Udaynarayanpur Tarun Sangha, Howrah
Dakini Ed.1
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
আঞ্চনী
প্রমথনাথ বিশ
বেঙ্গল পাবলিশাল
১৪, বঙ্কিম চাটুজেট, কলিকা
দেড় টাকা
প্রথম সংস্করণ—অগ্রহায়ণ—১৩৫২
বেঙ্গল পাবলিশার্সের পক্ষে প্রকাশক-শচীন্দ্রনাথ মুখােপাধ্যায়, ১০, বমি
টুয়েট, কলিকাতা। বেঙ্গল ইউনাইটেড ট্রেস লিঃ এর মুদ্রণ বিভাগে
[मा जब बम ৩৫ নং নারায়ণ ঠাকুর ট, কলিকাতা ],
এবিলাপ্রসাদ মুখােপাধ্যায় কর্তৃক মুত্রিত। প্রচ্ছদপট পরিকল্পনা
বন্দ্যোপাধ্যায়, ক ও এচছদপট মূত্রশ-ভারত ফোটোটাইপ ইডিও,
ৰাইবেল বাতাস।
নীহার রঞ্জন রায় রসিকে প্রমথনাথ বিশী প্রীত প্রবন্ধৰি রবী কাব্যপ্রবাহ রবীন্দ্র কাব্য-নিঝর রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতন মাইকেল মধুসূদন বাঙালী ও বাংলা সাহিত্য উপন্যাস ও গল কাব্য ও কবিতা দেশের শক্ত দেয়ালি বসেনা জোড়া দীঘির চৌধুরী পরিবার আত্মঘাতিনী কোপবতী প্রাচীন আসামী হইতে কান্তের পঞ্চম পর্ব বিদ্যাসুন্দর গ্রীকান্তের ষষ্ঠ পর্ব প্রাচীন গীতিকা হইতে গল্পের মতাে যুক্তবেণী ডাকিনী অকুন্তলা গালি ও গল্প নাটক ঋণং কৃথা ঘৃতং পিবেৎ মৌচাকে ঢিল পরিহাস বিজল্পিতম ডিনামাইট গভমেন্ট ইন্সপেক্টর ডাকিনী চতুর্গের মধ্যে জ্ঞানের উল্লেখ না থাকায় হলদেকলসির চৌধুরিগণ কখনাে তাহার চর্চা করে নাই এমন কি চতুর্বর্গের সারাংশ মাত্র রাখিয়া বাকিটুকু তাহারা বরাবর বর্জন করিয়া আসিতেছিল। এহেন কালে এবং এহেন ক্ষেত্রে কিভাবে চতুৰ্গাতীত সরস্বতীর উদয় হইল তাহা বিস্ময়কর হইলেও একেবারে অপ্রত্যাশিত নহে। সংসারে অপ্রত্যাশিতের অবকাশ সর্বদাই রহিয়াছে। হলদেকলসির বর্তমান জমিদার শশাঙ্ক চৌধুরী পিতৃহীন। বয়স হওয়া সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত মাতাই তাহার অভিভাবক। এখনাে সে বিবাহ করে নাই। তবে ভাবে গতিকে বুঝিতে বিলম্ব হয় না যে, এই অসহায় যুবকটি বিবাহ করিবামাত্র মাতার অঞ্চল পরিত্যাগ করিয়া পত্নীর অঞ্চল অবলম্বন করিবে। কোন কোন পুরুষ চিরকাল স্ত্রীলােকের অল ছায়ায় করদরাজ্যরূপে জীবন কাটাইতে অভ্যস্ত। শশাঙ্ক চৌধুরী সেই দলের। পূজার ছুটিতে শশাঙ্ক ও তাহার মাতা অধ্যময়ী দেওঘরে আসিয়াছেন। দেওঘরে শশাঙ্কর পিতা একটি বাড়ী তৈরী করিয়াছিলেন। সেই একতলা বাড়ীর উপরে আরাে তিনটে তালা চড়াইয়া দিয়া অধ্যমন্ত্রী বাড়ীটাকে পাড়ার মধ্যে উদ্ধত করিয়া তুলিয়াছেন। এই বাড়ীটি তাঁহার পরম গৌরবের বস্তু। তাঁহাদের বহু পুরুষের পাণ্ডাঠাকুর হঠাৎ একদিন কোন কারণে বাড়ীটির একটি প্রদর্শন করাতে অস্বামীর মুখ অকস্মাৎ গম্ভীর হইয়া গেল। তারপর অনেক দিন তিনি দেবদর্শন করিতে যাওয়া বন্ধ রাখিয়াছিলেন। অস্বামী জানিতেন দেবদর্শনে পাণ্ডার যেমন ৭ কিনী লাভ দের তেমন নহে। এত বড় দেওঘর সহরে একটিমাত্র পথ তাঁহার পরিচিত-মন্দির হইতে তাঁহার বাড়ীর পথ। এই দুটি স্থান ছাড়া কদাচিৎ অন্যত্র তিনি যাইতেন। একদিন মন্দির হইতে ফিরিবার পথে বাড়ীর কাছে আসিয়া শশাঙ্ক বলিয়া উঠিল—মা, তােমার বাড়ীটা যেন মন্দিরের চেয়েও উচু। দেবমন্দিরের উচ্চতা কল্পনাতে লম্বন করাও পাপকাজেই মাতা পুত্রকে তিরস্কার করিলেন বটে কিন্তু মনে মনে তেমন দুঃখিত হইলেন না। সেদিন চাহিবামাত্র শশাঙ্ক মাতার নিকট হইতে অপ্রত্যাশিত অর্থলাভ করিল। বলা বাহুল্য শশার পড়াশুনা বেশিদূর অগ্রসর হয় নাই, সে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় ফেল করিয়াছে। তাহার মা সগর্বে সকলের কাছে বলিয়া বেড়ান আমার ছেলে ম্যাকুলেশন ফেল—যেন ধনীর ছেলের পক্ষে পাশ হওয়ার চেয়ে ফেল হওয়ার গৌরব বেশি। যদুনাথবাবু সদাগরী অফিসের পেন্সনাপ্ত কেরাণী। তিনি পূজার ছুটিতে দেওঘরে হাওয়া বদল করিতে আসিয়াছেন। সঙ্গে তার মেয়ে মল্লিকা। মল্লিকাই তাঁহার একমাত্র সন্তান। যদুনাথবাবু বিপত্নীক। মেয়েকে দিবার মতাে অন্য কিছু তাঁহার নাই বলিয়া তাহাকে শিক্ষা দিয়াছিলেন। মল্লিকা এমএ পাশ করিয়াছে। সেদিন পিতা-পুত্রী ৰেডাইতে বাহির হইয়া অনেকটা ঘুরির পরে ক্লান্ত হইয়া হলদেকলসি ফুলরের গেটের পাশে বসিয়া বিশ্রাম করিতেছিলেন। এমন সময়ে অধ্যময়ী মন্দিরে যাইবার উদ্দেশ্যে বাহিরে আসিতেছিলেন। একটি অপরিচিত মেয়েকে বাড়ীর দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাইয়া থাকিতে দেখি তিনি শুধাইলেন—কি দেখছ না? মল্লিকা ঠিক যে কি দেখিতেছিল তাহা নিশ্চয় করিয়া বলা সহজ নহে। এরকম ক্ষেত্রে সহজতম উত্তরটাই সে দিলবাভীটা বেশ বাড়ী। আপনার বুঝি?
অকিনী অধ্যমন্ত্রীর মুখ উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। হ, মেয়েটি সমজদার বটে। কই এমন করিয়া কোন অপরিচিত ব্যক্তি অযাচিতভাবে তাে হার হলদেকলসি কুটীরের প্রশংসা করে নাই। তিনি বলিলেন মা আমাদেরই বাড়ী। তা এখানে বসে কেন? এসাে না ভিতরে । তারপরে গলা একটু খাটো করিয়া বলিলেন—উনি বুঝি তােমার বাবা? মল্লিকা বলিল, বাবা। যদুনাথবাবু বিশ্রাম করিতে লাগিলেন। অধ্যময়ী মল্লিকাকে লইয়া বাড়ীর ভিতর বিশ্রামের উদ্দেশ্যে প্রবেশ করিলেন। কিন্তু পরে লােক টানিয়া আনিয়া বিশ্রামের সুযােগ দান তত অধ্যমগীর অভিপ্রায় নয়—তিনি ঘণ্টাখানেক ধরিয়া মল্লিকাকে বাড়ীর অন্ধি সন্ধি সৰ দেখাইলেন। মল্লিকা কতকটা বা তার খাতিরে কতকটা বা সত্যের খাতিরে বাড়ীটার অনর্গল প্রশংসা করিয়া গেল। অস্বামীর মন গলিয়া গেল। বিদায় লইবার সময়ে তিনি মল্লিকার নাম, ধাম পুছিয়া লইলেন এবং পরদিন মধ্যাহ্নে আহার করিবার জতে পিতা-পুত্রীকে নিমন্ত্রণ করিলেন। মল্লিকা অস্বামীর অনুৰােধ এড়াইতে না পারিয়া প্রত্যহ বিকালে পিতাকে সঙ্গে করিয়া বেড়াইতে আসে। কয়েকদিন পরে একদিন অধ্যময়ী মল্লিকাকে বাগান দেখিবার জন্য পাঠাইয়া দিয়া নিজে চিকের আড়ালে থাকিয়া যদুবাবুর কাছে কর্মচারীর মারফৎ মল্লিকার সঙ্গে শার বিবাহ প্রস্তাব করিলেন। যদুৰাৰু ঠিক এ জন্য প্রস্তত ছিলেন না। তাই কি বলিবেন বিয়া পাইয়া বলিলেন—আমরা গরীব।
ডাকিনী অস্বামীর ইঙ্গিতে কর্মচারী বলিলেন-আমরা তাে টাকাকড়ি চাই —ভালাে মেয়ে চাই। ঘর বর যদি আপনার অপছন্দ না হয় । যদুবাবুবলিলেন—বিলক্ষণ। তারপরে শশার সঙ্গে মল্লিকার বিবাহ স্থির হইয়া গেল। এম-এ পাশরূপ কেবল যে একটি ধুং মেয়ের ছিল তাহা প্রকাশ পাইল না— প্রকাশ পাইলে কি হইত নিশ্চয় করিয়া বলা সহজ নহে। অম্রাণ মাসেই শশার সঙ্গে মল্লিকার বিবাহ দেওঘরে সম্পন্ন হইয়া গেল। বিবাহের কিছুদিন পরেই আরও দূরবর্তী স্থানের হাওয়া বদল করিয়া দেখিবার জন্য যদুনাথবাবু পরলােকে প্রস্থান করিলেন। মল্লিকা কিছুদিন খুব কান্নাকাটি করিল। কিন্তু যে কাল দুঃখের কালাে স্রোত ডাকিয়া আনে সেই কালই হাসির ও পুঞ্জ পুঞ্জ কেনারও বাহন। কালক্রমে তাহার চোখের জল শুকাইল এবং মুখে হাসি দেখা দিল। দেওঘরে কয়েক মাস কাটাইয়া ফাতনের প্রথমে অস্বামী পুত্র ও পুত্রবধু লইয়া হলদেকলসি গ্রামে প্রত্যাবর্তন করিলেন। গুড়নদীর তীরে আম কাটাল জাম নারিকেলের গাছের মধ্যে হলদেকলসি গ্রাম। বাংলাদেশের হাজার হাজার গ্রামের সঙ্গে এই গ্রামখানির প্রভেদ নাই। এপারে মানুষের বাস, ওপারে বিস্তীর্ণ চাষের ক্ষেত। তার মধ্যে আখের ক্ষেতটাই বেশি নজরে পড়ে। শরৎকালে বিস্তৃত ক্ষেত্রে প্রৌচ আখের সারি সঙীণভােলা বুহবজ সৈন্যবাহিনীর মতাে নিল গড়াইয়া থাকে। শরৎকালের মধ্যেই এই উক্তি বাহিনী আততায়ীর কাটারির আঘাতে ভূমিশায়ী হইয়া গাড়ী বােঝাই হইয়া ডাকিনী দুরবর্তী চিনির কলের দিকে প্রস্থান করে। শীতের শেষে এখন আখের ক্ষেত শূ। রবিশস্য পৰু প্ৰায়। ধানকাটা মাঠে আগুন ধরাইয়া দিয়া ধানের গােড়া পােডানাে চলিতেছে। ওপারের নিস্ততার মধ্যে নানা রকম শতের পরিণতি লাভের প্রয়াস; এপারে শত রকমের শব্দে তাজি আচ্ছাদিত মানুষের বসতির লক্ষণ। মাঝখানে গুড়নদী দুই দিকের শৈবালের পাড়ি দেওয়া গাজশী শাডিখানি পৰিয়া শৰ্ণ স্রোতে চলমানা। সে না মানুষের, না প্রকৃতির। মল্লিকা শহরের মেয়ে, গ্রামে আসিয়া নিজেকে বড়ই অসহায় অনুভব করিল। এখানকার নিস্তব্ধতা কেমন যেন বুক চাপিয়া ধরে—এখানকার নির্জনতা কেমন যেন অস্বস্তিকর। সহরের মেয়ে গ্রামের মধ্যে কোথাও অবলম্বন পায় না। নূতন আত্মীয়স্বজন এখনও তাহাকে প্রসারিত মনে গ্রহণ করে নাই-নূতন বন্ধুর প্রতি সৰ শুরকুলেই প্রথমে একটা প্রতি কূলতার ভাব থাকে। মল্লিকার প্রতি প্রতিকূলতা কিছু বেশি ছিল। অধ্যময়ী কাহারও সঙ্গে পরামর্শ না করিয়া, কাহাকেও ভাল করিয়া না জানাইয়া তাহাকে ঘরে আনিয়াছেন। সে দোষ যেন মল্লিকারই মল্লিকার উপরে সকলের- রাগটা কিছু বেশি। কারণ, অস্বামীর উপরে রাগ করা চলে, কিন্তু রাগ প্রকাশ করা চলে না। মল্লিকা একা বসিয়া থাকিলেও দোষ-দেখাে সহরের মেয়ের অহাৰ। আবার সকলের সঙ্গে মিশিতে গেলেও দোষ—দেখাে সহরের মেয়ের নিলজ্জতা। মল্লিকার সঙ্গে সকলের সম্বন্ধ ক্রমেই যখন সঙ্কটের মুখে—তখন তাহার এক জাতি ননদ হঠাৎ আবিষ্কার করিয়া ফেলিল—মল্লিকা ইংরাজি পড়িতেছে। সে তখনি দৌড়াইয়া গিয়া প্রচার করিয়া দিল—বৌদি ইংরাজি পড়ে। দেখিতে দেখিতে কথাটা গ্রামময় রাষ্ট্র হইয়া গেল চৌধুরীদের নূতন বউ ইত্যাজি পড়ে। সংবাদটা নানা মুখ ঘুরিয়া অবশেষে শশার কানে গকিনী ? আসিয়া পৌছিল। সে রাত্রিবেলা মল্লিকাকে পচিলমলি, তুমি নাকি ইঙ্গি পড়ে? মল্লিকা বলিল। কিন্তু মল্লিকা যেমন আশঙ্কা করিয়াছিল অঙ্ক রাগ করিল না বরঞ্চ যেন খুশি হইল। শশা বলিল—কি ৰই? ফাষ্ট বুক? আমিও ওই বই দিয়ে পড়া সুরু করেছিলাম। তুমি কি বই পড়ছিলে? মল্লিকা বইয়ের নাম প্রকাশ করিবার ইচ্ছা ছিল না কিন্তু স্বামীর স্পীড়াপীডিতে বইখানা বাহির করিতে হইল। শশাঙ্ক দেখিল-ফাষ্ট বুক নয় ছােট ছােট অক্ষরে ঠাসা পাতা বেশ মােটা বই—ডিকেন্সের ডেভিড কপারফিল্ড। শশাঙ্ক গিন্নীর ইংরাজি আনে চমৎকৃত হইয়া গেল—এবং পরদিনই বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের কাছে গিয়া নিজে পত্নীর লেখাপড়া প্রচার করিবার ভার লইল। ইহার ফলে মল্লিকার অবস্থা আরও শোচনীয় হইয়া উঠিল। একে তাে চৌধুরী বাড়ীর বউয়ের পক্ষে ইংরাজি পড়া প্রথাবিরুদ্ধ- তার উপরে তাহার স্বামী এই কাজের সহায়। শশাঙ্ক যদি মল্লিকাকে তিরস্কার করিত-তবে সকলে খুসি হইত—কিন্তু ইহাতে হিতে বিপরীত ঘটিল। শশাঙ্ক সন্ধ্যাবেলা হঠাৎ ঘরে প্রবেশ করিয়া দেখিল, মল্লিকা একা বসিয়া কাঁদিতেছে। শশাৰু তাহাকে কত সাধ্য াধনা করিল-কাকার কারণ মল্লিকা বলিল না। কি বলিবে, কেন এই কান্না নিজেই ভাল করিয়া জানে না। কোন উত্তর না পাইয়া শশাঙ্ক বলিল—মলি তােমার কি এখানে মন টিকছে না? মল্লিকা ঘাড় নাডিয়া সম্মতি জানাইল। শশাঙ্ক বলিল—চলল আমরা কোথাও বেড়াতে যাই। মল্লিকা খুশি হইয়া উঠিল। শশা বলিল— ডাকিনী এখন বেশ গরম পড়েছে, চলল দার্জিলিং যাওয়া যাক। এবারে মল্লিকার মুখে হাসি ফুটিল। পরদিন শশা মাতার কাছে প্রস্তাৰ কৰিল যে, সে দাজিদি যাইতে চায়। অাময়ী পরুপায় শুনিয়াছিলেন ধনীর ছেলেরা দার্জিলিং-এ যায়; কাজেই তিনি বলিলেন, বেশ তত ষ্টেশন থেকে ঘোড়ার গাড়ী আনিয়ে নিয়ে যাওনা বাবা। শশাঙ্ক বলিল—পাকীও লাগবে যে। বিস্মিত অধ্যময়ী বলিল-পাকী লাগবে কেন? শশা বলিল—মল্লিকাও যাবে। অন্বামীর মাথায় বিস্ময়ের আকাশ ভাঙিয়া পড়িল। মল্লিকার ইংরাজি পড়ার কথায় তিনি রাগ করেন নাই—কারণ যে বন্ধুকে তিনি একার দায়িত্বে নির্বাচন করিয়াছেন, সে যে আর পাঁচজনের চেয়ে Eে ইহাতে তাহারি গৌরব। কিন্তু চৌধুরী বাড়ীর বধু স্বামীর সঙ্গে দার্জিলি যাইবে। অাময়ী নির্বোধ নন। তিনি বুঝিলেন হাসিমুখে অনুমতি দিলে মুখে পুত্র ও পুত্রবধূর দার্জিলিং যাত্ৰাৰ অসমত সাক্ষ্য বহন করিয়া তাঁহাকে অপমান সহ্য করিতে হইবে। কাজেই তিনি বলিলেন- বেশ তত বউমাও ঘুরে আসুক না কেন। অন্বময়ী দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বুঝিতে পারিলেন—এতদিনে মাতার অঞ্চল হইতে বন্ধুর অঞ্চলে শশার সংক্রান্তি ঘটিয়াছে। তিনি তে দাতে চাপিয়া মুখ বুজিয়া ছিলেন। পুষেচোর বধুর প্রতি তিনি হাড়ে চটিয়া গেলেন। দার্জিলিং-এর নিয় শুক্রবার মধ্যে আসিয়া মল্লিকার সমস্ত গালি মুছিয়া গেল। সংসারের সব গনির উপরে সুধার প্রলেপ দিবার অই তাে দিকে দিকে উত্তক শৃঙ্গের সুধার তুলি উদ্যত করিয়া গিরিরাজ এত আড় করিয়াছেন। বুয়াশায় সিক্ত অঞ্চলখানা সেই জন্যেই মাহুতে মনে ডাকিনী উপর দিয়া তিনি এতবার করিয়া বুলাইয়া দেন-মুছিয়া যাক সব তাপ, ঘুচিয়া যাক সব দাহ। এখানেও যে সান্ত্বনা না পায়—সে সত্যই দুর্ভাগা । মল্লিকা আর শশাঙ্ক সারাদিন ঘুরিয়া বেড়ায়। ধাপে ধাপে পাহাড় নামিয়া গিয়াছে, যাহার নিম্নতম প্রান্তে প্রবল স্রোতস্বিনীগর্জনের কারা মাত্র অনুমানগম্য। থাকে থাকে বলিষ্ঠ বৃক্ষরাজি উঠিতে উঠতে আকাশকে প্রায় দুইয়া দিছে আর কি—যেখানে পরীদের খেলার ঘুডির মতাে পাণ্ডু, চাঁদখানা ঝুলিয়া আছে! সর্পিল পথ, গভীর উপত্যকা, উচ্চ শৃঙ্গ—এসব কি কল্পনায় পাইবার? এমন ঘন শ্যামলতা আর এমন ফুলের বৈচিত্র্য। আর এই স্বর্গীয় রঙ্গমঞ্চে আলাে-ছায়ার অর্ধনারীশ্বরের যে অন্তহীন অভিনয় চলিতেছে, কুয়াশার মলমল তাহার উপরে অঙ্কে অঙ্কে যবনিকা টানিয়া দেয়। মল্লিকা ভাবে এই রহস্য, এই সৌন্দর্য, এ কি এই জগতেরই অন্তর্গত, না তাহারা এমন এক স্থানে আসিয়া পড়িয়াছে- যেখান হইতে আভাসে অন্য এক জগতের এই সব ছবি দৃশ্যমান? মল্লিকা মুগ্ধ হইয়া গেল। শশাঙ্ক খুশি হইল। দুইমাস কাটাইয়া তাহারা আবার দেশে ফিরিয়া আসিল। শশাঙ্ক ও মল্লিকা ফিরিয়া আসিলে প্রথমেই সকলের চোখে যে পরিবর্তনটা ধরা পডিল-শশাঙ্কর শরীর খারাপ। সে কী ও কেমন যেন রক্তশূন্য! তবে নাকি দার্জিলিঙে গেলে শরীর ভালাে হয়। যাহারা কখনাে দার্জিলিঙে যায় নাই—আর যাইবারও যাহাদের বিন্দু মাত্র সম্ভাবনা নাই—তাহা শশার দৃষ্টান্তে দার্জিলিং না যাইবার বির সিদ্ধান্ত করিয়া ফেলিল। অথচ ইহার ঠিক বিপরীত প্রমাণ মল্লিকা ডাকিনী গালে ও দেহে সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছিল তাহা কেহ দেখিয়াও দেখিল না। অধ্যময়ী কাতর হইয়া বলিলেন—এ কি বাবা, তাের শরীর এত খারাপ হল কেন? শশাৰু বলিল—ওখানে পাহাড়ে ওঠানামা করতে গেলে শরীর একটু খারাপ হয়। ও কিছু নয়। অধ্যময়ী বলিলেন—সে আবার কি কথা ! দেওঘরের বাড়িতে চারতলা থেকে একতলায় দিনের মধ্যে কতবার ওঠানামা করেছিল, কই তাের শরীর তাে খারাপ হয়নি। যাই হােক অশ্বময়ী চিন্তিত হইয়া পুত্রের চিকিৎসার ব্যবস্থা করিলেন কিন্তু তাহার শরীরের বিশেষ উন্নতির লক্ষণ দেখা গেল না। ওই সনে মল্লিকার শরীরটাও যদি সমান খারাপ হইত তবে হয়তাে এ পরিবর্তন তেমন করিয়া কাহারাে চোখে পডিত না-কি পডিলেও কেহ কিছু মনে করিত না। এখন তার পরিজন বিশেষ করিয়া তাহার মাতা বধুর উপরে তুদ্ধ হইলেন। পৃথিবীর মধ্যে এক বাংলাদেশেই বােধ করি শরীর ভালাে হওয়াটা অমার্জনীয় অপরাধ। পূজার পরে অধ্যময়ী স্থির করিলেন এবারে দেওঘরে না গিয়া কাশী যাইবেন। তিনি শশাঙ্ককে বলিলেন বাবা এবার আমাকে কাশী নিয়ে চল। শশাঙ্ক কি যেন বলিতে যাইতেছিল, অধ্যময়ী বলিলেন—না, না, বিদেশে বৌটাকে নিয়ে গিয়ে কষ্ট দিতে চাইনে। সে থাকুক। আর আমরা তাে বেশি দিন ওখানে থাকবে না। আসলে বৌমার কষ্টটা নিতান্তই অবান্তর। বন্ধু যে পুত্রকে টানিয়া লইয়া দার্জিলিং গিয়াছিল—ইহা তাহারই উত্তর। অাময়ী দেখাইয়া ডাকিনী দিতে চান পুত্রের উপরে এখনাে র্তাহার পূর্বৎ অধিকার আছে। বন্ধু যদি তাহাকে মার কাছ হইতে টানিয়া লইয়া দার্জিলিং যাইতে পারে- তবে মাতাও তাহাকে বন্ধুর কাছে হইতে টানিয়া কাৰ লইয়া যাইতে সক্ষম। শশাঙ্ক তাঁহার সঙ্গে যাইবে, মল্লিকা যাইবে না, এই চিন্তাতেই তিনি উৎফু বােধ করিলেন—এমন কি পুত্রবধুর সঙ্গে অনেক দিন পরে এক আধটা কথাও বলিয়া ফেলিলেন। অধ্যময়ী ও শশাঙ্ক কাশী পৌছিলে পরিচিত আত্মীয়স্বজন দেখা করিতে আসিল। তাহারা আসিয়া সকলেই একবাক্যে জানাইল অস্বামীর শরীর বিশেষ খারাপ হইয়া গিয়াছে। প্রথমত, কথাটা সত্য নয়, দ্বিতীয়ত, ওটা একটা অভ্যর্থনার অর্থহীন প্রথামাত্র। উভয় পক্ষেই জানে কথা অমূলক তবু বলিতে হয়—ওটা তা। কিন্তু সত্যটাও তাহাদের চোখ এড়াইল না। শশার শরীর যে অতিশয় কৃশ হইয়া পডিয়াছে তাহা লক্ষ্য করি সকলেই উবেগ অনুভব করিল। এই সব আত্মীয়স্বজনের মধ্যে একজন নিস্তারিণী দেবী। ইনি শশক্তির সম্পর্কিত পিসি। এক সময়ে নিস্তাত্নিী দেবী শশাদের সংসারেই থাকিতেন—এখন তাহাদেরই প্রদত্ত মাসােহারায় কান বাস করেন। তিনি শর কৃশতা দেখিয়া একপ্রকার ভুকরিয়া উঠিলেন—ও বৌদি এ কি সর্বনাশ তুমি করেছ! সােনার যদি যে শেষ হয়ে গিয়েছে। নিস্তারিণীর প্রতিকুল সমালােচকগণ বলিতে পারেন যে, তাহার স্বরের উচ্চতার উপরে মাসােহায়ার স্থায়িত্ব নির্ভর করিতেছে—কিন্তু তাহা ছাড়া কি আন্তরিকতা থাকাও অসম্ভব নয়। নিরিণী ছিলেন কবে থেকে এমন হল? অধ্যময়ী বলিলেন, বিয়ের পর থেকেই তাে চোখে পড়ছে। বলা বাহুল্য কথাটা মিথ্যা। কিন্তু যে পুত্রবধূর উপরে তিনি কষ্ট অকিনী তাহার উপরে স্বভাবতই সেটা চাপাইয়া দিলেন। নিরিণীরও কথাটা মনে লাগিল। কাৰণ শশার বিবাহে তিনি নির্মিত হইয়াও যাইর রাহা খৰচ পান নাই—সে গােড়া হইতেই তিনি বন্ধুকে দোষী করিয়া রাখিয়াছিলেন। কাজেই এখন অস্বামীর কথা শুনিজ তাঁহার মনে হইল শশা যে শরীর খারাপ তাহার জন্য মজিকাই দায়ী। অধ্যময়ী বলিলেন, সেইজন্যেই তাে শশাকে নিয়ে পশ্চিমে এসেছি, দেখি যদি তাহার শরীরটা সারে। নিস্তারিণী সেদিন আর কোন কথা বলিলেন না—সেদিনের মতাে উঠিয়া পড়িলেন। দু'চার দিন পরে আবার নিস্তারিণী আসিলেন। বিশ্বনাথের মহিমা, ব্যাসাীর ইতিহাস, বাজার দর প্রতি যে কয়েকটি অত্যাৰক আলােচ্য বিষয় আছে তাহার সমালােচনা অন্তে নিস্তারিণী দেবী বলিলেন খ বৌদি, এ কদিন আমি শশার কথা ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারিনি। সােনায় চাঁদের শরীর যে এমন কাহিল হয়ে গেল এর তাে একটা বিহিত করতে হবে। অন্যাময়ী বলিলেন—সেইজনেই তােত, বােন পশ্চিমে আসা। নিভারিণী বলিলেন–পশ্চিমে এসেছ ভালই করেছ। কি এত জায়গা থাকতে বাবা বিশ্বনাথ নিজ ক্ষেত্রে টেনে আনলেন কেন? এ বাবার দয়া ছাড়া আর কিছু নয়। বাবার দয়াতে অর্থমন্ত্রীর কিছুমাত্র সংশয় ছিল না, কিন্তু ঠিক কি আকারে সে দয়া প্রকাশিত হইবে না বুঝিতে পারিয়া জিভাৰে তিনি নীরব হইয়া রহিলেন। তখন নিস্তারিণী গলা খাটো করিয়া শুরু করিলেন, চৌঘাটের কাছে এক ব্রহ্মচারী মাতা থাকেন—একেবারে ভূতভর্তিমান বিকালদশী। কত লােক যে তাঁহার প্রসাদে বিপদোত্তীর্ণ হইয়াছে তার ডাকিনী সীমা সংখ্যা নাই—এই বলিয়া কয়েকটি দৃষ্টান্তের উল্লেখ কৰিলেন। এ অবশেষে মন্তব্য প্রকাশ করিলেন—একবার তাঁহার কাছে গেলে হয় না— কারণ চিকিৎসাশাস্ত্র ও পশ্চিমের জল হাওয়া স্বাস্থ্যদায়ক বটে, কিন্তু বাবার দয়া ও ব্রহ্মচারী মাতার শক্তির কাছে কিছুই কিছু নয়। অধ্যমগীর এরূপ আধিদৈবিক চিকিৎসায় আপত্তি হইবার কথা নয়, বিশেষ পুত্রের মঙ্গল কামনা করিয়া তিনি অবিলম্বে রাজি হইলেন। স্থির হইল পরদিন উভয়ে ব্রহ্মচারী মাতার কাছে যাইবেন। চৌষটিঘাটের কাছে এক ভাঙা দোতালা বাডীতে ব্রহ্মচারী মাতা থাকেন। পরদিন অধ্যময়ী ও নিস্তারিণী যখন তাহার কাছে গিয়া উপস্থিত হইলেন তাঁহার সন্ধ্যাহিক শেষ হইয়াছে বটে, কিন্তু তখনও আসন ছাভিয়া ওঠেন নাই। দুজনে ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম করিলেন—অধ্যময়ী পায়ের কাছে মােটা প্রণামীর টাকা রাখিলেন। অধ্যময়ী তাঁহার মুখের দিকে চাহিয়া স্তব্ধ বিস্ময়ে দেখিলেন— প্রকৃতই ব্ৰহ্মচারিণী বটেন- মাথায় জটা হইতে পা পর্যন্ত আধিদৈবিক ক্ষমতায় দেদীপ্যমান। মাতার যেমন বিরাট চেহারা, তেমনি বিশাল মুখমণ্ডলে ভাটার মতাে দুটি চোখ, মাথার জটা পিঠ ঢাকিয়া মাটিতে লুষ্ঠিত, গলায় থাকে থাকে ছােট বড় রুদ্রাক্ষের একরাশ মালা, কপালে সিঁদুরের ছাপ, পরিধানে গেরুয়া, পাশে, রক্ষিত রক্তবর্ণ ত্রিশূল সম্মুখে রক্তজবা এবং রক্তচন্দনের পুজার উপকরণ-পাশে নরকপালে কারণবারি। তিনি বলিলেন—মন্তু। হাঁদেহের অনুরূপ কণ্ঠস্বর। মনে বিন্দুমাত্র সংশয় থাকিলে তাহার কণ্ঠ চাপিয়া মুহুতে বিনাশ করিবার মত তাহার প্রবল প্রচণ্ডতা। অধ্যময়ী চুপ করিয়া থাকিলেন আর নিস্তারিণী তাঁহাদের আগমনের কারণ ও উদ্দেশ্য বর্ণনা করিয়া গেলেন। সব শুনিয়া ব্রহ্মচারী মাতা ডাকিনী তাহাদিগকে আগামী শনিবারে পুনরায় আসিতে বলিলেন—ইতিমধ্যে তিনি সমস্ত সমস্যা নাকি মীমাংসা করিয়া রাখিবেন। শনিবারের পরে মঙ্গলবার, মঙ্গলবারের পরে অমাব—এমনি করিয়া বিশেষ বিশেষ তিথিতে ও বারে দুইজনে ব্রহ্মচারী মাতার কাছে যাতায়াত করিতে লাগিলেন এবং প্রতিবারেই অধ্যময়ী মাতাকে মােটা প্রণামী দিতে লাগিলেন। অবশেষে মাতা তপার্জিত বুদ্ধিবলে বুঝি- লেন—অতঃপর নীরব হইয়া থাকিলে ভক্তের সৰিয়া পড়িবার সম্ভাবনা কাজেই একদিন শনিবার অমাবস্যা তিথিতে তিনি অস্বামীর সমস্যার স্বরূপ বিশ্লেষণ করিয়া বলিয়া দিলেন। ব্রহ্মচারী মাতা অধ্যময়ীকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন—ছ, তােমাৰ পুত্রবধুর ডাকিনীর অংশে জন্ম। ডাকিনীর অংশে যেসব স্ত্রীলােকের জন্ম তাহাৱা ৰামীহী হয়। তাহাদের প্রভাবে স্বামীরা ধীরে ধীরে শুকাইয়া মারা যায়। স্বামী যতই শুকাইয়া আসিতে থাকে কিনী ততই স্বাস্থ্যবর্তী ও সুন্দরী হইয়া ওঠে। অধ্যময়ী মনে মনে লক্ষণ মিলাইয়া লইতে লাগিলেন—সবই তাে সত্য বটে। শশাঙ্ক কৃশ হইতে কাতর হইতেছেমল্লিকার স্বাস্থ্য ও রূপ অনেক বাড়িয়া গিয়াছে। পুত্রের অবস্থা স্মরণ করিয়া তাহার চোখ ছল ছল করিয়া আসিল। ডাকিনীর অংশে জন্ম বলিতে কি বুঝায় ব্রহ্মচারী মাতা তাহার ব্যাখ্যা করিতে লাগিলেন। শনি মঙ্গলবারে, অমাবস্যা তিথিতে কামরূপ কামাখ্যা হইতে ডাকিনীর হাত গভীর রাত্রে আকাশ পথে উড়িয়া জেলে যায়। ঠিক সেই মুহুতে তাহার গতিপথের নীচে কোন কন্যা ভূমিষ্ঠ হইলে ডাকিনী তাহাকে ভর করে। তাহার মধ্যে ডাকিনীর অংশ আসিয়া বতায়। এরূপ কন্যার মাতা প্রায়ই জীবিত থাকে না।
