Belgaria Sudha Smriti Pathagar
Nastodhar Ed.1
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
নষ্টোদ্ধার
বাংলার মেয়ে
(উপন্যাস)
শ্ৰীবিধুভূষণ বসু প্রণীত
প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
মূল্য ১৩ পাচসিক।
প্রকাশক–শ্রীশরৎকুমার হােড়,
শ্রীগােবিন্দ সাহিত্য মন্দির।
২৩১, হ্যারিসন রােড,
কলিকাতা।
প্রথম সংস্করণ
প্রিন্টার—শরৎকুমার হােড়
গগাবিন্দ প্রেস,
২৩১,হ্যারিসন রােড, কলিকাতা।
উৎসর্গ । স্নেহভাজন শ্ৰীমান্ চন্দ্রকুমার মজুমদার চির কল্যাণাপদেষু- চন্দ্রবাবু, কৰ্ম্মপথের শেষের দিকে চলিতে চলিতে তােমার সঙ্গে সাক্ষাৎ। এই সূত্রে কুমিল্লা জেলার সাথে খুলনা জেলার যে সামান্য একটু গ্রন্থি বদ্ধ হইল, যাহা এ বৃদ্ধ পরপার যাত্রী শেষের সম্বলের মতন আঁকুড়িয়া পরিবাছে।—তাহা মৰ্ম্মে প্রচ্ছন্ন না রাখিয়া বাহিরে প্রকাশ করিয়া ফেলিলাম। “নষ্টোদ্ধার” তােমাকে দেওয়ার উদ্দেশ্য,যদি লেখকেরা ওপার পৌছিবার পরেও এ গ্রন্থ এ পারের কোন লোকের হাতে পড়ে, তখন সে ভাবিয়া ব্যস্ত হইবে, এত দূরে দূরে দুইটা অসম প্রকৃতির অসম বয়সের মানুষের মিশামিশি হইল কিরূপে? এই গঙ্গে আর আশীৰ্বাদ মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা তােমার চিরকাল অক্ষুন্ন রহুক। বিষ্ণুপুর। ১৮ই ফাল্গুন, 1.তামার মঙ্গল কাম- 1. ১৩৩ সাল। এন্থিকার :
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
০ ০ ০ ০ ০ ০ ৩ ০ ০ ০ ú ৪। ১) ০ ০ ০ ০ } গ্রন্থকারের নিম্নলিখিত পুস্তকগুলি আমরা প্রকাশ করিয়াছি। চারু চন্দ্র (২য় সং ) ... ১ টাকা ২। অমৃতে গরল ( ২য় সং) • (২য় সং ) বন মালা (২য় সং ) ৫। পাপিষ্ঠা (২য় সং) ", ৬। লক্ষ্মী মেয়ে (৬ষ্ঠ সং) ৭। লক্ষ্মী বউ (৯ম সং) ৮। লক্ষ্মী মা (৫ম সং ) ••• ৯। সতী লক্ষ্মী (৩য় সং) ১০। স্বয়ম্বরা (২য় সং ) ১১। দীপালির বাজি (নূতন উপন্যাস) ১০ ১২। বিষের বাতাস ১৩। কুলের বলি (যন্ত্রস্থ ) ১৪। জ্যাঠাই-মা ১• ১) ১ ০ ০ ০ ১) ১১ ০ ০ ০ ১০ ১) . । * ০ ০ ০ ১০ প্রখরা ১০ গােবিন্দ সাহিত্য মন্দির ২৩১, হারিসন রােড, কলিকাতা।
জ্যাকাইমা। নুতন সামাজিক উপন্যাস প্রকাশিত হইয়াছে। নূতন সামাজিক উপন্যাস প্রকাশিত হইয়াছে। খুলে বলি। নুতন সামাজিক উপস য, শীই প্রকাশিত হইবে।
তেঁাদ্ধার। বক্তা—বিজয় সিংহ। আমার নাম বিজয় সিংহ, একথা শুনিয়া কেহ যেন মনে না করেন মামি কোনও দুর্ভেদ্য দুর্গবিজয়ী রাজপুত ক্ষত্রিয় বীর। আমি নিতান্ত , ডাল-ভাত খাওয়া বাঙ্গালী ; বাংলার নিতান্ত অবিখ্যাত পিছনে পড়া এক পল্লীতে আমার জন্ম স্থান। আমি যেবার ভূমিষ্ঠ হই, সেইবার আমার মামার বাড়ীতে “বিজয় বসন্ত” যাত্রার গীত হইয়াছিল, তাই আমার দিদিমা আমার নাম বিজয় রাখিয়াছিলেন। সিংহ আমাদের বংশের উপাধি, আমরা গােষ্ঠিপতি কায়স্থ। বাবার কিছু ভূসম্পত্তি ছিল, অতি বৃদ্ধ প্রপিতামহ হইতে তাহা কৃষক প্রজাদিগের সঙ্গে জোতজমায় বন্দোবস্ত ছিল, হাজার খানেক মুনফা ছিল, বাবা ও কাকা দুই ভা’য়ে যাহা ভাগ করিয়া পাইতেন, তাহাতেই ভদ্রলােকের মত সংসার আগে চলিত। তার পর যখন কোট, সার্ট, গেঞ্জি, যায়, সেমিজ, ব্লাউস প্রভৃতির বাজার বসিল, তখন আর সিংহ বাড়ীর মান রাখিয়া সংসার করা চলিয়া উঠিতেছিল না। বাবা তখন পৈতৃক নষ্টোর গতিটা নাড়িয়া ছাড়িয়া দেখিবার ইচ্ছা করিলেন। উকিলেরা পরামর্শ দিলেন, করবৃদ্ধি নিশ্চয়ই হইবে, হাজার টাকার স্থলে ৩ হাজার পর্যন্ত মুনফা হইতে পারে। তবে আগে কিছু টাকা খরচের আবশ্যক। কাকা কিছু ইংরাজী লেখা পড়া শিখিয়াছিলেন, সেই অল্প লেখা পড়ায়ই কলিকাতায় থাকিয়া চাকরী করিতেন। আরও ইংরাজী শিখিয়াছিলেন, কলিকাতায়ও থাকিতেন, সুতরাং হিন্দু সমাজের খাতা হইতে নাম কাটাইয়া ব্রাহ্মদের তালিকায় নাম লেখাইয়া লইলেন। বাবার সঙ্গে তাহার মােটেই মিল ছিল না। কাকা বলিলেন, আমি মামলা খরচের টাকাও দিতে পারিব না—লাভও চাই না; সম্পত্তি সকলই আমি দাদাকে ইজারা দিতেছি, পাচশ টাকা আমার ভাগে পাওনা, আমি সন সন তিন শ টাকা তিন কিস্তিতে পাইলেই খুসি। দাদা সম্পত্তি বাড়াইয়া গােছাইয়া খাইতে পারেন ভালই। তাহাই হইল, বার্ষিক তিন শ টাকা মুনফা দিয়া বাবা কাকার অংশ ইজারা লইলেন। তারপর প্রজাদিগের সঙ্গে লড়াই বাধাইলেন। প্রজারা একবারে বাঁকিয়া বসিল, তাহারাও উকিল বাড়ী যাইয়া আসিয়া থাকে। উকিল সেরেস্তায় কৰ্ষা জোতের কর বৃদ্ধি হইতে পারে এ পরামর্শ যেমন আছে, আবার তিন পুরুষে জোতের আবার করবৃদ্ধি কি, ও ত মররি স্বত্ব এ পরামর্শও নজির রুলিং সমেত পাওয়া যায়; সুতরাং মােকদ্দমাই চলিল। প্রজারা খাজনা বন্ধ করিল, এদিকে মামলা খরচ। মহাজনের ঘর হইতে বাবাকে অনেক টাকা ধার করিতে হইল ; উকিল বাবুরা বলিতেছেন, সব মামলায়ই ডিক্তি হইবে। ট্র কতকটার হইলও, প্ৰজাদিগকে ডিক্রী হইলেও উকিল বাবুর মালেকের কাছে আত্মসমর্পণ করিতে দেন নাই, আপিল করাইয়া দিয়ছেন। সুতরাং বাবায় ভিকীর টাকা আদায় করিতে বিলম্ব হইল। ;
নষ্টোর এদিকে কাকার সেই ইজারার খাজনা মােটেই দেওয়া হইতেছে না। কাকা কয়েকবার তাগিদ করিয়া নালিস রুজু করিয়া দিলেন। বাবা ত ভয়ানক রাগিয়া গেলেন, ভাই হইয়া এই বিপদের সময়ে এমন কাজ করিল, আচ্ছা ওর মােকদ্দমায় আমি অস্বীকার জবাব দিব। অনেক দিন বাবা আইন আদালত ঘুরিতেছেন, অহিফেনের নেশার চেয়ে মামলার নেশা গুরুতর। বাবার সঙ্গে কাকার মােকদ্দমা দুই আদালত চলিল। আদালতে মাঝে মাঝে সত্যের পরাজয় ঘটিলেও এক্ষেত্রে তাহার বিপরীত ঘটিল। কাকা মহাশয় হাজার তিনেক টাকা ডিক্রী প্রাপ্ত হইলেন। সেই সময়ে বাবার মহাজনেরাও নালিশ রুজু করিল। আমাদের তখন কিন্তু প্রজাদের কাছে অন্ততঃ দশ হাজার টাকার ডিক্রীর টাকা পাওনা রহিয়াছে। কিন্তু বাবার আদালত মন্দিরের পুজা দিবার মত অর্থ সংগ্রহ হয় না, সুতরাং দেবতাপ্রসাদ ন্যায্য প্রাপ্য হইলেও পাইবার সামর্থ্য নাই। তখন মা আমার দুই বৎসর রােগে ভুগিয়া একবারে শয্যা লইয়াছেন। যাহা কিছু যােড়ে আদালতের পূজাই লাগে, মায়ের চিকিৎসার ব্যবস্থা হয় না। আমি সেবার গ্রাম্যস্কুলে ম্যাটি কুলেশন পাশ করিয়াছি, মায়ের অবস্থা দেখিয়া বাবার সঙ্গে পুত্রের যাহা করণীয় নয়, এমন ভাবে কলহ করিলাম। তারপর মাকে লইয়া হাসপাতালে অসিলাম। রােগ চিকিৎসার তখন আর সময় ছিল না, রােগ-তাপ-দুশ্চিন্ত-ক্লিঃ জননীর জীর্ণ অস্থি মা গঙ্গা গ্রহণ করিলেন। মা-হারা হতভাগ্য আমি আর দেশে ফিরিলাম না, কাকার কাছে গিয়াছিলাম, তিনিও স্থান দিলেন না। তাহারও তখন বড় বিপদ, তিন তিনটা কন্যাকেই লেখাপড়া শিখাইয়া সুশিক্ষিত করিয়াছিলেন, তাহাদের সমাজে কন্যার বিবাহ না দিলে জাতি যায় না। কিন্তু আমার নষ্টোর ভগিনী তিনটাই কুমারী জীবনে ভারাক্রান্ত, স্ব স্ব প্রিয়জন পাইয়া প্রেমাকৃষ্ট হইয়াছেন, তাহাদিগকে পরিণয় সূত্রে গাঁথিয়া দেওয়া প্রয়ােজন হইয়াছে। সে সমাজে নাপিত পুরােহিতের দাবি না থাকিলেও, হােট খাটো বিবাহের আয়ােজন হাজার টাকার কমে হইতে পারে না। কাকার টাকার অভাব। এ সময়ে আমাকে দেখিয়া, ও বাবার ব্যবহার মনে পড়িয়া তিনি মা-মরা ভ্রাতুপুত্রকেও বাড়ীতে স্থান দিলেন না। যা হউক, বাবারও অদৃষ্ট ভাল, সেই বৎসরই কয়েক দিনের জরেই দেহত্যাগ করিলেন। বাবার রােগের খবর পাইয়াও বাড়ীতে যাই নাই, মৃত্যু সংবাদ পাইয়া না যাইয়া পারিলাম না। যাইয়া দেখিলাম, পিসিমা আসিয়া বাড়ী ঘরের পাহারা দিতেছেন। মায়ের শ্রাদ্ধ গঙ্গার কূলে করিয়াছিলাম, বাবার শ্রাদ্ধ দেশে বসিয়া জলে-ফুলে করিলাম। ঠিক তখনই কাকা মশাই তাহার ডিক্রিজারি দিয়া বিষয় নিলামে চড়াইলেন। মহাজনেরাও তাহার সঙ্গে যােগ দিল। আমি তাহার প্রতিরােধের আর কি চেষ্টা করিব। পিসিমাকে বাড়ীতে রাখিয়া কলিকাতায় চলিয়া আসিলাম। এক সদাশয় ধনবানের গৃহে তাহার দুইটা শিশু ছেলে পড়াইয়া, আমি কলেজে পড়িতে লাগিলাম। আমি সঙ্কল্প করিয়াছি, পড়াশুনা করিয়া কৃতবিদ্য হইব, তাহার পর বড় চাকরী করিয়া বড় লােক হইব। টাকা করিবই, আমার প্রাণপণ প্রতিজ্ঞ।
মাঘের শেষ, সেদিন সন্ধ্যার পূর্ব হইতেই টিপ টিপ বৃষ্টি হইতেছে, সঙ্গে ককনে বাতাস; রাত্রিটাকে নিতান্ত বিশ্র ভয়াবহ করিয়া তুলিয়াছে। বিশ্ব-প্রাণ-শক্তি-সঞ্চারিণী প্রকৃতি আজ কি পীড়াদায়িনী নির্দয় মূর্তি ধারণ করিয়াছেন! এত বড় কৰ্ম্মব্যস্ত কলিকাতা সহর, তাহাও যেন আজ পঙ্গু, কোনও প্রকারে মুড়িগুড়ি দিয়া তাহার সজীবতা বজায় রাখিয়াছে। রাত্রি দশটা বাজে, সাতটায়ই আজ রাস্তায় চৌদ্দ আনা লােক চলে নাই, দশটায় আর কে বাহির হইবে। তবু দুই একখানা গাড়ি জুড়ি চলিতেছে, তখন এতটা মটর বাসের ভিড় হয় নাই। পাহারাওয়ালার বর্ষাতি মুড়ি দিয়া ঝুল বারাণ্ডার দিকে সরিয়া দাঁড়াইয়াছে, কিন্তু শীতের কম্পন অপেক্ষা তাহাদের কর্তব্য লঘন জন্য ভয় ও উপর ওয়ালার নজরে ধরা পড়িবার ভয়ের কম্পন তাহাদিগকে মােটেই স্বস্তিতে থাকিতে দিতেছে না। ভিজা পুরাতন জুতা জুড়ি পায়ে, ছিটের কোটের উপর ছিন্ন ব্যাপার খানি জড়াইয়া আমি বউবাজার হইতে সুরি লেনে পড়িয়াছি। তখন আমি বড় দুরবস্থায়। বি, এ ফেল করিয়াছি, অত কষ্টে কি পড়াশুনা যায়? আমার মতন পূজিপাটা-হীন কয়েকটা বন্ধুর সঙ্গে বেলেঘাটায় একটা গােলপাতার মেটে ঘরে থাকি, নিজেরাই রান্না করি। সকালে ঐ বেলেঘাটায়ই একটা ছেলে পড়াই, আট টাকা মাইনে পাই। সন্ধ্যার পরে ওয়েলিংটন স্ট্রীটে আর একটা ছেলে পড়াই, দশ টাকা মাসহরা। সকালে বিকালে আমার সময় হয় না। আমার সহযােগীয়া দশটায় কাজে যান, আমি তখন সময় পাই, বাসায় বাসন নষ্টোর মাজা এটো ঝাট দেওয়া প্রভৃতি সারিয়া, জল তুলিয়া বাজার করিয়া, তরকারী ছাড়াইয়া আমি রাখিয়া আসি। তাহারা রান্না করিয়া আমার ভাত ঢাকিয়া রাখেন, আমি যখন যাই, তখন খাই। এমনি ভাবে আমার এক বৎসর কাটিতেছে, সুবিধামত চাকরীর সংগ্রহ কিছুতেই ইয়া উঠিতেছে না। তবে রেলের ঘােট সাহেব আশা দিয়াছেন, মার্চ মাসে ৪৫ টাকার একটা চাকরী তিনি দিতে পারেন, কিন্তু শতখানেক টাকা তাহার প্রণামী দিতে হইবে। তাইত ভাবনা, পিসিমাকে মাসে মাসে ৩টী করিয়া টাকা দিতে হয়, তিনি পৈতৃক বাড়ীটা আগলাইয়া আছেন। তবু সেভিংস ব্যাঙ্কের খাতায় গােটা পঞ্চাশেক টাকা হইয়াছে। যাহা হয়, এক রকম করিতেই হইবে। যে কোনও প্রকারে ডিপার্টমেন্টে ঢুকিতে পারিলেই আমার উন্নতি, তাহা আমি নিশ্চয় করিয়া বলিতে পারি। আজ শরীরের প্রতি প্রকৃতির এই বৃষ্টি বাদলের অত্যাচার, মনের উপরও অত্যাচার কম যায় নাই। যে বাড়ীতে টিউশনি করিতাম, তিনি আদালতের এটনি, বড় হুসিয়ার লােক। পর মাসের পনর দিন হইলে পূর্ব মাসের বেতন দিতেন না। আজ আমার টাকার বড় রকার ছিল। একজুড়ি জুতা কিনিতে হইবে, একটা গরম জামা বা একখানা ব্যাপার না কিনিলে আর চলে না। তাই বাবুর কাছে বড় কাতরে জানাইলাম, আমাকে পূর্ব মাসের দশটী টাকার সঙ্গে এ মাসের অন্তত ৫টা টাকা আজ দিয়ে দিন, আমার বড় অভাব। বাবু তাহাতে অগ্নিশর্মা হইয়া উঠিলেন। দরিদ্রদিগের কথা কাৰ্য কতটা মােলায়েম হইলে ধনবানদিগের স্বস্তির বাধা পড়ে না, তাহ দরিদ্রের দায়ে পড়িয়া সর্বদা বুঝিয়া উঠিতে পারে না, ইহাই কিন্তু রিদিগের দুর্গতির প্রধান কারণ হইয়া উঠে। বাবু বলিয়া উঠিলেন, নষ্টোয় “তােমার যত বেয়াদব ছেলেত দেখি নাই বাপু! আজ এই দুর্যোগ, এর মধ্যে তােমার টাকা চাই, তা আবার পাঁচ টাকা আগাম ! তুমি ত প্রত্যহ দশ মিনিট আগে থাকতে চলে যাও, এমন কল্পেপােষাবে না বাপু।” আমি তবু কাতরে বলিলাম, “আজ্ঞে না, আমি সময় হলেও দশ মিনিট পরে যাই, আমিত বলেছি, যদি রাত্রিতে এখানে একটু থাকবার যায়গা পাই, তা হলে আটটার সময়েই আনি খেয়ে এসে এগারটা . পর্যন্ত পড়াতে পারি।” বাবু তখনই অমনি বলিলেন, “না না, সে হবে না থাবার যায়গা টায়গা মিলবে না। ছােট লােক টোক বাড়ীতে যায়গা দেওয়া ভয়ানক ঝরি।” তখনও ধৈর্যের বাঁধটা আমার অভাবের ভাবনা দিয়া আটকাইয়া রাখিতে পারিয়াছিলাম, বলিলাম, “আমি দরিদ্র বটে, কিন্তু ছােট লোক নই, তা বােধ হয় আপনি জানেন। “আরে বাপু, ছােট লােককে চেনা, দেবতারও অসাধ্য, মানুষ ত কোথায় লাগে।” “আপনারা টাকার ওজন দিয়ে মানূষের মানের মাপ করেন, এটা আপনাদের ভুল।” “আরে মশাই, তুমিত তর্কবাগীশও কম নও।” “তা যাক, তর্কে কাজ নাই, আমার টাকা কটা দিয়ে দিন, আমার দরকার। এবারকার কথাটা আমার বুদ্ধির অগােচরে অন্তরাত্মা বােধ হয় একটু চড়া সুরেই বাহির করিয়া দিয়াছিলেন। কর্তা তখন বিষম ক্রোধে গায়ের ঢােখানা সরাইয়া বলিয়া উঠিলেন, *এই ত, তুমি ছােট লােক না ত বড় লােক? আবার এখনই তােমার টাকা, বল্লাম যে আজ না, আর এক দিন নিও।”
নষ্টোর দেখুন।” আমি বলিলাম, “না মশাই, আজ আমার চাই, বেশী না হয়, আমার আগেকার মাসের ডিউ হয়েছে, দিয়ে দিন।” “মলাে যা, আমি বলছি, এত শীতে হবে না, তা আবার ডিউ টিউ কি ? কে যাবে এখন বাক্স খুলে টাকা দিতে ?” “আর দেখতে ত পাচ্ছেন, আমি এই খালি গায়ে বেলেঘাটা পৰ্যন্ত যাই আসি। আমি আর আপনার ছেলে পড়াবাে না, কাল আস্বাে, আমার যা পাওনা চুকিয়ে দেবেন, আপনি অন্য মাষ্টার উপরের সিড়ি দিয়া নামিয়া নীচে আসিলাম, পিছন হইতে খানসামা ডাকিল, “শােন, শােন, ম্যাষ্টার শােন।” ফিরিয়া বলিলাম, “ক্যা বােতা?” খানসামা বলিল, “মা জি বােলা।” খানসামার সহিত আবার উপরে উঠিলাম। বাড়ীর গৃহিণী আমায় ডাকিয়া বলিলেন, “ম্যাষ্টার? তুমি নাকি খােকাকে আর পড়াবে না।” আমি তেমনি রুক্ষ কণ্ঠেই বলিলাম, “না, আমি আর পেরে উঠছি না।” “তুমি কি প্রত্যহ বেলেঘাটা থেকে এসে, আর এই রাত্রি দশটায় ফিরে যাও।” “তা বই আর কি? আমরা যে দরিদ্র, ছােট।” নারীর কণ্ঠে যে সহানুভূতি স্নেহের কোমলতা প্রচ্ছন্ন ছিল, সে উত্তেজনার সময়ে তখনও আমি বুঝিতে পারি নাই। গৃহিণী বলিলেন, “বােস তুমি, তােমার এত কষ্ট? কাল থেকে তুমি এইখানেই থাকতে পার, তার ব্যবস্থা আমি করূবােকর্তার অমনিই ভাব, ওর উপর রাগ করাে না, থােকা তােমারইত ছাত্র, ওর অকল্যাণ করাে না। এই নাও আমি দিচ্ছি তােমার দু’মাস মাইনে এই কুড়িটা ১ নষ্টোন্ধার টাকা, আর এই টাকাটার আট আনা পয়সা দিয়ে একখানা গাড়ি চড়ে বাসায় যেও, আর দোকান থেকে কিছু গরম খাবার কিনে খেতে খেতে যেও।” গৃহিণী কথার সঙ্গে কাজগুলিও করিয়া গেলেন, আমি কোনও কথা বলিবার অবসর পাইলাম না। বিনা প্রতিবাদেই রাস্তায় বাহির হইলাম। সুরি লেন ছাড়াইয়া বড় রাস্তায় নামিয়াই গাড়ি করিব, কিন্তু এতবড় হৃদয়হীন গৃহস্থের এমন দয়াশীলা গৃহিণী হইলেন কিরূপে? আবার ভাবিতেছি, এই ইট পাথরের সমুদ্র কলিকাতা সহরে হৃদয় বলিয়া কোনও কোমলস্পর্শের বস্তু ত এ পর্যন্ত আমি পাই নাই। তবে ইহাও ঠিক, এমন কিছু পবিত্র মহত্বের ম না থাকিলে এ লক্ষ্মীর লীলাস্থান মহানগরীর শােভার গাঁথুনী কখনই টিকিয়া থাকিতে পারে না। আজ পুরাতন কথা কিছু কিছু মনে আসিল, এমনি অবস্থায়ই লােকের চিত্তে তরঙ্গ উঠা স্বাভাবিক। ভাবিলাম, এইখানেই ত বিদ্যাসাগর ভূদেবের শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্র। এইখানেই কেহ আট টাকায় বিস্কুটের ব্যাপারী হইয়া ক্রোড়পতি, কেহ রাস্তায় বটতলায় কেতাৰ ফেরি করিতে গিয়া লক্ষপতি। আবার কেহত লক্ষ টাকার হৌসের মালিক হইয়া পথের ভিখারী। এখানে জয় পরাজয় দুই-ই আছে। ভাবিতে ভাবিতে অন্য মনস্ক ভাবে পথ চলিতেছি, ঠাৎ একজন লােকের গায়ে ধাক্কা লাগিল। ধাক্কা লাগিয়া লােকটা পড়িয়া গিয়া “বাবা গো বলিয়া কাঁদিয়া ফেলিল। দেখিলাম একজন বৃদ্ধা। তিনি কোনও বড়লােকের বাড়ীতে পাচিকার কাজ করেন, রাত্রিতে রন্ধনাদি সারিয়া, খালা বাটীতে ভাত ব্যঞ্জন লইয়া গৃহে ফিরিতেছিলেন। এ দুর্যোগ রাত্রিতে পথ চলিতে তাহার অবশ্য বড়ই কষ্ট হইতেছিল, কিন্তু মায়ে পড়া লােকের দুঃখ কষ্টের আবার মাত্রা কি? বৃদ্ধা যেমন গলির মােড় নষ্টোর ফিরিয়া আসিয়াছিলেন, অমনি আমার ধাকা লাগিয়া তিনি পড়িয়া গিয়াছেন। আমি বৃদ্ধাকে ধরিয়া তুলিলাম, দেখিলাম তাহার হাতের কনুইটা একটু কাটিয়া গিয়াছে, ভাত তরকারীগুলি ছড়াইয়া পড়িয়াছে। মরণাধিক লজ্জা ও দুঃখ হইল, কিরূপে এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত হইবে? বড় কাতরে, প্রাণের অকপট ভক্তিভরে, সত্যিকার দেবতার কাছে ভক্তের নিবেদনের মত বলিলাম, “মা! আমি দেখতে পাই নাই।” বৃদ্ধা কম্পিত কণ্ঠে অতি কষ্টে বলিলেন, “দেখতে ত পাও নাই, বাছা, মেয়েটা আজ না খেয়ে থাকবে। তুমি কি জাত বাছা?” বৃদ্ধা যেন একটুও ক্রুদ্ধ হন নাই, এ যেন তাহারই ভাগ্যলব্ধ দুর্ঘটনা, আমার যেন ইহাতে কোনও দোষই নাই। এতবড় ক্ষমা মানুষের থাকে? আমার কান্না আসিল, বলিলাম, “আমি কায়েস্থ”। বৃদ্ধ বলিলেন, “তবে দেখত, উপর উপর চারটা ভাত যদি তুলতে পার। ডালের বাটীটে ত ঠিকই আছে।” আমি বলিলাম, “না মা ভাত আর তুলে কাজ নাই, চল মা আমি তোমায় গৃহে রেখে আসি।” আমি খালা বাটা দুটা কুড়াইয়া তুলিয়া লইলাম। গায়ের ব্যাপার খানি খুলিয়া বৃদ্ধার গায়ে জড়াইয়া দিলাম, এ ছাড়া ত আর আমি করিবার মতন কিছুই পাইলাম না। বৃদ্ধা বলিলেন, “আহা কর কি বাহ! তােমার যে কত কষ্ট হবে?” আমি কিছু বলিলাম না, বলিতে পারিলাম না। সত্যই সেই দুরন্ত মাঘেয় বাদলার রাত্রিতে আমার গায়ে তখন ঘাম হাড়িয়াছে। সেই গৃহস্বামীর সঙ্গে তর্ক করিতে শরীরে তাপ ছুটিয়াছিল, সেই তাপ আরও নষ্টোর বাড়িয়াছিল, যখন দয়াবতী গৃহমিনী আমাকে ডাকিয়া মেহের পরশে আমার মনকে তাতাইয়া দিয়াছিলেন, মানুষের মন ভাবের বশেই তাতে, সে ভাব কঠোরই হউক আর কোমলই হউক। আর এইবার আমার মন হইতে, শরীরের অতি অভ্যন্তর হইতে যে তাত বাহির হইয়াছে, তাহাতে আমার সর্বাঙ্গ বৈশাখের রৌদ্র স্পর্শবৎ উত্তপ্ত করিয়া দিয়াছে। কেবলই ভাবিতেছি, এত বড় মহাপাপ কেন করিলাম? বুড়ী যদি ইহার জন্য আমাকে দুটী গালি তিরস্কার কথা বলিতেন, একটা হােট অভিশাপের কথা ও ফুটিয়া বলিতেন আমার বােধ হয় এতটা কষ্ট হইত না। বৃদ্ধাকে লইয়া সারপেন্টাইন লেনে একটা বাড়ীতে গিয়া উপস্থিত হইলাম। সেই বাড়ীটার কোণের একটা ঘরে ধাক্কা দিতেই, ভিতর হইতে দরজা খুলিয়া দেওয়া হইল। একটা মেটে প্রদীপের আলাে হাতে একটা দশ বারাে বছরের মেয়ে দরজায় আসিয়া দাড়াইল। বৃদ্ধা ঘরে প্রবেশ করিলেন দেখিয়া, আমি কথাটা না বলিয়া কালবিল করিয়া ছুটিয়া আসিয়া নিকটেই একটা খাবার দোকানে আসিয়া সেই আট আনার খাবার কিনিলাম। সেও আমার দয়ার দানে পাওয়া, সেই পবিত্র দানে পাওয়া বন্তু আজ এমন অতি পবিত্র বিষয়ে লাগাইতে পারিলাম ভাবিয়া মনে মনে বড় প্রসাদই জাগিল, আবার কিন্তু ভয় হইল, এ বস্তু যদি তাহারা গ্রহণ না করেন। বৃদ্ধাকে যে আমি বড়ই মহনীয়া চরিত্রের দেখিলাম। খাবারটা লইয়া আসিয়া দরজার কাছে দাড়াইলাম, শুনিতে পাইলাম তাহারা দুইজন আমারই কথা বলিতেছেন, আমার উপর একটুও বিরাগের কথা নয়। বৃদ্ধা বলিতেছেন, “ছেলেটার দোষ কি? যে দুর্যোগ রাত্রি, আমি মােড় ফিরে আসতেই তার গায়ের উপর পড়েই ত পড়ে গেছি। বড় ভাল ছেলেটি, আহা কি করেছে দেখ, তার ব্যাপারখানা আমার গায়ে জড়িয়ে দিয়েছিল, তা নিয়েও নষ্টোদ্ধার যায় না। কোথাথেকে ছেলেটী কথাটা না বলে পালিয়ে গেল। বড় লজ্জা পেয়েছে, তার গায়ের র্যাপারখানা দিয়ে চলে গেল। আহা কি অন্যায়, তাকে আর কোথায় পাব যে ব্যাপারখানা ফিরিয়ে দেই? না পাই তুই গায়ে দিস্ বােন্।” কথাগুলি আমার কর্ণে অমৃতের মত মিষ্টও বােধ হইতে লাগিল, আবার আমি যে এত মিষ্ট ব্যবহারের মােটেই যােগ্য নই ভাবিয়া মনটার বেশ আঘাতও লাগিতে লাগিল। বৃদ্ধার কথায় আর একটা বালিকা বলিল, “তিনি দয়ালু হতে পারেন, কিন্তু এমন ভাবে চুপে পালিয়ে যাওয়া তার উচিত হয় নাই। আছি নয় আমরা গরিব অবস্থায়, দু’দণ্ড বসে একটু বিশ্রাম করবার মতন যায়গা অবশ্যি আমরা দিতে পাত্তা।” স্বরটা মিষ্টও বটে, অকপট হৃদয়গ্রাহীও বটে, তাহাতে আবার দারিদ্র্য জনিত একটু ব্যথামিশ্রিত। আমি দরজায় ধাক্কা দিয়া বলিলাম, “ারটা খুলুন।” বালিকা খুব উৎসাহেই বলিল, “ঐ ত, ঠাকুরমা তিনি যান নাই, আহা এতক্ষণ দাড়িয়ে দাড়িয়ে শীতে কাঁপছেন।” বালিকাই আসিয়া দ্বার খুলিয়া দিল। আমি ঘরে প্রবেশ করিলাম। ঘরখানি নেহাৎ ছােট নয়, একজন বালিকা ও বৃদ্ধার থাকিবার পক্ষে যথেষ্টই। ঘরে ঢুকিয়াই চৌকির উপর পাতা বিছানার উপর বসিয়া পড়িলাম। খাবারের ঠোঙ্গাটা বালিকার হাতে দিতে বালিকা হাত বাড়াইয়া লইল, উপরের ঢানির পাতাটা তুলিয়া বলিল, ও মা, এত খাবার কি হবে ?” বৃদ্ধা বলিলেন, “আহা ! একি করেছ বাবা? না দেখে একটা কাজ হয়ে গেছে, তার জন্য কি এত কৰ্ত্তে হয়? “এমন কল্পে আমরা যে লজ্জা পাব, তা ওনি বুঝতেই পারেন নাই বলিয়া বালিকা আমার প্রতি নিঃসঙ্কোচেই চাহিয়া রহিল।
নষ্টোয় বৃদ্ধা বলিলেন, “তা হােক, মাধবী তুই থালাখানা টেনে, খাবারগুলি অর্ধেকটা সাজিয়ে ছেলেটাকে দে, আর অর্ধেক তুই খা।” মাধবী যেন কত খুসী হইয়াই চৌকির নিম্ন হইতে একখানা থালা তুলিয়া আনিল। এর আগে তার মুখে যে সমস্যা নিরাকরণ চিন্তায় ঘােরাল সন্দেহ ভাবের রেখা পড়িয়াছিল, তাহা যেন মুহূর্তের মধ্যেই কাটিয়া গেল, মুখখানা"তাহার নিতান্ত স্বাচ্ছন্দ্যের জ্যোতিতে যেন হাস হাস বােধ হইল। প্রদীপটা আরও টানিয়া কাছে লইয়া, মাধবী ঘােট হাতখানিতে থালার উপর খাবার সাজাইতে লাগিল। খাবার সাজাইতে সাজাইতে বলিল, “এ কচুরীগুণ একবারে বাসী, বিশ্রী হয়ে গেছে, এগুণ বাবুকে দেবব না মা, কি বলাে, খারাপ জিনিষ খেয়ে অসুখ কৰ্ত্তেও ত পারে ?” আমি এ পর্যন্ত কোনও কথা বলিবারই অবকাশ পাই নাই। বড় দুর্যোগের মধ্যে, এই এগারটা রাত্রি পর্যন্ত এক পয়সার ডাল’বাদাম মাত্র জলপানি খাইয়া, তিন ঘণ্টা ছাত্র পড়াইয়া এত পথ হাটিয়া আসিয়াছি, তাহার পর ভাবনা চিন্তার ঘাত প্রতিঘাতও কিছু গিয়াছে। বসিয়া একটু শান্তি দুর করিতে পাইয়াছিলাম, কিন্তু এই বালিকা ও বৃদ্ধার ব্যাপার দেখিয়া মনটা বিশেষ অস্বস্তি বােধই করিতে লাগিল। কিন্তু জবাবটা কি দিব, তা ঠাওর করিতে খুবই বিলম্ব হইয়া গেল, আবার উহারা আমার জবাবের প্রতীক্ষাই করিতেছে না। খাবায় সাজাইয়া, বালিকা বৃদ্ধার কাণের কাছে আসিয়া চুপে চুপে বলিল, “হ্যা মা। বাবু বামন ত নয়, আমাদের হাতে খাবেন ?” কথাটা চুপে চুপে বলিলেও আমি শুনিয়া ফেলিলাম, এবং কথাটার উত্তর দিয়া ফেলিলাম, “না না আমি বামন নই।” কথাটা বলিয়াই আমার হ হইল, একি করিলাম? আমি যে ভাবিতেছি কিরূপে নষ্টোর ১ এখানে বসিয়া এ খাবারটা না খাইয়া পারি ? কথাটা যাহা বলিলাম, তাহাতে যে আমার খাওয়া বিষয়ে সম্মতিই দেওয়া হইল। তাই আবার বলিলাম, “কায়স্থ হলেই কি সকলে সকলের হাতে খায়?” মাধবীও কথার জবাব দিল, “আমাদের হাতে সকল কায়স্থেই খেতে পারে, আমরা বরং সকলের হাতে খেতে পারি না, কেমন নয় মা?” কথাটা বলিয়া বালিকা খুব হাসিয়া ফেলিল। “দেখ, মাপ কর, রাত্রি অনেক হয়েছে, এরপর গাড়ি পাওয়া যাবেনা, আমি বেলেঘাটা পৰ্যন্ত যাব।” বলিয়া আমি উঠিয়া দাড়াইলাম। বৃদ্ধা বলিবেন, “ওমা, বেলেঘাটে যাবে ? এই রাত্রে ! তা কতকটা খাবার তুমি খেয়ে যাও, আজ রেতে তুমি ভাত খেয়েছ ?” এ কথার জবাব মাধবীই দিল, বলিল, “কিছুতেই নয়। এই শীতের রাত্রে খেয়ে দেয়ে কেউ রাস্তায় বেরােয়?” বালিকা সেই ঘরের মেজে একখানি আসন পাতিয়া, এক গ্লাস জল রাখিয়া, সহজেই ডাকি “আসুন।” তবু আমার সঙ্কোচ যায় না। বলিলাম, “এখন এতগুন খাবার খেলে ত ভাত খেতে পারবে না, সেগুলি অনর্থক নষ্ট হবে।” “আর এগুলি এখানে পড়ে সার্থক হয়ে যাবে? ভাত নিয়ে বসে আছেন বােধ হয় আপনার মা, আর যদি বউ থাকেন সে ত আমারই মতন ছেলে মানুষ। ভাত যদি না খেতে পারেন, তবে বলবেন, এক গরিব বুড়ীর ভাত ফেলে দিয়েই এই বিপদ।” বালিকা আরও কত হাসিল ! সত্যই বালিকাটা দেখিতে বড় সড় হৃষ্টপুষ্ট হইলেও বয়সে একবারেই বালিকা। খাইতে বসিলাম। আস্তে আস্তেই খাইতে লাগিলাম। তাড়াতাড়ি ইয়া সরিয়া পড়াই ভাল ছিল, কিন্তু আস্তে আস্তেই খাইতে লাগিলাম।
১৫ নষ্টোকার বালিকা বলিল, আমি কিন্তু ঠিক আদ্দেক ভাগ করে দিয়েছি, কিছু ফেলে যাবেন না কিন্তু।” আমি বলিলাম, “তুমি খাচ্ছ কই ?” “এই ত খাচ্ছি” বলিয়া বালিকা আর একখানি ডিসে তােল অবশিষ্ট খাবারটা চৌকির উপর বসিয়াই খাইতে লাগিল। খাইতে খাইতে সে বলিল, “এ খাবারগুলি এনে আপনার অনেক পুণ্যি হয়েছে। আমি মুড়ি খেয়ে থাকতু, মিঠাই খেতে পেলুম, সে জন্য পুণ্যি ত আছেই, তার উপর আবার ময়রা দাদার বাসি মালগুলি বিকিয়ে গেল। এ পাড়ায় দু’চার পয়সার খদ্দেরই মেলে, একদম এক টাকার খদ্দের ত সকল দিন তার মেলেই না।” মেয়েটা বকাটেও মন্দ নয়, কথাগুলি বেশ মিষ্ট সন্দেহ নয়। আমি বলিলাম, “এক টাকা তােমায় কে বল্লে ? এ যে মােটে আট আনার খাবার।” “নিশ্চয়ই না, আট আনায় এত খাবার দেয়?” “আমি কি তবে মিথ্যাবাদী?” একথায়ও মাধবী লজ্জিত হইল না, বলিল “আমরা বেশী করে লজ্জা পাব বলে, আপনি কম করে বতেও পারেন, তাতে কি আর মিথ্যাবাদী হয়ে গেলেন ? আট আনার বেশী হবে, নিশ্চয়ই।” আমি তখন সত্যকথা বলাটা নিতান্ত প্রয়ােজনই মনে করিলাম, “বলিলাম, সব শুদ্ধ সাড়ে দশ আনা লেগেছে!” বৃদ্ধা এতক্ষণে লেপটা টানিয়া শুইয়া পড়িয়াছেন তিনি বলিলেন, “এতগুন পয়সা নষ্ট করেছ বাপু! তুমিও যেন গরীবের ছেলে বােধ আমার কিন্তু তখন ইচ্ছা করিতেছিল, আমার সত্যিকার পরিচয়টা ইহাদিগকে দিয়া দেই। অন্তত আজ যে উপায়ে একটা টাকা মেহের নষ্টোর দান স্বরূপ পাইয়া আসিয়াছিলাম, তাহা না পাইলে ইচ্ছা থাকিলেও আমি অতি কর্তব্য কাজটাও করিতে পারিজম না, বিষয়টা ইহাদের কাছে খুলিয়া বলিতে ইচ্ছা হইতেছিল। কিন্তু তাই কি বলা যায় ? খাওয়া শেষ হইল ; সবগুলিই খাইলাম। কেবলমাত্র একটা রসগােল্লা মাধবীর পাতে তুলিয়া দিতে মাধবী কোনও আপত্তি করিল না। এদিকে বৃষ্টি যে আরও জোরে পড়িতেছে, তাহা লক্ষ করি নাই, বাতাসও জোরে বহিতেছে। দ্বার খুলিতেই ঘরের দীপটা নিবিয়া গেল। মাধবী তখনই আবার দীপ জ্বালিল। খুব যেন চিন্তিত হইয়াই বলিল, “তাই ত, কেমন করে যাবেন ?” আমিও বলিলাম, “তাই ত, কি করা যায় ? রাত্রি সাড়ে এগার বাজে।” মাধবী বৃদ্ধাকে বলিল, “মা, বাবু বাড়ীতে যাবেন কেমন করে, ভয়ানক ঝড় জল হচ্ছে যে।” মাধবী বলিল, “তবে আমি উপরে গিয়ে ঝির সঙ্গে ওই গিয়ে, বাবু এই বিছানার পাশেই শুয়ে পড়ুন। আর কি করা যায়?” বৃদ্ধ। বলিলেন “এত রাত্রে উপরে গিয়ে ডাকাডাকি করলে এরা কত বিরক্ত হবেন। হয় ত উঠবেই না।” “তাই ত কি করা যায় ?” মাধবীর মুখে যেন কত বড় মুস্কিলের ভাবনার ছায়া পড়িল। আমি বলিলাম, “যাকগিয়ে, বেরিয়ে পনি, একখানা গাড়ি ডেকে চলে যাই।” মাধবী খুব খিত্ন কণ্ঠেই বলিল, “তাই ত, না গেলে আপনার মার কত ভাবনাই হবে।” এখন আমি কথার পৃষ্ঠে কথা খুব তাড়াতাড়ি বলিতেছি, বলিলাম, মা বােন্ আমার ইহকালে কেউ নাই, একটা বাসায় থাকি।”
নষ্টোর মাধবী বলিল, “তবে, মা এই নীচে দুটী কম্বল পেতে ছােট একটু বিছানা করে দেই, বাবু এখানে শুন্, তুমিত আর এখন নেমে নীচেই আসতে পারবে না, নইলে আমরাই না হয় নীচেই শুতুম। এই দুৰ্যোগে রাস্তায় পড়ে মারা পড়ার চেয়ে এটা মন্দ হবে না। কি বলেন?” কথাটা তখনকার মত এমন সত্য যে তার উপর আর প্রতিবাদ চলে না। এ দুর্যোগে এমন সময়ে ঘরের বাহির হইলে, যমের হাতে নিষ্কৃতি পাওয়া গেলেও পাহারাওয়ালার হাতে রক্ষা পাওয়া যাইবে না। তবু বলিলাম, “তােমাদের ভারি কষ্ট হবে।” বালিকা তখন বিছানাই পাতিতেছিল, বলিল “ঘরে বসে একটু বিছানা পাতার কষ্ট, আর বাইরে পড়ে ঝড় জলে মারা পড়া, অবশ্য সমান হতে পারে না। নি, শুয়ে পড়ুন। রাত্রি অনেক হয়ে পড়েছে।” শুইয়াই পড়িলাম, বালিকা দীপটী নিবাইয়া বৃদ্ধার কাছে গিয়া শুইয়া পড়িল, উহারা শুইয়াই ঘুমাইয়া পড়িল, বৃদ্ধার নাক ডাকিতে লাগিল, বালিকারও নিশ্বাসের শব্দে-বােঝা গেল, সে গাঢ় নিদ্রায় বিভাের। আমার কিন্তু নিদ্ৰা আসিতেছিল না। মনে অনেক বাজে ভাবনা একটার উপর আর একটা বাহিরের হাওয়ায় মত আসিয়া মনটাকে যেন ঝাপটে ঝাপটে অতিষ্ঠ করিয়া তুলিল। ভাবিলাম এ আবার কি ঘটিল? আজকার দিনটার কি একটা দৈবশক্তি আছে ? ইহাদের পরিচয় ত কিছু জানিলাম , জানিবার সময় পাইলাম কই? বহুভাষিণী” এই বালিকাটার কথার উত্তর দিয়াই পারিলাম না। এত সকালে না ঘুমাইয়া, আরও কিছুক্ষণ জাগিয়া থাকিয়া, ইহাদের পরিচয়টা জানিয়া নিলেই হইত। রাত্রি কাটিল, ভােরে জাগিয়াই শয্যায় পড়িয়া রহিলাম, ইহার উঠিলে, একবার না বলিয়াই বা যাই কি করিয়া ।
নাটোর ১ মাধবীই আগে উঠিল। ডাকিল, “মা! ও মা! ঠাকুর মা?” এইবার বুঝিলাম বৃদ্ধা মাধবীর মা নন্, ঠাকুরমা। এ সন্দেহটা অনেকবারই মনটা ব্যস্ত করিতেছিল। ঠাকুরমা উঠিলেন, সেই সঙ্গে আমিও উঠিয়া পড়িলাম। মাধবী একটা ঘটিতে একটি জল ও গামছা আমার সম্মুখে রাখিয়া বলিল, “যান, নীচের পাইখানা খালি আছে, পাশেই কল, স্নান কর্তেও পারেন।” আমার বিড়িটা সিগারেটটা খাওয়ার অভ্যাস ছিল, কাছে ম্যাচ ছিল না, রাত্রিতে একবারও ধূমপান করি নাই, সত্যই এই অপরিচিত বৃদ্ধা ও বালিকার সামনে বিড়ি ধরাইতে আমার কেমন লজ্জা করিতেছিল, সে বয়সে এমনি ব্যাকুক গােছের লােকই আমি ছিলাম। সকালে নেহাৎ কেমন কেমন বােধ হইতে লাগিল, বলিলাম, “দেশালাইটা একটু দাও ত? মাধবী দেশালাই দিয়া বলিল, “আপনি বিড়ি সিগারেট খান, কাল ত খান নাই।” আমি বিড়িটা ধরাইয়া পাইখানায় গেলাম। স্নান করিলাম না। আসিয়া দেখি, মাধবী বিছানাটা তুলিয়া, ঘরটা ঝাঢ় দিয়া সব গােছাইয়া সেই ঘরেরই পাশের ছােট মােয়াকটীর উপর ছােট একটা লােহার উনুনে কয়লা ধরাইবার উদ্যোগ করিতেছিল। আমি ঘরে ঢুকিয়া, ছাতাটা যেই ধরিয়া বাহির হইব ভাবিতেছি, এমন সময়ে মাধবী ঠাকুরমার কাছে গিয়া ষ্টই বলিল “কাল ত বাবুর খুব কষ্টেই গেছে, আজ সকালেই দুটা ভাতে তাত করে দিব ভাবছি, আমি উনুনে কয়লা দিয়েছি। কি বলল ঠাকুরমা ?” ঠাকুরমার কথার উত্তর দেবার আগেই আমি বলিলাম, “না না, সে কি? তা কি হয় ? !
