Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Kanakanjali Ed.3rd

Baral,akshaykumar · 2010/01/10

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

কনকাঞ্জলি

১ম সংস্করণ-আশ্বিন, ১২৯২ সাল
২য়
বৈশাখ, ১৩০৪
কার্তিক, ১৩২৪
তিনি

কনকাঞ্জলি
গীতিকাব্য
শ্ৰীঅক্ষয়কুমার বড়াল
প্রণীত
তৃতীয় সংস্করণ
কলিকা
২০১, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট
শ্রীগুরুদাস চট্টোপাধ্যায় প্রকাশিত

কালিকা-যন্ত্র
২১, নন্দকুমার চৌধুরীর দ্বিতীয় লেন, কলিকাতা
ঐশরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী কর্তৃক মুদ্রিত

সূচী উৎসর্গ ২৫-৬৬ ৫ ০ ১-২ উপহার কতদিন পরে কবি ২৮ ৮ সুখ বাঁশরী-স্বরে 5 ৩৪ পথে আঁখি ৩৬ ৩৭ দেখ যদি ০ ৪১ s ৪২ ৪৩ ০ প্রত্যহ তার স্মৃতি সন্ধ্যায় স্বপ্ন-রাণী প্রভাতে নিদাঘে ৪৫ • ৪৭ ৪৯ কাঁদিতে পার অ এত বুঝি ও কথা যাই ৬০ আয় ঘুম ৬৩. অবশেষ ৬৪ २ ৬৭-১০৮ ৬৯, আমার এ কাব্যে কবিতা ৭১ " বরণ ৭৭ ৭৯, সংশয়-দৃষ্টি সম্ভাষণ মিলনে শত নাগিনীর পাকে ৮১ ৮২ . এখনাে রজনী আছে ৮৩ ৮৪. . ৮৫ যেও না আসি তবে। বিদায় দু’দিকে ৮৭ ৮ ৪ ৮৯. সে নেত্রে হেমন্তে ১০ ১১ ১২ হৃদয় সমুদ্র সম প্রেম কি বুঝান যায় সংসারে। সখীর উক্তি প্রেম-শিশু . কবিতা-বিদায় U ভূমিকা বিক্রমাদিত্যের তিরােভাবের পর পুরাতন ‘সত্তা’ কালক্রমে ‘বিহতা হইয়াছিল ;-তখন এক নূতন (নবক) রসবত্তা’ বিলসিত হইয়া উঠিয়াছিল ;-তাহার উদ্ধৃঙ্খল প্রবল প্রভাবের দিনে কে না কাহাকে অতিক্রম করিত? বাসবদত্তার মুখবন্ধে মহাকবি বন্ধু তাহার বর্ণনা করিবার জন্য লিখিয়াছিলেন, “সা রসবত্তা বিহগ, নবকা বিলসন্তি, চরতি ন কং কঃ ?” বাসবদত্তা প্রত্যক্ষর-শ্লেষনিবদ্ধ গদ্য কাব্য। এক অর্থ এক রূপ, অন্য অর্থ অন্যরূপ। এখানেও অন্য অর্থ আছে। তাহার সন্ধান পাইতে হইলে, শ্লোকার্ধটি একটু ভিন্নভাবে পদচ্ছেদ করিয়া পাঠ করিতে হয়। যথা,-- “সারসবা বিহতা, ন বকা বিলসস্তি, চরতি ন কঙ্কঃ!” ইহাও করুণ-রসাত্মক। বিক্রমাদিত্য-রসসবােবর শুষ্ক হইয়া গিয়াছে, ‘এখন আর সারস নাই ; বকেরাও বিলাসলীলা প্রকাশিত করে না ; এমন কি, মাছরাঙ্গাটি পৰ্য্যন্ত বিচরণ করে না। সুবন্ধুর এই সুপরি- চিত উক্তি সংস্কৃত কাব্য-সাহিত্যের ইতিহাসের একটি বিপ্লবযুগের আভাস প্রদান করে। অনেকে মনে করেন, বঙ্গকাব্য-সাহিত্যের ইতিহাসেও এইরূপ এক বিপ্লব-যুগের আবির্ভাব হইয়াছে। এখন আর বড় কবি নাই; সারসগুল মরিয়াছে, বকেরা উজাড় হইয়াছে, মাছরাঙ্গাটি পৰ্য্যন্ত দেখিতে পাওয়া যায় না। এখন যাহারা শুষ্ক-সবােবর-তীরে কলরব করিতেছে, তাহার! আর একশ্রেণীর জীব,অধিকাংশই দৰ্দর! এরূপ সমালােচনা সুলভ ও সরস হইলেও, সৰ্বাংশে সমীচীন বলিয়া গৃহীত হইতে পারে না।

সকল যুগেই প্রকৃত কবির সংখ্যা অল্প। যে যুগে জনসমাজে কাব্যের আদর প্রবল থাকে, সে যুগে রসজ্ঞের অভাব হয় না। তখন যে কেহ রসজ্ঞের মজলিসে বীণা বাঁধিয়া অগ্রসর হইতে সাহস করে না। যে যুগে জনসমাজে কাব্যের আদর অল্প হইয়া পড়ে, সেই যুগেই উদ্ধৃঙ্খলতা প্রশ্রয় লাভ করে, এবং প্রকৃত কবি-প্রতিভার পক্ষে সমুচিত বিকাশলাভের অন্তরায় হইয়া দাড়ায়। বঙ্গকাব্য-সাহিত্যের বর্তমান যুগে সুকবির একান্ত অভাব উপস্থিত হয় নাই ; কিন্তু প্রকৃত কাব্য- রসজ্ঞের কিছু অভাব উপস্থিত হইয়াছে বলিয়াই বােধ হয়। তজ্জন্য পুরাতন ‘রসবত্তা’ কিয়ৎপরিমাণে ‘বিহতা হইতেছে ;—‘নবকা রস- বা’ উদ্বেল হইয়া উঠিতেছে,—ভাবের হাট ভাঙ্গিয়া যাইবার উপক্রম হইতেছে! এমন দিন সুকবির সাধু কাব্যের সমুচিত বিকাশলাভের দিন নয়। যাহারা সুকবি, তাঁহারা অনেকেই অরণ্যে রােদন করিতে- ছেন। তাঁহাদের গানে ‘আগমনী’ অপেক্ষা ‘বিজয়া’র করুণ সুরই অধিক পরিস্ফুট। তাহারা যেন ভয়ে ভয়ে আসরে আসিয়া, পালা আরম্ভ করিবার পূর্বেই, ‘বিদায়’ লইবার জন্য ব্যতিব্যস্ত। হট্টগােল ইহার জন্য কত দূর দায়ী, তাহা অনেকেই ভাবিয়া দেখিবার সময় পাইতেছেন না। কবিবর অক্ষয়কুমার এই যুগের এক জন সুকবি। তাঁহার রচনায় কৃত্রিম নাই ; আন্তরিকতা আছে। তাহার ভাবের আকাশে কুজঝটিকা নাই, শরৎকৌমুদী আছে ;-তাহার পদবিন্যাস-কৌশলে বড়ম্বর নাই, সুশ্লীল সরলতা আছে। এষা’র কবি অক্ষয়কুমারের নাম সুপরিচিত। কিন্তু ‘এ’ যে কবি-প্রতিভার স্বর্ণমন্দির, তাহার ‘কনকাঞ্জলি' প্রভৃতি অন্যান্য কাব্য—তাহারই সুবিন্যস্ত সুবর্ণ- সােপান।

vo আমি অনেক দিন হইতেই অক্ষয়-গীতিকাব্যের পক্ষপাতী। তাহার এক একটি কবিতা হীরার টুকরার মত ঝলমল করে,—অল্প পরিসরের মধ্যে অনেক কথা মনের মধ্যে জাগাইয়া তুলিয়া কাব্যামােদিগণকে বিমল কাব্যানন্দে পূর্ণ করিয়া দেয়। কবি শিক্ষক ও সংস্কারক, কবি দেশসেবক ও দেশনায়ক, কবি সাধক ও উত্তরসাধক। অক্ষয়-গীতি- কাব্যে ইহার অনেক পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। “কাব্য নয়, চিত্র নয়, প্রতিমূর্তি নয়, ধরণী চাহিছে শুধু,হৃদয়-হৃদয়।” শঙ্খ। যে কবি ধরণীর এই আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করিতে পারেন, তিনিই যথার্থ কবিপদবাচ্য। অক্ষয়কুমার হৃদয়বান বলিয়াই তঁাহার গীতিকাব্যে এমন স্পষ্ট কথা অভিব্যক্ত হইয়াছে। হৃদয় যেখানে হৃদয়ের সঙ্গে কথা কহিতে চেষ্টা করে, কৃত্রিমতা সেখানে আড়ম্বর প্রকাশ করিতে পারে । ভাষার কৃত্রিমতা, ভাবের কৃত্রিমতা, সমানভাবেই অন্তর্হিত হইয়া যায়। অক্ষয়-গীতিকাব্যে ইহারও অনেক পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। এই প্রিয় কবির ‘কনকাঞ্জলির’ নুতন সংস্করণের ভূমিকা লিখিবার প্রয়ােজন ছিল না। কারণ, কনকাঞ্জলি’ বঙ্গসাহিত্যে সুপরিচিত; কিন্তু কবিবর হার এই সুন্দর গ্রন্থের সঙ্গে আমার এই ক্ষুদ্র নামটি সংযুক্ত করিবার জন্য যে অবসর দান করিয়াছেন, তাহা ত্যাগ করিতে পারিলাম না। এই গ্রন্থের সকল কবিতাই পৃথক্ কবিতা, তথাপি সকলগুলির মধ্যেই একটি ভাবের অনুবন্ধ দেখিতে পাওয়া যায়। সে ভাবের প্রবাহ স্বচ্ছ ও অনাবিল ;-তাহাতে গতি আছে, আবৰ্ত্ত নাই ;- উচ্ছ্বাস আছে, তরঙ্গ নাই ;-সংযম আছে, উদ্ধৃঙ্খলতা নাই। এই | গুণে অক্ষয়-গীতিকাব্য অলক্ষিতভাবে পাঠকহৃদয়ে সমবেদনার উদ্রেক করে। তাহা কখনও কখনও চিত্তকে উদাস করিয়া দেয়, কিন্তু কদাপি তীব্র কামগন্ধে ক্লিষ্ট করে না। তাহার প্রেমে লালসা নাই, আত্ম- বিসর্জন আছে। যাহা স্থায়িরস, তাহাই কাব্যের প্রকৃত রস। সে রসে অক্ষয়-গীতিকাব্য চির-অভিষিক্ত। ‘অসমাপ্ত এ চুম্বন, অপূর্ণ পিপাসা। এই ত প্রেমের বন্ধ, বাস্তবে স্বপনে দ্বন্দ্ব, কবিতার চিরানন্দ কল্পিত নিরাশা। খুলে দাও বাহু-পাক, অপূর্ণ—অপূর্ণ থাক ; আজ যদি কেঁদে যাই,-কাল ফিরে আসা। থাকুক পিপাসা। এই ভাবেই অক্ষয়কুমার ভাবিয়াছেন, এই ভাবেই আমাদিগকেও ভাবিতে শিখাইয়াছেন। ইহাতে অতৃপ্তি নাই, পিপাসা আছে ;- অনাসক্তি নাই, আগ্রহ আছে ;-নিরাশা নাই, আশা আছে। আশা আকাঙ্খা হইতে. একটু পৃথ। কেহই কামনাহীন নহে; তথাপি আশায় কেবল বাসনা; আকাঙ্ক্ষায় লালসা। অক্ষয়-গীতিকবিতায় আশা আছে, আকাঙ্ক্ষা নাই ;-বাসনা আছে, লালসা নাই। তাই তাহা সুসংযত, তাই তাহা অনাবিল। আমি কাব্য-সমালােচনায় অনধিকারী। অক্ষয়-গীতিকাব্য ভাল লাগে কেন, তাহারই একটু কৈফিয়ৎ দিলাম। ইহাই আমার ভূমিকা। শ্রীঅক্ষয়কুমার মৈত্রেয়।

