Makardah Saraswat Library, Howrah

Gayatirtha

Gupta, Sri Mahendranath · 2009/08/1

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

গয়াতীর্থ
পৌরাণিক নাটক
মিনার্ভা থিয়েটারে অভিনীত
প্রথম অভিনয় রজনী—দশহরা, শুক্রবার ৪ঠা আষাঢ়, ১৩৪৪
শ্রীমহেন্দ্রনাথ গুপ্ত এম, এ
একটাকা

প্রকাশক
শ্রীমহেন্দ্রনাথ গুপ্ত এম, এ
১৩৯, কেশব সেন স্ট্রীট,
কলিকাতা।
প্রিন্টার
জহরলাল কুতু
বৈদ্যনাথ প্রল
৩৬ নং ফকীর চক্রবর্তী লেন,
কলিকাতা।

কলা-লক্ষ্মীর বরপুত্র,
আমার অগ্রজ-প্রতিম
শ্রীযুক্ত নির্মলেন্দু লাহিড়ী
মহাশয়ের করকমলে।
ক।
E ARE
*0.119.
t.eh1:w.।
.
প্রতিধন্য
মছে।

নাট্যোলিখিত চরিত্র । পুরুষ বিষ্ণু, মহাদেব, ইন্দ্র, জয়ন্ত, যম, পবন, সূৰ্য্য, নারদ, মদন । গয়ার দৈত্য সম্রাট। দীপ্তজি ঐ সেনাপতি। চিত্রাঙ্ক কপিল ভাবী, অষ্টক, করন্দম, ঐ শিষ্যগণ। জয়ল, জাবালী দধিমুখ জনৈক ব্রাহ্মণ। অঘাসুর, ঘোঘাসুর, বকাসুর, জরানুর প্রভৃতি দৈত্যগণ, গ্রামবাসীগণ, প্রতিহারী ইত্যাদি। •• ঋষি। + + + } * ৫ श्री শচী, স্বর্ণ, ধরিত্রী, উর্বশী, রতি। সাগরিকা সাগর-কন্যা। ইলা গয়াসুরের পালিতা কন্যা গয়াসুরের মা। কলাপী পদ্মমণি দধিমুখের স্ত্রী। মীন-কন্যাগণ, দৈত্য-রমণীগণ, অপ্সরাগণ, সহচরীগণ প্রভৃতি। ঐ সঙ্গিনী।

কয়েকটী কথা মৰ্ত্তবাসী পপি করে; আকাশের দেবতারা সেই পাপের দণ্ড বিধান করেন। কোনাে দুঃখিনী মাতার বুক-ভাঙ্গা আৰ্ত্ত কাকুতি--কোননা প্রিয়-বিরহিতা বালিকা বধূর তপ্ত অশ্রুজল, প্রবৃত্তি-বিকার-বিহীন দেবতাকে কৰ্তব্য-ভ্রষ্ট করতে পারে না। দেবতা কৰ্তব্য-ভ্রষ্ট হন যদি, তা হলে নাকি সৃষ্টির সাম্য রক্ষা হয় না। কিন্তু তবুও যুগ-সঞ্চিত বেদনায় জর্জরিত জীবাত্মা সহসা দেবতার নিয়মতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে মাথা তুলে প্রশ্ন করে, “মর্ত্যজীবকে পাপাত্মা, পাপ সম্ভব করে সৃষ্টি করেছ তত তােমরাই ; সে পাপের জন্য শাস্তি প্রাপ্য কার ?” স্বর্গ ও মর্ত্যের এই শাশ্বত দ্বন্দ্ব নিয়েই গয়াতীর্থ নাটকের সূচনা। মূল আখ্যায়িকা পৌরাণিক হ'লেও নাটকীয় ঘাত প্রতিঘাতকে প্রবল করার জন্য অনেক স্থানে আমাকে কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়েছে। এটুকু স্বাধীনতা নাট্যকার মাত্রেই দাবী করতে পারেন। গয়াতীর্থ সম্বন্ধে দু একটা কথা বলতে ব'সে আজ বিশেষ করে মনে পড়ে আমার কৈশাের জীবনের শিক্ষাগুরু যুক্ত কিরণ চন্দ্র ঘােষ মহাশয়ের কথা। বহু দুঃখক্লিষ্ট জীবনের অন্তরালে যা কিছু সুন্দর ও শিব তার প্রথম আভাস পাই শ্ৰীযুক্ত কিরণ বাবুর নিকট থেকেই। আর সেই সঙ্গে মনে পড়ে কলা-লক্ষ্মীর বরপুত্র আমার অগ্রজ-প্রতিম শ্রীযুক্ত নির্মলেন্দু লাহিড়ী মহাশয়কে। আমার পক্ষে কোনাে দিনই নাটক রচনা সম্ভব হত না নির্মল বাবুর স্নেহ ও সাহচর্য যদি না পেতাম। আমার এই প্রথম নাটকখানি অভিনয়ের জন্য কিন্তু সম্পূর্ণরূপে দায়ী প্রযােজক শ্ৰীযুক্ত কালীপ্রসাদঘােষ মহাশয়। গতীর্থের সঙ্গে কালীপ্রসাদ Jy০ বাবু কেবল প্রযােজক হিসাবেই সংসৃষ্ট নন; তিনি এর রচনাধারারও আমূল সংস্কার করেছেন। বহুস্থানে স্বরচিত অংশ যােজনা ক'রে নাটকখানিকে রসসমৃদ্ধ করেছেন। বাঙ্গলাদেশ থেকে হাজার মাইল দূরের এই প্রবাসী নাট্যকারের পঁচিশ বছর বয়সে লেখা প্রথম রচনাকে তিনি যে স্নেহের চক্ষে দেখেছেন সে জন্যে মৌখিক ঋণ স্বীকার করে তাঁর স্নেহ প্রতিকে আমি অবমাননা করব না। গয়াতীর্থ অভিনয়কে সৰ্বাঙ্গ সুন্দর করবার জন্যে মিনার্ভার কর্তৃপক্ষ মুক্তহস্তে অর্থব্যয় করেছেন। মঞ্চসজ্জার ভার নিয়েছেন বর্তমান যুগের শ্রেষ্ঠ মঞ্চশিল্পী শ্ৰীযুক্ত পরেশ চন্দ্র বসু, নৃত্য পরিকল্পনা করেছেন নৃত্যগুরু শ্ৰীযুক্ত সাতকড়ি গাঙ্গুলী এবং সঙ্গীতে সুর যােজনা করেছেন সেই গীতাচাৰ্য কৃষ্ণচন্দ্র যাঁর মধু- নিন্দী সুরধারায় আজ সারা বাঙ্গলাদেশ অভিসিঞ্চিত। এদের সবার উদ্দেশে এবং মিনার্ভার সমস্ত নট-নটী, যারা আমার মানসী কল্পনাকে পাদপ্রদীপের আলােকে রূপায়িত করেছেন—তাঁদের স্মরণ করে- এই হাজার মাইল দূর থেকে আমার মুগ্ধ মনের অভিবাদন জানালাম। } নাট্যকার। ১৮ই জুন, ১৯৩৭ বিঃ দ্রঃ-প্রথম অঙ্কের প্রথম দৃশ্যে [] বন্ধনীযুক্ত অংশগুলি পাঠ-সৌকৰ্যার্থ রক্ষিত হইয়াছে -অভিনয়ে পরিত্যক্ত হয়।

প্রথম আভনয় লজনীৱ পাত্রপাত্রীগণ। সত্ত্বাধিকারী অধ্যক্ষ ৮) সুরশিল্পী মঞ্চশিল্পী নৃত্যাচাৰ্য্য ১) মঞ্চ তত্ত্বাবধায়ক শ্ৰীযুক্ত সলিল কুমার মিত্র বি, কম, জ্ঞানেন্দ্র কুমার মিত্র কালীপ্রসাদ ঘােষ বি, এ, সি, কৃষ্ণচন্দ্র দে পরেশ চন্দ্র বসু (পটলবাবু) সাতকড়ি গঙ্গোপাধ্যায় (কড়িবাবু) যতীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ভক্তিবিনোদ বিমল ঘােষ ও শ্ৰীযুক্ত জ্ঞান বসু শ্ৰীযুক্ত বিদ্যাভূষণ পাল ধীরেন্দ্র নাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সন্তোষ দাস (ভুলুবাবু) জীতেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী ললিত মােহন বসাক সতীশ চন্দ্র বসাক স্মারক হারমােনিয়ম বাদক বংশীবাদক পিয়ানােবাদক কর্পেট বাদক বেহালা বাদক সঙ্গতকারী আলােক পরিচালক মন্মথ নাথ ঘােষ রূপ সজ্জাকর নন্দলাল গঙ্গোপাধ্যায় ০) এপ্লিফায়ার বাদক 0) দুলাল মল্লিক মহাদেব रेख বঙ্কিম চন্দ্র দত্ত। গােপাল চন্দ্র দাস দে পঞ্চানন চট্টোপাধ্যায় রবীন্দ্র নাথ রায় চৌধুরী প্রফুল্ল কুমার দাস (হাজুবাবু) মুরারী মুখােপাধ্যায় (বাণীবাবু) জয়ও যম পবন । উমাপদ বসু } সূৰ্য্য শ্ৰীযুক্ত জয়নারায়ণ মুখোপাধ্যায় নারদ মদন শ্ৰীমতী সবিতা গয়াসুর শ্ৰীযুক্ত শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দীপ্তজি কামাখ্যা চরণ চট্টোপাধ্যায় চিত্রাঙ্ক সুশীল কুমার ঘোেষ কপিঞ্জল কুসুম কুমার গােস্বামী দধিমুখ রণজিৎ রায় শিষ্যগণ, গ্রামবাসীগণ ও অসুরগণ-গােপাল ভট্ট, বিষ্ণু সেন, গােষ্ঠ ঘােষাল, অশ্বিনী মুখােঃ, মণি চট্টো, অমূল্য মুখখাঃ, শরৎ সুর, বিজয় মিত্র, সন্তোষ বন্দ্যো, ননী বন্দ্যোঃ, কালী মজুমদার, রতন সেন, নলিন বাগ, সদানন্দ ঘােষ, সুকুমার। শ্ৰীম বেলারাণী স্বর্গ ল জ্যোতি ধরিত্রী রাধারাণী উর্বশী রাজলক্ষ্মী (খেদী) রতি শেফালিকা সাগরিকা ও ইলা তারকবালা (লাইট) গয়ারের মাতা নিভাননী কলাপী করুণাময়ী পদ্মমণি দুনিয়াবালা সাগরিকার সহচরী তারকবাল (ছোট) নর্তকীগণরাজলক্ষ্মী, তারকদাসী, তারকবাল। (ছােট), রাণীবালা, রেণুকা, মুকুল, বকুল, দুনিয়াবালা, দুনিয়ারাণী, রবি, সাবিত্রী, সুশীলা, পটলমণি, মুক্তারণী দুর্গারাণী, প্রভা, ইন্দু, শিবানী, লতিকা, হাসি, পারুল, রেপু, আশা, রাণীবালা, নন্দরাণী, সবিতা, সরসী, মানদা, রাধারাণী ইত্যাদি । 3) ০) 3 ১)

WAKARUHA HIWKAH.
LIERARE
t:19.
গয়াতীর্থ
প্রথম অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
সমুদ্রের তলদেশ -সাগরিকার জল-ভবন ।
মান-কন্যাদের গীত।
নীল সাগরে ভেসে আসি অতল তলে যাই ।
প্রবাল পুরীর স্বপন মায়া আঁখিতে বুলাই।
জোয়ার আসে সাগর জালে আকুল করে কূল,
সেই জোয়ারে ভেসে মােরা দুলি দোদুল দুল।
জোয়ার আসে জলবালার দেহের সাগরে,
মৃণাল বাহু বাধতে আকুল নবীন নগরে।
কে তুমি গাে সােণার নাগর, কেমন তােমার ছাদ,
কোন সাগরের কুলে থাক, কোন গগনের চাঁদ।
প্রবাল খাটে শুতে দিব, মরকতে দীপ জ্বালিব,
মৃণাল বাহু বিছিয়ে দিব, তােমায় যদি পাই

( দৃশ্যন্তির)
সমুদ্রের উপরিভাগ—সম্মুখে বেলাভূমি ।
( জলমধ্য হইতে সূৰ্য্য ও মীন-কন্য। সাগরিকার আবির্ভাব।)
সূৰ্য্য।
সূর্য।
প্রিয়া, এবার বিদায় দাও;
রক্তবর্ণ আলোক ছটায় উদ্ভাসিয়া নিখিল জগৎ
উদয় শিখরে মম হবে অধিষ্ঠান।
সাগরিক। কেন ? এখনো তো মধুরাতি হয় নাই শেষ ।
এখনাে ফুটেনি ফুল, ভাঙ্গে নাই তারার স্বপন
এ সময়ে কে বা য!বে আমারে ফেণিয়া ?
না-না প্রিয়তম, অরাে কাল রহ ;
চাণকাল রহি এই জলতা প্রবাল শয়নে
আকণ্ঠ করিয়া তৃপ্ত ভুঞ্জ মোর অধর মদির।
অনেক ভুঞ্জেছি প্রিয়া ;
স; রা নিশা তোমার ভবনে বাপিয়াছি আনন্দ উৎসবে
দিয়েছিলে সুখ শব্যা সুপ্ত মধুর
মরাল মিথুন আঁকা পা উপরি ।
তুমি গেয়েছিলে গান, মীন-কন্যা শত সহচরী
জল-তরঙ্গের তালে নাচিয়া নাচিয়া
বিভ্রম আনিয়াছিল নয়নে আমার।
হে প্রেয়সী, তৃপ্ত আমি—তৃপ্ত আমি সেবায় তােমার।
তব উপহার
মকর কেতন চূড়া এই হের সযতনে
রেখেছি ললাটে। লীলা কমলের মালা

প্রথম দৃশ্য ] গভীর্থ সংগ। সূর্য্য। দেখে চেয়ে এখনো এ কণ্ঠ 'পরে সানন্দে গুলিছে। তই যদি হয়, সত্য যদি ভাল লাগে মের উপহার, ভালাে লাগে যদি মাের প্রণয় গুঞ্জন তবে কেন যাবে প্রিয়তম ? পুষ্পমাল্য হয়েছে মলিন? মধু তার গেছে কি ঝরিয়া ? নাও নাও তবে নব মাল্য অশ্রু ধৌত শুভ্র সুকোমল নাও তব প্রের্দিকার নব উপহার। ক্ষান্ত হও সাগরিকা, নব মাল্য আর নাহি চাই । বৃজনী বিগত হ'ল ঐ শােনাে-শোনাে- দিকে দিকে জাগে মোর আগমনী গান- পত্র পুপ পল্লব শৰ্মরে। ওই হের যজ্ঞ-ধূম-অর-নয়ন তপস-কুমারী ঊষা আনে মাের উদ্বেধন মাঙ্গলিক ভার। যেতে হবে—যেতে হবে উদয় শিখরে স্বর্ণ রপে বসিতে এখনি।] প্রিয়তমা ছিঃ ! নিতান্ত বালিকা সম এ কি তব ব্যবহার অতি বিপরীত ? বাধা দাও কর্তব্য সাধনে। মহাকাৰ্য্য সম্মুখে আমার কাজ-শুধু কাজ । সাগ। সূৰ্য্য। সা।

৪ পান্নাতীর্থ [ প্রথম তা সূৰ্য্য। এই যে বেদনা মোর, এই যে মিনতি সারা-মৰ্ম্ম-নিপীড়িত, এই মোর তপ্ত আঁখি-জল- এ কি তবে কিছু নয় ?। অনন্ত কাজের মাঝে এর কি গাে এতটুকু স্থান নাই প্রিয় ? [বাধিনু—বাঁধিনু তোমা মৃণাল বন্ধনে ; দেখিব নিষ্ঠুর, এ বন্ধন ছিন্ন করি কেমনে পালাও। মৃণাল বন্ধন!] মুগ্ধা নারী আঁখিজল আর ওই অতি ক্ষীণ বাহুর বন্ধনে বাধিয়া রাখিতে চাও উদয় ভাস্করে! হায় হায় এত ভীরু, প্রেম বশে এমন বিবশা করি কেন তােমা রচিলেন ধাত ! ভেবেছিনু বলিব না তেম- কিন্তু আর তাে গোপন করা চলে না সে কথা । শোনাে সাগরিকা—দেবেন্দ্রের আজ্ঞা বাহি এসেছিল অলক্ষ্যে পবন-ক’য়ে গেল- ক্ষীরােদ সাগর বাস আজি হ'তে সমাপ্ত আমার, শেষ লগ্ন আজি প্রিয়া মধু যামিনীর। প্রিয়তম, একি কথা-একি কথা শুনি তব মুখে শেষ নিশাআজি শেষ নিশা মধু মিলনের ! আর আসিবেনা তুমি ক্ষীবােদ সাগরে । দিনান্তে গোধূলি লগ্নে ক্লান্ত হাসি হেসে- আর আসিবে না মাের চুম্বন মাগিয়া জলতল প্রবাল মন্দিরে। সাগ। .

প্রথম দৃশ্য ] গয়াতী সূর্য। মিলন সঙ্গীত মোর, বরমাল্য গাঁথা, জীবন দেবতা পায়ে প্রণয় অঞ্জলী শেষ—শেষ—চিরতরে শেষ হবে আজি ! -না, একি কথা? নহ তুমি এমন নিষ্ঠুর প্রিয় মাের নহে কভু এমন ষণ- নিরুপায়—নিরুপায় সাগর নন্দিনী বসবের আজ্ঞা পলি আনত মস্তকে ; বাসবের আজ্ঞাবহ আমরা দেবতা। সৃষ্টির রক্ষণ হেতু যন্ত্র-পুত্তলিকা সম কৰ্য্য করে যাই। অন্তরের ব্যথা, প্রেম, প্রিয়ার মিনতি বিচলিত করে যদি দেবতার মন, কঠোর কর্তব্যে তার ঘটিবে বিচ্যুতি, সৃষ্টি হবে আঁধারে বিলীন। তাই পাষাণে বেঁধেছি হিয়া ; পাষাণ পাযণ সমান তাই দূর দেশে চলিলাম প্রিয়।। প্রিয়তম, প্রিয়তম—জীবন বল্লভ, নানা পরিহাস—পরিহাস করিতেছ তুমি ? নহে পরিহাস-কহি সত্য কথা শােনাে মৰ্ত্ত নিবাসিনী নারী, আমরা দেবতা নারী সনে প্রেম, সে কেবল আমাদের ক্ষণিক বিলাস-পলকের আনন্দ বিভ্রম । স্বাধীনতা দেবের কোথায় ? নিয়ম তান্ত্রিক মােরা যন্ত্র পুত্তলিকা। সাগ। সূর্য।

গয়াভীর্থ [ প্রথম অঙ্ক সাগ। দেবতা ভুলিয়া যায় দিবালোকে নিশার স্বপন বিমলিন মালা রাত্রিশেষে ছুড়ে ফেলে দিয়া, চ'লে যেতে হয় তারে নিয়ম পালিতে। ভুলে যাও জলবালা, ভুলে যাও অতীতের কথা, ভুলে যাও দেবতার ক্ষণিক প্রণয়— ভুলে যাব-ভুলে যাব প্রণয় তােমার ! দীর্ঘ এক বর্ষকাল প্রতি রাত্রি মিলনের পরে আজ তুমি হেন কথা করে উচ্চারণ ? যৌবনে প্রস্ফুট দেহ অকলঙ্ক কুমারী হৃদয় নারীত্বের শ্রেষ্ঠ গৰ্ব্ব, শ্রেষ্ঠ রত্ন সতীত্ব ভূষণ একে একে তব পদে দিমু উপহার পরিবর্তে তর- আজ তুমি কহ কিনা ক্ষণিক বিলাস, মুহুর্তের মত্ততা কেবল ! নির্লজ্জ পাষাণ প্রাণ, নির্মম দেবতা, এই যদি মনে ছিল তব কেন তবে এসেছিলে মর্ত্যভূমি নিবাসিনী বালিকার কাছে? কেন তবে কাম লুব্ধ নয়ন মেলিয়া চেয়েছিলে অকলঙ্ক কুমারীর পানে ? লজ্জাহীন, কামুক, লম্পট , না ক্ষমা করাে, হয়েছি উদ্ধত কি বলিতে কি বলেছি, ক্ষমা করাে জীবন দেবতা *প্রথম দৃশ্য ] গয়াতীর্থ ৭ সূর্য। === তুমি জাননা তুমি জাননা প্রভু, তােমার চরণতল আশ্রয় ব্যতীত অভাগিনী বালিকার স্থান নাহি কোথা । মুছ আঁখি—মুছ আঁখি সাগর তনয়া। দেব আজ্ঞা শিরে ধরি বর্ষকাল বাপিয়াছি সুখ নিশা তােমার ভবনে। দেব অজ্ঞা শিরে ধরি পুনরায় লইনু বিদায়। এই এক বর্ষ ধরি দেহের ভৃঙ্গার হতে যত সুধা মৰ্ম্মে মোর করেছ সিঞ্চন নিভৃতে-নিভৃতে রহিবে তাহা নিয়ত সঞ্চিত সঙ্গোপনে নিত্যকাল হয়তাে বা তাহারই স্মরণে চিত্ত মাের ক্ষণে ক্ষণে উঠিবে গুমরি, তবু নিরুপায় প্রিয়া চলিতে হইবে। আমারে বিদায় দাও, মুছ অশ্রু, কাদিও না প্রিয়া । ভাল, তবে তাই হোক—তাই হােক তবে চলে যাও দেব অংশুমালী, কঁদিব না—কঁদিব না আমি ধরণীর অতি ক্ষুদ্র জীব- কি শক্তি আমার আছে—কোন পুণ্য আছে যার বলে বিশ্বপূজ্য দেবতারে রাখিব ধরিয়া ? যাও প্রিয়তম, আমার নাহিক কোনাে ক্ষোভ, কিন্তু হে দেবতা বহ্নি দীপ্ত তেজে তব উদ্ভব যাহার সাগ।

গাভী
[ প্রথন অঙ্ক
সূর্য।
তব দেহ-দ্যুতি খেলে ঘর কলেবরে—
যে তোমার লােকতীত সৌন্দর্য্যের দিব্য প্রতিকৃতি-
এই সেই নন্দিনী আমার ।
ইহারে গ্রহণ করে। প্রার্থনা আমার,
করিও পালন এরে দেবী রূপে দেবতা সমাজে।
প্রিয়া-প্রিয়া, দানের অতীত বস্তু করিয়া প্রার্থনা
বিকল করোনা মােরে ।
কন্যারে তােমার দেবীরূপে স্বর্গলোকে
কেমনে লইব ? দেবত্ব সে সুদুল্লভ ধন।
তপস্যার হােমাগ্নিতে তিলে তিলে দেহ বিসজ্জিয়।
তবে তাহা করায়ত্ত্ব হয়।
অন্য বর—অন্য বর বাঞ্ছা থাকে যদি
অসঙ্কোচে জানাও আমারে,
দেবত্ব প্রদান করা অতি অসম্ভব।
, না, হ'য়ােনা নিষ্ঠুর প্রিয়ত',
আমি যাবাে অনন্ত নরকে
ক্ষতি নাই; কিন্তু দেব,
কেমনে ভুলিয়া যা ও
তুমি পিতা এ শিশুকন্যার ! কে ইহারে
দেব পুরী হ'তে তবে করিবে বঞ্চিত
বৃথা বিতণ্ডায় শুধু উদয়ের কাল বয়ে যায়
আর অপেক্ষিতে নারি।
মাের কথা প্রতীতি না হয়,
জিজ্ঞাসহ আহ্বানিয়া দেবতা সমাজে।
সাগ।
;
সূৰ্য্য।

প্রথম দৃশ্য ]
গভী
সাগ।
কেমনে প্রীতি হবে হেন অসম্ভব ?
কোথা তুমি ত্রিংশ কে। টী দেবতা পূজিত
স্বর্ণাধিপ দেবেন্দ্র বাসব !
(ইলের আবির্ভাব )
ইন্দ।
কই দেব, সদ্যোজাত এই কন্য।
জন্ম যার দূতিমান ভাস্করের তেজে-
তারে কি লবে না তব দেবতা সমাজে ?
উন্মদাতা দেবত ভাস্কর,
কিন্তু মত। মৰ্ত্ত-নিবাসিনী ।
দেবকুলে দেবীমাঝে কি প্রকারে তর হবে স্থান ?
দেবত করেছে সৃষ্টি বিশ্ব-চরাচর,
তাই বলে বিশ্বের সকল জীব
কভু কি গো দেবত্বের পর অধিকার ?
কেন নাহি পাবে ?
যে দেবতা নিজে নাহি পারে কভু দেবতা জিতে
ধিক—ধিক তার শক্তির গৌরবে ।
না—না তব বাণী অতি ভ্ৰাত্মক,
বিশ্বস করিতে নারি।
কোথ। তবে বিশ্বের সুচির সী-
ব্রহ্মশ্বাস অধিষ্ঠাতা দেবতা পবন ।
সাগ
( পবনের আবির্ভাব।
তুমি ক—তুমি কহ স্বরূপ আমারে?