नत्र ঠাকুরমা বলিলেন, “দোষ কি বাবা। কাল ত দুজনেই খাবার খেয়ে আছ, আজ সকালে দুটো আলু ভাতে ভাত দুজনেই খেয়ে নাও।” *এ অনুরােধ আমায় করবেন না মা।” আমার কথার ভঙ্গিমা দৃঢ়তা ব্যক সুতরাং বিলক্ষণ কঠোর সুরেই বাহির হইল। বালিকার মুখখানা যে কি আঘাত পাইয়াই নেহাৎ ব্যথা পাইবার মত অস্বাভাবিক গম্ভীর হইয়া পড়িল, যেন যে অবস্থায় লোকে বলে, “উঃ”, মাধবীর মুখে সেই অবস্থা ফুটিয়া উঠিল। আমি বাহির হইবার উপক্রম করিতেছি দেখিয়া মাধবী বলিল, “আপনার ব্যাপার খানা নিয়ে যান। আমরা গরীব, আমি দুটী ভাত আপনার পাতে দিতে পারলে খুব সুখী হতাম নিশ্চয়ই।” আমি বড় যেন আঘাত পাইলাম। সত্য কথা বলিলাম, “আটটায় আমায় ছেলে পড়াতে যেতে হবে।” “আটটায়সবে এই ছ'টা বাজে, আমি সাড়ে সাতটার আগে আলুভাতে ভাত আপনাকে দেবই।* মাধবী পাখা লইয়া, উনুনে জোরে হাওয়া দিতে লাগিল। আমি ছাতাটা হাতে করিয়া দাড়াইয়া রহিলাম। এত বড় সমস্যায় ত কখনও পড়ি নাই। পিছন ফিরিয়া মাধবী চাহিয়া দেখিয়া বলিল, “আপনি ভাবছেন, এত বড় গরীবদের যরে অতিথি হওয়াটা কেমন ? তা বেশ, আপনার কাছে ত পয়সা আছে, ঐ দোকানটা থেকে দু’পর কাঁচা মুগের ডাল, আর দু’পয়সার ঘি নিয়ে আসুন, আপনার পয়সায়ই আপনাকে বেঁধে খাওয়াব। আপনার ত তবে ভাবনার কথা আর রইল না।” মাধবী কথাগুলি এমন সহজভাবে বলিয়া গেল যে, তাতে যেন সহে সমীহের লেশ মাত্রও নাই। আমি দোকানে গিয়া সত্যই ভাল নষ্টের ২০ । ঘি আনিলাম, পথে একটা লেবুওয়ালা বসেছিল, তাহার নিকট হইতে এক পয়সায় দুটী লেবুও আনিলাম। ফিরিয়া আসিলে মাধবী বলিল, “আর তিন পয়সার দই যদি আনতেন। আমরা মাছ ঘরে আনতে পারি , এ হাড়িতে মার রান্না হয় কি না? মা বাবুদের বাড়ীতে ভাত আনেন, তাই আমি খাই।” আমি ফিরিয়া গিয়া পাঁচ পয়সা দিয়া আধপােয় দই আনিলাম। সাড়ে সাতটার আগেই ডাল, ভাত আলুভাতে রান্না হইল, মাধবী বৃদ্ধাকে গরমজল করিয়া দিল, তিনি গান করিয়া আহ্নিকে বসিলেন। আমি ভাত খাইতে বসিলাম। মাধবী বেশ রধিতে পারে। খাইতে বসিয়া একটু পরিচয় যাহা জানিলাম, মাধীর এই ঠাকুরমা ছাড়া আর কেহ নাই। এ বাড়ীর বাবুরা তাহাদিগকে দয়া করিয়া এই ঘরটা তাহাদিগকে থাকিতে দিয়াছেন। মাধবী পরিবেষণ করিতে গিয়া অর্ধেকটা দই তাহাকে দিয়া বলিল, সবটা দিলে হয় ত আপনি রেগে যাবেন, এই দেখুন আমাদের জন্য অর্ধেকটা রেখে দিয়েছি। আমার তখন আর একটা কথা মনে আসিল, বৃদ্ধাও ত এই ভাত খাইবেন, তাহা হইলে এক পােয় দই আনা উচিত ছিল। আধপােয়া দই তিন জনের কুলাইবে কেন? কথাটা মনে মনেই রাখিলাম। খাওয়া দাওয়া করিয়া, সুস্থ কিন্তু ভাবনা ব্যাকুল চিত্ত হইয়া বাহির হইয়া পড়িলাম। আসিবার সময়ে ব্যাপারখানা আনিতে, আমিও ভুলিয়া গেলাম, তাহারাও বােধ হয় ভুলিয়া গিয়াছিল।
পূর্বের মতই আমার দিন চলিতে লাগিল। এটর্নি বাবুর বাড়ীতে টিউশনি করিতে আবার গেলাম, গৃহিণী আমাকে নীচের ঘরে দরওয়ানের কাছে শুইবার যায়গা করিয়া দিতে চাহিয়াছিলেন, কিন্তু তাহার বড় ছেলেটা আমারই সম্মুখে বলিয়াছিলেন “আবার এই সব বাজে লােক জায়গা দিয়ে একটা কিছু গােল বাধাবে দেছি।” আমি গৃহিণীর দয়ায় ধন্যবাদ দিয়া, সেখানে আর থাকিলাম না । দু’দিন বাদলা ভাব থাকিয়া একবারে ফরসা হইয়া গিয়াছে, মাসের শেষ, বুঝি ফান পড়ে পড়ে। রাজসহরের শত কৃত্রিমতার কঠোরতা ঠেলিয়াও বসন্ত একটু সাড়া না দিয়া ছাড়িল না। এই দারুণ দুর্যোগের পর কলিকাতার অধিবাসীরা স্বচ্ছ সুন্দর অপরাহে পার্কের সবুজ পত্রের মধ্যেই তাহা অল্পবিস্তর অনুভব করিয়া লইল। আমিও সে দিন চারটার আগে বাহির হইয়া, সেন্ট জেমস্ পার্কের একটা আসনে বসিয়া ভগবানের আশীর্বাদ বসন্তের শােভা উপভােগ করিতেছি। সবে বাইশ বৎসর মাত্র বয়স আমার, ভােগের স্পৃহা কতই আমার। কত লালসা লইয়া দুই বেলা ছেলে পড়াইয়া রাত্রি জাগিয়া বি, এ পর্যন্ত পড়িয়াছি। এখনও বাঞ্ছিত ভােগের সন্ধান মিলে নাই। মানুষেরা বােধ হয় সকলের অপেক্ষা কামনার বস্তু প্রীতি, সহানুভূতি। এক মা ছাড়া দুনিয়ায় আমি কোথাও সহানুভূতি পাই নাই, মা মরিয়া গিয়াছেন এই চারি বৎসর, তাহার আগেও তিনি তিন বৎসর যাবৎ কঠিন রােগ যন্ত্রনায় ছটফট করিয়া কাটাইয়াছেন, এক মাত্র ছেলে আমি, নষ্টোর ২২ আমাকেও দুটা প্রাণ-ভরা নেহের কথা বলিতে পারেন নাই। মেহের আবাদ আমি ভুলিয়াই গিয়াছিলাম। জগতে কাহারও প্রতি মেই করিবার মত অবসর বাবার ছিলই না। বাবার দুরন্তপনায় কাকা বিরূপ, মামাদের কাছে টাকা চাহিয়া বাবা পান নাই, সেজন্য তিনি তাহাদের সঙ্গে বড় ঝগড়া করিয়াছিলেন, মামারাও সেজন্য বিরূপ। বৃদ্ধ নিঃসন্তানা পিসিমা ছিলেন, তাহার কিছু টাকা সঞ্চিত ছিল। সুদে বাড়াইয়া দিবেন লােভ দিয়া বাবা তাহা আত্মসাৎ করিয়াছিলেন, ফিরিয়া দিয়া যাইতে পারেন নাই। তাই পিসিমার কাছেও প্রাণ দেওয়া মেহের আখাস পাই না। কাজেই দীর্ঘ চারি বৎসর অনাবৃষ্টি জন্য মরুভূমির মত হৃদয়টা যখন সারা বিশ্বে তাপ কুড়াইয়া ও ছড়াইয়া চলিতেছিল, তখন হৃদয়হীন এটর্নির গৃহিণী আমাকে একটু স্নেহের পরশ লাগাইয়া দিলেন। তার পর সেই রাত্রেই মাধবীর ঠাকুরমার কাছে আঘাতের বিনিময়ে বড় মিষ্ট মার্জনার মধুরতা অনুভব করিলাম, পরে সেই অজানা অচেনা বালিকা আমার বড় মােলায়েম সেবা যত্ন দিয়া একবারে আচ্ছন্ন করিয়া দিয়াছিল। কথাগুলি খুব তাড়াতাড়ি ভুলিতে পারিলাম না। অারও বাড়াইয়া গােছাইয়া ভাবিতে লাগিলাম। ব্যাপারখানা সেখানে ফেলিয়া আসিয়াছিলাম, সে জীর্ণ ছিন্ন ব্যাপার খানিতে আমার প্রয়ােজনই ছিল না, আমি পরদিন একখানা নূতন কিনিয়া লইয়াছি। কিন্তু সেখানি যে, অতি পুরাতন, অব্যবহাৰ্য, তাল দেখিয়া মাধবীর মত প্রখর বুদ্ধিশালিনী মেয়ে কি ভাবিতেছে। তাহা- দিগকে দরিদ্র দেখিয়া ব্যাপারখানি আমি তাহাদিগকে দান করিয়া আসিয়াছি, আর এমন পুরাণ অব্যবহাৰ্য ব্যাপার যে, তাহা দেখিয়া মাধৰী নিশ্চয়ই আমাকে অনেক অবজ্ঞা করিবে। ইচ্ছা, তাহাদিগকে আর একবার দেখিয়া আসিল; কিন্তু গেলে ত তাহারা ব্যাপারখানি ফেরত নষ্টোর দিবে। ভাবিবে এ ছেড়া কাপড়খানা লইতে লােকটা আবার ফিরিয়া আসিয়াছে, আহা সে কত বড় লজ্জার কথা? মাধবী হয় ত বা নূতন রকম আর একটু যত্ন করিয়া বসিবে। তবে ইহাদের পরিচয়টা আমাকে একটু ভাল করিয়া নেওয়াই উচিত ছিল। রাস্তায় যাইতে বৃদ্ধার সঙ্গে দেখা হইলেও হইতে পারে। ভাবিতেছি, আর ছেলেরা স্কুল খেলিতেছে তাই দেখিতেছি, এখন সময়ে দেখি মাধবীই আমার দিকে ছুটিয়া আসিতেছে। আসিয়াই আমার কাছে দাঁড়াইয়া বলিল, “হঁা বাবু! আপনি কেমন ধারা লােক, আপনার র্যাপারখানি ফেলে এসেছেন, মা আমায় কত বকেছেন আমি দিতে ভুলে গেছি বলে।” আমি কিছু বিস্মিতই হইলাম, যেন কোনও দেবতার আবেশের মত এরা আমায় পাইয়া বসিয়াছে। আমি বলিলাম “আচ্ছা একদিন গিয়া নিয়া আসিব।” বালিকা স্পষ্ট স্বরেই বলিল, “একদিন কি, আজই চলুন। ও, আপনি আর একখানা নূতন কিনেছেন। আপনি না হয়, কিনতে পেরেছেন, কিন্তু আমাদের ঘরে ও ভাবে একখানা ফেলে রেখে আসলে আমাদের কেমন লাগে বলুন ত?” ওখান নেহাৎ পুরাণ, ছিড়ে গেছে।” “তাই আমাদের গরীব দেখে দিয়ে এসেছেন?” আমি অবাক হয়ে মাধবীর মুখের উপর তাকাইয়া রহিলাম। সে মুখে কোনওরূপ বিধা সঙ্কোচের চিহ্নও নাই; তাহার চুলগুলিকে বেণী বটিয়া দিয়াছে, পিঠের উপর কালো সাপের মত দুলিতেছে, কপালে একটা খয়েরের টিপ, কাণে দুটা হােট দুল, নাসিকায় কোনও অলঙ্কার নাই, কিন্তু সে কি একটা মুক্তার নােলক ছিল দেখিয়াছিলাম, ওর উপর তাহার দাগটা রহিয়াছে; পরণে একটা ছিটের বডিসের উপর মােটা নাটোর ২৫ কালােপেড়ে সাড়ী আজ স্পষ্ট দিবালােকে মুক্ত প্রান্তরে বসিয়া দেখিলাম, মাধবী দেহে একটু অষ্টপুষ্ট বটে, কিন্তু বয়স তাহার এগার ছাড়ায় নাই, মাধবী মেয়েটা অদ্বিতীয়া না হইলেও বড় সুন্দরী। মাধবী আবার বলিল, “চলুন, এই ত আমাদের বাড়ী, আপনি কি ভুলে গিয়েছেন? দাঁড়ান, আমি ওদের বলে আসি, আমি ঐ বাবুদের ছেলেদের সঙ্গে এসেছি কিনা? রােতই আসি।” মাধবীর সঙ্গে আবার চলিলাম। পথে যাইতে যাইতে একটা দোতাল বাড়ী দেখাইয়া বলিল, এইটে আমাদের বাড়ী ছিল, বিক্রী হয়ে গেছে।” এবার মাধবী তাহার ঠোট দুখানা একখানার উপর আর একখানা রাখিয়া কেমন একটা ভাব করিল। সে যাইতেছিল আগে আগে, তাহাদের বাড়ীর কাছে গিয়ে আমারদিকে ফিরিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, “আপনার ইচ্ছা যে, ব্যাপারখানা আমাদের দেন, না ?” কি জালা ! কি বলিব? আমি বলিলাম, “অমন ছেড়া জিনিষ কাউকে দিতে লজ্জা করে না?” “তা কি হবে? আপনার ত ওর বেশী আর ছিল না? আমরা ব্যাপারখানা ফিরিয়ে দিলে আপনার মনে কষ্ট হবে না? তা দেখুন, নেহাৎ যদি ওখান আপনার দেওয়ারই ইচ্ছা হয়ে থাকে, তবে মাকে বলবেন না কিন্তু, বলবেন, তুলে রেখে দাও, একদিন এসে নিয়ে যাব। বালিকার এ কথার অর্থ অনেক পরে বুঝিয়াছি। বৃদ্ধা ছিলেন বড় ঘরের মেয়ে, বড় ঘরের গৃহিণী, তাঁহার ছেলেটা কদাচারী হইয়া যেমন অল্প বয়সে মারা গিয়াছে, তেমনি বাড়ীঘর বিষয় সম্পদও সকলই নষ্ট করিয়া গিয়াছে। পুত্রবধূটী এই মাধবীর মা স্বামীর আগেই স্বর্গে গিয়াছিলেন। বৃদ্ধা পৌত্ৰীটাকে লইয়া, পরগৃহে পাচিকার কাৰ্য্য করিয়া দিন চালাইতেছেন, তবু কাহারও দান বা অনুগ্রহ চান না। যে বাড়ীতে - ন তাহারা থাকে, সে বাড়ীর কর্তা বৃদ্ধার স্বামীর পরিচিত, তিনি মা ও তাহার ঠাকুরমাকে ভাত কাপড় দিয়া প্রতিপালন করিতে চাহিয়াছিলেন, কিন্তু ঠাকুরমা তাহাতে রাজি হন নাই। বিশেষ তাহারা খাদ্য মানে না, তুলসি গঙ্গাজল মানে না, ঠাকুরদেবতার ধার ধারে না। ঠাকুরমা তাহাদের সঙ্গে এক ঘরে থাকিতে রাজিই নন। অগত্যা তাহাদের দেওয়া ঘরটাতে আছেন, নইলে উপায় কি? এ সব খবর কিছুদিন পরে মাধবীর কাছ থেকে আমি কুড়াইয়া গােছাইয়া লইয়া- ছিলাম। । মাধবীর সঙ্গে তাহাদের ঘরে ঢুকিলাম। মাধবীই ঠাকুরমাকে বলিল, “ঐ ত উনি এসেছেন, ওঁর ব্যাপার নিতে, সেদিন ভুলে গিয়ে ছিলেন। ওনি বলেন, কাপড়খানায় দুটো যায়গা ছিড়েগেছে, আমায় রিপু করে দিতে, তা দিয়ে দেব, কেমন মা ?” সে দিন কিন্তু কথাবার্তা বলিয়া, চলিয়া আসিলাম। আসিবার সময় মাধবী আমার কাণের কাছে আসিয়া ছােট করিয়া বলিল, “আপনার নাম বিজয়? না? আপনার কাপড়ে লেখা আছে দেখেছি। কে লিখেছে ? আপনি?” আমি তার সকল প্রশ্নগুলিতেই সম্মতি দিয়া বলিলাম “তুমি লেখাপড়া করে থাক ?” মাধবী বলিল, “আমি উপরের ছেলেদের সাথে বসে পড়ি, সাহিত্য পাঠ আর বাংলার ইতিহাস পড়ি, সে দিন স্কুলে সাহেব এসে দুইখানা বই আমায় প্রাইজ দিয়েছিলেন। কাল আসবেন, আমি দেখাব।” ইহাদের সঙ্গে এই উপলক্ষে একটু ঘনিষ্ঠতাই হইল। এদিকে আমার দিনগুলিও এখন বেশ সহজে মােলায়েম ভাবেই কাটিতেছিল। এটর্নির বাড়ীতে সেই হইতেই একটু আদর যত্নই পাইতেছি, নার সন্ধ্যাবেলায় গেলেই এক পেয়ালা চা, দুখানা বিস্কুট কোন দিন কচুরী মিহিদানা জলখাবার আসে। একদিন বিকে বলিলাম, এ সব কেন? ঝিটা আমার কাণের কাছে মুখ নিয়া বলিল, এ তােমায় সে দিনকার কড়া কথায় লাভ। জানত না বাবু,বাবু, আর যেখানে যাই হােক, গিন্নীর কাছে একবারে বেরাল ছানাটী। ছেলে বলেহে মার কাছে, এমন ভাল মাষ্টার গেলে আমি আর কারু কাছে পড়বে না গিন্নীও বাবুকে এসে বলেছেন, গরীব ব'লে ভদ্র লােকের সুখ দুঃখ বুঝবে না। তুমি মাষ্টার ছােরাকে অমন করে বলােনা কিন্তু। বুঝলে, শক্ত ভক্ত।” ছাত্র পড়িতে আসিল ঝি আর বলিতে পারল না। আমি কিন্তু ভাবিলাম, কে বলে সংসারে সহানুভূতি নাই? এই ত বিশ্ব সদয় হইয়া আমার প্রতি সহানুভূতি ঢালিয়া দিতেছে, নিতান্ত হীনবৃত্তি এই দাসীটাও ত আমার উপর কত সহানুভূতি দেখাইল, এটর্নি-গিন্নীতাসত্যই আমায় স্নেহ করিতে আরম্ভ করিয়াছেন। আর মাধবীর ঠাকুরমা আমাকে সত্যিকার ভালবাসা দিয়াই আদর করেন। সে দিন বাবুদের বাড়ীর সত্যনারায়ণের প্রসাদী সন্দেশটুকু পৰ্য্যন্ত আমার জন্য তুলে রেখেছিলেন। আমি কিন্তু এই কয়দিনে, আমার সমস্ত পরিচয়টা তাহাদিগকে দিয়া ফেলিয়াছি। দেবার ইচ্ছা আমার ছিল না, তবু দুষ্ট মাধবী মেয়েটা কেমন করিয়া কথার ছলে আমার সমস্ত পরিচয় বাহির করিয়া লইয়াছে। আমি এখন যখন যাই, মাধবীকে একটু একটু পড়াই, মাধবী বলে সে ইংরাজী শিখবে। আমিও তাহাকে ইংরাজী পড়াই। মাস দুই পরে সংসার আবার তিক্ত হইয়া উঠিল। রেলের সাহেবটা আমাকে চাকরী দিবে বলিয়া কথা দিয়াছিল, সময় উপস্থিত হইলে বলিল, না এবার হবে না পরে খালি হইলে দেখা যাবে। আসল নার কথা শুনিলাম, আর একটা লােকের কাছ থেকে আড়াই শত টাকা প্রণামী লইয়া চাকরীটা তাহাকে দিয়াছে। মনটার ভিতর যেন বিষ ছড়াইয়া দিল। ভাবিলাম সহরে চাকরী করা আর চলে না। যাই পল্লীগ্রামে গিয়া দেখি একটা স্কুলের মাষ্টারী পাওয়া যায় কিনা। কিন্তু সে চেষ্টা ত একবার করিয়া দেখিয়াছি, সেখানে পঞ্চাশ টাকা লিখিয়া পচিশ টাকা দশ কিস্তিতে তিন মাস অন্তর পাইতে হয়, আবার মেম্বর মহাশয়দিগের ছেলেদের স্কুলের বেতন না পাইয়া বরাত কাটিতে হয়, প্রয়ােজন হইলে সম্পাদক মহাশয় যাহাকে একঘরে করিতে চাহিবেন, তাহার বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া সাক্ষ্য দিয়া কৰ্ত্তার মনের মধ্যে থাকিতে হয়। মাধবীদের বাড়ীতেও আজ কয়দিন যাই না, সময় হয় না, কয়দিন ধরিয়া সাহেবের আফিসেই ঘুরিতেছি। এটনি সাহেব গ্রীয়ের অবকাশে আরাম করিতে সপরিপারে পাহাড়ে চলিয়া গিয়াছেন, গৃহিণী আমাকেও সঙ্গে লইতে চাহিয়াছিলেন, তাহার ছেলের পড়ার বাধা পড়িবে ভাবিয়া। আমি এই চাকরীর আশায় যাই নাই। পাজী ফিরিলি আমার কি সর্বনাশই করিল, এ দুটো মাস আমার বাসা খরচই যে চলিবে না। পরদিন দুপুরেই মাধবীদের বাড়ীতে গেলাম। ঠাকুরমা দেখিয়া লিলেন, “আহা বিজয় ! আজ কত দিন এসাে না কেন? আমি যে বার রধি, তার কাঠের গােয় একজন লােক নেবেন, তােমার কথা আমি বলেছি, তিনি তােমায় দেখতে চেয়েছেন। চল এই বিকালেই আমার সঙ্গে, লােকটা আমায় বেশ মান্য করে।” মাধবী বলিল, “এই চাকরী আপনার হবেই। হলে কিন্তু সত্যি- নারায়ণ পূজা দিতে হবে, দেবেন ত?”
নষ্টোর ২ আমি চাকুরীর চেষ্টায় ও অভাবে খুব মুস্কিলেই আছি, তাহা এই নেহাৎ পর দুটা জীব বিলক্ষণ বুঝিতে পারিয়াই, এতটা মন দিয়া ভাবিয়াছে, এই ভাবনাটা মনে জাগিয়া মনটাকে বেশ একটু বিষাইয়া দিয়াই গেল। মাধবীর কথায় কোন উত্তরই দিলাম না, মাধবী আবার বলিল, “আপনি দেবতা মানেন না বুঝি? পূজো মানেন না?” “মানি বই কি?” মাধবী আবার বলিল, “চাকরী আপনার হবেই। আমি সেদিন তুলসীর পাতায় লিখে পরীক্ষা করে দেখেছি। একটা লিখলাম, হ্যা, আর একটায় না, ছােট খুকীকে বল্লাম, নেত একটা পাতা; ধুকিটা হ-টাই তুলে নিলে।” আমি হাসিলাম মাত্র, যা হােক পড়ে পাওয়া স্বজন এই মেয়েটা তবু আমার জন্য এতটা ভাবে। ঠাকুরমার সঙ্গে বাবুর বাড়ীতে গেলাম। বাবু একটা সাহেব কোম্পানির কাছে আমায় একটা চিঠি লিখিতে বলিলেন। তাহাতেই আমার পরীক্ষায় পাশ হইল। মাসে ৪০ টাকা বেতনে বাবু আমায় নিয়ােগ করিলেন, অধিকন্তু কারখানায়ই খাওয়া মিলিবে। আসল কথা ঠাকুরমার সুপারিশের খুবই জোর ছিল, তারপর বাবুরও বড় প্রয়ােজন। তাহাদের ছেলে পুলে নাই, টাকা অনেক, ধরিয়াছেন কাশীবাসিনী হইবেন। বাবুও অবশেষে তেমনি মত করিয়াছেন। একজন লােকের উপর কারবারের ভারটা দিয়া যাইতে পারিলেই নিষ্কৃতি। বাবুর আর একটা বিশ্বাস, পুরাতন লােক চোর হয়, নূতন পােক শ চুরি করিতে বােবে না। তাই আমাকেই নিয়াের্গ করিলেন। আমি দেখিলাম মাধবীর সত্যনারায়ণ নেহাৎ একেবারে মিথ্যা নয়। গৃহিণী নষ্টোন্ধার চাকরী হইল বটে, আমার বাবু সস্ত্রীক কাশীধাম যাইবেন, কিন্তু ঠাকুরমার যে চাকরী উঠিয়া গেল। তখন ইহাদের সঙ্গে আমার বেশ ঘনিষ্ঠতা হইয়াছে, ঠাকুরমাকে স্পষ্টতই বলিলাম, “ঠাকুরমা ! আপনাদের দুটীর খেতে আর কতই বা লাগবে, বড় বেশী লাগেত ১২ টাকা, একভাবে চলেই যাবে। আপনি আর এ বয়সে পরের বাড়ী রাধতে যাবেন না?” শুনিয়া বৃদ্ধা যেন অগ্নি অবতার হইয়া উঠিলেন। “যতদিন গতর আছে, খেটেই খাবাে, পরের কাছে ভিক্ষে মাগবে? সেদিন তােমার খাবারটা মাধবীকে খেতে দিয়েছিলাম বলে বুঝি, তােমার এত স্পর্ধ? তুমি ছেলে মানুষ একটা সৎকাজ কর্তে যাচ্ছ, তাই বাধা দেই নাই, ওকথা কিন্তু আর কখনও বলল না।” বৃদ্ধা সে রাগের মাথায়ই একটা পুরান বাক্স খুলিয়া একখানা ডাক ঘরের পাশ বই বাহির করিয়া আমাকে দেখাইলেন। বলিলেন, “দেখত কত আছে?” মাধবীকে বলিসনি কিন্তু খুলিয়া দেখিলাম দু’হাজার একশ বায়ান্ন টাকারও কিছু উপরে। ইহাদিগকে আমি গরীব বলিয়া অবজ্ঞা করিতেছিলাম। মনে বড় অনুতাপ আসিল বৃদ্ধ বলিলেন, “করি কি? মেয়েটা যদি বাঁচে, আজ কালত শালারা টাকা নইলে মেয়ে নিতে চায় না। একি আজকার টাকা? আমার শশুর আমায় দিয়েছিলেন। মিনসে কতবার নিতে চেয়েছিল, পারে নি। ছেলে জান্তই না, তবে তার ব্যায়ামের সময় শ পাঁচেক তুলে ডাক্তার খরচ করেছিলাম, সে রােগ কি টাকায় সারে ?” মাধবী বলিল, এতদিন আমায়ও বলনি মা ?” “তা নাই বা বলেছি, এখন এই বই নাও তুলে রাখে। তােমায় বর আসার আগেই যদি আমি মরি, তখন এদিয়ে একটা বর কিনে নিও।”
নভোর মাধবীটা হাসিয়াই বলিল, “তােমার শ্রদ্ধে যে অনেক টাকা লেগে যাবে।” আমার ইচ্ছা করিতেছিল বলিয়া ফেলি, মাধবীর বিবাহটা এখনই দিয়া যান না কেন? কিন্তু কি যেন ভাবিয়া কথাটা আমার বলা হইল । তবে শেষ কালে খুব শক্তভাবেই বলিলাম, “ঠাকুরমা তােমার পায়ে পড়ি, তুমি আর কাৰু বাড়ী রাধতে যেতে পাবে না, যদি যাও, আমার মরামুখ দেখ। ও টাকার দুই চার পাচশ কমে গেলেও মাধবীর বিয়ে আটকাবে না বলছি।” মাধবীও বলিল, “অর্থাৎ যা আটকায় আপনি আছেন।” বলিয়াই দুষ্ট মেয়েটা খিল খিল করিয়া হাসিয়া উঠিল। আমি ভাবিলাম, মেয়েটা নেহাৎ বেহায়া বক’টে হয়ে গেছে। ( 3 ) ভাল চাকরীই আমার হইল, আমি হইলাম এখন গােলার কর্তা। ১•১২ দিন মধ্যে কাজ কর্ম বেশ বুঝিয়াই লইলাম। আমার কাজ কর্ম দেখিয়া কর্তা খুব খুসিই হইলেন, তিনি গঙ্গাস্নান আর গীতাপাঠেই বিভাের হইয়া থাকেন, কাজ আমিই দেখি। আগামী বৈশাখে হাল তার পরেই কর্তা সীক তীর্থ যাত্রা করিবেন স্থির হইয়াছে। এখন মাধবীদের বাড়ীতে প্রায়ই যাইতে পারি না, সময় পাই না। সকাল হইতে রাত্রি ১০টা পর্যন্ত গােলার কাজ, তারপর রাত্রিতে গৃহের নয়ার বাহির হইলে গােলায় লােকজন ভাল মনে করিবে না, পুরান দুইজন সরকার আছেন তাহারা অাবার পদের বিদ্বেষ করেন। তবে রবিবার দুপুর বেলাটায় একবার যেরূপে হােক, সময় করিয়া মাধবীকে দেখিয়া আসি। রবিবার না হইলে এ সময়ে মাধবীর সঙ্গে দেখা হয় না, অঙ্ক দিনে সে স্কুলে যায়। এই কারবারের মধ্যে ঢুকিয়া আমার মনে আর একটা ভাব জাগিয়াছে। এমন ৪৫০ টাকা মাইনের পরের তাবেদারী করিলে ভবিষ্যতে কিবা উন্নতি হইতে পারে ? স্বাধীনভাবে একটা কোনও ব্যবসার আমায় খুলিতেই হইবে, টাকার অভাব ত হইবে না। মাধবীর ঠাকুরমার পাশ বহিতে দু’হাজার টাকা, বুড়ী বলে হাজার খানেক টাকা দিয়া মাধবীর গয়না গড়াইবে। অলঙ্কার গড়াইয়া টাকা নষ্ট করা কিছুতেই কর্তব্য নয়। মাধবীর বিয়ে হইবে মাত্র শাখা সাড়ি দিয়ে বাজে খরচ আবার কি? একদিন দেখিলাম, মাধবী গলায় একগাছা কড়িহার পরিয়াছে। বড় সুন্দর মানাইয়াছে, হার গাছটা মাধবীর গলে, সে দিন আমাকে বুঝিতেই হইল, অলঙ্কারের প্রয়ােজনীয়তা আছে; নইলে জুয়েলার সপগুলি এত শীঘ্র বাড়িয়া উঠে কিরূপে? একটা জুয়েলারের দোকান খুলিতে পারিলে সবার চেয়ে ভাল হয়। বড় ভদ্র ব্যবসায়, অল্প যায়গা লাগে, কাঠ ঠেলাঠেলি লােহা লক্কড় ঘাটাঘাটি কিছুই করিতে হয় না। বাইস তেইশ বছরের মন, পলকে হাজার কল্পনা জাগে। কল্পনাকে চাপা দিয়া বলিলাম, “মাধবী ত সুন্দর হারগাছটা গলায় পরেছ দেখছি, ঠাকুরমা ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলতে আরম্ভ করেন বুঝি।” মাধবী বলিল, “হ্যা, সেই টাকা? সে টাকা বুড়ীর বুকের হাড়। এ হার ত আমার মায়ের ছিল।”
নষ্টোর ৩ ঠাকুরমা বলিলেন, “ঐ হারগাছটা আমি অনেক কষ্টে রেখে দিয়েছিলুম। সকলে পরে তাই আজ বার করে দিয়েছি, ওর পরুতে সাধ আহলাদ হয় বইকি?” এ রকম এক গাছ হার গড়তে কত লাগে ঠাকুরমা ?” “আজকাল সােণার দাম কমেছে শ'তিতে টাকা হলে বােধ “আচ্ছা এ গাছ বিক্রয় কল্লে এখন কত হতে পারে?” “তা আর কত? এই বড় জোর দেড়’শ টাকা।” “আর দেড় শ টাকা তবে শ্যারার লাভ? মানুষগুলি কি বােকা? মাধবী বলিল, “ঠিক কথা। আমি কিন্তু ভাবি, এই সহরের বড় লােকগুলি যদি এমন নাকাটা বড় বড় বাড়ী আটকে না রেখে, আর দশজনকে থাকতে দিত, তা হলে এতগুনাে বাড়ী না হয়ে আরও অনেক যায়গা খালি থাকতত, সহরের লােক একটু নিশ্বাস ছেড়ে বাঁচত? কি বলেন মাষ্টার মশাই সত্যি না ?” মাধবীকে এখন একটু একটু পড়িয়ে দেই, তাই সে আমায় মাষ্টার মশাই বলে ডাকে। সে দিন উপরের বাবুদের মাষ্টার মহাশয়ের কাছে সে পড়া জিজ্ঞাসা করিতে গিয়াছিল, মাষ্টার মহাশয় সময় নাই বলিয়া ধমকদিয়া চলিয়া গিয়াছিলেন। তাহাতে মাধবী বুঝিয়াছিল, ছেলেবেলায় একজন মাষ্টার মহাশয় না থাকা বড় দুরদৃষ্টের কথা, আমাকে মাষ্টার ডাকিয়া সে দুঃখ তাহার গিয়াছে। মাধবীর আগেকার ঐ কথাটা শুনিয়া আমি বলিলাম, “মেয়েটা একবারে ইচড়ে পেকে উঠেছে।” মাধবী তাহাতে একটুও অপ্রতিভ হইল না, তাহার কালাে রেখাটার মতন দুটী গনিয়া, কালাে দুটা চক্ষের তারা একটু আড়তাৰে নায় ভাইয়া তুলিয়া বলিল, “আমি যে বার বছরে পড়েছি, এখন কি আমি ছোট খুকীটা আছি ?” হাসিয়া পারিলাম না। বলিলাম, “তবেত তােমার বিয়ের । . এসে পড়েছে।” “তা বই কি? মা ত কেবল সেই কথাই ভাবে। বুড়ীটা এমনই গল। বিয়ে হলে ত আমায় বরে নিয়ে যাবে, তখন মা একলাল পড়ে কাদবে না? আপনার দুঃখ আপনি টেনে আনে।” “যাঃ—এমন পাগলা মেয়ের আবার বিয়ে ?” “আমিও ত তাই বলি, মা বলে হাজার টাকা বরকে দিয়ে ভুলিয়ে বে, বুড়ীটার এমনও বুদ্ধি।” ঠাকুরমা সে দিন বলিলেন, “দেখ বিজয়, এই মাধবীর ভারটা নামাতে ল্লেত আমি কাশী চলে যেতুম, এই ত ও বাড়ীর কর্তা গিন্নী চলে চ্ছেন; এত ঐশ্বৰ্য্য, সব ছেড়ে কেড়ে চলে যাচ্ছেন। আমার এ কি য়া বলদিনি?” ঠাকুরমাকে বলিলাম, “ব্যস্ত কি ঠাকুরমা? বিয়ে দিলেইত এখনই খখী গিয়ে ঘর কর্ডে পেরে উঠবে না, আপনাকে আরও দুটো বছর ত কে আগলে রাখতেই হবে।” “শাশুড়ী ননদ থাকা ঘরে দিতে পালে হতাে ভাল বটে, তা এমন r৩ না থাকা মেয়ে কেউ ছেলের বউ কর্তে চায় না। যার যেমন তি, তেমনি এনে মিলায় বিধি আর কি?” ১৯০৯ সালের সেই নিমতলার কাল অগ্নিকাণ্ডের কথা বােধ হয় চলের মনে আছে। একদিনেই এত বড় দড়ামাহাটা বাজারটা ছাই য়া গেল। আমি জীবন মরণ তুচ্ছ করিয়া মুনিবের কাগজ পত্ৰ টাকা ও যা কিছু বাঁচাইতে পারিলাম বটে, কিন্তু সন্মুখের উপর লক্ষ লক্ষ নার টাকা ভন্ম হইতে দেখিয়া হতাশ হইয়া পড়িলাম। আমার একটা পাশ আগুনে ঝলসিয়া গিয়াছিল, সকলেই বলিল, আর একটু হইলেই আমার বাঁচিবার আশা ছিল না, অমন অলত সিড়ির উপর দিয়া দুই দুইবার ওঠা নামা কি দুঃসাহসেরই কাজ । গােলার মালিক আসিয়া দেখিয়া বলিলেন, “বেশ হয়েছে। আমার পক্ষে এটা ভগবান অগ্নি দেবের পরম দয়া বলতে হবে।” দমকল ওয়ালারা তখনও আগুন নিবাইতেছিল, কিন্তু আমাদের কর্তা সেদিকে কিছুমাত্র মন না দিয়া উচ্চৈঃস্বরে গীতার বিশ্বরূপ স্তোত্র পাঠ করিতে লাগিলেন। তাহার ভাব দেখিয়া লােকে ত অবাক! পরদিনই তিনি সপরিবারে কাশী না বৃন্দাবন কোথায় যাত্রা করিলেন। কিছু বলিয়াও গেলেন না। আমি ত ভাবিলাম, একি বিপদ! যাহােক, গােলায়ত দু-তিন হাজার টাকা নগদ তহবিল ছিল, সেটা নিয়ে যেতেও তিনি পানে। গােলার যাহারা মহাজন ছিল, তাহারা আসিয়া আমায় ধরিল। আমি বলিলাম, গােলার বিলাতবাকি বিস্তর আছে, ব্যবসা চালাইতে পারিলে খদ্দেরের কাছে টাকা আদায় হইতে পারে বটে, মহাজনের ঘরও শােধ হইলে হইতে পারে। কিন্তু মালেক ছাড়িয়া গেলেন, এখন আর কি করা যাইবে। মাড়ওয়ারি মহাজন, সহজে টাকা ডুবিতে দেয় না। তাহারা বলিল, তুমি গােল চালাও, আমরা মাল সরবরাহ করিব। শতকরা কুড়ি টা বাটা ছাড়িয়া আমরা বাকি টাকা লইতে রাজি আছি। এ ব্যবস্থা আমারই মনঃপূত। তাহাই করিলাম। বি, কে, সিংহ না দিয়া গােলার নূতন নামকরণ করিল, সেই তাপ বাড়িয়া নুতন জীবনে নূতন ব্যাথা বার বার করিলাম।
নটা দুনিয়ার সকল কাজ ত্যাগ করিয়া, ব্যবসায় মন দিলাম। মাধবীদের ওখানে ছ'মাসের মধ্যে দু’দিন মাত্র যাইতে পারিয়াছি, তাও দুদ বসিতে পারি নাই। তবে তাহাদের অবলম্বনেই আজ এই এত বা একটা কাঠের গােলার আমি মালিক, তাহা ভুলিয়া যাই নাই। ঠাকুরমাকে স্পষ্টই বলিয়া আসিয়াছি, আমার সময় নাই যে আসা যাওয়া করি, তবে এটা জাবেন, আপনার কৃপায় আমার এই উন্নতি, তা আমি ভুলে যাই নাই। ঠাকুরমা এখন আর আমার দেওয়া খরচের টাকা লইতে অস্বীকার করেন না। কয়বার নিজে যাইতে না পারিয়া দৰােয়ান দিয়া টাকা পাঠাইয়াছি। প্রত্যহ ব্যবসায়ে পঞ্চাশ ষাট টাকা লাভ হাতে আসিতে লাগিল। ঝড়ের মত হু হু করিয়া শত রকমের আশা আসি মনের মধ্যে বাসা করিতে লাগিল। ভবানীপুরের দিকে পাঁচ কাঠা জমি ইহারই মধ্যে কিনিয়া বসিলাম। ব্যবসায়ে ঢুকিয়া দেখিলাম, মাড়ােয়ারি মহাজনেরা অনেকই লাভ করে। সরাসরি রেঙ্গুন হইতে মাল আনার বন্দোবস্ত করিতে পারিলে লাভ অনেক বেশীই হইতে পারে। সার করিলাম রেঙ্গুন এবার গিয়া দেখিয়া আসিতেই হইবে। সল্প মাত্রই আমার প্রতিজ্ঞ। দিনও স্থির করিলাম। হঠাৎ দমােয়ান আসিয়া টাকা দশটী ফেরত দিয়া একখানা চিঠি হতে দিল। মাধবী টাকা ফিরাইয়া দিয়াছে, আরও লিখিত, আপনি গুরূপ ভাবে আর টাকা পাঠাইবেন না। আপনার টাকা আমাদের নেওয়া আর উচিত নয়। টাকার লােক হইয়াছেন বলি, টাকা নাই যাহাজের, তাহারে ওরূপ অবজ্ঞা করিতে নাই। ঠাকুরমার ইশরীর খারাপ।
