Belgaria Sudha Smriti Pathagar
Patibrata Ed. 2
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
পতিতা
ইবেরী
(সামাজিক নাটক
. .
ধীরে-মারায়ণ রায় প্রণীত
“স্পর্শের প্রভাব” উপন্যাস হইতে
যােগেশচন্দ্র চৌধুরী কর্তৃক
নাট্যরূপালিত
রংমহলে প্রথম নয়
১৭ই চৈত্র, ১৩৪
আর, এইচ, শ্রীমানী এও সল
২০৪ নং কর্ণওয়ালিস &ট, কলিকাতা।
১৯৫৫
তিীয় সংরণ
আশ্বিন, ১৩৫২ সাল
দাস , r" কা
সাত সিকা-
সর্বস্বত্ব-সংরক্ষিত
অতি প্রমানী কর্তৃক প্রকাশিত এবং নিউ মহামায়া প্রেস ৬৫৭ নং কলেজ স্ত্রীট,
কলিকাতা হইতে এগৌরচন্দ্র পাল কর্তৃক মুদ্রিত
নিবে। “পতিব্রতা” কুমার ধীরেন্দ্রনারায়ণ রায় প্রণীত “স্পর্শের প্রভাব উপন্যাসের নাট্যরূপ। উপন্যাসে যে গল্প ও চরিত্র আছে, তাহা লইয়াই আমি নাটক লিখিয়াছি ; নূতন চরিত্র সৃষ্টি করি নাই—আবশ্যকও হয় নাই। উপন্যাস হইতে নাট্যরচনার টেকনিক্ সম্বন্ধে “মহানিশা” নাটকের ভূমিকায় যে কথা লিখিয়াছি, এক্ষেত্রেও আমার তাহাই বক্তব্য। উপন্যাস হইতে নাটকরচনায় নাট্যরচয়িতার কাজ অনেকটা সূত্রধরের কাজ,গল্পের ও মূল চরিত্ৰকয়টির সূত্র আবিষ্কার করিয়া চিত্র ও চরিত্রগুলিকে সমসূত্রে গাঁথা। মূলে গল্প ও চরিত্র না থাকিলে, তাহা অবলম্বন করিয়া নাট্যরচনা সম্ভব হয় না। ঈশ্বরেচ্ছায় নাটক ও নাট্যাভিনয় প্রথম রাত্রি হইতেই জনপ্রিয় হইয়াছে ; আমার পরিশ্রম সার্থক। “মহানিশা” নাটকে নায়কনায়িকার চরিত্র অপেক্ষা পারিপার্ষিক চরিত্রগুলির জোর বেশী। এ নাটকে নায়কনায়িকার জীবনের জটিল দ্বন্দ্ব ইহাতে নাট্যরস সৃষ্টি করিয়াছে। একখানি নাটকের যখন নাম হয়, তাহার পশ্চাতে অনেকের পরিশ্রম থাকে। নটন, প্রযােজক, শিক্ষক হইতে আরম্ভ করিয়া যিনি রঙ্গালয় আলােকিত করেন—সকলের কাৰ্য্যের ঐক্যতান পরিপূর্ণ সাফল্যের জন্য অতি আবশ্যক। ইহাদের যে-কোন একজন যদি বেতালা বা বেসুরাে হন, সমগ্র অভিনয়ের রস কাটিয়া যায়। যাহাদের পরিশ্রমে নাট্যাভিনয় সৰ্বাঙ্গসুন্দর হইয়াছে, তাহাদের সকলের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। কুমার ধীরেন্দ্রনারায়ণ রায়ের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না, তিনিই আমায় ডাকিয়াছিলেন। তাঁহার বাল্যবন্ধু “শ্যামবাজার এ-ক্তি
[ ২ ]
স্কুলের সহকারী প্রধানশিক্ষক শ্রীযুক্ত উমাচরণ চট্টোপাধ্যায় মহাশয়
কুমার ধীরেন্দ্রনারায়ণের সহিত আমার পরিচয় করাইয়া দেন। পরিচয়
এখন বন্ধুত্বে পরিণত হইয়াছে। তাহার মত লক্ষ্মী ও সরস্বতীর প্রিয়পুত্রকে
বন্ধুরূপে পাওয়া অল্প সৌভাগ্যের কথা নয়। এই বন্ধুলাভের জন্য আমি
উমাচরণ বাবুর কাছে কৃতজ্ঞ।
রমহলের কর্তৃপক্ষগণ নাট্যাভিনয় সফল করিবার জন্য যেরূপ পৰ্যাপ্ত
অর্থব্যয় করিয়াছেন ও যত্ন লইয়াছেন, তজ্জন্ত তাঁহাদের নিকট আমার
আন্তরিক শুভ ইচ্ছা জানাইতেছি। আশা করি, এই যত্ন গ্রহণ ও
অর্থব্যয়ের সুফল তাহারা পাইবেন। ইতি-
}
১৮বি, বাগবাজার ফ্রীট
কলিকাতা।
৯ই বৈশাখ, ১৩৪১
যােগেশচন্দ্র চৌধুরী
রঙ মহলে উদ্বোধন-রজনী
১৭ই চৈত্র শনিবার, ১৩৪০
সংগঠনকারিগণ ?
গল্পাংশধীরেন্দ্রনারায়ণ রায়
নাট্যরূপ—যােগেশচন্দ্র চৌধুরী
ঐবিজয়চন্দ্র মল্লিক
অধ্যক্ষ শ্রীসতু সেন
শ্ৰীযামিনী মিত্র
প্রযােজক
{
নরেশচন্দ্র মিত্র
শ্রীসতু সেন
)
5, C.
Concü PTA.; *
No text on this page.
নাটকীয় চরিত্রপরিচয় সনাতন ••• সুধাংশু থাতের আলি রণে -পুরুষ- জমীদারের বাগানবাড়ীর মালী রাজ্যেশ্বর বাবুর বালক-পুত্র বাগানবাড়ীর মজুর চাপাপুকুরের যুবক জমিদার, পূর্বতন দুর্দান্ত জমিদারের পৌত্র চাপাপুকুর গ্রামবাসী অবস্থাপন্ন প্রৌঢ় গৃহস্থ রণেন্দ্রের পিসতুতাে ভাই ( আশ্রিত) জনৈক মধ্যবিত্ত কায়স্থ ভদ্রলােক মন্মথর কনিষ্ঠ ভ্রাতা রাজ্যেশ্বর কালীনাথ মন্মথ সরক ব্ৰজেন গিরিন রণেরে কলিকাতার যুবক বন্ধুগণ মাণিক, মধু গােপীনাথ বাগবাজারের স্বনাম খ্যাত গুপে গুণ্ডা রণেরে কলিকাতার বাড়ীর চাকর বিমল রাজ্যেশ্বর বাবুর পরিচিত যুবক ব্যারিষ্টার জেল-সুপারিন্টেন্টে, বৈষ্ণব ভিখারী, ঝুমুর-গানের দল প্রভৃতি। নীলু ০ ০ ০ ০ ০
৫০০
মাতঙ্গিনী
জ্যোন্য
সারদাসুন্দরী
তরলা
কুড়নী
•••
রাজ্যের বাবুর দূর সম্পর্কীয় জ্যেষ্ঠা ভগিনী
রাজ্যেশ্বর বাবুর একমাত্র সুশিক্ষিতা কন্যা
মন্মথর মাতা
মন্মথর শিক্ষিত। স্ত্রী
বস্তির দরিদ্র বালিকা
•••
পতিব্রতা
প্রথম অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
চাপাপুকুর গ্রাম। জমিদার বাবুদের পল্লীভবনের বাগানবাড়ী। শ্রীভ্রষ্ট পুরাতন
বাড়ীর সােপানাবলীর নিকট বৃদ্ধ সােনা মালী দাড়াইয়া আছে, আধুনিক
ধরণে সুসজ্জিত এক তরুণীর সহিত তাহার কথা হইতে ছিল।
তরুণীর নাম জ্যোৎস্না।
সােনা মালী। এই দিকে এস মা! (সিড়ি পুছিয়া দিয়া)
কোথায় আর বসতে দেব মা-লক্ষ্মী-এইখানেই বােস !
