ্ঠুরাচরণ সম্বন্ধে অনুসন্ধান করিয়া রিপোের্ট দিতে হয়। নির্ণয় করিতে তাহাকে অনেক স্থানে ঘুরিয়া অনেক কিছু দেখিতে শুনিতে হইয়াছিল। জ্ঞানের অফুরন্ত পিপাসা হালিদাকে শিক্ষা ও কৰ্ষণার দিকে সর্বদা উৎকৰ্ণ করিয়া রাখিয়াছে। যুদ্ধের মাঝেও তিনি আকশহরের চারিদিকের ইস্কুলগুলি পরিদর্শন করিতে গিয়াছিলেন। একবার কায়সারিয়ার তুর্কী এতীমখানা লইয়া তুর্কী কর্তৃপক্ষ ও আমেরিকান নিয়ার ইষ্ট রিলিফ ( নিকট প্রাচ্য সহায়ক আমেরিকান সমিতি) এর মধ্যে গােলমাল হয়। এতীমখানার পরামর্শ সভায় হালিদা একজন সদস্য ছিলেন। উভয়পক্ষের দ্বারা অনুরূদ্ধ হইয়া হালিদাকে কায়সারিয়া যাইয়া অবস্থা দেখিয়া রিপাের্ট দিতে হয়।

হালিদা হানুম সাকারিয়া যুদ্ধে হালিদা উপস্থিত থাকায় তুর্কীরা শত অসুবিধার মধ্যেও বিজয়ী হইয়াছিল। তাই মুস্তফা কামাল পাশা স্মার্ণার অভিযানের সময়ও তাহার উপস্থিতি শুভ ও মঙ্গলসূচক মনে করিয়া তাহাকে যথাসম্ভব সত্বরে যুদ্ধস্থলে উপস্থিত হইবার জন্য তার করেন। হালিদা আঙ্গোর হইতে ইউনিফর্ম লইয়া কোনিয়া অভিমুখে ছুটিয়া যান। হালিদার কাৰ্য্যের নির্দিষ্ট কোন সীমা ছিল না। কোন সময়ে দোভাষীর কাৰ্য্য করিতে হইত, কোন সময়ে বিশেষ প্রয়ােজনীয় সরকারী কাগজপত্রের অনুবাদের জন্য তাঁহাকে ঘুম হইতে ডাকিয়া ভােলা হইত, আবার আবশ্যকমত বিশেষ ঘটনা ও স্থান অনুসন্ধান করিয়া তাহাকে তদসম্বন্ধে রিপাের্ট দিতে হইত।

বিজয়িনীর সম্মান যুদ্ধে তুরস্কের পূর্ণ বিজয় লাভ হইল। হালিদা আদীব হানুম মুস্তফা কামাল পাশার নিকট বিদায় লইয়া সাফল্যের আনন্দে পরিপূর্ণ হৃদয়ে নগরী-কুল-রাণী কষ্টান্টিনােপলে ফিরিয়া আসিলেন। বিদায় কালে মুস্তফা কামাল পাশা তাহাকে সার্জেন্ট মেজরের চিহ্ন ও নিজের কোট প্রদান করেন। এইরূপে তিনি তুরস্কের জীবন মরণের সন্ধিক্ষণে এক ভীষণ বৈদ্যুতিক তুফানের অভিনয়ে সমস্ত জগতের শ্রদ্ধাপূর্ণ ‘মারহাবা’র মধ্যে রঙ্গমঞ্চ হইতে বিদায় গ্রহণ করিলেন। জীবনমরণ পরীক্ষায় তুরস্ক বাচিয়াছে। আজোরা তাহার তীর্থস্থান পবিত্র কৰ্ম্ম কেন্দ্র। সে এখন আবশ্যকমত প্রাশ্চাত্য আদর্শ গ্রহণ করিয়া পশ্চিম এশিয়ায় জ্ঞান ও আলাের দিকে পথপ্রদর্শক হইতে চলিয়াছে। ৬৪ প্রাণীপ্রিয়তা জীবে দয়া হালিদা আদীব হানুষের হৃদয়ের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাল্যকাল হইতেই তিনি কুকুর কোলে করিয়া আদর সােহাগ করিতেন ; কোন প্রাণীর কষ্ট দেখিলে ব্যথিত হইতেন । আঙ্গোরায় ও তিনি কুকুর খুব ভালবাসিতেন। আজোরায় জিন ও মােলদাশ (সঙ্গী ) নামক দুইটী কুকুর এবং সওদা (কাল) নামে একটা কুকুরী তাহার বড়ই প্রিয় ছিল। জিনের পা পক্ষাঘাতে অবস হইয়া গিয়াছিল, বাঁচার কোন আশা নাই—অসহ্য যন্ত্রণা ভােগ করিতেছে দেখিয়া একজন আদালী তাহাকে গুলি করিয়া মারে। প্রিয় কুকুরের এই শশাচনীয় পরিনামে হালিদা আকুল ভাবে কাদিয়াছিলেন। তাঁহার প্রিয় অশ্বগুলির মধ্যে ‘দর নাম উল্লেখযোেগ্য।