নাটোর পখানা পড়িয়া বড় লজ্জা বোধ হইল। তাইত, আজ আট দশ মাসের মধ্যে একবার দেখিয়া আসিতেও সময় পাই না। মাধবী বড় রাগ করিয়াছে, যাহাই হউক মাধবীকে সংসার সঙ্গিনী করিতে পারিলেই আমার আশা পূর্ণ হয়। রেঙ্গুন হইতে আসিয়াই পিসিমাকে এখানে আনিয়া শুভকাজ সম্পন্ন করিতে হইবে। কথাটা এবার মাধবীদিগকে স্পষ্টই বলিয়া আসিব। ঠিক দুপুর বেলায়ই আহারাদির পর একটু বিশ্রাম না করিয়াই একখানা ট্যাক্সি ভাকিয়া মাধবীর বাড়ীতে উপস্থিত হইলাম। দ্বারে ঘা দিতেই মাধবী দ্বার খুলিয়া পার্যে সরিয়া মাটী নােয়াইয়া দাঁড়াইল। আমি বিস্মিত হইলাম, একি? আমাকে দেখিলে মাধবীর মুখখানা যে হাসিতে একবারে ভাসিয়া উঠে, চকের তারা দুটা যেন আনন্দে নাচিতে থাকে। আজ এ কি নূতন দেখিলাম ! মাকে যে গােটা একটা বছর কাটিয়া গিয়াছে, তাহাত গণিয়া দেখিতেছি না। বলিলাম, “কেমন আছ মাধবী।” “ভাল আছি, ঠাকুরমাকে উপর থেকে ডেকে নিয়ে আসি, হােট করিয়া এই ছােট কথাটা বলিয়া মাধবী পিছনের দরজা খুলিয়া চলিয়া গেল। কত আস্তে আস্তে পা ফেলিয়া, পিঠের আঁচলটা কত সাবধানে টানিয়া গােছাইয়া সেই উচ্ছল অবাধমুখী পাগলী মেয়ে মাধবী কত শিষ্টের মত বাহির হইয়া গেল। আজ দেখিলাম, আহা যৌবন বসন্তের সরস পরশে মাধবীর দেহলতিকাৰ কিবা সুষমার ভাতি ফুটিয়া উঠিয়াছে। আর খুলিয়া যাইতে, সে একবার ঈষৎ ঘাড় বাঁকাইয়া, গহিয়া গিয়াছিল, আমি বসিলাম কি দাড়াইয়া রহিয়াছি, তাই বুঝি দেখিয়া গেল। বসিয়া পড়িয়াছিলাম, দেখিলাম তাহার ওষ্ঠের উপর নাসিকার কোণে মুকাবি যত ফুটিয়াছে, ফিরিয়া চাওয়াটা যেন * দোষের বিয়া সেল সেটা মাটীর সঙ্গে মিশাইয়া দিয়া নজের কত সাবধানেই লুকাইয়া লইল। যতক্ষণ একাকী বসিলাম, ততক্ষণ বিলাম, আরে মাধবী। আর কতদিন সে বাল্য বয়সের দর্গ করা তােমার চলে ? ঠাকুরমার সঙ্গে মাধবীও ফিরিয়া আসিল। দেখিলাম, বৃদ্ধার শরীর বড় কৃশ হইয়াছে। বলিলাম, “ঠাকুরমার কি কোনও অসুখ করেছে? ঠাকুরমা বলিলেন, “সন্তের বছরের বুড়ীর আবার অসুখ কিরে ভাই, যমের তাড়না, আর কি?” “যাই বলাে ঠাকুরমা, মরবার সময় তােমার এখনও হয় নাই। মাধবী তার বরের সঙ্গে ঝগড়া করে, ঘরের কোণে পড়ে থাকবে, থােকা-খুকী তার কেঁদে গড়াবে, তুমি না হলে কে তার সংসার আগলাবে ঠাকুরমা।” আমার এমন কাচা কথায়ও ঠাকুরমা যেন বড় খুসী হইলেন না। তিনি বলিলেন, “হাঁ, বিজয়, তুমি নাকি যায়গা রেখেছ, বাড়ী করূবে।” “যায়গা রেখেছি ঠাকুরমা, ভবানীপুরে গঙ্গার ধারেই, হােট একখানি বাড়ী করবাে ভাবছি, তা কারবারটা আর একটু দারস্ত না করে পাচ্ছি না” ঠাকুরমা আমার কাছে ঘেসিয়া বসিলেন, তারপর বেশ একটু গভীর হইয়াই বলিলেন, “দেখ বিজয়, আর ত দেরী করা চলে না। তাের মাধবীকে তুমি নাও, আমি স্বচ্ছন্দে যাত্রা করি। আমার কিন্তু আর বেশ সময় নাই।” আমিও বলিলাম, “আর দুটা মাস অপেক্ষা কর্তে হবে, সামনে ত চৈত্র মাস, বৈশাখ মাসটা আসতে দাও। আমি কিছুদিনের জন্য মেনে যাচ্ছি। মাড়ােয়ারি মহানের সঙ্গে কারবার করে ততটা লাভ হয় না, রেজুনে গিয়ে একটা সাহেব কোম্পানির কাছে বন্দোবস্ত করে যান আবার চেষ্টা করবে। আপনার আগেই আমার সব, महोपात्र । করুন, এ যদি পারি তবে কারবারে আমার বছরে পঞ্চাশ হাজার লাভ হবে।” মাধবী লজ্জানতমুখী হইয়া পাশে দাঁড়াইয়াছিল, সে তার সে বেশীক্ষণ রক্ষা করিতে পারিল না, এখনও পাকাপাকি অভ্যাস হয় নাই। সে সহজ দৃষ্টিতে চাহিয়াই বলিল “একবারে পঞ্চাশ হাজার? এত টাকায় কি হবে। আমি খুবই হাসিলাম, বলিলাম, “ঝাপি কিনে টাকাকড়ি রাখবাে, তার পর সেই টাকা দিয়ে দাসী নফর রাখব, আর কি ? মাধবী সে ব্যাঙ্গ যেন কিছু মাত্রও অনুভব না করিয়া বলিল, “অত টাকার নেশা ভাল না।” মাধবীর কথায় উত্তর দেওয়া নিয়ােন মনে করিলাম।' ঠাকুর- মাকে বলিলাম, “দেখ, ঠাকুরমা, টাকা না হলে আজকাল সুখ স্বস্তি মান মৰ্য্যাদা মােটই হয় না। টাকার অভাবে কত কষ্ট পেয়েছি জান ত, টাকা আমাকে কর্তেই হবে। আমি ত ভাবছি, বাড়ীটা করে নি, তার পর পিসিমাকে নিয়ে আসি। দেশ থেকে দুপচজন, আত্মীয় স্বজন-আর ত বেশী কেহ নাই-মামা মামীরা আছেন, কাকা- মহাশয়ের মেয়েরা আছেন, তারা ত জাত-ছাড়া ব্রাহ্ম, তাদের ত আনা হবে না, যাহােক দশনে মিলে মিশে কাজটা হলে, তােমার দেখে একটু শান্তি হােক।” ঠাকুরমা একটু ভাবিলেন, তাহার মুখখানা যেন মেঘাচ্ছন্ন আকাশের মত বিল হইয়া উঠিল। তিনি বড় বিষাদেই বলিলেন, “এ কাজ হবে না বিজয় ; তুমি আর আমায় সুর আল ভুলিও না। যার কারবারে লাভ পঞ্চাশ হাজার, কলিকাতা শহরে বাড়ী, একটা পথে পড়া বুড়ীর লাতিনী সে ধরে যেতে পারে না। যাক আমি অন্ত চো দেখবাে।”
নটো আমি এবার সুর করিয়াই হাসিলাম। “ঠাকুরমার মনে কত বড় অবিশ্বাস দেখ। তবে দাওনা তুমি আমাদের হাতে হাত জুড়ে, এ কাজে পুরােত সামাজিকের আবশ্যক হবে না, তােমারই আশীর্বাদে এতে মঙ্গল ঝরে পড়বে। যদি রেঙ্গুনে যাবার সময় ঠিক করে বতাম, তা হলে এই ফাত্তনেই যা হয় একটা হয়ে যেত।” ঠাকুরমা একটু প্রফুল্ল হইলেন। মাধবী আবার লজ্জাসঙ্কুচিত বধূটীয় মত, আঁচল টানিয়া মচক্ষুর অর্ধেকটা পৰ্যন্ত ঢাকিয়া, আস্তে আস্তে সেখান হইতে চলিয়া গেল। ঠাকুমা একটু বসিয়া থাকিয়া, বলিলেন, “শুয়ে থাক একটু এখানে, এত দুপুরে বেরিও না কিন্তু। আমি উপরে যাচ্ছি, গিন্নীর নাতির অন্নপ্রাশন, আমাকে ডেকেছিলেন জিনিষ পত্রের একটা ফর্দ কৰ্ত্তে।” আমার বিলম্ব করার ইচ্ছা ছিল না, তবু একটু গড়াইয়া এত বড় প্রখর মধ্যাহ্নটাকে একটু গড়াইয়া দিবার চেষ্টাই করিতে লাগিলাম। বুঝি ঘণ্টা খানেক সময় কাটিয়া গেল, বড় লম্বা বােধ হইতেছিল, আজ দু’টা বৎসরের মধ্যে এত সময় বৃথা কাটাইয়াছি বলিয়া ত বােধ হয় না। ইহার কেহ না আসিলেই বা যাই কি করিয়া ? মাধবীকে আর একটু দেখিতে বড় ইচ্ছা করিতেছে। সত্য কথাই বলিব, আজ যেন সেই প্রেমের বিধাতা অনঠাকুরটা আমার চব্বিশ বছরের দেহমনটাকে বেশ একটু নাড়া দিয়া গিয়াছেন। কিশােরীর অপাঙ্গদৃষ্টির সূত্র পাইলে এ দেবতাটীর শরসন্ধানে বিলম্বই হয় না। শুইয়া শুইয়া মাগই হইতেছিল, এতক্ষণের মধ্যে মাধবী কি একবার আসিয়া দেখিয়া যাইতে পারে না। বারে কপাট খােলার শব্দ হইল, কপাটধরা মাধবীর বালাপ হাতখানি দেখিয়া বলিলাম, “বেশ, আমি যেন কয়েদী।”
नहोलाब মাধবী ঐখানে দাড়াইয়া বলিল, “তাই অস্বস্তিতে ঘুম আসছে না।” “ঘুম একটু যেন এসেছিল।” “মিথ্যে কথা, একটুও না, আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি না?” “ড়িয়ে আছ ? আর আমি এই গরমে ছটফট কচ্ছি?” “তাও দেখছি, কিন্তু আপনার দেহের শীত গ্রীষ্ম ভেবে দেখবার আমার কি অধিকার আছে?” “বটে? আজ এমন স্বত্বের বিচার? সেই যে প্রথম দিন আমাকে অত ব্যস্ত হয়ে রেধে খাওয়াইবার কি অধিকার তােমার ছিল?” তখন আমার এগার বছর বয়স ছিল, এখন চৌদ্দ বছরে পা দিয়েছি না? আমি হাসিলাম, হাসিটা শব্দে ছুটিয়াই বাহির হইল। মাধবী ঘরে ঢুকিয়াই বলিল, “ছি ছি, করেন কি, এমন চেচিয়ে হাসছেন? আমি উঠিয়া বসিলাম, মাধবী জল দিল, মুখ ধুইলাম, গামছা খুজিয়া সে পাইল না, বলিল, “আপনার পকেটে রুমাল আছে না? গামছাখানা ত পাচ্ছি না।” আমি মাধবীর আঁচলটা টানিয়া মুখ মুছিলাম। মাধবী দাতে অধরে শক্ত করিয়া মিশাইয়া দাঁড়াইল। অতঃপর বলিলাম, “এখন যাই, অনেক দেরী হয়ে গেছে। মাধবী বলিল, “ঠাকুমা খাবার জানিয়ে রেখেছেন, খাবেন না?” সে একখানা থালায় কিছু মিষ্টান্ন সাজাইয়া আমার সম্মুখে ধরিল। আমি বলিলাম, “এ কি? এত খাবার এ সময়ে খেতে আছে। না, ওপৰ না।” “না খেলে বুটা দুঃখিত হবে না?
নাডার “আচ্ছা, দাও, কিছু খাই, এ সকল বাজারের খাবার না খাওয়াই ভাল।” *এ কথাটা দোকানদারের মুখে ভাল হয় না। খাবারের দোকানদারও খদ্দের চায়, কাঠের দোকানদারও খদ্দের চায়। তবে কেউ পঞ্চাশ হাজার, কেউ বা পাঁচ কুড়িতেই খুসী।” মাধবী আবার বালিকার মত হাসিয়া ফেলিল। “আর তােদের কাছে সত্যিকথা বলা হবে না, শেষে অত ঠাট্টা তামসা শুতে যাব কেন?” “সত্যি, আপনি টাকাই এত ভালবাসেন এ কথাটা না বলাই ভাল ছিল। রাস্তার কাউকে ভালবেসে এসে, ঘরে কি তা বলতে আছে। কুরুক্ষেত্র বাধে না ? “আরে, তুই কি তবে আমার ঘর?” মাধবীর মুখখানা একবারে লজ্জায় লাল হইয়া উঠিল। সে যেন মুখ- না কোনও উপায়ে ঢাকিতে না পারিয়া আমার পাশেই চৌকির পর উপুড় হইয়া পড়িয়া মুখখানা ষােল আনাই ঢাকিয়া ফেলিল। হার আল থালু চিকণ কালাে চুলগুলি অসংখ্য সপশিশুর মতন ঢাইয়া পড়িয়া তাহার সমস্ত পৃষ্ঠ স্কন্ধ বাহুরও অর্ধাংশ ঢাকিয়া ফেলিয়া- ল, সেই কৃষ্ণকেশের অন্তরাল হইতে ক্ষুদ্র কর্ণভূষার শ্বেতপ্রস্তরটুকু, চ্যাতি ফুটিয়া বাহির হইতেছিল। মুক্তগবাক্ষ দিয়া ফানের বাতাস লক্ষণ জেরে বহিয়াই তাহার পরিধানের সাড়িখানির যে অংশ সে পিয়া ধরিতে পারে নাই, তাহা কাপাইয়া দিল। আমি যে তখন মাংস দিয়া কুবেরের পূজায় নিযুক্ত ছিলাম, তথাপি আজ কি Tটা অদম্য শক্তি মনােমধ্যে হইতে উঠিয়া আমাকে একবারে স করিয়া তুলিল। আমি বাইবেষ্টনে নত মুখখানি ধরিয়া তুলিয়া নতার ২ বিচ এ পটীয় মত তাহার প্রাণ লইতে যাইতেছিলাম, তখনই মাধবী নিতান্ত ভয়ার্ত হরিনীর মত ক্ষিপ্রপদে সরি ভাইয়া, গ্রীবাটী বক্ত অথচ মুখখানা উন্নত করিয়া, চকুতার যত বড় সম্ভব প্রসারিত করিয়া, অনুচ্চ অথচ স্পষ্টস্বরে বলিল, “বেয়াদব।” আমি কেবল চাহিয়াই রহিলাম, এমন সুন্দর তলার দেখি নাই। ঠাকুরমা আসিলেন, জলযােগ করিয়া উঠিয়া পড়িলাম। ইহার পরের কতকটা কাহিনী আর একজন বলিবেন। বক্তা-সতীশ চন্দ্র। এ কাহিনীর কতকাংশ বলিবার ভার আমার উপর পড়িল। আমি শুভদৃষ্ট বলিয়াই মনে করি যে ভগিনী মাধবীর জীবন কাহিনী আমি বলিতে পারিলাম। আমার পিতামহ পীতাম্বর ঘােষ আর মাধবীর পিতামহ জয়রাম বসু দুইজনে একত্র হইয়া পূর্ব বাংলা হইতে কলিকাতায় অর্থান্বেষণে আইসেন। জয়রাম কিছু ইংরাজী লেখাপড়া শিখিয়া আসিয়াছিলেন, সুতরাং সহজেই সাহেব বণিক কোম্পানীর ধরে চাকরী পাইলেন। তখন কোনও প্রকারে একটু ইংরাজী লিখিতে পড়িতে পারিলে চাকরী পাই কষ্ট হইত না। আমার পিতামহ তেমন ইংরাজী লেখাপড়া নিতেন না। চাকরী না পাইয়া তিনি লালীর কাজ আর করেন।
নারি যতদিন তাহার দালালীতে যথেষ্ট উপার্জন না হইত, ততদিন বন্ধু জয়রাম তাঁহাকে অনেক সাহায্যই করিয়াছিলেন। অল্পদিনের মধ্যেই তাহারা দুইজনেই যথেষ্ট অর্থের অধিকারী হইয়া কলিকাতার সহরে বাড়ীঘর করিয়া ফেলিলেন। তাহারা আর দেশে ফিরিলেন না, শ্রীপুত্র নিয়া কলিকাতায়ই বাস করিতে লাগিলেন। মাধবীর পিতামহ কলিকাতায় একটা বাড়ী ও কিছু টাকা ব্যায়ে রাখিয়া স্বর্গারােহণ করিলেন। একটা মাত্র পুত্র তাহার, সহরের আব- হাওয়ায় মিশিয়া সকল রকম কদাচারেই অভ্যস্ত হইয়া পড়িলেন, এবং ত্রিশ বৎসর বয়স অতিক্রম না করিতেই, সর্বস্বান্ত হইয়া বিষজীর্ণ দেহখানি রক্ষা করিয়া ইহকালে আলা হইতে উদ্ধার পাইলেন। মাধবীর মাতাকে শাখা সিন্দুর পরাইয়া ইহার দুই বৎসর পূর্বেই আমরা নিমতলা ঘাটে রাখিয়া আসিয়াছিলাম। মাধবীকে কোলে আঁকুড়িয়া ধরিয়া তাহার বৃদ্ধ পিতামহী এই নিদারুণ দুঃখ দৈন্ত সহিয়া রহিলেন। আমাদের পিতার আমরা তিনটা পুত্র, পিতা মারা গিয়াছেন, মাতা আছেন, আমরা পুর্ব কথা ভুলি নাই। আমাদের সুখ সম্পদ কিছুমাত্র খর্ব হয় নাই। বাবা রুগ্ন ছিলেন, বাড়াইয়া গােছাইয়া তুলিতে পারেন নাই বটে। আমার দুই দাদাই ভাল রকম লেখাপড়া শিথিয়া বড় চাকরী করেন, আমি কলেজে পড়ি। আমরা মাধবীকে ঠাকুরমার সঙ্গে আমাদের বাড়ীতে লইয়া আসিলাম। বৃদ্ধ আমাদের সংসারে থাকিয়া আমাদের অন্নদাসী হইতে চাহিলেন না। আমাদের বাড়ীতে পৃথক ভাবেই বাস করিতে লাগিলেন। বর্তমানের চালচলনে আমাদের ঘরে খাদি ব্যাপারে যােবনা শাস্ত্রবিধি নানা চলিত না, লমীবার, মঙ্গলবারের আটক বাধাগুলিও আমরা সমান করিয়া শয়াছিলাম, গাজলের চেয়ে কলের অলই স্বাস্থ্যকর, সুতরাং পবিত্র নষ্টোর ৩০ । মনে করিতাম। মাধবীর ঠাকুরমা সেই অপরাধে আমাদের ঘরে কিছুতেই জল খাইতেন না। ঠাকুরমা একলাটী হইয়াও আমাদিগকে একঘরে করিয়াছেন বলিয়া আমরা খুবই হাসিতাম, কিন্তু আমাদের মা তাহাকে ভক্তি করিতেন যথেষ্ট প্রায় বছর দশেক এমনি কাটিয়া গেল, মাধবী বিবাহ বােগ্যা হইলে, ঠাকুরমা আমাদিগকে ধরিলেন মেয়েটার একটা ব্যবস্থা তােমরা করে দাও। এ পাপ আমার ঘাড় থেকে নামিয়ে দাও। আমরা চেষ্টা করিতে লাগিলাম, মাধবী রূপে গুণে যেমন মেয়ে, সে রূপ মনােমত বর মিলে না। মাধবীর আর কেউ নাই, এই দেবে মাধবীর রূপগুণের উপর কেহ দৃষ্টি বসাইতে পারে না। অথবা পৃথিবীর লােক প্রায়ই বর্ণান্ধ, খাটিরূপ কাহারও দৃষ্টিতে ফোটে না। দৃষ্টি যে মন-রাজার আজ্ঞাকারী, সে যেমন দেখায়, তেমনি দেখে। তবে যদি কোনও চক্ষু রাজার আইন না মানিয়া বিদ্রোহী হইয়া বসে, সে স্বতন্ত্র কথা। তবে এই রাজাজ্ঞা না মানা যতটা গল্পে শােনা যায়, কাজে তার অনেক কমই ফলে। যাক, মাধবী বড় শী শীঘ্র বড় হইয়া উঠিল, পক্ষান্তের তটিনীর মত মাধবীর রূপগঙ্গা যেন উথলিয়। উথলিয়া বাড়িতে লাগিল। আর সকলে বলিলেন, যা হয় একটা দিয়ে দে, আর ত মেয়ে আইবুড় রাখা যায় না। আমি বলিলাম, তা হইতেই পারে না, মাধবীর মত মেয়েকে অপাত্রে দেওয়া যেতে পারে না। না হয় বিয়ে নাই হবে। ওর স্কুলের পড়া শেষ হলেই, আমি ওকে কলেজে ভর্তি করে দেবে। এত বড় বােল আনা কড়ায় গণ্ডায় হিন্দু হইলেও, ঠাকুরমা ইহাতে বিশেষ জাপত্তি করিলেন না। মাধবীকে অযােগ্য পাত্রে দিতে গেলে তাহার যে অতি মর্মস্থলে টান পড়ে। একদিন মাধবীকেই বলিলাম, “কেমন রে মাধবী, বিয়ে না হইলে চলবে ত?”
নট্টোর সাধারণ মেয়েদের মত মাধবী মুখচোরা অতি লাজুক মেয়ে কোনও দিনই নয়, এজন্য আমরা তাহাকে পাগলী বলিতাম, কখনও কখনও লজ্জাহীনা অসভ্য বলিয়া মিঃ তিরস্কারও করিতাম। মাধবী বলিয়াছিল, “মেয়ে মানুষগুলােকে আপনারা জোর করে লাজুক বানিয়ে রাখেন। তারা লজ্জা মুশ,ড়ে থাকলেই পুরুষ বাবুদের সুবিধা কিনা, খেলার পুতুলটীর মত যখন যেমন ইচ্ছা নাচাতে পারেন।” আমি বারাে বছর বয়সের আগেই মাধবীর মুখে এই কথাটা শুনিয়া অবাক হইয়া গিয়া- ছিলাম, এবং কথাটাকে অতি সত্য বলিয়াই আমি মানিয়া লইয়াছিলাম। আজ যখন মাধবীকে বলিলাম, “বিয়ে না হলে চলবে ত?” মাধবী তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল, “সবে এই তের বৎসর বয়সে সে কথা কি করে বলি বলুন?” আজ কিন্তু কথাটা বলিয়াই মাধবী নীচের ঠোটখানি দাতে চাপিয়া ধরিল। তের চৌদ্দ বৎসর বয়সটা সহজে ঝাড়িয়া ফেলা যায় না। আমি হাসিয়া বলিলাম, “আমরা যে হয়রাণ হয়ে গেলুম।” “বিধাতার পরে আড়ি দিয়ে হয়রাণ হওয়াই মানুষের স্বভাব। আপনাদের পায়ে পড়ি, এমন পালে পালে কলেজের ছেলে ডেকে যাচাই কর্তে আর আনবেন না।” “সে দিন যে ছেলেটা এসেছিল, বেশ ছেলে, কিন্তু তার মা যে রাজি হচ্ছে না।” “আপনি ত বলেছিলেন, কলেজের শতকরা আটষট্টি জন ছেলের রক্তে বিষমাখা।” তা হলেও বাকি ক'জন ত ভাল আছে?” “অগাধ সমুত্রে লক্ষ সামুক ধুকে মুন্সর ঝিনুক খোজা ত সহজ নয়, মিছিমিছি, সমুদ্রে না নামাই ভাল।”
নামায় “যাঃ। ফাজিল বকাটে মেয়ে।” বলিয়া ঘােট করিয়া একচ মাধবীর পৃষ্ঠে মারিলাম, মাধবী আর একটু সরিয়া দাড়াইয়া বলিল, “আর একটা কথা বলে আমি লজ্জায় চুপ মেরে যাব। কথাটা কি ছােট বাবু, বিয়ে না হয় নাই বা কম, তবে বিয়ে করার মতন ধন দৌলত, রূপগুণ নেই বলে বিয়ে হলাে না, এ অপবাদটা মনে হলেই কেমন কেমন লাগে !” কথাটা বলিয়াই মাধবী মুখ ফিরাইয়া দ্রুতপদে ছুটিয়া চলিয়া গেল। দেখিলাম মুখখানা তার লাল হইয়া উঠিয়াছিল, তাহার নাসিকাগ্রে বৰ্ম্মবি ফুটিয়াছিল। নারী প্রকৃতিটা এমন করিয়া মাইয়া দিতে বালিকার যেন কঠোর পরিশ্রম হইয়াছিল। দেখিতে দেখিতে ঠাকুরমার আসকাল উপস্থিত হইল। দুইদিন একটু সামান্য পেটের পীড়ায় ভুগিয়াই বৃদ্ধ গঙ্গাযাত্রা করিলেন। মাধবী কাদিয়া আকুল হইল। আমরা যথারীতি বৃদ্ধার সৎকাৰ্য্য করাইয়া, মাধবীর মায়া তাহার শ্রাদ্ধাদিতে যথারীতি অনুষ্ঠান করিলাম। মাধবী একখানা পাশ বই মার হাতে দিয়া বলিল, “এর থেকে পাঁচশ টাকা তুলে ঠাকুরমার শ্রদ্ধে কাঙ্গালী ভােজন করান।” মা বলিলেন, “না না, মােটেত হাজার দুই টাকা, তার পাঁচশ তুলে কাজ নাই, তােত কোনও অবলম্বন নেই মাধবী।” “কি নাই আমার জ্যাঠাইমা? আমার সবই আছে। ঠাকুরমা বলে গেছেন, যার কেউ নাই, তার আছেন ভগবান; আপনারা আমাকে কেউ-না থাকা কিছু না থাকা করে দিন। মাধবী কাঁদিয়া বাড়ীর লােক পাগল করিয়া দিল। তাহাই করিতে হইল, টা তুলিয়া কাঙ্গালীদিগকে এক পােয় চাল, একখানা কল ও চারিটা করিয়া পয়সা দান করা হল।
মা একদিন আমার পড়ার ঘরে গিয়া বলিলেন “দেখ, সতীশ, এই মাধবী মেয়েটাকে কি করবি বল দিনি?” আমার পরীক্ষার দিন নিকট, ফাষ্ট ক্লাস একখানা সাটিফিকেট না নিতে পারিলে আমার যে কিছুতেই চলিবে না; দাদাদিগের মত সাহেবের অধীনে কলম পেশা আমার চলিবে না। আমার জীবনের লক্ষ্য প্রফেসারী করা। একটু বিরক্ত হইয়াই মাকে বলিলাম, “আমার কি এখন ও সৰ কথা শুনার সময়? দাদারা আছেন, বকুন না ? মা তব চুপ করিলেন না, পরীক্ষার্থী পুত্রের সময়ের মূল্য তিনি বুঝিলেন না। বলিলেন, “মাধবীর বর কোথাও মিলবে না।” “না মেলাই উচিত।” “আমি বলি কি, আলর ফরেই থাক।” “বেশত, তাই থাক।” কথাগুলি বলিতেছি নিতান্ত অন্যমনস্ক ভাবে, মাকে তাড়াইতে পারিলেই হয়। মা আর বাজে কথার সময় পাইলেন না। মা আর বলিলেন, “দুটো মিনিট, আমার কথা শুনে উত্তর । শােন, এভাবে কি পরের একটা বন্ধু মেয়ে রাখা যায়? তাই ত আমি বলছি, ওকে কলেজের বাের্ডিংএ রেখে দেওয়া ') নষ্টোর 6 মা যেন রাগিলেন, বলিলেন, “শোন গাধা, আমার ছােট বউমা- লীর আসনটা এখনও খালি আছে, আমার ইচ্ছা মাধবীকে আমি সেইখানে বসিয়ে দেই।” ভারতবর্ষটা এই সকালেই স্বাধীন হইয়া গিয়াছে, এ খবরটা পাইলেও বুঝি আমি এত বিষ্মিত হইতাম না। “বলল কি মা?” “কেন? দোষ কি! ভদ্র ঘরের মেয়ে, এমন সৰ্বাঙ্গসুন্দী। একটু সরলা, তাই আমরা মুখরা বলি,-নইলে মাধবীর মত বুদ্ধি ত আমি ঝি বউএর দেখি না।” “কি লাভ হবে মা?” লাভের কি দরকার আমার। ছেলে কি আমার অভাবে আছে অক্ষম?” আমি একবারে বিয়াহতই হইলাম, মাতার মুখের প্রতি সাবধনা দৃষ্টিতে চাইলাম, সন্দেহের লেশমাত্র ছায়াও ত তাহাতে দেখিলাম । এই ত সেদিন একটা সম্বন্ধ আসিয়াছিল, নগদে অলঙ্কারে তৈজসে বিশ হাজার টাকারও উপর, তবু মা সেই সঙ্গে আরও পাঁচটা ফরমাইস করিলেন। আর আজ একি কথা মায়ের ? বলিলাম, “তুমি এমন হয়ে গেলে কিসে মা ? মা বলিলেন, “কি জানি কেন? যে দিন মাধবীকে তার ঠাকুরমার একদিনে কাঙ্গালীদিগকে চাল বেটে দিতে দেখেছি, পরণে ভিজে নীলাম্বরী খানি, চক্ষুদিয়া জলের ধারা বহিতেছে, মাধবী দু'ধারে সার- দিয়ে বসা কাঙ্গালীর ভড়ে চাল ঢেলে দিচ্ছিল, যেন সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা। অমত করিস না বাবা, এ লক্ষী আমি পরের ঘরে দেব না। কি বলিস?
नहार এত বড় একটা অসম্ভব কানা মায়ের মনে জাগিবে, আমি তা কখনই ভাবি নাই ; বলিলাম, “যাও তুমি, আমার বিয়ের কথা কি আমারই মতে হবে নাকি? দাদাদের গিয়ে বল।” মা প্রফুল্লমুখে চলিয়া গেলেন। আমি কেবল ভাবিতে লাগিলাম, মাতৃগৌরবে যখন আমি এত বড়, তখন যদি সংসারের কোনও দুষ্টশক্তি আমায় নরকের তলেও টানিয়া লইয়া যায়, তথাপি আমার ভয় নাই। মা! তুমি বড়, তা জানি, কিন্তু এত বড়, তাত জানিতাম না। বারাণসীর গঙ্গাতীরে তােমার নামে কত বড় মঠ তুলিলে, তােমার এ মহত্বের নিদর্শন রাখিতে পারিবে তােমার এ অযােগ্য সন্তানেরা ? সে দিনকার পড়াশুনাটা মা একবারে মাটি করিয়া দিলেন। তবে মা বড় বুদ্ধিমতী, আমার পরীক্ষার মধ্যে বাড়ীর মধ্যে কথাটার একটুও আভাস কাহারও মুখে পাইলাম না, মাধবীর মুখ দেখিয়াও নয়। মাধবী তেমনিই নিঃসঙ্কোচে সকলের মত আমার সেবা যত্ন করে, আমার কি কেমন একটু লজ্জা সঙ্কোচ আসিয়া পড়ে। আমার ভাবটা একটু বাঙ্গাল ধরণের চিরদিনই আছে। তবে বিশেষ লক্ষ্য করিয়া দেখিয়াছি, মাধবীর মুখে যেন কেমন একটু আশ্বিনের কুয়াসা ঢাকা চাদের মত ছায়া ছায়া ভাবটা বসিয়া গিয়াছে। মাধবী যেন তেমন অবাধে আর হাসিতে পারে না। অামার পরীক্ষাটা যে দিন শেষ হইল, সে দিন বাড়ী আসিয়াই দেখি কথাটা বাড়ীময় রাষ্ট্র হইয়া গিয়াছে। মা আর সহিয়া থাকিতে পারে নাই। সন্ধ্যার পর বড় বউদিদির ঘরে আমার ঘােট বােন, বউদিদিয়া দু’জন আর মাধবী খুব বক্তৃতাই আরম্ভ করিয়াছেন। কথাগুলি শুনিতে আমার কৌতুহল হইল, একটা জানালার পাশে লুকাই দাড়াইয়া খনিতে লাগিলাম-মাধবী যেন কেমন ধরা গলায় স্পষ্ট ঠোদ্ধার 4, উত্তেজিত কণ্ঠেই বলিল, “আপনার কথাটা আমার এমন ভাবে হেসে উড়িয়ে দিচ্ছেন, আপনারা স্ত্রীজাতি ত? নারী হয়ে নারীর মূল্য এত তুচ্ছ মনে করেন? এইটা আশ্চৰ্য। এই জন্যই এ দেশটায় নারীগুলি পুরুষের অন্নদাসী হয়ে আপনাদের এটাই হারিয়ে ফেলেছে।” বড় বউদিদি হাসিয়া বলিলেন, “বেশ, বেশ, হবে ভাল, ঠাকুরপােও যেমন তর্কবাগীশ, তুইও তেমনি কথার ফোয়ারা বেশ মিলেছে।” মাধবী যেন নিতান্ত আহত স্বরেই বলিল, “ছি ছি কথাটা একটু ভেবে বলবেন। আমি বুঝতে পাচ্ছি, আপনারা আমায় নিতান্ত পথে পড়া পেয়ে কুড়িয়ে নিচ্ছেন, আপনারা বড় উদার ভাবে, মস্ত বড় লাভের দিকটাও না চেয়ে, আমাকে এমন সুখ সম্মানের পদে তুলে নিচ্ছেন, যার আমি কিছুতেই যােগ্য নই। কিন্তু আমি আবার অন্যরূপ বুঝতে পাচ্ছি, আমি ধনজনে দরিদ্র হলেও আমার যত সামান্যই হউক কিছু একটা মূল্য অবশ্য আছে, আমি কিছুতেই স্বীকার করি না, যে আমার কিছু মাত্রও মুল্য নাই। আপনাদের এই দয়ায় আমার যে মূল্যটা একবারে কিছু না হয়ে যায়। এই ঐশ্বৰ্য সম্পদের মধ্যে ডুবিয়ে রেখে, আমার যে ক্ষুদ্র স্বত্তা তা আমি একবারে কিছু না করে দিতে ইচ্ছা করি না। এই যে সহরময় বড় বড় অট্টালিকা কত অহঙ্কারে দাঁড়িয়ে আছে, এর মাঝে আবার দুই একখানা ঘােট খােলর ঘরের অস্তিত্বও এখনও বজায় আছে। ওর মধ্যেও গৃহস্থ খায় দায়, ঘুমায়, হাসে, কলহ করে, তা বলে সে এ আবর্জনা ভেঙ্গে ফেলে, ধনবানের ঐ নিরর্থক পড়ে থাকা বারাণ্ডায়, বা রাজা মহারাজের ধর্মশালায় পড়ে থাকতে ত যায় না। যে যায়, সে অতি ভাগ্যহীন। তবে সে চেষ্টা করে, তার কুড়ের উপর নিজে কোঠা গড়তে।”
নষ্টোর আমার ছােট বােনটা একটু বােকা ধরণের, সে বলিয়া “মাধবী দেখছে, রূপের ফাদে ত ধরেই ফেলেছে, এখন একটু নেলা খেলা কচ্ছে, শিকারী বিড়ালের অমনিই স্বভাব।” মাধবী যেন গর্জিয়া উঠিল, বলিল, “দেখুন, যাকে লক্ষ্য করে এই অতি কুৎসিত কথাগুলি আপনারা তুলছেন, তিনি দেবতা, আমি তার পায়ের ধূলারও যােগ্য নই, আমি সারাজীবন দাসী হয়ে তার সেবা কর্তে অপমান বােধ করি না, প্রাণের সমস্ত শ্রদ্ধা ঠাকুরের মত তার পায়ে আমি ঢেলে রেখেছি, কিন্তু এত বড় বিনিময় আমি কিছুতেই কোরবাে না আমি নারীত্ব দেবাে না।” ছােট বউদিদি বলিলেন, “পাগলটা বলে কি? মা দেখি স্যার ডেকে পাঠিয়েছেন, অলঙ্কারের বায়না দিতে।” মাধবী আবার বলিল, “তবে একটা সােজা কথা শুনুন, এই অলঙ্কার গুলি পরে অাপনাদের সঙ্গে যখন মিশে বেড়াব, তখন আমি যখন দেখতে পাব, এতে আমার পিতৃকুলের দাগটা মাত্র নাই, তখন অভিমানে আমি এতটুকু হয়ে যাব না? পৌষ মাসে পাখার হাওয়ার মত ঐ সােণা মণির পরশে আমার কি কখনও স্বস্তি বােধ হবে ? বড় বউদিদি এবার একটু গভীর হইয়াই বলিলেন, “এর ভিতর যেন আরও কিছু আছে মাধবী।” “তা ত আছে বউদিদি।” বলিয়া মাধবী ছুটিয়া বাহিরে আসি। বাহিরে আসিয়াই, আমি দাঁড়াইয়া ছিলাম দেখিতে পাইল। মাধবী স্তব্ধ হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল, রহিল, আমি দ্রুত পদে চলিয়া আসিলাম। আসিয়া ভাবিলাম, ব্যাপারটা কি। মাধবীর কথাগুলি অতি সত্য, কিন্তু একটা বালিকার এত প্রগলভতা বেসহনীয় নয়।
নটার পরদিন মধ্যাহ্নের আহারাদি সারিয়া, যে যাহার ঘরে বিক্রম করিতেছেন, যাহাদের আফিস্ আছে, তাঁহারা আফিসে গিয়াছেন, আমি আমার পড়ার ঘরে বসিয়া ভাবিতেছি, একটু পড়িব, না ঘুমাইব, বন্ধুদিগের বাড়ীতে গিয়া তাস খেলিব। মাধবী আমার ঘরে প্রবেশ করিল। আমি দেখিয়া চমকিত হইলাম। মাধবী অল্প অল্প কাপিতেছে, দেহের মৃদু কম্পনে তাহার পরিণত অঙ্গের রূপচ্ছটাও যেন কম্পিত হইতেছে, যেন ভাদ্রের ভরনদী শরতের জ্যোৎসনায় সমুজ্জল হইয়া বহু-সমীরে মৃদু মৃছ দুলিতেছে। তাহার দেহের শােণিত প্রবাহ যেন প্রবল গতিতে উর্ধ্বমুখী হইয়া তাহার ললাট কপােল চিবুক পৰ্যন্ত লােহিত রাগে রঞ্জিত করিয়া দিয়াছে, বালিকা যেন কি এক অতি দপী বিপক্ষের সম্মুখে তাহার সমস্ত শক্তি সংযত করিয়া দাঁড়াইয়াছে,যেন কি এক জীবন মরণের সমরে বীরাঙ্গনা দাড়াইয়াছে। মাধবী কথা বলিতে যাইতেছে, পারিতেছে না, রাধর কাঁপিতেছে, চক্ষে অতি উজ্জল জ্যোতিরশ্মি বিরিত হইতেছে। তাহার ললাটের ঘর্ম নাসিকা গড়াইয়া গণ্ডে নামিয়াছে! একি মূর্তি মাধবীর? তাহাকে ত দু’দিন আগেও ছুটিতে খেলিতে দেখিয়াছি, পাগলা বলিয়া তাহাকে কত রাগাইয়াছি। আজ এ কি নূতন মূর্তিতে কোনও প্রভাময়ী দেবী আমার গৃহে আবির্ভূত ইলেন। আমি ডাকিলাম “মাধবী? মাধৰী আমার পায়ের উপর লুটাইয়া পড়িল। “আপনি আমায় রক্ষা করুন। বলিয়া সে কাঁদিয়া ফেলিল। আমার বিয়ের অবধি নাই। বলিলাম, “কি? বল।” মাধবী ধীর স্পষ্ট কণ্ঠে বলিল, আমি অপরে বাগদত্তা মাধবীর হাতে আমার পা ছোঁয়া ছিল, পা সরাইয়া লইয়া বলিলাম, “ৰাগদত্ত। অনুরাও।
মটোর ।* মাধবী তাহার বাম হন্তের মুষ্টি হইতে একখানা কাগজ বাহির করিয়া আমার সম্মুখে ধরিল। কাগজ লইয়া পড়িয়া সকলই বুঝিলাম। সত্যই বলিতেছি, অন্যমনস্কভাবে পথে চলিতে চলিতে সহসা কোনও বাধার আঘাত লাগিলে আকস্মিক ব্যথাতে যেমন মুহূর্তের জন্য জ্ঞান করিয়া দেয়, তেমনি একটা আঘাত যেন বুকের মধ্যে বাজিল। কিন্তু পরক্ষণে সামলাইয়া বলিলাম, “আচ্ছা, সন্তুষ্ট হলাম।” কথাটা, যেন ইংরেজী ধরণে বলিলাম, মাধবী তাহা বুঝিতে পারিয়াছিল, এবার সে পা দুখানি আমার জোরে জড়াইয়া ধরিয়া, স্পষ্ট রােদন-বিকল-রেই বলিল, “আপনি আমার পরম পূজ্য ভ্রাতা, দাদা! দাদার উপর বােনের যে অধিকার সে অধিকার আপনার আমাকে দিতে হবে। আমায় আপনার বােনের যােগ্য করে নিতে হবে।” মাধবীর চক্ষুজলে আমার পা ভিজিয়া উঠিল, হৃদয়ের যা কিছু একটু ময়লা ছিল তাহাও বুঝি কাটিয়া গেল। স্বচ্ছন্দে বলিলাম, “তােমার মত বােন পাওয়াই গৌরব, বল বােটা, বিজয় কি যেন থেকে ফিরে এসেছেন?” “তা জানি না, আজ ছমাস কোনও খবরই রাখি না।” “আচ্ছা, আমি এখনি বেরচ্ছি।” তখনই জামাটা টানিয়া পরিতে যাইতেছিলাম, মাধবী আমায় বলিল, “মাকে কিরূপে শা করি দাদা? আমি ফিরে এসে তাকে সকল কথা খুলে বলবাে।” “কত ব্যথা পাবেন তিনি। ভাবিয়া মাধবীর কথাটার অর্থ বুঝিলাম, অর্থাৎ মা কত নির্থ করুণায় দীন হীন কন্যা মাধবীকে কত আদরে কুড়াইয়া লইতেছিলেন, নষ্টোর । মাধবী আজ সে আদর উপেক্ষা করিয়া সরিয়া দাড়াইতেছে, এ চিন্তাটা আপাততঃ উঠিয়া মাকে ব্যথা দিতে পারে বটে। ভাবিয়া বলিলাম, “আচ্ছা এর উপায় করব। তখনই বাহির হইয়া পড়িলাম। ২ “বিজয় কুমার সিংহ, কাঠের গােলা খুজিতে লাগিলাম। কোথাও পাই না অবশেষে সংবাদ পাইলাম, সে গােলা এখান হইতে উঠিয়া বহু বাজারের মােড়ে উঠিয়া গিয়া বি, সিং টিয়ার মার্চেন্ট হইয়া দাড়াইয়াছে। সুতরাং সে দিকেই ছুটিলাম। দোতালার একটা সজ্জিত সুন্দর কক্ষে বি, সিং কারখানার অফিস ঘর, দারােয়ান কৰাটের স্প্রিং ঠেলিয়া ঢুকাইয়া দিল। দেখিলাম হরহ একজন খাটি সাহেবই গভীর বনে বসিয়া বৰ্মা চুরুট হাতে বহি পড়িতেছেন, আগেই বইখানা দেখিয়াই চিনিলাম, রোলার নভেল, তাহাতেই বুঝিলাম সাহেব কাঠ ঘাটিয়া একবারে কঠোর কাঠ না হইয়া কতকটা নীরস দারুর মতই সম্মুখে প্রভাত হইতেছেন। আমি সুপ্রভাত বলিয়া অভিবাদন করিলাম। সাহেব আমার পদ শব্দ পাইবামাত্রই মুখ দুলিয়া আমার দিকে যেন কিছু সখি দৃষ্টিতেই তাকাইয়া পড়িয়াছিলেন। আমি অভিবাদন করিলে তিনি চকু নামাইয়া অভিবাদনটা ফিরাইয়া দিয়াই বলিলেন, “বন দয়া করে, কি চান?”
