Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Arjya-jeebanee Part 1

Saraswati,ramanath · 2010/01/13

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

ARYAN BIOGRAPHY
OR
THE LIVES OF A FEW ANCIENT
ARYAN HEROES
PART I,
BY
RAMANATH SARASWATI, M.A.,
Professor, Sanskrit, Dacca College.
-:০;
আৰ্য্য-জীবনা।
অর্থাৎ
-
কতিপর অৰ্য মহাপুরুষের জীবন-চরিত।
প্রথম ভাগ।
রমানাথ সরস্বতী প্রণীত
:0,
Calcutta :
B. Banerjee & Co.
25 Cornwallis Street, and 54: College Street.
1910. /
Price 10 Annas. ]
[ মূল্য—ly• দশ অনা

CALCUTTA,
PRINTED BY K. C. DATTA AT THE VICTORIA PRINTING WORKS
203/2, CORNWALLIS STREET.
PUBLISHED BY
B. BANERJEE & Co.,
25, CORNWALLIS STREET CALCUTTA,

সূচনা। আৰ্য-জীবনীর প্রথম ভাগ প্রকাশিত হইল। ইহাতে কতিপয় অমহাপুরুষের জীবনী বিবিধ সংস্কৃত গ্রন্থ হইতে সংকলিত হইয়াছে। বিদেশীয় ব্যক্তিদিগের জীবনচরিত পাঠ করিবার অপেক্ষা দেশীয় মহাপুরুষদিগের জীবনচরিত পাঠ করিবার অপেক্ষা দেশীয় মহাপুরুষদিগের জীবনবৃত্ত পাঠ করিলে পাঠকগণ যে অধিকতর উপকার লাভ করিতে পারিবেন, তদ্বিষয়ে সন্দেহ নাই। জীবনচরিত চরিত্র সংশােধন এবং চরিত্রসংগঠনের একটী প্রধান সাধক। অনেক ব্যক্তি জীবনচরিত পাঠ দ্বারা প্রভূত উপকার পাইয়াছেন। এই ভাগে যে জীবনীগুলি সংগৃহীত হইয়াছে, তন্মধ্যে দ্বিতীয়টা প্রথমে বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত হয়। অবশিষ্টগুলি সমস্তই তত্ত্ববােধিনী পত্রিকাতে প্রকাশিত। প্রথম প্রকাশকালে এই প্রস্তাবগুলি সংবাদপত্র-সম্পাদকদিগের দ্বারা প্রশংসিত হয়। তদনন্তর আমার কতিপয় বিদ্বৎসমাজ-পরিচিত বন্ধু এই প্রস্তাব সকল গ্রন্থাকারে মুদ্রিত করিতে আমাকে অনুরােধ করেন। তদনুসারে আর্য-জীবনীর প্রথম ভাগ প্রচারিত হইল। প্রাপ্ত হইলে ক্রমশঃ ইহার অপরাপর ভাগ প্রকাশ করিতে যত্ন করিব। এক্ষণে ইংরাজী এবং বাঙ্গালা বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষগণের সকাশে সবিনয় প্রার্থনা এই যে, তাহারা স্ব স্ব বিদ্যালয়ে এই আৰ্য-জীবনী পাঠারূপে গ্রহণপূৰ্ব্বক আমার এতাদৃশ যত্ন ও পরিশ্রম সার্থক করিয়া আমাকে উৎসাহ প্রদান অলমধিকেন ইতি। উৎসাহ ঢাকা কলেজ, } গ্রন্থকার। ২৫শে জুলাই, ১৮৮১।

নির্ঘণ্ট ।
বিষয়।
পৃষ্ঠা।
• *
•••
ধৰ্ম্মবীর যুধিষ্ঠিরের সংক্ষিপ্ত জীবনী
মৌৰ্য্যকুলবীর চন্দ্রগুপ্তের সংক্ষিপ্ত জীবনী
ঐক্ষাক ধৰ্ম্মবীর রামচন্দ্রের সংক্ষিপ্ত জীবনী
নাস্তিকত্রাস ধৰ্ম্মবীর শঙ্করাচার্যের জীবনী
জৈনধৰ্ম্মবীর মহাবীরের সংক্ষিপ্ত জীবনী
ধৰ্ম্মবীর অশােকের সংক্ষিপ্ত জীবনী
দানবীর ভােজপ্রমায়ের সংক্ষিপ্ত জীবনী
৪৭ ৭১
০ ০ ০
•••
•••
১৪৩
১৬০
৮ ০ ০

আঁৰ্য্য-জীবনী ধৰ্ম্মবীর। যুধিষ্ঠিরের সংক্ষিপ্ত জীবনী হস্তিনাপুরস্থ (১) পৌরববংশে কুরু নামে একজন ধৰ্ম্মজ্ঞ সুবিখ্যাত নৃপতি ছিলেন। তাহার নামে তৎপ্রদেশস্থিত কুরুজাঙ্গল এবং কুরুক্ষেত্র (২) এই স্থানয়ের নামকরণ হইয়া- ছিল। তাহার রজ্যাবধি পৌরবংশ কুরুবংশ নামে আখ্যাত হইয়াছে। এই কুরুবংশে বিচিত্রবীর্যনামধারী একজন প্রথিতনামা নরপতি ছিলেন। তাঁহার দুই ক্ষেত্ৰজ পুত্র ছিলেন, তাঁহাদিগের নাম ধৃতরাষ্ট্র এবং পাণ্ডু। ধৃতরাষ্ট্র (১) হস্তিনাপুর কেবিদিগের রাজধানী, বর্তমান বিজনোর নগরের দক্ষিণ-পশ্চিম এবং মিরট নগরের উত্তর-পূর্বে গঙ্গার দক্ষিণ তটে স্থিত ছিল। সুহেত্ৰিতনয় হস্তী নামে নৃপতি ইহা স্থাপন করিয়াছিলেন। (২) বর্তমান স্থানেশ্বরের সন্নিহিত। কুরুক্ষেত্র বর্তমান দিল্লীর প্রায় পঞ্চাশৎ ক্রোশ উত্তর পশ্চিম। মহারাজ কুরু এই স্থানে তপস্যা করিতেন। ইহার আর এক নাম ধৰ্ম্মক্ষেত্র। এখানে সমন্ত- পঞ্চক নামে একটী সরােবর আছে ; তাহার অন্যান্য নাম ব্ৰহ্মসর, ৰায়ু সর, পবনসর ও রমহ্রদ। নৈমিষারণ্য কুরুক্ষেত্রের পার্শ্বস্থিত।

২ আৰ্য্য-জীবনী। জন্মান্ধ ছিলেন বলিয়া জ্যেষ্ঠতা-সত্ত্বেও রাজ্যাধিকার প্রাপ্ত হইতে পারেন নাই। সুতরাং তাহার কনিষ্ঠ পাণ্ডুই রাজ- সিংহাসনে আরােহণ করেন। যদুশ্রেষ্ঠ বসুদেবপিতা শূর দেবের কুন্তী নামে এক রূপলাবণ্যবতী কন্যা ছিল। পাণ্ডু নৃপতি এই শূরকন্যা কুন্তীর পাণিগ্রহণ করেন । যদুকুল- শিরােমণি বাসুদেব কৃষ্ণ কুন্তীর ভ্রাতুস্পুত্র ছিলেন বলিলে কুন্তীর পরিচয় অনেকের সুবােধ হইবে। কুন্তীর প্রকৃত নাম পৃথা; কিন্তু তাঁহার পিতা শূরদেব তাঁহাকে অনপত্য নিজ সখা কুন্তীভােজ মহীপতিকে দান করিয়াছিলেন বলিয়া তাহার নাম কুন্তী হইয়াছিল । কুন্তীকে বিবাহ করিবার কিছু দিন পরে পাণ্ডু রাজা মদ্ররাজভগিনী মাদ্রী নামে একটা কন্যার পাণিপীড়ন করেন। পাণ্ডু ভাৰ্য্যাদ্বয়ের সহিত বহুদিন সুখােপভােগ করিয়া স্বীয় জিগীষা-বৃত্তি চরিতার্থ করিবার নিমিত্ত দিগ্বিজয়ে বহির্গত হইলেন। তিনি মগধ, মিথিলা, কাশী, সুহ্ম, পুণ্ড, (৩) প্রভৃতি বহুবিধ জনপদ জয় করিয়া স্বরাজ্যভুক্ত করিলেন। তদনন্তর হস্তিনাপুরে প্রত্যাগমন করিয়া রাজ্যসুখ উপভােগ করিতে লাগিলেন। কিয়দিন পরে তিনি হস্তিনাপুরস্থিত প্রাসাদনিলয় পরি- ত্যাগপূৰ্ব্বক হিমালয়ের পৃষ্ঠদেশে বাসস্থান নিবেশিত করিয়া (৩) মগধ, মিথিলা ও কাশী রামচন্দ্রের সংক্ষিপ্ত জীবনীর টিপনীতে সুহ্ম বর্তমান ত্রিপুরা ও আরাকান। পুও দেশ বর্তমান পাবনা। ইহার দক্ষিণে গঙ্গা, পশ্চিমে মহা-নদী এবং পূর্বে ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা। পৌণ্ড- বদ্ধন ইহার নামান্তর।

যুধিষ্ঠিরের সংক্ষিপ্ত জীবনী । মৃগয়াচরণে কালযাপন করিতে লাগিলেন। কিন্তু পুত্র-মুখ নিরী ক্ষণে সুখী হইতে পরিলেন না। অনন্তর পাদেব নিজপত্নী কুন্তী ও মাদ্রীকে পুত্রার্থে দেবগণের আরাধনা করিতে আদেশ করিলেন। তদনুসারে কুন্তী ধৰ্ম্মদেবের অনুগ্রহে যুধিষ্ঠির, বায়ুদেবের অনুগ্রহে ভীমসেন, এবং ইন্দ্রদেবের অনুগ্রহে অৰ্জ্জুন নামে ক্রমশঃ তিন পুত্র প্রসব করিলেন এবং মাদ্রী অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের প্রসাদে নকুল ও সহদেব নামে দুই যমক পুত্র প্রসব করিলেন। কুন্তীর দ্বিতীয় সুত ভীমসেন এবং ধৃতরাষ্ট্র-পত্নী গান্ধারীর প্রথম পুত্র দুৰ্য্যোধন এক দিনে জন্ম- গ্রহণ করেন। কলিযুগের ৬৫৩ অব্দ অতীত হইলে কার্তিক মাসের প্রথমে জ্যেষ্ঠানক্ষত্রযুক্ত আশ্বিন শুক্লপঞ্চমী তিথির অষ্টম মুহূর্তে বেলা দুই প্রহরের সময় যুধিষ্ঠির ভূমিষ্ঠ হন। এক্ষণে কলিযুগের ৪৯৮৩ অব্দ চলিতেছে। (যুধিষ্ঠিরের কালনির্ণয় এই জীবনীর শেষভাগে বিবৃত করিব।) যুধিষ্ঠির ভূমিষ্ঠ হইবা- মাত্র দৈববাণী হইল যে “এই নরশ্রেষ্ঠ ধাৰ্ম্মিকাগ্রগণ্য, বিক্রম- শালী এবং সত্যবাদী নৃপতি হইয়া যুধিষ্ঠির নামে ত্রিলােকে বিখ্যাত হইবেন। ইহার যশঃ এবং তেজঃ সৰ্ব্বত্র প্রথিত হইবে।” তদনন্তর ক্রমশঃ আর চারি পুত্রের জন্ম হইল। পাণ্ড, নৃপতি পঞ্চ পুত্র লাভে অতিশয় হৃষ্ট ও সন্তুষ্ট হইয়া দৈববাণী অনুসারে পুত্রদিগের নামকরণ করিলেন। হিমালয়- স্থিত ঋষিগণ পাণ্ড, নৃপতির দেবদত্ত, মহাবল, শুভলক্ষণসম্পন্ন, প্রিয়দর্শন, কুরুবংশবিবর্ধন পঞ্চ পুত্র দর্শন করিয়া পরম আহলাদিত হইলেন। পুত্রগণের শৈশবাবস্থাতেই পাণ্ডুর স্বর্গলাভ হইল। মাদ্রী ৪ আৰ্য-জীবনী। । তাহার সহগমন করিলেন। কুন্তী পুত্রগণের প্রতি পালনে যত্নবতী হইলেন। তদনন্তর হিমালয়স্থিত তাপসগণ পাণ্ডুপুত্র এবং কুন্তীকে সমভিব্যাহারে লইয়া হস্তিনাপুরে আগমন করিলেন, এবং রাজবাটীতে প্রবেশপূৰ্ব্বক ধৃত- রাষ্ট্রের সমীপে সকল বৃত্তান্ত যথাযথ নিবেদন করিলেন। তখন ধৃতরাষ্ট্র বহুমানপুরঃসর তাপসগণকে বিদায় দিয়া পাণ্ডুপুত্র যুধিষ্ঠির প্রভৃতিকে স্বপুএনির্বিশেষে পালন করিতে , ল্যগিলেন। পাণ্ডবগণ বেদোক্ত সংস্কার সকল প্রাপ্ত হইয়া নানাবিধ সুখভােগপূর্বক অনুদিন দুৰ্য্যোধনাদির সহিত বাল্যক্রীড়া করিতে লাগিলেন। দুর্যোধনেরা শত ভ্রাতা এবং যুধিষ্ঠিরেরা পঞ্চ ভ্রাতা পরস্পর মিলিত হইয়া নানাবিধ ক্রীড়া দ্বারা আমােদ করিতেন। দুৰ্য্যোধনাদি ভ্রাতৃগণ কৌরব নামে এবং যুধিষ্ঠিরাদি ভ্রাতৃগণ পাণ্ডব নামে আখ্যাত হইলেন। দুর্যোধন প্রভৃতি ভ্রাতৃগণ সর্বদা পাণ্ডবদিগের অনিষ্ট সাধন করতে চেষ্টা করিতেন, কিন্তু পাণ্ডুপুত্রের। সৰ্ব্বক্ষণ সাবধান থাকিতেন বলিয়া কোন অনিষ্ট করিতে পারিতেন । পাণ্ডুপুত্রদিগের এক পিতৃব্য বিদুর অনুক্ষণ তাহাদিগের মঙ্গলকামনা করিতেন এবং যুধিষ্ঠিরদওি সৰ্ব্বদা তাঁহার উপদেশানুসারে কাৰ্য্য করিতেন। অনন্তর ধৃতরাষ্ট্র তাঁহা- দিগকে ধনুদে শিক্ষার নিমিত্ত গৌতমগােলাৎপন্ন শারদ্বত কৃপাচার্যের অধীনে রাখিয়াছিলেন। পাণ্ডুপুত্রগণ চতুর্বিধ ধনুর্বেদ এবং অন্যান্য শাস্ত্র শিক্ষা করিয়া দ্রোণাচার্যের নিকটে অশেষবিধ অস্ত্র শিক্ষা করিলেন। অদনন্তর সংবৎসরাবসানে ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডুপুত্র যুধিষ্ঠিরকে যুধিষ্ঠিরের সংক্ষিপ্ত জীবনী। ৫ যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করিলেন। যুধিষ্ঠির পাণ্ডুর জ্যেষ্ঠ পুত্র, সুতরাং রাজ্যের উত্তরাধিকারী। যুধিষ্ঠির যৌবরাজ্যে প্রতি- ঠিত হইয়া প্রজা শাসন করিতে লাগিলেন। তিনি যেরূপ ধৃতি, সহিষ্ণুতা, স্থিরতা, ঋজুতা এবং অনুকম্পার সহিত রাজ্য শাসন করিতে লাগিলেন, তাহাতে প্রজাগণ সকলেই সন্তুষ্ট হইল। অনতিদীর্ঘকালমধ্যেই যুধিষ্ঠির স্বকীয় বিনয়, সদাচার, শৌর্য বীৰ্যাদি প্রকাশ এবং প্রজাদিগের অনুরঞ্জন দ্বারা স্বপিতা পাণ্ডুরাজার কীর্তি অন্তর্হিত করিলেন। প্রকৃতিরঞ্জন দ্বারা তাঁহার যুবরাজ নাম সার্থক হইল। তিনি প্রজাদিগের অভাবমােচন, অত্যাচারনিবারণ, শিক্ষাদান এবং সংরক্ষণ দ্বারা কিরূপে প্রজারঞ্জন করিতে হয়, তাহার জ্বলন্ত উদা- হরণ সকলকে প্রদর্শন করিয়াছিলেন। যুধিষ্ঠিরের শাসনে সন্তুষ্ট পুরবাসিগণ এইরূপ জল্পনা করিতে লাগিল যে “বুদ্ধিমান্ রাজা ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধতা হেতু রাজ্য প্রাপ্ত হন নাই, অত- এব তিনি এক্ষণে নৃপতি হইতে পারেন না। শান্তনুতনয় ভীষ্মদেব পূৰ্বে...রাজ্য প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন, তিনি কখন অধুনা রাজ্য গ্রহণ করিবেন না। অতএব আমরা তরুণ- বয়স্ক সমরকুশল ধৰ্ম্মজ্ঞ সত্যবাদী জিতেন্দ্রিয় এবং অনুকম্পা- শীল পাণ্ডবজ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠিরকে সিংহাসনে রাজা বলিয়া অভি যিক্ত করিব। যুধিষ্ঠিরই ভীষ্ম ধৃতরাষ্ট্র প্রভৃতিকে যথাবিহিত সম্মানের সহিত বিবিধভােগবিশিষ্ট করিবেন।” পৌরগণ যুধিষ্ঠিরের প্রতি স্বানুরাগ এইরূপে প্রকটন করিতে লাগিল। যুধিষ্ঠিরানুরক্ত প্ৰজাগণের এইরূপ কল্পনা শ্রবণ করিয়া দুৰ্য্যোধন অত্যন্ত ব্যথিত হইল এবং পিতৃসমীপে গমন

আৰ্য-জীবনী ।
পূৰ্ব্বক পিতাকে বলিল, “হে পিতঃ, পৌরগণ আপনাকে
এবং ভীষ্মকে অনাদর করিয়া যুধিষ্ঠিরকে রাজা করিবার মন্ত্রণা
করিয়াছে। পাণ্ডুপুত্র যুধিষ্ঠির যদি পাণ্ডর রাজ্য প্রাপ্ত হয়,
তবে আমাদের উপায় কি হইবে? আমরা পুত্র পৌত্রাদিক্রমে
কখনই রাজ্য ভােগ করিতে পাইব না। অতএব আপনি
ইহার উপায় বিধান করুন।” ধৃতরাষ্ট্র দুর্যোধনের এই
বাক্য শ্রবণানন্তর ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া বলিলেন ‘বৎস,
পাও ধৰ্ম্মপরায়ণ এবং প্রজাদিগের অনুরাগভাজন ছিলেন।
পাণ্ডু আমাকে অন্যান্য জ্ঞাতিদিগকে যথেষ্ট সম্মান
ভক্তি করিতেন। তাঁহার পুত্র যুধিষ্ঠিরও গুণবান,
ধাম্মিক এবং প্রজানুরঞ্জন বলিয়া খ্যাতি লাভ করিয়াছে।
পাণ্ডু অমাত্য, সৈন্য, ও ভৃত্যগণকে সতত ভরণ পােষণ
করিতেন। ইহারা পাণ্ডুকর্তৃক সৎকৃত হইয়াছে, এক্ষণে
অবশ্যই পাণ্ডুপুত্র যুধিষ্ঠিরের প্রতি অনুরক্ত এবং পক্ষপাতী
হইবে তদ্বিষয়ে কিঞ্চিত্র সংশয় নাই। আর যুধিষ্ঠিরের
কোন দোষের লেশমাত্র নাই; অতএব কি প্রকারে আমরা
যুধিষ্ঠিরকে তাহার পিতৃপৈতামহ রাজ্য হইতে চ্যুত করিব?
যুধিষ্ঠিরের অনিষ্ট চেষ্টা করিলেই পৌরগণ আমাদিগকে বধ
করিতে উদ্যত হইবে।” তখন দুৰ্য্যোধন কহিল, “আমি প্রজা-
দিগকে অস্মৃৎপক্ষে আনিতে চেষ্টা করিব। আপনি পাণ্ডব
দিগকে শীঘ্র হস্তিনাপুর হইতে বারণাবত নগরে (৪) প্রেরণ
করিবার উপায় চিন্তা করুন।”
।
(৪) বর্তমান এলাহাবাদ।

যুধিষ্ঠিরের সংক্ষিপ্ত জীবনী। ৭ তদনন্তর দুৰ্য্যোধন ভাতৃগণের সাহায্যে প্রজাবৃন্দকে অর্থ ও মান প্রদান দ্বারা বশীভূত করিতে লাগিল। ধৃতরাষ্ট্রও এক দিন সভামধ্যে পাণ্ডবগণকে আহ্বান করিলেন; এবং তাহারা উপস্থিত হইলে তাহাদিগকে রমণীয় বারণাবত নগর দর্শন করিয়া জীবন সার্থক করিতে বলিলেন। পাণ্ডবগণ ধৃতরাষ্ট্রের অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়া বারণাবতে গমন করিবার ইচ্ছা প্রকাশ করিলেন। অনন্তর যুধিষ্ঠিরাদি পঞ্চ ভ্রাতা মাতার সহিত গুরুজন- দিগকে অভিবাদনপূর্বক বারণাবতে বৎসর বাস করিবার নিমিত্ত যাত্ৰা করিলেন ? দিকে নৃশংস দুৰ্য্যোধন পুরােচন-নামক একজন যবনকে বারণাবতে প্রেরণ করিয়া পাণ্ডবদিগের তথায় উপস্থিত হইবার পূর্বেই তাহাদের বাসার্থে এক জতুগৃহ নির্মাণ করাইয়া রাখিয়াছিল । পাণ্ডবেরা এই সমস্ত বৃত্তান্ত বিদুরের নিকট হইতে জ্ঞাত হইয়াছিলেন; কিন্তু কাহারও সমীপে প্রকাশ করেন নাই। তাঁহারা বিদুরের উপদেশানুসারে জতুগৃহমধ্যে এক সুরঙ্গ প্রস্তুত করিয়া সৰ্ব্বথা সতর্ক হইয়া বাস করিতে লাগিলেন। একদা রাত্রিকালে ভীমসেন জতুগৃহে অগ্নিদানপূর্বক পুরােচনকে দগ্ধ করিয়া মাতা ও ভ্রাতৃগণের সহিত সুরঙ্গ দিয়া পলায়ন করিলেন। সুরঙ্গ-পথে আসিয়া তাহারা গঙ্গাতীরে উপনীত হইলেন এবং দেখিলেন যে বিদুর তাহাদিগের জন্য একখানি নৌকা সজ্জিত করিয়া রাখিয়াছেন। সেই নৌকাতে আরােহণ করিয়া তাহারা গঙ্গা আর্য্য-জীবনী। পার হইলেন এবং পরপাবস্থিত মহাবনে কিছুদ্দিন বাস করিয়া একচক্রা (৫) নগরাভিমুখে যাত্রা করিলেন। এ দিকে হস্তিনাপুরে পাণ্ডবদিগের দাহ-বৃত্তান্ত প্রচার হইল; এবং ধৃতরাষ্ট্র প্রভৃতি সকলে বহু বিলাপ করিয়া তাহাদিগের উদকক্রিয়া সম্পন্ন করিলেন। ওদিকে পাণ্ডবেরা একচক্রানগরে গুপ্তভাবে বাস করিতে লাগিলেন। এই স্থলে ভীমকর্তৃক বকাসুর-বধ সাধিত হয়। এই নগরে তাঁহারা যে ব্রাহ্মণের আলয়ে বাস করিতেন, তথায় এক দিন কতক গুলি ব্রাহ্মণ উপস্থিত হইল। ইহারা পাঞ্চালদেশে (৬) দ্রুপদ রাজকন্যা দ্রৌপদীর স্বয়ংবরের কথা বলিতেছিল। পাণ্ডবগণ উহা শুনিয়া সাতিশয় চঞ্চলচিত্ত হইলেন; এবং মাতার অনুমতি লইয়া পাঞ্চালদেশে প্রয়াণ করিলেন। পাণ্ডবেরা পাঞ্চাল- দেশে উপস্থিত হইয়া ব্যাসের সহিত সাক্ষাৎ করিলেন এবং তাঁহার উপদেশানুসারে এক কুলালের গৃহে অবস্থিতি করিতে লাগিলেন। পরে যথাসময়ে স্বয়ংবর-সভাতে গমনপূৰ্ব্বক সমস্ত দর্শন করিলেন। অর্জুন মীননেত্র ভেদ করিয়া জয় লাভ করিলেন এবং দ্ৰৌপদীকে প্রাপ্ত হইলেন। তৎপরে ভ্রমবশতঃ প্রদত্ত মাতার আজ্ঞানুসারে পঞ্চ ভ্রাতা মিলিত হইয়া দ্রৌপদীকে বিবাহ করিলেন । এতৎসংক্রান্ত সমস্ত বৃত্তান্ত বৃত্তান্ত যুধিষ্ঠির- জীবনীর বিষয় নহে বলিয়া সংক্ষেপে বর্ণিত হইল। ক্রমে, (৫) একচক্রা বর্তমান আরা। (৬) পাঞ্চালদেশ গঙ্গা ও যমুনার অন্তর্বেদিতে স্থিত কান্যকুজ প্রদেশ। কননা, কাস্পিল্য, এটোয়া প্রভৃতি নগর ইহার অন্তর্গত।

যুধিষ্ঠিরের সংক্ষিপ্ত জীবনী।
৯
দ্রৌপদী বিবাহ-বৃত্তান্ত হস্তিনাপুরে সকলে জানিতে পারিলেন।
এত দিন
পাণ্ডবেরা ছদ্মবেশে ছিলেন, বিবাহকালেও
কেহ তাহাদিগকে পাণ্ডুপুত্র বলিয়া জানিতে পারে নাই।
তখন ধৃতরাষ্ট্র যুধিষ্ঠিরাদিকে আনয়নার্থ পাঞ্চালরাজ্যে
বিদুরকে পাঠাইলেন, এবং যথাকালে পাণ্ডবেরা কুন্তী
দ্রৌপদীর সহিত হস্তিনাপুরে আসিয়া উপনীত হইলেন।
তাহাদিগকে দর্শন করিয়া পৌরগণ উচ্চৈঃস্বরে বলিতে
লাগিল “যিনি আমাদিগকে পুত্রনিৰ্বিশেষে পালন করিতেন,
যিনি আমাদিগের প্রিয় ও হিতসাধন করিতেন, সেই ধৰ্মাত্মা
পুরুষব্যাঘ্র যুধিষ্ঠির অদ্য পুনৰ্বার আসিতেছেন। বােধ
হইতেছে যেন প্রজাবৎসল পাণ্ডুদেবই আমাদিগের প্রিয়
সাধন করিতে বন হইতে আগমন করিতেছেন। যদি আমাদিগের
দানজন্য, হােমজন্য এবং তপস্যজন্য কিছু পুণ্য থাকে, তবে
পাণ্ডবগণ শত বৎসর এই নগরে বাস করুন।” পুরবাসীদিগের
এই বাক্য শ্রবণ করিতে করিতে তাহারা রাজপ্রাসাদে প্রবেশ
করিলেন এবং সৰ্ব্ব গুরুজনের পাবন্দনপূৰ্ব্বক কুশল জিজ্ঞাসা
করিলেন।
কিঞ্চিৎকাল বিশ্রাম করিবার পর ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডুপুত্রদিগকে
আহ্বান করিয়া বলিলেন, “বৎসগণ আমার বাক্য শ্রবণ কর।
কেন মিছামিছি বিবাদ করিবে, তােমরা পাণ্ডবপ্রন্থে (৩)
গমন কর এবং সেই স্থানে রাজ্য স্থাপন
(৭) বর্তমান দিল্লী যে স্থানে স্থিত।

১০ আৰ্য-জীবনী। দ্বারা স্থানে কেহ তোমাদিগকে বাধা দিবে না। আর রাজ্যের অর্ধাংশ গ্রহণ কর।” যুধিষ্ঠির ধৃতরাষ্ট্রের বাক্যানুসারে পাণ্ডব- প্রস্থে গমন করিলেন এবং তথায় স্বর্ণসংকাশ এক নগর, নিৰ্মাণ করিলেন। যুধিষ্ঠির এই সমস্ত কাৰ্য কৃষ্ণ ও বিদুরের পরামর্শানুসারেই করিয়াছিলেন। তিনি তথায় শান্তি স্থাপন করিয়া নগরের পরিমাণ নির্দিষ্ট করিলেন। নগরের চতুর্দিকে পরিখা খনন এবং প্রাকার দ্বারা নগর বেষ্টন করিতে আদেশ দিলেন। গগনস্পশী সৌধমালা, মরোপম দৃঢ় পুরদ্বার, নানাবিধ অঞ্জ শ। রক্ষিত দুর্গ প্রভৃতি পরিপাটীরূপে রচিত হইল। দুগোপরি হস্তক্ষেপ লৌহনিৰ্ম্মিত শক্তিযন্ত্র সকল এবং শতঘ্নী সকল স্থাপিত হইল। শাদিকুশল যােধগণ দুর্গরক্ষাৰ্থ নিযুক্ত হইল। নগরমধ্যে সুবিভক্ত রাজপথ সকল প্রস্তুত হইল। সেই ধনধান্যসম্পূর্ণ নগরী কুবেরপুরী এবং ভােগবতীর ন্যায় শােভা পাইতে লাগিল। যমুনাতীরে এই পুরী নির্মাণ করিয়া পাণ্ডবগণ ইহার ইন্দ্রপ্রস্থ নাম দিলেন। সৰ্ব্বশাস্ত্রনিপুণ দ্বিজগণ ইন্দ্রপ্রস্থে আসিয়া বাস করিতে লাগিলেন নানাদিদেশ হইতে ধনার্থী বণিকগণ তথায় আগমন করিতে লাগিল। সংস্কৃত প্রাকৃদি সৰ্ব্বভাষাবিং পণ্ডিতগণ ইন্দ্রপ্রস্থ অলঙ্কত করিতে লাগিলেন। সৰ্বশিল্পজ্ঞ ব্যক্তিগণ তথায়.. নিবাসার্থ উপস্থিত হইল। আম্র, আম্রাতক, নীপ, অশােক, চম্পক, পুন্নাগ, নাগপুষ্প, পনস, শাল, তাল, তমাল, বকুল, জম্বু, পারিজাত, করবীর প্রভৃতি নানাজাতীয় বৃক্ষের উদ্যানে ইন্দ্রপ্রস্থ চতুর্দিকে পরিশােভিত হইল।

যুধিষ্ঠিরের সংক্ষিপ্ত জীবনী । ১১ বিবিধ লতাগৃহ, চিত্ৰগৃহ, কৃত্রিম লীলাপৰ্বত, জলপূর্ণ বাপী, পুষ্করিণী ও তড়াগ প্রভৃতি দ্বারা ইন্দ্রপ্রস্থের রমণীয়তা শত- গুণ বর্ধিত হইল। এবস্তৃত পুরী-মধ্যে যুধিষ্ঠির রাজ্যশাসন করিতে আরম্ভ করিলেন দেখিয়া কৃষ্ণ ও বলদেব দ্বারকায় প্রস্থান করিলেন । ইন্দ্রপ্রস্থে বাস করিয়া যুধিষ্ঠির প্রজা- শাসন করিতে লাগিলেন। তাঁহার প্রকৃতিসমূহ ত্ৰিবৰ্গসাধক ধৰ্ম্মরাজকে প্রাপ্ত হইয়া সুখে বাস করিতে লাগিল। তিনি নীতিমার্গানুসারে সমভাবে সকল প্রজাকে পালন করিতে লাগিলেন। তাঁহার রাজ্যে কেহ কাহারও উপর অত্যাচার করিতে চাহিত না, সৰ্বত্ৰ নিৰ্ম্মল পবিত্র শান্তি বিরাজমান ছিল। যুধিষ্ঠির ব্ৰহ্মনিষ্ঠ, কর্মনিষ্ঠ, এবং নীতিনিষ্ঠ ছিলেন বলিয়া লক্ষ্মী দৃঢ়ভাবে তাহাকে আশ্রয় করিলেন। তিনি ভ্রাতৃ- গ্রণের সহিত নানাবিধ সৎকাৰ্য্য সাধন করিতে লাগিলেন। ধৌম্যাদি পুরােহিতগণ সৰ্ব্বদা তাহার সভাতে বিরাজ করি- তেন। তাঁহার প্রজাগণের নেত্র এবং হৃদয় প্রীতিপূর্ণ হই- ছিল। প্রজাগণ যে কেবল তৎকৃত শাসন ও পালন। হেতু সন্তুষ্টচিত্ত হইয়াছিল তাহা নহে; তিনি তাহাদিগের মনােরম কাৰ্য্য করিতেন বলিয়া তাহারা তাঁহার প্রতি অচল- ভক্তিবশতঃ হৃষ্টচিত্ত হইয়াছিল। কোন প্রজা কখন তাঁহার কোন অযুক্ত, অসত্য, দুঃখদ বা অপ্রিয় বাক্য শ্রবণ করে নাই। তিনি সকলের প্রিয়চিকীর্ষা ও হিতেচ্ছা দ্বারা সৰ্ব্ব- কাৰ্যে প্রণােদিত হইতেন। এইরূপে প্ৰজানুরঞ্জন এবং অধীন নৃপতিগণের সুশাসন হেতু যুধিষ্ঠিরের কীৰ্ত্তি দিদিগন্তরে, ঘােষিত হইতে লাগিল।

১২ আৰ্য-জীবনী । যুধিষ্ঠিরের ইত্যবসরে এক দিন মহর্ষি নারদ পাণ্ডবদিগের সকাশে আগমন করিয়া তাহাদিগকে উপদেশ দিলেন যে “তােমরা কদাপি দ্রৌপদীকে লইয়া সুন্দোপমুলের ন্যায় পরস্পর বিবাহ করিও না। তােমাদের পরস্পর ভেদ হইলে সর্বনাশ। অত সময় নির্ধারণ করিয়া তােমরা দ্রৌপদীকে উপভােগ করিবে।” নারদের এই সদুপদেশ পাণ্ডুপুত্রেরা শিরােধার্য করিলেন। পরে পাঞ্চাণীর গর্ভে প্রতিবিন্ধ্য, ভীমসেনের সুতসােম, অর্জুনের শ্রুতকৰ্ম্মা, নকুলের শতানীক এবং সহদেবের শ্রুতসেন এই পঞ্চভ্রাতার পঞ্চপুত্ৰ উৎপন্ন হইল। ইহাদিগের জাতকৰ্ম্ম, চূড়াকরণ, উপনয়ন প্রভৃতি সংস্কার-কাৰ্য মহর্ষি ধৌম্য যথাবিধি সম্পাদন করিলেন। নন্তর ইহারা বেদাধ্যয়নপূর্বক অর্জুনের সকাশে অস্ত্রশস্ত্র শিক্ষা করিল। এই সকল সুচরিতব্রত পুত্রগণের সহিত পাণ্ডুপু ত্রেরা সুখে রাজ্যশাসন করিতে লাগিলেন। যৎকালে খাণ্ডব-বন :দাহ করা হইয়াছিল, তৎকালে অর্জুন ময়দানবকে রক্ষা করিয়াছিলেন। ময়দানব এই উপকারের নিমিত্ত অর্জুনের নিকট আগমন করিয়া বলিল “আমাকে কি করিতে হইবে আজ্ঞা করুন।” অৰ্জ্জুন বলিলেন, আমি তােমাকে প্রাণনাশ হইতে রক্ষা করিয়াছি বলিয়া তােমার দ্বারা কোন কার্য সম্পাদন করাইয়া লইতে ইচ্ছা করি না। তথাপি তােমার সঙ্কল্প ব্যর্থ করিতে চাহি না ; তুমি কৃষ্ণের কোন কাৰ্য্য সাধন কর। বাসুদেব ময়দানব- কর্তৃক প্রার্থিত হইয়া মুহূর্তকাল চিন্তা করত তাহাকে যুধি- ঠিরের জন্য একটা উৎকৃষ্ট সভা নিৰ্মাণ করিতে আদেশ যুধিষ্ঠিরের সংক্ষিপ্ত জীবনী। করিলেন। অনন্তর যুধিষ্ঠিরের অনুমতি লইয়া ময়দানব তাঁহার নিমিত্ত সৰ্ব্বরত্নবিভূষিত দশসহস্ৰকিন্ধু পরিমিত এক মণিময় সভা নিৰ্মাণ করিলেন। চতুর্দশ মাসে সভানিৰ্মাণ সমাপন করিয়া ময়দানব যুধিষ্ঠিরকে গিয়া নিবেদন করিল। তদনন্তর অসংখ্য ব্রাহ্মণকে ধনদান এবং নানাদেশীয় রাজগণকে নিমন্ত্রণ করিয়া যুধিষ্ঠির মণিময় সভাতে প্রবেশ করিলেন। কিছু দিন পরে একদা যুধিষ্ঠিরের সভাতে দেবর্ষি নারদ আগমন করিলেন, এবং যুধিষ্ঠিরকে রাজসূয় যজ্ঞ অনুষ্ঠা- নার্থ উপদেশ দিলেন। যুধিষ্ঠির রাজসূয় রাজসূয় যজ্ঞের অনুষ্ঠান প্রচার করিলে অনুরক্ত প্রজাগণ সকলেই ইহার অনুমােদন করিল। যে রাজা স্বাধীন ও ক্ষাত্র-শ্রী-যুক্ত, তিনিই রাজসূয় যজ্ঞ করিতে পারেন। রাজসূয় যজ্ঞে সামবেদ-বিহিত মন্ত্রের দ্বারা যপ্রদেশে অগ্নি স্থাপন করিতে হয়। রাজসূয় অগ্নিহােত প্রভৃতি যাগ সম্পন্ন করিয়া অবশেষে অভিষিক্ত হইতে হয়। রাজয়ে অভিষেক দ্বারা সৰ্ব্বজিত্ব লাভ হয়। সুতরাং যুধিষ্ঠির রাজসূয় যজ্ঞের আয়ােজন করিতে লাগিলেন। যুধিষ্ঠির চারি তাকে দিগ্বিজয়ে প্রেরণ করিলেন। তাঁহারা ক্রমে ক্রমে মগধপতি জরাসন্ধ, কলিন্দাদি ভূপালগণ, প্ৰাগজ্যোতিষপুরাধিপতি ভগদত্ত, শালদ্বীপাধীশ্বর প্রতিবিন্ধ, পাৰ্বতীয় রাজগণ, বাহলীরাজ, কাম্বােজরাজ, পাঞ্চালাধিপতি, বিদেহনৃপতি, দশার্ণরাজ, সুধৰ্ম্মা, কোশলাধিপতি বৃহদ্বল, শূরসেনরাজ, মাহিষ্মতীপতি নীলরাজ, মৎস্যরাজ (৮) পঞ্চ- ( কলিন পঞ্চনদ প্রদেশে, চন্দ্রভাগা ও শত নদীর মধ্যস্থিত ১৪ আৰ্য্য-জীবনী। নদাধিপতি প্রভৃতি ভূপালবৃন্দকে পরাজিত করিয়া তাঁহা- দিগের নিকট হইতে করগ্রহণ পূৰ্ব্বক ইন্দ্র প্রস্থে প্রত্যাগমন করিলেন। কৃষ্ণের সম্মতি গ্রহণপূর্বক যুধিষ্ঠির যজ্ঞায়তন নির্মাণ এবং যজ্ঞীয় দ্রব্যসম্ভার সঞ্চয়ার্থ ভৃত্যগণকে নিয়োেগ করিলেন এবং ব্রাহ্মণ ও রাজগণের নিমন্ত্রণার্থ দূত প্রেরণ করিলেন। ভীষ্মদি সকলকে আনয়ন করিতে নকুল হস্তিনা- পুরে গমন করিলেন। যুধিষ্ঠির দীক্ষিত হইলেন। ক্রমে ক্রমে বিপ্রগণ ও রাজগণ আসিয়া উপস্থিত হইলেন এবং সকলেই সমুচিত সপৰ্যা প্রাপ্ত হইয়া সন্তুষ্ট হইলেন । প্রাথমিক অর্ঘ্য দানার্থ নানা বাদানুবাদ হইল ; কিন্তু পরিশেষে ভীষ্মের অনুজ্ঞাতে কৃষ্ণকেই প্রথম অর্ঘ্য প্রদান করা হইল। এতদ্দর্শনে চেদীশ্বর শিশুপাল ক্রোধপরবশ হইয়া যুধিষ্ঠিরাদিকে ভৎসনা করিয়া সভামণ্ডপ হইতে নির্গমন করিলেন। তদনন্তর মদেশের পূৰ্ব্বে স্থিত। প্রাগজ্যোতিষপুর বর্তমান আসাম, রামায়ণে ধৰ্মারণ্য নামে উল্লিখিত। শালদ্বীপ পঞ্চনদ প্রদেশের অন্তর্গত স্থান বিশেষ। বাহ্নীক বর্তমান বাল খ (Balk) ও তৎসন্নিহিত দেশ; বিপাশা ও শতদ্রর মধ্যে স্থিত। কেকয় রাজ্যের উত্তরে আর একটি বাহীক বা বাহিক দেশ ছিল। কাম্বােজ আধুনিক তাতারান্তগত ক্যাসগর (Kashgar)। পাঞ্চাল কাকুজ। বিদেহ মিথিলা। দশার্ণ মালব দেশের অন্তর্গত; বিদিশা ইহার রাজধানী। শূরসেন মথুরাপ্রদেশ। মাহিষ্মতী হৈহয়রাজ্য বা উত্তর নর্মদা 'প্রদেশের রাজধালী, নর্মদা-নদীতটস্থ ; মহেশমণ্ডল এবং মহেশ্বরপুর ইহার নামান্তর। মৎস্যদেশ মথুবা ও ব্রজের ঠিক পশ্চিমে; ইহার রাজধানী বিরাট নগর ইন্দ্র গ্রন্থের ৪২ ক্রোশ দক্ষিণ পশ্চিমে এবং জয়পুরের ২০ ক্রোশ উত্তরে স্থিত। বর্তমান জয়পুরকে অনেকে মৎস্যদেশ বলেন। দিনাজপুর যে মৎস্যদেশ সেটী ভ্রম।

যুধিষ্ঠিরের সংক্ষিপ্ত জীবনী। ১৫ কৃষ্ণ শিশুপালকে বধ করিলেন। অতঃপর মহাসমারােহে রাজসূয় যজ্ঞ নির্বিঘ্নে সমাপ্ত হইল। রাজগণ ও বিগণ যুধিষ্ঠিরের সকাশ হইতে সম্মান লাভ কমিয়া স্ব স্ব দেশে প্রতি প্রমাণ করিলেন। এই রাজসূয় যজ্ঞে যুধিষ্ঠির রাজগণের নিকট হইতে বহুমূল্য হীরক ও মণিমুক্তাদি, উৎকৃষ্ট স্বর্ণ মহার্ঘ কৌষেয় প্রভৃতি বস্ত্র, অদ্ভুত লৌহ ও গজদন্তবিনির্মিত দ্রব্যসামগ্রী, দুষ্প্রাপ্য পশুলােম ও পক্ষীর পক্ষপত্রে রচিত দ্রব্য সকল এবং নানাবিধ সুজাত অশ্ব ও হস্তী উপহার প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। (৯) (৯) রাজসূয় যজ্ঞ কিরূপ তাহা বুঝাইতে হইলে, আধুনিক দরবার এবং লেভির উল্লেখ কৰিলে পাঠক একপ্রকার ভাবগ্ৰহ করিতে পারেন। এই ইন্দ্রপ্রস্থে লর্ড লরেন্স এবং লর্ড লিটন বাহাদুরেরা দুইবার যে দরবার করিয়াছেন তাহাই অধুনাতন কালের রাজসূয় যজ্ঞ। পূৰ্ব্বে রাজসূয় যজ্ঞ একটা বৃহৎ ব্যাপার ছিল। রাজ সৰ্বগুণে গুণবান্ এবং সৰ্ব্ব প্রধান না হইলে এই যজ্ঞে তাহার অধিকার থাকিত না। এবং সর্বাংশে প্রভুত্ব লাভই ইহার উদ্দেশ্য। এস্থলে একটী যজ্ঞীয় বেদমন্ত্র উদ্ধত করিলে ইহা বুঝা যাইতে পারে। পুরোহিত যজমানকে সকল প্রজার মধ্যস্থলে আনিয়া কৃষ্ণ যজুর্বেদের এই মন্ত্রী পাঠ করেন। মাতৃ মন্ত ক্ষত্ৰম্মেঘমসি ক্ষত্ৰস্য যােনিরবিন্নো অগ্নিগ্ন হপতি রাবিন্ন ইন্দ্রো বৃদ্ধস্রব আবিন্নঃ পূষা বিশ্ববেদা আবিন্নৌ মিত্রাবরুণাবৃতাবৃধাবাবিন্নে। এই মন্ত্র দ্বারা সর্বসমক্ষে এই বলা হইল যে এই রাজা যজমান] এই যজ্ঞদ্বারা এই রাজ্যের সমস্ত প্রজার উপর আধিপত্য প্রাপ্ত হইলেন এবং মহাকুলত্ব লাভ করিলেন। এই মন্ত্র পাঠ হইলে যজমান বলিলেন “যজ্ঞফলদাতু পরমেশ্বস্য প্রসাদষ্ণমিতি ভব্যঃ সূচয়ামি নত্বহং গর্বে।ক্তিং ভণামতি বিদন্তঃ।” অর্থাৎ আমি আত্মশ্লাঘা করিতেছি না। যজ্ঞফলদাতা পরমেশ্বর-প্রসাদেই আমার এই যজ্ঞফল মহাপদ আৰ্য-জীবনী। এস্থলে ইন্দ্র প্রস্থের ভূগােল-বিষয়ে দুই একটা কথা অসঙ্গত হইবে না। ইন্দ্রপ্রস্থ যমুনা নদীর পশ্চিমতীরে স্থাপিত হয়। বর্তমান দিল্লী সহর পূর্বতন ইন্দ্রপ্রস্থের প্রায় এক ক্রোশ অন্তরে স্থিত। যমুনা নদীর তৎকালীন স্রোতঃ ইদানীন্তন কালীন স্রোতের প্রায় পঞ্চাশৎ ক্রোশ পশ্চিমে প্রবাহিত হইত। পাণিপ্রস্থ, শােণপ্রস্থ, ইন্দ্রপ্রস্থ, তিলপ্রস্থ ও ব্যাঘ্রপ্রস্থ নামে পঞ্চপ্রস্থ ছিল। ব্যাঘ্রপ্রস্থ ব্যতীত আর চারিটীই যমুনার পশ্চিম-তীরস্থিত। ইহাদিগকে এক্ষণে পাণিপত, শােণ- পত, ইন্দ্ৰাপত, তিলপত, ও বাঘপত কহে। ইন্দ্রাপতের আর এক নাম পুরাণকিল্লা। ইন্দ্র প্রস্থের উত্তরদিকস্থ প্রাচীরের ঠিক বাহিরে নিগমবােধ ঘাট বলিয়া যমুনার একটী ঘাট আছে। প্রবাদানুসারে এই ঘাটে যুধিষ্ঠির অশ্বমেধ সমাপ্তির পরে হােম করিয়াছিলেন। প্রতিবৎসর এই স্থানে একটা মেলা হইয়া থাকে। যে দিন সােমবারে অমাবস্যা হয়, সেই দিন মেলা আরম্ভ হয়। তৎপ্রাদেশিক প্রবাদ এই লাভ হইল আপনাদিগকে ইহাই জ্ঞাত করিতেছি। কিন্তু ক্ষত্রিয়ের এই সৰ্বাধিপত্য ব্রাহ্মণের সহ্য হইবে কেন। যজমান এই কথা বলিবামাত্র পুরােহিত তৎক্ষণাৎ বলিতেন “ভভঃ ভারতাঃ অয়ং বঃ সর্বেষাং রাজা ; সােমােহম্মাকং ব্রাহ্মণানাং রাজা!” ভারতবাসিগণ ! এই যজমান তােমাদের সকলেরই রাজা; সােমদেব আমাদের অর্থাৎ ব্রাহ্মণগণের রাজা। এই বলিয়া ক্ষত্রিয়ের অধীনত্ব স্পষ্ট অস্বীকার করিতেন। প্রাকৃতিক নিয়মই এই যে, যেখানে বল সেইখানেই প্রভুত্ব, কিন্তু ব্রাহ্মণের এই নিয়মের অন্যখাচরণ করিতে প্রয়াসী হন। ব্রাহ্মণদিগের এইরূপ অন্যায় ও অসঙ্গত প্রভুত্বে ক্ষত্রিয়েরা ক্রমশঃ বিরক্ত হইয়া উঠেন এবং সম্ভবতঃ সেই বিরক্তি হইতে ভারতবর্ষে বৌদ্ধধর্মের সৃষ্টি হইয়া একটা ঘােতর ধৰ্ম্মবিপ্লব সাধিত হয়।

যুধিষ্ঠিরের সংক্ষিপ্ত জীবনী। ১৭ যে, অশ্বমেধ হস্তিনাপুরে অনুষ্ঠিত হইয়াছিল। হস্তিনাপুর গঙ্গার উপকূলে স্থিত। এই দেশীয় প্রবাদ মহাভারত-বিরুদ্ধ। দুৰ্য্যোধন রাজসূয় যজ্ঞ দর্শন করিতে গমন করিয়া নানা- প্রকারে বিপ্রলব্ধ ও উপহাসিত হইয়াছিলেন। হস্তিনাপুরে প্রত্যাগমন করিয়া তিনি পাণ্ডবদিগের সমৃদ্ধি চিন্তা করিয়া অত্যন্ত পরিতপ্ত হইলেন এবং শকুনির পরামর্শে যুধিষ্ঠিরকে দূতক্রীড়ার্থ আহ্বান করিলেন। দূতক্রীড়াদ্বারা পাণ্ডব- দিগের ঐশ্বৰ্য্যহরণই দুর্যোধনের মুখ্য উদ্দেশ্য। বিদুর ইন্দ্রপ্রস্থে গমন পূর্বক ধৃতরাষ্ট্রের আদেশ জানাইলে যুধিষ্ঠির দূতক্রীড়া স্বীকার করিয়া হস্তিনাপুরে আগমন করিলেন। দূতক্রীড়া আরম্ভ হইল। দুর্যোধনের প্রতিনিধি শকুনি এবং যুধিষ্ঠির খেলিতে লাগিলেন। লাগিলেন। ক্রমে ক্রমে যুধিষ্ঠির সৰ্বস্ব হারিলেন এবং অবশেষে পঞ্চভ্রাতা ও দ্রৌপদীকে পণ করিয়া পরাজিত হইলেন। তখন দুর্যোধন অত্যন্ত হৃষ্ট হইয়া যুধিষ্ঠিরাদি পঞ্চভ্রাতা ও দ্রৌপদীকে অবমাননা করিতে উদ্যত হইলেন। ভীম কুরুকুল বিনাশ করিবার নিমিত্ত যুধিষ্ঠিরের অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। যুধিষ্ঠির সান্ত্বনা- বাক্যে ক্ষান্ত করিয়া ধৃতরাষ্ট্রকে বিনয়সম্ভাষণপূর্বক বলি- লেন “রাজন, আমরা আপনার আজ্ঞাবহ, আমাদিগের যাহা , কর্তব্য তাহা আদেশ করুন।” তখন ধৃতরাষ্ট্র ধৃতরাষ্ট্র বিবাদ মীমাংসা পূৰ্ব্বক যুধিষ্ঠিরকে স্বরাজ্যশাসন করিতে অনুজ্ঞা করিলেন এবং বিবিধ যুক্তি প্রদর্শনদ্বার ভ্রাতৃসদ্ভাব রক্ষার জন্য অনুরােধ করিলেন। তদনুসারে যুধিষ্ঠিরাদিও ইন্দ্রপ্রস্থে প্রস্থান করিলেন। २ আৰ্য-জীবনী। অনন্তর দুৰ্য্যোধন অভীষ্ট-সিদ্ধ হইল না দেখিয়া ধৃতরাষ্ট্র সমীপে দ্বাদশ বর্ষ বনবাস ও এক বৎসর অজ্ঞাত বাস পণ করিয়া যুধিষ্ঠিরের সহিত পুনৰ্ব্বার দূতক্রীড়ার্থ অনুমতি যাচ্ঞা করিল। ধৃতরাষ্ট্রও দ্রোণাদির নিষেধ অতিক্রম করিয়া স্বপুত্রের প্রার্থনায় অনুমােদন করিলেন। দূতক্রীড়ার অনুরােধে যুধিষ্ঠিরকে আবার হস্তিনাপুরে আনয়ন করা হইল। আবার শকুনির সহিত দূতারম্ভ এবং যুধিষ্ঠিরের পরাজয়। বনগমনার্থ প্রস্তুত হইয়া যুধিষ্ঠির সভ্যগণকে আমন্ত্রণ করিলেন এবং পাণ্ডবগণ স্বজননী কুন্তীকে বিদুরের গৃহে রাখিয়া বনে প্রয়াণ করিলেন। সকলেই ধৃতরাষ্ট্রকে নিন্দা করিতে লাগিল। পৌরগণ বিলাপ ও ধৃতরাষ্ট্রের যথােচিত নিন্দা- বাদ করিতে লাগিল। হস্তিনাপুরে নানারূপ মহােৎপাত উপস্থিত হইল। বিনামেঘে বজ্রপাত ও ক্ষণে ক্ষণে ভূমিকম্প হইতে লাগিল। অসময়ে রাহ সূৰ্য্যকে গ্রাস করিবার উপ- ক্ৰম করিল। সৰ্ব্বদা উল্কাপাত হইতে লাগিল। ইতিমধ্যে মহর্ষি নারদ কৌরব সভাতে আগমন করিলেন এবং ধৃত রাষ্ট্রকে বলিলেন যে এক্ষণ হইতে চতুর্দশ বৎসরে কুরুকুল নিৰ্ম্মল হইবে। নারদ এই সংবাদ দিয়া অন্তর্ধান করিলেন। এই অবসরে কৌরবেরা দ্রোণাচার্যের শরণাপন্ন হইলেন। এবং ধৃতরাষ্ট্রও পাণ্ডবদিগকে প্রত্যায়ন করিবার নিমিত্ত বিদুরকে আদেশ করিলেন, কিন্তু, কোন প্রকারেই ধৃতরাষ্ট্রের চিন্তাবেশ ও পরিতাপ দূর হইল না। পাণ্ডবগণ বন গমনে বহির্গত হইয়া রথারােহণে জাহ্নবী- যুধিষ্ঠিরের সংক্ষিপ্ত জীবনী। তীরস্থ প্রমাণবটের (১০) সমীপে গমন করিলেন এবং তথায় কিয়দ্দিন বাস করিয়া কাম্যক বনে প্রবেশ করিলেন। কাম্যক বনে বিদুর যুধিষ্ঠিরের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া ধৃতরাষ্ট্রের অভি- প্রায় জ্ঞাত করিলেন এবং যুধিষ্ঠিরকে নানা সদুপদেশ দান করিয়া ধৃতরাষ্ট্রসকাশে একাকী প্রতিনিবৃত্ত হইলেন। পাণ্ডবেরা কাম্যকবন হইতে দ্বৈতবনে, দ্বৈতবন হইতে পুনৰ্ব্বার কাম্যক বনে গমন করিয়া তথায় পাঁচ বৎসর অতিক্রম করিলেন। ইত্যবসরে যুধিষ্ঠির বৃহদশ্ব-রাজের নিকট অক্ষবিদ্যা শিক্ষা করিলেন। অনন্তর পাণ্ডবেরা তীর্থযাত্রায় নির্গত হইয়া নৈমিষা- রণ্য (১১), অগস্ত্যাশন, কলিঙ্গাদি দেশ, প্রভাসতীর্থ, মন্দর ও গন্ধমাদন পৰ্বত, নারায়ণাশ্রম, আষ্টিষেণাশ্রম প্রভৃতি নানাবিধ স্থানে ভ্রমণ করিয়া পুনৰ্ব্বার দ্বৈতবনে প্রবেশ করি- লেন। দ্বৈতবনে বাসকালে দুৰ্য্যোধন প্রভৃতি কৌরবগণ বিহারার্থে এবং স্বসমৃদ্ধি প্রদর্শন করিয়া পাণ্ডবদিগকে পরি- তাপিত করিবার নিমিত্ত তথায় গমন করিল। দ্বৈতবনে পৰ্যটন-কালে উহারা গন্ধৰ্ব্বদিগের সহিত বিবাদ করিয়া গন্ধৰ্ব্বগণ কর্তৃক বদ্ধ ও হৃত হইয়াছিল। যুধিষ্ঠিরের আদেশে ভীমাদি বীরগণ গন্ধৰ্বদিগকে পরাজয় করিয়া কোরবদিগকে মােচন করেন। (১০) রামায়ণের শ্যামবট। ইহার অপর নাম অক্ষয়বট। (১১) কুরুক্ষেত্রের সন্নিহিত প্রভাসতীর্থ গুর্জর প্রদেশের সােমতীর্থ। মলয় পর্বত ভাগলপুরের নিকটে স্থিত। গন্ধমাদন পর্বত হিমালয়ের উত্তরে অবস্থিত। নারায়ণাশ্রম প্রভৃতি হিমালয়ের উপরিস্থ।

