Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Tirthapathe
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
এই লেখকের লেখা
দীপান্বিতা
কবিতা (১৩৩০-১৩৩৫)
‘দীপান্বিতা’র কবিতাগুলি মূল্যবান
সাহিত্য-সমালােচনায় বিশিষ্ট প্রতিষ্ঠা
অর্জন করিয়াছে।
দাম দেড় টাকা
তীর্থপথে ও কবিতা (১৩৩১-১৩৩৮)
শ্ৰীহেমচন্দ্র বাগচী
শ্রীগুরু লাইব্রেরী, কলিকাতা
২০৪, কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, ১৩৩৯
গুরু লাইব্রেরীর পক্ষ হইতে
শ্রীভুবনমােহন মজুমদার, বি-এসি
কর্তৃক প্রকাশিত
[ গ্রন্থকার কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
প্রথম প্রকাশ-আষাঢ়, ১৩৩৯
মূল্য একটাকা
প্রিন্টার, কিশােরীমােহন মণ্ডল,
নব-গৌরাঙ্গ প্রেস,
১০৪, আমহাঃ স্ট্রীট, কলিকাতা
উৎসর্গ পিচরণে
No text on this page.
তীর্থপথে
No text on this page.
উত্তরবায়ু
খােল’ দ্বার, খােল’ দ্বার,-খুলে দাও দ্বার ;
ম্লান হ’ল শরতের শ্যাম উপচার ;-
বায়সের তিক্ত কণ্ঠ, কুয়াসার সুধীর সঞ্চার,
হেরি মাঝে তার
শেষ গান, রিক্ত প্রাণ, ছিন্ন কণ্ঠহার!
ঝরা পাতা স্নান ফুলফল,
শুষ্ক ধূলি জমিছে কেবল।
জীর্ণ তনু, কঁপে বুঝি স্নায়ু ;
খােল’ দ্বার, খোল দ্বার—আসিয়াছে উত্তরের বায়ু ?
কঁপে শিরা-উপশিরা ; কাপে আজি নিখিলের প্রাণ।
কোমলতা হয় অবসান ;
শুষ্ক দেহ, শুষ্ক মুখখানি
নাহি সরে বাণী।
কোথা’ শােভা শ্যামলতা ? স্নেহ-প্রেম নাশি
হাসি’ অট্ট হাসি,
শেষ করি’ নিখিলের আয়ু,
এল’ তীব্র উত্তরের বায়ু।
তুমি এলে হে নিঠুর, কা’র ব্যথা বহি’-
কা’র লােহু পিয়া রহি’ রহি’
কা’র অশ্রুজলমাখা চক্ষু দু’টি অন্ধ করি’ দিয়া ?
কাপাইয়া ধরণীর হিয়া,
হিমানীর বুকে সঞ্চরিয়া,
তীর্থপথে তীব্ৰতারে লভি হতাশায় ভরি’ প্রাণ, স্নান করি’ আকাশের রবি, বহি’ কা’র তপ্ত দীর্ঘশ্বাস, এলে তুমি উত্তর-বাতাস ? তােমারে চাহে না ধরা হে বিজয়ী, হে নিঠুররাজ । তবু হেরি নাহি তব লাজ ? বিরাগের রসহীন, শুষ্ক আভরণে কেন তারে সাজাও যতনে ? তীব্র তুমি, দৃপ্ত তুমি ;-তােমার পরশ নিল তার সকল হরষ । নিল’ তার আশা, নিল’ গান। জরাভরা বৃদ্ধা ধরা—দীপ্তি অবসান! ; তুমি মহাকাল-সখা—শুভ্র তব উত্তরীয়খানি শীতের রথাগ্রে চলে ; টুটে যায় গ্লানি। টুটে মােহ, টুটে চিন্তাভার, খুলে যায় দ্বার মুছে যায় মিথ্যা আশা, রাশি রাশি কল্পনার ভার। বহ’ বহ’ উত্তর-বাতাস, আন’ আজি বিরহীর তপ্ত দীর্ঘশ্বাস। সুতীব্র চেতনা দাও, জড়ে দাও শীতের কাপন- খুলে দাও ঘুমের বাঁধন! অগ্রহায়ণ, ১৩৩১
আবির্ভাব
তােমারে ডাকিয়াছি জীবনের পথে বার বার ;
তাই এলে সম্মুখে আমার!
সন্ধ্যার ছায়ার মত ধীরে ধীরে সুমন্দ সঞ্চারে,
এলে তুমি, দেখিলাম জীবনের পথের আঁধারে ।
ফুলফোটা হ’ল শেষ, থেমে গেল গান,
উজল দিবস মাের হ’ল অবসান।
পাখী ডাকিল না আর, নিবে গেল আলাে,
তােমার বিপুল ছায়ে কায়া মাের মিলালাে, মিলালাে ।
দু’টি বাহু প্রসারিয়া এলে তুমি অতিথি ভীষণ
আমারে লইলে কোলে, করেছিনু তব আবাহন।
**
এমনি করিয়া-
তােমারে যে ডাকে প্রিয়, পলে পলে মরিয়া মরিয়া-
তীব্র আলিঙ্গনে তব তাহারে কি লও তুমি ঘিরে ?
তােমার ভীষণ স্নেহে সে যে সখা, ভাসে আঁখি-নীরে
কি কঠোর পরশ তােমার !
সুপাত্র করি’ শেষ তুমি এলে সম্মুখে আমার ।
তুমি ছিলে কল্পনার মাঝে
ছিলে আলস্যের দিনে ঘুমভরা স্বপনের সাজে ।
আজি হেরি’ আকার তােমার
চিত্তে মাের উঠে হাহাকার !
স্বপন গিয়াছে টুটি সমুজ্জল এই রৌদ্রালােকে,
তােমার.মুরতিখানি ঝলকিছে পলকে পলকে !
তীর্থপথে
আজি তব লেলিহান রােষানলশিখা-
আমার ললাটে সখা, লিখে দিল দগ্ধ রক্তীকা।
মহারাজ, আসিয়াছ জীবনের ভস্মসৌধচূড়ে,
তােমরি কেতনখানি তাই বুঝি উড়ে।
মূঢ়তার হ’ল শেষ, অন্ধকার গেল বুঝি ঘুচে !
যা কিছু মিথ্যার লেখা দিলে সব মুছে !
এই ধ্বংসস্তুপশিরে জ্বেলে দিলে একটি প্রদীপ
অসুন্দর ললাটের একখানি টিপ।
খুলে দিলে সৰ্ব্ব আভরণ,
রিক্ত, চিরমুক্ত আজি পতিত জীবন ।
ভুলে তােমা’ ডেকেছিনু জীবনের পথে বার বার।
ভুল হ’ল মহাসত্য,—এলে তুমি সম্মুখে আমার!
অগ্রহায়ণ, ১৩৩১
৪
কল্লোল
তিমির-রাত্রির বক্ষে সাড়া দিয়া সচকিয়া দিক,
কা’রা সব নির্মম পথিক
যাত্রার আনন্দ-গানে ধরণীরে দিয়ে গেল দোল ।
শুনি তাই অশ্রান্ত কল্লোল !
জমিছে বন্ধনরাশি ; অন্ধকারে বারে বারে তাই
মােরা সবে পথ ভুলে যাই।
নিশার আকাশ চিরে বিদ্যুতের কটাক্ষ বিলােল ;-
শুনি তাই শ্রান্ত কল্লোল !
র
প্রশ্ন বাড়ে দিনে দিনে, কেহ নাই নাহি পাই সাড়া
ভীতি জাগে, প্রাণ দিশাহারা !
এ নিবিড় যবনিকা তােল আজি তােল তাের তােল
শুনি তাই অশ্রান্ত কল্লোল !
কুসুম ফুটেছে আজ, হেরি ঐ—মধু কই হায়,
পিপাসায় আকণ্ঠ শুকায় !
কোথা তােরা ? আয় সবে-নিঝরিণী, তােনাে বন্যারােল
শুনি তাই অশ্রান্ত কল্লোল।
ব্যথায় দহিছে প্রাণ ; কোথা’ শান্তি? ভ্রান্তিরাশি আজ
পদে পদে করিছে বিরাজ ।
আলােক-তরণী আসে ;-রাত্রি যায়, ব্যথা সবে ভােল
শুনি তাই অশ্রান্ত কল্লোল !
পৌষ, ১৩৩১
আত্মদান
নিষ্ঠুর নরের হাতে যারা দিল প্রাণ,
ভ্রান্ত শাসনের লাগি যা’রা দিল শির,
কুঠারের তীক্ষ্ণমুখে ঘাতক অধীর
যাহাদের পুণ্যরক্ত করি গেল পান,
তাহাদের তেজোময় তীব্র জয়গান
দেশ হতে মহাদেশে বহিছে সমীর।
মন্দির গড়িছে নর তাদের স্মৃতির।
অমর করিছে নর সেই আত্মদান।
সেই সব জ্যোতির্ময় নির্ভীক চরিত
শাস্তির কুটিল আঁখি উপেক্ষিয়া ধীরে,
গেয়ে গেছে চিরদিন প্রাণের সঙ্গীত,
সুমধুর সুর তা’র সঞ্চরিয়া ফিরে,
সেই শুভ্র জয়গাথা কালের সরিৎ
নিয়ে যায় সুমহান ভবিষ্যৎ নীরে।
প্রেমের মধুর আলাে তাদের ললাটে
নীরবে লিখিয়া দেছে দীপ্ত জয়টীকা
তাহাদের শান্ত নেত্রে তীব্র, ধ্রুব শিখা,
সত্যের দেবতা ছিল হৃদয়ের পাটে!
কাটিয়া পড়শির, সত্যের কে কাটে ।
চিরদিন দীপ্ত র’বে জয়পত্রলিখা ;
জাতির পরাণে সে যে প্রাণসঞ্চারিকা !
আত্মদান
নব নব দধীচির হৃদয়-কবাটে
লাগিবে আঘাত তার তীব্র কলরােলে,
নবীন মুক্তির দূত সেই ত্যাগ স্মরি’
হাসিবে মধুর হাস্য ; সে কি কভু ভােলে
আত্মার চরম দান ? কভু কি আবরি’
রাখে তারে বিস্মৃতির অন্ধকার কোলে ?
বীরত্ব অমর হয় বধভূমে মরি’!
;
মাঘ, ১৩৩১
৭
কবিতা
হে কবিতারাণী,
জগতের মাধুর্যের পূর্ণ পাত্রখানি
উচ্ছলিত লাবণ্যের প্রতিগানপ্ৰভায় শােভন
যুগে যুগে মানবের চিত্ত-বিমােহন,
তুমি যে আনিয়া দিলে বিশ্বের সম্মুখে,
আনন্দচঞ্চল নেত্রে স্পন্দমান, প্রকম্পিত বুকে।
ভাষার বন্ধনমাঝে তুমি কি দিয়াছ কভু ধরা ?
কল্পনার সুরলােকে সজ্জাময়ী হে চিরঅষ্পরা !
পুঞ্জপুঞ্জ লঘুমেঘে মেলি দু’টি সুকোমল পাখা,
পারিজাত-রেণুগন্ধমাখা,
তুমি কি সঞ্চরি’ ফির’ মন্দাকিনী-নিঝর-সমীপে,
নন্দনের নিশার প্রদীপে,
মুগ্ধ পতঙ্গের মত পাত’ কি গাে ইন্দ্রজালখানি ?
হে চিরইন্দ্রাণীসখী, লাস্যময়ী, মৰ্ত্তপ্রবাসিনী ।
-
দাবদহনের মাঝে তুমি আনাে শান্তিবারিধারা-
বাধাবন্ধ-হারা!
বিশ্বমানবের চিরতৃষাদগ্ধ শুষ্ক তালুদেশে
পীযুষ ঢালিলে তুমি হেসে !
দিলে প্রাণ, দিলে গান দিলে আশা, সঞ্চারিলে আয়ু,
নিখিল জাগিল হর্ষে প্রাণ পেল মেঘজলবায়ু।
তুমি বেদগাথামাঝে দেখা দিলে বিশ্বধাত্রীরূপে,
মানবের মানসের পঙ্কময় অগভীর কূপে,
কবিতা প্রবাহ দিয়েছ দেবী, সঞ্চারিয়া প্রীতিরসধারা- মর্ত্যেরে করেছ ধন্য, ভেঙে দিলে কলুষিত কারা ! প্রতিদিবসের তুচ্ছ সুখদুঃখ, স্বার্থের জঞ্জাল, লােভ, ঈর্ষা, কুটিল করাল- কলহ, সংশয় যত দানপ্ৰতিগ্রহণের মেলা, তুমি তার মাঝে দেবী, নেমে এলে আরম্ভিলে খেলা! প্রাণনাশী গাম্ভীর্য্যেরে ভাঙি’ ভাঙি’ করিলে চপল, বিসদৃশ চাপল্যেরে করি’ দিলে সরল-নিৰ্ম্মল ! উন্মুখ উদ্দামবেগে আনিয়াছ বিকাশ মহা- ব্যক্তি জাতি সমাজের পলে পলে সেধেছ কল্যাণ। তােমার স্রোতের মুখে অহরহ তরঙ্গ-লীলায় ক্লিষ্ট মানবের শান্তি ধীরে ধীরে আপনি মিলায়। বায়ু বহে, উঠে গান, ধেয়ে আসে মরণ-আহ্বান লীলাপদ্মে হাস’ তুমি হে অমরী, অক্লান্ত, অম্লান! বৈশাখ, ১৩৩২
মাধবী
হে শ্যামা মাধবী,
আনন্দ-চঞ্চল তব রাগরক্ত ছবি
স্মৃতির আঁধারন্তুপ ভেদি’
প্রদীপ্ত অরুণসম প্রত্যুষের কুম্ফটিকা ছেদি’
চিত্তে মাের দিল দেখা
নিশার আকাশে যেন শশাঙ্কের ক্ষীণ জ্যোতিরেখা
হে স্নিগ্ধা বল্লরী,
ওই রূপখানি তব চিত্তে মাের ধরি’
ভুলিলাম বহু শােক, নিরাশার বেদনার বাণী,
তােমার পল্লবপুঞ্জ চিত্তে মাের শ্যামরেখা টানি
তবকে স্তবকে ভারে ভারে
প্রস্ফুটিত কুসুম-সম্ভারে,
শােভিল সুষমাটিরে বহি'।
আজি রহি’ রহি’
সেই কথা জাগে মাের প্রাণে,
কবে বসন্তের দিনে ফাল্গুনের দিবা-অবসানে,
সন্ধ্যার নীরব নম্র শব্দহীন সুধীর সঞ্চারে,
জীবন-লাবণ্যভরা চিরশ্যাম হেরেছি তােমারে।
মাধবী,
আজি তােমা” ডাকে কবি,
চিরমরণের দেশে, নিরাশার পথের দুধারে,
যেথা একেবারে
মাধবী
অমৃত পায় নি ঠাই, সৌন্দর্য্যের ভিখারীর বেশ,
যেথা নাই মাধুরীর লেশ,
সেথা তুমি পরি’ এস শ্যামল সুধন আবরণ,
পরিপূর্ণ প্রাণরসে মৃতে দাও অনন্ত জীবন।
১১
আমার চলার পথে তব সাথে দেখা বহুবার,
ভুলিতে পারি না কভু আর
সেই ক্ষণে,
আমার এ মনে,
স্মৃতির হিন্দোলথানি দুলেছিল অপূৰ্ব উল্লাসে,
তারি আননকণা আজি মাের চিত্তে ভেসে আসে,
ভেসে আসে ধীরে অতি ধীরে,
বসন্তের উন্মাদ সমীরে,
পরিপূর্ণ কান্তি তাের বর্ধমান, চির অভিরাম
ভাদ্রের পূর্ণতাদৃশ্য তােরি রূপে জেগেছে সুঠাম !