কনকাঞ্জলি

Who is a poct needs must understand
Alike both speech and thoughts which prompt to speak.
ROBERT BROWNING.

উৎসর্গ
বিহারিলাল চক্রবর্তী
১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৩০১
নহে কোন ধনী, নহে কোন বীর,
নহে কোন কর্মী-গর্বোন্নত-শির,
কোন মহারাজ নহে পৃথিবীর,
নাহি প্ৰতিমূৰ্ত্তি ছবি ;
তবু কঁাদ কঁাদ, জনম-ভূমির
সে এক দরিদ্র কবি।
এসেছিল সুধু গায়িতে প্রভাতী,
না ফুটিতে উযা, না পােহাতে রাতি-
আঁধারে আলােকে, প্রেমে মােহে গাঁথি,
কুহরিল ধীরে ধীরে ;
ঘুম-ঘােরে প্রাণী, ভাবি স্বপ্ন-বাণী,
ঘুমাইল পার্শ্ব ফিরে।

কনকাঞ্জলি
দেখিল না কেহ, জানিল না কেহ,
কি অতল হৃদি, কি অপার স্নেহ।
হা ধরণী, তুই কি অপরিমেয়,
কি কঠোর, কি কঠিন।
দেবতার আঁখি কেন তাের লাগি
রহে জাগি নিশিদিন ?
মৃত তাের ভক্ত, কঁাদ, মা জাহ্নবী,
মৃত তাের শিশু, কদ, গাে অটবী,
হে বঙ্গ-সুন্দরী, তােমাদের কবি
এ জগতে নাই আর!
কোথায় সারদা-শরতের ছবি,
পর বেশ বিধবার ।
কদ, তুমি কঁাদ। জ্বলিছে শ্মশান,
কত মুক্তা-ছত্র, কত পুণ্যগান,
কত ধ্যান জ্ঞান, আকুল আহ্বান
অবসান চিরতরে।
পুণ্যবতী মার পুত্র পুণ্যবান
ওই যায় লােকাত্তরে !

কনকাঞ্জলি
২১
-
;
যাও, তবে যাও। বুঝিয়াছি স্থির,
মানব-হৃদয় কতই গভীর
বুঝেছি কল্পনা কতই মদির,
কি নিষ্কাম প্রেমপথ !
দিলে বাণীপদে লুটাইয়া শির,
দলি’ পদে পর-মত।
বুঝায়েছ তুমি,কত তুচ্ছ যশ ;
কবিতা চিন্ময়ী, চির-সুধা রস ;
প্রেম কত ত্যাগী—কত পরবশ,
নারী কত মহীয়সী ।
পূত ভাবােল্লাসে মুগ্ধ দিক্-দশ,
ভাষা কিবা গরীয়সী।
;
বুঝয়েছ তুমি,-কোথা সুখ মিলে—
আপনার হৃদে আপনি মরিলে
এমনি আদরে দুখেরে বরিলে
নাহি থাকে আত্ম-পর।
এমনি বিস্ময়ে সৌন্দর্য্যে হেরিলে
পদে লুটে চরাচর।

কনকাঞ্জলি
বুঝয়েছ তুমি,ছন্দের বিভবে ;
কি আত্ম-বিস্তার কবিত্ব-সৌরভে ;
সুখদুঃখাতীত কি বাঁশরীরবে
কঁদিলে আরাধ্যা লাগি’!
ধন জন মান যার হয় হবে-
তুমি চির-স্বপ্নে জাগি’!
-
তাই হােক, হােক। অনন্ত স্বপনে
জেগে রও চির বাণীর চরণে-
রাজহংস সম, চির কলম্বনে,
পক্ষ দুটী প্রসারিয়া ;
করুণাময়ীর করুণ নয়নে
চির স্নেহরস পিয়া !
;
তাই হােক, হােক। চির কবি-সুখ
ভরিয়া রাখুক সে সরল বুক !
জগতে থাকুক জগতের দুখ,
জগতের বিসংবাদ ;
পিপাসা মরুক, ভরসা বাড়ক,
মিটুক কল্পনা-সাধ।

কনকাঞ্জলি
তাই হােক, হােক। ও পবিত্র নামে
কাঁদুক ভাবুক নিত্য ধরাধামে।
দেখুক প্রেমিক, সুগভীর যামে,
স্বপনে জগৎ ঢাকি
নামিছে অমরী, ওই সুর ধরি,
আঁচলে মুছিয়া আঁখি।
তাই হােক, হােক। নিবে চিতানল
কলসে কলসে ঢাল শান্তিজল।
দুখ-দগ্ধ প্রাণ হউক শীতল
কবি-জনমের হাহা !
লওলও, গুরু, মরণ-সম্বল
জীবনে খুজিমে যাহা ।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

উপহার
-
ধর, সখী, কনক-অঞ্জলি।
নহে ইহা ফুলমালা-
আসি নাই দিতে জ্বালা ;
এসেছি বিদায় নিতে, কেঁদে যাব চলি।
তুলিব না পূর্বব-কথা,
সে কেবল মৰ্ম্ম-ব্যথা ;
নাহি সে সময় আর, কারে কি বলি’!
অদৃষ্ট-ঝটিকা-ঘায়
শুষ্ক পত্ৰ উড়ে যায়,
কর্দমে তরুর মূলে, তুমি কুলকলি,
ধর, ধর হৃদয়-অঞ্জলি।
কি দিয়ে শােধিবে দীন
তােমার অশেষ ঋণ!
তবু দিল-যাহা ছিল, মর্মে মর্মে জ্বলি।

কত দিন পরে
কত দিন পরে আজ-- কত দিন পরে,
সে স্মৃতি-কুহকে চিত চমকে আবার!
বিশীর্ণ কল্পনা-কন্তু, কি উচ্ছাস-ভরে,
ছুটিছে কল্লোলি’ আজ প্লাবি’ পারাপার ।
সে চির-মিলন-আশা, দূর বনান্তরে,
মাধবী-বাসর-কুঞ্জ চিছে আমার ।
জাগিছে সে প্রেম-স্বপ্ন নব কলেবরে,-
তরল জ্যোৎস্নায় হেরি’ তােমার আকার !
.
ঘুমায়ে পড়েছে দূরে জগৎ সংসার,
পত্রে পুষ্পে সমাবৃত, মলয়-নিঃশ্বাসে।
বিমুঢ় হৃদয় ভাবে,—কোথা ভাষা তার ।
কি দিয়া নবীন পিক বসন্তে সন্তাষে ?
জানি,—কি বলিতে চাই; জানি না,—কি বলি।
ক্ষম’ এই অক্ষমতা;—সত্যে নাহি ছলি।

কবি
সরল-হৃদয় কবি-
যেখানে মাধুরী-ছবি,
সেখানে আকুল।
পূর্ণিমায় নদীকূলে,
উষালােকে তরুমূলে
কত বকে ভুল।
প্রজাপতি, মৃগ-আঁখি,
ফুলে অলি, ডালে পাখী,
গাছে গাছে ফুল,
দুলে লতা তরু-বুকে,
চকাচকি মুখে-মুখে
দেখিলে ব্যাকুল।

কনকাঞ্জলি
।
রমণী, তােমারে চেয়ে,
ভেবাে না, কি গেল গেয়ে
কি বকিল ভুল!
সরল-হৃদয় কবি-
যেখানে মাধুরী-ছবি,
সেখানে আকুল।

সুখ
এমন চঞ্চল কেন সুখ,
নদী-বুকে যেন ক্ষুদ্র ঢেউ ;
ব্যাকুল লুকাতে সদা মুখ
ধরার সে নহে যেন কেউ।
একা সুখ নাহি পায় সুখ,
তাই সদা পরমুখ চায় ?
তাই কেঁদে ডাকে শত দুখ ?
বাস যথা আপনা বিলায়।
রমণী, তােমার মুখ হেরে’,
সুখ বুঝি এত সুখ পায়-
অত সুখ সহিতে না পেরে,
আত্মঘাতী হয়ে মরে যায়।

