Garh Bhawanipur R.p. Institute, Howrah
Jay Jodi Jak
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
যায় যদি যাক
ও ২৫
HTAK
অচিন্ত্যকুমার স্টে
স
২
ডি এম লাইব্রেরি
কলিকাতা
প্রথম প্রকাশ, ১৩৫২ জ্যৈষ্ঠ প্রকাশক- গােপালদাস মজুমদার ডি এম লাইব্রেরি ৪২ কর্ণওয়ালিস স্ট্রিট, কলিকাতা —মূত্রাকর- প্রভাতচন্দ্র রায় ৫ চিন্তামণি দাস লেন কলিকাতা দাম তিন টাকা ১৩৪৮-৫০ সালের একটি জ্বালাময় কাহিনী
No text on this page.
ein
bu?
ir
No text on this page.
সবাই পালাচ্ছে, উর্বশ্বাসে পালাচ্ছে। যত বাডির মােটর আর ট্যাক্সি, ছ্যাকা গাড়ি আর ফিটন, রিকশা আর ঠেলা—সব চলেছে কোনাে-না-কোনাে স্টেশনের দিকে, উত্তরে দক্ষিণে পশ্চিমে পূবে। হাওড়া, শেয়ালদা, শ্যামবাজার, বেলগাছিয়া, মাঝের হাট, কালিঘাট, বালিগঞ্জ, ঢাকুরে। কেউ-কেউ বা সিধে হাঁটা-পথে, বর্ধমানের রাস্তা, ব্যারাকপুরের রাস্তা, ডায়মণ্ডহারবারের রাস্তা। চলেছে এলােধাবাড়ি, উঠি-কি-পডি মরি-কি-বাঁচি হয়ে। বাঘের তাড়ায় হরিণের পালের মত। দিশ-বিদিশ নেই, বিচার-বিতর্ক নেই, সব বেহেড, বেহুল। ছ্যাকড়া গাড়ির ভাড়া পাঁচ থেকে পনেৰােয় এসে উঠেছে, ট্যাক্সির ভাড়া পনেরাে থেকে পঞ্চান, বু চলাে এই আতঙ্কপুরী থেকে। টাকায় কী হবে যদি প্রাণ না থাকে, প্রাণ থাকে তে হাত-পা না থাকে, হাত-পা থাকে তত ঘিলু না থাকে মস্তিষ্কে। হতকুচ্ছিতের মত মরলুম, হয়তাে বাড়ি চাপা পড়ে, হয়তাে বা দরজা-খােলা-না-পাওয়া নিরাশ্রয় রাস্তায়। ফুটপাতে শুয়ে পড়লুম অতর্কিতে, পা বাড়িয়ে দেখলুম মুণ্ডুটা ফুটপাতের নিচে পডেছে গড়িয়ে। হয়তত নাডিডি পডেছে বেরিয়ে, কাক খাচ্ছে টুকরে-করে, হাত বাড়িয়ে তাড়াতে পারছি না। কিংবা বেঁচে গেলুম ইয়ত, কিন্তু হাবা-কালা হয়ে গেলুম। শুধু কি তাই ? খাবে কি? জল কোথায় ? রাত্রে কাণ্ড হলে হাসপাতালে যাবার পর্যন্ত সুবিধে পাবে না। হাসপাতাল। শ্মশান যাবার পথ পাও কিনা তারই বা ঠিক কি। তারপর, মেয়েরা! ওদের কি দুর্গতি হবে। কেউ অটুট, আস্ত থাকবে না। দাঁড়িয়ে দেখতে পারবে কাঠ হয়ে ? দরকার নেই, পালাও। পালাও। হ্যা, পালাচ্ছে সবাই। চাকরি ছেড়ে দিয়ে পালাচ্ছে। জীবনভাের যত কল্পনা করেছিল, ঘর-দোর, টাকা-কডি, ব্যবসা-পসার—সব ছত্রখান তছনছ করে দিয়ে পালাচ্ছে। ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলে নিচ্ছে থাবা- থাবা। কাগজের টাকায় কি হবে, দেখ, কপাের টাকা পাও কি না, তামার পয়সা, নিদেন মেকি নিকেলের রেজগির দাম অনেক। তাই, যে যত পারছে টাকা ভাঙিয়ে নিচ্ছে। বাড়ি-ঘরের কি হবে? থাকবে তালা-বন্ধ হয়ে দেখছে, এমন কাউকে পায় কিনা যে বিনা ভাড়ায় জিম্ম নিতে রাজি। এ-আর-পি পাওয়া গেলেই সব চেয়ে ভাল। যদিও ঠাট্টা করে এ-আর-পির নাম রেখেছে,“আয় রে পালাই”। কি হবে বাডি- ঘরের মায়া করে। মমালয় না যমালয়। আর, আমাদের তা ভাড়াটে বাড়ি। যাক ও ধূলিসাৎ হয়ে। যদি কোনাে দিন ফের ফিরতে পাই তখন যেন এসে দেখি বাড়িটা ও তারি বাড়িওয়ালাটা অন্তত নেই। জানলার কাচ সরাবার কথা বলছে, যাবার আগে এ-বাডির শার্সির কাচগুলাে গুড়ো করে না দিয়ে যাই তাে কি। অত মাল নিয়ে কি হবে। গিন্নিরা গয়না, তারা নগদ টাকা। ওই হলেই যথেষ্ট। হ্যা, শীতের কাপড় যত পারাে নিতে হবে বৈ কি। লেপ তােষক, বালিশ, পাশ-বালিশ-কোনটা পাশ-বালিশ-কোনটা তুমি ফেলবে? বা, বাসন নিতে হবে বৈ কি। বঁটি, শিল-নােডা, চাকি-বেলুন—কোনটা লাগে শুনি ? হারিকেন, বালতি, মগ—কাকে ফেলে কাকে বাছবে ? হেলান-দেয়া একখানা চটের চেয়ার নিয়ে যেতে পারলে ভাল হয়। আর, কিছু কয়লা, চাল আর আলু। আর, হ্যা, জলের কুঁজোটা। দারুণ শীতে -মরৰার সময়ও প্রাণটা জল-জল করে। দশ টাকা ভাড়ার ছ্যাকড়া গাড়ি মালের বহর দেখে চোদ্দ টাকা ২ হাঁকে। শত ঘি উলেও ষাঁড়ের ঘাড় নােয়ানাে যায় না। তবু, মালে হাত লাগাবে না গাড়ােয়ান। তার জন্যে আরাে এক টাকা গুনগার। যান-যাত্রা। সার বেঁধে চলেছে, বাডির মােটর আর ট্যাক্সি, ছ্যাক শাড়ি আর কিটন, রিকশা আর ঠেলা, রিজার্ভ-করা বাস আর লরি। রাস্তার আইন মানতে চাইছে না, জাম্ হয়ে যাচ্ছে। এক নিশ্বাস বসে থাকবার কাৰু ধৈর্য নেই। কলকাতা যে কত কুৎসিত তা এর আগে টের পায়নি কেউ। এটা মিউজিয়ম, ওটা মনুমেন্ট, আঙুল তুলে-তুলে আনাড়ি মেয়েদের দেখিয়েও বিন্দুমাত্র গর্ববােধ করতে ইচ্ছে যাচ্ছে না । কার। কতক্ষণে এই ইট-কাঠ-সুরকির হাঁডিকাঠ থেকে বেরিয়ে পড়তে পারবে ধানখেতের ফাকায় বা নদীনালার নিরালায় তারি জন্যে সবাই উন্মুখ। যে লােক ভিডের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে পারছে পায়ে হেঁটে, সেই আগে বাঁচলাে, সেই ভাগ্যবান। মিছিমিছি গাড়ি-ঘােড় করে এই ঝকমারি। কে জানে, এমনি অনড় হয়ে বসে থাকতে-থাকতেই আকাশ চীর্ণ-বিচীর্ণ হয়ে যাবে। কে জানে, হয়তাে পূবের আকাশ থেকে বেরিয়ে পড়েছে ঝাঁকে-ঝাঁকে। ঝুলন্ত হাওডার পুল ভেঙে পড়ল বুঝি যাত্রীর ভারে, শেয়ালদার ভিতরে বাইরে ফুটবলের জনারণ্য। দিনের পর রাত, রাতের পর দিন পড়ে থাকছে স্টেশনে, উঠতে পারছে না গাড়িতে। মাল-পিছ পাঁচ টাকার কমে কুলি পাওয়া যাচ্ছে না। স্টেশনের গেট খােলাতে যাত্রী- পিছু দশ টাকা করে, ভিতরে ঢুকেই বা লাভ কি, কোনাে গাড়িতে তিলধারণের স্থান নেই। আবার ঘুষ দাও, এবার মােটা হাতে, দুশাে-পাঁচ শশা। খালি-গাড়ি জোড়া হচ্ছে এঞ্জিনের পিছনে, কিংবা ঠেলে তুলে দিচ্ছে মালগাড়িতে। গাদাগাদি, ঠাসাঠাসি, হাঁকাহাঁকি, কামড়াকামডি। মালে-মানুষে একাকার। দূতােত কারুর পা চলে এসেছে মুখের উপর, কারুর মাল নেমে বসেছে এসে ঘাড়ে। কার কাধের নিচে কার হাত কার পেটের নিচে কার পা বােঝবার জো নেই। একটা হাতুল-বাল অবস্থা। এরি মধ্যে কেউ কঁদছে তার মালের শােকে। কুলি কোন ফাকে ভেগে পডেছে গা-ঢাকা দিয়ে। কেউ কাঁদছে তার মেয়ের জন্যে। তাড়াতাড়িতে উঠতে পারেনি গাড়িতে। থার্ড ক্লাশের উপরে যে কোনাে দিন ওঠেনি, সে বেপরােয়ার মত আজ ফাস্ট ক্লাশ রিজার্ভ করছে। ত্রিশ-বত্রিশ মাইলের জন্যে বাস একটা রিজার্ভ করতে যেখানে বড় জোর ত্রিশ টাকা ছিল, সেখানে আজ । শ। তাই নিঃশব্দে বার করে দিচ্ছে টাক থেকে। টাকা বেশি না প্রাণ বেশি। তবু টাকার শ্রাদ্ধ করেও সদ্য-সদ্য বেনাে যাচ্ছে না। স্টেশনের শেডে, ওয়েটিং রুমে, ফুটপাতে পড়ে থাকছে পালে-পালে, বঞ্চিতের মত, বিতাডিতের মত। বিতাডিতের মত। যেন মূল নেই, আশ্রয় নেই। এক দিনে সমাজ থেকে উৎখাত হয়ে গেছে সব। স্রোতের শ্যাওলার মত ভেসে পড়েছে। আবার সিটি দিয়েছে বুঝি কোনাে ইঞ্জিনে। এই প্ল্যাটফর্মে না ওই প্ল্যাটফর্মে। ঢিল পড়েছে মৌচাকে। ফটকের কাছে, গাড়ির দরজায়, ঘুষের মাত্রা চড়ে যাচ্ছে ক্রমে-ক্রমে, কুলির বুলি উদারা থেকে তারায় উত্তীর্ণ হচ্ছে। তবু দ্বিধা নেই, দ্বিরুক্তি নেই। শিকের কোনাে ফাক দিয়ে এখাঁচা থেকে বেরুতেই পারলেই হলাে। সকলেরই এক উদভ্রান্ত চেহারা, উদ্ভ্রান্ত ব্যবহার। এক অসহায় ভয়, অসহায় বিব। একটা বােবা অজ্ঞান। কোথায় চলেছে এরা? শাখা-শিকড় ছিন্ন করে নিঃখের মত কোথায় ফিরে চলেছে? ফিরে চলেছে গ্রামে। যেখান থেকে এক দিন তারা এসেছিল। গড়েছিল শহর, গড়েছিল সভ্যতা। ব্যবসা-বাণিজ্য, কল-কারখানা। ঐশ্বর্যের নিচে লুকিয়ে রেখেছিল রিক্ততা, শান্তির নিচে শশাষণ, দয়ার নিচে অবজ্ঞা। যেখানে সমশু-কিছু প্রতিষ্ঠা করেছিল s লােভের উপর, স্বার্থের উপর, প্রতিযােগিতার উপর। যেন সব জারিজুরি ধরা পড়ে গেছে। এবার তাই তারা ফিরে চলেছে গ্রামে, গুহায়, আদিম গুহায়, আদিম প্রকৃতিতে। তাঁবু গুটিয়ে ফেলছে। আর ফিরে আসবে না তারা এই ছােট আকাশের সীমার মধ্যে। এই ইটকাঠের কয়েদখানায়। ‘এই গাডি, এই গাড়ি। দরজা খুলবে না কেউ, না খুলুক। জানলা দিয়েই গলতে হবে ভিতরে। আগে মাল, পরে মেয়েরা। লজ্জার সময় নয় এটা। বীরত্বের সময়। কুলির পাথালিকোল ছাড়া উপায় কি। তারপর, এইবার । আমি। জয় মা দুর্গা বলে ভূষণবাবুও কুলিৰ কোলে উঠলেন। তাঁর এক পাটি জুতাে প্ল্যাটফর্মে পা ফসকে পড়ে গেল ও আরেক পাটি জুততা কুলি কায়দা করে খুলে নিলে। যাক গে, পায়ের নিচে দাড়াবার জায়গা পেয়েছেন যে এই ঢের। যারা যেতে পারল না এই ট্রেনে, দরজায়-দরজায় আকুলি-বিকুলি করে মরছে তাদের দিকে তিনি একটি দীর্ঘ অনুকম্পার দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন।
২ ‘তােমরাও চললে নাকি ? পাশের বাড়ির বউটিকে বাঁধাছা করতে দেখে সেবা জিগগেস করল চেঁচিয়ে। প্রায় ছাইয়ের মত মুখ করে। জানলায়-জানলায় জানাশোনা। বোঁচকায় গিট দিতে দিতে ও-পারের বউ বললে, না গিয়ে আর উপায় কি। থােকার বাবার আফিসে খবর এসে গেছে দু’দিনেই ওরা এসে পড়বে। সেবার বুকের মধ্যে ছােট, ঠাণ্ডা একটা ফাক হয়ে গেল। ‘আমার শশুরের জানােবাধের ভয়ই বেশি। বউটি হাত ও মুখ বেকিয়ে দৃঢ়তর আরেকটা গিট দিলে। এ তাে, বােমা, বাঘ কোথায়। উনি বলেন, চিড়িয়াখানার সব বাঘ-সিংহ রাস্তায় বেরিয়ে পড়বে, অনেক দিন পর লােক দেখবে আর থাবা উচিয়ে বলবে, হালুম। সে কি ভয়ানক ব্যাপার ভাব দেখি, ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। আগের চেয়ে বেশি ভারিক্কি মুখে বউটি বললে। ‘খােকার বাবা কি করবে? “কি করবে মানে? কেঁচায় বেঁধে এনেছিল এবার কাছায় বেঁধে পালাবে। নতুন চাকরি পেয়েছিল শুনেছিলুম- চাকরি। আপিসের কই-কাংলাৱাই চাকরি ছেড়ে দিচ্ছে আর ইনি তাে ঘুষ চিংডি। কখে কুড়ে ভােজনে দেডে। বাপের উপর আছে কিনা। এইবার শেষ গিট পড়ল।
। ও মা, তােমরাও চললে নাকি?' সেবার মা মায়াময়ী পাশে এসে গডালেন। তার হাত-পা হঠাৎ ঠাণ্ডা, হালকা হয়ে গেল। শুধু ওরা কেন ? পনেয় নম্বরের বাড়ি চলেছে। বরদাবাবুদের বাড়ির সামনে পরপর চারখানা ঘােডার গাড়ি পাডিয়েছে। ভূপালবাবুদের বাড়ির ছাদে শাড়ি শুকোতে দিয়েছিল, না-শুকোতেই তুলে নিচ্ছে চটপট, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে জানলা-দরজা-না, সাইরেন নয়,—ওদের গাড়ি জোগাড় হয়েছে, কোনােরকমে গােগ্রাসে আধসেদ্ধ খেয়ে ওরাও রওনা হল। দুধউলি বকুলমতি, কঁাখে-কঁাধে পুটলি চাপিয়ে, বিছে-পৈছে বালাবাজু গায়ে চাপিয়ে চলেছে হাওডার বাস ধরতে। মােড়ের হিরণবাবুদের জন্যে ট্যাক্সি এসেছে, ঘাড় নুইয়ে খোপা দেখিয়ে-দেখিয়ে পর-পর উঠছে এসে মেয়েরা, সাজগােজের এতটুকু শৈথিল্য করেনি, গালের হাড়ের চূড়ায় মােছ-মােছা তেমনি গােলাপী আভা ফুটিয়েছে। তিনটে গরু ও দুটো বাছুর হটিয়ে নিয়ে চলেছে রামরিচ। শুধু পাঁশুটে গরুটার গলায় পেতলের সেই ঘন্টাটা আজ আর বাধা নেই। যেমন প্লেগ বা বসন্ত। তেমনি ছোঁয়াচে সেইভয়, যে ভয় যুক্তিহীন, অনির্দেশ। ও পালাচ্ছে, অতএব আমিও পালাই। ওরাও যখন পালাচ্ছেন, তখন আর কথা কি, আমাদেরও পালাতে হয়। বড়লােককে দেখে গরিব, কোঠাবাডিকে দেখে বস্তি, দোকানদারকে দেখে মুটে- মজুর। যে পালাতে পারছে সে জয়ীর মত মুখ করছে আর যে পালাবার পথ পাচ্ছে না সে মুখ করে আছে গরুচোরের মত। এখনাে যাননি? যেতে-যেতে গাড়ি থেকে বিজ্ঞ মুখ বাড়িয়ে জিগগেস করছে সগর্বে, আর এমন একখানা ভাব করছে যেন সাত হাত জলের নিচে ঠেলে ফেলে দিয়ে চলে গেলেন এপাৰে। চারদিকে একটা দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে ওঠার ভাব। চেহারা রুক্ষ, চাউনি হতবুদ্ধির মত। এখানে ফিসফিস ওখানে ফিসফিস। নখের চুলকুনিতে কলকাতার শরীরে বেরুচ্ছে শুধু গুজবের ফুড়ি।
দুপুরবেলা দেখা করতে এসেছিল সুজন। এ বাড়িতে ওর প্রবেশের পথ প্রশস্ত নয়। লুকিয়ে-চুরিয়ে দেখা হয়, তাও প্রায়ই চোখের দেখা। এবং সেই দেখাটুকুতেই, আশ্চর্য, সমস্ত জগৎ ভরে উঠে। তবু, ততটুকুতেও ভূষণবাবুর আপত্তি। আশা ছিল, আজকের এই বিশ্রী বিশৃংখলার মাঝে কোথাও একটা ৰড ফাক মিলে যাবে হয়তাে। চাই কি, আজ হয়তাে একটু ছুতে পারবে সেবাকে। কে জানে, হয়তাে সংবাদের বাইরে চলে যাবে, আর দেখাই হবে না কোনাে দিন। ঘটনার ঘূর্ণিপাকে পড়ে কোথায় কে তলিয়ে যাবে ভবিষ্যৎ শূন্যে একটি অক্ষরও কোথাও লেখা নেই। সেবা আরাে বেশি আশা করে ছিল। সে এবার বলবে, দৃঢ় হবে, স্পষ্ট হবে। শুধু স্তব-স্তুতি-আরাধনার পথ আর তার সহ হচ্ছে না। দুর- পথে ঘােরাঘুরি করে সে হাঁপিয়ে উঠেছে। ‘তােমরাও চলে উপায় কি। তুমি? সেবার চোখ ঝিকিয়ে উঠল। ‘আমি পালাব কেন? আমি যুদ্ধ করব। ‘যুদ্ধ করবে। কি দিয়ে? কলম দিয়ে ? সুজনের পাঞ্জাবির বুক- পকেটে শস্তা ক্লিপে-আটা খেলাে ফাউন্টেন-পেনের দিকে ইঙ্গিতটা ঝলসে উঠল। হা, কলম দিয়েই। যার যা কাজ তাতে অবিচলিত ভাবে লেগে থাকাই হচ্ছে যুদ্ধ করা। যে আদেশ পালন করে আর যে আদেশের জন্যে অপেক্ষা করে, দুইই সমান সৈনিক। আর, জীবনের শত্রু তাে শুধু ঐ বেঁটে-বাখুররাই নয়, শক্র হচ্ছে ভীরুতা, শত্রু হচ্ছে আলস্য, শত্রু হচ্ছে হুজুগেপনা। হুজ্জতের বদলে এবার কিছু হিম্মতের দরকার— ঢের ওরকম কথা শুনেছে সেবা। কান পচে গেছে বুনতে-নতে। বীরত্বের এই ভঙ্গিটা সে দেখতে পারে না। ৮
‘তােমাদের ইঙ্কল তত বন্ধ হয়ে যাবে।
‘এখনাে হয়নি।
হতে বেশি বাকি নেই। পাততাড়ি গুটোচ্ছে সব ছেলেরা।
‘গুটোক। তবু আমি এখানেই থাকব। কাজের অভাব হবে না।
‘নেহাতই তবে মরবে। সেবার নিচেকার চোখের পাতায় মিথ্যে
দিয়ে-মাখা মায়া-ভরা একটি হাসি টলটল করে উঠল।
মরব। মরতে আমার ভয় করে না। একেক সময় মনে হয় সে
জানি কি মজার জিনিস। কিন্তু বেঁচে থাকাটা জানাে, তার চেয়েও
মজার।
‘যদি চাকরি-বাকরি না থাকে, না খেতে পেয়ে বেঁচে থাকো, তা
হলেও ?
তা হলেও। বেঁচে থাকা, যে করে হােক, বেঁচে থাকার চেয়ে বড় কীতি
আর কিছু হতে নেই। আমাদের দেশ বড় বেশি মরতে ভালােবাসে।
কবিতায়, দর্শনে, ধর্মে, সবখানে ওরা মরতে চায়, মরার ওপরে বেশি মূল্য
দেয়। কিন্তু আমরা নতুন যুগের মানুষ, আমরা বাঁচতে এসেছি
আবার বক্তৃতা। আবার সব ধার যাবে মুছে, স্নায়ু যাবে স্নিগ্ধ হয়ে।
তবে আমিও থাকব তােমার সঙ্গে, কলকাতায়। সেবা প্রায়
সুজনের গা ঘেঁসে এসে দাঁড়াল। তার চুলের একটা গুচ্ছ লাগল সুজনের
মুখের উপর। বৃষ্টির নতুন ধারার মত।
বড় অদ্ভুত লাগছিল সেবার এই হঠাৎ ঘন-হয়ে-আসা। সমস্তটা
উপস্থিতি অনুকূল উষ্ণতায় গদগদ হয়ে উঠেছে।
‘তুমি ?
খা, আমি। আমাকে বাঁচতে দাও, বাজতে দাও একবার।
‘তােমার বাবা কোথায় ? সুজন ঘটনার ওজন নেবার চেষ্টা করল,
যেখানে দাড়িয়ে আছে সে-জায়গার জ্যামিতি।
ব্যায়ে গেছেন। টাকা তুলতে। ‘তােমার মা? বাক্স গুছােচ্ছেন। ক্ষণকালিক মুগ্ধতাটা কাটিয়ে উঠেছে সুজন। সাংসারিক হবার চেষ্টা করে বললে, এই বিপদের সময় তােমার বাবা-মা তােমাকে ছেড়ে দেবেন ? ‘বিপদ বলেই তো ছেড়ে দেবেন। বাবা কি বলেছেন জাননা?” সেবা তার চোখের দৃষ্টি বিলম্বিত করে তুলল। জানি। বলেছেন, ছােটলােকটা যেন এবার বােমায় বোমাকার না। বলেছেন, মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেলে বাঁচতুম। ‘সন্দেহ কি। সুজন হাসল। ‘যদি আজই হয়, আজই তিনি দিয়ে দিতে রাজি। ‘কেননা আজই তিনি পালাচ্ছেন। লাগেজ যত কম হয় ততই তাে সুবিধে। ‘আরাে কি বলেছেন জানাে ? জানি। বলেছেন- , জানাে না। বলেছেন, ইস্কুলমাস্টারই বা মন্দ কি। এইখানেই বরাবর আপত্তি ছিল শীভূষণবাবুর। আগে এ-পাড়ায় পাশাপাশি বাসা ছিল সুজনদের। আলাপী ছেলে, কম মাইনেতে চলবে বলে স্বজনকে তিনি মাস্টার রেখেছিলেন সেবার জন্যে। কিন্তু কদিন যেতে-না-যেতেই ঠাহর করলেন সুজনের লক্ষ্যস্থল বই নয়, ছাত্রীর মুখপদ্ম। ঠাহর করলেন এক হাত আরেক হাতের এলেকায় গিয়ে উঠেছে। ভঙ্গিটা খাড়া নেই, ঢিলে। আলােচনা কূজনের চেহারা নিয়েছে। কথার মাঝে হঠাৎ নেমে এসেছে অকারণে চুপ করে যাওয়া।
অসৎ মনে হল ভূষণবাবুর। গৃহশিক্ষক হয়ে এসে ছাত্রীর প্রেমে পডবে এর রূঢ় শসতিটা তাঁকে ধু পীড়িত নয়, ক্ষিপ্ত করে তুলল। সে-প্রেম বিয়েতে এসে থিতিয়ে পড়বে জেনেও তিনি ক্ষমার চোখে দেখতে পারেননি ব্যাপারটা। সুজনকে তাড়িয়ে তত দিলেনই, দরজা বন্ধ করে দিলেন মুখের উপর। মােটমাট, প্রেম জিনিসটার উপরেই তিনি হাডে চটা। বিশেষত যে-প্রেমে বােদের চেয়ে জ্যোৎস্নার ভাবটা বেশি। তেলচিটে যে-প্রেম। তা ছাড়া সামান্য মাইনের ইস্কুল-মাস্টারের অনেক উপরে তার ইচ্ছা যােরাফেরা করছে। মেয়ে তাঁর সুন্দর, স্বাস্থ্যোজ্জ্বল, ম্যাটিক পর্যন্ত পডেছে বাড়িতে। তার মানে, পাশ করতে পারেনি, পারবেও না কোন দিন, তা তিনি জানেন। মাস্টারির নামে ধাষ্টামি করলে মেয়ে ফেল করবে না ত কি। আজ এই ঘাের বিপর্যয় তাঁকে কিঞ্চিৎ নড়িয়ে দিয়েছে। ইস্কুপ দিয়েছে আলগা করে। কিছুক্ষণ কাটল চুপচাপ। পড়ন্ত নিশ্বাসটা বুকের মধ্যে চেপে রেখে সেবা বললে, ‘নিজেকে এবার ব্যক্ত কৰে। ঘােষণ কৰে। জীবনের খুব জয়গান করাে শুনি, এবার নিজে রচনা করে সে-জয়গান। একটি বার অন্তত ব্যবহার করে বীরের মত। অনেকগুলি কথা বলে ফেলে সেবা হাঁপাতে লাগল। নিচ্ছিদ্র দু হাতে মুখ ঢেকে নিজেকে নিশ্চিহ্নরূপে মুছে দিতে চাইল। সুজনের গলার আওয়াজে এতটুকু নেশা নেই। বরং যেন হিমাচ্ছন্ন। বরং যেন রেশ লেগে আছে উপহাসের। এই দুর্যোগের সময় বিয়ে। তুমি বলল কি সেবা ? কাৰু কোনাে নােঙর নেই, বন্দর ছত্রখান, উত্তাল ঝড় উঠেছে আকাশে, এই সময় ঘর-বাঁধার স্বপ্ন তুমি কি জেগে নেই ? জিদের উ, এর পরেও তর্ক, প্রবােচনা! তবু না চাইতেই কথা এল তার মুখে। বললে, “ভীষণ জেগে আছি। এই দুর্যোগকে শুভযােগে নিয়ে যাব এই আশায়। মরি-বাঁচি, আমরা দুজন—এই বিশ্বব্যাপী অনুভবে। আর পিছিয়ে যেও না। সুজনের গলায় সেই চমৎকার মণতা। বিয়ে বােমার মত অমন তাড়াহুডাের ব্যাপার নয়। ওটা সন্ধির ব্যাপার, শান্ত মাঠের ফসল। তারপর অবমাননাকর সান্ত্বনার প্রলেপ • ‘আমি আছি, তুমি আছ, আজকের দিনে এই সত্য এই অনুভূতিই জাজ্বল্যমান থাক। সেবা কাপড় কুঁচোতে লাগল। সুজন গেল মায়াময়ীর বাঁধাছদায় সাহায্য করতে। মায়াময়ী ভূষণবাবুর মত অত তেড়াবুদ্ধি নয়। নারকেল-কাতা দিয়ে যদি বিছানাগুলাে অন্তত বাঁধিয়ে নিতে পারেন তত মুল কি। ১২ বারিধি সব কয়েছে, পারঘাটায়, হাঁটা-পথের মােহভায়। গরম দুধ, জেল, পুরি-হালুয়া। প্রাথমিক চিকিৎসার জন্যে ডাক্তার রেখেছে মােতায়েন। স্ট্রেচারের অভাবে খাটিয়া। হারিকেন গােটাকতক। বিকেলের ট্রেন কতটা লেট করে তার ঠিক কি। ইভাকুয়িরা গাডি-বােঝাই হয়ে আসছে, পা-দানিতে ঝুলতে ঝুলতে। সামান্য এই গ্রাম্য জায়গাটাও এদের মানচিত্রে আঁকা ছিল ভাবলে আশ্চর্য মনে হয়। আসছে জলপ্লাবনের মত। যেন বাঁকা শিঙে বুনাে মােষ তা করেছে এমন চেহারা। যেন হুলিয়া বেরিয়েছে সবাইর নামে। এত শীতেও যেন ঝলসে গেছে সব। ঝটকানি-ঝকানিতে কেউ আর আন্ত নেই। চেপটে থেতলে গেছে। পােষাকে ছিরিছাদ নেই, চুল ঝাঁকড-মাকড়, দুই চোখে ঘুম রয়েছে চটে। চেঁচামেচি, দাপাদাপি, হুড়াহুডি। হুটপাট, হলুস্থূল। বেশির ভাগই মেয়ে। সকল রকম বয়সের, ফোড়া নাকে তত বাঁধা থেকে শুরু করে গঙ্গাজিনী। নােগ, চিমসে, ধুম্বি। বারিধি কোনাে মেয়েরই মুখের দিকে তাকায় না, পায়ের দিকে তাকায়। আর পায়ের থেকেই হয়তাে দেহের পরিমিতি অনুমান করতে পারে। চেষ্টা না করেই প্রৌঢ়াকে মা ও যুবতীকে দিদি বলতে পারে। মেয়েদেৰৱ তাই তার সান্নিধ্যে নিঃসংকোচ হতে দেরি হয় না। বারিধির সমস্ত সান্নিধ্যটাই সােহার্দে আর্থ। উপস্থিতি অনুগ্র, দাহহীন। পুরুষের উদ্ধতির বিরুদ্ধে মেয়েদের ফেচোখ সর্বদা জেগে থাকে, বারিধি জানে তা নিদ্রাবিষ্ট করে \ তুলতে। ধু মুখের মিষ্টিতে নয়, কাজের মিষ্টিতে। बाबाम নিস্পৃহতায়। নিয়ত উপকৃত হচ্ছে এই বােধের প্রয়শীলতায়। কার ছেলে হারিয়ে গেছে খুজে এনে দাও। কার গায়ে ছেডা- খোঁড়াও একটা ধুকড়ি নেই তাকে দাও কম্বল জোগাড় করে। কে বমি সুরু করেছে তার জন্যে ডাক্তার ডাকাও। চাল-চুলাে ঢেকি-কুলাে বন্দোবস্ত না করে যারা পাগলের মত বেরিয়ে পড়েছে সে-সব হতভম্বের জন্যে আয়ের ব্যবস্থা করে। যারা যাবে গ্রামের অভ্যন্তরে তাদেব খাওয়ার জোগাড় দেখ। কার কে বাক্স নিল ছিনিয়ে, কার মেয়ের গায়ে কে হাত দিয়েছে, কে কার নাকের উপর ঘুষি দিয়েছে বসিয়ে, তার ফয়সালা করাে। ওদিকে কার গা তেততততততা করছে তাকে ওষুধ খাওয়াও। হোঁচট খেয়ে কার পায়ের নােখ গিয়েছে উলটে তার তেলপটি লাগাও। শীতে কাপছে হি-হি করে, কুটোকাটা দিয়ে ধুনি জালে। গায়ে কার খডি উড়ছে, তেল মাখিয়ে তাকে চান করাও। হাজার রকমের ঝাট। কিন্তু বারিধি এক পায়ে খাড়া। সে সেবাব্রতী। বিকেলের ট্রেন এল ঝিমােতে-ঝিমােতে, অন্ধকারের ধার ঘেসে। আবার সেই মানুষের মাছ-পাতুৰি। আঠা দিয়ে আটকানাে কঁঠালের কোয়ার মত। আবার সেই আথাল-পাথাল। চেঁচামেচি, বকাবকি, খামচা-খামচি। ‘কি হয়েছে আপনাদের? উনি কেন অমন করছেন? বিমৰ মুখে সে বলল, বাবার সমস্ত টাকা রাস্তায় চুরি গেছে। ছিল কত ? ‘আমার সব, বাবা। প্রায় সমস্ত জীবনের উপার্জন। পুলিশ। পুলিশ! শীভূষণবাবু নিজের আগাপাতলা করাঘাত করতে লাগলেন। ‘কাল আমি খাব কি? চালাব কি করে ? তার জন্যে ভাবতে হবে না। বাড়ি ঠিক আছে আপনাদের? ১৪ কে নিতে এসেছে শীভূষণবাবুদের, কালি-পড়া ফাটা-চিমনির হারিকেন। ওর হরেন, এর চেয়ে যে বােমায় মরা ভালাে ছিল। আগন্তুক আত্মীয়ের কাঁধে হাত দিয়ে জীভূষণবাবু শােক সুরু করলেন। ততক্ষণে, সেই কালি-পা ফাটা-চিমনির হারিকেনে পা থেকে চোখ তুলে বারিধি দেখলে আরেকবার সেবাকে। মুহূর্তে মনে হল টেশকেলে মাণিক কুড়িয়ে পেয়েছে। যাকে বলে বপুষ্ট, অনল্পযৌবনা, যেমন বাঁধুনি তেমনি বলনি। অপ্রাপনীয়া হলেও যেন অবারণীয় নয়। গঙ্গা ত্রিপথগা। স্বর্ণবাসিনী মন্দাকিনী, মর্তপ্রবাহিনী ভাগীরথী আর তালগামিনী ভােগবতী। বারিধির মনে হল যে যেন পাতাল কত দূরে তাই দেখছে এই অন্ধকারে। ওৎ পাতল না, বুক পেতে দিল। হরেন সরে দাড়াল এক পাশে, মামুলি তদবির করতে এসেছিল, দেখল আসল আমােক্তারনামা বাৰিধির হেপাজতে। মিলিতহস্ত চাকর জোগাড় হল নিমিষে। বুডি করে কয়লা এল, বােতলে কেরােসিন, কাটা-বালতির ভােলা উনুনে চাপানাে হল রান্না। লক্ষ্মীকাল চাল, ডাল সােনামুগ। তা থেকে তুলে আনা ডিম। বোটা-ছেড়া বেগুন। দানা-ওলা ঘি। শুধু শুধু খাইয়েই বারিধি নিশ্চিত নয়। এল উক্তপােষ, মশারি খাটাবার দডি-পেরেক, আধখানা গা ঢলবার জন্যে চটের হেলা-চেয়ার। নর্দমায় ব্লিচিং পাউডার, পাতিনেবুর ঝাডের ধারে-পারে কার্বলিক এসিড। রাত্রে সাপ বলতে নেই-লতা ওঠে বেয়ে-বেয়ে। নগদ টাকা গেছে, গয়না ক' গাছ না যায়। সিধেল চোর আছে আনাচে-কানাচে। আছে ছিচকে চোর। দড়িতে টাঙানাে কাপড়, আলগা বাসন বা পাইখানার গাড় ধরে যে টান মারে। ইস রাখতে হবে চোখেকানে। তা ভয় নেই কিছু। গ্রামরক্ষাসমিতির একজন স্বেচ্ছাসেবী না-হয় রাখবে সে পাহারায়। ভূণ থেকে আরাে ঝকঝকে বাণ সে বার করল। মায়াময়ীকে ডাকল
মা, সেবাকে দিদি, শীভূষণবাবুকে বায়মশাই। ছােট ছেলেমেয়েগুলােকে
দেখতে-দেখতে লক্ষণ থেকে হনুমান বানিয়ে ফেললে।
মেয়েরা গলে গেলেন। কৃতজ্ঞতায় শীভূষণবাবুর গলা খাটো ও চোখ
ঝাপসা হয়ে এল। চলে গেলে জিগগেস করলেন হলেনকে, এ কে
হবেন ?
হবেন চোখ গােল করে বললে, ‘মন্ত লােক।
‘তা চেহারা দেখেই বুঝতে পেয়েছি। স্বভাব দেখে। কে এ?
