Maju Public Library, Howrah
Maharshi Mansur Ed.2
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
MAHARSI MANSUR
OR
THE VONDERFUL LIFE OF MANSUR
IIALLAZ,
A MOHAMEDAN SAINT
BY
MOZAMMEL HUQUE.
মহর্ষিমন্সুর।
( ধৰ্ম্মবীর মহা মন্সুর হাল্লাজের অপূৰ্ব্ব
জীবনাখ্যায়িকা।)
শ্ৰীমােজাম্মেল হকু-প্রণীত।
দ্বিতীয় সংস্করণ।
All Rights Reserved.
মূল্য ॥ন আনা।
Qalcutta:
PRINTED BY ABINASII CHANDRA MANDAL
at the "Siddheswar Machine Press,"
13, Shibnarayan Dass's Lane,
1908.
# ০ ০ ১. ০৮. ০ ০ ০ 을 ০০ এ ০ ০ ০০ * ০ ০ ৫ ০ ০ ০ ০ ০ বিজ্ঞাপন। মুন্সী মােজাম্মেল হকৃ-প্রণীত ১। হজরত মােহাম্মদ (চরিতামৃত) ২। মহর্ষি মন্সুর ( সাধক-জীবনী) ৩। ফেরদৌসী-চরিত .... ৪। প্রেম-হার (হৃদয়-উন্মাদিনী কবিতামালা ) ৫। অপূৰ্ব্ব-দর্শন কাব্য (ঐতিহাসিক) ৬। ইল্লাম-সঙ্গীত ( সামাজিক ) ন ৭। জুবিলী-সঙ্গীত • ৮। শিশুরঞ্জন বর্ণশিক্ষা (৮ম সংস্করণ ) ৯। সাহিত্যশিক্ষা ১ম ভাগ (২য় সংস্করণ) ১০। পথশিক্ষা ১ম ভাগ, (৫ম ঐ ১১। পত্র ও দলিল-লিখন-শিক্ষা (২য় ঐ ) ১২। পদ্যশিক্ষা ২য় ভাগ (নীতিপূর্ণ ) ১৩। তাপস-কাহিনী (২য় সংস্করণ ) ১৪৫, রঙ্গিলা বাই (উপন্যাস) ঐ ১৫। স্বজাতি-সঙ্গীত কলিকাতা-২০১ নং কর্ণওয়ালিশ স্ট্রীট, বাবু গুরুদাস চট্টো- পাধ্যায়ের দোকানে, ২৯ নং ক্যানিং স্ট্রীট নাথ কোংর দোকানে এবং শান্তিপুর জেলা নদীয়া” ঠিকানায় গ্রন্থকারের নিকট পাইবেন। বিদেশে ডাক-মাশুল খরচা দিতে হইবে। ) + + = •
সমালােচনা।
এডুকেশন গেজেট।-“মহর্ষি মন্সুর”, এই পুস্তক
খানি আমাদের বড়ই ভাল লাগিল। ভাষা মার্জিত বাঙ্গালা ।
আলােচ্য বিষয় হিজরী ৪র্থ শতাব্দীর একটী সাধক বৈদান্তি-
কের জীবনী। এরূপ মহাত্মার পবিত্র চরিত্র পাঠে সকল
জাতীয়রই উপকার আছে।” ১৩০৩। ৬ই অগ্রহায়ণ।
বসুমতী।—ফেরদৌসী-চরিত। মহাকবি ফেরদৌসী
সুপ্রসিদ্ধ পারস্য মহাকাব্য “শাহনামার” রচয়িতা, তাহার
জীবন-বৃত্তান্ত জানিবার জন্য কাহার না আগ্রহ হয় ? তাহার
পর লেখক মহাশয় নিজে এক জন প্রতিভাসম্পন্ন বাঙ্গালা
কবিতা-লেখক। বর্তমান পুস্তকে তিনি উৎকৃষ্ট বাঙ্গালা গদ্যে
কবির জীবনী লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। আমরা এই পুস্তক
পাঠ করিয়া অতীব পুলকিত হইয়াছি।' মুসলমানের লিখিত
এমন সুন্দর বাঙ্গালা পাঠ করা আমাদের ভাগ্যে অতি কমই
হইয়া থাকে। কবিবর মােজাম্মেল হক মহাশয়ের লেখনী
অমর হউক; তিনি নিজেব শক্তি-সামর্থ্য বঙ্গ ভাষার পুষ্টি-
সাধনে নিযুক্ত করিয়া প্রকৃত সহৃদয়তার প্রমাণ দিয়াছেন।”
২৬ এ মাঘ, ১৩০৬ শাল।
উৎসর্গ-পত্র) ১২৮৫ শালের ২৩শে আষাঢ় আমাদের পারিবারিক এক অতি শোচনীয় স্মরণীয় দিন। সেই দিন, জানি না কি অশুভ ক্ষণে আমার পূজনীয় প্রতিপালক মাতামহ, আজন্ম বিশুদ্ধ- চরিত্র, ন্যায়-নিষ্ঠা-সদাচারের জলন্ত মূর্তি, সদা ধৰ্ম্ম- নিরত পুণ্য-পুরুষ, মােহাম্মদ বাদ-উল্লা সাহেব, ( পীড়িত নহেন, সুস্থ শরীরে ) সহসা পরলােক গমন করেন। সেই দিন এবং তাহার স্মরণ জন্য, পবিত্র পুরুষের এই পবিত্র জীবনীগ্রন্থ তাঁহার পবিত্র নামে পরম ভক্তি ও শ্রদ্ধার সহিত গ্রন্থকার কর্তৃক উৎসর্গীকৃত হইল।
No text on this page.
নিবেদন
অনেক দিন পূর্বে এই গ্রন্থ লিখিত হইয়াছিল। কিন্তু
নানারূপ ভবিষ্যৎ ভাবিয়া ইহা তৎকালে প্রকাশ করিবার
ইচ্ছা করি নাই। সম্প্রতি কয়েক জন গুণগ্রাহী বন্ধু ইহার
হস্তলিপি দর্শনে মুদ্রাঙ্কনাৰ্থ উপদেশ দেন। তাহাদের উৎসাহে
প্রােৎসাহিত হইয়া আজ আমার পূর্ব মত পরিত্যাগ করিতে
বাধ্য হইলাম,-গ্রন্থ প্রচারিত হইল। কিন্তু অদৃষ্টে কি আছে,
কে বলিতে পারে ?
ইহা কোন গ্রন্থ বিশেষের অনুবাদ নহে। এক খানি উর্দ,
পুস্তিকার মর্মাবলম্বনে অন্যান্য গ্রন্থের সাহায্য লইয়া স্বাধীন
ভাবে রচিত হইয়াছে। সাময়িক কচির অনুরােধে স্থানে
স্থানে পরিবর্তিত, পরিবদ্ধিত ও নুতন বর্ণনার সংযােগ করা
গিয়াছে। বােধ করি, ইহাতে অন্যায় কিছুই হয় নাই।
এক্ষণে এতদ্বারা সেই সাধুকুল-শিয়ােমণি মহাত্মা হােসেন
মসুরের পবিত্র নামের পাছে কোন অসন্ত্রম হয়, ইহাই
ভাবিয়া আতঙ্কিত হইতেছি। আরও, গ্রন্থ মধ্যে কোন কোন
স্থলে ধৰ্ম্মসম্বন্ধে দুই একটা কথার উল্লেখ আছে। যদি
অজ্ঞানতা বশতঃ কুত্রাপি কোনরূপ দোষাশ্রয় ঘটিয়া থাকে,
তবে দয়াময় জগদীশ্বর যেন এ দীন অজ্ঞানাঙ্ককে সে অপরাধ
ক্ষমা করেন, ইহাই সানুনয় প্রার্থনা। সহৃদয় ইলাম সমাজ ও
বন্ধু ভাবে উক্ত ক্রটি পরিহারার্থ বা ইহার ভ্রমপ্রমাদ পরিবর্জন
ও উৎকর্ষ বিধানাৰ্থ উপদেশ দিলে আমি চিরকৃতজ্ঞ রহিব ।
এক্ষণে দয়াময়ের কৃপায় ইহার উপর সাধারণের মেহদৃষ্টি পড়ি-
লেই আমার পরিশ্রম পুরস্কৃত হইল, বিবেচনা করিব।
পরিশেষে বক্তব্য এই যে, ইহা রচনা কালে শান্তিপুর
জুবিলী মাদ্রাসার পারস্য-শিক্ষক জনাব মৌলবী হাজি
অবায়েদুল্লা সাহেবের অনেক সাহায্য পাইয়াছি।
তাঁহার নিকট কৃতজ্ঞ রহিলাম।
শান্তিপুর-নদীয়া ।
১৩০৩ শাল, ৯ই আষাঢ়।
মােজাম্মেল হক।
দ্বিতীয় সংস্করণের নিবেদন কোন প্রসিদ্ধ গ্রন্থকার লিখিয়াছেন, “প্রায় কোনও মুসলমান লেখকের ভাগ্যাকাশে তাহার পুস্তকের সংস্করণ- চন্দ্রমার উদয় হইতে দেখা যায় না।” কথাটা যে সততা- ভাবে সত্য, তাহা আমার “মহষি মন্সুর” হইতেই প্রমা- ণিত হইতেছে। কোথায় ১৩০৩ শাল, আর কোথায় ১৩১৫ শালের আরব্ধ কাল ; এই দীর্ঘকাল পরে—প্রায় যুগাবসানে ইহার পুনঃ সংস্করণ ! ইহা কি সংস্করণ বলিয়া মনে হইতে পারে ? ফলতঃ এত দ্বারা বঙ্গের মুসলমান সমাজের বিদ্যা- লোচনার অভাব, মুসলমানগণের বিদ্যা শিক্ষায় ঘাের অনাস্থার বিষয়ই বিশদরূপে প্রতিপন্ন হইতেছে। হায় কবে বঙ্গের মুসলমানগণ বিদ্যার সমাদর করিতে শিখিবেন—কবে হা- দের ঘরে ঘরে পুস্তক-পত্রিকা পঠিত হইবে। বিধাত! সে শুভ দিন কি আসিবে ? আশা হইতেছে—আসিবে, বঙ্গবাসী মুসলমান ধীরে ধীরে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রবেশ করিতে চেষ্টা করিতেছেন। আজ তাহারই ফলে, জগৎস্রষ্টার ইচ্ছায় মহর্ষি মন্সুরের দ্বিতীয় সংস্করণ হইল, বলিতে হইতেছে। এ সংস্করণে মুদ্রাঙ্কন-কাৰ্য যত্নের সহিত সুচারুরূপে সম্পা- দিত হইয়াছে, তদ্ভিন্ন ইহার স্থানে স্থানে পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও তৃতীয় পরিচ্ছেদে একটা সম্পূর্ণ নৃতন প্রস্তাব সন্নিবেশিত করা হইয়াছে। এক্ষণে প্রিয় পাঠক পাঠিকাগণ সন্তোষ- লাভ করিলেই আমার শ্রম সফল জ্ঞান করিব। শান্তিপুর। ১৩১৫ শাল, জৈষ্ঠ । সাধারণের অনুগ্রহ-প্রত্যাশ গ্রন্থকার।
সূচিপত্র। প্রথম পরিচ্ছেদ-মহানগর বােগদাদ, তাহার অবস্থান, ঐতি- হাসিক তত্ত্ব, দৃশশােভা, মন্সুরের জন্মকথা, বিদ্যাশিক্ষা, খ্যাতিলাভ, গুক অন্বেষণ, দীক্ষা গ্রহণ। দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ—প্রতিপত্তিলাভ, দেশভ্রমণ, মক্কাবাস, মাহা- ত্মোনন্মষ, পারস্য-ভ্রমণ, গ্রন্থ প্রচার, মক্কায় পুনর্গমন, ততোপদেশ-প্রদান, বােগদাদে প্রত্যাগমন, নির্জনবাস, ধৰ্ম্মোন্মত্ততা, “আনা হক” উচ্চারণ, ভীষণ আন্দোলন। তৃতীয় পরিচ্ছেদ—ধৰ্ম্মোন্মত্ততার দ্বিতীয় কারণ, মন্সুরের ভগিনীর গুপ্ত সাধনা, মসুরের তদনুসরণ, ভগিনী যােগ- মা, দৈব-দত্ত অমৃত পান, মন্সুরের আত্মপ্রকাশ ও পাত্রবিশিষ্ট পান, ধৰ্ম্মোন্মত্ততা, ভগিনীর অনুশােচনা ও সানা। চতুর্থ পরিচ্ছেদ-সাধারণের অনুতাপ ও উপদেশ, মন্সুরের উত্তর, তদ্বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, খলিফার নিকট প্রতীকার প্রার্থনা, কারাবাসাজ্ঞা, বন্দী অদৃশ্য, সাধারণের বিশ্ব ও ভীতি।
॥ ০ পঞ্চম পরিচ্ছেদ -মসুরের স্বভবনে অবস্থান, মাহাত্ম্য প্রদর্শন, বন্দীগণের কারামুক্তি, কারাধ্যক্ষের চিন্তা, মন্ সুর ধ্যানরত ও তত্ত্বকথা প্রচার। ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ—মন্সুরের স্বপ্নদর্শন, অপূৰ্ব্ব বস্ত্রাবাস, সাধু- সভা, বস্ত্রাবাসে ছিদ্র, ছিদ্র-রােধ চেষ্টা, হজরতের নিষেধ, স্বপ্ন ব্যাখ্যা ( টীকা)। সপ্তম পরিচ্ছেদ মন্সুরের হত্যার ষড়যন্ত্র, শেখ শিলীর আগমন, শাহ জুনেদের সাধারণকে সান্ত্বনা, মন্সুরের প্রতি উপদেশ, তাহার উত্তর প্রসঙ্গে নানা তত্বকথা, নিজ মতের দৃঢ়তা, সাধারণ উত্তেজনা, সৈয়দ জুনেদ শাহের নিকট ব্যবস্থা-প্রার্থনা, তাহার অমনোেযােগিতা, খলিফার নিকট তাহা জ্ঞাপন, ব্যবস্থা দানার্থ খলিফার অনুজ্ঞা, ব্যবস্থা প্রাপ্তি। অষ্টম পরিচ্ছেদ- -বােগদাদবাসীদের বধ্যভূমি গমন, শেখ শিবলীর কারাগারে প্রবেশ, মন্সুরকে প্রবােধ প্রদান, ধৰ্ম্মোন্মত্ততার পূর্ণ বিকাশ, মন্সুরের অবকাশ প্রার্থনা, শেখ কবিয়ের আগমন, মন্সুরের সহিত তৰালাপ। নবম পরিচ্ছেদ—মন্সুরকে বধ্যভূমিতে আনয়ন, নানা জল্পনা, মন্সুরের অদৃশ্য হওন, তাহার প্রাপ্তি মন্ত্রণা, মসুর- বন্ধুদের নির্যাতন, তাহার পুনরাবির্ভাব, তৎপ্রতি প্রস্তর বর্ষণ, ফুলাঘাতে ক্রন্দন, নানা তত্ত্বকথা, বধ-মঞ্চে আরাে- হণ, আনা হক্ উচ্চারণ, জড়-অজড় পদার্থ হইতে আনা হ শব্দোখান,বধায়ােজন, হন্তকৰ্ত্তন, রক্তাক্ত অজু, অন্যান্য অঙ্গচ্ছেদন, কোরাণের আয়েত উচ্চারণ, মস্তকচ্ছেদন, মাংসখণ্ড ও রক্তকণিকা হইতে আনা হক শব্দোখান, সাধারণের ভীতি, অগ্নিতে অস্থি-মাংস নিক্ষেপ, অস্থ্য- দির অদগ্ধ হওন, তৎসমুদয় নদীতে নিক্ষেপ। উপসংহার -জলােচ্ছাস ও প্লাবন, সাধারণের লাঞ্ছনা, উচ্ছা- সিত তরঙ্গে মহর্ষির অঙ্গবাস নিক্ষেপ, চির-শান্তি।
মহর্ষিমন্সুর। প্রথম পরিচ্ছেদ। ১৪ ৫ মময় আরবের উত্তরাংশে সুজলা সুফলা শস্য-শ্যামলা ভুবনবিদিত। তুরস্ক ভূনি। তুকের অগ্নিকোণস্থিত প্রদেশকে ইরাক-আরবি কহে। এই ইরাক-আরবির মধ্যে সুপ্রসিদ্ধ সুরম্য বােগদাদ নগর অবস্থিত। বােগদাদের অতুলনীয় সুষমা সমৃদ্ধি বর্ণনা করিয়া উঠে, কাহার সাধ্য ? জগন্মান্ত আব্বাস- বংশীয় দ্বিতীয় খলিফা মাহাত্মা আবুজাফর মনসুর হিজরীতে এই নগর প্রতিষ্ঠা পূৰ্ব্বক এখানে স্বীয় রাজধানী স্থাপন করেন এবং ইহার বৃদ্ধি ও সৌষ্ঠবসাধনার্থ রাশি রাশি অর্থব্যয় করিতে কুণ্ঠিত হন নাই। ইহাতে মজিবরাজি, মিনারশ্রেণী, তােরণমালা, বিদ্যালবাটী, প্রমোদ-কানন, রাজ- প্রাসাদ ও অপরাপর সৌধনিচয় নির্মিত হওয়ায় ইহা সৌন্দৰ্য- মহিমায় জগতের শীর্ষস্থান অধিকার করে।
২
মহর্ষি মনসুর।
মহানগর বােগদাদ প্রাকৃতিক দৃশ্য-শােভাতেও অতুলনীয়।
ইহার চতুর্দিকে শস্যশ্যামল উৰ্বর ক্ষেত্র, অদূরে কল্লোলময়ী
ফোরাৎ (ইউফ্রেটিস্) নদী প্রবাহিত, এবং নগরের বক্ষঃস্থল
ভেদ করিয়া নিৰ্ম্মল-সলিলা তরঙ্গিণী দেজলা (তাইগ্রীস্ )
উভয় তীরস্থিত সৌধমালার পাদদেশ বিধৌত করিতে
নির। সুতরাং ইহার সৌন্দৰ্য-সমৃদ্ধির ইয়ত্তা কোথায় ?
ফলতঃ বিধাতার কৃপায় পুণ্য-হস্ত-প্রতিষ্ঠিত এই পুণ্য-প্রভান্বিত
আদর্শ নগর, কালে জ্ঞান-বিজ্ঞান সভাতাশিক্ষার কেন্দ্রভূমি,
কত শত ধর্মাত্মা “সুফী-সাধুর লীলা-নিকেতন, এবং
ন্যায়বিচারক বিচক্ষণ নরপতি ও অদীন-পরাক্রম বীরবৃন্দের
সূতিকাগাররূপে পরিণত হইয়াছিল , ইহার নির্মল যশঃ-
সৌরভ ভূমণ্ডলের নরনারিগণকে বিস্মিত ও বিমুগ্ধ করিয়াছিল।
পূৰ্ব্বকালে এই ইলাম-গৌরব-গর্বিত বােগ্দাদ নগরে
এক অতি ধৰ্ম্মশীল, অগাধ ধীশক্তিসম্পন্ন, পরম পণ্ডিত ব্যক্তি
বাস করিতেন।
সত্যনিষ্ঠা ও সচ্চরিত্রতা-গুণে নগরস্থ
আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকলেই তাহার প্রতি আন্তরিক ভক্তি
ও প্রতি প্রদর্শন করিত। শাস্ত্রানুমােদিত ধৰ্ম্ম-কৰ্ম্মসমুহ
নিয়মিতরূপে প্রতিপালন করাই তাহার জীবনের প্রধান,
উদ্দেশ্য ছিল। তাঁহার পুণ্যহস্ত সাধ্যানুসারে দীন-দরিদ্রের
অবমােচনে প্রশস্ত ও পরােপকারে উন্মুক্ত থাকিত। তিনি
প্রথম পরিচ্ছেদ। ৩ । ক্ষুধার্তকে আহার, তৃষ্ণার্তকে পানীয় প্রদান ও নিঃসহায়কে সাহায্য করাই ধৰ্ম্মের এক প্রধান অঙ্গ বলিয়া মনে করিতেন। প্রতিবাসীগণ তাহাকে সৌভাগ্যবান্ পুৰুষ জানিয়া, চিরদিন তদীয় আনুগত্য স্বীকার করিয়া চলিত। ফলতঃ পরম- কারুণিক জগৎপিতা জগদীশ্বর, তাহার প্রতি প্রসন্ন ছিলেন ; দয়াময়ের অনুগ্রহে তাহার কিছুরই অপ্রতুল ছিল না। • সহধর্মিণী পূর্ণগর্ভা। সেই পতিব্রতা পুণ্যময়ী মহিলা তদবস্থার পালনীয় নিয়ম সকল প্রতিপালনপূৰ্ব্বক, অতি সন্তোষের সহিত গর্ভধারণ করিয়া আসিতেছিলেন। অনন্তর যথাকালে শুভলগ্নে তাহার একটী সৰ্ব্ব-সুলক্ষণাক্রান্ত পরম- সুন্দর তনয়রত্ন জন্মগ্রহ করিলেন ।* পুত্রের সুবিমল শশধর, * মহাত্মা হােসেন মন্সুর ঠিক কোন সময়ে জন্ম-পরিগ্রহ করেন, তাহা নিঃসংশয়িতরূপে অবধারণ করা কঠিন ব্যাপার। তবে এইরূপ অনুমিত হয়, আমাদের মহামান্য পুণ্য প্রাণ পয়গম্বর হজরত মহম্মদ মন্তফার (দঃ) আবির্ভাবের তিন শত বৎসর পরে অথবা হিজরী তৃতীয় শতাব্দীর শেষ ভাগে তিনি ইহজগতে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। তাহার সহাধ্যায়ী ধর্মপ্রাণ তাপস শেখ আবুবকর শিবলী হিজরী ৩৩৪ শালে মানব- লীলা সম্বরণ করেন। আবার গ্রন্থাগুয়ে লিখিত আছে যে, হজরত ওসমানের পুত্র ওমরের সহিত তাহার অদ্ভাব ঘটায় তিনি মাভূমি পরিত্যাগ করিয়া বােগদাদে প্রস্থান করেন। এই ওমর কোন সময়ের লােক এবং মসুর তাহার সমসাময়িক কি না, বিজ্ঞ পাঠকগণ তাহার মীমাংসা করিয়া লইবেন।
৪ মহর্ষি মনসুর। সন্নিভ কমনীয় কান্তিচ্ছটায় অন্তঃপুর প্রতি ভাসিত-দর্শনে পিতার আর আনন্দের সীমা রহিল না। তিনি তৎক্ষণাৎ সন্তানের শুভ কামনায় একান্তচন্তে সৰ্ব্ব আনন্দদাতা বিশ্ব- বিধাতার উদ্দেশে প্রার্থনা করলেন এবং স্বীয় অবস্থানুযায়ী অর্থাদি বিতরণে দীন-দুঃখীদের মনস্তুষ্টি সম্পাদন করিলেন । তাহারা পরিতুষ্ট হইয়া শিশুকে হস্ত তুলিয়া আশীর্বাদ পূর্বক প্রস্থান করিল। গৃহ উল্লাসময় - আনন্দ ভরা ! যেন স্বরং মূর্তিমান আনন্দ আগমন পূৰ্ব্বক চতুর্দিকে বিচরণ করিতে লাগিল। আজ যেন প্রচণ্ড তাপ দিনমণির কররাশি অধিকতর শুভ্র- অধিকতর উজ্জ্বল, অথচ শৈত্যগুণবিশিষ্ট। আবার সুশীতল মলয়-মারুত মৃদুমন্দ প্রবাহে ঢলাঢলি করতঃ ৰ্ত্তি প্রচারে তৎপর হইল। পুরবাসীগণ এই শুভদিনে আনন্দে উৎফুল- প্রণ! প্রতিবাসী, আষ্মীয়, বন্ধু বান্ধবরাও সে উৎসবে যােগদান করিতে ত্রুটি করল না। সকলেই আনন্দে উন্মত্ত । হাস্য-কোলাহলে গৃহভূমি শায়মান হইয়া উঠিল। বিধাতার কৃপায় এবং জনসাধারণের আন্তরিক আশী- বাদে এই ক্ষণজন্মা শিশু দিন দিন বৃদ্ধিত ও বলসম্পন্ন হইতে লাগিলেন। দিন দিন তাহার অঙ্গপুষ্টি ও অপরূপ রূপলাবণ্য পরিস্ফুট হইতে লাগিল। পিতামাতা পরমযত্নে লালনপালন করিতে রহিলেন। আহা এ জগতে ভবিতব্যতার কথা কে প্রথম পরিচ্ছেদ। জানিতে পারে ? যিনি ঐশী-শক্তি-প্রভাবে অলৌকিক কাৰ্য্য দেখাইয়া জগতকে বিমােহিত ও বিক্ষিত করিয়া গিয়াছেন, যে দৃঢ়ত সতপ্রিয় মহাপুরষ ধ্যানসমাধিতে নিমগ্ন হইয়া ধৰ্ম্মোন্মত্ততার চরমসীমায় সমুপস্থিত হইয়া অকাতরে স্বীয় জীবন বিসর্জন পূৰ্ব্বক পৃথিবীতে চিরস্মরণীয় হইয়া রহিয়াছেন, যিনি তপস্বীকুলের মহাতেজস্ব। সিহস্বরূপ ছিলেন, বাহার অপার্থিব বৈচিত্র্যময় জীবনবৃত্তান্ত শুনিতে শুনিতে সৰ্বাঙ্গ রােমাঞ্চিত, এবং হৃদয়মন বিস্ময়াপ্লত ও কি এক অভূতপূর্ব ভাবে বিভাের হইয়া অবসন্ন হইয়া পড়ে, আজ এই সূতিকা- ক্ষেত্রে এই শিশুরূপে তিনি আবিষ্কৃত হইলেন। অনন্তর পিতা যথাসময়ে শুভ দিন দৃষ্টে আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধবদিগকে নিমন্ত্রণ করিয়া আনিয়া, অতি সমারােহের সহিত শাস্ত্রসঙ্গত বিধানা- সারে শিশুকে হােসেন মন্সুর নামে আখাত করিলেন। হােসেন মন্সুর পরিশেষে যে এক জন ধর্মাত্মা মহর্ষি নামে প্রখ্যাত হইবেন, প্রথম হইতেই তাহার বিশিষ্ট লক্ষণ পরিলক্ষিত হইতে লাগিল। জন্মদিবসে তাহার সর্বাঙ্গে কি যেন এক অপূর্ব স্বর্গীয় জ্যোতি প্রতিভাসিত এবং প্রাণ- মনােমুগ্ধকর অপার্থিব সৌগন্ধে গৃহ আমােদিত হইতে থাকে ও তদীয় হৃদয়মধ্যে ঈশ্বর-প্রতির জলন্ত নিদর্শনস্বরূপ এক মধুময় ভাব সঞ্চারিত হয়। হাস্যে, ক্রন্দনে, ক্রীড়নে ও মহর্ষি মনসুর। হস্তপদাদির সঞ্চালনে সেই ঐশিক প্রেম অভিব্যক্ত। দর্শক শিশুর ভাবভঙ্গি দেখিয়াই বিস্ময়াপন্ন ও অজ্ঞান ! পিতামাতার আনন্দের অবধি নাই। আহা সে আনন্দ, সে স্বর্গীয় প্রফুল্লতা, ঈদৃশ ক্ষণজন্মা পুত্রের ভাগ্যবান্ পিতা ব্যতীত কি অপর কেহ অনুভব করিতে পারে ? এইরূপে দেখিতে দেখিতে ক্রমেই শিশুর জ্ঞানবিকাশ হইয়া, জিহ্বার জড়তা কাটিয়া গিয়া, মৃদু মধুর আধ আধ ভাষা দূরীভূত হইয়া বাক্যোচ্চারণ পূর্ণতা প্রাপ্ত হইল। তখন পুত্রের বিদ্যাশিক্ষার্থ, দেশের প্রথানুসারে বিজ্ঞ পিতা, মন্সুরকে বিদ্যালয়ে নিযুক্ত করিয়া দিলেন। স্থিরধী মন্সুর আন্তরিক যত্ন ও প্রগাঢ় মনােযােগের সহিত অধ্যয়ন করিতে লাগিলেন। বয়ােবৃদ্ধি সহকারে শিক্ষাগুণে যেমন তাহার বুদ্ধিবৃত্তি পরি- মার্জিত হইতে চলিল, সেই সঙ্গে সঙ্গে তদীয় অন্তরে ঈশ্বর- প্রীতি, গাম্ভীৰ্য্য, সত্যনিষ্ঠা, সাধুতা ও ধর্মচিন্তা ক্রমশঃ প্রবল- রূপে পরিবর্ধিত হইতে লাগিল। তিনি এমনি অসাধারণ প্রতিভাশালী, শান্তশীল ও স্মৃতিধর ছিলেন যে, সেই অনন্ত- দুষ্কর প্রজ্ঞাপ্রভাবে, দ্বাদশ বৎসর বয়ঃক্রমকালেই ধর্মবিষয়ক বহুবিধ গ্রন্থাদি পাঠ করিয়া অসাধারণ মনীষাসম্পন্ন পণ্ডিত বলিয়া প্রসিদ্ধি লাভ করিলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এই বহুদর্শনেও তাহার ধর্মপিপাসার উপশম হইল না।
প্রথম পরিচ্ছেদ। ৭ ঔদাসীন্যের কি যেন এক গাঢ় কুহেলি কাতানুসন্ধানের কি এক দৃঢ় আবরণ তাহার হৃদয়-ভূমি আচ্ছন্ন করিয়া রহিল। তদীয় অনন্য দুস্কর অধ্যবসায় প্রসূত যশঃসৌরভে জগৎ বিমুগ্ধ ও বিস্মিত হইল বটে, তিনি সাধারণ্যে সমাদৃত ও প্রিয়পাত্র- রূপে পরিগৃহীত হইলেন বটে, কিন্তু তাহার সেই ঔদাসীন্য-মেঘ- জাল অন্তর হইতে অপসারিত হইল না, প্রবল ধপিপাসার শান্তি হইল না, আন্তরিক বাসনা চরিতার্থ হইল না, নিরন্তর কেবল স্বীয় মনােমত এক জন উপযুক্ত দীক্ষাগুরুর জন্য চিন্তান্বিত রহিতেন। শাস্ত্রানুমােদিত ক্রিয়াকলাপ যথারীতি বিশুদ্ধভাবে সম্পন্ন করেন, আর কোথা গেলে কিরূপে অভিলষণীয় দীক্ষাগুক, পাইব, এই চিন্তাতেই দিনযামিনী ম্রিয়মাণভাবে ক্ষেপণ করেন। ভাবনার ভয়ানক কালিমা- রেখা তাহার বিস্তৃত ললাটফলকে নিয়ত পরিদৃশ্যমান থাকিত, সৰ্ব্বদাই অধােভাগে দৃষ্টি সংযােগ করিয়া কুঞ্চিতনেত্রে কি ভাবিতেন এবং স্বেচ্ছামত স্থানে স্থানে ধৰ্ম্মমন্দিরে গমনাগমন পূৰ্ব্বক আপন উদ্দেশ্য সিদ্ধির চেষ্টায় ফিরিতেন। শুকৰ্ম্মা মন্সুর এইরূপে ক্ষুব্ধচিত্তে দিনাতিপাত করিতে লাগিলেন। কিন্তু এ জগতে মঙ্গলময় জগদীশ্বর কাহারও মনােভিলাষ অসংপূর্ণ রাখেন না। তিনি ক্ষুধার্তকে উপাদেয় আহার, তৃষ্ণাতুরকে সুশীতল বারি, অর্থপ্রার্থীকে বিপুল বিব,
'মহসি মনসুর।
ভােগবিলাসীকে ব্যসনসামগ্রী ইত্যাদি প্রত্যেক ব্যক্তিকে
তাহাদের অভিলষিত্ব দ্রব্যাদি দানে পরিতুষ্ট করেন। তিনি
প্রার্থনাপূরণকারী, একমাত্র দাতা ও পরম দয়ালু। সুতরাং
মন্সুরেরও যে এই বাসনা পূর্ণ করিবেন, তাহার আর বিচিত্র
