Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Bhagaban Shri Shri Ramkrishnadeber Balyalila
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
ودود
و ویدویر هی
:)
وليداهه
ورع وليمرر
جمعی و وبدوره
انا ما اخبار کے ما
عناع
معدومر
ভগবান্
শ্রীরামকৃষ্ণদেবের বাল্যলীলা
ভক্ত-সাধক অমৃতলালের
শেষ জীবনের সাধনা
মুদ্রাকর ও প্রকাশক---
শ্রীপূর্ণচন্দ্র
ন্দ্র মুখােপাধ্যায়
বসুমতী-রােটারী-প্রেস,
১৬৬নং বহুবাজার ষ্ট্রীট, কলিকাতা
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মা তুমি পূর্ণ পবিত্রতা, সধবা কুমারী-ব্রতা, তাপিতের ত্রাতারূপা প্রকৃতি পরমা । কৃতযুগে বেদমাতা, ব্রহ্মার মানস-জাতা, সাবিত্রী গায়ত্রী কর্তী সবিতা সুষমা। ত্রেতাতে তুমি মা সীতা, দ্বাপরে জীবন্ত গীতা, বুদ্ধযুগে শুদ্ধা বুদ্ধি মােদা নিৰ্বাণ । পুরাণে মা পুরাতনী, নিত্যা সত্য সনাতনী, ভক্তি-গঙ্গা-তরঙ্গিণী প্রতিমানিৰ্মাণ । তুমি রূপে জগদ্ধাত্রী, দশভুজা পূজাপাত্রী, শ্যামা রমা সরস্বতী অন্নদা রাধিকা। নাম ধরি বিষ্ণুপ্রিয়া, চৈতন্য উদয়ে ক্রিয়া, অন্তরে অন্তরে রহি স্বতন্ত্র সাধিকা । রামকৃষ্ণ-লীলরঙ্গে, মাতৃ-মূর্তি পূত অঙ্গে, এলে সঙ্গে হেরি বঙ্গ বন্ধু অন্ধকূপে। ভাবে স্বামী সুবিভাের, “আনন্দরূপিণী মাের”, বলিয়া পূজেন জায়া যােড়শী স্বরূপে । শক্তির সঞ্চার করি, অলক্ষ্যে লেখনী ধরি, লেখালে লীলার গীতি কত ভক্তজনে। স্তব-স্তুতি পুথি নয়, হৃদয় এ কথা কয়, প্রত্যক্ষ পেয়েছে সাক্ষ্য কুপুত্র রচনে নহে কি সে মূর্খ নট, শূন্য শিরে জ্ঞান-ঘট, ঘটনা রটনা পারে করিতে খেলায়। আগে মনে জাগে নাই, কি লিখেছি ভুলে যাই, কলম তবে কে মা গাে চালায় হেলায় । সত্তর হয়েছি পার, পঞ্চবর্ষ পরে আর, ছিয়াত্তরে মন্বন্তরে হা-হা করেন।
[ ২ ] কাৰ্য আজো চায় ধরা, তাই নাই দেহে জরা, প্রভাবে অভাব সদা করে জ্বালাতন। আলস্য পরশু রাত্রে, শয্যায় শােয়ায় গাত্রে, মন কিন্তু মন দিল ভাবনা-পূজায় । নিদ্রা-ও সাধনা চায়, মরাতে ধরাতে পায়, মরণে আরাম আছে প্রত্যহ বুঝায় ॥ উঠে বসি বিছানায়, স্বপ্ন-পু-রচনায়, ক্রমে ক্রমে হােলাে গত ত্রিযামা রজনী। চিতে পারিনি আগে, নিশীথ চিন্তার যাগে, শ্রীকান্ত-মূর্তিতে জাগে চিন্তা-চূড়ামণি ॥ এ-দিক্ ও-দিক্ ঘুরে, কামারপুকুর পুরে, কি জানি কিসের ঘ্রাণে প্রাণ গেল লােভে। কুটীর খড়ের চালা, বাটীর সে ঢেকিশালা, আঁধারে হেরিল আলো শিশু শশী শােভে ॥ আদেশ শুনিল কান, রসনায় এল গান, জন্মতিথি-ব্রত-কথা সূচনার সুরে । নাহি ছিল নিদ্রাবেশ, জাগ্ৰত এ প্রত্যাদেশ, এমনি সহজ সেই জগতের গুরু রে ॥ তিনি মা চৈতন্য-দাগ, শক্তিময়ী তুমি মাতা, পাকে পােরা হৃদি-সরে ফোটাও কমল। চৰ্ম্ম-চক্ষে মৰ্ম্মঘাতী, দেখি ফাকি মাতামাতি, দেখাও সূতিকা-চিত্র পূত সুবিমল । শিশুরে ঈশ্বর-জ্ঞান, কর মা দীনেরে দান, শুদ্ধা ভক্তি দিয়ে কর মুক্ত রুদ্ধ মন । কু-চিন্তা কর মা দূর, হােক হৃদি শান্তিপুর, শুনাও সুতের কানে বীণার বাদন। দাও দাসে ভাব-ভাষা, ভগবানে ভালবাসা, কল্পনা-কুসুমে দেহ ঐশিক সৌরভ। অক্ষম্বেতে মূর্তিমতী, হও মাতা সরস্বতী, সদাই শুনুক লােকে গদাই-গৌরব ।
[ ৩ ]
মঙ্গল-বােধন
জয় জয় রামকৃষ্ণ ইষ্ট-সিদ্ধিদাতা।
ধরথে কৰ্ম্ম-পথে গতির বিধাতা ॥
কি কারণে নরদেহ করিয়া ধারণ।
আসিলে করিতে হেথা কি ব্যথা-বারণ
অনুরক্ত শ্রেষ্ঠ ভক্ত ধন্য পুণ্যবান্।
রাম দত্ত তার তত্ত্ব করেছে বাখান ॥
জয়যুক্ত নিত্যমুক্ত ভক্ত অবতার।
বীরেন্দ্র বিবেকানন্দ মুখেতে প্রচার ।
কিমাশ্চৰ্য্য খৃষ্ট-রাজ্য বলে জয় জয় ।
বেদান্ত-ব্যাখায় শুনি ধৰ্ম্ম-সমন্বয়।
জিজ্ঞাসে বিগেত যত শ্বেত নারী নর।
নূতন এতত্ব কোথা পেলে সাধুবর :
স্বামীজী বলেন সবে আমি কি বা জানি।
আদিষ্ট হইয়া কহি রামকৃষ্ণ বাণী।
গ্রন্থজ্ঞানশূন্য দ্বিজ চিন্তাচুড়ামণি ।
তিনি ব্ৰহ্ম তিনি শব্দ আমি প্রতিধ্বনি।
রামকৃষ্ণ মম ইষ্ট রামকৃষ্ণ জ্ঞান।
দিয়াছি,নরেন্দ্র নাম শ্রীচরণে দান ।
তিনি যা লেখান লিখি যা বলান বলি ।
প্রেমানন্দে অন্ধ হয়ে হাত ধরে চলি।
অভেদানন্দাদি অন্য গুরুবন্ধু সঙ্গে।
ভাসান শক্তির দেশ ভক্তির তরঙ্গে।
আনন্দে সারদানন্দ লীলার প্রসঙ্গে।
সাধনার সমাচার দিয়াছেন বঙ্গে।
“রামকৃষ্ণ কথামৃত” বারি যে তৃষ্ণার।
অক্ষরে অক্ষয় রাখে মহেন্দ্র মাষ্টার ॥
ঘরে ঘরে নর-নারী পড়িবে আশায়।
অক্ষয় পয়ার রচে সরল ভাষায়।
[ ৪ ] ব্ৰহ্মানন্দ শিবানন্দ প্রেমানন্দ আদি। সবার চরণে শির নত রাখি সাধি। ত্যক্ত জনে ভক্তি দিতে সবে শক্তিমান। ধনী যথ। দীনে পারে দিতে ধনদান । + দেহ দেহ দেহ মােরে দেহ সে বিশ্বাস। যার বলে প্রাণে পেলে প্রেমের উচ্ছ্বাস। উদ্দীপ্ত যৌবনকাল বিদ্যা-অভিমান। আশার নেশায় মন মাতালসমান । আশ্বাস দিতেছে মনে প্রত্যেক নিশ্বাস । কামিনী কাঞ্চন স্বপ্নে সৃজিত উল্লাস। জীবন-বসন্তে জাগে কামনা অনন্ত। সংসারে ভােগের সুখ সুযােগে সাজ। যে বিশ্বাসে আত্মশক্তি করিয়া আয়ত্ত । ভগবদ্ভক্তির ভাবে হইলে উন্মত্ত ॥ দৃঢ় করি ধরি করে শ্রীগুরু-চরণ। মানব-মঙ্গলব্রত করিলে গ্রহণ। অহেতু দয়ার দীক্ষা পেলে যার ঠাই। সে বিশ্বাস দাসে দাও তাহারি দোহাই । চাই চাই চাই করি পাই শুধু ছাই। খেয়ালে শালের লােভে জালেতে জড়াই। রচিৰ ঈশ্বর-ভাষ্য বিশ্বাসের বলে । প্রাণের প্রহরী রহ ভকত সকলে । বন্দনা রামকৃষ্ণ মিষ্টনাম, কর কণ্ঠ অবিরাম, করুণা-মাখানাে মূৰ্ত্তি স্মর সদা মন। ঘন উচ্চ উচ্চারণ, ক্রমে স্থির করে মন, সত্তার চৈতন্য করে শব্দে জাগরণ ॥ আদিতে উপাধিময়, ধ্যানে প্রাণে পরিচয়, দিব্যজ্ঞানে সন্নিধানে দেখে ভাগ্যবান্।
[ ৫ ] অর্জিত না ছিল পুণ্য, মরু-হৃদি গুরুশূন্য, কারুণ্য-কানন কাছে অরণ্য সমান। জনমে যৌতুক-বঙ্গ, মুখেতে কৌতুক ব্যঙ্গ, কপি সম করিয়াছি মাত্র উপহাস। ভুজঙ্গ গরল ঢালে, কণ্ঠে ধর সেই কালে, এমনি ঈশ্বর-বৃত্তি ওহে কৃত্তিবাস । চরণে বাজিলে বাণ, প্রণাম করহ জ্ঞান, কি ক্ষমা কি দয়া পিতা ব্যথিতে রিতে। আসিয়াছ কতবার, কর্ণে গেছে সমাচার, দৃষ্টিপথ ছেড়ে গেছি দুষ্টামি সারিতে। ভক্তিতেজে তপ্তর, গিরিশ আসক্ত ভক্ত, কভু না বিরক্ত লতে প্রভুপদপ্রান্তে। নাট্যগুরু ছদ্মবেশে যেতে পাদপদ্মদেশে, গুরুরূপে উপদেশ দিয়াছেন ভ্রান্তে। বিজপের অবসান, আসিয়াছে অভিমান, নহি আমি তীর্থযাত্রী পুত্র যে পিতার। ধরিয়া প্রাণের কান, যে দিন দেবেন টান, মাথা নত করে সব চরণে তার। হে গিরিশ ভক্তবীর, চরণে লুটায় শির, কৃতজ্ঞ প্রাণের অর্ঘ্য করিছে প্রদান। নাট্য-রবি কবি বিশ্বে, মেহের অনুজ শিষ্যে, রামকৃষ্ণপদপ্রান্তে দেওয়াইলে স্থান। চুকেছে ভােজন-পালা, শূন্য-স্থালী পাকশালা, অনাহারে আমি আর মিত্র এক অন্য । ব্যস্ত সে গিরিশ ঘােষ, পাছে করি আপশােষ, পাতের প্রসাদ আসে শ্রীমুখের অন্ন ॥ প্রসাদ প্রকারে পায়, নিবেদিত প্রতিমায়, মুখে তুলি ভক্তপ্রাণে আনন্দ বিশেষ। অহেতু কৃপার দান, অন্নপূর্ণা মা যােগান, চেতন-বিগ্রহগ্রাহ ভুক্ত অবশেষ।