‘এ পরগনার মালিক জমিদার পয়ােধিনাথের ছেলে।
‘বলল কি ? শীভূষণবাবু সপরিবারে চমকে উঠলেন, এত
পবােপকারী ।
‘রাত-দিন এই করছেন। দেশের কাজ। কার কি অভাব-অভিযােগ
-তন্ন করে খোঁজ করে বেড়াচ্ছেন। জমিদারিতে রুচি নেই।
বাপের সঙ্গে হচ্ছে না তাই বনিবনা। চাষী মজুরের ঘরে না জন্মে কেন
জমিদারের ঘরে জন্মালেন এই শুধু তার আপশােষ।
দরজার মাপের হাতির দাত-সাজানাে বেঠকখানায় মখমলের ফরাসে
রঙচঙে মাদুরের তাকিয়ায় ঠেস-দেয়া জমিদারি তার কাছে বিষের পুটুলি।
জমি যার, জমিদার—এই নতুন রসায়নে সে শশাধন করে নিয়েছে
নিজেকে। লাঙল যার, তারই ভাগে সীতা, শস্যমালিনী ধরিত্রী। তারই
ভাগ্যে অধত স্বত্ব।
অন্তহীন দিগন্তের স্বপ্ন দেখে বারিধি, আইলহীন মাঠের। নিষ্কণ্টক,
অসপত্ব পৃথিবীর। শুধু স্বপ্ন দেখে না কাজ করে। খালি পায়ে ঘুরে
বেড়ায় গ্রামের হালটে। কার কি জমি খোঁজ করে, নােনা না মিঠে,
আল না নাবাল। নােনা শিকন্তি হয়ে কার মাঠে অজন্মা হচ্ছে,
এলচাপ হয়ে কার ফল যাচ্ছে মা, কার ধান খেয়ে যাচ্ছে ধামা
পােয়, সে তার তল্লাস-তদারক করে। খাজনা মকুব করার কম
জারি করে। বাঁধবন্দী ও জলনিকাশের ব্যবস্থা করে। বাকিপ জমি বাঁচিয়ে দেয় নিগমের মুখ থেকে। যে ধার খায় তার ভার কমায়। সুদ-জাত, বন্ধক উদ্ধার করে জমি দেয় ফিৰিয়ে। মাটি-কাটাই, মাটি- ভরাট বা মাটি-পেটাইর যে কাজ করে, যে কাজ করে ছিটে-বেড়া বা চটা-বাখারির, তাদের জনের দাম বাড়ায়। সরাসর রাস্তা আটকে চাষীদের গতি-মুক্তির পথ কে বন্ধ করেছে, তার মুখ খােলসা করে। জঙ্গল হাসিল করে। জঙ্গল উঠিত হলে প্রজা বসায়। চাষের সময় কারা আল-ঠেলাঠেলি করছে, কোথায় বাধছে ছড-ঝগড় সব সে নিষ্পত্তি করে। হাটে যায়, জেলাে হাঁডির হাট, মাদুরের হাট, গরুর হাট। তােলা কমায়। অাদাভ-পাঁদাড থেকে বেশ্যা তাড়ায়। আমলা-ফয়লার খাই কমায়। গরু রােগা হয়ে যাচ্ছে, আবাদের শামলা ঘাসের বদলে খােল- ভূষির ব্যবস্থা করে। মেরামত করে দেয় কার নাভাকুচির ঘর। হিন্দু মুসলমানে মিল-মহব্বত করায়, মিলে-জুলে থাকতে শেখায়। গ্রাম্য মুরুব্বি-মাতব্বরের খপ্পরের বাইরে চাষাভুষােদের এককাট্টা করে। গডে কৃষকসমিতি। ‘মফস্বলে এসেছেন, দেখুন এবারে সত্যিকারের বাঙলা দেশ। দেখুন ঘুরে-ঘুরে। শুধু দেখলেই কি হবে? সেবা চোখ টান করে বললে। ‘না, কাজ করবেন। ভাঙবেন, গড়বেন। নতুন ছাঁচে ঢালাই করবেন সংসারকে। কত কাজ মেয়েদের। ‘দিন না কিছু কাজ। দূরে থেকেও অনেক কাছে তারা এসে গেছে। এসে উপায় কি। সময়টাই বাঁকা, বেয়াড়া। সমস্তই বেৰলেজ। রাজধানী থেকে মেয়ে এসে পড়েছে গ্রামে, দেশান্তরী পাখির মত।
এসে পড়েছে অনিষেধ আকাশের নিচে। ঝাঁক বেঁধে। শাড়িতে ঝলস ও গয়নাতে ঝলক দিয়ে বেকানুন ঘুরে বেড়াচ্ছে, বেলে-মাটির শালা বাঁধের উপর দিয়ে, উডি-ঘাস-গজাননা নাবাল চরে, ইস্টিশান পেরিয়ে পায়ে-পায়ে দাগ-ফেলা মেঠো রাস্তায়। গেয়ে শহরের লােকেরা হা করে চেয়ে থাকে, মাথায়-বােঝা-চাপানাে হাটুরে বেপারিরা ঘাড় ঘােয়, আড়তদারের হাতের পাঞ্জা বেপালট হয়ে যায়, মুহুরিদের হাতের কলম কানে গিয়ে ওঠে। বউ-ঝিরা ইতি-উতি উকি-ঝুকি মারে। যারা নেহাৎ হেঁজিপেজি নয়, যারা ভদ্রলােক, তারা আড়বাঁকা হয়ে চাউনিটা একটু কোণাচে করে। লীলায় লালিত চিত্রিত হরিণীরা যেন নেমে এসেছে কোন দুরাবােহ পর্বত থেকে। কারু বেণী কাৰু লােটন, কেউ ৰা আঁট দিয়ে গেবাে বাঁধা। গাছের ছায়ায় পিকনিক করে, নৌকো নেই বলে দুই-হীন গরুর গাড়িতে বসে খােলা গলায় গান ধরে। কেনই বা ধরবে না শুনি? সবাই বেঁচে এসেছে উদ্যত মৃত্যু, নির্ধারিত অপমান থেকে। ছাড়া পেয়েছে অবকাশের আবহাওয়ায়। প্রৌঢ়াৱা পর্যন্ত বেরিয়ে পড়েছে, স্যাণ্ডেল পায়ে, লম্বা আঁচলে চাবির রিঙ বেঁধে, কেউ বা খাটো আঁচলে গাঁথুনি আঁটুনি করে। বেরিয়ে পড়েছে পা বেড়াতে, তাদের শহুরে স্পর্ধা ও সমৃদ্ধি দেখাতে। যার যত কাপড় তার তত শীত তাই প্রমাণ করতে। নয়দুয়ারীর মত এ কোন নরকে এসে পড়েছে তারই অগত অন্তি মুখে মেখে । স্কুল-কলেজ-পালানাে নির্মা ছেলের দল ফড়ি করে আজ্ঞা দিয়ে বেড়ায়, পাটের গুদাম কেটে যেখানে সিনেমা বসাননা হয়েছে সেখানে গিয়ে হা বাধায়। নদীর পারে, যেখানে বা উড়ন্ত আঁচলে মেয়েদের জটলা। কাবলি পায়ে, বুকের বােম-খােলা শার্টে, উল্ক-খুৰু চুলে রাশ-হালকা হয়ে রাশিয়া-রাশিয়া করে সমস্ত ধনী নিঃস্ব হয়ে যাবে ভেবে মনে-মনে গরমের আরাম পায়। কোথায় কে বায় কখন কে বাড়ি ফেরে, কোনাে দিশ-পাশ নেই। ১৮ অভিভাবকেরা শুধু বাজার করে। শহরের আয়-কাউকে কিছু কেনবার ফুরসৎ দেয় না, খাৱা ভরে মাছ আর ধামা ভরে তরকারি নিয়ে আসে। উপর চড়া হয়ে দাম বাড়ায়। শুধু তাই নয়, মজুদ করে চাল আর চিনি, কমলা আর কেরাসিন, মজুদ করে মজা মারে। গাছেরও খায়, তলারও কুড়ায়। ধান ভানতে হয় না, তৈয়ার অন্ন খায়, ভাবনা কি, এমনি ভাব নিয়ে হেঁড়া ধুতিতে লম্বা কোচা দুলিয়ে চলে। পাশের বাড়ির ভাড়ার ঘরের পুঁজির খোজ নেয়, বেহিসেবী প্রতিযগিতা চালায়। তারপরে যখন খবরের কাগজ আসে, দশ দিক হতে দশ মাথা একসঙ্গে বুকে পড়ে। লিখিত-র মধ্যে অনুল্লিখিতের ব্যাখ্যা করে, বসে-বসে গুজবের গাঁজা টেপে। নিজেদের পালানাের সমর্থন হিসেবে অঘটনের রটনা করে। সমস্ত কিছুই যেন ফেফার, উল্টা-পাল্টা হয়ে গেছে এমনি ভাবের থেকে নিজের সংসারেও শৃংখলা রাখে না। যার-যেমন-খুসি, যখন-যা-ইচ্ছে। সমস্ত কিছুই অস্থায়ী, অব্যবস্থা। এখন-তখন। পেঁয়াে শহর হকচকিয়ে গেছে। মেয়েরা সাইকেল শিখছে, ছেলেরা নেশা করছে, ছেলেতে-মেয়েতে মিলে স্যাঙাত পাচ্ছে। এদিকে জনিস-পত্রের বেদম দাম, বাজারে রেকি নেই, পয়সা হঠাৎ পাখনা মেলে উড়ে পালিয়েছে, পাকির ওজন নেমে এসেছে কঁচির ওজনে। পু উসখুসিয়ে উঠেছে চোর-বাটপাড়ের দল, গুণ্ডা-বদমাস। কেউ বা গয়নার গরম দেখে, গয়নার গরব দেখে কেউ বা। কেলেংকারি যেখানে যেটু বাধছে, চাপাচুপি দিয়ে রাখছে। নিজের ঝাল নিজের গালেই রেখে দিচ্ছে। গোঁজামিল, জোড়াতালির দিন এখন। শীভূষণবাৰু তবু মাঝে-মাঝে তিড়বিড় করে ওঠেন। বলেন, 'সেবার অত মেশামিশিট ভালাে নয়। একটু সামলাতে বলল। মানে, নিজে বলতে জোর পাচ্ছেন না। এ তাে আর অকেজো ইস্কুল-মাস্টার নয় যে মেজাজ তিরিক্ষি করবেন। বারিধির মত ছেলে। তিনি তাে জানেন সে কি করেছে তাদের জন্যে। নিতান্ত অমর্যাদা দেখানাে হয় বলেই শুধু নগদ টাকা নেয়নি, কিন্তু যা সে দিয়েছে তা নগদ টাকায় কেনা যায় না। এই আতান্তরে বিদেশে-বিভুয়ে এসে তার কাছে তাঁরা যে উপকার পাচ্ছেন, যে আনুকুল্য, তার মাপজোখ নেই, অথচ কোথাও এতটুকু অনুকম্পার খোঁচা লাগে না। তারা আতুর আর সে দাতা একটুকু তার উল্লেখও রাখেনি কোনােখানে। বরং সে দায়ী আর তৰা অধিকারী এমনি নম্র-নির্মল ব্যবহার। এভূবণবাবু যে এত খুঁততে তবু স্পষ্ট করে আঁচড় কাটার জায়গা পান না। তবু, যুক্তি-তর্কের বাইরে, মনটা কেমন খচখচ করে। বেখাপ, বেমানান লাগে। রিটায়ার্ড রেলকর্মচারীর মেয়ে আর জমিদারের ছেলে জলের বিম্ব হয়ে জলে মিশে যাচ্ছে না, তেলে জলে হয়ে যাচ্ছে। ‘রাখখা তােমার বাজে কথা। মায়াময়ী ঝাঁজিয়ে ওঠেন। উঠতে পারেন কেননা আবহাওয়াটাই এলােমেলাে। বলেন, মেয়েটাকে পড়ালে , বিয়ে দেওয়ালে না, এখন এই একটু দেশের কাজ করছে এতে আবার বাদ সাধতে এসেছ? তবে কি ও পডে-পডে ঘুমােবে আর মােটা হবে?” দেশের কাজ। বারিধির এ এক রকমের বিলাসিতা। জানেন তা শ্ৰীভূষণবাবু। এ এক রকম নামের মালামাে। জমিদারের ছেলে হয়ে কমিদর-দের সঙ্গে মিশছে এ এক রকমের বাহাদুরি। নিজে না খেলে পাশে বসে বল’ চালাবে, এ উপ-চাল ছাড়া কিছু নয়। বাপের হস্তৰুদে খাকতি পড়ে এ কখনাে চায়না বারিধি। চায়না, সে ভােল যে সে অসাধারণ কিছু করছে, তার এই নেমে-আসায়ও সেই আভিজাত্যের চেতনা। সন্ত্রাতার স্বাদ। খালি-পায়ের ধুলাে মুছে মাঝে-মাঝে সে বাজবেশ পরে-আপ্রাদেশিক পােষাকমাথায় কাপড়ের টুপি, পায়ে আলখাল্লার ধরনে পাঞ্জাবি, পরনে পা-জামা, পায়ের চটিটা মুলটানাে।
যখন সে বক্তৃতা করে, যখন সে গরিবের দাবি নিয়ে দাড়ায় গিয়ে বন্ধ দরজার কাছে। তখনই কিছুটা আশ্বস্ত হন শীভূষণবাবু। তার ঐ ঢিলেঢালামিতে পরিচিত পরিমিতি খুজে পান। খুজে পান আলস্যের আভাস, আরামের গন্ধ। আশ্বস্ত হন, যখন দেখেন তার স্বাস্থ্য বলােঙ্কত, ভাষা মার্জিত, ভঙ্গি সমতসঙ্গত। যখন দেখেন শিক্ষা-সহবং কিছুই সে ছাড়েনি, ছাড়েনি তার কৌলীন্যের, ধনবার দায়িত্ব। শুধু কিছু বা টাকা খরচ করছে। ভাদুরে-কুঁড়ে আর-আর জমিদারের ছেলের মত মামুলি নেশায় টাকা না উড়িয়ে নতুন নেশায়, দেশের নেশায়, মজা উড়ােচ্ছে। সমান তামসিকতা। ফলে যদি একটা সে রায়সাহেব পায় বা একটা বিলিতি কাসার মেডেল, তাতেই সে হয়তাে চরম খুসি হয়ে গয়ে খােল মুখ ঢােকাবে। মনে-মনে যাই বলুন, মুখে বলতে পারেন না। যেটুকু সে করছে তাই বা সত্যি কম কি। তাতে শ্রীভূষণবাবুর আপত্তি নেই। যেখানে তার বাধছে, সে হচ্ছে সমস্ত ব্যাপারটা নিতান্তই সাময়িক বলে, আকস্মিক বলে, ভঙ্গিটা বেমজবুত বলে। পিছনে কোনাে দুঃখবােধ নেই বলে। দেশের জন্যে দুঃখ না পেলে দেশের জন্যে প্রীতি হবে কেমন করে। তাই তাঁর মনে হয় এও আরেক রকমের ভাবতারল্য, ইদ্মধারণ। ভক্তের ভণ্ডামিটা ভক্তি-জিনিসটাকেই তেতাে করে ছাড়ে। কিন্তু তার আপত্তিটা আসলে কোনখানে? বেশ তাে, বারিধি যদি শেষ পর্যন্ত পুকুরে এসেই ক্ষান্ত হয়, মন্দ কি। জমা-ওয়াশিল-বাকি, কডচা-সেহা, বােকড-চালান, চিঠা-খতেন। সে তত সুখের কথা। শাখা-প্রশাখা যতই তার ছাঁটকাট যাক, কাও তার প্রকাণ্ডই থাকবে। তবে এমন লােক হাতে পেয়ে সােনা ফেলে কে আঁচলে গেৱে দেবে? ঘর থাকতে বাবুই ভিজুক, কিন্তু মায়াময়ী নয়। এখানে যে ছােকরা এস-ভিও এসেছে তার বিয়েটা কি করে ঘটল জান? দিনের বেলায়ও লণ্ঠন জেলে খুজতে হয় এমন কালো বউ, কিন্তু গায়ের কালাে চোখের নজকে কালাে করতে পারে নি। মেয়েটার বাপ-মা তাে গছিয়ে দিতে পারত না, তাই গুছিয়ে দিয়েছে। ফাদ পেতে কাঁধে তুলে দিয়েছে। দেখতে-দেখতেই শেষে ভালাে লেগে যায়, মাটির কলসীও শানে ক্ষম ধরায়। এত উডে মেয়ে থাকতে বারিধি যখন এদিকে হেলেছে তখন হেলা করে হাল ছেড়ে দিলে চলবে কেন ? বাতাস পেয়ে পাল না তুলে দেবার মত ঝকমারি আর কি হতে পারে ? যেমন দিন পড়েছে। ૨૨ ৪ রদ-বদলের দিন। নিযুল করে নতুন নির্মিতি। নতুন মূল্যীকরণ। উদণ্ড ‘না’ এই বারিধি। নির্মম নান্তিবাদী। ধরে, ঈশ্বর। কি এই ঈশ্বর? ধনতান্ত্রিক সমাজে নিধনের জন্যে স্তোক, শস্তায় সান্ত্বনার ব্যবস্থা। দগ্ধ যন্ত্রণার উপরে মৃদু হস্তপ্রলেপ। যাতে সৌভাগ্যবান তার বিত্ত-বেসাত সভােগ করতে পারে স্বচ্ছন্দে। অথচ এই ঈশ্বরের নামে কত খুননাখুনি, কত রক্তারক্তি। নিজেকেও ভুলি, পকেও ভুল করে দেখি। যে-ঈশ্বরের সবাইকে সমান করার কথা, সে-ই এখন বাদ পড়লেই সবাই সমান হতে পারে। কিসের তােমার কর্মফল? তুমি যে গরিব হয়ে জন্মেছ সে কি তােমার দোষ, না সমাজের অপরাধ? যদি আজ দেশ থেকে দারিদ্র ঘুচে যায়, তবে কোথায় যাবে তােমার পূর্বজন্ম ? আমাদের সমস্ত কর্মজাল জটিল করে রেখেছি হাতের রেখায়, বর্তমানের নিক্রিয়তাকে রঙিন করে রেখেছি ভবিষ্যতের সম্ভাবনায়। ফন্দি, যাতে না আমরা কাজ করি, ভিড় বাড়াই, দাবিদার হই। চোখে যাতে না জালা ধরে তারি জন্যে চোখে আমাদের পরকালের পরকলা পারিয়ে দিয়েছে। যা দৃষ্ট যাতে তা না দেখি তার জন্যে অদৃষ্টের ধোঁকা তৈরি করে রেখেছে। ঝলসা-কাণার মত হয়ে আছি। না, ইহকাল ছাড়া কিছু নেই, কিছু নেই মানুষের উপরে, মানুষের বাইরে। মােহ- মূগরের জন্যে চাই এখন নতুন মােহল। চাই নতুন পরশুরাম। মাতার মত যে সনাতনী তাকে পর্যন্ত যে উচ্ছেদ করেছে। শিউরে উঠলে চলবে না। সনাতন বলেই কিছু সত্য নয়। আল-অভ্যাসে মিথ্যেও এও এক সততার চেহারা নিয়ে দেখা দেয়। শূন্য জ্যোতিলোকের দিকে উগ্ৰীৰ হয়ে নিরালম্বের মত আশ্রয় খুঁজি, পায়ের নিচের দৃঢ়, শক্ত মাটিকে অস্বীকার করি। , চোখ আনতে হবে ফিরিয়ে, নিজের দিকে, পরিপা, পথিপার্শ্বের দিকে। গােলকধাঁধা থেকে আসতে হবে বেরিয়ে, ফন্দিবাজদের বহুকেলে প্রবঞ্চনা ছিড়েফুড়ে ফেলতে হবে। না, না, না। বারিধির মন্ত্রপাঠ শেষ হয়নি এখনো। কাকে তুমি মহৎ গুণ বল ? দয়া, দক্ষিণ ? আমি আরামে থেকে তােমার দুঃখে আহা-উহু করছি, এ কি একটা গুণ ? এ ডেপগামি ছাড়া কিছু নয়। আমার অতিরিক্ত আছে, আর তুমি নিঃস্ব, তাই আমার দান ও দয়ার এত মহিমা। কিন্তু যখন তােমারে থাকবে, তখন আমি কাকে দান করব? কোথায় দয়া যাবে গয়া হয়ে। আমি অন্যায়রূপে অজস্র সঞ্চয় করেছি, আর তুমি দিন এনে দিন খেতে পাচ্ছ না, জরার দুয়ারে এসে একদিন তা ত্যাগ করে দিলাম, ততদিন দণ্ডিত না হয়ে আজ আমার সংবর্ধনা হল। কোথায় থাকবে ত্যাগের বডমানুষী, যখন আমার অপ্রয়ােজন তােমার প্রয়ােজনকে শূন্য, অঙ্ক করে রাখবে না ? কিসের কি কৃতজ্ঞতা? যেখানে দানের স্থান নেই, সেখানে কৃতজ্ঞতা কপটতা ছাড়া কিছু নয়। আমাদের চোখে ওরা মায়া-কাজল পরিয়ে রেখেছে, যাতে রােগের ঘাের আমাদের না কাটে। সেবা—তুমি নও- তষা, পরিচর্যা-সেবা বলতে লােকে যে এত অজ্ঞান, এটার মাঝে আছে কি? আবেগে বয়ে যেয়ােনা, ভেবে দেখ। যখন সমাজ-ব্যবস্থার দরুণ রােগের প্রসার বা প্রাদুর্ভাব যাবে কমে, যখন দেশে বন্যা হবে না, হবে না দুর্ভিক, মড এসে সড়ক বানাতে পারবে না, তখন কোথায় যাবে তােমার সঙ্গেসীরা তাদের সেবাধর্ম নিয়ে? যখন প্রতি মাইলে একটা করে হাসপাতাল বসবে আর রুগী পিছু একজন নর্স, তখন তােমার সঙ্গেীদের মঠ ছেড়ে ফ্যাক্টরিতে গিয়ে ভর্তি হতে হবে, সেই মঠই হবে হয়তাে হাসপাতাল। এখন সহেলী দেখে যেখানে ভাবে বিভাের হচ্ছ, সেখানে সন্নেসী দেখে তখ লজ্জিত হবে। আর অপচিত মনুষ্যত্বের প্রতীক সেই সন্নেসী তখন বা তুমি দেখবে কি করে? সংসার যারা পরিহার করতে চায়, তারা জেলে, সেবা ফুলেই যাদের কাজ ফুরােয় তারা কারখানায়। রঙ তখন গেরুয়া নয়, লাল। যদি লালসার মত লাল বলতে না চাও, বলল সূর্য ওঠার মত। ফুটেছে অনেক শাদা ফুল, এবার লাল ফুল ফোটাও। জানি তুমি এর পর সতীত্বের কথা তুলবে। সতীত্ব হচ্ছে পুঁজিবাদের উত্তরফল। সিন্দুকে গচ্ছিত সােনা, অন্তঃপুরে আবদ্ধ খ্রী। খ্রীত্ব হচ্ছে বিজ্ঞাপনের ফলক আর সতীত্ব হচ্ছে তার উজ্জ্বল বর্ণমালা। ফ্যাসিজমের নির্দয় নিদর্শন। স্বামীদের, প্রভুত্বের ফ্যাসিজম। ‘কিন্তু বিয়ে ? সেবা ভয়েভয়ে জিগগেস করে। ওটা বৈজ্ঞানিক, ওটাকে মানতে হবে। কিন্তু এ-জাতীয় বিয়ে নয় প্রেম বা প্রয়ােজনের থেকে নয়, সমর্মিতার থেকে। যে সহকর্মিণী না হবে সে সহধর্মিণী হবে কি করে? প্রেমের থেকে যে বিয়ে সে শুধু প্রেমটাকে অপ্রমাণ করবার জন্যে, প্রয়ােজনের থেকে যদি বিয়ে করি তবে আমি কৃতদার নই, তদাস। কি করে পারস্পরিক আকর্ষণ রাখব বাঁচিয়ে যদি না কর্মে সমতা আসে, কর্মে না মুক্তি পাই ? প্রথম রাত্রের শিশিরেই তাে প্রেমের পালিশ যায় ধুয়ে, তখন কে বাঁচাবে সেই মােহমােচন থেকে? নর্ম নয়, কর্ম, বলতে পারে বা কর্মের সাধর্ম। আমি-তুমি যদি হাত মেলাই, সে-হাত ঘর্মাক্ত হবে, কর্মাক্ত হবে, ক্লি, কিণ-কঠিন হবে। আমি কেরানি, আর তুমি কেরানির রানি হয়ে থাকবে খুঁটেকুড়ানির চেহারায়, তা আর চলবে না। হাত থেকে হাত যদি যায় খসে, তােমার কর্মের সেই মহান অধিকার বাতিল হয়ে যাবে , পাবে নতুনতর স্বীকৃতি, নতুনতর সাহচর্বে। অনেক টালমাটালের পর সে যেন শক্ত আশ্রয় পায়। তীব্রতার – মাঝে পায় একটা স্পষ্টতার শান্তি। ঘােরাঘুরি না করে স্থির লক্ষ্যে চলে আসবার কত তাকে চমক লাগায়, পরাভূত করে। সুজনকে মনে হয় অনেক ফিকে, অনেক ভীরু। মনটা নির্জীব হয়ে পড়ে ছিল, হঠাৎ রুখে ওঠে। বলে ওঠে, অক্ষম, অবােগ, অসভ্য। হ্যা, এসেছে দিন-বদলের দিন। হাওয়া-বদলের হাওয়া। আজকের সুজন কালকেরও স্বজন হয়ে থাকবে এমন কোনাে কথা নেই। সময় তার খােলস বদলাচ্ছে, সঙ্গে-সঙ্গে আমাদের মন। ছাঁচ বদলালেই ঘঁদ বদলাবে। ভাষা যাচ্ছে বলে যে-শব্দ যত বেশি গ্রাম্য তা তত বেশি সংস্কৃত, হরফ, বানান, ব্যাকরণ সব যাচ্ছে ওলােটপালােট হয়ে। চলেছে সব মহলের পথে। বদলাচ্ছে ব্যবহার। বদলাচ্ছে মর্যাদার সঙ্গে। বেবননদ মধ্যবিতা ভেঙে ভেঙে পড়ছে। বলছ কি, দেশের আইন আজ এখাে। বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন, চাষী-খাতক আইন, মহাজনী আইন। এসে গেছে ফিরিয়ে দেবার দিন। মহাজনদের ঠেছে ছুলে দিচ্ছে চাষীরা, উৎখাত জমি নিয়ে আসছে ফের খাসদখলে। আসল হক-হকিয়ত যে তার, পাচ্ছে তার স্বীকৃতি। ঠেকাবে কি করে? যায় যদি যেতে দাও এই হাজাখার দিন। আমাকে বলে, আমি জমিদারের ছেলে, গরিব নিয়ে বাবুয়ানা করছি। আমার জন্মের সেই কলঙ্ক আমি মূছৰ কি করে, আমার রক্তের নীলাভ? ডেক ধরেও আসল বৈষ্ণব হওয়া যায় সংসারে। আর এ যদি নিতান্ত খােস-খেয়ালই হয়, ক্ষতি কি? বলব, নির্দোষ খােস-খেয়াল। অন্তত নেশা-ভাঙ করার চেয়ে ভালাে। একজনকেও যদি দিতে পারি একটু শিক্ষা, ঘােচাতে যদি পারি একজনেরও দালি, আজকের দিনে তাই আমার অনেক। অনেক না হােক, কিছুটাও কি নয়? বলে, হাত দিয়ে আমি হাতি ঠেলছি। আমার যখন একার হাত, তখন হাতিটাকে বড়ই তাে মনে হবে। কিন্তু তােমরা যদি এসে হাত মেলাও, তবে হাতি কেন, বিন্ধ্যাচলও টলে পড়বে। বলে, আমার এটা সমস্তই সাময়িক, স্থায়ী নয়। বলে, দুনিয়ায় কার আছে এই স্থায়িত্বের অহংকার। চিরস্থায়ী যে বন্দোবস্ত তাও বদ হয়ে যাবে বলে শােনা যাচ্ছে। এই যে ধর্ম আর ধন নিয়ে এতদিন ধাপ্পাবাজি চলেছিল পারল তা টিকে থাকতে? সময় যদি সুদয় হয়, তবে কি সাময়িক হব না? জীবনে আমার দুঃখানুভব নেই, তাই সমস্ত জিনিসটাই আমার কৃত্রিম, এ নালিশও তুমি শুনে থাকবে। না খেতে পাওয়ার দুঃখের অবিশ্যি তুলনা নেই, কিন্তু কিছু করেও কিছুই করতে না পারার দুঃখটাই কি কম? আমি জেলে যাই নি তা ঠিক, যেতেও চাই নে, জীবন আমার কাটেনি দারিদ্র্যের পেষণে, তাতে আমার নির্বাচন ছিল না, কিন্তু বলল, তাই বলে কি আমি নামঞ্জুর হয়ে যাব? আমি যে আমি হতে পারছি না সেটাই কি যথেষ্ট যন্ত্রণা নয়? আর, কোথায় আমার হিংসা, যত দেখতে পাই ঘাস, তত দেখি দলিত কাঙালের দল, উপরতলার দিকে তাে চোখই ফেরাই না। যদি বা দেখি করুণার চোখে দেখি। ইজারা নিয়ে দখল পেয়ে যদি বা কেউ মূলস্বত্বের দাবি করে আর যদি তুমি অধিকার সান্তের জন্যে মামলা করাে, তাতে হিংসা কোথায়? বরং তােমার কৃপা হয়, ওর নির্ঘাৎ হার জেনে। ওর মিথ্যে হয়রানি দেখে। যে যাই বলুক, তুমি ভুল বুঝে না। সেবার মন মােমের মত গলে-গলে পড়ে, শিখাটা আরাে কেঁপে কেঁপে ওঠে। বলবান যখন বিষগ্ন হয় তখন তাকে আরাে মূল্য দিতে ইচ্ছে করে। বক্তৃতার দীপ্তির চেয়ে এই বিষাদ-বােধের লিখতাতেই সেবা বেশি নরম, নিস্তেজ হয়ে আসে। যাক যা কিছু নড়বড়ে, যা কিছু পচা-গলা। যা কিছু খা, বরবাদ বরখাস্ত করে দাও। থাক শুধু এম আর সাম্য আর সখ্য।
৫ এখন আমন ধান কাটা হয়ে গেছে। নাড়া দিয়ে বিয়ে বেঁধে ধান নিয়ে এসেছে চাষারা। নিয়ে এসেছে বাড়ির খলটের খামারে। ছাই আর মাটি দিয়ে তৈরি যে-খামার। চ্যাটার উপর বিছিয়ে শুকোতে দিয়েছে বােরে। তাই দেখতে চলে আসে দু’জন, সেবা আর বারিধি। দু’তিন বােদ্দর লাগবে নাকি শুকোতে। দাতে ভেঙে বুঝবে তৈরি হয়েছে কিনা। কোন কোন বাড়িতে মেটেতে ভিজিয়ে সেদ্ধ বসিয়েছে এরি মধ্যে। ধান ফেটে গেছে দেখলেই বুঝতে হবে নামাবার সময় হল। গরম ধান ঠাণ্ডা করে আবার চ্যাটায় ফেলে রােদে দাও। পা দিয়ে নাড়াে-চাড, ওলটাও-পালটাও। অন্তত দু’দিন ফের লাগবে হয়তাে শুকোতে। তারপর নিয়ে যাবে দেশকেলে, বসে আছে ধান-ভানীরা। পইয়ের উপর বাবলা-কাঠের টেকি বসানাে। আড় ধরে ঢেকির পটিতে পা রেখে পাড় দেবে হয়তাে দু’জন, আরেকজন নােটে হাত ঢুকিয়ে ধান এলে দেবে। ছেকাঠ যেন হাতের উপর এসে না পড়ে ততটুকু তাল রেখে চলতে হবে। নইলে শেষে তাল আর সামলানাে যাবে না। আধছাড়া হয়ে গেলে ধান ঝাডবে কুলােয় করে। ঝেড়ে ফের নােটে দেবে। সম্পূর্ণ ছেড়ে গেলে ফের তুলে নেবে কুলােয়। গায়ের কুঁড়ে পরিষ্কার করবার জন্যে আবার একবার কুটতে হবে। তারপর শেষবার ঝেড়ে নিয়ে মজুত হল গিয়ে মটকাতে। শেষবারে চাল কঁজিয়ে খুদ বেরুবে, সেদ্ধ করে খাওয়াও গরুকে। কে তােমরা ধান- মুনীরা? আমরা বাবু মুচি-কেও। মজুরি খাটছি। এক মণে চার আনা মজুরি। ২৮ খুটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখে সব সেবা। শশানে আর শেখে। গরুকে খােল-বিচলি খেতে দেয়া হয়েছে। গরু দিয়ে মলে যা বাকি থাকে তাই নাম পল। খেতে যা ফেলে এসেছে সেটা না। আর হাত দিয়ে ঝাড়া ধানের গােড়ার নাম বিচলি। ছােটনা ধানের বিচলিই হচ্ছে গরুর ভাল খাওয়া। চন্দনকাঠ বেটে দিতে পারাে যদি জানার সঙ্গে মিশিয়ে, তবে আর দেখতে হবে না, এক বলকেই দুধে দু আঙুল মােটা সর পড়বে। গরুও উঠবে তেজী হয়ে। ও যদি না পার, ফাতশুদ্ধ, ফেন দাও, দাও কুঁডাে আর চুনাে। আর ঐ দেখ কেমন পলের গাদা দিয়েছে। মাচায় করে ছড়িয়ে-ছড়িয়ে কেমন গাদার ছাউনি তুলেছে। ঠিক সােনালি গম্বুজের মত। এটা বুঝি গােলপাতার ঘর। কি রকম এ গােলগাছ ? নারকোল গাছের চারার মত দেখতে, দশ- বায়াে হাত উচু। । হয় নানা দেশে, জলের মত হয়। পেলে কি করে? বিলি-বন্দোবস্ত হয় নাকি? না, চুরি করে নিয়ে এসেছে, কাটবার ছাড় নেই। জালি-বােটে বন-বাবুরা পাহারা দেয়। তাৰি এক ফাকে ডােবা নৌকো তুলে কেটে নিয়ে এসেছে। নাডা বেচবে, না, তা দিয়ে ঘর ছাইবে ? এই বুঝি সব যন্ত্রপাতি। যুদ্ধ কত অস্ত্র লাগছে, কিন্তু লাঙলের মত অস্ত্র কই? এ হনন করে না, খনন করে, উদঘাতিনী ভূমিকে সমতল করে, ধরিত্রীকে করে শস্যমালিনী। বাঁকা কাঠটার নাম বুঝি গাদা, আর গাদার মুখে ফাল, আর এই লম্বা কাঠটার নাম ইশ। ফালের উলটো দিকের কাঠের নাম মুঠে। কাঠের খিলটার নাম আটচাল। আর একে বলে মই বা পেটে, কেউ বা বলে বই। এটার নাম বিদে, লােহার কাটার চিনি। আউসের চারা গজাবার পর বিদে দিয়ে, আঁচড়ে দেয় মাটি। আর একে বলে নিড়েন, ধান-গাছ বেখে আগাছা-ঘাস মেরে দিতে হয় একে দিয়ে। আছে কোদাল আর গাঁতি, খুরপি আর খা। বড় এদ্ধে এ সব কষিযন্ত্র। শত বার খেলেও এদের জোক করতে পাবাে না তুমি। আজ তারা গিয়েছিল জেলে-পাড়ায়, নিকারিদের বাড়ির পাশে। কাঁচা গাব টেকিতে কুটে ধান-সেদ্ধর হাঁড়িতে জাল দিচ্ছে। শাদা, বােনা জাল বুলিয়ে রাখতে হবে সেই গাবের আঠায়। বাবলার ছালের কাথ করে উপরে লেপ দিতে হবে। কি নাম তােমার ? নাম আমার শম্ভু দলুই। বুনছ কি? খেপলা জাল, যে-জাল ছুঁড়ে মারে। তুমি কি করছ ? মেরামত করছি, নিকারিদের বেঁউতি জাল, যে-জাল গাঙে পেতে রাখে। টানা জাল, ঝাই জাল, ধুকুচ জাল। বাঁ হাতে টিপনে আর ডান হাতে খচি নিয়ে জাল বুনছে তারা। আশি সুতােয় ছয় তার দিলে তবে মজবুত হবে খুব। কিন্তু তত মিলছে না বাজারে। টোনা দিয়ে ঘাই বাধছে, আর এই ঘাইয়ে লেগেই বড় মাছ ঘায়েল হবে। এই দেখ জালের চুড়াে, ঘর বাড়িয়ে ঘের বানােকে বলে মালি দেয়া। এগুলাে হচ্ছে লােহার কাঠি, জালের নূপুর। আমরা বাবু খুয়ে তাঁতি হয়ে তসরেতে হাত দিয়েছি। মাছের ব্যবসা ছিল আমাদের, গাঙে-গাঙে জলকর নিয়ে মাছ ধরতাম। নৌকো নিয়ে গিয়েছে, তাই এখন মাছ ছেড়ে জাল নিয়ে পড়েছি। যেতে হবে পারঘাটায়। পাটনী মাশুল নিয়ে বড় কষাকষি করছে। বােঝা বা বাঁক নিয়ে প্রত্যেক লােকের পানি যেখানে দু পয়সা, সেখানে চার পয়সা নিচ্ছে। বেহারা নিয়ে খালি ডুলির ভাড়া লেখা তিন পয়সা, এক পয়সা নেইলে ছয় পয়সা নিচ্ছে। দুই গয় বােঝাই যদি গাড়ি হল তবে একেবারে আট আনা। ডাকের পেয়াদা, আদালতের পেয়াদা, চৌকিদার-পঞ্চায়েত তাদের গাঁটরি নিয়ে বিনে- ভাড়ায় পার হতে পারবে, অথচ দোকানি-পসারির লাগবে নিজের ভাড়া, আবার ঝাঁকা-বুড়ির ভাড়া। হাটের সওদা সেরে বাড়িফের মূখে চাষীদের পোঁটলা-পুটলিও বাদ পড়বে না। আবার এদিকে রাস্তা মরামত করছে ফেসব কুলি, তাদের বা তাদের হেতের-শাবলের ভাড়া কুব, অথচ তাদের থেকেও আদায় করাে, নগদান না হােক বিডি মার দেশলাইয়ের কাঠি। দেখ, চলবে না এ-সব জবরজুলুম। ইজারা বাতিল হয়ে গিয়ে নতুন নিলেম হবে ফেরিঘাটের। ঘাটে আলাে রেখেছ কোথায় ? সােয়ারিদের জন্যে এই ভােমার বিমঘরের চহারা ? নৌকোয় লােভ-লাইন কই? জলে ধুয়ে গেছে, না ? কাথায় লটকে রেখেছ ফেরিঘাটের মাল-আদায়ের তপশিল ? ডাও, দেখাচ্ছি তােমাকে। শুনবাে না তােমার ধানাই-পানাই না, বাবু, কানমলা খাচ্ছি, সব ঠিক হয়ে যাবে। বাৰু আর তাঁর বিবি যদি বাওড়ে বেড়াতে যেতে চান, সে অনায়াসে জোগাড় করে দেবে পামপান। আমাদের জন্য মাথা ঘামাতে হবে না, নিজের কোর জল ফেরাও, হাল-চাল বদলাও। যে লােক জল ভেঙে বা সাতার দয়ে পার হয় তাকাে কি ভাড়া না দিয়ে নিস্তার নেই? না, বাবু, নাকখত্তা দিচ্ছি, আর নাকাল কোরাে না। ধরলে চিচি করে, ছেড়ে দলেই ফের লক্ষ ঝাড়বে, বলে আমােহীর দল। ঝাড়ু দেখি না আরেকবার, একজোট হয়ে আর্জি পাঠাৰে বাের্ডের দরবারে। ভয় নেই, আমরা আছি। আমরা সে-আর্জির মুসাবিদা করে দেব। চলাে এবার এনা-দেনাজের বাড়িতে। দু’ভায়েতে ভীষণ ঝামেলা। বাকিপড়া এজমালি জমি নিলেম হয়ে গেছে, বেদা তফকি নিলেম রদ করার জন্যে মামলা ঠুকেছে এনাজ খাঁ। তলে- তলে দেনাজ খাঁ গিয়ে সরসেরেভার নায়েবের সঙ্গে যােগসাজস করে তাবাদি করে দিতে চাইছে সেই বদ-রহিতের দরখাস্ত। মতলােৰ হচ্ছে, নলেম বাহাল রেখে যােল আনা পওন নেবে সে একলা। এনাজ খাঁকে ভিটেছাড়া করবে। এনাজ বলে, ঘরের ঢেকি হয়ে কুমির হবি ৩১ তুই ? দেনা জবাব দেয়, নিলেম জানার তারিখ থেকে দু’মাস কবে কাবার হয়ে