সাহিত্য-বৈশিষ্ট্য সাহিত্যের দিকে, কবিত্বের দিকে, কাগজে কলমে মানব মনের নিভৃত চিরন্তন সত্য প্রকাশ করিবার দিকে, সমাজ, ধর্ম ও রাষ্ট্রের বহিরাবরণের নীচে যে গুহ রহস্য প্রচ্ছন্ন আছে তাহা জগতের সামনে খুলিয়া ধরার দিকে, হালিদা আদীব হাসুমের প্রকৃতিগত ঝোঁক ও স্বভাবসিদ্ধ প্রেরণা তাহাকে নানা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে আজীবন জ্ঞান সেবায় নিয়ােজিত রাখিয়াছে। তাহার রচনার প্রতিছত্র, প্রতিশব্দ স্বভাবজ চিন্তার গতির সহিত স্বতঃই বাহির হইয়া পড়িয়াছে। বর্ণনা কৌশল তাহার অসাধারণ। আয়নার মত স্বচ্ছ তাহার দৃশ্য গুলি। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের প্রধান প্রধান প্রাচীন ও বর্তমান সাহিত্যের পূর্ণ অধিকার ও গভীর অন্তঃ প্রবেশ লইয়া তিনি যে বিষয়ে হাত দিয়াছেন তাহাই রূপ ও গন্ধ লইয়া ফুলের মত ফুটিয়া উঠিয়াছে। হালিদার ইংরেজীতে মার্কিনত্বের গন্ধ আছে। সাধারণ পাঠকের নিকট তাহার লেখার অনেক ইংরেজী শব্দের আমেরিকার সহজতর বানান বেশ ধরা দিবে। তাহার ইংরেজীতে এই মার্কিনত্বের ছাপের কারণ যৌবনে তাহার মনের উপর আমেরিকান কলেজের প্রভাব। ৬৬

হালিদার গ্রন্থাবলী
হালিদার লিখিত গ্রন্থমালার মধ্যে নিম্নলিখিত পুস্তক গুলির নাম
আজ পর্যন্ত জানিতে পারিয়াছি।
১। মাতা( ইংরেজী পুস্তকের অনুবাদ)
২। জীর্ণ-মান্দর
৩। হান্নান(উপন্যাস)
৪। হৃদয়ের ব্যথা-(উপন্যাস)
৫। নবীন তুরাণ রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় স্বপ্নরাজ্য)
৬। যাদুর কূয়া-( গল্প )
৭। সবীয়ে তালিব
৮। ইশিলদাকের স্বপ্ন—( গল্প )
কানানের মেষপালকগণ—( ক্ষুদ্র নাটক)
১০। আর্জরুমের এক নারী—( এক দুঃখিনীর জীবনকাহিনী)
১১। আগুনের জামা—(উপন্যাস)
Memoirs of Halide Edib.
(হালিদা আদীবের জীবনস্মৃতি)
১৩। The Turkish Ordeal (তুর্কীর পরীক্ষা)
১৪। Turkey Faces West ( তুরস্কের প্রতীচী বরণ)
হালিদার Memoirs বা জীবনস্মৃতিতে তাহার প্রাথমিক জীবনের
খুটিনাটী সমস্ত ঘটনা এবং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অবস্থা অতি মনোমুগ্ধকর
৯।
১২।
৬৭