গয়াতীর্থ
[প্রথম অঙ্ক
সাগ।
দেবরাজ মহাপ্রাজ্ঞ বাসব যে কথা
বলিলেন তােমারে এখনি
সে-ই মহা সত্য, কন্যা তব
দেবপুরে প্রতি-গৃহা নহে।
যড়যন্ত্র—ড়যন্ত্র করেছ সকলে।
যাও তুমি দেবতা পবন, তব কথা
কিছু আমি চাহিনা শুনিতে।
দেখা দাও—দেখা দাও এ বিশ্বের অন্তিম আশ্রয়
ধৰ্ম্মরাজ কালপতি যম !
(যমের আবির্ভব )
এম।
সাগ।
মি।
কহ দেব, বাঞ্ছা মোর হইবে পূরণ ?
সাগর নন্দিনী
বলবল তুমি, দেব অংশীভূত এই দুহিতা আমার
দেবপুরে ভিবে আশ্রয় ?
লভিবে আশ্রয় !
চরাচরে যত জীব মৃত্যু-অন্তে যমপুরে
লভয়ে আশ্রয়। তোমার নন্দিনী
সে-ও পাবে। তবে তাহা মৃত্যু-অন্তে,
আপাততঃ নহে।
বিদায়—বিদায় প্রিয়।
পার যদি ক্ষমা করাে মােরে।
সূর্য্য।
( সূর্যের উদয়গিরিতে অধিষ্ঠান ও তাহার রথ-চক্র ঘুরিতে লাগিল )

থম দৃশ্য ] গয়াতীর্থ ১১ ইল। ও একি হল—একি হল! সকল বাসনা মাের সকল কামনা, জীবনের সর্ব সাধ—ধ্যান-লব্ধ তপস্যার সৰ্ব্ব শুভফল—মুহুর্তেকে চূর্ণ হয়ে গেল ! মীন-কন্যা, মনক্ষোভ কর পরিহার । আমি ইন্দ্র করি আশীৰ্বাদ- তোমার নন্দিনী হবে অনিন্দ্য সুন্দরী বিশ্বলােকে নারী-শিরোমণি। বিশ্বলোকে নারী-শিরােমণি—অনিন্দ্য সুন্দরী। চমংকার---চমংকার ! তার পর একদিন বসন্ত বাতাসে উদভ্রান্ত দেবত এক পথহারা হয়ে বক্ষে তরে বাহুপাশে বঁধিয়া লইবে। পুনরায় একদিন কর্তব্য ব্যাধিতে শুষ্ক মাল্য সম তারে ফেলে দিয়ে যাবে। চমৎকার—চমৎকার ! প্রিয়া - -না, হবেনা-হবেনা তাহা। কোথা যাও নির্মম দেবতাকুল ইহকাল, পরকাল, সৰ্ব্বকাল বিচূর্ণিত করি । দাড়াও আকাশ পটে। স্বেচ্ছাচার রথ চক্র তবকালচক্র করুণা-বিহীন সতীত্বের দীপ্ত তেজে এক সাথে হউক স্তম্ভিত। ( চক্র নিশ্চল হইল)

গন্নাথ
[ প্রথম অস্ক।
৫।
দৈবগণ। একি ! একি ! একি মহা আশ্চর্য ঘটন!
সাগ।
শেন'-শােন’ ওহে দেবগণ,
মহাশ্চৰ্য্য আরাে কিছু করহ শ্রবণ ।
সমস্ত হৃদয় দিয়া পূজিয়!ছি যেই দেবতরে,
দেহ, প্রাণ, মন, সত্য-ধৰ্ম্ম সতীত্ব ভূষণ
নিঃশেষে যাহার পদে দিয়াছি অঞ্জলী-
মৰ্ত্ত-নিবাসিনী আমি এই অপরাধে
যে দেবতা আমার সে প্রেম-অর্ঘ্য তুচ্ছ করি যায়,
তাহার রথের চক্র স্তম্ভিত করিয়া
উচ্চকণ্ঠে কহি শোন’ সবে,
নহি আমি স্বর্গ বীরাঙ্গনা--
উর্বশী, মেনকা, রম্ভা,
ক্ষণিক বিলাস-বশে
দেবতারে করি নাই এ দেহ বিক্রয় ।
পতি জ্ঞানে অস্টিয়াছি দেবতা ভস্কয়ে।
আমার নন্দিনী হবে দেবী কুলে—দেবী শিরে:গণি,
ইন্দ্রাণী পূজিবে তার ধরিয়া চরণ।
মীনকন্যাগণ। সখি, সখি—
সাগ।
তাও যদি নাহি হয়,
আরো অসম্ভব—আরাে অসম্ভব ক করিব নিশ্চয়।
মাতৃত্ব করিব হত্যা।
উন্মাদিনী ছিন্নমস্তা সম
আপন বক্ষের ধন-আপন সন্তান
নিজ হাতে আছাড়িয়া ফেলিব ও পাষাণ ফলকে।

প্রথম দৃশ্য ]
গভীর্থ
নী-ক-গণ। সখি, সখি, উন্মাদিনী হইলে কি শেষে ?
কে আছ-কে আছ করুণাময়,
রক্ষা করে জননীরে—রক্ষা করে শিশুর জীবন।
সগ। ডাক ডক্ ওরে উচ্চকণ্ঠে ড লাে সজনি
কে অছ গাে শক্তিমান,
চূর্ণ কর দেবতার গর্ব অহঙ্কার।
ছুটে এসাে রক্ষা করে শিশুর জীবন ;
নহে অনন্ত প্রলয় হ’ল--
বিশ্ব গেল প্লাবনে ভাসিয়া
মাতৃ হতে হত্যা হ’ল আপন সন্তান।
( শিশুকে নিক্ষেপ করিবার জন্য তুলিয়া ধরিল
অকস্মাৎ গয়াসুরের প্রবেশ )
গর।।
ভয় নাই-ভয় নাই না
শিশুহত্যা করিতে হবে না,
সন্তান তুলিয়া দাও মাের বহু মাঝে-
দাও মোর তৃষাতুর ব্যগ্র বক্ষ 'পরে।
কে তুমি-কে তুমি !
পরিচয়ে কিবা প্রয়োজন ?
নহি দেব নন্দন-নিবাসী।
মর্তের মাটীতে জন্ম, মরদেহধারী,
মৃত্তিকা-মায়ের বক্ষ-সুধা করিয়াছি পান,
তাই শিখিয়াছি মাতৃত্বেরে করিতে সম্মান;
মাতৃ অপমান কভু না সহিব।

১৪ গাভীর্থ ; [ প্রথম অঙ্ক শুন দেবগণ অমর নিবাসী, যুগ-যুগান্তর ধরি ধরিত্রীর স্নেহ অঙ্কে লভিয়া জনম দেবতার গৰ্ব খর্ব করিয়াছে যারা সেই সে দানব কুলে জনম আমার গয়:সুর নাম। মাতা, এ সন্তান মােরে দাও করিব পালন । নিরানন্দ গৃহে মোর এ শিশুর হাসি জ্বালাইবে উৎসব-প্রদীপ। মৰ্ত্ত নিবাসিনী তুমি মাতা তোমার সন্তানে দেবী আখ্যা দিল না দেবত, দেবী যদি নাহি হয়—হইল দানবী, কি গতি তাহাতে? দানবী নামেতে কন্যা আজি হতে হবে পরিচিত। সাগ। তাই হােক। ( ; দন} নাওনাও নিয়ে যাও সন্তানে আমার- নিয়ে যাও শিশু কন্যা, তার সাথে নাও অক্ষয় এ বৰ্ম আর শর শরাসন। আমার মাতৃত্ব শক্তি এই অস্ত্র-বৰ্ম্ম-মাঝে প্রচ্ছন্ন রহিল। অনাগত ভবিষ্যতে মৰ্ত্ত ও অমর লোকে হবে মহা বিপ্লব সূচনা হেতু তার নন্দিনী আমার।

প্রথম দৃশ্য ] গভীর্থ গায়া নাও-নাও হে দানবপতি- দেবযুদ্ধে নাও তুমি মা’র আশীর্বাদ ( অস্ত্ৰ বৰ্ম্ম দান ) দাও-দাও মাতা, দাও আশীৰ্বাদ। সন্তানেরে শক্তি দিয়ে পশ মাল সলিল মন্দিরে, চলিলাম কন্যা লয়ে আপন ভবনে। যাও-বাও হে অমরাবতী নিবাসী দেবতা তোমর! অমরাবতী পুণ্যধাম মাঝে সানন্দে বিশ্রাম করাে আরাে কিছুদিন। এবার চলি ফিরে মর্ত্যবাসী প্রণও দানব- মাতৃশক্তি আশীৰ্বাদ মস্তকে লইয়া ; সে শক্তির পরিচয় যথাকালে অবশ্য লভিবে।

দ্বিতীয় দৃশ্য
বন-বালাদের গীত।
না মাগাে মা-ওমা নন্দরাণী, দেখ মা চেয়ে,
তোর আঙিনায় তোর কোলে মা কে এসেছে ।
আকাশ হ'তে চঁাদের টুকরা খসে পড়েছে ।
ওমা, নে মা কোলে-
ওমা নে মা কোলে কালো ছেলে কলো নাণিকপার
কোন আৰাগী রইল বেঁচে এমন মাণিক হারা?
হাত বাড়ায়ে সোণার নিধি হেসে উঠেছে,
হাসি দেখে বিশ্ব ভুবন নেচে উঠেছে ।
প্রস্থান।
( সাগরিকার শিশুকন্যাকে লইয়া গয়াসুর 'ও 'তংপশ্চাতে
গয়াসুরের মত ও কলাপীর প্রবেশ।)
গয়া।
মা-মাগাে-জননী আমার ।
হের মাতা-
কাহারে এনেছি আজি
তব পদে দিতে উপহার।
একি ! কোথা পেলি সদ্যোজাত শিশু?
গয়-গয়!
কি সুন্দর শিশু মাগাে !
গয়া-মা।
কলাপী।

দ্বিতীয় দৃশ্য ] গাভীর্থ ১৭ “য়া। দও শিশু মোরে আশ্রম-বাসিনীগণে দেখাইয়া আনি। [ শিশুকে লইয়া প্রস্থান। মাগাে ! দেবতার অবিচার সহ্য নাহি হ’ল । ক্ষীরােদ সাগর তীরে তপোভঙ্গে দেখি নির্যাতিত রমণীর মাতৃত্ব কাদিছে । অবিচারে মাতৃত্বেরে করি অপমান দেবতা ফেলিয়া যায় সদ্যোজাত শিশু! আমি তারে বক্ষপুটে তুলি সমাদরে তাই মাতা এনেছি কুড়ায়ে। দেবতার সহ দ্বন্দ্ব । কই পুত্র, দেব সনে সাধিয়াছ বাদ ? ইথে কি বিস্ময় মাত ! পক্ষাপক্ষ নাহি জানি জানিবার নাহি প্রয়োজন। আছিলেন দেবেন্দ্র বসব মৃত্যুপতি যম, পবন, অরুণ, হেরিলাম সমভাবে সবে নিষ্করুণ। তাই—তাই- একি কাপিতেছ তুমি ? চক্ষে তব নামে জল ধারা ? মাতা-মাতা- কাছে আয় ওরে বংস, আরাে কাছে আয়। *য়-মা। = গয়া-মা।

১৮ গভীর্থ [ প্রথম অঙ্ক আমার বুকের মাঝে আয় মাের চঞ্চল বিহগ, দীর্ঘ দিন তাের কাছে যে কাহিনী রেখেছি লুকায়ে- সেই কথা আজ তােমা কব প্রাণাধিক !- গয়া। গয়া-মা। গয়া। এয়া-মা। জানাে বৎস, বীরত্ব-মহিমা-দীপ্ত দৈত্যকুলে উবে তোমার। কিন্তু নাহি জানাে-- পিতা তব দৈত্যপতি ত্রিপুর অসুর ত্রিপুর অসুর ! ওই বিন্ধ্য অদ্রি সম সমুন্নত দীর্ঘ বরংপু- ললাটে জ্বলিত তঁার মধহ্নের শত দীপ্ত রবি, একাদশ রুদ্র যেন রে সে হ'য়ে— সে দেহের প্রতি রােমে উৎসারিত তেজঃপুঞ্জ সদ। রণ-সাজে মহাবীর ব্যজিত ঘন পদ-চাপে কঁাপিত মেদিনী, সিন্ধু-জলে উঠিত কল্লোল, আকাশ করিত ভয়ে বক্তবর্ণ বিদ্যুৎ বর্মন। এত শক্তি, কিন্তু হায় কি ফল ফলিল ? বিশ্বজয়ী হেন শক্তি দেব-রোষে সব ভস্ম হল। দেব-রোষে ! কই মাতা, কহ সবিশেষ। কি কহিব ? এখনাে স্মরণে মাের ভয়ে কঁপে বুক, ওষ্ঠ জিহ্বা শুষ্ক হয়ে আসে। গয়া। গয়া-মা।

দ্বিতীয় নৃশ্য ]
গন্নাভী
দেব রণে নাতিলেন অসুর সম্রাট
মনে হ’ল বিশ্বে বুঝি অমিল প্রলয় ।
গর্ভে মাের সে সময়ে আছিল সন্তান--
তাহার কল্যাণ চাহি দুরু দুরু বুকে
নারায়ণ মন্দিরেতে লই আশ্রয় ।
রাত্রিদিন বসি যােগাসনে-
ইষ্টদেবে এক মনে জপিতে লাগি
জপিতে জপিতে অকস্মাৎ
দেখিনু নয়নে-
যেন-যেন—সেই বিগ্রহ হইতে
গয়—গয়—পু
গায়।
মাতা-মাতা-রোমাঞ্চিত কি হেতু জননী--
স্বেদজল কেন ঝরে পড়ে ?
কহ মােরে-বিগ্রহ হইতে
গয়া-মা। অপূর্ব সুন্দর এক ঘন নীল স্নিগ্ধ জ্যোতিঃ-শিখা
ধীরে ধীরে দেহে মাের করিল প্রবেশ,
ধীরে ধীরে প্রতি রশ্মি তার
গর্ভস্থ শিশুর মাঝে হ'ল সঞ্চারিত,
মা-মা, বলে দেন শিশু ডাকিল আমারে
আনন্দে আচ্ছন্ন হয়ে জ্ঞানহারা পড়িনু ভুলে ।
গয়া। তারপর--তারপর মা ?
গয়া-মা। তারপর ? মুচ্ছা ভেঙ্গে গেল মাের
দৈত্যপুর-নারীদের দীর্ণ হাহাকারে;
চেয়ে দেখি দাউ দাউ চিতানল উঠেছে আকাশে

২০ গভীর্থ [প্রথম অঙ্ক রণক্লান্ত দৈত্যনাথ ত্রিপুর অসুর অনল পালঙ্কোপরি চক্ষু মুদি আছেন পড়িয়া। দিব ঝাপ চিতানলে হ’ল আকিঞ্চন- কিন্তু ওরে শিশু, তুই-তুই মােরে ক্ষুদ্র বাহু-ডোের দিয়া বাধিয়া রাখিলি— সে বাঁধন ছাড়তে নারিনু ! ওরে পুত্র, তাের তরে যত ভয় মাের। গয়া। ত্যজ শঙ্কা জননী আমার । বিষাদ কি হেতু মাতা? মুছ আঁখি জল। অজ্ঞানে অবোধ প্রণে এতকাল দেবপূজা করিয়া এসেছি । অজি হ'তে নহে পূজা—দেব-হিংসা- দেবহিংসা হ’ল মোর জীবনের ব্রত। গয়া-মা। চুপ চুপ,—এই ভয়ে, তােরে নিয়ে রাজ্য ত্যজি এসেছি কাননে। এই ভয়ে মিথ্যা পরিচয়ে তােরে, এত কাল রেখেছি লুকায়ে ! দেবতার সনে বাদ ফল তার কোন কালে শুভ নাহি হয়। পুত্র দেবরণে মাতিও না তুমি। গয়। শঙ্কিত হােয়াে না মাতা ত্রিপুর নন্দন আমি, জন্মক্ষেত্রে মম রয়েছেন চক্রধারী নিজে নারায়ণ। প্রাণভয়ে, তুচ্ছ প্রাণভয়ে সন্তানে বারিবে মাতা কর্তব্য হইতে এই ভয়ে শুধু

দ্বিতীয় দৃশ্য )
গাভীর্থ
",
গয়া-মা। বুঝিয়াছি, দৈব বলবান।
দেবতার সহ বাদ দৈবের বিধান।
ক্ষুদ্রশক্তি আমি, কি সাধ্য আমার
নিবারিতে নিয়তির দুঘ্য বিধান।
পুত্র, আর নাহি দিব বাধা
দি অনুমতি করাে তব যাই। অভিরুচি।
অন্তিম প্রার্থনা মোর নারায়ণ পদে
চির জয়যুক্ত হোক জীবন তোমার।
গর।।
অন্তিম প্রার্থনা !
মাতা-না তা-
গয়া-মা। শোন্ বংস, শঙ্কিতা বিহী সন
পক্ষপুটে ঢাকি তোরে এতকাল ক'রেছি পালন
সন্তানের মুখ চাহি দীর্ঘ দিন ভুলিয়াছি পত্নীর কর্তব্য ;
আজি মাের কাৰ্য্য শেষ ।
মধ্যাহ্ন-ভাস্কর সম দীপ্তিমান দেখিয়া তােমারে
স্থাপিয়া তোমারে পুত্র জয়যাত্রা রথে
আজি আমি ইষ্টের চরণ স্মরি দেহ বিসজ্জিব।
গয়া। মা-মাগাে এ কি কথা-
একি কথা তাের মুখে পাষাণী জননী ?
জীবনের যাত্রাপথে একাকী ফেলিয়া
কোথা তুই যাবি পলাইয়া
গয়া মা। ওরে পুত্র, আর নয়
অন্তিম-সাধনে মাের ঘটায়ােনা বাদ ।
তোর চোখে অশ্রুধারা ঝরিতে দেখিলে

গন্নতীর্থ
[ প্রথম অঙ্ক
“য়া।
ইষ্টচিন্তা হই বিস্মরণ।
শেন গয়,
রাজ্য তোর বহুদিন আছে অরাজক।
হয়তো বা দৈতণ
দেশে দেশে কিরিতেছে তোমার সন্ধানে
স্বর্ণপাত্রে জয়ে তা পিতার মুকুট।
ত্যজি এই জীর্ণবাস–পাতার কুটীর,
ফিরে যাও দৈত্যপুরী মাঝে ।
পুণ্য অভিষেক অন্তে সিংহাসনে বসি
এক মনে করাে বংস জাতির কল্যাণ।
জাতির কল্যাণ !
শক্তিময়ী জননী আমার
তুমি যদি পার্শ্বে নাহি থাকো
জাতির কল্যাণ তরে শক্তি পাবে কোথা?
চল মাগাে,
মাের সাথে চল দৈত্যপুরে
অভিষেক উৎসবে আমার
রাজলক্ষ্মী হ'য়ে তুই বিতরিবি আশীৰ্বাদ-ধারা-
আশীর্বাদ করি হেথা হ'তে।
পুণ্য লগ্ন সমাগত-আর মােরে ডেকোনা সন্তান!
দূর হতে শুনি বুঝি ইষ্টের আহ্বান,
কি মধুর—কি করুণ ধ্বনি!
গয়-
শেষবার—শেষবার দেখে নিই তােরে।
‘গয়া-মা।
গয়,

দ্বিতীয় দৃশ্য ]
গয়াতীর্থ
কাছে আয়-প্রাণাধিক নোর ।
নারায়ণ-নারায়ণ ।
( সমাধিস্থ )
মাতা-মাতা-রাজরাণী তপস্বিনী মা জননী মোর ।
একি ।
অসাড় শীতল দেহ, নাহি বহে শ্বাস
এই কি মরণ তবে ?
চারিদিকে বেষ্টিয়াছে কি গভীর নিবিড় অপার ।
নাহি সূৰ্য নাহি চন্দ্র অলোকের রেখা !
কাল-নিশিথিনী ওই রুধিরাক্ত চামুণ্ডার বেশে
ফুৎকারে নিভয়ে দিল তারার প্রদীপ,
শ্ৰস্ত কেশপাশ মেলি
জীব-স্রোত দিল অবিরিয়া।
সেই ঘন অন্ধকার মাঝে,
ও কাহারা দলে দলে নৃত্য করি আসে?
কঙ্কাল-বিশীর্ণ দেহ, ছায়া-মূৰ্ত্তি-ধারী
বীভৎস গলিত মাংস দুর্গন্ধের ভারে
বাতাস বিষাক্ত হল
রুদ্ধ হয়ে গেল যেন শ্বাস ।
কে? কে তােমর ছায়া-মুৰ্ত্তিধারী ?
এ পবিত্র অঙ্গনের নিকটে এস না।
এই বায়ুস্তরে ফেরে
দেহমুক্ত মাতৃআত্মা মোর ;
দুষিত নিঃশ্বাস দিয়ে
এ বাতাসে অশুচি করাে না।

২৪ গভীর্থ [ প্রথম অক্ষ যাও–যাও—তবু সরিবে না? প্রতিফল নে রে তবে অবাধ্য কঙ্কাল। { ধনুকে বাণ যােজনা ও যমের প্রবেশ) যম। গয়া। ক্ষান্ত হও গয়াসুর ! সরণ কর তব কালান্তক শর। মৃত জীব-আত্মা’পরে, শমনের চির অধিকার। তাই আসিয়াছি জননীর আত্মা তব সঙ্গে লয়ে যেতে। জননীর আত্মা মম সঙ্গে লয়ে যেতে। হে পাষাণ, বোঝ নাকি সন্তানের প্রাণ? কি যে ব্যাকুলতা এই বক্ষ-মাঝে রাজে, কি যে মর্মান্তিক ক্লেশ সহয়ে সন্তান জননী বিহনে, নিৰ্মন দেবতা, বুঝি তার বিন্দুমাত্র অনুভূতি নাহি তব মনে। নহে, কেমনে হে ধীর অচঞ্চল স্বরে মৰ্ম্মঘাতী বাণী কৈলে উচ্চারণ মৃত জীব-আত্মা’পরে তব অধিকার। থাকুক সে অধিকার বাধা নাহি দিব, কিন্তু এক ভিক্ষা হে শমন সন্তানের মুখ চাহি, এই ভিক্ষাটুকু মােরে দেহ দান- জননীরে মাের আরও কিছুকাল—আরও কিছুকাল মৰ্ত্তাবাসে দাও গাে থাকিতে।

দ্বিতীয় দৃশ্য ] গভীর্থ যম। ? হাঃ হাঃ হাঃ। মর-জীব, স্নেহ-দুৰ্বলত-মাখা নয়না দিয়া দেবতারে চাহ গলাইতে অলঙ্ঘ্য শমন-বিধি লঙ্ঘন না হয় । ছাড় পথ শমনের’পরে নাহি করে অধিকার। শমনের’পরে নাহি ক অধিকার ? গয়া। তবে কেন-- যম। গুয়া। তবে কেন দেবতা সমাজ, হে শমন, রহিয়াছে অমর হইয়া । কেন কর নাই দেবতার’পরে তব সাম্রাজ্য স্থাপন ? ধৰ্ম্মরাজ তুমি? ধৰ্ম্মরাজ আমি। নিরপেক্ষ ভাবে করি জীবের বিচার। বিচর! কিসের বিচার ? নামান্তর দুর্বল পীড়ন। পাপীরে দানিয়া শাস্তি লভিছু প্রসাদ। কিন্তু কহিতে কি পার বন, কেন জীব পাপ পক্ষে হয় নিমগন ? তোমরা দেবতা- স্নেহ দুৰ্বলতা দিয়ে জীবেরে সৃজেছ পাপ শুধু পরিণাম তার । সত্য যদি চেয়েছিলে গভীর্থ [ প্রথম অঙ্ক *নি। গয়া। ধরমাঝে পুণ্যার্থী কেবল, কেন তবে কর নাই মর-জীবে দেবতার মত দৃঢ় অচঞ্চল ? কেন তবে দিয়েছিলে জীবের হৃদয়ে লোভ, মােহ, কাম অাদি পঞ্চ রিচয় ? জরা, মৃত্যু, শোক, তাপ, স্নেহ দুর্বলতা সে শুধুই মর-জীব তরে দেবতারে কেন নাহি হয় গো সহিতে বিন্দুমাত্র দুঃখ গ্লানি তার ! এ প্রশ্ন আমারে কেন? জিজ্ঞাস ধরে। জিজ্ঞাসিব রে- কিন্তু ধৰ্ম্মরাজ বলি আর তুমি না করিও ভাণ! পক্ষ-পাত-পক্ষপাতদুষ্ট তুমি ধৰ্ম্মরাজ ! দুৰ্ম্মতি দানব ! এত স্পর্ধা ? ধৰ্ম্মরাজে কহ কটুবাণী ? ফল তার যথাকালে অবশ্য ভুঞ্জিবি। ( প্রস্থানােত) ছাড়িবে না জননীরে তবু ? -না, ছাড়িব না কভু ! আমি যদি রোধি তব পথ ? কি সাধ্য তােমার ? অন্ধকারে আবরি নয়ন, এই আমি চলিলাম যমপুরী মাঝে। [ প্রস্থান। যম। গয়া। যম। গয়া।

দ্বিতীয় দশ ]
গভীর্থ
२१
অস্ত্র-অস্ত্র !
একি! কোথায় শমন ?
চলে গেল উপেক্ষা করিয়া ?
শক্তিহীন—শক্তিহীন
হেন শক্তিহীন করি কেন সৃজিলে অমরে ?
নারায়ণ! নারায়ণ !
(নারদের প্রবেশ)
নারদ।
নারায়ণ ! নারায়ণ !
একি! বিদারিয়া ঘন অন্ধকার
অকস্মাৎ জ্যোতির্ময় পরম প্রকাশ।
বিশদ বসন বাস, গলে উত্তরীয়,
করতি বীণা যন্ত্রে তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে
আপনি জননি ছন্দ নেচে চলে যায়-
৫ে বিচিত্র আবির্ভাব, কেবা তুমি-
কহ তব স্বরূপ দাসেরে ?
দেবর্ষি নারদ আমি।
দেবর্ষি নারদ, সেই হরি গুণ-গানরত
দেবস্তুত পুরুষ প্রবর!
প্রণিপাত-প্রণিপাত চরণে তোমার।
কহ ঋষি মর-জীব’পরে কেন এই অত্যাচার ?
কেন জীব সহে অকারণে?
কেহ নাহি শমনে বারিতে?
নারদ।
নারদ ।
নারায়ণ! নারায়ণ !

২৮
গাভী
[ প্রথম অঙ্ক
মর-জীব তরে মুক্তিমন্ত্র
শুধু নারায়ণ !
শোন বংস, তােমারে ধরিয়া গর্ভে
আর নিজ তপস্যার বলে
বিষ্ণু-ভক্ত মাতা তব
লভেছেন আদিদেব বিষ্ণুর করুণা ;
তাই যমদূতে বিতাড়িয়া ষ্ণুিদূতগণ,
এই মাত্র নিয়ে গেল মায়ে তব বৈকুণ্ঠ ভবনে ।
প্রভুর ইচ্ছায় বংস,
আমি এসেছিনু হেথা
যম প্রতি ক্রোধ শান্তি করিতে তােমার।
ত্যজ শােক হে দানবপতি।
কৰ্তব্য কঠিন অংঘনে তােমায়।
(নেপথ্যে—জয় দৈত্য সম্রাট গয়াসুরের জয়!
ওই ওই শােন’ জয়ধ্বনি ওঠে
আসিছে স্বণ তব সিংহাসনে বসতে তোমারে ।
নারায়ণ পদে রাখি মতি
নিরুদ্বেগে চলে যাও কর্তব্যের পথে।
আশীৰ্বাদ করি—সিদ্ধ হােক সঙ্কল্প তোমার।
চলিনু এবার বৎস,
পথে যেতে শুনাব মায়েরে
বীণা বন্ত্রে হরিগান নাচিয়া নাচিয়া।

দ্বিতীয় দৃশ্য )
গাভীর্থ
( নেপথ্যে জয়ধ্বনি—জয় দৈত্যকুলেশ্বরী রাজমাতার জয়।)
গয়া ।
মাতা-মাতা, দৈতকু-রাজেশ্বরী জননী আমার ।
সহস্র সেবক তব জয় বাদ্য রবে
আসিতেছে রাজপুরে ফিরায়ে লইতে।
একবারও জাগিবেনা মাতা !
( দৈত্যগণের প্রবেশ।)
দপ্ত।
কালে। জয় সম্রাট গয়াসুরের জয়।
কজি। পেয়েছি—পেয়েছি বহুকষ্টে পেয়েছি সন্ধান।
সম্রাট-সম্রাট। আর কেন তপস্বীর বেশ
আনিয়াছি রাজার মুকুট।
স্বহস্তে জননী তােমা এ মুকুট দিবেন পরায়ে
মাতা-মাতা! কোথা মাতা মহারাজ?
য়া।
নিদ্রাগতা-মাতা।
নিদ্রাগত!
হয়। নিদ্রাগতা ! চির নিদ্রাগতা
ঐ হের রাজলক্ষ্মী ধূলি-শয্যা 'পরে ।
সকলে। একি সর্বনাশ! মৃতা মাতা!
সম্রাট ! এসেছিনু মহানন্দে
অভিষেক করিতে তােমার ।
কিন্তু সে পরম লগ্নে-
গুয়া।
অভিষেক নহে মাের শুনহে সচীব,
রাজলক্ষ্মী জননীর অভিষেক আজি।
দীপ্ত।

গন্নাতীর্থ
[ প্ৰম অ
দৈত্যপণ,
সাজও চলন চিতা কৃষ্ণা-নদীতীরে ;
সহস্ৰ পুত্রের তপ্ত নয়ন সলিলে
রাতুল চরণ দুটী করাইয়া স্নান
জননীরে তুলে দিব অগ্নি সিংহাসনে।
স্বর্ণ দেহ পুড়ে পুড়ে ভস্ম হয়ে যাবে-
সেই ভস্ম নিয়ে সবে ফিরে যেও দৈত্যপুরী সাবে
অর তুমি মহারাজ ?
রাজ্যে নয়, পুনরায় পশিৰ কাননে।
যতদিন তপস্যার বলে
মম-জয়ী মহাশক্তি নাহি করি লাভ-~-
ততদিন রাজা নহি—বনচারী তাপস কেবল ।
দীপ্ত।
গয়া

তৃতীয় দৃশ্য
কপিঞ্জল ঋষির আশ্রম।
ভরবী, অষ্টক, করম, জয়দ্বল প্রভৃতি শিষ্যগণের প্রবেশ ।
জয়দ্বল। কি হে, তােমরা পূজোর আয়োজন না করে এখানে নিশ্চিন্ত
হয়ে বসে পড়লে যে? গুরুদেব একে যে রুক্ষু মেজাজের মানুষ,
তার উপর বৎসরান্তে তীর্থ পর্যটন করে ফিরছেন ;—এসে যদি
দেখেন পূজোর আয়ােজন সম্পূর্ণ হয়নি, তাহলে কাউকে জীবিত
রাখবেন ভেবেছ ? একেবারে শাপ দিয়ে ভস্ম করে ফেলবেন (বে।
অষ্টক।
আরে রাখাে তোমার শাপ! তার শপের ভয়ে আগে থেকেই
এই পাথর ফাটান রােদে পুড়ে ভস্ম হ'তে বল নাকি ? উঃ কি
রোদই উঠেছে।
করন্দম। রোদ ! অগুণ বল, আগুণ।
ভরবী।
তা যা বলেছি ভাই, এ রকম অকাল তো জন্মে দেখিনি।
দুটী বৎসর ধরে এক ফোটা বৃষ্টি নেই।
দেবতাদের রাজ্যেও এবার মড়ক লেগেছে কি না, তাই তারা
আকাশের কড়াতে করে শ্রাদ্ধের লুচি ভাজছেন !
ভারবী। যা বলেছিস্ ভাই শ্রাদ্ধের চুগেই জ্বলেছে বটে—বাপস!
( অট্টহাসি হাসিতে হাসিতে দধিমুখের প্রবেশ)
দধিমুখ। হো-হো-হে-হে-হে-হাে।
কে হে?
অষ্টক। একি এবে দধিমুখ ! কিহে এত হাসছ কেন?
অষ্টক।