গেছে, সাঙ্গ কথা বলব না কেন? এক দিকে মেহ অন্য দিকে সত্য, লেগেছে সংঘর্ষ। ওরা মাঝে পড়ে সালিশ করে দেয়। হাল-বকেয়া সব হিসেব-মােকাবিলা করে নাও, নিলেম খণ্ডে যাবে। তারপর দু’য়ে খারিজদাখিল করে জমা-জমি বাঁটোয়ারা করে নাও, কচা কিংবা জারুলের খুঁটি দিয়ে সীমানা ভাগ হয়ে যাক। মায়া-মহব্বত আবার ফিরে আষক। কে ওই কঁদছে না? হ্যা, প্রিয় লাটির বউ গােরাশশী। পিটছে বুঝি বউকে। চলাে দেখে আসি। কি ব্যাপার? , গােরাশন রাত ভাের শিলে তার বুড়াে আঙুলের মাথা ঘসে ঘসে ঘা করে ফেলেছে তবু প্রিয় লাটি তাকে রেহাই দিচ্ছে না, বলছে টিপের রেখা এখনাে সব চুপসে যায়নি, আমরা বসাে। বুঝতে পারে এক নজরে। বউর নামে খত দিয়েছে বেনামীতে, এখন আদালতে নালিশ ঠুকে মহাজন টিপ-পরখের সাক্ষী মানতেই সুরু করেছে এ জালসাজি। বুড়ো আঙুলের মাথাটা একেবারে বেদাগ করে ফেলছে। ধার করেছিল, কিন্তু পাপ তত করিসনি, কেন এই দেকসে? আসবি আমাদের কাছে। একদম মাপ করাতে না পারি, লম্বা কিন্তি করিয়ে দেব। কেন অমন ছুটোছুটি করছিস? তুই ভােলাই সরদার না? কি হয়েছে? না, পয়সা নেই। তা তাে সবাই জানে। কি করে খাল ? দিন-মজুরি, ফুরনের কাজ করি। কাঠ চেলা করি, গাছ বাছি, মাটি কোপাই। তা, অমন হাঁসফাস করছিস কেন? ছেলেটা বাবু মার গেছে ভেদবমিতে। কিন্তু কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করতে পারছি না। পয়সা নেই দু’খানা নতুন চাদর কিনি, কিছু গােলাপপনি, আতর- কপূর কিনি। বাছাকে কি আমার খালি-তক্তায় শুইয়ে নিয়ে যেতে হবে কবরখােলায়? কত পয়সা লাগবে ? পয়সা দিতে চাও দাও, কিন্তু মরার দেহে নতুন কাপড় চড়িয়ে লাভ কি? পার এই ভেবমির উচ্ছেদ করতে ? দেশের কাজ করছি। সেবা এই নিয়েই মাতিয়ে-তাতিয়ে রাখে নিজেকে। আর যা হােক, সামাকে তাে মান্য করতে পারলাম, দীন- দুখীকে তত ভাবতে পারলাম দায়াদ বলে। সে যে দুরাকাঙ্গিনী, তাতেই কি সে দেশসেবিনী নয় ? বারিধির আশ্রয়ে নিজেকে তার অনেক নির্ভয় অনেক নিঃসংশয় মনে হয়। বেশি দৃঢ়, বেশি স্পষ্ট বলেই যেন স্থিতির মাঝে সে স্থিরতা খুঁজে পায়। এক রঙে ছুবিয়ে নিয়েছে তাদের নিশান, এক সুতােয় বেঁধে নিয়েছে রাখী। বিয়ে হয়তাে হবে একদিন। old W start 8 VAN ‘আমি কি করতে পারি ? খদ্দরের হাফ শার্ট-পরা মােটা চুরুট- কামডানাে স্কুলের সেক্রেটারি হীরেনবাবু বললেন। উদাসীন স্বরে, খবরের কাগজের উপর চোখ বুলােতে-বুলােতে। স্কুলের জানলার সব খড়খডি নামাননা। এই দু মাস। প্রথম মাসে সুজন পুরাে মাইনে পেয়েছিল, এবার পেয়েছে আধা। কিন্তু এতে সে চালাবে কি করে? মা-বাবা ভাই-বােন সবাইকে দেশে পাঠিয়েছে, বাড়ি ছেড়ে দিয়ে বিনেভাডায় উঠে এসেছে এক বন্ধুর ছাড়া-বাড়িতে, দারােয়ানের পার্ট নিয়ে। তবু মাঝে-মাঝে যেতে হয় দেশে, রেলভাড়া দিয়ে, লুকিয়ে কেরােসিন নিয়ে। অন্তত খানিকক্ষণের জন্যেও টেমি তত জ্বলবে একটা। আর কিছু চিনি। চিনি না হলে চা খেয়ে খিদে মারবে কিসে? তারপর, কিনে-কেটে রেখে আসতে হয় এটা-ওটা, ফুরিয়ে গেলে ফের করতে হবে মনি-অর্ডার। দু’জায়গার খরচ সে টানবে কি দিয়ে? ‘রিজার্ভ ফণ্ডে টাকা আছে তাে ইস্কুলের, তাই থেকে দিন না। সুজন দাবিদারের গলায় বললে । তার থেকেই তাে আদ্ধেক করে দেয়া হচ্ছে। এমনি বেশি দিন চললে সিকিও হয়ে যেতে পারে। আমরা কি তবে না খেয়ে মরব ? চোখ তুলে তাকালেন হীরেনবাবু। “কিসে মৰাে তার ঠিক কি। তার আগে একটা চাকরি দিন জুটিয়ে। আপনার যদি বাঁচবার অধিকার আছে, আমারাে তার চেয়ে কম নেই। বরং উকিল- ৩০ ব্যারিস্টারের চেয়ে মাস্টারের দাম বেশি। চেষ্টা করলেই তাে দিতে পারেন একটা। ‘এ-আর-পিতে যাও। ঝেটিয়ে লােক নিচ্ছে। ‘গিয়েছিলাম। ফুসফুস ভাল নয় দেখে নিতে চায়নি। ‘ওরা আবার ফুসফুস দেখে নাকি? তবে আর কি, হাওয়া খাও। না, তার চেয়েও স্কুল কিছু খাব। আপনার এখানেই বাহাল করুন। নিন না, খবরের কাগজটা পডে দি চেঁচিয়ে বােজ সকালে এসে এমনি নিয়ে যাব আপনাকে, আপনি মাইনে দেবেন। আপনার তাে অনেক আছে, এমনি দিতে পারেন অকাতরে। ‘ভিক্ষে দিতে পারি, মাইনে দিতে পারি না। যদি ভিক্ষে চাও হীরেনবাবুর আণত মূখ গােল ও ভারি হয়ে উঠেছে। ‘একজন এসে চাইছি কিনা, তাই এটাকে ভিকে বলছেন। কিন্তু অনেকে যখন আসব, তখন ? আরাে অনেকের কাছেই গেছে সুজন, অনাহুতের মত। এটাকে তার দাবি মনে করেনি, মনে করেছে প্রার্থনা , কেউ মনে করেনি এতে দৌরাত্ম্য ছাড়া কিছু ন্যায় আছে। কেউ বলেছে দেশে গিয়ে স্বাস্থ্য ফেরাও, কেউ বলেছে রিকশা টানাে। কৃষ্ণাকৃত কলকাতা। মনে হয় না এ কোনাে দিন কলকলিত ছিল। কোনো দিন ঝকমকিয়ে উঠেছিল তার সােনার মুকুট, ঝলমলিসে উঠেছিল তাব সােনার আঁচল। কেমন যেন হতভম্ব হয়ে আছে। হতচ্ছাডার মত। পথগুলি প্রায় নির্জন, আর নির্জন বলেই অত দীর্ঘ মনে হয়, বাড়ি-ঘর প্রায়ই শূন্য, রুদ্ধ, পরিত্যক্ত। গা-টা ছমছম করে। মনে হয় যেন বদ্ধশ্বাস পাথরের প্রেতপুরীতে চলে এসেছি। মােটর অনেক কমে গেছে, সাইকেল কপনাে-সখনাে চোখে পডে-নেই আর সেই দুষ্ট ধাবমানতা, সেই গতির গোঁয়ারতুমি। সব যেন কেমন গাধাবােট হয়ে পড়েছে। বাপ পড়েছে দোকান-পাটে, কারু-কারু মুখ একেবারে দেয়াল দিয়ে গাঁথা। কেউ কারু সঙ্গে মন খুলে কথা কয় না, মুখ খুলে হাসে না, মেঘলা দিনের মত থমথমে হয়ে গোঁজ হয়ে বসে থাকে। সকাল-সকাল বাড়ি ফেরে। পথে বেরুলেই যাড় আর পকেটমার, মাতাল না হয়েও খানায় পড়ে চোখ-নাক খাদা করতে হয়। পথে-ঘাটে ট্রামে-বাসে বাজারে-বায়স্কোপে আর মেয়ে নেই, সেই সব ফোলানাে- ফাপাননা ফিনফিনে-মিনমিনে মেয়ে। শালীনবেশিনী গণিকারা শুধু নামজাদা রাস্তার মােড়ে-মােডে ঘােরাঘুরি করে, রেস্তরাঁতে বসে চায়ের কাপের উপর ঘণ্টা কাটায়। তারপরে চাদ উঠে আসে। বীভৎস মনে হয়। কেমন কীটদষ্ট, কলঙ্কিত চেহারা। আত-কলঙ্কিত। আগে যখন আলােমালিনী ছিল এ কলকাত, শব্দটিত, তখন তার মাঝে একটা কৃত্রিমতার সৌন্দর্য ছিল। এ-সব লােহালক্কড়ের মাঝে তার উপস্থিতিটা মায়া বুনত, সে-মায়া ছিল তার মানিমায়, তার উপেক্ষায়। আজ সে নিদারুণ- রূপে নয়, নির্লজ্জ, তার উপস্থিতিটা উৎপাতের মত। এর চেয়ে অরণ্যের অন্ধকার ভাল, গুহার অন্ধকার। যাও, এখানে কেন, এই ইটজর্জর ঠুনকো-টোর দেশে, যাও, যেখানে অঢেল মাঠ আর উদ্বেল সমূত্র। যদি পৃথিবীতে কোনাে শান্তির কুটির পাও, তখন না-হয় কানাে শূন্য-শুভ্র বিছানায় ভেঙে পােভাে। এখানে তুমি অপব্যয়িত। অভাব-অভাব ছাড়া আর কোনাে বােধ নেই সুজনের। অভাৰবােধ দিয়ে সমস্ত সংসারকে সে ছুঁতে পারে, পৃথিবীর দূরপ্রান্তের দুরদৃষ্টকে। সকলের সঙ্গে সে মনে-মনে মিতালি পাতায়। যে কাতরাচ্ছে লােগ, যে কোণে বসে থাকছে শিক্ষার অভাবে, যে নিজিতনির্জীৰ হয়ে পড়ে আছে শুধু দুমুঠা না খেতে পেয়ে। যে বাড়তে পারছে , কাড়তে পারছে না। যে উটপাখির মত বালির মধ্যে ঘাড় গুজে আছে। শুধুই কি অভাব, অপমান নয়? উপেক্ষিত শত ফুটেটেই কি চলবে চিরকাল ? কিন্তু পুরীর অভাব কি? হীরেন খাস্তগিরের মেয়ে, দেদার পয়সা। ভালুক-মুলুক, দালান-বালাখানার মেয়ে। হেলে-গড়িয়ে মানুষ হবার মত, পাউডার-পমেটমের কোমলতায়। সে কেন এ-পথে এসেছে, দুঃস্থ-দরিদ্রের দলে? প্রথম দেখলে মনে হয়, চটুকে, নতুন ফ্যাশানের জেল্লায় জমকে উঠেছে বুঝি। কিন্তু না, কাছে এলে টের পাওয়া যায়, জালামালিনী মেয়ে। ঢ্যাঙা, বড় বেশি সিধে, নল-খাগড়ার মত, বাড়তি চবি নেই কোথাও। খটখটে লােদের মত, মাজা কাসার মত ঝকঝকে। জাল-ছেড়া পােলাে-ভাঙা মাছ। কাদা-ক্লেদের অনেক উপরে। ওর মাঝে সুজন দেখতে পায় হীরেন খাগিরের বরখাস্তের দিন। বাপের টাকা যে ছোঁয়না, তার মাঝে বিদ্বেষ নেই, আছে বিতৃষ্ণা। অনেকের চলে যাচ্ছে এত অল্পে, আমারই বা চলবে না কেন? শুধু আমি নিয়ে করব কি, যখন আর সকলেই এমনি রিক্ত, রক্তাক্ত থাকবে। আমার এই ব্যবহারটা বাবার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নয়, বাবা যে প্রতিবেশের প্রতিনিধি তার বিরুদ্ধে। আমরা সমষ্টির দলে, আমাদেরও তাই সমগ্রকেই প্রতিবােধ। প্রাপ্তিতে তাে আমাদের সমাপ্তি নয়, আমাদের সমাপ্তি পর্যাপ্তিতে। বাবার উপরেই যদি ক্ষুন্ন হতাম, তা হলে তার টাকা দশ হাতে উডােতাম, একমাত্র মেয়ে বলে আটকাত না একটুও। কিন্তু ক্ষুন্ন হয়েছি বিরাট একটা ব্যবস্থার উপরে, তাই নত না হয়েও নম্র হয়ে আছি, নিঃস্ব না হয়েও হয়ে আছি নিজের মত। কি সুন্দর করে কথা বলে পুর। কাজের যেমন জাদু আছে, তেমনি কথার আছে ইন্দ্রজাল। সমস্তটা ব্যক্তিত্ব বান্ময় হয়ে ওঠে। আর যেখানে ব্যক্তিদের ডাক সেখানেই অব্যক্ত আত্মার প্রতিনি। তবু, মুখে যাই বলুক, ওর মাঝে সুজন দেখতে পায় ভিত নড়িয়ে-দেবার প্রতিশ্রুতি, হীরেন খাস্তগিরের পরান্ত-প্রস্থান। পাশাপাশি চলতে-চলতে অনেক কাছে এসে পড়ে। মিত্ৰতাৰ সমতলে। অবন্ধুর বন্ধুতায়। ‘হাতে হাত দিয়ে চলতে অত সংকোচ কেন ? পুর অকুণ্ঠ হাত বাড়িয়ে সুজনের মৃদু, অলক্ষ্য স্পর্শকে মুঠোর মধ্যে নিমন্ত্রণ করে নেয়। বলছেন, আরাম, কিন্তু মনের মত কাজ করতে পারার মত কিছু আরাম আছে ? আমাদের এই কর্ম টুকুই কি বিশ্রাম নয়, যদি ওদের কর্মক্লিন্ন জীবনে এতটুকু অবসর এনে দিতে পারি ? বলবেন, বিলাস, কিন্তু বলুন, এই মৃত, ক্ষুধার্ত, অশিক্ষিতদের শােভাযাত্রাটাও কি এই মনসবদার সমাজের বিলাস নয়? স্বপ্ন ? সুর্যের স্বপ্ন ছাড়া রাত রাত- কাটাবে কি করে? আরাে হয়তাে কেউ বলবে, শুধু একটা ভঙ্গি, ভাবুননেপনা। তােক শুধু এটা ভঙ্গি, তাই বা কম কি? কিছু করতে না পারি, শুধু ভগিটা ঠিক থাকে, শত ঘুরিয়ে দিলেও কম্পাসের কাটাটা ঠিক থাকে উত্তরে, তা হলেই তােত চড়াইয়ের পথ উতরে গেলাম। শুধু প্রস্তুতি, শুধু একটি বিশ্বাস, তারই বা জোর কত। তারা চলেছে দু’জন বস্তিতে, দুপুরের খরায়। ওদেরকে সাহস দেয়, কাজে লেগে থাকতে বলে, অনিশ্চয় শূন্যে ঝাঁপিয়ে পড়ার বিপদ বােঝায়। বলে, সবাই তােমরা যুদ্ধ করছ, যার-যার কাজে, যার-যার যন্ত্রতন্ত্রে। কুলি বস্তা টানছে, মিস্ত্রি কল ঘােরাচ্ছে, কামার লােহা পিটছে—সব তােমরা যুদ্ধের সেনানী। কাজে লেগে থাক, জয় তােমাদের, জয় আমাদের, জয় সমস্ত মানুষের, মানুষ-হয়ে-উঠতে-চাওয়া মানুষের। গডখাই কাটায়, ঢাকনিওলা ছিপা-ঘরের সুপারিশ করে। টিউবওয়েল বসায়, আগুন লাগলে জলের উপায় বাতলায়। দৈনন্দিন জীবনকে পরিচ্ছন্ন করবার জন্যে ছােটখাটো কাজে হাত লাগায়। লাঠি-বুরুশ দিয়ে নর্দমা পরিষ্কার করে, ময়লা কুড়িয়ে এনে এক জায়গায় জড়াে করায়। স্বাস্থ্যের নিয়মকানুন ' শেখায়, কি করে কলেরা-বসন্তর হাত এড়াৰে সে সম্বন্ধে নিঃসংশয় করে। আর, আমরা যে সত্যি জিতব, আমাদের যে দিন ফিরবে, পবিত্রতায় স্নান করে উঠবে যে পৃথিবী, বারেবারে তার মএ শােনায়। স্বাধীনতা চাই আমরা, কিন্তু আমরা নিজেরা দিয়েছি স্বাধীনতা, যাদেরকে আমরা দিতে পারি ? ধরুন, এই মেয়েরা। এদেরকে আপনারা দডি দিয়ে আষ্টেপিষ্টে বেঁধে রাখেননি, সেই একই কায়েমি স্বার্থের অজুহাতে? ওদেরকে ব্যক্ত হতে দিয়েছেন? ওদেরকে সম্পত্তিতে অংশ দিয়েছেন, দিয়েছেন গান-বিক্রির অধিকার? আর, অবনত বলে যাদের জন্যে আমাদের মন কাদছে, তারা কি আমাদের পদানত নয়? কিসের জন্যে অস্পৃশ্য, অপাঙক্তেয় ? চিরদিন যার পাশাপাশি থাকব, সেই মুসলমানকে কেন আমাদের অবিশ্বাস ? কেন তার দাবি স্বীকার করব না, যে-দাবিতে নিজেকে সে নিরাপদ মনে করতে পারে? তাকে একবার নিরাপদ ভাবতে দিন, দেখবেন আপনিও নিরাময় হয়েছেন। ন্যায় করছেন ভেবে ন্যায় করুন, দেখবেন ন্যায় করেছেন বলে ন্যায় পাবেন। কটা চাকরি আর চাকতি, এই নিয়ে এত রেষারেষি। দেখবেন অফুরন্ত সুযােগ, দেশ যখন যন্ত্রায়িত হয়ে উঠবে। তখন কত পথ, কত নােজগার, কত সমৃদ্ধি। ভাবুন, জারের রাশিয়া আর আজকের রাশিয়া। যে একদিন মাঠে ধান বুন, সে আজ বিজ্ঞানের দিকপাল। যে একদিন নিরেট নিরক্ষর ছিল সে আজ প্রকাও সাহিত্যিক। ভাবুন তবে একবার আমাদেরাে মাঝে রয়েছে কত প্রতিভার প্রতিজ্ঞ। কত অভাবনীয় সম্ভাব্য। শুনছেন ? চমকে ওঠে সুজন। বলে, ক্ষমা করবেন, আমি শুধু আপনাকে দেখছি। স্বগতােক্তি করতে করতে হঠাৎ কাৰু উপস্থিতির চেতনায় অস্বস্তির মত পুত্র ধাক্কা খায়। মনে হয় কণ্ঠস্বরটা একটু গদ্গদ, অজানা দেশের কাকলী। পুত্র হঠাৎ নিজের উপস্থিতিতে অভিজাত বিচ্ছিন্নতা নিয়ে আসে। বলুন, দেখতে পারলে দেখাও কি শােনা হয়ে ওঠে না ? সুজন তার ভঙ্গিতে যেন আলস্য আনে। যান, ইস্কুলমাস্টারের মত কথা বলবেন না। পুর প্রায় ঝামটা দিয়ে ওঠে। পুর যখনই তাকে প্রত্যাখ্যান করে, তখনই এই ইস্কুল-মাস্টারির উপর ইঙ্গিত করে কেন? মিথ্যে কি, সে তত স্কুল-মাস্টারই। পুরীর সঙ্গে যায় সে তাদের আখড়ায়। তাঁতীকুল বৈষ্ণবকুল দুই কুল খুইয়ে যারা ভিড়েছেন এসে বন্দরে। অনেক সার্বভৌম লােক আছেন। আসেন অনেক মালকোচামারা কবি, নকল দাঁতের তার্কিক, অন্নান প্রফেসর। বড় চাকুরে, বড় বেনে-ব্যবসাদার। গােলে হরিবােল বলে যারা কাজ সারে, ভিড়ের আসরে জায়গা রেখে যায় আগে থেকে। বড় বড় আলােচনা। ঐতিহকে বাদ দিয়ে নতুন ইতিহাসের পত্তন করে। বলব না তাকে সাহিত্য, যাতে দুঃখী-দুর্গতের কাতােক্তি শােনা যাবে না, নাচেও আনতে হবে এই মৃত্যুর ঝংকার। স্বীকার করলে চলবে না নর্দমার পাশেও ফুটে আছে ভুইচাপা। থাক, তবু তুই দেখতে পারাে, ভুইচাপা দেখতে পাবে না। চাঁদ রাতকে যে ভালাে লাগায় সে কথা অনেক বলেছ, এবার বলাে চাদের রাতে উৎসাদের আহলাদ ওঠে লেলিহান হয়ে। চলবে না আর ব্যক্তিগত প্রেম, ব্যক্তিগত ব্যর্থতা। স্বার্থের কথা অনেক হয়েছে, এবার বলাে, সার্থের কথা। বস্তুবাদী সম্পাদক বলেন, রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে আমরা শুধু ভাষা শিখব। ই-লঙ্কার ঝালের মত কথাটা লাগে এসে সুজনকে। সে খেপে ওঠে: ‘বুবীনাথ যে সারা জীবন নির্যাতিত-নিগৃহীতে • থেকে প্রতিপক্ষ করলেন সেটা শিখবেন না? শিখবেন না তাঁর বিশ্বজনীনতা? তুমূল তর্ক ওঠে ফেনিয়ে। আর সে-তর্কের অবসান হয় পুরীর একটি মর্মান্তিক কথায় • ‘আপনি একেবারে পুরােদস্তুর স্কুল-মাস্টার। যে বড়লােক সে যদি মুড়ি খায় তবেই সে উদার হয়, আর সে যখন গরিব তখন মুড়ি তত সে খাবেই। সুজনের মনে হয়, সে যদি জমিদার বা ব্যবসাদার হত, তা হলে মানাত তাকে এই সাম্যবাদ , যে হেতু তার কিছু নেই, তাই তার মাহাত্মও নেই কাণাকডির। যে বামন সেই তত চিরকাল উদ্বাহু। এর পর আরাে আছে। আন্তর্জাতিক সমাজ। অটবী রায় বিয়ে করেছে এক পােল-ইঞ্জিনিয়রকে, তবু সিথির এক কোণে রেখায়িত করে রেখেছে সিদুরের ক্ষীণ সংস্কার। সাহেব ধরেছে কুত। আর হেঁটো ধুতি আর তা অম্লানমুখে সহ করছে অটবী। দীপেশ বিয়ে করেছে এক ইংরেজ-মেয়েকে, আর তাকে শাড়ি ব্লাউজ পরিয়ে ব্যাড়া, বিতিকিচ্ছি করে ছেড়েছে। কপালে-সিথিতে দিয়েছে সিদুর, হাতে শাঁখা, মােটা খালি-পায়ে স্যাণ্ডেল। অপরিচিত লােক দেখে মাথায় ঘােমটা টানা যে কেন শেখায়নি সুজনের আশ্চর্য লাগে। বিদেশিনী মেয়েকে দেখে যখন মুগ্ধ হয়েছিল দীপেশ, সে কি তার চামড়ার চটকে? তার সমস্ত শিক্ষা-দীক্ষা, ভাষা-পােষাক, সংস্কার-সংস্কৃতি সমস্ত কিছু দেখেই কি সে মনােনীত করেনি? তবে কেন এই প্রাদেশিকতা? সেই শাঁখা-সিদ্বরই যদি থাকবে, তবে গলায় জবাফুলের মালা ঝুলিয়ে যাও না কালীঘাট, ষষ্ঠীতলায় গিয়ে মানত করে এসাে না। সুজন বােঝে এখানে তার কলকে নেই। সে নিছু বৃত্তি, নিচু পঙক্তির লােক, তার গায়ে ইস্কুল-মাস্টারের ল্যাবেল আঁটা। পুর তাকে শুধু মাস্টার বলে না কেন? সে অনেক অন্তর, রহস্যময় নাম। ৫১ ইস্কুল কথাটা জুড়ে না দিলেই কি নয় ? পুরীর ঠাট্টার মাঝেও নিষ্ঠুরতার শােভা ও স্বাদ আছে। কিন্তু এ ডাকের আড়ালে কিছুটা ঘৃণা, কিছুটা দূরে-ঠেলার ভাব কি অনুচ্চারিত নেই ? সেদিন কাজের কথা হচ্ছিল। সুজন বললে, তা হলে মরে গেলে সৎকার করাটাও কাজ, খাদ্ধে কাঙালী-ভােজনও কাজ, ফুটবল মাঠে চ্যারিটি-ম্যাচের টিকিট কেনাটাও কাজ। ‘কাজই তাে। পুবশ্রী রুখে উঠল : ‘আজকের দিনে রিলিফই হচ্ছে একমাত্র রাজনীতি। ‘সাময়িক দুর্গতি একটা হবে বা হয়েছে তার জন্যে কাজটা দশের কাজ, কিন্তু যা হয়ে আছে তার প্রতিকারের কাজই হচ্ছে দেশের কাজ। আজ যদি আমরা একটা বিনে মাইনের স্কুল খুলি, ছেলে-বুড়াে মেয়ে-বুডি সবাইকে ডেকে এনে পড়াই, শেখাই, তা হলে বােধহয় কিছুটা কাজ হয়। ‘ইস্কুল মাস্টারের ঐ এক কথা। শুধু ইস্কুল খােলা। আটচালা আর পাঠশালা। পুরী মুখ বাঁকালাে। কিছু করতে হবে না আমাদের। শুধু মেইন সুইচটা টিপে দিতে হবে, দিকে-দিকে আলাে উঠবে জ্বলে। ‘কিন্তু বালব কই? মনে-মনে প্রশ্ন করল সুজন। বিমনায়মান সন্ধ্যা। দোতলা বড় বাড়ির নিচের একটেরে এক ঘরে সুজন থাকে। একলা। তক্তপােষে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে ভােলা জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাতেই ঝাপসা একটুকরাে আকাশ ও একটি তারা চোখে পড়ল। আকাশ গেল মুছে, তারাটা সবুজ হয়ে চোখের উপর চিকচিক করতে লাগল। নেহাৎই ওটা একটা তারা তাই অনেকক্ষণ ভাবতে চেষ্টা করল সুজন। কিন্তু কখন কে জানে, হঠাৎ তার সেবার মুখখানা মনে পড়ে গেল। বােকা-বােকা মিষ্টি-মিষ্টি মুখ। কিন্তু কেন যেন বিষন্ন । ઉર ৭ শুধু বিষ নয়, বিপন্ন আজ সেবা। দু-গরুর গাড়ি যাচ্ছে বনের পথ দিয়ে। বাঘ এল, গাড়ি ছেড়ে গাড়ােয়ান বাঁদরের মত লাফিয়ে উঠে পড়ল গাছে। বাঘ পড়ল একটা গরুর উপর, আরেকটা গৰু মন্ত্রমুগ্ধের মত নিস্পন্দ হয়ে দাড়িয়ে রইল, তার হত্যার প্রতীক্ষায়। সেই আরেকটা গরুর মতই আড়ষ্ট, অসাড় হয়ে ছিল সেবা। চিহি-কাচারির এলেকায় জমিদাবের আলাদা আস্তানা, সেগুন কাঠের পাটের দেয়াল, মেঝেটাও পাটাতনের, উপরে পেনটাইল। কেঠো, তুচ্ছ কটা আসবাব, জামকাঠের তক্তপােষ, খাড়া চেয়ার দুখানা কঁঠালকাঠের, সমান পায়ে বসতে পাবেনি এমন একটা কেরােসিন বাক্সের তজার টেবিল। বাবুগিরির মধ্যে ভেলকো বাঁশের চোঙের ফুলদানি করে তাতে কিছু ঘাস-পাতা গোজা, নামহীন কটা বুনাে ফুলের ছিটে। তা ছাড়া আগাগােডা কষ্টের কাঠিন্য। খায় কাহার-পাইকের হাতে, বলে, আর কিছু নয়, টেকিছাঁটা লাল কার চাল আর গেয়ে-গরুর দুধ। কাপড়- চোপড হ্ৰন্থ, হাতে-কাচা। ঘরে একটাও আয়না নেই, বলে, নিজের মুখ দেখব আমি নির্বাপিতদের মুখে। নেই একটাও নগণ্য ক্যালেণ্ডার, বলে, আমার কাছে দিন নেই, চিরন্তন রাত্রি, যখন আসবে লাল তারিখ তখনই আমার বৎসরের আরম্ভ। ঘরের আলােটা পর্যন্ত নিরীহ, অল্পেতেই নিভে যায়। শুধু মনে হয়, বিছানাটাই নরম তুলতুলে। বারিধি তার গত জীবনের কাহিনী বলছিল সেবাকে, প্রায় বে-আৰু করে। বে বিশ্বাসের থেকে সম্ভব সেই উদঘাটন, সেই বিশ্বাস সেই কাহিনী। ডুবতে অন্তরজ্ঞতা এসেছে দু’জনের মধ্যে। তরী তুরমের ডুবতে পারে-এসে-পা নাজেহাল জাহাজের। সেবার ভয় করছিল, কিন্তু সেই ভয়েই ছিল অপূর্ব ভেল্কি। তার মনে হচ্ছিল জোনের নিচে সে যেন দ্বিতীয় গরু। শীভূষণবাবুদের বাসা ছিল আগে এক ডাকের পথ, এখন একেবারে হাতছানির মধ্যে। ও-বাড়িতে জলের অসুবিধে, মেথরের আর নর্দমার, তা ছাড়া আনাগােনা বেড়েছে কালাে কেউটে আর গরুর খুলা গােখনাের। কাচারিবাডির রশি খানেকের মধ্যে খাস জমিতে একটা বেমেরামত বাড়ি পড়ে ছিল, সেটাকে জুতের করে নিয়ে সেখানে এনে বসাল ওদেরকে। খাজনা মিনাহা হল, একটা কিছু না দিলেই যখন নয়। এলতি লাকড়ি লাগে না আর, মান্দার চাকরের কাজ করে দেয়, আনাজ-তরকারি আসে ঝুড়িতে করে, কলাই-মুশুরি, আখের গুড়ের ঠিলি। সৰ এবাড়ি ও-বাড়ি । নামঞ্জুর করবার মত মনের জোর কোথায় ? তা ছাড়া পা-গাড়ি কেটে এখন তঁত বসানাে হচ্ছে। আজ সন্ধ্যায় সত্যি সেবার মনে হল যেন বাঘের বিবরে এসে ঢুকছে। উচ্ছিন্ন-উদ্ভান্ত চেহারা। ভয়ে চুপসে গেছে, ভাবনার ধুলাে-পােকা খেয়ে-খেয়ে তাকে ঝঝরে করে ফেলেছে। তবু মুখে হাসি টেনে সে বসল এসে চেয়ারে। দিনের শেষে এখন কি করা যায়, কোথায় যাওয়া যায়, শুয়ে-শুয়ে ভাবতে-ভাবতে তা এসেছে বারিধির। হুড়মুড় করে উঠে পড়ল সে। দেখল, সেবা। অদ্ভুত অসময়ে। কেমন যেন উলিত, বিধ্বস্ত। স্তব্ধতার চমক কাটতে লাগল কতক্ষণ। পড়ন্ত দিনের আলােয় তবু সেবার মুখে বিশ হাসি দেখা গেল। বললে, 'এবার আমাদের বিয়ে করতে হবে-
বারিধি যেন একেবারে বােব হয়ে গেল। কাছাকাছি কোথাও
একটা বোমা পড়লেও বােধহয় সে এত চমকাত না। গলা চিরে তার
আওয়াজ বেরুল • বিয়ে ?
চোখ নামিয়ে সেবা বললে, আমার সন্দেহ হচ্ছে—
অনেকক্ষণ হতবুদ্ধির মত তাকিয়ে রইল বারিধি। কি সন্দেহ হচ্ছে?
জিগগেস করলে কৌতুহলাবিষ্টের মত।
সেবা দু’ হাতে মুখ ঢাকল।
এতক্ষণে যেন সম্বিং ফিরে পেল বারিধি। ভোতা একটা মোচড
দিয়ে উঠল বুকের মধ্যে। জলের মত তরল, এমনি ভাবের থেকে সে
হেসে উঠল স্বচ্ছন্দে। নেমে দাড়াল তক্তপােয থেকে। বললে প্রাণখােলা
শাদা গলায়, তার জন্যে তুমি এত ঘাবড়াচ্ছ ? তুমি কি ছেলেমানুষ,
সেবা।
সে হাত সরিয়ে নিয়ে তাকাল ভােলা মুখে। আর্তনাদকে গলা
টিপে টিপে যদি মূক করে দেয়া যেত, তেমনি তার মুখ ।
তার জন্যে বিয়ে করতে হবে একেবারে ? হালকা পায়ে বারিধি
একটু হেঁটে নিল ঘরের মধ্যে।
‘চিরকালের জন্যে একটা নােনাধরা
স্যাতসেতে অন্ধকার কুঠুরির মধ্যে তুমি বন্ধ হয়ে যাবে?
‘যাব।'
‘তুমি কি যে বলছ তার ঠিক নেই। ভয় কি, আমার সঙ্গে চলে
তুমি কলকাতায়।
‘সেখানে-চোখ তুলল সেবা।
‘সেখানে আমার চেনা ভাল ডাক্তার আছে। এ সব ব্যাপারে পাকা
ওস্তাদ। অনায়াসে সব ঠিক করে দেবে।
‘কেন, বিয়ে ?’ সেবা যেন সাত হাত জলের তলা থেকে বলছে।
‘বিয়ে? সে তত আর মুখের কথা নয়। এখুনি বিয়ে কি ? বিয়ে
s
জন্যে তৈরি হলুম কোথায় ? বারিধি আরাে কয়েক পা ঘুরে এসে সেবার প্রায় কাছে এসে দাড়াল। ষডযন্ত্রীর গলায় বললে, ছােট্ট একটা ফোডা অপারেশান করার চেয়েও সােজা। মিছিমিছি তুমি ভয় পাচ্ছ । আকছাৰ, আকছার হচ্ছে। সমস্ত দেশ, যুদ্ধ, মৃত্যু, ভাবীকাল সব কিছু মিথ্যে, অনর্থক হয়ে গেল। তলিয়ে যাবার আগে আরেকবার হাত তুলল সে। বললে, ‘আপনি তত বলতেন বিয়েই একমাত্র সত্য ও স্থির হয়ে আছে এই ভেঙে-প সংসারে। বলতেন না? বলতাম হয়তাে। কিন্তু তার মানে কি তােমার-আমার বিয়ে ? এমনিই হবে এ যেন অনেক আগেই সেবা পড়ে নিয়েছিল দেয়ালে । মেঝের উপর তাকিয়ে রইল, শূন্য নিস্পন্দ চোখে। অনেক পর একটা নিশ্বাস ফেলে বললে, 'আমি তবে কি করব? আমার সঙ্গে কালই চলাে কলকাতায়। ডাক্তারের চমৎকার ক্লিনিক আছে। হেঁজিপেঁজি নয়, ঝানু ডাক্তার। খুব সহজেই হয়ে যাবে বন্দোবন্ত। কি, যাবে? না।' 'এ তােমার বাজে বােকামি। মিথ্যে সেন্টিমেন্ট। বক্তৃতায় কে পারবে বারিধির সঙ্গে? ‘হত্যার ভয় করছ ? বাচবার জন্যে দিনে-রাতে কত আজ আমরা হত্যা করছি, পােকা-মাকড, পশু-পাখি, সাপ-ধােপ —কি এসে যায়। যা অবান্তর, অকেজো, যা জীবনের বাইরে, জীবনের বিরুদ্ধে, তাকে বধ করে ফেলাই তােত কতব্য একশাে বার। তারপর আবার তুমি মুক্ত, নির্মল, যে-কে-সে। সেটা ভাল, না, এই দেহধাবী আত্মহত্যাটা ভাল ? বিচক্ষণের মত চারদিক ভাল করে ভেবে দেখ। তবে কি সেবা এবার খান-খান হয়ে পায়ের তলায় লুটিয়ে পড়বে? T কেঁদে নদী বইয়ে দেবে ? কিংবা উচু গলায় রাষ্ট্র করে দেবে এই অকীর্তি ? তাকে বাধ্য করাবে বিয়ে করতে, নিরুপায় পরাভূতের মত? তারপর? কোথায় তার আশ্রয়, কি তার পরিণতি? বাসি খবরের কাগজের মত সে তখন বিক্রি হবে না মুদির দোকানে ? ‘কাল সকালের ট্রেনেই চলে। আমার সঙ্গে যেতে দিতে তােমার বাবা-মা মােটেই আপত্তি করবেন না। বলব, পার্টির কাজে যাচ্ছি। না, না, না। তীক্ষ কণ্ঠে অকস্মাৎ ককিয়ে উঠল সেবা। বারিধির অল্প-অল্প ভয় করতে লাগল। আলাে-আঁধারি এ সময়টাই ভারি বিশ্রী, গা ছমছম করে। তাড়াতাড়ি জালালাে লণ্ঠন, বাড়িয়ে- কমিয়ে শিখাটা স্থির, পরিমিত করে নিল। না, ভয় কিসের? তার বলিষ্ঠ আশ্রয় আছে। সে-আশ্রয় হচ্ছে নিটোল অস্বীকারে। পরিষ্কার প্রত্যাখ্যানে। চরে বেড়াতে দিয়েছেন মেয়েকে, এখন বুঝি আমাকে শাসালাে দেখে শাসাতে এসেছেন—এই উত্তরে। উপায় কি। উপায় কি। সেবা অবােব হবে বলে সে নির্বোধ হতে পারে না। তাকে বাঁচতে হবে, আর বাঁচার জন্যে এই ভঙ্গিটাই বৈজ্ঞানিক। ‘আমাকে সেই ডাক্তারের নাম ও ঠিকানাটা লিখে দিন। সেবা বললে কুসংকল্পের মত। তক্ষুনি লিখে দিল বারিধি। বললে প্রায় নিজের কানে-কানে, ‘আমি সঙ্গে গেলেই ভাল হত। সেবা উঠে পড়ল এক ঝটকায়। সে একা, অসম্পৃক্ত এই ভঙ্গিতে। দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল সে, ফিরে এল। বললে, আর, আমাকে কিছু টাকা দিন। কত?” যেন হাডে খানিক বাতাস লাগল বারিধির। ‘যত পারেন। বারিধি বাক্স খুলে এক তাড়া নােট দিল তার হাতে। বুকের মধ্যে ৭
ফেলে দ্রুত বেরিয়ে গেল সে। কেউ আলাে দেখাবে বলে দাড়াল না
এক নিশ্বস।
পাথর-জাতা রাতটা সেবার কাটল অন্ধকারের দিকে চেয়ে থেকে-
থেকে। এক নিশ্বাসের জন্যেও নিজেকে বিশ্বতির মধ্যে ডুবতে না দিয়ে।
সকালবেলা মাকে সে বললে, ঠিক বললে না, বুঝতে দিলে।
মেয়েটা মার বুঝতে দেরি হল না। মায়াময়ী প্রথমে বিমূঢ়ের মত
হয়ে গেলেন, পরে মেয়ের গলা অমন স্পষ্ট ও স্থির দেখে যেন কিছুটা
ভরসা পেলেন। বললেন, বারিধিকে বলেছিল?
না।
না? মায়াময়ী যেন টলে পড়বেন মাটিতে। আই, এক্ষুনি
গিয়ে বলবি। তুই না বলিস আমি গিয়ে বলব। একটা বিনিশ্চিত
স্বত্বের উপর দাড়িয়েছেন, ঠিক তার ততখানি দৃঢ়তা।
না। ও নয়।
‘ও নয়? টুকরাে-টুকরাে হয়ে ভেঙে পড়লেন মায়াময়ী। আলুথালু
চুলে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন মেঝের উপর।
‘না। ও নয়। ও কি আমার যােগ্য?