হালিদা হানুম ভাষায় লিখিত হইয়াছে। এই গ্রন্থ সম্বন্ধে আমেরিকার বার্নার্ড কলেজ ও কোলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস অধ্যাপক এডওয়ার্ড লিড, আল সাহেব বলেন...which present a unique and charming picture of life in Turkey before the war." perts Barco মহাযুদ্ধের পূর্বেকার তুর্কী জীবনের এক অতুলনীয় ও মােহনীয় ছবি পাওয়া যায়। The Turkish Ordeal বা তুরস্কের পরীক্ষা নামক গ্রন্থকে আমরা তাহার জীবন স্মৃতির দ্বিতীয় খণ্ড বলিতে পারি। ইহাতে তুরস্কের স্বাধীনতা রক্ষার জীবন-পণ যুদ্ধের বিবরণ প্রদত্ত হইয়াছে। নবীন তুরস্কের ইতিহাসের জন্য ইহা এক অফুরন্ত উপকরণ-ভাণ্ডার। বর্তমান তুরস্কের যাহারা স্রষ্টা, তাহাদের ব্যক্তিত্ব ও কর্মজীবনের এক জীবন্ত এবং চাক্ষুশ ইতিহাস ইহাতে লিপিবদ্ধ হইয়াছে। এই গ্রন্থ প্রণয়নের পূর্বে ইহার স্বরূপ সম্বন্ধে হালিদা লিখিয়াছেন—I would try to tell the story of Turkey as simply and honestly as a child, that the world might someday read it--not as a historical record nor as a political treatise, but as a human document about men and women alive during my own life time ; and I would write it in a language far better fitted to reach the world than my own. opefte opfat fotos সরলতা ও সততা লইয়া তুরস্কের কথাগুলি বলিতে চাই ;-জগদ্বাসী কোন দিন তাহা পাঠ করিবে। ইহা ঐতিহাসিক বা রাষ্ট্রীয় গ্রন্থ হইবে ; আমার জীবিত কালের নরনারীর মানবীয় লিখন রাখিয়া যাওয়াই ৬৮ হালিদা হানুম আমার উদ্দেশ্য। বিশ্ববাসীর সহজলভ্য হইতে যে ভাষা আমার মাতৃ- ভাষার চেয়ে সবদিকে বেশী প্রসন্ত, সেই ভাষায় ইহা লিপিবদ্ধ করিব। অধ্যাপক এডওয়ার্ড মিড়, আর্ল--সাহেবের মতে Turkish Ordeal গ্রন্থখানি...“a history of the Nationalist Revolution based upon her own observation during the bitter years of struggle under Mustafa Kemal Pasha for the emancipation of Anatolia,” অর্থাৎ আনাতােলিয়ার স্বাধীনতা রক্ষার জন্য কামাল পাশার নেতৃত্বে যে জাতীয় বিপ্লবের সৃষ্টি হইয়াছিল সেই সঙ্কট কালের চাক্ষুশ ইতিহাস। Turkey Faces West বা তুরস্কের প্রতীচীবরণ পুস্তকখানি সম্বন্ধে পূর্বোক্ত অধ্যাপক সাহেব বলিয়াছেন যে—“Madame