Makardah Saraswat Library, Howrah

Dash Bhan

Basu,sri Manoj Ed. · 2009/08/14

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

দশ-ভাণ
ভাণঃ স্যা, ধূর্তচরিতাে নানাবস্থান্তরাত্মক।
একা এক এবাত্ৰ নিপুণঃ পণ্ডিতত বিট।
-সাহিত্য-দর্পণ
“বনফুল”
বেঙ্গল পাবলিশাস
১৪, বঙ্কিম চাটুজ্জে ষ্ট্রীট,
কলিকাতা

বেঙ্গল পাবলিশার্সের পক্ষে
প্রকাশক-শ্ৰীশচীন্দ্রনাথ মুখােপাধ্যায়
১৪, বঙ্কিম চাটুজ্জে স্ট্রীট, কলিকাতা
দু’ টাকা বারো আনা
মুদ্রাকরীপ্রভাত চন্দ্র রায়
গৌরাঙ্গ প্রেস
৫, চিন্তামণি দাস লেন, কলিকাত

সুনিপুণ কথা-শিল্পী
শ্ৰীমনােজ বসু
করকমলেষু
১৩, ৬, ৪৪
ভাগলপুর।

সূচীপত্র
বিষয়
পৃষ্ঠা
শিকাবাব
. . .
১
লেহ
জল
অবাস্তব
৫৪
নব সংস্করণ
৩৮
বানপ্রস্থ
১১৯
১৫৪
এ এ এ
আকাশ নীল
অন্তরীক্ষে
১৩ই বণ, ১৩৪৮
১৬০
১৮৪

শিক-কাবাব প্রকাণ্ড একটি হল-ঘর। ছদি পাকা নয়, খাপরার চাল। একটি বড় বরগা ঘরের এক প্রান্ত হইতে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত চলিয়া গিয়াছে, দেখা যাইতেছে। পর্দা টাঙাইয়া হলটিকে দুই ভাগে ভাগ করা হইয়াছে। পর্দা একটি নয়, দুইটি–পাশাপাশি টাঙানাে আছে। পর্দার ওপারে কি আছে তাহা দেখা যাইতেছে না বটে, কিন্তু উভয় পর্দার সন্ধিস্থল ফাক করিয়া দিলে স্পষ্ট দেখা যাইবে। ঘরের দুই দিকে দুইটি দরজা আছে। ঘরের মাঝামাঝি একটি গােল টেবিল এবং দেওয়াল ঘেষিয়া ছোট লম্বা-গোছের আর একটি টেবিল রহিয়াছে। গােল টেবিলের চারিধারে কয়েকখানি দামী চেয়ার আছে। সুদৃশ্য ডোম সমন্বিত একটি ইলেকটিক বাতি জ্বলিতেছে। একটি প্লেট হাতে করিয়া করিম খানসামা প্রবেশ করিল। করিম খানসামার নুর আছে ; পরিধানে চেক-চেক লুঙ্গি, ফতুয়া এবং মলিন ফেজ। প্লেটটি ছােট লম্বা টেবিলে রাখিয়া করিম উৎসুক নয়নে দ্বারের দিকে চাহিয়া রহিল। ক্ষণকাল পরে ডাক দিল করিম। কই রে শিব, শিকগুলাে নিয়ে আয়। শিবু। [ নেপথ্য হইতে ] যাই। করিম। [ এদিক ওদিক চাহিয়া ] সব ঘরগুলাের খাপরা নাবিয়েছে দেখছি। ঘরের মাঝামাঝি আবার পর্দা টাঙিয়েছে কেন! শিবু, ওরে শিবু । শিবু। [ নেপথ্য হইতে ] যাই—যাই। শিবু প্রবেশ করিল। ঝানু চেহারা। তাহার কাঁধে ঝাড়ন, পরনে ফতুয়া এবং হাতে গােটা দুই লােহার শিক। শিবু আসিয়াই চোখ বড় বড় করিয়া ঠোটে আঙুল দিল শিবু। আরে, চুপ চুপ করিম মিয়া, অত চেঁচায় না। করিম। কেন ? শিবু। [ পর্দা দেখাইয়া, চুপি চুপি ] আরে, দেখছ না? করিম। দেখছি তাে, পর্দা টাঙালে যে হঠাৎ ? শিবু। [ চুপি চুপি ] ওপারে মেয়েমানুষ আছে ।

দশ-ভাণ
করিম। [ সবিস্ময়ে ও নিম্ন কণ্ঠে ] তাই নাকি?
শিবু। তা না হলে শুধু শুধু পর্দা টাঙাব কেন ?
উভয়েই কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিল
করিম। কর্তা তা হলে আর একটি উড়িয়ে এনেছেন ?
শিবু সম্মতিচক ঘাড় নাড়িল
শিবু। তাই না শিক-কাবাব করবার জন্যে তােমার ডাক পড়েছে।
তােমার হাতের শিক-কাবাব নইলে কৰ্ত্তার ফুর্তিই জমে না যে।
করিম দন্ত বিকশিত করিয়া হাসিল
করিম। দাও তা হলে শিকগুলাে, মাংসটা গেঁথে ফেলি চটপট ।
শিবু শিক দিল, করিম মাংস গাঁথিতে লাগিল
শিবু। এখানে টেবিলটা ময়লা করবে কেন, চল না, রান্নাঘরে বসে গাঁথবে।
করিম।
রান্নাঘরে বা ধোঁয়া করেছ তুমি !
শিবু। কয়লায় আগুন দিয়েছি যে, যাই একটু হাওয়া করি গিয়ে, মদও
আনা হয় নি এখনও। তুমি মাংসটা গেঁথে নিয়ে চটপট এস।
গমনােত
করিম। আরে আরে, শােন না—[ বাম চক্ষু কুঞ্চিত করিয়া ] চিড়িয়া
ফাসল কি করে ?
শিবু। বাবুর ওই যে একটি নতুন মােসাহেব জুটেছে আজকাল
করিম। কে, পান্নালালবাবু?
শিবু। হঁ্যা। উনিই উড়িয়ে এনেছেন আজ সন্ধ্যেবেলা।
করিম। [ সাগ্রহে ] কোথা থেকে ?
শিবু। আমাকে জিজ্ঞেস ক’র না, আমি কিছু জানি-টানি না।
করিম। তুমি বাবা পুরনাে ঘুঘু, তুমি জান না !
শিবু মুচকি হাসিল
মাইরি বলছি, কালীর কসম। আমি চাকর মনিষি, সাতেও থাকি
, পাচেও থাকি না।
শিবু।

শিক-কাবাব করিম। তবু শিবু। যেটুকু জানি, সেটুকু হচ্ছে এই—সকালে বৈঠকখানা ঝাড়পোঁছ করছি, এমন সময় এক টেলিগেরাপ এল। জীবনধনবাবু তখন সেখানে বসে। টেলিগেরাপ পড়ে বাবু আমাকে বললেন, ওরে, পালকির বেয়ারাগুলােকে বলে দে, সন্ধ্যের সময় যেন তারা পালকি নিয়ে ইষ্টিশানে থাকে, জেনানি সােয়ারি আসবে। আর তুই বাগানবাড়িটা পরিষ্কার করে রাখিস । শিবু একবার পদ্দার প্রতি চকিত দৃষ্টিপাত করিয়া নিম্নকণ্ঠে পুনরায় শুরু করিল আমি বললাম বাগানবাড়িতে তো জেনানি রাখবার মত ঘর নেই, মাঝের হলঘরটি ছাড়া সব ঘরের খাপরা নাবানাে হয়েছে। বাবু ধমকে উঠলেন, বললেন, ওই হল-ঘরেই করাসের চাদর টাঙিয়ে একটা পর্দার ব্যবস্থা করে রাখ । পুনরায় পর্দার প্রতি চকিত দৃষ্টিপাত করিল করিম। [ মাংস গাঁথিতে গাঁথিতে ] তারপর ? শিবু। তারপর আর কি, সন্ধ্যের সময় পালকি এসে ওই পেছনের দরজাটায় লাগল, পান্নালালবাবু এসে কি একটু ফুসফুস গুজগুজ করলেন, চিড়িয়া এসে খাঁচায় ঢুকল। আমি ঝি-মাগীকে দিয়ে এক বালতি জল, একটা ঘটি আর কিছু জলখাবার পাঠিয়ে দিলাম। [ হাত উল্টাইয়া ] কত্তার ইচ্ছেয় কম্ম । যেমন যেমন বলেছিলেন, তেমনই তেমনই করেছি ; তােমাকেও খবর দিতে বলেছিলেন, তুমিও এসে গেছ ; যাই এবার, দেখি আঁচটার কতদূর! গমনােন্বত করিম। আরে, দাড়াও দাড়াও, আসল খবরটাই তাে বললে না। শিবু। [ সবিস্ময়ে ] আবার কি ! যা জানি, তা তাে বললাম। করিম। [ ভুরু নাচাইয়া ] মানে, চিড়িয়াটি কি রকম? বুলবুল, না •• ছাতারে ?

দশ-ভাণ
৪
শিবু। [ মাথা নাড়িয়া ] জানি না ভাই।
করিম। [ অবিশ্বাসভরে ] আরে যাও যাও।
শিবু। সত্যি বলছি, কালীর কসম। তবে পর্দার ব্যাপার দেখে মনে
হচ্ছে, বাগী ক্যাওড়া নয়, ভদ্রলােকের মেয়ে।
করিম। [ লুব্ধ আগ্রহে ] বল কি ?
শিবু। তাই তাে মনে হয়।
ভুট্টা নামক বালক-ভৃত্য প্রবেশ করিল
ভুট্টা। এই পেঁপে-বাটাটা মাংসে পড়ে নি।
করিম। সেকি, কোথায় ছিল ওটা এতক্ষণ?
ভুট্টা। রান্নাঘরের কোণের দিকটায় ছিল।
করিম। একটা শিক তত গাঁথা হয়ে গেছে। আচ্ছা দে, বাকি মাংসটায়
মিশিয়ে দিই।
মিশাইয়া দিল
শিবু। তুই উনুনটায় হাওয়া কর গিয়ে, আমি যাচ্ছি।
ভুট্টা চলিয়া গেল
করিম। বাদীই হােক, ক্যাওড়াই হােক, আর ভদ্দরলােকই হােক, শেষ
পৰ্যন্ত তােত আমাদের ভােগেই লাগবে।
হঠাৎ কঁাক কঁাক করিয়া হাসিয়া উঠিল
শিবু। [ নিম্ন কণ্ঠে ] আরে, চুপ চুপ, শুনতে পাবে যে, পাশেই রয়েছে ।
পর্দার ওপাশে চেয়ার সরানাের শব্দ পাওয়া গেল। উভয়েই সেদিকে সচকিত
দৃষ্টি নিক্ষেপ করিল। কিছুক্ষণ চুপচাপ
করিম। নিস্তারিণীটাকে আজকাল দেখলে কিন্তু কষ্ট হয়। দেখেছ এদানীং
তাকে তুমি ?
শিবু। দেখেছি।
করিম। গায়ে চাকা চাকা কি বেরিয়েছে বল দিকি ?

শিক-কাবাব শিবু। [ নির্বিকারভাবে ] কি আবার, কুট। করিম। ক্যাওড়ার মেয়ে হলে কি হয়, রূপ ছিল বটে এককালে! প্রথম বাবুর কাছে যখন এল—ওরে ব্বাস রে—চোখ-ঝলসান রূপ! শিবু। কিন্তু হ'লে কি হয়, শেষ পর্যন্ত যে ওরা গিয়ে ব্যবসা খােলে! ব্যবসা যাঁহাতক খুলেছে কি মরেছে ! করিম। কি করবে বল, বাবু তাে আর চিরকাল পােষে না। পেট চালাতে হবে তত বেচারীদের । শিবু। [ দরজার পানে চাহিয়া ] ওই কত্তা এসে পড়লেন, এখনও মদ আনা হয় নি। চল চল, যেটুকু বাকি আছে রান্নাঘরে বসেই গেঁথে। উভয়ে চলিয়া গেল। যাইবার পূর্বে শিবু ঝাড়ন দিয়া টেবিলটা ঝাড়িয়া দিল। কথা কহিতে কহিতে জমিদার এবং মোসাহেব পান্নালাল আসিয়া প্রবেশ করিলেন। পান্নালাল একটু রােগা-গােছের, ছিমছাম, চোখে চশমা, গোঁফদাড়ি কামানাে। জমিদারটি খুব মােটা বর্তুলাকার ব্যক্তি। তিন পাক চিবুকের উপর কটা রঙের ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি। মাথার সামনের দিকটায় টাক জমিদার। ওসব কবিত্ব-টবিত্ব রাখ তুমি, মনে ঘটা পড়ে গেছে বাবা। আগে ইতিহাসটা শুনি। পান্নালাল। ইতিহাস তাে বললাম সংক্ষেপে। জমিদার। সংক্ষেপে-টংক্ষেপে চলবে , বিশদভাবে শুনতে চাই। ইতিহাসটি পুরােপুরি না শুনে আমি ছুচ্ছি না ওসব। সেবারে মনে নেই, এক পুলিস-কেসেই ফেঁসে গেলাম বাবা, হাজারখানেক টাকা লম্বা হয়ে গেল ঘুষঘাষ দিতেই। এস, বসা যাক, ভাল করে সব গুছিয়ে বল দিকি শুনি। হ্যাংলার মত হামলে পড়বার বয়স গেছে—হুঁ হুঁ হুঁ হুঁ হুঁ [ হাসিলেন ]। পান্নালাল। বেশ শুনুন তা হলে। চেয়ার টানিয়া দুজনে উপবেশন করিলেন জমিদার। দাড়াও, সিগার বার করি। পকেট হইতে সিগার-কেস বাহির করিলেন দশ-ভাণ দেশলাইটা কোথা গেল? এ পকেট ও পকেট খুজিতে লাগিলেন ঠিক ফেলে এসেছি, এমন ভুলাে মন হয়েছে আজকাল ! ওরে শিবে ! পান্নালাল পকেট হইতে দিয়াশলাই বাহির করিলেন পান্নালাল। এই যে আমার কাছে আছে। জমিদার। দাও। দাও। এইবার আনুপূর্বিক সব কাহিনীটি বল দিকি বাবা, ভদ্দরলােকের মেয়ে তােমার খপ্পরে পড়ল কি করে ? পান্নালাল। ওই যে বললাম, শেয়ালদা স্টেশনে পুলিসের হাতে ধরা পড়ে কাঁদছিল। আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিল আর কি। জমিদার। আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিল ? তুমি জানলে কি করে ? পান্নালাল। পুলিসের কাছে শুনলাম, রেল-লাইনে মাথা দিয়েছিল। জমিদার। তারপর? পান্নালাল। তারপর আমি পুলিসকে কিছু দিয়ে-টিয়ে উদ্ধার করলাম। একটা হােটেলে নিয়ে গিয়ে খাওয়ালাম বােঝালাম- জমিদার। [ সকৌতুকে ] কি বােঝালে ? পান্নালাল। বােঝালাম যে, এত অল্প বয়সে মরবার দরকার কি! চল, আমি তােমাকে একটি চাকরি জুটিয়ে দিচ্ছি আমার এক জমিদার বন্ধুর বাড়িতে। জমিদার। আরে এটা তো শেষের ঘটনা। গােড়া থেকে সব বল না, শুনি। শেয়ালদা স্টেশনেই বা এল কি করে, তার আগেই বা কোথা ছিল? দাড়াও, এটা আগে ধরিয়ে নিই, তুমিও নাও একটা। জমিদারবাবু সিগার ধরাইতে লাগিলেন। দেখা গেল Alcoholic tremor আছে, হাত কাঁপে। পান্নালালও একটি সিগার লইয়া ধরাইলেন পান্নালাল। [ ধোঁয়া ছাড়িয়া ] সেই মামুলি কাহিনী আর কি। জমিদার। কি ?

9 শিক-কাবাব পান্নালাল। মেয়ের বয়স হ’ল, কিন্তু পাত্র জুটল না, বাপ মা বিয়ের জন্যে ছটফট করে বেড়াতে লাগল জমিদারবাবুর লিগারটা ঠিকমত ধরিতেছিল না। তিনি তাহা ধরাইবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন জমিদার। কি বললে, ছটফট করে বেড়াতে লাগল, আই সি তারপর ? পান্নালাল। তারপর যা হয়। কেউ চাইলে টাকা, কেউ চাইলে রূপ, কেউ চাইলে গান, কেউ চাইলে বাজনা, কেউ চাইলে নাচ, কেউ চাইলে লেখা- পড়া, কেউ চাইলে সব জমিদারের সিগার ঠিক ধরে নাই, নিবিয়া গেল। তিনি কম্পমান হন্তে পুনরায় তাহা ধরাইতে ধরাইতে গল্পে মনোযোগ দিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন অর্থাৎ বরপক্ষের চাহিদা সবই প্লাসের কোঠায় আর মেয়েপক্ষের দিকে সবই মাইনাস। সুতরাং বিয়ে হ’ল না, বয়স বাড়তে লাগল। জমিদার। এক মুখ ধোঁয়া ছাড়িয়া ] এইবার ধরেছে। কি বললে, বয়স বাড়তে লাগল, আই সি। [ সহসা] মেয়েটি দেখতে কেমন ? পান্নালাল। এস না, দেখবে? জমিদার। না, এখন থাক। এই অপেক্ষা করে থাকার মধ্যেই একটা কিক আছে হে, দেখলেই তাে সব ফুরিয়ে গেল—হুঁ হুঁ হুঁ হুঁ। যাক, ইতিহাসটা আগে শুনে নিই। ভাল কথা, ওকে ওখানে বসতে-টসতে দিয়েছ তাে ভাল করে ? পর্দার দিকে চাহিলেন পান্নালাল। একটা চেয়ার দিয়েছি। জমিদার। বেশ, এইবার বল শুনি। তারপর কি হল? পান্নালাল। তারপর একটু রােমান্টিক ব্যাপার ঘটল। জমিদার। কি রকম? পান্নালাল। স্বাভাবিক নিয়মে মেয়েটি একটি প্রতিবেশী যুবকের প্রেমে পড়ল।

দশ-ভাণ
জমিদার। [ হাসিলেন ] হুঁ হুঁ হুঁ হুঁ হুঁ হুঁ।
পান্নালাল। তারপরই কিন্তু হ’ল মুস্কিল, মনে মিলল, কিন্তু জাতে মিলল
।
জমিদারবাবু এ কথায় অত্যন্ত পুলকিত হইয়া উঠিলেন। হাস্যবেগ দমন করিবার চেষ্টা করিয়া
কৃতকাৰ্য্য হইতে পারিলেন না—এঃ হে হে হে হে হে করিয়া উচ্চকণ্ঠে ফাটিয়া পড়িলেন। শিবু,
এক বােতল হুইস্কি ও কয়েকটি গ্লাস লম্বা টেবিলটিতে রাখিয়া গেল
জমিদার। [ সিগারের ছাই ঝাড়িয়া বেড়ে বলেছ কথাটা হে, মনে মিলল,
কিন্তু জাতে মিলল না, আঁ! তারপর ?
পান্নালাল । উধাও হ’ল একদিন দুজনে।
জমিদার। উধাও হ’ল ! বল কি ?
পান্নালাল। হঁ্যা।
জমিদারবাবু বার্তাটি উপভােগ করিলেন এবং মৃদু হাসিয়া বলিলেন
জমিদার। ঠেকল গিয়ে কোথায় ?
পান্নালাল। কাশীতে।
জমিদার। পুণ্য বারাণসী তীর্থে ! [ সহসা চক্ষু দুইটি বড় করিয়া ] খান
জায়গায় গিয়ে পড়ল বল।
পান্নালাল। [ মুচকি হাসিয়া সে কথা আর বলতে ! খান খান হয়েও
গেল।
জমিদার। কি রকম ! এ যে রীতিমত উপন্যাস করে তুললে তুমি বাবা!
থাম থাম, এটা আবার নিবে গেল, ধরিয়ে নিই, আর গলাটাও একটু ভিজিয়ে
নেওয়া যাক, কি বল, আঁ? ওরে শিবু !
কম্পমান হন্তে সিগার ধরাইতে লাগিলেন। কয়েক বােতল সোডা লইয়া হন্তদন্তভাবে
শিবু প্রবেশ করিল
তুই সােড়া আনতে গেছলি বুঝি? ব্যাটা আগে থাকতে কিছু এনে রাখবে
। বােতলটা খােল।

৯
শিক-কাবাব
শিবু। খােলাই আছে হুজুর।
শিবু হুইস্কির বােতল এবং তিনটি গ্লাস আনিয়া গােল টেবিলটাতে রাখিল। জমিদারবাবু
দুইটি গ্লাসে মদ ঢালিলেন। শিবু সােড়া খুলিল
জমিদার। [ তৃতীয় গ্লাসটি দেখাইয়া ] এটা আবার কার জন্যে ?
শিবু। জীবনধনবাবুর আসবার কথা ছিল।
জমিদার। হা হঁ্যা, ঠিক তাে, সে এখনও এল না কেন? নে, ঢাল ।
শিবু সোডা ঢালিয়া দিয়া চলিয়া গেল। দুইজনে দুইটি গ্লাস তুলিয়া লইয়া ‘সিপ’ করিতে
লাগিলেন
এইবার বল শুনি। খান খান হয়ে গেল কি রকম ?
পান্নালাল। মানে, কাশীর পাণ্ডার হাতে পড়ল আর কি। পাণ্ডাগুলাে
তাে গুণ্ডারই নামান্তর।
জমিদার। আর সেই ছােকরা ?
পান্নালাল। ছােকরা আর কি করবে, তার না ছিল ট্যাকের জোর,
ছিল গায়ের জোর।
জমিদার। প্রেমের জোর তাে ছিল। কাশী পৰ্য্যন্ত টেনে তাে নিয়ে গেছল
বাবা-হুঁ হুঁ হুঁ হুঁ হুঁ হুঁ-তারপর ?
পান্নালাল। মেয়েটি পাণ্ডাদেরই আশ্রয়ে রইল দিনকতক।
জমিদার। আশ্রয়ে—আঁ !
মুচকি হাসিলেন। চৰ্বিস্ফীত গাল দুইটি আরও স্ফীত হইয়া উঠিল
পান্নালাল। দিন দশেক ছিল সেখানে। তারপর অসহ্য হওয়াতে পালাল একদিন।
জমিদার। পালাল ! এবার কার সঙ্গে ?
পান্নালাল। এবার একা, রাত্রে চুপি চুপি দরজা খুলে
জমিদার পুনরায় সিগার ধরাইতেছিলেন
.
জমিদার। মেয়েটির তা হলে খুব ইয়ে আছে বল। [ সহসা ] আচ্ছা,
এত সব খবর তুমি পেলে কি করে ?

দশ-ভাণ পান্নালাল। মেয়েটি সব বলেছে আমাকে। জমিদার। মেয়েটির বাপ মা কোন খোঁজ করে নি ? পান্নালাল। করেছিল কি না, মেয়েটি জানে না। জমিদার। মেয়েটিও বাপ-মাকে কিছু জানায় নি? পান্নালাল। জানাবে কি করে? নিরক্ষর পাড়াগেঁয়ে মেয়ে, নিঃসম্বল। তা ছাড়া অত বড় কলঙ্কের পর- জমিদার। যাক, তারপর ? পান্নালাল। পালিয়ে যাবার পর সন্তোষবাবু বলে এক ভদ্রলােকের সঙ্গে আলাপ হল। জমিদার। ছােকরা, না বুড়াে? পান্নালাল। বুড়ে। জমিদার। বুড়ে! তারপর? পান্নালাল। বুড়ো আশ্রয় দিলে । জমিদার। আশ্রয় দিলে মানে? খােলসা করে বল না বাবা! পান্নালাল। মানে চাকরাণী হিসেবে বাহাল করলে। জমিদার। [ সহাস্যে ] পাটরাণী না করে চাকরাণী করবার মানে? ধাম্মিক ব্যক্তি, না মেয়েটা কুৎসিত ? পান্নালাল। ধাৰ্মিক ব্যক্তি। কিন্তু হাসিলেন জমিদার। আবার কিন্তু কেন বাবা? মুখােসের তলা থেকে লেলিহান জি-উ-বা দেখা গেল নাকি, আঁ ? পান্নালাল। ধার্মিক কিছু করবার ফুরসতই পেলেন না। তার এক গোঁফ-ছাঁটা ভাগ্নে ছিল, সেই ব্যাটাই খেলতে লাগল । জমিদার। গোঁফ-ছাঁটা? দেখেছ নাকি তাকে ? পান্নালাল। ফোটো দেখেছি। ওর কাছে তার একখানা ফোটো আছে।

১১
শিক-কাবাব
জমিদার।
ওরে বাবা ! ফোটো পৰ্যন্ত রয়েছে-ভাগ্নের সঙ্গে ব্যাপার তা
হলে বেশ ঘনীভূত হয়েছিল বল।
পান্নালাল। খুব। বিয়ে করবে আশ্বাস দিয়ে ছােকরা ওকে নিয়ে কলকাতায়
ভেগেছিল।
জমিদার। { চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া ] বটে! তারপর? | সহসা ] ওরে
শিবু, !
পর্দার ওপারে খট করিয়া একটা শব্দ হইল। শিবু আসিয়া প্রবেশ করিল
শিবু। কি বলছেন হুজুর?
জমিদার। শিক-কাবাবের কতদূর?
শিবু। আজ্ঞে দেখি ।
চলিয়া গেল
জমিদার। জীবনধনের এখনও পর্যন্ত কোন পাত্তা নেই, কেন বুঝতে
পারছি না! মেয়েমানুষের গন্ধ পেয়েছে, তার এতক্ষণ আসা উচিত ছিল।
পান্নালাল। জীবনধন জানে নাকি ?
জমিদার। জানে বইকি। তােমার টেলিগ্রাম যখন এল, তখন তো সে
আমার কাছে বসে। টানু লােক-মালটাল টানতে গেছে বােধ হয়।
আসবে ঠিক।
সে থাকলে আরও জমত। তারপর কি হল ?
পান্নালাল শূন্য গ্লাসটি নামাইয়া রাখিয়া দিলেন
পান্নালাল। ভাগ্নে তাে ভাগলেন কলকাতায়। সঙ্গে সঙ্গে নামাও
ছুটলেন তার পিছু পিছু।
জমিদার। সেই ধার্মিক মামা?
পান্নালাল। হঁ্যা।
জমিদার। তার ছােটবার হেতুটা ?
পান্নালাল। ধার্মিক ব’লেই। তিনি ছুটলেন ভাগ্নেকে ফিরিয়ে আনতে,
পাছে সে বিয়ে করে ফেলে।

দশ-ভাণ
জমিদার। আই সি।
শূন্য গ্লাসটি রাখিয়া দিলেন
ভাগ্নে ফিরে এল ?
পান্নালাল। নিশ্চয়। অনুতপ্ত চিত্তে অশ্রু বিসর্জন করতে করতে।
জমিদার । [ হাসিলেন ] ----- তারপর ?
পান্নালাল। মেয়েটা রইল কলকাতায়।
জমিদার। কার কাছে?
পান্নালাল। সন্তোষবাবু তাকে এক অবলা-আশ্রমে ভর্তি করে দিয়ে এলেন।
শিবু আসিয়া প্রবেশ করিল
শিবু। । শিক-কাবাবের এখনও একটু দেরি আছে বাবু, এখনও ঠিক নরম
হয়নি।
জমিদার। [ ধমকাইয়া ] নরম আবার কোন্ জন্মে হবে ? মদ ফুরিয়ে
গেলে ও গুষ্টির পিণ্ডি নিয়ে কি করব আমি? সেবারেও ঠিক এই কাণ্ড হ’ল ।
গ্লাসে খানিকটা মদ ঢালিলেন
নে, সােডা দে। তুমি আর একটু নেবে নাকি পান্নালাল ?
পান্নালাল। না থাক, পরে নােব।
শিবু সােডা ঢালিয়া দিয়া চলিয়া গেল
জমিদার।
[ বেশ বড় এক চুমুক পান করিয়া ] হ্যা, তারপর ? অবলা-
আশ্রমে ভর্তি করে দিলে, তারপর ?
পান্নালাল সিগার ধরাইলেন
পান্নালাল। তারপর আর কি, তপ্ত কটাহ থেকে অগ্নিকুণ্ডে। সেখানে এক
ব্যাটা রাঘব-বােয়াল ম্যানেজার ছিল—
জমিদার মদ ‘সিপ করিতেছিলেন, এ কথা শুনিয়া আনলে বিষম খাইলেন
জমিদার। হে হে হে হে হেরাঘব-বােয়াল--আঁ—বেড়ে উপমাটা দিয়েছ
তাে হেনা চিবিয়েই গেলে, আঁ ?

শিক-কাবাব পান্নালাল উপমা-প্রয়ােগের কৃতিত্বটা স্মিত মুখে উপভােগ করিতে লাগিলেন ম্যানেজার রসিক ব্যক্তি বল। চিবিয়ে সব জিনিস যে গলাধঃকরণ করা যায় না, সেটা জানে, আঁ ? টলিতে টলিতে অসন্থত-বেশবাস মুক্তকচ্ছ জীবনধন প্রবেশ করিলেন। বগলে বােতল, কণ্ঠে গান জীবনধন। সুরে ] গয়লা দিদি লো, তাের ময়লা বড় প্রাণ- জমিদার। এস এস, জীবনধন এস, তােমাকেই খুজছিলাম এতক্ষণ। হচ্ছিল, কোথাও আটকেই গেলে বুঝি। জীবনধন। [ জড়িত কণ্ঠে ] যৌবন-জলতরঙ্গ বােধিবে কে- জমিদার। ব’স ব’স । জীধনধন চতুর্দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করিয়া জড়িত কণ্ঠে বলিলেন জীবনধন। সাড়া পেয়েই কোথায় সরালে বাবা পায়? পান্নালাল মুচকি হাসিলেন জমিদার। আরে, ব’স না আগে। জীবনধন ধপাস করিয়া একটা চেয়ারে বসিয়া পড়িলেন জীবনধন। হুকুম তত তামিল করলাম ইন্দ্রদেব, এইবার অপরাটিকে আসতে বলুন। জমিদার। হচ্ছে হচ্ছে, সব হচ্ছে। ততক্ষণ এক আধ পেগ চালাও না। জীবনধন। তথাস্তু। জমিদার। শিবু তােমার জন্যে আলাদা একটা গেলাস রেখে গেছে। এই নাও। তৃতীয় গ্লাসে মদ ঢালিলেন সােড় চাই ? জীবনধন। না। স্বয়ং সুজলা ধান্তেশ্বরী উদরে বিরাজ করছেন—জলের অভাব নেই। নির্জলাই দিন।

দশ-ভাণ
১৪
নির্জলা পান করিয়া মুখবিকৃতি করিলেন
জমিদার। হ্যাঁ, অবলা-আশ্রমে কি হ’ল তারপর ? রাঘব-বােয়াল
করলে কি ?
পান্নালাল। রাঘব-বােয়াল আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলে, আমাকে যদি না
গিলতে দাও, পাঞ্জাবীর কাছে বিক্রি করে দেব।
জমিদার। [ সবিস্ময়ে ] পাঞ্জাবীর কাছে ?
জীবনধন। [ জড়িত কণ্ঠে বিড় বিড় করিয়া বলিল ] পাঞ্জাবীরা গুড ট্যাক্সি-
ড্রাইভার—বেপরােয়া হাঁকায় বাবা ।
জমিদার মুচকি হাসিলেন
জমিদার। পাঞ্জাবী মানে ?
পান্নালাল। অবলা-আশ্রমগুলাে থেকে পাঞ্জাবীরা মেয়ে কিনে নিয়ে যায় যে,
বিয়ে করবে বলে। বেশ দাম দিয়ে কেনে, এক হাজার দেড় হাজার পর্যন্ত
দাম দেয়।
জমিদার। তাই নাকি? জানতাম না তাে এ কথা। তুমি জানতে
জীবনধন ?
জীবনধন। (হাতজোড় করিয়া] যদি অভয় দেন, একটি কথা নিবেদন করি।
জমিদার। কি ?
জীবনধন। অত্যন্ত বাজে বিষয় নিয়ে আলােচনা হচ্ছে হুজুর। পাঞ্জাবী
প্রসঙ্গে আলােচনা চলবে জানলে কোন্ শালা-
জমিদার। আহা, আর এক পেগ চড়াও না, ততক্ষণ আমরা গল্পটা শেষ
করি।
জীবনধনকে আরও খানিকটা নির্জলা হুইস্কি ঢালিয়া দিলেন
আর কতটা বাকী পান্নালাল ?
পান্নালাল। আর বেশি নেই।
জীবনধন। [ সানুনয়ে ] তাড়াতাড়ি শেষ কর পানু, লক্ষ্মী ধন আমার।

শিক-কাবাব
করিম শিক-কাবাব লইয়া প্রবেশ করিল
করিম। একটা শিক নিয়ে এলুম, হুজুররা একটু চেখে দেখুন তাে। ওরে।
শিবু, প্লেট নিয়ে আয় তিনখানা।
শিবু তিনখানি প্লেট দিয়া চলিয়া গেল, করিম তিনটি প্লেটে শিক কাবাব ভাগ করিয়া দিল
জীবনধন। [ এক কামড় দিয়া ] উঃ, বড় গরম যে! উঃ উঃ, এ যে নেশা
ছুটিয়ে দিলে বাবা—উঃ।
পান্নালাল। [ সামান্য ভাঙ্গিয়া লইয়া চিবাইতে চিবাইতে ] এখনও একটু
কসর আছে হে।
জমিদার বাম হাত দিয়া খানিকটা তুলিয়া ডান হাত দিয়া টানিয়া দেখিলেন
জমিদার। হঁ্যা, বেশ কসর আছে এখনও। নিয়ে যা, আরও খানিকটা
হবে।
পান্নালাল ও জমিদার প্লেট ঠেলিয়া দিলেন। জীবনধন কিন্তু প্লেট ছাড়িলেন না
জীবনধন। আমার এই বেশ লাগছে বাবা, বেড়ে ঝাল ঝাল হয়েছে।
করিমের মসলার হাতটি একেবারে নিখুত।
চক্ষু বুজিয়া চিবাইতে লাগিলেন। করিম দুইটি প্লেট লইয়া চলিয়া গেল
জমিদার। [ পান্নালালকে ] তারপর ?
পান্নালাল। গতিক খারাপ দেখে মেয়েটি একদিন অবলা-আশ্রমের পাচিল
ডিঙিয়ে পালাল।
জমিদার। আবার পালাল? এতে খুব তুখােড় মেয়ে দেখছি হে! পাঁচিল
ডিঙিয়ে, আঁ ?
পান্নালাল। পাঁচিল ডিঙিয়ে।
জীবনধন। [ সানুনয়ে ] সংক্ষেপ কর বাপ পানু।
জমিদার। তারপর ?
পান্নালাল। তারপর কলকাতার জনসমুদ্রে ঘােলটান খেতে খেতে শেয়ালদা
স্টেশনে গিয়ে হাজির এবং সেখানে

দশ-ভাণ
১৬
?
জমিদার। এবং সেখানে চারিচক্ষের মিলন, আর অমনই আমাকে টেলিগ্রাম
-এহ, এহ, এহ, এহ! বুদ্ধিকে তােমার বলিহারি !
পান্নালাল স্মিত মুখে সিগার ধরাইতে লাগিলেন
পান্নালাল। ইতিহাস তাে শুনলে, এইবার একটু আলাপ-পরিচয় হােক।
জমিদার। আলাপ-পরিচয় করতে পারি, কিন্তু আর কিছু নয়। আজই
সরিয়ে ফেল ওকে। [ সহসা ] তুমি আমাকে কি ঠাউরেছ বল দিকি
পান্নালাল একটু অপ্রতিভ হইয়া পড়িলেন
পান্নালাল। তুমি একদিন বলেছিলে কিনা যে, যদি ভাল জিনিস কখনও
চোখে পড়ে
জমিদার।
এর নাম ভাল জিনিস সাত ঘাটের জল খাওয়া রাবিশ দাগী
মাল। ছি ছি ছি ছি ।
জীবনধন। আরে বাবা, বারই কর না, দেখি জিনিসটা।
পর্দার ওপার হইতে চেয়ার সরানাের একটা শব্দ হইল। পর্দাটা একটু নড়িয়া উঠিল
জমিদার। [ চৰ্বিস্ফীত হাসি হাসিয়া ] অধীর আগ্রহে ছটফট করছে বলে
মনে হচ্ছে যেন!
সহসা জীবনধনের পানে চাহিলেন
আরে, ছি ছি জীবনধন, তুমি করছ কি, কঁাচা মাংসগুলাে চিবুচ্ছ ? রক্ত বেরুচ্ছে
যে ঠোঁটের দুপাশ দিয়ে।
জীবনধন। বড় মিঠে লাগছে কিন্তু।
আর একটা শিক লইয়া করিম পুনরায় প্রবেশ করিল
করিম। আগেকার শিকটায় পেঁপে দেওয়া হয়নি, এই শিকটা দেখুন
হুজুর। শিবু, প্লেট আন
শিবু প্লেট দিয়া চলিয়া গেল। করিম প্লেটে কাবাব পরিবেশন করিতে লাগিল।
জমিদারবাবু তিনটি গ্লাসে আবার খানিকটা করিয়া মদ ঢালিয়া লইলেন
জমিদার। ওরে শিবু !

১৭ শিক-কাবাব শিবু। [ নেপথ্য হইতে ] আজ্ঞে যাই। কয়েক বোতল সােডা লইয়া প্রবেশ করিল জমিদার। সােডা ভাঙ। শিবু সােড়া ভাঙিয়া জমিদারবাবুর হাতে দিল, তিনি নিজের গ্লাসে ও পান্নালালবাবুর গ্লাসে পরিমাণমত সোজা ঢালিয়া লইলেন পান্নালাল । [ শিক-কাবাব খাইয়া ] এইবার ঠিক হয়েছে । জমিদার। [ একটু চাখিয়া ] হু। জীবনধন। [ বেশ খানিকটা মুখে পুরিয়া, নিমীলিত চক্ষে ] দীর্ঘজীবী হও বাপ করিম, তুমি ছদ্মবেশী অন্নপূর্ণা বাপ। করিম ও শিবু চলিয়া গেল। তিনজনে জমাইয়া শিক-কাবাব সহযোগে মদ্যপান করিতে লাগিলেন পান্নালাল। এইবার ডাকব? জীবনধন। ডাক না বাপ। সুর করিয়া ] সময় বহিয়া যায়, নদীর স্রোতের প্রায় জমিদার। ডাকতে পার, তবে আমি এসবের মধ্যে নেই। এসব দশ-হাত- ঘােরা জিনিস টাচ করি না আমি। পান্নালাল। | হাসিয়া ] আলাপ করে দেখতে ক্ষতি কি জীবনধন। কিন্তু ক্ষতি নেই। পান্নালাল। ডাকি তা হলে ? জমিদার। ডাক। পান্নালাল। সৌদামিনী । পর্দার ওপার হইতে কোন উত্তর আসিল না সৌদামিনী ! “কোন উত্তর নাই ঘুমিয়ে পড়ল নাকি?

দশ-ভাণ
১৮
পান্নালাল উঠিয়া গেলেন ও পর্দা ফঁাক করিয়া চীৎকার করিয়া উঠিলেন
একি!
জমিদার। কি ?
তিনিও উঠিয়া গেলেন ও অন্য পদ্দটা ফঁাক করিয়া ধরিলেন। দেখা গেল, শুন্যে শেমিজ-পরা
একটি নারীদেহ বরগা হইতে ঝুলিতেছে। পরনের শাড়ি খুলিয়া সৌদামিনী গলায় দড়ি
দিয়াছে। জীবনধনও উঠিয়া দাঁড়াইয়া ছিলেন। রক্তাক্ত মুখে ভীত বিস্মিত নেত্রে খানিকক্ষণ
চাহিয়া থাকিয়া বলিয়া উঠিলেন
জীবনধন। গলায় দড়ি দিয়েছে—আঁ, সেকি!
যবনিকা

লেহ পটোত্তলন করিলে রঙ্গমঞ্চের ভিতর দেখা যাইতেছে-‘যুবক-সমিতি’ নামক বাঙালীদের ক্লাব। সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে। ক্লাবের হল ঘরটিতে একটি টেবিলে বীরেন, ভব, ছবি ও মহাদেব তাস খেলিতেছে। হলঘরটি নেহাং ছোট নয়। পাশে আর একটি ঘরও আছে। তাহার প্রবেশপথ হল ঘরের ভিতর দিয়া, দরজাটি দেখা যাইতেছে। একটি দেওয়াল ঘেঁষিয়া কয়েকটি আলমারিতে বহু রহিয়াছে। তাস খেলিবার অরিও গোটা দুই টেবিল আছে, এখনও খেলােয়াড় জোটে নাই। ইহা ছাড়া আরও দুইটি টেবিল অাছে।-একটি বড় গােল টেবিল, তাহার উপর কতকগুলি সাময়িক-পত্রিকা, তাহার চারপাশে কয়েকটি চেয়ার। আর একটি ছােট ড্রয়ার- ওয়াল টেবিল, ফুট-লাইটের কাছাকাছি ডান দিক িেযয় অাছে। তাহার এক দিকে একটি চেয়ার এবং বিপরীত দিকে একটি টুল। এটি ক্লাবের সেক্রেটারী মহাশয়ের টেবিল। সেক্রেটারি অক্ষয়বাবু এখনও আসেন নাই। ফুট লাইটের কাছাকাছি বাম দিকে একটি অর্গ্যান রহিয়াছে। ধীর পদসঞ্চারে হরেন আনিয়া প্রবেশ করিল। হরেনের পােষাক পরিচ্ছদ বেশ ছিমছাম, মুখভাব কিন্তু হতাশাব্যঞ্জক। হরেন অনিয়া গােল টেবিলে একটি চেয়ার টানিয়া বসিল, একটি সিগারেট ধরাইল এবং একটা খবরের কাগজের পাতা উল্টাইতে লাগিল ছবি। কি হে হরেন, তােমার ইন্টারভিউ কেমন হ’ল আজ? হরেন। এ বিষন্ন হাসি হাসিয়া ] ওই ইন্টারভিউ পর্যন্তই, আর বেশিদূর এগুবে বলে মনে হয় না। ছবি। [ দান ফেলিয়া ] তােমাকে যে ডেকেছিল ওই যথেষ্ট ; মহাদেবকে তাে ডাকেও নি। মহাদেব । আমার ভগ্নীপতি তাে আর সব ডিভিশনাল অফিসার নয় ভাই। বীরেন। শ্যামকেও ডেকেছিল না ইন্টারভিউ করবার জন্যে ? ছবি। হ্যা, তার গলাও চমৎকার। মহাদেব। [ সশ্লেষে ] তার জ্যাঠাও মুন্সেফ ছবি। শুধু মুন্সেফ আর সব ডিভিশনাল অফিসারের খাতিরেই ওদের ডাকে

দশ-ভাণ
নি। হরেন শ্যাম দুজনেই ফাস্ট ক্লাস অনার্স। তুমি না হয় গাইতে পার
স্বীকার করি, কিন্তু তুমি দু দুবার ফেল করে তবে বি. এ. পাস করেছ, সেটা
ভুলােনা।
মহাদেব রুখিয়া উঠিল
মহাদেব ! গানের সঙ্গে বি. এ. পাসের সম্পর্ক কি? তা ছাড়া তুমি কি
বলতে চাও, কোয়ালিফিকেশন নিক্তির ওজনে মেপে সবাইকে ডেকেছে ? আমি
না হয় দুবার ফেল, কিন্তু হাবু? সে ফাস্ট ক্লাস এম. এ , গানও করে চমংকার।
বীরেন। [ দান ফেলিয়া হাবু তােয়াক্কা করে না এ সবের, তাকে
সিনেমায় লুফে নেবে । সে অ্যাটিংও করে চমৎকার।
মহাদেব। তােয়াক্কা করুক আর নাই করুক, আমার কথা হচ্ছে-
ভব। আহা, বাজে কথা ছেড়ে খেল না তুমি, কি ফেলবে ফেল।
মহাদেব ছবির দিকে একটা ক্রুদ্ধ দৃষ্টি হানিয়া তাস ফেলিল। হরেন কাগজ
উল্টাইতে লাগিল
ওরে ঝগড়ু, এক গেলাস জল নিয়ে আয়।
মহাদেব। আর চারটি সুপুরি।
ক্লাবের বুড়া চাকর ঝগড়, জল ও সুপারি দিয়া গেল
বীরেন । [ পটাৎ করিয়া তাস ফেলিয়া ] বাঙালীকে আর চাকরি পেতে
হচ্ছে না এই বেহারে, তা তিনি ফাস্ট ক্লাসই হােন আর যাই হােন। তবে
ধনেশ্বরবাবুর বাঙালীদের দিকে একটু নেকনজর আছে বলেই যদি বাঙালীকে
রাখেন।
ছবি।
ছবি। [ তাস ফেলিয়া ] যা বলেছ।
বীরেন। এবার দুবে, চোবে, তেওয়ারি, প্রসাদ, সিং, লাল এদেরই পােয়
বাবাে। আমি তো আমার ছেলেটার নাম রেখে দিইছি খুবলাল-নাম-মাহাত্মে
যদি ব্যাটা উতরে যায়।

নেহ
মহাদেব। [ হাসিয়া । কিন্তু বাবা, উপাধিটা লুকোবে কি করে? সেন
শুনলেই যে-
বীরেন। সেন বলব না, শৰ্ম্মা বলব।
ভব পুনরায় অধীর হইয়া উঠিল
ভব। তাস খেলতে বসে এত বাজে কথা বল কেন? খেলতে বসেছ,
খেল না। ইয়ার্কি দিতে দিতে ব্রিজ খেলা হয় না।
নীরবে খানিকক্ষণ খেলা চলিল। একহাত শেস হইয়া গেল। ভর খাতায় পয়েন্টস টুকিয়া
লইল। পুনরায় তাস বিতরণ করিয়া ‘কল’ শুরু হইল। হরেন বাম হাত দিয়া
নিজের রগ দুইটা টিপিতে টিপিতে খবরের কাগজ পড়িতে লাগিল
ছবি। কাগজে খবর কি হে হরেন
হরেন। একজন ডেটিনিউ মারা গেছে।
বীরেন।
ও বেচারাদের আর কোন গতি হ’ল না।
ভবেশ ও জহরের প্রবেশ
ভবেশ । আজকে শরৎ বােসের স্টেটমেন্টটা পড়েছ হে ?
জহর। পড়ি নি! একেবারে আগুন ছুটিয়ে দিয়েছে।
উভয়ে চেয়ার টানিয়া গােল টেবিলে বসিল
ভবেশ। এতেও কি ওদের লজ্জা হবে ভেবেছ ?
জহর। রামঃ।
ভবেশ। আমার কি মনে হয় জান ?
জহর। কি ?
ভবেশ। এই কিষাণ মুভমেন্টই শেষ পর্যন্ত সব্বাইকে গ্রাস করবে।
তাসের টেবিল হইতে বীরেন প্রতিবাদ করিল
বীরেন। সুভাষ বােস নয় কেন?
ভবেশ। সুভাষ বােস পারত, কিন্তু ওর মালা আর ফোটোর দিকে বডড
বেশি লক্ষ্য।
২০১৭

দৃশ-ভাণ
২২
বীরেন। সেটা কার নয় শুনি ?
ছবি।
সকলের।
বীরেন। নেতা হতে হলে পাব্লিসিটি দরকার। যার যত পাব্লিসিটি, সেই
তত বড় নেতা।
ভবেশ। তা হলে জবাকুসুম তৈলের নেতা হবার দাবি সবচেয়ে বেশি
বল।
দুই তিন জন হাসিয়া উঠিল
বীরেন। আমাদের একটা প্রধান দোষ কি জান আমরা নিজের লােকের
ভাল কখনও দেখতে পারি না, বুকটা কেমন যেন করকর করে। আমাদের
মধ্যে একজন লােক একটু মাথাচাড়া দিয়ে অল-ইণ্ডিয়া ফিগার হয়েছে, কোথায়
সকলে মিলে একজোট হয়ে তাকে তুলে ধরবে, না
ভবেশ। আহা, তুলে ধরতে আমি রাজি আছি-
ভব আবার অধীর হইল
ভব। আরে, খেলতে বসেছ খেল না, কি বিপদ ! বীরেন, কি দেবে
দাও।
বীরেন তাস ফেলিল
ছবি। গােলামটা দিলি যে?
ওর চেয়ে ছােট আর কিছু নেই।
ছবি। তবেই গেম হয়েছে এবার !
জহর। [ পকেটে হাত দিয়া ] ওহহ, সিগারেট-কেসটা ফেলে এলাম
বাড়িতে। ভবেশ, একটা সিগারেট দাও তত যদি থাকে।
ভবেশ সিগারেট-কেস বাহির করিয়া দিল
তুমি আবার ক্যাস্ট্যান কবে থেকে ধরলে ?
ভবেশ। কঁইচিটা ভয়ানক খারাপ হয়ে গেছে আজকাল।
গােল্ডফ্লেক ধর। লংক্লথের পাঞ্জাবি, বঙ্গলক্ষ্মীর কাপড়, গ্লেজকিড
বীরেন।

পাশু আর গােল্ডফ্লেক সিগারেট—এ চারিটি জিনিসের মার নেই বাবা। ওই
আজকাল বাঙালীত্ব ।
ভবেশ। [ হরেনের প্রতি ] কি হে হরেন, অমন মিইয়ে রয়েছ কেন হে ?
জহর। রগ টিপছ যে, মাথা ধরেছে নাকি ?
হরেন কিছু না বলিয়া বিষ হাসি হাসিল
ভবেশ। আপিসে শুনলাম, ধনেশ্বর তােমাকে ডেকেছিল ইন্টারভিউ
করবার জন্যে। কি হল?
হরেন। ইন্টাভিউ হয়ে গেল, বললে, পরে খবর পাঠাব ।
ভবেশ। গান-টান শুনলে ? রবি ঠাকুরের গান-টান গাও নি তাে?
হরেন। [ হাসিয়া ] না।
ভবেশ। কি গান গাইলে ?
হরেন। থিয়েটারি গান।
জহর। [ সবিস্ময়ে ] ধনেশ্বর গান শুনলে মানে ? তার তো কুকুর পাের
শখ আছে জানি, গানের শখও আছে নাকি ?
ভবেশ। তুমি কিছু জান না নাকি ?
, আমি তো এখানে ছিলাম না। কর্পোরেশনের সেই চাকরিটার
চেষ্টায় কলকাতায় গেছলাম; হ’ল না যদিও কিছুই। ধনেশ্বরের খবরটা শুনি,
ধনেশ্বর গান শিখছে নাকি ?
ভবেশ। না, গান শিখছে না, ওদের হাই ইস্কুলটার জন্যে একজন গানের
মাস্টার অ্যাপয়েন্ট করবে। ওদের ইস্কুলে গানের ক্লাস খুলছে কিনা, তাই।
জহর। ও। কিন্তু গানের ও কি বােঝে, ও তাে ডগ-এক্সপার্ট।
ভবেশ। ওর টাকা আছে, সুতরাং ও সব বােঝে। ওর বাপের টাকাতেই
ইস্কুল, ও বুঝবে না তাে কি তুমি বুঝবে ?
জহর। আরে, ও যে আকাট মুখ।
তাসের টেবিল হইতে মহাদেব ফোড়ন দিল
৩

দশ-ভাণ
২
মহাদেব। আকাট মুখ নইলে অমন বিজ্ঞাপন দেয় ।
জহর। কি বিজ্ঞাপন ?
মহাদেব। নান নীড অ্যাপ্লাই হু ইজ নট এ গ্র্যাজুয়েট।
ছবি। বাঃ, গাইয়ে গ্র্যাজুয়েট যদি পাওয়া যায়, লােকে ছাড়বে কেন?
এইতেই শুনছি আড়াইশােখানা দরখাস্ত পড়েছে—আণ্ডার-গ্র্যাজুয়েট চাইলে
তাে দু চার হাজার পড়ে যেত।
মহাদেব। গানের সঙ্গে গ্র্যাজুয়েটের সম্পর্ক কি ?
ছবি। যদি দুবার বি, এ, ফেল করা লােক চাইত, তা হলেই ঠিক হত
তাের মতে, না ?
মহাদেব। [ রুখিয়া, ] দেখ ছবি, আমাকে বারবার এমন করে ইন্ট
ক’র না বলে দিচ্ছি। হাটে হাঁড়ি আমিও ভাঙতে জানি।
সক্রোধে তাস ফেলিল
ছবি। হাঁড়ি মানে?
মহাদেব। লজ্জা থাকলে লােক-সমাজে আর মুখ দেখাতে না পাের।
ছবি। কিসের লজ্জা ?
বীরেন। আরে, ঝগড়া কর কেন?
মহাদেব। কিসের লজ্জা! দামড়া বােনের কীর্তিতে শহরে ঢি ঢি পড়ে
গেছে, যেন কিছু জানেন না, ন্যাকা!
ছবি। কি, যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা !
তাস ফেলিয়া আস্তিন গুটাইয়া উঠিয়া পড়িল
মহাদেব । আমিও ভয় করি নাকি তােমাকে ?
আস্তিন গুটাইতে লাগিল
ভব। কি বিপদ দেখ দিকি
বীরেন, ভবেশ ও জহর উঠিয়া যুদ্ধোন্মুখ দুই বীরের যুদ্ধোদ্যমে বাধা দিল
বীরেন। ছি ছি মহাদেব, এসব কি ?
}

লেহ
জহর। ব’স ব’স, কি ছেলেমানুষি কর সব !
• ভবেশ। ক্লাবের একটা ডিসিপ্লিন থাকা দরকার তাে ?
সকলে মিলিয়া ছবি ও মহাদেবকে জোর করিয়া থামাইয়া দিল। তাহারা উভয়ে
স্ব স্ব চেয়ারে বসিল
?
তােমাদের সঙ্গে খেলতে বসে দেখছি, মুষ্কিলে পড়েছি। ছবি,
কি ফেলবে ফেল, আমি আটা দিয়েছি—আচ্ছা, রগচটা লােক সব !
আবার খেলা চলিতে লাগিল। হরেন কলরবে একটু সচকিত হইয়া পড়িয়াছিল,
কলরব থামিতে টেবিলে মাথা রাখিয়া শুই
ভবেশ। ও কি হে হরেন, ঘুমুচ্ছ নাকি
হরেন। [ হাসিয়া ] হ্যা, একটু ঘুম ঘুম পাচ্ছে।
ভবেশ। কটা গান গাইতে হয়েছিল সবসুদ্ধ, তােমাকে?
হরেন। পাঁচখানা।
জহর। পাঁচখানা গান গেয়েই কাত হয়ে পড়লে বাবা! স্যাম তত সেবার
বরযাত্রী গিয়ে সারারাত গাইলে একটানা।
ভবেশ। [ হরেনকে ] তােমাকে একটা টিপ দিই শােন। ওর প্রাইভেট
সেক্রেটারি চপলাকান্তবাবুকে যদি তােয়াজ করতে পার, সব ঠিক হয়ে যাবে।
বনেশ্বর ওর মুঠোর মধ্যে।
জহর। তােয়াজ করবার উপায়টাও বলে দাও। ভয়ঙ্কর ঘুষখাের ব্যাটা
ভবেশ। ঘুষ দিয়ে পেরে উঠবে না তুমি। একটি টিপ দিই শােন, ও
নিজে গান-টান লেখে, কবিতাও লেখে। ওর লেখা গানে যদি সুর-টুর দিয়ে
দিতে পার, তা হলে আর দেখতে হবে না।
কথা কহিতে কহিতে নবীন ও বিমলের প্রবেশ
দেখে আয়, নৰ্মা শিয়ারার মাইরি দারুণ প্লে করেছে।
বিমল। আরে দ্যুৎ, আদ্ধেক কথা বােঝাই যায় না। ওর চেয়ে আমাদের
বাংলা ফিল্ম ঢের ভাল ।
নবীন।

দশ-ভাণ
নবীন। বাংলা ফিল্ম । বাংলা ফিল্মে না শিয়ারার বের কর দিকি
একটা।
নবীন।
বিমল। দরকার নেই আমার নম। শিয়ারারে। এ কি হরেন নাকি, শুয়ে
পড়লি যে? ( ঈষৎ নিম্নকণ্ঠে ] খুব বেশি নেশা হয়েছে নাকি ?
হরেন। মাথাটা ঝিম ঝিম করছে।
নেশা হয়েছে মানে ?
বিমল। সাংঘাতিক কিছু নয়, আমার বাসায় গিয়েছিল, এক গেলাস সিদ্ধি
খেয়েছে।
ভবেশ। তুমি আর সিদ্ধি খাওয়াবার লােক পেলে না, হরেনকে সিদ্ধি
খাওয়াতে গেলে !
জহর। আমরা থাকতে।
পত্রিকাখানা টানিয়া উলটাইতে লাগিল
নবীন। কঁাধে করে বাড়ি না নিয়ে যেতে হয়-ওরা হ’ল গুড বয়।
একট। সিনেমা-সাপ্তহিক উল্টাতে উল্টাইতে
গাবো মাইরি একটা জিনিস। কি পােজ দেখেছিস? দেখ দেখ, ছবি-
খানা দেখ একবার। [ সকলকে দেখাইল |
ভবেশ। পত্রিকাখানা দাও তত জহর।
জহর। থাম, দিচ্ছি, একটু দেখে নিই, দাড়াও।
ভবেশ। আরে, ওয়ান্টেড দেখতে চাও তত ‘স্টেটম্যান’ দেখ না এই
নাও। পত্রিকায় এডিটোরিয়ালটা দেখা হয় নি আজ। দাও।
ষ্টেটম্যান আগাইয়া দিল। হরেনের নাক ডাকিতে লাগিল
হরেন যে একেবারে ঘায়েল হয়ে পড়ল দেখছি।
বিভূতির প্রবেশ
বিভূতি। সান্ন্যালের মেয়েটি মারা গেল।
দুই তিন জনে একসঙ্গে। তাই নাকি?

