Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Prakritik Bhugol Ed.20

Mukhopadhyay, Radhikaprasanna · 2009/10/20

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

INTRODUCTION
To
PHYSICAL GEOGRAPHY
RADHIKA PRASANNA MUKHERJI.
ভূবিদ্যা
বি ষ য়ক পা ঠ
অর্থাৎ
প্রাকৃতিক ভূগােল।
শ্রীরাধিকাপ্রসন্ন মুখােপাধ্যায় কঞ্জু
বিংশ সংস্করণ
Calcutta:
PRINTED BY JADU NATH SEAL,
HARE PRESS,
55, AMIJERST STRELT.
PUBLISHED BY TIIE SANSKRIT PRESS DEPOSITORY,
148, BARANASI GHOSE'S STRELT.
April, 1887

অষ্টাদশ সংস্করণের বিজ্ঞাপন। বিদ্যালয় সমূহের ইস্পেক্টর বিজ্ঞানশাস্ত্রবিশারদ শ্রীযুক্ত সি, বি, ক্লার্ক মহােদয়ের পরামর্শ গ্রহণ করিয়া ১৮৬৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই পুস্তক প্রথমবার মুদ্রিত ও প্রচারিত করি। তদবধি ইহা বিদ্যালয়ের পাঠ্য পুস্তকাবলীর মধ্যে সন্নিবিষ্ট আছে। পুস্তক বৃহৎ হইলে ছাত্রদিগের অসুবিধা হয়, এজন্য কোন কোন বিষয় সংক্ষেপে লেখা হইয়াছে। এত দিন পুস্তকের মূল্য আট আনা ছিল, এক্ষণে ছাত্রদিগের সুবিধার জন্য ছয় আনা নির্দিষ্ট হইল। ইতি জুলাই ১৮৮৫।

সুচীপ প্রথম অধ্যায় • ••• . ৩০। ৫ । ভূপঞ্জর ভূভাগের পরিবর্তন... ভূরাবলী বায়ুদ্বারা ভূভাগ পরিবর্তন জল উদ্ভিদ ও জীবাদি ৭. ।।। ।। তাপ ... । ৫০। ০ । । ভুপৃষ্ঠ ও ভূগর্ভের তাপ পরিমাণ ১ম অধ্যায়ের প্রশ্ন দ্বিতীয় অধ্যায়। ভূমণ্ডলের আদিম অবস্থা ০৫। সূৰ্য ও পৃথিবীর সম্বন্ধ চন্দ্রালােকের তাপের হ্রাস সৌরজগতের আদিম অবস্থা । • • ১৪ ২য় অধ্যায়ের প্রশ্ন। ০ । • ১৬ তৃতীয় অধ্যায়। t । জল ও স্থল বিভাগ ... ৩য় অধ্যায়ের প্রশ্ন । st s চতুর্থ অধ্যায়। ৫০ স্থল সংস্থা লভাগ সন্নিবেশের নিয়ম ৪র্থ অধ্যায়ের প্রশ্ন । পঞ্চম অধ্যায়। . . স্থলভাগের উচ্ছায় ভেদ উচ্ছায় ভেদ বিষয়ক নিয়ম ।। ঐ চিত্র '... ২৭ ৫। ৫ম অধ্যায়ের প্রশ্ন. ... * ০ ৫।

৫০ ষষ্ঠ অধ্যায়। ।। পৰ্বত সংস্থান, মালভূমি ও উপত্যকা পৰ্ব্বতশ্রেণীর নৈসর্গিক কাৰ্য পৰ্বত সংস্থান প্রভেদে দেশের প্রকৃতি ভেদ গিরিপথ ও উপত্যকা ৬ষ্ঠ অধ্যায়ের প্রশ্ন • ৮ • ৩৪ সপ্তম অধ্যায়। * * * নিম্ন প্রান্তর ও মরুভূমি পে... সাইবিরীয় প্রান্তর উত্তর আমেরিকার প্রান্তর লেন প্যাম্পাস সাহারা মারব দ্বীপ গোবি ৭ম অধ্যায়ের প্রশ্ন ৪ ০ : 6 * * * ••• ৪৩ ••• ৪ ৪ অষ্টম অধ্যায়। ••• ৪ ৫ ও ৭ * * * দ্বীপ সংস্থান প্রবালদ্বীপ। অগ্নিসম্ভূত দ্বীপ ৮ম অধ্যায়ের প্রশ্ন ৪৯ । এ ০ ০ ০ নবম অধ্যায়। f • * * আগ্নেয়গিরি ও ভূমিকম্প আগ্নেয়গিরি সংস্থান... বিশ্ববিয়স এটনা... হেলা অগ্ন্যুৎপাতের শক্তি ... ভূমিকম্প . . । ৫ ৭ . ।

•• હર ০৮০ কচ্ছ প্রদেশের ভূমিকম্প লিসবনের ভূমিকম্প... ভূমিকম্পাদির কারণ ৯ম অধ্যায়ের প্রশ্ন। ৬৭ ৫০ •• দশম অধ্যায়। ৭। ৭১ ৭১ ৭ ৩ ••• ৭৩ ৭৪ ৫. . ৭৫ = = = সাগরের বিবরণ সাগরের বর্ণ সাগর জলের উপাদান ঐ উষ্ণতা... ঐ ঐ গভীরতা ঐ ঐ সমোচ্চতা ঐ তরঙ্গ ... ঐ বেলা বন সমুদ্রস্রোত উপসাগরীয় শ্রোত অন্যান্য স্রোত বাণিজ্য পথ স্রোতেবিহীন সাগর সাগরের উপকারিতা ১০ ম অধ্যায়ের প্রশ্ন। ৭৭ ৭ ৮ • ৭৯ ৮০ ০ ০ ০ এr . ৮২ ••• ••• ৮৪ একাদশ অধ্যায়। প্রস্রবণ, নদী, জলপ্রপাত ও হ্রদ বৃষ্টি জলের পরিণাম... প্রস্রবণ ••• । নদী . ৮৮ ০ ০ • • • জলপ্রপাত e e? + + + ১১শ অধ্যায়ের প্রশ্ন... দ্বাদশ অধ্যায়। বায়র উপাদান বায়ুতে জলীয় বাষ্পের কাৰ্য ••• tণ০ দ • . . . • ০ । ও . . ৫ । . বায়ুর উপর তাপের কাৰ্য্য বায়ুর উষ্ণতা ভেদের কারণ সমােষ্ণতাসূচক রেখা, শীতােষ্ণতা ভেদের কাৰ্য্য ঝটিকা ঘূর্ণিবায়ু জলস্তম্ভ বাণিজ্যবায়ু উর্ধস্থ বায়ু প্রবাহ মৌসুম বায়ু অন্যবিধ বায়ু বায়ুস্থ জলীয় বাষ্প মেঘ ও বৃষ্টি কুজঝটিকা ও শিলাবৃষ্টি তুষার ও বরফ ১০৪ • • • | u ১৮৭ • । । । । . তুষার ক্ষেত্র • ১ ৫ . হিমশিলা শিশির ১২শ অধ্যায়ের প্রশ্ন... ১১৪ ত্রয়ােদশ ত্রয়োদশ অধ্যায়। ০ ০ ০ • • উদ্ভিজ্জ সংস্থান ১৩শ অধ্যায়ের প্রশ্ন... চতুর্দশ অধ্যায় । জীব সংস্থান ১৪শ অধ্যায়ের প্রশ্ন... २२ পঞ্চদশ অধ্যায়। মনুষ্য জাতিভেদ ••• ১৫শ অধ্যায়ের প্রশ্ন... • • •

ভূবিদ্যা
বিষয়ক পাঠ।
প্রথম অধ্যায়।
ভূপঞ্জর।
আমরা এই সুদৃশ্য ক্ষিতিলের শােভা সন্দর্শন করিয়া
বিমােহিত হই, এবং সহসা মনে করি যে এক্ষণে যে যে
জাতীয় উদ্ভিদ ও প্রাণী আমাদের দৃষ্টিগােচর হয়, তাহারা
বুঝি চিরকালই ভূলােকে বিরাজ করিতেছে। পৃথিবীর
নৈসর্গিক অবস্থা ভিন্ন প্রকার ছিল, বা ধরাধামে অন্যবিধ
জীবাদির বাস ছিল, একথা আমাদের মনে স্থান পায় না।
এক্ষণে, যে সকল জীবাদি ভূমণ্ডল অধিকার করিয়া আছে
পুরাকালে তন্মধ্যে অধিকাংশের জন্ম হয় নাই, একথা আমরা
কখনই ভাবি না। মনুষ্য ভূমণ্ডলের অধীশ্বর বলিয়া এত
গর্ব করিয়া থাকেন, পৃথিবীর আদিম অবস্থায় তাহার আবি-
ভাব হয় নাই, ইহা আমাদের মনে একবারও উদয় হয় না।
এক্ষণে যে সকল উন্নত পৰ্ব্বতশ্রেণী তুষারমণ্ডিত শৃঙ্গ উত্তোলন
পূৰ্ব্বক গগন-মার্গের শােভা সংবর্ধন করিতেছে, তাহারা
কোন,কালে সাগরগর্ভে নিহিত ছিল, এবং যে সকল স্থান

( ২ ) অর্ণবজলাকীর্ণ, তৎসমুদায়ের কোন কোন অংশ উন্নত ভূভাগ ছিল, ইহা আমরা কখনই মনে করি না। ফলতঃ আমরা সহসা ভূভাগের কোন পরিবর্তন দেখিতে পাই না বলিয়া, মনে করি যে উহা চিরকালই একভাবে রহিয়াছে। পৃথিবী জলস্থলময় বর্তুলাকার প্রদাৰ্থ এবং উহার বায়বীয় আবরণ আছে। এই ত্রিবিধ পদার্থ সংবলিত জড়ারাশিকে ভূমণ্ডল বলা যায়, এবং উহা শূন্থমার্গে বৃত্তাভাস পথে সূৰ্য- মণ্ডলকে প্রদক্ষিণ করে। কি কি নৈসর্গিক কারণে ভূমণ্ডলের নানাবিধ ঘটনা সংঘটিত হয়,এই পুস্তকে তন্মধ্যে প্রধান প্রধান কয়েকটির উল্লেখ করা যাইবে। ভূবিদ্যা শিক্ষা করিতে হইলে আমাদের চতুর্দিকে যে সকল নৈসর্গিক,কাৰ্য্য হইতেছে তাহা পৰ্যবেক্ষণ করা আবশ্যক। আমাদের বঙ্গদেশে ২০/৩০/৪০ বৎসরের মধ্যে ভূভাগের যে সকল পরিবর্তন হইয়াছে ও এক্ষণেও হইতেছে, তাহা নিতান্তু সামান্য নহে। নদীয়া, যশােহর, ও ২৪ পরগণা জেলার মধ্যে ভৈরব, চিত্রা, ইছামতী, মাইসাের, নবগঙ্গা, খড়িয়া, কুমার, ভাগীরথী প্রভৃতি নদ নদী বালুকাপূর্ণ বা শুষ্ক প্রায় হইয়াছে ; গঙ্গা ও পদ্মার তীরস্থ কত গ্রাম নদীগর্ভে গ্রাসিত হইয়াছে। কোথাও বা বৃহৎ চর উৎপন্ন হইয়া ভূমির আয়তন বৃদ্ধি করি- য়াছে। নদীর জলসহ মৃত্তিকারাশি আসিয়া কত বৃহৎ হ্রদ ও নিম্ন ভূমি মৃত্তিকাপূর্ণ করিয়াছে ; কোথাও বা প্রকাণ্ড আরণ্য প্রদেশ মনুষ্যের আবাস ভূমি হইয়াছে ; কোন নূতন প্রদেশ দিয়া নদী প্রবাহিত হইয়াছে, ও পুরাকালীন নদী শুষ্ক ও তৃণপূর্ণ জলা রূপে পরিণত হইয়াছে। স্থানে স্থানে নদীর গর্ভে বালুকা জমিয়া দ্বীপ উৎপন্ন করিয়াছে, কুত্রাপি পার্শ্ববর্তী

গ্রাম ভাঙ্গিয়া নদীর প্রস্থ বৃদ্ধি করিয়াছে। এদেশে ভূমিকম্প
ও আগ্নেয়গিরির সমধিক প্রভাব থাকিলে, আর ও কত
পরিবর্তন লক্ষিত হইত।
যদি ২০৩০ বৎসরের মধ্যে বৃষ্টি ও বন্যার জলে ভূমণ্ডলের
এত রূপান্তর হয়, ২০৩০ হাজার বর্ষে কত অধিক হইবার
সম্ভাবনা ? ২।৪।১০ লক্ষ বৎসরে আরও কত অধিক পরিবর্তন
হইতে
পারে ?
ভূবিৎ পণ্ডিতেরা পৃথিবীর বহির্ভাগ
পৰ্যবেক্ষণ করিয়া স্থির সিদ্ধান্ত করিয়াছেন যে, ইহা অপরিমিত
কাল বিদ্যমান আছে। এই সুদীর্ঘকালের মধ্যে কত ভিন্ন
ভিন্ন জাতীয় জীব ও উদ্ভিদ পৰ্যায়ক্রমে অবতীর্ণ হইয়াছে,
ধরাতলে স্বীয় প্রকৃতি অনুসারে কালযাপন করিয়াছে, এবং
অবশেষে পৃথিবীর ভাবান্তর উপস্থিত হইলে ক্রমে ক্রমে বিনষ্ট
হইয়া গিয়াছে। এক জাতির বিনাশসাধন না হইতে হইতে
আবার অভিনব প্রকৃতিবিশিষ্ট জীবপরম্পরা আবির্ভূত হইয়া
জগতের জীবশ্রোতঃ প্রবাহিত রাখিয়াছে। শীত গ্রীষ্মের
আধিক্য, আহারের অল্পতা ও অন্যান্য জীবাদির উৎপাত,
এই সকল কারণে জাতিবিশেষ স্থানবিশেষে বিলুপ্ত হইয়া
গিয়াছে। এইরূপে, উত্তরােত্তর উন্নতপ্রকৃতিবিশিষ্ট জীবের
আবির্ভাবের পর মনুষ্যর জন্ম হইয়াছে। বােধ হয় কালক্রমে
বর্তমান সময়ের উদ্ভিদ পশুপক্ষী প্রভৃতি জাতিও তিরােহিত
হইবে ও অপেক্ষাকৃত শ্রেষ্ঠতর প্রাণিগণ ভূমণ্ডল অধিকার
করিবে। অভিনব উদ্ভিদ ও জীব জন্তুর আবির্ভাবকে যুগান্তর
বলা যাইতে পারে। যে সকল জাতি বিনষ্ট হইয়া গিয়াছে
তাহাদের কোটী কতকাল পৃথিবীতে বাস করিয়াছিল
তাহা নিঃসংশয়ে নির্ধারণ করা যায় না, কিন্তু ঐ কাল যে

( ৪ )
অতি দীর্ঘ তদ্বিষয়ে অণুমাত্র সন্দেহ নাই।
দেখ, ব্যা
প্রভৃতি হিংস্র জন্তু কতকাল মনুষ্যের উৎপাত সহ করিয়া ও
এককালে বিনষ্ট হয় নাই।
সামান্য কূপাদি খনন করিবার সময় দেখা যায় যে,
গভীরতা অনুসারে ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির মৃত্তিকা সাজান
আছে। কোথাও বা দুই তিন ফুট পুরু হইয়া বালুকারাশি
রহিয়াছে, তাহা অতিক্রম করিলেই হয়ত ৩৪ ফুট আটাল
মাটী, তৎপরে হয়ত উদ্ভিজ্জাদির বিনাশাবশেষ। সচরাচর
লোকে ইহার এক একটিীকে এক একটা স্তর বলে। বঙ্গদেশের
অনেক স্থানে বর্ষাকালে নদীর জল উঠিয়া যে নূতন মৃত্তিকা
সঞ্চিত হয় তাহাও এক প্রকার স্তর। বৃষ্টি হইবার কিছুকাল
পরে পুষ্করিণী, হ্রদ প্রভৃতি জলাশয়ের গর্ভে চারিদিকের মৃত্তিকা
তৃণ ও বৃক্ষশাখাপত্রাদি জলের সহিত ভাসিয়া আসে এবং
দুই এক দিনের মধ্যে জনিয়া নূতন স্তর রূপে পরিণত
কালক্রমে জলাশয়ের নিকটস্থ ভিন্ন প্রকার মাটী বা
জীবশরীর বৃষ্টিদ্বারা চালিত হইয়া জলাশয়ে আসিয়া আর
একটি নূতন স্তর উৎপাদন করে। যে স্থান জলনিমগ্ন নহে
কিংবা নিকটবর্তী স্থান অপেক্ষা উন্নত, তথায় উক্ত প্রকার স্তর
জন্মিতে পারে না, বরং তাহা কালক্রমে বৃষ্টি ও বায়ুর, শক্তিতে
ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। বৃষ্টির দ্বারা যে স্তর গুলি নিৰ্ম্মিত হয় তন্মধ্যে
উপরেরটা আধুনিক ও যে স্তরটা যত নীচে, তাহা তত অধিক
কালের, ইহা অনায়াসে বুঝা যায়। ভূগর্ভের স্তর গুলির
কাল নির্ণয় করিতে হইলেও এই নিয়ম অনুসারে গণনা
করিতে হয়।
লােকে আকরিক পদার্থের অনুসন্ধানে সুগভীর আকর
হয়।
.

( ৫ )
খনন করিয়াছে। তাহাতে ভূমণ্ডলের স্তরনির্মাণ প্রণালী
কতদূর আবিষ্কৃত হইয়াছে। উন্নত পৰ্ব্বতের পার্শ্বদেশ
পৰ্যবেক্ষণ করিয়াও এই বিষয়ের জ্ঞানলাভ করিতে পারা যায়;
কারণ পাৰ্বতীয়প্রদেশ সন্নিহিতভূমি খন্ড হইতেই উৎক্ষিপ্ত
হইয়াছে। এই সকল স্তরের এক একটী এক এক জাতীয়,
এবং উহার প্রত্যেক স্তরই স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র জাতীয় উদ্ভিদ ও
জীব-কঙ্কাল-সমাকীর্ণ। যে যে স্তর উপর্যুপরি স্থাপিত,
উহাদের জীব ও উদ্ভিজ্জের কতকদূর সৌসাদৃশ্য আছে, অর্থাৎ
হয়ত একটী স্তরের ১৫ জাতীয় জীবের মধ্যে ৬০টী নিকটবর্তী
স্তরে পাওয়া যায়। অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী স্তরের সহিত এ
মিলিবার কথা নাই।
ভূপৃষ্ঠের নীচের স্তরে কোন জীবশরীরের নিদর্শন পাওয়া
যায়না; হয়ত তৎকালে কোন জীব জন্মে নাই,অথবা তাহাদের
• কঙ্কাল বিলুপ্ত হইয়াছে। এক্ষণে আগ্নেয়গিরি হইতে ভস্ম,
বালুকা, প্রস্তর, দ্রবধাতু প্রভৃতি যে সকল পদার্থ উৎক্ষিপ্ত
হয়, নীচের স্তরগুলি তাদৃশ পদার্থময়; এজন্য সকলে অনুমান
করেন যে এক্ষণে যেরূপে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত হয়
পুরাকালে সেই রূপে ইহাদের উৎপত্তি হইয়া থাকিবে ;
সুতরাং উহাদিগকে অগ্নিসম্ভূত কার বলে। অভ্র, স্ফটিক,
গ্রানিট প্রস্তর প্রভৃতি এই স্তরে বিদ্যমান আছে। পরবর্ত্তী
কোন স্তরে পাথরিয়া কয়লা, কোথাও বা লবণ, কুত্রাপি
চাখড়ি প্রভৃতি পাওয়া যায়, ও পৰ্যায়ক্রমে মৎস্য, সরীসৃপ,
স্তন্যজীবী ও পরিশেষে মনুষ্যের দেহাবশেষ দৃষ্ট হয়। এই
সকল স্তর এত পু যে উহাদের এক একটি জন্মিত্তে
অতি দীর্ঘকাল লাগিয়াছে তদ্বিষয়ে কিছুমাত্র সংশয় নাই।

এক্ষণে নদীর মােহনাতে ও হ্রদের গর্তে যতকালে যে পরিমাণে মৃত্তিকা সঞ্চিত হয়, তাহা দেখিয়া ভূবিপণ্ডিতেরা অতীতকালের স্তর নির্মাণের আনুমানিক কাল নির্দেশ করিয়া থাকেন। পৃথিবীর সকল স্থানে উপর্যপরি সকল স্তর পাওয়া যায় । পরস্পর নিকটবর্তী যে যে অঞ্চল সমকালে জলাকীর্ণ থাকে, তাহাদেরই সমপ্রকৃতিবিশিষ্ট স্তর জন্মিবার সম্ভাবনা। পৰ্ব্বতশ্রেণীসমূহ পূৰ্ব্বকালে সমুদ্রগর্ভে নিহিত ছিল, পরে শক্তি- বিশেষে উৎক্ষিপ্ত হইয়া অন্যান্য ভূভাগ অপেক্ষা উচ্চতর হইয়াছে। এজন্য পাৰ্বতীয় অঞ্চলের প্রায় সমুদায় শুরাবলী উর্ধে সাজান আছে। আমরা এই সকল পর্বতশ্রেণী পরীক্ষা করিলেই ভুপৃষ্ঠের শুরাবলীর প্রকৃতি অবগত হইতে পারি। বাস্তবিক ও পাৰ্বতীয় প্রদেশ অন্বেষণ দ্বারা ভূবিদ্যার উন্নতি সাধিত হইয়াছে। পৃথিবীর আবরণের যে ভাগ মনুষ্যকর্তৃক পরিদৃষ্ট হইতেছে, অথবা অনুমান ও পরীক্ষা দ্বারা যে স্থানের নৈসর্গিক কাৰ্যাদি নিরূপিত হইতেছে, তাহাকে ভূপঞ্জর বলা গেল। পৃথিবীর অভ্যন্তরের যে অংশ আমাদের অপরিজ্ঞাত রহিয়াছে তাহাকে ভূগর্ভ বলা যাইবে। উন্নত পৰ্বতশিখর চুইতে গভীর সমুদ্র- তলপৰ্যন্ত প্রায় ১০ মাইল পরিমিত স্থান আমরা পরীক্ষা করিতে পাই। পৃথিবীর ব্যাস ৭৭১২ মাইল, অতএব ইহার অধিকাংশই আমাদের জ্ঞানপথের বহিভূত। যে সকল নৈসর্গিক শক্তি দ্বারা ভূপঞ্জর অনুক্ষণ রূপান্তরিত হইতেছে,ক্রমান্বয়ে তাহাদের উল্লেখ করা যাইতেছে । (১) বায়ু। অম্লজান, যবক্ষার-জান, অঙ্গারক বায়ু, জলীয় ( ৭ ) বাষ্প প্রভৃতি কয়েকটী পদার্থযােগে বায়ু উৎপন্ন; বায়ু দ্বারা জীব ও উদ্ভিদের প্রাণরক্ষা হয়, ও অন্যান্য রাসায়নিক ক্রিয়া সম্পাদিত হয়। প্রধানতঃ ঝটিকাকালে বায়ু দ্বারা কোন অঞ্চলের বালুকারাশি সন্নিহিত স্থানে চালিত হইয়া স্তুপাকার হয়,এবং শীতপ্রধানদেশে বায়ুচালিত তুষারকণা পর্বতের পার্শ্বে ও সমুদ্রতটে সঞ্চিত হইয়া বরফরাশি ও বরফদ্বীপ উৎপন্ন করে। এই সকল প্রকাণ্ড বরফপিণ্ড স্থলিত হইয়া তৎপ্রদেশীয় প্রস্তর- থাদি সহ দূরবর্তী স্থানে নীত হয়। বায়ু আছে বলিয়া জলীয় বাষ্প উখিত হইয়া মেঘ, বৃষ্টি,শিলা,মেঘগর্জন, বজ্রপাত প্রভৃতি উৎপাদন করে। বৃষ্টিপাত হয় বলিয়া নদী,হ্রদ, প্রস্রবণ প্রভৃতি উৎপন্ন হয়। বৃষ্টির জলে বায়ুস্থ অঙ্গারক’ বাষ্প মিলিত থাকে বলিয়া ইহার দ্বারা অনেক কঠিন পার্থিব পদার্থ দ্রব হইয়া যায়। বায়ু না থাকিলে পৃথিবী জীব ও উদ্ভিদ শূন্য মরু- ভূমি হইয়া থাকিত। (২) জল। বৃষ্টিপাত, নদী ও প্রস্রবণ, তরঙ্গ, বেলা (জোয়ার), সামুদ্রিক স্রোত ও বরফ এই কয়েকটী দ্বারা জলের শক্তি প্রকাশ পায়। বৃষ্টিদ্বারা ভূমির উপরিভাগ ক্ষয়প্রাপ্ত হইয়া পড়ে। প্রস্রবণ দ্বারাও ভূভাগ ক্ষয়প্রাপ্ত হইয়া স্থানান্ত- রিত হয়, অথবা তদীয়জলসংমিশ্রণে নূতন রূপ ধারণ করে। নদীর তরঙ্গ ও স্রোতে নিকটবর্তী প্রদেশের মৃত্তিকা, কর্দম, বালুকা, অথবা কঙ্কররূপে বহুদূরে চালিত হইয়া কোন হ্রদ বা সমুদ্রের গর্ত্তে স্থাপিত হয়। যে নদীর স্রোত প্রবল তাহার দ্বারা তত অধিক পরিমাণে ভূমিখণ্ডের পরিবর্তন সাধিত হয়। পৰ্বত প্রভৃতি উচ্চ স্থান হইতে উৎপন্ন হইয়া সাগর সহ মিলিত হইবার পূর্বে নদীর স্রোতে যে সকল পদার্থ বাহিত হয়, ( ৮ ) তাহার কিয়দংশ নদীর গর্ভে বা পার্শ্ববর্তী ভূমিতে পতিত হয়, অথবা নদীর মােহানায় সঞ্চিত হইয়া নূতন স্তর উৎপন্ন করে। ক্রমে ক্রমে স্তর গুলি সমধিক উন্নত হইলেই দ্বীপ বা ভূমি- খণ্ডের অংশ বলিয়া পরিগণিত হয়। তরঙ্গ, বেলা ও সমুদ্র- স্রোত দ্বারা উপকূলভাগ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। তুষাররাশি ও তুষারশিলা দ্বারা পাৰ্বতীয় প্রদেশের প্রস্তরখাদি ধৃষ্ট ও চূর্ণ এবং বহুদূরে চালিত হইয়া যায়। (৩) উদ্ভিদ ও জীবশরীরযােগ ভূভাগ বর্ধিত হয়। কোন কোন উপকূলের বালুকারাশি তৃণাদি আবৃত বলিয়া বায়ু দ্বারা চালিত হয় না,কোথাও বা দীর্ঘকাল হইতে উদ্ভিদ সঞ্চিত হইয়া নূতন স্তরের ন্যায় হইয়াছে,কুত্রাপি বৃহৎ অরণ্য সমুদ্ভূত হইয়া রহিয়াছে। কোন কোন অরণ্য-প্রদেশের ভূভাগ মৃত্তিকামধ্যে বসিয়া যাওয়াতে তত্ৰত্য উদ্ভি-রাশি দীর্ঘকাল ভূগর্ভে নিহিত থাকিয়া কালক্রনে পাথরিয়া কয়লারূপে পরিণত হইয়া আমাদের কত উপকারে লাগিতেছে। বর্তমান সময়েও এইরূপ স্তর কোন কোন স্থানে জন্মিতেছে তাহার প্রমাণ পাওয়া যায়। চা-খড়ির স্তর জীবকঙ্কালময়, এখনও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীবকঙ্কাল সহকারে সমুদ্র গর্ভে উক্ত প্রকার স্তর জন্সিতেছে । গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলের সাগরে কীটাণু-বিশেষ দ্বারা বহুসংখ্যক দ্বীপ নিম্মিত হইয়াছে ও হইতেছে। . (৪) পৃথিবীর আভ্যন্তরিক তাপ দ্বারা ভূপৃষ্ঠস্থ অনেক আশ্চর্য ব্যাপার সম্পাদিত হইতেছে। এই তাপের কার্য্য ত্রিবিধ ; আগ্নেয়গিরির অগ্নদগম, ভূমিকম্প ও ধীরে ধীরে ভূপঞ্জর-চালনা। আগ্নেয়গিরির শক্তিতে ভূপৃষ্ঠ স্ফীত হয়,এবং গিরিনিঃসৃত দ্রবপদার্থরাশি ও ভস্নাদি নিকটস্থ প্রদেশে ( ১ ) নিক্ষিপ্ত হইয়া তাহার উচ্চতা বৃদ্ধি করে। ভূমিকম্প দ্বারা ভূতল কোথাও বা বিদীর্ণ হয়, কুত্রাপি উন্নত বা নিম্ন হইয়া যায়। বর্তমান খৃঃ শতাব্দীর মধ্যে সিন্ধু নদীর মােহনার নিকটবর্তী অঞ্চল নিম্ন, ও চিলি দেশের উপকূলের কোন কোন অংশ উন্নত হইয়া গিয়াছে, এবং কারিব সাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের কোন কোনটীর নগর ও পােতাশ্রয়াদি বিনষ্ট হইয়াছে। ধীরে ধীরে ভূপঞ্জর চালনা দ্বারা স্কাণ্ডিনেবিয়ার উপকূল ও সাইবিরিয়া, ও দক্ষিণ আমেরিকার পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল ক্রমশ উন্নত হইতেছে। প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপসমূহ, উত্তর আমে- রিকার দক্ষিণ-পূর্ব উপকূল, গ্রীনলণ্ডের পশ্চিম উপকূল ও নর ওয়ের দক্ষিণ উপকূল ভাগ ক্রমশঃ নিম হইয়া যাইতেছে। এই শক্তির প্রভাবে চিল্কা হ্রদের নিকটবর্তী স্থান ১০ হইতে ৪০ ফুট উচ্চ হইয়াছে। পৃথিবীর আভ্যন্তরিক অগ্নির শক্তিতে সমস্ত পৰ্বত শ্রেণী উৎক্ষিপ্ত হইয়াছে। ভূগর্ভে অবস্থান কালে এই সকল পৰ্ব্বত পার্শ্ববর্তী স্থানের ন্যায় স্তরময় ছিল, সুতরাং উথিত হইয়াও স্তরময় রহিয়াছে। এই সকল স্তর অর্ণবচর জীবের কঙ্কালে সমাকী দেখিয়া বােধ হয় যে ইহারা পূর্বে কোন সময়ে সাগর- গর্ভে নিমগ্ন ছিল। মনুষ্যজাতির আবির্ভাব হইবার অল্পকাল পূৰ্বে বা পরে যে যে জাতীয় জীব বিলুপ্ত হইয়াছে, হিমালয়, আল্প প্রভৃতি পৰ্ব্বতে তাহাদের নিদর্শন পাওয়া যায়, সুতরাং এই সকল পৰ্বত আধুনিক বলা যাইতে পারে। কোন কোন পৰ্বত স্তরময় নহে; দ্রব ধাতু নিঃস্রবময়। এই গুলি অগ্নি- সভূত। পৃথিবীর বহির্ভাগ ও অন্তর্ভাগে তাপ-পরিমাণ সমান নহে।

( ১০) যে দিন (১) যে প্রকাণ্ড বায়ুরাশি পৃথিরী বেষ্টন করিয়া রহিয়াছে তাহার উষ্ণতা সূৰ্যাতপের উপর নির্ভর করে। যেমন রৌদ্র হয়, তদনুসারে বায়ু উত্তপ্ত হয়। বিষুবরেখা হইতে যত উত্তর ও দক্ষিণদিকে গমন করা যায়, ততই বায়ুর উষ্ণতার হ্রাস লক্ষিত হয়। এতদ্ভিন্ন দেশের উচ্চতা অনুসারে তাপের হ্রাস বৃদ্ধি হয়। যে অঞ্চল যত উচ্চ তাহা তত শীত- প্রধান। সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলে শীত গ্রীষ্মের প্রাদুর্ভাব হয় না। অন্যান্য কারণেও বায়ুর শীতােষ্ণতার প্রভেদ হয়। (২) সূৰ্যকিরণ ব্যতীত অন্য দুই কারণে ভূপঞ্জরের তাপের নূনাধিক্য হয়। এই তাপের কিয়দংশ ভূগর্ভ হইতে প্রেরিত ও কিয়ভাগ রাসায়নিক কাৰ্যবিশেষে উৎপন্ন। ভূপঞ্জরের বহির্ভাগ শীত কাল অপেক্ষা গ্রীষ্মকালে অধিক উত্তপ্ত হয় বটে, কিন্তু ৮০৯০ ফুট নীচে সূৰ্যাতপের প্রভাব অনুভূত হয় না। (৩) উষ্ণপ্রস্রবণ, আগ্নেয়গিরি প্রভৃতি দ্বারা ভূগর্তের তাপের আতিশয্যের পরিচয় পাওয়া যায়। পূর্বোক্ত ৮০৯০ ফুটের নীচে, দূরতা অনুসারে তাপ বৃদ্ধি হয়। ৬০ ফুট অবতরণ করিলে ১ ডিগ্রী পরিমিত বৃদ্ধি হয়, সেইরূপ ১২০ ফুটে ২ ডিগ্রী ইত্যাদি। এই নিয়মে গর্শন করিলে, জানা যায় যে, যে স্থান ১৫০ মাইল গভীর, তাহার তাপ পরিমাণ এত অধিক যে ভূতলস্থ কোন দ্রব্য তাহাতে পড়িলে তৎক্ষণাৎ বাম্পাকারে উড়িয়া যাইবার সম্ভাবনা। কিন্তু ভূপৃষ্ঠে বায়ুমধ্যে তাপদ্বারা ঈদৃশ ঘটনা হইতে পারে বলিয়া ভূগর্ভেও যে তাহাই হইবে এরূপ নহে। যে স্থানের উপরি ১৫০ মাইল পরিমিত মৃত্তিকার ভার অনুক্ষণ চাপিয়া আছে, তথায় কি পরিমিত

( ১১ )
তাপে কি কাৰ্য হয় তাহা নির্ণয় করা দুঃসাধ্য। গণিত
শাস্ত্র দ্বারা এই মাত্র অবগত হওয়া যায় যে ভূগর্ভে যে পদার্থ
আছে তাহার ভার ভূপৃষ্ঠস্থ প্রস্তাদির ভার অপেক্ষা অনেক
অধিক। উপরের মৃত্তিকার ভারে তাহা ঘনীভূত হইয়া ভারী
হইয়াছে অনুমান করা যায়। কোন কোন পণ্ডিত অনুমান
করেন যে ভূগর্ভ লৌহ স্বর্ণ প্রভৃতি ধাতুময়। সূৰ্য্য ও গ্রহগণের
উপাদান পরীক্ষা দ্বারাও এই অনুমানের পােষকতা হয়।
কোন ধাতুর খনি পরীক্ষা করিলে দেখা যায় যে ভূগর্ভ হইতে
দ্রবধাতু ভূমি ভেদ করিয়া উপরের দিকে উঠিয়াছে। যদি১৫০
মাইল গভীর একটী ছিদ্র করা যায় তাহা হইলে ভূগর্ভের
পদার্থরাশির কিয়দংশ তরল বা বায়বীয় আকার ধারণ করিয়া
অতি প্রবলবেগে ভূপৃষ্ঠে উৎক্ষিপ্ত হয় তাহার সন্দেহ নাই।
আগ্নেয়গিরির অগ্নদগম কালে ঈদৃশ কোন ঘটনা হইয়া থাকে
তাহার কোন সন্দেহ নাই।
প্রথম অধ্যায়ের প্রশ্ন।
১। যুগান্তর, ভূপঞ্জর ও ভূগর্ভ কাহাকে বলে ?
২। ভু-গুরাবলীর কাল কিরূপে নির্ণয় করা যায় ?
৩। স্তরগ্রোথিত জীবকঙ্কাল পরীক্ষা করিয়া কি জানা যায় ?
৪ কিরূপে স্তর জন্মে? সকলস্থানে সকল স্তর না থাকার কারণ কি?
৫। সকল জাতীয় জীব আদিকাল হইতে আছে কি না ? ভবিষ্যতে কি
হইবার সম্ভাবনা?
৬। কোন্ কোন্ নৈসর্গিক কাৰ্য্য দ্বারা ভূমণ্ডল রূপান্তরিত হইতেছে ?
৭। পৃথিবীর ব্যাসের পরিমাণ কত ? আমরা পৃথিবীর কতদুর পরীক্ষা
করিতে পারি ?

( ১২ )
t
৮। আগ্নেয়গিরি দ্বারা কি কি কাৰ্য্য হয় ?
৯। উদ্ভিদ দ্বারা কি কি পরিবর্তন সাধিত হয় ?
১। নদীদ্বারা ভূভাগের কি রূপান্তর হয় ?
১৯। বায়ু দ্বারা কি পরিবর্তন সম্পন্ন হয় ?
১২। জীবজন্তু দ্বারা কি কি আশ্চর্য্য পরিবর্তন হইয়া থাকে ?
১০। বৃষ্টিতে কি কি কাৰ্য্য হয় ?
১৪। ভূমিকম্প দ্বারা কিরূপে ভূভাগের রূপান্তর হয় ?
১৫। ধীরে ধীরে ভূপঞ্জরচালনাতে কি কি ঘটনা হয় ?
১৬। জল, অগ্নি ও বায়ু ইহার মধ্যে কোন্টীর দ্বারা সমধিক পরিবর্তন
হইয়া থাকে ?
১৭। স্থানভেদে শীত গ্রীষ্মের নূনাধিক্য হইবার কারণ কি?
১৮। পৃথিবীর যে স্থান ভূতল হইতে ৪ মাইল নিয়ে তথায় তাপের পরিমাণ
কত? (ভূতলে তাপের পরিমাণ ৭• ডিগ্রী)
১৯। ভূগর্ভে তাপের পরিমাণ অধিক ইহার প্রমাণ কি?
২০। ভূগর্ভের অভ্যন্তর কিরূপ অবস্থায় থাকা সম্ভবপর ?
২১। ভূপঞ্জরের তাপ পরিমাণ কি কি কারণের উপর নির্ভর করে ?
২২। “হিমালয় পর্বতের অংশ বঙ্গোপসাগরের আয়তন হ্রাস করিতেছে;”
এইটা স্পষ্ট করিয়া বুঝাইয়া দেও।
২৩। কোন্ কোন্ দেশের ভূমি উচ্চ হইতেছে ? কোন্ কোন্ স্থানের ভূমিই
বা নিম্ন হইয়া যাইতেছে ?
২৪। কোন্ শক্তি দ্বারা পৰ্বত-শ্রেণী উদ্ভূত ইয়াছে? ইহাদের উদ্ভবের
কাল কিরূপে নির্ণীত হইয়াছে ?
২৫। অনেক পৰ্বত কোন কালে সাগরগর্ভে ছিল তাহার প্রমাণ কি?
২৬। স্তরগুলি কি প্রণালীতে সংস্থাপিত আছে বুঝাইয়া দাও।
২৭। সৰ্ব্বাপেক্ষা প্রাচীন স্তরগুলির নাম লিখ।

( ১৩ )
দ্বিতীয় অধ্যায়।
ভূমণ্ডলের আদিম অবস্থা ।
সূর্যের সহিত পৃথিবীর ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ। সূর্যের প্রভাবে
পৃথিবীমণ্ডলে প্রত্যহ এক প্রকার সৃষ্টির কাণ্ড উপস্থিত
হয়। রাত্রিকালে অধিকাংশ জীবগণ নিদ্রার বশীভূত হইয়া
অচেতন প্রায় পড়িয়া থাকে ; সূর্যোদয় হইলে যেন নূতন
জীবন প্রাপ্ত হইয়া জাগিয়া উঠে ও স্ব স্ব কর্মে প্রবৃত্ত হয়।
সূৰ্য্য জগতের চক্ষুস্বরূপ ; সূর্যের আলােকে ভূতলস্থ সমস্ত
বস্তু প্রকাশ পায়। সূৰ্য্য পৃথিবীর বৈচিত্র-সম্পাদক। সূৰ্য্য
থাকাতেই দিবাঙ্কত্রিভেদ, মেঘ, বৃষ্টি, ঝটিকা ও ঋতু পরিবর্তন
ঘটে এবং ভিন্ন ভিন্ন সময়ে পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন প্রকার শােভা
ছয়। সূর্যকে জগতের জীবনস্বরূপ বলিলেও চলে। সূর্যের
আলােক ও তাপ পাইয়াই তরুলতাদি বর্ধিত হয় ও জীবগণ
সুখ স্বচ্ছন্দে জীবনযাত্রা নির্বাহ করিতে পারে। সূর্যকিরণ
পাইলে পৃথিবী এত শীতল হইত যে ইহা জীবােদ্ভিদের
নিবাসভূমি হইতে পারিত না।
ভূলােক যে অনেক বিষয়ে সূৰ্য্যসাপেক্ষ, বিজ্ঞানশাস্ত্রের
উদয় হইবার বহুকালপূর্বে অতি প্রাচীনকালের চিন্তাশীল
লুধগণ, বুঝিতে পারিয়াছিলেন। এই নিমিত্তই এতদ্দেশে
ও অন্যান্য দেশে দেবতা বলিয়া সূর্যের পূজাপদ্ধতি
প্রবর্তিত হইয়াছিল ; এবং এই নিমিত্তই এক্ষণেও অনেক
স্থানে সূর্যের পূজা হইয়া থাকে।
পৃথিবীর সহিত সূর্যের যে ঘনিষ্ট সম্বন্ধ আছে, তাহার
কোন নিগূঢ় কারণ থাকিবার সম্ভাবনা। বর্তমান কালের

( ১৪ ) বিজ্ঞানবিৎ পণ্ডিতগণ অনুমান করেন যে এককালে পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহগণ সূর্যমণ্ডলের অঙ্গস্বরূপ ছিল; পরে বিচ্ছিন্ন হইয়া অনেক পরিমাণে স্বতন্ত্রতা লাভ করিয়াছে; এতদ্দেশীয় প্রাচীন ঋষিগণের মনেও এইরূপ অনুমানের উদয় হইয়া ছিল, ইহার আভাস পাওয়া যায়। তাহারা সূৰ্য্যকে সবিতা অর্থাৎ জগৎ প্রসবিতা বলিতেন। যে প্রকার প্রমাণ অবলম্বন করিয়া বিজ্ঞানবিৎ পণ্ডিতগণ এই প্রকার অনুমান করেন, নিম্নে তদ্বিষয়ের আলােচনা করা যাইতেছে। ভূপৃষ্ঠে কোন গভীর কূপ খনন করিলে দেখা যায় যে তাহার জল উষ্ণ। গভীর খনিতে যাহারা কাৰ্য্য করে, তাহারা তত্ৰত্য বায়ু অতি উত্তপ্ত এরূপ, বলিয়া থাকে। উষ্ণপ্রস্রবণ ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে ভূগর্ভের তাপের আতিশয্যের পরিচয় দিয়া থাকে। এই ঘটনা গুলি কি শীত কি গ্রীষ্ম সকল সময়ে সকল স্থানে ঘটে। ইহাতে অনুমান করা যায় যে পৃথিবীর অন্তর্ভাগ অতিশয় উত্তপ্ত । দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে স্থিরীকৃত হইয়াছে যে চন্দ্র- লােকে অসংখ্য ক্ষুদ্র ও বৃহৎ আগ্নেয়গিরির গহ্বর আছে। এক্ষণে ঐ গুলির উপদ্রব আছে বলিয়া বােধ হয় না। পূর্বে চন্দ্রলােকে যেরূপ তাপের আতিশয্য ছিল এক্ষণে তাহার অনেক হ্রাস হইয়া থাকিবে। পৃথিবীরও তাপের হ্রাস হইয়াছে ও হইতেছে তাহার কোন সন্দেহ নাই। অন্তর্ভাগ অপেক্ষা বহির্ভাগ শীতল হইয়াছে, ইহাতে বুঝিতে হইবে যে ভূমণ্ডলের তাপ অনুক্ষণ শূন্যে বিকীর্ণ হইয়া যাইতেছে। বােধ হয় কোটী বৎসর পূৰ্বে ভূমণ্ডলের তাপ পরিমাণ অনেকগুণ বেশী ছিল।