জ্যোৎস্যা। থাক্ থাক্ ;-তা তুমিই বুঝি এই বাগানের মালী?
এইখানেই থাক ?
সােনা। হঁ্যা মা! তা তুমি কে মা-লক্ষ্মী?-তােমায় ত কখনন
এ গ্রামে দেখিনি ?
জ্যোৎস্না। আমরা এ গাঁয়ে থাকি না। ক'দিন হ’লবাবার সঙ্গে
এসেছি ;-পড়া বাগান দেখে ভিতরটা দেখতে এলাম।
সােনা। তা বেশ করেছ লােকজন তাে আর কেউ বড়
আসে-টাসে না। এক রকম পড়াে বাগান বলতে হবে বৈকি?
পতিতা
[ প্রথম দৃশ্য
( একরাশি ফুল লইয়া সুধাংশুর প্রবেশ)
সুধাংশু। দিদি! তুমি তাে ভয়ে পালিয়ে এলে—দীঘির ওপারে
যা ফুল ফুটে রয়েছে, লাল টকটক্ ক’চ্ছে। এই দেখ না?—আমি
এতগুলাে তুলে নিয়ে এলুম।
সােনা। বেশ করেছ—আচ্ছা করেছ থােকাবাবু! এ থােকাবাবু
বুঝি তােমার ভাই, মাঠাকরুণ ?
জ্যোৎস্না। হা ; বাবা বাড়ী নেই কি না ?—তাই দুই ভাইবােনে
গা দেখতে বেরিয়েছি। সুধা ! তােমায় বারণ করলাম না—ফুল
তুলতে।
সুধাংশু। তােমার বারণ আমি শুনবাে কেন? তুমি নাকি বাবার
মতন বড় হয়েছ, তুমি নাকি পিসিমার মত গিন্নীবায়ী হয়েছ—তাই
তােমার কথা শুনতে হবে ?
জ্যোৎস্না। না বলে পরের জিনিস নিলে কি হয় জান না?
আচ্ছা, বাবা আগে বাড়ী আসুন।
সুধাংশু। পরের জিনিস কেন হ’তে যাবে? পরের জিনিস যদি,
তা ‘পর কোথায় শুনি ? হাগা! তুমি নাকি পর?—এ বাগানের
ফুল নাকি তােমার ?
সােনা। নানা, থােকাবাবু! এসব তােমার-তােমার ! তােমার
যত ইচ্ছে-ফুল তুলে লাও থােকাবাবু! আচ্ছা, আমি ফুল তােলবার
ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। ওরে, ও খাতেরআলি—একবার এইদিকে
আয় রে !
সুধাংশু। হাগা! তােমার ওই খাতেরআলি সাঁতার জানে ?
দীঘির মাঝখানে যা পদ্মফুল ফুটে আছে দিদি! এই—এত বড় বড়!
সােনা। ও-েও খাতেরঙ্গালি ।
কে
প্রথম অঙ্ক ] পতিব্রতা খাতের। ( নেপথ্যে) কি বতিছ গগা সােদা। সােনা। এই খােকাবাবুকে সাথে করে এক বােড়া বড় বড় দেখে ভাল ভাল পদ্মফুল তুলে দিবি। ( খাতেরআলি প্রবেশ করিল ) খাতের। এই অবেলায় জলে লাম্বাে ? কাল নাবার সময় পদমফুল তুলে দেব খােকাবাবু! আজ গােলাপী ফুল নিয়ে যাও—এস খােকাবাবু! সকালের পদম্ আরও ভাল। আজ দুদিন আবার মাথাটা টিপটিপ কতিছে কিনা ? সােনা। অমনি এখন তাের মাথা টিপটিপ করে উঠল? যত কুড়ের মরণ- সুধাংশু। আচ্ছা-আচ্ছা, পদ্মফুল তুমি কাল দিও। খাতের। কোন্ বাবুর পােলাগা সােনাদা?—আর, টুসকি দিলে নক্ত পড়ে—এ মাঠাকরুণই বা কেডা? এ গাঁয়ের বৌড়ি, না ঝিউড়ি ? সােনা। তাের অত খোঁজে দরকার কিরে বাপু? যা বল্লাম, তাই করনা।-হ্যা, আর গােটাকতক ডাব পাড়বি। খাতের। এনাদের এ গাঁয়ে দেখিনি কি না—তাই জেসছিলাম? সুধা। আমি তােমায় সব বলছি, তুমি এস-না ভাই! আমার নাম সুধাংশু। উনি আমার দিদি; আর ওই ঝাউগাছওয়ালা বাড়ীটে আমাদের বাড়ী!—বুঝলে? [ সুধা ও খাতের প্রস্থান করিল ]। সােনা। ও! বটে ?—ওই ঝাউগাছওয়ালা ঘরটা তােমাদের বাড়ী মাঠাকরুণ? তাই বটে, কদিন ধরে দেখ তিছি—ওখানে লােকজন খাটছে।—তা তােমরা কতদিন এসেছ এ গাঁয়ে মাঠাকরুণ?
৪
পতিব্রতা
[ প্রথম দৃশ্য
জ্যোৎস্না। পরশুর আগের দিন বিকেলে। আমরা এখানে ছিলাম
না--বাবার সঙ্গে পশ্চিমেই কাটিয়েছি। এখন বাবার পেন্ন্ হয়েছে
কিনা! দেশে ফিরে এসেও কিছুদিন কলকাতায় বাড়ী ভাড়া করে
ছিলাম। এইবার দেশে থাকবাে !
সােনা। বেশ মা–বেশ! দেশের মানুষ দেশে না থাকলে কি চলে?
জ্যোৎস্না। তােমার নাম বুঝি সনাতন ?
সােনা। হ্যা মা! তা তুমি কি করে জানতে পারলে মাঠাকরুণ?
জ্যোত্মা। ওই খাতেরআলি তােমায় সােনাদা বলে ডাছিল
কিনা!
সােনা। তােমার তত খুব বুদ্ধি মাঠাকরুণ ! তুমি বােধ হয় খুব
নেখাপড়া জান ?
জ্যোৎস্না। আচ্ছা, এতবড় বাগান—তা এরকম বিশ্রী হয়ে রয়েছে
কেন?—চারিদিকে শুধু কাটাবন আর জঙ্গল, বড় বড় পুকুর সব পানায়
বােঝাই !
সােনা। হবনি মা ? যার ধন সে যদি না দেখে, তাহলে কার
সাধ্যি বল মার’ক্ষে করে !
