Makardah Saraswat Library, Howrah

Prithibir Prem

Bhattacharya, Sri Prithbishchandra · 2009/08/24

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

পৃথিবীর প্রেম
শ্রীপৃথ্বীশচন্দ্র ভট্টাচাৰ্য্য
১১.৫
বুক করপােরেশন লিমিটেড,
৫এ, অবানী দত্ত লেন
কলিকাতা-৭

প্রকাশ কৰেছেনঃ-
ঐশঙ্করী প্রসাদ ঘােষ
বুক করপােরেশন লিমিটেড
৫এ, ভবানী দত্ত লেন,
কলিকাতা।
ছাপিয়েছেন :-
অমল চন্দ্র মােৰ
কপােতাক্ষী গ্রিটিং ওয়ার্কস
৭২, কর্ণওয়ালিশ খ্রীট
কলিকা-
বাঁধিয়েছেন :-
ন্যাশনাল বাইণ্ডা
৮২ ভবানী দত্ত লেন
প্রচ্ছদপট শিল্পী :-
কামাখ্যা বসাক
মূল্য তিন টাকা মাত্র

অশোক ওষুধের শিশি হাতে দ্রুত বাড়ীর দিকে চলিতেছিল- তাহার মায়ের বড় অসুখ, সম্ভবত নিউমােনিয়া। বিধবা মাতা, তাহার একমাত্র সন্তান অশােক। বহু কষ্টে দুঃখে সামান্য কয়েক বিঘা জমি ও বসতবাটীর উপর নির্ভর করিয়া তিনি ছেলেটিকে মানুষ করিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন। অশােক এবার প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করিয়াছে,—কিছুদিন হইল সংবাদ আসিয়াছে। অশােক আর তাহার মাতা ছাড়া তাহাদের আর কেহ নাই, তবে কয়েকজন সহৃদয় প্রতিবেশী আছেন একথা অস্বীকার করা যায় না, যাহারা সর্বদাই অশােক ও তাহার মাতার ব্যবহারে পরিতুষ্ট হইয়া সময়ে অসময়ে সাহায্য করিয়াছেন। অশােক তাহাদের গ্রাম কল্যাণপুরে পায়ে চলা পথ দিয়া দ্রুত যাইতেছিল, পথে প্রতিবেশী খুড়া মহাশয়ের সঙ্গে দেখা। তিনি বলিলেন, অশােক তোমার মা কেমন ? অশােক সংক্ষেপে কহিল, বুকের ব্যথাটা বাড়ছে। -সেরে যাবে, ব্যস্ত হয়াে না। তবে তােমাকে একটা সু-খবর জানাচ্ছি। এই চিঠিটা পড়, হরিদাস লিখেছে তুমি এলপানি পেয়েছ। পড়া ছেড় না,-পড়-উন্নতি হবে। পৃথিবীর এ-১ স্কলারশিপ পাইয়াছে—এত বড় একটা সাফল্যের সংবাদও তাহাকে খুশী করিতে পারিল না। মায়ের জন্যে তাহার বড়ই দুশ্চিন্তা-মা ব্যতীত তাহার ত কেহ নাই। যদি মাতার জীবন আজ শেষই হয় তবে পৃথিবীতে দাড়াইবার স্থান তাহার নাই। জীবনের কোন অর্থ আর থাকে না— সে দ্রুত বাড়ী আসিয়া পৌছিল। স্বল্পান্ধকার একখানা খড়ের ঘর, পূবে ও দক্ষিণে দুইটি অতি ক্ষুদ্র জানালা, তাহাও লাউ কুমড়ার মাচায় পরিবেষ্টিত। ঘরের একপাশে দুইখানি তক্তপােষ, অন্যদিকে হাঁড়ি কলসী প্রভৃতি বােঝাই। বেলা দশটা হইবে কিন্তু গৃহের মাঝে রাত্রির অন্ধকার যেন তখনও বাসা বাঁধিয়া আছে। অশােক ঘরে ঢুকিতে মাথায় চৌকাটটা লাগিল,-সে উঃ করিয়া উঠিতেই মাতা প্রশ্ন করিলেন,লাগলাে ? -না। —একটু সাবধানে চলতে হয় বাবা! অশােক রুগ্না মাতার শিয়রে বসিয়া কহিল,-এই অষুধ খেয়ে নাও, এক্ষুনি বেদনা কমে যাবে- মাতা কহিলেন,-অষুধে আর কি হবে বাবা! ও খেয়ে বলি, মানুষ বাঁচে তবে রাজা রাজড়ার ঘরে লােক মরবে কেন? -খাও না,খুব ভাল খবর দেব- -খেয়ে ফেল আগে মাতা অনিচ্ছা সত্ত্বেই অষুধটা খাইলেন। তাহার, পর বিস্বাদ মুখখানিকে পুছিয়া কহিলেন, কি খবর, বল ? —আমি দশটাকা জলপানি পেয়েছি সংবাদটা শুনিয়া মাতার আনন্দিত হইবার যথেষ্ট কারণই ছিল; কিন্তু তিনি কিছুক্ষণ নীরবে থাকিয়া চোখের জল ছাড়িয়া দিলেন- অশােক ব্যাকুলভাবে প্রশ্ন করিল,তুমি কাঁদছ মা? -না। একটা দীর্ঘশ্বাস মুক্ত করিয়া দিয়া কহিলেন,-বাঁচি আর নাই বাঁচি, তাের:ত আর পড়া হবে না! কত গাধা ছেলে টাকার জোরে পড়ছে—আর মাতা কথাটা সমাপ্ত না করিয়া আবার চোখের জল ছাড়িলেন এবং বুকের বেদনাটা যেন সহসা বাড়িয়া গিয়াছে এমনি ভাবে পাশ ফিরিয়া শুইলেন। অশােক বিহ্বলের মত বসিয়া রহিল,সত্যই পড়া তাহার হইবে না। গ্রামের স্কুলে পড়াই তাহার কতবার বন্ধ হইয়াছে, ওদিকে শিক্ষকগণ ও এদিকে প্রতিবেশীগণ কোনমতে চালাইয়া লইয়াছেন। কলেজে পড়া ত দুই-এক-টাকার কথা নয়। অশােক অনেকক্ষণ কি যেন ভাবিয়া যাইতেছিল হঠাৎ মা ডাকিলেন,- •অশােক,-শােন—আমি আর বােধ হয় বাঁচবাে না,-বাঁচবার ইচ্ছাও আমার আর নেই, ভগবানের কৃপায় তুই পাশ করেছি- অশােক জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল,-মাতা বলিলেন,- একটা কথা তােকে বলে যাই- -আমি যদি নাই সেরে উঠি ভাই বলছি। আমার এক ।

দাদা আছেন—মামাত ভাই -আমাকে আপন বোনের মতই ভালবাসতেন। আমি যখন থাকবে না তখন সেখানেই যাস- যদি তিনি পড়ান তবে পড়িস- অশােক বিস্মিত হইয়াছিল, তাহাদের কোন আত্মীয় ত্রিভুবনে আছেন এমন কথা মায়ের মুখে সে কোনদিন শােনে নাই। সে কহিল, -সে কে মা? এতদিন ত বলনি ? -না, গরীবের আত্মীয় থাকে না। তাই বলি নি। কলকাতার নামকরা ডাক্তার বিভাস বােস, বিলেত ফেরৎ, সরকারী টাকায় বিলেত গিয়ে পাশ করে এসেছে। তার নাম ত শুনেছি। -হা,–তাকে বলিস, আমি ‘দুলুর ছেলে। তা হলে অনাদর করবে না- -অত বড়লােক -কিন্তু শুধু টাকায় নয়, মনেও। অমন মহৎ অন্তর হয় না —কিন্তু একটা কথা-তাের বাবা শেষ বয়সে একটা কথা বলতেন সেটা মনে রাখিস,- -কি ? -তিনি বলতেন, আমার ছেলে না খেয়ে মলেও যেন ভিক্ষা করে ! টাকা কড়ি নয়—দয়া বা অনুগ্রহের প্রার্থী তুই যেন হস, এই ছিল তার ইচ্ছা- অশােক দৃঢ় কণ্ঠে কহিল,-র সে ইচ্ছা পূর্ণ ক’রবাে মা। -হ্যা, বিভাসদার কাছে রুবী জানা-অনুগ্রহ চাস না।

তিনি বলতেন, জীবন দু’দিনের—তার জন্যে আত্মমর্যাদাকে যারা হারায় তারা মানুষই নয়। -মাতার কঠোর জীবন যাত্রা ও সংযমের অর্থ আজ অশােকের নিকট সুপরিষ্কৃত হইয়া গেল। সেইজন্যে জীবনে তিনি কখনও কোন আত্মীয়ের নাম মুখে উচ্চারণ করেন নাই, এবং দীর্ঘ উপবাস করিয়াও কাহার দ্বারস্থ হন নাই। নিষ্ঠুর পৃথিবীর উপর একটা দুরন্ত অভিমানে তিনি যেন আপনাকে দগ্ধ করিয়া ভস্ম করিয়াছেন কিন্তু আপনার অন্তরে ভিক্ষালব্ধ শাস্তি বারি সেচন করিয়া পরিতৃপ্তি পাইতে চাহেন নাই। মা কহিলেন,—বৃথা অষুধ অষুধ করছিস কেন? যা, যা হয় দু’টো সিদ্ধ করে নিয়ে খা- অশােক উঠিয়া গেল কিন্তু তাহার অপরিণত কল্পনা মায়ের কথা কয়েকটিকে হৃদয়ের মাঝে বেগবান করিয়া তুলিল। * কাল রাত্রি হইতে মাতা সংজ্ঞা হারাইয়াছেন— অশােক সারারাত্রি মাতার অজ্ঞান দেহটির শিয়রে বসিয়াছিল- ডাক্তার ডাকিতে গিয়াছে কিন্তু তিনি সকালে আসিবেন বলিয়া- ছেন। সে ঔষধ খাওয়াইয়াছে আর নিশীথ রাত্রির গ্রাম্য স্তব্ধতা ভেদ করিয়া সজল চোখে কম্পিত কণ্ঠে মাঝে মাঝে মৰ্ম্মভেদী ডাক দিয়াছে—মা-মাপ্তি মা জবাব দেন নাই। অশােক কঁদিয়াছে, চোখের জল মুছিয়া আবার ডাকিয়াছে, ঔষধ খাওয়াইতে চেষ্টা করিয়াছে এই মাত্রইহার বেশী সে বুঝে নাই করেও নাই- সকালে প্রতিবেশী খুড়ামহাশয় আসিয়া নাড়ী দেখিলেন এবং অশােককে কহিলেন,-তুই যা বাবা ডাক্তারকে ডেকে আন্, ঔষুধও নিয়ে আসি, আমি বছি বৌ-ঠাকরুণের কাছে অশােক তাড়াতাড়ি ডাক্তারের ওখানে গেল—ডাক্তার কয়েকজন রােগী দেখিয়া ঔষধ দিতে ব্যস্ত--অশােককে দেখিয়াও যেন দেখিতে পান নাই। অশােক কহিল, এবার চলুন প্রতাপ কাকা। ডাক্তার বাবু হিসাবের বই খুলিয়া কহিলেন,--- দশটাকার বেশী হয়ে গেছে, কি এনেছ ? -এখন আনতে পারিনি, মা ভাল হলেই দিয়ে দেব অর্থাৎ ভাল না হলে দেবে না-এই ত । - নিশ্চয় দেব—চলুন কাকা, ওষুধ-মা কথা বলছেন না- প্রতাপ ডাক্তার চুপ করিয়া রহিলেন, অশােক আবার কাতর আবেদন করিল,—অষুধ দেন, যেমন করে পারি দাম দেব- প্রতাপ ডাক্তার একটু হাসিয়া কহিলেন,-অষুধে আর কি করবে ? এটা যে আমার ব্যবসা, দানধৰ্ম্ম করলে আমার চলবে কি করে-- -আমার এত বড় বিপদপরে নিশ্চয়ই বিপদ না হলে লােকে আমাদের কাছে আসে না- বুঝলে। টাকাটা নিয়েই তা হলে আসা দরকার

মানুষ মানুষের এমন বিপদের সময় যে এতদূর নিঃস্পৃহ
থাকিতে পারে তাহা অশােক জানিত না তাই সে ক্ষোভে দুঃখে
অত্যন্ত উত্তেজিত হইয়া উঠিল। উঠিয়া দাঁড়াইয়া কহিল,
দেবেন না?
প্রতাপ ডাক্তার চশমার ফাঁকে চাহিয়া একটু হাসিলেন।
অশােক চলিয়া আসিল—আসিতে আসিতে রাগে দুঃখে সে বার
বার ভাবিল, যেমন করিয়াই হােক জীবনে ডাক্তার হইতে হইবে
দীন আৰ্ত্ত তাহাদের মত যাহারা তাহাদিগকে বিনামূল্যে
চিকিৎসা করিবে—কি দীন অন্তর ওই নর পিশাচের।
অশােক বাড়ীতে ফিরিয়া দেখে প্রতিবেশিনীগণ উঠানে
দাড়াইয়া কঁদিতেছেন – ঘরের মধ্যে ভীড়। সে ঘরে ঢুকিতে
চেষ্টা করিল কিন্তু দরজার ভিতর দিয়া তাহারই মাতাকে সকলে
অন্তিম নাম শুনাইতে শুনাইতে বাহিরে আনিতেছে।
অশােক দাঁড়াইয়া রহিল–মা মারা গিয়াছেন। চাক্ষুষ
ঘটনাকেও সে বিশ্বাস করিল না, সে ডাকিল,-মা—মাগাে-
চারিপাশের কোলাহল ও কান্নার রােলের মাঝে তাহার কণ্ঠ
শােনা গেল না-
যন্ত্র চালিতের মত অশােক শ্মশানে গিয়াছিল,-প্রতিবেশীগণ
যাহা বলিয়াছেন সোহাই করিয়াছে। যে মায়ের মুখের একটু
কথা কত দুঃখ বেদনাকে মুছাইয়া দিয়াছে, নৈরাশ্যে উৎসাহ

ধ
দিয়াছে সেই মায়ের মূক মুখে সে বহ্নিসংযােগ করিয়াছে। যে
করুণ কোমল কল্যাণ হস্তখানি তাহাকে এতদিন ঘিরিয়া রাখিয়া-
ছিল, যে বুক নিঃসৃত পীযুষ ধারা তাহার দেহমনকে পরিপুষ্ট
করিয়াছে তাহা ধীরে ধীরে ভস্মতূপে পরিণত হইল—সে স্বচক্ষে
চাহিয়া চাহিয়া দেখিয়াছে।
দীর্ঘকাল কৃচ্ছসাধন করিয়া সে মায়ের পারলৌকিক কাজ
করিয়াছে, -মায়ের তৃপ্ত্যর্থে মন্ত্রোচ্চারণ করিয়াছে—এমনি
করিয়া শ্রাদ্ধাদিও সমাপ্ত হইয়া গিয়াছে।
জ্ঞাতিভােজনের পরদিন সকালে উঠিয়া সে প্রথম বুঝি,
এই বিপুল বিশ্বে সে একা একান্তই একা-বাঁচিবার আকর্ষণ
নাই, মরিবার তাড়া নাই, কাজের প্রয়ােজন নাই, জীবনের কিছুই
নাই—সে কি করিবে ?
গৃহ, অঙ্গন, বৃক্ষপত্র ধুলিকণা সমস্ত পার্থিব পদার্থের উপর
মাতার অপার্থিব স্নেহস্পর্শ-স্মৃতি শিশিরের মত স্বচ্ছ সজল ভাবে
পড়িয়া আছে।
আছে। অশােক তাহার মনের মাঝে তাহা গণিয়া
গণিয়া কৃপণের মত সঞ্চয় করিতেছিল...
সহসা পাড়ার খুড়ােমহাশয় আসিলেন। বারান্দায় জল
চৌকীটা লইয়া বসিয়া কহিলেন—আজ আর তােকে রাঁধতে
হবে না অশােক, তাের খুড়ী বলেছে সেখানেই খাবি।
অশােক অবাক হইয়া চাহিল।
-সকালে কিছু খেয়েছিস ?
-না।

– তবে চল, দুটো মুড়ি চিড়ে খেয়ে নিবি-সেখানেই কথা
ব’লব। খুড়ামহাশয় অশোককে সঙ্গে করিয়া বাড়ী লইয়া
গেলেন।
খুড়ামহাশয় কিছু উপদেশ দিলেন তাহার সারমর্ম এই যে
সে ভালছেলে পড়াশুনা করাটাই তাহার কর্তব্য। তাহার মামা
বিভাস বসুর নিকট যাইয়া পড়িলে তিনি ফেলিতে পারিবেন না।
অতএব তাহার সেখানেই যাওয়া কর্তব্য।
উপদেশের ফলে অশােকের বজ্রাহতের মত বিমূঢ় ভাবটা
কাটিয়া গেল তখন মনে পড়িল,—ডাক্তার হইতে হইবে, তাহার
মত যাহারা তাহাদের সেবা করিতে হইবে। আর পিতামাতার
ইচ্ছানুযায়ী ভিক্ষার্থী জীবনে সে হইবে না।
আরও দুই চারিদিন গেল,অবশেষে সে কলিকাতা যাওয়া
স্থির করিল। যদি পড়া সম্ভব নাই হয় তবে ফিরিয়া আসিতে
কতক্ষণ!
বিভাস বােস্ নাম করা ডাক্তার।
ভবানীপুরে বিরাট বাড়ী,প্রচুর উপার্জন। সংসার তাহার
ক্ষুদ্র, স্ত্রী ও দুইটি মেয়ে - লিলি আর মিলি। তাহারা কলেজে
পড়ে। বিভাস বাবু ডাক্তার এবং ডাক্তারই। বাহিরে
সাহেব কিন্তু ভিতরে একেবারে বাঙালী। সংসারটি তাহার
মনে প্রাণে এ্যাংলো বেঙ্গলী।

১০ বিভাস বাবু লােকটি একটু অসাধারণ। ডাক্তারী ব্যবসায়ের বাহিরে তাহার স্বতন্ত্র কোন সত্ত্বা নাই-স্ত্রীই সংসার চালান। খাইতে দিলে খাওয়া হয়, না খাইতে দিলে হয় না-ব্যক্তিগত জীবনে তঁাহার খাওয়া ও না খাওয়ার মধ্যে পার্থক্য বিশেষ কিছু নাই। লােকটি অত্যন্ত উদার এবং ভুলাে মন। তাহার আয় কত তাহাও তিনি জানেন না, খরচ কত তাহা ত জানা সম্ভবই নয়। স্ত্রীটি আধুনিক এবং উচ্চশিক্ষিতা তিনিই সর্বেসর্বা। ডাক্তারীর ফাঁকে যে সময় তঁাহার জুটে তাহাতে তিনি বিরাট বিরাট ডাক্তারী কেতাব খুলিয়া পড়েন এবং সে পড়াটা এত সাংঘাতিক যে কাণের কাছে চড়কপূজা হইয়া গেলেও তিনি তাহা ঠিক পান না - অশােক সকালে কলিকাতা পৌছিয়া ঘুরিয়া ঘুরিয়া যখন বিভাস ডাক্তারের বাড়ীতে আসিয়া পৌছিল তখন ৯||টা হইবে । একটা টিনের সুটকেশে তাহার সামান্য গ্রাম্য কাপড় জামা লইয়া সে আসিয়াছে,-বিভাস বসুর বিরাট ড্রইং রুমের একপাশে একটা বেঞ্চিতে সে বসিয়া ছিল, কত রােগীর ভীড়। তিনজন সহকারী সহ ডাঃ বােস নানা রােগী দেখিতেছেন। অশােক কলিকাতায় আসিয়া বিস্মিত হইয়াছিল,—ডাক্তার বােসের ঐশ্বৰ্য্য ও আড়ম্বর দেখিয়া ততােধিক বিস্মিত হইয়া চাহিতেছিল, কিন্তু একটা ঘটনা তাহাকে অধিকতর বিস্মিত করিল,-একটি দরিদ্র ব্যক্তি তাহার বাড়ীর একটি রােগীকে দেখিবার জন্যে কাতর প্রার্থনা করিল এবং রােগীর অবস্থা === অত্যন্ত আশঙ্কাজনক জানাইল। ডাঃ বােস সমস্ত কাজ ফেলিয়া তাহাকে দেখিয়া আসিলেন এবং বিনা পয়সার তাহার ঔষধও দিলেন। গ্রামের প্রতাপ ডাক্তারের কথা তাহার মনে হইল এবং এই মহত্ত্ব ও উদারতা তাহাকে এমন আঘাত করিল যে বার বার তাহার চোখ দুইটি জলে ভরিয়া উঠিতেছিল, সে বহু কষ্টে তাহা গােপন করিতে চেষ্টা করিতেছিল। ডাঃ বােস্ হাতের রােগী দেখা শেষ করিয়া বাহিরে প্রতীক্ষ- মান গাড়ীতে উঠিয়া কলে’ বাহির হইবেন এমন সময় ঘরের কোণে ন্যাড়া মাথা অশােকের প্রতি তাঁহার দৃষ্টি পড়িল। তিনি পুনরায় চেয়ারে বসিয়া বলিলেন,-এদিকে এস খােকা। অশােক আসিয়া টেবিলের পাশে দাড়াইল। তিনি ভাবিতেই পারেন না রােগী ছাড়া বেহ তাহার নিকট আসিতে পারে, তিনি তাই বলিলেন,-হাত দেখি,—কি হয়েছে। অশােক ইতস্ততঃ করিতেছিল, তিনি জোর করিয়া হাত টানিয়া লইয়া উদ্যত টেথিস্কোপ বুকে লাগাইতে যাইতেছিলেন এমন সময় অশােক কহিল—আজ্ঞে না আমার মা ভাঃ বােস্ একটু বিব্রত হইয়া বলিলেন,-ও তাই বল,-কি হয়েছে ? মারা গেছেন। মারা গেছেন, তার পরে তুমি ডাক্তার ডাকতে বেরিয়েছ- আজ্ঞে না।

- টুপটু বল,যে বেচে আছে তার কি হয়েছে বল। কলে বেরুচ্ছি দেখছ না ? অশােক ঢােক গিলিয়া কহিল,আমার মা আপনার পিসতুত বােন দুলু ডাঃ বোস্ ঝপ করিয়া বসিয়া পড়িয়া কহিলেন,তুমি দুলুর ছেলে। সে মারা গেছে কতদিন- অশােক জবাব দিতে যাইয়া কাঁদিয়া ফেলিল। ডাঃ বােস্ একটু বিমূঢ়ের মত বসিয়া থাকিয়া কহিলেন, দুলু মরে গেল,-বেচে থাকতে একটু সংবাদ দিলে না! এখন একেবারে ন্যাড়া হয়ে এসেছ- অশােক থামিয়া থামিয়া কহিল,--আমি ম্যাটিকে স্কলার- সিপ, পেয়েছি তাই মৃত্যুর পূর্বে মা আপনার কাছে দাবী করতে বলেছিলেন যে আমাকে পড়াতে হবে। বলেন, সে ছাড়া তাের আর কেউ নেই ডাক্তার বোস্ একটু.ভাবিয়া বলিলেন,-সত্যিই আমি ছাড়া আর তােমাদের কে আছে। জানি দুলুর ছেলে স্কলার সিপ পাবেই-আমাদের বংশ ত! হঠাৎ বিমনা ভাবে প্রশ্ন করিলেন,-দুলু মারা গেছে। কি বলেছে আমার কথা -আপনার কাছে দাবী জানাতে বলেছে— -হ্যা দাবী আছে বৈ কি? নিশ্চয়ই পড়বে—আই, এস, সি পড়, ডাক্তারী পড়বে- এস আমার সঙ্গে এস— অশােক টিনের সুটকেশটা হাতে করিয়া তাহার অনুগমন করিতে লাগিল। দ্বিতলের সিড়ি হইতেই ডাঃ বােস ডাকিতে আরম্ভ করিলেন,-ওগাে শুনছো,শুনছে-- বােসগৃহিণী আসিয়া প্রশ্ন করিলেন,—কি ব’লছছ ? এবং ন্যাড়া মাথা গ্রাম্য তরুণটিকে দেখিয়াই যেন মনে মনে অপ্রসন্ন হইয়া উঠিলেন। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করিয়া ডাক্তার কহিলেন, এ আমার বােন দুলুর ছেলে অশােক। এখানে থেকে আই, এস, সি পড়বে। কালই ভৰ্ত্তি করে দেবে, আর নিরিবিলি একটা ঘর ছেড়ে দেবে যাতে পড়াশুনাের অসুবিধে না হয়। ডাক্তার গৃহিণী কুঞ্চিত করিয়া কহিলেন—তারপর তাহার পর আর কি হইতে পারে তাহা ডাক্তার বাে ভাবিয়া পাইলেন না। একটু ভাবিয়া কহিলেন,—তার পর? একটা কিছু পাইয়াছেন এমনি ভাবে অশােককে বলিলেন,- জিব বের কর-অশােক জিব দেখাইল, তিনি চোখের কোণ টানিয়া দেখিলেন এবং মন্তব্য করিলেন,—ভিটামিন ডেফিসিয়েন্সি হা কিছু ফল আর ঘি রােজ দেবে আর মালটি-ভিটামিন ট্যাবলেট। গৃহিণী কহিলেন, তার পর! ডাঃ বােস বলিলেন-তারপর !•••ও হঁ্যা, অশােক স্কলার- সিপ, পেয়েছে—ভালছেলে। আমাদের রক্ত যেখানে গেছে তারা স্কলারশিপ পাবেই,-আর মাথা নীচু করবে না•••হাঃহাঃ বুঝলে। ডাক্তার বােস আর কোন কথা না বলিয়া বংশ-গৌরবে সগর্বে পদক্ষেপ করিয়া নীচে নামিয়া গেলেন।

১৪ ডাক্তার গৃহিণীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে অশােক আনতদৃষ্টিতে দাঁড়াইয়া ঘামিয়া উঠিল। এবং কিছুক্ষণ বাদে তাহার সহসা মনে হইল মামামাকে প্রণাম করা প্রয়ােজন, সে প্রণাম করিতে নীচু হইল। ডাক্তার গৃহিণী কহিলেন,—থা থাক্‌- তাহার কন্যাদ্বয় লিলি ও মিলি আসিয়া উপস্থিত হইল এবং নতুন একটি গ্রাম্যজীবকে অকস্মাৎ তাহাদের অন্তঃপুরে দেখিয়া বিস্ময় বিহ্বল দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল। মিসেস্ বোস তীক্ষ কণ্ঠে কহিলেন,—ওতে কি আছে খােল- লিলি প্রশ্ন করিল-কে মা ? -ওর কি রকম এক বােন কে যেন কোথায় ছিল, তারই ছেলে- মিলি কহিল,-এখানে থাকবে? অশোক সুটকেশ খুলিল। মিলি তাহার একটা জামা তুলিয়া ধরিয়া কহিল,–এই সব পরবে ? মিসেস্ বােস বিরক্তিসহকারে কহিলেন,—ওঁর হুকুম, তামিল -" না করলে রক্ষে আছে! হাড় জ্বলে গেল-দ্যাখাে বাবা, ওসব নােংরা কাপড় জামা এখানে চলবে না—আমরা একটু ভদ্রলােকের 1 মাঝে থাকি, কাপড় জামা চালচল্‌তি সেরকম না হলে চলবে না- অশােক বহু সাহস সঞ্চয় করিয়া কহিল,আপনি শিখিয়ে দেবেন-

—এসব মুখস্থ করে স্কলারসিপ, পাওয়া নয়—এসব শিখতে
সময় লাগে।
লিলি ব্যঙ্গ করিল,-পুথি মুখস্থ করে কালচার শেখা যায়
না। যতদিন শেখা না হয় ততদিন একটু আড়ালেই থেকো দয়া
করে। ডক্টর ঘােষ, মিস্ মিত্র এলে সবার সামনে কি বেকুবই
হতে হবে–তারা ত এমনটা দেখে নি--
অশােক সমীহ সহকারে কহিল,- আমি আড়ালেই থাকবাে
মিলি সােৎসাহে কহিল, -তা কেন ? দু’দিনে আমি
ঠিক করে দেব।
মিসেস্ বােস্ বলিলেন,-যা এখন সরকার মশায়কে ডাকতে
বল দিকি। কিছু কাপড় জামার অর্ডার দিয়ে আসুন-আর ঐ
কোনের ঘরটা দেখিয়ে দিয়ে আয়। সেখানেই ও থাকবে
লিলি ও মিসেস্ বােস্ চলিয়া গেলেন। মিলি কহিল,
এস, সব দেখিয়ে দি—
মিলি তাহাকে সঙ্গে করিয়া লইয়া ঘরে পৌছাইয়া দিয়া
পরিহাস করিল,এটা বিছানা এখানে শােবে, এই চেয়ার
ব’সবে,-দুইটা ধরিয়া কহিল,-এই দেখ বাতিজ্বলে, এই
দ্যাখাে নেতে, এই দ্যাখাে পাখা চলে, এই বন্ধ হয়—ইত্যাদি।
আর কি দেখাবাে ?
মিলির পরিহাস ও প্রগল্‌ভতায় অশােক হাসিয়া কহিল,
‘আমি তােমার দাদা।
-নমস্কার—দাদা অশােকদা !
ন

১৬ ? কান পথে খেতে যাবাে, কোন পথে বাইরে যাবো তাত বলে না। -ওঃ খিদে পেয়েছে বুঝি—আচ্ছা দাড়াও আসি— মুহূর্তে খাবার লইয়া মিলি ফিরিয়া কহিল, কি করে খেতে হয় দেখাতে হবে কি —না, ওটা জানি। মিলি হাসিয়া কহিল—জানবেই ত, তা নইলে কি কেউ স্কলারসিপ পায়। অবশেষে মিলি হাসিয়া কহিল,—যা হােক ভয় নেই, আমি আছি। দিদি আর মা একটু অমনি তাতে কিছু ভেবো না। আমার দাদা নেই বলে খুব দুঃখ বুঝলে তাই তােমাকে খাতির করলাম। তুমি আই, এস, সি, পড়বে এই যা দুঃখু—আমার যে পিওর আর্টস- —তাতে কি ? -তুমি নকল করতে জানে ? না। -ওঃ নেহাত সেকেলে! স্কলারসিপ পেলে কি করে ? কোলাহল মুখর রাজপথের পার্শ্বে লােকচক্ষুর অন্তরালে আগাছা যেমন করিয়া বাড়িয়া উঠে অশােক তেমনি করিয়া ভব্য সভ্য হইয়া উঠিতে লাগিল। যে গৃহে সে থাকে তাহার সহিত ১৭ তাহার কোন সম্পর্ক নাই, মামীমা বা লিলির সঙ্গে কদাচিৎ দেখা হয়, কিন্তু বাক্যালাপ বিশেষ কিছু হয় না। ঠাকুরে ভাত দেয়, চাকরে থালা লইয়া যায়, ঝি চা দেয়,-মাসের প্রথমে হাত খরচের নির্দিষ্ট টাকা আসে। মামা অবশ্য মাঝে মাঝে খোজ করেন তবে সেটা পক্ষান্তে বা মাসান্তে। কিন্তু মিলি নিত্য দু’বেলা আসে—প্রগল্ভ পরিহাসে পড়ার ব্যাঘাত সৃষ্টি করে এবং মাঝে মাঝে হিতােপদেশ দেয়। ওদিকে চলে পার্টি, সিনেমা, থিয়েটার, নাচ গান, পিনিক, প্রভৃতি কত কি ? তাহার কোলাহল কলরব অবশ্য অশােকের কানে আসে তবে তাহা অতি সুদূরের তাই তাহার প্রতি তাহার কোন আকর্ষণ নাই—সে দিবারাত্রি পড়াশুনাই করে, সময় হইলে মাঝে মাঝে মামার ডাক্তারী কেতাব খুলিয়া পড়িতে চেষ্টা করে। কলেজে যায় আসে, দু’চারজন বন্ধু না জুটিয়াছে এমন নয় কিন্তু ঘনিষ্ঠতা তেমন নাই। ছয় মাস চলিয়া গিয়াছে কিন্তু একদিন সে বন্ধুদের পাল্লায় পড়িয়া জগতের নবতম বিস্ময় সিনেমা দেখিয়াছে, থিয়েটারের জ্ঞান তাহার গ্রাম্য থিয়েটারেই সীমাবদ্ধ। ইতিমধ্যে কলেজের মধ্যে একটা প্রবন্ধ প্রতিযােগিতা হইয়াছিল, অশােক তাহাতে প্রথম পুরস্কার পাইয়াছে। তাহাতে অধ্যাপকগণ তাহাকে চিনিয়াছেন এবং ভালও বাসেন, এ সংবাদটি কেবল মিলিই জানে- সেদিন সন্ধ্যার সময় অশােক পড়িতে বসিয়াছিল, নিবিষ্ট পৃথিবীর প্রেম ১৮ মনে পঘিয়ও যাইতেছিল হঠাৎ মিলি আর একজন মহিলাকে লইয়া তাহারই ঘরে প্রবেশ করিল। মিলি কহিল,—অশােকদা, ইনি আমার বান্ধবী শুভ্রা ঘােষ, আর ইনি অশােক মিত্র প্রবন্ধ প্রতিযােগিতায় প্রথম পুরস্কার- প্রাপ্ত বিদ্যার জাহাজ অশােক অপ্রস্তুতের মত উঠিয়া দাড়াইল। শুভ্রা কহিল, নমস্কার। অশােক বিস্মিত বিহ্বল দৃষ্টিতে শুভ্রার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল,-এত সৌন্দৰ্য্য, এত কমনীয়তা সে কখনও একসঙ্গে দেখে নাই। মিলি হিহি করিয়া হাসিয়া কহিল,-হা করে দেখছ কি ? শুভ্রা আমার থেকে বেশী সুন্দরী নয়-নমস্কার কর- অশােক বেকুবের মত তাড়াতাড়ি নমস্কার করিয়া কহিল, হ্যা, নমস্কার-বসুন- মিলি কহিল, “তােমাদের কলেজেই পড়েন, আর্টস্। তােমার খ্যাতি শুনে আলাপ করতে এসেছেন,“তুমি ত কেবল ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছ। শুভ্রা পার্শ্বের চেয়ারে বসিয়া কহিল,-কি বলছিস মিলি। উনি স্কলারােেক, তাই হয়ত একটু ভুলােমন,- অর্থাৎ সাধারণ জ্ঞানহীন- শুভ্রা প্রশ্ন করিল,-কি করছেন ? -পড়ছিলাম। -দিবারাত্রিই পড়েন নাকি ?