কি ? সৌভাগ্যক্রমে বােগদাদ নগরেই পবিত্র সৈয়দ-বংশােদ্ভব
খাজা জুনেদ শাহ নামে এক অদ্বিতীয় ধৰ্ম্মশাস্ত্রজ্ঞ পরম পণ্ডিত
বাস করিতেন। তৎকালে তাহার সদৃশ তদশী সিদ্ধ পুরুষ
আর কেহই ছিল না, বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। ধৰ্ম্মের অতি
গভীর গঢ় বিষয় সমুদয় তাহার নিকট নখদর্পণের ন্যায়
প্রতীয়মান হইত। তাহার শিষ শাখা ও
নিতান্ত কম
ছিল না। তিনি নিয়ত তৎসমুদয়ে পরিবৃত হইয়! মহানন্দে
শাস্ত্র চর্চায় ব্যাপৃত থাকিতেন।
মন্সুর, মহাজ্ঞানী সৈয়দ জুনেদ শাহের গুণগ্রামের কথা
অবগত হইয়া, সৰ্ব্ব কর্ম পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক অনতিবিলম্বে
তৎসমীপে যাইয়া উপস্থিত হইলেন। অতঃপরু সময়ানুসারে
অতি নম্রভাবে সৈয়দ সাহেবের নিকট স্বীয় মনােভাব
ব্যক্ত করিলে, সেই মহিমান্বিত মহাপুরুষ মম্বরের
প্রস্তাবে সম্মতি দান করিয়া কহিলেন,-“ধৈৰ্য্য ও অধ্যবসায়
সহকারে অবস্থান করিলে করুণাম জগংস্রষ্টার কৃপায়
তোমার বাসনা সফল হইতে পারিবে, সন্দেহ নাই।”
প্রথম পরিচ্ছেদ। ৯ এতৎ অনুকূল বাক্য শ্রবণে মনসুরের আর আনন্দের সীমা রহিল না। তিনি সর্বসিদ্ধি কৰ্ত্তা নিখিলনাথকে ধন্যবাদ প্রদান করিয়া, প্রফুল্লচত্তে দি বারজনী গু--পদসেবায় প্রবৃত্ত হইলেন। এইরূপে কিছু দিবস অতীত হইয়া গেল। মন্সুরের ঐকান্তিক ধৰ্ম্মানুরাগ, প্রগাঢ় গুৰুভও, চিহারা বিনয়নম্রতা এবং অচলা সহিষ্ণুতা দর্শনে সৈয়দ সাহেব নিরতিশয় প্রতি প্রাপ্ত হইলেন। তঁাহার এতাদৃশ অসহ পরিশ্রমের পারিতােষিক প্রদান মানসে এক দিবস কৃপাবলোকনে ঈষৎ হাসিয়া কহি- লেন, “মনসুর! আমি তোমার ব্যবহারে বড়ই সন্তুষ্ট হইয়াছি। তােমার অধ্যবসায়, তােমার গুরু ভক্তি, তােমার শিক্ষানুরাগ, তােনার চরিত্র-বণ, তােমার আলাপ-সম্ভাষণ-সকলই মধুর, প্রশংসনীয় ও অনুকরণযোগ্য। তোমার হৃদয়-ভাব অতি উচ্চ ও মহান্ । পরিশ্রমের অবশ্যই পুরস্কার আছে। অতএব যাও, অবগাহন করিয়া আইন, অন্ত তােমাকে কিছু ধর্মোপদেশ প্রদান করিব।” শান্তশীল মনসুর হৃষ্টচিত্তে মস্তক অবনত করিয়া, যে অজ্ঞা বলিয়া প্রস্থান করিলেন এবং ঈশ্বরানুগ্রহে অদ্য আমার মনােভিলাষ পূর্ণ হইল বলিয়া অবিলম্বে স্নানকাৰ্য্য সমাপনান্তে শুদ্ধচিত্তে হস্তপদাদি প্রক্ষালন (অজু) পূর্বক অঙ্গ শুদ্ধি করতঃ পবিত্র ভাবে পুজ্যপান গুরুর সম্মুখীন হইলেন। তখন মহানুভাব সৈয়দ সাহেব শাস্ত্রানুমােদিত ব্যবস্থানুসারে মহষি মনসুর। মন্সুরকে প্রথমতঃ “তওবা” * করাইয়া লইলেন। পরে ইহ- পরকালের কঠোর যন্ত্রণার পরিত্রাণ-পথ প্রদর্শনার্থ তাহাকে একে একে তন্ন তন্ন করিয়া ধৰ্ম্মের যাবতীয় সূক্ষ্ম সূত্র ধরিয়া উপদেশ দিতে লাগিলেন। সাধু সমাজের স্পৃহণীয় গুপ্ত তত্ত্বের এরূপ বিশদ ব্যাখ্যা করিলেন যে, তাহাতে যেন মহাশক্তি জগস্রষ্টার পবিত্র সত্ত্বা সুস্পষ্ট প্রত্যক্ষ করাইয়া দিলেন। ফলতঃ বীজ উর্বর ক্ষেত্রে নিক্ষিপ্ত হইলে যেরূপ ফাপ্রসূ হয়, মন্সুরের পক্ষে এই গুরূপদেশও তদ্রুপ ফলােপধায়ক ও শুভজনক হইল ; তিনি একাগ্ৰমনে তৎসমুদয় শ্রবণ করিয়া হৃদয়ঙ্গম করিয়া লইলেন। এইরূপে প্রসন্নচিত্তে আন্তরিক যত্ন ও স্নেহের সহিত হৃদয় খুলিয়া সমস্ত ধৰ্ম্মত শিক্ষা দেওয়াতে হােসেন মনসুরের অন্তরাকাশ পরিষ্কত ও জ্ঞান-নেত্র বিকশিত হইল। তাহার সেই হৃদয়াধিকৃত তিমিরজাল অলক্ষ্যে অন্তর্হিত হইল ; যেন কোন মােহনীয় মন্ত্র প্রভাবে মুহূৰ্তমধ্যে কি এক অলৌকিক অভাবনীয় ব্যাপার সংঘটিত হইয়া গেল। মন্সুর নবজীবন প্রাপ্ত হইলেন। একে তিনি স্বতঃই অসাধারণ প্রতিভা-সম্পন্ন ছিলেন, তাহাতে আবার গুবদত্ত শিক্ষাবল * তওবা –অনুশোচনা বা কৃতাপরাধের জন্য জগৎস্রষ্টার সমীপে ক্ষমা এর্থ এবং পুনব্বার তাহা না করণের দৃঢ়তা।
প্রথম পরিচ্ছেদ।
পাইয়া তাহার সেই স্বাভাবিক প্রতিভা অধিকতর তেজস্বিনী
হইয়া উঠিল ; তিনি ঐশিক-প্রেমে বিমুগ্ধ হইয়া একেবারে
উন্মত্তবং হইলেন।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। বিদ্যাবিশারদ গভীর-তত্ত্বজ্ঞ সাধুকুল-শ্রেষ্ঠ সৈয়দ খাজা জুনেদ শাহ কর্তৃক দীক্ষাপ্রাপ্ত হইয়া, হােসেন মনসুরের ঈশ্বর- নুকাগ ও জ্ঞানান্বেষণ-বাসনা অত্যধিক পরিমাণে পরিবর্ধিত হইল। তাহার চিত্তভূমি প্লাবিত করিয়া সর্বাঙ্গ হইতে যেন স্নিগ্ধোজ্জল বিদ্যুলহরী আবির্ভূত হইতে লাগিল। জানের পূর্ণ বিকাশ হওয়াতে তিনি নশ্বর জগতের মােহময় মায়াজাল ছিন্ন করিয়া আপনাকে ক্ষুদ্রাদপি ক্ষুদ্র বলিয়া বিবেচনা করিতে। লাগিলেন, অথবা আমি এ মর-জগতের কিছুই নহি বলিয়া তাহার জান হইতে লাগিল। ফলতঃ অচিরকাল মধ্যে তিনি দেশ মধ্যে এক জন পরম তদশী ভাবুক বলিয়া পরিগণিত হইলেন। সমগ্র খ্যাতনামা পণ্ডিত ও ধৰ্ম্মপরায়ণ ব্যক্তি মন্ সুরের এই অভাবনীয় পরিবর্তন ও অচিন্তনীয় কাৰ্যকলাপ দৃষ্টে বিস্মিত হইয়া নীরবে মস্তক অবনত করিলেন। আবাল-বৃদ্ধ- বনিতা ভক্তি ও শ্রদ্ধা সহকারে তাহার পবিত্র নামােচ্চারণ করিয়া, সম্মান প্রদর্শন করিতে লাগিল। শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ও, নিতান্ত কম হইল না। অবিনশ্বর ধন পরমতত্ত্ব অবগত হইবার বাসনায় বহুসংখ্যক লােকের নিত্য সমাগম হইতে লাগিল ;
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। অনেকে অহনিশ তদীয় পদ-সেবায় নিযুক্ত ! কিন্তু তিনি নিরন্তর নেত্র-যুগ নিমীলন করিয়া স্থিরচিত্তে বাহ্যজ্ঞানবির- হিত হইয়া, কি এক গভীর চিন্তায় নিবিষ্ট থাকিতেন। সে কি চিন্তা, তাহা তিনি কাহারও নিকট ব্যক্ত করিতেন না। তাহার অন্তঃকরণে কেবল সেই একটী বিষয় ব্যতীত অপর কিছুই স্থানলাভ করিতে পারি না। দিবসে আহারে বাস্ত নহেন, নিশিতে নিদ্রা বা বিশ্রাম নাই, শুদ্ধ অবিশ্রান্ত জাগ্রদ- বস্থায় স্তব্ধ ভাবে কি যে যােগসাধনে নিবৃত থাকিতেন, তাহা প্রকৃত তত্ত্বজ্ঞানী ভালুক ব্যতীত অপর সাধারণ বুঝিতে অক্ষম। এই সময়ে মহর্ষি সাধু-সহবাসে অধিক তর অভিজ্ঞ তা- লাতের কামনায় দেশপৰ্যটনের বাসনা করেন। তদনু- সারে তিনি স্তরে আগমন করিয়া, সাধুবর আবদুল্লা তস্তরীর সহবাসে কিছুদিন অতিবাহিত করেন। তৎপরে ব, মক্কা, খােরাসান, শিন্তান, পারস্য, ভারতবর্ষ প্রভৃতি বহু দেশ ও বহু নগর পরিভ্রমণ করিয়া, বহু সাধু লােককে সর্শন করেন। আমরা এস্থলে তঁাহার সেই ভ্রমণবৃত্তা- শ্বের কয়েকটা অবশ্য জ্ঞাতব্য বিষয় সংক্ষেপে বিবৃত করিলাম। তপােধন বহুবার পবিত্র মক্কাভূমি পরিদর্শন ও তথায় অবস্থিতি করিয়া শাস্ত্রের বিধানানুযায়ী ধৰ্ম্মকাৰ্য্য সম্পন্ন বিশেষ বিবরণ “তাজকেরাতুল আউলিয়া” নামক গ্রন্থে দ্রষ্টব্য।
১৪ মহর্ষি মনসুর। করেন। একদা তিনি উক্ত পুণ্যস্থানে স্বীয় ধৈর্য্যশীলতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়াছিলেন। ইহা প্রসিদ্ধ আছে যে, তিনি সুবিখ্যাত বাতােল। অর্থাৎ ধৰ্ম্মমন্দির কাবা মজিদের সম্মুখভাগে সমস্ত দিবস প্রচণ্ড সৌর-রশ্মি-তলে অকাতরে স্থিরভাবে দণ্ডায়মান থাকিতেন। শরীরে আচ্ছাদন মাত্র দিতেন না, প্রখর সূর্যের অগ্নিকণা সদৃশ অসহ্য কর-প্রভাবে গাত্র বহিয়া অজস্রধারে স্বেদ-ধারা বিগলিত হইয়া ভূমিতল কর্দমাক্ত করিয়া ফেলিত, এবং তাহার সর্বাঙ্গ দগ্ধ কাষ্ঠ, খণ্ডের ন্যায় গাঢ় কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করিয়াছিল । কষ্টের অবধি ছিল না; কিন্তু তাহাতেও তিনি এক মুহূর্তের জন্য ও বিচ- লিত হন নাই। বদনমণ্ডল প্রফুল্ল.. চিত্ত বিকাররহিত ও উচ্চশির গিরি সদৃশ অদম্য, অচল ও অটল ; মুখে আহ্ শব্দটীও বহির্গত হইত না। দিবানিশি কেবল প্রস্তর- প্রতিমাবৎ স্থিরভাবে দণ্ডায়মান থাকিতেন। সেই সময়ে এক খণ্ড রুটীর সামান্য অংশ মাত্র তাহার দৈনিক আহার ছিল। এইরূপ কঠোর তপস্যায় মহাতপা মনসুর পূর্ণ এক বৎসর কাল অতিবাহিত করেন। কি অবিচলিত ভীষণ অধ্যবসায় ! ভাবিয়া দেখিলেও মস্তক বিঘূর্ণিত ও সৰ্বাঙ্গ কণ্টকিত হইয়া উঠে। এরূপ সহিষ্ণুতা প্রকৃত সাধক ব্যতীত অপরে কখনই সম্ভবপর নহে।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ; মহর্ষি মক্কা অবস্থানকালে একদা আরাফাতের প্রান্তরে প্রার্থনা করিতে গমন করেন। তথায় প্রার্থনাকালে বলেন, *হে কর ণাময় জগৎপতে। হে বিশ্বপ্রাণ! হে প্রেমময় দীনবন্ধো। আমার কার্যকলাপের দ্বারা জগৎ যদি আমাকে মহাপাপী ধর্মভ্রষ্ট বলিয়াই পরিগণিত করিয়া থাকেন, তবে হে দয়াময়। আমাকে এই অবস্থাতেই উন্নতি করিতে শক্তি দি উন।” এইরূপ বলিতে বণিতে সহসা তাহার চতুর্দিকে কতক গুলি লোক দেখিতে পাইলেন; অমনি তাহার কণ্ঠস্বর রদ্ধ হইল,—কিঞ্চিৎ সঙ্কুচিত হইলেন; নিকটে একটী বালুকাপ ছিল, এস্ত ভাবে তাহারই অন্তরালে যাইয়া আত্মগােপন করিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে যখন তিনি দেখি- লেন, প্রান্তর জনশূন্য হইয়াছে, প্রকৃতি নিস্তব্ধভাব ধারণ করিয়াছে, দৃষ্টিসীমার মধ্যে মানবের চিহ্নমাত্র নাই, তখন তিনি বহির্গত হইয়া ব্যাকুলচিত্তে, কতরকণ্ঠে অবিশ্রান্ত প্রার্থনায় নিরত হইলেন। ঋষিবর কিছুকাল অজ্ঞাতবাস করিয়াছিলেন। সংসার- আবল্য-জাল হইতে পৃথক থাকিয়া একাগ্রচিত্তে ধ্যান-ধারণা, করাই যে তাহার এই নির্জন-নিবাসের প্রধান কারণ, তাহাতে আর সংশয় নাই। তৎপরে তিনি পারস্য রাজ্যে গমন করেন। তথায় অবস্থিতিকালে মহসি কয়েকখানিতন্ধোপ মহর্ষি মনসুর। দেশপূর্ণ উৎকৃষ্ট গ্রন্থ প্রণয়ন করিয়াছিলেন। উল্লিখিত গ্রন্থনিচয় এরূপ গভীর গবেষণা-প্রসূত যে, অনেকানেক জ্ঞানবুদ্ধ পণ্ডিতের বহুদর্শনকেও তাহাতে পরাভব স্বীকার করিতে হইয়াছিল। অতঃপর তিনি পরিভ্রমণ করিতে করিতে বহুসংখ্যক যাত্রিক সমভিব্যাহারে পুনার পুণ্য- ক্ষেত্র মক্কায় আসিয়া উপনীত হন। এবার তিনি মক্কায় অধিক দিন অবস্থান করেন নাই। কারণ, এক জন নষ্টবুদ্ধি দুরন্ত লােক তঁাহাকে যাদুকর ভণ্ড-নােগী বলিয়া নাম রটনা করে। তজ্জন্য তিনি ক্ষুন্ন মনে মক্কা তীর্থ পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হন। তাপস রাজ তাপস রাজ সুদূরবত্তী ভারতবর্গে * আসিতেও ত্রুটি করেন নাই। তিনি আশা করিয়াছিলেন, ধর্মভ্রান্ত ভারতের অসার পৌত্তলিকতা অধৰ্ম্ম অপনােদন করিয়া তৎস্থলে যথার্থ ও জগদীশ্বরের মনােনীত নিরাকার একেশ্বরবাদ-ধৰ্ম্ম প্রতিষ্ঠিত করিব,অধিবাসীদিগকে সদুপদেশ প্রদানে সত্য- পথে আনয়ন করিব। কিন্তু তঁাহার সেই আশা কতদূর ফলবতী হইয়াছিল, তাহা অবধারণ করা যায় না। ফলতঃ এইরূপে তিনি বহু স্থান পর্যটন পূর্বক লােকদিগকে বিবিধ প্রকারে ঋবিরাজ ভারতের কোন প্রদেশে পদার্পণ করিয়া পবিত্র করিয়া- ছিলেন, কত দিন ছিলেন এবং কি কাৰ্য্য করিয়াছিলেন, তাহা অবগত হইবার উপায় নাই।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। ১৭ সংশিক্ষা প্রদান ও বহু সাধু-সহবাস করেন; কিন্তু আক্ষেপের বিষয়, কুত্রাপি সুনাম অর্জন করতে সমর্থ হন নাই। কারণ মহষি যেরূপভাবে তত্ত্ব কথা বলতেন, অবুদ্ধি লােকেরা তাহার তাৎপর্য পরিগ্রহ করিতে না পারিয়া, তাহার বিদ্ধে নানা অপবাদ রটনা করিত; এমন কি, অনেকে প্রকাশ্যে তাহাকে বিধর্মী বলিতে সঙ্কুচিত হয় না, কিন্তু তাহার বার-হৃদয় অচল অটল,---দমিত হইবার নহে, তাহাতে তিনি কিঞ্চিত্র ও নিরৎসাহিত বা ভগ্নাম হইতেন না, স্থিরমন স্বীয় গন্তব্য পথের অনুসরণ করিতেন। তপােবন, বহু দিবস নানাদিদেশ পর্যটনের পর স্বদেশে প্রত্যাগমন করেন। জন্মভূমি বোগদাদে আসিয়া তাহার ধন্মােন্মত্ততা চরম সীমায় সমুপস্থিত হয়। কথিত আছে, একদা তিনি স্বকীয় • দীক্ষাগুর তপস্বকুলভূষণ খাজা সৈয়দ জুনেদ শাহকে কোন প্রশ্ন করেন। সৈয়দ সাহেব তদুত্তরে বলেন, “মন্সুর ! সাবধান, রসনাকে শাসনে রাখিও। নতুবা আমি দিব্য চক্ষে দেখিতেছি, কোন্ দিন তুমি শূণাগ্র আত্ম- বিসর্জন পূৰ্ব্বক বধ্যভূমি অনুরঞ্জিত করিবে।” প্রশ্নের উত্তরে এই কঠিন কথা শুনিয়া স্পষ্টবাদী নিউকি মন্সুর খাজা জুনেদ শাহকে নিরত্তর করিয়া প্রস্থান করিলেন। অনন্তর সাধক প্রবর নির্জনে যােগসাধনে উপবেশন ১৮ মহর্ষি মসুর। করিলেন ; আহার, বিহার, বিশ্রম, নিদ্রা প্রভৃতি মানব-স্বভাব- সুলভ যাবতীয় ইন্দ্রিয়সম্পর্কীয় কাৰ্য্য হইতে একেবারে বিচ্ছিন্ন রহিলেন। কেবল সেই একই ভাব, সেই ফন্তু-নদীর অন্তঃ- প্রবাহ, সেই বাহ-জ্ঞানশূন্যতা, সেই ধ্যান-স্তিমিত নেত্র! নীরব ও নিস্পন্দ ! মশক-মক্ষিকাদির উপবেশনে দূরে থাক, দংশনেও গাত্র স্পন্দিত হইত না। এই অবস্থায় দীর্ঘ কাল অতিবাহিত হইয়া গেল। এক দিন, দুই দিন করিয়া ক্রমে সপ্তাহ, সপ্তাহের পর পক্ষ, পক্ষের পর মাস, মাসের পর বৎসর, এইরূপে কত দিন, কত সপ্তাহ, কত পক্ষ, কত মাস, কত বৎসর চলিয়া গিয়া, অনন্ত কালের গভীর গর্ভে বিলয়- প্রাপ্ত হইল, জগতের কত স্থানে কত পরিবর্তন সংঘটিত হইল, কত মানবের ভাগ্য-চক্রের ঘূর্ণনে অবস্থার বিপর্যয় ঘটিল, কিন্তু মন্সুরের এই ভাবের পরিবর্তন ঘটিল না, স্বভাবের অণুমাত্র ব্যতিক্রম হইল না। তিনি পূর্ববৎ নিরন্তর নিরাময় নিখিলনাথের ধ্যান-ধারণায় নিবিষ্ট ;-সাধন-সমুদ্রের অন্তস্তলে নিমজ্জিত হইয়া নির্জীব জড়পিণ্ডের ন্যায় নিশ্চল রহিতেন। তাহার চতুর্দিকে শত সহস্র আনন্দোৎসব, সুমধুর বাদ্যভাণ্ড, বা কোনরূপ ভীষণ অনিষ্টপাত হইলেও তদীয় চিরায়ত্ত চক্ষু কর্ণ শ্রমেও তদনুসরণে ধাবিত হইত না। ফলতঃ তিনি সংসার-আবল-জাল হইতে সম্পূর্ণ বিমুক্ত হইয়া, মায়া-মােহ-
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।
উঃ
বন্ধন ছিন্ন করিয়া অনন্য-অন্তঃকরণে ঈশ্বরপ্রেমে উন্মত্ত
থাকিতেন। সে প্রেমের মর্ম কাহারও নিকট প্রকাশ করি-
তেন না। কিন্তু আগ্নেয়গিরির গহ্বরাভ্যন্তরে অনলরাশি
পরিপূর্ণ হইলে, উদগীরণ না করিয়া কি আর স্থির থাকিতে
পারে ? পাত্র পূর্ণ হইলে বারি স্বতই উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠে
আহা! এক দিবস অকৃত্রিম ভক্ত প্রেমােন্মত্ত মসুর প্রেমের
পূর্ণ আবেশে অস্থির হইয়া উচ্চৈঃস্বরে উচ্চারণ করিয়া ফেলি-
লেন—“আনাল হক” (অহং ব্ৰহ্ম বা আমিই ঈশ্বর)।
কি ভীষণ অধর্মের কথা ! কি পাপের কথা ! কি স্পর্ধাজনক
অন্যায় উক্তি!! রক্তমাংসময় নশ্বর মানবে-ইন্দ্রিয়ের অঙ্গুলি
সঙ্কেতে চালিত দুর্বল মানবে—জলবিষবৎ ক্ষণস্থায়ী ক্ষুদ্র
মানবে ঈশ্বরত্বের অধিকার !! গােস্পদে গভীর বারিনিধির
আরােপ !! ইহা কি উন্মত্তের প্রলাপ নহে? ভক্তের কি এই
উক্তি? কখনই নহে। সকলে ইহা শুনিয়া বিস্মিত ও চকিত
হইয়া হতবুদ্ধির ন্যায় চাহিয়া রহিল। এদিকে মুহূর্ত মধ্যে
এ সংবাদ নগরময় প্রচারিত হইতে আর বাকি রহিল না।
যে শুনে সেই স্তম্ভিত, সেই হতচৈতন্য। নানা জনে নানা কথা
বলিতে লাগিল। বােগদাদের আবালবৃদ্ধবনিতা সৰ্ব্ব সমাজেই
এই একই কথা—একই বিষয়ের আন্দোলন। কেহ কে,
হায় ধর্মপ্রাণ মন্সুর পাগল হইয়াছেন বলিয়া শোক প্রকাশ
মহর্ষি মন্সুর।
করিতে লাগিল। বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়গণ মন্সুরের সকাশে
উপস্থিত হইয়া কহিলেন, “ভাই! তােমার মনে এ বিকৃতি
জন্মিল কেন ? তুমি কি উন্মত্ত হইয়াছ? তুমি এক জন
পরমজানী, তােমাকে উপদেশ দিতে যাওয়া আমাদের
অনধিকার চর্চা ও ধৃষ্টতামাত্র! তথাপি কর্তব্যের অনুরােধে
বলিতেছি, সাবধান, সাবধান। জান ত, এ ধৰ্ম্মবিগর্হিত
নিদারুণ পাপকথা। একথা পুনর্বার উচ্চারিত হইলে
তােমার সমূহ বিপদ উপস্থিত হইবে। এমন কি, ইহাতে
তােমার জীবনের আশা পৰ্যন্ত বিলুপ্ত হইবার সম্ভাবনা।
অতএব স্থির হও, যাহাতে এই কুচিন্তা অন্তর হইতে অন্তরিত
হয়, এবং চিত্ত প্রকৃতিস্থ ও সুস্থ হয়, তদ্বিষয়ে সতর্ক ও
সচেষ্ট হও। এ উক্তি তােমার পক্ষে, তােমার কেন, জগতের
কোন লােকের পক্ষে মঙ্গলজনক নহে। • তাই পুনৰ্ব্বার বলি-
তেছি, তুমি আপনাকে জগতের শত্রু করিও না, “চিত্তের স্থ্যৈ
সম্পাদন কর।” ইত্যাকার কতই প্রবোধ-ব্যবস্থার প্রয়ােগ
করা হইল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, উখিতফণ। ফণী মন্ত্রৌষধ গ্রাহ
করিল না! এ মন্ত্রে কোনও ফলােদয় হইল না,-সকলই
অসাধ্য ও ব্যর্থ হইল। প্রেমমুগ্ধ মন্সুর এ সান্ত্বনা-বাক্যে
তুলিলেন না। প্রবহমান স্রোতস্বতীর দিগন্তগ্রাসী প্রবল প্রবাহ
রােধ করে, কাহার সাধ্য ? তিনি নরলােক-দুর্লভ শান্তি
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।
২১
সুধাপ্রদ প্রেম-পারাবারের গভীর গর্ভে নিমজ্জিত হইয়া
আছেন, লােকের নিষেধ-বাক্যে সেই চিরসুখের স্থান কি
পরিত্যাগ করিতে পারেন ? সুখময় সরলপথ ছাড়িয়া কোন্
ব্যক্তি কণ্টকাকীর্ণ পথে পদার্পণ করে ? শত যত্নেও মন্সুরের
মানসিক গতি আর ফিরিল না; সুহৃদ্বর্গের উপদেশ উপে-
ক্ষিত হইল। তিনি উপহাসব্যঞ্জক উচ্চ হাত করিয়া গম্ভীয়-
ভাবে কহিলেন, “আমার আবার জীবনের আশা কিসের ?
আমার কি জীবন আছে ? আমি ত ইতিপূর্বেই জীবন
বিসর্জন দিয়াছি। আমি যে মৃত! মৃতের কি পার্থিব ভয়
বা স্বালাযন্ত্রণা আছে ? না কখন হইতে পারে ? অথবা যদি
জীবন থাকে, তবে তাহা ত অতি তুচ্ছ পদার্থ ! যাহা এই
আছে, পর মুহূর্তে নাই, সে পার্থিব ক্ষণস্থায়ী জীবনের মূল্যই
বা কত? সামান্য কাচখণ্ডের বিনিময়েও ত তাহা ক্রয়
করিতে পারা যায় না। সেই অকিঞ্চিৎকর পদার্থের অল্প
আবার ভয় কি ? তাহার মমতা যত্নই বা কি জন্য?”
ইহাই বলিয়া ধৰ্ম্ম-মদমত্ত মসুর উৰ্দ্ধমুখে চাহিয়া পুনঃ পুনঃ
‘‘আনাল হক” স্বরে চীৎকার করিয়া উঠিলেন।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ। মহর্ষি মসুরের ধৰ্ম্মোন্মত্ততার বিষয় পুস্তকান্তরে অন্যরূপ বর্ণিত হইয়াছে। আমাদের পাঠকগণের অবগতির জন্য সেই কৌতুফাবহ ঘটনাটীও এস্থলে গৃহীত হইল। ইহাঁ ভারতীয় সাধকবৃন্দের শিরােভূষণ ও তত্ত্ব-জ্ঞানের সমুজ্জ্বল সুৰ্য স্বরূপ মহিমার্ণব সিদ্ধ পুরুষ হজরত খাজা কোতব- উদ্দীন বক্তিয়ার কাকী সাহেবের কথা; সুতরাং মূল্যবান্ ও সারগর্ভ, তাহাতে সন্দেহ নাই। তিনি এক তাপস-সভায় নিগুঢ় ধর্মতত্বের প্রসঙ্গক্রমে এইরূপ প্রকাশ করেন যে, মহর্ষি হােসেন মন্সুরের এক ধর্মপরায়ণা জ্যেষ্ঠ সহােদরা ছিলেন। তিনি নির্জনে অনন্যমনে যােগ-সাধনের নিমিত্ত নিত্য নিশীথ সময়ে নগরবহির্ভাগে এক নিবিড় অরণ্যে গমন করিতেন এবং যথাস্থানে উপবিষ্ট হইয়া ভক্তিপূর্ণ- হৃদয়ে নিরাময় নিখিলনাথের ধ্যান-ধারণায় নিমগ্ন হইতেন। ইহাই তাহার তপস্যার নিয়ম ছিল। উপাসনাক্তে যখন তাহার প্রত্যাবর্তনের সময় উপস্থিত হইত, তখন দৈব আজ্ঞাক্রমে নিয়ােজিত এক স্বর্গীয় দূত সুনির্মল সুন্নিগ্ধ ঐশিক প্রেমামৃত- পূর্ণ এক সুদৃশ্য পানপাত্র হতে লইয়া তথায় শুভাগমন
তৃতীয় পরিচ্ছেদ।
৩
=======
করিতেন এবং পুণ্যবতী রমণীকে অভিবাদনপূর্বক অর্পণ
করিতেন। তিনি হস্তপ্রসারণপূর্বক পাত্র গ্রহণ করিয়া,
প্রফুল্লৰদনে সেই দিব্য সুধা পান করতঃ গৃহাভিমুখিনী
হইতেন।
এই গােপনীয় ঘটনার আভাসমাত্র কোনক্রমে মনসুরের
কর্ণগােচর হয়। প্রতিদিন নিশীথ সময়ে শয্যাত্যাগ করিয়া
ভগিনী গুপ্তভাবে কোথায় গমন করেন ? তপস্যার জন্য ?