তবে কে? কে পােডারমুখি ? জোরে হাত ধরে টেনে মায়াময়ী
মেয়েকে বসিয়ে নিজের কাছে নিভৃত করে নিলেন।
সেবা ঢোক গিলল, চুপ করে রইল।
তার এক গােছ চুল সজোরে টেনে ধরে মায়াময়ী চাপা-গলায়
জিগগেস করলেন, “কে তবে? আমাকে শিগগির বল, হারামজাদি।
সেবার গলা এতটুকু কাপল না। বললে, সুজন।
বন্ধ ঘরে সেবার হাড় এক ঠাই ও মাস এক ঠাই হয়ে গেল। কিল,
চড়, লাথি দোহাৱা চালাতে লাগলেন মায়াময়ী। ভূষণবাবু এসে
৮
যােগ দিলেন। এক পায়ের চটি নিয়ে সেবার পিঠে হাঁকড়াতে লাগলেন ইচ্ছেমত। রাগে, ক্ষোভে, অপমানে দুজনেই যেন মরিয়া হয়ে উঠেছেন। সেবা একটা টু শব্দ করল না, চোখের জল ফেলল না এক ফোটা। ভাবল, এ তার ন্যায্য প্রাপ্য, কে জানে, প্রাপ্যের চেয়ে হত কম। আবাে, আবাে তাকে মারা উচিত, ক্ষতবিক্ষত করে দেয়া উচিত। ঘরের মধ্যে কেন, বাইরে, লােকারণ্যে। উচিত প্রতিফল যে তার কী সুদূর সর্বনাশে তা তত সে কিছু এখনাে দেখতেই পাচ্ছে না। শুধু একবার সে বললে, “কেন, ইস্কুল মাস্টারে তত শেষকালে তােমাদের আপত্তি ছিল না। ঘােরতর আপত্তি। সুজন না হয়ে বারিধি হত, যা হােক তাঁরা চোখ ঠাতেন। বরং সেই দিকেই ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন হালের মুখ । এত কাঠ-খড় করে এই পরিণতি! ইস্কুল মাস্টার কেন, মুদাফরাসেও আর অরুচি নেই। ইস্কুল মাস্টারকে দিতেন তার হাতে ধরে, যা থাকে অদৃষ্টে, হজম করে নিতেন। কিন্তু এ কি কেলেংকারি। এ কি নােংরামি। এত পাপ, এত অপমান। এত বড় পরাজয়। হাতের কাছে ভাঙা ছাতাটা এবার তুলে নিলেন ভূষণবাবু। সেবা অজ্ঞান হয়ে টলে পড়ল মেঝের উপর। ৪ ৪১ চোখ চেয়ে দেখল, সে মরেনি। এবার বােধহয় আবার তাকে মারবে। মারুক। সে এবার আর মাঝখানেই অজ্ঞান হয়ে পড়বে না। কিন্তু না, শীভূষণবাবু তাকে কলকাতা নিয়ে চললেন। দুহাতে দু’গাছ শুধু চুড়ি রেখে সব খুলে রাখলেন গয়না, সাধারণ দুটো শাডি- সেমিজ দিলেন শুধু ঠনঠনে টিনের প্যাটরায়। সমস্ত রাস্তা ভুলেও একটাও কথা কইলেন না। আগাগােড়া চোখ বুজে রইলেন। তবু, কলকাতা। যেখানে এখন আসন্ন মৃত্যুর ছায়া। সে মরবে, মুক্তির তার আশা আছে এই শুধু তার গােপন সানা। ভাটির ট্রেন এখনাে ফাকা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন অন্ধকার ঠেলে চলেছে কোন ধ্বংসের গহ্বরে। জানলায় এক ভাবে ঠায় বসে থাকে সেবা, গাযেলবার জায়গা থাকলেও শুতে ইচ্ছে করে না। আকারে পৃথিবীকে কি গণ্ডিহীন ও প্রকাণ্ড দেখায় তাই সে অনুভব করে বুকের মধ্যে। আশ্বাস পায়, তার জন্যেও জায়গা একেবারে ফুরিয়ে যায়নি। ছ্যাকড়া গাড়ি করে ইস্টিশান থেকে সােজা চলে এলেন সুজনের বাড়িতে। মেসে খাবার আর পয়সা নেই বলে সুজন বিনা-ম্পিরিটে শুধু কেনােসিন দিয়ে স্টোভ ধরাবার চেষ্টা করছিল, দরজায় ঘােড়ার গাড়ি দেখে চমকে উঠল। এমন এখনাে আশা করা যায় না যে কলকাতায় কেউ বেড়াতে আসবে। কে জানে, দেশের বাড়ি থেকে বাবা-মা চলে এলেন নাকি না বলে-কয়ে। না, এ কি আচ, সে আর অভূষণবাবু। তাকে দেখেই, কিছু বুঝতে না দিয়েই, ভূষণবাবু তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন। স্কাউণ্ডল, বদমাস, আমাদের সঙ্গে এ কেলেংকারিটা না করলে তােমার চলত না? হাতের ছাতাটা মুঠো করে চেপে ধরে শূন্যে নাড়তে লাগলেন ঘন-ঘন, ইচ্ছেটা দু ঘা বসিয়ে দেন মাথার উপর। দুচো, পাজি, ঘােটলােক, সদর বন্ধ করে দিয়েছিলাম বলে মফস্বল দিয়ে তুমি বাডি ঢুকলে? তারপরে এই কাণ্ড? কী হয়েছে? সুজন আগা-মাথা কিছুই বুঝতে পাচ্ছে না। কী হয়েছে। ন্যাকা সাজছেন। হারামজাদ, জোচ্চোর কোথাকার। যেন ভাজা মাছটি উলটে খেতে জানেন না। কিন্তু বলে যাই যাবার আগে, যেন বােমা পড়ে একসঙ্গে মৰে তােমরা দুজন। এ যুদ্ধে অনেক পাপের শােধন হচ্ছে, যেন তােমৰা দু’জন যত শিগগির হয় লােপাট হয়ে যাও। বলে যে গাড়িতে এসেছিলেন সেই গাড়িতেই ফের চলে গেলেন স্টেশনের দিকে। সেবা দেয়ালের সঙ্গে লজ্জায় মিশে ছিল, ময়লা চাদরে মুখ ঢেকে। ধরণী দ্বিধা হয়নি বলেই। বড় বেশি তাকে রুগ্ন ও রিক্ত দেখাচ্ছে। নষ্ট, নিঃসঙ্গ। কি হয়েছে সত্যি? ‘আমাকে তুমি বাঁচাও।' সেবা হঠাৎ সুজনের পায়ের উপর লুটিয়ে পড়ল। তমার পায়ে পড়তে আমার এতটুকু লজ্জা নেই, মাথা কুটে মরতে পেলে ধন্য হয়ে যাব। বল, তবু, বাঁচাবে আমাকে? “নিশ্চয়ই বাচাব। দু’হাত দিয়ে তুলে সেবাকে সে দাড় করিয়ে দিল। ‘বিপন্ন হয়ে আমার কাছে এসে পড়েছ, আর বাচাব না আমি ? সমস্ত লালা সমস্ত পীড়ন থেকে তােমাকে বাঁচাব। কিন্তু, বলল, হয়েছে কি ? সেবা মুখ ঘুরিয়ে নিল। বললে, ‘ঘােতর পাপ করেছি, তার পালন নেই, মার্জনা নেই,তবু তােমার কাছেই আমি এলাম। সেবার দু চোখ জলে ফেটে পড়ল।
তবু আমার কাছেই তাে আসবে। একমাত্র প্রেমের কাছেই তাে সমস্ত পাপ ক্ষমা পায়। সমস্ত ভয় চোখ বােজ। আর এখানে দাড়িয়ে থেকো না, চলল ভিতরে। আমার হাত ধরে। তুমি কাপছ। হ্যা, এত বড় বাড়িতে নিচের তলায় ঐ একখানি শুধু আমার ঘর। আমি বিনে-ভাড়ার চৌকিদার। ইচ্ছে করলে এক-আধখানা বাড়তি ঘর পাওয়া যায়, কিন্তু চলে যায় এই একখানায়ই। এখন তুমি এসেছ, ইচ্ছে করছে ঘরটা আরাে ঘােট, ঘন করে আনি। হ্যা, বিছানাটা আমার অমনি চব্বিশ ঘণ্টাই পাতা থাকে, তুমি বড্ড অসুস্থ, দুর্বল, বিছানাতেই শুয়ে পড়াে। না, না, মেঝেতে শােবে কেন? আমার বিছানাটা এমন কিছু পরিচ্ছন্ন নয়, তার অনেক অনিদ্রার যন্ত্রণা এবার স্নিগ্ধ হবে তােমার বিশ্রামে। বা, আমাকে চুতে দেবে না তােমাকে? সেবা, জান না তুমি আমার কে? কত দূর থেকে কত ক্লান্তি নিয়ে তুমি এসেছ, আর তােমার কপালে একটু হাত বুলিয়ে দিতে পারব না? ঘুমােবে একটু? সত্যি, তােমাকে কিছু খেতে দিতে পারলে হত। কি নরম হয়ে পডেছ তুমি। একটু দুধ, একটু চা অন্তত। আচ, কিছু খেতে দেবার নেই। স্টোভটা পর্যন্ত এখন ধরাতে পারিনি। এ কার কাছে এলে তুমি ? বিষাদ-অনিমেষ চোখ দুটি সুজনের মুখের উপর তুলে ধরে সেবা বললে, আমাকে তুমি বিয়ে করবে? সে তত কবেই হয়ে গেছে। ‘জানি। কিন্তু আইন যাকে বিয়ে বলে, সমাজ যাকে বিয়ে বলে, তেমনি ? একশাে বার করব। মানে একবারই করব। আমাকে ? ‘হ্যা, তােমাকে। আগে করিনি, বুঝিনি প্রয়ােজন। এখন বুঝছি, f বিয়ে দিয়ে ঢেকে দিতে পারব তােমার সব লজা, সব লানা, তাই আজকেই তাে বিয়ে কবার দিন। সুজনের দু’হাত গলার নিচে চেপে ধরে সেবা বােজা চোখে বারবার করে কেঁদে ফেলল। ‘বিয়ের দিন বুঝি লােক কাদে? ঠিক হয়েছে, উপােস করে থাকতে হবে দুজনকে। বুকের ভিতর থেকে দশ টাকার একটা নােট বের করল সেবা। বললে, যাও, কিছু খাবার নিয়ে এস। দু'জনে মিলে খাব। মার ছাড়া দু’দিন আর কিছু খাইনি। ‘এত টাকা। ‘কার টাকা, কোখেকে পেলাম জিগগেস কোরাে না। ‘কার অমন মাথা-ব্যথা পড়েছে। চেয়ে-চিন্তে বা চুরি করে টাকা একবার হাতে পেলেই হল। আর এ তাে দস্তুরমত বপণ। সেবাকে একটু হাসিয়ে সুজন চলে গেল বাজারে। সর্বাঙ্গে ব্যথা। নড়া যায় না। তবু প্রসারিত হয়ে এ বিছানার মেহ সর্বাব্দ ভরে তার ছুঁতে ইচ্ছে করে। ঠোঙা করে ধু খাবারই নয়, কিছু চাল-ডাল চা-চিনি সুজন কিনে এনেছে। এসে দেখে সেবা এরি মধ্যে স্টোভ ধরিয়ে জল চাপিয়ে দিয়েছে, রাস্তার গয়লার থেকে জোলাে দুধ কিনেছে খানিকটা, ফিরিয়ালার থেকে কতক রুখা-খা তরকারি। এরি মধ্যে গােছগাছ করে নিয়েছে ঘর-দোর। ঘরের সমস্ত শীর্ণতা সমন্ত দারিদ্র্য যেন সিখ হয়েছে তার হাতের মমতায়। বায়া করল সেবা। আর যেন নড়া-চড়ায় সেই ব্যথা নাই, শুধু অতল অবসাদ। দুপুরে খেয়েদেয়ে বেরুবে সুজন। চাকরির খোঁজে। কোনাে চাকরি। যাঙের ছাতার মত এক ব্যাঙ্কে হবে বলে আশা আছে। আশার কুটোটিও সে ছাড়বে না। তােমার ইস্কুল? খােলেনি এখনাে । দশটি করেও যদি ছেলে ফিরে আসত, তবে খুলত নাকি। মাইনে দিচ্ছে আদ্ধেক করে। কি করে চালাই দু’ সংসার? দেখি, হয়ে যেতে পারে কিছু কোথাও। একা-একা তুমি বাড়িতে থাকতে পারবে তত? পারব না? আমি কি আর সত্যি একা? যেন কোথাও একটা অন্ধ অস্থিরতা ছিল, অনিশ্চয় আর অপচয়, বিষংস-বিশৃঙ্খলা। যেন কোন কিছুই টিকবে না, সব কিছুই ফুরিয়ে যাবে এমনি ত্বরান্বিত পরিভ্রমণ। যেন দমিত ও দণ্ডিত আত্মার আতনাদ। প্রতিশােধের প্রতিরূপ। যেন অনেক বেশি উগ্র, অনিবার্য, স্থিলক্ষ্য। যেন অজগরের গ্রাস। অপ্রতিবােধ্য। কে জানে, এই হয়তাে পরমতম মূল্যদান। দুর্লভকে কিনে নেবার। বঞ্চিত মাটি হয়তাে এতেই তৃণাঞ্চিত হবে। সব ঠিক আছে। নডে যাক, ঝরে যাক, তবু ঠিক আছে। আছে প্রেম। আছে ক্ষমা। আছে জীবন থেকে নবজীবনে নিয়ে যাওয়া। সমস্ত উদ্বেলতার তলে আছে কিন্তু সাম্য, স্থির শান্তি। খলিভের প্রক্ষালন। প্রেমে ধৌত হচ্ছে পাপ, সাম্যবাদে ধৌত হচ্ছে ধনিকতা। রাত্রে বলল সব সেবা। আলাে-না-জানা অজানা অন্ধকারে। বলল চেতনার আবছায়ার মধ্যে। ‘হ্যা, দয়া করে। নাম বােলাে না। সুজন প্রায় চেঁচিয়ে উঠল। সেবা দেয়ালে পিঠ দিয়ে বসে রইল। অবলুপ্তের মত। এমনি ভাবেই বাপারটা আন্দাজ করেছিল সুজন। ঘৃণা নয়, তার করুণা হল নতুন করে। বললে, ‘সন্তান কখনাে অবৈধ হয় না, অবৈধ তার বাপ-মা। একটা অশরীরী দীর্ঘশ্বাস ঘুরে বেড়াতে লাগল ঘরের মধ্যে। ‘কোন প্রাণই সংসারে ব্যর্থ নয়। অন্তত আমরা হতে দেব না আর। মনুষ্যত্বেই তার পরিচয়, পিতার পরিচয়ে নয়। আবার কোলে যে জন্মায় সেও সত্যকাম হয়। হ্যা, আমরাও তাকে সেই সুযােগ দেব, সেই পরিবেশ। দেখবে সে প্রকাণ্ড বৈজ্ঞানিক হবে, কি কবি হবে, হবে সেনাপতি। যেমন আমি, তুমি, তেমনি সে। সব আলাদা, সব সমান। সেবা স্নান করে উঠল। প্রণাম, আলিন, সর্ববিলােপ ভেবে পেলনা কি করে প্রকাশ করবে নিজেকে ? রাতে শুলে তারা পাশাপাশি, তক্তপােষের অন্তিম দুই প্রান্তে, কেউ কাউকে না ছুয়ে। সেবা মেঝেতে শুতে চেয়েছিল আলাদা হয়ে, দেয়নি সুজন। বিষয়টাকে ঘােলাটে আবেগের মধ্যে দিয়ে দেখােনা, দ্যাখাে মুক্তি ও সংমের চোখ দিয়ে। বুদ্ধিকে জীবিত করে, আবেশকে নয়। সেবা যেন দুর্গের আশ্রয়ে এসে শুলাে, স্বর্গ নেই কোথাও তলে, তবু মনে হল, যেন স্বর্গেরই এলেকায়। তবু কি সুজন এতটুকুও আশা করেনি যে ঘুমের অসাবধানে সেবার একটি অসংলগ্ন স্পর্শ এসে তার গায়ে লাগবে? না, এই তাে চাই, এই দৃঢ়তার চেতনা। বােধ, ধৃতি, প্রতীক্ষা : বিজ্ঞান-শাসিত দৃষ্টি। আর সেবা—সেবা কি করে আশা করতে পারে যে অজ্ঞানেও সুজন তাকে ছোবে? সে ব্ৰতঘাতী, সে ব্রাত্য। সে মসীলিপ্ত। খণ্ডিত, অসম্পূর্ণ। সমস্ত জীবন চলবে এই ব্যবধান। এই দ্বিধা আর সংকোচ। মিলনের বিস্তৃতির মধ্যেও এর বিস্তৃতি হবে না। ঘৃণার সঙ্গে দয়া মিশিয়ে জেগে থাকবে অনুকম্পা। দানের বিনিময়ে গ্রহণে থাকবে কার্পণ্য। অগাধ অতৃপ্তি। অসম্ভব। পাখা-কাটা পাখির মত সেবা সমস্ত রাত ছটফট করে কাটাল। কি সুজন কি নিশ্চিন্ত শান্তিতে ঘুমুচ্ছে। কি পরিপূর্ণ বিশ্বাসে! নামােচ্চারণ করবে না বলে ভেবেছিল, মৃত্যু ছাড়া কি মুক্তি ঈশ্বর, নেই, বিষমুক্তি? কেন একে জড়ালাম। ধু একটু খান বা প্রতি জন্যে? কেন এর সমস্ত জীবন কালি করে দিলাম ? খালি করে দিলাম ? কেন নিজে বড় গেলাম না, ফয়ে গেলাম না? কেন দাসী না হতে চেয়ে স্ত্রী হতে চাইলাম ? কি দেব আমি অৰ্য? এই স্পষ্ট দেহ? এই পঙ্কিল মন? ট্রেন যখন ঢুকছিল স্টেশনে, কেন তখন পড়লাম না এগ্রিনের সামনে ? কেন গুড়ো হয়ে গেলাম না। তার বদলে এই দৰ শলাকা বুকে নিয়ে বাঁচতে এসেছি ?
ডাক্তারের নাম সঞ্জীবন সিংহ। উগ্র ডিগ্রিওলা, পশ্চিম-প্রত্যাগত। ঠিকানাটা আরেকবার দেখে নিল সেবা। দুপুরবেলা, ঘরের দরজায় সে তালা দিয়ে এসেছে। বিকেলে, সুজনের ঘরে ফেরবার আগেই, হয়তাে ফিরতে পারবে। যদি না পারে, যদি অপারেশান-টেবিলেই সে মরে যায়, সে বেঁচে যায় তা হলে। অনেক লজ্জা, অনেক লাঞ্ছনা। তবু, ডাক্তারের কাছে কুণ্ঠা কিসের ? সে পরিত্রাতা, পবিত্র ঈবের মত। সে দূর করে ব্যাধি আর যন্ত্রণা, মুক্তি দেয় নবীকৃত জীবনে। আয়ু আর আনােগ্যের উদাতা সে। বয়েস চল্লিশের কিছু উপরে হবে। স্কুল, স্বাস্থ্যবান। গভীর। দেখলে নির্ভরযােগ্য বলে মনে হয়। মনে হয় বিশ্বাস করা যায় বিরলে। যেন অনেক অভিজ্ঞতায় শক্ত, অনেক বিকৃতিতেও অবিচলিত। শুধু চাউনিটা দূরবেধী, হয়তাে বা একটু নয়। এই কলঙ্কিত লজ্জাটা যেন একটু উপভােগ করে। কিন্তু মুখে উদার হাসি। বরাভয়। এটা তাঁর বাড়ি। নিচের তলায় ডাক্তারখানা। রুগী দেখবার ঘর, যে সব রুগী শিষ্ট। অনভিযুক্ত। তাঁরা বাইরের ঘরে। আর, তাদের মতন যারা রুগী, যারা গুগুগতি, তাদের ক্লিনিকটা অন্তরালে। হ্যা, সঞ্জীবন সিংহ মেয়েদের ডাক্তার। বিশেষজ্ঞ। ঠিক সময়েই এস্নেছেন। হয় দুপুরে, নয় অনেক রাত করে। যে- দুটো সময়ই একটু নিরুদ্বেগ। আসুন ভিতরে। কিছু ভয় নেই। ঘনােয়া গহতে চান, জায়গা আছে আলাদা। ৭
ডাক্তার সেবাকে একটা ছােট ঘরে নিয়ে এলেন। এটা পরামর্শের
ঘর। গৌরচন্দ্রিকার। ফর্দ-ফিরিস্তি না নিয়ে তিনি কাজে হাত
দেন না। রােগের বায়নাকা জানা চাই।
‘আমাকে আপনি গােপন বন্ধুর মত মনে করবেন। আপনার নাম ?
‘সত্যি-নাম বলতে হবে ? সেবা ডাক্তারের মুখের দিকে তাকাল
ভয়-ভয়ে।
‘আপনি নেহাৎ গােবেচারা। সত্যি-নাম কেউ বলে ? বানিয়ে বলে
ফেলুন না একটা।
‘সুপ্রীতি সান্যাল।
‘বানান করতে পারব কিনা কে জানে? নাম দরকার, একটা নির্দোষ
সেপশান করে দিতে হবে তাে। খাতায় রাখতে হবে নকল। যাক
গে, অনেক ঝামেলা, তা আপনি বুঝবেন না। যাক গে, এই প্রথম ?
সে ঘাড় হেঁট করে রইল।
‘মানে, এর আগে এসেছেন আর কোনাে ক্লিনিকে?
না।
কীর্তিমানটি কে?
তার নামও কি বানিয়ে বলতে হবে দরকার আছে?' সেবা পাত
দিয়ে ঠোটের একটা কোণ কামড়ে ধরল।
‘কিছুমাত্র না। জিগগেস করছি, সমাজকে বুঝতে চাইছি। লােকটা
কি ঘরের না বাইরের ?
জানি না। সে দৃঢ় গলায় বললে।
‘কেউ সঙ্গে আছে আপনার?
না।
‘অভিভাবকেরা জানে ?
।
৫
‘আমার ঠিকানা জানলেন কি করে?
‘আমাদেঙ্গ সঙ্গে পড়ত একটি মেয়ে, সে বলেছে। তার দিদি নাকি
এখানে এসেছিল। সেবা অম্লানমুখে বললে।
আশা করি সে নিজে আসবে না। ডাক্তার বদান্তমুখে হাসলেন।
তক্ষুনি মুখ ঘাের করে বললেন, কিন্তু আপনার দায়িত্ব নেবে কে?
‘ঈশ্বর। আর কোনাে নাম সেবার মুখে এল না।
‘হ্যা, আপনিই আমার সেঈশ্বর। আমি আমার সমস্ত দায়িত্ব
আপনার হাতে তুলে দিলাম। আর যদি কেউ দায়িত্ব নেবে তবে ছুটে
আপনার কাছে পালিয়ে আসব কেন?”
‘আমার ফি একশ টাকা। দিতে পারবেন?
ভেবেছিলেন অক্ষমতা জানালে ছেড়ে দেবেন খানিকটা। ঋণী করে
রাখবেন।
‘দিচ্ছি। আঁচলের তলা থেকে ন্যাকডার পুটলি বের করে সেবা
দশখানা নােট গুনে দিল। ডাক্তার দেখলেন, আরাে কতগুলি আছে।
বড় ঘরের মেয়ে, সন্দেহ কি। পাপের জৌলুস যেন তাতে আর বেড়ে
গেল।
‘আমন।
তারা আরাে ভিতরে ঢুকল, যন্ত্র-ঝলমল আরেকটা ঘরে। অনাবৃত
স্তব্ধতায়।
কতক্ষণ পর ডাক্তার বেরিয়ে এলেন পরীক্ষাগার থেকে। সেবাকেও
আসতে বললেন। ভয়ে ছাই হয়ে বেরিয়ে এল সেবা।
‘আপনি একটি পয়লা নম্বরের আনাড়ী। আপনার কিছু হয়নি।
ডাক্তার বললেন প্রায় হতাশের মত।
‘কিছু না ? জিজ্ঞাসাটা সেবার কথায় ফুটল না।
‘কিছু না। দুই আর দুই দেখেছেন, সােজাখুজি চার করে বসে
আছেন। এখন দেখতে পাচ্ছি, শূন্য। যান, মনের সুখে দৌড়ঝাঁপ
ছুটোছুটি করুন গে।
এখুনি সে ছুটে বেরিয়ে পড়বে কিনা, সেবার দু পা থরথর করে
কাপতে লাগল।
যাবেন না এখুনি। প্রেসপশান লিখে দেব একটা, ওষুধ নিয়ে
যাবেন।
যে সাময়িক অস্বাস্থ্য হয়েছে, ভাল হয়ে যাবে। ডাক্তার কাগজ
কলম তুলে নিলেন, এবার আপনার সত্যিকার নাম বলতে আপত্তি
হবে না আশা করি।
সেবা উৎফুল্ল হয়ে বললে, ‘সেবা—সেবা দত্ত।
‘ঠিকানা ? টলটলে চোখে ডাক্তার হাসলেন।
ঠিকানা দিয়ে কি হবে?
‘সিডির এক ধাপে পড়েছেন বলে ধাপে-ধাপেই পড়বেন আর
বারেবারে আমার শরণ নিতে হবে, সে কথা আমি বলছি না।
আপনার এখানে আসা আর না হতে পারে, কিন্তু আমি তাে যেতে পারি
আপনার ওখানে।
‘আপনি যাবেন কেন?
‘সাধে কি আর আপনি তিলকে তাল করেন ? বলছি, এর পর যখন
আপনার বিয়ে হবে, আর সঙ্গত কারণ ঘটবে, তখন তাে আপনাকে মুক্ত
করবার জন্যে আমার ডাক পড়তে পারে ? ডাক্তার টালটা চমৎকার
সামলে নিয়েছেন।
প্রায় নিশ্চিন্ততায় সেবা ঠিকানা বললে।
প্রথম চশমা পরলে সমস্ত যেমন আশ্চর্য দেখায়, তেমনি। সেবার ইচ্ছে
হল, এখুনি ছুটে গিয়ে সুজনের বুকের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে, নিবারণ
ব্যাকুলতায়, বলে, কানে-কানে বলে, দেহের অণুতে অণুতে বলে, না,
, না। কিন্তু তখুনি সে হোঁচট খেল। যদি তাকে মুক্ত দেখে সুজন আগের মত পিছিয়ে যায়, বিয়েতে বেঁধে ফেলতে না রাজি হয় ? যদি আবার দুর্যোগ-দুঃসময়ের দোহাই পাড়ে? তার এই কলঙ্কটাই তত সুজনের চোখে রূপবান হয়ে উঠেছে। সেই মােহটুকু যদি মুছে যায় জন্মের মত? সেবার বুকের ভিতরটা এতটুকু হয়ে গেল। কিন্তু তাই বলে, যা নয় তাই দেখিয়ে, ঠকিয়ে, জোচ্চুরি করে বিয়েটা সে হাসিল করবে? এই কি ন্যায়? কদিন পরে সুজন যখন বুঝবে, এটা ধাপ্পা, তখন সে কী ভাববে তাকে? ভাববে না সমস্তই একটা আষাঢ়ে গল্প, কাজ গুছােবার ফন্দি , সব সে বলবে খােলাখুলি। কিন্তু যখুনি বলবে তখুনি তার ডাকের সাজ খসে পড়বে। চিকন-চাকন ধুয়ে গিয়ে ভিতরের খড় পড়বে বেরিয়ে। ? ৩১ । আষাঢ়-শ্রাবণ মাস থেকেই লােকজন অল্প-অল্প করে ফিরে আসতে সুরু করেছে। ছ্যাকড-গাডির ঘােড়ারা মুখ ঘুরিয়েছে এত দিনে। ট্যাক্সির ভাড়া আজ বেশি বলে ভাবতে সাহস হচ্ছে। প্রতিবাদ করবার মত গলায় জোর পাচ্ছে একটু। যত মাল নিয়ে গিয়েছিল তার অর্ধেকও নিয়ে আসতে পারেনি, ফেলে-ছড়িয়ে দিয়ে এসেছে। সবাইই মুখে দুর্ঘটনার ছাপ। ছেলে ডুবেছে জলে, মরেছে গাছ থেকে পড়ে, পড়েছে সাপে-কাটা মেয়েটা গেছে টাইফয়েডে। কারু চুরি হয়ে গেছে সর্বস্ব। ইদুর জামা-কাপড় বিছানা-বালিশ কেটে তছনছ করে দিয়েছে। শেয়াল আর কোলা ব্যাঙ, কেমো আর মােলােকা, জোনাকি আর ঝি ঝি কোথায় গিয়েছিল তারা? কেবল জঙ্গল আর জলকচা, কচুপাতা আর কচুরিপানার রাজ্য। পাখায় রঙের ছিট- ওয়ালা মশা চল্লিশ-ডিগ্রি কোণে সে ম্যালেরিয়ার হুল ফুটিয়ে দিচ্ছে। কুইনিন নেই। কবরেজি পাচন খেতে হচ্ছে। কােজর পালা- জগ জ—জর্জর হয়ে গেছে। কাটালে মাছি, কুকুরে মাছি, ডাশ মাছি, কানামাছি—বেরিয়ে পড়েছে ঝাঁক ঝ। আর এত পােকাও ছিল—কুমপোেকা, গুবরে পােকা, গাধিপােকা, ঘূর্ণিপােকা, তেলাপােকা আর ছাপােকা। ওলাউঠা, আমােশা, খােস-পাচড়া। একটা হাতুড়েও পাওয়া যায় না হাতের কাছে। ওষুধ-পত্র সব আলমারি ছেড়ে সিন্দুকে গিয়ে উঠেছে। জেরবার, নাজেহাল হয়ে গেছে সব। ফিরে আসছে নাকচ- নাকাল হয়ে। যারা পালায়নি তাদের নীরব ও নিষ্ঠুর বিদ্রুপের মধ্য দিয়ে। দোকানের ঝাঁপ উঠছে থেকে-থেকে। পানের দোকান, মনিহারি।
রাস্তার মােড়ে-মােড়ে আসছে কতক রিকশাওয়ালা। ঝাঁকাটে। গয়লাৱা কেউ-কেউ দিনের বাঁক নিয়েছে কাধে করে, খেজু-পাতা- ভােবানাে চালানি দুধ। বা-হাতে পরামানিক দেখা যাচ্ছে দু’-একজন। মুচিরা কেউকেউ পায়ের তলায় গরুর শিঙ চেপে ধরে সূচের মুখে মােম ঠুকরে-করে জুতা সেলাই করছে। ভিখিরিরা জড়াে হয়ে উঠছে। পয়সার বদলে ভিক্ষে করছে ট্রামের কৃপন। বারিধিও এসেছে কলকাতায়। কলকাতাকে দেখতে। বালির বস্তায় জাঁতা ঠেকো-দেয়ালে মাথা-ঠোকা কলকাতা। আর সেবার খােজ করতে। শীভুষণবাবুর কাছ থেকে কোনাে হদিসই পাওয়া যায় নি। কথাই কমিয়ে ফেলেছেন। যেন কিছুই জানে না, এমনি অবাক হবার মত করে, জিগগেস করে এটুকু শুধু জেনেছে, মাসতুতাে বােনের বিয়েতে গিয়েছে কলকাতা। বারিধি অপদস্থ বােধ করছে নিজেকে। তার মনে হচ্ছে, সে সেবাকে প্রত্যাখ্যান করেনি, সেবাই তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তার পরামর্শ না নেওয়া, তার ছায়াতল থেকে বােন্দরে সরে যাওয়ার মানেই তাকে প্রত্যাখ্যান করা। তাকে প্রহার করা। গঙ্গায় ডুবে সেবা যদি আত্মহত্যা করে তবু সোলা ঠাণ্ডা হবার নয়। হাতের ঢিল ছুড়লে ফের ফিরে আসে না জানি, তবু দেখবে সে চেষ্টা করে, সে-টিল সে কুড়িয়ে পায় কিনা। তােমার এখানে সেবা বলে কেউ এসেছিল? এই কুড়ি-একুশ বসে ?” ‘কেন বলল তাে? ডাক্তার সিংহ টনটনে কৌতুহলে জিগগেস করেন। ‘হা, জানি সে আসৰে। ঘুঘু মেয়ে, শেষ ধাপ পর্যন্ত না পৌছে সে ছাড়বে না।”
‘কেন, হয়েছে কী? আর বােলল না। গায়ে গিয়েছিলেন ইকুইয়ি হয়ে। আর যা হয়, শহুরে পাখনা দিলেন মেলে, মরবার আগে পিপড়ের যেমন পাখা গজায়। আর, জানাে ভাে, শহরে-গাঁয়ে ব্যাঙের ছাতার মত একদল অকেজো ছেলে উঠেছে, ঢালা ফরাসের যারা স্বপ্ন দেখে, ভাঙা স্বপ্নের পর রাঙা স্বপ্নের সান্ত্বনা, তাদেরই সঙ্গে, ওড়াউডি সুরু করলেন। বাপটি একটি জাম্বুবান, অগামারা। আর মাটি তাে মেয়ের দেমাকেই ভগমগ। ফলে যা হবার তাই হল। আর, আমার কাচারির বগলেই তাদের ৰাসা। যেমন হয়, ছেলেটা অস্বীকার করেছে, পালিয়েছে পশ্চিমে। আর মেয়েটা দিশেহারার মত চলে এসেছে কলকাতা। তাকে ধরতে হবে, দাড় করিয়ে দিতে হবে, অপচয় বাড়তে দেয়া হবে না। নতুনতর সমাজের মূল্যে তাকে মূল্যবান করে তুলতে হবে। সংগঠন চাই, সমাজের সমস্ত বেমেরামত বননদ-গাঁথুনির পিল-থামাল খিল-খিলেন মজুবত করে দিতে হবে। ‘মেয়েটা বােক। ডাক্তারের এই যেন প্রকাণ্ড আপশােষ। প্রায় অভিযােগ। ‘বােকা না হলে এমন ভাবে কেউ সর্বনাশ ঘটায়? কিন্তু যাই বলাে, সর্বনাশ বলে কোনাে কথা নেই আর আমাদের অভিধানে। এখন সর্বভ। একবার পা পিছলে পড়েছে বলে মেয়েটাকে চিরকাল খােড়া করে রাখতে হবে এ অনুশাসন উঠে গেছে। ‘মেয়েটার কিছুই হয় নি। বােকা ও সেইখানে। ডাক্তার মৃদু রেখায় হাসলেন। যেন নিজে বােকা বনেছেন সেই ভাব। আরােগ্যের পুরস্কার বােগিণীর বন্ধুতা এই চিরকাল ধটে এসেছে সিংহের জীবনে। গূঢ় মন্ত্রগুপ্তির প্রতিশ্রুতি শুধু তারই সঙ্গে। তাঁর কাছে কিছু অজানা নেই, শুধু তার কাছেই সে উন্মুক্ত হাতে ছিল তার T সেই বশীকরণের রহস্য। কিন্তু এই মেয়েটা তাঁকে ফাকি দিয়ে গেছে। ফাকি নিয়ে গেছে তার মুক্তির নির্মলতায়, মুখতার সারল্যে। শুধু তার জন্যেই তার মায়া হয়েছে, জালা হয়নি। তাই তার চলে যাবার সময় তিনি তাকে আশীর্বাদ করে দিয়েছেন। বলেছেন, তােমার ভালাে হােক, তুমি বিয়ে করাে, রত্নপুত্রবতী হও। ‘কিছুই নয় ? বারিধি বসে পড়ল। ‘বিন্দুবিসর্গও না। মেয়েটা শুধু বােকা নয়, এক বাণ্ডিল নন। কী নরকের মধ্যে অকারণে নাকানিচুবুনি খেয়েছে এত দিন। ডাক্তারের বরে প্রায় সমবেদনা। ‘তার ঠিকানা দিয়ে গেছে । নিঃষের মত শােনাল এবার বারিধিকে। মনে হল, ক্ষীণতম সম্পর্কের তন্তুটি এবার ছিড়ে গেল। আর কোনো দাবিতেই তাকে কাছে আনা যাবে না। মর্মে লেগে থাকবে না তার আর কোনাে স্মৃতির শচীমুখ। এই মুক্তিটা লাগল তাকে শেষ পাভবের মত। ডাক্তার ঠিকানা দিলেন। সত্যি ঠিকানা কিনা কে জানে ? , সত্যি। নাম যখন সত্যি। মেয়েটা এত বােক নিজের নাম আল ঠিকানাটাও ভঁড়াতে পারেনি ? কিন্তু মুখ বলই নিষ্কৃতি মেলে তার প্রকৃতির হাত থেকে। বারিধি উঠে পড়ল। ডাক্তার বললেন, “যদি পাও, মেয়েটাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেময়া তার বাপ-মায়ের হাতে। বিয়ে দিয়ে দিতে বােলাে। যদি পার, কেনই বা পারবে না, তুমিও সাহায্য কোনাে এ বিষয়ে। বড় ভালাে মেয়ে, এমন মেয়ের সুপাত্রের অভাব হবে না। যে বিয়ে করবে সে বাজা হয়ে যাবে। সংসারকে সুন্দর করবার মন্ত্র জানা আছে তার। বারিধি জানে, কি করতে হবে। তখুনি সে বেরিয়ে পড়ল সন্ধানে। তা অনেক রকম বেশ আছে, পরলে কাবলিওয়ালার পােক।
ঠিক ঠিকানাই দিয়েছে দেখছি। এর মধ্যে বারিধি দেখতে পাচ্ছে যেন বিদ্রোহের ভঙ্গি, অল্পীর গাভীর্য। তার মধ্যে কিছু আর গােপন করৰার নেই, সে পরীক্ষাত্তীর্ণ, দণ্ডমুক্ত। তেজটা দগ্ধ করতে লাগল বারিধিকে। তারপর দূর থেকে যখন দেখল সে সেবাকে, বারান্দায় রােৱে হাতে-কাচা কার একটা শার্ট দিচ্ছে শুকোতে, তখন সে যেন ঠিক তার বুকের উপর প্রকাণ্ড ঘুষি খেল। দেখল, সেবার অন্য রকম চেহারা। সেই ঢলঢলে ভাব আর নেই, অনেক শক্ত, অনেক সমর্থ হয়ে উঠেছে। পেটাই-কুটাই হয়ে আঁট হয়ে গেছে সে গিটে গিটে। যেন, ভাঙৰে অৰু মচকাবে না এই প্রতিজ্ঞায় সে ঋজু। পরনে মােটা ময়লা শাডি, সম্পূর্ণ খালি তার হাত-গলা, কপাল-সিথিও শূন্য। শাখা বা সিদুৱেৰও চিহ্ন নেই। মূর্তিমতী রিক্ততা। সামনে এগােবার ভরসা পেল না বারিধি। ভিতরে একাকী কোন পুরুষের উপস্থিতি। গুপ্তচরের ভেক ধরে ঘুরতে লাগল সে আশে-পাশে, খাতা-পেন্সিল হাতে নিয়ে। কে কি কোথায়।
আরাে লােক আসছে ক্রমে-ক্রমে। ফ্যাকাসে, চোপসা মুখে আসছে
ছেলেরা। ইস্কুল খুলবে এবার সুজনদের। যে-বে ক্লাশে ছেলে পাওয়া
নয়, সে-সে ক্লাশ। সামনেই পূজার ছুটি, ছুটির পর পুরােপুরি ভােলা
•বে আশা হচ্ছে। আগে শার্সির কাচে কাগজের ফালি লাগানাে
হয়েছিল, এখন সমূলে খুলে ফেলা হয়েছে। মাঝখানের হলটাকে করা
হয়েছে প্রচ্ছন্ন কক্ষ।
মােটা চুরুট দাতে এটে হীৰেন পান্তগির খবরের কাগজ পড়ছেন।
লাে-বালি ওড়ানাে শুকনাে খানিকটা শীতের হাওয়ার মত ঘরে ঢুকে
পডল সুজন। ব্যাপারটা যেন কিছুই নয় এমনি উদাসীন ভঙ্গিতে সম্ভাষণ
করলেন হীরেনবাবু।
‘কি মনে করে ?
আমাকে নাকি ইস্কুল থেকে ছাড়িয়ে দেবেন?' সুজন বিমর্বের মত
লবে, না, বিদ্রোহীর মত, বুঝতে পারছে না।
'যা, কমিটির তাই মত।
‘আমার অপরাধ?
বাঁকা চোখে তাকালেন হীরেনবাবু। সত্যি, জানাে না কি
অপরাধ?
‘কি করে জানব। বলুন, শুনি।
‘তুমি একটা মেয়েকে নিয়ে আছ এক বাড়িতে।
এক বাড়িতে থাকব না তাে যাব কোথায় ? তাকে আমি বিয়ে
করেছি।'
‘বিয়ে করেছ? ঠাট্টায় কুঞ্চিত হল তার ঠোট।
হ্যা, বিয়ে করেছি। বেজেষ্টি করে। দেখবেন সে দলিল ?'
‘দরকার নেই। দলিল-টলিল আমি বিশ্বাস করি না। কিন্তু, বিয়ে
করেছ যে, তার চিহ্ন কই? কই মেয়েটার সিদুর আর শাখা ?
এ খবরও পৌচেছে তাঁর কাছে? সুজন ঢােক গিলল, বলল, আমি
মানি না ও-সব চিহ্ন, দাসত্বের চিমটে পুড়িয়ে হাতে-কপালে সেই
ছেকার দাগ। আমি পুরুষ, আর সে মেয়ে—এর বাইরে আমাদের অঙ্গ
কোনাে পরিচয় নেই। আমরা মানুষ—এর বাইরে নেই আমাদের
কোনাে সমাজ। আর, তার হাত-গলা খালি দেখতে না চান, অশীর্বাদ
বাবদ দিন না কিছু সােনা-দানা।
হীরেন খাস্তগিরের অভিজাত সংস্কার, তার মিরাশকায়েমী স্বত্ব, সেই
তার ধর্ম ও সমাজ, যার উপরে তার এই ঐশ্বর্ণের বনেদ—সমস্ত সেন
আমূল ঝাঁকুনি খেল। তবু, তিনি কণ্ঠ নিরুত্তে রাখলেন . কিন্তু
মেয়েটা খারাপ।
এক মূহুত চুপ করে রইল সুজন। বললে, কি করে জানলেন
আপনি ?
‘আমারও দলিল আছে, ডাক্তারের প্রেসকৃপশন।
‘মিথ্যে কথা। খারাপ আপনি কাকে বলেন আপনিই জানেন।
লােক উদ্বৃত্তের অধিকারী হয়েও প্রতিবেশীকে উপবাসী দেখে উপহাস
করে তার চেয়ে আর কে খারাপ হতে পারি জানি না। কিন্তু হলই ব
সে খারাপ। যে খারাপ তাকে চিরকালই খারাপ রাখার যে ব্যবস্থা চলছে
সমাজে, তা বদলাতে চাই। যে খারাপ তাকে ভাল হবার সুযােগ দেব
না? যে চোখ বুজে আছে অন্ধকারে, তাকে দেখতে দেব না পৃথিবী ?
বঙ্গময় দীর্ণশ্বাস ফেলে হীরেনবাবু বললেন, ‘শুনতে তাে ভালই
লাগে। কিন্তু কথা তা নিয়ে নয়—
৩৮
? ‘যাই নিয়ে হােক, আমি তাে তাকে বিয়ে করেছি। মানলাম সে খারাপ, কিন্তু বিয়েটা আপনি ভাল বলে মানবেন না ? ‘আমার কথায় কি এসে যায়? তােমার পাঠা তুমি ল্যাজে কাট কি ঘাডে কাট তাতে আমার কি মাথাব্যথা? কিন্তু কথা হচ্ছে, ছেলেরা কথা কইবে— সুজন জড়বুদ্ধির মত তাকিয়ে রইল। ‘া, তােমাকে নিয়ে তারা আলােচনা করবে, তােমার কীর্তির প্রতি কৌতহলী হয়ে উঠবে। সেটা তাদের মনের উপর ভাল কাজ করবে না। শিক্ষকের চরিত্র খারাপ হতে পারে, সত্য হােক মিথ্যে হােক, এমন একটা দৃষ্টান্ত কিছুতেই রাখতে দেয়া হবে না তাদের সমনে। উদগার্ণ “য়ার আরামে হীরেনবাবু চেয়ারের পিঠে হেলে পড়লেন। ‘কিন্তু চাকরি গেলে আমি খাব কি ? বড় মধুময় শশানাল যেন এই কাতর আর্তরটা। তঁার টাকার নঝনানিতে বাত্রিদিন এই কান্নাটাই শুনছেন, খাব কি? শুনতে-নতে কানের পােকা বেরিয়ে গেছে সব। আর, এ শুনতে না পেলেই যেন অশান্তি লাগে। ‘বা, চুপ করে থাকবেন না, উত্তর দিন। কই প্রার্থনার ভঙ্গিতে নুয়ে পড়বে, উলটে এখনাে কিনা দাবি জানায়। ভাবখানা এমন, সমস্ত মাল যেন হীরেন খাস্তগিরের জিম্মায়। বা, চাকরি যেমন নিয়েছেন একটা, তেমনি আরেকটার ব্যবস্থা করে দিন। 'তার আমি কি জানি। ‘অমন মােলায়েম করে বললেই চরম কথাটা বলা হল না। দিতে | যখন পাবেন না, তখন নেন কেন ছিনিয়ে?' সুজন থামল, কথার মাঝে হঠাৎ শােনা গেল কি একটু জোলাে কাতবােক্তি? শােনাক, তবু সেবা, ‘া, সেবার কথা ভেবেই সে বললে, ইচ্ছে করলেই, যখন অন্য জায়গায়
ঢুকিয়ে দিতে পারেন, তখন মিছিমিছি কেন আমাদের উপবাসী
রাখবেন?
‘যুদ্ধে যাও।
‘তাই যাব।'
দ্রুত দৃঢ় উত্তরে হীরেনবাবু চমকে তাকালেন একবাব সুজনের চোখে
কে জানে, হয়তাে তা আপনার বিরুদ্ধে। দু ভাগে তাই ভাগ হয়
গেছে পৃথিবী। এক দিকে লােভ আর স্বার্থ আর সঞ্চয় আরেক দিকে
হীরেনবাবু উচু গলায় হেসে উঠলেন ‘বােলাে না, কালনেমি অনেক
আগেই লঙ্কা ভাগ করে রেখেছিল।
‘পুর কোথায় ? সুজন হঠাং গভীর গলায় জিগগেস করল।
তততধিক গম্ভীর হল হীরেনবাবুর মুখ তাকে কেন ?
‘তিনি দেখতেন এই অবিচারটা।
এর চেয়ে ঢের বেশি সে দেখেছে। একটা যে বটগাছ, আরেকট
যে ভেরেণ্ডা, এটাই তার কাছে প্রকাও অবিচার। ক্লাশে পরীক্ষায়
একটা ছেলে যে কাস্ট হবে আরেকটা যে পাশ করতে পারবে না এট,
তার মর্মশূল। হাতের আঙুল পাঁচটা সমান নয় বলে আঙুলের মা
ঘসছে সে দেয়ালে। তার কথা আর বােলল না। হীরেনবা
অন্যমনস্কর মতে খবরের কাগজকে এপিঠ ওপিঠ করতে লাগলেন।
সুজন রাস্তায় নেমে এল। খুব অবসন্ন মনে করতে দিল না নিজেকে
পথ ঘাট সব অন্ধকার মনে হতে লাগল তবু মনের মধ্যে জে:
রাখবে সে আগুন যা তাকে আলাে দেবে, তাপ দেবে আমরণ।
তাই সেবাকেও সে হা-হুতাশ করতে দিল না। বললে, ‘ভয়ে দুঃখে
মৃত্যুতে নুয়ে পড়াটাই আমাদের হার হবে। আমরা লডব। মরবাল
আগেই মরব কেন? আমাদের বেঁচে থাকাটাই যে ওদেরকে উপহণ
কা। আমরা মরে গেলে, মরে গেলেই যে ওদের শান্তি। তা আমরা
হতে দেব কেন? মাটি কামড়েও বেঁচে থাকৰ আমরা।
পচা, নােনা-ধরা, পুতিয়ে-ফেলে-দেয়া তার জীবনটাকে আজ বড়
বেশি মূল্যবান বলে মনে হল সেবার। মনে হল তার অসীম ক্ষমতা,
অনেক দায়িত্ব। তার বাড়ির চৌকাঠ এই ইটকাঠের অনেক বাইরে
চলে গেছে। অনেক বেড়ে গেছে তার হদ্দা-চৌহদ্দি।
‘তার পর তুমি আমার পাশে। সুজন সেবার হাত ধরল, মুঠ
কবে চেপে।
সে শুধু খ্রী নয়, সন্নিী, সহচরী। গৃহশােতা নয়। পার্শ্বচারিণী
পথসাথী। পাড়ের ময়না নয়, শিকরে বাজ।
old
?