অয়ি শ্যামা আনন্দলতিকা,
তােমার যৌবন যেন ভাবময়ী অপূৰ্ব্ব গীতিকা,
প্রকৃতির কাব্যে হ’ল লেখা-
মাের বক্ষনভ-তলে তুমি যেন স্নিগ্ধমেঘরেখা।
তুমি যেন স্নিগ্ধা বঙ্গবালা।
বসিয়া নিরালা ।
তীর্থপথে
যে কল্যাণী নিজ মনে,
স্তব্ধ গৃহকোণে,
সুখময় স্বর্গলােক করেছে সৃজন।
তুমি যেন তারি প্রিয়জন।
তাহার লাবণ্য আজি হেরিতেছি পল্লবে তােমার।
তা’র মৃদু হাসিখানি পুষ্পে তব রাজে অনিবার।
তা’র মেহ, তার আশা,
তা’র যত প্রেম ভালােবাসা,
তা'র অশ্রু, তার ব্যথা সবই যেন দিয়াছে তােমায়,
মাধবী, সার্থক তুমি স্বর্গলােক এনেছ ধরায় !
তােমার পল্লবছায়ে,
মৃদুমন্দ বায়ে,
বিশ্রাম লভিতে চায় হিয়া
দিও তার বেদনা নাশিয়া
পুস্পন শাখাগুলি দুলা’য়ে দুলা’য়ে
ছায়াখানি দিও গাে বিলায়ে ।
চিরমরণের দেশে চিরশ্যামা মাধবীলতিকা,
গাও আজি দুলি’ দুলি’ অমৃতের আনন্দ-গীতিকা ।
বৈশাখ, ১৩৩২
১২
শেফালির মৃত্যু
শরতে যাহারা ঝরিয়া পড়িত গােপনে,
ধীরে ধরাতল-শয়নে,
ঊষার পরশে জনমবৃন্ত তেয়াগি
শুভ্র হাস্য হাসিত তাহারা কি লাগি’ ?
ইসারায় তারা সাড়া দিত বুঝি সদলে,
জীবন তাদের জাগিত মরণ-বদলে।
আজি কুয়াশায় কোথা’ তারা হায় লুকাল ?
শীতল শিশির-পরশে কি তারা শুকাল ?
বিফলে বালিকা খুঁজিছে পুষ্পবীথিকা-
ব্যর্থ শেফালি-চয়নে।
শীতের আভাসে মরেছে শেফালি, বিধুরা-~-
নাহি ধরাতল-শয়নে।
শয়ন তাহারা পেতেছে নিশীথ-গগনে।
কি জানি কি শুভলগনে,
আকাশে আজিকে চাহ’ চাহ ওগাে বালিকা
নিবিড় আঁধারে ফুটেছে শেফালি-কলিকা!
রজনীর শেষে তাহারা পড়িবে ঝরিয়া-
অস্ত-অচল-শয়নে রহিবে মরিয়া ।
শুভ্র আঁচল দুলা’য়ে প্রভাত-কিশােরী
তীর্থপথে
তাদের কুড়ায়ে গাঁথিবে বাঁধিয়া কবরী ;
ফুটিবে, ঝরিবে তাহারা নিশীথ-গগনে,
গন্ধ ভাসিবে পবনে,
শীতের আভাসে মরেছে শেফালি-বিধুর।
নাহি ধরাতল-শয়নে।
১৪
নবীন মন্ত্র • নূতন করিয়া গড়িতে হইবে জানি আমাদের এই পুরানাে জীবনখানি। গ্রন্থিল বাস ধূলায় মলিন হ’লল ; তালিতে ফাঁকিতে কতদিন রবে বলে ? ফাঁকে ফাঁকে তার ব্যাধি যে বাঁধিছে বাসা- মুদিত নয়ন ; মুখে নাহি সরে বাণী পরম প্রবীণ পুরানাে জীবনখানি। ; মেঘে মেঘে হায় হয়ে গেল বহু বেলা! জীবন লইয়া এখনাে চলিছে খেলা! যন্ত্রের মতাে মন্ত্রবচনগুলি চলিছে কেবল উড়ায়ে শুষ্ক ধূলি! বঙ্কিম পথ পঙ্কিল হলাে যবে, তখনাে কি সেথা নীরবে চলিতে হবে ? নবীন, তােমরা বসিয়া রহিবে কত- জীবনবিহীন জড়-পুত্তলি’-মত ? যাত্রা পথের তােমরা হইবে সার্থী ; তােমরা আনিবে আশার মধুর ভাতি! বেদের নূতন সূক্ত-সৃজন করি’ তােমরা তাহারে পরাণে লইবে টানি। ==
তীর্থপথে
প্রাণের শান্তি ভক্তির সাথে নিলে।
তােমরা জাতির আশার আভাস দিলে।
ফকিরে তাড়ায়ে ভ্রান্তির সাথে সাথে,
যুগে যুগে গুরু-গঞ্জনা নিলে মাথে !
গায়ত্রী আজি নূতন করিয়া গাহ’
শুনাও আশার নবীন অভয়-বাণী
নবযুগ আজি রহিল চাহিয়া পথে
গড়িবে তাহার নবীন জীবনখানি।
আশ্বিন, ১৩৩৩
;
মহত্তর ভারত
অধিকার-সীমা লঘি’ যারা চিরদিন,
আত্মার আনন্দস্রোতে মুক্তিগান গাহি’
গেছেন দুর্দম বেগে, দিনরাত্রি নাহি
তপস্যার আয়ােজনে—বিশ্রামবিহীন।
তাদের অনন্তকীৰ্তি কাল, সীমাহীন
জাতিরে দিয়েছে সপি’। অমরতা চাহি
চলেছে যাত্রীর দল দুঃখে অবগাহি’-
দিন যায়,-আশা তবু নাহি হ’ল ক্ষীণ।
জাতির শাশ্বতবাণী যারা দেশে দেশে
গণ্ডীর নিষেধ ভুলি গেলেন প্রচারি’,
স্বদেশের কেতনেরে অমানিশশেষে
নীরবে বহেন যারা দূরে দিয়া পাড়ি,
কেহ কি ভুলিবে কভু ম্লান হাসি হেসে,
তাদের অক্ষয় বাণী ভ্রান্তি লবে কাড়ি’ ?
আরণ্যক তপস্বীর অন্তর-আলােক,
যে বাণী বাহির হ’ল প্রাচীন ভারতে,
সুধন্য জগৎবাসী অমৃতের পথে
সে গীতি উঠিল গাহি’ অসীম পুলকে।
মহানু ভারত তাই একদা ভূলােকে
মহত্তর হয়েছিল সুকঠিন ব্রতে।
বাণিজ্যে, বিদ্যায়, কর্মে উন্নতির পথে,
তীর্থপথে
হয়েছিল অগ্রগামী জগতের চোখে !
প্রাচীর সে মহাসত্য আজিকার দিনে
জ্ঞানের বিমলালােকে উঠিবে উদ্ভাসি”
মহান্ ভারতে যারা প্রতিক্ষণে চিনে,
তাহারা হেরিবে চাহি’ সবিস্ময়ে হাসি
নবীন তপস্যাবলে ধীরে দিনে দিনে,
মহত্তর সে ভারত উঠিছে উল্লাসি’!
আশ্বিন, ১৩৩৩
১৮
দিনমজুরের ছেলে
দিনমজুরের ছেলে,
হাসি-খেলা তা’র দূরে ফেলি’ দিল ঠেলে,
‘ক্ষুধার দহনে বসে আছে পথে জীর্ণ বসন মেলে।
ললাটে তাহার বেদনা-চিহ্ন এখনাে রয়েছৈ আঁকা
নয়নে তাহার কি যেন মিনতি মাখা
কৌপীন পরি’ ফিরে পথে পথে, অঙ্গ পড়েনা ঢাকা,
ভীত কম্পিত ত্রস্ত জীবন, আদর-সােহাগ পেলে,
ভয়ে ভয়ে চায়, ছুটিয়া পলায় দিন-মজুরের ছেলে।
পিতা পড়ে থাকে বাহিরে কোথায়, মা’র স্নেহ নাহি পায়-
হৃদয়ের কিনারায়,
মমতা হারায়ে বাড়িয়া উঠে সে হায় !
কোমলতা হয় পাষাণের মত সঞ্চিত বেদনায় ।
শেষে দেখা দেয় সভ্যতাশিরে ধ্বংসমশাল জ্বেলে,
চিরবঞ্চিত লাঞ্ছিত চির দিনমজুরের ছেলে।
এরা আসি’ যেন তুলে কলরােল জীবনসিন্ধুতীরে,
বলে,আমাদের দাবী দাও গাে মােদের ফিরে।
চলে, নিশার বক্ষ উল্কার মত চিরে
কহে, তুমি ত পাষাণ নও,
আমাদের ব্যথা কিছু বুকে তুলি লও,
ক্ষুধিত, ব্যথিত, পঙ্গুজীবন কণ্টকপথে বও।
যদি বােবঝা ভার, দিও পথ’পরে ফেলে ;
সাগর-বেলায় আসে দলে দলে দিনমজুরের ছেলে!
তীর্থপথে
সন্তোষহীন জীবন তাদের এমনি বাড়িয়া চলে,
একদা তাহারা ফিরে আসে দলে দলে
দেশে দেশে আসে ধ্বংসের সেনা রক্ত-পতাকাতলে!
সভ্য মানুষ ধূলায় লুটায় এদেরি দানব-বলে !
সহসা হেরিনু ফিরে চাহি’ ওই খােলর ঘরের নীচে,
শ্রমিক-জীবন চলিছে গােপন সারা জগতের পিছে-
আপনার পথ’পরে,
তারা চলে বহি’ ব্যর্থপরাণ অসীম দৈন্তভরে
দীনের বংশ বেড়ে চলে ধীরে নব ধরণীর ঘরে।
আজি তাই শুনি হায়,
মহাকলরােল মােদের জীবন-সাগরের কিনারায় ।
শান্তিবিহীন ভিখারী কাহার দ্বারে কর হানি’ যায় !
ভারতের বুকে
দূরে দূরে
পল্লীপথের পরে,
এরা আসি’ ভিড় করে !
অর্থবিহীন, বিপুল ক্ষুধায় তৃযায় জ্বলিছে মরে,
প্রতিদিবসের রােগ ও শােকের অশ্রু পড়িছে ঝরে ।
জীর্ণবসন, শীর্ণশরীর হাসিখেলা দূরে ফেলে
মরণে রাখিল ঠেলে,
বিধির সৃষ্টি-উপহাস-সম দিনমজুরের ছেলে!
-
কার্তিক, ১৩৩৩
২০
মাটি
: আমার মাটিরে আমি চিনি নাই, তাই,
অন্তর ভরিয়া মাের জাগিছে সদাই
অভাবের শীর্ণমূর্তি; চির ক্ষুধানল,
ঘূর্ণীবায়ু, মরীচিকা, পিপাসা সম্বল।
মাটির সে ভাষা কানে পশে নাই, তাই
উৎসরা স্রোতসম কেবলি শুকাই
দিবসের খরতাপে। বর্ষা নাহি আসে,
শ্যামরেখা নাহি টানে গম্ভীর সম্ভাষে।
আজি
দূর পরবাসে পড়িতেছে মনে,
দীপ জ্বলিছে কোন্ গৃহের প্রাঙ্গণে
তুলসীর মঞ্চতলে। গাভী এল গেহে-
সুপ্তিমৌন, শান্ত গ্রাম স্তব্ধ চিরস্নেহে !
শুধু মাের মূক মাটি রয়েছে জাগিয়া
যারা দূরে গেছে চলে তাদেরি লাগিয়া ।
অগ্রহায়ণ, ১৩৩৩
২১
দুর্লভ তােমারে আমি জীবন ভরি’ খুজিনু মনে মনে কারণে অকারণে কত না দুখে, কত না সুখে কত মিলন-ক্ষণ- নবীন নব শিশুর মুখে, হাসির রেখা-সনে! আজিকে মাের নয়ন দু’টি ভরিয়া উঠে জলে, কখনাে কোনাে ছলে, এহীন মনে গােপনে যেথা বেদনাশিখা জ্বলে, আস’নি নেমে ! তাই ত সেথা মরিনু পলে পলে । আমারি পথে চলিতে মাের শিকল বাজে পায়ে, দাড়ায়ে গায়ে গায়ে হাজারাে জন, হাজারাে মন-শাসন ভাসে বায়ে, তােমারে পাব নাহি সে ক্ষণ পরাণ ভরে ছায়ে । নিজেরি মাঝে ডুবিয়া রহি, মরি যে তিলে তিলে, সময় নাহি মিলে। জীবনভার বাড়িয়া উঠে—তুমি ত নাহি নিলে, দীর্ণ মাের পর্ণপুটে অমৃত নাহি দিলে ! হে চিরপ্রিয়, চলেছি পথে, সহজ হবে কবে ? টানিয়া মােরে ল’বে ২২
দুর্লভ
মায়ের মতো চুমিয়া মুখ ডাকিবে স্নেহ-রবে,
গরবে মাের ভরিবে বুক, সহজ হবে যবে !