[ ৬ ] দেখেনি এ দীন-নেত্র, পুণ্যতীর্থ পুরীক্ষেত্র, তার তরে নাহি মনে আর কোন কষ্ট। নিজে প্রভু জগন্নাথ, চক্ষু-অগ্রে সু-সাক্ষাৎ, প্রসাদ-মাহাত্ম্য দেন বুঝাইয়া স্পষ্ট। সাগরে যেমন জল, কমলে কোমল-দল, স্বরূপে স্বরাট তথা দয়া মূর্তিমান। সে দয়ার আবির্ভাব, নরদেহে সু-প্রভাব, ঘুচাতে অভেদ-মন্ত্রে ধৰ্ম্মে ভেদবুদ্ধি। রামকৃষ্ণ নাম ধরি, শান্তি দেন ভ্রান্তি হরি, সৎ অর্থে পথ বলি লক্ষ্য চিত্তশুদ্ধি ॥ অপূর্ব সে জন্মকথা, ভাষায় রচিয়া লতা, বাসনা ফোটাতে তার অমৃতের ফুল। কর দেব শক্তিদান, ভক্তি-সিক্ত হাে গান, প্রচারিতে ব্রতকথা অমৃত আকুল । কথারম্ভ তীর্থ-কামারপুকুর উত্তর-পশ্চিম ভাগ হুগলী জেলায়। বাঁকুড়া ও বর্ধমান যেখানে মেলায় ॥ ত্রিকোণমণ্ডলে আছে গ্রাম তিনখানি। এত পাশাপাশি যেন এক বলে জানি। শ্রীপুর মুকুন্দপুর কামারপুকুর। জমীদার সুখলাল গোঁসাই ঠাকুর। সেকালে সকল গ্রাম ছিল সুখকর। সচ্ছলে স্বচ্ছন্দে স্বাস্থ্যে আনন্দ-আকর॥ ধান্তের প্রাধান্য ক্ষেত্রে লক্ষ্মীর আবাস। গােচরে বাছুর গরু সুখে খায় ঘাস। ডােবা দীঘি সরোবর বহে নদী খাল। আম জাম আদি বৃক্ষ নারিকেল তাল ।
[ ৭ ] দেউল মন্দির মঞ্চ দেউড়ী দালান। ভেঙ্গে পড়ে আছে দেখে হয় অনুমান । কামারপুকুর গ্রাম ছিল এককালে। লক্ষ্মীমন্ত বসবাসে বেশ ভাল হলে । ব্রাহ্মণ কায়স্থ তাঁতি কুমার কামার। ঘরে ঘরে সবাকার ধানের খামার। কৈবৰ্ত্ত আপন অর্থে সুখে বৰ্ত্তমান। চাষা বলে নাহি টুটে সদগােপের মান। চঁড়ালে বাড়ায় সবে বলে নমঃশূদ্র। পণ্ডিত উপাধি পেয়ে তােম নহে ক্ষুদ্র । বণিক গােয়ালা কলু রজক ধীবর । বিবিধ যাজকে যায় যজমানের ঘর । পাতে ভাতে জাতিভেদ নহে কভু আঁতে। স্যাঙাৎ পাতায় দ্বিজ অত্যজের সাথে । খাদকের অধিষ্ঠান মােদকে প্রমাণ। কামারপুকুরে ছিল জিলাপীর মান ॥ মিঠাই ও নবাতের সুখ্যাতি ঘটনা। ঘটার সমাজ বটে করয়ে রটনা গ্রামে গ্রামে ছিল তবে ভাল কারিগর। কুলীরূপে আজ তারা কলের চাকর । বিড়ি মুখে গুজে দিয়ে কেড়ে নিয়ে হুকো । স্বদেশী হয়নি যবে দেশ পােড়ামুখাে । কামারপুকুরে হােত কি সুন্দর নলচে। অভাবে যাহার আজো প্রাণ মাের জ্বলছে । গড়গড় ডাকে নল টেনে দিলে দম। কোথা লাগে তার কাজে তাের সা-রে-গ-মা। ঘরে ঘরে চর্কা ঘােরে সুতা সূত কাটে গামছা কাপড় বুনে তাঁতি যায় হাটে সিহর বদনগঞ্জ তারা-হাট আদি। সহরে কাপড় বেছে নিয়ে যেতদি।
[ ৮ ] বিষ্ণু চাপড়ী বুন্তো এম্নি শ্রেষ্ঠ কাপড়। কলকাতাতে দাম জোড়া পিছু চাপড় ॥ কলমী তিজেল সরা কুমােরের সজ্জা। গুমােরে বিকায়ে দিত বিদেশীরে লজ্জা চেঙ্গারি ধুচুনি কুলাে চেটাই মাদুর। কেনায় বেচায় দুঃখু দু’পক্ষের দুর ॥ খ্যাতি-তৃষ্ণা ছিল বটে ধর্মে কিন্তু নিষ্ঠা। ঠাকুর-বাড়ীতে অন্ন পুকুর প্রতিষ্ঠা। মাণিক বামুন-ঘরে ছিল কিছু ধন। গ্রামের লােকেরে দিল আমের কানন । বিনি দামে মিঠে আম খেয়ে তাজা তাজা। আজো শুনি লােকে বলে সে মাণিক রাজা । সরকারী রাজাগিরি দরেদরখাস্ত। হরঘড়ি ডরে মরে কখন্ বখাস্ত । স্বভাবের শান্তি-কুঞ্জ সন্তোষের জয় । সখ্যভাবে ঐক্য সবে লক্ষ্মীর আলয় । -তৃণের কুটীরতলে সুখ লুটাপুটি। অতিথি আইলে অন্ন পায় দুই মুটি । অন্নদান সম নহে অন্য কোনাে দান। হাসপাতালে যশ-মাতালে দানে খোঁজে মান ! বিলাতী ঔষধ অস্ত্র বস্ত্র বিছানায়। দানের প্রস্থান, রােগী পথ্য নাহি পায় । পালিয়া অবশ্য পােষ বিশ্ববিদ্যালয় । চিরারাধ্য শুদ্ধি বুদ্ধি করিতেছে লয় । বৃক্ষের রােপণে হয় ছায়া ফল-দান। সবােবর প্রতিষ্ঠায় গ্রামে স্নান পান । কামিনী কলস-কঁখে যায় শেষবেলা । বসাতে পুকুর-ঘাটে মিলনের মেলা। স্থলে জন্মে ফল শস্য জলে জন্মে মৎস্য। খাবে সুপ্তে নর-নারী পক্ষী গাভী বৎস।
অতিথি বা ধৰ্ম্মশালা পথিকের তরে।
শিরে ছাত কোলে পাত বিশ্রাম বিতরে॥
বলদ-গাভীর তরে গােচারণ মাঠ।
বুনন গিয়ে বন হতে কেটে আনে কাঠ।
গ্রামে গ্রামে সরকার-পাঠশালা খােলা ।
লেখা-পড়া অঙ্ক শেখে কৃষকের পােলা ।
পুরাণের পাঠ দেন গণ্য মান্ত লােক।
পায় তাতে সাধারণে জ্ঞানের আলোেক ॥
যাত্রাগানে কি আনন্দ সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা।
ভিখারীর দ্বারে তাই দীন পায় ভিক্ষা
পল্লীর সমাজ-মাঝে হলে কোনাে দোষ ।
বিচার বিধান করে চট্টো দত্ত ঘােষ।
এমনি সুন্দর গ্রাম কামারপুকুর।
যথায় লবেন জন্ম অাপনি ঠাকুর ॥
ধনে অন্ধ রামানন্দ করে অত্যাচার।
দ্বিজ ক্ষুদিরাম ত্যজে পূৰ্ব্বাবাস তার ।
সুখলাল সনে ছিল, আগে হ’তে সখ্য।
কামারপুকুরে বাস তাই তার লক্ষ্য ।
দুই পুত্র বিদ্যমান আর এক কন্যা।
গৃহিণী যে চন্দ্রমণি এই দেখে ধন্যা ॥
ভিটা ভূমি কৈল গ্রাস রামানন্দ রায়।
পুত-পরিবার লয়ে দ্বিজ দুঃখ পায় ।
ইথি-উথি পথি-বীথি ঘুরে হয়রাণ।
দাতা-পাশে নত মাথা ত্যাজ্য তাই দান ।
এক দিন গ্রামান্তরে প্রান্তরের পার।
উদভ্রান্ত আবেশবশে গতি হয় তাঁর।
মধ্যাহ্নে নিরন্নমুখে ফিরিবার কালে ।
শ্রান্ত দেহ দ্বিজবর বৃক্ষমূলে ঢালে ।
দরিদ্রের বন্ধু নিদ্রা আর্ল চক্ষু ঝাঁপে।
ক্ষণ শান্তি পান ভদ্র রৌদ্র-চিন্তাতাপে ॥
[ ১০ ] স্বপ্ননেত্রে ধান্যক্ষেত্র করেন প্রত্যক্ষ। তথা হতে আসে কেবা কারে করে লক্ষ্য। শিয়রে দাঁড়াল শিশু গৌরব-আধার । অঙ্গের সৌরভভরে পূরে চারিধার ॥ • দূর্বাদল-শ্যাম রাম বালকের বেশ। জরির পাছুড়ি গাত্রে চূড়া বাঁধা কেশ। সােনার দানাতে চূড়া করে ঝলমল। ললাটে টিকলি টিকা চোখেতে কাজল। নাসায় মােলক দোলে ঝলে গজমতি। কুণ্ডল-মণ্ডলে কর্ণ শােভাপূর্ণ অতি । কণ্ঠে দোলে কণ্ঠমালা সােনার হাঁসুলী। নূপুর চরণপুরে পশ্চিমা পাসুলী কটিতে কাঞ্চন-পাটা হেম-নিমফল । জলধর-বর-অঙ্গ রক্তপদ-তল। বামকরে ধনু ধরে দক্ষে লক্ষ্যি বাণ। তােতাে-তােত কহে কথা শিশুর সমান। বহি যায় সুধাধার নারায়ণ-মুখে। বলে রাম ক্ষুদিরাম শুয়ে শুনে সুখে। “অইখানে পড়ে পড়ে লুটাই ধূলায় । কেহ নাহি লয়ে গায়ে হাতটি বুলায় । রাম রাম বল তুমি সকালে বিকালে । কেন তবে কোলে তুলে লও না ছাবালে ৷ ধানক্ষেতে পড়ে আছি খেতে নাহি পাই। স’বে কেন অনাহার তােমারে শুধাই ।” ক্ষুধায় কাতর রাম হৃদয় গলায় । নিদ্রিত ব্রাহ্মণে যেন স্বপন বলায় ॥ “রাজপুত্র তুমি রাম দ্বিজ-দুঃখী আমি। তােমারে কি খেতে দিব জগতের স্বামী ॥ মনে ভয় পাছে হয় সে-অপরাধ। তিলেব ত্রুটিতে যাব নরকে অগাধ ।”