২৭
লেহ
বিভূতি। পুড়িয়ে আসছি।
বীরেন। কে দেখছিল ?
বিভূতি। বিজন ডাক্তার।
মহাদেব। অত জুনিয়রের হাতে রেখেছিল বরাবর ?
জহর। রেখেছে কি সাধে বাবা, কী লাগে না এক পয়সা, তাই রেখেছে।
ভব। এখানকার জুনিয়ার সিনিয়ার সব সমান, সব ব্যাটাই হাতুড়ে।
ভবেশ। [ বিভূতিকে ! আর কি খবর?
বিভূতি। ম্যাহােমেডেন স্পাের্টিং জিতেছে।
অনেকেই। তাই নাকি, কি করে জানলে ?
বিভূতি। রেডিওতে এক্ষুনি শুনে এলাম।
জহর। আমাদের ক্লাবে একটা রেডিও না নিলে আর চলছে না।
ভবেশ। কামতাবাবুকে তাে বলেছি, যদি কিছু আদায় করতে পারি।
লছমিবাবুকেও বলেছি।
বীরেন। আমরা বেহারীদের গালও দোব, আবার তাদের কাছে গিয়ে
ভিক্ষেও করর।
বেশ আছি আমরা।
জহর। আমাদের অক্ষয় সেক্রেটারি টীম নিয়ে জামালপুরে গেছে না।
আজ ?
বিভূতি। হঁ্যা।
ভবেশ। ফেরে নি এখনও ?
ছবি। এতক্ষণ ফিরেছে বােধ হয়। আসবে এখুনি।
বিভূতি। [ নিদ্রিত হরেনকে দেখিয়া ] হৱেন শুয়ে ঘুমুচ্ছে যে এমন
অসময়ে !
বিমল । ওকে বিরক্ত কর না, ওর ভয়ানক মাথা ধরেছে।
বিভূতি একখানা কাগজ টানিয়া লইয়া বসিল .
বিভূতি। হঠাৎ মাথা ধরবার মানে ?

দশ-ভাণ
২৮
বিমল ।
সব কথার মানে যে তােমাকে জানতেই হবে, তার মানে কি ?
আশ্চৰ্য্য দেখ দিকি, মাথা ধরার মানে ওকে বাতলাও এখন।
মহাদেব। [ ছবির অলক্ষ্যে ইঙ্গিত করিয়া ] তােমাদের পাড়ায় আসল
খবরটা কি হে বিভূতি?
বিভূতি। [ ছবির পানে এক নজর চাহিয়া ও হাসিয়া ] ঠিক আছে, মােটর
রােজ আসছে।
নবীন। বেড়ে আছ বাবা তুমি !
বিভূতি। বেড়ে আছি মানে?
বিমল। | ছদ্ম গাম্ভীৰ্য্যভরে ] মানে, তীর্থস্থানে আছ আর কি ! সবাইয়ের
ততা সে সৌভাগ্য হয় না।
ভবেশ পত্রিকার এডিটোরিয়াল পড়িতেছিল। সে হঠাৎ মুখ তুলিয়া বলিল
ভবেশ। দেখ, এটা চণ্ডীমণ্ডপ নয়, ক্লাব। এখানে ওসব আলােচনা
চলবে না।
জহর। [ স্টেটসম্যানের ওয়ান্টেড কলম হইতে চোখ তুলিয়া ] ঠিক কথা।
হয়তাে ইহা লইয়া একটা বাদ প্রতিবাদ শুরু হইত, কিন্তু অবিনাশ, অনাদি, করুণা, যুগল, ফণী,
পরেশ, কান্তি ও বিপিন আসিয়া প্রবেশ করাতে তাহা আর হইল না। সকলেই সবিস্ময়ে
তাহাদের দিকে ফিরিয়া চাহিল। অবিনাশের হাতে বাঁশী, অনাদির হাতে সেতার,
যুগলের হাতে এস্রাজ, করুণার হাতে ডুগি-তবলা, ফণীর হাতে বেহালা।
পরেশ, কান্তি ও বিপিনের শুধু হাত
ভবেশ। কি ব্যাপার হে? থিয়েটার আসন্ন নাকি?
অবিনাশ। [ হাসিয়া ] কাল এখানকার স্কুলে প্রাইজ। হেডমাস্টার মশায়
ধরেছেন, আমাদের কন্সার্টটা বাজিয়ে দিতে হবে।
পুনরায় খেলায় বাধা পড়াতে ভব রূকুঞ্চিত করিল ও নিজের হাতের তাসগুলি
দেখিতে লাগিল
যুগল। আমাকে তােমরা ধরে আনলে, কিন্তু আমার কাল বাইরে যাওয়ার
দরকার ছিল।
।

কর্তব্য।
ফণী। থাম থাম। শেয়ালের ইয়ের দরকার হলে শেয়াল পর্বতে গিয়ে
ইয়ে করে—তাের যে সেই দশা হ’ল দেখছি রে ।
ভবেশ। ছি যুগল, পাব্লিক ফাংশানে হেলপ করা প্রত্যেক সিটিজেনের
ওরকম কর না।
এডিটোরিয়ালে মন দিল
নবীন। [ সিনেমা-সাপ্তাহিকের আর একটা ছবি দেখাইয়া ! বিমল, এইটে
দেখ, উঃ, দারুণ মাইরি ! দাড়াবার কায়দাটা দেখ।
বিমল ঝুকিয়া দেখিতে লাগিল। নবাগত পরেশ, কান্তি ও বিপিন আসিয়া
তিনটি চেয়ার অধিকার করিল
ছবি। [ অবিনাশকে। কোন গংটা বাজাচ্ছ কালকে ?
মহাদেব। ভৈরবী গংটা বাজিও। ওটা বেশ হয় তােমাদের ।
অনাদি। বিকেলবেলা ভৈরবী কি সুবিধে হবে? ভাবছি, কানাড়াটা
বাজাব, যদিও কানাড়ারও সময় বিকেল নয়।
ছবি। না না, কানাড়াই ঠিক হবে । ইমন কি পূরবী হলে আরও ভাল
ভব ক্ষেপিয়া উঠিল
ভব। আরে বাপু, তােমরা বাজাবে তত সুরু করে দাও না ও ঘরে গিয়ে
খেলার মাঝখানে এসে বাগড়া দিচ্ছ কেন?
বাদকগণ পাশের ঘরে গিয়া ঢুকিল। ভবেশ পত্রিকাখানা মুড়িয়া রাখিয়া সহসা
আবিষ্কার করিল যে, তাস খেলিবার লোক জুটিয়া গিয়াছে
ভবেশ। এই তাে আমরা আটজন হয়ে গেছি। দুখানা টেবিল ও খালি
রয়েছে—সময় নষ্ট করে আর লাভ কি ?
পরেশ। কিছু লাভ নেই।
বিপিন। চল, খেলা যাক।
কান্তি। ওঠ হে জহর, ওয়ান্টেড পরে দেখাে।

দশ-ভাণ
বিভূতি। [ নবীনকে ] ছবি দেখে আর কি হবে বাবা, চল।
হাত হইতে সিনেমা-সাপ্তাহিক কাড়িয়া লইল
বিমল। তােমরা গোলমাল ক’র না বেশি। হরেনটা একটু ঘুমুক, এমন
নেতিয়ে পড়বে জানলে কি আমি ওকে সিদ্ধি খাওয়াই ! কি বিপদ দেখ দিকি।
সকলে গিয়া দুইটি টেবিল দখল করিয়া তাস খেলিতে বসিল। পাশের ঘরে কানাড়ার গৎ শুরু
হইয়া গেল। হরেন টেবিলে মাথা রাখিয়া ঘুমাইতে লাগিল। মিনিট দুই গৎ বাজিবার পর
সহসা চতুর্দিক অন্ধকার হইয়া গেল এবং গৎ থামিয়া গেল। হরেন স্বপ্ন দেখিতেছে। স্বপ্নটি এই
ভাবে দেখানো যাইবে—আলাে জ্বলিলে দেখা যাইবে, একটি কালাে পর্দা আসিয়া যুবক-সমিতির
ঘরটিকে দুই ভাগে বিভক্ত করিয়াছে। ডান দিকে সেক্রেটারির টেবিল টুল ও চেয়ার এবং বাম
দিকে অর্গ্যানটি কেবল দেখা যাইতেছে। বাকি সব কালাে পর্দার ওপারে অাছে। হরেন
আসিয়া প্রবেশ করিল। হরেন প্রবেশ করিবার সঙ্গে সঙ্গে বিপরীত দিক দিয়া প্রবল গুধারী
ভােজপুরী দারােয়ান বলিষ্ঠকায় রামবৃক্ষ সিংহও আসিয়া দাঁড়াইল
রামবৃক্ষ। কেয়া মাংতে হেঁ?
হরেন। চপলাকান্তবাবুর সঙ্গে দেখা করতে চাই।
রামবৃক্ষ। হােবে না।
হরেন। [ সবিনয়ে ] আমার বড় জরুরি দরকার ।
রামবৃক্ষ। হােবে না।
হরেন। কেন ?
রামবৃক্ষ। [ গুচ্ছ চুমরাইয়া ] হামরা খুশি।
হরেন সবিস্ময়ে দাঁড়াইয়া রহিল
বুঝলিন—চপ্লাকান্ত বাবুকা সাথ মুলাকাৎ হােবে না—হামরা খুশি, বুঝলিন ?
হরেন। [ আরও সবিনয়ে ] আমার বড় জরুরি দরকার ছিল।
রামবৃক্ষ। [ নির্বিকারভাবে ] উমে হামারা কেয়া হয় ?
হরেন। মানে ?
রামবৃক্ষ। আরে ভাইয়া, হােবে না। চপ্লাকান্ত বাবুকা সাথ এইসে
মূলাকাং হােবে না। রামবৃছ সিং ফজুল বাংমে গলনেবালা আদমি নেহি।

৩১
লেহ
হরেন। [ সসঙ্কোচে ] মানে-
রামবৃক্ষ। [ ভ্যাঙাইয়া ] মানে মানে মানে ! দুনিয়েমে একিহি চিজকো
তাে মানে হয়।
অঙ্গুষ্ট ও তর্জনী সহযােগে টাকা বাজাইল
হরেন। [ অর্থ বুঝিতে পারিয়া স্মিত মুখে ! ও, তার জন্যে আর কি!
পকেট হইতে বাগ বাহির করিয়া একটি আধুলি দিতে গেল
রামবৃক্ষ। [ সবিস্ময়ে ? আরে, ছিয়া ছিয়া ছিয়া ! ই কি ভদ্দর আদমিকা
কাম হায় ! কুল্লম আঠ আনা পয়সা? উ কোন্ ছুয়েগ? ছি ছিয়া ছিয়া!
হরেন। [ সানুনয়ে ] এর বেশি আর আমার কাছে নেই যে সিংজি।
রামবৃক্ষ। [ ধমকাইয়া তব সিধা রাস্তা দেখাে। চপ্লাকান্ত বাবুসে
মুলাকাৎ নেহি হােগা।
হরেন। এখন এই নাও, চাকরি হয়ে গেলে তােমাকে নগদ দুটাকা
বকশিশ দোব।
রামবৃক্ষ। ঠিক ?
হরেন। ঠিক।
রামবৃক্ষ।
হরেন। ঠিক।
রামবৃক্ষ।
ঠিক
হরেন। ঠিক।
রামবৃক্ষ আধুলি লইয়া ট্যাকে গুজিল এবং সঙ্গে সঙ্গে হিতৈষী হইয়া উঠিল
রামবৃক্ষ। নােরি কোরবার হিছ যদি থাকে, একঠো কাম মগর
কোরতে হােবে।
হরেন। কি ?
রামবৃক্ষ। চপ্লাকাবাবুকা পয়ের চাটুনে পড়েগা।
হরেন। পা চাটতে হবে ?
ঠিক ?
?

দশ-ভাণ
৩২
।
রামবৃক্ষ। [ চক্ষু বড় বড় করিয়া ] হাঁ, পা চাটতে হােবে।
হরেন। [ সবিস্ময়ে ] কি করে ?
রামবৃক্ষ। জিব নিকালকে। ওই টিবিল দেখছিন ?
টেবিলটি দেখাইল
হরেন। দেখছি।
রামবৃক্ষ। ওই কুরসি দেখছিন ?
চেয়ারটি দেখাইল
হরেন। দেখছি।
রামবৃক্ষ। ওই টুল দেখছিন?
টুলটি দেখাইল
হরেন। দেখছি।
রামবৃক্ষ। চপ্লাকান্ত বাবু কুরসি পর বৈঠকে টিবিল পর পয়ের চঢ়ায়
দিবিন—আর আপ টুল পর বৈঠকে জিব নিকালকে উনকো পয়ের চাটবিন।
হরেন। [ আরও বিস্মিত ] এ রকম করার মানে?
রামবৃক্ষ। চপ্লাকান্ত বাবুকো খুশি।
গুম চুমাইতে লাগিল
হরেন। আর কেউ করছে এ রকম ?
রামবৃক্ষ। বহুত, বােজ আতা হ্যায়।
হরেন। শ্যামবাবু এসেছিলেন ?
রামবৃক্ষ। হাঁ। মগর সেকলো না, বেচারা ওকি করতে করতে জান
জি লিয়ে ভাগলল।
হরেন হতভম্ভ হইয়া দাড়াইয়া রহিল। রামবৃক্ষ আর একটু সদয় হইল
হামারা একঠো সল্লা শুনবিন
হরেন। কি ?
রামবৃক্ষ। পহলে এক টুকরাহররা খাইয়ে লিন, তব কুসু মালুম নেই হােবে।
?

•
হরেন। হররা কি ?
রামবৃক্ষ। আপনারা যাকে বােলছিন হােরতুকি ।
হরেন। হরীতকী ?
রামবৃক্ষ। হাঁ, হােরতুকি ।
হরেন। কোথায় পাব এখন?
রামবৃক্ষ। হামারা বটুয়ামে হ্যায়।
কোমরের বটুয়া হইতে এক টুকরা হরীতকী বাহির করিয়া হরেনকে দিল
বাস্, মুমে দে কর চবাতে রহিয়ে। কুসু মালুম হােবে না।
হরেন যন্ত্রচালিতং তাহা মুখের মধ্যে পুরিয়া চিবাইতে লাগিল
চপ্লাকান্ত বাবুকো বােলাই ?
হরেন সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়িল
এ চপ্লাকান্ত বাবু, এক পয়ের চাটনেওয়ালা ছােকরা হাজির হুয়া হায়।
চপলাকান্তবাবু প্রবেশ করিলেন। তাঁহার মুখভাবে দাম্ভিকতা পরিস্ফুট। চেহারা
স্কুলাকৃতি, জবড়জং, দেখিলেই রাগ হয়। চপলাকান্ত আসিতেই হরেন
মেরুদণ্ড বক্র করিয়া নমস্কার করিল। রামবৃক্ষ চলিয়া গেল
চপলাকান্ত। কে আপনি?
হরেন। [ শ্রদ্ধা-কোমল কণ্ঠে ] আজ্ঞে, আমি
চপলাকান্ত। আমি! নাম কি বলুন না ?
হরেন। হরেন। আমি আপনাদের ইস্কুলে গানের মাস্টারি
চপলাকান্ত। বুঝেছি। মাইনে এখন আমরা ত্রিশ টাকার বেশি দিতে
পারব না, তা জানেন তাে?
হরেন। জানি।
চপলাকান্ত। পা চাটতে রাজি আছেন ?
হরেন। আছি।

দশ-ভাণ
৩৪
চপলাকান্ত। আপনার জিব দেখি ?
হরেন জিব বাহির করিল
দাত দেখি ?
হরেন দাত বাহির করিল
মুখের মধ্যে কোন রকম ঘা-টা নেই তাে?
চপলাকান্ত।
একবার এক ব্যাটাকে দিয়ে পা চাটিয়ে পাময় আমার
একজিমা হয়ে গেছল। আপনি রােজ মুখ পােন তাে?
হরেন। ধুই।
চপলাকান্ত। কি দিয়ে ?
হরেন। খড়িগুড়াে।
চপলাকান্ত। এবার থেকে কুন্দদন্ত টুথ পাউডার ব্যবহার করবেন, ওতে
আমার শেয়ার আছে।
হরেন। আজ্ঞে, এবার থেকে তাই করব।
চপলাকান্ত। বমি-টমি করে আবার কেলেঙ্কারি করবেন না তাে?
হরেন। আজ্ঞে না।
চপলাকান্ত। আচ্ছা, বেশ। আপনি একটা গৎ বাজান ততক্ষণ, আমি
আসছি এখনি।
চপলাকান্তবাবু চলিয়া গেলেন। হরেন অর্গানে বসিয়া একটি গৎ বাজাইতে লাগিল।
একটু পরে চপলাকান্তবাবু ফিরিয়া আসিলেন। তাঁহার হাতে একটি খাতা ও
একটি কুকুরের মুখোশ
চপলাকান্ত। দেখুন, চাকরি যদি রাখতে চান, আর একটি কাজ করতে
হবে। এই মুখখাশ পরে আমার তৈরি এই গানটা গাইতে হবে। ধনেশ্বরবাবু
ভারী পছন্দ করেন গানখানা। সুর আমিই দিয়েছি। আপনি এটা একটু রপ্ত ।
করে নিন। আমার মুখস্থ আছে, আপনি খাত দেখে গানটা মুখস্থ করবেন।
খাতাটা হরেনকে দিলেন

নিন, এইবার মুখােশটা পরুন। হরেন মুখােশ পরিল কুকুর পেছনের পায়ে দাড়ালে যে রকম দেখতে হয়, সেই ভাবে দাড়ান। হরেন সেই ভাবে দাড়াইল এইবার আমার সঙ্গে সঙ্গে গান করুন। চপলাকান্তের সহিত হরেন গাহিতে লাগিল। চপলাকান্ত গাহিবেন, শুনিয়া শুনিয়া হরেন গাহিবে এক এক কলি গান তু তু তু ক'রে ডাকবে যখন, ল্যাজটি নেড়ে আসব তখন, লুটিয়ে পড়ে চাটব চরণ- রাতুল চরণ রে। পারবে না কেউ রুখতে মােরে পারবে না রে কেউ। ভেউ ভেউ ভেউ। শিস দিয়ে বা আঙুল নেড়ে লেলিয়ে দিলেই ছুটব তেড়ে, শত্রু মিত্র বিচার ছেড়ে, ফেলব পেড়ে রে। টুটির পরে পঁাতের পাটি বসিয়ে দেব কঁাক। ঘ্যাক ঘ্যাক ঘ্যাক। আবার যখন চাবুক তুলে ফেলবে পিঠের চামড়া খুলে, ল্যাজ গুটিয়ে চরণমূলে থাকব প'ডে রে।

দশ-ভাণ
বলব, প্রভু, ঠাই দাও গাে,..
একটুখানি শুই।
কুঁই কুঁই কুঁই।
আবার সহসা সমস্ত অন্ধকার হইয়া গেল। আলাে জ্বলিলে দেখা গেল, কালাে পর্দা অনুহিত
হইয়াছে, পূর্ববৎ সকলে বসিয়া তাস খেলিতেছে, পাশের ঘরে ঐক্যতান বাজিতেছে, হরেন গােল
টেবিলে মাথা রাখিয়া গোঁ গোঁ করিতেছে। বিমল তাড়াতাড়ি উঠিয়া আসিল
বিমল। [ হরেনকে ঠেলিয়া ] হরেন, হরেন, হরেন, ওঠ ওঠ ওঠ। এ,
তুই ভােবালি দেখছি আমাকে।
হরেন উঠিয়া পড়িল
হরেন। উঃ, বিশ্রী একটা স্বপ্ন দেখলাম।
বিমল। কি স্বপ্ন ?
হরেন। যেন[ সহসা থামিয়া গেল ]
বিমল। মাত্র এক গেলাস সিদ্ধি খেয়ে একি কেলেঙ্কারি তাের।
হরেন হতভম্ভ হইয়া বসিয়া রহিল
ভবেশ। একটু তেঁতুল গুলে খাইয়ে দিলেই ঠিক হয়ে যাবে।
বিমল। তেঁতুল এখন পাই কোথা?
বিমল যে টেবিল হইতে উঠিয়া আসিয়াছিল, সেই টেবিলের খেলােয়াড়গণ বিমলকে
ডাকিতে লাগিল
বিভূতি। সেসব বাড়ি গিয়ে ক’র, এখন এস।
জহর। আশ্চৰ্য্য লােক।
পরেশ। এইজন্যেই তাে খেলতে ইচ্ছে করে না তােমাদের সঙ্গে! সায়েবরা
ব্রিজ খেলে, টু শব্দটি থাকে না।
বিমল। [ হরেনকে ! তুই আর একটু ঘুমােনা হয়।
বিমল গিয়া খেলায় যােগদান করিল। হরেন চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। পাশের ঘরে কানাড়া গৎ
বাজিতে লাগিল। পাশের ঘর হইতে ঝগড়, বাহির হইল। তাহার হাতে সুতায় বাঁধা
কতকগুলি স্লিপ।

৩৭
ঝগড়। [ হরেনকে ] বাবু, সিগারেটের দামটা দেবেন ? অনেক দিন
হয়ে গেল।
হরেন যেন সম্বিত ফিরিয়া পাইল
হরেন। কত বাকি আছে ?
ঝগড়। পাঁচ টাকা সাড়ে ন আনা।
হরেন। এখন নয়, পরে দেব।
ঝগড়, চলিয়া গেল। তাসের টেবিল হইতে নবীন ইহা লক্ষ করিল
নবীন। হরেন, ধার শােধ করছ নাকি হে, তা হলে আমার দোকানের
টাকা কটাও ফেলে দিও ভাই।
হরেন কিছু বলিল না, নবীনের দিকে চাহিয়া শুধু একটু হাসিল
ছবি। তােমার আবার কিসের দোকান ?
নবীন। আমার মানে বৈজুপ্ৰসাদ ভূধরমলের। ওদের দোকানে সেল্সম্যান
হয়ে ঢুকেছি যে আমি ও মাস থেকে। হরেন গেল মাসে কয়েকটা শার্ট
করিয়েছে সেখান থেকে কাপড় নিয়ে।
ছবি। ও।
ভব। আবার তােমরা বাজে কথা কইতে সুরু করলে ? জালাতন
তােমাদের নিয়ে ! খেলতে বসেছ, খেল না।
বীরেন। আমাদের নির্মলের ‘মনােহারি স্টোর্স’ কেমন চলছে হে?
বিভূতি। [ তাস ফেলিয়া ] ভালই।
নবীন। ওরে ঝগড়, জল নিয়ে আয় এক গেলাস।
মহাদেব। আর চারটি সুপুবি।
ঝগড়, জল ও সুপারি দিয়া গেল
বীরেন। আরে, নিৰ্ম্মলের নাম করতে করতেই নিৰ্ম্মল এসে হাজির যে!
নিৰ্ম্মল আসিয়া প্রবেশ করিল এবং পকেট হইতে এক তাড়া বিল বাহির করিল
ছবি। ওকি, পকেট থেকে বার করছ বিল নাকি ?

দশ-ভাণ নির্মল। [ হাসিয়া ] এইখানেই তােমাদের সব্বাইকে একসঙ্গে পাওয়া যাবে। [ হরেনের দিকে চাহিয়া ] কিছু দেবে নাকি ভাই ? হরেন। [ ম্লান হাসি হাসিয়া ] এখন নয়, পরে। বীরেন। বিল-টিল এখন রাখ। ক্লাবে বিল ! তুই যে মাড়ােয়ারীরও বেহদ্দ হয়ে উঠলি রে । অক্ষয়ের প্রবেশ অক্ষয়। হিপ হিপ হুররে। ভবেশ। তােমাদের টিম জিতল নাকি ? অক্ষয়। আরে দ্যুৎ, গােরাদের সঙ্গে জেতা সােজা নাকি? তিনটি গােল ঠেসে দিয়েছে। তা ছাড়া রেফারি ব্যাটা ভয়ঙ্কর পার্শিয়ালিটি করছিল। ছবি। তবে ‘হিপ হিপ হুররে’ কিসের? অক্ষয়। হরেনের চাকরি হয়ে গেছে। অনেকেই। তাই নাকি ? উল্লাসে উত্তেজনায় হরেন দাড়াইয়া উঠিল হরেন। কি করে জানলে তুমি ? 'অক্ষয়। ধনেশ্বরবাবুর সঙ্গে স্টেশনে দেখা হ’লতিনিই বললেন। তােমার গান খুব ভাল লেগেছে তাঁর। হরেন। সত্যি? অক্ষয়। কালই অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পাবে। থী চিয়ার্স ফর হরেন- হিপ হিপ হুররে, হিপ হিপ হুররে, হিপ হিপ হুররে। সকলে। হিপ হিপ হুররে। যবনিকা [ একটি প্রকাণ্ড কাচ-পাত্রের অভ্যন্তর। পাত্রটি ফ্লাস্ক জাতীয় এবং এত বড় যে, তাহার সমস্তটা দেখা যাইতেছে না। যতটুকু দেখা যাইতেছে, তাহা বহুগুণ বৃহদীকৃত অতি-ক্ষুদ্র একটি অংশ মাত্র। দৃশ্যমান অংশের দুই পার্শ্বে দুইটি মােটা সাদা কীলকের মৃত বস্তু দেখা যাইতেছে, এ দুইটি প্ল্যাটিনাম ইলেকটিক নােড। কাচপাত্রটির ভিতরে কোটি কোটি হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন পরমাণু ইতস্তত সঞ্চরণ করিয়া বেড়াইতেছে , কিন্তু তাহাদের সকলকে দেখা যাইতেছে । বৃহদীকৃত অংশটুকুর মধ্যে যখন যাহারা আসিতেছে, তাহাদেরই কেবল দেখা যাইতেছে। নাটকীয় প্রয়ােজনে পরমাণুগুলিকে মনুষ্যরূপে কল্পনা করা হইল। হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেনের বিভিন্নতাও তাহাদের পরিচ্ছদের বর্ণ-বিভিন্নতা দ্বারা প্রদর্শিত হইবে। হাইড্রোজেনদের পরিচ্ছদ শ্বেত এবং অক্সিজেনদের পরিচ্ছদ গৈরিক বর্ণের। হাইড্রোজেনদের পরিচ্ছদে হাইড্রোজেনের প্রােটন-ইলেক্ট্রনসমন্বিত রাসায়নিক রূপটি লাল সুতা দিয়া অঙ্কিত থাকিবে; তাহাদের পতাকাও এই চিহ্ন বহন করিবে। অক্সিজেনদেরও তদ্রুপ।] কয়েকটি হাইড্রোজেন-পরমাণু তর্ক করিতে করিতে আসিয়া প্রবেশ করিলেন •• ১ হা। আমাদের ধর্মই আলাদা, সে কথা বললে চলবে কেন ? ২ হা। ধৰ্ম্ম আলাদা সে কথা কে অস্বীকার করছে, কিন্তু আমরা, যে কারণেই হােক, এক জায়গায় এসে জুটেছি যখন ৩ হা।, সে তত ঠিকই। ১ হা। সে তত ঠিকই! বলতে বাধল না তােমার কথাটা, গলায় আটকে গেল না? ছি ছি ছি ছি। ৩ হা একটু কাচুমাচু হইয়া গেলেন ২ হা। [ ১ হা-কে ] আহা, তুমি কথাটা বুঝছ না তলিয়ে। আমাদের সঙ্গে অক্সিজেনদের অনেক বিষয়ে অমিল আছে তা ঠিক, ও ব্যাটারা পাজির পা-ঝাড়া তাও ঠিক; কিন্তু এটাও তত ঠিক কথা, আমরা, যে কারণেই হােক, ;

দশ-ভাণ
৪০
একসঙ্গে এসে জুটেছি এবং একসঙ্গে বসবাসও করতে হচ্ছে।
কথাটা বুঝে দেখ
তলিয়ে।
১ । [ উদ্ধাভরে ] আমি বুঝতে চাই না। [ ৪ হা-কে ] তুমি চাও ?
৪ হা। না।
১ হা। [ ৫ হা-কে ] তুমি চাও ?
৫ । আমি! আমি বাবা সাতেও থাকি না, পাঁচেও থাকি না, যে
কদিন বাঁচব, যেখানেই থাকি চুপচাপ থাকব।
১ হা। [ চটিয়া ] তার মানে ? ভিভিদে স্বার্থপর পাজি তুমি।
৫ হা হাসিভরা দৃষ্টিতে ৩ হা-র দিকে চাহিলেন
৬ হা। [ ১ হা-কে ] আরে, তুমি ঘাবড়াচ্ছ কেন, আমি তােমার পক্ষে
আছি। লড়ে যাও ব্যাটাদের সঙ্গে, তারপর যা হয় হবে। কি করতে চাও তুমি ?
১ হা। মীটিং। •
২ হা। মীটিং ! আমি ভাবছিলাম, বুঝি ঘােতর কিছু করবে। মীটিং
করতে আমিও রাজি আছি। ওরাও করছে।
৩ হা। সে তত ঠিকই।
১ হা। সবাই রাজি আছ তা হলে?
৭ হা এতক্ষণ কিছু বলেন নাই, গলা-খাকারি দিয়া আগাইয়া আসিলেন
৭ হা। [১ হা-কে ] আজ হঠাৎ তুমি এত ক্ষেপে গেলে কেন বল তাে?
২ হা। আসল কথাটা খুলে বল দিকি ভাই ?
৬ হা। যাই কারণ হােক, তােমার স্বপক্ষে আমি আছি, বল তুমি খুলে
আজ ক্ষেপবার কারণটা কি ?
৫ হা। আমারও কৌতূহল হচ্ছে, যদিও আমি কারও সাতেও থাকি না,
পাচেও থাকি না।
১ হা চক্ষু পাকাইয়া নিরুত্তর রহিলেন
৪ হা। মীটিং করবার আগে কারণটা শােনা দরকার।

৪১ ৩ হা। সে তত ঠিকই। ৭ হা। কারণটা বল, সবাই বুঝে দেখি। ধা করে একটা মীটিং করলেই হ’ল না তাে! এতদিন তুমি কিছু বল নি, আজ হঠাৎ ক্ষেপে উঠলে, এর মানেটা কি? ধাঁ করে একটা মীটিং করলেই হ’ল না তাে! [ অর্থভরা দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন ] ২ হা। আমার মতে মীটিং জিনিসটাই বা ক'রে করা যায়। আর কিছু ধ করে করা শক্ত আমাদের পক্ষে। ৭ হা। কি নিয়ে মীটিং করবে, কেন মীটিং করবে, আজই বা হঠাৎ কেন মীটিং করবে, এর কথাতেই বা কেন মীটিং করবে—এ সবগুলি পরিষ্কার না হলে ৩ হা। সে তাে ঠিকই। ১ হা এইবার কথা কহিলেন ১ হা। মীটিং করতে চাই নিজের জন্যে নয়, ধর্মের জন্যে। আমাদের ধৰ্ম্ম আজ বিপন্ন। ২ হা। [ সবিস্ময়ে ] তাই নাকি? ১ হা। [ ৪ হা-কে ] ধৰ্ম্ম বিপন্ন নয় ? ৪ । নিশ্চয়। ১ হা। কে না জানে, আজ আমাদের ধর্ম বিপন্ন ! কে না জানে, ধর্মকে বিপন্ন হতে দিয়েছি বলেই আমরাও আজ বিপন্ন, আমরাও আজ লাঞ্ছিত, আমরাও, আজ অপমানিত ! কে না জানে, এই ধর্মকে যতদিন আমরা আমাদের জীবনে তার সম্মানিত সর্বোচ্চ আসন দিতে না পারব, ততদিন আমাদের মুক্তি নেই। কে না জানে, আমাদের অপমানিত আত্মা যে বন্ধ কারাগৃহের রুদ্ধ দ্বারে মাথা কুটে মরছে, সে কারাগৃহকে ধূলিসাৎ করতে পারে কেবল আমাদের ধর্মবল !. কে না জানে, যে মর্মন্তুদ বেদনার কুশাঙ্কুর অহরহ আমাদের নগ্ন চরণতলকে ক্ষতবিক্ষত করছে, তার একমাত্র সবেগে অষ্টম হাইড্রোজেন পরমাণুর প্রবেশ

দশ-ভাণ
৪২
৮ হা। সর্বনাশ হয়েছে, আমার সর্বনাশ হয়েছে।
অনেকেই। কি? কি ?
৮ হা। [বুক চাপড়াইয়া ] হায় হায়, আমার মােল বছরের জোয়ান মেয়েকে
কতকগুলাে অক্সিজেন-গুণ্ডা এসে ধরে নিয়ে চলে গেল। হায় হায় হায় হায় !
বুক চাপড়াইতে লাগিল
৫ হা। থানায় খবর দিয়েছ ?
৮ হা। সেখানেই যাচ্ছি, কিন্তু দারােগাও যে অক্সিজেন।
৪ হা। তবু যাও, থানায় খবর দেওয়াটা দরকার।
৩ হা। সে তাে ঠিকই।
৮ হা চলিয়া গেল
১ হা। বন্ধুগণ, এখনও কি সন্দেহ আছে যে, আমাদের ধর্ম বিপন্ন ?
২ হা। দুটি বিষয়ে আমার ঘাের সন্দেহ আছে।
১ হা কুঞ্চিত করিয়া ২ হা-র পানে চাহিলেন
১ হা। কি কি ?
২ হা। আমার প্রথম সন্দেহ, তুমি এই যে আজ হঠাৎ ‘ধৰ্ম্ম ধৰ্ম্ম’ বলে
চেঁচিয়ে একটা হৈ চৈ বাধাবার চেষ্টায় আছ, এর মূল কারণ ধৰ্ম্ম নয়, এর মূল
কারণ তােমার ছেলে চাকরি পায় নি, একটি অক্সিজেনযুবক পেয়েছে। আমার
দ্বিতীয় সন্দেহ, এই যে হাইড্রোজেনকুমারীটি অক্সিজেন-গুণ্ডা কর্তৃক অপহৃত
হয়েছে, এর মূল কারণ ওর বাপটি অপদার্থ। খুব সম্ভবত ওই মেয়েটির কাছ
থেকে ওই গুণ্ডার দল প্রণয়ঘটিত কোনরূপ ইসাও পেয়েছিল, তা না হলে
দিনে দুপুরে
১ হা। তুমি পাষণ্ড।
২ হা। সম্ভবত। কিন্তু আমার যা সত্যি সত্যি মনে হচ্ছে, অকপটে আমি
তা বলতে বাধ্য এবং এখানকার লােকাল-বাের্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে ধৰ্ম্ম নিয়ে
দলাদলি করবার পক্ষপাতীও আমি নই।

৪৩ সে তত ঠিকই। ১ হা। আবার বলছি, তুমি পাষণ্ড। আমাদের ভােটের জোরে আজ তুমি লােকাল-বাের্ডের চেয়ারম্যান হয়ে অক্সিজেনদের চাকরি দিচ্ছ, লজ্জা করে তােমার ? ৫ হা। [ ৬ হা-কে জনাস্তিকে কোণঠাসা করেছে। ৬ হা। [ চুপি চুপি ] করবে না, অতি পাজি লােক যে ! কিছুতেই কন্টাক্টটা আমায় দিলে না হে। ২ হা। চুপি চুপি বললেও তােমার কথাটা শুনতে পেয়েছি। দেখ, লােকাল-বাের্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে আমি ন্যায়বিচার করতে বাধ্য। আমায় সব দিক ভেবে তবে তাে- ৭ হা। [ হাসিয়া ] কিন্তু ভায়া, স্বজাতির উপকার করা কি ন্যায়ধৰ্ম্মের বাইরের জিনিস ? এই যে আমরা না খেয়ে না দেয়ে তােমার ভােটের জন্য চতুর্দিক তােলপাড় করে বেড়ালাম, এইটেই কি তার প্রতিদান? ২ হা। আমায় কি করতে বল তােমরা। সমস্ত অক্সিজেনদের আপিস থেকে তাড়িয়ে দোব ? ১ হা। নিশ্চয়, পত্রপাঠ- ৭ হা। না গাে, না, সবাইকে তাড়িয়ে দিতে যাবে কেন, তবে আমাদের দিকটাও একটু দেখাে, এই আর কি। ২ হা। যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। আমি ১ হা। কিছুই করছ না তুমি। তুমি ভেবেছ, অক্সিজেনদের খােশামােদ করে হাতে রাখতে পারলে আগামী ইলেক্শনে তােমার সুবিধে হবে। মনেও স্থান দিও না , ওরা সাপের জাত, সুযােগ পেলেই ছােবল দেবে। ৬ হা। নিঃসন্দেহে। ২ হা। কিন্তু আমাদের মধ্যেই বা একতা কই, আমাদের মধ্যে খুব বড় একটা দল অক্সিজেনদের সঙ্গে বেশ মেলামেশা করে। তারা বিশ্বপ্রেমিক।

দশ-ভাণ ৪৪ ১ হা। তারা স্বার্থপর। তারা দুদলেরই সুবিধেটা পুরােমাত্রায় ভােগ করতে চায় এতটুকু স্বার্থত্যাগ না করে। তারা সুবিধেবাদী, তারা পাঁঠার মাংসটি খেতে চায়, কিন্তু পাঁঠা কাটা দেখতে পারে না, আড়ালে পাঠাটি অপরকে দিয়ে কাটিয়ে নিতে চায় ! ৬ হা। [ ১ হা-কে ] অত কথায় দরকার কি, তুমি মীটিং করতে চাও, কর না হে, আমি তােমার স্বপক্ষে আছি। [ ৪ হা-কে তুমি নেই ? ৪ হা। নিশ্চয়। আমার কিন্তু মনে হয়, ভেবে দেখা উচিত। ধাঁ করে কিছু একটা ২ হা। মীটিং করতে আমার আপত্তি নেই। সময়ে খবর পেলে আসব, এখন আমি চলি। এস হে। ২ হা ও ৩ হা চলিয়া গেলেন ৬ হা। [ ২ হা-র গমনপথের দিকে চাহিয়া ] অতিশয় দাম্ভিক লােক। মােসায়েবটিও জুটেছে বেশ। ৭ হা। [ উচ্চাঙ্গের হাসি হাসিয়া ] গােড়ায় গােড়ায় বলি নি আমি ! গরিবের কথা বাসী হ'লে মিষ্টি লাগে ভায়। ৫ হা। [ সবিস্ময়ে ] আপনি তাে মশাই, ওকে ভােট দেবার জন্যে সাধাসাধি করেছিলেন, এখন আবার বলছেন- ৭ হা। আহা, সে আগেই বলেছিলাম আমি, ইলেকশনের আগে অনেক আগে—[ ১ হা-কে দেখাইয়া ] ও সব জানে। ৫ হা। এইবার ব্যাপারটা খুলে বল । ১ হা। এর পরের ইলেক্শনে আমি দাড়াব। ৪ হা। নিশ্চয়। ৬ হা। মীটিংটা করে ফেল। ৭ হা। তুমি দাড়ালে তত বাঁচি আমরা। তাই তাে আমি গােড়ায় ৪৫ জল জানতে চাইছিলাম, কি নিয়ে মীটিং করবে, এখন ব্যাপারটা পরিষ্কার হ’ল । তা ছাড়া ও লােকটার সামনে খােলাখুলিভাবে তােমার কথায় সায় দিতেও পারছিলাম না। বােঝই তাে। নেপথ্যে বাদ্যভাণ্ড ও কলরব শোনা গেল ৫ হা। [ দূরের দিকে চাহিয়া ] একদল অক্সিজেন এই দিকে আসছে হে, প্রসেশন করে বাজনা বাজিয়ে। ১ হা। তাই নাকি? ৬ হা। হঁা হে, একটি দঙ্গল। ১ হা। খুব সম্ভব মীটিং করবে। তালে ঠিক আছে ওরা। অথচ আমরা- ৭। চল, একটু আড়ালে দাড়িয়ে শােনা যাক, কি করে ব্যাটারা। হাইড্রোজেন-পরমাণু দল অন্তহিত হইল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে গৈরিক-পতাকাধারী গৈরিক-পরিচ্ছদ- পরিহিত অক্সিজেন-পরমাণুগণের প্রবেশ। একটি অক্সিজেন-যুবকের স্বন্ধ হইতে হামোনিয়ম বিলম্বিত, আর একজনের মুখে বাঁশী বাকি কয়েকজন জাতীয় সঙ্গীত গাহিতেছেন। ইহা ব্যতীত আরও অনেকে আছেন। হাইড্রোজেন-পরমাণুদের অনুমান সত্য, একটি সভাই হইবে। একজন মাল্যশশাভিত সভাপতি এবং ঠিক পিছনেই তাহার আসন বহন করিয়া একটি যুবক দাড়াইয়া আছেন। নিকটেই আর একজনের মস্তকে একটি পাট-করা শতরঞ্জি দেখা যাইতেছে। জাতীয় সঙ্গীত চলিতে লাগিল। -জাতীয় সঙ্গীত আমরা আৰ্য, আমরা অক্সিজেন t আমরা শুদ্ধ আমরা বুদ্ধ আমাদের কথা ভগবান স্মরিছেন।

দশ-ভাণ
৪৬
নিৰ্মল করি বিষাক্তে
বিষ্ণুভক্তে, কি শক্তে
তীব্র দহনে জালাই আমরা
গালাইয়া করি ঢালাই আমরা
অক্সাইডের সনাতন ছাঁচে হে-
গ্রাহ্য করি না কেবা কিবা বলিবেন।
আমাদের কথা ভগবান স্মরিছেন।
আমারা শুদ্ধ
আমরা বুদ্ধ
আমরা আৰ্য, আমরা অক্সিজেন।
সঙ্গীত শেষ হইয়া গেলে সভাপতির অসিনটি যথাস্থানে সন্নিবিষ্ট হইল, শতরঞ্জিটিও পাতা হইল।
দেখিতে দেখিতে সভা জমিয়া উঠিল, যাঁহারা বসিতে পাইলেন বসিয়া পড়িলেন, যাঁহারা পাইলেন
দাঁড়াইয়া রহিলেন। দেখা গেল, সভায় কেবল অক্সিজেন-পরমাণু নয়, হাইড্রোজেন-পরমাণুও
অাছেন। ১ হা, ৪ হা, ৫ হা, ৬ হা এবং ৭ হাও সভাপতির পিছন দিকে ভিড়ের মধ্যে
আসিয়া জুটিলেন।
সভাপতি। আজ সকাল থেকে ক্রমাগত সভা করে বেড়াচ্ছি, আরও
দু জায়গায় বাকি আছে, সুতরাং আপনাদের যার যা বলবার আছে, একে একে
চটপট বলে যান।
একটি অক্সিজেন-পরমাণু উঠিয়া দাড়াইলেন
আপনি বলবেন ? বেশ, বলুন।
১ অ। আমরা সকলেই এক বিরাট কারাগারে বন্দী, আমাদের বাহির
হইবার পথ নাই, দুর্ভেদ্য কারা-প্রাচীর নিষ্ঠুর নিশ্চলতায় আমাদের পথ বােধ
করিয়া দাড়াইয়া আছে। কিন্তু আমাদের কারা-প্রাচীরের একটা বিশেষত্ব এই
যে, ইহা দুর্ভেদ্য হইলেও স্বচ্ছ। ইহার ভিতর দিয়াই আমরা আকাশ দেখিতে
পাই, মহাকাশচারী সূর্য-চন্দ্র-গ্রহ-নক্ষত্রের জ্যোতির্ময় অভিযান বিস্মিত নয়নে

৪৭ চাহিয়া দেখি, ছুটিয়া বাহির হইতে চাই, কিন্তু দুর্ভেদ্য প্রাচীরে প্রতিহত হইয়া ফিরিয়া আসি, মনে হয় সভাপতি। সংক্ষেপ করুন। ১ অ। মনে হয়, কবে ওই মহাকাশে মুক্তপক্ষ বিহঙ্গমের মত স্বচ্ছন্দে সঞ্চরণ করিতে পারিব ! মনে হয়, কবে আমাদের এই অভিশপ্ত জীবনের অবসান হইবে ! মনে হয়- ২ অ। ( ঈষৎ নিম্ন কণ্ঠে ] আরে কচু খেলে যা, তুমি আগে ডিষ্ট্রিক্ট- বাের্ডের রাস্তার কথাটা বল না, আকাশ নিয়ে পরে মাথা ঘামিও। সভাপতি। [ শান্ত কণ্ঠে ] সংক্ষেপে কাজের কথাটাই আগে বলুন। ১ অ। আচ্ছা বেশ। গলা-খাকারি দিয়া বক্তৃতার মােড় ফিরাইলেন আপনারা সকলেই বােধ হয় লক্ষ্য করিয়া থাকিবেন, আজকাল ডিষ্ট্রিক্ট- বাের্ডের রাস্তাগুলির কি ভীষণ অবস্থা। প্রায় প্রতি রাস্তাতেই গ্রীষ্মকালে এক হাঁটু ধূলা এবং বর্ষাকালে এক হাঁটু কাদা থাকে। পুলগুলিও মেরামত-অভাবে জীর্ণ। ইহার কারণ অনুসন্ধান করিলে জানা যায়, কন্টাক্টারেরা ফাকি দিতেছে। এই প্রসঙ্গে সমবেত ভদ্রমণ্ডলীকে একটি কথা স্মরণ করাইয়া দিতে চাই যে, বর্তমানে ডিষ্ট্রিক্ট-বাের্ডের শতকরা আশিজন কন্টাক্টার এবং পঁচাত্তরজন ওভারশিয়ারই হাইড্রোজেন-জাতীয়। যােগ্যতা সত্ত্বেও বহু অক্সিজেন-কৰ্ম্মী দেশের কাজে নিজেদের শক্তি নিয়ােগ করিবার অধিকার হইতে অন্যায় ভাবে বঞ্চিত হইয়াছেন। ডিষ্ট্রিক্ট-বাের্ড এবং লােকাল-বাের্ড উভয় প্রতিষ্ঠানেরই চেয়ারম্যান হাইড্রোজেন। হাইড্রোজেন যখন কর্ণধার, তখন অক্সিজেনদের কর্ণই যে বারংবার নিপীড়িত হইবে, তাহাতে যদিও বিস্মিত হইবার কিছু নাই, তবু আমরা করদাতাগণ, এই সভায় আমাদের কাতর প্রতিবাদ জ্ঞাপন করিতে আসিয়াছি। আশা করি, ইহা নিষ্ফল হইবে না।