নায় আমি বাংলায় বলিলাম, ইংরাজী কথা গুলিতে কতকগুলিয়ে, “প্লি “থ্যাঙ্ক ইউ” বাজে বকুনি দিতে হয়, ওটা আবার নেহাৎ রস ভঙ্গের মত বােধ হয়। বিশেষ আমি আসিয়াছি নিতান্ত একটা বাংলা কল্পনা লইয়া, সাহেবের বর্ণ যতই উজ্জল গৌরবর্ণ হউক, পােষাক পরিচ্ছদে সাগর পারের কায়দায় কোনও ত্রুটী না থাকিলেও, ঠাটনাড়া, হাতনাড়া চোক চাওয়া কোনওটীতে একসূত বেখাপ না লাগিলেও, আমিত এটা বুঝিয়াছি, এরূপ দেহের গঠন সে ইঙ্গভূমির বাতাসে সম্ভবে না, কিম্বা ফিরিঙ্গি পুরুষেও এমন বিশুদ্ধ অবিমিশ্র রূপ সম্ভবে না। সাহসে বাংলা ভাষায়ই বলিলাম, “বসাটা দয়া করে নয়, আপন গরজেই বসেছি, চাই কি, তা আর দুই একটা কথার পরে বলব।” ভদ্রলােক যেন শিহরিয়া উঠিলেন, স্বচ্ছ বাংলা ভাষায়ই বলিলেন, আপনি নেবুতলার দিকটা হতে এসেছেন?” আমার বড় আনন্দ হইল, বলিলাম, আপনি কি এমনি কিছু আশা করেই ছিলেন ? “সেইরূপই সম্ভব। কিন্তু আমি বড় অপরাধী। “নিশ্চয়ই, তবে রেঙ্গুন থেকে কবে এসেছেন?” “প্রায় একমাস হলাে।” “এক মাস হলাে? একমাসেও আপনার কাজের ভিড় যায় নাই? “কাজের ভিড় আমার আছে, কাজ কিছু করি না, কাজে মন নিতে পাবদা,আপনাদের শুভ পরিণয়টা হয়ে গেলে।” “আমাদের পরিণয় ? আপনি এত সংবাদ রাখেন? “মাধবীর ঠাকুরমার মৃত্যু হয়েছে, মাধবী আপনাদের আশ্রয়ে আছে, আপনারা সে নিরাশ্রয় বালিকাকে আশ্রয় দিয়াছেন, এরূপ অনেকেই দেয়। আপনার দেবী স্বরূপিনী জননী যে তাকে সেধে পুত্রবধু কর্তে যাচ্ছেন, তার অয় তার পায়ে কত প্রণাম কর্তে ইচ্ছা হয়। সে প্রণাম অামি অাপনাকে बरोशन দিয়েই তাকে পাঠাচ্ছি।” বলিয়া অত বড় সাহেব আমার পা ধরিতে যাইতেছিলেন, আমি তাহার হাত ধরিয়া তুলিয়া বলিলাম, “আপনি এত সংবাদ রাখেন। তবে মাধবীর সঙ্গে একবার দেখা করেন নাই কেন?” “আমার অধিকার নাই, সে অধিকার আমি রাখি নাই।” বলিয়া মিার সিংহ যেন পাইতে লাগিলেন। আমি তাঁহার মুখের পানে তাকাইয়া রহিলাম। তিনি আমায় বলিলেন “চলুন, বাহিরে কোনও মুক্ত বাতাসে গিয়া সমস্ত বলিব।” ঘড়ি দেখিয়া বলিলেন, “দুটো বেজেছে ; তবু চলুন লাল দীঘির পাড়ে একটা কুঞ্জবনে বসে, সমস্তই বলবাে। বলবার আমার প্রয়ােজন হয়েছে।” এখন বিজয় সিংহের মুখেই আপনারা সকল কথা শুনুন। বক্তা—বিজয় সিংহ। বাহাদুরী কাঠের দেশ ব্রহ্মে যাইতে জাহাজে চড়িলাম। সাগরে যে জল খেলিতেছে, তাহা ত অবিরাম অনন্ত, আমার বুকের মধ্যেওতাহার চেয়ে কম তরঙ্গ খেলিতেছিল না। চব্বিশ বৎসর বয়স,—প্রণয়, ভােগ বিলাসে তরল যে দুই একটা উঠিতেছিল না, এমন নয়, তবে সবার . নষ্টো উপরে ছিল ছিল ধন লালস। ধনে বড় আমাকে হইতেই হইবে। কলিকাতা মহানগরীর এই যে বড় বড় সজ্জিত সৌধ, যাহার অধিকাংশেই ইউরােপীয় বা মাড়ােয়ারি বণিকেরা অধিকারী, আমরা বাঙ্গালী কেবল চাহিয়া দেখিয়া বিস্মিত হই। বাঙ্গালী বাবু, ব্যারিষ্টার, রায় সাহেব রাজা বাহাদুর ভাড়া করা প্রাসাদে দু’দিন রাজত্ব বিছাইয়া, দেউলিয়া খাতায় নাম লেখাইয়া বাঁচিয়া যায়, আমি দেখিব, অমনি খাটি অধিকারে সহরে দাড়াইতে পারি কি না। আমি ছিলাম বড় দরিদ্র, পেট পূরিয়া খাইতেও পাই নাই। ধনবানের দ্বারে কত লাঞ্ছনাই ভােগ করিয়াছি। আমার এই অনবেদ্য স্বাস্থ্য, রূপে আমাকে লােকে অনুপম বলে, বুদ্ধির প্রখরতা নিশ্চয়ই আছে, নচেৎ এ পর্যন্ত পৌছিতে পারিব কেন? তথাপি ধনে খাটো বলিয়া সামান্য দশ হাজার পাঁচ হাজারের লােকও আমায় অবহেলা করিত। বাবা আমাকে অযত্ন করিয়াছেন, টাকা দিয়া তাহাকে খুসি করিতে পারি নাই বলিয়া,মামারা অবজ্ঞা করিয়াছেন, আমি রােজগারে সক্ষম বলিয়া, কাকা তাড়াইয়া দিয়াছিলেন, অক্ষমের ভার বহিতে হইবে বলিয়া। মােন্দা সংসারে স্নেহ মমতার আস্বাদ আমি পাই নাই, কেবল টাকা আমার নাই বলিয়া। কিন্তু ভগবান অবিচারী ম, তিনি আমায় টাকার পথ দেখাইয়া দিলেন। আমার অন্ন বস্ত্রে অভাব ঘুচিল, ইচ্ছা করিলে এখন আমি সারা জীবন পরিবার পরিজন লইয়া দুধে ভাতে থাকিতে পারি। কিন্তু ব্যায়ে দু’পাচ লাখের চেক যখন তপন কাটিতে পারি, ঐ শ্বেতাঙ্গ দাম্ভিকের দল টুপি তুলিয়া আমার ভাণ্ডার মারে সেলাম করিয়া যাইবে এমনটা আমাকে করিতেই হইবে। সতীশ বাবু কথার মধ্যে বাধা দিয়া বলিলেন, “আর সেই সমীর মন্দিরে অধিষ্ঠাত্রী দেবী হবে মাধবী ?”
নষ্টোর না, ও সব তরল কল্পনা আমার কখনও ছিল না জাহাজ হইতে নামিয়া মাটিতে পা দিবার পর মাধবী কোথায় ভাসিয়া গিয়াছে। একটা ভাল বাড়ী দেখিয়া, বড় সরাই দেখিয়া বাসা লইতে হইল। তাহারই পাশে একজন ব্ৰহ্মদেশীয় সাহেবের বড় বাড়ী, চারিদিককার দাময় মনুষ্য পিঞ্জরের মাঝখানে এই সৌধভবনটা অতি বড় মাতব্বর মহারাজের মতই উন্নত-শিরে আত্মগৌরব প্রচার করিতেছিল। বাংলায় হইলে ইহার প্রতাপে বাঘে মহিষে এক ঘাটে জল খাইত। অনুসন্ধানে জানিলাম, এই সাহেব বড় একটা সেগুন বাগানের আংশিক মালিক। ইহার সঙ্গে আলাপ করিবার প্রয়ােজন হইল। প্রথম দিন সে বাড়ীতে প্রবেশ করিয়া গৃহস্বামীর সঙ্গে দেখা হইল না, তাহার কন্যার সঙ্গে দেখা হইল। কন্যাটী যুবতী, সুন্দরীও বটে, বিলক্ষণ আলাপ কুশলা। আমার সঙ্গে অবাধে আলাপ করিল। আমি ব্যবসায়ের কথাই পড়িলাম। বিলক্ষণ বড় মেজাজে বড় আসবাব লইয়াই গিয়াছি, বড় হইয়াই বলিলাম, আমি এক লক্ষ টাকায় কাঠ বায়না করিব, বৎসরে দশ লাখ টাকার কারবার চালাইতে চাই। যুবতী হাসিয়া বলিল, “মােটে এক লাখ টাকা, আমার পিতা কি রাজি হইবেন? আচ্ছা, আমি না হয় একটু অনুরােধ করিব আপনার জন্য।” আমি একটু আঘাতই পাইলাম। বলিলাম “না না, আপনি আমার জন্য অনুরােধ করিতে কেন যাইবেন? আমি না হয় অন্য কোথাও চেষ্টা করিব।” সে সুন্দরী আমার কথায় দুঃখিত হইল না; বলিল “না না, পিতার সঙ্গে দেখা না করিয়া আপনি অন্যত্র বাইবেন না। পিতা আমার কথা খুব শুনিয়া থাকেন। আপনার মত লােকের সঙ্গে ব্যবসায়ে সম্বন্ধ রাখিতে পারিলে আমরা খুসীই হইব, সত্যই আপনার কাজ করিতে পারিলে আমি সন্তুষ্টই হইব।” আমি বলিলাম, “ধন্যবাদ।
নষ্টোর কিন্তু এত ক্ষণের পরিচয়ে আপনার এ অহৈতুক সহানুভূতি আমি বিশাস করিতে পারি কিরূপে?” যুবতী হাসিল, রক্তরাগ-সমুজ্জ্বল ওষ্ঠাধর দুটী চম্পক দলের মত অতি মৃদু কাপাইয়া কেমন একটু হাসিল, সহ সুন্দরী হইলেও আমাদের দেশের যুবতীর অমন হাসিতে জানে না। হাসি যেন আমার মর্মস্থল পৰ্যন্ত আলােকিত করিয়া দিল। আমি কিন্তু তাহাতে বিহ্বল বা বেসামাল হই নাই। বলিলাম, “কথাটা ভদ্রোচিত না হইতে পারে, কিন্তু সত্য।” যুবতীও বলিল, নিশ্চয়ই। এমন সত্য বলিয়া বীরের মত কথা বলিতে আপনাদের ভারতবাসী জানে না। আপনি গুজরাটী না রাজপুত? আমি বলিলাম, “আমি বাঙ্গালী।” “বাঙ্গালী ? বাঙ্গালী কি ? “ভারতের মধ্যে সর্বপ্রধান সভ্য জাতি।” “হ্যা, ঠিক, মনে পড়েছে, বাবা বলেছেন, বাঙ্গালী বড় বিদ্বান্ জাতি, তা না হলে দপ্তরখানা চলে না, আমার কোন বাঙ্গালীর সাথে আলাপ নাই, মাপ করবেন।” আমি বলিলাম, “তবে আজ আপনার সুপ্রভাত বলতে হবে, এটা নতুন জানােয়ার দেখলেন।” “নিশ্চয়ই। আপনারা তবে এমনি খাটি সাহেবও হ’তেই পেরেছেন। “কথাটা ঠিক বুঝলাম না, মাপ চাই।” “অর্থাৎ ঠিক আমাদের মতন পােষাক পরেছেন, আমাদের মতনই কথা বলছেন, আমার ত বিশ্বাস ছিল ভারতবাসীরা এমন পারে না।” প্রগলভার কথাটা একটু তিক্ত লাগিল, আমিও বলিলাম, “আপনি কি খাটি ইউরােপিয়ান নিভাঁজ চান?”
নষ্টোর যুবতী এবার কুদ্ধ না হইয়া আরও হাসিল, বলিল, “পনার কি মনে হয়? আমার ত সন্দেহ হয়।” যুবতীর মুখখানা আদাদে যেন খুব নাচিয়া উঠিল। *এ সন্দেহ কিসে হলো আপনার?” বলিয়া যুবতী বিশেষ উৎসুক নেত্রে আমার মুখপানে তাকাইয়া রহিলেন। আমি বলিলাম, “তা বলব না, বলা বেয়াদুবি।” মুবতী তার মুখ পরিবর্তিত করিয়া গম্ভীর করিয়াই বলিল, “আমিই আগে বেয়াদবী কচ্ছি, আপনাকে বলতেই হবে, কিসে আপনার মনে এ সন্দেহ ?” আমি অগত্যা বলিলাম, “অবিমিশ্র ব্রিটন বা শাসন রক্তে এমন চক্ষু গড়ে ওঠে না। যুবতী যেন বড়ই খুসী হইল, বলিল, “আপনি অত্যন্ত বুদ্ধিমান্ সন্দেহ নাই। আমি পিতাকে আপনার জন্য অনুরােধ করবােই। সাত দিন পরে পিতা ফিরবেন। এ সাত দিন আপনি কোথায় থাকবেন?” “আমি নিকটেই একটা কাঠের বাড়ীর একটা ঘর ভাড়া নিয়েছি।” “কি বােকা? ঐ বড় হােটেলটা দেখতে পান নি?” “আমি সাহেবের হােটেলে খাই না, নিজে ঘরেই পাক করে খাই।” “আশ্চৰ্য। তা হলে দিনে ৪৫ ঘণ্টা আপনার রাধতে খেতে চলে যায়? এমন অলস লােকের ত ব্যবসা করা পাের না। পিতা শুনলে আপনাকে কারবারের লােক বলেই পছন্দ করূবেন না।” যুবতীর কথাটা চিন্তার বিষয় হইল বটে। প্রকৃত পক্ষে ভােজন ব্যাপারের বাধা বাধি বা চুয়ায়ি ভাবটা আমি বিশেষ ভাবে কখনই মানিয়া চলি না। ব্যয়ের সংক্ষেপ হইবে বলিয়াই এ বন্দোবস্তটা করিয়া- নষ্টোর ছিলাম। ওই যুবতীর কথায় বুঝিলাম, এটা আমার ভুল হইয়াছে, কাজেই ভুল শােধরাইতে বলিলাম, “আপাতত এই ভাবে দাঁড়িয়েছি, এখন দেখে শুনে যা হয় করা যাবে।” অভিবাদন করিয়া বিদায় হইতেছিলাম, যুবতীটা বাধা দিয়া বলিল, “আপনি ত জেনে গেলেন না, আপনার সন্দেহটা ঠিক কি না? অমি বলিলাম, “অতটা কৌতুহল আমার নাই।” তবু আমি বলছি, আপনার সন্দেহ ঠিক। আমরা পর্তুগীজ, আমার মায়ের মা শুনেছি বাঙ্গালীর মেয়ে ছিলেন, মায়ের বাবা তাকে কেড়ে এনেছিলেন। আমার বাবা বলে থাকেন, এই পুরুষেও আমা থেকে ভারতের গন্ধ উঠে যায় নাই।” আমি কৌতুহলের নেত্রেই আবার তাহার মুখখানা ভাল করিয়া দেখিলাম এবং বলিলাম “অবশ্য আপনার সততই চেষ্টা যাতে এই গন্ধটা মুছে যায়।” “ও, আপনার বেয়াদুৰিটার অনেক প্রশ্রয়ই দিয়েছি।” যুবতী এবার রােষকটাই করিল। আমি অভিবাদন করিয়া প্রস্থান করিলাম। ( ২ ) হোটেলে বাসা লইলাম না। আদির ব্যবস্থা সেইখানেই করিলাম। চারটা বিদায় করিয়া দিলাম। সত্যই সময় অনেক বাচি নষ্টোর গেল, খরচও খুব বাড়িল না; খেতাজ মহিলাটীর পরামশট মূল্যৱা বলিয়াই গ্রাহ করিলাম। সকাল বেলায় চা পান করিতে বসিয়াছি। আমার পাশেই একজন গুজরাটী ও আর একজন বার্মিজ ভদ্রলােক বসিয়াছিলেন। সাহেবের সকলে শ্বেতাঙ্গ না হইলেও, খানিকটা দূরে বসিয়া আভিজাত্যটা রক্ষা করিতেছেন। সে দিনকার সেই যুবতী মিস্ রােজি জোসেফও তাহাদের মধ্যে আসিয়া বসিল। বসিয়াই আমার দিকে চাহিয়া বলিল, “এই যে মিষ্টার সিং, সাহেবদের হােটেলে এসেছ, জাত থাকলাে কই।” এই বলিয়া পার্শ্ববর্তী শ্বেতাঙ্গব্যক্তিকে বলিল, “এই বাঙ্গালী যুবকটা বেশ চলনসই ভদ্রলােক।” অমি অভিবাদন করিলাম মাত্র, বাক্যালাপ করিলাম না। অতপুরে বসা লােকের সঙ্গে আলাপ করা আমি মৰ্য্যাদার হানিজনকই মনে করিলাম, চা পান সারিয়া বেড়াইতে বাহির হইলাম। ঘােট একটা নদী বা সূতির ধার দিয়া জারুল গাছের ছায়ায় ঘুরিতেছি ; মিস্ রােজি আসিয়া বলিল, “আজকার সকালটা বেশ মিষ্টই বটে!” আমি বলিলাম, “পূর্ব দেশের সকাল বেলা সকলটাই এমনি, এত শীতে জড় শড় পশ্চিম দেশ নয়। আরও এ এপ্রিল মাস।” তার চেয়ে আরও আজ এমন সময়ে আপনার সঙ্গে বেড়াবার নান্দাদের সুযােগ পাওয়া গেল।” “ধন্যবাদ, আমার সঙ্গ কি আপনার এত মিষ্ট ?” “নিশ্চয়ই, আপনার চেহারাটা আমার মিষ্টই লেগেছে।” গৰ ধন্যবাদ। মি রােজি কতক্ষণ মৌনাবলখন করিয়া কি ভাবিল, তারপর বই হাসিয়া বলিল, “আচ্ছা বলুন ত, আপনার জীবনের লক্ষ্য কি?
নষ্টোদ্ধার আমি দ্বিধামাত্র না করিয়া বলিলাম, আমার জীবনের লক্ষ্য অর্থ- অর্ধবা হওয়া।” “আপনি টাকাই খুব ভালবাসেন?” “নিশ্চয়ই, টাকার চেয়ে কাম্য বস্তু আমার কিছুই নয়।” “আমরা কিন্তু শুনেছি, এই পূর্ব দেশের লােকগুলি বিশ বছর না হতেই বালিকাদের ভালবেসে বসে। আপনারা নাকি ভালবাসার জন সাথে পেলে রাস্তায় পড়ে অনাহারে দিন কাটাতে পারেন।” “হ্যা, আমাদের ভালবাসা এমনি পবিত্র ও মধুর বটে, তবে আমি ও সবে নাই।” বেশ, আপনার তবে কিছু আশা আছে।” মেনি ভাবে রােজীর সঙ্গে আমার বিশেষ ভাবে মেলা মেশা চলিতে লাগিল। ক্রমে জানিলাম রােজী যাহাকে পিতা বলে, তিনি রােজীর প্রকৃত পিতা নন, রােজীর মাতার দ্বিতীয় পক্ষের স্বামী ; তবে রােজীকে তিনি বড়ই ভালবাসেন। ক্রমে আরও জানিলাম, রােজী একজন মার্কিন যুবককে বিবাহ করিতে ইচ্ছা করিয়াছিল, কিন্তু যুবক এক দিন কথাচ্ছলে প্রকাশ করিয়া ফেলিয়াছিল, রােজী পিতৃহীনা নিতান্ত দরিদ্র বালিকা, তাই দয়া করিয়া সে তাহাকে বিবাহ করিতে প্রস্তুত। যুবকের এইরূপ মনােভাব বুঝিতে পারিয়া রােজী তাহাকে উপেক্ষা করিয়াছে। সে এমন কাহাকেও স্বামী করিবে না যে তাহাকে কোনও অংশে ছােট বা হীন বলিয়াই মনে করিবে। সংসারে যে সর্বোৎকৃষ্ট ব, স্ত্রীলােকের সেই হচ্ছে স্বামী, পুরুষের পক্ষে স্ত্রীও তাহাই। এতে আবার সেই দয়ার কি আছে। স্ত্রী যদি তার স্বামী-বন্ধুর প্রতি দয়াবান দাতার নজরেই চেয়ে থাকিবে, তবে তাহার স্বাধীনতা কোথায়, সুধই বা কি?
নষ্টোর ডুবন সত্যই রােজীর এ কল্পনাটুকু আমার মন্দ লাগিল না। এমন হইল, রােজীর সঙ্গ আমার বড়ই প্রতিকর ঘােধ হইল, কাজ কর্মের অবসরে তাহাকেই মনে পড়িত, সেও যেন গণ মাত্র আসিয়া আমাকে কত গল্প করিয়া অনিল দান করিত। প্রবাসে এমন সৎসঙ্গ সৌভাগ্যের বিষয়ই বলিতে হইবে। রােজীর পিতার সঙ্গে আমার ব্যবসায়ের কথায় পাকাপাকি হইয়া গেল। আমি প্রতি বৎসর ৬ লক্ষ টাকার বাহাদুরী কাষ্ঠের রপ্তানি লইব, বর্তমানে এক লক্ষ টাকার অর্ডার লইতেছি, পঞ্চাশ হাজার টাকা নগদ দিতেছি, আর পঞ্চাশ হাজার ৪ মাস পরে দেয়। কথাবার্তা ঠিক হইয়া যখন ব্যাঙ্কের কথা উঠিল, তখন মিষ্টার যােসেফ, শিহরিয়া বলিয়া উঠিলেন, “হা ঈর, তবেই ত হয়েছে, আপনার ব্যক্ত ।যে লাল বাতি জেলেছে, শুতে পান নাই?” আমি স্তম্ভিত হইয়া সাহেবের মুখের দিকে চাহিয়া রহিলাম, সাহেব একখানা টেলিগ্রাম আমাকে বাহির করিয়া দেখাইলেন। আমার পায়ের তলে পৃথিবীটা ঘুরিতে লাগিল। কোনও প্রকারে সে স্থান হইতে আমার বাসাবাড়ী পর্যন্ত ফিরিয়া আসিলাম, ছােট কাঠের সিড়ি ভাঙ্গিয়া উঠিতে, পা পিছলাইয়া গিয়াছিল। তার পর দু’দিনের খবর কিছু রাখি না। যখন আমার জ্ঞান হইল, তখন বুঝিলাম আমার বাম পায়ে একটা ব্যাণ্ডেজ বাধা, সর্বাঙ্গে অত্যন্ত বেদনা। বড় পিপাসা, জল চাহিলাম। একখানি সুন্দর হাতে আমার মুখে হােট মাসে করিয়া সরবৎ ঢালিয়া দিল। দুতিনবার চাহিয়া চিনিলাম, রােজী আমার শয্যার পাশে বসিয়া সেবা করিতেছে। তখন একবার মাধবীর কথা মনে হইল, আমি যদি এই নির্বান্ধব দেশে মরিয়া যাই, তবে মাধবীর কত কষ্ট নষ্টোর ইবে? আৰ এই রােজীই বা কত ব্যথা পাইবে। কিন্তু যেমন আরও একটু জ্ঞান হইল, অমনি আমার সর্বনাশের কথা মনে পড়িল- যাঙ্ক ফেল হইয়া আমার আশার বাসা চুরমার হইয়াছে।আমার আকাশ কসুম কল্পনা কোথায় উড়িয়া গিয়াছে; এর চেয়ে আমার মরণই মঙ্গল। মরিলাম না, রােজী আমাকে বাঁচাইয়া তুলিল। সেই নির্বান্ধব মগের মুলুকে খেতাঙ্গমহিলা সকল রকম এম কষ্ট উপেক্ষা করিয়া, প্রতিক্ষণ আমার সেবায় নিযুক্ত থাকিত, তাহারই সেবায় আমি চিলাম। কিন্তু বাচিয়া লাভ কি? কলিকাতার গােলা হইতে খবর গেল, ব্যাঙ্ক ত ফেল হইয়াছে, অধিকন্তু যাহার উপর গােলার ভার দিয়া আসিয়াছিলাম, সে যাহা হাতে পাইয়াছে, লইয়া পলাইয়াছে। গােলার সরকার মহাশয়, আমাকে শুষ ফিরিয়া যাইতে পত্র লিখিয়াছেন। আমি রােজীকে স্পষ্টতঃ বলিলাম, আর ফিরিব না, সাগর জলেই এ দেহ, রক্ষা করিব। রাজীও স্পষ্ট বলিল, “না, তােমার ভয় নাই প্রিয়তম, আমার পঞ্চাশ হাজার টাকা আছে, তােমাকে দিচ্ছি, তুমি কারবার ঠিক করে। কিন্তু বলল, তুমি আমার হবে?” আমি স্তম্ভিত হইয়া গেলাম। বুঝিলাম না এ যুবতী বলে কি? বলিলাম, “আমি ত বুঝতে পাচ্ছি না তােমার কথা ভদ্রে।” রােজী বলিল, “কথা আর কিছু নয়, তুমি আমায় বিবাহ কর। আমি স্বাধীন মিষ্টার যােসেফ, আমার পিতা নয়, আন ত। আমার পিতার আ হাজার টাকার আমি একাকিনী অধিকারিণী। যে টাকা লাগে নাও, চল আমরা কলিকাতায় চলিয়া যাই, তবে এই খানেই আমাদের বিবাহ কাৰ্য্যটা একটা গির্জায় গিয়া সম্পন্ন হয়ে যাক। T নষ্টোর হায় মাধবী। মাধবীর কথা মনে পড়িল। কিন্তু আমি যে টাকার শশাকে মরিতে বসিয়াছি, মাধবীর কথা ভাবিবার আমার সময় কই। মাধবীর বিবাহে দশ হাজার টাকা লাগিলেও আমি দিতে পারি, বাংলায় এমন শিক্ষিত বরের অভাব কি হইবে যে, দশ হাজার টাকায় কিনিয়া দিতে পারি। রােজীকে গির্জায় গিয়া বিবাহ করিলাম। ধৰ্ম্মাধর্মের বিচার করা আমি নিস্পয়ােজনীয় মনে করি। ধৰ্মালােচনা-প্রবৃতি আমি মানুষের একটা মানসিক দুর্বলতা মনে করি। বিশ্বসৃষ্টির কর্তা কেহ থাকেন ভালই, তাহার জন্য মানুষের ভাবিবার কি আছে? যখন হিন্দু ধর্মে থাকিয়াও, কোনও দিন হরিনাম কালীনাম করিবার অবকাশ পাই না, তখন খৃষ্টসমাজে নাম লিখিলেই বা ক্ষতি কি? খৃষ্ট ৰা কৃষ্ট কিছুই আমি বলিব না ইহা ঠিক সমস্ত ঠিক হইলে, সস্ত্রীক কলিকাতা আসিয়াছি। এ দেশটার কি একটা মােহিনী শক্তি। গঙ্গার তীরে নামিয়াই আমি কেমন হইয়া গেলাম। মাধবীকে স্মরণ করিয়া আমার প্রাণ যেন কি একটা যাতনায় জ্বলিয়া উঠিল। বালীগঞ্জে বাড়ী ঠিক করিয়া রােজীর সংসার পাতাইয়া দিতে হইল, বাঙ্গালী টোলার কারবার তুলিয়া সাহেব টোলায় আনিতে হইল। কিন্তু এত কাজের মধ্যেও আমি মাধবীকে ভুলিতে পারি নাই। অনুসন্ধান করিয়া জানিতে পারিলাম, মাধবীর ঠাকুরমা মার গিয়াছেন, মাধবী আপনাদের আশ্রয়ে আছে। মাধবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করিতে সাহস হইল না। তবু একদিন ও পাড়ায় একটা হােটেলের, ছাদে দাঁড়াইয়া মাধবীকে ছাদে বাঁড়ান দেখিয়াছিলাম। মাধবী সুখী কি দুঃখী, তাহা অতদূরে থাকিয়া বুঝিতে পারিলাম না, তাহার মুখ ভাল করিয়া দেখিতে পারিলাম না।
নষ্টোর তাহার পর সেদিন শুনিতে পাইলাম, মাধবীর সঙ্গে, আপনার বিবাহ স্থির হইয়াছে। আপনারা মহাশয় ব্যক্তি সন্দেহ নাই। আপনাকে কি বলিয়া ধন্যবাদ দিব বুঝিতে পারিতেছি না। আপনি শুধু নিরাশ্রয় বালিকা মাধবীকে আশ্রয় দিলেন না, আমাকে ঘাের বিপদ হইতে রক্ষা করিলেন। আপনার কাছে আমার বড় অনুরােধ, বিবাহের দিন বঙ্গভাবে আমাকে নিমন্ত্রণ করিবেন, আমি যদি যৎ সামান্য উপহার দিতে পারি, আপনারা গ্রহণ করিবেন। সতীশ বাবু এতক্ষণ কথাগুলি খুব তন্ময় হইয়াই শুনিতেছিলেন, এক্ষণে বলিলেন, “আপনার উচ্ছিষ্ট বস্তু যে আমি,গ্রহণ করূবাে, তা কি একটা ভাববার বিষয় নয় ?” আমি বড় ব্যথা পাইলাম, সতীশ বাবুর হাতখানি ধরিয়া বলিলাম, “ঈশ্বর সাক্ষী করে বলছি, মাধবী নিষ্কলঙ্ক পবিত্র কুসুম, আমি তাকে কোনও দিন স্পর্শও করি নাই।” তবু সতীশ বাবু আমাকে ক্ষমা করিলেন না বলিলেন, “আপনিত ঈশ্বরই মানেন না, তবে আবার ঈশ্বর সাক্ষী কি?” এবার আমি জবাব খুঁজিয়া পাইলাম না। আমার তখনকার মুখ দেখিয়া বােধ হয় সতীশ বাবুর দয়া হইল, তিনি নিজেই বলিলেন, “মানুষ তর্ক করিতে গিয়া, যত বড়ই নাস্তিক হউক না কেন, দায়ে পড়িয়া তাহাকে এমন অবস্থায় আসিতে হয়, তখন সে মনের অজ্ঞাত- সারেই একটা কিছু অজ্ঞেয় অবাচ্য শক্তির উপর নির্ভর রাখিতে বাধ্য হয়। এই শক্তিই ঈশ্বর, ইহাই নিয়ন্তা।” এই বলিয়া সতীশ চন্দ্র আমার নিকট হইতে চলিয়া গেলেন। আমি তাহাকে অভিবাদন করিবারও অবকাশ পাইলাম না।
বক্তা-মাধবী । ( ২ ) আমার কাহিনী আমাকে কিছু বলিতে হইবে বই কি। সতীশ দাদা সে দিন অনেক রাত্ৰি পৰ্যন্ত ও গৃহে ফিরিলেন না, তাঁহার মা ত ভাবিয়া অস্থির হইলেন। আমি কত ভাবিলাম, তাহা বলিয়া বুঝাইব কি? যখন তিনি গৃহে ফিরিলেন, তখন রাত্রি বারটা বাজিয়া গিয়াছিল। তাহার বিশ্রী গম্ভীর মুখভঙ্গি দেখিয়া মা বলিলেন, “কি রে সতীশ ? কি হয়েছে? কোনও অসুখ বিসুখ করেছে না কি ?” দাদা বলিলেন, “না, অসুখ আর কি ? অনেক ঘুরেছি, তাই পরিশ্রম হয়েছে। বড় ক্ষুধা পেয়েছে। খাইতে বসিলেন, বাড়া ভাতের অর্ধেকও খাইলেন না। কোনও প্রকারে হাত মুখ ধুইয়া শষ্যা লইলেন। হা জগদীশ্বর! এত চিন্তা ভারত হৃদয় পাতিয়া কখনও লই নাই। যে চিন্তাভারের একটুও কাহাকে বলিয়া লাঘব করিবার উপায় নাই, সে ভার এ যােণ বৎসরের প্রাণ কিরূপে সহ করিবে? মাথা ঘুরিতে লাগিল, বিছানায় পড়িয়া রহিলাম। পড়িয়া থাকিয়া থাকিয়া তা আসিতে লাগিল। তাহাতে কত রকম দুঃস্বপ্ন কুস্বপ্ন দেখিলাম। রাত্রি এক প্রকার কাটিয়া গেল। কিন্তু দাদার ত সাক্ষাৎ পাই না, তিনি প্রত্যুষেই বাহির হইয়া গিয়াছেন। দ্বিপ্রহরে গৃহে আসিয়া অতি সংক্ষেপে আহারাদি সারিয়া আবার কোথায় বাহির হইয়া গেলেন। রাত্রিতে আসিয়া ৰীয় শয়ন কক্ষে আর রু করিয়া শুইয়া পড়িলেন হয়। হায়। সতীশ দাদা। তুমি এত শিক্ষিত, এত উদার ? অামার উপর নার এত স্নেহশীল! কিন্তু এ কি নিষ্ঠুরতা তােমার ! আমি তােমার বালিকা ভগিনী, কত যাতনায় পলকে যুগ গণিয়া আমি দিন কাটাইতেছি, তাহা কি তুমি বুঝিতেছ না? আমি যে অকপটে তােমার দাদা ডাকিয়াছি, এত বড় বিচক্ষণ হইয়াও কি তুমি তাহা বুঝিতে পারিতেছ না ! আর ত লজ্জা সঙ্কোচ করিলে চলে না। আমি যে নিতান্ত অসহায় একাকিনী দুরন্ত দুর্তে গহন বনে ঘুরিতেছি, কত বড় অন্ধার ! বুঝি কত হিংস্র বা ভল্লুক আমার চতুর্দিকে বিচরণ করিতেছে! সাহস অবলম্বন আমাকে করিতেই হইবে! প্রিহরে দাদা স্নানের ঘরে যান করিতেছিলেন, আমি তাহার পায়ে লুটাইয়া পড়িলাম। দাদা আমাকে হাত ধরিয়া কাঁদিয়াই বলিলেন, “এখন না, রাত্রিতে সকলে ঘুমালে আমার ঘরে যেও।” বিস্ময় আরও বাড়িল, তবু সাগরে পতিতের কুল দেখার মত একটু ভরসায় নির্ভর পাইলাম। সে রাত্রি আসিতে যে কত বিলম্ব হইল, তাহার মাপ কাঠি তুচ্ছ ও ঘড়ির কাটায় সম্ভবে না, বড় একটা যুগের ভাঙ্গাগড়া ইহার মধ্যে ঘটিয়া যাইতে পারে। সকলে ঘুমাইল কি না জানিনা, আমি দাদার বারে আঘাত করিলাম। যার অর্গল বদ্ধ ছিল না, খুলিয়া গেল। এই টিপিয়া আমিই আলাে আলিলাম। দাদা শুইয়াছিলেন, উঠিয়া বসিলেন। তিনি ডাকিলেন, “মাধবী?” আমি বলিলাম, “আজ্ঞে। “কি শুনতে চাও? আমি দাদার মুখপানে চাহিয়া রহিলাম— আমার উত্তর না পাইয়া দাদা বলিলেন, “সংবাদ শুভ হলে কি আমি এত বিল করি?