( ১৫ ) শত কোটী বৎসর পূর্বে বােধ হয় পৃথিবীতে ভূমি ও সাগর ভেদ ছিল না; সমস্ত ভূমণ্ডল দ্রব পদার্থপিণ্ড বা বৃহৎ বায়ু- পিণ্ডবৎ সূর্যের চতুর্দিগে পরিভ্রমণ করিত। যে আনুমানিক বিবরণ লেখা হইল, ইহা কল্পনামাত্র নহে; সূর্যের অবস্থা পৰ্যালােচনা করিলে এইটী দৃঢ়ীভূত হয়। স্পেন্টু ফোপ, যন্ত্রদ্বারা সূৰ্যকিরণ পরীক্ষা করিয়া জানা গিয়াছে যে সূর্যমণ্ডলের তাপপরিমাণ এত অধিক যে তথায় পদার্থমাত্রই বায়বীয় আকার ধারণ করে। আমরা সূৰ্য্য হইতে যে আলােক ও তাপ প্রাপ্ত হই, তাহা অত্যুষ্ণ উজ্জ্বল বাষ্পরাশিতে উদ্ভূত। ভূতলে যে যে ধাতু গলাইতে বহুযত্ন ও পরিশ্রমের প্রয়ােজন, তন্মধ্যে কতকগুলি উক্ত বাষ্প- রাশিতে বায়বীয় আকারে বিদ্যমান আছে। বােধ হয় পৃথিবীতে যে যে পদার্থ আছে, সূৰ্যেতেও সেই গুলি আছে। যদি কোন প্রকার শক্তি প্রয়োেগ দ্বারা ভূমণ্ডল সূৰ্য্যমগুলে নিক্ষিপ্ত হয়, তাহা হইলে উহা তৎক্ষণাৎ বাষ্পকার ধারণ করিয়া সূর্যের বাষ্পরাশিতে মিলিত হয় তাহার কোন সন্দেহ নাই। সূৰ্য সৌরজগতের কেন্দ্রস্বরূপ এবং উহার আকর্ষণে সম্বদ্ধ থাকিয়া কৃতকগুলি দ্র ও বৃহৎ গ্রহ উহাকে প্রদক্ষিণ করি- ছে। পৃথিবীও একটী গ্ৰহমাত্র। ইহার বর্তমান অবস্থা দেখিয়া বােধ হয় কোন কালে ইহা তরল পদার্থপিণ্ড বা বাষ্পপিণ্ডস্বরূপ ছিল। 'জ্যোতির্বিদেরা দূরবীক্ষণযন্ত্রের সাহায্যে ঈদৃশ অনেক নক্ষত্ৰ পৰ্যবেক্ষণ করিয়াছেন, যে গুলি একালপৰ্য্যন্ত বায়বীয় অবস্থায় আছে। ইহারা অনুমান করেন সৌরজগৎ কোন ( ১৬ ) কালে ঐরূপ অবস্থায় ছিল। পরে ক্রমে উহার তাপ হ্রাস হইতে হইতে এক এক অংশ দূরে নিক্ষিপ্ত হইতে লাগিল। সেই দূরবর্তী অংশগুলি ক্রমে শীতল হইয়া গ্রহ উপগ্রহ রূপে সূৰ্য্যকে প্রদক্ষিণ করিতেছে। কেবল সূৰ্য্যই দীপ্তিমান তেজঃপুঞ্জ স্বরূপ মধ্যস্থলে অবস্থিতি করিয়া চতুর্দিকে কিরণ- জাল বিস্তার করিতেছে। দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রশ্নাবলী । ১। সূর্য দ্বারা ভূমণ্ডলের কি কি উপকার সাধিত হয়? ২। সুর্যের উপাসনা কিরূপে প্রচলিত হইয়াছে ? ৩। বৈজ্ঞানিকেরা পৃথিবী ও সূর্যের কি নিত্য সম্বন্ধ অনুমান করেন ? ৪। কি কি যুক্তি প্রদর্শন দ্বারা উক্ত অনুমান সমর্থিত হয় ? ৫। সূর্যের তাপের আতিশয্য কিরূপে জানা যায় ? ৬। পৃথিবীর আদিম অবস্থা কিরূপে অনুমান করা যাইতে পারে ? তৃতীয় অধ্যায়। -১ জলস্থল বিভাগ। সম্মুখে ভূমণ্ডলের চিত্র সংস্থাপিত করিয়া তৎপ্রতি দৃষ্টিপাত কৰূিলে অনায়াসে জলস্থলবিভাগের পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। প্রথমতঃ দুই বিশাল ভূমিখণ্ডের প্রতি আমাদের নয়ন আকৃষ্ট হয়, পূর্ব ও পশ্চিম মহাদেশ। এসিয়া, ইউরােপ ও আফ্রিকা পূৰ্ব্ব মহাদেশের অন্তর্গত। পশ্চিম মহাদেশ (১৭) উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা নামে খ্যাত। এতদ্ভিন্ন ক্ষুদ্র ও বৃহৎ অসংখ্য দ্বীপমালা ভূপৃষ্ঠস্থ জলরাশির নানাস্থানে বিরাজমান রহিয়াছে। তন্মধ্যে অষ্ট্রেলিয়া, নবজীলণ্ড প্রভৃতি দ্বীপশ্রেণী যেন একটী প্রকাণ্ড মহাদেশের ভগ্নাবশেষ রূপে জলধির প্রান্ত, দেশে ভাসমান থাকিয়া পুরাকালীন ভূবিপ্লবের সাক্ষ্য প্রদান করিতেছে। এতদ্ভিন্ন দক্ষিণমেরুসন্নিহিত মহাসাগরে একটী বৃহৎ ভূভাগ আবিস্কৃত হইয়াছে। ইহা সর্বদা বরফে আচ্ছন্ন ।.. ২। ভূভাগের প্রতি কিয়ৎক্ষণ নেত্রপাত করিলেই পৰ্বতশ্রেণী আমাদের দৃষ্টিগােচর হয়। ইহারা যেন ভূগর্ভ- ভেদ করিয়া শূন্যপথে বাহুবিস্তার পূর্বক প্রকৃতির শােভা সংবর্ধন করিতেছে। বােধ হয় যেন ধরাতলে একমাত্র সুদীর্ঘ পৰ্বতশ্রেণী বিদ্যমান রহিয়াছে। দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ প্রান্ত হইতে উদ্ভূত হইয়া উহা ক্রমশঃ উত্তরাভিমুখে গমন করিয়াছে, ও উত্তর আমেরিকা অতিক্রম করিয়া বোরং প্রণালী পৰ্য্যন্ত বিস্তৃত রহিয়াছে। তথায় সাগরগর্ভে নিহিত হইয়া অদূরবর্তী এসিখণ্ডের উপকূলে উঠিয়া অভিনব উপাধি ধারণ করিয়াছে, ও পরিশেষে পশ্চিমাভিমুখে নানীদেশ ভ্রমণ করিতে করিতে ইউরােপখণ্ডের পশ্চিম সীমা পৰ্য্যন্ত উপস্থিত হইয়াছে। ইউরােপ এসিয়া ও আমে- যিকর ভূধরসমূহ এই প্রকাণ্ড শ্রেণীর অন্তর্নিবিষ্ট বলিয়া উপলব্ধি হয় বটে, কিন্তু আফ্রিকা ও অষ্ট্রেলিয়ার পর্বতসমূহ স্বতন্ত্র হইয়া রহিয়াছে। ৩। দুই পৰ্ব্বতের মধ্যবর্তী নিম্নভূমিকে উপত্যকা কহে। দুইদিগেই উচ্চতর ভূমি থাকায়, উপত্যকা দ্বারা পর্বতের বৃষ্টি প্রস্রবণাদির জলরাশি ক্রমশঃ বহির্গত হইয়া নদীরূপ

( ১৮ )
ধারণ করে। সেই নদী ক্রমনিমপথে ধাবমান হইয়া
নিকটস্থ প্রদেশ অতি উর্বর করিয়া তােলে। অধিকাংশ
উপত্যকাই অতি রমণীয় স্থান।
পৃথিবীস্থ জলরাশি, ভূমিখণ্ড অপেক্ষা অনেক বড়।
উহা দ্বারা সমস্ত ভূভাগ বেষ্টিত রহিয়াছে। উহার পরি-
মাণ ভূভাগের প্রায় তিন গুণ। বাস্তবিক একমাত্র মহা-
সমুদ্র সর্বত্র ব্যাপ্ত হইয়া আছে ; লােকে নানাস্থানে উহার
নানাপ্রকার নাম প্রদান করিয়াছে। প্রশান্ত মহাসাগর,
আটলান্টিক মহাসাগর, ভারত মহাসাগর, ও উত্তর ও দক্ষিণ
মহাসাগর, এই পাঁচটীকে মহাসাগর বলে ; উহাদের অন্তর্গত
অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রায়তন সাগর, উপসাগর প্রভৃতি অনেক।
এই সমন্তের বিবরণ সামান্য ভূবৃত্তান্ত পাঠ করিলে অবগত
হওয়া যায়।
এক্ষণে আরও কিয়ৎক্ষণ ভূচিত্রের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া
পৰ্বত, নদী, হ্রদ প্রভৃতির অবস্থান পর্যালােচনা করা আবশ্যক।
কোন্ মহাদেশের কোন্ নদী কোন্ পৰ্বত হইতে বহির্গত
হইয়া কোন্ কোন্ দেশ অতিক্ৰম পূৰ্ব্বক কোন্ সাগরে মিলিত
হইয়াছে, ও পৃথিবীতে সমুদায়ে কত নদী
প্রবাহিত হইয়াছে, কতই বা কোন্ মহাসাগরে মিলিতেছে,
তদ্বিষয়ের পর্যালোচনা করা উচিত। পৰ্ব্বতের যে দিক কইতে
নদী প্রবাহিত হয়, সেই প্রদেশ নিম্ন ও উৰ্ব্বর, আর যে দিগে
নদী নাই, তৎপ্রদেশ শিলা অথবা বালুকাময় ও অপেক্ষাকৃত
উন্নত। এই উচ্চতর প্রদেশকে মালভূমি কহে। সমুদায়
বৃহৎ পৰ্বতশ্রেণীর প্রতি নেত্ৰপাত করিয়া এ বিষয়টা সুন্দর
রূপে হৃদয়ঙ্গম করা উচিত।
কোন্ দিগে

( ১৯ ) পূৰ্বই বলা হইয়াছে পৃথিবীর জলভাগ স্থলভাগের প্রায় তিন গুণ। স্থলভাগের পরিমাণ প্রায় ৫ কোটী ২০ লক্ষ , বর্গমাইল, ও অবশিষ্ট ১৪ কোটা ৫০ লক্ষ মাইল জল দ্বারা আবৃত। কিন্তু এই পরিমাণ, সকল সময় স্থির থাকে না। পৃথিবীর কোন কোন অংশ ক্রমশঃ সাগরে নিমগ্ন হইতেছে, কোথাও বা সমুদ্রতল ক্রমশঃ উন্নত হইয়া ভূমির পরিমাণ বৃদ্ধি করিতেছে। কিন্তু এই সকল পরিবর্তন অতি দীর্ঘকাল সাপেক্ষ। সমুদায় ভূভাগ সমুদ্রবেষ্টিত বলিয়া অর্ণবপােতে আরােহণ করিয়া অতি দূরবর্তী দেশেও গমন করিতে পারা যায়। নিকটে সমুদ্র না থাকিলে দূরদেশে গমনাগমন করা দুঃসাধ্য হয়। যে সকল দেশ সাগরতীরে অবস্থিত এবং যাহার উপ- কূলের দৈর্ঘ্য অধিক, প্রায় সেই সকল দেশ সভ্যতা ও বাণিজ্য- জুনিত ঐশ্বর্য্যের পরাকাষ্ঠা প্রাপ্ত হইতেছে। যে যে ভূভাগের উপকূল নাই, তথায় অসভ্যজাতির বাস। দেশের আয়তন যত বর্গ মাইল, সেইটীকে উপকূলের দৈর্ঘ্য দিয়া ভাগ করিলে নিম্নলিখিত কয়েকটী ফল পাওয়া যায়। ইহা পৰ্য্যালােচনা করিলে ইউরােপের সৌভাগ্য ও আফ্রিকার হীনাবস্থার একটী ধান কারণ জানা হবে। ইউরোেপ '... উত্তর আমেরিকা দক্ষিণ আমেরিকা বর্গ মাইলে এক অষ্ট্রেলিয়া এক মাইল উপকূল। এসিয়া আফ্রিকা ১৭০ ২৬০ ৪২০ ৪৬০ ৬৮০ ( ২০ ) তৃতীয় অধ্যায়ের প্রশ্ন। ১। ভূভাগ কয় প্রধান অংশে বিভক্ত? কোন্ কোন্ দীপ বৃহৎ ? ২। ভুমণ্ডলের প্রধান পৰ্বত শ্রেণী কোথায় আরম্ভ হইয়া কিরূপে কত দুর ব্যাপ্ত হইয়াছে? উহার বহিভূত পর্বতশ্রেণীগুলির নাম কর । ৩। পূর্বোক্ত প্রধান পৰ্বত শ্রেণী কোন্ কোন্ দেশে কোন্ কোন্ নাম প্রাপ্ত হইয়াছে ? ৪। উপত্যকা কাহাকে বলে ? উপত্যকা দ্বারা কি নৈসর্গিক কাৰ্য্য সাধিত হয় ? ৫। মালভূমি কাহাকে বলে ? কয়েকটী প্রধান মালভূমির উল্লেখ কর। ৬। মহাসাগর কয়েকটির নাম ও অবস্থান বল। কোন্ কোন্ মহাসাগরের সকল স্থানে গমনাগমন করা যায় না? ৭। প্রতি মহাদেশের নিকটবর্তী সাগর ও উপসাগরের উল্লেখ কর। ৮। প্রতি মহাদেশের যে যে নদী পূৰ্বাভিমুখে প্রবাহিত হইয়া সাগরে মিলিত হইয়াছে তাহাদের উল্লেখ কর। ঐরূপ অন্যান্য দিগেও যাহারা গমন করিয়াছে তাহাদের নাম বল। ৯। ভূমণ্ডলস্থ প্রধান প্রধান হ্রদের নাম বল। ১০। পৃথিবীর জলভাগের পরিমাণ কি ? স্থল ভাগই বা কত ? ১৯। নিকটে সমুদ্র না থাকিলে কি অসুবিধা হয় ? ১২। আফ্রিকার ও এসিয়ার অনেক স্থান অসভ্যাবস্থায় থাকিবার একটা প্রধান কারণ কি ? ১৩। ভারতবর্ষের সভ্যতার কি কি নৈসর্গিক কারণ আছে ? ইহার সকল স্থান তুল্যভাবে সভ্য নহে কেন ? ১৪। যে যে স্থান এক্ষণে জলমগ্ন তাহা কোন কালে গুঞ্চ ছিল ; এবং যে ৫. স্থান এক্ষণে শুষ্ক তাহা পূৰ্ব্বে জলধিতলে ছিল, এবিষয়ে যুক্তি ও প্রমাণ দাও। ১০। আমেরিকাকে কি জন্য নুতন পৃথিবী বলে?

( ২১ ) চতুর্থ অধ্যায়। স্থলসংস্থান। পূর্বে উল্লেখ করা গিয়াছে যে অধিকাংশ স্থলভাগ বিষুব- রেখার উত্তরদিগে অবস্থিত। আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও অষ্ট্রেলিয়া এই রেখার দক্ষিণে, ও ইউরােপ, এসিয়া ও উত্তর আমেরিকা উহার উত্তরে রহিয়াছে। এসিয়া-ইউরােপ খণ্ড পূৰ্ব্ব-পশ্চিম দিগে বিস্তৃত, উহার অনেক স্থান বিষুবরেখা হইতে প্রায় সমদূরবর্তী। এই জন্য উহার অনেক স্থানেই শীত গ্রীষ্ম প্রায় সমান। কিন্তু আমেরিকা উত্তর দক্ষিণ দিগে বিস্তৃত, ইহার মধ্যস্থল দিয়া বিষুবরেখা গমন করিয়াছে, এবং ইহার উত্তর ও দক্ষিণ সীমা দুই মেরু সন্নিহিত। এই কারণ বশতঃ আমেরিকাতে সর্বপ্রকার ঋতু বিদ্যমান থাকিয়া নানা- বিষয়ে অভিনব ভাব প্রদর্শন করিতেছে। স্থলভাগের আকৃতি সম্বন্ধীয় নিম্নলিখিত কয়েকটী কথা স্মরণ রাখা কর্তব্য। (১) সকল মহাদেশের আকৃতি প্রায় ত্রিভুজ ক্ষেত্রের ন্যায়। উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, এবং এশিয়া ও ইউরােপের দক্ষিণ ভাগের গঠন এইরূপ । ১ভূমণ্ডলস্থ দুই বৃহৎ মহাদ্বীপেরই উত্তর ও দক্ষিণ সীমা বিষুবরেখা হইতে প্রায় সমদূরবর্তী। উত্তর অন্তরীপ ও উত্তমাশা অন্তরীপ, এবং হরন অন্তরীপ ও বেফিন উপ- সাগরের উত্তর-পশ্চিম ভাগ, এইরূপে স্থিত। (৩) প্রায় সমুদয় উপদ্বীপ উত্তরদক্ষিণদিগে বিস্তৃত। স্কাণ্ডেনেবিয়া, ইটালী, গ্রীস, আফ্রিকা, আরব, ভারতবর্ষ, ( ২২ ) যালয়কোরিয়া, কামস্কাটকা, গ্রীল্লণ্ড, নােবাস্কোশিয়া, ফ্লোরিডা, কালিফর্ণিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকা এই নিয়মের অধীন। ইউকেটান, আলিয়াস্কা, জটলও ও এসিয়া-মাইনর এই নিয়মের বহির্ভূত। (৪) প্রায় সমস্ত উপদ্বীপের ' নিকটস্থ সাগর দ্বীপ- সমাকীর্ণ। যথা, দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণে টেরাডেল- ফিউগগা ও ফলও-পুঞ্জ,ভারতবর্ষের সিংহল, ইটালীর সিসিলি ইত্যাদি। এই সকল দ্বীপের অন্তরীপগুলি সমুদ্র হইতে অনেক উচ্চ ও শিলাময়। (৫) দেশের দৈর্ঘ্য অনুসারে পর্বতশ্রেণী বিস্তৃত ; আমেরিকার দৈর্ঘ্য অনুসারে আণ্ডি, ও এসিয়া-ইউরােপের আল্লাই প্রভৃতি। (৬) দুই সামান্য যােজক দ্বারা আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা, এসিয়া ও উত্তর আমেরিকার সহিত সংযুক্ত আছে এবং অষ্ট্রেলিয়াও ‘এসিয়া হইতে বড় দূরবর্তী নহে। উত্তর আমেরিকা ও কারীব সাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ যেরূপ সংস্থিত, ইউরােপের গ্রীস্ ও তৎপার্শ্ববর্তী দ্বীপ সমূহ, এবং এসিয়া ও পূৰ্ব উপসাগরীয় দ্বীপবৃহও সেইরূপে অবস্থিত (৭) সাধারণতঃ দ্বীপসমূহ পৃথক পৃথক্ না থাকিয়া অনেকগুলি একত্র থাকে, উহাদিগকে দ্বীপপুঞ্জ বলে।সেন্ট- হেলেনা, জুয়ানফারনাণ্ডেজ প্রভৃতি কয়েকটী স্বতন্ত্র আছে। (৮) বিষুবরেখার উত্তরস্থ মহাদেশগুলির উপকূলের দৈর্ঘ্য, উক্ত রেখার দক্ষিণস্থ মহাদেশসমূহের উপকূলভাগের দৈর্ঘ্য অপেক্ষা অধিক। সুতরাং প্রথমােক্ত দেশগুলিতে অধিক পরিমাণে বাণিজ্যবিস্তার হইয়াছে।

( ২৩ ) স্থলভাগের যেরূপ সন্নিবেশ বর্ণিত হইল, তাহা কোন কোন বিশেষ নিয়ম অনুসারে হইয়া থাকিবে, কিন্তু সে নিয়মগুলি কি ? বিজ্ঞান-শাস্ত্রের বর্তমান অবস্থায় তাহা স্থির করা যায় না। কোন কোন দ্বীপ পর্বতশৃঙ্গ মাত্র এবং দ্বীপপুঞ্জগুলি দেখিলে বােধহয় যে পূৰ্ব্বকালে উহারা স্থল- ভাগের উন্নত প্রদেশ ছিল, কালক্রমে পার্শ্ববর্তী ভূমিসমূহ জলনিমগ্ন হইয়াছে। যদি জলস্থলবিভাগ অন্যরূপ হইত, তাহা হইলে ভূভাগে এক্ষণে যে সকল জীব ও উদ্ভিদ বিদ্যমান আছে, উহারা ভিন্নপ্রকৃতি-বিশিষ্ট হইত। পূৰ্ব্বকালে সাহারা মরুভূমি সাগর-নিমগ্ন ছিল, কিন্তু এক্ষণে শুদ্ধ বালুকা- রাশিময় রহিয়াছে। এই বালুকার উপর দিয়া যে উত্তপ্ত বায়ু ইউরােপে গমন করে তারা ইউরােপ খণ্ডের তাপ- পরিমাণ বর্ধিত হইয়া থাকে। যৎকালে সাহারা জলময় ছিল তখন ইউরােপ সর্বদা বরফে আচ্ছন্ন থাকিত, সুতরাং মনুষ্যের বাসের উপযুক্ত ছিল না। ঐ সময়ে ইউরােপে যে সকল জন্তু- গণ বাস করিত, এক্ষণে তাহার অনেক জাতি বিলুপ্ত হইয়াছে, পৰ্বতগুহায় ও ভূগর্ভে তাহাদের কঙ্কাল প্রাপ্ত হওয়া যায়। চতুর্থ অধ্যায়ের প্রশ্ন। ১। পূর্ব ও পশ্চিম মহাদ্বীপের বিস্তার কোন্ দিগে রহিয়াছে ? অন্য কোন্ বিষয়ে তাহাদের সাদৃশ্য আছে ? ২। উপদ্বীপ সমূহ কোন্ সাধারণ নিয়মে অবস্থিত ? অন্য কোন বিষয়ে তাহাদের সুদৃশ্য আছে ? ৩। দেশের দৈর্ঘ্যের সহিত পর্বতশ্রেণীর সম্বন্ধ কি ? ৪। মহাদেশগুলির সাধারণ আকার কি?

( ২৪ ) ৫। বিষুবরেখা হইতে মহাদেশদ্বয়ের উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্ত কি নিয়মে অবস্থিত? ৬। দ্বীপ সকল কি সাধারণ নিয়মে স্থাপিত ? ৭। কি নিয়মে উপকূলের দৈর্ঘ্য নির্দিষ্ট আছে ? ৮। স্থলভাগের সংস্থান দেখিলে কি মনে হয় ? ৯। যদি সাহারা মরুভূমি সাগরবারি দ্বারা প্লাবিত হয়, তাহা হইলে কি ঘটিবার সম্ভবনা ? পঞ্চম অধ্যায়। স্থলভাগের উচ্ছায়ভেদ। ভূভাগের কোন অঞ্চলে পৰ্বতশ্রেণী বা উন্নত গিরি শিখর, কোথাও বা মালভূমি, কুত্রাপি নিম্নধরাতল। কি নিয়মে পৃথক পৃথক স্থানে ভিন্ন ভিন্ন আকার উদ্ভাবিত হইয়াছে'তাহা নির্ণয় করা দুষ্কর, কিন্তু পৃথিবীর আভ্যন্তরিক অগ্নির কার্যকারিতা প্রায় সর্বস্থানেই লক্ষিত হয় এই অগ্নির শক্তি সমকালে সৰ্বত্ৰ কাৰ্য্যকারী হয় নাই। কখন বা ইউরােপ, এশিয়া ও আফ্রিকার গ্রানিট প্রস্তর- সমাকীর্ণ প্রাচীন পৰ্ব্বতশ্রেণীতে স্বীয় প্রভাব দেখাইয়াছে, সময়ান্তরে ঐ মহাদেশের অভিনব পাৰ্বতীয় প্রদেশে প্রাদুর্ভূত হইয়াছে, এবং এক্ষণে আমেরিকার প্রধান প্রধান পর্বতশ্রেণীতে, এসিয়ার পূর্বভাগৈর দ্বীপ- বহে এবং প্রশান্ত সাগরীয় দ্বীপপুঞ্জসমূহে অসত্য করিতেছে। অগ্নি প্রভাবে কোথাও বা অর্ণবগর্ভ হইতে নুন ভূমি উৎক্ষিপ্ত হইতেছে, স্থানান্তরে, স্থলখণ্ড সাগর- তলে মগ্ন হইয়া যাইতেছে। প্রশান্ত মহায়াগরে যে সকল ঘটনা হইতেছে তৎপ্রতি দৃষ্টিপাত করিলে বােধ হয় যেন তথায় কোন নুতন কাণ্ড হইবার যােগাড় হইতেছে, কিন্তু { সকল ( ২৫ ) সেইটা কতদিনে সম্পন্ন হইবে তাহা নির্ণয় করা, দুরূহ। স্কাণ্ডিনেবিয়া ক্রমশঃ উন্নত হইতেছে, গ্রীণ্ডের দক্ষিণভাগ ক্রমশঃ নিম্ন হইয়া যাইতেছে। ভূভাগের উচ্ছায়ভেদ-বিষয়ক নিম্নলিখিত কয়েকটা নিয়ম স্মরণ রাখা আবশ্যক। + (১) সকল মহাদেশের ভূভাগই সমুদ্রতীর হইতে ক্রমশঃ উন্নত হইয়া দেশের প্রায় মধ্যভাগে উচ্চতম গিরিশিখর বা পৰ্বত- শ্রেণীতে পর্যবসিত হইয়াছে। এই উন্নত স্থান হইতে তৎ-প্রদে- শীয় সমস্ত নদী উৎপন্ন হইয়া দুই দিগ দিয়া প্রবাহিত হইতেছে। . (২) উচ্চতর প্রদেশ সকল মহাদেশের ঠিক মধ্য- ভাগে স্থিত নহে, এই হেতুবশতঃ দুইদিগের ভূমি সময়ত হইতে পারে নাই। এক দিগে দীর্ঘ ও অপরদিকে হ্রস্ব হইয়াছে বলিয়া, একটীকে দীর্ঘ ক্ৰমনিম্নভূমি ও অন্যটাকে হ্রস্ব ক্রমনিমভূমি বলা যাইতে পারে। পূৰ্ব্বদিগে দীর্ঘ ও পশ্চিমদিগে হ্রস্ব ক্রমনিম্নভূমি। প্রাচীন মহাদ্বীপের উত্তরভাগে দীর্ঘ ও দক্ষিণপ্রদেশে হ্রস্বটী বিস্তৃত। (৩) সকল মহাদেশেরই দক্ষিণভাগ অপেক্ষা উত্তর- দিগ ক্রমশঃ নিম্ন। এরূপ বন্দোবস্ত থাকাতে বিষুব- রেখার নিকটস্থ শর অসহ উত্তাপ কিয়ৎপরিমাণে নিবারিত হইয়া থাকে। দেখ, যদি মেরুপ্রদেশীয় ভূভাগ ক্রমশঃ উন্নত হইত, তাহা হইলে এক্ষণে তৎদেশে যেরূপ সভ্য জাতিদিগের অধিবাস রহিয়াছে, তৎপরিবর্তে কেবল চিরতুহিনাচ্ছন্ন মরুভূমি বিরাজমান থাকিত। (৪) মহাদশ, দেশ, দ্বীপ ও উপধী সমূহ যে দিগে বিস্তৃত, তৎসমুদায়ের পর্বতশ্রেণী সকল তাহাদের দৈর্ঘ্য নূতন মহাদ্বীপের প্রদেশের ( ২৬ ) অনুকরণ করিয়া অবস্থিত রহিয়াছে। আমেরিকা, এসিয়া, ইউরােপ, স্কাণ্ডিনেবিয়া, ইটালী, কামস্কাটকা, মাডাগাস্কার, গ্রীল প্রভৃতিতে এইরূপ ব্যবস্থা দৃষ্ট হয়। পর্বতশ্রেণীর মধ্যে হিমালয় সৰ্ব্বাপেক্ষা উচ্চ, উহার উচ্ছায় ২৯,০০০ ফুট। দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যে আণ্ডিস্ দ্বিতীয়, উহার উৎসেধ ২৪,০০০। মেক্সিকোর অন্তর্গত কর্ডিলিরাস ১৭,৭৪০। ইউরােপীয় অল্প ১৫,৭৪০। আফ্রিকার মধ্যবর্তী আবিসিনিয়ার পৰ্বত, ১৪,৭২০। এবং মালয়, অষ্ট্রেলিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপব্যুহের যে গুলি পরিজ্ঞাত হইয়াছে, তাহাদের উচ্ছায় ক্রমান্বয়ে ১৪,০০০ ৭,০০০ ও ১৬,০০০ ফুট। কোন দেশের পর্বত অধিকতর উচ্চ হইলেই যে তদ্দেশের সাধারণ উচ্ছায় অধিক হয় এরূপ নহে। সর্বশাস্ত্রবিশারদ প্রসিদ্ধ হােেন্ট গণনা করিয়াছেন যে আল্প পৰ্বত চূর্ণ করিয়া ইউরােপের সর্বত্র ছড়াইয়া দিলে উক্ত মহাদেশের উচ্ছায় ২১ ফুট মাত্র বৃদ্ধি হয়। সমস্ত পৰ্বত ঐরূপ করিলে উক্ত খণ্ডের সাধারণ উচ্ছায় কেবল ১৫০ ফুট বৃদ্ধি পাইতে পারে। তঁাহার গণনানুসারে সমুদ্রপৃষ্ঠ হইতে ইউরােপের উচ্ছায় গড়ে ১৩৪২, এসিয়ার আফ্রিকার ২২৬৩, উত্তর আমেরিকার ১৪৯৯ ও দক্ষিণ আমেরিকার ১৩০২ ফুট । আফ্রিকার সকল স্থান আবিস্কৃত হয় নাই, এজন্য তাহার উল্লেখ না করিয়া অন্যান্য মহাদেশের মহাদেশের উচ্ছায়বােধক একটা চিত্র দেওয়া গেল ; সাগর পৃষ্ঠ হইতে উচ্ছায়- পরিমাণ গণনা আরম্ভ হইয়া থাকে ; অমুক দেশ এত উচ্চ, ইহা বলিলে সমুদ্র হইতে এত উচ্চ ইহাই বলা হয়। ܝܘ obo

৪০০০
০০০০
সাইবিরীয় প্রার
F০০০০
এসিয়া, উত্তর মহাসাগর হইতে বঙ্গ উপসাগর পর্যন্ত।
( ২৭ )
ss০
ইউরােপীয়
প্রান্তর
আশ্ব
occo
ইউরােপ, উত্তর মহাসাগর হইতে ভুমধ্য সাগর পর্যন্ত ।

--006
রক
পৰ্বতশ্রেন
আলিঘেনী
স্য গিরিসমুহ
প্ৰে ৰি
০০০০
উত্তর আমেরিকা, অটলান্টিক হইতে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত।
( 4 )
২০১০
ব্রেজিলের গিরি
সমুহ
তাজেনীয়
ঐ
আসি
--১০০০
A: লেক
দক্ষিণ আমেরিকা, আটলান্টিক হইতে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত।

( ২৯ )
পঞ্চম অধ্যায়ের প্রশ্ন।
১। পৃথিবীর আভ্যন্তরিক অগ্নিদ্বারা কি কি কাৰ্য্য হইতেছে ?
২। বর্তমান কালে কোন্ কোন্ দেশে অগ্নির কাৰ্য দৃষ্ট হয় ?
৩। উড্ডয়ভেদবিষয়ক কয়েকটা নিয়মের উল্লেখ করু।
৪। গ্রীষ্মমণ্ডল উন্নত, ও মেরুসন্নিহিতদেশ নিম্ন হওয়াতে কি ফল
দর্শিতেছে ?
৫। পৃথিবীর কোন্ খণ্ডের কোন্ দিগে হ্রস্ব ও কোন্ দিগে দীর্ঘ ক্রম
নিম্নভূমি আছে ?
৬। কোথা হইতে নদী সমুহ উৎপন্ন হয়, ও' পরে কোন দিয়ে প্রবা-
হিত হয় ?
৭। পৃথিবীর প্রত্যেক খণ্ডের পর্বতের উচ্চতা ক্রমান্বয়ে লিখ।
৮। পৃথিবীর কোন্ খণ্ডের গড় উচ্ছায় কত ?
৯। পণ্ডিতবর হম্বােল্টের গণনায় এসিয়া খণ্ডের সমুদায় পৰ্বত চূর্ণ
করিয়া উক্ত দেশে ছড়াইয়া দিলে, উহার উচ্ছায় কি পরিমাণে
বৃদ্ধি হয় ?
১০। কোথা হইতে উচ্ছায় গণনা আরম্ভ হয় ?
১১। উচ্ছ্বয়বােধক চিত্র দেখিয়া কোন্ খণ্ডের কোন্ স্থান কত উচ্চ তাহা
গণনা করিয়া বল।
A
ষষ্ঠ অধ্যায়।
p
পৰ্বতসংস্থান। মালভূমি ও উপত্যকা।
চতুর্থ অধ্যায়ে ভূভাগের সাধারণ উচ্ছায় বর্ণিত হইয়াছে,
এক্ষণে পৰ্বত ও মালভূমির বিবরণ লেখা যাইতেছে ।

( ৩০ )
পাশ্ববর্তী ভূভাগ অপেক্ষা ২০ ০০ ফুটের অধিক উচ্চ হইলে
পৰ্বত, তদপেক্ষা নিম্ন হইলে পাহাড় বলা যায়। পৰ্বত ও
পাহাড় কোথাও বা অতিশয় দীর্ঘায়ত, কুত্রাপি অল্পদূরবিস্তৃত।
উভয়পার্শ্বের ভূমি ক্রমশঃ উন্নত হইয়া পরিশেষে উচ্চতম
শিখরদেশে পর্যবসিত হয়। এই শিখরদেশের আকৃতি নানা-
বিধ, কোথাও বা মােচা,স্থানান্তরে শলাকাবৎ অথবা গােল ;
সচরাচর এক একটী পৰ্ব্বতশ্রেণীর অনেকগুলি শৃঙ্গ থাকে,
কোথাও বা একশৃঙ্গ পৰ্বত দেখা যায় ; যথা টেনেরিফ,
জিবরাষ্টার, নবজীলণ্ডস্থ এন্ট ইত্যাদি। শেষােক্তগুলি
আগ্নেয়গিরি বলিয়া উপলব্ধি হয়, ইহাদের কোন কোনটা
বীতাগ্নি হইয়াছে, অবশিষ্টগুলি মধ্যে মধ্যে অগ্নি উদগীরণ
করে। এক একটি পৰ্বতশ্রেণী এত দীর্ঘ ও উচ্চ যে তাহা
ভূগর্ভ হইতে ক্রমশঃ উথিত হইতে অতি দীর্ঘকাল লাগিয়াছে
তাহার সন্দেহ নাই। পৰ্বতশ্রেণীর যে স্থান অপেক্ষাকৃত
নিম্ন সেই পথ দিয়া উভয়পার্শ্বের লােকজন যাতায়াত করতে
পারে। এই সঙ্কীর্ণ পথকে গিরিপথ বা গিরিসঙ্কট বলা গিয়া
থাকে। এই সকল গিরিপথ যুদ্ধকালে অতিশয় প্রয়ােজনীয়।
কয়েকটি প্রসিদ্ধ যুদ্ধ গিরিপথে সংঘটিত হইয়াছিল।
পৰ্ব্বতশ্রেণীর প্রতি দৃষ্টিপাত করিলে বিস্ময়াপন্ন হইতে
র। উহাদের প্রকাণ্ড আকার, অসাধারণ উচ্চতা, বিচিত্র
গঠনপ্রণালী, ও অদ্ভুত নৈসর্গিক কাৰ্য সকল পর্যালােচনা
কারলে বিশ্বরাজ্যের নির্মাণকৌশল দৃঢ়রূপে হৃদয়ঙ্গম হয়।
পতশৃঙ্গ সকল উৰ্দ্ধদেশে বিস্তৃত থাকায় মেঘমালা তাহা-
দিগকে অতিক্রম করতে পারে না, সুতরাং ঐ সকল মেঘের
জল পৰ্ব্বতেই গৃহীত হয়। এই জলের কিয়দংশ পৰ্ব্বতের
:

( ৩১ ) গাত্র বুহিয়া পড়ে, অবশিষ্ট ভাগ ভূগর্ভে প্রবেশ করিয়া পরে নিঝর ও প্রস্রবণ দ্বারা নির্গত হইতে থাকে। পরে কতিপয় প্রস্রবণের জল নিম্ন প্রদেশে গমন করিতে করিতে মিলিত হইয়া ক্ষুদ্র রিৎ উৎপন্ন করে। এই সকল পরিতের কতক- গুলি একত্র হইলে নদীরূপে প্রবাহিত হইতে থাকে। কোন কোন স্থানে একটা প্রস্রবণ হইতেই একটী নদী উৎপন্ন হইয়া থাকে। পৰ্বত দ্বারা ভূভাগ ক্রমশঃ উন্নত হওয়াতে ভূমির পরিমাণ বৃদ্ধি হয়। কোন কোন দেশের নিম্নভূমিতে যে সকল ফল মূল শস্যাদি জন্মে না, পৰ্ব্বতপার্শ্বে তাহাদের জন্মিবার উপযুক্ত স্থান প্রাপ্ত হওয়া যায়। গ্রীষ্মমণ্ডলের পৰ্বতশ্রেণী দ্বারা মনুষ্যের আবাসভূমি বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। পৰ্বত- শিখরের বরফরাশি দ্রব হইয়া উৎস ও নদীর পুষ্টিসাধন করে। পৰ্বত হইতে নানাবিধ মৃত্তিকা, জলসহযােগে দূরবর্তী প্রদেশে নীত হইয়া, ক্ষেত্রের উর্বরতা বৃদ্ধি করে। পৰ্বতপার্শ্বে অসংখ্য তৃণলতা ও বৃক্ষাদি জন্মিয়া বাহদৃশ্যের সৌন্দৰ্য্য সম্পা- দন করে। এই সমুদয় উদ্ভিদ অনেক জন্তুর আহারে লাগে। সেই সকল জন্তু আবার মনুষ্যের অশেষ প্রয়ােজন ও সুখের সাধন হইয়া থাকে। j পৰ্বত থাকাতে তীক্ষশীতল বায়ু দেশ-মধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া অশ্বেযুবিধ সুকোমল উদ্ভিদ নষ্ট করিতে পারে না। কোথাও বা সাগরতরঙ্গ সকল পৰ্ব্বতে প্রতিহত হওয়াতে দেশের ভূমি ক্ষয় হইতে পারে না। পৰ্ব্বত সকল ভূগর্ভ হইতে উথিত হইয়া নানাবিধু আকরিক পদার্থ উর্দ্ধে আনয়ন করিয়া রাখি- আছে, সুতরাং অপেক্ষাকৃত অল্পায়াসে, তাহারা মনুষ্যের কর তলস্থ হইয়া নানা প্রয়ােজনে লাগিতেছে।

( ৩২ ) পৰ্বতের উচ্চতা, অবস্থান, সমুদ্র হইতে দূরতা প্রভৃতি কারণে দেশের শীতাতপের অনেক নূনাধিক্য হয়। এতদ্ভিন্ন, পৰ্বতশ্রেণীর শীতােষ্ণতা নিকটবর্তী দেশের অপেক্ষা অনেক অংশে ভিন্ন। পৰ্ব্বতের উচ্ছায় ও বিস্তৃতির দিক্ অনুসারে, নদী সমূহের দৈর্ঘ্য ও গতি নিরূপিত হয়, পার্শ্বস্থ দেশ সকলের জীব ও উদ্ভিদের প্রকারভেদ হয়, এবং দেশের অধিবাসীদিগের চরিত্র রূপান্তরিত হয়। পৰ্বত দ্বারা ভাষাবিস্তারের সীমা নির্ধারিত হয়, জাতিবিশেষের অধিকার সীমাবদ্ধ হয়, যুদ্ধের প্রকৃতি স্থির হয়, ও সভ্যতার পরিমাণ নির্দিষ্ট হয়। পাৰ্বতীয় জনপদবাসীরা স্বাধীনতাপ্রিয়, পরিশ্রমশীল ও কষ্টসহ হইয়া, থাকে। কোন পর্বতশ্রেণীর সংস্থান, ভিন্ন প্রকার হইলে, দেশে যে সকল অভিনব কাণ্ড উপস্থিত হয়, তাহা বিবেচনা করিয়া দেখা যাউক। যদি আর্থস্ শ্রেণী আমেরিকার পশ্চিমপার্শ্বে স্থিত না হইয়া পূর্ব উপকূলের অদূরবর্তী প্রদেশে থাকিত, তাহা হইলে উক্ত মহাদেশ মনুষ্যের বাসস্থান হইতে পারি না কারণ এক্ষণেও আটলান্টিক সাগর হইত যে পরিমাণে মেঘ- মালা উখিত হইয়া বায়ুদ্বারা আমেরিকাখণ্ডে জ্ঞানীত হয়, তখনও তাহাই হইত ; সুতরাং পর্বতশিখরে আহত হইব্যুমাত্র সমপরিমাণে বৃষ্টিধারা বর্ষণ করিত। কিন্তু এক্ষণে যে বহ্বায়ত প্রদেশে এই বৃষ্টিরাশি বিতরিত হয়, তৎপরিবর্তে অতি ক্ষুদ্র ভূভাগে পতিত হইত, সুতরাং পৰ্বত হইতে পড়িবার সময় প্রচণ্ড জলপ্রপাতের ন্যায় বেগবিশিষ্ট হইয়া সম্মুখস্থ সমস্ত উদ্ভিজ্জাদি চূর্ণ ও উৎপাটিত করিয়া ফেলিত। এরূপ ঘটিলে ।

( ৩৩ ) ; পৰ্ব্বতের পূর্বপার্শ্বীয় ভূভাগ বাসের অযােগ্য হইয়া যাইত। পৰ্ব্বতের পশ্চিমদিগে মেঘ যাইতে পরিত না, সুতরাং তথায় প্রাণিশূন্য মরুভূমি অবস্থিতি করিত। যে বিশাল ভূভাগ মিসিসিপি, আমেজন প্রভৃতি মহানদীর জলদ্বারা সিক্ত হইয়া পৃথিবীমধ্যে উৎকৃষ্ট উর্বর ক্ষেত্র বলিয়া গণ্য হইয়াছে তাহা নিরবচ্ছিন্ন বালুকাময়, জনপ্রাণী ও উদ্ভি-বিহীন নিবৃষ্টি- মণ্ডল হইয়া থাকিত। পূৰ্বেই উপত্যকা ও গিরিপথ বা গিরিসঙ্কটের উল্লেখ করা গিয়াছে। কোন কোন উপত্যকা ক্ৰমনিম্ন ; অন্যগুলি নিকটবর্তী ভূমির উপর প্রায় লম্বভাবে স্থিত। ক্রমান উপত্যকাপথে যে সকল নদী প্রবাহিত হয়, তৎসমুদায় তাদৃশ বেগবতী নহে। যে যে নদী অন্যবিধ উপত্যকা দিয়া গমন করে, তাহাদের বেগ অত্যন্ত অধিক, এই সকল নদীতেই জল- প্রপাত উৎপন্ন হয়। কোন কোন উপত্যকা প্রবেশের দ্বার সঙ্কীর্ণ, তাহার দৃশ্য অতিশয় ভয়ঙ্কর। কিন্তু সেই পথ দিয়া গমন না করলে পৰ্বতের উভয়পার্শ্বের লােকেরা পরস্পর দেখা সাক্ষাৎ করিতে পারে না। আল্প পৰ্ব্বতের কোন কোন গিরি- পথ ১১,৮০০ ফুটউছে স্থিত, হিমালয় ও হিন্দুকুশের কোন কোনটী ৩১৪,০০০ ফুট উচ্চ। হিমালয়ের মধ্যে সর্বা- পেক্ষী উচ্চটীর উচ্ছায় ১৮,৫০০ ফুট। নিম্নে কয়েকটা উপত্যকার উল্লেখ করা যাইতেছে। এসিয়া। সুরম্য কাশ্মীর দেশ হিমালয়ের একটী উপত্যকা মাত্র। ইহারুদৈর্ঘ্য প্রায় ৮০ মাইল ও প্রস্থ ৩০ মাইল। ইহার উভয় পার্শ্বে বরফে আচ্ছন্ন, হিমালয়, কিন্তু কাশ্মীর নানাবিধ উদ্ভিজ্জ ও ফলপুষ্পে সুশােভিত।