দশ-ভাণ
৪৮
২ অ। বাঃ, বেড়ে বলেছ, এইবার ব’স।
সভাপতি। হ্যা, আপনি এবার বসুন।
করতালির মধ্যে ১ অ উপবেশন করিলেন
আরও যদি কারও কিছু বলবার থাকে তত বলুন।
৩ অ। [ সবিনয়ে ] আমাকে এরা এই সভায় কিছু বলবার জন্যে অনুরােধ
করেছেন, আমিও তাতে সম্মতি দিয়েছি—নিজের বাগ্মিতা জাহির করবার জন্যে
নয়, কারণ আমি যে বাগ্মী নই, তা আপনারা সকলেই জানেন ; আমি সম্মতি
দিয়েছি কতকটা কর্তব্যের খাতিরেও বটে, কতকটা আপনাদের সাহচৰ্য্যসুখ
লাভ করবার জন্যও বটে। বর্তমানে হাইড্রোজেন-অক্সিজেনের বিরােধটা
অতিশয় প্রবল আকার ধারণ করেছে, এবং এ সম্বন্ধে সত্য মিথ্যা নানারকম
গুজব বক্তৃতায় ও খবরের কাগজের মারফৎ চতুর্দিকে প্রচারিত হওয়াতে
সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই যেমন ধরুন, ‘নারী-ধর্ষণের কথা।
কতকগুলি দুৰ্বত্ত প্রতি বৎসরই এই হীন কাৰ্য্য করে থাকে, গত বৎসরে এ
সম্বন্ধে যতটুকু সত্য আমি সংগ্রহ করেছি, সেইটুকুই এই সভায় বলব।
কোন মন্তব্য আমি করব না, আপনারা নিজেরাই এ থেকে যা বােঝবার
বুঝে নিন।
অক্সিজেন কর্তৃক অক্সিজেন-নারী ধর্ষণ
বিধবা-১২ জন
সধবা-২৪ জন
কুমারী—১৮ জন= মােট ৫৪ জন
অক্সিজেন কর্তৃক হাইড্রোজেন-নারী ধর্ষণ
বিধবা-৭ জন
সধবা-১৩ জন
কুমারী—৬ জন= মােট ২৬ জন

৪৯
হাইড্রোজেন কর্তৃক হাইড্রোজেন-নারী ধর্ষণ
বিধবা—৩৫ জন
সধবা-২০ জন
কুমারী—১৩ জন = মােট ৬৮ জন
হাইড্রোজেন কর্তৃক অক্সিজেন-নারী ধর্ষণ
বিধবা-২২ জন
সধবা—২১ জন
কুমারী—৫ জন = মােট ৪৮ জন
স্ট্যাটিটিস থেকে প্রমাণ হচ্ছে যে, হাইড্রোজেনরাই অধিকসংখ্যক নারী
ধর্ষণ করেছেন, যদিও অক্সিজেনরাও এ বিষয়ে একেবারে নিরপরাধ নন। আমি
নিজে অক্সিজেন-জাতীয় হলেও সকলের জন্যই লজ্জাবােধ করছি, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে
আমি হাইড্রোজেন-জাতীয়দের এই অধিক অপরাধ-প্রবণতার দিকে কর্তৃপক্ষদের
দৃষ্টি আকর্ষণ না করে পারছি না। এর বেশি আমার আর কিছু বলবার
নেই।
করতালির মধ্যে উপবেশন করিলেন
সভাপতি। আর যদি কেউ কিছু বলতে চান তাে বলুন এবার।
৪ অ। আমাদের পাড়ার কয়েকটি কুমারী আপনাদের সম্মানার্থে ওরিয়েন্টাল
নাচ-গান প্রাকৃটিস করছে কদিন থেকে। যদি অনুমতি করেন, তাদের নিয়ে
আসি।
সভাপতি। আর কারও কিছু বলবার নেই?
৪ অ। আজ্ঞে না।
সভাপতি। নিয়ে আসুন তা হলে। বেশি দেরি করবেন না—আরও দু
জায়গায় যেতে হবে আমাকে, মনে রাখবেন।
৪ অ। আজ্ঞে না, এক্ষুনি নিয়ে আসছি।
ভিড় ঠেলিয়া ছােকরা বাহির হইয়া গেল এবং ক্ষণপরেই গােটা চারেক মেয়েকে আনিয়া হাজির

দশ-ভাণ করিল। দেখিবার মত বস্তু চারিটি। তাহারা আসিতেই সকলে সরিয়া গিয়া নাচের আসর করিয়া দিল এবং নৰ্তকীগণ আধুনিক কায়দায় হাত-পা বাঁকাইয়া নাচ-গান শুরু করিল -গান- নীল আকাশের হাতছানি জানি জানি জানি গাে বহন করে কোন্ বাণী । মন ভরে যায় উদাসে বুক ভরে যায় হুতাশে আনমনে গাে আনমনে খুলে রাখি দখিন বাতায়নখানি। নীল আকাশের হাতছানি পরাণ চঞ্চল করে- আঁখির কোণে জল ভরে হায় হায় হায় হায় রে- মনের বীণায় যায় কে মধুর মীড় টানি। নীল আকাশের হাতছানি নৃত্যগীত-অবসানে নর্তকীগণ এক পার্শ্বে উপবেশন করিতেই সভাপতি মহাশয় কালক্ষেপ না করিয়া উঠিয়া দাড়াইলেন। ভদ্রলােক অক্সিজেন-বংশাবতংস, ইহার বিদ্যায় বুদ্ধিতে চরিত্রবলে অক্সিজেন-কুল উজ্জ্বল। সভাপতি। অদ্য এই দুর্দিনে অক্সিজেন-বংশীয় পৌরজনকে আমি পুনরায় আমাদের অতীত গৌরব-কথাগুলি শুনাইতে চাই। প্রতি সভায় বরাবর আমি এই কথাগুলিই বারম্বার আবৃত্তি করিতেছি এই আশায় যে, আমাদের অতীত গৌরব-কথাগুলি স্মৃতি-পথে সতত জাগরূক রাখিলে আমরা হীনকাৰ্য্য করিতে সঙ্কুচিত হইব। আমরা যে বিশ্বব্যাপারে নিতান্ত তুচ্ছ করিবার মত বস্তু নহি, জল বস্তুত আমরা যে আছি, তাহার প্রথম আভাস পাইয়াছিলেন Boyle। কিন্তু তিনি আভাস মাত্রই পাইয়াছিলেন, আর কিছুই পান নাই। সপ্তদশ শতাব্দীতে John Mayow সত্যের কিছু নিকটবর্তী হইয়াছিলেন, কিন্তু তিনিও আমাদের প্রকৃত রূপটি কি, তাহা ধরিতে পারেন নাই। হয়তাে পারিতেন, কিন্তু তাহার অকালমৃত্যুতে এবং ফ্লজিস্টন থিওরির প্রাদুর্ভাবে তাহা আর ঘটে নাই। অষ্টাদশ শতাব্দীর তৃতীয় পদে Schecle এবং Priestley আমাদের বিশিষ্ট অস্তিত্ব সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হইয়া রসায়ন-জগতে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। সমর্থ হইয়াছিলেন বটে, কিন্তু তিনি আমাদের প্রকৃত রূপটি, আমাদের চরিত্রের বিশিষ্ট ধৰ্মটি আবিষ্কার করিতে পারেন নাই। সে আবিষ্কার করিয়াছিলেন মহামতি lavoisier; এই Lavoisievই সর্বপ্রথম বুঝিয়াছিলেন যে দহন মানেই আমাদের সহিত ঘনিষ্ঠ মিলন। শুনিয়াছি, আমাদের এই মিলনের ফলে Neutral oxide, Acidic oxide, Basic oxide, Amphoteric oxide, Peroxide 97 Compound oxide নামে ছয় প্রকার সঙ্কর কিন্তু প্রবল-শক্তিসম্পন্ন বিবিধ-গুণ- সমন্বিত রাসায়নিক বস্তুর উদ্ভব হইয়াছে। শুনিয়াছি- পিছন দিকের ভিড় ঠেলিয়া ১ হা অগ্রসর হইয়া আসিলেন। তাঁহার মুখমণ্ডল জাকুটি-কুটিল, চক্ষুদ্বয় অগ্নিবর্ষণ করিতেছে ১ হা। আমার কিছু বক্তব্য আছে। আরও আগাইয়া আসিলেন। সভাপতি মহাশয় উচ্ছাসের মুখে বাধা পাইয়া একটু থতমত খাইয়া গেলেন। সভাপতি হিসাবে হয়তো তিনি ১ হা-কে বাধা দিতে পারিতেন, কিন্তু ১ হা-র দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ভাবভঙ্গি দেখিয়া নিরস্ত হইলেন সভাপতি। [ নিরীহভাবে ] বেশ, বলুন কি বক্তব্য আপনার। আগে বললে দেখতে শুনতে সব দিক থেকেই শােভন হত। [ বসিলেন ] ১ হা। আগে কিছু বলবার আমার ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু আপনার বক্তৃতা শুনে আমার ধমনীতে ধমনীতে সমস্ত রক্ত টগবগ করে ফুটে উঠেছে।

দশ-ভাণ নাসারন্ধ বিস্ফারিত হইল সভাপতি। বেশ, বলুন। ১ হা। [ উত্তেজিত উদাত্ত কণ্ঠে ] নিজেদের মশাল-আলােকে যদি আপনা- দের চক্ষু অন্ধ না হত তা হলে আপনারা দেখতে পেতেন, নিজেদের ঢক্কা- নিনাদে যদি আপনাদের কর্ণ বধির না হত তা হলে আপনারা শুনতে পেতেন যে, হাইড্রোজেন নামেও এক অতি প্রাচীন বনিয়াদী জাতি বহুকালাবধি আপনাদের সান্নিধ্যে বাস করছে ; বুঝতে পারতেন, তাদের মহিমাও আপনাদের মহিমার চেয়ে কিছুমাত্র কম নয় ; স্বীকার করতে কুষ্ঠিত হতেন না যে, তাদের প্রাচীন ইতিহাসের বুকেও Paracelsus Cavendish এবং lavoisier-এর নাম স্বর্ণাক্ষরে খােদিত আছে ; চিন্তা করে শঙ্কিত হতেন যে, আগ্নেয়গিরির উৎক্ষিপ্ত ধূমরাশিতে, সূর্যের জ্বলন্ত শিখায়, বায়ুলােকের উস্তরে হাইড্রোজেন- পরমাণুগণ নিত্য বিরাজমান ; অনুসন্ধান করে জ্ঞানলাভ করতেন যে, আমরাও Hydride নামক রাসায়নিক বস্তুর জনক ; প্রতি মুহূর্তে হৃদয়ঙ্গম করতেন যে, সহসা ভিড়ের ভিতর হইতে একটি পাদুকা নিক্ষিপ্ত হইল, এবং তাহা আসিয়া ১ হা-র বুকে লাগিল। ১ হা থামিয়া গেলেন, কিন্তু ক্ষণপরেই পাদুকাটি উত্তোলন করিয়া পুঙ্গব কণ্ঠে গর্জন করিয়া উঠিলেন, •• যে ভীরু নপুংসক ভিড়ের মধ্যে আত্মগােপন করে কাপুরুষের মত এই জুততা ছুড়েছেন, তিনি যদি জারজ না হন, তা হলে এগিয়ে আসুন তিনি, তাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করছি, চলে আসুন। আস্তিন গুটাইয়া আগাইয়া গেলেন। সভা নিস্তব্ধ আবার বলছি, চলে আসুন। আরও খানিকটা আগাইয়া গেলেন। আগাইয়া যাইতে গিয়া ঝোঁকের মাথায় তিনি একজন নর্তকীর পা মাড়াইয়া দিলেন, নর্তকীটি কাতর কণ্ঠে “উঃ, বাবা গাে” করিয়া উঠিলেন জন জনৈক অ। মেয়েমানুষের গায়ে হাত দিয়েছে, মেয়েমানুষের গায়ে হাত দিয়েছে। সভায় একটা কলরব হইতে লাগিল। দেখা গেল ৩ অ, যিনি নারী-ধর্ষণ বিষয়ে বক্তৃতা দিয়াছিলেন, তিনি গা বাঁচাইয়া সরিয়া পড়িতেছেন। কলরব ক্রমশ বাড়িতে লাগিল। জনৈক হাইড্রোজেন-যুবক কর্তৃক আহত হইয়া সভাপতি রক্তাক্ত কলেবরে ভূশায়ী হইলেন। আরও উত্তেজনার সৃষ্টি হইল। ঘুষি, জুতা, ছাতা, ছড়ি, লাঠি এবং অবশেষে ছােরাছুরিও চলিতে লাগিল। উভয় পক্ষেরই দুই চারিজন রক্তাক্ত হইয়া ভূমিশয্যা গ্রহণ করিলেন। কলরবে, আর্তনাদে, গালাগালিতে সমস্ত স্থানটা ভয়াবহ হইয়া উঠিল। ব্যাপার যখন চরমে উঠিয়াছে, তখন দড়াম করিয়া একটা শব্দ হইয়া চতুর্দিক অন্ধকার হইয়া গেল এবং দুইটি প্ল্যাটিনাম ইলেকটিক নােডের মধ্যবর্তী স্থান তড়িৎশিখায় ক্ষণিকের জন্য আলােকিত হইয়া তড়িৎবৎ মিলাইয়া গেল। আলাে জ্বলিলে দেখা গেল, হাইড্রোজেন অক্সিজেন কেহ নাই, একটি টেবিলের উপর অবস্থিত ফ্লাস্কে নিৰ্ম্মল জল টলমল করিতেছে। তড়িৎশিখার যাদুস্পর্শে হাইড্রোজেন- অক্সিজেন পরমাণুগুলির লক্ষঝম্প জল হইয়া গিয়াছে। যবনিকা অবাস্তব একটি প্রশস্ত কক্ষ। কক্ষের দুইটি দ্বার। আসবাবপত্র বিশেষ কিছু নাই, কিন্তু অল্প যাহা আছে তাহা বেশ মূল্যবান। ঘরে দুইখানি টেবিল আছে। একটি অপেক্ষাকৃত বড়, সেটি কোণের দিকে রহিয়াছে। তাহার উপর রক্তবর্ণ শেড, দেওয়া একটি ইলেক্‌টিক বাতি এবং তিন-চারখানি পুস্তক ছাড়া আর কিছু নাই। পুস্তকগুলি উপযুপরি সাজানাে আছে। টেবিলটির পাশে একটি আরামকেদারা এমনভাবে রহিয়াছে যে তাহাতে শুইয়া ইলেকটি বাতিটির সহায়তায় বেশ পড়া যায়। আরাম কেদারার নিকট একটি চেয়ারও রহিয়াছে। দ্বিতীয় টেবিলটি ছােট। সেটি ঘরের মাঝামাঝি বাম দেওয়াল ঘেসিয়া রহিয়াছে। দুইটি টেবিল এমনভাবে আছে যে, একটি আর একটিকে আড়াল করিতেছে না। দ্বিতীয় টেবিলটির দুই পাশেও দুইখানি বেতের চেয়ার রহিয়াছে। সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে। ছােট টেবিলটির সামনে দাঁড়াইয়া বিখ্যাত লেখক অশােক দত্ত পাইপে তামাক ভরিতেছেন। টেবিল ল্যাম্পটি এখন জ্বলিতেছে না, শিলিং ল্যাম্প হইতে ঘরটি উজ্জ্বলভাবে আলােকিত। অশােকবাবু বেশ একটি মূল্যবান ড্রেসিং গাউন পরিধান করিয়া রহিয়াছেন। ভৃত্য সিবি একটি ট্রে-তে করিয়া কফির সরঞ্জাম লইয়া প্রবেশ করিল। অশােক। কি রে, কজনের সঙ্গে আলাপ-টালাপ করলি ? একটু সলজ্জভাবে হাসিয়া সিবি ছােট টেবিলটিতে কফির সরঞ্জাম রাখিল। আলাপ-টালাপ বেশী করাে না, বুঝলে? পাইপ ধরাইলেন সিবি। আজ্ঞে না। অশােক। কারাে সঙ্গে আলাপ হয় নি ? সিবি। মাত্তর একজনের সঙ্গে হয়েছে। আজ যখন বাজার করতে যাচ্ছিলাম, তখন মাঠের ওপাশে যে বাড়িটা রয়েছে সেই বাড়ীরই একটি বাবু আমাকে ডেকে আমাদের কথা জিগ্যেসাবাদ করছিলেন। সিৰি কাপে কফি ঢালিতে লাগিল

অবাস্তব
অশােক। কি জিগ্যেসাবাদ করছিলেন ?
সিবি। আপনার নাম ধাম সব জিগ্যেস করছিলেন ; আরও জিগ্যেস
করছিলেন এখানে এসেছেন কেন, এই সব আর কি
অশােক। তুই কি বললি?
সিবি। বললাম বাবুর শরীর খারাপ তাই এখানে এসেছেন হাওয়া
বদলাতে। বাবুটি বেশ আলাপী লােক। আপনার সঙ্গে এসে আলাপ করবেন
বললেন।
অশােক একমুখ ধোয়া ছাড়িয়া উপবেশন করিলেন
অশােক। ও, সে সব বন্দোবস্তও করে এসেছ তা হলে! আর কি কি
আলাপ হ’ল তার সঙ্গে?
সিবি কফিতে দুধ ঢালিয়া পেয়ালা আগাইয়া দিল
সিবি। এই সব আর কি, জিগ্যেস করছিলেন তােমার বাবু কি করেন।
অশােক। (স্মিত মুখে ) কি বললি তুই?
সিবি। বললাম—বাবু বই নেকেন !
অশােক। বলেছ তাে? সবাইকে ওই কথা বলে বেড়াও, আর দলে
দলে লােক এসে বিরক্ত করুক আমায় ।
কফিতে এক চুমুক
দিলেন,
সিবি। না, সবাইকে বলব কেন।
অশােক। আর কাউকে বলল না। নিরিবিলিতে থাকবার জন্য কোলকাতা
থেকে পালিয়ে এসে শহরের বাইরে তেপান্তর মাঠে এই বাড়িটা ভাড়া নিয়েছি।
তুমি লােক জুটিও না যেন!
সিবি। (একটু ইতস্তত করিয়া, চুপি চুপি ) শুনছি এটা নাকি ভুতুড়ে
বাড়ি বাবু,
অশােক। কে বললে?

দশ-ভাণ
সিবি। বাজারে শুনলাম। সেই জন্যেই নাকি কেউ ভাড়া নেয় না, আর
সেই জন্যেই নাকি এতবড় বাড়ির ভাড়া এত কম।
অশােক। ওসব বাজে কথা। তুই যা রান্না কর গিয়ে
সিৰি চলিয়া গেল। অশােক দত্ত পেয়ালা তুলিয়া আরও দু-এক চুমুক কফি
পান করিলেন। তাহার পর আপন মনেই বলিলেন
ভুতুড়ে বাড়ি-হাঃ—যত সব গাঁজাখুরি।
আরও দুই-এক চুমুক পান করিলেন। সিবি পুনঃপ্রবেশ করিল
সিবি। ভূদেববাবু দেখা করতে এসেছেন।
অশােক। ভূদেববাবু কে ?
সিবি। ওই যে সকালে যিনি ডেকে জিগ্যেসাবাদ করছিলেন—
অশােক। ও। এই সুরু হ’ল ! আচ্ছা ডেকে নিয়ে এস।
সিবি চলিয়া গেল ও ক্ষণপরে ভুদেববাবুকে লইয়া ফিরিয়া আসিল।
অশোকবাবু উঠিয়া সম্বর্ধনা করিলেন
নমস্কার, আসুন, আসুন, বসুন। একটু কফি খান, সিতাবি আর একটা
পেয়ালা নিয়ে আয়।
সিবি চলিয়া গেল, ভূদেববাবু, উপবেশন করিলেন
ভূদেব। (স-সমে) আপনিই কি বিখ্যাত লেখক অশােক দত্ত ?
অশােক। (হাসিয়া) বিখ্যাত কি না জানি না, তবে লিখি বটে।
ভূদেব। আমি আপনার লেখার একজন বিশেষ ভক্ত।
অশােক স্মিতমুখে চুপ করিয়া রহিলেন
আপনি এখানে এসেছেন কি বেড়াতে ?
অশােক। ঠিক বেড়াতে নয়, চেঞ্জে। কোলকাতায় শরীরটা কিছুতেই
ভাল থাকছে না। ভাবলাম বাইরে কিছুদিন কাটালে যদি
ভূদেব। হয়েছে কি আপনার ?

৫৭
অবাস্তব
অশােক। ডিসপেপসিয়া, কিছুই হজম হয় না—এই চা কফি টফি খেয়েই
কাটাই!
সিবি আর একটি কাপ লইয়া আসিল এবং ভূদেববাবুকে কফি ঢালিয়া দিয়া
চলিয়া গেল। ভূদেব কফি পান করিতে লাগিলেন। মিনিট খানেক পরে
ভূদেব। আপনি এই বাড়িটা নিলেন কেন?
অশােক। কোলকাতায় একদিন এই বাড়ির প্রােপ্রাইটার রমেশবাবুর সঙ্গে
আলাপ হ’ল। তার কাছেই শুনলাম যে এ জায়গাটা ডিপেপসিয়ার পক্ষে
ভাল। তাছাড়া তিনি খুব শস্তায় দিতে চাইলেন বাড়িটা। এমন ইলেকটিক
ফিটেড বাড়ির মাত্র কুড়ি টাকা ভাড়া—খুবই শস্তা।
অশােক পুনরায় পাইপ ধরাইলেন
ভূদেব। (একটু মৃদু হাসিয়া ) বিনা পয়সায় থাকতে দিলেও এ অঞ্চলের
কেউ এ বাড়িতে থাকতে রাজি হবে না।
অশােক। কেন, বলুন তাে?
ভূদেব। বাড়িটার একটা ইতিহাস আছে-
অশােক। কি ইতিহাস ?
ভূদেব। (হাসিয়া) সে আর নাই শুনলেন রাত্তির বেলায় নিয়েই যখন
ফেলেছেন তখন দেখুন না দু-চার দিন বাস করে। আপনি তাে আজই
এসেছেন, না ?
অশােক। হ্যা। শুনিই না কি ইতিহাসটা !
ভূদেব। রাত্তিরে হয়তাে ভয়টয় পাবেন, দরকার কি ! (হাসিয়া) আমিও
আসতাম না এখানে রাত্তিরে, কেবল আপনার নাম শুনে দেখা করতে এলাম।
যদিও নিজের চোখে দেখিনি কখনও কিছু—তবু
অশােক। শুনিই না ব্যাপারটা কি
উভয়ের কফি পান শেষ হইল

দশ-ভাণ
৫৮
ভূদেব। যদি ভয়টয় পান
অশােক। ভয় আমি কাউকে করি না। কাউকে করি না অবশ্য ঠিক নয়,
জন্তু-জানােয়ার চোর-ডাকাতকে করি এবং সে সবের জন্যে আমি প্রস্তুতও থাকি
সৰ্ব্বদা।
টেবিলের ড্রয়ার টানিয়া একটি ছােট পিস্তল বাহির করিয়া স্মিতমুখে সেটি তুলিয়া দেখাইলেন
ভূদেব। (সবিস্ময়ে ) পিস্তলের লাইসেন্স আপনাকে দিয়েছে। সাধারণত
কাউকে দেয় না।
অশােক। আমার বাবা একজন রিটায়ার্ড বড় পুলিশ অফিসার। তার
খাতিরেই পেয়েছি আর কি--
ভূদেববাবু পিস্তলটি নাড়িয়া চাড়িয়া দেখিতে লাগিলেন
ভূদেব। বাঃ, চমৎকার পিস্তলটি, একেবারে হাতের মুঠোর মধ্যে নেওয়া
যায় !
অশােক। সাবধানে নাড়াচাড়া করবেন-লােডেড আছে—দিন আমাকে।
পিস্তলটি দত্ত টেবিলের একধারে সরাইয়া রাখিলেন এবং প্রশ্ন করিলেন
এইবার বলুন তাে শুনি, বাড়ির ইতিহাসটা কি। কোন ভৌতিক ব্যাপার
আমার চাকরটা বলছিল সে কার কাছে নাকি শুনেছে এটা ভুতুড়ে বাড়ি!
ভূদেব। ও, আপনি শুনেছেন তা হলে ?
অশােক। এখুনি শুনলাম। ব্যপারটা কি বলুন তাে
ভূদেব। ওই ভৌতিক ব্যাপারই
অশােক। ভূতে করে কি, ঢিল ছোঁড়ে ?
ভূদেব। (হাসিয়া ) ঢিল ছোঁড়ে না।
?
ক
অশােক। তবে ?
ভূদেব। তা হলে গােড়া থেকেই বলি শুনুন
অশােক। বলুন।
পাইপ নিৰিয়া গিয়াছিল, পুনরায় ধরাইয়া লইলেন

অবাস্তব
ভূদেব। এ বাড়িটা অনেক দিনের। শুনেছি মিস্টার চৌধুরি বলে একজন
বিলেত-ফেরত বাঙালী প্রথমে তৈরি করান বাড়িটা। তিনি ছিলেন সেকেলে
বিলেত-ফেরত, বিলেতে গিয়ে মেম বিয়ে করেছিলেন।
অশােক। তাই না কি।
ভূদেব। হঁ্যা। মেমসায়েবকে নিয়েও এসেছিলেন সঙ্গে করে এদেশে।
তাকে নিয়ে সমাজে বাস করতে পারবেন না বলেই বােধ হয় লােকালয়ের বাইরে
বাড়িটা করিয়েছিলেন। অগাধ টাকা ছিল তার।
অশােক। কি ছিলেন তিনি, ব্যারিস্টার ?
ভূদেব। না, তিনি পাটের ব্যবসা করে লক্ষপতি হয়েছিলেন শুনেছি।
অশোক। ও। তারপর ?
ভূদেব। বিলেতে থাকতেই তাঁর একটি মেয়ে হয়েছিল। সেই মেয়ের
তত্ত্বাবধান করবার জন্যে একটি নিগ্রো চাকর রাখেন তিনি। দেশে আসবার
সময় নিগ্রো ছেলেটিকে সঙ্গে করেও এনেছিলেন।
অশােক। নিগ্রো ?
ভূদেব। হা কুচকুচে কালো একটি নিগ্রো ছেলে।
অশােক। তারপর ?
ভূদেব। তারা সবাই এই বাড়িতেই ছিলেন—মিস্টার চৌধুরি, মিসেস
চৌধুরি, মিস চৌধুরি আর সেই নিগ্রো ছেলেটি। আরও অবশ্য অনেক চাকর
বাকর ছিল, রীতিমত সায়েবি কেতায় থাকতেন তাঁরা।
অশােক। তারপর ?
ভূদেব। মিস্ চৌধুরি আর সেই নিগ্রো ছেলেটির বয়সের তফাৎ ছিল সাত
আট বছর মাত্র। তারা দুজনে একসঙ্গে এই বাড়িতে মানুষ হতে লাগল।
তারপর সাধারণত যা হয়-
অশােক। প্রেম ?
ভূদেব। হ্যা

দশ-ভাণ
অশােক। (হাসিয়া) বেশ জমিয়ে এনেছেন তােত, তারপর কি হ’ল
আত্মহত্যা?
ভূদেব। না, আত্মহত্যা ঠিক নয়, যা হ’ল তা ভয়ানক।
অশােক। কি?
ভূদেব। মিস্টার চৌধুরি রগচটা রাগী মেজাজের লােক ছিলেন। ভয়ানক
মদ খেতেন, রেগে গেলে দিগ্বিদিক জ্ঞান থাকতাে না। কেলেঙ্কারি যখন অনেক
দূর গড়িয়েছে মিস্টার চৌধুরি হঠাৎ একদিন টের পেলেন। টের পেয়ে তিনি
যা করলেন তা সাংঘাতিক। নিগ্রো ছেলেটাকে আর মিস চৌধুরিকে গুলি করে
মেরে ফেললেন।
অশােক। বলেন কি মশাই, নিজের মেয়েকে গুলি করলেন?
ভূদেব। তাই তাে শুনেছি আমরা।
অশােক। তারপর ?
ভূদেব। তারপর তাদের মৃতদেহ সঙ্গে সঙ্গে পুঁতে ফেললেন।
অশােক।
কোথায় ?
ভূদেব। এই বাড়িরই কোনখানে।
অশােক। তাই না কি। তারপর কি হল ?
ভূদেব। তারপর তারা বাড়ি ছেড়ে দিয়ে কোলকাতা চলে গেলেন এবং
কোলকাতাতেই বাড়িটা জলের দামে এক য়্যাংলো-ইণ্ডিয়ানকে বিক্রি করে
দিলেন। সেই য়্যাংলাে-ইণ্ডিয়ানই এসে প্রথমে ইলেকট্রিক কানেকশান নিয়েছিল
বাড়িটাতে। বেচারা কিন্তু বাস করতে পারে নি।
অশােক। কেন, কি হল?
ভূদেব। প্রথম প্রথম আবছা আবছা তারা নাকি ছায়া-মূর্তি দেখতে পেত।
প্রথমে ততটা গ্রাহ্য করে নি। কিন্তু একদিন সকালে উঠে দেখা গেল, তাদের
সতেরাে-আঠারাে বছরের মেয়েটি বিছানায় মরে পড়ে আছে। কে তার ঘাড়টি
মুচড়ে রেখে গেছে।

অবাস্তব অশােক ! ( সবিস্ময়ে) সে কি ? ভূদেব। হ্যা। ম্যাংলাে-ইণ্ডিয়ান সায়েব পালালাে। বাড়িটা এমনি খালি পড়ে রইলাে অনেকদিন। অনেক দিন পরে এক ভাটিয়া কিনলে বাড়িটা। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, ভাটিয়া যেদিন এসে পদার্পণ করলে বাড়িতে সেইদিনই তার মৃত্যু হ’ল ! অশােক। সেই দিনই ! কি করে ? ভূদেব। কি করে তা কেউ ঠিক বলতে পারে না। রাত্তিরে খেয়ে দেয়ে সবাই শুয়েছে-হঠাৎ গভীর রাত্তিরে তারস্বরে চীৎকার ! সবাই ছুটে গিয়ে দেখে বাড়ির মালিক মেজের উপর অজ্ঞান হয়ে পড়ে রয়েছে, কান দিয়ে চোখ দিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে। উভয়ে কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিলেন। সিতাবি আসিয়া প্রবেশ করিল এবং কফির সরঞ্জাম প্রভৃতি লইয়া চলিয়া গেল অশােক। আর কোন ঘটনা আছে ? ভূদেব। অনেক ঘটনা আছে। তারপর বাড়িটা যায় উমাকান্তবাবুর হাতে। উমাকান্তবাবুর ব্যাপারটাও খুব আশ্চৰ্যজনক। তাকে এসে বাড়িতে বাসও করতে হয় নি। বাড়ি কেনবার সঙ্গে সঙ্গেই অর্থাৎ যেদিন ডকুমেন্ট রেজিস্টার্ড হয়ে গেল সেইদিনই তার বড় ছেলে কলেরায় মারা গেল। তিনি অলুক্ষণে বাড়ি রাখলেন না, সঙ্গে সঙ্গে বেচে ফেললেন। কিনলে বেহারের এক জমিদার । বাড়িটা কেনবার পর মাস ছয়েক তিনি আসেন নি। যেদিন এলেন সেদিনটা কিছু হ’ল না, কিন্তু তারপর দিন তিনিও মারা গেলেন। সে এক অদ্ভুত ব্যাপার ! সর্পাঘাতে মারা গেলেন ভদ্রলােক ! শোেক। কি রকম ? ভূদেব। তার চাকরটা বললে যেদিন রাত্রে তিনি মারা যান সেদিন দুটো প্রকাণ্ড সাপ—একটা টকটকে লাল আর একটা কুচকুচে কালাে সমস্ত রাত সারা দশ-ভাণ •• বাড়িময় দাপাদাপি করে বেড়িয়েছে। এত ভীষণ তাদের তর্জন যে রাস্তার লােক পর্যন্ত থমকে দাড়িয়ে গেছে । অশােক। অদ্ভুত তাে। ভূদেব। সত্যিই অদ্ভুত ! অশােক। তারপর ! ভূদেব। তারপর বাড়িটা কিনলেন রমেশবাবু! ঠিক কিনলেন না, পেলেন। তিনি ওই বেহারি জরিদারদের উকিল ছিলেন, ফি হিসেবে তাদের কাছে অনেক টাকা বাকী পড়েছিল ; জমিদার মারা যাওয়ার পর তারা আর টাকা দিতে পারলে না, তার বদলে এই বাড়িটা পেলেন তিনি। নিজে তিনি অবশ্য কখনও এসে এ বাড়িতে বাস করেন নি, করবার সাহসই হয় নি। কিন্তু ভাড়াটে পেলে তিনি ছাড়েন না, বাড়িটা ভাড়া দিয়ে দেন, আর যে ভাড়াটে আসে— সহসা থামিয়া গেলেন অশােক। কি হয় তাদের ? ভূদেব। একটা না একটা কিছু হয় ! অশােক। (হাসিয়া) আপনি বিশ্বাস করেন এসব ? ভূদেব। আমি নিজেই তত তিনজন ভাড়াটের খবর জানি—একজন পাগল হয়ে গেল, একজনকে ছাত থেকে ঠেলে ফেলে দিলে আর একজনের ছােট ছেলেটি যে কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে গেল কোন পাত্তাই পাওয়া গেল না। আর একটা কি বিশেষত্ব জানেন, প্রত্যেকবার আলাদা রকম কিছু একটা হয় ! অশােক পাইপ ধরাইয়া একমুখ ধোয়া ছাড়িলেন অশােক। (হাসিয়া) আপনি অবশ্য যা বললেন তার থেকে কিছুই প্রমাণ হয় না। এ বাড়িতে উপযুপরি কয়েকটা মৃত্যু ঘটেছে তা ঠিক, কিন্তু প্রত্যেক মৃত্যুরই তাে একটা না একটা সঙ্গত কারণও রয়েছে। কেউ সাপে কামড়ে, কেউ কলেরায়, কেউ ছাত থেকে পড়ে, কেউ য্যাপােপ্লেসিতে। এ সবের দ্বারা এটা প্রমাণ হয় না যে এটা ভুতুড়ে বাড়ি। ৮ অবাস্তব ভূদেব। তা অবশ্য ঠিক। নিজের হাত-ঘড়ি দেখিলেন এ অঞ্চলের কিন্তু সব্বাই ভয় করে এই বাড়িটাকে! আপনাকে রাত্তির বেলা এসব গল্প শােনালাম, আপনার ভয় টয় করবে না তত ? অশােক। কিছুমাত্র না। ভূতের গল্প শুনে ভয় পাবার বয়স আর নেই ভূদেব পুনরায় হাত-ঘড়ি দেখিলেন ভূদেব। আজ তা হলে এবার উঠি। রাত প্রায় দশটা হল । অশােক। আচ্ছা। . অশােক ভূদেবের সঙ্গে সঙ্গে দ্বার পর্যন্ত অগাইয়া গেলেন। ভূদেব যথাবিধি নমস্কারান্তে বাহির হইয়া যাইবার পর অশোক খানিকক্ষণ কুঞ্চিত করিয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন, তাহার পর ধীর-পদ-সঞ্চারে ফিরিয়া আসিয়া ছোট টেবিলের নিকট চেয়ারে উপবেশন করিলেন এবং চিন্তিতমুখে রিভলভারটি তুলিয়া নাড়াচাড়া করিতে লাগিলেন। তাহার পর পাইপে তামাক ভরিলেন এবং পাইপটি ধরাইয়া চিন্তা করিতে করিতে অন্যমনস্ক ভাবে পাইপে টান দিতে লাগিলেন।•••সহসা চতুর্দিক অন্ধকার হইয়া গেল। ক্ষণ পরেই যখন আলাে জ্বলিল তখন দেখা গেল অশােকবাবু কোণের দ্বিতীয় টেবিলটির নিকট আরাম কেদারায় শুইয়া একটি বই পড়িতেছেন, গাঢ়রক্তবর্ণ শেড, দেওয়া টেবিল ল্যাম্পটি কেবল জ্বলিতেছে। ঘরের অন্ধকার শেডের আভায় রক্তাভ হইয়া উঠিয়াছে। দ্বারপ্রান্তে খুট করিয়া শব্দ হইল। অশােক তড়িৎস্পৃষ্টবং উঠিয়া বসিলেন। দেখা গেল দ্বারপ্রান্তে একটি কালাে কাফ্রি যুবক আসিয়া দাড়াইয়াছে। তাহার পরিধানে ধপধপে সাদা সাহেবি পােক। অশােকের পানে নিস্পলক নেত্রে চাহিয়া আছে। অশােক। সিবি, সিতাবি— পুনরায় চতুর্দিক অন্ধকার হইয়া গেল। পর মুহূর্তেই শিলিং ল্যাম্পটি জ্বলিয়া উঠিল। দেখা গেল অশােক আরাম কেদারায় নয়, ছােট টেবিলটির কাছে বেতের চেয়ারেই বসিয়া আছেন। সিতাবি আসিয়া প্রবেশ করিল। সিবি। কি বলছেন বাবু? অশােক যেন সম্বিৎ ফিরিয়া পাইলেন। চতুর্দিকে চাহিয়া দেখিলেন ৬৪ অশােক। কি আশ্চর্য জেগে জেগেই স্বপ্ন দেখলুম না কি। দেখ, তােত বাইরে কেউ এসেছে কি-না? সিবি চলিয়া গেল ও ক্ষণ পরেই ফিরিয়া আসিল। সিতাবি। না, কেউ নেই তাে ! অশােক। ভাল করে দেখিচিস্? সিবি। আজ্ঞে হ্যা। এখন আবার কে আসবে । অশােক। রান্নার কত দেরি ? সিবি। বেশী দেরি নেই আর। আমি যাই, সুপটা চড়িয়ে এসেছি চলিয়া গেল অশােক। আশ্চর্য! ঠিক মনে হচ্ছিল আমি যেন খাওয়া দাওয়ার পর আরাম কেদারায় শুয়ে বই পড়ছি আর সেই নিগ্রো ছেলেটা যেন এসে দাড়িয়েছে। ফানি! একটু অস্বাভাবিক ভাবে হাসিলেন , এ রকম কল্পনা করা তাে ঠিক নয়। আশ্চর্য ব্যাপার, ঠিক কিন্তু মনে হচ্ছিল কুঞ্চিত করিয়া খানিকক্ষণ পদচারণা করিলেন। তাহার পর আসিয়া ছােট টেবিলটায় বেতের চেয়ারে বসিলেন। পুনরায় পাইপ ধরাইলেন এবং রিভলভারটা লইয়া নাড়াচাড়া করিতে লাগিলেন। খানিকক্ষণ পরে পুনরায় আবার সমস্ত অন্ধকার হইয়া গেল। ক্ষণ পরেই আলাে জ্বলিলে দেখা গেল আগেকার মতাে অশােকবাবু, কোণের বড় টেবিলটার কাছে আরাম কেদারায় শুইয়া বই পড়িতেছেন। গাঢ় রক্তবর্ণ শেড দেওয়া টেবিল ল্যাম্পটি কেবল জ্বলিতেছে। পুনরায় দ্বারপ্রান্তে খুট করিয়া শব্দ হইল, অশোকবাবু তড়িৎস্পৃষ্টবৎ উঠিয়া বসিলেন ; দেখা গেল সাদা সাহেবি পােষাক পরা কাক্রি যুবকটি স্বারপ্রান্তে দাঁড়াইয়া অশোকের পানে নিনিমেষে চাহিয়া আছে। অশােক। কে ? কাফ্রি যুবক আগাইয়া আসিল এবং আকর্ণবিশ্রান্ত হাসি হাসিয়া দত্তকে বুকিয়া পেলাম করিল। অশােক খােল। বইখানা টেবিলের উপর উপুড় করিয়া রাখিয়া সােজা হইয়া বসিলেন।

অবাস্তব
কি চাই?
কাফ্রি যুবক আরও আগাইয়া আসিল, আর একবার সেলাম করিল এবং পকেট হইতে
একটি ভিজিটিং কার্ড বাহির করিয়া অশােকের হাতে দিল। অশােক টেবিল ল্যাম্পের আলোয়
কার্ডটি পড়িয়া দেখিলেন।
মিস্ চৌধুরি ! কি চান তিনি?
কাফ্রি। ( অস্বাভাবিক মােটা গলায়) মাে-লা-কা-!!
অশোক ক্ষণকাল নির্বাক থাকিয়া উত্তর দিলেন
অশােক। বেশ, ডেকে নিয়ে এস তাকে
কাফি-মুৰ্ত্তি অন্ধকারে মিলাইয়া গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে একটি মােল-সতেরাে বছরের সুন্দরী
মেয়ে দ্বারপ্রান্তে দেখা দিল। মেয়েটির পরিধানে ধপধপে সাদা গাউন, পায়ের মোজা এবং জুতাও
সাদা। পিঠে টকটকে লাল রিবন-বাধা বেণী দুলিতেছে।
কি চান আপনি?
মেয়েটি মুচকি হাসিতে হাসিতে আগাইয়া আসিল
আসুন, বসুন।
মেয়েটি আসিয়া চেয়ারে বসিল, কিন্তু কোন কথা কহিল না, কেবল মুচকি মুচকি
হাসিতে লাগিল
কি চান আপনি
?
মেয়েটি নীরব
কথা বলছেন না কেন?
মেয়েটি নীরব
কি চাই আপনার?
মেয়েটি নীরব
কোন দরকার যদি না থাকে যেতে পারেন আপনি।
বলিবার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটি উঠিয়া চলিয়া গেল। অশােক পুনরায় পড়িতে যাইবেন এমন সময়
আবার দ্বারপ্রান্তে সেই কাফ্রি-মূৰ্ত্তি আবিভূত হইল। ঠিক সেইরূপ আকৰ্ণবিশ্রান্ত হাসি
হাসিয়া আগাইয়া আসিল এবং সেলাম করিয়া পুনরায় তাহার হাতে কার্ড দিল।
মিস চৌধুরি !
কি চান তিনি?

দশ-ভাণ কাফ্রি। (পূৰ্ববং মােটা গলায়) মাে-লা-কা-২। অশােক। যদি কিছু দরকার থাকে আসতে বল ! কিন্তু অশােকের কথা শেষ হতে না হইতে কাফ্রি মিলাইয়া গেল এবং মিস চৌধুরি দ্বারপ্রান্তে দেখা দিয়া পূর্ববং মুচকি হাসিতে হাসিতে আগাইয়া আসিয়া চেয়ারে বসিল আমার কাছে কি দরকার আপনার বলছেন না তাে? মেয়েটি নীরবে মুচকি মুচকি হাসিতে লাগিল কি, দরকারটা কি ? মেয়েটি নীরব বলুন না, গােপনীয় কিছু? মেয়েটি নীরব আপনি বােবা না কি! মেয়েটি নীরবে মুচকি হাসিল কিছুই যদি বলবেন না, তা হলে এসেছেন কেন? মেয়েটি নীরব উদ্দেশ্য কি আপনার ? মেয়েটি নীরব কি আশ্চর্য! কিছু যদি বলবার থাকে বলুন, আর না থাকে তাে যান। মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গে উঠিয়া গেল। আবার দ্বারপ্রান্তে কাফ্রি-মুৰ্ত্তি দেখা দিল এবং পূৰ্ববং হাসিতে হাসিতে আসিয়া সেলাম করিয়া কার্ড দিল আবার মিস্ চৌধুরি ! কি আশ্চৰ্য্য, কি চান তিনি? কাফ্রি। (পূৰ্ববং মােটা গলায়) মােলা-কা-ৎ। অশােক। কিন্তু মােলাকাতের উদ্দেশ্যটা কি! আচ্ছা বিপদে পড়লাম তত ! দরকার থাকে তাে আসতে বল-আর- কথা শেষ হইবার পূর্বেই কাফ্রি অন্তর্হিত হইল এবং মুচকি হাসিতে হাসিতে মিস্ চৌধুরি আসিয়া চেয়ারে বসিলেন

৬৭
অবাস্তব .
দেখুন আমি পড়ছি, আমাকে এ রকমভাবে বিরক্ত করা উচিত নয়
আপনাদের।
হাত দিয়া টেবিলে উপুড় করা বইটি দেখাইলেন। মেয়েটি কোনই উত্তর দিল না
সত্যি সত্যি আপনার দরকারটা কি বলুন দেখি খুলে।
মেয়েটি নীরব
এমন ভাবে বিরক্ত করবার মানে কি
?
মেয়েটি নীরব। অশােকের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটিল। তিনি উচ্চতর কণ্ঠে প্রশ্ন করিলেন
কোন উত্তর দেবেন না আপনি?
মেয়েটি নীরব
আপনি কি মনে করেন আমি ভয় পেয়ে যাব ?
মেয়েটি নীরব
দেখুন ভয় পাবার ছেলে আমি নই। ভুতটুতে আমি বিশ্বাস করি না।
তা ছাড়া, এই দেখুন আমার পিস্তল আছে, আমাকে বেশী রাগাবেন না। রেগে
গেলে দিগ্বিদিক জ্ঞান থাকে না আমার।
পিস্তল দেখিবামাত্র মেয়েটি পাশের দরজা দিয়া সহসা অন্তর্হিত হইয়া গেল এবং
পরমুহুর্তেই একটি মরা শিশু আনিয়া সেটা টেবিলে শোয়াইয়া দুই কোমরে
হাত দিয়া বিকট রবে হাসিয়া উঠিল
মিস চৌধুরি। হা-হা-হা-হা-হা-
সঙ্গে সঙ্গে অশােকের পিস্তল গর্জন করিয়া উঠিল পুনরায় চতুর্দিক অন্ধকার হইয়া গেল।
ক্ষণপরে যখন ঘরের শিলিং ল্যাম্পটি জ্বলিয়া উঠিল তখন দেখা গেল, অশােকের রক্তাক্ত দেহটা
ছােট টেবিলটার উপর উপুড় হইয়া রহিয়াছে, ডান হাতে মুষ্টিবদ্ধ পিস্তলটা হইতে ধোয়া বাহির
হইতেছে। কোণের বড় টেবিলটায় ইলেকটিক বাতি জ্বলিতেছে না এবং সেখানকার একটি
পুস্তকও স্থানচ্যুত হয় নাই।
যবনিকা

নব সংস্করণ সুপারিন্টেন্টে অব পুলিস মিষ্টার রক্ষিতের অফিস-কক্ষ। কক্ষটি বেশ প্রশস্ত অর্থাৎ একটি বড় সেক্রেটেরিয়ট টেবিল, কয়েকখানা চেয়ার, ফাইল সমন্বিত কয়েকটা শেফ, থাকা সত্ত্বেও কক্ষটিতে পরিক্রমণ করিবার মতাে স্থান আছে। মিষ্টার রক্ষিত একটু উত্তেজিতভাবে পরিক্রমণও করিতেছেন। অফিস-কক্ষের পাশে আর একটি ঘর রহিয়াছে, তাহার দরজা দেখা যাইতেছে। মিষ্টার রক্ষিতের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি হইলেও শরীর বেশ বলিষ্ঠ । মুখটা দেখিলে ভয় হয়, হঠাৎ মনে হয় বুলগের মুখে কাঁচা-পাকা এক জোড়া গোফ গজাইয়াছে। পরিধানে খাকি হাফ শার্ট, হাফ প্যান্ট, হােস এবং মিলিটারি বুট। কোমরে চামড়ার চওড়া কোমরবন্ধ। মুখে পাইপ। দ্বারপ্রান্তে খুট করিয়া শব্দ হইল। মিষ্টার রক্ষিত ফিরিয়া দেখিলেন। দ্বাররক্ষী কনেষ্টবলটি প্রবেশ করিয়া মিলিটারি কায়দায় স্যালিউটু করিল এবং একটি কার্ড দিল। মিষ্টার রক্ষিত কুঞ্চিত করিয়া কার্ডটি দেখিলেন- রক্ষিত। (কার্ডটি টেবিলে রাখিয়া ) সা’বকো আনে বােলাে। কনেষ্টবল সেলাম করিয়া চলিয়া গেল। ক্ষণপরেই ধুতি পাঞ্জাবি পরিহিত প্রৌঢ় নিবারণবাবু আসিয়া প্রবেশ করিলেন। নিবারণ মিষ্টার রক্ষিতের বাল্যবন্ধু এবং স্থানীয় কলেজের প্রফেসার। নিবারণ। রক্ষিত, যা শুনছি তা সত্যি নাকি ? রক্ষিত। (ক্ষণকাল নীরব থাকিয়া ) সত্যি। রক্ষিতের চক্ষু দুইটি হইতে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছুটিয়া বাহির হইল। তিনি আরও যেন কি বলিতে যাইতেছিলেন কিন্তু আত্মসম্বরণ করিয়া পাইপটা কামড়াইয়া ধরিলেন। নিবারণ একটা চেয়ার টানিয়া লইয়া উপবেশন করিলেন। নিবারণ। সত্যি অপর্ণা পালিয়েছে ? রক্ষিত। (সহসা উচ্চকণ্ঠে ) হা হা, আমার একমাত্র মেয়ে অপর্ণা পালিয়েছে। তুমি কি তাই নিয়ে ঠাট্টা করতে এসেছ না কি আমাকে! ইফ সাে- পুনরায় আত্মসম্বরণ করিয়া পাইপ কামড়াইলেন

নব সংস্করণ
নিবারণ। ( শান্তকণ্ঠে ) এটা কি ঠাট্টা করবার বিষয় ! বন্ধুর বিপদে আসা
উচিত বলেই এসেছি। যদি বিরক্ত হও, উঠে যাচ্ছি
উঠিবার উপক্রম করিলেন
রক্ষিত। ( সহসা ঘুরিয়া ) Please take your seat and don't
be silly!
নিবারণ পুনরার বসিলেন এবং রক্ষিত পদচারণ করিতে লাগিলেন
নিবারণ । কোন খবরটবর পেয়েছ?
রক্ষিত। কিছু না। কিন্তু সহসা প্রসঙ্গান্তরে উপনীত হইয়া) আচ্ছা,
আমায় মেয়েকে তত তােমরা পড়িয়েছ। তার সম্বন্ধে তােমাদের ধারণা কি বল তাের
নিবারণ। আমার ধারণা খুব ভাল ! ফিলজফির নতুন যে ছােকরা
প্রফেসারটি এসেছেন, চেন বােধ হয় তাঁকে, মঙ্গলময়বাবু তিনিও তাে খুব
প্রশংসা করছিলেন সেদিন। বলছিলেন খুব ভালাে মেয়েটি
রক্ষিত। ভাল মানে কি?
নিবারণ । লেখাপড়ায় ভাল, ব্যবহার ভাল।
রক্ষিত। চরিত্র ?
নিবারণ। আমার তাে ধারণা ছিল ভালই--
রক্ষিত। তা হলে how do you explain this ? তােমাদের কেয়ারে
মেয়েকে কলেজে পড়তে দিলাম, তার এই ফল?
নিবারণ (হাসিয়া) দেখ ভাই, ছাত্রছাত্রীদের চরিত্রের দায়িত্ব নেওয়া
আমাদের সাধ্যাতীত, একরকম অসম্ভব।
রক্ষিত। তােমরা চার্জ নিয়েছ তােমরা জানবে না তাে কে জানবে।
নিবারণ। নােট বই মুখস্থ করিয়ে পরীক্ষা পাশ করানাে যায় কিন্তু চরিত্র
গড়া যায় না। চরিত্র জিনিসটা গড়ে ওঠে ছেলেবেলায়। সে সময় আমরা
কোথা ! তাছাড়া
সহসা থামিয়া গেলেন ও একটু হাসিলেন

দশ-ভাণ
৭০
রক্ষিত। তা ছাড়া কি ?
নিবারণ। হেরিডিটি বলেও একটা জিনিস আছে। হাজার চেষ্টা করলেও
নিমের বিচি থেকে আম গাছ হতে পারে না!
রক্ষিত। তা হলে তুমি কি বলতে চাও?
নিবারণ। আমি বলতে চাই ( যেন কোন একটা রূঢ় সত্য চাপিয়া গেলেন)
রক্ষিত। What do you mean by ă?
নিবারণ। I mean মেয়েদের চরিত্র judge করবার বেলায় বাপের
নিজেদের চরিত্রটা ভুলে যায় ।
রক্ষিত। গস! তুমি কি আমাকে ধর্মের উপদেশ দিতে এসেছ না কি !
ইফ, সাে-
আত্মসম্বরণ করিয়া পুনরায় পাইপ কামড়াইলেন
নিবারণ।
দেখ ভাই, মেয়েকে যখন উচ্চশিক্ষা দিয়েছ তখন অত অধীর হলে
চলবে না। তার তাল সামলাতে হবে।
রক্ষিত। তার মানে?
নিবারণ। মানে, তার স্বাধীনতাকে সহ্য করতে হবে।
রক্ষিত। স্বাধীনতা মানে কি উচ্ছঙ্খলতা?
নিবারণ। তা অবশ্য নয়। কিন্তু এটাও ঠিক যে, লেখাপড়া শেখানো
মানেই শেকল ভাঙবার উপায় শেখানােখাঁচার পাখীকে আকাশের খবর দিলে
খাঁচা সম্বন্ধে তার মােহ না থাকাটাই স্বাভাবিক। তার শিক্ষিত স্বাধীন বুদ্ধির
উপর আস্থা রাখা ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই। অধীর হয়ে না !
মেয়ে পালিয়ে গেছে, অধীর হব না, বল কি ! তা ছাড়া, তার
বিয়ের সব ঠিক ঠাক, জব্বলপুরের জমিদারের বড় ছেলের সঙ্গে। তারা মেয়ে
দেখে পছন্দ করে গেছে। তিন জায়গায় তত পছন্দই করলে না।
রক্ষিত।

৭১ নব সংস্করণ নিবারণ। ছি ছি ছি ছি, তােমরা লেখাপড়া জানা বড় বড় মেয়েকেও গরু-বাছুরের মতাে বের করে দেখাও, ওরা তাে রিভােন্ট করবেই। রক্ষিত। না দেখে লােকে বিয়ে করবে কেন? দেশসুদ্ধ পাত্রীর বাপ পাত্রদের দোরে সাধাসাধি করছে টাকার থলি নিয়ে নিবারণ। তা হলে মেয়েকে লেখাপড়া না শিখিয়ে সকাল সকাল বিয়ে দেওয়াই উচিত ছিল তােমার। দু নৌকোয় পা দিয়ে নদী পার হওয়া শক্ত, ডুবে যাবারই বেশী সম্ভাবনা। রক্ষিত। দেখ নিবারণ, এটা তােমার লেকচার থিয়েটার নয়। আর তােমার বক্তৃতা শােনবার অবসরও নেই আমার। নিবারণ। বক্তৃতা দিতে আসিনি আমি। যে জন্যে এসেছি তা হলে শােন। শুনছি না কি তুমি কলেজের কয়েকজন ছেলেকে অ্যারেষ্ট করেছ? রক্ষিত। নিশ্চয়ই করেছি। ক্রিমিনালকে অ্যারেস্ট করবার জন্যেই গভর্ণমেন্ট মাইনে দিয়ে আমাদের রেখেছে। নিবারণ । (সবিস্ময়ে ) এরা সবাই ক্রিমিনাল্ ? রক্ষিত। আমার সন্দেহ হয় ! নিবারণ। সন্দেহ হবার হেতু ? মিষ্টার রক্ষিত টেবিলের নিকট গেলেন এবং ডুয়ার টানিয়া কয়েকখানা চিঠি বাহির করিয়া নিবারণের হাতে দিলেন রক্ষিত। সব জায়গায় রিপ্লাই প্রিপেড, টেলিগ্রাম করে যখন জানলাম যে মেয়ে জানাশােনা কোন জায়গায় যায় নি, তখন I broke open her boxes and found these love-letters ! সব ব্যাটাকে অ্যারেষ্ট করেছি আমি। নিবারণ সবিস্ময়ে চিঠিগুলি উল্টাইয়া উল্টাইয়া দেখিলেন ও তাহার পর সেগুলি টেবিলে রাখিয়া দিলেন নিবারণ। মানলুম না হয় লাভ-লেটাস লিখেছে। কিন্তু লাভ-লেটাস লেখা ক্রাইম্ নয়। তা যদি হয়, তা হলে সব চেয়ে বড় ক্রিমিনাল তুমি ?