তােমারে সদা ভুলিয়া যাই ঘূর্ণীলােতমাঝে
চিরনবীন সাজে,
মরণে বসি’ হাসিছ তুমি স্মরণে রহে না যে !
জীবনে তুমি সহজে চুমি’ বহিলে মনােমাঝে ।
অগ্রহায়ণ, ১৩৩৩
বিজয়ী হাজার যুগের জড়তা টুটিয়া কবে বাহিরিলে রাজপথে ? সুদূর-বিসারী বিভায় মলিন নভে ভাতিলে নবীন রথে ! সেদিনের কথা আজি কি পড়িছে মনে ? গহন-গাহন মহাকণ্টক-বনে ;-- আশাহীন চির অজানা আন্দোলনে পথ-চলা কোনাে মতে। কারে পা’ব, কারে নাহি পাব এই ভেবে বাহিরিলে রাজপথে ! বঁধেনি তােমায় বাহিরের মহাসমােহ চির নাগপাশে তার আপনার পথে চলেছ ছুটিয়া বীর- যেন খর তরবার। ছিল সন্দেহ, আশা ছিল তবু জেগে, উদয়ের বাণী ঢাকে নি অলস মেঘে- পূর্ব-অচলে নবারুণ-বিভা লেগে টুটেছে অন্ধকার গগনে তােমার নবীন রশ্মি ভাতে খুলে সংশয়-দ্বার। ২৪
বিজয়ী
নিষাদ-তনয় গহন কাননমাঝে
আপন মানস-বলে,
আপনার পথ আপনি পেয়েছে খুঁজি
পথহীন বন-তলে!
সেই সে পথের পবিত্র রেণু মাখি’
সঙ্গীবিহীন চলিয়াছ থাকি থাকি
আত্মার মাঝে নির্ভরতায় রাখি
পথ-চলা পলে পলে--
ভ্রান্তির সাথে শান্তি করেছ তবু
তিতিয়া অশ্রুজলে ।
আজি হেরি তােমা’ বিস্ময় জাগে মনে,
পরাণে আলােক ভাতে--
মনে হয়, যেন তুমি দুর্জয় বীর
মহাদুর্যোগ রাতে
বিঘ্ন বিনাশি’ এসেছ চলিয়া ধীরে,
আনিয়াছ তুমি প্রাণের রশ্মিটিরে
শতেক যুগের নিরাশা-বক্ষ চিরে,
মহামণি ল’য়ে সাথে-
তিমির-লহরী ধন্য হইল আজি
তােমারি চরণ পাতে!
অগ্রহায়ণ, ১৩৩৩
২৫
ভালােলাগা মাের ভালােবাসা হবে কবে
এই বসুধার শ্যামল আঁচলখানি
পরাণ পরশে হরষের রেখা টানি’!
চিত্ত-চকোর নবীন-দরশ মাগি
চলে নিশিদিন নব নব অনুরাগী ।
রূপ হতে রসে, রস হতে রূপে ধেয়ে
ফিরিছে জীবন চঞ্চল গান গেয়ে,
বলে,
-চল চল’! বিপুল চলার বেগে
নূতন প্রভায়, নবীন আশায় জেগে !
তাই চলি ধেয়ে পিছনে ফেলিয়া সবে,
ফিরে ডাকে কারা ব্যাকুল আৰ্ত্তরবে
বিদায়-পথিক চলিছে এমনি করে ।
ক্রন্দন কা’র পিছনে টুটিয়া ঝরে
ভগ্নপরাণ তিক্ত ব্যথার ভারে,
নীরবে লুটিছে পাষাণ-পথের পারে।
মন্থর বায়ু জমিছে তাদের শ্বাসে,
দাড়ায় তাহারা পায়ে-চলা-পথ-পাশে ।
গতিরে তাহারা গােপনে টানিয়া রাখে--
শিহরে পথিক করুণ আত্তাকে।
তবু চলে যায় পিছনে ফেলিয়া সবে-
ভালােলাগা তার ভালােবাসা হবে কবে?
ভালােলাগা মাের ভালােবাসা হবে কবে
জীবনে আমার আজি যে আননগুলি
লুকায় গােপনে স্মৃতির বাঁধন খুলি,
তাহাদের কবে ভালাে লেগেছিল মনে,
ভুলেছি কখন বেদনা-ভাবনা-সনে!
ক্ষণিক অতিথি ফিরিয়াছে দ্বারে দ্বারে-
ভালােলাগা তার ভালােবাসা হ’লনা রে !
ভালােবাসা হয়, কোন্ সে পরশমণি,
তাহারি লাগিয়া প্রহর বসিয়া গণি।
জীবনে মরণ মিশিছে গভীর রবে,
ভালােলাগা মাের ভালােবাসা হবে কবে?
পৌষ, ১৩৩৩
২৭
গােপনচারী
অন্তর-প্রান্তর-পারে হে সন্ন্যাসী, চিনেছি তােমায়
তমােময়ী রজনীর সুগম্ভীর তিমির-ছায়ায়।
হে ধ্যানী, তােমারি লাগি’ অশ্রুজলে কাটায়েছি দিন
গ্লানির মুহূর্তে মাের সুরােরা জীবনের বীণ,
মহা দৈন্যভরে,
গাহে নাই পূর্ণগান, হৃদয়ের মৌন শ্রোতা লাগি
ব্যথিত অন্তরে।
সুদুলভ, তােমা লাগি’ পুঞ্জীভূত বেদনার বাণী
নিরাশার করতলে রাখিয়াছি ধীরে ধীরে আনি।
আজি এ তিমিরতলে চিনিয়াছি আনন তােমার,
জীবন-মাল্যের মাের গ্রন্থিহীন শুষ্ক পুষ্পভার
আজি তােমা লাগি
একে একে দিব তুলি’ শীর্ণ তব করপুট ভরি’
হে মাের বৈরাগী ।
কত দিন, কত সন্ধ্যা, কত রাত্রি ফিরেছে সবেগে,
আমার জীবন ঘিরি’ নব নব রূপরস লেগে,
তৃণের অঙ্কুর যেথা, সেথা ধীরে ফুটিয়াছে ফুল,
আতপ্ত প্রাণের রসে গাঢ়তম সুধাসমতুল
আশীৰ্বাদ-ধারা
চাহি নাই, ফিরিয়াছ ম্লানমুখে অস্তাচলপারে
যেন বাণীহারা !
২৮
গােপনচারী
সেথা ছিলে তপস্যায় দীর্ঘকাল মােরে প্রতীক্ষিয়া
বিজন নিৰ্বাস দেশে গুহাহিত আমারি লাগিয়া !
ফিরায়েছি বারে বারে দ্বার হতে নির্দয়ের মত
অকম্পিত করুণায় নেত্র দু’টি করিয়া আনত,
হে গােপনচারী,
হাসিয়াছ ম্লান হাসি, ফিরিয়াছ দুর হতে দূরে
গ্লানি অপসারি।
তিলে তিলে মােরে তুমি চাহিয়াছ ওগাে সঙ্গহীন,
আপন বক্ষের মাঝে একেবারে করিতে বিলীন,
মিলনসঙ্কেত তব দুর্দিনের অন্ধবারিধারে,
নিঃশেষে মিলায়ে যায়, সীমাহীন
সুদূর
পাথারে-
আমি রহি বসি’!
জীবন-কুসুম মাের ফুটি উঠি’ সৌরভ বিলায়
পবনে নিঃশ্বসি’!
শীত, গ্রীষ্ম সুখদুঃখ হে গম্ভীর, স্পর্শে না তােমায় ;
দিনের পশ্চাতে দিন অন্ধবেগে ছুটে চলে যায় ।
নীহারিকা-আবর্তনে জ্যোতির্বাষ্প শূন্যতল ঘিরে
গতির চরম বেগে জন্মমৃত্যু-আবরণে ধীরে
তপস্বী আমার ।
অন্তর-প্রান্তর-পারে জ্বলে তব হােমশিখা-খানি
দীপ্ত, দুর্নিবার।
তীর্থপথে
জলে তব হােমানল, ভস্ম হয় জীবনের গ্লানি,
নিম্মোক খসিয়া পড়ে-বাহিরায় সত্য মুক্তবাণী।
শিবের প্রশান্তি ভাতে জীবনের যাত্রাপথ 'পরে-
ছলনার মােহর দগ্ধ হয় ধীরে থরে থরে।
হয় বিনিঃশেষ,
দীপ্ত, তৃপ্ত নব মূর্তি আবরণ ফেলে স্লানিমার
ঘুচে যায় ক্লেশ।
আজি তব ধ্যানলােকে হে তপস্বী, আসিয়াছি ফিরে-
জীবন-সেতারখানি ধ্বনি’ তুল’ একান্ত গম্ভীরে।
সুমহান্ কালস্রোত—বালারুণ ভাতিছে গগনে,
মুক্তি দাও, মুক্তি দাও এই মহা প্রশান্ত লগনে
জ্ঞানের আলােকে।
সহস্র বন্ধনমাঝে স্মরি তব জ্যোতির্ময়ী বাণী
অসীম পুলকে!
পৗষ, ১৩৩৩
স্বপ্ন-প্রয়াণ - হে স্বপ্ন আমার ডাকো মােরে যেথা তব স্নেহধন প্রশান্তি-আগার। যেথা তব শ্রান্তিহীন মুগ্ধনেত্ৰ সভাসদ দল নয়নে অঞ্জন টানি’ হরি’ লয় বাস্তব-সম্বল ; মধুপ-গুঞ্জনসম যাহাদের পাখার লীলায় সহস্র অপ্সরােলােক ভাতি’ উঠি’ আপনি মিলায়, যেথা দীপ অহরহ নব জ্যোতি করে বিচ্ছুরণ, অপূৰ্ব বিলাসদ্যুতি, সরকত হিরণ-বরণ— যেথা তব নব সৃষ্টি, আপনার পূর্ণ অধিকার সেথা মােরে লয়ে চল’ ধীরে ধীরে হে স্বপ্ন আমার। বাস্তবের অবিরাম লীলামত্ত তরঙ্গ-দোলায়, ভ্রান্ত আমি, শ্রান্ত আমি কঠিনের প্রকট ব্যথায় । হে স্বপ্ন আমার! আজি তুমি খুলে দাও গুপ্ত তব অমরভাণ্ডার। তােমার সে রাজকোষ,প্রাচুর্যের মহা আয়ােজন- স্তরে স্তরে সাজায়েছ নিখিলের নয়ন-রঞ্জন আপনার মনে, হৃত চেষ্টা, মৃত প্রাণ, স্তব্ধগান যেথা সংগােপনে, তোমার কুহকদণ্ডে পেল প্রাণ, সুর সমাবেশ যেথা তব মায়াংশুকে আনিয়াছ আতপ্ত আবেশ লীলাভরে মন্ত্রজাল টানি’ ভাষা দিয়া বেদনারে আনিয়াছ সন্তোষের বাণী।
স্বপ্ন-প্রয়াণ
ছায়াময় তব কুঞ্জবনে,
শাখে শাখে আলিঙ্গন, পত্রে পত্রে নিবিড় গুঞ্জনে,
চলে ধীরে তব ভাষা অনাহত, মধুর গম্ভীর ;
শুধু ছায়াঘনছায়া ;'সুসংহত স্তব্ধ বাপীনীর
সেথা নাহি কলােগ্লাস উঠে,
অভিনব মরালের স্বর্ণময় সিক্ত পক্ষপুটে
সমারােহ নবীন শুক্তির,
সকলি নবীন যেথা, যেথ গান আনন্দ-মুক্তির,
সেথা সুচরিতে,
আমারে টানিয়া লহ মুগ্ধ করি’
মধুর
সঙ্গীতে।
হে কবিসঙ্গিনী,
আদিযুগ হতে তুমি লীলাময়ী অনন্ত রঙ্গিণী।
অপরূপ তােমারি লীলায়,
ছন্দ-ভাব-কাব্যস্রোত কালস্রোতে আপনি মিলায়।
প্রতিভার নবােন্মেষে নব নব সৃজনের সাথে,
তােমার সে লীলাপদ্ম দুলাইছ তরঙ্গ-আঘাতে।
সুবর্ণপরাগরেণু-পরিমল ভাসি’ যায় স্রোতে,
চিত্ত মম অলিসম ধেয়ে চলে অন্ধকার হতে।
ওগাে মঞ্জুভাষা,
ঘন নীল নিশীথের ইন্দ্রজালে মােহিয়া নয়ন
স্বপ্ন-প্রয়াণ
আমার অন্তরতলে ধ্বনি’ তােল’ একটি সে আশা-
আমার হারানো সুর ধীরে ধীরে কর গাে চয়ন।
ধরার বসন্তে আমি যাপিয়াছি যে দিবসগুলি,
কল্পনার করস্পর্শে পাসরিয়া কোলাহল-ধূলি,
আমার সে ধ্যান-লগ্ন মৌন বীণা তুলিবে গুঞ্জরি’
সুরে তার ধীরে ধীরে ঝরি’
পড়িবে শ্যামল তৃণে সুকোমল কুসুম-মঞ্জরী।
ভূতলের স্বর্গে মাের দিবে তুমি নব রস-ধারা-
তন্দ্রাহীন চন্দ্রালােকে জীবনের বদ্ধ অন্ধকারা
ভাঙি ফেলি বাহিরিব তােমার বিচিত্র পথ’পরে-
নব নব প্রেরণার লাগি’---
মুক্তিমানে ক্লিন্ন প্রাণ অপরূপ আনন্দের ভরে,
কোমল পরশে তব জরা হ’তে উঠে যেন জাগি।
আজন্মের সহচরী, লহ মােরে আলয়ে তােমার।
গ্লানিহীন লীলাভরে এ আসন ছাড়িয়া আবার
মানস-সন্ধানে প্রাণ যেতে চায় ব্যাকুল তৃষ্ণায়
অশ্রান্ত পাখায়
৩
তীর্থপথে
অদৃশ্যচারিণীদল ক্ষণে ক্ষণে করিছে চপল,
কর’ মােরে ব্যাকুল বিহ্বল,
তারপরে কবিদের পরিচিত ছায়াপথ ধরি’
দূরে দূরে লয়ে যাও তিমিরের লহর মুখরি’
নূপুর-আঘাতে,
নব যবনিকা তােল’ জীবনের অভিনয়-রাতে।
মাঘ, ১৩৩৩
৩৪
সখা
প্রণয়-বন্ধনে সখা, বাঁধিয়াছ এ দীন হিয়ায় ;-
কৈশােরের উৎসুক লীলায়।
অতীত দিনের কথা-কবে মাের মুখপানে চেয়ে
বলেছিলে কোন্ কথা, ফিরেছিলে কোন্ গান গেয়ে,
আজি একা-একা
নিশীথের অন্ধকারে স্মরি বসি’-নাহি তব দেখা।
দেখা নাই; তবু হায়, দীর্ঘ দিন চলিয়াছে ধীরে।