কিনী অময়ী দেখিলেন—কথা ঠিক। মল্লিকার মাতা তাহার নেয় কিছুদিন পরেই মারা গিয়াছিল। অধ্যময়ী কাদিয়া ফেলিয়া বলিলেন-মাতাজী, এখন তুমি উপায় করিয়া দাও। মাতাজী হাসিনা তাঁহাকে সানা দিয়া বলিলেনছা তােমার ভয় নাই। আমার কাছে ডাকিনী যােগিনী সবাই জ—কারণ আমি কামরূপ কামাখ্যার গিয়া দীর্ঘকাল তপস্যা করিয়া তাকিনী সিদ্ধ হইয়াছি। আমি এখন মপূত আধিদৈবিক ঔষধের ব্যবস্থা করিয়া দিব যাহাতে তােমার পুত্রবধুকে পরিত্যাগ করিয়া ডাকিনীর অংশ পলায়ন কৰিৰে, তােমার পুত্রের পুনরায় স্বাস্থ্যোন্ধার ঘটিৰে। কিন্তু তা অতে তােমার পুকে একবার এখানে লইয়া আসা দরকারকার তাহাকে সনে বরং এই ঔষধ পুত্রবধুর হাতে বাধিয়া দিতে হইবে। অধ্যময়ী এই প্ৰতাৰে এমাদ গণিলেন। এ নি এসব কথা বিশ্বাস করিবে না—আর একটা গণ্ডগােল করিয়া মহা অনর্থের সৃষ্টি করিবে। অধ্যময়ী বলিলেন—মাতাজী—আজকালকার ছেলেদের মতিগতি বুঝিয়া ওঠা সুৰ- তাহাদের নাস্তিক বলিলেই চলে। তাহারা কি এসব দৈৰ ব্যাপার বিশ্বাস করিবে? মাতাজী নরকপাল হইতে খানিকটা পানীয় গলাধঃকরণ করিয়া বলি- লেনছ সেজন্য তুমি ভাবিও না। মহাশক্তির কৃপায় আমি এমন ক্ষমতা লাভ করিয়াছি যে মহান্তিকেও আমার প্রভাব লক্ষন করিতে সমর্থ নয়। তােমার পুত্রকে আনিও, আমি যাহা বলিব—তাহাই সে বিশ্বাস করিবে। বাতৰিক ঘটিও তাই। মাতার সঙ্গে কয়েকদিন প্রচারিণীয় কাছে যাতায়াতের পরে শাকও বিশ্বাস করিয়া ফেলিল যে, তাহার পীর ডাকিনীর অংশে জন্ম—সেইজন্যই তাহার শরীর খারাপ হইয়া যাইতেছে। ব্রহ্মচারী মাতার প্রদত্ত ঔষধ পত্নীর হাতে ৰাখিয়া দিলে তাহাদের উভয়েরই T ডাকিনী মঙ্গল। শশাঙ্ক এই কাজে সম্মত হইল—কতকটা বা পত্নীর মঙ্গল কামনায়, কতকটা বা নিজের ইষ্ট চিন্তায় কতকটা মায়ের কান্নাকাটিতে, কতকটা ব্রহ্মচারিণীর ব্যক্তির প্রভাবে। মানুষ একান্তই ঘটনাচক্রের দাস। কে কি বিশ্বাস করিবে, কে কি কাজ করিবে তাহার খুব সামান্য অংশই নিজের ব্যক্তিত্বের উপরে নির্ভর করে। ঘটনার ব্যক্তিদের কাছে তাহার নিজের ব্যক্তিত্ব অতিশয় দুর্বল। তার উপরে আবার শশাঙ্ক চিরদিন দুর্বল প্রকৃতির জীবমাতার আরে থাকায় তাহার নিজের ইচ্ছা অনিচ্ছা সাবালকত্ব লাভ করিতে পারে নাই। ব্ৰহ্মচারিণী মন্ত্রপূত সিন্দুরলুপ্ত মটরদানার মতাে একটি বস্তু দিলেন। ইহা বন্ধুর বামহন্তে বাঁধিয়া দিতে হইবে। মাতাপুরে মুক্তি করিয়া স্থির করিল, মল্লিকার জন্য এক জোড়া অনন্ত গডিয়া লইয়া যাইবে, যাহার বাম হাতেরটির মধ্যে মটরনাটি ভরিয়া দেওয়া থাকিৰে। কাজেই মল্লিকার জানিবার কোন না থাকিবে না—অথচ কার হইয়া যাইবে। মাতাপুত্র ও নিস্তারিণী দেবী তিনজনে এইরূপ পরামর্শ করিলেন। নির্দেশমতাে অনন্ত গড়া হইল—এবং তন্মধ্যে ব্রহ্মচারিণীর এবং ভরিয়া দেওয়া হইল। এইবার হান্ন প্রফুলচিত্তে দেশে রওনা হইলেন— নিরিণী দেবীও চলিলেন। মাঝ রাত্রে শশাঙ্ক ঘুম ভাঙ্গিয়া উঠিয়া দেখিল আল কোমল শষ্যার একান্তে মল্লিকা পড়িয়া ঘুমাইতেছে-জানলা দিয়া অৱিত জ্যোৎন্সার ধায়া আসিয়া তাহার সঙ্গে পড়িয়াছে শষ্যায় এত রমণী যেন জনীগন্ধার বনে মূৰ্হিত না। এই মল্লিকাই কি ডাকিনী?
ডাকিনী তাহার বিশ্বাস হইল না। সেদিন ব্ৰহ্মচারিণীর কাছে যাহা বিশ্বাস করিতে দ্বিধা হয় নাই—আজ তাহা মিথ্যার চেয়েও মিথ্যা মনে হইল। না এ হইতেই পারে না। কিন্তু তবু তাে সে এই বিশ্বাসের বশেই কাজ করিয়াছে—এই বিশ্বাসের বশেই ঔষধ অনন্ত জোড়া তাহাকে পরাইয়া দিয়াছে। কাণী হইতে ফিরিয়া মন জোড়া মল্লিকার হাতে দিয়া শশাঙ্ক বলিয়াছিল—পরাে, নূতন ডিজাইনের অলঙ্কার। মল্লিকা পুছিয়াছিল—আচ্ছা এর নাম অনন্ত কেন ? শশাঙ্ক বলিয়াছিল—দেখছ সাপের আকারে গডা-সাপের নাম যে অনন্ত। তারপর বলিয়াছিল-এ যে আমার অনন্ত ভালবাসার প্রতীক। মল্লিকা বলিল-অনন্ত, তবু অন্ত আছে। তারপর দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিয়াছিল—কো ভালবাসায় বা অন্ত নাই। সে কি তখন স্বপ্নেও জানিত ওই অনন্ত কি বিষম বিষ বহন করিয়া তাহার বাহযুগণকে জড়িত করিল ? শশার চোখে সেই অনন্ত জো পড়িল। ইচ্ছা করিল টান মারিয়া তাহা খুলিয়া ফেলে ইচ্ছা করিল সকল কথা তাহাকে বলিয়া মাজনা চায়। কিন্তু দুর্বল প্রকৃতির পক্ষে কিছুই করা সম্ভব হইল না বন্ধুর পাশে শুইয়া পড়িল। তাহাকে নিকটে টাৱিতে গেলে ঘুমের মধ্যে মল্লিকার বাহু তাহাকে আঘাত করিলবাম হাতের অনন্ত অতর্কিতে তাহাকে জােরে লাগিল। শশা তাকাইয়া দেখিল অনন্তের লাল পাথর বানাে চোখ জ্যোৎস্নায় সাপের চোখের মতাে অলিতেছে। শশাঙ্ক দূরে সমিয়া ঘুমাইয়া পড়িল। শশাদের সংসারে তাহাদের দূরসম্পর্কিত এক পিতৃ-মাতৃহীন অনাথ বালিকা প্রতিপালিত হইত। কালাে মােটাসােটা মেয়েটি, মূখ কৌতুক কিনী ১৭ কোতে। তাহার সঙ্গে মল্লিকার সবচেয়ে বেশি মেহেয় সম্পর্ক ছিল। সে নিজে ওর মতই পিতৃহীন। মেয়েটির নাম ফজি। অম্বিকা তাহাকে আদর করিয়া কি-কুমড়ো। সা হইলেই কুমড়ো হার শষ্যায় আসিয়া আর লইতলিত মল্লিকা মাসি এক সেদিৰ কুমড় আসিয়া বলিল-মল্লিকা মাসি একটা গল্প বলল- তােমাদের দেশের গল্প। মল্লিকা কলিকাতার গল্প বলিতে উত হইলে কুভােবলিল—ও গল্প নয়, তােমার দেশের গল্প। মল্লিকা হাসিয়া বলিল—কেন কাতাই তাে আমার দেশ। কুমড়াে মাথা নাড়িয়া বলিল—না, আমি শুনেছি তােমার দেশ অধীনে। ৰিমিত মনিকা লিল-অখানে কোথায় আবার ? কুমড়াে বলিল-ই,ফাঁকি দিলে চলবে না তােমার দেশ কামরূপ কামিথ্যে! এবার মল্লিকা হাসি ফেলিল বলিল ওকথা আবার কে বলে? কুমড়া বলিল—কেন সবাই তাে জানে—সবাই তাে বলে। তােমার বাড়ী কামরূপ কামিথ্যে—তুমি ডাকিনী! তারপরে খামিয়া বলিল— আচ্ছা মাসি ডাকিনী নাকি আকাশ দিয়ে চলে? তুমি আকাশ দিয়ে যদি উড়ে যেতে পারাে তবে দার্জিলিং যাবার সময়ে পাকা করে গেলে ময়িকা বলিল-দূর পাগলি আমি তাকিনী হতে যাবে কেন? কুড়ে বুঝিল, মালিয় এখানে তাহাকে ফাকি দিবার ইচ্ছা। ডাকিনী-জীবনের পরম লােীয় গল্পগুলি না নিতে পারিলে আর মাসির विलाय एसा गांउ कि?
১ লকিনী সে বলিল—কাশী থেকে ওই যে বুড়ি এসেছে সে সব কথা বলেছে। তুমি ডাকিনী-মানুষের রূপ ধরে আছে। রাতের বেলায় সকলে ঘুমােল ছাদ ফুটা করে একখানা হাড় হয়ে আকাশ দিয়ে এক্ষেত্রে চলে বাও আবার ভােরবেলা ফিরে এসে মানুষ হ'য়ে ঘুমিয়ে থাকে। ইহা শুনিয়া মল্লিকা হাসিবে কি কাঁদিবে স্থির করিতে না পারি বলিলছি কুমড়াে-ও কথা বলতে নেই। তােমার মেসসা মশাই গলে রাগ করবেন। কুমড়াে বলিল-রাগ করবেন না ছাই। তুমি ভাবছ মেলােমশাই জানেন না। তিনিও জানেন। তিনিই তাে তােমাকে ওষধু পরিয়ে দিয়েছেন। মল্লিকা বলিল—ওষুধ আবার কই? কেন ওই অনন্ত জোড়া ওই বা হাতেরটিতে বাবা বিশ্বনাথের ওষুধ ভরা আছে। পাছে তুমি জানতে পারে বলে অনন্তের মধ্যে ভরে দেওয়া হয়েছে। মল্লিকা বিস্ময়ে, ক্রোধে, হতাশায় চুপ করিয়া রহিল। গল্প জমিবার আশা নাই দেখিয়া কু মনে কুমড়া প্রস্থান করিল। মল্লিকা ডাকিনীশশ একথা বিশ্বাস করে-অনন্তের মধ্যে ওষুধ ভরা-সব কেমন বিপর্যয়কর ঘটনা। একমুহূতে চিরদিনের চেনা পৃথিবী যেন ওলট-পালট হইয়া গেল। কাণী হইতে শশাঙ্কদের প্রত্যাবর্তনের পরে যেসব ঘটনা ঘটিয়াছে এতক্ষণে সেসব নূতন অর্থে তাহার চোখে নূতন আকার ধারণ করিল। তাহার মনে পড়িল নিস্তারিণী বুড়ি গােড়া হইতেই তাহাকে ভাল চোখে দেখে নাই। সে পিরপনে মল্লিকার সঙ্গে কথা বলি না। কিন্তু অন্যদের সঙ্গে মল্লিকার কথা যে বলিত তাহাতে সন্দেহ নাই- ডাকিনী কারণ মল্লিকা আসিয়া পড়িলেই চুপ করিয়া যাইত সকলের সঙ্গে একটা অর্থভন্ন ইসারার বিনিময় হইত। বাড়ীর ছােট ছেলেমেয়েদের তাহার কাছে আসা বন্ধ হইয়া গিয়াছিল। পাশের বাড়ীর ছােট ছেলেটিকে একবার সে কোলে লইয়াছিল অমনি তাহার মা দুটিয়া আসিয়া কোন কথা না বলিয়া ছেলেটাকে ছিনাইয়া লইয়া চলিয়া গেল অথচ কাণী হইতে ইহারা কিরিবার আগে ছেলেটা সারাদিন মল্লিকার কাছেই থাকিত। ঠাকুর ঘরে মল্লিকার প্রবেশ একপ্রকার নিষেধ হইয়া গিয়াছিল—ঢুকিতে গেলেই অস্বামীৰ সততসতর্ক চোখ তাহা ধরিয়া কেলিত-অমনি হুকুম হইত—বৌমা ওদিকে আবার কেন? কি ওখানে তােমার কি দরকার বৌমা। সে স্তম্ভিত হইয়া ভাবিতে লাগিল-এ আবার কি রকম বিপদ? কিলে ইহার সমাধান, কোথায় ইহার সানা? শশাও নাকি তাহার ডাকিনীত্বে বিশ্বাসী। বাড়ীর মধ্যে প্রাচীর ঘেরা একটি ফুল বাগান ছিল, কেহ যত্ব লইত না বলিয়া জল হইয়া গিয়াছিল—কোন গাছে কখনাে বা ফুল ধৰিত, কখনন ধরিত না। শশাৰু কাশী বেড়াইতে গেলে সময় কাটাইবার জন্য মল্লিকা সেই বাগানের যত্ন লইত। বাগানের একান্তে একটা জব গাছ ছিল। গাছটায় ফুল ধৰিত না। মল্লিকার যত্ন ও জল পাইয়া গাছটা অজস্র স্কুলে ভরিয়া গেল। মল্লিকা বলিল—ভালই হল, মা কাল থেকে ফিরলে জবাফুলের অভাব হবে না। কিন্তু অন্যময়ী ফিরিবার পরও সে ফুল পুজার জন্য সংগৃহীত হইত না। মল্লিকা একদিন শাশুড়ীকে ওই ফুল লইবার জন্য বলিয়াছিল-শাশুড়ী কোন উত্তর দেন নাই—তার পরিবর্তে নিস্তারিণী বুড়ি উত্তর দিয়াছিল ফুল অচিপূজার দিতে নেই। তখন মল্লিকা ভাবিয়াছিল কাশবাসিনী হয়তাে পূজার পুল নির্বাচনের এমন কোন গু হত আসে-যায় তাহার জানা নাই। কি কাজ সে ‘পষ্ট বুঝিতে পালি আমি ফোটা ফুল দেব - নিবি। কি পাও যে এই নি। য্যিায় বিশ্বাসী, এই কথাটা তাহ খামে বিতর তো দিতে এশিন।•••কি ই কি সে তাকে তাকিনী বলিয়া বিশ্বাস করে।•• দূর হই, এত চিন্তায় কাজ কি? হাতেই তাে প্রমাণ আছে। কাজে লিপবাম হাতের অনন্তের মধ্যে ডাকিণী আড়াই ওবধ তমান। মড়া এসব কথা কাণ-যুবায় না নিলে বলিবে কেমন করি মল্লিকা একটা নােড়া সংগ্রহ করিয়া কম পরা বন্ধ ফলিয়া দিল। তাঁরপরে অনন্ত জোড়া খুলিয়া বাম হাতেতে সৰলে আঘাত কফিন-এক আঘাতেই অনন্ত জঙিয়া গিয়া ভিতর হইতে সিনুর লিপ্ত একটা মটরদানার মতাে ৰ বাহির হইয়া আসিল। সেই টিকে হাতে ঘুরাইয়া ঘুরাইয়া সে দেখিল-চিনিতে পারি না, কি। তবু সে ভাবিল ইহা স্যাকার অনবধানতাযুক্ত কোন বাজে জিনিষ হইলেও হইতে পারে দেখা যাক খান হাতেরাতে কি আছে? তখনি সে আর এক আঘাতে ডান হাতের অনখানা জিয়া ফেলিল- কিই বাহির হইল না—সব শূ। সেই নির্জন ঘরে, শূ মেঝের উৰে, জ্যোংকার আলােয় সেই ঔষধটি হাতে করিয়া নেমুটের মতাে বলিয়া রহিল। কেবলি মনে হইতে লাগিল-সে কিনী, সে কিনী, তাহাকে তাড়াইবার ও এত ঔষধ, এত বড় এত আয়ােজন। সেও তবে দুর্বল নহে, তাহাও কিম শক্তি আছে। হঠাৎ সে হা হা করিয়া হাসিয়া উঠিলতার পরেই মূৰ্হিত হইয়া পড়িয়া গেল। শশা কয়েক দিনের অত কলিকাতায় গিয়াছিল বলিয়া মাত্রে দরজা খুলিতে হইল না। অফিস আদায় কলি কি না করি, লেশন কৰি একােনও কে আর না করে সাজিয়ে দেহ তায়। আলি না। পানি এনে মৱিা এক নূর মতে এক নূতন বীৰৰে পি এল। মলি বাড়ীর লােকের সঙ্গে মিৰািন্ত চেষ্টা ছাড়িয়া দিল। আগে সে মিশিতে চেষ্টা কৰিত লােকে এড়াইয়া চলিত। এবারে চেষ্টাও পরিত্যাগ করিল, নামী থাকিলে তাহার সঙ্গে মিলিত-কি এখন তাহার মনে পড়ি। ইদানীং স্বামীও যেন তাহাকে এড়াইয়া চলে। কয়েকদিন আগে শশা কাজে নাম কৰি কলিকাতা গিয়াছে- অনেক কয়েকদিন হইয়া গেল, আন্দির নাম নাই। ইহাও কি তাহাকে এড়াইয়া চলিবার একটা পন্থা নয়! মল্লিকা জানিত না বটে, কিন্তু কথাটা সত্য নিস্তাৰিণী আসিয়াই অস্বামীকে বুঝাইয়াছিল যে, ছেলেকে যতটা সম্ভব যৱিকাৰ কাছ হইতে দূরে রাখিতে হইবে। হাতে ধ থাকা পর্যন্ত কোন ভয় নাই—ৰু সাবধান হইতে দোষ কি? ভাৱ পৱামর্শেই অবামী কে কালের অছিলায় কলিকাতা পাঠাইয়াছেন—এ নিত্য নূতন কাজের ফমাস পাঠাইয়া তাহার প্রত্যাবর্তনে বিয় ঘটাইতেছেন। মল্লিকা এত খৰৰ ৰাখিত না কি স্বাভাবিক স্ত্রীবুরি বলে তাহার মানায় ঠিক জায়গায় পৌছিয়াছিল। বাড়ীতে মামী নাইকা কাহালে সনে সে মেশে কারে মল্লিকা যেন লােগৰে থাকিয়াও লােকসমাজের বাহিরে গিয়া পড়িল। প্রেভাবিকে বলেন লােকের ভিড়ের মধ্যেই ছায়া শরীরী বিশ ২২ ডাকিনী করিতেছে-মানুৰে তাহাদের অস্তিত্ব নিতে পারিতেছে না—কিন্তু উভয়পক্ষই যে আছে তাহাতে আর কোন সন্দেহ নাই। মল্লিকা ও বাড়ীর সকলের মধ্যে যেন সেই সম্বন্ধ। সে কাছে থাকিয়াও দূরে, ঘরের বধু হইয়াও ঘরের নয়, মানুষ হইয়াও ডাকিনী। কেবল একটি বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করিয়াছিল। লম্বা হাতার জামা পরিয়া অনন্ত হয় গকিয়া রাখিয়াছিল। একবার সে ভাবিল শাকে চিঠি লিখিয়া জানাইবে। কিন্তু কি লিখিবে? তিনিও তত এই যড়যন্ত্রে যােগ দিয়াছেন। তবে সেই কথাই সে না লেখে কেন? কিন্তু ইহার তােত কোন প্রমাণ নাই, ঘােট একটা মেয়ে কি বলিয়াছে তাহার উপর নির্ভর করিয়া লিখিলে তিনি তাে হাসিয়া উড়াইয়া দিতে পারেন। ব্যাপারটা যদি হাসিয়া উডিয়াই যায় তবে ক্ষতি কি? সংসারের এই তত বিপদ! অনুমানের সত্যকে প্রমাণের সত্য করিয়া তােলা যায় না বলিয়াই কি অনুমানের সত্য তুচ্ছ? এইভাবে দিন যায় এবং রাত্রি যায়। মল্লিকা ক্রমাগত মনে মনে জপিতে থাকে সে নাকি ডাকিনী। যতই সে এই কথা ভাবে ততই বাড়ীর সকলের প্রতি তাহার ধিকারের ভাৰ গভীরতর হয়—একসঙ্গে ধিকার, ক্রোধ, বিরক্তি, নৈরা, দুখ আরাে কত কি? তাহার ইচ্ছা করে সকলের কাছে প্রমাণ করিয়া দেয় সে তাহাদের আর দশজনের মতােই সাধারণ মানুষ। কিন্তু প্রমাণ কৰিৰে কি করিয়া ? তাহাদের অনুমানের সত্যকে কি করিয়া সে অপ্রমাণ করিবে? একদিন দুপুরবেলা নিন ঘরে আয়নায় নিজের ছায়া দেখিয়া সে চমকিয়া উঠিল। একি, তাহার এ কেমন চেহারা হইয়া গিয়াছে। ওই আয়নাখানা যেন একটা সুড়ক পথের একটা মুখ তাহার মধ্য দিয়া আর এক দিকের, আর এক জগতের কোন্ ছায়াময়ী দৃমান।
জকিনী ২৩ বাস্তবিক ছায়াময়ীই বটে। মনিকা কশ হইয়া গিয়াছে, মল্লিকার মতাে মিখ রভে উপরে একটা তীরুতা নামিয়াছে, বসনের ভ্ৰতা আর গায়ের রডের শুভ্রতা, সব মিলিয়া কেমন যেন একটা শাণিত অসির ভাব। চোখে অস্বাভাবিক দীপ্তি, মূখে এমন একটা হাসির রেখা—যাহাতে তরবারির দীপ্তি ও তরবারির শীতলতা দুই-ই মিলিত আছে। নিজের ছায়া দেখিয়া সে নিজেই চমকিয়া উঠিল। সামান্য কয়দিন সে আয়নায় প্রসাধন করে নাই—এরই মধ্যে তাহার একি পরিবর্তন! সে হাসিয়া ভাবিল—একেই ভােগ কিনতে পাওয়া বলে। আমি তাে আর মানুষ নই। ইতিমধ্যে এমন একটা ঘটনা ঘটিল, যাহাতে নিতান্ত নান্তিকে বিশ্বাস করিতে বাধ্য হইল যে, মল্লিকা ডাকিনী ছাড়া আর কিছু নয়। গ্রামের বদি হাড়ীর ছােট ছেলেটার তড়কা হইল। লােকে বলিল, ছেলেটাকে ডাইনিতে পাইয়াছে—এখন চৌধুরী বাড়ীর বৌমার দয়া ছাড়া আর রক্ষা নাই। বদি ছেলেটাকে লইয়া এক দৌড়ে চৌধুরী বাড়ীতে প্রবেশ করিয়া নিজের ঘরের বারান্দায় যেখানে মল্লিকা একা বসিয়াছিল সেখানে গিয়া ছেলেটাকে তাহার কোলে ফেলিয়া দিয়া একেবারে তাহার পা জড়াইয়া ধরিল। মল্লিকা কিছুই বুঝিতে না পারিয়া জিজ্ঞাসা করিল—একি! একি! বদি পা না ছাড়িয়া বলিল-বৌমা এবার তােমার দলা ছাড়া উরি নাই। ছেলেটাকে রক্ষা করাে। মল্লিকা বলিল—ওর যে গা গরম দেখছি। ইস খুব আর। তড়কা হমেছে। বদি বলি-ভড়কা নয় বৌমা। ডাকিনীর কৃপা হয়েছে—তুমি ছাড়া আর কে রা করবে।
মল্লিকা বুঝিল তার নুতন পরিচয় না এসে আইয়া গিয়াছে। সে ভাবিল, এই ছেলেটাৰ পৰিবতে তার হয় না। ইতি দু'চারজন করিয়া লােক জড় হইতে লাগিল। তাহলে এড়াইয়া জও বটে, ছেলেটাকে বাঁচানাে যায় কিনা দেখিবার এও বটে, সে তাড়াতাড়ি ঘরের মধ্যে জানা গেল এবং অল ও ইউ ডি কোমল মিশাইয়া ছেলেটার মূখে মাথায় দিতে লাগিল। অসেই ছেলেটা তড়কা ভাজিয়া সু হইল। তখন সে ছেলেটাকে আনিয়া তাহার মায়ের কোলে ফিরাইয়া দিল। দি আনলে জনি করিয়া লয়া গলার রূপার মালাটা এক টানে ছিড়িয়া মল্লিকার পায়ের উপরে রাখি-বলিল—বৌমা দয়া করে এটা তুমি নাও। বদি আর কোন কথা না বলিয়া ছেলেটাকে কোলে তুলিয়া লইয়া সবেগে প্রস্থান করিল। কিন্তু দর্শকের ভিড় সরিল না। আগামী নিস্তারিণীও এই ভিড়ের মধ্যে ছিলেন। দুইজনে পপলের দিকে চাহিয়া অর্থপূর্ণ হাসি হাসিলেন। এমন সময়ে নিরিণীয় ইঙ্গিতে অধ্যময়ী বলিয়া উঠিলেন—ডােমার অন্য কোথায় ? মল্লিকা দেখিল ব্যস্ততায় জামার হাত সৰিয়া গিয়াছে। সে বলিল খুলে রেখেছি। অাময়ী কঠোর পরে বলিলেন-খুললে কেন? আবার পরে। মল্লিকা ৰলিল খুলে ফেলে দিয়েছি—আয় পৱৰ না। নিজের ঘরের কঠোরতায় সে বিস্মিত হইয়া গেল। সাধারণ ৰং হইলে এমন অবাধ্যতার ও দণ্ডের অত থাকিত না। কিন্ত গণিীর উপরে কোষ প্রকাশ করিতে অত্যন্ত দুতি শাড়ীরও ভয় হয়। কিনী হইবার কিছু সুবিধাও আছে। এই ঘটনায় সকলেই বিম্বিত হইল যে, মল্লিকা জকিনী ছাড়া আর কিছু নয়।
অজী ও বিতারিখ নিতে বসিয়া পান করিতে লাগিলেন।
অষামন্ত্রী পুছিলেন—এখন কি করা যায়?