বাঁশরী-স্বরে
বাঁধিতেছিলাম মন আপন ঘরে-
কেন গৃহ ছাড়িলাম বাঁশরী-স্বরে !
সম্মুখে প্রমােদ-বন,
ফুটে ফুল অগণন,
উড়ে অলি, নাচে শিখী, হরিণী চরে ;
কেন গৃহ ছাড়িলাম বাঁশরী-স্বরে !
সমীর সুরভি-ভরে
ফুলে ফুলে ঢলে পড়ে,
মৃদু কাপে তরু-লতা, পিক কুহরে ।
আকাশে তারকা কত
চেয়ে প্রেমিকার মত,
ঢলিয়া পড়েছে শশ মেঘের থরে।

কনকাঞ্জলি
৩৩
স্রোতস্বিনী কলস্বর,
আসে ঊষা মনােহরা
আর তার রূপচ্ছটা মেঘে না ধরে ।
এ যে রে সুখের ধরা,
প্রেমের স্বপনে ভরা-
কার বাঁশী গেয়ে গেল কাহার তরে!
বাঁধিতেছিলাম মন আপন ঘরে।

পথে
যেন,
কেন সে চমকি’ ব্রাসে চেয়ে গেল রে !
যেন, মধুর শেফালি-বাসে ছেয়ে গেল রে !
যেন, সুদূর কানন-কথা,
প্রভাত-কাকলি-সম,
সমীর গ্রামের ধারে গেয়ে গেল রে !
গভীর বরষা-রাতে,
মেঘের আড়াল হতে
জগতের পানে চাদ চেয়ে গেল রে !
ভােরে, আধ-ঘুম-ঘােরে,
বাঁশীর গানটী যেন,
ধরি-ধরি না ধরিতে ধেয়ে গেল রে !
একটু অবশ সুখ,
একটু অলস দুখ,
একটী স্বপন-প্রাণ পেয়ে গেল রে !

আঁখি
[ সেলির ভাবানুকরণ ]
আঁখির কি আশা !
প্রভাত-কমল, রসে ঢলঢল,
চেয়ে চেয়ে রবি-পানে—মিটে না পিপাসা,
সারাদিনে মিটে না পিপাসা !
আঁখির কি ভাষা !
পাগল কবির প্রলাপ-সঙ্গীতে
নাহি ফুটে এত ভালবাসা !
একবার চাও !
এ বিষন্ন হৃদি পরে-অ-হারা মেঘ-স্তরে
ইন্দ্রধনু বারেক ফুটাও!
এ জীবন-বর্ষা-শেষে-আলাে-মাখা বৃষ্টি-বেশে
দণ্ড দুই খেলি একবার,
আঁখিতে তােমার!

দেখা
;
নয়নে নিমেষ নাই, কথা নাই মুখে ,
চেয়ে আছি,বুঝিতেছি ; কঁপিতেছি বুকে
বুঝিতেছি,-দেহ চায় দেহের পরশ ;
দাড়াইয়া আছি কাছে,সে যে দুঃসাহস !
দুটী মূর্তি—ছায়া সম ফুটে হৃৎ-কোলে,
বুকে বুকে দৃঢ় বাঁধা, কপােল কপােলে ;
সুখে স্বপ্নে অবসন্ন, অবশ শরীরে
জড়ায়েজড়ায়ে যেন মরিবে অচিরে।

দেখ
এই দেহ,—অতি সুকুমার।
নিজ অনুরূপ করি,
আদরে যতনে গড়ি
দেখান বিধাতা যাহে রূপ আপনার।
এত তরঙ্গের ভঙ্গ,
এত কুসুমের রঙ্গ,
ঘৃণায় কি দেখিলে না তুমি একবার !
এই মন,-অনুপম ভবে।
অলক্ষ্যে আমরী কত
আসে যায় অবিরত,
সম্রমে ভুলিয়া যায় নন্দন-বিভবে।
এত প্রেম, এত আশা,
এত সুর, এত ভাষা,
নিজ করে গড়ি’-কেন হারাও গরবে ।

যদি
আমি যদি হ’তেম ভূপতি,
তুমি হ’তে অনাথা রমণী ;
দাড়ালে আমার দ্বারে,
দিতাম যে একেবারে
তােমার চরণতলে সমগ্র ধরণী।
আমি যদি হ’তেম দেবতা,
তুমি যদি কেঁদে একবার
চাহিতে আকাশ-পানে!
আমি যে বিহ্বল-প্রাণে
পড়িতাম স্বর্গ হতে চরণে তােমার !
তুমি যদি হইতে পুরুষ,
আমি যদি হইতাম নারী
দেখিলে ও ম্লান মুখ,
শতধা হইত বুক,
শতকণ্ঠে বলিতাম,‘আমি যে তােমারি !

[ রবার্ট ব্রাউনিং-এর ভাবানুকরণ ]
এই পথ দিয়ে গেছে,এখনাে যেতেছে দেখা
শত শুভ্র তৃণ-ফুলে চরণ-অলক্ত-রেখা।
এই পথ দিয়ে গেছে,—চেয়ে চেয়ে চারি দিকে,
এখনাে হরিণী চেয়ে পথ-পানে অনিমিখে।
এই পথ দিয়ে গেছে,—ছিড়ে পাতা তুলে’, ফুল ;
নাড়া পেয়ে নাড়া দেয় এখনাে বিহগকুল।
এই পথ দিয়ে গেছে,-গেয়ে গেয়ে মৃদু গান,
এখনাে বাতাসে কাপে সেই গুন-গুন তান।

৪০
কনকাঞ্জলি
এই পথ দিয়ে গেছে,-বসে’ গেছে নদীকূলে,
গেঁথে গেছে ফুলমালা, পরে যেতে গেছে ভুলে।
এই পথ দিয়ে গেছে,—কেঁদে গেছে তরুতলে,
এখনাে সে অশ্রুকণা মিশে নি শিশিরদলে
কোথায় যেতেছে চলে',-কে আমারে বলে দেয় ?
এ অশ্রু কে মুছে দেবে, এ মালা কে তুলে নেয় ?
কি তার মনের কথা ? আমি ত জানি না কিছু!
কে দেখেছে তার মুখ ? আমি যে রয়েছি পিছু।

প্রত্যহ
'
চাহিয়া ঊষার পানে বলি যে হাসিয়া,
স্বপন সফল হবে আজ।
আশায় বঁধিয়া বুক থাকি যে বসিয়া,
সারাদিন শূন্যগৃহ-মাঝ ।
-ফুরায় না তার গৃহ-কাজ !
সন্ধ্যায় নিঃশ্বাস ফেলি,—জীবন বিফল ।
কি কঠোর নারীর অন্তর!
চাহিয়া আকাশ-পানে নয়ন নিশ্চল;
ঝরে অশ্র, হৃদয় কাতর।
—নাহি তার ক্ষণ-অবসর !

তার স্মৃতি
সংসারের আপদে বিপদে
ভাবি যবে,মঙ্গল মরণ;
তার স্মৃতি, এসে আচম্বিতে,
বলে হেসে,
‘মুধুর জীবন।
আছে তার স্মৃতি,
বাঁচিব গাে সয়ে।
সংসারের আনন্দে সম্পদে
ভাবি যবে,—মধুর জীবন ;
তার স্মৃতি, হৃদয়-নিভৃতে,
বলে কেঁদে,মঙ্গল মরণ!
কোথায় বিস্মৃতি।
বাঁচিব কি ল’য়ে ?

সন্ধ্যায়
আয় স্মৃতি, প্রীতির নন্দিনী।
পর্বত-শিখর হতে তটিনীর কলস্রোতে
শুনিতেছি যেন তাের মৃদু পদধ্বনি।
তরুর মৃদুল শ্বাসে, ফুলের মধুর বাসে,
সন্ধ্যার বাতাসে যেন তাের কণ্ঠ শুনি।
আয় মেহরাণী ।
আয় স্নেহরাণী ।
জেগে জেগে সারাদিন অতি শ্রান্ত, দীনহীন
ঘুমায়ে পড়েছে বুকে কল্পনা-কামিনী ;
মুখখানি তুলে তার, ডাক তারে একবার,
উঠিলে উঠিতে পারে তাের কণ্ঠ শুনি
আয় মেহরাণী ।

০৪
আয় মেহরাণী ।
কত-না যতন করে’ পেতে দেছি তাের তরে
কোমল অশ্রুর শয্যা—ভাঙ্গা হৃদিখানি।
তায়, বুকে শুয়ে থাক, এ জীবন হয়ে যাক
বরষা-রাতের এক স্বপন-কাহিনী।
নিশি যেন না পােহায়, পাখী যেন নাহি গায়,
আঁধারে মিলায়ে যায় জীবন এমনি !
আয় মেহরাণী ।

স্বপ্ন-রাণী
ঘুমন্ত চাদের বুক হতে,
ভেসে ভেসে জোছনার স্রোতে,
মুক্ত বাতায়ন দিয়া, তরাসে কম্পিত-হিয়া,
আসি, প্রিয়, তােমায় দেখিতে ।
ধীরে পড়ে বায়ুর নিঃশ্বাস,
মৃদু কঁাপে ফুলের সুবাস ;
ছােট ছােট তারাগুলি [মে পড়ে ঢুলি’ ঢুলি,
কাপে চোখে সরমের হাস।
নদী-পারে ডাকে পাখী আধ-ঘুমে থাকি থাকি,
কু-কুল নদী বহে যায়;
তীরে তীরে তরু-কোলে কুমিতা লতা দোলে,
জগৎ ঘুমায়।
আসি, প্রিয়, দেখিতে তােমায় !