৩২
গভীর্থ
[ প্রথম অঙ্ক
( দধিমুখ হাসিতেই লাগিল ) হি-হি-হি-হি-হি-হি-
কর। বাঃ কেবলই হাসি ! বলি ব্যাপারখানা কি ? পাগল হলে নাকি?
(দখিমুখ আরও হাসিতে লাগিল ) হা-হা-হা-হা-হা-হা-
ভরবী । আরে এতাে মন্দ মজা নয় ! তবু হাসে? এ হাঃ হাঃ হাঃ।
দধি। হাসে। হাসসা হাসতে হবে বাবাঠাকুর।
সকলে। দূর পাগল ! হাঃ হাঃ হাঃ-
দধি। ( সকলে হাসিতেছে দেখিয়া বিকটভাবে কঁদিতে লাগিলেন।)
এ-এ-এ-হু-হু-হু-
অষ্টক। একি আবার কঁদছে যে ! এই হাসি—এই কান্না!
আরে ব্যাপার কি? আবার কঁদিছিস্ কেন ?
দধি। কঁাদো কাদো কঁদতে হবে বাবাঠাকুর।
জয়। কঁাদতে হবে। বটে। আমাদের বাদর পেয়েছ? বাদর নাচ করতে
চাও?
দধি। বাঁদর পেয়েছি ! বদর নাচ করাতে চাই! কই তোমরা তাে
বদর নও ! আর ব্রহ্ম বাক্য যদি মিথ্যে না হয়—তাহলে তােমরা
সত্যি সত্যি বাঁদর হলেও, তােমাদের ল্যাজ তো নেই বাবাঠাকুর !
কর। শুনেছ, আবার অপমান কচ্ছে ! আরে রে বেল্লিক, তােকে আজ
ভস্ম না করে
অষ্টক। আ-হা-হা থাক্ থাক্ যেতে দাও করন্দম ; ভস্ম করা বিদ্যেটা
গুরুদেবেরই একচেটে! সে বিদ্যেটা তাে এখনাে আমাদের দেন নি।
দধি। কিন্তু আমি আজ এক নূতন বিদ্যে শিখে এসেছি বাবাঠাকুর।
ভাবী। কি কি বিদ্যে ?
দধি। শােন তবে ! অশ্রমের ‘পূজার জন্য ভিক্ষা করতে গিয়েছিলাম ও
পাড়ার হরিদাসের বাড়ী

তীয় দৃশ্য ] গভীর্থ জয় হরিদাস ! কি সর্বনাশ! সে তো চণ্ডাল ! শেষে চণ্ডালের বাড়ী গেলি ব্রাহ্মণসেবার 'দ্ৰব্য আন্ত? দধি। চণ্ডালের বাড়ী যাব না তো বামুনের বাড়ী যাব নাকি ? অারে এ পাগলা ঠাকুর বলে কি? বামুনবাড়ী গেলেই ঝুলি ভরেছিল আর কি । শ্যক। যেতে দাও, যেতে দাও, তারপর কি হ’ল দধিমুখ ? দ। ভিকসোয়াম দেহি বলে, তার দরজায় গিয়ে দাঁড়াতেই--ব্যাটা ক'লে কি, ছেলে মেয়েগুলোকে রেধে দেবার জন্যে তার ইস্তিরী দুটে। খুদ নিয়ে আসছিল—তার হাত থেকে তাই কেড়ে নিয়ে আমার ঝুলির মধ্যে ঢেলে দিলে । ছেলে মেয়েগুলাে মাটীতে আছড়ে পড়ে কাদতে লাগলো, কেন জানি না আমার চোখ দিয়েও টস্ টস করে জলের ফোটা ঝরে পড়লাে। হরিদাস আমার পায়ে লুটিয়ে পেন্নাম করতেই আমি তাকে তুলে ধরে বললাম,---ওরে আমায় পেন্নাম করিস্ নে ; আমি বামুনের ঘরের গরু, শাস্তর টাস্তর কিছুই পড়িনি। তার জবাবে সে কি বলেছিল জান? ৩৪। কি ? ৭। বললে-যে মানুষের হাসিতে হাসে, কান্নাতে কঁদে, সে শাস্তির পড়ুক আর না পড়ুক সেই প্রকৃত বামুন। আর যে তা পারে না সে হাজার শাস্তর পড়ুক আর যাই করুক—বামুনই হোক আর ঠাকুরই হােক আসলে সে কিন্তু কুকুর । রবী। তা—তা এক রকম সত্যি বটেই তাে ! দধি। সত্যি? বেশ! তবে এই যে আমি হাল্লাম তোমরাও হাসলে। এ পর্যন্ত বেশ মিললল; কিন্তু যখন কঁাদলুম, কঁাদলে না। কাদতে বললুম তবুও কাদলে । অতএব দেখা গেল, তােমরা হাসি দেখে হাসে, ৩৪ গন্নাভী [ প্রথম অঙ্ক কিন্তু কান্না দেখে কঁাদ না। সুতরাং প্রমাণ হ'ল তােমরা হাজার শাস্তর পড়া বামুনই হও, আর ঠাকুরই হও, আসলে তোমরা আ---- সকলে । বটে এত বড় স্পর্ধা! সংহার-সংহার-- ( মারিতে উদ্যত-সহসা জবালীর প্রবেশ } জাবালী। ওহে থামো থামাে সর্বনাশ হয়েছে। গুরুদেব এসে পড়েছেন ! সকলে। গুরুদেব ? সর্বনাশ! গুদে এসেছেন : অক। কি বিপদ। একপান। পুখি টুখ ও নেই. সামনে খুলে বা হোক, শীগগীর বসে পড়াে এখন-পাত্ৰাধার তৈল আরম্ভ কর। ( শিষ্যগণ দুইদলে বিভক্ত হইয়া মুখোমুখি বসিয়া তর্কের অভিনয় করিলে লগিল, কেহ বলে, ‘পাত্ৰধার তৈল ; কেহ বলে, তৈলাধার পাত্র। দধি। বাধার তৈল, তৈলাধার পাত্র, ছত্ৰাধার তৈল, তৈলাধার গো-মু, সুত্রার তৈল, তৈলাধার ( কপিঞ্জলের প্রবেশ1) কপিল। ( বাক দিয়া) কে তুই ? দধি। (সভয়ে ) গিরিগিটী গিরিগিটা গিরিগিটা। তৈলাধার গিরিগিটী । কপিঞ্জল। ভারবা, এই অর্বাচীনকে অশ্রন সীমায় কে প্রবেশ কর্তে দিলে ? ভাবী। প্রভু, এ এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ। দেশে দুর্ভিক্ষ ব’লে আমাদের আশ্রমে এসে কেঁদে কেটে আশ্রয় নিয়েছে-- দধি। বড়ই কেঁদে কেটে প্রভু, সংসার তাপে ৰড়ই জর্জরিত হয়ে । চরণে আশ্রয় দিয়ে এখন তাড়ালে আমি যাব কোথায় ? এই দুর্ভিক্ষের দিনে কচুর পাতা সিদ্ধ করে খাবে, তাও তত মেলে না প্রভু।

তৃতীয় দৃশ্য ]
গয়াতীর্থ
--
কপিঞ্জল । না মেলে তো আমি কি করব ? আমি কি অনুস খুলব বলে
সত্য;র গি করে এসেছি ?
দধি। তা-তা দেবতা ধৰ্ম্ম লাভের জন্য তো হরিণ পুছ, ছাগল পুৰছ, গরু
পুষছ, না হয় আমাকে ও--
কপিঞ্জল। চীন, আবার কথা ! ভরবী--
দবি। যাচ্ছি—যাচ্ছি ঠাকুর, পুষতে না পারে, ভস্ম করবার বিদ্যেটায় খুব
মজবুত আছে। তা জেনেছি। যাচ্ছি দয়াল বাবাঠাকুরেরা দুঃখ
করােনা, অামি আবার----গুছি-এ মুখেও আর ২ব না, 'প্রণাম।
[ প্রস্থ ন.।
কপিল। কি আশ্চর্য্য ! বষকল আসিনি শ্রমে,
রত ছিন্ন কর্থি-পর্যটনে,
ইতঃমধ্যে চতুর্দিকে ইন বিশৃঙ্খলা :
সকলো । প্ৰধু, ক্ষমা করুন, আর এরপ হবে না।
কপিঙ্গল ভল, জিকর পূজা আয়োজন সত্বর সম্পূর্ণ কর।
শিষ্য।
যে অজ্ঞে, যে অংজ্ঞে ‘প্রং।
[ প্রান।
( তাপসবেশী গয়াসুরের প্রবেশ 1 )
ঋষিবর, প্রণাম চরণে :
কপিল। একি দিবমুর্তি! সুদীর্ঘ সুঠাম তনু
প্রশস্ত উরস, অয় নয়নে আর ললাট উপরে
মূর্তিমতী প্রজ্ঞা নে করে অধিষ্ঠান ।
কে তুমি হে অনিন্দ্য সুন্দর !
কে বাস ব ?

গন্নাতীর্থ
[ প্রথম অঙ্ক
গয়া। বহু দূর দেশে বাস ছিল এককালে,
পিতৃ মাতৃহীন হয়ে সংসার ত্যজিয়া
প্রব্রজ্যর ব্রত লয়ে ফিরি দেশে দেশে ;
বহু তীর্থ করেছি ভ্ৰণণ, বহু বর্ষ ধরি
বেদ আদি নানা বিদ্যা করেছি অর্জন।
এবে অকিঞ্চন শিষ্যত্ব তোমার ।
বিষ্ণুভক্ত ঋষিশ্রেষ্ঠ তুমি
কহিলেন দেবর্ষি নারদ
সৰ্ববিদ্যা-সার ব্রহ্মবিদ্যা লাভ হেতু।
তাই আসিয়াছি তব পাশে।
পুরাও আকাঙ্খ দেশ
তব পদে লইনু শরণ।
কপিল। ওঠো সৌম্য।
সৃষ্টি-শুভ কান্তি তব মধুক্ষরা বাণী
পরিতৃপ্ত করেছে আমারে।
বিশেষতঃ দেবর্ষি তোমারে হেথা করিলা প্রেরণ।
আনন্দিত—আনন্দিত কপিঞ্জল তব সম্মিলনে।
চল বংস, পম্পা-জলে করি স্নান
শুচিবাস পরি
শুভক্ষণে বেদ বিদ্যা দানিব তােমারে।
গয়া। ভাগ্যবান আমি তাহে নাহিক সন্দেহ।
চল গুরু কোথা শায়ে যাবে।
(নেপথ্যে সমবেত কণ্ঠের ক্রন্দন।)

তৃতীয় দৃশ্য ]
পম্নতীর্থ
একি কিসের এ কোলাহল !
সমবেত কলকঠে উঠিতেছে রোদনের রোল !
আৰ্ত্তকণ্ঠে কি কারণ কঁাদে নরনারী
গুরুদেব-'গুরুদেব,
ওই হের আসে কারা এই দিকে ছুটে।
( রুদ্যমান ব্যাধ ও গ্রামবাসীগণের প্রবেশ)
সক।ে রক্ষা করুন--রক্ষা করুন দেবতা, আমাদের সন হয়ে গেল।
কপিল। কিসের সর্বনাশ ? কি চ! ও তোমরা?
জনৈক ব্যক্তি। কিসের সনশ, সে কি আপনার অন্য প্র? ইন্দ্রদেব
আমাদের প্রতি বিরূপ হয়েছেন। সারা বছরে এক ফোটা বৃষ্টি দেন
নি, আকাশ থেকে অগুণ ঝলসে পড়ছে—মাঠের ফসল পুড়ে ছারখার
হয়ে গেছে-নদীর জল শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে গেছে । খ: স্ত। তবে
জলাভাবে আমরা একেবারে কুড়ে মরে গেলাম। প্র, দয় করুন
-অামাদের প্রতি দয়া করুন !
কঞ্জি। দয়া ! আমি কি দয়া করব ?
জনৈক ব্যক্তি। আপনি দেবতার তুষ্টির জন্য ঠাকুরের পূজো দিন
আমাদের হয়ে যজ্ঞ করুন।
কপিঞ্জনা। যজ্ঞ ! কি যজ্ঞ করিব আমি?
করিয়াছ সুনিশ্চিত কোন মহাপাপ
তার শাস্তিদান হেতু হেন অনাবৃষ্টি-
সেই হেতু শস্যহীনা হয়েছে বসুধা।
বাও-চলে যাও, দেবতা দিয়েছে শাস্তি
প্রতিকার দেবতা করিবে।

গভী
[ প্রথম অঙ্ক
সকলে। প্রভু, প্রভু, বড় আশা করে এসেছি। আমাদের পরিত্যাগ করে
একেবারে মেরে ফেলবেন না প্রভু! দোহাই আপনার, পায়ে
ঠেলবেন না।
কপি। আচলে বাও দ্বিরুক্তি করোনা
দেবতা বিরুপ মারেই মরে দিল অভিশাপ
তাহারে আশ্রয় দিয়া দেবকার্যে ঘটাবে ব্যাঘাত ?
গুরুদেব—গুরুদেব, এই আকুলত--
বদীর্ণ এই হাহাকার
স্বকর্ণে শুনিয়া তবু
কপিঞ্জল ।. ক্রন্দন ! হাঃ হাঃ হাঃ, চঞ্চল যুবক তুমি
ধৰ্ম্মের নিগূঢ় তত্ত্ব
তাই আজে। বুঝিতে পারে না।
ওরে বংস, ধৰ্ম্মকাৰ্য্যে ব্ৰতী জন
নিরজনে ইষ্ট চিন্তা করে এক মনে ।
সেই উদ্ধলোকে যােগী করে বিচরণ
ধরণীর ক্ষুদ্র স্বার্থ করুণ ক্রন্দন,
কিছু সেথা পশিতে না পারে
পুঞ্জীভুত হাহাকারে চরণে দলিয়া
যোগীন্দ্র প্রয়াণ করে উর্ধ্বলােকে
ব্ৰহ্ম আস্বাদনে।
যাও—এখনাে কি হেতু কর বিফল ক্রন্দন ?
চলে যাও আশ্র ত্যজিয়া।
দাড়াও হে হতভাগ্যগণ !
ঋষিবর, যাচি তব চরণে বিদায়।

মার্থ
০৯
তৃতীয় দৃশ্য ]
কপিল। বিদায়! সেকি কথা !
শিষ্যত্ব প্রার্থনা করে কথা যাবে কিরে ?
বাক্য দান করিয়াছি নিজে
সুদুল্লভ ব্ৰহ্মবিদ্যা শিখাইব না ।
ক্ষমা কর ঋষিবর,
শিষ্যত্ব কামনা আর নাহিক অমর
ব্ৰহ্মবিদ্যা শিখিবার নহি আকিঞ্চন।
রাখ তরে বদ্ধ করি
আশ্রম সীমায় তব কমণ্ডলু মাঝে।
আমি যাব হেন বিদ্যা লভিবার তরে,
যে বিদ্যায় নাহি কোনো উচ্চ নীচ জাতির বিচার
সে বিদ্যা সঙ্কীর্ণ নহে সীমার বন্ধনে,
অজস্র ধারায় যাহা কল ক নাদে,
ভোগবতী ধারা সম ঝরে পড়ে
তৃষাতুর জীবের অন্তরে।
কপিল। এ হাঃ হাঃ উন্মত্ত যুবক !
স্বইচ্ছায় আপনার ভবিষ্যৎ পণ্ড করিতেছ !
ভাবিয়াছ যোগবলে বিদ্য৷ লভি
ঘুচাইবে এই সব অভিশপ্ত জীবের বেদনা?
ভাবিয়াছ বুঝি তপস্যার বলে তুমি
বৃষ্টি ধারা বহিয়া আনিবে ?
শস্য শ্যমমা করিবে মেদিনী?
প্রতীতি হয় না ঋষি ?
আকিঞ্চন বুঝি মাের নিতান্ত দুরাশা ?

৪০ পােভখ [ প্রথম অঙ্ক সত্য বটে, তব সম দীর্ঘকাল পরি নিরজনে করিনি সাধনা, বিশ্বেরে বঞ্চিত করি চাহি নাই এতকাল ব্ৰহ্ম-রসাস্বাদ। নাহি থাক তপােবনা থাক সাধনা তবু, মাের বক্ষ মাঝে পদ্মাসনে বসে নারায়ণ । সেই ইষ্টদেব পদে প্রণতি জানায়ে জলবাহী মেঘদলে আকর্ষণ করিয়া আনিব ; ধরণীরে জলধারে ভাসাইয়া দিব। হে অদৃশ্য মেঘদল- হে অবৰ্ত্ত, সংবৰ্ত্ত, পুষ্কর,- আবির্ভব—আবির্ভব গগন অঙ্গনে। অন্তরের পূজা, অর্ঘ্য, শ্রদ্ধাঞ্জলি মম দ নিলাম দিকপতি ইন্দ্রের চরণে, দানিলাম মেঘদল তােম। সবাকরে। লুকায়ে থেকোনা আর আর্ত জীব করিছে ক্রন্দন । সজল জলদকান্তি স্নিগ্ধ অভিরাম হে জীব বাঞ্ছিত লেব, সিক্ত করে ধরণীরে সলিল ধারায় । সকলে। কি আশ্চৰ্য্য! ওই ওই মেঘ দেখা দিয়েছে। ওই কাল ছায়ায় সূর্যালোক ঢেকে গেল। ওই মেঘেদয়-ওই মেঘােদয়- কপিঞ্জল। মেঘেদয় ! কি আশ্চর্য্য ! সত্য মেঘেদয়। কিন্তু ওই-হাঃ হাঃ হাঃ-দেখ, মুখগণ,

তৃতীয় দৃশ্য ]
গন্নতীর্থ
৪১
পলকের দেখা দিয়া বড়ইয়া তৃষা
ওই মেঘ ফিরে যায় পরম কাতুকে ! হাঃ ইঃ হাঃ।
( অন্ধকর অপসারিত হইল।
গায়।।
ফিরে যায়—ফিরে পায় না করি বান ।
এত স্পর্ধা নিৰ্ম্মন মেঘের !
কে আছকে অছি কোথা?
এক গোটা ধনুঃশর দেহ গয়ারে ।
জনৈক ব্যাপ। এই নাও—এই নাও প্রভু।
‘য়।। কোথা যাবি—কোথা যাবি
রে দুরন্ত ইন্দ্র অনুচর ?
পূজা অর্ঘ দিমু তাহে তৃপ্ত নাহি হ'ল
ফিরে যাও উপেক্ষা করিয়া ?
বুঝিয়াছি নস্ তোরা পূজার অাবার,
নীচ-বৃত্তি ইন্দ্রের সেবক,
অর্ঘ্য দান করি তোরে করিয়াছি ।
এইবার ধনু দণ্ডে জুডিলান কর ।
এক বাণে গতিপথ নিরুদ্ধ করিব,
অন্য বাণে মৰ্ম্মস্থল বিদীর্ণ করিয়া
জলধারা বহিয়া আনিব ।
দেখিব দুরন্ত মেঘ, পলায়ন করিস কিরূপে?
( ধরিত্রীর বেগে প্রবেশ)
ধরিত্রী
স্বর-সম্বর বাণ তনয় অামার,
আশঙ্কায় মেঘদল ওই হের এসেছে না মিয়া।

গন্নাথ
[ প্রথম অঙ্ক
ধরিত্রী
একি! নিপীড়িত ধরিত্রী জননী।
নিজে নিপীড়িত আমি,
তাই বুঝি নিপীড়ন কেমন ভীষণ
তাই বুঝি, অস্ত্রাতে কি বেদনা
পাবে মেঘদ।
ওই--ওই হের দৈত্যপী ও
স্নিগ্ধ শ্যাম সকরুণ মেঘ ছায়া হেরি
শীর্ণ শাখা-বহু মেলি কাপে বনস্থলী !
ওই শোন গুরু গুরু গম্ভীর নিনদে
উতলা কলাপী কেক নৃত্য করে মনের উল্লাসে।
চলােচলল প্রিয়বর,
ওই নীল গিরি-শিরে উঠি-
সানন্দে হেৰিৰ সবে নব-মেঘোৎসব।
[ সকলের প্রস্থান।
(গুরু গুরু মেঘ ডাকিতে লাগিল,
না-বালাগণ বর্ষা মঙ্গল গান গাহিয়া মাদল তালে নাচিতে গিল )
--
নাল সজল কাজল ছায়ায় নবীন বদল রে
কলাপ মেলে নাচে ময়ুর বিভােল পাগল রে-
ঝর ঝরি ঝরে জল, পন্থ পিছল,
ওগাে বধু, খােল তব মনের আগ
ধারা জলে নাহিয়া মল্লার গাহিয়া বন তল চঞ্চল উতল রে।

দ্বিতীয় আঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
রাজপথ।
{ উৎসব-রত দৈত্য-পুরাঙ্গনাদের গীত।)
উৎসব করাে উৎসব করাে, করো উংসব নারী
বরিষ বরিষ কুসুম লাজ,
এল রে ফিরিয়া রাজ-অধিরাজ,
শুভ অভিষেক পুণ্য সলিলে ভর গাে স্বর্ণ ঝারি ।
সে যে বিবাগী সাজিয়াছিল,
সে যে বাকল পরিয়াছিল,
সোণার ভূষণে সেজেছে এবার, কৌপিন ডোর ছাড়ি ।
[ পুরাঙ্গনাদের প্রস্থান।
( দুইজন দৈত্যের প্রবেশ )
১ম দৈত্য। অারে চল হে চল, অভিনয় যে এতক্ষণে শেষ হয়ে গেল ; এরপরে
সে দেখবে গিয়ে কঁচকলা শুধু ।
২য় দৈ! রেখে দাও তোমার কাচকলা। বলি আগে খাওয়া দাওয়াগুলো
তো শেষ কৰ্তে হবে না তোমার অভিনয় দেখলে পেট ভরবে।
একসঙ্গে চারদিকে রকমারী আয়োজন, কোনটা সামলাই ?

৪৪ গাভীর্থ [ দ্বিতীয় অঙ্ক ১ম দৈত্য। আরে খাওয়াতো চিরদিন আছে বাবা। ন: এই রসইন পেটুকের পাল্লায় পড়ে আমার শুদ্ধ অভিনয়টা আর দেখা হ’ণ ন; ; অাবে তো এস, নইলে আমি চলম । ২য় দৈত্য। আরে যাচ্ছি—যাচ্ছি, চল না। [ উভয়ের প্রস্থ ন ! ( মাথায় বিরাট খাদ্যবস্তু লইয়া ঢেকুর-ছাড়িতে ছাড়িতে দধিমুখের প্রবেশ । ) দধি। ওঃ কি খাওয়ানটাই খাইয়েছে রে বাবা ! লুচি, পুর্য, সন্দেশ, মিহি- দানা, রাজভোগ, সীতাভােগ, মতিচুর-তারপর? নন মনে নেই ততা! ও মনে পড়েছে, হুড় মুড়, মচ মচ, কিড়ি মিড়ি, হপ হপ সাপুস সাপুস, হুপ হাপ, অরে বাপ! এই সব রসাল খাদ্য বস্তু এ পৃথিবীতে এতকাল ছিল কোথায় ? খুব বুদ্ধি করে না উড়িয়ে দৈত্যদের দলে মিশে পড়া গেছে বাবা! নইলে এই দুর্দিনে এমন পরিপাটী খাওয়ার ব্যবস্থা দধিমুখের বরাতে জুটতে। কোথা থেকে? খালি দীয়াং ভুজ্য তং ! উদরের আকৃতি তো হয়েছে একেব? ২। মাঠে চরে খাওয়া গাে-মাতার উদরের মত। যাই হােক এতকাল ঋষির আশ্রমে কুলখ কলাই আর হরিতকি খণ্ড খেয়ে খেয়ে মোক্ষ নভের যোগাড় হচ্ছিল, তবু এবার মর্ত্যলোকে স্বশরীরে বেঁচে থাকার একটা ব্যবস্থা হ’ল। এখন ভাবছি কোন ব্যাটা দৈত্য আমায় ব! মুন বলে চিনে না ফেলে। কেউ সন্দেহ করলেই গেছি আর কি ! দূর ছাই, এত ভাবনা চিন্তাই বা কিসের? এখন আমি আর দধিমুখ নই— আমি এখন দৈত্যকুলের অঘােবৰ্ম্মণ ভট্টাচাৰ্য। চলনে বলনে অচ.রে ব্যবহারে একেবারে সাত পুরুষের কুলীন দৈত্য। আমায় চেনে কোন ব্যাটার সাধ্যি? তবে হঁ্যা, কথায় বার্তায় না ধরা পড়ি। একটু সামনে প্রথম দৃশ্য ] গন্নতীর্থ ৪৫ সুমলে থাকতে হবে। আচ্ছা এই দৈত্য বটার হঠাৎ এমন দান সর্ম খুলে বসল কেন ? কোনও মতলব নেই বলে ? খাইয়ে দাইয়ে শেষ কালে রস। সিন্দুক বন্ধ করবে না তো? এই যে এই আবার কয় ব্যাট!চ্ছেলে দত্যি এইদিকে আসছে। একটু সাবধানে খোজ খবরগুলাে নিয়ে নেই। এ ব্যাটাদের মধ্যে একটা কেষ্টো বিষ্ট, !ছের জমিয়ে নেওয়া দরকার। (নেপথ্যে চাহিয়া ) বলি হঁাহে ৩য়, উৎসবটা দেখছ কেমন ? ( ৩য় ও ৪র্থ দৈত্যদ্বয়ের প্রবেশ। ) ৩য় দৈত্য। উৎসব বলে উৎসব। আজ তিন দিন ধরে কি উৎসবটাই না চলছে ! ৪র্থ দৈত্য। হবে না? এতকাল পরে আমরা আমাদের রাজাকে পেয়েছি। দধি। তা শুধু তিন দিন কিহে ? তুমি কোন দেশী বোকা দত্যি? এ উৎসব যে তিন হাজার বৎসর ধরে চলবে, নগর টেড়া পিটীয়ে দস্তুর মত ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছে তাও জান না? (অপর- দৈত্যকে ) বলি হাগা আমাদের এই সে নুতন রাজাটী জন্মালেন তিনি ভাল আছেন তাে? রাজমাতা এত বড় একটা সন্তান প্রসব করে সুস্থ শরীরে— ৪র্থ দৈত্য। নবজাত রাজা? আরে গােমূখ, নবজাত রাজা এলেন কোখেকে ? আমাদের সম্রাট গয়াসুর তপস্যান্তে দেশে ফিরে এসেছেন তাইতাে এ উৎসব। কোন খবর রাখি না! তােমার দেশ কোথায় হে? দৈত্যগণ ! কোথায় হে দেশ? কোন গগনের চঁদ তুমি ? দধি। চা নই বাবা একেবারে মূর্তিমান রাহু। দেখছ না কি রূপের

গভীর্থ
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
মাধুরী। (খাদ্য বস্তু দেখাইয়া) দেখছ না চাদের সুধা হরণ করে
নিয়ে চলেছি, হিঃ হিঃ হিঃ। চিরকাল দৈত্য রাজ্য জুড়ে বসে আছি,
তার আমাদের রাজার খবরটা আমি জানি না তো জাবেও পড়ার
মাতঙ্গিনী পিসী ? অনন, নন্দ! রাজা ফিরে এসেছেন, তই
মনের আনন্দে একটু রহস্য ফচ্ছিল , দেখি তোমরা কি জনৰ দাও।
( নেপথ্যে কোলাহল)
দৈত্যগণ। ওকি, হঠাৎ এমন তুমুল কোণাইল জাগল কে? ব:পর
কি ?
( ১ম ও ২য় দৈত্যের পুনঃ প্রবেশ।
০
১ম দৈত্য। যুদ্ধ-যুদ্ধ, অবিলম্বে যুদ্ধ ঘােষণা কর ।
দধি। কেন রে বাবা ? আমি নাম ভাড়িয়ে দলে জুটেছি, সা# পেতে
নাকি ?
২য় দৈত্য। চল অবিলম্বে অস্ত্র সজ্জা করি।
৩য় দৈত্য। কেন ব্যাপার কি ? হঠাৎ কি ঘটল ?
১ম দৈত্য। যুদ্ধ চাই যুদ্ধ। চল ভাই সব আর বিলম্ব নয়, অস্ত্র
নিয়ে এগিয়ে চল।
দধি। আরে অস্ত্র তাে আমার হাতেই আছে-না হয় নাই থকলে,
তা বলে লড়াই করতে আটকাবে কিসে? কিন্তু ব্যাপারনি। কি
বল দেখি।
৩য় দৈত্য। বলহে ব্যাপার কি ?
১ম দৈত্য। কিছু জানাে না, তােমরা ছিলে কোথায় ?
দধি। আমরা? আমরা ওই ভাড়ার ঘরে কাৰ্যান্তরে একটু ব্যস্ত ছিলাম,

