Bally Sadharan Granthagar
Galpo, Galpo Noy Ed.1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
গল্প, গল্প নয়
শ্ৰীহেম চট্টোপাধ্যায়
শ্রীগুরু লাইব্রেরী
২০৪ কর্ণওয়ালিস থ্রীট, কলিকাতা
প্রকাশক
ভুবনমােহন মজুমদার
শ্রী গুরু লাইব্রেরী
২০৪, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
-আড়াই টাকা-
( সর্ব স্বত্ব গ্রন্থকাবেব )
১ম সংস্করণ
ভাদ্র, ১৩৫৩
মুদ্রাকর • শ্রী প্রভাতচন্দ্র রায়
শ্রীগৌরাঙ্গ
প্রেস
চিন্তামণি দাস লেন, কলিকাতা।
A석 2 G
No text on this page.
বাংলাদেশের “বাণী” ও “বউ-বাণীদের আগ্রহে ‘গল্প, গল্প নয়’ এব সূচনা। এই বইয়ের কয়েকটি গল্প ভাবতবর্ষ, প্রবাসী, বিচিত্রা, উদয়ন, দেশ প্রভৃতি মাসিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল, অপর গল্প কয়টি আমার নৃতন লেখা। এ পুস্তক প্রণয়নে যে সব মহানুভব মনীষীর শুভেচ্ছা আমার শ্রদ্ধা আকর্ষণ কবেছে, তন্মধ্যে বাণী ও কমলাব বরপুত্র, সুপ্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী শ্ৰীযুক্ত দেবেন্দ্রনাথ ভট্টাচায্য, শ্ৰীযুক্ত নগেন্দ্রনাথ শাস্ত্রী, শ্ৰীযুক্ত এস, এন, দত্ত এবং, স্নেহাস্পদা শ্রীমতী বেলা চৌধুরাণীর নাম বিশেষ উল্লেখযােগ্য। তাদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। প্রচ্ছদপট এঁকেছেন যশস্বী চিত্রশিল্পী শ্ৰীযুক্ত পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তী, এবং শ্রীগৌরাঙ্গ প্রেসের কর্তৃপক্ষ বিশেষ যত্ন সহকারে বইখানি ছাপাবাব ব্যবস্থা করেছেন, এজন্য তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। অলমতি বিবেণ । শিল পয়লা ভাদ্র, ১৩৫৩ হেম
No text on this page.
উৎসর্গ
ননীবালা দেবী
শ্ৰীনগেন্দ্ৰবালা দেবী
ইন্দুবালা দেবী
2
সুধীরচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
শ্রীদীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
পরিমল চট্টোপাধ্যায়
শ্রীবেলা দেবী
শ্ৰীআরতি দেবী
শ্ৰী
০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০
আমার ভাই-বােন, ‘তুমি’ও বৌমাদের
করকমলে,
ছয়গাঁও
ফরিদপুর
ভ্রাতৃদ্বিতীয়া
গল্প, গল্প নয় পরের ছেলে। “অজাযুদ্ধে, ঋষিশ্রাদ্ধে নীলার দিদি মােহনপুর ড্রামেটিক ক্লাব দুর্ঘটনা দেশের মায়া কেরাণীর দুর্গোৎসব —এই লেখকের বই- কাশফুল (২য় সংস্করণ ) সব প্রেম প্রেম নয় গ্রামের মেয়ে রানুর দিদি ও ৫ * * * * বালিগঞ্জের ট্রামে (২য় সংস্করণ ) গল্প, গল্প নয় –ছােটদের বই টো-টো কোম্পানীর ম্যানেজার (৪র্থ সংস্করণ) ৭০ ভণ্ডুলামের দিগবিজয় ১১ পিসেমশায় বনাম মেসােমশায় (যন্ত্র) গ, গর নয় বিহারী পিয়ন অনেকদিন ধরে কপভাঙার পােষ্ট অফিসে কাজ করছে, একথা ইন্সপেক্টর অমৃতবাবুর কাছে অনেকদিন শুনেছি। সে অড়াতাড়ি ছুটে এসে আমার পায়ের ধূলাে নিয়ে বললে, একটু কাদা হয়েছে কিন্তু, সাবধানে পা ফেলে যাবেন। এ জেলায় এই নূতন এসেছি, পথঘাটের সাথে ততটা পরিচয় ছিল । তবে বাঙলাদেশের ছেলে, আসামে পড়ে থাকলে কি হবে, একটা আঁচ ছিল মনে। ধীরে ধীরে ধাপ-কাটা তীরের কঁচা কাদার সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে এলুম। হরিপদবাবু কাছে দাঁড়িয়েছিলেন, জিজ্ঞাসা করলুম—পােষ্টমাষ্টারবাবু, পােষ্ট অফিস কত দুর এখান থেকে ? হরিপদবাবু বললেন, কাছেই,বাবুদের বাড়ীতে পােষ্ট অফিল, বলৈ’ কত আঁকাবাঁকা সরু পথ ধরে, কত ঝােপঝাডের আনাচে-কানাচে উচু উচু বন-মাকালের রাশি রাশি ঝরে-পড়া ফুল পায়ে দলে আমবাগানের কাছ দিয়ে পথ দেখিয়ে চলতে লাগলেন। অপরিসর পথের দুই ধারে সে কি করুণ সুর শুরু হয়েছে, খুব সম্ভব কোন ঝােপেঝাডে কোন অদৃশ্য পতঙ্গের আর্তনাদ শােনা যাচ্ছে। ভাঙা ভাঙা মেঘের ফাকে চাঁদের আলােয় অস্পষ্ট গ্রামখানি ঘরবাড়ী, কনজরুল চোখে যা পড়ল, কিছু কিছু দেখে নিলুম। দশ পনেরাে মিনিটের পথ অতিক্রম করে এসে পৌছলুম বাবুদের বাড়ীতে, তারই কাছাকাছি একটি জায়গায় পােষ্ট অফিস, মাষ্টারবাবুর কোয়ার্টার, মেহেদির বেড়া-দেওয়া খানিকটা জমি। অফিসের সামনে দাড়িয়ে চেয়ে দেখি, সুমুখটা ভীষণ ফাকা, সাদা কুয়াসার মত ঝাপসা কি যেন একটা নদীর মত দেখা যাচ্ছে এবং স্বচ্ছ ২ কলকল শ শােনা যাচ্ছে। অবাক হয়ে বললুম, এ কিসের শব্দ হবিপদবাবু?
৪ গল্প, গল্প নয় হরিপদবাবু বললেন, এই যে লক্ষ্যা নদী, রূপভাঙা লক্ষ্যার তীরেই, আমার ভৌগােলিক অনুসন্ধিৎসা সম্বন্ধে হরিপদবাবুর কোন সন্দেহ হয়েছিল কিনা জানি না, কোন মতে বললুম, তাহলে আমরা অনেক ঘুরে এসেছি। হরিপদবাবু জবাব দেবার আগেই বয়ােবৃদ্ধ বেহারী পিওন’ বললে, হুজুর, ঠিকই এসেছেন, বর্ষাকালে নদীতে বড় রাগ বাতাস থাকে, সাধ্য আছে কারও নৌকা ধরে এ সময় । অথচ ভােরবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখি, সারি সারি মহাজনী নৌকা, ইলিশ মাছের ডিঙি, গয়না নৌকা ঢেউয়ের তালে হেলেদুলে চলে যাচ্ছে। তবে সেদিন যে ঢেউ ছিল, আমি নিশ্চয়ই খুব ভয় পেতাম। জমিদারবাবুদের ওখানেই খাওয়া-দাওয়ার বন্দোবস্ত হয়েছিল। লােকমুখে শােনলুম, বৃদ্ধ প্রতাপবাবু গত হয়েছেন, তারই ছেলে অবিনাশ বাবু এখন জমিদার। তিনি কালেভদ্রে গ্রামে আসেন, থাকেন ঢাকায়, কোলকাতায়, আর ঘুরে ফিরে বেড়ান দেশ-বিদেশে। কাচা বয়স, বড় জোর সাতাশ আটাশ কি ত্রিশের কাছাকাছি। সখের প্রাণ, সংসারের ধারও ধারেন না, হেসে-খেলে দিন কাটান। দেশের বাড়ীতে শুধু তার মা, স্ত্রী, আত্মীয়স্বজন, লােকজন আমলা-কর্মচারী, দাসী-ঝি, পাইক, বরকন্দাজ পিয়াদা এবং আরও দশজন বড়লােকের সংসারে প্রতিপালিত নদীর তীরে ছবির মত গ্রামখানি, বেশ বর্ধিষ্ণু গ্রাম, প্রকাণ্ড গঞ্জ, বড়লােকের অন্ত নাই। দু’তিন দিন এখানে থাকব ভাবলুম। সেদিন ছিল রবিবার। হাতে কোন কাজ ছিল না। বারান্দায় বসে খবরের কাগজ পড়ছিলুম। অন্দর থেকে খবর এলাে, আপনাকে গল, গল্প নয় একবার ডাকছেন স্ত্রী-মা। রৌপ্যশু কেশরাশির অকালপকতায় ম্যানেজার যামিনীবাবুকে আরও দশ বছরের বেশী বয়সের বুড়াে মনে, হচ্ছিল। তিনি হেসে বললেন, উনি আপনার মায়ের বয়সী, আর বৌমা নাকি আপনাকে চিনতে পেরেছেন। আপনি কি কখনও লেবঙে ছিলেন ? •••লেবঙ! অবাক হয়ে বললুম, সে তাে আমার জন্মভূমি। হয়ত সেখানকার কেউ হবেন, মনে মনে ভাবলুম। ম্যানেজারবাবুর সাথে ভিতরে গিয়ে দেখি, একখানি রঙীন আসন পাতা, সুমুখে দাড়িয়ে একজন বিধবা ভদ্রমহিলা আপাদমস্তক শুভ্র পরিচ্ছদে আবৃত হয়ে আমারই অপেক্ষা করছিলেন। পাশে দাড়িয়ে একটি ঝি ফ্যাল ফ্যাল করে আমার দিকে চেয়ে দেখছে। ম্যানেজারবাবু আমার পরিচয় করিয়ে দিতেই আমি ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করলুম। তিনি আমাকে বসবার জন্য ইঙ্গিত করলেন। . অনেক কথাবাত। হ’ল। শেষে মিষ্টিমুখ না করিয়ে কিছুতেই ছাড়লেন না। বৌমাও এলেন একটু পরেই। ঘােমটার ফাকে একটুখানি চেয়ে আমায় প্রণাম করলে এবং পরক্ষণেই হেসে বললে, কি বুলুদা, আমায় চিনতে পাচ্ছেন তাে? আমি বমলা। •••র- মলা! কেমন আছো, ভালাে? -ভালাে, বলেই রমলা লেবঙের সব কে কেমন আছে, পাড়ার, সহরের কারও কথা সে বাদ দিলে না। আমি ধীরে ধীরে যতটা জানি বলে গেলুম। শুনলুম, পাঁচ বছরের ভিতর রমলা আর লেঙে ফিরে যায় নি। ওর বাবা-মা নাকি এখন কোলকাতায়, আর বােনেরা সব কোথায় কি বললে। রমলাকে দেখে খুব ভালাে লাগল। লেবঙে থাকতে সে যতটা গল্প, গ নয় ফস ছিল, বাঙলাদেশের জলবায়ুতে এসে যেন তা একটু মলিন হয়ে গেছে। তবে ও ফর্সা, খুব গৌরবর্ণ, একথা কোনদিন বলা চলেনি। লেবঙে থাকতে ওর গুণপনা, দোহারা চেহারা, সুন্দর গড়ন, ভাসা-ভাসা দুটি ডাগর চোখ, চোখে মুখে অতি সুন্দর, স্নিগ্ধ একটি মধুর শান্ত ভাব, যা আমার জানাশােনা ঢের ঢের রূপসী মেয়েদের মুখে কোনদিন চোখে পড়েনি। এই সব দেখে-শুনে আমি ওকে ছােটবােনের মত ভালবাসতুম। আমার নিজের হােটবােনেরা কেউ থাকে সিমলায়, কেউ এলাহাবাদে, তাই রমলাকে কল্পনায় ছােটবােনের মত ভালােবেসে দুধের স্বাদ ঘােলে মিটিয়ে নিতুম। রমলা যখন ছিল আরাে ছােট, ওর দিদির সাথে ছিল আমার আলাপ- পরিচয়, রমলা ও তার দিদির সাথে মাঝে মাঝে দেখা হয়ে যেত সেই লেবঙের মাঠের ধারে, আমরা কত কথা বলেছি, রমলা চুপটি করে শুনে যেত শুধু, তারপরও বড় হয়ে রমলার সাথে কম দেখা হয়নি। হাটে, মাঠে, ঘাটে, বাটে যখনই যেখানে গিয়েছি, তার সেই অভােল-ভােলা হাসিটুকু নিয়ে সে ছুটে গেছে আমার আশেপাশে, কথা বলতে কেন জানি তখন একটু সঙ্কোচবােধ হত। তবু আমি তাকে অন্তরের সাথে স্নেহের চোখে দেখতুম, ভক্তি কবুতুম, শ্রদ্ধা করে দেখেছি মন-প্রাণ এক অজানা, অসীম আনন্দে ভরে উঠেছে। মাঝে মাঝে যখন পাহাডিয়া পথে নিঝরিণীর ধাবে ঘুরে বেড়িয়েছি, রমলার কথা খুবই মনে পড়ত, মনে মনে ভগবানকে কতবার বলেছি, ওগো বিধাতাপুরুষ, তােমার যদি এতটুকু ক্ষমতা থাকে, তবে রমলাকে আমার দেহের বর্ণে বিভূষিত করে দাও, আর আমাকে দাও ঠিক তারই গায়ের রঙ। আমি পুরুষ মানুষ, একটু ময়লা রঙ হলে এমন কি আর আসে-যাবে। পাড়ার লােকের মুখে শুনেছি রমলার গুণপনার গল্প, গল্প নয় কথা, বিজয়গর্বে আমার বুকখানি ভরে উঠেছে, কাউকে বলিনি এসব কথা,আমার ভালােবাসা, আমার বুকভরা অসীম স্নেহ ছােট যােনটির জন্য যা যক্ষের ধনের মত দিনের পর দিন পুজি করে রেখেছিলুম, তা হয়ত চিরদিন অব্যক্ত হয়েই থাকবে বলেছিল। কিন্তু জগতের নিয়ম তা নয়। নিশ্চয়ই একদিন বাঞ্ছিতের প্রাণের সাড়া কোন না কোন সময় না পাওয়ার কোন কারণই নেই, আজ রমলার মুখে সেই মিষ্টি ডাকটি কী যে ভালাে লাগল, তা বােঝবার স্থান এখানে নয়। ‘বুলুদা, কি মিষ্টি ডাক।••••••আমার ভয়ানক ভুল হতে লাগল,আমি কি লেবঙের সেই বুলুদা,•••••না, ভাৰু ও তার বিভাগের•••••• ওর সাথে যে এমনিভাবে এত দূরদেশে আবার দেখা হবে, তা আমার কল্পনার অতীত। আমার ধারণা ছিল, রমলার হয়ত কোন আই-সি-এস কিংবা আই-পি-এসের সাথে বিয়ে হয়ে থাকবে। আর ও যা’ চমৎকার মেয়ে, কেউ জানলে ওকে লুফে না নিয়ে ছাড়বে। আমি ফিরে আসব ভাবছি, আবদারের সুরে রমলা বললে, যক্ষ বুলুদা’, কতকাল পরে দেখা, জানেন, বােনরা ভাইদের কথা সহজে ভােলে না, ভায়েরাই খুব তাড়াতাড়ি ভুলে যায়। রমলার শাশুড়ী একটুখানি হেসে বললেন, ব’সাে না বাবা, এত ব্যস্ত কিসের ? কাজ ত চিরদিনই থাকবে, কাজ ছাড়া মানুষ এক দণ্ড স্থির থাকতে পারে, এই ত দেখ না কত কাজ করে এলুম। সময়ােচিত একটি কথার জবাব দিয়ে চুপ করে আবার বসে পড়লুম। রমলার শাশুড়ী তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, ৰৌমা আজ রাত্রিতে কি ভালাে রান্নাবান্না করে দাদাকে খাওয়াতে হবে কিন্তু। কত রকরেই যে কান্না জানে বাবা, সে আর কত ৰ তােমাকে। ইলিশ মাছের গম, গর নয় ৫০০ ০ ০ ০ । । । । । ডিমের কাটলেট, আমের মােরক, হিঙের চপ, সর 'ভা, কীরপুলি, মাংসের পােলাও,••••মাছের ডালনা মনে মনে ভাবলুম, রমলা এসব কি করে জানে-ধনীর দুলালী, চিরদিন ত ছিল বইয়ের পােকা, হেসে খেলে নেচে বেরিয়েছে, সে কি আর রান্নাঘরের কোন খােজখবর রেখেছে। রমলা মৃদু একটুখানি হেসে চুপ করে রইলাে। রাত্রিবেলা সে কি খাওয়ার ধূম, যত্নআত্মি করে সে আমাকে খাওয়ালে, তার হাতের তৈরি সেই অসুতি, ছানার পায়েস আজও যেন মুখে লেগে আছে। আর কি চমৎকার পরিবেশন করতে শিখেছে রমলা, কত রকমে কথা বলে গল্প করে ভুলিয়ে ভালিয়ে কত সে খাওয়ালে আমাকে,আমি কিছুতেই না বলতে পারিনি। পরের দিন সহরে ফিরে আসব ভেবে দেখা করতে গেলুম। চোখ দুটি জলে উপচে উঠেছে দেখে সেদিন নৌকার মাঝিকে বিদায় দিলুম। পরদিন স্নেহের ছােট বােনটিকে কোনমতে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ফিরে এলুম সহরে। মােটে তিন ঘণ্টার পথ সহর থেকে রূপভাঙা। রূপভাঙার কথা, রমলার কথা, আর সেই মাতৃ-সমা রমলার শাশুড়ীর কথাও ভােলবার নয় আবার। বছর শেষ হয়ে আসছে, সব পােষ্ট অফিস পরিদর্শন শেষ করতে হবে এরই ভিতরে। কিন্তু রূপভাঙা থেকে “মা” এমন তাগিদ দিয়ে চিঠি লিখে পাঠিয়েছেন যে, টুয়ে যাওয়া অসম্ভব। ওকে আমি মায়ের মত দেখি, তিনিও আমাকে পুত্ৰাধিক স্নেহে সেই দু’দিনে আপন করে নিয়েছিলেন। এবাসে ছােট ভাই বােনের গে, অননীর সীম করুণা কোথায় পাওয়া যায় আর! যৌবনে তৃষিত হৃদয়টি
প, গল্প নয়
গঙ্গাজলী,
অজানার স্নেহের টানে আবুল হয়ে উঠেছে, কার সাধ্য কে তাকে ধরে
রাখবে।
দোটানায় পড়েছিলুম, কোথায় যাই, কি করি—এমন সময়
শরতের এক উজ্জ্বল প্রভাতে ম্যানেজার যামিনী বাবু, ফয়ং স্মিতমুখে
আমার দুয়ারে এসে উপস্থিত হলেন।
অভ্যর্থনা করে জিজ্ঞাসা করলুম, কি সংবাদ ম্যানেজার বাৰু ?
যামিনী বাবু রহস্য করে বললেন, সন্দেশ নিয়ে এসেছি, যাবার
আমন্ত্রণ। বলেই টিফিন কেরিয়ার থেকে কলাপাতার পুটলি বাঁধা
কি সব খাবার জিনিষ তিনি বের করে বললেন, বৌমা আর কীমা
কাল সারাদিন রাত্রি দশট। অবধি বসে এসব তৈরী করেছেন। তক্তি,
ক্ষীরপুলি, কমলাসন্দেশ, চিরাজিরা, নারকেলের
চম্পাপুলি•••••
কোনমতে বললুম, আই যেতে হবে নাকি, না কাল•••••
যামিনী বাবু মাথা বললেন, কাল হলেই আবার কাল হবে !
আজই যাবার কথা বলে দিয়েছেন। কাল বােধন, তার উপর আবার,
বাবু আসেননি, আসবেন কি না তাও ঠিক নেই! কাশ্মীরে ছিলেন,
লিখেছেন, অমৃতসর যাবেন।••••••
এ এক খেয়ালী লােৰু মশায়। ঘরে মা, স্ত্রী যার আশাপথ চেয়ে
রয়েছে, তার মন কি দেশে দেশে ঘুরে বেড়ায়••••••
জিজ্ঞাসা করলুম, শক্তি, হলে আসবেন না? আনন্দময়ী
এসেছেন, আর বাংলায় পড়ে থাকবে বিদেশে, এ কেমন কথা
ম্যানেজার বাবু?
যামিনী বাবু সে সব কথা না দিয়ে বললেন, রেখে দিন মশায়,
আদার বেপারীর আহাজের খবর! বড়লােকের আবার?
৫
গল্প, গমের দুর্গোৎসব। ঘরে মাণিক থাকতে যারা কাচের আশায় ঘুরে বেড়ায়, তাদের আবার পূজো-পার্বণ। ছিলেন আনুষ একজন, তিনি স্বর্গে গেছেন, বুড়াে বাবুর কথা আর কি বলবাে! যাকগে এ সব বাজে কথা ! আপনি বিকেলে তৈরি হয়ে থাকবেন, আমি বৌমার ফুটফরমাস সব সেরে আসি। মা লক্ষ্মী এসেছেন ঘরে, পাড়ার যত গরীব ছেলেরা আছে না মশাই, তাদের দুঃখে ওর চোখে জল আসে। ওর চোখের জল আর বুড়াে বয়সে সহ্য হয় না যে,••••••আরও কত কি তিনি বিড় বিড় করে বলে গেলেন, আমি সব কথা ভালাে বুঝতে পারলুম না। “চোখের জল,” “দুঃখ” এসব কি বললেন তিনি, মনের ভিতর যেন খচ করে একটা ব্যথা ফুটে উঠল। দুর্ভাবনার হাত থেকে এবার জন্য বাজারের দিকে একবার বেড়িয়ে পড়লুম। কিছু কাপড় জামা কিনতে হবে ত! রূপভাঙা পৌছাতে আমাদের একটু রায়ে গিয়েছিল। নদীর তীরে যেন ছেলেমেয়েদের হাট বসে গেছে। এদিক পানে কোন নৌকা তীরের দিকে বেয়ে আসতে দেখলেই ছেলেমেয়েরা সমস্বরে কোলাহল করে উঠে, নন্তু কাকা এসেছে, চুণীমামা এসেছে, কেউবা বলে বাবা আসবে দেখাে নিশ্চয়ই, কেউবা বলে ছােড়দার মত দেখা যাচ্ছে , ওই যে গলুইয়ের কাছে বসে আছেন•••••শেষে নৌকাখানি যখন এসে তীরের কাছে দাঁড়ায়, ছেয়েদের মুখখানি হয়ে যায় ফলল, কারু মুখে হাসি ফোটে, এমনি করে পঞ্চমীর সন্ধ্যা কেটে গিয়েছে। তীয়ে মহাবীর বরকন্দাজ আলাে নিয়ে বসেছিল দাদাবাবুকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে বলে। বেহারী পিয়া কি জানি কি ভাবে খবর পেয়ে গল্প, গল্প নয় ১১ এয়েছিল। বাড়ীতে গিয়ে দেখি লােকজনে বাড়ীখানি গম গম করছে। যত রাজ্যের আত্মীয়-স্বজনের ভিতর পড়ে আমি যেন নিজেকে হারিয়ে ফেললুম। মা এলেন ছুটে, কুশল প্রশ্নের পর কত কথা বলে যেতে লাগলেন, অবিনাশ আসেনি, একটু দুঃখ করলেন। আমাকে দেখে যেন হাতে চঁদ পেয়েছেন, বললেন। আরাে বললেন, রমলার কথা, “দাদা, দাদা” বলে কি ব্যাকুল হয়েছে সে। এত দূর দেশে বাপের বাড়ীর কাউকে সহজে দেখতে পায় না সে, দাদার জন্য তার মন কেমন করে! এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই রমলা এসে হাজির, কোন রকম সঙ্কোচ কিংবা দ্বিধা না করে সে আমাকে অনুযােগ করে বললে, ম্যানেজার বাবু না গেলে বুঝি আপনি আসতে পারেন না? আমি সস্নেহে ওর ঝাঁকড়া গুচ্ছ কেশরাশিব ভিতর আঙুল বুলিয়ে দিয়ে বললুম, অফিসের কাজ করতে হয় না বুঝি, কাজের ঝামেলায় আসতে পারিনি। সে কোন কথা শুনতে চায় না, বললে, আমি করে দিতুম। আমি বাবার কম কাজ করে দিয়েছি । হেসে বললুম, আচ্ছা তুমিই করে দিয়ে। যে কদিন ছিলুম সেখানে, পূজোর হৈ-হৈএর ভিতর দেখেছি, সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণার মত দশহাতে লােকজনের অভ্যর্থনা করা, পরিবেশন করা, কোমরে আঁচল জড়িয়ে ছুটোছুটি, এত ভাল লাগছিল আমার, মনে হল এই কি লেবঙের সেই রমলা, যার সম্বন্ধে আমার একটা আভিজাত্যের অদ্ভুত ধারণা ছিল, সে সব গেছে দূরে! আর তার কি মনের ফুর্তি, আরতির সময় জগাই ঢুলী যখন নেচে নেচে তালে তালে গাঁয়ের ছেলেদের সাথে তােরকাটিতে বাজনা শুরু করেছিল, সে আমাকে বললে, আপনি
১২
গল্প, গল্প নয়
হাতে তালি বাজিয়ে সুর দেন না কেন দাদা, ছেলেরা তালে তালে নাচতে
পারছে না যে !
আমি বললুম, ছােট ছেলেরা অত সুর তালের কি বােঝে বলল।
সে শাসনের সুরে আমায় তক্ষুনি বললে, পারে না না হাতী, আপনি
একটু দেখিয়ে দিন না ?
আমি ফস কবে বললুম, আমি পারি না রমলা, আমার বুঝি লজ্জা
করে না।
G
রমলা আমার কথা শুনে খুব হাসতে থাকে, ওদের পাড়ার আর
একটি নূতন বউ কনকের কাধে হাত দিয়ে বললে, শুনেছ কিনুদি’ দাদার
কথা, আমার বাজনা শুনে ইচ্ছে করচে একটু আরতি নৃত্য দেখিয়ে দিয়ে
আসি, আর দাদা পারে না,••• ••বলেই সে আরাে হাসতে লাগলাে।
কিন্তু তাকে বললে, সে জন্য হাসবার কথা হল কিসে?
রমলা কি কারও কথা শােনে, তার হাসি আব থামে না যেন।
এই হাসি কান্নার মাঝখানেই সংসার !
বিজয়ার পর থেকেই দেখেছি ওর চোখ দুটি কেমন ছল ছল করছে।
মনে বড় দুঃখ হল, কা’কে জিজ্ঞাসা করব ভাবছি, এমন সময় কিছু
আমাকে একদিন কথায় কথায় বললে, জানেন, “ও” আজকাল এত
মনমরা হয়েছে কেন! অবিনাশবাবুর ব্যবহারে এমন হয়েছে। বাবা
মাতত ভালাে দেখেই বিয়ে দিয়েছিলেন, অদৃষ্টে সুখ নেই তা আর কি করা
বলুন।
A
আমি যেন আকাশ থেকে পড়লুম। কেন কি হয়েছে, অবিনাশ বাবু
কেন এমন করেন, শুনেছি তিনি শিক্ষিত, রূপবান, গুণী।
কিছু বললে, সে সব ত বুঝলুম। কিন্তু স্ত্রীলােকের স্বামী ছাড়া
* কিছু আছে বলতে পারেন। খাওয়া-পরা, মান-সম্মান, সবারই
। গল, গল্প নয় ১৩ । জন্য দায়ী স্বামী। সেই স্বামী যদি অবহেলা করে, তা হলে সে বলতে পারলে না•••••• জিজ্ঞাসু নেত্রে চেয়ে বললুম, আমি ঠিক বুঝতে পারছিনে। অবিনাশ ত খুব ভালাে ছেলে শুনেছি। শিক্ষিত ছেলের কাছে অন্যায় কিছু আশা করতে পারি না যে,••••••কি হয়েছে, বলনা আমায়? তুমি ত আমার ছােট বােনের মত। কিছু লজ্জা সঙ্কোচ ত্যাগ করে সব কথা বলে যেতে লাগলাে, শুনে আমার অন্তরাত্মা শিউরে উঠলো একেবারে। কি মর্মন্তুদ কাহিনী, কিন্তু রমলার মুখের হাসি দেখে কে বিশ্বাস করবে যে তার জীবনের উপর দিয়ে এত বড় একটা ঝড় বয়ে গেছে। কিছু বলতে লাগলাে•••••অবিনাশ বাবুর যখন বিয়ে হল, রমলাদির নামে ছিল অজ্ঞান। উনি তখন এম-এ, ল পড়তেন কোলকাতায়। বছরখানেক খুব সুখেই কেটেছে। কেউ কাউকে ছাড়া সহজে থাকতে চায় নি। রমলাদি কলকাতায় গিয়ে থাকবেন এও কথা হয়েছিল। কিন্তু পড়াশােনার ক্ষতি হবে ভেবে তিনি বইলেন দেশের বাড়ীতে। এখন হয়েছে কি জানেন? অবিনাশ বাবুর মতিগতি এখন অন্যরূপ হয়ে দাড়িয়েছে। ম্যানেজার বাবু গিয়েছিলেন, রমলাদি গিয়েছেন, কেউ তাকে ফিরিয়ে আনতে পারে নি। মাসীমা কত কান্নাকাটি করেছেন ছেলের কাছে, অবুঝ ছেলে তা ভাল বুঝতে পারলে । কিন্তু বুঝবে একদিন যখন মােহ টুটে যাবে, ভুল ভেঙ্গে যাবে। আচ্ছা বলুনতাে, মেয়ে মানুষের এর চেয়ে আর কি দুঃখ কষ্ট থাকতে পারে ? —কিছুই না, বলে চুপ করে রইলুম। কিছু বললে, তবু রমলাদিকে ধন্য মেয়ে বলতে হয়। আমরা হলে ১৪ গ, গল্প নয় বেঁচে থাকতে পারতুম কি না সন্দেহ। তা না হলে দেখলেন তাে পূজার সময়টা যেন নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিল। •••আমিও ঠিক যেন জগন্মাতার মূর্তি ওর চোখে মুখে দেখতে পেয়েছিলুম, যেদিন রমলা কাঙালীদের খাওয়ালে, বােধ করি নবমী পূজোর দিন না ? কিছু আরাে অনেক গল্প বলতে সুরু করলে, জানেন, মাসীমা রমলাদি- কে ঠিক নিজের মেয়ের মত দেখেন, বলেন আমার মেয়ে নেই একটিও, এইত আমার মেয়ে,—সত্যি তাই! দেখেছেন ত মেয়ের মত রমলাদি কি এ বাড়ীতে থাকেন না ? কি যে জবাব দেব ঠিক খুঁজে পাচ্ছিলুম না, এমন সময় রমলা এসে ঝড়ের মত ঘরে ঢুকে বললে, বেশত আপনি দাদা, কিছু খাবেন না এখন ? সেই কখন খেয়েছেন, মনে আছে? বলেই একখানি রূপায় ‘রেকাবীতে ফলমূল মিষ্টিতে ভর্তি আমার সুমুখে রেখে ধপ করে পাথরের মেঝেতে চুপ করে বসে আবদারের সুরে বললে, সব না খেলে আমি আজ আর ছাড়বে না, বােজ বােজ সব ফেলে উঠে যাওয়া হয়, না ? আমি এ ক’দিন আর তেমন খোঁজখবর করতে পারিনি। পূজার ঝামেলা, বুঝতে পারেন তাে ? কিসের ঝামেলা, বুঝতে পারি কি না পারি, রমলা কি সে সব কথার কোন ধার ধারে। ভরে ভয়ে প্রায় সবটাই খেয়ে ফেলুন। না খেলে ও কোন কথা শুনবে না আমার। খামকা ওর মনে দুঃখ দিতে মন চাইল না যেন! এমনি বেচারী জগতে কারও কাছে এখন আর স্নেহ, মমতা, মায়া দরদ কোন কিছুরই প্রত্যাশা করে না সে, ওর মনে আর কষ্ট দিয়ে । লাভ কি।
গ, গল্প নয় কোজাগরী রাত্রিতে আমরা সবাই দল বেঁধে লক্ষ্যার বুকে নৌকায় বেড়াতে গিয়েছিলুম। হেসে হেসে নেচে খেলে ঢেউগুলি ভেসে যাচ্ছিল, আমাদের নৌকার তলায় আঘাত পেয়ে কল কল করে একটানা সুরে বেজে উঠেছিল যেন। সুমুখের ছােট খালের ভিতর ভাটার টানে বিপুল বেগে জলরাশি ছুটে চলেছে, আশেপাশের নৌকাগুলি একটানে ভেসে যাচ্ছে, দেখতে মন্দ লাগছিল না। শিশির পড়ছে বেশ বােঝ গেল, তবু ফিরে আসতে আর ইচ্ছা করছিল না। জ্যোৎস্নালােকিত শুভ্র সৌন্দর্যের মাঝখানে বসে আমি একটা কল্পলােকের সৃষ্টি করে ফেলেছিলুম, যেখানে কোন দুঃখ, নােগ শােক নেই, শুধু চির-আনন্দ, এই বহস্যভরা মায়াজালের সৃষ্টির মাঝখানে আমরা যেন কোন অজ্ঞাত দেশের খােজে বেরিয়েছিলুম, এবং আমারই পাশে বসে আমার স্নেহময়ী ছােট বােনটির মনের গহন কোণে যে অপরূপ সৌন্দর্য্যের উৎস উৎসারিত হয়ে উঠেছিল, তা যেন আজ তার মিষ্টি, উদার, শান্ত মুখখানির ভিতর শত সহস্র রূপে ফুটে উঠেছিল। সরল মুখখানির দিকে চেয়ে চেয়ে আমার বড় মায়া হল,ভাবলুম, হায় হতভাগ্য অকিাশ, নিজের ঘরে এমন সােনার প্রতিমা থাকতে তুমি কাচের আশায় জগতের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াও। সে কি কোনদিন এ কথা বুঝতে পারবে না ? রমলাকে চুপ করে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞাসা করলুম, তােমাদের আসল বাড়ী কোথায় ? রমলা বললে, ফরিদপুরের কাছে কি একটা জেলা আছে না, তারই কাছে। গৌরনদীর নাম জানেন ? আমি বললুম, কোথায় রে, ঢাকায় বুঝি। রমলা হেসে বললে, আপনি ছেলেবেলায় ভূগােল পড়েন নি বুঝি ? একটু অপ্রতিভ হয়ে মনে মনে ভাবলুম, গৌরনদী কোথায় এ গরু, গল্প নয় কথাটি জানি না বলে এমন কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেছে, ঠিক বুঝতে পারলুম না। হয়ত আমার জানা উচিত ছিল। নদীর ওপারে করুণ কণ্ঠে পাপিয়া থেকে থেকে ডেকে উঠছিল, লক্ষ্যার বুকে এমন সুন্দর দৃশ্য আর কোন দিন দেখিনি। আসবার দিন রমলার চোখের কোণে কয়েক ফোটা সদ্য অশ্রু দেখে এসেছিলুম, এমনি নীরব ব্যথার অশ্রু চিরদিনই কি তার আঁখির কোণে ফুটে থাকবে! বছর খানেকের ভিতর আরাে দু'একবার গিয়েছিলুম। শেষে বদলি হয়ে এলুম খুলনায়, মুর্শিদাবাদে, ডিব্রুগডে••••••কুমিল্লায় । তারপর পশ্চিমের একটা সহরে খােট্টার দেশ, মরুভূমির ধূ ধূ আগুন জলে দিনের বেলা সেখানে। এলাহাদে ফিরে আসার পথে একবার কোলকাতায় অবিনাশের খোঁজখবর করেছিলুম। দেখা হয়নি, শােনলুম, সে নাকি পুরী বেড়াতে গেছে, বাড়ীতে এক উড়ে ঠাকুর ছিল, তার কাছে শােনলাম, “বহুমা” সেই দেশের বাড়ীতেই আছেন। # + ০ ০ ৩ তিন চার বছর আর বাংলা দেশে আসতে পারিনি। যুদ্ধের ঘােতর পরিস্থিতিতে সরকারের কাছে ছুটি পাওয়ার বড় কড়াকড়ি আইনকানুন ছিল। আর দেশে আসবার জন্য তেমন একটা আকর্ষণও আমার ছিল । সংসারে আমার বলতে তেমন কেউ নেই, এবং সংসার, সমাজের বাইরে এসে দাড়িয়েছিলুম। চাকরির অবসরে বিয়ে করে সংসারী হওয়ার ফুরসৎ বনে হয়ে ওঠেনি, তাই নিঃসঙ্গ জীবন নিয়ে একটানা স্রোতে ভেসে চলেছিলুম কতদূ•ে•••••ঠিক জানি না। শুধু মাঝে মাঝে বলার কচি কিলাের মুখখানি আমার মনের কোণে কি কি দিয়ে যে, তার কথা মনে আমার মনটা হঠাৎ বাংলাদেশের গল্প, গল্প নয় ১৭ তালগাছে বে৷ আম-জাম সুপারি বনের ভিতর একখানি নগণ্য পল্লীর কথায় জেগে উঠত, সেই ঢেউ জাগা নদী, তীরে বনফুল, নীল অপরাজিতা রঙে বাগান আলাে হয়ে আছে। আর সেই রমলাদের ছােট মাঠের ধারে কি-এক রকম লাল ফুলের দোলনা ঝুলছে, তারই আগডালে ফিঙে নাচছে এবং ঝুলে ঝুলে দোল খাচ্ছে টুনটুনিরা। পাতাবাহারের ঝােপে ঝাড়ে বঙ্গিন প্রজাপতির মেলা, নীল আকাশের সাথে পাল্লা দিয়ে কাজল দীঘির অথই জলে শাপলা ফুলের ছড়াছড়ি, আর জ্যোৎস্না রাতে এমন তীব্র ফুলের গন্ধ ভেসে আসে যে, মনপ্রাণ নেশায় ভরপূর হয়ে থাকে। দিন কয়েক কেমন জানি কি রকম লেগেছিল ঠিক মনে নেই, শেষে আর সই করতে না পেরে মাস খানেকের ছুটি নিয়ে বেরিয়ে পড়লুম বাংলাদেশের ক্ষুদ্র একখানি পল্লী গ্রামের উদ্দেশে। সে দিনও ছিল ঠিক ভাদ্রের ভরানদী। সারাদিন ছিল ঝিরঝিরে বৃষ্টি, সন্ধ্যাবেলা একটু ধরে এসেছে যেন। কোন মতে কাদাভরা রাস্তায় পা বাঁচিয়ে সটান গিয়ে উঠলুম অন্ধকারে পােষ্ট অফিসের বারান্দায়। পােষ্টমাস্টার বাবু সেখানে ছিলেন না, খোঁজখবর করতে লাগলুম। আমার গলার স্বরে, কথা বলার ভঙ্গিতে বেহারী পিওন হুড়মুড় করে ছুটে এল, একেবারে পায়ের উপর উপুড় হয়ে পড়ে বললে, ভিতরে এসে বসুন। আপনি থাকবেন বাইরে দাড়িয়ে, সে কেমন কথা, বলেই ডিজ লণ্ঠনটি এগিয়ে ধরে আমাকে ঘরের ভিতর নিয়ে গেল। দু একটি কথা বলেই যেহারীকে জিজ্ঞেস করলুম, ও বাড়ীর সব কেমন আছে, বেহারী ? বেহারী ক্ষুদ্র একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললে, সে আর বলবেন না বাবু, বড় বিপদ আপদ গেছে তেনাদেল, বুড়ো মা বেঁচে নেই, গেল বছর ঠিক এমনি দিনে বাৰু, সে কি জল, কোন মতে তিন বুড়ঙ্গতে—আমি, २ ১৮ গল্প, গল্প নয় । ম্যানেজার বাবু আর সেই তিন পুরুষের বাজার সরকার তারিণী ঠাকুর, তিনজনে মিলে শেষে শবদাহ করে আসি। গাঁয়ে কি লােক আছে বাবু! বাবুও এলেন না মরার সময়, টেলি দিলেন ম্যানেজার বাবু, কোন খোঁজখবর নেই। শেষে খবর এল শুনেছি শিলঙে নাকি বেড়াতে গিয়েছেন। কিন্তু হক কথা বলব বাবু, এমন সেবা করতে দেখিনি বৌমার মত, তিনি ত দেবী, ও, যাবার দিন কি চোখের জলই না ফেলে গেছেন, যাওয়ার ইচ্ছা মােটেই ছিল না। শেষে কি ভেবে চলে গেলেন বুঝতে পারলুম না। কোনমতে ঢোঁক গিলে জিজ্ঞেস করলুম, কোথায় গেলেন ? ফ করে বেহারীর মুখ থেকে বাহির হয়ে এল, তিনি ত জেলে বাবু। —জেলে ? বলিস কিরে ? -হা বাবু, সত্যিই তিনি জেলে, বেহারী সরকার বিশ বছর । সরকারের নিমক খেয়েছে, মিথ্যা কথা কইতে জানে না। স্বদেশী করে না তেনার জেল হ’ল এক বছরের,••••••এখন বুঝি কলকাতায় না কই, ওই যে পােষ্টমাষ্টার বাবু আসছেন, তেনার কাছে সব জানতে পারবেন। আমরা মুখ্যমুখ্য মানুষ, সব কথা ভালাে জানি না। নূতন পােষ্টমাষ্টার বাবুর সাথে আলাপ পরিচয় হল। সব কথা শুনে নিলুম, কংগ্রেসের কি একটা আন্দোলনে যােগ দিয়ে রমলার এক বছরের জেল হয়েছিল, এখন সে আলিপুরের জেলে অনশন করছে, বাঁচবে কিনা সন্দেহ। আরও শােনলাম, অবিনাশ নাকি আবার বিয়ে করেছে। দেশের জায়গা জমি সব ম্যানেজার বাবুই দেখেন শােনন, শুধু টাকার দরকার হলে মাঝে মাঝে খবর আসে। শেষ রাত্রিতে নৌকা ছেড়ে চলে এলুম। কোলকাতা গিয়ে যদি কোনয়তে মেহের বােনটিকে বাঁচাতে পারি। জানি তার চোখের জলে ০৮০ ০ ০ ০ গল্প, গল্প নয় জগতের পাপপুণ্য সব লুপ্ত হয়ে গেছে, কত বড় দুঃখে সে যে দেশের সেবা মাথায় করে নিয়েছে, সে কি আমার আজ অজানা। মনে বড় দুঃখ হ’ল কেন বছর খানেক আগে তার কোনও খােজ খবর করিনি। সে ত আমাকে দাদা বলেই জানত। অভিমানী ছােট বােনটির কথা মনে পড়ে নৌকায় শুয়ে শুয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলুম, কিছুতেই মনকে প্রবােধ দিতে পারলুম না। হয়ত এমনি চোখের জলে তার কতদিন কেটেছে কেউ তার খবর রাখেনি, আর কে-ই বা রাখবে। বাংলা দেশের বাপমায়েরা ত মেয়েদের বিয়ে দিয়েই কতব্য কাজ ইতি করে ফেলেন, কচিং কেউ বা কালে ভদ্রে এক-আধটু খোঁজখবর করে থাকেন। কলকাতায় পৌছে প্রথমেই তার খোঁজখবর করলুম। শেষে জানতে পারলুম রমলাকে নাকি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে, এমনি তার গুরুতর অবস্থা। পাগলের মত ছুটে গেলুম তাকে দেখবার জন্য। কিন্তু গিয়ে দেখি জীর্ণশীর্ণ দেহখানি একেবারে নােগশয্যায় নেতিয়ে পড়েছে। ঢলঢলে দুর্গা প্রতিমার মত মুখ খানিতে সেই মিষ্টি হাসিটুকু যেন লেগেই আছে। আজ পনেরাে দিন ধরে সে অনশন করছে। অথচ কোন মায়াবলে সে ক্ষুধাতৃষ্ণার কথা একেবারে ভুলে আছে,—সে মুখের কি অপূর্ব জ্যোতি, একদৃষ্টে চেয়ে থাকা যায় না। সুমুখে দাঁড়িয়েছিলাম। প্রথমটা আমাকে চিনতে পারেনি ভালাে করে, ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়েছিল সে। শেষে কোনমতে হাতখানি বাড়িয়ে দিয়ে বললে, কে ? দাদা! আর কিছু সে বলতে পারলে না। চোখ দুটি থেকে ক্রমাগত অশ্রু ঝরে পড়তে লাগলাে। চুপ করে বসে তার চোখের জল মুছিয়ে দিতে লাগলুম। আশে পাশের নাসরা এবং ডাক্তার সাহেব ফিসফিস করে আমার কানের কাছে বলতে লাগলেন, “ওকে বলুন, কিছু খাবেন নাকি ? আজ না খেলে আর উপায় নেই।” ।
গল্প, গল্প নয় জিজ্ঞাসা করলুম, কিছু খাবে? ফিক্ করে একটুখানি হেসে শীর্ণকণ্ঠে বললে, না দাদা, আপনি ফিরে যান। এ অবস্থায় কোন রকম সান্ত্বনা দেওয়া উচিত হবে না ভেবে চুপ করে রইলুম। অনন্ত পথের যাত্রীর জন্য কয়েক ফোঁটা অশ্রু সকলের অলক্ষ্যে ঝরে পড়লাে, সেই পরম পাথেয় বুকে করে রাজপথে বেরিয়ে এলুম। বালিগঞ্জের কাছে যখন এসেছি তখন শােনলুম, লােজনেরা অনশন ব্রতীদের সম্বন্ধে কি সব বলাবলি করছে। একজন বললে, অলকা সেন, রমলা দেবীর অবস্থা সাংঘাতিক। আর একজন বললেন, সন্ধ্যা চ্যাটার্জি, লীনা গুপ্ত, বিজলী সেন, স্মৃতি রায়, মীনাক্ষী দেবী, চিনু ঘােষের অবস্থাও নাকি তততধিক•••••এই দেখুন খবরের কাগজে বেরিয়েছে। জানি রমলা চলেই যাবে, তাকে রাখবার মত কিছু নেই জগতে। বড় অভিমানে সে আজ চলে যাবে। এমন সুন্দর একটি প্রাণ হেলায় ফেলায় নষ্ট হয়ে গেল, ভগবান কেন তাকে এত রূপ গুণ দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন। দশ বছর পরে আবার লেবঙে এসেছি। পথ ঘাট একটু বদলে গেছে বটে, কিন্তু রমলাদের বাড়ীর সম্মুখে এসে কান্না আর কিছুতেই থামতে চায় না যেন! একজন পথচারীকে জিজ্ঞেস করে জানলুম, প্রতুল বাবুরা এখন আর লেবঙে নেই, তারা কোঝকাতায় না কোথায় আছেন, এ বাড়ী এখন ভাড়া খাটছে। রমলাদের বাড়ী অবধি একবার হেঁটে গেলুম। তাদের বল থেকে গােটা কয়েক তাজা ফুল মালে জড়িয়ে নিলুম। ফুলগুলি
গল্প, গল্প নয়
কতদিন পরে শুকিয়ে ঝরে পড়েছিল, সে খেয়াল আমার ছিল না।
দূরে কোথায় ঝির ঝির করে একটা পাগলা-ঝােরার শব্দ শােনা যাচ্ছিল,
আর সেই সরল বনের একঘেয়ে সন্ সন্ শব্দ মাঝে মাঝে ভেসে আসছিল।
সন্ধ্যা হয়ে আসতেই পথের বাঁকে কতদিন তার সাথে দেখা হয়েছে,
একে একে মনে পড়তে লাগলাে।
একে
সেই নীল শাড়ী পরা মমতা মাখা ঘােট বনটির সজল-চাওয়া
মুখখানি মনের কোণে এক একবার ভেসে উঠে আবার
যাচ্ছিল •••••
আর কখনও লেবঙে ফিরে যাইনি। লেবঙ পাহাড়ের স্বপ্ন-স্মৃতি
আজ আমার কাছ থেকে দূরে••••'বহুদূরে চলে গেছে, সে
আর ফিরবার নয়••••••••!