{ ১১ ]
বালক বলিছে যেন দ্বিজ শুনে কানে।
স্বর অতি মধুময় অভয় প্রদানে।
“পিতা বলে ডাকিয়াছি নিজে করে সাধ।
কভু আমি নাহি লব তব অপরাধ ।
যদুপতি খেলে ক্ষুদ বিদুরের ঘরে।
কেন চা’বে রঘুপতি অন্ন দুধে-সরে ॥
যা জোটে বাপের ঘরে ছেলে খাবে তাই।
অন্যায় আব্দারে দোষ মা-বাপের ঠাই।”
নীরব হইল স্থান নিদ্রা হ’ল ভঙ্গ।
কঁপে বিপ্র থর থর ঘামে ভেজা অঙ্গ।
উঠে তবে ধীরে ধীরে ক্ষেতবাগে নড়ে।
দেখেন অদ্ভুত লীলা শিলা এক পড়ে ।
শিলা হেরে মর জাথি রাম দেখে হিয়া।
করে ধনু ধরে নাচে তাথিয়া থিয়া ॥
জনম সফল হ’ল ভাবে মনে মন ।
যতনে তুলিয়া লন শিলা-নারায়ণ।
আনন্দে আপীড় দেহ হৃদে দৃঢ় নিষ্ঠা।
স্বগৃহে বিগ্রহ ল’য়ে করেন প্রতিষ্ঠা।
রঘুবীরের স্তব
রাম জয় জয় রাম জয় রাম নমস্তে।
স্তমিত ধৃতধনু রঘু-জনু নমন্তে ।
বিষ্ণু-অংশ সূৰ্য্যবংশ নরহংস নমস্তে।
রূপে ইন্দু কৃপাসিন্ধু কপিবন্ধু নমস্তে ।
বাচে চটু বনে বটু রণে পটু নমস্তে।
দাশরথি সীতাপতি ভবগতি নমস্তে।
বনচারী রাবণারি দুঃখহারি নমস্তে।
ভক্তিভক্ত ভাসক্ত ত্যাগে ব্যক্ত নমস্তে।
সত্যনিষ্ঠ নিত্য ইষ্ট-হৃদে তিষ্ঠ নমস্তে।
চিরারাধ্য সদাসাধ্য পাদপদ্মে নমস্তে।
[ ১২ ] সিংহাসনে মহাবনে রক্ষো-রণে নমস্তে। নরােত্তমে মনােরমে সমদমে নমস্তে ॥ নেত্ৰপত্ৰ কৃপা যত্র মেহসত্রে নমস্তে। হনূ-সেব নরদেব জিষ্ণু এব নমস্তে ॥ নামামৃত-পানে প্রীত যে অমৃতলাল । রামােদয় তিথি হয় তার বয়ঃকাল ॥ সে সম্বন্ধে প্রেমানন্দে ছন্দোবন্ধে বন্দন। যােড়হস্তে নমস্তে ন্যস্তে বসু-নন্দন । ক্ষুদিরামের গয়াগমন ও দিব্যদর্শনলাভ এইরূপে যায় দিন, পূজাকার্যে যাজ্য তিন, রঘুবীর রামেশ্বর শুভদা শীতলা। গৃহে নাহি ধন-রােগ, 'দেহ-মনে সুখযােগ, ক্ষুধার তাড়না আর না করে উতলা। হিন্দুর গৃহস্থ-ঘরে, পরিবারমধ্যে ধরে, বাস্তুদেবে সেবে ভেবে সুশীল সন্তান। (ওয়ায়ে খাওয়ায়ে তারে, ভােগ দিয়া তুষ্ট করে, অচিন্ত্য সন্তোষ-সুখ গৃহিণীরা পান। শিলা কি পিতল নয়, সেটি শুধু মনােময়, ক্ষুধা পায় নিদ্রা যায় দুঃখে দুঃখী সদা। কি খাবে স্বপনে বলে, অভিমান বেলা হলে, আলাে করে রহে ঘর বরদ বরা ॥ আত্মার আনন্দ ঝরে, প্রতিমাদি সৃষ্টি করে, কি তার এ কবিতার বুঝে সেই জন। আপন প্রাণের টানে, ছবিতে যে প্রাণ আনে, ভালবাসা করে ভােগ রূপ-রূপান্তরে। পিতা মাতা সখা সখী, পতি পত্নী চকাচকী, পুত্র কন্যা প্রভু ভাবে রসায় অন্তরে। এ বিশ্বের রাজা নয়, প্রসাদী উপাধিময়, নিতে ঢেলে দিতে জেলে ষণ্ড দণ্ডধর।
[ ১৩ ] নিশ্বাসেতে বিশ্বেশ্বর, ঘন দলে অনশ্বর, সূৰ্য্যকরে বায়ুভরে ব্যোমে দামােদর । ভিন্নাকারে একাকার, সে কারণে নিরাকার, এ নয়ন মন কিন্তু তাতে তৃপ্ত নয় । ঘন করে তাই শূন্য, রচনা করি যে চিহ্ন, ভাবভেদে ভিন্ন ভিন্ন যথা যে সময় । যে আসে আকুল ডাকে, হৃদয়-মাঝারে থাকে, ঘটে পটে প্রবেশিতে কিবা বাধা তার। ভক্ত-মনে উদ্দীপন, আদ্যে পদ্যে প্রয়ােজন, মূর্তিতে কি স্তব-গীতে সে পদ্য প্রচার ভাবের আনন্দ-ঘরে, লুকোচুরি নাহি ক'রে, খ টি করে থাক ধরে অভীষ্টে আপন। যেই ভাবে ক্ষুদিরাম, হৃদে জপি রাম নাম, রঘুবীরে ভক্তি-নীরে রেখেছে গােপন ॥ সে ভাবে স্বভাব দিশি, ধৌত মন দিবানিশি, নগ্নপদে জীর্ণ ছদে ঋষি অভিধান। পায়েতে পথের ধুলি, লােকে লয় শিরে তুলি, কোথা কে কুবের ধনে পায় এ সম্মান। ইন্দ্রাণী যে চন্দ্রমণি, করুণা স্নেহের খনি, জননী সবার তিনি ঈ-খানি সংসার। যার যেটা ঠেকে দায়, ডাক দিলে মা’কে পায়, খা(ওয়াতে বােয়ানে নিতে পােয়াতির ভার গাঁ-টি জোড়া ছেলে-মেয়ে, দরদে আদর পেয়ে, ধেয়ে যেত তার বাড়ী যখন তখন। ৰত করে আবদার, মুখে নাই দাব তার, পেত ছেলে মুড়ি-গুড় কখন মাখন । দিতে যার আছে চাড়, শূন্য নয় তার ভাড়, কিছু বাড় চাল তার আছেই ভাড়ারে। দোয়ারে দাঁড়ালে যেই, বলে আজ দিতে নেই, তার ঘরে কথা নেই “নেই নেই” ছাড়া রে ।
[ ১৪ ] ঠাকুরঘরের ভােগ, ভিখারীর জলযােগ, জোগাড় বিহানে চাই গিন্নী-বান্নি জানে। আরন্ধের কচুশাক, পােযেতে পিঠের জাঁক, অঘ্রাণে নবান্ন-গন্ধে চন্দ্রমণি-ঘরে। পড়শীরা পাতে পাত, বাদ নেই কোনাে জাত, হরিলুটে ছেলে জুটে উঠানে না ধরে । মধুর কথার ফাদে, কাঙাল জাঙাল বাঁধে, ঝিঙে ভেজে বলে না যে ভেজেছি পটল। সবে মানে দেখি তার সাহস অটল । মেহের সাধনাবলে, চন্দ্রা-হৃদি-পদ্মদলে, উথলে উঠিল ক্রমে পূর্ণ মাতৃভাব । চুটিল স্নেহের বন্যা, সারা গ্রাম পুত্র-কন্যা, ধন্যা তিনি করে এই ভালবাসা লাভ । কে খেলে কে অনাহার, সব যেন তার ভার, পাড়া ঘুরে বার বার তত্ত্ব লন তার। উপবাসী যারে দেখে, নিজ অন্ন দেন ডেকে, চিড়ে মুড়ি মুখে দিয়ে দিন কাটে মা’র । রঘুবীর শিলাবর, বাণলিঙ্গ রামেশ্বর, শীতলা পুতলী আর দূরে দূরে নয়। মন পূৱাে পরিষ্কার, ভয়ে ভয়ে নমস্কার, নাহি আর ঘােড় হাতে মুখের বিনয় । গর্ভের সন্তানে, দেবে, কিছু নাহি ভিন্ন ভেবে, ঠাকুরঘরের সেবা করে চন্দ্রমণি। রঘু যে রামকুমার, বাণলিঙ্গ রামেশ্বর, শীতল সমান ভাবে কন্যা কাত্যায়নী। নহে বরদাতা ইষ্ট, তিলেক ক্রটিতে রুষ্ট, আরতি পূজার তরে মিছে মন্ত্র ঝাড়া। একেবারে দেহময়, কথা শােনে কথা কয়, কখনােবা শিষ্ট-শান্ত কখনাে বেয়াড়া ।
[ ১৫ ] শুন গাে গৃহস্থগণ, এই ভাবে গড় মন, 'একেবারে নারায়ণে কর গাে আপন। দেখ তারে দিয়ে রূপ, ভাবিয়ে ভবের ভূপ, পেতে দাও বসিবারে হৃদি-সিংহাসন । সত্য ডাকো বাবা বােলে, মা বােলে বােসস গে কোলে, ছেলে-মেয়ে মনে করে নাওয়া খাওয়াও। প্রেমে না থাকিলে খাদ, লও স্বামি-সুখাস্বাদ, মুখপানে চেয়ে চেয়ে চোখেতে চাওয়াও। ঘুমুতে ঘুমুতে জেগে, চন্দ্রাদেবী যেতে বেগে, দেখিতে ঠাকুর ক’টি কেমন ঘুমায়। ভয় হােতত ভাবনায়, পাছে মশা লাগে গায়, এমনি আপন সে গাে ভাবিত ভূমায় । হতাশে পড়শী কয়, এ কথা তাে ভাল নয়, লেগেছে বাতাস বুঝি ব্রাহ্মণীর গায়। এ বয়সে এত ছিরি, কোথা থেকে এল ফিরি, উচা উচা মন ইতি-উতি চায় ॥ এক দিন পতিপাশে, বসি দেবী ভয়ে ভাষে, এ কি দশা এ বয়সে হােলাে গাে আমার । তুমি সেই গয়া যেতে, শেষে শুয়ে এক রেতে, অধৰ্য্য হইনু দেখে আশ্চৰ্য ব্যাপার। দুয়ারেতে খিল আঁটা, কা’র এ বুকের পাটা, শুয়ে আছে সুপুরুষ মাের বিছানায়। ছাঁৎ করে ওঠে গা’টা সমস্ত শরীরে কাটা, চোখ বুজে চেয়ে দেখি খাড়া হয়ে ঠায় । তেমনি দুয়ার বন্ধ, মানুষের নাই গন্ধ, ধুপের সুগন্ধে শুধু আনন্দের ঢেউ। আর দিন মনে পড়ে, দিব্যি এক হাসে চড়ে, রােদে ঘুরে মুখখানি রাঙা যেন কেউ । দেখে মনে হােলাে মায়া, বলি তাহে অই ছায়া নেমে এসে বােসস হেথা হাঁসেৰু ঠাকুর।