৪৬
কনকাঞ্জলি
;
যখন গাে হৃদয় ঘুমায়-
বাসনা ঘটনা যত, সমীরে সুরভি মত,
নীরবে দুটীতে মিশে যায়
ভাসা-ভাসা কথা শত, নদীতে ঢে’য়ের মত,
হেথাহােথা ভাসিয়া বেড়ায় ;
কে আপন, কেবা পর, কাহারে করিবে ভর
হৃদয় বুঝিতে নাহি চায় !
স্বপনের মত হয়ে, হাতে প্রেম-মালা লয়ে
আসি, প্রিয়, দেখিতে তােমায় !
.
আসি, প্রিয়, দেখিতে তােমায়।
যাই-যাই, নাহি বল, চোখে ভরে আসে জল,
হৃদয় কঁপিয়া উঠে সন্দেহে লজ্জায়।
আর বার মনে হয়, কেন লজ্জা, কেন ভয় ?
নয়নে লিখিয়া দেই অলক্ষ্য চুম্বনে,
যে প্রেম ফুটে না কভু নারীর বচনে ।

প্রভাতে
কে ভাঙ্গিল হৃদয়-কানন ?
সাধের অস্ফুট ফুল-বন !
জানি কে দেববাল।
ভরিতে ফুলের ডালা,
এসেছিল নিশীথে কখন!
শাদ্বলে যেতেছে দেখা
ঈষৎ গুলফের লেখা ;
শিলাসনে তনু-নিরূপণ।
পূর্ণিমায় ফুল্ল হিয়া,
দেখে নাই বিচারিয়া,
ছিড়েছে মুকুল অগণন !

৪৮
কনকাঞ্জলি
কে জানে নারীর খেলা,
কিসে সাধ, কিসে হেলা-
কে জানে কেমন নারী-মন !
কোন কথা নাহি বলি,
পদতলে গেল দলি
কত শ্রম, বাসনা, যতন !

নিদাঘে
দিয়েছিলে জ্যোৎস্না তুমি, নিয়ে আছি অন্ধকার ;
দিয়েছিলে ভালবাসা, নিয়ে আছি হাহাকার।
তুমি বেঁধেছিলে বীণা, আমি যে ছিড়েছি তার,
ভ্রমর গুঞ্জন করি’ আসে না ত কাছে আর!
ক
উষার মতন হেসে—ধরা আলাে করে এলে,
গেলে বিদ্যুতের মত,—শত বজ্র পাছে ফেলে !
কোথা সে প্রভাত-স্বপ্ন, কোথা সে সন্ধ্যার গান,
কোথা সে পৃৰ্ণিমা-নিশি—চেয়ে চেয়ে অবসান!
এস বর্ষা, এস তুমি,তুমি নিদাঘের শেষ,
ল’য়ে এস অন্ধ নিশা-ঘুচাও এ মৃত্যু-ক্লেশ !
তৃষায় ফাটিছে প্রাণ—কোথা প্রেম-পুণ্যজল !
চারি দিকে মরীচিকা হাসিতেছে খলখল।
৪

দুঃখ
v
গােলাপ সুন্দর অতি,
সকণ্টক বৃন্তে ফুটে ;
নিঝর মধুর-গতি,
রুক্ষ গিরিপথে ছুটে ;
কমল সুগন্ধে ভরা,
জনমে পঙ্কিল সরে ;
ঘুরে জীবপূর্ণ ধরা,
জীব-শূন্য কক্ষ পরে।

কনকাঞ্জলি
কোকিল--অখিল-রব,
শীতের মরণে উঠে;
তারকাখচিত নত
অমার আঁধারে ফুটে;
শশিকলা মনােহর
লুটে অন্ধ মেঘদলে ;
সহি শত মৃত্যু-জরা,
তাসে জীব ধরাতলে।
ঝটিকার পাছে আসে
হিল্লোলি’ সমীর ধীর ;
বন্যার প্লাবন-পাপে
কল্লোলি’ শীতল নীর ;
রণ পরে শান্তি-সুখ,
ভ্রান্তি পরে স্বস্তি-গান ;
তাপ-দগ্ধ প্রৌঢ়-বুক
শিশুর ক্রীড়ার স্থান। /

১২ কনকাঞ্জলি মুছি তবে নেত্ৰজল- অদৃষ্টের এ বিপাক ! ভাঙ্গে যদি মৰ্ম্মস্থল কি করিব ?—ভেঙ্গে যাক! নিশার পাণ্ডুর মুখ, হেরি’ দূরে সূৰ্যরথ ; যুঝুকযুঝুক দুখ সুখে মাের দিতে পথ ! দহিয়া বিরহ-দাহে হােক আরো শুদ্ধ প্রাণ ;- প্রেমময়ী, পার যাহে করিবারে অধিষ্ঠান। কত যুগে—দাও বলে, কিংবা জন্ম পরে কত কত দুখে জ্বলে জ্বলে হব তব মনােমত।

কঁদিতে পার
কঁদিতে পার’ গাে যদি চিরকাল নিতি নিতি,
এস তবে এস, সখা, দুজনে করি পিরীতি।
মিলনে নাহিক সাধ,
সে কেবল অপবাদ ;
র’ব মােরা দূরে দূরে, র’বে সুধু সুখ-স্মৃতি।
মিলনের তরে মন দিবে আকাশে চাহি,
বুঝাইব দীর্ঘশ্বাসে, -জগতে মিলন নাহি।
এ ধরা মাটীতে গড়া,
নর-নারী স্বার্থে ভরা ;
এ নহে নন্দনবন, হেথা আছে লােক-ভীতি।

৫৪
কনকাঞ্জলি
চোখে উছলিবে জল, মুখে ফুটিবে না কথা,
অন্তরে পিপাসা আশা, সম্মুখে বিরহ-ব্যথা।
কাছে আছ, তবু নাই !
আরাে চাই—আরাে চাই।
দিয়েছ, নিয়েছ সব—তবুও অভাব-গীতি !
মিলন নরক-দাহ—আমরণ হাহাকার,
নিমেষ-চঞ্চল-সুখে বুকে চির অগ্নি-ভার।
বিরহ-মথিত প্রেম,
অনল-কষিত হেম!
দিও না কলঙ্ক-ডালি তুলে’ শিরে, হে অতিথি !
এ নহে প্রেমের রীতি।

অঞ্জ
হৃদয়ে বেঁধেছি, সখী, বল ;
মুছ আঁখি-জল।
দাও-দাও, ছেড়ে দাও, যেথা ইচ্ছা—দূরে যাও;
প্রেম যদি কলঙ্ক কেবল
এ প্রেমে কি ফল ?
যদি এ মমতা-মায়া,
শুধু আলেয়ার ছায়া,
জীবন শ্মশান করি’,—বিভীষিকা-স্থল ;-
এ প্রেমে কি ফল?
ওই বিন্দু-মুকুতায়
মুহ আঁখি-জল।
ব্ৰহ্মাণ্ড গলিয়া যায়-
এখনি সঙ্কল্প হবে নিমেষে বিফল।
সংযম হারাবে মন, গ্রহে গ্রহে সংঘর্ষণ,
জগতে উঠিবে জ্বলি’ প্রলয়-অনল ।
মুছ আঁখি-জল।

এত বুঝি
এত বুঝি, এত সহি,
তবু তবু-প্রেমময়ী।
আবার সে ভুল !
আবার মিলন-আশে,
আবার বিরহ-শ্বাসে
হৃদয় ব্যাকুল।
আবার ভাবিছে মন,
এই প্রিয়া-সম্বােধন,
এই দীর্ঘশ্বাস,
পার হয়ে গিরি-নদী,
তব কর্ণে পশে যদি
কি অদ্ভুত আশ ।

কনকাঞ্জলি
বিরক্ত কি হবে তায় ?
বায়ু ত লইয়া যায়
কত পিক-স্বর ;
চন্দ্রমা ত দূরে রয়ে
চেয়ে থাকে মুগ্ধ হয়ে
আমি
শুধু পর !
নদী মত উছলিয়া
পড়ি না চরণে গিয়া,
লুটায়ে হৃদয় !
সার্থক হউক জন্ম,
সার্থক এ ধৈৰ্য্যধৰ্ম্ম,
সার্থক প্রণয় !
এ কি—এ কি আশা-ঘাের !
কোথা সে দৃঢ়তা তাের,
হ বিকল মন!
সহিতে জন্মেছি ভবে
আমৃত্যু সহিতে হবে—
কেন দুঃস্বপন ?

৫৮
কনকাঞ্জলি
হও, মন, হও স্থির,
হের—হের কি গম্ভীর
মরু-অহরহ;
কি নিষ্কাম মহাতপ,
কি নীরব মন্ত্র-জপ,
কি আত্ম-নিগ্রহ।
ভয়ে জীব যায় দূরে,
নিঃশ্বাসে ঝটিকা উড়ে,
দৃষ্টিতে প্রলয় ;
বুকে চির মরীচিকা
নাহি ত্যাগ-অহমিকা!
-প্রণম’, হৃদয় !

ও কথা
ও কথায় কাজ নাই আর।
আকাশে না দেখি ইন্দু,
এখনি হৃদয়-সিন্ধু
কঁদিবে করিয়া হাহাকার !
ও কথায় কাজ নাই আর।
হেমন্ত কুয়াসা মত
মশঃ বাসনা যত
হতেছে অস্পষ্ট অন্ধকার।
ও কথায় কাজ নাই আর।
ডুবিতেছে কাল-নীরে,
ডুবে যাই ধীরে ধীরে ;
কার আশা কন হাহাকার?

যাই
তরুণী বাহিয়া,
তরুছায়া দিয়া।
পশ্চিম-আকাশে
মেঘ-খণ্ড ভাসে;
অরণ্য দুধারে
শ্বসিছে আঁধারে।
ভগ্ন উচ্চ তীর,-
কৃষক-কুটীর ;
তুলসীর তলে
সন্ধ্যাদীপ জ্বলে।
দীর্ঘশ্বাস সনে
কত ভাবি মনে,
কৃষক-সংসার,
আর-আর

কনকাঞ্জলি
ঘুরি যাহা খুজি’,-
হেথা আছে বুঝি ?
সে উপকথায়
দিন যেন যায় !
বাহি তরী ধীরে,---
নিস্তব্ধ তিমিরে
অশ্বথ নিবিড়,
প্রাচীন মন্দির।
পলাল শৃগাল,
ডাকে ফেরুপালি।
গ্রাম-মধ্য হতে
আসে বায়ুস্রোতে
সংকীৰ্ত্তন-ধ্বনি—-
গভীরা রজনী।
অবসন্ন মন,-
এই কি জীবন?