পরের ছেলে আদেশে সামান্য একটি ডুমুর গাছ লইয়া ঘােট তরফে ও বড তরফে দস্তুর মত মােকদ্দমা শুরু হইয়াছিল। কত টাকা পয়সা যে অযথা নষ্ট হইতেছে, সেদিকে কাহারও লক্ষ্য নাই, রূপগঞ্জের ছােট তরফের জমিদার পানুবাবুরই এ বিষয়ে জিদ বেশী। তিনি বিনাযুদ্ধে সূচ্যগ্র ভূমি না দেওয়ার পক্ষে বরাবরই ছিলেন, আর আজ একটা জলজ্যান্ত ডুমুর গাছ তাহারই চোখের উপর বড় হিসার বড বাবুব লােজনেরা কাটিয়া লইয়া যাইবে, ইহা তাহার নিতান্তই অসহ। পানুবাবু খুল্লতাত জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বেণুবাবুব নামে আদালতে মামলা রুজু করিলেন। গ্রামের লােকেরা শুনিয়া ছি ছি করিল, কিন্তু পানুবাবু ইহাতে বিচলিত হইলেন না। বংশ পরম্পরায় এই দুই পরিবারের মনােমালিন্যের ঘনঘটা ক্রমশঃ বাড়িয়াই চলিয়াছিল। প্রাচীনকালে কর্তারা হাঙ্গামা, লুটতরাজ, ফৌজদারী মামলা করিয়া জিঘাংসাবৃত্তি চরিতার্থ করিতেন, এ আমলে এখন আর এসব চলে না, দাঙ্গা হাঙ্গামার নামে প্রজারা বিদ্রোহী হইয়া ওঠে। তাই সামান্য খড়কুটা লইয়া ঝগড়া-ঝাটি বাধে। পা বাবুর জননী দাঙ্গায়ণী এসব বিষয়ে পুত্রগণকে নিরন্তর উৎসাহিত করিতেন, বড় তরফের কী-মা এসব বিষয়ে বড় একটা গ্রাহ্য করিতেন না। পুত্রবধূ কমলার উপর সংসারের সমস্ত ভার বুঝাইয়া দিয়া তিনি সারাদিন পুজা-সন্ধ্যায় দিন কাটাইতেন।
পরের ছেলে । কমলা সাক্ষাৎ কমলার মত, কিন্তু নিঃসন্তান, তাহার মুখে হাসি না দেখিলে বাড়ীর দাসদাসী পৰ্যন্ত সুষ্ঠুরূপে কাজকর্ম করিতে পারে না। ও বাড়ীর ছােট বউয়ের সাথে তাহার খুব ভাব। বাবুরা বিষয়-আশয় নিয়া ঝগড়াঝাটি করে, ইহাতে তাহাদের কি! প্রতিদিন খিড়কি পুকুরের পাশাপাশি বাঁধাঘাটে বসিয়া দুই জায়ে গল্প করিতে করিতে বিভাের হইয়া যায়, নাওয়া-খাওয়ার কথা তাহাদের আর জ্ঞান থাকে না। যখন অন্দর হইতে বার বার বড়-মার তাগিদ আসিতে থাকে, কমলা সাত তাড়াতাড়ি পুকুরে নামিয়া এক ডুবে স্নান সানিয়া গৃহে ফিরিয়া যায়। ছােট বউ সতী ঘরে ফিরিয়া গেলেই শাশুড়ীর যত রাগ হয় বৌয়ে উপর, অথচ মুখ ফুটিয়া কোন কথা ভালাে বলিতেও পারেন না, গােমবা-মুখে বিড বিড করিয়া যা মুখে আসে তা-ই বলিতে থাকেন। মাঝে মাঝে বড় পৌত্রটির পিঠে মাথায় কিছু উত্তম-মধ্যম দিয়া শাসনে, সুরে বলিয়া উঠেন, হারামজাদা ছেলে, আর একদিন গিয়ে দেখিস ও-বাড়ী। শত্রুর বাড়ী কখনও মানুষ যায়, কোনদিনবিষ খাইয়ে মেরে ফেলবে তােকে। আর একদিন যেয়ে দেখি ও-বাড়ী, পা ভেঙে দেব না। বারাে বছরের ছেলে ফটিক ঠাকুরমার মুখের পানে চাহিয়া বলে, কেন, গেলে কি হয়? ও-বাড়ীর বড়-মা আমাকে একটা ফুটবল কিনে দেবে বলেছে, আমি, লাবু, হান্, টমপাই, আমরা একটা ক্লাব করব জানাে ঠাকুরমা ! আমাদের বাড়ীর উঠানে আমরা খেলবাে। কথা শুনিয়া ঠাকুরমা বিকৃতম্বরে মুখ ঝামটা দিয়া উঠিলেন। পাড়ার ভূতত আসিয়া ডাক দিতেই ফটিক বাহিরে ছুটিয়া গেল। কী হেঁচাইয়া কহিলেন, আবার কোথা যাচ্ছিস রে? ও ফেলার
২৪
গল্প, গল্প নয়
ক
মা, একবার দেখে আয় না বাছা, এই ঠাটা পােড়া বােদ্র বের হয়ে
যায় কোথা ?
ক্ষেমার মা হাত পা নাড়িয়া কহিল, আর যাবে কোথা, হেই বড়
বৌদির বাড়ী। সেখানে একদিন না গেলে ছেলের পেটের ভাত
হজম হয় আবার! আমি যাব এখন বাডী-বাড়ী ছেলে খুজতে !
দাঙ্গায়ণী বিরক্তির সুরে কহিলেন, তুই না পারিস, হরিকে একবার
ডেকে দে না!
হরি গিয়াছিল বাজারে সরকার মশায়ের সাথে। ফটিককে আর
পাওয়া গেল না। শিবপূজা করিতে করিতে দাক্ষায়ণী বার কয়েক
ফুল বেলপাতা যেমন খুসী তেমনিভাবে ছড়াইয়া ফেলিতে লাগিলেন।
যত রাগ হইল পুত্রবধূর উপর।
সেদিন দুপুরবেলা পানুবাবু খাইতে বসিলে দাঙ্গায়ণী কাছে আসিয়া ।
বসিলেন। একথা সেকথার পর তিনি ফটিকের বড়বাড়ী যাতায়াতের
কথা বলিতে ভুলিলেন না। পানুবাবু গোঁয়ার-গােবিন্দ লােক, কোন
মতে আহাদি শেষ করিয়া জীববিশেষের মত লাফাইয়া উঠিয়া
কহিলেন, কোথ। সেই হতভাগা, ডাকো দেখি এখানে।
ফটিকের ঘােট বােন বুড়ী সেখানে দাঁড়াইয়াছিল, চুপিচুপি বাবার
কাছে ঘেঁষিয়া আসিয়া
কহিল, দাদা লিচুগাছের আগডালে বসে
বাদুড় ঝুলছে।
দীক্ষায়ণী সায় দিয়া কহিলেন, ওইত ওর কাজ, ছাই, রজনীমাষ্টার
ওকে পড়ায় কিছু? তার চেয়ে মনসা পণ্ডিতের পাঠশালায় ভর্তি করে
দিলেই হয়। এদিকে সারাদিন, আর সন্ধ্যা অবধি পড়াবে রজনী
মাষ্টার, দেখি কি করে যায়।
বুড়ী ছুটিয়া গিয়া দাদার কাছে খবর দিতেই সে একলাফে নীচে
পরের ছেলে ২৫ নামিয়া বড়বাড়ীর খিড়কি দরজা দিয়া ভিতরে ঢুকিয়া পড়িল এবং উদ্ধশ্বাসে কমলার কোলে ঝাপাইয়া পড়িয়া কহিল, বড়-মা! কমলা ধীরে ধীরে তাহাকে কোলে জড়াইয়া ধরিয়া কহিল, কি হয়েছেরে ফটিক? অমনি ছুটে এলি কেন, কি হয়েছে বল না? ফটিক দুষ্টুমির একটুখানি হাসি হাসিয়া কহিল, বাবা নাকি আমাকে মারবে। -কেনরে! -তােমার কাছে যখন-তখন আসি বলে। ঠামা বলে দিয়েছে বাবার কাছে। আচ্ছা বড়-মা, তােমাদের বাড়ী এলে কি দোষ হয়। কমলার আসল ব্যাপার বুঝিতে বিন্দুমাত্র দেরী হইল না। সব কথা সে জানে, বােঝে, কিন্তু কোন কথায় সে যায় না। খানিকক্ষণ • চুপ করিয়া থাকিয়া কহিল, না, দোষ হয় না। এই কথাটি বলিয়াই পরক্ষণে ফটিককে ভুলাইবার জন্য কহিল, আজ ইস্কুলে গিয়েছিলি ? ফটিক ঘাড় নাড়িয়া জানাইল, হাঁ। জানাে বড়-মা, আজ মাষ্টার মশায় বুড়ীর কান দুটি মলে দিয়েছে, পড়া বলতে পারেনি, বলিয়াই ফটিক অঙ্গভঙ্গী সহকারে রজনী মাষ্টারের মুখবিকৃতি অভিনয় করিয়া পুনরায় কহিল, ঠা’মা বলেছে আমাকে বড় ইস্কুলে ভর্তি করে দেবে। সব কথা শুনিতে শুনিতে কমলা অন্যমনস্কর মত কহিল, বেশত।” কিন্তু তাহার মনে ফটিকের এ বাড়ী আসা-যাওয়া সম্বন্ধে নানা কথা জাগিতেছিল। দুই তরফে ঝগড়া ঝাটি, মামলা মােকদ্দমা হয় সত্য, তাই বলিয়া ছেলে মেয়েরা পর্যন্ত যাওয়া-আসা করিতে পারিবে , এ কি ধরণের কথা সে ভালাে বুঝিতে পারিল না। এই ঘটনার দিনকয়েক পরে ছােট বাড়ীতে বিষম কোলাহল, চীৎকার শুনিয়া কমলা চিলে ছাদের কাছে দাঁড়াইয়া চুপি চুপি দেখিল, গল্প, গল্প নয় ঋহিল, ফটিককে তাহার বাবা পানুবাবু রীতিমত মারধর করিয়েছিলেন। দৃশ্য যে আজ নূতন নয়, ইহা কমলার বেশ ভালাে জানা ছিল। ফটিকের মা কাছেই দাড়াইয়াছিল, সে বােবার মত চুপ করিয়া রহিল। অথচ স্বামী তাহার কথায় উঠে, বসে, এই কথা বার বার মনে করিয়া কমলার দরাজ প্রাণটি হঠাৎ কঁদিয়া উঠিল। কমলা জানে, ফটিক তাহার গর্ভজাত সন্তান নয়, ভগবান তাহাকে এবিষয়ে চিরদিনের মত বঞ্চিত করিয়াছেন। কিন্তু মায়ের প্রাণ ত তাহার আছে, সে জানে সন্তানের ব্যথা বেদনা। দাঙ্গায়ণী আনন্দে ডগমগ হইয়া পুত্রের সুমুখেই শাসনের সুরে কহিতে লাগিলেন, কেমন, এবার হয়েছে, আর একদিন যেয়ে, পিঠের হাড় মাস আর আস্ত থাকবে না। ফটিক মড়ার মত চুপ করিয়া একটি কথা তাহার মুখ হইতে আর বাহির হইল না। তাহার বড়াে করিয়া মনে পড়িল তাহার জননীর কথা, তিনি বাঁচিয়া থাকিলে আজ কেহ তাহার গায়ে হাত তুলিতে আবার সাহস করিত। ছ’বছরের সময় তাহার জননীর মৃত্যু হইয়াছিল, বৎসর না ঘুরিতেই তাহার নূতন-মা, আসিয়া এবাড়ীতে উপস্থিত হয়। সকল কথাই তাহার বেশ মনে পড়ে। তাহার ছােট ভাই টিটু ও মেজবােন বুড়ী শত সহস্র অন্যায় করিলেও তাহাদের সাত খুন মাপ, আর তাহার বেলায়ই যত দোষ নল যােব। বিষম মার খাইয়া বেচারী ফটিক বিছানায় পড়িয়া রহিল, বিন্দু ঝি, কেমীর মা, রসিকঠাকুর তাহাকে শত সাধ্য সাধন করিয়াও খাওয়াইতে পারিল না। একথা কমলার কাণে গেল। কমলা বড়ঘরের মেয়ে, সতীর মত
পরের ছেলে
২৭
গরীবের ঘরের মেয়ে নয় সে ; বাপের বাড়ীর দাসী পটলকে ডাকিয়া
কহিল, ফটিক কি এখনও না খেয়ে শুয়ে আছে পটল ? একবার
তাকে ডেকে আনতে পারি এখানে, যা না একবার ?
পটল জিভ কাটিয়া কহিল, তাহলে আর কারও রক্ষা থাকবে,
বিন্দুকে জিজ্ঞেস করে তবে ত এই খবর নিয়ে এলুম। আমাদের
ও-বাড়ীতে যাওয়া নিষেধ দিদিমণি। আমি আর কামিনী ঝি।
বামুন দিদি যায়, সে আলাদা কথা।
কমলা একটুখানি ভাবিয়া কহিল, শশী, গােরা ওরা যায় ?
—তা কি করে বলব দিদিমণি ! রেখে দাও ওসব কথা, মায়ের
চেয়ে মাসীর দরদ কেন! একটি ছেলে ত পেটে ধরনি। ভগবান
দেননি কি করবে বলে !
কমলার চোখ মুখ রাগে, দুঃখে ঈষৎ রঞ্জিত হইয়া উঠিল, কোন
মতে ক্রোধ দমন করিয়া কহিল, কি বললি লা, যত বড় মুখ নয়, তত
বড় কথা, তােকে আমি কোন কথা জিজ্ঞেস করেছি, যা এখান থেকে,
দূর হয়ে যা।
পটল ধমক খাইয়া চলিয়া গেল, রান্নাঘরের পিছনে আসিয়া
কামিনী ঝিকে একা দেখিতে পাইয়া কহিল, আচ্ছা, তুই বল না
কামিনী, আমাকে বলে কিনা ফটুকে-কে ডেকে নিয়ে আয়, তুই
পারিস কামিনী !
কামিনী ঝঙ্কার দিয়া কহিল, কেন পারবাে না, যার খাই তার
পরি, তার নামে দিই গড়াগড়ি, হাজার বার পারবাে।
ও বাড়ীর
ছােট-মা আমাকে একটু ভালো চোখে দেখেন, কত ফুট ফরমাস করে
দিই তার যখন-তখন, আর এ সামান্য কাজ পারব না।
পটল মুখ ভার করিয়া কহিল, ওসব রাজ-রাজড়ার কাণ্ড কারখানা
২৮
গল্প, গল্প নয়
আমি ভালাে বুঝিনে কার্মিনী, তাের যা খুসী, তুই কগে, বলিয়া
বিড় বিড় করিতে করিতে অন্যত্র চলিয়া গেল।
কামিনী ঝি মুখে যতই বলুক না কেন, কাজের বেলায় কিছুই
করিতে পারিল না। সে রাত্রিতে কমলা জলস্পর্শ পর্যন্ত করিল না,
তাহার তৃষিত মাতৃহৃদয়ের অব্যক্ত বেদনা শুধু অন্তর্যামী জানিলেন।
ভাের না হইতেই ফটিক আসিয়া হাজির।
কমলা ধড়মড়িয়া
জাগিয়া বসিল। বেণুবাবু ফটিককে সুমুখে দেখিয়া কোন উচ্চবাচ্য
করিলেন না।
তাহার মুখে কি একটা কথা সহসা বাহির হইয়া
পড়িতেছিল। হরিপুবের প্রজাদের আগমন বার্তা শ্রবণে তিনি সেরেস্তার
দিকে চলিয়া গেলেন।
কমলা মুখ তুলিয়া কহিল, আবার কেন এসেছিস ফটিক, আমার
জন্য তােকে কম শাস্তি পেতে হয়, তুই আর আসিনে ফটিক।
শেষের কথা কয়টি বলিতে বলিতে তাহার গলা ধরিয়া আসিয়াছিল।
উদগত অশ্রু কোন রকমে দমন করিয়া কমলা কবাটের আড়ালে চুপ
করিয়া দাড়াইয়া রহিল।
কমলার মনে পডিল, ফটিকের এই ব্যাপার নিয়া কাল এ বাড়ীতেও
একটা কুরুক্ষেত্র হইয়া গেছে। বেণুবাবু খুব ভালাে লােক, হঠাৎ
আগিলে দিক্বিদিক জ্ঞান থাকে না। কাল নাকি তিনি কমলাকে যা
মুখে আসে তাই বলিয়াছেন। স্বামীর মুখে এমন রূঢ় বাক্য সে সচরাচর
বড় একটা শশানে নাই। তাই কমলার শুধু অভিমান হয় নাই, একটু
বেশ মনে দুঃখও হইয়াছে। স্বামী বারংবার খােটা দিয়াছেন, পরের
ছেলের জন্য তার অত মাথা ব্যথা কেন! পরের ছেলে, একথা
ভাবিতেও তাহার বুকখানি হঠাৎ ছ্যাৎ করিয়া উঠে।
ফটিকের এখন একটু বয়স হইয়াছে, সে এসব কথা যে না বােঝে
.
পরের ছেলে এমন নয় ; কমলাকে সে কি চোখে দেখে, তাহা সে নিজেও ভালো জানে না। সাত বছর বয়সে ফটিক জননীকে হারাইয়া এই কমলার কাছে সময়ে অসময়ে অন্যায় আবদার করিত। দুই তরফে যখন মুখ দেখাদেখি পৰ্যন্ত ছিল না, কমলা হাসিমুখে এবাড়ীতে আসা যাওয়া করিত, এবাড়ীর মেয়েরা কদাচিৎ বড় বাড়ীতে পায়ের ধূলা দিত, কিন্তু ছেলেপেলেদের বেলায় এসব কথা কেহ কোনদিন কোনকিছু কানে শােনননি। ছলছল চোখে চাহিয়া ফটিক ধীরে ধীরে ঘবেব বাহির হইয়া গেল। এক মাসের ভিতর সে আর এবাড়ীতে পা দেয় নাই। বাবা মাও এখন আর তাহাকে তেমন বিষচক্ষে দেখেন না। তবে যার মা নাই, সংসাবে বাপের সঙ্গে তার এমন কি সম্পর্ক থাকিতে পারে। সতী তার নিজের ছেলেমেয়ে নিয়াই ব্যস্ত, ফটিকের কথা বড় একটা কাহারও এ বাডীতে মনে পড়ে না। সে খায় কি না খায়, বাঁচে কি মরে, পরের ছেলের জন্য এত দরদ আবার কারাে থাকিতে পারে। বামুন-দিদি এই মা-মরা ছেলেটিকে একটু স্নেহের চোখে দেখিতেন, পটলের তাহা সহ হইত না, সে টিটু, বুড়ীকে কাছে পাইলে হাতে আকাশ পাইত, অন্ততঃ এই ভাবটাই সতীর কছে দেখাইত। সেদিন বামুনদিদি বড় একটা কই মাছ ভাজা টিটুর পাতে না ফেলিয়া মেহভরে ফটিকের থালায় দিয়াছিল। পটলের চোখে তাহা এড়ায় নাই কিন্তু। সে তখনই ছােট মায়ের কানে নানা কথায় রঞ্জিত করিয়া কথাটি তুলিয়া আসিল। সহসা রান্নাঘরে সতীর আবির্ভাবে বামুন-মেয়ের ধরে আর প্রাণ ছিল না। টিটু, মাকে দেখিয়াই বলিয়া উঠিল, মা, কই মাছ ভাজা কই? আমাকে একখানা দিতে বল না। দাকে কেন দিয়েছে ?
গল্প, গল্প নয় ফটিক মুখ গুজিয়া ভাত খাইতেছিল, টিটুর দিকে চাহিয়া কহিল, আমি দেব আধখানা, এই নাও। যেমন বলা, সতী রান্নাঘর কাপাইয়া চেঁচাইয়া উঠিল, ওকি তােমার খায় না পরে, হাগা বামুন মেয়ে, তােমার চোখে একটুখানি পরদা নেই নাকি! আমার ছেলে হ’ল পর, আর পরের ছেলে হ’ল আপন, কি একচোখাে তুমি বাছা ! বামুন মেয়ে ধীরে ধীরে কহিল, কাল ছোটকে দিয়েছি, আজ ফটিককে দিয়েছি। দাঙ্গায়ণী পাশের ঘর হইতে ফিরিয়া যাইতেছিলেন, শেষের কথা কয়টি তাহার কানে যাইতেই তিনি অগ্নিমূর্তি ধারণ করিয়া রান্নাঘরের দাবায় আসিয়া পৌছিলেন, কহিলেন, ছােটকে কাল দিয়েছ বলে আজ আর দেওয়া যায় না। আমি সব বুঝি, সব জানি। লুকিয়ে লুকিয়ে সব ভালাে জিনিষ খাওয়ানাে হয় ওই হাড়হাবাতে পােড়ারমুখােকে। বলি বামুন মেয়ে, কার খাও, কার পরে; সে কথা কি তােমাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে বােঝাতে হবে নাকি ! বামুনদিদি ও যে-সে মেয়ে নয়, রাগতভাবে বিরক্তির সুরে কহিলেন, তা আর জানিনে! কার খাই, কার পরিবেশ জানি! মা লক্ষ্মী স্বর্গে গেছেন, এইত একটিমাত্র ছেলে, পরের ছেলেকে গাঁশুদ্ধ লােকে জানে, খেতে বসে একটি কথা পৰ্যন্ত নেই, যা দাও তাই খেয়ে উঠে যায়, মুখে রা শব্দটি নেই। ওর যদি না এমনি ভাবে কপাল পুড়বে তাহলে একটুকরাে মাছের জন্য এত কথা শুনতে হয় আমাকে। ফটিকও ব্যাপার দেখিয়া শুনিয়া অবাক, সে তাড়াতাড়ি মুখের ভাত ফেলিয়া দিয়া এক লাফে উঠিয়া পড়িয়া পুকুরের দিকে মুখ ধুইতে চলিয়া গেল। দাঙ্গায়ণী হাড়ে-হাড়ে জ্বলিয়া উঠিয়া কহিলেন, কি গো ।
পরের ছেলে নবাব পুত্তর, এক থাল ভাত যে ফেলে উঠে গেলে, তােমার কোন জমিদারী থেকে টাকা আসে শুনি। খিড়কি পুকুরে স্নান করিতে গিয়া কমলা অদূরে দাড়াইয়া দেখিতে পাইল, ফটিক ঘাটে নামিয়া হাত মুখ ধুইয়া ক্রমাগত উদগত অঞ দুই হাতের মুঠোয় ঠেলিয়া রাখিতেছিল। হঠাৎ কমলার চোখাচোখি হইতেই ফটিক তাড়াতাড়ি ঘাট ছাড়িয়া বাগানের পথে কোথায় জানি অদৃশ্য হইয়া গেল। আজ আবার কি ব্যাপার, ভাবিয়া কমলা ধীরে ধীরে বাঁধা ঘাটের বােয়াকে বসিয়া আকাশ পাতাল ভাবিতেছিল। আজ প্রায় তিন মাস পরে এই একদিন দেখা। বড়-মাকে এড়াইয়া চলিবার কৌশল ইতিমধ্যে ফটিক আবিষ্কার করিয়া ফেলিয়াছে। পুকুর ঘাটে স্নান করিতে গেলে সে বুড়ীকে কঁচা পাকা পেয়ারার লােভ দেখাইয়া বসাইয়া রাখে। বড়-মার সাড়া শব্দ পাইলেই বুড়ী চোখ ইসারায় সে কথা ফটিককে জানাইয়া দেয়। সেও ঝুপ করিয়া এক ডুব মারিয়া ভিজা কাপড়ে ভিতরে ছুটিয়া আসে। ডুমুর গাছ লইয়া যখন মন কষাকষি চলিয়াছিল, তখন শুধু কমলা বিজয়া দশমীর দিন একবার এ বাড়ীতে পা দিয়াছিল, সতী, পানু ও ছেলেপেলেরা বড় বাড়ীতে আসিয়া দেখা শােনা করিয়া গিয়াছে। ইহা ছাড়া এ বাড়ীর কুকুর বিড়াল পর্যন্ত ভুলে ও বাড়ীর আঙিনায় ছুটিয়া যায় না ! কালে ভদ্ৰে সতীর সাথে কমলার পুকুর ঘাটে দেখাশােনা। ফটিকের মারধরের ব্যাপারের পর হইতে কথাবার্তা বড় একটা হয় না। ঘােট বউ বড় বউকে দেখিলে ঘােমটা টানিয়া চলিয়া যায়, বড় বউ দেওরকে সুমুখে দেখিতে পাইলে কনে বৌয়ের মত চলাফেরা করে। এইভাবে ६५ গল্প, গল্প নয় দিন চলিয়াছে। বড় বাড়ীর কীমাকে কেহ বড় একটা দেখিতে পায় । ইদানীং তিনি গয়া কাশী করিতে বিদেশে বাহির হইয়াছিলেন। যাওয়ার সময় সকলের সাথে দেখাশােনা করিয়া গিয়াছেন, কবে পৰ্যন্ত ফিরিয়া আসিবেন, তাহার নিশ্চয়তা নাই। ছ'মাসও হইতে পারে, আবার দু’মাসেও ফিরিয়া আসিতে পারেন। কি! পূজা আসিয়া পড়িয়াছে। সংসারে কাজকর্মের অন্ত নাই। মুখুয্যে বাডীর শৈলরা বড় বাড়ীতে বেড়াইতে আসিয়াছিল। কথায় কথায় কহিল, ছােট বাড়ীর পানুবাবুর ছেলে ফটিক এবার পরীক্ষায় বৃত্তি পাইয়াছে। কমলা উচ্ছসিত হইয়া কহিল, পােড়ারমুখাে ছেলে সে কথা একবার বলেছে এসে। দেখা হলেই ছুটে পালায়। শৈল ফস্ করিয়া তাহার মুখের উপর জবাব দিল, ছুটে পালাবে না ত বাপ মায়ের শিক্ষা, আর ওই বুড়ী যত নষ্টের গােডা। ছেলেমেয়ের মাথা খেলে ওই ডাইনি! ওই ডাইনি বুড়ী ও ফটিককে এখন দু চোখে দেখতে পারে না ! কমলা সে কথায় কান না দিয়া কহিল, থাক্, সুখে বেঁচে থাক। পড়াশােনায় ভালাে না হলে ওর উপায় আছে। কাদম্বিনী জিহা উল্টাইয়া মুখে এক অদ্ভুত শব্দ করিয়া কহিলেন, মা মরলে বাপ হয় তালুই। ছেলেটার কি দুর্গতি গাে। দু’বেলা দুমুঠো খেতে পায় না। তার ওপর মারধর বকাঝকা ত আছেই। কিন্তু কি লক্ষ্মী ছেলে, কি বলব বৌমা, এমনটি হয় না। দুর্গার পেটে সােনার ছেলেই এসেছিল। ওই নাম করেই ত তার প্রাণ বেরিয়ে গেল! আহা পরের ছেলেকেও লােকে কত আদর যত্ন করে, আর এত •• পরের ছেলে কমলার চোখ দুটি সহসা সজল হইয়া উঠিল, কহিল, ঠাকুরঝি, একবার দেখা হলে আসতে বলল না! আগে আত ভাই, এখন আর আসে না ! শৈল মুখ ভার করিয়া কহিল, আমাদের নিখিল সেদিন বলছিল, ওর বাবাই নাকি কোথাও যেতে মানা করে দিয়েছে। তাই বােধ হয় আসে । তা বলে তােমাদের বাড়ী আসবে না, সে কি কথা! তুমি হলে আপন জ্যেঠাই মা! পাশাপাশি বাড়ী, এক দাদামশায়ের ছেলে পানু আর বেণু ! ঝগড়াঝাটি মামলা মােকদ্দমা হাজার হয় একখানে থাকতে গেলে, তা বলে ছেলেমেয়েরাও ঝগড়া করে এ বাড়ী আসবে না নাকি, একি একটা কথার কথা হ'ল। আর শুনলে লােকেই বা তােমাদের কি বলবে বলল। কমলা চুপ করিয়া রহিল, আর কোন কথা বলিল না ! তাহাকে নিরুত্তর দেখিয়া শৈল কহিল, আমাদের মনু কাল কি বলছিল জানাে বৌদি! ফটিক এবার জলপানি পেয়েছে না! সেই টাকা মাসে মাসে জমা করে তােমার টাকা নাকি শােধ করে দেবে। বলে কি আবার জাননা, বড় মা আমাকে জলখাবারের জন্য অনেক পয়সা দিয়েছেন, তাই সেদিনও গিয়েছিলাম পয়সা চাইতে, তাড়িয়ে দিয়েছে। কমলা এক মুহূর্তে মুখখানি কালি করিয়া কহিল, শােন, ছেলের কথা, আমি কখন তাকে তাড়িয়ে দিলুম? আচ্ছা ঠাকুরঝি, মনুকে একবার আসতে বলল না কাল, সব কথা শুনব। উপস্থিত মেয়েরা ও একটা বাজে কথা, ও সব কথায় কান দিয়ােনা বড় বউ' প্রভৃতি মন্তব্য করিয়া যে যার বাড়ীর দিকে রওনা হইয়া গেল। সন্ধ্যা হয়-হয় প্রায়। কমলার কত কথাই আজ মনে পড়িতে লাগিল। প্রতিদিন সন্ধ্যার পূর্বে সে ছাদের ওপর দাড়াইয়া এক দৃষ্টে ৩৪ গল্প, গল্প নয় নদীর পথের দিকে চুপি চুপি চাহিয়া থাকিত। ছেলের দল হল্লা করিতে করিতে গৃহে ফিরিয়া যায়, ফটিকও তাহাদের সাথে খেলা করিতে আসিত। যদি ভুলে কোনদিন সােনার ছেলে এদিক পানে একবার ফিরিয়া চায় । কতদিন মুখুয্যেদের মনুর কাছে, ও পাড়ার হারুর কাছে কমলা বলিয়া দিয়াছে ফটিককে আসিবার জন্য, ফটিক আর আসে না। তাহাকে শত ডাকাডাকি করিলেও সে মুখ ফিরাইয়া চলিয়া যায়। মহাষ্টমী পূজার দিন রাত্রিতে গ্রামের মেয়েরা প্রতিমা দেখিয়া বেড়াইতে বাহির হইয়াছিল। কমলাও গিয়াছিল। তাহার সাধারণ কাপড় জামা দেখিয়া গ্রামের মেয়েরা অবাক হইয়া গেল। এ বাড়ী ওবাড়ী করিয়া তাহারা ঘােষালদের বৃহৎ চণ্ডীমণ্ডপে গিয়া গড়াইয়া প্রতিমা দেখিতেছিল। সেখানে আজ আবার যাত্রা গান হইবে। ছেলের দল সন্ধ্যা হইতেই ভিড় করিয়া জায়গা জুড়িয়া বসিয়াছিল। ফটিক এক কোণে একটা ময়লা জামা পরিয়া চুপ করিয়া কি জানি দেখিতেছিল। ঘােষালদের হেবো তাহাকে তদবস্থায় দেখিয়া ঠাট্টা করিয়া কহিল, কিরে ফটিক, তাের বাবা তােকে একটা নূতন জামা কিনে দিতে পারে নি ? তােরা দেখি বড়লােক, জমিদার। দেখত, আমার বাবা কেমন সুন্দর জামা, কাপড়, জুতা কিনে দিয়েছেন! তাের লজ্জা করে না, ময়লা জামা পরে এসেছি যে এখানে ! ফটিক তর্ক না করিয়া কহিল, বাবা বলেছেন, কাল কিনে দেবেন ! -ওঃ পূজোর পরে। কালী পূজার সময় নাকি? হেবাে হি হি করিয়া হাসিয়া উঠিল । কমলার কানে সব কথা গিয়াছিল। সে একটুখানি চুপ করিয়া চাহিয়া দেখিল, আশে পাশে আর কেহ সে সব কথা শুনিতেছে কিনা। বিরাট প্রাঙ্গণে আরতির ধূপের ধোঁয়ায় চতুর্দিক অন্ধকার হইয়া
পরের ছেলে
৩৫
গেছে। দিগম্বর ঢুলী বাবরি চুলের গােছা নাড়াইয়া তালে তালে ঢাক
বাজাইয়া নাচিতেছিল। গণেশ মুখখাটি হুকা হাতে খড়ম পায়ে মাথা
নাড়িয়া তাল ঠুকিতেছেন দেখিয়া হারাণ ঘােষাল হাসিয়া কহিলেন, কি
পুতি, কেমন ঢাক বাজায় দিও ! চমৎকার হাত বলতে হয়। বাঙ্গীপাড়ার
দুইটি ছেলে কানাই ও ফেলু ধুনচি মাথায় করিয়া নাচিতে নাচিতে সারা
বাড়ী সরগরম করিয়া তুলিয়াছে।
ফটিক তন্ময় হইয়া তাহাই দেখিতেছিল, এবং আরতির পর যাত্রা
গান শুনিয়া বাড়ী ফিরিবে ইহাই তাহার ইচ্ছা ছিল। হঠাৎ পিছন
হইতে কে যেন তাহার হাত ধরিয়া টানিয়া আনিতেই সে ফিরিয়া দেখিল,
সুমুখে বড়-মা দাড়াইয়া মৃদু মৃদু হাসিতেছে।
ফটিক চুপ করিয়া রহিল, কোন কথা বলিল না, কমলা কহিল, কিরে
এত রাগ করেছি কেন? চল আমার সঙ্গে, আমাকে বাড়ী পৌছে দিয়ে
আবি। ভােলা চল, আমরা এখন যাবাে !
রমা সােৎসাহে কহিল, আরতি দেখবে না বৌদি ?
কমলা হাসিমুখে কহিল, এইত দেখলুম। এখন যাই, কাল সময়
হয়ত আর একবার আসবাে !
পাড়ার অন্যান্য মেয়েরা যাত্রাগানের আশায় আসিয়াছিলেন, তাহাদের
আর যাওয়া হইল না।
পথে পড়িয়া কমলা কহিল, হারে ফটিক, তােকে যে কতদিন আমি
আসতে বলেছি, আসি নি কেন রে?
- বারণ করেছে।
কামিনী ঝি সায় দিয়া কহিল, সত্যি মা সত্যি তাই।
তোরে ধরে মারপিট করেন।
কমলা মনে মনে ভয় পাইয়া কহিল, তুই নিজে দেখেছিস্?
যখন তখন
গল্প, গল্প নয় কামিনী ঝি হাত পা নাড়িয়া চোখ বড়াে করিয়া কহিল, দেখিনি আবার, সেদিন বুড়ীর সাথে কি নিয়ে ঝগড়া হয়েছিল, সেই নিয়ে সে কি মার দিলে মা, বলনা ভােলা, তুইত সেদিন দাড়িয়ে দেখছিলি সব ! ভােলা সাথে সাথেই বলিয়া উঠিল, সত্যি মা সত্যিই তা, বুড়ীকেও খুব মেরেছিল। শুনিয়া কমলা চুপ করিয়া রহিল। বাড়ী পৌছিয়া কমলা কহিল, আজ কি খেয়েছিস্? ফটিক স্নিগ্ধকণ্ঠে কহিল, হেবােদের বাড়ী নেমন্তন্ন খেয়েছি। —আজ এখানে খাবি, কেমন ? ফটিক ঘাড় নাড়িয়া কহিল, না, খাবাে না! -কেনরে? “তুমি যে মানা করেছ, আর কোন দিন আতে না•••••• কমলা তাহাকে বুকের মাঝে জড়াইয়া কহিল, ওরে বােকা ছেলে, মা কখনও ছেলেকে আসতে মানা করে। সেদিন অমনিই বলেছিলাম। আর কোন দিন বন্ধ না ! ফটিক আর কোন প্রতিবাদ না করিয়া মেজের উপর একখানি আসনে বসিয়া পড়িল, একখানি রেকাবিতে আহাৰ্য, ফলমূল, গৃহজাত সন্দেশ, নারিকেলের নাড়ু, মোয়া, চিরা-জিরা, গঙ্গাজলী সব পরিপাটিরূপে সাজাইয়া বহুদিন পরে আজ আবার কমলা ছেলেকে খাওয়াইতে সুমুখে বসিয়াছিল। ফটিক প্রথমে কিছুই খাইতে পারিবে না, এই মাত্র পেট ভরিয়া খাইয়া আসিয়াছে এই সব কথায় তাহার কাছে কাকুতি মিনতির আবেদন জানাইতেছিল, কিন্তু আধঘণ্টা পরে দেখা গেল, বড়মার সাথে গল্পে-গল্পে অন্যমনস্ক হইয়া সে পরম তৃপ্তি সহকারে সব নিঃশেষ করিয়া ফেলিয়াছে। রাত্রি দশটায় যখন ফটিক গৃহে ফিরিয়া আসিল, কমলা বারবার পরের ছেলে ৩৭ ০ মাথার দিব্যি দিয়া বলিয়াছিল, কাল ঘুম হইতে উঠিয়াই যেন এখানে সে চলিয়া আসে। বাজারে মনমােহন বাবুর দোকান হইতে বড় মা জামা-কাপড় সব কিনিয়া দিবে। সারারাত্রি ফটিক ভালাে ঘুমাইল কি ঘুমাইল না,-তাহা ভালাে বােঝা গেল না। বাহিরে কোন রকমে একটুখানি আলাের আভাস চোখে পড়িলেই এবং পাখীদের ডানাঝড়ার শব্দ শুনিয়া সে কঁচা ঘুমে বারকয়েক জাগিয়া বসিযাছিল। এবং কাল সকালবেলা নূতন জামা কাপড় পরিয়া সে হেবােকে নিশ্চয়ই একবার দেখাইযা আসিবে যে তাহার কথা ঠিক কিনা ? নবমী পূজার সময় খুব অল্প ছিল বলিয়া মাখম পুরােহিত রাত্রি ভাের হইতেই বিষম চেঁচামেচি শুরু করিয়া দিতেই ছেলের দল ফুল সংগ্রহের জন্য এ-বাড়ী সে বাড়ী ছুটিয়া যাইতে লাগিল। হরিধনদের বাড়ী নীল অপরাজিতা আছে, টিটুর তাহা জানা ছিল, সে ঘােষালদের পুকুর পাড় হইতে সব কয়টি রাঙা জবা, শেফালি, ভাট ফুল, যাহা সে হাতের কাছে পাইয়াছিল, সব কুড়াইয়া লইয়া আসিয়াছে। হেবােদের বাগানে একটি স্থলপদ্মও নাই, ফটিক আগলে চডিয়া সব সাবাড় করিয়া দিয়াছিল। বড়-মাদের ভােলা একটি ফুলও পায় নাই, ফটিক তাহাকে এক সাজি ফুল দিয়া গেল। টিটু সে কথা বাড়ী আসিয়া মায়ের কাছে বলিতে ভােলে নাই, অমনি ফটিকের খোঁজ খবর হইল । ফটিক তথন বড়-মাদের বাড়ী বসিয়া আহলাদে আটখানা হইয়া এক ডালা মুড়ি সন্দেশ সহকারে চিবাইতেছিল, ব্রজেন্দ্র সরকারকে বড়-মা ডাকিয়া পাঠাইয়াছেন এক্ষুনি বাজারে যাইতে হইবে এবং জামা কাপড় সব কিনিয়া আনিতে হইবে। মাখম পুরােহিত পাঠা উৎসর্গের জন্য বিষম ব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিল। .
৩৮ গল্প, গল্প নয় এদিকে বড়-মা ভিতরে বসিয়া ব্রজেন্দ্রের অপেক্ষা করিতেছে, ছেলেকে জামা কাপড় না পরাইয়া তিনি কিরূপে নিজে সাজিয়া গুজিয়া পূজা দেখিতে যাইবেন। এমন সময় কামিনী ঝি আসিয়া খবর দিল, ব্রজেন্দ্র জিনিষপত্র নিয়া আসিতেছে। ছােট বাড়ীর টিটু, তাহার ছােট বােন বুড়ী বড়দা’র খোঁজে এ বাড়ী সে বাড়ী করিয়া খুজিয়া মরিতেছিল। হঠাৎ বড় বাড়ীর চণ্ডীমণ্ডপে বড়দা’কে সিল্কের জামা, কোট, কাপড় পরিয়া দাড়াইতে দেখিয়া বুড়ী তাড়াতাড়ি দাদার কাছে ছুটিয়া আসিল এবং বড়দা’র হাতে ধরিয়া টানিয়া কহিল, জ্যেঠাইমা দিয়েছে বুঝি! ফটিক ফিরিয়া চাহিল, কহিল, জ্যেঠাইমা তােদের ও দেবে বলেছে। বুড়ী আনন্দে নাচিতে নাচিতে সে কথা মায়ের কর্ণগােচর করিতে ছুটিয়া গেল। হাঁফাতে হাফাইতে মায়ের কাছে কোন মতে পৌছিয়া বুড়ী কহিতে লাগিল, জানাে মা, জ্যেঠাইমা আমাদের নূতন জামা কাপড় কিনে দেবেন, দাদাকে কত ভালাে ভালো জামা কাপড় দিয়েছে। বুড়ীর মা সে কথা শুনিয়া হিংসায়, ক্রোধে বিবর্ণ হইয়া এই পূজা পার্বণের দিনে মেয়েকে ঘা কয়েক বসাইয়া দিলেন। অধিকতর ক্রুদ্ধ হইয়া কহিলেন, বিন্দু ঝি, শীগগীর শুনে যা ? বিন্দু ঝি নীচে কাজ করিতেছিল। ডরে, ভয়ে নবমীপূজার সদ্যস্নাত জীব বিশেষের মত কাপিতে কাপিতে ছুটিয়া আসিয়া কহিল, কি দিদিমণি ? সতী তীক্ষকণ্ঠে কহিল, বড় বাড়ী থেকে ফটিককে ধরে নিয়ে আয় ত। না আসে জোর করে নিয়ে আবি, গােরাকে সঙ্গে নিয়ে যায় আর তার গায়ে যত জামা কাপড় দেখবি না, সব ছিড়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে আবি, বুঝলি? যা !