১u
৭১
১২ আশ্বিনে ঝড় উঠল। আর, জল উঠল। কালাে ঝড় আর ঘােলা জল। একের সঙ্গে আর পাল্লা দিয়ে চলেছে। একটু কালে-কালাে মেঘ, ঠাণ্ডা-ঠাণ্ডা হাওয়া, একটু লেব কুলকুল। কিন্তু চক্ষের পলকে এ কি চেহারা নিল। ঝড়ের ভয়ে সবাই ধরে দোর এটে রইল, আর দোরে অমনি পড়ল জলের করাঘাত। গাছ পড়তে লাগল মড়মড় করে, জল উঠতে লাগল হুহুসে। বিয়স্ক হয়ে দানবের দল তিন ভুবন জুড়ে দাপাদাপি সুরু করেছে। দীঘা ও জনপুট ছেড়ে সমুদ্র ঢুকে পড়েছে ভিতরে, আদিগন্ত মুখব্যাদান কৰে। বালিয়াড়ি তলিয়ে গেল দেখতে দেখতে। হামলাতে লাগল গরু, দেউতে লাগল কুকুর। অন্ধকারে মুরগির ডাক। গাছহারা পাখির কচকচি। আর মানুষের বা আতনাদ তা তলিয়ে গেল সুবরদস্ত জলের গর্জনে। গ-ভেড়ার সঙ্গে ভেসে যেতে লাগল মা-মেয়ে ছেলে-বউ আণ্ডা-বাচ্চা। নেচে-নেচে কচুরিপানা, গোলে ঘাস, জেলাফুল। মাছ যে মাছ সে পর্ন আর জলজীয়ন্ত নেই। যেমন আদাডে কচু তেমনি বাগাটে তেঁতুল। এই কাঙালী লেয়ে আর হৈবতুল্লা। মালি-মামলা লেগেই আছে দু’জনে মধ্যে। কৌজ- দারির পর দেওয়ানি। এ ওর বাঁশের এটে কেটে নিয়েছে, ও এর কলার তেউর। এ ওর কেটে দিয়েছে চালের বাতা, ও ওর বেড়া বাখারি। নিত্যি আখে, নিত্যি আখখাটি। এ ওর কলাই ভাঙে ৬ এর মুরি খাওয়ায়। তার পর হক-হকিয়তের মামলা। এর গরু ওর হারাম। এ যদি কলাপাতায় এমনি করে খায়, ও খাবে অমনি করে। १२
সেই দুই চিরশত্রু আজ একই খােড়ােচালে আশ্রয় নিয়ে ভেসে
চলেছে। কটা মুরগি আর একটা মিনি বেড়াল। আজ একই বন্যা
কাঙালী আর হৈবতুল্লাকে একই পারের আশায় ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে।
সে বন্যা ওদের ভিতরকার সমস্ত মেকি বিবােধ ধুয়ে দিয়ে নিয়ে চলেছে
একই বন্ধুতায়।
কাঙালী বলেছে, 'ভাইরে।
‘ভাইরে। হৈবতুল্লা প্রতিধ্বনি করেছে।
ওদের কঠে সমান হাহাকার, একই মানুষের ভাষায় লেখা।
‘আর কাউকে নিয়ে আসতে পারলাম না, চেয়ে দ্যাখ, হাতে করে নিয়ে
এসেছি শুধু থেলাে কোটা। হৈবতুল্লা হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল।
কাঙালীর মুখেও সেই উদ্বেলিত কায়া ‘শেষ পর্যন্ত আঁকড়ে ছিলাম
মেয়েটাকে টেনে তােলবার সময় ছিড়ে বেরিয়ে গেল। চেয়ে গাধ
আমার হাতে তার সেই কোমরের ঘুনসি।
কসাই-ফীরাই রূপনারান আর রসুলপুর—সব খেপে গেছে।
(কাথাও একখানা নৌকো দেখা যাচ্ছে না। যারা চাল খুলে নিতে
পেরেছে, শােয়র মাচা, দরজার ঝাঁপ—তাতেই ভেসে চলেছে তারা।
যে গাছ পড়েনি এখনাে তাকেই আঁকড়ে আছে চেকের মত।
ডালটা আগে ভেঙে পড়ে তারই আতছে। আর সব জলযাত্রা করেছে,
সারি-সারি, কাতারে-কাভাবে।
কাঙালী আর হৈবতুল্লা পরস্পরের মুখের দিকে তাকায়, আর ভাবে
একই ভাবনার পাশাপাশি বসে, কোথায় তাদের জমি-জায়গা, হাল-গরু,
খলেন-খামার। কোথায় সেই বাশের এটে, কলার তেউর। তাদের
জরু-বেটি, ছেলে-ছাবাল। কোথায় সব ? একে অন্যের মুখের দিকে চেয়ে
সান্ত্বনা খোঁজে। তারা এক সর্বনাশের হিশ শাদার।
কোন
৭৩
পুত্র দেখা করতে এসেছিল স্বজনের কাছে।
সুজন আরেকখানা ঘর চেয়ে নিয়েছিল বাড়িওয়ালার কাছ থেকে।
‘
বন আমার ড্রয়িং রুমে।' বলে সুজন মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে দিল।
মসলনে না বসলে মসনদে বসতে পারবেন না।
হাঁটু দুমডে বসল পুর। বলল, একটু ব্যস্ত আছেন মনে হচ্ছে।
‘সামান্য। বাসা-বদল করছি।
‘কেন ?
বাডিওলা শাঁসালাে কোন এক ভাড়াটে পেয়েছেন। নাম বারিধি
মজুমদার। চেনেন নাকি?'
‘বাবার কাছে আসতে দেখেছি ভদ্রলােককে। শুনেছি পাটিব লােক।
কপিল মুখুজের বাড়িতে আলাপও হল সেদিন। গ্রামে নাকি খুব ভাল
কাজ করছেন। তা, এখন যাচ্ছেন কোথায়?
‘একটা বানােনুয়ারী বারেকের খুপরিতে। ভাট না দিয়ে ছিলাম
একটু স্বস্তিতে, তা সইল না কারুর।'
আমিও বাড়ি ছেড়েছি।
কই, নিনি তাে।
‘হ্যা, আছি একটা মেয়েদের হসটেলে। সৰ বামে, বােক। মেয়ে।
সাজগােজ, সিনেমা, চিঠি-লেখালেখি। ভাল লাগে না। আচ্ছা আপনার
ঐ ব্যারাকে আমার জন্যে একটা ঘর নিতে পারে ?
কি রকম যেন ক্লান্ত শােনাচ্ছে পুরীকে। দেখাচ্ছে আরাে কম,
;} প্রতিজ্ঞাতী।
নিজের স্বর শুনে নিজেই একটু চমকে উঠেছিল পুর, তাই
তাড়াতাড়ি মুখে হাসি এনে প্রশ্ন করলে শাদ। গলায়, আর কি
করছেন ?
বা, বললাম যে বাসা-বদল করছি। বাসা-বল শুনতেই আপনার
18
রােমাঞ্চ হয় না? নতুন খাত-মহর শুনলে বুক কেঁপে ওঠে না
আপনাৰ ?
‘আরাে অনেক কিছুতেই কেঁপে ওঠে। কিন্তু কাজ কি করছেন?
আপনি কিন্তু আমাকে আর ইস্কুল-মাস্টার বলে ঠাট্টা করতে পারবেন
।
লজিত বিনয়ে হাসল পুর। তা জানি। তারপর পেয়েছেন
কেননা কাজ ?
ভেবেছিলাম পাব না। কিন্তু একান্তই মরব না বলে প্রতিজ্ঞা
করেছি, তাই পেয়ে গেছি একটা। মাড়ােয়ারির গদিতে বাঙালী কেরানি।
বােক রাখি আর গুদাম থেকে মাল খালাস দিই। মােটে চল্লিশ টাকা
মাইনে। তা ছাড়া এখন আবার বাড়িভাড়া লাগবে। তবে যদি
মাড়েয়ারির আড়ত থেকে কিছু চাল-ডাল সরাতে পারি, তা হলেই
বেঁচে লই।
‘তা হলে এখন আপনাকে গদিয়ন বলব।'
‘বেনে-মুদি বলুন, ” থাকবে। তার উপর, শুনেছেন কিনা জানি
•, বিয়ে করেছি।'
রুকের ছিলাটা যেন ছিড়ে গেল। 'হঠাৎ?
‘পাকেচক্রে ঘটে গেল বিয়েটা। এই যে সেবা।' ভিজে হাত
আঁচলে মুছতে-মুছতে সেবা চলে এল ঘরের মধ্যে।
এ পুরী।
পর যেন তাকিয়ে তাকাল না। তাচ্ছিল্য করল। ভাবল,
আজেবাজে। সেই বাকের কই।
বলল, “আপনারে তা হলে আয়নার দরকার হল ?
‘আনা ? আয়না কোথায় ? খোঁচাটা বুঝতে পারেনি সুজন।
‘সেবা তত বাটির জলে মুখ দেখে সিথি কাটে।
আর আপনি আপনার বউয়ের মুখে নিজেকে দেখেন। তার জন্যেই তো বিয়ে। যাতে পুরুষ নিজেকে ডবলসাইজ করে দেখতে পারে। এমনিতে কেউকেটা, আর স্ত্রীর কাছে মহাবীর। পুত্র উঠে পড়ল। ‘মন কি। চল্লিশ টাকাটা যদি স্ত্রীর মুখের দিকে চেয়ে আশি টাকা ভাবতে পারি তা হলে তাে কিস্তি মাত করে দিলাম। এ কি, এখুনি চললেন যে? কেনই বা এলেন আর কেনই বা চলে যাচ্ছেন পুরণ দাড়াল। সত্যি, কেমন ছন্দপাতের মত দেখাচ্ছে। বললে, ‘আমি যাচ্ছি এখন বন্যার রিলিফে। ভেবেছিলাম আপনি বােধহয় বেকান আছেন, নিয়ে যাব সঙ্গে করে। কিন্তু এসে দেখছি, এখানে পুত্র হাসল, 'আপনি গদি ছেড়ে হাওদায় এসে বসেছেন। মৃত্যুর কথা কে মনে রাখছে। সেই মৃত্যুর পাহাড়। আখাম্বা জোয়ান ছিল কাঙালী আর হৈবতুল্লা, এখন মুন-ধৰ বাশের মত ঝাজরা হয়ে গেছে। শুয়ে আছে হাসপাতালের সামনে। ভিতরে জায়গা নেই। দুটি বিদেশিনী সেবিকা পলতে করে মুখের কল দিয়ে দুধ খাইয়ে দিচ্ছে। কোথায় সেই জল। এখন শুধু গরুর হাড়, মানুষের কঙ্কাল, আর দুর্গন্ধ। আব শকুনের পাখাট।
এত জলেও বারিধি বুয়ে নিতে পারল না নিজেকে। এসেছিল সে বন্যার মশানে, দুর্গতচায়। গঠন ও চালনা করল অনেক সেবাসৈন্য, নৌকোয় করে বস্তা-ব চাল, গাঁটরি-গাঁটরি কাপড়। গুড়ােনাে শুকনাে দুধ, শটিবালি, ওষুধ-পত্র। আকাকার বাইরে যে চলে গিয়েছে তার জন্য ভাত, মৃত্যুর চেয়েও নির্লজ্জ যে লজ্জ। তার জন্যে আবরণ। বাতাস একটু হালকা করে দাও এই শবগন্ধের স্পর্শ থেকে, স্বীকৃত আতনাদের ভার থেকে। খােত চালের ঘর তুলে দাও এক-আধখানা। চারের জন্যে বীজধান দাও অন্তত দু' কাঠি করে। নােনা জমি আবার মিঠেন করে তােলে। জমিতে জোর আননা ফিরিয়ে। কিন্তু কিছুতেই বাৰিধি শান্তি পায় না। মাঝে-মাঝে একটা উজ্জ্বল উত্তেজনা আসে মাত্র, কিন্তু তৃপ্তির তাপ লেগে থাকে না। ধিক্কার পরে যায়। এমন মহান যে দেশের কাজ তা দিয়েও সে নিজেকে মেজে-মেজে নির্মল করতে পারে না কেন? কেন সমস্ত পবিত্র নৃতকার্যের মাঝেও একটা আবিল কৌতুহল তাকে অন্যমনস্ক করে রাখে ? কচ্ছ দিয়েও শুকিয়ে মারতে পারে না সে সেই ক্লিন্ন কৌতুহলকে? কেন সুমন্ত একটি লিঙ্গ তার বুকে ঘুমুতে দেয় না ? এই যে দলে-দলে নিঃস্বার্থ ছেলে-মেয়ে কাজ করছে, মৃত্যু ও পুতিগন্ধের মাঝে, এত ক্লেশ আর অমর্যাদা সয়ে, কে জোগাচ্ছে তাদের প্রেরণা? শুধুই কি জুক, আত্মদর, নামের মত্ততা ? জানে না বারিধি। সে শুধু নিজেকে জানে। চিনে-চিরে দেখে নিজেকে। কেন কৃত্রিম
এত বড়
এ তার একটা সুম, নিজেকে দয়া করতে ইচ্ছে হয় এই বলে ।
নিজেরই কাছে ফের সায় পায় না। ভাবে, তার জীবনে সত্যিই দুঃখ
নেমে আষক, অবিচ্ছিন্ন কালাে রাত্রির মত, কি আশ্চর্য কোনাে প্রেম,
সমুদ্রের উপর সূর্যের আবির্ভাব। সময়ের হাতে ছেড়ে দেয় নিজেকে,
যদি পার পায় এই গলিত মাংস ও অঙ্গারিত অস্থি থেকে। যদি পায়
তার নিজের দেশ, নিজের পরিধি।
কিন্তু পথের পাশে চুপ করে বসে থাকলেই কি সে আসবে?
গলি চিনে দুপুরেই সে হাজির হল সেবাদের ব্যারাকের বাড়িতে।
দরজা খুলে তাকিয়ে দেখেই সেবা একেবারে থ হয়ে গেল।
নিতা সে কল্পনা করতে পারত না।
তােমার জন্যে আরাে কিছু টাকা নিয়ে এসেছি। বানিধি অম্লানমুখে
বললে, নাও।
টাকা। কথাটা মনে হল যেন কোন প্রিয়তম আত্মীয়ের নাম।
অনেক দিনের না-শােনা। যেখান থেকে হােক, যার হাত থেকে
হােক, টাকা টাকাই। সুজন প্রশ্ন করবে না, ছাত ফুড়ে পড়ল
নাকি মাটিতে। টাকায় কোনাে নাম লেখা নেই, আমার-তােমার নেই।
যখন যাব তখন তার। টাকা সকলের।
আপনি কি আমার কাছে ধারেন যে শােধ দিতে এসেছেন ।
দরজার পিঠ থেকে বললে।
না, তা নয়। বারিধি যেন মার খেল। তবে, কষ্টে পডেছ, টাকাটা
দিয়ে যদি কিছু সুবিধে হয় তাে মন্দ কি।
কষ্টে পড়েছি আপনাকে কে বললে? সেবা ভঙ্গিতে গরিমা আনবাব
চেষ্টা করল।
নিজেরই কাছে কথাটা ব্যজের মত শােনাল। কষ্টের ইতি-
কোথায়। দেশ থেকে শুর-শাশুডি চলে এসেছেন, শশুর ধুকছেন
হাঁপানিতে আর শাশুডি শশাকে-সুজনের পরের ভাইটি মারা গেছে বসন্ত হয়ে। ঝি-চাকর রাখবার সাধ্য নেই, পােপাবাডি অনেক দূরে চলে গিয়েছে। বায়ুহীন অন্ধকার ঘরে গুনে-গুনে নিশ্বাস ফেলছে তারা। সুজনের ঘুসঘুসে জ্বর আর তার ম্যালেরিয়া। না, তবু, কাকে কষ্ট বলে? ‘মনে তােমার যত সুখই থাক, শরীরের কষ্টটাই কষ্ট। আবার সেই শরীরই বুঝি উল্লিখিত হল এই পাণুর কৃশতায়, এই অপরিচ্ছন্ন দারিত্রে? ‘আমাদের চেয়ে ঢের বেশি কষ্ট আছে সংসানে— সেবা নির্ণয়ের যত বলে। ‘তা কি আমি জানি না ? ‘জানেন তাে, তাদেরকে আত্মীয় ভাবুন, দানে অনেক আনন্দ পাবেন।' ‘আর যাকে আত্মীয় ভাবতে হয় না যেন এ কথাটা সেবাকেই উদ্দেশ করে বলা। মানে, যাকে ভাবতে হয় না, যে আপনা থেকেই হয়ে আছে আত্মীয়। যেন অনেক অন্তরঙ্গতার স্বাক্ষর সে বহন করছে, অনেক সুদূর পরিচিতির। রক্তের চেয়েও গৃঢ় ও গাঢ় যার সঙ্গে সম্বন্ধ। শত অস্বীকাৰ সত্ত্বেও যে অঙ্গীত, হয়তাে অঙ্গীভূত। মানেটা ঘুরিয়ে দিল সে। বললে, তাকেও আনন্দ পেতে দেবেন নিশ্চয়ই। বারিধি বিমূঢ়ের মত কথাটার পুনরাবৃত্তি করল, “নিশ্চয়ই। ‘আপনি দাতার মত দেবেন পরকে প্রার্থী ভেবে তাতে তার আনন্দ নেই, অপমান। তার আনন্দ, যখন আপনার দেবার মত থাকবে না কিছু অহংকার। ‘দিয়ে-দিয়ে যদি ফুরিয়ে ফেলতে না পারি, তবে কেড়ে নাও 1
আমার থেকে। সত্যি, দাও না আমাকে শান্ত করে। বাৰিধি হঠাৎ
দু হাত প্রসারিত করে দিল।
ব্যাকুলতায় নয়, কাতরতায়। কিন্তু কে জানে এ হয়তাে নতুন ছন্দ
পাতা। নতুন সিল কাটার সুলুক-সন্ধান।
‘তার চেয়ে আপনিই আরাে অনেককে শূন্য করতে পারবেন সেবা
দরজা বন্ধ করতে যাচ্ছিল, হঠাৎ বারিধির মুখে কী দেখে থমকে গেল।
‘আমাকে একটু বসতে দেবে ভিতরে? ক'দিন ধরে আমার
হার্টটা ঠিক তাল মেপে চলতে পারছে না। একটু এখন বিশ্রাম না পেলে
হয়তাে
‘মাপ করবেন। আমি জীবানন্দের যােডল নই যে আপনার পিত
খুলে মাত্র মেপে মরফিয়া দেব খাইয়ে। অসুখ হয়ে থাকে, হাসপাতালে
চলে যান। ঢের লোক হাসপাতালে পৌছুবার আগেই রাস্তায় মরে
হুমড়ি খেয়ে।
উজ্জ্বলন্ত নিরত। মুখের মত চেয়ে থাকে বারিধি। যা ক্লিষ্ট ও
পাং তা যে এত সুধান্বিত হতে পারে তা সে ভাবতেও পারত না।
দারিদ্র্য ও রুগ্নতা যে হতে পাবে এত দীপ্তকীতি, এ নিজের চোখে
দেখেও তার অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। বারিধি অমীমাংসিতের মতাে চেয়ে
রইল। বললে, “দুঃখ তােমার অনেক, কিন্তু, বিশ্বাস তুমি করবে না,
তবু বলছি, বিশ্বাস করে, আমার দুঃখও কম নয়।
আপনার দুঃখ? সে-দুখ মেটাতে আপনার দুঃখ কি ?
কিন্তু তােমার দুঃখ থাকলে
থাক, আমার দুঃখমােচনের দাম আর আপনার না নিলেও চলবে।
আগুনের দাহ আছে তাই শুধু জানেন, কিন্তু তার পবিত্রতাও আছে,
সেটা আজ জেনে যান।
‘সেটা আজ দেখে গেলাম। আমাকে দেবে সে একটু আগুন ?
।
৮০
ধবেন যে, সে-আগুনের পাত্র কই আপনার জীবনে ? সেবা দরজাটা বন্ধ করে দিতে যাচ্ছিল, হঠাৎ বাইরে থেকে শােনা গেল বারিধির স্বর : “কিন্তু, কিন্তু এক গ্লাস জল দিতে পার খেতে ? দরজাটা বন্ধ করে দিতে-দিতে সেবা বললে, “না, পারি না। পিপাসা যেন চিরকাল আপনার মধ্যে বাসা বেঁধে থাকে, এই আমি চাই।' বারিধি নেমে গেল আস্তে-আস্তে, প্রতি পায়ে পরের সিড়িটা মারে অনুভব করতে-করতে। সরল সফরীর মত ছিল, এখন যেন হয়েছে অগাধ জলের মাছ। গ্রীমমণ্ডল থেকে চলে এসেছে মন্দোষ্ণমণ্ডলে। কমলকোমল ভাব ছেড়ে এখন সে হয়েছে রুক্ষ, শক্ত, অচিকণ। এত দিনে ব্যক্তিত্ব তার ছাদ বেধেছে। সে আজ আর কুলংক নয়, সে আজ মানসবােবর। আজই বুঝি সে ধ্যানের ও সন্ধানে। সত্যি, তাকে বারিধি ফিরিয়ে নিতে এসেছিল, তার প্রথম-পরম অধিকারে। কিন্তু এসে দেখল, অনেক দূরে সংস্কারের শিকড পাঠিয়ে দিয়ে সে কৃতজ্ঞতার নিশ্চিন্ত বৃন্তে শুভ-শুচি দুঃখের ফুল হয়ে ফুটে আছে। আর যেন তাকে ছেড়া যাবে না, ছোঁয়া যাবে না এমনি এক তীক্ষ্ণতা। সে এখন অনেক দূর-দুর্গম এমনি এক নির্জন নিবৃত্তি। বারিধির পিপাসা না মরুক, কিন্তু সেবারও দুঃখ যেন না শেষ হয়। ৮১ ১০ ‘তােমার ভয় করছে, সেবা ? ‘একটু-একটু করছে। সুজনের বাহু আঁকড়ে মুখ গুজে আছে সেবা। ‘কিছু ভয় নেই। আমরা যদি মরি, ভাবী কাল, ভবিষ্যমান পৃথিবীকে ওরা মারতে পারবে না। চাঁদ ছাড়া কেউ নেই আর বাইরে, পাথরের মত শাদা একটা স্তব্ধতা যেন আকাশ আর পৃথিবীর কঁকটা বুজিয়ে দিয়েছে। একটা কাক ঘুম-ভাঙা ভয়-পাওয়া গলায় থেকে-থেকে কা-কা করে উঠছে। শোনা যাচ্ছে বাক-বাঁধা কতলি ভ্রমরের গুঞ্জন। এই খােলা আকাশ এক দিন মানুষের কত বড় আয় ছিল, কত বড় মুক্তি। যখনই মানুষ ভুলতে চেয়েছে তার ক্ষুদ্রতাকে, এই আকাশের নিচে এসে দাড়িয়েছে। আজ সে আকাশ-প্রত্যাখ্যাত। আজ আকাশ তাকে ক্ষুদ্রাকার করে পাঠিয়ে দিয়েছে গুহার অন্তরালে। সেই তার বর্বর আদিমতায়। আজ তার আকাশপ্রদীপ গিয়েছে নিবে। আকাশ- কুমের দিন হয়েছে অন্তমিত। তবু ভেঙে যাক এই ধােপদস্ত জীবন। জীবনের যা কিছু ঠুনকো আর মেকি, বাজে আর ভেজাল, জলাে আর অ্যালজেলে। যত ঢং আর ঢামালি। যত নেকাপনা আর ন্যাতনেতে ভাব। সাজগােজ আর গােছগাছ। যত কাপট্যের পারিপাট্য। আম-সরঞ্জাম। যত জল-জোছরি। দাদন-মহাজনি। বিষ-বিষ। হামলা-হামলি। থাকবে না আর বেছর আর বেক্তিয়ার, বেকার আর বেইজ্জত।
ফিকিরে যারা ফকির সেজেছিল, সব আজ বেগতিক। এসেছে আছ তালমারের দিন। খবর রাত্রির অবসান। ‘আমরাই বা মরব কেন? বললে সেবা, অন্ধকারে চোখ মেলে। আমরাই বা মরব কেন? মন্ত্রে উচ্চারণের মত সুজন পুনরুক্তি করল। আমরা জয়ী হব। বর্বরতার উপর বড় হবে আমাদের মিত্রতা। আর সেই মিত্রতা থেকেই তৈরি হবে নতুন পৃথিবীর মানচিত্র। বার। নিজেদের চিরকাল বেবদল ভেবেছিল, দেখবে, তারাই কখন বেদখল হয়ে গেছে।' আবার শুরু হল একটা হডল। হুজুকপেয়ালা লােকের গুৰ টানাে। আবার দশ দিকে পালাতে লাগল লােক--এবার বেশির ভাগ নিম্নবিত্ত। যারা স্রোতের শ্যাওলার মত এসেছিল ভেসে, চলে যেতে লাগল খড়কুটোর মত। যাদের ঘর-বাডি নেই, আশ্রয়-আচ্ছাদন নেই, ঘরপােড়র কাঠও যাদের জুটবে না। ভদ্দরলােকেরা এবার নড়ল না, ঠেকে অনেক শিখেছে তারা, দুমড়ে-মুচডে ঠেকা-ঠোক্কর খেয়ে তারা পাতস্থ হয়েছে খানিক। বুঝেছে ঠেলার নামই বাবাজী নয়। বুঝেছে, সকল মুডিই শালগ্রাম হয় না। তাদের বল-ভরা বেড়ে গেছে অনেক। বুঝেছে, বিষ নেই, আছে শুধু কুলােপানা চক্র। তারপর, যাবে কোথায় ? ট্রেন কই ? ট্রেন কই? আগের এক হাত জায়গা এখন এক বিষতের চেয়েও কম। তারপর সেই আদিব্যাবি। এবার আবার খাদ্যাভাব। একে রাম রক্ষা নেই, তায় সুগ্রীব তার মিতা। সবংশে নিধন তবে এবার অনিবার্য। , নড়ল না তারা। বুঝে নিয়েছে এক অনিশ্চয়তা থেকে আরেক অনিশ্চয়তা কম ভয়ংকর নয়। মৃত্যুর দ্বার একটাই শুধু খােলা নেই সংসারে। যে ৰাস্তায় তাকে কেউ দেখবেও ভাবেনি সেই রাস্তায় হঠাৎ এসে সে থাবা মেয়েছে। একেবাবে দিনে ডাকাতির মত। ৮ , নড়বে না তারা। তাদের অসহায়তাই তাদের সাহস, তাদের নিৰীহতাই তাদের শান্তি। কিন্তু বাজারে হঠাৎ চালে টান ধরে। কত ধানে কত চাল কেউ জানে । কোখেকে আসে, কোথায় যায়, আদার ব্যাপারী হয়ে জাহাজের খোঁজে তাদের কাজ কি? কিন্তু হু করে চালের দাম কুড়ি টাকায় উঠেছে। কুড়ি টাকা। দেখতে-দেখতে চল্লিশ। ধানের রাজধানী যে বাঙলা দেশসেখানে কিনা চল্লিশ টাকা করে চাল। কে কবে শুনেছে জন্ম-বয়সে। ধন যাদের দেবী এমন বহু ভাগ্যবান পাটাবুক হয়ে ঘুরে বেড়ায় কলকাতায়। চাষার গােলাজাত ধান শাই করে এনে গুদামজাত করে। যার যত বড ধুতি তার তত বড় মরাই। যার যত বড় জিভ তার তত বেশি লােভ। উদ্ধৃত্তির অহংকারে প্রতিবেশীকে উপহাস করার প্রতিযােগিতা। অল্প কত জনের কত বেশি আর অসংখ্য অগণনেল কত কম—চলে শুধু তারই উলঙ্গ উদঘাটন। ‘চাল ফুরিয়ে এল।' বললে সেবা, সুজনের মুখের দিকে না চেয়ে। ‘চোখ তুলে মুখের দিকে তাকিয়ে বলল। তবু সেবা পারল না চোখ তুলতে। না, না, চেয়ে দেখ। ভয় পাবে না, চেয়ে দেখ, আশা এখনাে ফুরিয়ে যায়নি। মরব না বলে যে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম সেই প্রতিজ্ঞার আলো এখনাে জালিয়ে রেখেছি দু চোখে। শুধু চালই কি ফুরিয়ে এসেছে। আয়ু আসেনি ফুরিয়ে ? স্বাস্থ্য, প্রতিবােধের ক্ষমতা? মরব না, লড়ব-মেরুদণ্ডের এই উদ্ধতি আসছে নত হয়ে ? মুঠ থেকে কাছি খসে যাচ্ছে না ক্রমে-ক্রমে? সারা দিন টো-টো-মাতােয়ারির আডতে-গুদামে, কখনাে পায়ে হেঁটে, কখনো বা লঝর লরির ঝাকুনি খেতে-খেতেকোথায় উল্টাডাঙা, কোথায় খিদিরপুর, কাশিপুর থেকে টালিগঞ্জ-তারপর, ছাড় ছাড়া, চালান লেখা, ৮ মাল-খালাসের রসিদ রাখা—তারপর সন্ধ্যায় গদিতে ফিরে এসে টোক ফর্ণ দেখে হিসাব-কিতাৰ বুঝসমুঝ করা। মাত্র চল্লিশ টাকার বিনিময়ে। সে কি লড়ছে না বলতে চাও ? পণপণ যাই হােক, ফলাফল যাই হােক, বলল, লড়ছে সে প্রাণপণ। অন্তত এটুকু তাকে মর্যাদা দিও। কিন্তু সামান্য এ চল্লিশ টাকায় সে চালাবে কি করে? কি করে সে নিজে খাবে, খাওয়াবে আর সবাইকে বুড়ো বাপ-মা, পরের ভাইটা মরে গেলেও আছে আরেকটা ছােট ভাই আর বােন—আর সেবা। খেতে না পেলে শরীরে থাকবে কি করে বাবার প্রতিজ্ঞা, কি করে পকে করে বয়ে বেড়াবে প্রতিবিধানের প্রার্থনা ? এক অস্তের পর আরেক উদয়ের জন্যে কি করে প্রতীক্ষা করে থাকবে, রাতের পর দিন ? স যদি এখন ভেঙে পডে–ট্রামের পয়সা বাঁচিয়ে সুজন পায়ে হেঁটে চলেছে পগেয়াপটির রাস্তা ধরে, বগচটা বােরের মধ্য দিয়ে, জুতাের উদ্যত পেরেক থেকে যথাসাধ্য পা উঁচিমে-বাঁচিয়ে—তাৰছে, সে যদি এখন ভেঙে পড়ে, পুরু-পু অবসাদের ভারে, হতাশায় আর অবসানে, তা হলে যে সমস্ত পৃথিবী ভেঙে পড়ল, যুধ্যমান পৃথিবী, জায়মান জীবন। হাতের কাছি এখুনি ছেড়ে দিলে জাহাজ এখুনি বানচাল হয়ে যাবে। মন্ত জয় তার উপর নির্ভর করছে, তাদের উপর। এখুনি টলে পড়লে চলবে না, এখুনি মাটি নিলে সব মাটি হয়ে যাবে। যদি হাঁটু দুটো থেকে আসতে চায়, গ্যাসপােস্টটা আঁকড়ে ধরে কিছুক্ষণ না-হয় সে জিরিয়ে নিক। যদি খিদেতে সত্যিই আঁত শুকিয়ে দড়ি হয়ে গিয়ে থাকে, রাস্তার কল থেকে আঁজলা-আঁজলা জল খেয়ে নিক পেট ভরে। সুধাকে সে কোথায়, কত দূর নামিয়ে নিয়ে এসেছে। আগে কত কিছুর জন্যে তার খিদে ছিল, আলাে আর বাতাস, আরাম আর অবসর, এখন সেখিদে জঠরে এসে স্থান নিয়েছে, স্কুল পাকস্থলীতে। মনে হচ্ছে এর চেয়ে মহত্তর আর কোনাে খিদে নেই। এর চেয়ে নেই আর কোনটা বলবআকর্ষণ। প্রেম বললা, যুদ্ধ বলল, স্বাধীনত, বলল, খিদে না মিটিয়ে নিলে কেউ কোথাও নেই আর তােমার দিগন্তে। তখন তােমার দিগন্ত পর্যন্ত দাবানল। সমস্ত স্বপ্ন আর সাধনা সেই সর্বভক্ষের রসনা ভন্মসাং হয়ে গেছে। আর কিছু চাইবার নেই, খোবার নেই, শুধু দু মুঠো ভাত—তুষের সঙ্গে কটি অন্তত তলকণা। এই নিন পয়সা।' সুজন জানকীবাবুর দিকে একটা দু-আনি ছুডে দিল। যান, খুলেছে দোকান। ‘খুলেছে ? মৃত কাঠে যেন পত্র সঞ্চার হল। কুঁকড়ে পড়ে ছিলেন নকীবাবু, যন্ত্রণায় ঝিম খেয়ে, এবার টলতে-টলতে উঠে বসলেন। মুখে-চোখে মৌতাতের আঁচ জ্বলে উঠল । “হ্যা, কিউ করে দাড়িয়ে গেছে সব। শুধু এক কুচ করে দেবে। কাছা-বেচা সামলাতে সামলাতে জানকীবাবু ছুট দিলেন। প্রায় চার দিন ধরে চড়াতে পারেননি মৌতাত, আফিঙের শােকে চিবিয়ে- ফেলা ছােডাব মত হয়েছিলেন, এবার যেন তার কালো রক্তে লালের না, নীলের আমেজ লাগল। কিসের তােম হাবতের মত ভাত-ভাত কবছ, আমাকে শুধু এক ডেলা আফিং দাও, যদি মাত্রা চড়িয়ে দিতে চাও, আমি যাত্রা করতেও রাজি আছি। সাপের বিষ দিতে না পারে, দাও অহিফেন। বাবাকে দোকানে পাঠিয়ে দিয়ে সুজন তার টিনের বাক্সটা নিয়ে পড়ল। সেবাকে ডেকে নিল চুপিচুপি। বললে, খুলব এটা। এটার মধ্যে নিশ্চয়ই কিছু আছে। সেবাও তাই মনে করত। কি, কেন কে জানে, ভয় হল তার। বললে, “যদি এরি মধ্যে ফিরে আসেন? কোন ভরসা নেই। প্রায় এক মাইল লম্বা কিউ হয়েছে। এই কিউতে দাড়িয়ে থাকতে থাকতে গায়ের গলেই তাঁর নেশা লেগে যাবে। চাবিটা কোথায় রাখেন জান? এদিক-ওদিক একটু খোঁজাখুঁজি করে সে বললে, ‘বােধ হয় নিজের কোমরেই রেখে দেন সব সময়। কিন্তু খুলে যদি সত্যিই কিছু পাও, করবে কি? ‘করব কি? স্রেফ চুরি করব। আমরা সবাই মরব ধুকেধুকে আর উনি এমনি করে যখ আগলাবেন, এ অসহ। চাবি না পাই, চাড় দিয়েই ভেঙে ফেলব।' সুজন চেষ্টা করে দেখল, হাতের কব্দিতে তার আর সেই জোর নেই। আঙুলগুলিও কেমন পাঁশুটে, ফ্যাকাসে হয়ে তুমি জান না আমার বাবাকে। তুমি দেখছ আর কদিন, সমস্ত জীবন এই টিনের বাক্সটা তিনি আঁকড়ে আছেন বুকের কাছে। জমিদারের গােমস্ত ছিলেন, এক জীবনে কামিয়েছিলেন দু’পয়সা। করেছিলেন কিছু জমি-জিবাত, কিনেছিলেন কটা খাসতালুক। তবিল তছরুপ করেছেন বলে শােনা গেল। নালিশ-বেনালিশ সমস্ত খাজন; নাকি গাপ করেছেন। বিনা-মঞ্জুরিতে পাওনা দিয়েছেন ছেড়ে, ধূস নয়ে। আদায়ী-অনাদায়ী সমস্ত টাকার জন্যে হিসাবনিকাশের মামলা করলেন জমিদার। আর, ঐ আগুন লেগে গেল। এক তলা থেকে আরেক তলা, শাখা থেকে ফেডায়, খাই থেকে খানায়। তখনাে তিনি আফিং ধরেননি, মােকমই ছিল তার যথেষ্ট নেশা। আর, নেশা যা হয়, হয়ে উঠল সর্বনাশা। জমি-জিরাত গেল, গেল সব হুলি-মজকুরি। নিজে হলেন উকিলের মুহুরি বা মােকদ্দমার ফডে বা উক্ত-দালাল, আর আমাকে তালুকদারি বা তবিলদারির বদলে জুটিয়ে দিলেন মাস্টারি কিন্তু যাই বলল, মুহুরিদেরও তহৰি আছে, আমলা-ফয়লার সঙ্গে মাছে অনেক গ-শোকাকি। নিশ্চয়ই কিছু জমিয়েছিলেন শেষ ৮ বয়সে। হাড়কিপটে, বুকের পাঁজর খসে যাবে, অথচ বারে ভালাটা খুলবেন না। কয়লা-ভাঙা ভাঙা হাতুডি ও শক্ত এক টুকরাে ঝামা সেবা এনে দিল বনকে। চুরি করছি? যে উপহৃত্বে একদিন আমার নিশ্চিত উত্তরাধিকার তাকে নেওয়া কখনাে চুরি হতে পারে ? তালা ভাঙছি? তার চেয়ে বল না কেন খিল ভাঙছি। শুধু দরজা খিল নয়, মাটির খিল। গরলায়েক পতিত জমিতে হালচালনা করছি। কননা ক'কে কাগজ পড়ে আছে। না, কোম্পানির কাগ নয়, নয় কোনাে খত বা আগুনেট, শুধু আদালতের রায়ের ক’খানা জাবেদা নকল। যে নকলে এসে তার সমস্ত বিষয়-আশয় খেত-খামার জোত-জমি সব পর্যবসিত হয়েছে। যে নকলে আসলের আবাসখানা এখনাে ধােয়া- ধোয়া দেখা যায়। জায়গায়-জায়গায় দাগিয়েছেন পেন্সিল দিয়ে, যে জায়গাগুলিকে ভেবেছেন নিজের অনুকূলে, আর যেখানে আদালতের সিদ্ধান্তু তার বিরুদ্ধে, সেখানেই কুদ্ধ টিপ্পনি কেটেছেন। হাকিম যে নিরেট নির্বোধ আর পৃথিবী যে অরিষ্টদুষ্ট তারই প্রমাণ রেখেছেন তাঁব ওসব টিকা-ভায়ে। ধর্ম যে আসলে তারই পক্ষে তারই নির্মম প্রত্যায়ন। ৮৮ মা গাে, একটু ফেন দাও, মা এডাক এরা কোখেকে শিখল, কোন মার বন্ধনশালায় ? ঝাক বেঁধে, কাতার দিয়ে লােক আসছে শহরে, আকাশ-কালােকরা পঙ্গপালের মত। কি বলবে এদের? ভিক্ষুক বলবে, না, ক্ষুধাত বলবে? দেনদার বলবে, না, বলবে দাবিদার? ‘তুই তত বেটা পাড় পেশাদার। চা তাে দেখি ভিক্ষে। ‘চাটা ভাত দেবে ‘আর তুমি চাও তাে। একটুখানি ফেন দাও, বাবু। কোখেকে শিখল তারা এ-ডাক অন্তরের কোন অন্তস্তল থেকে? উদরের ভাষায় কে কবে শুনেছে এই আত্মার আকুতি? কোখেকে পেল তারা এ নির্লজ্জ সারল্য, এই দ্বিধাহীন দারিদ্র্যের উদঘাটন ? ধরে ও পােষাকে, চলনে ও চাউনিতে। ভীরু অথচ প্রবল, লাজুক অথচ অকপট, কোত্থেকে পেল তারা এই বাঁচবার তৃষ্ণা, মৃত্যুর অস্বীকার? ভিক্ষার সুরের ছদ্মবেশে কে আনল আজ দাবির ঘােষণা ? গ্রাম-গ্রামান্ত থেকে এসে পড়েছে সব, পায়ে হেঁটে, ট্রেনের পা-দানিতে চড়ে। এসেছে সচাষী আর সূত্রধর, মাহিয় আর ক্ষিরতাতি, কাপালি আর কয়াল। বিশি-বেহারা, কেওড়া-কাহার, করন-কাবাসী। এসেছে অভিলাষ আর হৃদয়, দীননাথ আর পঞ্চম। যুগলৰালা, ফিনােদা, শবযামিনী। মূসলমানও কি নেই? আছে। আছে গােপাল মােল্লা, ইজ আলি, দরবেশ কারিকর। সমান বিবি, জোবেদা খাতুন, গােলেহানেছা। কেউ গড় টানত, কেউ পালকি বাইত, কেউ ঘর ছাইত, জন দিয়ে বেড়াত। কেউ চাক ঘােত, জাল ফেলত, চামড়া ঘটত। জমিহীন জনমজুরের দল। কেউ গাছ বাছত, জিরেন কাটত, গাড়ি চালাত। মেয়েদের মধ্যে কেউ কাডত ধান, কেউ আড়ত চাল। কেউ চিডে কুটত, ভাজনা খােলায় ভাজত মুড়ি-খই। কেউ ঘুটে দিত, শাক বেচত বাজারে। হিঞ্চে, কলমি, পুই। দুধে চিনি না পড়লেও কেউ ভাবেনি শাকে বালি পড়বে। কেউ বাঁশের বেড়া বাঁধত কঞ্চি দিয়ে, কেউ-কেউ বা ঝুডি আর খারা, গরুর মুখে ঠুসি আর ছাগলের গলার তেকাটা। তল্লা বঁাশে কেউ-কেউ বা বানাত কুলাে-ডালা, চাঙারি- চালুনি, খেটে-পিট করে-কষে সবাই নুন-ভাত খেয়ে ছিল তার, আজ চলে গেছে জলের তলে আর চাল উঠেছে চালের চুড়ােয়। তাই তারা সব বেরিয়ে পড়েছে চালের খোঁজে চালের চালবাজিতে। ভিটে- মাটি চাটি হয়ে গেছে তাদের, গরু-বাছু কবে দিয়েছে বেচে, হাটের করার কাছে তাদের ঘটি-বাটিটা পর্যন্ত বাধা। থতমত খেয়ে গেছে তারা। জাকালাে- দয়েল বাড়ি দেখে, গাভি-ঘােডা ট্রাম-মােটর দেখে, বিলাসের লাসবেশ দেখে। ভাবতে পারেনি এমন একটা পাথুরে জায়গা। বুঝতে পারছে না, কোথায় রাখবে তাদের এ কণ্ঠস্বর, কার সঙ্গে মেলাবে? কাকে শােনাৰে এই প্রকাশ করতে না পারার দীনতা? করুণ দীনতা? এত বার মাঝে কে চাইবে তাদের মুখের দিকে , না-তাকিয়ে উপায় কী? দলে-বিদলে নােক আসছে। আমরা লােক। আবােলােক। মৌশুমি বাতাসে বৃষ্টির কণার মত। এবার শুনতে হবে কান পেতে, অন্তিমের কায়া, সদ্যোজাতের কান্না। কোণ- কানাচে অন্ধিসন্ধিতে সব জায়গায় এই কাঙালের ভিড। জায়গা ছেড়ে দিতে হবে তােমাকে, তােমার ফুটপাত, তােমার গাড়িবারান্দা। অন্ধকারে গেট খুলে বাড়ি ঢােকবার সময় অদ্ভুত দুটো দেহ না মাড়িয়ে তােমার নিস্তার নেই। ‘ও রকম কারাচ্ছ কেন? ‘বুঝতে পাচ্ছি না। ‘খাসপাতালে যাবে ? ‘শুধু যমের বাড়ির ঠিকানা নিয়েই এসেছি, হাসপাতাল কোন ঠেছে তার কি জানি? শুনে তখন তুমি তাকে হাসপাতালে পাঠাবার ব্যবস্থা করবে। তােমাকে বাধ্য করাবে। না পাঠালে কানের কাছে তার এই বীভৎস কাতরানিতে রাতে তােমার ঘুম আসবে না। প্যাকাটির মত একটা শিও মরে আছে বুঝি তােমার বােয়াকে নিচে। মা তাকে ত্যাগ করে গেছে জন্ম-কলঙ্কিত নয় বলে, মৃত্যু-কলঙ্কিত বলে। এ মরা বেরালের বাচ্চা নয় যে মেথর ডেকে বকশিস কবলে আর কাক বাড়ির দরজায় চালান দেবে। এর সংকারের ব্যবস্থা করতে হবে তােমার। খবরদারি করতে হবে। এই পীভূত মৃত্যুর পাশ কাটিয়ে যাবার আর তােমার সাধ্য নেই। মুহুর্তের জন্যে হলেও মনে-মনে তােমাকে মেনে নিতে হবে যে অঞ্চত মৃত্যুতে তুমি ওদের সমান। হকচকিয়ে গেছে তারা, গাডির শব্দ শুনে, নেভিগাের গান শুনে, মেয়ে-পুরুষের হৈ-হুল্লোড শুনে। আর দেখছে কত দোকান, কত জিনিস, কত কাপড়, কত খাবার। যারা কিনছে, তারা কেমন মণভাবেই কিনছে। যারা খাচ্ছে তাদের তৃপ্তির কোমলতায় একটুও খোচ লাগছে । সমস্তই কেমন সহজ অভ্যাসের ব্যাপার। সুস্থ লােকের গান র মতই গাগওয়া। একবার চোখ বুজে কি ভাবা যায় না, সে বদলে ১
গেছে এ লােফটাতে, জিনিস কিনছে পাকা, ঐ লােকটাতে, জিভে
মুখে শব্দ করতে-করতে খাচ্ছে যে ঐ চেয়ারে বলে ?