১৭ প্রথম দৃশ্য ] গন্নাতীর্থ মানে এই সব ছােটলোক বাতেগুলোকে পরিবেশন কচ্ছিলাম। দেখছ না আমাদের কি মরবার অবকাশ আছে। এই একরাশ খাদ্যবস্তু নিয়ে চলেছি ঐ দূরে ভিখিরীদের গাছতলায় পরিবেশন করবে, তাই এ দিককার খবর কিছুই জানি না। এখন ব্যাপারখানি কি খুলে বল- ৩য় দৈত্য। বল হে বল । ২য় দৈত্য। শুনবে তা হলো শােন’-র সবার সামনের মাঠে মাঠে মঞ্চ তৈরী করে অভিনয় হচ্ছিল। তন নট এসেছে সম্রাটের আগমন উৎসবে অভিনয় করতে। কচ অার দেবনী অভিনয় । দধি। কুজো আর দোয়! তদানী অভিনয় ! ২য় দৈত্য। কুজো দোয়াদানী নয় । কচ ও দেবযানী ; কচ হলেন দেবগুরুর পুত্র, আর দেবযানী হলেন আমাদের গুরু শুক্রাচার্যের । বুঝেছি বুঝেছি আর বলতে হবে না। সেই কুজো আর দোয়াত- দানী এই দুটো ছেড়া ছুড়ি মিলে শেষকালে একটা ভারী ইয়ে, মনে একটা বিতিকিচ্ছি করে বসেছে এই লে? ২৪ দৈত্য। হা, মানে তােমার চুলের ঝুটি পরে- ( চুলধারণ) দধি। ওরে বাবা ছেড়ে দে--- ৩য় দৈত্য। ছেড়ে দাও-দেড়ে দাও। ঘটনা কি হ'ল তাই বল । ২১ দৈত্য। বলব আর কি, ব্যাটা আমার মাথা গরম করে দিয়েছে। বলছিলাম—অভিনয়ে দেখাণ ঐ কচ অন:দের গুরুদেবের কাছ থেকে সঞ্জীবনী বিদ্যেটা হরণ করবার জন্যে শিষ সেজে এসেছিল। গুরুকন্য কচকে দৈত্য বংশীয় মনে করে ভালবাসলেন ; এবং গুরুদেবকে অনুরোধ করে কচকে সঞ্জীবনী বিদ্যা শিখিয়ে দিলেন। বিদ্যা দানের ৪৮ গভী [ দ্বিতীয় অঙ্ক এ বলা কি পর দেবযানী বললেন—এইবার আমাকে বিয়ে কর। তার অন্যায় হয়েছে ? ৩য়-৪র্থ দৈত্য। সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত। দধি। শুধু ন্যায়সঙ্গং কি হে! দস্তুর মত ন্যায়-সঙ্গং, বেদ-সঙ্গং, মহাভারত- সঙ্গং, কীর্তনের সঙ্গং, বেহালার সঙ্গং। তার পর ? ২য় দৈত। তারপর আর কি ! সেই দুই ও কচ গুরুদেবকে অপমান করে, আমাদের দৈত্যজাতিকে অপমান করে স্বর্গে পালিয়ে গেল । ৩য়-৪র্থ দৈত। পালিয়ে গেল এত স্পর্ধা । দধি। ধর-ধর, ভাই সব, কুজোকে এনে দোয়া তদানীর পায়েরতলায় ফেলে দে। ইচ্ছে হচ্ছে এই দণ্ড এই বিরাট বোঝাটা কুজোর কপালে ছুড়ে মেরে ঝন্ ঝন্ করে দুরি—কিন্তু তাহলে যে ভিখিরীর খেতে পাবে না। ৩য়-৪র্থ দৈত্য। এমন অপমান করে গেছে কচ আমাদের দৈত্য জাতির আর আমরা এর কিছুই জানি না। দধি। আমরা যে ভােজনাগারে কাৰ্যন্তরে ব্যস্ত ছিলাম হে। ১ম-২য় দৈত্য । চলহে-- চলহে সম্রাটের কাছে সবাই মিলে নিবেদন করি আমরা যুদ্ধ চাই-যুদ্ধ চাই। ৩য় দৈত্য। কিন্তু সম্রাটকে পাবে কোথায়? তিনি সেই যে বিষ্ণু মন্দিরে ঢুকে ধ্যানে ব’সেছেন, এখন পর্যন্তও তাে বাইরে আসেন নি। ১ম-২য় দৈত্য। তাও তত বটে! তা হলে উপায়? ৩য় দৈত্য। উপায় এক হতে পারে, রাজকন্যার স্মরণ নেওয়া। দধি। বলি দাদা কিছু নেশা করেছ নাকি? রাজকন্যাটা এল কোখেকে হে? রাজা তাে শুনলাম এতকাল বনে বনে তপকর্ম করছিলেন, এই হলে দেশে ফিরেছেন, তা তঁার আবার কন্যা এল কোত্থেকে ?

প্রথম দৃশ্য ] গন্নাতীর্থ ৪৯ ৩য় দৈত্য। কন্যা এল কোখেকে। আরে বর্বর কেবল ভোজ্যবস্তুর তত্ত্বাবধান করে বেড়াও, রাজকন্যার খবর পর্যন্ত রাখ’না! ষােল বছর আগে তপস্যার জোরে আমাদের মহারাজ এই কন্যাকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি আমাদের সারাজাতির মা ! সেই মা'কে পর্যন্ত চেন না । সকলে। কে হে তুমি অর্বাচীন ? | হিঃ হিঃ হিঃ—ধ্যেৎ তােমরা রহস্য মােটেই বোঝ না। আমি ঠাট্টা করে দেখছিলাম তােমরা কি জবাব দাও! মা—তিনি আমাদের দৈত্যজাতির মা! মা জগদম্বা—একহাতে তার ক্ষুধিত সন্তানের জন্য মিহিদানা, অন্য হাতে গজ—একহাতে কপির কচুরি, অন্য হাতে গোল সিঙ্গাড়—একহাতে বৃহৎ রোহিং মৎস্য, অন্য হাতে ক্ষুরধার যটি ! মা নেই সেকি হয়! মা না থাকলে আমরা এলাম কোখেকে— এ কি বল? মা না থাকলে আমরা কি এলাম মাটী ফুড়ে—এ কি বন? চল চল চল। সেই ভাম মায়ের কাছে যাই। চল হে, চণ- ধ। এগোও—এগেও অনি অছি। এই খাবারের ঝোড়াটা ভিখিরি- বেটাদের দিয়েই আছি। লুর ' LILIA HARY Egtd:-1219. BAKAHDAH HUWAH.

দ্বিতীয় দৃশ্য
উদ্যান।
( গয়াসুর, দীপ্তজীত্ব ও চিত্রাঙ্কের প্রবেশ।)
গয়া।
দীপ্ত।
শােন' দীপ্তজী, শােন হে চিত্রাঙ্ক,
জানি আমি দেবাসুর সংগ্রামের অছে প্রয়ােজন
গৰ্বোদ্ধত দেবতার ঔদ্ধত্য নাশিতে
স্বর্গে মর্ত্যে অবিলম্বে বাধিবে সংগ্রাম
সুচনা তাহার প্রথম দেখেছি আমি
ষােড়শ বৎসর পূর্বে একদিন প্রভাত আলেকে
দীপ্তজি, জানাে তুমি
সে দিনের কথা।
জানি প্রভু, কৃপা করি বলেছেন মোরে ।
সে দিন প্রভাতে ক্ষীরােদ সমুদ্র তীরে
নির্যাতিতা মীন-কন্যা সাগরিকা আসি
আপনার ব্যগ্র বক্ষে তুলে দিয়েছিল
চুপ চুপ, দীপ্তজিঙ্ক, সে কন্যা আমার ।
দানবী-দানবী ইলা, গয়াসুর-নন্দিনী সে ই।
কৈ কোথা গেল ?
কোথা মাের আনন্দের নিঝরিণী ধারা ?
কোথা ইলা নন্দিনী আমার ?
একি! অকস্মাৎ যেন চারিদিকে অন্ধকার
আসিল নামিয়া ।
গয়া।
-

দ্বিতীয় দৃশ্য }
গভীর্থ
দীপ্ত।
অন্ধকার-অন্ধকার
ডুবিল প্রভাত-সূৰ্য্য
ওরে ওরে মেঘরাশি একসাথে ব্যাপিল আকাশ।
কি বিচিত্র ! এত অকস্মাৎ!
এ কি কোন মায়াবীর মায়া ?
ওকি ওকি হােথা? দেখ চেয়ে দাপ্তজিত্ব
দেখ হে চিত্রাঙ্ক, মেঘস্তর হতে
কে যেন যুবক এক, মর্ত্যভূমে নামিয়া আসিল।
কে ও যুবা ? চিনিতে পার কি কেহ ?
চিনেছি সম্রাট, ঘেবর্ণ ঐরাবত হ'তে
নামিতেছে দেবরাজ ইন্দ্রের নন্দন
জয়ন্ত উহার নাম।
জয়ন্ত! ইন্দ্রের নন্দন! একি এইদিকে আসে ।
একা নয়, সঙ্গে আরও -- কি আশ্চর্য্য—কি আশ্চর্য্য ।
ইলা ! সহচরী সনে আমার নন্দিনী ইল।
কেন? ইন্দ্রপুত্র সনে কেন আমার তনয় ?
ষড়যন্ত্র, ষড়যন্ত্র-দেবতার ষড়যন্ত্র নিশ্চয় সম্রাট,
রাজকন্যা এসেছেন একাকিনী কুসুম চয়নে
এইরূপ করি অনুমান
চারিদিক আবরিয়া মেঘে
দুষ্টমতি ইন্দ্রপুত্র নিশ্চিত এসেছে তারে হরণ করিতে।
সেবকেরে করুন আদেশ,
হস্তে গলে বঁধি দুষ্টে
এখনি ফেলিব আনি রাজপদ-তলে ।
গয়া।
চিত্রাঙ্ক।

গভীর্থ
দ্বিতীয় অঙ্ক
গয়া।
চুপ, কথা কহিও না।
আসিতেছে এইদিক পানে
যাই অন্তরালে যাই, দীপ্তজি, চিত্রাঙ্ক,
দৈত্য-সৈন্য সজ্জা করি ঘিরিয়া উদ্যান,
রহ মোর অভা অপেক্ষায়।
সত্য আগে করিয়া নির্ণয়,
তারপর রাজ তাজ্ঞ করিব প্রচার।
[ সকলের প্রস্থান।
( ইলা, জয়ন্ত ও সখীগণের প্রবেশ।)
সখীগণের গীত।
রিণি ঝিণি রিণি ঝিণি নূপুর বাজে ।
দুরু দুরু কঁাপে হিয়া মধুর লাজে ।
ভুবন হসা একি উতরােল,
নীপবনে ফুলদোলে কে দিল দোল !
পরিমল শয়নে, অতনুর নয়নে,
স্বপন আঁকি কোন্ নটিনী নাচে।
মিলন-বাঁশরী সঙ্কেতে কার
টুটে গেল সরম ভরম আমার।
তনু মন জাগে
নব অনুরাগে
সুন্দর-পরশন সুন্দরী মাগে।
নমগা প্রিয় বরণীয়
মম পূজা ফুল নিও,
চল চল দিব পূজা কুঞ্জমাঝে।

দ্বিতীয় দৃশ্য ]
গম্নভীর্থ
ইলা।
জয়ন্ত ।
থাক সঙ্গীতের নাহি প্রয়োজন।
১না সখী। নাহি প্রয়ােজন। সেকি কথা ?
২রা সখী। সখি, কথা কও, কেন আজ এত ভাবান্তর ?
৩য় সখী। চুপ, বুদ্ধিহীনা, কি কথা মোদের সনে কহিবেন সখি?
যত কথা তরঙ্গ উচ্ছ্বাসময় নদীর মতন
মিশিতে চাহিছে এবে
ঐ মহা সমুদ্রের সাথে । ( জয়ন্তকে দেখাইল।)
( আদেশের স্বরে ) সখি,
যা তোরা সবে,
আজ আর করিব না কুসুম চয়ন। [ সখীগণের প্রস্থান
সত্য ইল, সত্য কথা বলিয়াছে সহচরীগণ,
আজ তব কিবা হেতু এত ভাবান্তর?
এই দীর্ঘ বর্ষকাল ধরি,
তােমাতে আমাতে নিতি দেখা হয় এ বিজন কুসুম-কাননে ।
তুমি কর কুসুম চয়ন,
চম্পক অঙ্গুলী মাঝে স্বর্ণসুত্র ধরি
সকৌতুকে স্মথ বসি মালা,
নিকটে দাড়ায়ে আমি, মুগ্ধ মনে দেখি সেই লীলা।
দু'চোখ ভরিয়া যায়, সারা অঙ্গে জেগে ওঠে
মন্ত্রমুগ্ধ বীণার ঝঙ্কার।
কিন্তু আজ ?
আজ তব মুখে ভাষা নাই, চোখে হাসি নাই
যেন-তুমি মৌন মূক অশ্রুর প্রতিমা।
কি হয়েছে ইলা ? কহিবে না মােরে ?

৫ ৪
গন্নাভী
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
কি হয়েছে? কুমার জয়ন্ত !
নানা কিছুই তাে হয় নাই মাের।
আজি এই মিলন মূহুৰ্ত্ত
উৎসব সঙ্গীতে মোর মুখরিত করি
এস প্রিয় সুধাধারে ডুবাই তোমারে !
গীত।
ইলা।
তুমি মােরে শিখায়েছ বার্সিতে ভালো।
এ হৃদি দেউলে মম জ্বেলেছ আলাে।
আমি তাে মগন ছিনু স্বপন ঘুমে, জাগালে তুমি প্রিয় নয়ন চুমে ;
আমার যতেক গান, সে যে গাে তােমারি দান,
আমার নয়নে প্রিয় তোমারি আলো ॥ ১
জয়ন্ত । একি ইলা, চোখে জল তব ?
কি হয়েছে ইলা?
জয়ন্ত, আমার মিনতি,
এ উদ্যানে আর কভু আসিও না তুমি ?
ইলা-
ইল। কালি রজনীতে শুনিয়াছি
অশ্রুসিক্ত সকরুণ দেবযানী কচের কাহিনী।
বিনা দোষে মহা অবিচারে
দানব কন্যার প্রেম পদাহত করি
নিৰ্ম্মম সে পুরুষ দেবতা স্বর্গপুরে করিল প্রয়াণ।
কহ হে জয়ন্ত, কেন দেবযানী-প্রেম
উপেক্ষা করিল সেই পাষাণ দেবতা?

দ্বিতীয় দৃশ্য ]
গয়াতীর্থ
কোন অপরাধ করেছিল শুক্র-কন্যা তাহার সকাশে ?
দানব-নন্দিনী বলি উপেক্ষার অপমান
তার কি গাে বাজে নাকো বুকে ?
দেবতা ব্যতীত ত্রিজগতে আর কারাে
নাহি কি গাে মর্যাদা সম্ৰম ?
-না হেন অসম্ভব কভু আমি ভাবিতে পারি না।
চল প্রিয়তম,
দুইজনে চলে যাই হাতে হাত ধরি
স্বর্গলােকে দেবেন্দ্রের রাজ-সভা তলে।
চকিতে দেবতা যত সবিস্ময়ে দেখুক চাহিয়া
দেবরাজ পুত্র আজ ধরিয়াছে মর্ত্যবাসী দানবী হাত
স্বর্গে মর্ত্যে একসাথে হয়েছে মিলন।
ইলা—
দ্বিধা করিও না আর, চলো স্বর্গলােকে।
স্বর্গলােকে।
কেন—কেন ইলা ?
এই প্রেম, একি ভালাে নয় ? এই হেথা-
সুনিভৃতে বিশ্ববাসী সকলের নয়ন আড়ালে,
দু’জনে ভুঞ্জিব সুখে দু’জনার অনন্ত মাধুরী।
কেহ রহিবে না কোথা-কেহ দেখিবে না,
কেবল দু’জনে মিলি--
( আদেশের স্বরে) জয়ন্ত,
নহি আমি দুগ্ধপােষ্য শিশু,
স্তোক বাক্যে ভুলাও কাহারে ?
জয়ন্ত ।
জয়ন্ত।
ইলা।

গয়াভী [ দ্বিতীয় অংশ • . সকল ছলনা তব সুস্পষ্ট দেখিছি ওই মুখপটে উঠেছে ভাসিয়া প্রতিবর্ণ তার দৃষ্টির আলােক দিয়া করিতেছি পাঠ। বুঝিয়াছি, দানব কন্যারে আজ বধূ বলি করিলে গ্রহণ, দেবতা সমাজ তব অখ্যাতি গাহিবে । তাই মােরে নাহি চাও- সাথে করে লয়ে যেতে ইন্দ্রের সভায় । সঙ্গোপনে প্রেম ! সঙ্গোপনে প্রেম! মধুর যৌবন-তাপ অঙ্গে মম রবে যতদিন ততদিন হবে তব বঙ্গোপন প্রেম ! উপভােগ শেষ হলে পান পাত্র সম মােরে ছুড়ে ফেলে দেবে অবহেলে ধূলার বুঝিয়াছি—বেশ বুঝিয়াছি- মেঘদলে আবরিয়া নিখিল ভুবন কেন তুমি চুপি চুপি অস’ এই বনে, কি জয়ন্ত, কি হেতু নীরব ? ইলা, আমি নহি অপরাধী, দেবতা সমাজ- দেব সমাজ আর এই মর্ত্যলােকে চিরদিন ঘাের ব্যবধান; দেবতা মরণ-জয়ী অক্ষয় অমর, মৰ্ত্তবাসী ক্ষীণ-প্রাণ, মরণ-অধীন। উপরে। জয়ন্ত।

দ্বিতীয় দৃশ্য ] গাভীর্থ ইলা। জয়ন্ত। ভেবে দেখ, সেই অভিজাত্য-গৰ্ব্বস্ফীত দেবতা সকল, তাদেরও সম্রাট যিনি— তাঁর পুত্র হ'য়ে—প্রকাশ্যে যদ্যপি আমি দানবীরে বধু রূপে থাক থাক যুক্তি বিচারের অর নাহি প্রয়োজন । হে মহা যশস্বী দেব, অকলঙ্ক যশ ল’য়ে ফিরে যাও সুখ-স্বর্গলোকে। ভয় নাই, দেবযানী নহি আমি, করিব না অশ্রুপাত তব উপেক্ষায়। জ্ঞানহারা পাগলিনী হয়ে উচ্চারণ করিব না অগ্নিগর্ভ অভিশাপ বাণী। ইলা, কেন যেন মনে হয়- এতদিনে তােমার নিকটে পাইয়াছি কোন্ এক মধুর সম্পদ, ধন রত্ন অতুল বৈভব কল্পতরু নন্দনকানন, স্বর্গপুরে সব আছে- শুধু বুঝি তুমি যাহা দেছ মােরে এই বস্তু নাই ! ইলা তাই হােক—চলাে মাের সাথে, দেবতা সমাজে সকাতরে মিনতি করিব, দেবেন্দ্রের পাদপদ্ম দু'হাতে ধরিব- আকুল প্রার্থনা মাের দেবগণ নিশ্চয় পুরবে ; চলল ইল, স্বর্গপুরে অধিষ্ঠিত করিব তােমারে । ধন্যবাদ বাসব-নন্দন, মর্ত্যবাসী দানবীর তরে চির উচ্চ শির তব নােয়াতে হবেনা, ক ইলা।

গভীর্থ [ দ্বিতীয় অঙ্ক জয়ন্ত। দেবেন্দ্রের পুত্র যদি তুমি আমিও দানব কন্যা! জানে দৈত্যগণ শক্তিবলে অধিকার প্রতিষ্ঠা করিতে। একান্ত বাসনা যদি ফেরাবে অনায়- তাই হোক চলিলাম ফিরে। হয়তো বা জীবনে প্রথম ভালবাসা কারে বলে জেনেছিনু তোমার নিকটে তাই চেয়েছিনু সঙ্গে করে নিয়ে যেতে অমর আলয়ে। আসিলেনা তুমি। কিন্তু এই স্বর্গপুরে সগৌরবে প্রতিষ্ঠিত করিবে তোমারে হেন শক্তি নাহি অসুরের। ইলা। চ'লে গেল। উপেক্ষার তীব্র কষাঘাতে মৰ্ম্ম মাের রক্ত-সিক্ত করি- চ'লে গেল পাষাণ দেবতা। দারুণ উপেক্ষা তার নিদারুণ অবহেলা তার তবু-তবু কেন সকল অন্তর- আকুল হইয়া তারে পিছু পানে ডাকে ? কেন তারে পুনরায় বঁধিবারে চায় ? ডাকিব কি উচ্চ কণ্ঠে ? ফিরাব কি তারে ?

দ্বিতীয় দৃশ্য ]
গয়াতীর্থ
৯
না, ছি ছি, একি আমি কহিতেছি ?
ও যে মহা শত্রুঅপমান করেছে জাতিরে।
এখনাে কি জাগিযেনা ধ্যানমগ্ন অসুর-সম্রাট,
সত্য কি-সত্য কি তবে
দৈত্য জাতি একেবারে শক্তি হীন নিবীর্য হয়েছে ?
( গয়াসুরের প্রবেশ )
ইল।
কে বলেরে শক্তিহীন নিবীর্য দানব !
দানবের সর্বশক্তি এইতো রে সম্মুখে দাড়ায়ে
শক্তিরূপা মাতৃ মূর্তি লয়ে
পিতা! পিতা! ভাঙ্গিয়াছে ধ্যান।
আসিয়াছ তুমি !
তোমার জাতিরে করি তীব্র অপমান
দেবতা চলিয়া গেল---
এখনাে কি হেতু তবে নীরবে দাঁড়ায়ে ?
কি কহিলি ? দেবত চলিয়া গেল
দম্ভ ভরে অসুরের করি অপমান।
দীপ্তজি—চিত্রাঙ্ক
( শৃঙ্খলিত জয়ন্তকে লইয়া দীপ্তজিহব ও চিত্রাঙ্কের প্রবেশ।)
ইল।।
গয়া।
এ কি জয়ন্ত! হস্তে তার লৌহের শৃঙ্খল ।
সম্মাননা-সম্মাননা
দাম্ভিক দেবেন্দ্র-পুত্রে-
দানব দিয়াছে ঐ অপরূপ লৌহ-সম্মাননা।

০ গাভীর্থ [ দ্বিতীয় অঙ্ক ইলা। গয়া। পিতা, বন্দী কেন করিলে ইহারে ? এরে নিয়ে কি করিবে তুমি? কি করিব ? দীপ্তজী, সুমেরু শিখরে ত্বরা কর আরােহন। দেবলোক লক্ষ্য করি শত ভূৰ্য্য দুন্দুভি নিনাদে উচ্চকণ্ঠে করহ ঘোষণা দেবরাজ-বাসব-নন্দন হস্তে পদে শৃঙ্খলিত হয়ে সারা দিবা রবে আজ দানবের লৌহ-কারাগারে। দিবা শেষ হলে দানবের নিন্দায় মুখর স্পদ্ধিত রসনা তার উৎপাটীত হয়ে কুকুরের যােগাবে আহার! বাধা দিতে শক্তি যদি থাকে আসুক নামিয়া তবে শস্ত্র-পাণি দেবকুল মর্ত্যের মাটীতে —না, একি অসম্ভব কথা ! একি মহা ভয়াবহ নির্মম ঘোষণা! পিতা পায়ে পড়ি তব, ক্ষমা করাে-ক্ষমা করাে ইন্দ্রের তনয়ে। { পদ ধারণ ইলা। ইলা ! গয়া। ইলা। গয়া। ক্ষমা করাে—হে ছাড়িব না চরণ তোমার। ওঠো মাগাে,-তাই হবে, কঁাদিও না তুমি। কিন্তু ভাবি, এই হ’ল অগ্নিবৃষ্টি মূহুর্তেকে একেবারে শ্রাবণের ঝর ঝর জল। হাঃ হাঃ হাঃ- দীপ্তজিহ্বা, শৃঙ্খল মােচন কর।

দ্বিতীয় দৃশ্য ]
গভীর্থ
৬১
হে জয়ন্ত বাস-নন্দন, মুক্ত তুমি
স্বচ্ছন্দে ফিরিয়া যাও সুখ-স্বর্গলোকে।
কহিও বাসবে, ষোড়শ বৎসর পূর্বে
রোদ সাগর তীরে দৈত্যপতি গয়াসুর
একদিন সম্ভাষণ করেছিল তারে,
কয়েছিল কিছুদিন প্রতীক্ষা করিতে।
(স প্রতীক্ষা কাল এতদিনে সম্পূর্ণ হয়েছে।
আজি রজনীতে-না এ রজনী দেবগণে
বিশ্রামের দিনু অবকাশ
প্রভাতে—প্রভাতে কাল
দেবাসুরে অস্ত্র করে হইবে সাক্ষাৎ।
যাও—ঘোষণা শুনিয়া যাও
আরাে কিছু শুনে যাও দেবেন্দ্র নন্দন
সহুকাল সুখ-স্বর্গ মাঝে সবে করিয়াছ বাস,
তাই দুঃখিনী মর্থ্যের ব্যথা বুঝিতে না পার
জীবের হৃদয় নিয়ে ছেলে খেলা করে ;-
এবার জানাব দুঃখ
বুঝাইৰ মৰ্ত্তবাসী কত জ্বালা সহে রাত্রি দিন।

ভূভীন্ন দৃশ্য
দৈত্যপুরী ।
[ দূরে রণ-কোলাহল ও বাদ্যধ্বনি।]
( সশস্ত্র দীপ্তজী ও চিত্রঙ্কের প্রবেশ।)
দীপ্ত।
উত্তাল তরঙ্গ সম দেব সেন চয়
দৈত্যপুরী করেছে বেষ্টন।
ভেবেছিনু উষাকালে হইবে সমর।
অবকাশ দিল না দেবতা।
বিষ্ণুপদে তপসিদ্ধি অঞ্জলী দানিতে
পুনৰ্ব্বার ধ্যানমগ্ন দানব-সম্রাট।
এখনাে সে ধ্যান তার শেষ নাহি হল ।
উপযুক্ত অবসর ভাবি
নিশীথের ঘন অন্ধকারে
ঝাঁপিয়ে পড়েছে তারা
অস্ত্র করে সমর প্রাঙ্গণে।
ওই—ওই শোন’ দুন্দুভি নিনাদ
ওই শােন’ দেবতার উল্লাস-হুঙ্কার ।
করুক উল্লাস নাদ,
ও উল্লাস এখনই ক্রন্দনেতে হবে পরিণত।
ওই ভেরী দুন্দুভি নিনাদ,
এখনই ঘােষিবে পুনঃ দেবতার বিসর্জন গীতি ।
চিত্রাঙ্ক।