জ্যোৎস্না। তা এ সম্পত্তির মালিক কে ?—তিনি কোথায় থাকেন?
সােনা। আর শুধু কি এই বাগান ?-বাবু যে আমাদের এ মল্লুকের
রাজা। এই গাঁয়ের কাছেই তাদের ভিটে ; দেখ যদি মাসে একখানা
গেরাম বললেই হয় ।
জ্যোৎস্না। তােমার বাবু কোথায় থাকেন?
সােনা। বুড়ােকা মারা গেলেন! তারপর বছরতিনেক হলাে
কত্তানীর
তানীর কাল হলাে -- ততদিন সব দেশেঘরেই ছিলেন ; তারপর থেকেই
খােকাবাবু একরকম বিবাগী বল্লেই হয়।
প্রথম অঙ্ক ] পতিব্রতা ৫ জ্যোৎস্না। তা খােকাবাবু এত অল্প বয়সে বিবাগী হয়ে গেলেন! সােনা। তা একরকম বিবাগী বলতে হবে বৈকি মা ! দেশেঘরে তত থাকেনই না—তাছাড়া কলকাতায় ঘর আছে, সেখানেও র দেখা পাওয়া যায় না! হিল্লীডিল্লী, কাশী গয়া শ্ৰক্ষেত্ৰবারমাস এই করেই বেড়াচ্ছেন। জ্যোৎস্না। আচ্ছা, এই যে মন্দির—এটা কি ? সােনা। ওই তত বাবুদের রাধা-গােবিজীর মন্দির! কত কাণ্ড হয়ে গেছে ওই মন্দির লিয়ে। এই ঠাকুরবাড়ীর দৌলতেই তাে এখানে বাগান! কর্তাবাবুদের আমলে সে কি বােল-বােলাও গেছে মা! ওই মন্দিরে বাসের সময়, দোলের সময়-বছরে দুবার করে যাত্রা-কীর্তন, লােকজন-এক মাস ধরে সদাব্রত! সাত-সাতটা পরগণার লােক এসে খেয়ে গেছে—নিয়ে গেছে । জ্যোৎস্না। তােমার খােকাবাবু বুঝি সেসব তুলে দিয়েছেন? সােনা। নিত্যি সেবার জোগাড় আজও আছে ; পাল-পার্বণ আর হয় না-কেডা করে? বাবু তাে আর দেশেঘরে থাকেন নি। জ্যোৎস্না। তা তােমার বাবুকে দেশেঘরে টেনে রাখতে পারে, এমন মানুষ বুঝি কেউ নেই ? সােনা। তাহলে আর দুঃখু কি ছিল মা! কৰ্ত্তা থাকতে হয়েছিল সবই মা—আমাদের বরাতে সইলনি মা! জ্যোৎন্সা। ওঃ বুঝেছি—তােমার বাবুর বৌ মারা গেছেন বুঝি? ও দুদিন পরে সব ঠিক হয়ে যাবে। তােমাদের বৌঠাকরুণ বুঝি বড্ডই সুন্দরী ছিলেন ? সােনা। মা ছিলেন আমার নম্মীর প্রতিমে! এই তােমার মত বর্ণ ছিল মাতােমার মত রূপ মা! তা মা, যমে যদি নিতে—তাহলে
পতিব্রতা
[ প্রথম দৃশ্য।
আমার মনটা বুঝতে ;-কর্তাদের কি ঝগড়া হলাে মা, তারপর বিয়ের
বৌ সেই যে বাপের বাড়ী চলে গেল—আর কেউ তেনারে আলে নি!
তা মা তােমাদের বড়লােকের বড় কথা—আমরা ওর কি বুঝি বল ?
তাদের ঝগড়া হ’লল, মামলা হ’লল, দাঙ্গা-হাঙ্গামা ফৌজদারী— সবই
হলাে; লাভের মধ্যে এই বাড়ীতে মা-লক্ষ্মীর আসার পথে পল কাটা।
জ্যোৎস্না। তােমার বাবুর নাম কি সনাতন ?
সােনা। আমি তাে তেনারে এই এতটুকু বেলা থেকে কোলেক্টখে
করে মানুষ করেছি। আমি তাকে থােকাবাবুই বলি। ভাল নাম কি
যেন একটা আছে! সে নামে কেউ ডাকেনি – খাতায় নেকা আছে।
রণেন। (নেপথ্যে গম্ভীরকণ্ঠে) সােনাদা!-সােনাদা কোথায় গাে?
পােনা। কি ?—খােকাবাবু এলে নাকি ?
(রণেনের প্রবেশ)
রণেন। হ্যা সােদা! (জ্যোৎস্নাকে দেখিয়া ) একি! আপনি
এখানে ?
জ্যোৎস্না। আপনিই বা এখানে কেন ?
সােনা। মাঠাকরুণ তােমার চেনা নাকি থােকাবাবু? তােমারই
কথা হচ্ছিল এতক্ষণ ধরে ওনার সাথে।
রণেন। আচ্ছা, তুমি এক কাজ কর সােনাদা! গাড়ীতে আমার
মুকেশ বিছানা সব রয়েছে, ওগুলাে আবার ব্যবস্থা কর। আর
আমার জন্যে একটা ঘর পরিষ্কার করিয়ে রাখ—আমি দিনতিনেক
এখানেই থাকবে। আমার সঙ্গে কালদা এসেছে। আমি যে কদিন
গছি, ও বাগানে থাকবে; তারপর ওবাড়ীতে গিয়ে থাকবে।
সােনা। কালীবাবুকে আবার কেন জোটালে থােকাবাবু?
প্রথম অঙ্ক ]
পতিতা
;
রণেন। কোথায় আর যাবে বল ?-আপনার লােক। এবার সে
খুব ভাল হয়ে গেছে-বুঝলে সােনাদা? সে মানুষই না—তুমি চিনতে
পারবেনা!—যাও, তুমি চট করে ব্যবস্থা করে ফেল; আমি ততক্ষণ
এর সঙ্গে কথা কচ্ছি।
জ্যোৎস্লা। সুধা যদি ওদিকে থাকে, এখানে পাঠিয়ে দিওনা
সােনাদা?
সােনা। আচ্ছা মা—আচ্ছা ; আমার থােকাবাবুর সাথে কথা বলে
দেখ মা—অমন ছেইলা আর হয় না।
[ প্রস্থান ]
রণেন। সােনাদা কি আপনারও ‘সােনাদা’ নাকি ?
জ্যোৎস্না। আপনারা সবাই যাকে সম্মান ক’চ্ছেন, আমি তাকে
নাম ধরে ডাকবাে কোন্ লজ্জায় ?
রণেন। সােনা বড় ভাল লােক—আমায় বড্ড ভালবাসে! ওর
জন্যই মাঝে মাঝে আসতে হয়।
জ্যোৎস্না। তা আপনার এই বয়সে এরকম অকাল বৈরাগ্য কেন
হলাে ?
রণেন। সােনাদা বুঝি বলেছে ? ও সব কথা জানে না।
জ্যোৎস্না। তবু, দেশেঘরে তত থাকেন না। আপনার এত বড়
সম্পত্তি-বাগানবাড়ী, ঠাকুরবাড়ী
রণেন। এ সব থেকেও নেই !