দশ-ভাণ
৭২
রক্ষিত। দেখ নিবারণ, I am not in a mood for jokes now.
নিবারণ। কয়েকটি ছােকরা তােমার মেয়েকে প্রেমপত্র লিখেছে এতে
এতটা খাপ পা হয়ে উঠেছ কেন বল তাে! তােমাকে রসিক বলেই জানতুম !
রক্ষিত। রসিকতার সময় অসময় আছে। এ নিয়ে তুমিও রসিকতা করতে
যদি অপর্ণা তােমার মেয়ে হত।
নিবারণ স্মিতমুখে ক্ষণকাল চুপ করিয়া রহিলেন
নিবারণ।
যে ছেলেগুলিকে আরেষ্ট করেছ কি করতে চাও তাদের
নিয়ে ?
রক্ষিত। এনকোয়ারি ।
নিবারণ। কোথায় তারা ?
রক্ষিত। কাউকে ‘বে দিইনি আমি। কাল সমস্ত রাত লক্-আপে
ছিল, এখন পাশের ঘরে রয়েছে। Good-for-nothing beggars all of
them!
নিবারণ।
কেবলমাত্র সন্দেহের উপর নির্ভর করে এতগুলি ভদ্রলােকের
ছেলেকে এমনভাবে-
রক্ষিত। You shut up! ভদ্দরলােকের ছেলে ! ভদ্দরলােকের ছেলে
ভদ্দরলােকের মেয়েকে এরকম ভাবে চিঠি লেখে না।
নিবারণ। মাঝে মাঝে দু-একটা বানান ভুল ছাড়া চিঠিগুলােতে আর বিশেষ
কোন দোষ দেখলাম না। সকলেই তাে বেশ সরস ভাষায় তােমার মেয়ের
স্তুতিগান করেছে—এতে অত চটছ কেন ?
রক্ষিত। দেখ নিবারণ, there is a limit to everything.
faatan Ought to be!
রক্ষিত। (সহসা আগাইয়া আসিয়া) তােমার উদ্দেশ্যটা কি ?
নিবারণ। এই ছেলেদের গার্জেনরা আমাকে এসে ধরেছে।
রক্ষিত। ও, সুপারিশ করতে এয়েছ তুমি! তবে যে বললে বন্ধুর বিপদ

নব সংস্করণ শুনে ( সহসা অধীরভাবে ) 0 you teachers and professors, you are a hopeless lot of liypocrites ! নিবারণ অবিচলিত নিবারণ। একটা বিষয়ে তােমার তারিফ করতেই হয় ; এতদিন পুলিশে চাকরি করেও ভাষাটা বেশ শ্লীল রাখতে পেরেছ তুমি ! রক্ষিত। দেখ নিবারণ। নিবারণ । ( সানুনয়ে) এদের ছেড়ে দাও ভাই । রক্ষিত। না। নিবারণ। দেখ- রক্ষিত। (প্রায় চীৎকার করিয়া) না, না, না—কিছুতেই এদের ছেড়ে দেব না আমি! This is abduction। নিবারণ। আমি বলছি এরা নির্দোষ। শােন রক্ষিত। কিছু শুনতে চাই না আমি! তােমার সহানুভূতিজ্ঞাপন যদি শেষ হয়ে গিয়ে থাকে—you may go and let me do my duty. (সহসা ) এরা নির্দোষ ! তুমি জানলে কি করে ? নিবারণ। আমার তাই ধারণা। রক্ষিত। ধারণা! আমার কি ধারণা জান ? নিবারণ। কি ? রক্ষিত। সতেরােটা গাধা মরে একটা মাস্টার হয় । নিবারণ। মানে? রক্ষিত। মানে-টানে কিছু শুনতে চাই না আমি—please go. I want to see through the game. দেখ শহরের এতগুলো ভদ্রলােককে চটানাে ঠিক নয়। আজকালকার দিনে রক্ষিত। তুমি কি আমাকে ভয় দেখাতে এসেছ নাকি? -

দশ-ভাণ
৭৪
নিবারণ। মােটেই না। জিনিসটার নানা দিক তােমাকে দেখাচ্ছি-
রক্ষিত। আমি দেখতে চাই না কিছু--please go.
নিবারণ হতাশ হইয়া চুপ করিলেন। রক্ষিত একবার ক্রুদ্ধভাবে তাহার দিকে
তাকাইয়া পদচারণা করিতে লাগিলেন
৯.
রক্ষিত। বসে আছ যে !
নিবারণ। তাড়িয়ে দেবে না কি ?
রক্ষিত। অন্য লােক হ'লে এতক্ষণ দিতাম ! (একটু পরে ) দশটা তাে
বেজে গেছে। তােমার কলেজ নেই
নিবারণ। কলেজের ছুটি। এদের তা হলে ছাড়বে না কিছুতেই ?
রক্ষিত। না।
নিবারণ। কাজটা কিন্তু ঠিক হচ্ছে না। আচ্ছা, উঠি তা হলে।
জিনিসটা ভেবে দেখাে-
রক্ষিত পাইপ ধরাইতেছিলেন, কোন উত্তর দিলেন না, নিবারণ চলিয়া গেলে চেয়ারে গিয়া
বসিলেন এবং ঘণ্টা টিপিলেন। কনেষ্টবল আসিয়া প্রবেশ করিল
রক্ষিত। (একটি চিঠি লইয়া ও লেখকের নাম দেখিয়া) জ্যোৎস্নাভূষণ
কো বােলাও।
কনেষ্টবল চলিয়া গেল। একটু পরে একটি লিকলিকে রােগ গােছর ছােকরা প্রবেশ
করিয়া সভয়ে প্রণাম করিল। রক্ষিত বার দুই তাহাকে
আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করিলেন
রক্ষিত। তােমার পুরাে নাম কি ?
জ্যোৎস্না। আজ্ঞে, জ্যোৎস্নাভূষণ চৌধুরি।
রক্ষিত। তুমি আমার মেয়ে অপর্ণাকে চেন?
জ্যোৎস্না। চিনি।
রক্ষিত। কি করে আলাপ হ’ল ?
জ্যোৎস্না। একসঙ্গে পড়ি আমরা।

৭৫
নব সংস্করণ
রক্ষিত। তাকে প্রেমপত্র লিখতে ?
জ্যোৎস্না। ( ঢোক গিলিয়া) আজ্ঞে না।
রক্ষিত। (একটি পত্র তুলিয়া) এটা তা হ'লে কার লেখা?
পড়িতে লাগিলেন
“প্রাণের অর্পণ, তুমি আজ পার্ড পিরিয়ডে মুখ ঘুরিয়ে বসেছিলে কেন? আমি কেসে
কেসে গলা চিরে ফেললাম তবু আমার দিকে একবার চাইলে না--"
এ কার লেখা?
জ্যোৎস্না। (শুকণ্ঠে ) আজ্ঞে ঠিক বুঝতে পারছি না, এ চিঠি কি
করে—
রক্ষিত। (ধমক দিয়া বুঝতে পারছ না, স্কাউণ্ডেল কোথাকার! চাবকে
পিঠের চামড়া ছাড়িয়ে ফেলব তােমার, তা জানাে?
জ্যোস্না। এইবারটি মাপ করুন, আর কখনাে এমন করব না।
রক্ষিত। অপর্ণা কোথায় আছে জানাে ?
জ্যোৎস্নাভূষণ কাঁদিয়া ফেলিল
জ্যোৎস্না। (চক্ষু মুছিয়া) আজ্ঞে না।
রক্ষিত। (পুনরায় ধমক দিয়া) সত্যি কথা বল ! ঠিক জান তুমি-
জ্যোৎস্না। সত্যি বলছি, জানি না।
রক্ষিত। মিথ্যে বলে আমার কাছে পার পাবে না !
জ্যোৎস্না। সত্যি বলছি সার।
রক্ষিত। আচ্ছা যাও, এখন ওই ঘরে গিয়ে ব’স। সত্যি বলছ কি না,
এখুনি টের পাব আমি।
জ্যোৎস্নাভূষণ পাশের ঘরে চলিয়া গেল। রক্ষিত অবার ঘণ্টা টিপিলেন।
কনেষ্টবল আসিল
রক্ষিত। (আর একটি পত্র দেখিয়া ) বিহঙ্গমবাবু কো বােলাও।
বিহঙ্গম আসিয়া প্রবেশ করিল। বিহঙ্গমের দশ-আনা ছ-আনা চুল ছাঁটা, পায়ে
বকলশ-দেওয়া চেটাইবুনানি স্থাণ্ডাল। ছােকরা বেশ সপ্রতিভ

দশ-ভাণ
৭৬
বিহঙ্গম। food inorning, sir.
রক্ষিত প্রাকৃঞ্চিত করিয়া ক্ষণকাল বিহঙ্গমের মুখের পানে চাহিয়া রহিলেন
রক্ষিত। তােমরা কি জাত ?
বিহঙ্গম। আজ্ঞে আমরা কায়স্থ। মিত্তির আমাদের উপাধি।
রক্ষিত। কোন ইয়ারে পড় ?
বিহঙ্গম। থার্ড ইয়ারে
রক্ষিত। কি কবিনেশন্ ?
বিহঙ্গম। হিস্টি, ফিলজফি। হিস্টিতে অনার্স আছে।
রক্ষিত। আমার মেয়েকে চেন?
বিহঙ্গম। যতগুলি মেয়ে আমাদের সঙ্গে পড়ে সব্বাইকে চিনি। আপনার
মেয়ের নাম কি ?
রক্ষিত। অপর্ণা।
বিহঙ্গম। (পুলকিত কণ্ঠে) খুব চিনি! ফরসা ফরসা দোহারা গােছের
চেহারা তাে?
রক্ষিত পাইপ কামড়াইয়া জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাহার দিকে চাহিলেন
রক্ষিত। পিঠের চামড়ার প্রতি যদি মায়া থাকে ভদ্রভাবে কথার উত্তর
দাও।
বিহঙ্গম। (সবিস্ময়ে ) বেফাস তত কিছু বলি নি।
রক্ষিত। আমার মেয়েকে তুমি চিঠি লিখতে ?
বিহঙ্গম। ক্লাসমেট যখন, লিখে থাকবে দু-একখানা, ঠিক মনে নেই।
রক্ষিত বিহঙ্গমের লেখা পত্ৰখানা তুলিয়া দেখাইলেন
রক্ষিত। এটা কি তােমার লেখা ?
বিহঙ্গম। (আগাইয়া আসিয়া ) কই দেখি—ও হ্যা, আমারই।
( সবিস্ময়ে) আপনি পেলেন কি করে !

११
নব সংস্করণ
রক্ষিত। শেষের দু’লাইন কবিতাও কি তােমার রচনা?
হিষ্ট্রির ক্লাসেতে তুমি কেন হলে লেট
মম হৃদি-শবাক্ষের ওগগা জুলিয়েট ।
বিহঙ্গম। ( হাসিয়া ) হাতের লেখা আমার, কিন্তু রচনা ভরে।
রক্ষিত। পুরাে নাম কি ?
বিহঙ্গম। ভূতনাথ পালিত।
রক্ষিত। কোথায় থাকে সে ?
বিহঙ্গম। নাপতে পাড়ায়।
রক্ষিত। ঠিকানা কি ?
বিহঙ্গম। ফাইভ এ খলু মিঞা লেন।
রক্ষিত ঘণ্টা বাজাইলেন। কনেষ্টবল প্রবেশ করিল
রক্ষিত। বদরুদ্দিন কো বােলাও।
বদরুদ্দিন দারোগা আসিয়া সেলাম করিয়া দাড়াইল
ফাইভ এ খললু মিঞা লেনের ভূতনাথ পালিতকে অ্যারেস্ট করে আন।
বিহঙ্গম সবিস্ময়ে একবার রক্ষিত এবং একবার দাবােগার মুখের পানে
চাহিল। দারােগা চলিয়া গেল
বিহঙ্গম। আমাদের সবাইকে এমন করে হরাস করছেন কেন সার?
কাল সারারাত মশার কামড়ে অত্যন্ত কষ্ট পেয়েছি আমরা।
রক্ষিত। (ধমক দিলেন ) Sliut up, আমার মেয়েকে প্রেমপত্র লিখতে
গেছলে কেন, তার উত্তর দাও।
বিহঙ্গম। এমনি।
রক্ষিত। এমনি মানে ?
বিহঙ্গম। আর পাঁচজন লেখে দেখে আমিও লিখলুম একদিন।
রক্ষিত কটমট করিয়া তাহার দিকে চাহিলেন। কি একটা বলিতে গিয়া
আত্মসম্বরণ করিলেন। তাহার পর সংযতভাবে বলিলেন।
রক্ষিত। অপর্ণা কোথায় পালিয়ে গেছে জান ?

দশ-ভাণ
৭৮
বিহঙ্গম। পালিয়ে গেছে না কি ! জানি না তাে!
রক্ষিত। সত্যি কথা বলল।
বিহঙ্গম। সত্যি কথাই বলছি, এই প্রথম শুনলুম !
রক্ষিত একটি কাগজ ও পেন্সিল আগাইয়া দিলেন
রক্ষিত। এই কাগজে লিখে দাও যে অপর্ণা কোথা গেছে—তুমি কিছু
জানাে না। লিখে নীচে নিজের নাম সই করে দাও।
বিহঙ্গম তাহাই করিল
ও ঘর থেকে ওকেও ডাকো।
বিহঙ্গম জ্যোৎস্নাভূষণকে ডাকিয়া অনিল
রক্ষিত। ( জ্যোৎস্নাকে) এইখানে নাম সই কর।
জ্যেষমা নাম সই করিল
যাও।
জ্যোৎস্নার সহিত বিহঙ্গমও চলিয়া যাইতেছিল, রক্ষিত বাধা দিলেন
তুমি যেও না।
জ্যোৎস্নাভূষণ চলিয়া গেল
কলেজের কোন্ কোন্ ছেলের সঙ্গে অপর্ণার ভাব ছিল জানাে? সত্যি
কথা যদি বল, তা হলে তােমায় ছেড়ে দেব।
বিহঙ্গম। সত্যি কথা বললে বিশ্বাস করবেন ?
রক্ষিত। নিশ্চয় করব।
বিহঙ্গম। কলেজের সমস্ত ছেলেরা ওর সঙ্গে ভাব করবার জন্যে পাগল—ও
কিন্তু কাউকেই আমল দেয় না। ইন্দ্রলাল তাে ক্ষেপে গেছে বললেই হয়—
রক্ষিত পাইপ কামড়াইয়া আত্মসম্বরণ করিলেন
রক্ষিত। বাজে কথা শুনতে চাই না। কার সঙ্গে ওর সব চেয়ে বেশী
মাখামাখি জানাে ?

৭৯ নব সংস্করণ বিহঙ্গম। না। রক্ষিত। যাও-ওঘরে বস গিয়ে তা হলে। স্কাউণ্ডে লস্। বিহঙ্গম গটগট করিয়া চলিয়া গেল। রক্ষিত পুনরায় ঘণ্টা টিপিলেন। কনেষ্টবল আসিল ইন্দ্রলালবাবু কো বােলাও। রক্ষিত ইন্দ্রলালের পত্রটি পড়িতে লাগিলেন। ইন্দ্রলাল আসিয়া প্রবেশ করিল। ইন্দ্রলালের চেহারা দেখিলেই মনে হয় সে কবি। মাথায় বাবরি চুল, চোখে চশমা, পাঞ্জাবির উপর চাদরটি বেশ কায়দা করিয়া পরিয়াছে। গোঁফ-দাড়ি নাই। তাহাকে কেহই যেন সম্যরূপে বুঝিতে পারিতেছে না—মুখে চোখে এমনি একটা মর্মাহত ভাব। ইললাল আসিয়া নমস্কার করিল না, সবিস্ময়ে রক্ষিতের মুখের পানে চাহিয়া রহিল। রক্ষিত। তােমার পুরাে নাম কি ? ইন্দ্রলাল উত্তর দিল না, কেবল এক দৃষ্টে চাহিয়া রহিল দেখছ কি অমন করে ? ইন্দ্রলাল সম্বিৎ ফিরিয়া পাইল ইন্দ্রলাল। (স-সন্ত্ৰমে ) আপনিই কি মিস্ অপর্ণা রক্ষিতের বাবা ? রক্ষিত। হঁ্যা। তার সম্বন্ধে কি জাননা তুমি ? ইন্দ্রলাল। (গলা খাঁকারি দিয়া) আপনার মেয়ে অপর্ণা দেবী, মানে, ( পুনরায় গলা খাঁকারি দিয়া) মানে, আমার বিশ্বাস তিনি একজন আদর্শ নারী। আমরা সীতা, সতী, গার্গী, লীলাবতী নিয়ে উচ্ছ্বসিত হই বটে— রক্ষিত। (সপদদাপে ) Shut up! ইন্দ্রলাল হচকাইয়া থামিয়া গেল। রক্ষিত নিষ্ঠুর নিষ্পলক নয়নে তাহার দিকে চাহিয়া রহিলেন। একটু সাহস সংগ্রহ করিয়া ইন্দ্রলাল পুনরায় শুরু করিল ইন্দ্রলাল। আমার কথাটা শুনুন দয়া করে। ইতিপূর্বে আমি দু-তিনবার আপনার কাছে আসবার চেষ্টা করেছি কিন্তু আপনার দাবােয়ানরা আমাকে ঢুকতে দেয় নি। আজ যখন ভাগ্যক্রমে আপনার কাছে আসতে পেরেছি তখন সমস্ত কথা খুলে বলতে চাই আমি! মানে-

দশ-ভাণ
রক্ষিত। এ চিঠি তােমার লেখা ?
চিঠি দেখাইলেন
ইন্দ্রলাল। কই দেখি, এ চিঠি আপনি পেলেন কি করে !
চিঠিখানি লইয়া সাগ্রহে পড়িতে লাগিল। রক্ষিত জটি-ভীষণ নয়নে চাহিয়া রহিলেন
কলমটা একবার দেবেন দয়া করেও আমার পকেটেই তােত আছে—চাদের
চন্দ্রবিন্দুটা পড়ে গেছে তাড়াতাড়িতে—ঠিক করে দি—
পকেট হইতে কলম বাহির করিয়া সংশোধন করিতে গেল। রক্ষিত উঠিয়া
হাত হইতে চিঠিখানা ছিনাইয়া লইলেন
রক্ষিত। (পুনরায় উপবেশন করিয়া আমার কথার জবাব দাও! এ চিঠি
তােমার লেখা?
ইন্দ্রলাল। ওটা তাে আমার বটেই—আরও অনেক চিঠি লিখেছি আমি—
এই বিষয়েই তাে আপনার সঙ্গে আলােচনা করতে চাই খােলাখুলি।
রক্ষিত। কি আলােচনা ?
ইন্দ্রলাল। আগেই আপনাকে বলেছি, মানে (গাঢ় স্বরে), আমার দৃঢ়
ধারণা মিস্ অপর্ণা রক্ষিত একজন আদর্শ নারী। আমি যেদিন থেকে তার
পরিচয় পেয়েছি সেই দিন থেকেই তঁাকে অন্তরের শ্রদ্ধা অসঙ্কোচে নিবেদন
করেছি।
রক্ষিত। ( ক্ষিপ্ত কণ্ঠে) একটি চড়ে তােমার মুণ্ডু ঘুরিয়ে দেব রাসূকে ?
শ্রদ্ধা নিবেদন করেছি।
ইন্দ্রলাল। মিস রক্ষিত বলেছিলেন আপনাকে সব কথা অসঙ্কোচে জানাতে,
বলেছিলেন যে আপনার যদি অমত না হয়—
রক্ষিত। (সবিস্ময়ে ) কিসের অমত ?
ইন্দ্রলাল। মানে, (একটু ইতস্তত করিয়া) মানে, আমি তাঁকে পত্নীত্বে
বরণ করে ধন্য হতে চাই।
রক্ষিত। (অধিকতর বিস্মিত) তার মানে !

৮১
নব সংস্করণ
ইন্দ্রলাল। ( ঢোঁক গিলিয়া) মানে, বিয়ে করতে চাই ।
রক্ষিত। বিয়ে করতে চাও! বাই জোভ! অপর্ণাকে ?
ইন্দ্রলাল। আজ্ঞে হ্যা।
রক্ষিত। আমার মেয়েকে বিয়ে করবার সঙ্গতি আছে তােমার ? তােমার,
বাবা কি করেন ?
ইন্দ্রলাল। চাকরি করেন।
রক্ষিত। মাইনে কত ?
ইন্দ্রলাল। আশি টাকা।
রক্ষিত। তুমি কি কর?
ইন্দ্রলাল। থার্ড ইয়ারে পড়ি।
রক্ষিত। ভাই-বােন আছে ?
ইন্দ্রলাল। চার বােন, দু ভাই।
রক্ষিত। বােনদের বিয়ে হয়েছে ?
ইন্দ্রলাল। না।
রক্ষিত। তােমার পুরাে নাম কি ?
ইন্দ্রলাল। ইন্দ্রলাল পােদ্দার।
রক্ষিত। বেনে?
ইন্দ্রলাল। আজ্ঞে হঁ্যা, গন্ধবণিক।
রক্ষিত। তুমি অপর্ণাকে বিয়ে করতে চাও?
ইন্দ্রলাল। আজ্ঞে হ্যা।
রক্ষিত সকৌতুক বিস্ময়ে নির্বাক হইয়া রহিলেন
সবই তাে খুলে বললাম। এবার আপনি কি করবেন তা যদি
রক্ষিত। I shall beat you black and blue!
ইন্দ্রলাল। অপর্ণা দেবীর জন্যে যেকোন নিৰ্যাতন আমি হাসিমুখে সহ

দশ-ভাণ
৮২
রক্ষিত। Slut up you fool ! অপর্ণা এখন কোথায় আছে জানাে?
ইন্দ্রলাল। এখন তাে কলেজের ছুটি, খুব সম্ভবত বাড়িতে আছেন।
রক্ষিত। ভণ্ডামি করবার চেষ্টা কোরাে না—you can't pull iny leg !
কাল থেকে অপর্ণাকে পাওয়া যাচ্ছে না।
ইন্দ্রলাল। তাই না কি ?
রক্ষিত।
সে কোথা গেছে জানাে?
ইন্দ্রলাল। আজ্ঞে না।
রক্ষিত। এই কাগজে নান সই কর তা হলে
বিহঙ্গমের লেখা কাগজটি দিলেন
Please remember you shall have a very nasty time if your
statement is untrue.
ইলাল সহি করিয়া দিল
ইন্দ্রলাল। (সহসা) আমার কষ্ট হচ্ছে, ভয়ঙ্কর কষ্ট হচ্ছে।
রক্ষিত। যাও, ওই ঘরে গিয়ে বস।
ইন্দ্রলাল পাশের ঘরে চলিয়া গেল। রক্ষিত পুনরায় ঘণ্টা টিপিলেন, কনেষ্টবল আসিল
অমিয়বাবু কো বােলাও।
কনেষ্টবল চলিয়া গেল, অমিয় আসিয়া প্রবেশ করিল। অমিয়র বলিষ্ঠ সুগঠিত দেহ;
ধরণ ধারণ একটু উদ্ধতগগাছের। পরিধানে হাফ শার্ট, কাপড় মালকোচামারা, পায়ে স্যান্ডাল।
অমিয় একজন স্পাের্টসম্যান।
অমিয়। আমি জানতে চাই আমাদের এমনভাবে ধরে আনবার মানে কি
রক্ষিতের চক্ষু দুইটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বর্ষণ করিল
রক্ষিত। তােমরা সবাই ক্রিমিনাল ।
অমিয়। ক্রিমিনাল ?
রক্ষিত। এ চিঠি কার লেখা?
পত্রটি দেখাইলেন
?

নব সংস্করণ
অমিয়। কিসের চিঠি, দেখি—
দেখিয়া ফিরাইয়া দিল
কার লেখা জানি না।
রক্ষিত। তোমার লেখা নয় ?
অমিয় । না।
রক্ষিত। নীচে অমিয় নাম লেখা রয়েছে দেখতে পাচ্ছ না ?
অমিয় । আমাদের কলেজে সাতটা অমিয় আছে। ল্যাংড়া অমিয়, কবি
অনিয়, অমিয় দত্ত, অমিয় সেন, প্লেয়ার অনিয়, অমিয় নাগ—আর আমি !
রক্ষিত। তােমার নাম কি ?
অমিয় । অমিয় ঘােষাল ।
রক্ষিত একটি সাদা কাগজ ও পেন্সিল অগাইয়া দিলেন
রক্ষিত। বাকী কজনের পুরাে নাম আর ঠিকানা লিখে দাও এতে।
কেন?
afsto I Because I order you to do so.
অমিয় ।
দেব না।
রক্ষিত। দেবে না !
অমিয়। না, কারাে নামে চুকলি খাওয়া আমার স্বভাব নয়।
af*31 I order you again.
অমিয় অবিচলিত দাড়াইয়া রহিল
অমিয় ।
যা বলছি তা কর !
অমিয়। এদের নাম নিয়ে কি করবেন ?
রক্ষিত কুঞ্চিত করিয়া তাহার দিকে তাকাইয়া রহিলেন
রক্ষিত। এই অপরাধে তােমার জেল হয়ে যেতে পারে তা জান ?
অমিয়। অপরাধটা কি ?
* 1 You are refusing to help law and justice.

দশ-ভাণ
৮৪
ও চিঠি
অমিয় । ( নির্বিকারভাবে ) জেল যেতে আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই।
নন-কো-অপারেশনের সময় ছমাস খেটেও এসেছি।
রক্ষিত। তুমি এদের নাম লিখে দেবে, কি দেবে না ?
অমিয় ।
দেব না।
রক্ষিত। (চিঠিটা তুলিয়া) তুমি বলছ এ চিঠি তােমার লেখা নয় ?
অমিয়। না। কিন্তু মিথ্যে কথা বলতেও আমার আপত্তি নেই।
আমার লেখা স্বীকার করলেই যদি বখেড়া মিটে যায় স্বীকার করতে রাজী আছি।
রক্ষিত। আমার মেয়ে অপর্ণা কোথায় আছে জানাে?
অমিয়। আপনার মেয়ে অপর্ণা কোথায় আছে আমি কি করে জানব?
আপনারই জানবার কথা-
রক্ষিত। দেখ বেশী যদি কথা বল—I shall tear out your dirty
tongue ! আমার মেয়ে কোথায় আছে জানাে কি-না? Yes or no?
অমিয়। না।
রক্ষিত। অপর্ণার বিষয়ে কি জান ?
অমিয়। অনেক কিছু জানি, কিন্তু বলব না।
রক্ষিত। I know how to brealk you and your like। যাও,
ওঘরে বস গিয়ে এখন! রাসকে !
ঘণ্টা টিপিলেন। কনেষ্টবল আসিল। কনেষ্টবলের সঙ্গে সঙ্গে অপর্ণা আসিয়া প্রবেশ
করিল এবং তাহার পিছু পিছু অধ্যাপক মঙ্গলময় দাস।
এ কি, অপর্ণা!
অপর্ণা। (হাসিয়া ) আমরা দুজনে তােমাকে প্রণাম করতে এলুম বাবা!
রক্ষিত। তার মানে?
মঙ্গলময় খুব সপ্রতিভভাবে আগাইয়া আসিলেন
মঙ্গলময়। আমি আপনার মেয়েকে বিয়ে করেছি।
রক্ষিত সবিস্ময়ে লক্ষ্য করিলেন অপর্ণার মাথায় সিদুর রহিয়াছে

নব সংস্করণ
রক্ষিত। বিয়ে করেছেন ! আপনি ! আমার মেয়েকে !
মঙ্গলময়। আজ্ঞে হ্যা, অনেক আগে থেকেই ঠিক করেছিলাম আমরা।
অপর্ণা । ( আবদার-তরল কণ্ঠে) তুমি রাগ করতে পাবে না বাবা!
রক্ষিত। (মঙ্গলময়কে। আপনি ওর প্রফেসার না ?
মঙ্গলময়। (স্মিতমুখে) তাতে কি হয়েছে? শাস্ত্রে শিষ্যার স্ত্রী হতে
বাধা নেই।
রক্ষিত। এমন ভাবে লুকিয়ে বিয়ে করার মানে !
মঙ্গলময়। আপনাকে বললে আপনি বিয়ে দিতে রাজি হতেন না।
রক্ষিত গুন্ হইয়া রহিলেন
অপর্ণা। ( আবদারমাখা সুরে ) রাগারাগি কোরাে না বাবা।
রক্ষিত। আমি মত দিতুম না জানলেন কি করে আপনি? পাত্র হিসেবে
আপনি খারাপ নন।
মঙ্গলময়। কিন্তু জাতে আমি সদ্গােপ, আপনারা কায়স্থ।
রক্ষিত। সদগােপ-আঁ-বলেন কি! সদ্গােপ আপনি ! সদ্গােপ!
মঙ্গলময়। আইন অনুসারে তাতে কোন বাধা নেই। আপনার মেয়ে
মাইনর নয়, সে স্বেচ্ছায় আমাকে বিয়ে করেছে—আইন অনুসারে আমাদের
ম্যারেজ রেজিষ্টার্ড হয়েছে। ( হাসিয়া ) বে-আইনী কিছু করিনি।
রক্ষিত। No, no, this cannot be. I want an explanation
for all this. (প্রায় চীৎকার করিয়া ) Do you hear, I want an
explanation !
কেহ কোন উত্তর দিল না। রক্ষিত পাইপটায় দুবার টান দিলেন-ধোয়া বাহির হইল না।
ছাত্র চারিজন দ্বারের নিকট আসিয়া সারি দিয়া দাড়াইয়াছিল। প্রফেসারের সহিত চোখােচাখি
হইবামাত্র সকলে যুগপৎ তাঁহাকে নমস্কার করিল।
সকলে। (স-সম্ভমে) নমস্কার মাস্টার মশাই।
যবনিকা

বানপ্রস্থ
একটি পোড়ে নীলকুঠির একটি কক্ষ। দরটিতে দুইটি বড় দরজা এবং কয়েকটি জানালা
রহিয়াছে। আসবাবপত্র কিছুই নাই। দরজা ঠেলিয়া বরদ। ও জামােহন প্রবেশ করিলেন ।
জগমােহনের হাতে দুইটি মুগুর, বরদার হাতে কিছু নাই। উভয়েই স্বাস্থ্যবান, যদিও উভয়েরই
বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। জমােহনের গোফ দাড়ি কামানাে, চোখে মুখে এমন একটি ভাব
আছে যে দেখিলেই মনে হয় লোকটি রসিক। বরদার বেশ জমকালো কাচাপাকা এক জোড়া
গোঁফ আছে, গোফের প্রান্তদ্বয় উর্ধ্বমুখী। বরদার চোখে-মুখেও এমন একটা ভাব আছে সে,
দেখিলে মনে হয় লোকটি রাশভারি এবং চটা মেজাজের। বরদীর রঙ, কালাে এবং বড় বড়
চোখ দুটি লাল। হারা প্রবেশ করিবার সঙ্গে সঙ্গেই একটি ভূতা-জাতীয় ব্যক্তি একটি শতরঞ্জি
বগলে করিয়া প্রবেশ করিল।
জগমােহন। শতরঞ্জিটা পেতে ফেল। বরদা, একটু সর তাে ভাই,
শতরঞ্জিটা বেশ চৌরস করে পাতুক ।
বরদ। একটু সরিয়া দড়ািইলেন। চাকরটি শতরঞ্জি বিছাইতে লাগিল। জগমােহন
ঘরের কোণে গিয়া মুগুর দুইটি রাখিয়া দিলেন।
ভৃত্য। (শতরঞ্জি পাতা শেষ করিয়া ) আমি এবার যাই হুজুর?
জগমােহন। বেশ, যা-ভাড়া পেয়ে গেছিস তাে?
ভৃত্য। আজ্ঞে হ্যা হুজুর !
নমস্কার করিয়া ভূত প্রস্থান করিল
জগমােহন। ওরে শােন্ !
ভৃত্য পুনরায় প্রবেশ করিল
, আমাদের সেই মালের নৌকোটার সঙ্গে যদি দেখা হয়, বলে দিস তাড়াতাড়ি
আসে যেন।
ভৃত্য। যে আজ্ঞে হুজুর।
চলিয়া গেল

৮৭
বানপ্রস্থ
জগমােহন। যাক্‌-এসে তাে পড়া গেল। ওপারের জমিদারবাবুদের
খবর পাঠিয়েছিলাম, তারাও ঘরটা সাফসুতরো করিয়ে রেখেছেন দেখছি।
বাপরে বাপ—রাস্তা কি সহজ, স্টেশন থেকে বারো ক্রোশ গরুর গাড়ি, তারপর
নৌকো-একি ভুরু কুঁচকে আছ কেন? এর মধ্যেই ঘাবড়াচ্ছ ! তখুনি
বলেছিলাম তােমার দ্বারা এসব হবে না।
বরদা। ঘাবড়াব কেন, আমি আশ্চর্য হচ্ছি তােমার বুদ্ধি দেখে।
জগমােহন। কি রকম?
বরদা। এত জিনিস থাকতে তুমি কেবল মুগুর দুটো নিয়ে এলে। ফলের
বাটে পড়ে রইলো ওই নৌকোটাতে, মুগুর নিয়ে কি করব এখন ।
জগমােহন। ব্যস্ত হও কেন !
ও নৌকোটাও এসে পড়ল বলে। পান্সির
মাঝিটাকে তাে বলে ও দিলুম শুনলে, যদি দেখা পায় তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দিতে।
আসবেও তারা তাড়াতাড়ি। আগাম ভাড়া দিয়ে দিয়েছি। খিদে পেয়েছে
কি ?
বরদা। খুব বেশী নয়, একটু একটু।
জগমোহন হাদিলেন
জগমােহন। তােমার পাল্লায় পড়ে এলাম তো। আসল ব্যাপারটা এইবার
খুলে বল দিকি। এমন ভাবে পালিয়ে আসার অর্থ টি কি
বরদা। অর্থ আবার কি, অর্থ তাে আগে বলেইছি।
জগমােহন। আমি শুনতে চাইছি নির্গলিতাৰ্থ । মানে-
বরদা। মানে টানে কিছু নেই—এ বয়সে শান্তিতে থাকতে হলে বানপ্রস্থ
নেওয়া ছাড়া গতি নেই। মানুষের ওপর ঘেন্না ধরে গেছে।
জগমােহন। এ সব তাে প্রাচীন কথা। হঠাৎ এ্যাদ্দিন পরে এ খেয়াল
হবার মানে ?
বরদা। ( উদ্দীপ্ত কণ্ঠে) খেয়াল ! কিছুমাত্র আত্ম-সম্মান জ্ঞান থাকলে

দশ-ভাণ bb বুড়ো বয়সে সংসারে থাকা উচিত নয়। একটা বুড়াে সংসারের অলঙ্কার নয়, ভার। তার মানে মানে সরে যাওয়াই উচিত। জগমােহন। (হাসিয়া) অর্থাৎ পরিবারের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে ? বরদা। পরিবারের সঙ্গে আবার সম্ভাব থাকে কার কোন্ দিন ! তুমি ব্যাচিলার মানুষ, পরিবারের স্বাদ পাওনি কখনও, তাই ইডিয়টের মতাে কথাটা বললে। কোনও ভদ্রলােকের কখনও কোনদিন কস্মিকালে পরিবারের সঙ্গে সদ্ভাব থাকে নি–থাকতে পারে না। জগমােহন কিছু না বলিয়া হাসিলেম শুধু পরিবারের সঙ্গে কেন কারাে সঙ্গে আমার সদ্ভাব নেই। এ যুগের কারাে সঙ্গে আমাদের মিলতে পারে না। জগমােহন। বল কি। বরদা। মিলবে কি করে ! আমাদের পছন্দ বালাপােষ, ওদের পছন্দ চেস্টারফিল্ড ; আমাদের জামা গলা-বন্ধ, ওদের জামা গলা-খােলা; আমরা মুগুর ভাজি, ওরা তাস ভঁজে ; আমরা কুস্তি করি পালােয়ানের সঙ্গে—ওরা ব্যাডমিন্টন খেলে মেয়েদের সঙ্গে। আমরা দামী গড়গড়ায় তাওয়া দিয়ে অম্বুরি তামাক খাই, ওরা ফেঁাকে সিগারেট। ওদের সঙ্গে আমাদের মিলতে পারে -পারে না-পারে না। ; প্রত্যেক ‘পারে না’র সহিত তিনি প্রসারিত বাম করলে মুষ্টিবদ্ধ দক্ষিণ করতল দিয়া আঘাত করিলেন জগমােহন। তােমার গিন্নিটি তে সেকেলে, এই থিওরি অনুসারে তাঁর সঙ্গে অন্তত তােমার ভাব থাকা উচিত ছিল। বরদা। তুমি আইবুড়াে কার্তিক, তুমি গিন্নি-ফিন্নির কিছু বােঝ কি ! ওরা হ’ল ঝড়ের আগে এঁটো পাতের জাত। যেদিকে হাওয়া বয়, সেইদিকেই ছছাটে। জগমােহন। তার মানে ?

বানপ্রস্থ বরদা। তার মানে—নির্বিচারে প্রবলের পক্ষ নেয়। আমার এখন বয়স গেছে, উপার্জন করি না; সুতরাং গিন্নি এখন ছেলেদের দলে যােগ দিয়েছে। ভাবছে—ও বুড়ােটার আর কি পদার্থ আছে—ওটাকে তাে আমসি-চোষা করে শেষ করে এনেছি। (সহসা উদ্দীপ্ত কণ্ঠে ) তা না ভাবলে-- সহসা আবার থামিয়া গেলেন জগমােহন। তা না ভাবলে ? বরদা। তা না ভাবলে কখনও আমার কথার উপর কথা কইতে আসে ? অমন সুন্দরী সদ্বংশের মেয়ে পছন্দ করলাম, কারুর মনে ধরল না। নানা বায়নাক্কা। দুর্গা নাম ছেলের পছন্দ নয়, মেয়ে গান গাইতে জানে না। আরে মােললা, গান শুনতে চাস তত ভাল একটা বাঈজী ডেকে গান শাে না। শুনে তৃপ্তি পাবি। তারা রুটির জন্যে গান শিখেছে—হামোনিয়াম প্যা-পো করে ন্যাকামি করবার জন্যে নয়। তা ছাড়া, বউ গান গাইবে কখন বল তােহ এসেই তাে ঢুকবে রান্নাঘরে, তারপর আঁতুড়ে। সারাটা জীবন রান্নাঘর-আঁতুড়ঘর করতে হবে যাকে, সে গান গাইবে কখন ? জগমােহন। তােমার বড় ছেলের বিয়ে কোথায় ঠিক হ’ল ? বরদা। কে জানে! কোন এক ধূসরা বলে মেয়ের সঙ্গে। জগমােহন। ধূসরা ! বরদা। হা ধূসরা। ধূসর ফোয়ারা জর্জেট মর্জিনা—যার সঙ্গে খুশি ছেলের বিয়ে দিক—আমি ওসবের মধ্যে নেই। আমি জীবনের বাকী দিন কটা শান্তিতে নির্জনে কাটিয়ে দিতে চাই, বাস্। পদচারণ করিয়া জানলার নিকট গিয়া বাহিরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন। জগমােহন স্মিতমুখে বরদার দিকে তাকাইয়া রহিলেন। বরদা সহসা ঘুরিয়া প্রশ্ন করিলেন দুধ পাওয়া যায় এখানে ? জগমােহন। এখানে কিছু পাওয়া যায় না; তবে, এখানে যদি থাকো, ওপারের গােয়ালাদের কাছ থেকে দুধের ব্যবস্থা হতে পারে।

দশ-ভাণ
বরদা। খেয়া নৌকো নেই বলছ, তারা পার হবে কি করে ?
জগমােহন। তারা মােষের পিঠে চড়ে পার হয় সাধারণতঃ।
বরদা।
পুনরায় জানলার দিকে ফিরিলেন
জগমােহন। বাড়িতে কি বলে এসেছ ?
বরদা। জমিদারী দেখতে বেরুচ্ছি। এক তুমি ছাড়া আর কেউ জানে না।
আমি কোথায় এসেছি।
জগমােহন। থাকতে পারবে তো, দেখ
বরদা। তুমি যদি পারাে, আমি পারবাে না কেন।
জগমােহ। আমার কথা ছেড়ে দাও, অনেক ঘাটের জল খাওয়া অভ্যেস
আছে আমার। চিরটা কাল ডিষ্ট্রিক্ট বাের্ডের ওভারশিয়ারি করে কাটিয়েছি,
তাছাড়া আমার তিন কুলে কেউ নেইও বুক চাপড়ে কঁদবে। তােমারি নানান
বখেড়া-
বরদা। আমার আবার কি বখেড়া দেখলে ।
জগমােহন। (হাসিয়া) বখেড়া বই কি ! তোমার ফরাস চাই, তাকিয়া
চাই, বই চাই, খাবার চাই, তামাক চাই, মুগুর চাই—মুগুর না ভজলে খিদেই
হয় না। তােনার মতাে লােকের এসব জায়গায় থাকা শক্ত বই কি।
বরদা। কিছু শক্ত নয়। সব জুটিয়ে নেব। ফরাস, তাকিয়া, বই,
খাবার সবই তাে আসছে। নৌকোটা কতক্ষণে এসে পৌছবে বল তাে ! তুমি
নিয়ে এলে মুগুর দুটো--ফলের বাস্কেটটা ফেলে।
--ফলের বাস্কেটটা ফেলে। আশ্চর্য বুদ্ধি তােমার ।
জগমােহন। মুগুর দুটো হাতে ছিল, নিয়ে এলাম। আমাদের ঐ ছােট
পানসিতে কি তােমার ওই বিরাট বড় বড় দুটো ফলের বাস্কেট আঁটতে?
দুটোকে বাস্কেট বল কি হিসেবে, দুটো তাে প্রকাণ্ড বড় বড় প্যাকিং কেস। কি
ফল এনেছ এত ?
বরদা। সমস্ত ড্রাই ফট। দু’জনের স্বচ্ছন্দে মাসখানেক চলে যাবে।
৩

বানপ্রস্থ তার পর ঠিক করেছি, কলকাতা থেকে রেগুলার বাস্কেট আনাব। নিজেদের একটা নৌকোও রাখতে হবে, বুঝলে ? চমংকার নির্জন জায়গাটি একট শিস দিলেন। সহসা শূন্যে করলি দিয়া বেশ মশা আছে দেখছি এখানে। জগমােহন। মশা তাে হবেই, বুনাে জায়গা। বরদা। তুমি নিধেটাকেও ওই নৌকোটাতে রেখে এলে। সে থাকলে জগমােহন। বাঃ-অত খাবারটাবার, কাপড়চোপড়, হােন্ড অল, হট কেশ, ট্রাঙ্ক, য্যাটাচি—সব ওই অচেনা মাঝি ব্যাটাদের হাতে ছেড়ে দিয়ে আসব ! নিধে পুরােনাে চাকর, সব সামলে-সুমলে আনতে পারবে। বরদা। [ সক্ষোভে ] তুমি যদি মুগুর দুটো না এনে তামাকের সরঞ্জামটা আর মহাভারতটা আনতে, তা হলে আরাম করে বসে একটু পড়া যেত। জগমােহন। সব এসে পড়বে এক্ষুণি, ঘাবড়াচ্ছে কেন? বস না। বরদা। শতরঞ্জির উপর দু’জনে মুখােমুখি হয়ে বসে থাকব ! তার চেয়ে চল বাইরে একটু ঘুরে বেড়ানাে যাক । জগমােহন। বাইরে স্রেফ শেয়াল কাটা আর কন্টিকারি ছাড়া কিছু নেই। এইখানেই বসতে হবে। বরদা। এই জঙ্গলে সায়েবগুলাে কেমন বাংলােটা বানিয়েছে দেখেছ। ঘুরিয়া ফিরিয়া দেখিতে লাগিলেন জগমােহন। আগে এখানে নীল চাষ হত কি না। বরদা। [ আর একটি দরজায় উকি দিয়া ] এদিকেও আর একটা ছােট রুম রয়েছে হে। জগমােহন। এ বাড়িটাতে অনেকগুলাে রুম। পূবদিকে একটা চমৎকার বারান্দাও আছে। বরদা। [ সহসা জানালার দিকে চাহিয়া ] ওহে, দেখ দেখ, আর একখানা

দশ-ভাণ
৯২
কাদের নৌকো যেন ভিড়েছে এসে। কে একজন যেন নেবে আসছেও-বেশ
হনহন করে আসছে। ভটচায্যি-ভটচায্যি চেহারা।
জগমােহন। এই পােড়ো বাংলােটার লােভে অনেকে পিকনিক করতে
আসে এখানে। শিকারও মেলে শীতকালে
বরদা। তুমি ওপারের জমিদারবাবুদের ব’লে সব ঠিক করে ফেলেছ তাে ?
জগমােহন। সমস্ত-মায় ভাড়া পর্যন্ত।
বরদা। ভদ্রলােক আমাকে দেখতে পেয়েছেন, এইদিকেই ঘুরলেন।
জগমােহন। বেশ তাে, আসুন না, গল্প করে সময় কাটবে।
বরদা। উঃ, কি ভয়ানক মশা হে
চটা করিয়া মারিলেন।
( নেপথ্যে) আসতে পারি ?
বরদা। [ আগাইয়া গেলেন ] আসুন, আসুন-নমস্কার!
শিরোমণি মহাশয় প্রবেশ করিলেন
আপনারা বুঝি বেড়াতে এসেছেন?
শিয়ােমণি। ওনারা হয়ত বেড়াতে এসেছেন, আমি এসেছি অদৃষ্টের
ফেরে। পূৰ্বজন্মজ্জিত কোন পাপের ফলেই সম্ভবত দূষিত সংসর্গ করতে
হচ্ছে, তা না হলে আমি অম্বিকা শিরােমণি স্বেচ্ছায় এদের সঙ্গে বেড়াতে
আসি না।
জগমােহন। আসুন আসুন, বসুন ।
বরদা। হ্যা, বসুন বসুন।
জগমােহন। [ হাসিয়া ] তুমি এইমাত্র মহাভারতের খোঁজ করছিলে স্বয়ং
শিরােমণি মশায় এসে হাজির হয়ে গেছেন। কত শাস্ত্রচর্চা করবে কর এখন
বসে বসে।
বরদা। যা বয়স হ’ল এখন শাস্ত্রচর্চাই করতে হবে ভাই। তা ছাড়া,