নার : আমি পড়িয়া যাইতেছিলাম, দাদা আমার হাত ধরিয়া তাহার বিছানার পাশে বসাইলেন। আমি অনেক কষ্টে বলিলাম, “ভাল করে বলুন, আমি সইতে পারবাে।” “তােমার বিজয় নাই?” “সেই নির্বান্ধব বিদেশে হ্যা, মরেছে সে। একি কঠোর কণ্ঠস্বর দাদার। এমন রুক্ষ স্বরেত এমন সংবাদ কেউ বলে না। আমি তাঁহার মুখপানে চাহিয়া রহিলাম। দেখিলাম, তাহার বড় বড় চকু দুটা যেন জ্বলিতেছে, যেন কোনও মহাশত্রুর উদ্দেশ্যে সে প্রখর দৃষ্টি নিবদ্ধ, সম্মুখে পাইলে তিনি যেন তাহাকে পলকে নখছিন্ন করিয়া উড়াইয়া দেন। আমি চাহিয়াই রহিলাম। তিনি অতি কুকণ্ঠে বলিলেন, “মরেছে সে, কিন্তু দেহটা তার চিতায় পুড়ে ছাই হয় নাই, বা পচে গলে মাটী হয়েও যায় নাই। তার প্রেতাত্মা তার দেহ নিয়ে এখনও লীলা কচ্ছে! সে মরণের কথা শুন না বােন্ ভুলে যাও। এ কোন্ সমস্যা! দুঃখের সঙ্গে রাগ হইল। একটু উচ্চকণ্ঠেই বলিলাম, “দাদা। এ ত হেয়ালীর সময় নয়, স্পষ্ট করে সমস্ত বলুন।” দাদা স্পষ্টই বলিলেন, “বিজয় রেঙ্গুনে এক ফিরিঙ্গি যুবতী বিয়ে করে খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণ করেছে।” ৰে কঠে কথাটা বাহির হইল, তাহাতে অবিশ্বাস করিবার স্থান ছিল , তুবু আমার বিশ্বাস করিতে ইচ্ছা হইল না। বলিলাম “বিষয়টা আমায় খুলে বলতে হবে।” দাদা বিছানার নিয় হইতে একখানা কাগজ আমার হাতে দিয়া বলিলেন, “এই কাগজখানা পড়, অত কথা খুলে বলতে পারি না।”
নষ্টোর কাগজখানা আদ্যোপান্ত পড়িলাম। পড়িয়া তাহা বিছানায় পর রাখিয়া উঠিয়া দাড়াইলাম। সত্যই বলিতেছি, অনেকটা সুস্থই হইয়াছি। আমি ভাবিয়াছিলাম, লােকটা বােধ হয় সেই বিদেশে বিনা যত্ন সেবায় মারা পড়িয়াছে, দাদা যাহাকে মরণের চেয়ে দুর্ঘটনা মনে করিতেছেন, আমি ঠিক তেমনটা বুঝিলাম না। তিনি যদি ধনবতী নারী বিবাহ করিয়া যথেষ্ট ধনের অধিকারী হইয়া থাকেন, সে মন্দ কি, তিনি অর্থের কাঙ্গাল, তা ত আমি জানি। আমি চলিয়া যাইতেছি দেখিয়া, দাদা বলিলেন, “এখন কি কর্তে চাও?” কথাটা যেন আমার মনের উপর তপ্তলৌহ শলাকা বিদ্ধ করিয়া দিল। আমার যে এই আকস্মিক এত বড় দুঃখ, এ আঘাত যেন তাহাকেও ছাপাইয়া গেল। সতীশ চন্দ্র কি এত অধম, আমি যে সত্যিকার দাদা বলিয়া তাহাকে ভাবিয়াছি, ডাকিয়াছি। তিনি কি আমার এই ঘৃণিত দেহ পিণ্ডটার জন্য এমনি লালায়িত। তবু আমি যতটা পারি সংযত হইয়া বলিলাম, “কি বলেন?” “এখনও কি তুই সেই নরাধমের অনুরক্ত ?” নিশ্চয়ই। কায়মনােবাক্যে : “আশ্চৰ্য্য। আর সেখানে দাঁড়াইতে পারিলাম না। পােড়। বাড়ীটার এমন একটু নিরিবিলি যায়গা পাই না যে, একটু বসিয়া ভাবিয়া দেখি ব্যাপারটা কি হইল। তখনও বাটীর লােকগুলি ঘুমায় নাই। আমি গিন্নীমার কাছেই শুইতাম, তিনি ডাকাডাকি করিতে লাগিলেন, রাত্রি জাগিলে আমার অসুখ হইবে। তাহার ধারণা আমি পড়ার ঘরে বসিয়া তখনও পড়িতেছি। অসুখ হইয়াছে, রাত্রিতে খাই নাই; তিনি যে नडोशन ; আঙ্গুর বেদানা লইয়া বসিয়া আছেন। রাগ হইল অনেক, তবু তাহার কাছে গিয়া শুইতে হইল। আঙ্গুর বেদানাগুলিও সব গলধঃকরণ করিলাম, না করিলে বুড়ীটা ছাড়ে না, সাত রকম কৈফিয়ত চায়। তার চেয়ে সেগুলি অধঃকরণ করাই ভাল মনে করিলাম। কিন্তু আমার মনে বাজিতেছে, সতীশ দাদার সেই শেষ কথাটা, “আশ্চৰ্য্য!” শুইয়া পড়িলাম, আশ্চৰ্য্য ইহাতে এমন কি আছে ? কি এমন অন্যায় বিজয় করিয়াছেন যে আমি তাহার উপর জন্মের মত বিরক্ত হইয়া যাইব। সেই নির্বান্ধব বিদেশ, কেউ নাই সেখানে দরদের জন, জীবনের হাড় জল করা টাকাগুলি পলকের মধ্যে উড়িয়া গেল, জীবনের এত বড় আশা তাহার চূর্ণ হইয়া গেল, টাকার কষ্ট তিনি অনেক পাইয়াছেন, তাই ত টাকা তিনি অতি ভালবাসিতেন। সেই দারুণ টাকার শােকে তিনি মরণাপন্ন হইলেন; সেই শঙ্কট সময়ে একজনে প্রাণ দিয়া তাহাকে সেবা করিয়া বাঁচাইল। তার পর তাহার সর্বস্ব ধন রত্ন তাহাকে ডালি দিল, এ অবস্থার তিনি যদি সেই ভাগ্যবতীর করায়ত্ত হইয়া থাকেন, তবে এমন অন্যায় আশ্চর্য কি হইয়াছে ? কত বড় মহান উদার হৃদয় সেই ফিরিঙ্গি রমণীর।—যে অর্থহারা শােকাকুল দেখিয়া এক বিজাতীয় বিদেশী পুরুষকে সর্বস্ব দিয়া তাহার শােকে সাধনা দিল। এ ক্ষেত্রে তিনি যদি তাহার সম্মান রক্ষা না করিতেন, তবে কি যােগ্য হইত! বিজয় ত হীন অধম পুরুষ নন। কোনও দিনই ত তিনি হৃদয়ের অমৰ্য্যাদা করেন নাই। তিনি ত সেই বিজয়, মাঘের শীতে নিজে ঝাপিয়া ঠাকুরমার গায়ে নিজের ব্যাপারখানি জড়িয়া দিয়াছেন। বিজয় নারীর সম্মান, প্রেমিকার মর্যাদা রক্ষা করিয়াছেন, সে নারী নিশ্চয়ই পরমা সুন্দরী, বিখ্যাত বিদূষী, কত মধুর সেবায় তিনি বিরের তাপদ প্রাণ শীতল করিয়াছেন। বিজয়ের ভুবনমােহন রূপ, নটো বিশ্বমােহন স্বভাব, মধুর কণ্ঠস্বর, তাহাতে না মুগ্ধ হয় কে? তাইত সে যুবতী মুগ্ধ হইয়া পড়িয়াছেন! আশ্চর্য কি? তবু আমি যে তাহারই অনুরক্তা, এই কি আশ্চর্য্য! আমি তাহাকে পাইলাম না, তাহার ঘরে গৃহিণী হইয়া সংসার পাতিতে পারিলাম না, আশার আকাশ কুম দিয়া যে কল্পনার মন্দির রচনা করিয়াছিলাম তাহা চূর্ণ হইয়া গেল। সংসারে সকলের আশা পূর্ণ হয় না। স্বামীর ঘর করা ছাড়া কি নারীর আর কোনও সাধ আহলাদ আশা আকাকা থাকে না? এক পুরুষে অবহেলা করিল, আবার অন্য পুরুষের আশ্রয় না লইলে রমণীর জীবন চলিবে না? এ ত নারীত্বের বড় অবমাননা। ভালবাসিতে ইচ্ছা হইয়াছিল বিজয়কে, ভালবাসিয়াছিলাম, তিনিও ভালবাসিয়াছিলেন, আজ তিনি দায়ে পড়িয়া প্রবলার করগতা হইয়াছেন। কত নারীর স্বামী জেলে আটক হয় না। এই ত সেদিন কতগুলি পুরুষ দেশ স্বাধীন করিবার পাগলামি করিতে গিয়, চোর ডাকাত না হইয়াও যাবজ্জীবন দীপান্তরে গেল, তাই বলিয়া তাহাদের যাহারা প্রেমিকা, তাহাদের কথা কি তাহারা একবারে ভুলিয়া গিয়াছেন। আমার বিজয় নিশ্চয়ই আমাকে ভুলিতে পারেন নাই। আমি তাহাকে ভুলিব কেন? যাক না কিছুদিন, তিনি যখন খুব বড় লােক হইবেন, কত বড় অট্টালিকা তাঁহার হইবে, গাড়ি ঘােড়া দাস দাসীতে ঘর ভরা থাকিবে, তখন আমি একদিন তাহাকে দেখা দিয়া বলিয়া আসিব প্রাণাধিক, তুমি আমার কথা ভাবিয়া ব্যথিত হইও না, আমি ভালই আছি। সমস্ত রাত্রি অনেক ভাবিলাম। প্রভাত হইল, সূৰ্য্যটা উঠিল, যেন আগুনের কুণ্ড হইয়া। সহরের কাকগুলি ডাকিল যেন মড়কের ঘােষণা ফরিয়া। ময়লাটানা গাড়িগুলি যেন আছড়াইয়া গড়াইয়া মরিতেছে। জন কোলাহল যেন বি কলহ করিয়া উঠিল। আলােক নষ্টোর দেখিয়া ভাবনাটা আর একদিকে ছুটিল। এখন আর এখানে থাকি কি করিয়া? এত লােকের মুখ দেখাদেখি করিয়া, কথা বলিয়া জিজ্ঞাসা বাদে উত্তর কাটিয়া এখন এখানে থাকি কি করিয়া ? যাই বা কোথায় ? এত বড় দুনিয়াটায় কি আমার যাইবার স্থান নাই ? হস্ত পদ চক্ষু কর্ণ সবই ত আছে, যে জন মনের মত তাহাকে পাইলাম না বলিয়া আমার স্থানই পৃথিবীতে নাই ? দাসী ইহতে গিয়াছিলাম, দাসীত্ব পাইলাম না বলিয়া কি জীবনের কোনও মূল্যই আমার নাই? দাসত্বই কি জীবের একমাত্র লক্ষ্য? লতা দাসত্ব চায় বৃক্ষের, নদী দাসত্বের জন্য ছােটে সাগরােদ্দেশে, ফুলও বুঝি বাতাসের দাসত্ব যাচিয়া তাহার গন্ধ ছড়ায়, আবার মানুষ দাসত্বের ভিক্ষায় তার চেয়ে বড় মানুষের দ্বারে ঘােরে। নারীও সেই নিয়মে নরের দাসীত্ব আশায় পতঙ্গের বহ্নি পরশের মত উড়িয়া পড়িয়া ছট ফটু করিয়া মরে। এ যদি সৃষ্টি নিয়ন্তার নিয়ম হয়, আমি সে নিয়ম ভঙ্গ করিব। এমন কি কেউ করে না? কত চোর ডাকাত নরঘাতক বিশ্বকর্তার নিয়ম মানে না, তবু তাহারা এই বিশ্ব জগতেই বাস করে। সে দিনটা গেল। সবাই আমায় আদর করিতে আসে, আমার মুখ শুকাইয়া গিয়াছে, আমার চো বসিয়া গিয়াছে। রাখিয়া দাওনা তােমাদের আদর যত্ন নেহ মমতা, ও সব বাজে মিথ্যা কল্পনায় মজিবার সময় আমার নাই। সতীশ দাদার কাছে গেলাম, বলিলাম,—স্বচ্ছন্দে স্পষ্ট স্বরে চোক তুলিয়া বলিলাম, “দাদা, তােমার সেই “আশ্চৰ্য্য” কথাটার জবাব দিয়া যাই নাই, আজ জবাব দিতে এসেছি।” দাদা যেন কত কাতরেই বলিলেন, “উত্তর দিতে হবে না মাধবী, আমি উত্তর পেয়েছি।” “তবে আপনি আমায় স্নেহ করেন ?”
নষ্টোর “বােনকে কোন ভাই গেহ না করে?” “তবে আমার একটা উপায় করুন।” “কি উপায় করবে, বলল।” “আমি ঘােট, কিছুই ত জানি না দাদা, তাইত তােমার কাছে এসেছি।” “আমি তােমায় বাের্ডিংএ রেখে পড়তে দেবােতুমি রাজি আছ?” “নিশ্চয়ই, এইত তুমিই আমার উপায় করে দিলে, এমন ত আর কেউ পাত্ত না। তবে আজই, দেরী করা চলবে না।” দাদা তখনই বাহির হইলেন, আমি তাহার পিছনে পিছনে চলিলাম। সকলে অবাক হইয়া তাকাইয়া রহিল, কেহ কিছু জিজ্ঞাসার অবকাশ পাইল না। সতীশ দাদা বাড়ীর গাড়িতে বড় চড়িতেন না, আজ ও চড়িলেন না। একটা ট্যাক্সি ডাকিয়া আমারে তুলিয়া লইয়া চলিলেন। আমি একটা মেয়ে স্কুলের প্রথম শ্রেণীতেই ভৰ্ত্তি হইলাম, দাদার সুপারিশে। ( ২ ) পর বৎসরই পরীক্ষায় পাশ করিয়া ফেলিলাম। সতীশ দাদা আসিয়া বলিলেন, “আমি আমেরিকা যাচ্ছি, যাবি মাধবী ?” আমি বলিলাম, “যাব দাদা, আমায় নিয়ে যেতেই হবে।” খানিকটা গাড়িতে চড়িয়া জাহাজে চড়িলাম। সমুদ্র বড়ই চমৎকার। এত বড় বিরাট সে, কোনও দিকেই তাহার যােত নাই, সে আবার নষ্টোর ৬ ; ৫ কোন্ ক্ষুদ্রের দিকেই ছুটিতে যাইবে? সূর্যের তপ্ত চাহনীতে সে ফুলিয়া উঠে, অনুরাগে নয়, রাগে, এত বড় বিরাটের বুকে সে আসে আবার রাগ ছড়াইতে! সমুদ্র যখন স্থির, তখন মাটীর চেয়েও স্থির, বুক চিরে জাহাজগুলিকে যাইতে দেয়, নড়েও না ; আমাদের নদীগুলি নিতান্ত ছােট, তাইত একখানা ঘােট ষ্টিমার গেলেই রাগে আছাড় খাইয়া মরে। কিন্তু সমুদ্র যদি খেপিয়া যায়! বাতাস বােধ হয় সমুত্রের চেয়েও বড়, সেই পারে সমুদ্রকে খেপাইতে। একদিন ছােট রকম একটু ঝড় হইল। জাহাজের কর্তা আমা- দিগকে কামরায় গিয়া এর বদ্ধ করিয়া শুইয়া থাকিতে আদেশ করিলেন, স্ত্রীলোেকগুলির উপরই তাহার হুকুম কড়া, কেউ ডেকে বেড়াইতে পারিবে না। আমি বলিলাম, তােমার ও জাহাজের সরকারী আমাকে দিলেও আমি করিতে পারি। একটা মেম একদিন কুটুম্বিতা করিতে আসিল, কিচমিচ করিয়া বলিল, তুমি ভালবাসার জনের সাথে সমুদ্রযাত্রায় এসেছ, কি সুখী তুমি ?” দাদার সামনে বসিয়াই কথাটা,-মেমটার মুখে একটা চড় মারিলাম, “আমরা ভাই বােন্ দেখ না পােড়র মুখী।” মেমটা বাঙ্গালীর মেয়ের চড়টা খাইয়া লজ্জায় আর উচ্চ বাচ্য করিল না। মার্কিন দেশের কথা একটু বলিব বই কি? কেন যে এদেশের লােক বিলাত হইতে সাহেব হইয়া ফিরিয়া আসিয়া সাহেব ভক্ত হইয়া পড়েন তাহা আমি যথার্থই বুঝিয়া আসিয়াছি। সে স্বাধীন রাজ্যের মধু মাটীতে সর্বত্রই যেন স্বাধীনতার গন্ধ ছুটিতেছে। সকলই স্বাধীন,—মুটে, মজুর, কুলী মেথর সবাই স্বাধীনতায় প্রফুল্ল। সত্যই বলিতেছি, এখানে খ্রীপুরুষে মেশামেশি ভাব দেখিলে বিষদৃশ লাগিত, এখনও লাগে, সেখানে স্ত্রীপুরুষের অবাধ মিলন মােটেই বিরক্তিকর বােধ হইত না।
নষ্টো সেখানে কাহাকে ও দু’দও বসিয়া গল্প করিতে দেখিলাম না। কেবল কাজ, কেবল ছুটাছুটি। একটা বাড়ীর তিনতলায় আমরা বাসা লইলাম, দু’জনের দুটি ছােট ঘর। খাওয়ার ব্যবস্থা হইল একটা হােটেলে। সে দেখি, একটা হিন্দু হটেল, ডাল ভাত তরকারী মেলে। দাদা যাইয়াই একটা সংবাদ পত্রে চাকরী লইলেন, আমাকে লইয়াই তাঁহার মুস্কিল। চাকরী না লইয়া আমাকে পুষিবেন কি করিয়া । আমি জাহাজে একমাস থাকিয়া দাদার সঙ্গে ইংরাজী কথাবার্তা বলিয়া তখন বেশ ইংরাজী বলিতে কহিতেই শিখিয়াছি, চলিতে ফিরিতে বিশেষ অসুবিধা হইল না। একটা ডাক্তারী স্কুলে ভর্তি হইলাম ; অপরাহু চারিটায় সে স্কুল বসে, ছাত্র শিক্ষক সকলই স্ত্রীলােক। স্ত্রীরােগের চিকিৎসাই শিখিতে হয়, স্ত্রীরােগীর শুশ্রুষা করিতে হয়। দশটা রাত্রি পৰ্যন্ত অবিরাম খাটিতে হয়। সেখানে ভারতবাসী ছাত্রী আমি ছাড়া তখন কেহ ছিল না, তাহাতেই সেখানে আমার যত্ন আর বরং আরও বাড়িল, সকলেই আমাকে স্নেহের চক্ষে দেখিতেন। একদিন একটা যন্ত্ৰ ভাঙ্গিয়া ফেলিয়াছিলাম, তার জন্য ফাইন দিতে হইল, কিন্তু কর্ত কেমন স্নেহের হাসিটা হাসিয়া বলিলেন, “অসাবধান হয়ে না মা।” অবশ্য ঠিক ‘মা’ কথাটা বলিলেন না, ইংরাজী শব্দেই বলিলেন, কিন্তু তাহারই মধ্যে আমি যেন সুমিষ্ট “মা” কথাটাই বুঝিতে পারিলাম। দাদা সকালে কাজে যান, বারটায় ফিরেন, আবার দু’টায় তাঁহার কলেজে যান, সাতটায় ফিরেন। তিনি দর্শন শাস্ক পড়েন। তাহার 'খাটুনি দেখিয়া আমার দুঃখ হয়, আমারই জন্য তাহার এই খাটুনি। সমস্ত দিনটা একলা ঘরে বসিয়া থাকি, বড়ই বিশ্রী লাগে। আমারই ঘরের সম্মুখে আর একটা মার্কিন মেয়ে থাকিতেন, আজ কদিন দেখিতেছি তিনি অনু, খইয়া থাকেন, ইচ্ছা করে কাছে গি ৭৮ নষ্টোদ্ধার তাহার একটু শুশ্রুষা করি, কিন্তু তেমন রীতি নাই,আদা বলিয়াছেন। সে দেশে বিনা পারিশ্রমিকে কেহ কাহারও সেবা নেওয়া অপমান বােধ করেন। একদিন সে যুবতী আমাকে হাত ছিনাইয়া হােট করিয়া ডাকি, লেন, আমারই সমবয়সী হবেন তিনি। আমি কাছে গেলে বলিলেন, “আপনি ত সারাদিন বসে থাকেন, কাজ কর্ম কিছু করেন না?” আমি বলিলাম, “কি আর করবাে? সেই ৪টায় স্কুল।” “চাকরী করবেন ?” “কি চাকরী ? কোথায় পাই ?” “আমার একটা চাকরী আছে, দু’দিন আমি অসুস্থ যেতে পারি না, আর দু’দিন না গেলে আমার সে চাকরী থাকবে না। তা হলে আমি বড় বিপদে পড়বে। আপনি যদি একটা সপ্তাহ কাজটা করেন, তবে আমার উপকার হয়, আমি একটু সুস্থ হয়ে নিতে পারি।” আমি ভাবিলাম, ক্ষতি কি ! দেখি না কাজটা কি ? কিন্তু পারিব কি না সন্দেহ। তিনি বলিলেন, “একটা চায়ের দোকানে চায়ের কাপগুলি এগিয়ে গুছিয়ে দিতে হবে। সাতটা থেকে নটা কাজ। এখনই রওনা হউন।” পাঁচ মিনিটের মধ্যে তিনি সকলই আমায় বুঝাইয়া দিলেন। আমি তখনই বাহির হইলাম, দাদা তখন ছিলেন না, তাহাকে না বলিয়া কাজটা গিয়া একটু বাহাদুরী করিবারই ইচ্ছা হইল। সাত দিন কাজ করা হইল, সে ত মুনিবের কাজ করি বলিয়া বােধ হইল না, যেন আপনার কাজই করিতেছি। সাত দিন পরে মাহিনা, পাইলাম। এতগুন টাকা, আমাদের দেশে আমার মত মেয়ে সাত মাসেও তাহা কামাইতে পারে না। সাত দিন পরে সেই বন্ধুকে বলিলাম, “এখন আপনি কাজে যেতে পারেন ত?” } নাম্বার তিনি বলিলেন, তিনি আর একটা সুবিধা মত কাজ পেয়েছেন, আমি যদি ঐ কাজটা করি, তবে তিনি সেই কাজে যান। তাঁহার মুখের হাসি আর কথার ভঙ্গি দেখিয়াই বুঝিলাম, আমাকে একটা কাজ দেওয়াই ভঁহার মতলব। আমাকে বসিয়া থাকিতে দেখিয়া তাহার কষ্ট বােধ হইয়াছিল। দাদাকে তখন বলিয়াছি, তিনি আপত্তি করিলেন না। পরে একদিন সেই চায়ের দোকান হইতে আসিবার কালে একটা স্ত্রীলােক বেশ বয়স হইয়াছে, আমাকে বলিলেন, “আপনার আর এক ঘণ্টা সময় হবে কি ?” জিজ্ঞাসিয়া জানিলাম, তিনি আমার কাছে ভারতের ভাষা শিখিতে চান, শীঘ্রই তিনি ভারত ভ্রমণে বাহির হইবেন। আমি হিন্দী আর বাংলা শিখাইতে পারি বলিলাম। তখনই তিনি আমাকে নিয়া তাহার ঘরে গিয়া বসিলেন। এক ঘণ্টা তাহাকে ইংরাজী শব্দগুলির বাংলা ও হিন্দি তর্জমা ইংরাজী হরপে লিখিয়া দিতে হইল তাহাতে এক সপ্তাহ পরে আর অতগুন টাকা পাইলাম। বাহবা দেশ কিন্তু, এ দেশে আমার লােকে বেকার থাকিয়া কষ্ট পাইবে কেন ? আটটা মাস এই ভাবেই গেল। আমার সেই বন্ধু মিস্ মনির কাছে একটু কৃতজ্ঞতা জানাই ভাবি, কিন্তু এই আট মাসের মধ্যে অবকাশই পাইনা। তাহার দেখাও কদাচিৎ পাই। এক দিন দেখি তিনি বেশ সাজিয়া গুজিয়া আমার ঘরে আসিয়া বলিলেন, আমি ত চলে যাচ্ছি আমি বলিলাম, “কেন ? কোথায় ?” তিনি সেদিন আধঘণ্টা সময় নিয়াই আলাপ করিলেন। তাঁর ডিগ্রি নেওয়া গিয়াছে, আর পড়াশুনা হইবে না। এখন গৃহধর্মে মন নষ্টোত্তার দিতে হইবে। তাহার পিতা তাহার বিবাহ স্থির করিয়াছেন। আগামী পূর্ণিমার দিন বিবাহ। বিবাহের পর তাঁহারা আর স্কুল কলেজে পড়াশুনা করেন না। যাইবার সময়ে আমার হাতখানি ধরিয়া বলিয়া গেলেন, “আমার বিবাহের নিমন্ত্রণে তােমাকে কিন্তু যেতে হবে ভাই, আমি কার্ড পাঠাইব। তােমার দাদাকেও পাঠাব,নইলে তুমি একা যেতে পাবে না।” যথা সময়ে আমেরিকার বড় সহর নিউইয়র্ক হইতে আমাদের নিমন্ত্রণ কার্ড আসিল। নিমন্ত্রণ পত্রের নিম্নে মিসমণির পিতার নাম লেখা, দাদা পড়িয়া বলিলেন, “এ কি ? এ যে মস্ত বড় বড় লােক?” ভাই বােন নিমন্ত্রণ খাইতে চলিলাম, আমি আমার দেশের নিয়মে সাড়ি সেমিজ পরিয়ই গেলাম। বিবাহ বাড়ীতে গিয়া এ দিক ও দিক দেখিয়া অবাক, আলােক মালার এত ঘটা ত জীবনে কখনও দেখি নাই। ঢােল কাশী বাজিতেছে না বটে, কিন্তু পিয়ান অর্গান বাশীর ধ্বনি বড় মিষ্ট বাজিতেছে ! দ্বারেই একজন প্রৌঢ় ভদ্র লােক। আমাকে দেখিয়াই হাতখানি ধরিয়া বলিলেন, “তুমি ত মিস্ মাধবী।” আমি হাসিয়া বলিলাম “হা।তখনই তিনি একজন পরিচারিকাকে আমাকে দেখাইয়া বলিলেন, এটা “মণির একটী ভারতীয় বন্ধু, বড় অন্তরঙ্গ, একে বাসর ঘরে নিয়ে যাও।” দাদার হাতখানি ধরিয়া বলিলেন, “নমস্কার, মিষ্টার ঘােষ।* একজন ভদ্র লােককে বলিলেন, “একে সভায় নিয়ে যাও, ইনি একজন ভারতীয় বিশিষ্ট ভদ্রলােক, এর পরিচয়টা বিশেষ করে সকলকে বুঝিয়ে দিও।” কর্মকর্তা আমাদের এতটা তত্ত্ব লইয়াছেন ভাবিয়া আমার আনন্দের সীমা রহিল না। ইহাদেরও বাসরােৎসবের রীতি আছে। ধর্ম মন্দিরে বিবাহ সম্পন্ন হইলে বাড়ীতে আসিয়া বাসনােসব হয়। এত কাল পরে ৮১ নষ্টোত্তর মার্কিন দেশের বাজে গল্প শুনিলাম। আমরা যত লােক আহারে বসিলাম, কেতুই চুপ করিয়া বসিয়া খাইল না, কেবলই হাসি আমােদ গল্প। মিসমণি এখন মিসেস টথ আমাকে কাছে বসাইয়া আমার হইয়া সকলকে বলিলেন, ইনি অনেক দূরের লােক, তাই আমাদের সঙ্গে আমােদে মিশতে পাচ্ছেন না।” যেমন রাত্রি দশটা বাজিল, অমনি সে উৎসব বাড়ী একবারেই নীরব, একে একে সকলই বিদায় সম্ভাষণ করিয়া চলিয়া গেল। আমরাও বাহির হইলাম। ট্রেণে আসিয়া দাদাকে বলিলাম, “এত বড় বড় মানুষের মেয়ে পাঠাবস্থায় চাকরী করিতেন, এটা ত বড় আশ্চৰ্য্য!” দাদা বলিলেন, “এখানকার সকলই আশ্চর্য! আমি বলিলাম, “এই দেশে থেকে গেলে হয়।” দাদা হাসিয়া বলিলেন, “তবেই হয়েছে, কি নিয়ে থাকবে ? ঐ যে আমাদের দুখানি ঘর, ওর ভাড়া কত জান, সাত দিনে পঞ্চাশ টাকা, অর্থাৎ মাসে দু’শ। এখানে আবার সাত দিন অন্তর দেনা পাওনা চুকান রীতি। আমি অবাক হইয়া গেলাম, এ সব খবর আমি রাখিতাম না। আমিও এখন মাসে প্রায় দুইশ টাকার মত রােজগার করি, সেই চাকরী আছে, আরও স্কুলে আমাদের শিক্ষক ডাক্তারেরা ঘােট ঘােট রােগীর বাড়ীতে আমাদিগকে কল দেন, তাহাতে মাসে মাসে বেশ কিছু পাইতাম। তাহাড়ে বিতাম, আমার জন্য এখন আর দাদাকে বেগ পাইতে হয় না। এখন ত শুনিয়া অবাক! অপ্রতিভ হইয়া আর কথা বলিলাম না। দুই বৎসর পরে দেশে ফিরিলাম ; দাদা কতকগুলি উপাধি পাইলেন, আমি পাইলাম। দাদা সেই মার্কিন দেশেই মাসে শ তিনেক টাকার একটা কাজ জোগাড় করিয়া আসিলেন। দেশে বসিয়াই ছারতের কথা আমেরিকার সংবাদ পত্রে লিখিবেন, সে সংবাদ পত্রের নষ্টোর কর্তা তাহাকে তিনশ টাকা দিবেন। আমি কেবল লেভি ডাক্তার হইয়াই দেশে ফিরিলাম। মহাসাগর পাড়ি দিয়া যাই পূৰ্ব দেশের হাওয়াটা গায়ে লাগিল, সত্যই যেন মেহময়ী মা তাঁহার অঞ্চল বাতাসের পয়শ সন্তানের গায়ে বুলাইয়া গেলেন। জন্মভূমির ঐ দুর প্রসারিত তরু কুঞ্জের ক্ষীণ রেখাটা দৃষ্টিগােচর হইল, অমনি যেন প্রাণটা নাচিয়া উঠিল। সেই সঙ্গে মনে হইল, বিজয়, আমার বিজয় জানি কেমন আছেন ? এতকাল কথাটা একবারে ভুলিয়া না গেলেও মনের মধ্যে বিশেষ আধিপত্য বিস্তার করিয়া থাকিতে পারে নাই। সহরে আসিয়া ঘর ভাড়া করিয়া লেডি ডাক্তারের সাইনবাের্ড দিয়া বসিলাম। দাদা একটা কলেজের প্রােফেসারি পাইলেন। ( ৩ ) দুই এক মাস আয় উপার্জন সামান্যই হইল। দুই একটা কল যাহা পাই, তাহাতে টাকা পাই অতি সামাই। বেশ বড় লােকের বাড়ীতে ডাকিয়া নিয়াও, ফি দিবার সময়ে তাহারা বলেন, তাহারা গরীব লােক, আট টাকার স্থলে ৪ টাকা নিতে হইবে। বিশেষ আপত্তি করি না, কতই বা টাকার আমার প্রয়ােজন, বাড়ী ভাড়ার পর গােটা পঁচিশেক টাকা হইলেই যথেষ্ট। ঝিটাকে গােটা আটেক টাকা দিতে হয়।
নষ্টোর আমার আপন জন নাই, সেইটাই এখন আমার বিশেষ অারামের ইল। সাগরপারে গিয়াছি, বাইশ বছর বয়সেও বিবাহ করি নাই, সুতরাং আমার জাতি নাই; এ কৈফিয়ত কাহাকেও দিতে হইল না ; কোনও জ্ঞাতি কুটু সামাজিক স্বজনের সঙ্গে মিশিতে পারি না বলিয়া কোনও রূপ ব্যথা বেদনা বােধ করিতে হইল না। দাদার কিন্তু হইয়াছিল, তাহার ভাইদের সঙ্গে তাহাকে পৃথক হইয়া পৃথক বাড়ীতে বাস করিতে হইল। ভাইএর দুটী কন্যা বিবাহ যােগা; আমেরিকা ফেরত ভাইএর সংবে থাকিলে হয়ত হিন্দুর ঘরে তাহাদের কন্যার বিবাহ নাও হইতে পারে। মা অনেক বলিয়া কহিয়া ছেলেকে প্রায়শ্চিত্ত করাইয়া শােধন করিয়া লইলেন। আমার উপর তিনি যাহা চটিয়া গেলেন, তাহা আর কি বলিব ? তাহাকে প্রণাম করিতে গিয়া পা দুই ফেলিয়াছিলাম, তখনই তাহাকে গঙ্গাস্নান করিতে হইল। এক দিন ভাবিলাম, বিজয়ের বাড়ীতে গিয়া একবার দেখিয়া আসি কেন তিনি কেমন আছেন। বাড়ীর অনুসন্ধান করিতে বেগ পাইতে হইল। তাহাকে বৎসরে অন্তত তিনবার বাড়ী বদলাইতে হয়। প্রথমে এক বাড়ীতে গিয়া শুনিলাম, তিনি এখানে নাই অন্য বাড়ীতে উঠিয়া গিয়াছেন। সেখানে গিয়া শুনিলাম, সবে কাল তিনি উঠিয়া এলগিন রােডে গিয়াছেন। এবার ঠিক ধরিলাম। এক দিন গিয়া বাড়ীটা চিনিয়া আসিলাম, দারােয়ানের কাছে জানিয়া আসিলাম বাবু কখন বাড়ীতে থাকেন। দারােয়ান বলিল সাহেব সকালে বাহির হন, আর রাত্রে দশটার আগে ফিরেন না। তাইত ভাল, তাহার সঙ্গে দেখা হওয়াটাই ভাল, আগে দেখিয়া লই তাহার ঘর করা কেমন চলিতেছে, যে ভাগ্যবতী আমার রত্ন কাড়িয়া লইয়াছেন, তিনি সে অমূল্য মানিক পরিয়া কত গৌরবে আনন্দে দিন যাপন করিতেছেন।
নষ্টোর তবু তাহাকে একটু দেখিতে ইচ্ছা করে বই কি? চকের দেখার অধি- কার আমার কে হরণ করিবে? সাজিয়া গুজিয়া সকলেই বাহির হইতে- ছিলাম, এমন সময়ে একটা বড় ঘরের ভদ্রলােক আসিয়া আমায় কল দিলেন ; না গেলে নয়, তাহার কন্যাটী গর্ভাবস্থায় মূৰ্ছা গিয়াছেন; তিনি ভয়ে এক বারে মুহমান। যাত্রায় বাধা পাইলাম, কলে যাইতে হইল। সর্বনাশ! এ যে সাংঘাতিক এক্লামসিয়া নােগ! আর একটা বড় ডাক্তার ডাকাইলাম। আট দিনের মধ্যে সে রােগী ছাড়িয়া আসিতে পারিলাম । ডাক্তারটা নামে খুব বড়, পাঁচ সাতটা অক্ষরে তাহার টাইটেল, দেহেও খুব মস্ত বড়, একটা হাতীর ওজন হইবে। কাজে দেখিলাম, গােবরগাদার কচু, ছুঁলেই গলা ধরে। সেই রােগীটার সম্মুখে ডাক্তার সাহেব রসিকতা করিতে গেলেন। দুই একবারে সামলাইয়া গেলাম, তৃতীয় বারে তাহাকে অমন বাঁকা মুখে বাহিরে যাইতে আদেশ করিলাম যে, এত বড় দেহধারী হইয়াও তাহাকে ভয় পাইতে হইল। সেখানে এক রাশি টাকা পাইলাম। দৈনিক ৪০ টাকা হিসাবে দশ দিন। টাকাগুলি আনিয়া বাক্সে ফেলিয়া আবার শুভ প্রভাতে বাহির হইলাম বিজয়কে দেখিতে। ট্যাকসি গেটে ধরাইয়া দেখিলাম, ড্রাইভার গাড়ী ঠিক করিয়া গেটে খাড়া রহিয়াছে, নামিয়া একটু সরিয়া দাড়াইলাম। বিজয় আসিয়া গাড়ীতে চড়িলেন। এ কি? এ যে কেবল অস্থি চর্মের কাঠামাে। সে উর্বসী মনােমমাহন রূপ, মধুর হাস্য, নিগ্ধ মুখশ্রী কোথায় গেল। তবে কি কোনও ডাকিনী আমার বিজয়কে অধিকার করিয়া বসিয়াছে। একটা লাইট পােষ্ট ধরিয়া দাড়াইলাম। গাড়ীটা ছাড়িয়া দিলে তবে গেটে প্রবেশ করিলাম।
৫ নষ্টোদ্ধার উপরে উঠিতেই একটা পাগড়ী মাথায় চাপরাস আটা বয়’ তাড়িয়ে আসিয়া বলিল, “কাহা যাতেহ, উপর জানেক হুকুম নেই।” “জানে দাও বেতমিজ।” বলিয়া সিড়ি ভাঙ্গিয়া উঠিয়া পড়িলাম, ছেলেটা ফ্যাল ফ্যাল করিয়া তাকাইয়া রহিল। তিন চারিজন দাস দাসী ছুটিয়া আসিল, এক জন বলিল, “কি চাই মাই ?” বলিলাম, “মিসেস সিংহকে পাশ মােলকাত মাংতেহ।” এক জন খবর দিতে চলিল, আমি তাহার পিছেই চলিলাম। দেখিলাম সুন্দর সজ্জিত কক্ষে একটা গৌরাঙ্গী তরুণী চেয়ারে একাকিনী চা পান করিতেছে। তাহার মুখ দেখিয়া বােঝা গেল, সে যেন নেহাৎ মুস্কিলে পড়িয়াই এখানে একাকিনী বসিয়া রহিয়াছে। সে গরমের দিন, বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাস হইবে। আমি ঘরে ঢুকিয়া সুইটা টিপিয়া পাখাটা খুলিয়া দিয়া তরুণীর সম্মুখে আর একখানা চেয়ারে বসিয়া পড়িলাম। এই তরুণী আমার প্রণয়ের প্রতিযােগিনী, আমার উপর সম্পূর্ণ বিজয়য়িনী। তবু ইহাকে দেখিয়া আমার বিশেষ রাগ হইল না। এ ত কখনও আমার বিয়ের যােগ্য হইতে পারে না। এমন বিশ্রী বেদনা-মাখা বিরূপ মুখে সে আনন্দ ধাম এ অধিকার করিতে পারিবে কেন? তাই আমি পরাজিত হইয়াও জেত্রীকে দেখিয়া বিশেষ কষ্ট হইলাম না। যুবতী খুব বিষক্তি বিকট মুখেই বলিল, “কি চাই?” আমি হাসিয়াই বলিলাম, “আপনার সঙ্গে একটু দেখা কর্তে এসেছি।” 'প্রয়ােজন?” প্রয়ােজন, আমি ডাক্তার, আপনাদের মত বড় ঘরের সঙ্গে আলাপ পরিচয়টা থাকলে দরকার মত স্বরণে পড়তে পারি। ব্যবসায়ের দায়ে এসেছি আর কি। এ দেশের ডাক্তারেরাও কি ফেরি করে ঘােরে ?”
নষ্টোর ৬ = “পশার না জমা পৰ্যন্ত খুরতে হয় বই কি?” “তুমি দেখছি খুব বড় ডাক্তার কোথাকার শিক্ষা? “এমেরিকায়। ডাক্তার খুব বড়, এখনও নাম বেড়িয়ে পড়ে নাই। তােমাকে ত ভাই বেশ নােগাই দেখছি।” “বটে? তােমার ত খুব বিদ্যা দেখছি। কিসে বুঝলে আমি রােগা ?” “তােমার চোক মুখ দেখে, তােমার ভিতরে নিশ্চয়ই কেনেও রােগ আছে, যান্ত্রিকও হতে পারে মানসিকও হতে পারে।” “তােমার মনে হয়,–এর কোনটা ?” “মানসিক রােগ বলেই মনে হয় ; বােধ হয় তােমার প্রেমিকের সঙ্গে ভাল মিল খাচ্ছে না?” যুবতী এবার হাসিয়া পড়িল, বলিল, “আমার স্বামীর সঙ্গে অভাব? সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা, তিনি আমায় ভাল বাসতে একটুও টী করেন না?” “তবে তুমি তােমার স্বামীকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসছ না।” “সে আরও মিথ্যা কথা। আমি প্রাণ দিয়াছি, সর্বস্ব দিয়া তাকে ভাল বেসেছি।” “তা হতে পারে, তবু এর মধ্যে কি একটা দেখাপ বেয়াড়া কিছু আছে। তােমাদের সংসারটা আমি তেমন প্রেমে মাখা মিষ্টি বােধ কাম না।” যুবতী তখন নিজেই কেটলি হইতে এক পেয়ালা চা ঢালিয়া আমার সম্মুখে ধরিয়া বলিল, “চা-পান কর ভাই, তুমি বড় হাসির মানুষ।” আমি চা খাইতে খাইতে বলিলাম, “তুমি ভাই এতকাল বাঙ্গালী স্বামীর সহবাসে নিশ্চয়ই কিছু বাংলা শিখেছ, এসােনা বাংলায় কথা বার্তা বলি।
নষ্টোর যুবতী বলিল, “না আমি বাংলা কিছুই শিখি নাই, স্বামী আমার সঙ্গে বাংলা কথা কখনও বলেন না।” “ও, তবে কিছুই হয় নাই, ভাষাটুকুও আদান প্রদান হয় নাই, তখন হৃদয় ত অনেক দূর। তুমিই কেবল দিয়েছ, তিনি কিছুই দেন নাই।” তার তেমন কিই বা আছে যে দেবেন?” “আছে বই কি অনেক, দিতে পাচ্ছেন না। আর কারু অন্য তুলে রেখেছেন।” “আর তার কে আছে ? একদিন একটা জানােয়ার এসেছিল, সে নাকি মায়ের ভাই মামা। তাড়িয়ে দিয়েছেন, একখানা দশ টাকার নােট দিয়ে।” “টাকা পয়সা খুব জছে ত?” “কই আর জমছে? কারবারে লােকসান হচ্ছে।” “শেষে লাল বাতি জ্বালতে না হয়।” “না, তেমন কিছু নয়, খুবই ত খাটছেন, এবার কিছু সুবিধা দেখা যাচ্ছে।” “তবে আসি এখন” বলিয়া উঠিলাম। যুবতীটী নেহাৎ অভই নয়, আমার সঙ্গে সিড়ি পর্যন্ত আসিল। নামিবার সময়ে বলিল, “মাৰে মাবে এসাে দয়া করে।” আমি বলিলাম, “দয়া করে আমরা আসি না। আমরাও ব্যবসায়ী, লাভ দেখলে আসি।” “আপনার ফোন নম্বরটা বলে যান, আমি ডাক্বাে। আপনার নামটা ?
নষ্টোর আমি তখন নীচে পৰ্যন্ত নামিয়া হাে হাে করিয়া হাসিলাম। সে হাসিতে শ্বেতাঙ্গ যুবতী নীচে পৰ্য্যন্ত না আসিয়া পারিল না। এমন হাসি যেন সে অনেক দিন দেখে নাই। অভাগিনী ত জানে না, এমন ভাবে হাসিতে না পারিলে নারী মরিয়া যায়। কেবল দেনা পাওনা লাভ ক্ষতি লইয়াই সংসার পাতিয়াছে, হাসি আনন্দের সে কি জানে? পরম শত্রু যে, সে যদি এমন হাসি আনন্দে বঞ্চিত থাকে, তা দেখিলে আনন্দ না হয় কার ? আমি হাসিতে হাসিতেই আমার ফোন নম্বর বলিলাম। সেই সঙ্গে বলিলাম, তােমার স্বামী ডাকিলে কিন্তু আসিব , আমি পুরুষের ডাকে আসি না। নামটা মিথ্যা বলিলাম, সত্য বলিতে সাহস হইল না। ( 3 ) বাড়ীতে আসিয়া দেখিলাম, দাদা আসিয়া বসিয়া আছেন। তিনি নাকি আজ আমার মুখখানা খুব হাসিমাখা দেখিতে পাইলেন, আমি সুস্থ স্বচ্ছল আছি দেখিয়া বিশেষ আনন্দ প্রকাশ করিলেন। কতদিন আমাকে দেখিতে আসিতে পারেন না বলিয়া কটী স্বীকার করিলেন। আমার আয় উপার্জন কেমন হইতেছে জিজ্ঞাসা করিলেন। আমি বাসের চাবিটা খুলিয়া দিয়া বলিলাম, “অনেকগুলি টাকা পেয়েছি দাদা নিয়ে যান।” দাদা বলিলেন, “আমি টাকা নিয়ে কি করবাে ?”