জ্যোৎস্না। যিনি থাকলে সব থাকার অর্থ হয়, তিনি নেই! তা
তিনি নেই কেন ?-তাকে আলেই তাে আসেন !
রণেন। লক্ষ্মীর আসার পথ কি করে যে বন্ধ হয়—লনীছাড়া তা
কেমন করে জানবে বলুন?
পতিব্রতা
[ প্রথম দৃশ্য
জ্যোৎস্না। তা বটে! তা আপনার সে কুকুরটা কোথায়?- তাকেও
সঙ্গে করে এনেছেন নাকি?
রণেন। না; সে কলকাতার বাড়ীতে আছে—আপনার ভয় নেই।
আচ্ছা, সেদিন ওই ভদ্রলােকটি আমার সঙ্গে ওরকম ব্যবহার করলেন
কেন বলুন তাে? আমি তাে সত্যি কোন অপরাধ করিনি।
জ্যোৎসা। কি জানি—আমিও ঠিক কিছু বুঝতে পারিনি! একবার
জিজ্ঞাসা করেছিলাম ; উত্তর কিছু দিলেন না !
রণেন। উনি আপনার কে ?
জ্যোৎস্না। আমার বাবা।
রণেন। আপনারা কি এই গাঁয়ের মানুষ ?
জ্যোৎস্না। বাবার কাছে তাই শুনেছি। আমার ঠাকুরদ্দামশাই
এইখানেই থাকতেন।
[ খাতেরআলির মাথায় বৃহৎ ঝুড়ি, সঙ্গে সুধাংশুর প্রবেশ ]
সুধা। দিদি !, কত ফুলফল তরিতরকারী আমাদের দিয়েছে –
এক গাদা!
খাতের। আরে—বাবু যে! আপনি কখন্ আলেন ? ছেলাম বাবু
ছেলাম!
রণেন। এই এসে পলাম—কে যেন টেনে নিয়ে এলাে ! ভাল
আছিস খাতের ?
খাতের। আজ্ঞে হ্যা বাবু, তা আপনার ছিচরণের কৃপায় প্রাণগতিক
সব মসল!
রণেন। এই যে—আপনার ভাইটাও সঙ্গে আছে! চিনতে পার
থােকা আমায় ?
প্রথম অঙ্ক ]
পতিব্রতা
সুধাংশু। তা আর পারিনে ?
রণেন। কোথায় দেখেছ বল দেখি ?
সুধাংশু। সেই—শিবপুর বােটানিক্যাল গার্ডেনে ? আপনার সেই
কুকুর ?-ওরে বাপরে, কি ভয়ানক কুকুর—যেন বাঘ ! ও বুঝি নােজ
একটা করে পাঠা খায়?—তাই ওরকম তেজালে ! সেদিন ভাগ্যি
আপনি কাছে ছিলেন—নইলে ও দিদিকে ফিষ্টি করে ফেলতাে ! আপনার
কাছে কিন্তু একেবারে কেঁচো ! আপনি বুঝি ওকে বড্ড ভালবাসেন?
রণেন। হ্যা; তুমি কুকুর ভালবাস?-তােমর কুকুর আছে ?
সুধাংশু। না, আমি নেংটী ইঁদুর ভালবাসি। আমার তিনটে বিলিতি
ইদুর আছে-সাদা দুধের মত।
জ্যোৎ। চল সুধা, বেলা গেল—এইবার বাড়ী চল। বাবা ফিরে
এসে আমাদের যদি না দেখতে পান আবার!
রণেন। বারে বা—আমিও এলাম আর আপনিও চললেন? এতে
বড় অন্যায় ! আচ্ছা, আমি না-হয় চলে যাচ্ছি। সােনাদার সঙ্গে তাে
বেশ গল্পগুজব করছিলেন, আমি এলাম আর আপনার বেলা গেল ?
জ্যোৎস্না। নানা ; আমরা কাউকে না বলে চলে এসেছি কিনা ?
-হয় আর একদিন আসবে ;-আজ যেতে হবে !
রণেন। আমি আর কদিনই বা এখানে থাকবে বলুন? কালই
হয়তাে-
=
খাতের। আজ্ঞে, আমি তাহলে কি করবাে বাবু? এই বােড়াটা-
রণেন। ঝােড়াটা ওখানে নামিয়ে রেখে একছিলি তামুক খেয়ে
নাওনা ? এত ফুলফল পেড়েছ—তােমার শ্রম হয়নি? যাও যাও, একটু
তামুক খেয়ে নাও গে, যাও!
১০ পতিব্রতা [ প্রথম দৃশ্য ( রাজ্যেশ্বর ও সনাতনের প্রফেশ) সােনা। মা-লক্ষ্মী আর থােকাবাবু বাগান দেখতে এসেছেন কর্তা- বাবু! ( রণেনকে দেখাইয়া) এই আমার বাবু। সুধা। বাবা, এই দেখ—সােনাদা আর খাতেরআলি আমাদের কত জিনিস দিয়েছে!—আর এই বাবুকে চিনতে চিনতে পাচ্ছনা ? সেই বােটানিক্যাল গার্ডেনের বাবু-দিদিকে কুকুরের মুখ থেকে বাঁচিয়ে- ছিলেন? সােদা, খাতের আলি—সবাই ওঁকে বাবু বলে ডাকে। [ রাজ্যেশ্বরবাবু চারিদিকে চাহিয়া ব্যাপারটা বুঝিবার চেষ্টা করিলেন ] রাজ্যেশ্বর। জ্যোৎস্না! আমার সঙ্গে এস। এটা কলকাতার সহর না, পশ্চিমের সহরও না—এটা পাড়াগাঁ; তােমার মনে রাখা উচিত, ছিল। সােনা। খাতের, ঝােড়াটা বাবুদের বাড়ীতে দিয়ে আয়। রাজ্যেশ্বর। না- সােনা। থােকাবাবু ফুল মাগছিলেন বাবু! তাহ- রাজ্যেশ্বর। না— সুধাংশু। বাবা, আমি না বলে পরের জিনিস নিইনি। সােনাদা. নিজে ইচ্ছে করে খাতেরআলিকে দিয়ে রাজ্যেশ্বর। তা হােক—তুমি এস। সুধাংশু। বড্ড ভাল ফুল বাবা ! রাজ্যেশ্বর। তর্ক করােনা সুধা, চল আমার সঙ্গে। রণেন। আমার একটা কথা শুনবেন ? রাজ্যেশ্বর। কি?- রণেন। আমি আপনার কাছে কি অপরাধ করেছি, জানতে পারি কি?
প্রথম অঙ্ক ]
পতিব্রতা
রাজ্যেশ্বর। না—কোন আবশ্যক নেই।
রণেন। আপনার আবশ্যক না থাকতে পারে, কিন্তু আমার আবশ্যক
আছে। সেদিন আপনি আমায় অপমান করেছিলেন ; আমার অপরাধ
-আমি আপনার মেয়ের প্রাণরক্ষা করেছিলাম। আজ আমার বাগানে
এসে সামান্য ভদ্রতা করে আমার সঙ্গে একটা কথা বলাও আপনি
আবশ্যক বলে মনে করেন না !–এর অর্থ কি ? আমি তাে জানতঃ
কোন অন্যায় করিনি আপনার।
রাজ্যেশ্বর। আমি তােমার কোন কথার উত্তর দেব না।
রণেন। উত্তর দেবেন না? কি আশ্চর্য ! এরকম অদ্ভুত মানুষ
তাে আমি কখনাে দেখিনি! আচ্ছা, আপনার বাড়ী কি এই গাঁয়েই ?-
আপনার নাম ?