বানপ্রস্থ শাস্ত্রচর্চা আমার ভালও লাগে খুব। শিয়ােমণি মশায় চটে আছেন বলে মনে হচ্ছে—বসুন।—দাড়িয়ে রইলেন কেন। সকলে উপবেশন করিলেন শিয়ােমণি। চটব কার ওপরে বলুন, নিজের অদৃষ্টের ওপরে? তবে ক্ষুব্ধ হতে তত বাধা নেই। ক্ষুব্ধ হয়েছিও। বরদা। যা বলেছেন, অদৃষ্ট ছাড়া পথ নেই। শিয়ােমণি। যথার্থ কথা, কিন্তু পুরুষকার বলেও একটা জিনিস আছে। কঠোপনিষদ বলেছেন- অন্যচ্ছে য়ােহদুতৈব প্রেয়- স্তে উভে নানার্থে পুরুষং সিনীত তয়ো: শ্রেয় আদাদনি সাধু, ভবতি হয়তেহর্থাত্ য উ প্রেয়াে বৃণীতে। জগমােহন। আপনারা ততক্ষণ শাস্ত্রলাপ করুন, আমি বাইরে থেকে ঘুরে আসি একটু। দেখি আমাদের নৌকাটা আসছে কি-না। শিবরামণি। কিসের নৌকা বরদা। আমাদের জিনিসপত্র যে নৌকাটায় আছে সেটা এখনও এসে পৌছয়নি। হ্যা, তুমি একটু খোঁজ নাও গিয়ে জমোহন বাহির হইয়া গেলেন ? আপনি যে শ্লোকটি বললেন তার অর্থ কি ? শিরােমণি ! তার অর্থ হচ্ছে গিয়েশ্রেয় আর প্রেয় পরস্পর বিভিন্ন জিনিস এবং দুই-ই জীবকে বিভিন্নরূপে আবদ্ধ করে। যিনি শ্রেয়কে গ্রহণ করেন তার মঙ্গল হয়, আর যিনি শ্রেয়কে ছেড়ে প্রেয়কে অর্থাৎ সুখকরকে বরণ করলেন তিনিই মলেন, পরমার্থ থেকে বিচ্যুত হলেন। টাক হইতে নানি বাহির করিয়া নস্য লইলেন দশ-ভাণ ৯৪ আমি এখন প্রেয়-বিলাসী পরমার্থ-বিচ্যুত এক ছােকার কবলে কবলিত। দুরদৃষ্ট আর কি। বরদা। তাই না কি। ব্যাপারটা কি ! শিরােমণি। মানে, বিপথগামী এক শিষ্যের পাল্লায় পড়েছি এবং সে বিপথগামী বলেই তাকে ছেড়ে যেতে পারছি না। কারণ স্বয়ং ভগবান গীতায় বলছেন- সদা যদাহি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত অভুথানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজামাহম্। পরিত্রাণায় সাধুনাম বিনাশায় চ দুষ্কতাম ধৰ্ম্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে। ধর্মের পুনঃ স্থাপনের জন্যই ধার্মিককে অধার্মিকের সঙ্গ করতে হয়, উপায় নেই। তা ছাড়া বেতনও দেয়, সুতরাং অধিকতর নিরুপায় । বরদা। ( উচ্ছসিত) আপনার সঙ্গে আলাপ হয়ে ভারি আনন্দিত হলাম। চমৎকার ! সময়টা ভাল ভাবেই কাটবে মনে হচ্ছে। আপনার সেই বিপথগামী শিষ্যটি কোথায় ? শিরােমণি। ওই যে নৌকাবিহার করছেন তিনি। আমার আর বরদাস্ত হ’ল না, নৌকো থেকে নেমে পড়লাম আমি। ছােকরার এদিকে লেখাপড়ার দিকে ঝোঁক আছে, এম. এ. পাশ, মৌলভী রেখে ফার্সি উর্দ, শিখেছে, সংস্কৃত চর্চার জন্যে আমাকে বেতন দিয়ে রেখেছে—কিন্তু হলে কি হবে—অবিদ্যায়ামন্তরে বৰ্তমানাঃ। ওই অবিদ্যাতেই সব মাটি করেছে। বরদা। যা বলেছেন। এ যুগটাই অবিদ্যার যুগ। যে ভারতে একদিন জগমােহন ফিরিয়া আসিলেন কি হ’ল হে, নৌকোর কোন পাত্তা পেলে? জগমােহন। কই, কিছু তাে দেখতে পেলাম না। একটু পরেই এসে পড়বে। শিয়ােমণি মশায়ের সঙ্গে ততক্ষণ শাহ্বালাপ করা যাক—

৯
বানপ্রস্থ
শিয়ােমণি। আমি শাস্ত্রের কতটুকুই বা জানি ! তা ছাড়া, শাস্ত্র—যার
অর্থ হচ্ছে প্রাচীন অনুশাসন—যা দেবগণ ঋষিগণ বেদ-তন্ত্র-স্মৃতি-পুরাণাদিতে
লিপিবদ্ধ করে গেছেন সে শাস্ত্র আজকাল কে মানছে বলুন। শাস্ত্রচর্চা আজকাল
একটা অবান্তর ব্যাপার। এই ধরুন না, যে জমিদারপুত্রটির সঙ্গে আমি এসেছি
সে কি মনুসংহিতােক্ত রাজার ধর্ম পালন করে?
বকবচ্চিন্তয়েদৰ্থান সিংহব পরাক্রমে
বৃকবচ্চনুলতে শশবচ্চ বিনিস্পতেং।
ও বকও নয়, সিংহও নয়, বৃকও নয়, শশও নয়—উপমা দিতে হলে বলতে
হয় ও একটা ছাগল ছাড়া আর কিছু নয়।
বরদা। (সমঝদারের মত ভঙ্গী করিয়া) ঠিক বলেছেন, আজকাল ব্যাপারই
এই রকম।
জগমােহন। (হাসিয়া) না, সেকথা বললে শুনব কেন ! শাস্ত্রের প্রভাব
এখনও কিছু কিছু আছে বই কি। প্রত্যক্ষ প্রমাণ তাে আপনার সামনেই
বৰ্তমান ; ইনি সংসারে বীতরাগ হয়ে বানপ্রস্থ অবলম্বন করে এখানে এসেছেন।
বরদা। তুমি থামাে দিকি।
জগমােহন। থামবাে কি রকম, যা সত্যি
শিরােমণি। বানপ্রস্থ ? তাই নাকি, এ যুগের পক্ষে বিস্ময়কর বটে।
বানপ্রস্থ ক’রকম জানেন ?
বরদা। আজ্ঞে না। (হাসিলেন)
জগমােহন। যদি আপত্তি না থাকে বানপ্রস্থের বিষয় আপনি কিছু বলুন না।
আমরা দুজনেই এ বিষয়ে অজ্ঞ।
বরদা। ( সাগ্রহে ) আজ্ঞে হ্যা বলুন বলুন ।
শিরােমণি। ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ, ভৈক্ষ্য—শাস্ত্রোক্ত এই চতুর্বিধ
আশ্রম। মহানিৰ্বাণতন্ত্র কিন্তু বলছেন কলিযুগে গার্হস্থ্য ও ভৈক্ষ্য ভিন্ন অন্য

দশ-ভাণ কোন আশ্রমই নেই। ও বিষয়ে কিন্তু মতভেদ আছে, ব্যাসদেব বলেন- যা সে সব—এখন বানপ্রস্থের কথা শুনুন। নস্থ লইলেন বানপ্রস্থ হচ্ছে তৃতীয় আশ্রম। অদ্রোহে বা অল্পদ্রোহে জীবিকা নির্বাহ করে অর্থাৎ শাস্ত্রীয় বিধি অনুযায়ী দারপরিগ্রহ অপত্যোৎপাদনাদি সমাধানান্তে বনবাসগমন পূৰ্ব্বক অকৃষ্ট পচ্য ফলাদি ভক্ষণ করে যে ঈশ্বরারাধনা তাকেই বলে বানপ্রস্থ। বানপ্রস্থ দ্বিবিধ বরদা। (মুগ্ধ) আপনার জ্ঞানের গভীরতা দেখে সত্যিই আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি ক্রমশ। আপনারাই হলেন ভারতের গৌরব । জগমােহন। ( সােৎসাহে ) সে কথা আর বলতে ! বরদা। বলুন বলুন শুনি। শিয়ােমণি। বানপ্রস্থ দ্বিবিধ-অশুকুট্টা ও দন্তদূখলিক। বরদা। তাই না কি! দন্তদূখলিক! শিরােমণি। যারা পক্ষান্তে বা মাসান্তে ভােজন করে তাদেরই দন্তদূখলিক বলে। বরদা। বানপ্রন্থে খেতেও মানা না কি ? জগমােহন। (অপাঙ্গে বরদার পানে চাহিয়) তবেই সেরেছে । শিরােমণি। না, না, খেতে মানা নেই, তবে আহার বিষয়ে সংযত হবার নানা বিধান আছে। ফালকৃষ্ট আহাৰ্য্যই নিষিদ্ধ। অন্যান্য বিধানও আছে, তার মধ্যে তিনবার স্নান করা, জটাবল্কল ধারণ করা, প্রতিগ্ৰহনিবৃত্ত হওয়া, স্বাধ্যায়বান হওয়া, দান্ত আত্মবান হওয়া—এইগুলােই প্রধান। বরদা। এ সব করবার মানে ? জগমােহন। ভীষণ আইন কানুন দেখছি। শিয়ােমণি। ভােগলিকে নিষ্পিষ্ট করে অবলুপ্ত করতে পারাই বানপ্রস্থের উদ্দেশ্য। গার্হস্থ্যাশ্রমে প্রবেশ করবার পূর্বে যেমন ব্রহ্মচর্যাশ্রমে শরীর মনকে

৯৭
বানপ্রস্থ
প্রস্তুত করে নিতে হয়, তেমনি ভৈক্ষ্য আশ্রমে প্রবেশ করবার জন্যে বানপ্রস্থে
সমস্ত বাসনাকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে হয়। সেইজন্যে গ্রীষ্মকালে পঞ্চাগ্নির মধ্যে,
বর্ষাকালে ভূতলশায়ী হয়ে এবং হেমন্তকালে আবস্ত্রধারী হয়ে থাকার নিয়ম
আছে। আসল কথা কি জানেন ?
বরদা বিভ্রান্ত হইয়া পড়িয়াছিলেন, শেষােক্ত বাক্যে উৎফুল্ল হইয়া উঠিলেন
বরদা। আজ্ঞে হ্যা, আসল কথাটাই বলুন সহজ করে।
শিরােমণি। আসল কথা উপনিষদে পাবেন। ছান্দোগ্যে আছে—শ্রদ্ধা
নিষ্ঠাসাপেক্ষ, নিষ্ঠা কৰ্ম্মসাপেক্ষ এবং কৰ্ম্ম সুখসাপেক্ষ
নস্য লইলেন
বরদা। একটা ভারি অভাব বােধ করছি, জগমােহন।
জগমােহন। কিসের ?
বরদা। তামাকের। তুমি খালি মুগুর দুটো নিয়ে এলে
জগমােহন। নৌকো এই এসে পড়ল বলে, একটু ধৈর্য্য ধর না।
বরদা। তুমি আর একবার বেরিয়ে দেখ না হয়।
জগমােহন। যাচ্ছি। পণ্ডিত মশায়ের কথাটা শেষ হয়ে যাক। এমন
উপদেশাত্মক ভাল কথা তাে চট করে শােনা যায় না।
বরদা। হা হা বলুন বলুন—ছান্দোগ্যে--
শিয়ােমণি। ছান্দোগ্য বলছেন, শ্রদ্ধা নিষ্টাসাপেক্ষ, নিষ্ঠা কৰ্মসাপেক্ষ, কর্ম
সুখসাপেক্ষ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সুখ কি ?
জগমােহন। ঠিক কথা, ওই সুখের খোঁজেই তাে এখানে আসা।
বরদা। ওইটেই তাে আসল প্রশ্ন।
শিরােমণি। তার আসল উত্তরও ওই ছান্দোগ্যেই পাবেন। যাে বৈ ভূমা
তৎ সুখং, নাল্পে সুখমন্তি, ভূমৈব সুখং, ভূমাত্বেব বিজিজ্ঞাসিতব্য। ভূমাই চরম
সুখ। এখন ভূমা হচ্ছে-
বরদা। হ্যা বলুন, বলুন।

০
দশ-ভাণ
৯৮
শিয়ােমণি। ভূমা হচ্ছে সেই জিনিস, যা লাভ করলে অন্য কোন বস্তু দেখা
যায় না, শােনা যায় না, জানা যায় না। যত্র নান্যং পশ্যতি, নান্যচ্ছ ণােতি, নান্য
বিজানাতি—স ভূম। যা অল্প, যা সীমাবদ্ধ তাই মরণশীল, তাই দুঃখজনক।
অর্থাৎ সমস্ত বাসনা-কামনা-বর্জিত না হলে ভূমা লাভ হয় না। বৃহদারণ্যকে
যাকে বলেছে এষণা—সেই এষণামুক্ত হতে হবে ।
বরদ। চটাৎ করিয়া একটা মশা মারিলেন
বরদা। ঠিক বলেছেন, মায়াই হল আসল বখেড়া। ওইতেই তাে ডুবেছি
আমরা।
( নেপথ্যে) শিরােমণি মশায় আছেন না কি ?
শিয়ােমণি। আমার শিষ্য প্রবর এসে হাজির হয়েছেন। এসাে হে রঙ্গলাল
ভিতরে এসাে।
রঙ্গলাল আসিয়া ভিতরে প্রবেশ করিলেন । চোখে প্যাশনে, পরিধানে সিল্কের পাঞ্জাবী,
হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। মুখে মৃদু হাসি, চক্ষু বুদ্ধিদীপ্ত। সপ্রতিভ সুদর্শন বাক্তি।
বয়স আন্দাজ চল্লিশ হইবে
বরদা। আসুন, আসুন, নমস্কার।
জগমােহন। (হাসিয়া) আপনার শিরােমণি মশায়ের সঙ্গে শাস্ত্ৰালােচনা
করছিলাম। আসুন, বসুন।
রঙ্গলাল প্রতিনমস্কার করিয়া হাস্যদীপ্তচক্ষে সকলের মুখপানে একবার চাহিয়া
দেখিলেন; তাহার পর সিগারেটটায় শেষ টান দিয়া সেটা জানালা
দিয়া ছুড়িয়া বাহিরে ফেলিয়া দিলেন
রঙ্গলাল। এই রবিন্সন ক্রুশাে-মার্কা দ্বীপে যে শিরােমণি মশায় শাস্ত্রালাপ
করবার মতাে লােক আবিষ্কার করতে পারবেন তা আমি ধারণাই করতে পারি
নি! আশ্চর্য ব্যাপার! ঠিক পেয়ে গেছেন তাে ?
জগমােহন। বসুন। আপনার সঙ্গেও আলাপ করা যাক।

বানপ্রস্থ
রঙ্গলাল। (উপবেশনান্তে ) শিরােমণি মশায়, থেমে গেলেন কেন—কি
বলছিলেন বলুন আমিও একটু শুনি।
বরদা। ভূমা সম্বন্ধে বলছিলেন উনি।
বঙ্গলাল। আহা, ভূমা কথাটা বড় ভাল। চুমার সঙ্গে প্রথম শ্রেণীর মিল হয় !
বরদা হো হাে করিয়া হাসিয়া উঠিলেন
শিরোমণি। এসেই ফাজলামি শুরু করলে তো বাবা !
রঙ্গলাল। Sorry'—আর একটি কথাও বলব না, আপনি যা বলছিলেন
বলুন।
বরদা। আমার দিকে অমন করে চেয়ে আছেন যে রঙ্গলালবাবু?
রঙ্গলাল। আপনার শরীর দেখছি। বাঃ, এই বয়সেও তো চমৎকার শরীর
রেখেছেন। ফাইন্ !
বরদা। কুস্তি-লড়া শরীর, এখনও মুগুর ভাজি।
রঙ্গলাল। ও তাই।
জগমােহন। শিরােমণি মশায়, থেমে গেলেন যে।
বরদা। হা হা বলুন বলুন।
শিরোমণি নস্য লইলেন
শিবরামণি। বলছিলাম, বৃহদারণ্যকের উপদেশ হচ্ছে—এষণামুক্ত হতে
হবে। পুত্ৰৈষণা, বিষৈণা, লােকৈষণা—সর্বপ্রকার এষণামুক্ত হয়ে পরমাত্মার
স্বরূপ উপলব্ধি করলেই পরমানন্দে লীন হবার আশা করা যায়। তৎপূৰ্বে নয়।"
রঙ্গলাল। মাপ করুন শিরােমণি মশায়, আমি কিন্তু পরমানন্দ লাভ করতে
চাই অন্য উপায়ে।
বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি সে আমার নয়
অসংখ্য বন্ধন মাঝে মহানন্দময়
লবি মুক্তির স্বাদ।
শিরােমণি। বন্ধন নিয়ে মুক্তির স্বাদ মেলে না বাবা, কবিতাতেই ও সব

দশ-ভাণ
শুনতে ভাল। মুক্তি পেতে হলে রীতিমত সাধনা করতে হয়, নিরাসক্ত হয়ে
পূজা করতে হয়।
রঙ্গলাল। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু বলছেন—
প্রতিদিন নদীস্রোতে পুষ্পপত্র করি অর্ঘ্যদান
পূজারীর পুজা অবসান ।
আমিও তেমনি যত্নে মোর ডালি ভরি
গানের অঞ্জলি দান করি
প্রাণের জাহ্নবী জল-ধারে
পূজি আমি তারে।
বিগলিত প্রেমের আনন্দ বারি সে যে
এসেছে বৈকুণ্ঠধাম ত্যেজে।
বরদা। ( উচ্ছসিত ) বাঃ, আপনিও তত গুণী লােক মশায়! ( তাহার
পর সহসা) জগমােহন নৌকোর গতিক কিন্তু খারাপ মনে হচ্ছে।
জগমােহন। আরে ব্যস্ত হও কেন, এখনি এসে পড়বে।
রঙ্গলাল। নৌকোর কথা শুনলেই আমার রবীন্দ্রনাথের ‘দিন শেষে’ কবিতাটা,
মনে পড়ে
স
দিন শেষ হয়ে এল আঁধারিল ধরণী
আর বেয়ে কাজ নাই তরণী।
“গাে এ কাদের দেশে
বিদেশী নামিনু এসে,
তাহারে শুধানু হেসে যেমনি
অমনি কথা না বলি
ভরা ঘট ছলছলি
নতমুখে গেল চলি তরুণী
এ ঘাটে বাঁধিব মোর তরণী।
নামিছে নীরব ছায়া ঘন বন শয়নে
এদেশ লেগেছে ভাল নয়নে-
সহসা থামিয়া গেলেন

১০১
বানপ্রস্থ
, এটা ঠিক হচ্ছে না। আপনাদের মুক্তি-টুক্তি নিয়ে সদালােচনা হচ্ছিল,
আমার এ রকম ভাবে বাধা দেওয়াটা
বরদা। না না বলুন আপনি, চমৎকার লাগছে।
রঙ্গলাল। (হাসিয়া) আমিও মুক্তিকামী লােক, শিরােমণি মশায়ও তাই।
আমাদের দুজনের পথ খালি বিভিন্ন ।
শিরােমণি। দেখ রঙ্গলাল, ইতিপূর্বে তােমাকে পুনঃপুনঃ বলেছি, এখন
আবার বলছি এবং যতদিন বাঁচব বলব—মুক্তি নিয়ে কবিত্ব করা এক জিনিস
এবং সত্যি সত্যি মুক্তি পাওয়া আর এক জিনিস। কহােল-যাজ্ঞবল্ক্য সংবাদের
যা বাণী
রঙ্গলাল। মাপ করুন শিৰােমণি মশায়, কহােল-যাজ্ঞবল্ক্য সংবাদের বাণী
বহুবার শুনেছি আপনার মুখ থেকে, কিন্তু কবির বাণীও কি তার চেয়ে কোন
অংশে কম ?
আবৃত্তি শুরু করিলেন
যেদিন আমার গান মিলে যাবে তােমার গানের
সুরের ভঙ্গীতে
মুক্তির সঙ্গম-তীর্থ পাবাে আমি আমারি প্রাণের
অাপন-সঙ্গীতে
সে দিন বুঝিব মনে নাই নাই বস্তুর বন্ধন
শূন্যে শূন্যে রূপ ধরে তোমারি এ বীণার স্পন্দন
নেমে যাবে সব বোঝা, থেমে যাবে সকল ক্রন্দন
ছন্দে তালে ভুলিব আপনা
বিশ্বগীত পদ্মদলে স্তব্ধ হবে অশান্ত ভাবনা।
আপনি কি বলতে চান, রবীন্দ্রনাথের এ কবিতায় মুক্তির বার্তা নেই ?
শিরােমণি। বার্তা থাকতে পারে, কিন্তু কেবল বার্তা পেলেই মুক্তি পাওয়া
যায় না। প্রাচীন ঋষিগণ মুক্তিলাভের জন্যে যে সব বিধি-বিধান বেঁধে দিয়েছেন

দশ-ভাণ
১০২
তা বর্ণে বর্ণে প্রতিপালন করতে হবে। প্রাচীন বিধানের প্রতি এই যে তােমাদের
অশ্রদ্ধা এটা মােটেই ঠিক নয়। তােমাদের সর্বাগ্রে চিত্তশুদ্ধি করা দরকার।
অনুতপ্ত চিত্তে আত্মানুশাসন না করলে কখনও চিত্তশুদ্ধি হয় না এবং চিত্তশুদ্ধি
হলে-
রঙ্গলাল। আপনারা তা হলে চিত্তশুদ্ধি করতে থাকুন, আমি কেটে পড়ি।
বরদা। (ব্যাকুল ভাবে) না, না, না-সে কি কথা, আপনি বসুন।
আপনার আবৃত্তি শােনা যাক আরও দু-চারটে ।
জগমােহন। সত্যি চমৎকার আবৃত্তি করেন আপনি।
রঙ্গলাল। শিবরামণি মশায় চটে যাবেন।
বরদা। না না চটবেন কেন ?
শিরােমণি। ও যতই না কেন কবিতা আওড়াক, একথা মানতেই হবে যে,
আসক্তি ত্যাগ না করলে ব্ৰহ্মলাভ হয় না এবং আসক্তি ত্যাগ করতে হলে তৃষ্ণা
এবং আসঙ্গ ত্যাগ করা চাই। শ্রীভগবান গীতায় বলেছেন—
রজো রাগাত্মকং বিদ্ধি তৃষ্ণাসঙ্গসমুদ্ভব
তন্নিবপ্নাতি কৌন্তেয় ! কসঙ্গেন দেহিন ।১৪৭
কর্মে আসক্তি জন্মে তৃষ্ণা এবং আসঙ্গ দ্বারা—এই তৃষ্ণা এবং আসঙ্গ ত্যাগ
না করলে ভূমালাভ অসম্ভব। তৃষ্ণা এবং আসঙ্গ ত্যাগ করা সহজ নয় মানি,
কিন্তু তার জন্যে অনুতপ্ত হও।
রঙ্গলাল। [ স্মিতহাস্যে ] আমার কি মনে পড়ছে জানেন ?
শিরােমণি। কি ?
রঙ্গলাল। রুবাইয়াং।
আবৃত্তি সুরু করিলেন
Iram indeed is gone with all its Rose
And Jamshyd's sev'n ringed cup where no one knows

১০৩
বানপ্রস্থ
But still the Vine her ancient Ruby yields
And still a garden by the water blows.
বরদা। চমংকার, অনেক দিন পরে ফিটজেরাল্ড বেশ লাগলােবা।
শিরােমণি। আমি ওসব ইংরিজি মিংরিজি বুঝি না, কিন্তু ছান্দোগ্যের সর্বং
খল্বিদং ব্ৰহ্ম তজালানিতি
বরদা। আপনি একটু চুপ করুন শিরােমণি মশাই, দোহাই আপনার।
রঙ্গলালবাবু, আপনি আরও খানিকটা বলুন রুবাইয়াং থেকে। চমৎকার
লাগছে।
শিরোমণি কিছু না বলিয়া নন্য লইলেন। জগমােহন স্মিতমুখে বরদার দিকে চাহিলেন,
রঙ্গলালবাবু আবৃত্তি শুরু করিলেন
And David's lips are lock't, but in Divine
High-piping Pehlvi with 'wine, wine, wine
Red wine'--the Nightingale cries to the Rose
That yellow cheek of hers to incarnadine,
Come, fill the cup, and in the Fire of Spring
The winter garment of Repentance fling :
The bird of time has but a little way
To fiy,--and lo, the bird is on the wing.
Here with a Loaf of Bread bencath the bough
A flask of wine, a book of verse ann Thoru
Beside me singing in the wilderness,
And wilderness is Paradise enow.
বরদা। Excellent, চমৎকার। [ সহসা ] জগমােহন, তুমি কিন্তু ভাই
দেখ একবার বেরিয়ে

দশ-ভাণ ১০৪ জগমােহন। যাচ্ছি যাচ্ছি, ব্যস্ত হও কেন ? শােন না রঙ্গলালবাবুর আবৃত্তি খানিকক্ষণ । বরদা। [ রঙ্গলালবাবুর দিকে ফিরিয়া ] সত্যি চমৎকার আপনার আবৃত্তি। শিরােমণি মশায়ের সংস্কৃতের অং বং-এর পর কর্ণে যেন একেবারে মধু-বর্ষণ করলেন। শিরােমণি মশায় রাগ করবেন না যেন—আমরা মানে—একটু ই’য়ে ধরণের, মানে-[ হাসিলেন। শিরােমণি। [ সজোরে নরে টিপ টানিয়া] রাগ করবার আর কি আছে এতে। ও ভাষা বুঝিও না, ওর রসও পাই না। রঙ্গলাল। ভাষা বোেঝবার তাে কিছু নেই, সুরটা কানে লাগলেই হল ! সুরটাই আসল, অমন যে ব্যাকরণের উপসর্গ, তাও সুর-সংযােগে উপভােগ্য হয়ে উঠেছে। প্রপরাপ সমম্বব নিরদুরভি ব্যধি সুদতি নিপপতি পৰ্যপয়ঃ শিয়ােমণি। [ উচ্চভাবে ] আমি সব সুরই বুঝি, বুঝলে বাবা। টোলে কাব্য অলঙ্কার পড়তে হয়েছিল আমাকে; কিন্তু তােমরা, আজকালকার ছেলেরা কেবল একটি সুরই বােঝ, আর সব বিষয়ে তােমরা অসুর। রঙ্গলাল কোন উত্তর না দিয়া স্মিতমুখে চাহিয়া রহিলেন বরদা। বেশ, খিদে পাচ্ছে কিন্তু ক্রমশ। জগমােহন (চটাৎ করিয়া একটা মশা মারিলেন) তুমি দিবি নিশ্চিন্ত হয়ে বসে আছে তাে! জগমােহন। আচ্ছা এই উঠলাম। আমি গিয়েই বা কি করব, নদীর পানে চেয়ে থাকলেই তাে নৌকো বোঁ বোঁ করে এসে পড়বে না। যাক্‌-বার বার বলছ যখন যাচ্ছি রাগের ভান করিয়া চলিয়া গেলেন রঙ্গলাল। আপনাদের সঙ্গে খাবার নেই না কি ? আমাদের সঙ্গেও যা

বানপ্রস্থ
ছিল সব খতম হয়ে গেছে। খানিকটা মাস্টার্ড পড়ে আছে খালি। শিরােমণি
মশায়, আপনার কলাগুলাে আছে, না নিঃশেষ করেছেন ?
শিরােমণি ।
সে কোন কালে
পুনরায় নস্য লইলেন
রঙ্গলাল। শিরােমণি মশায় আমাকে ছেড়ে থাকতেও পারবেন না, যেখানে
যাব আমার সঙ্গে যাওয়া চাই—অথচ আমার সঙ্গে মতের মােটে মিল নেই—খালি
ঝগড়া আর ঝগড়া-
শিরােমণি। ঝগড়া হবে না, এমন দুর্লভ মানবজন্ম পেয়েছ—সেটা কেবল
ভােগ-বিলাসেই কাটিয়ে দেবে ? তােমাদের জীবনের উদ্দেশ্যটা কি, কেবল
ভেসে চলা ?
রঙ্গলাল। (হাসিয়া ) তাই কি ছাই জানি। রবিঠাকুরের ভাষায়—কী চাই
কী চাই বচন না পাই মনের মতন রে—
বেঠিক পথের পথিক আমার
অচিন সে জন রে
চকিত চলার কচিৎ হাওয়ায়
মন কেমন করে
নবীন চিকণ অশথ পাতায়
আলাের চমক কানন মাতায়
যে রূপ জাগায় চোখের আগায়
কিসের স্বপন সে
কী চাই কী চাই বচন না পাই
মনের মতন রে।
বরদা। বাঃ
শিয়ােমণি। কিন্তু এ সমস্তই হ’ল দেহজ মােহের বিকার, কিন্তু দেহটা যে
কিছু নয় একথা সর্বদা মনে রাখা উচিত। গীতার কথা ভুললে চলবে না-
বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়—

দশ-ভাণ ১০৬ বরদা। দোহাই শিরােমণি মশায়, সংস্কৃতের কচকচি একটু থামান। এবার একটু কাব্যালােচনা হােক। চমৎকার লাগছে রঙ্গলালবাবুর আবৃত্তি শিরােমণি। বেশ তাই হােক—আমি চললাম। সক্রোধে চলিয়া গেলেন রঙ্গলাল। (হাসিয়া ) উনি যাবার জন্যে পা বাড়িয়েই ছিলেন। নীহার একা রয়েছে- গলা খাকারি দিলেন বরদা। নীহার কে ? রঙ্গলাল। সে আছে একজন। বরদা। যাক্ সংস্কৃতের কচকচি থামলো—বাঁচা গেল। রঙ্গলাল। সংস্কৃতকে অশ্রদ্ধা করবেন না মশাই, সংস্কৃতে কালিদাস কাব্য লিখেছেন- অশােকনিভংসিতপদ্মরাগ- মাকৃষ্টহেমদ্যুতিকণিকার মুক্তাকলাপীকৃতসিন্ধুবারং বসন্ত পুষ্পাভরণং বহন্তা। আবর্জিতা কিঞ্চিদিবনাভ্যাং বাসে বসানা তরুণর্করাগ পর্যাপ্তপুষ্পস্তবকাবনা সঞ্চারিনী পল্লবিনী লতেব। বরদা। আহা চমৎকার। রঙ্গলাল। কালিদাস আপনার পড়া আছে ? বরদা। এককালে বি-এ পাশ করেছিলুম—সেই সূত্রে কুমারসম্ভবের খানিকটা পড়তে হয়েছিল বই কি।

১০৭
বানপ্রস্থ
রঙ্গলাল। মনে আছে সেখানটা আপনার, মদনের সঙ্গে বসন্ত যেখানে
মহাদেবের কাছে আবির্ভূত হয়েছেন সেখানের বর্ণনাটা
মধু দ্বিরে: কুতুমৈকপাত্রে
পপৌ প্রিয়াং সামনুবর্তমান:
শৃঙ্গেণ চ স্পর্শনিমীলিতক্ষীং
মুগীমকয়ত কৃষ্ণসার:।
দদৌ রসাং পঙ্কজৱেণুগন্ধি
গজায় গণ্ড জলং করেণঃ
অর্পোপভুক্তেন বিসেন জয়াং
সম্ভাবয়ামসি রণাঙ্গনামা।
বরদা। (সােদ্যাস) আহা, কাণ নেন জুড়িয়ে গেল। সত্যি, সংস্কৃতের
মত ভাষা নেই–
=
বঙ্গলাল। যে কোন ভাষাতেই সুর লাগলে মিষ্টি হয়। ফারসী গজল কত
মিষ্টি । একেবারে মাতিয়ে দেয়-
বু জেতে অমােতহ, শরি
সুখনীরা সুগনীরা যখনীরা
'গুল অঙ্গ, রখং অমােতই, নাজুক
বদনীরা বদনীরা বদনীরা।
সুরই আসল, ছন্দই আসল—ভাষা কিছু নয়। এই সুর, এই ছন্দ এই
নেশা—পাগল করে দেয় মানুষকে। এরই উন্মাদনায় রবীন্দ্রনাথ একদিন
লিখেছিলেন বােধ হয়-
পাগল হইয়া বনে বনে ফিরি
আপন গন্ধে মম
কস্তুরী মৃগ সম
৯ জ=-এর মত উচ্চারণ, খ= guttural খই, শ=sh, স=s

দশ-ভাণ ১০৮ ফাল্গুন রাতে দক্ষিণ বায়ে কোথা দিশা খুঁজে পাই না যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই যাহা পাই তাহা চাই না বরদা। (দ্বারের পানে চাহিয়া। কিন্তু জগমােহন এখনও ফিরল না, আজ খেয়ে মরতে হবে দেখছি। তামাকের জন্যও প্রাণটা আইঢাই করছে। রঙ্গলাল। সিগারেট খাবেন ? বরদা। না, সিগারেট আমি খেতে পারি না। তামাক না হলেও চলবে —কিন্তু খেতে না পেলে আমি মারা যাব। বেশ খিদে পেয়েছে মশাই রঙ্গলাল। আপনি মরতে ভয় পান ? বরদা। তা পাই বই কি, আপনি পান না ? রঙ্গলাল। না। রবার্ট ব্রাউনিঙ-এর সঙ্গে মিলিয়ে আমার বলতে ইচ্ছে For sudden the worst turns best to the brave The black minute's at end And the elements rage, the fiendish voices that rave Shall dwindle, shall blend, Shall change, shall first become a peace out of pain Then a light, then thy breast 0, thou, soul of my soul, I shall clasp thee again And with God be the rest ! নেপথে মিষ্ট মেয়েলি গলায় গান ভাসিয়া আসিল- “গানের সুরের আসনখানি পাতি পথের ধারে ওগাে পথিক, তুমি এসে বসবে বারে বারে” বরদা। (উৎকর্ণ) চমৎকার মিষ্টি গলা তত-কে গাইছে মশাই ?

১০৯
বানপ্রস্থ
রঙ্গলাল। (হাসিয়া) নীহার পালিয়ে এসেছে।
বরদা। নীহার মেয়েমানুষ নাকি ?
রঙ্গলাল। নিশ্চয়, রীতিমত মেয়েমানুষ!
উঠিয়া গেলেন এবং জানালা দিয়া ডাকিলেন
নীহার, ভেতরে এসাে
নীহার প্রবেশ করিল, সঙ্গে সঙ্গে বরদাবাবু চটাং
করিয়া একটা মশা মারিলেন
?
তুমি পালিয়ে এলে যে?
নীহার। শিয়ােমণি মশায়ের কাছে থাকা যায় ।
বরদা ও রঙ্গলাল উভয়েই হাসিলেন
ইনি বুঝি
বরদা। বসুন, বসুন (সরিয়া স্থান করিয়া দিলেন) রঙ্গলালবাবু,
আপনার
রঙ্গলাল। না, কেউ হন না (একটু হাসিয়া ) অথচ সব হন। অর্থাৎ
রবীন্দ্রনাথের ভাষায়-
আমারে যে ডাক দেবে এ জীবনে তারে বারম্বার
ফিরেছি ডাকিয়া
সে নারী বিচিত্র বেশে, মৃদু হেসে খুলিয়াছে, দ্বার
থাকিয়া থাকিয়া
দীপখানি তুলে ধরে, মুখে চেয়ে, ক্ষণকাল থামি
চিনেছে আমারে
তারই সেই চাওয়া সেই চেনার আলােক দিয়ে আমি
চিনি অাপনারে।
বরদা। ইনি খুব ভাল গান গাইতে পারেন ?
রঙ্গলাল। চমৎকার, একখানা শুনিয়ে দাও না নীহার
নীহার। কোষ্টা গাইব?

দশ-ভাণ
১১০
রঙ্গলাল। যা তােমার খুশি।
নীহার। হার্মোনিয়মটা আনতে বলুন ত| হলে হীরুকে। খালি গলায়
আমি গাইতে পারব না।
রঙ্গলাল। বেশ তাে হামোনিয়মটা আনুক না। এইখান থেকে ডাকলেই
শুনতে পাবে বােধ হয় হীরু-
জানালার কাছে উঠিয়া গেলেন ও উচ্চৈঃস্বরে ডাকিলেন
হীরু ! হীরু।
( নেপথ্য হইতে হীরু) আজ্ঞে হ্যা—
রঙ্গলাল। হামোনিয়মটা আননা এখানে।
( নেপথ্য হইতে হীরু) যে আজ্ঞে।
বরদা। আশ্চর্য ব্যাপার, জগমােহনের কোন পাত্তা নেই।
রঙ্গলাল। শিরােমণির সঙ্গে আবার শাস্ত্রালাপ সুরু করেছেন বােধ হয় ।
শিরােমণি মশায় লােক পেলে তাে ছাড়বেন না।
বরদা। কিন্তু নৌকোটার কি হল? হু হু করে হাওয়াও উঠেছে একটা
রঙ্গলাল। এ রকম নির্জন স্থানে হু হু করে হাওয়া উঠলে কি মনে হয়
জানেন ?
বরদা। কি ?
রঙ্গলাল। রবিঠাকুর।
[ আবৃত্তি সুরু করিলেন ]
হু হু করে বায়ু ফেলিছে সতত
দীর্ঘশ্বাস
অন্ধ আবেগে করে গর্জন
জলােচ্ছাস।
সংশয়ময় ঘন নীল নীর
কোনাে দিকে চেয়ে নাহি হেরি তীর

১১১ বানপ্রস্থ অসীম রোদন জগং প্লাবিয়া দুলিছে যেন হীরু হামোনিয়ম লইয়া প্রবেশ করিল ও সেটি নীহারের সম্মুখে রাখিয়া চলিয়া গেল। রঙ্গলালবাবু আবৃত্তি করিয়া চলিলেন- তারি পরে ভাসে তরণী হিরণ তারি পরে পড়ে সন্ধ্যা কিরণ তারি মাঝে বসি এ নীরব হাসি হাসিছ কেন ? আমি তো বুঝি না কি লাগি তোমার বিলাস হেন! বরদা। এইবার একখানা গান হােক। আপনি থামুন। রঙ্গলাল। এ কবিতার শেষটা আলাে চমৎকার, শুনুন না- আঁধার রজনী আসিবে এখনি মেলিয়া পাখা সন্ধ্যা অাকাশে স্বর্ণ আলােক পড়িবে ঢাকা। শুধু ভাসে তব দেহসৌরভ শুধু কানে আসে জল কলরব গায়ে উড়ে পড়ে বায়ু ভরে তব কেশের রাশি। বিকল হৃদয় বিবশ শরীর ডাকিয়া তােমারে কহিব অধীর “কোথা অছি, ওগাে, করুহ পরশ নিকটে আসি", কহিবে না কথা দেখিতে পাব না নীরব হাসি।

দশ-ভাণ ১১২ বরদা। এইবার গান হােক—কবিতা থামান আপনার। নীহার। কোষ্টা গাইব? রঙ্গলাল। সেই গজলটা গাও না। নীহার হামোনিয়ম টানিয়া লইল এবং একটি উর্দ, গজল গাহিল। খুব দরদ দিয়া গাহিল। বরদা। (সেচ্ছাসে) চমৎকার ! রঙ্গলাল। ভাল লাগল আপনার ? বরদা। চমৎকার, চমৎকার—খুব চমৎকার ! রঙ্গলাল। চমৎকার লাগল ? আমার তেমন সুবিধে লাগল না। ভাল দেখে গাও আর একখানা বরদা। হ্যা হ্যা—আর একটা হােক। বাইরে তখন যেটা গাইছিলেন- নীহার। গানের সুরের আসনখানি-টা? বরদা। হ্যা। রঙ্গলালবাবু পকেট হইতে সিগারেট কেশ বাহির করিয়া খুলিয়া দেখিলেন সিগারেট নাই আমার সিগারেটের টিনটা কি তােমার য়্যাটাচিতে আছে ? নীহার। হঁ্যা। রঙ্গলাল। চাবিটা দাও তত নিয়ে আসি আমি। (বরদার দিকে ফিরিয়া ) আপনি গান শুনুন ততক্ষণ—আমি সিগারেট নিয়ে আসি। (চলিয়া গেলেন) নীহার গান ধরিল—“গানের সুরের আসনখানি”। গান শেষ হইয়া গেল, তবু রঙ্গলালবাবু ফিরিলেন না বরদা। ( অভিভূত) সত্যি আমি মুগ্ধ হয়ে গেছি। (একটু ইতস্তত করিয়া) আপনি, মানে রঙ্গলালবাবুর সঙ্গে আপনার নীহার। না, সম্পর্ক কিছু নেই। বরদা। আপনি তা হলে

১১৩
বানপ্রস্থ
নীহার। ( সলজ্জ ) আমাকে আপনি বলে লজ্জা দেবেন না
বরদা। (গলা খাঁকারি ) ও হঁা—আচ্ছা
নীহার। আর একটা গান শুনবেন ?
বরদা। হা হা নিশ্চয়ই। (সহসা) জগমােহন গেল ত গেলই।
নীহার গান ধরিল—“ঘুম মােরে এলে মনােহর।' বরদা
মুগ্ধ দৃষ্টিতে নীহারের পানে চাহিয়া রহিলেন
নীহার। ( সলজ্জ কণ্ঠে ) অমন করে দেখছেন কি
বরদা। তােমাকে। মনে পড়ছে প্রথম যৌবনে যে মেয়েটিকে পাগলের
মত ভালবেসেছিলাম সেও ঠিক যেন তােমারি মত দেখতে ছিল। আজ যেন
অনেকদিন পরে তার সঙ্গে দেখা হ’ল এই নির্জনে। বড় ভাল লাগছে।
মুগ্ধ ভাব স্পষ্টতর হইয়া উঠিল
নীহার। (কুন্তিত ) আর একটা গান গাইব?
বরদা। গাও।
নীহার ধরিল—‘বাঁধ না তরীখানি আমারি নদীকূলে। বরদা উন্মুখ-দৃষ্টিতে
নীহারের মুখের পানে চহিয়া রহিলেন। গান চলিতে লাগিল।
সহসা গানের মাঝখানেই বরদা বাধা দিলেন
গান থাকচল আমরা দুজনে বেড়াই গিয়ে
নীহার। কোথায় ?
বরদা। নদীর ধারে। পূর্বদিকে একটা চমৎকার বারান্দাও আছে, চল
সেইখানে বসি গিয়ে। চল আর গান ভাল লাগছে না।
নীহার। (একটু ইতস্তত করিয়া) চলুন।
পাশের দরজাটা দিয়া উভয়ে চলিয়া গেলেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে জগমােহন ও
রঙ্গলাল আসিয়া প্রবেশ করিলেন। রঙ্গলালের মুখে সিগারেট
জগমােহন। বরদা আবার কোথা গেল ?
রঙ্গলাল। (জানালা দিয়া গলা বাড়াইয়া দেখিলেন) ওই যে! নীহারের

দশ-ভাণ
১১৪
সঙ্গে পূর্বদিকের বারান্দায় বসে গল্প করছেন। বেশ জমে গেছেন মনে
হচ্ছে।
জগমােহন। যতক্ষণ অন্যমনস্ক থাকে ততই ভাল। আমি এখন কি করি
বলুন তাে?
রঙ্গলাল। নৌকো না আসবার কি কারণ হতে পারে ?
জগমােহন। যে কারণটা আমার মনে হচ্ছে তা যদি হয়ে থাকে তা হলে
তত ভয়ানক ব্যাপার।
রঙ্গলাল। কি ?
জগমােহন। মাঝি ব্যাটাদের অগ্রিম ভাড়া দিয়ে এসেছিলাম, তারা তাই
নিয়ে যদি তাড়ি খেয়ে থাকে, তা হলেই তাে সৰ্ব্বনাশ। তা হলে আজ আর
নৌকো আসবেই না। আর না যদি আসে তা হলে বরদা আমাকে আর আস্ত
রাখবে না।
রঙ্গলাল। বেশ তাে আমার নৌকোটা নিয়ে এগিয়ে দেখা যাক্। স্রোতের
মুখে যেতে আর কতক্ষণ লাগবে।
জগমােহন। আপনারা তা হলে এখানেই বসবেন বলছেন ?
রঙ্গলাল। চলুন না আমিও যাই। বেড়াতেই তত বেরিয়েছি। বরদাবাবু
ততক্ষণ একটু অন্যমনস্ক থাকুন
হাসিলেন। তাহার পর জগমােহনের দৃষ্টিতে একটা
প্রশ্ন লক্ষ্য করিয়া বলিলেন
আরে না না মশাই, আমার ওসব কমপ্লেক্স নেই। কাঙালের মতাে কোন
জিনিস আঁকড়ে থাকা আমার স্বভাবই নয়। তা ছাড়া, নীহার সন্দেশ নয় যে
বরদাবাবু টপ করে গালে ফেলে দেবেন। যদি দেনও (হাসিয়া ) I dont
mind ! চলুন। অমন সন্দেশ ঢের দেখেছি।
জগমােহন। কিন্তু শিয়ােমণি মশায় ?