[ ১৬ ] ধরে দু’টি পান্তা আছে, খেয়ে-দেয়ে যেও পাছে, হেসে সে মিশালে কিসে, বুক গুর-গুর। আশ্চৰ্য্য সবার চেয়ে, বলি খুলে লাজ খেয়ে, দাড়ায়ে পাড়ার অই শিবের তলায়। ধনি সাথে কথা কই, মনে নেই এই বই, হঠাৎ হােলেম আমি ভীতু উতলায় । ফিরে দেখি এ কি ভালাে, মন্দিরে সিন্দুরে আলাে, বাবার অঙ্গেতে যেন জ্যোতি বিভূতির। সে জ্যোতি বাতাসে দুলে, আসে ভেসে ঢেউ তুলে, হেরে ডরে হােললা মাের শরীর অথির ॥ কামার-ঝিয়েরে ডেকে, খামকা থমকে থেকে, বােধ হােলাে করে যেন উদরে প্রবেশ । চক্ষে দেখি লক্ষ তারা, পড়িনু চৈতন্যহারা, মনে নেই কতক্ষণ ছিল এ আবেশ ॥ আমার সৰ্ব্বস্ব তুমি, ও চরণ তীর্থভূমি, সতীর সুহৃদ্ গতি পতি এ ধরায়। জান যদি কিছু তথ্য, আমারে বুঝাও সত্য, দেব কিবা উপদেব ভয়েতে ভরায় । শুনে বার্তা, ভাবে ভর্তা, ঘােচে কৰ্ত্তা অভিমান। শ্রাদ্ধ-রাত্রে, গয়াক্ষেত্রে, স্বপ্ননেত্রে বিদ্যমান । কমান্ত, শ্যামশান্ত, ভ্রান্তিধ্বন্ত বিনাশন। সুধাধর, গদাধর, পদ্ম-পর দরশন। পীতবাসে, মিষ্টহাসে, স্পষ্টভাষে প্রত্যাদেশ। সুপ্রত্যক্ষ, কর লক্ষ্য, হিরণ্যাক্ষ হৃষীকেশ ॥ পুত্রভাবে, মােরে পাবে, দুঃখ যাবে দ্বিজবর। শুদ্ধ শয্যা, কাৰ্যে আৰ্যা, তব ভাৰ্য্যা পর-দুঃখী, সতী লক্ষ্মী চন্দ্রমণি। রাম সেবে, কৃষ্ণ ভেবে, হবে এবে মা জননী। আজি ঐক্য, দেববাক্য, পত্নী পক্ষ সাক্ষ্য সনে। জাগে ভয়, হর্যোদয় দ্বিজ-মনে। ধৈৰ্য্য ধর ॥ পূত কুক্ষি, ভক্তি বয়, [ ১৭ ] কহে ধীরে, বুক ভাসে। এ ঐশ্বর্য্যে এই শুদ্ধি, ব্রাহ্মণীরে, অশ্রনীরে দিব্যদান, এ সন্তান, ভগবান্ গর্ভবাসে । অযযাধ্যায়, মথুরায়, ধরি কায় যে উদয়। সে অচ্যুত, গুণযুত, পুনঃ হয় ॥ ধৰ্ম্মে ধৈর্য্যে, ব্ৰহ্মচর্য্যে, মেহে রক্ষ। এই সিদ্ধি, এই ঋদ্ধি এই মােক্ষ। কম্পিত দম্পতি-হৃদি সম্ভ্রমে বিস্ময়ে । অন্ধ-মনে বাধে দ্বন্দ্ব সন্দেহে প্রত্যয়ে ॥ যুগলে চলেন ব্ৰস্ত বস্তু দিয়া গলে । নিবেদিতে শুভবার্তা রঘু-পদতলে ॥ প্রণমি, চমকি চেয়ে দিব্য দরুশন। চর্মচক্ষে ধৰ্ম্মমৰ্ম্ম স্পষ্ট পরশন । নাহি ঘট নাহি শিলা লীলা চমৎকার। এক দেহে রামকৃষ্ণ মূৰ্ত অবতার । নবদূৰ্ব্বা হরিদাভা অৰ্দ্ধ অঙ্গ শশাভে। তমালপর্ণের বর্ণে অর্থ মন লােভে । শিরােপা আবােপ বামে দক্ষে শিখিপাখা। এক চক্ষে লক্ষ্য স্থির অন্য আঁখি বাঁকা ॥ শ্ৰীমুখমণ্ডল খণ্ডে ভূপাল গােপাল। এক ধারে দেখে যেই করেছে কপাল ॥ বাম বক্ষে মণি-মুক্তা কিরণ ঠিকরে । দক্ষিণে বনজ ফুল শােভে থরে থরে ॥ এক করে ধনু ধরে অন্য করে বাঁশী । সর্বাঙ্গে তরঙ্গ তােলে করুণার রাশি ॥ তাপিত-তারণ যুগল চরণ-তটে । সুরাসুর মুনিঋষি নর-নারী ললাটে । কোথায় গিয়াছে স্তব কোথা বা প্রণাম। ইষ্ট-স্নেহে মােহাবিষ্ট দু’টি দেহধাম ॥ নিরােধ ইন্দ্রিয়বৃন্দ আনন্দ-সমাধি। -দম্পতির ভাবে নাই জীবের উপাধি ॥
[ ১৮ ]
স্মরি গুরু গিরিশের পদ-অরবিন্দ।
সভায় অমৃত গাঁথে এ গীতগােবিন্দ ।
আবির্ভাব
তােমার জনম-কথা করিয়া শ্রবণ।
মানসে উচ্ছাসে যেই ভাব-প্রস্রবণ।
আনন্দ-আননা দেবী জননী সারদা।
করে ধরে লেখাবেন যেটুকু বরদা ।
সেই কয় ছত্র মাত্র র’চে দিব পদ্যে ।
তততধিক কিছু নাই এ দাসের সাধ্যে।
দিন যায় পক্ষ যায় ক্রমে যায় মাস।
আসন্ন প্রসব-চিহ্ন দেহে সুপ্রকাশ ॥
গতি অতি সুমন্থর অঙ্গেতে অলস।
স্নেহ-ক্ষীর-ভারে পূর্ণ হৃদয়-কলস।
ভােগ রাঁধে আর কাদে দেবী চন্দ্রমণি।
কার হাতে খাবে ভাবে মাের রঘুমণি
ভাঙ খায় ভালবাসে দুধ রামেশ্বর।
যত্ন করে এক দিন কে পাড়াবে সর।
শীতলা উতলা মেয়ে বড় অভিমান।
সময়ে খা(ওয়াবে কেবা কে করাবে স্নান ।
প্রবােধ-বচনে পতি বুঝান জায়ায়।
যার কাজ সেই করে ভুলিছ মায়ায় ।
আজিকার মত তুমি রেধে দাও ভােগ।
কালি হতে হয়ে যাবে অন্য যােগাযােগ !
ধনমণি কামাৱিণী সব কাজে শক্ত।
বিশেষতঃ তােমার সে অতিশয় ভক্ত।
তারে ডেকে বােলে দেব শুতে হেথা রাতে।
সামালিবে সেই হােলে ব্যথা অকস্মাতে।
কামারের ঝি রে অ বেটী কামারের ঝি।
পাদু খানাদে রে আমি সেই পায়ে লুটি।
[ ১৯ ] । সেই পায়ে লুটি আর ভাবি ভাগ্যবান্। ভগবান্ নিজে দেন তােরে যােগ্য মান। জাতাজাত ভাত পাত চটিতে বিচার। মন্দিরে ব্রাহ্মণ সেই শুদ্ধ মন খার। চণ্ডাল গুহকে দেন রামচন্দ্র কোল। গােয়ালার গােঠে গিয়ে কৃষ্ণ ঘোটে ঘােল। যবনে আপন জ্ঞান করেন নিমাই নীচে উচ্চ করে হরি জগত-গোঁসাই । সৃষ্টির ইষ্টেরে তুমি করাবে ভূমিষ্ঠ । এ শিরে চরণ রাখি ক্ষণ তরে তিষ্ঠ । সাঙ্গ বঙ্গে শীত-যাগ, মিলােলাে মাঘের দাগ। নব অনুরাগে হাসি আসিল ফাগুন। দখিণা পবন ঘ্রাণে, নবীন ভুবন প্রাণে, বসন্ত সান্ত্বনা আনে জীবন্ত দ্বিগুণ। সজিনাফুলের খােবা, শিমুলে আমূল শােভা, মালঞ্চে প্রফুল্ল জবা করবী বকুল। এই মাসে তিত মিঠে, নিমেতে হেমের ছিটে, ভিটের উঠানে ফোটে কৃষ্ণকলি ফুল । আমের মুকুল ধরে, ইক্ষুরস বাসে ভরে, নেবুতে নূতন পাতা, কচি কচি ফল। শসায় হাসায় ভূই; কঁকুড় কুটিয়া থুই, নিটোল পটোল-বােল জিভে আসে জল । আঙিনাতে মনােহারী, সােনার মন্দির সারি, ধানের মরাই রূপে করে ঝলমল । গৃহস্থের বাস্তু গণ্য, সঞ্চিত সুখের অন্ন, লক্ষ্মীপদতলে যেন স্বর্ণ-শতদল । কোয়েল-দোয়েল-কুল, ঝাঁকে ঝাঁকে বুবুল, পাপিয়া-শালিখ-টিয়া-ফিঙা-টুনটুনি। পাখার ঝলক জাকে, মউমাছি-ভােমরার শুনি গুনগুনি। মধুর মধুর ডাকে, [ ২ ] বসন্তবাতাস লাগে, যােগিনী-নাগিনী-যাগে, হেমন্তের অন্তে তার সমাধি যে ভঙ্গ। মনসা, শীতলা, ষষ্ঠী, ভজে পূজে ভুজে যষ্টি, প্রতিবেশিভাবে বঙ্গ নাগ-বাঘ সঙ্গ। হেন ফুল্ল পল্লীগ্রাম, বঙ্গজনপ্রাণারাম, উদয় সদয় ঋতু ধরিত্রী অমল। ফাগুন ছ’দিন গণে, রবি রহে কুন্ত সনে, জাতক-পাতকহারী দয়ালু সবল ॥ অসিত পক্ষের শেষ, চাদের দ্বিতীয়া বেশ, বসেছে তারার হাট ধরা আলােকরা । ভূমেতে ঘুমের ঘোের এখনাে হয় নি ভাের, জাগিছে যামিনী শীলা নীলাম্বরী পরা। বুধের বাসর যায়, লক্ষ্মীবার অপেক্ষায়, তা ত্যাগে চন্দ্রমণি জাগে বেদনায় । সতত সজাগ ধনি, আসন্ন প্রসব গণি, কেশবে এ ভবে আনে ক্ষিপ্র শুশ্রুষায় ॥ ধরি দেহ থিরে থিরে, গুতাইয়ে প্রতিরে, প্রভাতের অতিথিরে দেখিতে না পায়। ঝটিতি প্রদীপ হাতে, খোঁজে ধনি নবজাতে, কোণেতে উনুন ছিল সেই বাগে যায় । (সে উনুনে বাসি ছাই, তার মাঝে দেখে ধাই, ভস্ম-মাখা পড়ে আছে ন্যাংটা ভােলানাথ । দু’পলের ছেলে যেন, ছ’মাসের বাছা হেন, থ’ হয়ে রহিয়া ক্ষণ কোলে তােলে ধনি। যশােমতী-কোলে হায়, দোলে যেন পুনরায়, ভূতলে অতুল শােভা গােকুলের মণি। সেবারে গােয়ালাঘর, কামারপুকুরে ভর, এবারে ঠাকুর করে জন্মি ঢেকিশালে। বিশ্বকর্মা ধর নাম, তুমি সৰ্ব্বকৰ্মধাম, অতন্দ্ৰ তােমার কৰ্ম্ম অর্জুনে শেখালে ।