আয় ঘুম
আয়, ঘুম আয় !
চেয়ে আছি সারা রাত, বুকে দুটী দিয়ে হাত,
দীর্ঘশ্বাসে বুক ভেঙ্গে যায়।
আয়, ঘুম আয়!
ফুটে ডুবে কত তারা, ক্ষীণ শশী রশ্মি-হারা,
হিম-স্তব্ধ বায় ;
তরুলতা উঠে শ্বসি’, পত্র পুষ্প পড়ে খসি’,
তটিনী উছলি’ পড়ে পায়-
রজনী পােহায়।
আয়, ঘুম আয় !
বড় শ্রান্ত আমি এ ধরায়।
বড় শান্ত চেয়ে চেয়ে, বড় শ্রান্ত গেয়ে গেয়ে
সুখে, দুখে, প্রেমে, কল্পনায়।
বুকে মাথা রাখ ভুলে, অকূলে দেখা রে কূলে।
ঢাক মেহ-ছায়।

কনকাঞ্জলি ৬৩ আয়, ঘুম আয় ! ঘূথিকা শুকায়, ঢাকিস পাতায় ; ঢেকে দে আমায় ! বিষন্ন তারকা মেঘে দিস ঢাকা ; ঢেকে দে আমায়! তটিনী লুকায়, ধরণী লুকায়, তাের কুয়াশায় ; লু’ রে আমায় ! জগতের দূরে, ওই মেঘ-পুরে, নিয়ে যা আমায়- এ জগৎ যােক তাের স্বপ্ন-শােক- রচিত মিথ্যায় ।

অবশেষ
ধীরে ধীরে, নেমে নেমে, থামিয়া গিয়াছে গান ;
বুকে ঘুরে পথ-হারা এখনাে একটী তান।
কবিতা গিয়েছি ভুলে,
দুটী ছত্র মনে দুলে ;
মুছিয়াছি আঁখি, তবু—আসে অশ্রু আঁখি-কোণে ;
অলক্ষিতে পড়ে শ্বাস, শূন্যে চাই শূন্যমনে।
শুকায়েছে ফুল-হার,
একটু সুবাস তার
এখনাে বাতাসে যেন আসিতেছে ভাসি’ ভাসি’ ;
যে যাহার গেছে চলে,
আমি পড়ে’ তরুতলে ;
ডুবিয়া গিয়াছে জ্যোৎস্না,সম্মুখে আঁধার-রাশি।

কনকাঞ্জলি
ডুবিলে রক্তিম রবি, পশ্চিমে সঁঝের বেলা
দুটী শেষ-রশ্মি-রেখা খেলে ত মরণ-খেলা!
আকাশে চন্দ্রমা-হারা-
পড়ে থাকে শুকতারা ;
বিজলী ছলিয়া যায়, কাদে মেঘ ঝরি’ ঝরি’ ;
বসন্ত জ্বলিয়া যায়, থাকে শুষ্ক পাতা পড়ি।
স্বপন চলিয়া যায়,
তন্দ্রা করে হায় হায় !
প্রিয়তমা চলে গেছে, পড়ে আছে প্রেম-স্মৃতি
কখনাে কল্পনা সম, কখনাে কবিতাকৃতি !

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

আমার এ কাব্যে আমার এ কাব্যে আজ,--আপনা হারায়ে, দেছি মাের সর্বস্ব জড়ায়ে। যদি এ কবিতা সম হ’তে তুমি, প্রিয়া মম, কোন্ দিন ভেঙ্গে গড়ে’--হৃদয় তােমার লইতাম করি আপনার ! বৃথা গাঁথি ভাবে শব্দে তুমি কত দূরে, না জানি কাহার অন্তঃপুরে ! নিশীথে পাপিয়া তানে এ গান কি পশে কাণে? এ প্রেম কি জাগে প্রাণে, হেরি’ নিশা-শেষে ম্লান জ্যোৎস্না পড়ি’ দ্বারদেশে ?

৭০ কনকাঞ্জলি কোন দিন কাব্যখানি-দিন যদি পায়- হাতে শুয়ে মুখ-পানে চায় ! আগ্রহে আশায় ভুলি চাহিবে কি বর্ণগুলি ? কঁদিবে কি ছত্রগুলি বিরহ-ব্যথায় – চিত্ত মাের পাতায় পাতায় ?

কবিতা আসিছে কিশােরী, বনপথ দিয়া, নতমুখী কত লাজে । নবীন হৃদয়ে নবীন প্রণয় মৃদুল মধুর বাজে। কটিতটে দুলে মাধবী-মেখলা, উরসে বেলার মালা ; নীল-বাসে ঢাকা তনু-গৌরীলতা— জলদে তড়িৎ-জ্বালা। বকুল-সিথীটী পড়িছে সরিয়া, অলকে অ ক-দাম ; -সুরভি নিঃশ্বা দুলিছে মােলক, আঁখি-পদ্ম অভিরাম।

૧૨ কনকাঞ্জলি। পড়িছে খসিয়া বেণীর মল্লিকা, দুলিছে কর্ণিকা-দুল ; বাম করে ঝরে রসাল মঞ্জরী, দক্ষিণে পলাশ-ফুল। ফুল-ধনু সম সুভুরু দু’খানি, কপাল অরধ-চঁাদ ; চিবুকে শােভিছে মৃগমদ-বিন্দু, নয়নে কাজল-ফাদ। চম্পক-বরণ চরণে নূপুর- গুঞ্জরে মধুপ-দল ; পদ-পরশনে শিহরে ধরণী, তৃণ আরাে সুকোমল ! : কত সুখ-আশে, কত লাজে ত্রাসে, আশে-পাশে দূরে চায় ! নব কুরুবক ফুল্ল মুখখানি গােলাপে রাঙ্গিয়া যায় ।

কনকাঞ্জলি সম্মুখে সরসী, বিমল আরসী, রূপ-আভা পড়ে জলে ! বকুলের ছায়া কূল হতে সরে, ফুটে পদ্ম দলে দলে। টগর-কিরীটে ঊষার কিরণ উছলি’ পিছলি’ লুটে ; মিলাল কুন্দের মধুর হাসিটী কুসুম্ভ-অধরপুটে! চকিত নয়ন-- সভয় ভ্রমর আকাশে উড়িতে চায় । কোথা ভাব সখী, ভাষা সহচরী। কে পথ দেখাবে তায় ? – পড়িল বসিয়া তমাল-তলায় হৃদয়ে বিধিছে কি যে ! শিথিল শরীর, শ্লথ কেশ-বেশ, শিশিরে আঁচল ভিজে।

৪ কনকাঞ্জলি তরু লতা পাতা জিজ্ঞাসে বারতা, হরিণী বিস্ময়ে চায় ; তটে উথলিয়া কাঁদিছে তটিনী, সিছে কাতরে বায়। কে পথ দেখাবে, কেবা সাথে যাবে যাবে কোন্ স্বর্গপুরে ? জগতের জীব জানে না ত্রিদিব, নিজ সুখ-দুখে ঘুরে। বসন্ত পলা’ল, মলয় লুকাল, তুমি কি দেখ নি চেয়ে ? কত ফুল ফুটে’ পায়ে যে লুটাল, কত পাথী গেল গেয়ে !

বরণ ধর, ধর হৃৎ পুষ্প, লহ উপহার! আজি এ মধুর প্রাতে, মধুর প্রভাত-বাতে, কি শুভ সংবাদ আসে প্রেম-দেবতার ! গােপনে আপনে, নারী, আর না রাখিতে পারি- ছুটে কি আকুল শ্বাস আশা-মলয়ার! বুঝি দলে দলে ফুটে পূর্ণ হয়ে পড়ি লুটে’ টুটে’ পড়ে চারি ধারে সর্বস্ব আমার । তুলিতে তুলিতে ফুলে লই গাে আমারে তুলে’-- গাঁথিয়া পর’ গাে গলে প্রেম-ফুলহার! = ৭৬ কনকাঞ্জলি ধর, ধর হৃৎ-পুষ্প, লহ উপহার! তুমি স্বর্গ-বনদেবী ভ্ৰমিছ সমীর সেবি’, আমি মন্দাকিনী-কূল-নবীন-মন্দার,- জন্ম-জন্মান্তর ধরি আশা স্মৃতি জড়’ করি’ গড়িয়াছি তােমা তরে স্বপন-সম্ভার ! তুমি পরিমল-সুখে আদরে দুলাবে বুকে, পবিত্ৰকৃতার্থ হব পরশে তােমার! রাখ কিংবা দল’ পায়- কিবা তায় আসে যায় ? তােমারি একান্ত আমি-স্বতঃ উপহার সংশয়-দৃষ্টি কেন—কেন নিমীলিত নয়ন-পল্লব- অসহ কি শুভ বৰ্তমান ? নয়নে নয়নে এই নব অনুভব, প্রাণে প্রাণে আকুল আহ্বান! এ কি লজ্জা ?—কই কোথা আরক্ত কপােল, স্কুরিত অধরে স্থির হাস? সুধার সাগরে সেই সুপার হিল্লোল- জীবনের জড়ত্ব-বিনাশ!

৭৮ কনকাঞ্জলি এ যে রে সংশয়-দৃষ্টি-সংঘর্ষ বিষম, বর্তমানে ভবিষ্য-সন্ধান! . রুধি’ রবি-শশী-আলাে-সুখ-দুখ-ভ্রম, মুহূর্তের প্রাধান্য-প্রদান। - কি দেখিলে ? কি বুঝিলে? বল বল, প্রিয়া, প্রণয়ের কোন্ পথ শ্রেয় ? জীবন যৌবন ওই তুলাদণ্ডে দিয়া, এ প্রতীক্ষা—অতি ঘৃণ্য হেয় !