রাজ্যেশ্বর। আমি তাে তােমায় বলেছি, তােমার কোন কথার উত্তর
দেব না-তবে কেন বারবার বিরক্ত কচ্ছ?
[ জ্যোৎস্না যাইতে যাইতে রণেনের মুখের দিকে চাহিল ]
[ জ্যোৎস্না, রাজ্যেশ্বর ও সুধাংশুর প্রস্থান।
খাতের। বাবাঠাকুরের বােধ হয় মাথা খারাপ !
সােনা। যাকগৈ ; চল-ফুল দিয়ে
দিয়ে আমার খােকাবাবুর ঘর
সাজাই গে ।
রণেন। না সােদা, ফুলের আর দরকার নেই। খাতের! ফুল
তুই বাড়ী নিয়ে যা ; বেচে ফেলিস্ কি তাের মেয়েকে দিযা হয়
করি। আমি ফুল চাইনে।
[ সনাতন ও খাতেরের প্রস্থান।
ঘরটা পরিষ্কার করে শীগগির বিছানাটা করে ফ্যাল।
পতিব্রতা
[ প্রথম দৃশ্য
( কালীনাথের প্রবেশ )
কালী। কি হে ভায়া! ব্যাপার কি ?—তােমার শ্বশুর অমন
হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলাে—আবার মেয়ে নিয়ে হনহন করে চলে গেল
যে বড় ?
রণেন। আমার শ্বশুর !
কালী। হ্যা, তােমার শ্বশুরইতাে ? মেয়েটা গছাবার চেষ্টায়
এসেছিল বুঝি? তাড়িয়ে দিয়েছ তাে, বেশ করেছ! সংসার কি
গােলকধাধারে বাবা! তুমি এয়েছ এখানে কাকপক্ষীর মুখে শুনে
অমনি কাজ গােছাতে ছুটে এসেছে ! এমন বেহায়া মানুষ তাে কখনাে
দেখিনি। বেশ করেছ—
ধুয়ে বিদেয় করেছ! বুদ্ধিমানের মত
কাজ করেছ !
রণেন। উনি আমার শ্বশুর ?-- তুমি ঠিক জান কালদা ?
কালী। তােমার শ্বশুর না তাে কি আমার শ্বশুর নাকি ? কেন
তুমি ওকে চেননা নাকি? রাজ্যেশ্বর বােস—বিয়ের সময় দেখনি?
রণেন। ভাল মনে নেই !
কালী। হা---তা তো বটে! তখন তােমার বয়স আর কত!
দেখতে দেখতে বার-তের বছর হবে বােধ করি তােমার বিয়ে হয়েছে !
তখন তােমার বয়স বছর চৌদ্দপনের আর তােমার বউ বছর আষ্টেক
গৌরীদানের কন্যে! এসেই বুঝি বল্লে—তােমার বউ তুমি নাও বাপু!
এদ্দিন এ আকেল কোথায় ছিল বাছাধনের ?
রণেন। তুমি চুপ কর কালদা, উনি ওসব কথা কিছু বলেন নি।
কালী। হা-হা-ওর মতলব আর আমি বুঝিনি? টোপ গেঁথে
এনেছেন—যুবতী মেয়ে জামাইকে রূপে বশ করবে ! তুমি রাজা দুষ্মন্তের
মত একেবারে সাফ জবাব দিয়ে তাে? বেশ করেছ ভায়া, ও
প্রথম অঙ্ক ] পতিতা মেয়ের কি আর জাতজন্মের ঠিক আছে ?—রাজ্যেশ্বর বােস তত খৃষ্টান । মেয়ের চালচলন দেখলে না? দাদামশায়ের যেমন বুড়াে বয়েসে বাহাত্তরে ধরলো—গৌরীদানের মেয়ে আর খুঁজে পেলেন না ! কলকাতায় কতবার দেখেছি, ওই ধাড়ী ধিদী মেয়ে নিয়ে ট্রামে বাসে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে ওই রাজ্যেশ্বর বােসটা। রণেন। কাদা, এসব কথা তুমি কেন বলছ? আমি তােমায় কোন কথা জিজ্ঞাসা কচ্ছি? তুমি জান, পরচর্চা আমি ভালবাসিনে। কালী। আচ্ছা—আচ্ছা, তা থাক—তা থা! তা ‘পর আর এর মধ্যে কোথায় পেলে ভায়া? তােমার শ্বশুর, তােমার স্ত্রী-তাদের সম্বন্ধেই কথা। পরচর্চা তত করিনি ভাই,-পরচর্চা কেন করতে যাব ?—কি দরকার? আমার সে অভ্যাস নেই। ওরে ও সােনা, হারামজাদা ব্যাটা যে কা- যাবে—বাঘের মাসী-আঠারাে মাসে বছর! রণেন। দেখ কান্ন, সােনাদাকে তুমি ওরকম গালাগাল ক’রনা। ও আমার বড় ভাইয়ের মত ) কালী। আচ্ছা-আচ্ছ—বেশ! তাই হবে—তাই হবে। বসে বসে পেন্ খাচ্ছে, একটু-আধটুতা তুমি যা বলবে, তাই হবে ভাই ! আমার কি বল ? ওগাে–ও সােনার চাদ, বাপের ঠাকুর! দয়া করে তামাক টামাক একটু দেবে ইষ্টিদেবতা ? রণেন। চাকর-বাকরগুলাে কেন যে তােমায় মানে না, এখন আমি তা কতক কতক বুঝতে পাচ্ছি। কালী। মানেনা আবার! বুঝিয়ে দিতে পারি ভাই-মানে কি না মানে; জুতাের চোটে মানবে আবার বাবা বলবে! তােমাদের তাে এ জমিদারী মহল নয়—থিয়েটারী আখড়া! সদর নায়েব চাকর-বাকরদের ১৪ পতিব্রতা [ প্রথম দৃশ্য ; বাপুবাছা বলবে?—সে জমিদারীর পরমায়ু দশ বছরের বেশী নয়বুঝলে ভায়া ! আমারও পৈত্রিক কিছু ছিল-জানি সব ; তবে এখন মরে আছি, নইলে কাশীমিত্তিরের ঘাটও চিনি আর নিমতলার ঘাটও চিনি। রণেন। চটলে নাকি কাদা, কিছু মনে করােনা ভাই। মনটা ভাল নেই দাদা! কালী। তা আমি জানি; কিন্তু কেন—হয়েছে কি ? কে ও ব্যাটা, যে ওর জন্যে মন খারাপ করতে হবে ? রণেন। কি আশ্চর্য্য-ভদ্রলােক আমার সঙ্গে কথাই কইলেন না। এরকম অপমান আমি জীবনে হইনি। কালী। এ অঞ্চলের মালিক তুমি!-তােমার সামনে তােমায় অপমান করে গেল, আর তুমি বলছাে মন-খারাপ! একটা মুখের কথা খসাও দেখি ভায়া—এখুনি চারজন বরকন্দাজ পাঠিয়ে ব্যাটাকে জুতত মারতে মারতে এখানে এনে হাজির করি ; তারপর সারারাত পিঠমােড়া করে বেঁধে, কড়িকাঠে টাঙিয়ে জল-বিছুটা সপাসপ ! ব্যাটার চৌদ্দ- পুরুষের নাম ভুলিয়ে দেবনা ? রণেন। না-না, কান্দা! তুমি অত উত্তেজিত হয়ােনা। কালী। জমিদার বলি দাদামশায়কে! ওই তােমার শ্বশুরের বাপকে-সাত বছর ঘানি টানিয়ে তবে ছেড়েছিলেন। রণেন। একথা সত্যি কাদা ? কালী। সত্যি নয় ?