পরের ছেলে ৩৯ ফটিক তখন দাড়াইয়া পাঠাবলি দেখিতেছিল। বিন্দু ঝি ফিসফি করিয়া তাহার কানের কাছে আসিয়া কহিল, শীগগীর চলো, মা ডেকেছেন আর এই সব জামা কাপড় ভিতরে রেখে এস, নইলে আর রক্ষা থাকবে । ছােট-মা সব শুনেছেন ! ফটিক, রাগত ভাবে কহিল, শুনেছেন ত বড় বয়ে গেছে আমার। যা, আমি যাবােনা! বিন্দু ঝি জিভ কাটিয়া কহিল, ও কথা বলতে নেই থােকাবাবু। কৰ্ত্তা শুনলে আর তােমাকে আস্ত রাখবেন না। ভালাে চাও ত এখন বাড়ী চলে। —আমি যাব না, যাবে না, যাবে না, একশ বার ত বলছি। আমাকে কেটে ফেলে ও যাব না। আমি বড়-মার কাছে থাকব। বড়-ক্ষা বলেছেন এখানে থাকতে। সে কি হয় থােকাবাবু, এখনও চলল, ভালো বলছি, বিন্দু ঝি অনেক রকমে বুঝাইতে চেষ্টা করিল। ফটিক তাহাকে এক ধাক্কা মারিয়া দূরে ফেলিয়া দিল ! এক উঠান লােক বিন্দু ঝির সে দৃশ্য দেখিয়া হো-হ করিয়া হাসিয়া উঠিল। বিন্দু ঝি বিষম ব্যথা পাইয়াছিল, কোনমতে চোট সামলাইয়া লইয়া নিমেষের মধ্যে অদৃশ্য হইয়া গেল। একটা গােলমাল শুনিয়া কমলা ব্যাকুল হইয়া ছুটিয়া আসিল। গােরার মুখে সব কথা শুনিয়া সে একেবারে থ’ খাইয়া গেল, কিন্তু ফটিককে তাড়াতাড়ি ঘরের ভিতর লইয়া গিয়া গােরাকে চুপি চুপি বলিয়া দিল, গােরা, তুমি এখন বাড়ী যাও, আমি ওকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বিকেলে পাঠিয়ে দেব অখন! ছেলে মানুষ, ওর কি অত বুদ্ধিসুদ্ধি আছে ! হারে ভােলা, বিন্দুর কি খুব লেগেছে ? ভােলা মুখখানি নীচু করিয়া কহিল, না মা, তেমন লাগেনি। তবে সিড়ির উপর পড়ে গেলে মাথা ফেটে একটা রক্তারক্তি কাণ্ড হত ।
৪০ গল্প, গল্প নয় কমলা আর কোন জবাব দিলনা, ক্ষুদ্র একটি নিঃশ্বাস ছাড়িয়া ফটিককে সাথে লইয়া নিজের ঘরের দিকে চলিয়া গেল। বিজয়ার দিন ভােলা আসিয়া খবর দিল, মা দাদাবাবুকে আজও পাওয়া যায় নি। তিনি সেই যে সেদিন এ গা ছেড়ে চলে গেছেন, আর আসবেন না নাকি বলে গেছেন ! বাঘা জেলের সাথে সমস্তিপুরের পথে দেখা হয়েছিল। কমলা হতবুদ্ধি হইয়া কহিল, তা হলে কোথায় গেল ! আর সমস্তিপুরের পথেই বা কোথায় যাবে? —তা’ কি করে বলব মা, বলিয়াই ভােলা ধীরে নীচে নামিয়া গেল। প্রতিদিন কমলা ভােরবেলা ঘুম হইতে উঠিয়া ভাবে—আজ ফটিক নিশ্চয়ই আসিবে। বেলা ক্রমশঃ বাড়িয়া দুপুর হইয়া যায়, কমলার স্নানাহারের হুস থাকেনা। সন্ধ্যা ঘনাইয়া আসিতেই তাহার চোখ দুটি জলে ভরিয়া আসে ! ফটিকের কোন খোঁজ খবর নাই। কার্তিক মাসের মাঝামাঝি কমলা ম্যালেরিয়া জ্বরে পড়িল, গ্রামে তখন জ্বরের প্রাদুর্ভাব খুব বেশী ! নিশি কবিরাজ কত ওষুধপত্র দিতেছে, কিছুতেই কিছু হইতেছেন। এদিকে সেই ডুমুর গাছের মামলা এখনও নিষ্পত্তি হয় নাই। সীমানা লইয়া দুই তরফে প্রবল মনােমালিন্য, রেষারেষি চলিয়াছে, এখন পান হইতে চুণ খসিলেই আর একটা মােকদ্দমার সূচনা হয়। পানুবাবুর বিশ্বাস, কমার পরামর্শ মতই ফটিক রূপগঞ্জের সকল সম্বন্ধ ছিন্ন করিয়া চলিয়া গিয়াছে, কিন্তু কমলা ইহার বিন্দুবিসর্গও জানিত না।
পরের ছেলে ৪১ দিনকয়েক পরে খবর আসিল, ফটিক তাহার মামা বাড়ীতে সুখে আছে, মামারা সকল কথা জানিয়া শুনিয়া ফটিককে আর রূপগঞ্জে পাঠাইতে চাহে নাই। বড়মার কথা ফটিকের এখনও মনে পড়ে। সে প্রত্যেক শনিবার দিন ডোর গঞ্জে ঘােরাফিরা করে, সেখানে তাহাদের গায়ের বেপারীরা প্রায়ই হাট-বাজার করিতে আসে, তাহাদের সাথে দেখা হইলেই ফটিক গাঁয়ের খবর জানিয়া লয়, বড়মার কথা জিজ্ঞাসা করিতে ও ভােলে না। কিন্তু আদার ব্যাপারী জাহাজের খবর কি জানে! বড়-মার কথা কেহ তত ভাললা বলিতে পারে না। একদিন তাহাদেরই ভিটে বাড়ীর প্রজা রামসুন্দরের কাছে সে শুনিয়া ফেলিল যে বড়মার নাকি খুব অসুখ। সেই দিন অবধি ফটিক শুধু মুখ ভার করিয়া বসিয়া থাকিত ! রূপগঞ্জে আর ফিরিয়া যাওয়ার কোন উপায় নাই। বাবা, মা দুর দূর করিয়া তাড়াইয়া দিবেন, ও বাড়ীর জ্যেঠামশায় হয়ত লাঠি নিয়া তাড়া করিবে, আর বড়-মা, সে ত শয্যাগত, তাহার দিকে ফিরিয়া চাহিবার আর কে আছে। যদি বড়মা মারা যায়, তাহা হইলে রূপগঞ্জের যত সম্পর্ক চিরদিনের তরে তাহার উঠিয়া যাইবে, •••না, না:••সে আর ভাবিতে পারেনা। কমলার অসুখের পর হইতেই বেণুবাবু যেন কেমন মনমরা হইয়া গিয়াছেন। কমলা যে পলে পলে নিজেকে ক্ষয় করিয়া ফেলিতেছিল, ইহা সতী দিনকয়েক যাবৎ বেশ ভালাে বুঝিতেছিল। সেদিন কমলাকে দেখিতে গিয়া এই ধারণা তাহার আরও বদ্ধমূল হইয়া গিয়াছিল। সন্ধ্যাবেলা স্বামী গৃহে ফিরিয়া আসিতেই সতী কহিল, ওগাে শুষ্ক, ৪২ গল্প, গল্প নয় দিদিকে তুমি একবার দেঞ্চে এলেনা কেন। দিদির অবস্থা নাকি আজ খুব খারাপ। পানুবাবু চিন্তান্বিত সুরে কহিলেন, কে বলে? তুমি গিয়েছিলে নাকি ? —গিয়েছিলাম বৈকি! তুমি একবার যাওনা, দেখে এস, দিদি ত আমাদের পর নয়। দাদার সাথে তােমার ঝগড়া থাকতে পারে, কিন্তু বৌঠান ত সে চোখে তােমাকে কোনদিন দেখেনি। সেবার তােমার অসুখের সময় তিনি কতবার এসে দেখাশােনা করেছেন। পানুবাবু হু বলিয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন। পরদিন ভোের না হইতেই পানুবাবু ঘুম হইতে উঠিয়া বসিলেন। রাত্রিতে কি একটা দুঃস্বপ্ন দেখিয়া আর ভালাে ঘুমাইতে পারেন নাই ! তেতলার ছাদে পায়চারি করিতে করিতে তাহার মন অসহ ব্যথায় ভরিয়া উঠিতেছিল। হদে রােদের ঝিলিক গাছের মাথায় মাথায় আসিয়া না পৌছিতেই পানুবাবু পাগলের মত বড় বাড়ীতে ছুটিয়া গেলেন। ছােটবাবুকে উপরে উঠিতে দেখিয়া ঝি-চাকরেরা পৰ্যন্ত অবাক হইয়া গেল। ভােলাকে ডাকিয়া পানুবাবু জিজ্ঞাসা করিলেন, দাদা কোথায় ? ভােলা তাহাকে দ্বিতলের একটা কক্ষে লইয়া গিয়া চুপি চুপি কহিল, শুয়ে আছেন বােধ করি, সারারাত একটুও ঘুমুতে পারেন নি! বড় খারাপ অবস্থা গেছে মার, জেলা থেকে হেরম্ব ডাক্তার এসেছেন কাল! মা আর বাঁচবেন না বাবু, বলিয়াই ভােলা কাপড়ের খুঁটে উদগত অশ্রু দমন করিয়া কোনমতে কহিল, থােকাবাবুকে কাল নাকি রাত্রিতে একবার দেখতে চেয়েছেন। পানুবাবু স্তম্ভিত হইয়া দরজার সুমুখে দাড়াইয়া রহিলেন, পায়ের পরের ছেলে শব্দ শুনিয়া কমলা ধীরে ধীরে কহিল, কে এসেছে, ফটিক? কামিনী এখনও ফিরে এল না ? পানুবাবু চোখের জল চাপিয়া কহিল, আমি, বৌঠান । —কে, ঠাকুরপাে! এতদিন কোথায় ছিলে । আমি যে চলেছি ভাই। ফটিককে যে আর দেখতে পেলুম না ! একটা কথা রাখবে ভাই ? তুমি তাকে কিছু বলােনা। সে ভয়ে এ গা ছেড়ে চলে গেছে, আর আসবে না। তার কোন দোষ নেই, সব আমার•• পানুবাবু তাহার পায়ের কাছে চুপ করিয়া বসিয়া পড়িয়া কহিলেন, বৌঠান, তুমি ভালাে হয়ে ওঠ, সে আবার ফিরে আসবে। আমি তাকে কিছু বলব না। সে তার মামার বাড়ীতে আছে, সেখানে পড়াশােনা করছে। কমলার চোখ দিয়া টপ, টপ, করিয়া অজস্র অশ্রু ঝরিতে লাগিল, পানুবাবু মুখ নীচু করিয়া কহিলেন, ওকি বৌঠান অমন করছ কেন! তাহার স্বরভঙ্গ হইয়া আসিতে লাগিল। কমলা কিছুক্ষণ শুদ্ধ হইয়া রহিল, পরে আস্তে আস্তে কহিল, একবার তাকে খবর দিতে পারাে ঠাকুরপাে, একবার তাকে শুধু দেখব। একটিবার। পানুবাবু ঘাড় নাড়িয়া কহিলেন, আচ্ছা, আমি গােরাকে এক্ষুনি পাঠিয়ে দিচ্ছি। কমল হাত নাড়িয়া কহিল, গােরাকে পাঠালে সে আবে না যে, সে আমি খুব ভালাে জানি। যদি তুমি•••একবার,"তুমি কি যাবে ঠাকুরপাে •••কামিনীর মা গিয়েছিল তাকে আনতে, সে বুঝি এল ন••• পানুবাবু তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিলেন, কেন যাবে না, এখনই আমি যাচ্ছি।
৪৪ গল্প, গল্প নয় তাহাকে আর কোন কথা বলিতে হইল না। বাহিরের দিকে দৃষ্টি পড়িতেই পানুবাবু দেখিলেন, কামিনীর মা এক গাল হাসি মুখে আসিয়া ঘরের ভিতর প্রবেশ করিল। পানুবাবু ব্যস্ত সমস্ত হইয়া কহিলেন, ফটিক আসেনি ? কামিনীঝি একটু দম লইয়া কহিল, এসেছে, আপনার ভয়ে ঘরে আসছে না•••••• কমলা পানুবাবুর দিকে গভীর দৃষ্টিপাত করিয়া কহিল, আর আমি মরব না, ঠাকুরপাে, তােমরা পাশের ঘরে যাও, দাদার সাথে কি ঝগড়া- ঝাটি করতে আছে। মামলাগুলি সব মিটমাট করে ফেল গে, একটা ডুমুর গাছ গেছে, আরাে কত টাকা উকিল মােক্তারে খেয়েছে, এখন তােমাদের হুস হওয়া উচিত! ওগাে যাও না ?•••••• পাশের ঘর হইতে ফটিক আসিয়া ভূমিষ্ঠ হইয়া জ্যেঠামহাশয়, বাবা এবং অন্যান্য গুরুজনের পায়ের কাছে টিপ করিয়া প্রণাম করিতে লাগিল। কমল হাসিমুখে ক্ষীণকণ্ঠে কহিল, খেয়ে আসিনি বুঝি, তাই মুখখানি অমন শুকিয়ে গেছে। পটল, রসিক ঠাকুরকে একবার ডেকে দেত মা••• “অজা যুদ্ধে, ঋষি শ্রাদ্ধে—— বিয়ে হওয়ার পর অনেক দেখা-শােনা হইয়াছে, কিন্তু অগােচরেও দেখা-সাক্ষাৎ কম হয় নাই, এ-কথা একজনে জানে, অপরে জানে না। বৌদি কম দুষ্ট নয়, দাদাও তার চেয়ে কম নয়, এই কথা মনে মনে ভাবিয়া রাণুর মুখে হাসি ফুটিয়া উঠিল। ঘাটে নৌকা ভিড়িতেই দেশ-বিদেশের যত লােক হাঁ করিয়া চাহিয়া দেখিল, পীরগাছার দশ-আনির জমিদার রমাকান্ত গাঙ্গুলী কন্যা, স্ত্রী, পুত্রবধূসহ নৌকা হইতে তীরে অবতরণ করিতেই হালফ্যাসানের পুত্রবধূ সুধাকে দেখিয়া সকলেই চমৎকৃত হইয়া গেল। সাধারণতঃ হাটে- বাজারে দোকান-পাটে পেঁচার ওপর লক্ষ্মীর যে মনােরম ছবি দেখিতে পাওয়া যায়, তার চেয়ে এই মা-লক্ষ্মীর চেহারা আরাে শতগুণে ভাল। গাঙের পাড়ে যেন চাঁদের হাট বসিয়া গেল। নিতাই আগাইয়া আসিয়া কৰ্ত্তার পায়ে পড়িয়া প্রণাম করিতেই রমাকান্ত মৃদু হাসিয়া সকলের দিকে চাহিয়া কহিলেন, ভাল ত সব! সমাগত লােকজন, ইতর-ভদ্র সকলেই তাহাকে সমীহ করিয়া চলিত, এমন সদাশিব লােক সচরাচর বড় একটা দেখা যায় না! গ্রামবাসীরা উপস্থিত দেখা-সাক্ষাৎ করিয়া যে যার দিকে চলিয়া গেল ! পূজার ভিড়ের অন্ত নাই। সহসা গ্রামের লােকসংখ্যা ত বাড়িয়াছেই, হাট-বাজারের মাছ-দুধ, তরি-তরকারীর দাম দ্বিগুণ বাড়িয়া গিয়াছে বটে, কিন্তু বেচাকেনা আগের চেয়ে অনেক জোরে চলিয়াছে। এখন আর মহেন্দ্র পাঠক, নারায়ণ-দাদা, বগলা গাঙ্গুলী, চন্দ্রমােহন মুখুয্যের হাট-বাজারে গল্প, গল্প নয় প্রতাপ-প্রতিপত্তি নাই। দোকানীরা নগদ দামের খরিদ্দার পাইয়া হাতে আকাশ পাইয়াছে। এ অবস্থা চিরদিন থাকে না। কালীপূজার পর হইতেই গ্রামে আবার লােকের যাতায়াতের মড়ক লাগিয়া যায় । বাগানে এত ফুল ফুটিয়াছে যে, রাণী দু’সাজি ভরিয়া ফুল তুলিয়াও তাহার আশা মিটাইতে পারে নাই। জ্যোৎস্না রাত্রিতে ছাদের ওপর বসিয়া গল্প শুনিতে শুনিতে ছােটরা ঘুমের কথা ভুলিয়া যায়, বৌদির সুন্দর মুখখানির দিকে চাহিয়া দুরন্ত ছেলেরাও দস্যিপনা ক্ষণিকের জন্য বিস্মৃত হয়, কিন্তু রাণীর দাদা অমলের বিষম তাগাদায় বৌদিকে অনিচ্ছাসত্বেও উঠিয়া যাইতে হয় দেখিয়া কিশােরী মেয়ে রাণী রাগে গজ গজ করিতে করিতে বলিয়া ওঠে, কি ঘুম বাবা তােমাদের, দশটা না বাজতেই ডাকাডাকি। সুধা মৃদু হাসিয়া জবাব দেয়, তােরও এমন একদিন আসবে যে, চাঁদের আলােয় বসে আর বেশীক্ষণ গল্প বলা চবে না:•• কি অসভ্য বৌদি, বলিয়াই রাণী কৃত্রিম কোপ প্রকাশ করিয়া কহিল, —তােমার মত যেন সবাই। -আমিও এমন ছিলুম না রাণী । —তবে এমনি হ'লে কেন? -তােমার ওই গুণধর দাদাটিকে জিজ্ঞাসা করাে। —আমার বড় বয়ে গেছে জিজ্ঞাসা করতে। আর দাদার কথা আমরা জানি না। বিয়ের রাত্রিতেই না পালিয়েছিল রাগ করে। কত সাধ্যসাধনা করে দাদাকে এবার আনিয়েছে। সুধা স্মিতমুখে জবাব দিল, তা হলে তাে বাঁচতুম, না এলে আমার কি মজা হত! -অত বড়াই করাে না বৌদি, আমরা জানি না কিছু, সবই মনে আছে।
“অজা যুদ্ধে, ঋষি শ্রাদ্ধে” ৪৭ —তােমার মনে থাকবে না তাে কার মনে থাকবে। তুমি যে এখন রিহার্শেল দিচ্ছাে, বলি, বর আসবার আর ক’দিন বাকী। বাবাকে বলবাে, এবার আসছে ফাগুনেই যেন একটি ঠাকুরজামাই দেখে আনেন। রাণীর গাল দুটি সহসা আপেলের মত লাল হইয়া উঠিল, কহিল, ও-সবে আমার কাজ নেই বৌদি। তােমার জামাই নিয়ে তুমিই থাকো। সুধা রাণীর গাল দুটি টিপিয়া দিয়া কহিল, সবাই বিয়ের আগে ওকথা বলে, শেষে কাজ কাব থাকে বেশ বােঝা যায়। রাণী রাগতভাবে কহিল, ভাল হবে না বলছি বৌদি, আমি দাদাকে বলে দিচ্ছি দাড়াও। -ওরে বােকা, তাের বলতে হবে না, আমি নিজেই বব-বলিয়াই একটুখানি হাসিয়া সুধা রাণীর কানে কানে ফিস ফিস্ কবিয়া কহিল, রাঙা বর ত, আমি ভুলে যাবাে না, কক্ষণােও না। রণে ভঙ্গ দিয়া রাণী দুমদাম করিয়া সিডি বাহিয়া ছুটিয়া পলাইল। ছেলেমেয়ের দল বিষম হল্লা করিতে করিতে নামিয়া গেল। পরদিন সকাল বেলা অমল ঘুম হইতেই উঠিয়া দেখে, ঘরে-বাহিরে পথেঘাটে লােজন গম্ গম্ করিতেছে। ঘােষাল-মশায় এই ভােরেই স্নান-আহ্নিক সারিয়া গায়ে রক্ত নামাবলী দিয়া কি একটা সংস্কৃত শ্লোক অক্ষুটকণ্ঠে আওডাইতে আওডাইতে খডম পায়ে ঠক ঠক শব্দ করিয়া কাশিয়া অন্দরে ঢুকিয়াই কহিলেন, কবে এলে অমল ? অমল প্রণাম করিয়া কহিল, কাল এসেছি। -বৌমা আসেনি ? কৌতুক করিয়া অমল জবাব দিল, জানি না, দেখা হয়নি। কাদম্বিনী- মাসী কাছেই দাড়াইয়াছিলেন। একগাল হাসিয়া কহিলেন, দেখা আবার হয়নি!
৪৮ গল্প, গল্প নয় d ঘােষাল ফিরিয়া তীক্ষ দৃষ্টিতে চাহিয়া কহিলেন, তুই কবে এলি কাদু ? কাদম্বিনী আগাইয়া আসিয়া কহিলেন, এই তাে এলাম আজ সাত দিন। আপনি কেমন আছেন ? —আছি কাদু প্রাণগতিক, শৈলেশ আমাকে দিয়ে এবার বর্ষাকালে চলে গিয়েছে। কাদম্বিনী বিস্ময়ে, দুঃখে চোখ দুটি কপালে ঠেকাইয়া কহিলেন, বলেন কি ঘােষাল-কাকা? এমন সর্বনাশও কারাে হয় ? এমন সময় মহিম পাঠক ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিয়া কহিলেন, অনিত্য সংসারে খলু ধর্মসার বলিয়াই সকল কথা চোখের নিমিষে উড়াইয়া দিয়া পুনরায় কহিলেন, ঘােষাল-বাড়ীর উমাকান্ত এখনাে আসেনি, তাই সেখানে সতীশ-দাদাকে বড় মন-মরা দেখলাম, চলুন দাদা একবার ওপাড় হয়ে আসি। নদীর তীর দিয়া পথ। সে পথ ধরিয়া খানিকটা যাইতেই মহিম পাঠক হর্ষোৎফুল্ললােচনে দূরের পানে চাহিয়া বলিয়া উঠিলেন, ঐ যে উমাকান্ত এসেছে না, ঐ যে নৌকায় বসে•••সকলের দৃষ্টি সেই দিকে পড়িল। তীরে নামিতেই ছেলেবুডাের দল তাহাকে একেবারে ঘিরিয়া ফেলিল। ঘােষাল খুশী হইয়া কহিলেন, এসেছ বাবা, বেশ করেছ, এত দেরী হল কেন ? —আর বলবেন না কাকা সরকারের চাকুরীর কথা। বড়বাবুর স্ত্রীর সাথে ঝগড়া হয়েছিল বলে আমাদের কারও ছুটি পাওয়ার আশা ছিল না। -বলল কি হে, এজন্য তােমাদের ছুটি একেবারে বন্ধ ! -খােসমেজাজ না হলে কি ছুটি মেলে। শেষে শােনলাম, স্ত্রীর সাথে ভাবও হয়েছে আর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ছুটি।
“অজা যুদ্ধে, ঋষি শ্রাদ্ধে—” ৪৯ —বেশ, বেশ, ভালই হয়েছে। তােমাদের সাহেব বুঝি “দৌড়ায়” থাকেন বেশী। মহিম পাঠক সায় দিয়া কহিলেন, সাহেবরা আর কি কাজ করে, খায়-দায়, ফুর্তি করে, মােটা মাইনে পায়, তাদের আবার কাজকর্ম । নবীনখুড়াে কুটি করিয়া কহিলেন, ওদের দাঁতের একটু বুদ্ধি আমরা রাখি। মহিম পাঠক প্রতিবাদের সুরে কহিলেন, দাতের বুদ্ধি না রাখি সত্য, কিন্তু কি পাস ওরা। বিলাত থেকে এলেই হয়ে গেলেন জজ-মাজিষ্ট্রেট। এই ধবাে আমি, ঈশান-কাকা, ভগবান-দাদা আমরা বিলাতে জন্মালে এক একজন দিগগজ হতাম কিনা তুমিই বলাে নবীন-খুড়ে! ছেলেবুড়াে সকলেই মুখ টিপিয়া হাসিল। নবীন-খুড়ো কোন উচ্চবাচ্য করিল না দেখিয়া সনাতন মুদী গম্ভীর সুরে কহিল, কৰ্ত্তা আপনার বুদ্ধি- বিবেচনা কি কম। লােকে বােঝে না, এই যা দুঃখ । তা না হলে আপনি থাকতে লােকনাথ মাইতি হয় স্কুলের সেক্রেটারী আর মদন ঘােষাল স্কুলের হেডমাষ্টার । মহিমের কাছে সনাতন কিছু টাকা ধারিত এবং এই সেদিন মাইনে অনেক দিন না-দেওয়ার দরুণ সনাতনের থার্ড ক্লাসের পড়ুয়া ছেলেটির নাম মদন ঘােষাল হঠাৎ কাটিয়া দেওয়ায় সনাতন গ্রামে গ্রামে লােকনাথ আর মদনের দুনাম করিয়া বেড়ায়। এক সময়ে সে পয়সাওলা লােক ছিল, কিন্তু একটা স্বদেশী ডাকাতি হওয়ায় সনাতন একেবারে সর্বস্বান্ত হইয়াছিল। মহিম বিজ্ঞের মত হি হি করিয়া হাসিয়া জবাব দিল, তােরই কি কম বুদ্ধি-বিবেচনা ছিল। দিন থাকলে তােকে আমরা সেক্রেটারী করে দিয়ে তাের বাবার নামে স্কুল চালাতাম, কি বলল খুড়ো? ৪ ৫০ গল্প, গল্প নয় নবীন-খুড়াে বিরক্তি প্রকাশ করিয়া কহিলেন, সনাতন কি সে কথার লােক, আমি সে-বছরও বলেছিলাম, ‘সনাতন, হাজার তিনেক টাকা দিয়ে স্কুলের বড় ঘরটা তুই বানিয়ে দে, তাের বাপের নামে আমরা স্কুল করি ; ওকি আর কথা শােনবার লােক। এখন তোের টাকা-পয়সা বারভূতে মিলে লুট করে নিয়ে গেল। সনাতন ক্ষুদ্র একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া কহিল, আগে জানলে আমি ব্রাহ্মণসেবায়ও••• মুখের কথা কাড়িয়া লইয়া মহিম পাঠক লাফাইয়া উঠিয়া কহিলেন, এই একটা কথার মত কথা বলেছি। আর এই গাঁয়ের চৌকিদার- ব্যাটারা কি চশমখাের, একবার খবর পর্যন্ত নিলে না। —আর চৌকিদার। কাল তারিণী দাদার কালাে হৃষ্ট-পুষ্ট পাঠাটি মাধব দফাদার বেমালুম গাফ, করেছে। নবমী পূজার পাঁঠা খেয়ে কেউ কখনও হজম করতে পারে। তাই তাে চব্বিশ ঘণ্টা পার না হতেই মেয়েটার বিষম কাপুনি দিয়ে জ্বর এসেছে, আমি স্বচক্ষে দেখে এসেছি । কলিতে দেবদেবীর মাহাত্ম এখনাে যায় নি। সনাতন আরও কি বলিতে যাইতেছিল, কিন্তু হঠাৎ থামিয়া গেল পাণিকাউর কৈবৰ্ত্তকে দেখিয়া। পাণিকাউর মাধবের ভগ্নীপতি, সুতরাং এই প্রসঙ্গ এখানেই চাপা পড়িয়া গেল। বৈকালে সুধা, রাণী, সকলেই প্রতিমা দেখিতে বাহির হইয়াছিল। গ্রামদেশে অত বাঁধাবাঁধি নিয়ম এখন আর নাই। সুধা বেথুন কলেজে আই-এ পড়ে, শুধু লােক-লজ্জার খাতিরে একটু ঘােমটা টানিয়া বেড়াইতে গিয়াছিল। কখনাে ঘােমটা অনভ্যাসের বশে খসিয়া যাইতেছিল, আবার তাড়াতাড়ি টানিতে গিয়া বিষম অসুবিধা বােধ হইতেছিল। তাহার সুন্দর ঢলঢলে মুখখানি, নিখুত, নিটোল স্বাস্থ্য গ্রামের বৃদ্ধদের “অজা যুদ্ধে, ঋষি শ্রাদ্ধে দু’চার জনের যে চোখে না পড়িয়াছিল এমন নয়। ভগবানদাদা চোখেমুখে গিলিবার মত ভাবে চাহিয়া কহিলেন, মেয়েটি কে হে খুড়ো, বড় নির্লজ্জ দেখছি। দু’পাতা ইংরেজী পড়ে মেয়েদের চালচলন আজকাল••• নবীন-খুড়াে জিভ কাটিয়া চুপি চুপি কহিলেন, বড়-বাড়ীর অমলের বউ। অমনি ভগবান-দাদা সুর নামাইয়া কহিলেন, বেশ তো হাসি-খুশী, কোন দেমাক-টেমাক নেই দেখছি। আমি ভেবেছিলুম নেপালের মেয়ে ননী বুঝি ! খাসা বউ এনেছে কিন্তু। --তা আর বল্তে, যেন দুর্গাপ্রতিমাখানি, আমি বারে বারে চেয়ে তাই দেখছিলাম। পাড়ার মেয়ের নূতন বৌকে দেখিয়া মুখখানি মলিন করিয়া ফিরিয়া গেল। স্ত্রীলােক সুন্দরী হইলে অপরাপর মেয়েদের পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব ! কারণ বাংলা দেশের তেলে-জলে অমন রূপ, চেহারা কদাচিৎ দু-একটী দেখা যায়। তাই স্বভাবসুলভ ঈর্ষাপ্রযুক্ত হইয়া ওপাড়ার কাঞ্চন মাসী সুর চড়াইয়া কহিলেন, সুন্দরী বউ ঢের ঢের দেখেছি, তােদের পীরগাছায় এই নৃতন হতে পারে। আমার মেজঠাকুরের সেজঠাকুরঝিকে দেখলে ওকে দেখা যাবে একেবারে কালাে। মল্লিক-বাড়ীতে বৈঠক বসিয়াছিল। পানের খিলি মুখে পূরিয়া বােদের গিন্নিমা কাত্যায়নী চারিদিকে একবার ভাল করিয়া চাহিয়া গলা ঝাড়িয়া কহিলেন, এ আর কি বউ দেখছি, নাটোরের নাম শুনেছি তােত, তারই কাছে বীরকুৎসার জমিদারদের বউ-এর কথা আর কি বলব। চোখ দুটি যেন আকাশের তারা, আর চুলের গােছা পিঠ অবধি ছাড়িয়ে তাে গেছেই, পায়ের কাছাকাছি আর নাচগানের কথা যদি বলিস ত আসুক মিত্তিরদের মল্লিকা, কেমন গলা দেখে নেবাে।
গল্প, গল্প নয় কাঞ্চনমাসী গলা ছাড়াইয়া কহিলেন, আমার পানুর বউয়ের রঙ যদি আর একটু ফরসা হ’ত তােমরাই তাকে অপূর্ব সুন্দরী বলতে কি না বলাে। বিমলা মৃদু হাসিয়া কহিল, অমলের বউয়ের মত সুন্দরী বউ খুব কমই দেখেছি, যে যা-ই বলল না কেন ! কাঞ্চনমাসী চোখ ফিরাইয়া কহিলেন, কি বলি না, তােরা কয়টি সুন্দরী বউ চোখে দেখেছিস আর কয়টি সুন্দরীর নাম করতে পারিস। জন্মাষ্টমীর মিছিল দেখতে গিয়ে ঢাকায় উমাকে দেখে এসেছি, তার মত সুন্দরী আর হয় না ! —না হয়, না হােক, আমাদের তাতে কি মাসী, আমরা তো এক রকম বয়স কাটিয়েই গেলাম। এই রূপ নিয়েই তাে যত গােলমাল শুনি, তার চেয়ে রূপ না থাকাই ঢের ভাল । মুখুয্যেদের মেজবউ সৌদামিনী মুখ টিপিয়া হাসিয়া কহিল, অমলের বিয়েতে কি যে কাণ্ড হয়েছিল, শশানেননি বুঝি, এ-কথা তাে সবারই জানা-বলতেই পাড়ার মেয়েরা ‘এ’ ওর গায়ে, ‘ও তার গায়ে ঢলাঢলি করিয়া হাসিতে হাসিতে একেবারে কুটপাট হইয়া গেল ! । সুধার বাবা ছিলেন ঢাকা কলেজের প্রফেসার। অমলের সাথে যখন বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়, সুধা তখন টিকাটুলির স্কুলে পড়িত। ছােটবেলা থেকেই সে ভয়ানক দুষ্ট, এবং স্বাস্থ্য খুব ভাল ছিল বলিয়া তাহাকে তেরােতেই পনেবাের মত দেখাইত। সুধার সমপাঠী ছিল বীণা। বীণা বয়সে বড়, একটু উচু ক্লাশে পড়িত, তাহাকে একদিন সুধা ধরিয়া বসিল, বীণাদি, আমি আমার বরকে একটু দেখতে চাই । -বিয়ের আগে ? বিয়ের আগে কেউ কি কখনাে বরকে দেখে, ধেৎ বােকা!
“অজা যুদ্ধে, ঋষি শ্রাদ্ধে—” -না বীণাদি, আমি তার চেহারাটি শুধু দেখবাে। কালাে চেহারা হলে চলবে না বীণাদি! আমি তাে আর কুৎসিত নই । বীণা একটুখানি ভাবিয়া কহিল, সুধা, তাহলে এক কাজ করতে হবে। মেজদাকে বলে একদিন আমাদের বাড়ী নিয়ে আসলে চলবে। -বেশ তাে বলিয়াই সুধা সােৎসাহে চুপি চুপি কহিল, অমল গাঙ্গুলী, থার্ড ইয়ার। ও থার্ড ইয়ার...মেরী ইয়ার—বলিয়াই বীণা নােটবুকে টুকিয়া রাখিল। ঢাকা কলেজে বি-এ ক্লাশে তখনাে প্রায় দেড়শ’ ছাত্র পড়ে। বীণার মেজদা’ দ্বিজপদ অমলকে অনেক কষ্টে খুজিয়া বাহির করিল, কিন্তু অমলের সাথে তাহার তেমন জানাশােনা ছিল না। কি করিবে, বাসায় আসিয়া বীণাকে সব কথা খুলিয়া বলিতেই, বীণা কহিল, এক কাজ করাে না মেজদা, বাসায় নাই বা এলাে, আমরা রমনার পথের ধারে যেন বেড়াতে গিয়েছি, ঠিক এই ভাবে দাড়িয়ে থাকব, আর তুমি ইসারায় আমাদের দেখিয়ে দেবে। অমল বাবু, তাে আর কলেজ হােষ্টেলে থাকেন না ! -না, বলিয়াই দ্বিজপদ মৃদু হাসিয়া কহিল, কাল তাহলে সব ঠিক কিন্তু। আমি বােজরােজ এ-সব করতে পারব না। পরদিন ঠিক কথামত শীতের অপরাহে বীণা ও সুধা রমনার ধারে বেড়াইতে গেল, সাথে হিন্দুস্থানী চাকর গিরিধারী। দ্বিজপদের ক্লাশ অনেকক্ষণ শেষ হইয়া গেছে, সে অমলের অপেক্ষায় চুপ করিয়া লেবরেটারীতে বসিয়াছিল। ঘণ্টা বাজিতেই একে একে সব ছাত্র চলিয়া গেল, অমলও আসে না, দ্বিজপদও তাহাকে খুঁজিয়া পায় না। সুধার বুক দুরু দুরু করিয়া উঠিল। কি দেখিতে আজ কি দেখিয়া বসে, সারা জীবনের আধিপত্য দিয়া যাহাকে চিরপতিরূপে মনােরাজ্যে ৫৪ গল্প, গল্প নয় অধিষ্ঠিত করিয়া লইতে হইবে, তাহাকে দেখিয়া মন খুশী না হইলে চলিবে কেন! এদিকে শাস্ত্রের দোহাই চারিচক্ষু মিলন শুধু মুখচন্দ্রিকার শুভ মুহূর্ত ছাড়া হইতে পারে না, কিন্তু পৃথকভাবে যদি এক জোড়া চোখ অপরের অলক্ষ্যে তাহার দিকে চাহিয়া দেখে, তাহা হইলে তাে আর শাস্ত্রের নিয়ম লঙ্ঘন করা হইবে না। তাহার মনে এইরূপ নানা কথা ভাসিয়া উঠিতে লাগিল। এমন সময় দ্বিজপদ ধীরে ধীরে বাহির হইয়া চোখের ইশারায় যে- ছেলেটিকে দেখাইয়া দিল, অমল বলিয়া যদি কিছু তাহার দেহের বর্ণে। থাকে। সুধা এক রকম মুখখানি ভার করিয়া গৃহে ফিরিয়া আসিল। সেই দিন থেকে তাহার মুখে কেহ কোন দিন হাসি দেখে নাই। মায়ের মনে বিষম ভাবনা হইল, অথচ মুখ ফুটিয়া সে সে কথা কাহাকেও বলিতে পারিল না, আর কোন্ বাঙালী মেয়েই বা পারে ! বিবাহের দিন যতই ঘনাইয়া আসিতে লাগিল, সুধা ততই মনমরা হইয়া গেল। বীণা আভাস-ইঙ্গিতে এ-কথাটি একদিন সুধার জননীর কর্ণগােচর করিয়া ফেলিল। কিন্তু জননী তাে হাসিয়াই খুন! ছেলে কালাে হইলে এমন কি আসে যায়, অথচ অত বড় বনিয়াদী ঘরের ছেলে, সহজে হাতছাড়াও করা যায় না। তবু বীণার কথায় তাহার একটু খটকা বাধিল। তিনি একদিন কর্তার কাছে সেই কথা জিজ্ঞাসা করিয়া ফেলিলেন। নিরীহ প্রফেসার, সদাশিব লােক, কোনমতে টাল সামলাইয়া কহিলেন, তুমিও ক্ষেপেছ নাকি, তাহলে আমিও কালাে, কি বলো! কৰ্ত্তার ভ্রুকুটি দেখিয়া গৃহিণী আর কোন কথা জিজ্ঞাসা করিতে সাহসী হন নাই। বিবাহের দিন রাত্রিতে সুধা তেমন-কিছু কাপড়চোপড় পরিতে রাজী হইল না, এ যেন এক রকম জোর করিয়াই তাহাকে বিবাহ দেওয়া “অজা যুদ্ধে, ঋষি শ্রাদ্ধে” হইতেছে। তাহার মুখের রক্ত কোথায় উবিয়া গিয়াছে এবং কাহারে। সাথে কোন কথাবার্তা বলা সে আদৌ পচ্ছন্দ করিল না। বীণা ইচ্ছা করিয়াই আসে নাই, এবং পাড়ার সাথীরা অযথা ধমক খাইয়া বিফল মনােরথ হইয়া ফিরিয়া গিয়াছে। সে এমন সময় ধীর, স্থির হইয়া গুম হইয়া বসিয়া রহিল যে, যেন পার্বত্য কল্লোলিনী উপলখণ্ডে লাফাইতে লাফাইতে আসিয়া বিরাট বিপুল বাঁধের কাছে তাহার আকুল, উদ্দাম গতি যেন একেবারে প্রতিহত হইয়া গিয়াছে। মুখচন্দ্রিকার সময় সে চোখ বুজিয়া রহিল। নতুন জামাই বেচারী সব দেখিয়া শুনিয়া যেন একেবারে ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়া গেল। পুরােহিত ঠাকুর, পাড়াপড়শীরা, সমপাঠিরা বার বার বলিয়া উঠিল, চোখ খােল, চোখ খােল, কিন্তু সুধার চোখ দুটি সহসা একবার বিদ্যুতের মত খেলিয়া গিয়া আবার মেঘের কোলে লুকাইয়া গেল। গ্রামময় কানাকানি শুরু হইল। রমাকান্ত রায় গোঁফের ফঁাকে ঈষৎ হাসিয়া কহিলেন, ওসব ঠিক হয়ে যাবে, আমরা এসব করি নি। আমি ওর মার বিয়েতে কি রকম কটমট, চোখে চেয়েছিলাম, আমার এখনও বেশ মনে পড়ে। বরযাত্রী ভগবান-দাদা কাচের চশমার ভিতর দিয়া চাহিয়া কহিলেন, ঢের হয়, ঢের হয়, আমি বিবাহের ভয়ে পনেরাে বছরে বিয়ের আসর ছেড়ে পালিয়েছিলাম। আসরে একটা মৃদু হাসির ধ্বনি শােনা গেল। কন্যাত্রী ঈশান ঘােষাল কাংসবিনিন্দিত কণ্ঠে কহিলেন, ছেলেমেয়েরা সব হ’ল কি, বিয়ের সময় মুখ পেঁচা করে থাকতে এই প্রথম দেখলাম ! সদুর মা আমার দিকে কি রকমভাবে তাকিয়েছিল, একবার জিজ্ঞাসা করাে না ওকে,আমার এখনাে মনে পড়ে!
গল্প, গল্প নয় ? সদুর মা দূর হইতে অন্দরে সরিয়া পড়িয়া কহিলেন, বুড়াের কাছে যাবাে এখন সাক্ষ্য দিতে! মরণ আর কি এতেও কিছু হইত না, কিন্তু ভাের রাত্রিতে বরের হঠাৎ অন্তর্ধানে পাড়াময় টি-টি পড়িয়া গেল। থানায় খবর দেওয়া হইল, এবং চারিদিকে লােক ছুটাছুটি করিতে লাগিল। ছেলে শেষে একটা মনে আঘাত পাইয়া কিছু না করিয়া বসে এজন্য রমাকান্ত পুলিসে খবর দিলেন। চারিদিকে রেলওয়ে ষ্টেশনে, ষ্টিমার ঘাটে সি-আই-ডি পুলিস মােতায়েন হইল, কিন্তু কোন খোঁজ-খবর পাওয়া গেল না। পুলিসসাহেব তদন্তে মহকুমায় আসিয়াছিলেন। রায় বাহাদুর রমাকান্তের নাম শুনিয়া কনকসার হইয়া গেলেন। এই গ্রামে প্রফেসার মহাশয়ের বাড়ী। পুলিসসাহেব সদলবলে আসিলেন, সাথে পুলিস, পেয়াদা, চৌকিদার, দফাদার, কনস্টেবল, দাবােগা কেহই বাদ পড়িল না। মুখুয্যেদের চণ্ডীমণ্ডপে বিরাট বৈঠক বসিয়াছিল, এমন সময় পুলিস- সাহেব আসিয়া উপস্থিত । ভগবান-দাদা পিছনের দরােজা দিয়া লাফাইয়া পড়িলেন, সূৰ্য্যকান্ত গ্রামের প্রবীণ লােক, সেকালের মাইনর পাস, ইংরেজী কিছু কিছু জানেন, গুডমর্ণিং বলিয়া একরকম বাঁকাইয়া পড়িলেন। গদাধর কবিভূষণ পৈতা বাহির করিয়া আশীর্বাদ করিলেন, সাহেব মৃদু হাসিয়া কহিলেন, ছেলে কেন পলাইয়া গেল, গােসা করেছে নাকি? আজকালের দিনে ছেলে বাড়ী না থাকিলে ডাকাতি করিতে যায়। রমাকান্ত বিবর্ণমুখে জবাব দিলেন, বিবাহ করিতে আসিয়া পলাইয়াছে। -বিবাহ করিতে আসিয়া মেয়ে নিয়া পালাইয়াছে, elopement নিশ্চয়ই। ভগবান-দাদা মৃদু হাসিয়া শুষ্ক কণ্ঠে কহিলেন, হুজুর, আলাপ করেনি, এমনিই গিয়াছে।
“অজা যুদ্ধে, ঋষি শ্রাদ্ধে” রমাকান্ত চোখ টিপিয়া চুপি চুপি কহিলেন, আলাপ না, ইলােপ, এটা একটা খারাপ ইংরেজী কথা । দাদা তাড়াতাড়ি কথা ঘুরাইয়া কহিলেন, আলাপ-টালাপ হ'লে কি হুজুর পালায় ! সাহেব কহিলেন,-মেয়ে বুঝি beautiful না? আজ্ঞে মেমসাহেবের মত সুন্দরী—বলিয়াই ঈশান পাঠক আগাইয়া আসিলেন। সাহেব আশ্চর্য হইয়া গেলেন, কহিলেন, বােধ হয় ঝগড়া হইয়াছে, শীঘ্রই মিটিয়া যাইবে। ঈশান পাঠক মাথা নাড়িয়া উচ্চ কণ্ঠে বলিয়া উঠিলেন, ত’-ততা যাবেই। আমাদের শাস্ত্রেও আছে,-অজা যুদ্ধে, ঋষি শ্রাদ্ধে—দম্পতি কলহেশ্চৈব—উপস্থিত সকলেই হাসিয়া উঠিলেন, সাহেবও সঙ্গে সঙ্গে রসিকতা মনে মনে অনুভব করিয়া বােকার মত পরে একটু হাসিলেন। দাবােগা সাহেব বকাউল্লা ইংরেজী করিয়া বলিতে গিযা হয়রান হইয়া উঠিল। অনুবাদ বােধ হয় এই রকম করিয়াছিল— Goats fighting, Sradh ceremony of Rishis, and morning clouds, quarrel between husbands and wives are mere farce. সাহেব কি বুঝিয়াছিলেন, আমরা তাহা ভাল জানি না। পরে অমলের খােজ পাওয়া গেল। সে কলিকাতায় মেসে থাকিয়া কলেজে পড়িত। কিন্তু সুধার বাবা এ-খবর ভাল করিয়া জানিতেন না। তিনি তখন বদলি হইয়া বেথুন কলেজের প্রফেসার হইয়া আসিয়াছিলেন। বৈবাহিকের পত্রে কুশল প্রশ্ন মাঝে মাঝে পাইতেন সত্য, কিন্তু অমলের বিষয়ে কোন সংবাদ তিনি ইচ্ছা করিয়াই লিখিতেন না। রাগ, অপমান, গল্প, গল্প নয় ক্ষোভও তঁাহার কম হয় নাই। তিনি রমাকান্ত গাঙ্গুলী–পীরগাছার প্রকাণ্ড জমিদার, তঁাহার এত বড় একটা অপমান হইয়া গেল, কতকগুলি নগণ্য পল্লীবাসীর সুমুখে, তাহার মনেপ্রাণে এই অসহ ব্যথা বড় বাজিল, কিন্তু আপাততঃ কোন উপায় নাই ভাবিয়া বাঘের শিশু চিড়িয়াখানার লৌহপিঞ্জরে বন্দী হইয়া মনে মনে আহত হইয়া চুপ করিয়া রহিলেন। সুধা ম্যাটিক পাস করিয়া বেথুনে আই-এ পড়ে। অমলের কথা। সে কোন দিন মুখে আনে নাই। ক্লাশের সমবয়সীরা তাহার সিথিতে সিঁদুর দেখিয়া বরের কথা জিজ্ঞাসা করিলে সে বিষম ক্ষেপিয়া ওঠে। কেহ ঠাট্টা করিতেও ছাড়ে না। একদিন অমিতা জিজ্ঞাসা করিল, ঝগড়া করেছ বুঝি, বলল না ভাই, আমরা সব মিটিয়ে দি। নিভা মুখ টিপিয়া হাসিয়া কহিল, ও আবার ঝগড়া কি ? বীণার কথা মনে নেই ? দু-দিন বাদেই আবার অজ্ঞান ! কমল হাসিয়া কহিল, মিলনে বিরহ না থাকলে তত মধুর হয় না। সুধা মলিন মুখে জবাব দিল, ওসব কিছু নয় ভাই, তােমরা আমায় জ্বালাতন করাে না, আমি কখনাে বলেছি যে, ঝগড়া হয়েছে, আমার সাথে একদিনও দেখা হয়নি। ওমা বল কি, বলিয়া সকলেই মৃদু মৃদু হাসিতে লাগিল। নিভা সমঝদার মেয়ে, আসল ব্যাপারটি যেন মনে মনে অনুধাবন না করিয়া কহিল, তাইতাে তােমাকে অত মনমরা দেখি, বর বিলেত গিয়েছে বুঝি! —তা আমি কি জানি ? -তুমি জান না তাে, কি আমরা জানি —আচ্ছা, তােমার বাবাকে জিজ্ঞাসা করে খবর নেব। ?