( ৩৪ )
ইউয়ােপ। বােহিমিয়া দেশ একটী উপত্যকা মাত্র। বােহি-
মিরা ও কাশ্মীরের আকার দেখিলে বােধ হয়, যেন পুরা-
কালে উহারা হ্রদের গর্ডে অবস্থিত ছিল। সুইটজরলও
দেশের বেলে নামক বিভাগ আল্প পর্বতের উপত্যকার মধ্যে
সৰ্ব্বাপেক্ষা বৃহৎ ; উহার দৈর্ঘ্য প্রায় ১০০ মাইল, প্রস্থ ।
মাইল হইতে ৩ মাইল। এই স্থানে প্রায় সর্বপ্রকার শীতাতপ
অনুভূত হয়, ও নানাবিধ উদ্ভিজ্জ দেখিতে পাওয়া যায়।
পিরিনিস শ্রেণীতে আর্ডে নামক উপত্যকা ইউরােপে
সর্বাপেক্ষা গভীর। ইহার গভীরতা প্রায় ৩,২০০ ফুট।
আফ্রিকা। নীল নদ যে উপত্যকা দিয়া প্রবাহিত, তাহা
নিউবিয়া প্রদেশের পার্বতীয় অঞ্চলে অতি সংকীর্ণ, তথায়
ইহার প্রস্থ ১ মাইলের অধিক নহে। পরে ক্রমশঃ উহার
আয়তন বৃদ্ধি পাইয়াছে।
আমেরিকা। দক্ষিণ আমেরিকার কর্ডিলিয়া শ্রেণীতে
অতীব বিস্ময়জনক সুদৃশ্য উপত্যকা সকল দৃষ্ট হয়, ইহাদের
পার্শ্বে নানাবিধ উদ্ভিজ্জ উৎপন্ন হইতেছে। এই উপত্যকা
গুলির উচ্ছায় কোন কোন স্থানে প্রায় ৫০০০ ফুট। মিসিসিপি
প্রভৃতি মহানদী যে সকল উপত্যকা দিয়া বাহিত হইয়াছে,
দিয়া,
তৎসমুদায় অতি বিস্তৃত।
ষষ্ঠ অধ্যায়ের প্রশ্ন।
১। পৰ্বত, পাহাড় ও মালভূমি কাহাকে বলে ?
২। একশৃঙ্গ পবিত, গিরিপথ, গিরিসঙ্কট ও উপত্যকা ফাহাকে বলে ?
৩। প্রধান প্রধান পর্বত শ্রেণীর উল্লেখ কর।
৪। কয়েকটা উচ্চ মালভূমির নাম লিখ ।

( ৩৫ ) ৫। প্রধান, প্রধান উপত্যকাগুলির নাম লিখ। উহাদের আকারগত বিভিন্নতা আছে কি না ? ৬। কয়েকটি প্রধান প্রধান উপত্যকা ও গিরিসঙ্কটের উচ্চতা স্থির কর। ৭। পৰ্বতশ্রেণী দ্বারা কি কি নৈসর্গিক কাৰ্য্য সাধিত হয় ? ৮। যদি আণ্ডিস পৰ্বত আমেরিকার পূর্ব উপকূলে সংস্থাপিত হইত, তাহা হইলে কি কি ঘটনা হইত ? ৯। হিমালয় পর্বত থাকাতে ভারতবর্ষের কি কি উপকার দর্শিতেছে ? উহা বিন্ধ্যাচলের স্থানে অবস্থিত হইলে উত্তর ভারতবর্ষের কি অবস্থা হইত ? সপ্তম অধ্যায়। নিম্ন প্রান্তর ও মরুভূমি। যে সকল ভূভাগ সাগরপৃষ্ঠ হইতে অল্পে অল্পে উন্নত হইয়া অবশেষে অত্যুচ্চ অংশে কুত্রাপি সচরাচর ১০০ ফুটের অধিক উচ্ছায়বিশিষ্ট হয় না, তাহাদিগকে নিম্নপ্রান্তর বলা যাইতে পারে। আরও অধিক উচ্চ হইলে মালভূমি বলা যায়। প্রাচীন মহাদ্বীপের বৃহৎ প্রান্তর উহার উত্তর ভাগে অবস্থিত। এই প্রান্তর হলণ্ডের পূৰ্ব্বসীন হইতে আরম্ভ হইয়া সিয়া, পােলণ্ড, রুমিয়া ও সাহবিরিয়া ব্যাপিয়া রহিয়াছে, মধ্যে কেবল ইউরেল পৰ্বত উহাকে দ্বিখণ্ডিত করিতেছে। উহার উত্তর সীমা বটিক সাগর ও উত্তর মহাসাগর, এবং দক্ষিণ সীমা কার্পেথিয়ন পৰ্বত, পারস্য দেশ, ও অষ্টাই শ্রেণী। ইউনােপখণ্ডের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের নিম্নপ্রান্তর, কৃষ্ণসাগর পৃষ্ঠ হইতে ৬০ ফুটের অধিক উচ্চ নহে। ঋতুর প্রকৃতি অনুসাক্সে ( ৩৬ ) ইহা ভিন্ন ভিন্ন বেশ ধারণ করে। বসন্তকালে ও গ্রীষ্মেয় আরম্ভে ইহা পুষ্পবৃত থাকে ; তৎকালজাত তৃণাদি পর্যাপ্ত পরিমাণে আহরণ করিয়া না রাখিলে শীতকালে অসহ্য ক্লেশ হয়। গ্রীষ্মকালে রোদ্র প্রখর হইয়া উঠিলে সমুদায় ভূমি শুষ্ক হয় ও শরদাগমে দগ্ধরৎ হইয়া যায়। অক্টোবর মাসেই শীতারম্ভ হয়। তখন সমস্ত প্রদেশ বরফে আচ্ছন্ন ও এই ভাবে বসন্তকাল পর্যন্ত অবস্থিতি করে। এই সকল প্রান্তর তরুবিহীন, ও স্থানে স্থানে ৫০ হইতে ১০০ ফুট গভীর হইয়া ফাটিয়া যায়। এই ফাটল স্থানে, মধ্যে মধ্যে লােকের বসতি ও কৃষিকৰ্ম্ম দৃষ্ট হইয়া থাকে। এখানে বাঁধা রাস্তা নাই, সমদূরে ডাকের আড্ডা ভিন্ন অন্যবিধ লােকালয়ের চিহ্ন দেখা যায় না। উহার দক্ষিণ ভাগে অল্পায়াসে অধিক পরি- মাণে গম উৎপন্ন হয়, উহা বাষ্পীয়পােত ও রেলরােড দ্বারা দুরে নীত হইয়া ক্রমে ক্রমে সভ্যজাতিসমূহের ব্যবহারে লাগি তেছে। কিন্তু এই প্রান্তরের অধিকাংশই অনুৰ্ব্বর। কিছু কাল বৃষ্টি না হইলে অসহ গ্রীনুভব হয়, আকাশমণ্ডল দিবাভাগে কুজ্ঝটিকাবৃত থাকে, এবং উদয় ও অস্ত কালের সূৰ্য্য অগ্নিরাশির ন্যায় দেখা যায়। সমুদায় জলাশয় শুষ্ক হইয়া যায়, বায়ু সতত ধূলিকণাপূর্ণ থাকে, ও এককালে সহস্র সহস্র অশ্বগবাদি নিধন প্রাপ্ত হয়। শীতকালে ঝটিকা উপস্থিত হইয়া অনবরত তুষারকণা বর্ষণ করে, তাহাতে মনুষ্য পশ্বাদি ঘাের বিপদ্গ্রস্ত হয়। ফ্রান্স ও ইংলণ্ডের সহিত সংগ্রামকালে এক- দল রুশীয়সৈন্য ডন নীপার নদীর মধ্যবর্তী প্রদেশে বরফে আচ্ছন্ন হইয়া এককালে বিনষ্ট হইয়াছিল। সাইবিরীয় প্রান্তর “অতি বৃহৎ। এদেশের শীত অতি ( ৩৭ ) প্রচণ্ড। উহার উত্তর ভাগে কোন প্রকার শস্য উৎপন্ন হয় না, তথায় কেবল পাইন ও ফার নামক বৃক্ষ দৃষ্ট হয় । ও আরও উত্তরে গমন করিলে কেবল জলাময় প্রদেশ দেখিতে পাওয়া যায়। এই সকল জলাতে হস্তিজাতীয় পশুবিশেষের বিনাশাবশেষ প্রাপ্ত হওয়া যায়। যত উত্তরাভিমুখে গমন করা যায় ততই এই সকল পশুশরীর অধিক পরিমাণে দেখা যায়। ইহাদের দন্তপ্রভৃতি বহুমূল্যে বিক্রীত হয় বলিয়া, লােকে সতত তৎসমুদায়ের অন্বেষণে ব্যাপৃত। ভারতবর্ষের গঙ্গা ও সিন্ধুনদীর তীরবর্তী প্রদেশ এক প্রকার প্রান্তর মাত্র ; উহার অনেকাংশ পললময় ও অতিশয় উৰ্ব্বর। সিন্ধুনদীর মােহানার পূর্বদিগের ভূভাগ বালুকাময় মরুভূমি। জোয়ার হইলে এই স্থান জলদ্বারা আবৃত হয়, কিন্তু তথায় কোন প্রকার শস্য জন্মে না। মেসিকো উপসাগর হইতে উত্তর মহাসাগর পর্যন্ত একটী প্রকাণ্ড প্রান্তর বিস্তৃত থাকিয়া, উত্তর আমেরিকার ২৫লক্ষ বর্গমাইল পরিমিত ভূমি অধিকার করিয়া আছে। উহার কোন অংশ লতাগুল্মদিসমাকীর্ণ, অপর ভাগ বহুদূরবিস্তীর্ণ তৃণক্ষেত্র মাত্র ; তৃতীয় জলাময়, তথায় সুবৃহৎ হরিণ ও বন্য ঘােটক বিচরণ করে। উহার স্থানে স্থানে যে সকল বিশাল অরণ্য ছিল এক্ষণে তাহা পরিস্কৃত হইতেছে। উহার দক্ষিণ- পূৰ্ব্ব ভাগ বালুকাময়, তথায় পাই নামক বৃক্ষ ভিন্ন আর কিছুই জন্মে না। মিসিসিপি নদীর তীরবর্তী প্রান্তরের উত্তর • ভাগ সুদীর্ঘ তৃণ দ্বারা আচ্ছন্ন ; দক্ষিণভাগে এক প্রকার কৃষ্ণ বর্ণ মৃত্তিকা থাকায় তাহা অতি উৰ্ব্বর, তথায় কৃষিকর্মের বিল- ক্ষণ সুবিধা আছে। এতদ্ভিন্ন স্থানে স্থানে কোন কোন বৃক্ষ ০ • ( ৩৮ ) দৃষ্ট হইয়া থাকে। এই প্রান্তরের পশ্চিমদিগে কোন প্রকার শস্য জন্মে না, উহা আমেরিকার মরুভূমি বলিয়া খ্যাত। রকি পৰ্ব্বতের পশ্চিম অঞ্চলেও একটা মরুভূমি আছে। এলিমেনি পৰ্বত হইতে আটলান্টিক মহাসাগর পর্যন্ত ভূভাগ অনতিউচ্চ ও স্থানে স্থানে জলাময়। জর্জিয়া ও ফোরিডা দেশের জল। “ভীষণ জলা” বলিয়া খ্যাত। উহার দৈর্ঘ্য ৪০ ও প্রস্থ ২৫ মাইল। উহার জলে কোন কোন স্থানে স্রোত অনুভূত হয়, এবং উহাতে নানাবিধ তরু ও গুল্ম দেখা যায়। উহার অনেকাংশ কর্দমময়, কোন কোন স্থান উদ্ভিজ্জাদির মূল দ্বারা আবদ্ধ থাকাতে অপেক্ষাকৃত কঠিন হইয়াছে। পার্শ্ববর্তী ভূমি অপেক্ষা উহার মধ্যভাগ ক্রমশঃ উন্নত। এখানে প্রকৃত মৃত্তিকা প্রায় দেখা যায় না। বৃহৎ বৃহৎ বৃক্ষ এই জলার গর্ভে প্রােথিত, এবং উহার উপরিভাগ উদ্ভিজ্জাদির বিনাশা- বশেষ দ্বারা আচ্ছাদিত। দক্ষিণ আমেরিকা বৃহৎ-প্রান্তর-সমাকীর্ণ। ওরিনকে। ও আমেজন নদীর নিকটবর্তী প্রান্তর লেনস নামে খ্যাত। ব্রেজিল, বিউনােজেরিস্ ও প্যাটাগােনিয়ার প্রান্তরকে প্যাম্পাস বলিয়া থাকে ; লেনস দুই জাতীয়, জঙ্গলপূর্ণ ও তরুবিহীন। লেনসের যে অংশে আমেজন মহানদীর জল উঠে, তাহা নিবিড় অরণ্যময়। লেনসের পরিমাণফল প্রায় দশ লক্ষ বর্গ মাইল, তন্মধ্যে প্রায় ২ লক্ষ মাইল বর্ষাকালে জল দ্বারা আবৃত হয়। অরণ্য প্রদেশ নানা জাতীয় বৃহৎ বৃহৎ বৃক্ষে সমাকীর্ণ ; তৎসমুদায় বিবিধ লতাগুল্ম দ্বারা আবদ্ধ হই দুর্ভেদ্য জঙ্গল রূপে অবস্থিতি করিতেছে। জঙ্গলের দুই এক স্থানে যে -

( ৩৯ )
;
সামান্য ক্ষুদ্র পথ আছে, তদ্বারা ব্যাঘ্র প্রভৃতি বন্য পশু নদীর
জল পান করিতে আসিয়া থাকে। এখানে অসংখ্য বানর দেখা
যায়, তাহারা নানাজাতীয়। অতি
সুদৃশ্য পক্ষীও বিস্তর। নানা
প্রকার সর্প দেখা যায়, তাহাদের কোন কোনটী বিষধর।
এখানকার মৃত্তিকা উৰ্ব্বরা ; তাহাতে অধিক পরিমাণে বৃষ্টি ও
সূৰ্যাতপ পতিত হইয়া বৃক্ষাদি অতি সতেজ করিয়া তােলে।
এই দেশের অরণ্য সকল নদীর জলসীমা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই
দুর্ভেদ্য জঙ্গলময় ভূভাগ মনুষ্যের বাসের অযােগ্য ; কেবল
কতিপয় অসভ্য আদিম নিবাসীরা ইহার স্থানে স্থানে বিচরণ
করিয়া থাকে।
যে স্থানে ওরিনকো ও রাইওনিগ্রো একটী স্বভাবজাত
খালদ্বারা পরস্পর সংযুক্ত
হইতেছে, তথা হইতেই তরুবিহীন
লেন আরম্ভ হইয়া, আণ্ডিস পৰ্ব্বতের নিকট পৰ্যন্ত বিস্তৃত
হইয়া আছে। এই স্থানের ভূমি প্রায় সমতল ; সুতরাং
সামান্য বাতাস হইলে তত্ৰত্য নদীর স্রোত ফিরিয়া যায়। এই
প্রদেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘাস জন্মে, ও মধ্যে মধ্যে দুই একটি
তাল জাতীয় বৃক্ষ দেখা যায়, এবং নদী তীরে কুত্রাপি অন্যবিধ
ক্ষুদ্রাবয়ব উদ্ভিদ নিরীক্ষিত হয়। বর্ষাকালে উহা জলপ্লাবিত
হয়, এবং জল শুকাইয়া গেলে তৃণপূর্ণ হয়। এই তৃণময় স্থানে
অনেক ব্যাঘ্র লুক্কায়িত থাকে, উহারা অশ্বগবাদি দেখিলে
তৎক্ষণাৎ তাহাদের উপর লম্ফ প্রদান করিয়া পড়ে, ও তাহা-
দের প্রাণ সংহার করে। গ্রীষ্মাগমে এই ভূভাগ মরুভূমির
* আকার ধারণ করে। তখন তৃণক্ষেত্ৰ দগ্ধবৎ হইয়া যায়, ভূমি
ফাটিয়া উঠে, এবং বৃহদাকৃতি সর্প ও কুম্ভীর মৃত্তিকার নীচে
সুপ্তভাবে কালযাপন করে। বসন্তকালে বৃষ্টি আরম্ভ হইলে
}

( ৪০ ) উহাদিগের নিদ্রা ভঙ্গ হয়। বর্ষাকালে নদী ও জলাশয়ে অসংখ্য তাড়িতবিশিষ্ট বাইনমৎস্য দেখা যায়, এবং তৎ- প্রদেশীয় হরিণ পালে পালে ক্ষেত্রে বিচরণ করিয়া থাকে। কিন্তু গ্রীষ্মের আতিশয্য হইলে রুশিয়ার ষ্টেপের ন্যায় এই মরুভূমি নিতান্ত ভয়ানক হইয়া উঠে। মধ্যে মধ্যে ঘূর্ণি- বায়ু উপস্থিত হয়, দিবাভাগে আকাশ তিমিরাচ্ছন্ন বােধ হয়, জলাশয় শুষ্ক হইয়া যায়, ও পান্থগণ মৃগতৃষ্ণিকা দেখিয়া জল- ভ্রমে তৎপ্রতি ধাবমান হয়। রাত্রিকালে বাদুড়জাতীয় রক্ত- শােষক ও মশা প্রভৃতি জন্তুর অতিশয় উৎপাত। প্যাম্পাস নামক প্রান্তর ২০ দক্ষিণ অক্ষাংশ হইতে আরম্ভ হইয়া প্যাটাগােণিয়া দেশের অভ্যন্তর পর্যন্ত বিস্তৃত। ইহার দৈর্ঘ্য অন্যূন ২,০০০ মাইল প্রস্থ কোন কোন স্থানে ৫০০ ০ মাইলের অধিক। এই বৃহৎ প্রদেশে শীতাতপের অনেক প্রকারান্তর অনুভূত হয়। উহার উত্তর ভাগ লাপ্লাটা নদী দ্বারা বিভক্ত হইয়াছে,দক্ষিণ দিকে কোন বৃহৎ নদী নাই। প্যাম্পাসের উত্তর পশ্চিম ভাগ সতেজ তৃণপূর্ণ, তাহার পশ্চিমে পশুচারণের বিল- ক্ষণ সুবিধা আছে। তৎপরবর্তী ভূভাগ অপেক্ষাকৃত এত ভাল যে তথায় কৃষিকৰ্ম্ম হইতে পাকে। প্যাম্পাসের কোন কোন অংশ অতিশয় নিম্ন। সেই সকল স্থানে লবণময় হ্রদ দৃষ্ট হয়, তন্মধ্যে সৰ্ব্বাপেক্ষা বৃহৎটা দৈর্ঘ্যে ৫০ ও প্রস্থে ২০ মাইল। পূৰ্ব্বে এদেশে অশ্ব ও গরু ছিল না; স্পেনীয়ের এই সকল পশু আনয়ন করিয়া এখানে ছাড়িয়া দেয়। অপ- ৰ্যাপ্ত আহার পাই তাহাদের সংখ্যা এত বৃদ্ধি হইয়াছে যে এক্ষণে অন্যূন ১২ লক্ষ বন্য গরু ও ৩০ লক্ষ ঋন্য ঘােটক এই বিশাল তৃণক্ষেত্রে বিচরণ করে।

( ৪১ ) যে ভূমিখণ্ড বালুকা অথবা প্রস্তরময় ও কৃষিকর্মের অযােগ্য তাহাকে মরুভূমি বলা যায়। মরুভূমিতে মনুষ্য বাস করিতে পারে না। নিম্নপ্রান্তরের যে গুলি মরুভূমি তৎসমুদায়ের উল্লেখ করা হইয়াছে। এক্ষণে প্রকৃত মরুভূমি গুলির বিবরণ লেখা যাইতেছে। প্রাচীন মহাদ্বীপের মরুভূমি অতি প্রকাণ্ড। উহা আফ্রিকাখণ্ডের পশ্চিম উপকূল হইতে আরম্ভ হইয়া উত্তর আফ্রিকা দিয়া আরবদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত; তৎপরে পারস্য ও এসিয়ার মধ্যভাগ অধিকার করিয়া প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত ব্যাপ্ত হইয়া রহিয়াছে ; এই সুবিস্তীর্ণ ভূভাগ বালুকারাশি দ্বারা আচ্ছন্ন। এই দেশে বৃষ্টি হয় না। বায়ু প্রবাহিত হইলে উহার বালুকারাশি ক্ষুদ্র পর্বতের আকার ধারণ করিয়া ইত- স্ততঃ চালিত হয়, তখন কোন হতভাগ্য ব্যক্তি তাহার সম্মুখে পড়িলে, এককালে আচ্ছন্ন ও প্রােথিত হইবার সম্ভাবনা। আটলাস্ পৰ্ব্বতের দক্ষিণে সাহারা মরু অবস্থিত। আটলান্টিক হইতে লােহিত সাগর পর্যন্ত উহার দৈর্ঘ্য ১০,০০০ মাইল। উহা প্রস্থে প্রায় ৮০০ মাইল। ঈদৃশ অনুৰ্ব্বরা, শুষ্ক, ও ভয়ঙ্কর মরুভূমি ভূমণ্ডলে আয় কুত্রাপি দৃষ্ট হয় না। উহার কোন কোন স্থাহম ক্ষুদ্র পাহাড় আছে, কোথাও বা রাশীকৃত বালুকা দেখিয়া পাহাড় বলিয়া ভ্রম হয়। এক ক্রমে ১০০ অথবা ২০০ মাইল গমন করিলে একটু জল পাওয়া যায়, তাহা ও অনেক সময় লােণা ও তিক্ত। অল্পবারিবিশিষ্ট লবণময় হ্রদ সাহারার অনেক অংশেই দেখা যায়। উহার পশ্চিমভাগে বিশুদ্ধ সৈন্ধব লবণ পাওয়া যায়। এখানকার বায়ু অতি উত্তপ্ত, এমন কি চৰ্ম্মের মশকে করিয়া জল লইয়া যাইতে ( ৪২ ) যাইতে তাহা বাষ্পীভূত হইয়া যায়। তৎকালে কুপাদিতে জল না পাইলে পান্থগণ পিপাসায় কাতর হইয়া প্রাণত্যাগ বর্ষাকালে কোন কোন গর্ভে কিয়ৎ পরিমাণে জল থাকিয়া যায়, তাহাতে কোন সামান্য উদ্ভিদ জন্মিতে পারে, এতদ্ভিন্ন প্রায় কোন প্রকার বৃক্ষাদি নিরীক্ষিত হয় না। বানর, অষ্টিচ পক্ষী, বৃহদাকৃতি সর্প, সিংহ, ব্যাঘ্র প্রভৃতি জন্তু এ প্রদেশে বাস করে। সাহারার কোন কোন অংশ এরূপ ভয়ঙ্কর যে তথায় কোন প্রকার জীব বা উদ্ভি নাই, এমন কি অনেক দিন গমন করিলেও একটী পতঙ্গ বা তৃণ দেখা যায় না। মধ্যাহ্ন- কালে অসহ্য উত্তাপ অনুভূত হয়, কিন্তু রাত্রিতে ও প্রাতঃ- কালে শীত বােধ হইয়া থাকে। এখানেও মৃগতৃষ্ণিকা দেখা যায়, তাহাতে পান্থগণ স্ব স্ব উট সহ জলভ্রমে তৎপ্রতি ধাবমান হইয়া বিষম ক্লেশে পড়ে । মরুভূমির মধ্যে দুই একটী উৰ্বর প্রদেশ দেখা যায়, উহাদিগকে মারবদ্বীপ বলা যাইতে পারে। এই প্রদেশে কোন উৎস বা প্রস্রবণ থাকাতে বৃক্ষাদি জন্মিতে পারে, এবং মনু- য্যের বসতিরও সুবিধা হয়। আকিকার মারবদ্বীপগুলি পার্শ্ববর্তী ভূমি অপেক্ষা নিম্ন, তথায় তাল ও খেজুরের গাছ অনেক; সুতরাং পথশ্রান্ত লােকেরা দূর হইতে খেজুর গাছ দেখিলেই ক্লেশের অবসান হইল ভাবিয়া অপার আনন্দসাগরে মগ্ন হয়। সাহারার মারবদ্বীপ সমূহের মধ্যে ফেজান রাজ্য প্রসিদ্ধ। সাহার প্রদেশ পূৰ্ব্বকালে সাগরবারি-প্লাবিত ছিল তদ্বি- যয়ে কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। বহুসহস্র বৎসর হইল সাহারা ( ৪৩ ) এক্ষণে শুষ্ক হইয়াছে, কিন্তু এক্ষণে পুনরায় উক্ত প্রদেশে সমুদ্রজল আনিবার প্রস্তাব হইতেছে। সাহারার অনেক অংশ নিম্ন- ভূমি কিন্তু উহার মধ্যস্থল ২,০০০ ফুট উচ্চ। সমুদ্র হইতে ৫ মাইল মাত্র খাল কাটিলে সাহারার নিম্নভূমি জলপ্লাবিত হইতে পারে। সাহারা জল দ্বারা আবৃত হইলে বাণিজ্যের সুবিধা হইতে পারে বটে, কিন্তু তাহাতে ইউরােপখণ্ডের মহা অনিষ্ট হইবার সম্ভাবনা। পুরাকালে যখন সাহারা জলধি- তলে নিমগ্ন ছিল তখন ইউরােপের অনেক অংশ বরফে আচ্ছন্ন সুতরাং মনুষ্যের বাসের অযােগ্য ছিল। সাহারা প্রদেশের উত্তপ্ত বায়ু ইতস্ততঃ চালিত হইয়া দক্ষিণ ইউরোেপ ও পার্শ্ববর্তী স্থানে সময়ে সময়ে ক্লেশকর হয়। সাহারা অতিক্রম করিয়া লােহিত সাগর পার হইলে আরবের মরুভূমি আরম্ভ হয়। এইটী সাহারা অপেক্ষা নিম্ন। ইহার যে দিকে দৃষ্টিপাত করা যায়, সেই দিকেই বালুকারাশি লক্ষিত হয়। বালুকা ঝটিকাযােগে স্থানে স্থানে উন্নত হইয়া পাৰ্বতীয় অঞ্চলের আকার ধারণ করিয়া থাকে। উভয় পার্শ্বে উন্নত বালুকারাশি; তাহার মধ্যদেশ দিয়া গমন করিবার কালে, নিস রুদ্ধপ্রায় হইয়া যায়, ও চতুর্দিকে অগ্নিরাশি ব্ললিয়া বােধ হয়। পারস্য দেশের প্রায় এক তৃতীয়াংশ মরুভূমি। উহার মধ্যে বড়টী লবণময়। আফগানিস্থান ও বেলুচিস্থানের মরু- ভূমিরও প্রকৃতি ঐরূপ। সিন্ধু প্রদেশের মরুভূমি অনেক দূর ব্যাপিয়া আছে। মধ্য এসিয়ার গােবী মরুভূমি অতিশয় বৃহৎ। • উহার সকল অংশ আবিষ্কৃত হয় নাই। উহার কোথাও বা সামান্য

( ৪৪ )
মধ্য
উৰ্ব্বর।
তৃণক্ষেত্র, অন্য স্থানে লবণময় হ্রদ বা প্রস্রবণ দেখা যায়।
চীনদেশীয় প্রাচীরের নিকটবর্তী অংশ বালুকাপূর্ণ। এই
বালুকা বায়ু দ্বারা ইতস্ততঃ চালিত হইয়া থাকে।
এসিয়ার যে যে স্থান দিয়া নদী প্রবাহিত হয় সেই গুলি
উহার উত্তর ভাগে যে যে পৰ্ব্বতশ্রেণী অবস্থিত,
সে গুলি তিব্বতের মালভূমি অপেক্ষা নিম্ন। বাস্তবিক
যেন ক্রমশঃ সিঁড়ি দিয়া নামিতে নামিতে উত্তরাভিমুখে
গমন করিতে হয়।
উত্তর আমেরিকায় কালিফর্ণিয়া হইতে রকি পর্বতশ্রেণী
পৰ্যন্ত একটী মরুভূমি আছে। উক্ত পৰ্ব্বতের পূর্ব পার্শ্বে ও
মরুভূমি। দক্ষিণ আমেরিকায়, পারাগােয়ে নদীর নিকট
দুইটী, প্যাটাগােণিয়া দেশে একটী, ও বলিবিয়া দেশে একটী।
শেষোক্তটীতে স্পেনীয় লোকের মধ্যে অনেকে পিপাসায়
প্রাণত্যাগ করিয়াছিল। এই মরুভূমিটী এণ্ডিস হইতে প্রশান্ত
সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত।
সপ্তম অধ্যায়ের প্রক্ষবলী।
।
১। নিম্ন প্রান্তর ও মরুভূমি কাহাকে বলে ?
২। প্রসিদ্ধ কয়েকটী প্রান্তর ও মরুভূমির উল্লেখ কর।
৩। কয়েকটা নিম্ন প্রান্তরের বিশেষ নাম বল।
৪। প্রাচীন মহাদ্বীপন্থ বহ্বায়ত নিমপ্রান্তর ও মরুভূমির সংস্থান নির্দেশ
৫। সাইবিরীয় প্রান্তরে কি আশ্চৰ্য্য নিদর্শন পাওয়া যায় ?
৬। রুশিয়ার, উত্তর আমেরিকার, অথবা দক্ষিণ আমেরিকার কোন
সুবিখ্যাত প্রান্তরের বর্ণনা কর।

( ৪৫ ) । ভীষণ জলার বিবরণ লিখ। ৮। সাহারার বিবরণ লিখ। সাহারার পূর্বাবস্থা কি ছিল ? ৯। পৃথিবীর কোন্ কোন্ মহাদেশ প্রান্তরসমাকীর্ণ, ও কোন্ কোন্ ভাগেই বা অধিক মরুভুমি দেখা যায় ? ১০। কোন্ কোন্ মরু প্রদেশে লবণ অথবা লবণমর জল দেখা যায় ? ১১। মানবদ্বীপ কাহাকে বলে ? ১২। প্রকৃত মরুভূমি দিয়া গমনাগমনে কি কি কারণে ক্লেশ ও বিপদ হয় ? ১৩। সাহারার সহিত সমুদ্রে সংযােগ হইলে কি কি উপকার ও অপকার হইতে পারে ? ৪ অষ্টম অধ্যায়। দ্বীপ-সংস্থান। দ্বীপসমূহের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলে বােধহয় যেন উহারা সাগর প্রদেশের পর্বত শিখর অথবা মালভূমি। সেই সকল, পৰ্ব্বতের নিম্ন অঞ্চল ও উপত্যকাদি জলদ্বারা আবৃত হইয়া সাগরতলে অবস্থিতি কুরিতেছে। বর্তমান কালে কোন কোন উপকূল ক্রমশঃ নিম হইয়া যাইতেছে, তাহা দেখিয়া ভূবিৎ- পণ্ডিতেরা অনুমান করেন, সাগরের যে যে ভাগ দ্বীপসমাকীর্ণ, সেগুলি পূৰ্ব্বকালে কোন মহাদেশের অন্তর্গত ছিল। পরে ক্রমশঃ নিম্ন হইয়া দীর্ঘকালে সাগরতলে গমন করিয়াছে। কোন কোন দ্বীপ একশৃঙ্গ পৰ্ব্বতের ন্যায়, যথা সেন্টহেলেনা, জুয়ানফর্ণাণ্ডেজ প্রভৃতি। এ গুলির নিকটের সমুদ্র, অতি গভীর।

( ৪৬ ) যে যে দ্বীপ কোন মহাদেশের নিকটবর্তী সমুদ্রে অবস্থিত, বােধ হয় তাহারা পূৰ্বে উক্ত মহাদেশের সহিত সংযুক্ত ছিল। কোন কোন দ্বীপ প্রবাল কীটের দ্বারা নির্মিত। অন্যবিধ দ্বীপ ভূগর্ভস্থ অগ্নির শক্তিতে উৎপন্ন। এই ত্রিবিধ দ্বীপের ক্রমান্বয়ে উল্লেখ করা যাইতেছে। অষ্ট্রেলিয়া বাস্তবিক একটী মহাদেশ। উহার প্রকৃতি অন্যান্য মহাদেশের ন্যায় নহে। উহাতে পৰ্বত ও নদী অধিক নাই; কিন্তু বৃহৎ জলা ও মরুভূমি বর্তমান আছে। এই মহাদেশের জীব ও উদ্ভিদ স্বতন্ত্র। কাঙ্গারু প্রভৃতি দ্বিগর্ভ জীব বহুকাল হইল প্রাচীন মহাদ্বীপ হইতে অন্তর্হিত হইয়াছে, কিন্তু এদেশে আজিও বিরাজ করিতেছে। এই স্থানের অধি- বাসীর অতি কদাকার ও প্রায় পশুবৎ অসভ্য ; বােধ হয় অতি পূৰ্ব্বকালে এই দ্বীপ এসিয়া খণ্ডের সহিত সংযুক্ত ছিল, পরে কোন প্রকার ভূবিপ্লব হওয়াতে পৃথক হইয়া গিয়াছে। সুতরাং প্রাচীন মহাদ্বীপের পুরাকালীন জীবজন্তু এদেশে আজিও বর্তমান আছে। মহাদেশের সন্নিহিত দ্বীপসমূহের মধ্যে ভারত সাগরীয় দ্বীপগুলি অতি বৃহৎ। মালয় উপদ্বীপ হইতে আরম্ভ হইয়া উহারা অষ্ট্রেলিয়া পর্যন্ত ব্যাপিয়া আছে। ওদিকে কাম- স্কটিকা হইতে মালয় পর্যন্ত আরও কতকগুলি দ্বীপশ্রেণী দৃষ্ট হয়। এ সমুদায় পুরাকালে এসিয়ার সহিত সংযুক্ত ছিল এরূপ অনুভূর করা যায়, কারণ এসিয়ার অনেক জীব ও উদ্ভিদ এই দ্বীপগুলিতে দৃষ্ট হয়। নবজীলণ্ডদ্বীপের উত্তর হইতে, কয়েকটী দ্বীপপুঞ্জ নবগিনি পর্যন্ত বিস্তৃত হইয়া আছে। উহাদের মধ্যে নবজীলণ্ড, নবকালিনিয়া, নব হেব্ৰিড়িস ও # ( ৪৭ ) } সলোমন পুঞ্জ প্রধান। এই সমস্ত দ্বীপব্যুহ একই ভূমি- খণ্ডের ভগ্নাবশেষ বলিয়া প্রতীয়মান হয়, কারণ অষ্ট্রেলিয়ার জীব ও উদ্ভিদ শেষােক্ত দ্বীপ সমূহে বিদ্যমান আছে। বােধ হয় অষ্ট্রেলিয়া এসিয়া খণ্ড হইতে পৃথক্‌ হইবার পরে এই দ্বীপ গুলি উৎপন্ন হইয়াছে। ইউরােপ ও আমেরিকার নিকটবর্তী দ্বীপ গুলিও বোধ হয় পূৰ্ব্বকালে মহাদেশের সহিত সংযুক্ত ছিল। আফ্রিকার উত্তর পশ্চিম সাগরের দ্বীপগুলি এবং ভারতবর্ষ ও মেডাগাস্কর দ্বীপের মধ্যবর্তী, লাক্ষাদ্বীপ, মাল- দ্বীপ, চেগস ও সিচিলিপুঞ্জ বােধ হয় পূৰ্ব্বকালে মহাদেশের অন্তর্গত ছিল। প্রশান্ত মহাসাগরের অনেক দ্বীপ প্রবল-কীট দ্বারা নির্মিত। এই কীটের গাত্রের আবরণ কাঁকড়া অথবা ঝিনুকের ন্যায় কঠিন। এক একটী ক্ষুদ্র দ্বীপ অসংখ্য প্রবাল-কীটের দেহাব, শেষ মাত্র। মালদ্বীপ, লাক্ষাদ্বীপ প্রভৃতি প্রবাল-নির্মিত। কেরােলাইন পুঞ্জ প্রভৃতি অনেকগুলি প্রশান্ত-সাগরের দ্বীপ প্রবালময়। প্রবালকীট ১২০। ১৮০ ফুটের অধিক গভীর জলে জীবন ধারণ করিতে পারে না, সুতরাং অনতিগভীর জল হইতে উহার কাৰ্য্য করিতে আরম্ভ করে। সাগরগর্ভের যে যে ভূমি অপক্ষাকৃত অল্প জলে স্থিত, প্রবাল পুঞ্জ তাহার উপরিভাগে স্থাপিত হইয়া তাহাকে ক্রমশঃ উন্নত করিয়া সাগরপৃষ্ঠ পৰ্যন্ত তােলে। যখনই এই সকল স্থান এত উচ্চ হয় যে অল্প জোয়ার অর্থাৎ মরাকটালের সময় জলদ্বারা আর আবৃত হয় না, তৎকালে প্রবাল পুঞ্জের কাৰ্য শেষ হয়। তখন সহসা দেখিলেএই সকল দ্বীপ শ্বেত প্রস্তরময় বােধ হয়। পরে প্রাণিবিশেষের দ্বারা দ্বীপের কোন কোন অংশ খণ্ডিত হয়, এবং ( ৪৮ ) তরঙ্গ দ্বারা দুই এক খণ্ড ভগ্ন হইয়া উচ্চ স্থানে স্থাপিত হয়। এইরূপে ক্রমশঃ ১০। ১২ ফুট উচ্চ হইলে স্রোত দ্বারা চালিত বৃক্ষাদি আসিয়া উহাতে সংলগ্ন হইয়া উহার আয়তন বৃদ্ধি করে। তৎপরে উহার উজ্জ্বল শ্বেতবর্ণ বালুকা কিছু কাল বৃক্ষ শূন্য থাকে, ক্রমে তাহাতে নারিকেল প্রভৃতি বৃক্ষের বীজ দূর দেশ হইতে ভাসিয়া লাগে এবং অল্পকালের মধ্যে বৃক্ষরূপে পরিণত হয়। ক্রমে আরও অন্যান্য দ্রব্য আসিয়া উহাতে সংযুক্ত হয়। পরে নারিকেল প্রভৃতি বৃক্ষ বড় হইয়া অর্ণবচর গক্ষ্যাদির বাসের উপযুক্ত স্থান দান করে, এবং পরিশেষে মনুষ্য আসিয়া এই নূতন প্রদেশ অধিকার করে। প্রবাল দ্বীপ সমূহের আশ্চর্য নির্মাণ-প্রণালী দেখিলে কয়েকটী অতীব বিস্ময়জনক ব্যাপারের পরিচয় পাওয়া যায়। এদিকে কীটগণ নিরন্তর পরিশ্রম করিয়া ভূভাগ উন্নত করি- তেছে, ওদিকে ভূগর্ভস্থ অগ্নির শক্তিতে তাহা নিম্ন হইয়া যাই তেছে। দেখিলে বােধ হয়, প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলি পুরা- কালীন কোন মহাদেশের উন্নত ভাগ মাত্র। উহার সকল অংশ কখন সমান উন্নত ছিল না, ও এক সময়ে জলনিমগ্ন হয় নাই। অনুন্নত ভূমিখণ্ড প্রথমতঃ জন্মনিমগ্ন হইয়াছে, পরে ক্রমে ক্রমে উন্নত প্রদেশ সকল সাগরগর্ভে প্রবেশ করিয়াছে এই কারণ বশতঃ প্রবালময় সাগরের গভীরতা সকল স্থানে সমান নহে। যে স্থানের সাগর অনতিগভীর তথায় প্রবাল কীটের পরিশ্রন্থে অনেক দ্বীপ নিৰ্ম্মিত হইয়াছে। কতক- গুলি কীট গতাসু হইলে তাহাদের বংশাবলী তদীয় দেহাব- শেষের উপরি অবস্থিতি করে। এইরূপে ঐমে সাগরতল উন্নত হইয়া উঠে।

( ৪৯ ) উহা পুনঃ প্রশান্ত মহাসাগরের কোন কোন প্রবালময় দ্বীপশ্রেণীর উচ্ছায় দেখিলে বােধ হয়, যে তাহারা পৃথিবীর আভ্যন্তরিক অগ্নির শক্তিপ্রভাবে উত্তোলিত হইয়া থাকিবে। নব হেব্রেডি, সলােমান ও নব আয়রলও পুঞ্জ এইরূপ উন্নত স্থান। ডেঞ্জারস, সােসাইটি, নব কেলিনিয়া প্রভৃতি প্রবালদ্বীপ নিম্ন। অনেক প্রবালদ্বীপের মধ্যভাগে হ্রদের ন্যায় জলরাশি দেখা যায়। এই সকল দেখিতে অতি সুন্দর। হ্রদের চারিদিকে নারি- কেল বৃক্ষসমাকীর্ণ প্রদেশ, তাহা অতিক্রম করিলে সাগর- তীরবর্তী শুভ্রবর্ণ বালুকাময় উপকূল দেখা যায়, পুনঃ তরঙ্গমালা দ্বারা ঘৃষ্ট ও ভগ্ন হইয়া শ্বেত বীচি উৎপাদন করিতেছে, তাহার পরেই কৃষ্ণবর্ণ সাগরবারি বিরাজমান রহিয়াছে। মধ্যদেশের হ্রদের নির্মল বারিরাশিতে সূর্যরশ্মি পতিত হইলে অনির্বচনীয় হরিদ্বর্ণ উৎপাদন করে। প্রবালকীট গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলের সাগরে বাস করে। প্রশান্ত সাগরে বিষুবরেখার উভয়পার্শ্বে ৩০ অক্ষাংশ পরিমিত স্থানে, আটলান্টিকমধ্যে কারীব সাগরে, আরব ও পারস্য উপসাগরে, এবং ভারতবর্ষ ও মাডাগারের মধ্যবর্তী সাগরে উহার প্রভাব দেখা যায়। অগ্নিস্তৃত দ্বীপের মধ্যে প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহা- সাগরের কোন কোনটী পরিগণিত হইতে পারে। উহাদিগের এক একটীর আগ্নেয়গিরি অদ্যাপি অগ্নি উদগীরণ করে, যথা প্রশান্ত মহাসাগরে সেণ্ড উইচ পুঞ্জ, সােসাইটি, মাকু ইসাস ; আটলান্টিক সাগরে কেপ বার্ড, অজোর কেনার। অন্য- গুলির অঞ্চেয়পত বীতাগ্নি হইয়াছে, যথা প্রশান্ত মহাসাগরে ইষ্টার, আটলান্টিক মহাসাগরে হিনিডাড, আসেন। দুই ।

একটীতে আগ্নেয়পর্বতের নিদর্শন পাওয়া যায় না, যথা, সেন্ট
হেলেনা, আমষ্টার্ডাম।
বােধ হয় এই সকল দ্বীপ উখিত
হইবার পরে তথায় আর আভ্যন্তরিক অগ্নির কাৰ্য্য হয় নাই।
৫
অষ্টম অধ্যায়ের প্রশ্ন ।
১। দ্বীপসমূহ কয় প্রকার ?
২। কি কি রূপে দ্বীপ উৎপন্ন হইয়াছে ?
৩। অষ্ট্রেলিয়া ও এশিয়ার পূর্বদিগের দ্বীপ দেখিলে কি বোধ হয় ?
৪। কোন্ কোন্ অংশে অষ্ট্রেলিয়া অন্যান্য মহাদ্বীপ হইতে বিভিন্ন ?
প্রবাল কীট দ্বারা কি কি আশ্চর্য্য কাৰ্য্য হইতেছে ?
প্রবালময় দ্বীপ উৎপত্তির বিবরণ লিখ ।
৭। পৃথিবীর প্রধান প্রধান দ্বীপপুঞ্জ সমূহের উল্লেখ কর।
প্রধান প্রধান প্রবাল দ্বীপের নাম কর ।
অনেক দ্বীপ কোন কালে মহাদেশের সহিত সংযুক্ত ছিল, তাহার কি
কি প্রমাণ পাওয়া যায় ?
১০। দবিশিষ্ট প্রবাল দ্বীপের বর্ণনা কর।
প্রশান্ত মহাসাগরে কি কি আশ্চয্য ঘটনা হইতেছে ?
১৯। প্রবালকীট ও অগ্নি, এই উভয়ের প্রভাবে কোন্ কোন্ দ্বীপ উৎপন্ন
হইয়াছে ?
.
নবম অধ্যায়
আগ্নেয়গিরি ও ভূমিকম্প।
আগ্নেয়গিরির অগ্নগম, ভূমিকম্প প্রভৃতি ভূবিপ্লব পৃথিবীর
আভ্যন্তরিক তাপের প্রভাবে ঘটিয়া থাকে, একথা পূর্বেই