বঙ্কিম কুটিল পথে আপনার বিশ্রাম-মন্দিরে।
যেথা রাত্রি, সুগম্ভীরা আসে ধীরে নীলাঞ্চল পরি’
বেদনার সাথে মাের জাগে মেলি আঁধার কবরী।
নিখিল সুষুপ্তিমাঝে তারাদল চাহে মাের পানে ;
কি যেন হারায়ে গেছে!—সারা বিশ্ব ফিরে তারি ধ্যানে।
তুমি নাই ; আজি তাই ভ্রান্তমন ফিরে দ্বারে দ্বারে
বিরাট অতৃপ্তি ল’য়ে, ল’য়ে ক্ষুধা, স্তব্ধ বেদনারে ;
সহস্র প্রশ্নের ভারে অবসন্ন দেহ মন ল’য়ে,
মহাগ্লানি চিত্ততলে বয়ে,
আছি একা বসি’ ;
নির্জন মানসলােকে ফিরিতেছি তােমারে.পরশি ।
আমার মানসে আজি হেরিতেছি বিরাট প্রান্তরে,
তুমি, আমি চলিতেছি বঙ্কিম পথরেখা ধরে ;
=
তীর্থপথে ছায়াময়ী রজনীর শেষযামে দীপ্ত শুকতারা মােদের যাত্রার পথে ছিল চেয়ে যেন নিদ্রাহারা শীতল শিশির-স্পর্শে তৃণদল আকুল অধীর- ধরার নির্বাক শিশু; বহে শুধু নয়নের নীর! সম্মুখে সুদীর্ঘ পথ ; উদয়ের আলাে নাহি জাগে তুমি মাের কর ধরি’ কহিতেছ, ‘আগে, আরাে আগে! সুদূরের পিপাসায় কণ্ঠ তব তৃষিত দারুণ ; উদাসীন দৃষ্টি তব, বাণী তব একান্ত করুণ ; সে দৃষ্টি ডাকিত মােরে, সে বাণী ভুলা’ত বেদনায়, আজি তাই অধীর হিয়ায় তােমার পরশ মাগি আমার চিন্তার পথ’পরে। যে আশা জাগাতে প্রাণে, আজি চলি তাহারি নির্ভরে। স্মরি—মহা অন্ধকার, পূঞ্জীভূত ঘন ঘাের কালাে উর্দ্ধে মেলি হস্ত দু’টি—কহিতেছ, ‘আলাে, আরাে আলল। হে তরুণ বন্ধু মাের, হে সুন্দর, হে চিরনবীন, আলাের কামনা মাের প্রাণে তাই নহে নহে ক্ষীণ। তরুণ গরুড় জাগে মাতৃগর্ভে জন্মদিন চাহি’--- দূর সুরলােক হ’তে অমৃতের মহাগান গাহি’ তাহারে জাগিতে হবে ; তাহারে উঠিতে হবে শেষে বেদনার বন্ধ টুটি’ সগৌরবে মহা বীরবেশে।
সখা
নয়নসম্মুখে নও; আজি তােমা স্মরিতেছি প্রিয়,
মধুর মাধবী নিশি, শান্ত বায়ু, যেন বা অমিয় ।
এমনি বসন্তে কোথা’ মুখরিত বিহগের গীতে,
গােলাপের কুঞ্জতলে জোছনায় একান্ত নিভৃতে
হাফেজ তােমারি গানে জীবনের কাব্যটিরে গড়ি
বিশ্বজন-করতলে রেখে গেছে ; কত বর্ষ ধরি’
তাহারি অমর বাণী প্ৰদানিছে সঞ্জীবনী-ধারা-
বিরহের অশ্রু তাই মরুভূমে হয় নাই হারা!
-
হে দরদী, দাড়ায়েছ পাশে ;
যুগে যুগে বেদনায় শান্তি দিলে প্রসন্ন সন্তাষে।
সুবিপুল রণাঙ্গণে, ধ্বংসস্তুপে বিষাদের মাঝে,
তুমি যে সারথুি-বেশে দেখা দিলে অপরূপ সাজে।
শােনা’লে অপূৰ্ব বাণী ভয়-ভীত ক্লীব জনগণে,
গাহিলে গম্ভীর গান ভারতের বিরাট প্রাঙ্গণে।
তুমি মানবের সখা, বন্ধু তুমি, হে চিরভাস্বর,
বিপুল আশ্বাসবাণী ধ্বনি তুলি’ রাজরাজেশ্বর
৬ণয়েছ অদ্ভুত বারতা
সুমহান্ সন্ধিক্ষণে নবধৰ্ম্ম-জনমের কথা।
তীর্থপথে
;
হে নবীন, সখা তুমি, বন্ধু তুমি, তুমি প্রিয় মাের;
বিপুল বন্ধনমাঝে হাস্যমুখে নিলে রাখী-ডাের।
সখারূপে সত্য তুমি ; তাই প্রাণ সদা তােম চায়।
তব নীল নয়নের মেহঘন ব্যাকুল মায়ায়
রসধারা খুজে প্রাণ। তুমি তাই রহ’না পাসরি’
বেদনায় মথি হিয়া ভােল’ নাই বাজাতে বাঁশরী ।
ফাল্গুন, ১৩৩৩
সঘং শরণং গচ্ছামি আমার জীবনমাঝে হেরি আজ রাজে কোটি কোটি প্রাণ- আজি তারি লাগি’ অধীর, গভীর গাহি সত্যের গান। দেহের বীণার তারে কত সুর বাজে ধীরে অনুপম—শত পরমাণুভারে-- ব্যাকুল অধীর জীবন প্রবাহ মহা-আনন্দে ধায় প্রাণে জাগে বল, নয়নে দৃষ্টি, আননে গরিমা ভায়। গ্রহ-নৰ্ত্তন-তালে তালে মাের বুকে নর্তন চলে অমৃত রুধির সারা দেহ ছয় কিসের অসীম বলে। মিলেছে শক্তি রক্তে আমার আশা জাগে অফুরা, কৰ্ম্মের বাণী সে দিবে আমায়, আজি গাহি তা’র গান । সারাটি জগৎ মিলেছে আমার মানস-লােকের মাঝে, নবজীবনের বাণী বহি আনি’ মহামহিমায় বাজে । ধ্যানে, জ্ঞানে, প্রেমে মিলেছেন যারা, আজি তাহাদের লাগি আমার মরমকুসুম ফুটেছে দুখের রজনী জাগি। গত-অনাগত মনের মানুষ মাের মাঝে ভিড় করে কোন্ উপহার-সম্ভার আজি দিব তাহাদের তরে? শতশাখাময়ী জীবনের নদী সাগরের পানে ধায় কোথা সে সাগর ? কোথা মহাগান বেলাবালু-কিনারায় ? নয়নে যেথায় মরীচিকা জাগে, সেথায় কি আশা নাই ? সম্মুখে যেথা জাগে গিরিচূড়া, এস তারে দলি’ যাই।
তীর্থপথে এস হে নবীন; হাতে দাও হাত, গাহ’ সঙ্ঘের জয় সহবাধাকণ্টক দলি’ চল’ হে ধরণীময়। জানি, জানি আজি চলে আয়ােজন, বাজে হৃদয়ের বীণ- মানুষ মিলিবে মানুষের সাথে, এসেছে সে মহাদিন। একদা ভারতে হ’ল আয়ােজন, সঙ্ঘশরণ লাগি রহিল সাধক ধ্যানে আপনার দুখ-অমানিশা জাগি। রাজার দুহিতা, রাজার তনয় বাহিরিল পথে পথে সঙ্ঘের বাণী করিল প্রচার অরণ্য-পৰ্ব্বতে। প্রাচী সে গাহিল আদর্শ-গান, শ্রোতা কত মহাদেশ মহান্ রাগিণী উঠিল বাজিয়া আজো চলে তার রেশ। জানি, জানি আছে দৈন্য গভীর ; তবু হ’ব আগুয়ান্! কর্মের সাথে কৰ্ম্ম মিলিবে-প্রাণ সাথে মিলে প্রাণ। সুখগৃহকোণ মিলিবে বন্ধু, কৰ্ম্মের শেষ যবে, তা’র আগে এস বাহিরের ডাকে মহাভৈরবরবে। বিন্দু বিন্দু বারিকণা মিলি’ সাগর-রচনা করে মহামিলনের গানে এস আজ মহাজীবনের তরে। মনে প্রাণে হও লীন, নূতন সাধনা প্রয়ােজন আজি, নই’ নহ’ আশাহীন। এস আজি মােরা একতনমনে আপনায় করি দান, প্রাণের মাল্য রচিব বন্ধু, পথে পথে পা’ব প্রাণ। ৪ ০ সঙ্ং শরণং গচ্ছামি জীবন-মহোৎসবে, আপন জড়তা ফেলি’ এস আজ মেঘ-গম্ভীর রবে। মানসপক্ষ প্রসারিয়া আজি হেরিতেছি দূরে দূরে-- চলিছে জীবন ক্ষুদ্রতা ছাড়ি’ সুচিরনবীন পুরে। সাথে চলে তার বিরাট চিন্তা, মহান্ কৰ্ম্মর একটি জীবনে কোথা সে শক্তি তার ভার বহিবার ? জীবনের সাথে মিশিবে জীবন, কর্মের সাথে জ্ঞান- আজি তারি লাগি অধীর, গভীর গাহি সঙ্ঘের গান। চৈত্র, ১৩৩৩ ৪১
মরুভূমির মহাপুরুষ
আজি বসি’ সুখসুপ্তা ধরিত্রীর কোলে,
আমার এ প্রাণ যেন ধীরে ধীরে দোলে,
রাত্রির আসরে।
দূর-দূরান্তরে
ছায়াচ্ছন্ন স্তব্ধ গ্রাম রহস্যের দিতেছে আভাস।
নিশার আকাশ
তারকা-অক্ষরে লিখি’ বােধাতীত মহালিপিখানি
ছড়ায় শূন্যতা ভরি’ আপনারে অন্তরালে টানি।
সহসা মুছিয়া যায় জ্যোৎস্নাস্নাত অপার নীলিমা,
নয়ন-সম্মুখ হতে। প্রান্তরের মসীলিপ্ত সীমা
ধীরে ধীরে জাগি’ উঠে চল-চিত্র সম।
অপরূপ ইন্দ্রজালে জাগে অনুপম
নিশীথ-নিঃসাড় হিম মরুবালুরাশি
তরঙ্গিত সিন্ধুসম বালুবেলা ধীরে উঠে ভাসি।
দিগন্তে তারকামাল যেন তার ফেন শুভ্র হাসি।
দুলে চলে উষ্ট্ৰশ্রেণী রজনীর নীল অন্ধকারে
নিরুদ্দেশপানে।
সুঘন শ্যামল কুঞ্জ শীর্ণ মরু-তটিনীর গানে
নীরব ঝঙ্কৃত-তনু। মত্ত অলি তালীরসধারে
৪২
মরুভূমির মহাপুরুষ
গুঞ্জিয়া ফিরিছে যেথা ঘন বনতলে-
সমুচ্চ খর্জুরশীর্ষ স্তব্ধ যেন সৃষ্টি-কৌতুহলে
নিৰ্ণিমেষ নিদ্রাহীন চেয়ে আছে সমুন্নত শিরে-
আমার মানসযাত্রী চলে সেথা মরুর মন্দিরে,
উচ্চনীচ পথ-রেখা অতিবাহি’ নাহি চাহে ফিরে।
চলে ধীরে পূর্ণতা-প্ৰয়াসী
লজ্যি’ দেশজাতিসীমা, সুন্দরের জয়-ধ্বজা বহি
স্থলন-পতন লঙ্ঘি’ মানবের কীর্তি অবিনাশী
ভালােবাসি প্রাণ ভরি। চলে রহি' রহি’
অবগাহি’ অবজ্ঞার কণ্টকশয্যার গ্লানিমারে
চলে অন্ধকারে
মহত্ত্বের দীপ্ত দীপ-বিভার আশায়,
যুগে যুগে যা’র লাগি প্রাণ-বহ্নি নিঃশেষে ফুরায়
মরণ যাহার লাগি’ বরণীয় তীব্র বেদনায় ।
আজি তাই মরুভূমে মানস-প্রয়াণ ;
সেথা হেরি মহাপ্রাণ আরব-সন্তান
কী বিপুল তেজোরাশি বিকাশিয়া বিশ্বের সম্মুখে
অকম্পিত জীবনের শতদুঃখমুখে
মরু-প্রান্তে উর্ধশির তালীতরুণ
সহস্র জীবন-ঝঞ্চা অবহেলি’ একান্ত নির্মম
৪৩
তীর্থপথে অবহেলি’ স্বদেশের মিথ্যাগ্লানি লােকনিন্দাভয় লভিল সত্যের দৃষ্টি—চিরশান্ত, চিরনিরাময় । জীবন-কল্যাণবাণী ঋষিসম করিল প্রচার- ক্লান্তিহীন, প্রশান্ত, উদার । প্রাচী-র সে মরুদীপ্তি--আজি তারে করি নমস্কার । তুমি ছিলে জীবনের আনন্দ-পিপাসী ওগাে ঋষি নিরক্ষর, মরুপ্রান্তবাসী। আরবের শ্রেষ্ঠ পুষ্প, দেহে তব উষ্ণ রক্তধার— বিশাল মরুর মত প্রাণ তব অসীম উদার, গরুড়ের তৃষ্ণা বহ’ তুমি, তব মুখে শুন্য দিয়া, তােমারি ললাট-প্রান্ত চুমি ধন্য হ’ল মরুদেশ, ধন্য তব পুণ্য জন্মভূমি। একের সাধনাবাণী তিলে তিলে করেছ সঞ্চয় বাধাহীন মুক্ত দৃষ্টি দিয়া । জীবনের সর্বশেষ তারি তরে ফিরেছ মাগিয়া। কহেছ গম্ভীর কণ্ঠে, এক—সে যে অমর, অক্ষয় জীবনেরে পলে পলে দণ্ডে দণ্ডে নাহি করি’ ক্ষয় সকল প্রার্থনা তব অর্পি’ দাও চরণে তঁাহার, নদী যথা দেয় জলভার- বিশাল সমুদ্রমাঝে আপনারে দেয় নিঃশেযিয়া- অরণ্যানী-পৰ্বত ভেদিয়া। --- ৪ ৪
মরুভূমির মহাপুরুষ
দুর্জয়, দুর্দমবেগ হে স্বাধীন আরবসন্তান,
আজি তব প্রাণবাণী কোথা’ তা’র লভিয়াছে স্থান।
কল্যাণ-কামনা ভুলি’, ভুলি’ নিজ সত্যপরিচয়
নবীন জীবনস্রোতে কি বারতা আজিকে সে কয় ?