“অজা যুদ্ধে, ঋষি শ্রাদ্ধে” দিল। সুধা কথা কহিল না, শুধু একটু রঙীন আভা তাহার মুখের উপর হঠাৎ খেলিয়া আবার চোখের নিমিষে কোথায় উবিয়া গেল। অমলের উপর সুধার রাগের কারণ এবং এত তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ভাব সে এখনাে ভাল করিয়া বােঝে নাই, এবং জানে না। অথচ সুধা অপূৰ্ব্ব সুন্দরী, এমন বউয়ের কথা কোন্ না যুবক ভাবিয়া থাকিতে পারে ? সে ইহার একটা বােঝাপড়া করিবার জন্য সুযোগ খুঁজিতে লাগিল এবং তাহার ছােট বােন রাণুর কাছে সুধার বাবার ঠিকানার জন্য চিঠি লিখিয়া সে অভিমান করিয়াই বিয়ের রাত্রিতে চলিয়া আসিয়াছিল। এই অভিমান তাহার পক্ষে স্বাভাবিক। কারণ বিবাহের সময় যদি মেয়ে ঘৃণায় তাহার দিকে চোখ মেলিয়া চাহিতে কুণ্ঠা প্রকাশ করে, এ কি কম আপশােষের কথা, আর কেনই বা করিবে,—সে কি তার চেয়ে কম ? রূপে, গুণে, বিদ্যায়, ধনে-জনে অমলের মত একটি ভাল ছেলে বাংলা দেশে নিতান্তই বিরল। নিভা সুধার বাবার কাছ থেকে বেশী কিছু খবর সংগ্রহ করিতে পারে নাই, কিন্তু তার দাদা সমর একদিন কথায় কথায় বলিয়া ফেলিল, আমাদের সাথে পীরগাছার জমিদারের ছেলে অমল গাঙ্গুলী বলে একজন পড়ে, তুমি কি তার কথা আমার কাছে বলেছ সে দিন? ওর সাথে আমার খুব ভাব, কিন্তু ষ্টুপিড বলে, বিয়ে করেনি, আমি ভেবেছিলাম— নিভা হাতে আকাশ পাইয়া কহিল, হ্যা দাদা, অমল গাঙ্গুলীর কথাই বছি, ওদের বাড়ী আমাদের ঢাকায়, ওরা খুব বড়লােক। সমর একটু ভাবিয়া কহিল, বিয়ে তাহলে হয়ে গেছে । -না, তােমার জন্য বাকী আছে! —কিন্তু তাকে বড় আমনা দেখি ! তাের সাথে এক দিন আলাপ করিয়ে দেব ?
৬০
গল্প, গল্প নয়
—শুধু আলাপ করিয়ে নয়, একদিন আমাদের এখানে চায়ের নেমন্তন্ন
করাে। আর সুধাকে আমার বােন বলে ওর কাছে পরিচয় দেবে,
সাবধান দাদা, কখনাে পরিচয় দিয়ে না কিন্তু।
—আহা বেচারীকে তাের কথা একদিন বলতেই কত সুখ্যাতি
করলে তাের।
-এই না দেখেই।
-না রে বােকা, দেখার কথা তাে ওঠেনি। তুই যে রেডিয়ােতে
গান গেয়েছি, সে কথা শুনে একেবারে বিয়ে করতে রাজী হয়েছিল।
-তুমি বড়াে বাইরের ছেলেদের সাথে ইয়ারকী দাও দাদা, আমি
এ সব পছন্দ করি না। মেয়েদের কথা নিয়ে তােমরা এত অসভ্য আলাপ
করাে, এ কিন্তু তােমাদের ঠিক নয়।
-আর তােমরা ছেলেদের নামে কম বলো, আমরা বেথুন কলেজেব
মেয়েদের কথা জানি না। আচ্ছা, তুমিই বলাে কি না?
—অত তীব্র আলােচনা করি না, এ-কথা তুমি ঠিক জেনো
বলিয়াই কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া মনে মনে বলিয়া উঠিল, কি অসভ্য
অমল বাবু, নিজের স্ত্রী থাকতে
—আর আমরা তাে এ-কথা কল্পনায়ও আন্তে পারি না।
সমর বাইকে ছুটিয়া গেল অমলের মেসে চায়ের নেমন্তন্ন করতে।
সুধা শুধু আসিয়াছিল চায়ের নিমন্ত্রণে। ঘরখানি এমন সু ভাবে
সাজানাে হইয়াছিল, দেখিলে সহজেই চোখে পড়ে। ফুলের গন্ধে, তীব্র
আলােকে, রঙীন পর্দায় ঘরখানি ঝলমল করিতেছিল। অমল আসিল,
বসিতেই সমর পরিচয় করাইয়া দিল, এই দুটি তার বােন, এবং মেয়েদের
কাছে অমলের কথা শুধু বলিল, ইনি আমার সমপাঠী এবং কবি।
বলিতে ভুলিয়া গিয়াছি আষাঢ়ের নবঘন মেঘ দেখিয়া সে দুই-চারিটি
“অজা যুদ্ধে, ঋষি শ্রাদ্ধে” ; বিরহের কবিতা লিখিতে সুরু করিয়াছিল ; এ-ব্যাসিলি আজকাল স্কুলে, কলেজে এমন কি পল্লীর আনাচে-কানাচেও সংক্রামক হইয়া উঠিয়াছে। নিভা দু-একটা গান গাহিয়া অমলকে শােনাইল। অমল একেই গানের নামে পাগল। সে সমরের দিকে চাহিয়া ইসারা করিতেই সমর সুধার দিকে চাহিয়া কহিল, সেই গানটি তােমার মুখে খুব ভাল লাগে। সমর সুধাকে নিভার সমপাঠী হিসাবে “তুমি” সম্বােধন করিত। সুধা গান ধরিতে নিভা মুখ টিপিয়া মৃদু মৃদু হাসিতে লাগিল, ‘অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দমধুর হাওয়া দেখি নাই কভু দেখি নাই, এমন তণী বাওয়া’ অমল নিভার দিকে চাহিয়া, তাহাকে এরকম ভাবে মুখ টিপিয়া হাসিতে দেখিয়া কেমন জানি ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়া গেল। তবু সে একটুও ঘাবড়াইবার ছেলে নয়, কবির মত উদাসভাবে সুধার দিকে বার বাব চাহিয়া দেখিতেছিল। সমর ভাব-সাব বুঝিয়া নিজেই অর্গানটি টানিয়া লইয়া জলদগম্ভীর স্বরে গান ধরিল। তরে তার গলা তেমন মিষ্টি নয়, সে এক-আধটু গাহিতে জানে, ‘বিদায় করেছ যারে নয়নজলে, এখন ফিরাবে তারে কিসের ছলে:.. নিভা মুখে রুমাল দিয়া হাসি চাপিয়া রাখিল। সুধা ব্যাপার কিছুই বুঝিতে পারে নাই, সে অমলের দিকে একবার চোখ ঘুরাইয়া আবার সমরের গান গাহিবার ভঙ্গীতে মনে মনে একটু হাসিয়া উঠিল। রাত্রি অধিক না হইতেই যে যার দিকে পারিল বিদায় লইল। সমর অমলের মেসে গিয়া সে-রাত্রির মত আশ্রয় গ্রহণ করিল, বাসায় বলিয়া গেল, কাল ভােরে ফিরিয়া আসিবে। সারা রাত্রি দুই বন্ধুতে কত - গল্প, গল্প নয় আলাপ-আলােচনা হইল, তাহা বলিতে গেলে এখানে আর গল্প বলা চলে না। সমর ইচ্ছা করিয়াই সুধার কথা তুলিল, কহিল, আমার বড় বােনটিকে তােমার পছন্দ হয় ? —বা রে, ফাজলামি করার আর জায়গা পাও না! বিয়ে হয়ে গিয়েছে, সী থিতে সিদূর, তুমি তাে আচ্ছা লােক হে! —রাখাে না ভাই, বলতেই দাও না, ওর বিয়ে হয়নি, তবু বেচারী সী থিতে সিদূর দেয় কেন জাননা, বলে আমি মনেপ্রাণে একজনকে ভালবাসি, কিছুতেই নাম বলে না, শেষে দেখি চিত্রা পত্রিকায় তাের যে সেই কবিতাটি বেরিয়েছিল, সেই যে--পল্লীপ্রিয়ারে স্মরি—সেই কবিতার লেখককে ও মনেপ্রাণে ভালবেসে ফেলেছে। এমন ভালবাসায় যে কতখানি risk তা’ ও কি করে বুঝবে বলাে তাে। ধরাে না, প্রথম, লেখক বুড়ােনা যুবক বােঝা ভার, তারপর বিবাহিত হওয়াও অসম্ভব নয়। কিন্তু ও বলে কি জানাে••••••বুড়ো হতেই পারে না, কারণ এ রকম কবিতা বুড়ােদের পক্ষে লেখা অসম্ভব, আর বিয়ে হলে কি কেউ কখনাে পল্লীপ্রিয়ারে স্মরিয়া অত বিরহের কথা লিখতে পারে••••• —খুব পারে ভাই, এ-কথার কোন মূল্য নাই। আমার বিশ্বাস হয় ভাই। —কি বিশ্বাস হয় না,•••••• ও যে তােকে ভালবাসে, এই কথা ? অমল চুপ করিয়া থাকিয়া কহিল, এ কিন্তু ভারি অন্যায় সমর, তুমি আমায় ক্ষমা করাে ভাই, আমার বিয়ে হয়ে গেছে এ-কথাটি তুমি ওকে ভাল করে বুঝিয়ে বলে দিয়ো ! সমর তড়াক করিয়া লাফাইয়া উঠিয়া কহিল, বলি কি, সর্বনাশের কথা, আমি ওকে বলে রেখেছি, এ-বিষয়ে অমলের মত নিশ্চয়ই হবে, “অজা যুদ্ধে, ঋষি শ্রাদ্ধে ৬৩ আর তােমাকে এতাে মেলামেশা করিয়ে তুমি এখন বলল কিনা তুমি বিয়ে করেছ। আমি ভাই এ-সব বতে পারব না। তুমি বুঝিয়ে একদিন বলে এসাে ! অমল এই কথা শােনার পর একেবারে হতবুদ্ধি হইয়া গেল। তাহার মনে হইল, সত্যই তাে সমরকে সে বিষম ফ্যাসাদে ফেলিয়াছে, এখন তাে বিবাহ করা ছাড়া আর উপায় নাই। কি করিবে সে, পিতামাতার অগােচরে সে সমরের বােনকে বিবাহ করিয়া ফেলিবে! রাত্রি তিনটা বাজিয়া গেলে পর তাহার চোখে ঘুম আসিয়াছিল। সমর খুব ভােরে উঠিয়া মেস হইতে চম্পট দিয়াছিল, শুধু মেসের ঝি তাহাকে সদর দয়ােজা খুলিয়া যাইতে দেখিয়াছিল। কলেজের ক্লাশে সুধা নিভাকে কহিল, ছেলেটি কিন্তু বেশ শান্ত, শিষ্ট, অমায়িক। নিভা মুচকি হাসিয়া কহিল, আমার বর হবে ভাই কি বলে, কেমন সুন্দর চেহারাখানি, না ভাই —সে কথা আর বলতে। তােমার অদৃষ্ট ভাল, না হলে এমন সুন্দর বর: ••••• বাধা দিয়া নিভা কহিল, আর তােমার কপাল বুঝি মন্দ। তােমার বরও তাে এমনি সুন্দর, সেদিন যে মাসীমা বলেন। যাও ভাই, আর কাটাঘায়ে নুনের ছিটে দিয়ে লাভ কি বললা ত ? —আমি সত্যি বলছি ভাই, পরে কথাটি ঘুরাইয়া কহিল, কাল আমাকে দেখতে এসে তােমাকেই পছন্দ করে গেছেন। দাদা যেমন বলেন ওর বিয়ে হয়ে গেছে, আর সঙ্গে সঙ্গে একেবারে মূচ্ছ। আর কি! আজও নাকি খুব কান্নাকাটি করছেন। দাদা আজও তাকে নিয়ে আসবেন
৬৪
গল্প, গল্প নয়
-
আমাদের এখানে। তুমি ভাই আমার কথা একটু বুঝিয়ে বলবে
ওকে।
সব কথা শুনিয়া সুধা জবাব দিল, কেন বলবাে না ভাই, ওকে আমি
তােমার সামনেই সব কথা বুঝিয়ে বলবাে।
—বলে। কিন্তু ভাই, এ-বিষয়ে তােমার কাছে আমরা হার মানি।
পুরুষদের সাথে টেক্কা দিতে তােমার মতাে মেয়েই চাই। প্রত্যুত্তরে সুধা
আর কিছু বলিল না, চুপ করিয়া গেল।
সন্ধ্যায় আবার সেই চায়ের মজলিস। নিভা ভাবের আবেশে গান
ধরিল,
“সন্ধ্যা রাণী, সন্ধ্যা রাণী,
এই ত মােদের গােপন মিলন, কেউ জানে না আমরা জানি।”
সমর সেদিন এদিক-সেদিক ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল, কখনাে ঘরের
ভিতরে আসিয়া বসে, আবার বাহিরে গিয়া গুণ গুণ করিয়া
গান ধরে••••••
“সন্ধ্যা রাণী, সন্ধ্যা রাণী,
এই ত মােদের গােপন মিলন, কেউ জানে না আমরা জানি।”
গান থামিয়া গেলে অমল কি কথা বলিবে, এমন ভাব প্রকাশ করিতেই
সুধা তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিল, আপনাকে যেন একটু আনমনা দেখছি আজ।
অমল ঢােক গিলিয়া কোনমতে মাথা নীচু করিয়া কহিল, আপনার *
প্রেম অক্ষয়, অব্যয়, কিন্তু আমার কোন অপরাধ নেবেন না, আমি—বি
—বাহিত—বলিতেই তার চোখ দুটি ছল ছল করিয়া উঠিল, পরে
আবার কহিল, সমর আপনাকে ভুল বলেছে।
সুধা আগাগােড়া না বুঝিয়া কহিল, তার মানে?
—আপনি যে আমাকে এত ভালবাসেন, আমি সে ভালবাসার
“অজা যুদ্ধে, ঋষি শ্রাদ্ধে
অযােগ্য•••অমল এ-কথা বলিতেই সুধা বিষম ক্ষেপিয়া উঠিয়া কহিল,
কাকে কি বলছেন আপনি, আমার নাম নিভা নয়, আমি আপনাকে
কোনদিন ভালবাসি নি, আমার স্বামী আছেন।
সুধার চোখের দিকে আর তাকাইতে না পারিয়া অমল ক্ষমাপ্রার্থনা
করিয়া করজোড়ে কহিল, সমর বলেছিল, আপনি নাকি
ওসব বাজে কথা, আপনি কি বলছেন পাগলের মত, আপনার একটা
লজ্জাসরম নেই !
নিভা হাসিতে হাসিতে বলিয়া উঠিল, ঠিকই বলছেন অমল বাবু, এই
যে আপনার বিবাহিতা স্ত্রী সুধা। সুধা, স্বামীকে তুমি চিনতে পারে নি, এর
নাম অমল গাঙ্গুলী, পীরগাছায় এদের বাড়ী, শ্বশুরবাড়ীর কথা ভুলে গেছ...
সুধা ফ্যালফ্যাল চোখে চাহিয়া বলিয়া উঠিল, কে স্বামী, তুমি ভুল
বলছ নিভা, আমি নিজের চোখে দেখেছি:..
ছাই দেখেছ তুমি, ওদের ক্লাসে দুইজন অমল গাঙ্গুলী ছিল, সে সব
খবর আমরা পেয়েছি। তাের চেয়ে আর দ্বিতীয় বােকা পৃথিবীতে আছে
কিনা সন্দেহ।
সুধা থর থর করিয়া কাপিতে কাপিতে লজ্জায়, দুঃখে, ক্ষোভে
একেবারে উপুড় হইয়া অমলের পায়ের কাছে ধপ করিয়া পড়িয়া গেল।
অমল ভ্যাবাচ্যাকা গঙ্গারামের মত বায়ােস্কোপের চলচ্চিত্র দেখিতে-
ছিল, অমনি বলিয়া উঠিল, এ-সব ব্যাপার কি রে সমর।
সমর পর্দার ফাকে মুখ বাড়াইয়া সুর ধরিয়া কহিল,
‘ছিলে কালাদ হ'লে গােরামণি
তােমারে না দেখা ভালােসখিরে....
যুগে যুগে তুমি
ভানুর কিরণে আলাে••••••সখিরে।
৩
০ ০ ০ + ০ +
হও অবতার
গল্প, গল্প নয়
{
সকল ব্যাপার শুনিয়া দেখিয়া অমল আনন্দে প্রায় কঁদিয়া ফেলিল।
সমর তাহাকে সান্ত্বনা দিয়া আবার গাহিয়া উঠিল, “ধৈৰ্য্যং বহু,
ধৈৰ্য্যং বহু•••
০ ০ ০ ০
এখনাে পীরগাছা গ্রামে লক্ষ্যার তীরে বাঁধা-ঘাটে বসিয়া কোন তরুণ
তরুণীর মননামালিন্যের কথা উঠিলে ভগবান-দাদা বিজ্ঞের মত উচ্চকণ্ঠে
বলিয়া উঠেন
অজাযুদ্ধে, ঋষি শ্রাদ্ধে ••••••
ঈশান ঘােষাল ফোড়ন দিয়া তাড়াতাড়ি বলিয়া ওঠেন, দম্পতি
কলহেশ্চৈব......
একটা বিষম হাসির হব ছুটিয়া যায়। মহিম পাঠক শান্ত কণ্ঠে
বলিয়া উঠেন, ‘বহারম্ভে লঘু ক্রিয়া, এর পরে আর গল্প কি! গল্প অতি
সহজ, সরল এবং সংসারের দৈনন্দিন ঘটনার মাঝে গিয়া আপনাকে নিমেষে
হারাইয়া ফেলিয়াছে।
নীলার দিদি শরতের জ্যোৎস্নায় পথঘাট ভাসিয়া গিয়াছে। আকাশ নির্মল মেঘমেদুর নীলিমায় আবার ফুটফুটে জ্যোৎস্না উঠিয়াছে। গাছের ফাকে ফাকে আলােছায়া বড়ই সুন্দর দেখাইতেছিল। উন্মুক্ত প্রান্তরের উপর দিয়া হুহু শব্দে ট্রেণ ছুটিয়াছে, প্রথম শ্রেণীর প্রশস্ত কামরায় বসিয়া চাটার্জি সাহেব এদিক ওদিক দেখিতেছিলেন। সাত মাসের মেয়ে গীতা এইমাত্র ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। রাত্রি বােধকরি তখন দশটা বাজে। নবােঢ়া পত্নী অনিলা অনেক সাধ্যসাধনা করিয়া মেয়েটিকে ঘুম পাড়াইতে সফলকাম হইয়াছে, সেদিকে চাটার্জি সাহেবের হৃক্ষেপ নাই ! ‘ওগাে শুনছো তােমার মেয়ের কথা••• চাটার্জি সাহেব মুখ ফিরাইয়া কহিলেন, কি নীলা ? আবার তুমি নীলা ডাকছে। আমি ত আর নীলা নই, নীলার দিদি। অনিলার চেয়ে নীলা নামটি ঢের ভালো। তাহলে যে নীলা অভিমান করবে। চাটার্জি সাহেব হাসিয়া কহিলেন, আচ্ছা নীলা, শিলঙে সবাই তােমাকে নীলার দিদি বলে ডাকে, আর আমি বললেই যত দোষ হয়ে যায়, না? মুখখানি রাঙা করিয়া অনিলা কহিল, দোষ হয় কি গুণ হয় জানি না। তােমার যা খুসি তাই বলে ডেকো। কিন্তু তা বলে রাগ করে না যেন। হাঁ, নিশ্চয়ই রাগ করব—বলিয়া চাটার্জি সাহেব একটু হাসিয়া উঠিলেন।
গল্প, গল্প নয় প্রবাসে সরকারের দপ্তরে বড় কাজ করিয়া চাটার্জি সাহেব বহুদিন স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন নাই। পাড়াগাঁয়ের নামে তাহার গায়ে জ্বর আসে। পাড়াগা’ বলিতে চাটার্জি সাহেব শুধু বােঝেন,—ম্যালেরিয়া, ঝােপঝাড়, সাপ শেয়াল, দলাদলি, রেষারেষি—অবশ্যি সে কথা যে একেবারে মিথ্যা নয়, তাহা বলা চলে না। বাপদাদার আমলে প্রতি বৎসরই পূজায় বাড়ী যাইতেন, ইদানীং আর হইয়া উঠে না। এবার নীলার দিদির জেদাজেদিতে পূজার ছুটিতে শুধু বারাে দিনের জন্য দেশে যাইতেছেন। অনিলা আজন্ম সহুরে মেয়ে। পল্লীগ্রামের নামে তাহার মনপ্রাণ নাচিয়া উঠে। এতক্ষণ খুকীরও কি আনন্দ ছিল। হাত নাড়িয়া মুখে গাড়ী চলার শব্দ অনুকরণ করিতেছিল, ঝক, ঝ, ঝ। তার মা ত হাসিয়াই খুন। কথায় কথায় কহিল, দেশে যাবাে, কি চমৎকার লাগছে আমার, আর গীতার কি ফুৰ্ত্তি জানাে ! চাটার্জি সাহেব বিরক্ত হইয়া কহিলেন, তােমাদের মেয়েদের ঐ একটা জিনিস আমি পছন্দ করি না। সেইটি হচ্ছে আতিশয্য—সব তা’তেই একটা কিছু বেশ-বেশী ভাব দেখান। জানাে জানাে নীলা, তুমি এখন অফিসারের স্ত্রী, গ্রামে গিয়ে যেন যার তার সাথে আবার মেলামিশা করাে না। চাটার্জি সাহেব যে ভঙ্গীতে কথাটি বলিলেন, অনিলার কাণে এ সব বড় বিসদৃশ শুনাইল। অনিল। মনে মনে একটু বিরক্ত হইয়া কহিল, গ্রামের লােক বুঝি আর মানুষ নয়—কি যে বলল তুমি, বলিয়াই তরল হাসিতে বিরক্তির কণ্ঠস্বর সহসা ডুবাইয়া দিয়া কহিল, এই লাল শাড়িটা পরেচি, কেমন হয়েছে দেখতে বল তত ! —মার্ভেলাস, বলিয়া চাটার্জি সাহেব আলস্য ভাঙিয়া কহিলেন, চাঁদপুরে যখন নামবে, তখন কিন্তু নীল শাড়িখানি পরে নিয়াে। নীল নীলার দিদি শাড়িতে নীলার দিদিকে যা মানায় তা আর কি বলব! আর তােমার সেই মিনা করা দোদুল-দুল জোড়া—আর সেই হারের পদ্ম- লকেটটি ! রাত্রি বাবােটা অবধি বিচিত্র সাজসজ্জার কথা চলিল। সুন্দরী স্ত্রীকে নানা রকমের শাড়ি ও সৌন্দৰ্য্য প্রসাধনের আধুনিক রুচিসম্মত চাকচিক্যে এবং মনােরম পরিচ্ছদে দেখিতে তিনি বড় ভালােবাসেন। সবচেয়ে আরাে ভালােবাসেন, যখন দশজনের সে দৃশ্য দেখিয়া চোখ টাটায় ঈর্ষায়— তখন গর্বে চাটার্জি সাহেবের বুক এক হাত উচু হইয়া উঠে। আখাউড়া ষ্টেশনে চেকার আসিয়া টিকিট দেখিয়া নামিয়া যাইতেই চাটার্জি সাহেব একবার চোখ বুজিবার ভান করিয়া পড়িয়া রহিলেন। গাড়ীর দোলায় অনিলা নিরুদ্বেগে গীতার কাছে শয্যায় আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিল, তাহার যে ঘুম আসিয়াছে, এ কথা নিশ্চিত। আর কোন স্ত্রী স্বামী জাগিয়া থাকিলে একটু গা না গড়াইয়া পারেন! চাদপুর ষ্টেশন আসিতেই কুলীর কলরবে, অসংখ্য আলাের ঝিকিমিকিতে চাটার্জি সাহেব ধড়মড়িয়া উঠিয়া বসিলেন। নীলা ততক্ষণে নীল শাড়ি পরিয়া মখমল খচিত স্যাণ্ডেল পায়ে দিয়া গীতাকে জামা কাপড় পরাইতে ব্যস্ত ছিল। ট্রেণ থামিতেই পিপীলিকা শ্রেণীর মত যাত্রীর দল হুহু করিয়া নামিয়া পড়িতেছে। তাহাদের তাড়াহুড়া করিবার প্রয়ােজন নাই। ষ্টীমার আসিতে তখনও ঘণ্টাখানেক বাকী। বরিশাল, ঢাকার যাত্রীরা কে কোথায় গিয়াছে কে জানে, অসংখ্য কেরায়া নৌকার মাঝিরা দেশ দেশান্তরে চলিয়াছে যাত্রী লইয়া। তাহাদের প্রাণে যেন বাবুদের চেয়ে আনন্দ-উৎসবের মাত্রা আরাে অনেক বেশি। দু’পয়সা উপার্জন করিয়া টাকে টাকা গুজিয়া তাহারা দেশে যাইবে, ছেলেপিলের মুখের হাসি ৭০ গল্প, গল্প নয় দেখিয়া কত যে শান্তি পাইবে, সে কথা বলিতে গেলে এখানে আর গল্প বলা চলে না। রীতিমত রৌদ্র উঠিয়াছে। চাটার্জি সাহেব নদীর ধারে ঘুরিয়া ফিরিয়া দেখিতে লাগিলেন। জলের তােড় দেখিয়া ঘাবড়াইলেন না বটে, তবে মনে মনে একটু ভয় হইল। নদীর ওপারে বাজার, পাটের গুদাম, অসংখ্য বাড়ি, ঘর, দ্বিতল বাটি, আইস ফ্যাক্টরীর বড় বড় টিনের ঘর মন্দ লাগিল না, তবে নীলাকে এই সব বাড়ীঘর দেখাইতে তাহার মন সরিতেছিল না। এমন সময় রব উঠিল, বরিশাল ষ্টীমারের ধোঁয়া দেখা যাইতেছে। সত্যিই তাই! অমনি পোটলা পুটলি, ট্রাঙ্ক, বাক্স বিছানা কুলীর দল আসিয়া টানাহেঁচড়া সুরু করিয়া দিল। একটু সহ্যগুণ কাহারও যেন নাই। ষ্টীমার যখন চলিতে সুরু করিল, তখন দেখা গেল, একটি যাত্রীও তীরে বসিয়া নাই। সকলেই আপন আপন গন্তব্য স্থানে চলিয়াছে। তবু এই উঠানামা ব্যাপার লইয়া কত বাকযুদ্ধ, কলহ, ঝগড়া, গাত্ৰঘর্ষণ, কোলাহল মােটে দুই ঘণ্টার পথ, চোখের নিমেষে কাটিয়া গেছে। ষ্টেশনে ষ্টীমার থামিতেই দেশের লােকজন আসিয়া হাজির। এখানে আরদালি বেয়ারার বালাই নাই, তাহাদিগকে না আনিয়া কি বােকামি করিয়াছেন, এইসব কথা নিয়া চাটার্জি সাহেব মনে মনে মাথা ঘামাইতেছিলেন। নৌকার জন দুই মাঝি জিনিসপত্র টানিয়া পাটাতনের উপর আনিয়া রাখিল। একটা চিকণ পাটি পাতিয়া দিয়া তাহার উপর মাথার গামছা দিয়া মুছিতে মুছিতে বুড়া মাঝি কহিতে লাগিল—কর্তা অনেকদিন পরে দেশে আইছেন, এইবার আর আমাগাে চিন্তা কি, পােলাপানে খাইয়া বাঁচব। মা ঠাকরুণরে যে লইয়াছেন ভালাে করছেন।
নীলার দিদি ৭১ কথা শুনিয়া চাটার্জি সাহেব হতভম্ব হইয়া গেলেন। জীবনে যাহাকে কেহ কোন দিন সাহেব ছাড়া বলিতে সাহস করে নাই, আজ দেশের এইসব ছােটলােকেরা তাকে বলে কিনা কর্তা। তাহার চোখদুটি রাগে ক্ষোভে ক্ষুধার্ত ব্যাঘ্রের মত মিটমিট করিয়া জ্বলিতেছিল। বাড়ীর পুরাতন ভৃত্য মনাই কর সঙ্গে আসিয়াছিল, নীলা তাহার কাছে খুটিনাটি করিয়া গ্রামের সব কথা জানিয়া লইতেছিল। কেষ্টকুমার যে এবার প্রতিমা গড়িয়াছে, তাহা নাকি দেখিবার মত একটা—কিছু। চক্ষু কর্ণের বিবাদভঞ্জন না করা পর্যন্ত নীলার ঔৎসুক্য একটুও কমিতে পারে না! সে বার বার মনাইয়ের কাছে ভালাে করিয়া জানিয়া শুনিয়া লইতেছিল। গীতা মনে মনে ভয় পাইল এই কথা শুনিয়া যে, সিংহের কেশর টানিয়া ধরিয়াছে অসুর মশায়, আর সিংহ তাহার হাতে কামড় দিয়াছে, ঝরঝর রক্ত পড়িতেছে। চাটার্জি সাহেব এই সব কথাবার্তা শুনিয়া একেবারে থ’ খাইয়া গেলেন। নেহাত দায়ে পড়িয়া দেশে আসিয়াছেন, তার উপর কেঁচানাে ধুতি, পাঞ্জাবী ও পাম্পসু পায়ে দিয়া চলাফেরা করিবার কথা ভাবিতেই মাথায় যেন বাজ ভাঙিয়া পড়িল। উপায়ও নাই, জননী গৃহে আছেন, চোখ বুজিয়া সব সহ্য করা ছাড়া আর উপায় নাই ভাবিয়া মনে মনে নিরস্ত হইলেন। গ্রামে আসিয়া পৌছিতেই দলে দলে লােকজন নমস্কার জানাইয়া সরিয়া গেল। বৃদ্ধের দল আসিতেই জননী বারবার পায়ের ধূলি গ্রহণ করিবার জন্য বলিয়াছিলেন, না করা ছাড়া গতি নাই, নেহাৎ অনিচ্ছা- সত্ত্বেও তাহা করিতে হইল। বাড়ীর ভিতরে আসিতেই একজন নগণ্য লােকের সাথে মুখােমুখি দেখা হইল। নগণ্য এই হিসাবে, তাহার গায়ে কোন জামা চাদর নাই, পায়ে জুতা নাই, না আছে পরণে পরিষ্কার কাপড় ! নাম রামসুন্দর, ৭২ গল্প, গল্প নয় কর্তাদের আমলের ভাণ্ডারী। আনত হইয়া প্রণাম করিয়া বিনীতকণ্ঠে কহিল, ভাইর বেটা দেশে আসছেন, কত আনন্দের কথা। আপনার বাবার সাথে একসাথে খেলাধূলাে করছি, কত মারামারি, ঝগড়াঝাটি হইছে তার লেখাজোখা নাই। আপনাদের ভাত কাপড় খাইয়া-পইরাই আমরা মানুষ। নীলার আনন্দের সীমা নাই। সে এতদিনে হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিয়াছে। প্রাণ খুলিয়া কথা বলিবার মত মিলিয়াছে সখী, সাথী। টাটকা ফল- মূল, তরি-তরকারী, মাছ, দুধ, খাওয়ার অপৰ্যাপ্ত জিনিস, জীবনে সে এত চোখে দেখে নাই। পুকুরে সাঁতার কাটিয়া এপাড়া ওপাড়া ঘুরিয়া ফিরিয়া প্রতিমা দেখিয়াই সে ব্যস্ত। চাটার্জি সাহেবের খোঁজ খবর লইবার মত তাহার অবসর কোথায়। আর সহরের মত সর্বক্ষণ কথা বলিবার সুযােগ এবং সুবিধা সহজে মেলে না। চাটার্জি সাহেব গ্রামের উপর হাড়ে হাড়ে চটিয়া আছেন,—নীলার সাথে হঠাৎ দুপুর বেলা ছাদে দেখা। খালি পায়ে আলতা রঙিন পা দু'খানি স্যাণ্ডেল হারা দেখিয়াই তাহার মেজাজ চড়িয়া যাইতেই কহিলেন, একেবারে পাড়াগেঁয়ে ভূত হয়েছ দেখছি। ভালাে কাপড় চোপড় পরতে পারে নি ? নীলা প্রতিবাদের সুরে কহিল, এ গরীব দেশ, এখানে সব লােক দু'বেলা দু'মুঠো খেতে পায় না; তার ওপর আবার এ বৎসর অজন্মা হয়েছে, তুমি তার কোন খোঁজ খবর রাখে। আর আমি এসে এখানে ফুলবাবু হয়ে সেজেগুজে বেড়াবাে, সে আমি কিছুতেই পারবাে না। আমার লজ্জা করে না ? চাটার্জি সাহেব আতা আন্তা করিয়া কহিলেন, তা যাদের ভালাে কাপড় চোপড় আছে তারাও পরবে না, এ বড় অন্যায় কথা। তুমি জাননা, মেয়েদের ভালাে পােষাক পরিচ্ছদে দেখতে আমি খুব ভালােবাসি।
নীলার দিদি ৭৩ নীলা হাসিয়া কহিল, এ দশ বারাে দিন না হয় নাই বা দেখলে। এবার চাটার্জি সাহেব একটু রাগতভাবে কহিলেন, তুমি দিন দিন কেমন জানি হয়ে যাচ্ছ। ওকি, হাতের সব চুড়ি, গহনাপত্র কি করেছ ? —বাক্সে তুলে রেখে দিয়েছি। আবার যাবার দিন পরে যাব। -কেন, তার মানে ? —সে আমি তােমাকে কিছুতেই বােঝাতে পারবে না ! সবারই পরণে লাল টকটকে পাড়ের শাড়ী—পরিষ্কার ধবধবে জর্জেট, ক্রেপ, রেশমী শাড়ির বালাই নাই, হাতে দুই গাছি করিয়া শাঁখা, কপালে সিদূর। মুখ ভরা হাসি যেন লাগিয়াই আছে। কথায় কথায় বাপের বাড়ীর ঐশ্বর্যের বহর, মােটর গাড়ী, পাইক বরকন্দাজের বড় বড় কথা বলিয়া এখানে কেহ প্রাণ ওষ্ঠাগত করিয়া তােলে না। প্রাণখােলা হাসি, সাদাসিদা চালচলন, সাধারণ কথাবার্তা, এ সব অনিলার দেখিতে শুনিতে বেশ ভালাে লাগে। -দুপুরে সন্ধ্যাবেলা এ বাড়ী হইতে ও বাড়ী বেড়াইয়া আসে। রকমের ফলমূল নারিকেলের সন্দেশ, মায়া, নাড়, পরম পরিতৃপ্তির সহিত সে সদ্ব্যবহার করে। এখানে টি-পার্টি নাই, তবে চা-পানের প্রচলিত প্রথা যে একেবারে নাই, সে কথা বলা চলে না। চা-সমিতির কৃপায় গ্রামের কৃষকেরা পর্যন্ত চা-পানের অভ্যাস শুরু করিয়াছে। নীলার দিদিকে পাইয়া যেন গাঁয়ের মেয়েরা হাতে আকাশ পাইয়াছে ; অমন সুন্দর হাতের চুল বাঁধা, আদর যত্নের লােভ কেহই সহজে ছাড়িতে চায় না। এক বাক্স ভরা যে কয়খানি সুন্দর কাপড় সহর হইতে আনা হইয়াছিল, সব কয়খানি প্রায় সে বিলাইয়া দিয়াছে। স্বামী যে একটু অসন্তুষ্ট হইবেন সে কথা একবার ভাবিয়া আবার ভুলিয়া যাইত। গাঁয়ের ছেলেমেয়েরা তাহাকে পাইলে যে কত খুসী, সে কথা ভাবিয়া ৭৪ গল্প, গল্প নয় অনিলা মনে মনে একটু পুলকগর্ব অনুভব করে। ছেলে মেয়ের দল যখন দল বাঁধিয়া অনিলাদের ঘরেবাইরে জঞ্জালের সৃষ্টি করিয়া বসে, অনিলা নিজের হাতে সে সব পরিষ্কার করিতে লাগিয়া যায়। চাটার্জি সাহেবের চেঁচামেচিতে বাড়ীর লােকজন আসিয়া একত্রে জড়াে হয়, বােধ করি ডাকাত বাড়ীতে পড়িলেও এত গােলমাল হয় না। একদিন গাঙ্গুলী বাড়ীর একটি মেয়ে, নাম তার মালতী, আসিয়া কহিল,দিদি, আমাদের বাড়ী যাবে একদিন বেড়াতে ? কেন যাবােনা ভাই, স্নিগ্ধ হাসিয়া অনিলা কহিল—আজ আমার সৌভাগ্য, আজ কার মুখ দেখে না জানি ঘুম থেকে উঠেছিলাম। মালতী কৌতুক করিয়া কহিল, দাদাবাবুর মুখ দেখে নিশ্চয়ই ••• —সে আর বলতে বােন, যা’ বলেছ তুমি-বলিয়া গলাগলি হইয়া দুইজনে হাসিয়। কুটপাট হইল। হাসি থামিলে পর মালতী কহিল, দাদাবাবুকে নিয়ে যাবে কিন্তু। ছােট বেলায় নাকি তােমাদের সতীশবাবুর সাথে কত জানাশােনা ছিল ওর। কত মারধর করেছে, কতদিন একসঙ্গে সাঁতার কাটতে গিয়েছে, কত ভাব ছিল ওর সাথে। উনি দু’দিন এসে ফিরে গিয়েছেন, দেখা হয়নি নাকি, না বাড়ী ছিলেন না। বিকেল বেলা চাটার্জি সাহেবকে এক রকম জোর করিয়া টানিয়া লইয়াই অনিলা মালতীদের বাড়ি বেড়াইতে রওনা হইল। সন্ধ্যা হয়-হয় প্রায়, অষ্টমীর চাঁদ আকাশে উজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছে। পথে কোথাও আলাের বন্দোবস্ত নাই, জোনাকী-জ্বলা পথের দুই ধারে আম জাম সুপারির বাগ বাগিচা, শেয়ালের বসতি ; দলে দলে লোেকজন এই আলাে আঁধারের মাঝখানে আন্দাজে ভর করিয়া পথ চলিয়াছে। পূজার ঢাকীদের ঢাকা নিনাদে গ্রামখানি মুখরিত, কোন কোন চণ্ডীমণ্ডপে এইমাত্র • নীলার দিদি ৭৫ সন্ধ্যারতি সুরু হইয়াছে, তালে তালে নাচিয়া পাড়ার ছােট বড় ছেলের আসর জমাইয়া তুলিয়াছে। গাঙ্গুলী বাড়ীর কাছাকাছি একটি খালের উপর বাঁশের সাঁকো কোন মতে স্বামী স্ত্রী পার হইয়া গেল বটে, কিন্তু হিন্দুস্থানী ভৃত্য ভজুয়া কিছুতেই এই অভিনব সাঁকোর উপর দিয়া পারাপার করিতে সাহসী হইল না। চণ্ডীমণ্ডপের কাছে আসিয়া চাটার্জি সাহেব দেখিলেন, জনকয়েক রসিক ছােকরা ধূপধূনা মাথায় নিয়া ধিনধিন করিয়া সারা আঙ্গিনায় ছুটাছুটি করিতেছে। দেখিয়াই তাহার চক্ষু স্থির হইল। ইহাদের আগুনের ভয় নাই, সভ্যতার জ্ঞান কাণ্ড নাই.••এই সব যুবকদের কাণ্ডাকাণ্ডজ্ঞানরহিত দেখিয়া তিনি নিজেই মনে মনে শিহরিয়া উঠিলেন, কিন্তু সহসা তাহার চমক ভাঙিয়া গেল সতীশকে সুমুখে দেখিতে পাইয়া। সতীশকে তাহার মনে আছে, কিন্তু এখন তেমনভাবে প্রাণ খুলিয়া মিশিতে কেমন বাধ-বাধ ঠেকিল। সতীশ তাড়াতাড়ি কহিল, ঘরে এসে বসাে ভাই। বাইরে কেন ? চাটার্জি সাহেব জবাব দিলেন তা এখানেই বেশ আছি, আবার ঘরে কেন ? মানে ঘরে একদল লােক বসিয়া হৈ চৈ শুরু করিয়াছিল, তিনি সেই সব আদৌ পছন্দ করেন না। সতীশ প্রবলবেগে মাথা নাডিয়া কহিল, তা কি হয়। এস ভাই, এস! গ্রামে যখন এসেছ, তখন সহুরে ভাব একটু ছাড় ভাই। সতীশ যখন নাছােড়বান্দা, অনন্যোপায় হইয়া চাটার্জি সাহেবকে ঘরে গিয়া বসিতে হইল, কিন্তু মনে মনে যত রাগ হইল অনিলার উপর। সে-ই তাে তাহাকে এই বিপদে টানিয়া আনিয়া ফেলিয়াছে। তারপর সতীশের সাথে যত রকমের বাজে কথা দুনিয়ায় আছে । ৭৬ গল্প, গল্প নয় তাহাই সুরু হইল। চাটার্জি সাহেব ‘হাঁ, না’ বলিয়া কোন রকমে উঠিবার জন্য ব্যগ্র হইয়া উঠিয়াছিলেন, কিন্তু অন্দর মহলে অনিলার কোন সাড়াশব্দ নাই দেখিয়া তিনি চুপ হইয়া বসিয়া রহিলেন। ইতিমধ্যে গ্রামের ইংরেজী স্কুলের বৃদ্ধ রাইমােহন পণ্ডিতমহাশয় গলা ছাড়িয়া এমন উচ্চ কণ্ঠে রামপ্রসাদী গান ধরিয়াছেন যে সেখানে আর বসিয়া থাকা একরকম অসম্ভব হইয়া উঠিয়াছে। কিন্তু ভিতর হইতে ডাক আসিতে সে যাত্রা কোন মতে বাঁচিয়া গেলেন। অন্দরে গিয়া দেশীপ্রথায় চাটার্জি সাহেবকে দস্তুরমত চর্ধচোষ লেপেয় গলাধঃ করিয়া উঠিতে হইল। পূজার এই কয়দিন মিষ্টিমুখ না করিয়া কোন ভদ্রলােক পূজার বাড়ী হইতে যাইতে পারে না, সতীশ পূৰ্ব্ব হইতেই চাটার্জি সাহেবকে এই কথা জানাইয়া দিয়াছিল। তবু যেন কেমন কেমন তাহার আত্মসম্মানে বাধিতেছিল। তিনি এত বড় উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী, সাহেবসুবাের হাত ধরিয়া বেড়ান, আগামী সম্রাটের জন্মদিনে খেতাব লাভের আশা আছে, আর জনকয়েক নিষ্কর্মা যুবকের দল, বৃদ্ধেরা, তাহার সাথে গা মাখামাখি করিতে সাহস পাইতেছে। এই সবের আরও প্রশ্রয় পাইতেছে নীলার দিদির কাছে। ফেরার পথে মালতী খানিকটা দূর অবধি আসিয়াছিল। অনুনয় বিনয় করিয়া কহিল, আর একদিন আসবেন কিন্তু যাবার আগে। নীল। হাসিয়া সম্মতি দিতেই মালতী দীঘির পার হইতে হাসিমুখে ফিরিয়া গেল। পথে পড়িয়া চাটার্জি সাহেব রসিকতা করিয়া কহিলেন, ও নীলা। তুমি সব জিনিসই বড় বাড়াবাড়ি করে তােল, এ আমার ভালাে লাগে না। নীলার দিদি চুপ করিয়া থাকিবার পাত্রী নয়। ফস করিয়া জবাব দিল,তুমি না এলেই পারতে, আমার খুব ভালাে লাগে, তাই আমি আসি। তােমার ভালাে না লাগে, তুমি এসাে না।