নষ্টোদ্ধার “কি করবেন তা কি জানি? লােকে যা করে। মেয়ে মানুষে ত কিছু কর্তে পারে না।” দাদা টাকাগুলি বাহির করিয়া গনিয়া নােট, কঁচা টাকা পৃথক করিয়া বলিলেন, “এই ত সবে তিন শ বার টাকা,—এই হলো অনেক গুলাে ।” “আমিত এখন তিন মাস বসে খেতে পারি।” “তা বটে, তুমি বসে থাকবে, তবে আমি যে তােমায় পড়িয়ে শুনিয়ে মানুষ কর্তে এত টাকা দিয়েছি, তার কি হবে?” “সে টাকা আপনি দিলেও নেবেন না জানি।” “না নেবাে না। আমি কল্পতরু আর কি? আর তুমিত আমার ভারি বােন, মুখবলা বােন বইত নও।” আমি খুব হাসি হাসিলাম। তিনি বলিলেন, “কিছু খাবার টাবার দিবি না?” আমি একটুও অপ্রতিভ হইলাম না, বলিলাম “ঐ ত টাকা আছে, আনিয়ে খান না।” ঝিকে ডাকিলাম, ঝি সন্দেশ আনিল। ভাই বােনে বসিয়া খাইলাম। দাদা টাকাগুলি লইয়া উঠিয়া গেলেন। আমি ভাবিতে লাগিলাম, “বিজয়! তুমি গিয়ে আমায় যে এমন ভাই দিয়ে গিয়েছ, তাতেই আমি তােমার কাছে কৃতজ্ঞ। তােমার নিষ্ঠুরতায়ই ত দাদা আমার প্রতি এত স্নেহশীল।” তাহার পর ভাবিলাম, বিজয়, কি যন্ত্রণার তুষানলেই তুমি দিন কাটা। যাহাকে অর্ধাঙ্গিনী করিয়া সংসার পাতাইয়াছ, তাহার সঙ্গে ভাষা-বিনিময়টুকুও করিতে পার নাই। প্রাণের জনের সহিত মাতৃ নায় ভাষায় কথা না বলিতে পারার মত দুঃখ কি আর আছে। মার্কিন মুলুকে থাকিবার কালে দিন ভাের ইংরাজী বকুনি বকিয়া দিবার সঙ্গে মনটা কি বিশ্রী হইয়া পড়িত; দাদার সঙ্গে দেখা হইলে তবে দুটো কথা বলিয়া প্রাণ ঠাণ্ডা করিতাম। কি কষ্ট! যখন প্রাণ খুলিয়া উচ্চ হাসি হাসিয়া নাচিতে ইচ্ছা হইতেছে, তধন চুপটি করিয়া মুচকি হাসিটা দিয়া আদব বজায় রাখিতে হইবে।সে আবার অতি প্রিয়জনের সঙ্গে। বিজয়! তুমি আমায় ভুলিতে পার নাই। আমি তােমায় ছাড়িব না। আমার হারাণ মাণিক! অমূল্য র হৃদয় সর্বষ, হাসির আনন্দ, সুখের আশা, জীবনের সার, আমার ভক্তির দেবতা, শক্তির বিধাতা, সাধনার ঠাকুর, আমি তােমায় ছাড়িব না। তুমি আমার, আর কারু নও। ফোনে এলাম পড়িল, কাণ দিতে হইল। খবর আসিল জরুরি কেশ, প্রস্তুত হন। কলে যাইতে হইল, দাদা যে তাড়া দিয়া গিয়াছেন, টাকা অবহেলা করা চলিবে না। ঝি আসিয়া বলিল, রান্না খাওয়ার কি হইবে। আজ আর রাস্তা খাওয়া হয় না, একটা বামন দেখ,।” বলিয়া বাহির হইলাম। সেখানে গিয়া আর একটা ডাক্তারের সঙ্গে দেখা হইল। তাহার দেহটা নেহাৎ পাতলা, তাই বেশ লম্বা দেখায়। মুখে কপালে শিরগুলি জাগিয়া উঠিয়াছে, চকু দুটী কোটরে ঢাকা হইলেও বেশ বড় বড়, চাহনি দেখিলে ভয় হয়। মাথার চুলগুলি খাড়া থাকিতেই চায়, সুতরাং বাধ্য হইয়া বাবু তাহা ছাটিয়া ঘােট করিয়াই রাখিয়াছেন। রংটা ফরসা, তবে তাহার উপর চিত্রকর যেন পাতলা একটু তামার পোচ দিয়া টু কলার গ্রাউণ্ডের মত দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করিবার সুবিধা করিয়া দিয়াছেন। গোপজোড়া বেশ মােটা, বাবুটা তাহা না ছাটিয়া কাটিয়া বেশ বুদ্ধিমানের পরিচয়ই দিয়াছেন; তাহা না থাকিলে নভোচার হয়ত সে দেহে পুরুষের লক্ষণ না থাকিতেও পারে। সুট-পরা ডাক্তার- টীর দর্শন আমার নিকট বেশ নুতন বলিয়াই বােধ হইল। নাম শুনিলাম ডাক্তার ভদ্র এম, বি। ডাক্তার আমাকে ডাকিয়া একটা কামরায় নি গিয়া চুপে চুপে একটা কথা বলিলেন, শিহরিয়া উঠিলাম। তবু বলিলাম আচ্ছ রােগী দেখে নি। নােগীণী গৃহস্থের বিবধা পিতৃব্যপত্নী, ঠিক যুবতী নয়, প্রৌঢ় বয়সের কাছাকাছি। ৩২/৩৫ বৎসর বয়স হইবে। শুনিলাম রােগিণী পুরুষ ডাক্তারের ঔষধ খাইতে অনিচ্ছুক, তাই বাধ্য হইয়া মেয়ে ডাক্তার ডাকিতে হইয়াছে। গৃহস্থ পুলিশ কোর্টে মােতায়ী করিয়া খুব পশার জমাইয়াছেন, টাকা আছে। আমাকে ডবল ফি ৩২, টাকা দিতে চাহিলেন। আমি অন্য লােক ঘর থেকে সরাইয়া দিয়া রােগিণীকে বলিলাম, “আমার ঘরে যাবে দিদি। আমি তােমার সকল ভার নিতে রাজি আছি।” রােগিণী বলিবামাত্রই দ্বিতীয় কথা না বলিয়া সম্মত হইলেন। আমি বলিলাম, তবে চল এখনই। গৃহস্থকে বলিলাম, “আপনার সকল বিপদ আমি ঘাড়ে লইলাম, আমি রােগী বাড়ী নিয়া যাই। তবে আপনার পাপটা বােধ হয় চাইলেও পরকালের নিকাশী মুহুরী আমার ঘাড়ে দেবেন না। এতে আপত্তি করলে, আপনার ইহকালের সর্বনাশও আমি করে দিবাে।” সকলে ত অবাক! যেন বজ্রাহত। আমি কাল বিলম্ব না করিয়া রােগিণীকে গাড়িতে তুলিয়া চলিয়া আসিলাম। ফির জন্য হাত পাতিলাম, টাকা ছাড়িতে পারি না, দাদার তাড়া। গৃহস্থ বাবু কশিত হস্তে দুখানি দশ টাকার নােট আমার হাতে দিলেন। শুনিলাম মােকার হইলেও তিনি রায় বাহাদুর! কপালের জোর আহে।
নষ্টোর সন্ধ্যা বেলায় বাহিরের ঘরে একটু বসিয়াছি, বড় শান্তি বােধই হইতেছে। সেই যে মস্ত বড় দেহধারী ডাক্তারী, তিনি আসিয়া উপস্থিত হইলেন। আসিয়াই বলিলেন, “রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলুম একটু বসে যাই।” আমি বলিলাম, “এত অনুগ্রহ ! রােজই এই রাস্তা দিয়ে যান বোধ হয়।” “হ্যা, বােজই নয়, তবে প্রায়ই।” “যে দিন আপনার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল, তার পর থেকে?” “তা বটে, সেই দিন থেকে এ পথটায় যেন কে টেনে নিয়ে আসে।” বাবু বেশ হাসিলেন। আমিও ফেরতা হাসি দিয়া বলিলাম, “সার্থক আমার দেহটা, এত বড় পাহাড়ও টানতে পেরেছে।” “তা সত্যি, তােমাকে দেখলে বড় আনন্দ হয়।” “এরই মধ্যে ভুলে গেলেন, ভদ্র মহিলাকে তুমি না বলে, আপনি বলে সন্ত্রম দেখান সম্রান্ত লােকের কর্তব্য।” “আমাদের মধ্যে অতটা তফাৎ না থাকে এইটাই আমার ইচ্ছা।” জারের কড়া নড়িল, ঝি খুলিয়া দিল। সেই পাতলা ডাক্তার বাবুটী। সাদর সম্ভাষণে বসাইলাম। “আসুন, সুপ্রভাত।” মিষ্টার ভাদ্র ঘরে ঢুকিয়াই কিছু বিস্মিত হইয়াই বলিলেন, “এই যে, ভক্টর বসাক, সুপ্রভাত।” আমিও হাসিয়া বলিলাম, “বহবা, বৈশাখে মিলন, ভাত্র গুড়িগুড়ি ফোটা, আর তপ্ত বালির ফোয়ারা,বিদুঘুটে মেঘলা, আর আগুন ঢালা রােদ, পচা কাদা আর পা-পােড় পাথর। এ শুভ মিলন সুপ্রভাতেই লক্ষণ।”
নষ্টোর মিষ্টার ভাদ্র হাসিতে গিয়া মুখটী বিশ্রীভাবে বদিত করিয়া, বলিলেন, আপনি দেখছি বেশ সুকবি, আসুন না আমরা মিলে মিসে একটা মাসিক পত্র প্রকাশ করি।” তার প্রচ্ছদ পৃষ্ঠায় অবশ্য আমারই ছবিখানি ছাপতে হবে। আমি যখন বাথরূমে দাঁড়িয়ে স্নান করি, অমবা আয়না সুমুখে রেখে চুলে চিরুণী চালাই।” মিষ্টার বসাক বলিলেন, “রমণীই ত সংসারের রঞ্জিনী, ভুবন-মনন- মােহিনী, পুলক-প্রসাদ-দায়িনী সােহাগিনী, “রমন দায়িনী বলেই ত নাম রমণী।” “আবার জননী ভগিনীও ত।” এ কথায় কেহ উত্তর করিল না। আর অধিক ক্ষণ ইহাদের স্থান ও প্রশ্রয় দেওয়া উপযুক্ত বােধ করিলাম না। মনের প্রকৃত ভাব ব্যক্ত করিয়া পরুষ কণ্ঠেই কহিলাম, “আপনারা দেশের কোনও যুবতীকে ঘােমটা খুলে পথ চলতে দেখলেই বুঝি, মনের মধ্যে নরক রচনা করে বসেন। এই নারীর বুকে মায়ের স্বর্গসুধা লুকান, তা বুঝি মনেই আসে না * বাবু দু’টা থতমত খাইয়া তাহাদের বিশ্রী মূর্তি আরও বি করিয়া ফেলিলেন। উঠিয়া পলাইতে ইচ্ছা করিতেছেন, টেবলের উপর হইতে হাত নড়িল, কিন্তু পা নাড়িতে যেন ভয় করিতেছিল। আমি বলিলাম, “এক্ষণে নির্ভয়ে প্রস্থান করুন। মােটাটা উঠিলেন, পাতলাটা তবু বসিয়া রহিলেন। আমি বলিলাম, আপনি আর কি চান ? তিনি তবুও চুপে চুপে বলিলেন, “লােটা নেহাৎ ঘােট লােক।” হাসি পাইল, বলিলাম, “তবু আপনার চেয়ে ওজনে চারগুণ ভারি ( 2 ) কয়েক দিন পরে কল্ হইতে ফিরিয়া আসিয়া দেধি, দাদা বসিয়া আছেন। তিনি বাড়ীর ভিতর আর একটা স্বীলােক দেখিয়া বাহিরেই বসিয়া আছেন। আমি বলিলাম, “বাহিরে কেন, চলুন উপরে যাই। দাদা বলিলেন, আর একজন স্ত্রীলােক দেখলাম যে।” “বামুনী রেখেছি, আজ খেয়ে যেতে হবে দাদা।” “তােমার ঐ বামুনীর হাতে? আমা হতে ত হবে না।” উপরে গিয়া দাদাকে সকল কথা খুলিয়া বলিলাম ; তাহাকে ত কিছু গােপন করিতে পারি না। বলিতে খুব লজ্জা বােধ হইতেছিল, তবু না বলিয়া পারিলাম না। বড় ভয়ে ভয়ে বলিলাম, “দোষ করেছি किमाना?" দাদা ভাবিয়া বলিলেন, “দোষ কিছু নয় তবে বিপদ আপদ ঘটে। তার পর তিনি বলিলেন, তাহার একটা বন্ধু পত্নীর বড় পীড়া, তিনি একটা মফস্বলের মহকুমার ম্যাজিষ্ট্রেট। আমাকে তাহার স্ত্রীকে দেখিতে আজই যাইতে হইবে। তিনিও সঙ্গে যাইবেন। দুদিন ছুটি আছে, পরে তাহার সময় হইবে না। দাদার সঙ্গে যাইতে হইল। তাঁহার আদেশ অমান্য করিতে পারি না। গাড়ি ষ্টিমার চড়িয়া একটা দিন কাটাইতে হইল। পল্লী বক্ষে রজত হারের মত ক্ষুদ্র নদীটী ঘােট ঘােট তরঙ্গমালা নাচাইয়া শান্ত ােেত বহিয়া যাইতেছে; দুইধারে কোথাও গৃহস্থের সাজান বাগানের নষ্টোর } আম জাম নারিকেল কদলীর গাছগুলি নদী বক্ষে বুকিয়া তাহাকে ছায়া ঢাকা,করিয়া রাখিয়াছে, কোথাও পতিত ভূমির জঙ্গলে তীরভূমি দুর্গম অরণ্যে সমাচ্ছন্ন। কোথাও গৃহস্থের কুটীর তীর পর্যন্ত আসিয়াছে, মাঝে মাঝে সম্পন্ন গৃহীর অট্টালিকা দেখা যাইতেছে। ঘাটে ঘাটে পল্লী নরনারী গান করিতেছে, কাপড় কাচিতেছে, মেয়েরা কলসী কক্ষে ঘােমটা খাটো করিয়া আমাদের ষ্টিমার দেখিতেছে ; বালক বালিকায়। স্টিমারে আহত তীরে আছড়াইয়া পড়া ঢেউগুলির উপর লাফালাফি খেলিতেছে। মাঝে মাঝে বসতি নাই, বিস্তীর্ণ ধানের ক্ষেত ধান নাই, কাটিয়া নিয়া গিয়াছে ; সে মাঘ মাসের শেষ। স্থানে স্থানে কৃষকেরা পাতার ছাউনি দড়মার ঘেরা কুটীরের প্রাঙ্গনে ধান নাড়িতে। এক একটা স্থানে শ্মশানের কলসীর কাছে বাঁশ পােতা, অনেকগুলি, মড়ার খাটিয়া বিছানা ছড়ান। মরার কথা মনে পড়িলেই জীবিতের আতঙ্ক আসে। দাদাকে বলিলাম, “ওঃ ! ত লােকই মরেছে!” দাদা হাসিয়া বলিলেন, মিস বা ডাক্তার থাকলে এত মরে ! দাদা বড় দুষ্ট, ঘা দিবার অবসর পাইলে মােটেই ছাড়েন না। দাদা একবার গম্ভীর হইয়া বসিয়া বলিলেন, “দেখছ মাধবী, এই পল্লীমাটা হইতেই সরক্ত গিয়ে সহরের সে সৌধ-সাগর গড়া হয়েছে।” দাদার বন্ধু বাড়ীতে মহাসমাদরে অভ্যর্থিত হইলাম। তিনি সেখানকার রাজা, আমরা সেই রাজার অতিথি, কত অনুচর তাবেদার আসিয়া সেলাম নমস্কার করিল। রােগিণী দেখিলাম। মূল্যবান পরিচ্ছদালঙ্কারে ভূষিত হইয়া তিনি তাহার বিঞ্জ সুন্দর দেহখানি ঢাকিয়া রাখিয়াছেন, ভিতরে বিষের প্রবাহ বহিতেছে। পরীক্ষা করিলাম, তরুণীর ক্ষীণ অঙ্গে ইনজেকসনের পূচির আর স্থান নাই। রােগের নাম কতই বা করিব। রাগ যা হইল, এত রাগ বােধ হয় নষ্টোদ্ধার ৫ জীবনে কোনও দিন মাথায় ওঠে নাই। ক্রোধবশে বেহস হইয়াই বলিলাম, এ রােগের আবার চিকিৎসা কি? ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেবকে জিজ্ঞাসা কর, এক কোপে মানুষ কাটলে ত তার আইনে ফাঁসি হয়, বিষের আগুনে তিলে তিলে দছে মানুষ মারলে তার শাস্তি আইনে কি লিখে ?” দাদা ধমক দিলেন। তাহার ধমকে একটু হুসিয়ার হইয়া বলিলাম, “শুধু স্ত্রীর চিকিৎসা করিলে চলিবে না, স্বামীরও চিকিৎসা করিতে হইবে।” অনুসন্ধানে জানিলাম, এ বিষ ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব বিলাত হইতে লইয়া আসিয়াছেন।' রােগিণীকে বলিলাম, “দিদি, তােমার বাপের বাড়ী আছে ত?” জানিলাম তাহার বাপ ভাইও বড় লােক। ব্যবস্থা দিলাম অন্ততঃ, গােটা দুই বৎসর তাহাকে পিত্রালয়ে থাকিয়া ঔষধ ব্যবহার করিতে হইবে। দাম্পত্য প্রণয়টা এই দুই বৎসর একেবারেই ডুবাইয়া রাখিতে হইবে। সেই ছােট সহর হইতে, অনেক রােগী জুটিল। এক দিন, রাত্রি দেখিলাম, তবু ফুরাইল না। ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেবের বাড়ীতে একটা যােল সতের বৎসরের বালিকা দেখিলাম। বালিকাটীর বেশ নধর মাংসল দেহ, রংটা একটু ময়লা; কিন্তু শরীরের বিশুদ্ধ রক্তের জ্যোতি তাহার কিশাের কলেবরটা বড়ই উজ্জল করিয়া দিয়াছে। বেশ বড় দুটা চকু লজ্জার সঙ্গে করুণা মাখা। আমারই সেবায় সে নিযুক্ত, তাহাতেই অনন্তকৰ্মা হইয়া খাটিতেছিল। আমি বালিকাটীর পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলাম। সে কেবল নামটা বলিল, “দুলালী, দুলী তাহার খাটি নাম নয়। ম্যাজিষ্ট্রেটগৃহিণীর কাছে শুনিলাম, বালিকাটা তাহার মামার দেশের এক গরীব ভদ্র লােকের মেয়ে। ভদ্র লােকটা একটা ৯৭ নষ্টোর কলেজের ছাত্রকে যথাসাধ্য দান সামগ্রী দিয়া কন্যার বিবাহ দিয়াছিলেন। বরের পিতা সঘরের কন্যা পাইয়া কুল রক্ষা করিয়াছিলেন। বরের কিন্তু কালাে বলে বউ মােটেই পছন্দ হইল না, সেই সঙ্গে দান সামগ্রী ঘড়ি আংটি বিছানা বালিস কিছুই পছন্দ হয় নাই। তিনি ধর্ম সাক্ষী করিয়া প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন, এ স্ত্রী তাহার পরিত্যাজ্য। আবার বিবাহ করিয়াছেন কি না জিজ্ঞাসা করিলাম। জানিলাম এখনও করেন নাই। পল্লীগ্রামে আর বিবাহ করিবেন না, সহরে চেষ্টায় আছেন। ইহা ও শুনিলাম, সহরে তিনি এখনও কাজ কর্ম কিছু পান নাই, বি, এ পাশ করিয়া উমেদারী করিতেছেন। দুলালীর পিতা সম্প্রতি মারা গিয়াছেন, মাতা দুটা শিশুপুত্র নিয়া কষ্টে আছেন। ম্যাজিষ্ট্রেট গৃহিণী মামার বাড়ীতে নিমন্ত্রণে গিয়াছিলেন, দুলালীর প্রতি দয়া পরবশ হইয়া সঙ্গে লইয়া আসিয়াছেন। আমি বলিলাম, মেয়েটীকে আমাকে দাও, আমি ওর স্বামী ধরিয়া দিবার চেষ্টা করিব। সে গাধাটা নিশ্চয়ই আজ কাল ওকে দেখে নাই, সেই যা বার বছরে খুকিটী দেখিয়াছিল। এ মেয়ে যদি কুরূপ বলিয়া উপেক্ষিত হয়, সে ত নারী জাতির বড় অবজ্ঞা। দুলালী ত শুনিবামাত্র যাইতে চাহিল, তাহার স্বামী পাইবার বাসনা বড়ই প্রবল দেখিলাম। তাহার রক্ষয়িত্রীও অস্বীকৃত হইলেন । দাদাকে বলিলাম “মেয়েটাকে আমার নিতেই হইবে।” আমি যাহা সত্যি করিয়া মন দিয়া আবদার করি দাদা তাহা অগ্রাহ্য করেন না। সম্মতি দিলেন। পর দিন বলিলাম, একটু পল্লী-গ্রাম দেখিতে ইচ্ছা করে। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব নৌকা লােক যোগাড় করিয়া দিলেন। দাদার সঙ্গে পল্লী গ্রামে যাত্রা করিলাম। ছােট জরা, ছােট সূতি খাল, সে ভারি আনন্দ!
নষ্টোর ১৮ একটা কৃষক—গ্রামের মধ্যে নামিয়া হাটিয়া চলিলাম। কত গৰু কত গােলা মড়াই দেখিলাম। একটা বাড়ীতে ডাব কিনিয়া খাইতে চাহিলাম, তাহারা পয়সা লইল না, ডাব পাড়িয়া বাতাসা আনিয়া দিল, আমি ডাবের জলও খাইলাম, বাতাসা দিয়া ডাবের নেওয়াও খাইলাম, বড় মধুর লাগিল। বলিলাম, ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেবের লােক অড়িয়ে দাও, তার ভয়ে পল্লীবাসী ফলের দাম নেয় না। ভাই বোন মাত্র চলিলাম। কৃষক পল্লী ছাড়িয়া ভদ্র পল্লীতে ঢুকিলাম! গ্রামটীর নাম শুনিলাম চাপাতলা। নামটী শুনিবামাত্রই মনটা কেমন দমিয়া গেল। এ কোন্ চাপাতলা, বিজয়ের গ্রামের নাম শুনিয়াছিলাম চাপাতলা! আর ত কিছু জিজ্ঞাসিতে পারিলাম না; দাদা সঙ্গে। তবু দুই চারিবার ঢােক গিলিয়া বাধ বাধ করিয়া বলিয়া ফেলিলাম, “এ গ্রামে কোনও সিংহবাড়ী আছে ?” জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি বলিলেন, “সিংহ বাড়ী ছিল, এখন সে ভিট্টা ছাড়া রয়েছে । সে বংশে একটা ছেলে আছে, কলিকাতায় কারবার করে খুব বড় লােক হয়েছে, দেশে আর আসে না। জঙ্গলের ভিতর ভাঙ্গা ঘরটা পড়ে আছে মাত্র।” দাদাকে বলিলাম, “চল না দাদা সেই বাড়ীটা একটু দেখে যাই।” দাদা একটু হাসিলেন, আবার বিলক্ষণ বিমর্ষ মুখেই বলিলেন, “তা দেখে যেতে হবে বই কি? বিধাতা যে কাকে কোথায় এনে ফেলেন।” সেই লােকটাকে বলিলেন, “সে বংশের যে কুলাঙ্গার বড় হয়ে জন্মমাটা ভুলেছে, তার নামটা মশাই?” ভদ্র লােক বলিলেন, “নাম তার বিজয়, যে বিয়ে করে জাত খুইয়ে বসেছে।”
নষ্টোদ্ধার সেই বাড়ীতে গেলাম। চারিদিকেই জঙ্গল। কয়টা পােতায় টিপে বিবিধ গুল্ম জড়াইয়া বিছুটা ছাইয়া রহিয়াছে। ছােট একটা কোঠাঘর, বহুকালের পুরাতন, অসংস্কৃত ; জানালা দরজাগুলি খসিয়া গিয়াছে। একটা ঘরে ঢুকিয়া দেখিলাম, এক রাশি আবর্জনা ইদুর আরশােলার পূরীষে পরিপূর্ণ। দুর্গন্ধে দাড়াইতে পারিলাম না। বাহিরে চাহিয়া দেখি, কয়টা আম গাছে বােল ধরিয়াছে। একটার বােল ভরা ডাল ছাদে আসিয়া পড়িয়াছে ; ছাদে বসিয়া আমগুলি পাড়িতে কুড়াইতে কি আনন্দ! একটা গাছে পাতায় পাতায় টোপা কুল পাকিয়া রহিয়াছে। কলকগুলি আঁচলে ভরিলাম! পিছনে ফিরিয়া দেখি, দাদা দাড়াইয়া নিশ্চল। মেঘাচ্ছন্ন আকাশের মত তাহার মুখ খানা বিশ্রী গম্ভীর। চোক দিয়া যেন জল ছােটে। তখন সংজ্ঞা হইল, আহা! দাদাকে ত বড় ব্যথা দিয়াছি। কি পাগলামি করিতেছি। আঁচলের কুলগুলি ঝাড়িয়া ফেলিলাম। গ্রামের কয়েকজন মেয়ে পুরুষও সেখানে আসিয়া জমিয়াছিল, তাহারাও আমার এই অস্বাভাবিক চঞ্চলতা দেখিয়া বিস্মিত হইয়াছিল। আমি স্থির হইয়া দাদার কাছে দাড়াইলে, একজন বৃদ্ধা বলিলেন, “তুমি কাদের মেয়ে মা ?” আমি বলিলাম, “বসুদের।” “কোন ঘরের বউ ?” দাদাই উত্তর করিলেন, “শ্বশুরের ঘর ও এখন করে নাই, স্বামী নিরুদ্দেশ। একজন পুরুষ লােক জিজ্ঞাসা করিলেন, “এ বাড়ীটা দেখবার এত ইচ্ছা কেন?”
নষ্টাদ্ধার দাদা বলিলেন, “ওর ইচ্ছা এ বাড়ীটা কিনে নিয়ে এখানে এসে বাস করবে। “দাদার বুদ্ধির প্রখরতা দেখিয়া আমি প্রশংসা করিলাম। আমি যদি উত্তর দিতে পারিতাম, তবে এই উত্তরটাই দিতাম। আর একবার বাড়ীটার এদিক ওদিক চাহিয়া বিদায় লইলাম। যাহারা আসিয়াছিল, তাহারা যত্ন করিয়া বাড়ী লইতে চাইল। দাদা বলিলেন “আর সময় হইবে না। আমরা সহরে থাকি, পল্লী গ্রামটা দেখিতে আসিয়াছি। ) হা-ভগবান। আমার না কি কাজ ছিল না। কোনও কাজ জড়াইব না সঙ্কল্প করিয়াছিলাম এখন দেখি কাজ করিয়া অবকাশ পাই । সেই যে মােক্তারের বাড়ী হইতে একটা বিধবা কুড়াইয়া আনিয়া- ছিলাম, সে একটা কন্যা প্রসব করিয়াছে। ফুট ফুটে ফুলের মত মেয়েটা তাকে একটু কোলে কাখে না করিয়া পারি না; মা’টা তার কেবল কাঁদে আর ভাবিয়া শুকাইয়া যাইতেছে। এদিকে দিনে দু'তিন বার কলে ছুটিতে হয়, দাদার তাড়া টাকার দরকার। আবার দুলালীকে আনিয়াছি, তাহার স্বামী ধরিয়া দিতে হইবে। ছ'সাত মাস হইতে যায় তার চেষ্টাই করিলাম না। তাহার স্বামীর ঠিকানাটা জানিয়া আসিয়াছিলাম, একদিন গিয়া দেখিয়া আসিয়াছি, নষ্টোদ্ধার লােটা হাল চলনের বাবুই বটে। টিউশনি মাত্র সম্বল, আশানুরূপ চলনের মুসার নাই। একটা দুষ্টবুদ্ধি আসিল। খানকয়েক কাগজে লিখিলাম ; বি, এ, পাশ গৃহ শিক্ষক চাই, সন্ধ্যার পর একটা ছাত্রী পড়াইতে,—মাসিক বেতন ৩০ টাকা। তাহা সহরের গােটাকতক লাইট পােষ্টে লাগাইয়া দিলাম। পর দিন পিওন আসিয়া এক গাদা খামের চিঠি দিয়া গেল কি জালা! এত চিঠি আমি পড়ি কখন ? দুলালী মেয়েটাত কোনও কাজেরই নয়, ইংরাজী মােটেই জানে না, যে চিঠি গুলির নাম অন্ততঃ পড়িয়া দিবে। অনুগত ভৃত্যদিগের নামগুলি মাত্ৰ পড়িয়া লইলাম। পর দিন তাহার চেয়ে ডবল চিঠির গাদা। এখন যে আর একটা বিজ্ঞাপন দিতে হয় আমার চিঠি পড়িবার জন্য একজন লােক চাই। কলে যাইবার সময়ে গাড়ীতে যাইতে যাইতে পড়ি। পরদিন আরও চিঠি ! একখানা চিঠি পড়িয়া দুলালীকে ডাকি বলিলাম, দেখ, দেখি এই তাের মনােহর না কি? দুলালী লজ্জায় মুখ ফিরাইল। আমি চিঠি লিখি দিলাম, অপরাহু ৪টায় দেখা করিবেন। পরদিন দুপুর হইতেই টিপটিপে বৃষ্টি। নীচে নামিতে ইচ্ছা হইতেছিল না। উপরে থাকিয়া খুকী শকুন্তলাকে আদর চুম্বনে হাসাইয়া কাঁদাইয়া আন করিতেছিলাম। চারিটা বুঝি তখন বাজে নাই। ঘরে কড়া নড়িল। দুলালীকে বলিলাম, “দেখত কে এলাে?” দুলালী বলিল সে পারিবে না। ঝ। করিয়া কথাটা মনে পড়িল । আজত দুলালীর মনােহর আসিবার কথা ! আমি ভুলিয়া গেলে কি হয়। দুলালী সারাদিন ঘড়ির কাঁটার দিক নিশ্চয়ই চাহিয়াছিল। হায়রে মুঢ় বালিকা! এমনটা কি শুধু তুই একা করি? আমিও যে একটা ঘড়ির কাটার পানে তাকাইয়া একটা বছর কাটাইয়া দিলাম। ।
নষ্টোদ্ধার তাের ঘড়ির কাটা বার ঘণ্টায় ঘুরিয়া আইসে, বার বছরেও কাটা কি আমার ঘুরিবে। আজকার বাদলাদিনের মত মনটা ভার করিয়াই নীচে নামিতে হইল। ইহার আগেই ঝি দরজা খুলিয়া দিয়াছি। বাবুকে বৈঠকখানায় বসাইয়া বলিলাম, “যে বাদলা দিন, এমন দিনেও মানুষ ঘরের বার হয় ?” যুবকটী নেহাৎ বােকা ব্যাকুব ভাল মানুষটি নন। কথার উত্তর করিলেন, “দেখা যেত, এখন যদি রােগী বাড়ী থেকে একটা ডাক আস্ততা।” উপযুক্ত উত্তরটি পাইয়া খুসী হইলাম। বলিলাম “আপনি কি মনে করেন, টাকার কাছে মানুষের সুখ সুবিধার আরাম বিরামের কোনও মূল্যই নাই ?। “মানুষের সুখ সুবিধা ঐ টাকার উপরই নির্ভর করে।” “যাক, আপনি মনােহর বাবু?” যুবক আমার জবাবী চিঠি খানা বাহির করিয়া দেখাইল। আমি বলিলাম, “একটু অপেক্ষা করুন আমি আছি।” উপরে গিয়া দুলালীকে জিজ্ঞাসিয়া আসিলাম, কেমন এইত, দেখে যা। দুলালী উপর থেকেই আমার আগেই দেখিয়া লইয়াছে, আজ সে জানালার কাছেই বসিয়াছিল। আমি ফিরিয়া আসিয়া বলিলাম, “কাল থেকে আপনি সন্ধ্যা সাতটায় আসিবেন, ৯টা পর্যন্ত আপনার থাকিতে হবে, আমার একটা বােনকে পড়াতে হবে, বােনটা একটু হাবা গোছের নামও হাবী। জামাই বাবুটা খুব লেখা পড়া জানেন। এমন হাবা মেয়ে নিয়ে ঘর কর্তে চান না। আমার ঘাড়েই চেপে আছে। এ বােঝা আর কত দিন বই ?” একটু লেখা পড়া না শিখিয়ে পাচ্ছি না। অক্ষর পরিচয় চিঠি খানা পত্র থানা লিখবার মত বিদ্যা তার আছে।
নষ্টোর আর একটু বিদ্যা তাকে দিতে হবে, দুই একখানা নভেল নাটক পড়তে পারে, ইংরাজী চিঠির বার নামগুলি পড়তে পারে, বা লিখতে পারে। ত্রিশটী করে টাকা আমি দেবাে।” মনােহর অভিবাদন করিয়া উঠিয়া যাইতেছেন। আমি বলিলাম, “বােস, ব্যস্ত কি? তােমার ছাত্রীটীকে একবার দেখে যাও। দিন ভাল টাল আমরা মানি না । শুভ দিন শুভক্ষণে, বিশুদ্ধ বেদ মন্ত্র পড়ে, শালগ্রামের সম্মুখে হাত বাধাবাধি দেখেছি, তাত কত খুলে যায়। ওরে হাবী, এই তাের মাষ্টার এসেছে, দেখবি আয়, এক কাপ চা আর কিছু খাবার থাকেত নিয়ে আয়।” পােড়া মেয়েটা ভারি দেরী করিতে লাগিল। মনােহরের সঙ্গে আলাপ করিতে লাগিলাম। “আর কি কাজ কর্ম করা হয় ? “বি, এল ক্লাসে ভর্তি হয়েছি, আর কি করি। “ও একটা সুবিধা বটে, সরকারের লাইসেন্স নিয়ে জাল জুয়াচুরি শেখা যায়। ও হাবী ! এলি না, একবারে মরেছিস।” হাবী আসিল, চায়ের কাপ ও খাবার ডিস্ হাতে। ছুড়ীটা কাপছে। আমি বলিলাম, “দেখ দেখি ভাই, এ হাবীটা কি কখনও মানুষ হবে? আমি ওর একটা ভাল নামই বেছে রাখতে পাচ্ছিনা, হাবী নাম শুনলে কে আর ওকে নিতে আসবে? নামেইত গুণ জাহির হয়ে পড়বে। নামটা কি রাখা যায়, তােমার ঠাউরে দিতে হবে।” মনােহর হাবীর দিকে নিঃসঙ্কোচেই চাহিল। বুঝিলাম, ভাবনার কিছু নয়, চিনিতে পারে নাই। সে চায়ের বাটা হাতে লইয়া বলিল, “এর নাম রাখুন সবঙ্গলতা।”
নষ্টোন্ধার ১৪ “বেশ, ললিত লবঙ্গলতা পরিশীলন কোমল মলয় সমীরে। তুমি জয়দেব খানা সদ্য পড়ে এসেছ বুঝি।” মনােহর সে দিন চা বিস্কুট খাইয়া উঠিয়া গেল। হাবী বলিল “আমি পড়তে পারবাে না।” তাহার চোখে দেখি জল। বুঝিলাম! প্রাণে একটু ব্যথা লাগে বই কি। বলিলাম, ক’দিন আর পড়বি? এখন যত সত্বর পড়াতে পারিস, তাের উপর ক্ষমতার নির্ভর। ঐ মােটা চোকে অমন হাবা চাউনি চাবিত, মার খাবি। কেমন নামটা রেখেছে হাবি?” হাবীর পড়া আরম্ভ হইল। কয়েক দিন পরে দেখি রাত্রি দশটা বাজিয়া গিয়াছে, তবু হাবী পড়ার ঘর হইতে আসে নাই। ডাকিলাম, সেইখান থেকেই থেকেই বলিল, “মাষ্টার মশাই এখনও যান নাই।” এক দিন দেখি হাবী পড়ার ঘর হইতে আসিয়া ফুলিয়া ফুলিয়া কাঁদিতেছে। “কি হয়েছেরে? মাষ্টার মেরেছে না কি?” হাবী তবু কাঁদে। আদর করিয়া কোলে তুলিয়া লইলাম। মুখ চুম্বন করিয়া বলিলাম, কি হয়েছে বলত দিদি। হাৰী ফুলিয়া ফুলিয়া বলিল “আমি না হয় জানি, তিনি জানেন আমি পরী। দেবতার এমন দুর্মতি কেমন করে সহ করি বলল।” “দূর লক্ষ্মীছড়ি, ইংরাজী-পড়া বাঙ্গালীর ছেলে কি কখনও দেবতা থাকে? দেবতা তাদের করে নিতে হয় ? আজ মাষ্টারকে • জল খাবার দিয়েছিস?” “দিলে কি হয়? তার অর্ধেক আমাকে খেতে হয়। এত মিথ্যাচার কেমন করে আর করি দিদি? এতেও কি নারীর সতীত্ব থাকে।” - নষ্টোন্ধার হায়রে বােক। মেয়ে! তবুও তুই মন্ত্র পড়া স্বামী নিয়ে খেলা কচ্ছি। আমি কি করি তাত জানিস না। আমি যে এই পাঁচটা বৎসর ছায়ার পিছে ছুটে বেড়াচ্ছি। আমার মাথার মণি হারিয়ে গেছে কোন্ অন্ধকার অঙ্গীর কূপে। কত গভীরতা সে কূপের ? আমি তবু সেই অঙ্গার খুড়েই দিন কাটাচ্ছি। ঐ যে সপ্তাহে তিন চার বার মিসেস সিংএর কোন্ পেয়ে ছুটে যাই, স্বচক্ষে দেখে আসি আমার অমূল্যনিধির নরকদুর্গতি! তবুও আশা ছাড়তে পারি নাই। কোনও অপরাধ নাই তার ? জানি তিনি আমার। এত বড় বীর ভীমসেন, তিনিও রাক্ষসী মায়ায় ডুবিয়াছিলেন ? গােটা তিনেক মাস কাটিয়া গেল ! হাবীর মুখ পানে চাহিয়া বলিলাম, “হারে চুললামুখী, ডাক্তারের সমুখে থেকেও এত লুকে। চুরি, এখনও বলতে নেই ?” হাবী আমার বুকে পড়িয়া কাঁদিয়া আমার কাপড় ভিজাইয়া দিল। আমি বলিলাম নচ্ছরটাকে কিছু বলিস না কিন্তু, পালাবে।” শকুন্তলার মাও ব্যাপারটা বুঝিয়াছে। সে এক দিন বলিল, কি কর দিদি ? মাষ্টারটা তাড়াও।” আমি হাসিয়া বলিলাম, “তাড়াব যদি তবে এনেছি কেন? এখন তাড়িয়েই বা কি লাভ ?” “তােমার কি খেলাই এই ?” “হ্যা, এই খেলাই খেলে দেখব, দেখি এর সীমা কত দূর।” শকুন্তলার মায়ের যাহা দেহ মন, তাহাতে অধিক কথা বলা তাহার শক্তিতে কুলায় না। এখন আর সে রান্না করিতেও পারে না। নিজের দুটী হবিষ্য নিজে রেধে খায়, আর মেয়েটা কোলে করে বসে কাঁদে। আর মাঝে মাঝে শিহরে উঠে। তার মনের ভাব আমি বুঝি ; শকুন্তলার সুন্দর মুখের হাসিরাশি দেখে, যখন তাহার নষ্টোন্ধার মনে উঠে, একে কেমন করে মেরে ফেলতে যাচ্ছিল, তখনই বুক ভেঙ্গে সেই শিহরনটা তাহার সর্বাঙ্গ ঝাকা দিয়া উঠে। যথা কর্তব্য স্থির করিলাম। দাদার সঙ্গে পরামর্শ লইলাম। এতবড় গুরুতর ব্যাপার তাহার কাছে কি গােপন করিতে আছে ? নির্দিষ্ট দিনে, মনােহরকে উপরে ডাকিয়া লইলাম। তাহাকে বসাইয়া নিজে ধারের গােড়ে দাড়াইয়া বলিলাম, “হারে মনােহর এত বড় নচ্ছার তুমি? এ সর্বনাশের করি কি বল।” নিতান্ত ব্যাকুবের চাহিয়া লােকটা লােকটা বলিল, “কি বলছেন আপনি ?” “কি বলছি হতভাগা! বলি হাবী যে পােয়াতী।” লােকটা এত বড় মরদ, একবারেই কাঁপিয়া গেল। বুঝিবা আসন থেকে পড়িয়া যায়। বড় হাসি পাইল। স্ত্রীলােকের হাসি সময়ে বড় চাপিয়া রাখিতে হয়। ধমক আরও চড়া করিয়া বলিতে হইল, “তােমায় এতে কিছু বলবার আছে নাকি?” মনােহর তবু কথাটী বলিতে পারিল না, নত মুখ আরও নত করিয়া বসিল। আমি আর ও রুক্ষ হইয়া বলিলাম, “এখন বােক বিশ করম থাকলে চলবে না, বলি মেয়েটা এখন কোন কুলে যাবে ?” হাজার হউক, পুরুষ মানুষ, কত সইতে আর পারে ? এবার মুখ তুলিয়া বলিল, “এমন হাবা সমত্ত মেয়ে একটা যুবকের কাছে ‘অবাধে ছেড়ে দিয়ে আপনাদেরও এমন নিশ্চিন্ত থাকা ভাল হয় নি।” আমি এবার হাসিয়া ফেলিলাম। বলিলাম “ভাঙ্গা বেড়ার ক্ষেত দেখলে আর সামলিয়ে থাকতে পার না। চাষ এসে সিংএ দড়ি দিতে পারে, সে ভয়টা আর হলাে না। বেশ আমি ওর মা ভাইকে খবর নষ্টোর দিয়েছি, আছে তারা, এসে পুলিশে দিক, আর আদালত করুক, যা হয় করবে।” মনােহর উঠিয়া যাইতে চাহিল, দ্বারে দাড়াইয়া আমি বলিলাম “কোথা যাবে ভাই? ওর মা ভাই আসছে, আমি হাতে হাতে ধরে দেব, তার পর যা হয় হবে। তারা আসছে, এই আটটার গাড়িতে, আটটাত বেজে গিয়েছে।” বেজে গিয়েছে।” মনােহর ছুটিয়া আসিয়া পায়ের উপর পড়িতেছিল। আমি ধরিয়া তুলিলাম, “আমার পা ধরলে হবে কি ভাই, সর্বনাশ করেছ ঐ হাবীর, তার পা ধরে দেখতে পার।” আমার মিষ্ট কথায় একটু প্রকৃতিস্থ হইয়া মনােহর বলিল, “ওর স্বামী ত ওকে ত্যাগ করেছে শুনলাম, আমি ওরে চিরতরে গ্রহণ কর্তে রাজি আছি।” “তবে আমার পা ছুয়ে, ধৰ্ম্ম সাক্ষী করে বল ?” দাদা শিড়িতে উঠিতে উঠিতে ডাকিয়া বলিলেন, “এইত তােমার হাবী না দুলালীর মা ভাই এসেছেন মাধবী! এখন যা হয় কর।” মনােহর এবারে পাঁচ কদম সরিয়া দাঁড়াইল। দ্বার খুলিয়া দিলাম। দুলালীর মা ঘরে প্রবেশ করিলেন। মনােহর আরও সরিয়া গিয়া খাটের উপর শুইয়া পড়িল। আমি তাড়াতাড়ি কোটের বােতামটা খুলিয়া দিলাম। বলিলাম জামাইকে হাওয়া কর মা, সাধের কাপড় এনেছত ?”