অথবা এ নিয়তির
ক্রর
পরিহাস,
যুগে যুগে ফিরে আসে আদর্শের ব্যর্থ ইতিহাস।
অপমান-অশ্রুজলে বিগলিত শীর্ণ মুত্তি তার
সাধনা-বেদন ভুলে, ভুলে যায় বাণী ক্ষুরধার ।
তুমি ঋষি, তুমি কবি-হে মহান্ আরবসন্তান
বিধাতা তােমারে দিল জ্যোতিরূপ-নাহি পরিমাণ।
অসীমার করস্পর্শে মহীয়া তব প্রাণশিখা--
দগ্ধ করে জীবনের মৃত্যুনীল পাণ্ডু যবনিকা ;
বহে তা’র উর্দ্ধতম শির,
স্পর্শে না তারে জানি দিবসের কলুষ-সমীর
আপনার গান
অসঙ্কোচে গাহি যায়—দীস করি’ যায় দান
কলরােলে নীরভার। জীবনের সর্প অসম্মান
গলিত নিম্মোকসন খসি’ যায়, চলি য় দুরে
জীবন-সেতারখানি ধ্বনি’ উঠে অনাহত সুরে।
আজিকার মধ্যরাত্রি শান্ত স্তব্ধ স্বপনপুরীর
বিচিত্র আভাস আনে।
দূর অগ্রীর
৪ ৫
তীর্থপথে
,
অঞ্চল-পরশ যেন সমীরের কোমল সঞ্চার।
আজি স্তব্ধতার
বিরাট সাম্রাজ্যমাঝে ঐক্যবাণী তব,
মঙ্গলের সাথে আনে চির-অভিনব
ব্যথাহীন, বাধাহীন প্রশান্তি উদার
আরব-মরুর ঋষি, লহ’ আজি, লহ’ নমস্কার
বৈশাখ, ১৩৩৪
-
জীবন-তটিনী-পারে [ একটি বন্ধুর মৃত্যুর পরে । জীবন-তটিনী-পারে বেদনার অন্ধকারে শয়ন তোমার। লহ প্রিয়, শেষ-উপহার । চিরন্তন অবসান গেয়ে গেল মহাগান- মরণসম্মুখে আজি শুনি তাই পাতি’ কান, ব্যাকুল ব্যথায়- মৃত্যু এলাে চঞ্চল পাখায় । - হে প্রিয়, মরণে আজি ভরেছ জীবন-সাজি। নিয়েছ কি তুলে ছিল যাহা প্রাণ-উপকূলে ? ব্রাহ্মণ, আজিকে তব স্মৃতিরে স্মরিয়া নব- গান গেয়ে যাই। গাথি বসি’ তােমারি কথা-ই! অমর, তােমারি লাগি শশীতার রহে জাগি’-- বাসনা তােমার, ফিরে ফিরে আসে বার বার । অনন্ত অণুর মাঝে দুলিছ নবীন সাজে অনির্বচনীয়, মৃত্যুর অতীতপুরে হাসিয়া ফিরিছ ঘুরে নােরে প্রাণ দিয়ে । ৪৭
জীবন-তটিনী-পারে
যাদের বাসিতে ভালাে, তাহারা ভুলেছে আলো,
আঁধার-আঁধার !
তােমার প্রসন্ন হাসি
হাসিয়া বলিও, বাসি-
ভালাে বার-বার !
ক্ষয়রে অক্ষয় করি’
বিরাট ব্রহ্মাণ্ড ভরি’
রাখিছেন যিনি,
তা’রে মােরা এখনাে চিনি নি।
তােমার চলার সুরে,
চলে মন দূরে দূরে
আপনা পাসরি’
বাজি’ উঠে মরণ-বাঁশরী ।
সৃষ্টিরে প্রবাহ দিয়া
দশদিশি সচকিয়া
বাজে ভেরী তার
মনে হয় সকলি আঁধার !
তােমারে শেষের সাজে
সলিল-সমাধি-মাঝে
বীরবন্ধু মাের,
অর্পিয়া চলিনু ধীরে
সংসার-সাগর-তীরে
মুছি’ আঁখি-লাের !
৩রা জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৪
৪৮
প্রথম বারিধারা
প্রথম বারিধারা, আজিকে হ’ব হারা
আঁধারে !
আজিকে পথে আর নাহি যে নাহি আর
বাধা রে।
তৃষিত ধরণীর
নয়নে বহে নীর
নিদাঘে।
মাটির সব গান নীরবে অবসান
বিরাগে।
শ্যামল বৈভব, প্ৰদানি’ গৌরব
ধরা-তে।
রিক্ত সরােবর, নদী ও নিঝর
ভরা’তে,
ফুটাতে তৃণফুল প্রকাশ-বেয়াকুল
ভুবনে,
বরষা এলে আজ নিবিড় ঘনসাজ
গগনে ।
প্রথম সৃজনের অচল তিমিরের
মাঝারে !
অগম মনােরথ রহিল মৃতবৎ
পাথারে।
৪৯
তীর্থপথে
সেথায় আজি মাের নীরবে লাগে ঘাের
নয়নে।
রহিমু জীবনের
গভীর স্বপনের
বপনে ।।
}
প্রথম বারিভার লহ’ গাে উপহার
নীরবে ।
আজিকে মানুষের বেদনা-হরষের
বিভবে।
প্রবীণ ধরা’পর তুমি যে সহচর
সৃজনে,
প্রদানে অঞ্জন নয়ন-যুঞ্জন,
জীবনে ।
আজিকে ঝরি যাও ব্যাকুল দোলা দাও
হৃদয়ে,
সৃজন কোথ’ হায় ? প্রলয় বহি যায়
আলয়ে ।
প্রথম বারিভার, টুটে না মােহ আর
এ-দিনে।
গভীর দীনতায় বায়ু যে বহি যায়
বিপিনে।
প্রথম বারিধারা
নিখিল-মানবের বেদনা আজিকের
আকাশে।
জন কোথা’ তায় প্রলয় হেরি হায়
প্রকাশে ।।
প্রথম বারিধার, বেদনা উপর
লহ’ গাে।
শেষের বিষ আজ করিল নব সাজ
বহ’গাে।
সুনীলকণ্ঠের সাগর-মন্থের
বেদনা,
হরষে তুলি লও; আপন শিরে বও
সাধনা ।
আজিকে মেদিনীর দীনতা-নত-শির
নমিছে।
ক্ষণের তৃণদল ভুঞ্জি’ ধারাজল
ভ্ৰমিছে।
তিমির দিগভরি জাগিছে শর্বরী।
গােপনে,
তীর্থপথে
ঝিল্লী আজিকার স্বনিছে ব্যথাভার
পবনে
বিধুর বেদনায় পরাণ আজি হায়
বাঁধা রে।
প্রথম বারিধারা আজিকে হ’ব হারা
আঁধারে ।
জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৪
দেহ-দেব
মাের দেহধানি-
অনির্বাণ হােমশিখা-ধীরে ধীরে পাসরিয়া গ্লানি
যুগের জড়িমা ভেদি মােরে দিল আনি
বিধাতৃমহিমাদীপ্ত জ্যোতির্ময় জয়টীকাখানি।
।
অযুত পাখায়
ব্যাকুল নিঃশব্দ নৃত্যে কল্পলােকে যারা ভাসি’ যায়,
অদৃশ্য সৃজন-বেগে মুহুর্মুহু বাসনা-বিভায়,
তাহারা এসেছে নামি’
পূর্ণ করি’ ধরিত্রীর ক্লিষ্ট দিবাযামী
মাের দেহ-তটিনীর অবিরাম প্রাণ-আন্দোলনে !
আজি তাই গগনে গগনে
আনন্দ-আলোেকলিপি আবর্তিছে প্রতি ক্ষণে ক্ষণে।
আমারে ঘিরিয়া নাচে অসংখ্য কামনা
লীলামা ধরণীর প্রাণ-আরাধনা,
গ্রহচতারকার লক্ষ লক্ষ ভাবস্পর্শকণা,
দেহ-মঞ্জরীরে মাের ধীরে ধীরে তুলেছে ফুটায়ে
ক্লান্তিহীন নিশীথের বায়ে!
প্রভাতের মনােরম জ্যোতিৰ্বাণীটিরে--
নীরবে করেছে জপ দিবানিশি আলােকে শিশিরে।
চলা মাের শেষ নাহি হয়-
পথের কিনারে হেরি নব পথ-বনচ্ছায়াময়।
তীর্থপথে
কভু মরুদাহশীর্ণ, কভু তারে হেরি’ জাগে ভয়!
দিনান্তের ম্লান রবি গােধূলির সাথে কথা কয়।
কভু দূর বাটে,
আশার নবীন স্বপ্নে কুহেলির জীর্ণ জরা কাটে ।
মাের দেহ ভরি’
জাগে কত কল-কথা-মুখরিত শ্রাবণ-শৰ্বরী।
কত বেদনার বাণী, ঝরাপাতা ম্লান ফুলবাসে,
লক্ষ ঋতু-বরষের পুঞ্জীভূত সুদীর্ঘ নিঃশ্বাসে,
দেহ মাের মহীয়ান্ ; আজি তাই ভাসে,
অনন্ত ইঙ্গিতময় বর্ণচিত্র-ভরা-
শ্যামশষ্পে পরিপূর্ণ জীবধাত্রী মাতা বসুন্ধরা !
রূপ নহে ইন্দ্রজাল, রূপ মাের মহাসত্যবাণী ;
অরূপের আলিঙ্গনে প্রাণময় বলি তারে জানি!
এ বিশ্বের প্রকাশের ব্যথা
জীবন-ঘূর্ণন-স্তব্ধ ভাষাহীন যত ব্যাকুলতা-
দেহের মাঝারে মাের পেয়ে গেছে পরম সন্ধান।
মানুষের পরিপূর্ণ সাধনার গান,
দেহের মন্দিরা-তারে অহরহ ঝঙ্কারিয়া যায় ।
অরূপের ছন্দোময় অপূৰ্ব ব্যথায় !
লক্ষকোটি বর্ষ-পরে মাটির প্রতীক্ষা-অবশেষ,
আজি তার পেয়েছি উদ্দেশ!