নিস্তারিণী বলিলেন—যতদিন দুধ ছিল আর কিছু ছিল না।
সূধ ফেলে দেবার পয়েই তাে প্রকোপ হচ্ছে।
চিতি অাময়ী বলিলেন-কি এখােন কি?
নিরিণ বলিলেন—উপার আর কি? সৰ কোণ।
ঘাটাঘাটি করা কিছু নয়। এখন উনি নিজ ইচ্ছায় গেলেই বেশি
মল।
অন্যময়ী কাঁদো কাঁদো স্বরে বলিলেন—যত তাড়াগড়ি যায় ততই
ভালাে। বাছা আমার ফিরে আসবার আগে যায় না।
নিনি বলিলেন—জোর করা তাে যায় না দিদি। উনি জুক
হলে বাহার ক্ষতি করতে পারেন।
পুত্রের কতি হইবার আশায় অন্যমন্ত্রী শিহরিয়া উঠিয়া ইসলাম
আপ করিতে লাগিলেন।
মল্লিকার সঙ্গে কে মিলিত না—ইহা আগেই বলিয়াছি কেবল ঐ
অনাথ বালিকাটি মিশিত। বুড়াে আলিয়া মল্লিকাকে বলিল—মাসি,
সবাই তােমাকে ভয় করে, কেবল আমিই করি না।
তারপয়ে বলিলজ করবে কেন? তুমি তাে আমাদের মতাে
মা। া বলে তুমি গকিনী। ও না কেন ডাকিনী, আমার
মাসি ৰটে তাে! তুমি আমায় ডাকিনী মাসি।
জিকা কহিলা আর কি বলে রে?
কুমড়ো বসিএদিন কত দিদি আর কার দিদি বলাবলি
করছিল-আমি সৰ নে ফেলেছি। কাগই নাকি ভুমি উড়ে চলে
যাৰে কালীর থানে পুজো দিছে।•••••আহা মাসি, তুমি
ডাকিনী আমাকেও নিয়ে যাও না কেন? আমার তাে কেউ নাই-এর আমাকে কেউ দেখতে পারে না। মল্লিকা হাসিয়া বলিল-যাবি আমার সঙ্গে। কুমড়াে সাগ্রহে বলিযাব বই কি। ছাদ ফুটো করে দু'জনে উড়ে চলে যাব। প্রথমে স্বাৰৰ কামরূপ কামিখ্যেতারপরে, যাৰৰ ক্ষেত্রে। সে বেশ হবে মাসি। বাবার সময়ে এই বাড়ীর উপর দিয়ে উড়ে যেতে হবে—দেখবৰ তা কি করে ?•••আবার একটু থামিয়া বলিল- হ মাসি কবে যাবে ? মল্লিকা বলিলশীগগীরই। ‘সে বেশ হৰে বলিতে বলিতে কুমড় আনন্দে প্রস্থান করিল- বােধ হয় জিনিষপত্র ব্যাধির জনেই। মল্লিকা বুঝি-এবার তাহার যাওয়াই ভালাে। কিন্তু কোথায় বাইবে? কোনখানে তাে তাহার কেহই নাই—পৃথিবীর কোথাও তাহার তিলমাত্র আশ্রয় নাই। অৰই যাইতে হইবে এবং এই কিন্তু কোথায় ? চিন্তা করিয়া করিয়া মল্লিকা এ প্রশ্নের কোন কিনারা পাইল না। ডাকিনী হইবার অসুবিধার মধ্যেও একটা সুবিধা মল্লিকা পাইয়াছিল- নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে অবাধ স্বাধীনতা। সে যখন খুসি ঘুমাইত, যখন খুসি আহার কৱিত-আর সবচেয়ে সুবিধা ছিল রাত্রিবেলায় চৌধুরী বাড়ীর ছাদে ছাদে একাকী ঘুরিয়া বেড়াইত। কেহ বাধা দিত না, নিৰেণ কৰিত না। গভীর রাত্রে এক ছাদ হইতে অ ছাদে ঘুরিতে বুঝিতে তেতালার ছােদটা ওড়নদীর ঠিক উপরেই তাহার উপরে আসিয়া পড়াইত। সেখিত অনেক নীচে ওড়নদীর কালাে হলে তার ডাকিনী ছায়া-দেখিত নদীর ধারে দূরে চিতার আলাে নির্বাপিতপ্রায়, দেখিত নদীর ওপরে প্রতি অন্ধকারে জোনাকীর ঝলমলানি; কান পাতিয়া নিত, দিনের বেলার অত ওড়নদীর ছল ছল ধ্বনি, আর শুনিতে পাইত প্রহর-গােনা যামঘােষর দিগন্তজোড়া উর্ভোংক্ষিপ্ত বৰ। তারপরে এক সময়ে নিশাতের তল বাতাসে সচকিত হইয়া ক্লান্ত শরীরটাকে টানিয়া আনিয়া শ শয্যায় ফেলিয়া কখন ঘুমাইয়া পড়িত। ছাদে বেড়াইবার সময়ে সে জানিত, জানালা দরজা আলিসার আড়াল হইতে অনেকগুলি কৌতুহলী চ তাহার গতিবিধি লক্ষ্য করিতেছে। এমন সময়ে হঠাৎ একদিন শশাঙ্ক কিরিয়া আসিল। রাত্রি তখন অনেক। টেনেই সে আহারাদি সারিয়া আসিয়াছিল—কাজেই আসিয়াই সে নিজের শয়নগৃহে প্রবেশ করিল। মল্লিকা অং স্বামীকে ফিরিতে দেখিয়া চমকিয়া উঠিল। শশাঙ্কও তাহাকে দেখিয়া চমকিয়া জিসা করিলমল্লিকা, তােমার হাতের অনন্ত গেল কোথায় ? মল্লিকা একবার রিজবাহর দিকে তাকাইয়া হাসিয়া বলিল,-ভেঙে ফেলে দিয়েছি। ভীতবিশষে শশাঙ্ক বলিল, কেন? মল্লিকা এবার হাসিল, বলিল বুঝতে পারে না। আমি যে ডাকিনী। শশার অন্তরাত্মা শিহরিয়া উঠিল—একি পরিহাস, না সত্য? এবার সে ভালাে কৰি মল্লিকাকে লক্ষ্য করিল। জানালা দিয়া নির্গলিত জ্যোৎন্নার ধারাতে সে দাড়াইয়া , শাড়ীর শাদা জমিনে আপাদ- ক আবৃত ; চুল-এলাৰিত; কালাে চুলের দ্বন্দ্বে বসনের শাদা, রঙের শাদা, জোর , হাসির শাসৰত মিলিয়া কেমন যেন একটা
২৮
কিনী
অতীকিয় শুভ্রতা। সেই কুশুভ্র অনতিদীৰ নাৰীত যেন কোন
অটের একখানি শাণিত হয়নি। সে দাড়াইয়া ভাবিতে লাগিল।
মল্লিকা বলিল-কাে।
কি নিজের শয্যায় আমি ৰখির সাহস এর হইল না।
কিছু দিন আগে যে মল্লিকাকে সে চড়িয়া গিয়াছি, এ যেন সে
মলি নয়। সালের মে মলিন মনি চিরিচিত নারীকে
অলৌকিকের পাথরে বসিয়া কে যেন অর্নিহিত দীপ্তিময়ী
লােকরাকে বাহির করিয়াছে। এত কথা হতাে তাহার মনে হইত
, কিন্তু যতদিন সে কলিকাতায় ছিল প্রায় প্রতিদিনই মার পত্র পাইত
যাহাতে থাকিত এই ডাকিনীর নিত্য নব কার্যকলাপের পরিচয়তার
কতক সত্য, কতক মিথ্যা। সবই কল্পনার তুলিতে এল বর্ণে অঙ্কিত।
সেই সব ঘটনার সঙ্গে জড়িত করিয়া আজ যাহাকে যে দেখিল সে আর
তাহার পত্নী নহে-পত্নীরূপিনী ডাকিনী।
শশা অক্ষুটারে বলিল—তুমি কে?
মল্লিকা হি ক বলিল—আমি কিনী। আমার দেশ কামৰূপ
কামিথ্যে। আমি গভীর রাত্রে ছাদ টা করে কাল হয়ে আকাশপথে
উড়ে যাই—কামৰূপ থেকে এক্ষেত্রে কত পাহাড় পর্বত, নদনদীর উপর
দিয়ে, কত দেশ বিদেশ পার হয়ে। ওঃ সে কি আনন। তারপরে তাের
হবার আগে মা হয়ে তােমার পাশে আবার শুয়ে ঘুমােই।
শাঙ্ক কাঠের মতাে দাড়াই শুনিতেছিল। মন্ত্রিক বলিল-চলল
একদিন আমার সঙ্গে। যাবে।
শক্ত আর সই কৰিতে পারিল না—সে মাগাে শ করিয়া দুটি
গৃহ হইতে বাহির হইয়া গেল। তাহার সেই অনুচিত পলায়নের দৃশে
মল্লিকা হা হা করিয়া হাসিয়া উঠিল। সেই হাসি যেন কালের
কিনী
৩ হাত বাড়াইয়া শশাকে পরিবার আর পিছনে পিছনে
তেছে। এ একেবা তাহার মাসের শষ্যাপারে গিয়া হাড়ি
খাইয়া পড়িল।
অমী চমকি উঠা দেখিলেন, তাঁহার পুত্র সারা গায়ে ঘাম—
ঠৰু কি করিলা পিতেছে। তাহাকে শান্ত করিয়া থাইকেন
এসেই বুঝি রে গিয়েছিলি? আমাদের একবার হতে হয়। হাতে
ওসুধ বেধে দিতাম, স্কুৰে চুকলি। বল কি হয়েছে?
ৰু ৰ খুলি বলিয়া শেৰে ৰশিলমা এসে আমাকেও সনে
যেতে বলে। এতি অল্পী ‘যাট ষাট বলিয়া পুত্রের মাথায় ইটম
অপ করিয়া দিলেন এবং অবশেৰে ইহার একটা বিহিত করিবার জন্য
মল্লিকার ঘরের দিকে চলিলেন। তিনি একেবারে গতবস্ত্র হইয়া মল্লিকার
কাছে গিয়া বলিলেন—ওগাে, তুমি দেবী নবী ডাকিনী যােগিনী যেই
হও, আমরা তােমার কোন ক্ষতি করি নাই। তুমি যে এ বাড়ীতে
আর নিমেছিলে আর কােথায় এখান থেকে নিজের দেশে এখান
না।
এই বলিয়া তিনি গললীতবাস হইয়া জোড় হাতে দাড়াইয়া
রহিলেন, মাতার পিছনে দাড়াইয়া পুত্র কাঠপুত্তলিকাৰ। মল্লিকা
মাতাপুরের এই ভাব দেখিয়া একবার হাসিবলিল—তাই
যাবে। এই বলিয়া লে উভনের পাশ দিয়া বাহির হইয়া গেল। যাইবার
সমরে একবার আমার দিকে কটাক্ষ করিল। তাহার দিক হইতে কোন
সাড়া আসিল না কাঠের পুতুল কি সাড়া দিবে।
মল্লিকা ঘর হইতে বাহির হইয়া অকম্পিত পায়ে ভর করিয়া ছাদে
গিয়া উঠিল। এক মুহূর্তের জন্য দ্বিধা কৰিল না—নিজের কর্তব্যের ছক
যেন সমুখে বিস্তারিত।
ডাকিনী মল্লিকা ছাদ হইতে অন্য ছাদে, নিম্নতর হইতে উচ্চতর ছাদে গিয়া উঠিল এবং শেষে চারতলার চিলে কোঠার পাশে গিয়া গড়াইল। মল্লিকা উধ্বে তাকাইয়া দেখিল চৈত্র পূর্ণিমার জ্যোৎন্সা দিগদিগন্তব্যাপিয়া শু-নৈরাশ্যের ভঁৰু কানাং টাঙাইয়া দিয়াছে তাহারি উচ্চতম প্রান্তে জাদুকরের মেয়ে টা খুলে ঝুলিতেছে, আরও না জানি কি বিস্ময় সঞ্চিত আছে। নীচে যতদূরে চোখ চলে সপারি নারিকেলের মাথাগুলি তালে তালে দোলাহুলি করিতেছে। বাতাস উঠিয়াছে। মল্লিকার মনে হইল বাতাস উঠিয়াছে। পাল খুলিয়াছে, কাচিতে টান পড়িয়াছে। আর দেরী নয়। তাহার মনে হইল যে বাতাসে এখানকার সুপারি নারিকেলের মাথা দুলিতেছে সমুদ্রের ঢেউয়ে সে বাতাস কি কাণ্ডই না জানি করিতেছে। সুদূর সমূত্রে জোয়ারের জল এতক্ষণ পূর্ণতার লেখা ছাপাইয়া গিয়াছে। পৃথিবীর তীরে তীরে যত গুহা কদর আছে লবণাম্বুতে পূর্ণ হইয়া এতক্ষণে গদ গদ ভাষায় বেদনার কি বােচ্চারণই না করিতেছে। সেই ব্যথার টান কি এই শুকপ্ৰায় গুড়নদীর নাভীতেও আজ রাত্রে লাগে নাই? মল্লিকার মনে হইল আজ ব্যথার জোয়ার, নৈরাশ্যের হােলি। নিয়ে উড়ে কোথাও আজ পরিত্রাণ নাই, পরিচিত দিগন্ত আয়ের তীর ধুইয়া মুছিয়া কোথায় সব অবলুপ্ত হইয়া গিয়াছে। মল্লিকা দেখিল এই সর্বপ্লাবী বন্যার মুখে কোথাও তাহার কোন আশ্রয় নাই; না পতিকূলে, না পিতৃকুলে, সংসারে সৰ দিগন্তু কোন সর্বনাশের তলায় নিশ্চিহ্ন। এই প্রলয় পয়ােধির মুখে কোন টপকে অবলম্বন করিয়া সে বাঁচিৰে? কোথাও যে তাহার কোন আয় নাই। আর সর্বনাশের মুখে একটুখানি বাঁচাইয়া রাখিয়া কি লাভ? মল্লিকা তাকাইয়া দেখিল, অতি নিয়ে নদীর রূপার পাত জ্যোৎ চিক শীতল একটি বটপাতার মতাে বাতালে কাঁপিতেছে।
ডাকিনী আর বাতাস উঠিয়াছে, সুপারিনারিকেলের মাথাগুলির কি হয় হায় হাহাকার! দূরে গাছের মাথা, অদূরে গাছের মাথা, নিকটের গাছের মাথা, পায়ের তলায় গাছের মাখা এবং শেষে মল্লিকার চল বাতাসে উড়িতে লাগিল। দূরের বাতাস কাছে আসিয়া পড়িয়াছে আর বিলম্ব নয়। তাঁবুর উচ্চতম প্রান্তে জাদুকরের মেয়েটা। অনেকক্ষণ হইল দুলিতেছে—এবারে লাফাইয়া পড়িবে-আর বিলম্ব নয় ওর আগেই মল্লিকা চিলেকোঠার ছাদে উঠিয়া একবার পৃথিবীটা নিরীক্ষণ করিয়া লইল এবং পরক্ষণেই মাগাে রব করিয়া অতি নিয়ে গুড়নদী লক্ষ্য করিয়া ঝাঁপ দিন। জানালা দরজার আড়াল হইতে এল কৌতুহলী চক্ষু দেখিল ডাকিনী চিলে কোঠার ছাদে উঠিয়া মূর্তি ধরিয়া কামরূপ কামিথ্যের অভিমূখে উড়িয়া চলিয়া গেল। পরদিন সকালে যখন মল্লিকার তিসহ নদীর জলে পাওয়া গেল, তখনাে তাহাদের মত পরিবর্তন ঘটিল না। সবাই বলিল, ডাকিনী মানব দেহটা ফেলিয়া কাল হইয়া উড়িয়া গিয়াছে কামরূপ কামিখ্যেয়নরদেহে যাইবার উপায় নাই, মানুষের ঘরে মানুষের রূপে আসিয়াছিল—এবার রূপ ধরিয়া ফিরিয়া গিয়াছে। যাই হােক, বাড়ীর ডাকিনী দূর হওয়াতে সবাই নিশ্চিত বােধ করি এবং উনােক্তর শশার রাতের উন্নতি ঘটিতে লাগিল।
পোৰ বাবু আর পোৰ গণি বাৰু ত্রিশ বছর কাজ করিবার পরে গেইলেন। সেদিনটার কথা আজও স্পষ্ট মনে পড়ে। অল্পদিনের মতােই তিনমণি বাৰু আদালতে আসিলে, সেই বুকের কাছে গেট দেওয়া পুনাে খলশের শার্টের উপরে তৈলাক্ত চাদখানা ভাজ কৰি অক্ষিত, ঘরে ঢুকিয়াই দেওয়াল-ঘড়ির দিকে একবার তাকাইলেন, ঘড়িটা ঠিক চলিতেছে বলিয়া যেন তাকে উৎসাহ দিবেন, যেমন উৎসাহ দেয় ক্লাস টিচার ঘরে চুদিয়া পানিৱত ভালাে ছেলেটিকে; তারপরে চেয়াখানা রুমাল দিয়া বেশ করিয়া ঝাড়িয়া লইয়া সড়লে বসিয়া পড়িলেন; চারখানা গলা হইতে খুলিয়া মােরের হাতলে জড়াইয়া পকেট হইতে চশমার ভাঙা খাট বাহির করিলেন; চশমার কাচ যতই পরিষ্কার থাক কেন কোচাৰ দিয়া অত শত মিনিট ধরিয়া পরিষ্কার করিবেন; তারপরে চা পরিয়া ই আর একবার ঘড়ির দিকে তাকাইনে- ভাটা যেন বিনা চশমাৰ দৃষ্টিতে ফাকি দিয়াছ কিনা এইবাৰ দেখিব; ঘড়ি নিতান্ত সুৰােধ বালকের মতাে চলিতেছে দেখিয়া সমর্থনমূলক ভাবে একবার হাশিনে; তারপরে ভাঙা গলায় হাঁক দিবেন, জল। নয়ন আদালতের বে-সে এক গেলাস জল আনিয়া দেয়। রতনমণি বাবুর নিজস্ব একটি চিহ্নিত গেলাস আছে। রঞ্জন তাঁহার গোলে একটা টিক করিয়া রাখিয়াছিল পাছে ভুল ভ্রান্তি হয়। সে সেই চিটা পোর বাবুর দিকে ফিক্সাইয়া গেলাটা হাতে দেয়, কিন্তু পেন বৰু তিনি এত সহজে ভুলি নােক নহেন, তাঁহার নিজের একটি গােপন চিহ্ন আছে, গেলাসটা ঘুরাইয়া ফিরাইয়া সেটা দেখিয়া লইয়া এক নিবাসে অলটা আলগােছে পান করিয়া ফেলিয়া একটা তৃপ্তির দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়েন গেলাসটা রানের হাতে ফিরাইয়া দিতে দিতে বলেন—বেঁচে থাক বাপু! কেমন, বাড়ীর সব ভালাে লােগ। তাঁহার নিত্যকার নিয়ম এই পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হইলে অন্যান্য আমলা আসিতে থাকে, দু’চারজন করিয়া উকীল বাৰু আসিতে থাকেন—সবাই ঘরে ঢুকিয়া বৃদ্ধ তিনমণি বাবুকে একটা করিয়া নমস্কার করে কিন্তু তখন তাঁহার বাহন লুপ্ত হইয়া গিয়াছে—তিনি পীকৃত নখীর গাদার মধ্যে আত্মবিসর্জন করিয়াছেনকেবল যখন জজসাহে আসেন তখন তিনি যন্ত্র চালিতের মতাে উঠিয়া একবার মাথা বাকাইয়া নমারের ভী করিয়া বসিয়া পড়েন-নখীর গাদার মধ্যে হইতে তখন তাহাকে টানিয়া বাহির করা সব সময়ে কাজের সাধ্যেও কুলায় না । ইহাই রতনমণি বাবুর নিত্যকার অভ্যাস—এই রকম পত্রিশ বছর ধরিয়া চলিতেছে। অবশ্য প্রথমদিকে তিনি পেক্কার ছিলেন না-কিন্তু সে সব এখন স্মৃতির বাহিরে গিয়া পড়িয়াছে। সহর অন্ধ লোেক তাঁহাকে পেক্ষারবাবু বলিয়া জানে, আদালত সংক্রান্ত বাই সঁহার অতি তুচ্ছ অভ্যাসটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত। আদালতের সবাই জানিত টিফিনের সময়ে পোর বাবুকে কোথায় দেখা যাইবে। উত্তরদিকের বটগাছটার তলায় কাঠের ঘরখানার মােতি ময়রার প্রসিদ্ধ সন্দেশের দোকান, সেখানে একটি কাঠের টুলের উপরে পেক্ষাৰ ৰাৰু আসিয়া ৰসেন, ময়রা শশব্যন্তে কলার পাতে করিয়া দুটি বড় সন্দেশ রতন বাবুর হাতে দেয়—তিনি চক্ষু মুদ্ৰিত করিয়া ধীরে ধীরে সন্দেশ দুটি গলাধঃকরণ করেন তখন মােতি ঘটি হইতে তাহার হাতে ৩ করে। পেয়ার বাৰু জল গলিয়া দেয়, তিনি পান করেন ; মােতির অনেক অনুনােধ সত্বেও তিনি গেলাসে জল গ্রহণ করিতে সম্মত হন নাই। সত্য কথা বলিতে কি আমাদের তিনমণি বাবু একটু শুচিবায়ুগ্রস্ত। মােতি কলার পাতার ঠোঙায় টাটকা সাজা তামাকের কঙ্কেটি তাহার হাতে দেয় রতনমণি বাবু ধূমপান করেন, অতিরিক্ত ধূমপানে তাহার গোঁফের প্রান্ত তামাটে হইয়া গিয়াছে। রতনমণি বাবু উঠিয়া পডিতেই আর সকলে তাড়াতাডি জলযােগ ও বিশ্রাম সারিয়া নেয়—এবারে পুনরায় আদালত বসিবে। মােতি ময়রা পেক্কার বাবুকে বড খাতির করে—তাঁহার পৃষ্ঠপােষকতার ফলেই অন্যান্য কর্মচারী ও উকীলের মুহরিরা তাহার দোকানে জলযােগ মােতি রতনমণি বাবুর প্রিয় সন্দেশের নাম রাখিয়াছে ‘পোর-ভােগ। আমাদের রতনমণি বাবু কি ঘুষ লইতেন? এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সহজ নহে। মাছ যেমন জলে বাস করে, মানুষ যেমন বাতাসে বাস করে, আদালতের জীবগণ তেমনি ঘুষের মধ্যে বাস করে। কিন্তু রতনমণি বাবু সম্বন্ধে এ বিষয়ে দ্বিমত আছে। তাঁহার বন্ধুরা বলে তিনি ঘুষ নিয়া থাকেন, শত্রু বলে ঘুষ লইবার মতাে সাহস তাঁহার নাই। কিন্তু আমাদের মতাে নিরপেক্ষ লােকের অভিজ্ঞতা এই যে তিনি ঘুষ নেন এবং নেন না। অর্থাৎ সারা বছর ঘুষ নেন না। কিন্তু বিজয়া দশমীর পরে যেদিন আদালত খােলে, সেদিনটা তিনি ঘুষ নিয়া থাকেন। সেদিন একখানা বড় রুমাল হার টেবিলের উপর পাতিয়া দেন, অর্থ, প্রার্থী, দারােয়ান, চাপরাশি, আমলাগণ এমনকি অনেক জুনিয়ার উকীল পৰ্যন্ত সাধ্যানুযায়ী টাকাটা সিটো দেয়। আদালত শেষ হইলে ভরি রুমাল খানায় তােড় বাঁধি একবার মাথায় ঠেকাই পকেটে ভরিয়া তিনি বাড়ী যান এবং গৃহিণীকে ডাকিয়া সন্তর্পণে পেঙ্কার বাবু তাহার হাতে দিয়া বলেন-“ভালাে করিয়া তুলিয়া রাখিও-মায়ের আশীর্বাদ। ইহাই রতনমণি বাবুর জীবনের রুটিন। ইহাই তাহার পয়ত্রিশ বছরের রুটিন, পঁয়ত্রিশকে তিন শ পয়ষট্টি দিয়া ও করিলে যে সংখ্যা দাড়ায় তাহার অভ্যাস, কেবল ছুটির কটা দিন ছাড়িয়া দিতে হইবে। সেই রতনমণি বাবুর আজ আদালত জীবনের শেষ দিনকাল হইতে তাহার পেলন জীবন শুরু হইবে। আদালতের কাজ শেষ হইল মাত্ৰ-নাজির বাৰু আসিয়া রতনমণি বাবুর কানে কানে বলিলেন—পেক্ষাৰ বাৰু-একবার এদিকে আসবেন। নাজির বাবুকে অনুসরণ করিয়া তিনি নাজির বাবুর আফিল ঘরে গিয়া প্রবেশ করিয়া দেখিলেন বহুলোক সেখানে সমবেত—সবাই আদালতের কর্মচারী, নাজির, সেরেস্তাদার হইতে চাপরাশী পর্যন্ত সবাই আছে। তিনি নাজির বুকে কহিলেন—এ আবার কি? নাজির বাবু তাহাকে একখানা চোর দেখাইয়া দিয়া বলিলেন- বন। ব্যাপার আর কিছুই নয়। রতনমণি বাবুর বিদায় উপলক্ষে আদা- লতের কর্মচারিগণ একটি প্রতি সম্মেলনের আয়ােজন করিয়াছে মাত্র। সকলের সম্মতিক্রমে নাজির বাৰু সভাপতির আসন গ্রহণ করিলে মুলেফের পেক্কার যে ছােকটি স্থানীয় সময়ে জনায় অভিনয় করিয়া মহিলাগণের অ ও ভদ্রমহােদয়গণের করতালি আৰু করিয়া থাকে সে হার্গোনিয়াম বাজাইয়া খচিত সঙ্গীত আরম্ভ করিল “সত্যই কি তুমি যাবে চলে আমাদের একা ফেলে- মােন অসহা পোর বাবু করতালির মধ্যে সঙ্গীত সমাপ্ত হইলে নাজির বাবু আবানে বক্তারা একে একে রতনমণি বাবুর গুণ বর্ণনা ও তঁাহার বিদায়ে তাহাদের দুঃখ প্রকাশ করিতে লাগিলেন—আর তিনমণি বাৰু মূঢ়ের মতাে বসিয়া বসিয়া সমস্ত সৃটি দেখিতে লাগিলেন যেন ইহার প্রকৃত তাৎপৰ্য তিনি গ্রহণ করিতে অবশেষে সকলের বক্তব্য শেষ হইলে নাজির বাৰু দু’চার কথায় মনন- ভাব প্রকাশ করিতে রতনমণি বাবুকে অনুরােধ করিলেন। তনমণি বাবু উঠিয়া বলিলেন-“আজকার মতাে যাওয়া যাককাল আবার দেখা হবে। এই বলিয়া তিনি বসিয়া পড়িলেন। সকলে বলাবলি করিতে লাগিল পোর বাবু অত্যন্ত অভিভূত হইয়া পড়িয়াছেন—দেখিলে না তাহার কণ্ঠস্বর কি রকম গগ। লােকে যাহাই বলুক, আমরা জানি রতনমণি বাবু পেলন লইবার মর্মার্থ গ্রহণ করিতে পারেন নাই। এই আদালতেই তাঁহার জীবন, এখানে তাঁহার জীবনের পয়ত্রিশ বছর কাটি- আছে, পত্রিশ বছর তাে অনেকেরই জীবনের আন্ত, সেখান হইতে যে একদা তাহাকে অকস্মাৎ বিদায় লইতে হইবে ইহা কখনও তিনি ভাবেন নাই—আজও তাহা বিশ্বাস করিয়া উঠিতে পারিতেছেন না। তাই অতি স্বাভাবিক ভাবেই বলিলেন-আজকার মতাে যাওয়া যাক, কাল আবার দেখা হবে।” সভা ভলে প্রচুর জলযােগের আয়ােজন ছিল-পেঙ্কারভােগ সন্দেশ। জলযােগান্তে যে বাহার গৃহে রওনা হইল যতনমণি বাবুও নিত্যকার মতাে চাল না কাধের উপর ফেলি আদালত ত্যাগ করিলেন। পরদিনেও নিত্যকার মতাে বেলা দশটায় চারখানা কাধের উপরে পোৰ ৰাৰু ফেলিয়া যখন রতনমণি বাৰু বাহির হইতে উদ্যত, তখন গৃহিণী বলিলেন- কোথায় চলে আবার? রতনমণি বাবু নিতান্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলিলেন-কেন-আজ কি নতুন দেখছ নাকি? আমি দশটায় কোথায় যাই তা কি জানাে না? বিস্মিত গৃহিণী বলিলেন-তােমার যে পেলন হৱেছে। কিন্তু গৃহিণীর সব কথা তাহার কানে পৌছিল না, অনেক আগেই তিনি গৃহিণীর কণ্ঠস্বরের বাহিরে চলিয়া গিয়াছেন। আদালতে পৌছিয়া রতনমণি বাৰু দেখিলেন যে, শ্যামাচরণ নামে একজন জুনিয়ার কেরাণী পেঙ্কার পদে উন্নীত হইয়া তাহার বহুকালের চেয়ারখানি অধিকার করিয়া বসিয়াছে। রতনমণি বাবু তাহাকে দেখি বলিলেন ও তুমি এখানে বসেছ? আচ্ছা ব’সােব’সাে, আমি ওঘরে বসছি। এই বলিয়া তিনি সেরেস্তাদারের ঘরে গিয়ে একখানা + চেয়ারে বসিয়া পড়িলেন। ক্রমে ক্রমে কেরাণীকুলে ও অর্থী প্রার্থীতে আদালত পূর্ণ হইয়া উঠিল। সবাই রতনমণি বাবুকে দেখিয়া বিস্মিত হইয়া গেল। ব্যাপার কি? আবার তিনি কেন? পেন্সন লইয়া মানুষে দুপুরটা সুখে ঘুমাইয়া কাটাইয়া দিবে। নতুবা কাশীবাস করিবে কিন্তু রতনমণি বাবুর সবই নূতন! সেরেস্তাদার পুছিলেন—দাদা, আপনি এখানে যে? রতনমণি বাবু প্রশ্নটা ভুল বুঝিয়া বসিলেন, আর আদালতে স্বাে না, ছেলেমানুষদেরও একটা সুযােগ দেওয়া চাই। তাই খামা- চরণকে দিলাম ওখানে বসিয়ে। ছেলেমানুষ পাছে ভুলভ্রান্তি করে তাই আমি রইলাম মাথার উপরে। তারপরে একটু থামিয়া বলিলেন, দাও, তােমাদের হাতে বেশি কাজ থাকলে দাও, একবার দেখি।