২০ আৰ্য-জীবনী। পাণ্ডবেরা পুনর্বার দ্বৈতবন হইতে কাম্যক বনে গমন করিলেন। কাম্যকে তাঁহারা মৃগয়া করিতে বহির্গত হইলে সিন্ধুপতি জয়দ্রথ দ্রৌপদীকে হরণ হরণ করিয়া লইয়া যান । কিন্তু পাণ্ডবেরা তাঁহার অনুসরণ করিয়া তাহার সহিত যুদ্ধ । আরম্ভ করিলে, জয়দ্রথ দৌপদীকে ত্যাগ করিয়া পলায়ন করেন এবং যুধিষ্ঠির দ্রৌপদীকে লইয়া আশ্রমে প্রবেশ করেন। কাম্যকে কিছুদিন বাস করিয়া পাণ্ডবেরা পুনৰ্ব্বার দ্বৈতবনে প্রস্থান করেন। দ্বৈতবনে মৃগয়া করিয়া পাণ্ডবেরা তথায় বাস করিতে লাগিলেন। এক দিন কোন ব্রাহ্মণের অরণী- সহিত মন্থনদণ্ড হরণ করিয়া একটি মৃগ পলায়ন করে। পঞ্চভ্রাতা এই মৃগের অন্বেষণে গমন করিলেন। পরে যুধিষ্ঠির ক্ষুৎপিপাসায় কাতর হইয়া নকুলকে জল আনয়ন করিতে বলিলেন। নকুল একটি সরোবর দেখিয়া তাহার জল পান করিতে উদ্যত হইতেছেন, এমন সময়ে এই দৈববাণী হইল “হে তাত! আমার নিয়ম আছে যে, যে ব্যক্তি আমার প্রশ্নের উত্তর দানে সমর্থ হইবে, সেই ব্যক্তিই এই সরােবরের জল পান করিবে। অতএব তুমি সাহসিক কাৰ্য্য করিও না। অগ্রে আমার প্রশ্নের উত্তর দান কর, পরে জল পান করিও।” নকুল শূন্যস্থিত বকের এই বাক্য অগ্রাহ করিয়া যেমন জলপান করিতে উদ্যত হইলেন অমনি ভূমিতে পতিত হইয়া পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইলেন। তদনন্তর নকুলের বিলম্ব দেখিয়া যুধিষ্ঠির সহদেবকে পাঠাইলেন, কিন্তু সহদেবেরও পূর্বোক্ত দশা ঘটিল। তৎপরে অর্জুন ও তৎপশ্চাৎ ভীম- সেনও উক্ত সরােবরে আসিয়া পূর্বোক্ত প্রকারে গতাষ

যুধিষ্ঠিরের সংক্ষিপ্ত জীবনী ।
হইলেন। তখন যুধিষ্ঠির ভ্রাতৃচতুষ্টয়ের অনাগমনে অত্যন্ত দুঃখিত
হইয়া স্বয়ং সেই সােবর-তীরে উপস্থিত হইলেন।
তিনি তথায় উপনীত হইয়া দেখিলেন যে তাহার ভ্রাতৃ-
চতুষ্টয় যুগান্তে লােকপালচতুষ্টয়ের ন্যায় পতিত রহিয়াছেন।
এই ব্যাপার দর্শনে যুধিষ্ঠির অত্যন্ত সন্তপ্ত হইয়া বিলাপ ও
পরিতাপ করিলেন। তৎপরে নানাপ্রকার আশঙ্কা তাঁহার
মনােমধ্যে উদিত হইল। অবশেষে ভাবিলেন,
বােধ হয়
দুৰ্য্যোধন আমাদিগের উপাংশু-বধ-সাধনাৰ্থ এই সরােবরের
জল বিষ-মিশ্রিত করিয়া রাখিয়াছে। পরে তিনি তৎপরীক্ষার
নিমিত্ত ঐ জল পান করিতে উদ্যত হইলেন। অন্তরীক্ষ
হইতে তৎক্ষণাৎ পূৰ্ব্ববৎ বাক্য উচ্চারিত হইল। তখন
যুধিষ্ঠির উর্ধে দৃষ্টি
দৃষ্টি নিক্ষেপপূৰ্ব্বক দেখিতে পাইলেন যে
একটি বক বলিতেছে, “আমি তােমার ভ্রাতৃগণকে বিনাশ
করিয়াছি, তুমি পঞ্চম ব্যক্তি, অতএব আমার প্রশ্নসমূহের
উত্তর দান করিয়া জল পান কর।” অনন্তর যুধিষ্ঠির সাতিশয়
বিস্ময়াপন্ন হইয়া সেই বককে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতে বলিলেন।
বক ক্রমান্বয়ে পঞ্চত্রিংশৎটী প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিল এবং যুধিষ্ঠিরও
তৎসমস্তের যথার্থ উত্তর প্রদান করিলেন।
তন্মধ্যে কয়েকটি প্রশ্ন বিশেষ উপযােগী বলিয়া এ স্থলে
উদ্ধত করিতেছি। ভূমির অপেক্ষা গুরুতর কি ? গগন
অপেক্ষা উচ্চতর কি ? বায়ুর অপেক্ষা শীঘ্নতর কি ? তৃণ
অপেক্ষা বহুতর কি ? এই কয়েকটা প্রশ্নের
মাতা পৃথিবী অপেক্ষা গুরুতরা; পিতা গগনাপেক্ষা উচ্চতর ;
মন বায়ু অপেক্ষা শীঘ্রতর ; এবং চিন্তা তৃণাপেক্ষা বহুতর।
উত্তর ;

আৰ্য-জীবনী। এই লােকে পরম ধৰ্ম্ম কি ? জ্ঞান কাহাকে বলে? দয়ার লক্ষণ কি ? মনুষ্যের দুর্জয় শক্ত কি ? মনুষ্যের অনন্ত ব্যাধি কি? সাধু ব্যক্তির লক্ষণ কি ? এই প্রশ্নগুলির উত্তর ;-ইহ লােকে আনৃশংস্যই পরম ধৰ্ম্ম ; তত্ত্বার্থের সম্যক্ বােধের নাম জ্ঞান ; সৰ্ব্বভূতের সুখৈষিতাকে দয়া বলে ; ক্রোধ মনুষ্যের দুর্জয় বিপু; লােভ মনুষাের অনন্ত ব্যাধি ; ক্রোধ, লােভ, নির্দয়তা প্রভৃতি পরিত্যাগপূৰ্ব্বক যিনি সর্বপ্রাণির হিতকর কাৰ্য্যে রত হন, তিনিই সাধু। এই জগতে কে সুখী? এই জগতে কোন্ পথে চলা উচিত ? এই সংসারের বার্তা কি? এই পৃথিবীতে আশ্চ- যই বা কি ? এই প্রশ্ন গুলির উত্তর ;-যে ব্যক্তি কাহারও নিকট ঋণী নহে, যে প্রবাসে থাকে না এবং যে নিজগৃহে পাঁচ ছয় দিবস অন্তরও স্বাধীন ভাবে শাকান্ন ভােজন করে, সেই ব্যক্তিই সুখী। তর্ক দ্বারা কোন বিষয় নির্ণয় করা যায় না, শ্রুতি সকল পরস্পর-বিরুদ্ধার্থবাদী, ব্যাখ্যাতা ঋষিগণের পরস্পর ভিন্ন ভিন্ন মত, ধৰ্ম্মের তত্ত্ব অজ্ঞান-গুহাভ্যন্তরে নিহিত রহি- ছে, অতএব বহুজনসম্মত পথই অবলম্বন করা উচিত। মহাকাল, সূৰ্য্যরূপ অগ্নি এবং রাত্রি দিবা রূপ কাষ্ঠের দ্বারা এই মহামােহময় সংসার-কটাহে ভূতগণকে, মাস ও ঋতুরূপ দৰ্ব্বী পরিঘউনপূৰ্ব্বক পাক করিতেছেন, ইহাই সংসারের সমাচার। প্রতিদিনই সহস্র সহস্র জীবগণ শমন-সদনে গমন করিতেছে; কিন্তু যাহারা অবশিষ্ট থাকিতেছে তাহারা আপনাদিগকে চিরস্থায়ী ও অনশ্বর মনে করিতেছে, ইহাই মহৎ আশ্চৰ্য্য।

যুধিষ্ঠিরের সংক্ষিপ্ত জীবনী।
এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর শ্রবণে প্রীত হইয়া বকরূপী
ধৰ্ম্মদেব পাণ্ডবদিগকে পুনর্জীবিত করিলেন এবং যুধিষ্ঠিরকে
নানাবিষয়ক সদুপদেশ প্রদান করিয়া অন্তর্হিত হইলেন।
তদনন্তর পাণ্ডবগণ অজ্ঞাতবাসে ত্রয়ােদশ বর্ষ যাপন
করিবার মানসে বিরাটরাজ্য মৎস্য দেশে গমন করিলেন,
এবং ছদ্মবেশে বিরাটের অধিকারে নিযুক্ত হইয়া একবর্ষ
কাল অতিবাহিত করিলেন। এ দিকে দুৰ্য্যোধন চতুর্দিকে
দূত পাঠাইলেন, কিন্তু উহারা পাণ্ডবদিগের কোনও সন্ধান
পাইল না ।
যুধিষ্ঠির কঙ্ক নাম ধারণপূর্বক বিরাটরাজের
সভাস হইয়া এক বৎসর অতীত করিলেন। তৎপরে
পাণ্ডবগণ আত্মপ্রকাশ করিয়া মৎস্যরাজের সহিত মৈত্রীবন্ধন
করিলেন। তদনন্তর তাহারা সন্ধির প্রস্তাব করিয়া দুর্যোধনের
নিকট দূত প্রেরণ
করিলেন।
যুধিষ্ঠির উহার নিকট
রাজ্যের অর্ধভাগ চাহিলেন, কিন্তু দুৰ্য্যোধন তাহা দিতে
স্বীকার করিল না। তখন যুধিষ্ঠির পুনৰ্ব্বার কৃষ্ণকে হস্তিনাপুরে
দৌত্যকাৰ্যে যাইতে প্রার্থনা করিলে, কৃষ্ণ
তাহার
গ্রহণপূৰ্ব্বক হস্তিনাপুরে প্রয়াণ করিলেম ! ভীষ্ম, দ্রোণ, বিদুর
ও ধৃতরাষ্ট্র প্রভৃতি সকলেই দুৰ্য্যোধনকে সন্ধির প্রস্তাবে
সম্মত হইতে অনুরােধ করিলেও, দুর্যোধন তাহাদের কাহারও
বাক্যে কর্ণপাত করিল না। অবশেষে কৃষ্ণ বলিলেন যে,
তুমি সমস্ত রাজ্য ভাগ কর, কিন্তু পাণ্ডবদিগকে পাঁচখানি
গ্রাম (১২) প্রদান কর। প্রত্যুত্তরে দুর্যোধন বলিল “আমি
(১২) কুস্থল, বৃকস্থল, মাকণ্ডী বাণীবত ও অবসান এই পঞ্চগ্রাম।

২৪ আৰ্যজীবনী। বিনা যুদ্ধে সূচ্যগ্ৰ-পরিমিত ভূমিও উহাদিগকে দিব না।” তখন কৃষ্ণ নিরাশ হইয়া যুধিষ্ঠিরের নিকট প্রত্যাগমন করিলেন। উভয় পক্ষেই যুদ্ধের উদ্যোগ হইতে লাগিল। কৌরবগণ, একাদশ অক্ষৌহিণী সৈন্য এবং পাণ্ডবগণ সপ্ত অক্ষৌহিণী (১৩) সৈন্য সমবেত ও সজ্জিত করিলেন। এই যুদ্ধের উদ্যোগ করিতে এক বৎসর গত হইল। পরে কুরুক্ষেত্র নামক স্থানে মহাযুদ্ধ উপস্থিত হইল। এই যুদ্ধ অষ্টাদশ দিন ক্রমাগত হইয়া- ছিল। ভারতবর্ষীয় নৃপতিগণ ও অপরদেশীয় রাজগণ স্ব স্ব মিত্রপক্ষের সহায়তা করিতে সসৈন্যে যুদ্ধক্ষেত্রে সমাগত হইয়া- ছিলেন। যুধিষ্ঠির কর্ণের সহিত এবং মদ্ররাজ শস্যের সহিত ঘােতর যুদ্ধ করেন। শল্য যুধিষ্ঠিরের হস্তে যুদ্ধে নিহত হন। এই ভীষণ মহাসমরে দুর্যোধনাদি শত ভ্ৰাত নিহত হন। উভয় পক্ষের প্রায় সমুদয় সৈন্য নিহত হইয়া, পাণ্ডব পক্ষের সাত জন এবং কৌরব পক্ষে তিন জন মাত্র অবশিষ্ট ছিলেন। পাণ্ডবগণ পঞ্চভ্রাতা, কৃষ্ণ ও সাত্যকি এই সাত জন ; এবং অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য ও কৃতবর্মা এই তিন জন মাত্র। সুতরাং পাণ্ডবেরাই জয়লাভ করিলেন। এই মহাযুদ্ধে ক্ষত্রিয়-ধৰ্ম্ম- বিশিষ্ট নৃপতিগণ নিঃশেষ হইয়া গিয়াছিলেন। ক্রমাগত অষ্টাদশ দিবস যুদ্ধে কুরুক্ষেত্রে শােণিতনদী প্রবাহিত হইয়াছিল এবং ভারতবর্ষের সর্বনাশ ঘটিয়াছিল। ভীষ্মপর্বে উল্লিখিত ছে যে, (১৩) ২১৮৭০ হস্তী, ২১৮৭০ রৎ, ৬৫৬১০ অশ্ব এবং ১০১৩৫০ পদাতিক এই সৈন্যসমষ্টি এক অক্ষৌহিণী।

২ যুধিষ্ঠিরের সংক্ষিপ্ত জীবনী। এই কুরুপাণ্ডবীয় মহাযুদ্ধ মার্গশীর্ষ মাসের প্রথম দিনাবধি অষ্টাদশ দিন পর্যন্ত চলিয়াছিল। কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়ােদশীর দিনে ভারত- যুদ্ধ আরম্ভ হইয়াছিল। যুদ্ধাবসানে যুধিষ্ঠির অত্যন্ত নিবেদপ্রাপ্ত হইয়াছিলেন। আত্মীয় স্বজনের মৃত্যুর জন্য বহু বিলাপ করিয়া যুধিষ্ঠির প্রকৃতিস্থ হইলেন এবং তখনও যুদ্ধক্ষেত্রে শরশয্যায় শয়ান ভীষ্মের সকাশ হইতে নানাবিধ সদুপদেশ গ্রহণ করিলেন। অনন্তর যুধিষ্ঠির রাজ্য গ্রহণপূৰ্ব্বক রাজ্যের সুশৃঙ্খলতা বিধান করিয়া প্রজাপালন করিতে লাগিলেন। এই সময় তিনি অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন। অশ্বমেধ যজ্ঞানুষ্ঠানের পূর্বে পাণ্ডবগণ ভারতীয় বহু সংখ্যক রাজাকে বশীভূত করিয়া তাহাদিগের নিকট হইতে কর গ্রহণ করেন। উত্তরে ত্রিগর্ভ (১৪) প্রভৃতি, পূৰ্ব্বে মণিপুর প্রভৃতি বিবিধ প্রদেশ পাণ্ডবদিগের আধিপত্য স্বীকার করিল। ব্যাসের উপদেশানুসারে যুধিষ্ঠির দীক্ষিত হইলেন। এবং যথাসময়ে অশ্বমেধ যজ্ঞ সমাপ্ত হইল। এইরূপে অনেক কাল যুধিষ্ঠির ধৃতরাষ্ট্র প্রভৃতির সহিত একত্র বাস করিলেন, তিনি ধৃতরাষ্ট্র প্রভৃতি গুরুজনের প্রতি সর্বদা ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করিতেন। অবশেষে ধৃতরাষ্ট্র গান্ধারীর সহিত গঙ্গাতীরস্থ গঙ্গাদ্বারের নিকটে এক • অরণ্যে গমন করিলেন এবং তথায় আশ্রম নির্মাণপূর্বক অবস্থিতি করিতে লাগিলেন। কুন্তী এবং বিদুরও সেই আশ্রমে বাসার্থ প্রস্থান করিলেন। বিদুর তপশ্চৰ্যা দ্বারা শরীর (১৪) ত্ৰিগৰ্ত্ত বর্তমান তিব্বত দেশ।

২৬ আৰ্য-জীবনী। শীর্ণ করিয়া মানবলীলা সংবরণ করিলেন। কিছু দিন পরে একদা নারদ ঋষি আসিয়া যুধিষ্ঠিরকে ধৃতরাষ্ট্র প্রভৃতির দাবাগ্নি দ্বারা বন- মধ্যে দগ্ধ হইবার সংবাদ দিলেন। পাণ্ডবেরা ইহা শ্রবণ করিয়া অত্যন্ত ব্যথিত ও দুঃখিত হইলেন । তৎপরে দ্বারকানগরীতে কৃষ্ণ ও বলদেব ভবলীলা সমাপ্ত করিলেন। এই সমাচার শ্রবণে অর্জুন দ্বারকায় গমনপূর্বক উহাদিগের সৎকার এবং ঔদ্ধদেহিক ক্রিয়াদি সম্পাদন করিয়া কৃষ্ণবংশীয় বৃদ্ধ পুরুষ স্ত্রী এবং বালকগণকে দ্বারকা হইতে ইন্দ্রপ্রস্থে আনয়ন করিলেন। ইহার দ্বারকা পরিত্যাগ করিবামাত্র ঐ নগর সমুদ্রগর্ভে নিমগ্ন হইয়া গেল। ইহাদিগকে অর্জুন কুরুক্ষেত্র ইন্দ্রপ্রস্থ প্রভৃতি স্থানে বাস করাইলেন। এই সমস্ত ঘটনা দর্শনে যুধিষ্ঠির অত্যন্ত নিৰ্বিগ্ন হইয়া অৰ্জ্জুনের পৌত্র পরীক্ষিতের হস্তে রাজ্য ন্যস্ত করিলেন এবং ভ্রাতৃচতুষ্টয়ের সহিত রাজ্য ত্যাগ করিয়া উত্তর দিকে মহাস্থান আরম্ভ করিলেন। বহু দিন পদব্রজে ভ্রমণানন্তর তাঁহারা হিমালয় পৰ্ব্বতে উপস্থিত হইলেন, এবং ইহার শৃঙ্গের উপর আরােহণ করিয়া কৃচ্ছ ব্ৰতাবলম্বন করিলেন। এই স্থানেই তাঁহারা মানবদেহ পরিত্যাগ করিয়া ইহলােক হইতে অপসৃত হন। যুধিষ্ঠিরের সংক্ষিপ্ত জীবনী এতক্ষণে শেষ হইল। ইহা সংকলন করিতে আমরা মহাভারত হইতে বিশেষ সাহায্য পাইয়াছি। এক্ষণে যুধিষ্ঠিরের আকৃতি ও প্রকৃতি কিরূপ ছিল দেখিতে হইবে। জীবনীর মধ্যেই চরিত্রের কথা অনেক বলা গিয়াছে, তথাপি এ স্থলে বিছু বলা যাইতেছে। মহাভারতে বর্ণিত আছে যে, যুধিষ্ঠিরের গতি সিংহের ন্যায় মহত্ত্বগুণবিশিষ্ট ;

যুধিষ্ঠিরের সংক্ষিপ্ত জীবনী । ২৭ নাসিকা দীর্ঘ, লম্বমান, সুন্দর ও উজ্জ্বল, এবং নেত্রযুগল ইন্দীবর-সদৃশ ছিল। যুধিষ্ঠির হিন্দু চরিত্রের যতদূর সম্ভব উৎকর্ষ সাধন করিয়াছিলেন। তাঁহার ন্যায়পরতা, সাধুতা, বিবেকপরায়ণতা, ঔদাৰ্য্য, ধৈৰ্য্য, দয়া, দাক্ষিণ্য, ধর্মভীরুতা, বীরতা এবং ধর্মনিষ্ঠা সৰ্ব্বলােকের অনুকরণীয়। তাহার অমানুষিক এবং অলৌকিক সাধু চরিত্র ইদানীন্তন কালে একান্ত দুলভ। তাহার গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি, ভ্রাতৃগণের প্রতি স্নেহ ও বিশ্বাস, পত্নীর প্রতি অনুরাগ ও সদ্ব্যবহার এবং অমিত্রগণের প্রতি সাধুতা প্রদর্শন ও বৈরাভাব কাহার না আন্তরিক প্রশংসা আকর্ষণ করে। সত্যবাদিতা, দয়াশীলতা, শুচিতা, জিতেন্দ্রিয়তা, ক্ষমাশীলতা এবং নিমৎসরতা তাঁহার চরিত্রের উজ্জ্বল গুণ। তিনি কখন কোন কারণে স্বকৰ্ত্তব্য সম্পাদনে নিরস্ত বা ধৰ্ম্মপথ হইতে বিচলিত হইতেন না। “ধৰ্ম্মই ধার্মিক ব্যক্তিকে রক্ষা করে,” এবং “যেখানেই ধৰ্ম্ম, সেইখানেই জয়” এই দুই মহাবাক্য তাহার হৃদয়-দর্পণে সৰ্ব্বদা প্রতিভাত থাকিত। কৌরবগণ কতবার তাঁহার কত অনিষ্ট সাধন করিয়াছিল, কিন্তু কখন মুহূর্তের নিমিত্ত তাহার চিত্ত ক্রোধ- পরবশ বা প্রতিহিংসাপ্রবণ হয় নাই। কৃষ্ণের নীতিকৌশলে তিনি একবার কিয়ৎপরিমাণে মিথ্যা কথা কহিয়াছিলেন, এবং দ্রোণাচাৰ্য্য তাহার সত্যবাদিতাতে একান্ত বিশ্বাস হেতু পুত্রশােকে প্রাণত্যাগ করেন। তজ্জন্য দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা তাহাকে উদ্দেশ করিয়া এক সময়ে বলিয়াছিলেন “তুমি কখন জন্মাবধি মিথ্যা কথা বল নাই, তুমি কখন কোন ব্যক্তির শত্রুতাচরণ কর নাই, তবে যে আমার পিতার সমীপে তােমার সেই স্বাভাবিক আৰ্য-জীবনী। সত্যশীলতা ও বিদ্বেষাভাৰ ত্যাগ করিয়াছিলে তাহা কেবল আমার ভাগ্যদোষে ঘটিয়াছিল। যুধিষ্ঠির কখন কাহার হিংসা বা দ্বেষ বা কাহার প্রতি শত্রুতা ব্যবহার করিতেন না বলিয়া তাহাকে সকলে অজাতশত্রু (১৫), অজাতারি প্রভৃতি নামে সম্বােধন করিত। তাহার অনেক শত্রু ছিল, কিন্তু তিনি কাহারও শক্ত ছিলেন না—ইহাই তাহার চরিত্রের উন্নতির পরাকাষ্ঠা। তিনি জীবমাত্রেরই প্রতি মিত্ৰতাচরণ করিতেন। ধন্য তাহার পবিত্র চরিত্র ! এই জন্যই অদ্যাপি তাহার নাম “ধৰ্ম্মপুত্র যুধিষ্ঠির” বলিয়া হিন্দুসমাজে প্রবাদবাক্যের ন্যায় সকলের আদরণীয় ও শ্রদ্ধেয় হইয়া রহিয়াছে। যতকাল হিন্দুগণ জগতে স্থিতি করিবেন, ততকাল যুধিষ্ঠিরেরনাম তাঁহাদিগের (১০) অনেকে বলেন, যুধিষ্ঠিরের কেহ শত্রু ছিল না বলিয়া তাহার নাম অজাতশত্রু হইয়াছিল। এ অর্থ আমাদিগের হৃদয়ঙ্গম হয় না, যেহেতু কোরবেরা হায় ঘোর শত্রু ছিল। আমরা অজাতশত্রু প্রভৃতি শব্দের অন্যবিধ অর্থ করিতে চাহি। জাত শব্দের অর্থ—যাহারা জন্ম গ্রহণ করিয়াছে অর্থাৎ জীবগণ, জীবমাত্র। জাতদিগের অর্থাৎ জীবমাত্রের শত্রু জাতশত্রু, যিনি জাতশত্রু নহেন তিনি অজাতশত্রু। অজাতারি শব্দও এইরূপ। বেণীসংহার নাটকের তৃতীয়াদ্ধে অশ্বথামা যুধিষ্ঠিরকে বলিতেছেন ‘ন দেক্ষি যজ্জনমতন্তুমজাতশত্রুঃ* যেহেতু তুমি কোন লােককে দ্বেষ কর না, অতএব তুমি অজাতশত্রু বলিয়া পরিচিত। এই বচন আমাদের প্রমাণ। আমরা অন্য প্রমাণ প্রদর্শন করিতে ইচ্ছা করি না।

যুধিষ্ঠিরের সংক্ষিপ্ত জীবনী। ২৯ মানসে ভক্তিরসের উদ্রেক করিতে কখনই ক্ষান্ত থাকিতে পারিবে না। অবশেষে যুধিষ্ঠির কত দিন জীবিত ছিলেন এবং কোন্ সময়ে ইন্দ্রপ্রস্থের সিংহাসন অলঙ্কত করিয়াছিলেন এই দুটী বিষয় নিরূপণ করিয়া প্রস্তাব শেষ করিতেছি। যুধিষ্ঠির অতি অল্প বয়স হইতে রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন এবং বহু দিন পরে রাজসূয় যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন। রাজাবলী গ্রন্থের অনুসারে যুধিষ্ঠির ৭৬ বৎসর বয়ঃক্রম-কালে রাজসূয় যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন। তৎপরে রাজ্যভােগ, বনবাস ও অজ্ঞাতবাসে ত্রয়ােদশ বৎসর অতীত হয়। পরে সন্ধির চেষ্টা এবং যুদ্ধোদ্যোগে এবং যুদ্ধাবসানে রাজ্যের শান্তি-বিধানে এক বৎসর গত হয়। অতঃপর যুধিষ্ঠির রাজসিংহাসনে পুনরারােহণানন্তর ৩৬ বৎসর রাজ্য শাসন করেন। অতএব সৰ্বশুদ্ধ ১২৬ বৎসর যুধিষ্ঠির জীবিত ছিলেন দেখা যাইতেছে। ১২৬ বৎসর বয়ঃক্রম অসম্ভব ও অস্বাভাবিক নহে। (১৬) মনুষ্যের পরমায়ু পূৰ্ব্বকাল (১৬) শ্রুতি আছে “শতায়ুর্বৈ পুরুষঃ” অর্থাৎ মনুষ্য সাধারণতঃ একশত বৎসর বাঁচেন কিন্তু ইতিহাসপাঠে অবগত হওয়া যায় যে, পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন দেশে অনেক ব্যক্তি একশত বৎসর অপেক্ষা অনেক অধিক কাল জীবিত ছিলেন। পিত্রার্ক জানে নামক হঙ্গেরী-দেশীয় একজন কৃষক ১৮৫ বৎসর জীবিত ছিল (১৫৯৭ খুঃ অব্দ হইতে ১৭৮২ খ্রীঃ অঃ)। লুইজ। ফ্রাঙ্কো নাম্নী দক্ষিণ- আমেরিকা-নিবাসিনী এক কাফী স্ত্রী ১৭৫ বৎসর জীবিত ছিল। হেনরি জেন্সি নামক একজন দরিদ্র ব্যবসায়ী ইংরাজ ১৭৯ বৎসর এবং টমাস পার নামক একজন ভদ্র ইংরাজ ১৫২ বৎসর জীবিত ছিলেন। কাউন্টেস

আৰ্য্য-জীবনী।
অপেক্ষা অধুনা অনেক হ্রাস হইয়াছে। পূৰ্বকালীন মনুষ্যেরা
এখনকার মনুষ্যদিগের অপেক্ষা দীর্ঘজীবী ছিলেন।
এক্ষণে ইতিহাস যুধিষ্ঠিরের সময়সম্বন্ধে কি বলে দেখা
যাউক। পূৰ্বৰ্তন আৰ্য্যগণ রাজ্যবিপ্লব প্রভৃতি কোন প্রসিদ্ধ
ঘটনা এবং সামাজিক রীতি নীতির ও আচার ব্যবহারের
পরিবর্তন অবলম্বন করিয়া যুগ বিভাগ করিয়া গিয়াছেন।
বর্তমান কলিযুগ এইরূপ কোন ঘটনা বা পরিবর্তন অবলম্বন
করিয়া প্রবর্তিত হইয়াছিল। কলিযুগের এক্ষণে ৪৯৮৩ অব্দ
চলিতেছে। কাশ্মীর দেশের ইতিহাস রাজতরঙ্গিণীতে
লিখিত আছে যে ‘কলিযুগের ৬৫৩ বৎসর গত হইলে পাণ্ডবগণ
জন্মগ্রহণ করেন। যুধিষ্ঠির নৃপতির শাসনকালে সপ্তর্ষিগণ ম
নক্ষত্রে অবস্থিতি করিতেন এবং যুধিষ্ঠিরের রাজ্যকাল হইতে
২৫২৬ বৎসর অতীত হইলে শকাব্দ আরম্ভ হয়। এক্ষণে ১৮০৩
শকাব্দাঃ। অতএব ৬৫৪+২৫২৬+১৮০৩=৯৮৩ কলি-
যুগাব্দ । আবার রাজাবলী নামক ঐতিহাসিক গ্রন্থে
লিখিত আছে যে,
কলিযুগের ৩০৪৬ বৎসর গত হইলে
যুধিষ্ঠিরের প্রচলিত অব্দ বিলুপ্ত হয় এবং বিক্রমাদিত্যের
ডেসম নাম্নী ইংলণ্ডীয় একজন সন্ত্ৰান্তবংশীয়া স্ত্রী ১৫০ বৎসর জীবিত ছিলেন।
গ্রীসদেশীয় বিখ্যাত চিকিৎসক ও বৈজ্ঞানিক পণ্ডিত গেলেন ১৪০ বৎসর
জীবিত ছিলেন। আরব দেশে দুইশতবর্যবয়স্ক মনুষা পৰ্যটকদিগের নেত্রপথে
পতিত হইয়াছে। ভারতবর্ষে পূৰ্বকালের ত কথাই নাই, অধুনাও অনেকা-
নেককে একশত বৎসরের অধিক জীবিত থাকিতে দেখা যায়। (তত্ত্ববােধিনী
নবম কল্প তৃতীয় ভাগ ৪০৭ সংখ্যা ৫০ পৃষ্ঠা “মনুষ্যের পরমায়ু” শীর্ষক
প্রস্তাব দেখ)।

যুধিষ্ঠিরের সংক্ষিপ্ত জীবনী।
সংবৎ আরম্ভ হয়। সংবৎ ১৯৩৭। সুতরাং ৩০৪৬ +১৯৩৭ =
১৯৮৩ কল্যব্দ। বৃহৎসংহিতা নামক জ্যোতিষ গ্রন্থে লিখিত
আছে যে, যুধিষ্ঠিরের রাজ্যকালে সপ্তর্ষিমণ্ডল মঘা নক্ষত্রে
ছিল এবং এই স্থিতি শক-কালের ২৫২৬ বৎসর পূর্বে ঘটিয়া-
ছিল। অতএব এক্ষণকার ১৮০৩ শকের সহিত ২৫২৬
বৎসর যােগ করিলে ৪৩২৯ বৎসর হয়। কলির ৪৯৮২ অব্দ
গত হইয়াছে। ৪১৮২ বৎসর হইতে ৪৩২৯ বৎসর বিয়ােগ
করিলে ৬৫৩ বৎসর
বৎসর অবশিষ্ট থাকে। রাজতরঙ্গিণীতেও
ইহাই নির্দিষ্ট আছে। কলির অব্দ যখন অদ্যাপি প্রচলিত
আছে, তখন ইহা মিথ্যা হইতে পারে না। প্রচলনই ইহার
সত্যতার পরিচায়ক লক্ষণ। অতএব যুধিষ্ঠির কলিযুগের
৬৫৩ বৎসর অতীত হইলে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। যুধিষ্ঠির
কলিযুগের প্রথম কালের রাজা বলিয়া প্রসিদ্ধ।
এই মহাভারতের কালনির্ণয় করিতে গিয়া ইউরােপীয়
মহাপুরুষেরা যে কত কাণ্ডই করিয়াছেন তাহা সমালােচনা
করিলে স্তম্ভিত হইতে হয়। কেহ কেহ গণনা দ্বারা বলেন
যে মহাভারতে উল্লিখিত গ্রহ-স্থিতি খ্রীষ্টের পূর্বে ১৪২৪ অব্দে
ঘটিয়াছিল, তদ্ভিন্ন অন্য কোন সময়ে গ্রহগণের উক্ত স্থিতি
ঘটিতে পারে না। সুতরাং যুধিষ্ঠির ১৮৮১+১৪২৪ =৩৩০৫
বৎসর পূর্বে বৰ্তমান ছিলেন। আমাদিগের মতে ৪৩২৯
বৎসর পূর্বে । পাশ্চাত্য পণ্ডিতেরা যে কোথা হইতে এই
সমস্ত জানিতে পারেন, তাহা আমরা বলিতে পারি না।
সে দিন অধ্যাপক মনিয়র উইলিয়স এথিনিয়ম সংবাদপত্রে
লিখিয়াছেন যে, রাজা রামমােহন রায় সংস্কৃত ও ইংরাজী

৩২
আৰ্য-জীবনী।
ভাল জানিতেন না, অন্যের সাহায্যে উপনিষদ প্রভৃতি অনুবাদ
করিয়াছিলেন। এই কথাও যেমন সত্য, আর যুধিষ্ঠিরের
কালনির্ণয়ও তেমনি সত্য। ইউরােপীয়দিগের কথা দূরে
থাকুক, কোন কোন বাঙ্গালীও যুধিষ্ঠিরকে ২৫২৬ বৎসরের
লােক অর্থাৎ খৃঃ পূ: নবম শতাব্দীতে ফেলিতে চাহেন।
যাহা হউক এ সমস্ত নিরর্থক বিষয় আলােচনা দ্বারা সময় নষ্ট
করিতে আমরা চাহি না। পূৰ্বে যুধিষ্ঠিরের সময় নির্ণীত
হইয়াছে এবং উহাই আমাদের মতে প্রামাণিক।
মহাভারত যে রামায়ণ অপেক্ষা নব্য গ্রন্থ তদ্বিষয়ে কোন
সন্দেহ হইতে পারে না; কিন্তু হুইলার সাহেব এবং তদনুসারে
লেথব্রিজ সাহেব ভ্রান্ত মত প্রচার করিতেছেন বলিয়া
আমরা তদ্বিষয়ে দুই একটা কথা বলিয়া যুধিষ্ঠির-জীবনীর
উপসংহার করিব। রামায়ণ এবং মহাভারতের লিখিত-রীতি
দ্বারাই রামায়ণের প্রাচীন প্রতীত হয়। ব্যাস বাল্মীকিকে
কবিতা-কমল-রবি কবিগুরু বলিয়াছেন, সুতরাং বাল্মীকি
পরবর্তী হইতে পারেন না। মহাভারতে অনেক
রামায়ণ এবং রামায়ণের ব্যক্তিগণের উল্লেখ আছে, কিন্তু
রামায়ণে মহাভারত বা তাহার কোন ব্যক্তির নাম গন্ধ পৰ্যন্ত
নাই। মহাভারতের সময়ে আর্য্যগণ ভারতের সর্বত্রই প্রায়
ব্যাপ্ত হইয়াছিলেন, কিন্তু রামায়ণের সময়ে অনেকই অনাৰ্য
দেশ। মহাভারতে বর্ণিত আৰ্যদিগের অবস্থা রামায়ণের
আৰ্যদিগের অবস্থা হইতে অনেক পরিমাণে উন্নত এবং
সমৃদ্ধ। আর মহাভারতে কৃষ্ণচরিত সম্যক্‌প্রকারে বর্ণিত
হইয়াছে, কিন্তু রামায়ণে কৃষ্ণের কোন আভাস পর্যন্ত নাই।

চন্দ্রগুপ্তের সংক্ষিপ্ত জীবনী। এবংবিধ বহুসংখ্যক কারণে মহাভারত রামায়ণের পরকালীন বলিয়া প্রমাণিত হয়। বালকেরা যেন আর পাশ্চাত্য ভ্রান্ত মত দ্বারা বিমােহিত না হয় ইহা আমাদের একান্ত ইচ্ছা। মৌৰ্যকুলবীর চন্দ্রগুপ্তের সংক্ষিপ্ত জীবনী। আর্যাবর্তে মগধ নামে যে জনপদ ছিল, বৈদিক সময়ে তাহাকে কীকট বলিত। বিখ্যাত জরাসন্ধ নৃপতি মগধদেশে নিজ রাজ্য স্থাপন করেন। তাহার সময় হইতেই এই দেশ মগধনামে পরিচিত। মগধের অধুনাতন নাম বেহার প্রদেশ। জরাসন্ধ যযাতিপুত্র পুরুর বংশােৎপন্ন এবং মগধবংশীয় মহা- বলপরাক্রান্ত ভূপালগণের আদিপুরুষ। গয়ার পূৰ্ব্বস্থিত রাজগৃহে তাঁহার রাজধানী ছিল। তিনি পাণ্ডবদিগের সম- সাময়িক নৃপতি এবং ভীমের সহিত দ্বন্দ্বযুদ্ধে নিহত হন। বারাণসী নগরীতে জরাসন্ধ যে জয়স্তম্ভ নির্মাণ করিয়াছিলেন, মুসলমানেরা তাহা ভাঙ্গিয়া তাহা ভাঙ্গিয়া ফেলিয়াছে। দ্বাবিংশতিজন নৃপতি জরাসন্ধের সিংহাসনে রাজত্ব করেন। বিষ্ণুপুরাণের মতে মগধবংশের স্থিতি সহস্র বৎসর পর্যন্ত নিরূপিত আছে, অর্থাৎ এই দ্বাবিংশতি জন ভূপাল এক সহস্র বৎসর মগধ- ৩৪ আৰ্য-জীবনী। সিংহাসন অধিকার করিয়াছিলেন। শেষ নৃপতি রিপুঞ্জয় সুনীকনামক তাহার দুরাত্মা সচিবের হস্তে নিহত হন। রাজ্যলুব্ধ সুনীক তাঁহার পুত্র প্রদ্যোতকে মগধসিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করেন। ইহার পরে পঞ্চদশ জন মহীপতি মগধ- রাজ্যে রাজত্ব করেন। ইহাদের রাজত্বকাল বিষ্ণুপুরাণের মতে চারিশত নবতি বৎসর। মহারাজ মহানন্দ ইহাদিগের পঞ্চদশতম। ইহার মহাপদ্ম নামে এক তনয় জন্মে। এই মহাপদ্মই ইতিহাসে নন্দনামে প্রথিত হইয়াছেন। মহা- পদ্মনন্দ শূদ্ৰাগৰ্ভসমুদ্ভূত ছিলেন। ইহার প্রতাপ এবং বীরত্ব বহুদূর বিদিত হইয়াছিল। কেহই তাহার শাসন উল্ল- ঘন করিতে সমর্থ হইত না। যদ্যপি ইনি শূদ্রার গর্ভে জন্মিয়াছিলেন, তথাপি তাঁহার সামাজিক প্রতিপত্তি অব্যাহত ছিল। মহাপদ্ম নন্দের নব পুত্র জন্মিয়াছিল। এতদ্ভিন্ন তাহার ঔরসে মুরানামী দাসীর গর্ভে চন্দ্রগুপ্ত নামে আর এক পুত্র হইয়াছিল। এই চন্দ্রগুপ্তের সংক্ষিপ্ত জীবনী আমরা এ প্রস্তাবে সঙ্কলিত করিব। নন্দের পরলােকগমনানন্তর তাহার নয়জন পুত্র রাজ্য অধিকার করিলেন। তাঁহার চন্দ্রগুপ্তকে উপযুক্ত বৃত্তি দিতে চাহিলেন, কিন্তু রাজ্যের অংশ দিতে অসম্মত হইলেন। চন্দ্রগুপ্ত তাহা গ্রহণ করিলেন না বলিয়া তাঁহারা তাহাকে বধ করিবার উপক্রম করেন। প্রাণভয়ে ভীত হইয়া চন্দ্রগুপ্ত পঞ্চনদ প্রদেশে পলায়ন করেন । তথায় তক্ষশিলানিবাসী, চাণক্যপণ্ডিতের সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ হয়। চাণক্যের সহিত তাহার যে দিন প্রথম আলাপ হয়, সে দিন তিনি চন্দ্রগুপ্তের সংক্ষিপ্ত জীবনী । ৩৫ দেখিলেন যে, চাণক্য তক্রসেচনপূৰ্ব্বক কতকগুলি কুশা- স্করের মূলােচ্ছেদ করিতেছেন ; ইহাতে তাঁহাকে আপনার কার্যোপযােগী ব্যক্তি স্থির করিয়া তাহার সহিত মিলিত হইলেন। চাণক্য অতিশয় বুদ্ধিমান এবং রাজনীতিশাস্ত্রে সম্যক্ ব্যুৎপন্ন ছিলেন। এতাদৃশ সহায় প্রাপ্ত হইয়া চন্দ্রগুপ্ত মগধে প্রত্যাগমনের উদ্যোগ করিলেন। গ্রীসদেশীয় ইতিহাসলেখকেরা বলেন যে, চন্দ্রগুপ্ত যখন পঞ্চনদপ্রদেশে ছিলেন, তখন মহাবীর আলেজাণ্ডার ভারত- বর্ষ আক্রমণ করেন, এবং বিপাশানদীতীরে শিবিরসন্নিবেশ করেন। চন্দ্রগুপ্ত আলেজাণ্ডারের সেনানিবেশে প্রবেশ করিয়া আলেকজাণ্ডারের সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছিলেন। চন্দ্রগুপ্তের বাচালতা ও স্বাধীনভাবে বাক্য প্রয়ােগ হেতু সেকন্দর তাহার উপর এরূপ ক্রুদ্ধ হইয়াছিলেন যে, তিনি পলায়নদ্বারা আত্মরক্ষা সম্পাদন না করিলে, নিশ্চয় তাঁহাকে মারিয়া ফেলিতেন। পরে তিনি কুসুমপুরে পলা- য়ন করেন ; তথায় নব নদ-নরপতিগণ এক মিলিত হইয়া রাজত্ব করিতেছিলেন। তাঁহাদিগের রাজত্ব-সময়ে রাজগৃহ হইতে রাজধানী স্থানান্তরিত হইয়া কুসুমপুর বা পাটলীপুত্রে সংস্থাপিত হয়। কখন্ যে স্থানান্তরিত হইয়াছিল, তাহা আমরা জ্ঞাত নহি। নদ-নরপতিগণ প্রজারঞ্জনদ্বারা প্রজা- বর্গের পরম অনুরাগভাজন হইয়া উঠিলেন। রাক্ষস নামে জনৈক নীতিজ্ঞ ব্রাহ্মণ ইহাদিগের অতি প্রাচীন সচিব ছিলেন। রাক্ষসের অকৃত্রিম স্বামিভক্তি এবং রাজ্যের হিতচিন্তনহেতু সকলেই তাহার প্রশংসা করিত।

আৰ্য-জীবনী। একদা চাণক্য রাজবাটীতে কোন কাৰ্য্যোপলক্ষে নিমন্ত্রিত হইয়াছিলেন। তথায় কোন কারণবশতঃ তিনি নদ-নৃপতি- গণকর্তৃক অপমানিত এবং সভা হইতে হইতে বহিষ্কৃত হন। এই নিষ্কাৰণ অবমাননা জন্য তিনি নদ-নৃপতিদিগের ধ্বংস সর্বসমক্ষে প্রতিজ্ঞা করেন। পরে সে প্রতিজ্ঞা রক্ষা হইয়া- ছিল। চাণক্যের মন্ত্রণা ও বুদ্ধিকৌশলে চন্দ্রগুপ্ত নিজ ভ্রাতৃ- গণকে উপাংশুনিহত করেন এবং সিংহাসনে আরূঢ় হইয়া চাণক্যকে নিজের মন্ত্রিত্বে বরণ করিলেন। তৎপরে উগ্রধা নামক একজন নন্দপুত্রদিগের পক্ষীয় রাজা চন্দ্র গুপ্তের বিনাশের উপায় কল্পনা করিলে, তিনি নেপালরাজ্য হইতে সাহায্য প্রার্থনা করেন এবং উগ্ৰধশ্বাকে পরাজিত করিয়া সিংহাসনে দৃঢ়তররূপে সমাসীন হন। (১) এদিকে অমাত্য রাক্ষস স্বচক্ষে চাণক্য-কর্তৃক নন্দ-নৃপতি গণের সমুচ্ছেদ সন্দর্শনানন্তর নগর হইতে বহির্গত হইয়া মলয়কেতুনামক জনৈক পাৰ্বতীয় রাজার সহিত মিলিত হইলেন। ইহার সহিত মিলিত হইয়া চন্দ্র গুপ্তের অনিষ্ট- সাধনে প্রবৃত্ত হইলেন এবং মলয়কেতুকে কুসুমপুর আক্রমণ করিতে বলিলেন। মলয়কেতু সমুদয় নন্দরাজ্য পাইবেন বলিয়া আক্রমণের উদ্যোগ করিতে লাগিলেন। রাক্ষসের মন্ত্রণাকৌশলে কুনূতদেশের অধিপতি চিত্ৰবৰ্মা, মলয়দেশের রাজা সিংহনাদ, কাশ্মীরাধিপ পুরাক্ষ, সিন্ধুদেশভূপাল সিন্ধু- সেন এবং বহুতুরঙ্গ-সৈন্যশাণী পারসীকপতি মেঘাক্ষ প্রভৃতি (১) Asiatic Researclies, volv, চন্দ্রগুপ্তের সংক্ষিপ্ত জীবনী । ৩৭ স্লেচ্ছরাজগণ মলয়কেতুর সহায় হইল। অন্যান্য পার্থিবগণও মলয়কেতুর পৃষ্ঠপােষকতা করিতে স্বীকার করিল। ভদ্রভট, পুরুষদত্ত, হিঙ্গুরাত, বলগুপ্ত, রাজসেন, ভাগুরায়ণ, রােহি- তাক্ষ, বিজয়বর্মা প্রভৃতি চন্দ্র গুপ্তের সহোস্থায়ী প্রধান- পুরুষগণ মলয়কেতুর সহিত যােগ দিল। কুসুমপুরে জৈত্র- যাত্রার জন্য খশ, মগধ, চেদি ও হুন সৈন্যগণ সমাগত হইতে লাগিল। গান্ধার ও যবনভূপালগণ এবং শকভুপতিগণ সজ্জিত হইতে লাগিল। সত্বরেই কুসুমপুর অবরােধ করিতে মলয়কেতু সসৈন্যে গমন করিলেন এবং দিন দিন নগরের নিকটবর্তী হইতে লাগিলেন। সৰ্ব্বত্রই উৎসাহ ও অধ্যবসায় দৃষ্ট হইতে লাগিল। সকলেই ভাবিল, চন্দ্র গুপ্তের আর রক্ষা নাই। অমাত্য রাক্ষস কেবল এই যুদ্ধবিগ্রহের ভরসায় না থাকিয়া চন্দ্র গুপ্তের বিনাশের নিমিত্ত এক বিষময়ী কন্যা গােপনে নিয়ােজিত করিলেন, এবং যন্ত্রনির্মাণ, বিষপ্রদান প্রভৃতি কাৰ্যে কয়েকজন প্রণিধি প্রেরণ করিলেন এবং অন্যান্য অনেক নীতিকৌশল প্রয়ােগ করিলেন । অমাত্য রাক্ষসের এই সকল কৌশল দেখিয়া নীতিজ্ঞ চাণক্য ভীত হইলেন না, ক্রমে ক্রমে সেগুলি ব্যর্থ করিতে আরম্ভ করিলেন। চাণক্য প্রথমতঃ নিজ আজ্ঞাবহ অনুচরগণকে এবং কাৰ্যনিপুণ চরদিগকে মলয়কেতু এবং রাক্ষসের নিকট দাসত্ব স্বীকার করিতে প্রেরণ করিলেন। তাহারা সত্বরেই উভয়ে- রই অত্যন্ত বিশ্বস্ত ভৃত্য হইয়া উঠিল। অমাত্য রাক্ষস তাহাদিগের দ্বারা যে যে কাৰ্য করিতেন, চাণক্য তৎসমস্ত জানিতে পারিতেন। অমাত্য রাক্ষস কিছুমাত্র বুঝিতে পারেন আৰ্য-জীবনী। নাই, যে তাঁহার সেবকবর্গ চাণক্যের লােক এবং তাঁহার সর্বনাশ করিতে উদ্যুক্ত। কোন্ ব্যক্তি চন্দ্র গুপ্তের পক্ষ এবং কোন্ ব্যক্তি বিপক্ষ, তাহা বিশেষরূপে জ্ঞাত হইবার নিমিত্ত চাণক্য নানাভাকুশল চর সকল নিযুক্ত করিয়া- ছিলেন ; তাহারা ভিন্ন ভিন্ন বেশ ধারণপূৰ্ব্বক নানাস্থানে ভ্রমণ করত তত্ৰত্য লােকদিগের আচার ব্যবহার অবগত হইতেছিল এবং কুসুমপুরবাসী নন্দনরপতির অমাত্য ও বন্ধুবান্ধবদিগের গূঢ় ব্যাপার ও উপায় নিপুণরূপে অনুসন্ধান করিয়া বেড়াইতে লাগিল। শেষে তিনি রাক্ষসের বিশ্বস্ত ব্যক্তিদিগকে পৰ্য্যন্ত স্ববশে আনিলেন। চাণক্য জানিতেন যে, অমাত্য রাক্ষস স্বার্থশূন্য ভক্তিসহ- কারে তাহার কর্তব্য সম্পাদন করিতেন এবং কি প্রকারে শ্রেয়ঃ হইবে তাহাই অনন্যচিত্তে চিন্তা করিতেন। অনেক লােকেই স্বার্থসিদ্ধির জন্য সম্পৎশালী প্রভুকে সেবা কিন্তু রাক্ষস সেরূপ ছিলেন না। চাণক্য বিবেচনা করলেন যে, রাক্ষসকে হস্তগত করিয়া চন্দ্রগুপ্তের মন্ত্রিত্ব স্বীকার করাইবার প্রয়াস পাওয়া নিতান্ত আবশ্যক। রাক্ষ- সের বুদ্ধি, বিক্রম, এবং ভক্তি, এই ত্রিবিধ গুণ ছিল বলিয়াই চাণক্য তাহাকে চন্দ্র গুপ্তের মন্ত্রী করিতে ইচ্ছা করিয়াছিলেন। যাহাদিগের বুদ্ধি, বিক্রম ও ভক্তি এই তিন গুণ থাকে, তাহারাই প্রকৃত ভৃত্য, এবং তাহাদের হইতেই স্বামীর সর্বকালেই যথার্থ মঙ্গল হইবার সম্ভাবনা। সুতরাং চাণক্য রাক্ষসকে হস্তগত করিতে যতদূর সাধ্য যত্ন করেন। প্রথমতঃ রাক্ষস ও মলয়কেতুর বিচ্ছেদ উৎপাদন করিবার করে ;

চন্দ্রগুপ্তের সংক্ষিপ্ত জীবনী ।
৩৯
নিমিত্ত চাণক্য এক কৌশল করিলেন। রাক্ষসের নামমুদ্রা
দ্বারা অঙ্কিত একখানি পত্র চন্দ্রগুপ্তের নিকটে প্রেরণ
করাইলেন ; সেই পত্র পথিমধ্যে চাণক্যের প্রেরিত মলয়-
কেতুর বিশ্বস্ত সেবকদিগের দ্বারা ধৃত এবং মলয়কেতুর
সমীপে আনীত হইল। তদ্দর্শনে রাক্ষসের প্রতি মলয়-
কেতুর সন্দেহ বদ্ধমূল হইলে, তিনি অমাত্য রাক্ষসকে
আহ্বান করিয়া আনাইলেন, এবং তদ্বিষয়ক বিবিধ প্রশ্ন
তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন। রাক্ষস পত্রের মর্ম কিছুই
জানিতেন না, তিনি এ বিষয়ে সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিলেন ।
সুতরাং তিনি সদুত্তরপ্রদানে অসমর্থ হইলেন। ইহাতে
মুগ্ধবুদ্ধি মলয়কেতু রাক্ষসকে অপমানিত এবং স্বসকাশ
হইতে দূরীকৃত করিলেন। এবং চিত্ৰবৰ্মা প্রভৃতি পাঁচজন
মিত্ররাজকে মারিয়া ফেলিলেন। এই জন্য অপরপর
রাজারা মলয়কেতু অতি অবিবেচক ও দুবৃত্ত” ইহা
বিবেচনা করিয়া, বিশেষতঃ ভয়বিহ্বল
সৈন্যগণকে
পলায়ন করিতে দেখিয়া আপনাদিগের বিষয় সম্পত্তি রক্ষার
নিমিত্ত মলয়কেতুর সেনানিবেশ পরিত্যাগপূৰ্ব্বক স্ব স্ব রাজ্যে
প্রস্থান করিলেন। তদনন্তর ভদ্রভট, পুরুষদত্ত প্রভৃতি
চাণক্যপ্রেরিত প্রধানপুরুষগণ
মলয়কেতুকে বদ্ধ করিয়া
ফেলিল। তৎপরে
দুঃখিতান্তঃকরণে কুসুমপুরে
আগমন করিয়া প্রচ্ছন্নভাবে অবস্থিতি করিতে লাগিলেন।
চাণক্য তাহা জানিতে পারিয়া আর একটি কৌশলপ্রয়ােগ
দ্বারা তাঁহাকে হস্তগত করিলেন। একদিন চন্দ্রগুপ্তের
সমভিব্যাহারে তাঁহার নিকট গমন করিলেন এবং আপনি

৪০ আৰ্য-জীবনী। অমাত্য রাক্ষসকে অভিবাদন করিয়া, যথাবিহিত বহুমান- পুর:সর চন্দ্রগুপ্তকে ও তাঁহাকে প্রণাম করিতে বলিলেন। অমাত্য রাক্ষস চন্দ্র গুপ্তকে “বিজয়ী হও” বলিয়া আশীৰ্বাদ করিলেন। এইরূপে রাক্ষস হস্তগত হইলে চাণক্য তাঁহাকে চন্দ্র গুপ্তের সচিবকার্য্যের ভার গ্রহণ করিতে অনুরােধ করিলেন। অমাত্য রাক্ষস অগত্যা তাহাই করিতে স্বীকৃত হইলেন। তৎপশ্চাৎ চাণক্য চন্দ্রগুপ্তের সমীপে রাক্ষসের নানাবিধ স- গুণ বর্ণন করিয়া তাহাকে মন্ত্রিত্বের চিহ্নস্বরূপ শস্ত্র প্রদান করিলেন। অমাত্য রাক্ষস চন্দ্রগুপ্তের শস্ত্র গ্রহণ করিয়াছেন, এমন সময়ে রাজপুরুষেরা মলয়কেতুকে হস্তপদে বদ্ধ করিয়া দ্বারদেশে স্থাপিত করিল। রাজপুরুষেরা কি করিতে হইবে এই বিষয় চাণক্যকে জিজ্ঞাসা করিলে, চাণক্য বলিলেন, এক্ষণে অমাত্য রাক্ষস রাজকাৰ্য্য করিবেন, সুতরাং তাহাকে নিবেদন কর। রাক্ষস তখন চন্দ্র গুপ্তকে বলিলেন, “রাজ, তুমি ত জানই যে, আমি মলয়কেতুর সহিত কিছুকাল বাস করিয়াছিলাম, অতএব ইহার প্রাণ রক্ষা কর।” চন্দ্রগুপ্ত চাণক্যের মুখের দিকে নিরীক্ষণ করিলে, তিনি বলিলেন, “চন্দ্রগুপ্ত, অমাত্য রাক্ষসের এই প্রথম প্রার্থনা রক্ষা করা উচিত।” তদনুসারে চন্দ্র গুপ্ত মলমকেতুকে পৈতৃক বাজ্য প্রদান করিলেন এবং সম্মানের সহিত তাঁহাকে তথায় পাঠাইয়া দিলেন। চন্দ্র গুপ্তরাজের জীবনীর এই স্থানে মুদ্রারাক্ষস নামক নাটক শেষ হইয়াছে। এই নাটকে চাণক্যের বুদ্ধিচাতুরী রাক্ষসের অকৃত্রিম প্রভুভক্তি অতিস্পষ্টরূপে বর্ণিত চন্দ্রগুপ্তের সংক্ষিপ্ত জীবনী। ৪১ হইয়াছে। চন্দ্রগুপ্তের জীবনীর শেষভাগ পুরাণ প্রভৃতি আন্যান্য গ্রন্থ হই.৩ সন করত প্রবৃওঁ ইশ। বায়ুপুরাণে এ গুপ্তের রাজ কাল আটাইশ বৎসর নিয়তি অ(ছে। বুমারিকাখণ্ড এবং অমিপুরাণে লিখিত আছে যে, চাণক্য এবং চন্দ্র গুপ্ত কণিযুগের ২৭৯০ বৎসরে স্বকৃত পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিবার নিমত্ত নর্মদাতীরস্থিত শুতার্থে গমন করেন। এক্ষণে কলিযুগের ৪৯৮৩ অদ চলিতেছে। সুতরাং শুক্লতীর্থে গমন ৩১২ পূর্ব খ্ৰীষ্টাব্দে ঘটিছিল। স্কন্দপুরাণে লিখিত আছে যে, কলিযুগের ২৬৯০ গত হইলে নন্দরাজ্য এবং তাহার একশত বৎসর পরে অর্থাৎ ২৭৯) অকে চন্দ্র গুপ্তের রাজ্য আরম্ভ হইবে। উপরিউক্ত কুনারিকাখণ্ডের সময়নিরূপণের সহিত ইহার মিল হয়। স্কন্ধপুরাণের বচন- ততােহপি ত্রিসহস্রেষু দশাধিকশতত্রয়ে। ভবিষ্যরাজ্যঞ্চ চাণক্যে যা হনিষ্যতি ॥” অর্থাৎ তিন সহস্র বৎসরের তিন শত দশ বৎসর অবশিষ্ট থাকিতে নন্দরাজ্যের আরম্ভ। অনেকে “ ত্রিসহশ্রেযু” স্থানে “দ্বিসহষুে” পাঠ করিয়া একসহস্র বৎসর পশ্চাতে ফেলেন। ভাগবতের দ্বাদশস্কন্ধের প্রথম অধ্যায়ে দৃষ্ট হয় যে মহা- নন্দীর পুল মহাপদ্মনন এবং ভঁহার মুল্য প্রভৃতি ষ্ট পুত্র ছিলেন। এই মহাপদ্মনন এবং তাঁহার পুত্রগণ একশত বৎসর পৃথিবী ভােগ করিয়াছিলেন। ভাগবতের মতে ইহারা পরীক্ষিৎ নৃপতির জন্মের ১৫১০ বৎসর (এতদ্বষসহস্রঞ্চ (২) শতং পঞ্চ- (২) এতবর্ষসহস্র চ শতং পঞ্চ দশােত্তর’ পাঠ ধরিলে স্কুল- পুরাণ প্রভৃতির সহিত ইহার ঐক্য হয়।