১৯ . -না, তবে কাজ ত নেই। তাই যা পাই তাই পড়ি- বেড়াতে বেরােন না ? মিলি চট্ করিয়া কহিল, অমন অপকৰ্ম্ম ভুলেও করেন না। শুভ্রা পরিহাস করিল,-মাঝে মাঝে করলে ক্ষতি কি? অশােক হাসিয়া কহিল,-ক্ষতি নেই তবে কোথায় যাবাে, মাঝে মাঝে একা একা একটু ঘুরে ফিরে আসি। বিশেষ চিনিও না কিছু, পরিচিত লােকও তেমন কেউ নেই - মিলি কহিল,-এই ত একজন হ’লএখন যেও- শুভ্রা কহিল,-হঁা তােমারও যেতে যেতে কামাই নেই আর উনিও যাবেন- -উনি যান না বলেই ত যেতে পারি না। ওকে নিয়ে এবার থেকে যাবে কিন্তু অশােকদা বড় বোেকা, দেখ না কেমন ভয়েই জড়সড় হয়ে রয়েছে- -ভয়টা কিসের ? অশােক কহিল, ভূতের ভয়, সব জায়গাই থাকতে পারে ত ? মিলি কহিল,-মােটর উপর তুমি কিছু না -সে কথা আমি জানি, বলে বুঝিয়ে দিতে হবে কেন ? -হয় মাঝে মাঝে স্মরণ করিয়ে দিতে হয়। শুভ্রা কহিল,-আচ্ছা উঠি, তুই ওকে নিয়ে যাস্ না কেন? জানিস্ ত আমার বেরােনাে বড় কঠিন মিলি কহিল,-শুলে ত অশােকদা, আমাকে নিয়ে ওদের ওখানে কাল যেতে হবে- =

২০
অশােক কহিল,-সেটা ত সম্ভব নয় তবে তুমি আমাকে
নিয়ে গেলে যেতে পারি।
;
অশােকের সহিত শুভ্রার ইহাই প্রথম পরিচয় -
মিলির সহিত শুভ্রার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা বহু পুরাতন এবং
তাহা আকস্মিক নয়। বিভাস বসুর সহিত শুভ্রার পিতা শৈলেন
বাবুর পরিচয় ও বন্ধুত্ব ছিল সেই সূত্রেই পরিচয় ; কিন্তু মিলি
শুভ্রার পরিচয় এত ঘনিষ্ঠতা কেন লাভ করিল তাহাও বলা
কঠিন। মিলি চঞ্চল, প্রগল্ভ, সরল, উচ্ছল ঝরণা প্রবাহ—কিন্তু
শুভ্রা শান্ত সুশীল সুন্দর ভাদ্রের ভরানদীর মত মন্থর গম্ভীর।
বিপরীত ধৰ্ম্মী দুইটি প্রাণীর মধ্যেও কোথায় যেন একটা সাদৃশ্য
ছিল যাহা তাহাদিগকে একীভূত করিয়া দিয়াছে। দুইটি প্রাণীই
উদার শিক্ষা দীক্ষা, চলতি রুচি ও রেওয়াজ তাহাদের অন্তরের
সেই বেগবান অনুভূতি প্রবাহকে আবদ্ধ করিতে পারে নাই।
শিক্ষা ও সম্পদের ঔদ্ধত্য অন্তরের শালীনতাকে স্পর্শ করিতে
পারে নাই।
মানুষের জীবনে এমন কতকগুলি লােক আসে যাহারা
প্রথম দর্শনের পর হইতেই মানুষের জীবনে প্রভাব বিস্তার
করিতে থাকে, সে প্রভাবমুক্ত হওয়া সাধ্যাতীত হইয়া দাঁড়ায়।
কেহ বলিবেন ইহা এন্মান্তরের ‘নৈকট্য’, কেহ বলিকে
মনস্তত্বের খেলা; কিন্তু সে যাহাই
হৌক শুভ্রাও অত্যন্ত

২১
আকস্মিক ভাবে অশােকের মনে প্রভাব বিস্তার করিয়া ফেলিল।
এদেশে শুভ্রার মত সমীহ ও বিনয় সহকারে কেহ কথা বলিতে
পারে, কেহ মানুষের সম্পদ না দেখিয়া হৃদয়কে বিচার করিতে
পারে ইহা যেন তাহার কল্পনাতীত ছিল কিন্তু শুভ্রাকে দেখিয়া
তাহার ভুল ভাঙ্গিল। সম্ভবতঃ সেই জন্যেই মিলির সহিত
শুভ্রাদের বাড়ীতে যাইতে তাহার অপত্তি হয় নাই।
কয়েকদিন যাতায়াতের পরে শুভ্রার পিতার সহিতও তাহার
পরিচয় হইল এবং তিনি আনন্দের সহিত তাহাকে গ্রহণ করিলেন।
শুভ্রাও তাহাকে যেন একটু আপনার করিয়া লইল।
সে গেলে আনন্দিত হইত। অশােক জানিত, সে আশ্রিত মাত্র,
তাহার সহিত শুভ্রার অনেক পার্থক্য তাই সংকোচ তাহার
যথেষ্টই ছিল কিন্তু তথাপি শুভ্রর প্রভাব তাহার জীবনে একান্তই
অনিবাৰ্য হইয়া উঠিল
এত সুন্দর, এমন মিষ্টভাষী, এমনি
কমনীয় সহৃদয়তা সে কল্পনা করিতে পারে না।
সেদিন বৈকালে শুভ্রাদের বাড়ী যাইতেই হইল-মিলি
ছাড়িল না।
শুভ্রাদের বাড়ীও আধুনিক ; আসবাব পত্র দেখিলে বড়লােক
বলিয়াই মনে হইবে, যদিও তাহারা যথেষ্ট বড় লােক নয়। শুভ্র
অভ্যর্থনা করিয়া কহিল, যা হােক মিলি, এতদিন পরে আসবার
যােগ হল ? ধন্যবাদ অশােকবাবু দয়া করে এসেছেন
মিলি বলিল, বারে ! গত সপ্তাহেও ত এসেছি
শুভ্রার বাবা বলিলেন,-এস মা মিলি, কিরকম পড়া শুনাে

২২
হচ্ছে। অশােকের সাহায্যে তােমরাও ত পরীক্ষায় ভাল ফল
দেখাতে পারাে।
মিলি কহিল, পড়া শুনাে ত করছি-
-হ্যা, ভাল রেজাল্ট করা চাই। শৈলেনবাবু ছড়ি হাতে
করিয়া বৈকালিক ভ্রমণে বাহির হইয়া গেলেন।
শুভ্রা পরিহাস করিল, অশােকবাবু চা খাবেন ত ?
বালিগঞ্জের চা খেলেও মাথা ঘােরে ?
অশােক ব্যঙ্গ করিল, মাঝে মাঝে ঘােরে-সর্বদাই ঘােরে
এমন নয়।
– মিলিদের বাড়ীতে ত রােজই পার্টি, পার্টিতে গেলে কি
না
-হাসি পায়।
-কেন ?
অশােক হাসিয়া কহিল, মানুষ যদি খামকা নাচে আর গান
করে তবে কে না হাসবে ?
- ওটা পাগলামী তা হলে
প্রায়।
-ও আপনি মেয়েদের সহ্য করতে পারেন না। তা হলে ?
-সর্বনাশ, ছেলে হয়ে সে কথা বলা কি পাগলামি নয় ?
মিলি কহিল, -ও বাবা, অশােকদা, কেমন কথা ব’তে
শিখে ফেলেছে দেখ। সেদিন নমস্কার করতেই ভুলে গেল, আর
আজ চটপট কথা বলছে।

অশােক কহিল,-সত্যি কথা বলছি – তার মধ্যে চটপট কিছু নেই- শুভ্রা অর্থব্যঞ্জক প্রশ্ন করিল,—সত্যি ? অশােক কহিল,-কি ? মিলি টিপ্পনী করিল,--ঐ যে মেয়েদের পরে তােমার যথেষ্ট সহনশীলতা। নিশ্চয়ই —শুধু শুভ্রার পরেই বােধ হয় - অশােক লজ্জিত হইয়া থামিয়া গেল। একটু পরে কহিল, মিথ্যা নয়, ওর মত এমন উদার সুন্দর মন- মিলি কহিল,-সুন্দরী ত বটেই—অতএব অশােক প্রতিবাদ করিল,-সুন্দর মন, সভ্য জগতের মাঝেও যে এমন মন বেঁচে থাকতে পারে, তা না দেখলে হয়ত বিশ্বাস করতাম না। শুভ্রা কহিল,-একটু বেশী ব’লছেন বােধ হয়-রচনা লেখার মত মিলি ও শুভ্রা হাসিয়া উঠিল, অশােক কি যেন প্রতিবাদ করিতে গেল কিন্তু মিলি তাহা না শুনিয়াই কেবল হাসিতে লাগিল। অশােক অসহায়ের মত বলিল, চল মিলি রাত্রি হল। শুভ্রা ব্যঙ্গ করিল, হা, হা পড়াশুনাের সময় নষ্ট হচ্ছে- ২৪ অশােক চট করিয়া কহিল,—সেটা ত আর পাপকাৰ্য্য নয় যে তার জন্যে লজ্জিত হতে হবে ! অশােক উঠিয়া দাঁড়াইল। অশােক যে ঘরে থাকিত তাহাতে যাইবার দুইটি রাস্তা ছিল, -একটি সদর ও ড্রইং রুম হইয়া, দ্বিতীয়টি পাশের বারান্দা দিয়া অন্দর হইয়া। অশোক সাধারণতঃ সদর দিয়াই বাড়ী আসিত। সেদিন লিলি ও তাহার ককৈজন বান্ধবী ও ডাঃ দত্ত ড্রইং রুমে বসিয়া বৈকালিক গল্প করিতেছিলেন, অশােক বেড়াইয়া ফিরিবার সময় সেইপথ দিয়াই ফিরিতেছিল। তাহার অনিচ্ছাকৃত এই আর্বিভাবকে লিলি কি অর্থ করিয়াছিল বলা যায় না তবে সে মনে মনে ভয়ঙ্কর ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিয়াছিল। অশােক ঘরে আসিয়া জামা ছাড়িতেই লিলি উত্তেজিত ভাবে ঘরে প্রবেশ করিল। তিক্তকণ্ঠে কহিল, অশােক তােমাকে বারণ করে দিচ্ছি তুমি এপথে আসবে না, পেছন দিয়ে ঘরে আসবে। তােমার জন্যে আর মান-সম্ভ্রম রইল না- অশােক বিস্মিত হইয়া কহিল,-কেন ? এটা যে অন্যায়' তা’ত জানি না - —জানবে কি করে। নিজের চালচলতি কি তা একটু ভেবে দেখে দূরে থাকাই ভাল- খারাপ কিছু করিছি কি ?

- ! -ওরা জিজ্ঞেস করলে কি পরিচয় দেব- -কেন ? পিসতুত ভাই- -তাতে আমার লজ্জা করে বুঝলে? তােমার মত একটা ইডিয়েট আমার ভাই ! ছাে- যা ব’লুম তাই করবে- -আচ্ছা লিলি যেমন ভাবে আসিয়াছিল তেমনি ভাবে চলিয়া গেল। আকস্মিক এই ব্যাপারটায় অশােক বিষন্ন হইল। তাহার পিতৃরক্তও যেন উষ্ণ হইয়া উঠিল, -সে মায়ের মুখে শুনিয়াছে তাহার পিতা আজীবন সংগ্রাম করিয়াছেন, অশেষ দারিদ্র লাঞ্ছনা সহকরিয়াছেন কিন্তু গ্রামের জমিদারের নিকট মাথা নীচু করেন নাই। তাহার ধমনীতে সেই বিদ্রোহী রক্ত প্রবাহিত। সে উত্তেজিত হইয়া ভাবিল,—এই অনুগ্রহ অপেক্ষা মূর্থ হইয়া থাকাও ভাল, কেন সে এই অসম্মান সহ্য করিবে কিন্তু মনে পড়ে ভালমানুষটি মামার কথা, তাঁহার স্নেহ অকৃপণ, প্রসন্ন মহৎ-অন্তর তাহাকে সে কেন অপমান করিবে,- ওর বােনই ত মিলি—কিন্তু পরিহাস-ব্যঙ্গ-স্নেহপ্রীতিতে সে কত আপনার করিয়া লইয়াছে। ওরা ত ডাঃ বিভাস বােসের উপরে পরগাছার মত বাঁচিয়া থাকিয়া সম্পদের দম্ভ আর ঔদ্ধত্যে অন্ধ হইয়া আছে - আকস্মিক ভাবে মিলি আসিয়া খানিক হাসিয়া কহিল, চল, বাবা ডাকছে, বকুনি খাওয়াই কি করে দেখবে। বি করেছ তুমি••চল মজা দেখবে = ২৬ অশােক ভাবিল লিলির নালিশ হয়ত তাহাকে উত্যক্ত করিয়াছে। অশােক নির্ভীক ভাবেই মিলির সঙ্গে চলিল, যদি তাহাই হয় তবে এ অনুগ্রহ হইতে সে আজ নিষ্কৃতি পাইতে চায়। ডাঃ বােস, নিবিষ্টমনে কি যেন একটা পড়িতেছিলেন, মিলি কহিল, বাবা বাবা! তিনি পুস্তক হইতে চোখ তুলিতেই মিলি কহিল,-এই যে অশােকদা এসেছে- ডাঃ বােস চোখ হইতে চশমা নামাইয়া কহিলেন,-তােমাকে যত ভাল ভেবেছিলাম অশােক তুমি ত সে রকম নও- অশােক নির্ভীক কণ্ঠে কহিল,-কেন ? —দু’টি ঘােরতর অপরাধ তুমি করেছ— মিলি কহিল,—সাংঘাতিক বাবা ! -হ্যা, সাংঘাতিক, প্রথম তুমি এসে’ লিখে যে মেডেল পেয়েছ তা কোথায় ? -আমার কাছে আছে। -দেখাও নি কেন ? -সে ত কলেজের মেডেল, তার আর দেখানাের কি আছে ? – নিয়ে এস- অশােক উপর হইতে তাড়াতাড়ি মেডেলটি লইয়া গিয়া কহিল,- এই ত— ডাঃ বােস মেডেল হাতে করিয়া উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিলেন,- হা এমনি চাই, সব মেডেল জোগাড় করে আলমারী বােঝাই করবে-আমার মেডেলের আলমারী দেখেছ ? তার চেয়ে বেশী - পাওয়া চাই -আরে মিলি, আমাদের বংশের ছেলেরা সেকেণ্ড হয় না - মিলি কহিল, তার পরে দ্বিতীয় দোষটা ত বলে না –ও হা,–কি ত ? সেটা --স্কলারসিপের টাকা- হ্যা, স্কলারশিপের টাকা কি করেছ ? -বই কিনেছি--- নিয়ে এস কি বই- অশােক চলিয়া গেল। ডাঃ বােস কহিলেন,—অশােক কালে কালে আমার মত ডাক্তার হবে, ওকে তৈরী করে রেখে যাবাে - মিলি কপট অভিমানে কহিল,-তুমি ওকে ব’কবে বলে –বকা কেন ? সময় পায়নি তাই দেখায় নি - অশােক বিরাট দুইখানি বই লইয়া ফিরিল,ডাঃ বােস তাহা হাতে লইয়া কহিলেন,এ কি এ্যানাটমি, ফিজিওলজির বইতে কি হবে-- – ডাক্তারী পড়বার সময় লাগবে- -তুমি একটি গাধা, এত বই আমার রয়েছে দেখছ না। এসব ত ছেলে খেলার বই, -ওসব ত বুঝি না - ডাঃ বােস কহিলেন,-হা হা এখন একটু সােজা বই পড়া ভাল। বেশ বেশ,বই কিবে—বাজে বাজে সিনেমা আর থিয়েটার দেখে লিলির মত টাকা নষ্ট কর না।

২
মিলি - ক্ষুঃস্বরে কহিল, “বেশ, বিচার করলে ত বাবা।
আমাকে না খাইয়ে বই কিনেছে সেটা বেশ হ’ল ? এই বিচার
ক’রলে তুমি-
এইবার পরিহাসটি ধরিতে পারিয়াছেন এইভাবে ডাঃ বােস
হাসিলেন। পকেট হইতে একখানা দশটাকার নােট বাহির
করিয়া দিয়া কহিলেন,—যা যত সন্দেশ খাবি খেয়ে নে এখন
যা পড়তে দে -
এইরূপে লিলি ও তাহার মায়ের অসম্মানে যখন অশােকের
হৃদয় অভিমানে ক্ষোভে বিচলিত হইয়া উঠে, তখন মিলি আর
ডাঃ বােসের অকৃপণ সেহবারি সিঞ্চনে তাহা শান্তি লাভ করে।
অশােক মনে মনে তাহার এই ভুলােমন উদাসীন মামাটিকে বারবার
নমস্কার করে—তাহার প্রতি তাহার করুণা হয়—এই সংসারের
উৎসবের কোণে তিনি আর অশোক যেন অপাংক্তেয়ের মত
অপ্রয়ােজনীয়—কোনমতে নিজের গণ্ডীর মাঝে দিন চলিয়া যায়।
তাহাদের চিন্তারাজ্যের সহিত ওদের যেন কোন সংযােগ নাই।
সেদিন হলঘরে বিরাট একটা পার্টির বন্দোবস্ত হইতেছিল,
—সকাল হইতেই ঘর সাজানাে চলিতেছে। ডাঃ মিত্র, ডাঃ বসু
ও কয়েকজন লিলির বান্ধবী নিমন্ত্রিত–আধুনিক নৃত্যগীতের
ব্যবস্থা আছে। লিলির মাতাই পার্টির কত্রী ।
সন্ধ্যার পরে সমস্তই ব্যবস্থা হইয়া গেল। এইবার অতিথিগণ

২৯ আসিবেন,-ফুলদানি প্রভৃতি যথাস্থানে আছে কিনা লিলি তাহাই দেখিতেছিল এমন সময় বিভাস বাবু উপর হইতে নামিয়া আসিলেন-‘কলে’’ বাহির হইবার জন্যে প্রস্তুত হইয়াই বাহির হইতেছেন। লিলি কহিল,-বেশ,-বাবা তুমি বেরিয়ে যাচ্ছ। আজ যে আমাদের পার্টি। বিভাস বাবু হাসিয়া কহিলেন, -কিন্তু মা, আমার উপর কতজনের জীবন রয়েছে আমার পক্ষে বিশ্রাম করা তাই পাপ। -তাই বলে কি একটা দিনের জন্যেও একটু আনন্দ করতে নেই- -একটা কঠিন রােগী সারিয়ে আমি সাতটা পার্টির আনন্দ পাই মা! ও হে—দেখি—তিনি লিলির চোখটা টানিয়া ধরিয়া দেখিলেন। কহিলেন,-রােজ দু’টো ক্যালসিয়ম ট্যাবলেট খাবি। মিসেস্ বােস্ কহিলেন,-একদিনও তুমি থাকতে পারবে না ? —ঘুরে আসি,-দেখি যদি শেষাশেষি পৌছােতে পারি। বিভাস বাবু বাহির হইয়া গেলেন। ভিতর দিক হইতে মিলি ও শুভ্রা হলঘরে ঢুকিল। শুভ্রা নিমন্ত্রিত, লিলি তাই অভ্যর্থনা করিল-এসাে এসাে শুভ্রা, কতক্ষণ এসেছ ? -অনেকক্ষণ, মিলির সঙ্গে গল্প করছিলাম। এখনও ত কেউ আসেন নি দেখছি- -এক্ষুণি এসে পড়বেন। —কথাটা শেষ হইতে না হইতেইডাঃ মিটার আসিয়া উপস্থিত হইলেন। চালচলনে ঋটি সাহেব, কোট পেন্টলুন পরিহিত, চেহারাটি অবশ্য যথেষ্ট সাহেবী নয়। বাংলা বিশুদ্ধ ভাবে বলিতে পারেন না, মাঝে মাঝে ইংরাজী কথা দুই-চারিটি বাহির হইয়াই যায়। তিনি আসিলেন সদস্তপদক্ষেপে—হাতে একতােড়া তাজা গােলাপ। কহিলেন,-নমস্কার, নমস্কার মিস্ বসু লিলি প্ৰতিনমস্কার করিল,নমস্কার। মিত্র একটু প্রফুল্ল কণ্ঠে কহিলেন,-একটা ইউনিক থিং পেয়েছি। এই ছ'মাস মিউনিসিপ্যাল মার্কেট ঘুরে সত্যিকার কয়েকটা গ্লোরিয়া-ডি-ডাচার পেয়েছি--কি লাভলি দেখুন- ডাঃ মিত্র ফুল কয়টি লিলির হাতে দিয়া একটু হাসিলেন। লিলি সপ্রশংস দৃষ্টিতে ফুল কয়টিকে দেখিয়া কহিল, নাইস, লাভলি, এমন ডাচার হয় না,“থ্যাঙ্ক ইউ। মিঃ মিত্র উদাত্ত কণ্ঠে কহিলেন,-আপনাকে মনের মত ফুল ক’টা দিতে পেরেছি এ যে আমার কত বড় গৌরব। লিলি মরালীর মত ঘাড় বাঁকাইয়া কহিল,—তাই নাকি? থ্যাঙ্ক- মিসেস্ বসু আসিয়া পড়িলেন,-ফুলকয়টা দেখিয়া কহিলেন, চমৎকার ফুল,নিশ্চয়ই মিটারের চয়েস্- মাতা কন্যা যখন গােলাপফুলের তারিফে মগ্ন তখন মিলি ও শুভ্রা ধীরে ধীরে অশােকের ঘরে গিয়া উপস্থিত হইয়াছে। অশােক বিরাটকায় একখানা কেতাব পড়িতেছিল, সে মিলিদের

,
প্রবেশ লক্ষ্য করে নাই। মিলি বইটাকে বন্ধ করিয়া দিয়া
কহিল,এত পড়ে শেষে মারা যাবে নাকি ?
অশােক চমকাইয়া উঠিয়াছিল, ফিরিয়া মিলিকে দেখিয়া
কহিল, -সেও ভাল, ভাবলুম ভৌতিক ব্যাপার বােধ হয়—
মিলি হাসিয়া কহিল, -ভাষার ভুল, পেত্নিক হবে।
অশােক শুভ্রাকে কহিল,—বসুন, পার্টিতে বােধ হয় ?
হ্যা, কেন আপনি যাবেন না ?
-না, আমার বড় ভয় করে -
- তা নয়, পছন্দ করেন না -
- সর্বনাশ,- একথা কি বলা কোন সভ্য লােকের সম্ভব।
শুভ্রা কহিল, “তবে যাবেন না কেন ?
– যাওয়াটা ত আমার ইচ্ছার উপর নির্ভর করে না, প্রথমতঃ
চিন্তনীয় আমার উপস্থিতি অভিপ্রেত কিনা! দ্বিতীয়তঃ সকলের
পক্ষে আনন্দদায়ক কিনা। তৃতীয়তঃ আমি নাচতে কুদতে বা
গাইতে পারি কিনা, চতুর্থতঃ••••••
– থাক, আপনি যাবেন না এইত ! অর্থাৎ এই পার্টি এবং
আধুনিক মেয়েদের নৰ্তনকুন্দন আপনার ভাল লাগে না-কেমন?
-পূর্বেই বলেছি, তা হলে আমারই সেটা শিক্ষা-সংস্কৃতির
অভাব আছে বলতে হয় -
মিলি কহিল, কথাবার্তা ত বেশ চোখা চোখা ব’লছ দেখছি
--এখন চল ওখানে তােমাকে মানুষ করবার ভার আমার
উপর।

৩২
শুভ্রা • অত্যন্ত আকস্মিক ভাবে অশােকের হাত ধরিয়া
কহিল,-চলুন, বাগাড়ম্বর করে কি হবে ?
অশােক জানিত লিলি যখন পার্টির একজন উদ্যোক্তা তখন
তাহার যাওয়া সমীচীন নয়, অপ্রীতিকর কিছু ঘটা বিচিত্র নয়,
তথাপি শুভ্রার অনুরােধ উপেক্ষা করা তাহার পক্ষে অসম্ভব।
তাহারা যখন পার্টিতে আসিয়া উপস্থিত হইল তখন জনৈক
আধুনিক কলেজ ছাত্রীর নৃত্য ও গীত হইতেছে। একটি শােফা
খালি ছিল—তিনজনে সেটায় বসিয়া তাহার গান ও নৃত্যের
দিকে
মনোযােগ দিতে চেষ্টা করিল কিন্তু অশােকের কেবল হাসিই
পাইতেছিল,-নৃত্যকলাকে সে সম্যক ভাবে উপলব্ধি করিতে
পারে নাই, সেটাকে সে একটা অনৈসগিক উল্লম্ফন কল্পনা করিয়া
একটু একটু হাসিতেছিল, এমন সময় লিলি আসিয়া ডাক দিল,-
অশােক শোননা -
লিলির পিছনে অশােক উঠিয়া গেল। অশোকের ঘরে
আসিয়া লিলি কহিল,-তােমাকে বারণ করেছি না যেতে ওসৰ
হত্রলােকের মধ্যে।
ভদ্রলােক কথাটার প্রতি অত্যধিক জোর দিয়াই লিলি
বলিয়াছিল তাই বােধ অশােক হাসিল।
কহিল,-তােমাকে আড়ালেই থাকতে বলেছি তুমি কেন ওখানে
লিলি পুনরায়
—ভুল হয়ে গেছে, হৈ হল্লা শুনলে লােকে ত ছুটে
দেখতেই যায়-

—হৈ হাল্লা,নসেন্স
অশােক হাসিয়া ফেলিল। লিলি উত্তেজিত হইয়া কহিল,
আবার হাসছাে ?
—হাসিপেলে কি করবাে ?
-সিলি,-নসেন্স-লিলি উষ্মা সহকারে দ্রুতপদক্ষেপে
প্রস্থান করিল। অশােক বৃহদাকার বই খানার সামনে বসিয়া
পড়িতে চেষ্টা করিল কিন্তু লিলির এই অপমানটা তাহাকে
উত্তেজিত করিয়া দিতেছিল—এমন মাথা নত করিয়া ক্ষুদ্রতুচ্ছ
কারণে প্রতিনিয়ত অপমান সহ্য করিবার কি সার্থকতা আছে ?
পড়াশুনা—জগতে সকলেই পড়াশুনা করিবার সুযােগ পায় না,
জীবন অত্যন্ত তুচ্ছ কিন্তু তাহার জন্যে এমনি অপমান তুচ্ছতা
স্পর্ধা ও ঔদ্ধত্যকে কেন সে সহ্য করিবে ? পরক্ষণেই মনে
পড়ে তাহার মামার কথা, পৃথিবীর ক্লেদ গ্লানির উধ্বে উদার
প্রশান্ত ওই লােকটি -
শুভ্রা পার্টিতে বসিয়া কহিল,—কই লিলি অশােক:বাবু ত
এলেন না?
মিলি বুঝিয়াছিল লিলি অশােককে সরাইয়া দিয়া পার্টিকে
'নিষ্কণ্টক করিয়াছে। সে দুঃখিত হইলেও নিরুপায় তাই বলিল,-
ও নিশ্চয়ই পড়ছে,-যাগে যে পছন্দ করে না
অশােকের অশান্ত মনে কেবল একটা কথা ধ্বনিত হইতে-
ছিল একটু আড়ালেই থাকা দরকার। এবং ক্রোধে ক্ষোভে
ঘৃণায় সে ক্রমশঃ উত্তেজিত হইয়া উঠিয়াছিল। তাহার বংশানু-
পৃথিবীর বেম-৩

৩৪ ক্রমিক বিদ্রোহী রক্ত কোন ক্রমেই লিলির এই ঔদ্ধত্যকে মার্জনা করিতে পারিতেছিল না। - শৈলেন বাবু বেড়াইয়া ফিরিয়াছেন বৈঠকখানায় বসিয়া রেডিও শুনিতেছিলেন। শুভ্রা এক বাটি দুধ আনিয়া কহিল, আজ দিতে দেরী হ’লহিটারটা খারাপ হয়ে গেছে হিটার সম্বন্ধে শৈলেন বাবু বিন্দু মাত্র ঔৎসুক্য প্রকাশ না করিয়া কহিলেন,-বস্ততার সঙ্গে কথা আছে - তিনি মনে মনে অন্য কি যেন একটা কথা ভাবিতেছিলেন, শুভ্রা তাহার একমাত্র কন্যা, তাহার স্বাস্থ্যও খুব ভাল নয়, মৃত্যুর আশঙ্কা তাহাকে মাঝে মাঝে ব্যাকুল করিয়া তুলিত তিনি কহিলেন, “অশােক আর মিলি ত অনেক দিন আসে না- শুভ্রা কহিল, -এই ত শনিবারেও এসে গেল তােমার মনে নেই- – আচ্ছা অশােক, ডাক্তার বােসের কি হয় ? -ভাগনে,-তাঁর পিসতুত বােনের ছেলে। বােন মারা গেছে,ওর কেউ নেই তাই মিলির বাবা পড়াচ্ছেন—ওদেরই আশ্রিত - শৈলেন বাবু দুধটুকু পান করিতে করিতে কহিলেন,-- দূরসম্পর্কের ? -কেন?

-না, তাই বলছিলাম, ছেলেটার মধ্যে বেশ শক্তি আছে
যে। পড়াশুনােয়ত বেশ ভাল তাই মনে হয় –কি বলিতে
যাইয়া তিনি চুপ করিলেন।
-কেন। কি মনে হয় বল না -
ও রকম একটা ছেলে পেলে আমি মানুষ করতাম, আমি
আর কদিন, তাের জন্যেই ত ভাবনা হয়। হঠাৎ মারা গেলে
কি করবি।
শুভ্রা কহিল,-তুমি দিনরাত্রি নিজের মৃত্যু কামনা করে
করেই অমঙ্গল ডেকে আনতে চাও নাকি ?
এ বয়সে অমনি ভাবনা হয় মা-
-না ওসব বাজে কথা ভেবাে না-
-আচ্ছা আচ্ছা,তুই পড়তে যা,
শুভ্রা চলিয়া গেল—কিন্তু শৈলেন বাবু ভাবিতে লাগিলেন,-
অশােকের মত একটা ছেলের হাতে শুভ্রাকে দিয়া যাইতে পারিলে
তিনি যেন অনেকটা নিশ্চিন্ত হন। সুচরিত্র ভদ্রছেলে আজকাল
প্রায় দুষ্প্রাপ্য, বিশেষতঃ হৃদয়বান ছেলে-তারা আর যাই করুক
অন্যায় করিয়া কাহাকেও আঘাত করিবে না। অশােকের মধ্যে
যেন তিনি তেমনি একটা হৃদয় এবং উন্নতি করিবার শক্তি
দেখিয়াছিলেন তাই তাহার প্রতি তিনি আগ্রহশীল হইয়া
উঠিয়াছেন। মনের নিভৃত কোণে হয়ত বা তাহার জাগিয়াছিল,
দু’জন তাহার বাড়ীতে থাকিয়া একসঙ্গে লেখাপড়া করিয়া
জীবনের সঙ্গী হইলে যেন মন্দ হয় না—তিনি যেন তাহাতে
ত

আনন্দিতই হইবেন। অশােক ডাঃ বােসের আশ্রিত, না হয়
তাহারই আশ্রিত হইল !
এইরূপ চিন্তা তঁাহার আকস্মিক নয়,অশােকের সহিত
পরিচয়ের অনেক পূর্বেই তাহার এমনি একটা সুপ্ত বাসনা ছিল
অশােকের সঙ্গে পরিচয় যেন সেটাকে জাগরিত করিয়া দিয়াছে।
লিলির আরও কয়েকটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবহার অশােককে মনে
মনে উত্তেজিত করিয়া তুলিয়াছিল। এইরূপ অসম্মান
উপেক্ষার মধ্যে তাহার আর থাকিতে ইচ্ছা ছিল না; কিন্তু আজ
পড়া ছাড়িয়া দিলে জীবনও এইখানে সমাপ্তি লাভ করিবে
এই চিন্তাটা তাহাকে প্রতিরােধ করিতেছিল। মাঝে মাঝে মনে
হয় পড়িবার জন্যে জীবনে এই অসম্মান বরণের সার্থকতা কি ?
উত্তেজনা ও অধীরতা কয়েকদিন যাবৎ তাহাকে একটু বিমন।
করিয়া দিয়াছিল। সেদিন বৈকালে মিলি তাহার ঘরে আসিয়া
নানাভাবে তাহাকে উত্যক্ত করিতেছিল, শুভ্রার সহিত তাহাকে
জড়াইয়া উপহাসও করিতে ছাড়ে নাই। অশােক জবাব দেয়
নাই, শুধু বলিয়াছিল, -তােমাদের সঙ্গে বা শুভ্রাদের সঙ্গে
আমার যে তফাৎ অনেক সে কথা আমি ভুলি নি-
মিলি কহিল,—ভুলবে,-মাসখানেক যেতে দাও, সব ভুলবে
নিজের নাম গােত্তর ভুলবে-
অশােক মিলিকেও আজ কোনরূপ সম্মান না করিয়া নীরবে
বাহির হইয়া গিয়াছিল।
=

৩৭ সে যখন বাহির হইল তখন যথেষ্ট বেলা আছে, অকারণ নির্দিষ্টভাবে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরিয়া একদিকে যত ক্লান্তি আসিতে লাগিল, অন্যদিকে উত্তেজনাও তত বাড়িতে লাগিল। যদি এমনি করিয়া ঘুরিতে ঘুরিতেই অবসন্ন দেহে সে মরিয়া যায়, -জগতের একটি অপ্রয়ােজনীয় প্রাণী ফুটপাথে মরিয়া থাকে, তবে কাহার কি ক্ষতি। কিন্তু সম্পদের এই অন্ধত্ব ও অমার্জনীয় উদ্ধত্যকে মার্জনা করা, উপেক্ষা করা একান্তই কাপুরুষতা, মনুষ্যত্বের অবমাননা। যৌবনের উদ্দাম চিন্তা ও ভাবোন্মত্ততা তাহাকে যুগপৎ ক্রুদ্ধ ও দুঃখিত করিয়া তুলিল, পার্কের নির্জন বেঞ্চির উপর বসিয়া অশােক কয়েকবার অশ্রু মার্জনা করিল, মনে মনে মাকে বলিল —মা, তুমি কোথায় আমাকে ফেলে চলে গেলে আমাকে তােমার স্নেহময় ক্রোড়ে স্থান দাও। মায়ের স্মৃতি আর এই উদ্দামতায় তাহার অন্তর বারবার কঁদিয়া উঠিল,-চোখের জল মুছিয়া আবার ভাবিল - তাহার নিভৃত পল্লী, স্নেহময়ী মাতা- সম্পদ সেখানে নাই কিন্তু হৃদয় আছে, স্নেহ আছে, সমবেদনা আছে••• চোখের জল মুছিয়া দেখিল, চারিদিকে আলাে জ্বলিয়াছে। কলিকাতার কোলাহল অালােকদীপ্ত হইয়া সভ্যতার জয়যাত্রা ঘোষণা করিতেছে। সে ধীরে ধীরে উঠিয়া বাড়ীর দিকে রওনা দিল—এই বাড়ীতে প্রবেশ প্রস্থান এবং অবস্থিতির মাঝে একটা অজ্ঞাত শঙ্কা যেন তাহাকে ম্রিয়মান করিয়া রাখে,-একবার

বাহিরে. আসিলে আর প্রবেশ করিতে ইচ্ছা করে না—মনে
হয় বাড়ীর বাহিরে সে যেন মুক্ত বায়ুর শ্বাস গ্রহণ করিতে
পারে।
ড্রইং রুমে বসিয়া লিলি ও ডাঃ মিটার আলাপ আলােচনা
করিতেছিলেন যাহাকে ইংরাজি মতে ফ্লার্ট বলা চলে। মিত্রের
লিলির উপরে লােত কিছুটা না ছিল এমন নয় কিন্তু বিভাস
বাবুর এই বাড়ীর অর্ধেক ও ব্যাঙ্কের লক্ষ লক্ষ টাকার অর্ধেকের
প্রতি অধিকতর আকর্ষণ ছিল। কাজেই কোন মতে লিলিকে
জালে জড়াইবার প্রতি তাহার একটা ঐকান্তিক আগ্রহ ছিল
এবং নির্বোধ সাধনাও ছিল যথেষ্ট।
লিলি সােফায় অর্ধ এলায়িত হইয়া ছিল, ভাঃ মিত্র বলিতে
ছিলেন,—সত্যি বছ মিস্ বাস্তু, আপনি এত সুন্দর যে চোখ
ঝলসে যায়—
লিলি হি হি করিয়া হাসিয়া কহিল,-তাকান কি করে
তা হলে ?
মিটার একটু ভাবাকুল নেত্রে সুন্দরের পানে চাহিয়
কহিলেন,-জার্মানী, ইংলণ্ড, ফ্রান্স ঘুরেছি কিন্তু এমনটি কখনও
দেখিনি—যে নিঃশেষে হৃদয়ের সুধাকে শােষণ করে – শিহরণ
জাগে-
-আপনার ত তা হলে হার্ট ডিজিজ হয়েছে।

মিত্র পরিহাসটা গায়ে না মাখিয়া বলিলেন,—রােগ হয়েছে, হাট নয় তবে হৃদয়ে। -রােগের চিকিৎসা করুন। মিটার সস্নেহে এবং সমীহ সহকারে তাহার হাতটা লইয়া কহিল,আপনি অনুগ্রহ করলে নিরাময় হতে দেরী হবে না। ডাক্তার ত আমার বাবা । মিটার তাহার হাত খানা লিলির কাধের উপর তুলিয়া দিয়া কহিল,--তার মতামত ত নিতেই হবে যখন লিলির সহিত মিটারের ভাবলােক প্রায় বাস্তবকে অতিক্রম করিয়াছে ঠিক এমন সময় অশােক সদর দিক হইতে হলে প্রবেশ করিয়া, অন্য দরজা দিয়া ভিতরে যাইতেছিল কিন্তু তাহার আগমনটা উভয়কেই উত্যক্ত করিয়া তুলিল। মিটার অত্যন্ত বিরক্তির সহিত কহিলেন,--ওটা কে ? আমাদের কেউ নয়, বাবা আশ্রয় দিয়েছেন এখানে থেকে পড়ে। বাবার কাণ্ড! -কেউ নয় ? -না, গ্রামের ছেলে-নিরাশ্রয় হয়ে এসেছে। আশ্রিতের পক্ষে এরকম চালচলন ত— -একটু গ্রাম্য—মানে অসভ্যত হবেই- অশােকের মনটা আজ ভালই ছিলনা, তাহার পর এই রূঢ় কথাগুলি আজ তাহার মৰ্ম্মে তীক্ষ্ণ স্বরের মত বিদ্ধ হইল। দরজার নিকটে যাইয়া অপেক্ষা করিতেছিল।

৪০
মিত্র, উপেক্ষার সহিত কহিলেন,—এখানে থাকে কেন?
মাসে দু’চারটাকা সাহায্য ফেলে দিলেই হয়--মেসে ফেসে গিয়ে
থাকুক
লিলি কহিল, না, আমি আর এসব টলারেট করব না।
তাড়িয়ে দেব—কতদিন বলেছি ওদিক দিয়ে ঢুকতে—তা গ্রাহই
-
করে না -
অশােক আজ আর পারিলনা, সমস্ত সংযম মুহূর্তে ধূলিসাৎ
হইয়া গেল, সহসা তাহার মনে হইল এমনি করিয়া বাঁচিয়া থাকা
নিরর্থক, অসম্মান ও লাঞ্ছনার বােঝা বহন করিয়া বাঁচিয়া
থাকিবার নাম জীবন নয়। সে সবেগে ফিরিয়া আসিয়া কহিল,
ডাঃ মিত্র, উনি যা বললেন তা ঠিক নয়। আমি ওর পিসতুত
ভাই। আমার পরিচয় দিতে লজ্জা হয় বলে মিথ্যা কথা বলেছেন।
লিলি অশােকের এই কথাবার্তায় উত্তেজিত হইয়া উঠিয়াছিল,
-সে বলিল ইডিয়েট
অশােক এত উত্তেজনার মধ্যেও একটু হাসিতে চেষ্টা
করিয়া কহিল,আমি হয়ত গেঁয়াে ও অসভ্য হতে পারি কিন্তু
একেবারেই আশ্রিত এমন নয়—আমারও এখানে থাকবার একটা
দাৰী আছে—
লিলি কহিল, কোন দাবী নেই, গেট আউট স্টুপিড
কোথাকার
অশােক কঠিনকণ্ঠে কহিল, সম্পদের স্পদ্ধ। আপনাকে
আমার চেয়েও স্টুপিড করে তুলেছে তা বুঝতে পারেন কি ?