—আমি কি-না জানি বল ? বাঘের ঘরে ঘােগের বাসা! দশ কাঠা জমি নিয়ে ব্যাটা এল কিনা শিবনারায়ণ দত্তর সঙ্গে টক্কর দিতে! আরে, সে মহা দুর্দান্ত জমিদারবাঘে গরুতে এক- ঘাটে জল খাওয়াত। তার হাঁকডাক কি? তােমাদের ওই রাজবাড়ীর হাতে গড়িয়ে-দুখীরাম বলে হাঁক দিত, সাতখানা গাঁয়ের লােক এসে প্রথম অঙ্ক ] পতিব্রতা জড়াে হতাে। সে এক কালই গেছে ভায়া ! আমি কিছু কিছু দেখেছি। তােমরা তাে আর দেখনি ? রণেন। কিন্তু আমার দাদাশ্বশুরকে সত্যই তিনি জেল খাটিয়ে ছিলেন ? কালী। খাটানি? সে তত জেলেই মারা গেল ; কেন—তুমি এসব কথা জানতে না ? রণেন। আমার বিয়ে হয়েছে আর শ্বশুরের সঙ্গে আমাদের কি গণ্ডগােল! আমি শুধু এই জানি-আর কিছু জানিনে। কালী। চল-ভিতরে বসে মাক খেতে খেতে তােমায় সব কথা বলিগে। এস—ভারি মজার ব্যাপার! রণেন। তাহলে ভদ্রলােক অন্যায় কিছু করেনি। এর প্রায়শ্চিত্ত আমাকেই করতে হবে। চল—তােমার কাছে আগে সব কথা শুনি। কিন্তু এদিকে এ ব্যাপারটাও সহজ নয়-এর মধ্যে নিশ্চয়ই ভগবানের কোন ইঙ্গিত! · কালী। কোন্ ব্যাপারটা আবার ? রণেন। এমনভাবে আমাদের দেখা হ’লল! ঠিক সাতদিন আগে এমনি সময় শিবপুর বােটানিক্যাল গার্ডেনে গঙ্গার ধারে, তার ঠিক সাত- দিন পরে আবার এখানে এই গায়ে—আশ্চৰ্য্য নয় ? আর এই সাতদিন তােমায় আমি কি ব’লবাে কান্দা! তুমি বড় ভাই, তুমি জান, নারী সম্বন্ধে আমার একটুও দুর্বলতা নেই ; তবু তােমায় বলছি, এই সাতদিনে একমুহূর্তের জন্যও আমি তার মুখ ভুলতে পারিনি! (কালীনাথ হাসিল) কি-হাসছাে যে কালা? -বিশ্বাস হলাে না ? কালী। বিশ্বাস আর কেন হবেনা ভাই ?বরং একটু বেশীমাত্রায় বিশ্বাস হয়েছে। আসল কথাটি কি জান ভায়া তুমি প্রেমে পড়েছ।
১৬
পতিব্রতা
[ প্রথম দৃশ্য
তা পড়েছ পড়েছ, বেশ করেছ,নিজের স্ত্রীর প্রেমে পড়েছ ; দোষই
বা কি করেছ ?—তবে কিনা ভায়া !
রণেন। কি?-
কালী। আচ্ছা, এখন থা—পরে ব’লবাে।
রণেন। না-না, পরে না—পরে না; তুমি এখুনি বল?
কালী। আচ্ছা বলছি—ঘরে চল, ঘরে চল ; কিন্তু দেখাে ভায়া-
শেষে আমায় যেন দূযাে না? আমার শােনা কথা—অবশ্যি চোখে আমি
কিছু দেখিনি, হতেও পারে—আবার নাও হতে পারে ।
[ উভয়ের প্রস্থান।
দ্বিতীয় দৃশ্য
চাপাপুকুরে রাজ্যেশ্বরের বাড়ী। ঘরের ভিতর জ্যোৎস্না ও সুধাংশুকে
সঙ্গে লইয়া রাজ্যের সেখানে প্রবেশ করিলেন ।
রাজ্যেশ্বর। সুধা, এই টাকাটা রেখে দাও; তােমায় আমি ফুল
কিনে দেব।
সুধাংশু। শুধু ফুল বুঝি?—কত জিনিস দিয়েছিল-ফুলকপি,
বাঁধাকপি, মটরশুটা, পেয়ারা, মিঠে কুমড়ে-
রাজ্যেশ্বর। আচ্ছা, এই আর একটা টাকা নে। কলকাতা থেকে
তাের জন্যে কেমন বল এনেছি; তাের পিসিমার কাছে আছে, চেয়ে
নিগে।
সুধাংশু। তুমি বুঝি দিদিকে গল্প বলবে ?—আমি যাবােনা, গল্প
গুনবাে
প্রথম অঞ্চ ] পতিব্রতা ১৭ রাজ্যেশ্বর। গল্প সন্ধ্যের পর বলবাে। তুই যা-না এখন ; (নেপথ্যে ) “সুধা, খেলতে যাবিনে”? ও বাড়ীর মণ্ট, তােকে খেলতে ডাকছে যে? সুধাংশু। মন্ট, বুঝি ভাল ছেলে ? আমি নিজে দেখেছি বাবা, ও পিতামাতার কথা বড় অবহেলা করে। রাজ্যেশ্বর। আর তুমি বুঝি পিতার কথা বড্ড শােন ?—দুষ্টমি করােনা, যাও। সুধাংশু। আমায় কিন্তু সন্ধ্যে বেলা সব কথার মানে বলে দিতে আমি “অবশ্যম্ভাবী” কথার মানে জানিনে, “প্রায়ােপবেশন” কথার মানে জানিনে, “বিরহ”, “মনসিজ”—আরও সব অনেক কথা আছে ; হু- রাজ্যেশ্বর। আচ্ছা-আচ্ছা, এখন যাও। (সুধাংশুর প্রস্থান) আমার আজকের ব্যবহার দেখে তুমি মনে মনে খুব আশ্চর্য হয়েছে জ্যোৎস্না-না? জ্যোৎস্না। কোন ভদ্রলােকের সঙ্গে আপনি এরকম ব্যবহার করতে পারেন, আমি কোনােদিন ভাবিনি বাবা । রাজ্যেশ্বর। সেই কথাই তােমায় ব’লবাে, তােমায় বলা দরকার। জ্যোৎস্না। বলুন- রাজ্যেশ্বর। যার সঙ্গে ওখানে তােমার দেখা হয়েছিল, যার সঙ্গে তুমি কথা কইছিলে,তার চাইতে বড় শত্রু সংসারে আমার নেই। জ্যোৎস্না। কিন্তু উনিতাে জানেন না—উনি আপনার শক্ত? রাজ্যেশ্বর। না-ও জানেনা ; ওর জানবার সুযােগ হয়নি। জ্যোৎস্না। আপনার কথা আমি কিছু বুঝতে পারছি না বাবা! রাজ্যেশ্বর। বুঝিয়ে বলছি-শােন ! শত্রু ঠিক নয়, শত্রুর বংশধর। ভেবেছিলাম, একথা তােমায় কোনােদিন জানাব না। আমি শুনেছিলাম,
১৮
পতিতা
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
ওরা কেউ এগায়ে থাকে না ; তাই এখানে বাস করতে এসেছিলাম।
এখন দেখছি, ভাল কাজ করিনি।
জ্যোৎস্না। এমন কি শত্রুতা বাবা, যে বংশানুক্রমে তাকে জীইয়ে
রাখতে হবে ?