অথবা কি কারণে? এ রহস্য অবগত হইবার নিমিত্ত তাহার
অন্তরে অতীব ঔৎসুক্য ও উদ্বিগ্ন জন্মিল। তিনি নিদ্রিতের
ভাণে জাগরিত থাকিয়া বিশেষ সাবধানতার সহিত সতৃষ্ণ
নয়নে ভগিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করিতে লাগিলেন।
অতঃপর একদা সুযােগ উপস্থিত হইল। তাহার ভগিনী
নিয়মিত সময়ে সকলের অজ্ঞাতসারে গাত্রোখান করিয়া
নিন্তভাবে গন্তব্য স্থানাভিমুখে চলিলেন। অমনি মনসুরও
গুপ্তভাবে নিঃশব্দ পদক্ষেপে অতি সন্তর্পণে তাহার অনুসরণে
প্রবৃত্ত হইলেন।
অগ্রে ভগিনী, পশ্চাৎ ভ্রাতা—উভয়ে নিশার নিস্তব্ধতার
মধ্য দিয়া চলিতেছেন, কেহ কাহার গােচরীভূত হইতেছেন
।
মে নগরের নভস্পর্শী অট্টালিকারাজি
এর অতিক্রম করিয়া একটা নিবিড় অরণ্যের সম্মুখে
এক বিস্তীর্ণ
২৪ মহর্ষি মসুর । উপস্থিত। কুত্রাপি জন প্রাণী নাই, প্রকৃতি মৌনব্রত অব- লম্বন করিয়া শান্তিসুখে বিশ্রাম করিতেছেন, আকাশে আজ চন্দ্র অদৃশ্য ; কিন্তু লক্ষ লক্ষ তারকা প্রস্ফুটিত পুষ্পের ন্যায় আপনাদের ক্ষীণ রজতরশ্মি বিতরণ করিয়া নৈশ তমিশ্রের তরলতা সম্পাদন করিয়াছে। এহেন সময়ে এই দুর্গম স্থানে সরলা কুলমহিলা একাকিনী-এক দিন নহে, প্রত্যহ একা- কিনী আগমন করেন। কি ভয়ানক কাৰ্য্য, ইহা প্রকৃতই দুঃসাহসের কাৰ্য। অন্তঃপুরবাসিনী কোমলহৃদয় কুলাঙ্গনার স্বভাবে একাৰ্য্য কখনই শােভা পায় না। মন্সুর চিন্তাকুল- চিত্তে ইহাই ভাবিতেছেন। তঁাহার ভগিনী কিন্তু স্বীয় কার্যে অগ্রসর; তিনি বৃক্ষশ্রেণী-সমাকীর্ণ এক সংকীর্ণ পথ দিয়া অরণ্যের অভ্যন্তরভাগে প্রবেশ করিলেন এবং এক বৃক্ষতলে লতাপল্লব-রচিত আসনে উপবিষ্ট হইয়া একাগ্রচিত্তে গভীর তপস্যায় নিমগ্ন হইলেন। স্থানটী অতি মনােরম ! চতুর্দিকে ঘন সন্নিবেশিত তরু গুল্ম প্রাকৃতিক প্রাচীররূপে বিরাজিত, মধ্যস্থলে একটা বৃহৎ বিটপী ঘনপল্লববিশিষ্ট শাখা-প্রশাখা বিস্তার করিয়া দণ্ডায়মান ; বৃক্ষের নিম্নভাগ সমতল—সুন্দর—পরিষ্কৃত পরিচ্ছন্ন ! যেন মূর্তিমতী পবিত্রতা ও স্বর্গীয় মাধুর্যে স্থানী পরিব্যাপ্ত হইয়া রহিয়াছে। ফলতঃ ইহা সাধনার উপযুক্ত তৃতীয় পরিচ্ছেদ। ৫ আশ্রম বটে। এখানে আসি । মন্সুরের ভক্তিনদী স্বতঃই উচ্ছলিত হইয়া উঠিল। তিনি কৃতজ্ঞ-হৃদয়ে মহিমাময় মহীশ্বরের উদ্দেশে প্রণিপাত পূৰ্ব্বক প্রেমা বর্ষণ করিলেন এবং ধৰ্ম্মশীলা ভগিনীকে শত শত ধন্যবাদ প্রদানানন্তর তাহার শেষ কাৰ্যকলাপ দর্শনেচ্ছায় কিঞ্চিৎ দুরে লতাগুল্মের অন্তরালে প্রচ্ছন্ন ভাবে উপবেশন করিয়া রহিলেন। তপস্বিনী তপােমগ্না-বাহ্য জ্ঞান-বিরহিতা। তিনি বিশ্ব- বিধাতার ধ্যান-ধারণায় দেহপ্রাণ ঢালিয়া দিয়াছেন। নীরব-- নিস্পন্দ! যেন প্রস্তর-প্রতিমার ন্যায় যোগােপবিষ্টা। যােগ শত বজ পাতেও ভঙ্গ হইবার নহে। আহা কি অলৌকিক-- কি অনির্বচনীয় তপশ্চাণ। ধন্যা রমণী !! ধন্য তাহার হৃদয়- বল !! তখন মন্সুর বুঝিলেন, তাহার ভগিনী সামান্য রমণী নহেন। এই অবস্থায় যামিনীর যাত্ৰয় অলক্ষ্যে অতিবাহিত হইয়া গেল। রমণী যথাকালে কঠোর সাধন-সমাধি ভঙ্গ করিয়া গাত্রোখান করিলেন। তিনি দণ্ডায়মান হইবামাত্র সহসা কি এক অপূর্ব স্বর্গীয় সৌরভে চতুর্দিক আমােদিত হইয়া উঠিল ; পরক্ষণেই এক শুভ্রকান্তি দেব-দুতের আবির্ভাব !. দূতবরের হস্তে পানপাত্র-উজ্জল অমিয়পূর্ণ ; তাহা হইতে সুরম্য সৌরভ মনোপ্রাণ মাতাইয়া বহির্গত হইতেছে। শুদ্ধচারিণী শীল। } মহর্ষি মনসুর। মহিলা অতি যত্নে পাত্ৰ গ্ৰহণানন্তর ভক্তি-গদগদচিত্তে তাহাতে শ্রমুখ সংযুক্ত করিয়াপান করিতে আরম্ভ করিলেন। মনী মসুর অন্তরালে থাকিয়া সমস্ত দেখিতেছেন ; দেখিয়া বুঝিলেন, পাত্ৰন্থ পানীয় অপার্থিব, দৈব-প্রেরিত ও দৈবগুণ- সম্পন্ন, সন্দেহ নাই। যাহার ভাগ্য সুপ্রসন্ন, যে অস্থি-মাংস- মজ্জা-রক্ত-গঠিত মানব স্যায়-নিষ্ঠাসদাচার-বলে বলীয়ান, স্বয়ং করুণাময় বিশ্বপতি যাহার প্রতি সন্তুষ্ট; তিনিই এই দেবদুর্লভ পবিত্র গামৃত পানের অধিকারী। আহা পুণ্যকর্মফলে যখন আমার স্নেহময়ী ভগিনী সেই অমৃত-ভাণ্ড প্রাপ্ত হইয়া পান করিতেছেন এবং ভাগ্যক্রমে আমিও নিকটে উপস্থিত আছি, তখন আমার ঐ জগৎলােভন অমূল্য পদার্থের অংশ গ্রহণ করা অবকর্তব্য। এ শুভ সুযােগ পরিত্যাগ করা কোন ক্রমেই উচিত নহে। ইহাই স্থির করিয়া তিনি উচ্চকণ্ঠে বিনয়- নম্রতার সহিত “ভগিনি! ক্ষান্ত হউন, সমুদয় পান করিবেন , আমাকে কিঞ্চিৎ দিবেন” ইত্যাদি বলিতে বলিতে দৌড়িতে আরম্ভ করিলেন। অকস্মাৎ এ কাহার কণ্ঠস্বর ! কে এ গভীর নিশিতে এ নির্জন প্রদেশে আসি? রমণী চকিত ও বিস্মিত হইয়া পান-পাত্র হইতে মুখ তুলিয়া ফিরিয়া দেখেন, মসুর। মসুর! কিরূপে কখন এখানে আসিল মন্নুর !! কেমনে সে এ সংবাদ তৃতীয় পরিচ্ছেদ। ২৭ জানিতে পারিল ! হায় হায়, তবে ত সে আমার গুপ্তসাধন- ক্রিয়া সমস্তই জানিতে পারিয়াছে। সাধের যড়ষন্ত্র ভাদিয়া গিয়াছে! অহহা অদৃষ্ট! এত দিনে আমার সমুদয় পরিশ্রমই পণ্ড হইল! পুণ্যময়ী রমণী অপূর্ণ-নয়নে ঈদৃশ অনুশােচ- নার সহিত ভ্রাতার মুখের দিকে চাহিয়া মৃদুস্বরে কহিলেন, ‘মর! আসিয়াছ? উত্তম। পান করিবে, কর। কিন্তু ভাই! এ পানীয়ের জ্বালাময় প্রভাব তােমার ক্ষুদ্র প্রাণ সহ করিতে পারিবে না”। মসুর এ কথায় কর্ণপাত না করিয়া ব্যগ্রতার সহিত হস্তপ্রসারণ পূর্বক পান-পত্র গ্রহণ করিলেন, এবং ভগিনীর পানাবশিষ্ট যে অতি সামান্য পানীয় ছিল, তাহাই ভক্তিভাবে ব্যস্ততার সহিত পান করিলেন। কি আশ্চৰ্য্য । পরক্ষণেই ভগিনীর ভবিষ্যৎ বাণী সফল হইল। পান করিয়াই মসুর উদভ্রান্ত-বিভােয়-আত্মহারা হইলেন; এবং বিস্ফারিত-লােচনে উর্ধদিকে দৃষ্টিপাত করিয়া বলিতে আরম্ভ করিলেন “আনাল হক।” চুপ চুপ, চুপ-মন্সুর স্থির হও; তােমার কি হিতাহিত জ্ঞান নাই !! ও কথা মুখাগ্রে আর আনিও না। কিন্তু হায়, এ অনুযােগ অনুরােধ কোনও ফলােপধায়ক হইল না। তদর্শনে চাকুশীলা তপস্বিনী বাণবিয়া হরিণীর ন্যায় - হতাশ ছাড়িয়া ব্যথিত হৃদয়ে ক্রন্দন করিতে লাগিলেন। ;
২৮ মহর্ষি মন্সুর। নসুরকে কহিলেন, “রে অবােধ! রে সংকীর্ণচেতা! আমি কি বলি নাই, তুমি এ তেজঃ সহ্য করিতে পারিবে না ! তুমি যে কেবল আমার ধর্ম ব্রত পালনের পথে কন্টক স্থাপন করিয়াই ক্ষান্ত হইলে, তাহা নহে, আমার জীবনের মহৎ উদ্দেশ্য নষ্ট করিলে। আরও আমি দিব্য চক্ষে দেখিতেছি, তুমি অতঃপর আত্মসম্মান নষ্ট করিবে, কলক্ষিত হইবে এবং আমাকেও সেই কলঙ্কের অংশ-ভাগিনী করিবে।” ইহাই বলিয়া সেই তেজস্বিনী রমণী চঞ্চল চরণে আলয়াভিমুখে প্রস্থান করিলেন। দেবদূত ইত্যগ্ৰেই অদৃশ্য হইয়াছিলেন। মসুর উন্মত্ত ! সেই অবস্থায় “আনাল হকৃ” বলিতে বলিতে প্রত্যুষসময়ে জনাকীর্ণ মহানগর বােদদে প্রবিষ্ট হইলেন। * এক্ষণে পাঠক! বিবেচনা করুন, ঘটনাট্য কি ? এই রমণী যে বিশুদ্ধ- চরিত্র ও ধৰ্ম্মানুরাগিণী তাহাতে আর সংশয় নাই। ইনি, নির্জনে যােগ সাধনে।দ্দেশে এই নিভৃত স্থানে নিত্য আসিতেন, তাহা ত আপনি বুঝিতে পারিলেন। কিন্তু এই শুভ্রকান্তি দেবদূত কে? আর তাহার হস্তস্থিত পান- পাত্রই বা কি? জনৈক সূক্ষ্মদর্শী ব্যক্তি বলেন, এই দেবদূত নামে বর্ণিত সাধু পুরুষ রমণীর দীক্ষাগুরু, তিনি অতি প্রাচীন ও উজ্জ্বল গৌরবর্ণ, তদীয় খেত ও খেত কেশরাশিতে তাহার সর্বাঙ্গ যেন সুধা-ধবলিত সৌন্দর্য্যে পর্যবেশিত হইয়াছে। আজ সেই পাত্র ? তাহা তাঁহার অমৃয়মান তত্ত্বজ্ঞান ভাণ্ডার ব্যতীত কিছুই নহে।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ। এক্ষণে একটী কথা—মহষি মন্সুরের উন্মত্ততার পরি- নাম-ফল পরবর্তী পরিচ্ছেদসমূহে বর্ণিত হইয়াছে। মহর্ষির ভগিনীর সহিত তাহার পরিণাম ঘটনার দুই একটা বিষয়ের সংশ্রব আছে। কিন্তু তাহা যথাস্থানে উল্লেখ করার আবশ্য- ক তা বিবেচিত হয় নাই। ফলতঃ সেই ঘটনা যে তদীয় সহৃদয় সহােদরার মাহাত্মপ্রকাশক, তদ্বিষয়ে সন্দেহ নাই। তাই ( অপ্রাসঙ্গিক হইলেও) এস্থলে সেই শেষের একটী ঘটনার কথা অগ্রে বলিতে বাধ্য হইলাম। কথিত আছে, মহষির দেহাবসানের অব্যবহিত পরে কতিপয় ব্যক্তি তাহার প্রশংসা-কাৰ্তন করিয়া কহেন, “মন্ সুর এমনি তেজস্বী সাধু পুরুষ ছিলেন যে, আপনি যাহা সত্য বলিয়া অবধারণ করিয়াছিলেন, প্রাণ বিসর্জন করিলেন, তথাপি সহস্র পীড়নেও, তাহা হইতে বিচ্যুত হইলেন না।” তঁাহার ভগিনী এই কথা শুনিয়া ঈষৎ হাস্যের সহিত সদুঃখে কহিয়াছিলেন, “তােমরা নিতান্ত ভ্রান্ত! আমার ভ্রাতা যদি পুরুষ হইত, যদি তাহার কিঞ্চিৎ পৌরুষ থাকিত, তাহা হইলে পাত্র লেহন করিয়া খাইয়া কি উন্মত্ত হইত? পুর্ণ পাত্র পানেও সে অবিচলিত—স্থির—ধীরভাবে থাকিত। আমি তাহাকে পুরুষ বলিয়া গণ্য করি না।” ইহাই বলি। অতঃপর উত্তেজনার বশে বলিয়া ফেলিলেন, “আজ বিংশতি ।
মহর্ষি মনসুর। বর্ষ হইতে চলিল, আমি প্রত্যেক রজনীতে এই দৈব প্রেম- মৃত পূর্ণ মাত্রার পান করিয়া আসিতেছি, কিন্তু কৈ, কখন মুহূর্তের জন্যও ত বিচলিত হই নাই। আমার রসনা অবাধ্য হইয়া কখন ত অন্যায়াচরণ করে নাই !! বরং নিয়ত নম্রতার সহিত প্রার্থনা করিয়াছে, হে দয়াময় প্রভাে। এতদপেক্ষা অধিকতর উন্নতি-মার্গে আমাকে আকর্ষণ করুন।” প্রিয় পাঠক! দেখুন কি তেজস্বিতা। দেখুন কি তেজস্বিতা। কি অপূর্ব নারী- হৃদয়ের বল ! কি অলৌকিক সাধন-সহিষ্ণুতা ! ইনি কি মানবী ? না দেবী? কে না বলিবে ইনি মানবী-আকাকে মধামে বৰণীয়া দেবী ছিলেন। ফলতঃ তত্বদশী, পরিশুদ্ধ প্রেমােন্মত্ত মহর্ষি মনসুর অপেক্ষাও যে এই তপস্তেজা-শালিনী অমরাঙ্গণার তপশ্চারণ উচ্চতর ভিত্তির উপরে প্রতিষ্ঠিত ছিল, তাহাতে আর সন্দেহ নাই।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
মন্সুরের ইসলামধৰ্ম্মবিগর্হিত অন্যায় উক্তি, ধৰ্ম্মতী
মুসলমান জনসাধারণের হৃদয়ে যেন সুতী শেল বিদ্ধ
করিতে লাগিল। তাহারা সাতিশয় উত্ত্যক্ত ও মর্মাহত হইয়া
তাহার বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হইলেন। অনেকে তাহার প্রাণ
সংহার করিতে কৃতসঙ্কল্প হইলেন। সেই মুহূর্তেই মনসুরের
মস্তক দেহ হইতে অসিপ্রহারে বিচ্ছিন্ন করিয়া ফেলে, ইহাই
অনেক অসহিষ্ণু ব্যক্তির অভিপ্রায়। ধর্মযাজকগণ মসুরের
অবৈধ আচরণের কথা শ্রবণ করিয়া বিষম বিরক্তিসহকাকে
বদনমণ্ডল বিকৃত পূৰ্ব্বক কর্ণে হার্পণ করিলেন। কিন্তু
অলৌকিক ক্ষমতাশালী ধৈৰ্য্যশীল সিদ্ধপুরুষ মন্সুয় তাহাতেও
বিচলিত হইলেন না।
“হায় হায় মসুরের কি হইল, আহা, কেন তার এ
কুমতি ঘটিল” এবংবিধ বাক্যে অগণ্য লােক অনুশােচনা
করিতে লাগিলেন। বহুসংখ্যক দয়ার্ক ব্যক্তি সমবেত হইয়া
মন্সুরকে সানুনয়ে কহিলেন, “আপনাকে আমাদের একটা
অনুরােধ রক্ষা করিতে হইবে। আপনি 'আনাল হক
মহর্ষি মনসুর। শব্দের পরিবর্তে “হু অল্ হ” * বলিতে থাকুন। বােধ হয়, আমাদের এই অনুরােধের কারণ আর আপনাকে বুঝাইয়া দিতে হইবে না। আপনি স্বয়ং শাস্ত্রজ্ঞ ও জ্ঞান-গরীয়ান ; অবশ্যই ইহার গূঢ় মৰ্ম্ম হৃদয়ঙ্গম করিয়াছেন।” মহষি এত- শ্রবণে মৃদুগম্ভীরভাবে উত্তর করিলেন, “ই, সমুদয়ই বুঝিতে পাৰিয়াছি, আমি দুগ্ধপােয় শিশু নহি ; অনুপন দাতা ও দয়ালু আল্লার অসীম অনুগ্রহে বুঝিবার শক্তি আমার আছে । সত্য বটে, তিনিই ঈশ্বর-সমুদয়ই তিনি। তিনি সৰ্ব্বময়, তিনি বিশ্বব্যাপী, তিনি সৰ্ব্বস্থানে সৰ্ব্বসময়েই বিদ্যমান ছিলেন,-আছেন ও থাকিবেন। নগর ভিতরে, বিজন কান্তারে, জন-প্রাণী-হীন মরুভূমাঝারে, উচ-গিরি-শিরে, নীল সিন্ধু-নীরে, সুখদ আলােকে, দুঃখদ তিমিরে, নরের অগম্য পৰ্বত-গুহায়, বাপ্পি-জড়িত জলদ-মালায়, আকাশে, পাতালে, অনিলে, অনলে, সুদূর সুমেরু কুমেরু মণ্ডলে, হ অ হক্” অর্থাৎ তিনিই ঈশ্বর।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
গােলাপী-অধরা উষার ললাটে,
স্তিমিত-নয়ন প্রদোষের পাটে,
ফল, ফুল, তরু, লতায়, পাতায়,
ফুলের সৌরভে, ফল-স্বাদুতায়,
অমৃতে গরলে, জলের কল্লোলে,
পাবক-শিখায়, পবন-হিল্লোলে,
সমুজ্জল ছবি রবির প্রভায়,
চাদের কিরণে, রম্য তারকায়,
সংহার-মূরতি সমর প্রাঙ্গনে,
কেলি-লীলাভূমি প্রমোদ-কাননে,
সূক্ষ্ম বালুকণ, মানবের মনে,
দীনের কুটীরে, রাজার ভবনে,
তােমাতে, আমাতে, ধনী, বিত্তহীনে,
পতঙ্গ, কীটাণু, পশু পক্ষী মীনে,
আরাে আছে যত, নাম কব কত ?
সব তাতে তার বিরায় সহ !!
আহা! তিনি সকল স্থানেই সকল, সময়েই সমভাবে
বিরাজিত রহিয়াছেন। কিন্তু কি আশ্চর্য! আমি তােমাদের
কথায় বুঝিতেছি, তিনি যেন কোন সুদুর অপরিত স্থানে
অবস্থান করিতেছেন। আমরা খুঁজিয়া খুলিয়া পরিস্ক ও
৩৪ মহর্ষি মন্সুর। অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছি; তবুও তাহার দর্শন মিলিতেছে না, সে হারান ধনের—সে অমূল্য রত্নের উদ্দেশ পাইতেছি না। এ কি অদ্ভুত কথা ! কি অযৌক্তিক প্রলাপ বচন ! কি ভয়ানক ভ্রান্তি !! চক্ষুষ্মন্ বিবেকী ব্যক্তি, কখন কি একথা বলিতে সাহস করে? ভ্রাতৃগণ ! তিনি কি হারাইবার সামগ্রী ? ঐ দেখ দেখ, যদি নয়ন থাকে, উন্মীলন করিয়া দেখ, অপরূপ বিরাটরূপে নয়ন-মন বিমােহিত করিয়া তিনি চতুর্দিকেই বিরাজিত রহিয়াছেন। চন্দ্র, সূৰ্য্য ও অসংখ্য গ্রহনক্ষত্রাদির আধার অনন্ত আকাশ কি ক্ষুদ্র নেত্রের অন্তরালে ঢাকা যাইতে পারে? বিস্তীর্ণ মহাবারিধির লয় নাই, তাহা চির- দিনই সমভাবে বর্তমান। বরং আমি,-সামান্য জলবু,মাত্র, তন্মধ্যে পড়িয়া কোথায় বিলীন হইয়া গিয়াছি। আমার চিহ্ন বা সার লেশমাত্র নাই। হায়, আমার আমিত্ব কোথায় ?” ইহা বলিয়া তিনি নীরব হইলেন। তখন অনু- রােধকারী বাক্তিগণের মনে আরও ক্রোধের সঞ্চার হইল। তাঁহারা ইহার প্রতিকার-প্রত্যাশায় উপায় অন্বেষণ করিতে লাগিলেন। অনন্তর ইসলামের প্রকাশ্য ক্রিয়াশীল সেই ব্যক্তি, ধর্মোপদেশক পণ্ডিতদিগের নিকটে যাইয়া এই ব্যাপার জ্ঞাপন করিলেন। ধর্মানুরাগী পণ্ডিতমণ্ডলী তৎশ্রবণে চতুর্থ পরিচ্ছেদ। সাতিশয় চমকিত হইয়া নানাপ্রকার বাদানুবাদ ও অনুশােনা করিতে লাগিলেন। অনন্তর তাহারা একত্রিত হইয়া ধর্ম- প্রতিনিধি খলিফার সমীপে যাইয়া উপস্থিত হইলেন এবং নিতান্ত মর্মাহত হইয়া বিষন্ন বদনে মসুরের বৃত্তান্ত যথাযথ বিবৃত করিলেন । ইলাম-ধৰ্ম্মকে অক্ষুন্নরূপে প্রতিষ্ঠিত রাখিতে হইলে ঈদৃশ ধর্মদ্রোহীর শিরচ্ছেদন করাই উচিত, একথাও তঁাহারা সাগ্রহে প্রকাশ করিলেন। তৎকালে যিনি মহামান্য খলিফার সিংহাসন অলত করিয়াছিলেন, তিনি এক জন কর্তব্যপরায়ণ ধর্ম ভীরু ব্যক্তি। পবিত্র শরিয়ত । বহির্ভূত কোনও কাৰ্য্য দেখিলে তিনি কাহাকেও মার্জনা করিবার পাত্র ছিলেন না। তিনি ন্যায়ের তুলাদণ্ড ধরিয়া দোষীর দণ্ডবিধান ও নির্দোষ ব্যক্তিকে মুক্তি প্রদান করি- তেন। তিনি মন্সুয়ের অধৰ্ম্মোক্তির বিষয় অবগত হইয়া, প্রথ- মত “পাপ পাপ” বলিয়া ম্লানমুখে কর্ণকুহরে হাৰ্পণ করিলেন। পরে প্রধােবদনে নীরব হইয়া কি এক গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হইলেন; কাহাকেও কিছু কহিলেন না। এইরূপে বহু- ক্ষণ অতীত হইল দেখিয়া আগন্তুকগণ তাঞ্জলিপুটে নিৰে- দন করিলেন, “ইসলাম-সমাজপতে। আপনাকে নিস্তব্ধ দেখিয়া * শরিয়ত বা শরাহম্মদীয় শাস্ত্র অর্থাং কোরাণ শরিফ, হাদিস শরিফ না এবং কেয়াল।
মহর্ষি মসুর।
আমরা ভীত ও বিচলিত হইয়াছি। শাস্ত্রানুমােদিত শুভ
কাৰ্য্য পরিপালনার্থ প্লপ-প্রতিকারে নিশ্চেষ্ট থাকার কারণ
ত কিছুই বুঝিতে পারি না? যদি পবিত্র “শরিয়ত” অক্ষুন্ন
রাখিতে চান, যদি ধাবমাননার প্রতিবিধান করিতে চান,
দুষ্টের দমন যদি যুক্তিসঙ্গত বিবেচনা করেন, তবে আর
কালবিলম্ব না করিয়া এ বিষয়ের কর্তব্য নির্ধারণ করুন।
আপনি ধৰ্ম্মের রক্ষক এবং আমাদের প্রতিপালক, আপনি
বৈধ ব্যাপারে শৈথিল্য বা ঔদাসীন্য প্রকাশ করিলে নির্মল
ইলাম-ধৰ্ম্মে কলঙ্ক-কালিমা প্রক্ষিপ্ত হইবে, একেশ্বরবাদের
গৌরবােয়ত মন্তক, এবং আমাদের উজ্জ্বল মুখ এই নিদারুণ
ধৰ্ম্মবমাননায় নিষ্প্রভ হইবে। ক্ষুদ্র আমরা, ইহা ব্যতীত
আপনাকে আমাদের আর কি অধিক বলিবার ক্ষমতা আছে,
প্রছো?” প্রজারঞ্জক খলিফা নীরবে সমস্তই শুনিলেন।
বুঝিলেন তাহাদের মৰ্ম্মে কি অসহনীয় ভীষণ আঘাত লাগি-
গাছে। পরন্তু সাধারণের অভিপ্রায় এবং মসুরের পরিণাম,
এই উভয় দিক ভাবিয়া সেই আঘাতের প্রতিঘাত তিনি
আপনিও অনুভব করিলেন। তাই তিনি স্থির ধীর নীরব
গম্ভীর ভাব ধারণ করিয়াছিলেন। কিন্তু কি করবেন,
অবশেষে অনেক চিন্তার পর, এই প্রকাশ পাপের প্রায়
ক্তি-ব্যবস্থা করা সর্বাগ্রে কর্তব্য বিবেচনা করিয়া,
চতুর্থ পরিচ্ছেদ। চিত্তে মন্সুরকে কারাগারে বন্দী করিবার অনুমতি প্রদান করিলেন। অহাে কি আক্ষেপ ! কি ঘাের যাতনা! খলিফার অনুজ্ঞামাত্র ধর্মপ্রাণ মসুর রাজপুরুষগণ কর্তৃক ধৃত হইয়া কষ্টময় কারাগৃহে বন্দী হইলেন। অমনি দরবারে মহা কোলাহল উপস্থিত হইল; বােগদাদের ঘরে ঘরে আন্দোলন- স্রোত চলিল ; মন্সুরের দুঃথে কেহ হৃষ্ট, কেহ কষ্টকেহ বা নীরবে অশ্রুমােচনে নিরত হইল। জনৈক গ্রন্থকার আপন গ্রন্থমধ্যে এইরূপ লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন যে, যখন রাজপুরুষগণ মহষিকে ধৃত করিয়া কারা- গারাভিমুখে লইয়া যাইতেছিলেন, সেই সময়ে এক অজ্ঞ ব্যক্তি অবজ্ঞার সহিত উপহাস করিয়া উচ্চৈঃস্বরে মরকে কহে “ওহে সাধু! তুমি যদি সাধনার বলে প্রকৃত সি- পুর হইয়া থাক, তবে আজ তােমার এ ভয়ানক দুর্গতি দেখিতেছি কেন? তােমার সেই পােবল কি এই সামান্য সৈন্যবলের নিকট পরাভূত হইল? দুর্দান্ত শার্দল-সংগ্রামে ভীপ্রকৃতি অজেয় জয়! এ অতি আশ্চৰ্য্য ও বিড়ম্বনা দেখিতেছি। হায় ভণ্ড যােগি ! যদি ভুমি বাস্তবিকই সাধক হইতে, যদি তােমার অণুমাত্র সাধনার বল থাকিত, তাহা হইলে শতসহ বিবিপত্তি অতিক্রম করিয়াও আর এই কষ্টকর বন্ধন-যন্ত্রণা হইতে অবলীলাক্রমে আত্মরক্ষণে সমর্থ মহর্ষি মনসুর। হইতে। অহাে ! যে অদূরদর্শী ব্যক্তি ছলনার ছদ্মবেশে দেহাবৃত করিয়া ও ধর্মের ভাণ করিয়া অধৰ্ম্মের সঞ্চয় করে এবং তন্ধেতু পরিশেষে আপনি ঘোর বিপদে পতিত হয়, এ জগতে তাহার অপেক্ষা অধিক অর্বাচীন ব্যক্তি আর কে আছে ?” মহর্ষির কর্ণকুহরে এই বিদ্ধপসূচক কটুক্তি সুতীক্ষ্ণ শেলের ন্যায় প্রবেশ করিল। মূর্থের কর্কশ বাক্যে চাঞ্চল্য প্রকাশ করা অনুচিত জানিলেও, তিনি কেবল তাহাকে অপ্রতিভ কণার্থ শ্রবণমাত্র তন্মুহূর্তে সেই সশস্ত্র রাজ-প্রহরী-বেষ্টিত ও নাগরিকগণের জনতার মধ্যস্থলে থাকিয়া শত-সহস্র সতর্ক নেত্রে ধাধা লাগাইয়া, সহ যে কোথায় অন্তর্হিত হইয়া গেলেন, তাহা কেহ অনুভব করিতেও পারিল না। তখন রাজকিঙ্করগণ ও জনসাধারণ সকলেই বজ্রাহতের ন্যায় ব্যক্তিত, বিস্মিত ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া নীরবে পরস্পরের বদন নিরীক্ষণ করিতে লাগিল। মুখে শব্দ নাই, নয়নে পলক নাই, হৃদয়ে শেণিত অচল, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ স্পন্দন-মুহিত, শক্তি-শূন্য- হিম! নাট্যশালা পট-পরিবর্তনের ন্যায় কি যেন এক ঐন্দ্রজালিক , অপূৰ্ব ব্যাপার সংঘটিত হইয়া গেল। ভাবিয়া কিছুই বুঝিবার উপায় নাই। কূটবুদ্ধি প্রহরিগণও এ ব্যাপারে ম্রিয়মাণসংজ্ঞাহারা। পরে তাহাদের কফি চৈতদের
A - -
এ ন -
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
হইলে, “হায় কি হইল, কোথায় গেল, কোথায় গেলে তাহাকে
পাইব, খলিফা শুনিলে কি বলিবেন, তাঁহার সম্মুখে কি উত্তর
করিব; হায় না জানি কি কঠোর শাস্তি গ্রহণ করিতে হইবে,
এত লােকের হস্ত হইতে পলায়ন! ছি ছি কি লজ্জার কথা,
কি অপমানের বিষয়, কি করিয়া রাজদরবারে এ পােড়া মুখ
দেখাইব? দেশদেশান্তরের লােক এ কথা শুনিলেই বা কি
বলিবে! হায় হায় এমন বিপদে কখন ত কেহ পড়ে নাই।
ইত্যাকার অনুতাপ-বাক্যে মহা হুলস্থূল বাধাইয়া দিল। কেহ
কিঞ্চিৎ মৌখিক সাহস করিয়া কহিল, “ওরে ভাই! ভাবিয়া
কি হইবে ; ভয়ই বা কি কিসের ? আমরা ত আর সাধ
করিয়া তাহাকে ছাড়িয়া দিই নাই। সে যে একটা ভয়ানক
মায়াবী, তাহা সকলেই জানিয়াছে ।
সকলেই জানিয়াছে ! মায়াবিদ্যা প্রবে
যাহার অদৃশ্য হইবার শক্তি আছে, তাহাকে আমরা কেন ?