৪২
আৰ্য-জীবনী।
দশােত্তরং) পরে রাজত্ব করিতে আরম্ভ করেন এবং একশত
বৎসর রাজত্ব করেন। ইহার মতে পরীক্ষিৎ কলিযুগের
অশীতি অব্দে জন্মগ্রহণ করেন। সুতরাং কলিযুগের ১৫৯০
অব্দে নন্দরাজ্য-কাল। অতএব ১৬৯০ কলির অব্দে বা
১৪১২ পূৰ্ব্ব খ্রীষ্টাব্দে চন্দ্রগুপ্তের রাজ্যকাল হইয়া পড়ে। কিন্তু
ইহার সহিত পূর্বোক্ত
সময়ের ঐক্য হয় না। প্রাচীন
ভারতের কোন রাজার সময়নিরূপণ প্রায় অসম্ভব।
চন্দ্রগুপ্ত বিষয়ে যাহা কিছু পুরাণাদিতে পাওয়া গিয়াছে তাহা
পাঠকমহাশয়কে উপহার দেওয়া গেল, তিনি ইহার ভিতর
হইতে সারগ্রহণ করিবেন। বৌদ্ধ গ্রন্থে চন্দ্রগুপ্তের রাজ্যকাল
চৌত্ৰিশ বৰ্ষ নির্দিষ্ট আছে। বৌদ্ধমতে চন্দ্রগুপ্ত ৩৯৬ পূর্ব
খৃষ্টাব্দে সিংহাসনে আরােহণ করেন। পুরাণমতে তিনি
২৫ বৎসর নিরুপদ্রবে মগধ রাজ্য শাসন করিয়া মানবলীল
সংবরণ করেন। কোন কোন মতে ২৯২ পূৰ্ব্ব খ্রীষ্টাব্দে তাহার
মৃত্যু হয়।
চন্দ্রগুপ্ত নিজপ্রতাপ ভারতবর্ষের অনেক বিস্তার করিয়া-
ছিলেন এবং পঞ্চনদ প্রদেশ হইতে গ্রীক বা যবনদিগকে দূরীভূত
করিয়া দিয়াছিলেন। প্রবাদ আছে যে, তিনি দক্ষিণাবর্তে
কৃষ্ণানদীর তটে চন্দ্রগুপ্তনগরী নামে এক নগরী সংস্থাপিত
করেন। তত্ৰত্য লােকেরা চন্দ্রগুপ্তের ইতিহাস বিশেষরূপে
অবগত আছে। মুদ্রারাক্ষসের রচয়িতা এবং টীকাকার উভয়েই
তর্দেশীয় লােক। যবনসেনানী সেলিউক ভারতবর্ষে নিজ
অধিকার পুনঃপ্রাপ্তির জন্য আর একবার ভারতবর্ষ আক্রমণ
করিতে অগ্রসর হন। কিন্তু চন্দ্র গুপ্ত স্বসৈন্যসামন্ত সমভি-

চন্দ্রগুপ্তের সংক্ষিপ্ত জীবনী। ৪৩ ব্যাহারে সঁহার গতিরােধ করেন এবং তাঁহাকে পরাজিত করিয়া সন্ধি করিতে বাধ্য করেন। মুদ্রারাক্ষসের শেষে যে যবনদিগের আক্রমণের উল্লেখ দৃষ্ট হয়, তাহা বোধ হয় এই আক্রমণ। মগধরাজ্য পরাক্রান্ত না থাকিলে যবনহন্ত হইতে ভারতবর্ষ রক্ষা করা ভার হইত। চন্দ্রগুপ্তের সহিত যবনসেনাপতির সন্ধি ৩০২ খ্রীষ্টাব্দে হইয়াছিল। চন্দ্রগুপ্তের রাজ্যে প্রজাদিগের সুখস্বচ্ছন্দবৃদ্ধি এবং সামাজিক উন্নতি হইয়াছিল। প্রকৃতিবর্গ মগধরাজ্যের শান্তিচ্ছায়াতে নির্বিঘ্নে সুখে কালহরণ করিত, কোন উপদ্রব বা অত্যাচারের শঙ্কা ছিল না। চন্দ্রগুপ্তের রাজধানী পাটলিপুত্র নগর গঙ্গার উপকুলে স্থিত এবং পঞ্চক্রোশ দীর্ঘ ও একক্রোশ বিস্তৃত ছিল। তৎকালে ইহা বাণিজ্যের একটী প্রধান স্থান ছিল। নদীর বক্ষে শত শত বণিকৃপােত ভাসিতে দেখা যাইত। নগরের মধ্যে নানাশ্রেণীর কারুশিল্পকর বাস করিত এবং অগণ্য- পণ্যরাজিত বিপণি ও আপণমালা রাজপথের শােভা সম্পাদন করিত। হস্তিগণ অলঙ্কত সুচারু হাওদা পৃষ্ঠে করিয়া গম্ভীরপদবিক্ষেপপূৰ্ব্বক রাজপথে ইতস্ততঃ বিচরণ ও যাতা- মাত করিত। অশ্বারােহিগণ তুরঙ্গমপৃষ্ঠে বিচিত্ৰগতিতে ইতস্ততঃ পরিভ্রমণ করিত। রাজা স্বয়ং রণক্ষেত্রে সেনাপতির কাৰ্য্য এবং ধর্মাধিকরণে বিচারপতির কাৰ্য্য করিতেন। চন্দ্র- গুপ্ত অতিশয় রণকুশল সেনাপতি এবং অতি সুবিজ্ঞ বিচারক ছিলেন। তাঁহার চারি লক্ষ বেতনভােগী স্থির সৈন্য (standing army) ছিল। তিনি মৃগয়াশীল ছিলেন এবং শাসন- ৪৪ আৰ্য-জীবনী। ধারিণী যবনীগণপরিবৃত হইয়া মৃগয়ার্থ বহির্গত হইতেন। তার রজ্যে সভ্যতার লেক সর্বত্র বিকীর্ণ হইয়াছিল। জাতিভেদ এবং পৈতৃকব্যসরণ-প্রথা সম্যক্ প্রচলিত ছিল। রাজ্যের নানাবিভাগে সুযােগ্য রাজপুরুষদিগের দ্বারা সুচারুভাবে রাজ্যশাসনকার্য ও শান্তি বিধান সম্পাদিত হইত। প্রজাদিগের গৃহে সুখ শান্তি বিরাজমান ছিল। প্রজারা সুখে স্বচ্ছন্দে কালযাপন করিত। বণিক ও শিল্পীরা রাজ্যেৰ বিবিধপ্রকারে উন্নতিসাধন করিত ৷ তাহারা চন্দ্রগুপ্তের রাজ্যে স্বস্ব কার্য করিতে অনুমতি প্রাপ্ত হইয়াছিল বলিয়া রাজাকে কর দিত। অধুনাতন ইংরেজরাজ্যে ব্যবসায়ীরা এবং শিল্পীরা আইনদ্বারা সুরক্ষিত হইয়া নিরাপদে স্বৰ কাৰ্য্য করে বলিয়া রাজাকে কর দিয়া থাকে। অস্ত্রনির্মাণ এবং পােতনির্মাণে স্বতন্ত্র কাৰ্যালয় ছিল এবং সেই সেই স্থানে অস্ত্রশস্ত্র ও পােত সকল নির্মিত হইত। রাজা ব্রাহ্মণদিগকে অতিশয় সম্মান- প্রদর্শন করিতেন। প্রতিবৎসর তিনি ব্রাহ্মণদিগকে লইয়া এক মহাসভা করিতেন এবং তাঁহাদিগের সহিত রাজ্যের ও প্রজাদিগের উন্নতির উপায়চিন্তা করিতেন। চন্দ্রগুপ্ত চতুর্বিধ রাজবৃত্ত সমাক্ সাধন করিতেন। ন্যায়ানুসারে অর্থোপার্জন, সেই অর্থের বর্জন, তাহাব বক্ষণ এবং সৎপ্রকারে তাহার ব্যয় এই চারিটী কাৰ্য্যই তিনি উত্তমরূপে বুঝিতেন। চন্দ্রগুপ্ত বৌদ্ধ ছিলেন না, হিন্দু ছিলেন। তাঁহার পৌত্র অশােক বৌদ্ধ হইয়াছিলেন এবং অনেক বৌদ্ধস্তুপ ও মঠ নিৰ্মাণ করিয়া ছিলেন। চন্দ্রগুপ্তের রাজ্যসময়ে সমাজে “অহিংসা পরমম ধৰ্ম্মঃ” এই মত প্রচলিত হইয়া সমাজকে অল্পকাল পরে চন্দ্রগুপ্তের সংক্ষিপ্ত জীবনী। ৪৫ । বৌদ্ধধৰ্ম্ম অবলম্বন করিবার উপযােগী করিতেছিল। চন্দ্রগুপ্তের রাজ্যকালে এবং তাঁহার পুত্রপৌত্রের সময়ে মগধরাজ্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও প্রবলপরাক্রান্ত হইয়াছিল। মগধরাজ্য হইতে ভারতবর্ষের কি উপকার হইয়াছে, তাহার উল্লেখ করিয়া আমরা প্রস্তাব শেষ করিব। যখন শাক্যসিংহ মগধে পরিভ্রমণ করিয়াছিলেন, তখন মগধ দুই চারিটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত ছিল। কিন্তু যখন আলেকজাণ্ডার ভারতবর্ষ আক্রমণ করেন, তখন মগধ সাতিশয় উন্নত, সমৃদ্ধ ও প্রবল। এই দুই শত বা আড়াই শত বৎসরের মধ্যে পূর্বোক্ত ক্ষুদ্র রাজ্যগুলির সমবায় হইয়া মগধ- সাম্রাজ্যের উৎপত্তি হয়। কি কারণে এই রাজ্য সকল সমবেত হইয়াছিল, তাহা জানিবার কোন উপায় নাই। ভারতবর্ষে যে রাজ্যের রাজা পরাক্রান্ত, তাঁহার রাজ্যেই প্রজাদিগের সুখশান্তি ও সমৃদ্ধি দেখিতে পাওয়া যায়। মগধসাম্রাজ্য অতি প্রবলপরাক্রান্ত ছিল বলিয়াই প্ৰজাদিগের সুখস্বাচ্ছন্দ্যও নিরাপদ ছিল। মগধরাজগণ পূৰ্ত্তাদিকাৰ্যদ্বারা প্রজাদিগের সুখস্বচ্ছন্দতাবিধানে যত্নশীল ছিলেন। মগধরাজ্য তৎকালে ভারতবর্ষের প্রাণস্বরূপ হইয়াছিল । যখন সেকন্দর ভারতবর্ষ আক্রমণ করেন, তখন পঞ্চনদ প্রদেশের রাজগণ তাঁহার প্রতাপ সহ্য করিতে অসমর্থ হইল। কিন্তু মগধের গর্জনে তাঁহার হৃদয়ে ভীতির সঞ্চার হইল এবং তিনি আর পূর্বদিকে আসিয়া পঞ্চনদ প্রদেশ হইতেই স্বরাজ্যাভিমুখে প্রতি প্রয়াণ করিলেন। কিছুদিন পরে আবার যখন সেকদরের অন্যতম সেনানী সেলিউকস ভারতবর্ষ আক্রমণ করেন, তখনও মগধ ৪৬ আৰ্য জীবনী। হইতে ভারতরক্ষা হয়। সেলিউকস চন্দ্র গুপ্তের সহিত যুদ্ধে পরাজিত হইয়া সন্ধি করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। মগধ- সাম্রাজ্য না থাকিলে বােধ হয়, ভারতবর্ষ কিছুদিন গ্রীকদিগের অধীনে থাকিত। মুদ্রারাক্ষসের শেষে যে যবনদিগের আক্র- মণের কথা দৃষ্ট হয়, তাহা বােধ হয়, সেলিউকসের আক্রমণের কথা। অতএব মগধ হইতে ভারতবর্ষের দুইটী প্রধান উপকার সাধিত হয়। একটী প্রকৃতিদিগের সুখস্বচ্ছন্দতাবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নতি। দ্বিতীয়টী বিদেশীয়দিগের আক্রমণ হইতে ভারতবর্ষের রক্ষাসাধন। যত দিন মগধের বলবিক্রম বিদ্যমান ছিল, ততদিন আর কোন বহিঃশত্রু ভারতবর্ষে প্রবেশ করিতে সাহস করে নাই। মগধরাজ্য হইতে আর একটা উপকার হইয়াছে। তাহা দক্ষিণাবর্তে আধিপত্যবিস্তার। ইহা অশােকরাজের সময়েই ঘটে। অশােক নৃপতির রাজ্য- কালে দক্ষিণাবর্তের অনেক স্থান ও সিংহলদেশ বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হয় এবং তাৎকালিক ব্রাহ্মণগণ মহারাষ্ট্র, দ্রাবিড়, কেরল, তৈলঙ্গ প্রভৃতি প্রদেশে পপৗরাণিক মত প্রচার করেন। এইটী মগধসাম্রাজ্যের তৃতীয় উপকার। ইহার বিশেষ বিবরণ এ প্রস্তাবের প্রতিপাদ্য বিষয় নহে বলিয়া আমরা অদ্য ইহার বর্ণনা করিতে প্রবৃত্ত হইলাম না। সময়ান্তরে ইহা বিবৃত করিবার অভিলাষ রহিল।

ঐস্ফাক ধৰ্ম্মবীর রামচন্দ্রের সংক্ষিপ্ত জীবনী। আর্যাবর্তে ধনধান্যসম্পন্ন অতি সমৃদ্ধ কোশল (১) নামে এক জনপদ ছিল। ভুবনবিখ্যাত অযযাধ্যা নগরী ইহার রাজধানী। মানবেন্দ্র মনু এই পুরী নিৰ্মাণ করেন। এই পুরী দৈর্ঘ্যে ৪৮ ক্রোশ এবং বিস্তারে ১২ ক্রোশ ছিল। মনুর পুত্র ইক্ষাকু অযাে- ধ্যার আদি রাজা। ইক্ষাকুর রাজ্যকালে এই রাজধানী সুপ্রশস্ত রাজপথ ও বহিঃপথসমূহে বিভক্ত এবং চতুর্দিকে তােরণ ও কবাট দ্বারা সুরক্ষিত ছিল। ইহার রাজপথ সকল জলসিক্ত হইত। আপণশ্রেণী ইহার অপূৰ্ব্ব শােভা সম্পাদন করিত। এই রাজধানীতে নানাদেশীয় বণিকেরা বাণিজ্যার্থ আগমন করিত। এই নগরীতে নানাবিধ বিদ্যার সম্যক্‌প্রকারে (১) কোশল দেশ সরযূ বা ঘর্ঘরা নদীর উত্তর ও দক্ষিণ দিকে বিস্তত। উত্তর ভাগের নাম উত্তরকোশল এবং দক্ষিণ ভাগের নাম দক্ষিণ- কোশল। দশরথ ও রামচন্দ্রের রাজধানী উত্তর-কোশলে ছিল। গ্রাম- চন্ত্রের পুত্র লবও উত্তরকোশলে ৰাজ্য করিয়াছিলেন। বালরামায়ণের ষষ্ঠ অঙ্কে কৌশল্যা দক্ষিণ-কোশলরাজপুত্রী বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছেন। দক্ষিণাবর্তে মহাকোশল নামে এক জনপদ আছে। উহা বিদর্ভের নামান্তর। অযধ্যা নগরী বিশাখা, সাকেত, নন্দিনী, কোশল প্রভৃতি নামে প্রসিদ্ধ। ইহা ঘর্ঘরা ও গােমতী নামক নদীদ্বয়ের মধ্যস্থিত। আধুনিক লক্নাউ (Lucknow) সহরের প্রকৃত নাম লক্ষ্মণপুরী। এতদ্দেশীয়গণ ইহাকে লছমন পুরী বলেন। লক্ষ্মণদেবের নামে ইহার নামকরণ হইয়াছিল।

৪৮ আৰ্য-জীবনী। চর্চা হইত। নানাশাস্ত্ৰকুশল সত্যবাদী ব্যক্তিগণ এবং ক্ষিপ্র- হস্ত সুশিক্ষিত মহারথ বীরগণ এই পুরীকে অলঙ্কত করিয়া- ছিলেন। মনু সূর্যের পুত্র বলিয়া ইক্ষাকুবংশ সূৰ্য্যবংশ নামে প্ৰখিত। সূর্যবংশীয় রাজগণের রাজধানী অযযাধ্যা সরযূ নদীর তীরে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল ইক্ষাকুবংশে মহাবল পরাক্রান্ত পরমধাৰ্মিক রাজা দশরথ জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। দশরথ একজন স্বাধীন রাজা ছিলেন এবং পৌরজানপদগণ তাঁহার সুশাসনগুণে তৎপ্রতি অত্যন্ত অনুরক্ত হইয়াছিল। তিনি মিথিলা, কাশী, কেকয়, অঙ্গ, মগধ, পূৰ্বদেশ, সিন্ধু, সৌবীর, সৌরাষ্ট্র ও দাক্ষিণাত্য (২) জনপদের (২) মিথিলা গঙ্গানদীর উত্তমে গণ্ডকী নদীর পূর্বে স্থিত ত্রিত এদেশ। ইহার মধ্য দিয়া ছোট গণ্ডকী এবং বাঘমতী নদী প্রবাহিত। জনকপুর মিথিলার রাজধানী। মিথি নামে জনৈক মজ। কর্তৃক স্থাপিত বলিয়া মিখিল নাম হইয়াছে। কেকয় শতদ্রু ও বিপাশা নদীদ্বয়ের অন্তরস্থিত প্রদেশ। বাহলীক দেশ (Balk) ইহার উত্তর সীমা। কেকয়রাজ্যের রাজধানী গিরিব্রজ বা রাজগৃহ। ইহা মগধান্তৰ্গত রাজগৃহ নহে। কনিংহাম সাহেব এবিষয়ে ভ্রমে পতিত হইয়াছেন। কেহ কেহ বলেন, কেকয় রাজ্যের বর্তমান নাম হিরাট ; অঙ্গদেশ গঙ্গা ও সরযূর সঙ্গমস্থল হইতে বঙ্গের সীমা পর্যন্ত গঙ্গার দক্ষিণ তীরে স্থিত। ইহা বর্তমান ভাগলপুর ও তৎসন্নিহিত প্রদেশ । মগধরাজ্যের বর্তমান নাম বেহার। ইহার উত্তরসীমা ' গঙ্গানদী, দক্ষিণে সিংহভূম, পশ্চিমে বারাণসী এবং পূর্বে হিরণ্যপর্বত বা মুঙ্গের ছিল। পালীপুত্র বা কুসুমপুর (পাটুন।) ইহার রাজধানী ছিল। মগধ- জামধ্যে বুদ্ধগয়া, ইগয়া, কুক্কুটপদ, রাজগৃহ, কুশাগারপুর না, ইন্দ্ৰশিলাগুহ প্রভৃতি অনেকগুলি বিখ্যাত নগর ছিল। পলাশ মগধের নামান্তর। সিন্ধু বৰ্তমান সিন্দু প্রদেশের পশ্চিম প্রান্ত।

রামচন্দ্রের সংক্ষিপ্ত জীবনী। নৃপগণকে নিমন্ত্রণপূর্বক মহাসমারােহে যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন। তিনি অনেক দিন পর্যন্ত পুত্রমুখ নিরীক্ষণ করিতে পারেন নাই। অবশেষে মহারাজের পুত্র- চতুষ্টয় ক্রমশঃ জন্ম গ্রহণ করিলেন। চৈত্রের নবমী তিথিতে পুনৰ্ব্বসু নক্ষত্রে রাজমহিষী কৌশল্যা রামচন্দ্রকে করিলেন। এই দিন অদ্যাপি রামনবমী বলিয়া বিখ্যাত রহিয়াছে। অনন্তর কৈকেয়ীর গর্ভ হইতে ভরত এবং সুমিত্রার গর্ভ হইতে লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্ন ভূমিষ্ঠ হইলেন। রাজা পুত্রমুখ দর্শন করিয়া পরম সুখ ও সন্তোষ লাভ করিলেন। রামচন্দ্র যথাকালে নানাবিদ্যাবিশারদ হইয়া উঠিলেন। তিনি অশ্বারােহণ, রথচৰ্যা ও ধনুর্বেদ উত্তমরূপে শিক্ষা করিয়াছিলেন। লক্ষ্মণ শৈশবাবধি সতত রামচন্দ্রের প্রিয় কাৰ্য্য অনুষ্ঠান করিতে লাগিলেন এবং তাহার বহিশ্চর দ্বিতীয় প্রাণের ন্যায় প্রিয় হইয়া উঠিলেন। শত্রুঘ্ন ও ভরতের অনুগামী হইলেন। এইরূপে চতুর্দশ বৎসর অতীত হইল। অবশেষে মহাতেজা মহর্ষি বিশ্বামিত্র দশরথের নিকটে উপ- স্থিত হইলেন এবং নৃপতিদত্ত অর্ঘ্য গ্ৰহণানন্তর রাজ্যের কুশল জিজ্ঞাসা করিয়া বলিলেন “ভূপতে, আমি সম্প্রতি এক যজ্ঞে সৌীর সৌরাষ্ট্রের উত্তর ও নিষাদের দক্ষিণ কান্ধে উপসাগরের উপকূলে এবং আবুপৰ্বতের নিকটে স্থিত। বদী ইহার অপর নাম। বর্তমান সৌবীর রাজপুতানার দক্ষিণাংশ। সৌরাষ্ট্র বর্তমান গুর্জর দেশ। মালবদেশ হইতে মাহীদী সৌরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্ব দিক্ দিয়া প্রবাহিত হইয়াছে। বল্লভী সৌরাষ্ট্রের নামান্তর।

আৰ্য-জীবনী। দীক্ষিত হইয়াছি। ঐ যজ্ঞ সমাপ্ত না হইতেই মারীচাদি রাক্ষসগণ উহার বিবিধ প্রকার বিঘ্ন উৎপাদন করিতেছে। এই রাক্ষসদিগকে সংহার করিবার নিমিত্ত আমি মহাবীর রামচন্দ্রকে স্ব-সমভিব্যাহারে লইয়া যাইতে আসিয়াছি। আপনি ইহাকে আমার হস্তে সমর্পণ করুন। আপনি রামচন্দ্রের নিমিত্ত চিন্তিত বা ভীত হইবেন না। দশরথ সাতিশয় ভীত হইয়া রামচন্দ্রকে ঋষির সহিত প্রেরণ করিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করিলেন। কিন্তু বিশ্বামিত্র কোন মতে তাহা শুনিলেন না। অবশেষে দশরথ রামচন্দ্রকে বিশ্বামিত্রের সহিত প্রেরণ করিতে অগত্যা সম্মত হইলেন। বিশ্বামিত্র রামচন্দ্র ও লক্ষ্মণকে স্ব-সমভিব্যাহারে লইয়া অযােধ্যা হইতে নির্গত হইলেন। সরযূ নদীর দক্ষিণ তীর দিয়া ১দর গমন করিয়া তাহারা গঙ্গা--সরযু-সঙ্গমে উপ- ঙ্গি ও হইলেন এবং তত্রত্য অনঙ্গাশ্রম দর্শনপূর্বক গঙ্গা পার হইয়। গঙ্গার দক্ষিণ কূল দিয়া চলিতে লাগিলেন। এই পথে তাহারা তাড়কাৰনে (৩) উপনীত হইলেন এবং অগস্ত্যের পবিত্র আশ্রম অবলােকন করিলেন। এই স্থলে রামচন্দ্র তাড়কা রাক্ষসীকে বধ করেন এবং বিশ্বামিত্রের সকাশে অনেকগুলি দিব্যাস্ত্র শিক্ষা মন। তৎপরে তাহারা বিশ্বা- মিত্রের আশ্রম প্রাপ্ত হইলেন। মহর্ষি দীক্ষিত হইলে যজ্ঞ আরম্ভ হইল, এবং রাক্ষসগণ যজ্ঞব্যাঘাত জন্য আসিয়া (৩) তাড়াবন বা নগরের নিকট। বক্সারে বিশ্বামিত্রের আশ্রম ছিল। এই স্থলে তাড়কানালা নামে একটা নালা অদ্যাপি দৃষ্ট হয়।

রামচন্দ্রের সংক্ষিপ্ত জীবনী । এই নভােমার্গে উপস্থিত হইল । তখন রামচন্দ্র আগ্নেয় প্রভৃতি অস্ত্র নিক্ষেপ দ্বারা রাক্ষসগণকে বিনাশ করিলেন। বিশ্বামিত্র রাম- চন্দ্রের এই অদ্ভুত কাৰ্য্য দর্শনে অত্যন্ত পুলকিত হইলেন এবং মিথিলা-নগর-দর্শনার্থ রাম ও লক্ষণকে সঙ্গে লইয়া প্রস্থান করিলেন। বিশ্বামিত্রের সিদশম হইতে উত্তর দিকে গঙ্গা- তীরে গমন করত তাহারা শোণানী (৪) পাপ্ত হইলেন। মগধদেশ হাত নিঃসৃত হইয়া পূৰ্বাভিমুখে প্রবাহিত হই- য়াছে বলিয়া শােনদীর আর এক টী নাম মাগধী শােণানদীর তীরে গিরিব্রজ নগর (৫) সংস্থাপিত। শেণ- নদীর তীর দিয়া গমন করিতে তাহারা গঙ্গার উপকূলে উপনীত হইলেন। এবং নৌকাযােগে গঙ্গা পার হইয়া উত্তর তীরে উত্তীর্ণ হইলেন। জাহ্নবী-তটে উখিত হইয়া তাহারা বিশালানগরী (৬) নেত্রগোচর করিলেন এবং তথায় এক রাত্রি যাপন করিয়া পর দিন মিথিলীয় সমুপস্থিত হইলেন। তৎকালে মিথিলা সীরধ্বজ নামে জনৈক নৃপতির রাজ্য ছিল। মিথিল'- রাজগণের আদিপুরুষ নিমি নামে এক মহীপাল। নিমির (৪) শােণানদী মগধরাজ্যের মধ্য দিয়া উত্তর-পূর্বমুখে প্রবাহিত হইয়া পাটলীপুত্র নগরের নিকটে গঙ্গার সহিত সঙ্গত হইয়াছে। ইহার বালুকা সুবর্ণের ন্যায় পীতবর্ণ বলিয়া ইহার আর এক নাম হিরণ্যবাহু। (৫) গিরিজ বা রাহ মগধের পূর্বতন রাজধানী। পগিরিবেষ্টিত বলিয়া গিরিব্রজ নাম রাজধান। বলিয়া রাজগৃহ নাম হইয়াছে। জরাসন্ধ রাজ। এখানে রাজত্ব করিতেন। (৬) বিশাল। বা বৈশালী মিথিলার ঠিক দক্ষিণে গঙ্গানদীর তীরস্থিত। ১ আৰ্য-জীবনী। পুত্র মিথি হইতে মিথিলার নাম হইয়াছে। নিমির পৌত্রের নাম জনক। তদবধি মিথিলা-রাজগণ সকলেই জনক নামে অভিহিত হইতেন। মিথিলার আর এক নাম বিদেহ। সীর- ধ্বজ নৃপতির এক কনিষ্ঠ ভ্রাতা ছিলেন, তাহার নাম কুশধ্বজ । সীরধ্বজ জনকের সীতা ও উর্মিলা এবং কুশধ্বজের মাণ্ডবী ও শ্রুতকীৰ্ত্তি নংসে চারি কন্যা ছিল। সীতা বীৰ্য্যশুল্কা, ইহার বিবাহাৰ্থ জনক এক ধনুর্ভঙ্গ পণ করিয়াছিলেন। বহুসংখ্যক নৃপতি এই ধনুর্ভঙ্গ করিয়া সীতাকে বিবাহ করিতে আসিয়া- ছিলেন, কিন্তু সকলেই বিফল-প্রযত্ন হইয়া ম্লানমুখে প্রতি- প্রয়াণ করেন। বিশ্বামিত্র রামচন্দ্র ও লক্ষ্মণকে সেই ধনু প্রদ- শন করিতে বলিলেন এবং জনকের আদেশে ধনু রামচন্দ্রের সমীপে আনীত হইল। রামচন্দ্র বহু সংখ্যক লােকের সমক্ষে সেই শাসন অবলীলাক্রমে হস্তে তুলিয়া লইলেন এবং তাহাতে জ্যা যােজনাপূৰ্ব্বক আকর্ষণ ও আস্ফালন করিতে লাগিলেন। প্রচণ্ড কোদণ্ড তদ্দণ্ডেই দ্বিখণ্ড হইয়া গেল। তখন বিদেহরাজ জনক ধনুর্ভঙ্গব্যাপারে বিস্ময়াপন্ন ও হৃষ্টচিত্ত হইয়া বিশ্বামিত্রের অনুমতি গ্রহণপূৰ্ব্বক দশরথের নিকটে এই বৃত্তান্ত জ্ঞাপন করিতে, ও তাহাকে মিথিলায় ভরত ও শত্রুঘ্নের সহিত আসিতে, অযযাধ্যানগরে দূত প্রেরণ করি- লেন। যথাসময়ে রাজা দশরথ মিথিলায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন। এবং উদ্বাহ-বিধি সমারােহসহকারে সম্পন্ন হইল। রামচন্দ্র সীতার, ভরত মাণ্ডবীর, লক্ষ্মণ উৰ্মিলার এবং শত্রুঘ্ন শ্রুতকীৰ্ত্তির, ক্রমান্বয়ে পাণিগ্রহণ করিলেন। শাস্ত্রোক্ত প্রণালীমতে বিবাহ সম্পন্ন হইলে, দশরথের তনয়গণ তিনবার রামচন্দ্রের সংক্ষিপ্ত জীবনী। অগ্নি প্রদক্ষিণপূৰ্ব্বক পত্নীদিগের সহিত শিবিরে গমন করি- লেন, এবং পরদিন প্রভাতে পিতার সহিত অযযাধ্যায় প্রতি- গমন করিবার আয়ােজন করিতে লাগিলেন। তাহারা অযােধ্যাভিমুখে গমন করিতেছেন, পথিমধ্যে ক্ষত্রিয়কুলান্তক জটামণ্ডলধারী ভৃগুনন্দন পরশুরাম স্কন্ধদেশে পরশু, করে প্রখর শর ও ভাস্বর শাসন ধারণ করিয়া রামচন্দ্রের সমীপে আকি ভূত হইলেন। পরশুরাম রামচন্দ্রকে বলিলেন “রাম ! আমি তােমার অদ্ভূত অবদানসমূহ ও ধনুর্ভঙ্গ ব্যাপার সমস্তই শ্রবণ করিয়াছি। এক্ষণে তুমি আমার এই ভীষণ শরাসনে শর- যােজনা করিয়া ইহা আকর্ষণ ও নিজবল প্রদর্শন কর। এই কাৰ্য্যে তোর বীর্য পরীক্ষা হইলে আমি তােমার সহিত দ্বন্দ্বযুদ্ধে প্রবৃত্ত হইব।” রামচন্দ্র ভার্গবের এই দৃপ্ত বাক্য শ্রবণে ক্রোধে একান্ত অধীর হইয়া উহার কর হইতে সশর শরাসন গ্রহণপূৰ্ব্বক উহাতে গুণযােগ ও বাণযােজনা করিয়া উহার বলদর্প চূর্ণ করিলেন। ভার্গব পরাভূত হইয়া মন্দর পৰ্বতে (৭) প্রস্থান করিলেন এবং রামচন্দ্র জয়ােল্লাসে সকলের সহিত রাজধানী অযােধ্যায় উপস্থিত হইলেন। রামচন্দ্র পিতার আজ্ঞানুবর্তী হইয়া পৌরকাৰ্য্যসমূহ পর্যালােচনা, এবং যত্নের সহিত পুরবাসীদিগের প্রিয় ও হিতকর বিষয় সকল অনুষ্ঠান, করিতে লাগিলেন। সকলেই রামচন্দ্রের প্রতি অনুরাগ প্রদর্শন করিতে লাগিল। রামচন্দ্র শাস্ত্র- (৭) মন্দর পর্বত ভাগীরথীর নিকটে ভাগলপুর হইতে নূনাধিক বিংশতি ক্রোশ দক্ষিণে স্থিত। ইহা একটি তীর্থস্থান।

৫৪ অৰ্য জীবনী। নির্দিষ্ট পধ অবলম্বন করিয়া পিতা মাতা ও অন্যান্ঠ গুরু জনের প্রতি স্বৰ্ত্তব্য সম্পাদন করিতে লাগিলেন। রামচন্দ্র এইরূপে দ্বাদশ বর্ষ নানাবিধ সুখভােগ অতীত করিলেন। রাজা দশরথ তাহার এইরূপ চরিত্র দর্শন করিয়া অতিমাত্র প্রীতিলাভ কবিয়া তাঁহাকে যৌবরাজ্যে অভিযুক্ত করিবার সংকল্প করিলেন। প্রজাবৃন্দ রামচন্দ্রের বল বীৰ্য্য, লােকানু- রাগিতা, প্রিয়তা, ক্ষমা, সাধুতা ও সত্যশীলতা দর্শনে তাঁহার প্রতি একান্ত অনুরক্ত হইয়া উঠিল এবং সকলেই তাহাকে যুবরাজ করিতে সম্মত হইল। হামচন্দ্রকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করিবার আয়ােজন এবং দিন স্থির হইল। এই সংবাদ শ্রবণে সন্তপ্তহৃদয় কৈকেয়ী রাজা দশরথকর্তৃক পূৰ্ব্বে অঙ্গীকৃত দুই বর এক্ষণে প্রার্থনা করিলেন। কৈকেয়ী এক বর দ্বারা রামচন্দ্রের চতুর্দশ বর্ষ বনবাস, এবং অপর বর দ্বারা স্বপুত্র ভরতের রাজ্যে অভিষেক, রাজার নিকটে প্রার্থনা করিলেন। দশরথ পূর্বে দুই বর দিবেন স্বীকার করিয়াছিলেন। কিন্তু এক্ষণে এই দুই ভয়ঙ্কর বর শ্রবণ করিয়া কিংকর্তব্য- বিমূঢ় হইলেন। রামচন্দ্র পিতার এই অবস্থা দর্শন করিয়া এবং কৈকেয়ীর প্রমুখাৎ সমস্ত বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া পিতৃসত্য- পালনে কৃতসংকল্প হইলেন এবং লক্ষ্মণ ও সীতাকে সমতি, ব্যাহারে লইয়া রাজবেশ পরিহারপূর্বক জটাচীর ধারণ করিয়া অযযাধ্যা হইতে বনবাসার্থ বহির্গত হইলেন। রাজকুল এবং প্রজাবৰ্গ যৎপরােনাস্তি বিষন্ন হইয়া পড়িল । পুত্রশােকে দশরথ মানবলীলা সংবরণ করিলেন। পুরী অরাজক হইল। বশিষ্ঠাদি মন্ত্রিগণ ভরতকে তাঁহার মাতুলালয় হইতে আনয়ন রামচন্দ্রের সংক্ষিপ্ত জীবনী । করাইয়া মৃত রাজার ঔদ্ধদহিক কাৰ্য সকল সম্পন্ন করিলেন, এবং ভরতকে রাজ্য শাসন করিতে বলিলেন। কিন্তু ভরত অত্যন্ত দুঃখিত হইয়া কোনমতেই তা স্বীকার করিলেন না। অবশেষে ভরত স্থির করিলেন যে, বনে রামচন্ত্রের নিকট গমন- পূৰ্ব্বক তাঁহাকে প্রসন্ন করিম। অযোধমি পুনর্বার অনিবেন। এ দিকে রামচন্দ্র বণবসে বহির্গত হইয়া প্রথম অশোধ- পুরী ৩,গ করি। তমণ.৩টে (৮) উপস্থিত হইলন এবং তথায় এক রাত্রি যাপন করিয়া প, দিন কোশল দেশের অন্ত্য- সীমায় উপনীত হইলেন। দেবও তি, গোমতী, ও স্যকি। নামে তিনটী নদী পার হইয়া রমণীর কৌশল দেশ অতিক্রম পূর্বক গদ ৩ারাত সুসমৃদ্ধ শৃঙ্গবেরপুরে (৯) গমন করিণে। শৃঙ্গবেরপুর নিষাদর।জর রাজধানী, গু নামক জনৈক রাজার শাসিত। গুহের সহিত রামচন্দ্রের মিত্রতা ছিল। নিষাদাধি- পতি গুহ তাহার সম্যক্ সমাদরপূৰ্ব্বক আতিথ্য করিন। পরে রাম লক্ষ্মণ ও সীতার সহিত তথা হইতে তরণীযােগে গঙ্গা পার হইয়া দক্ষিণ উপকূলে উত্তীর্ণ হইলেন এবং কিয়- দর গমন করিয়া বৎসদেশে (১০) উপস্থিত হইলেন। সে স্থান . (৮) তমসা নদী (Tonse) প্রয়াগের কিছুদূর নিম্নে গঙ্গার সহিত মিলিত হইয়াছে। (৯) শৃঙ্গবেরপুর নিষাদ-রাজ্যের (bhil country ) রাজধানী ছিল। ইহা কোশল রাজ্যের সীমান্ত নগর। বর্তমান নাম স। (Sungroor)। আধুনিক ভিস জাতিরা (Bhils) গুহের বংশ উৎপন্ন। (১০) বৎসদেশ গঙ্গা যমূন। মধ্যবর্তী প্রয়াগের পশ্চিমে ' স্থিত। রাজধানী কৌশাম্বী বা ৎসপন। রত্নাবলী নাটিকা এই স্থানে প্রথম অভিনীত হয়।

আব-জীবনী ।
।
হইতে তাহারা প্রয়াগাভিমুখে
(১১) গমন করিতে লাগিলেন
এবং গঙ্গা-যমুনা-সঙ্গমে আসিয়া উপনীত হইলেন। গঙ্গা
ও যমুনার অন্তবেদিতে মহর্ষি ভরদ্বাজের আশ্রম। রামচন্দ্র
সীতা ও লক্ষ্মণের সহিত কিরর অতিক্রম করিয়া ভরদ্বাজের
আশ্রম প্রাপ্ত হইলেন । ভরদ্বাজাশ্রমে তৎকর্তৃক সৎকৃত
হইম। তাহারা ঋষির উপদেশানুসারে চিত্রকূট পর্বতের (১২)
দিকে প্রস্থান করিলেন। সঙ্গমতীর্থে গমনপূর্বক তাঁহার
পশ্চিমবাহিনী যমুনার তীর অবলম্বন করিয়া যাইতে লাগিলেন
এবং অল্পদূরে এক তীর্থ দেখিতে পাইলেন। সেই তীর্থে
অবতীর্ণ হইয়া তাহারা কাষ্ঠনির্মিত উড়প দ্বারা যমুনা পার
হইয়া দক্ষিণতটে উত্তীর্ণ হইলেন। তত্ৰত্য বনপ্রদেশ অতি-
ক্রম করিয়া তাহারা প্রসিদ্ধ শ্যামবটের সন্নিহিত হইলেন।
তথা হইতে কিয়ৎকাল পৰ্যটন করিয়া তাঁহারা চিত্রকূটে
আগত হইলেন এবং বাল্মীকিমুনির আশ্রম সন্দর্শন করিলেন।
চিত্রকূটের সমতল রমণীয় কাননে পর্ণকুটীর নির্মাণ করিয়া
তাঁহারা তথায় সুখে অবস্থান করিতে লাগিলেন।
এ দিকে ভৱত পৌর জানপদগণের সহিত চিত্রকুটে
উপস্থিত হইলেন এবং রামচন্দ্রের পদতলে নিপতিত হইয়া
পিতা দশরথের মৃত্যু সংবাদ নিবেদনপূর্বক তাঁহাকে অযােধ্যায়
(১১) এয়াগ বর্তমান এলাহাবাদ।
(১২) চিত্রকূট বুন্দেলখণ্ডের অন্তর্গত বন্দ (Bauda) নগরের
ক্রোশ দক্ষিণ-পূর্ব পিশুনী-নদী-তীরস্থ পর্বত। পূর্বে বাল্মীকির
আশ্রম এই ছিল, পরে কানপুরের নিকটে গঙ্গাতীরে
বির নামক স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়। রামায়ণের কোন
টীকাকার বলেন, এই বাল্মীকি আদি ঋষি বাল্মীকি নহেন।

রামচন্দ্রের সংক্ষিপ্ত জীবনী।
প্রতিপ্ৰয়াণ করিতে বারংবার অনুরােধ করিতে লাগিলেন।
রামচন্দ্র পিতার মৃত্যুতে শােকাকুল হইলেন, কিন্তু কিছুতেই
অযােধ্যায় প্রতিগমন স্বীকার করিলেন না। অবশেষে ভরত
রামন্দ্রের পাদুকযুগল গ্রহণপূৰ্ব্বক উহা সম্মুখে স্থাপন করিয়া
রামচন্দ্রের প্রতিনিধিরূপে চতুর্দশ বৎসর নগরের বহির্দেশে
নন্দিগ্রামে রাজ্যশাসন করিতে অঙ্গীকার করিলেন। ইতিমধ্যে
মহষি জাবালি রামচন্দ্রকে বনবাস হইতে প্রতিনিবৃত্ত
করিবার নিমিত্ত তাহার মনে নাস্তিক-বুদ্ধি উত্তেজিত করিতে
চেষ্টা করিয়াছিলেন। কিন্তু রামচন্দ্ৰ ধৰ্ম্মবুদ্ধি আশ্রয় করিয়া
জাবালিকে ধর্মভ্রষ্ট নাস্তিক বলিয়া বিস্তর ভৎসনা
করিলেন।
পরে রামচন্দ্র ভরতকে বিদায় দিরা অযোধ্যায়
পাঠাইয়া দিলেন। অযযাধ্যাবাসিগণ প্রতিনিবৃত্ত হইলে
ভাঁহার আর চিত্রকুটে বাস করিতে ভাল লাগিল না।
ঋষিগণ আসিয়া তাহাকে রাক্ষসদিগের উপদ্রবের কথা
নিবেদন করিলেন। তখন তিনি চিত্রকূট পরিত্যাগ করিয়া
অত্রিমুনির আশ্রমে গমন করিলেন এবং তথায় আতিথ্য
গ্রহণ করিয়া দণ্ডকারণ্যে (১৩) প্রবেশ করিলেন। দণ্ডকে
প্রবেশ করিয়া রামচন্দ্র তাপসগণের পুণ্যাশ্রম সকল দর্শন
করিলেন এবং তাহাদিগের আশ্রমে উত্তমরূপ সংকৃত ও সমা-
(১৩) দণ্ডকারণ্য যমুনানদীর দক্ষিণ তীরে গোদাবরী নদী
পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। দণ্ডনামক কোন রাজার নামানুসারে ইহার
নাম দণ্ডকারণ্য হইয়াছে। এই অরণ্যে অসভ্য জাতিরা বাস
করিত এবং রামায়ণের সময়ে ঋদিগের আশ্রম নির্মিত হইতে
আরম্ভ হইয়াছিল।

আৰ্য-জীবনী। দৃত হইয়া, তাঁহাদিগকে সম্ভাষণপূর্বক বনপ্রবেশ করিলেন। এই বনে বিরাধ নামে এক রাক্ষন তাহাদিগকে আক্রমণ করিল। তখন রাম ও লক্ষ্মণ দুই জনে সেই রাক্ষসকে নিপাত করিয়া শরভঙ্গের আশ্রম (১৪), সুতীরে আশ্রম প্রভৃতি অনেক ঋষির পুণ্যাশ্রমে ভ্ৰমণ করিলেন। এইরূপে বনবাসের দশ বৎসর অতীত হইল। অনন্তর তঁাহারা অগস্ত্য ঋষির উপদেশ-মতে গোদাবরী-তটে পঞ্চবটীর বনে (১৫) পর্ণশালা প্রস্তুত করিরা সুখে কালযাপন করিতে লাগিলেন। রামায়ণ- যুদ্ধের প্রথমাঙ্ক এই স্থলে অভিনীত হয়। একদা রাবণের ভগিনী শূর্পনখা নামে নিশাচরী রামচন্দ্রের পর্ণকুটীরে যদৃচ্ছ- ক্রমে আসিরা উপস্থিত হইল । শূর্পনখা রামচন্দ্রকে বিবাহ করিবার বাসনা ব্যক্ত করিল এবং সীতাকে গ্রাস করিতে উদ্যত হইল। ইহা দেখিয়া লক্ষ্মণ তাহার নাসিকা ও কর্ণ ছেদন করিয়া দিলেন। সে রোদন করিতে করিতে জনস্থানে (১৬) গমন করিল এবং তাহার ভ্রাতা খরের সমীপন্থ হইয়া আপনার অপমান নিবেদন করিল। খর ক্ৰোধান্ধ হইয়া চতুর্দশ সহস্র রাক্ষস-সৈন্যের সহিত' রামচন্দ্রকে তখন তা (১৪) বুন্দেলখণ্ডের অন্তর্গত বল প্রদেশের ( Banda District) প্রান্ত সীমায স্থিত। উহ অদ্যাপি শরভঙ্গাশ্রম বলিয়া প্রসিদ্ধ। অত্রি ও সুতীক্ষ মুনির আশ্রম বন্দ প্রদেশের অন্তর্গত। (১৫) পঞ্চবটী বোম্বাই নগরের ক্রোশ উত্তর পশ্চিমে গােদাবরী নদী-কটে স্থিত বর্তমান নাসিকনগর (Nasik)। এ স্থানে পণখার নাসিকাচ্ছেদন হয় বলিয়া বােধ হয় ইহার নাম নাসিক হইয়াছে। (১৬) জনস্থান পঞ্চবটীর দক্ষিণে স্থিত প্রদেশ।

রামচন্দ্রের সংক্ষিপ্ত জীবনী । আক্রমণ করিল, কিন্তু রণে পরাজিত এবং সগণে নিহত হইল। অকম্পন নামে একটী মাত্র রাক্ষস অবশিষ্ট ছিল। সে জন স্থান পরিত্যাগ করিয়া দ্রুতবেগে লঙ্কা নগরীতে (১৭) উপস্থিত হইয়া রাক্ষসরাজ রাবণকে সমস্ত বৃত্তান্ত নিবেদন করিল। আর শূর্পণখা রাবণকে সীতার কথা বলিয়া প্রতি- হিংসাতে সমধিক উৎসাহিত করিল। তখন রাবণ মারীচ নামক রাক্ষসের সাহায্যে গােপনে রাম ও লক্ষ্মণের অসাক্ষাতে সীতাকে হরণ করিয়া নিজ রাজধানী লঙ্কাতে লইয়া গেল সীতার অদর্শনে রামচন্দ্র বাতাহত কদলীর ন্যায় ভূতলে মুচ্ছিত হইয়া পড়িলেন। পরে লক্ষ্মণের চেষ্টায় তাহার সংজ্ঞা- লাভ হইলে তিনি নিরন্তর বিলাপ করিতে লাগিলেন। অব- শেষে ধৈর্য্যধারণ করিয়া সীতার অন্বেষণে প্রবৃত্ত হলেন এবং কিয়দ্র দক্ষিণে গমন করিয়া ঋষ্যমূক পৰ্ব্বতে (১৮) উপস্থিত হইলেন। তথায় বানররাজ সুগ্রীবের নিকট সীতার নিক্ষিপ্ত অলঙ্কার ও বস্ত্রখণ্ড প্রাপ্ত হইয়া সুগ্রীবের সহিত মৈত্রীবন্ধন করিলেন এবং সুগ্রীবের বিপক্ষ ভ্রাতা বালীকে বধ করিয়া সুগ্রীবকে কিষ্কিন্ধ্যারাজ্য (১৯) প্রদান করিলেন। সুগ্রীব রামচন্দ্রের অনুগ্রহে রাজ্য লাভ করিয়া সীতান্বেষণার্থ বানর- (১৭) লঙ্কা সিংহল দ্বীপের (Ceylon) রাজধানী। সিংহল দ্বীপের অন্যান্য নাম তাম্রপাণি, রত্নদ্বীপ ও লঙ্কাদ্বীপ। রামায়ণে লঙ্কা ভিন্ন নামান্তর দৃষ্ট হয় না। অন্যান্য নামগুলি অপেক্ষাকৃত অধুনাতন। (১৮) কিষ্কিন্ধ্যার পর্বত বিশেষ। (১৯) কিষ্কিন্ধ্যা মৈসুর (Mysore) রাজ্যের উত্তর প্রদেশ।

আৰ্য-জীবনী। দূত চতুর্দিকে প্রেরণ করিলেন। যাহারা দক্ষিণ দিকে গমন করিয়াছিল তাহাদিগের মধ্যে হনুমান্ নামে এক মহাবীর সমুদ্র লঙ্ঘনপূৰ্ব্বক লঙ্কাপুরীতে লঙ্কাপুরীতে উপস্থিত হইল। লঙ্কাই রাবণের সুসমৃদ্ধ রাজধানী। লঙ্কাপুরীর রাজপথ সকল প্রশস্ত ছিল, সর্বত্র প্রাসাদপুঞ্জ শোভা পাইত। কোন স্থানে সাপ্ত- ভৌমিক ভবন কোন স্থানে অষ্টতল ভবন, এবং কুটিম সকল স্বর্ণ ও স্ফটিকে মণ্ডিত। পুরীর দ্বার সকল কনকময়। দ্বার- বেদি পরিষ্কৃত পরিছন্ন এবং নানাজাতীয় বহুমূল্য প্রস্তরে খচিত। তােরণ নানা বর্ণে চিত্রিত ও স্বর্ণরঞ্জিত। ইতস্ততঃ উন্নতশিরস্ক অত্যুৎকৃষ্ট সভাগৃহ সকল দেদীপ্যমান ছিল। পুরী শতন্নী (২০) শক্তিষন্ত্র প্রভৃতি অসংখ্য আয়ুধসমূহে সুরক্ষিত ছিল। স্থানে স্থানে গােষ্ঠ ও যন্ত্রাগার শােভা পাইত। রাত্রিকালে সর্বত্রই দীপালােক পুরীকে আলােকিত করিত। নানাবিধ রমণীয় উপবন এবং আরাম গৃহ উহা পরি- শশাভিত করিত। এই লঙ্কার মধ্যে অশােকবনে সীতা রাম- চিন্তায় নিমগ্ন হইয়া দুঃখিতমনে বাস করিতেছিলেন। হনুমান সৰ্ব্বত্র অন্বেষণ করিয়া অবশেষে অশােকবনে প্রবেশপূর্বক সীতার দর্শন প্রাপ্ত হইল। সে তাহাকে রামচন্দ্র ও লক্ষ্মণের সংবাদ প্রদানপূর্বক আশ্বাসিত করিল এবং লঙ্কায় নিজ (২০) শতঘ্নী আগ্নেয় অস্ত্রবিশেষ। ইহা চক্রের উপর চালিত হইত এবং চালকেরা ইহার গর্ভে গােলক দিয়া শদিগের উপর নিক্ষেপ করিত। ইহাতে অগ্নিচূর্ণ ( বারুদ) ব্যবহৃত হইত। একবারে শতলােক বধ করিতে পারিত বলিয়া শতঘ্নী নাম হইয়াছে। বোধ হয় ইহা একপ্রকার কামান (নালীকান্ত্র)।

রামচন্দ্রের সপ্ত জীবনী। পরাক্রমের বিলক্ষণ পরিচয় দিয়। সমূদ্র পুনল ঘনপূর্বক রাম- চত্রের সমীপে প্রত্যাগমন করি। অনন্তর রামচন্দ্র সুগ্রীবে সাহায্যে সমস্ত সৈন্য সজ্জিত করিয়া সমুদ্রতীরে আসিয়া উপস্থিত হইলেন, এবং নলের সাহায্যে সমুদ্রোপরি এক সেতু বন্ধন করাইলেন। এই সেতু ভারতবর্ষ এবং লঙ্কাদ্বীপকে সংযােজিত করিল। ইহাকে সেতুবন্ধ কহে। সেতুর পিসিদ্ধির নিমিত্ত রামচন্দ্র ইহার উত্তরমূলে এক শিব !পনা করেন। ইহা হিন্দুদিগের একটী তীর্থস্থান। অদ্যাপি ক্ষণ মহাসমুদ্রে এই সেতুর ধ্বংসাবশেষ দৃষ্ট হয়। ৩.বর্ষ ও লঙ্কাদ্বীপের মধ্যবর্তী প্রণালীকে অধুনা Palk's s'..'t বলে এবং রামচন্দ্ৰনির্মিত সেতুকে Adam's Brid, ' বলে। রামচ সসৈন্যে এই সেতুর উপর দিয়া সমুদ্র প হইয়া লঙ্কাপুরীতে উপস্থিত হইলেন, এবং রাত্রিকালেই ঐ পুরী অবরােধ করিলেন। তখন রাবণ চিন্তিত হইল। রাবণের কনিষ্ঠ ভ্রাতা ধার্মিক বিভীষণ রাবণ কর্তৃক অবমানি ও তাড়িত হইয়া রামচন্দ্রের নিকটে আসিয়া তাহার *হত মৈত্রীস্থাপন করিলেন। বিভীষণ এই ভীষণ সমরে রামচন্দ্রের বিশেষ সহায়তা করিতে লাগিলেন। সন্ধির সমস্ত চে বিফল হইল এবং ঘােতর যুদ্ধ আরম্ভ হইল। দিন দিন বহুসংখ্যক রাক্ষস ও বানর নিহত হইতে লাগিল। উভয় পক্ষে মধ্যে মধ্যে বিষম সঙ্কট উপস্থিত। চতুর্দিকে রাম ও রাবণের জয়ঘােষণা প্রচা- • রিত হইতে লাগিল। বৃক্ষ দ্বারা লৌহবদ্ধ লড়সমূহ চুর্ণীকৃত হইতে লাগিল। বৃহৎ বৃহৎ শিলা দ্বারা মুদগর সকল নিষ্পিষ্ট আ-জীবনী। ।। । ।।।।।। ।।৭/১•••••৮৭ ।।।।।।। ? ? •• হইতে লাগিল। বানর ও রাক্ষসে এইরূপ তুমুল সংগ্রাম বহুদিন চলিয়াছিল। সমরােথিত ধূলিপটল রাক্ষস-শােণিত, নদীতে নিপতিত হইয়া বিলীন হইতে লাগিল। করিয়া সমস্ত রাসবীর সংগ্রামে আগমন করিল এবং রাম ও লক্ষ্মণের হস্তে কাল-কবলে পতিত হইল। রাবণের পুত্র মেঘনাদ রাম ও লক্ষ্মণকে নাগপাশে বন্ধন করিল কিন্তু গরুড়ের আগমনে উহা শিথিল হইয়া গেল। রাবণ শক্তি- শেল প্রহারে লক্ষ্মণের বক্ষঃস্থল বিদীর্ণ করিল, কিন্তু মহৌষধ সেবনে লক্ষ্মণ আরােগ্য লাভ করিলেন। অবশেষে রামচন্দ্র রাবণের দুর্জয় ভ্রাতা কুম্ভকর্ণ ও রাবণকে এবং লক্ষ্মণ রাবণ- পুত্র মেঘনাদকে সম্মুখসমরে বিনাশ করিলেন। বহুদিন পরে যুদ্ধের অবসান হইল (২১)। তখন রামচন্দ্র বিভীষণকে লঙ্কার সিংহাসন অৰ্পণ করিয়া সীতা-সমভিব্যাহারে সগণে ও সসৈন্যে অযােধ্যাভিমুখে যাত্রা করিলেন। অযােধ্যায় আগ- মন করিবামাত্র ভরত ন্যাসস্বরূপ রাজ্যভার রামচন্দ্রের হস্তে সমৰ্পণ করিয়া বিগতজ্বর হইলেন। রামচন্দ্র বনবাসবেশ পরিহারপূৰ্ব্বক সকলকে সন্তুষ্ট করিয়া স্বযােগ্য সিংহাসন অধিকার করিলেন। প্রজাগণ হৃষ্ট ও সন্তুষ্ট হইল। এই (২১) রামায়ণমতে পঞ্চদশ দিন; কিন্তু পদ্মপুরাণমতে উনচত্বা- রিংশৎ দিন। রামায়ণমতে চৈত্রমাসের অমাবস্যাতে রাবণ বধ ও বৈশাখ- শুক্লষষ্ঠীতে নন্দিগ্রামে রামচন্দ্রের আগমন। পদ্ম ও কালিকাপুরাণমতে আশ্বিন শুরুনবমীতে রাবণ বধ এবং দশমীতে ব্রহ্ম-প্রমুখ সুরগণকৃত নবাহ দুর্গার পূর্ণার পর ইন্দ্ৰকর্তৃক বিসর্জন ।