পোর বাবু অতিরিক্ত কাজ পাইবার আশায় তিনি মােটেই বঞ্চিত হইলেন না। অনেকগুলি খাতা ও নথী তাঁহার টেবিলের উপর আসিয়া পড়িল। রতনমণি বাবু এক মুহূর্তে নথীর ডুবজলে অন্তর্হিত হইলেন। টিফিনের ফাকে নিয়মিতভাবে টিফিন সারিয়া আসিলেন। তারপরে আবার কাজ—এইভাবে পাঁচটা পর্যন্ত চলিল। পাচটা বাজিবে চাদর লইয়া রতনমণি বাবু উঠিয়া পড়িলেন। রতনমণি বাবুর পেন্সন হইয়াও ছুটি হইল না। তিনি আগেকার মতই নিয়মিত সময়ে আসেন, সেরেস্তাদারের ঘরে বসিয়া বাড়তি কাজ কর্ম করেন, দুটি হইলে আগেকার মতই বাড়ী চলিয়া যান। সবাই তাঁহাকে বড় পেস্কার বাবু বলে, খামাচরণের নাম হইয়াছে হােট পেঙ্কার বাবু। টিফিনের অবকাশে শ্যামাচরণের সঙ্গে দেখা হইলে রতনমণি বাবু তাঁহার পিঠে হাত বুলাইয়া বলেন—শ্যামাচরণ কোন ভয় নাই, মাথার উপরে আমি। আর ভাই বা কিসের? নথী ঠিক থাকলে কেউ কিছু বলতে পারবে না। তবে শােন একটা গল্প বলি,-একবার এক জজ সাহেব এলাে মিঃ জনাথ। এদিকে মাদ্রাজী যেমন রং, তেমনি চেহারা, কিন্তু মেজাজে সাহেবের বাবা! আসছে মেদিনীপুর থেকে, আমি আগেই খবর পেয়েছি; ওখানকার নাজির আমার বন্ধু কি না। সে লিখে পাঠালােলদা এবারে বাঘ যাচ্ছে—এখানকার তিনটে পেক্কারের চাকুরি খেয়েছে, সাবধানে থেকে। আমি লিখে পাঠালাম, ভয় ক’নােনা—এখানে বাঘের ঘােগ আছে। জজ সাহেব তাে চেষ্টায় আছেন আমার ভুল ধরবেনহঠাৎ যখন তখন নথী তলব করে বসেন। না, কোন দিন কোন খুও পান না। অবশেষে যাওয়ার সময়ে সাহেব বলে গেলেন পেক্কার বাবু, আপনার মতাে ‘এফিসিয়েন্ট অফিসার এর আগে আমি দেখিনি। আমি দেখিনি। তবেই পোৰ বাৰু তাে দেখলে নথী ঠিক থাকলে কারাে বাপের সাধ্য নেই কিন্তু এই অত্যাশ্চর্য কাহিনী বলিয়া অবশেষে গলা খাটো করিয়া মা- চরণের কানে কানে বলেন—আর একটা কথা, বিজয়া দশমীর পরে কাছারী খােলার দিন ছাড়া কখনাে হেন ‘দনী’ নিমােননা। রতনমণি বাবু ‘ঘুষ’ শব্দের পরিবর্তে দর্শনী শব্দ ব্যবহার করেন। শ্যামাচরণ সব মন দিয়া শােনে-নথী ঠিক রাখিতেও তাহার আপত্তি নাই তবে শেষের উপদেশটি সে কি ভাবে পালন করিত সে সম্বন্ধে বিশদ আলােচনায় প্রবেশ না করিলেই তাহার প্রতি সুবিচার করা হইবে। এই ভাবে দিনের পরে দিন, মাসের পর মাস অতিবাহিত হয়। বড় পেস্কার বাৰু পোন লইয়াও আদালতের কর্মচারী শ্রেণীভুক্ত হইয়া কাজ করেন। কর্মচারীরা অপছন্দ করেনা, একে তাে সবাই তাহাকে ভালােবাসে, তা ছাড়া হাতের কাজটা তাঁহার কাছে ফেলিয়া দিলে সম্পন্ন হইয়া যায়। সবাই জানে বিজয়া দশমীর পরে বড় পোর বাবুর রুমালে কিছু দিতে হইবে—প্রধানতঃ কর্মচারীরাই দেয়। আগেকার মতাে তােড় তেমন ভারি হয় না। রতনমণি বাবু হাসিয়া বলেন—পেলেনের মতাে দর্শনীও আমার অর্ধেক হয়েছে। আসল কথা, মায়ের জীবন ধারণের জন্যে একটা মােহের আক। তাই একটা না একটা মােহের সে সৃষ্টি করিয়া লয়। হাঁসের ডিমের ভিতরকার পাখীর পক্ষে যেমন ডিমের প্রয়ােজন, নহিলে কোমল অঙ্গে বাহিরের ঘাত প্রতিঘাত সহ করিবে কেমন করিয়া ? মানুষের পক্ষেও তেমনি প্রয়ােজন একটা আবরণের। পাখীটা একটু শক্ত হইলেই খােলস দিয়া আকাশে উড়িয়া যায় হংসরূপে; ভগ্নমােহ মানুষও তেমনি কৈবলের আকাশে পরমহংসরূপে উড়িতে থাকে। কিন্তু তেমন সৌভাগ্য পোৰ বাৰু কজনের ভাগ্যে ঘটে ? অধিকাংশের জীবন ধারণের পক্ষে মােহার অত্যাবশ্যক। এই বড পোরের ভূমিকা অতনমণি বাবুর মােহাবা- ইহার জলে হয় তাহার মুক্তি নয় তাহার খত্যু। রতনমণি বাবুর পেন্সন লইবার পরে প্রায় দশ বৎসর গত হইয়াছে। এখন তিনি প্রায় চলৎশক্তি হীন বৃদ্ধ। তবু তাহার আদালতে আসিবার কামাই নাই। একজন চাকরে তাঁহাকে বাড়ী হইতে ধরিয়া আনিয়া পুরাতন চেয়ার বানাতে বসাইয়া দেয়। দৈবাৎ চেয়ার বদল হইলে তিনি ব্যস্ত হইয়া ওঠেন বলেন, আমার চোরখানা গেল কোথায়। তাঁহার চোর জিয়া আনিয়া তাঁহাকে বসাইয়া দেওয়া হয়—তিনি বসিয়া পড়িয়া চোখ বুজিয়া একটা আরামের দীর্ঘ ‘আ শব্দ করেন। রতনমণি বাবু প্রায় অন্ধ, চোখে অল্পই দেখেন—হাতে কলম সরে না, তবু এক গাদা নথী তাঁহার সম্মুখে রাখা চাই—তিনি সেগুলি নাড়াচাড়া করেন। এরূপে অভিনয় সাঙ্গ হইলে কাছারীর শেষে আবার চাকরের সাহায্যে বাড়ী ফিরিয়া যান। এই রকম চলিতেছে—হয় তাে তাহার জীবনের শেষ দিন পৰ্যন্ত এই ভাবেই চলিত কিন্তু ইতিমধ্যে এক বিঘ্ন ঘটিল। সে বিয় আর কিছুই নয় এক বাঙলী আইসিএসযুৰক অরূপে বদলি হইয়া আসিলেন। মাঝে মাঝে তিনি আদালতের সেরেস্তা প্রভৃতি পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে করা তামাকের পাইপ টানিতে টানিতে এঘরে ওঘরে ঘুরিয়া বেড়াইতেন। এই জাতীয় পরিদর্শনে রতনমণি বাবুর ভয়ের কোন কারণ ছিল না কারণ ইতিপূর্বে একাধিক জজ তাঁহাকে দেখিয়াও দেখে নাই, মানুষের এই ছেলেমানুষিকে তাহারা মেহের চকেই দেখিয়াছেন; একজন ইরাল এ তাে তাঁহাকে এ্যাও পা অব দি ফোট” পদবী আখ্যা ১ পোৰ বাৰু দিয়াছিলেন। কিন্তু কর্তব্যপরায়ণ বাঙালী আই সি-এস সেরেস্তাদারের আফিসে প্রবেশ করিয়া এদিক ওদিক ঘুরিতে ঘুরিতে রতনমণি বাবুর সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। রতনমণি কাবু উঠিয়া দাড়াইয়া সেলাম করিলেন। জজ সাহেব তাহাকে অগ্রাহ্ করিয়া সেরেস্তাদারকে ইংরাজিতে পুছিলেন—এই বৃদ্ধ লােকটি কে? সেরেস্তদার বলিলেন-আমাদের পুরাতন পোরবাবু। বাঙালী জজ পাইপ কামড়াইতে কামড়াইতে বলিলেন—লােকটা এখানে কেন? সেরেস্তাদার বাবু দীর্ঘ-ব্যাখ্যা আরম্ভ করিলে মধ্যপথে হাকে নিরস্ত করিয়া জজ বলিলেন - লােকটাকে বাহির হইয়া যাইতে বলাে। রতনমণি বাৰু যেন কি বলিতে যাইতেছিলেন-কর্তব্যপরায়ণ বাঙালী জজ হকিলেন—চিপ রাশি চাপরাশি শশব্যন্তে ছুটিয়া আসিল। জজ বলিলেন—বাবুকো বাহার দেখলাও। চাপরাশি রতনমণি বাবুর হাতে ধরিয়া আদালতের বাহিরে আসিয়া দাড় করাইয়া দিল। রতনমণি বাবুর চোখ দিয়া জল গড়াইতে লাগিল। অন্ধের চোখে দৃষ্টি নাই কিন্তু জল আছে। কর্তব্য সমাধান করিয়া শিষ, দিতে দিতে বাঙালী জজ খাস কামরায় ফিরিয়া গেলেন। কে বলিবে বাঙলী কর্তব্যপরায়ণ নহে? ৰাজী ফিরিয়া সেই রাতেই রতনমণি বাবুর বিষম আর হইল—এবং অল্প কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কার ঘাের বিকারে পরিণত হইল। খবর পাইয়া আদালতের কর্মচারিগণ দেখিতে গেল কিন্তু চৈতন্যহীন রতনমণি বাবু কাহাকেও চিনিতে পারিলেন না। ডাক্তার জবাব দিয়া চলিয়া গেল, বন্ধুরা হতাসে স্তব্ধ হইয়া দাড়াইয়া রহিল—আর মুমুম্ভ রতনমণি বাবু বিকারের ঘাের নখীর নধর হকিয়া যাইতে লাগিলেন—
২
পোর বাবু
৭৭২১ খাজনা
৩৯২৩ মটগে
২৯১২ মােফরা•••
•••চিপণি, বাবুকো বাহার দেখলাও
• হুজুর, আমার নথী ঠিক আছে
না, না, আমি বাইরে যাবাে না
শ্যামাচরণ, নথী ঠিক থাকলে আর কোন ভয় নেই.••
• চিপরাশি, বাবুকো বাহার দেখলাও ••
হজুর, আমার নথীপত্র সব ঠিক আছে ..
না আমি বাইরে যাবাে না
৭৭৩২১ খানা
৩৯৩২৩ মর্টগেজ
২৯১২৪ মােফরা
সবাই বুঝিল আর কোন আশা নাই। তাহারা নীৰে পাড়াইয়া
অমােচন করিতে লাগিল—আর মুমূয়ু পূর্বোক্তরূপ বকিয়া যাইতে
থাকিল।
, না, হুজুর আমার নথী ঠিক আছে
•••৭৭৩২১ খাজনা
এইরূপ বকিতে বকিতে মুমূর্ষ ক্রমেই নিস্তেজ হইয়া পড়িতে লাগিল,
সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার বিকারের উক্তি ক্ষীণ হইয়া আসিতে লাগিল। অবশেষে
সন্ধ্যার কিছু আগে ঠিক আদালত ভাঙিবার সময়ে রতনমণি বাবু শেষ
নিবাস পরিত্যাগ করিলেন। এখানকার আদালতের লীলা তাহার
শেষ হইল। বােধ করি উচ্চতর কোন আদালতে নথি পেশ করিবার
উদ্দেশ্যে তিনি প্রস্থান করিলেন। প্রতি মানুষের কথার চেয়ে বিকারের
০
পোর বাবু ৩ জগর কথাই এ ক্ষেত্রে অধিকতর বিশ্বাসযােগ্যহজুর, আমার নথীপত্র সব ঠিক আছে। উচ্চতর আদালতে তাহার নথীতে কোথাও ভুল ভ্রান্তি বাহির হইবে না, আর সেখানকার জজ যতই কর্তব্যপরায়হােক এই বুদ্ধকে চাপরাণি দিয়া ঘরের বাহির করিয়া দিবে না, ইহাও এক- প্রকার নিশ্চিত।
গদাধর পণ্ডিত নরেশচন্দ্র পাটের হাকিম হইয়াছে। জোড়াদীঘি গ্রামে তাহার আফিস। চাকুরিটি পাইয়া তাহার ভরসা হইয়াছিল, কলিকাতায় না হােক কোনাে জেলা-শহরে সে থাকিতে পাইবে। কিন্তু এমনি তাহার ভাগ্য যে, জেলা ত দূরে থাকুক, মহকুমাতে থাকাও ঘটিয়া উঠিল না-- একেবারে গ্রামে আসিয়া বসিতে হইল। গ্রামে থাকিবার হুকুম পাইয়া তাহার কলিকাতাবাসী মন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হইয়া উঠিল—এমন কি একবার চাকুরি ইস্তফা দিবার কথা চিন্তা করিয়া ফেলিল, কিন্তু বন্ধু ও আত্মীয়- স্বজনের উৎপাতে কোন সৎকাৰ্য্য করি কি উপায় আছে? তাহারা বুঝাইল, সরকারী চাকুরি হেলায় হারাইবার বস্তু নয়, বিশেষ করিয়া চিরকালই যে তাহাকে গ্রামে থাকিতে হইবে এমন নয় ; চাকুরি পাকা হইলেই চেষ্টা-চরিত্র করিয়া সহরে ট্রান্সফার হইলেই চলিবে—এমন কত হইয়াছে। তা ছাড়া গ্রামে থাকিবার কতকগুলি সুবিধাও আছে, যেমন অনেক জিনিষ খুব সুলভ আর অনেক জিনিষ আদৌ মেলে না কাজেই ফেসৰ কিনিয়া বৃথা অর্থব্যয় করিতে হয় না। আর গ্রামে সেই একমাত্র সরকারী চাকর, কাজেই অখও সম্মান ভােগ করিতে পারিবে-সহরে পাটের হাকিমকে চেনে কে? এই সব যুক্তির তাড়নায় আর প্রয়ােজনের তাড়াতেও বটে নরেশচন্দ্র জোড়াদীঘিতে গিয়া কাজে যােগ দেওয়া স্থির করিয়া ফেলিল। ইহা ছাড়া আরও একটা কারণ ছিল, যাহা তাহার বন্ধুবান্ধবের ৪৫ গদাধর পণ্ডিত জানিত না, কিন্তু পাঠকের জানিতে বাধা নাই নরেশচন্দ্র অল্প বয়স হইতেই আদর্শবাদী। ইস্কুলে পড়িবার সময়ে সে আচাৰ্য প্রফুল্লচক্রের বক্তৃতাদি শুনিত এবং কাগজে পড়িত। তখন হইতেই সে স্থির করিয়াছিল যে গ্রামে গিয়া দেশের উন্নতি করিবে। কলেজে ঢুকিয়া রবীন্দ্রনাথের ‘স্বদেশ সমাজ পডিয়াছে, গান্ধীজীর হরিজন নিয়মিত পড়িত। কাজেই ইস্কুলের আদর্শবাদ বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বাড়িয়াছে বই কমে নাই। কিন্তু অবশেষে সত্য সত্যই একদিন যে তাহাকে এমে যাইতে হইবে, তাও আবার পাটের হাকিম হইয়া ইহা স্বপ্নাতীত ছিল। কলিকাতায় থাকিয়া গ্রামের উন্নতি-এই ছিল তাহার স্বপ্ন। হঠাৎ তাহার মনে হইল বিধাতা পুরুষ নিতান্ত কৃপাপরবশ হইয়াই গ্রামে তাহার চাকুরি করিয়া দিয়াছেন- গ্রামের ও নিজের উভয়েরই উন্নতি হইবে—এক ঢিলে দুই পাখী প্রবাদের বাহিরেও মনে। এমন সময়ে সে সহর হইতে তাহার বাল্যবন্ধু অভয়কুমারের এক পত্র পাইল। অভয়কুমার লিখিছে যে, সে আজ কয়েক বৎসর সেখানে ইস্কুলের সাব-ইন্সপেক্টাররূপে রহিয়াছে। সহরের অধীনেই-জোড়াদীঘি গ্রাম; এই পথ ছাড়া জোড়াদীঘিতে যাইবার উপায় নাই। কাজেই নৱেশ যেন আগে এখানে আসিয়া তাহার বাসায় ওঠে তার পরে জোড়াদীঘিতে যাইতে পারিবে। অভয়কুমারের পত্র পাইয়া নরেশ অনেকটা আত হইল—তাহা হইলে নিতান্ত সে জলে পড়িবে না। আর অভয় বাল্যকাল হইতেই বাস্তববাদী, সব দিক দিয়াই সে ছিল আদর্শবাদী নরেশের বিপরীত। নরেশ বুঝিল, বিদেশে নির্ভর করিবার মতাে একটা লােক পাইবে। সংসারপটুতা বিষয়ে মাদর্শবাদীরা বাস্তব বাদীদের উপর নির্ভর করে, মনে মনে তাহাদের ঈর্ষা করে—ওইখানে বাস্তববাদের জিৎ।
জোড়াদীঘিতে আসিয়া নরেশচন্দ্র একেবারে মুখড়িয়া গেল। এতদিন সে সাহিত্যের বিশিয়া কাচের ভিতর দিয়া পল্লীকে দেখিত, পল্লী বড়ই মনােরম লাগিত। এবারে প্রথম বাস্তবে পত্নী দেখিল, সাহিত্যের বর্ণনার সঙ্গে যাহার কোন মিল নাই। তাহার আরও ধারণা হইয়াছিল, সে যখন পল্লীর প্রতি সহানুভূতি লইয়া আসিতেছে, পল্লীবাসীরা তাহাকে দু'হাত মেলিয়া আলিঙ্গন করিয়া লইবে। কিন্তু তেমন কিছুই ঘটিল না। এই সাহেবী পােষাকধারী ইংরাজি শিক্ষিত বিদেশী যুবককে গ্রামের লােক এড়াইয়া চলিতে লাগিল। দূর হইতে লােকে তাহাকে সেলাম করে কিন্তু তাহার মধ্যে প্রাণের টান নাই, সরকারী চাকুরির মােহ আছে। এমন যে হইৰে বন্ধু অভয়কুমার ইঙ্গিতে বলিয়াছিল কিন্তু আদর্শবাদী নরেশ তা বিশ্বাস করে নাই। সে গ্রামের জমিদারের বৈঠকখানা বাড়ীতে আশ্রয় পাইয়াছে। জমিদারবাৰু কলিকাতায় থাকেন, কাজেই বৈঠকখানায় তাহার একাধিপত্য। কলিকাতায় থাকিতে গ্রামের যে বর্ণনা পাইয়াছিল তাহার কতক অংশ সত্য বলিয়া বুঝিল। খাদ্যবস্তু যে এত সুলভ হইতে পারে সে ধারণা তাহার ছিল না। কাজ তাহার সামান্যই, অধিকাংশ সময় সে বই ও খবরের কাগজ পডিয়া কাটাইয়া দেয়। গল্পগুজব করিবার বা আচ্ছা দিবার মতাে লােকের সঙ্গে এখনাে তাহার আলাপ হয় নাই। একদিন সকালে সে বসিয়া আছে এমন সময়ে একটি লােক তাহার কাছে আসিয়া উপস্থিত হইয়া মাথা হইতে একটা ঝুড়ি নামাইয়া সাষ্টাব্দে প্রণিপাত করিল। লােকটা বৃদ্ধ, শরীর কশ, মাথাভরা টাক, পরণে মলিন একখানা খাটো ধুতি। লােকটি প্রণিপাত সাৰিয়া উঠিয়া হাত জোড় করিয়া বলিল-
গদাধর পণ্ডিত
s
হুজুরের জন্য কিছু তরকারি এনেছি। নরেশ দেখিল, বুড়ির মধ্যে
কুমড়ো, লাউ, বেগুন প্রভৃতি আনাজ।
নরেশ বলিল—ত বেশ করেছ, এর দাম কত?
বৃদ্ধ বহু হাসিয়া বলিল—এ আমার ক্ষেতের তরকারি—দাম আর
কি? তা ছাড়া হুজুরের কাছে থেকে কি দাম নিতে পারি?
বিস্মিত নরেশ বুঝিতে পারিল না এই অনুগত লােকটি কে? সে
পাইল—তুমি কে? তােমাকে তাে আমি চিনি না।
বৃদ্ধ বণিলহজুরকে আমি খুব চিনি। আপনি মহামা ইন্সপেক্টার
শ্রীল শ্রীযুক্ত অভয়কুমার রায়ের বন্ধু। হজুর, আমি এখানকার পাঠশালার
হেড পণ্ডিত।
এতক্ষণে নরেশের মনে পড়িল, অভয়কুমার তাহাকে এখানকার
পাঠশালার কথা বলিয়াছিল বটে। অত তাহাকে বলিয়া দিয়াছিল,
পাঠশালার প্রতি একটু দৃষ্টি রাখিও। হেড পণ্ডিত বেজায় ফাকিদার।
সে আরও বলিছিল, গ্রামের উন্নতি করিবার আশা ছাড়িয়া দাও।
ও সব তােমার আমার কর্ম নয়। যদি পাঠশালার পণ্ডিটাকে একটু
শাসনে রাখিতে পার তবেই অনেক করা হইবে। নরেশ শুধাইয়াছিল,
পাঠশালার পণ্ডিত তাহাকে মানিবে কেন? অত বলিয়াছিল,
আরে তুমি যে সাহেবী পােক পর তাহাই যথেষ্ট। বিশেষ সে
যখন জানিবে যে তুমি আমার বন্ধু, তখন আমার চেয়ে তােমাকে বেশী
করিয়া মানিবে। নরেশ দেখিল তাহার কথাই সত্য। সে পাঠশালার
সন্ধান লইবার আগেই পাঠশালা তাহার সন্ধান করিয়া লাউ এবং কুমড়ে
লইয়া ভেট করিতে আসিয়াছে।
নৱেশ ৰলিল-পণ্ডিত মশাই, এ সব তাে আমি নিতে পারি না।
এ কোরান্তরে ঘু নেওয়া।
গাধর পতি
এরকম কথা পণ্ডিত জীবনে প্রথম অনিল। সে একেবারে বসিয়া
পড়িল। হাত জোড় করিয়া বলিল, ঘুষ দেওয়া বেআইনি এ
কথা আমি জানি। কিন্তু লাউ কুমড়াে কোন কালেই ঘুষ নয়, বিশেষ
সবাই এসব জিনিষ নিয়ে থাকেন।
নরেশ বলিল—কিন্তু এত হাঙ্গামা করবার দরকার ছিল কি?
আমার প্রয়ােজন অতি সামান্য, আর এসব তাে এখানে খুব সত্য।
পণ্ডিত সপ্রতিভাবে বলিল-সেই জন্যই তাে এনেছি হজুর। দামী
জিনিস দেওয়ার মতাে কি আমার অব?
এই সূত্র অবলম্বন করিয়া সহজেই পণ্ডিতের আর্থিক অবস্থার কথা
আসিয়া পড়িল। নরেশ বলিল—আপনি বসুন। এই বলিয়া সে একটা
মােড়া দেখাইয়া দিল। কিন্তু পণ্ডিতকে কিছুতেই বসাইতে পারিল
। পণ্ডিত ক্রমাগত বলে আমার অন্নদাতা, পিতৃতুল্য—তাঁহার
সম্মুখে কি বসিতে পারি?
নরেশ খাই-পণ্ডিত মশাই, আপনার তালারি কত ?
এখন ‘গালারি' কথাটা পণ্ডিত কোন জন্মে শােনে নাই-কি উত্তর
দিবে?
নৱেশ তাহার অ বুঝিতে পারিয়া ব্যাখ্যা করিয়া থাইল
আপনি পান কত?
পণ্ডিত বলিল—হয়, চার টাকা।
চার টাকা! ব্যাপারটা পুরাপুরি বুঝিতে না পারিয়া নরেশ গুধা-
ইল মালে?