৪১ এক্ষুনি এবাড়ী থেকে বেরিয়ে যাও তুমিনসেন্স বেরিয়ে যাবার জন্যে প্রস্তুত হয়েই একথা বলেছি সেটীও বুঝলেন না! আপনার বুদ্ধি এত প্রখর সে কথা ভাবিনি তুমি আমাকে দাড়িয়ে অপমান করছ এতবড় স্পদ্ধ। অশোেক কহিল, এতক্ষণে বুঝলেন যে অপমান করছি- আপনাকে অপমান করা তা হলে আমার সাধ্যাতীত। অশোক দ্রুত সদরের দিকে বাহির হইয়া গেল। লিলি আর মিত্র ক্রোধে ক্ষোভে গুম হইয়া বসিয়া রহিলেন। ডাঃ বস্তু কি যেন একখানা বই নিবিষ্টমনে পড়িতেছিলেন অশােক কিছু না ভাবিয়াই তাহার সামনে উপস্থিত হইয়া কহিল, মামা আমি যাচ্ছি-- ডাঃ বসু মুখ না তুলিয়াই কহিলেন,-যাও, হন্ হন্ করে ছাটবে- -যদি কোন দিন বড়লােক হই তবে আস্ব- ডাঃ বসু কহিলেন, উচ্চাকাঙ্খই মানুষকে বড় করে ভিটামিন ট্যাবলেট খেয়ে শরীরটা তাজা রাখা দরকার— অশােক একটু ইতস্ততঃ করিল, পর মুহুর্তেই ভাবিল, মামার ভুল ভাঙ্গিলে হয়ত তাহার যাওয়া হইবে না। সে তাই তাড়াতাড়ি তাহাকে প্রণাম করিয়া কহিল, আসি মামা ! ডাঃ বােস, মুখ তুলিয়া কহিলেন, আমাকে প্রণাম করবার তবে। ।

৪২ দরকার নেই, তােমার মামীকে মাঝে মাঝে করে তাকে খুসী রেখে উপায় কি? আমাকে পৰ্যন্ত করতে হয়- তিনি নিজের রসিকতায় উচ্চকণ্ঠে হাসিয়া উঠিলেন। অশােক আর বিলম্ব না করিয়া বাহির হইয়া পড়িল। জ অশােক একবার স্বাধীন মুক্ত বাতাসে প্রাণ ভরিয়া শ্বাস গ্রহণ করিল। সম্মুখে জনারণ্য নগরী, কত পথ, কত লােক, কত বিস্ময়, কত অন্ধকার, কত অলল, অভন্তাত অখ্যাত পল্লী, অশােক ধীরে ধীরে সেই . অজ্ঞাত পৃথিবীর পনে পা বাড়াইল। একবার মনে মনে শুধু কহিল, জীবন আর মৃত্যুর মাঝে ব্যবধান অত্যন্ত সামান্যই তাহার জন্যে এই অপমান এই দুঃসহ পদ্ধাকে উপেক্ষা করা একান্তই কাপুরুষতা। বংশগত বিদ্রোহী রক্ত আজ তাহার শিরা উপশিরায় উত্তপ্ত হইয়া উঠিয়াছে, তাহাদের তাপে স্নায়ু মণ্ডলী যেন নিস্তেজ, কিছু ভাবিবার নাই। অশােক দ্রুত পায়ে তাই কেবল চলিতেই লাগিল। অশােক চলিয়াছে—রাস্তা বৃহৎ, ক্ষুদ্র, আলােকিত, অন্ধকার, জনবহুল, জনবিরল, সে থামে নাই ক্রমাগত চলিয়াছে। দুর্দমনীয় একটা ক্রোধ ও অভিমান পশ্চাৎ দিক হইতে তাহাকে যেন তাড়া করিয়া লইয়া চলিয়াছে। প্রাথমিক উত্তেজনা প্রশমিত হইয়া যখন সে প্রথম ক্লান্তি বােধ

করিল তখন ১২টা। ক্লান্তির সঙ্গে সঙ্গে সে একটা পার্কে গিয়া
বসিল। নিৰ্জ্জন নিশীথ রাত্রি, চারিপাশের স্তিমিত আলােক
গুলিও যেন ঝিমাইতেছে- মাঝে মাঝে দুই একখানা মােটর
তীব্র শব্দে ও বেগে চলিতেছে। কদাচিৎ তন্দ্রাচ্ছন্ন রিকসা-
ওয়ালার ঠন ঠন শব্দ••
অশােক যে বেঞ্চিটায় বসিয়া ছিল সেটা দীর্ঘ, অপরিচ্ছন্ন।
এতক্ষণ সে কিছু ভাবে নাই, এখন প্রথম মনে হইল জীবনের
দুইটি পরিচ্ছেদ সমাপ্ত হইয়াছে,- জীবন কাহিনীর নূতন অধ্যায়
সুরু হইতে চলিয়াছে। জীবনটা যেন এই বেঞ্চটার মত
অনাবশ্যকরূপে দীর্ঘ ও অপরিচ্ছন্ন-পিছনে কোন আকর্ষণ
নাই, একমাত্র শুভ্রা যেন তাহাকে পিছন হইতে ডাকে,
মিলি জীবনের কয়েকটি দিন তার সুমধুর করিয়া দিয়াছিল।
কি করিবে, কাল কি হইবে, কি খাইবে এসব চিন্তা তাহার
মনে ছিল না, কেবল বিগত অতীত যেন তাহার হৃদয়ের তন্ত্রী
আকর্ষণ করিতেছে অত্যন্ত নির্মম ভাবে কোথায় সেই ছায়া
পল্লবময় গ্রাম, মাতার স্নেহ, প্রতিবেশীর শুভেচ্ছা-শুভ্রার
শান্ত সুন্দর পরিচয়••••••
অশোক নিজের অজ্ঞাতেই ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল.•••••
রাত্রির শেষভাগে একটি পুলিশ প্রহরী আসিয়া তাহাকে
ঠেলিয়া তুলিল,-অশােক তাহাকে কিছু না বলিয়া আবার
চলিল--মনে মনে কহিল-এটা নিতান্তই অত্যাচার-যার স্থান
নাই সে কোথায় যাইবে—

৪৪ সে উপায়ান্তর না পাইয়া অন্য পার্কে যাইয়া পুনরায় শুইয়া পড়িল। প্রভাতের স্বর্ণরশ্মি যখন কলিকাতার সুউচ্চ বাড়ীগুলির উপর হইতে আসিয়া অশােকের ক্লান্ত দেহের উপর ছড়াইয়া পড়িল তখন সে ধীরে ধীরে চোখ মেলিয়া চাহিল। প্রথমেই তাহার হাসি পাইল,-আজ কিছুই করিবার নাই। কোন ব্যস্ততা নাই, পড় নাই কলেজে যাওয়া নাই...কিছুক্ষণ অত্যন্ত অলসের মত সে শুইয়াই রহিল, তাহার পর ধীরে ধীরে উঠিয়া বসিল। এমনি কর্মহীন দিনে কি করা যায় ? একটা কথা মনে হইল,-সংসার স্রোতে সে কোথায় ভাসিয়া যাইবে কে জানে,শেষ বিদায়ের পূর্বে শুভ্রাকে একবার দেখিতে ইচ্ছা হয়। পকেটে কয়েক আনা পয়সা আছে। তাহা দিয়া সকালের চা ও ট্রাম ভাড়া হইতে পারে। অশােক দ্বিতীয় চিন্তা না করিয়া একটা চা এর দোকানে পড়িল। চা পানান্তে মনে হইল দেহটা যেন আর অবশ অকর্মণ্য নাই,সে ট্রামে উঠিয়া রওনা দিল- শুভ্রদের বাড়ীর সামনে সে যখন উপস্থিত হইল তখন প্রায় দশটা। কলেজে যাইবার সময় হইয়াছে'—ওই অপরিচ্ছন্ন বেশ ও রাত্রি জাগরণ-ক্লান্ত চেহারা লইয়া শুভ্রদের বাড়ীতে যাইতে তার যেন অকস্মাৎ সঙ্কোচ বােধ হইল—মনে মনে প্রশ্ন ঢুকিয়া

৪৫
-
উঠিল শুভ্রা তাহার প্রতি যে সদয়তা দেখাইয়াছে তাহা কেবল
মাত্র তাহারই জন্যে, না সে মিলির ভাই বলিয়া অথবা ডাঃ বাসুর
ভাগিনেয় বলিয়া ?
বাগানের বাহিরের রাস্তার দাড়াইয়া থাকিতে থাকিতে হঠাৎ
তাহার চোখে পড়িল শুভ্রা আসিতেছে—কলেজে যাইবার জন্য
প্রস্তত হইয়া। সে গেট ঠেলিয়া বাহির হইল,—তাহার প্রতি
বােধ হয় একটা অনৈচ্ছিক দৃষ্টি নিক্ষেপ করিল কিন্তু চিনিল
না, কোনও প্রশ্ন করিল না। রাস্তার উপরে পেন্সিলটা হঠাৎ
পড়িয়া গেল—শুভ্রা আনত হইয়া সেটাকে কুড়াইয়া অপেক্ষারত
অশােককে পিছনে রাখিয়া দ্রুত চলিয়া গেল।
অশোকের নিকটে এই সামান্য ঘটনাটা অত্যন্ত বৃহৎ হইয়া
তীব্র তীক্ষ্ণ ভাবে তাহার অন্তর বিদ্ধ করিয়া রক্তাক্ত করিয়া দিল।
মানুষ ভালবাসে মানুষকে নয় ভালবাসে তাহার অর্থ সম্পাদকে—
আজ সে গৃহহীন অসহায় বলিয়াই তাহার কোন মূল্য নাই !
অপরিচিত উপেক্ষিত। অথচ সে কাল যাহা ছিল আজ তাহাই
আছে—
নিজের উপরে, সমস্ত পৃথিবীর উপরে তীব্র একটা অভিমান
লইয়া সে আবার চলিল। তাহার চোখের সামনে মুহূর্তে পৃথিবীর
ঐশ্বৰ্য সভ্যতার ঔজ্জ্বল্য অর্থহীন হইয়া গেল। ন্যায়-সত্য-ধৰ্ম্ম
বিবেক সমস্তই যেন অন্ধকারময় হইয়া উঠিল – মনে হইল
ছুটিয়া পলায়ন করে কোন নির্জন মানবহীন অরণ্য বা
প্রান্তরে---
।

৪৬
।
কলিকাতার জনাকীর্ণ রাস্তা দিয়া অশােক ছুটিয়াছে—ক্রোধে
ক্ষোভে অপমানে সমস্ত মনটা বিষাক্ত হইয়া উঠিয়াছে তাহাতে
কোনও সংজ্ঞা নাই।
অন্তরে একটা ভয়াবহ আবেগ তাহার সমস্ত দৈহিক চেতনাকে
বিলুপ্ত করিয়া দিয়াছে—ক্ষুধা নাই, তৃষ্ণা নাই, অবসাদ নাই।
যৌবনের উন্মাদ দিবসে অশােক তাই ছুটিয়া চলিয়াছে সংজ্ঞা
হীনের মত-শুভ্রাকে ঘেরিয়াই যেন তাহার জীবন এবং শুভ্রা-
হীন জীবন যেন ধারণের অনুপযুক্ত। কিন্তু সে ভাবে নাই
মহত্তর জীবনে বিপুল কর্তব্য, কল্যাণময় কৰ্তব্য রহিয়া গিয়াছে-
সমস্ত দিন ও রাত্রি চলিয়া গিয়াছে এমনি ভাবে। তৃতীয়
দিনের সকালে দৈহিক ক্লান্তি সে প্রথম বােধ করিল—তৃষ্ণায়
যেন বুকের ছাতি ফাটিয়া যাইতেছে,-ক্ষুধায় পেটের মাঝে
যেন ক্রুদ্ধ ভুজঙ্গের মত দংশন করিয়া ফিরিতেছে।
বস্তির মেয়েরা রাস্তার কলে জল লইতেছিল—জল পানের
আশায় অশােক দাড়াইয়া রহিল। মেয়েরা সরিয়া গেলে সে
জল পান করিবে। শেষ মেয়েটি কলসা নামাইয়া প্রশ্ন করিল,-
কি চাই!
—জল খাবো--
-তা খেয়ে নাও,আমি পরেই জল নেব।
অশােক জল পান করিল,—কিন্তু শূন্যোদরে কয়েকদিন

৪৭ বনে কুল পড়িয়া বৃশ্চিকের মত যেন দংশন করিল। সে পেট চাপিয়া ধরিয়া চীৎকার করিয়া উঠিল,-উঃ-উঃ ! মেয়েটি বলিল,—কি হ’ল। -ব্যথা, পেটে অসহ্য ব্যথা- -কেন জল খেলে ব্যথা হবে কেন ? বধূটি ব্রীড়া ভঙ্গি করিয়া কহিল,-ক’দিন খাওয়া হয় নি। অশােক আশ্চৰ্য্য হইয়াছিল। পেটের বেদনাটা তীব্র একটা কামড় দিয়া যেন ছাড়িয়া দিয়াছে। কহিল,-কেন? --খালি পেটে জল পড়লে অমনি হয়। চল আমার সঙ্গে খেতে দেব- '। -ভিক্ষে ? -না-না, ভদ্র লােকের ছেলে ভিক্ষে করবে কেন? *= অশােক বিজাতীয় একটা ঘৃণায় মুখ ফিরাইয়া কহিল, না—জীবন রক্ষায় জন্যে ভিক্ষা করা চলে না বধূটি আর একবার হাসিয়া একটু যেন নৈকট্য জ্ঞাপন করিয়া কহিল, নিশ্চয়ই না- কাজ করবে খাবে, তাতে ত অপমান নেই। তােমার মত একটি লােক আমার দরকার অশােক নির্বিকার চিত্তে প্রশ্ন করিল,-কি কাজ করতে -বাজার ঘাট, ফাই ফরমাস খাটা,-খেতে পরতে দেব কিছু হাত খরচও দেব। তার পর ভাল চাকুরী পাও চলে যাবে-

৪
অশােক অবাক হইয়া বধূটির মুখের পানে চাহিল। বধূটি
পুনরায় কহিল,-এখন বাড়ী ছেড়ে পালিয়েছ ত? খাওয়া
হয়নি,-বৃথা অত্যাচার করছ দেহের উপর তাতে লাভ কি ?
যারা অত্যাচার করে, বেঁচে থেকে তাদের উপর প্রতিশােধ
নিতে হয়। নিজের উপর অত্যাচার করে মরা ত একদম
কাপুরুষের কাজ -
আকস্মিক ভাবে কথা কয়েকটি অশােকের মর্মস্থলে যেন
স্নেহের স্পর্শ বুলাইয়া দিল – এমন কথা, এমন নৈকট্য পথের
পরিচিতের কাছে কে আশা করিতে পারে ! বধূটি আর একবার
হাসিয়া কহিল,-কি ভাবছ, চল -
অশােক কহিল
চলুন
বস্তির এককোণে ছােট্ট দু’টি ঘর। আসবাব পত্র মূল্যবান,
এরূপ ঘরের উপযুক্ত নয়, ঘরটিও পরিষ্কার ঝক ঝক্ করিতেছে।
এক পাশে একটা বিছানা, ভাল খাট। সবুজ একখানা তাঁতের
চাদরে ঢাকা, কয়েকটি সুন্দর শুভ্র বালিশ। বধূটি কহিল,-
এসাে এখানে হাত পা ধুয়ে বসো
অশােক নির্দিষ্ট স্থানে হাত পা ধুইয়া বিছানায় বসিল,-
বধূটি কহিল–একটু ব’সাে খাবার নিয়ে আসি। অশােক
বিস্মিত ভাবে চারিপাশে চাহিয়া দেখিতেছিল দেয়ালে কয়েকখানা
ছবি-সুরুচিসঙ্গত নয় কিন্তু মূল্যবান। আলমারীর মধ্যে

89 - খেলনা ও কতকগুলি কাচানাে ধুতি শাড়ী রহিয়াছে।*.একখানা আয়না,--তাহার নীচের তাকে প্রসাধন সামগ্রী। অশােক একে একে সব দেখিতেছিল – বধূটি কয়েকখানা গরম লুচি তরকারী ও বাজারের দুইটা সন্দেশ লইয়া আসিল। স্মিত হাস্যে কহিল,-খেয়ে নাও, তার পরে কাজ কর্ম বুঝিয়ে দেব। নাম আমার বিলাসী -কিন্তু তুমি বৌদি বলেই ডেকো,তােমার দাদা এলে আলাপ কমিয়ে দেব। খেয়ে নাও-সে উত্তরের অপেক্ষা না করিয়াই চলিয়া গেল- অশােক ইতস্ততঃ করিয়া খাইতে আরম্ভ করিল। বিলাসী আরও কয়েকখানা লুচি আনিয়া কহিল,- কই এখনও এ কখানা পানি খেতে। কাছে বসিয়া কহিল, -খেয়ে নাও, ভাত হতে দেরী হবে। তােমার নামটাত বললে না ভাই ? বল না -পথের আত্মীয়ও ত আত্মীয়। অশােক কহিল,-অশােক। -অশােক কি ? - অশােক মিত্র। ও তােমরা কুলীন কায়স্থ। আমরা কিন্তু গয়লা ঘােষ - জাত নেই বলেই চলে। তা হাে জাত যাবে না। যাবে না ত? অশােক কহিল,-না,-জাত আমারও নেই। যার টাকা নেই তার জাত কি ? পণ্ডিনীয় প্রেম-

বিলাসী কথাটা শুনিয়া হিহি করিয়া অনেকক্ষণ হাসিল,
অবশেষে একটু ব্যঙ্গ করিয়া কহিল – গরীবের ভাত নেই বল।
তা বেশ আমরা তা হ'লে ত এক জাতের ?
অশোক বিস্মিত হইয়া কহিল, - কি ?
-কেন ? বুঝল না, আমরা
এক – আমাদের
জাতের নাম গরীব জত। বিলাসী আবার হাসিল ।
অশােক এতক্ষণে খাইয়া শেষ করিয়া দিল। বিলাসী কহিল
আমরা গরীব জাতের, তাই এক্ষুণি রাস্তার কলে চান করে
এসো, এর পরে জল থাক্‌বে না। আমি রাঁধতে যাই।
নেয়ে
এসাে ঘুমােও কেমন ?
বিলাসী আলমার্মা হইতে একখানা কাচানো ধুতি তােয়ালে,
গন্ধতৈল প্রভৃতি
প্রভৃতি বাহির করিয়া দিয়া বহিল – যাও, জল
থাকবে না।
স্নান করিয়া অশােক ঘরে আসিল। বারান্দায় অপ্রশস্ত
রান্নাঘর হইতে বিলাসী কহিল,- ঘুমাও, রাঁধতে দেরী হবে-
কয়েকদিন পরে পেটে কিছু খাদ্য পড়িয়াছে, স্নান করিয়া
আসিতেই অশােকের সমস্ত শরীর অলস হইয়া পড়িল। সুন্দর
মসৃণ শয্যা – তিনটি রাত্রি পার্কে পার্কে পুলিসের তাড়া খাইয়া
বেড়াইয়াছে,-শয্যায় শুইয়া সে ভাবিতেছিল – প্রথম ভাবিল, সে

কোথায় আসিয়াছে ? কি হইবে ! ভবিষ্যতের গর্ভে তাহার
শুন্য কি অাছে ?
কিন্তু চিন্তাধারাও সহনা নিস্তেজ হইয়া আসিল, অশােক
সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমাইয়া পড়িল।
কতক্ষণ সে ঘুমাইয়াছিল ঠিক নাই। বিলাসীই তাহাকে
‘য়ি, তুলিয়া কহিল -- অশােক চল, রান্না হয়ে গেছে।
অশোক তন্দ্রাচ্ছন্নের মত উঠিয়া খাইয়া আসিল এবং পুনরায়
মাইয়া পড়িল।
খােলার ঘরের কোন একটা ফাঁকে ঘরের মাঝে এক ফালি
রোদ্র আসিয়া পড়িয়াছিল তাহার মাঝে দেখা যাইতেছিল অসংখ্য
পলা দিশেহারা হইয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। অপরাহ্নের রৌদ্রে
একটা সােনালী আভা।
অশােক জাগিয়া তাহাই দেখিতেছিল, হঠাৎ দেখে বিলাসী
তাহারই পাশে শুইয়া ঘুমাইয়া আছে। অশােক চমকাইয়া উঠিয়া
বসিল।
ডাঃ বস্তু শােকের প্রস্থান সংবাদ পাইলেন, তিনদিন পরে।
হঠাৎ তাহার একদিন মনে হইল অশােক কোথায় ? কয়েকদিন
যেন তাহাকে দেখেন নাই।
বাস্তু উপরে যাইতেছিলেন, সিড়িতে মিলির সহিত দেখা ;
তিনি প্রশ্ন করিলেন, অশোেক কোথায় রে মিলি ?

বসু পত্নীকে
মিলি মাথা নত করিয়া কহিল,—চলে গেছে।
কোথায় ?
জানিনা।
জানিনা মানে ?
মিলি ব্যথিত ভাবে কহিল, মা আর দিদি আছে, তাদের
কাছে শােনাে গিয়ে।
ডাঃ বসু ব্যস্তভাবে উপরে উঠিলেন। মাতা ও কন্যা ঘরে
বসিয়াছিলেন, কি একটা কথা হইতেছিল।
প্রশ্ন করিলেন, অশােক কোথায় ?
পত্নী ডাঃ বসুকে চিনিতেন। তঁাহার রুদ্র গম্ভীর মূর্তি
দেখিয়া তিনি ভীত হইয়াছিলেন, তবে তিনি জানিতেন, যতবড়
রাগই তাহার হউক তাহা দুইচার ঘণ্টার বেশী স্থায়ী হইবে না
এবং তিনি যে রাগিয়াছেন একথাও তিনি ভুলিয়া যাইবেন।
গৃহিণী কহিলেন,-পালিয়ে গেছে।
কোথায় ?
আমাকে ত বলে যায় নি।
কেন গেল সেটা খোজ করেছ ? না তার প্রয়ােজন
হয়নি ?
লিলির সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়েছিল, তার পরেই
কাউকে না বলে সে চলে গেছে।
কি হয়েছিল ?
এবার লিলি জবাব দিল, আমাকে অপমান করেছিল, তাই

তাকে বলেছিলাম, চলে যাও এবাড়ী থেকে। এখানে থাকবার
তােমার অধিকার নেই। সে বলে দাবী অাছে,
সে বলে দাবী আছে, আমি ব’লুম
কোন দাবী নেই-এই'- এতেই যে চলে যেতে হবে !
ডাঃ বসু চেয়ারখানায় বসিয়া পড়িলেন। অনেকক্ষণ যাবৎ
কি যেন চাহিয়া চাহিয়া দেখিলেন। তাহার পরে কহিলেন, সে
বাপের ছেলে, তার বাপ সারাজীবন দুঃখ পেয়েছে কিন্তু মাথা নত
করে নি, দুলু ও তাই, সে কি তােমাদের ঔদ্ধত্য সহ্য করতে
পারে।
লিলি অবাক হইয়া কহিল, আমাদের ঔদ্ধত্য ! তারই ঔদ্ধত্য
সে সমান ভাবে মিশতে চায় ! এ সাহস তার হওয়া ঠিক নয়।
তােমাদের সমান সে নয়, অনেক বড়। উঃ কি করেছ
তােমরা, হয়ত একটা জগদীশ বসু, কি আচাৰ্য রায় হতে পারত
যে তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও শক্তি তার ছিল, তোমাদের অহঙ্কার
তা'কে শেষ করে দিলে
লিলি কহিল, তাইবলে তার আমাকে অপমান করার সাহস
কেন হবে ?
তােমারও যে কারণ, তারও সেই-ই কারণ। তােমরা তাকে
অপমান করেছ বাবা বড়লােক বলে, সে করেছে তার মামা
বড়লোক বলে।
গৃহিণী সুর ধরিয়া কহিলেন, এতকাল ত দেখিনি বোন,
ভাগনে,ওকেই দেখলাম প্রথম। ও রকম আত্মীয় বহু থাকে-
তাই বলে তাড়িয়ে দিতে হবে।
।

৫৪
তাড়িয়ে দিলে কে ?
চলে গেল-ঠাকুর ঠাকুর করে
মাথায় করে রাখতে হবে ?
চলে গেছে মেরে অত চিরে ---
তাই বলে কি করতে হবে ? আমি খুজতে বেরনো?
জানাও নি কেন এতদিন ?
এমন কি ঘটেছে যে জানাতে বে ?
বা বিস্মিত হইয়া কহিলেন, এমন কি হয়েছে ?
মহৎ জীবনকে তোমরা নট করলে হও করলে--কত হতে
পারতাে ! তােমাদের অহঙ্কাও আমি সঙ্গণে, অমর স
সম্পত্তি অমি তারই নাম উইল রবে। এমনি ও মইকে
খাবে,তার চেয়ে সে অনেক ভাল -
বাস্তু ক্রেধে ক্ষেভে হার বক্তব্য শেষ না করিয়াই ৮ লয়।
গেলেন।
নীচের ধার ২য় অকারণ একটা আক্রোশে তিনি নিজে
নিজেই উত্তেজিত হইয়া উঠিতেছিলেন। মিলি আনিয়া পাশে
বসিল,-মিলি প্রগল্‌ভ কিন্তু অজ্ঞ সে তাই যেন ম্রিয়মাণ। সে
অত্যন্ত সন্তর্পণে কহিল,--বাবা, খবরের কাগজে একটা বিজ্ঞাপন
দিলে হয় না, তাতে হত ফিরে আসতে পারে—
একটা সমাধান পাইয়াছেন,—এমন ভাবে কছিলেন,—ঠিক
বলেছিস্ মা ! ভাল করে কয়েকটা বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে দে।
নিশ্চয়ই ফিরে আসবে--- আমার নাম করে দিবি তা হলেই
ফিরে আসবে, ছেলেমানুষের রাগ আর কদিন থাকে ?

মিলি কহিল তাই পাঠিয়ে দি-কেমন ?
হ্যা তাই দে মা। তিনি অনেকটা নিশ্চিন্ত মনে একখানা
বিরাট পুস্তক খুলিয়া বসিলেন যেন ভাবিহার আর কিছুই নাই,
অশােক ফিরিয়া আসিয়াছে।
কয়েকদিন পরের কথা---
মিলি কলেজ হইতে ফিরিয়া তাহার বাবার ঘরে বসিয়া
চিঠি পত্র খুজিতেছিল,যদি অশােক কোন চিঠি পত্র দিয়া
থাকে। কিন্তু অশোক ফিরিয়াও আসে নাই, কোন সংবাদ ও
দেয় নাই—দুইবার তিনবার করিয়া চিঠি পত্র দেখিয়া মিলি
তাই হতাশ হইয়া ভাবতেছিল। এটা করুণ নিরাশার বেদনায়
তাহার সমস্ত অন্তর আষাঢ়ের আকাশের মত মেঘাচ্ছন্ন হইয়া
উঠিয়াছিল—কোথায় আছে ? হয়ত খাওয়া জুটিতেছে না,
হয়ত বা কোথাও অত্যন্ত নিকৃষ্ট কাজ করিয়া উদরান সংগ্রহ
করিতেছে’--অথবা যদি আত্মহত্যা করিয়া থাকে ? মিলি
আর ভাবতে পারে না,-মা ও দিদির উপর নিস্ফল ক্রোধে
সে কেবল অভিভূত হইয়া পড়ে
অকস্মাৎ শুভ্রা আদিয়া প্রশ্ন করিল,-অশোকবাবুর কোনও
খবর পেলি ?
মিলি সংক্ষেপে কহিল,-না।
—কোনও সংবাদও নেই ?
। সে আর আসবে না-
কেন ?
.

মিলি ব্যথিতভাবে কহিল,—তাদের বংশের যে ইতিহাস শুনলাম বাবার কাছে, তাতে সে আর আসূবে বলে মনে হয় ,তারা অন্য জাতের শুভ্রা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাহিয়া কহিল। মিলি কহিল, ওর বাবা ভাল চাকুরী করতেন, একটা কথায় চাকুরী ছেড়ে চলে যান। কি একটা নিমন্ত্রণের ব্যাপারে ওদের গ্রামের জমিদার বলেছিল—সকলকে কাণ ধরে এনে খাওয়াবাে। কিন্তু তিনি যান নি,জমিদার তার সমস্ত সম্পত্তি বেদখল করে সর্বস্বান্ত করে,-সারাজীবন অশেষ কষ্ট পান কিন্তু তবুও মাথা নত করেন নি। জমিদার বলেছিল তার বাড়ীতে একদিন খেলে তিনি সমস্ত সম্পত্তি ফেরৎ দিবেন আর ক্ষতিপূরণও কনে, তবুও তিনি যান নি। পিতার মৃত্যুর পরে ওর মা প্রায় ১৬ বছর বেঁচে ছিলেন, তাকেও জমিদার তার বাড়ীতে নিতে পারেনি—সেই বংশের ছেলে অশোকদা। দিদির অমনি অপমানের পর সে কি আর আসে ! শুভ্রা কিছুক্ষণ পরে কহিল—একটা মহৎ জীবন এমনি করে ধূলায় ফেলে দেবেন। অথচ কত বড় স্কলার হতে পারতেন- মিলি কহিল,—এমনি কত প্রতিভা জগতে নষ্ট হয়ে গেছে অত্যাচারে অবিচারে- -কিন্তু অশােকবাবু আর ফিরে আসূবেন না-এ যেন কল্পনাও করা যায় না। দু’দিনেই মনে হত যেন কত আপনার, কত নিকট--

–
মিলি জবাব দিল না, চুপ করিয়া রহিল-সমস্ত মুখে একটা
বেদনার ছায়া তাহাকে স্নান করিয়া তুলিয়াছে ।
ডাঃ বস্তু আসিয়া মিলির দিকে চাহিয়া কহিলেন,—কিরে
মিলি, কি হয়েছে ? অশোকের কোন খবর নেই–
না।
তিনি হাসিয়া কহিলেন, ব্যস্ত হস্ নি। আমার ডাকে
সে ফিরে আসবেই – বিজ্ঞাপনটা হয়ত হাতে পড়েনি—যেদিন
পড়বে সেদিনই ছুটে আসবে-
শুভ্রা অসংযত প্রশ্ন করিল,-ফিরে আসবেন ?
- নিশ্চয়ই। যা তােরা সিনেমা টিনেমা দেখে একটু স্ফূর্তি
করে আয়
বাসু হাসিয়া ব্যাপারটাকে অনেকটা লঘু করিয়া দিলেন।
কিন্তু তিন সপ্তাহ চলিয়া গেল-অশােক আসিল না,
তাহার সম্বন্ধে কোন সংবাদও পাওয়া গেল না। ভুলােমন
ডাক্তার বস্তু ব্যাপারটা ধীরে ধীরে ভুলিয়া গেলেন, সেই সঙ্গে
উত্তেজনা বশতঃ উইল করা সংকল্পটিও ভুলিলেন। তাঁহার
চিকিৎসা সমান তালেই চলিল -
মিলি ও শুভ্রার বেদনাটাও ধীরে ধীরে কমিল -কলেজ,
পড়া,পার্টি ও সিনেমার মাঝে হয়ত অশােকের কথাটা উকি ঝুকি
দিত। ক্রমশঃ সেটার ব্যবধান বাড়িতে লাগিল, তাহার পরে
কালে কালে তাহার গুরুত্ব কমিল,-স্মৃতি ক্ষীণতর হইতে হইতে
বিলীন হইয়া গেল। এবং আরও কিছুদিন পরে পৃথিবীর বহু
}

বিয়ােগান্ত 'আখ্যায়িকার মত অশােক এবং তাহার গৃহত্যাগ
ইতিহাসে পরিণত হইল –যে ইতিহাস মানুষে কেবল আবৃত্তিই
করে কিন্তু তাহার জন্যে বেদনা বােধ করে না।
কয়েকটা দিন অশােকের বিলাসীর আশ্রয়েই কাটিয়া
গিয়াছে-
দুই তিন দিন ক্রমাগত ভােজন ও নিদ্রার পরে প্রথম তাহার
মনে হইয়াছিল-বিলাসী কে । কেনই বা তাহাকে আশ্রয়
দিয়াছে’-সেত কোন কাজই করে না। তাহার তথাকথিত স্বামী
একদিন কিছুক্ষণের জন্য আসিয়াছিল, তাহার চেহারা, কথাবার্তা
এবং ব্যবহার ইতরজনোচিত, সম্ভবতঃ মাতালও বটে। সে
যে সমস্ত কথা কহিয়াছে তাহার মধ্যে বিলাসী ও তাহাকে
ভাইয়া কি যেন একটা ইঙ্গিত করিয়াছে-অশােক ঠিক তাহ
বুঝে নাই।
বিলাসী মাঝে মাঝে যেন কেমন প্রগলভ, একটা বেমানান
ভঙ্গিতে কথা বলে। কথাগুলিও সম্পূর্ণ বােধ্য নয়, অশােক
তাহার কোন অর্থ বুঝে না ! বিলাসী কেবল হাসে এবং বলে
ভাই, কিছু বােঝাে না ?
১. পাশের ঘরখানি আরও রহস্যজনক। ও ঘরে অশােক
খনও যায় নাই। তবে সে জানে গভীররাত্রি পর্যন্ত অপরিচিত
লােক আসে যায়,-বিলাসীও সেখানে থাকে, কি করে তা
তুমি বড় বােক।