জগতের যাবতীয় রাজশক্তি একত্রিত হইলেও সনে রাখিতে
পারে কি না সন্দেহ। অতএব সকলে চল, খলিফার দুজুরে
একথা জানাইগে। আর তিনিই কি ইহা অবগত নহেন।
অনেকের কিন্তু এই সাহসের উক্তিতে মন আকৃষ্ট হইল না ;
তাহারা হতাশ মলিন-মুখে মস্তুকে হাত দিয়া অবশাতে বসিয়া
পড়িল।
-- *
{FA4
কা
পঞ্চম পরিচ্ছেদ। বন্দী পলায়ন করিয়াছে। প্রহরিগণ ব্যস্ততার সহিত দিগে দিগে অনুসন্ধানে ফিরিতেছে, নগময় মহা-আন্দোলন- কোলাহল পড়িয়া গিয়াছে। কিন্তু কিরূপে কোন্ দিকে পলায়ন করিয়াছে, তাহা কেহই বলিতে পারে না। যাহাদের তত্বাবধানে তিনি যাইতেছিলেন, তাহারাও এই ছিল, এই নাই ব্যতীত আর কিছুই বলিতে পারে না। আপন আপন বুদ্ধির প্রাখৰ্যানুসারে কত জন কত কথার অবতারণা করিতেছে, কত কল্পনা-জল্পনা চলিতেছে। এদিকে সাধক- শ্রেষ্ঠ মনসুর দৈব-শক্তিপ্রভাবে অদৃশ্য হইয়া ভবনে আসিয়া উপস্থিত। তিনি পূর্বনিয়মানুসারে স্বীয় কর্তব্য প্রতিপালন করিয়া নিরাপদে নিরুদ্বেগে অবস্থান করিতে লাগিলেন। অনুসন্ধিৎসু জনগণ কেহই তাহার দর্শন পাইত । কিন্তু তিনি কখন কখন কোন কোন ব্যক্তির প্রতি সদয় হইয়া সাক্ষাৎ করিতেন ও প্রতিসম্ভাষণে আপ্যায়িত করিতেন। আর একটা আশ্চর্যের বিষয় এই যে, এই সময়ে দর্শনপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণের মধ্যে যিনি যে বস্তু তাঁহার নিকট প্রার্থনা করিতেন, তিনি তাহাই পাইতেন।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ।
বস্তু দুষ্প্রাপ্যই হউক, আর সুলভ লভ্যই হউক, তপােধন
হন্ত প্রসারণপূর্বক এই ধর” বলিয়া তপােবলে
সেই সেই দ্রব্য প্রদানে যাচকের সম্ভ্রম রক্ষা করিতেন,
তাহাতে অণুমাত্র বিলম্ব বা অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করিতেন
। আবার কখন তিনি লােক-লােচনের গােচরে আসিয়া
স্ব-ইচ্ছায় ধৃত হইয়া কারাগৃহে নীত হইতেন; কিন্তু আবার
পরক্ষণেই যােগবলে তথা হইতে অদৃশ্য হইয়া নিজ নিকেতনে
প্রস্থান করিতেন। এইরূপে তিনি ঐন্দ্রজালিকের মায়াবিদ্যার
ন্যায় বিবিধ প্রকার অত্যদ্ভুত কাৰ্য্য দ্বারা সকলকে বিস্ময়াভিভূত
করিতে লাগিলেন। সাধারণে তঁাহার এবংবিধ অলৌকিক
কাৰ্য-ক্ষমতা দেখিয়াও ঈর্ষাবশতঃ অপযশ ব্যতীত কেহই
তাহার প্রশংসা করিত না। এই অবস্থায় অনেক দিন
অতিবাহিত হইয়া গেল। মন্সুরের সম্বন্ধে আপামর সাধা-
রণের মধ্যে নিত্য নূতন নূতন বাদানুবাদ চলিতে লাগিল।
কাণ্ডজ্ঞানহীন মূর্খেরা মসুর শৃঙ্খলাবদ্ধ হইয়া বীভাবে
আছেন, ইহাই দৃঢ় বিশ্বাস করিল। কিন্তু তক্ত জ্ঞানী
ব্যক্তিরা ইহাতে মোনাবলম্বন করিয়া থাকিতেন।
একদা মহর্ষি বন্দী অবস্থায় কারাবাসে উপুনীত হইয়া
দেখেন, অসংখ্য বন্দী সুদৃঢ় লৌহশৃঙ্খলে
আবদ্ধ থাকিয়া
দুঃসহ যন্ত্রণা ভােগ করিতেছে। তদ্দর্শনে তাহার কোমল
মহর্ষি মনসুর। অন্তরে আঘাত লাগিল। তিনি দয়ার্দ্র হইয়া তাহাদের সেই ভীষণ কষ্টের উপশম করণার্থ চিন্তান্বিত হইলেন। অব- শেষে দিবা গতে রাত্রি উপস্থিত হইলে, তিনি প্রত্যেকের কারাবাসের কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। বন্দীবৃন্দ আপন আপন দুর্দশাৰ পূৰ্বঘটনার বর্ণনা করিলে পর, তপস্বীবর কহিলেন, “ভ্রাতৃগণ! আমি তােমাদিগকে এই মুহূর্তেই এই অসহ কারা-যন্ত্রণা হইতে মুক্তিপ্রদান করিতেছি। তােমরা আমার কথা শুন, এই নরকতুল্য অগম্য স্থান হইতে আপন আপন গৃহাভিমুখে প্রস্থান কর, ইহাতে আর কাল- বিলখ করিও না।” তখন বন্দীগণ কৃতাঞ্জলিপুটে কাতর- স্বরে কহিল, “মহাত্মন্ ! আমাদের এমন সৌভাগ্য কি হইবে ? আমরা কি স্ত্রী-পুত্র কন্যার মুখ দেখিয়া ইহ-জীবনে আবার কি আনন্দলাভ করিতে পারিব? আমাদের স্বাধীনতা- প্রাপ্তি যে নিশার স্বপ্নবৎ অলীক। এই দেখুন, আমাদের হস্ত-পদ লৌহ-শৃঙ্খলে দৃঢ়রূপে আবদ্ধ, পার্শ্বপরিবর্তন করি বা এক পদ অগ্রসর হই, আমাদের এরূপ সামর্থ্য নাই। সুতরাং ইহজীবনে আমাদের আর পরিত্রাণের আশা কোথায় আছে, বলুন দেখি? অহাে! সে আশা সুদূরপরাহত। তবে যদি আপনার আশীর্বাদে এই মন ভাগ্যদের প্রতি দৈব কখন অকুল হন, তাহা হইলে একথা এক দিন সম্ভব পঞ্চম পরিচ্ছেদ। ৪ হইলেও হইতে পারে। নতুবা আকাশের চন্দ্র-ধারণের ন্যায়, পর পৰ্বত উন্নজনের ন্যায় নিষ্ফল কল্পনা করিতে যাওয়া আমাদের পক্ষে আরও যন্ত্রণাদায়ক ও বিপজ্জনক বলিয়া জানিবেন।” বন্দীদিগের এবংবিধ কাতরােক্তি শুনিয়া দয়া- প্রবণ-হৃদয় মনুমুর আর স্থির থাকিতে পারিলেন না, তাহ- দের উদ্দেশে উৰ্দ্ধমুখে হস্তোত্তোলন করতঃ সজোরে আকর্ষণ করিয়া লইলেন। কি আশ্চর্য্য পােবল ! কি অপার্থিব ঈশ্বরানুরক্তি!! মহর্ষির পূত হত নিম্নমুখে যেই আকৃষ্ট হইল, অমনি কয়েদীদিগের হস্তপদ-নিবন্ধ শৃঙ্খলনিচয় খণ্ড বিখণ্ড হইয়া ঝনঝনায়মান শব্দ করত ভূতলে নিপতিত হইল। বন্দীগণ, হস্ত পদের বন্ধন বিমুক্ত ও নরকযন্ত্রণার অবসান হইল দেখিয়া, সোৎসাহে উঠিয়া মহর্ষির সম্মুখে দণ্ডায়মান হইল এবং সহর্ষে যুক্তফরে কহিল, “মহাভাগ ? করুণাময় এগংপাতার ইচ্ছার ও আপনার ঐকান্তিক যত্নে এবং আশীৰ্বাদে সংপ্রতি আমরা বন্ধন-যন্ত্রণা হইতে অব্যহতি লাভ করিলাম বটে, কিন্তু বলুন, কি উপায়ে এই ঘোর বিপদসঙ্কুল অন্ধ তমসাচ্ছন্ন পুরা হইতে প্রস্থান করি। অত্যুচ্চ নগরাঞ্জ সদৃশ দুর্ভেদ্য উন্নত প্রাচীরে কারাগার পরিবেষ্টিত, যমদূতাতি অসংখ্য ভীষণদর্শন সন্ত্র প্রহরী দিবারজনী চতুর্দিকে পরিভ্রমণ করিতেছে, লৌহ-বিনির্শ্বি প্রতি দৃঢ় ৪৪ মহর্ষি মনসুর। কট কঠিন কুলিশােপম তালা সমূহে আবদ্ধ। এতদ্ব্যতীত আরও বহুবিধ অন্তরায় রহিয়াছে। পিপীলিকা প্রবেশ করিতে পারে, এরূপ পথও এখানে নাই, তবে বলুন ত, আপনার এ মন্দভাগ্য ভৃত্যগণের কি এমন দৈব-শক্তি আছে, যৎপ্রভাবে তাহার নিরাপদে নিষ্ক্রান্ত হইয়া ঈপ্সিত স্থানে প্রস্থান করিতে পারে?”, এই খেদোক্তি শ্রবণ করিয়া তাপসপ্রবর স্বকীয় গ্রীবাদেশ উন্নত করিয়া, তীক্ষ দৃষ্টিতে একবার চতুঃপার্শ্বে নেত্ৰপাত করিলেন। তাহাতে মহর্ষি দৈবশক্তি-বলে কারাবাসের চতুর্দিকস্থ বিশাল ভিত্তিতে মানব- দেহ-প্রবেশােপযােগী সংখ্যাতীত গবাক্ষের সৃষ্টি হইল। তদর্শনে বন্দীগণের হৃদয় বিস্ময়-রসে আপ্লত, সর্বাঙ্গ রােমাঞ্চিত ও স্বেদা হইল—ভাবিয়া আকাশ পাতাল কিছুই স্থির করিতে পারিল না। অতঃপর তাহারা তপস্বীর * বর্ধমানের নব্য সমাজ ঈদৃশী ঘটনা বিশ্বাস করিতে ইতস্ততঃ করিতে পারেন বটে, কিন্তু অবিশ্বাস করিবারও কোন কারণ নাই। মনুষ। যােগবলে- সাধন-শক্তিতে অলৌকিক ক্ষমা প্রাপ্ত হইয়া কি না করিতে পারেন? অনুৰু সাধু দীর্ঘকাল মৃত্তিকামধ্যে প্রােথিত ছিলেন, শপথে প্রয়াণ, নদীর উপর দিয়া গমন করিয়াছিলেন, এ সকল একেবারে ভিত্তিশুন্য কথা নহে। পৃথিবীর সর্ব জাতীয়ের সাহিত্য-ইতিহাসে এৰংবিধ বহু ঘটনার উল্লেখ আছে, দেখিতে পাওয়া যায়।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ।
৪৫
ইঙ্গিতক্রমে সেই সদ্যসৃষ্ট গবাক্ষদ্বার দিয়া অলক্ষ্যে বহির্গত
হইয়া ইতস্তত বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িল, প্রহরীগণ তাহার
অণুমাত্রও অনুভব করিতে সমর্থ হইল না।
পর দিবস নিশাবসানে কারারক্ষকগণ বন্দীদিগের তত্ব
সইতে গিয়া কাহাকেও দেখিতে পাইল না ; তখন সকলেই
চমকিত, চিন্তিত ও ভয়াকুল হইল। ক্রমে এই বিস্ময়জনক
ঘটনা রাজপুরুষগণের কর্ণে উঠিল। কারাধ্যক্ষ, কারাগার
পরিদর্শন করিতে গিয়া দেখেন, কারাগৃহ নিস্তব্ধ ও নির্জন,
কারাবাসীর অস্তিত্ব পৰ্য্যন্ত বিলুপ্ত হইয়াছে। কেবল দেখিতে
'পাইলেন, মহাযােগী হােসেন মনসুর ধ্যানস্তিমিত-নেত্রে গম্ভীর
ভাবে এক প্রান্তে একাকী উপবিষ্ট আছেন। এতদ্ব্যতীত
কারা-প্রাচীরে অসংখ্য গবাক্ষর দৃষ্টি করিলেন। এই
সমস্ত অদ্ভুত কাণ্ড দর্শনে কারাধ্যক্ষ নিরতিশয় আশ্চর্য
জ্ঞান করিলেন। যুগপৎ হৰ, বিষাদ, বিস্ময় ও ভয় তাহার
অন্তরাত্মাকে সমাচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল,-সর্বাঙ্গ রােমাঞ্চিত
হইল। ক্ষণেক স্থিরদৃষ্টে এক দিকে চাহিয়া কি চিন্তা করি-
লেন। আহা কি অলৌকিক ক্ষমতা ! কি অমানুষিক
চমৎকারজনক কাৰ্য্য! এই অক্ষত ও অভূতপূর্ব অপার্থিব
ব্যাপার তপস্বীকুল-শিরােভূষণ মহাত্মা মন্সুর কর্তৃক সমা-
হিত হইয়াছে, ইহা নিশ্চয় আনিয়া তাহার হৃদয়ে বিশ্বয়-
মহর্ষি মসুর।
बादौ ७
সহ ভক্তির উদ্রেক হইল। আবার এক জন মহামনা
পবিত্র পুরুষকে পাপপঙ্কিল নিকৃষ্টচরিত্র দুর্জনদিগের সহিত
একত্রে কারাবদ্ধ করা হইয়াছে, সুতরাং তন্নিমিত্ত পরিবামে
পরমকারুণিক বিশ্বপাতার সমীপে না জানি কত অ
তাহ হইতে হইবে, ইহা ভাবিয়া নিমেষ মধ্যে গাঢ় কৃষ্ণ
বিষাদ-ৰারিদের সঞ্চারে তদীয় নির্মল চিত্তাকাশ মলিনমূর্তি
ধারণ করিল। তিনি কিয়ৎক্ষণ অপলকনেত্রে ললাটভাগ
কুঞ্চিত করিয়া বিরসবদনে নীরব রহিলেন। অতঃপর নিরীহ
কারাধ্যক্ষ মৃদুপদে মহষির নিকটবর্তী হইয়া অবনতমস্তকে
অভিবাদন পূৰ্ব্বক হস্তপদে চুম্বন প্রদান ও যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন
করিলেন এবং বিনয়নম্রবচনে শত শত সাধুবাদ প্রদানান্তর
গদগদ কণ্ঠে কহিলেন, “মহাভাগ! আমরা রাজাজ্ঞানুসারে
আপনার প্রতি যাদৃশ উৎপীড়ন করিয়াছি, তাহাতে আপনার
সমক্ষে পুনর্বার বাক্যস্ফুরণ করিতে সাহস হয় না। তথাপি
কর্তব্যের অনুরােধে নিল হইয়া একটা কথা জিজ্ঞাসা
করিতে অগ্রসর হইতেছি। আমি রাজ-কি, এই
বন্দীশালার তত্ত্বাবধানকাৰ্য্য আমার উপর ন্যস্ত আছে।
বন্দী-সম্বন্ধে কিঞ্চিৎও গােযােগ বা বিশ্ব ঘটিলে
আমাকে বিপন্ন হতে হয়। কিন্তু বর্তমানে যেরূপ
সট উপস্থিত, তাহাতে আমার জীবন-সংশয় নিশ্চয়,
T পঞ্চম পরিচ্ছেদ। ৪৭ ভাবিয়া আকুল হইয়াছি। সাধু-প্রবর! কেবল আপনার এই দীন দাসের জীবন গেলে দুঃখ ছিল না। বরং তাহাতে পাপী তাপী আমি আপনাকে সুখী ও কৃতাৰ্থ বােধ করিতাম। কেননা এক জন ঈশ্বপরায়ণ পবিত্র পুরুষের কৃতকাৰ্য্য, যদি অপরের জীবন নাশের কারণ হয়, তবে তাহা কম সৌভাগ্য ও পুণ্যের কথা নহে। কিন্তু যেরূপ সর্বনাশকর মহান্ অনর্থ সংঘটিত হইয়াছে, তাহাতে আমি বুঝিতেছি, আমার, আমার অধীন কর্মচারীগণের এবং আমার পুত্রকলত্রাদির পৰ্যন্ত প্রাণ- নাশের সম্ভাবনা। তাই আমি ভীতচিত্তে জিজ্ঞাসা করিতেছি, এই যে শমনপুরী সন্নিভ প্রহরী-বেষ্টিত ভীষণ কারা-তবন, যাহা নাম শ্রবণে জগৎ আঙ্কিত হইয়া থাকে, যাহাতে ক্ষুদ্রকায় পিপীলিকারও নিষ্ক্রমণের পথ নাই, বিশ্বব্যাপী সমীরণ ও রৰি রশ্মিও যেখানে সঞ্চরণ করিতে কুষ্ঠিত হয়, সেহেন কঠিন স্থান হইতে অপরাধীবৃন্দ কিরূপে কখন্ কোথায় পলায়ন করিল, অনুগ্রহ পূর্বক তাহা বলিয়া এ দীনের উদ্বিগ্ন চিত্তের স্থ্যৈ সম্পাদন করুন। তেজস্বী তাপস কহিলেন, “ঈশ্বরের অনুগ্রহ হইলে পার্থিব নিগ্রহের অবসান হইয়া থাকে। বন্দীয়া আঁৰ ঈশ্বরানুগ্রহে মুক্তিলাভ করিয়াছে।” তখন ফারাধ্যক্ষ কহিলেন, “তবে আপনি আর এস্থলে বসিয়া নিরর্থক কইভােগ করি- তেছেন কেন? আপনি ত সর্বার্থে প্রদান করিতে পারিতেন ৪ মহর্ষি মনসুর। আমি বিনীতভাবে প্রার্থনা করিতেছি, আপনিও স্ব ভবনে প্রত্যাগমন করুন। নিয়তিলিপি খণ্ডনীয় নহে; আমার অদৃষ্টে যাহা আছে, তাহাই ঘটিবে। রাজপুরুষগণ এই অত্য- ভুত ঘটনার কারণ জিজ্ঞাসু হইলে, আমার উপর উৎপীড়ন হইলে, আমি যদৃচ্ছা উত্তর প্রদান করিব।” মন্সুর কহিলেন, “কোথায় যাইব? যে ব্যক্তি ঈশ্বরের কোপ-দৃষ্টিতে পড়িয়াছে, ইহ-জগতে তাহার পলাইবার স্থান বা উপায় কোথায় আছে ? অথবা পলাইলেও কি তাহার রক্ষা হইতে পারে ? আমি বিস্তীর্ণ অনিধিবক্ষ-ভাসমান অসহায় তৃণখণ্ডের ন্যায় অনন্ত পাথারে দেহ-তরী ভাসাইয়া দিয়াছি। অনন্ত-অপার-অসীম বারি- রাশি চতুর্দিকে মরুস্থলের ন্যায় ধূ ধূ করিতেছে, তরঙ্গাভিঘাতে নিমেষে শতবার নিমজ্জিত ও শতবার উখিত হইতেছি । সৈকতভূমি-সংলগ্ন হইবার আশা সুদূরপরাহত। দিশাহারা হইয়া কুল খুঁজিয়া পাইতেছি না। পাইতেছি না। সুতরাং এখান হইতে চলিয়া যাইতে আমার প্রবৃত্তি নাই। রাজদণ্ডে আর ভয় করিয়া কি কৰিব? প্রাণ যাউক, দৈহিক পরমাণু পরমাশ্বরে যাইয়া বিলয়প্রাপ্ত হউক, মন্সুর” এ হেল্প নাম পৃথিবী হইতে মুছিয়া যাউক, তাহাতে আমার কিছুমাত্র দুঃখ নাই। মৃত্যুকে ত আমি কুশলামী পরমবন্ধু বিবেচনা করি, তীক্ষা শূলা ও আমার সুখ-স্থান প্রবেশের সুখময় প্রশস্ত সােপন।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ। ৪১ আহা, কবে সে সুখ-সােপানে আরােহণ করিব? কবে সে দিন আসিবে ? কিন্তু সুখের দিন সহজে আসিতে চায় না, ইহা এখন আমি বুঝিতে পারিতেছি। কারাপতে ! এক্ষণে তুমি যাও, আমার প্রিয় কাৰ্য্যের প্রতিবন্ধক হইও না, এ স্থান হইতে প্রস্থান কর। আমি এখানে থাকিতে অসন্তুষ্ট নহি।” বুদ্ধিমান্ জেলপরিরক্ষক মন্সুরের সারগর্ভ বাক্যের গভী- রতা হৃদয়ঙ্গম করিয়া তৎক্ষণাং সেখান হইতে প্রস্থান করি- লেন। তখন মহর্ষি নির্জনে উপযুক্ত সময় পাইয়া একাগ্রচিত্তে যথারীতি অজু অর্থাৎ শাস্ত্রবিধি-সঙ্গত হস্ত-পদানি প্রক্ষালন- পূৰ্ব্বক অঙ্গ-শুদ্ধি-ক্রিয়া সম্পন্ন করিলেন। পরে কায়মনােবাক্যে পরম করুণাময় নিখিলকর্তার উদ্দেশে মস্তক অবনত করিয়া নামাজে নিতে হইলেন। তদীয় ভক্তির উৎস উচ্ছাসিত হইল। তিনি পবিত্র ঐশিক প্রেমে বিভাের হইয়া একেবারে স্পন্দন- শক্তিরহিত হইলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে, উপাসনা সাঙ্গ হইলে তন্ময়চিত্তে হস্তদ্বয় উত্তোলন করত প্রার্থনা করিতে লাগি- লেন,—“জগৎপতে। হে ভূত-ভাবন ভুবনপালক! হে সৰ্ব্ব- শক্তিমান্ সর্বান্তৰ্যামী অনাদি পুরুষ ! তােমার অপার কৃপা- পারাবায়ে বিক্ষু-বারি বিতরণে আমার মনােভিলাষ পূর্ণ কর। তুমিই একমাত্র দয়াময় দাতা; তুমিই এই অখিল সংসারে প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে দন্ত্র প্রেমময়, তুমিই বিশ্বরাজের মহষি মনসুর। একমাত্র রাজরাজেশ্বর মহারাজ-চক্রবর্তী ; তােমার রাজ্যে তােমার কাৰ্যে হক্ষেপ করিতে পারে, এমন কেহই বিদ্যমান নাই! তুমি সর্বান্তামী, ক্ষুদ্ৰবৃহৎ, উচ্চনীচ, দরিদ্র-ধনবান, পণ্ডিতমূখ সকলেরই অন্তরের ভাব তুমি অবগত আছ; তােমার সকাশে সকলই ব্যক্ত,—কিছুই লুক্কায়িত নাই। জগৎ জগতীস্থ স্থাবরজঙ্গম পদার্থনিচয়, স্বৰ্গনরক তােমারই সৃষ্ট। তুমিই নিঃসন্দেহ সৰ্ব্বনিয়ন্তা, স্রষ্টা ও পাতা। তােমার চিরস্থায়ী সুন্দর নিয়মে, তােমার অনুজ্ঞার বশবর্তী হইয়া চন্দ্র- সূৰ্য্য-গ্রহ-নক্ষত্রাদি পরিবেষ্টিত এই ভূমণ্ডলের যাবতীয় কাৰ্য্য সুশৃঙ্খলার সহিত পরিচালিত হইতেছে। কি আশ্চর্য্য প্রভু শক্তি! কি সুদৃঢ় শাসন-বন্ধন । তোমার আজ্ঞা ব্যতীত ক্ষুদ্র এক তৃণ খণ্ডেরও হেলিবার সাধ্য নাই। প্রেমময়। তােমার পবিত্র প্রেমে তুমিই আমাকে উন্মত্ত করিয়াছ। তুমি প্রেমিকের প্রাণের প্রফুল্লতা দিতে সমর্থ। তুমি দয়াময় মেহ-প্রবণ-হৃদয়। ব্যথিতের যন্ত্রণা বুঝিতে, পীড়িতের রােগ- প্রতিকার করিতে, তুমি বিনা আমার আর কে আছে ? আমি পীড়িত, তােমার সম্মিলনরূপ অমােঘ ঔষধ প্রদানে আমার চিরাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ কর! তােমার বিচ্ছেদ-যন্ত্রণায় ম্রিয়মাণ আছি-হৃদয় জর্জরিত, প্রাণ অবসন্ন, আর বিলম্ব সঙ্ক হয় না ; আশা পূর্ণ কর। অহে! চতুর্দিক অন্ধকারময় দেখিতেছি।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ। মনােণ দুর্বিষহ যাতনায় হু হু করিয়া জ্বলিতেছে, হৃদয়ে কে যেন ঘাের বিষবাণ বিদ্ধ করিতেছে। প্রতে। আমার কিরূপ দুর্গতি ঘটিয়াছে, তোমার ত তাহা অবিদিত নাই। দেখ, আজ কিনা আমি উন্মত্ত—পাগল ; মনসুর পাগল, তাই কারাগৃহে বন্দীভাবে অবস্থান করিতেছে। কিন্তু সখে ! পরম- সুখে আছি। সুগন্ধমােদিত কুসুমােথান অথবা বিবিধ চিত্ত- চমৎকারী বিলাস-সাধন-সজ্জায় সজ্জিত তুষারধবলিত প্রাসাদ, ইহার তুলনায় অতি হেয়—অতি তুচ্ছ। কেননা তােমার জন্যই ত আমার ঈদৃশী অবস্থা ঘটিয়াছে । আমি তােমারই প্রেমাকা ক্ষী, তােমারই সম্মিলন প্রার্থী, তোমারই বিচ্ছেদানল দিবানিশি আমার অন্তরে ধু ধু করিয়া জ্বলিতেছে ; মিলনের সুশীতল বালিপ্রপাতে শীঘ্র সেই তীব্র অগ্নি নির্বাণ কর। হে প্রাণিরাম! আর যে বিচ্ছিন্ন থাকিতে পারি না ; দর্শনােন্মত্তের প্রতি সদয় হও, ক্ষুধার্ত পতঙ্গের মিলন-দীপ্তিতে তৃপ্তি সাধন কর। অধমকে তােমার প্রেমিক বলিয়া গ্রহণ কর! হো হো হো ! এ আবার কি? এ আবার কি খেলা!! মিলন হইতে হইতে আবার নিরন্ত!! কৌশলি । এ আবার তােমার কি কৌশল ? আর না,তােমার আমার মধ্য হইতে পার্থক্যের পর্দা স্বরায় উঠাইয়া লও, আকাশ-পাতাল একাকার হউক। আমি তোমারই ; তার • ৫২ মহর্ষি মন্নুর। - সঙ্গ লাভে তােমার পথে থাকিয়া, তােমার প্রেমে মজিয়া, জগৎ বিরুদ্ধ হয়, হউক, তােমার দত্ত এ প্রাণ তােমার নামে উৎসর্গ করিতে—ধূলিময় এ সামান্য দেহকে শূলাগ্রে সমৰ্পণ করিতে আমি কুষ্ঠিত নহি, বরং সে কাৰ্য্য সমধিক গৌরবের বলিয়া বিবেচনা করি। অতএব হে প্রিয় বন্ধো ! হে সন্তাপিতের শান্তিদাতা। আমার মনের বাসনা সফল কর।” তপােধন এবংপ্রকারে উপাসনা সম্পন্ন করিলেন। কথিত আছে, এক ব্যক্তি তাহাকে প্রার্থনাকালে করণকাতরে অনুশােচনা করিতে দেখিয়া ঈষং কোপ এবং অবজ্ঞামিশ্রিত বিকৃত স্বরে কহে, “মহাত্মন্ ! আজ আপনাকে রক্তমাংস- ময় মর-জনােচিত কাৰ্য্য করিতে দেখিয়া অতীব বিস্মিত হইয়াছি। বিধাতার অখণ্ডনীয় লিপি-নিয়মাধীন মলমতি মানব আমরা জগৎস্রষ্টার আরাধনা করিতে অবশ্যই বাধ্য। কিন্তু আপনি যখন স্বয়ং আনাল হক” বলিয়া ঈশ্বরত্বের দাবি করিতেছেন, তখন বলুন ত, আপনি আবার কোন্ ঈশ্বরের উদ্দেশে মস্তক অবনত করিয়া উপাসনাকাৰ্য্য নিৰ্বাহ করিলেন? যে ব্যক্তি স্বয়ং অচিন্ত্য অনির্বচনীয় সর্বশক্তি খর অনাদি, পুরুষ, তাহার কি কখন পুরুষান্তরের যুব- অতি আবশ্যক করে ? না তাঁহার কেহ উপাস্য থাকিতে পারে ?” উন্মত্ত মসুর এতশ্রবণে গম্ভীর স্বরে কহিলেন, পঞ্চম পরিচ্ছেদ। ভদ্র ! “তােমার এ প্রশ্ন বিবেচনামুলক বটে। প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ না করিয়া অসূয়া-পরিশূন্য হৃদয়ে কহিলে এ প্রশ্ন সমধিক আনন্দবিবর্ধক ও প্রীতিকর হইত। কিন্তু সে অপরাধ তােমার নহে। মরণ-ধৰ্ম্মণীল অচিরদেহী অহঙ্কত মানমাত্রই কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করিয়া মােহবশে মূলমন্ত্র বিস্মৃত হইয়া অঙ্গীকৃত সুব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা ঘটাইয়া ফেলে এবং অশুভ প্রদ অপকৰ্ম্মকে কল্যাণকর কার্য্য বলিয়া জ্ঞান করিয়া থাকে। এক্ষণে হৃদয়কে সরল পথে চালাও, আমার বাক্য প্রণিধান কর,-আমি নিজেরই উপাসনা,নিজেরই স্তবস্তুতি নিতে করিয়া থাকি। আমার নামাজে” আমারই প্রার্থনা করা হইয়া থাকে। আমি নিজেই উপাস্য, নিজেই উপাসক, নিজে শিষ্য, নিজে গুরু, নিজে অনুসন্ধানকারী, নিজেই অনুসন্ধেয় বস্তু ; নিজে প্রেমিক, নিজেই প্রেমাস্পদ, নিজে চাকচিক্যশালী সূক্ষ্ম বালুকণা, নিজেই অননুমেয় প্রকাণ্ড জ্যোতি পদার্থ, নিজে ক্ষুদ্রাদপি ক্ষুদ্র এবং বৃহৎ হইতেও বৃহত্তম। আমি স্বয়ং অপার অনন্ত মহাসমুদ্র, আবার বয়ং তন্মধ্যস্থিত ক্ষুদ্র এক জলবি। অক্ষয় অবিনশ্বর সমুদ্র- বারি হইতেই বিষের উৎপত্তি এবং তাহাতেই তাহার স্থিতি। সুতরাং সমুদ্র ও জলবিধে কখন কি পার্থক্য পরিলক্ষিত হইয়া থাকে? কখনই নহে। এতদুভয় কেহ কাহারও সঙ্গ মহর্ষি মন্সুর। পরিত্যাগ করে না। একের বিয়ােগে, একের অভাবে দ্বিতীয়ের অস্তিত্ব পৰ্য্যন্ত পরিদৃষ্ট হয় না। কিন্তু অবিশ্ব ক্ষণভঙ্গুর-অনিত্য, চিরস্থায়ী নহে; উহা পরিণামে প্রেমভরে ভগ্ন হইয়া সেই মহাসাগরেই বিলীন হইয়া থাকে। যখন সে আপনার অস্তিত্ব লােপ করিয়া শেষে সাগরেই মিলিত হইয়া যায়, তখন আর এ জলধি এবং ইহা তজ্জাত বি, এরূপ পার্থক্য প্রদর্শন করিবার কারণ কি আছে? মুগ্ধ! চক্ষুর সদ্ব্যবহার কর, একবার তাহা উন্মীলন করিয়া দেখ,-এই পৃথিবীর ক্ষুদ্র বৃহৎ যাবতীয় স্থানে, যাবতীয় পদার্থে সেই অচিন্ত্য-শক্তি বিশ্বপ্রকাশক সৰ্বগুণৈক-নিলয় পরমপুরুষ মহিমা-গৌরবে সুস্পষ্ট দেদীপ্যমান রহিয়াছেন। প্রত্যেক বস্তুতে তাহার সমুল স্নিগ্ধ জ্যোতিঃ নিহিত থাকিয়া জগতের আনন্দ- বিধান করিতেছে। যাহার অন্তর হইতে অন্ধকারাবরণ অন্তরিত হইয়াছে,ব্যবধান তিরােহিত হইয়াছে, জ্ঞানাঞ্জন সহযােগে যাহার নয়ন-পঙ্কজ বিশদভাবে বিকশিত হইয়াছে, সে ব্যক্তি মুস্পষ্টরূপে তদীয় বিশ্ব বসুধা-ব্যাপ্ত বিরাট একত্ব দেখিয়া শুনিয়া তাঁহাকে কোন্ মুখে দ্বিতীয় বলিয়া নির্দেশ করিতে,—কি একারে তুমি আমি বলিয়া ভিন্ন ভাবিতে পারে? ইহাই বলিয়া ধর্মোক্ত মদী নিশ্বাস পরিত্যাগপূর্বক পুনৰ্ব্বার খান হক “আনাল হ” বলিয়া চীৎকার করিয়া উঠিলেন।