পণ্ডিত বলিল—মাসে আর পাই কই হয়। পচ, ২ মাস অন্তর
টাকা আসে। এবার সে এগার-মাস বাকি পড়েছে।
চার টাকা বেতন তার আবার এগার মাস বাকি। নরেশের মাথা
গদাধৱ পণ্ডিত ঘুমিতে লাগিল। তাহার মনে হইল বৈঠকখানার কড়িকাঠ ফাঁক হইয়া তাহার যত সদিচ্ছা ও গ্রামােরনহা সােজা নির্বাংলােকের দিকে প্রদান করিল। নরেশ এবারে পুছিবে আপনার চলে কি করে? পণ্ডিত বলিল-এই ক্ষেত খামার করে, লাভ বেগুন লাগিয়ে। ক্ষেত খামারের কথাটা নরেশের মল লাগিল না, কারণ আচাৰ্য প্রফুচন্দ্ৰ ৰাণীকে এই পৰমৰ বহুবার দিয়াছেন। কিন্তু পড়া কখন হয়? তাহার সমাধান তত আচাৰ্য্যদেবের বক্তৃতায় নাই। কাজেই সে ছিলক্ষেত খামার করা মন্দ নয় কিন্তু পাঠশালার কাজে অসুবিধা হয় না? পণ্ডিত বলি পাঠশালার কাজে অনুবি ! পাঠশালা আছে বলেই তাে সুবিধা হয়, ছেলেগুলােকে নিয়ে লেগে যাই। —তৰে পড়নি কখন? -এই কাজ করতে করতে। যেমন ধরুন, শশার মাচায় অনেক শশা ফলেছে। আমি বললাম—ওরে, ন দেখত কটা । নত গুণে এলে তিন আর চার সাত, আর পাঁচ বারাে, আর আট বুভি। যােগ শিক্ষা হ'ল। আবার ধরুন, যে দিন + তুলতে হবে সেদিন বিমােগ শিক্ষা হ'ল। কুড়িটা শশার মধ্যে বারােটা ভােলা হল- থাকলে আটটা। দেশজ কিণ্ডারগার্টেনের নমূনা পাইয়া নরেশ কৌতুহলী হইয়া উঠিল। পুছি—আর , ভাগ। পণ্ডিত হাসিয়া বলিল—ততদিন কোন দলই পাঠশালায় থাকে না। তার অনেক আগেই পাঠশাল ছেড়ে নিজের নিজের ক্ষেতখামারে গদাধৰ পণ্ডিত আপনার এই পড়ায় নীতি নিপেক্টর সাহেব জানেন? বি। সেবারে যখন আমি. শশার ক্ষেতে বােগ শিক্ষা দিচ্ছিলাম, হজুর হঠাৎ সাইকেল করে এসে উপস্থিত। অমনি বিলাপ শিক্ষাও দিলাম। তেত্রিশটা গলার মধ্যে তেইশটা তুলে হজুরকে ডেট দিলাম। জু সে কি খুশি। এই পৰ্যত বলিয়া একটু খামিরা বলিল-এর একদিন পাঠশালায় নাম খুলে দেবেন। নরেশ বলিল—অবই একদিন বাবাে। কিন্তু আমার মনে হয় যে, আপনি কওক কাব্যে অবহেলা করছেন। নরেশের কথার সম্যক মন্ত্ৰ বুঝিতে পারিলে পণ্ডিত হয়তাে দিয়া ফেলিত, কি কি যে তাহা কর্তব্য এবং কিভাবে যে সে তাহা অবহেলা করিতেছে বুঝিতে না পারিয়া বন্ধুকে পাঠশালা দর্শনের এ বারবার অনুৰােধ করিয়া সে প্রস্থান করিল। পণ্ডিতের সঙ্গে কথাবার্তা বলিয়া নৰেশের মােধনিকার একপ্রান্ত কিঞ্চিৎ ফাক হইয়া গিয়াছিল বটে কিন্তু তৎসত্বেও তাহার বার বার মনে হইল-লােকটা জাতি গল কাব্যে বিম অবহেলা করিতেছে, ইহার একটা ব্যবস্থা করা প্রয়ােজন। কিন্তু এবার তাহার মনে হইল না, যে কাজের মাসিক বেতন চার টাকা এবং তাহাও এগার মাস বাকি পড়ে—সে কাজের অবহেলার অভিযােগ একেবারে অচল। তাই কেহ অভিযােগও করে না, মাহিনাও মিটায় না অনেক দিন হইল একটা বােঝাপড়া হইয়া গিয়াছে। শু উদরের উপর কাহান দাৰী নাই—সে দাৰী বই না কেন মহ লােক।
;
বাজারের কাছে হােট একখানি চার-চালা ঘরে গদাধর পণ্ডিতের
পাঠশালা বসিয়াছে। চারচালাখানার খড় জীর্ণ, মেঝে কাচা, বেড়া
ভাঙ্গা। তারই মধ্যে কোন রকমে তিনটা ভাগ। একদিকে চিনি,
বাতাসা, গুড় প্রভৃতির ছোট একখানা দোকান। সেখানে সাধ
পণ্ডিত উপবিষ্ট ; হাঁটু পৰ্যন্ত ধুতি, কাধের উপরে একখানা গামছা, গলায়
মলিন উপবীত, হাতে একখানা ছড়ি। সেই ছড়িখানাই বােৰ কৰি
পণ্ডিতের পাঠশালাৰ ৰাজও। কিন্তু সেখানা দিয়া যে কেবল মাত্র
তাড়না চলে এমন মনে কৰিলে ভূল হইবে; ছাৰ তাড়নায় অবশ্য সেটা
লাগে—কিন্তু এখন দোকানের মাছি তাড়াইবার কাজে নিয়ুক্ত। গাধর
বসিয়া হিৱিক নিজার আমলে চুলিতেছে, আর মাঝে মাঝে অরে
বলিতেছে—পড়, পড়। যাহাদের উদ্দেশে এই উপদেশ উচ্চারিত
তাহারা, গুটি আটশ বালক মাঝখানে ঘরে টোপাটি করিতেছে।
তৃতীয় ঘটায় কয়েকটা গােৰু ৰসিয়া নােমন কাধে নির। পাঠ
শালার অদূরে বিখ্যাত সেই শশার মাচা—সেখানে ছাত্র যােঙ্গ বিয়ােগ
শিক্ষা পাইয়া থাকে।
একদিন দুপুর বেলা নরেশচন্দ্র পাঠশালা পরিদর্শন করিতে আসি
উপস্থিত হইল। তাহাকে দেখিয়া গদাধর পশতে উঠলা পাশের
দোকান হইতে একটা মােড়া আনিয়া দিয়া বলিলম্বন জুর।
তারপর হাত জোড় করিয়া বলিল—একেৰাৱে খবর না দিয়ে
নশে বলিল-চ্ছে করেই খবর না দিয়ে এসেছি কি কাজ
চলে রে ?
তারপর কোনখানার দিকে চাহিয়া বলি-এ কি যেন
চান নাকি?
গদাধর পণ্ডিত
গদাধর পণ্ডিত বলিল—আতে না চালিয়ে করি কি? ছেলে
মেয়েতে চারটি। বিশে, এতে ছেলেদের মণকি, শেরকি শিখবার
সাহায্য করে।
—কই, আপনার ছাত্রাব কই?
পণ্ডিত হাঁকিয়া উঠিল—ওরে নন্তু, গদা, রতা, পা-সব কোথায়
গেলি? হজুর এসেছেন যে, সেলাম করে না।
কিন্তু পণ্ডিতের আদেশ সত্বেও কেহ আসিল না। আসিবে কে?
ছাত্রেরা কেহই নাই।
পণ্ডিত বলিল, সৰাই ছিল। আপনার সাহেবী পােক দেখে
সব ভয়ে পালিয়েছে। দুরু দুরু দুর
শেষােক্ত সাবধান বাণী একটি কুকুরের প্রতি।
নরেশ বলিলও ঘটাতে আবার গােও ঢুকিয়েছেন দেখছি।
গদাধর হাসিয়া বলিল—ঠিক তা নয়, আমৱাই গরু ঘরে ঢুকেছি।
তার পরে ব্যাখ্যা করিয়া বলিল-পূরানাে পাঠশালা ঘরখানা ও বছর
পুড়ে যায়। সদরে লেখালিখি করে ঘর তুবার টাকা পাওয়া যায় না।
অব ইন্সপেক্টর সাহেব বলেছেন যে, এ বারাে টাকা দেবেন। কিন্তু
দু বছর হয়ে গেল—টাকা এলােনা। কাজ তাে চালান চাই। তখন
বাজারের দোকানদারদের ধরলাম। তারা এই খানা তুলে দিল।
শর্ত এই হল যে, এর একখানা কামরা তাদের গােলা থাকবে।
কাজেই হজু, এঘরে ওদেরও যে অধিকার, আমাদেরও সেই অধিকার।
পাঠশালার আগন্তু চিকে দেখি নরেশের কেমন বিলাতি ঘটিল।
যে শিক্ষাত্রের একটা দিক সে বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখি তাহারই অপর
দিকটা যে খড়ের দীর্ণ চারচালার আলিয়া পলিহাতে গরু ও
মাযের সমান অধিকার তাহার কনারও অতীত ছিল। কিন্তু
গদাধর পণ্ডিত কেন জানি না তাহার মনে হইল, ইহার জন্য এই পণ্ডিতই দায়ী, আর কেহ না। গদাধর বলিল এর ঐ আমার শশার মাচ—এখানে ছাত্ররা যােগ বিমােগ শিখে থাকে। একবার দয়া করে পদার্পণ নরেশ ভূভাবে বলিল—না থাক, আর দরকার নেই। সে পাঠশালা পরিত্যাগ করিয়া বাসায় চলিয়া গেল। বাসায় গিয়া সে অভয়কুমারকে দীর্ঘ পত্র লিখিয়া পাঠশালা ও পণ্ডিতের সমস্ত ব্যাপার জানাইল এবং মন্তব্য প্রকাশ করিল যে, এ সমন্তের এই পণ্ডিত দায়ী। তাহাকে অবিলম্বে পদচ্যুত না কৰিলে জাতিগঠন সম্ভব হইবে না। যেন ওই গদাধর পণ্ডিতই জাতি গঠনের পথে ঐরাবতের বাধা সৃষ্টি করিয়া দণ্ডায়মান। যেন ওই একটিমাত্র বাধা অপত হইলেই জাতীয় জীবনের জাহবী ধারা অনর্গল গতিতে প্রবাহিত হইবে। চিঠিখানা লিখিয়া ডাকে দিয়া নরেশ অনেকটা স্বস্তি বােধ করিল। কাতির প্রতি কর্তব্য যেন তাহার সমাপ্ত হইল। আট দশ দিন পরের কথা। একদিন বিকাল বেলা নরেশ বেড়াই ফিরিতেছে। গ্রামের এ দিকটায় সে ইতিপূর্বে আসে নাই। একজনকে ছিল—ওই বাড়ীটি কার? লােকটা বলিল -ওটা গদাধর পণ্ডিতের বাড়ী। নরেশের কৌতুহল হইল গদাধর পণ্ডিতের বাড়ীখানা একবার দেখিয়া আসে। সে বাড়ীর কাছে গিয়া দেখিল, বাড়ী তাে ভারি। জীর্ণ খান দুই খড়ের ঘর-চারিদিকে আগাছার জলে পরিবেষ্টিত। সে দাঁড়াইয়া গদাধর পণ্ডিতের নাম ধরিয়া ভাকিতে সুরু করি। শাচ সাতবার ডাকিবার পরেও কোন উত্তর আসিল না, অথচ ভাঙা বেড়ার ফাক দিয়া লােকের আভাস পাওয়া যাইতেছে। গদাধর পণ্ডিতের খাই জীবনের গদাধয় পণ্ডিত পরিচয় লালে লােভ স করিতে না পারি সে বেড়া খাতে শুরু করিল। তখন ছােট্ট কাঠের একটা জানালা খুলিয়া গেল এবং ভিতর হইতে গাখ পণ্ডিত বলিল,বেড় ধাকাবেন না, বেড়া পড়ে যাবে। নরেশ কষ্টভাবে কহিল (সে দিনে পর হইতে সে পণ্ডিতের উপর গিয়া আছে)তিরে কি করছেন? আনুন না। কি করছি-আমলােক তো! পণ্ডিত বলিল—ডাক ওহি হজু, কিন্তু বাইরে যাবার উপায় নেই। অপমানিত বােধ করিয়া মরেশ বলিল-কেন? গদাধৰ ৰলিল আমরা স্ত্রী-পুরুবে নময়ীর পালা অভিনয় করছি। নরেশ কিই বুঝিতে না পারিয়া বলিল-ঠাট্টা করবার আর লােক পেলেন না? —সর্বনাশ,জুরের সঙ্গে কি ঠাট্টা করতে পারি। তারপরে সে ঘরের মধ্যে কাহার প্রতি লক্ষ্য করিয়া বলিল—আঃ, তুমি একটু চুপ করে তাে। হুজুরকে বৰাে না তাে কাকে বলবাে? এবাৰে হতুর নলেন-দেখাে এখানে কাপড় মেলে কি না। এ পর্যন্ত ঘলিয়া সে পুনরায় নরেশকে লক্ষ্য করিয়া সুরু করিল হুজুর, স্ত্রী-পুরুষে মিলে আমাদের দু'খানা বন্ধু, দুখানাই ধুতি। একখানা আমি পৰি, একখানা আমার সহধর্মিণী পরে। পরতে পরতে যখন খুব ময়লা হয়, তখন কেটে নিতে হয়। অবিবাটা দুটি—আজ একখানা কেচে কোতে দিয়েছি। যতক্ষণ না শুকোচ্ছে আমরা পুরুষ এক- খনা ধুতির দুই দিক এড়িয়ে ধরে বন্ধ হয়ে থাকি। এ সেই নল-দময়ন্তীর কথা আর কি। ভাগ্যি পুরাণে এই গল্পটা ছিল-মইলে কি যে করতাম হজুরু। এই বলিয়া সে খুব একটা প্রতিতে হাসি হাসিল। নরেশ সিৰে কি দিৰে ৱি করিতে না পারিয়ান করিল।
গা পতি ৰামায় আসিয়া একখালা খুতি চায়ের হাতে দিয়া সে পণ্ডিতে বাড়ীতে পাঠায়া দিল। বাদল শের শােক সে, গালি দেখি, সারির নও দেখিয়াকিল চাকির এমন পৌরাণিক প্রয়াস যে ঘটিতে পারে তা সে কল্পনাও করিতে পারে নাই। হাসি টায় দামি যে কি কি তাহা এই প্রথম সে দেখিল। আকার ঘটনায় গাধর পণ্ডিতে সখ্যক চেহা তাহার চোখে পড়িল। এমন হতদরিদ্রের হাতে যাহারা জাতিগঠনেয় তার দিয়া নিশ্চিন্তে বসিয়া থাকে-দোষ সেই জাতি। গাধর পণ্ডিতকে সমস্ত দায়িত্ব-মূক্ত বলিয়া এবারে তাহার ধারণা হইল। তাহাকে বরখাস্ত করিবার জন্য চিঠি লিখিয়া ফেলিয়াছে বলিয়া তাহার আপ হইল। স্থির কলি, কালকার ডাকেই অভয়কুমারকে সব ঘটনা লিখিয়া আনাইৰে-পণ্ডিতের তালিম যেন কোন ক্ষতি না হয়। এই ঘটনার পরে নে আর কখনাে গাধ পণ্ডিতের পাঠশালায় । বাড়ীতে যায় নাই, পণ্ডিতকে এড়াইয়া চলিতে চেষ্টা করিত। তাহায় কাছে নিজেকে অপরাধী বলিয়া তাহার মনে হইত। এমন সময়ে সে একদিন অকুমারের চিঠি পাইল। অভয়কুমার পণ্ডিতের কা অবহেলার বিষয়ে তাহার সঙ্গে একমত। সে নিখিয়াছে যে, আমি গঙ্গাধর পণ্ডিতকে পদচ্যুত করিবার ব্যবস্থা করিলাম। শমই অন্য পণ্ডিত যাহাতে ওখানে নিশূক্ত হয় তাহার ট কৰিৰ না, আর তুমি যে কষ্ট যীকার কলিয়া এদিকে দৃষ্টি দিয়াছ এক ধন্যবাদ জানিৰে। চিঠিখানা পড়িয়া নরেশ একেবারে বসিয়া পড়িল। তাহার দ্বিতীয় পত্র কি যথাসময়ে শেীয় নাই। গড়িমসি করিয়া চিঠি লিখিতে দু'চার দিন বিল হইয়া গিয়াছিল। এখন সে গদাধর পণ্ডিতকে কি বলিবে? হার এই যে পণ্ডিতে চাকুরী গো-ই তাে বুঝিতে বাধিবে না।
গদাধর পণ্ডিত
এখন উপায় কি? পণ্ডিত অ কাজ কিছুই করে না, কি চায়
টাকা মাহির এগার মাস বাকি পড়িলে কি এই কাজ করিবে।
ছেলেমেয়ে, শ্রীপুরুবে যে তাহারা ছয়টি প্রাণী। আদর্শবাদের ঝোঁকে সে
কি করিতে কি করিয়া ফেলিল।
পরদিন সকাল বেলা নরেশ একাকী বসিয়া আছে এমন সময়ে
অপ্রত্যাশিতভাবে গদাধর পণ্ডিত আসিয়া উপস্থিত। নরেশ পালাতে
পাৰিলে ৰচিত, কিন্তু সে পথ ছিল না।
পণ্ডিত সাটাব্দে প্রণিপাত করিয়া বলিল, আমার চাকুরিটা
গিয়াছে। এবারে বােধ হয় আমার দুৱৰ বুটবে।
এই বলিয়া সে হাসিতে লাগিল। এরকম তৃপ্তির হাসি নরেশ
তাহার মুখে আর কখনাে দেখে নাই।
পণ্ডিত গদগদ কৃহে বলিয়া চলিল-ইচ্ছে থাকলেও চাকুরিটা
ছাড়া সম্ভব হয় নি। তিন পুরুষ হ'ল আমরা এই কাজ করছি।
সে কি সহজে ছাড়া যায়। অথচ জানতাম, একটু নড়াচড়া
করলেই দুপয়সা বেশি আনতে পারি। এবারে সেই সুযােগ
মিলা।
নৱেশ অপরাধীর ক বলিল—তা এ কথা আমাকে জানাবার
কারণ কি?
পণ্ডিত বলিল-নছিলাম হজুৱে এক জন পাচক ব্রাহ্মণের দরকার।
আমি তাে ব্রাহ্মণ, ভাবলাম একবার জেনেই আলি-এখন তাে আর
পাঠশালার হাঙ্গামা নেই।
নরেশ ইহার কি উত্তর দিবে। পণ্ডিতের কথায় তাহার আদর্শবাদের
মাখা এটম বােম নিক্ষিপ্ত হইল। যেদেশের পাঠশালার পণ্ডিত
চাকুরি গেলে খুশি হয়-অপরের পাচকবৃত্তিকে শ্রেয় মনে করে, মনে
গদাধর পণ্ডিত
করে এবার তাহার সালাৰিক উন্নতি হইৰে-সেদেশের কি আর ভবিৎ
বলিয়া কিছু আছে!
সে তখন পণ্ডিতকে একটা চুনা করিয়া বিদায় দিল। আর
সেই রাত্রেই সে গ্রাম ত্যাগ করিয়া কলিকাতায় রওনা হইল।
কলিকাতায় পৌছাইয়াই চাকুরিতে ইস্তফা পত্র পাঠাইয়া দিল। তারপরে
কার কখনাে লে দেশের উন্নতি করিতে চেষ্টা করে নাই। এখন কে
সিভিল সাপ্লাই-এ কাজ করে, বেতন মােটা।
এক গজ মার্কিন এক চামচ চিনি ১ মে মাসের দুপুর বেলা আড়াইটা, কি তিনটা হওয়াও বিচিত্র নয়। বাহির হইতে হইবে, অনেক আগেই বাহির হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু রােদের দিকে তাকাইবামাত্র সমস্ত কর্মস্পৃহা লুপ্ত হইয়া যায়। জরুরি কাজের একজনের সঙ্গে বেলা দেড়টায় দেখা করিবার কথা—গড়িমসি করিতে করিতে প্রায় তিনটা বাজিল। আর বিলৰ নৱ ভাবিয়া উঠিয়া পড়িলাম। জামা কাপড়গুলাও আগুনের মতাে গরম। কোন মতে একটা জামা গায়ে চাপাইয়া, ছাতাটা হাতে লইয়া আর একবার চিন্তা করিয়া লইলাম। জানালা দিয়া দেখা যাইতেছে বাহিরে রৌদ্রের জহরান্তির শিখা। রাজপুতরমণীর নিষ্ঠা থাকিলে নিশ্চিন্তমনে এমন অগ্নিসমুত্রে আত্মসমর্পণ করা যায় কিন্তু আমি যে নিরীহ বাঙ্গালী ভলােক। রাজপুতরমণীর সবিতার জন্য বৃথা আপ করিয়া লাভ নাই ভাবিয়া বাহির হইতে ৰাইৰ এমন সময়ে পাশের ঘর হইতে শুনিলাম—বোেচ্ছ নাকি? একবার এনে মেয়ে। আমার সহধণিীর কর। পাশের ঘরে প্রবেশ করিয়া দেখি ধৌত-শত মণ মেঝের উপরে, কত ঘূর্ণমান বৈদ্যুতিক পাখার নীচে, খসখসের সিক্ত সুগন্ধি পর্দা খাটানাে জানালার পাশে একটি বালি আয় করিয়া আমার সহধণিী সাহাৱা অতিক্রম' নামে একখানি অমণ পুস্তক পাঠ করিতেছেন।
এক গজ মাকিও এক চামচ চিনি পদশৰে আমার অতি উপলব্ধি করিয়া বলিলেন , নাহার মরুভূমিতে কি সত্যই এই রকম গরম। আমি বলিলাম তােমার এই যন্ত্রটির চেয়ে কি বেশ গরম বই কি। আমার নিবুজিতা বিম্বিত হইয়া (আজও তাহার বিশ্ব গেল না) বলিলেন—না গাে না, এই কলকাতা শহরের চেয়ে বাক্যটি সমাপ্ত হইবার আগেই বলিলাম-বেশি গরম না হতেও পারে। তবে ওদের এত বড়াই কিসের বলিয়া গৃহিণী মুখ খুলিলেন। ভাবিলাম বলি, কলিকাতা শহরে যে কত গরম হাতে তােমার বুঝিবার কথা নয়, কিন্তু মনের কথা মনেই রহিল, গৃহিণীর কাছে সব ভাৰ প্রকাশ বুলিমানের লক নয়। এতক্ষণে তিনি আমাকে ভালাে করিয়া নিরীক্ষণ করিয়া বলিলেন- বেরুচ্ছ বুঝি? তারপরে একটু থামিয়া বলিলেন-তােনাদেরই জীবন সুখের। আমরা চিরকাল ঘরেই বন্ধ হয়ে রইলাম। কথাটা সর্বৈব মিথ্যা নয়, বাড়ীতে এবং সিনেমা, থিয়েটারের ঘরে। দিবা রাত্রির অনেকটা সময় তিনি বা হইয়া থাকে সত্য। একটি দীর্থ- নিস চাপিয়া গেলাম। দীর্ঘনিশ্বসেরও কৈফি দিতে হয়। গৃহিণী বলেন-এক কাজ করে তাে। আর সময়ে এক গজ মার্কিন নিয়ে এসে তাে। মাফি! গৃহিণী কি জাগ্রত না সুপ্ত! প্রলাপ নয় তাে? না, কিন্তু আগে পিপ্রেরিত মণিঅর্ডার-টি হতে স্বাক্ষর করিয়া লইয়া- 'ছেন, কাজেই প্রলাপ বলি কি করিয়া ? মাথাটা ঘুরিয়া গেল-আর,
এক গজ কি ও এক চামচ চিনি
একটু হইলেই পড়িয়াছিলাম আর কি। টেবিলটা আয় করিয়া কোন
মতে বা পাইলাম।
কি বলি? কন্ট্রালের কথা কি গৃহিণী জানেন না? কন্ট্রোল
হইবার পর হইতে চিনি ও কেরােসিন তৈল পাওয়া যায় না বলিয়া অনেক
সময়ে তিনি আমাকে গানা দিয়াছেন। আর ব-কন্ট্রোলের কথা কি
অবগত নহেন ?
বলিলাম। কি তাে পাওয়া যায় না?
—তবে লথ এনাে, বলিয়া তিনি পাতা উল্টাইলেন।
সাহ স করিয়া বলিলাম—তুমি তাে নিয়মিত খবরের কাগজ
(অর্থাৎ বিপন) পড়ে-কাপড় যে পাওয়া যায় না তা কি
জানে না ?
এবারে ‘সাহাৱা অতিক্রম রাখিয়া সহংণিী আমাকে লইয়া পড়িলেন
-ওই তােমার এক কথায় পাওয়া যায় না। সবাই পায় আর তুমি
পাওনা কেন?
আমি বলিলাম-কেউ পায় না।
খুৰ পায়। এই বলিয়া তিনি বিশ পচিশটি ব্যক্তির নাম করিয়া
গেলেন যাহাদের অধিকাংশই এখনাে অলাত কি ৰহ কাল মৃত।
তারপরে একটু থামিয়াঘুষব্যক ঘরে বলিলেন—যার, যায় পাওয়া যায়
একটু খুজে পেতে এনাে।
স্ত্রী লােকের সঙ্গে তর্ক করা বৃথা কাজেই আর ভিক্তি না করিয়া
বাহির হইয়া পড়িলাম। আমার সহধর্মিণী সাহারা অতিক্রম করিতেছেন
ভাৰিা অহাৰ ক উদ্বেগ বােধ করিতে করিতে কলিকাতার
রৌসমুদ্রে ডুবুৰীয় মতাে নিমগ্ন হইলাম—একগজ মার্কিন মুক্তার
যায়।
মশাই মাকি আছে। অপর পক্ষ নীয়ৰ। ই আমার সপ্তম দোকান, কেহই কথা বলে নাই, তবু এখনাে আশা আছে, রবার্ট , নাকি অষ্টম ৰারে কৃতকাৰ্য হইয়াছিলেন। এবার ভাগ্য অপেক্ষাকৃত সত্ৰত, দোকানী কথা বলিল। সে একটা বিড়ি নিজে ধরাইয়া, আর একটা আমার দিকে দুড়িয়া দিয়া বলিল, নিন ধরান। আমি বিড়ি খাই না, কিন্তু মার্কিণের সুিরাহা হইতে পারে ভাবিয়া তাহাকে খুন করার আশায় বিড়িটি ধরইলাম। সহৃদয় দোকানী বলিল-যায়, আপনি লােকের ছেলে, লেখাপড়া জানেন বলেই মনে হচ্ছে, কাপড় যে পাজ্ঞা যায় না তা কি এখনাে জানেন না? আমি অনেকক্ষ থেকে দেখছি আপনি দোকানে দোকানে অনর্থক ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ও রকম করে কাজ এই কথায় যেন ক্রু একটুখানি আশার আলাে দেখিতে পাইলাম-- দুস্তর বাধার মধ্যে মূল জীবনটানেলের বন্ধুপথে একটুখানি আলাে। ও রকম করে কাজ হয় না। তবে কাল হইবার অন্য এক রকম পন্থা নিস আছে। তখনি চকিতের মতাে সেই অতি পুরাতন অথত চির নূতন, পরিচাতীত অথচ সদা প্ৰত্য, ধনীর সানা আর চরিত্রের স্বপ্ন, বহনকাম্য অথচ এর জন্য সেই শব্দটি মনে পড়িয়া গেল-ব্যাক মার্কেট। এদিক ওদিক তাকাইয়া বলিয়া ফেলিলাম-ম্যাকমার্কেটে পাওয়া যায় না? সে কোন দিকে না তাকাইয়া (আমাকে চিনিয়া ফেলিয়াছিল) বলিক পাওয়া যায়। তবে আপনাকে দেবে কেন?
এক গজ মার্কিন ও এক চামচ চা
কেন? ব্ল্যাক মার্কেটের দাের মােটর গাড়ী থেকে নামে,
হীরার আংটি ঝলক তুলে রূপাের সিগারেট কে থেকে কেজি সিগারেট
বের করে ‘অফার করে নিলেই সে এ জিনিৰে মাক মার্কেটের
বিভাে, সাের তা আর কোথাও গিয়ে রাখতে সাহ করে
গীতগুলে সােনা দিয়ে বাধিয়ে নিয়েছে। আপনার মতাে এই জটা
চেহারার ম্যাকমার্কেটতে প্রবেশ নিষেধ।
লােটা কি স্বামী নাকি! আমি ই ভাটা খাই, লেখা পড়া
জানি এবং লােকের ছেলে, এসৰ গুৰু অখ্য আনিল কেমন করিয়া ?