১১৫
বানপ্রস্থ
রঙ্গলাল। হঁ্যা শিরােমণি মশায় একটা প্রবলেম্ বটে। এই যে শিয়ােমণি
মশায় আসছেনও দেখছি
শিরোমণি প্রবেশ করিলেন। তাঁহার পরিধানে পট্টবস্ত্র
শিরােমণি মশায়, কাপড় বদলে এলেন যে-
শিরােমণি। আমাদের ফিরতে দেরি আছে তাে ?
রঙ্গলাল। একটু দেরি আছে—
শিরােমণি। তাহলে আমি সন্ধ্যাহ্নিকটা সেরেই নিই এখানে।
রঙ্গলাল। বেশ তাে, সন্ধ্যাহ্নিকের সরঞ্জাম তােত আপনার সঙ্গেই আছে,
মায় কুঁজোয় করে গঙ্গাজল পর্যন্ত এনেছেন আপনি। আনতে বলব হীরুকে?
শিরােমণি। আমি বলেছি-ওই যে এসেও পড়েছে।
হীরু প্রবেশ করিল। তাহার হাতে গঙ্গাজলের কুজো
কো-কুশি, কুশাসন
রঙ্গলাল। চলুন জগমােহনবাবু, আমরা যাই তা হলে।
জগমােহন। চলুন।
উভয়ে চলিয়া গেলেন। হীরুও অসন প্রভৃতি পাতিয়া দিয়া বাহির হইয়া গেল।
শিরােমণি মহাশয় আবৃত্তি করিতে করিতে সাড়ম্বরে অহিক সুরু করিলেন।
খানিকক্ষণ পরে বরদা আসিয়া প্রবেশ করিলেন। পিছু পিছু
নীহার। বরদার দৃষ্টি উদ্ভ্রান্ত
নীহার। আপনি অমন করে হঠাৎ উঠে এলেন যে?
বরদা। জগমােহনটা গেল কোথায় ভয়ানক খিদে পেয়েছে আমার
জানালার কাছে গিয়া উচ্চৈঃস্বরে
.
জগমােহন-জগমােহম-জগমােহন-জগা-
শিরােমণি মহাশয় প্রাণায়াম করিতেছিলেন। তাঁহার মুখ কুটি-
কুটিল হইয়া উঠিল। হীরু প্রবেশ করিল
হীরু। আজ্ঞে, ওনারা লৌকো করে চলে গেলেন।

দশ-ভাণ ১১৬ বরদা। (সবিস্ময়ে ) নৌকো করে চলে গেলেন ! কোথা গেলেন ! হীরু। আপনার নৌকোটার খােজেই বেরিয়েছেন। আপনাকে আর দিদিমণিকে এইখানে অপিক্ষে করতে বলে গেলেন। বরদা। অপিক্ষে করতে বলে গেলেন! হীরু। আজ্ঞে হ্যা। চলিয়া গেল বরদা। উঃ, এমন ফ্যাসাদে মানুষে পড়ে । নীহার। চলুন, আমরা তা হলে একটু বসে গল্প করি ওই বারান্দায় গিয়ে। বরদা। চল- উভয়ে চলিয়া গেলেন। শিরােমণি মহাশয় আরও খানিকক্ষণ পরে সন্ধ্যাহিক শেষ করিলেন এবং উচ্চৈঃস্বরে শিবস্তোত্র আবৃত্তি করিতে লাগিলেন। “প্রভুমীশমনীশমশেষগুণম” ইত্যাদি। খানিকক্ষণ পরে হীরু আসিয়া প্রবেশ করিল। হীরু। ওই বাবুটি কোথা গেলেন? শিরােমণি স্তোত্রপাঠ বন্ধ করিলেন। শিরােমণি। (রাগতভাবে ) কেন ? হীরু। ওনাদের লৌকোটা ডুবে গেইচে, তলার পাটাতন একখানা নাকি আলগা ছিল, সেটা হঠাৎ খুলে গিয়ে ডুবে গেইচে লৌকোটা। একটা মাঝি আইচে সাতরে শিয়ােমণি। একটু নিঝন্ধাটে পূজো করবারও জো নেই। বাবু ওদিকের বারান্দায় আছে, বলগে যা- হীরু চলিয়া গেল। শিরােমণি পুনরায় স্তোত্রপাঠে মন দিলেন। খানিকক্ষণ স্তোত্রপাঠ চলিল। বরদা প্রবেশ করিলেন। ওষ্ঠ দৃঢ়-নিবন্ধ, নাসারন্ধু স্ফীত। পিছু পিছু নীহার নীহার। অমন অস্থির হচ্ছেন কেন? বরদা। আমার মাথা ঘুরছে

১১৭
বানপ্রস্থ
নীহার। মাথা ঘুরছে? একটু বসুন না, বলেন তাে (ইতস্তত করিয়া)
একটু বাতাস করে দি—
শিরােমণি সক্রোধে উঠিয়া পড়িলেন
শিরােমণি। ওরে হীরু, এসব জিনিসপত্তর নিয়ে আর একটা ঘরে চল্। কি
পাপের ভােগেই পড়েছি আমি
পাশের ঘরে চলিয়া গেলেন। হীরুও আসিয়া জিনিস-পত্র
লইয়া তাহার অনুগমন করিল
নীহার। বাতাস করে দেব একটু?
বরদা। (রুক্ষকণ্ঠে ) না—
নীহার। তাতে ক্ষতি কি! দিই না একটু
বরদা। ( অধিকতর রুক্ষকণ্ঠে ) না! জগা রাঙ্গেলটা-
উঠিয়া পড়িলেন এবং অধিকতর উত্তেজিতভাবে পরিক্রমণ করিতে
লাগিলেন। তারপর সহসা দাঁত কড়মড় করিয়া
ওই মাঝি ব্যাটার হাড় ঠেঙিয়ে গুড়াে করে দেব আমি। ব্যাটা, পাজি,
হারামজাদা! ( উচ্চৈঃস্বরে) হীরু, হীরু-
হীরুর প্রবেশ
হীরু। আজ্ঞে, কি বলছেন?
বরদা। ( সক্রোধে ) ডাক মাঝি ব্যাটাকে, জুতিয়ে ব্যাটার পিঠের চামড়া
তুলে ফেলি। পাটাতন আলগা ছিল। ইয়াকি
নীহার। না, না, গরীবমানুষকে আর মারধাের করে কাজ নেই। হীরু,
তুই যা।
হীরু চলিয়া গেল
বরদা। ( অসংলগ্নভাবে ) স্কাইণ্ডেল, বােগ, রাসকেল, সােয়াই
নীহার। (বরদার বাহুমূলে হাত দিয়া, সানুনয়ে) একটু স্থির হাে-
বরদা ঝটকা মারিয়া নীহারের হাত সরাইয়া দিলেন
বরদা। ( অপ্রত্যাশিতভাবে ধমক দিয়া চুপ কর, ফাজিল কোথাকার।

দশ-ভাণ
১১৮
নীহার। (অভিমান-ক্ষুন্নকণ্ঠে) এতে আর ফাজলামির কি দেখলেন !
বরদা কোন উত্তর দিলেন না। ব্যর্থ আক্রোশে পিঞ্জরাবদ্ধ
ব্যাঘ্রের ন্যায় পরিক্রমণ করিতে লাগিলেন।
নীহার মুখ টিপিয়া একটু হাসিল
নীহার। তা হলে ততক্ষণ একটা গান গাই, শুনুন
বরদা উত্তর দিলেন না। একটা দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া দেখিলেন নীহার হামোনিয়মটি টানিয়া
লইয়া বসিল এবং গান ধরিল। বরদা—পরিক্রমণ করিতে লাগিলেন
আমার মনটি করিয়া চুরি
আমার প্রাণটি করিয়া চুরি
এই আসি বলে গিয়েছিলে চলে
এতদিনে এলে ফিরি, হে সখা,
এতদিনে এলে ফিরি।
বরদা। ( অপ্রত্যাশিতভাবে থামিয়া ও চীৎকার করিয়া) গান থামাও।
নীহার কিন্তু গান থামাইল না, আর একটু মুচকি হাসিয়া গাহিয়া চলিল—
কত মরু গেছে কত সাগরে
কত সাগর শুকাল বারি
কত নদী গেছে পথ ভুলি, হে সখা,
সখা, গলে গেছে কত গি-ই-রি
বরদা। (দাতমুখ খি চাইয়া ক্ষিপ্তকণ্ঠে চীৎকার করিয়া উঠিলেন) একশাে
বার বলছি, আমার খিদে পেয়েছে—খিদে পেয়েছে, ভয়ঙ্কর খিদে পেয়েছে-
গান-টান কিছু ভাল লাগছে না—চুপ কর তুমি
নীহার তবু থামে না
তবে রে তাের গানের নিকুচি করেছে ।
ক্রুদ্ধ বরদা কোণ হইতে একটা মুগুর তুলিয়া সবেগে সেটা হামোনিয়মের দিকে নিক্ষেপ
করিলেন। অৰ্ত্ত চীৎকার করিয়া নীহার সরিয়া দাড়াইল। হার্মোনিয়মের পাশ দিয়া গিয়া
মুগুরটা গঙ্গাজলের কুঁজোটাকে স-শব্দে চুরমার করিয়া দিল।
যবনিকা

কবয়ঃ
পাত্র-পাত্রী
লেখক•••লেখক এবং কবি
বৃন্দাবন রুজ•••মােদক
নরসুন্দর নাপিত
সকলেই নিরক্ষর
ভবেশ•••মালী
ধ্রুবেশ গুড়•••অতি-আধুনিক-মনা
অম্বিকেশ নন্দী:- জম্বুদ্বীপের জমিদার
চন্দ্রমুখী...অম্বিকেশের কন্যা
ছয় জন দারােয়ান।
[ নিজের ঘরটিতে লেখক বসিয়া আছেন। ঘরটির একটি বিশেষত্ব আছে, দেওয়াল দেখা
যাইতেছে না, চারিদিক রঙীন পর্দা দিয়া ঢাকা। ঘরের পিছন দিকে পর্দাগুলি বিভক্ত হইয়া
দুইটি দ্বারে পরিণত হইয়াছে। অভিনয়কালে দেখা যাইবে দ্বারের বাহিরে নানারঙের আলো
ফুটিয়া উঠিতেছে ও ধীরে ধীরে মিলাইয়া যাইতেছে। লেখক ঘরের মধ্যস্থলে বসিয়া আছেন।
তঁাহার বয়স অল্প, দেখিতে সুশ্রী, পরিধানে সাদাসিদা পরিচ্ছদ, কারণ তিনি গরীব। ঘরে কয়েকটি
মােড়া ছড়ি আসবাব নাই। একটি টেবিলে কাগজ কলম প্রভৃতি লিখিবার সরঞ্জাম দেখা
যাইতেছে।
লেখক [ দর্শকবৃন্দকে ]
নমস্কার বন্ধুগণ, আশা করি ভাল আছেন সকলে
আমাদের এ জম্বুদ্বীপে খারাপ থাকা শক্ত
জম্বুদ্বীপে কিছু না থাক আনন্দটি আছে সবার দখলে
একটুখানি সুযােগ পেলে হর্বভরে হই মােরা উন্মত্ত।
হবেই এটা বলতে
ঘূর্তি সদাই জ্বলছে মনে ঠোটের ফঁাকে, চোখের কোণে

দশ-ভাণ,
তৈল-বিহীন হয় না কভু সলতে।
সবাই হেথায় ফুর্তি করে হাসে নাচে ও খায় দায়
আজকে কিন্তু আমি মশাই পড়েছি এক বেকায়দায়
টাকার ফেরে পড়ে গেছি—দশটি নগদ টঙ্কা
জাগছে চিতে শঙ্কা!
দশটি টাকার জন্যে হবে কাব্য বিপর্যস্ত
এ যে বিপদ মন্ত!
চক্ষু দিয়ে যদিও তারে করি নি কো দর্শন
কর্ণপথে প্রবেশ করে করছে হৃদয়-কর্ষণ
নামের মােহে মন হয়েছে বন্দী
সুমিষ্ট নাম, অপূৰ্ব্ব নাম—চন্দ্রমুখী নন্দী।
কবিতাটা লিখেইছি তাে--কিন্তু তার অর্থকেই
মহত্তর করতে হবে দশটি টাকা সহযােগে
বাপের তার সৰ্ত্ত এই!
আমার সম্বল একটি টাকা
দেখাইলেন
ভরসা একটি আশার 'পর
জম্বুদ্বীপে বক্তা সবাই অধিকাংশই নিরক্ষর।
কালি কলম কাগজ ঘাঁটা—হেথায় কারাে সে শখ নেই
স্বভাবকবি অনেক আছেন আমি ভিন্ন লেখক নেই।
চন্দ্রমুখীর পাণিপ্রার্থী হন যদি কেউ তারে
আসতে হবে এই লেখকের দ্বারে।
কন্যাসহ নন্দী মশাই সন্ধ্যা বেলা এসে
এই খানেতেই কাব্যবিচার শেষে
শ্রেষ্ঠ কবি-করে

১২১ কবয়ঃ কন্যাটিরে দেবেন সমাদরে, অবশ্য সে যদি পারে দিতে দশটি টাকাও সুপ্রসন্ন চিতে! সকাল থেকে বসে বসে লিখেছি তাে কাব্য কিন্তু হায় রে—দশটি টাকা। যাক গে কত ভাবব যা হবার তা হবেই হবে—থাকে যদি ভাগ্যে ভাবব না আর যাক গে- বাহিরে জল-তরঙ্গের বাজনার মতাে ঘণ্টা বাজিয়া উঠিল। পরমুহূর্তেই বৃন্দাবন আসিয়া প্রবেশ করিলেন। লেখক সাড়ম্বরে তাহাকে অভ্যর্থনা জানাইলেন- এস এস বৃন্দাবন আগে যদি জানতাম তােমার মতাে মহৎ লােকের মিলবে আজি দরশন কারাে কাছে চেয়ে-চিন্তে কার্পেট একটা আনতাম তার ওপরে বিছিয়ে দিতাম কুন্দ কলি অগণন ! এমন সময় আস না তাে-হচ্ছে কেমন সন্দ’ সকাল সকাল আজকে কেন দোকান করলে বন্ধ। বৃন্দাবন। লেখনী-সম্রাট ওহে, জ্ঞান-তুঙ্গ শির, জিলাপি বেচিতেচিনু বসিয়া দোকানে ট্যাটরার বাদ্যভাণ্ড গুরু ও গম্ভীর আকুল করিয়া দিল অন্তরে ও কানে! অম্বিকেশ নন্দী নাকি করিছে প্রচার কন্যার বিবাহ তার দিবে এইবার ? লেখক। তাহাই তাে বলিতেছে সবে বৃন্দাবন। চন্দ্রমুখী-বিষয়েতে কবিতা রচিতে নাকি হবে ? সর্বাপেক্ষা ভাল হবে যার চন্দ্রমুখী তার?

দশ-ভাণ,
১২২
লেখক। তারই বটে—কিন্তু ভাই শুধু পদ্য নয়,
আরও সৰ্ত্ত আছে গদ্যময়।
বৃন্দাবন। কিবা কহ কহ,
আমি অহরহ
কবিতা লিখিব বসি’
চন্দ্রমুখী-মুখ-শশী
চটচটে ভাবলেই দিয়া
রাখিব সাঁটিয়া
শূন্য মম হৃদয়-আকাশে,
দোকান রহিবে বন্ধ, কিবা যায় আসে।
কহ, কোন সৰ্ত্ত আছে আর ?
লেখক। সম্পূর্ণ কবিতা চাই পূৰ্বেই সন্ধ্যার ।
বৃন্দাবন। প্রচুর সময়, এক ঘণ্টা আছে হাতে,
মহাকাব্য হয়ে যাবে তাতে!
ভাব-বস উথলিছে বুকে
চারি ছত্র কবিতা তাে এখনি রচিব মুখে মুখে।
নাই মনে ? সে বৎসর রায়েদের বাড়ি
সরবরাহ করেছিনু মাল এক গাড়ি
মাত্র একটি ঘণ্টার নােটিসে ?
একই ব্যক্তি আমিই বটি সে ।
আশা করি আর কোন নাহিক ঝঞ্চাট?
লেখক। আছে ভায়া, আছে আরও গাঁট ।
কবিতাতে মিল থাকা চাই চন্দ্রমুখীর সঙ্গে
মণি যেমন গাঁথা থাকে কাঞ্চনেরই অঙ্গে!

বৃন্দাবন। অথবা সন্দেশ যথা সুন্দর ছাঁচেতে। অন্তরে ফুটিছে রস কল্পনা-আঁচেতে•• লেখক। কাগজেতে ঢালতে হবে আঁচের থেকে নাবিয়ে মুক্তোর মত অক্ষরেতে লিখতে হবে বাগিয়ে ! বৃন্দাবন। দমাইয়া দিলে যে তাহলে লেখনী চলে না হাতে মাের- তাড়টাই চলে । লেখক। আমি তব ভৃত্য আছি ঠিক বৃন্দাবন। পারিশ্রমিক ? = লেখক। একটি টাকা। মুক্তোর মতাে অক্ষরে এমন ধারা লিখে দেব চন্দ্র-মুখী-বক্ষরে কাপিয়ে দেবে দুরু দুরু- বৃন্দাবন তৎক্ষণাৎ লেখককে একটি টাকা দিলেন বৃন্দাবন। বেশ, তাহলে করি শুরু ? থাম, দাড়াও কোন দিক দিয়ে ভাবি যদি বলি চন্দ্রমুখী তুমি মম হৃদ-প্যাটরার চাবি কিম্বা যদি বলি চন্দ্র তুমি আমার জগৎ লেখক। লেখার সঙ্গে দশটি টাকাও দিতে হবে নগদ বৃন্দাবন। দিব দিব তা-ও দিব নহি পিছপাও কবিতাটা ভাবি আগে কেন বাধা দাও। তুমি বস আমি গােল্লা তুমি পুর আমি যে কচুরি তুমি চিনি আমি বস্তা, মনে আসে উপমা প্রচুরই— তুমি না না না•••ওদিকেতে যাই- সম্মুখে থাকিলে কেহ জুৎ নাহি পাই।

দশ-ভাণ
১২৪
বৃন্দাবন ভাবগ্রস্ত হইয়া কবিতা ভাবিতে ভাবিতে একটু দূরে সরিয়া গেলেন এবং একটি মােড়া
টানিয়া বসিলেন। বাহিরে আবার জল-তরঙ্গ বাজিল।
লেখক। ঘণ্টা বাজায় কে
নেপথ্যে কণ্ঠস্বর
ফুল-বাগানের মালী আমি ভবেশ
লেখক। আসুন আসুন করুন প্রবেশ
দরজা দিয়া ভবেশ প্রবেশ করিলেন। বৃন্দাবন ইহা দেখিতে পাইলেন না। ভবেশ দেখিতে
সুখী নয়। দশ-আনা ছ-আনা চুল ছাটা, ফিনফিনে অদ্দির পাঞ্জাবি পরা, তলায় গোলাপী
গেঞ্জি। দুই কানে ফুল গোঁজা, হাতে ফুলের মালা জড়ান। মাথায় টেরি, এত তেল মাখিয়াছেন
যে গড়াইয়া পড়িতেছে।
লেখক। ফুলের বনে বসতি যার সৌরভে নিশ্বাস
তিনি আজি দীনের দ্বারে ! হচ্ছে না বিশ্বাস!
ভবেশ। সাধে কি এসেছি, জ্বালায় জ্বলছি
মাইরি বলছি।
কোণে ও কে ? অসুস্থ কি? রয়েছে চোখ বুজে !
চেনেন না কি শ্ৰীবৃন্দাবন রুজে ?
সুবিখ্যাত রস-স্রষ্টা, চৌমাথাতে মিষ্টান্ন ভাণ্ডার
তার পাশেই মুদির দোকান দেখেন নি কি তার ?
ভবেশ। বৃন্দাবন ? না, চিনি না। দুলছে কেন অমন ধারা।
লেখক। ছন্দ-দোলায় দিশাহারা,
এসেছেন মাের কাছে ছেড়ে নিজ গৃহে
লেখক।
ভবেশ। বল কি হে!
কবি-আত্মা ময়রা-বক্ষে
দেখতে হ’ল তাও চক্ষে।

১২৫ কবয়ঃ বৃন্দাবন। গােলমাল করিও না, কেটে যায় সুর, আরে কে ও ভবেশ চতুর ! ভুলি নি তােমার নাম বাকি রাখিয়াছ দাম বহুপূৰ্বে নিয়েছিলে কিছু মতিচুর। পুনরায় ভাবগ্রস্ত হইলেন “তুমি মতি আমি চুর—এ চিবুকে তুমি নুর- ভবেশ। মংলব আছে বাবা বেরাল বসে শুকছে গােলাপ উচু করে থাবা ! শােন লেখক পষ্ট বলি খুলে তােমার কাছে আসি নি পথ ভুলে নন্দীকন্যা চন্দ্রমুখীর ঝাঁঝে প্রাণের খাঁজে খাজে মানে- লেখক। অধম সবই জানে। যা বলেন—রাজি আছি করিবারে তাও ভবেশ। ভাও বাংলাও আমার কবিতা লিখে দাও যদি ক-টাকা চাও? লেখক। দু-টাকা ভবেশ। দুই নয় ভাই, একটি,লক্ষ্মী, ফাসাইতে যদি পারি ও পক্ষী এক মুঠো টাকা দেব ইনা- লেখক। রাজি হলাম। ভবেশ টাকা দিলেন

দশ-ভাণ,
১২৬
বৃন্দাবন। [ বুক চাপড়াইয়া ] হায় কি মুস্কিল
চন্দ্রমুখীর সাথে জোটে না যে মনােমত মিল
ভবেশ। কসিটাকে কর কিছু টিল
হয়ত মিলিবে অকস্মাৎ।
লেখক। [ অর্ধ-স্বগত ] তিন হ’ল-বাকি এখন সাত।
ভবেশ। এই মূর্তি সামনে রেখে কাব্য করা শক্ত হবে ভাই
একটুখানি একলা হতে চাই।
লেখক। বেশ তো, কোথায় বসতে চান
ভবেশ। খুশি হ'ত প্রাণ
পেতাম যদি নিরিবিলি, একটু আলাে ঝিলিমিলি
কাছেপিঠে থাকত আতরদান,
গদি-আঁটা নরম সােফা থাকলে হত আরও তােফা
বুঝছই তাে চরম কাব্য ভাবব তাতে বসে
শেষত সব ভেস্তে না যায় বসতে পারার দোষে !
তােমার দেখছি কাঠ-খােট্টা ব্যাপার
লেখক। এই মােড়াটায় বসুন না হয় পেতে দিচ্ছি ব্যাপার
ভবেশ। বেশ তাই হােক, কিন্তু লেখক আর কেউ যদি আসে
গােলমাল যেন না করে আমার পাশে।
একটি বোস বাক্য কিম্বা মূর্তি বেয়াড়া রকম
একটি হপ্তা করে ফেলে মােরে জখম।
কাব্যই নয় হয়ে যাবে মাের স্বাস্থ্য-নাশ
লেখক। সৰ্ব্বনাশ !
লেখক মােড়ায় ব্যাপার পাতিয়া দিতে ভবেশ তদুপরি বসিলেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সজোরে
আবার বাহিরে ঘণ্টা বাজিয়া উঠিল।
ভবেশ। এবার আমি করছি শুরু হুশিয়ার

১২৭
লেখক। [ অর্ধ-স্বগত ]
আর এক জন, চমৎকার !
হুড়মুড় করিয়া নরসুন্দরের প্রবেশ, হাতে প্রকাণ্ড একটা কাচি। লােকটি বেটে মােটা। বা
হাতে একটি চিরুনিও রহিয়াছে। নরসুন্দর খুবই উত্তেজিত।
নরসুন্দর।
লেখক-লেখক
শুনেছ ?
নন্দী—চন্দ্রমুখী!
ঢাটরা শােনা মাত্রই
আমি বেরিয়ে এলাম ছুটে !
খাঁচা ছাড়া পাখীর মতাে
ধনুক-ছোঁড়া তীরের মত
পারলাম না থাকতে
শহর—সমস্ত শহর উত্তেজিত
চন্দ্রমুখী—চন্দ্রমুখী
রাজরাণী হবার যােগ্যতা তার
প্রতি আঙুলে একটা করে আংটি
প্রতি আংটিতে দামী পাথর
ইয়া বড় বড়
কানে হীরের দুল
দুল নয় যেন মােচা-
লেখক। কঁচি সামলাও-চোখে দিও না খোঁচা
রসুন্দর। সামলাতে পাচ্ছি না
নিজেকে সামলাতে পাচ্ছি না আমি,
ইচ্ছে করছে নাচি।

দশভাণ ১২৮ লেখ, লেখ- আমার কবিতাটা লিখে দাও আমাকে ! গদ্য কবিতায় অভ্যস্ত আমি কিন্তু মিল মেলাবই! চন্দ্রমুখীকে পাই যদি ও যদি পাই চুল কাটতে হবে না দাড়ি ছাঁটতে হবে না বনে যাব- তরে’ যাব- কি আনন্দ, কি আনন্দ, কি আনন্দ আমার বুকের কথা টুকে দাও তুমি ! নেপথে কুদ্ধ কণ্ঠস্বর বেরিয়ে আয় ব্যাটা ধূসর পেঙ্গুইন রেলটুনটুনি চুপ নিঝঝুম আধখানা- নরসুন্দর। [ বিব্রত ] ঐ যাছি ছি! অতি আধুনিক কবি বেশ গুড়ের ছাঁটছিলাম দাড়ি!

১২৯
অর্ধেকটা হেঁটেছিলাম
এমন সময় শুনলাম ঢ্যাটরা
ছুটে এলাম আত্মহারা হয়ে
ডাক দিলে আমায় অনাগত
ক্রুদ্ধ ধ্রুবেশ গুড়ের প্রবেশ। খুব রোগাগােছর লোক, দাড়ির এক দিক ঠিক আছে, অন্য
দিকে খাবছা খাবছা করিয়া ছটা। গলায় একটা রঙীন তোয়ালে বাঁধা।
লেখক। গুড় মহাশয়, স্বাগত
অরুন্ধতীর সরু জ্যোতি
ঠোটে—হু !
মুচকি ?
চার পাশ ঘিরে
চতুর
চিকমিক
লেখক। হাসছি কেন ? অনেক দিনের আদর্শনের পরে
দেখা পেয়ে বুক উঠেছে ভরে।
গুড় মহাশয় নরসুন্দরকে দেখিয়া বোমার মত ফাটিয়া পড়িলেন।
গুড়। ওই যে—শ্রাদ্ধলােপাট
চালাকি—
হাস্যাস্পদ
সূৰ্য্য-প্রাখৰ্য্য, তপ্ত পথ, ছুটছি...
আধ-ছাটা দাড়ি-
বাষ্পীয় সম্রম !
লেখক। ধ্রুবেশবাবু, একটু ধরুন দম।
নর-সুন্দর নাপিত হলেও মনে মনে মস্ত কবি উনি
অন্তরেতে অহরহ জলে কাব্য-ধুনী।
প্রিয়া-মিলন লাগি

দশ-ভাণ,
১৩০
মিলন !
নাকের সঙ্গে ঘুসির
পিঠের সঙ্গে জুতাের
থুড়ি গুড়ি
উনবিংশ শতাব্দীর উপমা ওগুলাে-
থাইল্যাণ্ডের সঙ্গে টেলিভিশন মেড়ে
বিলিতী ছ-পেনি মাসিক পত্রের
যে কোন ছেড়া লেখকের চোখে
পরিয়ে দিন অঞ্জন,
তারই আবছায়া সৌন্দর্যের সঙ্গে
আলশেশিয়ান কুকুরের ল্যাজনাড়ার সুর
ভবেশ। ওহে লেখক, পাগলটাকে দাও না করে দূর !
বৃন্দাবন। ঐ যা, ফের কাটুল সুর ।
নরসুন্দর। সবিনয়ে বলছি
আর একদিন
সত্যি বলছি আর একদিন
দেব
হ্যা দেব
বাকি দাড়িটা নিশ্চয়ই হেঁটে দেব আপনার।
আজ কিন্তু রেহাই দিন
দোহাই !
মােড়া টানিয়া বসিলেন।
লেখক। ধ্রুবেশবাবু, আপনিও তাে মন্ত কবি শুনি
ছড়িয়ে বেড়ান পান্না-চুনী
বেণাবনে, আড়ালে আবডালে ।

উচ্চাঙ্গের চতুষ্পদী ছাড়ন না এই তালে
দাবড়ে বেড়াক চন্দ্রমুখীর বুকে
ময়নামতীর চরে জাগে সুখে
গুড়।
শ্যাওলার স্বপ্ন
শাকুনিক আকুতি !
ধূসর-পিঙ্গল মিনমিনে পায়রা সব
খরচ
ভয়ানক খরচ
গুহা:
অক্ষি-কোটর
লেখক। চন্দ্রমুখী ধনীর মেয়ে নিজের আছে মােটর
টো-টো করে বেড়ান যদি রেস্ত পাবেন টো-টোর ।
গুড়।
তাই কি?
কটা-চুলে জড়ানাে ভায়ােলেট পাপড়ি ?
ঘা-খাওয়া এরােপ্লেনের পুচ্ছােৎক্ষিপ্ত ধোঁয়া?
সত্যি!
নীলাভ সবুজাভা !
হা হা
মনে হচ্ছে দেখতে পাচ্ছি যেন
নিবু নিবু জোনাকী-উৎসবে
নিঃশব্দ পদধ্বনি
ক্লিওপেট্রার !
আসছে: ভাব আসছে•••
চিনে মাটির টবে

দশ-ভাণ ১৩২ লেখক। ভাবলে শুধু চলবে না কো লিখতে হবে । নন্দী নিজে দেখবে এসে কন্যা সহ- কি দুঃসহ ! লিখতে ? স্বপ্নের ফোটোগ্রাফ। লেখক। করেন যদি মাফ স্বপ্নটিকে বাঁধতে পারি দিয়ে আখর বাব একটি টাকা পেলে পরেই পাতব লেখার ফঁাদ । গুড়। এক টাকা ! অত্যন্ত দেশী । শিলিং লেখক। টাকা নইলে পারব না। গুড়। ( দন্তে দন্ত ঘষিয়া ) স্বপ্নকে মূর্তি দেবে। শাদা কাগজে তুলবে কালি-আবৰ্ত্ত ! লেখক। কি করব, নন্দীর ওই সৰ্ত্ত- তবে নাও—টাকাটাই বড় নয়—উঃ মৰ্ত্ত । টাকা দিলেন পাষণ্ড- অ্যামেথিষ্ট কপিশ ।

কবয়ঃ
লেখক। [ হাসিয়া ]
একটি কথা রাখলে মনে হালকা হবে বিষ
চন্দ্রমুখীর ঠোটটি রাঙা চোখটি কালো মিশ !
গুড় মহাশয় মােড় টানিয়া বসিলেন ও ক্রু কুঞ্চিত করিয়া
ভাবিতে লাগিলেন।
ভবেশ। কচকচানি থামল বাবাঃ-বাঁচা গেল
রে মনুয়া, মিলটি এবার মিলিয়ে ফেল ।
চন্দ্রমুখী, খুকি, শুকি, ঝুকি, ধুকপুকি
উহু হচ্ছে না ঠিক—টুকি, রুখি,—উহু-
নরসুন্দর। মুহুর্মুহু
আসছে আর পালাচ্ছে !
গদ্য কবিতার ধাত,
কিলবিলিয়ে মিল আসে না,
আসে আর পালায়
এসেছে-পেয়েছি—এই
চন্দ্রমুখী
ছন্দ ঠুকি-
গুড়। কৃকলাস উৎসুকই...
বৃন্দাবন। হে বন্ধু, নীরব থাকা যদি অসম্ভব
দূরে গিয়ে কর কলরব
ভবেশ। কঁাক করে ধরেছি এবার চঁাদ
ঘুঘু দেখেছ দেখ নি তাে ফাঁদ!
“অয়ি চন্দ্রমুখী
ফুলবনে আমি বাঁশী ফুকি-”

দশ-ভাণ ১৩৪ বৃন্দাবন। চন্দ্রমুখী হােয়য় না নির্মম হৃদয়-বাঁশী মম- ভবেশ। কি বললে, বাঁশী ! খবরদার আর বলবে না পুকুর চুরি দুকুর বেলায় চলবে না ! 'গুড়। ক্লকলাস উৎসুকই বাঁশী বাদে ভবেশ। ফের বাঁশী ! খবরদার মানা করছি বারম্বার বাঁশী আমার, বঁশী আমার, বাঁশী আমার ! বাঁশী ছাড়া নিতে পার অন্য কিছু যা খুশি লেখক। কল্পনা-আঁকুসি কখন কি যে পেড়ে আনে ভাব-শাখা হতে ভবেশ। কিন্তু ভাই সহিব না আমি কোন মতে যদি তাহা ক্রমাগত খালি বাঁশী পাড়ে। ধরি ঘাড়ে লেখক। আপনারা সব কবি প্রেমিক পাড়ি জমান পাথারে আপনাদের কি হওয়া সাজে বাবলা-বনের ছাতারে ! ঝগড়া থামান- মারতে মশা বুদ্ধিমানের পাততে কি হয় কামান ! নরসুন্দর । [ হঠাৎ উত্তেজিত ] লেখক লেখক, হয়েছে মিল করেছি মনের ধূপদানীতে ধোঁয়াচ্ছে ভাবের ধূপ- ভবেশ। আরে চুপ- বাঁশীর ব্যাপার মিটুক আগে। নরসুন্দর। মিল যে ভাগে । চট করে, লেখক- লিখে নাও আমারটা! আমি গদ্য-সুখী তবু চন্দ্রমুখী আমি ছন্দ কি বশী মন্দ্র- ভবেশ। তুমিও বাঁশী, রামচন্দ্র । কিন্তু নয় হাসি- ছাড়তে হবে বাঁশী । নরসুন্দর। চিরকাল ধরে বাঁশী বাজে কবিতায় বাঁশী চিরন্তন ভবেশ। [ মুখভঙ্গী করিয়া } আজ কিন্তু আমি আগে বাজিয়েছি ধন । বৃন্দাবন। আমি বৃন্দাবন মাের বাঁশী আরও সনাতন ! মিথুক করমচা-খাের কোকিল। সাইরেন—

দশ-ভাণ
লেখক। একটি কথা বলছি কিন্তু পষ্ট
হু হু করে সমাজ হচ্ছে নষ্ট।
নরসুন্দর। ঠিক বলেছেন।
কুছ পরােয়া নেই
ভাগাভাগি করি আসুন
থা
সবার কবিতাতেই বাঁশী থাক
রাজি আছি আমি
ভবেশ। আমি রাজী নই-ইয়াকি
ইজ্জত নেই প্রিয়ার কি।
বাঁশী মাের প্রিয়া তার কাছে
আমি একক
নরসুন্দর। ভাই লেখক
তুমিই তাহলে
মীমাংসা কর।
তােমার নিজের কোন স্বার্থ নেই
নেই কোন ব্যক্তিগত দ্বেষ
বৃন্দাবন। ইহাতে নাহিক মাের আপত্তির লেশ।
ভবেশ। [ অনিচ্ছা সহকারে ]
ছাড়বেন না যখন—বেশ ।
লেখক। বাঁশী যদি বাজান সবাই বেশ তাে
কালের এবং স্থানের মতাে সুরেরও নেই শেষ তাে !
বাজবে ওতে বেহাগ টোড়ি বাজবে ওতে মূলতান
চন্দ্রমুখীর গলবে পরাণ না হয় যদি ভুল তান।
কিন্তু যদি আমার কথায় রাখেন মশাই আস্থা

১৩৭
কবয়ঃ
বাঁশী
ছাড়ুন! পচে গেছে, ধরুন অন্য রাস্তা
বৃন্দাবনে বাজত বাঁশী সিনেমাতেও বাজছে
রেফারি আর গার্ড সাহেবে সবাই বাশী সাধছে
বাঁশ
ছাড়ুন,
বাঁশী ছাড়াও আছে অনেক যন্ত্র
ভবেশ। ঝাড়লে দেখছি অন্য রকম মন্ত্র !
নরসুন্দর। ঠিক হ’ল তাহলে
বাশী-বর্জন?
আমার আপত্তি নাই।
সকলেই আবার স্ব-স্ব স্থানে গিয়া উপবেশন করিলেন এবং বাঁশী-ৰতি ভাব ভাবিতে
লাগিলেন।
লেখক। এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ-আরও পাঁচটি চাই
সেই, পাঁচটি কি উপায়ে কোথাথেকে পাই ।
অদেখা মাের সাকী
পাচটি টাকার জন্যে শেষে ফসকে যাবে নাকি।
কবিতাটি লিখেছি যা—নিজের মুখে উচিত নয় ক বলা
একেবারে মর্ম-গলা !
কিন্তু হায় রে পাঁচটি টাকা, পাঁচটি রজত খণ্ড
তার অভাবেই সবটা হবে পণ্ড!
চুরি করার সময়ও নেই—যা হবার তা হবে—
পাই যদি তবে
স্বপ্ন দেখেই কাটবে জীবন-জন্মেছি এই বঙ্গে-
কাব্য করেই কাটিয়ে দেব স্বপ্ন-সাকীর সঙ্গে।
নরসুন্দর। [ হঠাৎ চীৎকার করিয়া ]
বাস হয়ে গেছে

দুশ-ভাণ
১৩৮
বেঁধেছি
লেখক, লেখ শীগগির
গদ্য-কবিতা-ম্যাড়া
ঢু মারছে মনে
মিলগুলো দেবে এখনি তছনচ করে
লিখে নাও—শীগগিরি
লেখক। এই যে ভাই—হাজির
লেখক কাগ কলম বাগাইয়া বসিলেন
নরসুন্দর। “ওগাে চন্দ্রমুখী
আমার কল্পনা-স্বর্গে কেন দিলে উকি—”
স্বর্গের চেয়ে কুঞ্জই ভাল বােধ হয়
লেখ
“আমার কল্পনা-কুঞ্জে কেন দিলে উকি
দুল দুটি কত চমৎকার—
বৃন্দাবন। হয়েছে আমার
লেখ লেখ হে লেখক—দেরি নহে আর।
“নহ সূর্য-নহ তারা
নরসুন্দর। “আমি আত্মহারা—”
লেখক। দু-হাত আমার চলে না ভাই, একসঙ্গে এমন ধারা—
গুড়। [ হঠাৎ ছুটিয়া আসিলেন ]
“জ্যামাইকা দ্বীপের বন্দরে আছে যত শামুকী—
নিকোলাসের পিতৃসার রিপ্রেশন্ উঠুক—”
ভবেশ। এবার তবে আমারও ফুল ফুটুক—
লেখ দেখি আমারটা
সবাই দেখি মস্ত কবি-কামার, কুমাের, চামারটা।

১৩৯
কবয়ঃ •
চোর ব্যাটারা, ভেবেছিল বাঁশীটাকে ভেস্তে
চন্দ্রমুখীর কাছে আমায় দেবে না আর ঘেষতে !
কিন্তু বাবা ফুলবাগানে যার
নরসুন্দর । “দুল দুটি কত চমংকার”
ভবেশ। “ফুল ফোটান যায় না সখি করে কেবল বুজরুকি-
বৃন্দাবন। “নহ সূৰ্য্য, নহ তারা, নহ পুস্প, ওগো চন্দ্রমুখী।"
নরসুন্দর। “আমি আত্মহারা হয়ে খালি ছন্দ ঠুকি ?”
লেখক। আমি একসঙ্গে কি করে টুকি।
একে একে হৃদয়গুলি মেলুন
সামলাতে কি পারি মশাই একসঙ্গে
চার চারটে বেলুন !
নরসুন্দর বলুন আগেওঁরই প্রথম দাবি
উনিই প্রথম খুলেছিলেন ভাবের ঘরের চাবি ।
লেখক আবার লিখিবার জন্য কলম তুলিয়া লইলেন
নরসুন্দর ! “ওগো চন্দ্রমুখী
আমার কল্পনা-কুঞ্জে কেন দিলে উকি ।
দুল দুটি কত চমৎকার
আমি আত্মহারা হয়ে খালি ছন্দ কি!”
লেখক। [ মুগ্ধভাবে ]
একে বলে কারুকার্য চারু
ভবেশ। হরিজন-হস্তে যেন ঝড়!
নরসুন্দর। বাগান সাফ করতে হয়
ঝাড় র কথা মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক।
ভবেশ। মুখ সামলেবেল্লিক

. দশ-ভাণ
১৪০
লেখক। শান্তি, শান্তি,—ঝগড়াঝাঁটি ভেল
বৃন্দাবন তুমি এবার ঢাখানি তােল।
বৃন্দাবন । নহ সূৰ্য্য, নহ তারা, নহ পুষ্প, তুমি চন্দ্রমুখী,
তবুও তােমারে বন্দি’ ছন্দ হয় সুখী
অন্তরে আবেগ জাগে, কণ্ঠে জাগে সুর
বক্ষে জাগে হর্য অহেতুকী।
লেখক। আহা, যেন তরমুজ !
ভবেশ। বন্ধুভাবে বলছি শােন বৃন্দাবন রুজ
সত্যি যদি চন্দ্রমুখীর হৃদয় দখল করতে চাও
অবিলম্বে শেষ কথাটি বদলে দাও--
চলবে না ও কোনক্রমে-
লেখক। বেশ হয়েছে, যাচ্ছ কেন দমে’!
আপনি আসুন গুড়মশায়, করুন মােদের সুখী।
জ্যামাইকা দ্বীপের বন্দরে আছে যত শামুকী
নিকোলাসের পিতৃসার রিপ্রেশন্ উঠুক কিম্বা নামুকই
ভলভিউলাস, ফোটোমিটার, নীটশের যত ফকুড়ি
সব তুচ্ছ তােমার কাছে চন্দ্রমুখী, চন্দ্রমুখী।
লেখক। আমার বিশ্বাস এই লেখাটির কৃষ্টি
চন্দ্রমুখীর ধূসর মনে করবে সুধা-বৃষ্টি।
ভবেশ। আমি কিন্তু গুড়মশাই
একটি কথা বলতে চাই।
দু-বার চন্দ্রমুখী কেন ?
ডাক হবে একটি ডাক—
তাতে যদি সাড়া না দেয়—চুলােয় যাক !
গুড় ক্রুদ্ধ দৃষ্টিক্ষেপ করিলেন মাত্র, কিছু বললেন না।

১৪১
কবয়ঃ
লেখক। বড় কড়া সমালােচক আপনি মশাই
ভবেশ। ফুল নিয়ে দিবারাত্রি করতে হয় যে মাজা-ঘযাই।
ফুলের একটি
তােড়া বাঁধা
এটা ছাঁটো, ওটা কাটো দস্তুর মতো হয়ে দাদা
লােকে ভাবে শক্ত কি আর
লেখক। আপনারটা বলুন এবার
ভবেশ। আমারটা? মানে, বেশ লিখুন
হয় নি কিন্তু তত নিপুণ !
মাজাঘষা করবারও নেই সময় আর
ভাবটি কিন্তু চমৎকার
“ফুল ফোটান যায় না সখি করে কেবল বুজরুকি
ঘটি ঘটি জল ঢাললেই হয় না কভু ফুল সুখী
সময় মত হিসেব মত ঝাঁঝরি দিয়ে ঢালতে হয়
আশা করি মনের কথা বুঝছ তুমি চন্দ্রমুখী”
বৃন্দাবন। বৃক্ষে কভু নাহি ফলে মূখ।
নরসুন্দর। সত্যি কি সূক্ষ্ম ।
যেন ছুচ
মৰ্ম্ম করে এ-ফেঁাড় ও-ফোড়।
গুড়।
ছায়াপথের মােড় :
নীলপরী ম্যাঙ্গোস্টিন খায়
বন্দী নয়
লেখক। ঠিক যেন সুকতে।
ভারী তৃপ্তি দিলে

দশ-ভাণ
১৪২
সকলের কবিতাগুলি লেখা হইয়া গেল। লেখক সেগুলি গুছাইয়া রাখিয়া দিলেন।
নরসুন্দর। সবাই মিলে
জটলা করে লাভ কি
নন্দী মশায় এলে
তার পর সব আসা যাবে।
তিনি কত দূর
তাই বরং দেখা যাক, চল ।
কি বল লেখক
বেশ তাই হােক—
লেখক ব্যতীত সকলের প্রস্থান
লেখক।
লেখক। নামছে আঁধার ডাইনে বামে নিবছে আলাে
জলব না দীপ আঁধার আমার লাগছে ভালো।
জোনাক জ্বলে আঁধার ভরি
চিকমিকিয়ে রূপাের জরি
চুমকি-দেওয়া নীলাম্বরী
অঙ্গেতে আজ কে জড়ালাে
কি সুন্দরী ওই মেয়েটি কাজল-কালাে !
কপালটিতে ছােট্ট করে টিপটি আঁকা
কিন্তু হায় রে পাঁচটি টাকা, পাঁচটি টাকা
পাঁচটি টাকা !
বাম দিকের পর্দাটি সন্তর্পণে সরাইয়া প্রথমে বৃন্দাবনের মুণ্ড পরে সশরীরে বৃন্দাবন প্রবেশ
করিলেন এবং পা টিপিয়া আগাইয়া আসিলেন।
বৃন্দাবন। হে লেখক, আসিলাম আর এক বার
লেখক। কেন, কি ব্যাপার,

১৪৩ বৃন্দাবন। শােন ভাই চন্দ্রমুখীকে আমি চাই। সংশয় জাগিছে চিতে ভবেশ কবিতাটিতে সহজ ভাষায় কহিয়াছে সাহা হায় যদিও তাহাতে নাই উচ্চতর ভাব তবু কিন্তু তাহার প্রভাব সহজ বলিয়া চন্দ্রমুখী-হৃদয়রে দিবে উতলিয়া । একে নারী, ধনীর দুলালী কটমট কবিতারে হয়তাে ভাবিবে গালাগালি। তুমি কিন্তু পার ভাই বাঁচাইতে মােরে ভবেশের কবিতাটি দাও পঙ্গু করে কলম তােমার হাতে,-আমারে বাঁচাও- লেখক। পারি,—যদি এক টাকা দাও বৃন্দাবন। এক্ষুনি, নাও- লেখক। ঠিক হয়ে যাবে, দাড়িও না যাও- বৃন্দাবন সন্তর্পণে প্রস্থান করিবার সঙ্গে সঙ্গে ডান দিকের পর্দা সরাইয়া নরসুন্দর মুণ্ড বাড়াইলেন এবং চোরের মতাে প্রবেশ করিলেন। নরসুন্দর। আর কেউ আছে নাকি, লেখক লেখক। না, আপাতত একক। কি চাই নরসুন্দর। শােন ভাই- কবিতা আমার সুবিধে হয় নি।

দশ-ভাণ ১৪৪ মিল দিতে গিয়ে ভারি পষ্ট হয়ে গেছে কবিতাটা লেখক। ভালই তাে, স্বচ্ছতা থাকাটা- নরসুন্দর। আগে নাও, ধর টাকাটা এক টাকা দিলেন লেখক। কি রকম হ’ল এটা নরসুন্দর। বুঝিয়ে বলছি শােন- অম্বিকেশ, চন্দ্রমুখী কবিতার ‘ক’ও বােঝে না ! তাই যে-কবিতা যত দুর্বোধ্য সে-কবিতা তত গভীর ওদের কাছে ; ধ্রুবেশ গুড়ই জিতবে সুতরাং যদি না তুমি ওর লেখার প্যাচগুলাে খুলে লেখক। [ হাসিয়া ] দিই চেঁছে ছুলে ? নরসুন্দর। একেবারে সরল রেখা বানিয়ে দাও। লেখক। আচ্ছা, যাও পর-মুহূর্তেই ডান দিকের পর্দা সরাইয়া বেশ গুড় এবং বাম দিকের পর্দা সরাইয়া ভবেশ মুণ্ড বাড়াইলেন ধ্রুবেশ। লেখক ! ভবেশ। লেখক। ধ্রুবেশ। এবােপ্লেন নির্নিমেষ কিমামি হেঁচকি- ভবেশ। কবিতার ছেচকি-

১৪৫
ধ্রুবেশ। আমি এসেছি লেখকের কাছে
ভবেশ। আমারও একটু দরকার আছে
ধ্রুবেশ। আপনি একটু বাইরে যাবেন ?
ভবেশ। আপনি একটি মােয়া খাবেন ?
ধ্রুবেশ। সত্যি এক বার বাইরে যান
ভবেশ। মাইরি প্রাণ।
লেখক। ঝগড়া করা তো মিথ্যে আওয়াজ ফাকা
আসল কথাটি বলছি পষ্ট করে
দেন যদি মােরে আর একটি করে টাকা
ওদের কবিতা দিচ্ছি নষ্ট করে।
প্রতিদ্বন্দ্বী এক জন শুধু রবে
চন্দ্রমুখীরে পাওয়াটা সহজ হবে।
ভবেশ। বেশ, তাই হােক তবে
টাকা দিলেন
ধ্রুবেশ। বিবেক।
হে অচি, ক্ষমা কর
নিরুদ্ধ আকুতির কনকনানি,
কিন্তু-ওঃ
যা—
টাকা দিলেন
ভবেশ। [ যাইতে যাইতে ]
বৃন্দাবনকে ভয়টা আমার বেশী
তার সঙ্গেই আসল রেষারেষি
এ দুটো তাে নিটোল নিরেট
চলিয়া গেলেন

দৃশ-ভাণ ১৪৬ ধ্রুবেশ। [ ধীরে ধীরে অবনত শিরে ] আঙুর-গন্ধী কিসমিসের প্লেট স্পর্ধা, অসমসাহসিক। হে নরসুন্দর পাবে না তুমি সান্ত্বনা এইটুকু বাহির হইয়া গেলেন লেখক। এক দুই তিন চার পাচ ছয় সাত আট নয় এ যে প্রায় হয় হয় ! এক মােটে বাকি! প্রিয়া—সখি—শাকী- বাকিটা কি করে পাই গুড় মশাই, ও গুড় মশাই- শুনে যান ধ্রুবেশ গুড় প্রবেশ করিলেন ধ্রুবেশ। আবার কি চান লেখক। হচ্ছে আমার আনন্দ ধ্রুবেশ। ভেকের যকৃতে সনাতন পিত্ত-ছন্দ! লেখক। বলতে চাই একটি কথা একলা শুধু আপনাকে নারীর সেরা চন্দ্রমুখী সত্যি যদি চান তাঁকে ভবেশটিকে করতে হবে নিষ্প্রভ ধ্রুবেশ। ভেঙে বলুন, আর এক টাকা ফের দোব ? লেখক। সত্যি যদি পারেন দিতে মিলবে বাহু-বন্ধ-সুখ চন্দ্রমুখী বামে নিয়ে হয়ে যাবেন চন্দ্রমুখ।

১৪৭ কবয়ঃ ধ্রুবেশ। উঃ জাম্বুবানের সংস্কার ! মৃতা মৈথিলী অথচ জীবিত... কিন্তু-উঃ--- টাকা দিয়া সবেগে চলিয়া গেলেন। লেখক। [ সােম্যাসে ] হে ধ্রুবেশ গুড় নীলকণ্ঠ তুমি চন্দ্রচূড় চিত্ত মম করিলে নির্বিষ কি আনন্দ কি আনন্দ ইস্! সহসা তন্ময় হইয়া আলােক মিলিছে ওই অন্ধকারসনে অম্বরে গম্ভীর সুর উঠিছে গুঞ্জরি শত বর্ণ বিচ্ছুরিত প্রদীপ্ত আসনে নীলাম্বরী সন্ধ্যা হাসে শ্যামলী সুন্দরী উত্তেজিত বৃন্দাবন, নরসুন্দর, তবেশ ও ধ্রুবেশের পুনঃপ্রবেশ। বৃন্দাবন। কন্যাসহ আসিছেন নন্দী অম্বিকেশ নরসুন্দর। চন্দ্রমুখীর চতুর্দোলাটা চমৎকার বেশ! ধ্রুবেশ। ইউবােটে আর তিমি মাছে.. ভবেশ। লেখক, আয়না আছে ? লেখক। না ভাই ভবেশ। কি মুস্কিল, আয়না কোথা পাই- নরসুন্দর। নখদর্পণ সঙ্গে আছে তাতেই দেখে নিন। লেখক। ওঁরা এসেছেন—সরুন রাস্তা দিন

দশ-ভাণ
১৪৮
সকলে ত্রস্ত হইয়া সরিয়া গেলেন। দক্ষিণ দিকের পর্দা সরাইয়া দুইজন দারােয়ান প্রবেশ
করিল এবং পর্দা টানিয়া ধরিয়া রাখিল, শ্ৰীযুক্ত অধিকেশ নন্দী প্রবেশ করিলেন। ফস।
বেঁটে লােক-দেখিলে মনে হয় যেন খাকৃতি কাবুলিওয়ালা এবং চটা মেজাজের। তাহার
পিছনে চারিজন দারোয়ান দ্বারা বাহিত হইয়া চলমুখীর চতুর্দোলা প্রবেশ করিল। চতুর্দোলাটি
শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া অথবা তৃতীয়ার চন্দ্রের মত দেখিতে, চমৎকার করিয়া সাজান। চন্দ্রমুখী
গৌরবর্ণা, পরিচ্ছদ রূপালি-জরির কাজ-করা কালো রঙের। চতুর্দোলা এক ধারে নামান হইলে
চন্দ্রমুখী উঠিয়া দাড়াইলেন। লেখক দুইটি মােড়। পাশাপাশি রাখিতেই অম্বিকেশ ও চন্দ্রমুখী
উপবেশন করিলেন। দারােয়ানের সারি বাঁধিয়া পিছনে দাড়াইল।
অম্বিকেশ। জম্বুদ্বীপের সুধীবৃন্দ সময় বেশী নাই আজ
অল্প দু-চার কথা বলেই শেষ করতে চাই কাজ।
আপনারা তাে জানেন সবই তবু আবার বলছি।
চিরটা কাল আমি আপন খেয়াল মতই চলছি।
মেয়ের পাত্র হিসেবে তাই সন্ধানি সেই লােককে
কাব্য-লােকের রঙীন স্বপন ভাসে যাহার চক্ষে ।
চাই না কোন হােমরা-চোমরা রেকর্ড ব্রেকার কুস্তির
জানতে চাই না সে ব্যক্তিটি অস্থির বা সুস্থির,
বিদ্বান বা ধনী কি না সুবােধ কিম্বা দুর্বোধ
একটি কথা জানব কেবল আছে কি না সুর বােধ ।
সুর থাকলে পরস্পরে পটাবে ও পটবে
তা নইলে সারাজীবন ছন্দ-পতন ঘটবে।
লােক দেখেছি অনেক রকম গেছি প্রয়াগ পুষ্কর
সার বুঝেছি বেসুরাে লােক নিয়ে চলা দুষ্কর।
পদ্য-লেখক রসিক জনে পারলে দিতে কন্যা
ভাগ্য বলে মানব আমি মেয়েও হবে ধন্যা।
পন্যও নয়, বাক্যও নয়, আসল কথা রসটি
এবং নিয়ম-রক্ষা বাবদ রজত-মুদ্রা দশটি !