Edib attempts in this book to tell the truth and nothing but the truth in frank and unashamed defense of her countrymen...... Its account of the Nationalist movement, for example, is more detached, objective and reflective. It shows how deep-rooted in the past are some of the two revolutionary reforms of 1908-1909 and 1919-25. It makes persistent and salutary distinction between things essentially Ottoman and things essentially Turkish. It views modern Turky in world persfective attributing the present dictatorship, in part at least, to a general post-war reaction against democracy as a ৬৯ হালিদা হানুম ; means of getting things done.” অর্থাৎ এই পুস্তকে আদীব হানুম প্রকাশ্য ও স্পষ্ট ভাবে স্বজাতির সমর্থন করিয়া প্রকৃত সত্য কথা বলিতে চেষ্টা করিয়াছেন; তিলমাত্রও মিথ্যা বলেন নাই। ইহাতে বর্ণিত জাতীয় আন্দোলনের বিবরণ অধিকতর বিচ্ছিন্ন, বাস্তব ও সুচিন্তিত। ১৯০৮ হইতে ১৯০৯ এবং ১৯১৯ হইতে ১৯২৫ খৃষ্টাব্দের বিপ্লবজনিত সংস্কারের মধ্যে কতকগুলির বীজ যে সুদূর অতীতে উপ্ত হইয়াছিল এই গ্রন্থ পাঠে তাহা বেশ বুঝা যায়। ইহাতে তুর্কী ও ওসমানীয় বৈশিষ্ট্যের মধ্যে দৃঢ় ও সারগর্ভ পার্থক্য প্রদর্শন করা হইয়াছে। এখানে বর্তমান তুরস্ককে বিশ্বের দৃষ্টিতে দেখা হইয়াছে এবং মহাযুদ্ধের পর কাৰ্যসিদ্ধির উপায় স্বরূপ প্রজাতন্ত্রের সাধারণ প্রতিক্রিয়াই যে শাসন ব্যাপারে বর্তমান একাধিপত্যের অন্ততঃ আংশিক কারণ, সঙ্গে সঙ্গে তাহাও দেখান হইয়াছে। হালিদা বইখানি উৎসর্গ করিয়াছেন তুরস্কের পরীক্ষায় সংশ্লিষ্ট জাতি সমূহের তরুণদিগকে। আগুনের জামা ঃ—ইহা তুর্কী ভাষায় লিখিত একখানি উপন্যাস। এই গ্রন্থখানি আনাতােলিয়ায় তুরস্কের জাতীয় আন্দোলন ও সমরের অতুলনীয় বাস্তব ছবি। ইহাতে বিয়ামী নামক এক ব্যক্তির মুখ দিয়া সবকথা বলা হইয়াছে। বিয়ামী যেন সাকারিয়া যুদ্ধের পর আঙ্গোরা হাসপাতালে আশ্রিত একজন আহত সামরিক অফিসার। তাহার মাথায় গুলি প্রবেশ করিয়াছে—এ পর্যন্ত বাহির করা হয় নাই। তাহার দুইখানি পা কাটিয়া বিচ্ছিন্ন হইয়া গিয়াছে। তাই সে মৃত্যু আসন্ন জানিয়া মহাযুদ্ধের আরম্ভ হইতে শেষ পর্যন্ত সমস্ত অভিজ্ঞতার কথা বলিয়া যাইতেছে। १०