( ৭ ) দুলালীত কুল পাইল, আমার অকুল সাগরে ভাসন ভেলা কি কুল পাইবে? এক দিন গিয়া শুনিয়া আসিলাম, মিসেস সিং বৰ্মার চলিয়া গিয়াছেন। সেই দিন ইতে দেখিতেছি, বিজয়ের দেহটা যেন একটু ভাল ভাব ধরিয়াছে। দুরে দাড়াইয়া লুকাইয়া দেখি, কোনও দিন তাহার গাড়ির পেছনে গাড়ি হাতাইয়া যাই। ইহার মধ্যে আর এক বিপদে পড়িলাম। শকুন্তলার মা’টা বাঁচিল । অভাগিনী হিন্দু রমণী সেই হইতে শুকাইয়া শুকাইয়া গঙ্গা যাত্রা করিল। এর মধ্যে আবার দাদার বিবাহ, মার কান্না কাটিতে আর আমার ধমক মুখ ভারে দাদা বিবাহ না করিয়া পারিলেন না। শকুন্তলাকে কোলে লইয়া দাদার বিবাহে যাইতে হইল। মেয়েটার কথা যে কত জনে কত ভাবে জিজ্ঞাসা করিল, তা আর কি বলিব। এক পােড়ারমুখী বলিল, শকুন্তলার মুখখানা সতীশ বাবুর মুখের মতন দেখায়। অধম নারী জীবনে এতও সহিতে হয়! ভাগ্যি দাদা কথাটা শুনেন নাই । এক দিবস দাদা আসিয়া বলিলেন, “বিজয় বড় পীড়িত, সে ফিরিঙ্গিটা মেয়েটা কাছে নাই, শুশ্রুষার কুটা হচ্ছে।” আমার হৃদ কম্প উঠিল। বলিলাম, “আপনি এতকাল তার খবর রাখেন?” সেও মাঝে মাঝে আমার কাছে আসে। তােমার খবর নেয়, কেমন আছ। অনেক বলাবলিতে তােমার ঠিকিনাটাও তাকে বলে দিতে হইয়েছিল।” - রাখি না।
নষ্টোদ্ধার হায়! এখন কি করা যায়? নির্বাসিত সীতা যে বিদ্যাবলে ছায়া- রূপিণী হইয়া তাহার দয়িতের সেবা করিতে পারিয়াছিলেন, এ যুগের লােকের কি সে বিদ্যায় অধিকার নাই ? একবার সীতাদেবীর মত ভাবিলাম, যাহা হয় হউক, যাই তাহার কাছে! কিন্তু তাহাতে যে তাহার আরাম হইবে বিশ্বাস কি ? বরং অনিষ্টই হইতে পারে। দাদা নিজেই বলিলেন, “ভয় নাই, আমি সমস্ত বন্দোবস্ত করেছি, দুই জন ভাল শুক্ৰষাকারিণী রাখিয়া আসিয়াছি। ডাক্তারে বলিয়াছেন, যদিও হৃদযন্ত্রের পীড়া, তবু রােগীর মানসিক বল অসীম, শীঘ্রই আরাম হইবে। টাকার টানাটানি ছিল, দিয়া এসেছি।” দাদা ত বলিয়া চলিয়া গেলেন। আমার ত ভাবনার পাড়ি নাই। সধবা ত কোনও দিন হইলাম না, তবু বৈধব্যের হাত হইতে নিষ্কৃতি পাইব না। হে অন্তর্যামী, তুমি ত দেখিতেছ সকল; এ নারীর হৃদয়ে এতটুকু পাপ কোথাও আছে ? সতীধৰ্ম আমি কি রক্ষা করিতে পারি নাই। তাহার টাকার টানাটানি। ব্যাঙ্কের বই খানা খুলিয়া দেখিলাম। এতকাল কখনও দেখি নাই, দাদা আনেন, দাদা রাখেন। বাসে টাকা পাইলেই লইয়া যান। আজ খুলিয়া দেখিলাম চারি বৎসরে তাহাতে দেখি পঞ্চাশ হাজারের উপরে জমা রহিয়াছে। আমার এত টাকা, তাহার এই রােগের সময়েও টাকার টানাটানি। কিন্তু আমি কি করি! এত করিয়াও ত নারীত্বের দুর্বলতা পরিহার করিতে পারিতেছি না। ভাবিয়া চিস্তিয়া স্থির করিলাম, পুরুষ সাজিব। পুৰুষ ত সাজিব, মাথায় এই এক রাশ চুল যে ! চুল ত কাটিতে পারিব না। পােড়া চিনাগুলি এখন আবার বেণী কাটিয়া ফেলিয়াছে,নইলে বেণী পাকাইয়া চিনা সাজিতে পারিতাম। দাড়ি থাকিলে পাগড়ি জড়াইয়া পাঞ্জাবী মুসলমান সাজিম, দূর হােক ছাই, পুরুষ সাজা হইবে না। } নষ্টোদ্ধার ১১০ ; দায়ে পড়িলে বুদ্ধি আসে। বিজয়ের দোকানের ঠিকানায় ফোন করিলাম। বলিলাম, আমার পঁচিশ টন সেগুন কাঠের প্রয়ােজন, দিতে পারিবেন কি ? কন্টাক্ট ঠিক হইলে অগ্রিম কিছু টাকাও দিতে পারি। কোটেশন সহ লােক পাঠাইবেন। কোটেশন লইয়া আসিল। বলিল, যদি সিকি টাকা অগ্রিম দিয়া অর্ডার দেন, 'এক মাসের মধ্যে মাল দিতে পারি। আমি রাজি হইলাম ; আমি তখন কিন্তু খাটি মেম সাজিয়া বসিয়াছি, এতকাল আমেরিকায় থাকিয়া মার্কিন আদব কায়দা যাহা শিখিয়াছিলাম, তেমনি ভাবে মার্কিন লেডি সাজিয়া দুর্গানাম করিয়া বাহির হইলাম। সিং সাহেবের বাড়ীতে উঠিয়া মার্কিন কায়দায় নমস্কার করিয়া দাড়াইলাম। সাহেব তখন বারাণ্ডায় ইজি চেয়ারে শুইয়াছিলেন। আমাকে দেখিয়া উঠিয়া বসিলেন। আমি বলিলাম, আমি আপনার কন্টাক্টে রাজি হয়েছি, রসিদ দিয়া টাকা নিন; সেক্রেটারীকে বলুন, অর্ডার লিখে নিতে। দু’হাজার টাকার নােট সম্মুখে ধরিলাম। “হ্যা, না, উত্তম,” ভিন্ন বড় কথা তিনি একটুও বলিলেন না। কর্মচারী রসিদ লিখিয়া আনিয়া, সহি করিয়া দিলেন। আমি নামিয়া আসিতে তিনিও নামিয়া আসিলেন। গেট পর্যন্ত আসিয়া বলিলেন, “দাড়াও মাধবী।” আর কিছু বলিতে পারিলেন না। আমার ঢাকাঢ়াকি সাজাসাজি সকলই বৃথা হইল, তিনি যেন টলিয়া পড়িয়া যান। আমিও বুঝি পড়ি পড়ি! তবু আমার ডাক্তারি বিদ্যটা ভুলিয়া যাই নাই। হৃদরােগের রােগীকে সত্য রুক্ষ কথা বলায় উপকার আছে। আমি বলিলাম, দেখ, মিষ্টার সিংহ তুমি চিনেছ ভালই, আমি কোনও পুরাণ কথা তুলিয়া ভাব কৰ্তে আসি নাই। আমার কাঠের দরকার, তুমি তার দোকানদার। তােমার কাছে জিনিষগুলি নিলে ১১১ নষ্টোদ্ধার অন্ততঃ খাঁটি মালটা পাব, এই বিশ্বাস। দাম দশ টাকা বেশী লাগলােই বা।” বিজয় যেন একটু সুস্থ হইয়া বলিলেন, “আমার টাকার অভাব, তা তুমি জান ?” “টাকার অভাব ? তা হলে ত এতগুলি টাকা দেওয়া অন্যায় হয়েছে। যা হােক, আমার মালগুলি যাতে তাড়াতাড়ি পাই সেই চেষ্টা করবেন। বাজারে ক্রেডিট না থাকে বলুন, আমি সব টাকাই নগদ দিচ্ছি। আমি শুধু আপনার কাছে এসেছি, মালটা ভাল পাব বলে। কাল রসিদ দিয়ে লােক পাঠাবেন, টাকা আমি দিয়ে দেবাে, পারেন আপনি নিজে যাবেন।” “আজ কতকাল পরে দেখা।” বলিয়া তিনি চক্ষু মুছিলেন। আমি চিকিৎসা বিদ্যায় জানিয়াছি, এমন রােগী কাদিতে পারিলে আরােগ্যের দিকে যায়। আমি বলিলাম, “ও রকম অনেক লােকের সঙ্গে অনেক দেখা হয়ে থাকে, কতকাল তা লােকে মনে করে রেখে থাকে ? আমি সফারকে গাড়ি হাকাইতে বলিলাম। তিনি বিশেষ কোনও শঙ্কটাপন্ন রােগে পীড়িত নন বুঝিয়া তবু অনেকটা আশ্বস্ত হইলাম। পরদিন দেখি তিনি নিজেই আমার বাড়ীতে গিয়া উপস্থিত। আপ- নারা বলিতে পারেন, এখন আমি কি করি? কেহ তাহা পারিবেন না। আমি সংক্ষেপে বলিলাম, “বসুন, এসেছেন, ভাল হয়েছে, আমি অন্ত লােকের কাছে এতগুন টাকা দিতাম না। তিনি বলিলেন, “আমাকেই বা তােমার এত বিশ্বাস কি মাধবী ? আমি কারবারে লােকসান দিয়ে দেউলিয়া হয়ে পড়েছি।” “তবেই হয়েছে। আমি সেধে গিয়ে এতগুলি টাকা খুইয়ে এলুম।
নটোম্বার ১১২ “তুমি যদি দশ হাজার টাকা আমায় দাও, আমি বােধ হয় সামলাতে পারি।” “সে কি আমি পারি? এত টাকা দিয়ে আপনার কারবার বজায় করবাে, এত বড় দাতা হবার অবস্থা আমার নয়। বাড়ীটা কচ্ছি, আশী নব্বই হাজার টাকার দরকার। যাক, অন্যত্র কাঠ যোগাড় করবো। গেল এই দু’হাজার, আমার খাটুনির টাকা।” তিনি কাতরেই বলিলেন, “না মাধবী আমি তােমায় মাল দেবে। এখন দশ হাজার টাকা দিলে মহাজনের কাছে আমার ক্রেডিট বজায় থাকবে।” গুড়ি গুড়ি হাটিয়া শকুন্তলা আসিল, তাহাকে কোলে তুলিয়া লইলাম। সে বলিল, “লঞ্জু।” লজেদুস চায়। বিজয় জিজ্ঞাসিলেন, এ মেয়েটা কে?” হাসিয়াই বলিতে হইল, “আমার মেয়ে।” তােমার আবার মেয়ে কি ?” আমি গম্ভীর হইয়াই বলিলাম,-পােড় অদৃষ্টে কত অভিনয়ই করিতে হইল,) মাপ করূবেন, অত অভদ্রতা করবেন ত, এখান থেকে চলে যান। স্ত্রীলােক আমি, আপনি পরিচিত লােক, লজ্জা সন্ত্রম করা চলে না। আপনায় টাকা দিচ্ছি, নিয়ে যান ; মােদ্দা এর বেশী আমার কোনও পরিচয় চাবেন না।” নােটগুলি গণিয়া দিলাম। তিনি হাতে লইয়া বলিলেন, “তােমার পরিচয় আমি কি জিজ্ঞাসা করব?—আমারই পরিচয় তুমি পেলে না।” তিনি উঠিলেন, আমি দুটো কথা বলিয়াও তাহাকে দেরী করাইলাম । তাহার সঙ্গে বাহির পর্যন্ত আসিলাম, বাহিরে আসিয়া তিনি বলি- লেন “তােমার দেওয়ালের গায়ে এমন হেনার গাছটা ছিল, তা নাই ?
নষ্টোর “তবে কি এ বাটীটা আপনি আগেও দেখেছেন?” বলিয়া বিল্পিত নেত্রে চাহিয়া রহিলাম। তিনি বলিলেন, “তা দেখতে পারি।” তিনি চলিয়া গেলেন। দুই একদিনের মধ্যেই বাসাটা বদলাইয়া, আর একটা পাড়ায় আর একটা বাড়ী ভাড়া লইলাম। সাই বাের্ড আর লটকাইলাম না, খুব গলির মধ্যে বাড়ী লইলাম। বিজয়কে সংবাদ দিলাম, আমি কিছু দিনের জন্য অন্যত্র যাইতেছি, আমার কাঠগুলি যেন প্রস্তুত থাকে। বক্তা—মিষ্টার-কার (বার-এট-ল)। * একটা যুগ, বারটা বৎসর ব্যারিষ্টারি ব্যবসায় করিতেছি। জানি কেবল আইন আর টাকা। অবশ্য প্রেমের বন্ধন মুক্তি বা ডাইভাের্স কেশেই আমার পশার বেশী ; কিন্তু প্রেমের অনুভূতি, যাহা নিয়া কবিদিগের বাজে বকাবকি তাহাতে আমি কোনও দিনই নাই। স্ত্রী পুরুষের ভালবাসাবাসি, স্বভাবের ফুলফোটাকুটিরই মত, মাঝে বেশীর ভাগ লাভ লােকসানের খতিয়ান। বৎসরে অন্তঃ ত্রিশটা ডাইভাের্স কেশ করিয়া এই জ্ঞানটাই আমার পাকাপাকি হইয়া গিয়াছে। সুন্দর বস্তু দেখিলে তাহার প্রতি টান হয়, যেমন ক্ষীরের মিঠাই দেখিলে রসনায় টান পড়ে, তা ছাড়া আর কিছু আমি জানিও না, বুঝিও না ।
নষ্টোদ্ধার ১১৫ এবার একটা ডাইভােস কেশ করিতে গিয়া, অদ্ভুত রকমের একটা জ্ঞান লাভ হইল। এখনও আমি মনকে বুঝাইতে পারি নাই, বিষয়টা কি। আমার মত কাঠ-কবি গল্প লিখিলে সুসাহিত্যিক কোনও মাসিক পত্র তাহা ছাপিবে না, তাহা জানি; বিশেষ তাহার সত্যের ধার দিয়াই যায় না, নিতান্ত অসত্য কুৎসিত না হইলে তাহারা স্থান দেয় না। তবু বিষয়টা আমার দশজনকে শুনাইতে হইবে। গৃহিণী একটা ছেলে প্রসব করিয়া রােগে পড়িয়াছেন, ডাক্তারগুলি আমার টাকা লুটিয়া লইতেছে, তবুও গৃহিণী বলেন, এখনও তিনি অসুস্থ। আঙ্গুর বেদানার দোকানে টাকা দিয়া হয়রাণ হইতেছি। আরও সেই সঙ্গে উদ্বেগ আশঙ্কায়, আমার টাকা রােজগারের সময়টাও বৃথা নষ্ট হইতেছে, গৃহিণী যদি এখন গঙ্গা যাত্রা করেন তবে এতগুলি বাচ্চা আগ্লাবে কে ? এমনি একদিন একটা ফিরিঙ্গি যুবতী আসিয়া উপস্থিত হইল। নােদে পােড় আমটীর মতন যুবতীটা যেন পঁচিশ বৎসরেই বুড়ী হইয়া গিয়াছে। মুখখানা যেন একখানি জ্বালার কুণ্ড। তাহার প্রতি নিশ্বাসেই যেন অন্তরের ছটফটানি বিষময় জ্বালা ছিটাইয়া যাইতেছে। বুঝিলাম মােয়াক্কেল হইবেন। তাহার ব্রিফ টায় মনোেযােগ দিলাম। ব্ৰিফে কয়দিন লে যাইতে- ছিল, ফুল হইবার আশা হইল। তাহার ব্রিফের ব্রিফ, সে ডাইভােস চায়। এক ধূৰ্ত্ত বাঙ্গালী যুবক ব্ৰহ্মদেশ হইতে তাহাকে ফুসলাইয়া, হাসি আলাপ রূপের কৃত্রিম ছবি দেখাইয়া সরলা রমণী সে, তাহাকে ভুলাইয়া, তাহার প্রায় আশী হাজার টাকা সহ তাহাকে এই বাঙ্গালা দেশে লইয়া আসিয়াছে। এই দু’টা বৎসর সে তাহাকে নিদারুণ নষ্টোদ্ধার প্রতারণাই করিয়াছে। সে যে খৃষ্ট-ধর্ম গ্রহণ করিয়াছে, সে কেবল প্রতারণা মাত্র। এক দিনও সে গির্জায় যায় না; হিন্দুর মত সে কাশী বৃন্দাবন ঘােরে, ঠাকুর দেবতা দেখিলে প্রণাম করে তাহার কিছু ছিল না, এই যুবতীর বলে মস্ত বড় ব্যবসায় গােছাইয়াছে। সে মরিতে যাইতেছিল, যুবতী তাহাকে বাঁচাইয়াছে, তবু সে যুবতীকে ভালবাসে না; ভূত্যের মতন যােড়হাতে সৰ্ব্বদাই থাকে, কিন্তু প্রিয় অন্তরঙ্গের মত অবাধ মনখােলা প্রেমের ভাব তাহাতে এই সাতটা বছরেও পাওয়া গেল না। সে কথায় কথায় কৃতজ্ঞতা জানায়, সামান্য একটু সেবা যত্ন করিতে গেলেই কুণ্ঠিত হইয়া বলে, আহা আমি তােমার কিছুই করিতে পারি না, তুমি আমার কত কর। যুবতী এই কপট দাস্যভাবের মধ্যে প্রকৃত বিষয়টা মােটেই বুঝিতে পারে নাই। সন্দেহ হইলে প্রকাশ করিতে সঙ্কোচ করিয়াছে। এতটা দিন নিতান্ত সম্ভান্ত অথিতির মতন কেবল আদর সম্ভ্রমে সদা সাবধান সেবার মধ্যে থাকিয়া প্রাণটা যখন তাহার নিতান্ত অতিষ্ঠ হইয়া উঠিল, তখন সে তাহার জন্মস্থান ব্ৰহ্মদেশে যাইতে চাহিল। তাহার স্বামী তাহাতে কিছু মাত্রও আপত্তি না করিয়া পরম উৎসাহে তাহার যাত্রার সুবিধা করিয়া দিলেন। ছ’টা মাস যে সেখানে কাটাইয়াছে, ইহার মধ্যে স্বামীর গুরুতর পীড়া গিয়াছে। তিনি যে সমস্ত সংবাদ তাহাকে দেন নাই, কেবল পত্র লেখেন, তুমি ভাল আছ শুনিয়া সুখী হইলাম, ওখানে তােমার শরীর ভাল থাকিলে আরও কিছুদিন থাকিয়া আইস। ফিরিয়া আসিয়া শােনা গেল, প্রতারক একটা বাঙ্গালী যুবতীর সঙ্গে ঘােরে। স্পষ্ট কথা জিজ্ঞাসা করায়, সে বলিল, সত্যই সে এত দিন চেষ্টা করিয়া তাহাকে ভালবাসিতে পারিতেছে না। তাহার ভালবাসার আর একটা লােক নষ্টোন্ধার আছে, তাহা হইতে সে মন কিছুতেই ফিরাইয়া আনিতে পারিতেছে না। বলিতে বলিতে যুবতীর মুখটা লাল হইয়া উঠিল, চুলগুলি যেন খাড়া হইয়া দাড়াইল, মস্তকের উষ্ণতায় যুবতী মাথার টুপিটা একবার খুলিয়া আবার পরিল। তাহার দাৰী বড় কঠোর, লােকটীকে সে ফকির করিয়া ছাড়িবে। তাহার দাবী বিবাহচ্ছে, সেই সঙ্গে পঞ্চাশ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ। আমি বলিলাম, “এত টাকা কি আদালতে মাবে?” “মাতেই হবে, মিথ্যা কিছু নয়, আমার আশী হাজার টাকা জানােয়ারটা খেয়েছে।” “টাকাগুলি বিবাহের আগে না পরে নিয়েছে ?” “আগে নিয়াছিল পঞ্চাশ হাজার, তার পর বাকিটা নিয়েছে, আমিত সন্দেহ করি নাই, সেধে দিয়েছি।” “কেকটা খুব সুরূপ ছিল? “নিশ্চয়ই, অমন ফুলটীর ভিতর এত বিষ, তাকি জানি? এখন কিন্তু সে রূপবিলাস কিছুই নাই, পােষাকটাও ভাল করে পরে না, যেন একটা ব্যাকুব বেহায়া।” যাহা হউক বায়নার সঙ্গে ব্রিফটা লইলাম। প্রতিবাদীর উপর রুলিং জারি না হইতেই দেখি প্রতিবাদী আসিয়া আমার বাড়ীতে উপস্থিত। শ্বেতাঙ্গের পরিচ্ছদধারী একজন বাঙ্গালী যুবক। যুবক যেন মস্ত বড় একটা ঝড় কাটাইয়া আসিয়াছে। আসিয়াই ভদ্র- লােক কোনও রূপ শিষ্টাচারের অপেক্ষা না করিয়া নিতান্ত পল্লীবাসী বৃদ্ধের মতন আমার হাতখানি জড়াইয়া ধরিল, সঙ্গে সঙ্গে বলিতে লাগিল, “আপনি আমায় রক্ষা করুন। আপনার ঐ ডাইসে মােকমায় ১১৭ নষ্টোদ্ধার আমিই প্রতিবাদী। আপনিই এই খানেই মােকদ্দমাটা মিটাইয়া দিন। আমি ডাইভােসে সম্মতি দিতে রাজি আছি। কিন্তু অত টাকা আমার নাই, আমার পঞ্চাশ ষাট হাজার টাকার আসবাব পত্র আছে, বিক্রয় করে যা হয় সমস্ত দিব। বিক্রয় করলে হাজার ত্রিশেক হতে পারে। কিন্তু সময় চাই। অন্তত তিন মাস আমায় সময় দিন। ত্রিশ হাজার টাকায় রফা করে দিন। পরে যদি টাকা হয়, আমি দাবীর সমস্ত দিতে রাজি আছি। অবশ্য মােকদ্দমা রফা কল্লে আপনার ফির লােকসান হবে, কিন্তু আমি নিতান্ত নিরুপায়, আমাকে রক্ষা করুন। আমি আপনার দাসত্ব কর্তে প্রস্তুত আছি।” আমি হতভম্ভ হইয়া পড়িলাম, লােকটার উপর দয়া আসিল। মানুষের মনে ঐ একটা বৃত্তি ফুটিয়া উঠিলে ব্যবসায় বুদ্ধি ডুবিয়া যায়। অব্যবসায়ীর মতই বলিয়া ফেলিলাম, “আপনি মােকদ্দমার উপযুক্ত এডভােকেট রেখে জবাব দিন, টাকার ডিক্রি নাও হতে পারে।” লােকটা যেন কত হতাশে বলিল, “কি আর জবাব দেব মহাশয়, সত্য মােকদ্দমা, ও সত্য আমি কাটতে পারবাে না। দাবীর সমস্ত টাকা দিলেও আমি বাদিনীর কাছে সম্পূর্ণ মুক্ত বলে মনে করবাে না। আদালতের কেলেঙ্কারী হতে আমায় রক্ষা করুন। আপনাকে দেবার মতন আমার কিছুই নাই; আমার সর্বস্বই ঐ বাদিনীর। আপনার বিস্তর আছে, আমায় দয়া করুন।” আমার কৌতুহল বাড়িল। হাসিও আসিল। গৃহিণী অনেকটা নিরাময় দেখিয়া প্রাণে একটু স্বস্তি ভাবও আসিয়াছে। বলিলাম, “আপনি তবে বাদিনীকে এখনও ভালবাসেন। “না না, ভাল তাকে কখনও বাসতে পারি নাই। কিন্তু পারা উচিত ছিল। বড় প্রীতিময় এাণ তার, অকপটে আমায় হৃদয়ের ভালবাসন নষ্টোর ১১- ঢেলে দিয়েছিলেন, সেই সঙ্গে সর্বস্ব দিয়েছিলেন। আমি তাই সম্বল করে ব্যবসায় করেছিলাম মাত্র, তাঁর শুদ্ধ সরল প্রীতির বিনিময় কিছুই কর্তে পারি নাই। পাপ যা করেছি, তার প্রায়শ্চিত্ত এক জন্মে হবে না। আপনি আমার ইহকালটা রক্ষা করে দিন, পরকালের কর্তার কাছে দয়া চাইতেও আমার ভয় হয়।” “আপনি এত ভয় পাচ্ছেন কেন? এখনও মােকদ্দমা উঠতে তিন চার মাস সময় যাবে, ভেবে চিন্তে কাজ করুন।” “না না মােকদ্দমা আর উঠে কাজ নাই। আমি বাদিনীর দাবিতে সম্মতি দিয়ে দিচ্ছি, আপনি দাখিল করে দিয়ে মােকদ্দমা তুলে নিন। আদালতকে আমি বিশ্বাস করি না, হয়ত বা অন্য রূপ বুঝে বাদিনীর দাবিতে আদালত বিশ্বাস নাও কর্তে পারে। শুধু টাকাটা দেবার জন্য তিন মাস সময় চাই।” “আচ্ছা আমি বাদিনীকে ডেকে পাঠাই। আপনি বসুন, ফোন কচ্ছি।” “না না, আমার সম্মুখে নয়, আপনি সব ঠিক করে আমায় কথা দেবেন। আমি আপনার দয়ার উপর নির্ভর কল্পম। নইলে আমি পালিয়ে যাব, পরলােকে গিয়েও যদি এ দায় থেকে বাঁচি, তাও ৰাব, আদালতে যাব না কিছুতেই।” লােকটা যেমন ব্যন্তে আসিয়াছিল, তেমনি ব্যন্তে চলিয়া গেল। আমি ভাবিতে লাগিলাম, এত রঙ্গ মন্দ নয়।
বসিয়া ভাবিতেছি, সহসা দেখি আমার গৃহিণীর লেডি ডাক্তার আমার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইয়াছেন। বুঝিলাম, তাহার কর দিনের ফিটা বাকি আছে, তাগিদ করিতে আসিয়াছেন। আবার একখানা চেক কাটিতে হইবে ভাবিয়া মনটা ভার হইয়া পড়িল। আমার দোষ, ব্যাঙ্কের চেক আমি হাসিমুখে কাটাতে পারি না। মিস্ বানু আসিয়া বলিলেন, “আপনিত বড় সুন্দর একটা তামাসার মামলা পেয়েছেন।” আমি বলিলাম, “হ্যা, আপনি বুঝি লােকটার কথা ঘর থেকে সব শুনেছেন।” “হ্যা, অনেকটা শুনেছি, আপনার বাড়ীতে এ কদিন আসা যাওয়া করে, মােকদ্দমার কথা শুনতে আমার বেশ নেশা জলেছে। এর মধ্যে আমারও কিছু লাভ কর্তে ইচ্ছা হয়েছে। শুলাম লােকটা তার আসবাব বেঁচে টাকা দেবে। লােকটার আসবাবগুলি মূল্যবান সন্দেহ নাই; লােকটা মিথ্যা বলে বলে আমার মনে হয় না। আমার কতকগুলি আসবাব পত্রের দরকার, আপনি আমায় ঐগুলি কিনে দেন না। প্রয়ােজন হয়, কালই টাকা দিচ্ছি, লােকটার উপকার হয়ে যাক। বাণী প্রতিবাদী উভয়েই বেঁচে যাক। উভয়েরই এতে লাভ আছে। মাঝে থেকে আমার কিছু লাভ হলাে ক্ষতি কি? তবে আপনার বিশেষ কিছু লাভ হচ্ছে না। দালালী কিছু চান দিতে পারি, তবে আপনাকে তত ছােট করে ত ভাবতে পারি না। বলেন ত আপনার স্ত্রীর কাছ থেকে সুপারিস আনি। কি বলেন?
নষ্টোদ্ধার বিস্মিত না হইয়া পারিলাম না। ভাই-ভােসের এমন জটিল মােক এমন জলের মতন মিটিয়া যাইবে, তাহা ত আমি আমার এত দিনের অভিজ্ঞতায় ধারণা করিতে পারি নাই। বলিলাম, আচ্ছা, ওর জিনিষগুলি একবার দেখে আসুন না। সেগুলি আপনার প্রয়ােজনে আসবে কি না পছন্দ হয় কি না, তাই বা কে জানে।” “তা হবে। সেগুলি পছন্দ না হবে, অন্য বেঁচে ফেলব। আমার মত একটা মেয়ে মানুষে কিছে, তা আপনি বলবেন না। মেয়ে মানুষ শুনলেই লােকটা বেঁকে বসবে। পুরুষ মানুষের পুরুষত্বই ঐখানে, -যাতে মেয়ে মানুষ ঠকাতে পারে। আমি টাকার যােগাড় করি, আপনি লােকটাকে ডেকে কথা স্থির করুন। না হয়, সময় হয়, নিজে একবার জিনিষগুলি দেখে আসুন। মােদ্দা কাজটা আপনাকে করে দিতে হবে, যত সত্বর পারেন।” ব্যাপার ত মন্দ নয়। বাদিনী পরম ব্যস্ত, প্রতিবাদী তাহার চেয়ে সাত গুণ ব্যস্ত, আবার মধ্যে পড়ে এই আর এক খরিদ্দার তার চেয়ে দশগুণ ব্যস্ত। এর মধ্যে কোনও রহস্য আছে না কি? শুনেছি, অনেক গুণ্ডা জুয়াচোর এমনি করে ষড়যন্ত্র পাকিয়ে অনেক কাজ হাসিল করে। এরা যে এক দলের লােক নয়, তাই বা কে জানে। “আচ্ছা, ভেবে দেখি” বলিয়া মিস্ বানুকে বিদায় করিলাম। বি, সিং কাঠের আড়তে একবার যাইতে হইল। তিন পাগলার পারায় পড়িয়াছি। লেডি ডাক্তারটা নিতান্ত ভাল মানুষ, গৃহিণীর সঙ্গে বড়ই ভাব জমাইয়া ফেলিয়াছে। তিনি বলেন তাহারই চিকিৎসা ও সেবায় তিনি আরােগ্য লাভ করিয়াছেন। নিরীহ সরলা স্ত্রীলােকটা ঠকিয়া যাইবে, একটু দেখিতে হয় বই কি? লাজ এই ব্যাপারে কিছুই হইবেই না।
১২১ নষ্টোদ্ধার গিয়া দেখিলাম, রাজার ঘরের মত আসবাবই আছে বটে। কিন্তু যত্ন মনােযােগর অভাবে বিশৃঙ্খল বিশ্রী হইয়া রহিয়াছে। পঞ্চাশ ষাট হাজার টাকা দাম হইতে পারে! তাহাতে বলিলাম, “আপনি আপনার সর্বস্ব বিকাইয়া এখন কি করিবেন?” “কি আর করবো, আর কিছু করার প্রয়ােজন রাখে না।” “বুঝিলাম নিতান্ত ঔদাসিন্য জন্মেছে সংসারে। ব্যাপারটা একটু খুলে বলতে পারেন ?” “নিশ্চয়ই। শুবেন, শুনুন। একটু সময় নষ্ট হবে আপনার।” লােকটা গল্প বলিতে আরম্ভ করিলেন। মস্ত বড় রূপ কথা । গল্পটা বলিয়া ফেলিয়া অবশেষে বলিল, ধন দৌলত বড় মানুষির কল্পনা ছাড়া আরও একটা মিথ্যা মনােবৃত্তি মানূষের আছে, যেটা কারু কাছেই, কোনও মায়ার চাপেই দমে থাকতে চায় না। সেই জন্য এত সুযােগ, এত টাকার সুবিধা পেয়েও আমি ব্যবসায়ে সুবিধা কর্তে পারি নাই। এখন আর পিরবার আশা নাই, এখন চাই সব ঝেড়ে ফেলে, একবারে পেছন ফিরে গিয়ে সেই পুরাণ অবস্থায় যদি যেতে পারি।” “সন্ন্যাসী হবেন বােধ হয়?” “না না, সন্ন্যাসী হয়ে গাছতলায় ছাই মেখে বসবার মতন মন গড়তে পারি নাই। সেইরূপ টিউশনি করে দিন চালাব, তা অব জুটবে।” “হয় ত এই ভাবে আবার মাধবীও জুটে যেতে পারে।” “না, সে আশা নাই; সে যখন দেখা দিয়ে আবার পালিয়েছে, তখন আর দেখা দেবে না। এখনও সে আমায় ভালবাসে বটে, কিন্তু ধর্ম জাতি সব গিয়েছে কি না, অস্পৃশ্য ভেবেছে।”
নষ্টোর ১২২ “আমি সংবাদ পত্রে বিজ্ঞাপন দেই, একজন লেডি ডাক্তার চাই, হয়ত ধরা পেতে পারি।” “না না ধরা পেয়ে কাজ নাই, হয়ত আমার দুয়বস্থার কথা জানতে পেলে আবার তার যা কিছু আছে, আমায় এনে ঢেলে দেবে। আর এমন ঠকঠকির ব্যাপারে আমি যেতে চাহি না।” এমন রহস্যময় ব্যাপারে কি না যাইয়া থাকা যায়? আমিও যে মিস বার দালাল হইয়া আসিয়াছি, তিনি আবার ডাক্তার। আমি আবাৰ পত্র সকলই খরিদ করিব আশ্বাস দিয়া চলিয়া আসিলাম। তাহার পর কোন্ করিয়া ফিরিঙ্গি যুবতী নােজী যােসেফকে ডাকিলাম। সে আসিলে তাহাকে বলিলাম, “তােমার প্রতিবাদী মামলা আপােষে মিটাতে চায়।” সে যেন ক্ষিপ্ত কুকুরীর মত বিকট স্বরে বলিল, “না না, মােকদ্দমা আমি আপােষে মিটাব না। কিছুতেও না, মরে গেলেও না।” “তােমার দাবি বুঝে পেলে মিটাবে না কেন?” “আমার দাবি ওর সর্বনাশ করা, ওকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে ভিক্ষা করান। এ দেনায় বডি ওয়ারেন্ট করে জেলে দেওয়া যায় না? “তােমাকে সর্বস্ব দিয়ে রাস্তায় দাঁড়াতে চায়।” “সর্বস্ব আবার ওর কি! যা কিছু আছে, পাওনাদারের শীঘ্রই এট্যাচ, করবে। একটা নেহাৎ অপদার্থ, সব খুইয়ে ফেলেছে।” “তবে ত ও রাস্তায়ই বড় হয়েছে। এই বেলায় তুমি যা পাও নাও, ত্রিশ হাজার টাকা পর্যন্ত ও দিতে পারে।” “ত্রিশ হাজার টাকা? কোথা ? তবে নিশ্চয়ই ওর সেই প্রেমিকার দেখা পেয়েছে, সেই টাকা দিচ্ছে, আমি টাকা পােব নেবে না।”
১২৩ নষ্টোর “না না, আমি টাকা দিচ্ছি। আমি টাকা দিয়ে ওর সব মাল আসবাব কিনে নিচ্ছি, আমার এতে লাভ আছে। তুমি রাজি হলেই আমি টাকা দেই।” না আপনি ও সব কিবেন না, ও সব রদি মাল। আর সপ্তাহের মধ্যেই ও মহাজনে ক্রোক কবে। আপনি ওতে যাবেন না।” “তা হলেও তােমার টাকা আদায়ের কোন আশাই নাই। আমি আজই টাকা দিয়ে জিনিষগুলি নিয়ে আসছি, মহাজনে আমার কি করবে ?” “না না, আমি টাকা নেবাে না, মামলা করবাে।” যুবতী অস্বাভাবিক ভাবে হাত পা ছুড়িয়া, বিকট মুখভঙ্গি ভঙ্গি করিতে লাগিল। আমি বলিলাম, “তবে তুমি ওকে গুলি করে মেরে ফেল না । “তাই উচিত, কিন্তু ওকে এখন মাঝব না, ওকে একবার বাঁচিয়ে ছিলাম, এখন মাতে পারি না। ওঃ, ঘা দিয়ে ফিকে ধরে রক্ত উঠবে, তা ত পারি না। “তবে আপাততঃ টাকা ত্রিশ হাজার নিয়ে ছোলেনামা সই কর । তারপর দেখা যাক লােকটা কি করে। আর ত ওর কিছু নাই, দেখছি তুমি ওকে দরদও কর, এই পৰ্য্যন্ত রেহাই দাও, আমার অনুরােধ ।” মহিলাটীর প্রকৃতিতে কোমলতা ছিল, বড় যাতনায় এমন খট খটে কাঠ হইয়া পড়িয়াছে। অগত্যা আমার প্রস্তাবে রাজি হইল। পরদিন মিষ্টার সিং আসিলে বলিলাম, “মশাই, আপনি নাকি মহাজনের অনেক দেনদর, তারাও শীঘ্র আপনার মাল ক্রোক দিবে।” তা হতে পারে, আপনি আজই মালগুলি নিয়ে আসুন।” “আচ্ছা, আপনি যদি এখন মাধবীকে পান তবে কি করেন ?”
নষ্টোর ১২০ “কিছু করি না মশাই। আপনাকে নেহাৎ মুরুব্বি ভেবে কথাগুলি বলে ফেলেছি, আপনি এখন এমন বিরূপ কল্পে বড়ই ব্যথা পাই। “আচ্ছ, কাল সকালে, আপনি উকিলের স্বাক্ষর করিয়ে সম্মতি পত্র লিখে দেবেন, টাকা আমি বাদিনীকে দিয়ে দেবাে। আজ এখন যান।” লােকটা পকেট হইতে একশ টাকার পাঁচখানা নােট আমার টেবেলে রাখিল, বলিল “আর আমার নাই, এতেই মাপ করুন।” আমি বলিলাম, “আপনার আজকার খাবার খরচ আছে ত? “হােটলে এক সপ্তাহের খরচ জমা দিয়েছি মশাই, ধারের ভিতর আর যাচ্ছি না।” “যা গিয়েছেন?-মহাজন গুলিকে ত একদম মেরে দিলেন। “তারাও অমনি তাদের মহাজনকে মারবে। আমায় কি আমার পাইকাড়রা মারে নি ?—দুনিয়ার কারবারই মারামারি।” লােকটার →ত্তি যেন খুলিতেছে। খুব দ্রুতপদেই বাহির হইয়া গেল। মিস্ বা টাকা লইয়া আসিলেন। আমি বলিলাম, “জিনিষগুলি যে আজই আনতে হবে, নইলে মহাজনে ক্রোক করে নেবে।” তিনি একটু হাসিয়া বলিলেন, “আবার মহাজন কি ?” “লােকটা মহাজনদের অনেক ধারে। তারাও নালিস চড়িয়েছে।” “তবে ইনসলভেন্সি নেয় না কেন?” “তা সে জানে। মোদ্দা দুই এক দিন মধ্যে মালগুলি না আনলে, আপনার টাকা যাবে।” “আচ্ছা সে ভাবনা নাই, আমি তার বন্দোবস্ত কচ্ছি। আপনি টাকা দিয়ে মামলাটা ত মিটিয়ে দিন।”
p নষ্টোর এবার আমি স্পষ্ট হাসিলাম। বলিলাম, “আপনার তবে মামলা মিটাবার দরকার, মাল পত্রের দরকার তত নয় ?” মিস্ বা বিমনা হইলেন। আমি তবু বলিলাম, “বুঝি লােকটাকে আপনার খুবই দরকার, আপনার কাছে বহু মূল্য? কিন্তু নেহাৎ লাট রদি মালের মতই হয়ে পড়েছে।” মিস্ বাসুর চোক দুটা একটু যেন জ্বলিয়া উঠিল, পরক্ষণেই অতি শিষ্ট হইয়াই বলিলেন, “আমি আপনার স্ত্রীকে দিদি বলেছি, কুৎসিত বিপ করে লজ্জা দেবেন না।” “তবে ত বেশ হলাে, অন্ততঃ শিষ্ট আনন্দ কর্তে আমার অধিকার হলাে ! বল ত বােন্, এখনও কি অপদার্থটার পরে তােমার মমত্ব আছে?” আমার স্নেহ স্পষ্ট কোমল কথাটীতে বালিকা মুহূর্তের মধ্যেই মলিন হইয়া গেল ; তাহার সুন্দর মুখখানি অতিরিক্ত লাল হইয়া যেন বিবর্ণ হইয়া উঠিল, চক্ষু দুটীর কূলে কূলে জল, যেন অম্লান নীল পদ্মের দুটা পাপড়ী শিশিরে ডুবিয়া গিয়াছে ! আমার মত নীরস কাষ্ঠ গলিয়া গেল। বলিলাম, “ভগিনী, সংসারের যে অতি শুদ্ধ সত্যটা এতকাল আমার চক্ষে অবরুদ্ধ প্রচ্ছন্ন ছিল, আজ তারই আবরণ তুমি খুলে দিলে। তােমার পবিত্র হৃদয়ের প্রতি-বসন্তের হাওয়ায় যার হৃদয় কুসুমটী একবার ফুটিয়াছিল, শত বর্ষা হিমের পরিবর্তনেও তা একেবারে শুকিয়ে বিরূপ বিত্র হয়ে যায় নাই। আমি আশ্চৰ্য্য ভেবেছিলাম, বাঙ্গালী ব্যবসাদার যুবক কেমন করে এমন সত্যপ্রিয় হয়। চল ভগিনী ভিতরে চল, তােমার দিদির কাছে আশ্রয় নিয়ে, হৃদয়ের তরঙ্গ প্রশমিত কর। প্রজাপতির কাছে প্রার্থনা করি, তোমার সাধনা সিক হয়।”
নষ্টোদ্ধার ! মাধবীকে লইয়া গৃহিণীর কাছে গেলাম। তখনও মাধবীর চক্ষে জল। গৃহিণী দেখিয়া মহাকুদ্ধ হইলেন, বলিলেন, “কি ? এমন মুখ ভার করে কেন ডাক্তার লেডী ?” আমি বলিলাম, “তােমাকে না কি দিদি ডাকে, তাই একটু ঠাট্টা করেছিলাম।” গৃহিণী একবারে দাঁড়াইয়া উঠিলেন, একবারেই অগ্নিমুখী ! “কি বেইমানী কাণ্ড! ভদ্রলােকের এই কীর্তি ? বাড়ীতে পেয়ে ভদ্র নারীর এমন অপমান! দড়ি কলসী জোটে না সর্বনেশে ! মাধবী তাহাকে ধরিয়া বসাইল। গৃহিণীর রকম দেখিয়া সে চক্ষে জল ভয়া থাকিতেও একটু হাসিয়া ফেলিল। আমি বলিলাম, “তা বলে তােমার বােনের বাসরে দুটো ফষ্টি নাষ্টি না করে আমি পারবে না, তুমি মারাে আর গাল দাও। কম খাটি নাই আমি এই ঘটকালিতে।” বলিয়া চলিয়া আসিলাম। মােকদ্দমা মিটিল। রােজি বিবি টাকা লইয়া একবারে গিয়া জাহাজে চড়িল। বাংলার মাটীতে আর সে থাকিবে না। মিস বাসুর টাকা দেওয়াই সার হইল, দুদিনের মধ্যে জিনিষগুলি আনার চেষ্টা হইল না, আমি এতটা মনেও করি নাই। অবশ্য নিজের হইলে করিতাম। আর অন্য দিকে কৌতুহল গিয়া ওদিকে বড় নজরও ছিল না। মহাজনেরা আসিয়া মিষ্টার সিংএর জিনিষপত্র সব জোক দিয়া লইয়া গেল। তবু বলিলাম একটা মােজাম দেই, মিস বা বলিলেন “না থাক। তারাও ত পাবে।”
বক্তা-সতীশ চন্দ্র। } বড়ই ত বিপদ, বিজয় সিংহকে এখন খুজিয়া পাই না! মাধবী জুতা মােজা ছাড়িয়া, লাল পেড়ে একখানি সড়িী পরিয়া, শুদ্ধ বাঙ্গালীর কুলবধূর মত গৃহের কোণে আশ্রয় লইয়াছে। কেহ ডাকিতে আসিলে ফিরাইয়া দেয়, বা অন্য চিকিৎসকের কাছে পাঠায়। বলে টাকার আর তাহার দরকার নাই। আমি বলিলাম “টাকার দরকার না থাকে, বিনা টাকায় কর না? পুণ্যত আছে।” সে বলিল, “পুণ্যেরই বা দরকার কি ? মানুষ বাঁচাইলে পুণ্য হয় তারই বা বিশ্বাস কি ? রােগে ভুগিয়া যত লােক বাঁচিয়া যায়, তার অনেকেরই না বাঁচিয়া মঙ্গল ছিল। বাঁচিয়া মরণের চেয়েও কষ্ট পায়। আবার চিকিৎসা করিলেই যে মানুষ বাঁচে তাহাও বিশ্বাস হয় না। কত কঠিন রােগের রােগী বিনা চিকিৎসায় বা কুবৈদ্যের ভুল চিকিৎসায়ও বাঁচিয়া যায়। পৃথিবী থেকে চিকিৎসা শাটা উঠিয়া গেলেও পৃথিবীর যে বিশেষ অনিষ্ট হয়, সে বিশ্বাস আমার নাই।” ইচড়ে পাকা মেয়েটার লম্বা বক্তৃতা শুনিয়া রাগ হইল। কিছু বলিতে পারিলাম না ; কত স্নেহ যে তাহাকে করিয়া ফেলিয়াছে। সে আরও বলিল, “টেবল চেয়ারগুলি তুমি নিয়ে যাও, না নাও, আমি বেঁচে ফেলব। পােষাক গুলিবো দিদিকে দিয়ে দাও।” আমি বলিলাম, “শকুন্তলা মেয়েটা ?”