দুটি মেয়ে সিনেমার সামনে রাস্তার উপর অপেক্ষা করছিল তাদের
বয়ফ্রেণ্ডের জন্য। একটি নােটন-পায়রা, অন্যটি ঝোটন-বুলবুলি।
আমাদের ফুলবাড়ির ভগবালা দাসী আধখানা মুখের উপর ঘােমট।
টেনে হঠাৎ ওদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। ওর ছেলে বন্যায় গিয়েছে
ভেসে, ওর স্বামী ভিড় ঠেলে ট্রেনে উঠতে গিয়ে পা হডকে পড়েছে
চাকার তলায়। সঙ্গে আছে দুটো ছানাপােনা। একটা ঈখে,
আরেকটা হাত ধরে। বেঁকে ঝুঁকে পড়ে একটা মাই চোসে, আরেকটা
নিজের আঙুল কামড়ায়।
‘কিছু দেবে মা খেতে? এই বাচ্চা দুটো
অভ্যেস নেই কোন দিন, সুভদ কথাটার মাঝে যেন সেই সুর
মানতে পারল না। যেন এল খানিকটা লজ্জা, আর একটা কারণ
সমের অনুভব।
, ফোটাতে হবে সেই বুকফাটা হাহাকার, একটিমাত্র করুণ
সযােধন।
‘মা, মা গো-
আর উপেক্ষা করতে পারল ন্ম।
‘তিন দিন খেতে পাইনি। দেখ চেয়ে, বাচ্চাদের পেটে-পিঠে এক
হয়ে আছে।
নােটনটি উলল বােধ হয়। সে তার থলের থেকে আরেকটা ছােট
খলে বের করে একটি ডবল পয়সা তুলে নিল। আলতাে করে ধরল তার
আঙুলের ডগায়।
বোটন এল ঝাপটা দিয়ে : ‘দিনে, খবরদার দিসনে। কত দিবি
তুই এক ধার থেকে? দিয়ে কি করতে পারবি তুই? জানিস না, বার্নার্ড শ কি বলেছে? “কি ?’ নামমােহিত হয়ে তাকাল নােটন। ‘বলেছে, ভিখিরিকে সাহায্য করা মানে সংসারে আরেকটি ভিখিরি সৃষ্টি করা। মানে, যে দেবে, খালি দেবে, দিতে দিতে ফতুর হয়ে সে ফের ভিখিরি হয়ে যাবে। সুতরাং ভিখিরিকে কখনাে সাহায্য কোনাে । ভিখিমিকে প্রশয় দেয়া মানেই তাকে কায়েমী করে রাখা, তার দল বাড়ান। আর কেউ মরছে বলে আমাকে মরতে হবে এটার কোন মানে নেই। নােটন তার আঙুলের ডগা দুটি যেমন-কে-তেমন ছােট থলেতে নিমজিত করল। শব্দ না করে সাবধানে রেখে দিল ডবল পয়সাটা। সুভই এবার গেল পত্তনীকেঁাচার এক লঙ্কা-পায়রার কাছে। এত উড়-উড় উদাসীন যে দেখলে মনে হয় না, যুদ্ধের খবর রাখে, খবর রাখে এ দুর্ভিক্ষের। কে এ ভিক্ষে চাইছে, কেন এ ভিক্ষে চাইছে, ফিরে তাকাবানাে তার সময় হয় না। যেমন হাওবিল বিলি করতে এলে হাত বাড়িয়ে নেয় না সে কখনাে হাবিল। সেবাদের ব্যারাকবাড়িও ছেকে ধরেছে এই হাঘরে- হাতের দল। নামায় ফেন খুজে বেড়াচ্ছে আমাদের মােমণি। এসেছে সােনারপুর থেকে। ফুটপাতের উপর চিৎ হয়ে শুয়ে মুখের উপর মাছি গুনছে আমাদের ভূষণ ঘাসী। এসেছে মাকড়দা থেকে। আর ওকে চেন? ঐ যে হাতের চেটোতে করে দশ-পনেৰে মিনিট অন্তর জিভ ঠেকিয়ে- ঠেকিয়ে রসগােল্লার সিরে চেটে খাচ্ছে, ওর নাম দ্বিজবর রুইদাস। এসেছে বীশিবপুর থেকে। কোন দিক থেকে আসেনি বলতে চাও? বৈদ্যবাটি ভদ্রেশ্বর, সিঙ্গুর-হরিপাল, বংশৰাট-ত্রিবেণী, আন্দুল-উলুবেড়ে, ধানকুড়ে আড়বেলে, ভােমজুড়-চাঁপাডাঙা, মল্লিকপুর-বারুইপুর, মসলশপুর-গােবর ১৩
ডাঙা, ঘােসাহাপুর-শখের বাজার আছে দিকবিদিকের প্রতিনিধি।
কাকে ছেড়ে তুমি কাকে দেখবে? আর কে ঐ মরে আছে না?
হ্যা, মা-টা মরে আছে, আর কোলের শিশুটা তার বুকের উপর
পড়ে মাই চুষছে।
আর দেখতে পারি না, শুনতে পারি না ওদের কান্না। সেবা
নিজেই কেমন কাতরে ওঠে।
না, শুনে রাখ, শিখে রাখ ভাল করে। সুজন তার পাশ ঘেসে
দাড়ায় : এবার আমাদের পালা।
গত যুদ্ধে দেখা দিয়েছিল খাটো চুল আর খাটো ঘাগরা, হাত-কাটা খাটো শার্ট আর পা-কাটা খাটো প্যান্ট। এবার দেখি দিয়েছে রেশনের খলে। সন্ত্রান্ত ভিক্ষার ঝুলি। নিম্ন মধ্যবিত্তের দল। আপিস-আদালতের কেনি, আমলা-ময়লা তাে বটেই, আরাে একটু উপরের লােক। যারা বাজারে যাবার অবসর পায়নি এত দিন, যাদের সমস্ত জীবনের আভিজাত্য ছিল বা এই বাজারে যাওয়ায়, তারাও। সবাই আজ বীরের ভঙ্গিতে থলে ঝুলিয়ে চলেছে। আগে হলে প্রকাশ্যে এমন ধারা একটা বােঝা বহন করার মধ্যে থাকত লজ্জা বা হীনতার ভাব, এখন এটা গর্ব বা সৌভাগ্যের নিদর্শন হয়ে উঠেছে। যার হাতে এই থলে সেই আজ ঈর্ষণীয়। সবাইর জঠরে জলছে যে নির্লজ্জ আগুন এই কথা রাষ্ট্র করে দিতে আজ আর কাকু আপভি নেই। উপরিতন সমস্ত আপাতরম্যতার পিছনে আছে যে এই মৌল আদিম বর্বরতা তা আজ বিকট দন্তে প্রকটিত। সদাগরী আপিসে যে সুট পরে যায় তারাে হাতে আজ রসদের থলে। শুধু দু’দল বাদ পড়েছে। এক দল, যারা বসে আছে উচু দাঁড়ে, নিবিন্ন কৌলীন্যে। বনেদী বেনিয়াপনাতে। অকর্মসাধন ছাড়া আর যাদের কিছু সস্থান নেই জীবনে। বাদের কাছাকাছি ঘুরঘুর করছে ফুস নেবার মত লােক, যাদের হাতে আছে বা ঘুস দেবার মত স্বাচ্ছন্দ্য- স্বাধীনতা। ঘাঁটিতে-ঘাঁটিতে যাদের মুরুব্বি-মাতবরের পাহারা। খিড়কির ১ দরজা দিয়ে যাদের বাড়িতে এসে মাল মজুত হচ্ছে। চাল-ডাল চিনি- ময়দা তেল-মুন। ভক্ষণের চেয়ে বক্ষণেই যাদের বেশি আনন্দ, বেশি মর্যাদা। আর, কে না জানে, যে যত পবান সেই তত ভূয়মান সংসারে : আরেক দল ইস্কুল মাস্টার। জীবনে তাদের বস নেই, রসদও নেই। সংসারে তারা অবান্তর, অপদার্থ। নয় যেন তার আসল কারিকরের হাতের জিনিস। তারা খেলল, তারা নিরেশ। তারা নকল। দশটা না বাজতেই সুজন চলে যায় মাড়ােয়ারির গদিতে। সত্যি- সত্যি গদিতে। আধহাত মােটা তােষকের উপর জাজিম পাতা । দেয়ালের ধার ঘেসে তাকিয়া। তাতে ঠেস দিয়ে বসা বৃহপু মাড়ােয়ারি, তার ছেলে আর ভাতিজা। সকলের সামনেই একটা করে কাঠের বাক্স। বেনিয়ান গায়ে, পেটের দিকে বােম খােলা। গলায় সৰু সােনার হার, বাহুতে বাজুবন। উদার উদর প্রায় উধোথিত। সেই উদরের স্থেল্যে দুর্ভেদ্য নিশ্চিন্ত, মাংসল পরিতৃপ্তি। চিলের মধ্যে চড়ুইয়ের মত সেই সভায় সুজনের বসবার জায়গা, তাবাে জন্যে একটা কাঠের বাক্স, তাকিয়াটা নেই শুধু পিছনের দিকে। উত্তির পাশে উপবাস, অপচয়ের পাশে শীর্ণতাবরণীয়ের পাশে বরখাস্ত সমস্তটাই তার কাছে লাগে একটা মস্ত তামাসার মত। এক হাত দূরের লােকের সঙ্গে এক জগতের ব্যবধান। ভাবতেও কেমন অসম্ভব মনে হয়। মনে হয়, সত্যি-সত্যিই এটা তামাসা হয়ে যেতে পারে না? মুনুতে ঘটে যেতে পারে না কোনাে ভানুমতীর খেলা? যাতে এক পলকে জায়গা বদল হয়ে গিয়েছে তাদের। সুজন বসেছে অমন বিস্ফারিত উদরে, আর মাড়ােয়ারি তার ছেলে ও ভাতিজাকে নিয়ে বসে আছে চৌকাঠের বাইরে, কুঠায় কাঠ হয়ে। নিমেষে ঘটে যেতে পারে না এ ভেলকি।
শুধু চাল-ভাল আটা-চিনিই ছাড় ছাড়া নয়, কাটা হয় হণ্ডি, খাড়া আর মূতী। সাহেরবার পর্যন্ত জুতা খুলে দিতে উঠে আসতে হয়, নইলে সটান উপুড় হয়ে শুয়ে চেক কাটো বা হুণ্ডি লেখ। ৰা, লেনদেনের হিসেব যেটাও। টাকার এত গরম যে কার কাছে এতটুকু নরম হবার দরকার মনে করে না। সমস্ত হালি আদব-কায়দা আসবাব- সরগ্রামকে বেপবােয়ার মত উপেক্ষা করে, উপেক্ষা কৰাৰ মত শক্তি পায় অনায়াস। এই শক্তির উৎস হচ্ছে টা, বে-খিরকি টাকা। গদি ছেড়ে ফের চলে আসতে হয় গুদামে। কখনাে উন্টোডিঙি, কখনাে বাজেশিবপুর। জাদরেল গুদাম, অন্ধকার, তাঁতসেঁতে। উপরে টিনের চাল, নিচে ঢালা পাকা মেঝে। তার উপর সারিসারি বস্তায় গাদি মারা। প্রায় চাল ছোঁয়-ছোঁয়। কোনােটা চিনি, কোনােটা বা মূশুর ডালের। অঢেল, অপর্যাপ্ত। প্রথমটা দেখলে মনে হয় বাইরের এ অনটনটা যেন মিথ্যে কথা। এত যেখানে খাবার রয়েছে জমা করা সেখানে লােকের কিসের কি অভাব। আর কতক্ষণ তলিয়ে ভাববার পর মনে হয়, সবাইকে ডেকে নিয়ে এসে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে দি। শেষকালে অসহায়ের মত ভাবে, যদি অন্তত পারতাম কিছু চুরি করতে। লরি আসে, আসে গরুর গাড়ি। যে সব ছাড সদুরে। কুলিরা পিঠে করে মাল তােলে। প্রতি পদে তাদের পয়সা। মাল তুলতে, মাল সাজাতে, বস্তা টুটা থাকলে তা গুণাঁচ দিয়ে সেলাই করতে। এ সৰ বা পয়সা। কিন্তু মাঝে মাঝে খিড়কির দরজায় এসেও গাড়ি পাড়ায় অন্ধ গলির আকারে। সেইখানেই কালাে বাজার। সেইখানে সামান্য বুলির দাবিও অত্যন্ত তেজর। সেইখানে পয়সার চেয়ে জিনিসেরই বেশি জেয়া। ৭ লৰি যায়, যায় গরুর গাড়ি, পিছনের বস্তায় কারা হঠাৎ একটা ধারালাে শলা ঢুকিয়ে খোঁচা মারে। ফুটো দিয়ে ঝরে পড়তে থাকে চালের সরু আঁকা-বাঁকা রেখা। ঢাকা যদি কখনাে কোনাে ঢিবিতে ৰা খোঁডলে ঘ খায়, তখন ছিটকে বেরিয়ে আসে ছােট একটি বা ডেলা, হয়তাে বা আধমূঠ। পিছনের লােক অনেকদূর পর্যন্ত এই রেখা ধরে ছুটে চলে। যতক্ষণ না অনেক বস্তায় চাপা পড়ে যায় সেই ফুটো। ধীরেন সাধুখাঁও গদিতে লেখা-পড়ার কাজ করে। হাড়গিলের মত চেহারা। ড্যাবডেবে চোখে ইতি-উতি কি খুঁজে বেজায় সব সময়। বলে, হাড়ভাঙা মেহন করছি রাত-দিন, বা-বা মাল থাকতে আমরাই বা পাব না কেন ছিটেফোটা ?” সুজনকে সে স্যাঙাত ঠাওরায়। দাবির বৈধতায় সুজনও কোমর বাধে। কিন্তু মজুতদারের তহবিলে লােভ আর লাভের বাইরে আর কোনােই কপক নেই। হ্যা, ওরা রেশন দেবে না হাতি। সাধুখা নিচের ঠোটটা ভারি করে ঝুলিয়ে দিল অনেকখানি। যেমন ওর কলসি তেমনি আমরা সৱা হব। যেমনি ওরা দেবতা তেমনি আমাদের নৈবে। আমরা চুরি করব। আচ। সুজনের মনে এতটুকু আঁচড় লাগল না। মহণ, মােলায়েম। তা ছাড়া আর কি! যে থাখি, সংস্থানহীন, সে চুরি করবে না তাে কে করবে? সাধুতার ভীরুতা তত তাদের, যারা চৌধ দিয়ে গড়ে তুলেছে পর্বতপ্রমাণ প্রাচুর্যকে। যতক্ষণ পর্যন্ত ভিক্ষে পায়, বা পাবে বলে আশা করে, ততক্ষণ পর্যন্ত চুরি করে না। কিন্তু না দেবে ভাগ, না দেবে ভিকা। না খায়, না কলা। তখন কি করবে এই নিঃসম্বলের দল? ভিক্ষে করে-করে ব্যর্থ হতে-হতেই হাতের শক্তি যাবে ক্ষয় হয়ে। যেটুকু বা থাকবে তা ধু কপালে শেষ করাঘাত 'করবার জন্যে। তাই, দেরি নয়, এখুনি, বেঁচে থাকতে-থাকতেই। পারবি ? গলা নামিয়ে জিগগেস করে সুজন। না পারলে চলবে কেন ? বেঁচে থাকার মান রাখতে হবে তাে ? ঘােগ বাসা নেয় বাঘের ঘরেই। আড়তে খবরগিরি করে নিধু । তার সঙ্গে সাধুখা একদিন চোখ-টেপাটিপি করে। কাটা নেই গুদামে, তাই মাল মেপে দেবার ব্যবস্থা নেই। বস্তা ধরে মাপ, ওজনের ছাপ রয়েছে গায়ে। দু’ মণ কুড়ি বা এক মণ চলি। সে করে। বস্তা পিছু দু’সের-আড়াই সের করে ঘাটতি। ঢাল মারের হিসেবে গােড়াতেই প্রকাণ্ড মুনফা মেরে নিয়েছে মহান। তারপর মাল এসে পড়ছে, মহাজনের দারােয়ান, নিধু ভঞ্জের খপ্পরে। সে আবার বন্যা ফুটো করে আনাে দু’সের করে ঘাটতি ঘটিয়ে কোল-বতা তৈরি করেছে। কোনােটা ভরা মণ, কোনােটা বা ত্ৰিশবত্রিশের কাছাাছি। সেই সব কোল-বা বেচছে সে খাদক-খদ্দেরদের কাছে, একটু বা দরের সুবিধে করে। মূল বস্তা পাঁচ-ছ'সেরী ঘাটতি নিয়ে উঠছে গিয়ে দুটো মহাজনের মুদিখানায়। কখনাে দাড়িপাল্লা, কখনাে ৰা বাটখারার কারসাজিতে পুষিয়ে নিচ্ছে বােল পণ। চলছে এমনি চাকার ভিতরে চাকা। চুরির ভিতরে জুয়াচুরি। আড়ত-গদির লােকদের মাঝে-মাঝে নিধু ঠাণ্ডা রাখে খাইয়ে, যারা অবিশ্যি ভিতরের খবর রাখে, গুদামের মধ্যে গুদামের খবর। বিনিময়ে আণা করে মদ কিংবা মদিরার সন্ধান। এ আর বেশি কি কথা? নিয়ে যাস তােরা দু’ বা। ভােলা তাে ঘরের লােক, আত্মীয়ের সামিল। নিধু ভঞ্জ উদার ভঙ্গি করে। সুজন বলে ধীরেনের মুখের উপর : এ চুমি কোথায়? এ তাে
বীরেন চোখ মটকায়। কিন্তু জেনে-শুনে চোরাই জিনিস ঘরে
তুলেছিল, সাফাই গাইলে চলবে কেন?
‘কে বললে, আমরা জানি-ওনি? গুদাম থেকে আমাদের দিলে
আমরা তাই বাড়ি নিয়ে গেলাম। মনেমনে দোষখালনের চেষ্টা করে
তার চেয়ে বল না কেন, আকাশ থেকে খসে পড়েছে আলটপকা।
বলি, পেলি যে বস্তাটা, দাম দিয়েছিস?' ধীরেন ফের চাউনিটা তেরছা
করে : আর তােকে দান দিতে যাবে এই দুদিনে,—নিধু ভঞ্জ? লােককে
বলবার মত সাহস পাবি তুই বুকের মধ্যে?
সত্যিই। কাউকে বলা যাবে না, কেউ বিশ্বাস করবে না।
ব্যাপারটার নিসন্দেহ চুরির চেহারা। -বাবা যাই ভাবুক, সেবা
ভাবৰে যে সে চালের বস্তাটা চুরি করে এনেছে।
কেমন অস্থির করে উঠল। বললে, “আচ্ছা, কিছু দাম দেয়া যায়
? কম-সম করে ?
ধীরেন হাওয়া করে দিল কথাটা। দাম দেব কোথেকে? কাণা-
কড়ি মুবােদ আছে আমাদের ?
‘আর নিধু ভাই বা কেন যে দেয় আমাদের
‘স্রেফ ভালবেসে সায়েদ বলে। আর নিধু আশা করে, কত
দেখাবার জন্যে বাড়িতে ওকে নেমন্তন্ন করে খাইয়ে দিবি এক দিন।
‘খাইয়ে দেব ?
হ্যা, তাের সুন্দরীর রাঙা হাতের রান্না। চাউনির ফোড়ন পেলে
আলুনিও রসাল হয়ে উঠবে নিধুর কাছে।
সুজন তকননা গলায় টোক গেলে। বলে, কিন্তু তুই কি করবি?
‘আমি বিয়ে করিনি, বারও করতে পারিনি তাের মত। হঠাৎ
ৰূনের মুখ বিশীর্ণ হয়ে উঠতেই সে তাড়াতাড়ি তার কাঁধের উপর হাত
রাখল। আমার অৰিখি ভাই শােনা কথা। একদিন একটা বেনামী চিঠি এসেছিল ৰত্ৰীদাস বাবুর কাছে, তােৰ বিৰুতে। লিখেছি, তােকে চাকরিতে বাহাল রাখা উচিত নয়, তুই নাকি কোন ঘরের মেয়েকে পথে টেনে এনেছিস। বীদাস বাবু বললেন, তাতে আমার কি। আমার আড়তের মাল পথে বের না করলেই হল। আড়তের সঙ্গে আওৰতের কোনই সম্পর্ক নেই। বলে বত্রীদাসের হাসিটাও ধীরেন এই সঙ্গে হেসে নিল। কার কাছে শুনেছি এ সব ? ‘নিধুর কছে। নিধু হচ্ছে গেঁটে বাঁশ, ঝুনাে নারকেল। আগের কথায় ফিরে যায় সুজন। আর, তুই কি করবি? ‘আমি? আমাদের পাড়ার মাটকোটায় মেদিনীপুর থেকে এক কৈব এসেছে, সঙ্গে তার ভবয়সের একটা মেয়ে। এসেছে বানে ভেসে। মেয়েটাকে নাকি বেচে দেবে তার বাপ। বউনির খবরটা ভাবছি পৌছে দেব নিধুকে। ওটা অৰিস্তি আমার রঙের টেকা, শেষ পিটের খেলা। দেখি, অরে যদি হয়, দু এক বােতল খাটি যদি জোগাড় করতে পারি চুরি করাটা এর পর সুজনের কাছে অনেক সহজ মনে হল। মনে হল খেতে না পাওয়ার পাশের চেয়ে চুরি করে খাওয়াটা বেশি কলঙ্কিত নয়। খ্রীদের অমর্যাদা, পিতৃমেহের অপবিত্রতা কিছুই নয় খিদের পঙ্কিলতার কাছে। খেতে পাওয়াটাই হচ্ছে আদিম পুণ্যকর্ম। পতিটা বাতর।
১৭ থার্ডক্লাশ ঘােড়ার গাড়ির মধ্যে করে চাল নিয়ে এল সুজন। এক বস্তা। প্রায় পুরােপুরি ভর্তি। খয়রাত হিসেবে তার বত্রিশ-সেবীই একটা চালাতে চেয়েছিল নিধু, কিন্তু তার কোনখানে জল ঢেলে মাটি চটকে কাদা করতে হয় সুজন বুঝে নিয়েছে নিমেষে। একটা মেয়েকে বার কবে মনে করে আরেকটা মেয়েকে বার করে এনেছে। যেটা প্রথম বাগে এল তাকে দিয়েই প্রথম বাগান সাজানাে। দু’দিন বাদেই ছেড়ে দেবে, চটক চটে যাবার আগেই। যার জন্যে গােড়ায় মন আঁকুপাঁকু করেছিল তার জন্যে ফের চার ফেলবে। ধীবেনের কৈবতের মেয়ের চেয়ে ঢের বেশি জেল্লাদার। ধীরেন পেল বত্রিশ সের, সুজন প্রায় দু’মণ। চাল নিয়ে সুজন এমন ভাবে এল গাড়ি চড়ে সে যেন চড়া দরে কিনে এনেছে, কেনবার মত আছে যেন তার খুতির দীর্ঘ। তাই এল সে স্পষ্ট দিন থাকতে, অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে নয়। এল সে রাস্তার অনেক কাঙাল-নিরকে অলক্ষ্যে উপেক্ষা করে। সে যে বাঁচবে, সে যে মরবার দলে নয়, সেই স্বীকৃতির উজ্জ্বল জয়টিকা পরে। সেবাকে বাইরে একবার দেখতে পাওয়া যায় কিনা তারই আশায় বারিধি ঘুঘুর করছিল। দেখতে পেল ছাড়া গাডি। দেখতে পেল চালের বস্তা। গাভােয়ান ও রাস্তার একটা লােক ধরে হাত-ধরাধরি করে নিয়ে যাচ্ছে ভিতরে। বেশ ভারি ওজনের মাল। রেশনের থলে বা পুটলি-পোটলা নয়, একেবারে বস্তা। বারিধি দুয়ে দুয়ে চার করলে। শাখা থেকে চলে গেল সে শিকড়ে। আঁকড়ালে গিয়ে ধীরেন সাধুখীকে। বললে, এটাকে একটা চুরির চেহারা দিতে হবে, কাঠামাের উপর চড়াতে হবে তার পালা। কিছু টাকা গুজে দেয় তার পকেটে। ধীরেন যেন পায়ের আঙুলের উপর দাড়িয়ে আছে। এক কথায় সে রাজি। শুধু বােপ বুঝে কোপ মারা নয়, সে চায় সমূলে উন্মুল করতে। ভদ্দরলােকের মেয়ে বের করে নিয়ে এসেছে কিনা, তাই ওর বেশি জৌলুস। সেই যতই কেননা ঘূণে-খাওয়া ঝঝরে হােক। মেদিনীপুরী কৈবত-মেয়ে যতই কেননা হােক আনাজের মত টাটকা, সে রােত, চা, লজঝর। বুঝলেন মশাই, ভেজালেই আজকাল বেশি ঝাঁজ। তাই আমার বেলায় বত্রিশ সে, আর ওর বেলায় দু’মণ। ধীৰেন একেবারে গােডা ধরে টান দিতে চায়। নিধু ভঙ্গেরও ঘাড় ভাঙতে হবে, খাওয়াতে হবে উল্টোবাজি। কিন্তু মুহূর্তেই কেমন গুটিয়ে গেল শামুকের মত। ভাবল, জটিল কোনাে প্যাচ আছে বুঝি কোথাও। পকেটে টাকা গোঁজা মানেই হয়তাে হাতে হাত-কডি পরাননা। কিন্তু, না, ভয়ের নেই কিছুই। বারিধি বিনীত দেশকর্মী, পুলিশের লােক নয়। তার পথটা শাসনের নয়, সংশােধনের। তার ভঙ্গিটা রােষের নয়, সহানুভূতির। অন্যায়ভাবে যে সঞ্চয় করে আর অন্যায়ভাবে যে সংগ্রহ করে, দুইই সমান অপরাধী। শেষােক্তই বরং বেশি পাপী, কেননা সংগ্রহই সঞ্চয়ের উদ্দীপক। সংগ্রহকে বন্ধ করতে পারলে সঞ্চয় আপনা হতেই নিশ্চল, নিষ্ফল হয়ে যাবে। ঘুস যে দেয় তার চেয়ে ঘুস যে নেয়, তারই বেশি কলঙ্ক। গৃহস্থ ঘর খােলা রাখবে বলেই চোর চুরি করবে এ যুক্তি অকর্মণ্য। তা ছাড়া, শান্তি দেয়ার নীতিই হচ্ছে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। এক্ষেত্রে ধীরেন আর নিধু যখন অনুতপ্ত, তখন তাদের সতর্ক করে দিলেই যথেষ্ট হবে এ যাত্রা। কিন্তু, নিজের পাড়াতে বলা বাহুল্য ৰাৰিধি স্বজনদের পাড়াতেই ঘূপটি একটা খুপৰিতে এসে বাসা নিয়েছে—এত বড় অধম সে বাদাত করতে পারবে না। সমবন্টন ও সমভুজনের দিনে এত বড় বিধি। বিশেষত, পথে-পথে যখন এত কাতরতা, এত মৃত্যু। কার্বো বিশেষত, স্বয়ং সংগ্রাহক যখন নিজে একজন সমানীকরণের পৰকাৰ। ভণ্ডামির চেয়ে স্বচ্ছ চুরি অনেক সহনীয়। । তিন জন যখন এক পাপে লিপ্ত, তখন যে কোনাে দু জনের সংযােগ তৃতীয় জনের সর্বনাশ, বিশেষ করে তৃতীয় জন যদি বােকার মত সত্যবাদী হয়। তাই মালিক বীদাস যখন জিগগেস করলে সে এক বস্তা চাল নিয়েছে কিনা গুদাম থেকে, তখন সুজন স্বচ্ছন্দে বীকার করে বলল, ‘নিয়েছি। ‘দাম দিয়েছ তার জন্যে? তা হলে সেটা চুরি করা হল। হয়ত হল। কিন্তু আপনার চুঝির তুলনায় সেটা কিছু নয়। আমারটা যদি গােশদ, আনাটা সমুদ্র। আমারটা খিদের জন্যে, আপনারটা লােতে। মুখ সামলে কথা বলে। যে চোর, তাকে আমি রাখতে পারব না চাকরিতে। আজ থেকে তুমি বরবাদ, বরখান্ত। অতি বড় শয়তায় জন একটু হাসল। বলল, কিন্তু আপনি কবে বরখাস্ত হবেন? কবে ঘুচবে আপনার এ বড়াই? পরক্ষণেই গলায় কেমন হঠাৎ একটা মিনতির হিমেল সুর বেজে উঠল, বললে, আমি চুরি করেছি অভাবে, অভাবে নয়, বেশি খাওয়ার লােভে নয়, একাম না খেতে পাওয়ার দুঃখে। তাই আমার চুৰিটাই নিন, চাকরিটা নেবেন না। চাকরিটা নিয়ে চোর করে দেবেন না চিরকালের তে। ১•
বীমাস টলবার লােৰু নন। বললেন, যখন চরিত্রের বিরুদ্ধে
শুনেছিলাম তখনই বাতিল করে দেয়া উচিত ছিল। যার চরিত্রই নেই
তার আছে কি।
‘চাকরি ধু আমারই গেল? কোপণী সুজনের কণ্ঠ।
আর কাৰ। আর কে আছে এমন ছ্যাচড় ?
‘কেন, নিধু? নিধুই তত দিয়েছে আমাকে।
‘মিথ্যে কথা। নিধু পাশেই ছিল দাড়িয়ে, ছিলা-ছেড়া ধনুকের মত
টার দিয়ে উঠল।
আর একা আমি নাকি ? ধীরেন নেয়নি ?
‘মিথ্যে কথা। ওপাশ থেকে ধীরেন উঠল লাফ দিয়ে।
‘নিজে ডুবছে বলে হাতের কাছের সবাইর পা ধরে জলে নামানাের
ফন্দি।
সত্যিই লজায় ভীষণ অপরিচ্ছন্ন লাগছিল নিজেকে। আর কেউ
চুরি করে পার পেয়েছে বলে নিজের চুরিটাকে প্রশ্রয় দেবার জন্যে
সুপারিশ করা। আর কেউ মিথ্যার আশ্রয়ে আত্মরক্ষা করেছে বলে
নিজের সত্যভাষণকে ধিক্কার দেয়া। নিজে দরিদ্র হয়েছে বলে আর
কাউকে সেই ভাগ্যহীনতার সমতলে নিয়ে আসা।
, বাহাল থাক ওরা চাকরিতে। যত দিন পাক দুটি খেয়ে নিক।
কিন্তু এ প্রশ্নেরই কোনাে কুল খুঁজে পায়না সুজন, কি করে এ নালিশ
মালিকের কানে পৌছলাে। তাই যাবার আগে সে বললে, আমি সত্যি
কথা বলেছি, আপনিও একটা বলুন দয়া করে। কে আপনাকে জানাল
আমার এই চুরির কথাটা?
‘কে আবার। যে তােমাকে দেখেছে চুরি করতে।
ধীরেন।
সুজন তাকাল একবার ধীরেনের দিকে। তার দৃষ্টিটাকে অবশ্যতে পেল না। একটা নিশ্বাস ফেলে বললে, এই আমি শুনতে চেয়েছিলুম এতক্ষণ। যে বন্ধু ছিল সেই যে অভিযােজা হবে এ তত পুৰােনাে কথা, পুরাণের কথা। ওর এই পুণ্যকাজের জন্যে মাইনেটা ওর বাড়িয়ে দেবেন যাতে না ওরও আর চুরি করার প্রয়ােজন ঘটে। সুজন যখন বাড়ি ফিরল, তখন সে ভগ, ছি, বিধবস্ত। কলকাতার কালাে আকাশের অন্ধকার যেন ধোয়ার অন্ধকার। যেন একটা নির্বায় নির্বাল পাথর। ঘরে এখন কিছু চাল জমেছে বলে আবহাওয়াটা খানিক হালকা। এরি মধ্যে যা সম্বল তাই দিয়ে সেবা নিজেকে একটু ঘসা-মাজা করে নিয়েছে। ফুটিয়েছে একটু চেকনাই। হাসির ছিটেন দিয়ে কথা কইছে ননদ-দেওরের সঙ্গে। বাবার বুক-জতা ঠনঠনে কাশটা তরল হয়েছে। বােগ-শোেক ভুলে মা দেয়ালে পিঠ রেখে উঠে বসেছেন। সুজন তার ঘরে ঢুকে তক্তপােষের এক কোণে চুপ করে বসে রইল। নটা ফেটে গিয়ে যেখানটায় কাগজের ফালি লাগানাে হয়েছে সেদিকে চেয়ে রইল এক দৃষ্টে। ভাবতে লাগল, ঐ কাগজটা যদি ফুটো করে দেয়া যায় তা হলে আগুনের শিখাটা কি করে ? খালি কাপে, না, কঁপতে- কাপতে নিবে যায় ? রানাঘর থেকে কি কাজে সেবা চলে এসেছে ঘরের মধ্যে, কি একটা হাসির কথার জের টানতে-টানতে। উনুনের উপর ভাত ফুটছে, ওর চলায়-বলায় যেন সেই ফেনের টগবগুনি। কোণের দিকে ছায়া-মত দেখে সেবা প্রথমটা শিউরে ওঠে। অধ পলকেই ঠাহর করতে পেরে বলে ওঠে: ‘ও কি, চুপটি করে বসে আছ যে? শরীর ভাল নেই? সুজন নিঃশব্দ।
একটু ভীত একটু বা ত্বরিত পায়ে সে কাছে সরে আসে। স্বামীর
কপালে ও গলার নিচে হাত রেখে বললে, 'জর হয়নি তাে?
‘না, আর হবে কেন? সুজন হঠাৎ স্ত্রীকে দুই দৃঢ় হাতে জড়িয়ে
ধরে ভেঙে আনে বুকের উপর। কপালের থেকে কয়েক গাছ চুল উপরের
দিকে সরিয়ে দিতে দিতে বলে, “আচ্ছা, তােমাকে আমি একটুও আদর
করি না কেন বলতে পার ?
‘কে বলে কর না? গাঢ়, আচ্ছন্ন গলায় সেবা বলে ধীরে-
ধীরে।
না, করি না। হয়তাে ভাবি, আমি গরিব, নিরন্ন, আমার প্রেমে
গদগদ হবার অধিকার নেই। কিম্বা হয়তাে ভাবি, এখন যুদ্ধ, প্রেম নিয়ে
আনন্দ করবার সময় নয় এটা। ভুল, ভীষণ ভুল করি আমরা।
আমাদের এই তত সময় এই অসময়। আমরা যারা বঞ্চিত, অৰীত
‘ছাড়াে, ছাডাে কে দেখে ফেলবে।
‘জানােনা, সেবা, আমার চাকরিটি আজ গেছে। কাজ থেকে ছাড়িয়ে
দিয়েছে আমাকে।
স্পর্শের এত প্রাবল্য দিয়েও সেবাকে আঁকড়ে রাখা গেল না।
কখন শিথিল ব্যবধান নেমে এল দুই বুকের মধ্যে। স্পর্শের এত তাপ
দিয়েও শান্ত রাখা গেল না তার বুকের স্পন্দনকে, হঠাৎ কখন হি
নির্জীব হয়ে এল। অনেকক্ষণ পর দমিত একটা আর্তনাদের টুকবাের
মত ছুটে এল একটা প্রশ্ন : কেন?
‘ও কটি চাল চুরি করেছিলুম বলে।
‘চুরি করেছিলে?
‘হ্যা, তুমি তাে আগেই জানাে, চুরি করেছিলুম। নইলে অতগুলি
চাল একসঙ্গে কেনবার মত আমাদের সঙ্গতি কোথায় ?
হ্যা, সেবা আগেই জানত বৈকি। অন্তত বুঝতে পেরেছিল তাে
১৭
নিশ্চয়। তবু কথাটা সুস্পষ্ট রূঢ়তায় উচ্চারিত হতে নিজেৰে অলক্ষ্যে শিউরে উঠল একবার। তবু তােমার মনে হচ্ছে না সেবা ঐ চুরির চেয়ে এই চাকরি নিয়ে যাওয়াটা ঢের বড দুফতি? ঢের বড় অপরাধ? সুজন বােধহয় আবার ব্যাকুল হাত বাড়িয়েছিল, জলের নিচে নােঙৰে আৰয়ে। কিন্তু সে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেল ছিটকে। তার আলিঙ্গন কলঙ্কিত বলে নয়, হাড়ির ফেন উনুনের আগুনে উথলে পড়েছে বলে। চুরি-করা চালের স্বাদ কোন অংশে ফিকে বা পানসে নয়। তার ক্ষুধাহরণের ক্ষমতায় নেই এতটুকুন্নত। সেবা চলে গেলে সুজন শুয়ে পড়ল তক্তপােষে, আদুড় কাঠের উপর। পৃথিবী কি তারি জন্যে তার কাছে খারিজ হয়ে যাবে? সে কি আর পৃথিবীকে অনুভব করতে পারবে না সুন্দর বলে, আমুফর বলে ? জীবনসাধন ৰলে? তার জীবনে নেমে এসেছে যে প্রেম, যে স্পন্দন তাকে সে অস্বীকার করবে? যত্যুর হতে হতে দেবে বাজেয়াপ্ত ? তা ছাড়া আবার কি! যে হবে তার চিত্তের আরতি, সে হয়ে আছে কিনা সামান্য ভূতিজীবিনী। যে হবে তার পরিচায়িকা তাকে সে পরিচারিকা করে ছেড়েছে। ক্ষুধার এত ধার যে দূৰধার কামনাকে পর্বত থেতাে করে দেবে। এই ভাবে হারবে সে বর্বর ক্ষুধার কাছে, অর্পিত দারিদ্র্যের কাছে? পেটে দ পড়েছে বলে বুকও কি তার পূর্ণ হয়ে থাকবে। যাতে তার ভাগ নেই বলে প্রেমেও কি তার অধিকার থাকবে না। প্রেম তার দুয়ারে দাড়িয়ে থাকবে উপবাসী প্রার্থনার মত? অপরাধী প্রতীক্ষার মত? নইলে সেবাকে সে নিবিড় করে গ্রহণ করে না কেন? কেন আচ্ছাদন করে না তার বিপুল বাহুছত্রে। তার হয়তাে মনে হয়, কাব্যে ও ১৮
old hors
কামে তার সমান অধিকার। যেহেতু সে খাত সেহেতু সে বর্জিত,
বহিত। সেহেতু তার পৃথিবীকে ভালাে লাগবার পর্যন্ত কোনাে
মিত্ব নেই।
কেন, কেন এই নতিস্বীকার ?
ভেজা হাত আঁচলে মুছতে মুছতে সে ঘরে ঢুকলে পিছন থেকে
ধরেফেলা ক্লান্ত কয়েদীর মত। কোন কথা না বলে বসল এসে জনের
পাণে।
তার একখানা হাত ধরল সুজন। তপ্ত পরিপূর্ণতায়। অন্ধকারে মুখ
তার স্পষ্ট দেখা গেল না। তবু তার এই নীরবতায় যেন অনেক সাহস
অনেক হে অনেক সামর্থ্য সে স্পষ্ট স্পর্শ করতে পারল।
বলল, ওরা আমাদের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র করেছে, সেবা। ওরা
চায় ল, আমরা বেঁচে থাকি, জীবনে বহন করি কোন অহংকার। অন্তত
ভালােবাসার অহংকার। ওরা চায় আমরা মরে যাই, হেরে যাই, দূর
হয়ে যাই। বলল, তাই যাব আমরা?