নীলার দিদি ৭৭ দুপুর হইতেই চাটার্জি সাহেব এবারের মত চুপ করিয়া গেলেন। সাধারণ লােক- জনের সাথে মেলামেশা করিতে তাহার সম্মানে আঘাত লাগে এ ধারণা তাহার বহুদিন হইতে ছিল। গ্রামে আসিয়া সে ধারণা তাহার আরও বদ্ধমূল হইবার উপক্রম হইল। কিন্তু নীলার দিদিকে চারি চক্ষের উপর পাড়ার ছেলে মেয়ে হইতে প্রৌঢ়া, বৃদ্ধারা যে স্নেহের চোখে দেখিতে লাগিলেন, ইহাতে তাহার মনে একটু খটকা লাগিল এবং ধীরে ধীরে মনােভাবের ক্রমশঃ পরিবর্তনের আভাস লক্ষ্য করিয়া চাটার্জি সাহেব নিজেই মনে মনে অবাক হইয়া গেলেন। দেখিতে দেখিতে ছুটি ফুরাইয়া আসিল। সেদিন নীলার দিদিদের ফিরিয়া যাইবার কথা। স্ত্রী পুরুষ, বালক, বৃদ্ধ, যুবা, বৌ-ঝিদের আনাগােনায় নতুন বাড়ী মুখরিত হইয়া উঠিয়াছে। সকলের মুখে সেই এক কথা—নীলার দিদি আজ চলিয়া যাইতেছে। সকলের সাথে হাসিমুখে অনিলা বিদায় গ্রহণ করিতে লাগিল। চোখ দুটি অশ্রুতে টলমল করিতেছে, তথাপি উদগত অশ্রু কোনমতে সংবরণ করিয়া সে ঘােমটার আড়ালে সুন্দর মুখখানি ঢাকিয়া লইয়া ঘুরিয়া ফিরিয়া বেড়াইতেছিল। পাড়ার ছােট খাট ছেলে মেয়েরা শাড়ির আঁচল ধরিয়া টানাটানি শুরু করিয়া দিল, মনে মনে এই ভাব যেন ধরিয়া রাখিবে, আর কোথাও যাইতে দিবে না। তাহারা জানে এই তাহাদের নীলার তাহাদের ভাই বােন, মা পিসী, মাসী সবাই ডাকে নীলার দিদি, এমন কি পাড়ার হাড়ী ডােম, মুচিরা পর্যন্ত—তাই ছেলেপেলেরাও নীলার দিদি নাম ধরিয়া ডাকিতে শিখিয়াছে। এমন সময় মরণ মাঝি নৌকা ঘাটে আনিয়া বাধিল। সর্বত্র যেন একটা চঞ্চলতার সৃষ্টি হইল। চাটার্জি সাহেব বাহিরে আসিলেন। বাহিরে আসিতেই গ্রামের আবালবৃদ্ধবনিতার শােকা বর্ষণের মাঝখানে দিদি ;
৭৮ গল্প, গল্প নয় তাহার মনে পডিল, বিজয়া দশমীর অব্যবহিত পরেই এই বিদায় দৃশ্য যেন সেই দৃশ্যেরই পুনরাবৃত্তি করিতেছে, নীলার দিদির আয়ত দুইটি চক্ষু যেন ছলছল করিতেছিল, হয়ত অকাল বাদল নামিয়া আসিবে ; এমন সময় শত সহস্র সস্নেহ মমতাময় ও সুকোমল হন্তের অযাচিত আশীৰ্বাদ তাহাব মাথার উপর বর্ষিত হইতে লাগিল। অপরিসীম আনন্দে চাটার্জি সাহেবের অন্তর মথিত করিয়া সর্বাঙ্গে এক রােমাঞ্চের শিহরণ খেলিয়া গেল, তঁাহারও ইচ্ছা হইল ওই সমবেত নরনারীর সাথে প্রাণ মিশাইয়া তিনিও একবার স্বদেশের তরে এক ফোটা জল ফেলিয়া যান। নৌকাখানি ঘাট ছাড়িয়া বহুদূর আসিলেও সকলেই একদৃষ্টে যতদূর দেখা যায় চাহিয়া দেখিতে লাগিল। বিস্ময়ে, পুলকে চাটার্জি সাহেবের সকল মান অভিমান জল হইয়া গেল। পূৰ্বস্মৃতি স্মরণপথে আরূঢ় হইতেই তাহার চক্ষু দুটি ক্রমাগত সজল হইয়া উঠিতে লাগিল।
“মােহনপুর ড্রামেটিক ক্লাব” দৈনিক খবরের কাগজ না পড়িলে যাহাদের পেটের ভাত সহজে হজম হয় না, তাহাদের কাছে মােহনপুর গ্রামের কথা ভালাে করিয়া না বলিলেও চলে বােধ করি। এই নগণ্য গ্রাম খানির অস্তিত্ব সম্বন্ধে কাহারও কোন সংশয় করিবার মত কিছু নাই। ব্রাহ্মণ-প্রধান গ্রাম, নদ-নদী, নালার বালাই নাই, গােটা কয়েক বেশ বড় বড় দীঘি, পুষ্করিণী কোন পুরাণ আমল হইতে বিরাজ করিতেছে কে জানে! গ্রামের চারিদিকে বড় বড় মাঠ, অদূরে লােকাল বাের্ডের রাস্তা, দূর হইতে তাল, সুপুরি, নারিকেল গাছের বাগ-বাগিচা দেখিলে সত্য সত্যই চক্ষু জুড়ায় । একদিন যে গ্রামে সাতশ’ ঘর হিন্দু-মুসলমানের বসবাস ছিল, আজ হয় সেখানে পাঁচশ আসিয়া দাঁড়াইয়াছে, তাই বলিয়া গ্রাম তাে আর একেবারে উঠিয়া যায় নাই, গাছ গাছড়া, বন বাগিচা, দীঘি, পুকুর, ভাঙা কোঠা-বাড়ি, বড় বড় টিনের ঘর, সবই পড়িয়া আছে। তবু গাঁয়ের লােকের দেশে যাওয়ার নামে গায়ে জ্বর আসে। গ্রামে পা দিয়াই দেখি যে, সে গ্রাম আর সে নাই। এখন গ্রামে স্কুল, বালিকা বিদ্যালয়, হাট বাজার, ডাক্তার খানা, দস্তুর মত একটি ছােট খাট সহর বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। চাষার ছেলেরা তামাক ছাড়িয়া বিড়ি ধরিয়াছে, বাড়ী-বাড়ী চা-পানের আসর, ঢঙী বাড়ী কলের গান, সেলাইয়ের কল, যুদ্ধের বাজারে ঘােষালদের আটচালায় একটি রেডিয়াে ইত্যাদি দেখিয়া মনে হইল, ভানুমতীর ভােজবাজীর মত রাতারাতি এ গল্প, গল্প নয় । গ্রামখানি সত্য সত্যই মানুষ হইয়া উঠিয়াছে। সবই আছে, শুধু মানুষ নাই! একদণ্ড যে প্রাণ খুলিয়া কাহারও সাথে আলাপ পরিচয় করিব, এমন লােক নাই। যাহারা আছে, তাহারাও মানুষজন দেখিলে বাঘের মত ভয় করে। ইদানীং গ্রামে সৈন্য সামন্ত, সাহেব সুবাে অনেক আসিয়া গেছে, তাই তাহারা প্রাণভয়ে তটস্থ হইয়া আছে। বৃদ্ধদের মুখে শুনিলাম, এই নাকি ঘাের কলি। কলির শেষে পৃথিবীর সর্বত্র অবিচার, অত্যাচার, মড়কের হিড়িকে দেশ ছাইয়া যাইবে, দেশে প্রচুর শস্য জন্মিবে না, দুর্ভিক্ষ, মহামারীর কবলে পড়িয়া অকালে কত লােক যে কালগ্রাসে পতিত হইবে, তাহার ইয়ত্তা নাই। গুরুলঘু ভেদাভেদ থাকিবে না, সংসার একেবারে রসাতলে ডুবিয়া যাইবে, এমনি ধরণের সব কথা শুনিয়া দুঃখও হয়, হাসিও পায়। প্রতিবারই যখন গ্রাম হইতে সহরে ফিরিয়া গিয়াছি, তখন আর গ্রামে যাইতে সাধ জাগে নাই। নিবিড় বনজঙ্গলে ঘেরা ঘর বাড়ী, মেঠো পথ, বাঁশঝাড়, ম্যালেরিয়া, পচা নালা ভােবা, শেয়ালের হুক্কাহুয়া, ডােবা, মজা দীঘির বুকে হলদে পানা, কচুরি পানা, সাপ খােপের ভয়, কত দুঃখ, কত দারিদ্র্য, তবু গ্রামের কথা ভুলিয়া থাকা যায় না, কি যে যাদু আছে, কে জানে! শীতের প্রভাত। পুকুর পাড়ে বসিয়া রৌদ্র সেবন করিতেছিলাম। সেখানে আসিয়া জুটিয়াছে পাড়ার প্রবীণ শম্ভ চাটুয্যে, দেবেন্দ্র ঘােষাল, শিবু খুড়াে, রাজকুমার পণ্ডিত, রাইমােহন মাষ্টার, আরও কত-কে ঠিক মনে নাই। কাহারও গায়ে একখানি পুরাণাে কথা, কেহ একখানি জীর্ণশীর্ণ বালাপােষ, কেহ একখানি সস্তা জাপানী কম্বল গায়ে জড়াইয়া রৌদ্রে লাল হইয়া উঠিয়াছেন। একটুখানি দূরে কুলগাছের নীচে প্রকাণ্ড এক ছেলেমেয়েদের জটলা বসিয়াছে। সকলেই উদগ্রীব দৃষ্টিতে গাছের উপরে ছােট ঘােট পাখীদের গতিবিধি বিশেষ ভাবে লক্ষ্য করিতেছিল, “মােহনপুর ড্রামেটিক ক্লাব” ৮) কখন দু একটী পাকা, ডাসা কুল তাহাদের ঠোটের মৃদুস্পর্শে বৃন্তচ্যুত হইয়া মাটিতে পড়িয়া যাইবে। এক গাদা বাসন মাজিতে মাজিতে ঘােষালদের বড় বউ ঘােমটার ফাকে সে দৃশ্য দেখিয়া মৃদু মৃদু হাসিতেছিল। এমন সময় পুকুরের ওপার হইতে বাল্যবন্ধু ষােড়শী চৌধুরীর আবির্ভাবে হঠাৎ চমকিত হইয়া কহিলাম, কি হে দধিরাম, খবর কি ? দধিরাম ওরফে ষােড়শী চৌধুরী পুলকে উচ্ছ্বসিত হইয়া কহিল, খবর সব ভালাে। গ্রামের কুশল। অনেক জিজ্ঞাসাবাদের পর সে আমাকে এক রকম জোর করিয়াই গ্রামের দিকে টানিয়া লইয়া চলিল। আমারও ইচ্ছা ছিল, একদিন গ্রামে ঘুরিয়া ফিরিয়া সকলের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করিয়া আসিব, দধিরামকে সঙ্গে পাওয়ায় সে সুযােগ মন্দ মিলিল না। নয়াবাড়ীর পথে ঘােষালদের আম বাগানের পথ ধরিয়া গ্রামের সুখ দুঃখের কথা শুনিতে শুনিতে চলিলাম। কালীবাড়ীর কাছে আসিয়াছি, এমন সময় দধিরাম ফস করিয়া কহিল, আঃ, রামঃ, যে কাজে এসেছিলাম, আসল কথা বলতেই ভুলে গেছি। বিস্মিত ভাবে তাহার মুখের দিকে চাহিয়া দেখি, বিজয় গর্ধ্বে উৎফুল্ল মিশ্রিত চাপা হাসিতে তাহার মুখখানি সহসা রক্তিমাভা ধারণ করিয়াছে। ব্যাপার কি কিছুই কূলকিনারা করিতে না পারিয়া কহিলাম, বলনা ভাই, কি হয়েছে। -“মােহনপুর ড্রামেটিক ক্লাবের সভ্য হতে হবে তােমাকে, বলিয়াই সে চাঁদার রসিদ বইখানি পকেট হইতে বাহির করিয়া ফেলিল। অবাক হইয়া কহিলাম, “মােহনপুর ড্রামেটিক ক্লাব”, সে আবার কবে হ’ল ? —আজ দু’ বছর। গেল বছর বারােয়ারী পূজায় “সাজাহান” অভিনয় == গল্প, গল্প নয় হয়েছিল, আর এবার হচ্ছে “কেদার রায়”,•••••গাম্ভীর্যের সহিত একটু হাসিয়া দধিরাম কহিল, সিন, ড্রেস, সবই নূতন কেনা হয়েছে, হামোনিয়াম, অর্গান, ডান-বায়া, সবই আছে। আমাদের কিসের অভাব তােমরা থাকতে! পুলকিত হইয়া কহিলাম, কার্ভালাের পাট কে করবে ভাই ? বড় শক্ত কিন্তু। দধিরাম গোঁফে চাড়া দিয়া কহিল, “ললিত দি গ্রেট।” বন্ধুর ভাইকে মনে আছে তাে ? বেশ আছে। —বন্ধু এখন নড়িয়ার দাবােগা। গেলবার পাঁচ টাকা চাঁদা দিয়ে গেছে। হাসিয়া কহিলাম, দারােগার ভাই অগাধ টাকা, আমিও কিছু দেব, তবে পাঁচ দশ টাকার আশা করে না কিন্তু। কথায় কথায় প্রায় গাঙ্গুলী বাড়ীর কাছে আসিয়া পড়িয়াছি, এমন সময় দেখি পাড়ার টেবু ঘােষাল চুপি চুপি গাঙ্গুলীদের বাঁশঝাড় হইতে গােটা কয়েক পাকা বাশ বেমালুম কাটিয়া গাফ মারিতেছে। দধিরাম হাঁকডাক করিয়া কহিল, টেবু ঘােষাল, দিনে দুপুরে এ কি ডাকাতি করছ! বলিয়াই চোখ দুটি কপালে উঠাইয়া কানে হাত দিয়া দধিরাম পুনরায় চীৎকার করিয়া উঠিল, ও অতসীর মা, খুড়ীমা, আপনাদের যথাসর্বস্ব নিয়ে গেল, বাঁশ ঝাড়ের••••••••• টেবু ঘােষাল তাড়াতাড়ি চোখ পাকাইয়া কহিল, কাল যে তােমর। থিয়েটারের জন্য ঝাড় শুদ্ধ বাঁশ সাফ করে নিয়ে গেলে, আর আমি আজ দু’টো বাঁশ কেটেছি তো বড় চক্ষুশূল হয়েছে তােমার,না? খুড়ী আজ ভিন গাঁয়ে গিয়েছে,•••আচ্ছা মনে রেখাে।
“মােহনপুর ড্রামেটিক ক্লাব” অনেক ডাকাডাকির পরও যখন খুড়ীমা আসিলেন না, দধিরাম সুর নামাইয়া কহিল, আচ্ছা আজ নিয়ে যাও, আর কখনও এ পাড়ায় এসে কি বাঁশঝাড়ে হাত দাও, তাহলে আর রক্ষা থাকবে না। টেবু ঘােষাল মুখ বিকৃত করিয়া কহিল, শালা চাদা নিতে এসাে, দেখা যাবে’খন। তােমাকে আবার চিনি না, শক্তের ভক্ত, নরমের যম তুমি! দধিরাম আমার মুখের দিকে চাহিয়া কহিল, দেখছো ভাই দেশের লােকের কাণ্ডকারখানা, দিনে দুপুরে ডাকাতি! টেবু ঘােষাল তখন কাছাকাছি আসিয়া কহিল, যােড়ী চৌধুরী, ছােট মুখে বড় কথা কয় না! বালিকা বিদ্যালয়ের নাম করে কত টাকা পয়সা পেয়েছ, এখন আবার থিয়েটারের ভড়ং করে এর পিছু জুটে বুঝি! সাবধান, একটি পয়সা দিয়েও দধিশৰ্ম্মাকে বিশ্বাস করােনা যেন! গাঁয়ের লােকের কাছে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবে বাবাজী। পুলিশের হাত ধরা লােক কিনা, তাই ভরে ভয়ে কেউ কিছু বলতে সাহস পায় না। আমি জানকী ঘােষালের ছেলে, আমার অত ডর ভয় নেই, তিন তিন বার গান্ধীর কল্যাণে জেল খেটে এসেছি। তােমার মত তিন দধিরামকে ঘােল খাইয়ে ছাড়তে পারি। দধিরাম বাধা দিয়া বিষম রাগিয়া উঠিয়া কহিল, দেশের কুলাঙ্গার, ঘােষাল বংশের কুষ্ম কোথাকার, লােকের সামনে দাঁড়িয়ে আবার ভ্যা ভ্যা করে কথা বলা হচ্ছে। হাতে-নাতে ধরা পড়েও লজ্জা হয়নি তােমার। হ্যা, থাকত আজ রমণী সামন্ত, আর তারক আচার্যের মত স্কুল মাষ্টার, কাণে ধরে কবে স্কুল থেকে বের করে দিল কিনা বােঝা যেত। বুঝলে ভাই, উনি তােমাদের পাঠশালার একজন মাষ্টার। টেবু ঘােষালও ততােধিক উচ্চকণ্ঠে আস্ফালন করিয়া কহিল, কোন ৮৪ গল্প, গল্প নয় f লালা আমাকে গ্রাম থেকে বের করে দিতে পারে, দেখি কার ঘাড়ে ক'টা মাথ',••••যত বড় মুখ নয়, তত বড় কথা ! একটা হাতাহাতি হইবার উপক্রম। কোন মতে দধিরামকে নিরস্ত করিয়া টানিয়া লইয়া কহিলাম, চল ভাই চলাে, ও সব বাজে কথায় কাণ দাও কেন? দেশের কাজ করছ, করে যাও। ভয় কিসের ; তারপর তােমার ড্রামেটিক ক্লাবের অভিনয় কবে হচ্ছে বলাে দেখি। দধিরামের রাগ দেখি পডিয়াও পডিতে চায় না। সারাপথ সে শুধু ব, বক্ করিয়া ঘােষাল অবতংসের আদ্যশ্ৰাদ্ধ শেষ করিতে করিতে পথ চলিয়াছিল। কোন মতে বেলা দুপুর অবধি এই ভবঘুরের সাথে টো-টো করিয়া ঘুরিয়া ফিরিয়া গৃহে ফিরিয়া আসিলাম। পরদিনও গ্রামে বাহির হইয়াছিলাম, এমনি প্রতিদিনই যাই। আর একদিন সকালে বাহির হইয়াছি, যােড়শী ব্যস্তসমস্ত হইয়া ছুটিয়া আসিয়া কহিল, রােববার “কেদার রায় হবে, গাঙ্গুলী বাড়ী, যেয়াে কিন্তু। —নিশ্চয়ই যাবাে। —আর চঁাদার কথা,•••ভুলােনা যেন! -না, না, ভুলবাে কেন, কালই পাঠিয়ে দেব। তােমরা গ্রামে থিয়েটার করছ, আমাদের যথাসাধ্য সাহায্য করা উচিত, ইত্যাদি। স্তোক বাক্যে ভুলইয়া বৃহৎ একটি সাঁকোর উপর পা ফেলিয়া খালের ওপারে গাঁয়ের হাটের পথে যাইতেছিলাম । পথে যত ছেলে ছােকরাদের সাথে দেখা হইয়াছে, সকলেরই মুখে & ঐ এক কথা, “কেদার রায়•••মােহনপুর ড্রামেটিক ক্লাব”, এমন কি কে কে কোন পাট অভিনয় করিবে তাহা পৰ্য্যন্ত কণ্ঠস্থ হইয়া গিয়াছে তাহাদের। হাটে গিয়া শুনি থিয়েটারের জল্পনা কল্পনায় ছেলে-বুড়ো-মেয়ে } “মােহনপুর ড্রামেটিক ক্লাব” ৮৫ মহলে হৈ হৈ পডিয়াছে। শম্ভু চাটুয্যের ওজন-হরির-লুট কাল হওয়ার কথা, দেডমণ বাতাসা মাপিতে গিয়া ভগা ব্যাপারী বিষম হাঁপাইতেছিল। এক সাথে এতগুলি বাতাসা চোখে দেখিবার সুযােগ আমার হয় নাই, তাই একেবারে তাক লাগিয়া গেল। গ্রামে গুজব শুনিলাম, দ্বিতীয় পক্ষের মানত ছিল, তাই শম্ভ চাটুয্যে ওজন-হরির লুটের ব্যবস্থা করিয়াছেন। শুধু তাহাই নয়, তিননাথের মেলা, নারায়ণ-সেবা, শান্তি, স্বস্ত্যয়ন, কোন কিছুই বাদ নাই। দোকানে ঢুকিয়া দেখি একজন বেশ লম্বা চওড়া চেহারা, দাড়ি গোঁফে সারা মুখে আগাছার মত একেবারে ভর্তি, ক্ষৌরকারের সাথে নয়-ছ'মাস যে তাহার দেখা হইয়াছে মনে হয় না। কাপড়-চোপড দেখিয়া সন্দেহ হয় যে, গ্রামে ধােপা-নাপিত বুঝি বদ্ধ। সর্বাঙ্গে চিতা বাঘের মত ক্ষত বিক্ষত কোন ব্যাধির চিহ্ন সুস্পষ্ট বর্তমান, সন্দিগ্ধভাবে আমার দিকে চাহিয়া কহিল, কবে এসেছ দেশে, ভালাে ত ? হঠাৎ তাহার কুশল প্রশ্নে আপাদমস্তকে একবার চোখ বুলাইয়া কহিলাম, দিন কয়েক হ’ল এসেছি, ভালােই আছি। সেই লােকটি অবিচলিত স্বরে কহিল, আমায় তুমি চিনতে পারেনি 'বাবা, আমি বল্পভ ডাক্তার চমকিয়া কহিলাম, বল্পভ ডাক্তার বাবু, আপনার এ দশা,'বার দালান, বালাখানা, দাসদাসী, টাকা পয়সা, ছেলে মেয়ে,•••আজ তাহার এই অবস্থা! কথাটি সময়ােচিত নয় ভাবিয়া মনাই চক্ৰবৰ্ত্তী ধীরে ধীরে কহিলেন, ছেলেটি মারা যাবার পর থেকেই এই অবস্থা। সকলই তার ইচ্ছা। -তার ইচ্ছা ত বটেই আর দ্বিরুক্তি না করিয়া তাড়াতাড়ি ফিরিয়া চলিলাম। মনে হইল;
গল্প, গল্প নয় ফালীর বাড়ী চণ্ডীমণ্ডপে একবার উকি মারিয়া যাই। সেখানে রাত্রি দিন নাই, পাড়ার অকেজো ছেলেদের থিয়েটারের মহলা চলিতেছে। খানিক দূর অগ্রসর হইতেই থিয়েটারের আরও সােরগােল শােনা যাইতে গিল। গিয়া দেখি, নিশি পােপা কয়েকটি বাগী পাড়ার ছেলেকে প্রাচ্য নৃত্যের মত কি একটা থিয়েটারী ঢঙের নাচ শিখাইতেছে। ইন্দু মন্ত্রিক, অবনী ঘােষাল, সীতা ব্যাপারী, স্বয়ং সম্পাদক দধিরাম পর্যন্ত বিকট চীৎকার করিয়া পার্ট বলিতেছিল, আমাকে দেখিয়া সকলের উৎসাহ যেন আরও বাড়িয়া গেল। বিদেশ হইতে আগত একটি ছেলে গানর সুর দিতেছিল। তাহার গলা নেহাত মন্দ না, চলনসই নিশ্চয়ই। অন্ততঃ আমি যে পাহাড়ে থাকি, সেখানে এমন ধরণের গাইয়ে-বাজিয়ে দু’ একজন ছাড়া বেশী নাই। পাহাড় হইলেও সহর বটে, আর এ যে গণ্ডগ্রাম। দধিরামের কাছে শুনিলাম, এই ছেলেটি নাকি সােণামণির পাট বেশ মিহি মেয়েলি গলা, চেহারাটাও নিতান্ত খারাপ নয়, রঙ ফস, পাউডার না মাখিলেও চলিবে। আরাে শুনিলাম, ইহার কনিষ্ঠ ভ্রাতা মাখম মুখুয্যে কলিকাতায় ইউনিভার্সিটি ইনষ্টিটিউটে সর্বদাই প্লে করিয়া থাকে, এবং সেই হিসেবে এই ছেলেটিও শিশির ভাদুড়ী হইতে কৃষ্ণধনের হাবভাব, মােশন, কথাবলার ভঙ্গী, সব কিছু একেবারে আয়ত্ত করিয়া ফেলিয়াছে। ছেলেটির নাম ননীগােপাল, কলিকাতায় সহরতলীতে মামার বাসায় থাকিয়া অনুধবংস করে এবং মামা-মামীর শত সহস্র ফুট-ফরমাস জোগাইয়া বিনি পয়সায় থিয়েটার, বায়োস্কাপ দেখে। তাহার মামা যতীনবাবু পুলিস অফিসার এবং আমি কলিকাতা কোন সময় গেলে সে আমাকে অনায়াসে এই সব দ্রষ্টব্যগুলি “পাশে” দেখাইয়া দিতে পারে, এই সব কথা এতদসঙ্গে কলিতে ভূলিল না। বলিবে।
“মােহনপুর ড্রামেটিক ক্লাব” ৭ তাহার সাথে আলাপ পরিচয় করিয়া দেখিলাম, সহরে থাকিয়া সে বেশ আদবকায়দা শিখিয়াছে। গ্রামের ছেলেদের মত ততটা অপ্রতিভ নয়। কথায় কথায় সে বলিতে লাগিল, অনীতা বসুর নাম শুনেছেন কি! অনীতা বস্তুর সাথে তাহার আলাপ পরিচয় আছে, অনাদি বাবু তাহার হাতধর লােক, শ্যামবাবু, হারুবাবু বন্ধু, কাননবালা, লীলা দেশাই কেহই তাহার অপরিচিত নয়। ইদানীং দেশের মায়া ছবিখানি আসিয়াছে। লীলা দেশাইর কথা জিজ্ঞাসা করায় সে কহিল, লীলাদের সাথে কতবার আমি কাসিয়াং বেড়াতে গিয়েছি, এই দেখুন তার ফটো। বলিয়া সে সত্যসত্যই একখানি ফটো পকেট হইতে বাহির করিয়া আমাকে দেখাইল। তবে লীলা দেশাইয়ের ফটো কি না সঠিক বলিতে পারিলাম না। ননীগােপালের ভাবগতিক দেখিয়া চুপ হইয়া গেলাম। মনে মনে কহিলাম, ইহারা কথায় কথায় লীলা দেশাই, জ্যোৎস্না গুপ্তা বলিয়া গর্ব অনুভব করে, আর আমরা একটি লােকের নাম ধাম, আলাপ পরিচয়ের কথা পৰ্যন্ত মুখে আনিতে পারিনা। পাড়া ঘােষদাদা বলেন, হায়রে দেশে যখন প্রগতির সূত্রপাত হইল, সহশিক্ষার যুগ আসিল, আমাদের যৌবন তখন একেবারে ফুরাইয়া গিয়াছে দেখি। এমন অসময়েও পৃথিবীতে আসিয়াছিলাম! এই পরম তৃপ্তিকর দুঃখের চিন্তাতেও আরাম আছে! কর্শের অবসরে এই সব রােমান্সের কথা, ছাই-পাশ কথায়ও বেশ সময় কাটিয়া যায়। শেষ পর্যন্ত ননীগােপাল আমাকে একটা ভাটিয়ালী গান গাহিয়া শােনাইয়া ছাড়িল। যাইবার পথে শুনিয়া গেলাম, কেদার রায়ের যিনি অভিনয় করিবেন, তাহার সমকক্ষ অভিনেতা এ অঞ্চলে আর দ্বিতীয়টি নাই। তিনি সৈন্ত bobo গল্প, গল্প নয় ঘােষের ঐতারক ভট্টাচাৰ্য। থিয়েটার করিয়া কত যে সােনা রূপার পদক তিনি পাইয়াছেন, তাহার ইয়ত্তা নাই। দধিরাম জোর করিয়া বলিল, এক তাক ভট্টাচাৰ্যই একা একশ’, তাহার অভিনয়ে আসর একেবারে মাত হইয়া যাইবে। বায়ােস্কোপের কল্যাণে বহুদিন থিয়েটার, যাত্রা দেখি নাই। এক সময়ে এ সব আমােদ প্রমােদে বেশ ঝোঁক ছিল। শিলং পাহাড়ে নারায়ণ ডাক্তারের আবদালা, এবং শৈলেশ বাবুর সাকিনা বিবির অভিনয় দেখিয়া ঘােট বেলায় মনে হইত, এমন চমৎকার অভিনয় বুঝি আর কখনও দেখিব না ! এবং আর কেহ করিতে পারে না। যেবার কলেজে পড়িতে আসিয়া ষ্টার থিয়েটার দেখিলাম, তখন সে সব ধারণা যে কোথায় উড়িয়া গেল, ভাবিয়া কুল পাইলাম না ! এখন শিক্ষিত সম্প্রদায়ের অভিনয় না হইলে মন উঠে না, কিমাশ্চৰ্য্যম্ অতঃপরম্। বেলা যে কয়টা বাজিয়াছিল, ঠিক বুঝিতে পারি নাই। সূৰ্য্য কিন্তু মাথার উপর ছিল। এমন রাস্তা ঘাট, আমজাম কাটালের শাখা প্রশাখায়, বেতস ঝােপে, বাঁশঝাড়ের সন্নিকটবর্তী বিক্ষিপ্ত গাছ গাছড়ায় চতুর্দিক অন্ধকার হইয়া আছে। কচুরিপানা পচার গন্ধে প্রাণ ওষ্ঠাগত, সুরুৎ করিয়া কি একটা সরীসৃপ প্রাণী পায়ের কাছে হিড় হিড় করিয়া ছুটিয়া গেল! মানু করের পােড় ভিটায় একটা শৃগাল এই দিনের বেলায়ই বসিয়াছিল, করের বাড়ীর কালাে কুকুরটা হঠাৎ দেখিতে পাইয়া তাড়া করিয়া গেল ! সারা দেহ যেন ছম ছম করিতে লাগিল। খানিকটা আগাইয়া আসিয়া দেখি পাড়ার হরিধনের পিসী একাকী চলিয়াছেন, পিসীর পিছু ধরিয়া কোন মতে বাড়ী আসিয়া পৌছিলাম। দিনের বেলা কোন রকমে কাটিয়া যায়, রাত্রিবেলা আর যেন কাটিতে চাহে না। সন্ধ্যা হইতেই ঘরে বসিয়া চুপ করিয়া থাকা ছাড়া আর “মােহনপুর ড্রামেটিক ক্লাব” কোন উপায় নাই। সন্ধ্যা রাত্রিতে ছেলেপেলেদের কোলাহলে বাড়ীখানি জাগিয়া থাকে। একটু রাত্রি গভীর হইলেই তাহাদের আর সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না। একদিকে ভুতুম পাখীর বিশ্ম ডাক, লক্ষ্মীপেঁচার ‘কু কৃ’ শব্দ, বিরাট নিস্তব্ধতা এইসব মিলিয়া মিশিয়া যেন এক মহা আতঙ্কের সৃষ্টি করে। জানালা খুলিয়া শশাওয়ার উপায় নাই, চোর ডাকাতের ভয়, অন্ধকার রাত্রি হইলেই তাহারা নিশাচরের মত ঘুরিয়া ফিরিয়া বেড়ায়। “খাটা নামক এক জন্তু ঘরের কোণে আসিয়া এমন বিশ্রী শক করিতে থাকে যে বুকের ভিতর পর্যন্ত শুকাইয়া উঠে। ফুলের গন্ধে চারিদিক আমােদিত, বাতাস ধীরে বহিতে থাকে, কখন যে ঘুমাইয়া পড়িলাম, ঠিক জানিতে পারি নাই! শেষ রাত্রিতে টুপটাপ করিয়া শিশির পড়িতে থাকে, শুকতারা দপদপ্ করিয়া না জ্বলিয়া উঠিতেই কত রকমের পাখী যে গান শুরু করিয়া দেয়, শীতের রাত্রিতে লেপমুড়ি দিয়া বিছানায় মড়ার মত পড়িয়া থাকিয়া কাণ পাতিয়া শুনিতে যে কী আনন্দ লাগে, তাহার বর্ণনা ভাষায় নাই। ভুক্তভােগী ছাড়া কেহ ভালাে বুঝিবেন কিনা সন্দেহ। ধীরে ধীরে পূবের আকাশ যখন ফস হইয়া ওঠে, মানিক মাঝি খেজুর গাছে উঠিয়া রসের হাঁড়ি নামাইতে থাকে। পাড়ার বউ ঝি, বৃদ্ধারা শষ্যা ছাডিয়া উঠিয়া পড়েন। ছােট ছােট ছেলে মেয়েরা কুল গাছের নীচে ছুটাছুটি শুরু করিয়া দেয়। এমনি ভাবে রাত্রি কাটিয়া যায়। সেদিন ভাের না হইতেই কালীর বাড়ী ললাকে-মজুরে সরগরম হইয়া উঠিল! সামিয়ানা খাটাইতে হইবে, তাহার নীচে সতরঞ্চি পাতিয়া বসিবার আসনের বন্দোবস্ত করিতে হইবে। ঘরের এক তৃতীয়াংশ জায়গা চিক দিয়া ঘেরিয়া দেওয়া হইয়াছে ভদ্র মহিলাদের জন্য। সিন, গল্প, গল্প নয় ডুপ, সাজসজ্জা ভিনগাঁ হইতে আসিয়া পৌছিয়াছে। গ্রামেও কম নাই। কেদার রায় অভিনয়ে অনেক জিনিষ পত্রের প্রয়ােজন, এ কথা সেক্রেটারী বাবু দধিরাম আগন্তুকদিগকে বার বার জানাইয়া দিতেছিল। একটি কাগজের জাহাজ পৰ্যন্ত তৈয়ার হইয়াছে। নিশি ধােপ মােসন মাষ্টার, ড্রামেটিক ক্লাবের জন্য তিনশতাধিক খিলিপান দিতে প্রতিশ্রুতি দিয়াছে। তামাকের ভার নিয়াছে লীগের মৈজদ্দি মােল্লা। হাটে তাহার প্রকাণ্ড তামাকের আড়ত আছে! চাদা এক টাকা নগদ এবং যাবতীয় তামাকের সাজ সরঞ্জাম সে শুধু যােগাইবে। এখানে বলা আবশ্যক যে, এই গ্রামে হিন্দু মুসলমানের মন কষাকষি নাই, কোন কালে দাঙ্গাহাঙ্গামা হয় নাই। দুর্গাপূজায় বৃদ্ধেরা দাড়ি নাড়িয়া আরতির সময় হিন্দুদের টিকি নাড়ার সাথে জগাই ঢুলির ঢল ঢাকের অপূর্ব বাদনের সহযােগে নৃত্য করিয়া থাকে, ইহাও সময় সময় দেখা গিয়াছে, এবং ওপুড় হইয়া সানেত্রে চণ্ডীমণ্ডপের কাছে ভক্তি প্রদর্শন করিতে ইতস্ততঃ করে নাই। তাহারা চাহিয়া শুধু পান তামাক খায় না, অন্যান্য প্রসাদ পাইলেও কম খুশী হয়না কিন্তু। যাক, যে কথা বলিতেছিলাম, বিড়ি সিগারেট, চায়ের ব্যয় মােহনপুর ড্রামেটিক ক্লাবই বহন করিবে। তবে চৌধুরী বাড়ীর মেয়েরা ক্লাবের সভ্যদের জন্য পাটালিগুড়ের সন্দেশ ব্যবস্থা করিয়াছেন, এ কথা দধিরাম সকলের কাছে অকাতরে বলিয়া বেড়াইতে লাগিল। দুপুর বেলা দলে দলে লােক আসিয়া দেখিয়া যাইতে লাগিল। বাঁধা ছাদা সব একেবারে কমপ্লিট। কালীর বাড়ীর চেহারাই যেন একেবারে বদলাইয়া গিয়াছে। মেয়েরা অপরাহ্ন হইতেই রান্না বান্না শেষ করিতেছেন। রাত্রিতে না গেলে আবার সুবিধামত বসিবার জায়গা পাওয়া যাইবে না। मका মােহনপুর ড্রামেটিক ক্লাব” ছােট ছােট ছেলে মেয়ের পরিত্রানে দুপুর হইতেই ঘুমাইতে ছিল, কেহ তাহাদের আর ডাকিতেছে না, কারণ আজ রাত্রি জাগিতে হইবে। মেয়েরা কেহ বলিতেছে, কেদার রায় যে বড প্লে, হয়ত রাত্রি ভাের হইয়াই যাইবে। কেহ বলিল, অত হবে নারে, রাত্রি তিনটে অবধি হবে। রাত্রি যাহাই হােক না কেন, থিয়েটার শেষ না করিয়া কেহ বাড়ী ফিরিবে , এ কথা নিশ্চিত। সন্ধ্যা হইতে না হইতেই শিরােমণি মশায় সায়ংসন্ধ্যা শেষ করিয়া আসিলেন। ছেলেমেয়েরা তখন কাপড় চোপড় পরিতেছিল। ঘােষালদের ছােট বউ রাণী সহরের মেয়ে, পূজায় বাড়ী আসিয়াছে। কেমন করিয়া সাজগোজ করিতে হয় সে ভালাে জানে। হাজার হােক দশ পাঁচটা ত সে চোখে দেখিয়াছে। সুন্দরী বলিয়া রাণীর গায়ে একটু নামও ছিল। তাহার সর্বাঙ্গে কয়েকখানা হাল ফ্যাশনের অলঙ্কার, পরনে ঘরবাড়ী ছবি-আঁকা পাড়ের শাড়ী, কপালে সিদূরের ফেঁটা, দেখা ভালো যায় কি যায় না। ঠোটে লাল রঙ, মুখে ‘লাবণি’, সর্বাঙ্গে “কান্তার” সুরভিতে ভরপুর। পায়ে এক জোড়া ফ্যান্সি স্যাণ্ডেল, আসরে আসিয়া বসিতেই গাঁয়ের মেয়েরা একদৃষ্টে চাহিয়া দেখিতে লাগিল! ঘােষালদের রমা সাধারণ একখানি ডুরে শাড়ী পরিয়া আসিয়াছে। হাতে চারগাছি সােণার চুড়ি, গলায় হার, কাণে রূপার দুল। দেহের রঙ যেন ফাটিয়া পড়িতে চায়, মুখশ্রী রাণীর চেয়ে ঢের সুন্দর। গরীবের মেয়ে বলিয়া কেহ তাহার দিকে ফিরিয়াও চাহিতে ছিল না। আরও বউ-ঝি-বৃদ্ধা-প্রৌঢ়া রমণীদের সমাগমে মেয়েদের বসিবার স্থান গমগম করিতে লাগিল। কেহ পানের বাটা, জাতি, সুপুরি, মশলা ইত্যাদি নিয়া আসিয়াছেন, সদ্য প্রসূতারা দুধের বাটি, রূপার ঝিনুক, ছােট স্পিরিট ল্যাম্পের বােঝা বহিতে কুণ্ঠিত হয় নাই। ছকির পিসী, হরি, ১ গল্প, গল্প নয় মাসী, নন্দলালের বিধবা ভগিনী এবং অন্যান্য প্রাচীন বৃদ্ধারা এই প্রচণ্ড শীতে মােটা কম্বল জড়াইয়া আসিয়াছিলেন, এবং কম্বলের নীচে প্রত্যেকের হাতেই এক একটি ভূষের আগুনের পাতিল, দিব্য আরামে তাহারা আগুন তাতিয়া কান পাতিয়া হালের মেয়েদের কথাবার্তা শুনিতেছিলেন। সেখানে আলােচনা হইতেছিল না, এমন বিষয় নাই। পাড়ার কোন গাছে কয়টা নােনা ফল ধরিয়াছে হইতে সুরু করিয়া রবি ঠাকুরের কথা, মহাত্মা গান্ধীকে কলিকাতায় কে কতবার দেখিয়াছে, কেদার রায় থিয়েটারে কে সব চেয়ে বেশী ভালাে পার্ট বলিতে পারিবে ইত্যাদি, ইত্যাদি ! চৌধুরীদের মেয়ে চপলা খদ্দরের শাড়ী পরিয়া আসিয়াছিল, রায় সাহেবের ভগ্নিপতির মাসতুত বােন তাহাকে শসাইতে লাগিলেন এই বলিয়া যে, তাহার স্বামী পেট কমিশনার অফিসে যখন কাজ করে, তবে কেন সে খদ্দর পরিয়া পুলিশের নেকনজরে পডিতে চায়। চপলা বিরক্তির সুরে জবাব দিল, খদ্দর না পরিলে আজ কালের দিনে ভর লােক হওয়া যায় না, সাহেবরা পর্যন্ত আজকালের দিনে খদ্দর পরিয়া থাকেন। পদ্মপিসী চশমার ফাকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, আজকাল কি সাহেব মেমরা কাপড় পরে নাকি কোলকাতায়। তবে যে আমাদের গ্রামে যারা আসে, তাদের পরণে সাহেবের পােষাক কেন! কেহ কেহ মুখ টিপিয়া হাসিলেন। রাণী তাড়াতাডি কহিল, না পিসিমা, তারা কাপড় পরবে কেন? তবে মেমরা সখ করে শাড়ী পরেন মাঝে মাঝে শুনি। পদ্মপিসী সকল কথা শুনিয়া নিজের ভুল বুঝিতে পারিয়া কহিলেন, তা হবে, তােদের মুখেই এ সব কথা শুনি। আমরা কি আর ওসব দেখেছি বা কারও কাছে শুনেছি।
“মােহনপুর ড্রামেটিক ক্লাব” এমন সময় বাহিরে সােরগােল উঠিল, ভাইস প্রেসিডেন্ট সাহেব আসিয়াছেন। কেহ বা ঝুকিয়া দেখিল, কেহ তেমন লক্ষ্য করিল না। দেখিতে দেখিতে প্রকাণ্ড আসর ললাকে লােকারণ্য হইয়া গিয়াছে। শিয়ােমণি মহাশয় নামাবলীর উপরে সুপ্রাচীন বালাপােষ জড়াইয়া ঘন ঘন তামাক টানিতেছেন, ভগবান-দাদা দু’কুড়ি খুডাে, কালী জ্যেঠা, ঘােষাল বাবুরা, ছেলে মেয়ে, ইতর ভদ্র গাঁয়ের যে যেখানে ছিল ছুটিয়া আসিয়াছে। শুধু মােহনপুর গ্রামের নয়, আশে পাশে, সুদূর ভিনগাঁ হইতে যে খবর শুনিয়াছে দল বাঁধিয়া মশাল আলিয়া সন্ধ্যা রাত্রিতে ছুটিয়া আসিয়াছে। মৈজদ্দী মােল্লা, কালু সেখ শুধু একা আসে নাই, দলবল লইয়া কোথায়, কিনারায় যেখানে একটু স্থান দেখা গিয়াছে, সেখানেই পাথরের মত নিশ্চল হইয়া বসিয়া পড়িয়াছিল, একবার উঠিলে আর সেখানে আসিয়া বসা অসম্ভব। দুর্গামােহন কাকার মন খারাপ, কোনদিন আমােদ প্রমােদে যােগ দেন না। গতকল্য দধিরাম জ্বলজ্যান্ত দু’টি নগদ টাকা চাঁদা লইয়া আসিয়াছে, টাকার শােকে তিনিও থিয়েটার দেখিতে আসিয়াছিলেন, জনসমুদ্র দেখিয়া তাহার দুই চক্ষু স্থির হইয়া গেল। শিরােমণি ‘মশায় ভক্তচূড়ামণিকে অদূরে দাড়াইয়া থাকিতে দেখিয়া লাফাইয়া উঠিলেন, এবং বিকট চীৎকার করিয়া কহিলেন, ওরে বাবা দধি, কাকা যে ওখানে দাড়িয়ে আছেন। ও বাবা ভলান্টিয়ার বাবুরা•••ও ইয়ার-কি ( A. . P.) বাবুরা শিরােমণি মশায়ের কথা শেষ না হইতেই দেখা গেল, একদল স্বেচ্ছা- সেবক দুৰ্গামােহন কাকাকে চ্যাঙদোলা করিয়া আসরের মাঝখানে নিয়া যাইতেছে। এমনি আর কত গণ্ডগােল শুরু হইল। বৃহৎ ব্যাপারে দোষ ত্রুটি চিরদিনই একআধটু থাকিয়া যায়।