[ ২১ ] কর্মফল কুড়াইতে, জীব-জ্বালা জুড়াইতে, বারে বারে দেহাধারে এস নারায়ণ। নর-গােত্রে হয় ধর্ম, লােকহিত মাত্ৰ কৰ্ম্ম, রটায়ে ইহার মৰ্ম্ম ফুটাও নয়ন। এ কানন রচে কালী, নর-নারী সাজে মালী, প্রভু নিজে বনমালী ফল অধিকারী। যে মালী না গুজে রেখে, ফল দেয় রে ডেকে, পড়ে না কৰ্ম্মের পাকে সেই আজ্ঞাকারী । গৃহস্থের বাস্তুভূমে, কাল যে কাটায় ঘুমে, যমে তারে ধরে ত্বরা, ঘর জ্বলে যায়। জীবনধারণ জন্য, প্রয়ােজন নিত্য অন্ন, ধান ভেনে ঢেকি, লােকে সে অন্ন যােগায়। পুণ্যমস্ত ঢেকিশালে, লক্ষ্মী নিজে ধান্য ঢালে, রান্নাঘরে অন্নপূণ্যে উনুনের ধারে। যে সংসারে চা ঢেকি, সেখানে চলে না মেকি, ভাঁড়ারে পাড়ার সুখ, ভিখারী দুয়ারে। শাশুড়ী ঝিউড়ি বউ, বুকে সুখ মুখে মউ, ঢেকিপাড়ে হাঁড়ি নাড়ে চরকা ঘুরােয়। তার বাড়ী বদ্যি মানা, গায়ে উঠে সােনাদানা, স্বামীর সােহাগ পায় কপাল ফিরােয়। অলস বিলাস আসি, শাক্তদেশে শক্তি নাশি, বিষয়-আসক্তি পৃথী করিছে শাসন। ধ্যান জ্ঞান গ্রন্থপৃষ্ঠা, স্বার্থ তরে অর্থ-তৃষ্ণা, নিষ্ঠা নাই চেষ্টা নাই, ইষ্ট অন্বেষণ তর্কে কথা কাটাকাটি, ধর্ম নিয়ে লাঠালাঠি, মত নিয়ে পথ নিয়ে সতত লড়াই। নাহি প্রেম নাহি ভক্তি, খোঁজে খালি রক্তারক্তি, আদি ছেড়ে উপাধি বা বিধির বড়াই । পুত্র-কন্যা করে পাপ, জ্বালায় পােড়ায় তাপ, বাজে তা বাপের প্রাণে করুণা-আধার।
[ ২২ ] বিষয়জরাজেশ্বর, ধরে নরকলেবর, আসেন ধরাতে তাই ঘুচাতে আঁধার । কভু জন্ম রাজাচারে, কভু রুদ্ধ কারাগারে, কৰ্ম্ম শুদ্ধ চেকিশালে এবার উদয়। টেকির মুখেতে ছিন্ন, তুষ হতে চা’ল ভিন্ন, খােসােম্মুক্ত ভক্তি-শস্য দেবে দয়াময় । -বঙ্গের উনুনে ছাই, দেখিয়া দুর্দশা তাই, সে ছাই গদাই ধেয়ে মাখে নিজ অঙ্গে। কর্ম-ধৰ্ম্মী কৰ্ম্মকার, বুঝি বা ঝিয়ারী তার, কোলে তুলে নিতে পেলে তাই লীলারঙ্গে । দু' পলের ছেলে যেন, ছ’ মাসের ছেলে হেন, আঁতুড়ে-ও অতি বড় গৃঢ় বিশ্বম্ভর। শিশুমুখে দিতে মধু, দেখা দিল ঊষা-বধু, অরুণ ভূষায় হােলাে রক্তিম অম্বর। এত ভােরে বাজে শাক, বুঝিল মঙ্গল-ডাক, ঝাঁকে ঝাঁকে পড়শীরা দেখা দিল আসি। বিধবা বেণের মেয়ে, প্রসন্ন আসিল ধেয়ে, সঙ্গে এল গঙ্গামণি মঙ্গলার মাসী ॥ রমণী বানী জয়া, দাঙ্গায়ণী লক্ষ্মী দয়া, মায়াবতী ক্ষেতি নিতি পুণি মনােরমা। খসা-খোপা দলমল, ঝন্ঝন্ বাজে মল, বিমল কমলা এল ক্ষীরাে নিরুপমা আঁটিতে আঁটিতে কসি, ঝটিতি আসিল যশি, মিসি মুখে সুখী আসে কলসী-কাকালে আঁচলেতে জল-পান মুখে এক থাবা। পুটি লুটি জটি এল হরি হেবরা হাবা । চক্ষু মেলে দেখে ছেলে কোরে নিরীক্ষণ। গিন্নীরা বলেন পুণ্যে সব সুলক্ষণ । অদূরে বধূর দল কলকল রবে। ইয়ের মঙ্গল মাগে মায়ের গৌরবে ।
{ ২৩ ]
হায় রে সে গ্রাম কোথা সরল স্বভাব।
দলাদলি ভুলে সেই গলাগলি ভাব ।
বামুন জ্যাঠার ব্যাটা (হয়) বেণে-বাড়ী ঘটা
কলুমাসী খুসী দেখে দুলে-বাে’র ছটা ।
দিয়েছে শখের ডাক গাঁটিকে জানা।
বেলা না বাড়িতে লােক জুটিল নানা
সব কর্ম ফেলে আসে ধর্মদাস লাহা।
গগাবর্ধন ধােপ আসে জনার্দন শাহ।
শঙ্কর নাপিত আসে কিঙ্কর ঘােষাল ।
দধি হাতে যাদু গােপ ছাড়িয়ে গাে-পাল।
আনন্দেতে বিদ্যানন্দ বন্ধ কোরে টোল।
মুচিপাড়া নাচিয়ে দে ডেকে আনে ঢােল ॥
সুন্দুরে সে বাজুন্দুরে নিয়ে নিজ দল।
গােকুল ভাবিয়ে করে বাকুল দখল ।
“দেখা গাে মা যশােমতী তাের নীলমণি।”
গান ধরে এই বােল ঢােলে তালে ধ্বনি।
বাজনা বেজেছ গাঁয়ে পাঠশাল ছুটী।
নেচে বাঁচে পােডােগুলাে হেসে লুটোপুটি।
টাকাটা সিকিটা পেয়ে দুয়ানি আধুলি।
বাঁশী কঁসি মিলে বাজে তাল রাখে ঢুলী।
পায় কড়ি খই-মুড়ি পুরানো কাপড়।
“দে দই দে দই” গানে বাধাই রগড় ।
পাঁচ দিন নাচগান বাজনা প্রভাতে।
কীৰ্ত্তন মৃদঙ্গ-রঙ্গ প্রতি সন্ধ্যা-রাতে ।
ষষ্ঠ দিনে হৃষ্ট মনে মিষ্ট বিতরণ।
যেঠেরা পূজার আজি হয় আয়ােজন।
শ্রীষেঠেরাপূজা
ছ’দিনে যেঠেরা-পূজা ব্যাটার কল্যাণে।
ব্রাহ্মণে সম্মান দিতে মাল্য আদি আনে।
[ ২৪ ] পিতৃদেব তুষ্ট-মন পূজি রঘুবীর । প্রতিবেশী নারী করে মায়েরে অস্থির ॥ যথারীতি হােল তবে গ্রাম্য-আয়ােজন। ষষ্ঠীর প্রতিষ্ঠা দ্বারে অগ্রে প্রয়ােজন । তৈজস চন্দনমাল্যে ব্রাহ্মণ-বন্দন। সবে বলে ভাগ্যধর হউক নন্দন ॥ মধ্যরাত্রি গত হয় নিদ্রিতা প্রতি। প্রবেশে সূতিকা-ঘরে বিভুর বিভূতি ॥ পােয়াতিরে তাপ দিতে কাঠের অাগুন। ফাগুনে করেছে ঘর গরম দ্বিগুণ। তাপ-ঝালে এককালে গৃহস্থের ঝির । খটখটে হয়ে যেত প্রসূত শরীর শ্লেষ্মযুক্ত রক্ত এবে করিতে গরম। নবীনা সেবন করে পানীয় পরম ॥ শিশি শিশি ফাসী আসে খালি খােললা ছিপি । এও জেনাে কৰ্ম্মফল এও বিধি লিপি ॥ তন্দ্রাগতা চন্দ্রাদেবী, ধনি ঘুমে ঘাের। মিটমিট জ্বলে দীপ প্রবেশে কে চোর । অগােচরে এই চোর ভাগ্য ভাঙ্গে গড়ে। কোঠা-বাড়ী টোটে কারাে সােনা মােড়ে খড়ে। ইনি দেন পুত্র কোলে ইনি নেন কেড়ে। এরি হাতে ভাঙে শাখা, শাড়ী রাঙা-পেড়ে। বিধাতা তুমিই দাতা তুমিই ডাকাত। তােমার চরণে করি কোটি প্রণিপাত । কলম চালাতে যদি জাতকের ভালে। আজি রাতে পার তবে বুঝিব সকালে । সােনার পুতুলী শিশু হৃষ্ট-পুষ্ট কায় । কোলের গরমে থােকা আরামে ঘুমায় । অভ্যাসে বিশ্বাস লিপি লিখিবে সােজায়। থােকা বুঝি বােকা কোরে ডাকায় রােজায় ।
[ ২৫ ] পলক-বিহীন নেত্রে জাতকে নেহারে। খুজিয়া খুজিয়া কিছু বুঝিবারে নারে ॥ *শিশুরে হেরিয়া হন বিধাতা বিপন্ন। জীবে-শিবে মেশা এক চিন্ময় চৈতন্য । ভাগ্যলিপি লিখিবারে মুছেন কপাল। খখ হাসে পাশে ব্রজের গোেপাল ॥ হাস্যধ্বনি শুনি গুণী চারিভিতে চান। শ্যাম আড়ে রাম নড়ে দেখিবারে পান। ভৌতিক ভাবিয়া ধা কালি নিয়ে খাকে। অবাক্ হইয়া বুকে “কালী কালী” ডাকে ॥ “কালী” নাম যেতে কানে শিশু আনহারা। শঙ্কায় ওঙ্কার জপে বিধি বলে তারা । তারা নামে ধারা বহে শিশুর নয়নে। তােলে যেন উনি হাত রহিয় শয়নে । করতলে পদ্মদল হেরি মনে হয় । বিধিরে দিতেছে বুঝি এ নিধি অভয় ॥ দক্ষিণে ফিরালে শির শ্যামারূপ ধরে। উত্তরে সম্বরে পুনঃ ধাতা হেরে হরে । পূৰ্বেতে অপূর্ব রূপ শ্যাম নটবর। পশ্চিমে অসীম শােভা শ্রীরাম পােচর ॥ সর্বদেবসমন্বিত উন্নত আধার। বিধাতা বুঝেন ভবে নব অবতার । ঈষৎ হাসেন বিধি নিজে অপ্রতিভ। ধরায় জ্বলিল হেরি মঙ্গল-প্রদীপ ॥ আনন্দে বিহ্বল আত্মা মুখে জয় জয় । ভারতে হইল পুনঃ নব অভ্যুদয় । তুমি কৰ্ম্ম কর্মস্ৰষ্টা কৰ্ম্মের আশ্রয় । কৰ্ম্মের নিয়ন্তা ধৰ্ম্ম তুমি গুণত্রয় ॥ জীবের যা পাপ-পুণ্য আদি কৰ্ম্মফল। মােতে অর্পিত হােলে দেহ পদতল
সর্বদেব সর্বভাব তােমাতে প্রকাশ।
বিলাতে অভেদ-জ্ঞান এসেছ শ্রীবাস ।
তােমারি সন্তান নর জগত জুড়িয়া।
বুদ্ধি-দোষে ধৰ্ম্ম-দ্বেষে জ্বলিছে পুড়িয়া।