৫৪
দেহেরে প্রদীপ কহি, কহি কভু দেবতা-দেউল- প্রেম তাহে কামনার পরিস্ফুট ফুল! তা হারে ঘেরিয়া মাের নাচি যায় অন্তর-বাউল ? দেহ মাের নহে মায়া- মিথ্যার স্বপন নহে, নহে শুধু মরীচিকা-ছায়া! দেহ মাের নহে কারাগার- রােগ শােক মলিনতা, শত গ্লানি, অযুত ধিক্কার- উষার মেঘের মত পলে পলে হয় একাকার। জাগে চিরন্তন, অসীম আনন্দঘন দেহ মাের সুন্দর, শােভন ! মাের দেহখানি- ধবল কঙ্কালমাঝে শেষ তা’র কভু নহে জানি! কালের ব্যাকুল ছন্দে পরমাণু-বাণী এ দেহ ঘেরিবে মাের-লীলামৃত্যে ল’বে তারে টানি। শীর্ণ মাের কঙ্কালের মাঝে, সুনবীন তৃণফুল দেখা দিবে নবতর সাজে । মৃত্যুদীৰ্ণা ধরণীরে ধীরে ধীরে দিবে আমি জানি অনন্ত অমৃতবার্তা চিরন্তনী মাের দেহখানি । জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৪ কবি কালিদাস কবি কালিদাস, আজিকে খুজিছে তােমা জগতের শ্রান্তিহীন কথা-ইতিহাস সহস্র বিরুদ্ধবাণী আবরিছে মুহুর্মুহু ভারতের ললাট-আকাশ। নাহি অবকাশ'! আমি জানি সব বাণী লুপ্ত হয়ে যায়, কালের জঠর-তলে, বিস্মৃতির ব্যঙ্গ-বেদনায়। শত রাজ্য-রাজপুরী রক্তলিপ্ত মহা-অভিযান, পুরাতন সভ্যতার গৰ্ব্বদীপ্ত কত অবদান মুছে যায়, জানি মুছে যায়- ক্ষণিক বুদু দসম সময়ের তরঙ্গ-লীলায়। আজি হেরি দীপ্তি তব লঙ্ঘি’ চলে কাল-ব্যবধান। জড়-তিমির-স্তর ভেদি চলে কীর্তি জ্যোতিষ্ম- চির-মহীয়ান্ । মানব-মানস-লােকে পাতি’ রাখে আসন তাহার দীর্ণ করি’ শত মৃত্যু-ভার, বিজয়-গৌরবে চলে ; দূরে যায় স্মৃতি-অন্ধকার । নবরত্নমধ্যমণি ভারতের কবি কালিদাস, আজিকে জগতে তব বেদনার হ’ল সুপ্রকাশ আজি তব মন্দাক্রান্তা ক্রন্দনের তরঙ্গ-দোলায়, মেঘের হিন্দোলা-সাথে বিরহের বাণী কহি’ যায়। বর্ষার বেদনা-ছায়া তব শ্লোকে নীরবে ঘনায়।
কবি কালিদাস
যৌবনের জয়-বাণী রিক্ত-প্রাণে তপস্যার শেষে,
অশ্রুসিক্ত বেশে,
প্রেম-স্বর্গ-সভাতলে ধীরে ধীরে এসে,
তব স্নিগ্ধ ভাবলােকে দাড়ায়েছে মুর্তি ধরি’ হেসে।
ক
প্রাচীন, আজিকে তুমি লহ’ লহ প্রণাম আমার!
মােরা যে এসেছি চলি’ শত শত শতাব্দীর পার
নূতনের বাণী হেরি আজি দৃপ্ত নব সভ্যতার
চিরন্তন বেদনা বহিয়া,
ব্যগ্র স্তব্ধ হিয়া,
যে বাণী হেরেছ তুমি কোটি কোটি দিবসের পারে ।
উজ্জয়িনী-সভাতলে, স্রোত-ধৌত শিপ্রার কিনারে !
আজি বিশ্ব-সমস্যায় কি গান রচিতে তুমি কবি ?
কোন্ ছবি
হেরিত তােমার
প্রথম আষাঢ়-দিন নব বরষার ?
কোন্ গীতে মুখরিয়া হিয়া,
তপ্ত নর-নারী-প্রাণে ঢালিতে অমিয়া ?
পুরাতন বাণী,
তােমার প্রাতিত নেত্র ধীরে দিল আনি’
বিশ্বজনকরতলে আন্দোলিয়া সুপ্ত হিয়াখানি!
১শ
তীর্থপথে
। ।
তবু লাগে মনে,
আরাে যেন আছে কথা রহস্যের জালায়ন-সনে।
আরাে যেন আছে মধু প্রিয়ার অধরে,
আরাে শক্তি অক্ষরে অক্ষরে !
আজি খুঁজি কেন্দ্র তার। । আজি তাই গগনে গগনে,,
বিশ্বের মানসচক্ষু ক্লান্ত নাহি হ’ল অন্বেষণে।
জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৪
শরৎচন্দ্রের প্রতি [ শরৎচন্দ্রের ত্রিপঞ্চাশত্তম জন্মােৎসব উপলক্ষ্যে আমি হেরিলাম দূর মায়ালােকে সৃষ্টির উৎসব, অস্ফুট কুহেলি’ পরে সূর্যের বিভাস। ওগাে শিল্পী, হেরিলাম, ছায়া নয়-দীপ্তির বিভব- নিৰ্ম্মম, নির্মল সত্য। চন্দ্রের আভাস মিলিল, মিলিল যেন! মেঘের গুণ্ঠন গেল খসি। সুস্নিগ্ধ কিরণ-পাতে সুধার লহর উজলিছে, উলসিছে। গঙ্গানীরে বিশ্ব হেরে শশী । শুচি হ’ল জীবনের প্রতিটি প্রহর। আজো কাপে মায়ালােক,—চীনাংশুক কাঁপিছে বাতাসে; রশ্মি বুঝি স্নিগ্ধ হ’ল নেত্রবিন্দুপাতে। প্রস্ফুট মাটির ঘর। প্রতিমার আতুর-নিঃশ্বাসে গলিল হৃদয় যেন জাহ্নবীর সাথে । বাঙালীর মাতা, কন্যা, বধূ এলাে সেই স্রোত-পথে ; গুণ্ঠনের অন্তরাল মুছিল সহসা । কী গভীর জ্বালা ছিল স্তরে স্তরে, তুমি সেথা হতে তাদের আনিলে বহি’। মুদিতা অবশা অপূৰ্ব্ব যাদুর স্পর্শে সঞ্জীবিয়া চাহে সচকিত । কী মধুর প্রাণ-সােম ওগাে সােমপীথী
তীর্থপথে
গঙুষে করেছ পান!-আজি তাই মানসের সীতা
জন্মিল, আসিল ভেসে সুদূরের গীতি!
আজি আর দ্বিধা নাই—প্রেম মাের সহজ, স্বাধীন
সে যেন রে লঘুপক্ষ, বিহগ,—প্রবল।
মিথ্যারে চিনেছি আজি—শুষ্ক, দীর্ণ, প্রাণমন্ত্রহীন
তােমারে নমি তাই হে নিৰ্ম্মম, সরল, নির্মল।
৩১শে ভাদ্র, ১৩৩৫
কবি
আমি কবে জন্মেছিনু ধরিত্রীর চিরশূন্য কোলে
আজ তাহা মনে নাই—মিও আমারে ;
উদাসিনী ছিল বসি’,—পদপ্রান্তে নৃত্য-কল যােলে
ছুটিত উন্মাদ সিন্ধু, তরঙ্গের হারে,
ফেনশুভ্র মেখলায় সাজাইতে চাহিত প্রিয়ারে-
সৃজন-আনন্দময়ী চারু-নয়নারে !
লঘিয়া পৰ্ব্বতজঘা খরবেগে আক্রমি’ শিখর
দেখা দিল একদিন ধরিত্রী-সন্তান!
সুবিশাল বক্ষ তা’র বিজয়ের বাণীতে মুখর,
দৃষ্টি তার প্রতি অণু করিছে সন্ধান!
ধরণীর সাগরের আকাশের গাহি মহাগান--
জন্মিলাম কবি আমি চিরমহাপ্রাণ।
সেদিন সাগর-শঙ্খ ফুৎকারিল উৰ্ম্মির সংক্ষোভে
ওগো উদাসিনী ধরা, চাহ’ আঁখি মেলি’-
অমৃতপিপাসু নর কোলে তাের—সহস্র বিক্ষোভে
মরে নাই, মরিবে না—চাহ’ আঁখি মেলি।
রবি-শশী দুই নেত্রে বসুন্ধরা ক্লান্তি অবহেলি’
দিবা-রাত্রি রহে চাহি’ আভরণ ফেলি।
তীর্থপথে
সেদিন আমার চক্ষে ভাতিয়াছে আকাশের জ্যোতি
অনাগত পৃথিবীর স্বপ্ন বহি আমি।
রচিলাম রামায়ণ, সৃজিলাম রাম,—মহামতি-
সীতার বিরহ-গানে কঁদে দিবা-মী ;
রঘুর বীর্যের গাথা একযুগে রহিল না থামি’
মন্থর মেঘের শ্লোকে অশ্রু এলে নামি’!
আমার সে প্রাণ-জ্যোতি আবরিল সারাটি ভুবন
অমারাত্রে জ্বালি’গেনু স্বপ্ন-দীপশিখা।
নীর আঁধার ভেদি তীব্র তীক্ষ্ণ বাণের মতন
ছুটিল সে ভাবীযুগ-নিশার দীপিকা।
নবীন-ধরণী-সৃষ্টি-সে আমার ললাট-লিপিকা
তরুণ গরুড়-ভালে অমৃতের টীকা।
কোটি কোটি নরমুণ্ডে যে জন রাখিল পদ তার,
আমি তারে তুচ্ছ করি’ গাহি যাই গান!
রক্ত লিপ্ত বধমঞ্চে দেহ মাের দিনু শতবার
ঘাতক-কুঠার লঙ্ঘি’ মাের মহাপ্রাণ
ছুটি’ গেল প্রাণ-জয়ে, দিনে দিনে জীবন-সন্ধান ;-
ভয় নাই তার, যা’র নিত্য সুধাপান।
কবি
যতদিন ধরণীর বক্ষে রহি দেহ-ভার বহি,
ততদিন কে চিনিবে, কে জানিবে মাের?
আকাশের তারা জানে কত তাপ অনুদিন সহি
বসুধার তৃণ জানে শ্যাম স্বপ্ন-ডােরে
কত তারে সাজাইব, এ-মাটির পাত্র-খানি ভরে
কত রস পান করি নয়নের লােরে।
ক
চাহিনা ক্ষণের হাসি, ক্ষণিকের উচ্ছল নয়ন
মুহূর্তের লাগি’ কভু নহি যে কাতর!
আমি চাহি ধরিবারে ছন্দে মাের উদার গগন ;-
রচি যাব’ ধরণীর অমর বাসর
কবিতায় মৃত্যু যদি চুম্বে ভাল, তবে তারপর
রহিবে আমারি পৃথী-উদাস, অজর।
মগ্রহায়ণ, ১৩৩৫
কল্যাণ-স্বপন
জনার-ইক্ষুর ক্ষেত দূর জন-পদ-সীমানায়
জীর্ণ শীর্ণ বেড়া-ঘেরা ; মধ্যপথে আলবদ্ধ জমি,-
কর্তিত-হৈমন্তী-ধান্য ;-অনুৰ্বর, ঊষর, অসমী।
সরিষার ফুলে ফুলে অবিশ্রাম মক্ষিরা বেড়ায় ;
শ্যামলের মেলা হেরি’ নেত্র মাের মর্মে মূরছায়
চিরদিন ; চিরদিন কেমনে যে তাহারে উপমি’ ?
মানসের তৃষ্ণানাশী, শােভা সেই ;—চিরদিন নমি।
আমারি মনের গান তারে ঘেরি’ নীরবে ঘনায় ।
নীরবে ঘনা’ আহা সে-দিনের শ্মশানের পরে
একটি করুণ জ্যোতি উদয়-অচল-প্রান্ত হতে ।
সে মহানিদ্রার শীর্ষে আশীৰ্বাদ যেন থরে থরে
বর্ষিয়া জাগায়ে দিক অবিরাম উদ্যমের স্রোতে
সফল কল্যাণ-স্বপ্ন। মহাদৃপ্ত সাহসের ভরে
মধুর কোমল হাস্য ফুটাইব গ্লানির মরতে ।
মাঘ, ১৩৩৫
৪
দুহিতার অশ্রু
=
শিশু সে দুহিতা মাের দিনমান খেলিয়া বেড়ায়
ধুলা মাখি’ সারা গায়ে কভু ফিরে উঠানে উঠানে
কভু উচ্চ হাসি শুনি, কভু নৃত্য করে কলগানে,
দুলা’য়ে ঝামর কেশ, দুষ্ট কভু ঝুমুর বাজায়,
করতালি দিয়া দিয়া আধ-আধ গান গেয়ে যায় !
একদিন হেরিতেছি—সাথী নাই, বসিয়া সােপানে,
কাঁদিছে বিধুরা মেয়ে, চাহিল না কেহ তা’র পানে,
ক্রন্দন বাড়িয়া উঠে, রুদ্ধস্বরে কেবলি ফোপায় !
আদরে লইনু কোলে, আঁখিজল মুছা যতনে,
মনে হ’ল, সারা বিশ্ব মনে মনে এরি ধ্যান করে-
আপনার লীলাখানি তুলি’ দিবে সাথীর নয়নে,
প্রকাশিবে আপনারে। বেদনায় মৰ্ম্ম তাই মরে।
চকিতে জাগি মনে—সে ব্যথা বসিয়া নিরজনে
আমারি বুকের মাঝে নিঃশ্বসিছে শুধু হা-হা স্বরে !
মাঘ, ১৩৩৫
দুরাশা
;
অনাদি ক্রন্দন মােৰ মৰ্ম্মতলে আঘাতিয়া ফিরে
কোটি কোটি সিন্ধু-শঙ্খ ধন উৰ্ম্মি-বিভ্রম-চূড়ায়
শােভে যেন রৌদ্রালােকে ; কে যেন রে কেতন উড়ায়,
লঘু শুভ্র চীনংশুক—মত্ত বায়ু নিত্য তারে ঘিরে।
সে কি ভীম আয়ােজন!-বক্ষ যেন লক্ষ হয়ে চিরে
ধূলিতে মিশা’তে চায় আপনার শ্রেষ্ঠ সাধনায় ;
সার্থক করিবে যেন প্রত্যহের তুচ্ছ ব্যর্থতায় !
দ্বিধা তবু চিরদিন,প্রাণ তাই গুমরিছে ধীরে !
এ কি আত্মনাশী তৃষা! নব নব চিন্তারে জড়ায়ে .
এ কি ক্ষোভ অহরহ! কি দুৰ্বার চিত্ত-বিমথন।
ভাষা এরে নাহি পায় ;-আশা তবু ঘুরায়ে ঘুরায়ে
দেখে লয় হৃত রত্ন ; পঙ্গু যেন করিবে লঙ্ঘন
দুর্গম শঙ্কর-শৃঙ্গ! মনে হয়, শিখর ছাড়া’য়ে
উঠিয়াছে বীর-শির-বিন্ধ্য নয়—চুষে সে গগন !
মাঘ, ১৩৩৫
কবি-বন্ধুর
প্রতি
১
একদিন এসেছিলে ধীরপদে অশ্রুভারাতুর !
ব্যথাম্লান আঁখি দু’টি স্মরি আজো ;-প্রেম-বেদনায়
কাতর, আতুর বাণী শুনেছিনু তােমারি ভাষায়-
সে প্রেম তােমারি নহে—ছিলে যবে বিরহ-বিধুর!