( ৫১ ) বলা হইয়াছে। আগ্নেয়গিরি সকল মােচাগ্র এবং পৃথিবীর অনেক স্থানে দৃষ্ট হয়। উহারা সরল রেখাক্রমে স্থিত ও সাগর অথবা তাদৃশ অন্য কোন জলাশয়ের অদূরবর্তী। উষ্ণ প্রস্রবণ, আগ্নেয়গিরির প্রকারভেদ মাত্র। আগ্নেয়গিরির অগ্নদগম কালে উহার গভীর গহ্বর হইতে জলীয় বাষ্প, ধূম, অগ্নিশিখা, অগ্নিবৎ প্রস্তরখণ্ড, ভস্ম, দ্রবপদার্থ, উষ্ণজল, কর্দম প্রভৃতি উৎক্ষিপ্ত হয়। আগ্নেয়গিরি ও উষ্ণপ্রস্রবণ ভূগর্ভের তাপের আতিশয্যের পরিচয় দিতেছে। ভূগর্ভের অবস্থা তরল কি কঠিন এই বিষয় লইয়া অনেক বাদানুবাদ চলিতেছে। কোন কোন পণ্ডিত অনুমান করেন যে পৃথিবী দুব-পদার্থনয় গােল জড়পিণ্ড ও উহার কঠিন আবরণ আছে। অন্যান্য পণ্ডিতগণ বিচার করিয়া বলেন যে ঈদৃশ জড়পিণ্ড স্বীয় মেরু- দণ্ডের উপর ও সূর্যের চতুর্দিগে আবৰ্তন করিতে পারিত না, অত এব পৃথিবীর অভ্যন্তর কঠিন পদার্থময়। ভূগর্ভের অবস্থা কঠিন হইলেও উহার তাপের আতিশয্য পক্ষে সন্দেহ নাই। বোধ হয় উহা দ্রবণােন্মুখ অবস্থায় অবস্থিত, কোন রকমে উহার উপরের মৃত্তিকার চাপ কমিয়া গেলে উহা ফুটিয়া উঠে বা বাষ্পভাবে বহির্গত হইতে পারে। ভূগর্ভের পদার্থের ভার বেশী। এজন্য অনেকে অনুমান করেন যে উহা ধাতু- পদার্থময়। পৃথিবীতে প্রায় ১৭৩টী আগ্নেয়গিরি আছে। এস্থলে সংক্ষেপে উহাদের অবস্থান বর্ণিত হইল। দক্ষিণ আমেরিকার আগ্নেয় পর্বতগুলি অতি প্রসিদ্ধ। টেরাডেলফিউগাে দ্বীপে আরম্ভ হইয়া কীটো নগরের ৬০ ক্রোশ উত্তর পর্যন্ত আণ্ডিস শ্রেণীর অন্তর্গত ৪৩টী গিরি হইতে অগ্নদগন হইয়া থাকে।

( ৫২ ) বিলারিকা, কটোপাসি, এন্টিসানা, টঙ্কারেগােয়া প্রভৃতি শৃঙ্গ এণ্ডিসশ্রেণীভুক্ত। মধ্য আমেরিকা ও মেসিকে। দেশে ৪০টী আগ্নেয়গিরির অগ্নদগম দেখা যায়। উহার মধ্যে টসলা, ওরিজিবা, পপকাটিপেটল, জোরুল্ল ও কোলিমা পূর্বপশ্চিম দিগে বিস্তৃত। কালিফর্নিয়া হইতে কলম্বিয়া নদী পর্যন্ত ৫টীর অগ্নদগম হইয়া থাকে। কারীব সাগরীয় দ্বীপে ২৩টর কাৰ্য দেখা যায়। এসিয়া খণ্ডের আগ্নেয় পর্বতশ্রেণী আমেরিকার এলিয়াঙ্কা উপদ্বীপে আরম্ভ হইয়া এলিউশনপুঞ্জ, কামস্কাটকা, কিউরিল- পুঞ্জ, জাপান, লুচু, ফৰ্মোজা, ফিলিপাইন, মলাপুঞ্জ, সম্বর, জাব ও সুমাত্রা দিয়া বঙ্গ উপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। কাস্পি- য়ান সাগরের পশ্চিমে বাকু নামক স্থানে যে প্রস্রবণ আছে, তাহা হইতে তৈলবৎ দাহ্য পদার্থ সকল নির্গত হইয়া থাকে। ইউরােপে গ্রীসদেশীয় সাগরের সেন্টরিণ দ্বীপ হইতে নেপ, সিসিলি ও লিপরিপুঞ্জ পর্যন্ত আগ্নেয়গিরি দেখা যায়। এতদ্ভিন্ন আইও দ্বীপে হেলা নামক অতি প্রসিদ্ধ আগ্নেয়গিরি আছে। আফ্রিকার কেনারীপুঞ্জে টেনিরিফ নামক আগ্নেয়গিরি অবস্থিত। প্রশান্ত মহাসাগরে বেণ্ডা, নবগিনি, নবব্রটন, নব হেব্রিডিস, নফেকদ্বীপ মিত্রদ্বীপ, সােসাইটী, লেড়োন, ও সেণ্ডউইচ, পুঞ্জ, আগ্নেয়গিরিবিশিষ্ট। এই গুলির মধ্যে সেণ্ডউইচ, পুঞ্জের কোন কোন গিরি অতিশয় ভয়ানক। দক্ষিণ মহাসাগরের বিক্টোরিয়া খণ্ডেও আগ্নেয়- গিরি বিদ্যমান আছে। অনেক আগ্নেয়গিরি দীর্ঘকাল হইল বীতাগ্নি হইয়াছে। ফ্রান্স দেশে এইরূপ অনেক গুলির নিদর্শন পাওয়া যায়। মধ্য ৫ ( ৫৩ ) এসিয়া, কাস্পিয়ান সাগরীয় প্রদেশ, তুরস্ক, ইঙ্গারি, জণি, ইটালী, স্পেন, স্কটলগু, মধ্য-আফ্রিকা প্রভৃতি অনেক দেশের পৰ্ব্বতের গঠন ও পার্শ্ববর্তী ভূমির প্রকৃতি দেখিয়া বােধ হয়, এই সকল স্থানে পূর্বকালে অনেকবার অগ্নদগম হইয়াছিল। সাগরগর্ভে অনেক আগ্নেয়গিরি আছে। উহাদের অগ্ন- দগমকালে বহুদূর হইতে সাগরের জল উচ্ছসিত হয়, ও ধূম ভস্মাদি নির্গত হইয়া কখন কখন অর্ণবজানের গতি রােধ করে। আটলান্টিক সাগরে আসেন্সন দ্বীপের উত্তরে উক্ত রূপ দুইটী গিরি আছে । 4, বিসুবিয়স্ পৰ্ব্বত। নেপলস্ প্রদেশের বিসুবিয়স্ আগ্নেয়গিরি অতি প্রসিদ্ধ। উছার শৃঙ্গ মােচাগ্র ; গহ্বরের পরিধি প্রায় ৩ মাইল ও গভীরতা প্রায় ১০০০ ফুট । ১৮২২ খৃঃ অব্দের অক্টোবর মাসে যে অগ্নদগম হয়, তাহাতে উহার শৃঙ্গের উপরি হইতে ৮০০ ফুট উচ্চ অংশ বিনষ্ট হইয়া গিয়াছে, সুতরাং পর্বতের উচ্চতা সে পরিমাণে কমিয়া ৩৪ ০০ ফুট হইয়াছে। খৃঃ অব্দের ( ৫৪ ) ৬৩ বৎসর পূর্বে এদেশে তাদৃশ উৎপাত ছিল না ; উক্ত সময় হইতে ৮৯ খৃঃ অব্দ পর্যন্ত অনেকবার ভূমিকম্প হয়, এবং শেষােক্ত বৎসরের আগষ্ট মাসে অতিশয় ভূমিকম্প হইয়া তৎপরে অগ্নিকাণ্ড আরম্ভ হয়। কিয়ৎকাল মেঘবৎ ধূম নির্গত হয়, তাহাতে মধ্যে মধ্যে বিদ্যুতের ন্যায় প্রভা দৃষ্ট হয়, তং- পরে একক্রমে আটদিন ভস্মরাশি উৎক্ষিপ্ত হইয়া হার্কিউলে- নিয়ম ও পম্পি নামক দুইটী নগরী এককালে প্রােথিত করিয়া ১৭১৩ খৃঃ অব্দে একটী কূপ খনন কালে হার্কি উলে- নিয়ম নগরীর নাট্যশালা বাহির হইয়া পড়ে। পরে অনুসন্ধান করাতে উভয় নগরীর কোন কোন অংশ আবিষ্কৃত হইয়াছে । উহাদিগের কোন কোন মন্দিরের প্রস্তরফলকে ১৬ বৎসর পূৰ্ব্বের একটী ভয়ানক ভূমিকম্পের উল্লেখ আছে। প্রস্তরময় রাজপথে গাড়ি চলিবার কালে চাকার ঘর্ষণ যে সকল দাগ হইয়াছিল, আজিও তাহার চিহ্ন দেখা যায়। পম্পি নগরের সেনানিবাসে কারারুদ্ধ দুই জন সেনার অস্থি ও নগরপার্শ্বে একটী গৃহে ১৭ জন ব্যক্তির কঙ্কাল দৃষ্ট হয়, এতদ্ভিন্ন মনুষ্য- শরীরের আর কোন নিদর্শন অদ্যাপি পাওয়া যায় নাই। বোধ হয় শেষোক্ত লােকগুলি আশঙ্কা ক্ৰমে পলাইতে পারে নাই। উক্ত গৃহে ক্রোড়স্থিত শিশুসন্তান সই একটী' স্ত্রীলােকের অব- য়ব পাষাণময় পদার্থে অঙ্কিত রহিয়াছে, এবং নিকটে তাহাদের যে কঙ্কাল পড়িয়া আছে তাহাতে স্বর্ণহার ও অঙ্গুরীয় দৃষ্ট হই- ছে। বােধ হয় এই স্ত্রীলােক গৃহস্বামিনী ছিলেন। নগরীদ্বয়ে অধিকসংখ্যক মনুষ্য কঙ্কাল না থাকাতে বােধ হয় অনেকেই জীবন রক্ষা করিবার অবকাশকাল পাইয়াছিল। সৈন্যগণ বারিকের গায় যে সকল অক্ষর খােদিত করিয়াছিল ও বাটীর ( ৫৫ ) দ্বারে গৃহস্বামীদের যে সকল নাম লেখা ছিল, তৎসমুদায় অদ্যাপি পড়া যায়। হাকিউলেনিয়ম নগরের গৃহের কড়িকাট দেখিতে কৃষ্ণবর্ণ হইয়াছে কিন্তু ইহা চিরিলে, নূতন বােধ হয়। ভূর্জপত্রের অনেক গুলি তাড়া পাওয়া গিয়াছে, তাহাতে কি লেখা আছে তাহা ঠিক করা যায় না। কোন ভদ্র ব্যক্তির পুস্তকালয় হইতে অনেক পুস্তক হস্তগত হইয়াছে, তন্মধ্যে প্রায় ৪০০ খণ্ডের নাম পড়া যায়। বােধ হয় এই দুই নগরীর সকল ভাগ আবিষ্কৃত হইলে, কোন না কোন উৎকৃষ্ট গ্রন্থ পাওয়া যাইবে। বর্তমান শতাব্দীতে বিসুবিয়সের পুনঃ পুনঃ অগ্নদগম হইতেছে। এটনা পৰ্বত সিসিলিদ্বীপে স্থিত। উহার উচ্ছায় ১১ সহস্র ফুট ; শৃঙ্গ মােচাগ্র, ও পরিধি ৮৭ মাইল। এই পৰ্বতের পার্শ্বদেশে নানাবিধ ফল ও শস্য জন্মে, এবং তথায় বহু লােকের ‘বাস। কিঞ্চিৎ উর্ধে ৬৭ মাইল পরিমিত স্থান নানা বৃক্ষ দ্বারা আচ্ছাদিত ; তথায় অনেক পশু বিচরণ করে। পৰ্বতের অত্যুন্নত প্রদেশ মরুভূমিবৎ। মধ্যবর্তী উন্নত শৃঙ্গ ব্যতীত পৰ্বতের পার্শ্বে প্রায় একশত ক্ষুদ্র শৃঙ্গ আছে। যে যে সময়ে পর্শ হইতে অগ্নদগ হইয়াছিল, তৎকালে উহার এক একটী উৎন্ন হইয়াছে। এই গুলি বৃক্ষসমাকীর্ণ থাকাতে উপরিভাগ হইতে দেখিলে অতি আশ্চর্য শােভাময় বােধ হয়। এটনার ভিন্ন ভিন্ন অগ্নদগমে অশেষবিধ মৃত্যাশ্চর্য ঘটনা হইয়া গিয়াছে। ১৭৬৯ সালে র উপদ্রবকালে যে দ্রব, পদার্থ নিঃসৃত হয়, তাহা ১৪টী গ্রাম ও নগর প্লাবিত করিয়া বহু সহস্র লেশকের প্রাণসংহার করে। কেটেনিয়া নগরর লােকে আশঙ্কাক্রমে একটা বৃহৎ বাঁধ বাঁধিয়া রাখিয়াছিল, { ৫৬ ) দ্রবপদার্থের স্রোত ক্রমে তাহার গায়ে লাগিল ও অবশেষে তাহা অতিক্রম করতঃ অতিশয় বেগে চালিত হইয়া নগরের কিয়দংশ নষ্ট করিয়া ফেলিল। এই স্রোত ১৫ মাইল দূরে যাইয়া সাগরে মিলিত হয়। তখনও ইহার প্রস্থ ৬০০ গজ ও গভীরতা ৪০ ফুট ছিল ; ১৭৬৬ সালে এরূপ স্রোত চলিতে চলিতে, প্রায় ৫০ ফুট উচ্চ এক খণ্ড পাহাড় পনর মিনিটের মধ্যে দ্রবীভূত করিয়াছিল। ১৮৬৫ সালেও দ্রবপদার্থের স্রোত চলিয়াছিল। আইলণ্ড দ্বীপের হো পৰ্ব্বতের অগ্নদগম এক এক সময় ৬ বৎসর কাল স্থায়ী। উহার উপদ্রবকালে সমস্ত দ্বীপ বারম্বার কম্পিত, পাহাড় সকল নিম্ন, পৰ্বত ছিন্ন ভিন্ন, নদী খাচু্যত এবং হ্রদ উৎপন্ন হইয়াছে। তৎকালে নিকটস্থ সাগরে কখন নূতন দ্বীপ উথিত হইয়াছে ; কখন বা পুরাতন দ্বীপ সাগরগর্ভে প্রবেশ করিয়াছে। উক্ত দেশের পর্বতের বিরাম- কালে অসংখ্য উষ্ণ প্রস্রবপ্ন দ্বারা অভ্যন্তরিক তাপের কাৰ্য প্রকাশিত হয়। ১৬৮৩ সালে আইলণ্ডে ভূমিকম্প হইতে ছিল, এক দিন তাহার প্রভাব অসহ্য হইয়া উঠিল। আইণ্ডে স্কাপ্তা নদীর নিকটবর্তী একটী গিরি হইতে দ্রব- পদার্থ নির্গত হইয়া উক্ত নদী পূর্ণ করিয়া ফেলিল+ এই নদী উন্নত প্রদেশে ৪০০ হইতে ৬০০ ফুট গভীর ও প্রস্থে ২০০ ফুট। নিম্ন প্রদেশে এই নদী ১২১৫ মাইল প্রশস্ত। দ্রবপদার্থস্রোত এই নদী পূরিয়া নিকটবর্তী ভূভাগ প্লাবিত করিল, পরে যাইতে মাইতে একটী সুগভীর হ্রদ পূর্ণ করিল। তদনন্তর কয়েকটী অন্তঃসলিল গহ্বরের উপর দিয়া যাইবার কালে সেই গুলির গর্ভস্থ জলের কিয়দংশ বাষ্পীভূত করিল, সেই বাষ্পের ।

( ৫৭ ) ক্রমে জোরে উপরিভাগের ভূমিখণ্ড স্থানে স্থানে উর্ধে উৎক্ষিপ্ত হইয়া গেল; এই স্রোত চলিতে চলিতে অনেক গ্রাম প্লাবিত করিয়া অবশেষে একটা জলপ্রপাতের নিম্নদেশের গহ্বার পূর্ণ করিল, কিন্তু তাহাতেও উহা নিঃশেষিত হইল না। আরও দ্রবপদার্থ আসিয়া উহার অনুসরণ করাতে অনেক দূর লইয়া দেশ প্লাবিত হইল। কোথাও বা ১০০ ফুট গভীর ১২।১৪ মাইল বিস্তৃত হ্রদ রূপে অবস্থিত রহিল। এই উপপ্লব- কালে অন্যূন ২০ খানি গ্রাম উৎসন্ন ও ৯,০০০ লােকের প্রাণ বিয়ােগ হয়। ১৮২২ সালে জাবদ্বীপের গলংগং পৰ্বত নিবিড় অরণ্য- ময় ও উহার সন্নিহিত ভূভাগ বহুজনসমাকীর্ণ ছিল। উক্ত অব্দের জুলাই মাসে তত্ৰত্য একটী নদীর জল সহসা উত্তপ্ত বোধ হইতে লাগিল। পরে ৮ই অক্টোবর অতি ভয়ানক শব্দ সহকারে পৃথিবী কম্পান্বিত হইল, তখন অত্যুষ্ণজল ও কর্দম- রাশি, প্রজ্বলিত গন্ধক, ভস্ম প্রভৃতি ভীষণবেগে উৎক্ষিপ্ত হইল। এই গুলির বেগ এত অধিক যে ৪• মাইল দূরে পতিত হইয়াছিল। পরে প্রজ্বলিত দ্রবপদার্থের স্রোত বহির্গত হইয়া নদী সকলের খাত পূর্ণও পার্শ্বস্থ দেশ প্লাবিত করিল। মাইল পরিমিত ভূভাগের জন প্রাণীর চিহ্নও রহিল না। ১১ই অক্টোবর পুনরায় অগ্ন্যুৎপাত আরম্ভ হইল, তাহাতেও ২০০ লােক মৃত্যুমুখে পতিত হয়। অল্প দিন হইল, পুনরায় জাবা- দ্বীপে ভূমিকম্প ও অগ্ন্যুৎপাত হইয়া বহুসংখ্যক লােক নিধন প্রাপ্ত হইয়াছে। সুক্ষ্ম ভরাশি উর্দ্ধে উৎক্ষিপ্ত হইয়া বহুদূরে ব্যাপ্ত হয় এবং কয়েক মাস পর্যন্ত পৃথিবীর অনেক স্থানে উদয় ও অন্তকালের পূর্বে সূর্যের পূর্ব বা পশ্চিম দিগ লােহিতবর্ণ ধারণ করে। ২৬ ( ৫৮ ) ; আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতকালে ভস্মাদি লঘু পদার্থ ব্যতীত অত্যুত্তপ্তপ্রস্তরখণ্ড উৎক্ষিপ্ত হয় ইহা পূৰ্ব্বে বলা হইয়াছে। এইগুলি উর্দ্ধে উঠিয়া পরস্পর আঘাত করে এবং রাত্রিকালে উহাদের গাত্র হইতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হইয়া অন্ধকারে দিঙ মণ্ডলের আশ্চৰ্য শােভা সম্পাদন করে। প্রস্তরখণ্ড কত জোরে উৎক্ষিপ্ত হয় তাহা কটোপেক্সী গিরির অগ্ন্যুৎপাতে অনুভূত হইয়াছিল। তৎকালে পাঁচ সহস্র মণ ভারি একখণ্ড প্রস্তর ৯ মাইল দূরে নীত হইয়াছিল। চিলি দেশের কোন গিরি হইতে প্রস্তরাদি ৩০ মাইল দূরে চালিত হইয়াছিল। বাস্তবিক যে শক্তিতে ঈদৃশ কাৰ্য্য সংঘটিত হয় তাহার পরিমাণ করা কঠিন। ভূগর্ভস্থ প্রকাণ্ড অত্যুষ্ণজলরাশির উপর মৃত্তিকাদির চাপ থাকাতে উহা বাষ্পীয় ভাব ধারণ করিতে পারে না বটে ; কিন্তু যখন উক্ত প্রকার চাপমতিক্রম করবার সুবিধা পায় তৎকালে সহসা বাষ্পীয় ভাব ধারণ করতঃ বায়ত হয়, এবং এই প্রক্রিয়াকালে, উহার জোর এত অধিক হয় যে তারা বৃহৎ বৃহৎ পদার্থ উর্ধে উৎক্ষিপ্ত হইয়া থাকে। ঐ বাষ্প উর্দ্ধে উঠিয়া অনেক সময় মেঘ ও বৃষ্টিতে পরিণত হয়। বাষ্পের সহিত দ্রব ধাতু প্রভৃতিও বহিত হইয়া থাকে। এই দ্রবপদাৰ্থ অতি উষ্ণ এবং উহার কাৰ্য পূর্বে বশিত হইয়াছে। বাম্পাদি একবার উঠিয়ই ক্ষান্ত হয় না। পুনঃ পুনঃ বিশাল শব্দ করতঃ বহির্গত হয় এবং নিবের স্রোত বহিতে আরম্ভ হইলে প্রায় অগ্ন্যুৎপাতের শেষ হইয়া থাকে। প্রভূত অঙ্গারক বাষ্পরাশিও পৰ্বত হইতে দীর্ঘকাল পর্যন্ত নির্গত হয়, তাহা নিশ্বাসঘারা গ্রহণ করিয়া অনেক জীবজন্তু মৃত্যুমুখে পতিত হয়। পরিশেষে ধাতু- থাকে। ( ৫৯ ) পূৰ্বে উল্লেখ করা গিয়াছে যে অনেক আগ্নেয় পর্বত বৃহৎ জলাশয় বা সমুদ্রের অদূরবর্তী। বৃষ্টির জল, অথবা নদী, হ্রদ বা সমুদ্রের জল কোনক্রমে ভূপঞ্জর ভেদ করিয়া কোন মতে অত্যুষ্ণ ভূগর্ভে উপনীত হইলে উহাও অত্যুষ্ণ ভাব ধারণ করে। পরে ঐ জলরাশির কিয়দংশ বহির্গত হইবার পথ পাইলে উহার পার্শ্ববর্তী দ্রবণােন্মুখ পদার্থগুলির ও বহির্গমনের সুবিধা হয়। এইরূপে সহসা অগ্নৎ fৎপাত আরম্ভ হইয়া থাকে। ভূমিকম্প। ভূমিকম্প কিতাহা অনেকে প্রত্যক্ষ করিয়া- ছেন; কিন্তু এই দেশে উহার তাদৃশ প্রাদুর্ভাব নাই। বঙ্গদেশের উত্তরপূর্ব পাৰ্বতীয় অঞ্চলে উহা দ্বারা অনিষ্টসাধন হইয়া সচরাচর ভূমি গৃহাদি আস্তে আস্তে কঁপিতে থাকে, কিন্তু কখন কখন উহাতে ভূপৃষ্ঠ নৃত্য করিতে থাকে, প্রস্তরাদি স্থানভ্রষ্ট হয়, বৃক্ষাদি উৎপাটিত হয় এবং গ্রাম নগরাদি ভূমিসাৎ হইয়া যায়। ভূমিকম্পে লােকের যে সৰ্ব্বনাশ হয় তাহা অতি বিস্ময়জনক। পূৰ্ব্বসূত্রে কিছুই জানা যায়না; সহসা দূরবর্তী মেঘ- গর্জন বা তােপের শব্দের ন্যায় শব্দ হয়, এবং লােকে চকিত হইয়া দেখে যে তৎক্ষণাৎ পদতলস্থ ভূমি দোলায়মান হইতেছে ; অট্টালি কাদিদুলিতে দুলিতে ভূমিসাৎ হইতেছে ইতস্ততঃ ভূভাণ বিদীর্ণ হইতেছে এবং পুনরায় যােডা লাগিয়া যাইতেছে। কয়েক সেকেণ্ড সময়ের মধ্যে বৃহৎ নগরাদি ভগ্ন ও বহুসহস্র লােক মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছে বা হইতেছে। ১৭৫৫ খ: অব্দে লিন্ নগরে যে ভূমিকম্প হয় তাহাতে ৬০,০০০ লােক মরে। কয়েক বৎসর পরে কেলেষ্ঠীয়ার ভূমিকম্পে ৪০,০০০ লােকের মৃত্যু হয়। কখন কখন উহার প্রভাব বহু- দূর ব্যাপী হইয়া ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশে অনিষ্ট করে। যেমন সমুদ্রে ;

তরঙ্গ হইলে জাহাজের মাস্তুল ইতস্ততঃ দুলতে থাকে, ভূমিকম্প কালেও ভূমির তাদৃশ অবস্থা হয়। অর্থাৎ ভূমিতে ও তরঙ্গ উৎপাদিত হইয়া থাকে। এই তরঙ্গ একস্থান হইতে আরম্ভ হইয়া ক্রমশঃ দূরে চালিত হয়। ভূমিকম্পকালে পৰ্বতের পার্শ্ব হইতে প্রস্তরখণ্ড খলিত হইয়া কখন কখন নদীর স্রোত অবরােধ করে এবং ক্রমশঃ জল সঞ্চয় হইতে হইতে পরিশেষে প্রস্তৱাদি অতিক্রম করিয়া প্রবলবেগে বহির্গত হয়। ভূমি বিদীর্ণ হইয়া গৃহ বৃক্ষাদি গ্রাস করে এবং পরক্ষণেই যােড়া লাগিয়া যায়। ভূমিকম্পের প্রভাবে কখন কখন ভূমি উন্নত বা নিম্ন হইয়া যায়। ১৮৩৫ খৃঃ অব্দে চিলি দেশের ভূমিকম্পে তত্ৰত্য উপকূল সহসা ১০ ফুট উন্নত হইয়াছিল। ১৮১১ হইতে অব্দ পর্যন্ত মিসিসিপি নদীর নিকটবর্তী প্রদেশে অনেকবার ভূমিকম্প হয় তাহাতে বহ্বায়ত ভূমিখণ্ড নিম হইয়া যায় । ঐ প্রদেশে কত বৃহৎ বৃক্ষাদি এক্ষণেও জলনিমগ্ন অবস্থায় দৃষ্ট হয়। যৎকালে সমুদ্রগর্ভ হইতে ভূমিকম্প আরম্ভ হইয়া উপ- কূলভিমুখে আগমন করে সেই সম সৰ্ব্বাপেক্ষা বেশী ক্ষতি হয়। এদিগে ভূভাগ কঁপিতে থাকে, ওদিগ সমুদ্র হইতে অত্যুন্নত তরঙ্গমালা আসিয়া উপকূলভাগ অধিকার করে। ভূমিকম্পের প্রকৃত কারণ অবধারিত হয় নাই। বোধ হয় উহার নানা কারণ আছে। আগ্নেয়গিরির কাৰ্য্যের সহিত যে উহার সম্বন্ধ আছে তাহার কোন সন্দেহ নাই। ভূগর্ত যেন কোন প্রবল শক্তিতে আহত হইয়া দুলিতেছে এইরূপ বােধ হয়। ১৮১৩ ১৮৫৫ সালে নবজীলও দ্বীপে ভূমিকম্প হইয়াছিল। উহার প্রভাবে দেড় মিনিটু কালের মধ্যে ইষ্টকালয় ও নদীর সেতু ভগ্ন এবং পৰ্বত-পর্শ্বস্থ বৃক্ষ সকল সমূলােৎপাটিত হইয়া- ছিল। এই ঘটনার পূর্বে বৰ্তমান শতাব্দীর মধ্যে আরও কয়েকটী ভূমিকম্প হইয়া এই দ্বীপের কোন কোন ভাগ উন্নত হইয়াছে। ১৮৩৭ সালে সিরিয়া দেশে যে ভূমিকম্প হয়, তাহা ৫০০ মাইল দীর্ঘ ও ৯০ মাইল প্রশস্ত ভূভাগে অনুভূত হইয়াছিল। উহাতে অন্যূন ৬০০০ লােক মৃত্যুমুখে পতিত হয়, পৰ্ব্বতের কোন কোন অংশ কাটিয়া যায়, ও অভিনব উষ্ণ প্রস্রবণ উৎপন্ন হয়। উক্ত বৎসর ৭ই নবেম্বর তারিখে চিলি দেশের ভূমিকম্পে বডিবিয়া নগর উৎস ও তদ্দেশের ভূভাগ উন্নত হয়। ৮৩৫ সালে উক্ত দেশে যে ভূমিকম্প হইয়াছিল, তাহা দৈর্ঘ্যে ১,০০০ মাইল ও প্রস্থে ৫০০ মাইল ব্যাপী। উহার প্রভাবে, সাগর তরঙ্গ ১৬২০ ফুট উচ্চ হইয়া উঠে। তৎকালে অসৰ্ণ নামক গিরির অগ্নদগম হয়, ও জুয়ানফার্ণাণ্ডেজ দ্বীপের নিকটস্থ সাগরে একটি পুতন অগ্নিকাণ্ড হয়, তাহাতে উক্ত দ্বীপ সমস্ত রাত্রি আলােকময় ছিল। কময় ছিল। সাগর তরঙ্গ সাগর তরঙ্গ উঠিয়া জুয়ান- ফার্ণাণ্ডেজ জলপ্লাবিত করিয়াছিল। কন্সেপ্ন নগরীর নিকটে কয়েকটী স্থান বারংবার ফাটিয়া গিয়া পূনরায় সংযােজিত হয়। উক্ত বৎসর কয়েক মাস পরে কন্সেপ্লন্ নগরে ভূমিকম্প হয়, ' তৎকালেও ৪০০ মাইল দূরবর্তী অসৰ্ণগিরির অগ্নৎপাত হইয়া- ছিল। ১৮২২ গালের ভূমিকম্পে প্রায় একলক্ষ বর্গ মাইল পরিমিত ভূমি ২ হইতে ৭ ফুট উচ্চ হইয়া গিয়াছে।

( ৬২ )
১৮২৭ সালের ১৬ই নবেম্বর বগােটা অঞ্চলে ভূমিকম্প
হওয়াতে অনেক নগরের গৃহাদি পতিত হয় ; নদীর জল বৃদ্ধি
হয়, তাহাতে গন্ধকের গন্ধ পাওয়া গিয়াছিল। স্থানে স্থানে
ভূমি ফাটিয়া যায়, ও নদীর গতি রােধ হয়। তৎকালে অধিক
বৃষ্টি হইয়াছিল। এণ্ডিস্ শ্রেণীতে সেই সময় দুইটী গিরির
অগ্নদগম হইতেছিল।
১৮১৯ সালে ১৬ই জুন তারিখে কচ্ছ প্রদেশে যে ভূমিকম্প
হয়, তাহাতে ভুজ নগর বিনষ্ট হইয়া যায়। কলিকাতা, কাটমুণ্ড
ও পটুঞ্চের পরস্পর এতদূরবর্তী কিন্তু উক্ত ভূমিকম্পের প্রভাব
সমকালে উক্ত তিন স্থানেই প্রকাশিত হয়, এবং তৎকালে
আহমেদাবাদ নগরের মজিদ ভূমিসাৎ হয়।
৩০ মাইল দূরে
দীনােদর আগ্নেয়গিরি হইতে তৎকালে অগ্নি নিঃসরণ হইয়া
ছিল, একথা অনেকে বলে। এই সময়ে সিন্ধুনদীর পূর্ব
শাখার জলের গভীরতা ১ ফুট হইতে ১৮ ফুট হইয়া যায়, কচ্ছ
প্রদেশের রণ বসিয়া যায়, ও তাহাতে সমুদ্রজ প্রবেশ করে,
এবং সিন্দুরী নামক দুর্গ ও গ্রাম বসিয়া গিয়া জল দ্বারা আবৃত
দুর্গের উপরিভাগ জলমগ্ন হয় না, এজন্য তাহাতে
আরােহণ করিয়া অনেকের
সিন্দুরী হইতে
অন্যূন ৫ মাইল দূরে ৫০ মাইল দীর্ঘ, প্রায় ১৬ মাইল প্রশস্ত ও
পাভূমি হইতে ১০ ফুট উচ্চ, একটী পাহাড় উৎপন্ন হয়,
তাহা ঈশ্বর কৃত ভাবিয়া লােকে তাহাকে আল্লাবাধ বলিয়া
থাকে। এই বাঁধের এক স্থান ভেদ করিয়া এক্ষণে সিন্ধুনদী
প্রবাহিত হইতেছে। আজিও সিন্দুরীয় দুর্গের উপরিভাগ
দেখিতে পাওয়া যায়।
চিল্কা হ্রদের দক্ষিণ উপকুল অন্ততঃ ২০৩০ ফুট উন্নত
প্রাণরক্ষা হয়।

( ৬৩ ) হইয়াছে, ও কলিকাতার সন্নিহিত প্রদেশ বসিয়া গিয়াছে ও যাইতেছে তাহার অসংখ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। চিল্কা হ্রদের দক্ষিণ উপকুলের নিকবর্ত্তী ২০৩০ ফুট উচ্চ ভূমিখণ্ডে জলচর জীবের কঙ্কাল প্রাপ্ত হওয়া যায়। তাহাতে বোধ হয় ঐ সকল ভূমি পূৰ্বে জলদ্বারা আবৃত ছিল। মান্দ্রাজ উপকূলের অনেক স্থানেও উক্তরূপ নিদর্শন পাওয়া যায়। কয়েক বৎসর পূর্বে কলিকাতার দুর্গের ভিতর ৪৮১ ফুট গভীর একটী কুপ খনন করা হয়। ৩৫০ ফুট নীচে, কচ্ছপের কঙ্কাল এবং ৩৮০ ফুট নিম্নে জলচর জীব ও বৃক্ষের নিদর্শন দৃষ্ট হইয়াছিল। এই গুলি দেখিয়া বােধ হয় যে আভ্যন্তরিক অগ্নির শক্তিতে কালক্রমে কলিকাতার ভূমি অন্তত: ৩৭০ ফুট বসিয়া গিয়াছে। ১৮১৫ সালের এপ্রিল মাসে যাবাদ্বীপের সন্নিহিত সম্বর দ্বীপে অতি ভয়ানক অগ্নদগম আরম্ভ হইয়া জুলাই পর্যন্ত শেষ হয় নাই। উহার ভীষণ গর্জন ৯৭০ মাইল দূরে সুমাত্রাদ্বীপে ও ৭২০ মাইল দূরে টর্ণেট দ্বীপে শোনা গিয়াছিল। গিরি- প্রদেশস্থ ১২,০০০ লােকের মধ্যে কেবল ২৬ জন জীবিত ছিল। তৎকালে ভয়ানক ঘূর্ণিবায়ু উখিত হইয়া মনুষ্য পশ্যাদি শূন্যে উৎক্ষিপ্ত করে ও বৃহৎ বৃক্ষাদি উৎপাটিত করিয়া ফেলে। পৰ্বত হইতে দ্রবপদার্থের স্রোত নির্গত হইয়া নানা ধারায় সমুদ্রে উপনীত হয়। ভস্মাদি পদার্থ পৰ্বত হইতে এত বেগে উৎক্ষিপ্ত হয় যে ৪০ মাইল দূরস্থ লােকেরাও ভয়ে গৃহাদি পরি- ত্যাগ করিয়া পলায়ন করে। ৩০০ মাইল দূরে জাবাদ্বীপে এত অধিক ভস্ম পতিত হয়, যে তথায় দিবাভাগে ঘােরতর অন্ধকার হইয়াছিল। অম্বয়না ও বোদ্বীপে (শেষােক্তটি৮০০ মাইল দূরে) সূক্ষ্ম ভস্মৰেণু কিয়ৎ পরিমাণে উপনীত হয়।

( ৬৪ ). গিরির নিকটস্থ টম্বরাে নগর সাগরজলে মগ্ন হইয়া যায় এক্ষণে তথায় ১৮ ফুট জল আছে। সম্বয় দ্বীপের চতুর্দিগে সহস্র মাইল দূরে এই অগ্ন্যুৎপাতের শব্দ ও অন্যান্য উপদ্রব অনুভূত হইয়াছিল। ১৮১২ সালের ২৬ এ মার্চ তারিখে কেরাকাস নগরের প্রসিদ্ধ ভূমিকম্প উপস্থিত হইয়া ক্ষণকাল মধ্যে নগরের সুরম্য প্রাসাদ ও মন্দিরাদি বিনষ্ট করিয়া ফেলে। তৎকালে অদূরবর্তী প্রদেশের অনেক স্থানের মৃত্তিকা ফাটিয়া জল নিঃসৃত হয়। উক্ত ঘটনার এক মাসের মধ্যে একটী সন্নিহিত পৰ্ব্বতের অগ্ন্যুৎপাত হইয়াছিল। ১৭৮০ সালের ভূমিকম্পে এই প্রদেশে একটি অরণ্য বসিয়া গিয়া ৮০ হইতে ১০০ ফুট গভীর গহ্বর- রূপে পরিণত হইয়া গিয়াছে। ১৭৮৩ হইতে ১৭৮৬ সাল পর্যন্ত কেলেব্রিয়া দেশে ভূমিকম্প হয়। এই ভূমিকম্পের বিস্তৃতি ৫০০ বর্গ মাইল। তত্রই উপিডাে নগরের চতুর্দিকে ২২ মাইল স্থানে উহার প্রভাব প্রদর্শিত হয়। এই ভূভাগের সমুদয় গ্রাম ও নগর এককালে বিনষ্ট হইয়া যায়। কোন কোন স্থানের ভূমি উন্নত বা নিম্ন হইয়াছিল, কোথাও বা ফাটিয়া গিয়াছিল। একস্থানে ১৭৮৫ ফুট দীর্ঘ, ৯৪৭ ফুট প্রশস্ত ও ৫২ ফুট গভীর একটী হ্রদ উৎপন্ন হয়, এবং স্থানান্তরে নূতন দিগ দিয়া নদীর গতি হয়। শস্য- ক্ষেত্ৰ অবিকৃত ভাবে এক স্থান হইতে অন্য স্থানে নীত হয়, ও ভূমি সহ গৃহাদি গুর চালিত হইয়া যায়। সমুদ্র-উপকূল স্থালিত অথবা জলপ্লাবিত হওয়াতে বহু লােকের প্রাণসংহার হয়। এই উপপ্লবে প্রায় ৪০ সহস্র লােক তৎকালে প্রাণত্যাগ করে। অনেকে ৪৫ দিন প্রােথিত থাকিয়া পরে উৎক্ষিপ্ত ( ৬৫ ) হয়। এই সময়ে ধ্রম্বলিগিরি শান্তভাব ধারণ করে ও ইটনা হইতে ধূম নির্গত হয়। ১৭৭০ সালে কারীব সাগরস্থ সেন্টডডামিঙ্গ দ্বীপে ভূমিকম্প হয় ; তাহাতে উহার অনেক অংশ বিনষ্ট হয়, ভূমি নানা স্থানে ফাটিয়া যায় ও স্থানে স্থানে উষ্ণ প্রস্রবণ উৎপন্ন হয়। ১৭৫১ সালের ভূমিকম্পে এই দ্বীপের ৬০ মাইল পরিমিত উপ- কূলভাগ সাগরগর্ভে প্রবেশ করে। ১৭৬২ সালে চট্টগ্রামে ভূমিকম্প হওয়াতে নানা স্থানের ভূমি ফাটিয়া যায়। সেই সকল স্থান হইতে গন্ধকমিশ্রিত জল ও কর্দম নিঃসৃত হয়, একটী নদী শুষ্ক হইয়া যায়, উপকূলের প্রায় ৭০ বর্গমাইল ভূমি ২০০ লােক সহ সাগরে বসিয়া যায়। মগদেশীর একটা পাহাড় এককালে অন্তর্হিত হয় এবং অপর একটির শৃঙ্গদেশমাত্র ভূগর্ভে প্রবেশ করে নাই। আরও চারিটি পাহাড়ের স্থানে স্থানে ৩০ হইতে ৬০ ফুট পরিমিত গর্ত উৎপন্ন হয়, এবং কয়েকটি গ্রাম বসিয়া গিয়ঃ জলপ্লাবিত হয়। নিকট- বী সুবিখ্যাত সীতাকুণ্ড পাহাড়ে তৎকালে দুইটী আগ্নেয়- গিরির কাৰ্য্য দৃষ্ট হয়। এদিগে যৎকালে চট্টগ্রাম উপকুল বসিয়া গেল, তখন অদূরবর্তী রামরী ও চেডুপ দ্বীপ উন্নত হইয়া উঠিল। ১৭৫৫ সালের ১লা নবেম্বর তারিখে লিম্বন্ নগরের ভূগর্ভে মেঘগর্জনের ন্যায় শব্দ হইতে লাগিল । পরক্ষণেই ভূমিকম্প আরম্ভ হইল। প্রথম কম্পনেই নগরীর অনেক গৃহ বিনষ্ট হইয়া গেল। ৬ মিনিটের নধ্যে ৬০ সহস্র লােক গতাসু হইল। প্রথমে সমুদ্র সরিয়া গেল, তৎপরেই ৫০ ফুট উচ্চ তরঙ্গ সহ প্রত্যাগত হইল। কয়েকটা পৰ্বত ৰাষার কম্পিত হইল, ( ৬৬ ) করে। তাহাদের শিখরদেশ ও অন্যান্য স্থান ফাটীয়া গেল, একং মাৰ্বল নির্মিত সুরম্য পােতাশ্রয়ের সুপ্রশস্ত ঘট সহসা সাগরগর্ভে প্রবেশ করিল। তৎকালে উক্ত ঘাটে সহরের অনেক লােক প্রাণভয়ে আশ্রয় লইয়াছিল, উহারা সকলেই বিনষ্ট হইল, উহাদের কাহারও শব কোন কালে ভাসিয়া উঠে নাই। এই ভূমিকম্পের প্রভাব সুইডেন, ইংলণ্ড, জৰ্ম্মনি, কারীব সাগরীয় দ্বীপ, কেনেডা, মরােক্ক প্রভৃতি দূর দেশে অনুভূত হয়। কালে মরােক্ক নগর হইতে ২৪ মাইল দূরে একটী গণ্ডগ্রাম ৮১০ সহস্র অধিবাসী সহ ভূগর্ভে প্রবেশ করে। ১৭৪৬ সালে পিরু অঞ্চলে ভূমিকম্প হওয়াতে লিমা নগর বিনষ্ট হয়, এবং পাঁচটী উপকূলস্থ নগর সাগরগর্ভে প্রবেশ ১৯ খান জাহাজ ডুবিয়া যায় ও অনেক সহস্র লােকের প্রাণ বিনাশ হয়। তৎকালে নিকটবর্তী চারিটী গিরির উপ- দ্রব হইয়াছিল। ১৬৩৯ সালে সিসিলি দ্বীপে ভূমিকম্প হইয়া কেটেনিয়া প্রভৃতি ৫০টী নগর ও গ্রাম ভূমিসাৎ হয়, তাহাতে প্রায় এক লক্ষ লােক প্রাণত্যাগ করে এবং স্থানে স্থানে ভূমি ফাটিয়া গন্ধক মিশ্রিত জল উৎক্ষেপ করে। ১৬৯২ সালে জেনে কাদীপ কম্পিত হয়, তাহাতে ভূমি- স্ফীত হয় ও স্থানে স্থানে ফাটিয়া গিয়া বহুসংখ্যক মনুষ্য গ্রাস করে। কোন কোন ব্যক্তির মধ্যদেশ পৰ্যন্ত ভূগর্ভে যাইতে যাইতে ভূমি ঘােড়া লাগিয়া যায়, কাহারও বা মস্তকনা ভূমিতে প্রবেশিত হয় নাই, অন্য কেহ কেহ প্রথমে ভূগর্ভে গৃহীত হইয়া পরক্ষণেই জলরাশিসহ উৎক্ষিপ্ত হয়। সমস্ত দ্বীপের গৃহাদি চূর্ণ হয়, কেবল রাজধানী পাের্টরয়েলের কোন কোন .