যত মত তত পথ লক্ষ্য এক স্থান।
আসিলে সমাজে দিতে সহজ এ জ্ঞান।
বাক্যই তােমার ববদ, বেদে তা প্রমাণ।
দূরে দেবে বিদ্যাগৰ্ব তর্ক অভিমান ।
প্রণতি তােমার পদে মঙ্গল-নিদান।
আজ্ঞা দেহ বিধিরূপে করি এ বিধান।
দেখিলাম রামকৃষ্ণ তােমাতে উভয়।
রামকৃষ্ণ নাম দিবে জীবেরে অভয় ॥
পরমা প্রকৃতি মাতা জগত-ঈশ্বরী।
রবেন বহু দিন সন্তানে বিস্মরি ।
“রামকৃষ্ণ-গতপ্রাণা তন্নাম-শ্রবণ-প্রিয়া”।
কৰ্ত্তা কাছে কর্মস্থলে আসিবেন ক্রিয়া ।
কবে বা কোথায় মাতা রবে অবতরি।
আপনি জানহ তুমি সে কথা শ্রীহরি ।
রেখ পায় নিশি যায় এখন বিদায়।
বােলে বিধি অন্তর্ধান শিশুটি ঘুমায় ।
নটের যেঠেরা-গীতে যেবা ত্রুটি হয়।
ভক্ত-মুখে উক্ত হােক জয় জয় জয় ।
আটকৌড়ি
আট দিনে আটকৌড়ে ছেলে আছে ভালাে।
হুড়ােহুড়ি গােল, পােয়াতির কোল আলাে।
গাঁয়ের ছেলের পাল উঠোনেতে জড়।
পিটিতে পিটিতে কুলাে কচ্ছে মজা বড় ॥
আটভাজা ভেজে দেছে পাঁচ এয়াে জুটে।
আঁচড়-কামড় তা কেঁচড়ে নিতে লুটে।
[ ২৭ ] ছড়াছড়ি খই-মুড়ি কড়ি কি পয়সা। নেতা কুড়াে ক্ষেতা কুড়াে কুড়াে রে ময়না । আনন্দ-মন্দিরে ছিল চাচের আগড়। বাঙলায় ছিল তায় রঙিলা রগড় ! সােনার কুলুপ-চাবি সুখের কপাটে । হাসির ভাসান বঙ্গে মশান সুনাটে । পড়শীর সুখে সুখী পড়শী সম্বন্ধে । বড়শী বিয়ে এবে বন্ধুর আনন্দে । চাটুৰ্য্যেরে পূজ্য ভাবে কামারপুকুর। চন্দ্রমণি সনে তিনি জীয়ন্ত ঠাকুর ॥ দেবদেবী বটে তবু রােগে করে সেবা। এ হেন ঠাকুরে ভালবাসে নাহি কেবা । প্রসূতির পথ্য নিত্য আনে সত্যবতী। নেড়ি আনে চিড়ে ভেজে ঝাল-নাডু মতি ॥ সদ্য গব্যঘৃত আনে কৃত্তিকা বােষ্টমী। রােহিণী দুষ্টমি করে বােলে আজ অষ্টমী । অষ্টমীতে ধৃত খেলে কষ্ট পায় ধাই । ধনির ‘সে’ ছিল এর ঠাকুরজামাই ॥ পল্লীর মল্লিকা-ফুল যৌবন-যৌতুকে। সেবিকা সংসারধৰ্ম্মে রসিক। কৌতুকে। পাকশালে পরিপাটী কাঠি দেয় ডালে। বাসরে হাসিয়া ঢলে গানে মধু ঢালে । সরিষার তেলে চুল ঝােলে জানু-মূলে। বেসনে ঘষিলে কেশ ঢেউ তােলে ফুলে। হলুদ দুধের সরে কচি কচি মুখ। গতরেতে পাছু নয় তাই উচু বুক। অধরে মাধুরীমাখা মুড়ি খেয়ে হেসে। কঁকাল করেছে সরু কলসীর ঠেসে ॥ এলাে-চুলে টেকি তুলে চরণের চাপে। চলনে দোলন আসে ললন-কলারে।
السا ২৮ ] মানানাে মণিকানন হেলে হার ছন্দে। সী থিতে সিন্দুর্বিন্দু সিন্ধুজ মণিবন্ধে । চাহনি তরল করে সরসীর জল। কোমল বিমল মন পরশি কমল । কোয়েল দোয়েল স্বরে ভরে দুটি কান। কথা কয় মনে হয় গীতের সমান। পল্লীর কাননে ফোটে হেন বনফুল। বাগানে বাহার নয় এর সমতুল ॥ এ ফুল পূজায় চলে কুলজা সাজায়। মাথা নত কোরে দেয় লজ্জায় রাজায় ॥ এই ফুলদল মিলি মনােলােভা গন্ধে। প্রতিরে নিতি নিতি ভাসায় আনন্দে। আঁতুড় উঠিল শেষ একুশ দিবসে। ষষ্ঠীপূজা মিষ্ট ভুজা বাঁটিয়া রভসে ॥ গয়াক্ষেত্রে স্বপ্ন-রাত্র স্মরি ক্ষুদিরাম । গদাই বলিয়া ডেকে রাখে পুত্র-নাম । গােকুলে কানাই ছিলে নদেতে নিমাই। কামারপুকুরে নাম হইল গদাই । জনম সফল হােনাে অমৃতের অদ্য। নরলীলারম্ভ-ছলে রচি এই পদ্য শিশু গদাই সেকালে স্বজন ছিল সত্য অন্তরঙ্গ। এক পরিবারে যেন ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গ। বাহ শােভা নহে তত্ত্ব সংসারে সাহায্য। গ্রহণীয় গৃহকাৰ্যে ব্যাভারে আহাৰ্য্য । ফিরে লও ইট-কাঠ দেরাজ সিন্দুক। রঙিন সিপাই দোরে সঙি বন্দুক । ফিরে লও ধন-গৰ্ব্ব কাগজের গাদি। চঁদি জমা রাজকোষে রসিদ ইসাদি ।
কাজ নাই গাড়ী-ঘােড়া খোঁড়ার মােটর।
চাকুরীতে খোঁটা বাধা কোঠার কোটর ।
নগরের প্রেমশূন্য বসতি ঘুচাও।
সঙ সাজা রঙ মাজা মুখটি মুছাও ।
যত আনি তত নাই খালি চাই চাই।
খেয়ে-শুয়ে স্বস্তি নাই মেটে না ত খাই ॥
প্রশংসার লােভে এই জিঘাংসার পূজা।
বন্ধ কর নিরানন্দ দেবী দশভুজা।
আমার সবুজ গ্রাম ফিরায়ে আবার।
দাও মা আমারে দু’টি শ্রমের খাবার।
দাও মা উলুর চালা শক্ত তক্তপােষ।
জীর্ণ করি’ যব-চূর্ণ পূর্ণ পরিতােষ ॥
আবার সে ক্ষেতে যেতে কৃষাণের সঙ্গে।
নেচে যেন ওঠে মন হর্ষের তরঙ্গে ॥
গাছে হাত দিলে যেন মিলে দুটো ফল।
রান্নার আনাজে ভরে গিন্নীর আঁচল ॥
মরাই দেখি মা যেন লক্ষ্মীর মন্দির ।
সুপত্র গােয়াল-গাত্রে স্বাস্থ্যের সন্ধির ।
পুকুরেতে আঁশ ভাসে পাড়ে বাঁশঝাড়।
ঘরেতে রক্ষিত ইক্ষু খেজুরের খাড় ।
প্রতিবেশী প্রয়ােজনে হাত দিলে গাছে।
ঠ্যাঙ্গা থােরে তাড়া কোরে ছেলেরা না নাচে
অতিথি-কুটুম্ব দেখে দোর নহে বন্ধ ।
মেয়েদের মুখে যেন দেখি মা আনন্দ ।
চাহি না ঐশ্বৰ্য্য ধন মােগল রাজার ।
হােগলার কুঁড়ে হােক আনন্দবাজার।
বাড়ীতে পীড়িতে বর, পাড়া পড়ে ঝেকে।
খুকীর অসুখ হােলে উকি মেরে দ্যাখে ।
ভাগ্যমানী চন্দ্রমণি আজি যে আনন্দে।
সে আনন্দ হােক পুনঃ জীবনের গন্ধে ।
[ ৩০ لسما খােকাকে মাখাতে তিতু তেল আনে পড়ে। নােদেতে পােয়াতে ছাতু গড়ি দেয় গড়ে। জোলাদের ভােলা দেছে দড়ী বুনে দোলা। পাখী দেছে মালী-বউ রঙ কোরে শােলা । তিনখানি কঁাথা দেছে তিনটি পড়শী। বালিস বানিয়ে আনে বেণেনী ষােড়শী। খাটো-খােটো মশারিটি সুসারের তরে। পীয়ারি তৈয়ার করে বােসে বােসে ঘরে। বলাই দোকান থেকে দিয়েছে দোলাই। রাম রাম বােলে কয় দাম লিতে নাই। মুচিমাসী হেসে দেছে খেলেনার ঢােল। কাহন বাহন গায়ে পেতে আছে কোল ॥ সােনার পুতুলী শিশু আছে কত ঘরে। তাদেরাে আদর হয় গাঁয়ের ভিতরে । এ কি শিশু জন্ম নিল দীন দ্বিজবাসে। প্রাণ ধােরে টান দিয়ে নিকটে নি’ আসে । প্রসন্ন ধনীর কন্যা মান্যা সব ঠাই। নিতি নিতি আসে রাম নাহিক কামাই ॥ সুধাইলে চন্দ্রমণি, বলে হাসি হাসি । জাদু জানে ছেলে তাের গলে দেছে ফাসি ॥ সে কি চায় গয়া কাশী পুরী বৃন্দাবন। এ ফাসী কোরেছে যারে আনন্দে মগন । প্রণাম সে গ্রামবাসি-পদ-অরবিন্দে । হাড়ী-মুচি-ডােমে নমি হয় হবে নিন্দে । যেই পুণ্যে ধন্য তবে কামারপুকুর। ভাগ্যফলে হােলে তথা পথের কুকুর। পশুজন্ম হােতাে বােধ কাম্য দেবতার। উচ্ছিষ্টে হইত মিষ্ট বােয়াদ সুধার ॥ পােড়ে পােড়ে জুড়াতাম হেরে মুখ-চাদা । রাজার রৈজাই ছেড়ে ঠাই ছাইগাদা ।