১৪১
কবয়ঃ.
;
লেখক মশাই আনুন দেখি, কে বাজাল কোন সুর
গণেশ প্রসাদ, চতুরীলাল হরেন কিম্বা মনসুর
যে-ই হােক সে,চিত্তে যদি থাকে কাব্য-দর্পণ
তারই হাতে চলমুখী করব আমি অর্পণ !
লেখক লেখাগুলি চন্দ্রমুখীর হস্তে দিলেন
লেখক। অক্ষম অপটু হস্তে আঁকিয়াছি অক্ষরের ছবি
সামান্য লেখক আমি—এরা সব কবি।
চন্দ্রমুখী। (মুগ্ধ ) আপনিই লেখক ! সুবিখ্যাত লিপিকার !
অম্বিকেশ। পড়; দেরি কেন করছ আর
চন্দ্রমুখী। [ একটি কাগজ তুলিয়া ]
এটির নীচে নাম দেখছি বৃন্দাবন
বৃন্দাবন। আমিই সেই অধম জন
উচ্ছ্বসিত হইলেন
জানি দেবি জানি
আমার কবিতাখানি
অম্বিকেশ । চুপ করুন। পড় চন্দ্রমুখী
চন্দ্রমুখী। [ পড়িতে লাগিলেন ]
নহ মণ্ডা, নহ গজা, নহ ল্যাংচা নােরব্বা-হরতুকি
বৃন্দাবন। এ কি এসব তাে আমি কোথাও
অম্বিকেশ। চুপ করুন, পড়ে যাও
চন্দ্রমুখী। নহ মণ্ডা, নহ গজা, নহ ল্যাংচা মােরব্বা-হরতুকি
তবু তুমি মিষ্ট চন্দ্রমুখী
নয়ন মুদিয়া ভাবি বুদিয়া কি উপমা তােমার ?
* সঙ্গে সঙ্গে মনে হয় আমি কি উজবুকই!
অম্বিকেশের মুখ লাল হইয়া উঠিল। কিন্তু তিনি আত্মসম্বরণ করিয়া চন্দ্রমুখীকে প্রশ্ন করিলেন

দশ-ভাণ ।
১৫০
অম্বিকেশ। তাের লাগল কেমন?
চন্দ্রমুখী। [ হাসিয়া ]
আর যা-ই হন ফুলবনের ভােমর। ইনি নন।
মনে হচ্ছে ময়রা-বাড়ীর ভীমরুল
বৃন্দাবন। ভুল, আগাগােড়া সব ভুল
ও কবিতা আমি লিখি নাই
ভবেশ ও ধ্রুবেশ। [ একযােগে ]
মিছে কথা কেন বল ভাই
বৃন্দাবন। হে শ্রদ্ধেয়, অম্বিকেশ নন্দী
ভিতরেতে আছে হীন ফন্দি
কহিতেছি তারস্বরে ও কবিতা নহেক আমার
ভবেশ ও ধ্রুবেশ [ সমস্বরে ] নিশ্চয় তােমার
বৃন্দাবন। [ আত্মহারা ] মন এ স্বপ্ন, না জাগরণ !
অম্বিকেশ। [ চন্দ্রমুখীকে ] দ্বিতীয়টা—ধর
চন্দ্রমুখী। এটির লেখক নর-সুন্দর
কে তিনি
লেখক [ দেখাইয়া ] এই যে ইনি—
চন্দ্রমুখী [ পড়িতে লাগিলেন ] আমি কি পরিপাটি সখি কামাই ছাঁটি
থাকি কখনও সিধা ফের কখনও ঝুকি,
মাের কাইচি চলে
ঘন চুলের তলে
আমি ভৃত্য তব ওগাে চন্দ্রমুখী !
নরসুন্দর [ ক্ষেপিয়া ]
লেখক, লেখক
খুন
খুন করব তােমায়

অম্বিকেশ [ সগর্জনে ] এই কোন্ হায় একজন দারােয়ান আগাইয়া আসিল অম্বিকেশ। টানতে টানতে বাইরে নে যাও ধরে গলার চাদর হাল্লাবাজ বাদর ! দারােয়ান নরসুন্দরকে বাহির করিয়া দিয়া স্বস্থানে আমিয়া দাড়াইল। সঙ্গে সঙ্গে নরসুন্দর পুনঃ প্রবেশ করিলেন এবং এক পাশে চুপ করিয়া উঁড়াইয়া রহিলেন। চন্দ্রমুখী। তৃতীয় কবিতার লেখক ভবেশ অম্বিকেশ। বেশ- ভবেশ। মাের কবিতার মানে বুঝতে অভিধান হবে নাকো খুজতে ! সােসাসুজি মােটামুটি ধ্রুবেশ। হায় মাখনমুগ্ধ রুটি তিতিক্ষার স্বপ্ন দেখ তৈল-সিক্ত গুম্ফ পেট্রল-সিক্ত কর অম্বিকেশ। [ ধমকাইয়া ] ফের গােলমাল করছেন ! নাও, পড়-- চন্দ্রমুখী। [ পড়িতে লাগিলেন ].খােল-পচা আর গােবর-পচা চটকে নিয়ে পাতা-পচার সঙ্গে গাছের গােড়ায় দেন যদি কেউ ভবিষ্যতে হবেন মহা সুখী ভবেশ। থামুন-থামুন-এ কি এ! অম্বিকেশ। আপনাকেও কি দারােয়ান দিয়ে বেশ সঙ্গে সঙ্গে নিরন্ত হইলেন

দশ-ভাণ.
চন্দ্রমুখী। খােল পচা আর গােবর-পচা
চটকে নিয়ে পাতা-পচার সঙ্গে
গাছের গােড়ায় দেন যদি কেউ
ভবিষ্যতে হবেন মহাসুখী
সার নইলে ফুল ফোটে না
এই কথাটা বুঝবে না কেউ বঙ্গে
ওগাে চন্দ্রমুখী !
ভবেশ। লেখক, তুমি সত্যি কথা কও
অম্বিকেশ। [ ধমক দিলেন ] চোপ রও!
সব কজনই মহা দিগগজ—নেইক কেবল শুড় !
চন্দ্রমুখী। এর পরেরটি শ্ৰী ধ্রুবেশ গুড়
“জ্যামাইকা দ্বীপের বন্দরে আছে যত শামুকী
নিকোলাসের পিতৃত্বসার রিপ্রেশন উইক কিম্বা নামুকই,
ভলভিউলাস্ ফোটোমিটর নীটশের যত ফকুড়ি
সব তুচ্ছ তােমার কাছে চন্দ্রমুখী, চন্দ্রমুখী”
অম্বিকেশ ক্রোধে নিৰ্বাক হইয়া রহিলেন। চন্দ্রমুখী লেখকের
পানে চাহিয়া দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিলেন।
চন্দ্রমুখী। আমায় নিয়ে এমন করে ঠাট্টা করার অর্থ টা কি ?
লেখক। সব তাে পড়া শেষ হয় নি
আরও একটা আছে বাকী
চন্দ্রমুখী। [ পুলকিতা] আপনি সেটার কবি নাকি
লেখক। নিজের মুখে বলব তা কি !
অম্বিকেশ। এই শুনলাম, দশটি মাত্র টাকাও তােমার নেই
লেখক। পেয়ে গেছি বরাত জোরেই
অম্বিকেশ। আশা করি কর নি কো চুরি,

কবয়ঃ
লেখক। আজ্ঞে না, পুরােপুরি,
সত্যি বলছি, পুরােপুরি উপার্জন !
অম্বিকেশ। বাজে কথায় সময় গেল অনেকক্ষণ।
পড় শুনি-আশা করি লেখ নি কো যা’ তা,-
চন্দ্রমুখী। [ কম্পিত কণ্ঠে ]
উনি পড়ন, ঘুরছে আমার মাথা
লেখক। [ আবেগভরে পড়িতে লাগিলেন ]
সুরবাহারের সুরটি যেন রূপ ধরেছে প্রজাপতির ডানায়
শঙ্খ ধবল পাত্রে যেন মেহেদি রঙ, টলছে কানায় কানায়
চাদনী রাতে বাঁশীর সুরে উতল হিয়া হয়েছে উন্মুখই
কোথা চন্দ্রমুখী।
চন্দ্রমুখী। [ অস্ফুট স্বরে ] চমৎকার !
অম্বিকেশ। সময় বৃথা নষ্ট করে কাজ কি আর ?
লেখক এবং চন্দ্রমুখী
পরস্পরে হউক সুখী
আমরা এখন অবান্তর
উঠিয়া পড়িলেন
লেখক। সুখের দিনে কারও সঙ্গে রাখতে চাই না। মনান্তর ।
যথাকালে শােধ করব সবার ঋণ
আপনারা সব আশিস দিন
বধি আমার বাস্তু
সকলে। তথাস্তু
যবনিকা*
* Clifford Bax-প্রণীত The Poetasters of Ispahan অবলম্বনে রচিত।

আকাশ নীল
জমিদার জনার্দন রায়ের বাড়ির সম্মুখস্থ বাগান। বাগানের এক প্রান্তে জনার্দনবাবুর প্রকাণ্ড
বাড়িখানা এবং অপরপ্রান্তে প্রকাণ্ড গেটটা দেখা যাইতেছে। গেটটা খোলা আছে। গেটের
ভিতর দিয়া একটি বল সবেগে আসিয়া বাগানের ভিতর পড়িল এবং লাফাইতে লাফাইতে
গিয়া একটা ঝোপে ঢুকিয়া গেল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে অমল আনিয়া প্রবেশ করিল। অমলের
বয়স বছর দশেক হইবে। চেহারায় তেমন কোন বিশেষত্ব নাই। শ্যামবর্ণ, রােগা গােছের।
অমল এ প্রদেশে অগিন্তুক, তাই নির্ভয়ে জনার্দন রায়ের বাগানে প্রবেশ করিয়াছে। এ
অঞ্চলের কোন বালক পাগল জনার্দন রায়ের ত্রিসীমানায় ঘেসে না। অমল বাগানে ঢুকিয়া
বলটি খুজিতে লাগিল। একটু পরেই অমলের খেলার সঙ্গী বিশু আসিয়া গেটের বাহিরে
দাড়াইল। বিশু অমলের সহপাঠী এবং এইখানেই তাহার বাড়ি। অমল ছুটিতে বিশুর বাড়িতেই
বেড়াইতে আসিয়াছে। বিশু গেটের বাহিরে দাঁড়াইয়া অমলকে ডাকিতে লাগিল।
বিশু। অমল চলে এস তুমি
অমল। বলটা খুঁজে নিয়ে যাচ্ছি।
বিশু। বল থাক, চলে এস তুমি
অমল। [ সবিস্ময়ে ] কেন ?
বিশু। চলে এস, তারপরে বলছি।
অমল। বলটা নিয়ে আসি, থাম।
বিশু। আরে, আমি বলছি বল থাক, চলে এস তুমি। জনার্দনবাবু বড়
ভয়ানক লােক।
অমল। কেন, কি করবে?
বিশু।
ধরলে আর আস্ত রাখবে না।
অমল। ইস্।
বিশু। সত্যি বলছি, পালিয়ে আয়।
অমল বিশুর কথা শ্রাহ না করিয়া বল খুজিতে লাগিল।

১৫৫
আকাশ নীল।
বিশু। এই অমল
অমল। বলটা খুজে নিয়ে যাচ্ছি, দাড়া না।
বিশু। পাগলা যদি বেরিয়ে আসে ভয়ানক কাণ্ড করবে।
অমল। পাগলা না কি ?
বিশু। মাথার ছিট আছে, তার ওপর দারুণ মাতাল, সর্বদাই মদ খেয়ে
থাকে। সব্বাই ভয় করে ওকে, আত্মীয় স্বজনরা পয্যন্ত ছেড়ে পালিয়েছে, ও
একাই থাকে। পালিয়ে আয়-
অমল। আমি কাউকে ভয় করি না। বল না খুজে নিয়ে আমি যাচ্ছি না।
বল খুজিতে লাগিল।
বিশু। যদি বেরিয়ে আসে মজাটি বুঝবে।
অল। তাের ভয় করে তো তুই পালা না-
বিশু। আচ্ছা, আমি তাহলে ততক্ষণ কানু, গােরা, জীবন, রবিকে ডেকে
আনি গিয়ে। তুই বলটা যদি পাশ ভাই, সবাই মিলে বল খেলা যাবে তা না
হলে হাডুডুডু খেলব, কেমন? তুই বেশীক্ষণ কিন্তু থাকিস না ওখানে।
অমল। বলটা পেলেই আমি যাচ্ছি, তুই যা-
[ বিশু চলিয়া গেল, অমল বল খুজিতে লাগিল। দূরে দেখা গেল জনার্দন রায় বাহির
হইয়াছেন এবং অমলের দিকে নির্নিমেষে চাহিয়া আছেন। লোকটী সত্যই ভীষণ-দর্শন।
রঙ, মিশ-কালাে, মাথার চুল ছােট ছােট করিয়া ছাটা। ছােট ছোট চোখে হিংস্র দৃষ্টি।
আজানুলম্বিত বাহু, ঝাকড়া ভুরু, বলিষ্ঠ গঠন। মনে হয় সামনের দিকে ঈষৎ ঝুকিয়া আছেন।
অনেকটা গরিলার মতাে হাব ভাব। অমল প্রথমটা দেখিতে পায় নাই, হঠাৎ ঘাড় ফিরাইতেই
চোখােচাখি হইয়া গেল। উভয়ে পরস্পরের দিকে চাহিয়া কয়েক মুহূর্ত দাড়াইয়া রহিল।
তাহার পর জনার্দন খানিকটা আগাইয়া আসিলেন এবং হাতছানি দিয়া অমলকে ডাকিলেন।
অমল নির্ভয়ে আগাইয়া গেল। ]
জনার্দন। (কর্কশ কণ্ঠে ] এখানে কি হচ্ছে ?
অমল। আমাদের বলটা এখানে

দশ-ভাণ ১৫৬ জনার্দন। [ দাঁত কড়মড় করিয়া } চোপ রও- অমল চুপ করিয়া গেল। তাহার পর ইতস্তত করিয়া আবার শুরু করিল। অমল। আমাদের বলটা আপনার বাগানে ঢুকেছে তাই জনার্দন। [ সবিস্ময়ে ] বল্ ! কিসের বল, কার বল্ ? [ দাঁত কড়মড় করিয়া ] মিথুক পাজি কোথাকার! অমল। আমি মিথ্যে কথা কখনও বলি না জনার্দন। [ চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া ] ও! [ সহসা হাসিয়া উঠিলেন ] ক্যহ ক্যহ ক্যহ ক্যহ ক্যহ ক্যহ ! তােমার নাম কি ? অমল। অমল। জনার্দন। যুধিষ্ঠির নয় ? ক্যহ ক্যহ ক্যহ ক্যহ ক্যহ! এইরূপ অদ্ভুত শব্দ করিয়া হাসিতে হাসিতে সহসা জনার্দন গম্ভীর হইয়া গেলেন, ক্রমশঃ হৃ যুগল কুঞ্চিত হইয়া উলি, হিংস্র চোখের দৃষ্টি অমলের মুখের উপর নিবদ্ধ করিয়া কয়েক মুহূৰ্ত্ত তিনি দাঁড়াইয়া রহিলেন। অমল। [ নির্ভীকভাবে ] কি দেখছেন ? জনার্দন। যুধিষ্ঠিরকে ! [ সহসা উচ্চকণ্ঠে ] যােগী সিং, যযাগী সিং- [ ভিতর হইতে যােগী সিং নামক দারােয়ান বাহির হইয়া আসিল] যােগী সিং। জি হুজুর। জনার্দন। হামারা হান্টার লে আও। যােগী সিং ভিতরের দিকে যাইতে যাইতে অমলকে ইঙ্গিত করিয়া পলাইতে বলিল। অমল নড়িল না। অমল। আমি আমার বলটা খুঁজে নিয়ে এখুনি চলে যাচ্ছি। জনার্দন। চলে যাওয়াচ্ছি দাড়াও না, পাজি মিথুক কোথাকার, বল্ ! অমল। আমি কখনও মিথ্যে কথা বলি না।

১৫৭ আকাশ নীল জনার্দন। কোথায় তােমার বন্ ? অমল। এইখানে কোথাও ঢুকে আছে। জনার্দন। [ চীৎকার করিয়া ] দেখাও, কোথায় তােমার বল। পাজি মিথুক কোথাকার, এসেছেন ফুল ছিড়তে, বলছেন বল্ । অমল। ফুল ছিড়তে আসি নি আমি। জনার্দন। চোপরাও পাজি মিথুক- অমল। [ দৃঢ়ম্বরে ] আমি মিথ্যে কথা কখনও বলি না। জনার্দন। কখনও বল না ? অমল। । জনার্দন। [ ভ্যাঙাইয়া ] কিছুতে না ? অমল। না। জনার্দনের মুখ কুটি-কুটিল হইয়া উঠিল। সহসা আগাইয়া নিয়া তিনি অমলের কান ধরিলেন । জনার্দন। [ কানে মােচড় দিয়া কিছুতে মিথ্যা বলবে না? অমল। । জনার্দন। [ আকাশের দিকে আঙুল দেখাইয়া ] আকাশের রঙ কি বল দেখি? অমল। নীল। জনার্দন। [ কানে আর এক পাক দিয়া ] নীল নয়, লাল। বল, আকাশের রঙ লাল। অমল। না, আকাশের রঙ, নীল । [ জনার্দন অমলের কান ছাড়িয়া দিলেন একটু তফাতে দাঁড়াইয়া বিস্মিত ক্রোধে তাহাকে নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। সহসা তাহার চক্ষু দুইটি হিংস্র হইয়া উঠিল—} জনার্দন। ( ধমক দিয়া ] বল, আকাশ লাল ।

১৫৮
অমল। আকাশ নীল।
[জনার্দন হঠাৎ অপ্রত্যাশিত ভাবে অগাইয়া গিয়া অমলের গালে জোরে এক চড় মারিলেন।]
জনার্দন। [ চক্ষু দুইটি ছােট করিয়া ধীর কণ্ঠে ] বল, আকাশ লাল।
অমল। আকাশ নীল।
[ জনার্দন পুনরায় চড় মারিলেন; অমল পড়িয়া যাইতে যাইতে সামলাইয়া লইল। ]
••
জনার্দন। বল, আকাশ লাল।
অমল। না, আকাশ নীল।
[ জনার্দন পুনরায় চড় মারিলেন, এত জোরে যে অমল পড়িয়া গেল। পুনরায় উঠিয়া
দাড়াইল। ]
জনার্দন। [ কর্কশ কণ্ঠে ] এখনও বল আকাশ লাল।
অমল। না, আকাশ নীল।
[ জনার্দন উপযুপরি তাহাকে আরও কয়েকটা চড় মারিয়া আবার ভূশায়ী করিয়া ফেলিলেন।
অমল পুনরায় উঠিয়া দাড়াইল ]
জনার্দন। কিছুতে বলবে না তুমি?
অমল। ।
জনার্দন। [ চীৎকার করিয়া ] শিগগির বল, আকাশ লাল।
অমল। না, আকাশ নীল।
জনার্দন। [ আরও চীৎকার করিয়া ] খুন করে ফেলব তােমায় আমি,
শিগগির বল আকাশ লাল।
অমল। না, আকাশ নীল
জনার্দন। যােগী সিং যােগী সিং-
[ শঙ্কর মাছের হাটার লইয়া যােগ সিং বাহির হইয়া আসিল। সে ইচ্ছা করিয়াই এতক্ষণ
দেরি করিতেছিল। ]
অমল। আমাকে বল্ খুঁজতে দিন।

আকাশ নীল জনার্দন। তােমাকে নতুন বল্ কিনে দেব আমি, বল আকাশ লাল- অমল। না, আকাশ নীল। [ সপাং করিয়া এক ঘা চাবুক পড়িল । জনার্দন। বল আকাশ লাল। অমল। [ আরও দৃঢ় কণ্ঠে ] আকাশ নীল । সপাং সপাং করিয়া আরও ঘা কয়েক চাবুক পড়িল। দুই এক জায়গা কাটিয়া রক্ত পড়িতে লাগিল। অমল অবিচলিত। জনার্দন। না বলিয়ে ছাড়চি না তােমায় আমি। আ-কাশ লাল। অমল। আকাশ নীল। জনার্দন। যােগী সিং, কুর্তা খােল দেও! দেখি কত বড় তঁাদড় ছেলে তুমি। যােগী সিং। বােলিয়ে না বাবু আকাশ লাল, ইসমে ক্যা হায় ! [ অমল নিরুত্তর ] জনার্দন। [ ধমক দিয়া ] জলদি কুর্তা খােললা তুম উল্ল- যােগী সিং অমলের জামা খুলিয়া ফেলিল। জনার্দন। বল, আকাশ লাল। অমল। [ অকম্পিত কণ্ঠে ] আকাশ নীল। জনার্দন মরিয়া হইয়া হান্টার চালাইতে লাগিলেন। অমল মাটিতে পড়িয়া ছটফট করিতে লাগিল। জনার্দন। [ হাঁপাইতে হাঁপাইতে ] এখনও বল, আকাশ লাল। অমল। [ মাটিতে শুইয়া শুইয়া ] আকাশ নীল। [ জনার্দন পুনরায় চাবকাইতে লাগিলেন ] জনার্দন। [ পাগলের মত চীৎকার করিয়া ] আকাশ লাল, আকাশ লাল, আকাশ লাল, শিগগির বল—আকাশ লাল।

দশ-ভাণ অমল। আকাশ নীল । জনার্দন উন্মাদের হাসি হাসিয়া উঠিলেন, কাহ কাহ ক্যহ ক্যহ এবং পুনরায় নিষ্ঠুরভাবে হান্টার চালাইতে লাগিলেন। খানিকক্ষণ চাবকাইয়া থামিলেন এবং বাম হাত দিয়া কপালের ঘাম মুছিয়া ফেলিলেন। জনার্দন। বল, আকাশ লাল- কোন উত্তর আসিল না। যােগী সিং। ছছাড় দিজিয়ে হজুর, ছােকরা বেহেস্ হাে গয়া। জনার্দন। [ বিস্মিত কণ্ঠে ] বেহেস হো গিয়া! [ হান্টারটা ফেলিয়া দিয়া মুঢ়ের মত চাহিয়া রহিলেন। গেটের বাহিরে দেখা গেল বিশু, কানু, গােরা, জীবন, রবি সভয়ে বিস্ময়-বিস্ফারিত নয়নে চাহিয়া আছে। ] যবনিকা। অন্তরীক্ষে • • অন্তরীক্ষে গ্রীক দেবী আথেনা দাঁড়াইয়া আছেন। চতুর্দিকে বিরাট মহাশূন্য, ক্ষুদ্র বৃহৎ বহু জ্যোতিষ্ক অলিতেছে ; দক্ষিণে রজতশুভ্রজ্যোতি একটি নীহারিকা বাষ্পীয় দেহ বিস্তার করিয়া অসীম শূন্যে মিলাইয়া গিয়াছে ; পিগেসাস নক্ষত্রমণ্ডলীতে একটা ধূমকেতু দেখা যাইতেছে ; কাছে দূরে উল্কাপাত হইতেছে। আথেনার পদতলে বহুনিম্নে পৃথিবীগ্রহ। অ্যাথেনা মানবী হইলে দেখিতে পাইতেন না, কিন্তু দেবী বলিয়া সৌরচক্রের দ্বাদশ রাশিকে স্পষ্ট দেখিতে পাইতেছেন। দেখিতে পাইতেছেন যে, মকররাশিতে পূর্ণিমার চন্দ্র, মীনরাশিতে প্রবালবর্ণ মঙ্গল, বৃষরাশিতে প্রদীপ্ত বৃহস্পতি নীলকান্ত শনি, সিংহ রাশিতে দ্যুতিমান শুক্র এবং কর্কট রাশিতে জ্যোতিষ্মন সুৰ্য্য দেদীপ্যমান। সূর্যকে একটি নক্ষত্রের মত প্রতীয়মান হইতেছে। দেহহীন রাহু কন্যারাশিকে এবং কবন্ধ কেতু মীনরাশিকে আশ্রয় করিয়া রহিয়াছেন। পৃথিবীর খানিকটা অংশে ঘনকৃষ্ণ মসীরেখার মত শ্রাবণের পুঞ্জীভূত মেঘমালা, তাহাতে বিসরণশীল বিদ্যুৎ-স্ফুরণ দেখা যাইতেছে। অ্যাথেনা কুঞ্চিত করিয়া পৃথিবীর দিকেই চাহিয়া আছেন। চিরন্তনী ক্রন্দসীর অবরুদ্ধ ক্রন্দনধ্বনি মহাশূন্যে ভাসিয়া বেড়াইতেছে।

অন্তরীক্ষে
অ্যাথেনা। গ্রীসকে মনে পড়ছে, মনে পড়ছে অ্যাথেন্সকে, মনে পড়ছে
অ্যাথেন্সের অ্যারিওপ্যাগাকে। [ কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া ] অ্যাথেন্সবাসীরা
এখনও প্যাথেনিয়া উৎসব করে কি? এখনও কি আমি তাদের কাছে
সত্য ?
সহসা মহাশূন্যে উড্ডীয়মান বিহঙ্গমের পক্ষ-বিধূনন-শব্দ শোনা গেল। ক্ষণপরেই এক বিরাট
ময়ুরপৃষ্ঠে আরােহণ করিয়া দিবাকান্তি হীরা দেবী আবির্ভুত হইলেন এবং অ্যাথেনাকে দেখিয়া
ময়ুরের গতিরােধ করিলেন।
হীরা। খবর শুনেছ অ্যাথেনা ?
অ্যাথেনা। কি ?
হীরা। আমার সপত্নীরা এখনও কেউ মরে নি।
অ্যাথেনা। আকাশ-দেবতা জিউস-পত্নীরা যে অমর! কেন, হ’ল কি ?
হীরা। তারা সবাই সদলবলে স্বামীসন্নিধানে এসেছেন।
অ্যাথেনা। সদলবলে, মানে?
হীরা। সন্তানসন্ততি-সহ। হাের মােরিদের নিয়ে থেমিস, চ্যারিটিদের
নিয়ে ইউরিনােম, পাসেফনকে নিয়ে ডেমিটির, মিউজদের নিয়ে নেমােসাইন,
অ্যাফ্রোডাইটিকে নিয়ে ডাওনি, এমন কি লেটো—যাকে সবচেয়ে ঘৃণা করি
আমি, সেও এসেছে অ্যাপােলল আর আর্টেমিসকে নিয়ে।
অ্যাথেনা।
কেন, ব্যাপার কি ?
হীরা। পৃথিবীতে আবার যুদ্ধ বেধেছে।
অ্যাথেনা। যুদ্ধ ? অ্যাকিলিস, হেকটর, এজাক্স, প্যারিস, অ্যাগামেনন
এরা তাে বহুদিন হ’ল মরে গেছে, আবার যুদ্ধ করবে কে?
হীরা। পৃথিবী উর্বরা, নূতন বীর জমেছে আবার।
অ্যাথেনা। অসম্ভব।
হীরা। অসম্ভব নয় অ্যাথেনা, এমন সব বীর জমেছে শুনলাম, যারা জলে
স্থলে আকাশে সর্বত্র যুদ্ধ করছে। আকাশ-দেবতা জিউস আর জল দেবতা
১১

দশ-ভাণ ১৬২ পসিডােনের-কর্তৃত্ব বুঝি আর থাকে না, হেডিসের রাজত্ব যায়-যায়, মানুষ পাতালেও প্রতাপ বিস্তার করছে। অ্যাথেনা। তারাই তা হলে আবার জন্মগ্রহণ করেছে। পুরাতমরাই নূতন নাম নিয়ে নূতনত্বের দাবি করছে। [ সহসা ] আমার যেতে ইচ্ছে করছে আবার। হীরা। কোথায় ? অ্যাথেনা। গ্রীসে। তােমরা আমাকে বাণী-বিদ্যাদায়িনী বানিয়েছ, কিন্তু জিউসের মস্তক বিদীর্ণ করে যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছিলাম, সেদিন আমার কণ্ঠে ছিল যুদ্ধের হুঙ্কার। মনে নেই ট্রয়ের যুদ্ধ ? হীরা। সব মনে আছে, তার আগের ঘটনা সােনার আপেলের গল্প—তাও মনে আছে [ হাসিলেন ] আমি এখন চললাম। অ্যাথেনা। কোথায় ? হীরা। দূরে, অনেক দূরেজালের বাইরে। অ্যাথেনা। [ সবিস্ময়ে ] জালের বাইরে। মানে ? হীরা। আমার সপত্নীরা খবর এনেছেন যে, পৃথিবীর বীরদর্পে শুধু মর্ত্য নয়, স্বর্গেরও সমূহ বিপদ আসন্ন, জিউস যদি অবিলম্বে এর কোন প্রতিকার না করেন, কিছু আর থাকবে না। অ্যাথেনা। জিউস কি করছেন? অ্যাফ্রোডাইটিকে পাঠাচ্ছেন মর্ত্যে ? হীরা। মর্ত্যের যে বীরপুরুষটি সর্বাপেক্ষা ভয়ঙ্কর, তিনি নাকি নারী-মােহ- মুক্ত, সুন্দরী পাঠালে কোন ফল হবে না। অ্যাথেনা। তা হলে তাে সত্যিই চিন্তার কথা, কি করছেন তা হলে জিউস ? হীরা। লেটোর পরামর্শে তিনি এক অদ্ভুত কাজ করছেন। অ্যাথেনা। কি ? হীরা। পৃথিবীর যত বড় বড় কবিদের আমন্ত্রণ করে এক সভার আয়ােজন করেছেন এর প্রতিবিধানকল্পে।

১৬৩ অন্তরীক্ষে অ্যাথেনা। কবিদের ? হীরা। হ্যা, কেবল মৃত কবিদের, জীবিতদের নয়, ঔপন্যাসিক, বক্তা, চিত্র- কর, ভাস্করদেরও নয়, কেবল যার ছন্দে বেঁধে কাব্য লিখেছেন তাদের সভা হবে। অ্যাথেনা। কেন, ঔপন্যাসিক, বক্তা, চিত্রকর, ভাস্কর এরাও তত এক হিসেবে কবিই ? হীরা। [ সশ্লেষে ] তােমার হিসেব আর লেটোর হিসেব এক নয়। লেটো বলেছে ছান্দিক কবিদের সভা হােক, সুতরাং তাই হবে, তােমার বা আমার কথা টিকবে না, তুমি যেন বলতে যেও না কিছু, আমার মত অপমানিত হবে। বহুকাল পরে লেটোকে পেয়ে উন্মত্ত হয়ে উঠেছেন জিউস। অ্যাথেনা। কিন্তু কবিদেরই বা একসঙ্গে পাবেন কি করে জিউস ? কে কোন্ লােকে ভেসে বেড়াচ্ছেন তার ঠিক আছে কি? হীরা। তাই তাে জাল পাতা হচ্ছে। অ্যাথেনা। বুঝতে পারছি না ঠিক। হীরা। আলাের জাল পাতা হবে সারা আকাশ জুড়ে, আর তার বাইরে হবে স্বর্গীয় সঙ্গীত। কবিরা গান শুনে আসবেন আর জালে আটকে যাবেন। অ্যাথেনা। গান গাইবে কে ? হীরা। মিউজরা আর আর্টেমিস। অ্যাথেনা। আর্টেমিস মানে, ডায়ানা ? হীরা। হা হা, ডায়ানা, গ্রীক নাম পছন্দ হচ্ছে না বুঝি। তােমাকে মিনার্ভা বলে ডাকতে হবে নাকি? আমাকে কেউ জুনাে বললে তাে গা জ্বালা করে আমার। অ্যাথেনা। তুমি পালাচ্ছ কেন? হীরা। সপত্নীদের কৃতিত্ব চোখের সামনে দাড়িয়ে দেখব! চল, তুমিও চল। অ্যাথেনা। সারা আকাশ জুড়ে জাল পাতা হবে বলছ, কোথায় যাব?

দশ-ভাণ, ১৬১ হীরা। যত বড় জালই হােক তার সীমা আছে, আকাশ কিন্তু অসীম। আমরা জালের বাইরে গিয়ে দাড়াই চল। অ্যাথেনা। কেন ? হীরা। সব পণ্ড করে দেব। জিউস আকাশের সম্রাট, কিন্তু আমিও আকাশের সম্রাজ্ঞী, আমাদের উভয়ের অনুমতি ব্যতীত কোন বিষয়ের শেষ মীমাংসা হতে পারে না। অ্যাথেনা। তার জন্যে বাইরে যাবার দরকার কি হীরা। ওই মিউজদের আমি বিশ্বাস করি না, ওরা সাইরেন, ওরা মায়াবিনী, হয়ত হঠাং মুগ্ধ করে ফেলবে আমাকে, হয়তো ওদের মতে মত দিয়ে ফেলব। অ্যাথেনা। মত দিয়ে ফেললেই বা ক্ষতি কি? পৃথিবী যদি বিপন্ন হয়ে থাকে, গ্রীসও বিপন্ন হয়েছে। গ্রীসের প্রতি এতটুকু মায়া নেই তােমার ? হীরা। গ্রীসের প্রতি ? না, এতটুকু না, গ্রীস কি আমাকে কোন দিন ? তারা কোথাও আমার পূজা করত তক্তা খাড়া করে, কোথাও বা কাঠের গুড়ি, কোথাও বা থাম। আমায় কিছু বুঝেছিল ভাস্কর পলিক্লিটাস, তাও সম্পূর্ণ নয়। [ সক্ষোভে ] আমার নিজের স্বামীই বুঝলে না আমাকে, অপরে কি বুঝবে! চল যাই, ওরা এসে পড়বে এখনই। অ্যাথেনা। আমি যাব না। হীরা। তবে থাকো আমি যাই। হীরার ইঙ্গিত পাইয়া ময়ুর পাখা বিস্তার করিয়া উড়িয়া চলিয়া গেল। অ্যাথেনা কিছুক্ষণ নীরবে দাড়াইয়া রহিলেন। অ্যাথেনা। যুদ্ধ হচ্ছে। কেন? হেলেন আবার জন্মাল নাকি? না, চুপ করে থাকলে চলবে না, হীরার ভাবভঙ্গি ভাল নয়, জিউসকে সাবধান করে দেওয়া উচিত। বুঝেছিল অন্তর্হিত হইলেন। ক্ষণপরেই বিস্তৃত আকাশপটে সুক্ষ্ম স্বর্ণতন্তুসন্নিত অসংখ্য আলােকরেখা পরিস্ফুট হইল এবং দেখিতে দেখিতে এক বিরাট জ্যোতির্ময় জাগক অন্ধকার মহাশূন্যে দিগদিগন্তু ১৬৫ অন্তরীকে হেতু, যিনি ব্যাপিয়া দুলিতে লাগিল। জালের বাহিরে রূপসী মিউজগণ ডায়েনা সমভিব্যাহারে একে একে আবির্ভূত হইলেন। প্রত্যেকের হন্তে একটি করিয়া ‘লায়ার’, প্রত্যেকেরই অঙ্গে সুস্থ গ্রীক সৌন্দৰ্য, প্রত্যেকের পরিধানে নাতিবহুল গ্রীক পরিচ্ছদ, সুন্দর বিশিষ্ট অনাড়ম্বর। ধীরে ধীরে তাহারা সঙ্গীত আরম্ভ করিলেন। ক্রমশ সমস্ত অন্তরীক্ষ উদাত্ত গভীর মহং এবং মধুর সুরসম্ভারে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল। কিছুক্ষণ পরে দূরে কয়েকটি ছায়ামুত্তি অস্পষ্টভাবে দেখা গেল, নিকটবর্তী হইলে বােঝা গেল পাঁচজন, দুইজন আগাইয়া আসিলেন, তিনজন একটু পিছাইয়া রহিলেন। তাহাদের আকৃতি যে কি, তাহা বোঝা গেল না। একটা ঘন কুয়াশা যেন প্রত্যেককে আবৃত করিয়া রাখিয়াছে, এবং সেই কুয়াশা ভেদ করিয়া একটা অপরূপ দুতি বিচ্ছুরিত হইতেছে। প্রথম ছায়ামূৰ্ত্তি। মহাশূন্যে জ্যোতির্ময় এ কি অপূৰ্ব প্রকাশ ! দ্বিতীয় ছায়ামূর্তি। যিনি দেবতাগণের জন্ম হিরণ্যগর্ভের জনক, তারই। এ নূতন লীলা। প্রথম ছায়ামূর্তি। কে আপনি? দ্বিতীয় ছায়ামূৰ্ত্তি। আমি? আমিও তারই প্রকাশ মাত্র। প্রথম ছায়ামূর্তি। আপনার পরিচয় পেতে পারি কি? দ্বিতীয় ছায়ামূর্তি। অসংখ্য আমার পরিচয়, কোষ্টা বলব, বলে লাভই বা কি? প্রথম ছায়ামূর্তি। আপনি মর্তবাসী ছিলেন নিশ্চয় ? দ্বিতীয় ছায়ামূর্তি। ছিলাম, মর্ত্যে শ্বেতাশ্বেতর নামে একটা উপনিষদও রচনা করেছিলাম, মর্ত্যে তাই আমার পরিচয়। [ অর্ধ স্বগত ] জানি না, সে গ্রন্থ এখনও আছে কি না। প্রথম ছায়ামূর্তি। উপনিষদের ঋষি আপনি। আমার নমস্কার গ্রহণ দ্বিতীয় ছায়ামূর্তি। [ নমস্কারান্তে ] আপনি কে ? প্রথম ছায়ামূর্তি। আমি দ্বৈপায়ন, কেউ কেউ বেদব্যাসও বলে আমাকে। দ্বিতীয় ছায়ামুর্তি এ পরিচয়ে বিশেষ বিচলিত হইলেন না মনে হইল, যেন চিনিতে পারিলেন না।

দশ-ভাণ
তিনি নীরবে আকাশের দিকে চাহিয়া রহিলেন এবং একটু দূরে সরিয়া গেলেন। তৃতীয় ছায়ামুর্তি
প্রথমের নিকট সরিয়া আসিলেন।
তৃতীয় ছায়ামূর্তি। কি অপূর্ব সঙ্গীত ! এই সঙ্গীতের ঠিক সুরটি ধরবার
সাধনায় দিবারাত্রি অতিবাহিত করেছিলাম একদিন, কিন্তু কিছুই করতে পারি
নি, কিছুই হয় নি।
প্রথম ছায়ামূর্তি। আপনি কে?
তৃতীয় ছায়ামূর্তি। হােমার।
প্রথম ছায়ামূৰ্ত্তি চিনিতে পারিলেন না।
বেদব্যাস। সত্যিই অপূর্ব সঙ্গীত, আমরা সম্ভবত কিন্নরললাকের সমীপবর্তী
হয়েছি।
উপনিষদের ঋষি। [ মৃদুকণ্ঠে আপন মনে ]
নীলঃ পতঙ্গো হরিতে লােহিতাক্ষশুড়িগর্ভ ঋতবঃ সমুদ্রা
অনাদিমত্ত্ব বিভূত্বে বৰ্তসে মতে জাতানি ভুবনানি বিশ্বাঃ।
হােমার। কি অপূর্ব সুর!
বেদব্যাস। শুধু সুর নয়, আকাশপটে বিলম্বিত আলােক-রেখা-রচিত ওই
জালটিও অপূৰ্ব ।
হােমার। আমি অন্ধ, আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।
অসহায়ভাবে ধীরে ধীরে সরিয়া গেলেন। চতুর্থ ছায়ামুর্তি আগাইয়া আসিলেন।
চতুর্থ ছায়ামূৰ্ত্তি। কি অপরূপ দৃশ্য, কি সুমধুর সঙ্গীত ! বিরহী শ্রীরামচন্দ্রের
দুঃখ-অপনােদন মানসে পম্পাতীরে বসন্তবর্ণনা-প্রসঙ্গে সৌন্দৰ্য্য ও সঙ্গীতের
অবতারণা করেছিলাম মনে পড়ছে, কিন্তু এ কি দেখলাম আজ, এ কি শুনলাম,
এ যে কল্পনাতীত।
বেদব্যাস। পম্পাতীরে ! আপনি কি তা হলে আৰ্যাবর্তনিবাসী?
চতুর্থ ছায়ামূর্তি। [ সগর্বে ] হ্যা, নিশ্চয়ই, মহেন্দ্ৰধ্বজসঙ্কাশ গৃঢ়জ
শ্রীরামচন্দ্রের পদরেণুপবিত্ৰ আৰ্যাবর্তই আমার মর্ত্যবাস ছিল।

১৬৭
অন্তরীক্ষে,
বেদব্যাস। আপনার পচিয় জানতে বাসনা করি। আমিও ভারতবর্ষীয়
চতুর্থ ছায়ামূর্তি। মর্ত্যলােকে আমি রত্নাকর নামে পরিচিত ছিলাম।
বেদব্যাস। কবিগুরু বাল্মীকি ?
সসমে নমস্কার করিলেন।
মনে
বাল্মীকি। [ প্রতিনমস্কারান্তে ] গুরুভার বহন করা সম্ভব নয় আমার
পক্ষে। শ্রীরামচন্দ্রের মহিমা-কীৰ্ত্তন করবার সুযােগ পেয়ে ধন্য হয়েছিলাম
একদিন, তাই আমার পরম সৌভাগ্য, আর কিছু কামনা করি না। আপনি কে?
বেদব্যাস। আমি আপনার পরবর্তী, আমার নাম দ্বৈপায়ন। পম্পা হ্রদকে
এখনও আপনার ?
মনে আছে বইকি। তার তীরে সেই কর্ণিকার, সিন্ধুবার,
মাতুলুঙ্গ, কোবিদার পুষ্পের শােভা, তার নীরে মধুকর-ভূষিত কমলকুল, অদূরে
শিখী-শিখিনীর নৃত্য, দত্যুহের করুণ কণ্ঠস্বর, সেই অঙ্কোল, কুরুন্ট, চূর্ণক
বৃক্ষরাজি, সেই শ্যামকান্তি ঋষমূক পৰ্ব্বত—এসব কি ভুলতে পারি কখনও !
[ একটু থামিয়া ] কিন্তু আকাশপটে আজ এ কিসের ছবি, ওই সুন্দরীরা কে ?
এই অপূৰ্ব সঙ্গীতের হেতু
উপনিষদের ঋষি। [ যেন আপন মনে উত্তর দিলেন ]
অনাদ্যনং কলিলস্য মধ্যে
বিশ্বস্ত স্রষ্টারমনেকরূপম্ ।
হােমার কান পাতিয়া মিউজদের সঙ্গীত শুনিতেছিলেন।
কি ?
হােমার । [ মাথা নাড়িয়া ] হেক্সা মিটারে ঠিক এই সুর ফোটানো
অসম্ভব। না, আমি পারি নি।
পঞ্চম ছায়ামূর্তি নিকটবর্ত্তী হইলেন।
পঞ্চম ছায়ামূর্তি। এ কি মনােহর চিত্র, এ কি স্বর্গীয় ঐক্যতান।
গন্ধমাদনবনের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা সূৰ্য্যকান্তমণি-নির্মিত পাত্রে কল্পতরুর আসব পান

দশ-ভাণ ১৬৮ করেও তাে এ অভিনব-সৃষ্টির কল্পনা করতে পারবেন না। কোন্ শিল্পীর সৃষ্টি এ? কেহ উত্তর দিলেন না। বেদব্যাস ফিরিয়া দেখিলেন এবং নিকটে সরিয়া আসিলেন। বেদব্যাস। আপনি কি ভারতভূমি থেকে আসছেন ? পঞ্চম ছায়ামূর্তি। এসেছি অনেক দিন। এত দিন যে, আমি কবে কোথায় জন্মেছি, তা এখন পণ্ডিতদের তর্কের বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। বেদব্যাস। ও, পণ্ডিতরা শ্রান্ত হন নি এখনও আপনার সম্বন্ধে ! তা হলে আপনি আধুনিক। আপনার নামটি জানতে পারি কি? পঞ্চম ছায়ামূর্তি। কালিদাস দেবশর্মণঃ । বেদব্যাস। ভারতভূমির কোন্ অঞ্চলে ছিলেন আপনি? কালিদাস। উজ্জয়িনীতে বিক্রমাদিত্যের সভাকবি ছিলাম। বেদব্যাস কালিদাসকে অর্বাচীন মনে করিয়াই সম্ভবত আর বাক্যালাপ করিলেন না। বাল্মিকী, হােমার এবং উপনিষদের ঋষি ইতিমধ্যে দূরে সরিয়া একা একা ঘুরিয়া বেড়াইতেছিলেন। বেদব্যাসও তাহাই করিতে লাগিলেন। কালিদাস একা দাঁড়াইয়া রহিলেন। কালিদাস। এ দিব্যাঙ্গনাগুলি কে? গন্ধৰ্ব্বকন্যা, কিন্নরী, দেববালা, না মানবী? আশ্চর্য রূপ, আশ্চর্য কণ্ঠস্বর । দেখিতে দেখিতে দূরে সরিয়া গেলেন। ইহার ঠিক পরেই আরও তিনজন আসিলেন। ইহাদেরও চারিদিকে একটা কুয়াশার আবরণ, কিন্তু তাহা অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছ বলিয়া লোকগুলিকে চেনা যায়। শ্যামবর্ণ ছিপছিপে গড়ন দেখিয়া ভাজিলকে, লম্বা মুখ, ভারী চোয়াল, বহির্মুখী পুরু অধর, সম্মুখে-ঈষৎ-ঝুকিয়া-পড়া দেহ, শুকচ নাসা, ঘনকৃষ্ণ কুঞ্চিত কেশ, চাপ দাড়ি, গম্ভীর বিষঃ বদন, শান্ত গমনভঙ্গি দেখিয়া দান্তেকে এবং কলার' দেখিয়া শেকৃম্পিয়ারকে চিনিতে বিলম্ব হয় । শেকৃম্পিয়ার আড়চোখে একবার ভাজিলকে, একবার দান্তেকে লক্ষ্য করিতেছিলেন। দান্তে গভীর ঔদাসীন্যভরে কাহাকেও এবং কিছুই দেখিতেছিলেন না। ভার্জিল অবাক হইয়া ফ্যালফ্যাল করিয়া আকাশের দিকে চাহিয়া ছিলেন। ভাজিল। বাই থিওক্রিটাস-এ যে- ১৯ অন্তরালে কথা শেষ করিতে পারিলেন না, চাহিয়া রহিলেন। দান্তে এতক্ষণ কাহারও দিকে চাহিয়া দেখেন নাই, এই উচ্ছাসােক্তিতে তাহার দিকে ফিরিয়া দেখিলেন এবং ঈষৎ কুঞ্চিত করিলেন। শেকৃম্পিয়ার। [ ভাজিলকে থিয়েটারি কায়দায় অভিবাদন করিয়া ] আপনার মত একজন সুরসিক ব্যক্তির পরিচয় লাভ করবার সৌভাগ্য হবে কি আমার ? ভাজিল। আমার পরিচয়? আমি একজন কে চাষার ছেলে, ইটালির বাইরে মাৰ্টয়াতে জন্ম হয়েছিল আমার । দান্তের জ্ব আরও কুঞ্চিত হইল। শেকৃম্পিয়ার। চাষার ছেলে? হলেই বা ! অব্রে বলে, আমি নাকি কসাইয়ের ছেলে। [ সগর্বে ] অথচ আমার বাবার যে কোর্ট অব আর্মস ছিল তার ঐতিহাসিক প্রমাণ আছে। আপনি কার ছেলে তা জেনে অবশ্য সুখী হলাম, কিন্তু আপনার পরিচয় জানবার কৌতুহল আমি সম্বরণ করতে পারছি না। ভাজিল। [ সহাস্যে ] আমি গেঁয়াে মানুষ, পিতার পরিচয়েই নিজের পরিচয় দিয়ে থাকি। [ একটু চুপ করিয়া থাকিয়া, আমার বাবা চাষা ছিলেন বটে, কিন্তু অবস্থা নেহাত খারাপ ছিল না আমাদের। আমাদের চাষবাস ছাড়া বনকর ছিল, মৌমাছি পালন করতাম আমরা, বাবা আমাকে লেখাপড়া শিখতে প্রথমে ক্রিমােনা, তারপর মিলানে পাঠান। শেকৃম্পিয়ার। [ বিস্ময়ের অভিনয় করিয়া ] ও, তা হলে মস্ত বড় একজন বিদ্বান ব্যক্তির সঙ্গে পরিচিত হবার সৌভাগ্য হ’ল আমার! ভাজিল। বিদ্বান বলে কিন্তু কোন খ্যাতি হয় নি আমার, আমার সামান্য যা খ্যাতি তা কবি হিসেবে। শেকৃম্পিয়ার। তাই বলুন। থিয়েটারি কায়দায় পুনরায় অভিবাদন করিলেন। দান্তের জ্ব আরও কুঞ্চিত হইল শেকৃম্পিয়ার। আপনি কবি! এর চেয়ে বড় পরিচয় মানুষের আর হতে পারে না। ভার্জিল। [সসঙ্কোচে ] সামান্য গ্রাম্য কবি আমি, আমার একলােগস-

দশ-ভাণ
১৭০
?
দান্তে। এলােগ!
ভার্জিল। হ্যা, এলােগস বলে একটা কবিতাগুচ্ছ আছে আমার,
আসেনিয়াস পােলিও অবশ্য প্রশংসা করেছিল বইটার
দান্তে। জর্জিক্স, ইনিড কি আপনারই লেখা?
ভার্জিল। হ্যা, ও বই দুটো পরে লিখি। জর্জিক্সটা অক্টেভিয়াসকে সন্তুষ্ট
করবার জন্যে, আর ইনিডটা অগাস্টাসের ফরমাশে লিখতে হয়েছিল, কিন্তু
দান্তে। আপনি ভার্জিল
ভার্জিল। [ চোখ-মিটিমিটি করিয়া ] হ্যা? আপনি, আপনাকে তত ঠিক
দান্তে সহসা নতজানু হইয়া অভিবাদন করিলেন। শেকৃম্পিয়ার shrug করিয়া
একটু সরিয়া গেলেন
দান্তে। আপনি আমার আদর্শ, আপনারই কৃপায় সংসারের জটিল অরণ্যে
পথ খুঁজে পেয়েছি আমি, আমার কমেডিয়াতে আপনিই প্রথম পথপ্রদর্শক,
বিয়াত্রিচের কাছে আপনিই পথ দেখিয়ে নিয়ে গেছেন আমাকে
ভার্জিল। আমি ! কই, আমার তাে কিছুই মনে নেই।
দান্তে। [ উঠিয়া দাড়াইলেন ] মানুষ ভার্জিলকে আমি দেখেছি, শুধু দেখি
নি, পূজা করেছি।
শেম্পিয়ার একটু দূরে দাঁড়াইয়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে উভয়কে লক্ষ্য করিতেছিলেন। সহসা
যেন কি একটা কথা মনে পড়িয়া যাইতে আগাইয়া আসিলেন
শেকৃম্পিয়ার। যদি অনুমতি দেন—আচ্ছা থাক, আপনাদের আলাপে বাধা
দেব না।
ভার্জিল। কি বলুন?
শেকৃম্পিয়ার। আপনি কি জুলিয়াস সীজারকে দেখেছিলেন ?
ভার্জিল। দেখেছিলাম বইকি, তাকে যখন খুন করে, তখন আমি বােমে
রেটরিক আর ফিলজফি পড়ছি।
শেকৃম্পিয়ার। লােকটা আসলে কি রকম ছিল বলুন তো?

১৭১
অন্তরীক্ষে
ভার্জিল। ট্রায়াভিরেটের সবাই যেমন তেমনই। বাইরে হিতৈষী
জননায়ক, অন্তরে অহঙ্কারী ক্ষমতাপ্রিয় স্বার্থপর।
শেকৃম্পিয়ার। ও!
ভার্জিল। হঠাৎ তার কথা মনে পড়ল কেন ?
শেস্পিয়ার। শেকৃম্পিয়ার ব’লে একজন নাট্যকার তাকে মস্ত একটা
হিরাে খাড়া করে নাটক লিখেছে একখানা। আপনাকে দেখে হঠাৎ মনে
প'ড়ে গেল কথাটা।
দান্তে। [ ভার্জিলকে ] আপনি এখানে কেন ?
ভাজিল। সুরের টানে চলে এলাম। তুমি ?
দান্তে। আমি ? আমি ঘুরেই বেড়াচ্ছি কেবল। পৃথিবীতে শেষজীবনট!
এর ওর তার দুয়ারে ঘুরেছি, মরেও শান্তি পাই নি, প্রেতের মত মহাশূন্যে ঘুরে
বেড়াচ্ছি। এখানে কেন এসেছি জানি না, হয়তো সুরেরই মােহে, হয়তো
ভাজিল। এমন উদ্ভ্রান্ত কেন তুমি ?
দান্তে। পৃথিবীতে বড় কষ্ট পেয়ে এসেছি। [ সহসা ] জানেন, কবর থেকে
তুলে আমার হাড়গুলো পর্যন্ত পুড়িয়ে দিত ওরা, যদি ব্যাভেনার নাগরিকরা বাধা
দিত?
ভার্জিল। [ স্নেহভরে শান্তকণ্ঠে ] মর্ত্যের কথা ভুলে যাও, চল, গান শুনবে
চল, এস।
ভার্জিলের পিছু পিছু দান্তে দুরে চলিয়া গেলেন। শেস্পিয়ার কোমরে হাত দিয়া
আকাশের দৃশ্যটা দেখিতে লাগিলেন
শেকৃম্পিয়ার। মন্দ নয়। যদি সুযােগ থাকত, তা হ'লে—এ আবার কে?
অন্ধকারে হাতড়াইতে হাতড়াইতে অন্ধ মিল্টন প্রবেশ করিলেন
মিন্টন। [ অর্ধ-স্বগত ]
A little onward lend thy guiding hand
To those dark steps, a little farther on,

'দশ-ভাণ
১৭২
শেকৃম্পিয়ার। কে আপনি?
মিল্টন। আপনি কে, পাব্লিক অফিসার ?
শেকৃম্পিয়ার। বাই জোভ, না। এখানে পাব্লিক কোথায় যে পাব্লিক
অফিসার থাকবে?
মিল্টন। এটা কি Prison in Gaza নয় ?
শেকৃম্পিয়ার। এখানে prisonও নেই, tavernও নেই। একটা taven
খুজে খুঁজে হয়রান হয়ে গেছি, কোথাও কিছু নেই।
মিন্টন। গান শুনে মনে হচ্ছিল, বুঝি Gaza prisonএর কাছাকাছি
festival হচ্ছে। Samson Agonistesএ যা কল্পনা করেছিলাম, তাই বুঝি
হঠাৎ বাস্তব মূর্তি পরিগ্রহ করেছে। এ জায়গাটা তা হলে কি Chaos ?
শেকৃম্পিয়ার। কি যে জানি না ঠিক।
মিল্টন। আপনিও আমার মত অন্ধ নাকি?
শেকৃম্পিয়ার। অন্ধ নই, কিন্তু মনে হচ্ছে, হলে ভাল হত, এমন কল্পনা
আর বাস্তবের দোটানায় পড়তে হত না। চোখ থেকে মুশকিল হয়েছে, দেখছি
এক রকম, মনে হচ্ছে আর এক রকম।
মিন্টন। কি দেখছেন?
শেকস্পিয়ার। দেখছি, অন্ধকার মহাশূন্যে গ্রহনক্ষত্র অলছে, রূপসী যুবতী
কয়েকজন গান গাইছেন, আর তাদের সামনে দুলছে বিরাট একটা আলাের জাল,
মনে হচ্ছে, অনেকগুলাে বিদ্যুৎ যেন স্থির হয়ে গেছে হঠাৎ একসঙ্গে।
মিল্টন। [ সাগ্রহে ] আলাে! আলাের জাল।
শেকৃম্পিয়ার। হ্যা।
মিল্টন। কি মনে হচ্ছে আপনার?
শেকৃম্পিয়ার। প্রথমেই মনে হয়েছিল, সুযােগ থাকলে আমার মিডসামার
নাই ভ্ৰীমে এই সীনটা ঢুকিয়ে দিতাম।
মিন্টন। মিড, সামার নাইটস ড্রীম ! আপনি কে?