সে বুঝে না। অশােক মাঝে মাঝে বিস্মিত হইয়া ভাবে—এরা কারা, তাহাকেই বা আশ্রয় দিল কেন ? গ্রামের সরল জীবনযাত্রার মধ্যে মা’কে আশ্রয় করিয়া সে বাড়িয়াছিল,-সহর সে দেখে নাই। একবৎসরের মত মামার বাড়ীর একটা অভিজ্ঞতা তাহার হইয়াছিল। কিন্তু সে অভিজ্ঞতা এবং পুথিগত যে জ্ঞান টুকু তাহার ছিল তাহা দিয়া বিলাসীদের রহস্য সে ভেদ করিতে পারে না। তবে এটুকু সে বুঝিয়াছিল, বিলাসী সৎবংশােদ্ভব নয় এবং ভগৃহের বধূও নয়, বারবণিতা বা অমনি কিছু হইবে। সেই জন্যেই এখান হইতে কোথায়ও যাইবার একটা আগ্রহ তাহার ধীরে ধীরে হইতেছিল, মনটা মাঝে মাঝে অকারণ শঙ্কায় কেন যেন ভারাক্রান্ত হইয়া উঠে সেদিন দুপুরে অশােক খাইয়া উঠিয়া পুরাতন একখানা মাসিক পত্রিকা পড়িতেছিল। বিলাসী জর্দাযুক্ত পানের পিচ ফেলিয়া তাহার পাশে আসিয়া বসিল। অশােকের বুকে হাত বুলাইতে বুলাইতে প্রশ্ন করিল,-তােমার কথাত কিছু বলে না ভাই—কেন না খেয়ে রাস্তায় ঘুরছিলে। তোমায় দেখতে মনে হয় তুমি ভদ্রলােক, লেখাপড়া শিখেছ অশােক সংক্ষেপে কহিল,-সে শুনে কি হবে ? -কেন হবে না। আমার কাছে বলবে না ? বলতে বাধা নেই- -ভবে বল। শােক সংক্ষেপে সমস্ত কথাই বলিল। বিলাসী গুলি কহিল, বড়লােক যারা তারা অমনিই হয়। দয়া মায়া তাদের থাকে না,দুঃখ পায় না বলেই পরের দুঃখ বােঝে না। কিন্তু এখনও জীবনের অনেক পড়ে রয়েছে ভাইটি–কি করবে ? জীবন কি এমনি করে কাটানাে যায় ! বিলাসীর দরদী কথা কয়েকটা তাহার অন্তরস্পর্শ করিয়াছিল। অশােক কহিল, সে কথা এখনও ভাবিনি। বিলাসী হাসিয়া কহিল,-মেয়ে মানুষের ভালবাসা চাও? প্রেম ? অশোক উঠিয়া বসিয়া কহিল, ভালবাসা কথাটির কোন মানে হয় না-আমার যদি আজ লাখাে লাখাে টাকা থাকতো, গাড়ী বাড়ী থাকতাে কত বড় লােকের মেয়ে ভালবাসতে কিন্তু রাস্তায় দাড়ালে কেউই ভালবাসে না। আমি একই কিন্তু অবস্থাটা ভিন্ন-কাজেই ও ভালবাসা টাকায়ই বিলাসী আবার একগাল হাসিয়া কহিল, কেন ? আমি যে তোমায় ডেকে নিয়ে এলাম,-এইযে তােমাকে যত্নআত্তি করছি একি টাকার জন্যে। আমি ত জানি তােমার কিছুই নেই-কেন অশোক কহিল,-কি জানি ? বিলাসী অশােকের চিবুকে হাত দিয়া কহিল, এমন ত হতে পারে যে তােমর টুকটুকে চেহারাটা দেখে তােমাকে আমি ভাল বেসে ফেলেছি তােমাকে নিয়ে উড়তে চাই- অশােক শঙ্কিত হইয়া কহিল,-বাজে কথা। ।

।
-ও নয় বাজে কথা। কিন্তু জগতে তুমি কি চাও বলত !
আমাকে না হয় নাই চাইলে টুকটুকে একটা বৌ নিয়ে ঘর
করতে চাও ?
-মা ঘর করব বলে ত ঘর ছাড়িনি-
-তবে কি চাও—টাকা ? অনেক টাকা।
-হা টাকা চাই,এতটাকা চাই যে মুঠি মুঠি খরচ করেও
ফুরােতে পারবাে না-
–চাকুরী করে তাকি হয়?
যেমন করে হাে চাই, চুরি, ডাকাতি, লুটযৈমন
করেই হােক্‌-
বিলাসী আবার খানিক হাসিয়া কহিল,-চুরি ডাকাতি ওসব
শুনেছ-তাতে সাহস লাগে বুদ্ধি লাগে তুমি কি তা পারাে
--খুব পারি। মানুষ ভয় করে মৃত্যু, সে ভয় আমার ত
নেই। আত্মীয়স্বজন নেই—জীবনকে ভালবাসতাম-তাও আজ
তুচ্ছ করে দিয়েছি-কাজেই ভয়ের কি আছে আর ?
বিলাসী তাহার গায়ে হাত বুলাইতে বুলাইতে কহিল, খুব
সাহসী ত তুমি। তাহার পর খিলখিল্ করিয়া হাসিয়া উঠিল।
অশােক প্রতিবাদ করিল, হাসলে যে ।
—তােমার বীরত্ব দেখে। রাতারাতি বড়লােক হতে চাও,
কিন্তু তা কি হয় ?
হয় না—তবে সেই রকম পথই বেছে নিতে হবে।
—বেশ তাই করাে—এখন না হয় ঘুমােও।বিলাসী মার
-

একবার হাঁসিল। তাহার পর কহিল, তাহার পর কহিল, কিন্তু আমার ভালবাসাটা এমনি দু’হাতে ঠেলে – সেটা কি ভাল ? স অশোক একটা ব্যাপার ঠিক বুঝিতে পারিত না- সন্ধ্যার ঠিক পরে বিলাসী তাহাকে কিছুতেই ঘরে থাকিতে দিত না। বলিত, যাও বেড়িয়ে এস, মন ভাল হবে। হয় সিনেমা দেখে এস- এসমস্ত ব্যাপারের সুপরিস্কার অর্থ সে বুঝিত না, তবে তাহাদের জীবনযাত্রা যে রহস্যময় এবং তাহা খুব সৎ নয় একথা অনেক বুঝিয়াছিল সেটুকু বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতা তাহার ছিল। বিলাসী নানাভাবে অশােকের মনােরঞ্জন করিত, কিন্তু অশােকের যৌনচেতনাকে কোনমতে সক্রিয় করিয়া তুলিতে না পারিয়া সে যেন একট, শঙ্কিত হইয়া উঠিয়াছিল। সেদিন রাত্রি প্রায় নটায় ফিরতেই অশোক দেখে বিলাসীর তথাকথিত স্বামী ঘরের মাঝে আসীন-এবং রক্তচক্ষু করিয়া বিলাসীকে শাসাইতেছে। অশোককে দেখিয়াই একগাল হাসিয়া কহিল,-এস ভায়া এসাে। শুলাম তােমার খুব সাহস, রাতারাতি বড়লােক হওয়ার ইচ্ছেও আছে। আমি তার পথ বাৎলে দিতে পারি, কিন্তু সে কি তােমার পছন্দ হবে - অশােক কথা কয়েকটি ব্যঙ্গোক্তি মনে করিয়া একটু উত্তেজিত হইয়াছিল। সে কহিল বড়লােক হতেই হবে তাতে যে পথই ধরতে থােক না।

= = তাহার পিঠ চাপড়াইয়া দিয়া সে কহিল,-সাবাস ভায়া- দেখা যাক্‌-এবং একগাল হাসিয়া বিলাসী ও অশােককে জড়াইয়া একটা কুৎসিত রসিকতা করিয়া চলিয়া গেল। অশােক রসিকতাটায় ব্যথিত হইয়াছিল কিন্তু বিলাসী খুব একগাল হাসিয়া কহিল-কি ভাই - বড়লােক হবে ? --হ’ব বৈ কি ? তােমাকে কিন্তু অনেক টাকা পাইয়ে দিতে পারি যদি একটা কাজ করতে পার। একটু সাহসের কাজ তা তুমি পারবে কি ? বিলাশীর কথায় তাহার পৌরুষ আহত হইয়াছে এমনি ভাবে অশোক কহিল,—সাহসের কাজই করতে চাই - -পারবে ? -কেন পারবো না। —কিন্তু কি কেন,এসব প্রশ্ন করতে পারবে না। -নাই করলুম- —একটা জিনিষ তােমাকে দিল্লীতে কোন ঠিকানায় পৌছে দিতে হবে। সেকেণ্ডক্লাসে সাহেব সেজে যাবে। যা চেহারা তা’তে রাজপুত্তর র মনে করবে- ভাবনা নেই। খরচ সব পাবে —ফিরে আসলে তােমাকে দু'হাজার টাকা দেবে,—তা নিয়ে তুমি ব্যবসা করবে—পারবে ? হু- যত সহজে হু' বলে তাতে পারবে মনে হয় না। জিনিষটা কি তা ত শুনলে না ৬৪ -তার দরকার কি? আর শুনতে পাবাে না সে ত আগেই বলে- —তবুও বলছি, ভেবে দেখ পারবে কি না? দু’টো রিভলভার থাকবে একটা বাক্সে তালাদেওয়া, সেটাকে সুটকেশে ফেলে নিয়ে যাবে। পারবে ? অশােক হাসিয়া কহিল,—হু-তা’তে আর কি ? ধরা পড়লে একদম দু’বছর জানােত ! -একই ব্যাপার। এই পৃথিবী আর জেলখানার মাঝে কোন তফাৎ নেই অন্ততঃ আমার কাছে। এটা ছােট আর পৃথিবীটা বড় এই যা! বিলাসী সহাস্যে তারিফ করিয়া কহিল,—ঠিক বলেছ। কবে যাবে ? যে দিন বলবে ? দুই চারিদিনের মধ্যেই অশােক রওনা দিবে এইরূপ স্থির হইল- যথা সময়ে দিল্লীর একখানি সেকেণ্ডক্লাস টিকিট, নগদ শ’- তিনেক টাকা, ও দুইটি ভাল সুট ও একটা গােছন সুটকেস্ দিয়া বিলাসী কহিল,—আজ যেতে হবে দুপুরের গাড়ীতে, রাত্রিতে সাবধান থেকো,চুরি না হয়। এই বিছানাটা ব্যবহার করা গাড়ীতে খাবার রইলাে খেয়ে-ভয় করছে না ত ? -না, না,গাড়ী কখন ? বিলাসী সমস্ত বুঝাইয়া দিয়া যথা সময়ে সিদ্ধিদাতা গণেশের নাম উচ্চারণ করিয়া অশােককে বিদায় দিল- অশােক ছােট্ট বিছানাটা ও সুটকেশটা হাতে করিয়া বড়রাস্তা হইতে একটা ট্যাক্সি লইয়া হাওড়া রওনা দিল। বিপুল পরিধি জগতের মাঝে সে আজ যেন একটা মুক্তির আনন্দ লাভ করিয়াছে। ধরা পড়িলেও ক্ষতি নাই, না পড়িলেও ক্ষতি নাই সেজন্য তাহার কোন উদ্বেগ ছিল না,-জীবনের নূতন বিস্ময়কর একটা অভিজ্ঞতা তাহার হইতে চলিয়াছে সেইটাই যেন পরম আনন্দ, পরম লাভ। তাহার জীবনকে সে জলাবর্তের বিপুল স্রোতের মাঝে মােচার খােলার মত ভাসাইয়া দিয়াছে—মানুষ যখন নির্ভর ছাড়িয়া বিবাগী হয় তখন জীবনকে লইয়া ছিনিমিনি খেলিতেই তাহার আনন্দ। গাড়ীর নির্দিষ্ট বার্থে বিছানাটা করিয়া, সুটকেশের উপর বালিসটা দিয়া সে দেহটাকে যথা সম্ভব সম্প্রসারণ করিয়া দিয়া শুইয়া পড়িল,মনে মনে তাহার হাসি পাইতেছিল—কোথায় লিলি, মিলি, শুভ্রা, মামা, মামী, মা,-জন্মভূমি আর সে কোথায় চলিয়াছে ? এই আকস্মিক পরিবর্তন যেন হাস্যকর,-অভিমানের উষ্ণতায় সে ভবিষ্যতের পরম দুঃখকে মনে মনে আনন্দময় করিয়া ভূলিল,- গাড়ী চলিয়াছে—ত, তীব্র গতিতে। যা সত্তর মাইল পরে পরে একবার থামিবে--একটানা ঝক ঝক শব্দ করিয়া সেটা দুটিয়াছে— আশােৰু তাহাই ভাবিতেছিল,—প্রতিমুহূর্তে সে দূরে দূরে চলিয়া যাইতেছে—সমস্ত প্রিয়জনকে পিছনে ফেলিয়া- যাত্রী উঠিল, নামিল,বাংলার সমতল ছাড়িয়া গাড়ী বিহারের ঊষর বন্ধুর পথ ধরিল–দূরে দূরে নগ্ন ধূসর পাহাড়-বাংলার শ্যামলতা হীন।•••তারপর ধীরে সন্ধ্যা ঘনাইয়া আসিল। রাত্রি হইল,ক্রমে তাহা গভীরতর হইল— নিশীথ রাত্রির স্তব্ধতা ভেদ করিয়া গাড়ী ছুটিয়াছে-আকাশে অগণ্য তারা, পৃথিবীতে অন্ধকার। তাহার অপর দিকে একটি স্থূলকায় অবাঙালী ভদ্রলােক গভীর নিদ্রায় অচেতন। অশােক ঘুমাইতে চেষ্টা করিয়াছিল চোখ বুজিয়া অনেক ভাবিয়াছে কিন্তু ঘুম আসে নাই। তাহার মাঝে মায়ের মুখখানি, গ্রামের সেই পুকুরঘাটে, উদার মাঠ আম্রবনের কথা মনে পড়িয়া মনটা ব্যথিত হইয়া উঠিয়াছিল, চোখ দুইটিও অশ্রু সজল হইয়াছিল কিন্তু সে ক্ষণিক-হাউই বাজির মত পুড়িবার নেশায় সে ছুটিয়াছে হঠাৎ তাহার মনে হইল—আগ্নেয়াস্ত্র গুলির নাম সে শুনিয়াছে কিন্তু কদাচ দেখে নাই। তাহার কৌতুহল হইল সে সপ্তর্পণে সুটকেশ খুলিল—প্রয়ােজনীয় সকল দ্রব্যই আছে। কাপড় হইতে টুথ ব্রাস, পেষ্ট, তােয়ালে সব—এককোণে একটি বাক্স তালাবদ্ধ। সে খুলিবার চেষ্টা করিল কিন্তু খুলিল না। টানাটানি করিতে করিতে সেটা ভাঙ্গিয়াই গেল কিন্তু আশ্চৰ্য্য ভিতরে আগ্নেয়াস্ত্র নাই, আছে একটা জড়ােয়া সােনর নেবে। গাড়ীর আলাে পাথরগুলিতে ঠিকরাইয়া প্রতিফলিত হন। অশােক সেটাকে তাড়াতাড়ি বন্ধ করিয়া শুইয়া পড়িটি ভিন্নপথগামী হইয়া উঠিল—

•••দ্রব্যটি চোরাইমাল সন্দেহ নাই সেই জন্যেই তাহা এইরূপে।
পাঠান হইতেছে। কলিকাতায় বিক্রয় করা অসুবিধা কিন্তু এইটি,
বিলাসী আর তাহার কদৰ্য্য অকথিত স্বামীটির ভােগে লাগাইয়া।
লাভ কি ? সেত ইচ্ছা করিলে আজ বড়লােক হইতে পারে।
অনৈসর্গিক একটা উত্তেজনায় তাহার শরীর গরম হইয়া
উঠিল—শতচেষ্টায়ও তাহার ঘুম হইল না। ভােরের কাছাকাছি
কি একটা বড় স্টেশনে গাড়ী থামিতেই সে নামিয়া পড়িল।
ষ্টেশনের পান্থশালায় আহারাদি ও বিশ্রাম করিয়া সে খবর।
লইল। বােম্বাইগামী গাড়ী দুই ঘণ্টা পরেই আসিতেছে-সে।
মনস্থির করিয়া ফেলিল। সে বােম্বাই যাইবে-
•
বিলাসী তাহার তথাকথিত স্বামীকে বলিয়াছিল,-অত দামী
জিনিষটা ছেলে মানুষকে দিয়ে পাঠালে লােকসান হয়-
-তা হতে পারে। সেও নিয়ে ভাগতে পারে—
বিলাসী প্রতিবাদ করিয়াছিল,সে সেরকম ছেলে নয়,
ভালছেলে কিছুই সে বােঝে না, বাড়ী থেকে রাগারাগি করে।
বেরিয়েছে এই না!
একই ব্যাপার! মালটা সরানাে গেছে সেই ভাল
পুলিশ যেরকম পিছু নিয়েছে তাতে কবে বামাল শুদ্ধ ধরে
ফেতে। যদি কিছু হয় ভাল, না হয় পুলিসে ত কিছু করতে
পারবে না। তবে হলে ভাগে ত্রিশ হাজার পর্যন্ত হতে পারে।
তাহারা কিছুদিন অপেক্ষা করিল, প্রথমে আগ্রহ ছিল, তার

পরে তাহা ক্রমশঃ হ্রাস পাইল। শেষে সপ্তাহান্তে তাহারা
বুঝিল-অশােক আর ফিরিল না। এবং আর ফিরিবেও না।
মনে মনে অকৃতজ্ঞ অশােককে তিরস্কার করিয়া তাহারা নির্বাক
হইল। বিলাসীর তথাকথিত স্বামীটি একদিন দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া
কহিল, একটা জিনিষ ভালই হল। মালটা বেচতে গিয়ে ও
নিশ্চয়ই ধরা পড়বে- আমাদের ভাবনাটা কমবে,
বিলাসী হাসিয়া কহিল,—ওটাত সান্ত্বনা মাত্র।
অশােক বােম্বাই পৌঁছিয়া একটা ভাল হােটেলে উঠিল এবং
একটা দিন বিশ্রাম করিয়া পরের দিন হারটা এক বড় স্বর্ণকারের
নিকট লইয়া গেল। তাহারা তাহার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলে
অশােক সংক্ষেপে কহিল-মহারাজ কুমার-কুমিল্লা-তাহারা
নানা প্রশ্ন করিল, অশােক যাহা জানাইল তাহা সংক্ষেপে এই যে
পিতার (মহারাজার) সহিত বচসা হওয়ায় সে মাতার নেকলেসটি
লইয়া চলিয়া আসিয়াছে। দোকানীরা অশােকের চেহারা,
ইংরাজি কথাবার্তা প্রভৃতিতে তাহার পরিচয় বিশ্বাস করিয়াছিল।
বােধ হয় তাই, তাহারা দশহাজার হইতে দাম আরম্ভ করিল।
শােক একটা ধমক দিয়া কহিল,পঞ্চাশ হাজার টাকা
এক্ষুনি দিলে হারটী দিয়ে যেতে পারি, এ তৈরী করতে আশী
হাজার টাকা লেগেছিল।
দোকানীরা একটু আমতা আমতা করিয়া কহিল-দলিল
ন করতে হবে—টিপসই দিয়ে-

, -আনুন দিয়ে দিচ্ছি— তাহারা কিছুক্ষণ জটলা করিল, তাহার পর টিকিটমারা একখানা টাইপকরা কাগজে সই ও টিপসহি দিতে কহিল,- অশােক টাকাটা টেবিলে রাখিতে বলিয়া, সই করিতে উদ্যত হইল - দোকানী কহিল,- টাকা সবই এই দেখুন- অশােক টাকাটার একটা আন্দাজ করিয়া সই করিল, মহারাজ কুমার এইচ, চৌধুরী অফ, কুমিল্লা। টিপসই দিয়া- নাসাকুঞ্চিত করিয়া হাতের কালিটা একখানা নতুন রুমাকে পুছিয়া ফেলিয়া দিল এবং অপেক্ষা না করিয়া টাকার ভাড় পকেটে ফেলিয়া রাস্তায় নামিল, এবং পথচারী একখানা ট্যাক্তি ডাকিয়া উঠিয়া বসিল। হােটেলে সে নাম লিখিয়াছিল-ডাঃ এইচ, চৌধুরী। কয়েকখানা ডাক্তারী বই সে ইতিমধ্যেই কিনিয়া পড়িতেছিল কয়েকদিন নিজের ঘরেই সে কাটাইয়া দিয়াছে। মাঝে মাৰে হােটেলের ড্রইংরুমে সে বসে,-কদাচিত কাহারও সঙ্গে কথ হয় এই পর্যন্ত। আজ আকস্মিক ভাবে সে লক্ষ্য করিল, একটি বাঙালী বৃদ্ধ ও একটি তরুণী এককোণে বসিয়া আছেন। সম্ভবতঃ পিতা কন্যা। তাহারা আর এক ভদ্রলােকের সহিত সেয়ার বাজা সম্বন্ধে আলাপ করিতেছেন—আলাপ বাংলাতেই চলিতেছে।

বৃদ্ধ ভদ্রলােক এতক্ষণ অশােককে লক্ষ্য করিতেছিলেন, হঠাৎ
প্রশ্ন করিলেন--আপনি বাঙ্গালী ?
=া-
- আপনার নাম
—ডাঃ এইচ চৌধুরী
-আপনি কতদিন এখানে
-তিনদিন,-মেডিক্যাল রিসার্চ করবার জন্যে এখানে
এসেছি।
-বেশ বেশ, বিদেশে বাঙালী দেখলে বড় আনন্দ হয়।
এখানে পড়ে আছি, মাতৃভাষা ভুলবার উপক্রম হয়েছে। এই
যে আমার মেয়ে তপতী, ওত বাংলাই ভাল শিখতে পারলে না।
তপতী ইনি ডাঃ চৌধুরী
অশােক নমস্কার করিল। তপতী ক্ষুদ্র একটু নমস্কার
করিয়া কহিল,-আপনিত ঘরেই থাকেন দেখি,-তবুও একটু
মস করা যাবে
-হ্যা আমিও প্রায় সঙ্গীহীন তাতে এ সহরে নতুন
তপতী কহিল,-সে আমি সব চিনিয়ে দেব দু’দিনে—
অশােক জিজ্ঞাসু ভাবে কহিল,-আপনি ?
বৃদ্ধ হাসিয়া কহিলেন,-এখানেই এক সামন্ত রাজ্যে চাকুরী
করি, তাই এখানে আসতে হয়, তপতীও সঙ্গে আসে।
এবার আই এ পাশ করেছে। বাড়ীতেই বি, এ, পড়ছে—আর
ইনিও একজন বাঙালী।
--

৭১ -আজ্ঞে হ্যা। আমার নাম ভগবতী রাউৎ। সেয়ারের দালালী করি। আপনাদের মত সজ্জনদের ধনবান করেই আমার উদরা চলে—পাটের দাম এখন হু হু করে চড়ছে ধরলেই আবে। অশােক হাসিয়া কহিল-পাটের দাম বাড়ছে। আজ্ঞে হ্যা,ভদ্রলােক উঠিতে উঠিতে কহিলেন,-চচ্চড় করে বাড়ছে ধরলেই ব্যস্- —কিন্তু আমি ত এসব করিনা -আজ্ঞে সকলেই ত করে না, আস্তে আস্তে আরম্ভ করলেই রস পাবেন—আর না করলেই বা আমরা খাব কি বলুন। তা সে সব কথা থাক্‌ আমি প্রাইভেটলি দেখা করবাে কেমন ? কি বলেন ? অশােক কহিল, হ্যা তাই করবেন- -হা-হা,–তাই করবাে এ সব কথা ত আর সকলের সঙ্গে হয় না। তবে দেখা করবাে’ত? -হ্যা –অশােক সংক্ষেপে কহিল। ভগবতী বাবু কহিলেন,-তবে আমাদের কথাটা হয়ে যাক হ্যা চলুন। তপতী তুমি ডাঃ চৌধুরীর সঙ্গে গল্প কর। । গভীবাবু ও বৃদ্ধ বাহিরে বারান্দায় দাড়াইয়া কথা বলিতে ছিলেন।

৭২
অশােক তপতীর মুখখামুখি যেন একটু লজ্জিত ও বিব্রত
বােধ করিতেছিল। সে অবস্থাটাকে সরল করিবার জন্যে
প্রশ্ন করিল,-আপনার বাবার নামটি কিন্তু এখনও জানতে
পারিনি
রমেশ চন্দ্র বসু। আমার খান্নাগড়ে
আমার খান্নাগড়ে থাকি, বাবাই
দেওয়ান
-ও, দেশীয় রাজ্যগুলি কেমন ? দেখতে ইচ্ছে হয়
চলুন না আমাদের ওখানে। হপ্তা খানেক পরেই আমরা
যাবাে-বাঙালী মাত্রই যেন পরম আত্মীয় বলে মনে হয়-
- বিদেশে হয় বটে,
--তপতী একটু করুণ ভাবে কহিল,আমি বাঙালী কিন্তু
বাংলাদেশ আজও দেখিনি। ৪৫ বছর বয়সে একবার গিয়েছিলাম
কিন্তু কিছুই মনে নেই—আপনি কতদিন থাকবেন এখানে ।
-- যতদিন কাজ না শেষ হয়। একমাস থেকে এক বছরও
হতে পারে। এসেছি পড়তে পড়াটা ত সারাজীবনও চলতে পারে।
—তা বটেই। আমি কিন্তু হাঁপিয়ে উঠেছি! চলুন
আজ একটু বেড়িয়ে আসি।
-আমার আপত্তি সেই—আমি হারিয়ে যাবাে ভয়ে বেরুই
।-অশােক হাসিয়া উঠিল।
তপতী ব্যঙ্গ করিল,—ও হারিয়ে যাওয়ার ভয় এখনও আছে
তা হলে? ভয় কি আমি সঙ্গে থাকবাে--
--তা হলে ত ভালই হয়-

-তবে কোথায় যাবেন বলুন
—সমুদ্র তীরে
-বেশ সেই ভাল; বেলাত প্রায় ৪টা হ’ল। চলুন চা খেয়ে
বেরিয়ে পড়ি।
সেদিন বৈকালে অশােক তপতীকে লইয়া বাহির হইল, অথবা
তপতীই অশােককে লইয়া বাহির হইল। বােম্বাই শহরটা ঘুরিয়া
সন্ধ্যার পরে সমুদ্র সৈকতে আসিয়া বসিল,-তরুণ তরুণী, বৃদ্ধ
বালক একসঙ্গে প্রায় হাট সৃষ্টি করিয়া সমুদ্ৰাগত বায়ুকেও
দূষিত করিয়া তুলিয়াছে।
তপতী বালু বেলায় বসিয়া কহিল, বাঙালী, কিন্তু বাংলা
দেশটাই দেখলুম না। । মস্ত বড় ক্ষোভ রয়ে গেল।
অশােক সহাস্যে কহিল,দেখবেন,-ব্যস্ত কেন ?
বাংলা দেশটা কেমন ? এবড়াে খেবড়ো, বন্ধু,
-না, সমতল, সুন্দর সবুজ-যেমন সবুজ ভারতের আর
কোথাও দেখা যায় না—বাঙালীর মত কমনীয়।
—সত্যিই বাঙালী বড়ই কমনীয়—এখানকার লােকগুলাে
যেন কেমন কাঠখােট্টা কথার চালচলনে সে নমনীয়তা নেই।
-হ্যা কথাটা সত্যিই। দেশের প্রকৃতি অনুসারেই চরিত্র
গড়ে উঠে, চেহারা হয়। শ্যামলতার দেশ বলেই বাঙালী কবি,
স্রষ্টা। আশ্চর্য্য হই আর একটা জিনিষ দেখে বহু তরুণ দেখলাম,
সুন্দরী বহ্নির মত উজ্জ্বল, কিন্তু বাঙালী মেয়ের মত জ্যোৎস্নার
স্নিগ্ধতা নেই তাদের-ঔজ্জ্বল্য আছে তার তাপও আছে-

৭৪ ==Fল এ । তপতী হাসিয়া কহিল-তাদের মধ্যে সুন্দরী দেখেন নি -দেখেছি, কিন্তু তার মাঝে যেন স্নেহকরুণ সে অনুভূতি নেই, যাকে ভালবাসতে ইচ্ছে হয়, শ্রদ্ধা করতে চায় অন্তর- তপতী কি মনে করিয়া যেন একটু হাসিল; তাহার পর প্রশ্ন করিল, আপনি Love at First Sight বিশ্বাস করেন ? অশােক কহিল, মাপ করবেন, ভালবাসা কথাটার অর্থ জানিনা কিন্তু সেটা সম্পূর্ণ অবস্থাগত--আর তার কোনমূল্য নাই বলেই মনে হয়- -কেন ? --যদি কারও ব্যাঙ্কে প্রচুর টাকা থাকে তবে তাকে সকলেই ভালবাসে, গরীব হলে কেউই তাকে চায় না, কুষ্ঠ রােগীর মত সকলেই ত্যাগ করে- গরীবের তা হলে ভালবাসা নেই- -সেটা সম্পূর্ণ দায় ঠেকে—পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সুন্দরী ও ধনী কন্যা এবং আমার মত অক্ষম কুৎসিত ব্যক্তি যদি কোন কারণে নির্জন দ্বীপে বন্দী হয় বা নির্বাসিত হয় তবে উভয়েই উভয়ের প্রেমে পড়বে কিন্তু এ পৃথিবীতে সেরকমটা ঘটে না, ঘটতে পারে । কাজেই সেটা প্রয়ােজনের উপর নির্ভরশীল। তপতী কি ভাবিয়া কহিল, আমি কিন্তু বিশ্বাস করি। এদেশে কত পরিচিত বন্ধু আছে, কিন্তু একজন বাঙালীকে প্রথম পরিচয়েই যেরকম আপনার করে নিতে পারি তাদের ত সেরকম পারি না।

ক -সেটা সংস্কার, মানুষ মূলতঃ একই। সামাজিক অবস্থা ভেদে তাদের সংস্কার জন্মায় এই- অশােকের মনে পড়িল শুভ্রার কথা, সে তাহাকে দুর্দিনে চিনিতেও পারে নাই। একটা তীব্র অভিমানে তাহার সমস্ত অন্তর বিষাক্ত হইয়া ছিল। সে তাই বলিল, ওসব কবির কল্পনা; বাস্তব জগতে ভালবাসা টাসা বলে কিছু নেই। নারী স্বামীকে ভালবাসে কারণ ঐ লােকটি ব্যতীত সে নিরুপায় তপতী হঠাৎ প্রতিবাদ করিল, আপনি যেন কার উপর রেগে রেগে কথাগুলি বলছেন—শুনলে মনে হয় হতাশ প্রেমি- কের মত অভিমান ভরা আপনার যুক্তি। অলােক বিস্মিত হইয়াছিল। সে কহিল, চলুন রাত্রি হল, আপনার বাবা হয়ত ভাববেন। তিনি ভাববেন না, তা হলেও যাওয়া উচিত বৈকি ? স কয়েকটা দিন কাটিয়া গেল। তপতী ও অশােক বেশ আড্ডা জমাইয়া তুলিয়াছে—সময়টার গতিও সঙ্গে সঙ্গে বাড়িয়াছে। বাড়িয়াছে। একটা ঘরে বসিয়া অশােক ভাবিত দিনগুলি বড় দীর্ঘ এখন দিনগুলি আনন্দে, আলাপে, ভ্রমণে কাটিয়া যায়। অবসর সময়ে সে বসিয়া বসিয়া পড়ে কখনও কখনও হাসপাতালে যাইবার নাম করিয়া বাহির হয়- দূরে দূরে ঘুরিয়া আসে অনির্দিষ্ট ভাবে— সেদিন সকালে ভগবতীবাবু আসিয়া নমস্কার করিলেন। অশোক কহিল, বসুন এত সকালে কি মনে করে ? —আজ্ঞে নমস্কার জানাতে এলাম। আর একটা খবর আছে-খুব জরুরী -বলুন- -আয়রণ এ্যাও ধীল ভয়ঙ্কর তেজি- একেবারে রেসের ঘোড়ার মত ছুটছে— অশােক ব্যঙ্গ করিল,-বটে! কিন্তু যদি ডিগবাজি খায়— -কিছুতেই নয়, হতেই পারে না। আর যদি হয় তার আগেই জুট ধরে দেব। কপাল ঠুকে ঝুপ, ঝাপ কাজ করে যান, কেমন করকরে টাকা-ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স রৈ রৈ করে চড়ে যাবে- কি বলেন, একহাজার কিনে ফেলি- অশােক কহিল, এখানকার কোন ব্যাঙ্কে ত আমার এ্যাকাউন্ট নেই,-কাজ করি কি করে ? ভগবতীবাবু কহিলেন,-তাতে কি? সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কে ইনট্রো- ডিউস্ করে দিচ্ছি। আমার ৭টা ব্যাঙ্কে হর-কছম এ্যাকাউন্ট আছে। তা হলে ফুড়ুৎ করে গিয়ে একটা ফৰ্ম্ম নিয়ে আসি কি বলেন ? অশােক কহিল,তাই করুন। বিকেলে ব্যাঙ্কে যাওয়া যাবে—মানে তিনটে - হা,সেই ত বেশ হবে। এই আমি ঝাঁ করে যাবাে আর সাঁ করে চলে আস্বাে- ।

৭৭ ভগবতীবাবু পরম উৎসাহে রওনা দিলেন। যাইবার সময় হঠাৎ ফিরিয়া বলিলেন,-এই দেখুন না,-রমেশবাবু আজ ছ’দিনে বারহাজার টাকা কামিয়ে নিলেন-নমস্কার। ভগবতী চলিয়া যাইবার পর অশােক একটু নিশ্চিন্ত বােধ করিল,- ঘরের মধ্যে এতগুলি টাকা তাহাকে বড়ই অস্বস্তি দিতেছিল—সেটাকে ব্যাঙ্কে পাঠাইতে পারিলে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়- তপতী আসিয়া কহিল,—কি করছেন ডাঃ চৌধুরী অশােক কহিল--পড়ছিলাম—ডাক্তারীটা ভুলে না যাই তপতী কহিল, চলুন বেড়িয়ে আসি,- বাংলা সিনেমা আছে চলুন- অশােক কটাক্ষে চাহিয়া কহিল,-বেড়াতে যাবেন আমার সঙ্গে? আমি ত অত্যন্ত বদলােক, এমন কি চোর ডাকাতও হতে পারি- —তাতে কি হল,আমায় ত গিলে ফেলতে পারবেন না - —তাও হতে পারে ত! —খেয়ে দেখুন না,-হজম করতে পারবেন না। চলুন ঘরের কোণে বসে থাকবেন না- -তা চলুন, কিন্তু শেষে আমাকে দোষ দিতে পারবেন না। আমি যদি হারিয়ে যাই তবে সে দোষ আপনার তপতী ব্রীড়া ভঙ্গি করিয়া কহিল,-হারাবেন না। ভয় নেই। তা হলে অনেক আগেই হারিয়ে যেতেন। ক ৭৮ অশােক ব্যাঙ্কে হিসাব খুলিবার পর ভগবতীবাবুর উৎসাহে ও প্রলোভনে সেয়ার কিনিয়া ফেলিল। ভগবানও তাহাকে দুই হাতে অর্থ ঢালিয়া দিতে লাগিলেন। যে সেয়ার সে ধরে তাহাই দেখিতে দেখিতে চড়িয়া যায়। দেখিতে দেখিতে তাহার টাকা লাখ ছাড়াইয়া গেল অশােক তাই মাঝে মাঝে হাসে! জীবনের কি পরিহাস- দরিদ্র বলিয়া সে পড়িতে পারিল না অথচ তাহারই দুই মাসের মধ্যে সে লাখপতি ইচ্ছা করিলে সে তপতীকেও বিবাহ করিয়া ধনীর জীবন যাপন করিতে পারে কিন্তু বেশীদিন একস্থানে থাকা নিরাপদ নয় সে কথাও সে জানিত। জীবনে যেন একটা ক্লান্তি আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে -উত্তেজনার পর একটা অবসাদ আসিয়াছে— অশােক মাঝে মাঝে তাহাই ভাবে—সে যেন হাউই বাজির মত পুড়িতে পুড়িতে উঠিতেছে কখন কোন সময়ে নির্বাপিত হইয়া পৃথিবীর মাটীতে পড়িয়া চূর্ণ হইতে হইবে ! তপতী মাঝে মাঝে তাহাকে ভালবাসা জানায়—সে হাসে। কি বুদ্ধিহীন একা, অর্থকেই ওরা জানে, মানুষকে চিন্‌তে চায় না—তপতীর কথার মাঝে মাঝে প্রলােভন হয় আবার ধাক্কা খাইয়া ফিরিয়া আসে। সংসার জীবন সভ্যজগত-সেখানে তাহার স্থান নাই সেদিন রমেশবাবুও আলাপ প্রসঙ্গে তপতীর জন্যে পাত্র !