রাজ্যেশ্বর। সব কথা তােমায় কোনদিন বলিনি মা—পাছে তুমি
মনে ব্যথা পাও;-তােমার জ্ঞান হওয়া অবধি একটি কথা তােমার
সামনে কোনদিন উচ্চারণ করিনি—আজ সেই কথাটা তােমায় জিজ্ঞাসা
করছি।-আচ্ছা, ছেলেবেলার কোন কথা তােমার মনে পড়ে?
জ্যোৎস্না। মনে পড়ে বাবা। আমি বুঝতে পেরেছি—চিতেও
পেরেছি।
রাজ্যের। প্রথমেই চিনতে পেরেছিলে?
জ্যোৎকা। হ্যা—প্রথমেই।
রাজ্যেশ্বর। বােটানিক্যাল গার্ডেনে ?
জ্যোৎস্না। না; আপনি যখন ঐরকম ব্যবহার করলেন, তখুনি
আমার মনে সন্দেহ হলাে!
রাখেন। যে সব ঘটনা তথন ঘটেছিল, তার কিছু জান ?
জ্যোৎসা। কিছু জানি—সব নয় ।
রাজ্যের। কেমন করে জানলে? আমি তাে সে কথা কখনও
ঘুণাক্ষরেও তােমায় জানতে দিইনি?
জােৎস্না। মা বেঁচে থাকতে তিনি কতবার আপনার কাছে কেঁদেছেন
-আপনি সে কথায় কান দেননি! মরবার সময় মা একটি কথা আমায়
বলে যান।
রাজ্যের। কি কথা?
বো। সে কথা থাক বাবা, আপনি শুনলে কষ্ট পাবেন।
প্রথম অঙ্ক ] পতিব্রতা ? রাজ্যেশ্বর। না—আমি কষ্ট পাব না; তুমি বল। জ্যোৎকা। মা বলেছিলেন-তােমার বরাতে যে কি আছে, কিছুই জানিনে মা! নইলে এমনই বা হবে কেন? তবে তুমি মনে খটা থেকো। কখনাে ভুলােনা, মেয়েমানুষের স্বামীর চেয়ে বড় কিছু নেই। রাজ্যেশ্বর। তােমায় আমি যে সব বই দিয়েছি ইউরােপের new woman movement সম্বন্ধে,—তুমি বইগুলাে পড়েছিলে ? জ্যোৎঙ্গা। পড়েছি বাবা । রাজ্যেশ্বর। এই সব পড়ার পরও কি তুমি মনে কর, তােমার মার কথাই সত্যি জ্যোৎস্না। আমায় এসব কথা জিজ্ঞাসা করবেন না বাবা, আমার মতামত কিছু নেই। আমি ভাল বুঝতে পারিনি। রাজ্যের। শােন জ্যোৎস্না—তােমায় আমি স্পষ্ট কথা বলি। তােমার স্বামী আমার পরম শত্রুর নাতি; এরকম শক্ত মানুষ মানুষের হয় না; -সে আমার বাবাকে সাত বছর জেল খাটিয়েছে। তখন ষাটের উপর তাঁর বয়স। Rigorous imprisonment—তাকে ঘানি টানতে হ'ততা! সর্বস্ব খরচ করেও আমি তার খাটুনি মকুব করাতে পারিনি। জেলের ভিতর আমার যাবার হুকুম ছিল না। অনেক তরি করে মাত্র একটি দিন গিয়েছিলাম। বাবা কথা কইতে পারলেন না—তখন তার মুখ দিয়ে রক্ত উঠছে! তবু তাকে হাসপাতালে পাঠানাে হয়নি, শিব- নারায়ণ দত্তর এমনই তদ্বিরের জোর । জ্যোৎ। আমি এতাে কথা শুনিনি বাবা! রাজ্যেগর। আমি কারাে কাছে কখনাে বলিনি। আমার বংশের যে যেখানে আছে, তাদের কারও সঙ্গে ও বংশের কারও কোন স নেই। তােমার মাকেও কোনদিন বলিনি। তিনি জানতেন, জেলে
পতিব্রতা
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
বাবাকে খাটতে হয় না। রােজ খাবার পাঠিয়েছেন। আমি তাকে
মিথ্যে কথা বলেছি—জেলে খাবার পাঠান সম্ভব ; সে-খাবার খেয়েছে
শিয়াল-কুকুরে! আমি একা সহ করেছি। আমি জানি, তােমার স্বামী
নির্দোষ ; কিন্তু সে শিবনারায়ণ দত্তর নাতি ! তুমি মনে করতােমার
বিয়ে হয়নি!
জ্যোৎস্না। ওকথা থাক্ বাবা !
রাজ্যের। না মা–ও কথা যখন উঠেছে, তখন মীমাংসা হওয়া
জয়কার! তুমি বড় হয়েছ, তােমায় আমি লেখাপড়া শিখিয়েছি, স্বাধীন
ভাবে চিন্তা ক’রবার অভ্যাস আছে তােমার—তুমি ভাল করে বিবেচনা
;
জ্যোৎস্না। বাবা, আমি একটু বাইরে যাবাে-বড় গরম বােধ
হচ্ছে!
রাজ্যের। -না, জ্যোৎস্না-এখন ছেলেমানুষী করুন! আমার
সব কথা শােন। আজ চোদ্দ বছর তােমাদের বিয়ে হয়েছে।
তােমার বয়স আট বছর; চোদ্দ বছর পরে আবার তােমাদের দেখা।
বারাে বছরের উপর তার কোন খবর তুমি জানতে না-তুমি ইচ্ছা করলে
তাকে ত্যাগ করতে পার,শান্তে এবিধি আছে। তখন অ পাত্রে
সহজেই তােমার বিয়ে হতে পারে। আমি ভাল পণ্ডিতকে দিয়ে এর
বিধান নেওয়া।
জ্যোৎকা। আপনার কোন বিধান নিতে হবে না বাবা! আমি
যেমন আছি তেমনিই থাকবে—আমার জন্য আপনি ভাববেন না !
{ ঢ্যোং এহান করিলে রাজ্যের সেইদিকে তাকাইয়া রহিলেন,
সুধাংশু একে কলি)
সুধা। ৰাৰা, জুপাঠ* নাকি খুব সােজা! কে বলে সােজ?