না। সেবা বললে দৃঢ়, অথচ শান্ত কঠে
না, আমরা মরব না, হারব না কিছুতেই। ওদের সমস্ত জারিজুরি,
সমস্ত জবরদস্তি ভেঙে দেব আমরা। শত অত্যাচারে বেঁচে থাকব।
পারব না বেঁচে থাকতে ?
খুব পারব।' স্বামীর স্পর্শময় গেহােজ্জালে ধুয়ে যেতে-যেতে সেবা
বললে, 'আমি আছি তােমার
শ এখন দু’জন।
আমরা বহুজন।
P ৩ .
১০
১ না, মা, আপনি না, আমি যাব।' সুজনের মা, জগদ্ধাত্রী, দেশের বাড়ি থেকে ফিরে ছেলের পাশে বউ দেখে প্রথমটা ভয়ানক বিরূপ হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ক’দিনেই টের পেলেন এ বউ ছাড়া সংসার একদিনও চলবার নয়। রােগে-শােকে তার হাত পা অচল, বুকের ভিতরটা একটু হলেই ধ্বক-ধ্বক করতে এ দুঃসময়ে সেবা এসে কাধ পেতে না দিলে কেউ দাড়াতে পারত না। রাঁধুনি-চাকরানির সমস্ত কাজ সে একা করে, এক হাতে। সাত চড়েও রা কাড়ে না। এত যে ক্লান্তি এত যে ব্যর্থতা, অ মুখের উপর নির্মল একটি শান্তির ভাব রাখে ফুটিয়ে। দুদিনের অবসানের আভাস। দু' দিনেই জগদ্ধাত্রীর ভঙ্গিতে ভাঙন ধারল, ত্যা চোখ সােজা করে তাকালেন আর মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তিনি নিজেও কখনাে এমন বাছুনি করতে পারতেন না। তার ছেলে যে কোন দিন মামুলি ধরনের বিয়ে করে নগদ টাকা বা গয়নাগাটি আদায় করবে এমন ভরসা তার ছিল না। বরং, যে রকম হাওয়া বইছে উত্তরে, বিদঘুটে কি কাণ্ড করে বসে, কোন অজাত-কুলাতের মেয়ে নিয়ে আসে ঘরে, সেই ভয়ে তিনি তটস্থ ছিলেন। কিন্তু এ কী আজোড়-জোড়ন! পথ ভুলে মরুভূমির দেশে চলে এসেছে যেন জলরেখা। তবু এমন ভাৰ যেন কি অপরাধ করে আছে। যেন আর কাৰু তাতে বসাচ্ছে ভাগ, আর কাকু জায়গা দিয়েছে ছােট করে। উপস্থিতিতে এতটুকু তার উচ্চারণ নেই। নেই কোনাে কর্তৃ, এতটুকু আত্মঘােষণা।
বিরক্তিহীন, প্রতিবাদহীন, নেই এতটুকু বা ভাগ্যের কাছে অভিযােগ। অন্ধকার কোণের সংকীর্ণ আশ্রয়টুকু যে সে পেয়েছে তাইতেই সে পরম ধন্য। তার সমস্ত কাজ যেন পূজা, সমস্ত সহন যেন উৎসর্গ। যেন অনেক কমা অনেক দয়াৰ সে প্রত্যাশী। মূর্তিমতী বা সে। হাত দিয়ে হাতি ঠেলছে। ডুবন্ত নৌকোর খােলে যে জল উঠছে তাই সে সেছে ছিন্ন আঁচলে। টলবে না, দমবে না, পিছু হটবে না। বিনা যুদ্ধে মাটি দেবে না সূচ্যগ্র। চোরাই চাল কৰে গেছে ফুরিয়ে। এখন সম্মুখ যুদ্ধে কিনতে হবে কনট্রোলের দোকানে। মাথাপিছু আই সের। প্রশ্ন উঠেছে : যাবে কে? জগদ্ধাত্রী না সেবা ? স্বজনের ছােট ভাই রাজন কোন সাত-সকালে বেরিয়ে গেছে কয়লার খােজে। কখন ফেরে তার ঠিক নেই। সুজন এখন একটা সাবান ও গন্ধ-তেলের এজেন্সি নিয়েছে, রেশনের থলেতে মাল নিয়ে বাড়ি-বাড়ি ফিরি করে। মাইলের পর মাইল হেঁটে পায়ের অতত ছিড়ে গিয়েছে তার। কাশিটা বেড়েছে ক’দিন ধরে, হাডের অর ভেসে উঠেছে চামড়ার বিছানায় শুয়ে আছে কুঁকড়ে। কাটা-কাটা শুনছে করুণ উপর। কথাবার্তা। মা বলছেন, ‘তুমি বউ মানুষ সেবা উঠল আপত্তি করে, যেমন ন তেমনি দৃঢ় : আপনি বুড়ো মা, বােদ মাথায় করে আপনি দাড়াবেন গিয়ে লাইনে? আর সেই চাল ফুটিয়ে মূখে তুলতে হবে আমাদের? পারবে তুমি? অনেক অনিচ্ছা ও অনেক অসহায়তায় প্রচ্ছন্ন এই প্রশ্ন। ‘পারলে আমিই পারব। কষ্ট বা ক্লান্তি কিছুতেই আমাকে কায়দা করতে পারবে না। আর এতে তাে অসম্মান কিছু নেই আমার। ১১১ আমার রি ভাে আর আমার সমান নয়, আমাদের সমাজের সমান। পরে গেল সেবা খানের কাছে। ‘আমি যাচ্ছি কনট্রোলের দোকানে। আড়াই-সেব করে চাল দেবে শুনেছি। দোকান খুলবে দশটায়। আলাদা লাইন আছে মেয়েদের। এ কি, বি সেজে নিলে না? ‘বি-র আর বাকি কি! পরনে ছেড়া ময়লা শাড়ি, হাতে গালার চুড়ি এক গাছ করে, কোথাও আর ভােমার সান্তাের উল্লেখ রাখিনি। কিন্তু তােমার মূখখানা? তােমার চেহারার চাৰু ? ‘দুঃখেৱ দিনে আমাকে তুমি আর হাসিও না। সকলের চেহারার ভেতর থেকে একই কাল রয়েছে উকি মেরে। একই অভ্রান্ত পরিণতি। সুজন খানিকক্ষণ মুখের মত তাকিয়ে রইল সেবার দিকে। বললে গাচ গলায়, তুমিই যাবে সত্যি? “নিশ্চয়, আমিই তাে যাব। তুমি ভূলে গেছ, তােমার মা, সেদিন তুমি যা বলেছিলে আমার বুকের মধ্যে মুখ রেখে ? আমরা মরব না, আমরা হারব না, আমরা হট না এক চুল। কিসের ভােমার ভয় ? তুমি কি আজো সন্ত্রাত? কাটা কান যে ঢাকবে তােমার চুল আছে ? ‘আমি সে-কথা বলছি না। আমি বলছি, তােমার ভীষণ কষ্ট হবে। ‘কষ্ট? না-খেতে পেয়ে তিল তিল করে মরার কষ্টের চেয়েও কি বেশি? ‘সে-কষ্ট নয়। আমার মনে হচ্ছে কি জান, শেষ পর্যন্ত তুমি আনতে পারবে না। হয়, তােমার পৌছুবার আগেই চাল ফুরিয়ে যাবে, কিন্তু ঠায় দাড়িয়ে থাকতে-থাকতে টলে পড়ে যাবে তুমি। পাটলুক, তবু যেন প্রতিজ্ঞা না টলে। আমি যাব। আমি চেষ্টা ১১২ করব। বাঁচবার মহান চেষ্টা করব আমি।' বাক্স থেকে শুনে-গুনে পা বের করে আঁচলে আঁট করে গিট দিল সেবা। ‘বি ভেবে তােমাকে যদি কেউ রাস্তায় অপমান করে? ‘কে অপমান করবে? কিসের অপমান? যে কুকুরের ছাল নেই তার নাম আবার বাবা । যে গরিব, তার আবার সমান! ছায়ায় তুমি ভূত দেখােনা দয়া করে। ও-সব ঠুনকো সৌখিন জিনিস এবার বাদ দাও। আঁচলটা সেবা শক্ত করে জড়িয়ে নিল কোমরে। লম্বা লাইন হয়েছে দুটো। একটা পুরুষের, অন্যটা মেয়েদের। এৰি মধ্যে দুটো-তিনটে করে মােছ নিয়েছে। সেবা দাড়ালে গিয়ে তার লাইনে, লাইনের শেষে। মনে হল না, দিনের শেষেও পৌছুতে পারবে দোকানের চৌকাঠে। তবু ভরসা পেল, যখন দেখল তারও পিছনে মেয়ে- ছেলে এসে জড়াে হচ্ছে মে-জমে। উলটো দিকে পুরুষের লাইনটাই সেবা লক্ষ্য করছে তখন থেকে। বিশেষ করে ঐ পুরু কাচের চশমা-পরা আট-ন বছরের ছেলেটির নােদে- অর্জর কাতর মুখখানির দিকে। এই দু'ঘণ্টায় সেবা হয়তাে কুড়ি হাত এগিয়ে এসেছে, কিন্তু ঐ ছেলেটি দু’পা এগুতে পেরেছে কিনা সন্দেহ। ভিডের চাপে দুই হাত বুকের উপর লেপটানাে, কপালের ঘাম পড়ে চশমার কাচ ঝাপসা হয়ে এলেও তা মুছে নেবার তার শক্তি নেই, অবসর নেই। সমস্ত সংসার তাকে প্রতিনিধি করে পাঠিয়েছে, নিজের স্বল্পতম আরামের জন্যেও সে তার মহান দায়িত্বে এতটুকুও শৈথিল্য আনবে না। মেয়েদের দিকে পক্ষপাতিত্ব দেখান হচ্ছে। উপায় নেই। কিন্তু হােট ছেলেদের জন্যে যদি আলাদা একটা লাইন থাকত, সেবা কান্তি পেত অনেক। অন্তত ঐ চশমা-পরা ছেলেটিকে যদি সে নিয়ে আসতে পারত তার নিজের লাইনে। সম্ভব নয়, খাকি পােবাকে অনেক কবির ১৩ তদারক চলছে। এমন তদবির-তারক যে অনেক পেয়ারের লােক পিছনের দরজা দিয়ে মাল নিয়ে যাচ্ছে লুকিয়ে-লুকিয়ে। কেউ কেউ বা চলতি মােটরে তুলে নিয়ে, লাইন ছত্রভঙ্গ করে দিয়ে। ‘পিছনের লােককে সাবধান। দেখাে যেন পকেট কাটে না।' ছসিয়ার করে দিচ্ছে। নেংটার আবার বাটপাড়ের ভয়। ‘কৌপিনের আবার পকেট। ‘গাঁয়ের নাম তেঘরে, তার আবার উত্তরপাড়া। আরাে একটা মােট আসছে গলির মধ্যে। লাইনে জাগছে আবার নড়া-চড়া। মােটরটাকে একটা মসৃণ মুক্তি দেবার জন্যে লাইনগুলি দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে, ত্যাড়াবাকা হয়ে পড়ছে। ভিড়ের চাপে তাগবাগ ঠিক থাকছে না। হঠাৎ সে লক্ষ্য করে দেখল, চশমা-পরা ছেলেটি ছিটকে বেরিয়ে এসেছে লাইন থেকে। সেবার হাত-পা সেধিয়ে গেল পেটের মধ্যে আর বুকটা দমে গেল দশ হাত। এত বড় একটা বিয়ােগান্ত ব্যাপার সে কল্পনা করতে পারত না। চোখ চেয়ে দেখতে পাচ্ছে না সে এত বড় একটা নিঃসহায় ব্যর্থতা। ছেলেটা শূন্য স্তব্ধ চোখে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল সে শ্রেণীবদ্ধ নিষ্ঠুরতার দিকে, তারপর ফের লাইনের পিছনে গিয়ে দাড়াল। সেবা যখন চাল পেল তখন বেলা তিনটে। তার নেবার কিছুক্ষণ পরেই দোকান গেল বন্ধ হয়ে। ঘাড় ফিরিয়ে সেবা তাকাল একবার সে ছেলেটির দিকে। দােকান বন্ধ হবার খবর তখন তার কাছে এসে পৌছােয়নি। তখনাে নতুন উদ্যমে সে প্রাণপণে ভিড় ঠেলছে। গলি থেকে বেরিয়ে আসতেই গ্যাসপােস্টের নিচে কাকে দেখে সেবা থমকে গেল। কে-একজন বুজে-মতন লােক দাড়িয়ে আছে থামে হেলান ১১০
দিয়ে। যেন মাটিতে পড়ে যেতে-যেতে সামলে নিয়েছে কোনােরকমে।
গায়ের জামা দিয়ে বুকের বিধবস্ত পাজয় ক'খানাই সে ঢাকেনি, ঢেকেছে
অনেক পরাজয় অনেক লাঞ্ছনার ইতিহাস। কেঁদে-ককিয়ে যা বলতে
পারছে না যেন তারি নিরুচ্চার অভিব্যক্তি। সেবা ভেবেছিল ক্ষুধিত
জনতার এমনি হয়ত নির্বিশেষ প্রতীক, কিন্তু ঠাহর করে চেয়ে দেখল,
তার বাবা, ভূষণবাবু। হাতে রেশনের থলে।
মাটির মধ্যে সেখােনন কাকে বলে মাটির উপর দাড়িয়ে থেকেই
বুঝতে পারল সেবা, এগুতে পারল না। পিছুতেও পারল না। ফাদে-
পড়া ইদুরের মত নিঃঝুম হয়ে রইল।
ভেবেছিল, বাবাই হয়তাে সরে যাবেন। ঘণায় না হয়, লজ্জায়।
রাগে না হয়, বিরাগে। কিন্তু, না, এগিয়ে এলেন দু’পা। আশ্চর্য,
তাই অভিমূখে। নিঃসঙ্কোচে বললেন, ‘পেলি তুই?
পেয়েছি।
‘আমি পেলাম না। আমিও গিয়ে পৌছুলাম দোকানের কাছে,
আর দোকান বন্ধ হয়ে গেল।
সকল প্রশ্নের আগের প্রশ্ন, চাল পেয়েছিস কিনা। কেমন আছিস,
কোথায় আছিস, কি ভাবে আছিস—এ সব কোনাে প্রশ্নই আজ আর
প্রধান নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, খিদে মেটাবার জন্যে চাল পেয়েছিল কিনা
দু’মুঠো ?
এখন কি করি? কখন আবার দোকান খুলবে কে জানে।
বাডিতে কি একেবারেই চাল নেই ? সেবা তার হাতের থলেটা
শক্ত করে ধরে রইল।
কাল রাত থেকে নেই। কাল রাত থেকে সবাই আমরা অভুক্ত।
কেমন ভিক্ষুকের মত কণ্ঠস্বর ভূষণবাবুর।
‘আমার থেকে কিছু নেবে? সেবা ব্যাগের মুখটা খুলে ধরল।
১১৫
লােভে এলে উঠল ভূষণবাবুর চোখ। বললেন, ‘দিতে পারবি? ‘কিছুটা পারব হয়তাে। ‘তাই দে মা, লহী, যতটা পারিস বাবার চোখের দিকে সেবা তাকাল আরেকবার বিম্মিতের মত। স্বণা নেই, রাগ নেই, বিতৃষ্ণা নেই—আছে শুধু ক্ষুধা। সেবা ব্যাগটা আস্তে-আস্তে কাৎ করে ধরল। ভূষণবাবু দুখের তালিকাটা দীর্থ করে তুলতে লাগলেন। তিনি, সেবার মা, সেবার ছােট- ছােট ভাই-বােন সবাই না খেয়ে আছে, উপবাসের উপরে আছে নােগ, বােগের উপরে আছে ডাক্তারের ক্ষুধা। সেবার হাতের ব্যাগটা ক্রমশ উপুড় হতে লাগল। ‘বেঁচে থাক মা, বেঁচে থাক মা' শ্ৰীভূষণবাবু উদ্দীপনা জোগাতে লাগলেন। এক সময়ে হঠাৎ তার অভূক্ত স্বামীর কথা মনে পড়ে গেল, তার অভুক্ত দেওর-ননদের কথা। ব্যাগটাকে তাই সে ফের ক্ষিপ্র হাতে সােজা করে তুলল। ‘বাঁচালি মা আমাকে। কি বলে আশীর্বাদ করব তােকে—ভূষণবাবু বিড়বিড় করতে-করতে কেটে পড়লেন। মেয়েকে ফেললেও ফেলতে পারলেন ফেলতে পারলেন না তার দেয়া এই ততুল-ভিক্ষা। অবস্থাটা আগাগােড়া উপলব্ধি করবার আগেই কে আরেকজন তার কাছে এসে দাড়াল। বললে অনুযােগের বরে, সব কটি চাল দিয়ে দিলে এমনি করে? এটা ভাল হল ? ‘ও। আপনি? চোখ চেয়ে বারিধিকে দেখতে পেয়ে সেবা কাঠ হয়ে গেল। বললে, আপনি এখানে? আপনিও লাইন ধরেছিলেন नादि। ১১৩
না। দূরে দাড়িয়ে-ড়িয়ে দেখছিলাম। দেখছিলাম এত পরিশ্রমের
জিনিস কত সহজে বিলিয়ে দিলে এক পলকে
বা, বাবাকে দেব না?
‘দেবে বৈকি। যে বাবা অমানুষিক ভাবে মেরেছিল একদিন, আয়
থেকে বার করে দিয়েছিল নির্ণয়ের মত, তাকে না দিলে চলবে কেন?
বামায়ণ-মহাভারতের মান লে রাখতে হবে।
আয় থেকে একা ধু বাবাই বার করে দেন নি।
আমিও দিয়েছিলাম। আমি তা জানি। আমার জীবনে সে একটা
প্রকাও ভুল হয়েছিল। তখন বুঝিনি, এখন বুঝতে পারছি। দিনে দিনে
তিলে তিলে বুঝতে পারছি। আচ্ছা, আমি যদি খিদেয় মরতে বসতাম
এখানে এই পথের পাশে, তবে আমাকে তুমি ভিক্ষা দিতে?
জানি না। হয়তাে দিতাম। ক্ষুধায় মরতে দেখলে হয়ত দয়া
হত। জানি না। কিন্তু আপনি তাে আর বসেন নি মরতে।
‘সংসারে লােকে কি মরে শুধু এক কুথাতেই ? আমার ক্ষুধার
যন্ত্রণাটা কি কিছু কম ?
‘পেটের ক্ষুধার তুলনায় কিছুই নয়। আত্মার ক্ষুধাটা হচ্ছে বিলাস,
আনলীলা। এক রকমের সভাগ। কার সঙ্গে কার তুলনা!
সেবা হাঁটতে লাগল তাড়াতাড়ি করে। পাশে-পাশে চলতে লাগল
বারিধি।
‘আপনি কোথায় চলেছেন ? সেবা বিলকিয়ে উঠল।
“তুমিই বা পালাচ্ছ কার থেকে ?
‘পাপের থেকে পালাচ্ছি।
কিন্তু খিদের থেকে পালাতে পারছ কই ? চলেছ যে হনহন করে,
কী নিয়ে চলেছ তােমার অভুক্ত স্বামীর জন্তে,
এড়ির জন্য ?
রামায়ণ-মহাভারত তাে ওদিকেও ছিল।
১১৭
‘চাল এখনাে আছে খানিকটা শূন্য দৃষ্টিতে সেবা একবার তাকাল
খলের মধ্যে।
‘এক গ্রাস করেও সবাইর হবে না। শােনন, দাড়াও, আমি
তােমাকে চাল দেব।
‘চাল? নিজের অলক্ষ্যে সেবা দাড়িয়ে পড়ল।
হ্যা, যত চাও। মজুত আছে আমার কাছে। যদি বলাে তাে,
পাঠিয়ে দিতে পারি এক বস্তা।
সেবা হাঁপাতে লাগল। যেন সে আর পায়ের উপর পাড়িয়ে থাকতে
পারছে না। প্রচণ্ড ভারের পেষণে ভেঙে নুয়ে পড়ছে, ধেৎলে গুলাে-
গুড়ো হয়ে যাচ্ছে। চাল। চালের পাহাড়। থালা-ভরা তাল-তাল
ভাত। লােভ-উজ্জ্বল উন্মুখ কতগুলি চক্ষু। লালাক্লিন্ন কতগুলি
মুখবিবর। সর্বোপরি সেবায় আত্মল জয়গৌরব। তার প্রতিষ্ঠার
সাফল্য।
অনেক টালমাটাল করে সামলে নিয়েছে সেবা। বললে, না, দরকার
নেই।
বাজে বােকো না। আত্মীয়ের মত করে ধমকে উঠল বারিধি
‘তােমার চালের দরকার নেই? তুমি কি পাগল? ঘরে এতগুলি
অভুক্ত প্রাণী তােমার মুখ চেয়ে বসে আছে, তবু তুমি ফিরবে খালি
হাতে? ফিরতে ভাল লাগবে তােমার ?
‘চাল—আপনার চাল আমরা নেব কেন?’ সেবা তাকাল প্রায়
মুটের মত।
‘চাল যাই হােক, চাল তাে বটে। চালের মালিক অবাঞ্ছিত হতে
পারে, কিন্তু চাল তাে অবাহিত নয়। বারিধি সঙ্গে-সঙ্গে চলল আরাে
কয়েক পা, পদক্ষেপগুলি যদিও এখন মরতর : ‘এ চাল ফিরিয়ে
দেবার তােমার বিন্দুমাত্র অধিকার নেই।
১১৮
‘কত লােকই তাে পায়নি। কোনাে দিন পাবে কিনা তাও জানে না। খালি-হাতে তারাও তাে এক সময় ফিরে যাবে। তারাও তাে বসবে গিয়ে মৃত্যুর মুখখামুখি। ‘কিন্তু তুমি ভরা-হাত ইচ্ছে করে খালি করছ। পাওয়া জিনিস সাধ করে ফেলে দিচ্ছ মাটিতে। তােমার সংসারের লোেকদের বাঁচাবার সুযােগ পেয়েও বাঁচাচ্ছ না তাদেরকে। এক পাপের থেকে উদ্ধার পাবার ওজুহাতে ঝাঁপ দিয়ে পডছ আরেক পাপে, গভীৰতর পাপে। কতগুলি নিরীহ দুর্বল প্রাণীর তুমি অকারণে মৃত্যু ঘটাচ্ছ। তােমার বিবেকে এসে লাগছে এখন হত্যার কলঙ্ক। না, না-খেয়ে মরব, তবু আপনার থেকে নিতে পারব না চাল। সেবা কট ভঙ্গিতে স্পষ্ট দাড়িয়ে পড়ল। “তুমি নিজেই বুঝতে পাচ্ছ, কোনই কৃতিত্ব নেই এই অস্বীকারে। বারিধিও দালাল তার ভঙ্গির স্পষ্টতায় : আমি তােমাকে নগদ টাকা দিচ্ছি না, চাল দিচ্ছি।” জানি। কিন্তু বিনা দামে দিচ্ছেন না। ‘বিনা দামে দিচ্ছি না ? না। এ দেওয়ার পিছনে আছে আপনার ক্ষতিপূরণের লালসা। আমাদের গ্রাস আচ্ছাদন করতে গিয়ে নিজের গ্রাস রেখেছেন উদ্যত করে। নিজেদের ক্ষুধা মেটাতে গিয়ে, আপনার ক্ষুধাকে আমরা প্রশ্রয় দিতে পারব না, কিছুতেই না।' সেবা আবার পা চালাল। ‘শােনন, দাড়াও। বারিধি আবার তার পিছু নিল : ‘দাম অবিশিই চাই, কিন্তু অত ছােট করে দেখ না আর আমার চাওয়াটাকে। এক দিন যে-দাম দিতে চেয়েছিলে সেই আমার সত্যিকারের দাম। শুনে রাখ, বলতে আমার দ্বিধা নেই, তার নাম প্রেম। পাশাপাশি চলতে লাগল দু’জন : ‘এক দিন তার মান রাখতে পারিনি তাই সে অমন নির্মমর ১১১
মত প্রতিশােধ নিচ্ছে আজ। তাকে এক দিন ফিরিয়ে দিয়েছিলাম বলেই
সে চিরদিনের জয় মিথ্যে হয়ে যায় নি।
আমি দু বলে আমাকে এমন নির্যাতন করবার আপনার অধিকার
নেই। সে কান্নাভরা চোখে বললে।
আর, তােমারই কি আছে এমন দুস্থ থাকার অধিকার ? এমন
নিৰাতিত থাকৰাৰ ? চাল তােমার ফিরিয়ে দিলে চলবে না, কিছুই
তােমার ফিরিয়ে দিলে চলবে না। যেখানে তুমি যাচ্ছ সেখানে শুধু
একটা কৃত্ৰিম কৃতজ্ঞতা, প্রেম নেই এতটুকু, সেখানেই পাপ, দারিদ্র্য,
ত। শোেননা, ওখাঁচবে এসাে বাইরে
গলির মধ্যে মিলিয়ে গেল সেবা। বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ে দরজাটা
বন্ধ করে দিল সশনে।
১৯ স্টিমারঘাটের রাস্তার দু পাশে যে সব কার দোকান বসেছিল, সব এখন উঠে গেছে। যার যতটুকু সােনাগনা ছিল সব কাগজের টাকায় কিনে নিয়ে পিটটান দিয়েছে তারা। মাঠভরা এখন সেই সােনার ধান। ধানের শান বলতে পার। দাওয়াল নেই যে খান কাটে। সব ছারখার ছানভান হয়ে গেছে। সব উলুখাগডার দল। মুচিপাড় তাঁতিপাড়া জেলেপাড। জমিহীন দিনমজুরের দল। মুচিদের যারা বেঁচে আছে তারা চলে গেছে কলে কাজ নিয়ে। যদিও গরুর মড়ক চলেছে, পাচ্ছে না আর চালানী চামড়া। পাচ্ছে না রাতে কাজ করার জন্যে কেরাসিন। তিরা রস চোলাই করে তাড়ি করছে, জেলেরা জন খাটবার অস্টে জাল ফেলে তুলে নিয়েছে কান্তে। মানুষের কঙ্কালের উপর ফলেছে এবার অপর্যাপ্ত শলাচ্ছ্বাস। অস্থিচুর্ণে বসাল কার পেয়েছে এবার। কম-মজবুত ঘর পড়ে গিয়েছে মুখ থুবডে। তেজালাে হয়ে গজিয়েছে যত জলে আগাছা। এখানে-ওখানে পড়ে আছে কাল। কাক-শালি পর্যন্ত ভাগাড়ে চলে গিয়েছে। বােলা-পেট কুকুর ঘাস খাচ্ছে চিবিয়ে চিবিয়ে। রাস্তার উপর পড়ে আছে মরা বেরাল। মরা ছেলে। দালালের নৌকোয় চালান যাচ্ছে মেয়েরা—সমর্থ আর , যাদের মধ্যে যৌবনের আছে বা এতটুকু উল্লেখ বা অন্যা। চালান যাচ্ছে মজুতদারের চাল। চালান যাচ্ছে বেওয়ারিশ কালের ছালা। জীবন্ত দেহের দাম ছিল না, দাম হয়েছে পরিত্যক্ত জপিৰে। নিজেদের পার্টি-থেকে-চালানাে লঙরখানার ভার নিয়ে পুর চলে ১২১ এসেছে এই গ্রামে, যদুরহাটিতে। দল ভারি করবার জন্যে সম্প্রতি চলে এসেছে বারিধি। কোন কঠিন সেবা ও কৃচ্ছে র আগুনে নিজেকে নিক্ষেপ করবার জন্যে। নিজেকে পরিখালন করবার জন্যে। ক্ষুধার হাহাকারের মাঝে আত্মার হাহাকারকে ডুবিয়ে দেবার জন্যে। স্থানীয় জমিদারের কাছারিবাড়িতে আছে তারা, কর্মীরা। নায়েব- গােমস্তারা রেখেছে তাদের আমিরি আরামে, বিশেষ যখন জানতে পেরেছে তাদের জন্মের কৌলীন্য, সামাজিক উচ্চতা। মহং তােদাপনের সংকল্প। ওদের কাজে পালিশ পড়ছে জমিদারের নামে। গুরে দিয়ে লাভ বই কোনাে ক্ষতি নেই কার। অতিরিক্ত পরিশ্রমে পুশ্রী অনেক কাহিল হয়ে পড়েছে, একটা করুণ ক্লান্তি যেন ছায়া ফেলেছে তার শরীরে। মর্মের কোন অদৃশ্য কুহরে যেন জমে উঠছে দীর্ঘশ্বাস। সে ক্লান্ত হয়ে উঠেছে ক্ষুধার কাতরতা দেখে নয়, ভিজার কাতরতা দেখে। তারাও সবাই বসে আছে এই ভিক্ষুকের ভঙ্গিতে প্রতীক্ষা করে। স্বপ্নের কুজঝটিকা সৃষ্টি করে। তারাও সেই দিন-গােনার দলে, ঝিনুক দিয়ে সমুদ্র সেচার, নখে আঁচড়ে পাহাড় ক্ষয়াবার। এটা হলে ওটা ঘটে, এটা ঘটলে এটা হয়—এই নিষ্ক্রিয় বিশ্বাসই শুধু তাদের সম্বল। শুধু বিশ্বাস করা ছাড়া আর কী করবার আছে? ঝড়ের রাতে বিশ্বাসের আলােটুকু রেখেছি বাঁচিয়ে—এই উদেষণ ছাড়া আর আছে কি বলবার ? এই পূর্ববর্তী চুক্তি পরিপূর্ণ না হলে ভবিষ্ণু সাফল্য অসম্ভব—এই অসম্ভব সতের অন্তরালে আত্মগােপন না করে থেকে উপায় কি এখন। কি কাজ করছি আমরা? ভঙ্গি তৈরি করছি। এখন বাকিয়ে দিচ্ছি প্রথমে, পরে না-হয় আসবে সতেজ তীক্ষ্ণতা। কিন্তু এই বাঁকানােটাই কি আরামে নােয়ানাে নয়? বড্ড বেশি ইজিচেয়ারের ১২২ আলস্য। ভদিয়ানের ভৰি। কর্মটাই বড়, বিরতিটা কিছু নয় ? ততাটা বুঝি মুখরতা নয় কখনন? তেমন কিছু একটা দর্শনীয় না হলে বুঝি বউ কাজ হল না? দর্শনীয় না হােক, স্পর্শনীয় তত অন্তত হবে। কোথায় সেই স্পর্শ? কোথায় সেই স্পর্শমণি ? শুধু ঈর্ষা আর ঈর্ষা। অবজ্ঞার বদলে ঈর্ষা। ধনীর অহংকার যেমন অসৰু তেমনি অসহ্ন এই গরিবের বিদ্বেষ। এই দরিদ্রের দীনতা, চিদীনতা। দোষ কার? ধনীর ? না, ধনবণ্টনব্যবস্থার। তবে ধনীকে কেন প্রহার করি? সেই ব্যবস্থার দোষেই তাে সে স্বার্থপর, সঞ্চয়বিলাসী। ব্যক্তির দোষ কোথায়? দোষ ব্যবস্থার। তেমনি গরিবের গুণগানের মধ্যে গৌরব খুজি কেন? সেই একই ব্যবস্থার দেবে সে পরশ্রীকাতর, সংকীর্ণচিত্ত। তার নিজের দোষ নয়। দোষ সেই সমাজনিয়মের। সেই নিয়মের বিরুদ্ধে লড়ছি না বলতে চাও? এই যে চিন্তা করছি এই তাে আমাদের লড়। ধীর জলই পাথর কাটবে এক দিন। সাত নকলে আসল না খান্ত হয়। আদর্শ যেন না তুচ্ছ দেখায়, তার প্রতিভূ আজ অক্ষম ও অধম রয়েছে বলে। ঘােডার গােয়ালে ভেড়া ঢুকেছে বলে ঘােডার যেন না নিন্দা করি। খোঁটার জোড়ে মেড়া লডে-এ দুর্বলতা যেন ঘুচে যায় একদিম। দল-বদলানাে বেকার, নাস্তিমান কেরানি-কর্মচারী আর বৃদ্ধিহীন বুদ্ধিজীবীর দল—এদেরােম্প। যেন নরম পড়ে। সুবিধাবাদীদের যেন বাদ পড়ে সুবিধা। সাত ভাই তাত বুনতে-বুনতে যে-ষার শুধু আপন কোলের দিকে টানছে এ যেন দেখতে হয় আর। ফকিরে-ফকিরে ভাই ভাই, ফকিরের রাজত্ব সব ঠাই—এ যেন শুধু ফকিরের রাজত্বই না হয়। শুধু নিঃস্বতার ভিত্তির উপরেই না নিক্ৰিয়তাৰ মন্দিৰ গড়ি। সােনার দাডে না কাক বসাই। ব্যক্তি দিয়ে না ব্যবস্থার বিচার করি। শাখ যেন না উলটো ১২৩ - বুঝি ভূইফোড় ব্যাখ্যাকান্তের মূর্ধতায়। হাতের শাখা না দােকানের দর্পণে দেখতে হয়। বিদেশের বৃহুর না হয়ে যেন স্বদেশের ঠাকুর হই। হাটে কলা না নৈবেদ্যায় নম করি। দুভিটা না এলে আমরা কি করতুম বলুন তাে? পুরী জিগগেস করে বারিধিকে। ‘যখন এলই, তখন তাকে পাশ কাটিয়ে এড়িয়ে গেলে চলবে কেন? এক ধার সমতলে মিলতে পারছি আমরা, ছুতে পারছি অভাজন জনগণকে। অভিশাপের বেশে আশীর্বাদ বলতে পারেন। যুদ্ধ কাকে বলে জানি না, কিন্তু একজনের সমূহ ক্ষুধা যদি মেটাতে পারি, তবে সেটাতে পাই সেই যুদ্ধজয়েরই আনন্দ। সময়ের ঝুটি আঁকড়ে ধরবার কাজ নেই, শুধু সময়ের হাতে ছেডে দিই নিজেকে। তাড়াতাড়ি করলেই খেয়াঘাটে গড়াগড়ি দিতে হবে। তাই দাড়িরা গড় না টানলেও দেখতে পাব বাটের নৌকো আর ঘাটে পড়ে নেই। সময়ের স্রোতেই টেনে নিয়ে যাবে আমাদের। উজিয়ে যাবার দরকার কি, ভাটিয়ে যাবার দিন এই এল বলে। ঈশ্বর, আদর্শ না ম্লান হয় কোনাে দিন। বাঁশি হারিয়ে না শেষে এক দিন শিঙ্গায় ফু দিই। শুধু তিলক কেটেই না বৈষ্ণব সাজি। অন্যের পােড়া ঘরের পাশে বসে না আগুন পােহাই। আজকে যা আবর্জনা, তা ধু সাৱ হােক মাটিতে। টবে-পোঁতা ধার-করা চারা না হয়ে সারালাে মাটিতে গজাক এবার সত্যিকারের তেজালাে গাছ, মেলে ঠিক তার বিপুল ছায়াচ্ছ। এই আশ্বাসেই শুধু আয় খুজি। ‘আমি ক’ দিন ঘুরে আসি বাইরে। পুত্র বলে প্রায় অপরাধীর সুরে। ‘তাই যান। শরীটা আপনার ভাল নেই। সকল কথার মত এ কথাতেও বারিধি সম্মতি দেয়। ১২ আপনি? আপনারে তাে শরীর খুব ভাল দেখাচ্ছে না। ঠিক ধরেছেন। কোথাও জায়গা পাচ্ছি না এমনি শুধু মনে হচ্ছে। তবে আপনিও চলুন না। ‘যদি বলেন তাে যাই আপনার সঙ্গে। সমস্তটাই শুধু ক্ষুধা আর ক্ষোভ নয়। কাদা আর ক্লেদ নয়। সমস্ত স্বপ্নই নয় দুঃস্বপ্ন। এত সত্বেও পৃথিবীকে সুন্দর বলে অনুভব করবার লগ্ন বিদায় হয়ে যায়নি। আছে গান, আছে বাজনা। নরম আলাে, নরম সাহিত্য। ভাল খাওয়া, গা-ছােবানাে বিছানা। স্নায়ু আর মিতা। প্রকৃতির শক্তি। দেশভ্রমণের আরাম। উচ্চ চিন্তার আলস্য। কেন এসব বাদ দেবে জীবন থেকে চিন্তাই যখন তুনীর আর ভঙ্গিই যখন আয়ুধ, তখন আর কষ্ট করে ভেক নেয়া কেন? দলের খাতায় নামটা শুধু লিখে রাখলেই হল। ওয়াক, থু, খাব না, খাব না এসব। কে একজন খুতিয়ে উঠল : যত সব বাজে বিচ্ছিরি খেতে দেয়া ‘বা, ও তাে খিচুড়ি। ‘তােমার মাথা! বেনের কাছে তুমি মেকি চালাচ্ছ? এ হচ্ছে শুধু দলচুর ঘাট। এমনিতে না খেয়ে মরতাম, এখন অপবাদ হবে যে পেটের অসুখ হয়ে মরেছি। না, খাব না, খাব না আমি। লােকটা অথচ না খেয়ে পারছে না। দৃশ্যটা চোখে পড়ল বারিধির। যখন তারা যাচ্ছে পারঘাটের দিকে। একজনের সমূহ ক্ষুধা যদি মেটাতে পারি, তবে সেটাতে পাই যুদ্ধজয়েরই আনন্দ। কথাটা মনে পড়তেই বুকের কাছে ধাক্কা খায় সে একটা। মনে পড়ে, শুধু এক জন ক্ষুধার্ত মুখে উপহাস করেছে তার উদ্যত আয়ের উপহার।
২০
হীরেন খাগির প্রথমে চিনতে পারেননি। কদাকার কঙ্কালসার
চেহারা। ডিমে মােগা।
‘এখানে কি? এখানে না। যাও নিচে, গেটের বাইরে। গোঁফ
ফুলিয়ে হকার দিয়ে উঠলেন।
‘আমি আজকাল সাবান বিক্রি করছি।
গলার স্বরে হীরেন বাবুর দৃষ্টিটা যেন একটু নরম হল। যেন বা চিনতে
পারলেন। বললেন, ‘তা বেশ ভালই করছ। ব্যবসা করছ। তিল
কুড়িয়েই তাল হয়।
আর তাল গুড়িয়েও তিল হয় এক দিন। যদি কিছু নেন।
‘মাপ করে, ও সব দিশি সাবান আমি মাখি না। স্বদেশী করে গায়ে
ফোস্কা ফোটাবার আমি পক্ষপাতী নই।
‘কিন্তু যদি নেন দয়া করে, আমার গায়ে তবে কিছু মাংস ফুটতে
পারে।
একটা খনখনে কাশি উঠতেই হীরেনবাবু তাকালেন সুজনের মুখের
দিকে। চোপসানাে, তােবড়ানাে মুখের দিকে। বললেন, ‘তােমার কোনাে
অব ?
সুজন ফ্যাকাসে চোখে হাসল। বলল, না, অসুখ কোথায়। বাঁশের
আগালের মত সরু সরু আঙুলে শূন্য একটা চেয়ারের পিঠ ধরে ফেলে
তার দাড়ানােয় একটু জোর আনলে।
“দেখ, সাবান-টাবান আমি রাখব না। তবে তুমি যখন দুঃস্থ হয়ে
পডেছ, তখন তােমাকে আমি স্বচ্ছন্দে কিছু সাহায্য করতে পারি। হীরেন
বাবু ড্রয়ার টেনে মনিব্যাশ বের করলেন।
ফোকরের মধ্যে আঙুল ঢুকিয়েছেন, সুজন বলে উঠল, ‘আমি দাম
চাই, ভিক্ষে চাই না।
‘না, না, দাম হবে কোখেকে? ও জিনিস আমি ব্যবহারই করতে
পারব না।'
‘ব্যবহার নাই বা করলেন। কিনে বাইরে ফেলে দিলেন না হয়
ছুডে। আর পয়সা যদি দানই করতে চান আমাকে, আমিও না হয়
আপনাকে আমার সাবান দান করলাম।
‘মিছিমিছি অপচয় আমি পছন্দ করি না। হীরেনবাবুর মুখ বিরক্তিতে
কুঞ্চিত হল।
‘শুনে সুখী হলাম। কিন্তু আমাকে একবার সেই অপচয়ের সুযােগ
দিন না জীবনে।
“দেখ, বেশি বকবার আমার সময় নেই। নাও এই দুটো টাকা, আর
ফিরিয়ে নিয়ে যাও তােমার সাবান। তােমার তত তাতে লাভই হবে।
পয়সাও পেলে, জিনিসও থেকে গেল। সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না।
ব্যবসা করতে বসে এমন দাও ছাড়তে নেই।
ও নিলেই আমি হেরে গেলাম।
‘হেরে গেলে?