সম্ভাষণ শ আসি নাই ছলিতে তােমায়। ও মুখ হেরিয়া আজ মনে হয়,তীর্থ ঘুরি’ আসিয়াছি দেশে পুনরায়। প্রেমিক ত সদা চায় মিশে যেতে প্রেমাস্পদে- আপনারে বিলালে সে বাঁচে। মিলনে মিটে না আশা, বিরহে দারুণ তৃষা,- নিঃস্বার্থ ভাবিয়া স্বার্থ যাচে। দাও শিক্ষা, রূপবতী, যেখানে থাক না তুমি, হেরি আমি সৌন্দর্য্য তােমার ? ডুবিয়া তােমার রূপে ভুলিয়া আমার সত্তা, তােমাময় হেরি ত্রিসংসার। জপিয়া বিন্দুরে এক ব্যাপ্ত হই বিশ্বময় শিখা রে--শিখা সে প্রেম-যােগ ? ঘুচে যাক জীবনের সদা সুখ-অন্বেষণ জন্মগত চির স্বার্থবােগ ।

৪০ কনকাঞ্জলি জন্মিয়া অনন্ত-মাঝে, বাড়িয়া অনন্ত-মাঝে, অনন্তের হয়ে অবতার- তুচ্ছ সুখে দুঃখে আর আত্মঘাতী হই কেন,- কেন্দ্র করি’ দেহ আপনার ? ধূমায়িত দীপ-শিখা দাও-দাও নিবাইয়া, উঠুক—উঠুক ঊষা হেসে ! পঙ্কিল সরসীকূলে রেখ না ডুবায়ে আর, যাই-যাই পারাবারে ভেসে ! চরণে বিশাল পৃথী, পশ্চাতে উত্তঙ্গ গিরি, শির’পরে উদার আকাশ- দাড়াও, শুভদা দেবী, মুক্তকেশে হাসিমুখে, বাসনার হােক সববনাশ ! দাও সে অজর প্রেম, দেবতার পুণ্যভাগ চিরশুভ, সুন্দর, মহান্ । লও, এ হৃদয় লও, হৃদয়-সর্বস্ব লও তােমার পদে বলিদান।

মিলনে কভু নয় ? এই কি ধরণী সেই, স্বর্গ নহে কল্পলতা-কুঞ্জ, এ কি সে কানন ? নহে মন্দারের শ্রেণী এ তরুনিচয় ? নহে বিধাতার মুর্তি, এ কি সে তপন ? নহে অস্পরার শ্বাস, বহে কি মলয় ? নহে দেববীণা-ধ্বনি, ভ্রমর-গুঞ্জন ? এ কি নহে মন্দাকিনী, সে জাহ্নবী বয়? এ কি আমি সেই দেহ, সেই প্রাণ মন! বল, সখী, সত্য তুমিনহ গাে কল্পনা! সত্য-ধ্রুব সত্য এই হৃদয়-মিলন। স্বপন-ছলনা নহে,-এ প্ৰেম-চেতনা, জীবনের অন্তরালে অনন্ত জীবন। দরশে পরশে আমি হারায়ে আপন, পাতিয়াছি দেহে মনে তব পদ্মাসন।

শত নাগিনীর পাকে শত নাগিনীর পাকে বাঁধ’ বাহু দিয়া, পাকে পাকে ভেঙ্গে যাক এ মাের শরীর এ রুদ্ধ-পঞ্জর হতে হৃদয় অধীর পড় ক ঝপায়ে তব সর্বাঙ্গ ব্যাপিয়া। হেরিয়া পূর্ণিমা-শশী—টুটিয়া লুটিয়া সুভিয়া প্লাবিয়া যথা সমুদ্র অস্থির ; বসন্তে--বনান্তে যথাদুরন্ত সমীর সারা ফুলবন দলি’ নহে তৃপ্ত হিয়া। v এ দেহ পাষাণ-ভয় কর গাে সত্তর ! হৃদয়-গােমুখী-মাঝে প্রেম-ভাগীরথী, ক্ষুদ্র অন্ধ পরিসরে ভ্রমি নিরন্তর হতেছে বিকৃত ক্রমে, অপবিত্র মতি। আলােকে পুলকে ঝরি’, তুলি কলস্বর করুক তােমারে চির নিন্ম-জাতি।

এখনাে রজনী আছে এখনাে সুদীর্ঘ ছায়া ঢাকি’ তরুমূল ; এখনাে সুদূর বাঁশী আলাপে মধুর ; এখনাে ঝরিছে জ্যোৎস্না মলিন বিধুর ; এখনাে বহিছে ঝরা করি’ কুলু-কুল। এখনাে টুটিছে ফুল, ফুটিছে মুকুল; এখনাে দেখিছে গিরি রবি কত দূর ; এখনাে সুমন বায়ু সুগন্ধ-আতুর- কেন তুমি, বনযুথী, সরমে আকুল ! সুপ্ত-অলি-বন্ধ-পদ্মকলিকা-নয়নে রও, চির চেয়ে রও, লাে মধুযামিনী! অতনু-কম্পিত তনু,অতৃপ্ত শপনে আঁধ’ চির-আলিঙ্গনে, কুসুম-কামিনী ! এখনাে দেবতা আঁখি জাগিয়া আকাশে; এখনাে দেবতা-শ্বাস ভাসিছে বাতাসে।

যেও না যেও না-যেও না তুমি, মলয়-সমীর, নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে তব করিয়া অধীর ! শত ফুলরেণু-চাপে এ দেহ আবেশে কঁাপে । যেন কার অভিশাপে নীরবে যেতেছে প্রাণ হইয়া বাহির । তুমি, ফুলবন-সাথী, কোথা যাবে, হায় ! এ দেহে চেতনা নাই, কে দিবে বিদায় ।

আসি তবে আসি তবে, প্রেম-নিশা বুঝি বা পােয় । প্রত্যক্ষ আগত-প্রায়, ভাষা আর না জুয়ায়, শপথে সন্দেহ হয়—বিদায়, বিদায়। ভাঙ্গিছে কল্পনা-ভ্রান্তি, আসে বুঝি সুখ-শান্তি ; আসিলে বিরক্তি ঘৃণা র’বে না উপায় ! বিদায়, বিদায়! অসমাপ্ত এ চুম্বন, অপূর্ণ পিপাসা। এই ত প্রেমের বন্ধ, বাস্তবে স্বপনে দ্বন্দ্ব, কবিতার চিরানন্দ কল্পিত নিরাশা! খুলে দাও বাহু-পাক, অপূর্ণ—অপূর্ণ থাক; আজ যদি কেঁদে যাই,কাল ফিরে আসা থাকুক পিপাসা।

কনকাঞ্জলি থাকিতে সময় তবে বিদায়, ললনা । মিলন চঞ্চল অতি বিরাগ-সমুদ্রে গতি ; আর কেন স্বপ্নে মাতি থাকিতে চেতনা ! দেখিছ না পলে পলে প্রেম মৃত্যুপথে চলে ভুলি’ বৰ্তমানক্রমে ভবিষ্য-ভাবনা! বিদায়, ললনা ! হা হৃদয়, বিনিৰ্ম্মিত রক্ত-মাংস-মেদে! পরিমলে কুতূহলী, ফুলে শেষে পদে দলি; তৃপ্তির নরকে জ্বলি অতৃপ্তির খেদে। বুঝি না সঞ্চারী পরে স্থায়ি-রস মূৰ্ত্তি ধরে ; অসীম মিলন ফুরে সসীম বিচ্ছেদে।

বিদায় যে কথাথাকিতে প্রাণ --ফুটিবে না মুখে, পলে পলে বুঝিতেছে কিন্তু প্রাণ মন! দেখ, এই দিবালােকে অশ্রু মুছি’ স্থির চোখে, হৃদয়ে প্রলয়-ঝড়, অন্ধ দু’ নয়ন! যে অধর কঁপিতেছে বলিবার তরে, সে অধরে একবার করলাে চুম্বন! শিরায় শিরায়, বালা, দেখ কি বিদ্যুৎ-জ্বালা ; সানলে দেহে মনে সজ্ঞানে দহন ।

৮ কনকাঞ্জলি কি দিব বিদায়-চিহ্ন, তুমি তুলে’ লও বকুল চম্পক বেলা তােমারি সকল ! ধরার বসন্ত বটে, আমি বৈতরণী-তটে খুঁজিতেছি কোথা মৃত্যু তুষার-শীত === যাও তবে কি বলিব! কভু কোন দিন শুন যদি অভাগার হয়েছে মরণ,- একদিন ধরাতলে, এক বিন্দু নেত্ৰজলে তৃষাহত প্রণয়ের করিও তর্পণ।

দু’ দিকে দু’ দিকে ফিরাল মুখ নীরবে দু’ জন, জন্ম মত পরস্পরে চাহি' একবার। পড়িল গভীর শ্বাস, মুছিল নয়ন, ঘুচিল না নয়নের তবু অন্ধকার ! রহিল পড়িয়া পিছে পুষ্পিত কানন, সম্মুখে অপরিচিত সুদীর্ঘ সংসার। যায়—যায়—তবু যায়, বাধিছে চরণ, কে জানে পৌছিবে কি না গৃহে যে যাহার । যায়—যায়—তবু যায়, বিশুদ্ধ নয়নে রাখিয়া কলঙ্ক-রেখা সরে গেছে জল। যায়—যায়—শূন্যে চায়, অতি শূন্য মনে, ছিন্ন ভিন্ন চূর্ণ সব, শূন্য ধরাতল! চুম্বন-চিহ্নটী সুধু অধর-শয়নে, জীবনের চিরস্মৃতি, মরণ-সম্বল। === সে নেত্রে সে বিশাল-নেত্রে কাল সব মনঃপ্রাণ দিতাম ঢালিয়া যদি চুম্বনে চুম্বনে ! নির্লিপ্ত-নয়নে চেয়ে, চঞ্চল-চরণে পলা’ত না দূরে আজ হরিণী-সমান। ঝরিত সে আঁখি হতে কত গীতিগান, সুখে স্বপ্নে মুগ্ধ করি’ প্রেমলুব্ধ জনে! প্রশান্ত জলদ সম নয়নে নয়নে ঘুরিত--ফিরিত সদা কি কাব্য মহান্ ! পূর্ণেন্দু-কিরণে যথা নীল সিন্ধুজল ঝকঝক জ্বলে,—শত বিজলী-প্রতিমা। প্রভাত-কিরণে যথা নব মেঘদল,- প্রান্তে লুটে রৌপ্য-হাসি, স্বর্গ-মধুরিমা। বসন্ত-মিলনে ধরা শ্যামল বিল রূপসী লভিত, আহা, প্রেমের মহিমা !