যষ্ঠ পরিচ্ছেদ। এইরূপ বর্ণিত আছে যে, একদা নিশীথ কালে মহা- মনস্বী হােসেন মন্সুর গভীর নিদ্রায় অভিভূত হইয়া শয়ান ছিলেন এবং তদবস্থায় স্বপ্নযােগে এক কল্পনাতীত অপূর্ব ঘটনা নয়নগােচর করেন। তিনি দিব্য চক্ষে দেখিতে পাই- লেন, যেন এক বিস্তার্ণ শুত্র ভূমিখণ্ডের উপর একটা প্রকাণ্ড বাবাস স্থাপিত রহিয়াছে। বস্ত্রাবাসীর শাে- সৌন্দর্য্য অতি মনােরমবর্ণনাতীত। আহা শিবির তদীয় অত্যাশ্চর্য অকৃত্রিম শিল্পচাতুর্যের পরিচয় প্রদানার্থ যেন উহা অপরূপ বিশ্বোজ্জ্বলকারী সুন্ধি জ্যোতিরাশি দ্বারা পরম যবে নিৰ্মাণ করিয়াছেন। উহার চতুর্দিক হইতে বিজলীপ্রভা- গন ঔজ্জল্যলহরী বিনির্গত হইয়া দিগ্দিগন্তর আমােদিত ও আলােকিত করিতেছে। বস্ত্রাবাসের অভ্যন্তরস্থ সাজসজ্জা- সমূহের সৌন্দৰ্য্যই বা বর্ণনা করিয়া উঠে কাহার সাধ্য ? সমুদয় অলৌকিক ও অপার্থিব। রসনা তাহার বর্ণনা করিতে ভাবা সেরূপ ভাবপ্রকাশক শব্দসমষ্টির কামাল। নর-চক্ষু তাহা অনুভব করিবার অণুমাত্রও শক্তি প্রাপ্ত হয় নাই। ফলতঃ সেই সমুদয় বিষয় মাহাত্মজ্ঞাপক ও অকূল: নীয় বটে, কিন্তু সর্বোপরি সেই বাবা/ভ্যন্তরীণ মৃদু-মন্দ-মলয়- মহর্ষি মসুর । মারুত-শীতলীকৃত ছায়ার গুরুত্ব, গরিমা ও মর্যাদা অধিক। কেননা নিদারুণ নিদাঘের প্রচণ্ড মার্তণ্ড-উত্তাপে প্রতপ্ত ও ক্লিষ্ট জনগণ, সেই সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করিলে, শরীরের তাপ ও হৃদয়স্থিত কলুষরাশি বিদূরিত হইয়া সুবিমল সত্বগুণের সঞ্চরণে নিঃসন্দেহে ইহ-পারলৌকিক সুখ-শান্তি ও সন্তোষ লাভ করিয়া থাকে। বস্ত্রাবাসের মধ্যস্থলে মরকত-মণি বিখচিত কমনীয় কনক- সনােপরি জগজ্জন-হিতৈষী, জীবের একমাত্র পরিত্রাণপথ- প্রদর্শনকারী মহাপুরুষ হজরত মহম্মদ মস্তফা প্রসন্নবদনে পবিত্রভাবে উপবিষ্ট আছেন। তাহার অলােক সামান্য সৌম্য- মূর্তির জ্যোতিতে সৰ্ব্ব স্থান উদ্ভাসিত হইয়া অপূর্ব শ্ৰধারণ করিয়াছে এবং সেই সুকুমার স্বর্গীয় শরীরের সৌগন্ধে দশদিক প্রমােদিত করিয়াছে। হজরতের চতুষ্পৰ্থে ইস্লামের গৌরব- মুকুট রূপ ধৰ্ম্মপরায়ণ সাধুবৃন্দ ও ধর্মযুদ্ধে নিধন-প্রাপ্ত বীর পুরুষগণ যথাযােগ আসনে নতভাবে আসীন রহিয়াছেন। সভায় শোভা অতি রমণীয় ও অতুল, যেন সুবিমল নােমণ্ডলে সংখ্যাতীত কাঞ্চনকান্তি নক্ষত্রের সমাবেশ এবং তন্মধ্যস্থলে অকলঙ্ক শশধর ভুবনমােহনরূপে বিরাজ করিতেছেন। সভাস্থল নীরব, সভাসদবর্গ নিস্তব্ধ। সহসা বন্ধাবাসের এক স্থানে একটা অতি সূক্ষ্ম ছিদ্র পরিলক্ষিত হইল। সেই ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ। ছিদ্রপথাভ্যন্তর দিয়া সূর্যের কিরণ আপতিত হইতে দেখিয়া সভায় সমাগত সাধকবৃন্দের সাতিশয় উৎকণ্ঠার আবির্ভাব হইল। কেননা তাহাতে তাহারা ক্লেশানুভব করিতেছিলেন। তজ্জন্য তাহারা প্রত্যেকেই, তাহা বন্ধ করণার্থ প্রাণপণশক্তিতে বিবিধপ্রকার চেষ্টা ও কৌশল অবলম্বন করিতে লাগিলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, অশেষবিধ যত্ন ও বহু পরিশ্রম করিয়াও সেই সাধনবল গরীয়ান্ মুক্তাত্মগণের কেহই সফল মনােরথ হইতে পারিলেন না। আহা, যে ধর্মপন্থা-চির-বিচরণ- শীল তবুদ্ধি কৃতী পুরুষগণ দৈবশক্তি প্রসাদাৎ কত কত উৎকৃষ্ট ও অদ্ভুত কাৰ্য অবলীলাক্রমে সম্পাদন করিয়াছেন, আজ তাঁহারা এই কার্যে অকৃতকার্য হইয়া নিতান্ত দুৰ্ম্মনায়মান ভাবে নতশিরে অবস্থান করিয়া রহিলেন। ছিদ্রপথ কোনমতে রুদ্ধ হইল না। সকলের সমবেত চেষ্টা ব্যর্থ হইল, দেখিয়া জগদেক-আশ্রয় পুণ্যপুরুষ হজরত মহম্মদ মুস্তফা সকলকে অতি করুণ-মৃদুস্বরে কহিলেন, “হে ইলাম-হিত-চিকৗধু মহামতিগণ! তােমরা বৃথা চেষ্টা ও বৃথা পরিশ্রম করিয়া ক্লান্ত হইতেছ কেন? তােমাদের প্রয়াস, তােমাদের যত্ন কোন ফলােপধায়ক হইবে না। আমি ইহা বেশ বুঝিতে পারিয়াছি, যে পৰ্যন্ত না হােসেন মন্সুর স্বেচ্ছা-প্রণােদিত হইয়া আপা মস্তক ছিদ্রপথ-তলে অর্পণ করিবেন, তদবধি উহা কিছুতেই মহাষ মনসুর। হায় এই অবরুদ্ধ হইবার নহে।” সেই দেবসভায় স্বয়ং মনসুরও এক আসন পরিগ্রহ কঠিয়া উপবিষ্ট ছিলেন। তিনি নিখিল- নাথ-বান্ধব নকুলহিতৈষী হজরতের প্রমুখৎ এবংবিধ উক্তি শ্রবণ করিয়া হর্ষোৎফুল্ল-লােচনে সােৎসাহে দণ্ডায়মান হইয়া তৎক্ষণাৎ বলিয়া উঠিলেন, “আহা কি অনুগ্রহ। আহা কি ‘স্নেহবাৎসল্য !! প্রভাে! এক মস্তক কেন, আজ যদি এই দীনাতিদীনের লক্ষ মস্তক থাকিত, তাহা হইলে প্রভুর নির্দেশ মত এই দণ্ডে এই জগৎ-প্রীতিজনন সেই বিভুর কার্যে সাদরে উৎসর্গ করিয়া কৃতার্থ হইতাম। বসুন্ধরাতলে এমন সম্মানিত সৌভাগ্যবান পুরুষ কে আছে, যে ব্যক্তি জন্মমৃত্যু-রক্ষণ-ভূত জগদীশ্বরের পথে আত্মজীব- নােৎসর্গ করিয়া পারলৌকিক শ্রেয় লাভ পূৰ্ব্বক তদীয় প্রিয় হইতে পারে। যদি প্রণয়ীর জন্য প্রাণ যায়, যদি প্রিয়- ভাজন বান্ধবের বিপদে বিপন্ন হইয়া আত্মবিনাশ ঘটে, তাহ অপেক্ষা শুভদৃষ্ট ও মুখের বিষয় এ জগতে আর কিছুই নাই। ফলে প্রণয় করার নাম আত্মবলিদান, ইহা আমি বিলক্ষণরূপে হৃদয়ঙ্গম করিয়াছি। যে প্রেমিক আত্ম- বলিদানে অসমর্থ, যে প্রেমিক প্রেম-সঙ্কটে মন্তক ছেদিত হইবে বলিয়া ভয়-বিল, সে কখন প্রকৃত প্রেমিক নহে, সে , সে শঠ, সে ছদ্মবেশী স্বার্থপর!” জপ ও হজরত ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ। মহম্মদ মহােচ্চমনা মন্সুরের এইরূপ সদুত্তর শুনিয়া সৰ্ব্ব-সমক্ষে তাহার অকৃত্রিম ও ঐকান্তিক ঐশিক প্রেমিক তার ভূরি ভূরি যশােকীৰ্ত্তন করিলেন। অকস্মাৎ মন্সুরের নিদ্রাভঙ্গ হইল, জড়তা কাটিল ; সঙ্গে সঙ্গে দেবসভাও নয়নের ব্যবধানে পড়িয়া গেল। তিনি জাগ- রিত হইয়া সে স্বর্গীয় শােভা-সমৃদ্ধ—সে সভ্যগণ-সমাবেশ- ঋষিবরের এই স্বপ্নবৃত্তান্তের তাৎপৰ্য-ব্যাখ্যা কোন কোন মহাত্ম। এইরূপ করিয়াছেন। স্বপ্নদৃষ্ট বস্ত্রাবাসটা জগৎস্রষ্টার প্রিয়, ও পরম পবিত্র নাহ ইসলাম-ধর্মস্বরূপ (শরিয়ত)। প্রধান ও পয়গম্বর-প্রধান হজরত স্বয়ং, অন্যান্ত ধাকিগণের সহিত উহা মশুকে ধারণ করিয়া যত্নে । করিতেছেন। সুৰ্য্যোত্তাপে তপ্ত (অর্থাৎ ধর্মান্ত) নৱগণ ইহার সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় লইলে অর্থাৎ শান্তিপ্রদ সনাতন ইসলাম ধর্মাবলম্বন করিলে আন্তমে পরিত্রাণ পাইয়া পরম সুখের অধিকারী হইয়া থাকে। ধর্ম-বিগ- হিত উক্তি “আনাল হক” মনুর কর্তৃক উচ্চারিত হওয়ায় বস্ত্রাবাসের (ইসলাম ধর্মের) এক স্থানে ছিদ্রস্বরূপ প্রকটিত হইয়াছে। ঐ ছিদ্র অ. রোধার্থ অনেকে অনেক চেষ্টা করিয়া অর্থাৎ মনসুরকে “আনাল হক বলিতে নিষেধ করিয়া অকৃতকার্য হইলেন। সেই অঙ্ক কথিত হইয়াছে যে, যদবধি হােসেন মন্সুর -ইচ্ছায় ছিদ্রপথে স্বীয় শিৰ স্থাপন না করি- ধৈন না। শনিবনাল হক” উচ্চারণে কান্ত না হইবেন, অথবা আত্মবিসর্জন না করিবেন, তদবধি উহা অপরের সহস্র চেষ্টায় কিছুতেই ( তিনি উহা উচ্চারণে কিছুতেই নিয়) হইৰায় লয়ে।
মহর্ষি মন্সুর। মােহ—এ দির কিছুই আর দেখিতে পাইলেন না! কিন্তু সেই সুর- সভা ও তাহার সভ্যসমিতির ক্রিয়াকলাপ তদীয় হৃদয়- ফলকে প্রতিফলিত হওয়ায় এবং মানস-যন্ত্রে প্রতিঘাত করায়, তিনি তখনও যেন তৎসমুদায়ের জীবন্ত বিদ্যমান উপলব্ধি করিতে লাগিলেন। পরন্তু, সচৈতন্য ব্যক্তির এ. -এ মরীচিকাময় ভাব আর কতক্ষণ থাকিতে পারে ? তিনি ক্ষণকাল পরেই শয়নকক্ষের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করিয়া হা হুতাশ ছাড়িয়া আক্ষেপ করিতে লাগিলেন। তাহার গণ্ডস্থল ভাসাইয়া দরদর-ধারে প্রেমা বিগলিত হইতে লাগিল। কিন্তু কি করিবেন। হাত নাই। অবশেষে হতাশ-মলিন- মুখে প্রেম-গদগদ ভাষে পুনৰ্ব্বার তিনি “হ-হক, আনাল হ” বলিয়া উচ্চ ধ্বনি করিয়া উঠিলেন।
সপ্তম পরিচ্ছেদ। মসুরের অহ-ব্ৰহ্মবাদিত্বের” কথা দেশদেশান্তরে প্রচারিত হইতে আর বাকি নাই। কিন্তু তিনি আজ প্রশান্ত- ভাবে কারাগৃহে অবস্থান করিতেছেন, এই সংবাদ শ্রবণে চতুর্দিক হইতে সহস্র সহস্র লােক দলে দলে আসিয়া কারা- গৃহ-সমীপে সমবেত হইতে লাগিল। বিশাল বােগদাদ নগরস্থ ধৰ্ম্মশাস্ত্রবেত্তা পণ্ডিতগণও সেই স্থানে আসিতে ত্রুটি করিলেন না। ফলতঃ কি সংসার-জ্ঞানশূন্য তরলবুদ্ধি বালক, কি কৌতুহলাক্রান্ত বলিষ্ঠ যুবাপুরুষ, কি স্থিরবুদ্ধি বৃদ্ধ, সকলকেই কোন না কোন প্রবৃত্তি-পরতন্ত্র ইয়া এই জনতার সংখ্যা বৃদ্ধি করিতে হইয়াছিল। সকলেই ক্রোধান্বিত, সকলেরই মসুরের প্রতি রােষ-কম্বিত দৃষ্টি। কত কথা বলিতেছে ; কোলাহলের গম্ভীর ধ্বনি গম্ গম্ করিয়া উঠিতেছে। পরিশেষে কতকগুলি লোেক বহু প্রকার তীব্ৰাক্তি করিয়া মনসুরের জীবননাশের যড়যন্ত্রে লিপ্ত হইল। সেই স্থানে মহর্ষির সহাধ্যায়ী বন্ধু সুধীবর শেখ আবুবকর শিবলীও সমুপস্থিত হইয়াছিলেন। তিনি প্রিয় বন্ধুর আসন্ন বিপদের বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত অবগত হইয়া নিরতিশয় শােক সন্তপ্ত হইলেন এবং সর্বলােক-পূজনীয় মহামনী ধর্ম
মহষি মনসুর।
;
সৈয়দ জুনেদ শাহের নিকটে আসিয়া ক্ষুব্ধচিত্তে সমুদায়
নিবেদন করিতে আর ক্ষণবিলম্ব করিলেন না।
জ্ঞানবৃদ্ধ ধর্মাচাৰ্য জুনেদ শাহ এই মর্মান্তিক সংবাদে
প্রথমে স্তম্ভিত হইলেন; তাহার মুখকান্তি সহসা রূপান্তরিত
হইল। অতঃপর, কিয়ৎক্ষণ নীরব থাকিয়া কতিপয় ধার্মিক
লােকের সমভিব্যাহারে শশব্যন্তে কারাগৃহাভিমুখে প্রভাবিত
হইলেন। তিনি তথায় উপনীত হইয়া দেখেন, সংখ্যাতীত
লােকের সমাগম হইয়াছে। কি ভয়ানক বিরাট ব্যাপার।
সকলের উত্তেজনা ও অভিপ্রায় দেখিয়া শুনিয়া তিনি ভীত
হইলেন; কি যে বলিবেন, তাহা ভাবিয়া ঠিক করিতে
পারিলেন না। অবশেষে সাহসের সহিত দণ্ডায়মান হইয়া
সকলকে সম্বােধন পূর্বক ধীরগম্ভীরে কহিলেন, “হে
ইস্লামের ধর্মভীরু প্রিয় সন্তানগণ। হে সমাজের ধর্মশীল
পুরুষবর্গ। আপনারা আজ ধর্মের জন্য-ধৰ্ম্মাবমাননার প্রতি
শােধ লইবার জন্য এখানে উপস্থিত হইয়াছেন দেখিয়া পরিতুষ্ট
হইলাম। ইহা ধৰ্ম্মনিষ্ঠার জ্বলন্ত উদাহরণ,-সমাজের জীবন্ত
শক্তির প্রকৃষ্ট প্রমাণ, সন্দেহ নাই। কিন্তু একটা কথা ; বিশেষ
রূপ বিবেচনা না করিয়া কোন গুরুতর কাৰ্যে উৎসাহিত ও
অগ্রসর হওয়া বুদ্ধিমানের কৰ্ম্ম নহে। আমি ভরসা করি,
ঈশ্বরেচ্ছায় আপনারা আমার বাক্যে বিরক্ত না হইয়া
সপ্তম পরিচ্ছেদ। ধৈৰ্য্যাবলম্বন করিবেন। দেখুন, মন্সুর অবোধ নহেন; ধর্ম- কর্মে তাহার যথেষ্ট আস্থা ও অচলা ভক্তি দেখিতে পাওয়া যায়। ইম-সম্মত ক্রিয়াকলাপ সম্পাদনে তাহার কিছুমাত্র ত্রুটি পরিলক্ষিত হয় না। তবে একটা কথার নিমিত্ত আজ আপনারা তাহার প্রতি খড়গহস্ত হইয়াছেন-হইবারই কথা। যেহেতু প্রদীপ্ত হুতাশন-সন্তাপে পদার্থমাত্রেই উত্তপ্ত হইয়া থাকে। আবার যদি সেই অগ্নি নিস্তেজ বা একেবারে নিৰ্ব্বাণ প্রাপ্ত হয়, তবে তাবৎ বস্তুরই শীতলতা সম্পাদন হইতে দেখা যায়। তাই বলিতেছি, মসুর যদি সেই কোপােদ্দীপক বাক্যোচ্চারণে চিরবিরত থাকেন, তবে কি তিনি ক্ষমার পাত্র নহেন ? দোষ মনুষ্যেই করিয়া থাকে, ক্ষমাও মনুষ্য-হৃদয়ের এক অদ্বিতীয় মধুর গুণ ! তাই বলি- তেছি,আপনারা অবশ্যই শান্ত ভাব অবলম্বনে তাহার অপ- রাধের মার্জনা করিবেন। আমার দৃঢ় প্রত্যয় আছে যে, তাহার বসনা হইতে শরা-বহিভূত নিষিদ্ধ বাক্য আর কপি বহির্গত হইবে না। ইহা বলিয়া সৈয়দ সাহেব মন্সুরের সমীপবর্তী হইলেন এবং প্রীতিপূর্ণ-বচনে, সাদর সম্ভাষণ পূৰ্ব্বক কহিলেন, “একি! মসুর সহসা তােমার ঈদৃশ চিত্ত- চাঞ্চল্য উপস্থিত হইল কেন ? কোন্ ঘটনায় তােমায় বাগিয়িকে এরূপ অতপর্ব ন্যায়বিরুদ্ধ নিন্দিত বাক্য মহর্ষি মসুর । স্ফুরণে বাধ্য করিয়াছে ? স্থিরভাবে ইহার সবিশেষ বৃত্তান্ত আমাকে নির্দেশ করিয়া বল।” তখন ধৰ্ম্মোন্মত্ত মসুর, “আমার এক মুহূর্তের ও অবসর নাই, আমাকে একটু অবসর দিউন, ইহাই বলিয়া অপ্রসন্নভাবে অন্য দিকে বদন ফিরাই- লেন। তদ্দর্শনে সৈয়দ সাহেব কথঞ্চিৎ বিরক্ত হইয়া গম্ভীর স্বরে কহিলেন, “মন্সুর ! তুমি এবংবিধ বাহাড়ম্বর পরিত্যাগ কর, ভয়ানক পাপ-কথা আর মুখাগ্রে আনিও , প্রকৃতিস্থ হও। তােমার এ শ্রবণকঠোর পাপময় বাক্যে-- বৃথাভিমানে জগৎ সন্তুষ্ট নহে। যে দাবি মানবকুলে কেহ কখন করে নাই, করিবারও সামর্থ্য নাই, যে কথা কর্ণেও কেহ শুনে নাই, আবালবৃদ্ধবনিতা যাহাতে মহাপাপ অর্শে বলিয়া জ্ঞান করে, এক জন কাণ্ডজ্ঞানহীন মুখও যে কথা শুনিলে সঙ্কুচিত ও ভয়বিহ্বল হয়, আজ তুমি এক জন ক্ষণ- ভঙ্গুর সসীমশক্তি ক্ষুদ্র মানব হইয়া তদুচ্চারণ করিলে ধর্মের অবমাননা করিলে, মনুষ্য সমাজ কোনক্রমেই সহ করিতে প্রস্তুত নহে। আমি তােমার উপদেষ্টা ও মঙ্গলার্থী। তােমার অমঙ্গল ঘটিলে আমার যাদৃশ কষ্ট অনুভব হইবে, তাদৃশ আর কাহারও হইবে না। অতএব স্থির হও, আমার কথা শ্রবণ কর, সুবিমল সনাতন ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে মশুকোত্তােলন করিও না-বিঘ্ন ঘটাইও না। অন্যথা হােমর
সপ্তম পরিচ্ছেদ।
ঈশ্বর-প্রেমিকতা-ধ্যান-ধারণা কোন ফলােপধায়ক হইবে না,
তুমি পরিশ্রমের পুরস্কারে বঞ্চিত হইবে। আমি বুঝিতে
পারিয়াছি, শিক্ষার অসহ গুরু ভারে তােমার মস্তিষ্ক বিকৃতি
জন্মিয়াছে। তুমি দিান্ত পথিকের ন্যায় প্রকৃত পথ হইতে
অপত হইয়াছ-তােমার চিরলক্ষ্য প্রেমপথ ভ্রষ্ট হইয়াছ।
জলভ্রমে তরঙ্গায়িত মরীচিকার দিকে ধাবিত হইয়াছ।
এখনও বলিতেছি, যদি কল্যাণ কামনা কর, সুপথে আইস।
ইহা তুমি বিলক্ষণ জান যে, আল্লাহ মহান, সর্ব শক্তির
আধার, অক্ষয় অদৃশ্য পুরুষ। তাহার সদৃশ কেহ বা কিছুই
নাই। তাহার দান বা সৃষ্ট মনুষ্য, পশু, পক্ষী, তরু, লতা,
সিন্ধু, সরিৎ, পৰ্বত, স্বর্গ, মর্ত, শুন্য, চন্দ্র, সূৰ্য্য, তারকা
প্রভৃতি। তবে বল দেখি, সেই মহিমাময় মহাদাতার দাবি
করা--তংস্থানীয় হইতে যাওয়া, রক্তমাংসময় অচির-দেহধারী
সংকীর্ণশক্তি মনুষ্যের পক্ষে কোনক্রমে শােভা পায় কি?
আর যদি তুচ্ছ এরূপ কথন কখন যুক্তিযুক্ত ও ন্যায়ানুমােদিত
হইত, তাহা হইলে নরের অনন্ত-শরণ প্রেরিত পুরুষ-প্রভা-
কর মহামাহ হজরত মহাদ মােন্তফা শেরেকী” করা অর্থাৎ
খােদাতালার অংশী-স্থাপন করা বা ততুল্য জ্ঞান করাকে
মহাপাপ বলিয়া কদাচ নিষেধ করিয়া যাইতেন না। তিনি
পৃথিৰীস্থ যাৰতীয় ধর্মপ্রাণ মহাপুরুষগণের অগ্রগণ্য পূজনীয়
মহর্ষি মন্নুর। ও সংখ্যাতীত নক্ষত্রের মধ্যে স্নিগ্ধোজ্জ্বল জ্যোতিঃপূর্ণ অকলঙ্ক শশধর স্বরূপ। আহ যে চন্দ্রের নির্মল আলােকে অখিল বিশ্ব আলােকপ্রাপ্ত, পবিত্র কোরাণের বিধি এবং তাহার আজ্ঞা অবহেলন করা কত দূর ন্যায়বিবর্জিত ও দূষণীয় কাৰ্য, তাহা কি তুমি এখন বুঝিতে পারিতেছ না ? তাই পুনঃ পুনঃ বলিতেছি, যদি বুদ্ধিমান হও, অবিলম্বে এই পথ পরিত্যাগ কর ; মহাপুরুষের পথানুসরণ করিয়া আত্ম- কল্যাণে রত থাক।” এতবণে সাধক মন্সুর উন্নতশীর্ষে চক্ষুরুন্মীলন করিয়া বিরক্তি সহকারে স্বীয় দীক্ষাগুক সৈয়দ জোনেদকে সম্ভাষণ- পূৰ্ব্বক কহিলেন, “আপনি কেন আমাকে বিরক্ত করিবার জন্য এখানে উপস্থিত হইয়াছেন ? আপনার বচনপরম্পরায় স্পষ্টই প্রতীয়মান হইতেছে যে, প্রেমের মাহাত্ম্য এখনও আপনি বুঝিতে সমর্থ হন নাই, ইহার সুমধুর রসাস্বাদনে আপনি বঞ্চিত আছেন। যদি প্রেমতত্বে আপনার অণুমাত্রও অধিকার থাকিত, তাহা হইলে আজ আমার প্রতি কঠিন কুলিশেপম হৃদয়-বিদারী বাক্যবাণ বর্ষণে উদ্যত হইতেন না। আর বলুন ত, পয়গম্বরবর হজরত মুহাম্মদ সম্বন্ধে আপনি কি উৎকর্ষ লাভ করিয়াছেন ? তাহার ইঙ্গিতের প্রকৃত উদ্দেশ্য হৃদয়ঙ্গম করা সাতিশয় কঠিন ব্যাপার। তিনি সপ্তম পরিচ্ছেদ। ৬৭ বলিয়াছেন “খােদ। সর্বদা আমার সঙ্গে আছেন ; এবং ধৰ্ম্ম-গ্রন্থেও উক্ত হইয়াছে, “আমি (সৃষ্টিকর্তা) মনুষ্যের নিকট হইতেও অতি নিকটে আছি।” এক্ষণে বলুন দেখি, আপনি ইহার কিরূপ মৰ্ম্মগ্রহণ করিয়াছেন ? আপনি প্রকাশ্য কাৰ্য্য- কলাপে, বাহ অনুষ্ঠানে, লৌকিক আচার-ব্যবহারে বিশেষরূপ পারদর্শিতা লাভ করিয়াছেন, সত্য, কিন্তু বলুন ত, চাকচিক্য- ময় বহির্ভাগ দেখিয়া ভিতরের ভাব হৃদয়ঙ্গম করা যায় কি ? শুদ্ধ বাহ আড়ম্বরে কিছুই হইবে না, অন্তর ও বাহির উভয় একই কেন্দ্রাভিমুখী হওয়া চাই। যেমন কোন পাত্রের অন্তর ও বহির্ভাগ সম্যক পরিশুদ্ধ ও পরিমার্জিত হইলে স্বতই উহা দর্শকের ভক্তি ও শ্রদ্ধাকর্ষণ করিয়া থাকে, তদ্রুপ শাস্ত্রোক্ত প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য উভয়বিধ ধ্যান-ধারণার সমতা রক্ষা করিতে পারিলে সেই বিশ্বকল্পতরু মহিমাময় মহীপতি স্বয়ং প্রসন্নচিত্তে ভক্তকে অমৃতরসাভিষিক্ত মধুর ফল প্রদান করেন, নতুবা নহে। তুলাদণ্ডের এক দিক ভারাক্রান্ত করিলে দণ্ড কোন্ কালে সমভাবে সরল পথে দাড়াইয়া থাকে ? আহা! পবিত্রতম স্বর্গীয় গ্রন্থ কোরাণ শরিফে যে অভিপ্রায় সুস্পষ্ট পরিব্যক্ত রহিয়াছে, আপনার হৃদয়-ক্ষেত্রে তাহার ছায়ায় লেশমাত্রও নিপতিত হয় নাই। তবে আপনি কেমন করিয়া প্রেরিত পুরুষের প্রদর্শিত পথাবলম্বন করিলেন?