[ ৩১ ] বােঝাতেম সােজাসুজি কোরে ঘেউ ঘেউ। কুকুরের বুকে ওঠে পুকুরের ঢেউ। অধম কুকুর হােতে পরিচয় নর। শ্রদ্ধাশুদ্ধি-হীন পশু বুদ্ধিতে বানর। শুদ্ধা ভক্তি দেহ হৃদে অটল বিশ্বাস। রামকৃষ্ণ বােলে ফেলি অন্তিম-নিশ্বাস । বাল্যখেলা ঘুমায় মায়ের কোলে, দড়ীর দোলায় দোলে, বাপের বুকের তাপ জুড়ায় গদাই। ঘােট দুটি হাত তুলে, উঠানে টলিয়া বুলে, আধ-আধ মিঠা বােলে হাসে সে সদাই। অঙ্গছাদে চঁাদ-গলা, দিনে দিনে বাড়ে কলা, খেলাচ্ছলে লীলারঙ্গ জন-মনােহর। পঞ্চমীর সুধাকর, সদানন্দ গদাধর, শিশুরা সাজায় তারে রাজ-রাজেশ্বর। সদ্য তুলে পদ্মপত্র, কেহ শিরে ধরে ছত্র, বন-ঝাউ এনে কেউ চামর চুলায় । সাথীরা কৌতুক-কাজে, ভরত-লক্ষ্মণ সাজে, হনুমান্ অনুমানে লুটায় ধূলায় ॥ কোনাে দিন কুতূহলে, ছুটে সবে গােঠে চলে, ধড়া কোরে ধুতি পােরে সাজিয়ে রাখাল। গদাই ধায় যে আগে, তিতে তনু অনুরাগে, চূড়ায় দোলায় ফুল হেলায় কাকাল। হাতে মুখে মারে থাবা, গাল বাজে আবা-আবা, মণ্ডলী করিয়া নাচে কর-ধরাধরি । আর সে গদাই নাই, নাচে নাচে রে কানাই, তালি বাজে করতলে রাধে-রাধে’ করি । বুঝি বা রচেছে মন, আবার সে বৃন্দাবন, দাম সুদাম সাথে গােঠে গােচারণ।
[ ৩২ ] তপন-তনয়া-তটে, নীপমূলে বংশীবটে, মধুর অধরপুটে বাঁশরী-ধারণ এ কালে লীলার ছন্দে, প্রেম নয় গােপী-গন্ধে, আনন্দ-দায়িনী নারী জননী এবার। নহে কুঞ্জে অভিসার, খামার চরণ সার, মালতীর মালা নয় আদর জবার ॥ জয় রাধে, রাধে রাধে, রসনা ভাষে না সাধে, নয়নে শ্রবণধারা মা মা মা মা রবে । শুনি শ্যামা-নামগান, পুলকে পূরিবে কান, বাহ্যজ্ঞান হারা হবে নবলীলা ভবে ॥ যুগে যুগে প্রয়ােজন, ভিন্ন ভিন্ন আয়ােজন, ভজন পূজন ভিন্ন লীলায় লীলায় কভু ধনুর্ধারী বীর, বিরাজ সরযূতীর, পতিতা-তারণ দিয়ে চরণ শিলায় । যমুনা-পুলিনে পুন, বাঁশরী-বাজন শুন, গােপী-প্রেমে উতরােল গােলােকবিহারী । জ্ঞানপথ শান্ত শুদ্ধ, রাজভােগ ত্যজি বুদ্ধ, অহিংসা-বারণ হরি নয়নে নেহারি ॥ বৌদ্ধ নষ্ট বুদ্ধিভ্রমে, আস্তিকতা অন্ত ক্রমে, প্রকাশ শঙ্কররূপে সঙ্কটে তারিতে। শিব শিব শিব নাম, ধরে পুনঃ ধরাধাম, সন্ন্যাস-আশ্রম সৃষ্টি অনিষ্ট বারিতে ॥ শ্রীগৌরাঙ্গ অবতারে, প্রেমে নাম বিলাবারে, ভাসে আঁখি জলধারে দ্বারে দ্বারে কাঁদে। এক অঙ্গে রাধাকৃষ্ণ, সুস্পষ্ট নয়নে দৃষ্ট, ধন্য হেরি লােকারণ্য শ্রীচৈতন্যচাদে ॥ গ্রন্থগত বিদ্যাগৰ্ব্ব, এবার করিতে খর্ব, উদ্ভব অপূৰ্ব্ব নব ভাবের আধার। অরুচি অক্ষরে শিক্ষা, চক্ষের স্বাক্ষরে দীক্ষা, তিতিক্ষা মতের দ্বন্দ্বে বাক্য সুধাধার ॥
[ ৩ ] ভাবে মাত্র রাখ শুচি, যার যাহা অভিরুচি, সেই নামে একেশ্বরে কর উপাসনা। তিনি ব্ৰহ্ম নিরাকার, শিব-শিরে জটাভার, তিনি রাম তিনি শ্যাম কেশরি-আসনা। তিনি আল্লা তিনি যীশু, নন্দের নন্দন শিশু, কংসের সংহারে বীর কুঞ্জে বংশীধর। দানব-দলনী কালী, বৃন্দাবনে বনমালী, পিতা মাতা সখা স্বামী তিনি নারী নর ॥ সহজ মানুষ-বেশ, সহজ এ উপদেশ, সহজ সকল কার্য ব্যাভার আচার। বিভূতিবিহীন বাহ, অন্তরে শান্তির রাজ্য, শৈশব হইতে সুরু সত্যের বিচার। নলীলা অভিনয়, করিবেন জ্ঞানময়, হাতেখড়ি পাততাড়ি বাল্যে প্রয়ােজন। কিসে কি হয় দোষ, কিসে বা সন্তোষ রােষ, কেন ভাল মন্দ আচরণ সুধায় কারণ। কেবল শুনিয়া কানে, বিধি বাধা নাহি মানে, প্রাণে না পৌছিলে কথা শুনে না বারণ । যে ঘাটে মেয়েরা নায়, সেথায় ছেলেরা যায়, জলে উলে হুড়ােহুড়ি সাঁতার খেলায়। সন্তান-সমান খেলে, তবু তারা ব্যাটাছেলে, পরিতে ছাড়িতে শাড়ী নারী লজ্জা পায়। প্রাচীনা পড়শীগণ, তাড়া দিয়ে হেঁকে কন, এ ঘাটে হেঁড়ারা কেন আসি পােড়াতে। কত দোষ না জানিস, কিছু দেখি না মানি, বড়ই দুষ্টমি বাড়ে দেখি যে গােড়াতে ॥ ভয়ে ভয়ে অন্য ছেলে, ভিন্ন ঘাটে গিয়ে খেলে, ধমকে খামকা কিন্তু গদাই না ছাড়ে। মনে মনে ইচ্ছা বাড়ে, লুকায়ে পুকুরপাড়ে, দেখে নেব কি বা ঘটে থেকে আড়ে আড়ে ।
[ ৩ ] শুকদেব সম মন, এ বালক নারায়ণ, নর-নারী-ভেদ-বুদ্ধি শুদ্ধ চিত্তে নাই। হৃদে নাহি কোনাে সন্দ, চোখে নাহি বিধে মন্দ, মেয়েদের এ প্রবন্ধ মিথ্যা ভাবে তাই। ঘটেছে বা কি বালাই, ভয়েতে তত না পালাই, ভুলায়ে ওগুলাে করে আসিতে বারণ । জননী বৃত্তান্ত শুনি, লােক-লজ্জা-ভয় গুণি, নিভৃতে ডাকিয়া পুত্রে বুঝান কারণ ॥ মেহে শিরে রেখে কর, বলে শােন গদাধর, তাের দেহে বটে কোন ঘটে না অনিষ্ট। কিন্তু যারা করে মান, তারা এতে লজ্জা পান, নারী-অপমান নহে আচরণ শিষ্ট। আমি তাের মা যেমন, মেয়ে মাত্র যে তেমন, সকল রমণী জেনাে মায়ের সমান। বলৈন বদন চুমি, সবার সন্তান তুমি, মেয়েদের অপমানে মা’র অপমান । উপদেশ মাতৃদত্ত, সহজে বুঝায় তত্ত্ব, সুপথ্য-সমান জ্ঞান প্রবেশে শ্রবণে । তদবধি গদাধারী, মাতৃভাবে হেরে নারী, আজীবন ব্রহ্মচারী এ ভাবপ্রবণে ॥ আবাল্য সারল্য সার, ভাবময় অবতার, শৈশবে ভাবের ভরে হৃদি যায় গলে । আকাশে বকের ঝাঁক, দেখে শিশু হয় তাক, সহজ স্বাধীন ভাসে জলধর-তলে । পাইয়া মুক্তির ঘ্রাণ, উড়ে যায় নিজপ্রাণ, অজ্ঞান লুটায় মাঠে হাসি সুধাধরে। গ্রাম্য মাসী পিসী দিদি, বলে কি করিল বিধি, সযতনে কোলে তুলে ফিরে আনে ঘরে। তারা বলে ডাকো রোজা, এ ভুত নহে তাে সােজা, বাছারে করেছে ভর আচমকা বাতাসে।
[ ৩৫ ] সৃষ্টি যার পঞ্চভূত, তারে ধরে কোন্ ভূত, অন্বত অদ্ভুত ভাবি মনে মনে হাসে। বাল্যশিক্ষা পূজা-কাৰ্য-অবকাশে, পুত্রেরে বসায়ে পাশে, যতনে শিখান পিতা বংশ-পরিচয়। পিতৃ-মাতৃকুলাগত, গুরুজন-নাম যত, পূৰ্বেতে কোথায় কার আছিল আলয়। শিক্ষা দেন সদাচার, ব্রাহ্মণের ব্যবহার, বিনয়ে সর্বত্র জয় বুঝান বালকে। জগদ্ধিতায় সংস্কার, নারায়ণে নমস্কার, করে লােকে অই বাক্যে জ্ঞানের আলােকে পরহিতপরায়ণ, সে ব্রাহ্মণ নারায়ণ, জাগালে মানব-মনে জাগে নারায়ণ। বিসর্জন দিয়া স্বার্থে, ত্রাণ যেই করে আর্তে, ব্যর্থ নহে হয় তার মানব-জীবন । মুখে মুখে শুনে রব, শিখে শিশু কত স্তব, কত স্তুতি কত শ্লোক ধ্যান বা প্রণাম। কাশীদাস কৃত্তিবাস, অভ্যাসে শ্রীমুখে বাস, যাত্রাগান শুনে পালা বলে অবিরাম। দেখিয়া এ মেধা-শক্তি পুণ্য বাণীপানে ভক্তি, সুপণ্ডিত হবে পুত্র, পিতৃ-মনে আশ । শুভ তিথি করি ধার্য্য, সারি হাতে-খড়ি কাৰ্য্য, পাঠাইলা পাঠশালে যদু-গুরু-পাশ ॥ চূড়াবাঁধা ঘন কেশ, ধরিয়া পড়াে-বেশ, ককে রাখে পাততাড়ি হাতেতে দোয়াত। কেঁচড়েতে জলপান, গদাই লিখিতে যান, সঙ্গে সঙ্গে চলে দলে কতই ভাত।
[ ৩৬ 1 লিখেন বানান ফলা, আঙ্ক আঙ্ক নিয়ে শলা, লিখিলেন ডাক-বলা দাড়াইয়ে সারে। কড়াঙ্কে বাধায় গােল, গণ্ডাকেতে ধরে চোল, আ আ করে নাস্তার ধারে । মনে-মনে ভাবে ছেলে, কি হবে এ পড়া পেলে, চাল-কলা বাঁধা হদ্দ হিসাব শিখিয়ে। মিছা এই পাঠ পড়া, বাসনা দুরাশা গড়া, চাই না এমন বিদ্যা এ মন বিকিয়ে । প্রহলাদ আহলাদে গলে, ভিজে দুটি আঁখি জলে, যে বিদ্যা শিখিল ভাবি কৃষ্ণ-পদতল। যে বিদ্যায় জন্মে জ্ঞান, বৃথা ধন-অভিমান, কাঞ্চন-সঞ্চয়ে সুখে বঞ্চনা কেবল খয়ে পুথির পৃষ্ঠা, বাড়ে মাত্র অর্থ-তৃষ্ণা, লােভে আসে হিংসা দ্বেষ ক্ষোভের আকর। প্রভুভাবে করে নৃত্য, আদেশ বহিছে ভৃত্য, ভুলে যায় ভৃত্য-পালে হইয়া চাকর । নিজ হােতে ধনবান্ দেখে বুকে বিঁধে বাণ, যত বাড়ে পরিমাণ ততই অভাব। যে বিদ্যা করিলে লাভ, জাগে মনে উচ্চ ভাব, তুচ্ছ জ্ঞান হয় চক্ষে নৃপতি নবাব । সে বিদ্যার সংখ্যা “এক”, “এক” বলে চেয়ে দ্যাখ, কোটি কোটি কোটি রূপে “একেরই বিকাশ। একে মাত্র রেথে চোখ, সংসারে চলিলে লােক, সে “এক” করিবে ভাবে অভাব বিনাশ। জীব-জন্যে এই দেহ, মায়ার আধার গেহ, বিষয়-বাষ্পেতে খেলে আলেয়ার আলাে। ঈশ্বরের অবতার, দেহে নহে মায়াপার, বাহ কাৰ্য্যে চেনা তারে নাহি যায় ভালাে। অন্তর তথাপি দীপ্ত, বিষয়ে না হয় লিপ্ত, বি৪ে মঙ্গল-দীপ মাটীর আধারে ।