( ৬৭ ) গৃহ অবিনষ্ট ছিল। উহার বন্দরের নিকটস্থ ভূভাগ সাগরে নামিয়া গিয়াছিল। অনেক প্রসিদ্ধ অগ্নদগম ও ভূমিকম্পের উল্লেখ করা হইল। উহাদের প্রভাবে ভূভাগ যেরূপ সহসা উন্নত বা নিম্ন হয়, সেরূপ আর কিছুতেই হয় না। মাদ্রাজ ও সুইডেনের উপকূল উন্নত ও ২৪ পরগণা ও গ্রীণ্ডের উপকূল ভাগ ক্রমশঃ নিম্ন হইতেছে, কিন্তু এই দেশ গুলিতে ভূমিকম্প ও অগ্নদগমের কোন পরিচয় পাওয়া যায় না। এই ঘটনাগুলি আভ্যন্তরিক তাপসক্তৃত, তদ্বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। ভূমিকম্প ও অগ্নদগনের যেরূপ সম্বন্ধ দেখা যায় তাহাতে উভয়েরই কারণের একতা নিঃসংশয়ে প্রতিপন্ন হইল। ভূমি- কম্প ও অগ্নদগমকালে ভূভাগ হইতে বাষ্প, উষ্ণজল, দ্রবপদার্থ প্রভৃতি উৎক্ষিপ্ত হয়, তাহাতে বােধ হয় যে পৃথিবীর আভ্য- উরিক তাপ উহাদের উভয়েরই আদি কারণ। কিন্তু সেই তাপ কি কি অবস্থায় ঈদৃশ ভয়ানক কাণ্ড উপস্থিত করে তদ্বিষয়ে পণ্ডিতদিগের মত ভেদ আছে ; সম্ভবপর মতট নিম্নে লিখিত হইল। ভূভাগের কোন কোন স্থানে গহবর আছে, তাহাতে জল অথবা অন্যবিধ পদার্থ সঞ্চিত থাকে। গহ্বরের জল বিবরদি দিয়া অত্যুষ্ণ স্থানে উপনীত হইলে বাষ্পীভূত হয়। কোন পদার্থ বাষ্প হইবার কালে তাহার আয়তন সহসা অনেক গুণ বৃদ্ধি পায়, সুতরাং বাষ্পরাশি যে দিগে পথ পায় সেই ব্রিগে ধাবমান হয়। ভূপৃষ্ঠ হইতে উক্ত স্থান পর্যন্ত কোন বিবর থাকিলে বাষ্পরাশি সেই পথেই গমন করে, নতুবা জোর করিয়া উপরের ভূভাগের কোন স্থান ছিন্ন ভিন্ন করিয়া সেই

( ৬৮ )
পথে বহির্গত হয়। যেমন বারুদে আগুণ দিলে “তদুৎপন্ন
বাষ্প বায়ত হইয়া অতিশয় বেগে গুলির সহিত বন্দুকের
নলের মুখ দিয়া বহির্গমন করে, ভূগর্ভেও তাদৃশ কোন ঘটনা
হওয়াতে অভ্যন্তরস্থ পদার্থরাশি প্রবল বেগে উৎক্ষিপ্ত হয়।
যে প্রদেশের ভূগর্ভে ঈদৃশ উপদ্রব হয়, সে অঞ্চল সহজেই
ইতস্ততঃ সঞ্চালিত হইয়া ভূমিকম্প প্রভৃতি উৎপাদন করে।
কখন কখন আভ্যন্তরিক বাষ্পরাশি ভূপৃষ্ঠ পৰ্যন্ত না উঠিয়া
ইতস্ততঃ ধাবমান হইতে হইতে কোন শীতল পদার্থযােগে
পুনরায় তরল হইয়া যায়। এরূপ সময়ে কেবল ভূমিকম্প
হয় কিন্তু অগ্নদগন হইতে পারে না।
ভূগর্ভের আভ্যন্তরিক তাপের কারণ নির্দেশ করা কঠিন।
এই তাপ সূৰ্য্য হইতে প্রাপ্ত নহে, কারণ তাহা হইলে ভূগর্ভ
ভূপৃষ্ঠ অপেক্ষা অধিক উত্তপ্ত হইত না। পণ্ডিতগণ অনুমান
করেন যে প্রথমে ভূমণ্ডল সূৰ্যমণ্ডলের ন্যায় উত্তপ্ত বাষ্পপিণ্ড
ছিল, ক্রমে উহার তাপ ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হওয়াতে উপরিভাগ
অপেক্ষাকৃত শীতল হইয়াছে কিন্তু অভ্যন্তর এক্ষণেও সাতিশয়
উত্তপ্ত আছে। পৃথিবী ক্রমে শীতল হওয়াতে উহার আয়তন
ক্রমশঃ হ্রস্ব হইয়াছে। এক সময়ে ভূপৃষ্ঠে সকল স্থান সমান
রূপে সঙ্কুচিত না হওয়াতে পৰ্ব্বত, হ্রদ, সাগর ইত্যাদি উৎপন্ন
হইয়াছে।
.
নবম অধ্যায়ের প্রশ্ন।
১। আগ্নেয়গিরি কাহাকে বলে ? উহার আকার কেমন ?
২। এক প্রদেশীয় আগ্নেয় পর্বতগুলি পরস্পর সম্বন্ধে কি ভাবে অবস্থিত ?
উহাদের সংস্থান বিষয়ক আর কি নিয়ম দেখা যায় ?

( ৬৯ )
৩। পৃথিবীর প্রধান প্রধান আগ্নেয়গিরিবিশিষ্ট প্রদেশ নির্দেশ কর।
৪। ফেন্ কোন্ দেশে অধিক ভূমিকম্প হয় ?
৫। ভূমিকম্প কাহাকে বলে ও উহার পূর্ব লক্ষণ কি ?
৬। কয়েকটী প্রসিদ্ধ ভূমিকম্পের উল্লেখ কর।
৭। ভারতবর্ষের কোন্ কোন্ স্থানে ভয়ানক ভূমিকম্প হইয়াছিল ?
সংক্ষেপে তাহার বিবরণ লিখ ।
৮। কোন্ কোন্ দেশে অগ্নদগম অতিশয় ভয়াবহ ?
৯। অগ্নদগমে কি কি ভয়ানক কাণ্ড হয় ?
১। কেলেব্রিয়া, কেটে নিয়া, লিন, জেমেকা, সম্বয়, কেরাকাস, কচ্ছ,
ইহাদের কোন একটী স্থানের ভূমিকম্পের বিবরণ লিখ।
১১। সাগরগৰ্ভস্থ অগ্নিগিরির দুই একটা উদাহরণ দেও।
১২। হার্কিউলেনিয়ম ও পম্পি কিরূপে প্রােথিত হয় ? তাহাদের কি
নিদর্শন পাওয়া গিয়াছে ?
১৩। কোন্ কোন্ পৰ্বত হইতে দ্রবপদাৰ্থস্রোত বৃহদাকারে প্রবাহিত
হইয়াছে ?
১৪। ভূমিকম্প দ্বারা কিরূপ অনিষ্ট হয় ?
১৫। অগ্নেয়গিরি ও ভূমিকম্পের কারণ কি
১৬। অগ্নিপ্রভাবে অভিনব গিরি উৎপন্ন হইবার উদাহরণ দেও ।
১৭। অগ্নৎপাতে কোন্ কোন্ দেশের ভূমি উন্নত হইয়াছে ?
১৮। অগ্ন্যুৎপাতে কোথায় কোথায় ভূমি বসিয়া গিয়াছে ও নগরাদি ভগ্ন
হইয়া গিয়াছে ?
১৯। অগ্নপাতে কোন্ কোন্ স্থানে উষ্ণ প্রস্রবণ উৎপন্ন হইয়াছে ?
২। কাস্পিয়ান সাগরতীরে কি আশ্চর্য্য কাণ্ড দেখা যায় ?
২১। কোন্ দেশের ভূমিকম্পে অধিক সংখ্যক লােকের প্রাণ সংহার
হইয়াছিল ?
১৮৬০ সালের পরের ২৪ টী অগ্নদগমের উল্লেখ কর।
২৩। ভূগর্ভের তাপের কারণ কি ?

( ৭০ ) দশম অধ্যায়। সাগরের বিবরণ। ভূপৃষ্ঠের প্রায় ভাগ সাগরজলে আবৃত। স্থলভাগ যেরূপ সকল স্থানে সমােচ্চ নহে, কোথাও উন্নত, স্থানান্তরে নিম্ন, সাগরতলও সেইরূপ ; কারণ জলনিমগ্ন স্থল ভাগই সমুদ্রতল। সাগরের বর্ণ, লবণাক্ততা, শীতাতপ, গভীরতা, সমােচ্চতা, তরঙ্গ, বেলা ও স্রোত এই কয়েকটা বিষয়ের বিবরণ ক্রমে লেখা যাইতেছে। (১) সচরাচর সাগরবারি হরিৎ, নীল, গাঢ় নীল, বা কৃষ্ণাভ নীল বর্ণ। যেরূপ পৃথিবীর চতুর্দিস্থ বায়ুরাশির বর্ণ নীল, সেই রূপ জলরাশির বর্ণ ও নীল। কারণবিশেষে উহার ব্যতিক্রম ঘটিয়া থাকে। স্থলভাগের নিকট কর্দমাদি মিশ্রিত থাকায় সাগর জল হরিদ্বর্ণ হয়। আমেজন প্রভৃতি বৃহৎ নদীর স্রোত এত প্রবল যে তাহা বহুদূর পর্যন্ত সমুদ্র- জলের সহিত না মিশিয়া পৃথক্‌ রূপে অবস্থিতি করে। উপ- কূল হইতে দূরবর্তী সমুদ্রের জল গাঢ় নীলবর্ণ ও এরূপ স্বচ্ছ যে তাহার ৪০ ৩৫০০ ফুট নীচের পদার্থ আনায়াসে দৃষ্ট হয়। মেঘ হইলে তাহার বর্ণ সাগর জলে প্রতিফলিত হইয়া নানা- বিধ রঙ উৎপাদন করে। কোন কোন স্থানে কারণবিশেষে নানা বর্ণ উৎপাদিত হয়। লােহিত সাগর ভূমধ্য সাগরের পূৰ্ব্ব ভাগ ও কালিফর্ণিা উপসাগর রক্তাভ, গিনি উপসাগর শ্বেত, পীতসাগর পীত, কৃষ্ণসাগর ও মালদ্বীপের নিকটস্থ সমুদ্র কৃষ্ণবর্ণ বােধ হয় কীটাণু বা ক্ষুদ্র উদ্ভিদ, বিশেষ দ্বারা শ্বেত ও রক্তবর্ণ উৎপন্ন হয়। পীতসাগরের বর্ণ তত্ৰত্য মৃত্তিকা }

( ৭১ )
হইতে উৎপন্ন। এতদ্ভিন্ন রাত্রিকালে জাহাজের পথে অতি
সুদৃশ্য উজ্জ্বল আলোেক দেখা যায়, তাহা কীটাণু জাত।
(২) সমুদ্রের জল লবণময়, উহাতে কয়েক প্রকার লােণ।
জিনিস মিশ্রিত থাকে। উপকূল হইতে যতদূর গমন করা
যায়, সাগরের জল ততই • লােণা। আমেজন, মিসিসিপি,
গঙ্গা প্রভৃতি বৃহৎ নদীর মােহানার নিকটবর্তী সাগরের ও
মেরু সন্নিহিত সাগরের যে ভাগে বরফ গলয়া জলের সহিত
মিশ্রিত হয়, সেই সেই প্রদেশের জল তত লোণা নহে। বণ্টীক
সাগরে কয়েকটী নদী মিলিত হওয়াতে উহার জল সৰ্বা-
পেক্ষা কম লোণা এবং যে সাগরগুলিতে অলপরিমাণে নদীর
জল মিশ্রিত হয় তাহাদিগের জল অধিক লােণ। কারণ
উক্ত সাগর গুলি হইতে যে যে পরিমাণে বাষ্প উত্থিত হইয়া
জলরাশির হ্রাস হইতেছে, বৃষ্টি বা নদীর জল আসিয়া
সেই ক্ষতি পূরণ করিতে পারে না, সুতরাং অবশিষ্ট জলরাশি
ক্রমেই বেশী লােণা হইতেছে। নিম্নের সাগর গুলি পৰ্যায়-
ক্রমে লবণাক্ততার আধিক্য অনুসারে লেখা হইল।
কৃষ্ণসাগর, ভূমধ্যসাগর, বিষুবরেখার নিকটস্থ সাগর, উত্তর
আটলান্টিক, মর্মরা 'সাগর, দক্ষিণ আটলান্টিক, লােহিত
সাগর ও মরু সাগর। শেষােক্তটীতে অন্যান্ত সাগর অপেক্ষা
প্রায় ১০ গুণ অধিক লবণ পাওয়া যায়। সমুদ্র মধ্য হইতে
কখন উৎসবারি উঠে তাহা লোণ নহে। সমুদ্র জলে নানা-
বিধ পথার্থ মিশ্রিত থাকাতে উহা বিশুদ্ধ বারি অপেক্ষা অনেক
ভারি।
(৩) সাগরবারির উপরিভাগ সচরাচর তত্ৰত্য বায়ুর
ন্যায় উত্তপ্ত ; অর্থাৎ বিষুবরেখা হইতে যত উত্তর ও দক্ষিণে
গমন করা যায়, বায়ু যেমন ক্রমেই শীতল হয়, জলের উপরি-
যথা,

( ৭২ ) ভাগও সেইরূপ। এ বিষয়ে কয়েকটা নিয়ম নির্ধারিত হই- ছে। (১) মধ্যাহ্নকালে সাগরবারি বায়ু অপেক্ষা শীতল থাকে। (২) নিশীথ সময়ে উহা বায়ু অপেক্ষা উত্তপ্ত। (৩) প্রাতে ও সায়াহ্নে উভয়ের তাপ-পরিমাণ সমান। (৪) ভূভাগ হইতে দূরবর্তী সাগরবারি গড়ে ঘায়ু অপেক্ষা অধিক উত্তপ্ত। (৫) সাগরের যে স্থানের জল গভীর নহে ও যাহার তলা বালুকাময়, তথাকার জল অন্যান্য স্থানের জন্য অপেক্ষা শীতল। মেরুদ্বরের নিকটস্থ সাগর বরফে আচ্ছন্ন। শীতকালে বরফের বিস্তৃতি বৃদ্ধি হয় ও গ্রীস্মাগমে তাহা কমিয়া যায়। বিশুদ্ধ বারি যত শীঘ্র জমিয়া বরফ হয়, সমুদ্রের লবণময় জল তদপেক্ষা অধিক সময়ে বরফে পরিণত হয়। তীক্ষ শীতল বায়ু সমাগমে জলের উপরের এক স্তর প্রথমে জমিয়া যায়, পরে তাহার নীচের স্তর জমিতে থাকে। বরফ জল অপেক্ষা লঘু, এজন্য জল-নিমগ্ন না হইয়া কঠিন আবরণ স্বরূপ জলের উপরে ভাসিতে থাকে। এই আবরণ ভেদ করিয়া নীচের জল-রাশিতে শীতল বায়ু লাগিতে পারে না, এজন্য সমস্ত জল-রাশি বরফ হইতে পারে না। বর-রাশির নীচের জল দিয়া মৎস্যাদি গমনাগমন করিতে পারে ও স্রোতাদি বাহিত হয়। বরফ যদি জল অপেক্ষা ভারী হইত; তাহা হইলে জমিবামাত্র সমুদ্রতলে পড়িত, ও উপরের জল পুনরায় বরফ হইয়া যাইত। এইরূপে ক্রমে শীত-প্রধান প্রদেশের সমুদ্রের সমস্ত জল-রাশি বরময় হইত ও দুর্ভেদ্য প্রাচীরবৎ দণ্ডায়মান থাকিয়া পােতাদির গতি অবরােধ করিত। তাহা হইলে তত্রত্য সমুদ্রের প্রাণিগণ বরফের উপদ্রবে এক কালে বিনষ্ট হইয়া যাইত।

(৪) সাগরের গভীরতা সৰ্বত্ৰ সমান নহে। এক স্থানে ত হাত গভীর অন্যত্র হয়ত তত মাইল। পরীক্ষা দ্বারা জানা গিয়াছে আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের কোন কোন স্থানের গভীরতা ৪৷৷ বা ৫ মাইল। যে দেশের উপকূল ভাগ উচ্চ, তাহার নিকটে সমুদ্র অতি গভীর । যেখানে উপকূল ক্ৰমনিম্ন, তথাকার সাগরের গভীরতা অল্পে অল্পে বৃদ্ধি পায়। বল্টিক সাগরের যে ভাগ জৰ্ম্মনি ও সুইডেনের মধ্যবর্তী, তাহার গভীরতা ২২০ ফুট মাত্র। ঐরূপ আরও কয়েকটী উদাহরণ আছে। ভূমধ্যসাগর ১,০০০ হইতে ৬. ০ ০ ০ ফুট গভীর, কৃষ্ণসাগর ২,৫০০। ৩,০০০ ফুট গভীর। এসিয়ার পূর্বদিকের সমুদ্র অনেক স্থানে ৩০০। ৪০০। ৫০০ ফুটের অধিক গভীর নহে। বঙ্গোপসাগরের কোন কোন অংশ অতিশয় গভীর। গঙ্গা ও মেঘনা নদীর মােহানার মধ্যবর্তী স্থানকে অতলস্পর্শ বলে, আহার গভীরতা দুই মাই- লেরও অধিক। এসিয়ার পূৰ্ব্বদিগের দ্বীপপুঞ্জ গুলি অতিক্রম করিলে অধিক গভীরতা দৃষ্ট হয়। তাহাতে বােধ হয় দ্বীপ- গুলি পূৰ্ব্বকালে এসিয়ার সহিত সংলগ্ন ছিল। আটলান্টিক মহাসাগরের উত্তরভাগ অপেক্ষা দক্ষিণ ভাগ অধিক গভীর। আয়রলও হইতে নিউফৌণ্ডলণ্ড পর্যন্ত উত্তর আটলান্টিকের অভ্যন্তর দিয়া টেলিগ্রাফের তার গমন করিয়া প্রাচীন ও নুতন মহাদ্বীপ সংযােজিত করিয়াছে। এই প্রদেশের গভীরতা ১৪,৫০০ ফুটের অধিক নহে। তরল পদার্থের সাধারণ ধৰ্ম্মানুসারে সাগরবারি সর্বত্রই সমান উচ্চ, কিন্তু বায়ুপ্রভাবে কোন কোন সাগর-শাখার {:

( ৭৪ ) জল মহাসাগরপৃষ্ঠ অপেক্ষা উন্নত হয়। হলণ্ডের জুইডরজী জন সাগর অপেক্ষ। উন্নত এবং লােহিতসাগর ভূমধ্য- সাগর অপেক্ষা উচ্চ। কৃষ্ণসাগর ও বটিক সাগরে নদীর জল মিশ্রিত হয়, তৎকালে বিপরীত দিগ হইতে বায়ু প্রবাহিত হইলে সেই অতিরিক্ত জলভাগ বহির্গত হইতে পারিয়া উক্ত সাগরদ্বয়ের জলরাশির উচ্চতা সম্পাদন করে। বৃহৎ সাগরাদির জল এবম্বিধ কারণে উচ্চ হইতে পারে না, সুতরাং সকল সময়ে প্রায় সমােচ্চ থাকে। (৬) কিয়ৎক্ষণ প্রবলবেগে বায়ু প্রবাহিত হইয়া জল- রাশিকে পুনঃ পুনঃ আন্দোলিত করিলেই তরঙ্গ উৎপাদিত হয় ; কারণ এক স্থানের জল বায়ুপ্রভাবে সরিয়া গেলে তাহার নিকটের জল আসিয়া তথাকার সমােচ্চতা রক্ষা করে। উপ- কূল ও সাগরতলের গঠন ভেদে তরঙ্গের আকার নির্ণীত হয়। সাগরবারির উপরিভাগ মাত্র বায়ু দ্বারা উচ্ছসিত হয়, ৩০০০ ফুটের অধিক নিম্নে বায়ুর প্রভাব দৃষ্ট হয় না। হরণ ও উত্তমাশা অন্তরীপের নিকটে ৩০৪০ ফুট উচ্চ তরঙ্গ উৎপাদিত হইয়া থাকে। উপকূলের নিকটে তরঙ্গের যেরূপ জোর দেখা যায়, দূরস্থ সাগরে তত নহে। কখন কখন দুই দিগ হইতে তরঙ্গ মালা আসিয়া পরস্পরকে খণ্ডিত করে, তাহাতে অতিশয় উপদ্রব হয়। এরূপ ঘটনা তিনটা কারণে ঘটিতে পারে। (১) কোন সাগরশাখা হইতে তরঙ্গ প্রতিহত হইয়া ফিরিয়া আসিবার কালে অন্য তরঙ্গ দ্বারা আহত হয়। (২) ঘূর্ণিবায়ু দ্বারা এক কালে নানাদিগ হইতে তরঙ্গ উৎপাদিত হয় মধ্যস্থানে অতি ভয়ানক আকার ধারণ করে। (৩) দূরন্থ ঝটিকা দ্বারা যে তরঙ্গ উৎপাদিত হয় তাহা শেষ না ( ৭৫ ) এ হইতে হইতে নুতন দিগ হইতে বায়ু প্রবাহিত হইলেও এরূপ ঘটিয়া থাকে। ভূমিকম্প দ্বারা যে সকল তরঙ্গ উৎপাদিত হয়, তাহা আরও ভয়ানক। লিসবনের ভূমিকম্পকালে তথায় ৬০ ফুট উচ্চ তরঙ্গ হইয়াছিল। ওরঙ্গ দ্বারা উপকূলভাগ ধৃষ্ট ও ভগ্ন হয়। মান্দ্রা উপকূলে এইরূপ ঘটে; অন্যান্য স্থানেও ইহার পরিচয় পাওয়া যায়। (৭) বেলা (জোয়ার ভাটা) চন্দ্র সূর্যের আকর্ষণ বশতঃ উৎপন্ন হয়। ইহার মধ্যে চন্দ্রের আকর্ষণই প্রধান। অমা- বস্যা ও পূর্ণিমা কালে চন্দ্র, সূর্য ও পৃথিবী সমসূত্রে অবস্থিতি করে ; এজন্য তৎকালে অধিক তেজে জোয়ার হয়। সপ্তমী অষ্টমী তিথিতে উহারা সমসূত্রে না থাকিয়া পৃথিবীকে আকর্ষণ করে, সুতরাং তৎকালে তাহাদের পরস্পরের আকর্ষণ বিপরীত রূপে কাৰ্য্যকারী হওয়াতে অল্প জোরে জোয়ার হয়। সূর্য্য অনেক দূরে অবস্থিত, এজন্য চন্দ্র অপেক্ষা তাহার আকর্ষণ অনেক কম সুতরাং চন্দ্রের আকর্ষণই জোয়ারের প্রধান কারণ। পৃথিবীর যে স্থান যখন চন্দ্রের নিকটবর্তী হয়, তৎপ্রতি অধিক তেজে চন্দ্রের আকর্ষণ হয়। পৃথিবীর স্থলভাগ কঠিন বলিয়া তাহাতে কোন উপদ্রব লক্ষিত হয় না, কিন্তু জলরাশি তরল বলিয়া শীঘ্রই উচ্ছসিত হইয়া উঠে। আবার তৎপ্রদেশের ঠিক বিপরীত দিগেও জোয়ার হয়। म জোয়ার চন্দ্রের আকর্ষণ অভাবেই হয়। চন্দ্র সমস্ত পৃথিবীকে আপনার দিকে আকর্ষণ করাতে পৃথিবী কিয়ৎপরিমাণে চন্দ্রের নিকটবর্তী হয়, কিন্তু ঠিক বিপরীত দিগের জলরাশি তরলাবস্থা বশতঃ তাহার সঙ্গে সঙ্গে যাইতে না পারিয়া যেন ঝুলিয়া পড়ে। তাহাতেই বিপরীত দিগে জোয়ারের ন্যায় জলের সেই সময়ে ০ ( ৭৬ ) বৃদ্ধি দেখা যায়। অতএব চন্দ্র যৎকালে আমাদের মস্তকোপরি তখন একবার জোয়ার হয়; আবার যখন ঠিক বিপরীত দিগে থাকে, তখনও জোয়ার হয়। চন্দ্র পৃথিবীকে দৃশ্যতঃ ২৪ ঘণ্টা ৫৪ মিনিটের মধ্যে একবার প্রদক্ষিণ করে, এজন্য এক দিনের মধ্যে দুইবার জোয়ার দেখা যায়। অদ্য যে সময় জোয়ার হইল, কল্য তদপেক্ষা প্রায় এক ঘণ্টা পরে হয়, তাহারও কারণ এই। চন্দ্ৰ আকৰ্ষণ করিতে করিত্বে সরিয়া যায়, তাহাতে সাগর- পৃষ্ঠ ক্ৰমে স্ফীত হইয়া তরঙ্গাকারে চন্দ্রের অনুগমন করে। কিন্তু উক্ত তরঙ্গ ভূমির বাধা প্রভৃতি নানা কারণ বশতঃ চন্দ্রের সঙ্গে সঙ্গে যাইতে পারে না। এজন্য কোন স্থানের উপর দিয়া চন্দ্র গমন করিবার কিছুকাল পরে তথায় জোয়ার আরম্ভ হয়। অষ্ট্রেলিয়ার কিছু দক্ষিণে, প্রশান্তমহাসাগর হইতে জোয়ণ আরম্ভ হইয়া উহা ভারতসাগরে উপনীত হয়, উহার এক শাখা উত্তরাভিমুখে বঙ্গ ও পারস্য উপসাগরে গমন করে। অন্যভাগ লােহিতসাগরের মুখ হইতে উত্তমাশা অন্তরীপ পর্যন্ত ব্যাপ্ত হয়। উহা তৎপরে আটলান্টিক মহাসাগরে প্রবেশ করিয়া, আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল হইতে দক্ষিণ আমেরিকার পূর্ব উপকূলে গমন করে, এবং আটলান্টিক প্রদেশে ১২ ঘণ্টার মধ্যে এদিগে আফ্রিকার ব্লাঙ্ক অন্তরীপ, ওদিগে উত্তর আমেরিকার নিউফৌণ্ডলণ্ড পৰ্য্যন্ত ব্যাপ্ত হয়। আর তিন ঘণ্টা অতীত না হইতে হইতে আয়লণ্ডের পশ্চিম উপকূলে গমন করে। তদনন্তর তিন শাখায় বিভক্ত হইয়া এক শাখা ডােবর প্রণালী দিয়া ইংলিশ সাগরে প্রবেশ করে, দ্বিতীয় ( ৭৭ ) শাখা সেন্টজৰ্জ প্রণালী দিয়া ব্রিষ্টল উপসাগরে জোয়ার উৎপন্ন করে। তৃতীয়টী আয়লণ্ড ও স্কটলণ্ডের পশ্চিম ও উত্তর উপকূল দিয়া ইংলণ্ডের পূর্ব উপকূলে প্রথম শাখাটীর সহিত মিলিত হয়। দক্ষিণ আমেরিকার জোয়ার প্রবাহ রাইও- জেনেরাে হইতে পশ্চিমাভিমুখে যাইয়া ক্ৰমে ফকলপুঞ্জে উপনীত হয়। একটী জোরার প্রবাহ মেজিলন প্রণালী হইতে উত্তরাভিমুখে গমন করিয়া আমেরিকার উপকূল দিয়া উত্তর মহাসাগরে সান্টপুঞ্জ পৰ্যন্ত ব্যাপ্ত হয়। মহাসাগরে জোয়ারের গতি পশ্চিমাভিমুখে হয়। উপকূলের গঠনক্রমে কোন কোন স্থানের জোয়ারের তরঙ্গ অতি উচ্চ হইয়া উঠে। প্রশান্ত মহাসাগরের জোয়ার ১২ ফুটের অধিক উচ্চ হয় না। আটলান্টিক মহাসাগরে গভীর অংশে উহার বেগ প্রতিঘণ্টায় ৫০০ মাইল, কিন্তু উচ্চতা ইংলিশ সাগরে ফ্রান্সের উপকূলে উহা ৪০ ফুট উচ্চ হয়। উত্তর আমেরিকার উত্তর-পূর্ব দিকে ফণ্ডি উপসাগরে ৭০ অথবা ৭৫ ফুট উচ্চ হইয়া জোয়ারের জল অাগমন করে। গঙ্গা, মেঘনা, আমেজন, গেরণ, সেবারণ, চীন দেশীয় সীষ্টাংপ্রভৃতি কয়েকটী নদীর মােহনায় জোয়ারের তরঙ্গ প্রবিষ্ট হইবার কালে বান হইয়া থাকে। নদীর জল অপেক্ষা কোন কোন স্থানে ৩০ ফুট উচ্চ হইয়া বান অতি দ্রুতবেগে নদী মধ্যে প্রবেশ করে, তৎকালে বৃহৎ নৌকাদিও তাহার সম্মুখে পড়িলে ভগ্ন ও জলমগ্ন হয়। গের ও বােরন নদীর জোয়ার ৪০ ফুট উচ্চ হয়, তৎপূৰ্বে বানের শক্তিতে জল ৯ ফুট উচ্চ হইয়া অতিশয় বেগে ধাবমান হয়। সষ্ট্যাং অতি অল্প। বান।

( ৭৮ ) নদীর বান ৩০ ফুট উচ্চ এবং ইহা ১ ঘণ্টায় ২৫ মাইল গমন করে। আমেজন নদীতে কোন কোন সময়ে ১২ ফুট অেথবা ১৫ ফুট উচ্চ হইয়া বানের জল আগমন করে। কলিকাতার গঙ্গার বানের জল অনুন ৫ ফুট উচ্চ হয়। যেখানে অল্প জল সেই খানেই বানের জোর অধিক অনুভূত হয়, এজন্য মাঝিরা ৰানের সময় গভীর জলে নৌকা রাখিয়া থাকে। জোয়ারের তরঙ্গ কোন নদীর মােহানায় প্রবেশ করিবার কালে যদি তত্ৰত্য ভূমিতে আহত হইয়া বাধা পায় তাহা হইলে স্ফীত হইয়া উঠে, এমন সময়ে তৎপশ্চাদ্বী তরঙ্গ আসিয়া তাহাতে মিলিত হয়। এইরূপে ২৩৪ তরঙ্গ একত্র হইয়া গমন করাতে বান দেখা গিয়া থাকে। (৮) সমুদ্র স্রোত। সমুদ্রের কোন কোন ভাগে স্রোত নিরীক্ষিত হয়। চন্দ্র সূর্যের আকর্ষণ উহার কারণ নহে। এই সকল স্রোত পৃথিবীর আহ্নিক গতি, বা বায়ুপ্রবাহ ও • তাপের মুনাধিক্য বশতঃ জন্মে। আহ্নিকগতিপ্রভাবে বিষুব- রেখার নিকটবর্তী প্রদেশ মেরু সন্নিহিত ভূভাগ অপেক্ষা অধিক বেগে চালিত হয়, সুতরাং তত্ৰত্য জলরাশি তত বেগে না যাইতে পারিয়া পিছাইয়া পড়ে, তাহাতে স্রোত জন্মে। একক্রমে একদিগ হইতে বায়ু বহিলেও জলের গতি হয়। বিষুবরেখার নিকটবর্তী প্রদেশে প্রতিনিয়ত পশ্চিমাভিমুখে বায়ু বহিয়া থাকে, তাহাতে সাগরবারির উপরিভাগে স্রোত ন্মে। এই স্রোতের গভীরতা অধিক নহে। জেরুসন্নিহিত প্রদেশের শীতল জল ভারী হইয়া ডুবিয়া যায় এবং অপেক্ষাকৃত উষ্ণজল আসিয়া তাহার স্থান অধিকার করে। সেইরূপ শীতল জল ক্রমে ক্রমে আবার উষ্ণ হইয়া ( ৭৯ ) পরে ভাসিয়া উঠে। এইরূপে জলের গতি হইয়া স্রোত উৎপন্ন হইয়া থাকে। উপসাগরীয়-স্রোত নামক একটা অতি দীর্ঘ ও বােয়ত স্রোত মেসিকো উপসাগর হইতে উত্তরাভিমুখে গমন করিয়াছে, তাহার তুল্য প্রসিদ্ধ স্রোত কুত্রাপি নাই। উহা ফ্লোরিডা ও বাহামাপুঞ্জের মধ্য দিয়া কিয়দ্দর যাইয়া ৩২ মাইল প্রশস্ত ও ১২ ফুট গভীর হইয়াছে, তথায় উহার বেগ প্রতি ঘণ্টায় ৫ মাইল। হেটারস্ অন্তরীপের নিকট উহার প্রস্থ ৭৫ মাইল, গভীরতা ৭৩০ ফুট ও বেগ ৩ মাইল। আরও উত্তরে গিয়া উহা নিউফোলণ্ড বামদিকে রাখিয়া পূৰ্বাভিমুখে আয়রলণ্ডের দিকে ধাবমান হইয়াছে। নিউ ফৌণ্ডলণ্ডের নিকট উত্তরমহাসাগরীয় বরফরাশিসমাকীর্ণ স্রোত উহাকে ভেদ করিয়াছে, এস্থলে উহার প্রস্থ অত্যন্ত অধিক কিন্তু গভীরতা তেমনি অল্প। পরস্পর উষ্ণ ও শীতল স্রোত- দ্বয়ের সমাগমে এই স্থানের বায়ুর উষ্ণতা এত পরিবর্তনশীল থাকে যে এখানে ভয়ানক কুজঝটিকা ও বায়ু প্রবাহ উৎপন্ন হইয়া নাবিকদিগকে ব্যতিব্যস্ত করিয়া ফেলে। আটলান্টিক পার হইয়া ইউরােপ এমনকালে উপসাগরীয় স্রোতের বেগ ১ মাইলের অধিক থাকে না, এবং ইউরােপের নিকটে আফ্রি- কার উপকূলের স্রোত উহার সহিত মিলিত হইয়া যায়। পার্শ্ব- বন্তী সমুদ্রের জল অপেক্ষা উহা অনেক উত্তপ্ত, এই কারণে উহা দ্বারা ইউরােপের পশ্চিম অঞ্চলে তাপ বিতরিত হইয়া থাকে। ইংলণ্ড, নরওয়ে ও স্পিটসবর্জেন পৰ্যন্ত উহার গতি দেখা যায়। এই প্রকাণ্ড স্রোতের দৈর্ঘ্য তিন সহস্র মাইল এবং উহার গতি প্রায় ৮০ দিনে সম্পন্ন হয়।

( ৮০ ) উভয় পার্শ্বের জলের সহিত উহার-সাদৃশ্য নাই। উহার জল নীলবর্ণ । আর একটী স্রোত বিঙ্কে উপসাগর হইতে আরম্ভ হইয়া আফ্রকার উপকূল পর্যন্ত গমন করিয়া তথা হইতে আট- লান্টিক অতিক্রম করতঃ ব্রেজিল দেশের সেন্টয়ােক অন্তরীপের নিকট উপনীত হয়, তৎপরে মেসিকো উপসাগরে যাইয়া তত্ৰত্য স্রোতে বিলীন হইয়া যায়। আফ্রিকার উপকূলে বিষুবরেখার কিঞ্চিৎ দক্ষিণ হইতে একটী স্রোত উৎপন্ন হইয়া উক্ত রেখাক্রমে আমেরিকার দিকে গমন করিয়াছে। পশ্চিমদিগ হইতে উহার সমান্তরাল একটা স্রোত আসিয়া দুই শাখায় বিভক্ত হইয়াছে, তাহার একটা উত্তর-পশ্চিমাভিমুখে সেণ্টােক উপকূলের নিকট দিয়া গমন করিয়াছে। উত্তরসাগরীয় স্রোত গ্রীলণ্ড ও ব্রেডরের উপকূল দিয়া বরফরাশিসহ নিউফৌণ্ডলও পৰ্যন্ত আসিয়া উপসাগরীয় স্রোত অতিক্রম করত বিলীন হইয়া গিয়াছে। দক্ষিণ মহাসমুদ্র হইতেও একটী স্রোত আসিয়া উত্তমাশা অন্তরীপ ও তাহার উত্তরবর্তী সাগর পর্যন্ত তুষার শিলা আনয়ন করে। আর একটি স্রোত উত্তরাভিমুখে চিলি উপকূল দিয়া বিষুবরেখা পর্যন্ত গমন করে। ভারত মহাসাগর হইতে একটী স্রোত উৎপন্ন হইয়া মাদা- গার দ্বীপের পশ্চিম আফ্রিকার উপকূল দিয়া উত্তমাশা অন্তরীপ পৰ্যন্ত গমন করিয়াছে। উহার জল উষ্ণ। এইটা উত্তমাশা হইতে আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল দিয়া কিয়দ্দর যাইয়া তৰত স্রোতের সহিত মিলিত হইয়া আমেরিকার উহা অভিমুগ্নে প্রবাহিত হইয়াছে। আফ্রিকার দক্ষিণে এই উষ্ণ স্রোতের সহিত দক্ষিণ মেরু প্রদেশীয় শীতল স্রোতের সংঘাত হয়, তাহাতে তৎপ্রদেশে ভয়ানক ঝটিকাদি উৎপন্ন হইয়া থাকে। মাদাগাস্কর দ্বীপের পূর্ব উপকূল দিয়া একটা স্রোত প্রবাহিত হইয়া প্রায় আফ্রিকার দক্ষিণ উপকূলে গিয়া পুনরায় পূৰ্বাভিমুখে প্রত্যাবৃত্ত হইয়াছে। উহার গতি ৪০ অক্ষরেখা ক্রমে দেখা যায়। আটলান্টিক মহাসাগর হইতে আফ্রিকার দক্ষিণ দিয়া একটা স্রোত ভারত সাগরে প্রবেশ করিয়াছে। এইটার নাম ‘দক্ষিণ যােজক স্রোত।” প্রশান্ত মহাসাগর হইতে একটী সুদীর্ঘ স্রোত উদ্ভূত হইয়া এসিয়ার উপকূল দিয়া উত্তরাভিমুখে গমন করে। বাের্নও দ্বীপ হইতে আরম্ভ হইয়া ফিলিপাইন্ ও জাপানের পূৰ্ব দিয়া এলিউশন পুঞ্জ পর্যন্ত প্রবাহিত হইয়াছে। উহা উষ্ণ প্রদেশে উৎপন্ন, সুতরাং উহার জল অপেক্ষাকৃত উষ্ণ। এই স্রোতের জল কৃষ্ণবর্ণ। এই স্রোত দ্বারা যে তাপ বিতরিত হয় তাহাতে উত্তর প্রদেশের শীতের আধিক্য নিবারণ ওখটস্ক সাগর হইতে একটী শীতল জলময় স্রোত জাপান পৰ্যন্ত অনুভূত হইয়া থাকে। দক্ষিণ প্রশান্তমহাসাগরে অষ্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূল দিয়া একটী স্রোত দক্ষিণাভিমুখে গমন করিয়াছে। অষ্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যবর্তী সাগরে কোন প্রকার স্রোত দৃষ্ট হয় না। বিষুবরেখার নিকটে প্রায় সর্বত্রই স্রোত দেখা খায়। উহাকে বিযুবরৈখিক স্রোত বলা যাইতে পারে। সমুদ্রের উপরিভাগে যেরূপ তে দৃষ্ট হয় জলের অভ্যন্তরে হয়।

( ৮২ ) তাহার ঠিক বিপরীত দিগে স্রোত প্রবাহিত হইতে থাকে। জিবরষ্টার প্রণালী দিয়া আটলান্টিক হইতে ভূমধ্যসাগরে স্রোত আসিয়া থাকে, কিন্তু নিম্ন দিক্ দিয়া জল বহির্গত হইয়া আটলান্টিকে প্রত্যাবর্তন করে। লােহিত সাগরেও এইরূপ ঘটে। অন্যান্য স্থানেও পরীক্ষা দ্বারা স্থির হইয়াছে যে সমুদ্রের অভ্যন্তর দিয়া স্রোত চলিয়া থাকে। বাহ্য হােত অপেক্ষা আভ্যন্তরিক স্রোতের বেগ অধিক। স্রোত দ্বারা উষ্ণদেশের জল মেরু সন্নিধানে নীত হইতেছে, ও মেরু প্রদেশীয় শীতল জল উষ্ণ প্রদেশে প্রেরিত হইতেছে। বাহ ও আভ্যন্তরিক স্রোতােবশতঃ ভূপৃষ্ঠস্থ বারিরাশি অনবরত স্থান পরিবর্তন করিতেছে। বাণিজ্যপথ। ইংলণ্ড হইতে সমুদ্রপথে ভারতবর্ষে আসিতে হইলে সােথষ্টন হইতে বহির্গত হইয়া ভূমধ্যসাগর ও সুয়েজ- খাল দিয়া লােহিত সাগরথে বোম্বে নগরে উপনীত হওয়া যায়। কিন্তু এই পথে বাষ্পীয় পােত ভিন্ন অন্যবিধ জাহাজ আসিতে পারে না। ইংলণ্ড হইতে মহাসমুদ্র পথে এতদ্দেশে জাহাজ আগমন করিবার বিলক্ষণ সুবিধা আছে। প্রথমত মেডিরাদ্বীপ পর্যন্ত আসিয়া শ্রোতােহভিমুখে গিনি উপসাগরে যাইতে হয়। তথা হইতে টিনিউড দ্বীপে যাইয়া “দক্ষিণ যােজক স্রোত দিয়া আফ্রিকার দক্ষিণে ও তৎপরে মাদাগাস্কারের পূর্ব উপকূলে আসিয়া বায়ু অনুসরণ করতঃ ভারত-সাগর অতি- ক্ৰম করিতে হয়। যৎকালে দক্ষিণপশ্চিম দিক হইতে বায়ু প্রবাহিত হয়, তখন ভারতবর্ষে আগমন কর অতি সহজ । কিন্তু বিপরীত বায়ু বহিলে আফ্রিকা হইতে ৮০° দ্রাঘিমা ( ৮৩ ) পৰ্য্যন্ত পুৰ্বাভিমুখে যাইতে হয়, তথা হইতে উত্তর-পূৰ্ব্ব ও উত্তরমুখে সুমাত্রা পর্যন্ত আসিতে হয়। সুমাত্রা হইতে চীন ও ভারতবর্ষে আগমন করা যায়। এই সকল স্রোত দ্বারা বাণিজ্যকাৰ্য্যের নানা সুবিধা হয়। এতদ্ভিন্ন উষ্ণজলের স্রোত শীতল দেশে গমন করিয়া তত্ৰত্য অসহ্য শীতের হ্রাস করে, ও শীতপ্রধান দেশ হইতে বরফরাশিবিশিষ্ট স্রোত আসিয়া উষ্ণ দেশের গ্রীষ্মের আতি: শয্য নিবারণ করে। সাগরের কোন কোন ভাগে কিছুমাত্র স্রোত নাই,তাহার চতুর্দিগ দিয়া তােত প্রবাহিত হয়। এই সকল স্থান তৃণ শৈবালাদি দ্বারা আচ্ছন্ন। উহার এক এক অংশে এই সকল উদ্ভিদ এত নিবিড় হইয়াছে যে জল দেখা যায় না, সহসা বােধ হয় যে তাহার উপর দিয়া চলিয়া যাওয়া যায়। এই প্রদেশে অসংখ্য মৎস্য থাকে এবং তােত দ্বারা আনীত নানা- দেশীয় বৃক্ষাদি এখানে অবস্থিতি করে। আটলান্টিক মধ্যে কোর্ডপুঞ্জের সন্নিহিত সাগর এইরূপ। উহার আয়তন অতি বৃহৎ। প্রশান্তমহাসাগরে ৩০ ও ৪• উত্তর অক্ষাংশের অন্ত- গত আর একটী শৈবালসাগর দৃষ্ট হয়, এইটী অপেক্ষাকৃত ভারতমহাসাগরে মাদাগাস্কর দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব সাগরেও একটা দেখা যায়। সাগরের উপকারিতা। সাগর আছে বলিয়া বাণিজ্য ও বিদেশগমনের অশেষবিধ উপায় রহিয়াছে। সমুদ্র হইতে বাম্প-রাশি উঠিয়া মেঘ রূপে স্থাভাগে গমন করে, ও তথায় বৃষ্টিরূপে পরিণত হইয়া সমুদ্রে পুনঃ প্রেরিত হয় অথবা ভূম- গুলে পড়িয়া মৃত্তিকা আর্ন করে কিম্বা ভূগর্তে প্রবেশ করিয়া ( ৮৪ ) নদী, উৎস প্রভৃতির প্রয়ােজনীয় জল বিতরণ করে। নদীদ্বারা যে জল প্রবাহিত হয়, তাহা পুনরায় সাগরে প্রত্যাগমন করে। সাগরের নিকটবর্ত্তী ভূভাগে শীত গ্রীষ্মের আধিক্য হইতে পারে না। সমুদ্র স্রোত দ্বারা উষ্ণদেশের উত্তপ্ত জল শীত- প্রধান দেশে যাইয়া তত্ৰত্য শীতেরলাঘব করিতেছে। পক্ষা- স্তরে মেরুপ্রদেশের শীতল জল আসিয়া গ্রীষ্মমণ্ডলের তাপ হ্রাস করিতেছে। সাগর তরঙ্গে উপকূল ভাগ ঘৃষ্ট ও ভগ্ন হইতেছে এবং নদী বাহিত মৃত্তিকারাশি সমুদ্রে সঞ্চিত হইয়া কালক্রমে ভূমিখণ্ড বৃদ্ধি করিবার আয়ােজন হইতেছে। সাগর অসংখ্য ক্ষুদ্র ও বৃহৎ প্রাণীর আবাসভূমি। দশম অধ্যায়ের প্রশ্ন। ১। সাগরবারির বর্ণ কি ? ১। সাগরজলে কি কি পদার্থ মিশ্রিত আছে ? ৩। সাগরবারির উপরিভাগের তাপসম্বন্ধে কি কি নিয়ম নির্ধারিত হইয়াছে ? : ৪। সাগরের গভীরতার দুই চারিটী উদাহরণ দেও। । সাগরতরঙ্গের কারণ কি ? উহার উচ্চতার উদাহরণ দেও। ৬। সাগরতরঙ্গ কি কি কারণে ভয়ানক হইয়া উঠে ? ৭। জোয়ার ভাটার কারণ কি ? কোন্ তিথিতে অধিক ও.কোন্ সময়ে অল্প জোরে জোয়ার হয় ? ৮। এক সময়ে পরস্পর বিপরীত দুই দিগে জোয়ার হয় কেন? । এক স্থানে এক দিনে দুই বার জোয়ার হইবার কারণ কি? • জোয়ারের গতি নির্দেশ কর। ১১। কোন্ কোন্ স্থানে জোয়ারের জল অধিক উচ্চ হয় ? ১২। বন হইবার কারণ কি? কোন কোন নদীর জল বানের সময় অধিক উচহয় ? : (