হালিদা হানুম
তুরস্কের বিখ্যাত কাগজ ‘একদাম' এই পুস্তকের ভূয়সী প্রসংসা
করিয়াছেন। মৌলবী গােলাম রব্বানী সাহেব ইহার উদ্ অনুবাদ
করিয়াছেন। (১) ইহার আরবী এবং ইংরেজী অনুবাদ ও হইয়া
গিয়াছে।
(১) প্রাপ্তিস্থান-সুফী প্রিন্টিং এণ্ড পাব্লিশিং কোম্পানি লিমিটেড। পিণ্ডি
বাহাউদ্দিন, পাঞ্জাব।
৭১

নিরপেক্ষ সমালােচক সত্যপ্রিয়তা, স্পষ্টবাদিতা ও নির্ভীকতা হালিদার অস্থিমজ্জাগত। গ্রীকরা তুর্কীদের উপর যেরূপ অমানুষিক অত্যাচার করিয়াছে, যেরূপ অন্যায় ভাবে রণশ্রান্ত তুরস্কের বুকের উপর গ্রীক সাম্রাজ্য স্থাপন উদ্দেশ্যে এক লক্ষ লােক লইয়া রক্তগঙ্গা বহাইয়াছে, সে অন্যায় অতিরঞ্জিত করা বা শত্রুর সৎকাৰ্য গােপন করা অস্বাভাবিক নহে। মানুষের এদিকে দুৰ্বলতা খুব বেশী কিন্তু হালিদার হৃদয় মন ইহার অনেক উপরে। গ্রীকদের খুটিনাটি উদারতার কথা তিনি খুটিয়া খুটিয়া লিখিয়াছেন। সাকারিয়া যুদ্ধের সময় তিনজন আহত তুর্কী সৈন্য রণক্ষেত্রে পরিয়া- ছিল। তাহাদের নড়া চড়া করিবার কোন শক্তি ছিল না। অন্বেষণ কারীরা তাহাদিগকে দেখিতে পায় নাই। তাহারা নিরুপায় অবস্থায় মৃত্যুর প্রতীক্ষা করিতেছিল। এমন সময় একজন গ্রীক ডাক্তার তাহাদিগকে দেখিতে পান। তিনি তাহাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করিয়া তাহাদের নিকট কিছু রুটী ও পানি রাখিয়া যান। হালিদা তাহার Turkish Ordealএ গ্রীক ডাক্তারের এই মহানুভবতার কথা উল্লেখ করিয়াছেন। আবার তুর্কীদের দোষ ও অপরাধ তিনি কখনও গােপন করেন নাই। ওসমানীয় সাম্রাজ্যের দোষ ত্রুটী তিনি স্পষ্টভাবে স্বীকার করিয়াছেন। খােদ কামাল পাশার কাৰ্য, ব্যবহার ও শাসন নীতির দোষ দেখিলে তাহার তীব্র সমালােচনা করিতে এবং স্থান বিশেষে প্রতিবাদ করিতে টী করেন নাই। १२ Stefate কলেজ জীবনের অভিজ্ঞতা ও চিন্তার গতি সম্বন্ধে তিনি লিখিয়াছেন- As a whole, 'college had a liberating effect upon me, giving me a much greater balance and opening up to mne the possibility of a personal life with enjoyments of a much more varied kind. Some of the already strong tendencies of iny thought also now found new vistas into wider paths. I was most concerned with matters of religion, and I was in a questioning and critical mood in that respect. The reverent and emotional tendencies of my soul, and its absolute need of a spiritual reality higher than the human realities I had so far touched, was foremost. I had been hitherto a faithful Moslem in heart and practice, but I was not orthodox in mind. Somehow the Sunni teaching did not satisfy me ; and I believed, like Gazali, that the door of ijtihad ( testa fool) could not be closed against any one and that the mind could १७ হালিদা হানুম not rightly be required to accept any barriers in its continual search for higher truths, which should properly strengthen rather than weaken its faith. I had an infinite longing for the infinite, in religious thought as in every other thought activity, and I was ready to refuse a salvation and felicity in which all mankind could not share. I would plunge into any kind of knowledge the pursuit of which was recommended by the extraordinarily free and tolerant spirit of Islam, which I felt to be struggling against the conventions and the secularization of the Sunni Church. The simple saying of Mohammad, "Search knowledge though it be in China." ( the most improbable and remote region to an Arab's mind) I always regarded with reverence. I plunged into passionate study of religious creeds, and strangely enough I felt charmed and soothed by reading of Buddha. This seemed to me to be the creed which came nearest to promising a universal happiness." (>) ২। পারস্য সাহিত্যের মােহনীয় শক্তি সম্বন্ধে হালিদা বলেন - "The philosophical and mystical beauty of Persian a (>) Memoirs. (Ist. edition, 1926 ) Pp. 190-192 and 195. 