সে প্রেম আমারাে মনে এনেছিল মধুর সুদূর
বিহগের শ্রান্ত সুর বনানীর মর্মর-সভায়—
শ্যাম তৃণভূমি’পরে এনেছিল শিশির-শােভায়
কভু অশ্রু-ছলছল, কভু স্তব্ধ ব্যথায় আতুর।
ক
সেথায় মিলেছি মােরা—মিলে গেছে হৃদয়-স্পন্দন!
আজ মাের যাত্রা শুরু—শুনিব না পদ্মর ক্রন্দন,
ব্যাকুল উদ্দাম নদী, চন্দ্রালােকে দিকের কিনারে
আজ মাের যাত্রা শুরু শীর্ণ শুভ্র পথ-রেখা বাহি’
পড়েছে চাদের আলাে--পথখানি আছে যেন চাহি
চলিলাম দূরে দূরে তুলে নিতে কঙ্কর-লীনারে।
সংগ্রামের শ্রান্তিরেখা হেরেছিনু ললাটে তোমার,
ক্ষতচিহ্ন বক্ষে ধরি’ তুলেছিলে তুমি জয়গান
মৃত্যুহীন পিপাসার। সেথা তব পেয়েছি সন্ধান
অমেয় প্রাণের শক্তি, গুপ্ত যাহা বক্ষে বিধাতার!
সে শক্তি আমারাে বন্ধু, যেথা আমি হেরেছি ব্যথার
তীর্থপথে হরিত-নীলিম রূপ, সেথা আমি চিরশক্তিমান্ প্রাণের উদ্বেল ছন্দে ধরিয়াছি উদাসীর গান, তুমি যেথা ভাষাহীন, সেথা মাের বাণী যে উদার। বিদায়, কিশােরবন্ধু, একদিন মিলেছিনু জানি, যে-বীণা বাজিছে দূরে, তারি সেই সুরজ্যোতিখানি চুমেছে হৃদয় মাের। এসেছে সে নয়নের’পরে- এ নয়ন নিশিদিন চাহে তারি পরম পরশ-- তাই দূরে চেয়ে আছি—ক্লান্তি কভু, কভু বা হরষ দোলায় সারাটি হিয়া-বিদায়ের অশ্রু তাই ঝরে। মুক্ত ছিল বাতায়ন,রৌপ্যশুভ্র শান্ত জলভার- আকাশের ছায়াখানি নমিয়াছে মৌন নদীবুকে, কালাে তরী ভেসে যায় বাণীহীন গােধুলির মুখে দূর-তীরে। সেথা আমি হেরিলাম নয়ন তােমার। কৃষ্ণ স্বচ্ছ জলতলে হেরিলাম শুভ্র বালুকার শুভ্রতম হাসিখানি। সে যেন গাে অবহেলি’ সুখে স্রোতের প্রবল পীড়া, চাহি’ আছে সরল কৌতুকে এ মাের নয়ন’পরে। দূরে গেল হৃদয়ের ভার । ৬৮
কবি-বন্ধুর প্রতি
-
সেথা আমি ফিরে পেনু আপনার হারানাে শৈশব,
হারানাে বনের কুঞ্জ,
নিরালায় পাখী-কলরব
দিনমান শ্রান্তিহীন ; ফিরে পেনু যেন আপনারে-
যে পান্থ দিনের শেষে বৈশাখীর আসন্ন শঙ্কায়,
ঘুরায়ে ঘূর্ণীর খেলা, উপেক্ষিয়া কালের ডঙ্কায়
দীপালা গৃহ পায়, আমি পেনু তেমনি তােমারে ।
চৈত্র, ১৩৩৫
পরিচয়
ধূলিপাণ্ডু রুক্ষ জনতায়,
দেখা হ’ল তােমায় আমায় !
যেথায় রৌদ্রের খেলা, পাংশু জীর্ণতার মেলা,
নয়নের বিজলী মিলায়
দেখা সেথা তােমায় আমায়।
হে বিদ্যুৎ, পরাণ-বাসিনী,
মন জানে, তােমারেই চিনি।
তবু সেই পরিচয়
নয়, যেথা কঙ্কণ-কিঙ্কিণী,
মন জানে, তােমারেই চিনি।
নির্জন গুহায় নয়
বহুদূর আকাশে আকাশে,
রথের ঘর্ঘর-ধ্বনি আসে ;
তারকার রেণুকায় পথ তার ছেয়ে যায়-
ছিন্ন-ভিন্ন মেঘবাষ্প ভাসে
বহুদূর আকাশে আকাশে !
সে-রথের উচ্চ চূড়া হ'তে
খসে ফুল ধূলার মরতে !
সে কুসুমে বাঁধি’ ডাের পদ প্রান্তে দিব তাের
সাধ ছিল ; জনতার স্রোতে,
তােরে হেরি ধূলার মরতে ।
পরিচয়
মিলায়েছে দিবসের আলাে।
তামসিনী রজনী ঘনালো!
ধূসরিতা, সেই ক্ষণে,
কালাে কুয়াসার সনে
মাের মুখে পড়ে তাের আলাে।
তামসিনী রজনী ঘনালাে !
হে বন্দিনী, তাের ইসারায়,
পরাণে আগুন ঝলকায়
বক্ষের প্রশ্বাস মাের ছিড়িয়া বন্ধন-ডোের,
তােমারই মুক্তির পথে ধায় !
পরাণে আগুন ঝলকায় !
ভিখারিণী, চেনাে এইবার,
এসেছে সে রাজার কুমার !
লাখাে জন-জনতায় চিনিতে নারিলে যায়—
তারি কষ্টে দাও তব হার।
ভিখারিণী, চেনাে এইবার !
বিষাদিনী, চেনে তারে চেনাে,
তােমারই সে কণি, তা’রে জেনাের
তােমার দূরের আশা,
তাহারই কণ্ঠের ভাষা,
মুক্তির চারণ বলে মেনন !
বিষাদিনী, চেনাে তারে চেনো!
পৌষ, ১৩৩৬
বন্দী কোকিল
এ মাের মনের আঁধার কোটরে কেন না জানি
বন্দী কোকিলে বেঁধেছে বাসা !
কোথা আলাে নাই, ফুল নাই কোথা’, বিলীন বাণী
অধীর তিমির সর্বনাশা !
ঈশানের কালো মেঘে মেঘে ছায় আকাশ-তল,
ধূলি-ঝঞ্চায় ঘেরে চারিধার ; কোথায় জল ?
পিঞ্জরে কঁপে সােনার কোকিল—অসাবধানী
লাল দু’টি ঠোঁটে ফোটে না ভাষা-
কতকাল হ’ল আঁধার কোটরে কেন না জানি
বন্দী কোকিলে বেঁধেছে বাসা !
হােথা’ ঝাউবনে সন্ধ্যা নামিছে নদীর তীরে
শাদা ভাট-ফুলে ভরিছে বন ;
আধ-ফোটো-ফোটো মুকুলের দল তরুটি ঘিরে
তুলিছে গুমরি’ ভােমর-মন !
সে জগৎ যেন চুপি চুপি আসে স্মরণ-পথে-
কত কথা বলে আপনা-আপনি আপনা হতে,
কন্টক-ঘায় স’রে সরে যায় আঁচল ছিড়ে,
তবু উঠে সুর-গুঞ্জরণ !
ওগাে কতবার নামিল সন্ধ্যা নদীর তীরে
কত ভট-ফুলে ভরিল বন !
१२
বন্দী কোকিল আজি এ নগর-পাষাণে হেরি যে রৌদ্র-রাজ- সে কি গাে আমার মনের দাহ ? দূর অলিন্দ-বন্ধ-কারায় হায় নিলাজ বন্দী কোকিল, কি গান গাহ’? হেথা আননা কি গাে ভীরু পল্লব-মর্মরিত ? বনের বেণুর:আননা কি গাে সুর-সঞ্চরিত? অশথ-জামের চিকণ-পাতায় পরে কি সাজ- আলাে ও ছায়ার সে অবগাহ ? আজি রৌদ্রের রুদ্র-লীলায় হে সুর-রাজ ছড়াও কি শুধু মনের দাহ ? তােমারি মতন আমার এ-মনে কঁদিছে কে সে- বাঁধন-নেশায় লাল সে আঁখি ! গােধূলি-প্রভাত-ফিরে যায় রাত হেথায় এসে অঘাের এ ঘাের টুটিবে না কি? যদি নাহি টুটে, তবে তােল’ সুর উৰ্দ্ধ গ্রামে, উঁচু-নীচু পথে চলল। মনােরথ ডাহিনে বামে সবার উপরে ফেলল আলাে-সুর মধুর হেসে- কোনােখানে কিছু রেখােনা বাকী, সােনার কোকিল, তােমারি মতন কঁদিছে কে সে- বাঁধন-নেশায় লাল সে আঁখি।
তীর্থপথে . হায় গােঠে গােঠে ফিরে এলো ধেনু বিকালবেল- কুলায়ে তােমার ফিরিবে কবে ? শিকল পাহারা-ঝটপট ডানা, ধূলির মেলা ভুলায়ে তােমারে ল’বে কি নভে ? সবুজ পাতার আড়ালে মধুর লাল সে ফল- গােয়লের ধোঁয়া, নিম-পল্লব, ছায়া শীতল, নিথর দীঘির উপরে পাখীর কি কল-খেলা- তারা কি তােমার পরশ লভে ? ঘন শ্যাম বনে ফিরে এলাে পাখী বিকালবেলা কুলায়ে তােমার ফিরিবে কবে ? ওগাে দিশাহারা বন্দী রাগিণী, তােমারে লয়ে পাঠাইমু আজি সীমার শেষে ; দিবস-নিশার হারা গীত-গান যেথায় ব’য়ে কত প্রাণ চলে অনাম দেশে। সেইখানে আজি হারাইতে চাই আপন হিয়া জানি না কোথায়, কতদূরে তুমি মিলিবে গিয়া! শীতনিশাপার—প্রদোষ-তিমির-বিজনালয়ে সুরের কুসুম চলিবে ভেসে ওগো পথহারা বন্দী রাগিণী, তােমারে লয়ে পাঠাইমু আজি সীমার শেষে ! ফান, ১৩৩৬ ৭৪
পুরুষ
আমার সম্মুখ অন্ধকার, আলাে হাতে নাই কোনােজনা-
আকাশে তারকা নাই— লক্ষ লক্ষ বাদুড়ের দল
তীক্ষ্ণ চৰ্ম্মগন্ধসনে নিশারে করিছে অভ্যর্থনা
হে পুরুষ, এই ত সময় ।
অমৃতের আশা নাই—পান কর তীব্র হলাহল ;
জীবন-সরােজ-রাগ সে ত শুধু অলীক কল্পনা
সত্য বলে মাননা পরাজয়--
হে পুরুষ, এই ত সময় ।
-
জাগাে জাগাে হে প্রথম নর,
প্রস্তর-কঠিন হিয়া, রক্তচক্ষু, উলঙ্গ, প্রখর
জাগাে এইবার !
পাষাণী ধরার বক্ষ বিদারিয়া আনো ক্ষীরধার!
শ্লিল দক্ষিণহস্তে রাখে। শুধু অসীম নির্ভর।
বধূ তব পীনস্তনী, বাম করে লহ’ তা’রে পাশে
তারপরে চলাে পথ-পাংশুল, ধূসর।
জাগো, জাগাে হে প্রথম নর!
স্যার বক্ষ বহি বহি’ অস্ত্রাঘাতে নামে রক্তধার ;
নয়নে ঘনায় ছায়া আসন্ন মৃত্যুর
তবু পথ, শুষ্ক দীৰ্ণ নিদাঘের খর মরুপথ—
পিপাসার্ত ক্লান্ত নারী—আরাে দূর, চলাে আরাে দূর!
দেবতা কোথাও নাই, গঙ্গা নাই,—সবই মৃতবৎ,
তীর্থপথে
শুধু আছো তুমি বন্ধু, আর আছে শাণিত তােমার
শত্রু রক্তপায়ী সেই ঝকমক তীক্ষ্ণ তরবার।
জাগাে, জাগাে হে বীর প্রথম,
আপনি জ্বালাও আলাে, অন্ধকার রবে চিরদিন
চিরদিন গাঢ় মসী-তারি মাঝে আননী গো বিষম
কলকল জলস্রোত, নিজ হস্তে ধরে। গাে কুঠার !
স্রষ্টা তুমি জেনাে আপনার
পরম করে সে আয়ু, যে আয়ুরে বলে সবে ক্ষীণ।
জাগাে, জাগগা কবির অন্তর,
হে পুরুষ, জাগে আজি, হে নির্ভীক, হে প্রথম নর
বাজিয়াছে রণভেরীশঙ্কা হরাে হে মহাশঙ্কর !
দাও সেই মহাবহ্নি, স্বপ্নে মাের লাগা’ব আগুন,
হে পুরুষ, এই ত সময় ।
লােকালােকগিরি লঘি’ সে শিখার চঞ্চল সঞ্চর
সত্য বলে মানি শুধু জয় !