রামচন্দ্রের সংক্ষিপ্ত জীবনী। সময়ে রামচন্দ্রের বয়ঃক্রম একচত্বারিংশ বৎসর এবং সীতার চতুস্ত্রিংশ বৎসর। অযােধ্যাপতি রামচন্দ্র সীতার সহিত পরম সুখে কাল- ক্ষেপ করিতে লাগিলেন। তিনি পিতার ন্যায় প্রজাদিগকে সুতনির্বিশেষে পালন করিতে লাগিলেন। তাঁহার রাজ্যকালে প্রজাগণ হৃষ্ট, পুষ্ট ও সন্তুষ্ট ছিল। তাঁহার রাজ্যে দুর্ভিক্ষের শঙ্কা ছিল না ; অগ্নিভয় প্রভৃতি অজ্ঞাত ছিল নগর ও রাষ্ট্রসকল ধনধান্যসম্পন্ন ছিল, এবং প্রকৃতিপুঞ্জ নিরন্তর সুখে কালহরণ করিত। এইরূপে জীবলােকের রক্ষক ও স্বজনপালক রামচন্দ্র প্রজারঞ্জন করিতে লাগিলেন। তিনি ধৰ্ম্মণীল ও সুশীল ; রাজনীতি তঁাহার কণ্ঠস্থ ; ধনুর্বেদ তাহার অধিকৃত ; সাধুগণের উপকার ও সৎকার্যের প্রচার তাহার অভ্যস্ত ; এবং প্রজাপালন কঁহার প্রিয়ব্রত ছিল। তিনি তেজস্বিতায় সূৰ্য্যকে, ক্ষান্তিগুণে সৰ্ব্বংসহা পৃথিবীকে, বুদ্ধিতে দেবগুরু বৃহস্পতিকে, এবং কীৰ্ত্তিতে সুরপতিকে, অতিক্রম করিয়াছিলেন। তিনি পণ্ডিতগণের পূজিত, প্রজাবৃন্দের অভ্য- চ্চিত, এবং ভ্রাতৃগণের আরাধিত ছিলেন। তিনি সত্যধৰ্ম্ম- নিরত, দেশকালজ্ঞ এবং প্রিয়বাদী ছিলেন। তাঁহার দেহের বর্ণ শ্যামল ও চিক্কণ, প্রমাণ চারি হস্ত, এবং সৰ্বাবয়ব সুরূপ ও সবল। এই রাজ্যকালে সীতা কুশ ও লব নামে দুই পুত্র প্রসব করেন। ইতিমধ্যে যমুনাতীরবাসী ঋষিগণ লবণাসুর কর্তৃক প্রপীড়িত হইয়া রামচন্দ্রের নিকটে শরণার্থী হইয়া উপস্থিত হইলেন। রামচন্দ্র শত্রুঘ্নকে লবণবধার্থ নিয়ােজিত করিলেন। আদেশমাত্র শত্রুঘ্ন সুসজ্জিত হইয়া ৬৪ আৰ্য-জীবনী লবণপুরীতে গমন করিলেন এবং যুদ্ধে লবণাসুরকে নিহত করিয়া, কালিন্দীর উপকূলে মথুরা নামে (২২) এক পুরী নির্মাণ করিলেন। শত্রুঘ্ন শত্রুঘাতী ও সুবাহু নামক পুত্রদ্বয়কে মথুরা ও বিদিশার (২৩) আধিপত্য প্রদান করিয়া, রাম- দর্শনােৎসুক হইয়া অযােধ্যায় প্রত্যাগত হইলেন। অনন্তর রামচন্দ্র অশ্বমেধের অনুষ্ঠান করিলেন। নিমন্ত্রিত ঋষিগণ এবং পার্থিবগণ নানাদিগদেশ হইতে অযযাধ্যায় আগমন করিতে লাগিলেন। মহাসমারােহে ভূরিদক্ষিণ বাজিমেধ যজ্ঞ সমাপ্ত হইল, এবং রামচন্দ্র যজ্ঞান্তে সরযুতে স্নান করিয়া উজ্জ্বল প্রভা ধারণ করিলেন। তিনি যজ্ঞাবসানে ঋষিবর্গ ও সুহৃদগণকে পুরস্কার প্রদানপূর্বক বিদায় দিয়া রাজ্যে মনােনিবেশ করিলেন। প্রজাপালক রামচন্দ্র কুশকে কুশাবতীতে এবং লবকে শরাবতীতে (২৪) সংস্থাপিত করি- লেন। ভরতের পুত্রদ্বয় তক্ষ ও পুষ্কর সিন্ধুরাজধানীতে অভিষিক্ত (২২) পাল ও মৎস্য দেশের মধ্যস্থিভ মথুরা প্রদেশের রাজধানী। কংসরাজ এখানে রাজত্ব করিতেন। কৃষ্ণের পিতামহ শূরসেন মথুরা প্রদেশের রাজা ছিলেন বলিয়া ইহার শৌরসেন নাম হইয়াছে। মথুরাপুরী যমুনার তীরে স্থিত। বৃন্দাবন ইহার তিন ক্রোশ উত্তর। (২৩) মালবদেশে বেত্রবতী নদীর তটে স্থিত বিদিশা দশর্ণ প্রদেশের রাজধানী। বর্তমান নাম ভিসা ( Bhilsa)। এখানে অত্যুৎকৃষ্ট ভ্যালসা তামাক প্রস্তুত হয়। (২৪) কুশাবতী বা কুশস্থলী দক্ষিণ কোশলার রাজধানী, বিন্ধ্যপর্বতের উপরি প্রতিষ্ঠিত। শরাবতী বা শ্রাবন্তী উত্তরকোশলাস্তর্গত। সিন্ধুদেশের ভক্তশিল তক্ষের এবং পুরাবতী পুষ্করের রাজধানী ছিল।

রামচন্দ্রের সংক্ষিপ্ত জীবনী। হইলেন। লক্ষ্মণের পুত্রদ্বয় অঙ্গদ ও চন্দ্রকেতু কারাপথের (২৫) আধিপত্যে অধিষ্ঠিত হইলেন। রামচন্দ্র এইরূপে পুত্র এবং ভ্রাতুস্পুত্রদিগকে রাজ্যে অভিষিক্ত করিয়া ক্রমশঃ পতি- লােকগত জননীদিগের শ্রাদ্ধাদি সমাধা করিলেন। তদনন্তর লক্ষ্মণ মানবলীলা সংবরণ করিলেন এবং কিছু দিন পরে রামচন্দ্র, ভরত ও শত্রু ইহলােক পরিত্যাগ করিয়া পরলােকে গমন করিলেন। বিষ্ণুপুরাণের চতুর্থ অংশে চতুর্থ অধ্যায়ের শেষভাগে রাম- চন্দ্রের যে সংক্ষিপ্ত বৃত্তান্ত আছে, তাহাতে কিছু বৈষম্য দেখা যায় । আমরা সেই অংশটুকুও উদ্ধত করিলাম। ভগবান বিষ্ণু ভূভারহরণার্থ অংশ-চতুষ্টয়ে মহারাজ দশরথের পুত্ররূপে জন্মগ্রহণপূর্বক রান, লক্ষ্মণ, ভরত ও শত্ৰুগ্ন নামে অভিহিত হন। রামচন্দ্র বাল্যকালে বিশ্বামিত্রের সমভিব্যা- হারে যজ্ঞ-বি-শান্তির নিমিত্ত গমন করিয়া তাড়কা-নামী এক রাক্ষসীর প্রাণ সংহার করেন। যজ্ঞস্থলে তাহার নিদারুণ শপ্রহারে রাক্ষসগণ নিহত এবং দূরে নিক্ষিপ্ত হয়। তৎপরে তিনি মিথিলায় রাজর্ষি জনকের গৃহে উপস্থিত হইয়া হরধনু ভগ্ন করিয়া জনকতনয়া সীতার পাণিপীড়ন করেন। পরি- ণয়ান্তর অঘােধ্যাভিমুখে আগমনকালে তাঁহার নিকটে ক্ষত্রিয়কুলান্তক হৈহয়কুলের ধূমকেতুস্বরূপ মহাবীর পরশু- রামের দর্প চূর্ণ হয়। চুর্ণ হয়। অনন্তর তিনি রাজ্যাভিলাষ তুচ্ছ করিয়া (২৫) কারাপথদেশ হিমালয়ের সন্নিহিত। অঙ্গদের রাজধানী অঙ্গদী ও চন্দ্রকেতুর রাজধানী চন্দ্ৰবক্তা সমৃদ্ধিসম্পন্ন ছিল।

অৰ্য্য-জীবনী। পিতৃসত্য পালন করিতে সীতা এবং লক্ষ্মণের সহিত চতুর্দশ বর্ষ বনে বাস করেন। দণ্ডকারণ্যে লঙ্কাধিপতি দশাননকর্তৃক সীতা অপহৃত হইলে তিনি খর-দূষণ প্রভৃতি রাক্ষসদিগকে এবং বালীকে বিনাশ করিয়া সাগর বন্ধনপূৰ্ব্বক অবশেষে রাক্ষসকুল ধ্বংস করত সীতাকে উদ্ধার করেন। জনকনন্দিনী তাহার সমীপে সমুপস্থিত হইয়া অনলে প্রবেশপূৰ্ব্বক নিজ শুদ্ধ চরিত্রের পরীক্ষা প্রদান করিলে, তিনি দেবগণের অনুরােধে তাঁহাকে গ্রহণপূর্বক অযযাধ্যায় আনয়ন করিয়াছিলেন। এইরূপে তিনি পৃথিবীর স্থিতি-সাধনের জন্য দুষ্টগণের প্রাণ সংহার করিয়া পরিশেষে স্বর্গারােহণ করেন। বিষ্ণুপুরাণের রচনা রামায়ণের বহুকাল পরে হইয়াছে। সুতরাং ইহাতে আমরা রামচন্দ্রের দেবভাব দেখিতে পাই- লাম। বাল্মীকি এই পৌরাণিক অবতার-বৃত্তান্ত জ্ঞাত ছিলেন , কিন্তু তৎপরবর্তী লেখকেরা তাহা জানিতে পারিয়া- ছিলেন। রামচন্দ্রের মৃত্যুর পর ললাকে তাঁহাকে দেবতার ন্যায় কীৰ্ত্তন করিত এবং কালক্রমে দেবভাব আরােপ করি- য়াছে। অবশেষে তিনি বিষ্ণুর অবতার বলিয়া প্রসিদ্ধ হইয়াছেন। হিন্দুসমাজ অদ্যাপি তাহাকে বিষ্ণুর অবতার বলিয়া পূজা করে। ইহা কেবল তাহার প্রতি জনসমাজের শ্রদ্ধা ও ভক্তির পরিচায়ক ব্যতীত আর কিছুই নহে। বস্তুতঃ ইহাই যুক্তিসঙ্গত বলিয়া বােধ হয় যে, তিনি জনসমাজে এতদূর আদৃত ও পূজিত হইয়াছিলেন যে, সমাজের লােকেরা তাঁহাকে বিষ্ণুর অবতাররূপে স্বীকার করিয়াছিল এবং তদবধি তিনি সেই ভাবে পূজিত হইয়া আসিতেছেন।

রামচন্দ্রের সংক্ষিপ্ত জীবনী। রামচন্দ্রের সংক্ষিপ্ত জীবনী এতক্ষণে শেষ হইল। ইহা সংকলন করিতে আমরা পণ্ডিতবর শ্রীযুক্ত হেমচন্দ্র ভট্টাচার্যের প্রচারিত রামায়ণ হইতে বিশেষ সাহায্য প্রাপ্ত হইয়াছি। এক্ষণে রামচন্দ্রের সময় নির্ণয় করতে চেষ্টা করা যাইতেছে। রামায়ণের প্রথমে লিখিত আছে যে, রামচন্দ্র একাদশ সহস্র বৎসর জীবিত ছিলেন। রামায়ণে ও পুরাণে দৃষ্ট হয় যে, রামচন্দ্র অযােধ্যাতে দশ সহস্র এবং দশশত বর্ষ রাজ্য করি- য়াছিলেন। রামায়ণের এই দুইটী শ্লোক প্রক্ষিপ্ত বলিয়া বােধ হয়। লিঙ্গপুরাণ ও বায়ুপুরাণে দশসহ বৎসর রামচন্দ্রের রাজ্যকাল নির্দিষ্ট হইয়াছে। জীবনীতে আমরা দেখিতেছি যে, রামচন্দ্রের পঞ্চদশ বর্ষের শেষে বিবাহ হয়। তৎপরে দ্বাদশ বর্ষ অযযাধ্যায় বাস করিলে তিনি বনবাসে গমন করেন, এবং চতুর্দশ বৎসর অতীত হইলে পুনৰ্ব্বার অযযাধ্যায় আগমন করেন। সুতরাং রামচন্দ্র যখন রাজ্য- গ্রহণ করেন, তখন তাহার বয়ঃক্রম একচল্লিশ বৎসর। তৎপশ্চাৎ তিনি বহু দিন রাজ্যশাসন করিয়া দেহত্যাগ করেন। ইহাতে কিছু একাদশ সহস্র একাদশ সহস্র বৎসর হইতে পারে না। আমরা দেখিয়াছি যে, যুধিষ্ঠির ১২৬ বৎসর জীবিত ছিলেন। রামচন্দ্রেরও তদনুরূপ হইবে। হিন্দুশাস্ত্রসমূহ একবাক্যে রামচন্দ্রকে, ত্রেতাযুগের রাজা বলিয়া স্বীকার করে। ত্রেতা- যুগের পর দ্বাপরযুগ ও দ্বাপরযুগের পর কলিযুগ। কলিযুগের অষ্টম শতাব্দীতে মহাভারত রচিত হয়। রামায়ণ মহাভারতের অনেক পূৰ্ব্বে লিখিত হয়। বাল্মীকি রামচন্দ্রের সমকালীন এবং তৎপ্রণীত রামায়ণ রামচন্দ্রের সভাতে গীত হইয়াছিল।

আন-নী। রামচন্দ্রের চরিত্র পবিত্র ও সুন্দররূপে চিত্রিত করিয়াছে, নিঃস্বার্থ ও পরহিতব্রত যে, তাঁহার বীরত্ব, ঔদাৰ্য, - সৰ্ব্বজনের আদরণীয় এব পিতৃমাতৃভক্তি, পবিত্র প্রণয়, " অতিশয় প্রসংশার বিষয়। হইলেন, তখন তাহার মনে উদিত হয় নাই। হয় নাই। তাহা: করিলে বিস্ময়াপন্ন হইতে হয় বিশেষরূপে প্রদর্শিত হইয়াছে, তিনি পতিদেবতা ও পতি, , গুণের নিদর্শনভূতা পৃথিবীর গার্হস্থ্য ধৰ্ম্মের মূর্তিমতী প্রতি। পতিভক্তি, অটল ধৈৰ্য্য এ । চিত্ত আকর্ষণ করে। ভরত ও কৌশল্যা পুত্রবাৎসল্যের অতি উন্নত ও পরিশুদ্ধ। যায় যে, যে পর্যন্ত পৃথিবী রহিবে, সে পর্যন্ত রামচতি, থাকিবে। অধুনা জর্মন ৬ : গাত্রোখান করিয়া রাম ও সা; দিগকে চরিতার্থ মনে করে শ্ৰদ্ধাপ্রদর্শন করিতে কখনই ।" অঁল। বাল্মীকি ইহা অতি রামচন্দ্র এতদূর সমভাবে র দৃষ্টান্ত অতি বিরল। রাগ এবং ধর্মপ্রবণতা •ণীয়। তাঁহার সৎসাহস, > ভ্রাতৃস্নেহ এবং সমদর্শিতা শুনি অরণ্যে নির্বাসিত ষি বা ক্রোধের লেশমাত্র 'কক চরিত্ৰ পৰ্যালােচনা 'নীর মধ্যে তাহার চরিত্র • র চরিত্র অতি মনােহর। • তনি সৰ্ব্বংসহা—সহিষ্ণুতা- '; এবং শ্রীরও ঐ। তিনি গাহার বিশুদ্ধ প্রণয়, অচল 1ী সহিষ্ণুতা কাহার না ভ্রাতৃস্নেহের এবং দশরথ দর্শ। রামায়ণের নীতি সন্দেহরূপে বলিতে পারা এবং নদী সকল বিদ্যমান -কে প্রচলিত ও আদৃত নরনারীগণ প্রাতঃকালে • উচ্চারণ করিয়া আপনা- ৩. দুগণ রামচরিত্রের প্রতি কতে পারিবেন না।

রামচন্দ্রের সংক্ষিপ্ত জীবনী। { প্রসিদ্ধ। রামচন্দ্রের প্রতি হিন্দুসমাজের শ্রদ্ধা ও ভক্তি রাম- নবমী সুপ্রতিষ্ঠা দ্বারা সূচিত হইয়াছে। যে নবমী তিথিতে রামচন্দ্র জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, তাহাই রামনবমী নামে ইহা হিন্দুসমাজের একটী মহােৎসবের দিন। যতদিন হিন্দুসমাজের চিহ্ন পৰ্যন্ত থাকিবে, ততদিন রামনব- মীতে হিন্দুদিগের মহােৎসব হইবে এবং ততদিন রামচন্দ্রের নাম হিন্দুদিগের হৃদয়ে শ্রদ্ধা ও ভক্তির সহিত জাগরূক থাকিবে। রামচন্দ্র কোন সময়ের লােক, জিজ্ঞাসা করিলে আমরা যে কি বলিব, তাহা স্থির করিতে পারি না। যুধিষ্ঠিরাদির সময় নির্ণয় করা করা সহজ, কিন্তু রাম ন্দ্রের সময়নিরূপণের কোন অবলম্বন কোন গ্রন্থে দৃষ্ট হয় না। বিষ্ণুপুরাণের চতুর্থ অংশের চতুর্থ অধ্যায়ের শেষে লিখিত আছে যে রামচন্দ্র সূৰ্য্যবংশের ষটপঞ্চাশত্তম নৃপতি এবং বৃহদ্বল ষড়শীতিতম নৃপতি। বৃহদ্বল কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন এবং অভিমন্যু কর্তৃক নিহত হন। অতএব কুরুক্ষেত্র-যুদ্ধ রামচন্দ্রের ত্রিংশৎ পুরুষের রাজত্বের পর ঘটিয়াছিল । এই ত্রিংশৎ পুরুষে অন্ন ১০ ০ ০ বৎসর অতীত হইয়াছিল। ইউরােপীয় পণ্ডিতেরা যাহাই বলুন, আমরা তাহাদের ন্যায় প্রতি পুরুষে ২০ বা ১৬ বৎসর ধরিতে পারি না। ত্রেতাযুগের লােক কলিযুগের লােক অপেক্ষা দীর্ঘায়ু ছিলেন। কুরুক্ষেত্ৰ-যুদ্ধ কলিযুগের ৭৪২ অব্দ গত হইলে অর্থাৎ নুনাধিক ২৩৬০ পূর্ব-খ্রীষ্টাব্দে ঘটিয়াছিল। রামচন্দ্র এই সময়ের অন্যূন এক সহস্র বৎসর পূৰ্বে বর্তমান ছিলেন। দক্ষিণাবত্তবাসী তামিলগণ বলিয়া ৭০ আৰ্য-জীবনী থাকেন যে, রামচন্দ্র কিঞ্চিদধিক পঞ্চ সহস্র বৎসর পূর্বে কুমা- রিকাতে রামেশ্বর দেবের মন্দির নির্মাণ করিয়াছিলেন। তাহা হইলে রামচন্দ্রের রাজত্ব কাল ৩৩৮০ পূৰ্ব্ব-খ্রষ্টাব্দে নির্দিষ্ট হয়। ইহা বর্তমান সময় হইতে ৫২৪১ বৎসর পূর্ব- তন। ইউরােপীয়দিগের ধর্মশাস্ত্রমতে তখন সবে পৃথিবীর সৃষ্টি হইয়াছে। কিন্তু অযােধ্যানগরীতে তখন ৫৬ জন রাজা রাজত্ব করিয়াছেন। এক সহস্র বৎসর আমরা অতি নূন সংখ্যা ধরিয়া গণনা করিলাম। যতক্ষণ ইহার প্রতিকূলে বলবত্তর প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া না যাইতেছে, ততক্ষণ ইহাই প্রমাণ বলিয়া গ্রহণ করিতে হইবে। রাজতরঙ্গিণীর প্রথম অধ্যায়ে দেখিতে পাওয়া যায় যে, কাশ্মীররাজ দ্বিতীয় দামােদর ব্রাহ্মণগণকর্তৃক অভিশপ্ত হইয়া তাহাদিগকে প্রসন্ন করিলে তাঁহারা রাজাকে এক দিবসে সম্পূর্ণ রামায়ণ শ্রবণ করিতে আদেশ করেন। রাজতরঙ্গিণীর অনুবাদক ট্রয়ার সাহেব নিজ গণ দ্বারা কাশ্মীরের রাজা তৃতীয় গােনৰ্দের সময় ১১৮২ পূৰ্ব্ব-খ্রীষ্টাব্দ নিরূপণ করিয়াছেন। দ্বিতীয় দামােদর এবং তৃতীয় গােনৰ্দের মধ্যে পাঁচ জন রাজা কাশ্মীরে রাজত্ব করেন। সুতরাং দ্বিতীয় দামােদরের সময় অন্ততঃ পূৰ্ব্ব-খ্রীষ্টাব্দের চতুর্দশ শতাব্দীতে হইবে। অনেকে প্রতি রাজার রাজত্বকাল ২০ বৎ- সর গণনা করেন, কিন্তু আমরা তাহা করিতে পারি না। যদি ট্রয়ার সাহেব এইরূপ গণনা দ্বারা পূর্বোক্ত কাল নির্ণয় করিয়া থাকেন, তাহা হইলে উহা আমাদের অভিমত নহে; চতুর্দশ শতাব্দী না হইয়া আরও প্রাচীন হইবে। এই সময়ে রামায়ণ প্রচলিত ছিল দেখিয়া আমরা রামায়ণের সময় নিরূপণ শঙ্করাচার্যের জীবন ৭১ ।।।।।। । । • করিতে পারি না। একজন গ্রন্থকার বলিয়াছেন যে, দ্বিতীয় দামােদরের পূর্ধ্বতন পঞ্চ নৃপতির প্রথম জনের রাজত্বসময়ে রামায়ণ অজ্ঞাত ছিল। ইহা কিরূপে জানিতে পারা যায়, তাহা আমরা বুঝিতে পারি না। যদি উল্লেখ না থাকিলেই অনস্তিত্ব অনুমান করিতে হয়, তবে ত ভয়ানক কাণ্ড হইয়া । রাজতরঙ্গিণীর পূর্বোক্ত আভাস আমাদিগের নির- পিত সময়ের কোনরূপেই প্রতিকুল হইতেছে না। আমরা রামচন্দ্রের রাজত্বকাল খ্রীষ্টাব্দের প্রায় ৩৪০০ বৎসর পূৰ্ব্বে স্থির করিয়াছি এবং অন্য বলবত্তর-প্রমাণাভাবে উহা ত্যাগ করিতে প্রস্তুত নহি। উঠে। নাস্তিকত্রাস ধৰ্ম্মবীর শঙ্করাচার্য্যের জীবনী। জীবনচরিত পাঠ করিতে সকলেই ভাল বাসেন। ইহার হেতু এই যে, জীবনচরিত দ্বারা অনেক উপকার সাধিত হইয়া থাকে। যাহার জীবনী লিখিত হয়, তিনি কিরূপে সমাজের সহিত সম্মিলিত হইয়া কাৰ্য্য করিয়াছিলেন, কিরূপেই বা সমাজের কোন উন্নতি বা পরিবর্তন সাধন (যদি করিয়া থাকেন করিয়াছিলেন, কিরূপে বিবিধ-মতাবলম্বী লােকদিগের সহিত ব্যবহার করিতেন, কিরূপেই বা সংসারের নানা প্রলােভন হইতে আত্মরক্ষা করিয়াছিলেন, কিরূপেই বা সাধারণ জনগণের মন আকর্ষণ করিয়াছিলেন, ৭২ আৰ্য-জীবনী। ইত্যাদি বিষয় জ্ঞাত হইবার নিমিত্ত বিশেষ কৌতুহল উপস্থিত হয়, এবং আগ্রহ জন্মে। জীবনবৃত্ত-পাঠে অনেকে বিশেষ রূপে উপকৃত হইয়াছেন, কারণ, তারা তাঁহারা নিজের দোষ- প্রভৃতি সংশােধনপূর্বক উন্নতি বিধান করিয়াছেন এবং সমাজে প্রশংসনীয় ও গণনীয় হইয়াছেন। অতএব জীবনচরিতের উপকারিত্ব প্রভূত। আবার যদি এই জীবনচরিত কোন মহাপুরুষের জীবনচরিত হয়, তাহা হইলে ত সৰ্বাংশেই ঔৎসুক্য- জনক হয়। মহাপুরুষের নাম-শ্রবণে হৃদয়ে একটী ভয়-ভক্তি- সংবলিত প্রকাণ্ড ভাবের উদয় হয়। পৃথিবীর সর্বত্র মহাপুরুষ- দিগের সম্মান, আদর এবং পূজা দৃষ্ট হইয়া থাকে। সৰ্বত্ৰ সৰ্ব্বদা দেখিতে পাওয়া যায় যে, এটী মহাজনগৃহীত বাক্য, এইটা মহাজনের উক্তি, এটী মহাপুরুষের কথা, এইটী মহাপুরুষের আচার -এই কথা বলিলে লােকের মনে অতিশয় সম্মান-ভাবের অতএব মহাপুরুষের জীবনচরিত আরও অধিক প্রীতিকর ও রুচিকর। যখনই কোন সমাজের অবস্থা ঘটনা- চক্রের পরিভ্রমণে এরূপ হইয়া উঠে যে, যদি কোন মহাপুরুষ সে সময় আবিভূত না আবিভূত না হন এবং সমাজের অবনতির প্রতিরােধ না করেন, তবে সমাজ বিচ্ছিন্ন এবং শিথিলবন্ধন হইয়া যাইবে; তখনই সেই সমাজের রক্ষার নিমিত্ত একজন মহাপুরুষ উদিত হন। যৎকালে • ভারতবর্ষে ব্রাহ্মণ্যধৰ্ম্মের অন্যায়রূপে ব্যবহৃত প্রভাব দ্বারা সমাজের বিশৃঙ্খলা ঘটিল, তৎকালে কপিলবস্তু নগরে সমাজ- সংস্কারার্থে বুদ্ধদেব জন্মগ্রহণ করিলেন। তিনি রাজপুত্র হইয়াও সংসারের মায়া পরিত্যাগপূৰ্ব্বক সমাজসংস্কার-কাৰ্য্যে উদয় হয়।

শঙ্করাচার্যের জীবনী। আত্মসমর্পণ করিয়াছিলেন এবং ভারতবর্ষের প্রথম বুদ্ধি- বিপ্লবের আবহন করিয়াছিলেন এবং সমাজের ক্ষয়প্রাপ্ত জীবনীশক্তি পুনঃপ্রদান করিয়াছিলেন। যৎকালে জেরু জেলাম (Jerusalem) নগরে ফারিসি (Pharisees) এবং সাডিউসি (Saducees) নামে দুই ধৰ্ম্মসম্প্রদায়ের কৌটিল্য, অন্তরে বাহিরে দ্বিভাব, এবং লাম্পট্য প্রভৃতি দোষে সমাজ অধঃ- পাতে যাইতেছিল, এবং যৎকালে আন্তরিক হৃদয়ের কিছুই না থাকিয়া কেবলমাত্র বাহ সাড়ম্বরের ঘাের ঘটা সমাজকে রসাতলে দিতেছিল, তৎকালে যীশুখ্রীষ্টের আবির্ভাব হয়। খ্রীষ্টের পঞ্চদশ শতাব্দীর পরে, যখন খ্রীষ্টান-সম্প্রদায়মধ্যে অত্যন্ত বিশৃঙ্খলা, অন্যায় আধিপত্য ও বলপ্রয়ােগ, রােম- নগরস্থ পােপ (Pope) নামা ধৰ্ম্মাধ্যক্ষের অসহ্য অত্যাচার, এবং অন্যান্য গােলযােগ উপস্থিত হইয়াছিল এবং খৃষ্টান সমাজের অধােগতির সূত্রপাত করিতেছিল, তখন মার্টিন লুথার নির্ভীক- চিত্তে সমস্ত কুসংস্কার দূর করিয়া সমাজকে সজীব করিলেন এবং বিবেকশক্তির সুচালনার ঐকান্তিক ঔচিত্য প্রচার করিলেন। লুথার যদি জন্মগ্রহণ না করিতেন, তাহা হইলে খৃষ্টান-সমাশের যৎপরােনাস্তি অমঙ্গল ঘটিত। তিনি সম্রাট-সহ-সেবিত সভামধ্যে স্বমত বিশদরূপে বুঝাইয়া দিয়া অবশেষে ভীতিরহিত- চিত্তে বলিয়াছিলেন যে, “এই আমি কুসংস্কারস,হের বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হইলাম ; আমি নিজ বিবেকের উপদেশ অবহেলন করিতে পারিব না। ঈশ্বর আমাকে সাহায্য করুন।” কি সামান্য মনের কথা ? এই প্রকার যখন যখন সমাজের রক্ষার নিমিত্ত মহা- ৭8 অৰ্য-জীবনী পুরুষের আবির্ভাব আবশ্যক হইয়াছে, তখন তখনই আমরা দেখিয়াছি যে একজন না একজন সংস্কারক আবিভূত হইয়া- ছেন। অধ্যবসায়, জিতেন্দ্ৰিয়ত্ব, মনস্বিতা, সম্পূর্ণ নির্ভীকতা প্রভৃতি মহাপুরুষের লক্ষণ। স্কুণ্ড -দেশীয় বিখ্যাত সংস্কারক জন নক্সের (Knox) সমাধিকালে আরল অব মর্টন (Earl of Morton) বলিয়াছিলেন “ঐ ব্যক্তি কখন মনুষের মুখকে ভয় করে নাই।” হিউ লাটিমার ( Hugh Latimer), টমাস gtanto ( Thomas Cranmer), o praraq (John Colvin) প্রভৃতি ইউরােপীয় সংস্কারকগণের আবির্ভাব ঠিক উপযুক্ত কালেই হইয়াছিল। ভারতবর্ষেও রামানুজ, কবীর, দাদু, নানক, চৈতন্য প্রভৃতি কত সম্প্রদায়-প্রবর্তক মহাপুরুষ উদিত হইয়াছেন। সে দিনও বঙ্গীয় সমাজের ধর্মসম্বন্ধীয় নির্জীবতা দূর করিবার নিমিত্ত রাজা রামমােহন রায় ব্রাহ্মধর্মের প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন। অতএব ইহা প্রদর্শিত হইল যে, যৎকালেই সমাজের রক্ষার্থে মহাপুরুষের আবির্ভাব আবশ্যক হয়, তৎ- কালেই কোন না কোন মহাপুরুষ তথায় আবিভূত হইয়া সমাজকে অব্যাহত অবস্থায় রক্ষা করেন। ভারতবর্ষের দুইটী বিশেষ গৌরবের সময় । প্রথম যখন বুদ্ধদেব প্রথম বুদ্ধিবিপ্লব ঘটাইয়াছিলেন। দ্বিতীয়টী যখন শঙ্করাচাৰ্য অদ্বৈতমতের প্রচার করিয়া সমাজের উদ্ধার করিয়াছিলেন। এই নাস্তিকত্রাস প্রাতঃস্মরণীয় শঙ্করা- চার্যের জীবনচরিত লিখিবার জন্যই আমরা এত কথা বলি- লাম। ইনি অদ্বৈতমতের প্রচারক'। ইনি মঠাশ্রমের প্রবর্ত- য়িতা। ইনি ভারতবর্ষের সর্বত্র দেবতা বলিয়া মান্ত, গণ্য এং শঙ্করাচার্যের জীবনী। ৭৫ ; পূজনীয়। ইনি ভারতের যাবতীয় ধর্মের কিছু না কিছু পরি- বৰ্তন করিয়া গিয়াছেন। ইনি বহুসংখ্যক অদ্বৈতমতবিরােধি মত নিরাকরণপূৰ্ব্বক সত্য অদ্বৈত মত সংস্থাপন করিয়া গিয়া- ছেন। ভারতের সর্বত্র ইহাকে শৈব বলিয়া লােকে পূজা করে, কিন্তু ইনি শৈবমত খণ্ডনপূৰ্ব্বক অদ্বৈতমত প্রচার করেন। ইহার দশজন প্রধান শিষ্য হইতেই ইহার অদ্বৈত মতের সর্বত্র প্রচার হইয়া পড়ে। আমরা এই সমস্ত যথাস্থানে সবিশেষ বর্ণনা করিব। শঙ্করাচার্যের জীবনবৃত্ত লিখিতে হইলে তদ্বিষয়ক গ্রন্থ- নিচয়ের আশ্রয় লইতে হয়। এরূপ প্রবাদ যে, তাঁহার শিষেরা সকলেই তাহার জীবনচরিত লিখিয়াছেন; কিন্তু তৎসমস্ত এক্ষণে প্রাপ্ত হওয়া যায় না। তাঁহার বিখ্যাত শিষ্য শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার টীকাকার প্রথিতনামা আনন্দগিরি স্বীয় আচার্যের জীবনী এবং দিগ্বিজয় (অর্থাৎ স্বমতপ্রচার ও বিরুদ্ধ- মতখণ্ডন) স্বকৃত শঙ্কর-বিজয় নামক গ্রন্থে বহুলরূপে বর্ণনা করিয়াছেন। এই গ্রন্থের বিশেষ ঐতিহাসিক মূল্য আছে এবং ইহা প্রামাণিক বলিয়া ধরা যাইতে পারে, যেহেতু আনন্দগিরি শঙ্করাচার্য্যের শিষ্য এবং তৎসাময়িক লােক। আর ধর্মভয়ে আনন্দ নিজ গুরুর জীবন-চরিত মিথ্যা-কল্পনা-দোক্রান্ত করেন নাই; তবে তাহার বিশ্বাস এবং তৎকালিক আচারের অনুরােধে কতকগুলি আতিশয্যদ্যোতক বর্ণনা করিয়াছেন। গুরুপরম্পরাশ্রুত প্রবাদ অনুসারে ইহা দ্বাদশ শত বৎসর পূৰ্ব্বে রচিত হয়। ইহাগদ্যেই বিবৃত, মধ্যে মধ্যে পদ্য নিবেশিত হইয়াছে। ইহা চতুঃসপ্ততি প্রকরণে সম্পূর্ণ। আচার্যের জীবন- ৭৬ অৰ্য-জীবনী ছিলেন। চরিত বিষয়ে দ্বিতীয় গ্রন্থ মাধবাচাৰ্য-প্রণীত শঙ্কর-দিগ্বিজয়- নামক মহাকাব্য, যােড়শ সর্গে সম্পূর্ণ। মাধবাচাৰ্য পাঁচ শত বৎসরের লােক। ইনি বিজয়নগরের বুকভূপের সচিব সায়নাচার্য্যের ভ্রাতা। ইহারা দুই ভাইই অত্যন্ত পণ্ডিত ইহারা উভয়ে স্বশিষদিগের সাহায্যে বেদ, ব্রাহ্মণ এবং উপনিষদের ভাষা লিখিয়া গিয়াছেন। মাধবাচাৰ্য্য সৰ্ব-দর্শনসংগ্ৰহ গ্রন্থে দৰ্শনসমূহের সারাদান করিয়াছেন। তিনি তাঁহার শঙ্করদিগ্বিজয়ের প্রারম্ভে বলিয়াছেন যে, আমি শঙ্করবিজয়ের সারসংগ্রহপূর্বক এই গ্রন্থ রচনা করিয়াছি। (১) তিনি আরও লিখিয়াছেন যে, পুরাণ কবিরা শঙ্করা- চার্য্যের বিষয় অনেক লিখিয়া গিয়াছেন। ইহা দ্বারাও প্রতীতি হইতেছে যে, শঙ্করাচাৰ্য মাধবাচার্যের বহুকাল পূর্বের লােক। শঙ্করাচার্য্যের জীবনী-বিষয়ক তৃতীয় গ্রন্থ কেরলােৎপত্তি। ইহা তেলুগু ভাষায় রচিত। ইহাতে শঙ্করা- চার্যের বাল্যকালের বৃত্তান্ত বিবৃত আছে। এতদ্ভিন্ন বেঙ্কট- রামস্বামী দক্ষিণদেশীয় কবিদিগের যে জীবন-চরিত সংগ্রহ করিয়াছেন, তাহার মধ্যে শঙ্করাচার্যের জীবন-চরিত আছে। এই সমস্ত গ্রন্থ হইতে এবং আচাৰ্য্য-প্রণীত শারীরকভাষ্য প্রভৃতি হইতে আমরা আচার্যের জীবন-চরিত সংগ্রহ করিয়াছি। (১) শঙ্করদিগ্বিজয় গ্রন্থের সারসংকলন করিয়া সুকবি সদানন্দ “দিগ্বি- জয়সার” রচনা করিয়াছেন। সুতরাং ইহাকে শঙ্করজীবনী বিষয়ে স্বতন্ত্র গ্রন্থ বলিতে পারা যায় না। ইহার ‘শঙ্করবিজয়জয়ন্তী” নামে বঙ্গভাষায় একখানি অনুবাদ আছে।

শঙ্করাচার্য্যের জীবনী। ৭৭ ।। । । । বৌদ্ধধর্মের প্রভাব ভারতবর্ষে সহস্র বৎসর অপ্রতিহত ভাবে চলিয়া আসিতেছিল। ক্রমশঃ এই প্রভাব ক্ষীণ হইতে লাগিল এবং ব্রাহ্মণ্য-ধৰ্ম্মের পুনঃপ্রচার আরম্ভ আরম্ভ হইল। বৌদ্ধধর্মের প্রভাব-ক্ষীণতার কারণ এই যে, বৌদ্ধধর্ম বেদ এবং ঈশ্বর মানিত না। ভারতের সর্বত্রই বেদের এতদূর সম্মান এবং এতদূর আদর যে, সাংখ্যদর্শনকার কপিলঋষি বেদের নিত্যতা এবং প্রামাণ্য স্বীকার করিয়া ঈশ্বরের অস্তিত্ব একেবারে অস্বীকার করিয়াও রক্ষা পাইয়াছিলেন। বুদ্ধদেব যদি বেদের দোহাই দিয়া নিজ মত প্রচার করিতেন এবং ঈশ্বরের সত্তা স্বীকার করিতেন, তাহা হইলে তাঁহার ধৰ্ম্ম কখন ভারতবর্ষ হইতে বিলুপ্ত হইত না। কেবল ঈশ্বর এবং খদের নাম করিয়া, তিনি অক্লেশেই স্বমত প্রচার করিতে পারিতেন। আর বৌদ্ধধর্মের উপাসকদিগের নিয়ম সকল অতিশয় কঠোর ছিল বলিয়া সকলে তদনুসারে চলিতে পারিত না। এতদ্ভিন্ন বৌদ্ধধর্মের জাকজমক এবং লােক- চিত্তাকর্ষক আড়ম্বর কিছুই ছিল না। বৌদ্ধ পুরােহিতেরাও ক্রমশঃ অত্যন্ত দুৰ্বৰ্ত্ত, ভ্রষ্টচরিত্র এবং উচ্ছ,ঙ্খল হইয়া উঠিয়াছিল। ইত্যাদি নানা কারণে বৌদ্ধধর্মের অবনতি ঘটিয়াছিল। বৌদ্ধধর্মের প্রভাব ক্ষীণ হইলে পর ব্রাহ্মণেরা পুরাণ প্রচার আরম্ভ করিলেন এবং বিবিধ উপায় অবলম্বন- পূৰ্ব্বক সাধারণ লােকের চিত্ত আকর্ষণ করিতে লাগিলেন। কথকতা দ্বারা তাহারা হিন্দুধৰ্ম্ম-মৰ্ম্ম সমাজে বােধগম্য করা- ইতে লাগিলেন এবং সকলেই হিন্দুধৰ্ম্মের শ্রেষ্ঠতা হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিল। কথকেরা নিজ বাগ্মিতার দ্বারা লােকের ৭৮. আৰ্য-জীবনী। মনােহরণ করিতে লাগিলেন। লােকে বুঝিতে বুঝিতে পারিল যে, যে হিন্দুধৰ্ম্মের সর্বকাৰ্য্যেই ঈশ্বরের নাম করা হয়, সে হিন্দুধৰ্ম্ম অবশ্য শ্রেষ্ঠ এবং গ্রহণীয়। (২) এবম্প্রকারে হিন্দুধর্মের প্রচার ক্রমশঃ বিস্তৃত হইতে লাগিল। কিন্তু যাহার প্রচার হইল, তাহা হিন্দুধর্মের বিকৃত ভাব, প্রকৃত হিন্দুধর্ম নহে। বেদবােধিত সত্যজ্ঞানময় ব্রাহ্মণ্যধৰ্ম্ম লুপ্তপ্রায়। ব্রাহ্মণাদি বর্ণেরা পরস্পর রাগাদিগ্রস্ত এবং ত্য- জ্ঞানশূন্য হইয়া বৈদিকাচার পরিত্যাগপূৰ্ব্বক উন্মার্গগামী হইতে লাগিল। সুতরাং সমাজ বিশৃঙ্খল হইয়া উঠিল। এই সাজিক অবস্থা আনন্দগিরির শঙ্করবিজয়ে দ্বিতীয় প্রকরণে উৎকৃষ্টরূপে বর্ণিত আছে। আমরা সেই কবিতাগুলির পছে অনুবাদ নিয়ে নিবেশিত কারতেছি। কেহ পূজা করে শম্ভু, কেহ পূজে হরি। কেহ অর্চে বাণী, কেহ নানাচিহ্নধারী। কোন জন পূজে বহ্নি, কেহ দিবাকর। কেহ বা গণেশদেব, কেহ শক্তিপর। (২) “ঔষধে চিন্তয়েৎ বিষ্ণুং ভােজনে চ জনার্দন। শয়নে পদ্মনাভঞ্চ বিবাহে চ প্রজাপতিম্। যুদ্ধে চক্ৰধরং দেবং প্রবাসে চ ত্রিবিক্রম। নারায়ণং তনুত্যাগে শ্রীধরং প্রিয়সঙ্গমে। দুঃস্বপ্নে স্মর গােবিন্দং সঙ্কটে মধুসূদন। কাননে নরসিংহঞ্চ পর্বতে রঘুনন্দন! জলমধ্যে বরাহঞ্চ পাবকে জলশায়িন। গমনে বামনঞ্চৈব সৰ্ব্বধাৰ্যেষু মাধবম্।”

শঙ্করাচার্যের জীবনী। কেহ বা ভৈরব সেবে, কেহ বিশ্বসেন। মল্লারি কেহ বা পূজে, কেহ বা মদন । কেহ ইন্দ্র, কেহ যম, কেহ সরিৎপতি। উদক, অম্বর, বায়ু, পৃথিবী প্রভৃতি। কেহ পূজে অর্থপতি, কেহ বা ব্রহ্মারে। যথেচ্ছায় গুণত্রয় অৰ্চনা বা করে । সাংখ্যমতে কেহ বা প্রকৃতিপরায়ণ। কর্মশীল অণু মান্য করে কোন জন। কেহ সােম, কেহ কুজ, কেহ সােমসুত । বৃহস্পতি, শুক্র, শনি, নানামতযুত । কেহ সেবে কালদেব, কেহ পিতৃগণ। অনন্ত, গরুড়, কেহ সিদ্ধ অগণন । কেহ বা গন্ধৰ্ব্ব ভজে, কেহ সাধ্যগণ। পূজে ভূত, কিংবা করে বেতাল অৰ্চ্চন। এইরূপ নানাবিধ লােকেরা যথেচ্ছাবৃত্তি আরম্ভ করিয়া- ছিল। এতদ্ব্যতীত তাহারা মৎসরতা, জিগীষা, এবং নিজে- চ্ছাকৃত লিঙ্গ, ত্রিশূল, ডমরু, শঙ্খ প্রভৃতি বিবিধ চিহ্নধারণ অবশ্য কর্ত্তব্য বলিয়া মনে করিত। আর তাহারা স্বে- চারী হইয়া শাস্ত্রের উক্তি সকল অগ্রাহ্য করিত। সংক্ষে- পতঃ সমাজের ঘাের বিপ্লব ঘটিয়াছিল। এবংবিধ সমাজ- বিপ্লবের • সময় এক জন মহাপুরুষের আবির্ভাব একান্ত আবশ্যক। এ বিপ্লব দমন না করিলে সমাজ একেবারে ছিন্ন- বিচ্ছিন্ন এবং শিথিল-বন্ধন হইয়া যাইত। ভারতের এবং বিধ অবস্থায় শঙ্করাচাৰ্য জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন। এই ৮০. আৰ্য-জীবনী নিমিত্তই আনন্দগিরি তাহাকে শিবের অবতার বলিয়া স্থির করিয়াছেন। আনন্দগিরি-লিখিত আচার্যের অবতার- প্রয়ােজন এই নরাধম মনুষদিগকে সদাচারভ্রষ্ট দেখিয়া নারদ ঋষি ব্রহ্মার নিকটে গমন করিয়া নিবেদন করিলেন, “হে তাত! জগতের এই শশাচনীয় অবস্থা কি আপনি দেখিতেছেন না, জগতের যাহাতে বিনাশ না হয় তাহার উপায়বিধান করুন।” ব্রহ্মা ইহা শুনিয়া স্বগণসমভিব্যাহারে শিবলোকে প্রবেশ করিলেন এবং মহাদেবকে বিজ্ঞাপন করিলেন “ভূলােকে ভয়ানক উপদ্রব উপস্থিত হইয়াছে ; লােকে বৈদিক আচার ত্যাগ করিয়া মিথ্যাচার আশ্রয় করি- তেছে ; বিপ্রপ্রভৃতিরা বিচিত্র চিহ্ন দ্বারা দেহকে সন্তপ্ত করিতেছে ; দ্বিজবৰ্গ যথাকালে অগ্নিতে হােম করে না, পৰ্ব্বতিথিতে পিত্রাদির তৃপ্তির নিমিত্ত কব্য প্রদান করে না, সত্যলােক-প্রাপ্তির নিমিত্ত বেদপাঠ করে না, এবং নানা- প্রকারে সর্বসৎকৰ্ম্ম-বিবর্জিত হইয়া পাষণ্ডতা প্রাপ্ত হইতেছে। কেহ কাপালিকাচারী, কেহ বা মদ্যমাংসাশী হইয়াছে। সকলেই সত্যশৌচাদি ধৰ্ম্ম-কৰ্ম্ম-জ্ঞান-রহিত পশুর ন্যায় কুপথে গমন করিতেছে এবং কুমত অবলম্বন করিতেছে। অতএব আপনি বেদমার্গ উদ্ধার করিবার উপায় চিন্তা করুন।” ব্রহ্মাকর্তৃক এই প্রকারে সােধিত , শিব সন্তুষ্ট হইয়া বলিলেন “হে ব্ৰহ্মন্! আপনি স্বলােকে প্রতিপ্রয়াণ করুন, আমি জগতের রক্ষার নিমিত্ত এবং বেদমার্গ উদ্ধার করিবার জন্য, শঙ্করাচাৰ্যরূপে অবতীর্ণ হইব।” অনন্তর দক্ষিণাপথে চিদম্বরপুরে আকাশলিঙ্গ নামে এক । • শঙ্করাচার্যের জীবনী ৮১ শিব আবিভূত হইলেন। সেই স্থানের মহেন্দ্র-বংশে উৎ- পন্ন সৰ্ব্বজ্ঞ নামে জনৈক দ্বিজ চিদম্বরেশ্বরের ভক্ত উপাসক হইলেন। সৰ্ব্বজ্ঞের সুলক্ষণবিশিষ্ট কামাক্ষী নামে নামে এক পত্নী ছিলেন। চিদম্বরেশ্বরের প্রসাদে এই দ্বিজদম্পতী বিশিষ্ট নামে গুণবতী কন্যা লাভ করিলেন। আশ্চৰ্যকৰ্ম্ম। শান্তশীল বিশ্বজিৎ নামে বিপ্র বিশিষ্টার পাণিগ্রহণ করি- লেন। বিশিষ্ট। অত্যন্ত ভক্তিসহকারে শিবের আরাধনা করিতেন, কিন্তু তত্রাপি তাহার পতি বিশ্বজিৎ অরণ্যে তপস্যা করিবার নিমিত্ত তাহাকে পরিত্যাগ করিয়া গেলেন। তদ- বধি সেই পতিব্রতা কামিনী একমনে চিদম্বর মহেশ্বরের পূজন, ধ্যান প্রভৃতি কাৰ্যে আত্মসমর্পণ করিলেন। একদা চিদম্বরেশ্বর মন্দিরে সমাগত সৰ্বজন সমক্ষে বিশিষ্টার বদন-সরােজে জ্যোতিরাকারে প্রবেশ করিলেন। এই অদ্ভুত ঘটনা সন্দর্শনে সমবেত জনবর্গ অত্যন্ত বিস্মিত হইল। শিবের উগ্ৰতেজঃপ্রবেশহেতু বিশিষ্টার গর্ভ অনুদিন উপচিত হইতে লাগিল। অনন্তর দ্বিজগণ তৃতীয়াদি মাসে বেদোক্ত কৰ্ম্ম সকল সম্পাদন করিলেন। এই প্রকারে দশ মাস অতীত হইলে পর যথাসময়ে বিশিষ্টার গর্ভ হইতে শঙ্করা- চাৰ্য-রূপে মহাদেব অবতীর্ণ হইলেন। তাঁহার জন্মক্ষণে স্বর্গ হইতে আনন্দ-সূচক পুষ্পবৃষ্টি পতিত এবং দেবদুন্দুভি- নিনাদ সমুথিত হইল। শঙ্করাৰ্য্যের আবির্ভাব যে আবশ্যক হইয়াছিল, তাহা প্রমাণিত হইয়াছে। তিনি যদি জন্মগ্রহণ না করিতেন, তাহা হইলে এত দিন হিন্দুধর্মের চিহ্নও থাকিত কি না, ৮২ আৰ্য-জীবনী সন্দেহ-স্থল। তিনি ভারতবর্ষের তৎকালিক সমাজবিপ্লব নিবারণ করিয়া আৰ্যগণের প্রাচীন কীৰ্ত্তিসকল দৃঢ় করেন। যত কাল ভারতে হিন্দুধৰ্ম্মের গন্ধ পৰ্যন্ত থাকিবে, ততকাল শঙ্করাচার্য্যের নাম চিরস্মরণীয় রহিবে। শঙ্করাচাৰ্য মলয়বর দেশে নাম্বুরিব্রাহ্মণবংশে জন্মগ্রহণ করেন। কোন কোন মতে কর্ণাটদেশান্তগত তুঙ্গভদ্রা -নদী- তীর-স্থিত (৩) শৃঙ্গপুর নগরে তাহার জন্ম হয়। তৃতীয় বর্ষে তাহার চৌড়কর্ম, পঞ্চমে মৌঞ্জীবন্ধন এবং অষ্টমে উপনয়ন হইলে পর, তিনি বেদাধ্যয়নে প্রবৃত্ত হন। আনন্দগিরি লিখি- য়াছেন যে, আচার্যের ললাটদেশ অর্ধেন্দুশােভিত, বদন পূর্ণেন্দুশােভন, বক্ষঃস্থল বিশাল, বাহু আজানুলম্বিত, উরু এবং গুল্ফ স্কুল, পদ স্বল্প, নখ শশাণবর্ণ, কর-পাদ-মধ্যস্থল শঙ্খচক্র প্রভৃতি দ্বারা চিহ্নিত, মস্তকের বাম ভাগে ত্রিশূল- চিহ্ন এবং দক্ষিণ ভাগে অর্ধচন্দ্রচিহ্ন বিদ্যমান ছিল। চমৎ- কারিণী মেধাশক্তি, সুতীক্ষ্ণ বুদ্ধিবৃত্তি এবং দৃঢ় অধ্যবসায়ের প্রভাবে তিনি অল্পকালমধ্যেই অশেষ শাস্ত্রে বিশেষ ব্যুৎপত্তি- লাভ করিয়াছিলেন। আনন্দগিরি বলেন, গুরুর সমীপে একবার শ্রবণমাত্রেই আচাৰ্য সৰ্ববিদ্যাপ্রপঞ্চ অবগত হইয়া- ছিলেন। আনন্দ আচাৰ্য্যকে কল্পবৃক্ষ কল্পনা করিয়া ষড়, দর্শনকে তাহার ল, ইতিহাসকে স্থাণু, নিগমকে শাখা, (৩) তুঙ্গ এবং ভদ্র নাথে দুইটী নদীর সংযােগে জাত। ইহা ‘দক্ষিণা- পথজাহ্নবী” বলিয়া প্রসিদ্ধ। ইহা একটী তীর্থস্থান। বহুসংখ্যক যাত্রী ইহার জলে স্নান করিতে গমন করে।

শঙ্করাচার্যের জীবনী । বেদেব ষড়ঙ্গকে পল্লব, শ্রোতাদি সূত্রকে পুষ্প, বেদমন্ত্রকে শলাটু (অপক্ক ফল) এবং জ্ঞানকে পঙ্কফল-নির্দেশ করিয়া- ছেন। আনন্দ আরও লিখিয়াছেন যে, শঙ্করাচাৰ্য পৃথিবীতে স্বর্গের কল্পতরু, ভূদেবগণের কামপ্রদ, বেদে ব্ৰহ্মকল্প, ষড়ঙ্গে গার্গসমান, বেদবাক্যের তাৎপৰ্যাৰ্থ-বিবেচনে বৃহস্পতিতুল্য, বৈদিক কর্মকাণ্ডের মীমাংসায় জৈমিনিসম এবং জ্ঞানকাণ্ডে ব্যাসসদৃশ। আচাৰ্য অনেক বিঘ্নে পতিত হইলেও বিদ্যা- শিক্ষায় বিরত হন নাই। এইরূপে বিবিধশাস্ত্রের পারদৃশ্য। হইয়া তিনি বহুসংখ্যক শিষ্যদিগকে নিগমাদি শাস্ত্রসনহের সদুপদেশ প্রদান করিতেন। এ স্থলে আমরা শঙ্করাচার্য্যের আবির্ভাবকাল নিরূপণ করিতে চেষ্টা করিব। প্রথমতঃ-মাধবাচাৰ্য শঙ্করাচার্যের জীবনচরিত লিখিয়াছেন। তিনি শঙ্করবিজয় গ্রন্থকে প্রাচীন বলিয়াছেন। মাধবাচাৰ্য ৫০০ বৎসরের লােক। শঙ্করাচার্য্য তাহার বহুদিন পূর্বে আবির্ভূত হইয়াছিলেন। দ্বিতীয়তঃ-বৈষ্ণবদিগের চতুঃসম্প্রদায়ের শ্ৰীসম্প্রদায়ের সংস্থাপক রামানুজ আচাৰ্য শঙ্করাচার্যের মত নিরাকরণ পূৰ্ব্বক স্বনাম-প্রসিদ্ধ বৈষ্ণব-সম্প্রদায় স্থাপন করিয়া বৈষ্ণব-ধৰ্ম্মের শ্রীবৃদ্ধির সূত্রপাত করেন। সুতরাং রামানুজ শঙ্করাচার্য্যের পরবর্তী তােক । স্মৃতিকাল-তরঙ্গের মতে রামানুজ ১০৪৯ শকাব্দে বর্তমান ছিলেন। বানান সাহেব Fu atitis &178 (Buchanan's Mysore, vol. II. 1.424.) উল্লিখিত শিল্পলিপির প্রমাণে রামানুজ ১০ ৫০ শকে বিদ্যমান ছিলেন। অতএব রামানুজ যে একাদশ শত শকাব্দীর লােক, অন্তভূত ৮৪ আৰ্য-জীবনী। । বঙ্গ- তাহা নিশ্চিত। সুতরাং শঙ্করাচাৰ্য্য রামানুজের পূর্বে প্রাদু- ভূত হইয়াছিলেন। তৃতীয়তঃ—তৈলঙ্গভাষা-রচিত কেরলােৎপত্তিনামক গ্রন্থের অনুসারে যৎকালে মলয়বর প্রদেশের রাজা শিওরাম, কৃষ্ণ- রাও নামক কোন রাজাকে যুদ্ধে পরাজিত করেন, তৎকালে শঙ্করাচাৰ্য মলয়বর দেশে বর্তমান ছিলেন। এই ঘটনা কিঞ্চিদধিক সহস্র বৎসর পূৰ্ব্বে ঘটিয়াছিল। সুতরাং শঙ্করা- চাৰ্য্য সহস্র বৎসরের লােক। চতুর্থতঃ-শঙ্করাচার্যের জন্মভূমিতে মলয়বর দেশের লােক দিগের মধ্যে প্রচলিত প্রবাদ আছে যে, তিনি সহস্রাধিক বৎসর পূৰ্ব্বে প্রাদুর্ভূত হইয়া ভারতবর্ষ উদ্ধার করিয়াছিলেন। দেশে গুরু-পরম্পরাশ্রুত মত এই যে, তিনি দ্বাদশ শত বৎসর পূৰ্বে জীবিত ছিলেন। ভারতবর্ষে সময়নিরূপণ করিতে প্রবাদ, কিংবদন্তী বা দেশের প্রচলিত মত বিশেষ উপযােগী। পঞ্চমতঃ-শঙ্করদিগ্বিজয়ের মতে শঙ্করাচাৰ্য কাশ্মীর দেশে গমন করিয়া সরস্বতীপীঠে কিয়ৎকাল অবস্থিতি করেন। এই সময়ে তিনি তত্ৰত্য স্বমতবিরােধীদিগকে পরাজিত করেন। রাজতরঙ্গিণীর চতুর্থ তরঙ্গে লিখিত আছে যে, ললিতাদিত্যের রাজত্বের শেষকালে গৌড়দেশ হইতে কতকগুলি পণ্ডিত কাশ্মীরস্থ সরস্বতীর মন্দির দর্শন করিতে আসিয়াছিলেন। ইহাদিগের সহিত কাশ্মীরস্থ লােকদিগের ধর্মসম্বন্ধীয় কোন কারণবশতঃ ঘাের বিবাদ হইয়াছিল। আমরা এই জীবনীর শেষভাগে দেখিব যে, শঙ্করাচাৰ্য গৌড়দেশীয় পণ্ডিতগণকে পরাজিত করিয়া কাশ্মীরে গমন করেন। সুতরাং রাজ- শঙ্করাচার্য্যের জীবনী। ৮৫ তরঙ্গিণীর পণ্ডিতেরা সম্ভবতঃ শঙ্করাচাৰ্য্য এবং তাঁহার শিষ্য- বৃন্দ। গৌড়দেশ দ্বারা এস্থলে বঙ্গদেশ বুঝিতে হইবে না; সার- স্বত, কান্যকুজ প্রভৃতিও পঞ্চ-গৌড় প্রদেশের অন্তর্গত ছিল। অতএব ইহা অত্যন্ত সম্ভবপর যে, শঙ্করাচাৰ্যই এই ঘাের বিবাদ ঘটাইয়াছিলেন। রাজতরঙ্গিণীর মতে ১১৩০ বৎসর পূৰ্বে ললিতাদিত্যের রাজ্যকাল। আচাৰ্য্য তৎকালের লােক। এই কয়েকটী প্রমাণ দ্বারা সহজেই বিনিগমনা করা যাইতে পারে যে, শঙ্করাচাৰ্য ন্যূনাধিক খ্ৰীষ্টীয় ৭০০ হইতে ৮০০ বৎ- সরের মধ্যে অর্থাৎ অষ্টম শতাব্দীতে প্রাদুভূত হইয়াছিলেন। এ বিষয়ে যখন সাক্ষাৎ কোন আলােক প্রাপ্ত হওয়া যায় না, তখন কেবল প্রতিফলিত আলােক এবং অন্যান্য কালনিরূ- পণােপায় দ্বারা যতদূর পারা যায়, ততদূর আচার্যের আবির্ভাব-কাল স্থির করিতে চেষ্টা করা গেল। অষ্টম শতাব্দী অথবা সপ্তম শতাব্দীর শেষভাগ যে আচার্যের প্রাদুর্ভাবকাল, তদ্বিষয়ে অনুকূল যুক্তি ভিন্ন প্রতিকূল কোন যুক্তি বা প্রমাণ দেখা যায় না। শঙ্করাচাৰ্য্য অল্পকালের মধ্যে নানাশাস্ত্রবিশারদ হইয়া উঠিলেন। আনন্দগিরি লিখিয়াছেন যে, আচাৰ্য্য সময়ে সময়ে সমবেত শিষমণ্ডলীকে উপদেশ দিতেন। তৎসময়ে তাহাকে উদয়াচলে বালভানুর ন্যায়, ব্রহ্মাণ্ড-গােল-কীলে ধ্রুব নক্ষত্রের ন্যায়, জনক-নৃপতি-কৃত দ্বাদশবার্ষিক সত্রে যাজ্ঞবন্ধের ন্যায়, পরীক্ষিৎ রাজার জ্ঞানবােধনকালে শুকদেবের ন্যায়, মেরুশিখরে তপশ্চৰ্য্যানিরত ব্যাসদেবের ন্যায়, রাম-কথা বর্ণনাকালে বাল্মীকির ন্যায়, ভাদ্যোপদেশ-সময়ে পতঞ্জলির ৬ আৰ্য-জীবনী। ন্যায়, দেবগণকে উপদেশদানকালে সুরাচার্যের ন্যায়, নারদ- ঋষিকে উপদেশদানকালে ব্রহ্মার ন্যায়, এবং যুধিষ্ঠিরকে তত্ত্ব উপদেশ দিবার সময়ে শ্রীকৃষ্ণের ন্যায় শােভাসম্পন্ন বােধ হইত। এইরূপে বহুশিষ্যকে উপদেশ দ্বারা ধন্য করিয়া অষ্টম বর্ষে তিনি শ্রীমৎগগাবিন্দ যােগীন্দ্রের সদুপদেশানুসারে পরমহংসত্ব স্বীকার করিলেন। এস্থলে জিজ্ঞাসা করা যাইতে পারে, ভগ- বান্ শঙ্করাচাৰ্য্য এরূপ অসঙ্গত কাৰ্য কেন করিলেন ? ব্রাহ্মণ- দিগের ব্রহ্মচর্য্যাদি আশ্রম-চতুষ্টয় ক্রমশঃ স্বীকার করিতে হইবে। শ্রুতি আছে যে, ব্রহ্মচর্য সমাপনপূৰ্ব্বক গৃহী হইবে, গৃহী হইয়া বনী (বানপ্রস্থাশ্রমী) হইবে, এবং বনী হইয়া প্রব্রজ্যাশ্রম গ্রহণ করিবে। এই আশ্রম-চতুষ্টয়ের ক্রমান্বয়ে অনুষ্ঠান করিলে মুক্তি হইবে। আচাৰ্য কেন ক্রমভঙ্গ করি- লেন? ইহার উত্তর এই যে, ব্রহ্মচর্যাদি আশ্রমের যে আশ্রমেই বিরাগ উৎপন্ন হইবে, সেই আশ্রম হইতেই প্রব্রজ্যাশ্রম স্বীকার করিতে পারা যায়। কি ব্রহ্মচর্য্য, কি গৃহস্থ, কি বান- প্রস্থ, যে অবস্থাতেই বিরাগ হইবে, সেই অবস্থাতেই প্রব্রজ্যা- শ্রম গ্রহণ করা যাইতে পারে। “যদহরেব বিরজেৎ তদহরেব প্রজেৎ”--যে দিন সংসারে বিরাগ জন্মিবে, সেই দিনেই পরমহংস হইতে পারিবে,—এই মত শঙ্করাচার্যের পূর্বে কেহ অবলম্বন করে নাই, তিনিই ইহা প্রথম প্রদর্শন করেন। অতএব আচাৰ্য যে প্রব্রজ্যা স্বীকার করিলেন, তাহা গহিত হয় নাই। অতি অল্প বয়সেই শঙ্করাচার্যের সন্ন্যাসধৰ্ম্ম স্বীকার করিবার আত্যন্তিকী ইচ্ছা হইয়াছিল ; কিন্তু মাতার অমত জন্য অভিলাষ চরিতার্থ করিতে পারেন নাই। যখনই