৭১ খুজিতেছেন বলিলেন। তাহার ইঙ্গিতটায় অশােক একথা স্পষ্টই বুঝিয়াছিল যে অশােককে মনে মনে তিনি একটা সুপাত্র বলিয়া ধরিয়া লইয়াছেন। বিশেষতঃ সে যে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা ইতিমধ্যেই ব্যাঙ্কে উঠাইয়াছে একথা তিনি ভগবতী বাবুর নিকট হইতে জানিয়াছিলেন। অশােক তাই তপতীর নৈকট্যকে মনে মনে ভয় করিতে আরম্ভ করিয়াছিল তাহার অন্তর যেন অন্ততঃ তাহাকে ভাল- বাসিয়া ব্যথিত না হয়। অকারণ একটি অন্তরে ব্যর্থতার বেদনা দিয়া লাভ কি ? তপতীর কথায় মনটা তাহার সর্বদাই ভীত হইয়া উঠিত,-তাই সে মনে করিল, আর বিলম্ব করা ঠিক নয়। তপতীর জন্যেও বটে এবং নিজের জন্যও বটে এখন এই পান্থ- শালার পরিচয়কে ভুলিবার সময় আসিয়াছে। অশােক মাঝে মাঝে তাই সংকল্প করে কিন্তু পরক্ষণেই একটা মমতায় যেন অন্তর ছাইয়া যায় কেমন করিয়া, কি বলিয়া সে আকস্মিক ভাবে চলিয়া যাইবে- অশােক টেলিফোনে ভগবতীবাবুর সহিত কথা কহিতেছিল। সে তাহাকে তাহার যাবতীয় শেয়ার ছাড়িয়া দিবার জন্যে জানাইল। ভগবতী বাবু কোনাে বিরুদ্ধ যুক্তি দেখাইতেছিলেন কিন্তু অশােক তাহার আদেশ প্রত্যাহার তখনও করে নাই। তপতী আসিয়া বসিল, অনেক আলােচনার পর প্রসঙ্গটি বুঝিয়া লইয়া সে কহিল,-হঠাৎ সব বিক্রি করছেন যে ! অশােক কহিল,-না আজই সমস্ত শেয়ার ছেড়ে দিন-সে

টেলিফোন রাখিয়া দিয়া ভগবতীবাবুর সমস্ত যুক্তির মুখ বন্ধ
করিয়া দিল।
তপতী পুনরায় প্রশ্ন করিল,-সব ছেড়ে দিচ্ছেন যে !
-কেন ?
অশােক হাসিয়া কহিল, সময় হয়েছে নিকট, এখন বাঁধন
ছিড়তে হবে। যতই বাজি পুড়তে পুড়তে ওপরে ওঠে
আসল আগুন থাকে না, তখন সে নামে -
তপতী বিস্মিত হইয়া কহিল, তার মানে।
-আর ভালাে লাগে না,-একট, ঘুরতে বেরুবাে। পুনা
মাম্রাজ বাঙ্গালাের জয়পুর যেখানে দু’চোখ যায়-
তপতী ব্যথিতভাবে প্রশ্ন করিল, আবার কবে আসবেন ?
আসবে কি না, তা কে বলতে পারে ? জীবনে আমি
ছন্নছাড়া, চরিত্রে ভবঘুরে, একজায়গায় বেশীদিন থাকতে আমার
ইচ্ছেই হয় না-
তপতী দীর্ঘ আখি মেলিয়া বিস্মিত ব্যথিত কণ্ঠে কহিল, এই
পরিচয়, এই নৈকট্য সব ফেলে রেখে
অশােক হাসিয়া কহিল,-এইত জগতের নিয়ম—জীবনের
সথায় দিনান্তে নিশান্তে ফেলে যেতেই ত হয়—
তপতী কাতর কণ্ঠে কহিল,-এর কোন মূল্য নেই !
-না, জগতে টাকা ছাড়া আর কোন কিছুরই কোন মুল্য
নেই।

৮১ ক তপতী কহিল,-স্নেহ প্রীতি মমতা-ভালবাসা- আশােক হাে হাে করিয়া হাসিয়া কহিল, কেন আপনি কি আমাকে ভালবেসেছেন--এই অধমকে ? তপতী দৃঢ়কণ্ঠে কহিল,—যদি তাই বলি- তারও কোন মূল্য নেই। আজ যদি আমি ব্যাঙ্ক ব্যালান্স হারিয়ে ভিখারী হই, আমাকে চিনবেন না। টাকা আছে বলেই আপনার মনে হচ্ছে হয়ত ভালবাসি কিন্তু সেদিন কোন মূল্য থাকবে না। টাকা বিহীন আমার মূল্য অকিঞ্চিৎকর- তপতী বিস্মিত হইয়াছিল। আকস্মিক ভাবে লােকটি যেন বদলাইয়া গিয়াছে। সে তাই প্রশ্ন করিল,-এ আপনি বিশ্বাস করেন ? -শুধু আমি নয় সকলেই করে—আমি বলি, আর যারা চালাক তারা বলে না এই তফাৎ। -মেয়েদের এত হীন মনে করেন--- -স্ত্রী পুরুষ ভেদে সমগ্র জগতই এমনি। আমি যদি হােটেলে না থেকে ফিরিওয়ালা হতাম তবে কি আপনি ভালবাসতেন ? সে সুযােগ হত? আমি কিন্তু একই আছি, তার একটা অবস্থায় ভালবাসা যায়, আর একটা অবস্থায় যায় না তপতী প্রতিবাদ করিল, কিন্তু -কিন্তু নেই—এই জগৎ, এই প্রত্যক্ষ বাস্তব। যারা বিশ্বাস করে না তারা ঠকে প্রেমের নামে নিজেকে প্রতারণা করে। কাজেই ভালবাসা প্রেম ও-সব মনের বিলাস মাত্র–কাব্যকথা পৃথিবীর প্রেম-

২
মাত্র। সোফায় বসে যে কথা বললে আনন্দ হয়—লােকে শুনে
হাত তালি দেয়-
তপতী সজল আঁখি মেলিয়া কহিল,—আমাদের এই পরিচয়
অশােক কহিল,দুঃখিত হবেন না, সত্যি কথা বলবাে
কি ? এ পরিচয় পরিচয়ই-কিন্তু নিষ্ফল। কথাটা শ্রুতিকটু
কিন্তু সত্যি। এ আমি জীবনে প্রত্যক্ষ করেছি। আপনার
বাড়ীর সামনে রেলিং ধরে ভিখারীর মত দাঁড়িয়ে থাকলে সেদিন
আমাকে চিনতে পারবেন না। এই ভালবাসা, এই পরিচয়-
তপতী সাহস সঞ্চয় করিয়া প্রশ্ন করিল,--কেন? আপনি
জীবনে বিয়ে করবেন না-
অশােক হাসিয়া কহিল,—মানুষ ভালবাসে পাওয়ার অতীত
বস্তুকে, আর বিয়ে করে সাধারণকে। কাজেই বিবাহের
প্রশ্ন ওঠে না- যা সুন্দর তাকে ভালবাসা যায় কাজেই আমি
তাকে সুদুলভ করে রাখতে চাই, তাকে বিয়ে করে ধূলায় নামাতে
চাইনে। বিবাহের জন্য পৃথিবীর যে কোন নারীই যথেষ্ট
তপতী জড়ের মত বসিয়া রহিল। অশােক কহিল,-কালই
যাব ঠিক করেছি তাই একটু ব্যস্ত আছি, এক্ষুনি বেরুতে হবে-
তপতী কোনমতে অশ্রু গােপন করিয়া বাহির হইয়া আসিল।
অশােক চাহিয়া দেখিল, বেদনাও বােধ করিল। কিন্তু তাহাকে
যাইতেই হইবে-
'স
অশােক চলিয়া গিয়াছে-কোথায় কেহ জানে না-
.

=
তপতীরা আরও কিছুদিন বােম্বাইতে ছিল। আকস্মিক
ভাবে তপতীর নিকটে অশােক বড় সুন্দর বলিয়া মনে হইয়াছিল,
অশােক যেন তাহার কল্পনার মানুষটি। কিন্তু কি যেন একটা
রহস্য ঘিরিয়া রহিয়াছে তাহার জীবনকে। অশােক চলিয়া
যাইবার পরে কয়েকদিন তপতীর মনটা বড় ফাঁকা মনে হইল,
ভগবতী বাবু দুঃখ করিলেন, তপতীর পিতা পরিতাপ করিলেন।
তাহার পর শুভ্রা, মিলি যেমন করিয়া অশােককে ভুলিয়াছে
তেমনি করিয়া তাহারাও ভুলিতে আরম্ভ করিল
অশােক চলিয়া যাইবার প্রায় এক সপ্তাহ পরে একদিন
কয়েকজন পুলিশ কৰ্ম্মচারী আসিয়া হােটেলে নানা খোঁজ খবর
নিতে আরম্ভ করিলেন। তপতীরা ও ভগবতী বাবু বাঙালী
বলিয়া তাহাদিগকে নানারূপ জেরা করা হইল। তাহারা অশােক
সম্বন্ধে যে সব প্রশ্ন করিল তাহার সঠিক পরিচয় তাহারা জানিতেন
, বলিতেও পারিলেন না। তাহাদের আর একটি প্রশ্ন ছিল
অশােক অকস্মাৎ এতটাকা কি করিয়া পাইল—
ভগবতী বাবু কহিলেন, ভয়ঙ্কর লাকি বয়, আমার কাছে
হিসেব আছে দেখবেন। একমাসে বােধ হয় সে প্রায় পঞ্চাশ
হাজার টাকা পেয়েছে। যে শেয়ার ধ’রতাে তাই চড়চড় করে
উঠতে--
পুলিশ হিসাবটা দেখিতে চাহিলে ভগবতী বাবু তাহা দেখাইয়া
দিলেন, কিন্তু তাহারা অশােকের খোজ কেন করিতেছে এ কথা
তিনি ঠিক বুঝিতে পারিলেন না। তবে পুলিশ প্রাথমিক তদন্তের

৮০
ব্যাপারে অনেকটা হতাশ হইয়া পড়িল। এবং ভগবতী বাবুর
কথায় যে তাহাদের সন্দেহ অনেকটা প্রশমিত হইল একথা
ভগবতী বাবু বুঝিলেন।
কিছুদিন বাদে তপতীরা চলিয়া গেল-পান্থশালায় দু’দিনের
পরিচয় সুখ দুঃখ, জীবনের একটা স্মৃতিতে পরিণত হইল। যে
স্মৃতি কেবল কাহিনীই, অন্তরকে আন্দোলিত করিবার শক্তিও
ধীরে ধীরে তাহার কমিয়া গেল—যেমন করিয়া সাধারণতঃই
যায়-
প্রায় ছয় বৎসর পরের কথা-
শুভ্রা এবারে এম, এ, পাশ করিয়াছে, মিলি বি, এ, পাশ
করিয়া অপ্রয়ােজন বােধে আর পড়ে নাই। শুভ্রার পিতার
শরীর অত্যন্ত খারাপ হইয়া পড়িয়াছে, তাহার অন্তে একমাত্র
কন্যার কি হইবে এই কথা মাঝে মাঝে ভাবিয়া তিনি আকুল
হইয়া পড়েন। শুভ্রা তাহাকে সান্ত্বনা দেয়। তাহার এম এ পাশ
করার কথা জানাইয়া বলে,-এম, এ, পাশ করলুম আর নিজের ।
তার নিজে বইতে পারবাে না-টাকা বাড়ী দেখে খেতে
পারবাে না ?
তাহার পিতা তবুও অবুঝের মত বলেন,-মেয়ে ত মা !
একটা সৎপাত্রে তােকে দিয়ে যেতে পারলে ভাবনা থাকতে
না-

; শুভ্রা হাসে এবং সান্ত্বনা দেয়,-নাই বা জুটলাে, সৎপাত্র। একাই কি আর থাকতে পারবাে না ? খুব পারবে- তাহার পিতা শুধু বলেন,-তা কি হয় মা। শুভ্রা ও মিলির গল্পের মাঝে কদাচিত কখনও অশােকের প্রসঙ্গ না উঠে এমন নয়। তবে সেটা সাধারণতঃ ভালছেলের, প্রসঙ্গে। অশােক পড়িলে হয়ত বা ফাষ্ট ক্লাস ফাষ্ট হইতে পারিত এ সম্বন্ধে উভয়েই একমত। তাহাদের বাড়ীর সামনে চওড়া রাস্তা। তাহার ও পারে একখানা বাড়ী খালি পড়িয়া ছিল সম্প্রতি ভাড়া হইয়াছে। একজন ডাক্তার ভাড়া নিয়াছে,-ডাঃ এইচ, চৌধুরী, এম, ডি, ( মিউনিক); বিরাট একখানা গাড়ী করিয়া ডাক্তার নিজেই ঘুরিয়া বেড়ায়। গাড়ী প্রায়শঃই নিজে চালায়। রােগীর ভিড় কিছু নেই, একজন এ্যাসিস্ট্যান্ট আছেন। পাড়ার অনেকেই ডাক্তার সম্বন্ধে কৌতূহল প্রকাশ করেন কিন্তু কাহারও সহিত বিশেষ পরিচয় নাই, তবে চালচলনে বােঝা যায় ডাক্তার ধনবান। ডাক্তার সম্বন্ধে যথেষ্ট কৌতূহলই ছিল, কিন্তু গত মাসাধিকালের মধ্যে তাহার সহিত কেহ আলাপ করিয়া তাহার সমগ্র পরিচয় সংগ্রহ করিতে পারেন নাই। তবে তিনি বিশেষ ভলােক এবং দাতা একথা পাড়ার ক্লাবের ছেলেরা প্রায়শঃই বলিয়া থাকে, কারণ, তাহার চাঁদার খাতা হস্তে ব্যর্থ মনােরথ হই, ফিরে নাই। আর একটি কথাও পাড়ায় প্রচারিত হইয়াছি উক্ত ডাক্তারটি গরীবকে বিনা পয়সায় চিকিৎসা করিয়া থাকে এবং প্রয়োজন বােধে নিজ ব্যয়ে পথ্য ও ঔষধের ব্যবস্থাও করিয়া থাকেন। এহেন ডাক্তারের নিকট যথেষ্ট রােগীর ভিড় হওয়াই স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু আশ্চর্য্য, তাহা হইত না। কেন হইত না সেটা একটা সমস্যা। অশােক ওরফে ডাঃ এইচ চৌধুরী এম, ডি, তাহার সহকারী ডাঃ দত্তকে সঙ্গে করিয়া রােগী দেখিতেছিলেন। শেষ পরীক্ষা করিয়া অশােক কহিল, আপনি প্রেসক্রিপসান্ করে দিন ডাঃ দত্ত আমি দেখে দেব- ডাঃ দত্ত প্রেসক্রিপসান্ করিয়া দিলে অশােক তাহা দেখিয়া কহিল,—ঠিকই আছে সঙ্গে একটা টনিকফুড দিয়ে দিন ডাঃ দত্ত কহিলেন, স্কটই দি। হা!-অশােক কি একখানা বইতে মনােনিবেশ করিল। প্রেসক্রিপসান রােগীর হাতে দিয়া ডাঃ বলিলেন,-যােল টাকা- রােগী কাতর কণ্ঠে কহিল,-বড় গরীব বাবু চল্লিশ টাকা মাইনে পাই- -তাই বিলেত ফেরৎ ডাক্তার না হলে চলে না ? যতাে অশােক মাথা তুলিয়া কহিল, কি বলছেন?

৮৭
=
বােগী কাতর কণ্ঠে কহিল,-বড় গরীব ডাক্তার বাবু.-
টাকা নেই—খাছাই সংগ্রহ করতে পারি না।
অশােক প্রশ্ন করিল,—গরীব ?
-হ্যা পাঁচটা ছেলেপুলে-মাইনে চল্লিশ টাকা, দয়া করুন
ডাক্তারবাবু-
অশােক হাসিয়া কহিল, বেশ ভিজিট না হয় নাই দিলে ।
অষুধের দাম ত দশটাকা হবে, কি দিয়ে কিনবে?
-দশ, টাকা তা হলে আর অষুধ কিনতে পারবে না-
অশােক পকেট হইতে একখানা দশ টাকার নােট বাহির
করিয়া দিয়া কহিল, নিয়ে যান; অষুধ কিনে খাবেন,--নইলে
বাঁচবেন না---
রােগী নমস্কার করিয়া অন্তরের কৃতজ্ঞতা জানাইয়া চলিয়া
গেল। ডাঃ দত্ত অশােকের মুখের পানে বিস্ময় বিস্ফারিত
চোখে চাহিয়া ছিলেন। অশােক কহিল,আশ্চর্য হচ্ছেন
-হা--এতে--
অশােক নাটকীয় ভঙ্গিতে হাসিয়া কহিল,শুনুন, ডাঃ দত্ত,
আমার প্রচুর আছে, টাকা দিয়ে কি করবাে ? গরীবদের তাই
আমি অমনি দিদিতে বেশ লাগে। তাই বলে আপনার
ক্ষতি হবে না, আপনার পাওনা আপনি পাবেন। ডাক্তারী
পাশ করেছিলাম কিন্তু ওসব আমার ভাল লাগে না। আপনিই
সব করবেন—আমি নিমিত্ত হয়ে রইব—

-কিন্তু স্যর সেটা -টাকার দরকার আপনার আছে জানি, আমার নেই। কাজেই আপনি পাবেন। -ডাঃ দত্ত খুশী হইয়া কহিলেন,“আজ্ঞে টাকার দরকার আমার আছে বৈ কি। -তবে লজ্জা করে লাভ নেই। আমি চাই গরীব লােকের চিকিৎসা হােক্ টাকা যা লাগে আমি দেব।-গরীবকে দান করে আমার বেশ আনন্দ হয়। কি ইচ্ছে করে জানেন, যাদের ছেলের গুড় নিয়ে কাড়াকাড়ি করে তাদের বড় বড় রাজ- ভােগ খাওয়াতে ইচ্ছে করে, কি তৃপ্তি কি আনন্দ তাদের মুখে ফুটে উঠবে কথাগুলি বলিতে বলিতে অশােকের কণ্ঠ ভারী হইয়া উঠিয়াছিল,—সে অন্যমনে পাশের ঘরের পর্দা ফঁক করিয়া ঢুকিল। গৃহাভ্যন্তর হইতে কহিল,-আপনি যেতে পারেন ডাঃ দত্ত। দারােয়ানকে বলে যাবেন যেন দরজা দিয়ে দেয়। আর আর বেরুবে না। শুভ্রার এম,এ তে ফাষ্ট ক্লাস পাওয়ার উপলক্ষে আজ উৎসব হইতেছিল। উৎসব অর্থাৎ পার্টি, নাচ গান ও ভােজন। নিমন্ত্রিত অনেকেই ছিলেন,-তাহার মধ্যে লিলি ও তাহার স্বামী মিটার, মিলি প্রভৃতি আছে।

মিলিই প্রথম আগন্তুক। মিলি আসিতেই শুভ্রার পিতা,
শৈলেনবাবু কহিলেন,—এস মা মিলি তােমার দিদি কোথায় ?
মিলি কহিল,-আসবে এক্ষুনি,-আমি আগেই এসেছি।
-বেশ মা, বেশ, গুছিয়ে নিয়ে তােমরাই ত করবে।
শৈলেন বাবু একটু দূরে যাইতেই মিলি শুভ্রাকে ব্যঙ্গ করিল,
- শুভ্রা, তােমাকে অভিনন্দন জানাই। তােমার ফাষ্ট ক্লাস
প্রাপ্তি যে নিঃসন্দেহে একটা অসাধারণ বস্তু বা কৃতিত্ব এটা
স্বীকার করেই অভিনন্দন জানাচ্ছি -
শুভ্রা কহিল,—যাক্, এখন আমাকে একটু সাহায্য করবে ।
.
কি ?
তা পারি, তবে এটাও সত্যি যে অশােকদা পরীক্ষা দিলে
সে ফার্স্ট ক্লাস ফাষ্ট ই হতাে—তার সঙ্গে তুমি পার-তে-না-
শুভ্রা হাসিয়া কহিল,—তিনি ফাষ্ট হলে আমি অন্ততঃ
দুঃখিত হতাম না-
-কেন?
--তার কাছে পরাজয়ে আমার দুঃখ নেই বরং গৌরব আছে-
মিলি প্রগলভা,-সে কহিল,-ও বাবা! এ যে কাব্য—তুমি
ভুলতে পারনি আজো ?
শুভ্রা কহিল,-রসিকতা ছেড়ে একটু সাহায্য কর
হাস্যপরিহাসে ড্রইংরুম সাজাইতে সাজাইতে অতিথিবৃন্দ
আসিলেন। চা প্রভৃতি চলিতে লাগিল,—পাড়ার জনৈক তরুণী
গান করিয়া সভার উদ্বোধন করিলেন।

। শুভ্রা ব্যস্ততার মাঝেও হঠাৎ লক্ষ্য করিল তাহার পিতা সােফা হেলান দিয়া কেমন ভাবে শুইয়া আছেন, সমস্ত মুখখানি ঘামিয়া গিয়াছেকপাল হইতে ফোঁটায় ফোঁটায় ঘাম চুয়াইয়া পড়িতেছে ! সে ছুটিয়া গিয়া প্রশ্ন করিল,—কি বাবা! তােমার কি হয়েছে? -শরীরটা ভাল লাগছে না মা। আমাকে একটু ধর ত, নিয়ে চল- —কেমন লাগছে? বলতে পারছিনে ঠিক-কেমন যেন -শুভ্রা তাহাকে ধরিয়া তুলিতে গেল, শৈলেন বাবুও উঠিতে চেষ্টা করিলেন কিন্তু উঠিতে পারিলেন না,-অকস্মাৎ সেখানেই মুচ্ছিত হইয়া পড়িয়া গেলেন উৎসব থামিয়া গেল,—চারিপাশে একটা হৈ চৈ ও ছুটাছুটি লাগিয়া গেল। শুভ্রা কি করিবে বুঝিয়া পাইল না। এমন আকস্মিক বিপদ তাহার জীবনে এই প্রথম, তাহার প্রথম চিন্তা হইল ডাক্তার প্রয়োজন। সে কাহাকেও উদ্দেশ্য না করিয়া উদ্ভ্রান্তের মত কহিল,- ডাক্তার ডাকতে হবে,-ডাক্তার- সঙ্গে সঙ্গে তাহার মনে হইল, রাস্তার ওপারের জাৰ্মানী ফেরৎ ডাক্তারের কথা। সে বিন্দুমাত্র চিন্তা না করিয়া এক- দৌড়ে রাস্তাটা পার হইয়া একেবারে অশােকের চেম্বারে আসিয়া উপস্থিত হইল- অশােক ও ডাঃ দত্ত বসিয়া ছিলেন, রােগী কেহ ছিল না। = শুভ্রা হাঁপাইতে হাঁপাইতে কহিল,-ডাক্তারবাবু শিগগির চলুন, বাবা বড় অসুস্থ--কেমন করছেন- অশােক কিছু বলিতে পারিল না,কেবল শুভ্রার স্বেদস্নাত বিহবল মুখের পানে পরম বিস্ময়ে চাহিয়া রহিল,-- ডাঃ দত্ত প্রশ্ন করিলেন,-কি হয়েছে- শুভ্রা কহিল,-হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন চলুন-দেরী করবেন না অশােক এতক্ষণে সম্বিৎ ফিরিয়া পাইয়াই যেন কহিল,চলুন ডাঃ দত্ত, সেরিব্রাল হেমারেজ যদি হয় তবে দেরী করলে খারাপ অশােককে লইয়া শুভ্রা যখন ফিরিয়া আসিল তখন পার্টির অনেকে চলিয়া গিয়াছেন, মিলি তঁাহার মাথায় আইসব্যাগ দিতেছে। অশােক ঢুকিয়াই কহিল –ব্লাড প্রেসারটা দেখুন - এবং নিজে টেথিস্কোপটা বাহির করিয়া হৃদযন্ত্রের উপর স্থাপন করিয়া একবার চারিপাশে চাহিল। মিলি – লিলিডাঃ মিটার সকলেই আছেন,আরও অনেকে অপরিচিত। অশােকের অন্তরটা দুলিয়া উঠিল—উঃ দত্ত বলিলেন,- প্রায় নরমাল-তবে- অশােক বিজ্ঞের মত কহিল,-বডড, Interesting-কি বলুন ত? -স্যর, এটা থমবসি বলে মনে হয়-

-yes, yes-ঠিক তাই, এইটে first attack কি না-
তবে একটা কিনি দিয়ে দি-
-হা, হা শিগগির
শুভ্রা ব্যস্তভাবে প্রশ্ন করিল,-কেমন দেখছেন ডাক্তার বাবু?
অশােক প্রশান্ত হাসিয়া কহিল,-ভয়
-ভয় নেই,-ব্যস্ত হবেন
না। উনি সেরে উঠবেন তবে বিশেষ যত্ন করা দরকার।
শুভ্রা কহিল, -সেবা যত্নের কোন ত্রুটি হবে না-
-হা,–তাই যেন না হয়। অষুধ পত্রের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
অশােক ও ডাঃ দত্ত ঔষধ পথ্য ও উপদেশাদি দিয়া পারিশ্রমিক
লইয়া প্রস্থান করিল। তাহাদের সঙ্গে সঙ্গে পার্টির সকলেই
চলিয়া গেলেন। কেবল শৈলেন বাবুর শয্যাপার্শ্বে রহিয়া গেল
শুভ্রা ও মিলি-
প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে শৈলেনবাবু চোখ মেলিয়া কহিলেন,
–
-ল দে মা -
একটু জল পান করিয়া তিনি যেন অনেক সুস্থ হইলেন,
তাহার পর দুঃখিত ভাবে কহিলেন—আমার জন্যেই সব পণ্ড
হয়ে গেল
মিলি কহিল,—তা হােগ গে,
-তা হগগে,-আপনি ঘুমোন। কথা বলতে
ডাক্তার বারণ করেছে ?
-কে ডাক্তার ?
শুভ্রা কহিল, ঐ রাস্তার ওপারের এইচ, চৌধুরী।
-ভাল ডাক্তার শুনেছি

- মিলি কহিল,-হা, অষুধে বেশ কাজ করেছে কিন্তু। যখন জ্ঞান হয়েছে তখন আর কোন ভয় নেই- শুভ্রা ব্যস্তভাবে কহিল,-তাই বল্ ভাই, ভয় যেন না থাকে। শৈলেনবাবু কহিলেন,-তাই ত বার বার বলি মা, কবে এমনি করে- শুভ্রা কহিল, কথা বলল না বাবা—কথা বলল না-- মিলি কহিল, ডাক্তারটি সত্যিই বেশ, হঠাৎ দেখে মনে হয়েছিল অশােকদা বুঝি। ঠিক তেমনি চেহারা,কেবল গালে একটা জড়লই যা বেশী। শুভ্রা এতক্ষণ তাহা লক্ষ্য করে নাই, এখন যেন সে ভাবিয়া বুঝিল লােকটীকে সত্যই অশােকের মত দেখিতে। সে তাই কহিল,-সত্যি প্রায় তার মতাে মিলি কহিল,-ই যদি অশােকদা হত তবে কি মজাই না হত। তাই না শুভ্রা ? শৈলেনবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস মুক্ত করিয়া কহিলেন,-দেখতে অশােকের মত ? মিলি কহিল, হা কাকাবাবু অবিকল তার মত, তবে একটু যেন মােটা আর মুখে একটা জড়ল আছে বেমানান শৈলেনবাবু কহিলেন, ওঃ—ডাঃ এইচ চৌধুরী—না? -হা- ১৪ কয়েকদিন পরের কথা- শৈলেনবাবু ধীরে ধীরে ভাল হইয়া উঠিয়াছেন—বর্তমানে তিনি একটু আধটু বাহিরে বাগানে বেড়াইতে পারেন। এ কয়েক দিন আসা যাওয়ায় শুভ্রা ও মিলির সঙ্গে ডাঃ চৌধুরীর একটু ঘনিষ্ঠতা হইয়াছে,-একটু আধটু ব্যঙ্গ পরিহাস না হয় এমন না। সেটা বয়ােধর্ম প্রসূতও বটে এবং কতকটা ইচ্ছাকৃতও বটে। অশােক সেদিন সকালে চেম্বারে বসিয়া পুরাতন একটি রােগীর নিকটে তাহার দেওয়া টাকার হিসাব এবং রােগীর পথ্যাদির সংবাদ লইতেছিল এমন সময় মিলি ও শুভ্রা উভয়েই প্রবেশ করিল। অশােক ডাক্তার-সুলভ ভদ্রতা সহকারে কহিল, বসুন- রােগীটির কথাবার্তা শুনিয়া অশোক কহিল, আমি আপনাকে কিছু দিয়েছিলাম রােগীর ঔষধ পথ্যের ব্যবস্থা করতে, বাজার করতে ত সাহায্য করিনি- লােকটি বিবর্ণমুখে কহিল, কি করবো, ছেলেপুলে না খেয়ে । থাকে। অশােক হাসিয়া কহিল,বেশ করেছেন, আচ্ছা আরও দশ টাকা নিয়ে যান লােকটি নােটটি হস্তগত করিয়া সকৃতজ্ঞ চিত্তে প্রস্থান করিল। মিলি ব্যঙ্গ করিল, আপনার ডাক্তারী এমনি ?

-প্রায়। -- ফাঁকি দিয়েও ত নিতে পারে— —তা পারে, তাতে আমার যথেষ্ট ক্ষতি করতে পারবে না। যা আছে তা আমার পক্ষে প্রচুর। চলুন ও ঘরে গিয়ে বসি কেমন আপনার বাবা ভাল ত ? শুভ্রা স্মিতহাস্যে কহিল,-া, কাল বিকেলে বাগানে বেড়িয়েছেন। শহারা তিনজনে আসিয়া পাশের ঘরে বসিল। মাঝের পর্দাটি বিজলী পাখার বাতাসে দুলিতেছে। অশােক সেইদিকে একটু চাহিয়া থাকিয়া সােফায় বসিল। শুভ্রা প্রশ্ন করিল, বাবাকে কি খেতে দেব আজ ? -যা ইচ্ছে করেন তাই,তবে মাংস পােলাও প্রভৃতি গুরুপাক খাদ্য দেবেন না - শুভ্রা অশােকের দিকে চাহিয়া কহিল-একে চেনেন নিশ্চয়ই, মিলি বােস, ডাঃ বােসের কনিষ্ঠা কন্যা—বি, এ, পাশ করে বর্তমানে ভেরেণ্ডা ভাজছেন। মিলি চট্‌ করিয়া কহিল,যা উনিও অতঃপর ভাজবেন- অশােক প্রশান্ত হাসিয়া চাহিল,-নমস্কার -নমস্কার অশােক ধীরে ধীরে কহিল, আপনারা একটু আশ্চর্য হচ্ছেন বােধ হয় আমার ডাক্তারী দেখে ? অবশ্য হওয়াটাও স্বাভাবিক। তবে সত্য কথা বলব কি ডাক্তারী করতে আমার ইচ্ছে করে না। তবে গরীব লােকের মুখে হাসি দেখলে আমার বড় আনন্দ হয়। মিলি কহিল,-গরীবকে আপনি ভালবাসেন? -হ্যা, গরীবকে দিয়ে আমার সত্যিই খুব আনন্দ হয়-একা মানুষ এত টাকা দিয়ে কি হবে ? মিলি আকস্মিক ভাবে কহিল, আপনার চেহারাটা কিন্তু ঠিক আমার এক দাদার মত - শুভ্রা, ঠিক অশােকদার মত নয় ? শুভ্রা কথাটা সমর্থন করিল। অশােক কহিল, দাদা- আপনার ভাই -না, পিসতুত ভাই, কিন্তু চমৎকার ছেলে, তার তীক্ষ্ণবুদ্ধি সুন্দর স্বভাব- মারা গেছেন ? মিলি ব্যস্তভাবে প্রতিবাদ করিল,-না-না, অভিমান করে চলে গিয়েছে—বেঁচে আছে কি নেই ভগবান জানেন? —তা চলে গেলেন কেন ? -সে গরীবের ঘরের ছেলে, দিদি তাকে একটু অপমান করে, সেই রাগে- মিলির সহিত কথা বলিতে বলিতে কেন যেন অশােকের চোখ দুইটি বার বার সজল হইয়া উঠিতেছিল। শুভ্রা ও মিলিকে একদিন সত্যসত্যই সে আপনার করিয়া লইয়াছিল, আজ ডাঃ চৌধুরী হিসাবে তাহাদের সামনে বসিয়া তাহার হৃদয় বারবার উিেলত হইয়া উঠিতে লাগিল। এরা এত নিকট অথচ কতদূর ;

--অশােক আকণ্ঠে কহিল,—তাতে রাগের কি আছে। গরীবকে সকলেই অপমান করে—যাদের টাকা আছে তারা ত করতেই পারে- শুভ্রা এতক্ষণ চুপ করিয়া ছিল, সে কহিল,-কেন! আপনি ভ করেন না ! অশােক কি উত্তর দিবে ভাবিয়া পাইতেছিল না। মিলি কহিল,-গরীবকে যারা ভালবাসে তাদের আমার খুব ভাল লাগে-এই অশােকদা যদি থাকতাে সে নিশ্চয়ই ফাষ্ট ক্লাস ফাষ্ট হতাে-অথচ অমন ছেলে আজ কোথায় কি করছে ? বেঁচে আছে কিনা- তাই গরীবকে যে সাহায্য করে তাকে আমারও ভাল লাগে-- অশােক বলিবার মত একটা কিছু পাইয়াছে এমনি ভাবে কহিল,—তা হলে আমাকেও ভাল লাগে বলুন-অশােক হে হাে করিয়া হাসিয়া উঠিল ; কিন্তু চোখ দুইটি তাহার জলে ভরিয়া উঠিয়াছে, সে রুমাল দিয়া মুছিয়া মুখখানি পরিষ্কার করিয়া লইল- মিলি কহিল, “সত্যিই অশােক কহিল, চেহারাটীও যখন আপনার দাদার মত, আর তালও যখন লাগে তখন আমাকে না হয় অশােকদাই মনে করুন না—মাঝে মাঝে দাদাকে খাওয়াবেন,আমারও দ্বিতীয় কেউ নেই জগতে যখন- মিলি কহিল,-ভালই ত, আমার দাদা নেই, বৌদি বলে - .