মহর্ষি মন্সুর। স্বাদ গ্রহণ না করিয়া কোন বস্তু মিষ্ট, তিক্ত বা কষায়, তাহা বলিতে পারা যায় কি ? নিজে ধর্মের গৃঢ় মৰ্ম্মোদ্ভেদ করিতে অক্ষম হইয়া অপরকে প্রকাশ্যে ধর্মভ্রষ্ট বলিয়া অপ- বাদ দেওয়া জ্ঞানবান ব্যক্তির কর্তব্য নহে। ফলতঃ বৃথা বাদানুবাদে কোনও সুফল সমুদ্ভূত হয় না। কি জন্য আমি ধৰ্ম্ম-পথভ্রষ্ট হইলাম, বিশেষরূপ বিবেচনা পূৰ্ব্বক সৰ্ব্ব সমক্ষে আপনি তাহার শাস্ত্রসম্মত উত্তর প্রদান করুন। আমি যাহা করি, তাহাই উৎকৃষ্ট, তাহাই থােদাতালার অনুমােদিত ও যুক্তিযুক্ত কাৰ্য, এরূপ বােধ করা কদাচ ভাল নহে—ভ্রান্ত- মতি স্বল্পধী মানবের পক্ষে সঙ্গত নহে। আপনার পথ সরল অগ্রে তাহার অবধারণ করা কর্তব্য। কে না জানে, এ সংসারে সত্যপথ কন্টকময় ও বিপজ্জনক এবং তাহাতে বিবিধপ্রকার প্রতিবন্ধক দৃষ্ট হইয়া থাকে? হায় আজ আমাকে ন্যায়ের অনুরােধে বলিতে হইল যে, সে পথের পথিক হইতে আপনি অসমর্থ ; তাহাতে অনেক সৌভাগ্য, অনেক সহিষ্ণুতা, অনেক সম্বলের প্রয়োজন। আপনার সে সম্বল কৈ? ঈশ্বরের প্রকৃত একত্ব বিষয়ক জ্ঞানের অধিকার আপনার কোথায় ? আপনার অন্তরে প্রণ- ফের ভীষণ প্রতিবন্ধক রূপ লক্ষাধিক সুদৃঢ় যবনিক এল- তি, সুতরাং সেই প্রেমময় নিখিলনাথের নির্মল সেন লাভ সপ্তম পরিচ্ছেদ। করিয়া অপার্থিব অনন্ত সুখে সুখী হইতে পারিকেন কিরূপে? আপনার জ্ঞাননয়ন প্রস্ফুটিত হইবার এখনও বিলম্ব আছে।” উন্মত্ত আত্মহারা মসুর মনের আবেগে জলদগম্ভীরে এতদূর বলিয়া শান্ত ভাব অবলম্বন করিলেন। উত্তাল তরঙ্গ- সঙ্কুল জলধি সহসা যেন স্থির,-তরঙ্গ-বহিত হইল । সৈয়দ সাহেব তাহার ঈদৃশ স্পর্ধা সম্বলিত তেজস্কর বােক্য শ্রবণে কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের ন্যায় মস্তকে হাত দিয়া বসিয়া পড়িলেন। চিত্ৰপুত্তলিকাবৎ ক্ষণকাল নীরব ও নিস্পন্দ। অতঃপর আর বাক্য ব্যয় বৃথা জানিয়া গাত্রোখানপূর্বক ভবনে প্রত্যাবর্তন করিলেন। এই ঘটনায় সাধারণ ক্রোধে অধিকতর উত্তেজিত ও অধীর হইয়া উঠিল। “মৃত্যুকালে বিপরীত বুদ্ধি ঘটে, হিতা- হিত জ্ঞান থাকে না; সে লক্ষণ মন্সুরের যথেষ্ট প্রকাশ পাইয়াছে। এখন হিতগর্ভ উপদেশ বা প্রবােধ প্রদান, ইহার কিছুই ফলােপধায়ক হইবে না। স্বয়ং পূজ্যপাদ শিক্ষা- তা যখন কুশল সাধন করিতে গিয়া অপদ ও নৈরাশ্য- সন্তপ্ত হইয়া প্রস্থানপর হইলেন, তখন আর ইহার মঙ্গল কোথায়?” এইরূপ নানা জনে নানা কথার উত্থাপন করিয়া তাঁহার প্রাণসংহারের নিমিত্ত অধৈৰ্য্য ও আগ্রহাতিশয্য দেখা- ইতে লাগিল। কিন্তু শাস্ত্রানুমােদিত ফতুয়া অর্থাৎ বিধান মহর্ষি মনসুর। } ব্যতিরেকে এক জনের প্রাণদণ্ড কিছুতেই হইতে পারে না। এই নিমিত্ত কয়েক জন বিচক্ষণ ব্যক্তি, সৰ্ব্বশাস্ত্র-বিশারদ পণ্ডিত- পটল-সূৰ্য্যস্বরূপ মহামান্য ব্যবস্থাপক সৈয়দ জোনে শাহের নিকটে ব্যবস্থা গ্রহণ করা বিধেয় বিবেচনায়, তৎকাশে উপনীত হইয়া ব্যবস্থা-প্রাণী হইলেন। জোনেদ শাহ্ মন্সুরের ব্যবস্থার কথা শুনিয়া নিস্পন্দ ও নিরুত্তর। সেই জ্ঞানবৃদ্ধের দুই চক্ষু হইতে গণ্ডস্থল বহিয়া অবিরল ধারে বাষ্পবারি বিগলিত হইতে লাগিল ; তাহার শােক-সিন্ধু উচ্ছসিত হইয়া সহস্র ধারে প্রবাহিত হইতে লাগিল। তদুপরি আবার দীর্ঘ নিশ্বাস-ভীম- বাত্যাঘাতে দীয় অস্তরাত্মা যে কিরূপ নিদারুণভাবে আলো- ড়িত হইয়াছিল, তাহা তদবস্থাপন্ন ব্যক্তি ভিন্ন অপরের বােধগম্য নহে। ফলতঃ তিনি যে অকৃত্ৰিম ধৰ্ম্মানুরাগী মহাত্মা মন্সুরের আসন্ন বিপদে মর্মান্তিক আঘাত প্রাপ্ত হইয়াছিলেন, তাহাতে আর সংশয় নাই। ব্যবস্থা প্রার্থীরা সৈয়দ সাহেবের অবস্থা অবলােকনে অতীব আশ্চর্যান্বিত হইলেন। অনেক অনুনয় বিনয় করিয়া তাহার ব্যবস্থা-প্রদান-অভিরুচিজ্ঞাপক কোন ভাবই লক্ষিত হইল না- একটী বাক্যও ফুরিত হইল না। তিনি কেবল নীরবে কাতরভাবে অশ্রুবিসৰ্জন করিতে লাগিলেন। এতদ্দর্শনে বস্থাপ্রার্থী ব্যক্তিগণ সাতিশয় বিরক্ত হইলেন। কাহার কাহার সপ্তম পরিচ্ছেদ। ৭১ ধৈৰ্য্যচ্যুতিও ঘটিল। কিন্তু তাহা হইলে কি হইবে? নানা কারণে সে অধৈৰ্য্যবেগ সম্বরণ করিতে হইল। হইল। অবশেষে রাজাধিপতি ধৰ্ম্ম-প্রতিনিধি মহামান্য খলিফাকে জানাইলে সহজেই ইহার প্রতীকার হইবে—বিনামুরােধে শীঘ্র ব্যবস্থা হস্তগত হইবে, এই আশায় সকলে সমবেত হইয়া খলিফার দরবারে উপনীত হইলেন এবং আদ্যোপান্ত ঘটনা যথাবিধি তাহার কর্ণগােচর করিলেন। দরবারের বিচারকার্যে নিয়ােজিত জনৈক সম্ভ্রান্ত রাজকর্মচারী মনে মনে এই বিষয় বিবেচনা করিয়া দেখিয়া ইসলাম-সমাজপতি মহামান্য খলিফাকে কহিলেন, “এই দুরূহ কাৰ্য, কার্যে পরিণত করিবার অগ্রে পূজ্যপাদ সৈয়দ জোনে শাহের ব্যবস্থা লওয়া কর্তব্য বটে। যেহেতু তিনি দরবেশকুলের শ্রেষ্ঠ এবং তাহাদের গুরুস্থানীয়, তিনি যে ব্যবস্থা প্রদান করিবেন, তাহা সৰ্ববাদী-সম্মত ও শিরােধার্য। কিন্তু তিনি ব্যবস্থা না দিলে ভয়ের কারণ আছে।” খলিফা প্রজারঞ্জক, ন্যায়বান ও নিতান্ত ধর্মভীরু ব্যক্তি ছিলেন। তাঁহার শাসনশৃঙ্খলা ও সুবিচারের ত কথাই নাই, কিন্তু সর্বোপরি ধৰ্ম্মের দিকে সতত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থাকায় ঈশ্বয়া- গ্রহে তদীয় সুবিস্তীর্ণ সাম্রাজ্য মধ্যে ধৰ্ম্মবহির্ভূত কোন একটা সামান্য কাৰ্য্য সংঘটিত হওয়া দূরে থাকুক, একটা বাক্যও উচ্চায়িত হইতে পারিত না। কিন্তু আজ তাহার বিষম বৈপরীত্য।
৭২ মহর্ষি মন্সুর। সন্দর্শনে তিনি সাতিশয় মর্মাহত, বিস্মিত, বিচলিত ও চিন্তাকুল হইলেন। অজ্ঞান-সাধারণ ব্যক্তি হইলে ভাবিবার এত অধিক প্রয়ােজন ছিল না বটে, পরন্তু এ যে সে ব্যক্তি নহে, ইহা ধর্মশাস্ত্র-বিশারদ পরমজ্ঞানী মসুরের বিরুদ্ধে প্রাণদণ্ডের অভিযােগ ! কি সর্বনাশকর ঘটনা !! ইহা যে ভাবিবারই ক্ষেত্র। বিশেষতঃ ধর্মাধিকরণে উপবিষ্ট হইয়া আনুপূর্বিক পর্যালোচনা- পূৰ্ব্বক ন্যায়-সম্মত কাৰ্য্য করাই যথার্থ সুবিচারক ও সর্বলোকে প্রশংসিত ব্যক্তির কর্তব্য। যিনি তাহাতে অক্ষম, সেই দুৰ্বলচেতা মানব ধৰ্ম্মজগতের পরিরক্ষক পদবাচ্য নহেন, তিনি সুবিচারক ও প্রশংসাই বলিয়া পরিকীর্তিতও হইতে পারেন না। এই ধারণা বশতই বিচক্ষণ খলিফা চিন্তাবিবলচিত্তে অর্থপ্রত্যর্থ বরূপে মনে মনে বহু বাদানুবাদ ও বিবিধ তর্কবিতর্ক করিলেন । পরিশেষে বুঝিলেন, ধর্মের অপ্রতিহত প্রভাব খর্ব করণে-উদ্যত মসুর দণ্ডের যােগ্য বটেন। তখন রাজকর্মচারীর কথা যুক্তি- মূলক বিবেচনা করিয়া ধৰ্ম্ম-পরিরক্ষণার্থ ব্যবস্থা প্রদান জঙ্ক তিনি পণ্ডিতপ্রবর শাহ জোনেদকে অনুজ্ঞ পত্রপ্রেরণে বাধ্য হইলেন। কহিলেন, “মহাত্মন্ । উন্মত্ত মন্সুর সুনির্মল ইসলাম ধর্মে যে কি ভয়ানক দুরপনেয় কলঙ্ককালিমা লেপন করিতে,-চিরন্তন সরল বিশ্বাসের মূলে সুতী কুঠারাকাত করিতে সমুন্নত হইয়াছেন, তাহা আর আপনার অৰিধিত সপ্তম পরিচ্ছেদ। ৭ নাই। আজ ইল্লাম-সমাজ তঁাহার সেই কৃতাপরাধের,সেই ধৃষ্টতার সমুচিত প্রতিবিধান করিতে বদ্ধপরিকর। আপনি ধৰ্ম্মবিৎ এবং পণ্ডিতকুলের শীর্ষস্থানীয়, আপনার ধর্মভীরুতা চিরপ্রসিদ্ধ। ধর্মের অবমাননা আপনার হৃদয়ে বিষদিগ্ধ বাণের ন্যায় যাতনা প্রদান করে। অতএব আশা করা যাইতে পারে যে, মনসুরের এই পাপের প্রায়শ্চিত্তের নিমিত্ত শানু- মােদিত যে ব্যবস্থা হয়, তাহা প্ৰদান করিয়া সত্য সনাতন ইলাম-ধৰ্ম্ম অক্ষুন্ন রাখিতে আপনি ত্রুটি করিবেন না। অঙ্কুরে মূলােৎপাটিত না করিলে, কালে ইহা শাখা-প্রশাখা-বিশিষ্ট হইয়া ধৰ্ম্মজগতে নিদারুণ বিপ্লব সমুপস্থিত করিতে পারে, আপনার স্থায় ভবিষ্যদ্দশী ব্যক্তিকে একথা লেখাও বাহুল্য মাত্র।” লেখা সাঙ্গ হইল, অভিযােক্তাগণ যথারীতি নম্রতার সহিত সিংহাসনপদ প্রান্ত চুম্বন করিয়া লিপি গ্রহণ করিলেন। আনন্দের সীমা নাই, লিপি পাইয়া কোলাহল করিতে করিতে জনস্রোত চলিল ; অনন্তর ব্যস্ততার সহিত যাইয়া সেই পত্র মাননীয় জোননদ শাহের হস্তে অৰ্পণ করিল। সকলে “ফতুয়া” প্রাপ্তির আশায় দণ্ডায়মান, সতৃষ্ণ নয়ুনে ফতুয়া-দাতার মুখ নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। এদিকে শাহ কিন্তু পুৰ্ববং নীরব, নিরুত্তর ও কাতর-ভাবাপন্ন। তিনি প্রথমতঃ সম্মাননার সহিত খলিফা প্রদত্ত পত্রিকা খানি গ্রহণ ও চুম্বন কৰিলে।
৭s মহর্ষি মন্সুর। অতঃপর পাঠ করিতে লাগিলেন। কিন্তু কি বেদনা-ব্যঞ্জক ব্যাপারপাঠমাত্র আঁহার বিষাদসিন্ধু উচ্ছসিত হইয়া উঠিল, দর-বিগলিত অশ্রু-ধারে লিপি অভিষিক্ত অভিষিক্ত হইয়া গেল। আগন্তুকেয়া ব্যবস্থাদাতার এই লক্ষণ তঁাহাদের আশা প্রদ নহে দেথিয়া, কিছুক্ষণ পরে পুনৰ্ব্বার খলিফার সমীপে যাইয়া আবেদন করিলেন। তিনিও বিরক্ত না হইয়া “ফতুয়ার” জন্য পুনঃ অনুরােধপত্র প্রেরণ করিলেন। এইরূপে ছয় বার যাতায়াত হইল, তথাপি ফতুয়া হস্তগত হইল না। ব্যবস্থাদাতার মনের ভাব পূর্বের ন্যায় অপরিবর্তিত, অচল ও অটল। হাঁ কিংবা না, ইহার কোন কথাই তাহার মুখ হইতে বহির্গত হইল না। কিন্তু ধৈৰ্যশীল ব্যবস্থাপ্রার্থীরাও ছাড়িবার পাত্র নহেন। তাহারা সপ্তমবারে যখন মহামান্য 'খলিফার নিকট হইতে পত্র লইয়া শাহ-সন্নিধানে উপনীত হইলেন, তখন তিনি নিজেও বিষম বিরক্ত হইলেন এবং বারংবার রাজাজ্ঞা অবহেলন বা প্রত্যাহার করা উচিত বিবেচনা করিলেন না। যদি করেন, তাহা হইলে সাধারণের অপ্রিয়ভাজন, দেশ- বিদেশে নিন্দিত ও খলিফার কোপদৃষ্টিতে পড়িলেও পড়িতে পারেন। বিশেষ পবিত্র শরকে” অক্ষু ও গৌরবান্বিত রাখাও সর্বাগ্রে কর্তব্য, মনােমধ্যে এইরূপ অশেষবিধ চিন্তার আবির্ভাব হওয়ায় পরিশেষে বাধ্য হইয়া ব্যবস্থা প্রদান সপ্তম পরিচ্ছেদ। ৭৫ করিতে সম্মত হইলেন। তখন তিনি শাস্ত্রানুসারে হস্তপদাদি প্রক্ষালন করতঃ ( অজু করিয়া) পবিত্র হইয়া সৰ্ববি-বিনাশন জগন্নিদান জগদীশ্বরের নামােচ্চারণপূৰ্ব্বক প্রথমতঃ সূফির সজ্জা ( আধ্যাত্মিক পরিচ্ছদ ) পরিত্যাগ করিয়া পার্থিক পােষাক পরিধান করিলেন। পরে চিন্তিতচিত্তে লেখনী গ্রহণ করিয়া সর্বাগ্রে একমাত্র উপাস্য বিশ্বস্রষ্টার মহান্ নামের মহত্ব পরিকীৰ্ত্তন করিলেন, পরে লিখিলেন, “যে ব্যক্তি নির্বিকার নিরাকার চৈতন্য স্বরূপ অদ্বিতীয় জগৎস্রষ্টার অংশী স্থাপন করে-ঈশ্বরত্বের দাবি করে, সে ধর্মদ্রোহী, ইমবিয়ােধী মহাপাপী। নিরপেক্ষ মহাম্মদীয় বিধানানুসারে যদি ইহার প্রকাশ্য ব্যবস্থার প্রয়ােজন হয়, তবে তাহার শিরচ্ছেদন দণ্ডই প্রশস্ত প্রায়শ্চিত্ত, তাহাতে সন্দেহ নাই।” সৈয়দ সাহেব এইরুপ মন্তব্য লিপিবদ্ধ করতঃ আগন্তুকদিগের হতে সমৰ্পণ করিলেন। তাহারা ব্যবস্থা পাইয়া অভিবাদনপুৰ্ব্বক মহাননে কোলাহল করিতে করিতে আপনাদের গন্তব্য স্থানে প্রস্থান করিলেন।
অষ্টম পরিচ্ছেদ। ব্যবস্থা হস্তগত হইয়াছে, মনস্কামনা সিদ্ধ হইয়াছে ; নগর- বাসীদের আর আনন্দের সীমা নাই। আজ মন্সুরের প্রাণ- গণের দিন। তাই দলে দলে লােক আসিয়া এক বিস্তীর্ণ প্রান্তরে সমবেত হইতে লাগিল। ধনী মধ্যবিৎ দরিদ্র, বালক বৃদ্ধ যুবক, পণ্ডিত শিক্ষার্থী মুর্থ, মূক খঞ্জ বধির,-কেহই স্থির নহেন, সকলেই চলিয়াছেন, নদী-স্রোতের ন্যায় মনুষ্য- হােত চলিয়াছে। রাজপথ জনতাপূর্ণ-কোলাহলময় ; কল কল শব্দে সমগ্র বােগদাদ নগর শায়মান, আকাশমণ্ডল প্রতিধ্বনিত-গম গম করিতেছে। সহস্র সহস্র নরকণ্ঠস্বর একত্র সংমিশ্রিত হইয়া এক গম্ভীর শব্দ উৎপাদন করিতেছে। দূর হইতে সেই শব্দ অধিকতর ভীষণ ও গম্ভীর অনুমিত হই- তেছে। কত জনে কত কথা বলিতেছে। কত বাকবিতণ্ডা, কত শ্লেষবিজপ, কত পাণ্ডিত্য প্রকাশিত হইতেছে। কেহ উৎফুল্ল নয়নে “তামাসা” দেখিবার জন্য খস্ খল করিয়া হাসিয়া বেড়াইতেছে, কেহ বা বিষচিত্তে, নীরবে সমবেত মানব মণ্ডলীর কার্যকলাপ পৰ্যবেক্ষণ করিতেছেন। . কেহ কেহ বা “হা হতভাগ্য মর! শেষে তােমার ভাগ্যে এই অষ্টম পরিচ্ছেদ। ৭৭ ছিল” বলিয়া অবশাঙ্গে বসিয়া আক্ষেপ করিতেছেন। বা বলিল, “ধৰ্ম্মবিদ্রোহীর কঠিন শাস্তি হওয়াই উচিত, তাহাতে কাহারও ক্ষুন্ন হইবার কারণ নাই।” মন্সুরের সহাধ্যায়ী তাপস-প্ৰবন্ধু শেখ আবুবকর শিবলী মহােদয় এই দৈব দুর্বিপাকে সমধিক মর্মাহত ও বিষ। তাহার হৃদয়ে যেন পাষাণ পিষিয়া যাইতে লাগিল। যদি কোন প্রকারে এই বিপত্তির নিরাকরণ করিতে পারেন, যদি কোন কৌশলে মন্সুরের মনের গতি ফিরাইয়া তাহার জীবন রক্ষা করিতে পারেন, এই আশায় আশ্বস্ত হইয়া তিনি শশব্যন্তে কারা- গৃহে মন্সুরের সমীপন্থ হইলেন এবং বহুবিধ প্রসঙ্গের অবতারণা করার পর অবােধ বাক্যে দুঃখিত ভাবে কহিলেন, ভ্রাতঃ। জানিয়া শুনিয়া আপনার প্রাণ আপনি বিসৰ্জন করিতে চলিলে ! ইহা কি তােমার ন্যায় সুপণ্ডিত সূক্ষ্মদশী ব্যক্তির অনুরূপ কাৰ্য? যে হৃদয় সুদৃঢ় নগরজ সদৃশ অটল ও অদম্য ছিল, আজ তাহা সহসা বিচলিত ও বিপর্যস্ত হইল কেন? কোন্ সূত্রে কোথা হইতে এই চিত্তবৈকল্য উপস্থিত হইয়া তােমাকে ঈদৃশ অবস্থায় পাতিত করিয়াছে। তােমার সেই অবিচলিত অধ্যবসায়, সেই অমানুষিক সহিষ্ণুতা, সেই দেব- দুর্লভ ইলিয়-সংষমন, সেই প্রখর বিবেকবুকি আজ কোথায়? গুরূপদেশের কি এই পরিণাম? নির্জনধ্যান-ধারণা, অসামান্য ৭ মহর্ষি মনসুর। শাস্ত্রাভিজ্ঞতা শেষে কি অজ্ঞানতায় পর্যবসিত হইল? এক ব্যক্তি যাহা সত্য ও স্বতঃসিদ্ধ বলিয়া বিশ্বাস করে, কিন্তু জগৎ অসত্য ও অন্যায় জ্ঞানে ঘৃণা, নিন্দা ও বিপক্ষতা করিয়া থাকে, এবংবিধ কাৰ্য্য হইতে নির্লিপ্ত থাকাই শ্রেয়। তােমার ন্যায় বিজ্ঞ ব্যক্তিকে এ কথাও কি আবার বুঝাইয়া দিতে হইবে ? কিন্তু তথাপি বন্ধুত্বের ও কর্তব্যের অনুরােধে বলিতেছি, তােমার উচ্ছল উর্দ্ধগা প্রবৃত্তিকে সংযত কর, আলােড়িত চিত্তকে সুস্থির কর। এখনও নিরস্ত হও, রসনাগ্রে সেই অবৈধ উক্তিকে আর প্রবেশাধিকার দিও না, স্মৃতি হইতে সেই বিঘ্ন- করী স্মৃতিমূল উম্মলিত করিয়া ফেল; দেখি, কোন্ ব্যক্তি তােমার প্রতিকূলে আর বাক্যমাত্র ব্যয় করিতে অগ্রসর হইতে সাহস করে। এই যে সমবেত অগণ্য নাগরিক তরঙ্গোচ্ছাসিত দুর্ধর্ষ সিন্ধুসম নােবকবায়িত-লােচনে তােমার বিরুদ্ধে খড়গ- হত্ত,-তােনাকে গ্রাস করিতে উদ্যত, দেখিবে, এই মুহূর্তেই তাহারা পূর্বের ন্যায় সাদর সম্ভাষণে তােমাকে হিতবান্ বন্ধু জানে আলিঙ্গন করিবে। তাই বলিতেছি, ভাই। শান্ত হও ধৈর্য ধারণ কর। হৃদয়ে শান্তি স্থাপন করিতে সচেষ্ট হও।” বাক্যম্নোত রু হইল। মনসুরের কর্ণকুহরে উহা প্রবেশ করিল বটে, কিন্তু মনােমধ্যে ককালের জন্যও স্থানত করিতে সমর্থ হইল না। বিজনারণ্যে রােদনের ন্যায় তাহাতে অষ্টম পরিচ্ছেদ। কোনও ফল দর্শিল না। দশিবেই বা কি প্রকারে ? যখন প্রেমোদ্দীপ্ত মােহাভিভূত পতঙ্গ অকৃত্রিম প্রেমাবেশে ক্ষিপ্ত হইয়া সমুজ্জ্বল দীপশিখা আলিঙ্গন করিতে প্রধাবিত হয়, তখন যে, পতনমাত্রই ভস্মসাৎ হইয়া যাইবে, তাহার সে আশঙ্কা বা সে জ্ঞান কি থাকে? কখনই নহে। সেই জন্যই, এই আসন্ন বিপদেও চিন্তার লেশমাত্র নাই, হাসিতে হাসিতে অম্লান বদনে মন্সুর উত্তর করিলেন, “দয়ার্ল সখে! সমস্তই বুঝিয়াছি, সমস্তই জানি। কিন্তু আর গভীর অনুশশাচনায় বা তীব্র তিরস্কারে ফল কি ? তােমার উপদেশরূপ অঙ্কুশ প্রহারেও আমার উন্মত্ত মনমাতঙ্গ বারণ মানিতে চাহে না। আমি যে সেই জন্মমৃত্যুনিয়া, ভাগ্যলিপি-প্রণেতা মহান্ আল্লার নামে জীবনােৎসর্গ করিয়াছি !! প্রাণের প্রতি আর মায়া নাই, মমতা নাই, মেহ নাই, সমস্তই বিদায় দিয়াছি, চির বিদায় দিয়াছি। আর ভয় কিসের ? কাহার ভয় করিব ? হৃদয় পাষাণ করিয়াছি। হউক শত বজ্রপাত, এ হৃদয় পাতিয়া দিব। ভাই! আমি প্রেমময়ের প্রেম-সমুদ্রে নিমজ্জিত—উত্তাল তরঙ্গ-তাড়নায় হাবুডুবু খাইতেছি, উঠিক রামর্থ্য নাই। এ সমুদ্র অপার, অসীম, অনন্তু, অতলস্পর্শ। দিক্হাৱা-যে দিকে তাকাই, ধু ধূ ধূ করিতেছে। হায়, অশেষ যন অন্বেষণ করিয়াও ইহার তীরভূমি পাইবার উপায় নাই। .
মহর্ষি মসুর।
ফলতঃ বিপদের কুটিতে আমি শঙ্কিত নহি। কারণ শান্তি
এবং সুখ উভয়ই আমার পক্ষে তুল্য। সখে! আমি ত জীবনী
শক্তিরহিত জড়পিণ্ড! আমি ত মৃত! কি আশ্চৰ্য্য, মৃত
ব্যক্তিকে মরিতে হইবে বলিয়া কি পুনঃ ভয় প্রদর্শন করিতে
হয়? মরার উপর খাড়ার প্রহার মূর্থের কাৰ্য—নিতান্ত
কাণ্ডজ্ঞানহীন অর্বাচীনের প্রস্তাব! ভাই! তােমরা আর
আমাকে মসুর বলিয়া ডাকিও না-জানিও না। আমি
এখন আর মন্সুর নহি। আমার আমিত্ব আছে কোথায় ?
প্রেমময়ের সায় আমার আমিত্ব বিমিশ্রিত হইয়া গিয়াছে,
আকাশ পাতাল এক হইয়াছে। একাকার! একাকার। একা-
কার। অগ্রপশ্চাৎ, দক্ষিণ বাম, উৰ্দ্ধ-অধঃ যে দিকেই নেত্রপাত
করি, একাকার দেখিতেছি। এক ভিন্ন দ্বিতীয় নাই। যদিও
সংপ্রতি আমি মন্সুর নামে অভিহিত, কিন্তু সেই এক হইতে
স্বতন্ত্র পদার্থ নহি! আমার এই শরীরে সেই অদ্বিতীয়ের
ঐশ্বৰ্য্য গুপ্ত নাই, ৪ এই নামে তাঁহার অপূৰ্ব্ব মাহাত্ম্য
অবকাশ নাই! হায় বাহ দৃশ্য দেখিয়া জগৎ বিমােহিত।
আভ্যন্তরিক মধুর ভাব দেখিতে জগতের নাই, অথবা
অসমর্থ। কাহারও কি চক্ষু নাই? কেহই কি এ স্পৃহণীয়,
গুপ্ত রহস্যোঙে করিতে সমর্থ নহে? সুগভীর রত্নাকর
গর্তস্থিত মহামুল্য মুক্তা উত্তোলন করিতে ক্ষমবান ডুরি কি
অষ্টম পরিচ্ছেদ।
;
একবারেই বিরল ? অথবা হইতে পারে, এ তত্ত্ব জগৎ .
নৱগত। কিন্তু আর বিলম্ব নাই; শীঘ্রই এ কথা চতুর্দিকে
বিঘােষিত হইবে, এগতের নর-নারীর কাণে বাজিৰে-চক্ষুন
প্রেমিকগণের নিকটে এ দৃশ্য প্রকাশিত হইবে। অচিরে
আমি আত্মবলিদান দিয়া আপনাকে নাস্তিত্বে পরিণত
করিব, তাঁহার প্রেমে জীবন বিসর্জন করিয়া সুখদ নবজীবন
সহ চিরস্থায়ী অমূল্য ধন প্রাপ্ত হইব। আহা! প্রেমে যে
ব্যক্তি পরিপক-দক্ষ, প্রেমের প্রতিচ্ছায়া-প্রেমের অবস্থা
তাহাতে পতিত ও প্রকাশিত হইবেই হইবে। যে বর্ণে বস্তু
রঞ্জিত করিতে হইবে, বস্ত্রে তাহা প্রক্ষিপ্ত হইবে সেই বর্ণ কি
তাহাতে প্রতিফলিত হয় না। তাই শিবুলি ! বল দেখি,
আমি কি পৃথিবীতে সত্য গােপন করিতে আসিয়াছি ?
আর সত্য-গােপন করিবই বা কেমন করিয়া ? সত্য-গগাপনে
যে মহাপাপ। অন্তরে যে ভাব, মুখে তাহা ব্যক্ত যে না করে,
সেই কপট কুকুরের দয়াময়ের স্বারস্থ হইবারও অধিকার
নাই। আমার অচিরস্থায়ী দেহের পতন হয়, হউক।
ক্ষতি কি? “তাহার সুখসাধনােদেশে এই পাপে অবিনশ্বর
আত্মাকে কলুষিত করিতে আমি সাত নহি। আমি কখনই
এই সত্য প্রচারে পরখ কইব না কাহার কথা শুনিব না,
কোনও প্রতিবন্ধক মানি না। তাহাতে গিৎ শক্ত হয়
মহর্ষি মনসুর।
;
হউক; সমাজ যে শাস্তি দিবেন, দিউন ; অবনত মস্তকে
তাহা গ্রহণ করিতে প্রস্তুত আছি। তজ্জন্য দুঃখ প্রকাশ বা
একটাও প্রতিবাদ করিব না। তাই বলিতেছি-
প্রিয় সখে !
প্রাণপণে অতি করিয়া যতন,
কি আর অধিক বুঝাবে বল ।
বুঝিবার যাহা বুঝিয়াছি তাহা,
তার চেয়ে নাই বুঝিতে বল।
১
শাস্ত্রমহাসিন্ধু করি আলােড়ন,
সহস্র প্রমাণ কর প্রদর্শন,
অশেষ যুকতি, প্রবােধ-ভারতী,
অথবা দেখাও প্রাণের ভয়-
সব অকারণ, বুঝিবে না মন,
কিছুতেই কিছু হবে না ফল।
সুদৃঢ় কঠিন করিয়াছি হিয়া,
পড়ক অশনি ভীম গরজিয়া,
অনা’লে লইব এ বুক পাতিয়া,
যতই যাতনা থােক রে হায়
অষ্টম পরিচ্ছেদ।
যথা হিমাচল, স্থির অবিচল,
তথা রবে মন চির অটল।
দেখে হাসি পায়, হায় কি অজ্ঞান !
(এরা)-গিরি-পাদমূলে করি অবস্থান,
শৃঙ্গবাসী জনে লােষ্ট্র নিক্ষেপণে,
নীচে নিপাতিত করিতে চায় !!
রবি-শশী-তারা নামে কি হে ধরা ?
নামে কি ভূতলে জলদদল ?