শঙ্করাচার্য্যের জীবনী ।
মাতার নিকট ঐ বিষয়ের জন্য প্রার্থনা করিতেন, তখনই
মাতা মেহপূর্ণ কাতরোক্তি দ্বারা তাহাকে লক্ষ্য হইতে নিরস্ত
করিতেন। কিন্তু মাতার অনেক অনুরােধেও বিবাহ করেন
নাই। তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত করিয়াছিলেন যে, মাতার
একবার কোনক্রমে অনুজ্ঞা লাভ করিতে পারিলেই সন্ন্যাসী
হইয়া ঈশ্বরের আরাধনায় এবং ধৰ্ম্মের চিন্তাতে জীবন ক্ষয়
করিবেন । সৰ্ব্বদাই সন্ন্যাস-ধৰ্ম্ম গ্রহণ করিবার উপায় অন্বে-
ষণ করিতে লাগিলেন, এবং কি সুযােগে মাতার অনুজ্ঞা লাভ
করিতে পারিবেন, ইহাই মনে মনে ভাবিতে লাগিলেন।
তাঁহার চিত্ত অস্থির হইল, সংসার বিষময় বােধ হইতে লাগিল,
কি উপায়ে পরমহংস হইয়া সুখী হইবেন, তাহাই অবিরত
চিন্তা করিতে লাগিলেন। অবশেষে বিধি অনুকূল হইল,
এবং তাহার সুখের দিবস সুপ্রভাত হইল। তিনি তাঁহার
মাতার সহিত স্বগৃহের নিকটে কোন আত্মীয়ের আলয়ে
গমন করিলেন। যাইবার সময় পথিমধ্যে একটা ক্ষুদ্র স্বল্পতােয়া
নদী পার হইয়া গিয়াছিলেন। ইতিমধ্যে বৃষ্টির জলে সে
নদীটী পরিপূর্ণ হইল। তাহারা যখন প্রত্যাগমন করেন
তপন দেখিলেন যে, নদী জলপূর্ণ, সহজে হাঁটিয়া পার হইবার
উপায় নাই। কিয়ৎকাল অপেক্ষা করিয়া জলের কিয়ৎ
হ্রাস হইলে পর তাঁহারা নদীর গর্ভে নামিলেন এবং পরপারে
যাইবার নিমিত্ত ক্রমশঃ পদব্রজে অগ্রসর হইতে লাগিলেন।
কিয়দ্র গমন করিয়া দেখিতে পাইলেন যে, অত্যন্ত জলবৃদ্ধি
হইয়াছে এবং তাঁহারাও ক্রমশঃ আকণ্ঠ জলে নিমগ্ন হইলেন।
তখন আর পূর্বপারে ফিরিয়া আবাির উপায় রহিল না।

৮ আৰ্য-জীবনী। জননি! তাঁহাদের জলমগ্ন হইয়া মরিবার উপক্রম ঘটিল। তখন শঙ্করাচাৰ্য্য স্বীয় প্রত্যুৎপন্নমতির বলে মাতাকে বলিলেন, যদি আপনি আমাকে সন্ন্যাস-ধৰ্ম্মগ্রহণে অনুজ্ঞা করেন, তাহা হইলে আমি করুণাময় ঈশ্বরের আরাধনা দ্বারা আমাদিগকে রক্ষা করিতে চেষ্টা করি, নতুবা উভয়কেই জল- মগ্ন হইয়া প্রাণ বিসর্জন করিতে হইবে। তাঁহার মাতা ভয়ে ভীতা এবং বিষম বিপদে বিল হইয়া সন্ন্যাস ধৰ্ম্মগ্রহণে পুত্রকে অনুজ্ঞা করিলেন। তখন শঙ্করাচাৰ্য দ্বিগুণবলের সহিত মাতাকে পৃষ্ঠদেশে আরােহণ করাইয়া নদীসন্তরণপূর্বক পরপারে উত্তীর্ণ হইলেন এবং ঈশ্বরের জয় প্রচার করিতে লাগিলেন। অনন্তর যথাসময়ে ভক্তির সহিত মাতার চরণার- বিন্দে প্রণাম এবং যথারীতি প্রদক্ষিণাদি করিয়া সন্ন্যাসধৰ্ম্ম গ্রহণ করিতে প্রয়াণ করিলেন। শঙ্করাচাৰ্য আৰ্য, বৌদ্ধ, জৈন প্রভৃতি নানাবিধ শাস্ত্র রীতিমত অধ্যয়ন করিয়াছিলেন। এই সমস্ত শাস্ত্রই তাহার নখদর্পণ ছিল। এই সমস্ত অধ্যয়ন করিয়া তিনি অদ্বৈত মত প্রচার করিতে বাসনা করিলেন। সত্যজ্ঞানানন্দময় এক- মাত্র ঈশ্বরই সত্য, এই পরিদৃশ্যমান জগৎ মায়াময় ; ঈশ্বরই জগতের উপাদান কারণ। যজপ রঞ্জুতে সর্পভ্রম এবং শুক্তিকাতে রজতভ্রম হইয়া থাকে, তদ্রুপ এই মিথ্যা মায়াপ্রপঞ্চমাত্র জগৎকে জগৎ বলিয়া ভ্রম হয়। জীবাত্মা এবং পরমাত্মার কোন প্রভেদ নাই। সত্যজ্ঞানানন্তলক্ষণ- লক্ষিত পরমাত্মার সম্যক্ সাক্ষাৎকারলাভ হইলে এই ভেদ- ভ্রান্তি বিদূরিত হইয়া জীবাত্মার মুক্তি হইবে। শঙ্করাচার্যের } শঙ্করাচার্যের জীবনী । ।।।।।।। অদ্বৈতমত এই জীবনীর উপসংহারকালে বিশদরূপে বিবৃত হইবে। শঙ্করাচার্যের এবংবিধ উপদেশপ্রভাবে বহুসংখ্যক শিষ্য শুদ্ধাদ্বৈতমতপরায়ণ এবং সদাচারতৎপর হইল। তিনি সকল- কেই কাম্য কৰ্ম্ম ত্যাগ করিয়া নিত্যকর্মের আচরণে প্রবৃত্ত হইতে এবং কর্মসমুদায় ব্রহ্মে অৰ্পণ করিতে উপদেশ দিতে লাগিলেন। তিনি কহিতেন, নিত্যকর্ম করিলে পরমেশ্বর তুষ্ট হইয়া অদ্বৈতজ্ঞান প্রদান করেন এবং নর মুক্ত হয়। আত্মার ইহলােকে এবং পরলােকে একরূপতাবশতঃ, প্রাণীর কর্মক্ষয় হইলেই দেহত্যাগ হয়, এবং এই দেহত্যাগই মুক্তি। যে দেশের লােক অদ্বৈতমতাবলম্বী, সেই দেশ পুণ্য- বৰ্ধন। হারা অদ্বৈতদর্শন-পর, তাহারাই মুক্ত। মূঢ় এবং দুঃখভােগী যাহারা অদ্বৈত মতের নিন্দা করে, তাহারা মাতৃনিন্দানির পামরদিগের ন্যায় নিরয়গামী হইয়া থাকে। ক্রমশঃ পদ্মাপাদ, হস্তামলক, সমিৎপাণি, চিদ্বিাস, জ্ঞানক, বিষ্ণুগুপ্ত, শুদ্ধকীৰ্ত্তি, ভানুমরীচি, কৃষ্ণদর্শন, ভানুমরীচি, কৃষ্ণদর্শন, আনন্দগিরি প্রভৃতি অনেক শিষ্য তাঁহার সেবা আরম্ভ করিলেন। ইহ'- দিগকে সমভিব্যাহারে লইয়া আচাৰ্য দ্বৈতবাদীদিগকে জয় করিতে নিষ্ক্রান্ত হইলেন। শঙ্করাচাৰ্য্য স্বশিষবর্গ সমভিব্যাহারে চিরস্থল হইতে দক্ষিণদিকে যাত্রা করিয়া মধ্যাৰ্জ্জুন নামক স্থানে উপস্থিত হইলেন। তথায় মধ্যাঞ্জুনেশ্বর নামে এক শিবলিঙ্গ প্রতি- ষ্ঠিত ছিলেন। তত্ৰত্য লােক সকল বিস্ময়াপন্ন হইয়া তাহার উপদেশগ্রহণপুৰ্ব্বক শুদ্ধাদ্বৈতমত অবলম্বন করিল। ক্রমে আৰ্য-জীবনী। । । । । ক্রমে তদ্দেশস্থিত সকল ব্রাহ্মণকে অদ্বৈতমত গ্রহণ করাইয়া শিষ্যসমেত তিনি সেতুবন্ধরামেশ্বরে গমন করিলেন। এখানে দেশীয় প্রবাদানুসারে পঞ্চসহস্রাধিক বৎসর পূর্বে শ্রীরামচন্দ্রের প্রতিষ্ঠিত রামেশ্বরাভিধেয় এক শিবমূৰ্ত্তি আছেন। শঙ্করাচাৰ্য্য বিবিধবিধানে রামেশ্বরের অর্চনা করিয়া সেই স্থানে মাদ্বয়- পরিমিতকাল অবস্থিতি করিলেন। তখন অদ্বৈতমতপরিপন্থী শৈব, রৌদ্র, উগ্র, ভট্ট, জঙ্গম ও পাশুপত নামে পরিচিত ষড়বিধ সম্প্রদায় শিবচিহ্নধারণপূৰ্ব্বক তাহার সকাশে আগমন করিয়া তাহাকে নানাজাতীয় প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল। তাহাদের প্রশ্নাবসানে তিনি ঐ সকল প্রশ্নের যথাযথ উত্তর প্রদান করিয়া তাহাদিগকে স্বমত উত্তমরূপে বুঝাইয়া দিলেন। অবশেষে লিঙ্গচিহ্নধারীদিগের নেতা বিদ্বেষবীর বারংবার আচার্য্যের পাদবন্দনা করত তদুক্ত আচার এবং উপদেশ শিরােধার্য্য করিয়া স্ববংশীয়, স্বদলীয়, ও স্বদেশীয় সকলকে অদ্বৈতমতগ্রাহী করিয়া সুথে বাস করিতে লাগিল । এবারে তদ্দেশ হইতে শিবমত নিরস্ত হইলে পর, পীঠা…নতৎপর, শুভ্রবিভূতি-বিভূষিতসৰ্বাঙ্গ, রুদ্রাক্ষমালা-পরি- শােভিতকণ্ঠশিরস্ক প্রতিপক্ষ চণ্ডভৈরব প্রভৃতি শৈবমতাবলম্বী- গণ আচার্যের সমীপে আগত হইল এবং স্বমতসমর্থনার্থে নানাশাস্ত্র হইতে বহুবিধ বচন উদ্ধত করিয়া শিবের সৰ্বোত্ত- মতা, সৰ্বাত্মকতা, সর্বকলুষনাশকতা করিতে লাগিল। তৎপশ্চাৎ রুদ্রের উপাসনা দ্বারাই মােক্ষ- সিদ্ধি হয় সিদ্ধান্ত করিয়া ব্রাহ্মণদিগের লিঙ্গবিভূতি প্রভৃতি চিহ্নধারণ অবশ্যকর্তব্য সপ্রমাণ করিল। শঙ্করাচাৰ্য তাহা প্রভৃতি প্রমাণিত শঙ্করাচার্যের জীবনী। A\/\\\/\/\/\/\/\\ দিগের মতনিরসন করিয়া তাহাদিগকে উপদেশ দিলেন যে, “তােমরা এক্ষণে পামরবুদ্ধি পরিত্যাগপূৰ্ব্বক লিঙ্গাদি চিহ্ন বর্জন করিয়া বেদাদিষ্ট কৰ্ম্মনিবহ ঈশ্বরে সমৰ্পণ করিতে শিক্ষা কর এবং জীবাত্মা ও পরমাত্মার ঐক্যানুসন্ধান করত জন্ম-মরণ-প্রবাহের উৎসস্বরূপ অজ্ঞানের নিবৃত্তি করিয়া লিঙ্গদেহভঙ্গদ্বারা মুক্তিলাভ করিতে চেষ্টা কর।” ইহা শ্রবণ করিয়া তাহার পরমগুরু শঙ্করকে অভিবাদনপুরঃসর সপরিবারে ও সবান্ধবে লিঙ্গধারণরীতি পরিহারপূৰ্ব্বক সম্যক উপদিষ্ট শুদ্ধাদ্বৈতমত স্বীকার করিল। এই প্রকারে আচার্যের শৈবমনিবহণ সমাপ্ত হইল। তদনন্তর তিনি অনন্তশয়নাখ্য স্থানে যাত্রা করিলেন। অনন্তশয়নে অনন্তনামে এক বিষ্ণুমুর্তি সংস্থাপিত ছিলেন। স্বশ্যিগণের সহিত তথায় এক মাস কাল বাস করিলেন। তথায় ভক্ত, ভাগবত, বৈষ্ণব, পঞ্চরাত্র, বৈখা- নস এবং কর্মহীন এই ষড় বিধ বৈষ্ণব-সম্প্রদায় ছিল। ইহারা জ্ঞান ও ক্রিয়াভেদে আবার দ্বাদশবিধ। অনন্তদেবের চরণ- দর্শন ও সেবাকে ইহারা কৰ্ম্ম বলিত এবং তাহার আশ্রয়ে স্থিরভাবে অবস্থানকে জ্ঞান বলিত। অনন্তদেবের পাদপদ্ম ইহাদের একমাত্র শরণ ও আশ্রয়। আচাৰ্যকর্তৃক পৃষ্ট হইয়া ইহারা নিজ নিজ মত ব্যাখ্যা করিলে পর, তিনি ইহাদের মত খণ্ডন করিয়া বলিলেন “তােমরা ব্রাত্য ও ধৰ্ম্মের বহিষ্কৃত ; অতএব আমাদিগকে তােমাদের সংসর্গে দূষিত করিও না, এ স্থান হইতে দূর হও।” আচার্যের এই তিরস্কার নিশমন করিয়া তাহার করুণস্বরে তাহাকে বলিতে লাগিল “যতিনাথ । আমাদের সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করুন” এবং দণ্ডবৎ প্রণাম ৯২ আৰ্য জীবনী মৃত করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে স্থাণুবৎ নিশ্চলভাবে দণ্ডায়মান হইয়া রহিল। তাহাদিগকে শরণাগত দেখিয়া তিনি হস্তামলক- প্রমুখ শিষদিগের হস্তে তাহাদিগকে অর্পণ করিয়া তাহাদিগের প্রায়শ্চিত্তবিধান করিতে আজ্ঞা করিলেন। প্রায়শ্চিত সম্পাদনান্তে তিনি তাহাদিগকে সদুপদেশদানপূর্বক অদ্বৈত- মতাবলম্বী করিলেন। এইরূপে বৈষ্ণবসম্প্রদায়সমূহের খণ্ডন করিয়া এবং তাহাদিগকে স্বমতে আনিয়া তিনি অনন্ত- শয়ন হইতে পশ্চিমাশামুখে প্রস্থান করিলেন; এবং পঞ্চদশ দিবস পৰ্যটন করিয়া স্বশিষ্যগণ সহিত সুব্রহ্মণ্য দেশে উপনীত হইলেন। সুব্রহ্মণ্যপ্রদেশে উপস্থিত হইয়া শঙ্করাচাৰ্য তত্ৰত্য কুমার- ধারানদীতটে বাসস্থান নিবেশিত করিলেন । কুমারধারা দক্ষিণাবর্তে মৈসুরপ্রদেশস্থিত সাগরবাহিনী নদীবিশেষ। সুব্ৰহ্মণ্যে কুমারদেবের এক মন্দির ছিল। এ স্থলে হিরণ্যগর্ভ, অগ্নি এবং সূর্যের উপাসকদিগের সহিত তাহার আত্যন্তিক বিচার হয় এবং তাহারা বিচারে পরাজিত হইয়া তাহাকে নমস্কারপূর্বক অদ্বৈতমত আশ্রয় করে। তদনন্তর ত্রিসহ- শিষ্যপরিবৃত হইয়া তিনি বায়ুকোণে চলিলেন। তদীয় শিষ্যগণ শঙ্খ, ঘণ্টা, করতাল প্রভৃতি বাদ্যের ধ্বনি দ্বারা দিত্মণ্ডল আঘাত করিয়া চামরপিচ্ছাদি দ্বারা আচাৰ্য্যকে ব্যজন করিতে করিতে ক্রমাগত বায়ুকোণে অগ্রসর হইতে লাগিল। মার্গস্থিতদেশবাসিবিপ্রগণ অদ্বৈতমত গ্রহণ করিল। অবশেষে তিনি গণবরপুরে আগমন করিলেন এবং কৌমুদী নদীতে স্নান করিয়া তত্তীরে' প্রতিষ্ঠিত গণপতিদেবের মন্দিরে একমাস শঙ্করাচার্যের জীবনী। বিশ্রাম করিলেন। এই সময়ে তাঁহার পদ্মপাদপ্রভৃতি প্রয়ো- দশজন শিষ্য দিগগজ উপাধি প্রাপ্ত হইলেন; এবং সকলে মিলিয়া মহাসমারােহে তাঁহার স্তুতি করিলেন। তথায় তিনি গাণপত্যদিগকে অদ্বৈতমত গ্রহণ করাইয়া ভবানীনগরে প্রয়াণ করিলেন। এই স্থানে এক মাস অবস্থিতিপূৰ্ব্বক ভবানীভক্ত, কমলাভক্ত, শারদাভক্ত এবং বামাচাপরায়ণ শাদিগকে স্বমতচ্যুত করিয়া অদ্বৈতমতে আস্থাবান্ করি- লেন। অনন্তর তিনি উত্তর দিকে প্রস্থান করিয়া উজ্জয়িনী নগরে সমুপস্থিত হইলেন। তখন উজ্জয়িনী কাপালিক- দিগের কেন্দ্রভূমি। উজ্জয়িনী নগরে দুই মাস বাস করিয়া তিনি কাপালিক, চার্বাক, জৈন এবং বৌদ্ধমত নিরাকৃত করিলেন। এই বৌদ্ধমত শাক্যসিংহপ্রচারিত মত হইতে বিভিন্ন প্রকার। শবরনামক বৌদ্ধ তাহাকে বলিল “অদ্বৈত- মত শশবিষাণবৎ অসম্ভব, সুতরাং অগ্রাহ। মনুষ্য আজী- বন নানারূপে অন্নপানাদি দ্বারা আত্মাকে চরিতার্থ ও পরিতৃপ্ত করিবে এবং মৃত্যুর পর মুক্তিলাভ করিবে। পরকাল লইয়া মস্তিষ্কবিলােড়ন করিবার প্রয়োজন নাই। যাহা দেখিতেছ, তদনুসারে কাৰ্য্য কর। সুখে স্বচ্ছন্দে জীবনযাপন কর এবং আনন্দানুভব দ্বারা জীবন সফল কর। দেহপাত হইলেই মােক্ষাবাপ্তি হইবে।” আচাৰ্য তাহাকে বুঝাইয়া দিলেন “দেহধ্বংস হইলে মুক্তি হইতে পারে না, কারণ পরলােক- গমন শাস্ত্রে উক্ত আছে। অতএব জ্ঞান ব্যতিরেকে মুক্তির আর কোন উপায় নাই। সৰ্ব্বভূতে আত্মদর্শন এবং আত্মাতে সৰ্ব্বভূতদর্শন দ্বারাই পরমব্রহ্মপ্রাপ্তি হয়। এক্ষণে মূঢ়বুদ্ধিত্যাগ ৯৪ অৰ্য্য-জীবনী। . .।।। ।।।।।।।।।।।। ।। ••• • • করিয়া অদ্বৈতমতগ্রহণ দ্বারা সুস্থ হও।” কাপালিকদিগের মতে কৰ্ম্মদ্বারা মুক্তি হয় না। সুতরাং তাহারা কর্মহীন। তাহারা মদ্যপায়ী, স্ত্রীজাতির মর্যাদাহন্তা এবং বেদাদিশাস্ত্রের অবজ্ঞা। তাহারা সংহারভৈরবের উপাসক। তাহারা কদৰ্যাচাপরায়ণ এবং দুষ্টযুক্তিশীল। উন্মত্তভৈরবাভিধান জনৈক শূদ্ৰজাতীয় কাপালিক শঙ্করাচার্য্যের সহিত বিচার- প্রার্থনা করিলে, তিনি তাহাকে বলিয়াছিলেন “রে বব্বর! দূরী ভব, তােরে আমার কি প্রয়ােজন ? দুষ্টব্রাহ্মণদমন আমার মুখ্য উদ্দেশ্য। আমি দুষ্টমতাবলম্বী ব্রাহ্মণদিগকে দণ্ডবিধানপূৰ্ব্বক সৎপথে আনয়ন করিতে আসিয়াছি। অপর জাতিরা ব্রাহ্মণের অনুসরণ করিবে। চার্বাক মত- বলম্বী বিচারে বিজিত হইয়া আচার্য্যের পুস্তকাদিবাহক হইয়াছিল। চার্বাক এই ভাবে নিজমত ব্যাখ্যা করিয়াছিল— “শরীরের লয়ই মােক্ষ, মৃত্যুই মুক্তি ; ভস্মীভূত দেহের পুনরা- গমন হইতে পারে না; স্বর্গ ও নরক পার্থিব সুখ ও দুঃখ ভিন্ন কিছুই নহে; মৃত ব্যক্তির উদ্দেশে শ্রাদ্ধাদি নিষ্ফল অতএব জীবিতকালে কেবল আনন্দেই রত থাকিবে।” জৈনধর্মাবলম্বী বলিল “জিনদেব সকলের মুক্তিদাতা এবং সৰ্বপ্ৰাণীর হৃদয়ে আত্মরূপে অবস্থিত আছেন—ইত্যাকার জ্ঞান দ্বারা দেহনাশের পরেই মুক্তি হয়। জীব শুদ্ধ, দেহ কেবল মলপিণ্ড, জীবের সৎকর্মের প্রয়ােজন নাই।” তদনন্তর আচাৰ্য্য উজ্জয়িনী পরিত্যাগ করিয়া বায়ুকোণে যাত্রা করিলেন এবং কিছুকাল ব্ৰজ্যানন্তর অনুমল্লনগরে মল্লারিদেবের উপাসক- দিগকে, মরুন্ধপুরে বিশ্বসেন ও কামদেবের উপাসকদিগকে, ।

শঙ্করাচার্যের জীবনী। করিলেন। মাগধপুরে কুবেরভক্তগণকে, ইন্দ্রপ্রস্থনগরে ইন্দ্রভক্তদিগকে, যমপ্রস্থপুরে যমােপাসকদিগকে এবং প্রয়াগনগরে বরুণ বায়ু প্রভৃতির উপাসকবর্গকে পরাস্ত করিয়া অদ্বৈতমতে আনয়ন প্রয়াগনগরে সাংখ্য এবং যােগমতাবলম্বীরা তাহার সহিত বিচারে পরাজিত হইয়া অদ্বৈতমতগ্রহণ করিয়া- ছিল। তথা হইতে তিনি কাশীতে উপনীত হইলেন এবং কৰ্ম্মমত, চলমত, গ্রহমত, গরুড়মত, সিদ্ধমত, গন্ধৰ্ব্ব মত, ভূতবেতালমত প্রভৃতির (৪) নিরাস করিয়া বিপথগামী নানা- দুষ্টমতানুযায়ী ব্যক্তি ও সম্প্রদায় সকলকে স্বদলাক্রান্ত করি- লেন। এইরূপে অদ্বৈতমতের উপাসকসংখ্যা বৃদ্ধি করিয়া তিনি বারাণসী নগরীতে বাস করিতে লাগিলেন। এই বারাণসীতে (৫) তাঁহার ব্যাসের সহিত সাক্ষাৎ ও বিচার হয় । এক দিন মধ্যাহ্নকালে মণিকর্ণিকার ঘাটে শঙ্করাচার্য্য স্নানানন্তর নিদিধ্যাসন করিতেছেন। এমন সময়ে ভগবান ব্যাস একটী স্থবির ব্রাহ্মণের ন্যায় আগমন করিয়া শঙ্করা- চার্য্যের ষট্‌সহস্ৰ শিষ্য দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন ইনি কে ? - (৪) যাহারা এই সকল মতের বিশেব বিবরণ জানিতে ইচ্ছা করেন, তাহারা ১৮০১ শকের তত্ত্ববােধিনী পত্রিকার দশমকল্পে প্রথমভাগের ৪৩, ৪৩৪ সংখ্যাতে তাহা পাইবেন। সাধারণ পাঠকের বিরক্তিকর হইবে বলিয়া এই সকল মতের বিশেষ বিবরণ পরিত্যক্ত ৪৩৩ হইল। (৫) বারাণসীনাম এক্ষণে বাণারসীনামে পরিবর্তিত হইয়াছে। বাণারসী অনুসারে ইংরাজী বেনারস (Benares )। ১০০০ খ্রীষ্টাব্দের অধস্তন সংস্কৃত গ্রন্থে বাণারসীম দৃষ্ট হয়। শত্রুঞ্জয়মাহাত্মে এবং বিক্রম- দেবচরিতে বারাণসী পাঠের পরিবর্তে বাণারসী পাঠ আছে। ইহা লিপিকরপ্রমাদ বলিয়া বােধ হয় না।

আর্য-জীবনী। শিষেরা তাহাকে বলিল, ইনি পরম গুরু শঙ্কর, ইনি সেতুবন্ধ প্রভৃতি প্রদেশস্থ কুমতাবলম্বী ব্রাহ্মণদিগকে দমন করিয়া দিগ্বিজয়-প্রসঙ্গে এক্ষণে কাশীতে উপস্থিত হইয়াছেন। ইনি ব্রহ্মপুত্রের তাৎপৰ্য বিনির্ণয় করিয়াছেন এবং অদ্বৈতমতা- বলম্বী। তখন ব্যাস শঙ্করের নিকট উপসৰ্পণপূর্বক তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কি ব্রহ্মসূত্ৰ-ব্যাখ্যা করিয়াছ ? বল দেখি, কোন স্থলে তােমার ব্যাখ্যা করিতে অত্যন্ত কষ্ট হই- আছে ? শঙ্কর বলিলেন, হে বিপ্র ! তুমি কোন স্থল বুঝিতে পার নাই তাহা বল, আমি অর্থ করিয়া দিতেছি। বৃদ্ধ “তদন্তরপ্রতিপতো রংহতিসম্পরিদ্বক্তঃ প্রশ্ননিরূপণাভ্যাং” এই ৩১১১ সূত্রের তুমি কি অর্থ করিয়াছ? শঙ্কর একরূপ অর্থ করিলেন, বৃদ্ধ আর একরূপ অর্থ করিলেন। শঙ্করাচাৰ্য্য জানিতেন না যে, ঐ ব্যক্তি বৃদ্ধ ব্যাস। উভয়েই বাদানুবাদ করিতে করিতে উষ্ণ হইতে লাগিলেন। অবশেষে শঙ্করা- চাৰ্য ব্যাসকে বলিলেন ‘তুমি ইহার তত্ত্ব কিছুই বুঝ না, এবং এই বলিয়া তাহার কপােলদেশে এক চপেটাঘাত করি- লেন। কপােলতাড়ন করিয়াই পদ্মপাদকে বলিলেন, এই বৃদ্ধকে দূর করিয়া দেও। বৃদ্ধ এই কথা শ্রবণমাত্র আপনি শীঘ্র দূরে চলিয়া গেলেন। পদ্মপাদ তখন গুরুকে প্রণামপূর্বক বলিলেন, প্রভাে! “শঙ্করঃ শঙ্করঃ সাক্ষাৎ ব্যাসাে নারায়ণঃ মৃতঃ। তয়ােৰ্বিবাদে সপ্রাপ্তে কিঙ্করঃ কিং করােম্যহম্ ॥” --আপনি সাক্ষাৎ শঙ্কর, ব্যাস নারায়ণ, 'আপনাদিগের বিবাদ উপস্থিত হইলে, 'আমি কিঙ্কর কি করিব। তখন ।

শঙ্করাচার্য্যের জীবনী। ৯৭ 1 /\/\/\/\/\/\/\/\/\/\/ শঙ্করাচাৰ্য অনেক আরাধনা করিয়া ব্যাসকে প্রত্যাবৃত্ত করি- লেন এবং তাহাকে অর্চনাপূর্বক তাঁহার আশীর্বাদ গ্রহণ করিলেন। ব্যাস প্রসন্ন হইয়া অদ্বৈতবাদের সর্বত্র জয় হইবে এবং তােমার শত বর্ষ পরমায়ুলাভ হইবে বলিয়া শঙ্করা- চাৰ্য্যকে আশীর্বাদ করিলেন। এ স্থলে বলা আবশ্যক যে এই ব্যাস কৃষ্ণদ্বৈপায়ন নহেন। কাণীতে প্রথম ব্যাসের সময়াবধি বরাবর এক এক জন ব্যাস আছেন। ব্যাস উপাধি- মাত্র। এক্ষণেও কাশীতে হরেকৃষ্ণ বেদব্যাসনামে এক জন ব্যাস অবস্থিতি করিতেছেন। কিন্তু অনেকে মনে করেন যে, স্বয়ং কৃষ্ণদ্বৈপায়নই শঙ্করের সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছিলেন। শঙ্করবিজয়ে এমন কোন বাক্য দৃষ্ট হয় না যে, ব্যাসকে দ্বৈপা- -য়ন বলিয়া স্থির করা যাইতে পারে। আনন্দগিরি কিন্তু যে কি বুঝিয়াছিলেন তাহা আমরা বলিতে পারি না। তাঁহার লিখিত বিজয়ে তিনি কিছুই স্পষ্ট করিয়া লিখেন নাই। তাঁহার এরূপ সংস্কার থাকিতে পারে যে, ব্যাস চিরকাল বৰ্ত্ত- মান এবং সেই ব্ৰহ্মসূত্ৰকৰ্ত্তা ব্যাসই আসিয়াছিলেন। আমরা তাহা বলিতে পারি না, যেহেতু তাহাতে সময়গত দোষ উপস্থিত হয়। ব্যাস চারি সহস্র বৎসর পূর্বে জীবিত ছিলেন, আর শঙ্কর এক সহস্র বৎসর পূর্বে কাশীতে উপস্থিত হন। সুতরাং ইনি তৎকালিক ব্যাস বলিয়া মীমাংসা সমীচীন বােধ হয় । কাশী হইতে উদীচীমুখে প্রস্থান করিয়া শঙ্কর অমরলিঙ্গ, কেদারলিঙ্গ নামে শিবমূর্তিদ্বয়দর্শনপূৰ্ব্বক কুরুক্ষেত্রে সমাগত হইলেন এবং কুরুক্ষেত্ৰসন্দর্শনানন্তর বদরিকাশ্রমে সমুপস্থিত

৯৮
আৰ্য-জীবনী
হইয়া তত্ৰত্য বদরীনারায়ণ দর্শন করিলেন। সে স্থানে
উষ্ণপ্রস্রবণের জলে স্নান করিয়া আচাৰ্য স্নিগ্ধ হইলেন এবং
দ্বারকাদি দিব্যস্থল ভ্রমণ করিয়া অমােধ্যানগরীতে আগমন
করিলেন। অযযাধ্যা হইতে গয়া, গয়া হইতে গঙ্গা, গঙ্গা
হইতে জগন্নাথক্ষেত্রে গমন করিলেন। সেই প্রদেশে আচার্য্য
এক মাস বাস করিলেন। ইতিমধ্যে রুদ্ধাখ্যপুর হইতে
ব্রাহ্মণেরা তাঁহার নিকটে সমাগত হইয়া নিবেদন করিল যে,
ভট্টাচাৰ্য্য নামক জনৈক পণ্ডিত উত্তরদেশ হইতে আসিয়া
বৌদ্ধ ও জৈনদিগকে পরাস্ত করিয়া উহাদের শিরশূেদন
করিয়াছেন এবং উহাদিগের মস্তক উদূখলে চূর্ণ করিয়াছেন।
অবশেষে তিনি কোন জৈন গুরুর নিকটে পরাজিত হইয়া
কিছু উপদেশ লাভ করিয়া নিৰ্ব্বেদাপন্ন হইয়াছেন। ইহা
শুনিয়া শঙ্কর সাতিশয় কৌতূহলাক্রান্ত হইয়া রুদ্ধাখ্যপুরে গমন
করিলেন এবং তথায় উপস্থিত হইয়া শুনিলেন যে, ভট্টাচাৰ্য্য
“আমি জৈন বধ করিয়া কি সর্বনাশ করিয়াছি, যখন জৈনের
নিকটে শিক্ষালাভ করিলাম, তখন জৈন আমার গুরু হইল,
সুতরাং গুরুবধ করিয়াছি” এই ভাবিয়া বিজন প্রদেশে
হােমাগ্নি দ্বারা দেহপাত করিতে সংকল্প করিয়াছেন। তখন
তাঁহার দর্শনার্থ শীঘ্র গমনপূৰ্ব্বক তাহার সমীপে উপস্থিত
হইয়া দেখিলেন যে, ভট্টাচার্যের জানুপৰ্যন্ত দগ্ধ হইয়াছে।
শঙ্করাচাৰ্য ভট্টকে সম্বােধন করিয়া বলিলেন “হে দ্বিজ ।
তুমি অজ্ঞানতঃ এই অবস্থা প্রাপ্ত হইয়াছ, তুমি গূঢ় বেদার্থ
পরিজ্ঞাত নহ।” ইহা শুনিয়া ভট্ট জিজ্ঞাসা করিলেন “তুমি
কি নূতনতর বৌদ্ধ ?” “শঙ্কর উত্তর করিলেন “আমি বৌদ্ধ

শঙ্করাচার্যের জীবনী। ৯৯ •••• • • • •"fnWd, নহি অদ্বৈত-মত-প্রচারক শঙ্করাচাৰ্য।” তখন ভট্ট বলি- লেন “যদি তােমার এতই বাদকওয়া (চুলকানি) হইয়া থাকে, তবে আমার ভগিনীপতি মণ্ডনমিশ্রের নিকট গমন কর এবং তাহার সহিত বাদানুবাদ করিয়া কয় য়া-নিবৃত্তি কর। আমি এই অবস্থায় পরলােকে চলিলাম,” এই বলিয়া ভট্টাচাৰ্য্য নিমীলিতাক্ষ হইলেন এবং প্রাণ পরিত্যাগ করিলেন। ভট্ট একজন কৰ্ম্মকাণ্ডাবলম্বী ছিলেন তৎপরে শঙ্করাচাৰ্য্য রুদ্ধাখ্যপুরস্থ সমুদয় লােকদিগকে অদ্বৈত মত গ্রহণ করা- ইয়া তথা হইতে মণ্ডনমিশ্রের উদ্দেশে উত্তরদিকে প্রয়াণ করিলেন। পদ্মপাদ প্রভৃতি শিষ্যগণ ঢক্কা, শঙ্খ, করতাল প্রভৃতি বাদ্য দ্বারা এবং আচার্যের জয়শব্দ দ্বারা দিহস্তী- দিগের কর্ণকুহর বধির করিয়া চলিলেন। অনন্তর শঙ্করাচাৰ্য উত্তর দিক্‌ অবলম্বনপূৰ্ব্বক হস্তিনা- পুরের আগ্নেয় কোণে বিজিবিন্দু নামে প্রথিত বিদ্যালয়- স্থলের সন্নিহিত এক তালবনে আসিয়া উপনীত হইলেন। এই তালবনে মণ্ডনমিশ্রের নিবাস। ইনি একজন সুদক্ষ কর্মকাণ্ডাবলম্বী এবং জ্ঞানকাণ্ডবাদীদিগের ঘাের বিপক্ষ। ইনি পঞ্চশত শিষদিগকে দিগ্বিজয়ে সমর্থ করিয়াছিলেন। মণ্ডনমিশ্রের আলয়ে দাস দাসী ও শুক সারিকা পৰ্যন্ত সকলে সংস্কৃত শ্লোক বলিতে পারিত। শঙ্করাচাৰ্য মণ্ডনমিশের গৃহের সম্মুখে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন যে, কবাট রুদ্ধ রহিয়াছে এবং শুনিলেন যে, মন- মিশ্র শ্রাদ্ধ করিতেছেন। প্রাণায়ামবলে শূন্য মার্গ দিয়া আচাৰ্য ভিতরে প্রবেশ করিয়া মণ্ডনমিশ্রের সন্নিহিত হই- আৰ্য-জীবনী লেন। সন্ন্যাসিদৰ্শনে মণ্ডনমিশ্র কোপাকুলিতচিত্ত হইয়া বলিলেন, আঃ! এ মুণ্ডী আবার কোথা হইতে আসিল ? ক্ষণকাল উভয়ে উত্তর প্রত্যুত্তর হইল। অবশেষে ব্যাসের বাক্যানুসারে মণ্ডনমিশ্ৰ আচাৰ্যকে পাদ্য প্রদান করিলেন। মগুনমিশ্র শ্রাদ্ধে ব্যাসকে নিমন্ত্রণ করিয়াছিলেন; আনন্দগিরি বলেন যে, মিশ্র মন্ত্রশক্তিবলে ব্যাসকে তথায় আনয়ন করিয়াছিলেন। পাদ্য-গ্রহণ-কালে আচার্য্য বলিলেন “বিচা- রের নিমিত্ত আসিয়াছি।” মিশ্র উত্তর করিলেন “ভােজনান্তে বিচার করিব।” বাদের বিচারের) পণ হইল যে, যিনি পর- জিত হইবেন, তিনি স্বমত ত্যাগপূৰ্ব্বক বিজেতার মত অব- লম্বন করিবেন। মিশ্ৰপত্নী সরসবাণী উভয়পক্ষ-গ্রহণ-সমর্থ মধ্যস্থ রহিবেন। প্রসিদ্ধি আছে যে, মণ্ডনমিশ্র স্বয়ং ব্রহ্মা এবং সরসবাণী ব্ৰহ্মপত্নী সরস্বতী । নিগমাদি সৰ্ববিদ্যা- প্রসঙ্গে শত দিন বিচার হইল। শত দিনের পরে সরসবাণী মণ্ডনমিশ্রকে বলিলেন “নাথ ! আসুন, ভিক্ষাৰ্থ গমন করি”। মণ্ডনমিশ বিচারে পরাস্ত হইয়া শঙ্করাচার্যের চরণে প্রণতি- পুরসর তদুপদেশানুসারে সন্ন্যাসী হইয়া উত্তর দিকে গমন করিলেন। সরসবাণী দেখিলেন যে, পতি সন্ন্যাসা- শ্রম স্বীকার করিয়া যতি হইলেন এবং তাঁহাকে পতির জীবিতাবস্থাতেই বিধবা হইতে হইল। এই দুঃখে তিনি ব্ৰহ্মলােকে গমন করিতে উদ্যত হইলেন। শঙ্করাচার্য্য তাহাকে বলিলেন “সরসবাণি, তুমি ব্ৰহ্মশক্তি এবং মণ্ডন- মিশ্রের পত্নী। আমার সহিত বিচার না করিয়া তুমি যাইতে পারিবে না। অতএব আমার নিকটে পরাভব

শঙ্করাচার্য্যের জীবনী।
স্বীকার কর।” সরসবাণী বিচার আরম্ভ করিলেন এবং
প্রথমে কামশাস্ত্রে নায়িকানায়কপ্রপঞ্চের আলাপ করিলেন।
শঙ্করাচার্য্য কামশাস্ত্র পাঠ করেন নাই, সুতরাং তাহার
প্রশ্নের উত্তর করিতে পারিলেন না। তখন আচার্য্য
বলিলেন “মাতঃ ! আপনি ছয় মাস কাল অপেক্ষা করুন,
আমি কামকলা শিক্ষা করিয়া আসিতেছি।” এই বলিয়া
তিনি কামশাস্ত্র শিক্ষা করিতে বহির্গত হইলেন এবং
পশ্চিম দিকে গমন করিতে করিতে দেখিলেন যে, এক
রাজার মৃত দেহ চিতার উপর নিহিত রহিয়াছে। তখন
সেই পুরের প্রান্তভাগে স্থিত এক গিরিগহ্বরে নিজদেহসংস্থঃ-
পনপূর্বক স্বশিদিগকে তাহার রক্ষণে নিয়ােজিত করিয়া
পর-শরীর-প্রবেশ-বিদ্যা-প্রভাবে রাজার দেহমধ্যে প্রবেশ
করিলেন। তদনন্তর রাজপুরে রাজ্ঞীর নিকটে কামশাস্ত্র
শিক্ষা করিলেন। রাজ্ঞী অতিশয় চতুরা, রাজার আচার ব্যবহার
দেখিয়া তাহার সন্দেহ জন্মিল এবং তিনি তৃত্যগণকে আজ্ঞা
করিলেন “দ্বাদশ যােজনের মধ্যে নদী, গিরিগুহা, দেবালয়
প্রভৃতি যে কোন নিভৃত স্থানে কোন মৃত দেহ দেখিতে
পাইবে, তাহা আনিয়া দাহ কর।” ভৃত্যগণ অনেক
অন্বেষণ করিয়া শঙ্করাচার্যের মৃত দেহ প্রাপ্ত হইল এবং
তাহ দাহ করিতে লইয়া চলিল। তাঁহার শিষ্যগণ রাজার
সকাশে . আগমনপূর্বক তাহাকে উদ্বোধন করিতে লাগিল।
তখন শিষকর্তৃক উদ্বোধিত হইয়া শঙ্করাচাৰ্য মুচ্ছিত
হইলেন এবং রাজদেহ বিসৰ্জন করিয়া স্বদেহান্বেষণ করিতে
লাগিলেন। শঙ্করাচাৰ্য্য সূক্ষ্ম শরীরে স্থূল শরীর অন্বেষণ

অৰ্য্য-জীবনী ।
।।
করিয়া চিতার উপর উহা প্রজ্বলিত দেখিতে পাইলেন এবং
কপালমধ্য দিয়া দেহে প্রবেশপূৰ্ব্বক চিতা হইতে লক্ষ
দিয়া ভূমিতে পড়িলেন। নৃসিংহদেব অমৃতবৃষ্টি দ্বারা তাঁহার
আরােগ্য সাধন করিয়া “সৰ্বলােক জয় কর” এই আশীৰ্বাদ
করিয়া তিরােধান করিলেন। তৎপরে শঙ্করাচাৰ্য সত্বর
মণ্ডনমিশ্রভবনে প্রত্যাগমনপূর্বক সরসবাণীর নিকটে
উপনীত হইলেন এবং বিচারপ্রার্থনা করিলেন। সরসবাণী
অশ্লীল আলাপ হইবার শঙ্কাবশতঃ নিজের পরাভব স্বীকার
করিলেন। এই প্রকারে সরসবাণীকে জয় করিয়া শঙ্করা-
চাৰ্য তাহাকে মন্ত্রবদ্ধ করিলেন এবং তুঙ্গভদ্রা নদীতীরে
প্রতিষ্ঠিত শৃঙ্গপুরে গমন করিলেন। এই স্থানে এক
মঠ নিৰ্মাণ করিয়া সরস্বতীকে কহিলেন “তুমি আমার
মঠে চিরকাল স্থির হইয়া অবস্থিতি কর।” এই মঠ
অদ্যাপি শৃঙ্গগিরি বা সিংহারি নামে প্রথিত। অনন্তর
তথায় বিদ্যাপীঠ নিৰ্মাণ করিয়া ভারতীসম্প্রদায় স্থাপন
করিলেন। অত্ৰত্য শিষমণ্ডলীর ভারতী নাম প্রদান
করিলেন। ভারতীসম্প্রদায়ের সন্ন্যাসিগণ সর্বাপেক্ষা অধিক
পূজনীয়; ইহাদের মধ্যে মূখ সন্ন্যাসী ছিল না। সন্ন্যাসী
তিন প্রকার—ভারতী, গিরি ও পুরী । অনেকে বলেন যে,
শঙ্করাচাৰ্য ভারতীসম্প্রদায়, গিরিসম্প্রদায়, পুরীসম্প্রদায়, এই
তিন সম্প্রদায়ই সংস্থাপিত করেন। কিন্তু আনন্দগিরির
বিজয়ে ভারতীসম্প্রদায়ের মাত্র উল্লেখ আছে। আনন্দগিরি
গিরিসম্প্রদায়ের লােক ছিলেন। ভারতী ও গিরিসম্প্রদায়ের
মহান্ত সকল ভারতবর্ষের অনেক স্থলে দৃষ্ট হয়। তারকে
;

শঙ্করাচার্যের জীবনী। ১০৩ শ্বরের মহান্ত গিরিসম্প্রদায়ের লােক, কিন্তু তাহার দশনামার মধ্যে দুই তিন জন ভারতীও আছে। পুরীসম্প্রদায় আমরা অবগত নহি। শৃঙ্গগিরি মঠে দ্বাদশ বৎসর অবস্থান করিয়া এবং নিজ অন্তেবাসী সুরেশ্বরাচাৰ্য্যকে বিদ্যাপীঠের অধ্যক্ষ করিয়া শঙ্করাচাৰ্য তথা হইতে নির্গত হইলেন। তিনি অহােবল- নামক স্থানে নৃসিংহদেবােপাসকদিগকে অদ্বৈতবাদী করিয়া বৈকল্যগিরিতে উপস্থিত হইলেন, এবং সে স্থান হইতে কাঞ্চীনগরে প্রবেশপূৰ্ব্বক অদ্বৈতমত প্রচার করিতে লাগিলেন। তৎপরে কাঞ্চনগর হইতে বহির্গত হইয়া বিদ্যাকামাক্ষীনামী ব্রহ্মবিদ্যার প্রতিষ্ঠাকরণানস্তর প্রতিষ্ঠাকরণানশুর শ্রীচক্র- রচনা করিলেন। শ্ৰীচক্র বৈদান্তিকদিগের উপাস্য, যেহেতু ইহার উপাসনা দ্বারা মােক্ষসিদ্ধি হয়। শ্ৰীচক্রনিৰ্মাণান্তে তিনি ব্ৰহ্মজ্ঞানবিষয়ক উপদেশ দিতে লাগিলেন। এইরূপে শঙ্করাচার্যের অদ্বৈতমত হিমাচল হইতে সেতুবন্ধ- পৰ্যন্ত সৰ্ব্বস্থানে প্রচারিত হইল, কিন্তু অল্পকালের মধ্যে তিনি বুঝিতে পারিলেন যে, লােকসাধারণ অদ্বৈতমত সম্পূর্ণ হৃদয়ঙ্গম করিতে পারে নাই। পুনৰ্ব্বার পৌত্তলিকতার আবি- ভাব হইতে আরম্ভ হইল। আচাৰ্য শঙ্কিত হইলেন এবং কিরূপে অসৎমতের গতিরােধ করিতে পারিবেন, তাহার উপায় চিন্তা করিতে লাগিলেন। অবশেষে নিজ শিষদিগকে আহ্বান করিয়া তিনি তাহাদিগকে অদ্বৈতমতের অবিরােধে শৈব মত, বৈষ্ণব মত, সৌর মত, শক্তি মত, গাণপত্য মত প্রভৃতি সংস্থাপন ও প্রচার করিতে আদেশ দিলেন। এই ।

আৰ্য-জীবনী। সকল মত অদ্যাপি অদ্বৈতমতের সঙ্গে যুক্ত হইয়া চলিতেছে। এক্ষণে আর শুদ্ধ কোন মত দৃষ্ট হয় না। সকলেই অদ্বৈতমত অব্যাহত রাখিয়া স্ব স্ব মত প্রকাশ করিতে চেষ্টা করেন। নব্য স্মৃতি, পুরাণ, তন্ত্র প্রভৃতি সৰ্ব্বত্রই অদ্বৈতমতের প্রাদুর্ভাব দেখিতে পাওয়া যায়। শঙ্করাচার্য হিন্দুচিত্তকে এরূপ অদ্বৈত- মত-প্রবণ করিয়া গিয়াছেন যে, অদ্যাপি হিন্দুগণ তাহা অনু- ভব করিতে পারিতেছেন। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে এবং দক্ষিণ- বর্তে শঙ্করাচার্য্যের প্রভাব বিস্তর; তথায় তিনি দেবতা, তাহার মত অভ্রান্ত। বঙ্গদেশে বৈদান্তিক মতের প্রচার অতি সঙ্কীর্ণ, সুতরাং শঙ্করাচার্যের প্রভাব ও আদর অতি অল্প। যে স্থানেই বেদান্তশাস্ত্রের অনুশীলন ও চর্চা আছে, সে স্থানেই শঙ্করাচার্যের একাধিপত্য। কি আধুনিক সাংখ্য শাস্ত্র, কি আধুনিক মীমাংসা, কি আধুনিক পুরাণ সৰ্বত্ৰই অদ্বৈতমতের মিশ্রণ এবং কেবল বঙ্গদেশে ন্যায়শাস্ত্রই অদ্বৈতমতের সহিত সম্বন্ধ রাখে না। এইরূপে অদ্বৈত-মত-মিশ্রিত অন্যান্য মত প্রচারিত হইলে পর শঙ্করাচার্যের জীবনীশক্তির হ্রাস হইতে লাগিল, এবং তিনি স্কুলশরীর সূক্ষ্মশরীরে অন্তর্হিত করিয়া সােপ হইলেন। তদনন্তর সূক্ষ্মশরীর কারণশরীরে বিলীন করিয়া চৈতন্যরূপ হইলেন। তাহার অলীক ও ক্ষণিক দেহ- ত্যাগের পর শিষ্যগণ মহাসমারােহের সহিত অত্যন্ত শুচি প্রদেশে গর্ত খননপূর্বক তাহার সমাধি করিলেন। কাঞ্চী নগরেই শঙ্করাচাৰ্য এই ভৌতিক জগৎ ত্যাগ করেন। কোন কোন মতে তৎকালে তাহার বয়ঃক্রম ৩২ বৎসর। সংসৃষ্টি।

শঙ্করাচার্যের জীবনী। ১০৫ আনন্দগিরিও বােধ হয় ইহাই বিশ্বাস করেন, কারণ, বিজয়া- নুসারে অষ্টম বর্ষে সমস্ত বিদ্যা শিক্ষা করিয়া তিনি দিগ্বিজয়ে বহির্গত হন এবং ৫৬ বৎসর পরে বিদ্যাপীঠে দ্বাদশ বর্ষ যাপন করেন। অতঃপর স্বমতপ্রচারে ও নগর- চক্রাদিনির্মাণে ৫৬ বৎসর অতীত হয়। ৫৩ প্রকরণে: শঙ্করাচাৰ্য ব্যাস ঋষিকে বলিয়াছেন যে “আমি আর ষােড়শ-বর্ষ মাত্র বাচিব, তাহা হইলে আপনার অনুগ্রহ ব্যতীত অদ্বৈত মতের প্রচার-সম্ভাবনা দেখি না। তদু- ত্তরে ব্যাস ব্রহ্মাকে শঙ্করের আয়ু দ্ব্যর্থ অনুনয় করিলে, ব্রহ্মা বলিলেন, শঙ্কর যতদিন পৃথিবীতে থাকিতে ইচ্ছা করিবেন, ততদিন থাকিতে পারিবেন। কিন্তু ব্যাস তাঁহাকে “তুমি শতায়ু হও” বলিয়া আশীৰ্বাদ করিয়াছিলেন । যদিই শঙ্করাচাৰ্য ৩২ বৎসর বয়ঃক্রমকালে ইহলােক ত্যাগ করিয়া থাকেন, তথাপি তাহার কাৰ্যকলাপ অসম্ভব হইতে পারে না। তিনি অতিশয় বুদ্ধিমান ছিলেন, সুতরাং অল্প- কাল-মধ্যে অনেক কাৰ্য্য করিয়া গিয়াছেন। তিনি অসাধারণ লােক ছিলেন। তাহার প্রভাব ও কাৰ্য্যসহ অলৌকিক শঙ্করাচার্যের জীবনবৃত্তান্ত এক প্রকার বর্ণিত হইল। পূর্বোক্ত গ্রন্থাবলী হইতে আমরা যতদূর পারিয়াছি কিন্তু শঙ্কর-বিজয়ই প্রধান অবলম্বন। শঙ্করদিগ্বিজয়ের সহিত ইহার অনেক স্থল সংলগ্ন হইবে না, কারণ, মাধবাচাৰ্য কবি এবং শঙ্করের বহুকালপরবর্তী। মাধব অবরবৃত্তান্ত যেরূপ সঞ্জিত করিয়াছেন, তাহা সঙ্কলন করিয়াছি,