১৪ গল্প, গল্প নয় রাত্রি তখন প্রহরাতীত। কোন মতে একটু স্থান লাভ করিয়া আসরে বসিয়া হিহি করিয়া শীতে কাঁপিতেছিলাম। চারিদিক এক রকম খােল বলিলেই হয়, মাঝে মাঝে বাতাস বহিতেছে, অত্যুজল “হেজা” ল্যাম্পের তীব্র আলােকে চাহিয়া দেখিলাম, মাঝখানে পদ্মফুল আঁকা বিশাল সামিয়ানা শিশিরে ভিজিয়া একশা হইয়া গেছে। আর যে কতক্ষণ এইভাবে বসিয়া থাকিতে হইবে, ভগবানই জানেন। ভিতরে সাজ পােষাকের মহলা চলিয়াছে। বয়স্ক ছেলেরা দাড়ি গোঁফ কামাইয়া স্ত্রীলােক সাজিবার জন্য মুখে চুণ কালি মাখিতেছিল, দুষ্ট ছেলেরা তাহা উকি মারিয়া দেখিবার ব্যর্থ প্রয়াস করিতেছে। দধিরামের চোখে বার কয়েক পড়িয়া অসহ্য ধমক, শাসানি খাইয়াও তাহাদের চৈতন্য লাভ হয় নাই। এমন সময় একজন স্বেচ্ছাসেবক এক ডাল পানের খিলি লইয়া উপস্থিত হইতেই একদল ছেলে যেন ডালার উপর উপুড় হইয়া পড়িল । চেঁচা-চেঁচি, মারামারি, হুড়াহুড়ি করিয়া ছেলেটিকে আর বাটিয়া দিবার অবসর দিল না। বেগতিক দেখিয়া যে যাহা পাইল, কাড়িয়া লইল, ছেলেটি রণে ভঙ্গ দিয়া ‘চাচা, আপন পরাণ বাঁচার’ মূল নীতি অনুসরণ করিয়া পলায়ন করিল। রাত্রি নয়টা বাজিতেই ঠঙ, করিয়া প্রথম ঘণ্টা বাজিয়া উঠিতেই ঐক্যতান বাদন সুরু হইল। বাজনা নেহাত মন্দ নয়, ছেলেপেলেদের কোলাহল, ঘন ঘন করতালিতে কিছুই ভালাে শােনা যাইতেছিল না। কেহ কেহ বা জোরে শীস দিতে শুরু করিয়া দিল। এই অবস্থায় প্রায় ঘণ্টাখানেক কাটিয়া গেল। অজস্র কোলাহলের এবং চেচা-চেঁচির ভিতর প্রাচীনেরা অনেকেই দধিরামের খোঁজখবর করিতে লাগিলেন। ড্রপ উঠিতে আর কত বাকী। তাঁহারাও অতিষ্ঠ হইয়া উঠিয়া দধিরামকে “মােহনপুর ড্রামেটিক ক্লাব” } গালাগালি শুরু করিয়াছিলেন। কোথায় দধিরাম আর তার সাঙ্গো পাঙ্গরাই বা কি করিতেছে এতক্ষণ বসিয়া। এই শীতের রাত্রিতে... কে-একজন আসিয়া খবর দিল, দধিরাম মুখে চুণকালি মাখিয়া বাজার পােষাক পরিতেছে, অমনি সভায় হাসির লহর খেলিয়া গেল। ইতিমধ্যে ঐক্যতান বাদনও হঠাৎ থামিয়া গিয়াছে, অথচ দ্বিতীয় ঘণ্টাও পড়িতেছে না, ড্রপ শুধু বাতাসে নড়িতেছে মাত্র। একটি ছেলে সুমুখে বসিয়াছিল, সে চেঁচাইয়া কহিল, ড্রপ উঠিতেছে। সকলেরই কৌতূহল দৃষ্টি সেদিকে পতিত হইল, এমন সময় মৈজদ্দি মােল্লা দাড়ি গোঁফ সমেত মুখখানি ডুপসিনের এক কোণ হইতে বাহির করিয়া কহিল, আজ্ঞে, কর্তারা ত ভিতরে কেহই নাই। সুমুখের ছেলেমেয়েরা কেদার রায় আসিয়াছে বলিয়া ঘন ঘন করতালি দিতে লাগিল। মৈজদ্দি মােল্লা লুঙ্গী পরিয়া বাহিরে আসিল, এবং আবার সে সেই কথা পুনরায় কহিতেই ছেলেমেয়েরা হুড়মুড় করিয়া উঠিয়া পড়িল। বৃদ্ধ এবং যুবকেরা অসহ বিস্ময়ে স্তম্ভিত হইয়া ডাকাডাকি, হাঁকাহাঁকি সুরু করিয়া দিল। জন কয়েক সদ্যঃ আন্দামান ফেরত তরুণেরা লােকজনকে ধরিয়া বসাইল। লােকজন উন্মত্ত হইয়া ড্রপ ইত্যাদি ছিড়িয়া ফেলিবে ভাবিয়াছিল। একজন তরুণ তাড়াতাড়ি ডুপসিন টানিয়া উঠাইয়া ফেলিল। চারিদিকে তন্নতন্ন করিয়া খুঁজিয়াও কাহাকে পাওয়া গেল না। ব্যাপার কি দেখিবার জন্য বৃদ্ধেরাও আগাইয়া আসিলেন। কোথায় দধিরাম শৰ্মা আর তাহার দলবল। ষ্টেজের পিছন দিকে প্রকাণ্ড এক আম বাগিচা ছিল, সেই পথে, হয়ত কেন নিশ্চয়ই সকলে অন্তহিত হইয়াছে। কেন সকলে এরূপভাবে চলিয়া গেল, এ বিষয়ে নানা জল্পনা কল্পনা শুরু হইল। এমন সময় পচা ঘােষাল ছুটিতে ছুটিতে আসিয়া হাজির। তাহার হাতে একটা ডিজের গল্প, গল্প নয় লণ্ঠন। সে হাঁপাইতে হাঁপাইতে কহিল, থিয়েটার হবে কি শিয়ােমণি- মশায়। তারক ভটচাষ্যি এইমাত্র খবর পাঠিয়েছে যে, আজই কলিকাতা থেকে তার শ্যালিকার বিয়ের খবর পেয়ে তাকে চলে যেতে হচ্ছে, একটি দিনও সবুর সইবে না। কেদার রায়ের অভিনয় করবার মত আর দ্বিতীয় ব্যক্তি এ দলে নেই, তাই.•• পলায়তি স জীবতি... কাহিনী শুনিয়া সকলেই রুষ্টকণ্ঠে বকর বকর করিতে করিতে চলিয়া গেল। পদ্মপিসী এতক্ষণ আত্মবিহ্বলের ন্যায় দাড়াইয়াছিলেন, একটু আগাইয়া আসিয়া কহিলেন, তা’ ঘােষাল, কেদার রায়ের পার্ট বাদ দিলে কি থিয়েটার হতনা। খামকা এই শীতের রাত্রে এনে কষ্ট দেওয়ার কি কাজ ছিল বল দেখি। আর গাঁয়ে এত লােক থাকতে তারক ভটচাষ্যি না হলে তােদর থিয়েটার হয় না বাপু, কি কেলেঙ্কারী কাণ্ড। অমন থিয়েটারের মুখে আগুন•••আর সেই মুখপােড়া ভটচায্যি-ই বা কেমন লােক, একদিন পরে গেলে কি শালীর বিয়ে একেবারে ফুরিয়ে যেত নাকি! ইহার উত্তর কে দিবে । দৈনন্দিন ঘটনা মানুষের আয়ত্তের বাইরে কখন যে কোন অজানিত পথে চালিত হয়, ইতিহাস এখানে আজও মৌন হইয়া আছে।
দুর্ঘটনা খট-খট-খটাঙ, •••এইমাত্র একটু শব্দ কানে এসেছিল, জেগে দেখি, জামা কাপড় সব কাদায় একাকার, কি করে যে গাড়ী থেকে ছিটকে এসে এখানে পড়েছি, আমি নিজেই তা টের পাইনি। চারিদিকে কালকাসা, জলকচু আরাে কি সব বিশ্রী জংলী গাছ, লতাপাতার দল পরস্পর মিলে মিশে একটা ঝােপের সৃষ্টি করেছে, ভাগ্যিস তারই লতায় পাতায় জড়িয়েছিলুম, নইলে একেবারে পগারে পড়ে বেঘরে পৈত্রিক প্রাণটা এখানেই খতম হয়ে যেত। চারিদিকে আর্তনাদ, কোলাহল, এবং হৈ-হৈ-রৈরৈ শব্দে আমার চমক ভাঙল। উঠে কোনমতে দাড়িয়ে দেখি, ভয়ানক দুর্ঘটনা হয়ে গেছে, কোথায় রেলগাড়ীতে শুয়েছিলাম সুখে,•••আর একি ভীষণ কাণ্ড, ব্যাপারখানি বুঝতে আমার দু’মিনিট লেগেছিল। রাত্রি যে তখন ক’টা বাজে আন্দাজে কিছুই বুঝতে পারিনি, আকাশের এক কোণে একটি তারা দপদপ করে জ্বলছিল, এবং পূবদিকটা একটু ফর্স। হয়ে উঠেছে যেন মনে হল ! শিশির-ভেজা গাছ-গাছড়ার ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে চেয়ে দেখি, চারিদিকে ধু ধু মাঠ, দূরে, কাছে কালাে কালো গ্রামের ভিতর ঘরবাড়ীর মত কি দেখা যাচ্ছিল ! খানিকটা দূরে কোলাহলের শব্দ যেন আরাে বেড়ে যেতে লাগলাে, সুমুখে এগিয়ে গিয়ে দেখি, ভীষণ ব্যাপার হয়ে গেছে। কারও হাত গেছে, কারও পা নেই, কারও প্রাণ নেই, গাড়ীর নীচে যে কতজন চাপা পড়ে পিষ্ট হয়ে গেছেন, কিছুই ভালাে বুঝতে পারলুম না। সবাই ৭ Sb গল্প, গল্প নয় ছিল ঘুমিয়ে, মাঝখানে এই দুর্ঘটনা, শেষরাত্রিতে যেন সেখানে একটা দস্তুরমত কোলাহলের বাজার বসে গেল। আশে পাশের গাঁ থেকে দলে দলে লােকজন ছুটে আসতে লাগলাে, কেউ বা পায়ে হেঁটে, কেউ বা নৌকায় রেল লাইনের অনতিদূরে এসে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে ছুটতে লাগলো। ভাের প্রায় হয়ে এসেছে তখন, ছুটোছুটি করে যে দৃশ্য চোখে দেখতে লাগলুম, তাতে যে কি করে মাথা স্থির রেখে চলাফেরা করেছিলুম, ভগবান ছাড়া কেউ জানেন না আমার সেই মানসিক অবস্থার কথা ! গার্ডসাহেবের সন্ধান কোথাও পাওয়া গেল না ! ইঞ্জিন চালকের একখানি পা গেছে, তাকে রেল লাইনের নীচে থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ! কত লােকের সর্বনাশ হয়েছে, কত পরিবার নিঃস্ব হয়েছে, কত দেশের গণ্যমান্য লােক অকালে ইহলীলা শেষ করে গেলেন, সে সব কথা বলবার সময় নেই এখন। তাড়াতাড়ি করে আমরা জন পচিশেক সুস্থ লােক গ্রামবাসীদের সাহায্যে এদিক ওদিক ছুটোছুটি করে ভগ্নস্তপের ভিতর থেকে অর্ধনগ্ন, অৰ্দ্ধ গলিত, অর্ধ পিষ্ট, আহত, ভীত, আর্ত নরনারী, শিশু, বৃদ্ধ, যুবকদের নিয়ে টানা হেঁচড়া সুরু করে দিলুম। না পাওয়া যায় কোন কিছু, এইসব রক্তাক্ত দেহে প্রাণ- ভীত জনকয়েক শিশুকে বাইরে এনে ঘাসের ওপর ছড়িয়ে রাখলুম, তার একটু দূরে একটা ভীষণ গােঙানি শব্দ শুনে ছুটে গেলুম, গিয়ে দেখি ধ্বংসস্তুপের মাঝখানে একটি মৃতদেহের উপর আছাড়ি-বিছাড়ি খেয়ে জনৈকা ভদ্রমহিলা আর্তনাদ করছেন। কতরকমে তাকে সান্ত্বনা দিয়ে দেখলুম, কিছুতেই কিছু হ’ল না। উচ্চকণ্ঠে আকরুণ সুরে কি জানি বলছিল, সব কথা ভালাে বােঝা গেল কি গেল না, শেষে অনেক দুর্ঘটনা ৯ ৯ চেনবার কষ্টে জানতে পারলুম, বউটির স্বামী গাড়ীচাপা পড়ে হাড়মাংস এক- সঙ্গে তাল পাকিয়ে পড়ে আছে, মেরুদণ্ড থেলে গেছে, চেহারা দেখে জে। নেই, ভদ্রলােকের অবস্থা দেখে আমার অন্তরাত্মা বারংবার শিউরে উঠতে লাগল । পাশে পাঁচ বছরের একটি এবং বছর তিন হবে বুঝি একটি মেয়ে অবাক দৃষ্টিতে মায়ের কাছটি ঘেঁষে দাড়িয়ে মায়ের দেখাদেখি একবার হাউহাউ করে কঁদছে, এবং এক একবার চোখের জল মুছে সবার দিকে তাকিয়ে দেখছিল ! বিনােদ বাবু বলে এক ভদ্রলােক খুকীকে কোলে তুলে নিতেই খুকীর সে কি কান্না, “বাবা বাবা” বলে সে আর্তনাদ করে কাঁদতে লাগল। এক বুড়াে ভদ্রমহিলা বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি ত নিশ্চয়ই, ছেলেটিকে ভুলিয়ে ভালিয়ে এদিকে নিয়ে আসতেই আমি তাকে কোলে তুলে নিয়ে ভদ্রমহিলাটিকে ফিস ফিস করে বল্লুম, আপনি খােকার মাকে দেখুন, আমি একে দেখছি । ছেলেটি বেশ হৃষ্টপুষ্ট, গােলগাল চেহারা, আমার কাছে চুপি চুপি জিজ্ঞাসা করলে, বাবার কাছে যাবাে ! অবােধ শিশু সে তাে আর জানে না যে, তার বাবা আর বেঁচে নেই, তবু একথা সেকথা বলে তাকে বন্ধুম, পরে যাবে। খােক সত্যি তা ধরে নিয়েছে, সে এক ছুটে আমার কোল থেকে লাফিয়ে পড়ে তার মার কাছে দৌড়ে গিয়ে বললে, মা, বাব। আসবে, সত্যি দেখাে, নিশ্চয়ই আসবে, তুমি কেঁদো না। সেই বর্ষীয়সী ভদ্রমহিলা আমাকে চোখের ইসারায় খােকাকে তার মায়ের কাছ থেকে নিয়ে যেতে বলেন, সেই তরুণীটির ঘন ঘন মূৰ্চ্চার ভাব তখনও দেখা যাচ্ছিল। বেলা তখন দশটা বাজে, রিলিফ গাড়ী একখানি এসে গেছে, ১০০ গল্প, গল্প নয় লােকজন, ডাক্তার, স্বেচ্ছাসেবক, নাস, কোন কিছুরই অভাব নেই এখন। লােকের ভিড়ে গল্প করছে, গ্রাম্যবধূরা, ছেলেমেয়ের দল, কৃষক মজুর, যে যেখানে ছিল যত রাজ্যের লােক এসে জুটেছে সেখানে। শুধু লােক আসছে আর যাচ্ছে, কেউ কারও খোঁজ খবর নেয়া কর্তব্যের মাঝে আনেনি। বরং আমাদের বিপদেব সুযােগে ব্যবসায়ীরা জিনিসপত্রের দাম এত চড়িয়ে দিলেন যে, ফলে দুধের সেব আট আনা এবং ফলমূল এবং খাবারের দাম অগ্নিমূল্য হয়ে গেল । কয়েকজন সৎসাহসী যুবকের মৃতদেহ সৎকারের কিছু ব্যবস্থা বিলি করলেন, অনেকের আত্মীয় স্বজন এসে পড়েছিলেন, ক্রমে ক্রমে লােকের ভিড় কমে আসতে লাগল। এবং সন্ধ্যা হয়ে না আসতেই আর লােকজনের টিকি দেখতে পাবাে কিনা সন্দেহ। মনে বড় ভয় হ’ল, এই বিদেশে, বিয়ে কোথায় যাবে এখন এদের নিয়ে, এবং আগন্তুকদের শত সহস্র কুৎসিত দৃষ্টির মাঝখানে এই তরুণীটিকে এবং শিশু পুত্রকন্যা দুটিকে কার জিম্মায় রেখে যাব, তাই ভাবছিলুম বসে । এক ভরসা ছিল, রেল লাইনের শ'খানেক কুলি, পাঁচ ছয়জন বাবু এবং আনুষঙ্গিক আরো কয়েকজন কর্মচারীর মুখ দেখতে পাবাে, তাদের সারারাত্রি কাজ করবার কথা। তবে হুহু করে যে হাওয়া বইছে, এই শীতের রাত্রিতে পেরে উঠবে কিনা সন্দেহ। বেলা পড়বার সঙ্গে সঙ্গেই তরুণীটি উঠে বসল। আমি তাকে কত রকমে বুঝিয়ে বন্ধু, আমার কথায় যেন কাজ হয়েছে বােঝা গেল। ছেলেটি রেল লাইনের ধারে দাঁড়িয়েছিল, খুকী তার কাছে যােরাফিরা করছে। রেলওয়ের একজন বাবুর কাছে শােনলাম, আগে এবং পেছনে দু’জায়গাই রেল-লাইন খারাপ হয়ে গেছে। চব্বিশ ঘণ্টার ভিতরই দুর্ঘটনা গাড়ী চলাচল শুরু হবে। তরুণীটির কাছে অনেক খোঁজ খবর নিলুম। নিয়ে জানতে পারলুম, এর স্বামী আয়কর বিভাগে অফিসার ছিলেন, রঙপুরে থাকতেন, কি-একটা কাজে কলকাতাষ যাচ্ছিলেন, আজ সাত বছর হল এদের বিয়ে হয়েছে এবং কি সুখে দিন কাটছিল সে সব কথা বলতে বলতে তার চোখ দুটি থেকে ক্রমাগত অশ্রু ঝরে পড়ছিল। সংসারে আপন বলতে তেমন কেউ নেই, থােকার জ্যেঠামশায়রা নাকি বাংলা দেশের বাইরে কোথায় থাকেন, তাদের সাথে তেমন বনিবনা নেই কথায় কথায় আমাকে বলে ! আরাে অনেক কথা শােনলুম, শেষে ঠিক হ’ল ওদের আমি আপাততঃ রঙপুরে নিয়ে যাবো। তারপর কি হবে ভগবানই জানেন! এক মাসের ছুটিতে যাচ্ছিলুম পাহাড় ছেড়ে বাংলাদেশের একটা সহরে, সেখানে যাওয়া আর হবে কিনা কে জানে,মনে মনে ভাবলুম, থােকাদের রংপুরে নিয়ে যাবে, সেখানে দিন দুই থেকে সটান একেবারে লম্ব। পাড়ি দেব আসামের দিকে। ভদ্রলােকের মৃতদেহ সৎকারের ব্যবস্থা করবার জন্য এদিক ওদিক হাঁটাহাঁটি করছিলাম। যাদের আত্মীয় স্বজন কেউ সঙ্গে ছিল না, তাদেব মৃতদেহ, শােনলুম, মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে। সে সব কথা কাণে তুলে লােকজন সংগ্রহের জন্য একজন রেলওয়ে বাবুকে ধরলুম, তিনি আমাকে একজন ভদ্রলােকের কাছে নিয়ে গেলেন। ভদ্রলােক আসছি বলে যে কোথায় অন্তর্ধান হলেন, দু’মাইলের ভিতর তার অস্তিত্ব সম্বন্ধে আমি একটু সন্দিহান হয়ে উঠলাম। খােকার মা আমাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, এখানে লােকজন পাওয়া যাবেনা ? এত রেলওয়ের কর্মচারীরা আছেন। আমি কোনমতে বল্লুম, দেখি পাওয়া যায় কিনা, তারা সবাই কাজে ব্যস্ত আছেন, লাইন রাতারাতি মেরামত করতে হবে কিনা!
১০২ গল্প, গল্প নয় একজন গ্রামের লােক পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন, বললেন, কোথায় মশায় বাসি মরা নিয়ে হাঙ্গামা করবেন, গাড়ীতে বােঝাই করে দিন। আমি তাকে চোখ ইসারায় বন্দুম, এখানে মৃত ভদ্রলােকের স্ত্রী, পুত্রকন্যা রয়েছেন এবং ভদ্রলােক নিজে একজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছিলেন, তার মৃত দেহ সেই গ্রাম্য লােকটি সে কথা শুনে কথার সুর বদলে নিয়ে বলে, কি বলেন মশায়, লােকজন পাওয়া যাবে না, আমি দশজন লােক ডেকে নিয়ে আছি, আপনি ঘাবড়াবেন না মশায়, কিছু প্রাপ্তির আশা থাকলে ওইসব ছােট লােকদের দিয়ে না করানাে যায় এমন কাজ নেই। কথায় আছে, টাকা হলে বাঘের চোখ মিলে। লােকটির কথা শুনে আমি থ’ খেয়ে গেলাম! একে রক্ত গরম, তার উপর কলেজে পড়ি, এ সব বাজে কথা কোনদিন বরদাস্ত করতে পারিনি, কিন্তু অসহায় অবস্থা ভেবে চুপ করে গেলুম ! থােকার মা সব কথা শুনূতে পেয়েছিল, আমাকে ডেকে বলে, লােকটিকে বলুন না লােজন নিয়ে আসতে, যা খরচ লাগে দেব, মরা আর কত বাসি হবে বলুন! ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে গেছে প্রায়, আমি তার মিনতি ভরা চোখ দুটির পানে চেয়ে দেখলুম, সেখানে অশ্রু টলটল করছে। কি সুন্দর দুটি চোখ, অমন সুন্দর চোখ জীবনে আর কখনাে দেখিনি। দোলনচাঁপা রঙের পাতলা ছিপছিপে দেহখানিকে কি করে শুভ্র বসনে আবৃত করে রাখবে, এত সুখ, সাধ, জীবনের আশা ভরসা, বাসনা কামনা, সবই তার এক নিমেষে ফুরিয়ে গেছে, এই কথা ভেবে মনে বড় দুঃখ হতে লাগল। বহুদিন আগে যখন আমার মেজবৌদি মারা যান, তখন তার কথা মনে পড়ে মাঝে মাঝে আমি ক্লাশের বেঞ্চে চুপ করে বসে হাতের আড়ালে দুর্ঘটনা কত চোখের জল গােপনে মুছে ফেলেছি! ঠিক যেন তারই মত গােলগাল গড়ন, ভাসা ভাসা দুটি চোখ, হাসিমাখা মুখখানি,•••সেই ঝুমু বৌদির কথা আজও আমার মনে পড়ে ! আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে সেই লােকটি আবার বললে, কি মা, আপনিই না হয় বলুন, ক’জন লােক নিয়ে আসব, থােকা বাবু ত ভড়কে গেছেন শােকে দুঃখে, আর তা যাবারও কথা ! আমাদের মত বয়স হলে তখন এসব কিছু থাকবে না ! ওই যে টোকানি সা’র গদীর লােক আসছে এই দিকে, দেখি দেবা ঘােষাল কি বলে, বলেই কোন উত্তরের অপেক্ষা না করে সেই লােকটি আগন্তুকের কাছাকাছি গিয়ে বলে, ঘােষাল, আজ কার মুখ দেখে উঠেছিলে বলােতা, সরু ককে না বােতল ! এবং পরক্ষণেই গলা চড়িয়ে বলে, চলাে দেখি, বাজারের গান্ধীকে পাই কিনা! দেবা ঘােষাল এক গাল হাসি হেসে বললে, কে, অনাথ ? অনাথকে আমিই নিয়ে আসছি, কিন্তু পাঁচকড়ি দা’, মনাই চক্কোতি আর কেবলপুতির কাছে তুমি নিজেই যাও। আমার নাম করে বলল, আমরা সবাই ক্যাবলাভিটার ধারে যাচ্ছি ! দেবা ঘােষাল খানিকটা দূর এগিয়ে গিয়ে রাসভকণ্ঠে গান ধরলে, ওরে ভাই ক্যাবলাভিটার মাঠে আমি দেইখ্যাছিলাম তাকে, তাকে তাকে ছিলাম রে ভাই বাবলা বনের ফাকে••••• রেল লাইনের এক পাশ থেকে পাঁচকড়ি দা’ বলে উঠলাে, আরে ঘােষাল, ভয় কিসের ? আসবাে নাকি ? ঘােষাল এমনি ভাবে গান ধরেছিল যে পাঁচকড়ি দা’র করি তার ১০৪ গল্প, গল্প নয় কানে গিয়ে পৌছেছিল কিনা সন্দেহ! দিগন্তজোড়া মাঠের মধ্যে জ্যোৎস্নার আলোেক যতদূর দেখা যাচ্ছিল, ঘােষাল গান গেয়েই চলেছিল। রেল লাইনের ধারে কৃষ্ণচূড়ার চিকরিকাটা পাতাব ফাকে ফাকে জ্যোৎস্না উকিঝুকি দিয়ে যাচ্ছিল, সেই গাছের নীচে থােকাখুকী তখন ঘুমিয়ে পড়েছে। থােকার মা বলে, কত টাকা লাগবে? আমি বন্ধুম, সে যা হয় হবে 'খন, আপনি ব্যস্ত হবেন না। থােকার মা বলে উঠল, আপনাকে পেয়ে যে কী বল ভরসা পেয়েছি, তা বলতে পারছিনে। স্বামী কারও চিরদিন থাকেনা, সে ত ভালাে জানি! এখন বলুন, কোথায় গিয়ে যে থাকব তাই ভাবছি। দেশের বাড়ীতে আজ পর্যন্ত যাইনি, কি রকম সেখানের আত্মীয় স্বজন, লােকজন জানিনে, আর বঙপুরে গিয়ে কি করে থাকব একা এই দুটি শিশু প্রাণী নিয়ে... আপনার বাপের বাড়ী ? —তাদের কথা বলে লাভ কি! বাবা নেই, মা আছেন না থাকার মত। ভাইদের এখন সংসার, বৌদিরা হলেন কর্তা। নানা গৱে ভাের হয়ে গেল। মৃতদেহ সৎকার হয়ে গেছে, দেব ঘােষালের হাতে দশটি টাকা গুজে দিয়েছিলুম, সেই নিয়ে শােনলুম, পাঁচকডিদা’র সাথে তার একটা হাতাহাতি হয়ে গেছে! এমন চশমখাের লােক আমার জীবনে এই প্রথম দেখা। বেলা আটটায় গাড়ীর শব্দ শােনা গেল। খােকা খুকীর মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল রঙপুরে বাবার নামে। খােকার মা ঘােটার ফাকে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলাে। যতক্ষণ না গাড়ীখানি চলতে শুরু করেছিল, থােকার মা জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে কি দেখছিল এবং ক্রমাগত উদগত অ বনাঞ্চলে মুছে ফেলতে লাগলাে।
দুর্ঘটনা তিন চার দিন রঙপুরে ছিলুম। সেখানে ওদের চেনা জানা এত ছিল, দু’একজন ভদ্রলােক এসে মুখের ভদ্রতা করে চলে গেলেন। একজনের অভাবে কেউ আর তেমন করে চিতেও চাইলে না, এইত জগতের চিরন্তন নিয়ম। ওদের ছেড়ে যে কি করে যাবে, তাই ভাবছিলুম বসে। খােকাকে নিয়ে দু’একদিন সহরে বেড়াতে বেরিয়েছি, সবার কাছে থােকা বলে, আমার কাকাবাবু’, খুকী বলে “কাকু”, আমি ওদের মাকে বৌদি বলে ডাকতুম, এমনি একটা মাখামাখি, হৃদ্যতা হয়ে গেছে সবার সাথে। মেজ বৌদির কথা আমি ভুলিনি, আমার যেন মনে হত এই আমার সেই মেজ বৌদি ! তাকে বিয়েছিলুম শুধু ফিরে পাবার জন্য ! আমার অন্তরের কথা এই বৌদি কি করে জানতে পারলেন, ঠিক জানি না, কিন্তু এদের অসহায় অবস্থা ভেবে আমি ব্যাকুল হযে উঠতুম! বাপ-দাদা বেঁচে ছিলেন তখন, গাছের,—গাছের ছায়ায় ছিলুম, কোন ধার ধারিনি কারও, সংসারের ভাবনা কোন দিন কাছেও আসেনি। তাই চুপটি করে বসে ভাবতুম—বৌদির কথা, কি হবে তাদের, আমি চলে গেলে কে তাদের দেখবে; এই সব নানা কথা আমার তরুণ মনে নিয়তই উকিঝুকি দিত! আর বৌদিও যেন কেন জানি , আমার উপর সব বিষয়ে নির্ভর করে যেতে লাগলেন। সব কথায়, সব কাজে আমার পরামর্শ নিতেন, আমার বয়সই বা কি এমন যে তাকে আমি কিছু ভালাে করে গুছিয়ে বলতে পারি। আর বৌদির বয়সই বা কত, বড় জোর পঁচিশ, আমার চেয়ে দু’এক বছরের বড হবেন বােধ করি। খােকার বাবা ওদের জন্য কিছু টাকাকডি রেখে গেছেন একথা বৌদি একদিন আমায় কথায় কথায় বললেন, এবং এখন ওঁরা বাবলাহাটিতে ওদের দেশের বাড়ীতে গিয়ে থাকবে, শেষে অন্য ব্যবস্থা হবে। বৌদি যে ভালােমানুষ, টাকাপয়সা নিয়ে দেশের বাড়ীতে গিয়ে ১০৬ গল্প, গল্প নয় থাকবেন, আমার জানি কেমন মনে হল। একে চোর ডাকাতের ভয়, গ্রামে আবার তেমন লােজনও নেই,•••কল্পনায় অনেক কিছু আমার চোখের সামনে ভেসে উঠত। দিনকয়েক আর রংপুরে ছিলুম মাত্র। তারপর বড় দুঃখে এবং বেদনায় বৌদিকে নিয়ে বাবলাহাটিতে রওনা হলুম ! ঝিকরদহ ষ্টেশনে নেমে আমাদের নৌকায় যেতে হবে বাবলাহাটি। ঘণ্টাখানেকের মাত্র পথ, উজান খাল ছাড়িয়ে নৌকোখানি মাঠের ভিতর গিয়ে পড়লাে। দুই দিকে সবুজ ধানের বুক চিরে নীল জলের রেখা তর তর করে বয়ে যাচ্ছে, নৌকোর তলায় জোয়ারের জল বেধে এক একবার কলকল শব্দ করে উঠছে, আর খানিকটা বাদেই পচা কচুরিপানা, বিশাল দামের ওপর দিয়ে যাবার সময় মাঝি নৌকাখানিকে পা দিয়ে হেলিয়ে দুলিয়ে লগি ঠেলে যাচ্ছিল। খােকার সে কি আনন্দ! ছইএর ভিতর চুপটি করে বসে দেখছে এবং মাঝে মাঝে হাত বাড়িয়ে ধানের ডগাগুলি টেনে আনছিল । আমার কত কথাই মনে হতে লাগলাে ! দু’দিন আগে এরা কত বড়লােক ছিল। ঠাকুর, ঝি, চাকর, চাপরাশী, মােটরকার সবই ছিল এদের, আর আজ একজনের অভাবে এরা সাধারণের পর্যায়ে এসে নেমে : গেছে! কত সবুজ মাঠ পেরিয়ে, কত বাঁশ ঝাড়ের পাশ কেটে একটা খালের ধারে এসে নৌকাখানি ডাঙ্গায় ভিড়তেই আমি এক লাফে তীরে উঠে খোঁজখবর নিলুম, মহেশ গাঙ্গুলীদের বাড়ী কোন দিকে? একটি আমাকে বাড়ীর হদি বলে দিলে। একটা পুরাণাে বাড়ীর সামনে এসে যখন দাড়িয়েছি এক দঙ্গল ছেলেপেলে হৈ হৈ করে ছুটে এল, অনকয়েক বৃদ্ধ, বাড়ীর মেয়েরা, এবং পড়ার কৈলাস ঘােষাল ইকো হাতে বঙ্গভূমিতে অবতীর্ণ হলেন! বেদির কথামত শীতল গাঙ্গুলীর দুর্ঘটনা ১০৭ পুত্রবধূ পরিচয় দেওয়া সত্বেও কেউ তেমন একটা সাড়াশব্দ দিলে না। কে একজন প্রৌঢ়া এগিয়ে এসে বললেন, কে, বীরুর এমন সর্বনাশ হল কবে গাে বলেই চেঁচিয়ে উঠলেন, সাথে সাথে আরাে জনকয়েক। আমরা হতভম্ব হয়ে ঠায় দাড়িয়েছিলুম, কেউ একবার বললে না যে, ঘরে এসাে। বেগতিক দেখে আমি বৌদিকে নিয়ে সুমুখের একটা ঘরের দাবায় গিয়ে উপস্থিত হলুম। শােক, দুঃখ, হাহাকার এসবের অভিনয় হতে ঘণ্টাখানেক কেটে গেল, এর পরই সবাই এসে খোঁজখবর নিতে সুরু করলেন, টাকা পয়সা কেমন রেখে গেছে বৌমা, তােমাদের ত আর অকূলে ভাসিয়ে যায়নি, বীরু ছিল আয়করের হাকিম, দু’পয়সা নিশ্চয়ই রেখে যাবার কথা ! এ কথার কে কী জবাব দেবে,•••একজন বৃদ্ধা বললেন, তােমাকে ত চিনতে পারলুম না বাবা? তুমি কি বৌমায়... বৌদি জবাব দিলেন, আমার ছােট ভাই! কৈলাস ঘােষাল বললেন, ছােট ভাই ! বসসা, বসে বাবা, বেশ করেছ, শত হলেও স্ত্রীলােকের স্বামীর ভিটা•••যথাস্থানে নিয়ে এসেছ, বেশ করেছ ! কোনমতে জবাব দিলুম, সে ত সত্যি কথা ! বৌদি আমাকে চুপি চুপি বললেন, তুমি আমাকে আজ থেকে ‘ছােড়দি’ বলে ডেকো । প্রতিবাদ করবার মত আমার কিছু ছিল না, বৌদি, ছােড়দি সবই সমান আমার কাছে। পরদিন ভােরবেলা ঘুম থেকে উঠে বসে আছি, ঈশান মুখুয্যে এসে চুপি চুপি আমাদের কাছে বলতে লাগলেন, এই ঘর বাড়ী তােমারই বৌমা, দয়াল আত্মসাৎ করে বসেছিল। আমরা পাঁচজনে জানিনে, শীতল ১০৮ গল্প, গল্প নয় আসাম থেকে শালকাঠ এনে এ ঘর তুলেছিল। তােম ত দেশে আসসা নি এতকাল। দুপুরবেলা শুনছি, মালতীর মা বলে একজন ভদ্র মহিলা এসে খানিকটা চোখের জল ফেলে বললেন, তােমরা আমাদের পর নও, আমি তােমার ঘরসংসার দেখবো, তুমি এসব কোনদিন করেছ। সেই দিন থেকে মালতীর মা এবং মালতী এ বাড়ীতে চিরস্থায়ীরূপে বহাল হয়ে গেলেন। থােকা ও খুকী ত এ সব দেখে শুনে অবাক, তারা গ্রামের লােকজন কখনও দেখেনি, ইয়া বড় বড় গোঁফদাড়ি, ইয়া লম্বা চেহারা, দু’একজন কাপালিকের মত ভগ্নবস্তু পরে যখন আনাগােনা করে, তারা ছুটে যায় মায়ের কাছে! সেদিন কৈলাস ঘােষাল এসে হত্যা দিয়ে ছােড়দি’র’ কাছ থেকে দশটি টাকা গাপ করে নিলেন, কেউ কাপড়-চোপড়, কেউ টাকা-পয়সা, কেউ চাল, ডাল, মুন, তেল, যে যা পায়, তাই নিয়ে যাচ্ছে। ছােডদি কাউকে না করতে পাচ্ছেন না, এমনি মধুর স্বভাব তার। চার পাঁচ দিন হয়ে গেল এসেছি। এরি ভিতর সব গুছিয়ে নেওয়া হয়েছে। আমি যাবার কথা তুললেই ছােড়দি বড় দুঃখ করেন, বলেন, উনি ত তােমার হাতেই আমাদের দিয়ে গেছেন ! সত্যি কি তা । চুপ করে থাকি, কোন জবাব দেবার মত ভাষা খুজে পাইনে। অজিত ওরফে থােকা এবং বাপী ওরফে খুকী ওরা দুজনে আমার গায়ে গায়ে লেগে আছেই, যেন জগতে ওরা শুধু আমাকে চিনেছে। দয়াল গাঙ্গুলী রাশভারী লােক, একদিন কথায় কথায় বললেন আমাকে তুমি আর কাজকর্ম নষ্ট করে কতদিন এখানে বসে থাকবে। তুমি নিশ্চিন্ত মনে চলে যাও বাবাজী, আমরা দশজন যখন রয়েছি, দুর্ঘটনা তখন চিন্তার কিছু নেই। শুধু বৌমাকে একটু বলে যেয়াে, হাতটা যেন শক্ত করেন। হাঘরের দল ত চিরদিনই হাঁ করে আছে ; আমরা হলুম জ্ঞাতি, এগারাে দিনের বুঝলে কিনা, আপদে বিপদে খবর পেলে ছুটে আসব আমরাই,•••তখন তােমার কৈলাস খুড়াে, রায় গিন্নি আর বৈকুণ্ঠ ভচার্যির টিকিটিও দেখতে পাবেনা ••আরও কি তিনি বলতে যাচ্ছিলেন, কৈলাস ঘােষালকে সুমুখে হঠাৎ দেখতে পেয়ে কথার সুর বদলে বললেন, এই যে কৈলাস খুড়াে এসেছেন, খুড়াের ওপর সব ভার দিয়ে যাও। কৈলাস খুডো সন্দিগ্ধ নেত্রে ক্ষণকাল দৃকপাত করে চেঁচিয়ে বললেন, আর বাহাদুরী করতে হবেনা দয়াল, আমি সব শুনতে পেয়েছি, এবং পরক্ষণেই দয়ালের পানে বিষম জকুটি করে ফের বলেন, জায়গা জমি সব ভােগ দখল ছেড়ে দিতে হবে এবার কিন্তু। দয়াল চুপ করে থেকে কি-একটা কথা বলতে যাচ্ছিল, কৈলাস খুড়াে বাধা দিয়ে বলেন, চুপ করে থাকলে চলবে না, কত লােকের বাস্তুভিটায় তুমি ঘুঘু চড়িয়েছ, এবার তােমার পালা,"কি বলল দয়াল? দয়াল হুম করে গম্ভীর স্বরে বলে, বেশ করেছি, তােমার তাতে কি শালা? যেমন বলা, কৈলাস খুড়াে এক হাতে এক পাটি খড়ম এবং অন্য হাতে বেতের লাঠি গাছি শূন্যে তুলে বিষম আস্ফালন করে ছুটে গেলেন। একটা রক্তারক্তি কাণ্ডের উপক্রম প্রায়, কোনমতে থামিয়ে দিয়ে বৌদির কাছে গিয়ে বললুম, দেখলেন ত কাণ্ডটা, গ্রামে কি করে থাকবেন বৌদি একা ! তার চেয়ে সহরে থাকা ঢের ভালো নয় কি! বৌদি হেসে বললেন, এসব ভাই দু’দিন থাকলেই গা-সওয়া হয়ে যাবে। সহরে গিয়ে কার আশ্রয়ে থাকবাে বলল, তবু গ্রামে দু’চারজন লােক আছে। এদের মুখ চেয়েই এখন জীবন কাটাতে হবে । বড় দুঃখ হ’ল শুনে। দিন কয়েক পরে যেদিন ফিরে এলুম, নদীর ১১০ গল্প, গল্প নয় তীরে ওরা সবাই এসেছিল, নৌকাখানি তীর থেকে ছেড়ে আসতেই খােকা ও বাপীর সে কি মর্মন্তুদ কান্না,••আড়ষ্ট চোখে চেয়ে রইলুম বৌদি ঘােমটার ফাকে ক্রমাগত অশ্রুজল বনাঞ্চলে মুছে ফেলে ফিরে ফিরে তাকিয়ে দেখছিলেন। নদীর বাঁকে এসে ফিরে দেখি, সবাই তখন ঠায় দাড়িয়ে আছে, ধীরে ধীরে নদীর তীর, গ্রামখানি, উচু গাছ পালা, বনানী, মঠের চূড়া, সব অদৃশ্য হয়ে যেতে লাগলাে। ••••••••• আজ দশ বছর প্রায় হয়ে গেছে। সংসারের কত পরিবর্তন হয়েছে, বাবা ইহধাম ত্যাগ করেছেন, সাথে সাথে ছােট ভাইটি, দিদি, পিসিমা,•••••••• বাংলা দেশে আর ফিরে যাইনি। মাঝে মাঝে পাহাড়িয়া পথে নিঃসঙ্গ জীবনের বােঝা বুকে নিয়ে যখন পথ চলতে থাকি, মনে পড়ে ছায়া ঘেরা, পাখীর গানে জাগা সবুজ মাঠের ধারে একখানি নগণ্য পল্লীর কথা, মনে পড়ে থােকা, বাপীর কথা,••না জানি তারা আজ কত দূরে, কোথায়, কিভাবে আছে••• আর আমার সােনার বৌদি,•••অপূৰ্ব স্নিগ্ধ, পবিত্রতায় গড়া সেই মহিমাময়ী দেবী মূর্তিকে প্রতিনিয়ত সকাল সন্ধ্যায় চোখের সুমুখে দেখতে পাই! কি একটা অসহ ব্যথায় আমার মন প্রাণ ভরে আসে, সেই গভীর নিশীথের দুর্ঘটনার কথা মনে পড়ে•••••••! আকাশ যখন গাঢ় নীল হয়ে ওঠে, সবুজ ধানের দোলনা শুরু হয়, গাছে গাছে মুহুর্মুহু ঘুঘুর ডাক শােনা যায়, কি-এক অজানার ব্যথায় মন কেঁদে ওঠে জানি কেন, মনে হয় একবার বাংলার বুকে ফিরে যাই। বাংলা দেশের পথ ঘাট, মাঠ, হাট আমায় কে হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকে। তখন পাহাড়ের কোণে চুপ করে বসে থাকি, আর ভাবি, দেশের মায়া পাহাড়িয়া দেশে যেমন বিনা নােটিশে বৃষ্টি নামে, ঠিক তেমনি ভাবে শীতের ছুটিতে অর্ণব দেশে যাওয়া স্থির করিয়া ফেলিল। পরদিন দুপুর বেলা মােটরে চাপিয়া সিলেটের পথে যাত্রা করিতে হইবে, একথা সে ইলাকে বার বার স্মরণ করাইয়া দিল। ইলা বিস্ময়ে একটুখানি চাহিয়া থাকিয়া কহিল, কালই যাবে ? অর্ণব তাড়াতাড়ি কোটের পকেট হইতে রিটার্ণ টিকেটগুলি বাহির করিয়া কহিল, এই যে দ্যাখাে ! প্রিয়তমা পত্নী ইলা একটুখানি অভিমানের সুরে কহিল, বেশতাে, বলা নেই, কওয়া নেই, টিকিট কেনা হয়ে গেছে। তাহলে তােমরা যাও, আসগে,•••আমি যাবাে না। অর্ণব হাসিয়া শিস্ দিতে দিতে কহিল, তুমি যাবেনা বুঝি, কেন? শিলঙের শীতে বরফে জমে তুমি চুপ করে বসে থাকো এখামে। আমরা পলাশপুর থেকে ঘুরে আসি। —বেশ তাে যাওনা, আমি কমলানের দেশে:•••••••• —আর আমাদের পলাশপুরে, ছ’গায়ে ইয়া বড় বড় সয়েশ, দু’পয়সা সের দুধ, বানাে আনা ঘিয়ের সের, কত রকমারি খাবার। ইলা আবদার করিয়া কহিল, বারে, আমার অন্য বুঝি কিছু নিয়ে আসবে না? নীপাও যাবে ? যাবে না তাে কি বসে থাকবে ! তুমিও চলােনা, বেশ মজা হবে কিন্তু ! যাবে ?