৪
সাধকের আঁখি করিয়া বিকাশ,
দেখ দেখি চেয়ে তব চারি পাশ ।
গ্রহ, উপগ্রহ, শূন্য, গন্ধবহ,
অনল, সলিল, ভূধরচয়-
তিনিময় সব, তিনিময় ভব,
তিনিই বিটপী, তিনিই ফল।
পুষ্পরূপে'আহা তিনিই প্রকাশ,
তিনিই অম্বরে বিজলীর হাস,
ঝটিকা উচ্ছাস, মরুভূর ব্রাস,
কমায়।
তিনিই আঁধার আলােকময়
প্রকাশ্যগােপন, নব পুরাতন,
আদি মধ্য অন্ত তিনি কেবল।
অলি হলে তিনি নিজ গুণ গান,
কুলিশে অতুল প্রতাপ জানান,
ভূমির কম্পনে জাগ্রতে চেতনে,
উল্কাপাতে কহে হইবে লয়-
করুণ কঠোর, তিনি সর্বত,
বুঝেনাক ইহা অবােধদল।
৭
(আমি) বিভেদ-পদ। ফেলিছি ছিড়িয়া,
জানিনা কিছুই দ্বিতীয় বলিয়া,
এক আমি সেই, ভিন্ন কিছু নেই,
নিরখে দিত মন -
ইহ-পরকাল হয়েছে মিশাল,
একাকার ধরা পাতাল-তল।
এক(ই) জামি দেখি, চিকী-দেখিনা,
এক বিনা দুই জানিনাগানিনা,
অষ্টম পরিচ্ছেদ।
৫
একে আমি ডাকি, একে খুজে থাকি,
একেই হৃদয় ডুবিয়া রয়
ইথে যা তা হবে, সৰি প্ৰাৰে সবে,
চাই না শুনিতে ভূরের ছল।”
সখে! ণ ত তরী অকূল পাথারে ভাসাইয়া দিয়াছি।
আর অসুযােগে ফল কি? সমাজের মনােভিলাষ পূর্ণ হইতে
দেও। যদি আমি ধৰ্ম্মদ্রোহীই প্রমাণিত হইয়া থাকি, জৰ
এই পাপীকে বার্থ প্রয়াস পাওয়া কি অবােধের পরিচায়ক
নহে। বীমই এ মূর্তি নরলােক হইতে অদৃশ্য হওয়া উচিত।
কিন্তু একটা নিলেন,—“আমি সাধারণের নিকট এক দিনের
ক অসৰু প্রর্থনা করি--এক দিন অপেক্ষা করিতে হইবে।
ক শিরাজ নগর হইতে এক প্রিয় বন্ধু এখানে শুভাগম
হইবে। তিনি সমধিক বিদ্যাবুদ্ধি ও এতিসম্পন্ন অদ্বিতীয়
পণ্ডিত এক ধার্মিক বলিয়া জগৎপ্রসিদ্ধ। গুগুতৰে তাৰা
অধিকারও যথেষ্ট। তিনি জনসমান শেখ কৰি বলিয়া
পরিচিত। আমি উহার সহিত কণকাল আত্মবৃত্তান্ত
জানাই কাপন করিতে বাসনা করি। আমার এ
আকা চরিতার্থ হইলে তোমাকে জড়িলণীর কা স
রিক্ত আৰু পৰিলও সহ করিও না।
মহর্ষি মন্সুর।
বিজ্ঞবর আবুবকর শিবলী ধৰ্ম্মোন্মত্ত ঋষিসত্তম মন্সুরের
এই সদর্থযুক্ত সতেজ বাক্য শ্রবণ করিয়া নিরুত্তর হইলেন
ও তদীয় জীবন রক্ষায় হতাশ হইয়া পড়িলেন। অবশেষে
মহর্ষির শেষ আবেদন সাধারণ্যে জ্ঞাপন করিলেন। অনেক
বাদানুবাদের পর সেই প্রস্তাবে সকলেই সম্মতি প্রদান
করিল। কোন কোন গোড়ার দল শুভ কাৰ্য্যে বিলম্ব
ঘটিল অথবা ভবিষ্যতে ব্যাঘাত ঘটিতে পারে বলিয়া নাসিকা
কুঞ্চনপূর্বক ক্ষুন্ন রহিল।
মনসুরের প্রাণদণ্ডাজ্ঞা এক দিনের জন্য স্থগিত হইল।
আর এক দিনের জন্য তিনি ইহলােকে অবস্থিতি করিবার
অবসর প্রাপ্ত হইলেন। ইহা শুনিয়া সমবেত নাগরিকগণের
কেহ কেহ গৃহাভিমুখী হইল। কিন্তু অনেকেই উত্তেজনাধিক্য
বশতঃ সেই সময়ের জন্য বাটীতে আর প্রত্যাবর্তন
করিল না ; নগর বহির্ভাগে সুকোমল মখমল সদৃশ সেই
শ্যাম দুৰ্ব্বাদল ক্ষেত্রেই আন-কোলাহলে যামিনী যাপন
করিতে লাগিল।
কোন কার্যের অপেক্ষায় উৎসুক ও উদ্বিগ্নচিত্তে সময়াতি
বাহিত করার চেয়ে আর যন্ত্রণা নাই। তখন সময় যেন অতীব
দী হইয়া পড়ে, এক মুহুর্ত একটা যুগ বলিয়া অনুমিত হয়,
কিছুতেই কাটিতে চায় না। প্রারম্বিত নাগরিকগণ আজি
অষ্টম পরিচ্ছেদ । ৮। এই অবস্থায় অবস্থাপিত। তাহাদের সময় আর কাটিতেছে । কখন্ প্রভাত হইবে, কখন্ সূৰ্য্য উঠিবে, কথন্ নির্দিষ্ট কাৰ্য কার্যে পরিণত হইবে, এই প্রতীক্ষায় রহিয়াছে। কত মনােরঞ্জন উপকথা বলিয়া, কত রঙ্গরস, কত বৈষয়িক জল্পনা, কত ধৰ্মালােচনা করিয়া দলে দলে ইতস্ততঃ পাচারণ পূর্বক কালাতিপাত করিতেছে। দেখিতে দেখিতে ত্রিযামার যামব্রয় অনন্তের গর্ভে অলক্ষ্যে বিলীন হইয়া গেল। শ্বেতরশ্মি নিশাকর ক্লান্ত কলেবরে পশ্চিম আকাশের দিকে ঢলিয়া পড়িল। ক্রমে কনকান্তি নক্ষত্র কুল আপনাদের জীবনকালের স্বল্পতা উপলব্ধি করিয়া ত্রাসে নিষ্প্রভ ও ব্যথিত হইয়া টিপ টিপ করিতে লাগিল। এমন সময়ে নিশাবসানের পূৰ্ব্বদূতস্বরূপ মধুরকণ্ঠ বিহঙ্গম সমূহ কলম্বনে দিগন্তের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করিল। সেই কাকলী সুখস্পর্শ পবন-বাহনে আরােহণ করিয়া তর তর বেগে দূর দুরান্তে ভাসিয়া চলিতে লাগিল। সহসা উদয়াচল পরিত্যাগ- পূর্বক তিমিরারি দিনমণি মৃদুমন্দ পাদবিক্ষেপে নভস্তলে সমুপস্থিত,রজনী প্রভাত হইল। নিশাবসানের সঙ্গে সঙ্গে,-তপনের তরল কিরণ-ছটায় নীলাকাশ,মনােরম অনু- রঞ্জিত হইবার সঙ্গে সলে মন্সুরের কথিত সেই সুধী পুরুষের আগমন-বার্তা খনতার মধ্য হইতে বিঘােষিত হইল। তিনি
মহৰি মন্সুর।
প্রান্তরে লােক-সমাগম দর্শনে ও তাহাদের বাকবিতণ্ড
শ্রবণে বিস্মিত ও স্তম্ভিত হইলেন; শেষে হতাশব্যাকুল মনে
মন্সুরের দিকে শশব্যন্তে অগ্রসর হইতে লাগিলেন। অসহিষ্ণু
জনস্রোতও তদীয় পশ্চাদনুসরণ করিল।
এই সর্বজন-সুপরিচিত ধর্মপরায়ণ ব্যক্তি মন্সুরের
সম্মুখীন হইয়া প্রথমতঃ যথাবিহিত সাদর সম্বোধনে ভঁহাকে
আপ্যায়িত করিলেন; অনন্ত কিছুক্ষণ কথােপকথনের পর
অনুতাপের সহিত বীরগম্ভীরে কহিলেন, “খে ? ধর্মাচরণে
ও পাণ্ডিত্যে আপনি জগৎপ্রসিদ্ধ। পারমার্থিক তত্ত্বজ্ঞান
বিশারদ ব্যক্তি আপনার তুল্য অতি বিরল। কিন্তু বলুন,
কি জন্য সেই নিগুঢ় তত্বের আবরণ উন্মােচন করিয়া-
খনিস্থিত সুক্ষাতি মণির ন্যায় উজ্জ্বল সত্য প্রচারে উদ্যত
হইয়া অবিজ্ঞ মুখে সদৃশ আপনাকে ভীষণ বিপদে পাতিত
করিলেন? আজি আপনি শপরিবেষ্টিত, জগতের বিচারে
অপরাধী। যাহারা আপনার আত্মীয়স্বজন, যাহাদের নিকটে
সর্ব সম্মানিত ও পূজিত ছিলেন, যাহাদিগকে আপনি
পরম মিত্র জান করিতেন, তাঁহারাই আজ ধর্মের অনুফে
সমাজের ওয়ােনা, জানার বিরুদ্ধে অখিত।
একেক্ষ, অসহায় ও দুর্বল। এলের নিকটে দুর্বলের
পরিণাম যে কিরূপ শোচনীয়, তাহা ত আপনি বিদিত গান।
অষ্টম পরিচ্ছেদ।
আপনার মহান্ বাক্যের গভীর তাৎপৰ্য্য মর্ক-কান-গরীয়
জ্যোতির্ময় জগদীশ্বর এবং তদীয় আগৃহীত সাধক পুরুষ
ব্যতীত জগৎ বুঝিতে অশক্ত। যাহা জগৎ বুকে না, যাহা
সাধারণ মানববুদ্ধির অগম্য, সত্য হইলেও অহা অসত্য,
অভ্রান্ত জানিলেও জাত বিশ্বাসে তাহার পরিহার করা অৰ
কর্তব্য, মনুষ্য-সমাজে সেই কঠিন জটিল সমস্যার সঙ্গে
করিতে নিয়ন্ত থাকাই সর্বতােভাবে যুক্তিসঙ্গত। যে তত্ত্ব
গুপ্ত, তাহা চিরগুপ্তই থাকুক। দেখুন, লোকে কী
ধনসম্পত্তির নিরাপদ জন্ত গুপ্তভাবেই রাখিয়া থাকে, এবং
তজ্জন্য সদা শঙ্কিতচিত্তে বাস করে। কিন্তু আপনি কোন
বিশ্বাসের উপর নির্ভর করিয়া এবং কি জন্য তাহা প্রকাশ
করিয়া স্বেচ্ছায় ক্ষতস্করের কোপ-দৃষ্টিতে পড়িলেন। কি
প্রায় পঞ্চাশ বৎসর কাল অতীত হইতে সলিল, কালাম
অনলরাশি অন্তরে ধারণ করিয়া অবিচলিতভাবে অবস্থান
করিয়া আসিতেছেন; কখনও আপনার স্বাভাবিক ভাবে
পরিবর্তন বা ব্যত্যয় ঘটিতে দেখি নাই। ফখনও আপনার
সাধক-জনােচিত সহিষ্ণুতার লাফ হইতে শুনি নাই। কিন্তু
'হা, প্রতি এ কি অজ্ঞানান্ধের ন্যায় কাব্য করিয়া বসিয়া
ছেন? এই অসহিষ্ণুতার-উন্মতার ব্যয়ণ কি? |
এত দিন রে মাখিয়াছিলেন, তারা অনুমেই শােষণ করিয়া
মহর্ষি মন্সুর। রাখা কি উচিত ছিল না? যাহা হউক, অধিক আর কিছু , বলিবার নাই, স্থিরচিতে আমার কথা শ্রবণ করুন। যে উক্তি লােকের শ্রবণ-কঠোর বােধ হয়, সমাজ যাহাতে অধৰ্ম্ম বিবেচনা করেন, যাহার প্রশ্রয় দিতে বালবৃদ্ধ কেহই সম্মত নহেন, আপনি এবধি উক্তির উচ্চারণে ক্ষান্ত থাকিয়া আপনাকে বিপদমুক্ত করুন, ইহাই আমার অনুরােধ।” মনসুর আদ্যোপান্ত সমুদায় শ্রবণ করিয়া, দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক ক্ষণকাল নীরব থাকিয়া মৃদুস্বরে কহিলেন, “যদি মুখতাই না করিব, যদি ধৃষ্টতাই না হইবে, তবে আজ দুর্দশার চরম সীমায় সমুপস্থিত হইব কি জন্য ? নর-বিচারে অপরাধ করিয়াছি বলিয়াই ত অপরাধী! নতুবা নিরপরাধের কেশস্পর্শ করে, কাহার সাধ্য ? কিন্তু জানিবেন, ইহা বিধি- লিপি! বিধাতা-পুরুষ অদৃশ্য অক্ষরে ললাট-ফলকে যে সমস্ত ভাৰী ঘটনায় উল্লেখ করিয়া দিয়াছেন, জীবনে তাহা ঘটিবেই যটিবেকিছুতেই খণ্ডিত হইবার নহে। সুতরাং আমি স্বয়ং সাধ করিয়া যে আত্মনাশে উদ্যত হই নাই, ইহা স্থিরনিশ্চয়। ইহা বিধাতার কাৰ্য। আপনি ত সমস্তই অবগত আছেন? এবং আমার বর্তমান আন্তরিক ভাবনিচয়ও ত হৃদয়ঙ্গম, করিতেছেন? আমি অপার জ্যোতিসমুদ্রের মধ্যস্থিত ক্ষুদ্র তৃণখণ্ডবৎ অতি প্রবল তরঙ্গমালায় দোদুল্যমান; ইচ্ছা, স্থির অষ্টম পরিচ্ছেদ। ১১ থাকি, কিন্তু পারি কই ? সে শক্তি আমার কোথায় ? মুহূর্ত মধ্যে চলেৰ্ম্মি প্রভাবে আমার অসংখ্য বার উর্ধাধাে- ভাবে উত্থান পতন হইতেছে। সুতরাং অনর্গল মুখদ্বার দিয়া অন্তরের কথা উচ্ছলিত হইয়া স্বতই বাহির হইয়া পড়িতেছে। তাহা রােধ করিতে আমার সামর্থ্য নাই, প্রবৃত্তিও হয় না। অতএব যে কারণেই হউক, আমি প্রাণ- দণ্ডের উপযুক্ত পাত্র। আহা কি আনন্দ ! কি সুখদর্শন। আজ সমুদয়ই আলােকময় দেখিতেছি—আকাশ পাতাল- ভরা একই আলােক, দ্বিতীয় আলােক নাই। কি আশ্চৰ্য্য। কি মনােম! এমন ঔজ্জ্বল্য-লহরী-লীলা ত কখন দেখি নাই। হে জ্ঞানময় ! বিলম্বে প্রয়ােজন কি ? বােগদাদবাসিগণের এবং আমার মনস্কামনা শীঘ্র পূর্ণ হউক। হে হিতৈৰি। যদি শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতেরা জিজ্ঞাসা করেন, তবে বিনা চিন্তায় সরানুসারে আপনিও ইহার ব্যবস্থা প্রদান করিতে কুষ্টিত হইবেন না। সুবুদ্ধি শেখ কবির, মহর্ষি মসুরের এতদ্বাক্য প্রবণে একেবারে হতাশ হইয়া পড়িলেন। তিনি বিষম মর্মবেদনা অনুভব করিতে লাগিলেন, তাই অবশেষে মৃদুস্বরে কহিলেন, “আপনার কথা সমস্তই সত্য। উহার উপর মন্তব্য প্রকাশ করিতে কাহারও ক্ষমতা নাই। কিন্তু ভাবিয়া দেখুন, কাৰ্যটা
মহর্ষি শুরু।
কি মর্মভেদী! কি লোমহর্ষণ! এমত সঙ্কটস্থলে আমাকে
ব্যবস্থা লেখা কি সম্ভব হইতে পারে ?” মসুর উচ্চ স্বরে
কহিলেন, “পারে—অবশ্যই পারে? “সার” বিধানকে প্রতারণা
করা আমার বাসনা নহে—আপনারও হইতে পারে না।
শাস্ত্রমতে যখন আমি শূন্ত্রে বধার্থ প্রশস্ত, তখন তাহাতে
নীরবতা অবলম্বন করিয়া স্বীয় দুর্বলতা ও সঙ্কীর্ণতা প্রদর্শন
করা অকর্তব্য। অতএব আমার অনুরােধ, আপনি ব্যবস্থা
দিতে ইতস্তত করিকেন না।” এইরূপ বহুবিধ কথােপকথন
হইল। সেই কথােপকথনের ঘাত প্রতিঘাতে উভয়ের মুখ
হইতে কত নৈতিক উপদেশ, কত গুঢ় তত্ত্বকথা, কত প্রিয়
প্রসঙ্গ বাহির হইয়া পড়িল। কিন্তু অল্পবুদ্ধি জনমণ্ডলীর
তাহা বুঝিবার হৃদয় কোথায় ? ফলতঃ যে বুঝিল, সে মৃতবৎ
দণ্ডায়মান হইয়া অবিরল অশ্রুধারে বক্ষস্থল প্লাবিত করিতে
লাগিল। ব্যথিত-প্রাণ মহাত্মা কবির আর অপেক্ষা করিলেন
না; জনতা তাে করিয়া
মন্সুরের নিকট হইতে বহির্ভাগে
জাসিয়া উপস্থিত হইলেন।
নবম পরিচ্ছেদ। মহর্ষির বাক্যালাপ সাঙ্গ হইলে, চতুর্দিকন্তু আমবমণ্ডলী কোলাহল করিয়া উঠিল। অনেকে মন্সুরের কথিত মতে ব্যবস্থাপ্রার্থী হইয়া আগন্তুক শেখ সাহেবকে বেষ্টন করিয়া দাড়াইল। কিন্তু সেই মহামনস্বী ব্যক্তি কিয়ৎকাল নিস্তব্ধতা অবলম্বন করিলেন। তাহার অন্তর মধ্যে নানা চিন্তার আবির্ভাব হইল। অনন্তর গাত্রাখানপূর্বক সর্বসমক্ষে দণ্ডায়মান হইয়া উচ্চৈঃস্বরে কহিলেন, “হে বােগ্দাদের ইম-সন্তানগণ! দৃঢ়ব্রত মনুরের সহিত যে সমস্ত কথা হইল, তাহা আপনারা সকলে শ্রবণ করিয়াছেন। তাহার গুপ্তাবস্থা অর্থাৎ মানসিক ভাব সেই সৰ্ব্বক বিশ্ববিধাতাই অবগত আছেন। তাহাতে ইনি অপরাধী কি না, তাহা তিনিই জানেন। তবে প্রকাশ্য অবস্থার দিকে দৃষ্টি করিলে তিনি যে অমার্জনীয় অপরাধে অপরাধী, তাহাতে সন্দেহ নাই। পবিত্র “স” বিচারে সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত রূপ প্রাণদণ্ডের বিধান আছে। কিন্তু তস্য ব্যাকুল কেম? যিনি ঈশ্বয়ের পথে স্বয়ং আত্মবিসৰ্জন করিতে প্রত, তাহার প্রতিকূলে ব্যবস্থায় আবার প্রয়ােজন কি বল দেখি। ৰিমার- ০৪ মহর্ষি মসুর। পতি কাজীই বা তাহার কি বিচার করিবেন ? তিনি ত আপনার বিচার আপনিই করিয়া রাখিয়াছেন। আপনারা যাহা চাহিতেছেন, তিনিও তাহাই চাহিতেছেন, এবং তজ্জন্য প্রস্তুত হইয়া আছেন।” এই কথা শ্রবণ করিয়া সকলেই সন্তুষ্ট হইল। কিন্তু ইত্যবসরে অনেকগুলি নিষ্ঠুর ও উদ্ধত প্রকৃতির লােক বিলম্বজনিত বিরক্তির সহিত মহর্ষিকে বল- পূৰ্ব্বক ধৃত করিয়া আনিয়া বধ্যস্থানে উপস্থিত করিল। আহা সেই শুদ্ধকৰ্ম্মা পুরুষের পবিত্র ও কোমল অঙ্গে কত ধৰ্ম্ম- জ্ঞানবর্জিত নির্দয় রাক্ষসের কঠোর কুলিশােপম হস্ত পতিত হইল। আবার মহাকোলাহল—আবার মহাধুমধাম পড়িয়া গেল। সকলেরই দৃষ্টি সেই একই কেন্দ্রাভিমুখে ধাবিত হইল। অন্তরে, অদূরে, সর্বত্রই একটী অভিনব দৃশ্যের সৃষ্টি হইল। অহহ! সে দিনের সেই ভীষণ দৃশ্যের—সেই ভয়াবহ ঘটনার বর্ণনা করিয়া উঠে, কাহার সাধ্য ? প্রান্তরের চতুর্দিকেই যেন প্রলয়-তুফান বহিতে লাগিল। চতুর্দিকেই সংখ্যাতীত ললাকের সমাবেশ। পিপীলিকা শ্রেণীর ন্যায় বধ্যভূমি লক্ষ্যে সুবিশাল বােগদাদ নগরবাসীদের দ্রুত গমনের বিরাম নাই; অনকোলাহলে আকাশমার্গ গমগম্ করিতে লাগিল। কাহার মুখে শােকসূচক হাহাকার ধ্বনি, কেহ বা আনন্দ প্রকাশে নিরত হইল।
অষ্টম পরিচ্ছেদ। ১৫ আজ প্রণয়-পরীক্ষার দিন! প্রেমিক স্বীয় প্রাণ উৎসর্গ করিয়া প্রণয়পাত্রের সম্মুখীন হইতেছেন,-বিচ্ছেদের বিষাদ- ময়ী রজনীর অবসানে সুখময় মিলন-প্রভাত সমুপস্থিত হইতেছে। প্রেমিক ও প্রণয়াস্পদ নিয়ত নির্ভয়ে প্রণয়ার্ণবে নিমগ্ন থাকিবেন, আজ তাহার সূচনা হইতেছে। বিরহের বিষম চিন্তা আজ চিরবিদায় গ্রহণ করিবে। বহু দিন হইতে যে হৃদয় শূন্য ছিল, আজ তাহা পূর্ণ হইতে চলিল। দগ্ধ ক্ষতে শান্তিসুধার বর্ষণ হইতেছে। আজ ঈশ্বরের কৃপায় সাধকের চিরাভিলাষ সিদ্ধ হইতেছে।” এবার বহু বাক্যে যাবতীয় লােক, কেহ সুভাবে, কেহ বা রহস্য ও অসূয়াপরবশ হইয়া পরিহাস-প্রকাশক কণ্ঠে-যাহার মুখে যাহা আসিল, সে তাহাই কহিল। কিন্তু দৃশ্যটী কি লােমহর্ষণ! ঘটনাটী কি নৃশংস !! কাৰ্য টী কিরূপ মৰ্ম্মস্পশী বেদনাব্যঞ্জক !!! সে দিকে কাহার দৃষ্টি নাই ; কার্যের গভীরতা পরিমাণ করিতে ও পরিণাম চিন্তা করিতে সকলেই অক্ষম। হা বিধাত! হে প্রেমময় পরাৎপর প্রভু! প্রেমের কি পরিণাম এই? প্রেমিকের পুরস্কার কি এইরূপেই হইয়া থাকে ? হে বিশ্বপ্রেমিক! তােমার সহিত প্রণয়-বন্ধনে প্রণয়ী আবহমান কাল সুখ-শান্তিতে থাকিয়া লােকের ভক্তি, প্রতি ও সম্মান লাভ করিয়াই আসিয়াছে, কিন্তু কাহাকে কবে অতিকরে জীবন বিসর্জন মহর্ষি মনসুর। করিতে হইয়াছে? আজের এ ঘটনা নিখিল ধরণীধামে অভিনব, অলৌকিক, অদৃষ্ট ও অশ্রুতপূর্ব। * ধন্য মহর্ষি মন্সুর! ধন্য স্কুশি অকৃত্রিম প্রেমিক! ধন্য তুমি সাধনসহিষ্ণু ধৰ্ম্মবীর! ধন্য দোমার তত্ত্বজ্ঞানজনিত বৈরাগ্য! আজ তােমার বিচ্ছেদানল-হৃদয়ের সন্তাপানল নির্বাপিত হইবার উপক্রম হইয়াছে, পীড়ার উপশম হইতে আর বিলম্ব নাই। ত্বরায় প্রিয় সহ প্রিয় সম্ভাষণে সম্মিলিত হইবে। হীনবুদ্ধি লােকেরা ভাবিতেছে, তুমি ভীষণ যন্ত্রণা সহ করিতে এখানে আনীত, হইয়াছ। কিন্তু তােমার মনে ত সে ভাবের লেশমাত্র নাই। তুমি ভাবিতেছ, তােমার সুখের পথ নিষ্কণ্টক হইতেছে ; দুঃখী অমানিশার অবসান হইতেছে। কখন সৰ্ব্ব-ভুবন- প্রকাশক দিনমণির শুভ্রালােকে চরাচর উদ্ভাসিত হইবে, তুমি সেই আশার ফকণ্ঠ চাতকের দায় সময় গণনা করিতেছ। বদনে চিন্তার স্থপিত মাত্র হয় নাই ; চিত্ত বিকাররহিত একুল পরি মরি কি মধুর। কি অলৌকিক! কি অভাব- মীয় অমায়িক ভাব। মহুর্বে! এ জগতে তুমিই তােমার এক- মাত্র দৃষ্টাইল। (*) ধূয়ানদিগের মতে মহাত্মা যীশুখৃষ্টে (হজরত ইসা নবীর) শূলে জায়গাপিত হইৰায় ঘটনা এরূপ অদ্ভুত আত্মোৎসর্গের জ্বলন্ত উদা- এরূপ অর্কিন লোশ হে।
নবম পরিচ্ছেদ।
৯৭
নীরব।
করে ?
লােকারণ্যের মধ্যস্থলে উচ্চশির শালবৃক্ষ • সদৃশ মস্তক
উন্নত করিয়া—অগণিত অজ মধ্যে মহাবল শাৰ্দল সম সাহসে
স্ফীত হইয়া মহামনী মন্সুর অনন্যমনে দণ্ডায়মান,—অন্তরে
উদ্বেগের চিহ্ন নাই, মুখে বচন নাই—নির্ভয়, নিস্পন্দ ও
ভয় করিবেন কাহার? সাগর কি শিশিরের ভয়
মাতঙ্গের মনে কখন কি পতঙ্গের শঙ্কা জন্মে ?
আহা মহর্ষির সে সময়ের ভাব অতি মধুর, অতি গম্ভীর ও
প্রফুল্ল হা-ব্যঞ্জক। সংখ্যাতীত নরচক্ষু তাহার প্রতি তীব্র
লক্ষ্যে অপলকে চাহিয়া রহিয়াছে। কিন্তু সহসা কি এ
অত্যদ্ভুত ঘটনা।
ইহা ঐন্দ্রজালিকের মােহকরী যাদুবিদ্যা
হইতেও বিস্ময়জনক, ও চমকপ্রদ। অকস্মাৎ জলদ-নির্ঘোষে
“আনা হকৃ” শব্দ সাধারণের ঐতি-বিবরে প্রবিষ্ট হইল।
পরমুহূর্তে দেখে, মন্সুর নাই। এই ছিল, এই নাই।
প্রাণান্তক যমদূত সমকক্ষ প্রহরীগণ-পরিবেষ্টিত বন্দী তপস্বা,
শত শত নর-নেত্ৰ-পথ হইতে অন্তর্হিত হইয়া কোথায় চলিয়া
গেলেন, তাহা কেহই অনুমান করিতে পারিল না। সকলেই
যথাস্থানে একই অবস্থায় দণ্ডায়মান, পিপীলিকা প্রবেশের
পথ নাই, বাতাস নিঃসারিত হয়, এমন ছিদ্র নাই; তবে
মন্সুর কোন্ শক্তি প্রভাবে কেমন করিয়া কোন্ পথে
পলায়ন করিলেন ? বিদ্যুৎস্ফুরণ কার্য সম্পাদিত হইতে
৭
১৮ মহর্ষি মনসুর। যতটুকু সময় লাগে, তদপেক্ষাও স্বল্প সময়ের মধ্যে, মুখের কথা মুখে বিলীন হইতে না হইতে, চক্ষের পলক পড়িতে, পড়িতে এই ঘাের পরিবর্তন! ইহা কি ভৌতিক ঘটনা। কে বলিতে পারে, ইহা ভৌতিক ঘটনা। ফলতঃ সকলেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পরস্পরের মুখ নিরীক্ষণ করিতে লাগিল। রসনা নীরস, মুখ মলিন, হৃদয় উৎসাহহীন, শরীরে বল নাই। জনসাধারণ যেন গতিশক্তি-বিরহিত প্রস্তর-খােদিত প্রতিমা বৎ অবশ ও অচল। কে যেন অকস্মাৎ নয়নে ধাঁদা লাগাইয়া দিল ; আনুপূর্বিক তাবত ঘটনা স্বপ্নময় বলিয়া প্রতীয়মান হইতে লাগিল। অনন্তর কিছুক্ষণ পরে, আবার ভয়ানক কোলাহল সমুখিত সকলেই নানাপ্রকার বাদানুবাদে প্রবৃত্ত হইল । মসুরের ক্ষমতা অদ্ভুত, এ ক্ষমতা সাধনা-সত, বিস্ময়ের একশেষ এ দৃশ্য ইত্যাদি বলিয়া অনেকে তাহার প্রশংসা-গান করিল। নিরীহ ধর্মসেবকগণ “হা ঈশ্বর! তুমিই মহা” বলিয়া প্রসন্নমনে প্রেমা বর্ষণ করিলেন। কিন্তু মসুর- বিদ্বেষীদলের মুখ েেষ, ক্ষোভে, লজ্জায় ও অপমানে অবনত। “ধত ব্যাঘ্র পলায়ন করিয়াছে, হায় ধর্মাবমাননার বুঝি আর প্রতীকার হয় না।” চঞ্চলমতি গোঁড়ার দল ইহাই ভাবিয়া আকুল। অনন্তর কি কৌশল করিলে মন্সুৱের পুনরাবির্ভাব হইল।
নবম পরিচ্ছেদ। হইতে পারে, তদ্বিষয়ে মন্ত্রণা চলিতে লাগিল। কিন্তু কেহই ভাবিয়া কোন সুক্ষ্ম উপায় বাহির করিতে পারিল না। তখন প্রধান পক্ষীয়েরা পরামর্শ করিলেন, “মনসুরের প্রতি কটুক্তি ও তৎপক্ষাবলম্বীদের উপর অত্যাচার করিলে, নিশ্চয় তাহার পুনর্দর্শন পাওয়া যাইতে পারিবে। তিনি এই স্থানেই আছেন, কিন্তু আমাদের মন্ত্রমুগ্ধ নয়ন তাহাকে দেখিতে পাইতেছে না ; ফলতঃ এ কার্য করিলে তিনি কিছুতেই আর অন্তরালে থাকিতে পারিবেন না।” এই সিদ্ধান্তে দৃঢ় বিশ্বাস করিয়া, হারা সমবেত জনমণ্ডলীকে উত্তেজিত করিলেন। তাহাতে দুর্দান্তস্বভাব অর্বাচীনেরা আঘাতপ্রাপ্ত বিষধরের ন্যায় ক্রোধে তর্জন গর্জন করিয়া ঋষিরাজকে অকথ্য কটুক্তি করিতে লাগিল ও তৎপক্ষসমর্থনকারী সহমতাবলম্বী সাধুদিগকে বিকৃত স্বরে পরিহাস ও কুবাক্যবাণ বর্ষণ করিতে প্রবৃত্ত হইল তাহাতেও সফলকাম না হওয়ায়, পরস্পর ইঙ্গি তানুসারে সজোরে প্রস্তরাঘাতপূৰ্ব্বক সেই নিরীহ ব্যক্তিগণকে ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিল। ভীষণ অরাজকতা উপস্থিত। 'বিড়ম্বনার একশেষ। অবিচার-উৎপীড়ন পূর্ণমাত্রায় চলিতে লাগিল। মারধরসূচক হুহুঙ্কার নাদে যেন প্রবল বাতার সৃষ্টি হইল। এদিকে অদৃশ্য যবনিকার অন্তরালে থাকিয়া এই বীভৎস কাও দর্শনে তপােসিদ্ধ মন্সুর আর সহ্য করিতে পারিলেন না।
মহর্ষি মনসুর। একের পরিবর্তে অপরের নিগ্রহ, অপমান—দণ্ডভােগ ! ইহা তাহার ভাল লাগিল না। তিনি তৎক্ষণাৎ প্রেমপূর্ণ “আনা হক” শব্দে দিষ্মণ্ডল প্রতিধ্বনিত করিয়া,-অত্যাচারীগণের অন্তর ঝাপাইয়া আবার সকলের দৃষ্টিসীমার মধ্যে আসিলেন। অমনি নির্লজ্জ ভূরকৰ্ম্মাগণ সক্রোধে তাহার উপরে প্রস্তর বর্ষণে রতহইল। ইহা দেখিয়া তিনি ত্বরিতপদে শূণাস্ত্রের নিকটে উপস্থিত হইলেন। চতুর্দিক হইতে বর্ষার বারিপাতের ন্যায় মহর্ষির উপর আরও অজস্র প্রস্তর পতিত হইতে লাগিল। কিন্তু সেই সাংঘাতিক আঘাতেও কোন দিকে তঁাহার দৃ- পাত নাই ; সাধনসহিষ্ণুতার ফলে মনের ভাব পূৰ্ব্ববৎ তুষ্টি- জনক ও বিকাররহিত। বিষাদের কালিমা রেখার পরিবর্তে হাস্যের আনন্দলহরী তাহার বদনমণ্ডলে পরিদৃশ্যমান। কেননা শনিক্ষিপ্ত সেই সমস্ত কঠিন পাষাণ তাহার শরীরে প্রস্ফুটিত ফুলের ন্যায় হাসিয়া হাসিয়া পড়িয়াছিল, এবং তজ্জনিত আঘাত তিনি সুকোমল কুসুম-স্পর্শ তুল্য জ্ঞান করিয়াছিলেন। পরন্তু আর একটী বিস্ময়জনক ঘটনা –এই সময়ে শেখ শিবলীর নিক্ষিপ্ত একটী পুষ্পঘাতে তিনি মর্মান্তিক কাতর হইলেন । প্রস্তরাঘাতে আনন্দ এবং পুষ্পষতে যাতনা! প্রকৃতই ইহা বিস্ময়ের কথা বটে! ইহার কারণ জিজ্ঞাসিত হইলে মহর্ষি সহর্ষে বলিলেন, “ধৰ্ম্ম-মৰ্ম্ম-জ্ঞানহীন অপ্রেমিক অত্যাচাষীর নবম পরিচ্ছেদ। প্রহার হইতে আমি স্বাধীন। অন্ধের লক্ষ্য কখন কি ঠিক হইতে পারে? ফলতঃ চক্ষুষ্মন ব্যক্তির সন্ধান অব্যর্থ ও মারাত্মক। আমার বন্ধুর প্রেমিক যিনি, যাহার সহিত আমার নিকট সম্বন্ধ, যিনি আমার ব্যথার ব্যথী, তাহার তৃণাঘাতেও কষ্টানুভব হইয়া থাকে।” পুনঃ প্রশ্ন হইল, শিবলী বলিলেন, “হে প্রিয়ম্বদ প্রিয়বর! ‘প্রেম’ শব্দটা সর্বত্রই শুনিতে পাই, কিন্তু সাধারণ্যে প্রকাশ করিয়া বলুন, প্রেমের অর্থ কি ?” মহর্ষি কহিলেন, “হে শিবলি । প্রেমের ব্যাখ্যা কি আপনি বুঝিতে পারেন নাই ? ইহার প্রকৃত অর্থ, হত্যা ও সৰ্বসমক্ষে প্রেমিকের শব দগ্ধ করণ। ঘ্রই এ ঘটনা দেখিতে ও বুঝিতে পারিবেন।” “আধ্যাত্মিক তব্দের অর্থ কি ?” কহিলেন, “অতি সামান্য, অতি সূক্ষ্ম, রেণু-কণা সদৃশ। যাহা দেখিয়াছেন, সে সমস্ত অনর্থক চিন্তামাত্র।” এইরূপ ধীরচিত্তে মহর্ষি বহুলােকের বহু প্রশ্নের সদুত্তর প্রদান করিলেন। অবশেষে তেজস্বী থবীর প্রসন্ন- বদনে শূলীদণ্ড চুম্বনপূর্বক স্বয়ং বধমঞ্চে আরােহণ করিলেন। তখনও প্রস্তর পতনের বিরাম নাই, তখনও লােকের ক্রোধের উপশম নাই। কিন্তু সাধারণে তাহার অৰিচলিত ধৈৰ্যশীলতা ও দৃঢ়হৃদয়তা দেখিয়া আরও চমৎকৃত হইল। তদনন্তর মহাতপা মন্সুর জগৎপাতার উদ্দেশে উৰ্দ্ধমুখে মহষি মন্সুর। ; হস্তোত্তোলন করিয়া, প্রার্থনা পূৰ্ব্বক গম্ভীর স্বরে “হ হক আনা হ” শব্দোচ্চারণে দিক দশ বিকম্পিত করিয়া তুলিলেন। কি আশ্চৰ্য্য! কি অলৌকিক ঘটনা ! বিধাতার কি অনুভূত বিচিত্র লীলা যে শব্দের উচ্চারণে বােগদাদের জন-সাধারণ মসুরের প্রাণহন্তারক হইয়া দাঁড়াইয়াছে, এক্ষণে সেই নিষিদ্ধ “অনাহ” বাক্য তাহাদেরই রসনা হইতে স্বতঃ অনিবাৰ্য্য- রূপে ভূয়ো-ভূয়ঃ নিঃসারিত হইতে লাগিল। কে যেন তাহাদের রসনা-যন্ত্র ঘূর্ণিত করিয়া এই ধ্বনি বাহির করিতে লাগিলেন। কেহই নিস্তব্ধ নহে; সকলে এই একই ধূয়ায় উন্মত্ত। কেবল মনুষ্য নহে, নির্জীব জড়পদার্থ ও উদ্ভিজ্জাদিও ঐ ধ্বনি বহির্গমনে ক্ষান্ত রহিল না। মানবমণ্ডলীর মুখে “আনা হক, পদদলিত দুৰ্ব্বাদলে “আনা হক, ইষ্টকপ্রস্তর-মৃৎখণ্ডে “আনাল হক,” তরু-লতা-গুল্মে “আনা হক, অলক্ষ্য বায়ু সাগরে “আনা হক,” উডীয়মান মেঘমালায় “আনা হক, পশু-পক্ষী-কীট-মুখে আনা হ”; এইরূপ যে দিকেই কর্ণ- পাত করা যায়, সেই দিকস্থ স্থাবরজঙ্গম যাবতীয় পদার্থেই উক্ত এবিধ শব্দবিনির্গমন শ্রুতিগােচর হইতে লাগিল। আহা, এতদপেক্ষা বিস্ময়ের বিষয়-অমানুষিক ঘটনা আর কি হইতে পারে ? আরও আশ্চৰ্য্য, যারা বিরুদ্ধপ, তাহাদিগকেও আজ অপরাধীর দণ্ডবিধান করিতে আসিয়া জড়-অজড় পদার্থ D
নবম পরিচ্ছেদ।
১০৩
নিচয়ের সহিত সেই একবিধ দোষেই দোষী প্রমাণিত হইতে
হইল। ইহা দৈবের কৌশল, না বিড়ম্বনা ?