অৰ্য-জীবনী।
কাব্যের যােগ্য। শিব অবতীর্ণ হইবেন বলিয়া কার্তিক
কুমারিল স্বামী, ইন্দ্র সুধন্বা নামে নৃপতি, বিষ্ণু সঙ্কর্ষণ,
তনন্ত নাগ পতঞ্জলি এবং ব্রহ্মা মণ্ডনমিশ্র ও সরস্বতী
সরসবাণী রূপে অবতীর্ণ হইলেন। কেরলখ্যপ্রদেশে
পূর্ণানদীতীরে বৃদ্ৰিনামক স্থলে বিদ্যানিবাস বলিয়া একজন
অশেষশাস্ত্ৰকুশল পণ্ডিত ছিলেন। বিদ্যানিবাসর শিবগুরু
নামে এক পুত্র
জন্মে। শিবগুরু নানাবিদ্যাপারদশী
হইলেন, এবং ব্রহ্মচর্য অবলম্বনপূৰ্ব্বক সমস্ত জীবন যাপন
করিবেন স্থির করিলেন। কিন্তু স্বকীয় পিতা ও মাতার
মনস্তুষ্টি সম্পাদনের নিমিত্ত অবশেষে বিবাহ করিতে বাধ্য
হইলেন। কন্যা ও কন্যযাত্রীরা বরের বাটীতে আগমন
করিল এবং নির্বিঘ্নে উদ্বাহক্রিয়া নিষ্পন্ন হইয়া গেল।
এইরূপ নূতন প্রকার বিবাহ অধুনা কদাচিৎ দৃষ্ট হয়।
শঙ্করাচার্য্য এই বিবাহের ফল। শিবগুরু অনেক যত্নেও
সন্ন্যাসী হইতে পারিলেন না, কিন্তু শঙ্করাচাৰ্য্য সহজেই
সন্ন্যাসী হইয়াছিলেন। আনন্দগিরি শঙ্করাচার্যের শিষ,
মাধবাচাৰ্য অন্ততঃ বৎসর পরকালীন।
সুতরাং
মাধবাচাৰ্য অপেক্ষা আনন্দগিরির কথা আমাদিগের অধিক
শ্রদ্ধেয়। আমরা, “দিগ্বিজয়” ও সদানন্দকৃত “দিগ্বিজয়সার”
এই গ্রন্থদ্বয়ের সহিত “শঙ্করবিজয়ের” কতিপয় বৃত্তান্ত-বৈষম্য
প্রদর্শন করিতেছি।
প্রথমতঃ ।
শঙ্করাচার্য্যের আবির্ভাব-সম্বন্ধে
আবির্ভাব-সম্বন্ধে মতভেদ।
কি জন্মভূমি, কি পিতামাতার নাম, কি অন্যান্য আনুষঙ্গিক
বৃত্তান্ত, কিছুরই মিল নাই। শঙ্করবিজয়ের কথা আমরা

শঙ্করাচার্য্যের জীবনী। ১০৭ পূৰ্বে বলিয়াছি। দ্বিতীয় মতে দেবগণ মহাদেবের নিকটে গমনপূৰ্ব্বক বৌদ্ধধৰ্ম্ম-দূষিত সমাজের পরিত্রাণের তাঁহাকে প্রার্থনা করেন। মহাদেব শঙ্করাচাৰ্যরূপে অব- তীর্ণ হইবেন বলিয়া দেবগণকে তাঁহার সহায়তার নিমিত্ত আদেশ করিলেন। কার্তিকেয় (৪) কুমারিলভট্টরূপে জন্মগ্রহণ করিয়া জৈমিনি-সূত্রের তাৎপৰ্য প্রকাশ করিলেন। ইন্দ্রদেব সুধৰা নামে মগধরাজ হইয়া বৌদ্ধধর্মের উন্নতি সাধনে য- শীল হইলেন। ব্রহ্মা বিশ্বরূপনামক বিপ্ররূপে অবতীর্ণ হইয়া পত্নীর সহিত কর্মকাণ্ডের পক্ষ হইলেন এবং অনেক বিপক্ষ পণ্ডিতগণকে জয় করিয়া মণ্ডনমিশ্র নামে বিখ্যাত হইলেন। চন্দ্র পদ্মপাদ, পবন হামলক, বৃহস্পতি আনন্দগিরি, বরুণ চিৎসুখ হইলেন। ব্রহ্মপত্নী সরস্বতীও ভূলােকে অবতীর্ণ হইয়া যথাকালে বিশ্বরূপের সহিত পরিণী ৩ হইলেন। কার্ত্তিকেয় জন্মপরিগ্রহ করিয়া নানা শাস্ত্র আলােচনা করিতে লাগিলেন এবং কর্মমত সংস্থাপন করিলেন। তৎ- পরে তিনি দিগ্বিজয়ে বহির্গত হইয়া সুধ। নৃপতির সভাতে উপস্থিত হইলেন। তথায় বৌদ্ধ পণ্ডিতদিগের সহিত তাহার ঘােতর বিচার হইল এবং অবশেষে বৌদ্ধগণ পরাভূত হই- লেন। এই বিচারে পরাস্ত হইয়াও বৌদ্ধগণ পরাজয় স্বীকার করাতে, নৃপতি জয় ও পরাজয় নির্ণয় করিবার দুইটা উপায় (৪) ইনি তন্ত্রবার্তিকের রচয়িতা এবং খ্ৰীষ্টিীয় সপ্তমশতাব্দীর শেষ- ভাগে বিদ্যমান ছিলেন। অতএব শঙ্করাচার্য্য সপ্তমতাব্দীর শেষভাগে অথবা অষ্টমশতাব্দীতে আবিভূত হইয়াছিলেন।

Salou আৰ্য-জীবনী। স্থির করিলেন। বৌদ্ধগণ তাহাতে সম্মত হইল। যে পক্ষ পরাজিত হইবে, তাহারা নিহত হইবে। প্রথমতঃ যিনি উন্নত পর্বতশিখর হইতে পতিত হইয়া অক্ষতশরীর থাকিবেন তাঁহার মত সত্য ও প্রমাণ বলিয়া গৃহীত হইবে। এইরূপ প্রসিদ্ধি যে, কুমারিলভট্ট বেদ স্মরণ-পূৰ্ব্বক গিরিশিখরে আরােহণ করিয়া তথা হইতে পতিত হইলেন এবং অণুমাত্র আঘাত না পাইয়া ধরাতলে আগত হইলেন। নরপতি বেদ- প্রামাণ্য স্বীকার করিয়া খল-সংসর্গ-দূষিত আপনাকে বারংবার নিন্দা করিতে লাগিলেন; কিন্তু শঠ বৌদ্ধগণ বলিল, মহা- রাজ! মন্ত্র মহৌষধি প্রভৃতি দ্বারা দেহ রক্ষা অসম্ভব নহে, তাহাতে বেদশাস্ত্রের সত্যাসত্যতার কি হইল? ইহা শুনিয়া নৃপতি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইয়া দ্বিতীয় উপায়ের কথা বলিলেন। তিনি গােপনে একটী কলসমধ্যে বিষাক্ত সর্প পূরিয়া উহার মুখ বদ্ধ করিয়া সভাতে আনয়নপূৰ্ব্বক সকলকে সম্বােধন করিয়া এই প্রশ্ন করিলেন, যাঁহারা এই কলসের মধ্যে কি আছে বলিতে না পারিবেন, তাহাদিগকে আমি পাষাণ-যন্ত্রে বিনষ্ট করিব। বৌদ্ধ পণ্ডিতগণ বিবেচনার জন্য একদিন সময় লইলেন এবং পরদিন আসিয়া বলিলেন যে উহার মধ্যে সর্প আছে। আস্তিক ব্রাহ্মণগণ বলিলেন যে, উহার মধ্যে ফণাধরের ফণাতে বিষ্ণু শয়ান আছেন। তৎক্ষণাৎ ব্রাহ্মণ- বাক্য সত্য বলিয়া আকাশবাণী হইল, এবং কলসের মুখােদ্- ঘাটনপূৰ্ব্বক সকলে দেখিলেন যে, ব্রাহ্মণগণ যাহা কহিয়া- ছিলেন, তাহাই সত্য। তখন রাজার আদেশে তাঁহার রাজ্য- স্থিত বৌদ্ধকুল নিৰ্ম্মল হইল। কেহ কেহ কেহ পলায়ন দ্বারা শঙ্করাচার্যের জীবনী। ১০৯ প্রাণরক্ষা করিল। এইরূপে সুধা নৃপতি বৌদ্ধধর্মপরিহার- পূৰ্ব্বক বেদবােধিত ধর্মের সংস্থাপন ও সংরক্ষণ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। ভারতে বৌদ্ধনাম প্রায় বিলুপ্ত হইল। তথাপি ইদানীন্তন অনেক পণ্ডিত বলেন যে, শঙ্করাচাৰ্য্য বৌদ্ধদিগকে ভারতবর্ষ হইতে বিদূরিত ও বিতাড়িত করিয়াছিলেন। আচাৰ্য যে এক জন বৌদ্ধের সহিত বিচার করিয়াছিলেন, তাহার ধর্ম শাক্যসিংহ-প্রচারিত বৌদ্ধধৰ্ম্ম হইতে অত্যন্ত বিভিন্ন, আমরা পূর্বে দেখাইয়াছি। এক্ষণে বােধ হয় আর কোন বিজ্ঞ ব্যক্তির সন্দেহ থাকিবে যে শঙ্করাচাৰ্য বৌদ্ধদিগকে ভারতবর্ষ হইতে তাড়াইয়া দিয়াছিলেন। দিগ্বিজয়ের মতে শঙ্করাচার্যের জন্মস্থান কেরল প্রদেশে পূর্ণানদীর তীরস্থিত কোন স্থান। তাঁহার পিতার নাম শিবগুরু এবং মাতার নাম সুভদ্রা। ইহাদের গ্রামে স্বয়ম্ভুলিঙ্গ নামে এক শিবের মন্দির ছিল। শিবগুরু পত্নীর সহিত সেই শিবের বহুকাল আরাধনা করিলে মহাদেব তাঁহাকে বর দিলেন—তিনি শিবগুরুর সন্তানরূপে জন্মগ্রহণ করিবেন। যথাকালে সুভদ্রার গর্ভ হইতে শঙ্করাচাৰ্য্য ভূমিষ্ঠ হইলেন। তাহার জন্মকালে পঞ্চ গ্রহ উচ্চসংশ্রয়স্থ এবং অনস্তমিত ছিল। দিব্য পুরুষের জন্মলগ্নেই অনস্তমিত পঞ্চ গ্রহের উচ্চ সংশয় দৃষ্ট হয়। জ্যোতির্বিদ্‌গণ গণনা করিয়া বলিলেন যে এই বালক অসাধারণ-শক্তিসম্পন্ন, সর্বজ্ঞ, অসংখ্যগুণশালী এবং পবিত্ৰকীৰ্ত্তি হইবে। তৃতীয় বর্ষে শঙ্করাচার্যের পিতৃবিয়ােগ হইল। পঞ্চম বর্ষে উপনীত

১১০
আৰ্য-জীবনী
হইয়া তিনি সাঙ্গোপাঙ্গ বেদ অধ্যয়ন করিয়া সৰ্ব্বশাস্ত্র
শিক্ষা করিলেন। গুরু-গৃহে অধ্যয়নকালে তিনি এক
অদ্ভুত কাৰ্য করেন। তিনি একদা ভিক্ষা করিবার জন্য
কোন দরিদ্র বিপ্রের ভবনে উপস্থিত হইলে, বিপত্নী
কহিলেন “আমরা দীন ও ভাগ্যহীন, আমাদের কিছুই
নাই যে আপনাকে ভিক্ষা দেই । অতএব আপনি এই
আমলকী ফলটী গ্রহণ করুন। শঙ্কর ইহা শ্রবণ করিয়া
দয়াচিত হইলেন এবং তদ্দণ্ডেই কমলাকে স্তুতি দ্বারা
সন্তুষ্ট করিয়া সেই বিপত্নীর গৃহ সুবর্ণে পরিপূরিত করিয়া
দিলেন। দ্বিজদম্পতী সুখে স্বচ্ছন্দে কাল যাপন করিতে
লাগিলেন। ইহা শঙ্করের পঞ্চম বর্ষ বয়সের কাৰ্য।
কিয়দিন পরে গুরুর অনুমতি লইয়া শঙ্কর স্বগৃহে আগমন
করিলেন। এই সময়ে একদা গৌতমাদি ঋষিগণ তাহাকে
দর্শন করিবার নিমিত্ত তাহার ভবনে উপস্থিত হইলেন,
এবং তিনি তাহাদিগকে যথােচিত অর্চনা করিলেন।
তাঁহার মাতা ঋষিগণকে তঁাহার আয়ুর কথা জিজ্ঞাসা করি-
লেন। অগস্ত্য মুনি বলিলেন “তােমার পুত্রের আয়, ষােড়শ
বর্ষ”। ইহা শুনিয়া তাহার জননী ক্রন্দন করিতে লাগিলেন,
কিন্তু শঙ্কর তাহাকে বহু প্রকারে সান্ত্বনা করিলেন।
তদনন্তর অষ্টম বর্ষে শঙ্কর সন্ন্যাসগ্রহণের উপায়
চিন্তা
করিতে লাগিলেন এবং মায়াপ্রদর্শনপূর্বক মাতার , অনুমতি
প্রাপ্ত হইলেন। তিনি একদিন অবগাহন-চ্ছলে নদীতে
নামিয়া কুম্ভীরে তঁহাকে ধরিয়াছে বলিয়া কাদিতে লাগিলেন
এবং জননীকে উদ্দেশ করিয়া বলিলেন 'মাত! যদি

শঙ্করাচার্যের জীবন । ১১১ আমার প্রাণরক্ষা আপনার অভিপ্রেত হয়, তবে অবিলম্বে সন্ন্যাসগ্রহণে আজ্ঞা করুন”। জননী উপায়ান্তর না দেখিয়া বলিলেন, “বৎস! তুমি সত্বর সন্ন্যাস গ্রহণ কর”। তখন তিনি জল হইতে উথান করিয়া মাতাকে কহিলেন যে সন্ন্যাস গ্রহণের সঙ্কল্প করিবামাত্র কুঙীর তঁহাকে ছাড়িয়া পলাই- য়াছে। অনন্তর জননীকে বলিলেন “আপনি যখনই আমাকে স্মরণ করিবেন, তখনই আমাকে নিকটে পাইবেন” এবং ইহা বলিয়া মাতার শোক-ভার-লাঘব করিবার নিমিত্ত দূর স্থিত নদীকে শিব-মন্দিরের সমীপস্থ করিয়া দিলেন। ইহা তাহার দ্বিতীয় অলৌকিক কাৰ্য্য। গৃহ হইতে বহির্গত হইয়া তিনি বহুদূর গমন করিয়া নর্মদা-নদী-তীর-স্থিত পরমহংস শ্রীগুরু গােবিন্দনাথ স্বামীর আশ্রমে উপস্থিত হইলেন এবং তাহার অন্তেসিত্ব স্বকার করিলেন। এস্থানে তাহার তৃতীয় অদ্ভুত কাৰ্য অনুষ্ঠিত হয়। নর্মদানদীর জলকল্লোল গুরুর ধ্যানের প্রত্যুহস্বরূপ স্থির করিয়া তিনি উহার জল সমাহরণপূৰ্ব্বক মন্ত্রপূত কমণ্ডলু- মধ্যে স্থাপন করিলেন। ইহাতে গােবিন্দনাথ স্বামী অত্যন্ত বিস্মিত ও প্রীত হইয়া শঙ্করকে কাশীপুরীতে গমনপূর্বক মুমুক্ষু ব্যক্তিদিগকে আত্মজ্ঞানের উপদেশ প্রদান করিয়া তথায় অবস্থিতি করিতে বলিলেন। আচার্যের উপদেশ সারে তিনি কাশীতে গমন করিলেন এবং বেদান্ত-মতের উপদেশ দিতে লাগিলেন। এই স্থানে সনন্দন নামে এক জন চোলদেশবাসী তাহার শিষ্যত্ব স্বীকার করিলেন। ইনিই পরে পদ্মপাদ নামে খ্যাত হন। পদ্মপাদ নামের হেতু । ।

১১২
অৰ্য-জীবনী
এইরূপ লিখিত আছে। একদা গঙ্গার পূৰ্ব্বতীরস্থিত
শঙ্করাচাৰ্য পরতীরে দণ্ডায়মান সনন্দনকে তাঁহার সমীপে
আসিতে আদেশ
করিলেন।
সনন
একান্ত ভক্তিসহকারে গঙ্গার উপর দিয়া পদব্রজে চলিয়া
আসিবার উপক্রম করিলেন। ভক্তি-প্রভাবে তিনি
যেখানে যেখানে পদনিক্ষেপ করিতে লাগিলেন, সেখানে
সেখানে এক একটী পদ্ম উদ্ভুত হইয়া তাহার পদক্ষে।
করিতে লাগিল। অতঃপর শঙ্করাচাৰ্য্য তাহার নাম
পদ্মপাদ রাখিলেন। এইটী শঙ্করাচার্যের
চতুর্থ অদ্ভুত
কাৰ্য্য।
কাশীতে অবস্থিতি-কালে তিনি অনেকগুলি শৈবমতা-
বলম্বীদিগকে পরাজিত এবং অশিষ্য করেন। তদনন্তর
তাঁহার ব্যাসের সহিত সাক্ষাৎ ও বেদান্তসূত্রের তৃতীয়
অধ্যায়ের প্রথম সূত্রের অর্থ লইয়া আট দিন বিচার হইয়া-
ছিল। এ বৃত্তান্ত পূর্বে বর্ণিত হইয়াছে। দিগ্বিজয়ের
মতে ব্যাস তাঁহাকে তাহার আয় স্কাল ৩২ বৎসর হইবে
বলিয়া আশীর্বাদ করেন। বারাণসী হইতে তিনি প্রয়াগ
যাত্রা করেন এবং সে স্থানে কুমারিলভট্টের সহিত সাক্ষাৎ
করিয়া রেবাতীরস্থিত মাহিষ্মতী নগরীর অভিমুখে প্রস্থান
করেন। তথায় মণ্ডনমিশ্রের সহিত তাঁহার যে বিচার
হইয়াছিল, তাহা পূর্বে বিবৃত হইয়াছে। এই সময়ে
মনপত্নীর সহিত বিচারহেতু শঙ্কর যে অদ্ভুত কাৰ্য্য করিয়া-
ছিলেন, তাহাও পূৰ্ব্বে কথিত হইয়াছে। এইটী তাহার
পঞ্চম অদ্ভুত কাৰ্য। তদনন্তর তিনি তীর্থ-পৰ্যটমে বহি--
।

শঙ্করাচার্যের জীবনী । গত হইলেন, এবং গােকর্ণাখ্য শিবালয়, হরিহরালয় প্রভৃতি সন্দর্শন করিতে লাগিলেন। শঙ্করাচাৰ্য মনমিকে পরাজয়ানন্তর স্বমতাবলম্বী করিয়া তাহার সুরেশ্বরাচাৰ্য নাম দিলেন। তদনভর শিষ্যগণ-পরিবৃত হইয়া অদ্বৈত মত প্রচার করিতে লাগি- লেন। কাণাদ, কাপিল, শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব প্রভৃতি মত নিরস্ত হইল। দ্বৈতমতাবলম্বীদিগের পক্ষ এককালে বিলীন হইয়া গেল। শঙ্করাচাৰ্য যথাসুখে ইতস্ততঃ বিচরণ করিতে লাগিলেন। এক দিন জনৈক দুষ্ট কাপালিক তঁাহার সমীপে উপস্থিত হইয়। সাতিশয় ভক্তিসহকারে ও বিনয়াবনত- ভাবে তাহাকে বন্দনা করিল। তৎপরে সে ব্যক্তি তাহাকে নিবেদন করিল, মহাদেব তাহার প্রতি সন্তুষ্ট হইয়া তাহাকে এই বর দিয়াছেন যে “তুমি কোন সৰ্ব্বজ্ঞ বা রাজার মস্তক উপহার দিতে পারিলে সিদ্ধ হইবে”। সে শঙ্করাচার্য্যের মস্তক প্রার্থনা করিল এবং তিনিও তাহা দিতে স্বীকার করিলেন । সেই দুষ্ট কাপালিক তাহার ইষ্টসাধনাৰ্থ একদা শূলহস্তে শঙ্করের নিকটে আসিল এবং তাহাকে বধ করিবার উদ্যোগ করিতেছিল, এমন সময়ে নৃসিংহদেব আবিভূত হইয়া তাহাকে বিনাশ করিলেন। এইটী সম্পূর্ণ নুতন উপাখ্যান। শঙ্করাচাৰ্য তীর্থ-পৰ্যটনে নির্গত হইয়া হরিহরালয়ের পথে দেখিলেন, কোন দম্পতী ক্রোড়ে করিয়া "ভয়ানক বিলাপ করিতেছে । তদ্দর্শনে দয়া হইয়া সেই মৃত শিশুর জীবনদান করিলেন। তথা হইতে শ্রীবলীক্ষেত্রে ১১৪ আৰ্য্য-জীবনী। ১২, ১৫, ১১ গমন করিলেন এবং সে স্থানে কোন ব্রাহ্মণের এক জড় পুত্র দর্শন করিয়া তাহার পিতার প্রার্থনানুসারে সেই পুত্রকে জিজ্ঞাসা করিলেন “শিশশা? তুমি কে ? নিমিত্ত এরূপ হইয়াছ?” বালক বেদান্তার্থগ্রথিত বাক্যে তাহার উত্তর প্রদান করিল। ইহাতে সকলেই চমৎকৃত হইলেন এবং শিশুর পিতা শিশুকে শঙ্করাচার্যের হস্তে সমর্পণ করিলেন। ইহার নাম হামলক হইল। তদনন্তর আচাৰ্য শিষ্যগণ-সমভিব্যাহারে শৃঙ্গগিরিতে সমুপ- স্থিত হইয়া তথায় এক শােভন প্রাসাদ নির্মাণ এবং শারদা দেবীর মূর্তি সংস্থাপন করিলেন। এই স্থলে গিরি নামে জনৈক গুরুভক্ত ও গুরুপ্রিয় শিষ্য আচার্যের শুশ্রষা করিতেন। ইনিই আনন্দগিরি নামে। প্রথিত। ইনি গুরুর কৃপাবশে অশেষশাস্তু-কুশল হন। এই সময়ে পদ্ম- পাদ, হস্তামলক, সুরেশ্বর এবং গিরি এই চারিজন শঙ্করাচার্য্যের প্রধান শিষ্যরূপে বিখ্যাত হন। ইহারা সকলেই শঙ্করভাষ্যের উপর টীকা রচনা করেন। পদ্ম- পাদবিরচিত টীকার নাম পঞ্চস্যচরণা পঞ্চপাদিকা টীকা। আনন্দগিরির টীকা স্বনামখ্যাত। সুরেশ্বর তৈত্তি- রীয় ও বৃহদারণ্যক উপনিষদের ভাষের টীকা রচনা করেন। হস্তামলকের টীকাও নিজ নামে বিখ্যাত। তদনন্তর শঙ্করা- চাৰ্য স্বভবনে মাতার চরণ দর্শনার্থ গমন করিলেন এবং তাঁহাকে বিষ্ণুলােকে দিব্য শরীরে প্রেরণ করিলেন। তৎপরে মাতার পাঞ্চভৌতিক দেহ অগ্নি দ্বারা ভস্মসাৎ করিলেন।

শঙ্করাচার্যের জীবনী : ইতিমধ্যে পদ্মপাদ তীর্থ দর্শন-কামনায় বহির্গত হইয়া কালীশ্বর, কাঞ্চীক্ষেত্র, পুণ্ডরীকপুর, রামেশ্বর প্রভৃতি তীর্থে ভ্রমণ করিয়া অবশেষে গুরুর দর্শনাভিলাষে কেরল- দেশে গমন করিলেন। এই স্থানে তিনি শঙ্করাচার্যের মুখ হইতে তাহার পঞ্চাস্যচরণ টীকা ( যাহা ইতিপূৰ্ব্বে অগ্নিদগ্ধ হইয়াছিল। অবিকল সম্পূর্ণ লিখিয়া লন। আর রাজশেখর নৃপতি স্বপ্রণীত নাটকত্রয়ী ( ইতিপূৰ্বে অগ্নিযােগে ভস্মীভূত) শঙ্করাচার্যের মুখ হইতে সম্পূর্ণ উদ্ধার করেন। ধন্য স্মৃতিশক্তি! ধন্য মেধা । দ্বিতীয়তঃ। শঙ্করাচার্যের দিগ্বিজয়-বিষয়ে মতভেদ। এতক্ষণ যাহা বলা গেল তাহা দিগ্বিজয়ে বহির্গত হইবার পূৰ্বে ঘটিয়াছিল। শঙ্করবিজয়ের মত প্রকটিত হইয়াছে। দৈবযােগে একদিন একদিন সুধন্য নৃপতির সহিত শঙ্করাচার্যের সাক্ষাৎকার হইল। তিনি রাজাকে বলিলেন “রাজন্ ! আমি পৃথিবীতে বেদান্তমত প্রচার করিতে বাসনা করিয়াছি, অতএব আপনাকে আমার সহায় হইতে হইবে”। ইহা শুনিয়া সুধ। নৃপতি সসৈন্যে শঙ্করাচার্যের সহায়তা করিতে বদ্ধপরিকর হইলেন। অনন্তর সশিষ শঙ্করাচাৰ্য্য সসৈন্য ভূপতির সহিত দিগ্বিজয়ে যাত্ৰা করিয়া প্রথমে সেতুবন্ধ রামেশ্বরে গমন করিলেন। পথিমধ্যে শাক্তমতাবলম্বীগণ তাহার সহিত তর্ক করিয়া পরিশেষে , পরাস্ত হইল এবং অদ্বৈতমত গ্রহণ করিল। রামেশ্বর হইতে তিনি চোল, দ্রাবিড় প্রভৃতি দেশ জয় করিয়া কাঞ্চীপুরে সমাগত হইলেন এবং তত্ৰত্য দৈবত্যবাদী- পূর্বে আৰ্য-জীবনী। wv1/•• A 5 //\; ! ! দিগকে জয় করিয়া কর্ণাট দেশে প্রস্থান করিলেন। কর্ণাট দেশে তখন কাপালিকদিগের ঘােরতর প্রতাপ ও প্রভাব। কচ নামে দুরাত্মা কাপালিকগুরু তাঁহাদের নানাবিধ ব্যাঘাত করিতে আরম্ভ করিল। সুধম্বা নৃপতি সৈন্য- বলে কাপালিকদিগকে যুদ্ধে হনন করিলেন এবং শঙ্করা- চাৰ্যও কতকগুলি কাপালিককে স্বয়ং হুঙ্কার দ্বারা ভস্মসাৎ করিলেন। তখন ঐকচ রােষাবিষ্ট হইয়া নিজ ইষ্টদেব ভৈরবকে স্মরণ করিলেন। মৃত হইবামাত্র ভৈরবদেব তথায় আবির্ভূত হইলেন। ঐকচ তাহাকে শঙ্করাচার্যের বধের নিমিত্ত প্রার্থনা করিল। কিন্তু ভৈরবদেব ক্রুদ্ধ হইয়া ক্রকচকে শঙ্করাচার্যের নিকটে অপরাধের জন্য মস্তক ছেদনপূৰ্ব্বক বিনষ্ট করিলেন এবং শঙ্করকর্তৃক হইয়া অন্তর্হিত হইলেন। এইরূপে কাপালিক-দল নিধন- প্রাপ্ত হইলে শঙ্করাচাৰ্য্য সমুদ্র পর্যন্ত জয় করিয়া (৭) গগাকর্ণ তীর্থে প্রস্থান করিলেন এবং সে স্থানে ব্ৰহ্মাদ্বৈত মত প্রচার করিতে লাগিলেন। তৎপরে ঘােরতর শৈব নীলকণ্ঠের সহিত শঙ্করাচার্যের ভয়ানক বিবাদ ও বিচার হয়। অবশেষে নীলকণ্ঠ পরাজিত হইয়া অদ্বৈতমতগ্রহণ করিলেন। নীলকণ্ঠের পরাজয়সংবাদ শ্রবণে উদয়নাচাৰ্য প্রভৃতির হৃদয়ে ভীতিসঞ্চার হইল। তদ- নন্তর শঙ্করাচাৰ্য বারবতীনগরে গমন করিলেন এবং তত্রত্য (৭) দক্ষিণাবর্তে 67** (Konkana) প্রদেশের অন্তবর্তী । পরশুরাম কোঙ্কণপ্রদেশ সমুদ্রের নিকট হইতে গ্রহণ করিয়া- ছিলেন।

শঙ্করাচার্যের জীবনী । ১১৭ পাঞ্চরাত্র প্রভৃতি বৈষ্ণবগণকে পরাস্ত করিয়া স্বমতে আন- য়ন করিলেন। তথা হইতে তিনি অবন্তীনগরে যাত্রা করি- লেন এবং সে স্থানে প্রথিতনামা দ্বৈতবাদী ভাস্করাচার্যকে বিচারে পরাস্ত করিলেন। ভাস্করাচাৰ্য্য শিষ্যবর্গ সহিত অদ্বৈত মত স্বীকার করিলেন। তদনন্তর তত্ৰত্য জৈনদিগকে অবশে ও স্বমতে আনয়ন করিয়া শঙ্করাচাৰ্য নৈমিষদেশে গমন করিয়া তদ্দেশস্থ পণ্ডিতবর্গকে জয় করিলেন এবং অবশেষে নৈয়ায়িকশ্রেষ্ঠ শ্রীহমিশ্রকে পরাজিত করিলেন। পরে শিষসঙ্গে সকল দেশ জয় করিতে করিতে শঙ্করাচার্য্য কামরূপে উপস্থিত হইলেন এবং সেখানে শক্তিমতাবলম্বী অভিনবগুপ্তকে পরাজিত করিয়া, অঙ্গ প্রভৃতি দেশে পণ্ডিত- গণকে জয়করণানন্তর গৌড়দেশে গমন করিলেন। তথায় বিখ্যাত মীমাংসাশাস্ত্ৰপারগ মুরারিমিশ্র এবং ন্যায়শাস্ত্র- কোবিদ উদয়নাচাৰ্য্য (৮) শঙ্করাচার্য্যের নিকটে পরাজিত হইয়া বেদান্তমত গ্রহণ করিলেন। এইরূপে শারমতের প্রকাশে (৮) উদয়নাচাৰ্য কুসুমাঞ্জলি প্রণেতা। শ্রীহর্ষকৃত খণ্ডনগ্রন্থে কুসুমাঞ্জলির উল্লেখ আছে এবং ইহা হইতে দুই এক স্থল উদ্ধত করা হইয়াছে। বাচস্পতিমিশ্র স্বকৃত খণ্ডনােন্ধার গ্রন্থে শ্রীহর্ষের মতের প্রতিবাদ করিয়াছেন। বাচস্পতিমিশ্র শাঙ্করভাষ্যের উপর মতী নামক টীকা প্রণয়ন করেন। ইনি নবম অথবা দশম শতাব্দীতে বর্তমান ছিলেন। কেহ কেহ বলেন শঙ্করশিষ্য সুরেশ্বরাচাৰ্য বাচস্পতিমিরূপে জন্মগ্রহণ করিয়া ছিলেন । অধ্যাপক কাউ এল সাহেবের মতে উদয় নাচাৰ্য বাচ- স্পতিগ্রন্থের টীকা লিখেন এবং দ্বাদশশতাব্দীতে বর্তমান ছিলেন। মাধব- চাৰ্য উদয়নের নাম সম্মানসহকারে উল্লেখ করিয়াছেন। এমতে শঙ্কর- দিগ বিজয়ের কথা অসার হইয়া পড়ে।

১১৮ আৰ্য-জীবনী। অন্যান্য দ্বৈতমত সকল এককালে বিলুপ্ত হইয়া গেল এবং বেদান্তমত সর্বত্র আদরণীয় হইতে লাগিল। শঙ্করাচার্য্য তাহার অভীষ্ট সিদ্ধি করিলেন এবং আপনাকে কৃতকাৰ্য্য দর্শন করিয়া আনন্দিত হইলেন। এই সময়ে তাহার ভগন্দর রােগ জন্মে ; কিন্তু তিনি শরীরকে তুচ্ছ করিয়া উহার প্রতিবিধানের কোন চেষ্টা করেন নাই। তাহার শিষ্যরা। নানাবিধ চিকিৎসা দ্বারা উহার কিছুই করিতে পারিলেন না। অবশেষে পদ্মপাদ সিদ্ধমন্ত্র জপ দ্বারা উহার আরােগ্য সাধন করিলেন। ইহার পর শঙ্করাচাৰ্য গৌরাপাদ স্বামীর সহিত সমাগত হন। গৌরপাদ স্বামী তাহার গুরু ; শঙ্করাচাৰ্য্য মাণ্ডুক্য উপনিষদের ভাষ্য করিয়াছেন শুনিয়া তাহা দেখিতে আসিয়াছিলেন। গৌরপাদ মাণ্ডুক্য উপনিষদের এক অদ্ভুত বাৰ্ত্তিকের রচয়িতা। শঙ্কর গুরুর এই অভিলাষ এবং এতদূর কৃপা দর্শন করিয়া নিজকৃত মাণ্ডুক্য উপনিষদের ভাষ্য, ব্ৰহ্ম- সূত্র গীতা এবং অন্যান্য উপনিষদের ভাষ্য, গুরুকে শ্রবণ করাইলেন। গৌরপাদ স্বামী সাতিশয় সন্তুষ্ট হইয়া শঙ্করকে আশীৰ্ব্বাদ করিয়া স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন। তদনন্তর শঙ্করাচাৰ্য শিষ্যগণ সহিত কাশ্মীরমণ্ডলে গমন করেন। তথায় কাণাদ, নৈয়ায়িক, কাপিল, সৌগত, জৈন, জৈমিনীয় প্রভৃতি বিবিধ মতাবলম্বীদিগের সহিত তাহার তুমুল বিচার কিন্তু তিনি সকলকে পরাস্ত করিয়া বিদ্যাভদ্রাসন নামক পীঠে (সরস্বতীপীঠে ) আরােহণ করেন। রাজতরঙ্গিণীতে এ ঘটনার উল্লেখ আছে তাহা আমরা পূৰ্বে বলিয়াছি। কাশ্মীরে অদ্বৈত মত প্রচার করিয়া তিনি শৃঙ্গপৰ্বতে প্রস্থান

শঙ্করাচার্য্যের জীবনী।
১১৯
করিলেন এবং তথায় এক
বৎসর বাস করিয়া বদরী
কাননে যাত্রা করিলেন। সে স্থানে মহর্ষিদিগের সহিত অদ্বৈত
মত লইয়া নানাবিধ আলাপ করেন। এইরূপে শঙ্করাচার্যের
বত্রিশ বৎসর পূর্ণ হইল এবং ব্রহ্মাদি দেববৃন্দ তাহাকে
কৈলাসে আনয়ন করিবার জন্য তাঁহার সমীপে গমন করিয়া
তাহাকে স্তবস্তুতি করিতে লাগিলেন। তখন শঙ্করাচাৰ্য্য
ভৌতিক শরীর পরিত্যাগ করিয়া স্বদেহপ্রাপ্ত হইলেন এবং
সগণে কৈলাসে গমন করিলেন।
পাঠকগণ এক্ষণে শঙ্করবিজয় এবং শঙ্করদিগ্বিজয় এই
দুই গ্রন্থের বৃত্তান্ত তুলনা করিয়া দেখিবেন, তাহা হইলেই
আমরা পূৰ্ব্বে গ্রন্থদ্বয়বিষয়ে যে মত প্রকাশ করিয়াছিলাম
তাহা হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিবেন। মাধবাচাৰ্য্য এবং
তদনুসারে সদানন্দ শঙ্করজীবনী যতদূর রঞ্জিত করিতে পারিয়া-
ছেন তাহা করিতে সাধ্যমত ত্রুটি করেন নাই। তাহা-
বর্ণনার
অনেক স্থল অনুধাবন করিয়া দেখিলে
পরস্পর-বিরুদ্ধ এবং অসঙ্গত বলিয়া প্রতিপন্ন
আনন্দগিরি শঙ্করের প্রিয় শিষ্য এবং বরাবর তাহার সঙ্গে
ছিলেন। তিনি অনেক বিষয় জানিতেন না আর পরবর্তী
গ্রন্থকারেরা তাহা জানিলেন ইহাই বড় আশ্চৰ্য। আমরা
উভয় মতেরই সারাংশ মাত্র বিবৃত করিয়াছি। সম্পূর্ণ রূপে
বিবৃত করিলে ত দিগ্বিজয় ও দিগ্বিজয়সারের উপর পাঠকের কি
প্রকার আস্থা থাকিত তাহা বলিতে পারি না।
আমরা এক্ষণে শঙ্করাচার্যের চরিত্র সমালোচনা করিতে
প্রবৃত্ত হইতেছি। শঙ্করাচার্য অসাধরণ-বুদ্ধি-শক্তিসম্পন্ন
হইবে।

১২০
আৰ্য্য-জীবনী
ছিলেন। তিনি অল্প বয়সে নানাশাস্ত্র শিক্ষা করিয়া
ভারতের সমাজে ধৰ্ম্ম-বিপ্লব নাশ করিতে উদ্যোগী হন।
তিনি জন্মগ্রহণ না করিলে ভারতবর্ষের অবস্থা যে কিরূপে
পরিণত হইত তাহা চিন্তার অতীত। সমাজকে
করিলে সমাজ রসাতলে যাইত এবং ধর্মের মহিমা
অধঃপাতিত হইত। তিনি সমাজের পরিত্রাতা ভারতের
ধর্মবীর এবং নাস্তিকগণের ত্রাস। তঁাহার দিগ্বিজয় রামা-
য়ণের বা মহাভারতের দিগ্বিজয় নহে; ইহা সমগ্র ভারতের
ধর্মসংস্কার, সমগ্র ভারতের নাস্তিকতা নিবারণ এবং সমগ্র
ভারতে শুদ্ধ অদ্বৈত মতের প্রচার । তাহার শুদ্ধ অদ্বৈত
মত ইদানীং ভারতের অনেক প্রচলিত নাই বটে, কিন্তু
ভারতের এমন কোন আৰ্য্যধৰ্ম্ম নাই যাহা শঙ্করের অদ্বৈত
মতের কিছু না কিছু গ্রহণ করিয়াছে। ভারতের সর্বধৰ্ম্মে
তিনি তাহার মতের মুদ্রা অঙ্কিত করিয়া গিয়াছিলেন। ভারতের
কোন ধর্মাবলম্বী বলিতে পারিবেন না যে তিনি শঙ্করা-
চার্যের ধার ধারেন না। কেবল বঙ্গদেশীয় নৈয়ায়িকগণ
অনেক পরিমাণে তাহা হইতে স্বাধীন আছেন।
তাঁহার দিগ্বিজয়ের উদ্দেশ্য কি ছিল ? কেহ কেহ বলেন
তাহার মন অতি অনুদার, অতি সঙ্কীর্ণ ছিল। তিনি কেবল
ব্রাহ্মণদিগের সংস্কারে ব্যস্ত ছিলেন। অন্যান্য জাতিদিগের
জন্য কিছুই ভাবিতেন না। উজ্জয়িনী-বাসকালে তিনি এক
জনক পালিককে বলিয়াছিলেন যে দুষ্ট বাহ্মণ দমন
তাহার উদ্দেশ্য, সমাজের অন্যান্য জাতিরা ব্রাহ্মণদিগের
অনুসরণ করিবে। ইহা দ্বারা এমন বুঝায় না যে ব্রাহ্মণ

শঙ্করাচার্য্যের জীবনী । ভিন্ন জাতিদিগের ধর্ম-সংস্কার তাহার অভিপ্রেত ছিল না। এবং ইহাও বলা যায় না যে তাহার মন শাক্যসিংহের মনের ন্যায় প্রশস্ত ছিল। শাক্যসিংহের সমাজ-সংস্কারের প্রধান কারণ ব্রাহ্মণদিগের অত্যাচার ও অন্যায় একাধিপত্য কিন্তু শঙ্করের সমাজসংস্কারের প্রধান কারণ ধৰ্ম্মসম্বন্ধে নানা মত প্রচার এবং ব্রাহ্মণদিগের ভ্ৰষ্টাচার। তাহার সংস্কার বেদ উপনিষৎ বজায় রাখিয়া ; বুদ্ধের সংস্কার বেদাদি শাস্ত্র রসাতলে দিয়া । এক জন ব্রাহ্মণদিগের উপর চটিয়া সংস্কা- রক হন ; অপর জন ব্রাহ্মণদিগের ভ্ৰষ্টাচারে দুঃখিত ও চিন্তিত হইয়া সংস্কার কাৰ্যে প্রবৃত্ত হন। শঙ্করাচার্যের সংস্কার অল্পায়ত নহে, কিন্তু অল্পের মধ্যে লােকায়ত। যাহা, হউক, তিনি ভারতবর্ষের বিস্তর উপকার করিয়া গিয়াছেন। তাহার সংস্কার না হইলে আজ ভারতে বােধ হয় হিন্দু- ধৰ্ম্মের গন্ধও থাকিত না। তাহার দিগ্বিজয় কি প্রকারে হইয়াছিল ? বহুসংখ্যক শিষ্যগণ সহিত তিনি দিগ্বিজয় করিতে বহির্গত হইয়াছিলেন। বােধ হয় অনেক স্থলে বলপ্রয়ােগ দ্বারা পরপক্ষ নিরস্ত করিতেন। শঙ্করবিজয়ে দুই স্থলে বল প্রয়ােগ দৃষ্ট হয়। কাপালিক—সমাগমে এবং ব্যাস-শঙ্কর-সংবাদে। দিগ্বিজয়সারে কাপালিকদিগের সহিত সুধন্বা নৃপতির বাস্তবিক যুদ্ধ ঘটিয়াছিল। ব্যাসের প্রতি উক্তরূপ ব্যবহার শঙ্করাচার্য্যের অত্যন্ত অনুচিত হইয়াছিল। আমাদের এরূপ বিশ্বাস যে তিনি অনেক স্থলে বলপ্রয়ােগ করিতেন নতুবা তাহার চারি সহস্ৰ শিষ্য সঙ্গে লইয়া যাইবার আবশ্যকতা কি? ছলে, বলে, কৌশলে, যেরূপে পারিতেন ১২২ শঙ্করাচার্য্যের জীবনী। গ্রাহী। সেই রূপেই পরপক্ষ নিরস্ত করিতেন। কিন্তু তাঁহার সর্ব শাস্ত্র নখদর্পণ ছিল, কখন তর্ক করিতে কুণ্ঠিত হইতেন না। কি আৰ্য, কি বৌদ্ধ, কি জৈন, কি কাপালিক, সকল সম্প্র- দায়ের শাস্ত্রই তাঁহার সম্যক্‌ অভ্যস্ত ছিল। আর তিনি এত বিশদভাবে নিজ মত প্রকটন ও বিপক্ষ-মত খণ্ডন করিতেন যে তাহাতে তাহার বিপক্ষেরা তাঁহার প্রতি স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া শ্রদ্ধা করিত। বেদান্তদর্শনের দ্বিতীয় অধ্যায়ের দ্বিতীয় পাদে তিনি সাংখ্যাদি যে সকল মত নিরসন করিয়াছেন, তাহা সংস্কৃতভাষাবিজ্ঞ ব্যক্তিমাত্রেই অল্পায়াসে বুঝিতে পারেন। তাহার রচনা অতিশয় প্রাঞ্জল, সরস এবং হৃদয়- তাঁহার শিষ্যগণও তাঁহার রচনাপ্রণালী শিক্ষা করিয়াছিলেন। যদ্যপি তিনি আর কোন কাৰ্য্য না করিয়া কেবল শারীরক ভাষ্য লিখিতেন, তাহা হইলেও তাহার নাম চিরস্মরণীয় হইয়া থাকিত। যত দিন ভারতবর্ষে হিন্দুধর্মের লেশমাত্র এবং সংস্কৃত ভাষার চর্চা থাকিবে, তত দিন শঙ্করাচার্য্যের নাম কখন ভারত হইতে বিস্মৃত বা বিলুপ্ত হইবে না। এক্ষ্মণে আমরা গ্রীসীয় দার্শনিক প্লেটোর এবং জামান দার্শনিক স্পিনােজার মতের সহিত অদ্বৈতমতের তুলনা করিয়া প্রস্তাব উপসংহৃত করিতেছি। অদ্বৈতমতকে শাঙ্করমত বা বেদান্তমতও “একমেবাদ্বিতীয় ব্ৰহ্ম, ' নাদস্তি কিঞ্চন” অথবা “ব্ৰহ্ম সত্যং জগৎ মিথ্যা জীব হ্মৈব নাপরঃ” এই বাক্যগুলি ইহার ভিত্তিভূমি। একমাত্র অদ্বিতীয় ব্ৰহ্মব্যতীত আর কোন পদার্থেরই প্রকৃত অৰ্য-জীবনী। ১।//////••।।। ৯। । . সত্তা নাই। কেবল অদ্বিতীয় ব্ৰহ্মই সৎ বস্তু, অন্য সমস্তই অসৎ। জগৎ অসৎ, মায়াকল্পিত। যেরূপ অন্ধকার রজনীতে রজুতে সর্প-ভ্রম হয়, অথবা যেরূপ দূর হইতে একখণ্ড শুক্তিকাতে রজত-ভ্রম হয়, তদ্রুপ এই দৃশ্যমান জগতে জগৎ বলিয়া ভ্রম হয়। যখন এই ভ্রম বিদূরিত হইবে, যখন তত্ত্বজ্ঞান হৃদয়কে আলােকিত করিবে, তখনই আমা- দের “একমেবাদ্বিতীয়ং ব্রহ্ম নাদস্তি কিঞ্চন,” সম্যকরূপে উপলব্ধি হইবে এবং আমরা মুক্ত হইব। একমাত্র ব্রহ্মই জগতের উপাদান কারণ, নিমিত্ত কারণ এবং মূল কারণ। “সত্যং জ্ঞানমনস্তং ব্ৰহ্ম সচ্চিদানন্দরূপং”, ইহাই ব্রহ্মের লক্ষণ ; তিনি সত্যস্বরূপ এবং অনন্তস্বরূপ ; তিনি সৎস্বরূপ, চিৎস্বরূপ এবং আনন্দস্বরূপ। তিনিই সত্তার আদিজনক, তিনিই জ্ঞানের আকর এবং তিনিই আনন্দের, নিদান। ঈশ্বরের এই ত্রিবিধ স্বরূপ ঋগ্বেদ- সংহিতার সময় হইতে প্রচলিত। উপনিষদে ইহার সম্পূর্ণ বিবরণ লক্ষিত হয়। তখন অন্য কোন জাতির ধর্মশাস্ত্র প্রণীত হয় নাই। খ্রষ্টীয় সমাজে ঈশ্বরের ত্রিবিধ স্বরূপ ইহার সহিত ঠিক মিলিয়া যায়। তাঁহার পিতা, পুত্র এবং পবিত্র আত্মা এই তিন স্বরূপ স্বীকার করেন। পিতা সৎস্বরূপ বা সত্তার আদিস্রষ্টা, পুত্র চিৎস্বরূপ বা জ্ঞানের আকর এবং পবিত্র আত্মা আনন্দস্বরূপ বা আনন্দের আলয়। অনেক মিসনরী মহােদয় বলেন যে তাঁহাদের ত্রিবিধ স্বরূপ হইতে আৰ্যদিগের ত্রিবিধ স্বরূপ অপহৃত। এ কথা কত দূর সঙ্গত তাহা বিবেচক মাত্রেই বুঝিতে পারেন। উপনিষদ

১২৪
আৰ্য্য-জীবনী।
বাইবেলের অনেক পূর্বের সামগ্রী। পরব্রহ্মের স্বরূপ
বাক্য এবং মনের অগােচর। ইহা বাক্য দ্বারা বিবৃত করা
যায় না; মনেও ইহার সম্পূর্ণ ধারণা হয় না। তিনি
অচিন্তনীয়, অনির্বচনীয় এবং অনাকলনীয়। তিনি জগৎ
সৃজন করিতে কামনা করিয়া সঙ্কল্প মাত্রে ইহার সৃষ্টি
করিলেন। এই সৃষ্টির কারণ অবিদ্যা, মায়া বা অজ্ঞান।
ইচ্ছাময় ব্রহ্ম ইচ্ছাপূৰ্ব্বক আপনাকে অবিদ্যা বা অজ্ঞান
দ্বারা আচ্ছন্ন করিলেন এবং জগৎ উপাদন করিলেন। ইচ্ছা
করিলে তিনি ইহা না করিতে পারিতেন। কেন তাহার
ইচ্ছা হইল এ প্রশ্নের উত্তর কেহ জানে না।
এই অবিদ্যাবশতই আমরা জীবাত্মা এবং পরমাত্মার
প্রভেদ বুঝিতে পারি না এবং এই পরিদৃশ্যমান জগৎ,
ভৌতিক শরীর এবং মনকে প্রকৃত বস্তুসৎ পদার্থ বলিয়া
মনে করি। বেদান্তদর্শন এই অজ্ঞান বা অবিদ্যা নিরাস
করিয়া জীবাত্মা এবং পরমাত্মার যে কোন ভেদ নাই তাহা
বুঝাইয়া দেয়।
অবিদ্যার ঘাের কাটিয়া গেলে
আমাদের আর এই সকল ভ্রম থাকিবে না। তখন আমরা
‘একমেবাদ্বিতীয়ং ব্রহ্ম’ যে কি পদার্থ তাহা বুঝিতে
পারিব।
শঙ্করাচার্যের মতে মনুষ নিত্য কর্মের আচরণে
প্রবৃত্ত হইবে এবং কর্মসমুদায় পরব্রহ্মে সমর্পণ করিবে।
তিনি শিষদিগকে উপদেশ দিতেন যে সন্ধ্যোপাসনাপ্রভৃতি
বেদবােধিত নিত্যকর্ম সম্পাদন করিলে পরমেশ্বর সন্তুষ্ট এবং
প্রীত হন এবং অদ্বৈত নালােক প্রদান করেন।

শঙ্করাচার্য্যের জীবনী । ১২৫ যদিও শঙ্করাচাৰ্য জগতের বস্তু-সত্তা স্বীকার করিতেন না কিন্তু তিনি ইহাকে কাল্পনিক বলিয়া অগ্রাহ করিতে বলিতেন ‘না। তাহার মতে জগৎ প্রভৃতির পারমার্থিক সত্তা নাই, কিন্তু ব্যবহারিক সত্তা আছে। ঈশ্বরের সত্তা পারমার্থিক। ইহা কেহই স্বীকার করেন না যে ঈশ্বরের সত্য এক জগৎ প্রভৃতির সভা একপ্রকার । জগদাদি সমস্ত অনিত্য, কিন্তু ঈশ্বর নিত্য। অতএব আমরা বলিতে পারি না যে জগৎ কিছুই নহে। ইহার ব্যবহারিক অস্তিত্ব আছে। প্রতি মুহূর্তেই যাহা দেখিতেছি, যাহা স্পর্শ করিতেছি, তাহা কখন একবারে মিথ্যা হইতে পারে না। কিন্তু জগৎ এবং ঈশ্বর একরূপ- সত্তা-বিশিষ্ট বলিলে বিষম ভ্রম হইবে । অনেক অর্বাচীন ব্যক্তি বেদান্তমতের মর্ম বুঝিতে না পারিয়া ইহাকে উপেক্ষা করেন। তাহারা বলেন যে বেদান্ত দর্শন আমাদের নীতিসম্বন্ধীয় এবং ধৰ্ম্মসম্বন্ধীয় কর্তব্য- কৰ্ম্ম সকলের সম্পাদন-পথের কণ্টকস্বরূপ। যদি পৃথিবী কিছুই না হয়, এবং আমরাও কিছুই না হই, তবে আর কোন কৰ্ম্মে উৎসাহ হইতে পারে না, কোন বিষয়ের উন্নতিসাধনে যত্ন হইতে পারে না। অথবা আমাদের আত্মা ও পরমাত্মা যদি এক হয়, যদি আমরা ব্ৰহ্ম ভিন্ন হই, তবে আর আমাদের উন্নতির চেষ্টা অনাবশ্যক। কিন্তু এগুলি বিষম ভুল। জীবাত্মা অজ্ঞান-তিমির ভেদ করিতে পারিলে তবে পরমাত্মার সমান হইবে। এই অজ্ঞান- তিমির নাশ করিবার জন্য আমাদের সযত্ন এবং সচেষ্ট হওয়া উচিত। জ্ঞান-বৃদ্ধিসহকারে আমরা উন্নত হইব ১২৬ অৰ্য-জীবনী। ইহা সামান্য প্রােৎসাহ নহে। যতই জ্ঞানবৃদ্ধি হইবে ততই আমাদের উৎকর্ষ, ততই আমাদের উন্নতি। এই উন্নতির ফল ঈশ্বরের সহিত সাযুজ্য বা সহযোগ। জ্ঞানের সহিত ধৰ্ম্ম এবং কর্তব্য কর্মের নিত্য সম্বন্ধ। জ্ঞানবৃদ্ধি হইলেই আমাদের ধর্ম এবং নীতির উন্নতি হইবে। এই উন্নতি ক্রমে আমাদিগকে পরব্রহ্মে লইয়া যাইবে—এই আশা জনক এবং উৎসাহজনক বাক্য শুনিলে কাহার না মনে আনন্দ হয় এবং কোন্ ব্যক্তি না উন্নতির পথে ধাবমান হন। জ্ঞানেই উন্নতি। যেখানে জ্ঞান, সেখানেই নীতি এবং ধর্ম। সুতরাং বেদান্ত দর্শন নীতি এবং ধর্মের বিঘ্নস্বরূপ নহে, বরং উত্তেজকস্বরূপ। কিন্তু না বুঝিতে পারিলে অমৃত ও গরল হয়। বেদান্ত মতের অযথা ব্যবহার করিলে যে বিষময় ফল লাভ হয় তাহার দোষ বেদান্তদর্শনের নহে, নির্বোধ ব্যবহারীর। যথা-ব্যবহৃত হইলে বেদান্তমত অনেক অমৃতময় ফল প্রসব করিবে। তবে ইহা অবশ্য স্বীকাৰ্য্য যে বেদান্ত মত কিছু দুর্বোধ। লােকে ইহাকে যত সহজ মনে করে, তদপেক্ষা বিলক্ষণ বিলক্ষণ কঠিন। সুতরাং ইহা সম্যকরূপে শিক্ষা করিতে হইলে আমাদিগের অতি সতর্ক- ভাবে অগ্রসর হওয়া উচিত। একটু তাড়াতাড়ি করিলেই সকল চেষ্টা বিফল হইয়া যাইবে। এক্ষণে এই মতের সহিত প্লেটোর (Plato) মায়াবাদ ( Idealism) কতদূর মিলে দেখা যাউক। ভাবনা-মত ( Theory of Ideas ) প্লেটোর দর্শনের মধ্যবিন্দুস্বরূপ। ভাবনা ( Idea ) আদর্শস্বরূপ এবং বাহ পদার্থ সকল ছায়া- শঙ্করাচার্যের জীবনী । ১২৭ মাত্র। সৎ পদার্থের ভাবনাই (Idea of the (Good) সর্বোৎকৃষ্ট ভাবনা। ইহাই পরমেশ্বর। এই দৃশ্যমান জগৎ ভৌতিক এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ, কারণ ইহা সৃষ্ট। ভূত- পদার্থ ( Matter) সৰ্ব্বতােভাবে নিগুণ এবং বস্তুতঃ অসৎ। ভৌতিক জগতেরও কোন বস্তু-সত্তা নাই। ঈশ্বর পরম কারুণিক, সত্তম এবং রাগদ্বেষাদি-বিবর্জিত। তিনি সদিচ্ছাতেই এই জগৎ সৃষ্টি করিয়াছেন। কেবল জ্ঞান বা কেবল আনন্দ উৎকর্ষের চরম সীমা নহে। পরমেশ্বরের সহিত যতদূর সম্ভব সাযুজা বা সাদৃশ্যই উন্নতির পরাকাষ্ঠা। পুরস্কারপ্রাপ্তির আশায় বা দণ্ডের আশঙ্কায় ধৰ্ম্ম আচরণ করা উচিত নহে। কিন্তু ধম্মই আত্মার স্বাস্থ্য এবং সৌন্দৰ্য্য বলিয়া ধৰ্ম্মের আলােচনা আবশ্যক। এই অংশ গুলি শাঙ্কর মতের মধ্যে অনেক পরিমাণে দেখা যায়। উভয়ের মধ্যে প্রভেদ বিস্তর আছে, তাহা পদর্শন করা আমাদের উদ্দেশ্য নহে। অতঃপর স্পিনােজার ইউরােপীয় দার্শনিক first catat ( Spincza ) ১৬৩২ গ্রীং অব্দে আমষ্টার্ডাম নগরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৬৭৭ অব্দে হেগ নগরে তাহার মৃত্যু হয়। তিনি ডেকার্ট (1)cs Cartes) নাম দার্শনিকের দ্বৈতবাদকে অদ্বৈতবাদে অদ্বৈতবাদে পরিণত করেন। তাহার মতে পদার্থ একমাত্র, দ্বিতীয় নাই। এই একমাত্র পদার্থ ঈশ্বর । যাহা অন্ত-নিরপেক্ষ হইয়া আপনাপনি বিদ্যমান থাকিতে পারে এবং অন্যের সাহায্য ব্যতীত যাহার ভাবনা স্বতই হইতে পারে, তাহাকে পদার্থ বলে।