তৃতীয় দৃশ্য ]
গভীর্থ
৬৩
দীপ্ত।
দেবতার বিসর্জন গীতি।
ফাও যাও হে চিত্রাঙ্ক,
বীর্যে তব পরাজিত করহ শমনে,
মাের তরে বজ্রধর দেবেন্দ্র রয়েছে-
রহিয়াছে কোটী দেব সেনা,
উল্লাস উল্লাস করাে অসুর সকল,
যে শক্তি অর্জিত হ’ল বহু যুগ ধরি,
আজি হবে পরীক্ষা হার।
মিলেছে সমস্ত জাতি একসাথে সমর অঙ্গনে।
এক সাথে প্রাণ দাও
কিম্বা আনাে এক সাথে জয়-
একযুদ্ধে ত্রিদিবের আধিপত্য লাভ
কিম্বা হোক দৈত্য জাতি চিরতরে লয়।
[ উভয়ের প্রস্থান ।
( দধিমুখের প্রবেশ ।)
দধি।
ওরে বাবরে—বাবারে—বাবা! শেষকালে সত্যি সত্যি লড়াই বেৰে
গেল । বলা নেই, কওয়া নেই, একেবারে ধাঁ করে একটা
বিতিকিচ্ছি লড়াই। আর দোষই বা দেব কাকে? দেবতা বল’
দৈত্যি বল’ কোন বেটাই মানুষ নয়, একেবারে মালকেঁচা মেরে
লড়াইয়ে লেগে গেছে। হায়, হায়, কেন দুটো ভাল খাবার
লোভে, এ দত্যিদের দলে এসে জুটেছিলাম, এর চেয়ে যে কপিঞ্জ
মুনির আশ্রমে হরিতকি চিবােন ঢের ভাল ছিল। এখন উপায় :
প্রাণটা বাঁচাবার উপায় করি কি! ওরে বাবা ব্যাটার ষণ্ডামার্ক

৬৪
গভীর্থ
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
গুণ্ডারা পালাবার পথটা পৰ্যন্ত তীর বর্ষা দিয়ে আটকে রেখে
দিয়েছে।
( অঘাসুর ও বকাসুরের প্রবেশ।)
অঘা। কিহে, তুমি এখনাে একলাটী কচ্ছ কি? সবাই অস্ত্র নিয়ে চলে
গেছে, তুমি যে দাড়িয়ে আছি বড় ?
দধি। ইচ্ছে করে দাড়িয়ে নেই বাবা। ছোটবার পথ পাচ্ছি না।
বকা। ছুবার পথ পাচ্ছ না। তার মানে?
দধি। তার মানে ! তার মানে বুঝতে পারলে অন ক্যাবলার মত
জিজ্ঞাসা করতে না। আমার তলােয়ার চুরি হয়ে গেছে, তলােয়ার
বুঝেছ ?
অধ্য। সেকি হে? তলােয়ার চুরি গেল !
দধি। বােঝনি, বীরদপে গিয়ে এই এক ধমক লড়াই করে এলাম, হাজার
হাজার দেবতার মাথা বো বেঁ করে তলােয়ার ঘুরিয়ে বাতাসে উড়িয়ে
দিয়ে বড় ক্লান্ত হয়ে তলোয়ার খনি মাথার নীচে রেখে একটু
ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, সেই ফঁাকে কোন ব্যাটা গাঁটকাটা যেন আমার
তলোয়ার খানা মাথার তলা থেকে চুরি করে নিয়ে গেছে ।
দৈত্যদ্বয়। হে হে হে, সেকি হে !
দধি। আরে, তা না হলে কি আর এতক্ষণ এক বেটা দেবতাও বেঁচে
থাকৃত ? তােমরা এগােও। আমি কামার বাড়ীতে তলােয়ার
গড়াতে দিয়েছি, এতক্ষণে হয়ত তৈরী হয়ে গেছে। এই নিয়ে
এলাম বলে।
অঘা। তা যাও ভায়া মােদ্দা দেখ’ দেরী কর না কিন্তু। সেনাপতির আদেশ
দৈত্যপুরীর এক প্রাণও যুদ্ধে না গিয়ে ঘরে বসে থাকতে পাবে না।

তৃতীয় দৃশ্য ]
গয়ভীর্থ
দধি। (সভয়ে) এ্যা। এই আদেশ দিয়েছেন নাকি? তা আমার
আর ভয় কি? আমি তাে একবার যুদ্ধ করে এসেছিই। তােমরাই
তত বরং এতক্ষণ ঘরে বসেছিলে। এগোও—এগোও—তােমরা সব
এগােও, আমি যাচ্ছি—ঝ ক'রে তলােয়ার খানা নিয়ে চলে আসছি।
দৈত্যগণ।
চল হে চল।
[ দৈত্যগণের প্রস্থান।
সাধ, বাবা, ব্যাপার তাে বড় সাংঘাতিক! লড়াইয়ে কি সত্যি সত্যিই
যেতে হবে ? ওরে বাবা রে বাবা, আচ্ছা লড়াইয়ে না গিয়ে না হয়
কচুবনে গা ঢাকা দিয়ে থাকব । কিন্তু সেখানেও কি রেহাই
আছে ! হে ভগবান বোম-ভোলা, একটা মংলৰ বাৎলে দাও বাবা ।
একটু খানি বুদ্ধি হয়েছে—হয়েছে—সেদিন সাবিত্রীর কাহিনী
শুনলাম, সাবিত্রী যম রাজাকে জয় করে তার মৃত স্বামীর প্রাণ
ফিরিয়ে এনেছিল। তেমন একটী সতী সাবিত্রী যদি আমার জটে
যেত। হায় হায়, এমন অদৃষ্ট করে এসেছিলাম যে একটা সতী স্ত্রীও
বরাতে জুটলাে না। রোসােরোসো—আমাদের ও পাড়ার পদ্মমণি
রয়েছে ত! তা পদ্মমণিই বা সাবিত্রীর চেয়ে কম কিসে? তাকে
চোক কাণ বুজে কোন রকমে বিয়ে করে ফেতে পারলে সেকি
একটা ছোট খাট সাবিত্রী হতে পারে না? আরে হস্তী বঁধতে
হস্তিনীর দরকার আর টিকটিকির জন্য টিকটিকিনীই যথেষ্ট। যাই
যে ক'রে হােক একটা টোপর যোগাড় করে এবার পদ্মমণিকে বিয়েটা
তত করে ফেলি। টোপর—কিন্তু টোপর কোথায় পাবাে ? আরে
এ হতভাগা লডুয়ে গুলাের দেশে ঢাল আছে-তলোয়ার আছে,
অকাজের জিনিষ সবই আছে কেবল কাজের জিনিষটাই এ রাজ্যে
নেই দেখছি।
[ প্রস্থা।

গন্নাতীর্থ
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
( দৈত্য-রমণীগণের প্রবেশ ও গীত।)
কেবা আছ মহাবীর এখন ঘুমে।
মরণ বিষাণ বাজে সমর-ভূমে।
(দৈত্যগণের প্রবেশ ও গীত।)
আগে চল আগে চল আগে চল ভাই--
আমরা রয়েছি মাগাে আর কেহ নাই।
( দৈত-বালকগণের প্রবেশ ও গীত।)
সকলে।
আমাদের ছােট বুক ছোট হাত পা
তবুও দানব মােরা ভয় জানি না।
আগে চল, আগে চল, অ:লে চল ভাই।
অসিরা রয়েছি মাগাে আর কেহ নাই।
[ দিতে গাহিতে সকলের প্রস্থান :
(.
টোপর মাথায় বর বেশী দধিমুখের পুনঃ প্রবেশ
দধি।
( বিকট সুরে)
কেন সব হাদারাম সময়ে চলে
বিয়ের সানাই বাজে ছাদনাতলে।
সবাই করগাে বিয়ে ছাড়িয়ে লড়াই
ইহা ছাড়া বাঁচিবার অন্য পথ নাই।
( জরাসুর ও ঘােঘাসুরের প্রবেশ।
জরা। কে রে তুই সং সেজে দাঁড়িয়ে আছিস ?

তৃতীয় দৃশ্য ]
গভীর্থ
দধি। ( ক্রুদ্ধ স্বরে) রণ—রণ, সংহার—সংহার ( অস্ত্র দেখিয়া ভয় পাইয়া)
ও তুমি—ভাই, বন্ধু আমার—দৈত্য দাদা আমার—স্বজাতি ?
তা—তা ভাই আমার পদ্মকে—আপাততঃ যখন পাওয়া যাচ্ছে না,
তা তোমার বেশ একটী বোন আছে ন', এই নেহাৎ ছােটও নয়
বড়ও নয়, সতের, আঠার কি উনিশ পর্যন্ত।
জরা। কি—কি বলছিস্? আমার বোন আছে কি না আছে তাতে তাের
কি দরকার রে ? তোর মাথা ব্যথা কেন ?
ঘোঘা। লড়াই ফেলে বোনের খোঁজ কেন রে ?
দবি। বলছিলাম—বলছিলাম-না ছিঃ লজ্জা করে। থকৃগে, আমার
পদ্মই ভাল, তাকেই খুজে আছি, তােমরা এগােও।
জরা। কিন্তু তুমি লড়াইয়ে যাচ্ছি না!
দধি। যাচ্ছি না? তবে কি এ সাজে সেজেছি যাত্রা করব বলে ? আমি
তাে লড়াইয়েতেই যাচ্ছি।
ঘোথা। লড়াইয়েতে ! এই বেশে ?
দধি। হা গো হা এই বেশে। একি তোমাদের মত ঐ হেজি পেঁজি
লড়াই নাকি? এ হচ্ছে আসল লড়াই। একটা কীর্তি রেখে
যাবার মত লড়াই। বাবা বোঝ না, দেবতাদের সঙ্গে লড়াই-স্বয়ং
যম রাজের সঙ্গে লড়াই। আট ঘাট বেঁধে যেতে হবে তাে? তাই
লড়াই করবার আগে একটী সতী ইস্ত্রি বিয়ে করতে চলেছি।
হলে তােমার পবনই বল, শমনই বল কোনাে বেটার সাধ্যি নাই যে
আমার চুলের টিকি ছুঁতে পারে। যেমনি তারা অসবে অমনি
সতীর তেজে একেবারে ভস্ম, এই ভস্ম—এই ভস্ম ।
( নেপথ্যে কোলাহল )

৬৮ গন্নতীর্থ [ দ্বিতীয় অঙ্ক জরা। ওই ভয়ানক কোলাহল উঠছে। যুদ্ধের অবস্থা বড় সাংঘাতিক হয়ে উঠল । চল হে চল, আর দেরী নয়। জয় দৈত্যপতি গয়াসুরের জয়। [ উভয়ের প্রস্থান। দধি। (কঁাপিতে কাপিতে) ভয়ানক হয়ে উঠলা ভয়ানক হয়ে উঠল ? ওরে বাবা! দৈত্যগণ ভয় নাই আমি আছি, এখনও পর্যন্ত আছি। তােমরা এগােও, আমি, আমি-ওরে বাবা কি গণ্ডগােল ! পদ্ম, বাপ আমার দেখা দাও- ( ছুটিয়া পলায়ন। (দীপ্তজিহ ও চিত্রাঙ্কের পুনঃ প্রবেশ।) দীপ্ত। চিত্রাঙ্ক। দীপ্ত। দৈত্য-সৈন্যে মর্মভেদী কেন হাহাকার ? দেব দলে কেন জাগে নব-দৃপ্ত উল্লাস হুঙ্কার ? কে—কে আসিল পুনৰ্ব্বার করিতে সংগ্রাম? কে আসিল—কে আসিল হেন বীৰ্য্যবান ? মহাদেব-মহাদেব নেমেছে সমরে। ললাটের বহ্নি তার সহিতে না পারি দৈত্যকুল পায় তরাসে। মহাদেব-মহাদেব । একদিকে কালমৃৰ্ত্তি ধরিয়াছে যম, অন্যদিকে মহাদেব নাদে। কি করি—কি করি কোন দিকে যাই, কোন জনে আক্রমণ করিব প্রথম। চিত্রাঙ্ক।

গভীর্থ
৬৯
হে সম্রাট, এখনাে জাগিয়া ওঠো
অস্ত্র ধর রণে
নহে দৈত্যকুল হইল নিৰ্ম্মল।
( নেপথ্যে কোলাহল )
দীপ্ত
চিত্রাঙ্ক।
একি পশ্চাতে আবার কারা করে কোলাহল।
মায়াধর দেবগণ নয় বলে পুরীমাঝে করে কি প্রবেশ।
মায়া বলে পুরী নাঝে করিবে প্রবেশ ।
কৈ, কোথায়? ওঃ হয়েছে।
আর চিন্তা নাই আমাদের ।
দক্ষিণ সমুদ্র-তীরে
মহাবল গজাসুর নিদ্রাগত ছিল।
দেব-দৈত্য সমরের সংবাদ শুনিয়া
আসিতেছে নৃত্য করি সমর অঙ্গনে।
ভয় নাই-ভয় নাই আর
মহাদেবে গজাসুর অস্বনিবে রণে ;
যাও—ছুটে যাও পবনে রােধিতে
আমি যাই যমের সম্মুখে।
[ উভয়ের প্রস্থান।
(নৃত্য করিতে করিতে গজাসুর এবং তৎপশ্চাতে তাহার সৈন্যগণের প্রবেশ।)
গীত।
অসুরগণ।
হাঃ হাঃ হাঃ-
গজাসুরের সৈন্য মােরা যুদ্ধে ডরি না।
গজা। (শুণ্ড নাড়িয়া) হু-

৭০ গভী [ দ্বিতীয় অঙ্ক অসুরগণ। আয়রে ছুটে মর্দ জোয়ান আয়রে অসুর দল। বিশ্ব ভুবন চরণ দাপে কাপুক টল মল চড় চড় পাহাড় ভাঙ, সাত সাগরে ছুটুক বান, আকাশ ছিড়ে উল্কা গ্রহ উপড়ে মারাে ঘা। গজা। হু- [ নাচিতে নাচিতে প্রস্থান। , ( ইলা ও কলাপীর প্রবেশ।) རྟེན་{ | দেব দৈত্যে মহাযুদ্ধ হয়েছে আরম্ভ। অসি মাঝে দানবের ঝলে যেন বিজলীর ছটা। ঐ হােথা মহেশ্বর গজাসুরে রণ। শিঙ্গানদ বােম্ বােম্বােল ছায়ামূর্তি ভূত প্রেত পিশাচ নর্তন। একি! অসুর কটক মাঝে হাহাকার রব । কে পড়িল, কে পড়িল, মূচ্ছাগত দানব সেনানী? চিত্রাঙ্ক ! চিত্রাঙ্ক মূচ্ছিত হ’ল যম দণ্ডাঘাতে ! কি হবে-কি হযে উপায় তবে ? কে রক্ষিবে দানবের মর্যাদা সম্মান? ( দূরে শঙ্খধ্বনি) ঐঐ হ’ল শঙ্খের নিনাদ। ধ্যান শেষে জেগেছেন পিতা। ভয় নাই—ভয় নাই, দানব সকল- বিষ্ণু পূজা সমাপিয়া উঠেছেন দানব সম্রাট, == তৃতীয় দৃশ্য ] গভীর্থ ৭১ কলাপী। এখনি হইবে ধ্বংশ, দেবতার সৰ্ব্ব পরাক্রম। দেখ চেয়ে দেখ রে কলাপী কি অপূর্ব রণ করিছেন পিতা! যমরাজে হস্তে গলে বঁধিয়া কৌতুকে রথ হতে ফেলেছেন ভূমে। তারপর ঝম্প দিয়া বুথে তার ব’সেছেন পিতা । চমৎকার—চমংকার, আর নাহি ভয় রণে ভঙ্গ দিয়া—ঐ— উদ্ধশ্বাসে শত্রুগণ করে পলায়ন- পাশ হতে পলায় বরুণ, বজ্র হাতে পলায় বাস, ঐ গৃহ পানে ছুটে কুবের, পবন ; বৈষ্ণবস্ত্র এড়িলেন পিতা- পাশ, বজ্ৰ মুছৰ্ত্তেকে হ’ল শক্তিহীন। (নেপথ্যে দৈত্য-সৈন্যগণ—জয় দৈত্য-সম্রাট গয়াসুরের জয়।) রণ জয়-রণ জয় সম্পূর্ণ হইল। চল—চলরে কলাপী, জয়মাল্য করিগে প্রস্তুত। [ প্রস্থান। { শৃঙ্খলিত যমকে লইয়া গয়াসুর, দীপ্তজিহ্ব ও দৈত্য-সৈন্যগণের প্রবেশ।) গয়া। মহা যুদ্ধ হল অবসান। পরাজিত দেবতা মণ্ডল চতুর্দিকে উদ্ধশ্বাসে করে পলায়ন।

12
গয়াতীর্থ
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
কুবের, পবন, ইন্দ্র
সকলে পলায়ে গেছে, ভগ্ন অসি রাখি রণস্থলে,
পারে নাই পলাইতে—একমাত্র দেবতা শমন ;-
যাক, অন্য দেবগণ-কারে নাহি চাই,
কিন্তু শুনি সৰ্ব্ব শাস্ত্ৰে, সৰ্ব্ব লােক মুখে
যম তুমি মৃত্যু
অধিপতি
মৃত জীব আত্মা’পরে আধিপত্য করো—
পাপ পুণ্য করহ বিচার।
দেখিব বিচার তব বড় অকিঞ্চন--
তাই বন্ধু বহু যত্নে পরানু শৃঙ্খল।
দীপ্তজিহ্ব-স্বর্গ পুরী করে অবরােধ
দুন্দুভি পটহ নাদে তিনকে বিকম্পিত করি
দেবেন্দ্র প্রাসাদ শীর্ষে
দানবীয় রক্তধ্বজা করহ উডভীন।
যাও চলে স্বর্গলােকে
আমি আসিতেছি—যারাজে বঁধি লয়ে রথের চাকায়
( প্রস্থানােত)
( মহাদেবের প্রবেশ।)
মহাদেব। দাড়াও দানবপতি-
ইন্দ্র চন্দ্রে বিমুখিয়া রণে
শমনে লইয়া তুমি কোথা চলে যাও
রণ—রণ—রণ দাও ত্রিশূলী শঙ্করে।
গা। ত্রিশূলী শঙ্কর ?

তৃতীয় দৃশ্য ]
গয়াতীর্থ
৩
এখনাে দাঁড়ায়ে তুমি সমর অঙ্গনে।
আমি তাে ভাবিয়াছিনু
গজাসুর বীৰ্য বলে তাড়িত হইয়া
কোন কালে পলায়েছ ভুত প্রেত সহ
কৈলাস পর্বত মাঝে পাষাণ গুহায় ।
মহাদেব। গজাসুর? গজাসুর ! হাঃ হাঃ হাঃ
রক্ত সিক্ত দেহ তার
দেখে আয় পড়ে আছে সমুদ্র সৈকতে
আত্মা তার বায়ু স্তরে কঁদিয়া ফিরিছে।
রে অসুর,—পাশ, বজ্র, যাদণ্ড ব্যর্থ করেছিস,
তাই কি ভাবি-
ত্রিশূলীর শূল হ'তে পাবি পরিত্রাণ?
দে রণ, রণ দে মোরে দুরন্ত দানব,
ব্যর্থ কর সেই শূল,
সন্ধানে যাহার একদিন হয়েছিল ত্ৰিপুর সংহার
গয়া। ( অস্ত্র ধরিয়া) ত্ৰিপুর সংহার ।
( সংযত হইয়া)
না করিব না রণ আমি।
সম বােদ্ধা সহ রণ কর্তব্য বীরের
সম তত দূরের কথা,
যােদ্ধা পদ বাচ্য-কভু নহে যেই জন--
সেই ভাঙ্গড়ের সহ রণ
গয়াসুর চাহে না করিতে।
মহাদেব। কি বলিলি ? নহি যােদ্ধা।
কেবল ভাঙ্গড় আমি।

৪ গভীর্থ [ দ্বিতীয় অল্প গয়া। ভাঙ্গড়-ভাঙ্গড় তুমি। ভঙ্গি খেয়ে বাহ্যজ্ঞান চেতনা বিহীন দুর্গন্ধ বাঘের ছাল কটীতে বাধিয়া— ভুত প্রেত সহ নাচো শশ্মানে মশানে। চণ্ডাল ডোমের সাথী মাঠে ঘাটে রাত্রি দিন শূকর চরাও- যাও যাও সেই কাৰ্য কর গিয়া পুনঃ আসিও না সমর করিতে। বুদ্ধি হীন প্রমত্ত মাতাল হিতাহীত কিছু নাহি জ্ঞান? স্বার্থ বশে হীন মতি দেবতা তোমারে যখনি ক্ষেপায়ে দেয় তখনই ছুটিয়া আস’ ত্রিশূল লইয়া ! স্বর্গ হোক দেবতার কিম্বা দানবের হে উন্মাদ তাহে তব কিবা আসে যায় ! তব তরে যে শশ্মান চির দিন সে শশ্মান বাস চির দিন বাঘছাল পরা চির দিন ভূত প্রেত সাথী। উন্মাদ, উন্মাদ তুমি অসি হস্তে উন্মাদেরে কোন শিক্ষা দিব ? ফিরে যাও-ফিরে যাও কৈলাস ভবনে। কি আর কহিব তােমা, লজ্জাহীন তুমি,

তৃতীয় দৃশ্য ]
গভীর্থ
থাকিলে লজ্জার লেশ
বহুক্ষণ লইতে বিদায়।
মহাদেব। ফিরে যাব—ফিরে যাব দানবের তিরস্কার শুনি।
ভাল তাই যাব।
নিন্দারে ডরিনা আমি,
নিন্দা ভস্ম গায়ের ভূষণ।
চলিলাম ফিরে
কিন্তু রে দানব, আমি ফিরে গেলে
তােরও তবে দেবহিংসা ত্যজিতে হইবে
স্বৰ্গলি দিবি বিসর্জন।
আমার সম্মুখে কর পণ,
এখনি দানিবি মুক্ত কালপতি যমে।
মায়া। কেন, ত্রিশূলের ভয়ে?
হাঃ হাঃ হাঃ!
দেখিতেছি এতক্ষণে সুরু হল
মাতালের প্রমত্ত শাসন।
-দিব না—দিব না ছেড়ে কালপতি যমে,
স্বর্গরাজ্য ছাড়িব না আমি।
সমর বিজয়ী আমি দুর্ধর্ষ দানব
চলিলাম বন্দী যমে বাঁধিবারে রথ-চক্র সনে,
সাধ্য যদি থাকে—বাধা দাও, বুঝিব বিক্রম।
মহাদেব। মরমর তবে দাম্ভিক দানব।
এই হানিলাম শূল,
নিজদোষে নিজ মৃত্যু আনিলি ডাকিয়া।

গন্নাতীর্থ
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
গয়া।
হানােহনাে শূল বাধা নাহি দিব।
অবিচার-স্রোত হ'তে মত্ত লােক উদ্ধার কারণ
ধরিয়াছি খড়গ চৰ্ম্ম, শর শরাশন।
বক্ষে মাের বিষ্ণুভক্তি-
মাতৃশক্তি অক্ষয় কবচ।
এ সকল যদি সত্য হয়
থাকে যদি বিশ্বলােকে মাতৃত্ব গরিমা—
থাকে যদি বিষ্ণুভক্তি বীর্যের মহিমা
তােমার ও ত্রিশূলে তবে নাহি ডরি আমি।
হানাে--হানাে শূল প্রমত্ত শঙ্কর !
মহাদেব । মরমর তবে।
( ত্রিশূল সন্ধান, গয়াসুরের বক্ষে লাগিয়া তাহা মাটীতে পড়িল ।)
একি! একি !
ব্যর্থ করে দিলি মাের অব্যর্থ ত্রিশূল !
গয়া। হাঃ হাঃ হাঃ!
আমি করি নাই ব্যর্থ, ব্যর্থ করিয়াছে
বিষ্ণুভক্তি—মাতৃশক্তি মাের।

তৃতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
স্বর্গলােক।
[ অপ্সরাগণ ও সুরাপান রত দৈত্য-সৈন্যগণ ]
অঘা। চালাও-চালাও সব স্ফুর্তি চালাও।
জনৈক দৈত্য। হাঁহ, এত কষ্ট করে স্বর্গটা যখন জয় করলুম বাবা, তখন
তোমাদের নইলে স্ফুর্তি জমবে কেন?
অপ্সরাগণের গীত
আজ সজনী জাগব বাসর ফুল কাননে।
কইব যত গােপন কথা প্রিয়তমের কাণে কাণে।
চাদ ভুলানাে কোন রূপসী বাজিয়ে গেল কিঙ্কিনী,
তার পরশে মধুর হ’ল জ্যোৎস্না নিশিথিনী।
কঙ্কনেরি ইঙ্গিতে, বিশ্ব মাতে সঙ্গীতে,
মুঞ্জরিল অশােক চাপা গন্ধ-পাগল নন্দনে।
অঘা। হাঃ হাঃ হাঃ! খাসা গান-খাসা মজা।
বকা। এখন এ মজা লুটতে আছি আমরা।

৭৮
গভীর্থ
[তৃতীয় অঙ্ক
জরা। ইন্দ্র ? তপন ? সে দফায় এখন কঁাচকলা। জাননা তাদের দশা
এখন কি ?
দৈ গণের গীত।
?
হিঃ হিঃ হিঃ।
ও ভাই দেবতাগুলোর দশা এখন কি
যেন ভাঙ্গার উপর চিংড়ি মাছ আর পান্ত ভাতে ঘি is
হিঃ হিঃ হিঃ-
( হেসোনা ডাঙ্গার চিংড়ি বুঝলে কিনা)
ছিলেন ডুবে এই লাল জলে,
এখন বন বাদাড়ে কাপাস উলে,
মদের খিদে পেলেই খায় কাচকলা নয় কচুর চচ্চড়ি ।
পবন, বরুণ, কুবের আর ইন্দ্র তাদের রাজা,
মনের দুঃখ কইছে ব’সে মহাদেবের ষাঁড়ের পাশে
আর কেঁদে কেঁদে ছিলিম নিয়ে টানছে ক’সে গাঁজা।
( ও ভাই সবাই টানে, কিন্তু যম কি টানে ?)
( উহ টানছে বটে, তবে গাঁজা নয় সে।
চার পা হয়ে টানছে শমন দৈত্যরাজের ঘানি।
অঘ। (নেপথ্যে চাহিয়া) আরে বাবা! কি ব্যাপার।
সকলে। কিরে–কিরে ?
অঘা। সেনাপতি চিত্রাঙ্ক। দুই চোখে তার আগুণ জ্বলছে। স্বর্গে এসে
দেবতাদের তিন কলসী মদ সাবাড় করেছে কিনা, তাই তার অসুরের
গায়ে একেবারে দেবাসুর বিক্রম হয়েছে।

(প্রথম দৃশ্য গভীর্থ ৭৯) সকলে। দেবাসুর বিক্রম, অঘ। ওই দেখ, সেই বিক্রম নিয়ে সেনাপতি একেবারে ধেই ধেই করে পিছনে ছুটে আসছে। বকা। এ্যা বলিস কি ? ঘােঘা। কিন্তু কার পিছনে ছুটছে ? অগ্না। এত বীর দাপ--তবু বুঝিস নে ? কার পিছনে আবার ? মেয়ে মানুষ--ওরে মেয়ে মানুষের পিছনে। দে ছুট—দে ছুট, ওই এসে। পড়ল । [ সকলের ছুটিয়া প্রস্থান। ( পলায়ন-পর উৰ্বশীর পশ্চাৎ চিত্রাঙ্কের প্রবেশ।) চিত্র। কোথা যাবি কোথা যাবি রে উক্কাশী আমার কবল হতে কোনরূপে পরিত্রাণ পাবি? সরে বাসরে বা দৈত্য, দেবভােগ্যাদেবপূজা আমি দানব স্পর্শিতে মােরে নারিবে কখন। উৰ্বশী । চিত্র। স্ক। দেবভোগ্যাদেবভোগ্যা ! হাঃ হাঃ হাঃ! কোথায় দেবতা তাের ! মর্ত্যলােকে ঘন বনে, পৰ্বত করে কঁদিয়া ফিরিছে সবে করি আর্তনাদ। এস সখি, ধরা দাও সাহুর বন্ধনে। বা সরে সরে, নীচ কামুক-মাতাল । মাতাল ! সুরাপান ঘৃণা কর বুঝি ? উর্বশী। চিত্রাঙ্ক।