T
৮। সমুদ্রস্রোতের কারণ কি?
১৪। উপসাগরীয় স্রোতের গতি নির্দেশ কর।
১৫। অন্যান্য ২১ টী সাগরীয় স্রোতের বিবরণ লিখ।
১৬। সমুদ্রস্রোতের দ্বারা কি কি উপকার হয় ?
১৭। স্রোতােবিহীন সাগরভাগের বর্ণনা কর।
সাগর দ্বারা আমাদের কি কি উপকার হয় ?
১৯। বাণিজ্যপথের দুই একটীর উল্লেখ কর।
২• | সমুদ্র-জলের বাহ ও আভ্যন্তরিক স্রোতের বিবরণ লিখ।
২১। উষ্ণ ও শীতল স্রোতের সাত হইলে কি নৈসর্গিক উপপ্লব হয় ?
একাদশ অধ্যায়।
প্রস্রবণ, নদী, জলপ্রপাত ও হ্রদ।
বৃষ্টির জল ও তুষারাদি স্থলভাগে পতিত হয়, উহার
কিয়দংশ স্রোত বহিয়া নদী, হ্রদ প্রভূতি জলরাশির বৃদ্ধি করে,
অবশিষ্ট ভাগ মৃত্তিকা ভিজাইয়া উদ্ভিদ ও জীবের অশেষ উপকার
করে, এবং কিয়ৎপরিমাণে ভূগর্ভে প্রবেশ করিয়া তথাকার
গৃহৃরাদিতে সঞ্চিত থাকে। মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে জল
প্রভৃতি তরল পদার্থ উচ্চস্থান হইতে নিম্নপ্রদেশে গমন করে।
এই নিয়মের বশবর্তী হইয়া ভূগর্ভস্থ বারিরাশি সময়ে সময়ে
গতিবিশিষ্ট হয়, ও অপেক্ষাকৃত নিম্ন প্রদেশের বিবরাদি দিয়া
অতিশয় বেগে বহির্গত হয়। তরল পদার্থের সাধারণ ধৰ্ম্ম এই
যে উহার সর্বস্থানই সমােচ্চ। ' এই ধৰ্ম্মানুসারে পরস্পর
নিকটবর্তী জলরাশি যতক্ষণ সমােচ্চ না হয়, ততক্ষণ:
গতি হয়। উন্নত পাৰ্বতীয় প্রদেশের ভণ

( ৮৬ ) জল অধিক পরিমাণে সঞ্চিত থাকে; উহা নীচের কোন স্থানের মৃত্তিকা ভেদ করিয়া প্রস্রবণরূপে আমাদের দৃষ্টিপথে উদিত হয়। কোন কোন প্রস্রবণ প্রধানতঃ বৃষ্টির জল হইতে উৎ- পন্ন, বৃষ্টির অভাব হইলে উহাদের কাৰ্য রহিত হয়। কতকগুলি প্রস্রবণ ভূগর্ভস্থ বৃহৎ গহ্বরাদি হইতে জল প্রাপ্ত হয়, সুতরাং ঐ গুলি নিরন্তর কার্যকারী থাকে। কোন কোনটা জোয়ারের জলে উৎপন্ন, কোন টী অগ্নিসত। যে গহ্বর হইতে জল আগমন করিয়া প্রস্রবণ উৎপাদন করে তাহা যত উচ্চ, প্রস্রবণের জোর তত অধিক হয়। কূপখনন করিয়া আমরা যে জল প্রাপ্ত হই, তাহা পার্শ্ববর্তী অপেক্ষাকৃত উচ্চ আর্দ্র মৃত্তিকা হইতে আসিয়া থাকে, অতএব প্রস্রবণ ও কৃপ একই নিয়মের অধীন। কোন কোন প্রস্রবণ হইতে নিরন্তর জল বাহির হয়। কোন কোনটা ঋতুবিশেষে প্রবল থাকে। ফ্রান্সদেশের লঙ্গি। ডুক, ইংলণ্ডে টোৰ্বে ও বটন ও স্পেন দেশের গেলিসিয়া প্রস্রবণ হইতে জোয়ারের সময় জল উঠে, ভাটার সময় উঠে কমে নগরের প্রস্রবণটার জলের প্রতিঘণ্টায় হ্রাসবৃদ্ধি হয়। ফ্রান্সদেশের কোলনার নামকটীর জলের প্রতিঘণ্টায় ৮ বার ঐ রূপ ঘটে ফলতঃ যে প্রস্রবণে যে পরিমাণে জল আমদানি ব, সেই পরিমাণে বহির্গত হইয়া থাকে। কোন কোন প্রস্র- বণ হইতে জল নির্গত না হইয়া আলকাতরা বা মেটে তৈল উৎক্ষিপ্ত হয়। কাস্পিয়ান সাগরের নিকট বাক্, টি নিড়ান্ড ও জেণ্টিদ্বীপের হ্রদ, ও উত্তর আমেরিকার কয়েকটী প্রস্রবণ এই শ্রেণীভুক্ত। কতকগুলি প্রস্রবণ অগ্নিসস্তৃত, ও আগ্নেয় গিরির ন্যায় প্রবলবেগে উষ্ণজলরাশি উদিগরণ করে। আইলও ( ৮৭ ) দ্বীপে শেষােক্ত প্রকার অনেকগুলি দেখা যায়, তন্মধ্যে গয়ন্সর নামক তিনটী প্রসিদ্ধ। তাহার বৃহৎটী বিশাল ধ্বনি করতঃ ১০ ৩২০০ ফুট উন্ধে বারি উৎক্ষেপ করে। মুঙ্গের ও চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড নামক উষ্ণ প্রস্রবণ ও অগ্নিসম্ভূত। দক্ষিণ আমে- রিকার বেনিজুলা প্রদেশের টিঞ্চিরা, জাপানদ্বীপের অরিজিনো ও আইণ্ডের গয়সর প্রভৃতি প্রস্রবণের জন অতিশয় উষ্ণ। অরিজিনাের জল এত উষ্ণ যে অনুক্ষণ বাষ্পভাবে উঠিয়া থাকে। এতদ্ভন্ন ফ্রান্স, ইংলণ্ড প্রভৃতি দেশে ও অন্যান্য স্থানের আগ্নেয়গিরি-প্রদেশে অসংখ্য উষ্ণ প্রস্রবণ দৃষ্ট হয়। সমুদ্র মধ্যে কখন কখন প্রস্রবণ দেখা যায়। প্রস্রবণের জল প্রায়ই বিশুদ্ধ নহে। ভূগর্ভ হইতে আসি- বার কালে উহাতে চুণ প্রভৃতি নানাবিধ পদার্থ মিশ্রিত হয়। কোন কোন প্রস্রবণের জলে অন্য পদার্থ পড়িলে ক্রমশঃ রাসায়নিক ক্রিয়াবিশেষে পরিবর্তিত হইয়া যায়। আয়রলও দেশের লফনী নামক প্রস্রবণে কাষ্ঠাদি পড়লে প্রস্তরীভূত হয়। উস্কানি প্রদেশের সেন্টলিপাে প্রস্রবণে মুদ্রাদি রাখিলে চূণের আবরণযুক্ত হয়। ডেনিউব নদীর উপর বিখ্যাত রােমীয় সম্রাট ট্রেজান যে সেতু নির্মাণ করিয়াছিলেন তাহার কাষ্ঠ- গুলি একপ্রকার প্রস্তরের ন্যায় পদার্থে পরিণত হইয়াছে। কোন কোন প্রস্রবণে গন্ধক, আইওডিন, লৌহ প্রভৃতি পদার্থ থাকাতে নানা রোগগ্রস্ত ব্যক্তিদিগের পক্ষে সময়ে সময়ে মহােপকারী হয়। সকল প্রস্রবণ হইতে সমান পরিমাণে জল নির্গত হয় না। আয়রলণ্ডের হােলীওনেল প্রস্রবণ হইতে প্রতি মিনিটে প্রায় ৫০০ মণ জল উৎক্ষিপ্ত হয়। বােহিমিয়ার অন্তর্গত কারলসবাদ ( ৮৮ ) স্থানের প্রস্রবণ হইতে, প্রত্যহ প্রায় ১৯,৬০০ মণ জল বাহির হয়। ফ্রান্স দেশীয় বক্স নামক স্থানের প্রস্রবণ হইতে এত জল উৎক্ষিপ্ত হয়, যে তারা সর্ণ নামক নদী উৎপন্ন হইয়াছে। অনেক স্থানেই কতিপয় প্রস্রবণের জল মিলিত হইয়া একটী নদী উৎপাদন করে। সচরাচর পাৰ্বতীয় অঞ্চল হইতে নদীর উৎপত্তি হয়, পরে তাহার জল যে দিগে নিম্নভূমি পায় মাধ্যা- কৰ্ষণ প্রভাবে সেই দিগ দিয়া প্রবাহিত হয়। কয়েকটী নদী হ্রদ হইতে উৎপন্ন। ভারতবর্ষ প্রভৃতি যে সকল দেশে বর্ষা- কাল নির্দিষ্ট আছে, তত্ৰত্য নদীর জল ঐকালে বৃদ্ধি পাইয়া পার্শ্ববর্তী ভূভাগ প্লাবিত করে। সচরাচর দেখা যায়, পাৰ্বতীয় উচ্চ ভূমিতে জল পতিত হইয়া প্রথমতঃ, ক্ষুদ্র সরিৎ উৎপন্ন করে, পরে উহার দুই তিনটী মিলিত হইয়া অপেক্ষাকৃত প্রশস্ত নদী জন্মে, এবং ঈদৃশ দুই চারিটা নদী মিলিত হইয়া প্রকৃত নদীরূপ ধারণ করে। বঙ্গদেশের ময়ূরাক্ষ, অজয় প্রভৃতি নদী এইরূপে উৎপন্ন হইয়া পরে, গঙ্গাতে মিলিত হইয়াছে। এইগুলির জল অতি দ্রুতবেগে বহির্গত হইয়া যায়, সুতরাং বৃষ্টিপাতের ৮১০ ঘণ্টার পর উহাদের আয়তন হ্রস্ব হয় এবং শীত ও গ্রীষ্মকালে উহারা প্রায় শুষ্ক হইয়া যায়। এদেশের গঙ্গা প্রভৃতি নদীতে বর্ষাকালে যে পরিমাণে জল থাকে, অন্য সময় তাহা থাকে না। আবিসিনিয়া দেশে বর্ষাকালে যে জল পত্তি হয়, তাহাতে নীল নদের জল বৃদ্ধি হয়। কখন কখন উন্নত পৰ্ব্বতের বরফ দ্রব হইয়া নদীর জল বুদ্ধি করে। অল্প পৗঁতের বরফ গলিলে রাইন ও রােণ নদীর জল বৃদ্ধি হয়। গঙ্গা ও সিন্ধু নদীর জলও গ্রীষ্মকালে ঐরূপে বাড়িয়া থাকে। নদীদ্বারা পার্শ্ববর্ত্তী ভূভাগে কৃযিকর্মের যেরূপ সুবিধা হয় ( ৮৯ ) তেমন আর কিছুতেই হয় না। নদী প্রবাহিত থাকিলে দেশের ভূমি আর্জ হয় না ও নদীপথে দেশের মল বহির্গত হইয়া যায়। নদীতীরস্থ প্রদেশ সভ্য জাতির আবাসভূমি। পাৰ্বতীয় প্রদেশে নদীর জল কলুষিত থাকে, ক্রমে দূরে আসিতে আসিতে নিৰ্ম্মল হয়। বর্ষাকালে অধিক পরিমাণে বৃষ্টি, হওয়াতে নদী স্ফীত হইয়া নিকটস্থ দেশ প্লাবিত করে; ঐ জলে নানাবিধ পদার্থ মিলিত থাকে, তাহা প্লাবিত স্থানে পলল রূপে পড়িয়া ভূমির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। নদী আছে বলিয়া বাণিজ্যের বিস্তর সুবিধা হইয়াছে। নদী দ্বারা ভূভাগ ক্ষয় প্রাপ্ত হয়, উচ্চ দেশের মৃত্তিকা নিম্ন- প্রদেশে আনীত হয়, ও জলের সহিত প্রকাণ্ড মৃত্তিকারাশি সাগরগর্ভে প্রেরিত হয়। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মিসিসিপি, আমে- জন প্রভৃতির জলের সহিত এত অধিক পরিমাণে কর্দম প্রবা- হিত হয়, যে তারা নদীর মােহনার ভূভাগ নিরত বৃদ্ধি পাইতেছে। গঙ্গা প্রভৃতি নদীর জলে এত বালুকা থাকে, যে তাহাতে শাখাসরিৎ গুলি পূর্ণ হইয়া যাইতেছে। চিরকাল এক হাত দিয়া নদী প্রবাহিত হয় না। খাত বালুকাপূর্ণ হইলে কিম্বা কোন প্রতিবন্ধক উপস্থিত হইলে, নূতন দিগ দিয়া নদীর গতি হয়। কোন কোন নদী প্রবাহিত হইতে হইতে বালুকাময় ভূমিতে শোষিত হইয়া যায়; সেই স্থানের মৃত্তিকা খনন করিবামাত্র জল প্রাপ্ত হওয়া যায়, যথা গয়ার নিকটে ফন্তু নদী। এক একটী নদী এইরূপ অন্তঃসলিল থাকিয়া যায়, কোন কোনটী কিয়দ্র যাইয়া পুনরায় ভূপৃষ্ঠে দেখা দেয়। পাৰ্বতীয় প্রদেশে অধিক পরিমাণে বৃষ্টি ও বরফ, সঞ্চয় হয় বলিয়া সচরাচর তথা হইতেই নদীর উৎপত্তি হয়।

( ৯০ ) উচ্চপ্রদেশ হইতে নিম্নভাগে গমন করিবার কালে নদী অতি- শয় বেগবতী হয়, তৎপরে সমভূমিতে আসিলে বেগ কমিয়া যায়, তখন অন্যান্য সরিৎসই উহার মিলন হইতে থাকে। যদি দুই বৃহৎ নদী মিলিত হইয়া অ প্রশস্ত খাত দিয়া প্রবাহিত হয় তাহা হইলে উহার বেগ বৃদ্ধি পায়, কিন্তু খাত বেশী প্রশস্ত হইলে স্রোতের জোর কমিয়া যায় । যে সকল নদী সরল- রেখাক্রমে গমন করে, তাদের বেগ অতি প্রবল ও তাহাদের স্রোতে যে মৃত্তিকা বাহিত হয় তাহা এক কালে সমুদ্রে যার। বনদীর বেগ অধিক নহে, কিন্তু তাহার স্থানে স্থানে মৃত্তিকা পড়িয়া চর জন্মিয়া থাকে, সুতরাং তার বক্তৃতা ক্রমেই বৃদ্ধি পায়। কতকগুলি নদীর মােহানায় মৃত্তিকা সঞ্চিত হইয়া ব-দ্বীপ বা ডেটা উৎপন্ন করে। জলপ্রপাত। পাৰ্বতীয় প্রদেশ হইতে নীচ আসিবার সময় কোন কোন নদীর জল সহসা অধিক নিম্নে পড়িয়া জলপ্রপাত উৎপন্ন করে। কয়েকটী জলপ্রপাত অতিশয় বিস্ময়-জনক ব্যাপার। ভারতবর্ষের মধ্যে মহাবলেশ্বর পাহাড়ের জলপ্রপাত ৬০০ ফুট উচ্চ। কানাড়া প্রদেশে সরবতী নদীর জলপ্রপাত ৮৮৮ ফুট উচ্চ। কাবেরী নদীর জল প্রপাত শেষােক্তটীর ন্যায় উচ্চ নহে, কিন্তু উহাতে অধিক পরিমাণে জলরাশি নিক্ষিপ্ত হয়। খাসিয়া পাহাড়ে ১৮০০ ফুট উচ্চ একটী জলপ্রপাত আছে, কিন্তু বর্ষাকাল ভিন্ন অন্য সময়ে উহার কাৰ্য দেখা যায় না। উত্তর আমেরিকার নায়েগ্রা নদীর জলপ্রপাত অতিশয় অদ্ভুত ব্যাপার। ইরাই হইতে অন্টানিও হ্রদে জল গমন করিবার প্রণালী' নায়েগ্রা নামে খ্যাত। ইরাই ৩৩১ ফুট উৰ্ধ হইতে অন্টারিও হ্রদে নায়েগ্রা ( ৯১ ) দিয়া জল প্রেরণ করিতেছে। নায়েগ্রার দৈর্ঘ্য ৩৩ মাইল মাত্র। অন্টারিওর নিকট আসিয়া অল্প দূরের মধ্যে ১৪০। ১৬০ ফুট নীচে জল পতিত হয়, সেই স্থানেই প্রকৃত জল প্রপাত দৃষ্ট হয়। প্রতি মিনিটে ১৭৫ কোটী মণ জল পতিত হই- তেছে। ইহার বিশাল শব্দ শ্রবণ ও অনির্বচনীয় শােভা সন্দর্শন করিলে মােহিত হইতে হয়। হ্রদ। কোন বৃহৎ গহবরে জল সঞ্চিত হইলে তাহাকে হ্রদ বলা যায়। ইউরোপ ও এসিয়ার উত্তর ভাগে বহুসংখ্যক হ্রদ দৃষ্ট হয়। এই গুলি বােধ হয় গতিবিশিষ্ট প্রকাণ্ড বরফ- পিণ্ডের সংঘটনে উৎপন্ন। কতকগুলি হ্রদ বােধ হয়, পূর্ব- কালে সাগরের সহিত সংযুক্ত ছিল, যথা চিল্কা, পলি কট্ট ; অবশিষ্ট গুল নদী, প্রস্রবণ বা বৃষ্টির জলে উৎপন্ন। ইংলণ্ড, ইটালী ও সুইটজলণ্ডের পরম রমণীয় হ্রদসমূহ পৰ্বত গহ্বরে স্থিত ও নদীর জলে উৎপন্ন। ভারতবর্যে ও নৈনিতাল ও সিকিনে উক্ত প্রকার হ্রদ দৃষ্ট হয়। পাৰ্বতীয় হ্রদগুলি অতি উর্ধে অবস্থিত, তন্মধ্যে টিটীকাকা, রাবণহ্রদ প্রভৃতি প্রধান। এই গুলির গহ্বর, হয়ত পৰ্বত উৎপন্ন হইবার সময় জন্মিয়াছে, অথবা বৃহৎ বরফ পিণ্ডের শক্তিতে উৎপন্ন। আগ্নেয় গিরির কাৰ্যেও কোন কোন হ্রদ উৎপন্ন হইয়াছে, তাহার সন্দেহ নাই। কোন কোনটী মালভূমির নিম্নপ্রদেশ মাত্র। আফ্রিকার ভিক্টোরিয়া নয়ঞ্জা ও তিব্বতের হ্রদ গুলি এইরূপ । কাস্পিয়ান হ্রদ পূৰ্ব্বকালে কৃষ্ণসাগরের সহিত সংযুক্ত ছিল, এরূপ অনুভব হয়। পরে বলগা, ইউরেল প্রভৃতি নদীবাহিত মৃওিকারাশির দ্বারা পৃথক্‌ হইয়া গিয়াছে। কাস্পিয়ান সাগরে কয়েকটী নদীর জল আগমন করিতেছে, তথাপি উহার ( ৯২ ) জলরাশি ক্রমেই হ্রাস হইয়া যাইতেছে। বােধ হয় যে পরিমাণে নদীবাহিতবারি আমদানী হয়, তদপেক্ষা অধিক বাষ্প উখিত হওয়াতে এরূপ ঘটিতেছে। বারিরাশি কমিয়া যাওয়াতে কাস্পিয়ানের জল ক্রমেই অধিক লােণা হইতেছে। আর হ্রদ বােধ হয় পূৰ্ব্বকালে কাস্পিয়ানের সহিত সংযুক্ত ছিল, বৃষ্টি ও নদীর জলে উহার বারিরাশি ক্রমেই বৃদ্ধি পাইতেছে। মরুসাগর অতিশয় লবণাক্ত। উহার জল ক্রমশঃ কমিয়া অধিক লােণা হইতেছে। মরু সাগরে জর্ডন নদী মিলিত হইতেছে। রাজপুতানা প্রদেশে কয়েকটী লবণময় হ্রদ আছে, তন্মধ্যে সম্বর হ্রদ সৰ্ব্বাপেক্ষা বৃহৎ। বৈকাল হ্রদ অতি বৃহৎ। ইহা সাগরপৃষ্ঠ হইতে ১৩৬৩ ফুট উচ্চ , ইহার দৈর্ঘ্য ৩৭০ মাইল এবং প্রস্থ ২০ হইতে ৭০ মাইল। উহার জল নদী- সংমিলনে অতি উৎকৃষ্ট হইয়াছে। আমেরিকার সুপীরীয়র, হিউরণ, মিচিগান, ইরাই ও অন্টারিও হ্রদ সেন্টলরেন্স নদীর যােগে উৎকৃষ্ট সুস্বাদবারিবিশিষ্ট হইয়া আছে। উহাদের পরিমাণ ১,৮০,০০০ বর্গ মাইল। এত বৃহৎ বিশুদ্ধ বারিরাশি আর কুত্রাপি দৃষ্ট হয় না। পাৰ্বতীয় অঞ্চলের কোন কোন হ্রদ অতি গভীর। অল্প পৰ্ব্বতের কোন কোটী ২৮০০ ফুট গভীর। জলের কাৰ্য। বৃষ্টি পতিত হইবার সময় বায়ু হইতে অঙ্গারক বাষ্প গ্রহণ করে। ঐ বাষ্প জলে মিশ্রিত থাকিয়া ভূপৃষ্ঠের প্রস্তরাদি ক্ষয় করে। উহার রাসায়নিক শক্তিতে মর্মর প্রভৃতি প্রস্তরও সচ্ছিদ্র হয় এবং ক্রমে ভাঙ্গিয়া যায়। পাৰ্বতীয় প্রদেশে বৃষ্টির জল সংযােগে অনুন্নত পাহাড়ের গাত্র ক্ষয় প্রাপ্ত হয়, তাহাতে অতি সুশ্রী স্তম্ভ উৎপন্ন হয়। নদীর স্রোতে ভূভাগ ধৃষ্ট হয়। গঙ্গা প্রভৃতি বৃহৎ নদীর তীরবর্তী

( ৯৩ )
শেষােক্ত নদী
প্রদেশ অনেক সময় ভাঙ্গিয়া যায় ও অপরতীরে চর উৎপন্ন
হয়। বৈগবতী নদীর জলে মৃত্তিকা মিশ্রিত থাকে, তাহার
পরিমাণ একান্ত বিস্ময়জনক। বর্ষাকালে গঙ্গার জলে ৪১৮
ভাগের এক ভাগ মৃত্তিকা থাকে। মিসিসিপি নদীর জলে
১৫০৩ ভাগে এক ভাগ মৃত্তিকা পাওয়া যায় ।
দ্বারা ৭৫ কোটী ঘন ফুট মৃত্তিকা প্রতি বৎসরে সমুদ্রে নীত
হইয়া থাকে।
যে প্রদেশ হইতে এই মৃত্তিকারাশি গৃহীত
হইতেছে তাহা যে ক্ষয় পাইতে পাইতে কালক্রমে নিম্ন হইয়া
যাইবে তাহার সন্দেহ কি ?
পাৰ্বতীয় প্রদেশ হইতে যে নদীবাহিত মৃত্তিকা আসিয়া
নিম্ন প্রদেশে সঞ্চিত হয় তাহা সিন্ধু, গঙ্গা, ব্ৰহ্মপুত্র প্রভৃতি
নদ নদীর পার্শ্বস্থ দেশের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলে উপলব্ধি
হইবে। ইহাদের জলের সহিত হিমালয় পর্বতের চূর্ণ মৃত্তিকা
রাশি আসিয়া নদীর খাত অগভীর • করিয়া তােলে। এই
মৃত্তিকার কিয়দংশ বঙ্গোপসাগরে উপনীত হয় এবং উহার
উপকূলস্থ ভূভাগ বৃদ্ধি করে।
পৃথিবীর অনেক স্থানে অনেক হ্রদ ও নদী আছে,
তাহাদের বিশেষ বিবরণ প্রচলিত ভূগােলবিবরণে অবগত
হওয়া যায়, এজন্য এস্থলে তৎসমুদায়ের উল্লেখ করা গেল না।
D
একাদশ অধ্যায়ের প্রশ্ন।
১। নদী হ্রদ ও প্রস্রবণের সম্বন্ধ কি ?
২। নদী দ্বারা ভূভাগের কি কি পরিবর্তন হয় ?
৩। নদী মনুষ্যের কি কি উপকারে লাগে ?
৪। উষ্ণ প্রস্রবণের উদাহরণ দাও। উহা কি রূপে উৎপন্ন ?

( ৯৪ )
৫
৫। জলপ্রপাত কিরূপে উৎপন্ন ? প্রসিদ্ধ কোন কোন জলপ্রপাতের
উল্লেখ কর।
৬। নদী কিরূপে উৎপন্ন হয় ? নদী দ্বারা ভূভাগের কি কি পরিবৰ্ত্তন হয়।
৭। প্রস্রবণ উৎপত্তির কারণ কি ? প্রসিদ্ধ প্রস্রবণগুলির উল্লেখ কর।
৮। কোন্ কোন্ নদী হ্রদে পতিত হইয়াছে ?
৯। কোন্ কোন্ নদী হ্রদ হইতে উৎপন্ন ?
১। আটটা বৃহৎ নদী ও হ্রদের উল্লেখ কর। সুস্বাদ জলবিশিষ্ট বৃহৎ হ্রদ
সমূহ কোথায় ?
১১। অন্তঃসলিল নদী কিরূপে প্রবাহিত হয় ?
১২। প্রস্রবণে কি কি আশ্চর্য ঘটনা হইয়া থাকে ?
১৩। ব-দ্বীপ কাহাকে বলে ও উহা কিরূপে উৎপন্ন ?
ভারতবর্ষের প্রসিদ্ধ জল প্রপাত গুলির উল্লেখ কর।
১৫। হ্রদ কি কি রূপে উৎপন্ন ?
• ভূভাগে জলদ্বারা কি কি কাৰ্য্য হয় ?
১৪।
দ্বাদশ অধ্যায়।
বায়ু, বায়ুর তাপ-পরিমাণ, ঝড়, মেঘ, বৃষ্টি,বরফ।
যে প্রকাণ্ড বায়ুরাশি পৃথিবীকে চতুর্দিকে বেষ্টন করিয়া
আছে, তাহা ভূমণ্ডলের আকর্ষণ বশতঃ শূন্যে বিক্ষিপ্ত হইয়া
যাইতে পারে না। উহা সাগরপৃষ্ঠ হইতে অন্ততঃ ৭০
মাইল পর্যন্ত ব্যাপ্ত। অনেকে অনুমান করেন ১০০ মাইল
দূরেও বায়ুর সঞ্চার আছে। বায়ু অতিশয় স্থিতিস্থাপক, বায়ুর
উপরে কোন ভার চাপাইলে উহার আয়তন হ্রস্ব হইয়া পড়ে,
সুতরাং ঘনতা বৃদ্ধি পায়। উহার যে অংশ সাগরপৃষ্ঠসংলগ্ন
দুপরি ৭০ মাইল পরিমিত বায়ুরাশি চাপিয়া আছে, এজন্য

তাহা উর্জের বায়ু অপেক্ষা ঘন ও ভারী। যত উচ্চ স্থানে গমন করা যায়, তথাকার বায়ু, জমে তত লঘু দেখা যায় । কোন বস্তু জলে নিক্ষেপ করিলে যেমন ভাসিয়া উঠে, সেই রূপ উপরের লঘু বায়ু নীচের ভারী বায়ুর উপরে অবস্থিতি করে। ভূতলে প্রতিবর্গ ইঞ্চ পরিমিত স্থানে বায়ুর ভার প্রায় ৭|| সের। বায়ু মিশ্ৰপদার্থ। ১০০ ভাগ পরিমিত বায়ুতে প্রায় ৭৯ ভাগ যক্ষারজান ও ১১ ভাগ অম্লজান বাম্প। এতদ্ভিন্ন অঙ্গারক বায়ু জলীয় বাষ্প প্রভৃতি কয়েকটী পদার্থ উহাতে বিদ্যমান আছে। বায়ুর অম্লজানবাষ্প গ্রহণ করিয়া জীবগণ প্রাণধারণ করে। উদ্ভিদগণ বায়ুস্থিত অঙ্গারক বাষ্প হইতে অঙ্গার গ্রহণ করিয়া বৰ্ধিত হয়। বায়ুতে জলীয় বাষ্প গৃহীত হয় বলিয়া সমুদ্রের লবণময় জল অনুক্ষণ প্রকাণ্ড নিৰ্ম্মল বাষ্পরাশিতে পরিণত হইয়া মেঘরূপে দৃষ্ট হয়, অথবা অদৃশ্য থাকিয়া সময়ক্রমে বৃষ্টি, শিশির, বরফ ও তুষার রূপে পতিত হইয়া নদী, হ্রদ প্রভৃতির বিশুদ্ধ জলরাশি বৃদ্ধি করে। বাস্তবিক স্থল খণ্ডের নির্মল জল যেমন নানা কারণে হ্রাণ হইয়া যাইতেছে, তেমনি আবার বায়ু হইতে উহা পুনরায় পাওয়া যাইতেছে। দেখ, মেঘ ইতে বৃষ্টি পড়িতেছে ; বৃষ্টির জল নদীদ্বারা সমুদ্রে যাইতেছে ও উহা পুনরায় বাম্পাকারে উঠিয়া মেঘ হইতেছে। এই রূপ পৰ্যায়ক্রমে ভূমণ্ডলের বহুবিধ নৈসর্গিক কাৰ্য্য সাধিত হইতেছে। বায়ুরাশির এক ভাগ অন্য ভাগ অপেক্ষা উত্তপ্ত হইলে উহার আয়তন বৃদ্ধি হয়; সুতরাং লঘু হইয়া উন্ধে উঠিয়া . যায়, তখন পার্শ্ববর্তী শীতল বায়ু আসিয়া উদ্যার স্থান অধিকার করে। এইরূপ বায়ু গমনাগমনেই বায়ু প্রবাহ উৎপন্ন হয়। এই প্রবাহের বেগ অনুসারে, মন্দ সমীরণ, ঝড়, ঘূর্ণি- বায়ু প্রভৃতি নানা নাম দেওয়া যায়। সূৰ্যাতপ ও পৃথিবীর আহ্নিক গতি বায়ুপ্রবাহের প্রধান কারণ। পৃথিবীর সকল স্থানের বায়ু সমভাবে উত্তপ্ত নহে; এক স্থানে বার মাস সমান শীতােষ্ণতা অনুভূত হয় না। কোন স্থানে তীক্ষ্ণ শীতল বায়ু প্রবাহিত হয়, কোথাও বা শুষ্ক উত্তপ্ত বায়ু বহিয়া জনগণকে কাতর করে, স্থানান্তরে উত্তপ্ত জলীয় বাষ্প-সিক্ত বায়ু চালিত হইয়া উদ্ভিজ্জগণের তেজস্বিতা সম্পাদন করে। বায়ুর তাপপরিমাণ স্থির করিবার অতি সহজ উপায় আছে। তাপমান যন্ত্র দ্বারা এই কার্য সম্পন্ন হয়। বােধ করি অনেকে তাপমান দেখিয়া থাকিবেন। উক্ত যন্ত্রে ডিগ্রী অঙ্কিত থাকে। ৩২° ডিগ্রী পরিমিত তাপে জল জমিয়। বরফ হইতে আরম্ভ হয়, ২১১° পরিমিত তাপে জল ফুটিয়া উঠে, মনুষ্য শরীরের তাপ ৯৮° ডিগ্রী। এতদ্দেশের বায়ুর তাপ কখন কখন ১১০° ডিগ্রীর ও অধিক হয়, ও শীতকালে কখন কখন ৫০° ডিগ্রী অপেক্ষাও নুন হইয়া থাকে। ১। বিষুবরেখার নিকটস্থ প্রদেশে সূর্যকিরণ প্রায় লম্বভাবে পতিত হয়, সুতরাং উক্ত ভূভাগ অন্যান্য দেশ অপেক্ষা উত্তপ্ত। ভূতল হইতে পৰ্বতাদি উচ্চ স্থানে উঠিতে হইলে ক্রমে তাপ হ্রাস হইতেছে অনুভব করা যায়, এবং হিমালয় প্রভৃতি অত্যুচ্চ পর্বতশৃঙ্গে তাপ এত অল্প যে তথায় চিরদিন • বরফরশি বিরাজমান থাকে ; উচ্চ স্থানে তাপের পরিমাণ হ্রস্ব হইবার বিশেষ কারণ দেখা যায়। সূর্যকিরণ বায়ুরাশি

( ৯৭ )
ফুট উচ্চ
ভেদ করিয়া ভূপৃষ্ঠে আগমন করিবার কালে বায়ুকে তাদৃশ
উত্তপ্ত করিতে পারে না, কিন্তু পৃথিবীতে সূর্যরশ্মি পতিত
হইতে হইতে ভূপৃষ্ঠ উত্তপ্ত হয়, সেই তাপ পৃথিবী হইতে বিকীর্ণ
হইয়া নিকটবর্তী বায়ু রাশিকে উত্তপ্ত করিয়া তােলে । নীচের
বায়ুরাশি যে পরিমাণে উত্তপ্ত হয়, উপরের বায়ু তত উষ্ণ
হইতে পারে না, সুতরাং ভূতল হইতে যত উর্দ্ধে উঠা যায়,
ততই তাপের অল্প অনুভূত হইয়া থাকে। দক্ষিণ আমে-
রিকার কীটো নগর বিষুবরেখার উপরি স্থাপিত, কিন্তু উহা
সাগরপৃষ্ঠ হইতে ৯৫০০
এজন্য উক্ত স্থানে চিরবসন্ত
বিরাজমান রহিয়াছে।
২। দেশের ভূমির প্রকৃতি অনুসারে বায়ুর উষ্ণতা ভেদ হয়।
যদি ভূমি বালুকাময় হয়, তাহা হইলে অতি শীঘ্র উত্তপ্ত হইয়া
সন্নিহিত বায়ু রাশিকে উত্তপ্ত করে।
শীতকালে বালুকাময়
ভূমি হইতে অতি শীঘ্র তাপ বিকীর্ণ হইয়া যায় সুতরাং শীতের
আতিশয্য অনুভূত হয়। দেশের অধিকাংশ ভূমি অরণ্য বা
জলাশয়ময় হইলে তাহাতে সূৰ্য-কিরণ প্রতিফলিত না হওয়াতে
বায়ুর উত্তাপ প্রায় সমভাবে থাকে, এজন্য অরণ্যময় স্থান
অপেক্ষাকৃত শীতল। শ্ৰীষ্ম কালে বালুকাময় পথে ভ্রমণ করিলে
অসহ উত্তাপ অনুভূত হয়, কিন্তু তৃণ-সজ্জিত ভূমিখণ্ড অতিক্রম
করিতে তাদৃশ শ্রান্তিবোধ হয় না। সাহারা মরু হইতে পারস্য
উপসাগর পর্যন্ত ভূভাগে যত বালুকারাশি দেখা যায়, তত
আর কুত্রাপি নাই, উক্ত প্রদেশের বায়ু যেরূপ উত্তপ্ত সেরূপ
আর কুত্রাপি দেখা যায় না।
৩। দিবাভাগে ভূমি অপেক্ষা জলরাশি শীতল, থাকে কিন্তু
রাৱি কালে ঠিক উহার বিপরীত ঘ:ট। সেইরূপ গ্রীষ্মকালে

( ৯৮ ) } জলভাগ স্থল অপেক্ষা শীতল ও শীতকালে উত্তপ্ত থাকে। এই কারণ বশতঃ মহাসমুদ্র বা কোন বৃহৎ জলাশয়ের নিকটবর্তী স্থানে শীত গ্রীষ্মের আতিশয্য অনুভূত হয় না। দেখ, লণ্ডন নগর আষ্ট্ৰাকা নগর অপেক্ষা মেরুর কত নিকটবর্তী, কিন্তু শীতকালে আট্টাকানে যে পরিমাণে বরফ সঞ্চিত হয়, লণ্ডনে তাহা হয় না। সমুদ্রতীরবর্তী স্থানে জলীয়বাষ্প উখিত হইয়া বৃষ্টি ও শিশির রূপে অনুক্ষণ পতিত হইয়া ভূমির উর্বরতা সম্পা- দন করে। আয়লও বারমাস হরিবর্ণ শস্যাদিতে শােভিত,কিন্তু আট্টাকানের নিকটবর্তী ভূভাগ গ্রীষ্মাগমে দগ্ধ প্রায় হইয়া যায়। ৪। কোন কোন সাগীয় স্রোত উষ্ণ, কতকগুলি শীতল। উপসাগরীয় শ্রোতদ্বারা ইউরােপের পশ্চিমখণ্ডের তাপপরিমাণ বৰ্ধিত হয়, সেইরূপ প্রশান্ত মহাসাগরীয় স্রোতে আমেরিকার উত্তর পশ্চিম উপকূল উত্তপ্ত থাকে। কিন্তু গ্রীনলণ্ড প্রভৃতি দেশ হইতে শীতল জলস্রোত নিউফৌণ্ড ও পৰ্যন্ত অব্যাহত রূপে বাহিত হয়, তাহার প্রভাবে নবইয়র্ক প্রভৃতি আমেরিকার পূর্ব উপকূলস্থ নগরাদ শীত প্রধান স্থান বলিয়া পরিচিত সেইরূপ দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূল ও ওখটস্ক সাগরের সন্নিহিত স্থানে শীতল স্রোত বাহিত হয় বলিয়া অধিক শীত অনুভূত হয়। যে ভূভাগের উপর দিয়া বায়ু প্রবাহিত হয়, তাহা উষ্ণ হইলে বায়ু উষ্ণ হয়, এবং শীতল হইলে বায়ু, শীতল হয়। হিমালয় পর্বতে হিমমণ্ডিত শৃঙ্গাদির উপর দিয়া যে বায়ু বাহিত হয় তাহা শীতল। সাহারা মরু হইতে যে বায়ু আগমন করে তাহা অতিশয় উত্তপ্ত ; সমুদ্র হইতে যে বায়ু আইসে তাহা জলীয়বাষ্পপূর্ণ, সুতরাং তাহার সঙ্গে মেঘনালা উখিত হইয়া অাছে। ;

( ৯৯ ) বারিবর্ষণ করে। দেশের নিকটে পৰ্বত থাকিলে তাহাতে উক্ত মেঘমালার সঘাত হইয়া বৃষ্টির পরিমাণ বৃদ্ধি করে। সমােষ্ণ রেখা। সভ্য দেশের পণ্ডিতেরা তদ্দেশের বায়ুর প্রাত্যহিক উষ্ণতা নিরূপণ করিয়া বার্ষিক গড় স্থির করিয়া থাকেন। তাপমান যন্ত্রে কোন্ দিন কত ডিগ্রী তাপ দৃষ্ট হয় তাহা লিখিয়া তাহার সমষ্টিকে বৎসরের দিন সংখ্যা দিয়া ভাগ করিলে উক্ত বার্ষিক গড় স্থির হয়। পরে পৃথিবীর যে যে স্থানে গড়ে তাপপরিমাণ সমান দেখা যায়, ভূচিত্রে সেই সেই স্থানের উপর দিয়া সমােষ্ণতাসূচক রেখা টানা হয়। কোন সমােষ্ণতাসূচক রেখার সকল অংশ বিষুবরেখা হইতে সমদূরবর্তী নহে; নবইয়র্ক, ডবলি, লণ্ডন, সেল,আট্টাকা ও জাপান এক সমােষ্ণতাসূচক রেখার স্থিত, কিন্তু এই সকল স্থানের অক্ষরেখা নিতান্ত ভিন্ন ভিন্ন। এই সকল স্থানের গড় উষ্ণতা প্রায় ৫০ ডিগ্রী। কলিকাতার গড় উষ্ণতা প্রায় ৮০ ডিগ্রী। উহার সমােষ্ণতাসূচক রেখায় করাচী বন্দর, মস্কট, আফ্রিকাস্থ ফ্রিটেন, দক্ষিণ আমেরিকার জর্জটোন, এবং গােয়াটিমালা অবস্থিত। এই সকল স্থানের অক্ষরে খ সমান নহে। যে যে স্থান এক সমােষ্ণতাসূচক রেখায় স্থিত, তাহাদের বার মাসের শীত গ্রীষ্ম যে সমান হইবে এমত নহে। পূর্বেই বলা হইয়াছে, লণ্ডন অপেক্ষা আট্টাকা নগরে শীত ও গ্রীষ্ম উভয়ই অধিক। সাহারা মরু ও আরব দেশের কিয়দংশ ভূমি অন্যান্য স্থান অপেক্ষা উত্তপ্ত। ভারতবর্ষের মধ্যে বালুকাময় পঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশ গ্রীষ্মকালে অতিশয় উষ্ণ ও শীতকালে অতিশয় শীতল হয়। মনুষ্যের অধ্যুসিত স্থানের মধ্যে লেনা নদীর তীরবর্তী ( ১০০ ) ভূভাগ ও ইয়খটস্ক নগরে যেরূপ শীতের আতিশয্য তদ্রুপ আর কুত্রাপি অনুভূত হয় না। এই স্থানে তাপমান যন্ত্রের পারদ ডিগ্রীর ৪০ ডিগী নীচে দৃষ্ট হয়, অর্থাৎ যত শীত হইলে জল জমিয়া বরফ হয় এস্থানের তাপপরিমাণ তাহা অপেক্ষা ৭২ ডিগ্রী কম। ভূগর্ভ অত্যুষ্ণ পদার্থময় বটে কিন্তু তত্ৰত্য তাপ ভূপৃষ্ঠে অনুভূত হয় না। আমরা যে তাপ অনুভব করি তাহা সূৰ্য্য হইতে প্রাপ্ত। মধ্যাহ্নকামের রৌদ্র কত উষ্ণ, কিন্তু নিশীথ সনরে তাহার প্রভাব কিছুই থাকে না। দিবা ভাগে যে তাপ ভূপৃষ্ঠে গৃহীত হয়, তাহ। ক্রমে শূন্তে বিক্ষিপ্ত হইয়া যায়। যে দেশে লম্বভাবে রৌদ্র পতিত হয় সেখানে যত তাপ বিতরিত হয়, অন্য দেশে সেরূপ নহে। সূৰ্য্য হইতে ভূমণ্ডলে এত তাপ বিতরিত হইতেছে, কিন্তু তাহাতে পৃথিবী অধিকতর উত্তপ্ত হইতেছে না, কারণ ঐ তাপ অনুক্ষণ শূন্যে বিক্ষিপ্ত হইতেছে। অনেকে অনুমান করেন যে আমরা প্রতি বৎসর সূৰ্য্য হইতে সমান পরিমাণে তাপ প্রাপ্ত হই, কিন্তু পৰ্যবেক্ষণ দ্বারা জানা গিয়াছে যে সূৰ্যে যে সকল কৃষ্ণবর্ণ দাগ আছে তাহার আয়তন ও সংখ্যা সময়ে সময়ে হ্রাস বৃদ্ধি পায় এবং ঐরূপ হ্রাস বৃদ্ধির সহিত ভূভাগের পরিমাণের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ আছে। যৎকালে ঐ গুলির বৃদ্ধি হয়, তখন পৃথিবীতে অতিবৃষ্টি, ঝটিকা প্রভৃতি ঘটনা সংঘটিত হইয়া থাকে। বিষুবরেখার উত্তর প্রদেশে ভূমির ভাগ অধিক, সুতরাং তাহাতে সূৰ্য্যরশ্মি পতিত হইয়া অধিক তাপ উৎপাদন করে। কিন্তু উক্ত রেখার দক্ষিণের অধিকাংশ প্রদেশ মহাসাগরের ' জলে আবৃত, সুতরাং দক্ষিণ মেরু হইতে চালিত তুষারশিলা