হা, আমার বাঁচার মধ্যে যে ন্যায় আছে, আমার জীবনে যে আছে
মূল্য, তা আমি অনুভব করতে চাই। মরে গেলেও আমি ভিক্ষে চাইতে
পারব না। নিন না দাম দিয়ে কিনে।
“কি আশ্চর্য, ব্যবহার করি না, তবু এ আমাকে কিনতে হবে ? হীরেন
বাবু এবার ধমকে উঠলেন।
এমন সময় পুত্র সে-ঘরে এসে ঢুকল। শান্ত স্বরে বললে, আমার
১২৭
ঘরে চলুন, আমি কিনৰ ওসাবান। দিশি সাবান মাখতে আমার ভারি তৃপ্তি লাগে। পবিত্রতার পা পাই। সুজনকে পুত্র তার নিজের ঘরে নিয়ে এল। বেশ সাজানাে-গােছানাে ঘর, আর বেশ একটু হাতের যত্নে চোখের আদরে সাজানাে। ঘরের সুরটা গদগদ। আগে দু একবার এসেছিল সে পুৰঞ্জর ঘরে। তখন কেমন যেন একটা রিক্ত কাঠিন্য ছিল। আসবাব-পত্র ছিল কম, এলােমেলাে। বিছানাটা এমন উন্মােচিত ছিল না। তখন ঘরে ছিল পালাই-পালাই ভাব। অরি-চপলতা। এখন যেন এসেছে গা-হাত-পা মেলে বিশ্রামের ভঙ্গি। শুধু ঘরে নয়, শরীরেও। সচেষ্ট হয়ে সাজলে তাকে যে খুব সুন্দর দেখায়, পুর যেন এত দিনে এসেছে সেই চেতনা। তার শরীরের দীর্ঘতাকে যে লীলায় নমনীয় করা যায় সে যেন শিখেছে সেই ইন্দ্রজাল। সেই জালামালিনী মেয়ে কেমন যেন এখন ছায়াকায়িনী হয়ে উঠেছে। খটখটে বােদের উপর নিয়ে এসেছে ঠাণ্ডা কালাে মেঘ। হীৰেন খাস্তগিরের বরখান্তর দিন দিয়েছে পিছিয়ে। ঘড়ির কাঁটা দিয়েছে বাঁয়ে ঘুরিয়ে। ‘এ আপনার হয়েছে কি ? সুজনকে কৌচে বসিয়ে তার মুখখামুখি আরেকটা চেয়ার টেনে বসে পড়ে পুর জিগগেস করলে। তার প্রশ্নে শুধু চঞ্চল কৌতুহল নেই, আছে একটি বা অচঞ্চল বেদনা। সুজন খুব সংক্ষেপে সেরে দিল ইতিহাসটা। খুব মামুলি ভাবে। বাবা ক’দিন আগে মারা গেছেন, মাও মরমর। কিছুতেই নতুনত্ব নেই। তার চাকরি গেছে, বােগ ঢুকেছে শরীরে। এটাও নেহাৎ মামুলি। আরাে দু একটা যদি দুর্ঘটনা ঘটে, কোনােই তাতে চমক থাকবে না। সেই একই মুখস্তকরা রাস্তায় একচক্র প্রদক্ষিণ । পুত্র অনেকক্ষণ তাকিয়েছিল মুজনের দিকে। খেয়াল হল যখন কথা শেষ করেও তার দিকে সুজন ফিরে তাকাল না। ৩ ১২৮ পুর এ কি দেখছে? দারিদ্র্য দুর্ভিক্ষ দুঃস্থিতি ? মাত্র একটা বেকার জীবনের পরিণাম? অধু খেতে না পেয়ে রােগে ভূগে মরার অনিবাৰত ? বড় জোর একটা নিদ্ধ অভিযােগ, সুলীত অভিমান? না, আর কিছু? ‘চলুন, আমরা কোথাও চলে যাই। পুরীর গলা থেকে হঠাৎ বেরিয়ে এল কথাটা। যেন অনেক দূর থেকে কে গান গেয়ে উঠল। অনেক দূর থেকে। পুত্র যখন ফিরে এল তার গ্রামের কাজ থেকে, রুক্ষ ভঙ্গিটা মােলায়েম করে, ধুলােবালি মুছে ফেলে শরীরে আলস্যলালিত লালিত্য নিয়ে, আর তার পিছে পিছে তার ঘরে এসে ঢুকল যখন বাবিধি, জমিদারের ছেলে, তালুক-মুলুকের ওয়ারিশ, তখন জামাৰ হাতায় মুখ ঢেকে হীরেনবাবু হেসেছিলেন একটু লুকিয়ে। সে-হাসিটা বিছের কামডের মত বিধে আছে পুরীর বুকের মধ্যে। যেন সেই হাসিতে তার হাটাকে বিজলী আলােৰ সূচ ফুটিয়ে বিজ্ঞাপন দেয়া হচ্ছে। শােন যাচ্ছে বা অপরপক্ষের উন্মত্ত হাততালি। সেই থেকে তারই অহেতুক এখয়ে হীরেনবাবু তার প্রতি অ-উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন। বারিধির অভ্যর্থনায় হলেন অনিত, উৎসুক-উৎফুল্ল। ব্যবস্থা করলেন নানান ছাদের পাটি নানান ছাদের ঘটাটোপ। খেতে-খেতে লােভ ও কাদতে- কাদতে শােকের মত বলতে-বলতে বিয়েটা প্রায় সাব্যস্ত করে ফেললেন। বারিধিকে এমন কি বললেন পর্যন্ত যে, আসল মিলন ঘটে আহত সমধর্মিতা থেকে, সমর্মিতা, সমব্ৰতিতা থেকে, এক কথায়, কমরেডশিপ থেকে। বারিধি দিব্যি মাথা দোলাল। সমস্ত কিছু চাবুকের বাড়ির মত লাগছে তার গায়ের উপর। অবলুনির মত। ভাবল, এই বার সে প্রতিশােধ নেবে। ঢিল দিয়ে ঢিল ভাঙবে এবার। ‘চলুন, বাইরে চলুন কোথাও। শই, সামাঠা গলায় বললে পুরণ। 'কোথায় ? সুজন তাকাল এবার নিয়ে চোখে। ১২ ‘চেয়ে। সময় থাকলে ইউরােপে চলে যেতুম। ইদানিং, সােনার বাঙলার বাইরে, অন্তত যেখানে মানুষের হাতে তৈরি মৃত্যুর খেলনা বিকোচ্ছে না বাজারে। ‘পালিয়ে যাব বলতে চান ? ‘পালিয়ে যাবেন মানে। ‘এখানে আমি যুদ্ধ করছি না? ‘যুদ্ধ করছেন? কী যুদ্ধ ? সুজন হাসল: ‘জীবনযুদ্ধ। তাকাল তার শিরালাে, শীর্ণ হাতের দিকে। শুধু এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল পুঞ্জ। বললে, ‘পালানােটাও এক প্রকারের রণনীতি। যুদ্ধ করাটাই শুধু বাহাদুরি নয়। পালিয়ে শক্তি সংগ্রহ করে এসে শত্রুকে যদি শেষে হারানাে যায়, তবে সেটাকেই বলব বীরত্ব। ‘আমার যুদ্ধনীতি সে রকমের নয়। সুজনের গলা দৃঢ়তায় গম্ভীর হয়ে এল : ‘আমি নড়ব না, সব না, হটব না কোনাে দিন। এই প্রতিজ্ঞায় আমি অটল থাকব। প্রাণ দেব, কিন্তু মান দেব না, মনুষত্বের বা মান- পুত্র স্থির বিশ্বাসে হাত রাখল সুজনের হাতের উপর। বললে, কথাটাই শুধু বড় হল, কিন্তু ফলটা বড় নয়। ‘বড় নয়? হাসল সুজন : এক শ্রেণী থেকে আরেক শ্রেণীতে চলে আসছি, ইস্কুল মাস্টার থেকে ফিরিয়ালা, চলে আসছি শ্রেণীহীনতায়, ফল বড় হল না? না, হাত ধরে নাড়া দিল পুঞ, আপনি জানেন না, কী ভীষণ খারাপ হয়ে গেছে আপনার স্বাস্থ্য। এখানে এমনি করে আর কিছু দিন থাকলে আপনি মরে যাবেন। ১০
।
হয়তাে মরে যাব, কিন্তু তবু আমরা মরব না কোন দিন।
না, আপনি চলুন। আমাকে নিয়ে চলুন
‘কোথায় যাব ? কোথায় নিয়ে যাব ? সুসময়ের ইউরােপের কথা
বলছিলেন না, কিন্তু আমি দেখছি এক কঙ্কালধবল পৃথিবীর মরুভূমি।
পৃথিবীতে যাবার কোথাও জায়গা নেই।
না, আছে। জায়গা আছে। এখনাে আছে চাদ, আছে শিশু, আছে
রাত্রির ভাের হওয়া।
‘বিশ্বাস করি না। শুধু আছে যুদ্ধ, আছে হিংসা, আছে বলি।
না, আপনি চলুন। আপনিও বাঁচুন, আমাকেও বাঁচতে
দিন। পুত্র তার স্পর্শে আরাে ব্যাকুলতা চাইল সঞ্চারিত করে
দিতে।
স্পর্শটা অস্বীকার করবার মত তার নির্দয়তা নেই, কিন্তু তাতে চঞ্চল
হবার মত আছে তার নিস্পৃহতা। তাই সে সহজ সুরে বললে,
‘একা-একা যাই কি করে ?
একা-একা?
‘ভুলে যাননি নিশ্চয়ই, আমার স্ত্রী আছে, ছছাট ভাই-বােন আছে,
মুমু মা আছে তারা যাবে কোথায় ?
পুত্র সামলে নিল মুহূর্তে। বললে, তাদের আমি ব্যবস্থা করে
দেব। মাস-মাস, যক্ষিন না আপনি সম্পূর্ণ সুস্থ হন, তাদের আপনি
মাসােয়ারা পাঠাবেন।
‘তবু একা-একা বাঁচব আমি স্বার্থপরের মত ? প্রশ্নে এতটুকু রাগ
নেই, যেন বা প্রচ্ছন্ন কাতরতা।
‘এই স্বার্থপরতা অত্যন্ত বড় জিনিস। জীবনের প্রাবল্যের প্রমাণ।
এ তাে আপনিও জানেন। মৃত্যু যত কাছে, স্বার্থপরতাটা তত দুর্দান্ত।
এমন সময় আসে মা পর্যন্ত ছেলের মুখের গ্রাস কেড়ে নেয় স্বচ্ছন্দে। তা
১১
ছাড়া, শুধু একা আপনিই কি বাঁচছেন- পুরীর স্তব্ধতাভরা আয়ত
চোখ ডেকে নিল সুজনের দৃষ্টিকে : আমাকে বাঁচাচ্ছেন না?
এক দিগন্ত ছুয়ে আছে সমূহ, আরেক দিগন্তে প্রান্তরের প্রান্ত আছে
লীন হয়ে। উদ্বেল উদধির পরে শক্ত স্থির ভূমির শান্তি। মুহূর্তের
জন্যে সুজন এক ধূসর শূন্যতার বদলে এক আশ্চর্য উমুক্তি দেখল।
মুহূর্তের জন্যে। মন আবার ফিরে এল কঙ্কাল-কৰােটির দেশে। পুরীর
হাত আস্তে সরিয়ে দিয়ে সে বললে, ‘পারব না।' শােনল বিদ্রোহবাণীর
মত নয়, রণধ্বনির মত নয়, কাতবােক্তির মত।
পাখা ঝাড়া দিয়ে পাখি উড়ে গেল কুলায়ে, বৃক্ষচুডে।
‘বন। পুরী উঠে দাঁড়াল। তার ঋদ্ধিমান ঋজুতায়।
গেল ঘর ছেড়ে।
কিছুক্ষণ পরে ট্রেতে করে খাবারের প্লেট ও জল পাঠিয়ে দিল কে
বেয়ারার হাতে। নিজে এল পিছু-পিছু। তার উদ্ধত নিলিপ্তিতে।
বললে, খান।
রাশীভূত খাবার। চেয়ে থাকতেও আশ্চর্য লাগে ।
পুত্র আবার মনে করিয়ে দিল।
অফ রেখায় হাসল একটু সুজন। বললে, ভরাডুবির মুঠো লাভ
বােধ হয় ?
‘জানি না। লাভ-লােকসানের হিসেব করতে ভুলে গেছি। নিন,
বান।
‘খিদে নেই।
‘খিদে নেই ?
‘রুচি নেই। যা শ্যাষ্য তার অতিরিক্তে লােভও নেই, শৃহাও নেই।
যখন উঠে দাড়াল। বললে, সাবান নেবেন বলেছিলেন—
যা, আছে কতগুলি ? খুব শন্দিতের মত বললে।
কতগুলি ? মাত্র ডজনখানেক আছে। টুকরাে পাঁচ আনা করে, ডজন হিসেবে সাড়ে তিন টাকা। যতখানা তার দরকার। পুত্র সবগুলিই কিনে নিল। সাড়ে তিন টাকার বেশি দিতে পারল না। সুজন বস্তিতে ফিরে এসে সেবাকে দেখাল তার উপার্জন। এক সঙ্গে সাড়ে তিন টাকা। কল্পনা করতেও শিহরণ হয়। ‘কি করবে এ দিয়ে?' সেবা জিগগেস করলে হতবুদ্ধির মত। ‘কি করব মানে? সুজনও প্রায় বিমূঢ়। ‘আমি বলি কি, যা লাগে আগে মার জন্যে ওষুধ নিয়ে এস। সেই পুরােনাে প্রেসপশানটা পাওয়া গেছে খুজে। আগের সেই ব্যথাটাই উঠেছে চাড়া দিয়ে। ‘হ্যা, সেই পুরােনাে প্রেসক্লপশান মতই ওষুধ আনব। সেই এক এবং অদ্বিতীয় ওষুধ। আর তার নাম হচ্ছে ভাত। ব্যথা যদি সারে, ওতেই সারবে।” এত দিন লঙরখানা থেকে চলেছে। জগদ্ধাত্রী পর্যন্ত তাই খেয়েছেন। খিদের চোটে পাটকেলেই কামড় পড়ে, এ আর বেশি কি। আজ যদি দুটি চাল পায়। আলােচালে সাধ নেই, বুকড়ি চাল হলেও চলে যায়। বিকেলবেলা কনট্রোলের ফের দোকান খুলবে। সেবা তুলে নিল সেই রেশনের থলে। থাকবার মধ্যে ওটাই শুধু আছে। জায়গায় জায়গায় কাপড়ের পাড় দিয়ে সেলাই করা। ইদুর তার খিদে মেটাতে দত বসিয়েছে এই থলেতে। সােনার উপরে মিনের কাজ করা। বজন বললে, আমি যাই। ‘তুমি সকালবেলা টহল দিয়েছ অনেকক্ষণ। এবেলা তুমি জিৰােখ। শরীর যদি ভাল বােব, সন্ধের দিকে না-হয় বেরিয়ে সাবান নিয়ে। সুজন অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল সেবার দিকে। আগে-আগে এ রকম চাউনিতে সে একটু সলই অনুভব করত। এখন আর তাতে রেখা পড়ে না। এখন সে সমর্পিত, এলিখিত। তাকে এখন কাটলেও রক্ত নেই, কুটলেও মাংস নেই। নদীকুলে বাস করলেও তার আর ভাবনা নেই কানাকডির। সর্বশেষ সর্বনাশের জন্যে সে প্রস্তুত। নী শুকিয়ে লেখা হয়ে গেছে সে। রিক্ততার একনাে হাওয়ায় মরে গেছে যৌবনের পত্ৰভার। পরনের কাপড়টায় জায়গায়-জায়গায় খাবল মারা, প্রমাণের প্রায় আদ্ধেক। টেনে-বুতে কুলােয় না। বুক-পিঠ ঢাকা যায় না এক সঙ্গে। বুক-পিঠ ঢাকতে গেলে কোমরে ফের বেড আসে না, নামতে চায় না গােছের নিচে। তাল-কার বাখারির চালুনির মত পাঁজরগুলি ফাক-ফাক হয়ে রয়েছে, কার হাড় নামা জমির আলের মত রয়েছে উচিয়ে। গাল তুবড়ে গেছে, বুক গেছে চুপসে, কোমর গিয়েছে বসকে। গায়ে খড়ি উড়ছে, চুল উঠে যাচ্ছে, জট পাকিয়ে যাচ্ছে। বাঁধনি-বলনি সব ঢিলে হয়ে গেছে। গা-ময় চুলকুনি উঠেছে। ছােট-ঘােট নখের ভিতরে মাটি, দাতের গােয় নীলচে দাগ ধরা। আছে শুধু দুটি ভাসা-ভাসা ভাবতরল চোখ। তার জন্যে এত । দিগন্তে বর্ণ-বিদীর্ণ সন্ধ্যা, সবুজ সমুদ্রে চাদের মুক্তমান, সুব্ধ মধ্যাহ্নের মন্থর মদিরা—একবার এসে ডাক দিল সুজনকে। শৃঙ্গরপূর্ণ ভৃঙ্গার ছেড়ে সে আছে এ কী কাঠের পুলী নিয়ে। সােনা ফেলে আঁচলে গেরো দিচ্ছে কি পেয়ে? এ শুধু একটা মমতা ছাড়া আর কি। শুধু একটা সেকেলে বিবেকদংশ। একটা জান্তব মেহ। আশ্চর্য, মমতা প্রেমের চেয়ে বড় হবে? মৃত্যু হবে জীবনের চেয়ে বলবান ? আত্মার আতনাদের চেয়ে জঠরের যন্ত্রণা হবে অপ্রতিরােধ্য ? ‘জানাে সেবা, তােমার আরেক নাম লক্ষ্মী। সুজন ছুলাে সেবাকে। ‘লক্ষ্মী ? অনেক দিন পর সেবার ঠোটের ধারে হাসির রেখা পড়ল । হ্যা, জান না, স্বামীর হাতে টাকা এলেই স্ত্রীর নাম লক্ষ্মী হয়ে যায় ? ১৩ ফুটপাতে শুয়ে আছে সারে-সারে। কাতারে কাতারে। ন্যাতা- চোৰড হয়ে। একেকটা পরিবার। শত-শত পরিবার। মাকে ঘিরে। কেউ বা ছুটকো, দল-ছাড়া। শুয়ে-শুয়ে গােঙাচ্ছে, গােঙাতে-গােঙাতে শুয়ে পড়ছে। গভীর রাতেও কান্নায় কামাই নেই, বরং আরও শশানাচ্ছে যেন অতলান্ত। অত রাতেও ভাত চাচ্ছে, ফেন চাচ্ছে, উনির জলের মত হলেও চাচ্ছে একটু দুধ। বােঝা কী প্রচণ্ড ক্ষুধা। খুদের জাউয়ের বদলে দুধের জন্যে কাঁদছে বােঝে কী অসম্ভব খিদে তার ছেলের, তার দুধের ছেলের। স্তনের বৃন্তে নেই আর এক বিন্দু দুব। শুধু মরছে না, প্রসব হচ্ছে এরি মধ্যে। বাস্তায়, আস্তাকুঁড়ের কিনারে। মৃত্যুর শিখরে উদয় হচ্ছে নবাগত শিশুর। অনাগত পৃথিবীর প্রত্যাশায়। বেশির ভাগই পাে-পােয়াতি মরে যাচ্ছে কয়েক দিনের মধ্যে। এরি মধ্যে মা মেয়ে রুক্ষ চুলে বিলি কেটে উকুন বেছে দিচ্ছে। কখন সন্ধে বেলা বাবুর জন্যে রসদ তুলে নিচ্ছে তার দাবােয়ান। অনেকে এর মধ্যে দান-খয়রাতের সুযোগ পেয়েছে। অনেকে পেয়েছে। যেমন ঘুসের, নিটমূনাফার। অবিশ্যি এই ঘুস ও মুনাফার অংশ থেকেই খয়রাত। গজিয়ে উঠছে নানা ঢঙের লঙরখানা। ছত্রিশ জাতের একস। তিলি-মালি-তামিলি, সদগােপ-নাপিত-মালাকর, কামার-কুমার গন্ধবণিক, হাঁডি-ডােম-মুচি, জেলে-জোলা-নিকারী—হিন্দু আর মুসলমান সব মিলেছে এক ক্ষুধার অগ্নিকুণ্ডে। এক নির্বাপনের আশায়। এক খাওয়া শেষ না হতেই আরেক জায়গায় খাওয়ার জন্যে ছোেট, পড়ে এমডি খেয়ে, কাল একবারও খেতে পারবে কিনা নেই তেমন নিশ্চয়তা। খিদের সনে অ পাল্লা দিয়ে পেরে উঠছে না। খিদের কান্নাটা মুখ, কাপড়ের কান্নটা নির্বাক। তােমাকে শুনতে হবে না, দেখতে হবে। কিন্তু দেখ এমন সাধ্য কি। বৃষ্টিতে ভিজে গেলে এক অচল কোমরে রেখে আরেক অচল শুকিয়ে নেয়া যায় না। অনেকে Uধু ঘরের মধ্যে পড়ে মরে রয়েছে। বেরুবার মতও কানি ছিল না বলে। যারা বেরিয়েছে তারা আজ দুঃসাহসিক উদাসীন। অনুপায়, অবিকৃত নগ্নতা। যে নগ্নতা মাংসের আড়ালে কঙ্কালকে দেখায়, লােভের আড়ালে দেখায় বংসের অনিবার্য। একে অন্ধকার, তায় এই পঙ্কিলতা। কলকতা কলুষিত হয়ে গেল। তার দোকান-পসরা সরাই-চটি গাডি-ঘােডা খেলাধূলা সিনেমা-থিয়েটার আমােদ-বিনােদ, সব হয়ে দাড়াল ব্যঙ্গের জিনিস। এদের ঝেটিয়ে বিদেয় করে দাও। নােগের আকর, বীভৎসতার প্রতিচ্ছায়া, পীভূত বাধা, এদের ফিরিয়ে নিয়ে যাও নিজের-নিজের সহচ্ছে। অবধাৰিত মৃত্যুর চাকার তলে এদের শুইয়ে রেখে লাভ নেই। বাঁশের চাড়া দিয়ে ছাদ আর বজায় রাখতে পারছে না সুজন। পড়েছে অনেক আগেই, এখন ভেঙে পড়ল। অল্পে কাতর ছিল, এখন পাথর হয়ে গিয়েছে। ব্যারাক-বাড়ি থেকে চলে এসেছে বস্তিতে। বারদুয়ারী বস্তিতে। মা মারা গিয়েছেন। মারা যে যেতে পেরেছেন তার ভাগ্যে তাই সবাই খুশি। একেক খানের প্রাণ একেবারে যেতে চায় না, গলার কাছে এসে আটকে থাকে। কষ্টও আড়ষ্ট হয়ে গিয়ে দেহটাকে বােবা করে রাখে। নিজেই সু শান্তি পাননি, শান্তি এনে দিয়েছেন। মরবার আগেই এটুকুই শুধু ভয় ছিল, চিতা করে পােড়ানাে হবে কি না তাকে, মুখাগ্নি করতে পাবে কিনা সুজন। দু এটুকু বিলাসিতা। কঁাধে নয়, মােটরে করে মা হেলে পুড়তে গেছেন। আর মার মুখে সব সময়ে জলছিল ক্ষুধার আগুন, তার নিভে যাবার পর আবার আগুন কিসের? রাজন দূরে এক চাটের দোকানে কাজ পেয়েছে। খােলর বস্তির খােপরিতে-খােপরিতে খুরিতে করে খাবার দিয়ে আসে। খালি-গায়ে হাফ-প্যান্ট পরনে। ঘরে-ঘরে মাসি-দিদি বলে। বকশিস কুড়ােয়। দরকার হলে মাঝে-মাঝে এটো-টা মুক্ত করে। কখনাে-কখনাে ৰা ট্যাক্সি ড্রাইভারের পাশে হাওয়া খেতে বেনােয়, অনুযাত্রী প্রহরী হিসেবে। আগে-আগে বাড়ি ফিবত, বউদিদিকে দিয়ে যেত পয়সা, যখন চা খেয়ে খিদে মারত। এখন আর আসে না। এখন তার মুখে গন্ধ থাকে, খুরিতে করে খাটি টানে। রাজনের দু বছরের ছােট রাধা, নদশ বছরে। আগে ফ্রক পরত, ছােট দেখাত। এখন বাধ্য হয়ে কাপড়ের ফালি পরতে হয়েছে। অনেক গাঙা লিকলিকে দেখায়। আদর করা যায় না, জালাতন করা যায় এমনি একটা মুকলি এনেছে চলা ও চাউনি চাপল্যে। বন্তির ছুরিদের সঙ্গে শােয়া-বসা করে, ফস্টিনষ্টি করে, আস্তাকুঁডের ভাষা শেখে, হাবভাব শেখে। দুধা যেখানে অশান, সেখানে থাকতে পারে না কোন শাসন- শৃংখলা, অাব্য সেখানে আদেশ-উপদেশ। কাছেই আছে একটা অফিস- বাবুদের মেসবাডি, সেখানে পচি-পুনি-কালি-শিবির সঙ্গে সেও হানা দেয়, হামলা চালায়। এ বাবুর পিঠ চুলকে দেয়, ও বাবুর হাঁটু দেয় টিপে, তৃতীয় বাবুর চোখের পাতায় আঙুল বুলিয়ে-বুলিয়ে ঘুম পাড়ায়। সিকি- আধুলি বকশিস নিয়ে আসে। পচি-পুনি কি রকম টেবিলের থেকে এটা-ওটা তুলে নিয়ে আসে, রাধার তখনাে হত ওঠে না। একদিন একটা দিয়াশলাই সরাতে গিয়ে ধরা পড়েছিল, শান্তিস্বরূপ আদরের মাত্রাটা বেশি হয়েছিল সেদিন। পচি-পুনি বলে এক দিনেই কি আর পারবি, আতি চোর পাতি চোর হতে-হতে সিদেল চোর। রাধা ১৩ ছাড়েনি তার বৌদিকে। আহলাদে কোনো দিন ডগমগ হয়ে আসে, ফুপিয়ে-ফুপিয়ে কাঁদে বা কোন দিন। সুজনের সাবান কেনা হয়ে গিয়েছে মিলিয়ে। সে এখন বিছানা নিয়েছে। বিছানার সঙ্গে মিশে গিয়েছে বলতে পারো। জ্বর, কাশি, বুকে শত-চের যন্ত্রণা, কি নয়। কাজ নেই, কামাই নেই, এই যে শুয়ে আছে বিছানায়, উড়তে না পেরেই যে পােষ মেনেছে-এই দাসত্বটাই তার বড় বাধি, বড় কষ্ট। বলে, ‘দখান্তে নাম দস্তখত করতে পারব না আমি, যাব না আমি খাস্ত-বরখাস্তের দলে। আমি উঠব, লড়ব, গডব আমার দেশ, আমার নতুন দেশ, আমি হারব না, নডব না, মৰব না কিছুতেই। আমাকে মরতে দিও না, সেবা। জয়ী হতে দিও আমার এই বাঁচার পৃহাকে। বাসা আমি অনেক ছােট করেছি, কিন্তু আশা আমাকে ছােট করতে দিও না। বন্যার মত এসে পড়েছে দুদিন, এক মুহূর্তের জন্যে স্থির জায়গায় রাখতে দিচ্ছেনা পা। রাখতে-না-রাখতেই ধাক্কা দিয়ে ঠেলে ফেলছে। এখন শুধু খাওয়ার সমস্যা নয়, চিকিৎসার সমস্যা। চাল-বজরা তেল-নুন নয়, নগদ পয়সা। তাও এক-আধটা নয়, মঠ-মুঠ। নােগের সঙ্গে যুঝতে হবে। যে রােগ ছুচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরুবে। কিন্তু পয়সা কোথায় ? ‘এ দুর্ভিক্ষে যদি কেউ মবল সেবা, সে হচ্ছে ভগবান। আমরা নয়। জীব দিয়েছেন যিনি আহার দেবেন তিনি—উড়ে গিয়েছে এ মন্ত্র। এখন জিভ পেয়েছেন যিনি আহার খাবেন তিনি। চলছে তার যুগ। চলতে দিও না, সেবা। তুমি একা না পারে, আমাকে বাঁচিয়ে তােলে। চাল নেই ধান নেই, কিন্তু গােলাভরা ইদুর আমরা দূর করব। বস্তির গলিতে ফঁাকে কয়েকটা মেয়ে পাড়ায়। কালাে ঠোটে বিভি খায়। হেঁড়ে গলায় সুর তাঁজে। গােলাপ-মাসি সেবাকে পড়াতে বলে পাশ ঘেমে। ধনেখালি শাড়ি ১৩ কিনে দেবে বলে। গন্ধতেল। কেমিকেলের চুডি। ঘর দেবে আলগা। প্রথমে না হয় মাদুর আ টেমি, দেয়ালে ভূসি, পরে ছাপাের খাট, ঝড়- বাতি, দেয়ালে টানা আয়না। শেষে মঞ্চের মালতী, পরদার তারকা। স্বামী যার মরতে বসেছে তার আবার সতীপনা কিসের ? চালে খড় নেই তার আবার বাড়ির বহর। শুধু ভিক্ষে করে সে স্বামীর চিকিৎসা চালাবে ? কে দেবে ভিকে? আর কতটুকু ? এক চিমটি মুন দেয় না কেউ, সাবু-বার্লি চিনি-মিছরি দেবে ? দেবে তারপরে ওষুধ? কে দেবে তাকে কালাে বাজারের সন্ধান ? চোর ধরতে চোরকে লাগাবার মত তার মুরােদ কোথায় ? সেই মলই তাে খসাবি তবে আর মৃত্যুকে হাসাচ্ছিস কেন? চালুনি করে ঘােল বিলােবি কি করে? তার চেয়ে সােজাসুজি ঝাঁকের কই ঝাকে চলে আয়, বেঁচে যাবি তা হলে। স্বামীর প্রাণের চেয়ে তাের এই সংস্কারটাই বড় হল ? তারপর কি আর ফিরতে পারবিনে তাের স্বামী- প্রেমের শক্তিতে? সুজনের ক্ষমায় এখনাে তাের অবিশ্বাস ? প্রশ্নের উত্তরে উত্তরণের জায়গা পায় না সেবা। ভিক্ষা দিতে নয়, ভিক্ষা করতেই শেষে পথে বেবােয়। সব সময়েই মনে হয়, বারিধির সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। আজ সে কোনাে প্রতিবাদ করবে না, যে কোনো দামে যে কোনাে জিনিস নেবে বুঝি আঁচল পেতে। মুখে ঘােমটা টানা, একখানা হাত মেলে ধরা বাইরে। দেয়ালে পিঠ দিয়ে ঠায় বসে থাকা চুপ করে ।
২২
নিলে হয় বুকে।
ভিক্ষুকের ছবিটাতে সম্পূর্ণতা আসেনি। সঙ্গে একটা ছেলে চাই।
ছেলে পেলে তার মধ্যে বঞ্চিত, পরাভূত, অপমানিত মাতৃত্বে
ছবি ফুটে উঠবে। ছেলে পেলে তাকে আর দেয়ালে পিঠ দিয়ে বসে
থাকতে হবে না। বড়লােকের বাড়িতে সােজা ঢুকতে পারবে তার
মাতৃত্বের মর্যাদা রেখে। ছেলে তার মাঝে আনৰে সখান, দেবে
অব্যাহতি।
ছেলে চাই।
পথে অসংখ্য ছেলে গড়াগড়ি যাচ্ছে, একটা
কিন্তু সব মা হুসিয়ার। মরবার মুহূর্তের আগে কেউ ছেড়ে দিতে
রাজি নয়।
পথের সংসারে বেছে-বেছে মােমণির সঙ্গে সে ভাব করেছে।
মর-মর দেখে। ডাকসুর বিযেটাক জমি ছিল তাদের আগে, গােয়া-
গরু ছিল, গােয়ালে সাঁজালি দিত সে নােজ। ধারে-কর্জে জমিটুক
ধূলিসাৎ হয়ে গেল। পরে ভানাকুটো করে খেত। আসাঁটা চাল আব
হিকেলমি। পরে লাল আলু। আরাে পরে দলকচু। মঞ্চে,
মহেঁয়ে, শেষ পর্যন্ত আছে এই ছেলেটা। মােমণি মরে গেলে ও-ও
টেলে যাবে। যেন তার মরবার আগে না যায়।
আমাকে দাও।
মৃত্যুর মুখে এসে সন্তানের জন্যে মায়াটাও অবাস্তব লাগে। মােক্ষণি
১৪৩
গােলাপ-মালি তাকে একটা ছেড়া কাপড় দিয়েছে, যাতে অন্তত কিছু
দীঘ-পাণ আছে, আছে কিছুটা বা আবরণের পৰ্যাপ্তি। ছেলে কোলে
নিয়ে তার চেহারা অনেক খুলে গেছে। এসেছে তী, এসেছে বা
অভাবের বাস্তবতা। তার ছিঃ আঁচলের তলায় চোখ পাঠাতে গিয়ে
সবাই ছেলে দেখছে। চোখের লালসার উপর এসে পড়ছে বা গাভী,
টিক-খর রােদে মেঘের মিতা।
কিন্তু রাই কুড়িয়ে বেল হচ্ছে না।
একসঙ্গে অনেক টাকা চাইতে অদ্ভুত ডাকসাইটে ভাজার আন?
যায় একজন। যত দামই হয়, ওষুধ খাওয়ানাে যায় ঠিক-ঠিক।
তুমি আছ, তুমি থাকতে আমি কেন মরব? তুমি হেরে যেও না,
তােমার পাশ ছেড়ে পাঠিয়ে না আমাকে হাসপাতাল। আমার না-মরার
স্বপ্ন সফল হতে দিও।
বাবুদের বাড়ির দারােয়ান এসেছে সেবার কাছে। আগে-আগে
বেছে বেছে কয়েকটা মেয়েকে তুলে নিয়ে গিয়েছে দারােয়ান। সেই বুকে
ঘাপটি মেরে বসেছে আজ সেবা।
সমের সময় নিয়ে যাব তােমাকে।
‘কি রকম পাব ?
‘আ-আৱনা তত ৩ধু খেতে পেয়েছে পেট ভরে। তােমাকে নিশ্চই
কিছু দেবে মােটা হাতে। তােমাকে তাে প্রায় ভদ্রলােক বলে মনে হয়।
তােমার বাবু তাে আরাে ভলােক। আমরা তাে জানাে বাজারের
নই—
‘ত জানি না। তাই তাে বাবু খাওয়াচ্ছেন তােমাদের বেছে বেছে।
‘ত, শ'খানেক টাকা পাওয়া যাবে?
মনে-মনে মুণ্ডপাত করলেও বাইরে দানােয়ান মুখ খিচোলাে না।
কেননা ভাল জিনিসে তার ভাল মুনাফা। ঠাণ্ডা গলায় বললে, তা বাবুর
১১
মজি হলে একশাে টাকা আর বেশি কি। সে যাই হােক, ছেলেটাকে আর কার কাছে কিন্তু রেখে এসাে। ‘ত না-হয় আসব। কিন্তু দর ঠিক না হলে আমি যেতে রাজি নই। আমার পেয়াজ-পয়জার দুই হবে এ আমি চাই না। তােমার বাবুকে পাঠিয়ে দিতে পারাে না? কথা বলে দেখি। আচ্ছা, বলছি গিয়ে। তুমি একটু ঐ আবডালে গিয়ে দাড়াও। বারিধি অনেক দূর থেকেই সেবাকে চিনতে পেরেছে। কিন্তু তাকে সেবার চেনবার কথা নয়। প্রথমত তার মুখে ঘােমটা, খানিকটা ধিকারে, খানিকটা বা সন্ত্ৰমের বিজ্ঞাপন হিসেবে। দ্বিতীয়ত, এখন তার রাজবেশ। পায়ে জরির মােটা কাবলি, পরনে নয়ানষকের ঢিলে পা-জামা, গায়ে গরদের পাঞ্জাবি, তার উপরে কাশ্মিরি ফতুয়া। মাথায় জরির টুপি, বাঁকা করে বসান। তার উপর, আজকাল সে পায়ে হেঁটে পিছু নেয় না, মােটরে করে সাঁ করে বেরিয়ে যায়। বারিধি মােটরে করে সা করে বেরিয়ে গেল। এ কি আশ্চর্য, সেবার কোলে ছেলে। বুকের উপর সে হঠাৎ একটা হাতুডির ঘা খেল। কি সে এত দিন ধোঁকা খেয়ে আছে? আজ কি তার জীবনের পরম ক্ষণে সেবা চরম প্রতিশােধ নেবে ঠিক করেছে? ষডযন্ত্র করেছে তাকে তার ছেলে ফিরিয়ে দেবার জন্যে ? ছেলেটা কি মরা, না, বেঁচে আছে ? যখন সন্ধ্যায় পুত্র আর সে একসঙ্গে চা খাবে তখনই হয়তাে সেবা সেই মরা ছেলেটা তার কোলের উপর ফেলে দিয়ে বলবে, এই নাও তােমার ছেলে। বারিধি ভূত দেখল। বললে, গাড়ি আরাে জোরে कांना সেবা চুপ করে বসে আছে প্রতীক্ষায়। বাবু তাে এল না, দারােয়ানও নয়। যাই হােক, সামনাসামনি গিয়েই ঠিক হবে একটা। ভারি হাত হলে আজ সে ফিরছে না কিছুতেই। ভাল একজন ডাক্তার দেখুক, ১২ এই এখন সাধ সুজনের। ক্রমশই সে তলিয়ে যাচ্ছে। বাধাকে বসিয়ে এসেছে তার পাশে। বাধা চেনে সেবার মুদ্দা, কোথায় গেলে ধরতে পারবে তাকে। অবস্থা আরাে খারাপ বুঝলে গােলাপ-মাসির জিম্মায় রেখে তাকে ডেকে নিয়ে যাবে তাড়াতাড়ি। শেষ সময়ে একবার বাহুর ডাের দিয়ে আঁট করে বেঁধে সমস্ত শক্তি প্রয়ােগ করে তাকে রেখে দিতে চেষ্টা করবে। তার প্রতিজ্ঞার মান রাখবে। ছেলেটা ঘুমিয়ে পড়েছে। যদি সত্যিই আপত্তি হয়, ফুটপাতের উপর আলগােছে রেখে যাবে না-হয়। মােমণি মরেছে। ছেলেটাররা অমন কোলে চড়ে বেড়াবার কথা নয়। সন্ধের মােডটা দেখে যাবে একবার। না হয়, রাত্রিবেলা গােলাপ মাসিরই শরণাপন্ন হবে। সন্ধে হতে আর কত বাকি। কতক্ষণে আসবে জানি দারােয়ান। হঠাৎ কতগুলি ভারি-ভারি গাড়ি এসে পৌছুলাে রাস্তায়। ভিখিরি দলকে টেনে-ঠেলে তুলতে লাগল সেই গাড়িতে। কেউ-কেউ ভয় পেল, কান্নাকাটি শুরু করল। কত ব্যক্তির মত লােকেরা অভয় দিতে লাগল যে যাচ্ছে তারা অনাথ-আবাসে, সেখানে খেতে পাবে মাগনা, দূর হয়ে যাবে সব নােগজালা, যা কিছু ভােগান্তি। সুস্থ হলে, সুসময় আসতেই ফেরৎ পাঠাবে তাদের গ্রামে, মিলিয়ে দেবে তাদের আত্মীয়স্বজনের সছে। তবু মূঢ় জনতা যেন তা বিশ্বাস করতে চায় না। এদিক-ওদিক ছিটকে বেরিয়ে পড়ার চেষ্টা করে। বলে, গঙ্গায় নিয়ে গিয়ে ডুবিয়ে মারবে দেখাে। ‘এই যে এদিকে। এরা দু' জন। কে একজন সেবা ও পাশের ঘুমন্ত শিশুটাকে স্পষ্ট আঙুলে দেখিয়ে দিলে। কে একজন বেহারা-পাঞ্জাবীর মত লােক। সঙ্গে খৱসায় একজন মহিলা। জামাটাই বুকের আবরণ। আঁচলটা বাহুল্য। মূখে উগ্র ১৩
কারুকাজ। এ কাব্যক্তিদের সাহায্য করছে বােয়া গেল।
এখন এদের কাজ, দলের কাজ। ফুটো জাহাজকে মেৰামতের অন্তে,
বন্দরের কারখানায় নিয়ে যাওয়া। এই এখন এদের নতুন চাকরি।
সে করুণৰূরে প্রতিবাদ করে উঠল, 'আমি না, আমি না
আমি ভিখিরি নই
সমস্ত কথা খতিয়ে দেখবার সময় কোথায়। সঙ্গে যে তার ছেলে, সে
যে ফুটপাতে, সে যে কঙ্কালসার এটাই তার ভিখিরিদের আপাতপ্রমাণ।
টেনে-ঠেলে তুলে দিল সেবাকে। আর তার ছেলেকে।
বেহারী-পাগৰীকে চিনতে পেরেছে সে। চিনতে পেয়ে
তার কণ্ঠস্বরের কাঠিন্যে। চেঁচিয়ে উঠল সে আত কঠে: ‘বারিধিবাবু,
বারিধিবাবু, আমি। আমি। আমাকে কেন নিয়ে যাচ্ছে? আমি কি
ভিখিরি?
পুর কৌতুকান্বিত হয়ে বললে : ‘এ তােমাকে চেনে দেখছি।
বারিধি অদৃয়মান গাড়ির দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু হেসে বললে,
এদের মধ্যে এত বিলিফের কাজ করছি, আর আমার নামট
জানবে না ?
১
No text on this page.
কারুকাজ। ওরা কর্তাব্যক্তিদের সাহায্য করছে বােঝা গেল। এই
এখন এদের কাত দলের কাজ। ফুটো জাহাজকে মেরামতের জষ্টে,
বন্দরে কারখানায় নিয়ে যাওয়া। এই এখন এদের নতুন চাকরি।
সেবা করে প্রতিবাদ করে উঠল, আমি না, আমি না
আমি ভিখিরি নই
সমস্ত কথা খতিয়ে দেখার সময় কোথায়। সঙ্গে যে তার ছেলে, সে
যে ফুটপাতে, সে যে কঙ্কালসার এটাই তার ভিখিরিদের আপাতপ্রমাণ।
টেনে-ঠেলে তুলে দিল সেবাকে। আর তার ছেলেকে।
বেহারী-পাৰীকে চিনতে পেরেছে সেবা। চিনতে পেরেছে
তার কণ্ঠস্বরের কাঠিন্যে। চেঁচিয়ে উঠল সে আত কঠে: ‘বারিধিবাৰু,
বারিধিবাবু, আমি। আমি। আমাকে কেন নিয়ে যাচ্ছে। আমি কি
ভিখিরি?
পুর কৌতুকান্বিত হয়ে বললে : এ ভােমাকে চেনে দেখছি।
বারিধি অদৃশ্যায়মান গাড়ির দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু হেসে বললে,
‘এদের মধ্যে এত রিলিফের কাজ করছি, আর আমার নামট
খানবে না ?
১ঃ
No text on this page.
No text on this page.