আমি মিশাই, সৰ কথাই তাে বুঝলাম কিন্তু এখন
মার্কিন না নিয়ে বাড়ী ফিরি কি উপায়ে ।
লােৰুটি হাসিয়া বলিল—ও গিমি বুঝি রাগ করবেন।
শায় সন্দেহ নাই যে লােকটা আসামী। সৰত পৰই
কোন নেতা।
আমি দুঃখে ও সহানুভূতিতে বিগলিত হইয়া বলিলাম—তে ঠিক
বলেন।
লােকটি বলিল—কোন ভয় নেই। ওষুধ শিখিয়ে দিচ্ছি। কাছে
আনুন।
এই বলিয়া গুরু যেমন শিয়ের কানে ইউযন্ত্র প্রদান করে, তেমনি
করিয়া তিনি (সে বলিতে আর ইচ্ছা কৰিতেছে না) কয়েকটি কথা
বলিয়া দিলেন। এক মুর্তে আমাৰ যি দুঃখ দূরীভূত হইয়া নবীন
জীবন প্রাপ্ত হইলাম! এতক্ষণ পৃথিবীটাকে এক খানা ছি কার মতাে
বােধ হইতেছিল, এক নিমেষে তা বাদশাহী কিবারে পরিণত হইল।
আমি তাহাকে প্রণাম ও নমস্কারের মাঝামাঝি একটা মূত্রা কৰিা
রুতপদে গৃহে উদয়ে রওনা হইলাম।
এক গ শাকিল ও এক চামচ টিনি
বাড়ীতে ঢুকিয়া দেখিলাম একা সাহারা অভিনয় কৰি
গৃহিণী শা আল কাছে। তিনি আমাকে আক্রমণ করিবার
পূর্বেই আমি বলিয়া দিলাম কোথায় গাে? কাৰ গীর এক
কাপ চা নিয়ে এলাে। চনি তােমায় শিবির কাও।
খবরের কাগজে জড়িত একটি গুলির মতাে হাতে চিল, বনের
কাগজখানা দোকানীর দয়ার দান।
-কই চা আননা, আর এই মার্কিন নিয়ে যাও। এর জন্য কি অল্প
ঘুরতে হয়েছে।
আমার প্রথম সাড়া পাইয়া গৃহিণী নিজের অস্তিত্ব বিজ্ঞাপিত করিয়া
দিলেন, এবারে চালের তাগিদে একেবারে নীরব। কোন কাজ
নাই।
বাতৰিক দোকানী যে পাপ তাহাতে সন্দেহ ছিল না, নতুবা সে
কি করিয়া জানি যে আমার ঘরে চায়ের চিনি নাই—এবং চিনির অভাবে
চা না দিতে পাৱিা লজ্জিত গৃহিণী আত্মগােপন করিবেন।
আমি নীচের তলায় বৈঠকখানায় বলি মাগত হকিতেছিকই
গােচা আনাে আর মার্কিন না। গৃহিণী আর দেখা দেন না।
তাঁহার দেখা না পাইয়া এত খুশী আর কখনাে হই নাই। তিনিও কি
অরূপ খুশী হইতেছিলেন।
চা আসিল না, কিন্তু গৃহিণীও আসিলেন না।
গৃহিণী আসিলেন সেই রাত্রে আহারের সময়ে। পুছিলেন-কখন
এলে?
সেই বিকেল বেলা। তােমাকে কত ভাকলাম, কোথায় ছিল?
তিনি বলিলেন, তুমি বের হবার পরেই আমি ওদের বাড়ীতে বেড়াতে
গিয়েছিলাম।
এক গণমাকিল ও এক চামচ চিনি
ওরা আমাদের এক প্রতিবেশ।
গৃহিণ মাকিণের কথা তুলিলেন না দেখি আমিও আর চায়ের
কথা তুলিলাম না: আহারাতে গৃহিণী স্বীকার করিলেন সাহাৱা গরম
কি কলিকাতা সইও কম গরম না আমি কেন আর অপুর বেলা
কখনাে না বাহির হই-এই অনুরোধাই তিনি কৰিলেন। আমি সন্মত
হইলাম।
সিক,
পাশের ঘরে স মৃত রামবাবু হট পড়িয়া আছে আর এ ঘরে
তাঁহার চারি পুত্র পিতার নিকট পড়িয়া আছে, নড়ে চড়ে
। ধূট সমাচিত নয়, কি করে সমলােচিত কাটা ঘটনা
ঘটে। রাষৰু বিপৰীক, কাজেই নি আসল নােকট ছিল না,
আর যাদের দিবার কথা তাহলে বিষয় তাে উল্লেখ করিলাম।
খানে যাইৰাৰ সময় অতিক্রান্ত হয় চে গুদের সে দিকে তৃ িনাই,
অবশেষে পাড়াভিণে উদ্যেগ হইয়া তিদেহ সৎকারে এ লইয়া
(गन-बाब मिलाराज बना लबिक मिला बहर माया
যত পড়ি মহিল।
বিচক্ষণ পাঠক ইতিমধ্যে নি বুঝিতে পারিয়াছেন যে সিটি
সামান্য নহে। বাস্তবিক, সিন্দুকটির একটু ইতিহাস আছে, অথবা
সিন্দুকটিই ইতিহাস। সেই ইতিহাসই এই কাহিনীর বর্ণনীয়।
রামবাবু গ্রামের মধ্যে ধী; তাঁহাকে গায়ের লােকে মানে শাচ
গাঁয়ের লােক চেনে, দশ গায়ের লােকে ধনীর দৃষ্টান্ত নিতে হইলে এক
বাক্যে রামবাবু উল্লেখ করে কি নামৰাৰু দি মূলে কিনি
করিয়া কে জানে না। তাৰ মুলুক জমিদারী নাই; ক্ষেত থানার
আমি মা যাহা আছে তাতে সংসার চলে কিন্তু পলারে লীনা ন
চলে না; ব্যবসা বাণিজ্য রামবাবু নাই, লুঙ্গীকার বাতি
আছে বলিয়াও কেহ জানে না। এ ছাড়া বাকি বিল কৈখন
আর গুপ্ত ধন। ওটির বিষয়ে অনুমান চলে, এমা চলে না। কি
ডাকিনী পরের ধন সম্পর্কে অনুমান যেমন সচল, প্রমাণ তেমনি অচল। কাজেই বিনা প্রমাণে রামবাবুর ধনখ্যাতি ব্যাবিলনের শূন্তােনের মতো সকলের বিষয় ও বাহবা উদ্রেক করিয়া বিরাজমান; শূন্যস্থানের ফুলগুলি এত উকে বিকশিত যে স্বভাবতই তাহাকে কল্পবৃক্ষ বলিয়া এম হয়। কিন্তু এতৎ সত্ত্বেও সত্যের খাতিরে বলিতে হয় যে রামবাবুর কোন ধন ছিল তাহা বলা চলে না, তাহার মূলধন ও সিন্দুকটি। বাস্তবিক এত বড় সিন্দুক একালে দেখা যায় না, সেকালেও কদাচিৎ দেখা যাইত—এই সিন্দুকের তুলনা দিতে হইলে এক সিন্ধবাদের বিখ্যাত সিন্দুকটি ধরিয়া টান দেওয়া ছাড়া উপায় নাই। প্রকাণ্ড লােহার সিন্দুক ঘরের আধখানা জুড়িয়া বিরাজ করে। মােটা মােটা লােহার পাত দিয়া আগা গােড়া ভাননা , ভিতরে পাঁচ সাতটা নােক অনায়াসে গুড়ি মারিয়া বসিয়া থাকিতে পারে। আর তালাটাই বা কত বড়! একটা মানুষের আস্ত মাখার মতাে। সিন্দুকের সারা গায়ে সিদুর আর চন্দনের দাগকত বছরের পুরাতন, কত বিচিত্র রকমের চিহ্ন। এই সিন্দুকটি যে রামবাবু কি সুত্রে পাইয়াছিলেন লােকে জানে । খুব সম্ভবতঃ পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত। গ্রামের বৃদ্ধদের মুখে শুনিতে পাওয়া যায় এমন নদীটি যখন সচল ছিল, সে বহু বছর আগের কথা, তখন নদী দিয়া বড় বড় পালােৱী নৌকা যাতায়াত করিত। তখন নবাবী আমল—একর ঢাকা হইতে মুর্শিদাবাদামী একখানি নবাবী ৰজরা ঝড় উঠিয়া এখানে নদীর বাঁকে ডুবিয়া যায়। সেই নৌকায় নাকি মােহয়-ভরা এই সিন্দুক ছিল। রামবাবুর কোনাে পূর্বপুরুষ জল হইতে এই সিন্দুকটি উদ্ধার করিয়া বাড়ী লইয়া আসেন। সেই হইতেই তাহার এর সূত্রপাত। অন্যান্য কিন্তীর মতাে হয় তাে এ ঘটনাও সত্য নয়, বিশেষ বাম- সিন্ধুক বাবুর অতীত বা বর্তমান ঐশ্বৰ্যের কোন প্রত্যক্ষ প্রমাণ নাই। কিন্তু গীয়ের লােকে এত তলাইয়া বােঝে না—সিন্দুকটাই কি যথেষ্ট প্রমাণ নয়। গ্রামের মধ্যে যাহাৱা বু হিসাবী তাহার সিন্দুকের বর্গফল কষিয়া বহুবার বহু রকমে হিসাব করিয়াছে মােহর ভর্তি হইলে কত? টাকায় ভর্তি হইলে কত? আর কোম্পানীর কাগজে ঠাসা হইলেই বা কত মূল্য রামবাবুর ঐশ্বরে! আর এমন হওয়াও বিচিত্র নয় যে সিন্দুকটা —তাহা হইলে তাে রামবাবুকে ঐন্দ্রজালিক বলিতে হয় সিন্দুকে এরূপ খ্যাতির পূর্ণতা! ঐন্দ্রজালিকেরও মায়া বিস্তারের জন্য একখানা ও হাড়ের প্রয়ােজন হয়। রামবাবুর গ্রামের নাম জোড়াদীঘি। জোড়াদীঘিতে একবার পর পর ডাকাতি শুরু হইল। ডাকাত অন্য গ্রামের। জোড়াদীঘির লােক অতিষ্ঠ হইয়া উঠিল। কিন্তু ডাকাতের সঙ্গে পারিয়া উঠিবার উপায় নাই—তাহাদের বন্দুক আছে, ঢাল শড়কি আছে। এ সব না হইলে ডাকাতের দলকে বাধা দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু টাকা কোথায়? তখন গাঁয়ের লােক কাঁদিয়া আসিয়া রামবাবুর পায়ের উপরে পড়িল-বিল- কর্তা, আর তত সহ হয় না, একবার সিন্দুকটা খুলে কিছু বের করুন, দুশমনদের আমরা দেখে নিই। রামবাবু সব গুনিয়া, অনেকক্ষণ ভাবিয়া, এটা খড়কে দিয়া দাত টিতে ধুটিতে চিবাইয়া চিবাইয়া বলিলেন—তা হলে সিন্দুক খুলতেই হ’ল দেখছি। গাঁয়ের লােক আশ্বস্ত হইয়া ফিরিয়া গেল। কিন্তু সিন্দুক লিবার আর প্রয়ােজন হইল না যে কারণেই হােক ডাকাতি বন্ধ হইয়া গেল। গ্রামের নােক নিজেদের মধ্যে বলাবলি করিতে লাগিল দুশমন এবার খবর পেয়েছে যে কর্তা এবারে সিন্দুক খুলবেন। সিন্দুকের নামেই
ডাকিনী
জনদের এমন জ জানিয়া গাঁয়ের লােকে খুব এক চোট হাসি
লইল। সিন্দুকের উপরে তাহাদের আস্থা বাড়িয়া গেল।
আর একবারের কথা। বা হইয়া ক্ষেতখামায় আসিয়া গেল।
লােকে রামবাবু কাছে আসিয়া বলিনকর্তা, সিন্দুক না খুললে তাে
এমেরি।
কামৰাৰ বলিলেন-সে কথা ঠিক। এ রকম ক্ষেত্রে সিন্দুক না খুললে
আর কৰে ৰে।
কিন্তু খুলির প্রয়ােজন হইল না। দু'একদিনের মধ্যেই চাউল ও
বস্ত্র বিতরণের জন্য সদর হইতে লােক আসিয়া উপস্থিত হইল। রামবাবু
সকলকে শুনাইয়া শুইয়া বলিলেন—না, এৱা আমাকে খরচ করতেই
দেবে না দেখছি।
সকলে কি করবেন না
,, অসময়ে আপনার সিন্দুক
থাকে। নামৰাৰু তটিতে ধুটিতে বলিলেন তােমরা যখন চাইছে,
তাই থাক।সিকের উপরে সকলের ভক্তি বাড়িয়া গেল।
সিন্ধুকটাকে লইয়া রামবাবু ঘটা কল্পিতেন। প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা
মান কবি গানের গুলি চাল গারে সিন্দুকের মুখে বসিয়া পূজার্চনা
করিতেন এবং অবশেষে সিনুটাকে ধুপ দীপ লইয়া আরতি করিতেন।
অক্ষয়তৃতীয়ার দিনে সিন্দুকটাকে বটের পল্লব জিয়া সাজাইতেন আর
বিজয়া শীতে সিগাকে আগাগােড়া সিন্দুর ও চন মারা আলিপিত
করিতেন। বাড়ীর চাকরবাকর ও আত্মীয়-পরিজন মুখৰিয়ে কর্তার
কালখিত।
এই আত্মার মধ্য রামবাবুর পুত্রগণ বাড়িয়া উঠিতে লাগিল।
তাহার চাৰুি পুল। পুরো বাজাও হইয়াই বুঝিতে পারিল ওই
সিটাই তাদের পরিবারের পিত। বল বাড়ি সুদে সঙ্গেই
সিক তাহাদের গতিবিধি শিমুকের কাছে ক্রমেই সন্দেহজনক হইয়া উঠিতে লাগিল। রামবাবু দেখিতে পাইলে বলিতেন-ই, ওদিকে না, যাও পড়াে গে! পুরো ছুটিয়া পালাইত। তাহারা এক আধবার গােপনে সিন্দুকটা খুলিতে চেষ্টা করিয়াছে। কিন্তু লৌহ-আৱৰ নিৰ্দৰ আৰু চাবিও অলভ্য। বাকি তাহার চাৰি যে কোথায় তা কেহই জানিত , রামবাবুর সতর্কতা অসীম। নিরুপায় পুরাে বিত—এখন না হােক, একদিন সিন্দুকের গহ-উদ্ধার হইবেই পিতার মৃত্যুর পরে। সেই বহু প্রতীক্ষিত শুভদিন আজ সমাগত। পুত্রগণ সিন্দুক জড়াইয়া পড়িয়া আছে। কিন্তু চাবি কোথায়? কেহই জানে না। কাহাকেও ছাডিয়া কেহ খুঁজিতে যাইতে রাজি নয়—কি জানি অপরে কি করিয়া বসে। কাজেই অধিকার সাব্যস্ত করিয়া সিন্দুক এড়াইয়া পড়িয়া থাকা ছাড়া আর উপায়ন্তর নাই। হয় তাে এমনি করিয়া পড়িয়া থাকিয়াই শেষ পৰ্যন্ত তাহাদের প্রায়ােপবেশনে মরিতে হইত, দিনে দিনে, তিলে তিলে। এমন সময়ে গভীর রাত্রে শ্মশানবগণ ফিরিয়া আসিয়া একা একটা চাবি পুত্রদের উদ্দেশ্যে ডিয়া বিল,বলিল—কর্তার কোমরে ছিল। পুত্রগণ চাবি লুফিয়া লইয়া দরজা বন্ধ করিয়া দিয়া গা-ঝাড়া দিয়া দাডইল। তখন সেই গভীর রাত্রে ক্ষীণ দীপালােক সহায়ে রামবাবুর চারিপুত্র বহুকালের মহ-উদ্ধারে প্রবৃত্ত হইল। তায় চাবি ঘুরাইতেই খট্ করিয়া শব্দ করিয়া দুর্জয় তালা খুলিয়া গেল। চার জনে মিলি আট হাতের শক্তিতে সিন্দুকের গুরুভার ঢাকনা তুলিল এবং সকলে একসঙ্গে দীপালোক তুলিয়া ভিতরে তাকাইল। সিন্দুক শূ! কোথাও কিছু নাই! না এ তাদের চোখের এ ছাড়া আর কিছু নয়। চারিজন ভিতরে নামিয়া পড়িয়া ডুরি যেমন করিয়া সন্ধান করে ডাকিনী তেমনি করিয়া হাতড়াইয়া মরিতে লাগিল। সত্যই কোথাও কিছু নাই। এমন সময়ে একখানা কাগজের টুকরা দেখিতে পাইল। চারজনে সেখান লুকের মতাে লইয়া বাহিরে আসিল। ছােট্ট একখানা কাগজের চিরকুট। দীপালােকে দেখিল তাহাতে পিতার হতাম। চার পুত্র একসঙ্গে চার- করে তাহা পাঠ করিল। কাগলে রাম বাবুর হস্তাক্ষরে লিখিত-বাপু সকল, আমার মৃত্যুর পরে সিন্দুক খুলিলেই দেখিতে পাইবে সিন্দুক শত। সিন্দুক যেমন, আমার অদৃষ্টও তেমনদুইই । কিন্তু বুদ্ধি একেবারে শূন্য নয়। দেখনা, শূহ সিন্দুক লইয়া কেমন আসর জমাইয়া গেলাম। এখন তােমরা যদি বুদ্ধিমান হও তবে ইচ্ছা করিলে আমার সুনাম ও ধনগৌৰ বজায় রাখিতে পারাে। তােমাদের কাজ শুধু ধনাপবাদ পরিপাক করা। সব অপবাদের প্রতিবাদ করৰে-কেবল ধনাপবাদ ছাড়া। তুমি যে ধনী, অপরের এই বিশ্বাসই প্রকৃত সম্পদ। ইহাকে যক্ষা করিতে সামান্য একটুখানি বুদ্ধি ও কাণ্ডজ্ঞান ছাড়া আর কিছুই প্রয়ােজন নাই। প্রমাণ—আমার সিন্দুক। তােমরা ধনী-অপরের মনে এই বিশ্বাস আমি স্থাপন করিয়া গেলাম। ইহাই তােমাদের একমাত্র পৈত্রিক সম্পত্তি। এখন ইহাকে রক্ষা করা বা না করা তােমাদের দায়িত্ব। পিতার কর্তব্য আমি পালন করিয়া গেলাম। ইতি নিঃস্ব কিন্তু ধনাপবালগপিতা।” চারিপুত্র পিতার পত্র পড়িয়া মুচের মত ৰসিয়া নীরবে চুল ছিড়িতে লাগিল। কেবল জ্যেষ্ঠের মাথায় বৃহৎ টাক ৰলিয়া সে কনিষ্ঠের চুল ছিড়িতে থাকিল। ধনতত্ত্ব সম্বন্ধে চরম কথা রামবাবুর পড়ে থাকা সত্ত্বেও পুত্রদের মনে পিতার সম্বন্ধে যেসব অৰক্তভাব উদিত হইতে লাগিল তাহা প্রকাশ না করাই শ্রেয়ঃ-কারণ জগতে এখনাে পিতৃভক্ত পুত্রের অভাব ঘটে নাই।
নীলমণিৰ স্বর্গলাভ । ৪ [ সাঁওতাল পরগণীয় জয়ন্তী নদীর ধারে যা পাহাড়ের কোলে কোলে, বাতাস যেখানে মহুয়ার মধু-গন্ধে মদির সেখানে ছিল একজনের জন্মভূমি -কিন্তু সে জানতাে না তার জ্ঞান যখন হয় সে তখন শহরের দাসলে বাধা পৃলের শব্দেই তার জীবন গড়ে ওঠে সব শৃঙ্খলিত জীবের মত তারও হয়ত ধারণা হয়ে যায়, শৃখল নিয়েই বুঝি সে জন্মেছে তার পর একদিন এ বন্যা ভেসে গেল সব••ভেসে গেল সে সেই সনে ভেসে গেল তার পৃথল'""সে জাগলাে, যেন নতুন জীবনে, আবার সেই জয়তী নদীর ধারে গা পাহাড়ের কোলে, বাতাস যেখানে মহুয়ার গন্ধে মদির জীবনের পর সেই কি স্বর্গ। কিন্তু তবু সেগ-বাসের মধ্যে অন্তরে কিসের যেন বাথা কাটার মত ফোটে? কি সে? ব্যঙ্গসুনিপুণ শিল্পী ব্যঙ্গ করতে গিয়ে বেদনায় ভরে উঠে এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন • প্রশ্ন আর উত্তর নীলমণির জীবনেও যেমন সত্য••• • আপনার আমার জীবনেও তেমন সভ্য••• নীলমণি আর আমাদের মধ্যে যদিও অরণ্যের ব্যবধান কিন্তু কতটুকু এ ব্যবধান?] ‘ভুগ, দুগ, ভুগ-নীলমণির বাপ পথ দিয়া ডুগডুগি বাজাইয়া চলিয়াছে। পাড়ার ছেলেরা ভীড় করিয়া আসে, গ্রামের কুকুর ঘেউ ঘেউ করিয়া সাড়া দেয়—কাছে যেসিতে সাহস করে না, দূর হইতেই প্রতিবাদ জানায়।
१२ কিনী ছেলেদের মধ্যে সাহসী আগাইয়া আসিয়া বলে খেলা দেখাও। নীলমণির বাপ একবার তাহাদের হাতে কিছু আছে কিনা দেখিয়া লইয়া বলে-পয়সা কোথায় ? কথাটা ছেলেদের ভালাে লাগে না-জাহাৱা চুপ করিয়া থাকে। নীলমণির বাপ একটু অগ্রসর হইয়া যাইতেই তাহাৱা ঘােট করিয়া একটা চিল ছেডে। নীলমণির বাপ জানিতেও পায় নাকি নীলমণি মুখ ফিরাইয়া যোৎ ঘোষ করিয়া ওঠে, মুখ ঘুরাইয়া হাঁ করে, কয়েকটা দাত দেখা যায়। ছেলের দল জ পাইয়া পিছাইয়া যায়। কুকুরগুলাকে উৎসাহিত করে—কি কুকুরগুলা যে ছেলের দলের চেয়ে বেশি সাহসী এমন মনে হয় না, তাহাৱা ভাকিতে থাকে কিন্তু এগাের না। ততক্ষণে নীলমণির বাপ অনেক দূরে চলিয়া যায়। সে অঞ্চলের লােকে নীলমণির বাপের আসল নামটা ভুলিয়া গিয়াছিল ভালুকটার নাম নীমণি, তাই ভালুকওয়ালাকে নীলমণির বাপ বলিয়া তি। নীলমণির বাপ নীলমণিকে লইয়া গ্রামে গ্রামে খেলা দেখাইয়া বেড়াইত। কঁাধে তাহার কুলি, হাতে ডুগডুগি, পিছনে দড়িতে বাধা নীলমণি। সে মাথা নিচু করিয়া দড়ির টানে ধীরে ধীরে পা ফেলিয়া চলে। কিছুক্ষণ পরে পরই মাটিতে উপুড় হইয়া পড়িয়া খুঁকিতে থাকে— নীলমণি তখন দডি ধরিয়া পাড়ায়। ধমক মারিলে সে একবার আছ করিম মাটিতে গড়াগড়ি দিয়া উঠিয়া পাড়ায় নীলমণির বাপ আবার চলিতে শুরু করে। এক একদিন খেলা বেশ মে, অনেক নােগার হয়। নীলমণির উপরে তার বাপ সেদিন খুব খুশী। তাকে একটা উইমের ঢিপির কাছে ছাড়িয়া দেয়। নীলমণি চিৰি ভাঙ্গিয়া মাটি খুড়িয়া উইয়ের বাসা উজার কয়িরা খায়। পাখ-ষ্ঠা উইলা উড়িয়া যায়শীলমণি বৃথা আালন নীলমণির স্বর্গলাভ করে, নীলমণির বাপ কত কতক ধরিয়া নীলমণি মুখের কাছে ফেলিয়া দেয়। সে দেখিতে দেখিতে সব খাইয়া ফেলে। কিন্তু সবদিন সমান খেলা জোটে না, গায়ের লােক গরীব, প্রতিদিন খেলা দেখিবে কেমন করিয়া। যেদিন সারা দিন ঘুরিয়া কিছু লোটে না, নীলমণির বাপ নীলমণির উপরে রাগ করে। উইয়ের ঢিবির পাশ দিয়া গেলেও তাহার উই খাওয়া হয় না। নীলমণি বাপের দৃষ্টি আকর্ষণ করিবার উদ্দেশ্যে দড়িতে একটু টান দেয়-নীলমণির বাপ তার চেয়ে জোর টান দিয়া দুইজনে অগ্রসর হইয়া যায়। এই ভালুক আর ভালুকওয়ালা ও অঞ্চলের লােকের অতি পরিচিত। সাওতাল পরগণায় জয়ন্তী নদীর ধারে পাহাড়ী গ্রামে নীলমণির বাপের বাস। পূজার সময় হইতে সাৱা শীতকাল তাহার নােগারের মরশুম। কাছেই হােট একটা সহর। এই সময়টাতে সহরের শূ বাড়ীগুলি স্থান্বেষীর ভিডে ভরিয়া যায়। নীলমণিকে লইয়া লােটা তখন বেশ দুপয়সা নােজগার করে। ওই কয় মাসের নােজগারে তাহার সারাবছর চলিয়া যায়। নীলমণির বাপকে একেবারে অবিবেচক বলা চলে না—যার জন্যে তার এত রােজগার তাকে খাতির করিয়া চলে। বড় বড় শাদা কড়ির মােটা মালা নীলমণির গলায় পরাইয়া দেয়, মালার মাঝখানে ছােট একটা ঘুটি দোলাইয়া দিতেও জে না, আর সাজিমাটি দিয়া তাহার লােমগুলি পরিষ্কার করিয়া ধুইয়া কাঠের কাই দিয়া আঁচড়াইয়া দেয়। নিজের বেশভূষাতেও একটু পারিপাট্য করে। মাথার পাগড়িটা কাচিয়া নূতন করিয়া বাঁধে, হাতকাটা কালাে কতুয়ার উপরে লাল-নীল পাথরের মালা পরিয়া নেয়। নীলমণির বাপ সাজ বদলাইতে বলাইতে ভাৰে-ভেক না হইলে কি ভিল মেলে।