[ ৩৭ ] শৈশবেতে সে আলােকে, আপনারে দেখে চোখে, মাঝে মাঝে চেনাে চেননা করে বারেবারে। বুঝেন আনন্দময়, আনন্দ বন্ধনে নয়, লৌকিক এ বিদ্যা শুধু অবিদ্যা-বন্ধন। কলে চলে এই শিক্ষা, ফল, ছলে অন্ন ভিক্ষা, কাম, ক্রোধ, লােভ, হিংসা, মাৎসৰ্যে রন্ধন! যথায় আনন্দ পান, গদাই সন্ধানে যান, দেখেন আনন্দ-ভরা বিশ্বের রচন। কি আনন্দ নীলাম্বরে, শুভ্র অভ্রে সুধাকরে, আনন্দ নক্ষত্র-ক্ষেত্ৰ জগত-লােচন। আনন্দ বাতাসে বয়, আনন্দ কাননয়, আনন্দে সরসী-জল করে ঢল-চল। তাতে খেলে মীনচয়, হেলা-ফুল ফুটে রয়, শরতে মরত আলাে করে শতদল। আনন্দে পতঙ্গ ওড়ে, পাখী গায় ঝাড়ে-ঝােড়ে, ফল-ফুল-গন্ধে কিবা আনন্দ-বিহার। আনন্দে বিজলী ঝলে, হরষে বরষা-জলে, আনন্দে ঝরিয়া পড়ে নিশির নীহার। আনন্দে কৃষক মাঠে, দলে-দলে ধান কাটে, আনন্দে গা-চাটাচাটি করে বৎস-গাভী। জগতে নূতন লাট, আপন রচনা পাঠ, আনন্দে করেন ঘুরে নিজে পদ্মনাভি । যিনি বিশ্ব-শিল্পকর, তিনি যান শিল্পি-ঘর, প্রতিমা পুতুল পট শিখেন গড়িতে। যাত্রা শুনে সাধ হয়, অনুরাগে অভিনয়, মন শুধু নাহি লয় বাঁধাধরা পড়িতে। আপনার শিক্ষা নাই, শিশুরে শিখাতে চাই, পর-বাক্য চুরি করি গুরু অভিমান। কেবল শিখেছি বাক্য, কিছুই করিনি লক্ষ্য, চক্ষে বক্ষে ঐক্য নয় অক্ষএেতে জ্ঞান।
[ ৩৮ ] t বেই পােড়ে হয়ে গণ্য, বােলে দিই তন্ন তন্ন, পঞ্চাশ ব্যঞ্জন অন্ন রান্নার কৌশল। আপনি উনুন জ্বেলে, হাঁড়ি কেঁড়ে চাল ঢেলে, হাতে কোরে ভাতে-ভাত রাঁধিনি আসল। সৃষ্ট যার এই দেহ, আলাে করিবারে গেহ, জ্ঞানের প্রদীপ জ্বেলে রেখেছেন তিনি। প্রত্যক্ষ চক্ষের পর, স্পষ্ট তার হস্তাক্ষর, নিরীক্ষণ করিলেই নিতে পারি চিনি। দেখ বুঝে পরিষ্কার, যত কিছু আবিষ্কার, কার মনে জাগায়েছে পুথিগত বিদ্যা। ঢেকি কুলাে থেকে কল, বাষ্প কি বিজলী বল, শিখায়ে দেছেন সে প্রকৃতি সর্বসিদ্ধা। সকল গ্রন্থের আৰ্য্য, মানব-মানস কাৰ্য্য, চরিত্র-বৈচিত্র্য গড়া অবস্থার ভেদে। এই নর-নারায়ণ, কেন সাধু চোর হন, চিন্তায় সিদ্ধান্ত নহে বিজ্ঞানে কি বেদে । অবিদ্যারে বিদ্যা বলি, দম্ভে দাপে দলাদলি, আপনারে স্বামী জ্ঞানে “আমি-বুদ্ধি” সৃষ্টি। না বুঝিয়া ব্ৰহ্মতত্ত্ব, কামনা-নেশায় মত্ত, জগতের পতি পায় নাহি যায় দৃষ্টি। এ জগত বিদ্যালয়, গুরু বিভু জ্ঞানময়, নিলে তার পদাশ্রয় পাই দিব্যজ্ঞান। গ্রন্থ-গত গদ্য পদ্য, সঙ্কীর্ণ সীমায় বদ্ধ, নদী কি বারিধি যথা আছে পরিমাণ ‘অনন্ত নিঝরপ্রায়, জ্ঞান-ধারা বহে ধায়, লুটে সেই লােটে যেই গিরিধারি-পায়। এই মন করে যােগ, করে যে ঈশ্বর ভােগ, ভাস্বর জ্ঞানের নেত্র তার খুলে যায় । সূৰ্য্যস্তোত্র কবি গায়, কি কবিতা সবিতায়, “চত্র আদি গ্রহ তারা কাব্যগাথা যার।
[ ৩৯ ] সে কবির দয়া হলে, অক্ষরান্ধ ছন্দ বলে, রসনায় গলে তার শব্দ-সুধা-ধার। শিল্পের কৌশলে যিনি, আকর্ষণ মন্ত্রে জিনি, ব্ৰহ্মাণ্ড রাখেন শূন্যে করি দুল্যমান। তিনি না প্রেরণা দিলে, কার সাধ্য এ অখিলে, আবিষ্কার করে কল পড়িয়া বিজ্ঞান। চিত্রকর লিখে পট, অভিনয় করে নট, নৃত্য গীত বাদ্য সাধ্য করে কলাবান্। আঁকে যেই রামধনু, বিশ্বরূপ যার তনু, সেই বেণুধর জানি সবে বিদ্যমান। বাল্যের চাপল্য-মাঝে, জ্ঞানের ঔজ্জ্বল্য রাজে, কাজে কিম্বা সাজে বুঝি বৈরাগ্য-বিকাশ। আপন আপন ভাবে, ভিন্ন জনে ভিন্ন ভাবে, কারাে চোখে অপরূপ কাহারাে তরাস ॥ তত্ত্বলাভ কামারপুকুর হতে দউড়ের দূর। বাঁধা পথ সেথা যেতে জগন্নাথপুর ॥ সতত সন্ন্যাসী সাধু সে সরণী ধরে। শ্রীধাম তীর্থেতে যান দরশন তরে। মহাপ্রাণ লাহাগণ সে রাহার পরে। বিশ্রাম-আশ্রম রচে অতিথির তরে। গদাই সদাই চায় সাধুসন্তসঙ্গ। অন্তরে তাদের শিশু জানে অন্তরঙ্গ । শুনিলে সাধুর মেলা অতিথিশালায়। খেলা ফেলে ভােলা ছেলে সেথায় পালায়। দেবকান্ত শান্ত শিশু আনন্দ-আধার। আধ-আধ মধু ভাষ বটু ব্যবহার।
-- ৪৫ ] তীর্থে তীর্থে সন্ন্যাসীরা করে পর্যটন। গিরি নদী বনে হেরে বিচিত্র ঘটন। বালক পুলকে শােনে তার বিবরণ। কোথায় কেমন লােক কি আচরণ। দুগ্ধের দুলাল শােনে মুগ্ধ হয়ে বােসে। উন্নতি কি গুণে কোথা পতন কি দোষে পুরাণের গল্প শশানে শ্লোক দোঁহাবলী। শ্রুতিমাত্ৰ স্মৃতিগত মুখে কাকলী ॥ সুধাইলে সুক্ষ্মতত্ত্ব ধর্মের বিজ্ঞানে। বিস্ময়ে সাধুরা চান শিশু-মুখ-পানে । কেহ কেহ ভাবে শিশু নহে সাধারণ। “কারণ জিজ্ঞাসে নিজে জগত-কারণ সত্যের সন্ধানে মন বন্ধনে বিরাগ। জন্ম-জন্ম করিয়াছে যেন যােগ-যাগ । চিন্তা করি ত্যাগপন্থী শান্ত সাধুগণ। শুনান জ্ঞানের কথা হয়ে একমন ! আৰু আঙ্ক নিয়ে গুরু থাক এক কোণে। তােমার না রাখ রাম তা কি শশানে। যে দক্ষপ্রত্যক্ষ শিক্ষা লন গদাধর। কবে পাবে ধরাধামে সে শিক্ষা আদর। মাংসপিণ্ডমধ্যে জ্বলে ক্ষুধা অগ্নিকুণ্ড। লালায়িত লেলিহান সদা লােভ-গুণ্ড। অন্ন অন্ন কোরে ভিক্ষা বিদ্যার চরম। গরম কঞ্চন-সন্ধি না চিনে পরম । পড়ে এ বিদ্যা পায় শৃগাল-কুকুর। তাদের আবাস আছে আহার প্রচুর ॥ কুকুর করয়ে যদি চাকুরীস্বীকার। প্রভু-প্রেমে গলে তার দোলে হেম-হার। প্রভুর দুয়ারে এসে দাঁড়াইলে কেউ । প্রভুত্ব জানায় সে-ও কোরে ঘেউ ঘেউ ।
[ ১ ]
ঈশ্বরের অভিরূপ এই নরকায়।
কামিনী-কাঞ্চন-লােভে কাদায় লুটায় ॥
জগত-পিতার সাথে যাহার সংযােগ ।
মৰ্ম্ম ফাটে দেখি তার ঘটে চর্মরােগ ॥
রাজধৰ্ম্ম শিখে রাম বসি বনবাসে।
বীরকৰ্ম্মে কপি-সঙ্গ রাবণ-বিনাশে।
কৃষ্ণের আরম্ভ বিদ্যা গােচারণ মাঠে।
প্রেমের প্রথম পাঠ যমুনার ঘাটে ॥
সিদ্ধার্থ অরণ্যে যান জ্ঞান-অন্বেষণে।
করেন বন্ধুত্বলাভ দৈন্যের আসনে ॥
জীষা জগত পূজ্য না পড়িয়া বই।
“বিশ্বাস” “আশ্বাস” দুই ক্রসে লেখা সই
চৈতন্য করিয়া লাভ শ্ৰীশচীনন্দন।
ভাগীরথী-জুলে দেন ফেলে ব্যাকরণ ।
জগতের জ্ঞান-গুরু আচাৰ্য সকল ।
পুরাতন জ্ঞান কিনে করেনি নকল ॥
প্রেরণা পেয়েছে প্রাণে, নহে গ্ৰন্থ-পাঠে
আবিষ্কার-কর্তা সব বিজ্ঞানের রাঠে ॥
নাট্যসম্রাট অমৃতলাল বসু
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.