( ১১ )
ও শীতল জলস্রোত উহার অনেক স্থানেই দৃষ্ট হয়। শীতল
স্রোত ও বরফশিলা নিবন্ধন এই ভূভাগের তাপের গড় পরিমাণ
উত্তর বিভাগ অপেক্ষা চারি ডিগ্রী ন্যূন।
ঝড় ও ঘূর্ণিবায়ু। দেশের শীতােষ্ণতা ভদে মেঘ, বৃষ্টি,
ঝড় প্রভৃতির প্রকৃতি ও পরিমাণ নিরূপিত হয়। বায়ুর বেগ
এক ঘণ্টায় ৩ মাইলের কিছু অধিক না হইলে বায়ু সুখপ্রদ
হয় না, ১০/১৫ মাইল হইলে তাহাকে প্রখর বায়ু বলা যায়,
তাহার অধিক হইলেই ঝড়' বলিয়া গণ্য হয়।
ঝটিকার
বেগ কখন কখন ঘণ্টায় ৫০৬০ মাইল দেখা যায়। ঘূর্ণিবায়
অতিশয় ভয়ানক। ঘূর্ণিবায়ুর বেগ কখন কখন ৮০১০০১২৫
মাইলেরও অধিক হয়। ১৮৬৪ সালের ৫ই অক্টোবর তারিখে
কলিকাতা প্রদেশে যে ভয়ানক ঝটিকা উখিত হইয়া বৃক্ষাদি
উৎপাটিত, গৃহাদি চূর্ণ, ও অর্ণবপােতাদি জলমগ্ন করে,
যাহাতে মেদিনীপুর ও ২৪ পরগণা জেলার অন্যূন ৪৮,০০০
লােক মৃত্যুগ্রাসে পতিত হয় তাহা এক প্রকার ঘূর্ণিবায়ু।
১৮৭৬ সালের অক্টোবর মাসে যে ঝটিকার প্রভাবে বাখরগঞ্জ
নােয়াখালি ও চট্টগ্রাম জেলায় সমুদ্র তরঙ্গ প্রবেশ করিয়া
অন্যূন ২,৫০,০০০ মনুষ্য ও অসংখ্য পশ্বাদির প্রাণনাশ করে
তাহা ঘূর্ণিবায়ু মাত্র।
সহসা কোন স্থান সূৰ্যাতপে অথবা অন্য কোন কারণে
বায়ুশূন্য হইবামাত্র তদভিমুখে চতুর্দিক হইতে প্রবল বেগে বায়ু
আগমন করে ও পরস্পর বিপরীতদিকের বায়ুর আঘাত,প্রতি-
ঘাতে ঘূর্ণিবায়ু উৎপন্ন হয়। আমরা কখন কখন দেখিতে
পাই যে ভূতলে ১০/১২ হাত স্থানের মধ্যে সহসা ঘূর্ণিবায়ু
উপস্থিত হইয়া ধূলা তৃণ প্রভৃতি পদার্থ প্রবলবেগে উৰ্দ্ধদেশে

( ১০২ ) •
উৎক্ষেপ করিতেছে অথবা দূরে লইয়া গিয়া ভূমিতে ফেলিয়া
যাইতেছে। এরূপ সামান্য ঘূর্ণিবায়ু বিশেষ অনিষ্টের কারণ
নহে, কারণ উহার ব্যাস ১০/১২ হাতের বড় অধিক হয় না,
ও সচরাচর উহার বল ও অধিক নহে। কিন্তু যৎকালে বহু-
দূরব্যাপী ঘূর্ণবায়ু উপস্থিত হইয়া থাকে, তখন জীবজন্তু
মনুষ্যাদির অশেষবধ অনিষ্টপাত হয়। উহা আবৰ্তন করিতে
করিতে কথন উর্ধ্বগামী ও কখন অগ্রগামী হয়। উহার
আকার গােল ও ব্যাস ১০০ হইতে ২০০ মাইল পর্যন্ত হইয়া
থাকে। ঘূর্ণিবায়ুর কেন্দ্র যত বেগে চালিত হয়, উহার পরিধি
সেরূপ বেগে চালিত হয় না, এই জন্য যে স্থানের উপর দিয়া
কেন্দ্র গমন করে তথায় ভয়ানক উৎপাত ঘটিয়া থাকে।
এতদ্দেশে উহা সচরাচর বঙ্গোপসাগরে আরম্ভ হয়, তথা হইতে
ঘূরিতে ঘূরিতে প্রতি ঘণ্টায় ৯ হইতে ৪৩ মাইল বেগে অগ্রসর
হইতে থাকে। কিন্তু উহার আভ্যন্তরিক বেগের পরিমাণ স্থির
হয় নাই। অনেকে ১২০, ১২৫ মাইলেরও অধিক বিবেচনা
করেন। উহার আয়তন আকুঞ্চিত ও প্রসারিত হইয়া থাকে,
আকুঞ্চিত হইবার পরক্ষণেই উহার জের অতিশয় বৃদ্ধি পায়।
জলাশয়ে ঘূর্ণিবায়ু উপস্থিত হইলে জলরাশির কিয়দংশ উয়ার
শক্তিতে উদ্ধে উঠে, ও কখন কখন ১০০/১৫০ হাত উচ্চ
হইয়া প্রচণ্ডবেগে ধাবমান হয়, ও সম্মুখস্থ পদার্থের উপর দিয়া
গমন করিবার কালে তাহা ভগ্ন ও চূর্ণ করিয়া ফেলে। ইহাকে
জলন্থ বলা যায়। এদেশের লােকেরা কহিয়া থাকেন
ইন্দ্রদেবের হস্তী ও প্রসারিত করিয়া সমুদ্র হইতে জল
উত্তোলন করিবার কালে এইরূপ ঘটনা হয়। বাস্তবিক
জলস্তম্ভের আকার হস্তি শুণ্ডের ন্যাঙ্ক। ঘূর্ণিবায়ুর সময়

( ১০৩ ) বিদ্যুদগ্নি বিশেষের প্রাবল্য হয় দেখিয়া পণ্ডিতেরা অনুমান করেন উহার সহিত বিদ্যুতের সম্বন্ধ আছে। কিন্তু সেই সম্বন্ধ কি তাহা স্থির হয় নাই। বিষুবরেখার উভয় পার্শ্বে ২৩২° পরিমিত স্থানের মধ্যে সচরাচর ঘূর্ণিবায়ুর প্রভাব দৃষ্ট হয়। উহা ঘূর্ণন করিতে করিতে অগ্রসর হয়। বিষুবরেখার উত্তর ও দক্ষিণ উভয় খণ্ডেই উহার গতি সূর্যের বিপরীত দিগে হইয়া থাকে। অর্থাৎ গােলকের উত্তরাদ্ধে দৃশ্যতঃ সূর্যের গতি পূৰ্ব্ব হইতে দক্ষিণ, পশ্চিম ও উত্তরাভিমুখে; এবং ঘূর্ণিবায়ুর অবর্তন পূর্ব ও উত্তর হইতে ক্রমে পশ্চিম ও দক্ষিণ অভিমুখে হইয়া থাকে। সেইরূপ দক্ষিণ গােলকার্ধে সূর্য্যের গতি পূৰ্ব্ব হইতে ক্রমে উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণাভিমুখে, এবং ঘূর্ণিবায়ুর গতি পশ্চিম ও উত্তর হইতে ক্রমে পূর্ব ও দক্ষিণ অভিমুখে। ঘূর্ণিবায়ু বিষুবরেখার উপর দৃষ্ট হয় নাই এবং কখন উক্ত রেখার এক পার্শ্বে আরম্ভ হইয়া অপর পার্শ্বে গমন করে নাই। উহার গতি বক্র। উত্তর গোলার্ধে প্রারম্ভকালে উহার গতি সচরাচর পূর্ব হইতে পশ্চিমাভিমুখে, ও শেষ হইবার সময় পশ্চিম হইতে পূৰ্বাভি- মুখে হইয়া থাকে। ঘূর্ণিবায়ু আবৰ্তন করিতে করিতে যখন সমুদ্রের উপকূলে উপস্থিত হয়, তৎকালে সমুদ্রের জল উচ্ছসিত হইয়া উঠে। এই তরঙ্গমালা হুগলি প্রভৃতি নদীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করিলে নদীর পার্শ্ববর্তী স্থান জল প্লাবিত হয়। ১৮৬৪ এবং ১৮৭৬ সালের ঝটিকায় যে সকল লোেক গতাসু হয় তন্মধ্যে অনেকেই জলপ্লাবনে মারা পড়িয়াছিল। বাণিজ্য বায়ু। বিষুবরেখার নিকটস্থ দেশ অধিক উত্তপ্ত;

( ১০৪ ) তদভিমুখে উত্তর ও দক্ষিণ মেরু-সন্নিহিত শীতপ্রধান দেশ হইতে নিরন্তর বাতাস বহিয়া থাকে। যদি পৃথিবী স্থির ভাবে থাকিত, তাহা হইলে এই বায়ু ঠিক উত্তর ও দক্ষিণ দিগ হইতে প্রবাহিত হইত। কিন্তু পৃথিবী নিয়ত পশ্চিম দিগ হইতে পূৰ্বাভিমুখে স্বীয় মেরুদণ্ডের উপর আবর্তন করে, ও সেই আবর্তন সময়ে মেরু প্রদেশীয় ভূভাগ অপেক্ষা বিষুব- রেখার নিকটস্থ দেশ অধিক বেগে ঘূর্ণিত হয়। সুতরাং বিষুবরেখার দিগে ধাবমান হইবার কালে শীতল বায়ু ভূভাগের সহিত সমবেগে যাইতে পারে না, অর্থাৎ তাহার পশ্চাতে পড়িয়া থাকে ; তাহাতে বােধ হয় যেন বায়ু পূৰ্বদিক হইতে আসিতেছে, এইরূপে উত্তরপূর্ব ও দক্ষিণপূর্ব বায়ু উৎপন্ন হয় ; বিষুবরেখার দক্ষিণে দক্ষিণ-পূর্ব বায়ু ও উত্তরে উত্তর- পূৰ্ব্ব বায়ু বহিয়া থাকে। এই সুদীর্ঘ বায়ুপ্রবাহ বিষুবরেখার অভিমুখে গমন করে, উহার অনুসরণ করিয়া দূরদেশ হইতে সমুদ্রপথে গমনাগমন করা যায়, এজন্য ইংরেজের উহাকে বাণিজ্যবায়ু বলিয়া থাকেন। মহাসমুদ্রে এই বায়ুর গতি অতি সহজে অনুভূত হয়, কিন্তু ভূমিখণ্ডের নিকট উহার প্রকৃতি নানা কারণে পরিবর্তিত হইয়া থাকে। বিষুবরেখার উভয় পার্শ্বে বাণিজ্য-বায়ুদয়ের মধ্যস্থলে কথন কখন প্রায় বাতাস বহে না, কিন্তু এক এক সময়ে তথায় বিজাতীয় ঝড় হয়। উর্ধ-বায়ু। যেরূপ মেরু-প্রদেশীয় বায়ু বিষুবরেখার অভিমুখে প্রতি নিয়ত প্রবাহিত হইতেছে, সেইরূপ বিষুব- রেখার নিকটবর্তী প্রদেশের বায়ু সূৰ্যোপে লঘু হইয়া উদ্ধ দিগে উঠিয়া মেরু প্রদেশাভিমুখে গমন করিতেছে। এই বায়ু উর্ধে উঠিতে উঠিতে ক্রমে শীতল হইয়া মেরু প্রদেশের দিগে ধাবমান হয়। এইরূপে ভূতলে বাণিজ্য বায়ু ও উর্দ্ধে তাহার বিপরীত বায়ু প্রবাহিত হইতেছে। মেরুদ্বয় হইতে দুইটা প্রবাহ ও বিষুবরেখা হইতে মেরুদ্বয়ের অভিমুখে দুইটি, এই চারটা প্রবাহ নিরন্তর বিদ্যমান আছে। কোন উচ্চ পর্বত শিখরে আরােহণ করিলে উৰ্দ্ধ দেশের বায়ুপ্রবাহের শক্তি অনুভব করা যায়। ১৮৭০ সালের যুদ্ধ কালে একদিন উত্তর দিগ হইতে বায়ু বহিতেছিল,সেই দিন পারিস নগরী হইতে বেলুন আরােহণ করিয়া দুই ব্যক্তি দক্ষিণে গমন করিবার চেষ্টা করেন, কিন্তু বেলুন নীয়দিগের কামানের গােলা অতিক্রম করিবার চেষ্টার উদ্ধে উঠিলে, উৰ্দ্ধদেশের বায়ুপ্রবাহের শক্তিতে প্রচণ্ডবেগে মেরুসন্নিহিত দেশাভিমুখে চালিত হইয়া ৯০০ মাইল দূরে সুইডেন দেশের উপরি উপস্থিত হয়। আরােহীরা বিপদাশঙ্কা করিয়া তৎকালে বেলুন ভেদ করিয়া অবরােহণের চেষ্টা করেন, তাহাতে মেরু প্রদেশে পতিত না হইয়া লােকালয়ের নিকটে অবতীর্ণ হন। কোন কোন আগ্নের গিরির উপদ্রবের সময় ভস্মাদি উর্দ্ধে উৎক্ষিপ্ত হয়, সেই সকল পদার্থ ভূতলস্থ বায়ু- প্রবাহের বিপরীত দিগে চালিত হইয়া দূরে পতিত হয়। এই ঘটনা দেখিয়াও উৰ্দ্ধ দেশের বায়ু প্রবাহের গতি স্থির করা যায়। বায়ু। কোন কোন প্রদেশে বিশেষ কারণ বশত বাণিজ্য বায়ুর গতি ফিরিয়া যায়। ভাৰতবর্ষ ও তাহার নিক বর্তী সাগরে শীতকালে উত্তর-পূর্ব দিগ হইতে, এবং গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে দক্ষিণ-পশ্চিম দিগ হইতে, বায়ু প্রবাহিত হয়। এই ঘটনার কারণ নিয়ে লিখিত হইল। ০ মৌসুম বায়ু।

( ১০৬ ) আফ্রিকার যে অংশ বিষুবরেখার দক্ষিণে অবস্থিত, তথায় ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে সূৰ্য্যোত্তাপ অতিশয় প্রখর হয়; তৎকালে তাতার, তিব্বত, মঙ্গোলিয়া, ভারতবর্ষ প্রভৃতির মরুভূমি শীতাধিক্যবশতঃ অতিশয় শীতল হয়। উষ্ণবায়ু লঘু হইয়া উর্দ্ধে উঠিয়া গেলে অপেক্ষাকৃত শীতল বায়ু তাহার স্থান অধিকার করে। এই নিয়মানুসারে মধ্য এসিয়ার শীতল বায়ু আফ্রিকার উত্তপ্ত খণ্ডের দিগে ধাবমান হইয়া উত্তরপূর্ব বায়ু প্রবাহ উৎপন্ন করে। যতদিন আফ্রিকা অপেক্ষাকৃত অধিক উত্তপ্ত থাকে ততদিন এই বায়ু বাহিত হয়। যখন আমাদের গ্রীষ্মকাল, সেই সময়ে আফ্রিকার উল্লিখিত খণ্ডে শীতাধিক্য হয়, সুতরাং তথা হইতে ভারতবর্ষ প্রভৃতি উত্তপ্ত দেশে দক্ষিণ- পশ্চিম হইতে বাতাস আসিয়া থাকে। এইরূপে এপ্রিল হইতে অক্টোবর পর্যন্ত দক্ষিণ পশ্চিম দিগ হইতে ও অক্টোবর হইতে এপ্রিল পর্যন্ত উত্তর-পূৰ্ব্ব প্রদেশ হইতে এতদ্দেশে বায়ু আগমন করে। বঙ্গোপসাগরের উপর দিয়া যখন বায়ু প্রবাহিত হয় তৎকালে উহার মেঘমালা অসিয়া বঙ্গদেশে বারি- বর্ষণ করিয়া থাকে। দক্ষিণ-পশ্চিম হইতে বায়ু আসিবার কালে, উহার সহিত আরব সাগর ও ভারত মহাসাগর হইতে মেঘমালা আসিয়া পশ্চিম ঘাট পৰ্বতে বাধা পায় এবং তথায় প্রচুর পরিমাণে বারি- বর্ষণ করে। পরে এই বায়ু অপেক্ষাকৃত শুষ্ক অবস্থায় হিমালয়ে উপনীত হয়, কিন্তু তত্ৰত্য শীতসহযােগে উহার বাষ্পবিন্দু সকল তুষার রূপে পরিণত হয়। দিবাভাগে সমুদ্রের জলরাশি অপেক্ষা স্থলভাগের বায়ু অধিক উত্তপ্ত হয়, এজন্য সমুদ্র হইতে স্থলাভিমুখে বায়ু ( ১০৭ ) আগমন করে। রাত্রিকালে স্থলভাগ অধিক শীতল হয় বলিয়া স্কুল হইতে সাগরাভিমুখে বায়ু প্রবাহিত হয়। • উত্তপ্ত বায়ু। সাহারা প্রভৃতি মরুভূমি অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়, এজন্য চতুদ্দিগ হইতে তদভিমুখে বায়ু প্রবাহিত হয়। সেই বায়ু মরুভূমি অতিক্রম করিতে করিতে অতিশয় উত্তপ্ত হয়, এবং সময়ে সময়ে সমীপবর্তী দেশবিশেষে যাইয়া ক্লেশ- কর হইয়া উঠে। ইটালীর দক্ষিণ ভাগে এই উত্তপ্ত বায়ু অনু- ভূত হয়। ভারতবর্ষে ঈদৃশ উত্তপ্ত বায়ু লু নামে খ্যাত। জলীয়বাষ্পের উপকারিতা। ভূপৃষ্ঠে যে জলরাশি আছে তাহা হইতে প্রতিনিয়ত বাষ্প উখিত হয়, উহা বায়ুর সহিত মিশ্রিত হইয়া সৰ্ব্বদা ইতস্ততঃ চালিত হইতেছে। ভূমণ্ডলের বায়ুতে প্রতি বৎসর কি পরিমাণে জলীয়বাষ্প উঠিতেছে পণ্ডিতের তাহা স্থির করিয়াছেন। উহা জলে পরিণত হইলে, এক মাইল গভীর হইয়াদুই লক্ষ বর্গ মাইল ভূমি অধিকার করিতে পারে। এই বিশাল জলরাশি যেন সমুদ্ৰাদি জলাশয় হইতে সূর্যরশ্মির শক্তিতে বায়ুমণ্ডলে উখিত হইতেছে। বায়ুতে যে প্রকাণ্ড বাষ্পরাশি বিদ্যমান আছে তাহা হইতে মেঘ, বৃষ্টি কুজ্ঝটিকা, শিলা, শিশির ও তুষারশিলা উৎপন্ন হয়, এবং বায়ুর বাষ্পধারণার শক্তি আছে বলিয়া পৃথিবীতে শস্যাদি জন্মিল মনুষ্য পশ্বাদির জীবন রক্ষা করিতেছে। যদি বাষ্প উঠিতে না পাইত তাহা হইলে বৃষ্টি ও শিশির দ্বারা ভূভাগের উর্বরতা সংসাধিত হইত না। সুতরাং সৰ্ব্বত্রই মরুভূমির ন্যায় উদ্ভিদ ও জীবন্ত প্রদেশ লক্ষিত হইত। বায়ু জলীয়বাষ্পবিশিষ্ট থাকায় ভূপৃষ্ঠ অপেক্ষাকৃত উষ্ণ থাকে। অদৃশ্য চন্দ্রাতপের ন্যায় উহা পৃথিবীর উপর বিস্তৃত ১৮) থাকিয়া এক সময়ে রোদ্রের প্রখরতার হ্রাস করিতেছে, অন্য সময়ে মেঘরূপে উর্ধে অবস্থিত থাকিয়া ভূপৃষ্ঠের তাপ শূন্যে বিক্ষিপ্ত হইতে দিতেছে না উহা না থাকিলে মধ্যাহ্নকালীন রোদ্র অসহ্য হইত এবং রাত্রিকালে ভয়ানক শীত বােধ হইত। বায়ু যত * উত্তপ্ত হয় উহাতে তত অধিক জলীয়বাষ্প থাকিতে পারে ; বায়ুর তাপ-পরিমাণের হ্রাস হইলে উহার অন্তর্গত বাষ্পের কিয়দংশ স্থগিত হইয়া পড়ে। এই কারণ বশতঃ অপেক্ষাকৃত শীতল বাতাস লাগিলে বায়ুস্থিত বাষ্পের কিয়ৎভাগ বৃষ্টি, শিশিরাদি রূপে অনুক্ষণ পতিত হয়। তাড়ি তের প্রভাবে ও বৃষ্টির অধিক্য বা অল্প হইয়া থাকে। কিন্তু কি কি অবস্থায় তাড়িতের শক্তি কি রূপে কাৰ্যকারী হয় তাহা সুন্দররূপে বুঝা যায় না। মেঘ ও বৃষ্টি। বায়ু-রাশি প্রায় কখন জলীয়বাষ্পবিহীন হয় না। উত্তপ্ত সাগর বারির উপর দিয়া উত্তপ্ত বায়ু আসিবার কালে, অধিক মাত্রায় বাষ্পযুক্ত হয় ; যে বায়ু, মরু প্রদেশ ও পৰ্বত অতিক্রম করিয়া আসে, তার বাষ্পের ভাগ অতি অল্প; সময়ে কিছুমাত্র থাকে না। যখন বাষ্পমুক্ত বায়ুরাশিতে অপেক্ষাকৃত শীতল বায়ুর সংঘাত হয়, তৎ- কালেই তাহার বাষ্পের কিয়দংশ ঘন হইয়া আমাদের দৃষ্টি- গোচর হয়। যদি ভূপৃষ্ঠের নিকটে এরূপ ঘনীভূত হয়, তাহা হইলে কুজ্ঝটিকা জন্মে, অধিক উন্ধে ঘনীভূত হইলে মেঘা- কারে দৃষ্ট হয় ; কোন কোন সময়ে এই মেঘ বায়ুদ্বারা চালিত হইতে হইতে পৰ্ব্বতবিশেষের হিমময় প্রদেশে আহত হয়, ও. তৎক্ষণাৎ মূষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করে। এতাদৃশ কারণে চির- পুজি পাহাড়, গায়না, ব্রেজিল ও বোম্বাই উপকুলে যত বৃষ্টি, এক ( ১৩৯ ) . হয়, তত আর কুত্রাপি হয় না। পৃথিবীর মরুভূমি গুলিতে প্রায়ই মেঘ জন্মিতে পারে না, অন্যদেশজাত মেঘ উহার উপর দিয়া গমন করিবার কালে তথাকার উত্তাপে পুনরায় অদৃশ্য বাষ্প হইয়া যায়। মেঘ বায়ুসহ অধিক উৰ্দ্ধ উঠিতে পারে না। সচরাচর ৪ মাইলের অধিক উপরে মেঘ দৃষ্ট হয় না। যে মেঘে বৃষ্টি হয় তাহা আরও নীচে থাকে, এমন কি কখন কখন দুই সহস্র হন্তের নীচে দৃষ্ট হয়। ফলতঃ জলীয় বাষ্প যতক্ষণ বায়ু অপেক্ষা লঘু থাকে, ততক্ষণ উপরে উঠিতে পারে। উদ্ধের বায়ু ক্ৰমশঃ লঘু ও শীতল, এজন্য তথায় জলীয় বাষ্প অবস্থান করিতে পারে না। কোন কোন গিরিশিখরে উপবেশন করিয়া তাহার নিম্ন প্রদেশে মেঘ, বৃষ্টি ও বজ্রাঘাত হইতেছে এরূপ দেখা গিয়া থাকে। পৃথিবীর সকল স্থানে সমপরিমাণে বৃষ্টি হয় না। সমুদ্রের নিকটে অধিক বাষ্প জন্মে, সুতরাং অধিক বৃষ্টি হয় । পৰ্বত- পাওে অধিক বারি বর্ষিত হয়। গ্রীষ্মপ্রধান দেশে অধিক * বাষ্প উৎপন্ন হইয়া অধিক পরিমাণে বারিবর্ষণ করে। কোন কোন দেশে প্রায় কখনই বৃষ্টি হয় না, যথা সাহারা, গােবী ও আরবের মরুভূমি, মিসর, পারস্য ও মােঙ্গলিয়া, মেসিকো, গােয়াটিমালা, কালিফর্নিয়া ও পেরু। কুজঝটিকা। জলীয় বাষ্পবিশিষ্ট উষ্ণ বায়ুতে শীতল বায়ু বা শীতল ভূমির সংস্পর্শ হইলে উহার বাষ্পময় কিয়দংশ সূক্ষ্ম জলকণায় পরিণত হইয়া কুঁজঝটিকা উৎপাদন করে। শীত কালের প্রত্যুষে মুখ দিয়া নিশ্বাস ত্যাগ করিলে উহার উদা- হরণ প্রত্যক্ষ করা যায়। কখন কখন সন্ধ্যার সময় নদী বা p ( ১১০ ) উচ্চ ভূমির বায়ুও হয়। উভয় বিলের উপর কুজঝটিকা দেখা যায় । তাহার কারণ এই যে তাপ বিকিরণ করিতে করিতে জলের নিকটস্থ ভূমি জল অপেক্ষা শীতল হয়। সুতরাং জলের উপরের বায়ু অপেক্ষা , শীতল বায়ুর সংমিশ্রণে কুজ। ঝটিকা জন্মে। পৰ্বত পার্শ্বে উষ্ণ বায়ু আসিয়াও ঐরূপ কাৰ্য- কারী হয়,এই কারণ বশতঃ ঐ প্রদেশে অনেক সময় কুজঝটিকা দেখা যায়। শীতকালে ভূতলে ভিন্ন ভিন্ন তাপপরিমাণবিশিষ্ট বায়ুর সংঘাতেও ঐরূপ হইয়া থাকে। শিলাবৃষ্টি। বৃষ্টি হইবার সময়, অতিশয় শীতল বায়ু প্রবাহ সংবােগে ও তাড়িতের শক্তি বিশেষে বৃষ্টির জল জমাট হইয়া শিলা বৃষ্টি হয়। সচরাচর শিলাগুলি ক্ষুদ্র, শুভ্রবর্ণ ও গােল । কখন কখন উহাদের অন্যবিধ আকার হইয়া থাকে। সময়ে সময়ে পারাবতের ডিম্বের ন্যায় বৃহৎ হয়, এবং পতনকালে উহার ২। ৪ টী মিলিত হইয়া প্রবল বেগে ভূতলে পড়ে। শীত কাল অপেক্ষা গ্রীষ্মকালে এবং গ্রীষ্মধিক্য হইলে অধিক শিলা বৃষ্টি হয়। বৃহৎ বৃহৎ শিলাপতন হইলে ভয়ানক ক্ষতি হয়। তাহাতে বৃক্ষাদির ফলপুষ্প শাখাদি ভগ্ন ও চূর্ণ হয়, মনুষ্য গবাদি নিধন প্রাপ্ত হয় এবং গৃহাদি ভগ্ন হইয়া যায়। তুষার ও বরফ। শীতকালে বায়ুরাশির উন্নত প্রদেশে যে বাষ্প অবস্থিতি করে, তাহা শীতল বায়ু সংযােগে বরফের ন্যায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তুষারকণায় পরিণত হইয়া পতিত হইতে থাকে। শীতপ্রধান দেশে রজনীকালে এত অধিক তুষারকণা পতিত হয়, যে তদ্বারা মনুষ্যাদি আচ্ছাদিত ও প্রােথিত হইয়া যায়। গ্রীষ্মমণ্ডলের উন্নত গিরিশিখরে এইরূপ তুষার সঞ্চার হয়। এই সকল পৰ্বতের উৰ্দ্ধ ভাগ প্রায় বরফে আচ্ছন্ন দেখা যায়। ৫

১১১ )
শীতের আতিশয্য বশতঃ মেরু-সন্নিহিত দেশের সাগর ও
অন্যান্য জলাশয়ের জলের উপরিভাগ জমিয়া কঠিন প্রস্তরবৎ
হয়, তাহার উপর দিয়া অনায়াসে গমনাগমন করা যায়।
কখন কখন শীতের আতিশয্য হইলে কৃষ্ণসাগর, এড্রিয়াটিক
সাগর ও ইটালী দেশের কোন কোন নদীর জলও জমিয়া
গিয়াছে তাহার বিবরণ পাঠ করা যায়। ১২০৫ খ্রীঃ অব্দে
ইংলণ্ডে বরফ পড়িয়া প্রায় তিনমাসকাল কৃষিকার্যের ব্যাঘাত
করিয়াছিল। তৎকালে নদী, খাল, পুষ্করিণী প্রভৃতি জলা-
শয়ের জল জমাট হইয়া গিয়াছিল। ১৮১৪ খৃঃ অব্দে লণ্ডনের
নিকট টেমস নদীর জল জমাট হয়, তাহার উপর দিয়া লােক
যাতায়াত করিয়াছিল। উহার পরে আর ওরূপ ঘটে নাই।
বরফ জল অপেক্ষা লঘু, এজন্য উহা জলের উপরে ভাসে।
যদি বরক জল অপেক্ষা ভারী হইত তাহা হইলে মগ্ন হইয়া
সাগরতলের জীবগণ বিনাশ করিয়া ফেলিত।
তুষার ক্ষেত্র। যে যে প্রদেশের উন্নত ভূমি চিরতুহিনাচ্ছন্ন,
শীতাতিশয্য হইলে তাহার সন্নিহিত ভূমিখণ্ড বরফে আবৃত
হয়। নরওয়ে দেশের মালভূমিতে এইরূপ ঘটে। কোন উন্নত
স্থান হইতে উহার প্রতি দৃষ্টিপাত করিলে বােধ হয় যে অসীম
তুষার ক্ষেত্র বিরাজ করিতেছে । যে দেশে বিস্তীর্ণ মালভূমি
নাই, সেখানে পৰ্বত শ্রেণী সমূহের মধ্যবর্তী নিম্নস্থানে তুষার
সঞ্চিত হয়। এই সকল ভূভাগে বৃষ্টির পরিবর্তে তুষারপাত
হয়, সুতরাং গ্রীষ্মাগমে উহা দ্রব হইতে না পারিলে কাল
ক্রমে পৰ্বতাকার হইয়া উঠে। গ্রীনলণ্ড দেশে কয়েক শত
ফুট পুরু হইয়া বিশাল তুষার ক্ষেত্র অবস্থিতি করিতেছে। ঈদৃশ
ক্ষেত্রের প্রান্তভাগ ভগ্ন হইয়া বজ্রপাতের ন্যায় শব্দ করতঃ

( ১১২ ) নিকটবর্তী নিম্নপ্রদেশ অভিমুখে ধাবমান হয়। উহার শক্তিতে প্রস্তর বৃক্ষাদি ভগ্ন ও চূর্ণ হয় এবং গ্রামাদি বিনষ্ট হইয়া যায়। আল্প পৰ্বতের উন্নত ভাগে এইরূপ ঘটে বলিয়া,তত্ৰত্য লােকে বৃহৎ বৃক্ষশ্রেণী রােপণ করিয়া কিয়ৎ পরিমাণে আত্মরক্ষা করে। ইহা হিমশিলা নামে খ্যাত। হিমশিলা। গ্রীষ্ম-প্রধান দেশের উন্নত পৰ্ব্বতের উদ্ধাদেশ চিরদিন তুষারাবৃত থাকে। শীতকালে তাহার নিম্নদেশের অনেক দূর পর্যন্ত তুষারমণ্ডিত হয়। গ্রীষ্মগমে এই তুষার- রাশি দ্রৰ হইতে থাকে, তখন তাহার নিকটে গমন করিলে কখন কখন সহসা হিমশিলা স্থলিত হইয়া হতভাগ্য মনুষ্য- দিগকে একেবারে চূর্ণ ও প্রােথিত করিয়া ফেলে ; এক একটা হিমশিলা এত প্রকাণ্ড যে তাহার দৈর্ঘ্য এক মাইল ও উচ্চতা ফুট। উপত্যকা ও গহ্বর হিমশিলা জন্মিবার উপযুক্ত স্থান। হিমশিলার সহিত ক্ষুদ্র প্রস্তর খাদি চালিত হইয়া , দূরবর্তী স্থানে নীত হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠে যে সকল হিমশিলা ভাসমান থাকে তাহাদের আকার আরও বৃহৎ। উহাদের পরিমাণ ৫। ৬ বর্গমাইল এবং উহারা সাগর পৃষ্ঠ হইতে ২০০৩০০ ফুট উচচ। জলের অভ্যন্তরে উহার ৮। ৯ গুণ নিমগ্ন থাকে। গ্রীণ্ডের পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলের অনেক স্থান ভগ্ন। সেই সকল স্থান হতে হিম- শিলা স্থলিত হইয়া স্রোতে ভাসিতে ভাসিতে নিউ-ফৌলও পৰ্যন্ত উপনীত হয়। হিমশিলার সহিত প্রস্তরখাদি যাহা ভাসিয়া আসে তৎসমুদায় নিউফৌণ্ডলণ্ডের নিকটস্থ সাগরে খসিয়া পড়ে। কারণ উপসাগরীয় স্রোতের উত্তাপে এই স্থানে বরফরাশি দ্রব হইতে থাকে। দক্ষিণ মহাসমুদ্র হইতে ( ১১৩ ) অনেক হিমশিলা উত্তমাশা অন্তরীপের নিকটবর্তী সাগরে উপ- স্থিত হয়। হিমশিলার নিকটে এহাজ পড়িলে বড়ই বিপদ • ঘটে। উছার উপরিভাগ হইতে অনুক্ষণ বাষ্প উথিত হইয়া কুটি কাবৎ প্রতীয়মান হয় এবং উহার সহিত বায়ু অতি- শয় শীত বােধ হয়। হিমশিলা এত বৃহৎ যে তাহার আঘাত লাগিবামাত্র জাহাজ ভগ্ন হইয়া আরােহীদিগকে হিমময় সাগরে মগ্ন করে । তিনি মৎস্য হিমময় সারে বাস করে। উত্তর সাগরের তিমি গ্রীষ্মমণ্ড অতিক্রম করিয়া দক্ষিণ সাগরে যাইতে পারে না, কারণ গ্ৰীম-শগুলের সাগর উহাদের পক্ষে এগ্নিকাণ্ডবৎ। ইংলণ্ড, ফ্রান্স, যাণ্ড ও আমেরিকার বহুসংখ্যক জাহাজ তিমি ধরিবার জন্য উত্তর ও দক্ষিণ মহাসাগরে এভিমত পরিভ্রমণ করিতেছে। শিশির। কোন পদার্থ রাত্রিকালে বারে বায়ুতে থাকিলে ৬ হতে তাপ বিকীর্ণ হইয়া যাওতে 'বাপেক্ষা অনেক শীত হয়। এই শীতল পদার্থে: 5ংলগ্ন বায়ুর চলীয় বাষ্প শীত হইয়া বিন্দু বিন্দু আকারে শিশির র” পরিণত হর ও উক্ত পদার্থের গাত্রে লাগিয়া থাকে। শীতকালের রজনীতে কখন কখন শিশির জমিয়া যায়, ভাতা প্রাতঃকালে শুভ্রবর্ণ তুলার ন্যায় দেখায়। কোন গদাৰ্থ হইতে যে পরিমাণে তাপ বিকীর্ণ হয়, তাহাতে তত শিশির দেখা যায়। ঘাস, মেষের ললাম, কচুর পাতা প্রভৃতি উহার উত্তম উদাহরণ। রজনীতে বাতাস হইলে শিশিরসঞ্চারের বাধা হয়। আবৃত স্থানে শিশির সঞ্চিত হয় না, মেঘ হইলেও শিশিরের বাধা জন্মে। মেঘ হইলে ভূপৃষ্ঠ হইতে তাপ বিকিরণের বাধা হয়,

( ১১৪ )
সুতরাং বায়ু অপেক্ষাকৃত উষ্ণ থাকে। তাহাতে আর শিশির
সঞ্চয় হইতে পারে না।
দ্বাদশ অধ্যায়ের প্রশ্ন।
১। তাপমান যন্ত্রের কত ডিগ্রী উত্তাপ হইলে বরফ জন্মে, কত উত্তাপে
জল ফুটিয়া উঠে?
২। কলিকাতার গড় উত্তাপ কত ডিগ্রী? উহার উত্তাপের উচ্চ ও নিম্ন
সীমা কত ?
৩। উর্ধে উঠিলে উত্তাপের হ্রাস অনুভব হয় কেন?
৪। কি কি কারণে শীতাতপ ভেদ হয় ?
৫। পৃথিবীর কোন্ স্থানে শীত ও গ্রীষ্ম অধিক ?
৬। দেশে অরণ্য থাকিলে শীতপের কি ভিন্নতা হয় ?
৭। কিরূপে ভূমির তাপের আধিক্য হয় ?
৮। সমােষ্ণতাসূচক রেখার দ্বারা কি জানা যায় ?
৯। কলিকাতা ও লণ্ডনের সমােষ্ণতাসূচক রেখায় কোন্ কোন্ স্থান আছে ?
১০। বিষুবরেখার উত্তরের ভূভাগ অপেক্ষা দক্ষিণের ভূভাগে উষ্ণতা কম
কেন ?
১১। সমুদ্র দ্বারা কিরূপে উষ্ণতার ভেদ হয় ? .
১২। বায়ুতে কোন্ কোন্ পদার্থ কি কি পরিমাণে আছে ?
১৩। বায়ুর গতি হইবার কারণ কি ?
১৪। বাণিজ্য-বায়ু কাহাকে বলে ও তাহার কারণ কি ?
১৫। ভারতবর্ষে যে দুই প্রকার বায়ু প্রবাহিত হয় তাহার কারণ নির্দেশ
.
১৬। সমুদ্র ও স্থলভাগ সম্বন্ধে কিরূপে বায়ু প্রবাহিত হয় ?
১৭। লুং কাহাকে বলে ও উহার উৎপত্তি কিরূপে হয় ?
১৮। মেঘ জন্মিবার কারণ কি? কিরূপে বৃষ্টি হয় ?

( ১১৫ )
১৯। ভূমণ্ডলের কোন্ কোন্ স্থানে অধিক বৃষ্টি হয়, ও কোন কোন স্থানে
এয়ই হয় না? কারণ নির্দেশ করিয়া বল।
২০। শিলাবৃষ্টি, তুষার পতন, বৃষ্টি ও বরফ সঞ্চয় কি কি কারণে হয় ?
২১। বায়ু দ্বারা কি কি নৈসর্গিক কাৰ্য্য সাধিত হয় ?
২২। ঘূর্ণিবায়ুর কারণ কি? উহার গতির নিয়ম কি ?
২৩। জলস্তম্ভ কি কারণে উৎপাদিত হয় ?
২৪। শিশির জন্মিবার কারণ কি? কি কি কারণে উহার বাধা হয় ?
২৫। হিমশিলার বিবরণ লিখ। সাগরে কি রূপে হিমশিলা জন্মে ?
২৬। ভূপৃষ্ঠে যে দিগ হইতে বায়ু বহে, উর্ধে তাহার বিপরীত বায়ু বহে
উহার প্রমাণ কি?
২৭। এতদ্দেশে বায়ু প্রবাহ ও বৃষ্টির সম্বন্ধ কি বুঝাইয়া দাও ।
২৮। বায়ুতে জলীয় বাষ্প না থাকিলে কি হইত ?
২৯। তুষার ক্ষেত্র কাহাকে বলে ?
৩০। কুজঝটিকা কিরূপে উৎপন্ন হয় ?
৩১। সূর্যমণ্ডলে কৃষ্ণবর্ণ যে সকল দাগ আছে, তারা পৃথিবীর কি
লাভালাভ হয় ?
ত্রয়ােদশ অধ্যায়।
এক্ষণে
উদ্ভিজ্জ সংস্থান ।
ভূমণ্ডলে যে সকল উদ্ভিদ আছে পণ্ডিতগণ তাহাদিগকে
ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণী ও জাতিতে বিভক্ত করিয়াছেন।
১২০,০০০ জাতীয় উদ্ভিদ আবিষ্কৃত হইয়াছে, তন্মধ্যে ১০৩০ ০০
সপুষ্পক ও ১৭০০৫ অপুষ্পক। এক্ষণে যে যে জাতির উদ্ভিদ
দৃষ্ট হয়, উহারা এক সময়ে ভূতলে আবির্ভূত হইয়াছে এরূপ
নহে। নানা জাতীয় তৃণ, শৈবালাদি বহুদেশব্যাপী।

( ১১৬ ) হয় এই গুলি প্রথমে জন্মিয়াছে। যে সকল উদ্ভিদ অল্পদুর- ব্যাপী সেই গুলি পরে জন্মিয়াছে। অনেক উদ্ভিদ সইসা বহু- দূরে ব্যাপ্ত হইতে পারে। উহাদের বীজ বায়ু ও ঝটিকাদ্বারা দুরে চালিত হয়, কখন বা প্যাদির উদরে থাকিয়া দূরদেশে নীত হইয়া থাকে। কখন বা নদী সমুদ্র প্রভৃতি জলরাশি দ্বারা ঐ সকল বীজ দূরে বাহিত হয়। মনুষ্য দ্বারাও এক দেশ হইতে ভিন্ন দেশে গৃহীত ও যত্নে পালিত হইয়া বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। সল দেশে ও সৰ্ব্ব সময়ে সর্ব প্রকার উদ্ভিদ জন্মে না, ইহা অনেকেই অবগত আছেন। আমাদের ভারতবর্ষের নানা স্থানে নানা প্রকার শস্যাদি উৎপন্ন হয়। কোনটা বা বঙ্গদেশে, অন্যটী উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে জন্মিয় থ:কে। এই বঙ্গদেশেরও সকল জেলার উৎপন্ন দ্রব্যের প্রকারভেদ হইয়া থাকে। এস্থলে সংক্ষেপে উহার কয়েক কারণ উল্লিখিত হইতেছে। (১) শীতাতপের ন্যূনাধিক্য উদ্ভিদের প্রধান কারণ বলিয়া উপলব্ধি হয়। বিষুবরেখার নিটবর্তী গ্রীষ্ম প্রধান দেশে যে যে শস্যাদি জন্মে, অপেক্ষাকৃত শীতল স্থানে সে গুলি দৃষ্ট হয় না। গ্রীষ্মমণ্ডলের পৰ্বতাদির নিম্নভাগ হতে ক্রমে যত উন্ধে আরােহণ করা যায়, ততই অধিক শীত অনুভূত হয় ও শীত প্রধান দেশের উদ্ভিজ্জ দেখা যায়। ক্রমে হিমালয়, এণ্ডিস প্রভৃতি পৰ্ব্বতের উন্নত প্রদেশে উঠিলে মেরু:সন্নিহিত ভূভাগের ক্ষুদ্রাবয়ব শৈবালাদি দেখা যায় ; আরও উদ্ধে চির- তুহিনাচ্ছন্ন শিখরদেশ নয়নপথে পতিত হয়। ২) বায়ু ও ভূমির আর্দ্রতাভেদেও শস্যাদির প্রভােদ হয়। সকল উদ্ভিজ্জ সমপরিমাণে বৃষ্টির উপর নির্ভর করে না, কিন্তু এককালে জলের অভাব হইলে কোন প্রকার উদ্ভিজ্জ

( ১১৭ )
'
}
জন্মে না। সাহারা প্রভৃতি জলশূন্য ভূভাগে বৃক্ষতৃণাদি অতি
বিরল।
(৩) মৃত্তিকাদির রাসায়নিক প্রকৃতি অনুসারে ও উদ্ভিজ
ভেদ হইয়া থাকে। সকল প্রকার মৃত্তিকায় সকল শস্যাদি
জন্মে না, এজন্য কৃষকের ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন প্রকার
শস্য উৎপাদন করে। অন্য প্রকার উদ্ভিজ্জের পক্ষেও এই
নিয়ম। যে যে পদার্থের যােগে উদ্ভিজ্জবিশেষের অবয়ব বৃদ্ধি
হয়, সে সমুদায় সকল ভূমিতে সমপরিমাণে থাকে না।
কয়েক প্রকার প্রয়ােজনীয় উদ্ভিদের উৎপত্তি স্থান প্রভৃতি
নিম্নে লিখিত হইল।
(১) খাদ্যউদ্ভিদ।এই গুলি চারি শ্রেণীতে বিভক্ত ;
শস্য, ফল, মূল, মসলা ইত্যাদি। মনুষ্যের যত্নে এক প্রদেশের
শস্য, ফল, মূল ভিন্ন দেশে নীত হইতেছে এবং কৃষিকার্যের
উন্নতি সহকারে খাদ্য দ্রব্যের প্রকৃতির উৎকর্ষ সাধিত
হইতেছে। ধান্য, গােলআলু প্রভৃতি দ্রব্য আদিম অবস্থায়
যেরূপ ছিল এক্ষণে তাহা অপেক্ষা কত সুস্বাদ হইয়াছে এবং
ভবিষ্যতে আরও উৎকৃষ্ট হইবে ।
(ক) শস্য।-ধান্ত, ভুট্টা, মটর, কলাই প্রভৃতি গ্রীষ্মপ্রধান
দেশ জাত। গােধূম ও জৰ অপেক্ষাকৃত শীতল দেশে জন্মে
এবং অনেক সভ্যজাতির আহারে লাগে। যৈ শস্য ইংলণ্ড,
স্কটলও প্রভৃতি উত্তর দেশে জন্মে। এদেশেও শীতকালে
উহার চাস হয়।
(খ) ফল।-আষ, কঁাটাল, আতা, পেয়ারা, জাম, আনা
রস, নারিকেল, শ্রম্ভা,খর্জুর, কুল, লিচু, প্রভৃতি উষ্ণ দেশজাত।
উৎকৃষ্ট দাড়িম্ব, দ্রাক্ষা, কমলালেবু প্রভৃতি ফল অপেক্ষাকৃত