নষ্টোর ১২৮ “ওটাকে আর কাকে দেব? ঐত বিদ্যা ফলিয়ে ওটাকে বাঁচিয়ে রেখেছি, ওর মাটাকে বাঁচাতে পালুম না। ওত বেঁচে আছে, সংসারের কাছে ঘৃণা আর অপমান পেতে। যাক, তুমি আমাকে কোনও পাড়ার্ময়ে একখানা কুড়ে বেঁধে দাও, আমি ওকে নিয়ে সেইখানেই থাকবে। অত চ’কের সম্মুখে সহরে আমি থাকব না।” “কেন? তােত সেই পাড়াগাঁয়ে আম গাছ তলায় বাড়ী পড়ে আছে, সেখানে কত টোপা কুল আর সজিনা ডাটা।” মাধবী একবারে কাঁদিয়া ফেলিল, বলিল, “দাদা, এমন বিদ্রুপ তুমি করবে, তাত বুঝি নাই। বুঝলাম আমার কেউ নাই। কেউ ছিল না, সেই ভাল।” বড় ব্যথা পাইলাম। প্রতিজ্ঞা করিলাম বিজয়কে না সন্ধান করিয়া আর মাধবীর সম্মুখে আসিব না। মিষ্টার করও আমার সহযােগ হইলেন। সেও একটা মাঘের রাত, শ্বশুর বাড়ীতে নিমন্ত্রণ, না গেলে নয়। যাইতে হইল। সেখান থেকে খাওয়া দাওয়া সারিয়া বাড়ীতে ফিরিতে হইবে। কথা আছে ভাের ছটায় আমি আর কর সাহেব হুগলিতে গিয়া বিজয়ের সন্ধান লইয়া আসিব। কর সাহেব নাকি সংবাদ পাইয়াছেন তেমনি একটা লােক সেখানে আছে। দশটার আগেই আহার করিয়া উপরের বারাণ্ডায় বসিয়া হাত ধূইতেছি, আর নীচের শুনিতেছি, ঝি ডাকিল, “ও মাষ্টার মশাই, বলি ভাত টাত খাবে ?” বিশেষ মৃদু কণ্ঠে উত্তর হইল, “হ্যা, খাব বই কি। দিলেই থাই।” “ভাত কি ঐ বিছানায় গিয়ে দেবে ? তুমিত কেবল ঘুমুতেই শিখেছ। কে রােজ রােজ ডাকা হাকি করে বল দিনি।”
১২৯ নষ্টোদ্ধার ; “কই না, ঘুমুই নেই ত, এক ডাকেই ত উত্তর দিয়েছি।” “তবে অমন ভাবে পড়ে না থেকে, ছেলেটাকে আর একটু পড়ালেইত পাৰ্ত্তে।” “ছেলে ত পড়লাে না, ঘুম পাচ্ছে বলে চলে গেল।” “ছেলে চলে গেল। তুমি ত মাষ্টারি করেছ ; ছেলে যদি চলে গেল, তবে তুমি আছ কেন ? কেবল খেতে আর গুতে? আশ্চৰ্য্য মানুষ বাবা, ঘরের বার হতেই মাথা কাটা।” “ঘরের বার হয়ে লাভ কি ? ঘরে থাকাই ভাল। আমি হচ্ছি গৃহ শিক্ষক! ঝি চাকর ত নই।” ঝিটা একবারে গর্জিয়া উঠিল, “বটে! এত কথার ঘটা ! আমি ঝি চাকর, ছােট লােক! ঘরের বার হয়ে এসেছি ! এত বড় কথা ! আমি শান্তিপুরে গয়লার গয়লার মেয়ে, বলে ঘরের খানকি হয়ে এসেছি ? মিলে মাথা নাড়ে না, কথা বলে না, এখন তার কথার ঘটা দেখ। ভালর জন্য আমি খেতে ডাকছি, তার উপর এত বড় কথা! বেহায়া ব্যাটা, ব্যাকুব ব্যাটা, বেয়াদব বেস ব্যাটা! আমি ঝি, আমি চাকর, যেন ওর চাকর? আমি চাকর, গার ওনি লাট সাহেব ! নচ্ছার হাতে ব্যাটা! ইত্যাদি।” শুনিয়া শুনিয়া আমি বড় বিরক্ত হইলাম। মাষ্টার তদ্রলােকের ছেলে সন্দেহ নাই; তাহাকে ঝি এমন বেইমানী গালাগালি দিতেছে। আমার শাশুড়ী সেখানে ছিলেন। বলিলাম, “একি ? ঝিটা মাষ্টারকে এমন গাল দিচ্ছে মিছেমিছি। বড়ইত বেয়াদব ? শাশুড়ী ঠাকুরাণী বলিলেন, “ও বড় দায়ে পড়েছি বাবা। ঝিটা ঐ রকমই প্রখর! রাত্রি দিন ছট ফট করে কাজই করে, একলা পাঁচ জনের কাজ কর্তে পারে, বসা আলসে লােক মােটই { নষ্টোদ্ধার দেখতে পারে । আবার একটা মাষ্টার রেখেছি, সেই যে এবাটীতে ঢুকেছে, প্রায় এক মাস হলো একটাবারও ওকে বাইরে যেতে দেখলাম না। সকাল থেকে ৯টা আর সন্ধ্যা থেকে ৯টা পৰ্য্যন্ত ছেলে নিয়ে থাকে, পড়ায় বড় ভাল। কিন্তু ঘরের বার কিছু তেই হয় না, ঘরে দোর দিয়ে শুয়েই থাকে। লােকটা খুব ভদ্র ঘরের ছেলে সন্দেহ নাই, মাথাটা যেন একটু খারাপ। খায়, থাকে, মাইনে পত্র কিছু চায় না।” ওদিকে ঝির কিন্তু মুখ চলিতেছিল, “বােকা, অকস্মা, বজ্জাত, গতরশােকা, কলুর বলদ, ইত্যাদি কত বিশেষণেই মাষ্টারকে সে উপাধি যুক্ত করিতেছিল। হঠাৎ মাষ্টারও যেন গর্জিয়া উঠিল, বলিল, “চুপ বহ হারামজাদী! ফিন বাত বেলগে ত হাড়ি তাের দেগা ?” আমি চমকিয়া উঠিলাম। এ গলার আওয়াজ যেন চেনা ? শাশুড়ী ঠাকুরাণীকে বলিলাম “মাষ্টারটীর নাম কি মা?” তিনি বলিলেন, “কি জানি নামটা কি বলেছিল, মনে আসছে না, থােকা ঘুমিয়েছে, সেই জানে।” “আচ্ছা, ওকে একটু উপরে ডাকুন ত ?” মা ঝিকে মাষ্টারকে উপরে ডাকিয়া আনিতে আদেশ করিলেন। কি সেই খানে দাড়াইয়া বলিল, “কোথায় তােমার মাষ্টার মা! সে এতক্ষণ ঐ চৌমাথার! র্যাপারটা মুড়ি দিয়ে ছুট দিয়েছে। একটা পাগল কোথাকার।” আর ত বিলম্ব করা চলে না। শশুরবাড়ী হইতে আসা তাড়াতাড়িও চলে না। কেউ ত আসতে দেবেনই না। জুতা জোড়া কুড়াইয়া পাইতেই পাচ মিনিট দেরী হইয়া গেল। কোনও উপরােধ না মানিয়া ছুটিয়া বাহির হইলাম। রাত্রি তখন প্রায় এগারটা, মাছের নষ্টোদ্ধার কনকনে শীত। গাড়ী টেকসিতে চলিলে চলিবে না। হাটিয়াই চলিতে হইল। কোন্ দিকেই বা যাই? বড় রাস্তাটা বাহিয়া খানিক দূরে চলিলাম। তাহার পর ভাবিলাম, ভুল করিয়াছি, এত সদর রাস্তায় সে আসে নাই। ফিরিয়া মােড় পর্যন্ত গিয়া গলির মধ্যে ঢুকিলাম। অনেক দূর গিয়া দেখি, একটা যায়গায় অনেকগুলি লোক দাঁড়াইয়া হল্লা করিতেছে। এক টী স্ত্রীলােক খুব বকিতেছে ! দেখিলাম তাহারই মধ্যে আমার আসামী। বিজয় একবারেই উন্মাদ। কেহ মাতাল বলিয়া গালি দিতেছে, কেহ মারিতে যাইতেছে। একবারে বেহুস উন্মাদ বিজয় বলিতেছে, “আমি ঠাকুরমাকে খুজতে এসেছি। এমনি একদিন শীতের রাত্রিতে আমি তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলুম। তখন আমি মাষ্টারি কৰ্ত্তাম। ঠাকুরমাকে ধাক্কা দিয়ে আমার মাষ্টারি কেটে গেল, প্রথমে সরকার, তারপর অধিকারী, তারপর মাধবী! হ্যা, ঠাকুরমা ; তুমি আমার ঠাকুরমা নও? তােমার বড় শীত পাচ্ছে, এই নাও আমার ব্যাপারখানা, গায়ে জড়িয়া নাও।” বিজয় একটী স্ত্রীলােকের গায়ে ব্যাপারখানা খুলিয়া ফেলিয়া দিল। সকলেই হৈ হৈ করিয়া হাসিয়া উঠিল। স্ত্রীলােকটী অকথ্য বলিয়া গালি দিল। আমি ভিড় ঠেলিয়া গিয়া বিজয়ের হাত ধরিলাম। আমাকে দেখিয়া সকলে সরিয়া যায়গা দিল। আমাকে দেখিয়াই বিজয় বলিল, “এই যে সতীশবাবু! আপনাকে কিন্তু আমি এখনও চিনি না। এই সবে আমার মাষ্টারি আরম্ভ হয়েছে, এর মধ্যেই তুমি এলে কেন ভাই ?” আমি সকলকে ভদ্রলােকের ছেলে মাথা খারাপ হইয়াছে, মিষ্ট কথায় বুঝাইয়া দিয়া বিজয়কে লইয়া একখানা ট্যাসি ডাকিয়া চড়িয়া পড়িলাম। পথে বিজয় এলােমেলাে অনেক বকিল। এক- } নষ্টোদ্ধার ১৩২ বার ট্যাকসি হইতে লাফাইয়া পড়িতে যায় ; বলে “পায় পড়ি দাদা, গাড়ি বড় তাড়াতাড়ি যায় ; আমি অত তাড়াতাড়ি পছন্দ করি না। আস্তে, আস্তে, শবুরে মেওয়া ফলে।” ট্যাসি মাধবীর ঘরে আসিয়া থামিল! বিজয়কে লইয়া নামিয়া পড়িলাম। বুক ভাঙ্গিয়া কান্না আসিতে লাগিল । হায় ! একি কুড়াইয়া লইয়া আসিলাম? মাধবী কি সইতে পারিবে ? বারে কড়া নাড়িতেই, মাধবী আসিয়া দ্বার খুলিল। মাধবী চমকিত হইয়া সরিয়া দাঁড়াইল, পড়িয়া যাইতেছিল, সামলাইয়া গেল। মেয়েটার মনের বল অনেক। বিজয়ের একবারে বাবােধ। এত যে বকাবকি করিতেছিল, একবারেই নীরব যেন কোনও জড় প্রস্তর মূর্তি। ঘরে গিয়া বসিলাম, বিজয়ও বসিল। মাধবীকে বলিলাম, মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটেছে! ভয় নাই, অল্পেই বােধ হয় আরাম হবে। বিজয়ের খাওয়া হয় নাই। ঝিকে ডাকিয়া খাবার আনিতে দিলাম। কর সাহেবকে সংবাদ দেওয়ার কৌতুহলটা ঢাকিয়া রাখিতে পারিলাম ফোন করিলাম। কর সাহেব বলিলেন, আচ্ছা আমি আসছি। আইন ঘসা ব্যারিষ্টারটারও উদ্বেগ কম ছিল না। এই রাত্রি সাড়ে এগারটায়ও বলিল আসছি। ঝিকে বলিলাম, ‘ভাল করে চা কর। একবারে শীতে একবারে শীতে জমাট ধরে যাচ্ছি। আবার কর সাহেব আসছেন।” বিজয়ও শীতে কাপিতেছিল, শুধু একখানি র্যাপার গায়ে মাত্র মাধবীকে দেখিলাম, কয়েকবার একখানা ব্যাগ হাতে তুলিয়া আবার রাখিয়া দিল। বুঝিলাম লজার অনুরােধে সে রাগখানা বিজয়ের গায়ে জড়াইয়া দিতে পারিতেছে না। হাজার হউক বাঙ্গালীর মেয়ে ত। না।
নষ্টোদ্ধার আমি ব্যাগ খানা আনিয়া বিজয়ের গায়ে জড়াইয়া দিলাম। বিজয় এখন বেশ পাথরের ঠাকুরের মত বসিয়া আছে। ঝি খাবার আনিয়া দিলে সম্মুখে থালা রাখিয়া খাইতে বলিলাম। বিজয় খাইতে লাগিল। ক্ষুধা খুবই পাইয়াছিল, তাড়াতাড়ি খাইতে লাগিল, অনেকগুলি খাইল ; আমি দেখিলাম, এতগুলি ঠাণ্ডা লুচি পুরী মিষ্টান্ন খাওয়া ভাল নয়, সম্মুখ হইতে থালা সরাইয়া নিলাম। হাত ধুইতে বলিলাম, হাত ধুইল। তারপর তাকে শােয়াইয়া দিলাম । তখনই বাহিরে গাড়ির শব্দ শুনিলাম। কর সাহেব আসিয়াছেন। আরে একি!—মিসেস, করও সঙ্গে ! তাহারাও কি ব্যাপারটা এত মন দিবার মত ভাবিয়াছেন ? বক্তা-মাধবী। সেইত একটা জড় মনুষ্যদেহ আমার ঘাড়ে চাপাইয়া দিয়া তাহারা চলিয়া গেলেন। সাত দিনের মধ্যে একবার দেখিতেও আসিলেন না। মিসেস, কর প্রত্যহ একবার দেখিতে আসিতেন। তিনি কথা কাহারও সঙ্গে বলেন না, কিন্তু শকুন্তলার হাত এড়াইতে পারেন না। তাহার সঙ্গে দুই একটা কথা তাহার বলিতে হয়। তাহাতেই বােঝা যায় তাহার বাকশক্তি একবারেই নষ্ট হয় নাই। শকুন্তলা যদি বলে, “গালি দেখবাে চল।” অমনি তাহাকে লইয়া বারাণ্ডায় গিয়া বসেন। শকুন্তলা যদি বলে, “সন্দেশ খাব।” তখনই নষ্টোদ্ধার ১৩৪ ঝিকে বলেন সন্দেশ আনিতে। শকুন্তলা বলে, “চল বাগানে বেলাতে।” অমনি তাহাকে লইয়া পার্কে বেড়াইতে যান। মন না। • শকুন্তলাই হইল তাহার জীবন শক্তির চালক। নিজের যতটা ডাক্তারি বিদ্যা ছিল তাহাতে বুঝিলাম, বহু ঘাত প্রতিঘাতে বিশৃঙ্খল মনােবৃত্তিগুলি নিতান্ত অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছে। শিশুর কোমল মধুর অকপট আদরে তাহা যাহা একটু সতেজ হইতেছে। একটু আশা হইল বই কি? ভাবিলাম বড় একটা ডাক্তার ডাকি। আবার ভাবিলাম ডাক্তার ডাকিয়া লাভ কি ? ডাক্তারেরা রােগ সারিতে আসে , রোগের বড় বড় নাম ও ঔষধ বাতলাইয়া পয়সা লুটিতে আসে। আমি নিজেই একজন তাই। আমাদের শাস্ত্রে আছে, স্বয়ং শিবঠাকুর চিকিৎসা বিদ্যা ও ঔষধ প্রচার করিয়াছেন, তবু মমের অধিকার বজায় রাখিয়াছেন। তাহার কৌশলে, রােগে ঔষধে আর চিকিৎসকে কখনও মিল হইবে না, সুতরাং নির্ধারিত নিয়তি দিনে যমের অধিকার কেউ কাড়িয়া নিতে পাষিবে না। আমি ত দেখিতেছি, ইনি এখন কাছে গিরা জুড়াইতে পারিলেই বাঁচেন। কিন্তু আমার যে বড় প্রয়ােজন, ইহাকে বাচাইয়া রাখা। ইহাকে লইয়া আমি ইহকাল ভােগ করিব, এ বাসনা ত আমি ত্যাগ করি নাই। পরকাল, পড়ে থাক তা অনেক দূরে! সবে এই চব্বিশ বৎসর বয়স আমার, আমি কি ইহকাল ছাড়িয়া পর- কালের দিকে চাহিয়া থাকিতে পারি? আমার ইহকালের সর্বস্ব, জীবনপথের ধ্রুবতারা, আমার হারাণাে মানিক, ডােবা তরী, কত সাগর ছেচে আমি কুড়াইয়া পাইয়াছি, আমি কি তাহা ভােগ করিতে পাইব না। আমি ত সন্ন্যাসিনী নই। আমার যে বড় সাধ, আমি ভাত বাড়িয়া বসিয়া থাকিব, তিনি কর্মক্লান্ত দেহে যমের নষ্টোন্ধার আসিয়া খাইতে বসিবেন। আমি বিরহ-শয্যায় শুইয়া ছটফট করিব, তিনি কর্মের ভিড়ে অনেক রাত্রি কাটাইয়া আসিয়া গুইয়া পড়িবেন। আমি আমার বাড়া ভাত অথিতিকে দিয়া উপবাস করিব, তিনি আমার শুষ্ক হাসি মুখ দেখিয়া বলিবেন, তােমার মুখটা শুকিয়ে গেছে কেন? আমি হাসিয়া তাহার কথা ঢাকিয়া দিব। আমি কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার আলেপনা দিয়া সারা ঘরটা সাজাইয়া ফেলিব, পাড়ার দশ এয়াে ডাকিয়া হুলুধ্বনিতে গৃহস্থল পূর্ণ করিয়া আড়ির ডালি পাতিব, তিনি হাড়ি হাড়ি মিষ্টান্ন আনিবেন, আমি তাহা শত নিমন্ত্রিতকে সাজাইয়া বাটিয়া দিব। তাহার জন্ম তিথি দিনে আমের বােল আর বকুলের মালায় সমস্ত গৃহ সাজাইয়া দিবসে ফান মাস আমার মনে আছে, তিনি কত আনন্দ সাবধানে নিমন্ত্রিত বন্ধুদিগকে অভ্যর্থনা করিবেন। যে দিন আমার রান্না খারাপ হইবে, সে দিন তাহার ভাল খাওয়া হইবে না, সেই উপলক্ষে আমি পাঁচ রকমের মিষ্টান্ন প্রস্তুত করিব। সেই মিষ্টান্ন তাহার বন্ধুদিগকে খাওয়াইয়া আমার আরও আনন্দ হইবে। তিনি রাগ করিলে আমি রাগ করিব না, তঁাহার উদ্বেগ অশান্তির সময়ে আমি অভিমান কৌতুক কিছুই করিব না, যখন দেখিব তিনি বেশ প্রফুল্ল, তখন একটা কিছু ছুতানাতা ধরিয়া অভিমান করিব। তিনি আমার অভিমান দুর করিতে যত্ন করিবেন, কিন্তু কোনও ব্যথা বােধ করিবেন না। আর যদি কখনও,-স্ত্রীজাতির আশা কতই আকাশে সৌধ রচনা, যদি কখনও—থােকাখুকী কোলে আসে, কত কলহ করিব তাহার সঙ্গে সেই শিশুর যত্ন আদর নিয়া! এ সাধগুলিত আমি ত্যাগ করি নাই কখনও। সাগরবক্ষে ঘুরিয়া ঘুরিয়া সেই পাতালের দেশ মার্কিন মুলুকে গিয়া একবারে যে ইহলােক ছাড়া নষ্টোদ্ধার হইবে। আর একটা লােকে গিয়াও এ সাব আমি ত্যাগ করিতে পারি নাই। ডাক্তারবিবি সাজীয়। দৈনিক একশত টাকা রােজগার করিয়াও এ বাসনা আমি বিসর্জন দেই নাই। আমি জানি আমার বিজয় আমারই সে যে আমার সাধনার সামগ্রী, তপস্যার বর, বহু জন্তের অনুষ্ঠিত পুণ্য ; আমি যে তাহারই জন্য ধরায় আসিয়াছি। আমার এ কামনা কি ব্যর্থ হইবে ? একদিন আমি তাহার পা খানি ধরিয়া বলিলাম “কেন এমন হলে প্রাণাধিক ?” তিনি শুইয়াছিলেন, উঠিয়া বসিলেন। বসিয়াই বলিলেন, “বিশ্ব- বিদাহী দাবানল, তার মধ্যে সঙ্কীর্ণ অতি সঙ্কীর্ণ—পথ, আমাকে বলিয়া দিন্স এর মধ্যেই সুখ, ঐশ্বৰ্য্য সম্পদ যশ। শৈত্য নাই, সরসতা নাই, তব সুখ আছে। সেই পথেই প্রবেশ করিলাম, সুখ আমি চাই-ই চাই। দূরে দূরে ! ঐ দূরে রজত কূপ ! ঐখানেই সুখ। যার বিন্দুর অভাবে আমার দুঃখ, তার স্তপ আমাকে অধিকার করিতেই হইবে । কত দীর্ঘ সে পথ । সে পথে অসংখ্য সূচীর মত কটক, তা হােক, আনাকে ঐ পথে যাইতেই হইবে। ঐত দেখা যায় আমার কাম্য রসত পৰ্ব্বত, চক্ চক্ ঝক ঝক করিতেছে! চলিলাম, রক্ত শুকাইয়া যায়, চৰ্ম্ম দগ্ধে যার, হাড়ে গিয়া অগ্নি শিখা লাগে, তবু যাইতেই হইবে। কত কাল কত যুগ চলিলাম। সে মরীচিকা ধরা যায় না, কেবল দেখা যায়। সহসা কে বলিয়া দিল, ও মৃগতৃষ্ণিকা, ধরা যাবে ; সেইখান থেকে আবার ফিরিলাম। সম্মুখে অগ্রসর বরং সস, পিছন ফেরা আরও শক্ত। হােক, তবু ফিরিতে হইবে। পুরাণ কথা মনে আসিল। ফিরিতে পারিলেই সুখ না থাক, স্বস্তি আছে। মনে হইল সে যে আমার বড় আরামের, বড় স্বস্তিক ১৭ নষ্টোদ্ধার অবস্থা! সেইখানে ফিরিয়া যাইতে হইবে। হয়ত তাহা নাই, হয়ত তাহা আর পাইব না, তবু ফিরিব। ফিরিতে উণ্টা বাতাসে সে আগুন দ্বিগুণ জ্বালা দিল । তবু আমার জয়, আমি ফিরিতে পারিয়াছি। ফিরিয়া দেখি এ যে অতি শীতল, অতি কোমল। এত দাহের পর ত এত শীতল সয় না । অসাড় হয়ে যাই যে! দাহের ক্ষতে শীতস্পর্শে বড় জ্বলে উঠে। | বাতাস কর, বাতাস কর, মাধবী; আস্তে, আস্তে, অত প্রখর বাতাস ত সইতে পারি না। পাখা টান, বেন হাওয়া না বয়। গায়ে হাত দাও, যেন কোমল মােলায়েম না ঠেকে, সরবৎ খাওয়ায়, অত মধু মিষ্টি দিও না। আর কি করবে? ঠিক বুঝতে পাচ্ছি না, যাতে ভাল হয় তাই কর । কথা যেন প্রবল ফোয়ারা বেগে ছুটিতে লাগিল, রুদ্ধ স্রোত যেন খুলিয়া গেল। এ অপেক্ষা রুদ্ধ বাকই যে ভাল ছিল। কেবলই কথা। সে কথার ঝড়ে শকুন্তলা কাঁদিয়া দিল। তবু ঝড় থামিল না। এইবার আমি হতাশ হইলাল। কথা। ) পর দিবস অতি প্রত্যুষেই মিসেস্ কর আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তাহার সঙ্গে একজন ব্রাক্ষণ। ব্রাহ্মণের প্রৌঢ় বয়স, পূর্ণাঙ্গ দেহ, নধর বলিষ্ঠ, গৌরকান্তি হইতে যেন রক্ত ছুটিয়া বাহির হইতেছে। পরিধানে রক্ত বসন, রক্ত উত্তরী স্কন্ধে, ললাটে রক্ত চন্দনের ফোটা নয়নে চন্দ্র দীপ্তির মতন শান্তোজ্জল করুণা। অধরে অস্ফুট নষ্টোদ্ধার ১৩ মধুর হাসি। মিসেস্ কর ব্যারিষ্টার সাহেবের গৃহিনী হইলেও ব্রাহ্মণ সাধুর প্রতি অকাট্য বিশ্বাস ভক্তি। তিনি বলিলেন, “ইনি ব্যস্তয়ন করিবেন, বােগ আনােগ্য হইবে। ব্রাহ্মণ অবধূতের উপর আমার বিশ্বাস ছিল না, তবু এ ব্রাহ্মণকে দেখিয়া ভক্তি আসিল। পায়ে পড়িয়া প্রণাম করিলাম। ব্রাহ্মণ ঘট পাতিলেন। ধূপ দীপ জ্বলিলেন পুষ্প চলন দিয়া পূজা করিলেন। তারপর অতি অপূৰ্ব্ব পুলক-সঞ্চারী রুদ্র মধুর কণ্ঠে ওপাঠ আরম্ভ করিলেন। সে স্বরতরঙ্গে বিকারীর প্রলাপ দমিয়া আসিল। কথা বলিবার অবকাশ পাইলেন না। সেই স্বরতরঙ্গ, গতী লহরী বিবিধ মূৰ্ছনাভঙ্গে চলিতে লাগিল। গৃহ স্বরময় হইয়া উঠিল, প্রাচীরে প্রতিধ্বনি আহত প্রতিহত হইতে লাগিল। পঠনের বিরাম নাই, বিচ্ছেদ নাই! অবসাদ নাই, শ্রান্তি নাই। শিশু শকুন্তলাও স্তম্ভিত হইয়া পড়িল। “যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমাে নমঃ।” কত রূপে কত ভাবে সে নমস্কার মন্ত্র ! শক্তি, বুদ্ধি, তুষ্টি, পুষ্টি, লজ্জা ঘৃণা, সৰ্বরূপেই নমস্কার। ভক্তি, মায়া, ভ্রান্তি, সকলই তাহার বিভূতি ! তথাপি রােগী কি বলিতে যাইতেছিলেন, অবকাশ পাইলেন না। মধু কৈটব, মহিষাসুর, রক্তবীজ, চণ্ডমুণ্ড, শান্ত, নিশুম্ভ বধ হইল, একই মহাশক্তির প্রভাবে। সর্বদেবতা তটস্থ হইয়া হুতি গাহিলেন। দেবী আশীর্বাদ কবিলেন, অভয় দিলেন। রােগী মূৰ্জিত হইয়া পড়িলেন। পুরােহিত শান্তিজল তাহার মন্তকে দিয়া, তাহাকে কবচ মন্ত্রে ঝাড়িতে লাগিলেন। নােগী সংজ্ঞা লাভ করিয়া বলিলেন,—অতি ধীরে আর্তস্বরে, “এই কি আমার প্রায়শ্চিত্ত।” ঠাকুর বলিলেন, হ্যা, তােমার প্রায়শ্চিত্ত হইল, তুমি শুদ্ধ পবিত্র।”
নষ্টোর “দেবী এমনই ভ্রান্তিময়ী।” “আমার শুদ্ধ শক্তিময়ী।” শক্তিতে আমার ভ্রান্তি কেন?” “তা না হলে জীব জীবকৰ্ত্তার সমান হয়। অষ্টা সৃষ্টকে সমান রাখলে, সৃষ্টি বৈচিত্র থাকে না, তার লীলা ফুরিয়ে যায়।” “নিশ্চয়ই। তিনিই ভ্রান্তি, এই জ্ঞান হলে ভ্রান্তিতে জীবের নিজস্ব বােধ রহিল না। তখন আর ভ্রান্তি জন্য জীবের গ্লানি কি?” “ভ্রান্তি যদি গেল, তবে জীবের বাঁচিবার প্রয়ােজন রইল কই ?” *একভ্রান্তি হতে আর এক ভ্রান্তিতে যেতে হবে। জীবনই ভ্রান্তি।” “তা হলে ভ্রান্তি হতে মুক্তিলাভ জীবের অসাধ্য ?” “অসাধ্য নয়, কষ্টসাধ্য। ভ্রান্তি, মুক্তি উভয়েই জীবের আনন্দ আছে। প্রান্তির আনন্দ নশ্বর, মুক্তির আনন্দ অবিনশ্বর। অবিনশ্বর আনন্দ হলে ত সে আনন্দময়ই হয়ে যায়, তখনত জীব থাকে না, আনন্দই হয়। ভ্রান্তির আনন্দই প্রেম, মুক্তির আনন্দে প্রেমেরও সত্ত্বা থাকে না। প্রেম যখন বিশুদ্ধ হয়, তখন আপন সত্ত্বা লুপ্ত করে, আনন্দে ডুবে যায়। সেও মুক্তি লাভের একটা উপায়।” “আমি এখন কি করবাে ?” “প্রেমেরই সাধনা কর, তাহাতেই তােমার অধিকার। তাই নিয়াই তােমার কর্মের সূত্রপাত।” ঠাকুর রােগীর শির হইতে করতল উত্তোলন করিলেন, রােগী অসাড় অজ্ঞান হইয়া রহিলেন।
বক্তা-সতীশ চন্দ্র। সুস্থ প্রকৃতির বিজয় কুমার সরল নির্ভয়ের কণ্ঠে আসিয়া বলিলেন, “আমি মাধবীকে শাস্ত্রবিধিমতে বিবাহ করিব, আপনি তার ব্যবস্থা করিয়া দেন।” আমি ভাবিলাম, শাস্ত্রবিধি আবার কি? এতটা টান হেচড়ার পরে আবার গােটাকতক সংস্কৃত মন্ত্রমুত্রের কি প্রয়ােজন। বলিলাম, “বিবাহটা তবে গন্ধর্ব মতে হােক, প্রজাপত্য বিধিতে নাই বা হােল।” বিজয় বলিলেন, “না তা হবে না। পুরােত ডেকে, শালগ্রাম সম্মুখে মন্ত্র পাঠ করে সম্প্রদান কর্তে হবে।” “সম্প্রদান আবার কে করে বলুন! মাধবী নিজেই নিজেকে সম্প্রদান করে আছে।” বিজয় আনন্দের হাসি হাসিল। বলিল, “বর খুজিতে এত কষ্ট স্বীকার কল্লেন, একজন সম্প্রদাতা খুঁজিবায় কষ্টটুকু স্বীকার করবেন ? যতদিন তা না হয়, ততদিন আমি আপনার এখানেই থাকব। এর পূর্বে আমি আর মাধবীর কাছে যেতে চাই না।” তাহাই হইল। বিজয় আমার এখানেই থাকিয়া গেল। আমি খুজিয়া মাধবীর পিতার একজন জ্ঞাতি পাইলাম। তিনি অত বড় সাগর ফের বাড়ী মেয়ে সম্প্রদান কর্তে শাক্ত ধর্ম ও সমাজের ভয় পাইলেন। তাহার সে ভয় ভাঙ্গিতে বিশেষ কষ্ট হইল না। এক জোড়া ঢাকাই ধুতি চাদর ও কিছু রজত দক্ষিণা দিয়াই সহজে কার্যোদ্ধার হইল।
১৪১ নষ্টোদ্বার ফাল্গুনে দিন স্থির হইল। কন্যা কৰ্ত্তা আমি স্বয়ং, বর কৰ্ত্তা হইলেন মিষ্টার কর। কর সাহেব আসিয়া বলিলেন, “দেখুন মশাই। আজ কালকার বাজারে শুধু হাতে ভগিনীর বিবাহ দেওয়া চলিবে না, বাজার মত বরের মূল্য দিতে হইবে। যৌতুকাদির কথা আগে পাকা পাকি হওয়াই ভাল।” আমি বলিলাম, “কন্যার ঘরের দিকে চাহিয়া কথাটা বলিবেন। কত বড় কুলীনের মেয়ে, তাত জানেন। গােষ্ঠিপতি হলেও বর মৌলিকের ঘরে। ঘরের মান কিন্তু খােয়াতে পারবাে না।” অনেক বুঝাইয়া বলিয়া কহিয়া মাকে এই বিবাহে যােগ দিতে, বর কন্যা আশীর্বাদ করিতে রাজি করিলাম। তাহা না হইলে মাধবী কান্না ছাড়ে না। বউদিদিরা শুনিয়াই আহলাদে নাচিয়া উঠিলেন, তাহারা কোনও শুদ্ধি অশুদ্ধির কূটতর্ক মানেন না। পল্লী দেশ হইতে বিজয়ের মামাত ভাই পিশতত ভাই, জ্ঞাতি কুটুথ আট দশ জন আসিলেন। শুভ বিবাহ হইয়া গেল। মাধবীটা যে কেমন করিয়া চেলি পরিয়া ঘােমটায় মুখ ঢাকিয়া পিড়ির উপর বসিয়া সাত পাক ঘুরিল, তা ভাবিয়া আমি হাসি রাখিতেই পারিলাম না।
বক্তা-মাধবী । শেষটা আমাকে না বলিলে চলিল না। আপনারা হাসিয়া লজ্জা দেবেন না। কর দিদি আমাকে যা লজ্জা দিয়াছিলেন, তা যখন সইতে পারিয়াছি, তথন হাসি টিটকারী আমি খুবই খাইতে পারি। যদি প্রাণভরা আনন্দ থাকে, তবে আঘাতে বড় ব্যথা লাগে না। স্বামীকে বলিলাম, “চল দেশে যাই, আর এ সহরের ভিড় ভাল লাগে না।” তিনি বলিলেন, “সর্বনাশ। দেশ আবার কোথায়?” “কেন সেই পল্লীর বাড়ীতে, আমি ত সে বাড়ী দেখে এসেছি।” “সেখানে গিয়ে কিরূপে চলবে?” “ভালই চলবে। সে ত সােণার দেশ। অত বড় বাখানার ভিতরেই দু’জনের অন্ন বস্ত্র চলতে পারে।” “তােমার ব্যবসাত সেখানে চলবে না। পাড়া গাঁয়ের পুরুষ ডাক্তারকেই টাকা দেয় না। “ব্যবসা আর করবাে না ; বিদ্য ফলাতে হয়, সেই পল্লীর সেবারই বিদ্যার সার্থকতা করবে। ডাক্তারি আর করব না, ডাক্তারের অত্যাচার হইতে বােগীদিগকে বাঁচাবার উপায় করবে। আমি একটা কথা মােটেই বুঝতে পারি না যে, ডাক্তারের যত নাম পশার বাড়ে, ফি তার তত বেড়ে যায়। নাম পশার বাড়লে ফিত আরও কমে যাওয়া উচিত। দিনে একটা কল পেয়ে, চার টাকা না হলে দিন চলে । দিনে যদি দশট। কলই মিলে, তবে এক টাকা হলেই বা দোষ ১৩ নষ্টোর ? কি? আমরা সাগর পাহাড় ত অনেক ঘুরলাম, কাজ ত কিছুই কল্পাম • না। পল্লীর ভিজা মাটীতে ছায়ায় বসে, একটু আরাম করিগে চল।” “পল্লীতে বড় ম্যালেরিয়া : “চল, সেই রাক্ষসীর সঙ্গে লড়াই করি গিয়ে। ম্যালেরিয়ার ধ্বংসের এক মাত্র উপায় পেট ভরে খাওয়া, আর মুক্ত বাতাসে বেড়ান। এখনও হাজার পাঁচেক টাকা আমার আছে। সেই টাকা নিয়েই অন্ততঃ সেই গ্রাম থেকে ও রাক্ষসীটাকে আমি তাড়াতে পারবে। নেহাৎ না পারি, দশ জনের সাথে আমরাও মরবো। তবুত বীরের মত রণে মৃত্যু হবে। এইট পাথরের মধ্যে মরেও সুখ হয় না। বক্তা—বিজয় সিংহ। শেষটায় আমাকেও একটু বলিতে হইল। গােটা দুই বৎসর পত্নী গ্রামের বাড়ীতে থাকিয়া পুরাতন স্মৃতিগুলি ভুলিয়া ফেলিয়াছি। সে গুলি এখন আর ডাকিয়া না আনিলে সাধিয়া আসিয়া মনের মধ্যে ভিড় পাকাইয়া বসে না। এ ছায়া-ঢাকা আঁধার পথে এমন কিছুই চক্ষে পড়ে না, যাহাতে সে পুরাণ কথাগুলি মনে ডাকিয়া আনিবে। দিনও একরূপ বেশ চলে। মাধবী ডাক্তারী করে না, কিন্তু চিকিৎসা করে। পাঁচ গ্রামের মধ্যে রােগ হইলে তাহাকে পাইতে আর কাহাকেও বড় ডাকে না। আর আমাদের বাড়ীতে শাক সবজি আম কাটাল, নারিকেল কদলী, দুধ, খেজুর রস, গুড়, চিড়া, মুড়ি প্রায়ই আস, হিসাব করিয়া দেখিলে ইহাতে মাধবীর প্রায় দৈনিক গােটা মষ্টোদ্ধাঃ ১৪৪ দুই টাকা আয়। আর প্রণামী কাপড়ের সঙ্গে হাড়ি হাড়ি বাতাস সন্দেশও আসে। মাধবীর ছেলে মেয়ে, দিদি বােনর অভাব নাই। আমিও বসিয়া থাকি না। প্রথমে নিজ বাস্তু বাড়ীটার জঙ্গলগুলি কাটাইয়া কোদলাইয়া কৃষি আরম্ভ করিলাম। চারি পার্শে তিন শ নারিকেল গাছ পুতিয়াছি, মধ্যে আলু কপি পটন বেগুনের ক্ষেত। নারিকেল গাছগুলি এই দু’বৎসয়েই বেশ বাড়িয়া উঠিয়াছে, দেখিলে বড় আনন্দ লাগে। আমার সবজি বাগ দেখিয়া পল্লীবাসীর হাতে প্রলােভন আসিয়াছে। চার পাঁচটা গ্রামের যুবকদল ডাকিয়া একটা সমিতি গড়িলাম, স্থির হইল গ্রামের সমস্ত জঙ্গল আগাছা কাটিয়া সাফ করিব। পরে তাহাতে মরসুম মত ফসলের চাষ করিব। খরচ সমস্তই সমিতি হইতে দেওয়া হইবে। ফসল উঠিলে বিক্রয় করিয়া, টাকায় বৎসরে এক আনা হিসাবে সমিতির টাকা শােধ দেওয়া হইবে। সমিতিতে প্রথমে মাধবী হাজার টাকা জমা দিলেন। তিন বৎসরের মধ্যে গ্রাম শবজি বাগের হরিৎ শোভায় সুশােভিত হইল। উপযুক্ত সার ব্যবহার করায় শস্য দ্বিগুণ ত্রিগুণ ফলিতে লাগিল। পল্লীবাসী বুঝিল, কামধেনু পল্লীরাণী, চাহিলেই সুধা দান করে। পেট ভরিয়া ক্ষেতের শস্য খাইয়া, পরিস্কার রােদ-বাতাস-খেলা গ্রাম্য রাস্তায় ঘুরিয়া পল্লীবাসী স্বাস্থ্য-সুন্দর হইয়া উঠিল। ম্যালেরিয়ায় নাশ হইলেও শক্তি খর্ব হইল। আপনার সেবা সর্বস্ব না. ভাবিয়া পরের সেবায় মন দিলে আনন্দ অসীম, তাহা বুঝিলাম। ভাবনা এখন শকুন্তলাকে লইয়া, তাহার এই দশ বৎসর বয়স, যােল পা হইতে আর কতই বা দেরী। মাধবী বলে, যে শকুন্তলা গড়তে পারে, একটা দুষ্মন্তু গড়তে তার আটকায় না। সম্পূর্ণ।
No text on this page.
No text on this page.