১৭৩ অন্তরীক্ষে শেকৃম্পিয়ার। উইলিয়াম শেকৃম্পিয়ার। মিন্টন। শেক্‌স্পিয়ার! [ দুই হস্ত প্রসারিত করিয়া ] কই, কোথা আপনি? শেকৃম্পিয়ার। এই যে, কেন ? একটু সরিয়া আসিতেই মিণ্টন ভঁহাকে আবেগভরে জড়াইয়া ধরিলেন শেকৃস্পিয়ার। [ স্বগত ] আহা, লােকটা যদি মেরী ফিটন হত। মিল্টন। আপনাকে যে এমন ভাবে পাব, তা কোন দিন কল্পনাও করি নি আমি। জানেন, সাহিত্য-জগতে আমার প্রথম প্রবেশ আপনার সেকেণ্ড ফোলিও এডিশনে। শেকৃস্পিয়ার। আমার নাটকের এডিশন হয় ? বেন জন বলত- হঠাৎ উত্তেজিতভাবে গেটে আসিয়া প্রবেশ করিলেন এবং ইহাদের উপস্থিতি সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করিয়া লুব্ধদৃষ্টিতে মিউজদের দিকে চাহিয়া রহিলেন শেকৃম্পিয়ার। [ অর্ধস্বগত ] লােকটি রসিক আছে। গেটে। [ আপন মনে ] গ্রেট চেন ?' ক্যাথারিন? ফ্রেডারিক ? বুফ ? লারােচে ? স্টীন ? ভুলপিয়াস? মেরিয়েন? [ কিছুক্ষণ দেখিয়া ] না, এরা তারা নয়। শেকৃম্পিয়ার আগাইয়া গেটের কাছে গেলেন। মিণ্টন কেমন যেন তন্ময় হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন, তাহার ঠোট নড়িতে লাগিল, মনে হইল, যেন তিনি মনে মনে কিছু আবৃত্তি করিতেছেন শেকৃম্পিয়ার। [ ক্ষমাপ্রার্থীর ভঙ্গীতে ] যদি অনুমতি করেন- গেটে। [ ঘাড় ফিরাইলেন ] আমাকে বলছেন? শেকৃম্পিয়ার। হ্যা। গেটে। কি বলুন? শেকৃম্পিয়ার। আপনি এখনই যে সুমিষ্ট নামগুলি উচ্চারণ করলেন, সেগুলি কি ওই সুন্দরীদের নাম? ওঁদের সম্বন্ধে আমারও কৌতুহল কিঞ্চিৎ উক্তি হয়েছে।

দশ-ভাণ
১৭৪
গেটে। আমি যাদের নাম করলাম, তারা মর্ত্যলােকে আমার প্রণয়িনী
ছিলেন।
শেকৃম্পিয়ার। এতগুলি
গেটে। আপনি বায়ােলজি পড়েছেন ?
শেকৃম্পিয়ার। না।
গেটে। পড়লে বিস্মিত হতেন না। কোথ। বাড়ি ছিল আপনার?
শেকৃম্পিয়ার। ইংল্যাণ্ডে।
গেটে। ইংল্যাণ্ডে, তাই। জার্মেনিতে হলে এত বিস্মিত হতেন না।
একটু পরে ] অবশ্য ইংল্যাণ্ডে একটি লােক ছিলেন, তিনিও বিস্মিত হতেন না।
শেকৃম্পিয়ার। কে তিনি?
গেটে। উইলিয়াম শেকৃম্পিয়ার।
শেকৃম্পিয়ার।
ও।
গেটে মিউজদের দিকে চাহিতে চাহিতে দূরে সরিয়া গেলেন
শেকৃম্পিয়ার। চলুন, মিস্টার—ভাল কথা, আপনার নামটাই জিজ্ঞাসা করা
হয় নি।
মিল্টন। জন মিল্টন।
শেকৃম্পিয়ার। চলুন মিস্টার মিল্টন, একটু অগ্রসর হওয়া যাক। ও কি,
আপনি খোঁড়াচ্ছেন কেন ?
মিন্টন। গাউট আছে আমার।
উভয়ে অপহৃত হইলেন। গান করিতে করিতে বিদ্যাপতির প্রবেশ
বিদ্যাপতি।
কত চতুরানন মরি মরি যাওত
আদি অবসানা
তােহে জনমি পুন তােহে সমাওত
সাগর-লহরী সমানা
বিপরীত দিক দিয়া চণ্ডীদাসের প্রবেশ
ন তুয়ে

১৭৫
অন্তরীক্ষে '
চণ্ডীদাস। ওই, বিদ্যাপতি নাকি হে ?
বিদ্যাপতি। [ সবিস্ময়ে ] চণ্ডীদাস !
চণ্ডীদাস। সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।
বিদ্যাপতি। তার মানে ?
চণ্ডীদাস। এ দেবলােকেও তােমাকে দেখে যতটা আনন্দ পেলাম, এমন আর
কিছুতে পাইনি ভাই, এমন কি ওই দেবীদের দেখেও না।
বিদ্যাপতি। তবু চল, তামাসাটা দেখাই যাক।
চণ্ডীদাস। হ্যা, দেখতে হবে বই কি।
উভয়ে সরিয়া গেলেন। গল্প করিতে করিতে শেলী ও কীটুস প্রবেশ করিলেন। শেলী
তাঁহার দীর্ঘ অবিন্যস্ত চুলে অঙ্গুলি-সঞ্চালন করিয়া সেগুলিকে আরও
অবিন্যস্ত করিয়া ফেলিয়াছিলেন
কীটুস। সত্যি ?
শেলী। হ্যা, সত্যি। এরিয়েল ভুলে গেল, আমি তলিয়ে গেলাম, তােমার
কবিতার বইটা পকেটে ছিল আমার, তারপর কিছুদিন পরে ভেসে উঠলাম ;
বায়রন, লে হান্ট, ট্রেলনি সমুদ্রের ধারে চিতা সাজিয়ে আমার শবটাকে মদে
ভিজিয়ে পুড়িয়ে ফেললে।
কীটুস। পুড়িয়ে ফেললে?
শেলী। পুড়িয়ে ফেললে।
কীটস। কিন্তু তুমি তাে ঠিক তেমনই আছে দেখছি।
শেলী হাসিয়া উঠিলেন
শেলী। ওরা পাগল, তাই পােড়াবার চেষ্টা করেছিল আমাকে। আগুনকে
কখনও পােড়ানাে যায়? [ কীটসের চিবুক ধরিয়া ] অ্যাডােনিস কখনও মরে ?
[ সহসা ] হ্যা, একটা কথা শুনেছ? প্রমেথিউস আবার বন্দী হয়েছে, আবার
ঈগলে, তার লিভার ছিড়ে খাচ্ছে।
কীটস। তাই নাকি?

দশ-ভাণ ১৭৬ শেলী। খবরটা পেয়েই আমি জিউসের খোঁজে যাচ্ছিলাম। কীটস। কেন, জিউসের কাছে কেন? শেলী। এবার জিউস তাকে বন্দী করে নি, করেছে ম্যামন। আমি ভাবছি, প্রমেথিউস ক্যান নেভার বি বাউণ্ড বলে আর একটা কবিতা লিখব। কীটুস। কিন্তু এখানে ছাপাখানা আছে কি? শেলী। সেইজন্যেই তাে জিউসের কাছে যাচ্ছিলাম, তঁাকে বলব একটি সুন্দর পাখী সৃজন করুন আপনি, সােনার মত তার পালকের রং হবে, প্রবালের মত চঞ্চু, নীলকান্তমণির মত চোখ, কণ্ঠস্বর হবে অর্ফিউসের বাঁশীর মত সেই পাখী আমার কবিতা গেয়ে বেড়াবে পৃথিবীর আকাশে আকাশে। কীটস। [ উৎসাহিত ] চমৎকার হবে, কি বললেন জিউস ? শেলী। জিউসের কাছে যাওয়া হ’ল কই, এদের গান শুনে চলে এলাম। এরা কে বল তাে? কীটস। জানি না। মনে হচ্ছে, যেন একটা নূতন ধরনের গ্রীসিয়ান আন জীবন্ত হয়ে উঠেছে আকাশপটে। শেলী।. যা বলেছ, চল, আর একটু এগিয়ে ভাল করেই দেখা যাক। উভয়ে চলিয়া গেলেন। বৃদ্ধ ওমর খৈয়াম প্রবেশ করিলেন। চলনে, দৃষ্টিতে, হাস্যে, গমনভঙ্গিমায় পাকা এপিকিউরানকে চেনা যাইতেছে। আকাশের দিকে চাহিয়া সহাস্থ জঙ্গিসহকারে সুন্দরীদের একে একে তিনি নিরীক্ষণ করিলেন, তাহার পর দৃষ্টি ফিরাইয়া লইলেন ওমর খৈয়াম। শুধু কতকগুলাে রঙিন পেয়ালা! সরাব কই? মাথা নাড়িলেন, শুভ্র দাড়িতে একবার হাত বুলাইলেন, তাহার পর ধীরে ধীরে চলিয়া গেলেন। . ক্ষণপরেই অবনত মস্তকে চিন্তাকুল আননে কালাে ফ্রক কোট ও পাটে রঙের ট্রাউজার পরিহিত আর এক ব্যক্তি প্রবেশ করিলেন। তাঁহার প্রশস্ত শুভ্র উন্নত বলাট, রক্তাভ কুঞ্চিত দীর্ঘ কেশদাম, নােম-লেশহীন পরিচ্ছন্ন মুখমণ্ডল, সুবর্ণ লােহিতাভ প্রতিভাতী চক্ষু, দৃঢ়নিবন্ধ বঙ্কিম ওষ্ঠাধর। ভিক্টর হিউগাে। হিউগাে। নােবেসপেয়ার! নােবেসপেয়ারের মতটাই কি ঠিক ? খানিকক্ষণ আনত-আননে চিন্তা করিলেন ১৭৭ অন্তরীক্ষে বিদ্রোহ ? ভেঙে ফেলাটাই কি সব সময়ে সমীচীন ? কিন্তু এ কি সহসা মিউজদের সঙ্গীত থামিয়া গেল। একটা দূরাগত গভীর বজ্রনির্ঘোষ ক্রমশ স্পষ্ট হইতে স্পষ্টতর হইয়া উঠিতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে এক বিরাট ঈগলবাহিত স্বর্ণসিংহাসন উলােক হইতে নামিয়া আসিল। সিংহাসনে সৌম্যমূৰ্ত্তি বজ্ৰপাণি আকাশদেবতা জিউস বসিয়া আছেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পেমিস, ইউরিনােম, ডেমিটির, পাসেফন, নেমেসাইন, লেটে, অ্যাপােলো, ডাওনি, অ্যাফ্রোডাইটি এবং অ্যাথেনা আসিয়া উপস্থিত হইলেন। অ্যাাপােলার হাতে লরেলের একটি মুকুট (ডায়াডেম) রহিয়াছে। মিউজগণ এবং ডায়ানাও আসিয়া ইহাদের সহিত যােগ দিলেন ও জিউসের সিংহাসনের দুই পার্শ্বে সারিবদ্ধ হইয়া দণ্ডায়মান হইলেন। এই আকস্মিক পরিবর্তনে সমাগত কবিগণ বিস্ময়ে নির্বাক হইয়া পাশাপাশি আসিয়া দাঁড়াইলেন। হোমার ও মিণ্টন কিছুই দেখিতে পাইলেন না, কিন্তু সঙ্গীত বন্ধ হইয়া যাওয়াতে তাহারা উভয়েই উৎকর্ণ হইয়া রহিলেন। জিউস। হে শ্রেষ্ঠ কবিগণ, আজ এক বিশেষ কারণে আপনাদের সকলকে একত্রিত করেছি, পৃথিবীর সমূহ বিপদ সমুপস্থিত, ক্ষিপ্ত মানবগণ নৃশংস হিংস্রতায় পুনরায় সভ্যতাকে ক্ষতবিক্ষত ছিন্নভিন্ন করে ফেলছে, জল স্থল অন্তরীক্ষ কোথাও শান্তি নেই। আপনারা কবি, আপনারা ভবিষ্যৎদ্রষ্টা, আপনারা নিয়ামক, আপনারাই মানব-সমাজের প্রকৃত নেতা। আপনারা এক সভা আহ্বান করে এর প্রতিবিধানের চেষ্টা করুন। এ যুদ্ধ নিবারণ করা দেবতার সাধ্যাতীত, কারণ দেবতার প্রতি মানবের আস্থা হারিয়েছে। সুন্দরীশ্রেষ্ঠা অ্যাপােলাে-জননী লেটোর অভিমত—আপনাদের সাহায্য ব্যতীত এ সমরানল নিৰ্বাপিত করা অসম্ভব। শ্ৰীযুক্ত লেটোর ধারণা সুস্থ অসুস্থ সর্বপ্রকার মানবই এখনও আপনাদেরই বশীভূত। আমার সনির্বন্ধ অনুবােধ, আপনারা এ বিষয়ে যত্নশীল হােন। এইবার সভাপতি নির্বাচন করা যাক তা হলে। এ সভার সভাপতি- পদ কে অলঙ্কৃত করবেন ? অথেনা, তুমি কি বল ? অ্যাথেনা। হােমার। নেমােসাইন। হােমারকে এ সভার সভাপতি নির্বাচন করা আমাদের পক্ষে অশােভন হবে, সকলে বলবে, আমরা পক্ষপাতিত্ব করেছি। আমি বাল্মীকির নাম প্রস্তাব করি।

দশ-ভাণ ১৭৮ থেমিস। আমার মতে এ সভায় বাল্মীকি অপেক্ষা যােগ্যতর ব্যক্তি উপনিষদের ঋষি। উনিই ভারতীয় সভ্যতার প্রতীক। ইউরিনােম। আমি বেদব্যাসকে আহ্বান করছি। অ্যাফ্রোডাইটি। আমার কিন্তু পছন্দ মহাকবি কালিদাসকে। নর-নারীর সুখ-দুঃখের কবি উনি। ডেমিটির। পৃথিবীর সুখ-দুঃখ, পৃথিবীর সভ্যতা নির্ভর করে কৃষকদের উপর। সুতরাং জর্জিক্‌সের কবি ভার্জিলকেই আমি সভাপতি-পদে বরণ করতে চাই। প্রথম মিউজ। চণ্ডীদাসও গ্রাম্য কবি, ওঁর সুমিষ্ট সঙ্গীতে পাষাণও বিগলিত হয়, উনি ইচ্ছে করলে অনায়াসে এ কলহ নিবারণ করতে পারেন, এ সভার উনিই নেতা হােন। দ্বিতীয় মিউজ। বিদ্যাপতিই বা কিসে কম ? পাসেফন। তােমরা একটা বিষয়ে ভুল করছ, মধুরকণ্ঠ হলেই হবে না শুধু। যে পৃথিবী নরকে পরিণত হয়েছে, তাকে প্রায়শ্চিত্ত করিয়ে স্বর্গসুষমা দান করতে হবে। কমেডিয়ার কবি দান্তে ছাড়া এ কাজ আর কেউ পারবেন না। তিনি শুধু কবি নন, যােদ্ধাও, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আছে তাঁর। ষষ্ঠ মিউজ। জীবন-দর্শনের মহাকবি ওমর খৈয়ামকে আমি অভিবাদন করি। তিনিই এ ভার গ্রহণ করুন। তৃতীয় মিউজ। স্বর্গ নরক স্বপ্ন বাস্তব বহুবিধ মানবের বহুবিধ সুখ-দুঃখ- আশা-আশঙ্কা বহুকালাবধি যিনি রঙ্গমঞ্চে মূর্ত করেছেন, সেই শেকৃম্পিয়ার থাকতে আর কি কারও সভাপতি হওয়া সম্ভব ? চতুর্থ মিউজ। গম্ভীর উদাত্ত সুরে স্বর্গ মর্ত্য পাতালে যিনি স্বচ্ছন্দে বিহার করেছেন, যিনি জীবনে কখনও কোন অন্যায়ের সমর্থন করেন নি, যার নৈতিক আদর্শ মাউন্ট অলিম্পাসের মতই ঋজু ও সমুন্নত, সেই মহাকবি মিণ্টনকেই আমি এই সভায় সভাপতি-পদ বিভূষিত করতে অনুবােধ করি।

১৭৯ অন্তরীক্ষে লেটো। আমি কিন্তু বরণ করতে চাই, কবি নাট্যকার দার্শনিক গেটেকে। তাঁর নাট্য-প্রতিভা যুগান্তকারী, গীতিকবিতা সুধানিষ্যন্দী, দর্শন চিরন্তন সত্য- সন্ধানী। তিনি শুধু ভাব-বিলাসী কবি নন, তিনি বৈজ্ঞানিকও। কৃষিবিজ্ঞান, উদ্ভিদবিদ্যা, রসায়ন, পদার্থবিদ্যা সমস্তই আজীবন চর্চা করেছেন তিনি, বহু দেশে ভ্রমণ করেছেন, যুদ্ধ করেছেন স্বয়ং যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে, রাজ্যশাসন করেছেন ডিউকের সহচররূপে—তার চেয়ে যােগ্যতর ব্যক্তি আর কে আছে এ সভায় ? পঞ্চম মিউজ। কিন্তু এই যুদ্ধের কারণ বৃদ্ধ কুচক্রীদের স্বার্থপরতা। আমাদের আদর্শ যৌবন, প্রেম, মুক্তি, আর সে আদর্শের ধ্বজাবাহক মহাকবি শেলী। শেলী ছাড়া এ আদর্শ আর কে প্রচার করতে সক্ষম, তা তাে আমি জানি না। ডায়েনা। কীটস। যষ্ঠ মিউজ। ( সশ্লেষে ) কেন, উনি এডিমিয়নের কবি বলে? সপ্তম মিউজ। আমি আহ্বান করছি ওই উন্নতললাট প্রতিভা-প্রদীপ্ত ফরাসী মহাকবি ভিক্টর হিউগােকে। উনি শুধু শ্রেষ্ঠ নাট্যকার, শ্রেষ্ঠ কবি, শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক নন, উনি দীনদরিদ্রের বন্ধু, স্বাধীনতা-মন্ত্রের উদগাত, ফ্রেঞ্চ রেভলু- শনের কবি। ষষ্ঠ মিউজ। ওঁর মতের ঠিক নেই, উনি প্রথমে রয়ালিস্ট ছিলেন। জিউস। [ আদেশের ভঙ্গিতে ] তর্ক ক’র না ইরাটো। ষষ্ঠ মিউজ চুপ করিল। জিউস। [ কবিগণকে ] আপনাদের কারও যদি কিছু বলবার থাকে বলুন। উপনিষদের ঋষি। যে অদ্বিতীয় প্রচ্ছন্নভিপ্রায় পরম পুরুষ নানা শক্তিযােগে নানা বিষয়ের সৃষ্টি করেন, একমাত্র তিনিই এ বিরােধের অবসান করতে পারেন। সেই পরম পুরুষের প্রেরণা-লাভ সাধনা-সাপেক্ষ, সভা করে তা হবে না। জিউস। [ সবিস্ময়ে কি করে জানলেন?

দশ-ভাণ
১৮০
উপনিষদের ঋষি। [ দৃঢ় প্রতীতি সহকারে ]
বেদাহমেতং পুরুষং মহান্ত
আদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ
সকলে কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিল
জিউস। আর কেউ কিছু বলবেন?
হােমার। আমি এ দায়িত্ব নিতে অক্ষম। আমার বক্তব্য আমি আমার
কাব্যে বলে এসেছি, তার বেশি আমার আর বলবার কিছু নেই। মর্ত্যবাসীরা
আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিল, তাদের সংস্রবে যাওয়ার বাসনাও নেই আমার।
বাল্মীকি। মর্তের যে স্মৃতিটি কাটার মত আমার মর্মমূলে বিধে আছে,
সেটি সুখস্মৃতি নয়।
জিউস। কেন, কি হয়েছিল ?
বাল্মীকি। আমার সীতাকে স্বয়ং শ্রীরামচন্দ্রের হস্তে সমর্পণ করেছিলাম,
তবু সে চিরদুখিনী, তবু তাকে পাতালপ্রবেশ করতে হ’ল। মর্তের ব্যাপারে লিপ্ত
থাকতে অনুরােধ করবেন না আমাকে।
বেদব্যাস। কবিগুরু বাল্মীকি যে ভার নিতে পরান্মুখ, আমি সে ভার নিতে
যাব কোন সাহসে? ' আমাকে ক্ষমা করুন আপনারা।
জিউস। কালিদাস ?
কালিদাস। [ সকাতরে ] পাত্রস্থ তৈল ও বর্তিকা নিঃশেষ হলে উযাকালীন
দীপশিখা যেরূপ নির্বাণােম্মুখ হয়, আমারও সেই দশা, অন্ধকার বিদূরিত করবার
সামর্থ্য নেই আমার।
ভার্জিল। আমারও নেই। তাছাড়া আমার বিশ্বাস, মানুষ চিরকালই
পৃথিবীতে মারামারি কাটাকাটি করবে, ওসব হট্টগােল থেকে দূরে সরে থাকাই
ভাল।
জিউস। এ ধারণা কেন হ’ল আপনার কবি?

১৮১ • অন্তরীক্ষে ভার্জিল। অভিজ্ঞতা থেকে। জিউস। চণ্ডীদাস, আপনি ? চণ্ডীদাস। প্রণয়-কলহ ভিন্ন অন্য কোন প্রকার কলহের সমাধান করবার .কৌশল আমার জানা নেই। বিদ্যাপতি। রাজা শিবসিংহ আর লছিমা দেবী যদি জীবিত থাকতেন, তা হলে তাদের সাহায্যে হয়তাে আমি কিছু চেষ্টা করতে পারতাম। তাদের অবর্তমানে মর্ত্যের ব্যাপারে আমি অসহায়। দান্তে। মর্তের ব্যাপারে আমার বহু অভিজ্ঞতা আছে। ঘিবেলাইনদের পক্ষ নিয়ে গুয়েলফদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে পােপ অষ্টম বনিফিসের কিছু পরিচয় পেয়েছি, বিয়াঞ্চি আর নেরিদেরও চিনি, নির্বাসনে লর্ড অফ ভেরােনার বাড়িতে পরভৃতের মত সসঙ্কোচে বাস করে এসেছি, গুইডাে নােভেলের চাকরিও করেছি কিছুদিন : আমার ডি মনাকিয়া বইখানাতে লীগ অফ নেশনের আভাস দিয়ে- ছিলাম, সেখানা কার্ডিনাল পােগেট পুড়িয়ে দিয়েছে শুনেছি, এর পর আমার কাছ থেকে আর কি আশা করেন আপনারা? আমার জীবনের যা আদর্শ, মর্ত্যে তার কোন মূল্য নেই। শেকৃস্পিয়ার। মর্ত্যের থিয়েটারে তার মূল্য আছে। আদর্শবাদী ব্রুটাস, আদর্শবাদী হলেট নিজেরা মরেছিল বটে, কিন্তু থিয়েটার খুব জমেছিল। কিন্তু আমার দল ভেঙে গেছে, থিয়েটারও আর আমি জমাতে পারব না। ওমর খৈয়াম। আমারও সেই দশা। সেই সাকী, সেই সরাব, সেই গােলাপ সেই বুলবুল, সেই সরাইখানা কিছু নেই। হােটেল রেডিও সিনেমার যুগে আমি অচল। জিউস। মহাকবি মিল্টন মিন্টন। মর্তে আমার জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছিল কবিতা লিখে নয়, কওয়েলের চিঠির ল্যাটিন তর্জমা করে এবং ধৰ্ম আর রাজনীতি নিয়ে প্যাফ্লেট লিখে [ হাসিলেন } সে সুখও অবশ্য বেশি দিন থাকে নি, প্রােটে- ?

দশ-ভাণ
১৮২
।
টরেটের পর রেস্টোরেশন এসেছিল, হাতে হাতকড়ি পড়েছিল, জরিমানা দিতে
হয়েছিল। [ সহসা উদ্দীপ্ত হইয়া ] যেখানে বিবাহিতা স্ত্রী পালিয়ে যায়, মেয়ে
'বাপকে যন্ত্রণা দেয়, স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করবার যুক্তি দেখিয়ে এরিওপ্যাজেটিকা
লিখতে হয়, সেখানে
Which way I flee is Hell, my self an Hell
And in the lowest deep a lower deep
Still threatening to devour me opens wide.
অভিভূত হইয়া থামিয়া গেলেন
গেটে। আমি এবার উঠি
জিউস। এ বিষয়ে কিছু বলে যান।
গেটে [ হাই তুলিয়া ] আমি দার্শনিক স্পাইনােজার শিষ্য, আমি প্রকৃতির
উপাসক। প্রকৃতি মানুষকে যে পথে নিয়ে চলেছে তাতে বাধা দেবার আমার
প্রবৃত্তিও নেই, সামর্থ্যও নেই। ( শেলীকে দেখাইয়া ] এরা তরুণ, এরা হয়তাে
কিছু
শেলী। আমি বর্তমানে বাস করি না, আমি বাস করি ভবিষ্যতে। যে
ঝড়ােহাওয়া শুষ্ক শীর্ণ পীত বিবর্ণ পাতার রাশিকে উড়িয়ে নিয়ে চলেছে ধ্বংসের
মুখে, সেই ঝড়াে হাওয়াই সঙ্গে সঙ্গে বপন করে চলেছে নূতন সৃষ্টির বীজ।
আমি ভবিষ্যতের শ্যামস্নিগ্ধ কোমল কিশলয়দের দেখতে পাচ্ছি। যুদ্ধ নিয়ে
মাথা ঘামাবার প্রয়ােজনই নেই, সব ঠিক হয়ে যাবে ভবিষ্যতে ।
জিউস। [ কীটসকে ] আপনিও কি কিছু করবেন না মর্ত্যের জন্যে, যাকে
এত ভালবাসতেন একদিন ?
কীটস। ব্লাউড ম্যাগাজিনখানা কি এখনও আছে মর্তে?
জিউস। আছে।
কীটুস। তা হলে আমি মর্ত্যের সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখতে চাই না।
আমি দূর থেকেই তার স্বপ্নে বিভাের হয়ে থাকব।

১৮৩ : অন্তরীক্ষে, হিউগাে। সেই ভাল। আমি ওদের মুক্তির জন্যে কি না করেছি ? নাটক, উপন্যাস, কাব্য, বক্তৃতা কিছু বাকি রাখিনি—কিন্তু ফল হয়েছে কি ? আমার জীবনলেখক বলেছেন যে, আমার ফ্রেঞ্চ রেভলুশন সম্বন্ধে উচ্ছাস থিয়েটারি উচ্ছাস মাত্র। আমার আর প্রবৃত্তি নেই ওসবে। জিউস। আপনারা সকলেই যদি অসম্মত হন, তা হলে আমাকে নিজের রাজকীয় ক্ষমতা ব্যবহার করতে হবে। { অ্যাপােরলাকে ] অ্যাপােললা, তােমার যাকে খুশি সভাপতি কর। দাও, ডায়াডেম পরিয়ে দাও। ময়রের পক্ষবিধুনন-শব্দ শোনা গেল। ঝড়ের বেগে হীরা দেবী প্রবেশ করিলেন জিউস। অ্যাপােলাে, সভাপতি বরণ কর। হীরা। না, করবে না। আমি আকাশের সম্রাজ্ঞী, আমার আদেশ ব্যতীত অ্যাপােলাে কিছু করতে পারে না। জিউস। বেশ, তুমিই আদেশ দাও। হীরা। দেব না, এদের একজনুকেও পছন্দ নয় আমার । জিউস। একজনকেও না ? হীরা। ( তীব্রকণ্ঠে ] না না, কাউকে নয়। সার্বজনীন উদার দৃষ্টি এদের কারও নেই। একজনের আছে জানি, কিন্তু তিনি সহসা চতুর্দিক ইন্দ্রধনুবর্ণে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল। সপ্তাশ-বাহিত হিরন্ময় অরুণ-রথে রবীন্দ্রনাথ প্রবেশ করিলেন; সকলেই সসম্ভ্রমে দাঁড়াইয়া উঠিলেন। অ্যাপােলল নিনিমেষে কিছুক্ষণ চাহিয়া রহিলেন, তাহার পর নির্ভীক পদৰিক্ষেপে অগ্রসর হইয়া হার মস্তকে লরেলের মুকুট পরাইয়া দিলেন। হীরা মুগ্ধ বিস্ময়ে চাহিয়া রহিলেন, বাধা দিলেন না রবীন্দ্রনাথ। [ সবিস্ময়ে } এ কি, এখানেও সভা নাকি। চতুর্দিকে নিরীক্ষণ করিয়া দেখিলেন। তাহার পর সহসা এতগুলি বিখ্যাত কবিকে একত্রিত দেখিয়া বিস্ময়বিমূঢ় হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন এবং ক্ষণপত্রই কর্তব্য সম্বন্ধে সচেতন হইয়া অভিজাত- সুলভ শ্রদ্ধাভরে সকলকে প্রণাম করিলেন। যবনিকা

১৩ই শ্রাবণ, ১৩৪৮
স্থান-মেয়েদের কলেজ-হষ্টেলের একটি ঘর।
সময়-বিংশ শতাব্দীর চতুর্থ দশকের শেষ ভাগ।
তারিখ-১৩ই শ্রাবণ, ১৩৪৮।
রাত্রি প্রায় দশটার কাছাকাছি। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, গুরু গুরু গর্জন শােনা যাইতেছে, কিন্তু
এখনও বর্ষণ শুরু হয় নাই। বিদ্যাসাগরের মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে যে সান্ধ্য সভা অনুষ্ঠিত
হইয়াছিল, তাহা সবেমাত্র ভাঙিয়াছে। চার পাঁচটি পোষ্ট-গ্র্যাজুয়েট ক্লাসের মেয়ে কলরব করিতে
করিতে ঘরটিতে প্রবেশ করিল। একজনের হাতে বিদ্যাসাগরের একখানি বাঁধানাে ছবি।
মেয়েগুলির সাজসজ্জা দেখিয়া মনে হয় না যে, তাহারা কোন গম্ভীর শােকসভা হইতে আসিতেছে,
বরং মনে হয় তাহারা সিনেমা হইতে ফিরিল।
প্রথমা। বাবা বাবা বাবা ! বিদ্যাসাগরের মৃত্যু-বাষিকী, নয় তাে,
আমাদের মৃত্যুবার্ষিকী, একটা ফাড়া যেন!
দ্বিতীয়া। যা বলেছিস, বক্তৃতা শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা ! লােকগুলাে
বলতে আরম্ভ করলে আর থামতে চায় না।
তৃতীয়া। আজও আমার ডেন্টিস্টের কাছে যাওয়া হল না, পরশুদিনই
ফিলিংটা পড়ে গেছে, ভেতরে কিছু একটা ঢুকে গেলে আবার। [ সহসা
চতুর্থাকে | তুই সেদিন মার্কেট থেকে এই শাড়িটা কিনলি বুঝি?
চতুর্থ। হ্যা।
প্রথমা। রংটা আর একটু ‘সােবার হলে ভাল হত।
দ্বিতীয়া। [ অর্থপূর্ণ হাসি হাসিয়া ] ও তােত আর তােমার পছন্দ অনুসারে
শাড়ি কিনবে না।
চতুর্থ। ( ঈষৎ কোপভরে ] তােমাদের খালি ওই এক চিন্তা।
পঞ্চমা। তাতে দেষটা কি, ভাবী স্বামীর পছন্দ অনুসারে চলাই তত ভাল।
.

১৮৫
১৩ই শ্রাবণ, ১৩৪৮
দ্বিতীয়া। আচ্ছা, কি কেলেঙ্কারি করলে বল দেখি আমাদের সুপারিন্টেন্টে।
বলবার ক্ষমতা নেই যখন, বলতে ওঠা কেন, আমতা আমতা করে, ঘেমে,
ঢোক গিলেছি—ছি !
চতুর্থা। সত্যি ! আর আমাকে শুধু শুধু এই ছবিটা নিয়ে যেতে বললে
কেন বল তাে? ওরা বেশ বড় সুন্দর ছবি এনেছিল, আমি শুধু শুধু ব’য়ে
মলুম এটা।
তৃতীয়া। বেচারী
পঞ্চমা। ল কলেজের ছেলেটি বেশ বললে কিন্তু ।
প্রথম। আমি শুনি নি।
পঞ্চমা। কানে আঙুল দিয়ে ছিলি নাকি ?
প্রথমা। আমি শুধু দেখছিলাম তাকে।
দ্বিতীয়া। সত্যি, কি মিষ্টি দেখতে ছেলেটি !
তৃতীয়া। [ চতুথাকে ] তাের কিন্তু এমন ভাবে সেজেগুজে যাওয়াটা
ঠিক হয় নি।
চতুর্থ। [ ফোস করিয়া উঠিল ] আহা, তবু যদি ওঁকে মাসে দুবার করে
দেখতে আসত।
তৃতীয়া। [ গালে হাত দিয়া ] আমাকে মাসে দুবার করে দেখতে আসে।
চতুর্থ। না এলে সেজেগুজে সিনেমাতে পার্টিতে যাওয়ার অত ঘটা কেন ?
আমরা যেন বুঝি না কিছু!
তৃতীয়া। যত সব বাছে কথা।
নােযভরে বাহির হইয়া গেল
প্রথমা। [ চতুর্থাকে ] তাের ‘বেড পিল’ আর আছে ?
চতুর্থা। আছে।
প্রথমা। আমাকে দেতাে ভাই একটা।
চতুর্থ টেবিলের উপর হইতে একটি ছােট লালরঙের কৌটা দিল

দশ-ভাণ
১৮৬
চতুর্থ। একটি মাত্রই আছে আর।
প্রথমা। যাই এবার, আমার চুল খুলতে বাকি এখনও। [ দ্বিতীয়াকে ]
আয় না।
দ্বিতীয়া। যা না, আমি আসছি।
প্রথমা। না, আমার বড় ভয় করে ভাই ওই বারান্দাটা দিয়ে একা যেতে,
ওখানকার বাল্বটাও আবার ফিউজ হয়ে গেছে।
চতুর্থা। বুড়ো ধাড়ি মেয়ে একথা বলতে লজ্জা করে না?
প্রথমা। নিজে যা সাহসী, তা জানা আছে। সেদিন একটা কালাে
বেড়াল দেখে আঁতকে উঠেছিলেন।
চতুর্থা। বেড়াল দেখে আঁতকে উঠতে পারি, তােমাদের মত ভূতের ভয়
আমার নেই।
প্রথমা। মিথুক কোথাকার! [ পঞ্চমাকে ] তবে তুই আয়।
পঞ্চমা। চল, একে—একটা কথা বলে যাই থাম,
চতুর্থার কানে কানে কি যেন বলিল, উভয়েই একটু হাসিল
প্রথমা। তােদের ফুসফুস-গুজগুজের আর অন্ত নেই।
পঞ্চমা। চল এইবার।
পঞ্চমা ও প্রথমা হির হইয়া গেল
দ্বিতীয়া। আমাকে এইবার নােটটা দে ভাই, যাই। মেঘ করেছে বৃষ্টি
নামবে বােধ হয়, আমার দিকের জানালা আবার ভােলা আছে।
চতুর্থ। এই যে দিই, খুঁজতে হবে একটু।
দ্বিতীয়া। ছবিখানা নিয়ে ঘুরছিস কেন, টাঙিয়ে রাখ না। পেরেকের
খোঁচ-টোচ লেগে অমন সুন্দর শাড়িখানা ছিড়ে যাবে আবার ! কত পছন্দ
করে কিনে দিয়েছেন ভদ্রলােক।
চতুর্থ শেলফে ‘নােট’ খুজিতেছিল, এই কথায় ঘাড় ফিরাইয়া মুচকি হাসিল

১৮৭. :
১৩ই শ্রাবণ, ১৩৪৮
দ্বিতীয়া। বাঁ দিকের ওই কোণের দিকে বসেছিলেন তাে? দেখেছি
আমি।
চতুর্থ একটি খাতা আনিয়া দ্বিতীয়াকে দিল। আকাশের গুরুগুরু গর্জন স্পষ্টতর হইয়া উঠিল
দ্বিতীয়া। [ সচকিত ] আমি যাই। সত্যি, তাের সাহস আছে বলতে হবে,
আমি মরে গেলেও এই সিংগল-সীটেড রূমে থাকতে পারতাম না।
দ্বিতীয়া চলিয়া গেল। চতুর্থ তখন বিদ্যাসাগরের ছবিটি যথাস্থানে টাইয়া রাখিল। ক্ষণকাল
ছবিটির পানে চাহিয়া রহিল, তাহার পর কি ভাবিয়া একটি প্রণাম করিল। তাহার পর গুনগুন
করিয়া গান করিতে করিতে আয়নার সঙ্গে গিয়া পােমকী ঝুমকো হার প্রভৃতি গহনাগুলি
খুলিয়া রাখিতে লাগিল। নিঃশব্দচরণে বিদ্যাসাগর আসিয়া প্রবেশ করিলেন। আয়নায় ছায়া
পড়িতেই মেয়েটি ফিরিয়া দেখিল এবং বিস্ময়ে হতবুদ্ধি হইয়া গেল
মেয়েটি।
কে আপনি?
বিদ্যাসাগর নীরবে দাঁড়াইয়া রহিলেন
কে আপনি ?
বিদ্যাসাগর । ভাল করে চেয়ে দেখ দিকি, চিনতে পার কি না।
মেয়েটি চিনিবার চেষ্টা করিল
মেয়েটি। কই না, চিনতে পারছি না
বিদ্যাসাগর। তবে চললুম।
গমনোগত
মেয়েটি। [ আদেশের ভঙ্গিতে ] দাড়ান।
বিদ্যাসাগর ফিরিলেন
বিদ্যাসাগর। কি ? :
মেয়েটি। আপনি রাত্রে এখানে এলেন কি করে ?
বিদ্যাসাগর। বিনা নিমন্ত্রণে সাধারণত আমি কোথাও যাই না। তােমরা
আজ আমাকে স্মরণ করেছিলে তাই এসেছিলাম, তাড়িয়ে দিচ্ছ, চলে যাচ্ছি।

দশ-ভাণ
• ১৮৮
মেয়েটি। আপনাকে স্মরণ করেছিলাম।
বিদ্যাসাগর। অন্তত খবরের কাগজে তাই বিজ্ঞাপিত হয়েছে।
অস্বস্তিকর সত্যটা সহসা মেয়েটার চেতনায় প্রতিভাত হইল। সে দেওয়ালের ছবিটার দিকে
চাহিয়া আবার বিদ্যাসাগরের মুখের দিকে চাহিল। বিদ্যাসাগর হাসিলেন
মনে হচ্ছে, যেন চিনেছ চিনেছ।
মেয়েটি। [ রুদ্ধশ্বাসে ] আপনি কি?
বিদ্যাসাগর। [ হাসিয়া ] এখনই যে বড় বড়াই করছিলে, ভূতের ভয় নেই
তােমার !
মেয়েটি ভয়ে কাঠ হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল
ভয় পেও না, কোন ভয় নেই তােমার, আমার দ্বারা তােমার কোন অনিষ্ট
হবে না।
মেয়েটি। [ সবিস্ময়ে ] আপনি বিদ্যাসাগর ।
বিদ্যাসাগর। এতক্ষণে চিনতে পারলে যা হােক তবু।
মেয়েটি। আপনি ভূত হয়ে আছেন !
বিদ্যাসাগর। বর্তমান যে নই, তার প্রমাণ তত তুমিই এখনই দিলে।
সামনে এসে দাড়ালাম, তবু চিনতে পারলে না। চিনতে যদি বা পারলে,
এখনও ভয় খাচ্ছ মনে মনে। তােমার সঙ্গে দুটো কথা কইতে এসেছিলাম,
তা আর হ’ল না দেখছি। [ একটু থামিয়া ] আমার জন্যে আজ সন্ধ্যে থেকে
অনেক কষ্ট পেয়েছ, শােও এবার, অনেক রাত হয়েছে।
মেয়েটি চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল
যাও, শশাও গিয়ে। সকালে উঠে ভেবাে, রাত্রে একটা ভূতের স্বপ্ন
দেখেছিলে।
হাসিলেন
মেয়েটি। আপনার কথা শুনে আপনাকে কিন্তু আর ভয় করছে না আমার।
ঠিক মনে হচ্ছে আপনি যেন বেঁচে আছেন।

১৮৯ ১৩ই শ্রাবণ, ১৩৪৮ বিদ্যাসাগর। বেঁচে আছি বই কি-[ হাসিয়া ] জীবন-চরিতের পাতায়। আমার কথা থাক, আর ভয় করছে না যখন, তােমার কথাই একটু বল শুনি। কোন্ শ্রেণীতে পড় তুমি ? মেয়েটি। আমি এম. এ. পড়ি। বিদ্যাসাগর। এম. এ. পড়! বাঃ বাঃ, বড় সুখী হলাম। চন্দ্রমুখী যখন এম. এ. পাস করেছিল, তখন ভারী আহ্লাদ হয়েছিল আমার, তাকে একখণ্ড শেকস্পীয়রের গ্রন্থাবলী উপহার দিয়েছিলাম। তােমার কিন্তু এখনও বিবাহ হয় নি, নয় ? মেয়েটি। না। বিদ্যাসাগর। কেন, এখনও বিবাহ হয় নি কেন? মেয়েটি। আপনি এ কথা বলছেন। আপনিই তাে বাল্যবিবাহের বিরােধী ছিলেন শুনতে পাই। বিদ্যাসাগর। আমাদের কালে বড় কচি কচি শিশুদের বিয়ে হ’ত যে ! তাই তার বিরুদ্ধে লেগেছিলাম। তা বলে সময়ে বিয়ে করবে না? এত এত লেখাপড়া শিখে লাভ কি, যদি তােমরা দেশকে সু-সন্তান না দিতে পার ? মেয়েটি। [ মুচকি হাসিয়া ] কেন চাকরি করব । বিদ্যাসাগর। চাকরি করবে ! কেন ? মেয়েটি। স্বাধীনভাবে থাকতে পারব। সামান্য টাকার জন্য স্বামীর কিংবা আর কারও মুখ চেয়ে থাকা অপমানকর। বিদ্যাসাগর। ইস্কুলের সেক্রেটারি বা হাসপাতালের ডাক্তারের মন যুগিয়ে চলাটা কম অপমানকর মনে হয় বুঝি তােমাদের কাছে ? তা হবে। কিন্তু কই, তােমাদের মুখে প্রসন্নতা তাে দেখতে পাচ্ছি না! আজ দেখলাম, দলে দলে মেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কারও সীমন্তে সিদুর নেই, অথচ সকলেই প্রায় যৌবনের শেষ সীমায় উপনীত আর সকলেই বিষণ্ণ মুখ। বাইরে হাসিখুশি বটে, কিন্তু বিষাদের ছাপটি ঢাকা পড়ে নি। বিধবাদের এই দুঃখ ছিল বলেই

দশ-ভাণ
১৯০
ততা সৰ্বস্ব পণ করে তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করেছিলাম আমি। কিন্তু এখন
দেখছি, বিধবা-বিবাহ তাে চললই না, কুমারীদের পর্যন্ত বিয়ে হওয়া দুঃসাধ্য
হয়ে উঠেছে। সেই কথাটি জানবার জন্যেই তােমার কাছে এসেছি আজ।
এমন সুন্দর চেহারা তােমার, বিয়ে হয় নি কেন বল তাে?
মেয়েটি। [ অনুযােগভরে] পাত্রই জোটে না, বিয়ে হবে কি করে?
বিদ্যাসাগর। কেন, দেশে পুরুষ নেই ?
মেয়েটি। ভাল পাত্র বড় বেশি পণ চায়। আমার বাবা গরীব মানুষ,
কোথা পাবেন অত টাকা?
বিদ্যাসাগর। [ সবিস্ময়ে ] গরিবের মেয়ে বুঝি তুমি! ও বাবা, তােমার
সাজসজ্জা দেখে ভেবেছিলাম, তুমি বুঝি বা কোন রাজারাজড়ার মেয়ে !
মেয়েটি একটু অপ্রতিভ হইল
মেয়েটি। এসব বাইরেই এমনই ঝকমকে দেখতে, দাম খুব বেশি নয়।
এই দেখুন না, এই জর্জেটখানার দাম মাত্র দশ টাকা।
বিদ্যাসাগর। তাও তত খুব কম নয় মা। আমার বাবার মাসিক বেতন
ছিল দশ টাকা, তাই দিয়ে সংসার চালাতে হত তাকে। তােমার বাবার
মাইনে কত?
মেয়েটি। দেড়শাে।
বিদ্যাসাগর। তা হলে তাে বেশ মােটা মাইনে। তবু তােমার জন্যে
একটি বর যােগাড় করতে পারেন নি তিনি।
মেয়েটি চুপ করিয়া রহিল
বেশ তত, তিনি না পেরেছেন, না পেরেছেন, তুমি তাে সাবালিকা হয়েছ,
তুমি নিজেই পছন্দ করে বিয়ে কর না কাউকে।
মেয়েটি। [ ওষ্ঠভঙ্গি করিয়া ] সব অপদার্থের দল, কাকে পছন্দ করব
বলুন?

পরে । । ১৯১, ১৩ই শ্রাবণ, ১৩৪৮ বিদ্যাসাগর। ঠিক বলেছ, তাই দেখছি, সব অপদার্থ। [ একটু পরে কিন্তু দেখ, এর জন্যে তােমরাই দায়ী। মেয়েটি। [ সবিস্ময়ে ] আমরা দায়ী? বিদ্যাসাগর। হঁা, তােমরাই। নারীর মনের কামনাই তত পুরুষের 'চরিত্র গঠন করে। তােমরা তাে আজকাল পুরুষের চরিত্রে বীরত্ব মনুষ্যত্ব এসব কামনা করছ না, তােমরা কামনা করছ পুরুষ চাকরি করে হােক, চুরি করে হােক, যেমন ক'রে হােক রাশি রাশি টাকা রােজগার করে আনুক, আর তােমরা তাই দিয়ে দিব্যি গাড়ি বাড়ি গয়না কর। তােমাদের কামনা অনুসারে তাই দেশ জুড়ে চাকর আর চোরের সৃষ্টি হয়েছে। এখন আফশােস করলে কি হবে বল? তােমরা যেদিন দারিদ্র্যকে তুচ্ছ করে মনুষ্যত্বকে বরণ করতে প্রস্তুত হবে, সেদিন আবার এই কাপুরুষদের ভেতরই সত্যিকার মানুষ দেখা দেবে। [ সহসা] আচ্ছা, তােমাদের এমন মতিচ্ছন্ন হ’ল কবে থেকে বল দিকি ? আগে মেয়েরা কামনা করত, শিবের মত স্বামী হােক—যে শিব নগ্ন দরিদ্র, কিন্তু মৃত্যুঞ্জয় নীলকণ্ঠ- মেয়েটির আত্মসম্মানে একটু আঘাত লাগিল মেয়েটি। আমাদের দেশে ভাল ছেলে যে নেই তা নয়, এমন ভাল ছেলে আছে যারা মহৎ আদর্শের জন্য প্রাণ পৰ্য্যন্ত দিতে পারে। বিদ্যাসাগর। [ সােল্লাসে ] এই তাে চাই। ওদের মধ্যেই একজনকে পছন্দ কর না। মেয়েটি হাসিয়া ফেলিল . বিদ্যাসাগর। ও, পছন্দ করে রেখেছে বুঝি একজনকে? মেয়েটি। শুধু আমার পছন্দ হলেই তাে চলবে না। বিদ্যাসাগর। আবার কার পছন্দ চাই ? মেয়েটি। বাপ-মার, সমাজের।

দশ-ভাণ ১৯২ বিদ্যাসাগর। ভাল ছেলেকে বিয়ে করলে বাধা দেবেন তারা? মেয়েটি। দেবেন, যদি বিদ্যাসাগর। এদেশ এখনও বদলায় নি দেখছি। বাধা মানবে কেন তুমি, লেখাপড়া শিখছ কেন তবে ? আলাের কাছে অন্ধকার টিকতে পারে কখনও? বিধবা-বিবাহেও সমাজ বাধা দিয়েছিল, সে বাধা কি আমি মেনেছিলুম? মেয়েটি। তা হলে আপনি বিদ্রোহ করতে বলছেন? বিদ্যাসাগর। নিশ্চয়। । মেয়েটির মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল মেয়েটি। [ একটু ইতস্তত করিয়া, সহসা ] চেহারা দেখবেন তার, আমার কাছে ফটো আছে, নিয়ে আসি দাড়ান। উত্তরের অপেক্ষা না করিয়া মেয়েটি ছুটিয়া গিয়া ঘরের কোণে রক্ষিত তােরঙ্গের নিকট হাঁটু গাড়িয়া বসিল এবং তােরঙ্গ খুলিতে লাগিল। বিদ্যাসাগর নিঃশব্দচরণে বাহির হইয়া গেলেন। মেয়েটি ফোটো বাহির করিয়া অনিল মেয়েটি। কই, কোথায় গেলেন আপনি? বাহিরে মেঘের গুরুগুরু শব্দ শােনা যাইতে লাগিল যবনিকা

Dash Bhan

Author
Basu,sri Manoj Ed.
Title
Dash Bhan
File name
Dash Bhan
Text
OCR done
Citation
1937
Published
2009/08/14
Publisher
Bengal Publishers, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
199
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Drama. Plays.
Keywords
Drama
DLI number
512579
Barcode
4990010019641.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
HrTlzoat1ng
Download PDF

Dash Bhan