হে পুরুষ এই ত সময়।
চৈত্র, ১৩৩৬
৫
আমার এ কাব্যলােকে • আমার এ কাব্যলােকে কোথা হতে জানি না কখন বহে যায় বৈশাখের ঝড়। মনের বেণুর দল নুয়ে পড়ে ছোয় না গগন থেমে যায় সহজ মৰ্ম্মর। থেমে যায় দক্ষিণার গান, থেমে যায় মুখর পরাণ ; কা’রা বলে বার-বার, জাগাে, জাগাে, ওগাে কবি-মন, কালাে হ’ল দিবস প্রখর কালাে হ’ল !ছায়া কার ? হু-হু হু-হু শুনি গরজন ধেয়ে আসে কালান্তের ঝড় ! চলিলাম দ্বার খুলে-রুদ্ধ দ্বার বহু বহু কাল, ঝাপসা চোখের’পরে মাের- কঠিন কাকর লাগে—মুখে লাগে সঞ্চিত জঞ্জাল! ছিড়ে যায় যত্নে-রচা ডাের ! ছিড়ে যায় মালাখানি তার ক ভেঙে পড়ে হৃদয় কাহার। কোনাে অবসর নাই—ধেয়ে চলি আজ হতে কাল পরাণে যে মরণের ঘাের- দ্বার খুলে চলিলাম, রাত্রি নাই নাহিক’ সকাল ছিড়ে যায় যত্নে-রচা ডাের। ११ তীর্থপথে = আমার সে পথে আমি হেরিলাম কলের পুতুল হেরিলাম মেষধৰ্মী নর- কতদূরে পথ তা’র ? নির্বিকার, নাহি কোনাে ভুল, প্রশ্ন নাই—চলিয়াছে জড়। শােননা, শােননা, সে মৃত্যুর মাঝে আমার পরাণ বাজে না যে ! একপাশে রহিলাম-ঝরে যায় মনের বকুল, প্রতীক্ষায় চিত্ত থর-থর- হেনকালে মনে হ’ল, আসিলে কি হে চিরব্যাকুল অসংশয়ী কালান্তের ঝড়! সে মহানির্ঘোষ, গুরু, আজি মাের কণ্ঠে ল’ব শিখে ল’ব সেই ধূলার সঙ্গীত, বিমান আলােড়ি তুলি’ বাণী মাের ষাক্ দিকে দিকে অচেতনে দিবে সে সম্বিৎ । শােনন, শােননা, স্বপনের পরে, লেলিহান্ অগ্নিশিখা ধরে- কুসুম-আয়ুধ আজি ভস্ম হ’ল নিমিখে নিমিখে লহ’ কবি পরম ইঙ্গিত-- সে মহানির্ঘোষ, গুরু, কণ্ঠ ভরি’ লইলাম শিখে তুলিলাম ধূলার সঙ্গীত। ৭৮ আমার এ কাব্যলােকে একটি প্রাণের স্পর্শ চেয়েছিনু এই ধরণীতে, হােক না সে দীনতম, দীন- একটি মানুষ চাহি নির্বিকার জুড়ে প্রাণ দিতে চলে যায় লক্ষ রাত্রি-দিন। বহি বহি’ আপনারে তাই, আমার ক্লান্তির সীমা নাই । খরদীপ্তি মধ্যদিন, পিপাসার্ত জীবন বহিতে সাধ নাই—আশা হয় ক্ষীণ কোথায় সে প্রাণবহ্নি? ল’ব তারে এই ধরণীতে হােক না সে দীনতম দীন। বিশীর্ণ কঙ্কাল হেরি' চোখে মাের ধাঁধা লেগে যায়- পুরুষের কণ্ঠ নাহি আর। “নারীরে লভে না নারী--মহাভঙ্গী সিংহ সে কোথায়- -মেঘসম গর্জন গুহার ? পিঙ্গল কেশর-মাঝে ওই, ক্ষুধাদীপ্ত নেত্র দু’টি কই অসাড়-পাষাণে যেই রক্তলেখা হেরিবারে চায় গজমুক্তা নখরে যাহার দু’পাশে কঙ্কাল ঠেলি’ পথ-চলা হ’ল আজি দায় পুরুষের কণ্ঠ নাহি আর। ৭৯
তীর্থপথে
==
আমার এ কাব্যলােকে তাই বহে বৈশাখের ঝড়,
আমি চাই
নূতন জগৎ,
নুয়ে পড়ে শিশুত, থেমে যায় সহজ মৰ্ম্মর
চাহি না রহিতে মৃতবৎ !
সূৰ্য্য, তুমি সরে যাও দূরে
পরাণ-গগন মাের জুড়ে
কালাে-জটা মরুতের নৃত্য হোক—পৃথা থর-থর
উড়ে যাক মৈনাক পৰ্বত।
কবে দেখা দিবে পৃথু ? তারি পরে আমার নির্ভর
আমি চাই নূতন জগৎ।
চৈত্র, ১৩৩৬
শুধু কবি
মেশিনের ঘূর্ণীধুমে যে আকাশে জ্বলেনাক’ তারা,
যেখানে ধুলির মত চুর্ণ হ’ল আশা ও বাসনা,
যেথায় প্রাণান্ত শ্রম, নিঃশ্বাসের অবসর নাই,
আলাে আসে ভয়ে ভয়ে গলিপথে সুড়ঙ্গের দ্বারে,
ছায়া যেথা অধীশ্বর, যেথা ঘুরে টাকার চাকারা
সীমাহীন বর্ণহীন পথে,নগরী সে শবাসনা-
ধাত্রী নয়, অঙ্গুলি-হেলনে তা’র ছুটিছে সদাই
দীর্ঘপথ, শীর্ণদেহ—শুষ্কমুখ কশার প্রহারে !
সেখানে দেখেছি আমি সঙ্গীহীন ক্ষীণ গৌরতনু,
শুনিতে চাহিছে প্রাণে বহু যুগ-যুগান্তের ভাষা-
গাহিতে চাহিল কণ্ঠে সিন্ধু-তীর-অরণ্য-মর্মর,--
বহে চোখে চিরদিন সাগরের শীকর-কণায়,
শীতল শৈবালে আর জনহীন সামুতে যে অণু
নিঃশব্দে জাগিয়া থাকে—তারি পরে একি এ দুরাশা!
কোলাহল তােমাদের, সে শুনিছে মুখর ঝঝর
আত্মার অতল দেশে,ভাসিছে সে সুরভি হাওয়ায়।
উদাসীন, মনে হয়, তােরি লাগি’ রজনী আমার
হয়েছে মদির-রূপা! চ'লে গেছি পাখা ভর করি
যেখানে মিলেছে গঙ্গা সাগর-দ্বীপের কাছাকাছি,
দুলিছে ফুলিছে সিন্ধু, পাঠাইছে জোয়ার-বারতা
৮১
তীর্থপথে
3
শ্রান্ত দু’টি কপােল প্রিয়ার ; তলহীন সে পাথার
হিন্তালের বনভূমি, শব্দহীন গহন শৰ্বরী,
সুশীতল কলধ্বনি—এক বাণী, ‘আছি, আমি আছি-
উপরে জাগিছে চন্দ্র, কবি সে-ও, সে-ও কহে কথা !
*
মাঘ, ১৩৩৭
৮২
ভাবী মানব কতকাল চেয়ে র'বে ওই মাঠে ওগাে কাঙালিনী, মরা বিলে, জনশূন্য ক্ষেতে? কে আসিবে ধূলিপথে তােমার মলিন বাসে, ছায়াঘেরা দীন আঙিনায় ? গহন অরণ্যে তব কোন্ আশা হে নিরাভরণা, পুষিছ অনন্তকাল ধরি’ ? দিবা, আলােক-মালিনী নিঃশব্দে চাহিয়া থাকে যেথা শুধু বটে ও অশথে ফেলেছে জটার জাল ; একা শশী জাগ্রত নিশায় দুর তার-লােকে জাগে ; কঁাদে রাত্রি অসিত-বরণা। নাহি কি সন্তান কেহ দৃঢ়ব্রত পুরাণের বীর- তােমার বন্ধন খুলি ছুটে যাবে বাহির-জগতে, নীরবে সংগ্রাম করি’ ক্ষতদেহে জয়মাল্য ধরি’ আসিবে তােমার ঘরে সৌম্যমুখে সম্পদ বহিয়া ? নাহি কি তেমন কেহ ? তবে কেন সারাটি রাত্রির কঠোর প্রতীক্ষা বহি’ একা জাগাে শুভ্র রুক্ষ পথে, ভিখারিণী, কহ’ মােরে, কে নিয়েছে রত্ন অপহরি’? কতকাল এ দীনতা রবে তুমি নীরবে সহিয়া ? বিধাতা, আমারে শুধু দিলে এই লেখনী তােমার, দিলে দৃষ্টি দেখিবার -ধরা খুলে মৰ্ম্মের বারতা। দিলে না পাষাণ-বাহু, দিলে শুধু গভীর হৃদয় । একবার খুলে দাও যেথা রাখাে শক্তির নিঝর
তীর্থপথে
=
সেথা হতে মন্ত্র ল’ব, মূৰ্ত্তি গড়ি’ দিব কল্পনার
গড়িৰ এমন নর, কী যেই, কহে নাক কথা-
গতিহারা সৃষ্টি তব সে করিবে নব প্রাণময়-
জানি তারে বাধা দিবে, তবু তার অসীম নির্ভর।
মা,১৩৩৭
1
৪
রবীন্দ্র-জয়ন্তী
;
মােরা বলি, আর কেন?—ক্ষান্ত করে বাণীর নিঝর
নবযুগ-মধুচ্ছা! মধ্যাহ্নের হ’ল অবসান ;
ছায়া হল দীর্ঘতর ;-পূরবীতে যে করুণ তান,
বাজিছে কম্পিত, সুরে, তারাে শেষ ; গাঢ় কণ্ঠস্বর!
মােরা বলি, কোথা’ গাও ?-নগরীর বিলাস-সাগর
দুলিছে কি তব সুরে? কিম্বা কোথা সে বলিষ্ঠ প্রাণ
যে ধরিবে বজ্রকণ্ঠে পরিত্যক্ত তােমার বিষাণ?
ছায়া এলো; কেন আর?-ক্ষান্ত করাে বাণীর নিঝর।
দূর হতে কারা কহে, নহে, নহে আরাে কিছুকাল ।
ফুরাতে শেষরশ্মি গােধূলির অস্ফুট প্রবাহে,
কবি! তুমি ক্লান্ত করে লেখনীর শেষ রক্তদানে
ঘুচাও এ মৃত্যু-তৃষা! ওই দু’টি নয়ন বিশাল
না মুদিতে, স্পর্শে ত’র স্নিগ্ধ করে বিশ্বের প্রদাহে।
জীবন রচিব মােরা মৃত্যুজয়ী তােমার ও গানে!
আষাঢ়, ১৩৩৮
রবীন্দ্রনাথের প্রতি
[ কবির সপ্ততিতম জন্মােৎসব উপলক্ষ্যে ]
তুমি রবি আকাশের, হিরন্ময় রথ-সমাসীন
বৈদু-মুকুট শিরে, আপিঙ্গল অরুণ-সারথি
সপ্ত তুরগের রশ্মি দৃঢ় মুষ্টিতলে—তুৰ্ণগতি
ধায় রথ—ছিন্নমেঘবাষ্পচূর্ণ আবর্তে বিলীন,
জ্যোতিস্রোতে ভেসে যায়—এ উপমা আমাদের নহে।
অথবা যে ‘অ্যাপােলাে’র স্মিত হাসি ফুটালাে ভাস্কর
সূর্যের দেবতা যিনি, সপ্ত অশ্ব যার রথ বহে,
সুঠাম সুন্দর মূর্তি,—“লরেল-পল্লব’—শিবােপর,
কল্পনা নামিছে ভঁরে, কিন্তু সে যে কানে কানে কহে,-
‘কবি যে স্বর্গের নহে-মৰ্ত্তলােক করে সে ভাস্বর।
হে মানব, জীবলােকে ক্ষণস্বর্গ করেছ সৃজন,
সে তব অমােঘ স্বপ্ন ;-সেথা মােরা লভিনু বিশ্রাম।
রৌদ্রদগ্ধ, শ্রান্ত তনু-পল্লবের ছায়া লভিলাম।
শ্যামস্নেহমুগ্ধদৃষ্টি লভিলাম মৰ্ম্ম-বীজন।
নেত্র ভরি’ এলাে অশ্রু, কণ্ঠ মাের স্তব্ধ হ’ল গানে—
গান নয়—যেন বাজে অপ্সরীর চরণ-নুপুর ;
মনে হয়, সুখস্বর্গ এলাে বুঝি ধরার বিতানে,
একসাথে উঠে গন্ধ, গাঢ় ধূম ধূপ-অগুরুর
বহুদূরে বাজে বঁাশী, মাতে প্রাণ অধীর সন্ধানে
যত তাপ, যত দাহ মনে হয় সকলি মধুর।
রবীন্দ্রনাথের প্রতি
এ স্বপ্ন মিলা’য়ে যায়,-সূক্ষ্ম এই সুর-মুর্তিগুলি
জীবনের রুক্ষপথে খণ্ডে খণ্ডে ধূলিতে লুটায়—
উচ্চকিত রাজপথে ত্রস্ত, ক্ষুব্ধ ঘন জনতায়
মাধুৰ্য্য হারায়ে প্রাণ নিরন্তর উঠে যে ব্যাকুলি’!
মােরা চেয়েছিনু শুধু প্রাণ ভরে লভিতে নিঃশ্বাস,
যেথা তুমি আন্দোলিছ নিরন্তর সঙ্গীত-সুরভি
তরলিত কণ্ঠস্বনে, ভাবনার স্বচ্ছ অবকাশ
যেথা তুমি বিস্তারিছ এ বিশ্বের প্রাণ-স্পর্শ লভি
গম্ভীর, নিৰ্ম্মল মন্ত্রে ! আমাদের ধূসর আকাশ
বিষনীল হয়ে উঠে—ভুলে যাই শান্ত ধ্যানচ্ছবি ।
প্রাচীরে পাংশুল রেখা—জনাকীর্ণ বসতির মাঝে
দাসজীবনের গ্লানি বহি’ চলে অযুত ধিক্কার,
গােপন অশ্রুর ফক্ত, কঙ্করের মাঝে হাহাকার
জড়তার মহাস্তুপে শুনিতেছি সুগভীর লাজে।
তাই, বড় সংগােপনে তব গান রেখেছি লুকায়ে
নিভৃত মুহুৰ্তমাঝে—যবে অশ্রু উঠিবে উচ্ছলি
অকারণে চৈত্র-রজনীতে, উদাস বসন্ত-বায়ে
শৃঙ্খল মােচন করি’ অন্তরের কানে কানে বলি
তব উদ্বোধনী বাণী-শ্রান্ত প্রাণ রাখি যে জাগায়ে
নব প্রভাতের লাগি’ স্তব্ধ করি’ কণ্ঠের কাকলী ।
২৭শে কার্তিক, ১৩৩৮
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.