১১২ গল্প, গল্প নয় শিলং থেকে চলে যাওয়ার নামে ইলার মুখখানি সহসা মলিন হইয়া উঠে। এই সহরে তার প্রাণের পুতুলি চিরনিদ্রায় নিদ্রিত আছে,ওই দূর সরল বনানীর উপান্তে পার্বত্য স্রোতস্বিনীব কাছে, তাহাকে একা ফেলিয়া যাইতে ইলার মন সরে না। আজ প্রায় বছর খানেক অতীত হইয়া গেছে, তবু সে ভুলিতে পারে নাই। শিলঙ পাহাডের মায়া চিরদিন তাহার মনে এক অপূর্ব ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করিয়া আছে, দূর পাহাড়ের দিকে চাহিয়া সে কথাই ইলার বার বার মনে পড়ে। মনে পড়ে সুদূব দিল্লী সহরে যখন তাহার সােণার শৈশব একটানা সুখে কাটিতেছিল, পৃথিবীতে নােগ, শােক, দুঃখ বলিয়া যে আরাে কিছু আছে, তাহা সে ভাল জানিত । কৈশােরের স্বপ্নের ঘাের কাটিতে না কাটিতেই তাহার বিবাহ হইয়া গেল। প্রথম দু’একবছর সে ভালাে করিয়া অর্ণবের চোখােচাখি চাহিয়া কথা বলিতে পারে নাই। কোথায় দিল্লী, আর কোথায় শিলং পাহাড়, অদ্ভুত যােগাযােগ কিন্তু। বিবাহের পর ইলার এক অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটিয়া গেল। দিল্লী থাকিতে চোখে মুখে কথা বলিতে, বাইক চডিতে, নৌকায় পাড় টানিতে, কলেজের ছেলেদের সাথে হল্লা করিতে তাহার জুডি দ্বিতীয়টি ছিল না। গান গাওয়া তার অভ্যাস আছে, কিন্তু প্রাচ্যনৃত্যে সে একসময় একেবারে তন্ময় হইয়া গিয়াছিল। কিন্তু আজ সে অবাঙমুখে ঘরের বারান্দায় পায়চারি করিয়া বেড়ায়, অকারণে উদগত অঞ চাপিয়া রাখিয়া বসিয়া থাকিতে বেশী পছন্দ করে! আজ না হয় তাহার কন্যা বিয়ােগ হইয়াছে, কিন্তু চিরদিন ত এমন ছিল না। তবে কেন এমন হয় ! হায়রে পুত্র কন্যার মায়া ! অদ্যাবধি পলাশপুরে সে একবারও যায় নাই! গ্রামের নাম শুনিলে সে শুধু মনে করে, ম্যালেরিয়া, পচা ডােবা, ভাঙা ঘর, চোর ডাকাতের চুপ হইয়া দেশের মায়া ১১৩ ভয়, দুর্দশার একশেষ, সেখানে কেহ থাকেনা, শ্মশানপুরীর মত দেশ, কথাটি যে একেবারে মিথ্যা, সে কথা বলা চলে না। অনেক সাধাসাধি, অনুনয়-বিনয়ের পর শেষে ঠিক হইল ইলা দশবারাে দিনের জন্য পলাশপুরে যাইবে। নীপা আহলাদে অধীর হইয়া উঠিয়াছে, তাহার শিশুমনে আনন্দের জোয়ার জাগিয়াছে দেশে যাওয়ার নামে! ইলা আজ অবধি পাড়াগাঁয়ে পা দিয়ে দেখে নাই যে, সে দেশটা কি মাটির না সােনার ! তবু তাহার শিলঙ পাহাড় খুব ভালাে লাগে, এমন কি পাহাড়ের মায়া ছাড়িয়া সহজে সে দিল্লীতে বাপমানের কাছে যাইতে চাহে নাই। জানালার ধারে বসিয়া ইলা প্রতিদিন মােটর গাড়ীর যাতায়াত দেখিতে থাকে, তাহারা কোথায় যায়, কেন আসে, এসব দেখিতে তার খুব ভালাে লাগে। কত লােকজনের যাওয়া আসা দুদিনের অন্য, কোন কিছু যেন স্থায়ী নয়, পিছনে পড়িয়া থাকে শুধু অতীতের অন্ধকার, ভবিষ্যতের সােনালী আশা। শিলঙের পথে আঁকাবাঁকা মােড়গুলি ঘুরিয়া মােটর গাড়ী সশব্দে ছুটিয়াছে। আশেপাশে, দূরে, কাছে ধূসর গিৰিশ্রেণী আকাশের গায়ে মিশিয়া গড়াইয়া। সুমুখের দিকে চাহিয়া নীপা হাতে তালি দিয়া নজরুল ইসলামের দুর্গম গিরি, কান্তার মরু...’গানটির দু একটি চরণ ঘুরিয়া ফিরিয়া গাহিতেছিল। ইলা শুধু পিছনের দিকে ফিরিয়া ফিরিয়া চাহিয়া দেখিতেছিল। অর্ণব দেওয়ালে ঠেস দিয়া ঝিমাইতেছিল, বােধ করি তাহার একটু তন্দ্রার ভাব আসিয়াছে। ইলা ঠেলা দিয়া বিব্রত ভাবে কহিল, বারে বাঃ, বলে কয়ে নিয়ে আসা হ’লআর নিজে বুঝি চুপ চাপ, আমার বুঝি আর ঘুম পায়না? ৮ ১১৪ গল্প, গল্প নয় মৃদু হাসিয়া তাহার কথা এক রকম উড়াইয়া দিবার মত ভাবে কহিল, আমি বসে বসে নীপার গান শুনছিলাম। গান শুনছে না ছাই, বলিয়া ইলা অর্ণবের গায়ে মৃদু একটি ঝাঁকুনি দিয়া কহিল, দেখাে, দেখাে কী চমৎকার, তুলা পেঁজার মত ধোঁয়াটে মেঘ আমাদের আশেপাশে ছুটে যাচ্ছে। নীপা তাড়াতাড়ি উঠিয়া পড়িয়া কহিল, কই মা, আমায় ধরে দাও না ? অতুলনীয় ভ্রুযুগল উন্নত করিয়া ইলা কহিল, ওমা, কি বললা তুমি মেঘেরা কত দূরে থাকে, সে কি ধরা যায় বােকা! নীপা তাড়াতাড়ি হাত পা নাড়িয়া কহিল, কেন যাবে না, এই তাে কাছে। কি যে ক ০ ০ ০ ০ ০ ০ অর্ণব মৃদু হাসিয়া ইলার দিকে চাহিয়া কহিল, ওইত মজা, কাছে এলেও কাছে পাওয়া যায় না। যেমন মেঘেরা, তেমনি তােমরা! দার্জিলিঙে কতদিন দেখেছি, মেঘগুলিকে আশেপাশে দেখতে পেয়ে ছুটে গিয়েছি ধরবার জন্য, কিছুই পাইনি, শুধু চোখের জলে ফিরে এসেছি, পেয়েছিও কয়েক ফোটা অশ্রু। ওই মেঘের বুকে রহস্য আছে, ওরা শুধু উদাসীর মত দেশে দেশে ঘুরে বেড়ায় কত অজানার ব্যথা নিয়ে, কিন্তু ধরা দেয়না, শুধু মন ভুলিয়ে যায়, দেয়না, দেয়না সে ধরা আমার দ্বারে•• | নীপা ফস করিয়া কহিল, বাবা, পঙ্কজ মল্লিকের গান না এইটি ? ইলা হাসিয়া কহিল, দেখেছ, মেয়ের কি রকম মনে রাখবার ক্ষমতা, যা তা বলনা ওর সামনে। অর্ণব ভিজা বিড়ালের মত চুপিচুপি আবার প্রশ্ন করিল, কি যা-তা’ বলেছি। আমি বলেছি কি জাননা? মেয়েরা সহজে ধরা দিতে চায় মা, ধু মন ভােলাতে জানে!
দেশের মায়া
১১৫
ইলা অভিমানের সুরে কহিল, এ খোটা কেন বােজ বােজ আমায়
শােনাও, আমার কি দোষ বলল! দিদিকে তুমি পছন্দ করে, দিদিও
তোমাকে কত ভালােবাসত,••
যাগে ওসব বাজে কথা। আর শীলা,
লিলি, সতী, সুপ্রভার কথা নিয়ে বােজ বােজ আমাকে জব্দ করা
কেন! এরা ত আর সব মেয়েদের মত নয়।
অর্ণব ফিসফিস্ করিয়া কহিল, কাজের বেলায় সব মেয়েই সমান!
ইলা হাসিয়া দূরের পানে চাহিয়া অন্য কথা পাড়িল, এই বুঝি তােমার
লাইলঙ্কটের গড়, ওরে বাব্বা, এই অতল খাদে যদি একবার আমাদের
গাড়ী গড়িয়ে পড়ে যায়
অর্ণব গম্ভীর ভাবে জবাব দিল, পড়ে যাওয়া অমনি মুখের কথা নাকি!
নীপা ফস করিয়া কহিল, কি পড়ে যাবে মা?
ইলা নীপার ছােট দুইখানি হাত লইয়া নাড়াচাড়া করিতে করিতে
কহিল, ওই যে সব মেঘগুলি !
-কোথায় যায় মা ওরা ?
—আকাশে !
কি-একটা ষ্টেশনে তখন গাড়ী থামিয়াছে। রাত্রি গভীর, টপটপ,
করিয়া শিশির ঝরিতেছে, জানালার কাচে আবছায়ার মত বাহিরের
দৃশ্য দেখা যায়। কুয়াসার ফাকে অর্ণব চাহিয়া দেখিল, বড় বড়
অক্ষরে লেখা, “আখাউড়া জংসন।” মিনিট
পনেরাে চুপ করিয়া
থাকিয়া লােহালক্কড়ের দানব যন্ত্র আবার হুহু শব্দে ছুটিতে সুরু করিল।
কত গ্রাম, কত দেশ, কত নদী, কত প্রান্তর চোখের নিমেষে ছুটিয়া
যাইতে লাগিল কে জানে। গভীর নিশীথে দশমীর জ্যোৎস্নায় চারিদিক
১১৬ গল্প, গল্প নয় যখন ফুটন্ত যুঁইফুলের হাসি নিয়ে মশগুল, আলাের শাদা আলিপনা আঁকা বকুল তলায় ফুলের গন্ধে পাপিয়ার তানে বিভাের, অর্ণব এক- দৃষ্টে চাহিয়া আছে ইলার মুখখানির দিকে। ইলার সেই রক্তিম-জেহের বর্ণের সাথে সুন্দর খাপ-খাওয়া লাল টকটকে ঝলমল ব্লাউজের অপূর্ব শােভা যে কি সুন্দর দেখাইতেছিল, তাহা ভাবিয়া অর্ণবের চোখে ঘুম আসি-আসি করিয়া আসিতেছিল না। কি সুন্দর তার ভাসা ভাসা দুটি চোখ, টানা ভুরু, অর্ণব যত চাহিয়া দেখিতেছে, ততই যেন সে বিস্ময়ে অভিভূত হইয়া যাইতেছে। পুলকগৰ্বে সহসা তাহার সর্বাঙ্গে এক অপূর্ব শিহরণ খেলিয়া গেল। দেশে পৌছিতে প্রায় বেলা বারােটা বাজিল। পাল্কীর বেহারাদের অদ্ভুত সারি গানে গ্রামখানি মুখরিত হইয়া উঠিয়াছিল, দলে দলে লােক- জন ছুটিয়া আসিয়াছে চাটুয্যদের বৃহৎ প্রাঙ্গণে। দণ্ডী চাটুয্যে আজ জীবিত নাই, তাহার সাধের সােনার সংসারে বাতি দিবার মত যে দু’ একজন বাঁচিয়া আছে, তাহারা যে মাঝে মাঝে দেশে আসিয়া ঘুরিয়া ফিরিয়া যায়, বাপ পিতামহের সুনাম বজায় থাকে, এই কথা কমসে কম পাড়া প্রতিবেশীরা হাজার বারও তাহাদের কর্ণগােচর করিতে কর করে নাই। পাব্দী হইতে ইলা নামিয়া আসিতেই প্রতিবেশিনীরা হুলুধ্বনি করিয়া উঠিল, বর্ষীয়সী মহিলারা তাহাকে সাদরে, সাহলাদে ঘরে বরণ করিয়া লইয়া গেল। ইলা আড়নয়নে চারিদিকে বার কয়েক চাহিয়া অবাক হইয়া গেল। এমন অদ্ভুত ধরণের কথাবার্তা, আত্মীয়তা, আন্তরিক তাহার জীবনে সে কোনদিন দেখে নাই। কেহ আসিয়া বৌদিদির গায়ের গহনা খুটিনাটি করিয়া দেখিয়া লইতেছে, কেহ শাড়ির রঙের বাহবা দিতে দিতে একগাল হাসিয়া পানদোতা চিবাইতে লাগিল। ইলার দেশের মায়া ১১৭ বিস্ময় তখনও যায়নি। কয়েকটি ছােট মেয়ে তাহার আশে পাশে ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল, কেহ মাসীমা, কেহ বৌদি, কেহ মামীমা, কেহ বড়দিদি, কেহ সেজদি, নাম-ডাকের যেন অন্ত নাই—আবদানের সুরে আসিয়া গায়ে ঘেসিয়া দাঁড়াইল, যেন কতকালের জানা শােনা। দুপুর গেল, বিকেল বেলা দলে দলে মেয়েরা আসিলেন, বুড়ােরাও বাদ গেলেন না । গ্রামে রব উঠিয়াছে, অর্ণবের স্ত্রী সাক্ষাৎ পরী, এমন বউ পলাশপুর, দু’গায় এবং দেবভােগে কোনদিন আসে নাই ! কৈলেস খুড়ো সায় দিয়া কহিলেন, বউমা যেন দুগগগা পিয়তিমা! ঈশান ঘােষাল গ্রামের পুরােহিত। এক গঙ্গা কাদা পায়ে মাখিয়া ছুটিয়া আসিয়া কহিলেন, কই, বউ মা কই। দেখি একবার। তা’ বাবা অনু, দেশে থাকবে তত দিন কয়েক, তােমরা না এলে আমরা যাই কোথা বল দেখি ! তা’ সব ভালাে ত ? অর্ণব পদধূলি লইয়া কহিল, দিন দশ বারাে থাক্বাে ভেবেছি। সব ভালাে। -বেশ, বেশ, তা’ দু একটা ফুলকপি আনননি বাবাজী। অর্ণব স্মিতমুখে কহিল, বেশী আনতে পারিনি। যে দূর দেশে থাকি, ঢাকা-কোলকাতা হলে তবু একটা কথা ছিল। ঈশান ঘােষাল হঠাৎ সে কথার সুর ধরিয়া কহিলেন, তা জানিনে বাবা, শিলং পাহাড় কি এখানে? সেই বর্মার পথে না কোথায় বিশুমুখখাটি তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিল, হিমালয়ের কাছে প্রায়, যে শীত, শুনেছি লােকজন লেপ গায়ে দিয়ে সেখানে যােরাফেরা করে। ঈশান ঘােষাল শীতে হি-হি করিয়া কাপিতে কাপিতে কহিলেন, এবার দেশেও কি কম শীত বাবাজী। এই দেখাে, অটুর কল্যাণে কেমন একখানি বালাপােষ পেয়েছি। বরফের অফিসে কাজ করে, আর ১১৮। গল্প, গল্প নয় ব্রাহ্মণী এই বুড়াে বয়সে, বুঝলে কিনা বাবাজী, গঙ্গাস্নানের লােভে নাটুর সাথে কোলকাতা সহরে পরিবার গিয়েছেন। যাক, দিন কয়েক সুখে। থেকে আক! কৈলেস খুড়াে গলা কাসিয়া কহিলেন, ঈশেন, তুমি গেলে না কেন বাবা ? ঈশান ঘােষাল গর্বিত হাসিমুখে চারিদিকে চাহিয়া কহিলেন, ব্যস্ত কি খুড়াে! চৈত্র মাসের পর দুটো মাস আম-কাঠাল খেয়ে একেবারে কাশীবাসী হব ভেবেছি, কি বলেন খুড়াে? খুড়াে মাথা নাড়িতে নাড়িতে কহিলেন, যাদৃশী ভাবনা যস্যসিদ্ধির্ভবতি তাদৃশী ! এতে আর বলাবলি কি উপস্থিত সকলেই মৃদু মৃদু হাসিতে লাগিল। সকাল বিকাল বহির্বাটীতে লােজনের জটলা। ঘন ঘন তামাক খাওয়া, নানা বিষয়ে গল্পগুজব চলিতেছে। অন্দরমহলে বউমাকে লইয়া গ্রামের মেয়েরা চুল বাঁধা, সেলাই, বােনা, গল্প, গানের আসর জমাইয়া বসিয়াছে। কাদম্বিনী পিসী চারিদিকে চাহিয়া মেয়েদের রকমসকম দেখিয়া শাসনের সুরে কহিলেন, তােদের সেলাই-ফেঁাডার চোটে বাড়ীতে তিষ্ঠান দায় দেখছি। বউমা যে ঘেমে রাঙা হয়ে উঠেছে, ও মাধু, একবার বৌমাকে নিয়ে মধুসূদন ঠাকুরের বাড়ী থেকে ঘুরে এসাে না মা। বাবা, কি সব আরম্ভ হয়েছে••• ইলা পুলকিত হইয়া কহিল, চলাে না মাধু ঠাকুরঝি, তােমাদের গ্রামখানি কিন্তু দেখতে বেশ। নদীর ধারে পথ হাঁটতে কি চমৎকার লাগে, চলনা শৈল ভাই। কি বলো রেবাদি ? হেনা যাবে তাে? হেনা ঘাড় নাড়িয়া কহিল, চলাে না, বেশ তাে! :
দেশের মায়া খালি পায়ে হাঁটার অভ্যাস ইলার কোনদিন ছিল না। গ্রামে জুতাে- মােজার চালচলন এখনও তেমন প্রতিপত্তি লাভ করে নাই। তবে বৌ-ঝিরা রাত্রিবেলা বাড়ীতে কালেভদ্রে ব্যবহার করিয়া থাকে। বাড়ী হইতে রওনা হইয়া তাহারা ঘােষালদের পুকুরপাড়, ধরিয়া নয়াবাড়ীর বকুলতলার পথে পথ চলিতে লাগিল। চাটুযোদের বাধা ঘাটুলার আশে পাশে পাতা বাহারের সারি, অতসীফুল, কাটা নাগেশ্বরের ফুলের সৌরভ, গাঁদা ফুলের বনে ভর্তি, কি সুন্দর দেখায় চারিদিক! ইহার পরই রজনী করের বাগবাগিচা। দুপুরবেলা পর্যন্ত সেই বাগানে সূর্যের কিরণ ভালরকমে প্রবেশ করিতে পারে না। কয়েকটি ফলন্ত কুলগাছে বসিয়া পাড়ার ছেলেমেয়েরা দল বাঁধিয়া মহানন্দে কুল খাইতেছে। মাধবী ছেলেদের খেজুর রসের লােভ দেখাইয়া কয়েকটি পাকা, ডাসা কুল সংগ্রহ করিয়া নতুন বৌয়ের হাতে আনিয়া দিল। পাশেই একটি বড় চাতে গাছ, গাছে অসংখ্য চাতে ঝুলিতেছিল। খেজুর রসের হাড়ি কঁাধে ফেলিয়া আহম্মদ চৌকিদার গাছে উঠিতে উঠিতে কহিল, মা ঠাকৃরুণরা কই চলছেন, বেড়াতে নাকি ? তেনারা কবে আসলেন? বুডাকতার নাতির পরিবার না ? কত খাইছি, পরছি তেনাগো বাড়ীতে••• এ সব কথাবার্তা শুনিয়া, গাছে গাছে ফলফুল দেখিয়া ইলা ত খুব খুসী! শৈল ডাকিয়া কহিল, আহম্মদ, বৌঠানকে তােদর যাদব বাড়ীর ভিটার গােটা কয়েক মিঠে চাতে এনে দিস বাবা, আচার করে দেব। চাতের আচারের নামে উপস্থিত অনেকেরই রসনা সরস হইয়া উঠিল। আহম্মদ খেজুর গাছের আগডালে ঝুলিয়া গাছ কাটিতে কাটিতে কহিল, কালই দিয়ে আসব, এই কথা কইবেন না আর। আজ ভাবছিলাম, গল্প, গল্প নয় এক হাড়ি রস, তা আর হইল কই, এই বাদুড় আর পাতিশেয়ালের জালায় অস্থির আমরা! মাধবী হাসিয়া কহিল, তা দিস্ আহম্মদ। তােদের ঘরের চালের ওপর থেকে গােটা কয়েক কচি লাউয়ের ডগা, আর কয়েকটি ফুলে বেগুন দিয়ে আসিস কিন্তু, ভুলিস না যেন! আহম্মদ বাবরী চুলের গােছা নাড়া দিতে দিতে কহিল, ক্যমনে ভুলুম। গেদার মার কাছে আজ দুপুরবেলাই বলে রাখছি। ঘােষাল বাড়ীর ছেলে নন্দলাল এক পকেট ভতি কামরাঙা আনিয়া কহিল, বৌদি, নূতন দেশে এসেছ, এই নাও কামরাঙা, অর্ণবদা’কে বলে কিন্তু আমাদের থিয়েটারের জন্য এক টাকা চাঁদা দিয়ে যেতে হবে, না হলে চলবে না••• মুখের কথা কাড়িয়া হেনা কহিল, ভারী থিয়েটার, তার আবার চাদা, যা, যা, ফড়, ফড়, করিস নে••! পাড়ার অপর একটি ছেলে মুখ ভ্যাঙ চাইয়া কহিল, ভারী ত থিয়েটার। তুমি রমেশ গাঙ্গুবীর মেয়ে, তােমাকে চিনিনে, একটি পয়সা দেবার নাম নেই আবার মাতব্বরের মত কথাবাত।। হেনা বিষম রাগিয়া কি জানি বলিতে যাইতেছিল, মাধবী মাঝখানে পড়িয়া কহিল, ছি নন্দ, ছি টুনু, ও সব কথা গুরুজনদের বলতে নেই, টাকা একটি চাই তােমাদের, হবে 'খন! ইলা সায় দিয়া কহিল, আমিও আর এক টাকা দেব, কি থিয়েটার হবে তােমাদের ? হনা ফল করিয়া কহিল, অত আস্কারা দিয়ােনা বৌদি, একেবারে পেয়ে বসবে তােমাকে। জানােত কুকুরকে ‘নাই দিলে এক লাফে মাথায় উঠতে চায়।
দেশের মায়া
১২১
কটমট চোখে চাহিয়া পরেশ কহিল, ওর গায়ের রঙ কালাে কিনা
তাই বিয়ে হয় না, যত লােক দেখেছে, সবাই মুখ ফিরিয়ে গেছে, আমরা
একদিন ক্ষেপিয়েছিলুম, তাই যত রাগ আমাদের থিয়েটারের ওপর।
কালাে মেয়েকে আবার বিয়ে করবে কে, বলিয়াই ছেলের দল অদূরে
গিয়া সমস্বরে চেঁচাইয়া উঠিল,
বুড়ী তুই বিয়ের যােগাড় কর
তাের জামাই এলাে দিগম্বর
বলা বাহুল্য হেনার ডাক নাম বুড়ী এবং তাহার গায়ের রঙ একটু
ময়লা।
যে, দিন কাল; তার ওপর আবার গ্রামে গ্রামে গণ-জাগরণের
আন্দোলন। মাধবী ছেলেদের ধমক দিয়া কহিল, কিছুতেই টাকা দেবাে
, এই হয়েছে তােমাদের শিক্ষা, না ?
টাকা প্রাপ্তির আশায় বিপদ দেখিয়া ছেলেরা জন দুই এক লাফে
কাছে আসিয়া মাধবী, ইলা প্রভৃতির পায়ের কাছে উপুড় হইয়া বসিয়া
পড়িয়া কহিল, পায়ে পড়ি, আর যদি কোন দিন•••
মাধবী মুখ ফিরাইয়া ধীরে ধীরে কহিল, হেনার পা ধরে ক্ষমা
চেয়ে নে••
ছেলেরা এ ও তার মুখের দিকে চাহিয়া কহিল, ক্ষমা করাে এইবার
হেনা দি’, কালাে বুড়ী হেনা দি’••
হঠাৎ শুনিয়া ফেলিয়া মাধবী বিরক্ত হইয়া কহিল, ফের
আবার•••
হেনা এইবার জিদ ধরিয়া কহিল, আমি কিছুতেই মা করবনা!
ছেলের দল বিষম চুপ হইয়া গেল। ইলা তাড়াতাড়ি হেনার হাত দুখানি
ধরিয়া কহিল, ওরা যে অবুঝ হেনা, তুমিও ওদের সাথে পাগল হবে। পরে
১২২ গল্প, গল্প নয় ছেলেদের দিকে চাহিয়া কহিল, যাও তােমরা, খারাপ কথা বলে কখনও। জন কয়েক মাটিতে গড়াইয়া কহিল, আর কখনও বলবাে না। মেয়েরা তখন শরৎ করের বাঁশের সাঁকোর কাছে আসিয়া পৌছিয়াছে। নিবারণ পুতি আর যামিনী ভঙ, করের বাড়ীর পুকুরে জাল ছুড়িয়া মাছ ধরিবার চেষ্টা করিতেছিল! যামিনী ভঙের জালে একটা বড় বােহিত মাছ পড়িয়াছে, এরূপ মুখের ভাব দেখিয়া মেয়েরাও কৌতুহলের সহিত চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। নিবারণ পুতি এক গলা জলে নামিয়া ডুব মারিয়া দেখিল, সত্যিই রােহিত মাছ জালের নীচে আছে কিনা, এমন সময় বৃহৎ রক্তাভ একটি বােহিত মাছ জাল ছিড়িয়া প্রাণভয়ে একলাফে ডাঙায় আসিয়া পড়িতেই তামাক সেবনরত পরাণ সাধু হুড়মুড় করিয়া ছুটিয়া গেল ! মংস্য প্রবর আর এক লাফে জলে ছিটকাইয়া পড়িতেই যামিনী ভঙ তাহার পিছু অনুসরণ করিয়া জলে ঝাঁপ দিয়া পড়িল। তীরে একটা বিষম কোলাহল উপস্থিত হইল, ছেলেরা সমস্বরে বলিয়া উঠিল, যামিনী ভঙ, নিশ্চয়ই ডুব মারিয়া মাছ ধরিয়াছে, মেয়েরা এ সব কাণ্ড কারখানা দেখিয়া হাসিয়া একেবারে খুন। পরাণ ধূলা কাদা গায়ে মাখিয়া কিম্ভুতকিমাকার হইয়াছে। হরিদাস , শিরােমণি রসিকতা করিয়া কহিলেন, পরাণ, তুমি না মাছমাংস ত্যাগী ব্রহ্মচারী। আর একটা জলজ্যান্ত রােহিত মৎস্যের লােভ সামলাতে না পেরে শেষে একেবারে ধূলায় গড়াগড়ি দিলে ! তা হলে তুমি মাছমাংস খাও মাঝে মাঝে। পরাণ আপনাকে সামলাইয়া লইয়া কহিল, খাই, আবার খাইও না। প্রসাদ হলে একটু ঝােল খাই শুধু, জীব হত্যা আমাদের ধর্মে নিষেধ আছে।
দেশের মায়া ৩ হরিদাস সন্ধিসুরে কহিলেন, জীবহত্যা নিষেধ আছে, আর এত বড় একটা মাছের জন্য এত কাণ্ড কারখানা করলে,••এর নাম কি জীব হত্যা নয় ? রসিক গাঙ্গুলী অবসরপ্রাপ্ত সবজজ, সব কথা দেখিয়া শুনিয়া রায় দিলেন, মাছ ত আর পরাণ সাধু ধরেন নি, ধরতে গিয়েছিলেন মাত্র। পরম বৈষ্ণব ভেবে রােহিৎ মৎস্য ও সাধু মহাশয়কে স্পর্শ করেন নি, এতে আর জীব হত্যা কিসে হ’ল ? উপস্থিত সকলেই মৃদু মৃদু হাসিতে লাগিল। ইলা হাসিতে হাসিতে কহিল, চল ভাই ঠাকুরঝি, চৌধুরীদের বাড়ী থেকে একবার ঘুরে আসি। কাল রে কালাচাদ বাবুর স্ত্রী এসেছিলেন না, তার সাথে একবার দেখা করে যাবাে। বড় ভালাে লাগে আমার তাকে। গ্রামে আসিয়া ইলার প্রথমে গ্রামের সমবয়সী সঙ্গিনীদের সাথে আলাপ পরিচয় করিতে বাধ-বাধ ঠেকিত, কিন্তু যতই সে প্রাণ খুলিয়া তাহাদের সাথে মিশিতে লাগিল, তাহাদের আলাপ পরিচয়ে, আদর আপ্যায়নে ইলা একেবারে মুগ্ধ হইয়া গেল। তাহারা সহরের ভদ্র মহিলাদের মত বড় মানুষী চালের কথাবার্তা বলেন, অকারণে কুৎসা করিতে তাহারা তেমন পটু নয়, কিংবা স্বামীর টাকার বহর, শাড়ি কাপড় জামা জুতা, গা ভরা গহনা, মােটর গাড়ী, ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স ইত্যাদির বড় বড় কথায় যখন তখন কান অতিষ্ঠ করিয়া তােলে না ; মুন্সেফ গিন্নী, সবজজ মাসীমা, আণ্ডার সেক্রেটারী পিসীমা, কম্পট্রোলার কাকীমা এই সব বড় বড় পদস্থ কর্মচারীর আভিজাত্যে উচ্চাসন প্রতিষ্ঠিত হয় না, এখানে শুধু মনের সত্যিকার পরিচয়। এখানে দীন দরিদ্র পরিবারের শ্যামা ঠাকরুণ হইতে বিংশ সহস্র রজতখণ্ডবার্ষিক আয়ের ভূম্যধিকারী কামাখ্যা বাবুর স্ত্রী শ্রীপ্রতিমা দেবী পৰ্য্যন্ত একভাবে কথা বলেন। ০ ১২৪ গল্প, গল্প নয় রাত্রি বেলা অর্ণবের সাথে দেখা। অর্ণব কহিল, কেমন লাগছে তােমার গাঁয়ে ? ইলা মুখ খানি ভার করিয়া কহিল, মন না ! -মন্দ না কেন ইলা ! পাহাড়ের কথা তুমি আজও ভুলতে পারেনি। ইলা বিবর্ণমুখে কহিল, পাহাড়ের মায়া আমায় বােজ টানে, অজানার টানে টানে আমায়, কেন জানিনা । অর্ণব যেন আকাশ হইতে পড়িল। মাথা নাড়িয়া কহিল, ছি ইলা, অবুঝ হয়ােনা। দেশের মায়া কি কারও চেয়ে কম ! এমন সুন্দর দেশ, বুনন গাছপালা, স্নিগ্ধ নদ নদী, আত্মীয় স্বজন, এর চেয়ে কি স্বর্গ বড় ? ইলা সবিস্ময়ে কহিল, আমি তােত কোন দিন এর মর্যাদা খাটো করিনি। কি যে আনন্দে আজ কয়দিন কেটে যাচ্ছে আমার, সে আমি তােমাকে ভাষায় বােঝাতে পারবাে না। আগে গ্রামে আসতে আমার খুব ভয় লাগত, এখন খুব ভালাে লাগে, মনে হয়, কেন আরাে আগে আসিনি। তবু কি জানি থেকে থেকে পাহাড়ের মায়ায় আমার মন ভরে উঠে। আমরা সবাই এসেছি! শুধু তাঁর স্মৃতি আমি ভুলতে পারি না, আজও ভুলতে পারিনি। সে আমায় ডাকে, সে আমায় ডাকে, কেবলই ডাকে, অশরীরী বাণীতে প্রতিদিন আমাকে ডেকে যায়, চোখের নিমেষে আমার মন উড়ে যায় শিলঙ পাহাড়ে, বাতাসের বুকে, ঝর্ণার কোলে, সরল বনের ধারে অর্ণব এবারের মত চুপ করিয়া গেল। শােক, দুঃখ, ব্যথা, এর কাছে দেশের মায়া তুচ্ছ নয়, তবে সময় সাপেক্ষ বটে! কোন অজ্ঞাত সুদূরের মায়ায় ইলার কোমল মন প্রাণ হুহু করিয়া ওঠে কে জানে! মনে হয় তার স্নেহের পুতুলির শৈশবের ক্রীড়াভূমি, কৈশােরের রম্যাদ্যান, শত সহস্র গৃহের জাগর-স্মৃতি দুর্দমনীয় আকর্ষণে ৩। ৩০ দেশের মায়া মানুষের ক্ষুদ্র প্রাণে তােলপাড় করিতে থাকে, মিথ্যা অজানার মােহ, মায়া, মনের কুহক, স্নেহ, মমতা জীবনের বেলা ভূমিতে ঢেউ খেলিতে থাকে। বিস্মৃতির ফেনিল উচ্ছাসে তাহাকে দূরে সরাইয়া রাখিতে পারে এমন সাধ্য কাহারও নাই ! রাত্রে শুইয়া ইলা এই কথাই ভাবিতে থাকে। সকাল বেলা ঘুম হইতে উঠিয়া সে দীঘির কোলে সাঁতার কাটিয়া আসে। দীফির কালো জল দেখিয়া সে কত খুসী, কিন্তু নিমেষেই সেই ভাব আবার অন্তর্হিত হইয়া যায়, মনে পড়ে ডাগর দুটি কালাে চোখ! মাঝে মাঝে সঙ্গিনীদের সাথে সে সবুজ মাঠে বেড়াইয়া আসে, কলাই শাকের কচি কচি পাতা সে চুপ করিয়া চাহিয়া দেখে। ধীরে ধীরে সূর্য ডুবিয়া যায়, কুয়াশার মত ধোঁয়ায় সারা মাঠ ডুবিয়া, ভরিয়া একাকার হইয়া ওঠে। রাত্রিতে টপ, টপ, করিয়া শিশির ঝরে, ভূতুম পাখীর বিঞ্জ ভাক সে কান পাতিয়া শশানে, বুক ধড়ফড় করে,••••••মনে হয় আবার কি অমঙ্গল হইবে কে জানে। পাড়ার ছেলে মেয়েরা ভাের হইতেই ছুটিয়া আসে ইলার কাছে। কত আদর, কত সােহাগ, ক মেহ মমতা তাহাদের জন্য,•••স্বামীর কাছে বলিয়া প্রতিদিন সে কত টাকা পয়সা খরচ করে, ছেলে মেয়েরা পেট ভরিয়া সন্দেশ খায়, কমলা নিজ হাতে বিলাইয়া দেয়। নূতন জামা কাপড় পরিয়া হাসিতে হাসিতে এক ছুটে ঘরে ফিরিয়া যায়। সন্ধ্যার পর এই সব দস্যি ছেলে মেয়েরা মায়ের কোলে ঘুমের ঘােরে স্বপ্ন দেখে কত দেশ বিদেশের রাজপুত্র, রাজ কন্যার কথা ! শেষ ০ শিলঙ ফিরিয়া যাইতে আর মাত্র দিন দুই বাকী। ছেলেরা ছটফট সুরু করিয়াছে এখন হইতেই, ইলার মনেও শান্তি নাই ! ' আবার কবে আসিবে কে জানে! দেশের জন্য কেমন একটা মায়া জন্মিয়া গিয়াছে।
১২৬ গল্প, গল্প নয় সেই মাধবী ঠাকুরঝি, শ্যামা ঠাকরুণ, ভুবন দিদি, হেনা, মালতী, বকুল, টগর সবাই যেন অদৃশ্য শক্তিতে তাহাকে টানিতেছে। সেই থিয়েটারের ছেলের দল, পাড়ার ছেলে মেয়েরা, নিতাই ঠাকুর, পরাণ সাধু, ভগবান দাদা রােজই একবার মায়ের মুখে একটুখানি হাসি দেখিবার জন্য ছুটিয়া আসে। আহম্মদ চৌকিদার, নবু সেখ, ছবরালী, জবাই ঢালী তাহারাও দিনান্তে সাঁঝ রাত্রিতে বাবুর বাড়ীর বাঁধা বােয়াকে বসিয়া একপ্রহরের রাত্রিতে যখন পকী বিশেষ সময় জ্ঞাপন করে, উঠিবার নামও করে না। সারাদিনের পরিশ্রম, ক্লান্তি যেন বাড়ীর উঠোনে আসিয়া পা দিলেই এক মুহূর্তে চলিয়া যায়। তাহারা খুকীর সুখ দুঃখের কথা বলিয়া নিজেরা কঁাদে, ইলাকে কাঁদায়, আবার কোনদিন জারী গান গাহিয়া গভীর রাত্রে ঘরে ফিরিয়া মুখে নিদ্রা যায়। একদিন আহম্মদ না আসিলে ইলা বার বার বাড়ীর পুরাতন ভৃত্য ফাজিলাকে পাঠাইয়া দশবার খবর নেয়। নবুর পাঁচ বছরের ছেলেটির আর হইয়াছে, ইলার চিন্তা হয়, তাহার ঘরে সাবু, মিশ্ৰী, বার্লি আছে কিনা। সে নিজেই লােক পাঠাইয়া বাজার হইতে ফল, মিশ্র, বালি, খেলনা আনাইয়া দুঃস্থ প্রজাদের ঘরে ঘরে দিয়া আসিতে বলে। কেহ কেহ সাদরে গ্রহণ করে, কেহ ছুটিয়া আসিয়া মায়ের পায়ের ধূলাে গামছার কোণে মাখাইয়া লইয়া যায়, এবং গৃহে ফিরিয়া রুগ্ন স্ত্রীপুত্রের কপালে ছোঁয়াইয়া ছে চার বেড়ার ফাকে গুজিয়া রাখে। পরদিন যােগের একটু উপশম হইলে এই সব নিরীহ কৃষকেরা যার যেমন সাধ্য দুধ, নলিন গুড়, কাচা তেঁতুল, নবান্নের জন্য নূতন ধান ধামায় করিয়া বহিয়া চাটুয্যদের প্রাঙ্গণে আসিয়া উপস্থিত হয়। না বলিলেও তাহারা কোন কথা শােনে না, বা শুনিতে চাহে না। সকলের মুখে সেই এক কথা,-মা-ঠাকরুণের জন্য। কিন্তু মা-ঠাকরুণকে তত তাহারা আজ দেশের মায়া ১২৭ h পৰ্যন্ত ভালাে করিয়া চোখে দেখে নাই। অবগুণ্ঠনে ঢাকা হাস্যময়ী •একখানি দেবী প্রতিমার দুইখানি রাঙা চরণ দেখিয়া তাহারা মনে মনে কত খুসী হইয়া ফিরিয়া যায়। যাওয়ার দিন আর ইলা কাহারও সাথে তেমন কিছু বলিতে পারিল না। ভােরে ষ্টীমার পরিবার জন্য গ্রাম থেকে রওনা হইতে হয়। সবে ভােরের পাখী জাগিয়া উঠিয়াছে। পাকী বেহারার হৈ চৈ শব্দে যে যেখানে ছিল, মাতৃহারা শিশুর মত ছুটিয়া আসিয়া দলে দলে সার বাঁধিয়া ষ্টেশন অবধি পৌছাইয়া দিয়া গেল। অর্ণব হাসিমুখে প্রত্যেককে প্রত্যভিবাদন জানাইল। ইলা পাকীর জানালার ফাকে একদৃষ্টে চাহিয়া এক একবার মুখ লুকাইয়া ভিতরে ফেঁাপাইয়া ফোপাইয়া কঁদিতেছিল। কিছুক্ষণ পরেই ষ্টীমার আসিয়া ছাড়িয়া দিল ! কেবিনে বসিয়া ইলার চোখ দুটি অপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে। ওই যে দত্তদের তালগাছটি কোথায় লুকাইয়া গেল, কনকসারের খাল, চন্দনকর, সবই ধীরে ধীরে অদৃশ্য হইয়া যাইতে লাগিল। অর্ণব কাছে আসিয়া দেখিল, ইলা তখনও কাদিতেছে। কোনমতে আপনাকে সংযত করিয়া কহিল, তুমি কাঁদছ ইলা? ইলা কোন কথা বলিল না। ধীরে ধীরে কেবিনের জানালা ধরিয়া নাড়াচাড়া করিতে লাগিল। অর্ণব পুনরায় কহিল, চল দেশে ফিরে যাই ! দেশের জন্য তােমার মন কেমন করছে, না ? ইলার ডাগর চোখে আশ্চর্য মিনতি••যেন বলিতে চাহিতেছে, ওগাে চল, ফিরে যাই,•••অথচ খুকীর জন্যও মনটা কেমন করিতেছে। শিলঙ না গেলেও নয়•••পাহাড়ের বুকে, পাহাড়ের কোলে
১২৮
গল, গল্প নয়।
নদীর একটা বাঁক ফিরিতেই ইলা গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া
ধীরে ধীরে কেবিনের জানালা বন্ধ করিয়া দিল। গায়ের বুকে ফেনার
ফুল ফুটাইয়া ঢেউগুলি তীরের বুকে আছাড়ি বিছাড়ি খাইতে খাইতে
চলিয়াছিল।