১ ডাকবার সম্ভাবনাও নেই। তা হলেও আপনাকে অশােক ঠিক বলা চলে না তবে চৌধুরীদা বলা চলে, -কেন অশােকদা বলা চলে না কেন? তাকে কি এতই ভালবাসতেন আপনি - —আমি কেন ? সবাই তাকে ভালবাতাে! তার সঙ্গে পরিচয়ের পরে তাকে ভালবাসেনি এমন কেউ নেই - এই শুভ্রার সঙ্গে দু’দিনের পরিচয় কিন্তু সে আজও ভুলতে পারে না তাকে। অশােক ব্যঙ্গ করিল,-তাই নাকি শুভ্রা দেবী—তাকে- কিন্তু আকস্মিক ভাবে কণ্ঠ যেন তাহার অশ্রুর বন্যায় রুদ্ধ হইয়া গেল, সে আর বাক্যটিকে শেষ করিতে পারিল না। শুভ্রা শান্ত চোখ দুইটি অশােকের মুখের উপর চাহিয়া কহিল, সত্যিই ভাল লাগতত তাকে-- অশোক পুনরায় প্রশ্ন করিল,সত্যি? শুভ্রা কহিল,“হ্যা—এত বড় অভিমানী তিনি- শুভ্রার স্বীকারােক্তি অশােকের বুকখানাকে যেন সহসা বর্শা বিদ্ধ করিয়া দিল। সে উঃ বলিয়া চোখে রুমাল গাপিয়া ধরিল। এমনি একটা অবস্থা যেন জীবনে সহনাতীত। মিলি কহিল,—কি হ’ল চৌধুরীদা- -কিছু না-চোখে যেন কি একটা পড়ল—অশােক ঘর হইতে বাহির হইয়া চোখেমুখেজল ছিটাইয়া রুমালে মুখমুদ্ধিতে মুছিতে ফিরিয়া আসিল। অশোেক হাসিতে চেষ্টা করিয়া কবিতা হ'লেমিনু বসুকে এখন থেকে তুমি বলার অধিকার আল- উঠিল। ‘মিলি কহিল,-তা হ’ল বৈকি? তবে বােনের আব্দার সব রক্ষা করা দরকার সেটিও খেয়াল রাখবেন। -হ্যা, অন্যায় আব্দার হলে বকুনি ঝকুনিও খেতে হবে। অশােক আরাম করিয়া বসিল, বেয়ারা চা দিয়া গেল। মিলি চা ঢালিয়া দিতে দিতে কহিল,শুভ্রা, তাের আর কিছু হল না- আমি ত দাদা একটা পেয়ে ফেললুম,—তুই- কথাটার ব্যঙ্গ বুঝিয়া শুভ্রার মুখখানি লজ্জায় রক্তিম হইয়া অশােক সেটা ঠিক লক্ষ্য করে নাই, লক্ষ্য করলেও ইহার অর্থ সে বুঝিতে পারি না। অশােক তাই বলিল,-- আপনারা যাকে এত ভালবাসতেন, সে চলে গেল অথচ আপনারা তার খোঁজ করলেন না- এটাই বা কিরকম হ’ল ? মিলি কহিল,-খোজ ? এমনি যা তাত হ’লই, একমাস খবরের কাগজে বাবা বিজ্ঞাপন দিয়েছেন। শেষে তিনিই বললেন -ও যে বংশের ছেলে তাতে আর আসবে না। বাবা ত তার নামে সব উইল করে দিতে চেয়েছিলেন- —তবুও সে ফিরলে না—তা হলে সে আর ভাললােক হলো কিসে? -সেইটেই ছিল তার বৈশিষ্ট্য, সে মরবে ত মাথা নীচু করবে না,একি কম শক্তি বলেন কি? বাস্তব জগতে ওটা আহাম্মকা- মিলি সকরুণ কণ্ঠে কহিল,-তাইত, তা না হলে তুই কথায় জীবনের সমস্ত ভবিষ্যৎ পায়ে মাড়িয়ে সে চলে গেল। -শক্তি ?

অশােক হাসিয়া কহিল,আপনার অশােকদা তাহলে
আহাম্মক ছিলেন, তা বেশ ।
মিলি মিনতিভরা চোখে চাহিয়া কহিল, না না, তাকে ব্যঙ্গ
করবেন না
অশােক চুপ করিল–মিলি সত্যিই তাহাকে অগ্রজের মত
ভালবাসিত, শ্রদ্ধা করিত, এবং তাহার বুকের কোণে সে স্নেহ
মমতার কুসুম কোরক আজও অম্লান রহিয়াছে দেখিয়া তাহার
যন্ত্রণা বিক্ষুব্ধ জীবনটা যেন সহসা পরিপূরিত হইয়া উঠিল।
বুক পুরিয়া একটা নিঃশ্বাস গ্রহণ করিল–মিলির মুখখানি বারবার
চাহিয়া দেখিল-তেমনি সরল, তেমনি মমতাময়ী, তেমনি
আশােকদার সাহায্যকারিণী, তেমনি প্রগলভা।
এমনি করিয়া দিন যায়-
এমনি করিয়াই অশােকের সঙ্গে নতুন করিয়া মিলি ও
শুভ্রার সঙ্গে পরিচয় ঘনিষ্ঠতর হইয়া উঠে। কিন্তু সে পরিচয়ের
মাঝে বিরাট ব্যবধান রহিয়া গিয়াছে-ডাঃ চৌধুরী। শৈলেন
ৰাৰু মাঝে মাঝে রাস্তা পার হইয়া অশােকের এখানে আসেন এবং
কখনও কখনও তাহাকে বাড়ীতে লইয়া চা পানান্তে গল্প করেন।
শুভ্রা আসে, বাড়ীতে যেটুকু অভ্যর্থনা তাহাও করে কিন্তু
তেমন নৈকট্য গড়িয়া উঠে না।
অশােক পাশের ঘরে বসিয়া সেদিন কি একখানা বই

পড়িতেছিল, শুভ্রা পর্দার অন্তরাল হইতে কহিল,-আসতে
পারি ?
==
-নিশ্চয়ই,—আসুন আসুন। আপনি আসবেন এত
আমার পরম সৌভাগ্য।
শুভ্রা হাসিয়া কহিল, পরম সৌভাগ্য আমার,কৃতজ্ঞ আমি,
অাপনার জন্যেই বাবার প্রাণ ফিরে পেয়েছি।
“ভুল, শুভ্রা দেবী, ভগবান বাঁচিয়েছেন, ডাক্তারে যদি
প্রাণ দিতে পারতাে তবে বড়লােক ত মরতােই না-
- বাবা বলছিলেন—
অশােক হাদিয়া কহিল, আপনাদের ওখানে চা খেতে ত?
সে ত নিত্যই খাচ্ছি ; বসুন-শুভ্রা বসিল। হাতের বইখানার
দিকে চাহিয়া কহিল, কি পড়ছিলেন ?
-সাইকলজির একটা বই-ডাঃ ব্রিলের। কিন্তু আশ্চর্য
হচ্ছি একটা জিনিষ পড়ে—সেকপিয়র Love at First Sight
বিশ্বাস করতেন—আজ দেখছি ব্যাপারটা সত্যি। ডাঃ ব্রিল
তা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাদ্বারা প্রমাণ করেছেন -
শুভ্রা বিস্মিত হইয়া কহিল,—সত্যি?
-হ্যা প্রায় দুইহাজার আমেরিকান বিবাহের ইতিহাস থেকে
এ কথা তিনি প্রমাণও করেছেন—আপনি এটা বিশ্বাস করেন।
শুভ্রা কিছুক্ষণ চুপ করিয়া কি যেন ভাবিল তাহার পর মুখ
তুলিয়া কহিল, বিশ্বাস করি -
অশােক কহিল,-কেন বলুন ত ? আমারও তাই মনে হয়,
ক

১০২ । কতকগুলি লােক প্রথম দেখার পর থেকেই এত আপনার হয়ে যায় যে তাদের আর ভােলা যায় না। প্রথম দর্শনেই মনের মাঝে এমন ছাপ রেখে যায় যে জীবনেও সে ছাপ আর ওঠে না— শুভ্রা কথাটাকে অনুমােদন করিল,-সত্যিই তাই। আপনি একথা কি করে বিশ্বাস করতে পারেন,—এমন কোন ঘটনা হয়েছে; বা শুনেছেন- শুভ্রা কহিল,কলেজ স্কুলে পড়তে পড়তে বহু ছেলের সঙ্গেই আলাপ হয়েছে, ঘনিষ্ঠতাও যথেষ্ট হয়েছে কিন্তু আশ্চর্য যে ছেলেটির সঙ্গে যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা হয়নি সেই ছেলেটিই সবচেয়ে আপনার হয়ে আছে- -আশ্চৰ্য্য। -হ্যা আমিও আশ্চর্য্য হই। তার সঙ্গে যে পরিচয় তা সামান্যই কিন্তু সে আজ ক’বছরের কথা হবে, তার পরে কত পরিচয় পুরােনাে হয়ে গেল, তবুও তাকে ভুলতে পারিনে -মনে হয় —হা, মনে হয়, সে আবার আসূবে, হয়ত আবার পরিচয় মনে মনে আশা করি ফিরে আসুক। দু’দিনের পরিচয় যে এমন করে মনের মাঝে চিরস্থায়ী হতে পারে এ যেন বিশ্বাস করা চলে না অশােক একটু বক্রকটাক্ষে চাহিয়া কহিল—কে সে গ্যবান ? -ভাগ্যবান নয়, ভাগ্যহীন—গরীবের ছেলে। অর্থের ১০৩ ঔদ্ধত্যকে সে ক্ষমা করেনি—কিন্তু হয়ত প্রতিশােধ নিয়েছে নিজের ওপর —তার নামটি কি? -আশােক, মিলির সেই পিস্তুত ভাই- অশােক শুভ্রার আনত মুখখানি ভাল করিয়া দেখিল,- সমস্ত মুখে যেন বেদনা ও ব্যর্থতা পুঞ্জীভূত হইয়া উঠিয়াছে। তাহার অন্তর দুলিয়া উঠিতেছিল, হায় হায়, শুভ্রা তাহাকে ভাল- বাসিয়াছিল, আজও সে ভুলিতে পারে নাই ! অশােক তাই সজল কণ্ঠে কহিল,-অশােককে আপনি ভালবেসেছিলেন? কথাটা বলিতে বলিতে তাহার কণ্ঠ যেন বাকহারা হইয়া স্তব্ধ হইল। শুভ্রা ব্যথিত চোখ দুইটি মেলিয়া ধরিয়া কহিল, বােধ হয়- নইলে এখনও মনটি তার প্রসঙ্গে ব্যথিত হয় কেন? -কিন্তু সে ত গরীব,অত্যন্ত গরীব! অবহেলিত ছিল সমাজে - শুভ্রা একটা দীর্ঘশ্বাস মুক্ত করিয়া দিয়া কহিল,-গরীব ছিল বলেই বােধ হয় ভুলতে পারি না-বড়লােক হ'লে বােধ হয়। ভুলতে পারতাম শুভ্রার এই স্বীকারােক্তি ও বেদনা ব্যথিত মুখখানি অকস্মাৎ। অশােকের অন্তর একটা অব্যক্ত আনন্দ ও পরিতৃপ্তিতে পূর্ণ করিয়া দিল। শুভ্রা তাহাকে ভালবাসিয়া কাঁদিয়াছে ইহাই যেন পরম আনন্দ,—অপূর্ব তৃপ্তি। অশােক তাই প্রশ্ন করিল,- আর একদিনও আসে নি তার পরে ?

১৪ -না। একটু হাসিয়া কঠিন কণ্ঠে শুভ্রা বলিল,-জানি সে মরতে পারে কিন্তু মাথা নীচু করতে পারে না। অশােক আত্মবিস্মৃত হইয়া কহিল,-এসেছিল। —এসেছিল ? অশােক নিজেকে সংযত করিয়া লইয়া কহিল, হয়ত এসেছিল আপনি জানেন না, দেখেন নি- -না আসে নি,--যদি কোনদিন বড় হতে পারে তবে হয়ত আসবে- -ত’কে কি আজও তেমনি ভালবাসেন ? - জানি না, ভুলতে চেষ্টা করেও পারিনি অশােক কম্পিত কণ্ঠে কহিল,-ভুলতে পারেন নি। অশােকের চোখ দিয়া নিরুদ্ধ অশ্রু গড়াইয়া পড়িতেই সে রুমাল দিয়া চোখ ঢাকিয়া ফেলিল- শুভ্রা বিস্মিত হইয়া কহিল,-ও কি ডাঃ চৌধুরী ? অশােক সংক্ষেপে কহিল, কিছু না,-চোখটা একটু খারাপ হয়েছে-অশােক তাড়াতাড়ি উঠিয়া চোখে মুখে জল দিয়া আসিল। শুভ্রা কহিল,চলুন ডাঃ চৌধুরী বাবা বসে আছেন- চলুন- অশােক নির্জনে বসিয়া মাঝে মাঝে ভাবে-শুভ্রা তাহাকে আজও ভালবাসে। তাহার বাবার যেরূপ কথাবার্তা তাহাতে মনে হয় তিনি ডাঃ চৌধুরীর হাতে শুভ্রাকে সম্প্ৰদান করিয়া নিশ্চিন্ত হইতে চান—শুভ্রাকে লইয়া তাহার জীবন আজ সুন্দর পরিপূর্ণ হইয়া উঠিতে পারে—কিন্তু পিছনে রহিয়াছে কলঙ্ক- ইতিহাস – হয়ত বা পুলিশ নিশ্চেষ্ট নাই,-তাহারা বােম্বাই হােটলে যখন গিয়াছিল তখন যে আজও আর্যাবর্ত দাক্ষিণাত্য তাহারা তাহাকে খুজিতেছে না তা কে বলিতে পারে? সে নিশ্চিন্তমনে কোথায় কাল কাটাইতে পারে নাই, অশরীরী একটী রাহু যেন নিরন্তন তাহার পিছনে তাড়া করিয়া লইয়া চলিয়াছে। যে কোন দিন যখন তাহার ডাক্তারী খােলশ খুলিয়া পড়িতে পারে তখন শুভ্রার পবিত্র সুন্দর জীবনকে সে কেন দু’দিনের জন্য কীটদষ্ট করিয়া যাইবে-শুভ্রা সুখী হােক-ভাবিতে ভাবিতে হৃদয় কারুণ্যে ভরিয়া উঠে,অশ্রু সজল হইয়া উঠে, মাঝে মাঝে মনে হয় চলিয়া যায় কিন্তু কোথায় যাইবে, বিপুল পৃথিবীতে সব ঠাঁই তাহার জীবনে একই অনন্ত ঊষর শূন্যতায় ভরা। তাহার মাঝে আশ্রয় নাই—সে রাত্রির অন্ধকারে ঘুরিতেছে আশ্রয়শাখা হীন একক বিহঙ্গের মত, নিবিড় তিমির সমুদ্রে। ভাবিতে ভাবিতে সে ক্লান্ত হইয়া উঠে, অকারণ মােটর লইয়া ঘুরিয়া আসে কিন্তু শুভ্রা আর মিলির সান্নিধ্য তাহার মনটিকে চঞ্চল করিয়া তুলে। অতি আপনার জন থাকিয়াও নাই, এত নিকটে থাকিয়াও কতদূর-সম্পদের প্রাচীরে বিপুল ব্যবধান সৃষ্টি করিয়া দিয়াছে। অশােক ভাবে আর জগতের উপর নিস্ফল অভিমানে আপনাকে আপনি দংশন করে- সেদিন বৈকালে শুভ্রাদের বাড়ীর সামনে ফুলবাগানে ঘেরা ছােট সবুজ মাঠটিতে বসিয়া শৈলেনবাবু শুভ্রা ও ডাঃ চৌধুরী চা পান করিতেছিলেন—আলােচনা চলিতেছিল আধুনিক সমস্যাদি লইয়া-ফাঁকে ফাঁকে শৈলেনবাবু যাহা বলিতেছিলেন তার সারমর্ম এই যে ডাঃ চৌধুরীর এখন বিবাহ করা প্রয়ােজন। সন্ধ্যার একটু পূর্বে ডাঃ বােস্ ও মিলি প্রবেশ করিলেন। শৈলেনবাবু কহিলেন, আসুন আসুন, ডাঃ বােস, ডাঃ বােস্ একটু হাসিয়া স্বভাবসুলভ আন্তরিকতার সহিত প্রশ্ন করিলেন,-ভাল আছেন ত ? —হ্যা, একরকম আছি, এরই কৃপায়। ইনিই ডাঃ চৌধুরী- মিলি কহিল, “ঐ যে তােমায় বললাম চৌধুরীদার কথা, ঠিক অশােকদার মত দেখতে ডাঃ বােস্ অশােকের মুখের দিকে চাহিয়া থাকিয়া কহিলেন, সত্যিই-ত একেবারে অশােকের মত,-হঠাৎ দেখলে ভুল হওয়া স্বাভাবিক। আহা কোথায়ই চলে গেল অশােক—কত বড় হতে পারতাে ডাঃ বসু ও ডাঃ চৌধুরী ইংরাজি মতে করমর্দন করিলেন। অশােক হাসিয়া কহিলেন আপনাদের কথাবার্তা শুনে অশােক। হ’তে নােত হয়- ডাঃ বােস কহিলেন,-লােভ হবারই কথা, বড় ভাল ছেলে ছিল অশােক- - ১০৭ শৈলেনবাবু কহিলেন,- চলুন আমরা ভিতরে বসি, দুই বুড়ো সুখ দুঃখের কথা কইব— মিলি কহিল,-এখানেই বসুন না, আমরা কি আপনাদের সুখ দুঃখের কথা বুঝি না ? -বােঝা আর কই মা? তা হলে বুড়ােকালে শুভ্রা কি এত কষ্ট দিত? শৈলেন বাবু ডাঃ বসুকে লইয়া ভিতরে চলিয়া গেলেন। অশােক বক্র কটাক্ষে চাহিয়া কহিল,-জ্বালাটা কি ? ঠিক বুঝতে পারছিনে। মিলি কহিল,—অত্যন্ত সরল কথা-শুভ্রা বিয়ে করতে চায় -ওঃ সেই অশােক বাবু ! সেই মহাজনের মধ্যে এমন কি ছিল বুঝিয়ে বলতে পারেন ? মিলি কহিল,কি ছিল মানে? মানে,কোন্ গুণ ছিল যার জন্যে সে আপনাদের এত প্রিয় বড় গুণ তার ছিল এই যে, যা বুঝতাে তা অকপটে বলা সাহস তার ছিল—জগতে সে মাথা নীচু করেনি —এ সব গুণ নয়, ভয়ানক দোষ। এ সব দোষ যাদের থাকে তারা জগতে বেশদিন বাঁচে না— শুভ্রা ব্যথিত ভাবে অশােকের মুখের পানে চাহিয়া রহিল অশােক অনিচ্ছাকৃত দৃষ্টি শুভ্রার মুখের উপর রাখিয়া কহিল, সেই জন্যেই মনে হয় আপনাদের অশােকদা বেঁচে নেই- . আকস্মিক এইরূপ একটা মন্তব্যে সকলেই নীরব হইয়া গেল -শুভ্রা ও মিলি ঘাসের পানে চাহিয়া কি যেন ভাবিতে লাগিল। অশোক তাহা লক্ষ্য না করিল এমন নয়, কিন্তু যে অশােককে একদিন তাহারা বিদায় করিয়াছিল অত্যন্ত অনাড়ম্বরে সেই অশােকের জন্যেই আজ ইহার বেদনা বােধ করিতেছে দেখিয়া তাহার যেন একটা আনন্দ হয়, তাই শুভ্রা ও মিলির ব্যথাতুর মুখ দুখানি তাহার বড় ভাল লাগে। অশােক কহিল,আমার কিন্তু অশােকবাবুর কথা শুনতে বেশ লাগে। আচ্ছা তিনিও কি শুভ্রা দেবীকে ভালােবাসতেন ? শুভ্রা যেন একটু উত্তেজিত ভাবে কহিল,—সে কথা থাক্‌- আপনি তার কথা তুলে সব জেনে নিতে চান অথচ নিজে একেবারে চুপ। আপনি বিশ্বাস করেন কেন তা ত বললেন না? অশােক হাসিয়া কহিলেন,-শুনতে চান তা বলেই পারেন, -এ সবে আমার কোন লজ্জাই নেই, কারণ মানুষের জীবনে এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। আমিও একটি মেয়েকে অমনি প্রথম দর্শনেই ভালবেসেছিলাম—হয়ত বা সেও ভালবেসেছিল। ভাগ্য- বিপর্যয়ে হঠাৎ আমার পরিবর্তন হ’ল, একদিন তারপর অত্যন্ত দরিদ্র বেশে তাদের বাড়ীর সামনে দাড়িয়ে ছিলাম, সে আমার পাশ দিয়ে চলে গেল কিন্তু চিলে না- শুভ্রা কহিল,-এ হতে পারে না মিলি প্রতিবাদ করিল,-না-না,মেয়েরা কি কেবল অর্থকেই ভালবাসে === অশােক কহিল,এতে কি আমাকে মিথ্যাবাদী বলা হয় না ? শুভ্রা কহিল,—না, হয়ত সে দেখেনি—আনমনে চলেছিল কিন্তু দেখেও দেখেনি এমন নয় - —কিন্তু এটা সত্য কথা, -আপনি ভুল বুঝেছেন- অশােক আপনমনেই অভিনেতার মত একটু হাসিল, তাহার পর কহিল,- আচ্ছা অশােকবাবু শুভ্রাদেবীকে ভালবাসূতেন কিনা সেটা কেমন করে বুঝলেন- শুভ্রা প্রসঙ্গটাকে বন্ধ করিয়া দিতেই যেন কহিল,—তা বােঝ যায় নি-আর যাবেও না- মিলি ব্যঙ্গ করিল,—অশােকদার কথা শুনতে ত আপনার হিংসে হওয়া উচিত যদি অশােক অবাক হইয়া কহিল,—কথাটা স্পষ্ট করে বল- -মানে যদি শুভ্রার পরিচয়কে আপনি মানে —ভালবেসে থাকেন এই ত? কিন্তু শুভ্রাদেবীকে ভাল লাগে একটি গুণে সেটি হচ্ছে উনি দরিদ্রকে ভালবাসেন বলে- শুভ্রা কহিল,-ও কেবল তাই অশােক কহিল,-বােধ হয় তাই। অশােক বাবুকে দরি জেনেও যে উনি ভুলতে পারেননি এই কথাটা আমার মনে সত্য রেখাপাত করেছে—সেই জন্যেই ওর পরিচয়কে আমার কার এত মহার্ঘ করে রেখেছে। শিলি কহিল, নইলে ?

এবং -নইলে, জগতে সব নারীর মুখই আমার কাছে আজ সমান। জানি তরল পদার্থ মাত্র, যে পাত্রে থাকে তার অবয়ব ও রং সে পায়—আমি চাই জগতে দরিদ্রকে সকলে ভালবাসুক, দারিদ্র্য কি,—কত তার লাঞ্ছনা, কি অপরিসীম লজ্জা ও বেদনা পুঞ্জীভূত হয়ে থাকে সেখানে তা সম্পদের স্পর্ধা কোন সময়েই অনুভব করতে পারে না, অশােক কথা কয়েকটি বলিতে বলিতে উত্তেজিত হইয়া উঠিয়াছিল, সে হঠাৎ কহিল,-আচ্ছা আসি, নমস্কার। কোন উত্তরের অপেক্ষা না করিয়াই চলিয়া গেল- মিলি কহিল,—ডাক্তারদা সত্যিই মহৎ-মনে হয় ওর জীবনে কোথায় একটা বিরাট রহস্য রয়েছে, যার জন্যে উনি অমনি ভাবপ্রবণ শুভ্রা নীরবে অপসৃয়মান ডাঃ চৌধুরীর দিকে চাহিয়া রহিল, -ডাক্তার চৌধুরী গেট বন্ধ করিয়া লম্বা লম্বা পা ফেলিয়া রাস্তা পার হইয়া গেল। মিলি কহিল,মনে হয় ডাক্তারদা তােকে ভালবাসে শুভ্রা হঠাৎ যেন সম্বিত ফিরিয়া পাইয়াছে এমনি ভাবে কহিল, -ওঃ উনি চা না খেয়েই চলে গেলেন যে- মিলি কহিল,-তাই ত? - এশােক বাড়ীতে আসিয়া সােফাটির উপর লম্বা হইয়া শুইয়া পড়িল-সে একাকী একরূপ থাকে, জীবনটাকে সহজ সরলতাৰে

১১)
লইয়া সে চলিতেও পারে কিন্তু ওই শুভ্রা ও মিলির সামনে উপস্থিত
হইয়া সে যেন কেমন হইয়া যায়, উত্তেজনায় ভাবাতিশয্যে সে যেন
বদলাইয়া যায়, সহজ সরল ভাবে চলিতে পারে না। তখন
সে বুঝিতে পারে না কিন্তু পরক্ষণেই সে বুঝিতে পারে তাহার
ছেলেমানুষী এবং লজ্জিত হয় !
এমনি করিয়াই দিন যায় – কয়েকমাসও হইয়া গেল।
শুভ্রা ও অশোকের আলাপ আলােচনা ও হৃদয়ের উদ্বেলিত
তরঙ্গ একই স্থানে আসিয়া রােজ মিলাইয়া যায়—পৌনঃপুনিক
দশমিকের মত ঘুরিয়া ঘুরিয়া একই ফল প্রসব করে। অত্যন্ত
উৎসাহের সময় অশােক আত্মবিস্মৃত হইয়া কত কি বলিয়া যায়-
তারপর যখনই মনে পড়ে সেই জড়ােয়া হারটির কথা তখনই
সংকোচে লজ্জায় ভয়ে সে ফিরিয়া আসে—ভাবে, শুভ্রার
জীবনকে নষ্ট করিবার, ব্যর্থ করিবার অধিকার তাহার নাই,
শুভ্রা সুখী হােক—
সেদিনও অমনি একটা চিন্তা তাহার অন্তরাকাশকে মেঘাচ্ছন্ন
করিয়া রাখিয়াছিল, হঠাৎ মিলি ব্যস্ত সমস্ত ভাবে প্রবেশ
করিয়া ডাকিল,-ডাক্তার দা, ডাক্তার দা
-অশােক হাসিয়া কহিল,-কি বােন? ব্যাপার কি
হাঁপাচ্ছ যে। বসাে-
.
-বসো, চা খাও,-একটু জিরিয়ে বলবে-

১১২ মিলি হাঁপাতে হাঁপাইতে যেন কহিল, “আপনি বিয়ে করেন না কেন ? অশােক হাে হাে করিয়া হাসিয়া উঠিয়া কহিল,-ও এই কথা। ভেবে চিন্তে দেখি, তুমি ঠাণ্ডা হয়ে বসে। চিন্তে পৰামর্শ করে এক সময় বিয়ে করা যাবে তার জন্যে ব্যস্ততা কি—আর হাপাচ্ছই বা কেন ? আর আমি কাউকে বিয়ে করতে চাইলে সে আমাকে বিয়ে করবে । কেন ? নিশ্চয়ই বিয়ে করবে। কেন করবে না? আপনিত শুভ্রাকে ভালবাসেন—তবে ? অশােক হাসিয়া কহিল, কিন্তু শুভ্রাদেবী যে আবার সেই তােমার অশােকদার পথ চেয়ে আছেন আমাকে বিয়ে করবেন, কেন? মিলি কহিল, করবে- তা হলে ওসব মিথ্যে কথা ? মিথ্যে নয়, কিন্তু যে চলে গেছে তার জন্যে—হয়ত আর ফিরবে না। তার জন্যে—যাক সে কথা আপনি বিয়ে করে ফেলুন,-এই ত? হ্যা যখন ভালবাসেন- অশােকের মনে পড়িল-সে ট্রেনে যাইতেছে, খুলিয়া দেখে ছােট্ট বাক্সের মধ্যে হীরাজহরতে বন্দী হইয়া আছে প্রায় এক লক্ষ টাকা তারপর বােম্বাই-তারপর ..

১১৩
=
অশােক কহিল,ভালবাসি বলেই তাকে বিয়ে করে
অসম্মান করতে চাইনে। আমি অযােগ্য—
বেশ বললেন ত হেয়ালী -
হেয়ালী নয় মিলি—জীবনে এইটেই চরম ও মর্মান্তিক
সত্য। শুভ্রা যদি আমাকে ভালও বাস্ততা তবুও আমি তাকে
ব’লতুম-অশােককে দূর করে আমাকে ভালবেসাে না, আমাকে
দূর করে অশােককে ভালবেসাে-
অশােকের মনে পড়ে আকতৃষ্ণা লইয়া সে জলকলের
কাছে দাড়াইয়া ছিল, তিনদিন অনাহার অনিদ্রা,—বিলাসী
তাহাকে আশ্রয় দিয়াছিল—সেদিন এখনও জ্বলন্ত অঙ্গারের মত
তাহার অন্তরে বহ্নিজ্বালা ছড়াইয়া দেয় –
-না—না, বিয়ে আপনাকে করতেই হবে-
-তােমার লাভ কি তাতে মিলি ?
মিলি কহিল,-আপনাকে নিকট করবে, তাই বলে
অশােকদাকেও দূর করবাে না
-কিন্তু শুভ্রা ?
মিলি কহিল,—সে সুখী হবে। আমার মুখে শুনেই
আপনি একথা বিশ্বাস করতে পারেন।
সেদিন শৈলেনবাবু ও শুভ্রা বৈকালে বাগানে বসিয়া কথা
বলিতেছিল-কথা একই-শুভ্রার বিবাহ। ওই একই আলােচনা
পৰিৰীয় বেশ

১১৪ পিতাপুত্রীর মাঝে রােজই হয়, গরমিল অঙ্কের মতই রােজ তাহ আটকাইয়া যায়, কোন ফল প্রসব করে না। সেদিন শৈলেনবাবু সােজা সুজি তাহার মত ব্যক্ত করিয়া ফেলিলেন।- তাহার সংক্ষিপ্ত বক্তব্য এই যে তাহার যেরূপ শরীর যে কোন দিন তাহার মৃত্যু হইতে পারে এক্ষেত্রে তাহার ইচ্ছা তিনি ডাঃ চৌধুরীর হাতেই শুভ্রাকে সমর্পণ করিবেন কিন্তু শুভ্রা বড় হইয়াছে, শিক্ষা লাভ করিয়াছে তাহার ব্যক্তিত্ব বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে তিনি কিছু করিতে চান না—তাহার পছন্দকেও তিনি অস্বীকার করেন না। শুভ্রা অনেকক্ষণ চুপ করিয়া ছিল, তাহার পর কহিল- তাতে কি তুমি সুখী হবে বাবা? শৈলেনবাবু কহিলেন, মা, তােকে বােধ হয় কেবল সেই অশােক আর এই ডাঃ এই চৌধুরীর হাতে দিয়েই নিশ্চিন্ত হতে পারি। অশােক—কিন্তু ডাঃ চৌধুরীও চমৎকার লােক। তুই কি তাতে সুখী হবিনি মা ? শুভ্রা অত্যন্ত শান্ত ও সিগ্ধ কণ্ঠে কহিল,—তুমি সুখী হলেই আমি সুখী হব বাবা। তােমাকে সুখী করা ছাড়া জীবনে আর কি বৃহত্তর কর্তব্য আছে ? —আমি ত চাই না যে আমাকে সুখী করতে তুই অসুখ —তুমি সুখী হ'লে আমি অসুখী হব কেন ? গেটের দিকে একটা শব্দ হইতেই উভয়ে চাহিয়া দেখিলে ১১৫ ডাঃ চৌধুরী গেট ঠেলিয়া ভিতরে প্রবেশ করিলেন। ডাঃ চৌধুরী আসিয়া নমস্কারান্তে প্রশ্ন করিলেন,—ভাল আছেন? শৈলেন বাবু কহিলেন,—ঠিক সময়টিতেই এসেছেন আপনাকেই চাইছিলাম মনে মনে অশােক স্মিত হাস্যে কহিল, আমাকে ? বলুন—আমি কি করতে পারি- শৈলেনবাবু ভণিতা করিয়াই কহিলেন,-শুভ্রা ছাড়া পৃথিবীতে আমায় আর কেউ নেই, তাকে কারও হাতে দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত হতে পারি না।•••বােধ হয় এক তুমি ছাড়া অশােক বিস্মিত হইয়া কহিল,—আমি ? কিন্তু আমি ত অযােগ্য, ওঁর মত শিক্ষিতা মেয়েকে বিবাহ করবার উপযুক্ত আমি নই- অশোকের হৃদয় মথিত করিয়া ভাসিয়া উঠে তাহার বিগত জীবন, যেখানে একটি পাপ তাহার সমস্ত জীবনকে নিবিড় কালিমায় ঢাকিয়া রাখিয়াছে, যে মহূর্তে তাহা প্রকাশিত হইবে সেই মুহূর্তে শুভ্রার কাছে সে হইয়া উঠিবে অতিশয় ঘৃণ্য, তার জীবন আর মৃত্যুর মাঝের ব্যবধান ফুরাইয়া যাইবে। শৈলেন বাবু কহিলেন,-না, অযােগ্য নয়, শুভ্রা তােমার যোগ্য হবে এই আশাই করি। -কিন্তু আমার কুলশীল জানেন না, আমি চোর জুয়াচোৰ হতে পারি, এই এম, ডি ডিগ্রী আমার মিথ্যা হতে পারে- -তা হয় না, তােমার যেটুকু পরিচয় আমি পেয়েছি তাতে ১১৬ তা হয় না,-হওয়া সম্ভব নয়। আর যদিও হয়, তথাপি তুমি মনে করে না, তােমার এম, ডি ডিগ্রী, গাড়ী কি অর্থ দেখে তােমার উপযুক্ত বিচার করেছি। তােমার মাঝে সত্যিকার মনুষত্ব আছে তাই তােমার উপর আমার এই আগ্রহ—জানি তুমি ওর প্রতি কোনদিন অবিচার করতে পারবে না—তােমরা বড় হয়েছ এর মীমাংসা তােমাদেরই করে নেওয়া দরকার শৈলেনবাবু আর কিছু না বলিয়া উঠিয়া গেলেন। অশােক তাই একটু নীরব থাকিয়া কহিল—অশােকবাবুর সেই সংযম, সে দৃঢ়তা, সে চরিত্র বল ত আমার নেই। আমি হয়ত অসৎ,-আমার সব ত তুমি জানাে না শুভ্রা। -বাবা খুসী হবেন এর চেয়ে বেশী জানবার প্রয়ােজন আমার নেই। তার শেষ জীবনকে আমি সুখী করতে চাই- অশােক ব্যথিত ব্যকুল কণ্ঠে কহিল, কিন্তু আমি কেমন করে তােমার জীবন নষ্ট করবে—আমি যে সত্যিই তােমাকে তালবাসি। তােমাকে বিয়ে করে তাই তাহার অমৰ্যাদা করতে চাইনে। আর তুমি কি সুখী হবে? শুভ্রা আনত আঁখি দুটি তুলিয়া ধরিয়া কহিল,-বাবা খুশী হলেই আমি হব, নিজের সুখ দুঃখ সম্বন্ধে আমি এর বেশী সচেতন এখনও হতে পারিনি -কিন্তু আমি হঠাৎ যদি মারা যাই। অশােক অসহায়ের মত কহিল,-তুমি এবিয়েতে মত দিওনা শুভ্রা,-মাত্র কয়েক নিমের মন্তে-

১১৭
শুভ্রা কহিল,—সে আমার ভাগ্য! আমি যে চিরদিন
বেঁচে থাকবে তারই বা কি নিশ্চয়তা আছে। আজি আমি
অনেকটা ভাগ্যবাদী
অশােক অসহায়ের মত কহিল,—এ এত বড় সৌভাগ্য যে
একে অবিশ্বাস করাই উচিত,একে ফিরিয়ে দেওয়াই উচিত।
তােমাকে পাওয়ার প্রলােভন আমার এত দুর্নিবার যে তা আমি
প্রতিরােধ করতে পারবাে না, কিন্তু যদি জীবনে সুখী হতে চাও
তবে তুমি প্রতিরােধ করাে-তাতে তুমি সুখী হবে—
অশােক আর কিছু বলিতে পারিল না, শুভ্রার সম্মুখ হইতে
অপরাধীর মত একটা অকরুণ লজ্জা লইয়াই যেন পলাইয়া গেল।
ছয়মাস পরের কথা-
শুভ্রার সহিত অশােকের বিবাহ সুসম্পন্ন হইয়াছে।
পঞ্জিকার মতে শুভদিনে শুভক্ষণে এক আনন্দ মুখর রাত্রিতে
অশােক অপরাধীর মত বর বেশে উপস্থিত হইয়া শুভ্রার পাণি-
গ্রহণ করিয়াছে। আনন্দ কোলাহলের মাঝে বার বার তাহার
মনে পড়িয়াছে তাহার জীবনের কথা,—পরিহাস ও ব্যঙ্গের উত্তরে
সে কেবল মিথ্যা ভাষণ করিয়া ছিল—শরীরটা ভাল নেই।
শুভ্রাকে সে ভালবাসিত, এবং অত্যন্ত ভালবাসিত বলিয়াই সে
এ বিবাহ মনে মনে সমর্থন করে নাই, অথচ তাহাকে দূরে ঠেলিয়া
দিবার মত সাহসও তাহার ছিল না,দূরে পলাইবার শক্তিও