৮
গয়াতীর্থ
তৃতীয় অঙ্ক)
উর্বশী।
চিত্রাঙ্ক।
দেবতারা সুরাপায়ী নহে? যােগী শ্রেষ্ঠ তারা।
এত সুরা স্বর্গলোকে কলসে কলসে
এ বুঝি কেবল তারা যজ্ঞানলে আহুতি যােগায়!
সেই সুরা করিয়াছি পান,
তাই কহ দানবেরে প্রমত্ত মাতাল ! হাঃ হাঃ হাঃ!
এস লাে রমণী ভজহ আমারে-
কভু নহে—নি নতি দানবেরে
দেহ দান কভু করিব না।
কভু করিবে না?
সতী শিরােমণি তুমি !
সতীত্বের এত গৰ্ব্ব যদি
কেন তবে এত ঘঁদে পরেছ কঁাচলী?
কেন শিরে বেণী বাঁধা ভুজঙ্গ সমান?
কেন তব দেহ-ভঙ্গে শিখায় শিখায়
ঝলিতেছে চঞ্চল অনল !
ওই—ওই তব নয়ন বিভঙ্গে,
কত যুগ যুগান্তের
অতৃপ্ত লালসা লিপি রহিয়াছে লেখা।
মদালস চক্ষু দিয়া পড়িতেছি যেন সেই নিমন্ত্রণ
এসাে“ছলনা কি হেতু আর,
ধরা দাও সখি-
ওগাে রক্ষা করে কে আছ কোথায় ?
সুরাপায়ী প্রমত্ত দানব, অবলার
করে অপমান।
উর্বশী ।

ম দৃশ্য ] গন্নাতীর্থ (গয়াসুর ও দীপ্তজিষ্মের প্রবেশ।) গয়া । চিত্রাঙ্ক ! চিত্রাঙ্ক। গুয়া। উর্বশী । হয়। গয়া। দীপ্ত। গয়া। একি, সম্রাট! ( অভিবাদন ) যাও দেবী মুক্ত তুমি- যথা ইচ্ছা চলে যাও নিঃশঙ্ক হৃদয়ে। কে আপনি মহাভাগ? শুনিলে তাে ? দৈত্যপতি গয়াসুর আমি, যাও। [ উৰ্বশী ধীরে ধীরে প্রস্থান করিল। দীপ্তজীষ্ম, শৃঙ্খলিত কর। মহারাজ! ( আদেশের স্বরে) দীপ্তজী! ( শৃঙ্খলিত করণ ) বাও নিয়ে যাও বধ্যভূমে না-না, নিজে যাবাে আমি নিয়ে এস অামার পশ্চাতে। সম্রাট-সম্রাট কি-কি বলিতে চাও? সম্রাট, দৈত্য-সেনাপতি এই কুমার চিত্রাঙ্ক সম্রাটের প্রধান সেনানী। জানি আমি তাহা। সম্রাট, বন্ধুর হইয়া নিজে আমি চাহিছি মার্জনা প্রাণ ভিক্ষা দিন চিত্রাঙ্কেরে। প্রাণভিক্ষা! কারে দেব প্রাণভিক্ষা? দীপ্ত। ওয়া। দীপ্ত। গয়া। দীপ্ত । গয়া গভীর্থ [ তৃতীয় অঙ্ক চিত্রাঙ্ক। যার হেতু কামােন্মত্ত পশু সম যেই কুলাঙ্গার রমণীর পূত অঙ্গে করে হস্তক্ষেপ তারে কহ ক্ষমা করিবারে ? ছি-ছি-ছি-একি হীন ঘৃণিত ব্যাভার! স্বর্গ-জয় ধৰ্ম্ম-রাজ্য স্থাপন প্রয়াস সব পণ্ড হল! কি করিলি—কি করিলি রে চিত্রাঙ্ক নিজে ধ্বংশ হলি— তার সাথে ধ্বংশ করে দিয়ে গেলি অসুরের সর্ব ভবিষ্যং-অসুরের জাতিত্ব গৌরব । মহারাজ-অকারণ মনঃ ক্ষোভ তব ; করি নাই আমি হেন রূপ কোন অপরাধ নষ্ট হবে অসুরের জাতিত্ব সম্রম। ঊর্বশী সে স্বর্গ-বারঙ্গিন-- দেহ তার পণ্য দ্রব্য সম ; এত দিন সেই দেহ দেবগণ করেছে সম্ভোগ এবে সে উর্বশী অসুরের দাসী— দেহ তার অসুর সম্পদ স্তব্ধ হ’ স্তব্ধ হ’ রে পাপাত্মা দুর্জন। পুনৰ্বার হেন কথা হ'লে উচ্চারিত জিহ্বা তাের উৎপাটীত করিব এখনি। স্বর্গ-বারাঙ্গনা! কেবা সেই বারাঙ্গনা ? পর রমণীর-মাতা ভিন্ন অন্য পরিচয় কভু জানেন অসুর! কাম-দাস নীচাত্মা, লম্পট, আত্মপক্ষ সমর্থতে গয়া।

প্ৰৰন দৃশ্য ] গাতীর্থ এত বড় ঘৃণ্য কথা কর উচ্চারণ । দীপ্তজিত্ম, যাও আদেশ পালন করে ছিন্ন মুণ্ড-ছিন্ন মুণ্ড পামরের এনে দাও ত্বরা। মহারাজ, অ—দ্বিরুক্তি চাহিনা আর, যা ও- [ চিত্রাঙ্ককে লইয়া দীপ্তজিত্বের প্রস্থান দাপ্ত। গয়া। ( শচীর ও ইলার প্রবেশ।) শী। ‘ম।। ইল।। গায়। গয়া। দৈত্যরাজ ; কে—ক আপনি? পিতা, ইনি দেবেন্দ্র মহিষী । দেবেন্দ্র মহিষ। শচী দেবী। কহ মাতা কি আদেশ তব ? আদেশ ! আদেশ নয়? আসিয়াছি বন্দিনীর নমস্কার জানাতে তোমায়। মাতা,-মাতা- স্বর্গপুরী অবরুদ্ধ করেছে দানব মহা ভয়ে ছিলাম মরিয়া । এবে স্বচক্ষে দাঁড়ায়ে হেথা হেরিলাম দানবের অদ্ভুত বিচার, নারী প্রতি অপরূপ সম্মাননা তার। হে দানবপতি, স্বর্গের ইন্দ্রাণী আমি মুগ্ধ মনে অকপটে তবু কহিতেছি নারী-ধৰ্ম্ম রক্ষা হেতু এমন বিচার- শচী।

৮৪ গয়ভীর্থ [তৃতীয় অঙ্ক গয়া। শচী। করে নাই কোন দিন দেবেন্দ্র আপনি। মহাভাগ, লহ তুমি নমস্কার মোর। মাতা, অকারণ স্তুতিবাদ করান। পুত্রের, নারী-ধৰ্ম্ম রক্ষা করা চিরদিন কৰ্ত্তব্য বীরের। ইথে যদি প্রশংসার গাকে অবকাশ- মোরে নহে করে তাহা কন্যারে আনার ইলা মোরে দিয়েছে সংবাদ, তাই আসি রক্ষিলাম ঊর্ধ্বীর মান। হে কল্যাণী, রাজ্যচুতা দেবেন্দ্রাণী রিক্ত হস্তে তােমারে কি দিবে আশীৰ্বাদ। গজমােতি, পারিজাত-হার, এ নন্দন উপবন, স্বরগের সম্পদ ভূষণ, সকলের অধিশ্বরী আজি তুমি গাে কল্যাণী । এ ঐশ্বৰ্য বৈভব মাঝারে, এই আশীর্বাদ শুভকালে-শুভক্ষণে মনােমত পতিলাভ করিও জননী। ( মাথা নত করিল !) একি! মাের আশীর্বাদ শুনি অকস্মাৎ কেন চমকিতা? জয়ন্তের মাতা তুমি মনােমত পতিলাভ আশীর্বাদ করিলে আমায় । মনােমতপতিলাভ দি আশীর্বাদ করি শুধু ইলা। শচী। ইলা। শচী।

প্রথম দৃশ্য ] গাভীর্থ গয়া। শচী। তাহে তব—একি ইলা চোখে জল ! কঁদিতেছ তুমি ? দৈত্যরাজ- মাতা সে কাহিনী শুনিবার নাহি প্রয়োজন। শুধু শুনে রাখ, ঐ আঁখিজল হেরিয়া নয়নে যুগে যুগে দৈত্যশক্তি উঠেছে গরজি— ঐ আঁখিজল ধারা মোচন কারণ ভুবলে স্বর্গপুরী লয়েছি কাড়িয়া, দানবীরে স্বর্গলোকে অধিষ্ঠাতা করিয়াছি দেবীর আসনে। কিন্তু হায়, তবু কেন আঁখিজল মুছাতে পারি না। তবু কেন ঝরে জল শ্রাবণের বারিধারা সম । দৈত্যরাজ- যাও দেবী, দানবীর ব্যথা তুমি বুঝিতে চেয়োনা সাধ্য নাই বুঝিতে সে ব্যথা। ফিরে যাও ফুল্লমনে দেবেন্দ্রের পাশে সঙ্গে নাও অন্য যত দেবের রমণী, চিরমুক্তি দিলাম সবারে। একান্ত বাসনা যদি হয়, জিজ্ঞাসা করিও তবে নন্দনে তােমার দৈত্যকন্যা কেন ফেলে তপ্ত আঁখিজল । [ প্রস্থান। বুছিতেছি—অনুমানে বুঝিতেছি সব। মদোদ্ধত সন্তান আমার চিরদিন ভয় করি তার ব্যবহার। গয়া। শচী।

৮৬ গন্নাভীর্থ [ তৃতীয় অঙ্ক ইলা। মাতা, তােমারে কি আর কব ? যেই অত্যাচার হ'তেছিল উর্বশীর প্রতি, হয়তাে বা ইন্দ্রাণীরও প্রতি তাহা হইতে পারিত তুমি-তুনি শুধু রাখিয়াছি ইন্দ্রাণীর নারীত্ব গৌরব। উচ্চকণ্ঠে দেবী শ্রেষ্ঠা বলি তোমা ঘোষণা করিয়া, মুগ্ধনে নিবেদিমু অন্তরের পূজা। না, মা, একি কর—একি কর মাতা ? আমি কন্যা, তুমি মোর মাতা। সর্বনাশা হেন কথা করি উচ্চারণ অমঙ্গল কর কি কারণ ? কেন মাগাে শুষ্ক তাের মুখখানি রুক্ষ্ম তোর কুল কলাপ! দান করেছে জয় এ অমরাবতী সেই হেতু এত বিষাদিনী ? নিদ্রাহীন আঁখি দুটী একেবারে আরক্ত হয়েছে । দুশ্চিন্তার কালাে রেখা ললাটে পড়েছে-- আয় মাগাে মন সাধে সাজাইব তােরে গন্ধতেলে মাজি কেশ বাঁধিব কবরী, ললাটে আঁকিয়া দিব সুমঙ্গল সিদুরের রেখা। ইলা -না এমন বিষঃ বেশে যাবি তুই পতি পুত্র পাশে, সেকি হয়? তাহে যে গাে নিন্দা হবে পিতার আমার। আয়-আয় মাগাে। ( প্রস্থানেদ্বিত) শচী। ইলা।

প্রথম দৃশ্য ] গম্নতীর্থ ৮৭ (গয়াসুরের প্রবেশ। ) গয়া। শচী। দাড়াও জননী, ইন্দ্রের অমরাবতী সত্য বটে নিয়েছি কাড়িয়া, কিন্তু মাগাে বিন্দুমাত্র বৈরী ভাব নাহি মম ইন্দ্রাণীর প্রতি। রিক্ত হস্তে পতি পাশে তোমারে মা ফিরিতে না দিব। কহ মাতা কোন উপহার দিলে সন্তুষ্ট হইয়া যাবে দেবেন্দ্র মহিষী ? দৈত্যরাজ, উপহার সত্য যদি দিতে চাও মোরে সকল দেবতা মুক্ত বন্দী করি রাখিয়াছ শুধু শমনেরে । সেই শমনের মুক্তি চাই উপহার। শমনের মুক্তি! বড় সাধ ছিল মনে, তাহারে লইয়া -থাক তাই হবে মত। রাখিতে সম্মান তব করি অঙ্গীকার নিজ হস্তে শমনেরে মুক্তি দিব আমি। ( সকলের প্রস্থান। ওয়া। (মদন ও রতির প্রবেশ।) গীত। বতি। কুম-২, কুসুম-ধ, কেন মদন-বিলাসে অলস-তনু ? বাহুর বাঁধনে, অধর আননে, এসলাে নাগরী ভুঞ্জি মদন।

গভীর্থ [তৃতীয় অঙ্ক গয়া। একি হল! কি আশ্চর্য ! জাগ্রত দাড়ায়ে আমি, কিম্বা হেরি নিদ্রাঘােরে অসম্ভব ভীষণ স্বপন। হাঃ হাঃ হাঃ! উর্বশীউৰ্বশী তুমি ? চিত্রাঙ্ক--চিত্রাঙ্ক—ছুটে এস ত্বর দেখে যাও-দেখে যাও সুরেন্দ্র বন্দিতা এই স্বর্গ নিবাসিনী আসিয়াছে ভিখারিণী সম আজ বাচিকা হইয়া দানবেরে নিজ দেহ করিতে অর্পণ। দেখে যাও দেবতা পুজিতা সেই স্বর্গের অপ্সরী ( চিত্রাঙ্কের ছিন্নমুণ্ড লইয়া প্রতিহারীর প্রবেশ।) প্রতি। মহারাজ! গয়া। গয়া। উর্বশী। গয়া। কে কে ? সেনাপতি চিত্রাঙ্কের ছিন্নমুণ্ড এই আনিয়াছি তব পদে দিতে উপহার। ওঃ-ওঃ, চিত্রাঙ্কচিত্রাঙ্ক- নিয়ে যাও—নিয়ে যাও ছিন্নমুণ্ড সম্মুখ হইতে। কোথা যাবে—কোথা যাবে ছিন্নমুণ্ড লয়ে। রে নিলজ্জা কামুকা পাষাণী, মর্থ্যের জননী সমা ভেবেছিনু পবিত্ৰা তােমারে। তাের মাঝে মাতৃ-মূর্তি দেখেছি কল্পনা নয়নে। রাখিতে সম্মান তাের { প্রথম দৃশ্য গন্নাভী ৯১ চিত্রাঙ্কের ছিন্ন দেহ শ্মশানে লুটায় - আর তুই কিনা হেথা বারাঙ্গনা সম পুনঃ এসেছিস্ দেহ সৎপিতে? এই নে--এই নে দেবী, দানবের প্রেম উপহার!' (মুণ্ড নিক্ষেপ) [ অনাদ করিয়া প্রস্থান। উব য়া। ! হাঃ হাঃ হাঃ- দীপ্তজির দীপ্তজি! দেখে যাও উর্বশীর প্রেম অভিসার দেখে যাও দানবের প্রেম উপহার। ( দীপ্তজিঙ্গের প্রবেশ । ) প্তি। ওয়া। দীপ্ত। ওয়া। দীপ্ত। মহারাজ! ( চমকিত হইয়া) দীপ্তজী। মহারাজ, আসিয়াছি ভয়াবহ দুঃসংবাদ করিয়া বহন। কি তােমার বার্তা দীপ্তজিত্ব ? মহারাজ ঘোর দুঃসংবাদ ! নিরুদ্দেশ সম্রাট নন্দিনী। কি—কি বলিলে, নিরুদ্দেশ ইলা বাক্য তব পারি না বুঝিতে, স্পষ্ট করি কহ। মহারাজ কিছুক্ষণ পূৰ্বে দেখিয়াছি মন্দাকিনী ঘটে বঁধা একখানি তরী। য় ।

৯২
গভীর্থ
[তৃতীয় অঙ্ক
রাজকন্যা ইন্দ্রাণীরে বিদায় দানিয়া
সেই পথে ফিরিছেন গৃহে
হেন কালে দেখা হ’ল শমনের সনে ;
কি যেন কহিল যম,
অঙ্গুলি নির্দেশে তারে দেখাল তরণী ।
অকস্মাৎ কি যে হল !
রাশি রাশি ধূম-পুঞ্জ ঘের ঘনকারে
মুহুর্তেকে ব্যাপিল চৌদিক।
সেই অন্ধকার মাঝে চকিতের প্রায় কি যে হয়ে গেল
কিছু আর নারিনু বুঝিতে।
ক্ষণ পরে চেয়ে দেখি
তটভূমে বিহবলার প্রায় রহিয়াছে সখীগণ
—রাজকন্যা হয়েছে উধাও।
ষড়যন্ত্র“ষড়যন্ত্র-দেবতার যড়যন্ত্রে নিরুদ্দেশ ইলা !
মায়াবলে অন্ধকার করেছে সৃজন
মায়াবলে দৈত্যগণে বিভ্রান্ত করিয়া
দেব ইলারে মাের করেছে হরণ !
নীচ-আত্মা কাপুরুষ নিবীর্য দেবতা
সম্মুখ-সমরভূমে পরাজিত হয়ে
হেন রূপে জিঘাংসার করিবি পূরণ
কন্যাহারা করিয়া আমারে ?
দিব না—দিব না তােরে মন সাধ পূরাতে কদাপি
হােক স্বর্গ, হােক মর্ত্য, হােক রসাতল
যেখানে রাখিস তারে
গয়া।

দ্বিতীয় দৃশ্য ]
গয়াতীর্থ
অন্বেষিয়া অনিব নিশ্চয়।
সে প্রয়াস ব্যর্থ যদি হয়
জ্বালামুখী বাণের সন্ধানে
ভস্ম করি উড়াইব এ তিন ভুবন,
সৃষ্টি লােপ করিব নিশ্চয় ।
দ্বিতীয় দৃশ্য
মন্দাকিনী তীর।
থেমে গেল বীণার ঝঙ্কার,
কুঙ্কটিকা হইল বিলীন।
কোথা আমি ? কোথা মম সখীগণ
কোথা সেই নদী বক্ষে বিচিত্র তরণী !
কি আশ্চর্য! কেহ কোথা নাই।
একি স্বপ্ন, কিম্বা কোন দৈবী মায়া।
মনে পড়ে শমন-ইঙ্গিতে
মন্দাকিনী জলপানে চাহি যেমনি,
অমনি সে নদীজলে শুনিলাম যেন
কত যুগ-যুগান্তের অশ্রুত কাহিনী।

১৪
গাতী
তৃতীয় অঙ্ক
জতল অন্ধকার হতে ‘সন্তান-সন্তান’ বলি
কে আমারে বক্ষ মাঝে তুলিবরে চায় ।
রক্তবর্ণ কে পুঃয সঃখে দাড়ায় ।
-না, গয়াসু র কা কান চঞ্চলত করি ।
শুধু সেই এক চঞ্চলতা
জাগরণে, শয়নে, স্ব’নে,
প্রতিক্ষণ হিয়া মাের ব্যাকুল করিছে ।
মনে পড়ে পুষ্প-বনে কুসুম চয়ন,
সেই তার স্বপ্নভরা সুনীল নয়ন,
‘ইলা’ ব'লে মধুকণ্ঠে নাম ধরে ডাকা।
কেন ? কেন সে আমারে ডাকে ?
কেন মোরে চায় ?
—না, ডাকিও না—ডাকিও না হে জয়ন্ত,
ভুলে যাও ইলারে তােমার।
গীত।
ওগাে তিমির রাতি!
-মম জীবন সাথী।
মেঘের বাতায়নে বসিয়া আনমনে
তাহারই পথ চাহি তাহারই গান গাহি
বুঝি তাহারই রাগিনী আলে আশার ভাতি।'
উদাস সমীরণে কত কি পড়ে মনে
তাহারই কত ব্যথা তাহারই কত কথা
তাহারই সুরে উঠি মাতি।

দ্বিতীয় দৃশ্য ] গন্নাতীর্থ ৯ (নেপথ্যে জয়ন্ত-ইলা-ইলা!) ( জয়ন্তের প্রবেশ।) ইল। ইলা। জয়ন্ত । কে ? ইলা, আসিয়াছি পিতৃ-আজ্ঞা লয়ে। দেবত সমাজ মাঝে, দেবীরূপে প্রতিষ্ঠিত করিতে তোমারে । দেবতা সমাজে, দেবীরূপে প্রতিষ্ঠিত করিতে আমারে ! হ ইলা, শুনিয়া মায়ের মুখে তব সমাচার সমুৎসুক দেবগণ দেখিতে তোমারে। সমুংসুক পিতা মাের দেবেন্দ্র বাসব পুত্র-বধুরূপে তােমা গ্রহণ করিতে। ধন্যবাদ হে জয়ন্ত । কিন্তু আমি অযােগ্য ইহার, সাধ্য নাই এই দয়া করিব গ্রহণ। ইলা, কহ স্পষ্ট করি দেব-দেবী মিলে যদি চাহিছে তোমারে কেন তবে যেতে নাহি চাও- কেন? উত্তর ইহার হবে কি গাে নােমত তব ? দেবেন্দ্র চাহিছে, দেবেন্দ্রাণী চাহিছে আমারে আর চাহে দেবেন্দ্র তনয় । চাহিলেই পাওয়া যায় বুঝি ? ইলা। জয়ন্ত । ইলা। -

গয়াতীর্থ
[ তৃতীয় অঙ্ক
জয়ন্ত।
ইলা ।
শিশু যদি উগ্ধ পানে দুইবাহু তুলি
চাহে ঐ আকাশের চাঁদ
অমনি চন্দ্র তারে ধরা দেয় এসে ?
ইল!
রাজ্যহারা পথের ভিখারী তুমি বাসব তনয় ।
আমি ইলা, ত্রিদিবের অবিশ্বরী।
একদিন শক্তি-গর্বে উপেক্ষা করেছ মোরে
আজ কোন অধিকার—কোন শক্তি বলে তবে
ভিখারী হইয়া চাহ রাজকন্যা ইলার প্রণয় ?
দেব-বধু কোন দিন নাহি হবে দানব নন্দিনী।
( ইন্দ্রের প্রবেশ।)
দানব নন্দিনী কেবা ?
দেবকন্যা গৃহে নিতে মহোল্লাসে এসেছে দেবতা।
জয়ন্ত।
পিতা!
দেবেন্দ্র বসব! বাকা তব রহস্য আবৃত।
কহ দেব, হেথা কোথা দেবের দুহিতা ?
দেবকন্যা সম্মুখে আমার।
ইলা নামে পরিচিত যেবা মলােকে
সেই কন্যা নহে কোন দানব নন্দিনী,
দেব-বীর্য্যে জনম তাহার।
পিতা-পিতা—
কি—কি বলিছ তুমি? ঘটিল কি মতিভ্রম তব ?
শােনন ইলা, আর তােমা রাখিব না রহস্য আড়ালে,
ইলা।
ইন্দ্র।

দ্বিতীয় দৃশ্য।
গয়াতীর্থ
সৰ্ব্ব কথা কব স্পষ্ট করি ।
সত্য বটে, কন্যা-স্নেহে গয়াসুর গালিয়াছে তােমা,
কিন্তু ইলা, সে তােমার জন্মদাতা নহে—
জন্মদাতা জনক তোমার—দেব দিবাকর
( সূর্যের প্রবেশ1)
ইলা।
এই হের সম্মুখে দাঁড়ায়ে ।
একি এযে সেই স্বপ্ন-দৃষ্ট অগ্নিবর্ণ ভয়াল পুরুষ !
সত্য কি—সত্য কি তবে জন্মক্ষেত্রে রহি মম
নির্দয় দেবতা রবি ক্রুর হাসি হাসে?
—না, মিথ্য-মিথ্যা !
নিঃসহায় একক পাইয়া
মিথ্যা ষড়ষন্তু-জালে
আসিয়াছ দানবীরে ছলনা করিতে ?
নীচ প্রতারকগণ
হেন কথা কর উচ্চারণ গয়াসুর-নন্দিনী সমীপে ।
ক্রুদ্ধা হইয়ােনা ইলা; নহে মিথ্যা,
পি তব দেব দিবাকর,
কিন্তু মাতা মর্ত্ত্য-নিবাসিনী
মীন-কন্যা জলচারী সাগরিকা নাম।
কন্যা, এত দিনে শেষ হল পরীক্ষা তােমার।
..দানব ভবনে রহি তবুও জননী
দেখায়েছ যেই শক্তি নারীত্ব গৌরব
তাহে মােরা মানি বিস্ময়।

গভীর্থ
[ তৃতীয় অঙ্ক
ইলা
বুঝিয়াছি এতদিনে, তােমার শ্রীঅঙ্গ মাঝে
এতটুকু পড়ে নাই মর্থ্যের কালিমা।
জ্যোতির্ময়ী জ্ঞানেজ্জলমহাদেবী তুমি।
এসাে কন্যা-
দেবেন্দ্র বাসব সনে নিজে আমি জনক তােমার
ডাকিতেছি সমাদরে পরম যতনে।
দৈত্যকুল পরিহরি এসাে দেবী নিজ গৃহে ফিরে।
গৃহ! কোথা গৃহ মাের ? দেবতা-সমাজে?
নানা, দেবী নাম কোনাে দিন ছিলনা আমার,
কোন জন্মে চাহিব না তাহা।
একমাত্র পরিচয় মাের-কি ? কি সে পরিচয় ?
দানবী? না-না-দানবী ত’ নহি আমি !
দয়া-দয়া করে দৈত্যপতি গৃহে দেছে স্থান!
মা, মাগাে, কোথা তুমি প্রবঞ্চিতা
নির্যাতিতা অভাগিনী জননী আমার,
স্থান দাও, স্থান দাও বুকে!
জল-তল পাতালের গভীর আঁধারে
বক্ষে বক্ষ রাখি মাের।
মাতা কন্যা এক সাথে করিব ক্রন্দন,
এক সাথে মাগাে
যুক্ত করে মৃত্যুবর চাবাে বিধাতায়।
[ প্রস্থানােতা।
কোথা যাও কোথা যাও ফিরে এলাে ইলা,
ফিরে এস, ফিরে এস তনয়া আমার!
জয় ।

দ্বিতীয় দৃশ্য ] গভীর্থ বিশ্বের আনন্দ-মূৰ্তি সুবর্ণ-প্রতিমা উদ্বোধন-লগ্নে আজি হবে বিসজ্জিত। ইলা-ইলা--- বিদায়—বিদায় হে দেবগণ - বিদায় জয়ন্ত দেবীত্ব করিতে নাশ ওই দূর সিন্ধু-জলে দেহ বিসজ্জিব। (যমের প্রবেশ।) যম। যম। রক্ষা করাে আশ্রিত জনেরে— প্রাণত্যাগ সঙ্কল্প তােমার দাও বিসর্জন কৃপা করাে রক্ষা করাে ভয়ার্ত শমনে। শমন ! শমন! শমন আমি তােমারি আশ্রয় আশে এসেছি ছুটিয়া । তােমারে একান্তে পেয়ে মন্দাকিনী তীরে ঘূর্ণাবর্ত সৃজেছি আমি, ঘাের ধূমে ব্যাপিয়া গগন- মায়া বলে এইখানে এনেছি তােমারে ; ছিল আশা, দেবের নন্দিনী, পেলে তব সত্য পরিচয়, দের কুলে সসম্মানে হলে প্রতিষ্ঠিত, দেব কাৰ্য্যে হইবে সহায় ;

গভীর্থ
[ তৃতীয় অঙ্ক
ইলা।
তােমারে আশ্রয় করি
যমপুরী-ধ্বংশ হতে গয়াসুরে নিবৃত্ত করিব।
কিন্তু আশা মোর হইল বিফল ;
এবে শঙ্কিত হয়েছি মাগাে-
যে মুহুর্তে পিতা তব পাইবে সন্ধান
আমিই হরেছি তোমা মায়াজালে ঘিরি,
তব এই দেহত্যাগ আমারি কারণ বলি,
তীব্র রােষে দৈত্যপতি উঠিবে গর্জিয়া।
প্রতিহিংসা ক্ষিপ্ত তার রোষাগ্নি হইতে
কে তবে রক্ষিবে মা তুমি না বুজিলে ?
কহ কি চাহ আমার কাছে, কি সঙ্কল্প তব ?
ত্বরা কহ কি তব প্রার্থনা ?
কহিব-কহিব মাগাে,
বারেকের তরে বিসজ্জিয়া মৃত্যু বাঞ্ছা তবে
মোর সাথে তোরে মাতা আসিতে হইবে
আমারে রক্ষিতে হবে বিপদ হইতে !
তারপর যথা ইচ্ছা যেও মাতা বাধা নাহি দিব ।
ভাল তাই হোক। এসাে যমরাজ,
তােমারে রক্ষিব আমি পিতৃ-রােষ হ'তে।
চল মাতা, পথে যেতে জানাইব তোম।
কোন পথে কি কাৰ্য্য করিব।
য।
ইলা ।
যম।