( ১১৮ ) শীতল দেশে উৎপন্ন হয়। যে দেশে আরও অধিক শীত তথায় অনেক প্রকার অম্নরস বিশিষ্ট ক্ষুদ্র ফল দৃষ্ট হয় ; যথা পীচ, বেরী, প্রভৃতি। (গ) মূল।-মূলের মধ্যে কয়েক জাতীয় আলু অধিক ব্যব- হৃত হয়। গোল আলু বা বিলাতীআলু পূৰ্বে আমেরিকার চিলি প্রদেশের বনে প্রাপ্ত হওয়া যাইত। ৩০০ বৎসরে উহা সৰ্ব্বস্থানে ব্যাপ্ত হইয়া প্রধান আহারসামগ্রী মধ্যে গণ্য হইয়া উঠিয়াছে। আরারূট, সাগু, টেপিওকা গ্রীষ্মপ্রধান দেশে জন্মে। (ঘ) মসলা প্রভৃতি দ্রব্য।-এলাচি, লবঙ্গ, দারুচিনি তেজপত্র, মরিচ প্রভৃতি এশিয়ার দ্বীপ সমূহে এবং ভারতবর্ষ ও আমেরিকার উষ্ণ প্রদেশে উৎপন্ন। চা প্রথমে আসাম ও চীনদেশে জন্মিত, এক্ষণে হিমালয়শ্রেণীর সন্নিহিত অনেক স্থানে উৎপাদিত হইতেছে। কাফি প্রথমত আফ্রিকার পূৰ্ব্বখণ্ডে প্রাপ্ত হওয়া যাইত, এক্ষণে দক্ষিণ আমেরিকার ও এসিয়ার কোন কোন দ্বীপে জন্মিতেছে। চা এবং কাফি অনেক সভ্য জাতির প্রধান পানীয় মধ্যে গণ্য হইয়াছে। ভারতবর্ষে ইক্ষু ও খেজুরের রসে শর্করা উৎপন্ন হয়। এক্ষণে আমেরিকার উষ্ণ প্রদেশে ইক্ষুর চাস হইতেছে। ফ্রান্স ও জম্মুনির লােকে বীটপালঙ্গের মূল হইতে চিনি প্রস্তুত করিয়া থাকে। ফ্রান্সের বীট অতি সুস্বাদ। কলিকাতার বাজারেও এক্ষণে পূৰ্ব্বাপেক্ষা উৎকৃষ্টতর বীট পাওয়া যায়। ২। কতিপয় উদ্ভিদ হইতে সূত্র হয়, এই গুলি দিয়া বস্ত্রাদি প্রস্তুত করা যায়। অন্য কতকগুলি হইতে রঙ প্রস্তুত হয়। } . - * ( ১১৯, ): শতাধিক জাতীয় উদ্ভিদ হইতে বস্ত্রাদি প্রস্তুত হইতে পারে, তন্মধ্যে কার্পাস প্রধান। উহার চাস আমেরিকার ইউনাই, টেড় প্রদেশে অধিক, ভারতবর্ষেও এক্ষণে বহুল পরিমাণে হইতেছে। শণ হইতে সূক্ষ্ম সূত্র প্রস্তুত করা যায়। ভারতবর্ষে ও ইউরােপের অনেক স্থানেশণের চাস দেখা যায়। পাট ভারতবর্ষে জন্মে, এক্ষণে বিলাতের কারুকরেরা পাট দিয়া নানাবিধ বস্ত্রাদি প্ৰস্তুত করিতেছেন, এই গুলি মােটা এবং শক্ত। নারিকেলের খােসা হইতে স্থূল রজু প্রস্তুত হইয়া থাকে। তুতগাছের পত্ৰ খাইয়া গুটীপােকায় যে রেশম-সূত্র প্রস্তুত করে, তাহাতে বস্ত্রাদি প্রস্তুত হইয়া থাকে। জাতীয় কীটে বৃক্ষ বিশেষের পাতা খাইয়া তসরের সূতা উৎ- অন্য এক পন্ন করে। • রঙের মধ্যে নীল প্রধান। নীলেরছ ভারতবর্ষে জন্মে। ইউরােপে ম্যাডার নামক বৃক্ষ হইতে লালরঙ প্রস্তুত হয়। ভারতবর্ষের বকম কাঠেও লাল রঙ প্রস্তুত হয়। মেক্সিকো প্রদেশে কোচিনীল নামক পতঙ্গ হইতে লালরঙ প্রস্তুত হইয়া থাকে, এই পতঙ্গ এক প্রকার কণ্টক বৃক্ষভােজী। ৩। উদ্ভিদের মধ্যে যে গুলির কাষ্ঠ ও তক্তা দ্বারা নৌকা, গৃহসামগ্রী ও কড়িকাঠ প্রভৃতি প্রস্তুত হয়, তৎসমুদায় মনুষ্যের পক্ষে অতিশয় হিতকারী। এতদ্দেশের শাল, শিশু, সেগুণ, কঁাটাল, তুদ, আবলুষ প্রভৃতি কাঠ সৰ্ব্বদা ব্যবহারে লাগে। এতদ্ভিন্ন আত্ৰ, জারুল, শিমুল, সুন্দরী প্রভৃতির তক্তাও সচরাচর ব্যবহৃত হয়। আমেরিকার মেহগনি বৃক্ষের কাঠ অতি উৎ- কষ্ট। এক্ষণে এই দেশে উক্ত গাছ জন্মিতেছে। বিলাত

( ১২০ )
৪।
হইতে ওক কাঠ আসিয়া থাকে, উহা জাহাজ নির্মাণে লাগে।
যে কাষ্ঠ হইতে বােতলের ছিপি প্রস্তুত হয়, তাহাকে“কাক’
বৃক্ষ বলে। উহা ইউরােপের উত্তর প্রদেশে জন্মে।
কয়েক জাতীয় উদ্ভিদ বা তাহার নির্যাস ঔষধ রূপে
ব্যবহৃত হয়। তামাক, সিদ্ধি, ‘আফিঙ, কুচলিয়া, হরিতকী,
হিঙ, প্রভৃতি এই শ্রেণীভুক্ত। অনেকে এই গুলির প্রকৃত
গুণ না জানিয়া অসময়ে ব্যবহার করেন। তাহার ফল অচি-
রাৎ দৃষ্ট হয়। সিঙ্কোনা বৃক্ষ , হইতে কুইনিন প্রস্তুত হয়।
ঐ বৃক্ষ এক্ষণে সিকিম প্রদেশে জন্মিতেছে।
৫। কতিপয় বৃহৎ বৃক্ষ পক্ষ্যাদির বাসস্থান স্বরূপ আছে।
এই সকল বৃক্ষতলে পথশ্রান্ত লােক জন বিশ্রাম করিয়া থাকে।
এদেশে অশ্বথ, বট প্রভৃতি এই জাতীয়। আফ্রিকার সেনি-
গাল প্রদেশে এই জাতীয় অতি বৃহৎ বৃক্ষ দৃষ্ট হয়, ইহার নাম
“বেওয়াব”। কালিফর্ণিয়া উপদ্বীপে ৪০০/৫০০ ফুট দীর্থ,
৪০৫০ ফুট পরিধি বিশিষ্ট বৃক্ষ দেখা যায়। সিকিম প্রদেশে
“ওক’’ জাতীয় এক প্রকার গাছ আছে, তাহা ২০০ ফুট উচ্চ।
হিমালয় পর্বতে দেবদারু বৃক্ষ আছে, তাহা ঐরূপ উচ্চ।
উহার আকার ও প্রকৃতি বঙ্গদেশীয় দেবদারুর ন্যায় নহে।
৬। উদ্ভিদের মধ্যে পুষ্পবৃক্ষ সৰ্ব্বাপেক্ষা মনােহর।
সুবৃহৎ “ভিক্টোরিয়া রিগিয়া’ পুষ্প দক্ষিণ আমেরিকায় দৃষ্ট হয়।
এক্ষণে নানা দেশে ব্যাপ্ত হইয়াছে।
সমুদ্র মধ্যেও নানা জাতীয় উদ্ভিদ আছে, উহার কোনটা
ছােট, কোনটী বড়। পূর্বে যে শৈবালসাগরের উল্লেখ করা ।
গিয়াছে, তাহার কোন কোন স্থানের তৃণ ৭০০ ফুট দীর্ঘ।
উদ্ভিদগণ প্রায় পৃথিবীর সকল স্থান অধিকার করিয়া

{ ১২১ ) আছে। যে দেশে বৃহৎ বৃক্ষাদি অধিক নাই সেখানে অল্প বৃষ্টিপাত হয়, এজন্য এক্ষণে সভ্যদেশ সমূহে বৃক্ষাদি সংরক্ষণের জন্য বিশেষ যত্ন হইতেছে। বৃক্ষতলে ক্ষুদ্র জঙ্গল ও তৃণাদি থাকিলে ভূমি আর্দ্র থাকে, তাহাতে কতক উপকার হয়। রাস্তার ধারে বৃক্ষশ্রেণী থাকিলে পান্থগণের শান্তি দূর হয় এবং দূষিত বাষ্পবিশিষ্ট জলাভূমির প্রান্তে বৃক্ষরােপণ করিলে উক্ত বাষ্প বায়ু দ্বারা চালিত হইয়া সন্নিহিত গ্রামে যাইয়া পীড়া- দায়ক হতে পারে না। এরূপ স্থান অতি বিরল, যেখানে কোন না কোন প্রকার উদ্ভিদ দেখা যায় না। উষ্ণ প্রস্রবণ ও আগ্নেয় গিরির গহ্বরে ও উদ্ভিদ দৃষ্ট হয়। কেবল নিরবচ্ছিন্ন মরুভূমি ও তুষারমণ্ডিত গিরিশিখর উদ্ভিদশূন্য বলিয়া অনুভূত কখন কখন বরফের উপরেও ক্ষুদ্র উদ্ভিদ জন্মে। কোন কোন উদ্ভিদের বীজ অতি দীর্ঘকাল স্থায়ী, ৪৫ হাজার বৎসর পরেও অঙ্কুরিত হইয়াছে। কতকগুনি এত ক্ষুদ্র যে, বায়ুর সহ কয়েক সহস্র মাইল দূরে চালিত হইয়া অঙ্কুরিত হইয়া থাকে হয়। ত্রয়ােদশ অধ্যায়ের প্রশ্ন। ১। কি কি কারণে উদ্ভিজ্জের ভেদ হইয়া থাকে ? ১। কোন্ কোন্ উদ্ভিদ আমাদের প্রয়ােজনে লাগে ? ৩। কয়েকটী প্রধান প্রধান উদ্ভিদের জন্মস্থান নিরূপণ কর। ৪। পৰ্বতাদি আরােহণ কালে কিরূপে উদ্ভিজ্জভেদ লক্ষিত হয় ? ৫। উদ্ভিজ্জ দ্বারা আমাদের কি কি উপকার হয় ? ৬। শাল, সেগুণ, ওক্ প্রভৃতি কোথায় জন্ম ও কি কাজে লাগে ? ৭। সর্বাপেক্ষা বৃহৎ বৃক্ষ কোথায় দেখা যায় ?

( ১২২ ) চতুর্দশ অধ্যায়। জীব-সংস্থান। উষ্ণ প্রদেশে রৌদ্র ও বৃষ্টির আধিক্য বশতঃ বৃক্ষাদি শী শীঘ্র বর্ধিত হয় এবং মনুষ্যের উৎপাত না হইলে অল্পদিনের মধ্যে নিবিড় অরণ্য রূপে পরিণত হয়। এই জন্য গ্রীষ্ম-প্রধান দেশই অনেক বৃহৎ উদ্ভিজ্জর জন্মস্থান। কোন কোন প্রাণিগণ উদ্ভিদভােজী, অন্য গুলি উদ্ভিদভােজী প্রাণী হত্যা করিয়া আহার নির্বাহ করে। যেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণে উদ্ভিদ জন্মে, তথায় অধিক প্রাণী থাকিবার সম্ভাবনা, এজন্য গ্রীষ্ম- প্রধান দেশেই অধিক প্রাণীর বাসস্থান। শীতপ্রধান দেশেরও অর্ণবচর তিনি প্রভৃতি জন্তু বৃহৎ। জন্তুগণ একস্থান হইতে অন্য স্থানে গমন করিতে পারে, সুতরাং উছারা উদ্ভিদ অপেক্ষা অধিক দূরব্যাপী, কিন্তু অনেক জন্তু নির্ধারিত সীম উল্লঙ্ঘন করিতে পারে না। জীব- মাত্রেরই খাদ্য নিরূপিত আছে, এবং উহারা লােমাদি গাত্রবরণ অনুসারে শীতল বা উষ্ণ দেশে বাস করিতে পারে। মেরুসন্নিহিত দেশের বগা হরিণ উত্তাপ সহ্য করিতে অক্ষম, উজাতীয় লামা নামক জন্তু শীতে কাতর হয় না, কিন্তু আর্দ্র স্থানে বাস করিতে পারে না। উষ্ট্র শীতপ্রধান বা আর্দ্র স্থানে কখনই জীবিত থাকে না। যে যে জীব, কীট, পতঙ্গ পল্লবাদি ভক্ষণ করিয়া জীবনধারণ করে, উহারা হয়ত যেখানে বার মাস এই সকল খাদ্য পাওয়া যায়, এইরূপ স্থানে বাস করে, অথবা এক দেশে খাদ্যের অভাব হইলে ভিন্ন দেশে

( ১২৩ )
}
গমন করে, কিম্বা শীতকালে নিদ্রা যায়। কোন কোন জীবের
শৈশবকালে একপ্রকার আহার, পূর্ণবয়সে ভিন্ন প্রকার ;
উহাদের জনক জননী সন্তানেৎপাদন কালে সন্তানগণের
আহারের উপযােগী স্থানে বাস করে। কোন কোন পক্ষী
এই নিয়মের অধীন।
কখন কখন বৃহৎ পৰ্বত, নদী, অরণ্য বা মরুভূমি থাকাতে
এক প্রদেশের কোন কোন জীব নিকটবর্তী প্রদেশে যাইতে
পারে না। যথা, হিমালয় পর্বত এবং আরব, পারস্য ও
আফ্রিকার মরুভূমি হস্তিজাতির বাসস্থানের উত্তর সীমা বলিয়া
নিৰ্বাচিত রহিয়াছে। সৰ্ব্বাপেক্ষা সমুদ্রই জীবভেদের প্রধান
কারণ। অষ্ট্রেলিয়া, নবজীল ও দক্ষিণ আমেরিকায় মেষ,
অশ্ব, গবাদি পূর্বে একটী ও ছিল না। কিন্তু এক্ষণে এই সকল
স্থানে উক্ত কয়েক প্রকার জন্তুর সংখ্যা অতিশয় বৃদ্ধি হইয়াছে।
ইউরােপীয়ের। ২৪ টী করিয়া যে গুলি আনিয়াছিল, তাহাদের
বংশ বৃদ্ধি হইয়া এক্ষণে অগণ্য হইয়া গিয়াছে।
জন্তু সকল স্থানে বাস করিতে পারে না বটে, কিন্তু গ্রাম্য জন্তু-
গণ মনুষ্যের সঙ্গী হইয়া সকল স্থানে বাস করিবার যােগ্য
হইয়াছে।
উদ্ভিদের ন্যায় জন্তুগণও সর্বত্র ব্যাপী। কি পর্বতশিখর,
কি মেরু সন্নিহিত প্রদেশ, কি জলরাশি বা সমুদ্রতল সর্বত্রই
জীবের আবাস দৃষ্ট হয়। গ্রীষ্মপ্রধানদেশে প্রাণীর সংখ্যা
অধিক, ক্রমে যুত হিমপ্রধান দেশে যাওয়া যায়, ততই জীবের
সংখ্যা অল্প দেখা যায়। জীববিশেষের উৎপাতে অন্য জীবের
সংখ্যার হ্রাস হয়, ও কখন কখন এককালে তিৱােৰু হইয়া
থাকে। মনুষ্যের উৎপাতে ঝ্যাম্ৰাদি হিংস্র জন্তু প্রায়ই নিপাত
সকল

.
( ১২৪ )
হইয়া যাইতেছে। তৃণভােজী জীবের হ্রাস হইলেও শ্বাপদগণ
আহারভাবে মারা যায়।
এশিয়ার দক্ষিণভাগে যত মাংসাদ জন্তু আছে এত আর
কুত্রাপি নাই। সিংহ, ব্যাঘ, শৃগাল ও নেকড়ে বাঘ প্রধানতঃ
এশিয়ার দেখা যায় । কিন্তু আফ্রিকার বিরল নহে। ব্যাঘ্র
এদিকে কাস্পিয়ান সাগর হইতে প্রশান্ত মহাসাগর, ওদিকে
জাবাদ্বীপ হইতে আমুর নদী পর্যন্ত দৃষ্ট হয়। ভারতমহা-
সাগরীয় দ্বীপের পক্ষিগণ যেরূপ, সুশ্রী তেমন আর কোথাও
নাই। এই প্রদেশ রক্তশােষক বাদুড়ের বাসস্থান। দক্ষিণ
আমেরিকার নিবিড় অরণ্যে বহুবিধ বৃহৎ পতঙ্গ দেখা যায়।
অষ্ট্রেলিয়া মহাদেশে বানর ও রামন্থক এবং স্থূলচৰ্মী জন্তু
নাই। কিন্তু এই দেশে কাঙ্গারু, অপসম প্রভৃতি দ্বিগর্ভ জন্তু
আছে। আমেরিকায় ও দুই একটা দ্বিগর্ভ জন্তু দেখা যায়।
অষ্ট্রেলিয়ার আর্ণিথরঙ্কস্ নামক জন্তুর প্রকৃতি অতীব বিস্ময়
জনক। উহার ধড় আটর অর্থাৎ ধেড়ের ন্যায়, উহার চক্ষু
পাতিহাঁসের ন্যায়, উহারা স্তন্যপায়ী কিন্তু ডিম্ব প্রসব করে।
প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপসমূহে, এবং টেরাডেফিউগো ও
ফণ্ড দ্বীপে ভেক, সর্প প্রভৃতি সরীসৃপ নাই।
আফ্রিকার স্কুলচৰ্ম্মী জন্তুগণ প্রসিদ্ধ। জিরাফ, জলহস্তী
দ্বিশৃঙ্গ গণ্ডার এবং এক প্রকার হস্তী এই দেশজত। পশ্চিম
আফ্রিকায় বৃহৎ বৃহৎ বানর ও গরিলা দেখা যায়। বাের্ণিও
দ্বীপে বনমানুষ আছে। আমেরিকার বানর গুলি লেজ দ্বারা
অনায়াসে কোন বস্তু ধরিতে পারে।
আমেরিকায় মৃগনাভি, বৃষ ও দৃঢ়কেশ উল্লুক আছে।
কণ্ডর নামক পক্ষী এণ্ডিস পৰ্বতে ১৫,০০০ ফুট উর্ধে বা

নির্মাণ করে, ও অনায়াসে ২০,০০০ ফুট উর্ধে উড়িয়া উঠে। উহার ন্যায় বৃহৎ ও বলবান্ পক্ষী আর নাই। হমিংবার্ড নামক পক্ষী আমেরিকা ভিন্ন অন্য কোন স্থানে নাই। নির্দস্ত জন্তু যথা শ্লথ, আর্মাডিলাে ও পিপীলিকাভুক্ কেবল আমেরিকায় আছে। সিংহের পরিবর্তে পুমা, ব্যাঘ্রের পরিবর্তে জাগুয়ার, হস্তীর পরিবর্তে টাপীর, এবং উষ্ট্রের পরিবর্তে লামা ও আল্- পাকা আমেরিকাখণ্ডে দৃষ্ট হয়। কত ভিন্ন জাতীয় প্রাণী ভূমণ্ডলে বিচরণ করিতেছে তাহার সংখ্যা করা যায় না। প্রসিদ্ধ পণ্ডিত আগাজিজ গণনা করেন যে প্রায় আড়াই লক্ষ ভিন্ন ভিন্ন জাতি পরিজ্ঞাত হইয়াছে। এক্ষণেও ভূভাগের অনেক স্থান অনাবিষ্কৃত রহিয়াছে, কত প্রদেশ আংশিক রূপে আবিস্কৃত হইয়াছে, এবং কত নিবিড় অরণ্য ও পৰ্বত শিখর ও সাগর তলের জীব জন্তুর বিষয় রীতি- • মত অনুসন্ধান করা হয় নাই। বহু সংখ্যক ক্ষুদ্র জীব এত ছােট যে অনুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্য বিনা নয়নগােচর হয় না। কোন কোন জন্তু মনুষ্যের সাড়া পাইলেই দ্রুত বেগে পলায়ন করে। নানাজাতীয় ক্ষুদ্র জীবের অবয়ব বয়সভেদে ও স্ত্রীপুরুষ ভেদে বিভিন্ন বলিয়া, প্রতীয়মান হয়, সুতরাং চিনিয়া লইবার বেলায় ভ্রম ঘটে। মেরুদণ্ডবিশিষ্ট জীবই সৰ্ব্ব প্রধান, তন্মধ্যে স্তন্যপায়িগণ উচ্চশ্রেণীতে আরূঢ়। শেষােক্ত জীবগুলির মধ্যে আবার মনুষ্য জাতি সৰ্বশ্রেষ্ঠ। প্রাচীন পণ্ডিতেরা মনে করিতেন জগদীশ্বর স্বয়ং প্রত্যেক জাতীয় প্রাণী সৃষ্টি করিয়াছেন, কিন্তু কয়েক বৎসর হইল ডারউইন্ প্রভৃতি কতিপয় প্রাণিবিৎ পণ্ডিতেরা অনেক পরীক্ষা দ্বারা সিদ্ধান্ত করিয়াছেন যে এক জাতীয় প্রাণী হইতে অন্য- ( ১২৬ ) জাতীয় প্রাণী উৎপন্ন হইয়াছে। বর্তমান কালে অল্প সময়ের মধ্যে জন্তুবিশেষের অবস্থা পরিবর্তন করিয়া দেখা হইয়াছে যে তাহাদের আকার ও প্রকৃতি পরিবর্তিত হইয়া যায়, কিন্তু, এক্ষণেও পরীক্ষা শেষ হয় নাই; অনেক প্রধান পণ্ডিত এই সিদ্ধান্তটা সম্ভবপর মনে করেন। কিরূপে প্রথমে প্রাণী ও উদ্ভিদের সৃষ্টি হইল তাহা স্থির করা যায় না, মানা দেশীয় ধৰ্ম্মশাস্ত্রে নানা কথা লেখা আছে। বর্তমান কালের কোন কোন পণ্ডিত কাচের নলের ভিতর পদার্থ বিশেষের যােগে ক্ষুদ্র প্রাণী বা উদ্ভিদ প্রস্তুত করিয়া- ছেন এরূপ পাঠ করা যায়, কিন্তু সহসা এরূপ ঘটনা বিশ্বাস করিতে পারি না। বায়ু-রাশিতে যে অসংখ্য কীটাণু বা উদ্ভিদ- বীজ বিদ্যমান আছে, বােধ হয় তাহা কোন প্রকারে কাচের নলের ভিতর প্রবেশ করিয়া জীব বা উদ্ভিজ্জের উৎপত্তি করিয়া থাকিবে। অনেক উদ্ভিদের বীজ অদৃশ্য রূপে বায়ু দ্বারা • ইতস্ততঃ চালিত হইয়া থাকে এবং উপযুক্ত স্থান পাইলে অঙ্কু- রিত হয়। এক্ষণে সংক্ষেপে দেশভেদ অনুসারে প্রধান প্রধান স্থলচর জীব ও উদ্ভিজ্জের আবাসভূমির সীমা নির্ধারণ সূচক একটি তালিকা দেওয়া যাইতেছে। এক সীমার অব্যবহিত পরেই যে সকল জীব নূতন প্রকারে দৃষ্ট হয় এরূপ নহে, ক্রমে ক্রমে এক এক জাতির বিরলতা বা অভাব হইয়া পড়ে।

আবাস ভূমি,
এীষ্মমণ্ডল
জীবগণ।
বানর জাতি, সিংহ, ব্যাড্র, শৃগাল,
জিরাফ, হস্তী, গণ্ডার, জলহস্তী,
কুম্ভীর, কচ্ছপ, বােড়াসৰ্প প্রভৃতি
সরীসৃপ, অষ্ট্ৰীচ, ময়ুর, ময়না এবং
নানাবিধ উজ্জ্বল পক্ষ বিশিষ্ট পক্ষী,
ও নানাজাতীয় কীট পতঙ্গ।
উদ্ভিজ্জগণ।
খেজুর, নারিকেল, তেঁতুল, পেয়ারা,
আম, কলা, কঁাটাল, জাম, তরমুজ,
সাগু, ভুট্টা, ধান, চিনি, কাফি,
দারুচিনি, লবঙ্গ, জায়ফল, মরিচ,
আদা, হরিদ্রা, চন্দন, নীল, রবর,
খয়ের, মেহগনি, সেগুন ইত্যাদি।
( ১২৭ )
মধ্য দেশ বা
গাে, মহিষ, মেষ, ছাগল, হরিণ
প্রভৃতি রােমন্থক জন্তু, উ, বন্য
বরাহ, নেকড়ে বাঘ, খেকৃশেয়ালী,
বীবর, অপস, কেঙ্গারু, ইগজ,
হংস, টর্ক মোরগ প্রভৃতি, সরীসৃপ
ও পতঙ্গের সংখ্যা ক্রমে অল্প।
খেজুর, কমালেবু, লেবু, ডুমুর
দাড়িম্ব, অলি, দ্রাক্ষা, ধান্য,
ভুট্টা, গােধূম, যব, যৈ, আলু, কপি,
কুল, পেয়ারা, এপেল, চা, তামাক,
পাট, শণ, কর্কবৃক্ষ, ওক,
ইত্যাদি।

বগা হরিণ,
কটাভালুক ও মেরু
দেশীয় ভালুক ও
থেশেয়ালী,
এ প্রদেশে কোন
কোন পক্ষী বিচরণ করিতে আসে,
সরীসৃপ প্রায় নাই।
কয়েক জাতীয় বেরী নামক ফল,
কয়েক প্রকার
শৈবাল, কয়েক
জাতীয়
ফার নামক দেবদারু
ইত্যাদি।
মেরুমণ্ডল
এস্কিমাে কুকুর।
( AS)
চতুর্দশ আধ্যায়ের প্রশ্ন।
১। কি কি নিয়মে জন্তুদিগের আবাসভূমি ভেদ হয়?
২। পক্ষিগণ দেশ দেশান্তরে গমন করে তাহার কারণ কি?
৩। কি রূপে কোন্ স্থান হইতে জাতিবিশেষ তিরােহিত হয় ?
৪। জীব ও উদ্ভিদের আবাস ভূমি কয় অংশে বিভক্ত ? উহার প্রত্যেক অংশের কতিপয় জীব
ও উদ্ভিজ্জের উল্লেখ কর।
৫। কোন্ কোন্ স্থান জীবন বলিয়া বােধ হয় ?
৬। ভারতবর্ষের প্রধান প্রধান প্রাণীর উল্লেখ কর। আমেরিকা ও অষ্ট্রেলিয়া প্রদেশে কোন্
কোন্ জন্তু ও উদ্ভিদ দৃষ্ট হয় ?
৭। ডারউইন সাহেবের মত কি ?
৮। সৃষ্টি বিষয়ে কি জানা যায়।

( ১২৯ ) পঞ্চদশ অধ্যায়। মনুষ্য-জাতিভেদ। মনুষ্য নানাবিধ দ্রব্য আহার করিয়া জীবন ধারণ এবং বুদ্ধি কৌশলে গৃহনির্মাণ ও বস্ত্র প্রস্তুত করিয়া ভূমণ্ডলের সকল স্থানেই বাস করিতে পারে। উষ্ণদেশের মনুষ্য উদ্ভিদ ভােজী, নাতিশীতােষ্ণদেশের লোক উদ্ভিদ ও মাংস ভক্ষণ করে ; শীতপ্রধান দেশে উদ্ভিদ দুষ্প্রাপ্য, এজন্য তথায় মৎস্য- তৈল ও চর্বি প্রধান খাদ্য। মনুষ্য এক দেশ হইতে ভিন্ন দেশে যাইয়া বাস করিতে সক্ষম। কিন্তু দীর্ঘকাল কোন স্থানে থাকিলে তথাকার শীতাতপ, প্রচলিত খাদ্য, ও সামাজিক আচার ব্যবহার অনুসারে মনুষ্যের বর্ণভেদ ও আকারগত ভেদও জন্মিতে পারে। কিরূপে মনুষ্যের উৎপত্তি হইল তাহা বিজ্ঞানের সাহায্যে জানা যায় না, কিন্তু ভূমণ্ডল অতি দীর্ঘ কাল হইতে যে মনুষ্যের আবাস ভূমি হইয়াছে, তদ্বিষয়ে কিছুমাত্র সংশয় নাই। ইউরােপের কতিপয় পৰ্বত-গুহার মনুষ্য-কঙ্কালের কতিপয় অংশ ও মনুষ্যের গঠিত যে সকল প্রস্তরময় অস্ত্র পাওয়া গিয়াছে, তাহা কত লক্ষ বৎসর পূর্বে ব্যবহৃত হইয়াছিল স্থির করিয়া বলা যায় না। আমাদের শাস্ত্রে সত্য, ত্রেতা,দ্বাপর,কলি চারি যুগের উল্লেখ আছে। ঐ চারি যুগ দীর্ঘকাল স্থায়ী, এবং উহাদের প্রকৃতি গত ভেদ আছে। মৎস্য, কুৰ্ম্ম, বরাহ, নৃসিংহ প্রভৃতি অবতার সত্যযুগে হইয়াছিল। এক্ষণে ভূবিদ্যার অনুশীলনে জানা যায় যে এক্ষণে ভূপৃষ্ঠে যে সকল উন্নত প্রকৃতিবিশিষ্ট জীব আছে, পুরাকালে তাহাদের আবির্ভাব হয় নাই। প্রথমে কীট ( ১৩০ ) পতঙ্গাদি জন্মে এবং পর্যায়ক্রমে মৎস্য, সরীসৃপ, পক্ষী, স্তন্যপায়ী ও মনুষ্য ভূমণ্ডল অধিকার করিয়াছে। যে যুগের মনুষ্য-কঙ্কাল পাওয়া গিয়াছে তখন ভূপৃষ্ঠে শীতের আতিশয্য ছিল। তৎকালে ইউরােপে যে স্থল- ভাগ ছিল তাহা সমুদ্রবেষ্টিত এবং তথায় সৰ্ব্বদা মুষলধারে বৃষ্টি হইত। প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড হিমশিলা উহার উপকূলে এবং মালভূমিতে বিরাজমান ছিল। ভূতাগ দিয়া বৃহৎ বৃহৎ নদী প্রবাহিত ছিল এবং মনুষ্যের সহিত কয়েক জাতীয় জন্তু বাস করিত। প্রকাণ্ড হস্তী, পশমবিশিষ্ট গণ্ডার, ভল্লুক, অশ্ব, বগা হরিণ, এক জাতীয় নেকড়ে বাঘ ও সিংহ প্রভৃতি তৎ: কালে ঐ প্রদেশে ছিল। মনুষ্যজাতি ইহাদিগকে দমন করিতে এবং ইহাদের কোন কোনটীকে বধ করিয়া তাহাদের মাংস ভক্ষণ করিতে বাধ্য হইত। এ অবস্থায় মনুষ্য এক্ষণকার ন্যায় উন্নত প্রকৃতিবিশিষ্ট ছিল না। বর্তমান কালের কোন কোন অসভ্য জাতিদিগের ন্যায় ইহাদের অবস্থা ও প্রকৃতি অতি হীন ছিল। উহাদের কোন কোন জাতির শরীর ৬ ফুটের অধিক দীর্ঘ ছিল এবং মস্তকের গঠন দেখিয়া বােধ হয় যে বুদ্ধিশক্তি নিতান্ত অল্প ছিল না। মনুষ্যের আদিম অবস্থার কোন কথাই জানিবার উপায় নাই, কিন্তু এক্ষণে দেখা যাইতেছে যে সৰ্ব্বস্থানের মনুষ্যের সাধারণ সোসাদৃশ আছে। প্রকৃতির বিভিন্নতা অনুসারে পণ্ডিতেরা মনুষ্যজাতিকে তিন প্রধান শ্রেণীতে বিভক্ত করিয়াছন, যথা ইউরােপীয়, মােঙ্গলীয় ও ইথিওপীয়। এই তিন জাতির সংমিশ্রণে সঙ্কর জাতি উৎপন্ন হইয়াছে ; কোন কোন পণ্ডিত এরূপ অনুমান করেন। মালয় ও মাদাগাস্কর

( ১৩১ )
.
বাসীরা মালয়, নবগিনি ও নবহেব্রিডিসবাসী পাপুয়ান ও
অষ্ট্রেলিয়ার মেয়রি জাতি এবং আমেরিকার আদিম নিবাসীরা
এইরূপে উৎপন্ন। ইউরােপীয় ও আমেরিকীর দিগের সংমিশ্রণে
যে সকল জাতি উৎপন্ন হইয়া পিরু, মেসিকে। প্রভৃতি
প্রদেশে বাস করিতেছে তাহাদের সংখ্যা ৩৫০ বৎসরের মধে
প্রায় দুই কোটী হইয়াছে। ভারতবর্ষের পুরাবৃত্ত পাঠ করিলে
জানা যায় যে পূৰ্ব্বে চারিটী বর্ণ বা জাতি ছিল। উহাদের
সংমিশ্রণে হিন্দু সমাজের ভিন্ন ভিন্ন জাতি উৎপন্ন হইয়াছে।
পূৰ্ব্বকালে বর্ণ দ্বারা জাতির পরিচয় পাওয়া যাইত, তাহাও
প্রতিপন্ন হয়।
এদেশের ফিরিঙ্গীরাও ইউরােপীয় ও ভারতীয়
জাতির সংমিশ্রণে উৎপন্ন। উহাদের সংখ্যা নিতান্ত কম
নহে। আমেরিকায় নিগ্রো ও ইউরােপীয় দিগের সংমিশ্রণেও
ঐ রূপ সঙ্কর জাতি উৎপন্ন হইয়াছে।
১। ইউরােপীয় জাতির বাসস্থান ইউরােপ এবং এসি-
আর পশ্চিম ও দক্ষিণ ভাগ। উহাদের অবয়ব সুশ্ৰী; বাহুদ্বয়
প্রসারিত করিলে শরীরের দৈর্ঘ্যের সমান হয়, মস্তক গােল,
মুখ ডিম্বাকৃতি, নাসিকা অল্পায়ত। মস্তক ও মুখ কেশদ্বারা
আবৃত, কিন্তু শরীরে অধিক লােম নাই। উহাদিগকে
শুশ্রুল বলা হয়। উহাদের বর্ণ শ্বেত, কিন্তু বাসস্থান
ভেদে ভিন্ন প্রকার হয়। উহাদের কেশ পীত ও কৃষ্ণ
বর্ণের আভাযুক্ত
নয়নদ্বয় নীল ও কৃষ্ণাভ। কেল্টিক, গর্থিক
সাবনিক, ভূমধ্যসাগরিক, ও পারসিক, উহারা এই পাঁচ
শ্রেণীতে বিভক্ত। কেল্টিকদিগের বাস ফ্রান্সের মধ্যে ব্রিটনি
এবং ওয়েলও মান্ দ্বীপ, আয়রলণ্ড ও স্কটলণ্ডের হাইলণ্ডে ।
গথিকদিগের বাস জনি, লণ্ড, ডেন্মার্ক, নরওয়ে সুইডেন
।

( ১৩২ ) এবং আইণ্ডে। ইংলণ্ড ও স্কটলণ্ডের মনুষ্যেরা কেল্টিক ও গথিকের সংমিশ্রণে উৎপন্ন, কিন্তু উহাদের প্রকৃতিতে গথি- কের প্রাধান্য আছে। সাবনিক জাতি রুশিয়া, পােলও, হঙ্গারি, ও ইউরােপীয় তুরস্কে বাস করে। ভূমধ্যসাগরিকেরা গ্রীস, ইটালী, স্পেন, ফ্রান্স ও তুরস্কে আছে। পারসিকেরা কুর্দিস্থান, পারস্য, বেলুচিস্থান, আফগানিস্থান এবং ভারতবর্ষে দৃষ্ট হয় । ২। পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক লােক মােঙ্গলীয় বংশোদ্ভূত। এশিয়া, আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপে উহাদের বাস। উহাদের মস্তক তাদৃশ বড় নহে কিন্তু অতি- শর ভারী, উহাদের মুখমণ্ডলের অস্থি উন্নত, নাসিকা খৰ্ব্ব, চক্ষুদ্বয় পরস্পর দূরবর্তী ও চক্ষুর কোণ উচ্চ ; বর্ণ পীত, কেশ মােটা, শ্মশ্রু বিরল। উহাদিগকে শ্মশ্রুবিহীন বলা যায়। • ইউরােপীয় । মোঙ্গলীয় {{ ১৩৩ ) ৪ ৩ . মালয়। আমেরিকান বা ইণ্ডিয়ান। চীন, তিব্বত, পূৰ্ব্ব উপদ্বীপ, মােঙ্গলীয়া, জাপান, মধ্য- এসিয়া, তাতার, এসিয়ামাইনর, ককেস, হঙ্গারি ও ল্যা- ল্যাণ্ড, মােঙ্গলীয় জাতির অধিকৃত। ইউরােপীয় তুরস্কের রাজপুরুষেরা এই বংশােদ্ভূত । মাদাগাস্কার, মালয়, সুমাত্রা, জাবা, বর্ণিও ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপেও এই জাতির সন্তান সন্ততি দেখা যায়। শেষোক্ত জাতিকে কেহ কেহ মালয়জাতি বলিয়া থাকেন। উত্তর ও দক্ষিণ উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার আদিম নিবাসীরাও এই,জাতির অন্তর্গত,কেহ কেহ উহাদিগকে ইণ্ডিয়ান নাম, দিয়া থাকেন। মােঙ্গলীয়, মালয় ইণ্ডিয়ান একই শ্রেণীভুক্ত বলিয়া উপলব্ধি হয়। ৩। ইথিওপীয় বা নিগ্রোজাতি আফ্রিকা ও আয়রদেশে কাস করিতেছে। উহাদের ললাটদেশ অনুন্নত, মুখমণ্ডল বিস্তৃত ও উন্নত, ওষ্ঠদ্বর স্থূল, নাসিকা চাপা, কেশ পশমের ন্যায়, এবং চৰ্ম্ম কৃষ্ণবর্ণ। সেনিগাল ও গেন্ধিয়া নদীর অন্তর্গত প্রদেশ উহাদের আদিম বাসস্থান। এই জাতির অন্তর্গত ফেলাতা জাতি পশ্চিম আফ্রিকায় আছে, তাহাদের বর্ণ ঈষৎ

(১৩৪.')
৫
৫ ইথিওপীয় ।
রক্তাভ পাটল। দক্ষিণ আফ্রিকায় হটেন্টট, কাফ্রি ও বেচুয়ান।
জাতির বাস। পূৰ্ব্ব ও উত্তর পূর্ব আফ্রিকা গালা, নিউৰীয় ও
কপ্ট বা মিশরীয় জাতির দ্বারা অধু্যষিত। গালারা দেখিতে
আরবদিগের ন্যায়, উহাদের বর্ণ কাল নহে। মিশরীয়গণ নীল
নদীর মােহনার নিকট বাস করে, উহারাও তাদৃশ কাল নহে,
কিন্তু উহাদের নাসিকা ও মুখমণ্ডল অন্যান্য নিগ্রোদিগের
ন্যায়। আরব ও ইহুদীয়া এই জাতির শাখা, অনেক পণ্ডিড
এরূপ অনুমান করেন।
ভূমণ্ডলের লােক সংখ্যা ১০০ কোটি হইলে, মােঙ্গলীয়
জাতির সংখ্যা ৫০ কোটি, ইউরােপীয় ৩৫ কোটি ও ইথিওপীয়
১৫ কোটি হইবে।
মনুষ্যদ্বারা ভূভাগের অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়। কোন
অরণ্যময় দেশে সভ্য জাতি আগমন করিলে প্রথমতঃ জঙ্গল
কাটিয়া কৃষিকাৰ্য্য আরম্ভ করা আবশ্যক হয়, তাহাতে ভূপৃষ্ঠ
শুষ্ক হইয়া উঠে, বৃষ্টি কমিয়া যায়, এবং মৃত্তিকা হইতে
সূৰ্যাতপ প্রতিফলিত হইয়া বায়ুর তাপ পরিণ বৃদ্ধি করে।
অনেক জন্তু আহায়াভাবে নির্মূল হয়।
আমেরিকায় পূৰ্ব্বে, অশ্ব, মেষ ও গবাদি ছিল না, এক্ষণে
:

* ...
"f ১০৫
সভ্যজাতির যত্নে তথায় অসংখ্য গ্রাম্য জন্তু বিচরণ করিতেছে।
আমিেরকায় এক্ষণে ইক্ষু, কাফি, কার্পাস, মসলা ও ধান্যাদির
চাষ হইতেছে। পিরু হইতে সিঙ্কোনা নামক জ্বরনাশক তরু
ভারতবর্ষে নীত হইয়াছে। গােলআলু, তামাক ও ককে।
আমেরিকা হইতে পৃথিবীর সৰ্ব্বত্র ব্যাপ্ত হইয়াছে। মেষ,
মৎস্য ও সুস্বর পক্ষী এক্ষণে অষ্ট্রেলিয়াখণ্ডে নীত হইয়াছে।
বাণিজ্যবিস্তারসহকারে
একদেশের মনুষ্য ভিন্নদেশে
আসিয়া বাস করিতেছে। সভ্যজাতির সংসর্গে আমেরিকা,
আফ্রিকা, নবজীলণ্ড, অষ্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশের আদিম
বাসিগণ ক্রমে বিনষ্ট হইয়া যাইতেছে।
পঞ্চদশ অধ্যায়ের প্রশ্ন।
১। মনুষ্যজাতির বাসস্থান নির্দিষ্ট আছে কি না?
২। প্রধানতঃ মনুষ্য কয় জাতিতে বিভক্ত ?কোন্ জাতির লােকসংখ্যা কত?
৩। ইউরােপীয় জাতির শাখা গুলির উল্লেখ কর। কাহার কোনটি কোন
দেশে দৃষ্ট হয় ?
৪। মােঙ্গলীয়ের কোন্ দেশে বাস করিতেছে ? এই জাতির অন্য দুই
প্রধান শাখার নাম ও বাসস্থান নির্দেশ কর।
৫। মনুষ্যদ্বারা ভূভাগের,কি রূপ পরিবর্তন সাধিত হয় ?
অসভ্য ও সভ্য জাতির একত্র সমাগম হইতে কি কি ফল হয় ?
৭। কয়েকটি প্রধান জাতির বাহ্য লক্ষণ উল্লেখ কর ।
৮। কতকাল হইতে ভূমণ্ডলে মনুষের আবির্ভাব হইয়াছে ?
৯। সঙ্করজাতি: কাহাকে বলে ?
১০। কতিপয় প্রধান সঙ্কর জাতির উল্লেখ কর।
১১। হিন্দুশাস্ত্রে যে যুগভেদের ও বর্ণভেদের উল্লেখ আছে তাহা কি পরিমাণে
সপ্রমাণ হইতেছে ?
&
সম্পূর্ণ

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Prakritik Bhugol Ed.20

Author
Mukhopadhyay, Radhikaprasanna
Title
Prakritik Bhugol Ed.20
File name
Prakritik Bhugol Ed.20
Text
OCR done
Citation
1887
Published
2009/10/20
Publisher
Hare Press,calcutta
Language
Sanskrit
Pages
148
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Physical Geography
Keywords
Prithibi
DLI number
513081
Barcode
4990010020092.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
Hn6oFsk2cpJ
Download PDF

Prakritik Bhugol Ed.20