তাহার নাই। যন্ত্র চালিতের মত সে শৈলেনবাবু মিলি ও শুভ্রায় ইচ্ছার কাছে আপনাকে সমর্পণ করিয়াছিল—তাহার পর একটি একটি করিয়া বহুদিন গিয়াছেশুভ্রার সেবা স্নেহ ভক্তি ভাল- বাসায় সে যেন সর্বদাই সঙ্কুচিত হইয়া উঠে। শুভ্রাকে পাইয়াও সে যেন পায় নাই-কি একটা ব্যবধান, একটা অস্বস্তি গােপন, কাটার মত তাহার হৃদয়কে রুধিরাক্ত করিয়া তুলে। সে মুখে হাসে, অভিনেতার মত নিজের হাসিতে, আনন্দে নিজেই চমকাইয়" উঠে! সেদিন বৈকালে শুভ্রা ও অশােক চা পান করিতেছিল, মিলি গৃহে প্রবেশ করিয়া কহিল,-ডাক্তার বৌদি নমস্কার- শুভ্রা হাসিয়া কহিল-বড়াে ফাজিল হয়েছিস ? তােকে বিয়ে দিয়ে বিদেয় করে দিতে হবে। তুমি একটা ছেলে দেখ ত । অশােক সমর্থন করিল, – ওই রকম একটা শাস্তি দিতেই হবে দেখছি, গুরুজনের সঙ্গে ইয়াকি। বড় অন্যায়- মিলি কহিল,-সেটা কি একটা শাস্তি হ’ল নাকি ? জিজ্ঞেস কর তােমার বৌদিকে ? মিলি শুভ্রার সন্তানসম্ভাবনার প্রতি ইঙ্গিত করিয়া পরিহাস করিল, এর মাঝেই শাস্তি আরম্ভ হয়েছে ? ওই জন্যেই শরীর খারাপ ? শুভ্রা আরক্ত মুখে কহিল,-ধ্যেৎ-চা খেয়ে নে- মিলি কহিল,—ও নুতন টি-সেট দেখছি—আপনি বহু খরচ করেন দেখছি ডাক্তারদা-

১১৯
আশােক পরিহাস করিল,—সেটি ব’লবার যাে নেই। আমার
সব কিছু ওর বাক্সে ট্রান্সফার করে দিয়েছি কাজেই বাজে ব্যয়
এখন সব তােমার বৌদির। আমি নিমিত্ত মাত্র, খেতে দিলে
খাই-না দিলে খাইনা-
শুভ্রা টিপ্পনী করিল,হা সুবােধ বালক!
-
কয়েকদিন পরে ব্যাঙ্ক হইতে অকস্মাৎ একজন পিওন আসিয়া
তাহার কয়েকটি সহি লইয়া গেল। ব্যাপারটা তখন অশােকের
কাছে রহস্য জনক মনে হয় নাই, ব্যাঙ্ক হইতে ওরূপ সহি ত
সইতে পারে কিন্তু সহি দিবার পরদিন তাহার মনে অকস্মাৎ
একটা খটকা লাগিল এই দীর্ঘ ছয় বৎসরে সে বহুস্থান ঘুরিয়াছে
কিন্তু অন্য কোনদিন ত কেহ তাহার সহি চাহে নাই। বােম্বাইয়ে
জহুরীর দোকানে সে যে সহি করিয়াছিল তাহাও এইচ, চৌধুরী,
—সেখানকার ব্যাঙ্কেও তাহার সহি ছিল এইচ, চৌধুরী।
যাহাই হোক সে বুঝিয়াছিল তাহার দিন সমাগত,-আর
একবার এই রঙীন পৃথিবীকে, প্রিয়তমা শুভ্রাকে ফেলিয়া
তাহাকে যাইতে হইবে। বিদায় লইতে হইবে এই ভাবনাটাই
শুভ্রাকে যেন অতি আপনার করিয়া তুলিল-সে তাই প্রতিদিন।
সিনেমা, থিয়েটার, বােটানিক্যাল গার্ডেন প্রভৃতি করিয়া শুভ্রার
সহিত তাহার দিনকয়েকটি অত্যন্ত মধুর করিয়া তুলিল। বিদায়ের
পূর্বে আপনাকে সে শুভ্রার কাছে মধুরতর করিয়া সঞ্চিত করিয়া;

রাখিবে। শুভ্রাকে আপনার মাঝে সুন্দর মধুর করিয়া সঞ্চয় করিবে-
শুভ্রাকে মুহূর্ত একাকী ছাড়ে না। মহামূল্য সামগ্রীর মত চোখে
চোখে রাখে-শুভ্রা হাসিয়া বলে,-তােমার হ’ল কি? কেবল
ছেলেমানুষীই করছে? অশােকও হাসে কিন্তু জবাব দেয় না,
সংক্ষেপে বলে,-বৃদ্ধ হয়েই বা লাভ কি। কিন্তু অন্তর তখন
অনাগত ভবিষ্যতের আশঙ্কায়, বিদায়ের বেদনায় হাহাকার
করিয়া উঠে-
-দীর্ণ হইয়া যায়-
সেদিন সন্ধ্যায় অশােক ও শুভ্রা বসিয়াছিল। অশােক শুভ্রর
চেহারাটা লইয়া ব্যঙ্গ করিয়াছিল তাই শুভ্রা কৃত্রিম ক্রোধে
কহিল,-অমনি করলে চলে যাবাে -
অশােক কহিল,-যাই করাে ছেলেই যদি হয় তবে তাকে
তুমিই মানুষ করবে কিন্তু সত্যকার মানুষ যেন সে হয়।
সত্যকার কাচের পুতুল সে যেন না হয়-
-তুমি কি করবে-
-আমি ? আমি কি দিনরাত্রি ছেলে কোলে করে বসে
থাকবে নাকি? আর মানুষ করবার ভার চিরদিনই মায়ের
উপরেই থাকে।
মিলি হঠাৎ ঘরের মাঝে আসিয়া কহিল,—ডাক্তার
শুভ্রাকে নিয়ে যাবাে- এক্ষুনি। ঘর সংসার করলে কি আর
বেরুতে নেই।

১২১ L অশােক পরিহাস করিয়া কহিল,--না এমন কথা, শ্রীমদ্ভাগবত গীতায় লেখে না- – তা হলে শুভ্রা যাবে ত? অশােক কহিল,-তােমার বৌদিকে তুমি নিয়ে যাবে, এবং উনি যাবেন,আমি তৃতীয় ব্যক্তি কেন বাজে কথা ব’লবােবলাে? -না, রসিকতা রাখুন,-বলুন যাবে কি না? অশােক অপ্রাকৃত গাম্ভীর্যের সহিত কহিল,আমার দৃঢ় মত এই যে, উনি যদি যান তবে যান আর যদি না-ই যান তবে যাবেন না সকলেই অশােকের পরিহাসে হাসিয়া উঠিল। শুভ্র। কহিল,-না, সত্যি করে বল--যাবে কিনা শেষে অশােক পুনরায় কহিল,-বাড়ীর গৃহিণী বেড়াতে যাবেন তা’তে ঠাকুর চাকর ড্রাইভার স্বামী সকলেরই মত নিতে হবে নাকি ? ধিক্‌ রমণী জীবনে মিলি কহিল,-চল ভাই,—তাড়াতাড়ি। বাজে কথার সময় নেই। মিলি মস্ত বড় একখানা বই অশােকের হাতে গুজিয়া দিয়া কহিল-এই খানা পড়ন-আমরা যাই- মিলি ও শুভ্র। উভয়ে বাহির হইয়া গেল। তাহাদের মােটরের শব্দ ধীরে ধীরে মিলাইয়া গেল। অশােক বিরাটকার পুস্তকখানি হাতে করিয়া কিছুক্ষণ ভাবিল-কত কি ? তাহার পর আপন মনেই উঠিয়া আয়নার সামনে উপস্থিত হইল।

১২২
মুখের আঁচিলটা তুলিয়া ফেলিয়া সে নিজের চেহারা দেখিয়াই
যেন হাসিয়া ফেলিল। মনে মনে কহিল,-এই টি শুভ্রা যাকে
ভালবাসতাে...আঁচিলটা আবার যথাস্থানে লাগাইল। অচিলের
স্থানটা সাদা হইয়া একটা ক্ষতে পরিণত হইয়াছে। তাহার পর
আয়নার প্রতি চাহিয়া কহিল,-এইটি শুভ্রার স্বামী।•••আমি
যে আমি নয় এইটেই জীবনের বড় পরিহাস। অশােক আবার
আসিয়া সােফায় দেহ এলাইয়া বসিল –মনটা তাহার ছুটিয়া
চলিয়াছে অতীতের পানে-দূরকাশের কোলে শঙ্খ চিলের
মত হাওয়ায় ভাসিয়া চলিয়াছে।
বাহিরে কলিং বেলের শব্দ হইল। অশােক তাড়াতাড়ি
বাহিরে আসিয়া দেখে একজন পুলিশ কনেষ্টবল। সে সেলাম
করিয়া জানাইল,-বড়সাহেব আপনাকে একবার তার অফিসে
অাসতে বলেছেন।
-কে ? কমিশনার সাহেব?
-হ্যা।
-কেন ? শরীর খারাপ করেছে ?
-জানি না, হুজুর।
-হ্যা ডাক্তারের স্মরণ যখন হয়েছে তখন অসুখই।
আজ্ঞে না।
--Go Death
Death Certificate face cortaranta
হয়েছিল বটে। আচ্ছা তুমি যাও আমি যাচ্ছি। পথে একটা কেস
দেখেই যাবাে-
.

১২
কনেষ্টবলটি নমস্কার করিয়া প্রণাম করিল। অশােক প্রতি
নমস্কার করিয়া একটু দাড়াইয়া রহিল। অশােক বসিবার।
চেষ্টা করিল,-এই ত জীবন। উন্নতশীর্ষ বটবৃক্ষও মুহূর্তে
ধরাশায়ী হয়।—মনে মনে কহিল,-কোন দুঃখ নেই, জীবন ত
পূর্ণ-ডাক্তার হয়েছি, দরিদ্রের সেবা করেছি, শুভ্রাকে পেয়েছি
অতএব বিদায় সুন্দর ধরণী। অশােক উচ্চকণ্ঠে ড্রাইভারকে
গাড়ী বাহির করিতে বলিল
গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রােড দিয়া অশােক গাড়ী চালাইয়াছে দ্রুত।
তীব্র গতিতে।—অশােক ছুটিয়া চলিয়াছে পৃথিবীকে পিছনে
ফেলিয়া নূতন জীবনে, কোথায় যাইবে কেন যাইবে সে তা
ভাবে নাই, সে শুধু চলিয়াছে—তীব্র গতিতে বিরাট গাড়
খানি চলিয়াছে-
চলিতে চলিতে রাত্রি গভীর হইয়া উঠিল। জন হীন রাহু
হেডলাইটের আলােয় উদ্ভাসিত করিয়া সে ছুটিয়া চলিয়াছে
হঠাৎ তাহার সামনে টতিতে টলিতে একটা মাতাল বা অমা
কেহ আসিয়া পড়িল,--তাহাকে বাঁচাইবার চেষ্টা সে করি।
বটে কিন্তু লােকটাও ঘুরিয়া ফিরিয়া গাড়ীর সামনেই আসি
পড়িল অশােক ব্রেক দিলেও লােকটা মােটরে ঘূর্ণ ম
চাকার নীচে নিষ্পিষ্ট হইয়া গেল,-একটু আর্তনাদ করি
না, কারােক্তি করিল না। অশােক পরীক্ষা করিয়া দেখিল,

২৪ দেহে প্রাণ নাই অথচ এতটুকু রক্তপাত হয় নাই। আশে পাশে বাঁশবন, নিকটে গ্রাম আছে বলিয়া মনে হইল না। গাড়ী স্টার্ট দিতে গেল কিন্তু গাড়ী বিকল,গাড়ী আর চলিবে সে অশােক মনে মনে কি যেন ভাবিল এবং কি যেন একটা ৰংকল্প করিল, তাহার পর লােকটিকে ড্রাইভারের সিটে বসাইয়া দয়া গাড়ীতে আগুণ লাগাইয়া দিল, নিজের কোটটিকে খুলিয়া একটি দুইটি বােম ছিড়িয়া রাস্তায় ফেলিয়া দিল, কোটটিকে মৰ্দ্ধ দগ্ধ করিয়া পাশের নয়নজুলিতে ফেলিয়া দিল। এতক্ষণে মাটর খানি দাউ দাউ করিয়া জ্বলিতেছে, জ্বলন্ত গাড়ীখানাকে প্রাণপণে ঠেলিয়া কোনক্রমে সে নীচু নয়নজুলিতে ফেলিয়া বতেই তাহা উল্টাইয়া গেল ! লােকটা ছিটকাইয়া জ্বলন্ত ঞ্জিনের নীচে গিয়া পড়িল। অশােক চারি পাশে চাহিয়া ওনা দিল- কতক্ষণ সে হাঁটিয়াছিল ঠিক জানা নাই,ভােরের দিকে কখানা কলিকাতা গামী লীতে উঠিয়া সে ফিরিয়া আসিল। অশােক সােজা আসিয়া লালবাজার পুলিশ অফিসে আত্মসমর্পণ রিল। কমিশনার সাহেবের সহিত চিকিৎসা ক্ষেত্রে তাহার কিছু রিচয় ছিল। কমিশনার তাহাকে প্রশ্ন করিলেন,-সে সমস্তই কিার করিল। টিপসহি দিলে তিনি তাহা জহুরীর দোকানে টিপসহির সহিত মিল করিয়া দেখিলেন। কমিশনার সাহেব নানা প্রশ্ন করিলেন—অশােক নিঃসংকোচে সমস্তই বর্ণনা করিল। অবশেষে সাহেব প্রশ্ন করিলেন –আপনি এত বড় ডাক্তার। আপনার চিকিৎসার সুনাম শুনেছি, আমারও বাড়ীতে ত আপনি চিকিৎসা করেছেন- -~-ডাক্তারী আমি ঘরেই পড়েছিলাম, কোনাে কলেজে পড়িনি। এম, ডি, ডিগ্রী আমার মিথ্যা। ওটা নেহাত দিতে হয় তাই দিয়েছিলাম। আপনি আশ্চর্য হচ্ছেন আমার স্বীকা- রােক্তিতে, তা আমি জানি কিন্তু একটা উপকার আমার আপনি করতে পারেন- -কি বলুন –এ মামলায় বিচার হবে কোথায় ? আমাকে কোথায় পাঠাবেন ? -বােম্বাই- —তবে আমার একান্ত অনুরােধ আমার অশােক নামেই যেন মামলা চলে। আমি যখন সবই স্বীকার করেছি তখন ডাঃ চৌধুরী যে আমিই একথা না বললে ক্ষতি কি। অর্থাৎ আমি চাই ডাঃ চৌধুরী যে অশােক একথা সর্বসাধারণে না জালে মামলার কোন ক্ষতি হবে না—অথচ আমার উপকার সাহেব হাসিয়া বলিলেন,—এ উপকার আপনার করতে পারবে বলে মনে হয়। কারণ, আমাদের কাজ আপনাকে

গ্রেপ্তার করে পাঠানাে। অর্থাৎ ঐ ব্যাঙ্কের H. Choudhury
পহির লােকটিকে তাহার চায় -
অশােক নিশ্চিন্ত মনে কহিল, আপনার উপকার চিরকাল
মনে থাকবে।
তারপর কাহিনী খুবই সংক্ষেপ
পরদিন কাগজে বাহির হইল,-বালিগঞ্জের ডাঃ চৌধুরী
মােটর দুর্ঘটনায় হত হইয়াছেন। পথিপাশ্বে গাড়ী উল্টাইয়া
যাইয়া এঞ্জিনে আগুন লাগিয়া যায়, সেই অগ্নিতে ভঁহার দেহ
গ্ধ হইয়া গিয়াছে—সনাক্ত করিবার উপায় নাই তবে আনু-
ঙ্গিক প্রমাণ প্রয়োেগ হইতে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয় যে ওই
দহ ডাঃ চৌধুরীর
বােম্বাইতে সামান্য একদিন একটু বিচার হয়, তাহাতে চুরি
হাজানি প্রভৃতি অভিযােগে অশােকের প্রতি সাতবৎসর
কারাদণ্ডের আদেশ হয়। অশােক অত্যন্ত নিশ্চেষ্ট ও নিশ্চিন্ত
নে কারা প্রাচীরের অন্তরালে আশ্রয় গ্রহণ করে যেন জীবনের
প্রবল ঝড় ঝাপটার পর সে একটা আশ্রয় পাইয়াছে। কারা
প্রাচীরের প্রবেশদ্বার হইতে বিস্তৃত ধরণীর পানে চাহিয়া, প্রবল
মভিমান স্ফুরিত অন্তরে তাহাকে বিদায় নমস্কার জানাইয়া সে
ীির্ঘদিনের মত অপসৃত হইয়া গেল। আজ কারাগার ও বহি
ঈগতের মাঝে তাহার কাছে কোনই পার্থক্য নাই।

১২৭ সংবাদপত্ৰদ্বারা অবসর সময় বিনােদন করিতে করিতে এক- দিন মিলির চোখে সামান্য একটা সংবাদ পড়িল-বােম্বাইতে বহুমূল্য একটি জড়ােয়া হার রাহাজানির অপরাধে অশােক নামক জনৈক ব্যক্তির সাতবৎসর সশ্রম কারাদণ্ড দিয়াছে। তাহার মনে কিরূপ একটা সংশয় জাগিয়াছিল তাই ডাক্তার বসুকে সে সংবাদটা দেখাইয়াছিল। মিলি প্রশ্ন করিয়াছিল, আমাদের অশােকদা নয় ত? ডাঃ বসু তাহার স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে বলিয়াছিলেন,-তা : হতেও পারে বা ? সে যে ছেলে সে জেলে যাবে, চুরি রাহাজানি করবে তবুও ভিক্ষা করবে না। একটা মহৎ প্রাণকে তােমরা দশজনে মিলে হত্যা করেছ- -এমনি কাজ করবে একি সম্ভব,—জগতে কত অশােক আছে - ডাঃ বসু বলিলেন, তা ও হতে পারে, কিন্তু একটা কথা মনে রেখাে সে স্কলার, সে বড় হলে হতে পারতাে। তিনি দীর্ঘশ্বাস মুক্ত করিয়া কহিলেন,-জগতে কত প্রতিভা এমনি করে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, আর একদিন শৈলেন বাবু ডাঃ চৌধুরীর মৃত্যু সংবাদ জানিয়া চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিয়াছিলেন-উঃ আর ত পারিনে- শুভ্রা অশ্রু মার্জনা করিয়া কহিয়াছিল,-কেঁদো না ৰাৰ ভাগ্যে যা ছিল হয়েছে- ।

১২
-আহত হওয়ার পরেও হয়ত প্রাণ ছিল, হয়ত বাঁচতে
পারতাে। তখন অত্যন্ত অসহায় ভাবে পুড়ে মরেছে-উঃহু-
-
--সেকথা ভেবে কি হবে বাবা ।
-ভেবে কি আর হবে? মােটর এ্যাকসিডেন্ট কতই হয়,
কেবল আমার ভাগ্যেই মােটর জ্বলল—বুকখানাও জ্বলতে সুরু
করলাে-
শুভ্রা কঁদিয়া কি কহিতে যাইয়া শুধু বলিয়াছিল,-বাবা,
তুমি অমন করলে আমি থাকবাে কি করে ?
-কি করে তােকে অমনি বেশে দেখবাে ? আমার কি
মৃত্যু নেই
ক্রন্দন শােক ও বিলাপে কয়েকটি দিন অতিবাহিত হইয়াছে,
শােক চিরদিন থাকে না, সময়ের সঙ্গে যেমন পৰ্বতও উচ্চতা
হারায়, দেশও উর্বরতা হারায় তেমনি করিয়া শােকও কমিয়া
আসে-জীবন আবার চলে। মানুষ হাসে, কাজ করে আকুল
আগ্রহে বাঁচিয়া থাকিবার জন্যে চেষ্টা করে।
পৃথিবীর উপরে দিনের পর দিন, রাত্রির পর রাত্রি শীতের
পর গ্রীষ্ম আসে চলিয়া যায়,–একদল মানুষ বৃদ্ধ হইয়া মরে আর
একদল যৌবন ছাড়াইয়া বৃদ্ধ হয়—একদলের হাসিকান্না ফুরায়
আর একদল কাদিতে আরম্ভ করে। এই জগতের চিরন্তন
নিয়ম-মানুষের অন্তরের বেদনা, নৈরাশ্য, আনন্দ পৃথিবীর উপরে
কোন ইতিহাসই রচনা করতে পারে না, জীবনের সঙ্গে সঙ্গে

তাও মুছিয়া যায়। পুরাতনকে ছাড়িয়া মানুষ নুতনকে গ্রহণ করিয়া বাঁচিয়া থাকে,-অতীতকে ভুলিয়া ভবিষ্যতের স্বপ্নরসে জীবনকে সঞ্জীবিত করিয়া রাখে। তেমনি করিয়া মিলির কাছে অশােকের স্মৃতি ঝাপসা হইয়া গিয়াছে, ডাঃ চৌধুরীও ধীরে ধীরে ঝাপসা হইয়া আসে। শুভ্রার হৃদয় যেমন করিয়া অশােককে ত্যাগ করিয়া ডাঃ চৌধুরীকে গ্রহণ করিয়াছিল, তেমনি করিয়া অনাগত শিশুর পানে চাহিয়া ডাঃ চৌধুরীকে ভুলিয়া যায়- জগতে চলে আবর্তন বিবর্তন উত্থান পতন। সূৰ্য্য উঠে ডুবে মানুষের অন্তর মূক হইয়া যায়, বধির পৃথিবী সে কথা শুনিতে পায় না। পৃথিবী চলে- আলোক অন্ধকারে,-বেদনাতুর বৈধব্যের শুক্লবাস পরিয়া - কারা প্রাচীরের অন্তরালে অপােকের দিন যায়- তাহার অন্তরে কোন দুঃখ নাই, আনন্দও নাই-সে যেন মৃত্যুর পরে অশরীরী হইয়া রহিয়াছে, তাহার মাঝে দেহ ও মন কোনটাই বাঁচিয়া নাই। কারাগারে কায়িক পরিশ্রম সে করে হাসি মুখে, অন্যান্য সহকর্মীর ক্ষুদ্র স্বার্থ, প্রীতি, প্রবঞ্চনা প্রভৃতি দেখিয়া সে হাসে। বদ্ধ প্রাচীরের অন্তরালে দৈনন্দিন জীবন- যাত্রার মাঝে একটা অকারণ উল্লাস তাহাকে প্রফুল্ল করিয়াই রাখে। এ জীবনে তাহার যাহা কিছু কাম্য সে সবই পাইয়াছে— ১০ অর্থ পাইয়াছে—সে ডাক্তার হইয়াছে,শুভ্রাকে ভালবাসিত তাহাকে পাইয়াছে, কাজেই জীবনে চাহিবার আর কি থাকিতে পারে। দিনের পর দিন আনন্দচিত্তে সে তাই অপেক্ষা করে মৃত্যুর জন্য- জীবনের আর কিছু অবশিষ্ট নাই। তাহার শ্মশ্রু গুম্ফ ধীরে ধীরে বাড়িয়া উঠে, বুক পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত হইয়া যায়, বছরের পর অনভ্যস্ত কায়িক পরি- শ্রমে শারীরিক একটা পরিবর্তন আসে, চুল দাড়িতে ধীরে ধীরে পাক ধরে—দেহের কান্তি লাবণ্য দূরীভূত হইয়া পরুষ ও কঠোর হইয়া উঠে- সে ঘানি টানে-হাসে-গান করে। বৈকালে বাগানে বাঁকে করিয়া টিন টিন জল ঢালে। কর্তৃপক্ষ তাহার প্রফুল্ল মুখ ও পরিশ্রমে খুশী হইয়া উঠেন, মাঝে মাঝে তারা সান্ত্বনা দেন। কাজ কিছু কমাইয়া দেন কিন্তু অশােকের আনন্দ কাজের মাঝেই, বসিয়া থাকিলেই মনে পড়ে জীবনের অতীত, রঙীন পৃথিবী, জীবনের সুখ দুঃখ হাসি কান্না। সে অকৃতজ্ঞ, বধির পৃথিবীর কোলে ফিরিয়া যাইতে তাহার ইচ্ছা নাই, কিন্তু তবুও তার স্মৃতি যেন তাহাকে ব্যথিত করে। সহকর্মীরা মাঝে মাঝে তাহার প্রফুল্লতা দেখিয়া প্রশ্ন করে, তাহার কি কোন দুঃখ নাই ? সে সংক্ষেপে জবাব দেয়,-দুঃখ কিসের ? মানুষ যা কিছু চাইতে পারে, আমি সবই পেয়েছি। তাহার পরিহাস করে,-উন্মাদ মনে করিয়া তাহার সঙ্গে নানা তামাসা করে। তাহার উচ্চশিক্ষিত স্ত্রী ও পুত্র আছে শুনিয়া অবিশ্বাসের হাসি হাসিয়া তাহারা তাহার মস্তিষ্ক সম্বন্ধে সন্দেহাতীত ভাবে নিজস্ব অভিমত জানায়। অশােক হাসে তাহাদের অভিমত শুনিয়া নয়, মানুষের অজ্ঞতা দেখিয়া। তাহারা অতীত জীবনের কথা বলে, অশােক আগ্রহে তাহাদের কথা শুনে, অর্থের লােভ তাহাদের সাংঘাতিক,অর্থই তাহাদের পরমার্থ। তাহাদের অন্তর বাহির-বিশ্বে রসসুধা পান করিতে ছুটিয়া যায়, কারাপ্রাচীরে মাথা ঠুকিয়া ফিরিয়া আসে। বীভৎস চীৎকারে -বিদীর্ণ হইয়া যায়। অশােক পৃথিবীর পানে চাহিয়া হাসে- মনে মনে ভাবে, এইত পৃথিবী। কারাগার পৃথিবীর একটা ক্ষুদ্র সংস্করণ, বাহিরের পঙ্কিলতা, অনুদার আত্মকেন্দ্রিকতা সবই রহিয়াছে—ভিতর আর বাহিরে তফাৎ কিছু নাই—ইহার প্রাচীরের অন্তরালে কঁদিতেছে, ওরা বাহিরের উদার বিশ্বে কঁদিতেছে। এমনি করিয়া পৃথিবীর আবর্তন চলে,-রচিত হয় দিন রাত্রি। পৃথিবীর বার্ষিক গতি রচনা করে, বৎসর, মাস, শীত বসন্ত। এমনি করিয়া ধীরে ধীরে সাতটি বৎসর কাটিয়া গেল,-পৃথিবীর উপরে কত পরিবর্তন রচিয়া গেল এই দীর্ঘ সময় কৃশতা কুজতা ও পৰু কেশ তাহার বয়সটীকে যেন আরও অনেক বাড়াইয়া দিয়াছে। একদিন অত্যন্ত নিশ্চিন্তে সে গাছে

জল দিতেছিল, অকস্মাৎ জেলের কর্তা তাহাকে জানাইলেন যে
কাল তাহার কয়েদী জীবনের শেষ, সে মুক্তি পাইবে।
অশােক বিস্ময় বিস্ফারিত চোখে চাহিল। আবার এ
পৃথিবীতে ফিরিয়া যাইতে হইবে, আবার বাঁচিয়া থাকিবার জন্যে
সংগ্রাম করিতে হইবে। ঐ সম্পদের ঔদ্ধত্য, নীচতা, লােভ
প্রলােভনের মাঝে ফিরিয়া যাইতে হইবে ভাবিয়া তাহার মন
সঙ্কুচিত হইয়া উঠিল। সে সংক্ষেপে কহিল, আমি যাবাে না,
বেশ আছি এখানে। কোথায় আবার যাবাে ?
জেলার হাসিয়া বলিলেন,-রাখবার ক্ষমতা আমার নাই,
আনবার ক্ষমতাও নেই। আমি কি করতে পারি ? কেন মুক্তি
পেতে আপনার এত দুঃখ কেন ?
-কেন ? অশােক ভাবিয়া কহিল,-জানিনা, তবে আবার
বেঁচে থাকবার জন্যে দাসত্ব করতে হবে,-বেচে থাকতে হবে ?
জেলার হাসিয়া ফেলিলেন, এবং তাহার মস্তিষ্ক সম্বন্ধে
পূৰ্বেই অনেকের সন্দেহ ছিল তাই বাদানুবাদ না করিয়া চলিয়া
গেলেন।
অশােক বিমর্ষ হইল,—গাছগুলির পানে একবার মমতাধূর্ণ
চোখে চাহিল। তাহার পর সন্ধ্যায় সজল নয়নে আপনার কারা-
কক্ষে আশ্রয় লইল। রাত্রির অন্ধকারে বিচিত্র ভাবনা তাহার
মস্তিষ্কে উত্তাপ সৃষ্টি করিয়া তুলিল তাই সারারাত্রি ক্ষুদ্র জানালার
মাঝে সে এক টুকরা আকাশের পানে চাহিয়া রহিল-উহারা
অনন্ত আকাশে চলিয়াছে পথহারা

?
পরদিন সকালে পথখরচের কয়েকটা টাকা হাতে করিয়া সে
রাস্তায় আসিয়া দাঁড়াইল। সাত বৎসর পরে বিস্তীর্ণ পৃথিবীর
পানে চাহিয়া তাহার মনে হইল,উঃ এই পৃথিবীটা কত বড়,
কত প্রকাণ্ড ওর দেহ-কত বৈচিত্র্য ওর অঙ্গে!•••কিন্তু বিরাট
এই পৃথিবীতে তাহার আশ্রয় নাই,—সে কোথায় যাইবে? কি
করিবে? আবার উদরাম্নের জন্য তাহাকে কাজ করিতে হইবে,
দাসত্ব সহ্য করিতে হইবে, অকারণ ঔদ্ধত্যকে তােষামােদ করিতে
হইবে।
অশােকের চোখ ফাটিয়া জল বাহির হইয়া পড়িল। এই
কার প্রাচীরের মধ্যেও তাহার এতটুকু স্থান জুটিল না-
দীর্ঘকায় বিশাল একটি
বৃক্ষমূলের
নিকটে বসিয়া সে আবার
চাহিল—প্রভাতের স্বর্ণরশ্মি দূরের গগনচুম্বী হৰ্ম্মমালার শিখর
উদ্ভাসিত করিয়াছে, নগর তখনও সুপ্তিমগ্ন। সে কি করিবে এই
প্রশ্নটার কোন জবাবই সে পায় না। সে আনমনেই পথ চলিতে
আরম্ভ করিল,—সে জানে না সে পথ কোথায় গিয়াছে কতদূর,
কতদীর্ঘ সে পথ•••••••••
কেমন করিয়া সে জানে না, অশােক কলিকাতায় আসিয়া
পেীছিল—শুভ্রাদের সেই বাড়ীখানি আজও রাস্তার পাশে
দাঁড়াইয়া আছে,-একটু বিবর্ণ হইয়াছে এই মাত্র। সেখানে

১৩৪
ভাড়াটেদের কাছে শুনিয়া সে জানিল,-পিতার মৃত্যুর পর বিধবা
বাড়ীওয়ালী দেওঘরে থাকে, সেই ঠিকানায় তাহারা মাসে মাসে
ভাড়ার টাকা পাঠাইয়া দেয়।
অশােক আর একবার ভাবিল,বিপুল বিশ্বে আশ্রয় কোথায় ?
শুভ্রা ছাড়া কোন আশ্রয়ই বা তাহার আছে। তাহার সেই
অনাগত শিশু, সে কি, কোথায় ? টাকাও নেই যে আজ সে
জগতকে ব্যঙ্গ করিয়া ঘুরিয়া বেড়াইবে।
••••••শুভ্রা কেমন আছে ? আজও কি তাহার কথা ভাবে,
ডাঃ চৌধুরী, কি অশােক, কি মৃত স্বামী ? তাহারই রক্তমাংসের
অংশ সে কি ভূমিষ্ঠ হইয়া বড় হইয়াছে,-কথা বলে ?
সে একদিন দেওঘরে আসিয়া উপস্থিত হয় ? দেওঘরে
তাহাদের বাড়ীর সম্বন্ধে সে অনেক শুনিয়াছে—
?
সেদিন সকালে ঘুরিতে ঘুরিতে সে শুভ্রার বাড়ীর গেট দরজায়
আসিয়া দাঁড়াইল। সেখান থেকেই দেখা যায় শুভ্রা ও মিলি
দুইজন বারান্দায় বসিয়া গল্প করিতেছে একটি দুরন্ত শিশু বল
খেলিতেছে।
শুভ্রা মিলি ও শিশুটির সামনে দাঁড়াইয়া-অশােকের অন্তর
কঁপিয়া পিয়া উঠিতে লাগিল,-যদি কণ্ঠস্বরে, চেহারায় উহারা
কোন সাদৃশ্য লক্ষ্য করে•••কিন্তু যে মরিয়া গিয়াছে সে বাঁচিয়া
আবার ফিরিয়াছে একথা বােধ হয় মানুষ ভাবে না। গেটেরু

১৩৫
লােহার গরাদ ধরিয়া সে দাড়াইয়া ভাবিতেছিল আর ভয়ে দুঃখে
অন্তর কাঁপিয়া উঠিতেছিল।
শুভ্রা হাত ইসারা করিয়া ডাকিল, এস, কি চাও?
অশােক ভিতরে প্রবেশ করিয়া সিড়ির উপর বসিয়া পড়িল
শুভ্রার শুক্ল বাস, পাংশু মুখ ও নবীন ওই শিশুটির পানে
চাহিয়া সে কিছুই বলিতে পারিল না,-তাহার অজ্ঞাতে চোখের
জল চিবুক গড়াইয়া কাঁচাপাকা দাড়ি ভিজাইয়া দিল—
শুভ্রা প্রশ্ন করিল,—কি চাই বল। কাঁদছাে কেন ?
অশােক তথাপি নীরব। কিছুক্ষণ নিজের মাঝে যুদ্ধ করিয়া
সে কোনমতে তিনটি অক্ষর উচ্চারণ করিল,-আশ্রয় ।
শুভ্রা কহিল,—কি কাজ করতে পারাে? লেখাপড়া কিছু
জানাে ?
-জানি, সামান্য, সরকারী করতে পারি, সবই পারি—
মিলি প্রতিবাদ করিল,-অজ্ঞাতকুলশীল লােককে আশ্রয়
দেওয়া ঠিক নয় শুভ্রা, যখন একা থাকো
-কিন্তু আমি যে ওদের ফেরাতে পারি না। দরিদ্র ছিল
* তঁার আপনার, তাদের কি করে ফেরাবো বল ? আর আমার
কি ও করবে ? হ্যা কি কাজ করতে পারবে ?
বাজার ঘাট, বাগান দেখা, জলতােল, বাসন মাজা, লেখা
পড়ার কাজও কিছু কিছু
-বেশ বাজার ঘাট করবে, আর কলকাতা যেয়ে ভাড়া
আদায় ট্যাক্স জমা দেওয়া এসব পারবে?