ও ভালুক-ওয়ালা এদিকে এসে। আচিরে যে বড় বাড়ীটা থেকে এৰু বাৰু ভাক দেয়। নীলমণির বাপ গেট দিয়া ঢুকিতে ঢুকিতে ভাবে বাবু এখানে নূতন, আমার নাম জানেন না। বাস্তবিক ভাই। কলিকাতা অঞ্চল হইতে পূজার সময়ে মেদবহুল যেসব ব্যক্তি এখানে স্বাস্থ্য- পরিবর্তনের জন্য আসে-এ বাবু তাহাদের অন্যতম। নীলমণির বাপ প্রবেশ করিয়া একটা সেলাম করিয়া দাড়ায়। বাবু বান—খেলা দেখাও, কত নেবে। সে হাসিয়া বলে—হুজুরের কাছে আর বেশি কি চাইব, পাঁচ সিকে পয়সা দেবেন। পাঁচ সিকে অবশেষে এক টাকায় রফা হইলে নীলমণির বাপ ভুগডুগি বাজাইতে শুরু করে—অমনি মহুয়া গাছের তলাটা ছেলেমেয়ে এবং জনতায় ভরিয়া যায়। তখন ভালুকওয়ালা নীলমণির দড়িতে একটা টান দেয়। নীলমণির চমক ভাঙে। এতক্ষণ সে নাসারন্ধু বিদাৰিত করিয়া অতি পরিচিত একটা গন্ধ গ্রহণ করিবার চেষ্টা করিতেছিল। মহুয়া গাছের গন্ধ। তাহার মনের মধ্যে বসন্তকালের কুয়াশার মতাে অস্পষ্ট একটা অনুভূতি জমিয়া উঠিতেছিল—মহা গাছ-মহল্লার ফুল-নীল পাহাড়ের কাছে ঘন অরণ্য- যার তলা দিয়া প্রবাহিত মহিষাসুরের মূণ্ডের মতাে কালাে পাথর বাহির হওয়া স্বচ্ছ ধারার নদী। কিন্তু এভাৰ বেশিক্ষণ থাকিতে পারে না। তাহাৰ কানে প্রবেশ করে নীলমণি বড় বাবুকে সেলাম করাে, এই ৰলিয়া একখানা কাটি নীলমণি নখে গুজিয়া দেয়। নীলমণি খাড়া নীলমণির স্বর্গলাভ হইয়া উঠিয়া খানিকটা অগ্রসর হইয়া মােটা বাবুটিকে উদ্দেশ করিয়া লাঠিখানা মাথায় ঠেকায়। নীলমণি বাবুদের আয়তন বিচার করিয়া বড়বাবু, ছােটবাৰু চিনিতে শিখিয়াছে। বড়বাবু খুসী হইয়া একটা সিকি দুভিয়া দেন, তাহার ইচ্ছা করে সিকিটা কামড়াইয়া চূর্ণ বিচুর্ণ করিয়া ফলে কিন্তু তখনই মনে পড়ে তাহা হইলে আজ আর উইনের টিপি খুড়িয়া খাওয়ার সুযােগ মিলিবে না। নীলমণির বাবা আবার বলে-নীলমণি বউ কি করে শ্বশুর বাড়ী যায় দেখাও তত বাবা। রাণী মা শাড়ী দেবেন। নীলমণি খাড়া হইয়া উঠিয়া ধীরমন্থরগতিতে চলিতে সুরু করে পিতৃগৃহত্যাগ করিয়া যাইতে বধূর পা যেন চলিতেছেই না। নীলমণির বাপ হকে—আচ্ছা, নীলমণি এবারে দেখাও তাে মেয়ে কি করে বাপের বাড়ী আসে। নীলমণি অমনি দ্রুতপায়ে তাড়াতাডি চলিতে থাকে। দর্শকগণ উচ্চৈস্বরে হাসি ওঠে। হঠাৎ নীলমণি উপুড হইয়া পড়িয়া ধুকিতে থাকে। সকলে বলিয়া ওঠে ভালুকের আর আসিছে। ছেলেমেয়েরা সাহস পাইয়া কাছে আসিয়া দাড়ায়। বারান্দা হইতে রাণী মা নীলমণির বাপকে বলিয়া পাঠান।—ভালুকের গায়ের কয়েকটা লােম চাইজরের ধন্বন্তরি ঔষধ। পয়সার লােভে ভালুকওয়ালা নীলমণির ললাম টানিয়া ছিড়িয়া পাঠাইয়া দেয়। কিন্তু নীলমণি ব্যাপারটা কিছুই বুঝিতে পারে না। আর আবার কি? তাহার প্রভুকে মাঝে মাঝে কয়েকদিন বিছানায় পড়িয়া থাকিতে দেখিয়াছে, তাহাই কি অর? কিন্তু তাহার হইতে যাইবে কেন? সে নিস্তেজ হইয়া পড়িয়া অতীত জীবনের কথা ভাবিতে থাকে। স্বপ্নের কিনী কুয়াশার মতাে অস্পষ্ট অথচ সজীৰ একমার ছবি তাহার চোখের সমূখ দিয়া আলিয়া যায়। এক দিনের কথা মনে পড়ে, সে তখন ছােট, একটা শিয়ালের বাচ্চার চেয়ে বড় হইবে না, আর পিছনে পিছনে যাইতেছিল, এমন সময়ে একটা শিনে তাহাকে তাড়া করে। সে নিরুপায় হইয়া মাকে আহ্বান করিল, মা কয়েক ধাপ আগে ছিল। তারপরে যা কাণ্ড! মা যে এত ছুটিতে পারে—সেকি গেও জনিত! খাড়া হইয়া দাড়াইয়া, দাত বাহির করিয়া সে কি তাড! বেচারা শিয়াল বেগতিক দেখিয়া একটা গাছে উঠিয়া পড়িল। সেই হইল তাহার কাল। নীলমণির মা সােজা গাছে উঠিয়া শিয়ালটাকে ধরিল—দুটা জড়াজড়ি করিয়া নীচে পড়িয়া গেল। কিছুক্ষণ পরে শিয়ালটার ছিন্ন ভিন্ন দেহখণ্ড ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট রহিল না। সে আজ কতদিনের কথা। কোথায় সে বন, মহুয়ার ফুলের নেশায় যাহার সমস্ত মুখ কিংশুক বর্ণে রক্তিম ? কোথায় সেই পাহাড়, রাত্রে যেখানে শুকনাে ঘাস আগুনে জ্বলে-আর দিনে যেখানে শিমূল আর পলাশে লাল? আর তাহার মনে পড়ে শীতের শেষে বনের মধ্যে ঝরাপাতার উপর দিয়া সে চলিত, মচমচ, শব্দ হইত, প্রত্যেক পদক্ষেপেই শঙ্কা হইত পিছনে যেন কে আছে! মুখ ফিরাইয়া দেখিত কেহ নাই, নিজের পায়ের শব্দ বুঝিয়া হাসিত। ভালুকের আবার হাসি ? আচ্ছা মানুষগুলা এ নির্বোধ কেন? তাহারা ভাবে হাসি কান্নায় তাহাদের ছাড়া আর কাহারাে অধিকার নাই। নির্বোধ ভালুকের মনের কথা বুঝিবে কি প্রকারে ? আর নির্বোধ নয় তাে কি? নতুবা তাহার চলাগে দেখি এত আনন্দ পায় কেন ? তাহার প্রভুকে এত পয়সা দেয় কেন? দেয় মন্দ নয়, তাহার প্রভু খুসী হয়, প্রভু খুশী হইলে তাহারও আহার জোটে ভাল। কিন্তু আর নয়। এখনি প্রভু খোচা দিবে। নীলমণির বাপ বলে-ওঠা, বাপ, এ।
নীলমশিন লাভ নীলমণি গড় দিয়া ঠে। সেদিনের মতাে খেল না করিয়া এছু পয়সা, কাপড় লইয়া নীলমণি ৰাপ নীলমণিকে টানিয়া লইয়া প্রস্থান করে। ছেলেরা কি পৰ্যন্ত পিছনে পিছনে আসে—কিন্তু পাড়ার কুকুরগুলাে কিছুতেই স ছাড়িতে চায় না-ঘেউ ঘেউ, রবে বিরক্ত করিতে থাকে। প্রভু যদি একবার ছাড়িয়া দিত, নীলমণি কুকুর- গুলাকে সেই শিয়ালের অবস্থা করিয়াছাড়িত। ‘ডুগ, দুগ, দুগ। ডুগডুগি বালাইতে বাজাইতে নীলমশির বাপ নীলমণিকে লইয়া জয়ী নদীর হাঁটু জল পার হইয়া গ্রামান্তরে চলিয়া যায়। জয়তী নদীর ধারে পাহাড়ী গ্রামে নীলমণির বাপের বাস ইহা আগেই বলিছি। এমখানি ছোট। গােয়ালা জাতীয় লােকের বাস। আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, আতা গাছের সঙ্গে সরু সরু বাঁশের ঝাড়ও আছে। গ্রামের এক পাশে নীলমণির বাপের বাড়ী। মাটির দেয়ালে খডের ছাউনি। এক সময়ে তাহার গােটা দুই গােৰু ছিল, এখন সেই গােয়াল ঘরে নীলমণি থাকে। নীলমণির বাপ নীলমণি লইয়া সফৱে ৰাহির হয়, এক সঙ্গে দশ বারাে দিন বাড়ী-ছাড়া থাকে—ফলে তাহার বাড়ী-ঘর ক্রমে হত হইয়া পড়িতেছে। তাহার আর কেহ নাই। বাড়ীর নীচেই জয়ন্তী নদী। ৰালি আর পাথরের একদিকে ক্ষীণ স্বচ্ছ জলের ধারা, কিন্তু হঠাৎ যেদিন বা আলে, কোথা হইতে গেরুয়া জলের অ নদী ও নদীর কুল দুৰাই দিয়া গ্রামখানিকে লােপ করিয়া দিতে চায়। নীলমণির বাপের বাড়ীর মধ্যে জল ঢুকি পড়ে, ৭৮ গকিনী নীলমণি ঘরের চালে গিয়া আশ্রয় লইয়া শঙ্কিত-চিত্তে জলের প্রচেষ্টা দেখিতে থাকে। এমনি এক বন্যার মুখে ভাসিতে ভাসিতে সে এই গ্রামে আসিয়া ঠেকিয়াছিল। সে আজ অনেক দিনের কথা। তখন সে শিশু। আর কিছু তাহার মনে পড়ে না। তাহার প্রভু তাহাকে ধরিয়া আনিয়া নিজের বাড়ীতে রাখে। গলায় ও নাকে দড়ি পরাইয়া দেয়। একটু বড় হইলে তাহাকে নানারকম খেলা শিখাইতে আরম্ভ করে। প্রথম প্রথম সে খুব মার খাইত। এ সব কথা তার বেশ মনে পড়ে। এখন আর মার খাইতে হয় না। সব খেলা শিখিয়া লইয়াছে। ছুটির দিনে সে বাড়ীর উঠানে বসিয়া থাকে। সমুখে নদী। নদীর ওপারে মাঠক্রমে উচু হইয়া দিগন্তের দিকে চলিয়া গিয়াছে—সেখানে নীল রঙের একটা পাহাড়। মাঠের মধ্যে এখানে ওখানে শাল, খেজুরের বন, দুরে দুরে ছােট গ্রাম—এপার হইতে আকাশের গায়ে প্রলম্বিত চিত্রপটের মতাে দেখায়। নীলমণি চুপ করিয়া বসিয়া এই ছবি দেখে আর ওই পাহাড়টাকে ভাবে তাহারি মতাে একটা কালাে ভালুক—কেবল আকার কিছু বলাে। ওটারও কি এমনি প্রভু আছে? নিশ্চয়ই আছে। নতুবা কাহার ভয়ে সে একস্থানে নিশ্চল হইয়া পড়িয়া আছে ? আর ওই বনটা? ওখানে হাওয়া যায় না? ওখানে নিশ্চয় মহুয়া গাছের আর অন্ত নাই। নীলমণি ভাবে একবার ওখানে যাইতে পারিলে খুব মজা হয়, আর লােকালয়ে ফিরিবে না। মহুয়া গাছের তলে তলে, শাল বনের ছায়ায় ছায়ায়, ঝরা পাতার উপরে মচমচানি শব্দ তুলিয়া সে সারাদিন কেবল উইয়ের ঢিবি খুজিয়া বেড়াইবে। আঃ একবার যদি কেবল ছাড়া পাওয়া যায়। নীলমণির বাপ সেদিন যেন কোথায় গিয়াছে। রাত্রে ফিলি । সারারাত্রি অবিমি বই পড়িল। ফান মাসে এমন রুষ্ট কখনও নীলমণির লাভ ৭ হয় না। নীলমণি সমস্ত রাত্রি গােয়ালঘরে বসিয়া বসির ভিজিল। সকাল বেলাতেও বৃষ্টি থামিল না। এমন সময়ে একটা হৈ হৈ রৈ রৈ শৰ উঠিল। বন্যা আসিতেছে। জলের শব্দ আর তার সঙ্গে মানুষের আর্ভরদুইয়ে মিলিয়া সে এক আতঙ্কজনক কোলাহল। গায়ের লােকেরা যে বাহার গােৰুবাছুর, স্ত্রী-পুত্র লইয়া উচু ডাঙ্গার দিকে ছুটিল। নীলমণির কথা কাহারাে মনে পড়িল না। তাহার প্রভু বাড়ী- ছাড়া। অল্পক্ষণের মধ্যেই প্রবল বন্যার মূখে নীলমণি ভাসিয়া চলিল। দুই একবার সাঁতার দিবার চেষ্টা করিল। কিন্তু শেষে গা ছাড়িয়া দিয়া অনিবাৰ্য্যের স্রোতে ভাসিয়া চলিল—অবশেষে এক সময়ে তাহার জ্ঞান লুপ্ত হইয়া গেল। তারপরে যে কি হইল—নীলমণি আর জানে না। । নীলমণির জ্ঞান হইলে দেখিল সে এ কোথায় আসিয়া পড়িয়াছে ? একি বাস্তব না তাহারি বহুদিনের কনা? বনপাল, মহুয়া, হরিতকির বনস্পতি। মাটিতে শুকনা পাতার সুব্য আস্তরণ বিছানাে। পাতাঝরা শাল গাছের কালঙলা সারি সারি দণ্ডায়মান। মহুয়ার গাছে অজস্র শাদা শাদা, গােল গােল, নধর মহুয়ার ফুল, শ্যামল পাতার ফাকে ফাকে বনদেবীদের নােলকের ফুল মুক্তার মতাে বাতাসে দুলিতেছে। পাশেই ছােট্ট একটুখানি নদী, অলের নীচের মাছগুলার প্রত্যেক গতিবিধি দেখা যায়। ও পারে পলাশে শিমূলে বাঙা। বনের মধ্যে যতদূর দৃষ্টি চলে উইয়ের ঢিবির সারি। হরিতকির শাখায় শাখায় মধুর চাক। প্রথমে প্রথমে তাহার ভয় হইত এ বুঝি এখুনি আসিয়া পড়িবে কিন্তু সে ভয়ও কমে তাহার কাটিয়া গেল। আর আলিলেই গকিনী বা তাহাকে চিনিৰে কেন কফি? বঙ্গায় তােড়ে তাহার দড়ি, গলার মালা সৰ কোথায় পশ্চিমা গিয়াছে। নীথি একবার মনেই হইল সে বাচি না করিয়া আর কোন পৃথিবীতে আসিয়া পড়িয়াছে? একদিন ঘুম হইতে পরিচিত গন্ধ পাইয়া জাগিয়া উঠিল- তাহার চারদিকে এক পাল জানুকতাকে ঘিলিয়া দাড়াইয়া গন্ধ কিয়া তাহার পরিচয় লইবার চেষ্টা করিতেছে। নীলমণি ভাৰিল ইহাৱা কি জীবিত না তাহার মতই সৰিয়া ৰ্গে আসিয়াছে? সে আর কিছু না বলিয়া উঠিয়া দাড়াইল এবং তাহাদের দলে মিলিয়া চলিতে সুরু করি। তাহারা এক হরিতকি বনের মধ্যে প্রবেশ করিল। সেখানে অনেক গুলি মৌচাক ছিল। গােটা দুই ভালুক গাছে চড়িয়া কয়েকটা মৌচাক ভাঙ্গিয়া ফেলিয়া দিল। তখন সকলে মিলিয়া সেই-চাকগুলি চুষিয়া খাইল-নীলমণিও একটা খাইল। তারপরে তাহারা মহুয়া গাছের তলে গিয়া ঝরা হয়াৰ ফুৰ পেট ভরিয়া খাইল। তখন সকলের মাথায় মধুর আর মহুয়ার নেশাচড়িয়াছে। তাহারা বনের মধ্যে মধ্যে বৃত্তাকারে দাড়াইয়া নাচিতে করিল-পায়ের তলার শুকনােপাতা নাচের তালে তালে ঝার দিতে লালিল। নীলমণির এবার নিসি বিশ্বাস হইল সে মরিয়া স্বর্গে আসিয়াছে—যা ছাড়া এত সুখ কোথায়? স্বর্গ সুখ ভােগ করিতে করিতে এক একবার প্রভুর কথা তাহার মনে পড়িয়া যাইত। এমনি এখানে আসিলে তাহাকে একবার তাহার ঐটা দেখাইয়া দিত। কিন্তু তখনি আবার মনে পড়িয়া যাইত এ মরিলে ততা এখানে আসিতে পারিবে না—সে মায়ের স্বর্গে যাইৰে—এ যে ভালুকের ঘা। নিজের ঐশ্বৰ্য দেখাইতে পারিবে না বলিয়া তাহার একটু দুখ হইত, নাচের তাল কাটিয়া যাইত, আর সকলে বুঝিতে নীলমণির স্বর্গলাভ পালিত না, সে কেন এমন অন্যমনস্ক হইয়া যায়। তাহারা তাহাকে হলিয়ার করিয়া দিত। নীলমণি সচেতন হইয়া উঠিয়া আবার নাচে যােগ দিত। মহুয়া আর মধুর নেশায় তাহার এই একটি মাত্র দুঃখ ডুবিয়া যাইত। শুকনা পাতা ঝঙ্কার দিত, গাছের পাতা বাতাসে সঙ্গত করিত—এই একটা মাত্র দুঃখকে ডুবাইয়া দিতে এত আয়ােজন আবশ্যক। স্বর্গের সুখের পাত্রও কি তৰে সত্যসত্যই নিৱন্ধ নহে।
ভুপুৰ
[ লেখকের খ্যাতিনাশক একটি একা নাটিকা।
প্রধান চরিত্র
বামী
স্ত্রী
ভূতপূর্ব স্বামী
ব
স্থান-কলিকাতা
কাল—যুদ্ধোত্তর পর্ব
এখন .
[ একটি ড্রয়িং রু। খাত চেয়ার ও সােকা দিয়া সাজানো।
বিস্তৃত বর্ণনার প্রয়োজন নাই। কলিকাতার যে কোন রাস্তা দিয়া
চলিতে চলিতে খোলা বানালা দি বেশ চোখে পড়ে সেই রকম।
কােলে একদিকে একটি ঘড়ি, এদিকে এক বিধু সত
কাহারাে ফটোগ্রাফ কিন্তু নি বুঝিবা উপায় নাইকরণ হদি-
খালার মুখ দেওয়ালের দিকে-টাপিঠ দৃশ্যমান। ঘরটি শূন্য।]
[ বাড়ীৰ ভিতর হইতে একজন ব্যক্তি এবেশ। সেই ব্যক্তি অর্থাৎ
নাট্য ব্যাপারে বানী বলিয়া পরিচিত।]
মীনা, ছবিখানা আবার উল্টিয়ে রাখলে কে? এই গােপাল।
গোপাল ৰা ত্যবাবু।
২৩
ভূতপূর্ব
বামী-ছবিখানা উল্টিয়ে রাখলাে কে?
গােপাল-ভাতে, আমি।
স্বামী তুই রাখতে গেলি কেন? তােকে নিষেধ করিনি। আর
কখখনাে ও ছবিতে তুই হাত দিৰি না। বুলি!
গােপাল-বুঝলাম। তবু ছবি উল্টিয়ে যাবে।
বামী-কেমন করে? না তুই ছৰি ওটা কেমন করে?
গােপাল—আমি তাে ওটাই না।
স্বামী—তবে কেন বললি যে তুই ছবি উল্টিয়েছি।
গােপাল-দোষ হলেই মনিবে ধরে নেয় যে চাকরে করেছে-তাই আগে
থেকেই স্বীকার করে নিলাম।
স্বামী--তবে ছবি ওটালাে কে?
[ স্ত্রী অর্থাৎ পূর্ণিমার প্রবেশ ]
স্বী—ওকে মিছিমিছি ধমকাচ্ছে কেন?
কামীমকাবাে না? ছবি ওন্টালাে কে?
শ্রী—আমি।
স্বামী তুমি! কেন আবার ওন্টাতে গেলে? তােমাকে কতবার নিষেধ
করেছি।
স্ত্রী গােপাল তুই যা।
[ গােপালের প্রস্থান।
উল্টিয়ে করি কি। আমি ও-ছবি দেখতে পারি না।
বামী দেখতে পারে না! কেন? আমার বন্ধুর ছবি, আমার ঘনিষ্ঠতম
বন্ধু ছিল সে-
আমার যে
৮
ডাকিনী
স্বামী-থাক, থাক্।
জী—তুমি যেমন সে কথা শুনতে চাও না, আমিও তেমনি ছবি দেখতে
পারি না।
স্বামী—আমার বন্ধু বলেই না হয় দেখলে
শ্রী—তােম সব পানােতােমরা পুরু। আমরা মেয়েরা পারি না।
অতীতকে যখন আমরা বর্জন করি, নিঃশেষে করি। অতীতের জের
বর্তমানের মধ্যে টেনে চলবার শক্তি আমাদের নেই।
স্বামী—সে তাে মৃত।
স্ত্রী-থাক, থাক, চুপ কৰাে। মানু যায় বলে কি তিও যায়! ফুল
ফেলে দিলেও রুমালে তার গন্ধ থাকে।
স্বামী—সেই গন্ধ বলেই ওই ছবিখানাকে নাও না কেন ?
স্ত্রী-তর্ক করে সব বােঝননা যায় না।
স্বামী—তবে কাজেই প্রবৃত্ত হওয়া যাক।
[ছবিখানা উল্টাইতে প্রবৃত্ত ]
শাড়াও, দাও, আগে আমি যাই।
[ প্রস্থান।
বামী মেয়েমানুষ! মেয়েমানুষ।
[বিন সােলামুখে গন কমিতে সাকি পােৰু পৰিতি
এ দুপুৰ যুবকের চেহাৱনইল ]
ব্রেভ বয়। ডায়েড এ হিরােজ ডেথ।
[ সম্মুখের বার দিয়া এক ব্যক্তি প্রবেশ ]
সেই ব্যক্তি অর্থাৎ বন্ধু কি হে আমলেটের মতাে আপন মনে ছবি-
খানার দিকে তাকিয়ে কি বছ?
ভূতপূর্ব
বামী—বলছি—লুক এ টু পিকচার এও লুক এই দি’
[ দি বলিয়া নিজেকে দেখাইল ]
বন্ধু—সে তােত আমি বলবাে তােমাদের দুজনকে দেখিয়ে—আর পূর্ণিমা
শুনবে।
স্বামী-শুনবে? একবার শােনাতে যেনাে তােমার বান্ধবীকে।
কেন?
স্বামী–পূর্ণিমা ওই ছবিখানা কিছুতেই সহ করতে পারে না। যতবার
আমি সােজা করে রাখি, সে উল্টিয়ে দেয়।
বন্ধু-মরিয়া হবে কী আমার পরে
এমনি করিয়াছ ফলি।
স্বামী—অথচ আমি ওর ছবিখানা ঘর থেকে সরাই কি করে। এমন বন্ধু
আর পাবাে না।
বন্ধু -সে কথা একবার। বেঁচে থাকতে তােমাকে ভালােবাসতে
আর মরবার পরে সব দিয়ে ফেলেছে, বাড়ী ঘর, টাকাকডি
মাম •
স্বামী-থাক, থাক, ওটা আর নাই বললে। পুরুষােম যখন বম।
ক্যাম্পেনে যাত্রা করে, আমার ছােট একখানা ছৰি চেয়ে নিয়েছিল
আর বলেছিল—এ ছবি তােমার বরাবর আমার সঙ্গে থাকবে।
জাপানীদের হাতে পড়ি তাে এই ছবিই পড়বাে। ওদের বলবাে
এ হচ্ছে গিয়ে লর্ড বুজর ছবি। বুভক্ত বলে ছেড়ে দিতে পারে।
কিন্তু আর একটা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সেটা তাে এখনও পালন
করলাে না।
বন্ধু-ও-সেই মৃত্যুর পরে-
মী, মৃত্যুর পরে দেখা দেওয়ার কথা। সে বলেছিল আমার যদি
ডাকিনী
যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যু ঘটে ভােমাকে দেখা দেবে। থিওজফিতে ওর খুব
বিশ্বাস ছিল।
বন্ধু—যত সব কি-
স্বামী—না, না। আমি সেদিন ডক্টর দত্তর কাছে গিয়েছিলাম-বাঙলা
দেশের সব চেয়ে বড় থিওফিষ্ট। তিনি সব শুনে বললেন, থিও
জফিতে বিশ্বাসীর মৃত্যুর পরের কথা তােত কখনাে মিথ্যা হয় না।
তার মৃত্যু সংবাদ মিথ্যা। আমি মিলিটারী বিভাগের নিজস্ব সংবাদ
দেখালাম। তিনি শুনে বললেন—প্রবলেমটা আমি ভেবে দেখবাে
আজ তার কাছে যাবার কথা আছে। চলাে না।
বন্ধু-পূর্ণিমাও কি সঙ্গে যাবে?
স্বামী- হাঁ, তাকে অনেক বলে করে রাজি করেছি।
বন্ধু-চলাে জীবনে অনেক অফি’ দেখেছি, এবারে থিওজফি দেখে আসি।
কিন্তু ডক্টর দত্তর কথাই সত্যি। থিওজফিষ্টদের মৃত্যুর পরের কথাই
মিথ্যা হয় না।
বামী—তার মানে?
বন্ধুত্যুর আগের কথা সময়ে তিনি কোন নিশ্চয়তা দেন নি।
স্বামী—তুমি চিরকালই ‘সিনিক’ থেকে গেলে। এ হচ্ছে বিয়ে না
করবার ফল
বন্ধু—সবাই বিয়ে করলে পরকীয়াসাধনা করবে কে?
বামী—কীয়া থাকলে তবে তােত পরকীয়ার মর্ম বােঝা যায়।
বন্ধু কোন কোন সৌভাগ্যবানের অদৃষ্টে একদেহে পরকীয়া সুকীয়ার
মিলন ঘটে।
বামী-আঃ চুপ করে। চলে যাওয়া যাক। পূর্ণিমা! আমরা আসছি।
[ দুনের ভিতরের দিকে প্রস্থান।]
ভূতপূর্ব
৮৭
[ ঘর নির্জন হল কিন্তু শূ হইল । বিকালের আলাে তেহা-
তাৰে নালা দিয়া আসিয়া মেঝেতে পড়িয়া লােহার শিকের কালাে
ডােয়-টাকা লেয়ার গেম বিছাইয়া জিল। ঘড়ির কাঁটা দুটা
মুখােৰ বৃক্ষে আঙ্গুলের মতো প্রত্যেকটি মুটিকে বাজাইয়া
লইতে লাগিল। আর নির্মল বা নিস্তব্ধ বাদ্যযন্ত্রের নীরবতা লইয়া
পড়িয়া তুলি। অন্ধকার আর একটু ঘনাইয়া আসিলে গোপাল ও
তাহার সহ পাশের বাড়ির এক ভৃত্য প্রবেশ করিল।
গােপালনে একটা সিগারেট খা।
রাখাল (পাশের বাড়ীর কৃত্য -এ যে দামী জিনিষ।
গােপাল-তুই কি ভাবছিস। বাবুরা কি ফেসে জিনিস খেতে পারে?
রাখাল-তাের বেড়ে চাকরি ভাই।
গােপাল—চাকরি ফল নয়, কিন্তু থাকতে ইচ্ছে নেই।
রাখালকেন, এমন মুখের চাকরি ছাড়বি কেন?
গােপানু কি জানি ভাই, কত-গিন্নির ভাব বড ভাল নয়।
রাখাকেন?
গােপাল-এই যে ছবিখানা দেখছিল-এই নিয়েই যত গণ্ডগােল। বাবু
ছবিখানার দিকে হা করে তাকিয়ে বিভৰিত ক'রে বকে। আবার
গিন্ধি-মা ছবিখানার দিকে তাকিয়ে চোখের জলে বুক ভাসিয়ে দেয়।
রাখলবি কার ?
গােপাল—কি জানি কার। বাবু রাখে সােজা করে। মা দেয় উল্টিয়ে।
আর দু’জনেই আমাকে বকে কেন তুই উল্টিয়ে রাখলি, কেন তুই
সােলা করে রাখলি।
রাখাল—এ যে মিলিটারি লােক। যুদ্ধে গিয়েছে, বেচে আছে না মা
গিয়েছে।
bob
ডাকিনী
গােপাল—কি জানি! আমি আবার রাত্রে এই ঘরে শুই-ভয় হস
কখন ভূত হয়ে এসে চেপে ধরে!
রাখাল—ধরে তাে তাের কতগিন্নিকে ধরবে, চাকর-বাকরকে ধরতে
যাবে কেন? ভূতের নজর মানুষের নজরের চেয়ে উচু।
গােপাল ভাই, দে একটা চাকরি খুলে।
রাখাল-চাকরির তাে অভাব ছিল না—যু থেমেই যত গােল বাধিয়েছে।
যুদ্ধ আর কিছুদিন চললে লােকগুলােকে একবার দেখে নিতাম।
গােপাল-ওই বুঝি বাবুরা এলােচল।
[ দুইজনের এহান। বাহিরে যায় খুলিয়া দিতে বাৰী, ৰী ও বন্ধু
এবে।]
বামী—কেমন ইমপ্রেসড হয়েছ কি না—ডক্টর দত্তকে দেখে?
বন্ধু-হ, লােকটা ট্যালেন্টেড বটে—তাতে সন্দেহ নেই।
স্বামী-ট্যালেন্টেড! কত বড় স্পিরিচুয়ালিষ্ট দেখলে না! হিমালয়ের
গুহায় যে সব মহাপুরুষ থাকেন, তাঁদের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা চলে।
বন্ধু প্রমাণ অবশ্য নেই।
শ্রী-আবার প্রমাণ কাকে বলে? আপনার সামনেই তাে ধ্যান
হলেন-অমনি মুখ দিয়ে কত জ্ঞানের কথা বেরুতে লাগলাে।
--ওকে কি প্রমাণ বলে?
এ -শুনলেন না যে মৃত ব্যক্তিদের সঙ্গে ওঁর নিয়ত আলাপ-আলােচনা
চলে। কয়েকদিন আগে লর্ড কিচনায় এসেছিলেন, তিনি বলে
গেলেন কোন ভয় নেই, মিত্রপক্ষের জয় অবশৰী।
বামী-অত কথায় কাজ কি? পুরুষােত্তম সম্বন্ধে কি বললেন, এই
মধ্যে ভুলে গেলে?
খ্রী—তিনি বললেন যে, উনি কাল রাত্রে ওঁকে দেখা দিয়ে বলে গিয়েছেন
যে, উনি সেভে গেন’-এ অাছেন। আমরা তাঁকে ভালেই দেখা
দেবেন।
বন্ধু—তারও তাে প্রমাণ আবশ্যক।
বামী-প্রমাণ তােত আমাদের হাতেই। এসাে না এই নির্জন ঘরে বসে
তিনজনে তন্ময় হয়ে তার কথা ভাবা যাক। অবশ্য দেখা দেবে।
বন্ধু—মন কি, দেখাই যাক না কি হয় !
[ তখন দরজা বন্ধ করিয়া দিয়া ঘরের আলাে নিভাইয়া দিয়া খোকা
জানালার কাছে বসিয়া বাহিরের দিকে তাকাইয়া পুরুষােভ বা ৰা'র
ফটাগ্রাফ তাহার কথা ভাবিতে করিল
স্বামী-উহু, চোখ বুজতে হবে। একেবারে তন্ময় হয়ে যাওয়া চাই
অন্য কথা ভাবলে চলবে না।
[ সকলে চোখ বুজিয়া ৰীৰ)
অ—আমি যেন সেভে প্লেনের আভাস পাচ্ছি।
স্বামী-ডর দত্ত সত্যিই বলেছেন যে, মেয়েদের তন্মষ হবার শক্তি বেশী।
বন্ধু-সেভে প্লেন কি রকম?
শ্রী—অনেকটা হুঁচি কুমড়াের মতাে।
[ আবার সকলে সীৰ ]
স্বামী-না, আমি ‘ফিফথ, প্লেনের বেশ কিছুতেই উঠতে পারছি না
বন্ধু—সেটা আবার কি রকম?
বামী—অনেকটা নালি গুড়ের মতাে। তােমার কিছু মনে হচ্ছে না?
বন্ধু আমার কেবলি ধোকার ডালনার কথা মনে পড়ছে।
বামী—এটা সেকেণ্ড প্লেন!
[ আবার সকলের মুহিত বতা]
[ হঠাৎ চোখ খুলিয়া জানালার দিকে তাকাইয়া চমকিয়া উঠিল ।
জকিনী
স্বীও কে। ও কে ?
বন্ধু ও স্বামী-একি! একি! বলেছিলাম থিওজফি মিথ্যা হতে পারে
। এসেছে! এসেছে!