১২৮
আৰ্য-জীবনী ।
**
কোন বস্তুর ভাবনা ব্যতীত যাহার ভাবনা করা
যাইতে পারে, তাহাই পদার্থ। স্পিনােজার মতে ইহাই
পদার্থের প্রকৃত লক্ষণ। পরমেশ্বরই একমাত্র অদ্বিতীয়।
পদার্থ। ইহার দুইটা সৰ্ব্বপ্রধান গুণ আমাদের জ্ঞেয় ;
এবং ব্যাপিত্ব, জ্ঞান এবং বিস্তৃতি। স্পিনােজার
মতে জ্ঞত্ব রহিত কোন ব্যাপক বা বিস্তৃত পদার্থ নাই।
ঈশ্বর হইতেই জগতের উৎপত্তি, ঈশ্বরই জগতের মূলকারণ।
ঈশ্বর স্বাধীন এবং
সেচ্ছাপ্রবৃত্ত হইয়া কাৰ্য্য করেন।
তাঁহার ইচ্ছা মঙ্গলময়ী। জ্ঞানের বৃদ্ধি সহকারে আমরা
ঈশ্বরকে
ভাল বাসিতে
করিব । ঈশ্বর-প্রীতিই
সুখ এবং স্বাধীনতা। মুক্তি ধর্মের পুরস্কার নহে; কিন্তু
মুক্তিই প্রকৃত ধৰ্ম্ম । অতএব আমরা মুক্তির নিমিত্ত সর্বদা
যতমান হইব। স্পিনােজার অদ্বৈতমত এবং শঙ্করাচার্যের
অদ্বৈতমত কতক অংশে একরূপ।
শঙ্করাচাৰ্য্য সম্বন্ধে সমস্তই বিবৃত হইয়াছে। এই মহা-
পুরুষ ভারতবর্ষের
মহােপকর্ম করিয়াছেন, তজ্জন্য
সমস্ত ভারতই তাঁহার নিকটে কৃতজ্ঞ রহিয়াছে। ভারতবর্ষে
তাহার নাম চিরস্মরণীয় থাকিবে।

জৈনধর্মবীর
মহাবীরের সংক্ষিপ্ত জীবনী ।
মহাবীর জৈনদিগের চরম তীৰ্থকর (১) বলিয়া প্রসিদ্ধ।
এই নিমিত্তই অনেকে
অনেকে তাহাকে বিশেষরূপে শ্ৰমণ শব্দে
অভিহিত করিয়া থাকেন। তাঁহার জীবন-চরিত কল্পসূত্রে
বর্ণিত আছে।
জৈনদিগের অন্যান্য ধৰ্ম্ম-পুস্তকের ন্যায়
কল্পসূত্র ও প্রাকৃত মাগধী ভাষাতে লিখিত।
ইহার মতে
মহাবীর দেবত্ব এবং দেব-সম্বন্ধীয় সুদীর্ঘ জীবন পরিত্যাগ
করিয়া অমরত্ব লাভের নিমিত্ত তীর্থঙ্কররূপে ভূমণ্ডলে অবতীর্ণ
(১) জৈনধর্মাবলম্বিগণ কতকগুলি সিদ্ধপুরুষকে দেবতা বলিয়া
অর্চনা এবং আরাধনা করিয়া থাকেন। ইহার। इथेनन
সংসারসাগর উত্তীর্ণ হইয়াছেন বলিয়া তীর্থকর, তীর্থর বা পারগত
নামে অভিহিত। উপর্যপরি বহুবার জন্মগ্রহণ
করিবার
পর অবশেষে কঠোর তপস্যাপ্রভৃতির বলে তীর্থকর
লা হয়।
তীর্থকগণক দেব ও মনুষ্যের পূজা,
এই নিমিত্ত অহৎ নামে
কীর্তি এবং রাগন্বেষাদি
সমস্ত রিপু জয় করিয়া অায়েশ্বর
ও সৰ্ব্বজয়ী হইয়াছেন বলিয়া জিন বা জিনেশ্বর নামে খ্যাত।
ইহাদের সর্বজ্ঞতা, সর্বদর্শিতা, আপ্ত,
রাগাভাব প্রভৃতি
অনেকগুলি লােতিগ গুণ নির্দিষ্ট আছে। ইহাদের সংখ্যা
চতুর্বিংশতি। পার্শ্বনাথ গােবিংশতিতম এবং
মহাবীর শেষ
তীর্থঙ্কর।

১৩০
আৰ্যজীবনী।
হইয়াছিলেন। এই সময় জৈন চতুর্থ যুগের ৭৫ বৎসর
অবশিষ্ট ছিল।
মহাবীর প্রথমে ঋষভদত্তনামক কোন
ব্রাহ্মণের
পত্নী দেবানন্দার গর্ভে আবির্ভূত হন। ঋষভদও জঘু
দ্বীপান্তৰ্গত ভারতবর্ষের ব্রাহ্মণকুণ্ড গ্রামে
গ্রামে বাস করিতেন।
দেবানন্দা স্বপ্নে দেখিয়াছিলেন যে, তাহার গর্ভে মহাবীর
জন্ম গ্রহণ করিয়াছেন। মেরুর দক্ষিণ প্রদেশের অধীশ্বর
এবং স্বর্গীয় দেধৰ্ম্মাখ্য-বিভাগ-নিবাসী ইন্দ্রবে এই সংবাদ
জ্ঞাত হইয়া মহাবীরের চরণেদ্দেশে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত পূর্বক
ভবিষ্যৎ জিন বলিয়া ভঁহার পূর্ণ করলেন।
অনন্তর চিন্তা
করিয়া দেখিলেন যে, এতাদৃশ মহাজনের ঈদৃশ দরিদ্র
এবং ভিক্ষুক-বংশে জন্ম-পরিগ্রহ অনুচিত।
প্রধান অনুচর হরিনৈগমেষীকে দেবানন্দার গর্ভস্থ মহাবীরকে
কাশ্যপগােত্রজ ইক্ষাকুবংশীয় সিদ্ধার্থ রাজার মহিষী
ত্রিশালা দেবীর গর্ভে স্থানান্তরিত করিতে আদেশ করিলেন।
আদেশানুসারে সমস্ত সম্পন্ন হইলে পর ত্রিশালা দেবী স্বপ্নে সকল
বিষয় জানিতে পারিলেন। পরে গণকেরা মজাকে জানাইলেন
যে, চরম জৈন মহাপুরুষ মাজমহিষীর গর্ভে জন্ম গ্রহণ করিয়াছেন।
রাজা শুনিয়া অত্যন্ত আহলাদিত হইলেন। যথাকালে মহাবীর
ভূমিষ্ঠ হইলেন। প্রবাদ আছে চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষীয় এয়ােদশী
মহাবীরের জন্মতিথি। সিদ্ধার্থ ভারতবর্ষের অন্তর্গত পাবন নামক
প্রদেশের অধিপতি ছিলেন। তিনি প্রথমে সন্তানের নাম বর্ধমান
রাখিলেন। কিন্তু পরে সন্তানকে অশেষশক্তিমান্ খিয়া তাঁহাকে
মহ, তীর এই সংজ্ঞা প্রদান করেন। যেমন মহাবীরের তিনটী নাম
সুতরাং নিজ

মহাবীরের সংক্ষিপ্ত জীবনী। ১৩১ সর্বত্র বিখ্যাত, তদ্রুপ সিদ্ধার্থ রাজারও তিনটী নাম ছিল সিদ্ধার্থ, শ্রেয়াংশ এবং যশস্বী। ত্রিশালা দেবীরও তিনটা ছিল ; যথা—ত্রিশালা, বিদেহদিন্না এবং প্রীতিকারিণী। পিতা মাতা এবং পুত্র প্রত্যেকই যে তিনটী করিয়া নাম ছিল তাহা আশ্চর্যের বিষয় সন্দেহ নাই। মহা- বীরের পিতৃব্যের নাম সুপাশ্ব, জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার নাম নন্দবর্ধন এবং ভগিনীর নাম সুদর্শন। মহাবীর যশােদানামী কোন কামিনীর পাণিপীড়ন করেন। যশােদা দেবী সমবীর নগরের রাজার কন্যা। যশােদা দেবীর গর্ভে মহাবীরের এক কন্যা জন্মে। ইহার দুইটী নাম রাখেন, অনােজ্জা এবং প্রিয়দর্শনা। জামলি নামক এক শিষ্যের সহিত প্রিয়দর্শনার পরিণয় হয়। মহাবীরের দৌহিত্রীর দুইটী নাম রাখা হয়, শেষবতী এবং যশােমতী। মহাবীর চরতি নামক জৈন গ্রন্থে মহাবীরের বহু জন্ম গ্রহ- ণের বিস্তারিত বর্ণনা আছে। ইহাতে সৰ্বশুদ্ধ আট বার জম্ম পরিগ্রহের উল্লেখ আছে। ১। মহাবীর বিজয়নগর রাজ্যের অন্তর্গত কোন এক গ্রামে জন্মিয়া ন্যায়সার নামে খ্যাতিলাভ করেন। ২। তিনি প্রথম তীর্থকর ঋষভ দেবের পৌত্ররূপে জন্ম- গ্রহণ করিয়া মরীচি নামে অভিহিত হন। ৩। তিনি ইন্দ্রিয় সুখ-নিরত সংসারী ব্রাহ্মণরূপে জন্ম গ্রহণ করেন। ৪। তিনি বেহারদেশান্তর্গত রাজগৃহ নামক স্থানের রাজা বিশ্বভূত নামে বিখ্যাত হন।

আৰ্য-জীবনী । ৫। তিনি দেব ত্রিপিটপ নামে জন্ম গ্রহণ করেন এবং নানা কুকার্য্যে রত হইয়া পরােনাভি কষ্টকোগ করুন। ৬। তিনি সিংহযােনিতে জন্মগ্রহণ করেন। ৭। তিনি মহাবিদেহ ( মিথিলা?) দেশে প্রিয়মি চক্রবর্তী নামে জন্মেন। ৮। তিনি ভারতবর্যের অধিপতি জিতশত্রুর তনয়রূপে জন্মলাভ করিয়া নন্দন নামে বিখ্যাত হন। এই জন্মে তিনি অত্যন্ত ধার্মিক ছিলেন এবং পরজন্মে মহাবীর নামে অবতীর্ণ হইয়া তীর্থংকরত্ব প্রাপ্ত হন। মহাবীরের অষ্টাবিংশতি বর্য বয়ঃক্রমকালে পিতামাতার পরলােক প্রাপ্তি হয়। জনক জননীর মৃত্যুর পর দুই বৎসর কাল তিনি তাঁহার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা নন্দবর্ধনের সহিত একত্র বাস করিয়াছিলেন । ত্রিংশৎ বৎসর বয়ঃক্রমকালে সংসারের মায়। পরিত্যাগ করিয়া তিনি সন্ন্যাসাশ্রম স্বীকার করেন। তাহার এই কাৰ্য্য কি দেবগণের, কি মনুষ্যগণের, সকলেরই অতিশয় প্রীতিকর হইয়াছিল। তাঁহার তপশ্চৰ্য্যা এবং দিব্য- (জ্ঞানপ্রাপ্তির বিস্তারিত বর্ণনা আছে। সন্ন্যাস ধৰ্ম্ম স্বীকার করিয়া তিনি বৎসরয় কঠোর তপস্যা করিলেন। তৎপয়ে স্বধর্ম প্রচার করিতে ও চিরাভিলষিত জিনত্ব লাভ করিতে নিতান্ত চেষ্টিত হইলেন। বহুদিনপৰ্যন্ত তিনি অনশন ব্রত অবলম্বন করিয়া থাকি- তেন এবং নেত্রদ্বয় নাসাগ্ৰবৰ্ত্তী করিয়া মৌনব্রত ধারণ (করিতেন। তাঁহার এই সমস্ত কৃচ্ছসাধন-কালে ইন্দ্রদেব এক জন যক্ষকে তাহার শরীররক্ষার্থে প্রেরণ করিতেন। এইরূপে মহাবীরের সংক্ষিপ্ত জীবনী। ১৩ নীক। কিয়দ্দিন গত হইলে রাজগৃহপ্রদেশান্তর্গত কোন গ্রামনিবাষী গােশাল নামক চঞ্চৰস্বভাব এক ব্যক্তি স্বধৰ্ম্ম পরিত্যাগ করিয়া তঁাহার অনুচর হইল। এই ব্যক্তি সর্বদাই অপর লােক দিগের সহিত বিবাদ ঘটাইত অনন্তর তিনি বিহারের অন্তর্গত শ্রাবস্তী, বৈশালী প্রভৃতি বিবিধ জনপদ পৰ্যটন করেন এবং অন্যান্য অনেক অসভ্য জাতিদিগের মধ্যেও স্বমতপ্রচারার্থে উপস্থিত হন। অতঃপর মহাবীর অতঃপর মহাবীর কৌশাম্বী- নগরে প্রস্থান করেন। তৎকালে ঐ নগরের অধিপতি শতা- এ স্থলে মহাবীর অত্যন্ত সমাদৃত হইলেন এবং অনেকে তাঁহার মত অবলম্বন করিল। এই স্থানেই তিনি দ্বাদশ বক্সর কাল কৃচ্ছসাধনে যাপন করিয়া অবশেষে সাংসারিক কর্মসুত্র ছিন্ন করিলেন। এই সময় তাঁহার দিব্যজ্ঞানের উদয় হইল। তিনি জিনত্ব প্রাপ্ত হইলেন। সমস্ত ইজিয় তাঁহার বশীভূত হইল এবং তিনি সর্বজ্ঞ ও সৰ্ব্বদর্শী হইলেন। এই প্রকারে ৭২ বৎসর বয়ঃক্রমকালে তিনি সৰ্ব্বশে হইতে একবারে মুক্ত হইলেন। এই ঘটনা বিহার-দেশান্তর্গত অপাপপুরী নামক স্থানের রাজা হস্তিপালের রাজধানীতে ঘটিয়াছিল। তৎকালে জৈনদিগের অবসর্পিণ কালের দুঃখ সুখমা নামক চতুর্থ যুগের প্রায় চার বৎসর অবশিষ্ট ছিল। (২) (২) ৪১১ খ্রীষ্টাব্দে কল্পসূত্র রচিত হয়। ইহা গুর্জরদেশনিবাসী ভদ্রবাহুর কৃতি। গুর্জনের ধ্রুবসেন রাজার সময়ে ভদ্রবাহু বর্তমান ছিলেন। অতএব মহাবীর ৫৬৯ পূৰ্ব্ব খীষ্টাব্দে মানবলীল। সংবরণ করিয়াছিলেন। ভদ্রবাহুর এই কথার (অর্থাৎ মহাবীবের মৃত্যুর ৯৮০ বৎসর পরে কল্পসূত্র লিখিত হয়) কতটুকু ঐতিহাসিক মুল্য ১৩৪ আৰ্য-জীবনী । মহাবীরের সংসার-মুক্তির ৯৮০ বৎসর পরে কল্পসূত্র রচিত মহাবীর যৎকালে নিজ মত প্রচার করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন, তখন মগধ দেশে বেদচর্চা প্রবল ছিল, এবং অনেক বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণের সহিত তাহার বিচার হইয়াছিল। কিন্তু প্রায় সকলেই তাহার নিকট পরাস্ত হইয়া তৎপ্রদর্শিত ধৰ্ম্মপথের পথিক হইয়াছিলেন। এইরূপে অতি অল্পকালের মধ্যে মহাবীরের বিলক্ষণ খ্যাতি ও প্রতিপত্তি হইয়া উঠিল। যে সকল ব্রাহ্মণ স্বধৰ্ম্ম পরিহারপূর্বক জৈন ধৰ্ম্ম স্বীকার করিয়াছিলেন তাহারা সকলেই গণাধিপ বা গণধর নামে খ্যাত হইয়া জৈনধৰ্ম্মপতাকা ভারতের সৰ্ব্বত্র উড্ডীয়মান করিতে সংকল্প করিলেন। মহাবীরের একাদশ জন শিষ্য ছিলেন, যথা—ইন্দ্রভূতি, অগ্নিভূতি, বায়ুভূতি, সুধৰ্ম্ম, মণ্ডিতপুত্র, মৌৰ্যপুত্র, অকম্পিত, অচলব্রত, মৈত্রেয় এবং প্রভাস। ইহাদিগের মধ্যে দুই জন মাত্র মহাবীরের মােক্ষের পর জীবিত ছিলেন। তাহাদিগের নাম ইন্দ্রভূতি এবং সুধর্ম । ইহারা মুহাবীরের মুক্তির পর মুক্তি লাভ করেন। কল্পসূত্রানুসারে সকল যতি এবং সন্ন্যাসী সুধৰ্ম্মের শিষ্যপরম্পরার অন্তর্গত, ফলতঃ অর কোন শিষ্যের শিষ্য ছিহ না। ইন্দ্রভূতির অপর নাম গৌতম। এই নাম-সাদৃশ্য অব- এখন পূৰ্ব্বক জৈনগণ বৌদ্ধ গৌতমকে মহাবীরের শিষ্য ব্যক্ত, আছে তাহা আমরা বলিতে পারি না। কল্পসূত্ৰ জৈনশাস্ত্রনিবহের শিরভুষণ এবং জৈনদিগের অতিশয় আদরও আরাধনার বস্তু।

মহাবীরের সংক্ষিপ্ত জীবনী। বলিয়া নির্দেশ করেন। ইন্দ্রভূতি গৌতমগােত্রোৎপন্ন মগধ- নিবাসী বসুভূতিনাম৷ কোন ব্রাহ্মণের পুত্র, এই নিমিত্তই তাহার গােতমসংজ্ঞা হয়। অগ্নিভূতি এবং বায়ুভূতি তাঁহার সহােদর। মহাবীর যৎকালে মগধ প্রদেশে পর্যটন করি- য়াছিলেন, তৎকালে ইহারা স্বধর্ম ত্যাগ করিয়া জৈনধর্ম অবলম্বন করিয়াছিলেন। ব্যক্ত এবং সুধৰ্ম্ম উভয়েই ব্রাহ্মণ ছিলেন, এবং জৈন ধর্মে দীক্ষিত হইবার পূৰ্বে আৰ্য- ধৰ্ম্মের উপদেশ প্রদান করিতেন। মণ্ডিতপুত্র অথবা মণ্ডিত এবং মৌৰ্য্যপুত্র উভয়েই ব্রাহ্মণ উভয়েই ব্রাহ্মণ এবং সহােদর । এবং সহােদর। অকম্পিত গৌতমগােত্রজ মৈথিল ব্রাহ্মণ। মহাবীর যখন বৈশালী প্রদেশে ভ্রমণ করিয়াছিলেন, তখন বােধ হয় অকম্পিত স্বধৰ্ম্ম পরিত্যাগ করিয়াছিলেন । অবশিষ্ট তিন ব্যক্তিই ব্রাহ্মণ ছিলেন। কোন কোন স্থলে অচলব্রত এবং মৈত্রের এই নামদ্বয়ের পরিবর্তে “অচলভ্রাতা” এবং “মেতাৰ্য” নাম- দ্বয় দৃষ্ট হয়। উপরি উক্ত একাদশ জনই মহাবীরের সহিত বিষম বিবাদে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন, কিন্তু পরাজিত হইয়া স্ব ধর্ম পরিত্যাগ করেন। মহাবীর স্পষ্টাক্ষরে বিশদরূপে তাহাদিগকে বুঝাইয়া- ছিলেন যে, ইন্দ্রিয় জ্ঞানের আধার হইতে পারে না, যেহেতু ইন্দ্রিয়-নাশে ইন্দ্রিয়-জন্য জ্ঞানের নাশ হয় না কৰ্ম্মের' সত্তা অবশ্য স্বীকার করিতে হইবে, স্বীকার করিতে হইবে, যেহেতু পাপ পুণ্যের উৎপত্তি এবং পাপ পুণ্যাদি কৰ্ম্মের ফল দেখিতে পাওয়া যায় ; পাপ পুণ্যাদি কর্মের আধারস্বরূপ জীবপদার্থ অবশ্যই বর্তমান আছে, যেহেতু পাপ পুণ্যের ফলতোগ

আর্যজীবী।
হইঙ্গা থাকে এবং জীব না থাকিলে কে ফলভােগ করিকে?
পরলােকের অস্তিত্ব অবশ্য মানিতে হইবে। এইরূপে
বিৰিখপ্রকার সন্দেহ নিরসন দ্বারা মহাবী হাদিগের মন
এত বশীভূত করিয়াছিলেন যে, তাঁহারা সকলেই তাঁহার ধ্বন্ধে
দীক্ষিত হইয়া তংপ্রচারে দৃঢ়ত হয়।
মহাবীর অহিংসাকে পরম ধৰ্ম্ম বলিয়া স্বীকার করিতেন।
তাহার মতে শারীরিক ক্লেশ সহ করা মনুষ্যের উচিত,
কিন্তু তাই বলিয়া দেহের উপর স্বয়ং কোন অত্যাচার করা
কৰ্তব্য নহে। অন্যের শরীরের প্রতিও যেরূপ সদয় ব্যবহার
করিতে হইবে, নিজের শরীরের প্রতিও তদ্রুপ করিতে
হইবে। এই পরম রাক্য অনুসরণ করিয়া তিনি যখন
বজ্রভূমি, শুদ্ধভূমি প্রভৃতি অসভ্য প্রদেশে ভ্রমণ করিয়াছিলেন,
তৎকালে তত্ৰত্য অসভ্য জাতিদিগের কটুক্তি এবং প্রহার
অম্লানবদনে সহ করিয়াছিলেন। তাহাদিগের উপর তাঁহার
অসন্তোষ বা ক্রোধের লেশমাত্রও উদয় হয় নাই। তিনি
বলিতেন, সুনৃত বাক্যের ন্যায় উপাদেয় পদার্থ জগতে আর
দ্বিতীয় দৃষ্ট হয় না; সৰ্ব্বদা সত্যভাষী হওয়া উচিত,
মিথ্যা কথা বিষবৎ পরিত্যাগ করা কর্তব্য। অন্য ব্যক্তির
কোন সামগ্রী অপহরণ করা অতি গর্হিত কৰ্ম্ম। সংসারের
শেষ সীমা নাই ; সংসার-ক্ষেত্রের যে দিকেই দৃষ্টি নিক্ষেপ
করিবে সেই দিকই অনন্ত অপার দেখিতে পাইবে, সর্বত্রই
মায়া-মরীচিকায় প্রলােভিত হইবে। জীব বিবেক-শক্তির
যথােচিত পরিচালনা করিতে এবং সর্বক্ষণ অৱহিতচিত্তে
যাপন করিতে সক্ষম হয় না এবং তন্নিমিত্তই মায়াজালে

মহাবীরের সংক্ষিপ্ত জীবনী । ১৩৭ জড়িত হইয়া পড়ে। মায়াজালে পড়ে। মায়াজালে জড়িত হইলে পাপ-পঙ্কে পতিত হইয়া ক্রমশঃ অধােগামী হইতে থাকে। অতএব যদি আমরা উন্নতির আশা করি, তাহা হইলে বিবেক-শক্তির চালনাপূৰ্ব্বক কর্মসমূহের ফলাফল বুঝিতে চেষ্টা করিব এবং মায়াজাল ছেদন করিতে যত্নশীল হইব সুতরাং সংসার-সাগরে বিবেক-শক্তি একমাত্র তরণী। মহা- বীরের মহাকাব্যটী এই ;- সংসার-সাগরে আছে বিবিধ তরঙ্গ । বিবেকী তরিতে পারে, অবিবেকী আতঙ্ক। বিবেক-তরণী তাহে, মায়া সে ভুজঙ্গ, কলুষতাশ তাহে কখন করে কি রঙ্গ। কোন ব্যক্তি জৈনধৰ্ম্মের প্রবর্তক তাহার নিশ্চয় করা দুঃসাধ্য। বর্তমান কালের প্রথম অহৎ ঋষভদেব কিন্তু যখন জৈনশাস্ত্রকারগণই ঋষভদেবয়ে পূর্বে অন্য অর্হৎগণের উল্লেখ করিতেছেন, তখন ঋষভদেবের কখনই জৈনধর্মের প্রবর্তক বলিতে পারা যায় না। পূৰ্ব্বকালের পূৰ্বকালের প্রথম অহৎ কেবল জ্ঞানী যদি ধৰ্ম্মপ্রবর্তক হইতেন, তাহা হইলে জৈনগণ তাহার পূজা করিতেন এবং ধর্ম প্রবর্তক বলিয়া স্বীকার করিতেন। কিন্তু জৈনেরা তাঁহার পূজাও করেন না; কিম্বা তাঁহাকে ধৰ্ম্মপ্রবর্তক বলিয়া স্বীকারও করেন না ; কোন কালে তাহার পূজা চলিত ছিল কি না তাহার কোন স্থিরতা নাই। অতএব যখন পূর্বকালের প্রথম অহৎ জৈমসম্প্রদায় মধ্যে মা ও গণ্য নহেন, তখন তাঁহাকে কোন কারণেই জৈনধম্মপ্রবর্তক বলা যায় না। ইদানীন্তন- ; ১৩৮ আৰ্য্য-জীবনী। কালীন জৈনগণ ও কেবল কোন এক মহৎকে পূজা করেন তাঁহাদিগের মধ্যেও মতভেদ মতভেদ দৃষ্ট হয়। কোন শ্রেণী পার্শ্বনাথকে পূজা করেন এবং কোন শ্রেণী মহাবীরকে পূজা করেন। যাহারা পার্শ্বনাথ দেবকে পূজা করেন তাহা- দিগের মত পার্শ্বনাথ জৈনধর্মপ্রবর্তক। যাহারা মহাবীরকে অর্চনা করেন তাঁহারা মহাবীরকে ধৰ্ম প্ৰবৰ্ত্তয়িতা বলিয়া স্বীকার করেন। জৈনশাস্ত্রে জিন বংশের বর্ণনাকালে উল্লি- খিত হইয়াছে যে পার্শ্বনাথ (৩) এয়ােবিংশতিতম মহৎ এবং মহাবীর চতুর্বিংশতিতম অহৎ। পার্শ্বনাথ শতবর্ষ বয়ঃক্রম- কালে সমেৎশিখরে এবং মহাবীর ৭২ বৎসর বয়ঃক্রম কালে অপাপপুরীতে মুক্তিলাভ করেন । কল্পসূত্রানুসারে এই দুই ঘটনার মধ্যে ২৫০ বৎসর ব্যবধান ছিল । পার্শ্বনাথের শিষ্যগণ শ্বেতবস্ত্র পরিধান করিত, কিন্তু মহাবীরের শিষ্যগণ দিগম্বর অর্থাৎ উলঙ্গ থাকিত। উভয় দলের মধ্যে সম্প্রতি ছিল না। উভয় দলের লােক একত্র হইলেই বিবাদ মহাবীবেব সহচর গােশাল পাশ্বনাথের শিষ্যদিগের সহিত কেবল বিবাদ করিত। বিবাদের বিবাদের প্রধাণ কারণ ঘটিত। (৩) পার্শ্বনাথ ইক্ষাকুবংশীয় অশ্বসেন রাজার পুত্র। নারাণসীর নিকটস্থ ভেলুপুর। ইহার জন্মস্থান। ইনি ত্রিংশৎ বর্য বয়ঃক্রমকাল হইতে সপ্ততি বৎসর ক্রমাগত তপস্যা করিয়া সংসারমুক্ত হন। সমেৎশিখর বঙ্গদেশে হাজারিবাগ জিগায় পার্শ্বনাথ পর্বত নামে বিদিত। কল্পসূত্রানুসারে পূর্বখ্রষ্টাব্দে পাশ্বনাথ পাশ্বনাথ মুক্তিলাভ করেন। পার্শ্বনাথের ধ্বজ সৰ্প। জৈনদিগের ইক্ষাকুবংশ সুৰ্য্যবংশ নহে। ৮২০

মহাবীরের সংক্ষিপ্ত জীবনী।
১৩৯
পরিধেয় বস্ত্র-ভেদ মাত্র। মহাবীরের জীবনবৃত্ত মহাবীর-চরিতে
বর্ণিত আছে। পার্শ্বনাথ চরিতেও পার্শ্বনাথের তীর্থঙ্করত্ব
• লাভের উপযােগী সমস্ত বিষয় বর্ণিত আছে। অতএব
ইহাদিগের মধ্যে একজনকে পরিত্যাগপূৰ্ব্বক দ্বিতীয় জনকে
জৈন ধর্মের প্রবর্তক বলিতে সাহসী নহি। আমাদিগের
মতে জৈনধৰ্ম্মের আদিম প্রবর্তকের কোন নিদর্শন প্রাপ্ত
হওয়া যায় না। কিন্তু বহুদিন জৈন ধৰ্ম্মের মতসমূহ সমাজে
চলিতে আরম্ভ হইলে পর পার্শ্বনাথ আবির্ভূত হন এবং
নিজক্ষমতাবলে সমাজকে স্বস্থিত করিয়া নিজের
সম্প্রদায় চালাইয়া যান। তৎপরে মহাবীর নিজের বুদ্ধিবলে
বহুসংখ্যক শিষ্য সংগ্রহ করিয়া স্বনামের গরিম সাধন করেন
এবং সমাজের অনেকে তাঁহার সম্প্রদায়ভুক্ত হন। এইরূপে
সম্প্রদায়-ভেদে দুই জন প্রবর্তক হইয়াছেন। কিন্তু বস্তুতঃ
ইহারা প্রবর্তক নহেন, সমাজে নেতৃস্বরূপ। ইহাদিগকে
দলপতি বলিলেও কোন দোষ হয় না। বুদ্ধদেব যেরূপ
বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক, তদ্রুপ জৈন ধর্মের কোন প্রবর্তক
দেখিতে পাওয়া যায় না।
এ স্থলে জৈনদিগের সম্প্রদায় ভেদ বিষয়ে দুই চারি কথা
নিরর্থক হইবে না। মহাবীর শিষ্যদিগের সহিত গঙ্গার
উভয়তীরস্থিত
প্রদেশসমূহে
ধৰ্ম্ম-প্রচার করিয়াছিলেন।
বিহার, প্রয়াগ, কৌশাম্বী, রাজগৃহ, অপাপপুরী প্রভৃতি স্থানে
তিনি ধৰ্ম্ম-প্রচার করিয়াছিলেন। তাহার সকল শিষ্যই তাঁহার
জীবিতকালে সংসার ত্যাগ করিয়াছিলেন।
ত্যাগ করিয়াছিলেন। কেবল সুধৰ্ম্ম
এবং গৌতম তাঁহার মৃত্যুর পর জীবিত ছিলেন। গৌতম

১৪০ আৰ্য-জীবনী। শীঘ্রই মানবলীলা সংবরণ করেন। এক মাত্র সুধর্মই জৈনমত বিষয়ে উপদেশ দিতে অবশিষ্ট ছিলেন। সুধর্মের প্রধান শিষ্য জম্বুদ্বামী, এবং তদনন্তর তাঁহার শিষ্যগণ, জৈনধৰ্ম্ম- প্রচারে ব্রতী হন। মহাবীরের সময় হইতে জৈদিগের মধ্যে সম্প্রদায়-বন্ধন হইবার সূত্রপাত হয়। তাহায় শিষ্যেরা অনেকেই স্ব স্ব প্রধান হইয়া নিজ নিজ সম্প্রদায় বন্ধন করেন। এইরূপে জৈনদিগের মধ্যে বহুসংখ্যক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সম্প্রদাহ্ম হইয়া উঠে। জৈনেরা দিগম্বর এবং শ্বেতাম্বর এই দুই প্রধান সম্প্রদায়ে বিভক্ত। দিগম্বরদিগের পরিধানবাস ছিল না বলিয়া তাহা- দিগকে দিগম্বর বলিত। দিগম্বর জৈনগণ আপনাদিগকে মহাবীরের শিষ্য বলিয়া অভিমান করে। ইদানীং ইবারা রক্তাম্বর বা রক্তপট বলিয়া অভিহিত হইয়া থাকে । কারণ ইহারা এক্ষণে আহার-কাল ব্যতীত অন্য সকল সময়ে বস্ত্র পরিধান করিতে আরম্ভ করিয়াছে। দিগম্বরেরা খেতাম্বর- দিগের অপেক্ষা धान বলিয়া আপনাদিগকে প্রচার করিয়া থাকে। দিগম্বর জৈনের তীর্থঙ্করদিগের মূর্তি সকল বসন ভূষণ প্রভৃতি দ্বারা অলঙ্কত করিয়া রাখে না। ইহার ষােড়শবিধ স্বর্গ এবং শতবিধ স্বর্গস্থ ইন্দ্রের অস্তিত্ব স্বীকার করিয়া থাকে। ইহারা সম্মার্জনী বা জলপাত্র হস্তে গ্রহণ করিয়া দেশ বিদেশ ভ্রমণ করিয়া বেড়ায় না। কিন্তু শ্বেতা- ‘স্বর জৈনগণ 'শ্বেত বসন পরিধান করে এবং আপনাদিগকে পাশ্বনাথের শিষ্য বলিয়া পরিচয় দেয়। শ্বেতাম্বর জৈনেরা তীর্থঙ্করদিগের মুর্তি সকল বসনভূষণাদিতে ভূষিত করিয়া ;

মহাবীরের সংক্ষিপ্ত জীবনী ১৪১ রাখে এবং সৰ্বশুদ্ধ দ্বাদশটা স্বর্গ ও চতুঃষষ্টিসংখ্যক ইন্দ্রের অস্তিত্ব স্বীকার করে। ইহারা সম্মার্জনী এবং জল-কমণ্ডলু হস্তে ধারণ করিয়া সর্বত্র ভ্রমণ করে। এরূপ করিবার তাৎ পৰ্য্য এই যে, অজ্ঞাতসারে কোন জীবের প্রাণহিংসা নিবারণের জন্য তাহারা হস্তস্থিত সম্মার্জনী দ্বারা কোন স্থান পরিষ্কার করিয়া তবে তথায় উপবেশন করে। কমণ্ডলু করিয়া জল লইবার প্রয়ােজন এই যে, অন্য-প্রদত্ত জল পান করিতে হইলে, যদি সেই জলে কটাদি কোন জীব থাকে তাহা হইলে তাহারা জীবহিংসা করিবে এবং তজ্জন্য পাপগ্রস্ত হইবে। ইত্যাদি নানা বিষয়ে উভয় সম্প্রদায়ের মতভেদ দেখিতে পাওয়া যায়। এবংবিধ মতভেদ আছে বলিয়া উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে অনেক সময় ঘােরর বিবাদ হইয়া থাকে। উপরি উক্ত সম্প্রদায় ব্যতীত জৈনদিগের সাধারণতঃ যতি এবং শ্রাবক এই দুই সম্প্রদায় আছে। যতিগণ উদাসীন এবং যােগী। ইহারা কেবল ভিক্ষালব্ধ সামগ্রী দ্বারা জীবন- যাপন করে, কোনপ্রকার ব্যবসায় অবলম্বন করিতে ভাল বাসে না, স্ত্রীলােকদিগের সহবাস ঘৃণা করে এবং লােকালয়- শূন্য প্রদেশে মঠরচনা করিয়া তথায় বাস করে। ইহারা “অহিংস পরমাে ধর্মঃ” মত অত্যন্ত আড়ম্বরের সহিত প্রদর্শন করে। ইহারা সম্মার্জনী দ্বারা উপবেশনস্থান পরিষ্কার করিয়া তথায় উপবেশন করে। ইহারা কখনও জৈন মন্দিরের পুরাে- হিত হয় না। পৌরােহিত্য কাৰ্য্য প্রায় ব্রাহ্মণদিগের দ্বারা নিষ্পন্ন হইয়া থাকে। যতিরা পূজাদি কাৰ্য নির্বাহ করে না বটে, কিন্তু জৈন মন্দিরে ধর্মশাস্ত্র পাঠ করিয়া থাকে ১৪২ আৰ্য-জীবনী। শ্রাবকের সংসারী। শ্রাবকগণ : যতিদিগকে ভিক্ষা প্রদান করে এবং পার্শ্বনাথ ও মহাবীর' এই তীর্থঙ্কদ্বয়ের বিশেষরূপ অর্চনা করে। শ্রাবকেরা অনেক বিষয়ে হিন্দুদিগের আচার অনুকরণ করে। শ্রাবকেরা গৃহস্থ এবং সংসার-নিবিষ্ট কিন্তু যতিরা সংসারত্যাগী এবং স্বল্পাহারী ক্লেশসহিষ্ণু, সন্ন্যাসী মাত্র। যাহারা সংসারাশ্রম পরিত্যাগ করিয়া যতি হয়, তাহারা 'দেবতাৰ্চনা প্রভৃতি প্রভৃতি করে । জৈন শ্রাব- কেরাই মন্দিরাদি-প্রতিষ্ঠিত তীর্থঙ্কর প্রভৃতির পূজা করিয়া থাকে। ইহারা কেবল তীর্থঙ্করদগের পূজা করে তাহা নহে, অনেক হিন্দু দেবদেবীরও অর্চনা করিয়া থাকে। ইহাদিগের মধ্যে জাতিভেদও একপ্রকার প্রচলিত আছে। ইহারা কোনপ্রকার জীবের প্রতি হিংসা করে না এবং বৎসরের কতিপয় নির্দিষ্ট দিবসে লবণ, অন্ন, মধু, ফল, মূল প্রভৃতি কতকগুলি দ্রব্য ব্যবহার করে না। ইহারা নীতি- শাস্ত্রের পাঁচটী নিয়ম সবিশেষ পালন করে। সে পাঁচটা নীতি এই ;- (১) জীবহত্যা করা উচিত নহে। (২) সৰ্ব্বদা সত্য কথা কহা উচিত। (৩) সরল এবং সৎস্বভাব হওয়া উচিত। (৪) পতি ও পত্নীর পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস-ঘাতক হওয়া অথবা অন্যাসক্ত হওয়া উচিত নহে। (৫) পার্থিব বাসনাসমূহ দমন করা একান্ত আবশ্যক।

ধর্মবীর অশােকের সংক্ষিপ্ত জীবনী। • আমরা প্রাচীন ভারতের যে সমস্ত রাজার নাম শ্রুত হই, যাহাদিগের কীর্তিকলাপ এখনও লােকসমাজে উজ্জ্বল রহিয়াছে, তন্মধ্যে রাজা অশােক সর্বপ্রধান। এক সময় ইহার শাসন কপর্দিগিরি হইতে উৎকল এবং বিহুত হইতে গুর্জর দেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। প্রজাদিগের হিতজনক কাৰ্য্য সৰ্ব্বদাই ইহার মনে জাগরূক ছিল। ইনি এক জন বৌদ্ধধর্মপ্রচারক, তজ্জন্য ব্রাহ্মণেরা ইহার বিদ্বেষ্টা ছিলেন, এবং স্বপ্রণীত গ্রন্থা- দিতে ইহার বিশেষ কোন উল্লেখ করেন নাই। কিন্তু বৌদ্ধেরা ইহার চরিত্র গ্রন্থবদ্ধ করিয়া যান। অবধানশতক, দিব্য অবধান, এবং অশােক অবধান এই কএকখানি বৌদ্ধ গ্রন্থে অশােকের জীবন-বৃত্তান্ত বর্ণিত আছে। তন্মধ্যে প্রধানত শেষের গ্রন্থখানি অবলম্বন করিয়া অশােক-জীবনীর সংক্ষিপ্ত- সার বিবৃত হইল। (১) পাটলীপুত্র (২) নগরে বিন্দুসার নামে এক রাজা ছিলেন। তিনি মৌৰ্যকুলবীর চন্দ্রগুপ্তের পুত্র। তিনি যখন পাটলী- (>) Asiatic Society's Journal. (২) বৃহৎকথাগ্রন্থের অনুসারে ইহার সংস্থাপক পুত্র এবং তৎপত্নী পাটলীর নাম হইতে পাটলীপুত্র নাম হইয়াছে। কুসুমনামে পুত্রের এক তনয় হইতে ইহার নাম কুসুমপুর। কুসুমের পাটুননামী এক কন্যা ছিলেন। তাহার নামে আধুনিক নাম পাটন। পাটনা দেবানুগৃহীত। হইয়া অদ্যাপি এই নগরের অধিষ্ঠাত্রী দেবতারূপে বর্তমান রহিয়াছেন।

১৪৪ আৰ্য-জীবনী। পুত্রে রাজ্য শাসন করিতেন, : তৎকালে চম্পাপুরী হইতে এক ব্রাহ্মণ আসিয়া তাহাকে আপনার এক কন্যা উপহার দেন। ঐ কন্যার নাম সুভদ্রাঙ্গী। তিনি সর্বাঙ্গসুন্দরী ও সর্বসুলক্ষণসম্পন্না। কোন এক সময়ে দৈবজ্ঞেরা ঐ কন্যা দেখিয়া ব্রাহ্মণকে কহিয়াছিল, তােমার কন্যার অঙ্গে নানারূপ সুলক্ষণ দেখিতেছি, ইনি নিশ্চিয়ই রাজমহিষী হই- বেন এবং ইহার গর্ভে যে পুত্র জন্মগ্রহণ করিবে তিনি সসাগরা পৃথিবীর অধিপতি হইবেন। দৈবজ্ঞগণের বাক্যে ব্রাহ্মণের সম্পূর্ণ বিশ্বাস জন্মিল এবং সেই বিশ্বাসলে তিনি উপহার-স্বরূপ আপন কন্যারত্ন বিন্দুসারকে অর্পণ করিলেন। সুভদ্ৰাঙ্গী রাজার অন্তঃপুরবাসিনী হইলেন। তাহার সৌন্দৰ্য দর্শনে রাজমহিষীগণের অত্যন্ত ঈর্ষা জন্মিল এবং উহারা সামান্য কিঙ্করীর ন্যায় তাহাকে গৃহকাৰ্য্যে নিযুক্ত করিলেন। তৎকালে সুভদ্ৰাঙ্গীর প্রতি যে সমস্ত কাৰ্য্য- ভার অর্পিত হইল তন্মধ্যে ক্ষৌরকাৰ্যই সর্বপ্রধান। মহি- ষীরা কহিলেন যদি তুমি এই কর্মে নৈপুণ্যলাভ করিতে পার তবে মহারাজ তােমার প্রতি যারপরনাই প্রসন্ন হইবেন। সুভদ্ৰাঙ্গী ক্রমশঃ ক্ষৌরকর্মে সুদক্ষ হইয়া উঠিলেন তখন একদা মহিষীরা কহিলেন, তুমি গিয়া মহারাজের ক্ষৌরকর্ম করিয়া আইস। সুভদ্রাঙ্গী তৎক্ষণাৎ সম্মত হইলেন এবং নৈপুণ্যের সহিত রাজার ক্ষৌরকর্ম করিলেন। তখন রাজা তাহার প্রতি প্রীত হইয়া পুরস্কার দিবার সংকল্পে অশােকের সংক্ষিপ্ত জীবনী। ১৪৫ কহিলেন, বল তােমার কি অভিলাষ ? সুভদ্ৰাঙ্গী তঁাহার নিকট বিবাহের প্রস্তাব করিলেন। রাজা কহিলেন, দেখ, তুমি জাত্যাংশে নিকৃষ্ট, সুতরাং আমি তােমার পাণিগ্রহণে কিরূপে সম্মত হইব। সুভদ্ৰাঙ্গী কহিলেন, মহারাজ, আমি জাতিতে নিকৃষ্ট নহি; রাজমহিষীগণের আদেশেই এইরূপ নীচ কাৰ্য্য স্বীকার করিয়াছি। বস্তুতঃ আমি ব্রাহ্মণের কন্যা, রাজরাণী হইব বলিয়াই পিতা আমাকে আপনার হস্তে অৰ্পণ করিয়া যান। তখন রাজা বিন্দুসারের সমস্তই মনে পড়িল। তিনি সুভদ্ৰাঙ্গীর পাণিগ্রহণ করিলেন এবং উহাকে মহিষীগণের মধ্যে সর্বপ্রধান করিয়া রাখিলেন। এই সুভদ্ৰাঙ্গীর গর্ভে অশোকের জন্য হয়। পুত্রের মুখচন্দ্র দেখিয়া জননীর সকল শােক দূর হইয়াছিল, তন্নিমিত্ত উহার নাম অশােক। দ্বিতীয় পুত্রের নাম বীতশােক হইল। অশােক কুরূপ ও কদাকার ছিলেন, তজ্জন্য বিন্দুসার তাহাকে মেহদৃষ্টিতে দেখিতেন মা। অশােকের স্বভাবও অত্যন্ত অপ্রীতিকর ছিল । ফলতঃ তিনি এইরূপ বামশীল ছিলেন বলিয়া তাঁহার অপর নাম চণ্ড। রাজা বিন্দুসার তঁহাকে বিদ্যাভ্যাসের জন্য পিঙ্গলবৎসনামা কোন জ্যোতির্বিদের হস্তে এই জ্যোতিষিক তাহার নানারূপ সৌভাগ্য- চিহ্ন পরীক্ষা করিয়া কহেন, এই বালকই পিতৃসিংহাসনের একমাত্র উত্তরাধিকারী হইবেন। রাজকুমার বয়ঃপ্রাপ্ত হইলেন। কিন্তু তাঁহার স্বভাব কিছুমাত্র পরিবর্তিত হইল না। তাহা পূৰ্ব্ববৎ উগ্র ও অর্পণ করেন, ১৪৬ আৰ্য-জীবনী । রুক্ষ রহিল। তখন বিন্দুসার ভাবিলেন এক্ষণে অশােককে কাৰ্যান্তরব্যপদেশে স্থানান্তরিত করাই কৰ্ত্তব্য। তৎকালে তক্ষশিলায় ভয়ঙ্কর বিদ্রোহ উপস্থিত হয়। এই স্থান রাজধানী পাটলীপুত্র হইতে বহুদুর। অশােক এই বিদ্রোহশান্তির জন্য তথায় প্রেরিত হইলেন। কিংবদন্তী এইরূপ যে, যখন অশােক তক্ষশিলায় যাত্রা করেন তখন নানরূপ অনুকূল দৈববাণী হইয়াছিল এবং তাহার যুদ্ধসাহায্যের জন্য আকাশ হইতে দিব্যাস্ত্র পতিত হইয়াছিল। তিনি তক্ষশিলায় গিয়া বিদ্রোহ- শান্তি করিলেন এবং তথায় পরমসমাদরে প্রতিষ্ঠিত হই- নেন। বিন্দুসারের সর্বজ্যেষ্ঠ পুত্রের নাম সুসীম। তিনি পাটলী- পুত্রে অত্যন্ত উপদ্রব আরম্ভ করেন। উপদ্রব আরম্ভ করেন। তন্নিবন্ধন প্রধান রাজমন্ত্রী তাহার উপর অত্যন্ত বিরক্ত হন এবং কৌশলমে সুসীমকে তক্ষশিলায় প্রেরণ ও অশােককে পাটলীপুত্রে আনয়ন করেন। বিন্দুসারের মৃত্যুকাল উপস্থিত। যদিও অশােককে রাজ্যভার অর্পণ করিতে তাহার তাদৃশ ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু মন্ত্রীর অনুরােধে অগত্যা তদ্বিষয়ে সম্মত হন। এক্ষণে অশােক পাটলীপুত্রের রাজা। এ দিকে বিন্দুসারের মৃত্যু সংবাদ পাইয়া সুসীম তক্ষশিলা পরিত্যাগপূৰ্ব্বক তথায় উপস্থিত হইলেন এবং পৈত্রিক রাজ্যে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হইয়া পাটলীপুত্র আক্রমণ করিলেন। রাধাগুপ্ত নামে অশােকের এক বিচক্ষণ মন্ত্রী ছিলেন। অশােক তাহার পরামর্শ ও সাহায্যে সুসী- মকে পরাজয় করিলেন এবং ভাবী অনিষ্ট নিবারণের জন্য অশােকের সংক্ষিপ্ত জীবনী। ১৪৭ মন্ত্রীদিগকে কহিলেন, তােমরা এখনই রাজোদ্যানের সমস্ত বৃক্ষ ফলপুষ্পের সহিত ছেদন কর। কিন্তু মন্ত্রীগণ তদ্বি- ষয়ে সম্মত হইলেন না। তখন অশােক স্বহস্তেই রাজবংশীয় সকলের শিরচ্ছেদন করিলেন এবং নিষ্কণ্টকে রাজ্য-সুখ-সম্ভোগ করিতে লাগিলেন। তিনি একদা শুনিলেন অন্তঃপুরের কতকগুলি স্ত্রীলােক একটী অশােক বৃক্ষের শাখা ভগ্ন করিয়াছেন। এই কথা শনিবামাত্র তাহার মনে অত্যন্ত ক্রোধ উপজাত হইল এবং ঐ সমস্ত অপ্রিয়কারিণী রমণীকে ভস্মসাৎ করিবার জন্য চণ্ড- গরিকনামা জনৈক ঘাতককে আদেশ করিলেন। তৎক্ষণাৎ প্রকাণ্ড অগ্নিকুণ্ড প্রস্তুত হইল এবং চণ্ডগিরিক ঐ সমস্ত স্ত্রীলােককে তন্মধ্যে নিক্ষেপপূৰ্ব্বক দগ্ধ করিয়া ফেলিল। পূর্বে অশােক বেদ্ধধর্মের একজন বিদ্বেষ্টা ছিলেন, এবং ঐ চণ্ডগিরিককেই বৌদ্ধসন্ন্যাসী-বিনাশে নিয়ােগ করেন। এই সময় একটা বিস্ময়কর ঘটনা উপস্থিত হয়। সার্থবাহ নামে কোন এক ধনবান বনিক, অন্যান্য বনিকের সহিত বাণিজ্যার্থ সপরিবারে সমুদ্রযাত্রা করেন। পথিমধ্যে তাহার একটী পুত্র হয়। সমুদ্রে জন্ম বলিয়া উহার নাম সমুদ্র। যখন সার্থবাহ বণিক বার বৎসর পরে গৃহে প্রত্যাগমন করিতেছিলেন, তৎকালে সামুদ্রিক তৎকালে সামুদ্রিক দস্যুর হস্তে পতিত হন, এবং ধনে প্রাণে বিনষ্ট হইয়া যান। তৎকালে কেবল বণিকপুত্র সমুদ্রই অনেক কষ্টে রক্ষা পান। সমুদ্র পিতৃমাতৃহীন ও স্বতসৰ্বস্ব ; তিনি বৌদ্ধ ভিক্ষুক হইয়া ইতস্তত পৰ্যটন করিতে লাগিলেন। একদা তিনি ভিক্ষার্থ ১৪৮ আৰ্য-জীবনী। যদৃচ্ছক্ৰমে ঐ চণ্ডগিরিকের গৃহে উপস্থিত হন। চণ্ডগিরিকও তৎক্ষণাৎ তাহাকে বধ করিবার জন্য উদ্যত হয়, কিন্তু কোন- রূপেই কৃতকাৰ্য্য হইতে পারিল না। তখন সে অতিমাত্র বিস্মিত হইল এবং রাজা অশােককে শীঘ্র এই সংবাদ দিল । অশােক বৌদ্ধভিক্ষুকদর্শনার্থী হইয়া তথায় উপস্থিত হইলে, এবং ভিক্ষুকের বাক্যে বিস্মিত হইয়া তৎক্ষণাৎ চণ্ডগিরিকের শিরচ্ছেদন করিলেন। বৌদ্ধ ভিক্ষুর এই অলৌকিক কাৰ্য রাজা অশােকের মনে বিস্ময় উৎপাদন করিল, এবং তদবধি তিনি বৌদ্ধধর্মে সবিশেষ আস্থাবান হইলেন। পরে তিনি একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর উপদেশক্রমে কুকুটোদ্যান নামক স্থানে একটী চৈত্য নির্মাণ করিলেন এবং তথায় বুদ্ধদেবের অঙ্গবিশেষ স্থাপন করিলেন। তাহার প্রযত্নে রামগ্রামে বৌদ্ধমন্দির প্রতিষ্ঠিত হইল। তিনি রামগ্রাম হইতে গঙ্গাতটে উপস্থিত হন। তথায় বহুসংখ্যক নাগা বাস করিত। তিনি উহাদের অনুরােধে উহাদের গ্রামে ধৰ্ম্মমন্দির নির্মাণ করেন। অশােকের কুনাল নামে এক পুত্র জন্মে। ইহার অপর নাম ধৰ্ম্মবর্ধন। ইনি অল্প দিবসেই নানাশাস্ত্রে সুপণ্ডিত হন এবং বৌদ্ধধৰ্ম্মে অধিকার লাভ করেন। একদা রাজা অশোক কুকুটোদ্যানে কোন এক যতির নিকট ধর্মশিক্ষা করিতে যান । তথায় উপগুপ্তনামা আর একজন বৌদ্ধধৰ্ম্মতত্বপ্রবীণ যতির সহিত তাঁহার পরিচয় হয়। রাজা এই যতিকে বেণুবনস্থ মঠের সমস্ত ভার্পণ করেন। উপগুপ্ত মথুরানিবাসী কোন এক ধনী লােকের পুত্র। ঐ ধনী উরুমুণ্ড পৰ্বতে শােণ বাসীনামা অশোকের সংক্ষিপ্ত জীবনী । ১৪৯ এক বৌদ্ধ সন্নাসীর নিকট ধর্মশিক্ষা করিতেন। তাহার সৰ্বশুদ্ধ তিনটী পুত্র, অশ্বগুপ্ত, পনগুপ্ত, ও উপগুপ্ত। তিনি এই তিনটী পুত্রকে ঐ সন্ন্যাসীর হস্তে অর্পণ করেন। বুদ্ধ কহিতেন (১) “আমার নির্বাণের শত বৎসর পরে উপগুপ্ত নামে এক জন ভিক্ষু উৎপন্ন হইবেন।” বিম্বিসার বুদ্ধদেবের সমকালীন লােক। অশােক বিম্বিসার হইতে ত্রয়ােদশ পুরুষ অন্তর। সুতরাং বুদ্ধের মৃত্যুর পর এক শত বৎসর পরে অশােকের সমকালীন কোন ব্যক্তির জন্ম অসম্ভব। যাহাই হউক, বুদ্ধদেবের এই ভবিষ্যৎ বাক্য রাজচক্রবর্তী অংশাকের গুরু উপগুপ্তের মহিমা বর্ধিত করিয়া দেয়। অশােক ইহার নিকট ধর্মশিক্ষা করেন এবং ইহারই প্ৰবৰ্তনায় তীর্থযাত্রা করিতে যান। তীর্থযাত্রা-প্রসঙ্গে তিনি বহুদেশ দর্শন করেন। তিনি যে সমস্ত প্রদেশে পৰ্যটন করিয়াছিলেন তথায় এক একটী মঠ প্রস্তুত করিয়া দেন। ভারতবর্ষের নানা দেশে তিনি অসংখ্য ত প নির্মাণ করাইয়াছিলেন। ক্রমে ক্রমে তাহার চণ্ড নাম তিরােহিত হইল। অনন্তর তিনি দেশমধ্যে প্রচার করিলেন যে, বৌদ্ধ ধর্ম সর্ব- সাধারণকে গ্রহণ করিতে হইবে। তিনি নূতন-ধৰ্ম্ম-প্রচার এবং ইহার গৌরববিস্তার করিবার জন্য বিস্তর অর্থ ব্যয় করিতে এই সকল কারণে তিনি ধৰ্ম্মাশোকনামে প্রথিত হইয়া উঠেন। বুদ্ধগয়াতে যে বােধিবৃক্ষ আছে, তাহার লাগিলেন। (৩) মম নিবৃতিমারভ্য শতবর্যোগতে উপগুপ্তনামা ভিক্ষুরুংপুংস্ততে।

আৰ্য-জীবনী। শােভাসম্পাদনার্থও তাহার অনেক ব্যয় হয়। এই বােধি- বৃক্ষতলে বুদ্ধদেব ধর্মোপদেশ প্রদান করিতেন। পবিষ্য- রক্ষিত নামে তঁাহার এক মহিষী ছিলেন। তিনি রাজ। অশোককে পৈতৃক ধর্ম পরিত্যাগ করিতে দেখিয়া অত্যন্ত বিরক্ত হন এবং পবিত্র বােধিবৃক্ষ নষ্ট করিবার নিমিত্ত মাতঙ্গীনাম্নী এক চণ্ডালীকে প্রচ্ছন্নভাবে নিয়ােগ করেন। ঐ চণ্ডালী ঔষধ ও মন্ত্রবলে ঐ বৃক্ষ শুষ্ক করিয়া ফেলে। অশােক, বােধিবৃক্ষ নষ্ট হইয়াছে শুনিয়া, শশাকে অত্যন্ত অভিভূত হন। তৎকালে রাজমহিষী তাহাকে সান্ত্বনা করিবার নিমিত্ত বিস্তর চেষ্টা করিয়াছিলেন, তিনি কিছুতেই এবােধ মানিলেন না। পরিশেষে মহিষী বৃক্ষকে পুনর্জীবিত করিবার নিমিত্ত ঐ চণ্ডাণীকে নিয়ােগ করিলেন । বৃক্ষও মন্ত্রৌষধিবলে পুনরায় সজীব হইয়া উঠিল। অনন্তর অশােক পাঁচ বৎসর বৌদ্ধসংসর্গে কালক্ষেপ করেন। তৎকালে তিনি মন্দর পৰ্বত হইতে আগত সপিণ্ডলভরদ্বাজনাম। এক বৌদ্ধ যতিকে স্বরাজ্যমধ্যে বৌদ্ধধর্ম প্রচারার্থ নিয়ােগ করিয়াছিলেন এবং পঞ্চম বৎসরান্তে আড়ম্বর সহকারে একটা ধর্মোৎসবের অনুষ্ঠান করিয়া বৌদ্ধ পুরােহিতদিগকে বিস্তর অন্ন বস্তু দান করেন। এ দিকে অশােকের পুত্র কুনালের বিবাহকাল উপস্থিত হইল। কুনাল কাঞ্চনমালা-নামী সৰ্বাঙ্গসুন্দরী একটী কন্যার পাণিগ্রহণ করেন। বিবাহের অব্যবহিত পরেই অশােক কুনালকে বিদ্রোহশান্তির নিমিত্ত তক্ষশিলায় প্রেরণ করিলেন।