বিপক্ষদল এই দৈবনিৰ্বন্ধে বিস্মিত, স্তম্ভিত, ভীত ও
নিতান্ত মৰ্ম্মপীড়িত হইল এবং উপায়ান্তরবিহীন হইয়া
অধৈর্যের সহিত উচ্চৈঃস্বরে ঘাতককে কহিল, “আর বৃথা
বিলম্বের প্রয়ােজন কি ? আর বিড়ম্বনা-ভােগ কি জন্য ? উহার
প্রাণবায়ু যত শীঘ্ৰ দেহবাস শূন্য করিয়া অনন্ত বায়ু-সাগরে
বিলীন হয়, ততই মঙ্গল। তুমি তাহারই আয়ােজন কর।
ইহার সর্বাবয়ব সুতীক্ষ্ণ অসি প্রহারে শতধা বিচ্ছিন্ন করিতে
অস্থিসন্ধি পৃথক করিতে আর ক্ষণমাত্র দয়ার অপেক্ষা করিও
।” উঃ কি লােমহর্ষণ ভয়ঙ্কর কথা! কি বঙ্কুলেপহৃদয়
নির্মমগণের নিষ্ঠুরাদেশ ! কি অমানুষিক পৈশাচিক অত্যাচার !
শুনিলে অন্তরাত্মা উড়িয়া যায়, সৰ্বাঙ্গ শিহরিয়া উঠে, শােণিত
বিশুষ্ক হয়, নিতান্ত পাষাণহৃদয়ও দয়ার্দ্র হইয়া থাকে। আহা
তৎকালে তথায় কি কেহই ছিল না,-মহর্ষির গুঢ় উক্তির
মৰ্ম্মগ্ৰহ করিতে যথার্থ জ্ঞানী পুরুষ-নৃশংস হত্যার কবল
হইতে ধাৰ্ম্মিককে রক্ষা করিতে প্রকৃত নয়শার্দল কেহই কি
বিদ্যমান ছিল না। বড়ই ক্ষোভের কথা ! বড়ই পরিতাপের
বিষয়! লেখনি! ভস্মীভূত হও, মস্যাধারে নদী বিশুষ্ক হউক।
হস্ত! আজ অচল হও, এই দুর্বিষহ শশাকের কাহিনী বর্ণনা
মহর্ষি মনসুর। ? করিতে আর অগ্রসর হইও না। বিধাত! এই কি তােমার ভক্তগত প্রাণ ! এই কি তােমার অনুগতের কুশল সাধন? এই কি তােমার বন্ধুত্বের প্রতিদান? ক্ষুদ্র নর আনি, বুঝিতে পারিলাম না। প্রভো! তােমার এ কেমন কৌতুকাবহ লীলাখেলা প্রিয় পাঠক! আসুন, একবার মনশ্চক্ষে নিরীক্ষণ করুন, কি হৃদয়বিদারক দৃশ্য। ঐ দেখুন, অজ্ঞা- নান্ধদের আজ্ঞাক্রমে কালান্তক যমদুত স্বরূপ নির্দয় ঘাতকের বিজলীবিনিন্দিত চাকচিক্যশালী খরশাণ তরবারি উর্ধে উখিত হইল। মহর্ষি তন্নিম্নে মস্তক অবনত করত: ঘাতককে বিনীতভাবে কহিলেন, “ভাই। শীঘ্র স্বীয় কার্য সম্পাদন কর। আমার অন্তর অহারজনী দগ্ধ হইতেছে। যদি দেখাইবার হইত, তবে আজ জগৎকে দেখাইতাম, দেখিয়া বুঝিত। আমার হৃদয়ে সুখ নাই,মনে শান্তি নাই, অন্তর অনলপূর্ণ তুফানময়! তুমি আজ সেই আগুন নিবাইয়া দিয়া বন্ধুর কাৰ্য কর।” মহষির বিনীত বচন শ্রবণমাত্র নিষ্ঠুর ঘাতক অসিপ্রহারে তাহার পবিত্র দেহ হইতে হস্তদ্বয় বিচ্ছিন্ন করিয়া ফেলিল। অমনি দুই বাহুমূল হইতে পবিত্র শােণিত-প্রস্রবণ দ্রুত উচ্ছসিত হইয়া সুদূর উর্দ্ধে উখিত হইল। তাহার সর্বাঙ্গ রক্ত- রঞ্জিত,—রক্তপ্রবাহে ধরাতল কর্দমাক্ত হইল। অহহ কি নবম পরিচ্ছেদ। . হইল। ! ! ভীষণ নিষ্ঠুর কাণ্ড! অকস্মাৎ যেন বিনা মেঘে বজ্রাঘাত হইল। চতুর্দিক হইতে বিলাপসূচক করুণ কাতরােক্তি অলক্ষ্যে আকাশ ছাইয়া ফেলিল। প্রকৃতির হাস্যভরা বদন- মণ্ডলে যেন বিষাদের বিষম কালিমা-কুষ্মটিকার সঞ্চার বিশ্বসংসার অন্ধকারময়। অহহ, তৎকালে এই অবিচার-অত্যাচারের লীলাস্থলী বসুমতী ঘন ঘন বিকশিত হওত: রসাতলতল-সাগরে বিপর্যস্ত না হইয়া, সেই পাপস্মৃতি এখন পর্যন্ত হৃদয়ে ধরিয়া আছে কেন, কেমনে বলিব ? বিধাতার চক্র, বিধাতাই জানেন। সহৃদয় পাঠক! বিদুষী পাঠিকাগণ ! করুণাময় জগদীশ্বরের অনুগ্রহে কথায় কথায় আপনাদের সঙ্গে সঙ্গে এত দূর পর্যন্ত আসিলাম। কিন্তু আর না-এক্ষণে মহাবিপদ-ঘাের সঙ্কট। কি সঙ্কট ? তাহাও কি আবার বলিয়া দিতে হইবে ? যাহার আংশিক অবতারণায় আপনারা পােকে ক্ষোভে ম্রিয়মাণ ও মর্মবেদনায় সংস্নাশূন্য, অসংবরণ করিতে পারিতে- ছেন না, সে বিপদের কথা কি এখনও বলিয়া দিতে হইবে ? এমন মর্মভেদী ভয়াবহ ঘটনা কেহ কখন দেখে নাই, কাহার নিকটে শুনেও নাই, জগতে আর কখন ঘটিয়াছে কি না, তাহাতেও ঘাের সন্দেহ আছে। হায় কি করিব, কিছুই স্থির করিতে পারিতে ছ না। ভাবিয়া মন্তক ঘুরিয়া যাইতেছে, এ মহর্ষি মনসুর। কল্পনার উদ্ভাবনীশক্তি তিরােহিত হইয়াছে, হস্ত শিথিল ও রসনা অবশ। করধৃত লেখনীও কম্পিত। সুতরাং কি বর্ণনা করিব? বর্ণনা করিবার শক্তি কোথায় ? তাই বলিতেছি পাঠক! আজ বিষম সঙ্কটে পড়িয়াছি। জানিয়া শুনিয়া ইচ্ছা করিয়া এমন কঠিন কার্যে কি প্রবৃত্ত হইতে আছে ? কিন্তু কি করিব, হাত নাই, যে ঔষধ গুলিয়াছি, তাহা গিলিতেই হইবে। মহষির সুপবিত্র বাহুদ্বয় ভূপতিত হইয়া রধিরাক্ত ও ধূল্যবলুষ্ঠিত হইতে লাগিল। তদ্দর্শনে সেই সহ্যগুণের অব- তার সাধকপ্রবর ধ্যানস্তিমিতনেত্রে ঈশ্বরের গুণানুকীৰ্ত্তন- পূৰ্ব্বক হৃষ্টচিত্তে কৃতজ্ঞতা প্রদর্শনার্থ প্রার্থনা করিলেন এবং কহিলেন—“মনুষ্যের স্থূল দৃষ্টির দৃশ্য আমার স্থূল হস্ত কর্তিত হইল বটে, কিন্তু যে হস্ত নর-দৃষ্টির বহির্ভূত, আমার সেই অদৃশ্য সুক্ষ্ম হস্ত কাটিবার এ জগতে কাহারও ক্ষমতা নাই।” এই উক্তির পরে শশাণিতা বাহুমূলে স্বকীয় মুখমণ্ডল ঘর্ষণ করিলেন; তখন মুখশ্রী রক্তিমরাগে রঞ্জিত হইল। শিবলী ভগ্নহৃদয়ে কাতর কণ্ঠে তাহার কারণ জিজ্ঞাসু হইলে, তিনি কহিলেন, “পবিত্ৰাত্মন্! আমি সেই পরাৎপর পরম বন্ধুর প্রিয় কাৰ্য নামাজ পড়িবার উদ্দেশে “অজু” করিতেছি, পার্থিব জীবনের শেষ সাধ মিটাইয়া লইতেছি।
নবম পরিচ্ছেদ। ভ্রাতঃ! আমি আত্মশ্লাঘা করিতেছি না, জানিবেন,- প্রেমের জন্য প্রেমিক আপনার জীবনকেও তুচ্ছ জ্ঞান করে,—যথার্থ বন্ধুত্বপ্রয়াসী যিনি, তিনি বন্ধুর প্রতি-সম্পা- দাের্থ সকলই করিতে পারেন। তাহার পক্ষে পরিবর্তে স্বয়ি শরীর নিঃসৃত রক্তে “অজু করাই প্রশস্ত ও গৌরবের বিষয়। যে ব্যক্তি হৃদয়ের রক্ত দ্বারা ‘অজু না করে, তাহার নামাজ” সিদ্ধ নহে এবং সে প্রেমাস্পদের নিকট সম্মানিত হয় না। তাহার চিরাকাঙ্ক্ষিত সুখ পরম- পদ লাভে বঞ্চিত হওয়াও অসম্ভব নহে।” মহর্ষির এই বাক্য অবসানের সঙ্গে সঙ্গে তঁাহার পদযুগল কর্তিত হইল। অমনি তিনি মুক্তকণ্ঠে কহিলেন, “বােগদাদবাসিগণ ! হে ধৰ্ম্মাভিমানী ব্যক্তিবৃন্দ । নশ্বর ‘পার্থিব পদ কর্তন করা কঠিন কাৰ্য্য নহে, কিন্তু যে পদ আনময়ের অবিনশ্বর সুখ- রাজ্য দর্শনার্থ ধাবমান, এ জগতে কে তাহা কাটিতে ক্ষম বান্ আছে ?” এইরূপে নানা সৎপ্রসঙ্গ চলিতে লাগিল এবং তৎসঙ্গে সঙ্গে ক্রমে ক্রমে তাহার অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলি ছিন্ন হইল। অবশেষে নয়নযুগল উৎপাটিত। উঃ কি বীভৎস ঘটনা! এই নৃশংস ব্যাপারে অনেক লােক অসংবরণ করিতে পারিল না। চারিদিকে হাহতাশ পড়িয়া গেল। হায় হায় উচ্চ রােলে আকাশ ছাইয়া ফেলিল। কিন্তু করুণ।
১০৮
মহর্ষি মনসুর।
কোথায় ? দয়া কোথায় ? মমতা কোথায় ?
মমতা কোথায় ? এ ভীষ,
অভিনয়ক্ষেত্র হইতে যেন তাহারা চিরবিদায় গ্রহণ করি-
গাছে। পাঠক! ঐ দেখ দেখ, অশ্রু বর্ষণ কর, আর দেখ,
ঘাতক মহর্ষির পবিত্র জিহ্বা ছেদন করিতে অগ্রসর ! যে
জিহ্বায় দিবা রজনী পবিত্র বাণী বহির্গত হইত, যে জিহ্বা
উপদেশামৃত বর্ষণ করিত, ঘাতক তাহা কাটিতে উদ্যত
হইল। তখন মহর্ষি প্রিয় ভাষে কহিলেন, “ভ্রাতঃ ক্ষণেকের
জন্য অপেক্ষা কর, দুটী কথা বলিয়া লই।
দুইটা কথা
বলিবার অবর আমাকে দেও।” ঘাতক অসি সংবরণ করিল।
তখন রক্তাল্পত মাংসপিণ্ডস্থিত মস্তক উৰ্দ্ধমুখে কহিলেন,
“দয়াময়! এই দুরাচরণের জন্য ইহাদের উপর কুপিত হইও
—পরমপদলাভে বঞ্চিত করিও না। কেননা ইহারা যাহা
করিতেছে, তাহা তােমারই জন্য করিতেছে। এই সময়ে
জনতার মধ্য হইতে এক লজ্জাহীনা বৃদ্ধা উপস্থিত হইয়া
বলিল, “এই সে মসুর, এই সে ইল্লাম-বিরোধী ! মার মার,
খুব মার” ইহা বলিয়া চীৎকার করিয়া উঠিল, এবং ঋষিরাজের
প্রতি প্রস্তর নিক্ষেপ করিল। মহাত্মা মসুর তৎশ্রবণে
জন্মের মত পবিত্র কোরাণােক্ত আয়েত (শ্লোক) বিশ্বে
উচ্চারণের পর আর একবার “আনা হ” ধ্বনি করিলেন।
অহাে সেই ধ্বনির প্রতিধ্বনি দিগদিগন্তরে বিকীর্ণ হইতে
নবম পরিচ্ছেদ। না হইতে পবিত্র মস্তক বিচ্ছিন্ন হইয়া ধরাশায়ী হইল। সাধক-শিরােমণি ধবীর হােসেন মন্সুর, অবিচলিতচিত্তে হাসিতে হাসিতে সাধুতার পরাকাষ্ঠা দেখাইয়া, ঈশ্বর-প্রেমিক- তার অতুলনীয় খ্যাতি রাখিয়া, সৰ্বসমক্ষে জগদীশ্বরের নামে সুদুর্লভ ঋষিজীবন উৎসর্গ করিলেন। তঁাহার পূতাত্মা নশ্বর দেহ-বন্ধন বিমুক্ত হইয়া বগীর সমীরণ সহযােগে অলক্ষ্যে উথান করতঃ সেই নিত্যধামে যােগ্য পাত্রে যাইয়া সম্মিলিত হইল, যে ধামে শান্তিসুখ, প্রেম-পবিত্রতা, আনন্দোৎসব চির-বিরাজমান, যে রাজ্যের প্রজা সকলেই সাম্য ভাবাপন্ন, -পরম সুখী, যেখানে প্রেমিকের প্রেমাকা চরিতার্থতা লাভ করে—পিপাসা চিরনিৰ্ব্বাণ প্রাপ্ত হয়। আর তাঁহার দেহ? অনিত্য-অসার-একত্রসন্ধযােত পরমাণু-সমষ্টি দেহ ? অনাদরে-অবহেলায়—বিকৃত অবস্থায় নানা নির্যাতন ভােগ করণার্থ ধূলায় ধূসরিত। কেন তৎপ্রতি লক্ষ্য রাখিবেন ? তাহার আদরে বা অনাদরে লাভালাভ কি আছে ? কধুক পরিত্যাগ করিলে অহিবর সে দিকে একবার ফিরিয়াও চায়ে ! কিসের আবশ্যক ? কিন্তু পাঠক! এ সাধারণ কধুক নহে ! পবিত্র আধেয় ধারণ করিয়াছিল বলিয়া এক্ষণে সেই ক্ষুক—সেই সুপবিত্র আধার স্বীয় মাহাত্ম্য প্রকাশে উদৃপ্ত হইল।
মহর্ষি মনসুর।
তপস্বীর ছিন্ন শির ও অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ইতস্ততঃ ধূলায় পতিত ।
নগরবাসীদের আর উদ্বেগ নাই—সমস্ত ক্ষোভ দুর হইয়াছে।
কিন্তু আবার কি এ অলৌকিক ঘটনা !! সেই সমস্ত
দেহাংশ ও প্রত্যেক রক্তকণিকা হইতে অবিরল ‘আনা
হ” শব্দ নির্গত হইতে লাগিল-বিরাম নাই। মুহুর্মুহু
দমে দমে “আনা হ” ধ্বনি বাহির হইতেছে। এই
ঘটনায় অনেক লােক শােকসন্তপ্ত হইল, আবার উদ্বেগ
উপস্থিত। বিপক্ষ দল ক্ষোভে ও অভিমানে ম্রিয়মাণ। কি
করিবে? কিছুই স্থির করিতে না পারিয়া অবশেষে ক্রোধান্ধ
হইয়া মৃত দেহ ও ছিন্ন মস্তক সহস্ৰধা ক্ষুদ্র অংশে খণ্ড বিখণ্ড
করিয়া ফেলিল। কিন্তু তাহাতে আরও বিপরীত কাণ্ড ঘটিল।
তাহারা ভাবিয়াছিল, তদ্রুপ করিলে সমস্ত জঞ্জাল কাটিয়া
যাইবে—রােগের উপশম হইবে। ফলতঃ উপশমিত হওয়া দূরে
থাক, উত্তরােত্তর উপসর্গের বৃদ্ধিই হইতে চলিল। ঐশ্বরিক
শক্তিপ্রভাবে সেই মাংস খণ্ড সমূহ হইতে সমস্বরে “আনা
ক” শবোথিত হইয়া দশদিক প্রতিধ্বনিত করিল
সহসা যেন প্রবল ঝটিকায় শান্ত সাগর তরঙ্গায়িত হইল।
পরিণাম আরও যে কি ভয়ানক হইবে, তাহাই ভাবিয়'
সকলে চমকিত, অবাক্ ও ভয়বিহবল। প্রধান পক্ষীয়দের
মুখ স্নান,-আতাল বিশুষ্ক হইয়া গেল।
পরন্তু ঘটনার
;
নবম পরিচ্ছেদ। অলৌকিকত্ব ও অদ্ভুতত্ব এত দূচীন নিরক্ষর মুখ ; দিব্য- চৈতন্যোদয় হইতেছে না এবং কেহষ, ও চলচ্ছক্তিবিরহিত চরণ করিতে ক্ষান্ত হইতেছে না। এ রূপবতী কামিনী ও ও ভ্ৰমান্ধতা আর কি হইতে পারে ? আহা সেই উন্মত্ত জন- মণ্ডলীর হৃদয় কোন উপকরণে গঠিত ? তাহাতে কি কোম- লত্বের কণামাত্র ও ছিল না ? অহে! কি আক্ষেপ, দয়া-মেহ- করুণা-মমতার ছায়াও কি তাহাতে কখন পতিত হয় নাই ? ধৰ্ম্মের আদেশ পালন করিতে গিয়া অবশেষে যাহা অধৰ্ম্ম,- নিতান্ত নিষিদ্ধ পাপকৰ্ম্ম, তাহাও সম্পাদিত হইতে চলিল। শরিয়তের ( ইল্লাম-ধৰ্ম্মানুষ্ঠানের) দৃঢ়-বিশ্বাসী পণ্ডিত- গণের মতানুসারে প্রতিদ্বন্দ্বীদল এক স্থানে পৰ্বতপ্রমাণ পাকার কাষ্ঠাদি সজ্জিত করতঃ তাহাতে অগ্নি স’যােগ করিয়া দিল। দেখিতে দেখিতে ল ল জিহ্বা বিস্তার করিয়া—ধূ ধূ শব্দে ভয়াবহ বিভাবসু জ্বলিয়া উঠিল। তখন সেই সমুদয় মাংস খণ্ড ও শশাণিত সেই সৰ্ব্বসংহারক প্রচণ্ড পাবককুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হইল। মহর্ষির সৰ্বাৰম্ভব ভখাকাকে পরিণত হইতে চলিল। এই বার সমস্ত আপদের শাস্তি হইবে, লােকে বুঝিল। কিন্তু সকলই নিরর্থক; কিছুতেই কিছু হইল না,কোন চেষ্টাই ফলবতী হইল না। ছিন্ন অবয়ব সমূহ ভস্ম কারে পরিণত করিতে প্রচণ্ড হতাশনের মহর্ষি মন্সুর। সাহস হইল না—উহা কিছুতেই পুড়িল না। অধিকন্তু হতে বিপরীত!—সেই শ,—সেই নিষিদ্ধ শব্দ প্রসারিত হইয়া গেল। “আনা হ’’ ধ্বনি অনলরাশি হইতেও ঘন ঘন উথিত হইতে লাগিল। কি জালা ! এত করিয়াও এ বিপদের নিরাকরণ নাই।—দেখিয়া সকলের আপাদ মস্তক জ্বলিয়া উঠিল, হতাশে হৃদয় ভাঙ্গিয়া গেল। তাহাদের প্রতি কেশ- রন্ধ, হইতে যেন অনল-ফুলিঙ্গ বাহির হইতে লাগিল। তখন তাহারা ভীষণ রােষপরবশ হইয়া যাবতীয় মাংস দেশান্তরিত । করণার্থ নদীগর্ভে নিক্ষেপ করিল। উহা “আনা হক” শব্দে সৈকতভূমি কঁপাইয়া, বারি-রশি মাতাইয়া স্রোতো- বেগে অকুল পাথারে ভাসমান হইল। পাঠক! এক্ষণে বলুন দেখি, এ জগতে সর্বাপেক্ষ। বলবান্ কে ? উত্তর—নিয়তি লিপি। নিয়তিলিপি অবিচল--অনিবার্য। সে লিপির লিখন খণ্ডন করিতে কাহার সাধ্য নাই। এক দিন বিধাতা পুরুষ অদৃষ্ট-ফলকে যাহা লিখিয়া দিয়াছেন,—প্রস্তরাঙ্কিত- বৎ জলদরে আঁকিয়া দিয়াছেন, তাহা ঘটিবেই ঘটিবে- বিন্দু পরিমাণে তাহার “নড়চড় হইবার নহে। প্রচণ্ড বিক্রম সসাগরা ধরার সার্বভৌম নরপতি, ও দীনহীন নিরাশ্রয় পথের ভিখারী, পরম-ধার্শ্বিক নিত্য জিতেন্দ্রিয় সাধুপুরুষ, ও পরস্পাপহারী সদ। কদাচারী দ্য ; সদা কদাচারী দ; অগাধ মনীষাসম্পন্ন নবম পরিচ্ছেদ। দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত ও নিতান্ত অর্বাচীন নিরক্ষর মুখ ; দিব্য- লাবণ্য-পরিশােভিত বলিষ্ঠ যুবাপুরুষ, ও চলচ্ছক্তিবিরহিত লােলচায় বৃদ্ধ, নবযৌবন-গৌরবিণী রূপবতী কামিনী ও যৌবনবিগত পলিতকেশা প্রবীণা, পবিত্রতা-মাত-হৃদয় প্রিয়- দর্শন বালক ও উদগন্তোন্মুখী সুকুমারী বালিকা,সকলেই নিয়তির অধীন,সকলেই সুখে দুঃখে নিয়ত নিয়তির পূজা করিয়া থাকে। তাই বলিতেছি, বিশ্বসংসারে নিয়তির সীমা অতিক্রম করিতে কেহই সক্ষম নহেন। আজ সেই প্রবল নিয়তিচক্রে নিপতিত হইয়া ঋষিরাজ মন্সুর ও আপনার জীবন ও গৌরব- গুরুত্ব বিসর্জন করিলেন।
উপসংহার। সাগরের সীমা নাই ; সাগর অসীম, অনন্ত, অতলস্পর্শ ও সুদূর প্রসারিত। পবিত্র মাংসখণ্ড সমূহ স্রোতের আকর্ষণে এই অনন্ত সাগরে আসিয়া পতিত ও বিলুপ্ত হইবে বলিয়া সরিৎ-সলিলে নিক্ষিপ্ত হইল। লােকে ভাবিল, এই বার এই অলৌকিক অভিনয়ের যবনিকা পতন হইল, চিন্তার অবসান হইল। কিন্তু আরও কি বিস্ময়কর কাণ্ড। ঋষি- রাজের স্বর্গীয় উপাদানে গঠিত দেহাংশ সকল সরিৎসলিলে নিক্ষেপ করিবামাত্র জলরাশি প্রবল তরঙ্গে উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিল এবং লােকদিগকে আক্রমণ করণার্থ কূলাভিমুখে দ্রুত ধাবিত হইল ; বেলাভূমি প্লাবিত করিয়া, ভাসমান জল- যানাদি বিপর্যস্ত করিয়া উপকূলস্থ ব্যক্তিবৃন্দকে ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিল। কি ভীষণ দৈব বিড়ম্বনা! তখন সকলেই আসন্ন বিপদে রক্ষা পাইবার জন্য পলায়মানােদ্যত হইল, যে যে দিকে পারিল, প্রাণ লইয়া উৰ্দ্ধশ্বাসে পলায়ন করিতে লাগিল। স্রোতের প্রচণ্ড আঘাত অনেককেই সহ করিতে হইল। কত জন নিমজ্জিত, কত জন ভূপতিত ও কর্দ- মাক্ত হইল, কেহ কেহ বা অন্য কাহারও বস্তু বা হাদি উপসংহার। t ধারণ করতঃ প্রাণরক্ষায় চেষ্টিত হইল। “পলাও পলাও” ভয়ানক কোলাহলের সহ জলোচ্ছাসের অগ্রে মানব-স্রোত বহিয়া চলিল। এদিকে মহর্ষির জনৈক প্রিয় শিষ্য এই এণ ঘটনায় শান্তি স্থাপন মানসে শশব্যন্তে ধাবমান হইয়া সেই স্থলে উপনীত হইলেন। মহর্ষি একদা জীবনকালে এই শিষ্যকে বলিয়াছিলেন, “আমার ছিন্ন বিচ্ছিন্ন দেহের মাংসখণ্ড সমূহ নদীতে নিক্ষেপ করিলে যখন বারি-রাশি স্ফীত হইয়া, লােক- দিগের অনিষ্ট কামনায় প্রধাবিত হইবে, তখন তুমি আমার নির্দিষ্ট জীর্ণ পরিধেয় বৈরাগ্যবস্তু আনয়ন করতঃ অবিলম্বে জলােপরি নিক্ষেপ করিবে ; তাহাতে ক্রোধােচ্ছাসিত অম্বুরাশি অবনত ও শান্ত হইয়া স্বস্থানে প্রস্থান করিবে, এবং সমবেত ব্যক্তিবর্গও অনিষ্টের হস্ত হইতে পরিত্রাণ পাইবেন।* মহর্ষির জীবনকালের এই উপদেশানুসারে তদীয় প্রিয়শিষ্য সেই পবিত্র পুরুষের পবিত্র অঙ্গাচ্ছাদনী বিস্তৃত করিয়া ক্ষিপ্রহন্তে উত্তাল তরঙ্গমালার উপরিভাগে নিক্ষেপ করিলেন। কি আশ্চৰ্য্য! অমনি উচ্ছাস-উদ্ধত জলরাশি প্রশান্তভাবে নিস্তব্ধতা অবলম্বনে স্থানে প্রত্যাবর্তনপূৰ্ব্বক, নৈসর্গিক অবস্থায় অবস্থিত হইল—যেন উর্জোখিত অনল-শিখায় বারি- বর্ষণ, ক্রোধােদীপ্ত বিস্তৃতফণ অহিরাজকে মন্ত্রমুগ্ধ করিল।
মহষি মনসুর। পাঠক! ইহা মহর্ষির মাহাত্ম্যের পরিচায়ক নহে কি ? তাহার অকৃত্রিম ঈশ্বর-সাধনার আজল্যমান প্রমাণ নহে কি? লােক- সাধারণে বিপদমুক্ত হইয়া স্থিরচিত্তে এই অত্যাশ্চর্য ঘটনার বিব ভাবিয়া তাহা বুঝিল এবং একেবারে চমৎকার-রসে অভিষিক্ত হইয়া গেল। ঘটনার অলৌকিকত্বে সকলের অন্তরে বিবিধ ভাবের আবির্ভাব হইল। কেহ হাস্যমুখে, কেহ চিন্তা- ভাবনত অন্তরে, কেহ বা প্রকাশ্য অনুশােচনার সহিত স্ব স্ব ভবনাভিমুখে প্রস্থান করিল। বােগদাদ নগরের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার মুখে দিবারজনী এই প্রসঙ্গ চলিতে লাগিল। অনন্তর মহর্ষির শিষ্যবর্গ সমবেত হইয়া, ব্যথিত অন্তরে জলমধ্য হইতে অস্থিমাংস সংগ্রহ করিলেন এবং শাস্ত্র-সঙ্গত বিধানানুসারে সমাধি প্রদান করিলেন। হায়! এইঙ্কপে এক জন অসাধারণ ঐশিক তেজোবীৰ্যশালী, অমানুষিক জ্ঞান- সম্পন্ন, অতুলনীয় তত্বশী, অলৌকিক কার্যক্ষম ও নিরতিশয় ধর্মপরায়ণ মহাপুরুষের পবিত্র জীবনাভিনয়ের যবনিকা পতন হইল।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.