[জানালার বাহিৰে জীপালােকে পুরুষােঙ মায়া-সাময়িক
পােৰাকে যেন ছবিতে আছে।]
স্বামীকোন্ প্লেনে ছিলে ভাই?
পুরুষােত্তম-শিঙাপুরে।
স্বামী-না, না, তার পরে?
পুরুষােত্তম-ওখানেই বরাবর ছিলাম।
স্বামী-আমরা স্পিরিচুয়্যাল প্লেনের কথা বলছি—অর্থাৎ মৃত্যুর পরে।
পুরুষােম-(হাসিয়া উঠিয়া) গবর্ণমেন্ট ভুল খবর দিয়েছিল আমি
মরিনি। পূণিমাকে বিধবার বেশে দেখবৰ আশঙ্কা করেছিলাম
শাখশাড়ি না ছেড়ে ভালই করেছে! আগে দরজা খুলে
দাও।
স্ত্রী-মা-গগা! (বলিয়া মূৰ্ছিত হইয়া পড়িয়া গেল।)
স্বামী-পুরুষােম তুমি বেঁচে! কি সর্বনাশ!
বন্ধু-না, থিওজফি কখনাে মিথ্যা হতে পারে না। দেখা মিললাে শেষ
পর্যন্ত।
[ বছু উঠিয়া জৱা খুলিয়া দিল—যােত ঘরে প্রবেশ করিয়া
বলিল-]
পুরুষােম—তিন বৎসর পরে বাড়িতে ফিরলাম—হােম সুইট হােম।
বন্ধুইনডী ! সুইটনেস অব এ সুগাৰ কোটেড পিল।
[ সকলে নির্বাক, বি
দ্বিতীয় তৃ
[ বন্ধুর বাড়ির ড্রয়িং রুম। বহু পুরুষােভ অর্থাৎ ভূতপূর্ব স্বামী এবং
তার উকিল)
ভূতপূর্ব স্বামী-আই ওয়ান্ট মাই আই ব্যাক। দ্যাট ইজ পজিটিভ।
আইনের সাহায্যে হয় উত্তম, নতুবা আমি আইন লম্বন করতে দ্বিধা
করবে না। গত তিন বছর ধরে খুন করবার শিক্ষা পেয়েছি, খুন
করবার জন্য উৎসাহ পেরেছি-এই যে আমার বুকে রঙীন ফিতে
দেখছেন, জানেন এ কিসের জন্য? জলের মধ্যে হঠাৎ তিনজন
জাপানীকে দেখতে পেলাম। তারা আমাকে দেখতে পাবার আগেই
আমি তিনজনকে সাবাড় করে দিলাম। তাই পুরস্কার এই ফিতে।
এতদিন পরের রাজ ফিরে পাবার জ েলভেছি—এবারে দরকার
হ'লে নিজের স্ত্রীকে ফিরে পাবার জন্যে লড়বে।
উকিল-কিন্তু সেটা বেআইনী।
ভূতপূর্ব—বে-আইনী! শহরে ব'সে আপনার আইনের এক মূর্তি
দেখেছেন। আমরা জলে জলে ঘুরে অজুলে-আইন শিখেছি।
সেখানে প্রাণ বাঁচাতে গেলে হত্যা, আশ্রয় নিতে গেলে হত্যা, খাত
সংগ্রহ করতে গেলে হত্যা! সে অভ্যাস কি এত সহজে ভুলতে পারি।
উকি কিন্তু তার প্রয়ােজন হবে না। আইনসঙ্গত উপাৰেই আপনি
আপনার স্ত্রীকে ফিরে পেতে পারেন।
ভূতপূর্ব—আচ্ছা উকিলবাবু, আতরক্ষা বিধান প্রয়ােগ করা চলে না?
উকিল-সে মকরধ্বজের যে কিসে প্রয়ােগ চলে না তা জানি না। কিন্তু
অত উৎকট ঔষধের দরকার হবে না। আপনার স্ত্রীর দ্বিতীয় বিবাহ
সিভি-এ্যাক্ট অনুসারে হয়েছে। এখন আপনি ফিরে এসেছেন
এই এাউণ্ডেই পরের বিবাহ বাতিল হয়ে যাবে।
ডাকিনী
ভূতপূর্ব—তার দ্বিতীয় পক্ষের স্বামী যদি ‘কনটেষ্ট করে।
উকিল-মামলা চলবে, কিন্তু আপনি জিতবেন নিশ্চয়।
বন্ধু—কিন্তু স্ত্রী যদি আপত্তি করে ?
উকিল-তাতে তিতােস পেতে বাধ্য হবে না। অৰত এর সঙ্গে ঘরকরা
-করা তাঁর ইচ্ছা।
ব—এমক্ষেত্রে স্ত্রীর মতামত একবার নেওয়া দরকার।
ভূতপূর্ব-কেন আমি জাপানীদের হাতে মরলাম না!
বন্ধু—তাতে ঘটনায় জটিলতা কমে যেত, কিন্তু আপনার কোন লাভ
হ’ত মনে হয় না।
ভূতপূর্ব--আর এতেই আমার কি লাভ হল?
বন্ধু-ক্ষতিই বা কি হল? আপনার বাড়ি-ঘর টাকাকডি সবই তো
ফিরে পেয়েছেন।
ভূতপূর্ব—কিন্তু স্ত্রী।
উকি—আর একটি বিয়ে করুন।
বন্ধু—কিন্তু আমার পরামর্শ যদি শােনেন, তবে আর বিয়ে করবেন না।
ভূতপূর্ব-কেন?
বন্ধু—এক কলসী জল মাথায় বহন করলে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘাড়ে ব্যথা
ধরে যায়—কিন্তু এক সমুদ্র জলে ডুব দিন—কোন ভার নেই।
বিবাহ এক কলসী জল; বন্ধুত্ব অগাধ সমূ-তাতে ভাৱ নেই,
দায়িত্ব নেই—আছে অবাধ বিহারের মুক্তির আনন্দ।
পূর্ব-তাই বুঝি আপনি বিবাহ করেন নি?
ব—ঠিক ধরেছেন।
ভূতপূর্ব-কিন্তু সমুদ্র আপনাকে চিরকাল বিহারের অধিকার দেবে
ভূতপূর্ব বন্ধু-এক সমুদ্র না দেয়, আর এক সমূলে চলে যান। জানেন তাে সমুদ্র সাতটা, পৃথিবীর নানা আনাই জলময়। ভূতপূর্ব—আপনার বন্ধুনীরা তােত চিরকাল অবিবাহিতা থাকবে না ? বন্ধুবনীর অভাব কি? তাছাড়া, এমন ক্ষেত্রে বন্ধুত্ব করুন যেখানে আর বিবাহের আশঙ্কা নেই। ভূতপূর্ব-অর্থাৎ ? বন্ধু—অর্থাৎ পরস্ত্রীকে বনী করুন। ভূতপূর্ব—কিন্তু স্বামী দেবে কেন? বন্ধু-সৰ স্বামী দেবে না। কিন্তু অনেক স্বামীকেই এ বিষয়ে পণ্ডিত দেখবেন—তারা বিপদে অধ ত্যাগ করতে অসম্মত নয়। স্ত্রীকে ঘরে রাখবার জয়ে তার সব খানিকটা তারা পরিত্যাগ করে থাকে। বিশেষ যখন তার স্ত্রী বন্ধুর সঙ্গে ঘুরছে, সে যে নিরি বসে আছে এমন মনে করৰার কারণ নেই, তখন সে অন্য পরস্ত্রীর সঙ্গসুখ ভােগ করছে। ভূতপূর্ব-অ্যাবসার্ড! বন্ধু-মােটই নয়। বর্তমান মেলা-মেশার যুগে সমাজব্যবস্থায় বিৰাহকে রক্ষা করবার এই হচ্ছে গিয়ে একমাত্র উপায়। আমাদের সমাজ যখন গ্রামায়ী ছিল, বিবাহের একনিষ্ঠা তখনকার বস্তু। এখন নগরায়ী সভ্যতা, এখানে অবাধ মেলামেশা, ট্রামে, বাসে, ইলে কলেজে, খেলার মাঠ, সিনেমা-থিয়েটারে, পথের আর অন্ত নেই। এরকম ক্ষেত্রে বিবাহের একটিমাত্র দরজা মানুষের অবাধ চলাচলের পক্ষে যথেষ্ট নয়। মনের সবটুকু তাতে ভরে না। তাই প্রাচীন সংস্কারের দেয়ালে একটা জানালা ফুটিয়ে দেবার প্রয়ােজন হয়েছে। সেই জানালাই হচ্ছে বন্ধুত্ব।
জকিনী ভূতপূর্ব—কিন্তু সতীত্ব? বন্ধু-জানালা দিয়ে চোখ যায়, কিন্তু দেহ যেতে পারে না। ভূতপূর্ব—কিন্তু দেহ যদি চোখকে অনুসরণ করতে চায়? কেউ কেউ জানালা থেকে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করবে- তাই বলে জানালাহীন বাড়ি গজা চলে না। ভূতপূর্ব আপনি বলছেন দেহ-মনের ধর্ম এক নয় ? বন্ধু—আমি বলছি বন্ধুত্ব ও বিবাহের ধর্ম এক নয়। বন্ধুত্বের দেবতা কর্প, বিবাহের দেবতা প্রজাপতি। ভূতপূর্ব—কিন্তু স্ত্রীরাই বা রাজি হবে কেন? বন্ধু—সহজে হবে না, একদিনে হবে না। ঘটনার চাপে হবে, ভাব- বিবর্তনের তাড়নায় হবে। সামাজিক সংস্কার তত সমাজখের চাকার দাগ ছাড়া কিনা। এখন পথ চওড়া হয়েছে, বুখ অনেক, সর্বদা নূতন নূতন দাগ পড়ছে। এর সপত্নীদের সখী মনে করতাে, আর সূর্যমুখী সপত্নীদের দুখে গৃহত্যাগ করেছিল। ভূতপূর্ব কিন্তু কিন্তু আবার কি? ভূতপূর্ব কি আমার স্ত্রীকে আমি যে চাই। বযান, তবে হয় মামলা করুন, নয় খুন করে ফাসি যান। ভূতপূর্ব-দরকার হলে ফাঁসিই যাবে। বন্ধু-সেই মরাই মরবেন-তবে যুদ্ধে মরলেন না কেন? যুদ্ধে মরলে “হিরাে” হতেন—এখানে মরলে খুনে ছাড়া আর কি কেউ ববে না। ভূতপূর্বচলুন উকিলবাবু, পরামর্শ করা যাক। উকিল-চলুন। = = = .
ভূতপূর্ব
ভূতপূর্ব—যান, কিন্তু আমার পরামটাও মনে রাখতে চেষ্টা করবেন।
[ভূতপুর্ব ও উকিলের প্রস্থান।
[বামীর প্রবেশ ]
স্বামী-ফাউণ্ডেলটা গিয়েছে।
বন্ধু-যে ছিল তােমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সে হ’ল স্কাউণ্ডেলী
স্বামী-নষ্ট দুধ টক ছাড়া আর কি হয়?
বন্ধুতার দোষ কি? সরকারী ও সমর্থন করে মরতে পারে নি,
এই তাে?
স্বামী-আমারি বা দোষ কি?
বন্ধু-কেউ তত তােমাকে দোষ দিচ্ছে না।
বামী—এই লােকটা নিয়ে দিচ্ছে।
বন্ধুর মাথা ঘুরছে, সে পৃথিবীটাকে দোলায়মান দেখবেই। পৃথিবী
নড়ছে কিনা তাকে জিজ্ঞাসা করে যার মাথা ঠিক আছে।
স্বামী-বেশ, তােমাকেই জিজ্ঞাসা করছি।
বন্ধুদোষ কারাে নয় ঘটনাচজের ছলনা মাত্র। মানুষের গতিবিধিয়
জটিলতা বেড়ে যাচ্ছে তার ফলে মাঝে মাঝে এমন দু'চারটে অঘটন
ঘটবেই। এসব ব্যাপারকে এ্যাকসিডেন্ট বলে নেওয়া ছাড়া আর
উপায় নেই।
[ ভূতপূর্ব স্বামীর প্রবেশ]।
ভূতপূর্ব-ছডিখানা ফেলে গিয়েছিলাম।
[ স্বামীকে দেখিয়া]
আই খাল কিল ইউ।
স্বামী-আই শ্যাল স্ম্যাশ ইউ।
ভূতপূর্ব-আইখাল নক ইউ।
কিনী স্বামী-আই খাল কিক ইউ। ভূতপূর্ব—আই শ্যাল সেণ্ড ইউ টু হেল। স্বামী-আই শ্যাল.সেও ইউ টু হেভেন দেয়ার আর নন নিউজ পেপার দেনার। ভূতপূর্ব-আই শ্যাল—আই খাল- বন্ধু-আশা করি ভােমাদের ইত্যাদি শব্দের পুজি শেষ হয়েছে। এখন কি করবে বল। কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন জীবের মতাে আচরণ করবে, না বরের মত খুননাখুনি করে মরবে? যদি খুননাখুনি করাই স্থির করে থাকে তবে এই নাও [ এই বলিয়া সে ভিতর হইতে দু হােৱা আনিয়া তাহাদের সম্মুখে ধরিল।] নাও। নিচ্ছ না কেন? ও বন্দুক চাই বুঝি, তাও আছে। আনছি। ভূতপূর্ব আপনার প্রস্তাব কি? বন্ধু'জনে শুনতে রাজি হলে বলতে পারি। বামী-শুনতে আপত্তি কি? বন্ধু-আপনাদের কেসটা হচ্ছে—এর স্ত্রী স্বামীকে মৃত মনে করে আপনাকে বিয়ে করেছেন। এখন ইনি ফিরে এসেছেন। এ অবস্থায় কর্তব্য কি? এই লে? ভূতপূর্ব-এর মধ্যে আবার চিন্তার কি আছে আমি ফিরে এসেছি, আমার জিনিস আমি ফিরে পাবে। বন্ধু জিনিস নয়, মানুষ, তার মন আছে। বামী-আমি পেয়েছি, আমি দেব কেন? বন্ধু তোমাকে সে পেয়েছে কি? যদি সে আর তােমাকে না পেতে
ভূতপূর্ব
চায়? আপনাদের কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে গােক ভেড়া কিম্বা
বিষয়সম্পত্তি নিয়ে যেন আপনারা বিবাদ করছেন। আপনাদের
আর একবার স্মরণ করিয়ে দিই—যাকে নিয়ে কলহ সে বস্তু নয়,
মানুষ, তার মন আছে, তার মতামত আছে।
স্বামী ও ভূতপূর্ব-তারপরে
বন্ধু-তারপরে তিনি যার সঙ্গে ঘর করতে চাইবেন, তাঁর কাছেই থাক
বেন। আইনের বাধ্য হবেন না। যদি তিনি পুরুষােম বাবুর কাছে
থাকতে চান, কোন হাঙ্গামা নেই, তিনি ফিরে আসাতে পরবর্তী বিবাহ
বাতিল হয়ে গিয়েছে। আর যদি তিনি তােমার সঙ্গে থাকতে চান,
তবে আগের বিবাহে একটা ডিভােস নিলেই চলবে।
ভূতপূর্ব-হাউ ইজি-
স্বামী-চমৎকার।
বন্ধু-এখন আপনাদের মত কি?
স্বামী ও ভূতপূর্ব-রাজি।
বন্ধু-তবে আগামীকাল এখানেই এই অভিনব স্বয়ংবর অনুষ্ঠিত হবে।
এবারে চলুন বেনাে যাক! আমি পূর্ণিমাকে নিয়ে একবার
ফিরপােতে যাবাে।
উভয়ে—আর আমরা।
বন্ধু—আপনারা তাে বন্ধু নন, স্বামী মাত্র, অতএব যান সিনেমা টিনেমা
দেখে সানা লাভ করতে চেষ্টা করুন।
ভূতপূর্ব-নট ব্যাড।
বন্ধু ফিলিপ সিডনির অনুকরণে ‘দাই নেসেসিটি ইজ গ্রেটার দ্যান
মাইন’ বলতে পারলাম না বলে দুঃখিত। চিনােনা।
স্বামী-চলল মেট্রোতে। একটা ভালাে ছবি হচ্ছে দেখে আসি।
১৮
ডাকিনী
ভূতপূর্ব-কি ছবি ?
স্বামী-হাউ এন ওয়াজ মাই ভ্যালি।
ভূতপূর্ব-চলাে।
[ সকলের প্রস্থান ]
তৃতীয় দৃ
বন্ধু-আমি তাে নিয়ে গিয়েছি।
বার বাড়ির ড্রয়িং রুম। অপরাহ্ন। স্বামী ও ভূতপূর্ব স্বামী দুইজনে
বসিয়া তাস খেলিতেছে।]
ভূতপূর্ব-না, আর কতক্ষণ তাস খেলা যায়! ওরা কখন আসবে?
স্বামী-কেমন করে বলবাে?
ভূতপূর্ব-দেরি হলে একটা খবর দেওয়া উচিত।
বামী-তাদের তত তাড়া নেই। তারা বেশ জানে আমরা অপেক্ষা
করে থাকবেই।
ভূতপূর্ব—গিয়েছে কোথায় ?
স্বামী-হয়তো কোন প্রদর্শনীতে, নয় কোন পার্টিতে, নয় কোন সিনেমায়
নয় কোন হােটেলে।
ভূতপূর্ব—এমন কি প্রায়ই হয় না কি?
বামী—প্রায়। প্রতিদিন।
ভূতপূর্ব—তবে পূর্ণিমার দেখা পাও কখন?
বামী-মানে একবার। যখন তার বন্ধুর হাত থেকে ছাড়া পায়।
ভূতপূর্ব-বাড়িতে নিয়মিত ফেরে তাে?
বামী-যেরে এবং নিয়মিত বটে। তবে প্রতিদিন
তবে প্রতিদিন নূতন নিয়মে।
ভূতপূর্ব ৯ ভূতপূর্ব—কি রকম? বামী ফিরতে প্রায় অনেক রাত হয়ে যায়-বলবার উপায় নেই। ভূতপূর্ব-কেন? বামী-কেন কি? সে বলবে বিয়ে করেছি বলে কি বন্ধুর সনে দেখা করতে নেই? তুমিও তাে তােমার বন্ধুর সঙ্গে দেখা করাে। ভূতপূর্ব-দ্বামী-স্ত্রীর সম্বন্ধ এই রকম এসে বাড়িয়েছে। যখন আমরা যুদ্ধে যাই, কই তখন তাে এরকম ছিল না? স্বামী-সে কথা ঠিক। এ যুদ্ধকে বােমার যুদ্ধ বলা হয়েছে। বােমার ঘারে কত যুগের পুরাতন বাড়িঘর সব ভেঙে পড়ে নূতন দৃষ্ণ উদঘাটিত হয়ে গিয়েছে। এই যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া মনের মধ্যেও তেমনি বােম- বর্ষণ করেছে, যার ফলে পুরাতন সংস্কারের বা সব ভেঙে ভেঙে পড়ে নূতন জগৎ অবারিত করে দিয়েছে। যুদ্ধের ফলে রাজ্যে রাজ্যে পুরাতন সম্বন্ধ যে ধু বদলে গিয়েছে তা নয়, সামাজিক সম্বন্ধেরও পরিবর্তন হয়েছে। স্বামী-স্ত্রী পিতাপুত্র, ভাইবােন কোন সম্বন্ধই আর আগের ভিত্তিতে অৰিচলিত নেই। এরা যাকে বন্ধুত্ব বলছে, তা ভাবী সম্বন্ধের ভূমিকা ছাড়া আর কিছু নয়। বন্ধুফের পরিণাম স্বামীত্বেও হতে পারে, শক্রতাতেও হতে পারে। ওটা নাে ম্যান ল্যাও। ভূতপূর্ব-কিন্তু পূর্ণিমা ত এমন ছিলাে না? স্বামী-জাপানই কি এমন ছিল? জামানীই কি এমন ছিল? ভূতপূর্ব-রাত্রে ফিরতে দেরি করে? স্বামী-তবে শােনন। একদিন রাতে শুতে যাবার সময়েও পূর্ণিমা এলাে । মনের মধ্যে উদ্বেগ নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। রাত্রে যেন স্বপ্ন দেখছি পাশেই পূর্ণিমা শুয়ে আছে-শাদা থানপরা বিধবায় বেশ।
: ডাকিনী ভাবলাম, এ কি কর হয়? আমি তাে জীবিত, তবে তার বিধবার বেশ কেন ? ঘুম ভেঙে আলাে জালিয়ে দেখি পাশেই শাদা পাশ- বালিশটা পড়ে আছে। তাকেই পূর্ণিমা মনে করেছিলাম। সে তখনাে ফেরেনি। ভূতপূর্ব—কি বিপদ। স্বামী-লােকে স্ত্রীলােকের দুঃখ নিয়ে বাড়াবাড়ি করে—অথচ স্বামীদের দুঃখ যে কত মর্মান্তিক, তা প্রকাশ করবার ভাষা নেই, বলবার লােক নেই, বলতে গেলে লােকে হেসে উড়িয়ে দেবে। বলবে কাপুরুষ। ভূতপূর্ব-এসব কথা তাে ভাবি নি। স্বামী—ভাবােনি বলেই তুমি আমাকে দোষী করেছিলে। পূর্ণিমার স্বামীর উপরে তুমি রাগ করতে পারাে-কিন্তু পূর্ণিমার বন্ধুদের উপরে তােমার রাগ করবার অধিকার নেই। অথচ রাগ করতে হলে ওদের উপরেই করা উচিত, ওদের অধিকারের তুলনায় স্বামীর অধিকার নিতান্ত সঙ্কীর্ণ। [ পাশের ঘরে টেলিফোনের বেল বাজিয়া উঠিল—বামী উঠিয়া গেল ] দেখি ব্যাপার কি ? ভূতপূর্ব-কি সর্বনাশ! এমন হ'লে বন্ধুত্ব ছেড়ে বিবাহ করবে কে? স্বামী—ঠিক বলেছ। যুদ্ধোত্তর যুগের সামাজিক সমাধান হচ্ছে বন্ধুত্ব স্বামীত্ব নয়। ভূতপূর্ব—টেলিফোনের খবর কি? স্বামী–পূর্ণিমার বন্ধু বলল যে একটা বিশেষ কারণে ওদের দেরি হয়ে গেল—এখনি আছে, আমাদের অপেক্ষা করতে বলেছে। ভূতপূর্ব-গিয়েছিল কোথায়?
T
ভূতপূর্ব
স্বামী-প্রাচ্য চিত্রকলার প্রদর্শনীতে।
ভূতপূর্বযুদ্ধ থেকে ফিরে এসে দেখছি পায়ের তলাকার পুরাতন মাটিকে
কে সেন সরিয়ে নিয়েছে। দাড়াতে যাই মহাশূন্যে ঘুরতে ঘুরতে
পডি। পুরাতন পথ, পুরাতন জগৎ, পুরাতন সম্বন্ধ, পুরাতন মাটি
কিছুই নেই—পুরাতনের ধ্বংসস্তুপে নূতনের পথেও অজ্য বাধা।
এর চেরে যে যুদ্ধ চলাই ভালাে ছিল। সে এক নেশায় ছিলাম—
এত চিন্তা করবার অবকাশ ছিল না। এখন নেশা ছুটেছে, চিন্তা
ধরেছে, যে চিন্তার সমাধান নেই। না, পাগল হয়ে যাবাে।
স্বামী–পুরুষােত্তম, মানুষে ছয় বছরে ছয়শ’ বছর অতিক্রম করে
গিয়েছে।
ভূতপূর্ব—কিন্তু কোথায় গিয়েছে। পুরাতন জগতের ধ্বংসস্তুপের তলে
চাপাপড়া মানুষের আতরে নরকের প্রেতের চোখেও জল আসে।
[ বন্ধু ও স্ত্রীর প্রবেশ।]
বন্ধু—এই যে তােমরা অপেক্ষা করছ? বেশ আমি ইচ্ছে করেই
পূর্ণিমাকে সঙ্-ছাড়া করিনি। আমি নিরপেক্ষ, তােমরা স্বার্থবান
তােমাদের একজনের কাছে থাকলে অপরের প্রতি অবিচার করা
হ’ততা। আমার কাছে থাকতে তােমরা কেউ ওকে ইনফ্লুয়েন্স’
করতে পারনি।
স্বামী—এখন তাড়াতাড়ি ব্যাপারটা চুকিয়ে ফেলে।
বন্ধু—বেশ, পূর্ণিমা, তােমাকে সব বুঝিয়ে বলেছি-এবারে তােমার মতামত
স্পষ্ট করে জানিয়ে দাও-কার ঘর করবার ইচ্ছা তােমার ?
ভূতপূর্ব—তার আগে আমার একটু বক্তব্য আছে। আমি এই
প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে পড়লাম।
বন্ধু ও স্বামী-সরে পড়লে? তুমি? কেন ?
১০২
লকিনী
ভূতপূর্ব—যার পায়ের তলার মাটি সরে গিয়েছে সে ঘর গড়বে কোথায় ?
বন্ধুত্ব ও বিবাহের মধ্যে আমি বন্ধুকেই বেছে নিলাম।
স্বামী-তােমাকে দুঃখ দিতে চাই না পুরুষােম, তােমার পুরাতন
স্বামীত্বে তুমি পুনরুধিষ্ঠিত হও-আমিই বরফ বন্ধু হই।
ভূতপূর্ব-পুরাতন পদে পুনধিষ্ঠান আর সম্ভব নয়। পুরাতন জগৎও
নেই, পুরাতন সম্বন্ধও নেই।
স্বামী-আমি আমি চাই না। আগে বন্ধু ছিলাম, আবার বন্ধু হ’ব।
ভূতপূর্ব-অদৃষ্টের লীলায় আমি স্বামিত্ব থেকে খারিজ হয়েছি—আর
স্বামিত্বে ফিরে যাবাে না। এবারে বন্ধু হ’ব।
বন্ধু-দেখা যাচ্ছে বন্ধুত্বের গুরুত্ব দুজনেই উপলব্ধি করেছ?
উভয়ে-করবাে না! তাস খেলে বিরহ যাপনশীল স্বামী হওয়ার চেয়ে
সিনেমা-থিয়েটা-পাটি দেখিয়ে বেড়ানাে বন্ধু হওয়া কি বুদ্ধিমানের
কাজ নয়?
ভূতপূর্ব—আমি বন্ধু হ'ব।
স্বামী—আমি বন্ধু হ'ব।
বন্ধু -আমি তাে হয়েইছি।
ভূতপূর্ব—আমি পার্টিতে নিয়ে যাবে।
স্বামী-আমি নিয়ে যাব।
বন্ধু-আমি তাে নিয়ে গিয়েইছি।
পূর্ণিমা-আমার একটা মতামত নেবার যেন কথা ছিল।
বন্ধু-বেশ তােমার স্বাধীন মত দাও, কে স্বামী হবে আর কে বন্ধু ?
পূর্ণিমা-আমি পুরাতন আখয়ে ফিরে যেতে চাই।
ভূতপূর্ব-হা হতােহন্মি। কেন জাপানীদের হাতে মরলাম না। তােমার
মনে শেষে এই ছিল।
ভূতপূর্ব স্বামী—এবারে আমি হলাম ভূতপূর্ব স্বামী। পূর্ণিমা তােমাকে অশেষ ধন্যবাদ। স্বী-তােমাকে নয়, আপনাকে। স্বামী—আপনাকে, আপনাকে, একশবার আপনাকে। ভূতপূর্ব-চলল তাহলে বাড়িতে যাওয়া যাক। স্ত্রী-কিন্তু আজ যে আমার একটা পাটি ছিল। ভূতপূর্ব চলল আমিও যাই। স্ত্রী—সেখানে স্বামীর প্রবেশ নিষেধ, বন্ধু যেতে পারে। স্বামী- চলাে—চলুন আমি যাচ্ছি। স্ত্রী-চলুন! স্বামী-এবারে তুমি কি করবে? আমি তাে পূর্ণিমাকে নিয়ে চলাম। ভূতপূর্ব-ওথেলােজ অকুপেশনস গন।” বন্ধু-তার চেয়ে ন- "আমার ভাণ্ডার আছে ভরে তােমা সবাকার ঘরে ঘরে।” পত্নীর সংখ্যা সীমাবদ্ধ হতে পারে-বন্ধু অসংখ্য। আমি চললাম মিঃ মুখার্জির বাড়িতে। মিসেস মুখার্জিকে নিয়ে যাবে সিনেমায় স্বামীকি ছবি। বন্ধু-‘এ্যাকটিক্যালি ইওরস। স্ত্রী-‘আই এনভি হার। স্বামী-চলুন পূর্ণিমা দেবী। চিয়ােনর বয়। স্ত্রী-তুমি বাড়িটা গুছিয়ে রাখাে গিয়ে আমি আসছি। টাটা। [ দুজনের প্রস্থান।]
১৫
ডাকিনী
ভূতপূর্ব-জাপানীর হাতে মরবার সৌভাগ্য যার হয়নি-তার কি স্বামী
এড়াবার সৌভাগ্য হবে? যাই বাড়ি গােছই গে।
বন্ধু-দুঃখ করবেন না। মিসেস গুপ্তর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবাে।
বন্ধু হিসাবে তিনি আইডিয়াল হবেন।
ভূতপূর্ব-আজই, এখনই চলুন।
বচলুন।
ভূতপূর্ব-“থ্যাঙ্ক গড আই অ্যাম্ সেভড।
[ দু’জনের প্রস্থান।]
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.