1 48 হালিদা হানুম literature with its exquisite delicacy of form made me feel that there is a spirituality and significance in form when it attains to the heights which it undoubtedly has in Persian literature. But its very perfection is a danger to any other literature and art which falls under its sway. It acts upon them very powerfully and always in the direction of destroying originality. The admirers and imitators of the Persian culture were entirely enslaved and chained by its form as well as by its spirit, and any slavery to form creates rigid and conventional artists." (>) ৩। ফরাসী সাহিত্য ও জোলার প্রভাব সম্বন্ধে হালিদা বলেন : -......"Its mere form, so inimitably beautiful, impressed me as something almost spiritual. Yet I did not linger long with the stylists. It was the French soul in its fastidious insistence upon beauty, and still more upon truth, which held me in subjection. Good old Daudet with his warm, loving, and tender soul I always adored,"......"Zola has remained as perhaps the most powerful educator of my soul." () (3) · Memoirs. ( Ist. edition, 1926 ) P. 183. (2) Memoirs. (rst edition, 1926 ) P. 208. 96 ...... হালিদা হানুম ৪। সেক্সপিয়র সম্বন্ধে মত ব্যক্ত করিতে গিয়া হালিদা fafruta5a :- "Shakespere with his amazing genius had created much of his own English, expressing psychological and philosophical complications of the subtlest order with words never before so employed...... Shakespere, although more impersonal than any other human genius that I know, revealed the dominant personality of his mind to me. He made me feel clearly that there $ such a thing as a difference between man andą,woman in art, in religion, and in all forms of culture. I cannot say that one is higher than the other, but they are distinctly different. The highest art and the highest beauty may be revealed by persons of either sex indifferently. Genius is a divine gift which either a womnan or a man may have ; and sometimes indeed it is a woman who may express the man's note in art while a man may express the woman's. It does not depend on their sex ; it depends on the quality of their souls. For me, both our poet Suleiman Dede' and Jesus Christ in their sublime note of love strike the supreme হালিদা হানুম note of woman in religion and art; while Mohammad and Shakespere sound the highest note of man, or rather the male note in the same realms. It is strange to admit that what Mohammad gave me in religion, Shakespere gave me in art. There is no Christian feeling in Shakespere. He is a man, clearly chanting the creative manliness of his barbaric ancestors toning them down to the harmony, indeed bringing into formal beauty the chaotic ideas of their dreams and struggles, and painting them in terms with which every human being in every decade of history may become familiar. . Mohammad, though the last Semitic prophet, is not influenced in his soul to any great extent by the series of prophetic predicessors who left behind them their tradition and their prophetic art. Though somewhat iinpressed by the organising power and the manly capacity of Moses, he is otherwise but little touched by the Jewish art in the Old Testament, which not infrequently reaches a strident note of complaint sometimes very beautiful but usually very hysterical. The sublime but womanly gestures of Christ did not touch Mohammad either. In his love, in his pity, in his social ११