তৃতীয় দৃশ্য
বনপথ।
গ্রাম্য-কন্যগণের গীত।
এমন ভরা সন্ধ্যাকালে ওলো রাঙা বউ
যানে জলে, জীবন নিয়ে ফেরা হবে দায়।
ঘাটের পথে ভূত দেখেছি, বশীর আওয়াজ তাও শুনেছি,
সোণর মুপুর বাধা দেখলাম পায় ।
দেখলে রে বুড়ো বুড়ি, কালা দেয় আঁচল মুড়ি,
ঘােমটা টানা যেন কুলের বউ।
ওমা একি সর্বনেশে, 'আমায় দেখে তাকায় হেসে,
খাবে বুঝি রঙিন্ ফুলের মউ !
[ প্রস্থান।
( কলসী-কক্ষে পদ্মমণি ও দধিমুখের প্রবেশ।)
পদ্ম।
নধি। পদ্ম—পদ্মমণি—পদ্মিনী—অ পছু, যানি—ওরে বাসনি।
আ অলপ্পেয়ে, তুই আবার ঠিক এখানে এসে জুটেছিস্?
* দধি। জুটবোনা? ব্যাপারটা কতখানি গুরুতর তা জানিস্ ? একে সন্ধ্যে
বেলা, তায় নির্জন পুকুর ঘাট, তার ওপর তুই একা অবলা, আর চার
দিকে শকুনি উড়ছে। ওরে অত বড় দত্যিরাজা যে নাকি যমরাজাকে
নাকে দড়ি বেঁধে হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে এল, তার মেয়েটা পর্যন্ত
চুরি হয়ে গেল, আর তােকে একা পেলে তাে-ওরে বাবা, সে
ভাবতেও যে আমার ওঁঙা ওঁঙা ব'লে কঁদতে ইচ্ছে করে! চল চল

গভীর্থ
তৃতীয় অঙ্ক ]
বাড়ী চল তাের আর জল এনে কাজ নেই। গুটি গুটি পা চালিয়ে
আয় দিকিন, ঘরের ছেলে মেয়ে আমরা ঘরেই ফিরে যাই
(নেপথ্যেওহে জরাসুর এদিকে যে গলার আওয়াজ শুনছি,
এগিয়ে এস’না।)
দধি। ওরে বাবা এই সেরেছে! ব্যাটারা এসে পড়ল, নাও এখন কাল
সামলাও! একশ’ বার বলছি, ফিরে চল—ফিরে চল তাতে
গেরাহি নেই, এখন! বলি এখন !
(ঘোঘাসুর ও জুরাসুরের প্রবেশ।)
ঘােঘা। কেহে তােমরা?
জরা! এযে আমাদের অভােবৰ্ম্মণ হে! বলি এই বনের পাশে মেয়ে
মানুষ নিয়ে দাড়িয়ে আছ যে ভায়া, এটী যােগাড় হ’ল কোত্থেকে?
বাঃ! খাসা চীজ তো ?
ঘোঘ। আমাদের ফাকি দিয়ে এমন ফুটফুটে--
পদ্ম। চুপ কর মুখপােড়া। ইনি আমার সােয়ামী
দধি। চুপ চুপ, সােমত্ত মেয়ে ছেলে হয়ে এই সব জোয়ান জোয়ান ব্যাট
ছেলের সামনে—আহা তুমি পিছনে থাকনা পদু, আমি বলছি । দেখ
জরাসুর ভাইটা আমার, দেখ ঘােঘাসুর দাদা, অমন কটমট করে ?
এদিকে তাকিও না। নােয় জল এলে হাতের চেটোয়ই মুছে ফেল
একদিন আমি তত তােমাদের বুনুই হ’তে চেয়েছিলাম হে, কেমন
না? তা আমার পদুমণি তােমাদের সেই বহিন। আর তােমরা
আমার? হিঃ হিঃ হিঃ।
ঘােঘা। ঐবিষ্ঠু-শ্রীবিষ্ট ।

তৃতীয় দৃশ্য ] গভীর্থ চল হে চল। আমরা রাজকন্যার খোঁজে এসেছি তাকেই খুঁজে বেড়াইগে! 't [ উভয়ের প্রস্থান। দধি। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। পদু, তাহলে আর দেরী নয় । এবার পা চালিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ীর দিকে চল । পদ্ম। বলি হ্যাগা, তােমার কি ভীমরতি ধলল, না আর কিছু? অত ভয় থাকে তাে নিজে বাড়ী ফিরে যেতে পার না? ঘরে এক ফোটা জল নেই, পুকুর ঘাটে একটু জল নিতে চলেছি, তা যত সব দধি। এই মরেছে! আরে শােন, দৈত্যরাজের চরেরা রাজকন্যাকে না পেয়ে হয়ে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে। একলটী দেখবে তােকে ওই ছােট্ট খাট্ট বউটা, আর একেবারে উড়িয়ে নিয়ে ফেলবে দৈত্যরাজের অন্দর মহলে ;--আর তা ছাড়া--আর তা ছাড়া পাড়ার ছোড়াগুলােও তো ভাল নয় চারিদিকে ইয়া ইয়া সব দৈত্য- ( অঘাসুর ও বকাসুরের প্রবেশ । ) অঘা। কে হে-কে হে তােমরা? দধি। এই রে এবার আর রক্ষা নাই। বকা। সঙ্গে স্ত্রীলোক নিয়ে যাচ্ছ কোথায় হে? অঘা। কার স্ত্রীলােক হে? দধি।. তােমার বাবাঠাকুরের হে! বকা। কি—কি বল্লি বেল্লিক? মা-মার শালাকে। দধি। ওরে,বাবা–ওরে বাবা-ও পদ্ম- পদ্ম । ওগাে—একি সর্বনাশ হােল-মেরে ফেলে যে গাে তােমাদের পায়ে পড়ি বাবা সব ছেড়ে দাও। (পদ ধরিতে উদ্যত )

১০৪
গভীর্থ
[তৃতীয় অঙ্ক
দধি। ছিঃ ছিঃ সরে যাও, সোমত্ত বউ তুমি। সরে না—উঃ ওরে বাবা
ছাড় ছাড়, বাবারা বিষ্টর দোহাই লাগে ছাড়।
( দৈত্যগণ ছাড়িয়া দিল
অঘা। বিষ্টর দোহাই বলি তাই ছাড়লাম। কিন্তু খবর্দার অমন
গালাগালি আবার দিবি তাে ঘুসিয়ে
দধি । গালাগালি কথন দিলাম? কই না ! তোমাদের—তােমাদেরও
হয়েছে। একে তোমাদের বাবাঠাকুরের ইস্ত্রী বলেছি তাই রাগ ?
কেন সেকি গালাগাল ? জান না, বিষ্ট, পুরাণে আছে যে পরস্ত্রী
মাতৃ তুল্যা ! কেমন, তোমরা তাে বিদ্যার এক একটা দিক্‌হস্তী !
বিষ্ট, পুরাণে এই কথা নেই বলতে চাও?
উভয়ে। হঁ্যা তা আছে হয় তাে! নিশ্চয় আছে।
বেশ পর স্ত্রী মাতৃ তুলা। আমি একজন পর, আর ইনি একজন
আমার স্ত্রী। সুতরাং ইনি পরস্ত্রী—এবং তোমাদের মাতৃতুল্যা—
কেমন না? আমার স্ত্রী তােমাদের মা জননী। সুতরাং আমি
হলেম গিয়ে-তােমাদের-হিঃ হিঃ হিঃ ।
অঘা। তা বটে—তা বটে—
বকা। তা হলে পেন্নাম হই বাবা ঠাকুর, চলহে চল। [ দৈত্যগণের প্রস্থান।
• দধি। এইবারে আয় ছুড়ি—আর এক মূহুর্তও দেরী করি না। আবার
যদি কেউ তােকে দেখে ফেলে
পদ্ম। দেখে ফেললে তাে হয়েছে কি? তাকিয়ে দেখলে আমার জাত গেল
নাকি ? ভাল জ্বালা।
দধি। তাকিয়ে দেখবে—পর পুরুষ তাের দিকে তাকিয়ে দেখবে ! বলি
এটা কি তাের একটা সতী সাবিত্রীর লক্ষণ হােল নাকি এটা?
হায় হায়, শেষকালে এমন সাবিত্রীর পাল্লায় পড়েছি যে, যমের হাত
দধি।

তৃতীয় দৃশ্য ] গভীখ থেকে বাঁচান তত দূরের কথা, টেনে এনে যমের ঝুলির মধ্যে পুরে দিয়ে পালিয়ে যাবার মতলব! তাহলে যা, তাের যেদিকে খুসী চলে যা, আমি বিষ্টর দোহাই দিয়ে রক্ষা পেয়েছি, সেই বিষ্ণুর নাম স্মরণ করে বিবাগী হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ( হাত ধরিয়া) রাগ ক'লে ? পদ্ম। ধি। দ্বৈত গীত। পদ্ম। দধি। পদ্ম। দধি। পদ্ম। রাগ করনা সোণার বন্ধু, আমার মাথার কিরে । বাড়ী ফিরে খেতে দেব শালি-ধানের চিড়ে । চাই না—আমি চাই না নাড়ু দেব, মোয়া দেব, দেব সাঁচী পান, মসলা দেওয়া তামাক দেব, গেয়াে রসের গান। গাইব? গাইব? হিঃ হিঃ হাঃ হাঃ- ওরে বন্ধুরে অামার, সোণার বন্ধুরে আহা হা—থাক্ পাক্ থাক্‌, কিবা গলা সাধা, ও গান শুনে আসে ছুটে ধোপা বাড়ীর গাধা। কি ? আমায় অপমান ? ছিঃ—আর ক’বনা মন, { ধারণ) ছাড়াে ছাড়াে দেখবে আবার কোন হনুমান। দেখুক না—ভয় কি ? ওরা কি ভাবে জানাে ? ওরা ভাববে সাত রাজার ধন মাণিক আমার তুমি সাগর-সেচা। না না, তুমি আমার লক্ষ্মী ঠাকরুণ আমি তােমার পেঁচা। দধি। পদ্ম। দধি। পদ্ম। দধি। পদ্ম । দধি।

চতুর্থ দৃশ্য
গয়াসুরের কক্ষ।
(গয়াসুর ও দীপ্তজিঘের প্রবেশ ।)
গয়া।
চুর্ণ করাে দ্বারদেশে মঙ্গল কলসী
হর্ঘ্য চুড়ে স্বর্ণ ধ্বজা, স্বর্ণ আভরণ
একসাথে ভগ্ন করি ফেলে দাও মন্দাকিনী জলে।
দীপ্ত।
মহারাজ, মহারাজ
গয়া।
দীপ্ত।
চুপ কোথা মহারাজ?
কন্যাহারা পিতা আমি, সর্বহারা বঞ্চিত জনক।
অন্য পরিচয় মাের নাহিক ভুবনে।
চেষ্টার করিনি ত্রুটী শােন মহারাজ,
গিয়াছি কুবের পুরে, ব্ৰহ্মলােক-মাঝে,
পবন, বরুণ, সােম, আদিত্য, বাসব--
একে একে সৰ্বজনে ক'রেছি জিজ্ঞাসা,
হতবাক নিরুত্তর দেবতা সমাজ
ভয়ে কেহ নাহি কহে কথা।
একমাত্র অগম্য সে যমপুরী বিনা
ত্রিজগতে কোন স্থান অন্বেষিতে রাখি নাই বাকী।
যমপুরী—যমপুরী।
কেন তবে যমপুরী করনি প্রবেশ ?
সাধ্য মত প্রবেশিতে ক'রেছি প্রয়াস
কিন্তু প্রভু, ব্যর্থকাম এসেছি ফিরিয়া ।
গয়া।
দীপ্ত।

চতুর্থ দৃশ্য ] গভী গয়া। দীপ্ত। অসম্ভব, যমপুরী প্রবেশের কল্পনাও নিতান্ত দুরাশা। দুরাশা ! দুরাশা—নিতান্ত দুরাশা প্রভু। স্বর্গ মর্ত্য রসাতল তিনলােক করিয়া সন্ধান ছুটিলাম অস্ত্র করে যমপুরী পানে। বায়ু নাহি বহে সেথা ঘন-ঘাের কৃষ্ণ মেঘরাশি বেষ্টিয়াছে পুরী। নাহি চন্দ্র নাহি সূৰ্য্য নক্ষত্র নিকর পরিখা-রূপিণী সেথা ঘূর্ণমান বৈতরণী নদী সে নদীতে নাহি জল- তপ্ত তৈল ফুটে বুঝি সৃষ্টি জোড়া সমুদ্র কটাহে ! অট্টহাস্য মাঝে তার শত বজ্র নিঘেষি ফিরিছে, কি উপায়ে প্রবেশিব পুরী ? করাল সে বৈতরণী কেমনে তরিব ? কেমনে তরিতে হয় সে দেখিব আমি। মূখ তুই দীপ্তজি, মূর্খ দৈত্যগণ, যমপুরী-বিভীষিকা হেরিয়া নয়নে ফিরে এলি প্রতারিত হয়ে । নিশ্চয়—নিশ্চয় সেই পুরীমাঝে দেবগণ কন্যা মাের রেখেছে লুকায়ে । সপ্তাহ হইল গত নন্দিনী বন্দিনী নাহি জানি সহিতেছে কত নিৰ্যাতন যমপুরী মাঝে- গয়া।

১০৮ গভীর্থ [তৃতীয় অঙ্ক দীপ্ত। গয়া। দীপ্তজি, রণসজ্জা কর যাব আমি শমনে ভেটিতে। মহারাজ, এযে রাত্রিকাল তদুপরি বাহিরে দুর্যোগ দুৰ্যোগ ! কন্যারে লইয়া মোর দেবতা পলায়, আর আমি ঝঞ্চা হেরি গৃহ মাঝে রহিব বসিয়া। দীপ্তজি, গয়াসুর ভয় করে অন্ধ রজনীরে ? অপরাধ-অপরাধ করেছি চরণে ; ক্ষমা ভিক্ষা চাহি মহারাজ । দীপ্ত। কিন্তু প্রভু, সপ্তরাত্রি নিদ্রাহীন তুমি সপ্ত রাত্রি-সপ্ত দিন- অনাহর অনিদ্রায় করেছ যাপন ক্লান্তি দূর কর প্রভু এই রাত্রিটুকু শুধু বিশ্রাম করিয়া । হে দানবপতি, তােমার ও পরিস্লান পাণ্ডুর বদন দেখিয়া কঁদিছে যত দৈত্য-নর-নারী। দীপ্তজি,দীপ্তজিহ্ব- প্রভু, চরণের ভৃত্য তব ধরিয়া চরণ সকাতরে করিছে প্রার্থনা বিশ্রাম করহ প্রভু আজি নিশাকাল— প্রভাতে যাইও তুমি শমনে ভেটিতে। গয়া। দীপ্ত ।

চতুর্থ দৃশ্য ]
গয়তার্থ
হে দানবপতি, তােমার ও ক্লান্ত মূর্তি
সে যে আর দেখিতে পারিনা।
গয়া।
ওঠো দীপ্তজিহ্ব ! বিশ্রাম বিশ্রাম ।
ভাল তাই হবে।
যাও শয়ন করগে সবে শয়ন মন্দিরে
একাকী থাকিয়া আমি করিব বিশ্রাম।
[ দীপ্তজিহের প্রস্থান।
( বাহিরে করুণ যন্ত্র ধ্বনি উঠিল, দীপ স্তিমিত হইল)
গয়া।
বিশ্রাম, বিশ্রাম চাই
সপ্ত রাত্রি নিদ্রাহীন অগি;-
দীর্ঘ সপ্ত রাত্রিকাল
জাগরণে নিরসনে গিয়াছে কাটিয়া,
তাই আজ ক্লান্তি আসে দেহ মাঝে মোর,
তাই বুঝি অবসাদ নেমে আসে আঁখির পাতায় ।
কোথা হতে উঠিতেছে হেন সকরুণ মৃদুল সঙ্গীত ধারা ?
কে বাজায় বেণু বীণা, কেবা গাহে গান?
ওই সুরে
ওই সুরে নিদ্রাতুরা হ'ল বুঝি নিজে নিশীথিনী ।
ঘুম-ঘুম-আমারাে নয়নে ঘুম
স্তরে স্তরে আসিছে নামিয়া।
বুঝিতে না পারি, এ কি কোন দৈবী মায়া ?
অবশ হইল তনু—অবশ চেতনা
সাথে সাথে কেন নামে নিবিড় আঁধার ?
(নিদ্রা, বাহিরে যন্ত্রধ্বনি আরও করুণ হইল।

গভীর্থ [ তৃতীয় অঙ্ক (যম ও ইলার প্রবেশ ।) যম। ইলা। যম। ইলা। যম। । রাজকন্যা ইলা ! যমরাজ ! শুনিলে সকল ? শুনিলে দানবপতি গয়াসুর মুখে মম প্রতি আক্রোশ তাহার ? শুনিলে ত’ চাহে দৈত্য যম-পুরী ধংশ করিবারে। শুনিলাম সব। কিন্তু দেব, কহ এবে কি আমারে করিতে হইবে ? তােমারে করিতে হবে দৈত্য অনুরােধ মম প্রতি এই হিংসা দিতে বিসর্জন আদরিণী কন্যা তুমি তার তব বাক্য দৈত্যরাজ অবশ্য পালিবে। যমরাজ ! শপথ করায়ে লও দানব সম্রাটে কভু সে বিরুদ্ধে মাের অস্ত্র যেন না করে গ্রহণ অসম্ভব! এ জীবনে কোন দিন কোন কাৰ্য্যে তার বাধা আমি দিইনি কখননা, আজও দিতে পারিব না। ইলা, ইলা, অন্যথা কমােনা আর; হবে তাহে অনর্থ সাধন, ইলা। যম। ইলা। ফ। - চতুর্থ দৃশ্য ) গম্নভীর্থ ১১১ ইলা । ‘যম। বিশ্ব-সৃষ্টি ধ্বংশ হবে মুহুর্ত মাঝারে । হয় হোক বিশ্ব-বংশ, যাক সৃষ্টি রসাতলে তবু—তবু পারিব না, পিতৃ কাৰ্যে বাধা দিতে পারিব না আমি । ক্ষমা করাে কৃতান্ত আমারে। [ প্রস্থানোস্ততা। দাড়াও হে মৰ্ত্তবাসী জীব কোথা যাও দেব-আজ্ঞা অবহেলা করি? দেব-আজ্ঞা ! কে কাহারে করে আজ্ঞা ? গয়াসুর-কন্যা আমি ভুবন-ঈশ্বরী- দেব-আজ্ঞা মোর তরে নহে- [ গমনোস্ততা। তবু—তবু তুমি পণবদ্ধা ইলা— শপথ করেছ নিজে, মম কাৰ্য্যে হইবে সহায়। ইলা। যম। ইলা। শপথ ! যম। হ। শপথ করেছ নিজে সে শপথ রক্ষা হেতু, চির-মৌনা ছায়ামূর্তি ধরি সঙ্গে মাের এসে পুনৰ্ব্বার। যে কাৰ্য্য করিব আমি- নীরবে দাঁড়ায়ে তুমি শুধু দেখে যাও। সত্যভঙ্গ মহাপাপে ভয় কর যদি ধৰ্ম্মনিষ্ঠ গয়াসুর পালক তােমার এই শৰ্ব্ব মনে থাকে যদি

১১২
গয়া।
গভীর্থ
[ তৃতীয় অঙ্ক
নিস্তব্ধ-নিস্তব্ধ হইয়া তবে ছায়া-মূৰ্ত্তি সম
এসাে ইল। পশ্চাতে আমার
[ উভয়ের প্রস্থান।
( স্বপ্ন ঘােরে ) অন্ধকার—অন্ধকার
ঘনীভূত অন্ধকারে পরিব্যাপ্ত একি মহা দুর্গম প্রদেশ ।
বায়ু নাহি বহে হেথা,
নাহি হেথা আলোক প্রকাশ
স্থির অচঞ্চল মহা শূন্যময় দেশ ।
একি, একি,
অকস্মাৎ কোথা হ'তে উঠিতেছে মৃদুল সঙ্গীত।
-না-এ নহে তাে সঙ্গীত লহরী
এযে রে ক্রন্দন রােল।
বুঝি নিপীড়িত জীবকুল অৰ্ত্তরে করিছে ক্রন্দন।
তার মাঝে ইলা-ইলা ! ইলা !
না সে ক্রন্দন বিমথিয়া বিচ্ছিন্ন করিয়া
ও কি কালমূৰ্তি আসি গগনে উদিল ?
ও কি মহা ভয়ঙ্কর নির্মম মূরতি ।
কে তুমি-কে তুমি হে নিষ্ঠুর ভয়াল ?
( যমের ছায়া-মূর্তির আবির্ভাব )
যম।
হে দানব,
চিনিতে পার কি মােরে ?
স্বপ্ন চক্ষু প্রসারিয়া ভাল করি দেখ পুনর্বার।
পার কি চিনিতে ?

চতুর্থ দৃশ্য ] গভী গয়া। যম । হাঁ, চিনেছি—চিনেছি তোম। তুমি যম মৃত্যু-অধিপতি। চিনিব না তোমারে শমন ? তোমারি দমন লাগি মনে মনে অভিলস মোর । তব পুরী ধ্বংশ করি মৃত জীব-আত্মাগণে চিরমুক্তি দিব এই কামনায় মোর উদ্দীপ্ত অন্তর। সে কামনা বিসজ্জিতে হবে। যমপুরী অভেদ্য অটল অনাদি অনন্তকাল স্থির রবে তাহা। দেহধারী জীব সে তো অতি তুচ্ছ কথা - যমপুরী বিনাশ প্রয়াল দেবেরও অসাধ্য জেনাে। অসাধ্য-তাসাধ্য ! দেবের অসাধ্য যাহা ইচ্ছা মাত্রে গয়াসুর পূর্ণ করে তাহা। তবু কহি ইচ্ছা তগ কর দৈত্যরাজ। ইচ্ছা ত্যাগ ! তণ দেহে আছে প্রাণ অটুট সঙ্কল্প মম । অটুট সঙ্কল্প ! অটুট সঙ্কল্প। উত্তম, দেখ তবে রে দানব- কাহারে বন্দিনী করি আনিয়াছি সাথে । গয়া। যম। গয়া। যম। গয়া। যম। ( ইলার ছায়ামূৰ্তির আবির্ভাব ) গয়া। কে—কে হোথায় ছায়াময়ী নারী। একি ইলা-ইলা? নন্দিনী আমার । ৮

১১৪
গাভী
[ তৃতীয় অঙ্ক
যম।
গয়া।
তােমার নন্দিনী—তোমার নন্দিনী ইলা ।
তারে নিয়ে চলিলাম যমপুরী মাঝে।
নিপীড়িত নির্যাতিতা করিব তাহারে
জীবন্ত রাখিয়া দিব তপ্ত তৈল ফুটন্ত কটাহে ;
পিতার পাপের ফল কন্যা তব করিবে সম্ভোগ ।
চলিলাম ইলারে লইয়া
মায়া স্বপ্নে আচ্ছাদিত তুমি,
সাধ্য নাই হে দানব নিবারণ করিতে আমারে।
কভু নয়, কভু তাহা হইতে দিব না।
সাধ্য যদি নাহি নিবারিতে
তবু তোমা উচ্চকণ্ঠে কহি শােন’ দেবতা শমন
বিষ্ণু তেজোদীপ্ত আমি দৈত্য গয়াসুর
আমার বাণীর মাঝে ব্ৰহ্মশক্তি করে অধিষ্ঠান,
সেই বাণী ত্রিলােকে শুনায়ে আজি করি উচ্চারণ
মম কন্যা দেব হস্তে নির্যাতিত হবে না কখন ;
দেবতার স্পর্শমাত্রে
কন্যা মাের শিলা মুর্তি করিবে গ্রহণ ;-
পাষাণী—পাষাণী হইবে ইলা দেবতার কাছে।
সে পাষাণ আমার পরশে শুধু লভিবে চেতনা
পাষাণী—পাষাণী ইলা দেবতার কাছে।
তথাস্তু-তথাস্তু, হাঃ হাঃ হাঃ!
যম।
(নেপথ্যে আৰ্তরােল )
গয়া।
( জাগ্রত হইয়া) এ কি আৰ্তরােল ।

চতুর্থ দৃশ্য ]
গভীর্থ
এ কি বিভীষিকা !
দীপ্তজি—দীপ্তজিহ্ব।
(দীপ্তজিস্বের প্রবেশ। )
দীপ্ত।
মহারাজ-মহারাজ, নিদ্রঘোরে ডাকিছেন করে ?
দুঃস্বপ্ন কি দেখেছেন প্রভু ?
গয়া। দুঃস্বপ্ন ! না—না, এখনাে দেখিছি বুঝি
স্পষ্ট দেখিতেছি মাের আঁখির সম্মুখে।
এই—ওই হের দীপ্তজি
ধূমরাশি-আচ্ছাদিত বহ্নিময় পুরী
কাল নদী সে পুরীরে করেছে বেষ্টন।
বিষধর নাগদল কুম্ভীর মকর
তরঙ্গ উচ্ছাসে তর করে গরজন।
ওই—ওই হের, ছায়ামূৰ্তি জীবদলে
দণ্ডধারী যমদূত করিছে তাড়না।
কেহ ছিন্নমুণ্ড তার, কেহ বা রুধিরে সিক্ত হস্ত-পদহীন,
কেই বা কবন্ধ-মূর্তি ভীষণ-দর্শন।
ওই—ওই চক্ৰসম অগ্নিরাশি ঘুরে চতুর্দিকে,
মাংসাহারী বজ্ৰনখ বাজপক্ষীদল
ছিড়িছে দেহের মাংস পাকসাট মারি।
ওঃ কি অবিচার ! মৃত জীব-আত্মা’পরে
শমনের একি অবিচার।
(নেপথ্যে মৃত জীবাত্মাগণ। রক্ষা করাে-রক্ষা করাে।)
গয়া। ভয় নাই, ভয় নাই জীব-আত্মাগণ ;

গভী তৃতীয় অঙ্ক ] ব্ৰহ্ম অস্ত্র করিয়া সন্ধান যমপুরী ভস্ম সম বাতাসে উড়াবো কতন্ত-কব-মুক্ত তোমরা সকলে। আমার তপস্য। বলে উর্ধ্বলোকে লভিবে আশ্রয় . ( সহসা কাল পাযাণখণ্ডে পুরী-ঘার আচ্ছাদিত হইল। একি পাষাণ ফলক আসি রুধিল দুয়ার। ওরে-ওরে দুরন্ত শমন ভেবেছি এইরূপে পাবি পরিত্রাণ? ভাঙ্গিব পাষাণ দ্বার চূর্ণীকৃত করিব রে সকল প্রয়াস। দেখ চেয়ে দাড়ায়ে শমন- ( অস্ত্ৰক্ষেপ-~পাষাণ ভাঙ্গিয়া গেল, তন্মধ্যে বাণিবিদ্ধ। রক্তাক্ত ইল।। ইল। উঃ-পিতা, পিতা- গয়া। শ পিতা ব'লে কে ডাকে আমারে ! ইলা? ইলা? বাণবিন্ধা নন্দিনী আমার । ( বুকে টানিয়া লইলেন ) তুই হেথা-তুই হেথা আসিলি কেমনে? পিতা! গয়া। ও হয়েছে স্মরণ ! পাষাণী হইবে ইলা, স্বপ্ন ঘােরে বলেছিনু আমি সে পাষাণ মাের স্পর্শে লভিবে চেতনা। নিয়তি! নিয়তি।

চতুর্থ দৃশ্য। গভীর্থ ইলা ; চেতনা লভিলি কন্যা পিতৃহস্ত-নিক্ষেপিত বাণের চুম্বনে ! ওহোহা- ন—না, বঁদিও না পিতা, কোনাে দুঃখ নাহি মোর । এইতাে গাে তব ক্রোড়ে মস্তক রেখেছি ২াণমুখে স্নেহ-সিক্ত চুম্বন ভেছি, মরণেরে জয় করি গদ্ধেত শির পুণ্যময় তব কথা স্মরিতে স্মরিতে অমৃতমণ্ডল মাঝে চলিয়াছি পিত। র তবে কি দুঃখ অমির? ই-ইল- না--না কাদিও না তুমি দেবতা হাসিবে তাহে কাদিও না নিত ; ওয়া। ই! । গায়? ইল।। পিত ! ইল।। ওয়া। বিদায়ের কালে একমাত্র মিনতি জানাই বড় দুঃখ–বড় দুঃখ সহে জীব শমন ভবনে। দেখেছি নিজের চোখে জীবের যাতনা। সে যাতনা দূর করে পিতা। করিব, করিব মাগো শেষ রক্তবিন্দু দিয়া সে চেষ্টা করিব। ; ইলার মৃত্যু ) ইলা-ইলা- মহারাজ! দীপ্ত :