অশােকের সংক্ষিপ্ত জীবনী । ১৫১ L কুঞ্জরকর্ণ বিদ্রোহীদিগের অধিনায়ক। রাজকুমার কুনালের নিকট পরাস্ত হইলে দেশমধ্যে সর্বাঙ্গীন শান্তি সংস্থাপিত হইল। এই ঘটনার কিছুদিন পরে একদা অশােক স্বপ্নযােগে দেখিলেন, যেন রাজকুমার কুনালের মুখ বিবর্ণ ও শুষ্ক হইয়া গিয়াছে। তিনি এইরূপ দুঃস্বপ্ন দেখিয়া দৈবজ্ঞদিগকে জ্ঞাপন করিলেন। দৈবজ্ঞের। কহিল, রাজন! এক্ষণে একটা দুর্ঘটনা উপস্থিত হইবার সম্ভাবনা--প্রাণনাশ, সন্ন্যাসী হইয়া দেশত্যাগ, বা অন্ধতা। ইহা শুনিয়া রাজা অশােক অত্যন্ত দুঃখিত হইলেন, এবং তদবধি তিনি সমস্ত রাজকাৰ্য কিছুমাত্ৰ পৰ্যবেক্ষণ করিতেন না। তিয্যবক্ষিতা নামে অশােকের আর এক মহিষী ছিলেন। তিনি কুনালের বিমা, তিনি রাজার স্বপ্নবৃত্তান্ত সমস্তই শুনি- লেন এবং সুযােগ বুঝিয়া রাজকাৰ্য্য স্বহস্তে লইলেন। তিনি কাৰ্যপৰ্যবেক্ষণ, আজ্ঞাদান এবং পত্রাদি স্বাক্ষর করিতেন। সপত্নীপুত্র বলিয়া কুনালের উপর তাহার অত্যন্ত বিদ্বেষ ছিল। তিনি রাজকীয় মুদ্রায় পত্র অঙ্কিত করিয়া কুঞ্জরকর্ণকে এইরূপ লিখিলেন যে, তুমি আমার আদেশ পাইকমাত্র রাজকুমারের চক্ষু উৎপাটন করিয়া লইবে। কুঞ্জরকর্ণ এই আদেশপত্র পাইয়া অত্যন্ত বিস্মিত হইল এবং এক জন চণ্ডালের সাহায্যে এই কঠোর রাজাজ্ঞা প্রতিপালন করিল ! এ বিষয়ে মতাম্ভর দৃষ্ট হয়। পরে রাজকুমার কুনাল অন্ধ হইয়া ভিক্ষুকবেশ-ধারণ- পূৰ্ব্বক প্রচ্ছন্নভাবে তক্ষশীলা পরিত্যাগ করিলেন। একদা আৰ্য-জীবনী। তিনি পৰ্যটনপ্রসঙ্গে পাটলীপুত্তে উপস্থিত হন, এবং রাত্রি- কালে রাজার হস্তিশালায় আশ্রয় লন। তখন রাত্রি দ্বিপ্রহর এবং জনপ্রাণী নিস্তব্ধ হইয়াছে, এই অবসরে রাজকুমার একাকী বংশীবাদন করিতে লাগিলেন। তখন রাজা অশােক জাগরিত ছিলেন। তিনি বংশীরবে অত্যন্ত বিমােহিত হইলেন। পর দিন অশােক প্রাতঃকালে বংশীবাদককে আহ্বান করিলেন এবং তাহাকে দেখবামাত্র বুঝিলেন যে তিনিই তাহার একমাত্র পুত্র কুনাল। অনন্তর অশােক রাজকুমার কুনালকে এই দুরবস্থার কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। কুনাল তাহার নিকট আদ্যোপান্ত সমস্তই কহিলেন। তাহা শুনিয়া অশোক ক্রোধে একান্ত অধীর হইয়া উঠিলেন এবং মহিষীর মস্তক ছেদন করিবার নিমিত্ত অসি গ্রহণ করিলেন; কিন্তু কুনাল বুদ্ধদেবের নাম গ্রহণ পূর্বক তাহার ক্রোধশান্তির চেষ্টা করিতে লাগিলেন। শক্রর প্রতি এইরূপ দয়া ও সদ্ভাব প্রদর্শন করাতে তাহার অন্ধতাও দূর হইল। অনন্তর রাজ্যের কতকগুলি লােক রাজা অশােককে রাজ্য- মধ্যে বৌদ্ধধর্ম প্রচারে একান্ত যত্নবান্, দেখিয়া বীতশােকের আশ্রয় লইল এবং যাহাতে রাজার বৌদ্ধধর্মে শ্রদ্ধার, হ্রাস হয় তদ্বিষয়ে বিশেষ চেষ্টা করিতে বলিল। বীতশােক অশােককে পৈতৃক ধৰ্ম্মে আনিবার জন্য অনেক উপায় অবলম্বন করিলেন, কিন্তু কোনটাই বিশেষ ফলােপধায়ক হইল না। পরি- শেষে রাজমন্ত্রী এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিলেন এবং গোপনে বীতশােককে নানারূপ প্রলােভন দেখাইলেন। অশােক অশােকের সংক্ষিপ্ত জীবনী। লেন। বীতশােকের দুশ্চেষ্টার বিষয় জানিতে পারিয়া অত্যন্ত কুপিত হইলেন এবং অবিলম্বে তাহার শিরচ্ছেদন করিবার আজ দিলেন। তখন রাজমন্ত্রী মধ্যস্থ হইয়া সপ্তাহকাল ক্ষমা চাহি- ইত্যবসরে বীতশােকও পলায়নপূৰ্ব্বক উপগুপ্তের অশ্রয় লইলেন এবং উপগুপ্তের শিষ্য গুণাকরের প্রসাদাৎ সন্ন্যাসধর্ম গ্রহণ করিলেন। কিন্তু ইহাতেও তাহার প্রাণ- নাশের আশঙ্কা বিদূরিত হইল না। ঐ সময় বৌদ্ধধর্মের একজন পরম শত্রু উদিত হয়। ঔ ব্যক্তি আপনার প্রতি- কৃতির পাদমূলে বুদ্ধের মূর্তি চিত্রিত করিয়া সেই আলেখ্য সর্বত্র প্রচারপূর্বক বৌদ্ধধর্মের সাতিশয় নিন্দাবাদ করিতে লাগিল। ক্রমশঃ এই ব্যাপার রাজ্যের সৰ্ব্বত্র অত্যন্ত প্রচার হইয়া উঠিল। তখন অশােক তাহার শিরচ্ছেদনে উদ্যত হইলেন এবং যে এই কাৰ্য্য সমাধা করিবে তাহাকে উপযুক্ত পুরস্কার দিবেন। এই পারিতােষিক-লােভে একদা একজন আলীর ভ্রান্তিক্রমে বীতশােককে ধরিল এবং তাহার দীর্ঘ জটাভার দেখিয়া তাহাকেই বুদ্ধশত্রু স্থির করিয়া তাহার মস্তক ছেদন করিল। তখন অশােক বীতশােকের ছিন্ন মস্তক দেখিয়া অত্যন্ত দুঃখিত হইলেন এব উপগুপ্তের নিকটে গিয়া ধর্মোপদেশে দুঃখ শান্তি করিলেন। অশােকের দেবী নামে আর এক মহিষী ছিলেন। তাহার গর্ভে মহেন্দ্রনামা এক তনয় এবং সঙ্ঘমিত্রানামী এক তনয়ার জন্ম হয়। ইহরা উভয়ে তরুণবয়সে সিংহলদ্বীপে যাত্রা ১৫৪ আৰ্য-জীবনী। করেন এবং তথায় অবস্থানপূর্বক তত্ত্বত্য ভূপতিকে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত করেন। রাজা অশােক দক্ষিণাপথবাসীদিগকে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত করিবার নিমিত্ত ধর্মপ্রচারক প্রেরণ করেন। প্রচারকের। উড়িষ্যা, কলিঙ্গ, কর্ণাট, তৈলঙ্গ মহারাষ্ট্র প্রভৃতি স্থানের লােকদিগকে বৌদ্ধধর্মাবলম্বী করিলেন। ধর্মপ্রচারের সহিত দক্ষিণাপথপ্রদেশে আধিপত্যবিস্তারও অশােকের অভীতি ছিল। সুতরাং তিনি সম্পূর্ণ ফললাভ করিতে পারেন নাই; কিন্তু অনেকাংশে কৃতকার্য হইয়াছিলেন। মগধসাম্রাজ্য হইতে ভারতবর্ষের এই একটা মহােপকার। অশােকনৃপতির এই চেষ্টা দর্শনে ব্রাহ্মণগণ দক্ষিণাপথে ব্রাহ্মণ্যধর্মপ্রচারে যত্নশীল হইয়া মহারাষ্ট্র, দ্রাবিড়, কেরল প্রভৃতি প্রদেশে পৌরাণিক ধৰ্ম্ম প্রচার করিয়াছিলেন। অশােক নরপতি ৩৭ বৎসর রাজ্যশাসন করিয়া মানবলীলা সংবরণ করেন। প্রায় সমস্ত ভারতবর্ষে তাহার আধিপত্য- বিস্তার হইয়াছিল। তিনি ধর্মাশােক এবং প্রিয়দশী নামে কীৰ্তিত হইতেন। তাঁহার মৃত্যুর পর তদাত্মজগণ তদীয় সুবিশাল রাজ্য আপনাদিগের মধ্যে বিভাগ করিয়া লন। কুনাল পঞ্চনদপ্রদেশের অধীশ্বর হইলেন। ইনি ধৰ্ম্মবর্ধন নানে প্রথিত হন। জলােকনামা আর এক পুত্র কাশ্মীররাজ্য গ্রহণ করিলেন। পাটলীপুত্র তাহার তৃতীয় পুত্রের শাসনাধীন রহিল। সংবৎপ্রারম্ভের ২০৭ বৎসর পূর্বে অর্থাৎ ২৬৩ পূৰ্ব্ব খৃষ্টাব্দে অশােক সিংহাসনে আরােহণ এবং শাক্যসিংহের মৃত্যুর ২০২ বৎসর পরে অর্থাৎ ২৪৫ পূর্ব খষ্টাব্দে বৌদ্ধধর্মা- অশােকের সংক্ষিপ্ত জীবনী । অবলম্বন করেন। অশােক চন্দ্রগুপ্তের পৌত্র। তাঁহার পিতা বিন্দুসার ২৮ বৎসর রাজত্ব করেন। বিষ্ণুপুরাণমতে অশােক পুত্র সুসপ্ত, মগধের রাজা হন। • কাথিবারপ্রদেশে গির্ণারপৰ্বতে, পেশৌরসন্নিহিত কপর্দি- গিরিতে, উড়িষ্যান্তৰ্গত ধাউলীতে এবং দিল্লী ও প্রয়াগনগরের লাট অর্থাৎ স্তম্ভসমূহে অশােকবন্ধনের বিস্তর অনুশাসনলিপি প্রাপ্ত হওয়া গিয়াছে। এই সকল লিপিতে প্রধানতঃ বৌদ্ধ ধর্মসংক্রান্ত এবং তাঁহার রাজনীতি ও রাজ্যশাসন প্রণালী- সম্পর্কীয় নানা বিষয় উল্লিখিত আছে। ধৰ্ম্মানুশাসনের জন্যই তিনি বিশেষরূপে প্রসিদ্ধ। অশােক বৌদ্ধধর্মাবলম্বন করিবার পূর্বে দুবৃত্ত, নৃশংস, এবং অনুদার ছিলেন; কিন্তু বৌদ্ধ হইবার পর তাঁহার চরিত্র সম্পূর্ণ নবীভাব ধারণ করিল। তিনি সুবৃত্ত, সদাত্মা, এবং উন্নতাশয় হইয়া উঠেন। তাহার ধর্মভাব প্রবল এবং কর্তব্যনিষ্ঠা বলবতী হইয়া উঠিল তিনি নামে প্রিয়দশী এবং কাৰ্য্যে সমদর্শী ছিলেন। তিনি ব্রাহ্মণ ও শ্রমণ উভয়কে তুল্য ভাবে দর্শন করিতেন। মনুষ্য এবং পশুজাতির উপকারার্থে অনেকগুলি চিকিৎসালয় ও উদ্যান স্থাপিত হয়। তিনি স্বীয় অনুশাসন পত্র দ্বারা প্রজাদিগকে নীতিমা ও ন্যায়বান্ হইতে আদেশ করেন। এই সকল অনুশাসন- পত্র পাঠ করিলে সম্যক্ প্রতীতি হয় যে, অশােকের সময়ে বৌদ্ধধর্ম বিশুদ্ধ এবং দোষলেশশূন্য ছিল। অনুশাসনগুলি সাম্য এবং ন্যায়পরতার উচ্চভাবে পরিপূর্ণ। ইহাদের কতকগুলি ধৰ্ম্মসম্বন্ধীয়, কতকগুলি রাজ্যশাসন-প্রণালী-

১৫
আৰ্য্য-জীবনী।
বিষয়ক এবং কতকগুলি নিজচরিত্রসংক্রান্ত। ধর্মসম্বন্ধীয়
অনুশাসনগুলির
মতে মানবজাতির
সর্বসাধারণ
ধৰ্ম্ম হওয়া উচিত। ইহলােকে এবং পরলােকে সুখভােগই
ধৰ্ম্মশীলতার পুরস্কার। জনক জননীর প্রতি ভক্তি,
আত্মীয় প্রতিবাসী ও বন্ধুজনের প্রতি, স্নেহ ও প্রীতি,
পশুজাতির প্রতি দয়া, ভৃত্যাদি নিকৃষ্ট জনের প্রতি
সদাচরণ, ব্রাহ্মণ এবং শ্রমণদিগের প্রতি শ্রদ্ধা, প্রভুর
প্রতি সম্মান, নিন্দাবাদ ও কুৎসাপরিহার, ক্রোধ
নিষ্করুণতা অমিতব্যয়িতা প্রভৃতির দমন, সদাশয়তা সমদর্শিতা
ভূতানুকম্পা প্রভৃতির পরিচালনা ইত্যাদি বিষয়ের
প্রবৃত্তিবিধায়ক ভূরি ভূরি উন্নত উপদেশ ধৰ্ম্মসম্পৰ্কীয়
অনুশাসনাবলীতে প্রাপ্ত হওয়া যায়। অশােক প্রচারকদিগকে
সর্বত্র এই সমস্ত উপদেশ প্রচার করিতে বলিতেন।
সকল উপদেশ পালন দ্বারা স্বর্গসুখলাভ হয়, এবংবিধ প্রলােভন
প্রদর্শিত হইত।
রাজ্যশাসনসম্পৰ্কীয় অনুশাসনগুলির তিনটী মুখ্য উদ্দেশ্য
ছিল। প্রথমতঃ, আহার বা যজ্ঞের নিমিত্ত জীবহত্যানিষেধ
দ্বিতীয়তঃ, সমুদয় রাজ্য মধ্যে ঔষধশালা ও চিকিৎসালয়
সংস্থাপন ; এবং তৃতীয়তঃ, নীতিশিক্ষার প্রবর্তন। অহিংসা ও
প্রাণিবর্গের প্রতি কারুণ্য অশােকের অনুশাসনপত্রনিবহের মূল
অশােক প্রকৃত হিতৈষী ছিলেন এবং
তাঁহার হৃদয়কর জন্তুগণের প্রতি দয়ারসে অভিষিক্ত ছিল।
পূর্বে তিনি মাংস আহার এবং যাগাৰ্থে পশুবধ করিতেন।
তৎকালে তিনি প্রতিদিন বছিসহজ ব্রাহ্মণ ভােজন
;
বিষয়।

অশােকের সংক্ষিপ্ত জীবনী। ১৫৭ করাইতেন কিন্তু বৌদ্ধধর্মের প্রভাবে তাহার মানসিক গতি ও ভাব পরিবর্তিত হয়। মনুষ্য এবং পশুদিগের ব্যাধি- প্রতীকারের জন্য যেমন চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠিত হইল, অমনি সেই সঙ্গে প্রত্যেক রাজপথের মধ্যে মধ্যে কূপখনন এবং ছায়া-তরু রােপণ করিতে আদেশ প্রচারিত হইল। নীতিশিক্ষা দিবার অভিপ্রায়ে এবং দুষ্ট ব্যক্তিদিগকে দণ্ডিত ও শিষ্ট ব্যক্তিদিগকে পুরস্কৃত করিবার উদ্দেশ্যে কতক- গুলি পুরুষ. নিযুক্ত হয়। ইহাদিগের হস্তে অনুসন্ধান এবং শাসনের ক্ষমতা ন্যস্ত হইয়াছিল। অবশিষ্ট অনুশাসন দ্বারা অশােক প্ৰজাদিগকে ধৰ্ম্মমার্গে আনয়ন করিতে অধিকতর সফল হইয়াছিলেন। পূর্বোক্ত অনুশাসনগুলিতে প্রজাদিগের চিত্ত আশানুরূপ আশানুরূপ আকৃষ্ট হয় নাই। শেষ অনুশাসনগুলি স্বচরিত্রসম্বন্ধীয়। এই সকল হইতে জানা যায় যে, অশােক মৃগয়া, বৃথাটা, অক্ষক্রীড়া প্রভৃতি ব্যসনে আসক্ত ছিলেন না। তিনি ব্রাহ্মণ ও শ্ৰমণ দিগকে ভিক্ষাপ্রদান এবং সন্দর্শন করিতে বিশেষ আনন্দ অনুভব করিতেন। তিনি আগমবৃদ্ধ, শীলবৃদ্ধ, এবং বয়ােবৃদ্ধ ব্যক্তিদিগকে পুরস্কার দান করিতেন। তিনি দেশ ও প্রজাগণের অবস্থা পরিদর্শন, নৈতিক নিয়মপ্রচার এবং নৈতিক ব্যবহার প্রচলন করিতে ভাল বাসিতেন। তিনি অন্য ধর্মের উপর অত্যাচার করিতেন না। সর্বপ্রকার ধৰ্ম্মই তাহার সমীপে যথােচিত শ্রদ্ধা এবং উৎসাহ প্রাপ্ত হইত। সর্বত্রই হিতকর এবং ধৰ্ম্মানুমােদিত সৎকাৰ্য্য সকল তাহার দ্বারা সমাদৃত ও প্রশংসিত হইত। সৰ্ববিধ ধর্মাশ্রয়ীরাই

১৫৬
আৰ্য-জীবনী।
জাহার দানে অধিকৃত ছিল। তিনি বলিতেন ধর্ষকার্যে
জানই প্রকৃত দান এবং ইহা হইতেই প্রকৃত সুখের উদয়
চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বসময়ে মগধ-সাম্রাজ্যের বিশিষ্ট উন্নতি
হইয়াছিল। অশােকের শাসনকালে সে উন্নতির গতিরােধ
হয় নাই, বরং পরিসরবৃদ্ধি হয়। গুজ্জর, কাবুল, কাশ্মীর,
প্রয়াগ, দিল্লী, কটক, প্রভৃতি স্থানে স্থানে তাহার বিজয়-
বৈজয়ন্তী উড্ডীয়মান হইয়াছিল। সমস্ত আৰ্যাবৰ্ত্ত তাহার
শাসনবশ্যতা স্বীকার করিয়াছিল। সর্বত্র ধর্মভাব, সুখ ও
শান্তি বিরাজিত। চোল, পাণ্ড্য, সত্যপুত্র, কেরল প্রভৃতি (6)
জনপদেও তাঁহার শাসন প্রসারিত হয়। ধর্মের যথেষ্ট অনুশীলন
হইত বটে; কিন্তু ঈশ্বরের সহিত ইহার কোন সম্পর্ক ছিল না।
পুরস্কারের আশায় লােকে ধর্মের অনুসরণ এবং শান্তির আশঙ্কায়
পাপের পরিবর্জন করিত।
অশােকের রাজত্বকালের সপ্তদশ বর্ষে পাটলীপুত্র নগরে
বৌদ্ধদিগের তৃতীয় মহাসমিতির অধিবেশন হয়। ইহাতে
একসহ যতি উপস্থিত ছিলেন। বিনয় ও অভিধৰ্মনামক
গ্রন্থদ্বয়ের পাঠ হইত, এবং নয় মাস ইহা চলিয়াছিল। ইহাতে
যে যদি সভাপতি হইয়াছিলেন, তিনি ধর্মবিষয়ে সংশয়
(৪) চোল আধুনিক তাঞ্জোর ( Tanjore )। পা মাডুরা
( Madura) এবং টিমেবেলী (Tinnevelly)। সত্যপুত্র নর্মদানদীর
দক্ষিণস্থিত সাতপুরা শৈলশ্রেণী অর্থাৎ মহারাজ হােলকারের রাজ্য! কেবল
মালাৰাৰ উপকূল প্রদেশ।

অশােকের সংক্ষিপ্ত জীবনী।
১৫৯
নিরসনের উপায় সম্বন্ধে বিবিধ উপদেশ প্রদানপূর্বক সভাঙ্গ
করেন। এই সমিতির পরেই বৌদ্ধধর্মপ্রচারার্থ চতুর্দিকে
প্রচারক সকল প্রেরিত হন। দীপবংশের অষ্টম অধ্যায়ে
এবং মহাবংশের দ্বাদশ অধ্যায়ের ইহাদিগের উল্লেখ আছে।
কাশ্মীর এবং গান্ধার দেশে মধ্যাস্তিকনামা জনৈক প্রচারক
গমন করেন। মহীশ প্রদেশে মহাদেব, বনবাসিদেশে রক্ষিত
অপরান্তকজনপদে ধৰ্ম্মরক্ষিত, মহারাষ্ট্রে মহাধৰ্ম্মরক্ষিত,
হিমবদঞ্চলে মধ্যিম, যােনললাকে মহারক্ষিত, সুবর্ণভূমিতে সেন
ও উত্তর (৫), এবং লঙ্কাদ্বীপে মহেন্দ্র ও সঙ্ঘমিত্রা প্রেরিত
হন।
ইহারা
সকলেই বৌদ্ধধর্মপ্রচারে কৃতকাৰ্য
হইয়াছিলেন।
অশােক নৃপতির নাম ভারতবর্ষের ইতিহাসের পৃষ্ঠে
স্বর্ণাক্ষরে চিরকাল অঙ্কিত থাকিবে। ভারতের ইতিহাস
হইতে তাহার নাম কখনও বিলুপ্ত হইবে না। তিনি
যে সকল কীর্তি রাখিয়া গিয়াছেন, তৎপ্রভাবে তিনি অমর
হইয়া চিরদিন ইতিহাসের বরণীয় থাকিবেন। “কীৰ্তির্যস্য স
জীবতি।”
(৫) শহীশ দেশ গোদাবরীনদীর দক্ষিণে স্থিত নিজামের রাজ্যের
অন্তর্গত। বনবাসিজনপদ সম্ভবতঃ গাজপুতানায় একাও তুমি
প্রান্তদেশ। পরাক পঞ্চনদ প্রদেশের পশ্চিমাংশ। বােনকে
বর্তমান ব্যাকটি য়া (Bactria) সুবর্ণভূমি মালেয়া উপদ্বীপ (Malay),
অথবা রেঙ্গুন হইতে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত
বঙ্গোপসাগবের উপকূল
এদেশ।

অশােকের সংক্ষিপ্ত জীবনী
নিরসনের উপায় সম্বন্ধে বিবিধ উপদেশ প্রদানপূর্বক সভাভঙ্গ
করেন। এই সমিতির পরেই বৌদ্ধধর্মপ্রচারার্থ চতুর্দিকে
প্রচারক সকল প্রেরিত হন। দীপবংশের অষ্টম অধ্যায়ে
এবং মহাবংশের দ্বাদশ অধ্যায়ের ইহাদিগের উল্লেখ আছে।
কাশ্মীর এবং গান্ধার দেশে মধ্যাস্তিকনামা জনৈক প্রচারক
গমন করেন। মহীশ প্রদেশে মহাদেব, বনবাসি-দেশে রক্ষিত
অপরাজনপদে ধৰ্ম্মরক্ষিত, মহারাষ্ট্রে
মহারাষ্ট্রে মহাধরক্ষিত,
হিমবদঞ্চলে মধ্যিম, যােনললাকে মহারক্ষিত, সুবর্ণভূমিতে সেন
ও উত্তর (৫), এবং লঙ্কাদ্বীপে মহেন্দ্র ও সঘমিত্রা প্রেরিত
হন। ইহারা সকলেই বৌদ্ধধর্মপ্রচারে কৃতকাৰ্য্য
হইয়াছিলেন।
অশােক নৃপতির নাম ভারতবর্ষের ইতিহাসের পৃষ্ঠে
স্বর্ণাক্ষরে চিরকাল অঙ্কিত থাকিবে। ভারতের ইতিহাস
হইতে তাহার নাম কখনও বিলুপ্ত হইবে না। তিনি
যে সকল কীৰ্ত্তি রাখিয়া গিয়াছেন, তৎপ্রভাবে তিনি অমর
হইয়া চিরদিন ইতিহাসের বরণীয় থাকিবেন। “কীৰ্ত্তিৰ্যস্ত স
জীবতি।”
(৫) মহীশ দেশ গোদাবরীনদীর দক্ষিণে স্থিত নিজামের রাজ্যের
অন্তর্গত। বনবাসিজনপদ সম্ভবতঃ রাজপুতানার প্রকাও তুমি
প্রান্তদেশ। পরান্তক পঞ্চনদ প্রদেশের পশ্চিমাংশ। যােনলেক
বর্তমান ব্যাকটি মা (Bactria) সুবর্ণভূমি মালেয়া উপদ্বীপ (Malay),
অথবা রেঙ্গুন হইতে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত , বঙ্গোপসাগরের উপকূল
এদেশ।

দানবীর ভােজপ্রমারের সংক্ষিপ্ত জীবনী । ভােজপ্রমারের নাম ভারতবর্ষের ইতিহাসে চিরপ্রসিদ্ধ। খারানগরীপতি ভােজরাজ যশস্বী নৃপতি, বিখ্যাত গ্রন্থকার এবং বিদ্যার অদ্বিতীয় উৎসাহদাতা বলিয়া সৰ্ব্বত্র বিদিত। কি কাব্য, কি উপন্যাস, কি উপাখ্যান-সৰ্ব্বত্র ইহার নাম প্রশংসার সহিত কীৰ্ত্তিত হইয়াছে। তথাপি ইহার সমস্ত ঐতিহাসিক বৃত্তান্ত এক্ষণ পর্যন্ত প্রকাশিত হয় নাই। ভােজ- প্রবন্ধ এবং ভােজচরিত নানাবিধ কাল্পনিক উপাখ্যানে পরিপূর্ণ। বল্লাল প্রভৃতি অনেকে প্রকৃত ইতিহাসকে এরূপ অতিরঞ্জিত করিয়াছেন যে, তাহার সারনিষ্কর্ষ প্রায় দুরূহ। “এসিয়াটিক সােসাইটির জর্নাল” প্রভৃতি গ্রন্থে ভােজবিষয়ক কতকগুলি বিবরণ সংকলিত হইয়াছে। হর্ষ-চরিত, কুমারপাল-চরিত, বিক্রম-চরিত, নব-সাহসাঙ্ক চরিত, বিক্রমাঙ্ক-চরিত, ভােজ- চরিত প্রভৃতি গ্রন্থ হইতে হর্ষ প্রভৃতি রাজগণের ইতিহাস অনেক পরিমাণে জ্ঞাত হওয়া যায়। এ প্রস্তাবে আমরা ভােজ নৃপতির সম্বন্ধে যাহা জ্ঞাত হইয়াছি তাহা পাঠকবর্গকে উপহার দিলাম। ভােজ নামে অনেকগুলি রাজা এবং বিখ্যাত ব্যক্তি জন্ম- পরিগ্রহ করিয়াছিলেন। ইহাদিগকে সম্পূর্ণরূপে প্রভেদ করা যায় না। অনেকের সংস্কার এই যে, ভােজ নাম 'দেখিলেই ধারাখিপ ভােজপ্রমার স্থির করিতে হইবে। এ সংস্কার নিতান্ত ভ্রান্তিমূলক। ঋগ্বেদসংহিতার তৃতীয় অষ্টকের তৃতীয় অধ্যায়ে ভােজপ্রমারের সংক্ষিপ্ত জীবনী। বিংশবর্গের সপ্তম সূক্তে ভােজ নাম লক্ষিত হয়। ভাষ্যকার সাণাচাৰ্য ইহার ‘সুদাসৰংণীয় ক্ষত্রিয়’ অর্থ করিয়াছেন (১)। মহাভারতের আদিপর্বে ভােজ নাম দুই বার দৃষ্ট হয়। পাণ্ডব- জমনী কুন্তী ভােজনরপতির পালিত কন্যা। দ্রৌপদী-স্বয়ংবর- স্থলে শধরশ্রেষ্ঠ ভােজনামক আর এক ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। ইনি বিহারান্তর্গত ভােজপুরের অধিনায়ক। মহা- ভারতের অন্য এক স্থলে উল্লিখিত আছে “যদুর বংশধরগণ যাদব নামে বিখ্যাত, তুৰ্ব্বসুর বংশধরগণ যবন নামে বিদিত, দ্রুবংশীয়গণ ভােজ নামে পরিচিত, এবং অনুর সন্তানগণ স্লেচ্ছজাতি বলিয়া বিজ্ঞাত।” ইহা দ্বারা ভােজ একটা গােত্র- নাম বলিয়া প্রতীয়মান হয়। রঘুবংশে অপর এক ভােজ ভূপতির উল্লেখ আছে। উড়িষ্যার ইতিবৃত্তে আমরা আর এক জন ভােজকে প্রাপ্ত হই। ইনি ৩ হইতে ১৩০ সংবৎ পর্যন্ত রাজত্ব করেন, এবং ইহার সভাতে কালিদাস প্রভৃতি ৭৫ জন কবি বিদ্যমান ছিলেন (২)। ইহা সকলেই জানেন যে, যেখানে বিক্রমাদিত্য বা ভােজ নৃপতি, সেখানেই কালি- দাস। ভারতে বিক্রমাদিত্য এবং ভােজ অনেকগুলি ; সুতরাং কালিদাসও অনেকগুলি। এইরূপ অনেকগুলি (১) ইমে ভােলা আঙ্গিরসােবিরূপাং'—ঋহ্মেদ, ৩ মণ্ডল, “ইমে গং কর্বাণা ভােলা সৌদাসা ক্ষত্রিয়াঃ বিরূপা নানারূপাঃ- সায়ণঃ। (২) As Soc. Journal. No. If, ii63, p. 93.

আৰ্য-জীবনী । তােজের নাম করা যাইতে পারে; কিন্তু তাহাতে কোন ফল- লাভের সম্ভাবনা নাই। ভানুমতী নামে একখানি বাঙ্গালা উপকাসে ভােজকে 'বিক্রমার্কের শ্বশুর এবং ভােজবাজির প্রব- ওঁক বলা হইয়াছে। আমাদের দেশে বেদিয়ারা যে বাজি করিয়া থাকে তাহাকে ভােজবাজি বলে, এবং উহাদের মতে ভােজ ঐ বাজির প্রবর্তয়িতা। এই সকল ভােজ সম্বন্ধে কোন কথা বলা আমাদের বর্তমান প্রস্তাবের উদ্দেশ্য নহে। আমরা ধারানগরীর অধীশ্বর প্রমারবংশীয় ভােজনৃপতির কথা বলিব। মালব দেশে ধারারাজ্যে সিন্ধুরাজসুত সিন্ধুল নামে জনৈক রাজা ছিলেন। মালব দেশ বহুকাল হইতে বিদ্যা, সভ্যতা এবং বিশুদ্ধ নীতির নিমিত্ত প্রসিদ্ধ। সিন্ধুল নৃপতি বহু বৎসর নিজ প্রজাগণকে পুত্র-নির্বিশেষে পরিপালন করিয়াছিলেন। ইহার বৃদ্ধ বয়সে ভােজ নামে এক পুত্র জন্মে। ভােজ পঞ্চবর্ষ- বয়স্ক হইলে সিন্ধুল নৃপতি আপনাকে জরাপ্রপ্রীড়িত দেখিয়া চিন্তা করিতে লাগিলেন যে, তাহার পুত্র অতি শিশু এবং তাঁহার কনিষ্ঠ ভ্রাতা মুঞ্জ মহাবলসম্পন্ন, অতএব যদি তিনি অনুজকে রাজ্য না দিয়া পুত্রকে রাজ্যে অভিষিক্ত করেন তাহা হইলে লােকাপবাদ হইবে এবং রাজ্যলােভবশতঃ মুঞ্জও বিষাদি প্রয়ােগে ভােজের বিনাশসাধন করিতে পারেন। সুতরাং ভােজকে রাজা করিলে পুহানি এবং বংশােচ্ছেদের সম্ভাবনা। এই সকল বিবেচনা করিয়া তিনি মুঞ্জকে রাজ্যভার প্রদান পূৰ্বক ভােজকে তঁাহার হস্তে সমৰ্পণ করিলেন। তদনন্তর রাজার পরলােক প্রাপ্তি হইলে মুঞ্জ ভূপতি মুখ্যামাত্য বুদ্ধি- সাগরকে পদচ্যুত করিয়া তৎপদে অন্য এক ব্যক্তিকে নিযুক্ত ভােজপ্রমারের সংক্ষিপ্ত জীবনী । ১৬৩ করিলেন এবং স্বপুত্র জয়ন্ত ও ভ্রাতৃজ ভােজকে বিদ্যা শিক্ষা করাইতে লাগিলেন। ক্রমে ক্রমে ভােজ নানাশাকুশল হইয়া উঠিলেন। ভােজপ্রবন্ধের মতে মুঞ্জ সিঙ্কুলের অনুজ ভ্রাত। কিন্তু ভােজ-চরিতে মতান্তর দৃষ্ট হয় (৩)। উহার অনুসারে সিন্ধু নৃপতি একদা মৃগয়া করিতে করিতে বনমধ্যে মুঞ্জতৃণের উপর একটী নবজাত শিশু দেখিতে পাইলেন এবং তাহাকে গৃহে আনিয়া নিজ ভাৰ্যা পদ্মাবতীর হতে পালনার্থ অৰ্পণ করিলেন। এই শিশুই শেষে মুঞ্জ নামে বিখ্যাত হয়। সুতরাং মুঞ্জদেব ভােজদেবে আপনার পিতৃব্য নহেন। মুঞ্জদেবের রাজ্যশাসনকালে একদা সকলৰিদ্যাচতুর এক জন বিগ্র রাজসভাতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন এবং আপনাকে সর্বজ্ঞ বলিয়া রাজসকাশে পরিচয় দিলেন। মুখদেব নানাবিষয়ক প্রশ্ন করিয়া সদুত্তরলাভে পরিতুষ্ট হইলেন এবং তােজের জন্মপত্রিকা জিজ্ঞাসা করিলেন। ভােজ বিপ্ৰসমীপে আনীত হইলে, বিপ্র তাহাকে যত্ন পূর্বক সন্দর্শন করিয়া রাজাকে বলিলেন “ভােজের সৌভাগ্য বর্ণনা করিতে স্বয়ং বিধাতাও সমর্থ নহেন, আমি সামান্য উদরভরি ব্রাহ্মণ কি করিতে পারি। তথাপি স্বমতি-অনুসারে বলিতেছি। বােজকে অধ্যয়নশালাতে প্রেরণ করুন। তিনি আরও বলিলেন “ভােজ পঞ্চান্ন বৎসর সপ্ত মাস এবং তিন দিন গৌড়দেশ- সহিত দক্ষিণাপথ শাসন করিবেন।” (৩) As. Soc. Journal, Vo. II, 1863, p. 109.

১৬৪ আৰ্য-জীবনী । “পঞ্চাশৎ পঞ্চবর্ষাণি সপ্তমাসদিনতম্। ভােঙ্গরাজেন ভক্তব্যঃ সগৌড়াে দক্ষিণাপথঃ ॥” ইহা শ্রবণ করিয়া মুঞ্জ মহীপাল অন্তরে ব্যথিত হইলেন, এবং বঙ্গদেশাধীশ্বর বৎসরাজকে আহ্বানপূর্বক ভােজকে উপাংশু বধ করিতে আদেশ দিলেন। বৎসরাজ একজন অধীন করদ রাজা। বৎসরাজ রাজাজ্ঞা সাধনাৰ্থ সন্ধ্যা- কালে ভােজকে লইয়া ভুবনেশ্বরী-বনে গমন করিলেন এবং রাজার আদেশ তাহাকে জ্ঞাপন করিলেন। তােজ একটী শ্লোক লিখিয়া বৎসরাজের হস্তে দিলেন এবং তাহাকে রাজাজ্ঞা সম্পাদন করিতে বলিলেন। কিন্তু বৎসরাজ তাহা করিলেন না এবং ভােজকে গােপনে রক্ষা করিয়া কৃত্রিম- বিদ্যবিৎ ব্যক্তিদিগের দ্বারা কুণ্ডলযুক্ত নিমীলিতনেত্ৰ কুমার- ভােজ-মস্তক নিৰ্মাণ • করাইয়া তাহা নৃপতি-সমীপে স্থাপন করিলেন। নৃপতি বৎসরাজকে জিজ্ঞাসা করিলেন যে কুমার- ভােজ খঙ্গ-প্রহার-সময়ে কি বলিয়াছিল ? বৎসরাজ সেই শ্লোকটী রাজাকে দিলেন এবং তিনি উহা প্রদীপের আলােকে পাঠ করিলেন, মান্ধাতা চ মহীপতি কৃতযুগালঙ্কারভূতো গতঃ। সেতুর্যে মহাদধে বিরচিত কাসৌ দশাস্যাক। অন্তে চাপি যুধিষ্ঠিরপ্রভৃতয়াে যাতা দিবং ভূপতে, নৈকেপি সমং গত বসুমতী নূনং ত্বয়া যাস্ততি। অর্থাৎ সত্যযুগের অলঙ্কারভূত মান্ধাতা মহীপতি পর- লােকগত হইয়াছেন। মহাসমুদ্রোপরি যিনি সেতুবন্ধন ভােজপ্রমারের সংক্ষিপ্ত জীবনী। ১৬৫ করিয়াছিলেন, সেই দশানন-রিপুই বা কোথায় ? অন্য যুধিষ্ঠির প্রভৃতি মহাত্মারাও স্বর্গে গমন করিয়াছেন । হে রাজন! বসুমতী কাহারও সঙ্গে গমন করে নাই, নিশ্চয় আপনার সঙ্গে যাইবে। রাজা এই শ্লোক পাঠ করিয়া সংজ্ঞাহীন হইয়া ধরাতলে পতিত হইলেন, এবং চৈতন্যলাভান্তে বহু বিলাপ করিতে লাগিলেন। অবশেষে সেই রাত্রিতেই বহিপ্রবেশ দ্বারা নিজ পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিবার সংকল্প করিলেন। তখন বৎস- রাজ, বুদ্ধিসাগর নামক অমাত্যের পরামর্শানুসারে কুমার ভােজকে গুপ্ত স্থান হইতে আনয়ন করিয়া জনৈক কাপালিক দ্বারা ভােজ জীবিত হইয়াছেন এই কথা প্রচার করিয়া দিলেন। পরে ভােজ-রাজসন্নিধানে আনীত হইলেন। রাজা তাঁহাকে আলিঙ্গন করিয়া বহুপরিদেবনানন্তর তাহাকে সমস্ত রাজ্য প্রদানপূর্বক সস্ত্রীক তপােবনে প্রয়াণ করিলেন। ভােজ- দেব রাজ্য পালন করিতে লাগিলেন! ভােজচরিতে, মুঞ্জদের- সম্বন্ধে ভিন্ন প্রকার দুই একটা কথা আছে। চালুক্যবংশীয় মহাবল পরাক্রান্ত ভূপাল • তৈলপ মুঞ্জদেবকে আক্রমণ করিয়া বন্দী করিয়া লইয়া যান। চালুক্যবংশীয়-তাম্রশাসন- পত্র হইতেও এই আক্রমণ ও বন্দীকরণ প্রমাণিত হয়। এই মুঞ্জ-সভাতে ধনিক নামে জনৈক পণ্ডিত দশকপাখ্য অলঙ্কাল্প এন্থ , প্রণয়ন করেন। মুঞ্জ মহীপাল বাকৃপতিরাজ নামেও প্রসিদ্ধ। শ্রীতৈলপ খ্রঃ দশম শতাব্দীর শেষভাগে, রাজ্য করিয়াছিলেন। ভােজ-চরিত এবং ভােজ-প্রবন্ধের বিবরণ কতদূব সত্য এবং বিশ্বাস্য, তাহা নির্ণয় করা ১৬৬ আৰ্য-জীবনী। অসম্ভব। মতান্তরে মুঞ্জদেব পঞ্চাশৎ বৎসর রাজত্ব করিয়া- ছিলেন (৪)। কুমারপাল-চরিত অনুসারে মুঞ্জদেব ১০২০ খ্রঃ অব্দে বর্তমান ছিলেন। ভােজদেব সিংহাসনে আরােহণ করিয়া রাজ্যশাসন ও প্রজাপালন করিতে লাগিলেন। ভােজপ্রবন্ধের মতে তিনি প্রথমে কৃপণ ছিলেন, কিন্তু অল্পদিন পরেই অত্যন্ত দাতা হইয়া উঠিলেন নানাদিগদেশ হইতে পণ্ডিত मकन তাহার সভাতে উপস্থিত হইতে লাগিলেন। রাজাও তাহাদিগের যথােচিত সম্মাননা করিয়া, তাহাদিগকে বির পারিতােষিক প্রদান করিতে লাগিলেন। দেশ বিদেশে ভােজদেবের যশােগান হইতে লাগিল। ভােজ-প্রবন্ধের মতে ধারানগরে তৎকালে একজন একজন মুর্থ ব্যক্তিরও বাস ছিল । ইহাতে কেবল বহুসংখ্যক পণ্ডিতের নাম, তাহাদের রচিত শ্লোক এবং রাজার পুরস্কার উলিখিত অাছে। গ্রন্থকার যেরূপ ভাবে কোবিদবৃন্দের নাম উল্লেখ করিয়াছেন, তাহাতে তাহার গ্রন্থের উপর অণুমাত্র শ্রদ্ধা হইতে পারে না। তিনি যে কি করিয়া কালিদাস, ভবভূতি, বাণভট্ট, মাঘ, মলিনাথ প্রভৃতিকে এক রাজার সভায় পুরস্কৃত বলিয়া লিখিয়াছেন তাহা আমরা বুঝিতে পারি না। ভােজ- রাজ-সভাতে কালিদাস, ভবভূতি, মাঘ, মল্পিনাথ, শঙ্করকবি, বররুচি, বাণ, ময়ুর, হরি, গােবিন্দ, কপূর, বিনায়ক,, মদন, বিদ্যাবিনােদ, কোকিল, তায়ে, কচ্ছি, লক্ষ্মীধর, সীতাকবি, (৪) As Soc, Journal, No. II. 1863, p. iio.

ভােজপ্রমারের সংক্ষিপ্ত জীবনী । সুবন্ধু, রামেশ্বর, মহেশ্বর, চোলপণ্ডিত, তণ্ডুলদেব, সীমন্ত, শুকদেব, বাসুদেব, সােমনাথ, সােমনাথ, বিষ্ণু, মুচুকুন্দ, বিষ্ণু, মুচুকুন্দ, গােপাল, ভাঙ্ক, শাক্য, শান্তদেব, জয়দেব, কবিশেখর, দণ্ডী প্রভৃতি কবিগণ সৎকৃত এবং পুরস্কৃত হইয়াছিলেন। ইহা দ্বারা বােধ হয়, ভােজপ্রবন্ধ-রচয়িতা কবির নাম জানিতেন, সকলকেই ভােজরাজ, সম্মানিত করিয়াছেন। নতুবা এই সমস্ত কবি ভােজ সভাতে বর্তমান ছিলেন বলিলে প্রত্যক্ষ ইতিহাসের অব- মাননা করা হয়। তােজরাজের জীবনী-লেখকেরা বলেন, তিনি পঞ্চান্ন বৎসর নির্বিঘ্নে রাজ্যশাসন করিয়াছিলেন। বিদ্যাপতি- বিহলণ-বিরচিত বিকুমাঙ্কদেব-চরিতে (৫) আমরা দেখিতে পাই যে, চালুক্যবংশীয় প্রথম সােমেশ্বর ভােজরাজধানী ধারানগরী আক্রমণ করেন এবং ভােজরাজকে রাজধানী পরিত্যাগপুৰ্ব্বক পলায়ন পলায়ন করিতে বাধ্য এই সােমেশ্বরদেব ১০৪০ হইতে ১০৮৯ খ্ৰীঃ অব্দ পর্যন্ত সিংহা- সনারূঢ় ছিলেন এবং তিনি আহমদেব ও ত্রৈলােক্য: মল্লদেব নামে প্রসিদ্ধ। বিদ্যাপতি হিলণ ভােয়াজের সম- সাময়িক কবি ছিলেন নানা স্থান পরিদর্শনার্থ ভ্রমণকালে ভােজরাজের সহিত সাক্ষাৎ করিবেন মনে করিয়াছিলেন; কিন্তু কোন কারণবশতঃ ভােজরাজসভাতে (৫) প্রথম সর্গ ৯১-৯৬ শ্লোক। ডাক্তার বলার প্রকাশিত সংরণ, পৃষ্ঠা।

১৬৮ , আৰ্য-জীবনী। অতএব এই উপস্থিত হইতে পারেন নাই। বিহলণ কবি ১৬২ খ্রীষ্টাব্দে ভ্রমণার্থ নির্গত হইয়াছিলেন এবং বহু বৎসর ভ্রমণ করিয়া অব শেষে ত্রিভুবনমল্লদেবনামান্তর বিক্রমাদিত্যের (১০৭৬-১১২৭) সভাতে অবস্থিতি করেন। রাজতরঙ্গিণীর সপ্তম তরঙ্গের ২৫৮ শ্লোকে লিখিত আছে যে ১০৬২ খ্রীষ্টাব্দে ক্ষিতিরাজ এবং ভােজরা দুইজন প্রকৃত কবি-বান্ধব ছিলেন। সময়ে ভােজরাজ বর্তমান ছিলেন। অধ্যাপক ল্যাসেন ভ্রান্ত হইয়া ভােজরাজত্বকাল ৯৯৭ হইতে ১০৫০ অব্দ পর্যন্ত স্থির করিয়াছেন। ডাক্তার শ্ৰীযুত রাজেন্দ্রলাল মিত্র প্রমাণ করিয়া- ছেন যে ভােজরাজ ১০২৬ হইতে ১০৮৩ খ্ৰীষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করিয়াছিলেন। অধ্যাপক বেন্টলী প্রমাণান্তর প্রয়ােগ পূর্বক ১০৮২ খ্রীষ্টাব্দে তােজরাজের রাজত্ব শেষ হয় নির্ণয় করিয়াছেন (৬)। ডাক্তার বুলার সাহেব তাহার বিক্রমাঙ্ক-চরিতের পূর্ব- পীঠিকার ২৩ পৃষ্ঠার টীপপনীতে লিখিয়াছেন যে ভােজরাজের করণ রাজমৃগাঙ্ক ১০৪৩ অকে প্রস্তুত হয়। এই সমস্ত প্রমাণ হইতে ইহা নিঃসন্দেহরূপে বলা যাইতে পারে যে ভােজরাজ একাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ধারারাজ্য শাসন করিয়াছিলেন। ভাজরাজ যে সময়ে ত্রৈলােক্যমল্ল দেবের আক্রমণবশতঃ রাজধানী হইতে পলায়ন করিয়াছিলেন, সেই সময় ভিন্ন তাঁহার রাজশাসনের আর কোন ব্যাঘাত আমরা জ্ঞাত নহি। কেহ কেহ এই আক্রমণের পরিবর্তে একটা নূতন (৬) As. Res, Vol. VIII. p. 43.

ভােজপ্রমারের সংক্ষিপ্ত জীবনী। ১৯ কথা বলেন। কোন সময়ে জনৈক যােগী ভােজরাজকে এক শরীর হইতে শরীরান্তরে আত্মা প্রবেশ করাইতে শিক্ষা দিতে আসিয়াছিলেন। এই যােগী ছলপূৰ্ব্বক ভােজরাজের আত্মা বা সূক্ষ্ম শরীর এক শুক পক্ষীর শরীরে প্রবেশিত করিয়া স্বয়ং রাজশরীরে প্রবেশ এবং কিছুদিন তাহার পরিবর্তে আপনি রাজ্য করেন। অবশেষে চন্দ্রাবতীপতি চন্দ্রসেনের সাহায্যে ভােজ যােগীকে নিজ শরীর হইতে দূরীকৃত করিয়া দেন স্বয়ং শরীরে প্রবেশ করেন। ভােজরাজের স্বাভাবিক মৃত্যু হইলে তাহার পােষ। পুত্র গজানন্দ রাজসিংহাসনে আরোহণ অন্যত্র আবার উদয়াদিত্যের নাম দৃষ্ট হয়। এই মতে তােজরাজের মৃত্যুর পর রাজ্যে বিশৃঙ্খলা ঘটিলে উদয়াদিত্য নামে তাঁহার কোন আত্মীয় রাজ্যভার গ্রহণ- পূর্বক রাজ্যশাসন করিতে থাকেন। ইনি উৎসাহশীল, অসাধারণ বীর এবং শত্রুদমন ছিলেন (৭)। ভােজপ্রবন্ধ হইতে আমরা জানিতে পারি যে ভােঙ্গ-নৃপতির সভাতে কখন কোন বিদ্বান্ এবং গুণী ব্যক্তি ব্যর্থ-মনােরথ হন তাহার অজস্র দান অবলােকন করিয়া অমাত্য তাহাকে অর্থরক্ষার জন্য প্রার্থনা করিলে, তিনি উত্তর দিয়াছিলেন যে “আপদের নিমিত্ত ধন সঞ্চয় করিবার প্রয়ােজন নাই, যেহেতু লক্ষ্মী অপগতা বা কুপিতা হইলে সঞ্চিত অর্থও বিনষ্ট হইয়া যায়।” তিনি সদ্বিদ্বান, বিদ্যোৎ- সাহী, গুণগ্রাহী এবং পণ্ডিতদিগের দৈন্ত-বিমােচনে মুক্ত (৩) As. Soc. Journal, Vo, ff. 1968, p. 109 and p. ics, নাই।

১৭০ আৰ্য-জীবনী। হস্ত ছিলেন। তিনি স্বয়ং নানাশাস্ত্ৰাৰ্থকুশল এবং সুকবি ছিলেন বলিয়া শাস্ত্রবিৎ এবং কবিদিগের বন্ধু হইয়াছিলেন। তাঁহার ত্যাগ-লীলায়িত ভুবনবিদিত এবং সর্বত্র প্রশংসিত। ভােজপ্রবন্ধের প্রায় প্রতি পৃষ্ঠা হইতে কালিদাস যে অদ্বিতীয় কবিত্বশক্তিসম্পন্ন ছিলেন, তাহা প্রমাণিত হয়। কালিদাস কখনই ভােজরাজের সভাতে ছিলেন না ; অথবা যিনি ছিলেন তিনি অন্য কোন কালিদাস হইতে পারেন। ভােজপ্রবন্ধকার মিশ্রের বর্ণনা বিশ্বাস করিতে হইলে বিষম কাণ্ড হইয়া উঠিৰে। কালিদাস এক সময়ে কোন কারণে কষ্ট হইয়া ভােজ সভা পরিত্যাগ করিয়া একশিলা নগরে গমন করিয়াছিলেন। কালিদাস-বিয়োগে শােকাকুল ভােজদের তাঁহাকে অন্বেষণ করিতে কাপালিক- বেশে একশিলা নগরীতে যাত্রা করিলেন। তথায় কালি- যােগিবেশধারী ভােদেবকে চিনিতে পারিয়া, তাহার সহিত আলাপ করিয়া জানিতে পারিলেন যে তিনি ধারানগরে বাস করেন। তখন কবিবর ভােজভূপতির কুশল জিজ্ঞাসা করিলে যােগী উত্তর দিলেন যে ভােজদেব স্বর্গারােহণ করিয়াছেন। এভশ্রবণে কালিদাস পতিত হইয়া বহু বিলাপ করিতে লাগিলেন। এবং এই চরম শ্লোক রচনা করিলেন- অদ্য ধারা নিয়াধারা নিরালা সরস্বতী। পণ্ডিতাঃ খণ্ডিতাঃ সর্বে ভােজরাজে দিবং গতে। অর্থাৎ ভোজরাজ দ্যুলােকগত হইলে ( খারানগরী আধারশূন্য, সরস্বতী অবলম্বন রহিত এবং পণ্ডিতগণ খণ্ডিত ভােজপ্রমাদের সংক্ষিপ্ত জীবনী । ১৭১ হইলেন। কবি এই শ্লোক বলিতে না বলিতে যােগী বিসংজ্ঞ হইয়া ভূমিতে পতিত হইলেন। কালিদাস তাঁহাকে তদবস্থ নিরীক্ষণ করিয়া ভােজদেব বলিয়া চিনিতে পারিলেন এবং বলিলেন, মহারাজ, আপনি আমাকে বঞ্চনা করিয়াছেন। বলিয়াই প্রােক্ত শ্লোক প্রকারান্তরে তৎক্ষণাৎ পাঠ করিলেন, অদ্য ধারা সাধারা সদালা সরস্বতী। পণ্ডিত পণ্ডিতাঃ সর্বে ভােজরাজে ভুবং গতে। অর্থাৎ ভােজরাজ পৃথিবীগত হইলে অদ্য ধারানগরী নের আধার, সরস্বতী উৎকৃষ্টাবলম্বনবিশিষ্ট এবং পণ্ডিতগণ মণ্ডিত হইলেন। তদনন্তর কালিদাস ভােজরাজকে আলিঙ্গন করিয়া তাহার সহিত ধারানগরে প্রতিপ্রয়াণ করিলেন। কি ভােজপ্রবন্ধ, কি ভােজচরিত, কিছুতেই তাহার জীবন- চরিত উপযুক্তরূপে বিবৃত হয় নাই। উভয় গ্রন্থই কতক- গুলি কাল্পনিক ও অমূলক গল্প ও উপাখ্যানে পরিপূরিত। অন্যান্য পুরাতত্বপ্রিয় কোবিদগণও গবেষণা দ্বারা ভােজরাজ সম্বন্ধে বিশেষ কোন বৃত্তান্ত আবিষ্কৃত প্রকাশিত করিতে পারেন নাই। যাহা প্রকাশ হইয়াছে তাহা বিবৃত হইল। ভােজরাজ চম্পুরামায়ণ, সরস্বতীকণ্ঠাভরণ, অমর- টীকা, রাজবাৰ্তিক, পাতঞ্জলদর্শনভাষ্য এবং চাচাৰ্য রচনা করিয়াছিলেন। তিনি সুকবি,কাব্যপ্রিয় এবং অশেষগুণ- মণ্ডিত ছিলেন। কর্ণেল টড তাহার রাজস্থানের ইতিবৃত্তে লিখিয়াছিলেন যে যতকাল সংস্কৃত সাহিত্য বিদ্যমান থাকিবে ততকাল ভাজপ্রমার এবং তাহার নবরত্নের নাম বিলুপ্ত ও বিস্মৃত হইবে না। কর্ণেল টঙ তিন জন ভােজরাজেয় কাল ১৭২ আৰ্য-জীবনী । নিরূপণ করিয়াছিলেন। প্রথম ভােজ ৬৩১ সংবতে, দ্বিতীয় ভােজ ৭২১ সংবতে এবং তৃতীয় ভােজ ১১• সংবতে বর্তমান ছিলেন। এই শেষ ভােজ আমাদের অদ্যকার প্রস্তাবের বিষয়। ইহার নবরত্ন ছিল না। ইনি বিদ্যোৎসাহী ছিলেন বলিয়া ব- সংখ্যক পণ্ডিত ইহার সভাসদ ছিলেন। ইহার নবরত্ন থাকিলে ভােজপ্রবন্ধকার অবশ্যই তাহার বিবরণ লিপিবদ্ধ করিতেন। বিক্রমাদিত্যদেবের নবরত্ন ছিল এবং কালিদাস প্রভৃতি তাহার অন্তর্গত ছিলেন। বিক্রমাদিত্যের বহুশতাব্দী পরে ভােজরাজ ধারানগরীর রাজপটে আসীন হন। ভােজদেব তাহার গ্রন্থনিচয়ের মধ্যে কুত্রাপি কালিদাস ভবভুতি, মাঘ, মল্পিনাথ প্রভৃতির নামােল্লেখ করেন নাই। সুতরাং ভােজ- প্রবন্ধের কথা অপ্রামাণিক। ভােজপ্রবন্ধ ১২০০ খ্রীষ্টাব্দে রচিত হয়। ইহা হইতে আমরা জানিতে পারি যে কালিদাস, জয়দেব, বাণভট্ট, ভবভূতি, ময়ুর, মাঘ, মল্লিনাথ এবং সুবন্ধু ১২০০ খ্রষ্টাব্দের পূর্বতন গ্রন্থকার। ভােজপ্রবন্ধমতে মাঘ গুর্জর- হইতে, ভবভূতি বারানসী হইতে, এবং মল্লিনাথ দক্ষিণদেশ হইতে আসিয়াছিনেন। ‘বিশ্বগুণাদর্শ গ্রহের অনুসারেও মাঘ, চোরকবি, ময়ুর, মুরারি, ভাবি, হর্ষ, কালিদাস, ভবভূতি প্রভৃতি ভােজরাজের প্রভৃতি ভােজরাজের সভাসদ ছিলেন। বিবিধ প্রমাণ প্রয়ােগ দ্বারা নিঃসংশয়রূপে প্রতিপাদন করা যাইতে পারে যে এই সকল কবি সমসাময়িক নহেন এবং ভিন্ন ভিন্ন সময়ে প্রাদুভূত হইয়াছিলেন। n প্রথম ভাগ সমাপ্ত

No text on this page.

No text on this page.

Arjya-jeebanee Part 1

Author
Saraswati,ramanath
Title
Arjya-jeebanee Part 1
File name
Arjya-jeebanee Part 1
Text
OCR done
Citation
1910
Published
2010/01/13
Publisher
B.banerjee And Co. Calcutta
Language
Sanskrit
Pages
182
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Biography
Keywords
Saraswati,Ramanath
DLI number
510853
Barcode
4990010018055.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
IPjN30oukct
Download PDF

Arjya-jeebanee Part 1