—পারবেও কাজ আমি পারি— ঐ বাইরের ঘরে,-ঐ যে গেটের পাশে ওখানে থাকবেন। পারবেন। হ্যা -তা হলে জিনিষপত্র নিয়ে আসুন- -আমার কিছুই নেই- শুভ্রা তাহার পর নানা প্রশ্নে তাহার বাড়ী ঘর, এই নিঃসম্বল হইবার কারণ সব একে একে জানিয়া লইলসে যাহা শুনিল তাহা বিশ্বাসযোগ্য। তাহার বাড়ী কোনও গ্রামে, কলিকাতায় সরকারী করিত, কর্তার মৃত্যুর পরে পুত্রগণ তাহাকে তাড়াইয়া দেয় ইত্যাদি শুভ্রা শেষে কহিল,-আচ্ছা যাও, এখন কিছু খেয়ে নাও তারপর কাজ করবে। তােমার বিছানার একটা ব্যবস্থা করে দেব- অশােক আর একবার সরকাররূপে শুভ্রার জীবনে উপস্থিত হইল। মিলি মাঝে মাঝে যাই যাই করে, শুভ্ৰাই তাহাকে বাইতে দেয় না,সে বলে একাকী নির্বাসিত জীবন যাপন করছি, তােরাও যদি এসে দু’দিন না থাকবি তবে জীবন কাটবে কি করে? মিলি বলে,-কি করব, ইচ্ছে করেই পরাধীন হয়েছি, ওর আবার আমি না থাকলে চলে না

শুভ্রা পরিহাস করে,—চলে ত নাই, সে কথা সত্যি। কিন্তু
স্বামীটীকে অত ভয় করলে কি আর চলে, আমার কথা লিখে সে,
আর এখানে আসতেই নিমন্ত্রণ কর না
অশােকের নতুন চাকুরী কয়েকদিন হইয়া গিয়াছে—সে
দিবারাত্রি নানা কাজ লইয়াই থাকে, কয়েকদিনেই বাড়ীখানাকে
সাজাইয়া গােছাইয়া সুন্দর করিয়া ফেলিয়াছে—মনের সংগােপনে
তাহার একটা বিশ্বাস বা ধারণা জন্মাইয়াছিল এ সবই তার, কাজেই
পরম আগ্রহে ও স্নেহে সে বাড়ীখানিকে আপনার করিয়া
লইয়াছিল।
শুভ্রা তাই সেদিন কহিল, “লােকটাকে ত ভাল বলেই
মনে হয়, বাজার বেশ ভালই করে,কেমন আগ্রহে কাজ করে
-কিন্তু লােকটা শিক্ষিত এবং ভদ্রলােক বলেই মনে হয়। মাঝে
মাঝে যে সব কথা বলে তাতে মনে হয় বেশ কিছু লেখাপড়া
মিলি কহিল, “ভাল হয় সেত ভাল কথা, তবে আজকাল
মানুষকে বিশ্বাস করাই হয়েছে সবচেয়ে কঠিন
-কথা সত্যি, কিন্তু আমার আর ভয় করবার কি আছে?
কি আছে যে নেবে-
এমনি করিয়াই কিছুদিন যায়। খােকার সঙ্গে সরকারের
বেশ জমিয়া উঠিয়াছে-সে তাহার খেলার সাথী, আদর আব্দার
সবই তাহার কাছে চলে, তাহার সঙ্গেই বেড়াইতে যায় –
সেদিন অশােক বাগানের ফুলগাছগুলির গােড়া ধুচিয়া
=

১৬ A চাকরকে দিয়া জল আনাইয়া দিতেছিল। অদূরে খােকা একাকীই বল খেলিতেছিল,-অকস্মাৎ বলট। অশােকের নিকটে আসিয়া পড়িল। খােকা কহিল,-সরকার মশাই বল দি- আসুন খেলবেন-- অশােক আপনমনে হাসিল,-“সরকার মশাই”; ডাকটা মনের কোন এক নিভৃত কোণে যেন আঘাত করিয়া রক্তাক্ত করিয়া তুলিল। সে কহিল, যাই বাবা! বল খেল, জলটা দিয়ে নি গাছে,তার পরে খেলবে, ভাবনা কি ? -না তাড়াতাড়ি আসুন -আছি বাবা- অশােক আবার গাছটার সংস্কার করিতে আরম্ভ করিল। মিলি ও শুভ্রা বেড়াইতে যাইতেছিল, তাহারা খােকাকে ডাকিল, কিন্তু খােকা কহিল,-না আমি খেলবে। সরকার মশাই এর ঙ্গে- শুভ্রা হাসিল। অশােকের শ্রান্ত মুখের পানে চাহিয়া কহিল,-এসব আপনি ক’চ্ছেন কেন সরকার মশাই ? অশােক কাজ করিতে করিতেই কহিল,-করতেই ত হবে: আমারই বাড়ী, নিজের বাড়ীতে এসব করলে ত অপমান নেই- -তা হলেও এটা ভাল দেখায় না- -কেন? যতক্ষণ থাকি, ততক্ষণ এ ত আমারই বাড়ী বলতে হবে—এতে ভালমন্দ দেখার কি আছে, আর দেখছেই বা কে ? -তবুও আপনি ভদ্রলােক

অশােক হাসিয়া কহিল,-ভদ্রলােক বলেই ত করি। তা
ছাড়া এসব করতে আমার বেশ লাগে—বসেই ত থাকি ।
-আমি কিন্তু এসব আপনাকে করতে বলিনি - আপনাকে।
—না বললেই যে করবে না এমনত হয় না, যখন আছি
তখন ভালমন্দ বিবেচনা করেই কাজ করতে হবে ত!
বেশ তাই করুন,কাল খােকার জন্মদিন মনে আছে
ত? সকাল সকাল বাজারটা করে আনতে হবে—মনে আছে ত ?
অছে বেকি
মিলি ও শুভ্রা বেড়াতে বাহির হইয়া গেল, অশােক চাকরকে
আর এক বালতি জল আনিতে বলিলে সে অপ্রসন্ন ভাবে
বালতিটা লইয়া গেল। খােকার তাড়ায় সেদিন আর কোন
কাজ হইল না, – বাকী সময়টা খােকার সঙ্গে ফুটবল খেলিয়া
কাটাইতে হইল।
গেটের পাশের ঘরেই অশােক থাকিত। সেদিন গভীর
* রাত্রে অকস্মাৎ সে দেখিল শুভ্রার ঘরে কেন যেন আলো
জুলিতেছে। রাত্রি নিশীথ,-চারিদিকে নিঝুম স্তব্ধতা, চারিপাশে
নিবিড় অন্ধকার,অগণ্য তার কালো আকাশের কোলে জ্বলিতেছে।
অশােক বিস্মিত হইল—এত রাত্রে শুভ্রা কি করে ? সে মাঝে,
মাঝে লক্ষ্য করিয়াছে এমনি করিয়া রাত্রি নিশীথে একবার দীপ
জ্বলিয়া আবার নিভিয়া যায়। অদম্য একটা কৌতুহলে অশােক

১৪ = উঠিয়া বসিল কিন্তু যদি দেখিতে যাইয়া ধরা পড়ে, অন্য কেহ দেখিয়া ফেলে তবে সে কি ভাবিবে ? কিন্তু কোন ভয়ই কৌতূ হলকে নিবৃত্ত করিতে পারিল না— সে নিঃশব্দ চরণে ধীরে ধীরে ঘরের বাহিরে আসিল, নিবিড় অন্ধকারে সাদা কাপড়টা বেশ দেখা যায়, সে একটা চাদর আপাদমস্তক জড়াইয়া লইয়া ধীরে সন্তর্পণে জানালার পাশে আসিয়া দাঁড়াইল,—অত্যন্ত সাবধানে সে ধীরে ধীরে একখানা পাখী ফাঁক করিয়া চাহিয়া রহিল- দেওয়ালের গায়ে তাহারই---ডাক্তার চৌধুরীর একখানা বিরাট ছবি রহিয়াছে। শুভ্রা তাহার পদমূলে মস্তক লুষ্ঠিত করিয়া কাঁদিতেছে, ছবিখানিতে নূতন করিয়া আজ যেন ফুলের মালা ও চন্দন দেওয়া হইয়াছে, দুইটি সুগন্ধী ধূপ জ্বলিতেছে খােকার জন্মদিন বলিয়া হয়ত বা অশোক চাহিয়া চাহিয়া দেখিল, তাহারই ছবির পদমূলে শুভ্রা চোখের জলে আপনাকে নিবেদন করিয়া দিতেছে, -ফুলিয়া ফুলিয়া কঁদিতেছে, অশােক আর দেখিতে পারিল না,—তাহারাও চোখদুইটি ধীরে ধীরে ঝাপসা হইয়া উঠিল। ধীরে সন্তর্পণে পাখী খানা নামাইয়া দিয়া সে ভাবিল,-শুভ্রা আমাকে এত ভালবাসে ! এই দীর্ঘ বৎসরগুলির প্রতিরাত্রে এমনি করিয়া কি অহাকে চোখের জলে অর্চনা করিয়াছে ? তার হৃদয় মথিত করিয়া কান্না যেন কষ্টের মাঝে আসিয়া ন

১৪১
শ্বাস বন্ধ করিয়া দিতে চাহিল,-সে নিঃশব্দ চরণে পুনরায়
ফিরিয়া আসিল আপনার কুটীর দ্বারে। সেখানে দাঁড়াইয়া আর
একবার পিছন পানে চাহিল,আলাে তেমনি জ্বলিতেছে,
শুভ্রাও তেমনি কাদিতেছে-
সে বিছানায় আসিয়া বালিশে মুখ গুজিয়া চোখের জল
ছাড়িয়া দিল,-হায় বধির ধরণী, তাহার মর্মকথা তুমি শুনিলে
-সে কি করিয়াছে, কত চোখের জল ফেলিয়াছে তাহা কেহ
দেখিল না।
পরক্ষণেই তাহার মনে পড়িল,-ও ত সে নয়। ও পরম
দানশীল ডাঃ চৌধুরী,—আর সে ত চোর, কয়েদী নং ৫২৩ মাত্র।
অশােক মনে মনে কহিল,আমি ত ওর স্বামী নই—ওর
স্বামী ডাঃ চৌধুরী এম, ডি, কেমন করে বলবে আমি ওর স্বামী,
আমি যে চোর, ওর এতদিনের প্রেম পূজাকে, ওর দেবতাকে
কেমন করে ধূলায় নামিয়ে দেব ?-না-না-আমি চোর,
প্রতারক-শুভ্রা, চোরকে, তুমি এত ভালবেসেছিলে ?
অশােক বালিশে মুখ লুকাইয়া কঁদিল, সমস্ত জীবনের
সাধনা, আকাঙ্খ একটা পাপে এমন করিয়া বিধ্বস্ত হইয়া
গেল ! সমস্ত কিছু মুছিয়া কলঙ্ক টীকার পতাকাই কেবল
সগৌরবে উড়িল—
অশােক আবার ভাবে, কাল তাহারই ছেলের জন্মদিন -
, ও ত ডাঃ চৌধুরীর ছেলে,-সে ত সরকার, সরকার মাত্র
পৃথিবীর কালাে অন্ধকারের মাঝে, আপনার নিঃসঙ্গ একক

১৪২
জীবনে অশােক আজ প্রাণ ভরিয়া কঁাদিল,কোথায় তাহার
জন্মভূমি, মায়ের স্নেহকর স্পর্শ অসহায় মৃত্যু••••••আর পৃথিবীর
কোন প্রান্তে নিজের জীবন বহ্নিতে নিজে আজ পুড়িয়া
মরিতেছে।
এই ত মানব জীবন। নিকটের দূরত্বই সর্বাপেক্ষা বেশী,
সে দূরত্ব দুল প্রাচীর বেষ্টিত -অনধিগম্য। বাহিরের নিবিড়
অন্ধকারে আজ তাহার অন্তর ছাইয়া গিয়াছে—এত বেদনা, এত
প্রদাহ তবুও আজ সে বলিতে পারেনা সে - অশােক,ডাঃ
চৌধুরী, সরকার মশাই।
অশােক আজ নূতন বেদনায় কঁদিতে কাঁদতে ঘুমাইয়া
পড়িল।
খােকার জন্মদিন।
সকালে সমস্ত আয়ােজন সুসম্পন্ন হইয়াছে। শুভ্রার ঘরে
পীড়ি পাতিয়া খােকা বসিয়াছে, শুভ্রা ধৃতের প্রদীপ জ্বালাইয়া,
ধান দূর্বা লইয়া বসিয়া তাহাকে আশীর্বাদ করিবে, মিলিও
আশীর্বাদ করিবে।
অশােক দ্বার প্রান্তে বসিয়া বার বার দেয়ালের দীর্ঘকায়
ছবিটির পানে চাহিতেছিল—এ কি তাহারই প্রতিকৃতি -
শুভ্রা আশীর্বাদ করিল, মিলি আশীর্বাদ করিল
শুভ্রা কহিল,আপনি আশীর্বাদ করুন সরকার মশাই

১৪৩ . দাড়াইয়া দৃপ্ত অশােক অবাক বিস্ময়ে কহিল,-আমি ? -হঁ্যা, বয়সে বড় ত, শুভাকাঙক্ষী— অশােক আশীর্বাদ করিল—যন্ত্র চালিতের মত- শুভ্রা খােকাকে উঠাইয়া লইয়া দোয়ালের ছবিখানার নিকটে লইয়া গিয়া কহিল,-প্রণাম কর বাবা, তাের বাবাকে প্রণাম কর- খােক প্রণাম করিল। শুভ্রা কহিল,-বল, আমি যেন তোমার মত হতে পারি । অশােক আপনাকে ভুলিয়া হঠাৎ বলিয়া উঠিল,-না-না, বাবার মত নয় - শুভ্রা মুহূর্তে ফিরিয়া কণ্ঠে কহিল, তার মানে, ওর বাবা কে আপনি জানেন ? অশােক জড়িত কণ্ঠে কহিল,–না–না, আমি বলছিলাম, বাবার চেয়েও বড়, বাবার চেয়েও মহৎ- শুভ্রা হাসিয়া কহিল,—তাই হ্যা তাই বল, তুমি তােমার বাবার চেয়েও বড় হ’য়াে এই আশীর্বাদ করি - অশোক ব্যস্ততার সহিত কহিল,-হ্যা আমিও তাই বলি বাবার চেয়েও বড় হয়ে শুভ্রা কহিল, -তাই যেন হতে পারে, আশীর্বাদ করুন— হবে বৈ কি, নিশ্চয়ই হবে--আপনার ছেলে হবে না? শুভ্রা হাসিয়া কহিল,—যার ছেলে তাকে দেখলে বুঝতেন ও বড় হবেই- ।

১৪৪
অশােক কহিল, -নিশ্চয়ই বড় হবে-
অশােক ধীরে ধীরে বারান্দায় আসিয়া দাড়াইল,-সামনে
বিস্তৃত পাণ্ডুর ধূসর মাঠ বন্ধুর উচ্চাবচ। দূরে দেখা যায় টিলার
উপর বনশ্রেণী-অদূরে ক্ষুদ্র একটু পাহাড় তাহার পর নীলাকাশ
--অশােকের চোখের সামনে তাহারা সব মিলাইয়া ঘন কুয়াশাবৃত
হইয়া উঠিল। অশােক আত্মগােপন করিতে তাড়াতাড়ি পলাইয়া
খােকার জন্মদিনের পর দিন মিলি কহিল,-আর ত থকা
চলে না, কাল যেতেই হয়।
শুভ্রা কহিল, আর কতদিন আটকাতে পারি বল, কিন্তু
বড়ই একা তাই কষ্ট হয়।
-আবার আস্বাে ভাবনা কি ?
হা এবার দু’জনে আসবি, যাতে পেছনটান না
থাকে।
পরের দিনই মিলি যাইবে স্থির হইল। সে জন্যে মিলি,
প্রস্তুত হইল এবং সারাটা দিন যাইবার পূর্বের একটা বিষণ্ণতায়
কাটিয়া গেল।
মিলি একবার অশােককে উদ্দেশ্য করিয়া কহিল,আপনি
থাকবেন ত সরকার মশাই ?
কোথায় তার যাবাে-

১৪৫ -হ্যা বয়স হয়েছে, এখানেই থাকবেন। শুভ্রা বড় অভাগা, ওকে দেখবেন তাতে ভগবান আপনার মঙ্গল করবেন- অশােক একটু মাথা নত করিয়া থামিয়া বলিল,-বয়স হয়েছে আর কোথায় যাবাে,শেষ দিনক’টা ওর আশ্রয়ে যদি কাটাতে পারি সে আমার পরম সৌভাগ্য। মিলি কহিল,—আপনার কথা বার্তা শুনে মনে হয় আপনি যথেষ্ট শিক্ষিত না; তবে শিক্ষিত লােকের বাড়ীতে দীর্ঘ কাল চাকুরী করেছি। কিন্তু আপনি ত আরও কিছু দিন থাকলে পারতেন বেশ হতো মিলি কহিল,—যেতে আমারও ইচ্ছে করে না কিন্তু নিরুপায় তাই যেতেই হবে- পরদিন সকাল বেলা অশােক বাজারে যাইবে। শুভ্র তাই বলিল,-সরকার মশাই কাল দশটার গাড়ীতেই ও যাবে, আপনি ঐ—জনকরামের গাড়ীটার কথা বলে যাবেন বাজারে । যাবার সময়- -আচ্ছা। জনকরামের গাড়ীতেই সাধারণতঃ তাহারা যাওয়া আসা করিত। লােকটি দায়ীত্ব জ্ঞানহীন নয়, তাহা ছাড়া ব্যবহারও কয়েক বছরে একটু খাতিরও জন্মিয়াছে। ঠিক সময়টাতে সে আসিয়া উপস্থিত হয় এবং যত্ন সহকারে যাত্রীগণকে লইয়া

১৪৬
পরদিন জনকরামকে বলিয়াই অশােক বাজারে গিয়াছিল।
বাজার করিয়া দুই হাতে তরিতরকারী ও মৎস্যাদি লইয়া সে
ফিরিতেছিল—ফিরিবার একটু তাড়া ছিল। মিলি চলিয়া
যাইবে, জীবনে হয়ত আর দেখা হইবে না,যাইবার সময়ে সে
তাই উপস্থিত থাকিতে চায়
অশােক মনে মনে পথ চলিতেছিল আর ভাবিতেছিল মিলির
কথা, তাহার স্নেহপ্রতি শ্রদ্ধা তাহার অন্তর জয় করিয়াছিল।
সভ্যতার কাচের সমাজে এমন একটি হৃদয়বতী নারী বড় পাওয়া
যায় না।
অকস্মাৎ নারীকণ্ঠের সমবেত চীৎকারে সে সামনের দিকে
চাহিল—একখানা ঘােড়ার গাড়ী অসমতল পথ দিয়া ছুটিয়া
আসিতেছে,ঘােড়াটা যেন ক্ষেপিয়া গিয়াছে’ চালক তাহাকে
কিছুতেই সংযত করিতে পারিতেছে না, ঘােড়া দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য
হইয়া ছুটিতেছে এবং বন্ধুর রাস্তায় গাড়ীখানি পিছনে পিছনে
ছুটিতে ছুটিতে আসিতেছে, কখন পড়িয়া যাইবে স্থিরতা নাই
আরােহী কয়েকটি ভয়ার্ত নারী আর্তনাদ করিতেছে-অার একটু
নিকটবর্তী হইতেই অশােক চিনিল-জনকরামের গাড়ী, এবং
তাহার আরােহী যাহারা তাহা সে জানিত। গাড়ীখানি নিকটবর্তী
হইতেই সে হাতের বােঝ ফেলিয়া দিয়া ঘােড়াটির গলা ধরিয়া
বুলিয়া পড়িল।

১৪৭
আকস্মিক এই আক্রমণে ঘােড়াটী স্তব্ধ হইয়া দাঁড়াইয়া গেল
কিন্তু তাহার তীব্রগতি প্রতিহত করিতে অশােক ছিটকাইয়া
পাশের প্রস্তরময় নয়নজুলিতে যাইয়া পড়িল।
ওয়ার্ল্ড মিলি ও শুভ্রা নীচে নামিয়া প্রশ্ন করিল,-কি হল
নকরাম ?
জনকরাম বলিল যে সরকার মশাই ঘােড়াটীকে থামাইয়া
দিয়াছেন কিন্তু তিনি কোথায় ?
এদিক ওদিক চাহিতেই সংজ্ঞাহীন অশােকের দেহখানিকে
নয়নজুলির মাঝে দেখা গেল। তাহারা ছুটিয়া আসিয়া দেখে
সরকার মশাই পড়িয়া আছেন, সমস্ত মুখখানি রক্তে ভিজিয়া
গিয়াছে, কপালের খানিকটা অংশ ফাটিয়া ফাঁক হইয়া গিয়াছে
এবং তাহা দিয়া স্রোতের মত তাজা লাল রক্ত বাহির হইতেছে।
তাহারা জনকরামকে ডাক্তার আনিতে পাঠাইয়া অন্য গাড়ী
করিয়া অচৈতন্য অশােককে লইয়া ফিরিয়া আসিল।
সংজ্ঞাহীন অশােককে ঘিরিয়া দাড়াইয়া ছিলেন ডাক্তার ও
তাহার সহকারী, শুভ্রা ও মিলি। ডাক্তার পরীক্ষা করিতেছিলেন।
শুভ্রা প্রশ্ন করিল,-কেমন দেখছেন ? বাঁচবেন ত ?
--কয়েকটা স্থান খুবই গভীর হয়েছে, তা ছাড়া বুকের
পীরাও একখানা ভেঙ্গেছে।
-তা হলে?
-ভয়ের কিছু নেই’-তবে যদি মুখ দিয়ে রক্ত ওঠে তবে কি

১৪
-
হয় বলা যায় না। আচ্ছা আপনারা যান,আমরা কাজ আরম্ভ করি,
কয়েকটা সেলাই করতে হবে। ডাক্তার সহকারীকে কহিলেন,
-তুমি কামিয়ে ফেল, অত দাড়ির মাঝে ত সেলাই চলবে না-
শুভ্রা কি যেন প্রশ্ন করিতে যাইতেছিল, ডাক্তার কহিলেন,
আপনারা যান আমাদের কাজকর্ম দেখলে আপনাদের ভালও
লাগবে না, আর আমাদেরও অসুবিধে হবে।
শুভ্রা ও মিলি চলিয়া গেল। ডাক্তার মুখের দাড়ি কামাইয়া
সেলাই করিলেন,চোখ দুইটি ও মুখখানি বাদ রাখিয়া সমস্ত মাথাটা
ব্যাণ্ডেজ করিলেন এবং একটি ইনজেকসন করিয়া দিয়া সেদিনের
মত তাঁহাদের কর্তব্য শেষ করিলেন। যাইবার সময়ে রােগীর
সম্বন্ধে সমস্ত উপদেশই দিয়া গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে বলিলেন,-
রােগীর একটু সেবা শুশ্রুষা হওয়া প্রয়ােজন, সে দিকে ব্যবস্থা
ভাল না হলে সারতে দেরী হবে-
শুভ্রা ও মিলি অশােকের সংজ্ঞাহীন দেহ ঘিরিয়া বসিয়া ছিল।
মিলি কহিল,-তুই কি সেবা শুশ্রুষা সব করতে পারবি? একটা
ব্যবস্থা
শুভ্রা কহিল, ওর জন্যেই ত আমরা বেঁচে গিয়েছি। আমাদের
জন্যে যিনি প্রাণ দিতে গিয়েছিলেন তাকে অযত্ন করা কি উচিত।
যতই কষ্ট হােক ওর সেবা আমাকেই করতে হবে-
মিলি কহিল,—সে ত নিশ্চয়ই,
-সে ত নিশ্চয়ই, কিন্তু কি করে পারবি,
আমিও না হয় তাের কাজ ভাগাভাগি করে নেব।
৩ষা সম্বন্ধে দুইজনে বাদানুবাদ করিতে করিতে ক্য

১৪১
করিল রােগী চোখ মেলিয়া চাহিয়া আছে। শুভ্রা তাড়াতাড়ি
প্রশ্ন করিল,-কেমন আছেন,সব বুঝতে পারছেন ?
-হ্যা, সবই
বুঝতে
পারছি।
-খুব বেদনা বােধ কচ্ছেন ?
-বেদনা আছে, কিন্তু খুব বেশী নয়—ব্যস্ত হবেন না।
আমার জন্যে আপনাদের বসে থাকতে হবে না -কেন কষ্ট
করবেন ?
-আমাদের জন্যে আপনি কেন এমন করে প্রাণ দিতে
গেলেন?
অশােক হাসিবার চেষ্টা করিয়া কহিল, কারজন্যে আর দেব?
শুভ্রা কহিল,-আপনার আত্মীয় স্বজন কে আছেন জানি
না,তাদের খবর দেব কি ?
অশােক একটুখানি নীরব থাকিয়া কহিল,-আত্মীয় স্বজন ?
শুভ্রা তাহার মাথায় হাত বুলাইয়া প্রশ্ন করিল,আর
স্ত্রী আছেন ?
অশােক শুভ্রার হাতখানিকে আপনার বুকের উপরে ধরিয়া
রাখিল।
শুভ্রার প্রশান্ত সুন্দর মুখের পানে চাহিয়া ধীরে ধীরে কহিল,
-হা-ছেন।
তাকে খবর দেব?
খবর? সে আমিই দেব। যদি সময় আসে-
মিলি প্রশ্ন করিল,ভাইবােন কেউ আছেন, কোথায়

১৫০ অশােক আর একহাতে মিলির হাতখানি ধরিয়া অমনি করিয়াই বুকের উপর রাখিল এবং মিলির মুখের পানে চাহিয়া কহিল,বােন ? হ্যা তাও আছে- -তঁাদের আসতে লিখবাে ? অশােক কহিল,তারা ত আছেই, আপনারা যথেষ্ট করছেন আর কেন বৃথ- শুভ্রা প্রশ্ন করিল,-বেদনাটা কমেছে। -হা কমেছে- -বুকের ব্যথাটা ? অশােক কি ভাবিল বলা যায় না, চোখ দিয়া একফোঁটা জল গড়াইয়া পড়িল, অত্যন্ত সাবধানে সে কহিল, বুকের বেদনাটাই যায় না,-বুকই একেবারে ভেঙ্গে গেছে- ছিঃ ওকথা বলবেন না। ডাক্তার বাবু বললেন কোন ভয় নেই- অশােক ধীরে ধীরে কহিল,-ডাক্তারে বলেই কি আর ভয় থাকে না। গভীর রাত্রি। চারিদিকে গভীর অন্ধকার, ঘরের কোণে একটা বাতি জ্বলিতেছে। অশােকই শুভ্রা ও মিলিকে বিদায় দিয়াছে। সে বলিয়াছিল,আপনাদের বসে থাকবার প্রয়ােজন নেই, আমি ভালই আছি, ঘুম পাচ্ছে ঘুমােবাে-

শুভ্রা ও মিলি চলিয়া গিয়াছিল, এবং অশােক তন্দ্রাচ্ছন্ন হইয়া
পড়িয়াছিল। রাত্রিশেষে দৈহিক যাতনায় ঘুম ভাঙ্গিয়া গিয়াছে—
যে দিকটায় শুইয়াছিল সে দিকটা হিম অবশ হইয়া গিয়াছে,
শতচেষ্টা করিয়া সে পাশ ফিরিতে পারিতেছে না, তাই ঘুম
ভাঙ্গিয়া গেল সে বাহিরের পানে চাহিল,-রাত্রির নিবিড়
অন্ধকার যেন তরল হইয়া আসিয়াছে, হয়ত বা প্রভাত হইয়া
আসিয়াছে—সমস্ত দেহ বেদনায় বিষ হইয়া গিয়াছে, মনে হয় সহস্র
পাকাকোড়ার টাটানী শরীরটাকে যেন নিরন্তর পোঁচাইয়া
পোঁচাইয়া কাটিতেছে-
< সে পাশ ফিরিবার চেষ্টা করিতে করিতে উঠিয়া বসিল,
পাশফেরা সম্ভব না হইলেও কেমন করিয়া সে যেন উঠিয়া বসিল।
গলার ভিতর কি যেন একটা সুড়সুড় করিতেছে তাই সে গলাটা
পরিষ্কার করিবার জন্যে কাশিল খানিক জমাট রক্ত বাহির
হইয়া আসিল। তাহার পরে বাহির হইল উজ্জ্বল লালরক্ত
অশােক রক্ত দেখিয়া চমকাইয়া উঠিল,উঃ তাহা হইলে
এই কি শেষ?
শুভ্রা ও মিলির সঙ্গে এই কি শেষ দেখা এ
জীবনে।
অশােক ভাবিয়া চলিল,-আমি কি পাপ করেছি। জীবনের
আকাঙক্ষাকে পূর্ণ করেছি মাত্র, সেই কি পাপ ?••••••
?••••••কিন্তু কেমন
করে শুভ্রাকে আমি ব’বাে যে তার প্রেমের দেবতা, নরাধ
চোর, কিন্তু তবুও আমি ভালবাসি প্রাণ ভরে ভালবাসি।

১২ ভাবিতে ভাবিতে সে উত্তেজিত হইয়া উঠিল--যদি আজ জীবনের যবনিকা পাত হইয়াই যায় তবে তাহার প্রতারণা চিরন্তন হইয়া রহিবে—পৃথিবী জানিবে না, শুভ্রা জানিবে না, সে মনে- মনে কহিল,-না, আমি মরবার আগে বলবাে, বলে যাবাে, আমি অশােক, আমি ডাঃ চৌধুরী, আমি সরকার মশায়। তার মাঝে শুভ্রা কোনটিকে চায় ? আমার পাপের স্বীকারােক্তি আমি করে যাবাে -- অশােক উঠিয়া দাড়াইল,—শক্তি নাই তবুও একটা উত্তেজনা ও বিজাতীয় ক্রোধ তাহাকে যেন মুহূর্তে শক্তিশালী করিয়া দিয়াছে। সে আর একবার কাশিল, আর কয়েক ফোঁটা কাল রক্ত মেঝের উপর পড়িল - অশোক সে দিকে ভ্রুক্ষেপ না করিয়া ধীরে ধীরে বাহির হইল এক পা, দুই পা করিয়া সে অগ্রসর হইল,—আর সময় নাই, এখনই তাহাকে সব বলিতে হইবে নইলে হয়ত আর বলা হইবে । মুখের ব্যাণ্ডেজটা টন্টন্ করিতেছে,—সেটা যেন শরীরের সমস্ত শিরা উপশিরা টানিয়া ধরিয়াছে, চলিবার শক্তি নাই- অশােক সেগুলিকে টানিয়া খুলিয়া ফেলিল। বেদনা লাগিল,- তুলাগুলি রক্তে জমিয়া আটিয়া আছে, তাহা আর খােলা যায় না- অশােক টলিতে টলিতে অগ্রসর হইল,-তাহার ঘর হইতে শুভ্রার ঘর যে এতদূর তাহা কে জনিত ! এ পথটুকু কোনমতেই অতিক্রম করা যায় না, অসহ বেদনা ও অসব শ্রম স্বীকার করিয়া তবুও সে এক পা দুই পা করিয়া আগাইতে লাগিল- আকাশে প্রভাতী তারা নিষ্প্রভ হইয়া আসিয়াছে, পাণ্ডুর একটু উঁদ পৃথিবীর উপরিতলকে যেন কুয়াশাচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছে —চারিপাশে সবই ঝাপসা অস্পষ্ট,-দূরের পাখীরা থাকিয়া থাকিয়া কলরব করিতেছে- অশােক কাঁকর বিছানাে পথের উপরে টলিতে টলিতে বসিয়া পড়িল,—সর্বাঙ্গে সহনাতীত যাতনায় একবার বলিয়া উঠিল, মাগাে সঙ্গে সঙ্গে তাহার মনে পড়িল জন্ম পল্লীর কথা,-জননীর কথা—তাহার মনে হয়, সেই পল্লীর স্নেহ ক্রোড়ে মায়ের চিতার পার্শ্বে সে যদি দেহরক্ষা করিতে পারিত। মনে পড়ে মায়ের কথা,-জীবন তুচ্ছ তার জন্য মাথা নীচু করা কাপুরুষতা- অশােক আপন মনেই বলে,-আমি ভিক্ষা করিনি,—মাথা নীচু করিনি মা। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও আমি ভিক্ষা করিনি.. দেহের সমস্ত শক্তি দিয়া সে আবার চলিল, কিন্তু হায় দৈহিক শক্তির শেষ আছে, সীমা আছে। সে সিড়ির উপরে গিয়া বসিয়া পড়িল,আর যেন পারে না, দম যেন বন্ধ হইয়া আসে, -সে তবুও আর একসিড়ি উঠিল,—আর একবার চেষ্টায় বারান্দায় উঠিল কিন্তু ঘরের কড়া তখনও অনেক দূর। ক্লান্তি শ্রম ও বেদনায় সে শুইয়া পড়িল,কড়া নাড়িতে চেষ্টা করিল ০ ০ ০ ০ ০ ০ ১৫৪ কিন্তু সেটা তখনও একগজ দূরে। সে শেষবার চেষ্টা করিয়া নিশ্চেষ্ট হইয়া থামিল- আর বলিতে পারিবে না মনে করিয়া সে চঞ্চল হইয়া উঠিল প্রভাতের পাণ্ডুর চাঁদ ডুবিয়া গিয়াছে,-পূবের আকাশ আরক্তিম, ঊষালােকে সমস্ত পৃথিবী সুস্পষ্ট সুন্দর হইয়া উঠিয়াছে- অশােক মেঝের উপর মুখ গুজিয়া দিয়া যথাসাধ্য উচ্চকণ্ঠে ডাকিল,-শুভ্রা--শুভ্রা-- শক্তি সঞ্চয় করিয়া লইয়া কহিল,আমি এসেছি শুভ্রা,-আমি অশােক, আমিই ডাক্তার চৌধুরী, আমি তােমার সরকার••আমার জীবনের অপরাধ কেবল সত্য হয়ে রইল আর সবই মিথ্যে হয়ে গেছে শুভ্রা ঘুম হইতে উঠিয়া বসিতেই শুনিল বাহিরে কে যেন বিড় বিড় করিয়া কি কহিতেছে, সে তাড়াতাড়ি দরজা খুলিয়া বাহিরে আসিল। বারান্দায় কে যেন শুইয়া আছে- প্রভাতের আলােয় ব্যাণ্ডেজহীন অশােকের মুখখানি সুস্পষ্ট রেখায় ফুটিয়া উঠিয়াছে, শুভ্রা মুহুর্তে তাহার মুখখানিকে কোলের উপর তুলিয়া লইয়া কহিল,-কে? কে? তাহারপৰ আৰ্ত্তকণ্ঠে বুকফাটা আর্তনাদ করিয়া উঠিল,-তুমি! তুমি ? সংজ্ঞাহীন অশােককে লইয়া মিলি ও শুভ্রা কয়েক রাত্রি কাগণ করিল, যমে-মানুষে লড়াই চলিল,-পরিশেষে একদিন অশােকের জ্ঞান হইলে ডাক্তারবাবু বলিয়া গেলেন—আর কোন ভয় নেই- সেদিন শুভ্রা মিলির আনন্দের সীমা নাই। মিলি প্রশ্ন করিল,-কেমন লাগছে ডাক্তারদা- অশােক চোখ মেলিয়া চাহিয়া রহিল, ধীরে ধীরে কহিল, আমি ডাক্তারদা নই-অশােক ধীরে ধীরে তাহার সমস্ত কাহিনী যখন শেষ করিল তখন তাহার দুই চোখ হইতে অশ্রু ঝরিয়া পড়িতেছে- • শুভ্রা অমার্জনা করিয়া কহিল, আমাকে তুমি সব বললে কেন ? -তােমার ভালবাসার অযােগ্য আমি,-আমি চোর, আমি দাগী আসামী–অশােক আবার কঁদিয়া উঠিল। মিলি কহিল,তুমি অশােকদা এই পরিচয়ই ত যথেষ্ট অশােকদা-~- অশােক সাশ্রনয়নে প্রশ্ন করিল,-আমায় কি তুমি গ্রহণ করতে পারবে শুভ্রা- শুভ্রা কহিল,-তুমি ছাড়া খােকার কি পরিচয় আছে আর ? খােক এতক্ষণ বিছানার পাশে দাঁড়াইয়া সব শুনিতেছিল, সে প্রশ্ন করিল,-কে মা?

শুভ্রা কহিল,-তােমার বাবা ! সে বিস্মিত হইয়া কহিল,-বাবা! অশােক খােকার মাথাটিকে বুকের মাঝে চাপিয়া ধরিয় কহিল,-হ্যা বাবা! শুভ্রা বিস্ময় বিমুগ্ধনেত্রে পিতা-পুত্রের পানে চাহিয়া রহিল- অনেকক্ষণ। -সমাপ্ত

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Prithibir Prem

Author
Bhattacharya, Sri Prithbishchandra
Title
Prithibir Prem
File name
Prithibir Prem
Text
OCR done
Citation
1935
Published
2009/08/24
Publisher
Sri Sankariprasad Ghosh, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
164
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Fiction, Prose Narrative
Keywords
Novel
DLI number
513106
Barcode
4990010020115.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
IFuid6ZrBXG
Download PDF

Prithibir Prem