১১৮
গন্নাতীর্থ
[ তৃতীয় অঙ্ক
গয়া।
যাও কন্যা,
মরণের পথ ধরি চলে যাও অমৃত আলোকে,
মৃত্যু তােমা স্পর্শিবে না কভু।
যাও তুমি জ্যোতির্ময় নক্ষত্র মণ্ডলে
উদয় শিখর’পরে শুকতারা হয়ে কন্যা করহ বিরাজ ।
আকাশের দেবগণ
মুগ্ধনেত্রে যুগ যুগ দেখুক চাহিয়া ;
আর মর্ত্যলােক হতে দেখি,
আমি তাের ভাগ্যহত পিতা গয়াসুর ।
;

চতুর্থ অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
মেঘলােক।
( বিষ্ণু, ইন্দ্র, যম, পবন ইত্যাদির প্রবেশ।
বিষ্ণু,
যম।
কি করিলে দেবতা শমন।
ধিক্‌—ধিক ওহে অমর মণ্ডলী!
বিষ্ণুভক্ত ন্যায়শীল দান-ব্রতধারী
তিনলােকে অকলঙ্ক চরিত্র যাহার
সেই পুণ্যশ্লোক দানব-সম্রাটে
হেন নীচ নির্মম উপায়ে কন্যাহারা
করিলে সকলে ?
নিরুপায়—নিরুপায় হয়েছিনু শুন নারায়ণ
পুরী মাের অগ্নিবাণে ভস্ম হয়ে যায়
লুপ্ত হয় বুঝি মাের আমােঘ শাসন
তাই-তাই নিরুপায় হয়ে
তাই নিরুপায় হয়ে
দেবতা বিজয়ী যেই মহাবীৰ্যবান
হস্তে গলে শৃঙ্খলিত করিয়া তােমারে
পুনর্বার আপনার করুণার বলে
বিষ্ণু।

গয়াভী [চতুর্থ অঙ্ক ইন্দ্র। বিনাসৰ্তে মুক্তি দিল লৌহ-কারা হ'তে-- মহত্ত্বের প্রতিদান করিয়াছ তার কন্যাহারা করিয়া তাহারে । চমংকার বিচার তোমার। তিনলােকে ব্যাপ্ত হ'ল দেবতার পৰ্ম্মের গৌরব ( প্রস্থানােত) প্রভু, প্রভু, রােষ ক্ষুব্ধ হইও না তুমি । ভেবে দেখ একবার কত নিরুপায় হয়ে এ হেন নিষ্ঠুর কাৰ্য্য করেছিল দেবতা শমন। অন্যথা করিলে ব্ৰহ্ম-অস্ত্রধারী সেই দানবের করে লুপ্ত হয়ে যেত প্রভু শমন শাসন। বাণাগ্নিতে তার ভস্ম হত বিশ্বসৃষ্টি পলক মাঝারে । তাই বিশ্বলোক রক্ষা হেতু বিশ্বলোক রক্ষা হেতু ? সে কাৰ্য্য আমার । প্রয়ােজন হলে, অস্ত্র ল’য়ে করে আমি রক্ষা করিতাম শমনে তােমার ! বিষ্ণু। দেব পুরন্দর! ভাবিয়াছ এই ভাবে কন্যাহারা করিয়া তাহারে, বিশ্বলােক করেছ রক্ষণ! রক্ষিয়াছ শমন শাসন ? সিংহের বিবর হ'তে চুরি করে নিয়ে এসে শাবক তাহার- ভাবিয়াছ বুঝি সবে পাবে পরিত্রাণ ।

[ প্রথম দৃশ্য গন্নতীর্থ বেশ তাই হোক। নিজ হস্তে ইয়াছ বিচারের ভার ফল তার ভুঞ্জিবে আপনি। বিষ্ণু। is পরিত্যাগ করিও ন; দেবতা মণ্ডলে। পরিত্যাগ দেবকুলে করি নাই কভু কিন্তু অসম্ভব কা; হাকেমনে করিব ? সুবিচারে কেমনে দানিব বধ ? অতি দপী হ'য়েছ শান, অধিকার যদি তব সঙ্কুচিত হয় আপন কার্যের ফলে- বাধা দিতে তাহে নারায়ণ অপারগ জানিই নিশ্চয়। রক্ষা করো-রক্ষা করে দেব নিরন। চরণে অশ্রিত তব কঁাদে দেবগণ। ছাড় পথ, নারায়ণ কভু নাহি দানিবে অাশ্রয় অপরাধী নির্মম নিষ্ঠুরে। 'জান পুরন্দর, বিষ্ণু-ভক্ত মহাবীর দৈত্য গয়াসুর । ভক্ত কাছে নারায়ণ চির পরাজিত তদুপরি মাতৃ-শক্তি অস্ত্র বৰ্ম্ম সদা অঙ্গ তার করয়ে রক্ষণ- দুর্ভেদ্য সে বৰ্ম্ম,-ব্যর্থ যাহা করেছিল ত্রিশূলির শূল ! বিষ্ণু।

ARUkm. Huwhar.
১২২
গভীর্থ
[ চতুর্থ অঙ্ক
পবন।
কোরূপে-কোরূপে
পরাজিবে দৈত্য গয়াসুরে?
যাই--বিতণ্ডায় কাল বয়ে যায় ।
ওই ভক্ত ডাকে মােরে আকুল আহ্বানে,
রােধি বার শক্তি নাই, যেতে হবে ত্বরা।
[ প্রস্থান।
কি হবে উপায় মােদের তবে ?
নারায়ণ বিরূপ মােদের ।
পরাজয় সুনিশ্চিত
রণজয় অসম্ভব গণি !
যা হবার হবে, কিবা ফল চিন্তা করি আর ?
এক পন্থা-নাহি জানি
সম্ভব কি অসম্ভব তাহা !
কহ ত্বরা কোন যুক্তি করেছ বাসব?
মাতৃশক্তি অস্ত্র-বৰ্ম
কোনরূপে যদি পারি করিতে হরণ।
এস যুক্তি করিব নিভৃতে। [ সকলের প্রস্থান।
যম।
ইন্দ্র।
যম।
ইন্দ্র।
v>
-i-fi,
}
E2td.-ci9.

দ্বিভীন্ন দৃশ্য গয়াসুরের বিষ্ণু-মন্দির। গয়া । সবিতৃ মণ্ডল মাঝে কমল আসন হে আরাধ্য আদি দেব- সচন্দন পুষ্প অর্ঘ্য লহ উপহার। বহুদিনবহুরূপে তব পদে বহুবিধ কাম্য বস্তু করেছি প্রার্থনা, ধনরত্ন-ঐশ্চৰ্য-বিভব- লােকান্তরে মােক্ষধাম-অভয় চরণ- কিছু আজ নাহি চাহি, শুন ইষ্টদেব ;-- বিড়ম্বিত জীবনের একমাত্র কামনা আমার-- শমন দমন শক্তি দেহ নারায়ণ । যমজয়ী মহাবীৰ্য্য দেই। • ( নারায়ণের আবির্ভাব।) বিষ্ণু। গয়া। বিষ্ণু। গয়, গয়! আসিয়াছ নারায়ণ ! ভক্ত প্রতি হয়েছ সদয় ? শােনাে গয়, আসি নাই মনোবাঞ্ছা তব করিতে পূরণ আসিয়াছি ভক্ত পাশে মিনতি জানাতে অসম্ভব প্রার্থনা করিয়া, বিপন্ন কোরো না মােরে। শমন দমন বাঞ্ছা কর পরিহার ।

১২৪ গভীর্থ [ চতুর্থ অঙ্ক গয়া। আমি রত সৃষ্টির রক্ষণে—জীবের পালনে সৃষ্টি ধ্বংশ কেমনে করিব ? বাঞ্ছাকল্পতরু ! যম তব সব হ’লজীব কিছু নয়। আন্ত্রজীব করিছে ক্রন্দন নদণ্ডে নির্যাতিত জীবাত্মার তীব্র আর্তনাদ পশে না কি শ্রবণে তােমার ? করুণায় বিগলিত-চিত্ত-হে দয়াল, শুধু মম তরে? বেশ তাই যদি হয় শুন নারায়ণ, কর তুমি কৰ্তব্য আপন বাবা নাহি দিব, অটুট সঙ্কল্প মাের আমিও রাখিব । শমন দমন তরে যদি হয় প্রয়ােজন তব সনে করিবারে রণ তথাপি—তথাপি আমি না বজ্জিব সঙ্কল্প আপন, দেখি তুমি কেমনে থাকহ স্থির জীবের ক্রন্দনে। একি—একি! জল কেন চোখে ? নীল ইন্দিবর আঁখি কেন ভাসে নীরে ? কাপে মুর্তি থর থর ভূকিকম্পে ভূধর সমান। উপাসক উপাশের হইবে সমর পি পুত্রে রণ আয়োজন- তাই বিচলিত-হিয়া হলে নারায়ণ ? -না, কাদিও না আরাধ্য আমার যে বাসনা নিজে তুমি জানাইতে সঙ্কোচ করেছ আমি শুধু সে বাসনা জানাই দেবতা !

দ্বিতীয় দৃশ্য ) গয়াতী বিষ্ণু। গয়া । গয়, গয়! যাও ত্বরা নারায়ণ- কর গিয়া রণ-আয়োজন। আমারে না করিয়া হনন—মনেরে নারিবে রক্ষিতে। কোন যুক্তি শুনিব না আমি। আমিও চলিনু এবে অস্ত্র ধৰ্ম্মে সজ্জিত হইতে ( নারায়ণের প্রস্থান ও স্বর্গের প্রবেশ।) স্বর্গ । গয়া। স্বর্গ । গয়া । দৈত্যরাজ, একি, দেবতা ! ভিখারিণী—তাসিয়াছি ভিক্ষ। হেতু (৩ামার দুয়ারে। অসঙ্কোচে কর আজ্ঞা দেবেন্দ্র জননী। বিষ্ণু সনে হবে রণ বিলম্বের নাতি হবকাশ । রণযাত্রা পূৰ্বভাগে ত্রিলোক সাম্রাজ্য তামিষে। বিতরিয়া কহ স্বৰ্গদেবী, কি কামনা তব ? হৃতরাজ্য বাসবের ফিরে চাও মাতা? হৃতরাজ্য ! হতরাজ্য প্রত্যপিবে ? হৃতরাজ্য প্রত্যপিলে গোথা দানবের ঘোষিবে জগত। ম্লান হবে দেবের মহিমা। নানা, রাজ্য ভিক্ষা নাহি চাই। ওই তব মাতৃ-শক্তি অস্ত্র-বৰ্ম কর মােরে দান। কি—কি বলিলে দেবী ? স্বর্গ । '।

গভীর্থ [ চতুর্থ অঙ্ক । স্বর্গ। গয়া। মাতৃ-শক্তি অস্ত্র-বৰ্ম্ম ! সমস্ত বৈভব ফেলি, সৰ্ব্ব অস্ত্র দিয়া বিসর্জন যে শক্তির 'পরে শুধু নির্ভর করিয়া ইষ্টদেব নারায়ণে আম্বানিনু রণে রণযাত্রা পূৰ্বভাগে সেই অস্ত্র-বৰ্ম্ম তুমি করিলে প্রার্থনা ! ভেবে দেখভেবে দেখ সুরেন্দ্র জননী, কত মৰ্মাতিক কত না নিৰ্মম দেবী প্রার্থনা তােমার। কিছু আমি চাহি না শুনিতে ইচ্ছা হয় দাও অস্ত্র-বৰ্ম নাহি দাও শূন্য হস্তে কিরে চলে যাই। রুষ্টা হইয়াে না দেবী, প্রার্থনা পূরণ তব অবশ্য করিব। হয়তাে বা এই দান পরিণাম অতীব ভীষণ, হয়তাে বা রণক্ষেত্রে হবে ইথে মরণ আমার ; কিন্তু মৃত্যুরে ডরি না আমি দৈত্য গয়াসুর। নারায়ণ সহ রণে মরণ বরণ- কয়জন ভাগ্যবান লভিয়াছে কবে ? ইষ্টদেব চাহিছেন নিরস্ত্র করিয়া মোরে সারে ভেটিতে। দাড়াও জননী, অস্ত্র-বৰ্ম্ম নিয়ে আসি মন্দির হইতে ( মন্দির মধ্যে প্রবেশ) একি, একি, অস্ত্র-বৰ্ম কেন আমি পারি না তুলিতে ! কি আশ্চর্য ! যেই মুষ্টি নিষ্পেষণে দ্বিতীয় দৃশ্য } গয়াতীর্থ ১২৭ স্বর্গ। মত্ত সিংহ ভূমে লুটে গর্জন করিয়া যে বাহুর বজ্রচাপে চূর্ণ হয় কত শত পৰ্বত শিখর, সে দুর্জয় মুষ্টি আজি অস্ত্র-বৰ্ম্ম স্থানচ্যুত করিতে অক্ষম। দেবী একি হল? দৈত্যরাজ, ছলনার নতি প্রয়োজন। ত্রিংশকোটী দেব সহ শূলধারী আপনি শঙ্কর যার বাহুবলে পরাজিত হইল সমরে- সামান্য ধনুক বৰ্ম্ম সেই জন পারে না তুলিতে? স্পষ্ট কথা কহ দৈত্যপতি, অস্ত্ৰ বুৰ্ম্ম দানিবার ইচ্ছা নাহি তব । মাতা-মাতা, না, না, কে তুই—কে তুই শক্তি অলক্ষ্য-চরিণা অস্ত্ৰ বৰ্ম্ম রাখি পরিয়া ? ছেড়ে দে-ছেড়ে দে ত্বরা। আঃ ছাড়—ছাড় মায়াবিনী । ( নেপথ্যে) উঃ। একি আৰ্তনাদ ! গয়া। ধরিত্রী। গয়া। ( ধরিত্রীর প্রবেশ।) ধরিত্রী। ক্ষান্ত হও-ক্ষান্ত হও গয়াসুর, অস্ত্র-বৰ্ম্ম করিও না দান। সৰ্বস্ব হারায়ে আমি বেঁচে আছি একমাত্র তোর মুখ চাহি। কাঙালিনী ধরণীর তুই যাদু অন্তিম সম্বল।

১২৮ গভীখ [ চতুথ অঙ্ক গয়া। দিব না—দিব না আমি অস্ত্র-বৰ্ম্ম করিতে প্রদান। ইচ্ছা হয় তার আগে লহ মোর প্রাণ। মাতা-মাতা, একি অকুত তব ? সর্বংসহা নামে তুমি খ); ত চ চরে ! রাত্রি দিন কত অবিচারক নির্যাতন মাগো হাসি মুখে সহিতেছ তুমি ; কত পুস্প ফুটে তোর বনে, অকালে ঝরিয়) যায়— কত সুখ নীড় তের, মত্ত প্রভঞ্জন আসি ভাঙ্গিয়া উড়ায় নিশ্চল বসিয়া তুই দেখিস সকল সব ব্যথা বুকে তার লুকাইয়া রয় । মাগাে, আজ তবে একি আকুলতা তাের? ভয় নাই ওরে মত, মৃত্ব যদি হয়- তবু আমি তোরই কোলে লভি আশ্রয় – তোরে ছেড়ে কোথাও না যাব। দেবমাতা, অস্ত্র-বৰ্ম্ম করহ গ্রহণ। ( অস্ত্র-বৰ্ম দান ) [ স্বর্গের প্রস্থান! কি করিলি—কি করিলি গয়াসুর? মাত, নিষ্ঠুর রাক্ষসী স্বর্গ, সন্ত. র মাতা হয়ে বুঝিলি না জননীর ব্যথা। মাতা হয়ে চিতানল মাতৃ-বক্ষে দিলিরে জালিয়া। শােন ওরে নি পাষাণী, ধরিত্রী। গয়া। ধরিত্রী।

দ্বিতীয় দৃশ্য ] গভীখ ১২৯ গয়া। অভিশাপ দিল তােরে সর্বহারা ব্যথিত ধরণী-- মাের বুকে যেই রূপ জ্বেলে দিলি চিতার আগুণ তােরও বুকে সেই রূপ- মাতা-মাতা, পায়ে ধরি তাের যে দান করিমু আমি—অভিশাপ দিয়ে সে দানেরে দিস্ না পুড়ায়ে ! তার আগে মাের শিরে দেরে অভিশাপ। পুত্র, পুত্র- -না, অশ্রুপাত নহে, নহে আঁখিজল, কাদিতে দিব না তেরে জননী আমার । চুপ,চুপ, আয়-আয় মাগাে সাথে চলে আয়। [ উভয়ের প্রস্থান। ধরিত্রী। গয়া। --- ( বিষ্ণু ও ইন্দ্রের প্রবেশ) বিষ্ণু। কি করিলে হে বাসব, অতি বুদ্ধি বশে সৰ্ব্বনাশ পুনরায় আনিলে ডাকিয়া। ছলনায় অস্ত্র বৰ্ম্ম করিয়া হরণ অস্ত্রহীন করিলে দানবে ? এবে কহ পুরন্দর, নিরস্ত্র শত্রুর সনে নারায়ণ কি প্রকারে করিবেক রণ ? দেব । অস্ত্রযুক্ত গয়াস্থর থাকিত যদ্যপি বিষ্ণু।

গভীর্থ
[ চতুর্থ অঙ্ক
=
হয়তাে বা তার সনে রণ
সম্ভব হইত কভু।
কিন্তু এবে তার মুক্ত বক্ষ, মুক্ত মৰ্ম্মস্থল
সেথা আমি কোন প্রাণে সুদর্শন করিব সন্ধান ?
বুঝি হীনবুদ্ধি বশে
সৰ্ব্বনাশ দেবতার অনি ডাকিয়া
হিতে হৈল বিপরীত,
গয়াসুরে করিলাম অবধ্য বিষ্ণুর !
নারায়ণ—নারায়ণ, কৃপা কর দেবতার প্রতি
রক্ষা কর এ মহা সঙ্কটে।
বিষ্ণু।
সঙ্কট।
কি সঙ্কটে আছ দেবগণ ?
নারায়ণ যে সঙ্কটে উদ্ভ্রান্ত আজিকে
তার তুলনায় তােমাদের কতটুকু হয়েছে সঙ্কট ?
যাহার দর্শন মাত্র সারা তনু মন মাের চঞ্চল অধীর
যাহার নয়ন পাতে নয়ন পড়িতে
দরবারে অশ্রু ঝরে তিতিয়া বসন,
অন্যায় সমর করি
তাহারে বধিতে হবে হানি সুদর্শন?
অসম্ভব-অসম্ভব, পারিব না তাহা ;
সারা হৃদি কেঁদে ওঠে আকুল উচ্ছাসে-
ইচ্ছা জাগে মনেবাড়ায়ে ব্যাকুল বাহু
দানবীর ভক্তে মাের টেনে লই বক্ষের মাঝারে ।
ওই—ওই সে আসিছে বুঝি এই দিক পানে।

য়ি দৃশ্য ] গভীর্থ ১৩১ দু’ নয়নে বিদ্যুৎ প্রবাহ-তাহার আড়ালে হের কি করুণ বেদনার মেঘ ঘনায়েছে । কন্যার বিরহ-ক্লিষ্ট ভগ্ন-চূড় হিমাদ্রি সান- বাহিরে দম্ভের বেশ, রণসজ্জা কাৰ্ম্মক কৃপণ অন্তরালে বক্ষে লেখা ইষ্টদেব নারায়ণ নাম। ঐ মূর্তি-ঐ মূৰ্ত্তি আকুলিল মােরে, হস্ত হ'তে খসে বুঝি চক্র সুদর্শন। -না, যাই-যাই পালাই এখনি । পুরন্দর, অসুর চাহিলে রণ কহিও তাহারে বিনা রণে পরিহার মাগি তার কাছে কঁদিয়া ফিরিয়া গেছে তার নারায়ণ ! (গয়াসুরের প্রবেশ।) গয়া। কে কঁাদে-কে কাদে? অসুর বধিতে এসে কঁাদে নারায়ণ ! হাঃ হাঃ হাঃ। দাড়াও—দাড়াও হে লক্ষ্মীপতি, হেন অপরূপ মূৰ্ত্তি তব আমি না দেখিব যদি কে দেখিবে তবে? বাঃ বাঃ পীতবাস, পীতধড়া, গলে ফুলমালা, ভালে লেখা কস্তুরিকা কুঙ্কুম চন্দন মরি মরি! শ্যামায়িত দেহখানি কঁপে থর থর- দক্ষিণ সমীরে যথা বিকশিত মাধবী বল্লরী। কাজল-নিবিড় পথ নয়ন-পল্লব মধুমত্ত ভৃঙ্গ সম ক্ষণে উঠে এড়ে,

১৩২
পস্নাতীর্থ
[ চতুথ অঙ্ক
ইন্দ্র ।
তাহার আড়ালে
নীলাজ নয়ন কোলে মুক্তা বিন্দুসম ওকি
করে ছল ছল !
দেখি দেখি
আনত কোরাে না আঁখি, দেখি নারায়ণ !
ঐ-ঐ আবার ঝরিল জল-তিতিল বসন
অলকা তিলক লেখা সব মুছে গেল।
হেরহের পুরন্দর, অসুর বধিতে এসে
সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় আকর
লক্ষ্মীপতি নারায়ণ করিছে ক্রন্দন।
প্রভু-প্রভু, আঁখি তােলদা
চাহ ফিরে দেবতার পানে।
থাক ডাকিয়ে না নারায়ণে-ডাকিতে হবে না।
ঐ চারু গণ্ড বাহি আমারি কারণে যদি ঝরে অশ্রুধারা--
আমারে সমর দিতে কাতর হইয়া
কঁদিয়া আকুল যদি বিলােক ঈশ্বর,
সে ক্রন্দন বারণ কারণ
০ই আমি অত্যাগ করিলাম রণে।
হে ঈশ্বর! বর চাও,
বর লয়ে রক্ষা কর শমনে তােমার।
কল্পতরু সম আজ শঙ্কিত ঈশ্বরে আমি
প্রদানিব বর।
গয়ার-গয়ার,
বুঝিয়াছি কি কারণ বরদান করিবারে চাহ নারায়ণে।
গয়া।
বিষ্ণু।

দ্বিতীয় দৃশ্য। গন্নভীর্থ গয়া। বিষ্ণ। গয়া। বিষ্ণু। বর দিয়ে চাহ তুমি নারায়ণে রক্ষিতে সঙ্কটে ? কিন্তু গয়, সে তাে আমি লইতে পারি না। শুনিব না কোনাে কথা। হয় হবে দুরন্ত সমর, নতুবা হে লক্ষ্মীপতি, পরাজয় মানি তুমি মেগে লবে বর। গয়—প্রিয়বর- শুনিব না নারায়ণভুলিব না ঘন শ্যাম মাধুরী হেরিয়া । বর চাও, সৃষ্টি যদি চাহ গাে রক্ষিতে-নহে ছাড় পথ শমনে ভেটিতে দাও সম্মুখ সমরে। উত্তম, তাই হােক তবে ! নিয়মতান্ত্রিক বিশ্বে জেগেছিল মত্ত প্রভঞ্জন সেই ঝড় আজি তবে শান্ত হয়ে যাক স্থির হােক বিক্ষুব্ধ সাগর । দাও বর গয়াসুর, ত্রিলােক-পূজিত নারায়ণ প্রার্থী আজি তােমার নিকটে--- শােন গয়, আজি হতে পাষাণ হইয়া তুমি রণক্ষেত্রে করহ শয়ন। পাষাণ-পাষাণ হইয়া হেথা সুপ্ত রহ দৈত্যপতি যুগ যুগান্তর। তথাস্তু-তথাস্তু! আরাধ্য দেবের ইচ্ছা করিতে পূরণ রণস্থলে সব আমি অনন্ত শয়ন। ইষ্টদেব, শিরে রেখাে কমল-চরণ। ভক্ত, তুমি দিতে চেয়েছিলে বর গয়া। বিষ্ণু।

১৩৪
গভীর্থ
[ চতুর্থ অঙ্ক
গয়া।
সে বরে পাষাণ-রূপী করি তোমারে।
প্রিয়তম, এই ক্ষণে তুমি চাহ বর,
নহে মাের হবে অপমান !
নারায়ণে বিক্ষুব্ধ করাে না।
এ আবার কোন্ লীলা তব নারায়ণ,
পুরাইতে চাই তুমি অন্তরের কামনা আমার,
এত দয়া ভক্ত প্রতি তব নারায়ণ ?
বেশ তাই যদি হয়—বর তবে দেহ নারায়ণ
এই মাের শিলাশয্যা 'পরে--এই তব পদাঙ্ক উপরে
পিতৃলােক উদ্দেশিয়া পিণ্ডদান করিবে যে জন
সে মূহুর্তে যমপুরী-মুক্ত হয়ে পিতৃগণ তার
মহানন্দে দিব্যধামে করিবে প্রয়াণ।
তথাস্তু"তথাস্তু।
নিজমুখে প্রচারিং আমি নারায়ণ,
এ শিলা শয়ন পরে পিণ্ডদান করিলে তখনি
জীবাত্মা বিমুক্ত হবে যমালয় হতে
দিব্যধামে হবে তার অনন্ত প্রয়াণ ।
হে ভক্ত, আজি হ'তে এইস্থান তােমার স্মরণে
বিশ্বে হবে পরিচিত
পুণ্যধাম গয়াতীথ রূপে ।
প্রিয়তম, আর কেন ?
দেহ তব থাক্ হেথা পাষাণ হইয়া
আত্মা তব দেহ মােরে-
নিয়ে যাই মহােল্লাসে বৈকুণ্ঠ ভবনে ।
বিষ্ণ।

দ্বিতীয় দৃশ্য ]
গভীর্থ
গয়া।
প্রয়ােজন নাহি নারায়ণ,
নাহি চাই বৈকুণ্ঠ নিবাস ।
ধরিত্রী মাতার বুকে করিব শয়ন ।
বক্ষে মাের ইষ্টদেব বিষ্ণর চরণ
অপূৰ্ব্ব এ দৃশ্য অভিরাম
উগ্ধ হ'তে দেখিবেক নক্ষত্র নিকর
নিশান্ত গগন হতে দেখিবে প্রত্যহ
শুকতারা নন্দিনী আমার,
বিড়ম্বিত জীবনের শেন পরিণাম
ইষ্টদেব, চিরদিন কামনা আমার।
শিলারূপে রহিলাম—
নির্যাতিতা মাতা মোর ধরণীর বুকে।
হেথা শুয়ে যুগে যুগে মহানন্দে
নেহারিক জীবাত্মার পরম উদ্ধার ।
দেবের চক্রান্তে কভু,
কিম্বা দুষ্ট শমনের ছলে,
পিণ্ড দিয়ে তবু যদি জীবাত্মার
কোনাে দিন না হয় উদ্ধার
পাষাণ ভাঙ্গিয়া আমি উঠিব সে দিন,
বাণে বাণে স্বৰ্গলোক
ভস্ম করি বাতাসে উড়াব।
কাজ নাই—কাজ নাই বৈকুণ্ঠে আমার,
বিষ্ণু-পাদপদ্মযুগ মস্তকে ধরিয়া
এই আমি মাতৃবক্ষে রহিলাম শুয়ে (শয়ন)

MAKARDAHA- BUSAHA
গয়াতীর্থ
[ চতুর্থ
বিষ্ণু।
ভয় নাই ভক্ত মাের, বাণী মাের না হবে অন্যথা,
গয়াতীর্থে পিণ্ডদান
কোন দিন কোন কালে হবে না বিফল ।
( অন্তরীক্ষে সমবেত কণ্ঠে গীত হইল—
ওঁ মধুবাতা ঋতায়তে, মধুক্ষন্ত সিন্ধবঃ মাধ্বীর্ণ সন্তোষধী।)
যবনিকা।
ARY
ViT LI,
১
bd-1219.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Gayatirtha

Author
Gupta, Sri Mahendranath
Title
Gayatirtha
File name
Gayatirtha
Text
OCR done
Citation
1937
Published
2009/08/1
Publisher
Sri Mahendranath Gupta, Calcutta
Language
Sanskrit
Pages
152
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Drama. Plays.
Keywords
Mythological drama
DLI number
550719
Barcode
4990010021071.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
GlV7R1C8yS6
Download PDF

Gayatirtha