হেমন্তে আকাশ হতেছে ক্ৰমে কুক্সটি-মলিন, নিষ্প্রভ হতেছে শশী, সুদীর্ঘ রজনী ; নিশা-শেষে অশ্রুকণা ফেলিছে ধরণী ; সমীর শীতল ক্রমে, মৃত্তিকা কঠিন। সন্ধ্যার আঁধার মুখ, তারা রশ্মিহীন ; তরুলতা শুদ্ধদেই,শুষ্কপত্র মূলে ; স্রোতস্বতী শীর্ণ-কায়া-হংসী নাহি কূলে ; ক্ষেত্র বিদারিত-দেহ, ক্রমে ক্ষুদ্র দিন। হৃদয়, উঠ রে উঠ, বৃথা আর বসি, বৃথা এ মমতা-গীতিকাতর ক্রন্দন ! বৃথা এই সযতন স্বপন-কর্ষণ- নির্গন্ধ কুসুম সম পথ চেয়ে শ্বসি। দেখিবে না—বুঝিবে না আমারি প্রেয়সী, যদিও আমার দুখে কাদে বিশ্বজন।

হৃদয় সমুদ্র সম হৃদয় সমুদ্র সম আকুলি’ উচ্ছ সি’ আছাড়ি’ পড়িছে আসি’ তব রূপ-কূলে ! হৃদয়-পাষাণ-দ্বার দাও-দাও খুলে’! চিরজন্ম লুটিব কি ও পদ পরশি’ ? অনুদিন-তানুক্ষণ দুরাশায় শসি’ বৃথায় পশিতে চাই ওই মৰ্ম্ম-মূলে ! লক্ষ্যহীন-নেত্রে, নারী, সাজি’ নানা ফুলে, মরণ-লুণ্ঠন হের,—স্থির গর্বে বসি’! কি মমত্ব-হীন তুমি, রমণী-হৃদয় ! এত বর্ষে, এই স্পর্শে, এ চির-ক্রন্দনে, এত ভাষ্যে, এই দাস্যে, এ দৃঢ়-বন্ধনে,- দানব সদয় হয়, ব্ৰহ্মাণ্ড বিলয়। বিফল উদ্যম, শ্রম, বিক্রম, বিনয়- নিত্য পরাজিত আমি তােমার চরণে!

প্রেম কি বুঝান যায় প্রেম কি বুঝান যায় ? নয়নে নয়নে না মিলিল যদি, কেমনে বুঝাব তায় ? চলিয়া সে যায়, ফিরিয়া না চায়, আমি শুধু চেয়ে থাকি বুঝিতে চাহিলে সকলি বুঝি, আঁখিতে মিলিত তাঁখি । প্রেম কি বুঝনি’ যায় ? নিশাসে নিশাসে বুক ভেঙ্গে আসে, কেমনে বুঝাব তায় ?

কনকাঞ্জলি দাড়াইলে কাছে, দুরুদুরু হিয়া, গুরু-গুরু গরজন ; বুঝিতে চাহিলে সকলি বুঝি, দেহে মনে প্রাণপণ ! = প্রেম কি বুঝান’ যায় ? কথায় কথায় মরম-ব্যথায় কেমনে বুঝাব তায় ? বলি-বলি কত, মুখখানি নত, অধরে উঠে না ফুটি’ ; বুঝিতে চাহিলে সকলি বুঝি, হৃদয়ে পড়িত লুটি’! প্রেম কি বুঝান যায় ? আভাসে বিশ্বাসে যদি না বুঝিল, কেমনে বুঝাব তায়? কোথা তার আদি, কোথা তার অন্ত, কোথা তার মধ্যদেশ! একে সদা, হায়, অন্য হয়ে যায়, এত লাজ-ভয়-ক্লেশ!

কনকাঞ্জলি প্রেম কি বুঝান’ যায় ? দেখে দেখুক, না বুঝে বুঝুক, সুখ দুখ তার পায়। কোথা রবি উঠে, কোথা ফুল ফুটে ; ছুটে কেন পরিমল ? দেবতা আকাশে, ঋষি বনবাসে ; মাঝে কেন আঁখি-জল ? পরবাসে পতি, মরে কেন সতী ? মতি-গতি পতি-পায়। আপন মরণে আপনি বরিয়া, কেমনে বুঝাব তায় !

সংসারে দে রে, দে রে, ছেড়ে দে রে, ছুটে গিয়ে কেঁদে আসি পারি না বহিতে আর এ মায়া-মমতা-রাশি। এ কি স্নেহ, এ কি ভয়, এ কি হাস, এ কি কঁাদা। ফিরিতে দিবি না পাশ—শত নাগ-পাশে বাঁধা ! গেল, গেল, সব গেলঅকূল সমুদ্র-আশ, —ও ক্ষুদ্র ইঙ্গিত-পথে ছুটে ছুটে’ বারাে মাস ! কোথা সে পৌরুষ-গ—বিশ্বাস সে গর্জন। সে উল্লাস, সে উচ্ছাস, উৎক্ষেপণ, বিক্ষেপণ ! ছেড়ে দে, পাগল প্রাণ উধাও ছুটিয়া যাক। পুষ্প-পরিমল-ভারে যে থাকে—পড়িয়া থাক। দুরন্ত প্রলয়-ঝড়--আছে তার শত কাজ, অঞ্চল-বীজন হ’তে আসে নি সে ধরা-মাঝ?

কনকাঞ্জলি পড়, পড়, খসে পড়, হাহা, তৃণ-গুল্ম-বাস! উঠুক আকাশে গিরি উদগারি’ অনল-শ্বাস ! জ্বলে যাক চিরস্থির-কুঙ্কটিকা-অন্ধকার। ক্ষুদ্র নিঝরিণী-ধ্বনি—শত প্রতিধ্বনি তার। লুটাক চরণে ধরা, ইঙ্গিতে বৰ্ত্তন-পথ । পারি না থাকিতে আর স্পন্দহীন চিত্রবৎ। আকাঙক্ষা—বা দুরাকাঙক্ষা, বুঝিতে সময় নাই, ধূধূ ধূধু করে প্রাণ—হুহু হুহু ছুটে যাই। কি মহা-জীবন-খেলা—মেঘে বজ্রে হুড়াহুড়ি, দাপটে ঝাপটে ধরা ভ্রমে কোথা গুড়িগুড়ি। আহাহা, সমুদ্রে ঝড়ে কি সম্ভাষ, কি আরতি,- মূচ্ছিত দেবতাগণ, স্তম্ভিত ব্রহ্মাণ্ড-গতি।

সখীর উক্তি আকুল ঝটিকা ওই যায়—ওই যায় । ছুটিল সাগর-মুখে, হইল না ঠাই তার এ ক্ষুদ্র ধরায় ! কাটিল না তার বেলা, ল’য়ে লতা-পাতা-খেলা, ল’য়ে তটিনীর উর্মি, কুসুম-কুন্তল প্রাণে তার এত কোলাহল ! যায়—ওই যায় ! ধূধূধূ সাগর-নীরে, ধূধূধূ বালুকা-তীরে, ধূধূধূ মধ্যাহ্ন-রৌদ্রে আনন্দে লুটায় ! কল্পনার শত চিত্র কত-না নায়িকা মিত্র হয় ওতপ্রােত নিত্য হৃদয়ে যাহার,-- সদা ঢুলুঢুলু প্রাণে ঢলিবে তােমার পানে, এ যে রে অসাধ্য কৰ্ম্ম-আত্মহত্যা তার। == কনকাঞ্জলি ৯৯ , দাও ছেড়ে দাও। কেন নিমেষের তরে মাঝে তার এসে পড়ে চূর্ণ হয়ে যাও! দাও—যেতে দাও। ও যে জগতের দূরে চল যাই অন্তঃপুরে, সজল নয়নে মিছে পথ-পানে চাও ! ওর সুধু খেলা সার- চুরমার ছারখার ; নিমেষের সুখ সাধ, নিমেষের ক্লেশ ; নাহি গত-সুখ-স্মৃতি, নাহি পর-দুখ-ভীতি, কি করি—কি করি সদা, কর্তব্য অশেষ ! পরপদে প্রাণ দিয়া, বিনামূলে বিকাইয়া, সাধিয়া রমণী-ধৰ্ম্ম,-কেন ভগ্ন মন ? হােক তার জয় জয় নিত্য এই বিশ্বময় শত পরাজিত-মাঝে তুমি এক জন উঠ, সখী, মুছই নয়ন!

প্রেম-শিশু মৃত আজি প্রেম-শিশু, দাও গাে সমাধি তায়। এই তটিনীর কূলে, এই বকুলের মুলে, এই শুভ্র জ্যোৎস্না-তলে,তৃণ-ফুল-বিছানায়। বকুল ঢাকুক ফুলে, ব্যজন করুক বায়, শিশির ঝরুক শিরে, শশী চা’ক ফিরে ফিরে, তটিনী কাঁদুক তীরে লুটিয়া লুটিয়া পায়। কিছুতে সে বুঝিল না,বুঝি নাই সে কি চায়? নিজ হৃদি শূন্য করি দিনু তার হৃদি ভরি’ কত সুখ-সাধ-আশা, কত স্নেহ-মমতায় !

কনকাঞ্জলি এত যত্ন, এত স্বপ্ন, এত সুপ্ত বাসনায়-- তবু সে পেলে না সুখ, দিন দিন ম্লান-মুখ, মুদিল নয়ন-যুগ কি লুকান বেদনায় ! মিছা সুখ, মিছা দুখ, মিছা ভয় ভাবনায় ! কাদিয়া কি হবে ফল? মুছ নয়নের জল, চল ধীরে ঘরে ফিরি’, দুই পথে দু’জনায়। তােমায় আমায় যদি দেখা হয় পুনরায়, তুমি অন্য দিকে চেও, তুমি অন্য পথে যেও, পথের পথিক মােরা, কেহ নাহি জানে কায় দিন যায়, মাস যায়, বর্ষ যায়, যুগ যায়; যেতে এই পথ দিয়া যদি শিহরয় হিয়া, বিষঃ-সায়াহ্নে কোন নব ঘন বরিষায় - ১০২ কনকাঞ্জলি আসিও সমাধি-পাশে, ধীরে ধীরে পায়-পায় ; কাতর সমীর-শ্বাসে গতকথা মনে আসে, আসে-পাশে কায়া মাের ছায়া সম মিশে যায় ; আকুলিয়া উঠে প্রাণ,—জীবন ফিরিতে চায়, হৃদয় কঁদিয়া কয়, ধন-জন নয়-নয়, হারায়েছি যেই ভ্ৰম,-সে-ই সুখ এ ধরায়। মুছিতে নয়ন দুটী হয় ত দেখিবে তায়, আবার সমাধি খুলে, দুটী কচি বাহু তুলে, উঠিতে তােমার কোলে কত-না আগ্রহে চায় !