হালিদা হানুম
organisation and his whole conception of life bộth
here and hereafter, Mohammad is essentially a man,
The mys-tic and somewhat sickly tendencies of his own
people had to find satisfaction by infiltrations from
other sources into his clear and well-balanced creed;
while the manly tone with which Christianity was
tempered by means of its iron organisation of later years
all came from church organizers and personalities
of somewhat Roman tendencies rather than from
Christ's own teachings." (>)
৫। বহু পত্নিকতা সম্বন্ধে হালিদা লিখিয়াছেন :-
.When a woman suffers because of her husband's
secret love-affairs, the pain may be keen, but its quality
is different. Whan a second wife enters her home
and usurps half her power, she is a public martyr and
feels herself our object of curiosity and pity.......I have
heard polygamy discussed as a future possibility in
Europe in recent years by sincere and intellectual
people of both sexes. “As there is informal polygamy
and man is polygamous by nature, why not have the
sanction of the law ?" they say.
(>) Memoirs ( Ist. edition, 1926 ) P. P. 220-222.

হালিদা হানুম Whatever theories people may hold as to what should or should not be the ideal tendencies as regards the family constitution ; there remains one irrefutable fact about the human heart, to whichever sex it may belong. It is almost organic in us to suffer where we have to share the object of our love, whether that love be sexual or otherwise. I belive indeed that there are as many degrees and forms of jealousy as there are degrees and forms of human affection. But even supposing that time and education are able to tone down this very elemental feeling, the family problem will still not be solved ; for family is the primary unit of human society, and it is the integrity of this smallest division which is, as a matter of fact, in question. The nature and consequences of the suffering of the wife, who in the same house shares lawfully with a second and equal partner, differs both in kind and in degree from that of the woman who shares him with temporary mistress. In the former case, it must also be borne in mind, the suffering extends to two very often considerable groups of people-children, servants, and relations-two whole groups whose interests are from a ৭৯ হালিদা হানুম the very nature of the case more or less antagonistic, and who are living in a destructive atmosphere of mutual distrust and a struggle for supremacy. On my own childhood., polygamy and its results produced a very ugly and distressing impression. The constant tension in our home made every simple ceremony seem like a physical pain, and the consciousness of it hardly ever left me." (>) ৬। সংসার সম্বন্ধে হালিদার অভিমত "The world was after all what it should be ; its aspect could be changed according to the use we made of it ; its colour depended on the lenses through which we looked at it ; and its hardness or softness, its painfulness or soothing power, depended on our personal handling of it.” (R) ৭। তুরস্কের বিখ্যাত দার্শনিক তৌফীক ফিরতের মতের সমালােচনা করিয়া হালিদা লিখিয়াছেন :— "Tewfik Fikret attacked above all else these two things : tyranny and religion. Being a man sans peur (>) Memoirs. (1st edition, 1926.) Pp. 143-145. (3) Memoirs, ( Ist. edition, 1926.) P. 230.

হালিদা হানুম et sans reproche, he did not realise the social and individual value of religion, its importance in human morals and culture, its historic necessity to complete the social evolution in the early stages of the human society. He saw only how man in general suffered from tyranny and the narrow rule of the churches, how men rent each other in the name of religion all over the world, and what political use they made of creeds and of their gods.” (>) ৮। হালিদার মতে nationalismএর অর্থ “The individual or the nation in order to understand its fellow-men or its fellow-nations, in order to create beauty and to express its personality, inust go deep down to the roots of its being and study itself sincerely. The process of this deep self-duty, as well as its results, is nationalism." ৯। ধর্মের জন্য জীব হত্যা সম্বন্ধে হালিদা লিখিয়াছেন - "How I hated it (PT) and all the bloody inhuman side of religion, which commands people to shed blood and hurt helpless creatures." (R) (>) Memoirs...... ( 1st. edition, 1926 ) P, 264. (3) Memoirs......( 1st edition, 1926 ) P. 101. by

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Halida Hanum Ed. 1st

Author
Hilali, Golam Maksud
Title
Halida Hanum Ed. 1st
File name
Halida Hanum Ed. 1st
Text
OCR done
Citation
1933
Published
2010/01/31
Publisher
Mahafujar Rahaman Khan, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
98
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Biography
Keywords
Hilali, Golam Maksud
DLI number
512676
Barcode
4990010019728.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
GhgcFa5q1Yx
Download PDF

Halida Hanum Ed. 1st