কেরাণীর দুর্গোৎসব সুরেন্দ্রনাথ হিসাব-নিকাশ অফিসের কেরাণী। সরবরাহ বিভাগের আয়-ব্যয়ের হিসাব শুধু কাগজে কলমে লিখিয়া পড়িয়া সন্ধ্যাবেলা সে পরিশ্রান্ত দেহে গৃহে ফিরিয়া আসে। তাহার স্ত্রী কমলার বিশ্বাস, সে যখন সরকারের টাকা পয়সার হিসাব রাখে, তখন আর তাহাদের চিন্তা কি! সংসারে আর কেহ নাই, পিতামহের আমলের এক বৃদ্ধ, ভৃত্য, বিন্দু পিসী এবং একমাত্র শিশু কন্যা মিলু। ইহারা সুদুর পল্লীতে ভগবানের আশ্রয়ে থাকে। দুর্ভিক্ষে, অনশনে, রেশনের প্রকোপে এবং কন্টোলের দৌরাত্ম্যে ইহাদের মুখের দিকে চাহিবার মত আয় দ্বিতীয় ব্যক্তি নাই। আর সুরেন্দ্রনাথের এমন অবস্থা নয় যে, সপরিবারে সহরে বসবাস করিতে পারে। বিন্দু পিসীর দিনরাত্রি মালাজপ করিয়া সময় কাটে, চোখে বড়-একটা দেখিতে পান না। ভৃত্য হরিহর বৃদ্ধ হইলেও যােয়নের দাদা! বয়সের সময়ে সে কত . দাঙ্গা হাঙ্গামা করিয়াছে, গায়ের লােক এখনও সে কথা সহজে তুলিতে পারে নাই। তাহার দাপটে ঘােষালদের অন্দরে আজ পর্যন্ত কোন চোর-ডাকাত পা ফেলিতে সাহসী হয় নাই। সুরেন্দ্রনাথের পিতা হরেন্দ্রনাথ এবং পিতামহ নৃপেন্দ্রনাথ এক সময়ে দস্তুরমত বর্ধিষ্ণু লােক ছিলেন। কিন্তু অকালে কালগ্রাসে পতিত হইতে না হইতেই সংসারের হাল ঘুরিয়া গেল। মানুষের ভালমন্দ ঘটিতে কতক্ষণ! পিসিমার বয়স হইয়াছে, কখন কি হয় বলা যায় না। কমলা বড় গল্প, গল্প নয় আশা করিয়া থাকে, সুরেন্দ্রনাথ বৎসরান্তে পূজার ছুটতে একবার অন্ততঃ আসিয়া সকলকে দেখিয়া যাইবে। কিন্তু সব সময় তাহা হইয়া উঠে না। কমলা দেখিতে সাক্ষাৎ কমলার মত। টানাটানা দুটি চোখ, এক গােছা চুল, ‘হিমকল্যাণের কল্যাণে অপূৰ্ব কুন্তল, ঢল- ঢলে মুখখানি, ছিপছিপে পাতলা গড়ন, ফুলের পাপড়ির মত সুন্দর ঠোট দু’পানিতে মিষ্টি হাসি সর্বদাই লাগিয়া আছে। কিন্তু পিসীর বাতরসের শরীর, নড়িতে চড়িতে কষ্ট হয়। হরি বৌমার কাছে বসিয়া বাটনা বাটিয়া, তরকারি কুটিয়া, মিলুকে কোলে, কঁাধে লইয়া সন্ধ্যা বেলা পিসীমার কাছে আসিয়া রামায়ণ, মহাভারত পড়িয়া শােনায়। সুখে দুঃখে দিন কাটে। শরৎকাল আসিলেই বিন্দুপিসী হইতে মিলুর কোমল প্রাণখানি পৰ্যন্ত আনন্দে নাচিয়া উঠে। এবার আশ্বিনের প্রথম ভাগে পূজা, শেফালি ফুটিয়া চতুর্দিক আমােদিত করিয়া ফেলিয়াছে। পুকুরের জলপদ্ম ও তীরের রক্ত কমল হাসিয়া খেলিয়া আবার শুকাইয়া যাইতেছে, আকাশের নীল বড় করিয়া চোখে পড়ে, মেঘের শিশুরা ধীর বাতাসে ভর করিয়া কোন অজানা দেশে উড়িয়া যাইতেছে, মিলু, অবাক দৃষ্টিতে তাহা ঘুরিয়া ফিরিয়া দেখিতে থাকে। বৃদ্ধ হরিহর এখন হইতেই দিন গণিতে সুরু করিয়াছে। কলেজ ছুটি হইতে মাত্র আর তিন চারি দিন বাকী। নদীর ঘাটে এখন হইতেই ভিড় জমিতেছে। হরিহও মিলুকে সঙ্গে লইয়া প্রত্যহ একবার নদীর তীরে বেড়াইতে যায়। অবােধ শিশু সে তত আর এসব জানে না, সুরেনের কখন ছুটি হইবে, কখন সে দেশে আসিতে পারিবে। মাৰ গাঙে পাল তুলিয়া ক ভিনগাঁয়ের নৌকা দেশান্তরী কেরাণীর দুর্গোৎসব ১১ হইয়া যায়, মিলু আশাভরে প্রতিদিনই চাহিয়া থাকে, সন্ধ্যা হইতেই বাড়িতে ফিরিয়া আসে। আসিয়া মায়ের গলাখানি ছােট দুটি নরম হাতে জড়াইয়া ধরিয়া কহিতে থাকে, মা, বাবা আজও এলাে না। কমলা সান্ত্বনার সুরে হাসিমুখে জবাব দেয়, আজ না এসেছে, কাল আসবেই আসবে, তুমি ঠিক দেখাে । মিলুর মন আবার পুলকে নাচিয়া উঠে। ষ্টীমার ষ্টেশন হইতে সনাতন মাঝি নােজই গাঁয়ে ফিরিয়া আসে। সে আর কতদূর হবে, রশিখানেক জায়গা, বড় গাঙে বাহিয়া শেষে আসিয়া তাহাদের নিজেদের গাঙে হাল ধরিয়া একটানা ভাটিতে গলুই- এর উপর বসিয়া নিশ্চিন্তমনে তামাক খাইতে খাইতে বামুনভাঙার ঘাটে পাড়ি দিতে থাকে। সন্ধ্যাবেলা বােজই তাহার নজরে পড়ে হরিহরকে। মাথা নাড়িয়া মৃদু হাসিয়া হরিহর জিজ্ঞাসা করিবার আগেই সনাতন জানাইয়া দেয়, সুরুবাবু আসেনি। এলে কি আমি বাবুকে ফেলে আসব। দশটা কেরায়া থাকলেও সে গাফিলতি আমার হবে না, একথা তুমি ঠিক জেনাে হরিদা’! বর্ষাকালে এই নদীর নাগর দোলায় কোন মাঝি নৌকা না দোলাইয়া চলিয়া যাইতে পারে না। ঢেউয়ের দাপাদাপি, তীরে তীরে ঝুপ ঝাপ শব্দ, সারা বর্ষা ভরিয়াই আছে। শরতের প্রারম্ভেই কী যেন একটু পড়িয়া আসে! মিলু যত আশাই করুক না কেন, সুরেনের এবার পূজায় বাড়ি যাওয়া শেষ পর্যন্ত হইয়া উঠে কিনা সন্দেহ। বড়বাবুর মেজাজ ভালাে , বড়সাহেব টুরে, এখন ছুটি হইবে কি না কে জানে! সুরেন ভাবিয়া আকুল হইল। বৎসরান্তে স্বীকন্যার দর্শনলাভ, ১৩২ গল্প, গল্প নয় জন্মভূমির স্নিগ্ধ স্পর্শ তাহার সারা বছরের ব্যথা বেদনা ভুলাইয়া দেয়, কিন্তু এবার যাইতে পারিবে না ভাবিতেই তাহার নিপ্রাণ সহসা কঁদিয়া উঠিল। বড়বাবুর কাছে শুধু ধর্না দিতে বাকী। মুখে, কাগজে পত্রে অনেক বলিয়া লিখিয়া দেখিয়াছে সে, এমন কি পাড়ার একজন বর্ষীয়সী রমণীকে দিয়া বড়বাবুর তরুণী, রূপসী ভাৰ্য্যাকে অনেক রকমে তােমােদ করিয়াও কোন সুফল হয় নাই। নানা দুশ্চিন্তা ভাবনায় সুরেন্দ্রনাথ একরকম পাগল হইবার উপক্রম হইল। হায়রে প্রবাসীর বিয়ােগ-ব্যথা! এই বড়বাবুর উপর অধিকাংশ কেরাণীবর্গ একেবারে হাড়ে হাড়ে চটা। জিতু দাস এবং সহকৰ্মী সতীশ সৎপরামর্শদানে সারা অফিসে একেবারে অদ্বিতীয়। ইহারা, অডিট অফিসে কাজ না করিয়া যদি উকালতী ব্যবসা করিত, হয়ত ইহাদের পশার অল্প দিনেই জাকিয়া উঠিত। জিতুদাস অনেক চিন্তা ভাবনা করিয়া এক বুদ্ধি বাহির করিল। সান্ধ্যভ্রমণে বাহির হইয়া সতীশের সঙ্গেও এবিষয়ে তাহার কি সব কথাবার্তা হইয়াছিল। বিপদে পড়িলে মানুষের দিকবিদিক জ্ঞান থাকে , তাহা বেশ ভালাে বােঝা যায় সুরেন্দ্রনাথকে দেখিলে ! সতীশ পরামর্শ দিল যে, “মেডিকেল লিভ” না লইলে এবার ছুটি পাওয়া, অসম্ভব, কোন একটা ছােট খাট নােগের ছুতানাতা না করিয়া কঠিন রােগের অবস্থা দেখাইলেই সাহেবের দয়া না হইয়া আর যায় কোথায়। তখন কোথায় থাকবে বড়বাবু আর তার হাত-ধরা বড়সাহেব! ভিতু দাসের কথামত সুরেন্দ্রনাথ দিন দুই অফিসে না আসিয়া আরের ভান করিয়া বাড়ীতে পড়িয়া রহিল। সতীশ ছাপােষা লােক। অফিসে আসিয়াই বড়বাবুর কাছে সুরেন্দ্রনাথের ভয়ানক অসুখ, পারিবারিক অসুবিধা ইত্যাদি বিনাইয়া বিনাইয়া বলিয়া মনে মনে এক- কেরাণীর দুর্গোৎসব চোট হাসিয়া লইল। জিতু দাস সমবেদনা প্রকাশ করিতেই বড়বাবু নিজে সাহেবের কাছে গিয়া ভিজা বিড়ালের মত চুপ হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন! সাহেব মুখ তুলিয়া চাহিতেই বড়বাবু ফিরিয়া যাইবার ভান দেখাইয়া আবার টেবিলের সুমুখে আসিয়া দাড়াইল, এবং ব্যসমস্ত হইয়া কহিল, স্যার, আপনি খুব ব্যস্ত আছেন, আমি পরে আসব খন। সাহেবের মন ভিজিয়া গেল। কহিলেন, ব্যস্ত এ ক’দিন থাকতেই হবে। ছুটি এসে পড়েছে না। বড়বাবু মুখখানি কাচুমাচু করিয়া কহিলেন, ছুটির হিড়িক না পড়তেই সুরেনবাবু অসুস্থ বলে জানিয়েছেন। দু’দিন আগেও দেখেছি পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কোন একটা ছুটি এলেই বাঙালীবাবুদের যত অসুখ-বিসুখ দেখা দেয়। কি করব স্যার বলুন। আমি আর ক’দিক দেখব। আর আপনিও খেটে খেটে.... সাহেব কুঞ্চিত করিয়া কহিলেন, সিভিল সার্জনের কাছে পাঠিয়ে দিন, সত্যি অসুখ হয়েছে কিনা। -আপনি যদি স্যার সাহেবকে একটু ফোন করে দেন, একটু ভালাে করে একজামিন•••• ••••••ননসেন্স ! আপনি কি বলছেন। আপনি কাতে যান। বড়বাবু ধমক খাইয়া ধীরে ধীরে স্বস্থানে ফিরিয়া আসিতেই জিতু দাস টেবিলের সুমুখে চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। বড়বাবু চশমার ফাকে তেরছাভাবে অবলােকন করিয়া তিরিক্ষি মেজাজে মনের যত ঝাল জিতুদাসের উপর মিটাইয়া লইলেন। কহিলেন, আপনাদের ছুটির অষ্ট সাহেবকে বলে বলে আমি হয়রান। সাহেব ভয়ানক চটে গেছেন, এবার আর কারও ছুটি হচ্ছে না। আর আমিও কারও জন্য কিছু বলতে পারব না।
১৩৪ গল্প, গল্প নয় জিতুদাস তােষামােদে অদ্বিতীয়। নানারকম কথাবার্তা বলিয়া বড়বাবুর মন নরম করিয়া কহিল, আপনি না বললে কে বলবে বলুন স্থার আমাদের জহ! এই ত দেখুন, সুরেনবাবুর জন্য কত সুপারিশ করে এলুম। সাহেব রেগে মেগে বললেন, বােজ বােজ ছুটির দরখাস্ত আমি পছন করি না। আর পুজোর ছুটি, বড়দিন এলেই আপনাদের যত অসুখ- বিসুখ, মা বাবা, ভাইবােনের যত দুঃসংবাদ, স্ত্রীর মরণাপন্ন অবস্থা। সাহেব আর কিছুতেই এসব বরদাস্ত করবেন না বলেছেন ! জিতুদাস হাসিতে হাসিতে কহিল, ছুটি না হয় আমাদের নাই দেবেন। কিন্তু সুরেনবাবুর অসুখ, সে কি আর না দিয়ে পারবেন। —এমন কি অসুখ যে ছুটির প্রয়ােজন হবে। সর্দিজ্বর, গা ব্যথা নিয়ে আমরা আপনাদের বয়সে কত রাত্রি অবধি খেটেছি, জানেন, আর আপনারা ননীর শরীর, একটুতেই মুষড়ে যান। জিতুদাস নীরবে দাঁড়াইয়া সকল কথা শুনিয়া বাহিরে আসিল। এবং ছুটির পরে সতীশের সাথে এবিষয়ে পরামর্শ করিতে করিতে পথ চলিয়াছিল। বাড়ীর কাছাকাছি গিয়া দুইজনে হাসিয়া বিদায় লইল। সতীশ ফিরিবার পথে টিপ্পনি কাটিয়া কহিল, যেমন বুননা ওল, তেমন বাঘা তেঁতুল না হলে চলবে কেন, কি বলল জিতু দাস ? জিতু দাস মাথা নাড়িয়া সম্মতি জানাইল, সে দেখা যাবে 'খন! পূজার মরসুম আরম্ভ হইয়াছে। নদীর ঘাটে লােকজনের অভাব নাই, আজ বাবুরা আসিলেন, কাল শিরােমণি মহাশয় সপরিবারে আসিতেছেন, শেষরাত্রিতে লােকজন নৌকাসহ ষ্টেশনে , গিয়াছে। হরকান্ত এবার আসিতে পারিবে না, তাহার মনিব বড় কড়, তাই কেরাণীর দুর্গোৎসব ১৩৫ ঘােষালদের বউএর মুখ ভারী। সীতানাথ ভাটিতে চাউলের কারবার করে, দুই নৌকা বােঝাই জিনিষপত্র, ছেলেপেলে সহ আসিয়া পেীছিয়াছে। শুধু আসে নাই সুরেন্দ্রনাথ। আসিবে কিনা সে সম্বন্ধে কোন সঠিক খবর আজ পর্যন্ত পাওয়া যায় নাই। তবু কমলা হাল ছাড়িয়া বসিয়া নাই, প্রতিদিন সকালে সন্ধ্যার অপেক্ষায় বসিয়া থাকে, কারণ সাধারণত বৈকালে ষ্টীমার বামুনভাঙা ঘাটে আসিয়া পৌছে। পাড়ার ছেলেমেয়েদের মুখে আর হাসি ধরেনা যেন। কেহ নূতন জামা, জুতা, কেহ নানাবিধ খেলনা, কেহ বা আত্মীয় স্বজনকে কাছে পাইয়া উল্লসিত হইয়া উঠিয়াছে। চণ্ডীমণ্ডপে ও ছেলেমেয়েদের ভিড় কম নয়। কেষ্টকুমার এইমাত্র চাল চিত্তির শেষ করিয়া গৃহাভিমুখে যাওয়ার উদ্যোগ করিতেছে। জগাই ঢাকী ভর সন্ধ্যায় গ্রামে পা দিয়াই ষষ্ঠীর বােধন উৎসবের বার্তা সরবে জোর কাঠিতে জানাইয়া দিতেছিল। মিলুর নূতন কাপড় জামা আসে নাই, তাই সে পাড়ায় প্রতিমা দেখিতে যায় নাই। মুখখানি কালাে করিয়া সে ঘরের দাবায় বসিয়া আছে। বৃদ্ধ পিসীমা কত সাধ্যসাধনা করিয়া শ্ৰীমতীকে ঘরের বাহির করিতে পারিতেছেন না। ছলছল চোখে চাহিয়া কমলা শুধু একটি মাত্র মেয়ের হাত ধরিয়া এদিক ওদিক ঘুরিয়া ফিরিয়া বেড়াইতেছে, আর লক্ষ্য সর্বদাই ওই নদীর দিকে, -ঘাটে কোন নৌকা আসিয়া ভিড়ে কিনা। মেয়েটির চোখেও ঘুম নাই, শেষ রাত্রিতে খট করিয়া একটু শব্দ হইলেই সে লাফ দিয়া উঠিয়া বসে, অমনি মায়ের কাছে জিজ্ঞাসা করে, মা, বাবা এলাে নাকি ? মা তাড়াতাড়ি গায়ে মাথায় হাত বুলাইতে বুলাইতে বলেন, কাল আসবে। কিন্তু এই ‘কাল যে আর কত দিন পরে আসিবে অবােধ গল্প, গল্প নয় মিলু তাহা ভালাে করিয়া বুঝিতে পারে নাই। বছর খানেক আগে সুরেন্দ্রনাথের বড় মেয়েটি ইহধাম ত্যাগ করিয়াছে। এক রকম বলিতে গেলে বিনা চিকিৎসায়। পাড়াগাঁয়ের হাতুড়ে ডাক্তার, জ্ঞান বুদ্ধিতে যাহা ভালাে বুঝিতে পারিয়াছে, তাহাই করিয়াছিল। কিন্তু মেয়েটি অকালে কালগ্রাসে পতিত হইয়াছে। সেই সময়ও সুরেন্দ্রনাথ তার পাইয়া আসিতে পারে নাই। ছুটি পায় নাই, খুকীর মৃত্যুর খবর যখন আসিয়া পৌছিল, তখন নাকি দয়ালু বড়বাবু ডাকিয়া বলিয়াছিলেন, একবার বাড়ী ঘুরে আসতে চাও তাে যেতে পারাে। সাহেব নাকি ভাল মন্দ কিছু বলেন নাই। সারাদিন, সারারাত্রি সুরেন্দ্রনাথ মেসে বসিয়া চোখের জল ফেলিয়া হাউ হাউ করিয়া দিয়াছে। এখনও সময়ে অসময়ে তাহার চোখে বাদলধারা ঝরিতে থাকে। খুকীর কথা বড় করিয়া মনে পড়িলে সে তাড়াতাড়ি চোখের জল মুছিয়া বড় বড় যােগের খাতা লইয়া একাগ্র মনে কাজ করিতে করিতে খুকীর কথা ভুলিতে চেষ্টা করে। ভুলিতে পারে কিনা এ কথা বলা কঠিন। আর কে-ই বা ভুলিতে পারে। কাজকর্মে সুরেন্দ্রনাথ একেবারে মােটামুটি মন্দ না। হাজার হােক একদমে বি-এ পাশ করিয়া এ অফিসে আসিয়া ভর্তি হইয়াছিল। উপরিওয়ালার নেকনজরে পড়ে নাই, ‘লালমুখের চোখে পড়িলে এতদিনে তাহার একটা সুরাহা হইয়া যাইত। কিন্তু কথায় আছে, তুমি যাবে কপাল যাবে সঙ্গে। অদৃষ্টের বিধিলিপি তাহার এখনও কাটিতে অনেক বাকী আছে, এ কথা নাকি গাঁয়ের প্রবীণ জ্যোতিষী বিশু মুখখাটি মহাশয় কমসে কম বার দশেক বলিয়াছেন। শনির দশা এবং রাহুর দৃষ্টি কি এমনি সব কি কথা বলেন। নবগ্রহ কবচ এবং নগদ সাতটাকা সাড়ে সাত আনা অতি আবশ্যক ব্যয় ছাতা কোনমতেই রেহাই নাই।
৭ কেরাণীর দুর্গোৎসব ১৭ কমলা এখন আর সে কমলা নাই। মেয়েটি মারা যাওয়ার পর হইতেই সে এখন জানি কেমন আনমনা হইয়া গেছে। মিলুকে সারাদিন চোখে চোখে রাখিয়া কোনমতে দিন কাটায়। মিলুর বিশ্বাস, তাহার দিদি এখনও মরে নাই, হাসপাতালে আছে, এ কথা নাকি পাড়ার বর্ষীয়সীরা তাহাকে বলিয়া দিয়াছে। সে সেই বিশ্বাসেই আছে, এবং মাঝে মাঝে এই প্রসঙ্গ তুলিয়া মাকে এবং ভৃত্য হরিহরকে বিষম ব্যতিব্যস্ত করিয়া তােলে। কমলা চোখের জলে মুখ ফিরাইয়া লয়। হরিহর গান গাহিয়া তাহাকে লইয়া গ্রামের মাঝখানে ঘুরিয়া আসে। ধীরে ধীরে দিদির প্রসঙ্গ চাপা পড়িয়া যায়। হায়রে চাকুরি, হায়রে পেটের দায়! এই মােহে পড়িয়া সুরেন্দ্রনাথ শেষ সময়ে একবার মেহের পুতুলিকে চোখের দেখা দেখিতে পাইল না! তবু সুরেন্দ্রনাথকে ‘ধন্য বলিতে হয়। দু'এক দিন চোখের জল ফেলিয়া সে আবার মন স্থির করিয়া কাজেকর্মে মন দিয়া বসিল। বড়বাবু লােকলজ্জার ভয়ে প্রথম দু'একদিন সান্ত্বনা বাক্যে তাহাকে সংসারের অহমিকা বিশদভাবে বুঝাইয়া দিলেন এবং সপ্তাহ না যাইতেই অফিসে নিজ মূর্তি ধারণ করিলেন। যে গিয়াছে, সেজন্য হায় আফশােষ করিয়া কোন ফল নাই, এ কথা আনিয়া শুনিয়াও লােকে দুঃখ করে। রক্ত মাংসের গড়া শশীর যাহাদের, তাহাদের না করিয়া উপায় নাই। চোখের জল ফেলিলে শােক দুঃখ নাকি একটু হাল্কা হইয়া যায়, একথা পাড়ার মেয়েরা সর্বদাই বলাবলি করে। প্রায় প্রত্যহই সুরেন্দ্রনাথ মেসে চুপ করিয়া বসিয়া অনুচ্চকণ্ঠে ফেঁপাইয়া দিতে দিতে শুইয়া পড়িত। অন্যান্য সহকীয়া আসিয়া মাঝে মাঝে কত প্রবােধবাক্যে তাহাকে ভুলাইতে চেষ্টা করিত, তাহার মন প্রাণ সে কথা ভালাে শুনিত কি শুনিত না, তাহা ভালাে জানা যায় নাই।
১৩৮ গল, গল্প নয় ছেলেবেলা হইতেই সুরেন্দ্রনাথ নিরীহ প্রকৃতির লােক। সাধারণ বাঙ্গালী ঘরের ছেলেদের মত সে সিগারেট খাইয়া, আজ্ঞা দিয়া, তাস পিটিয়া সময় কাটাইত না। এহেন গােবেচারী লােক আজ কালের দিনে অতি বিরল। বিবাহ হওয়ার আগে সে কোন মেয়েদের সাথে মেলামিশা করা দূরে থাকুক, তাহাদের ত্রিসীমা কোনদিন ভুলেও মাড়ায় নাই। বিবাহ অবধি সে জানে শুধু কমলা, এবং কমলা ছাড়া আর কোন তরুণীকে তাহার চোখে তেমন করিয়া চোখে পড়ে না। প্রবাসে কমলার ফটোখানি বুক পকেটে করিয়া সে পথে ঘাটে ঘুরিয়া বেড়ায়। কাহারও চোখে পড়িলে সে তাড়াতাড়ি যক্ষের ধনের মত ছবিখানি লুকাইয়া রাখিত। একবার নাকি ছবিখানি পাড়ার কোন মেয়েদের চোখে সহসা পড়িয়া যায়। সুরেন্দ্রনাথ লজ্জায় রাঙা হইয়া তাড়াতাড়ি সে স্থান হইতে সরিয়া পড়ে, ইহা নিয়া তাহাদের পাশের বাড়ীর কোন মেয়ে এবং সহরের তরুণরা এবং কলেজের ছাত্রীরা রমলা ও কনক গাঙ্গুলী তাহাকে ক্ষেপাইতে কম কসুর করে নাই, তবু সে মুখ বুজিয়া সব সহ করিয়া যাইত। তাহার সর্বদাই মনে হইত, গরীবের আবার মান অপমান কি। পথে চলিলে ধনীর মােটর গাড়ীর কাদা সস্নেহে তাহাকে আলিঙ্গন করে, বৃষ্টি বৌদ্র তাহাকে অতিষ্ঠ করিয়া তােলে, সভ্য যুগের যান বাহন তাহার ঘাড়ে আসিয়া পড়িতে একটুও দ্বিধা বােধ করে না। অফিসে বড় বাবুর চোখ রাঙানি, গৃহে বুভুক্ষিত পরিবারের আর্তনাদ, পথে ঘাটে শত সহস্র সহনা, গঞ্জনা, ইহাই তাহার জগতে প্রাপ্য। অনাদর, উপেক্ষা, অপমান তাহার পদে পদে আছে। সুরেন্দ্রনাথ আর এসব কথা ভাবিতে পারে না।
কেরাণীর দুর্গোৎসব - ভােরবেলা সহসা সুরেন্দ্রনাথের ঘুম ভাঙিয়া গেল। আজ দুই তিন দিন তাহার নাওয়া-খাওয়া এক রকম নাই বলিলেই চলে। বেলা দশটায় কাঁটায়-কাঁটায় সে সিভিল সার্জনের অফিসে গিয়া হাজির। বুকের দুরুদুরু কাঁপুনি ক্রমশঃ বাডিয়াই চলিয়াছে, তবু কোনমতে আদমন করিয়া চুপ হইয়া সে বসিয়া রহিল। এমন সময় সাহেব উপস্থিত হইলেন। দলে দলে লােকজন দেখা সাক্ষাৎ করিয়া বাহির হইয়া আসিতে লাগিল। প্রায় যখন সকলেরই দেখাশােনা শেষ হইয়া গেল, এমন সময় সুরেন্দ্র- নাথের তলব হইল! সুরেন্দ্রনাথ অষ্টমী পূজার জীব বিশেষের মত কঁপিতে কঁপিতে সাহেবের ঘরে ঢুকিয়া দেখিল, গােল-গাল চেহারা, লালমুখের হাসি, দাড়ি গোঁফ কামানাে এক সাহেব চুপ হইয়া বসিয়া আছেন। সাহেবের মুখে মৃদু হাসি দেখিয়া সুরেন্দ্রনাথের প্রাণে জল আসিল। পরণে আধ ময়লা কাপড়, ছেড়া জামা, রুক্ষ, মলিন চেহারা, সজারুর কাটার মত বিপুল কেশদাম, সুরেন্দ্রনাথ অতি ধীরে একখানি টুল ভর করিয়া দাঁড়াইল। সাহেব নানা রকম প্রশ্ন ও পরীক্ষা করিয়া কোন অসুখ ঠিক করিতে না পারিয়া কহিলেন, আপনার কি অসুখ ? সুরেন্দ্রনাথ ধীরে ধীরে কহিল, জানিনা স্যার। তবে শরীর বড় দুর্বল, রাত্রিতে ঘুম নেই, ক্ষিধে নেই.. ••••••মনও এক এক সময় খুব খারাপ থাকে! সাহেব বাধা দিয়া কহিলেন, ওসব যাক। কিছুদিন আগে কোন কঠিন ব্যারাম হয়েছে কি ? আজ্ঞে না•••••• সাহেব বিস্মিত কণ্ঠে কহিলেন, না! এমুনি ভাব কতদিন থেকে হয়েছে ? -প্রায় মাস খানেক।
১৪০
গল্প, গল্প নয়
সাহেব একটু নড়িয়া চড়িয়া বসিয়া তীক্ষ দৃষ্টিপাত কলাি কহিলেন,
আমি তাে কত রকমে আপনাকে পরীক্ষা করলুম, কোনমতেই কিছু
বের করতে পাচ্ছিনে। আপনার হার্ট, ফুসফুস সবই ঠিক আছে। তবে
কেন মন হয়।
সুরেন্দ্রনাথ আমতা আমতা করিয়া কহিল, জানিনা স্যার।
জানেন না কি রকম। অসুখ আপনার, আর আপনি জানেন না,
তবে কি আমি জানব?
—সেই জন্যেই তাে স্যার আপনার কাছে আসা !
সাহেব মাথা নাড়িলেন, সে তাে সত্যি কথা !
একাগ্র মনে সব কথা শুনিয়া সাহেব নিবিষ্টচিত্তে একটুখানি ভাবিয়া
কহিলেন, আপনি বিয়ে করেছেন?
হা।
।
=
—আপনার স্ত্রী কোথায়? এখানে আছেন ?
-না, দেশে।
কতদূরে আছেন ?
-প্রায় চারশাে’ মাইল দূরে!
-কতদিন দেখা হয়নি ?
দু’ বছর।
সাহেব মৃদু হাসিয়া কহিলেন, Oh my God !
-দেশে যাননি কেন, ঝগড়া হয়েছে নাকি ?
-সাহেব, দুটি পাইনি, তাই যাওয়া হয় না। গেল বছরও আমার
বড় খুকী যখন মারা যায়•••••বলিতে বলিতে সুরেন্দ্রনাথ হাউ হাউ করিয়া
কঁদিতে লাগিল।
সাহেব তাহাকে হাতে ধরিয়া চেয়ারে বসাইলেন এবং নিজে জকুঞ্চিত
কেরাণীর দুর্গোৎসব ১৪১ করিয়া একটু চিন্তা করিয়া কহিলেন, সেই থেকে তােমার শরীর খারাপ ,••••••আচ্ছা, সেরে যাবে, কোন ভয় নেই। দিন কয়েক অন্য কোথাও থেকে ঘুরে এসাে, আমি তােমাকে পনেরাে দিনের ছুটি দিচ্ছি। আর কিছু টনিক ওষুধ খাওয়া মন্দ নয়, এই যে আমি লিখে দিচ্ছি। তােমার যত মানসিক অশান্তি!•••••• দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া সুরেন্দ্রনাথ সাহেবকে সব কথা খুলিয়া বলিল। সাহেব নিজেও প্রবাসী, চিরকুমার, বিরহের ব্যথা অতশত বুঝিতে না পারিলে ও জানেন। সব কথা শুনিয়া একটু মুখ টিপিয়া হাসিলেন মাত্র। সুরেন্দ্রনাথের পনেরাে দিনের ছুটি মঞ্জুর হইয়াছে। বেলা সাড়ে দশটায় ঢাকা মেল ছাড়ে। সুরেন্দ্রনাথ যখন ষ্টেশনে আসিয়া পৌছিল, তখন সাড়ে আটটার বেশী বাজে নাই। সােনালী রৌদ্রে পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায় ঝিলিমিলি খেলিতেছিল। পথে পথে বন করবীর ঝাড় ও দোপাটি অনাদৃত ভাবে ফুটিয়া রহিয়াছে। গাড়ী ছাড়িয়া যাইতেই জিতুদাস ও সতীশ রুমাল উড়াইয়া তাহাকে অভিনন্দন জানাইল। তাহাদের পূজার ছুটি হয় নাই। চির প্রবাসে থাকিয়া দিন কাটাইতে হইবে। মেডিকেল সার্টিফিকেট খানা বড় বাবুর হাতে আসিয়া পৌছিতেই তিনি একেবারে থ’ খাইয়া গেলেন। তাড়াতাড়ি সাহেবের কাছে ছুটিয়া যাইতেই সাহেব বিরক্তির সুরে বড়বাবুকে দু’ চারিটি গালি গালাজ করিয়া বিদায় দিলেন। জিতু দাস কান পাতিয়া সে সব কথা শুনিয়া ফেলিয়াছিল। বড় বাবুর সাথে দেখা হইতেই বড় বাবু ফোকলা দাত বাহির করিয়া কহিলেন, অনেক কষ্টে ছুটি মঞ্জুর করে নিয়ে এলাম••••••এই আপনাদের সুরেন বাবুর।
১১২ গল্প, গল্প নয় জিতুদাস ও তাহার সহকর্মীরা টেবিলের নীচে মুখ রাখিয়া হাসিতে লাগিল। বামুনডাঙার ঘাটে একখানি নৌকা ভিড়িতেই মিলু ও হরিহর সাড়া পাইয়া ছুটিয়া আসিয়াছে। ঘােষাল বাড়ীর সপ্তমী পূজার পাঠা স্নান কানাে হইয়াছে, সেখানে যত ছেলেমেয়ের ভিড়,••••••রমাপুতি মায়ের মণ্ডপে মাথা ঠেকাইয়া পড়িয়া রহিয়াছেন, যজ্ঞেশ্বর ঢাকীর জোর কাটিতে গ্রাম সরগরম হইয়া উঠিয়াছে। পিসীমার তাড়নায় কমলা প্রতিমা দেখিতে আসিয়াছিল। মােক্ষদা মাসী নদীর ঘাটে স্নান সারিয়া এই মাত্র ফিরিয়া আসিয়াছেন। তাহার কাছে সুরেন্দ্রনাথের আগমনবার্তা শ্রবণ করিয়া উপস্থিত সকলেই চঞ্চল হইয়া উঠিলেন, কমলার কথা আর ভালাে করিয়া না বলিলে ও চলে বােধ করি। চাটুয্যদের চণ্ডীমণ্ডপে তখন আরতির বাদ্যের বাজনা শােনা যাইতেছিল, ধিতা ধিন্ ধিন্ ধিন্•••••জগাই ঢুলি বাবরী চুলের গােছ নাড়াইয়া নাচিতে নাচিতে ঢাক বাজাইয়া নিজেও মুখে বােল দিতেছিল, ধিতা ধিন্•••••ধিতা ধিন্•••••তাধিন্ তাধি, ••••• এহেম চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসরাজী সম্বন্ধে সাহিত্য-সাধনায় সফলতা লাভ করে, এই কামনা করি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ২৮১১। লেখকের অনুভূতি বিশ্লেষণ এবং বিন্যাস কৌশল প্রশংসনীয়- আনন্দবাজার মহামহােপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী পূর্বাভাষে বলিয়াছেন,-লেখকের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙ্গলা সাহিত্যের অধ্যাপক ডক্টর মুদ শহীদুল্লাহ, এ, এ., বি. এ, ডি-লিটু, ডিপ্লোফোন (প্যারী) মহােদয় বলেন,—শিলঙের প্রিয়দর্শন কবি শ্রীমান্ হেম চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসরাজী স্বপ্নলােকের স্মৃতিবিজড়িত ছন্দে গাঁথা কথা ও কাহিনী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলার, ভক্টর রমেশচক্র মজুমদার এ. এ., পি-এইচ. ডি. মহােদয় বলেন, গতানুগতিক ভাব ত্যাগ করে তুমি একটি নূতন পথে অগ্রসর হছে। শ্ৰীযুক্তা ইন্দিরা দেবী বলেন, তােমার সােণার লেখনী জয়যুক্ত প্রবীণ সম্পাদক (দেশ) শ্রীযুক্ত বঙ্কিমচন্দ্র সেন বলেন, শ্ৰীযুক্ত হেম চট্টোপাধ্যায় প্রাণের সকল দরদ দিয়ে লিখেন। অর্থাৎ বিভিন্ন ইন্দ্রিয়ে অগ্নিময় আকুতি তাহার অনুভূতিতে উদ্দীপ্ত হইয়া উঠে। তার লেখা ফাকা অনুকৃতি নহে,•••••ইনি সত্যকার দৃষ্টি পেয়েছেন এই হিসাবেই স্রষ্টা এবং সাহিত্যিক।
COMPLETELY DEPENDABIL
.
ben
ET APPOINTMENT
WATCHES
Guglo:lucina
NATIONALLY KNOWN
CAVALRY - BRIGADE
ANGLO-SWISS WATCH
07 DALHOUSTE
SQARE, CALCUTTA
মতের শেষ কথা।
ठा
.
দেশবাসীর এই অনাবিল প্রশংসা আমাদের উৎসাহ ও আনন্দবন্ধন করে
আসছে এক শতাব্দীর উপর। এর মূলে রয়েছে আমাদের একনিষ্ঠ সাধনা
কারিগরগণের অননুকরণীয় নৈপুণ্য ও তদুপরি আমাদের বিশুদ্ধ ও উৎকৃষ্ট
উপকরণ।
৪
WORD
82
CONTES
R
এs।
ERIES
এত
নাত
EHIMLAC)
Girl
BHIM NAG
ে on www
• • • •
••••••
৬ ও ৭, ওয়েলিংটন ষ্ট্রীট, বি, বি, ১৪৬৫
৪৬, ট্রাও নােঙ, বি, বি, ৩৩৭৮
৬৮, আশুতােষ মুখালী নােভ
পি, কে?
কষ্টেলি দরে বীজ বিক্রয় হয়
নমর্পন
জাজে
টাটুকাস
কলেজ প্লট মার্কেট
কলিকাতা
কৃষিলক্ষণী পত্রিকার সম্পাদক ও গ্লোব নার্শরীর স্বত্বাধিকারী
শ্রীঅমরনাথ রায়, এফ, আর, এইচ, এস (লণ্ডন)
প্রণীত
কয়েকখানি উৎকৃষ্ট কৃষিপুস্তক
১। বাংলার সঙ্গী
৫। সরল পৌী পালন
২। চাষীর ফসল
। আদর্শ ফলকর
৪। পুপােদ্যান
২•
২০
২০ ৬। মাছের চাষ
২০ ৭। পশু খাদ্যের চাষ
২০ ৮। সরল সারের ব্যবহার
১
১•
কৃষিলক্ষ্মী মাসিক
|
বার্ষিক সডাক
৩০
ক্যালকাটা কমার্শিয়াল ব্যাঙ্ক লিঃ
১৫, ক্লাইভ ষ্ট্রীট, কলিকাতা
ব্রা:
কলিকাতা—বড়বাজার, হাওড়া, কালীঘাট, মাণিকতলা, শ্যামবাজার
বেঙ্গল-বরাকর, বরিশাল, ঢাকা, জলপাইগুড়ি, কৃষ্ণনগর, মালদা,
ময়মনসিংহ, নবদ্বীপ, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংহদি, রাজশাহী,
সিরাজগঞ্জ, বগুড়া
নির—ভাগলপুর, চাইবাসা, দেওঘর, দুমকা, গয়া, হাজারীবাগ,
কাটিহার, মুঙ্গের, মুজাফরপুর, পাটনা, রাঁচী, সাকচী
( জামসেদপুর), সাহেবগঞ্জ
আসাম-গৌহাটী, জোড়হাট, করিমগঞ্জ, শ্রীহট্ট, তেজপুর
ইউ, পি-বেনারস
স
অনুমােদিত মূলধন শূন্যান্ত সংখ্যায় ৫০,০০,০০০
বিক্রীত মূলধন
১৪,৬৫,০৩,
আদায়ীকৃত মূলধন
১৪,২৫,০০০
৬,৬০,০০০
মজুত তহবিল
জে, এন, সেন, বি, এ, এফ, আর, ই, এস (লণ্ডন)
এস, ও
জেনারেল ম্যানেজার
ম্যানেজিং ডিরেক্টর
Jai Hind
Abdul Hussain Hassanbhoy & Co.
IRON, HARDWARE, PIPE, FITTINGS
and
MACHINERY MERCHANTS
Stockists of
RICE, FLOUR & OIL MILL STORES
BELTINGS AND GENERAL ORDER
SUPPLIERS
Telegram: "PROPRIETOR"
Telephone : CAL. 1641
Post Box No. 28
93-2, CLIVE STREET, CALCUTTA
বন্ধু-বান্ধবের অভাব হয় না
যদি আপনি আপনার সুসময়ে কিছু কিছু সঞ্চয় করে ব্যাঙ্কে
গচ্ছিত রাখেন। আপনার আর্থিক সচ্ছলতার বন্ধুকে
সুনিয়ন্ত্রিত করিতে পারে একমাত্র বিপুল অর্থসঙ্গতি সম্পন্ন
সুপ্রতিষ্ঠিত ও সুপরিচালিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান
দার্জিলিং
ব্যাঙ্ক
লিঃ
হেড অফিস-ভবানীপুর-কলিকাতা।
ব্রাঞ্চ
ভারতের প্রধান প্রধান ব্যবসাকেতে
ঐদ্বিজেন বসু
শ্ৰীবীরের মুখার্জী
ম্যানেজিং ডিরেক্টর
ডিরেক্টর-ই-চার্জ
7: "Rainbow-Cal, :
ফোন : পি, কে, ২৬৮১
ছােটদের কয়েকখানি ভাল বই কামালের গ দশ সতীকুমার নাগ তুর্কীবীর কামালের জীবন চরিত- ছােট ছােট ছেলেমেয়েদের জন্য সরল ভাষায় লেখা—মূল্য চৌদ্দ আনা হেমেন রায়—পতির রত্নপুরী-মূল্য ১১ হেম চট্টোপাধ্যায়—ভণ্ডুলরামের দিগ্বিজয়—মূল্য ১১ সবিতা দেবীরণামূল্য আশুতােষ বন্দ্যোপাধ্যায়—দিন দুপুরে ডাকাতি—মূল্য ৫০ আশুতােষ বন্দ্যোপাধ্যায়-অমৃতের সন্ধানে—মূল্য পy বিমলাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়—মাঠের বাড়ীর ভুত—মূল্য ৬০ কো-অপারেটিফ বুক ডিপাে কলেজ স্ট্রীট, কলিকাতা দি ত্রিপুৱা মডার্ণ ব্যাঙ্ক লিমিটেড (সিভিউ ও ক্লীয়ারিং) পৃষ্ঠপােষক : ত্রিপুরাধিপতি এইচ, এইচ, দি মহারাজা মাণিক্য বার কে, সি, এস, আই প্রধান অফিস :-আগরতলা (ত্রিপুরা ষ্টেট) রেঃ অফিস-আখাউড়া। কলিকাতা শাখাসমুহঃ ১০২১, ক্লাইভ ষ্ট্রীট, ২০১, হারিসন বােড়, ৫৭, ক্লাইভ ষ্ট্রীট, ১০৯, শােভাবাজার স্ট্রীট অন্যান্য শাখাসমূহ: গৌহাটী শিবসাগর মৌলবীবাজার হাইলাকান্দি আজমীরিগঞ্জ শিলচর মেদিনীপুর জলপাইগুড়ি বদরপুর শ্রীহট্ট ময়মনসিংহ নর্থ, লখীমপুর বাজিতপুর ইম্ফল নবদ্বীপ নেত্রকোণা ঝাড়গ্রাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া তেজপুর নারায়ণগঞ্জ করিমগঞ্জ চট্টগ্রাম পুরী কুটি কুমিল্লা চাঁদপুর ঢাকা টাঙ্গলা কেঁচুগঞ্জ কুলাউরা ঢেকিয়াজুলি গােলাঘাট ডিব্ৰুগড় কিশােরগঞ্জ মঙ্গলদই হবিগঞ্জ শিলং শীঘ্রই তিনসুকিয়া শাখা খােলা হইবে সকল প্রকার ব্যাকিং কার্য করা হয়। রাজসভাভূষণ-হরিদাস ভট্টাচাৰ্য, ম্যানেজিং ডিরেক্টর মঙ্গল
Phone : Cal. 2492
S. K. CHAKRAVARTI LTD.
MISSION ROW
CALCUTTA
Consult us:
for
Modern Bathroom
Town Water Supply
&
Drainage
স্নানের জন্য
পা ই ল ট
সুগন্ধি গায়ে মাখা সাবান
বঙ্গলক্ষ্মী সােপ ওয়া লিঃ
হেড অফিস-১১, ক্লাইভ বাে, কলিকাতা।
ঐ
স
ভারতের রূপচর্চার
ভাণ্ডার থেকে উদ্ধৃত
pas
আধুনিক যুগের ঠিক আগে
গত এলানের সবচেয়ে রাষী ও
কালো উপায়ণগুলি এটা বলে
পশি রপ্তানী হত। অতপনে পৃথিবীর সকল
দেশের মেয়েরা এত্যের কাছেই চার শিক্ষানবিশ
হে। দূর অতীত যুগেও ভারতীয় মেয়েরা প্রেসাধন
। সামগ্রী ব্যবহারে সুনিপুণ হিল ভার বহু প্রমাণ পাওয়া যায়
ভারতের এগতিহাসিক নগরগুলির শে। রতীয়
পায় তার থেকেই প্রাচীন একটি প্রক্রিয়ায় সাহায্যে
ও প্রাপ্য উপাদানে তৈরি সম্ভ-মালতী আধুনিকারে
পকে অগনি একটি প্রাণী। এই রসমালতী এবারে
কে পরিত, পরিও করে তােলে। এণ, শােমণের
নীতি এবং মেচেতা কৃষ্টি করে। মুখের চামায় লাবণ্য
তােলে। ফলত ৰারের পর পাতায়
নেপৰে ।
৪ |
asant
বসুজ্জাল
©
पाव वाली
দিকে কেন এত কোং লিঃ
शन कनिकाज
6
প্রত্যেক খানি বন্দিরা,রাধারাণী
শরৎ পীর
প্রথarm
বার্ষিক
জা
'
পূৰ্ব্ব পূৰ্ব্ব বৎসরের মত
এবারও পূজার আগেই বাংলার শিশুমহল সরগরম করিবে
প্ররিইয়াছে,
অনিন নই
কপালকুণ্ডলা
চন্দ্রশেখর
রাজসিংহ
রজনী
দেবীচৌধুরাণী
যুগলাঙ্গুরীয়
সংক্ষেপিত
गा
মালা
একটাকা,
শীবজনবিহারী ভট্টাচার্য সম্পাদিত
আশুতোষ লাইব্রেরী
৫ নং কলেজ স্কোয়ার, কলিকাতা
বঙ্গলক্ষ্মী আয়ুৰ্বেদ ওয়ার্কস
হেড অফিস—১১, ক্লাইভ রাে,
লিগ।
মহাসারিবদ্যরিষ্ট
রক্ত শােধক ও বলবর্ধক সালমা
ব্রাহ্ম্য রসায়ন
মেধা ওতিশক্তিবর্ধক
রসায়ন
বিশুদ্ধ স্বর্ণঘটিত
মকরধ্বজ
সর্বরােগের মহৌষধ
Telephone : Park 597
Telegrams : TRUDELE
P. C. CHANDA & Co. Ltd.
11-IA, BECHULAL ROAD, ENTALLY
CALCUTTA
Manufacturers of
PAINTS, COLOURS, VERNISHES
WATERPROOFING
COMPOUNDS
২০ ২|| নেতাজী সুভাষ বসু প্রণীত দুইখানি বই অধ্যাপক চারু চন্দ্যোপাধ্যায় তরুণের স্বপ্ন বনজ্যোৎস্না (য় সং) ৩ মুতনের সন্ধান যাত্রা সহচরী ৩, বিশ্বেশ্বর দাস এম-এ প্রণীত মােহিতলাল মজুমদারের রাষ্ট্রপতি সুভাষচন্দ্র (জীবন ও বাণী) ও বিচিত্র কথা অধ্যাপক প্যারীমােহন সেনগুপ্ত প্রণীত বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ের বিপ্লবী সুভাষ ও আজাদ রিয়েলিষ্ট রবীন্দ্রনাথ (২য় সং) ১০ হিন্দ ফৌজ মূল্য ৩০ টাকা সাহিত্য সম্রাট শরৎচন্দ্র প্রণীত নিত্যস্বরূপ ব্রহ্মচারীর সম্পাদিত স্বদেশ ও সাহিত্য (২য় সং) শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত শৈলজানন্দ মুখােপাধ্যায়ের সাধক কণ্ঠহার (৫ম সং) ১০ খরস্রোতা (২য় সং) নাট্যকার মহেন্দ্রগুপ্ত এম-এ প্রণীত আকাশ কুসুম (২য় সং ২॥ মঞ্চে ও নেপথ্যে ৩ নারীজন্ম (২য় সং) সৌরীন্দ্র মুখােপাধ্যায় প্রণীত মানিক ভট্টাচার্যের লেক রােড (২য় সং) ৩, মালতি ও বিভুতি (২য় সং) ২১ যতীন্দ্র মােহন সিংহ অনাথ বন্ধু বেদজ্ঞের শাশ্বতী সন্ধি উপন্যাস অজয়েন্দ্রনারায়ণ রায়ের উপন্যাস উৎপলেন্দু সেনগুপ্ত বিজিতা অভ্রছায়া দেবদাস ঘােষ প্রণীত প্রবীণ হেড মাষ্টার সারদা চরণ দত্ত অমরার অমৃত সাধনা প্রণীত ও অধ্যাপক ক্ষিতিমােহন সত্যচরণ চক্রবর্তীর সদ্যপ্রকাশিত সেনগুপ্তের ভূমিকা সম্বলিত ছেলেদের নােমাঞ্চকর উপন্যাস জীবন সন্ধা অদ্ভুত ভাগ্যচক্র ১০ গুরু লাইব্রেরী ২০৪, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
Jalan Industries Ltd.
THE PIONEER
IN DEVELOPING
COTTON TEXTILE
INDUSTRY
I N A S S AM
With Compliments
of
Power Tools
&
Appliances Co.
2, Dalhousie Square East,
CALCUTTA
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.