কবিতা-বিদায় যাবে কি একান্ত তবে ? যাবে তুমি, প্রিয়া সকলি কি ফুরাল চকিতে! জীবনের সব সাধ, সব প্রেম দিয়া, তবু আমি নারি রাখিতে? চাহি নি জগৎ-পানে, তােমারে চাহিয়া আজীবন দেখেছি স্বপন ; আজ-জগতের দ্বারে, কার কাছে গিয়া কি মাগিব ? সবই যে নূতন !

১০৪ কনকাঞ্জলি তােমার নয়ন হ’তে ফিরালে নয়ন, এ জীবন শূন্য মনে হয় ! কোথা ঊষা, কোথা আলাে ! কেবল দহন ; কোথা শােভা-বিকাশ-বিস্ময় । কোথা শশি-তারা-ভরা নিথর আকাশ, চিরস্থির পূর্ণিমার রাত ! জীবনে মরণে সেই গভীর বিশ্বাস, অলক্ষ্যে অপ্সরা-যাতায়াত ! নিষ্ফল সাধনা, আজ—অদৃষ্টে আশ্রয় ; গেছে স্বর্গ সরি’ বহু দূরে ; নাহি দেহে বসন্তের আকাঙক্ষা দুর্জয় রূপে রসে, গন্ধ-স্পর্শ-সুরে। সে মত্ত হৃদয় নাই—সৌন্দর্য্যে উচ্ছল, সবিশ্বে আছাড়িয়া পড়ি। সজীব নির্জীব নাই-কল্পনা-বিহল, সর্বভূতে আপনা বিতরি।

কনকাঞ্জলি সে পৃত মাহেন্দ্রক্ষণে যে দাঁড়াত আসি’- হােক চিত্রে মূর্তিতে সঙ্গীতে, দিয়া নিজ আশা ভাষা, প্রেম রাশি রাশি, মজিতাম তাহারি ভঙ্গিতে। দিতাম নয়নে তার আমার চেতনা, হৃৎ-রক্তে রঞ্জিয়া কপােল,- লতিকার নব পর্ণ পুষ্প-সম্ভাবনা, সৌন্দর্য্যের বিচিত্র হিল্লোল ! তুমি শব্দে ভাবে ছন্দে কেন এসেছিলে, নতমুখী নবীনা ললনা ? দেখি নি–ভাবি নি কিছু আমি যে অখিলে, বুঝি নাই নারীর ছলনা! ত্ৰস্তে ব্যস্তে প্রেমমালা পরাইনু গলে, আশার কিরীট দিনু শিরে; ইহ-পরকাল মম দিয়া পদতলে- আজ আমি কোথা যাব ফিরে’ ?

১০৬ কনকাঞ্জলি সে যৌবন-কল্পনায় নিজ প্রাণ দিয়া জড়ে কেন দেই নি চেতনা ? দৃষ্টিহীন নেত্রে—চির রহিত চাহিয়া আমার সে প্রথম কামনা ! কেন অঙ্গে অঙ্গে তার দেই নি ছড়ায়ে আমার সে হৃদয়-স্পন্দন ? আপনার বাহুপাকে আপনা জড়ায়ে দেখি নাই প্রেমের স্বপন ? আজন্ম তপস্যা-ফলে লভি উপহাস তবু কেন বিরহ-বেদন ? মাদকতা-অবসাদে মাদক-পিয়াস, ভ্রম-ভঙ্গে ভ্রম-অন্বেষণ । কোথা তুমি, মহাশ্বেতা, অচ্ছােদের তীরে ল’য়ে তব অক্ষয় যৌবন! কেন আর, কাদম্বরী, মৃতচাপীড়ে প্রেম-ভরে করিছ চুম্বন!

কনকাঞ্জলি যাও তবে, প্রাণাধিকা, মুছিনু নয়ন, রুদ্ধ অশ্র চিররুদ্ধ থাক। কেন বিদায়ের ছল, নিঃশ্বাস সঘন, সান্ত্বনার অর্থহীন বাক ! বৃথায় আশ্বাস-দান—হ’য়াে না নিষ্ঠুর, আমি অতি কৃপাপাত্ৰ-দীন ; তােমার বিজয়-গবে আমি শত-চুর— শ্রেয় প্রেয় উভয়-বিহীন। - যাও তবে! মৃত্যু পরে যদি দেখা হয়, ভুবলোকে-কাশ্যপ-আশ্রমে ; -ক্ষোমবাস-অন্তরালে কম্পিত হৃদয়, অভিমানে, লজ্জায়, সম্রমে ! অযশ-ভবিষ্য-পুত্র কৌতুকে জিজ্ঞাসে, ‘দু জনার কি সম্বন্ধ-বাদ ? নারীর সরল-প্রেমে, সহজ-বিশ্বাসে কহিও, ক্ষমিও অপরাধ। সমাপ্ত

No text on this page.

অক্ষয়-গীতিকাব্য ৩ বর্ধিত) মূল্য ১। ভুল ( দ্বিতীয় সংস্করণ, আমূল পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত ) যখ্রস্থ ২। কনকাঞ্জলি (তৃতীয় সংস্করণ, পরিবর্তিত ও পরি- ৭০ সুপ্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক শ্রীযুক্ত অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় লিখিত ৪ পৃষ্ঠা- ব্যাপী ভূমিকা ও কবির প্রথম যৌবনের প্রতিকৃতি সংবলিত। ইহাতে ৪৬টী কবিতা আছে, তন্মধ্যে ১৩টী নূতন। “বার বৎসর পরে যদি অক্ষয়কুমারের এমন অনুপম কনকাঞ্জলির নুতন সংস্করণ করিতে হয় ত, বুঝিতে হইবে, এ পােড়। দেশে কাব্য লেখাই বিড়ম্বনা-লেখকের বিড়ম্বনা, সমালােচকের বিড়ম্বনা, পাঠকের বিড়ম্বনা।”--বঙ্গবাসী। ৩। প্রদীপ (তৃতীয় সংস্করণ, পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত ) মূল্য সাহিত্য-সম্পাদক শ্রীযুক্ত সুরেশচন্দ্র সমাজপতি লিখিত ৮ পৃষ্ঠাব্যাপী প্রস্তুতি ও কবির মধ্যযৌবনের প্রতিকৃতি সংবলিত। ইহাতে ২৭টি কবিতা আছে, তন্মধ্যে ৩টা নূতন। “রবীন্দ্রনাথের মানসী ব্ৰহ্মলােকে আধ্যাত্মিকার জাল বুনিতেছে। দ্বিজেন্দ্রলালের প্রতিভা নাটক গড়িতেছে। এখন এক অক্ষয়ের কণ্ঠেই বাঙ্গালার গীতি-কাব্যের সেই পুরাণে অক্ষয় সুর শুনিতে পাইতেছি।”—বসুমতী।

po • . ৪। শঙ্খ ( দ্বিতীয় সংস্করণ, পরিবর্ধিত) মূল্য no প্রসিদ্ধ মনৰী শ্ৰীযুক্ত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় লিখিত ১১ পৃষ্ঠাব্যাপী অনুবন্ধ ও কবির শেষ যৌবনের প্রতিকৃতি সংবলিত। ইহাতে ৪৪টী কবিতা আছে, তন্মধ্যে ৩টী নূতন। সাহিত্য-মহারথ শ্ৰীযুক্ত চন্দ্রশেখর মুখখাপাধ্যায় বলেন, “কবিতাগুলি অতি সুন্দর হইয়াছে। আজকাল এমন কবিতা প্রায় দেখা যায় না।” ৫। এষা (দ্বিতীয় সংস্করণ) মূল্য জন-নায়ক শ্ৰীযুক্ত বিপিনচন্দ্র পাল লিখিত ২৪ পৃষ্ঠাব্যাপী পরিচয় ও কবির প্রবীণ বয়সের প্রতিকৃতি সংবলিত। ইহাতে ৫০টী কবিতা আছে। সাহিত্যাচাৰ্য্য স্বর্গীয় অক্ষয়চন্দ্র সরকার বলেন, “অক্ষয়কুমার অনেকদিন হইয়েই ক-িকিন্তু এবার তাহার কবিত্ব বুক চিরিয়া বাহির হইয়াছে, খােদর কাছে আয় আয় পৌছিয়াছে। কবিত্বের গুণে আমাদের মনে হয়, যেন আমরা হিন্দুর জাজি আধ্যাত্মিকতাৰ হৃদয়ঙ্গম করিতে থাকি। যেন হিন্দুয়ানীর বাগ আনা বুদ্ধিতে পারি। বলিহারি কবির কল্পনা-আর ধন্য কবির বিশ্বাস! এই বিশ্বাস আৰীফেও বিশ্বাসী করিয়া তুলে।”-সাহিত্য। । প্রত্যেক পুস্তকের খণ্ডকবিগুলি এরূপ ভাৰে, সুবিন্যস্ত যে, প্রত্যেক পুস্তকই একখানি অখণ্ডকাব্য বলিয়া মনে হয়। পুস্তকগুলি পুরু মসৃণ কাগজে সুচারুরূপে মুদ্রিত। গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় ২০১, কর্ণওয়ালিস্ স্ট্রীট, কলিকাতা

No text on this page.

No text on this page.

Kanakanjali Ed.3rd

Author
Baral,akshaykumar
Title
Kanakanjali Ed.3rd
File name
Kanakanjali Ed.3rd
Text
OCR done
Citation
1917
Published
2010/01/10
Publisher
Gurudas Chattopadhyay,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
109
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Lyric
Keywords
Baral,Akshaykumar
DLI number
511152
Barcode
4990010018326.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
HwZv5Cr4sOk
Download PDF

Kanakanjali Ed.3rd