প্রথম অঙ্ক ]
পতিব্রতা
২১
‘ঋজু মানে সােজা—তাতেই বুঝি হলাে? সােজা বইতে বুঝি এইসব
কথা থাকে—দংষ্ট্র, কণী, পরিলেলিহচিন্তয়ৎ ?—আচ্ছা বাবা, “কণী
পরিলেলিহচিন্তয়ৎ” কথার মানে কি ?
রাজ্যেশ্বর।: মানে না-জানা যত কথা সব একসঙ্গে লিখে রাখ
আমি সন্ধ্যের পর সব কথার মানে বলে দেব।
সুধাংশু। আচ্ছা বাবা, কাউকে ‘থনক’ বললে তাকে গালাগাল
দেওয়া হয় ?
রাজ্যেশ্বর। না—তুমি যাও।
সুধাংশু। দিদি-দিদি! I am a ভারক, and you are a
কথনক
( মাতঙ্গিনীর একেশ )
মাতঙ্গিনী। রাজু আছিস?
রাজ্যেশ্বর। আছি দিদি।
মাতঙ্গিনী। হারে-জামাই এসেছেন নাকি ?
রাজ্যেশ্বর। কার জামাই ?—কোথায় আসবে?
মাতঙ্গিনী। তাের জামাই নাকি এসেছে ওঁদের বাগানবাড়ীতে?
রাজ্যেশ্বর। আমি জানিনে।
মাতঙ্গিনী। ও কথা আর মেয়ের বাপের মুখে খাটে না! যাও
ভাই, জামাইকে নিয়ে এস ; তুমি কারাে কোন কথা শুননা।
কু’রে আলেই আসবে
• রাজ্যেশ্বর। বাবার মৃত্যুর কথা এখনাে ভুলতে পারিনি দিদি।
একটা ছেড়া মাদুরে শুয়ে আছেন, পরণে জেলের জাঙিয়া-ময়লা ;
মুখে একটু গঙ্গাজল দেবার লােকও ছিলনা-নাভিস উঠেছে তখন।
পতিতা [ দ্বিতীয় দৃ আমি ছেলে; সন্ধ্যার আগে আমায় টেনে বার করে দিলো—সে রাতে আমি জেলের দরজার সামনে গাছতলায় ধূলাের উপর শুয়ে কাটাই । দাদা! • মাতঙ্গিনী। মেয়েটার মুখ চেয়ে ওসব কথা আর মনে করাে না সে সব তাে চুকেই গেছে। আহা! বুড়াে শিবনারায়ণ যখন মরে, সেইদিন ঐ একটিবার দেখতে গিয়েছিলাম—প্রাণ আর বেয়ােয় না।—উ, সে যে কি যাতনা ! পাপের প্রায়শ্চিত্তি তার হয়েছে। রাজ্যেশ্বর। তাতে আর আমার কি সান্ত্বনা ? ও বংশের কারও সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নেই দিদি ! তাতে মেয়েই পর হক-আর ছেলেই- মাতঙ্গিনী। বালাই বালাই, ষাটু-ষাট ! ও সব কি কথা মুখে আনন? মানুষের ঝগড়াও যত গেট দেবে, তত বেড়ে চলবে ; আবার নেই বল্লেই নেই। কথায় বলে জানিস্ তত?—নেই বললে সাপের বিষ থাকে না ! ওসব মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে হয় ; নইলে কি আর সংসারে থাকা চলে তাই কালী। (নেপথ্যে) রাজেশ্বরবাবু বাড়ীতে আছেন? রাজ্যের। কে মশায় ? কালী। চিনতে পারবেন না—আপাততঃ একটু অপরিচিত। বাড়ীর ভিতরে যাব কি? রাজ্যেশ্বর। দিদি! ( দিদিকে ইঙ্গিত করিলেন—তাহার প্রস্থান) বন! ( কালীনাথের একেশ ) কালী। দেখুন, একবার ভাল করে চেয়ে দেখুন। কি রক মনে হয় নিতে পারছেন ? ?
প্রথম অঙ্ক ]
পতিব্রতা
রাজ্যের। আপনাকে একটু আগে ওই বাগান বাড়ীর গেটের
কাছে দেখেছি।
কালী। আরও দেখেছেন—কলকাতায় ; দু’দশ বছর অন্তর দেখা-
সাক্ষাৎ হয়েছে।
রাজ্যেশ্বর। হতে পারে—আমার ঠিক মনে নেই।
কালী। হ্যা, আপনি লক্ষ্য করেন নি।
রাজ্যেশ্বর। আপনার প্রয়ােজন?
কালী। বলছি, আপনি ব্যস্ত হবেন না ! একটু স্থির হয়ে বসুন—
মনে হচ্ছে যেন, আপনি একটু উত্তেজিত।
রাজ্যেশ্বর। আপনি কি শিবনারাণ দত্তর কেউ হন ?
কালী। আমি তার দৌহিত্র। আপনার জামাই আমার মামাতাে
ভাই ।
রাজ্যেশ্বর। আমার কাছে কি দরকার? জামায়ের সঙ্গে আমার
কোন সম্পর্ক নেই।—আপনি যেতে পারেন।
কালী। আপনি কি আমায় বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দিতে চান ?
তাহলে অবশ্য আমি আর ব’বাে না! তবে আমার অনেকগুলাে কথা
ব’লবার ছিল—শােনবারও ছিল।
রাজ্যেশ্বর। আপনি তো নেহাৎ ছেলেমানুষ নন। আমার সঙ্গে
শিবনারায়ণ দত্তর সম্পর্ক জানেন বােধ হয়।
কালী। সবই জানি ! আপনার উপর যে অত্যাচার হয়েছে, তার
প্রতীকার কিছু আছে কি না—সেই কথাই আলােচনা করবার ইচ্ছা
ছিল। আপনি যদি আবশ্যক মনে না করেন, তাহলে
রাজ্যের। আজ আর প্রতীকারের কিছু নেই। আচ্ছা-আপনি
বসুন। আপনি কি শিবনারায়ণের নাতির কাছ থেকে আসছেন।
২৪
পতিতা
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
কালী। হ্যা, আমি তারই সঙ্গে এখানে এসেছি। আমি এখানকার
সদর নায়েবনূতন কাজ পেয়ে এসেছি। আপনার সঙ্গে কিছু কাজের
কথা ছিল ! আপনি সম্পর্কে আমার কাকা—আমার পিতার নাম
গােলক চন্দ্র বােস।
রাজ্যেশ্বর। তুমি গােলকদার ছেলে?
কালী। আজ্ঞে হ্যা। (প্রণাম করিল) শিবনারায়ণের দৌহিত্র
হলেও আমি আপনাদেরই বেশী আপনার-আপনার জ্ঞাতি।
রাজ্যের। তােমার সম্পত্তি তাে সবই নষ্ট হয়ে গেছে ?
কালী। দাদামশায় তাে কাকেও রেহাই দেননি ।-জামায়ের সম্পত্তি
তিনিই গ্রাস করলেন ! তাছাড়া আপনি তাে সবই জানেন?-
আমারই তাে মােল আনার মালিক হবার কথা।
রাজ্যের। কই না—আমি তাে শুনিনি?
কালী। দেখুন, এ সব ঘরের কলঙ্ক—বলাও তাে যায় না। আমিও
তখন ছেলেমানুষ। বাবা মারা গেলেন—মা এসে বাপের বাড়ী রইলেন।
মামার তাে অনেক দিন পর্যন্ত ছেলেপিলে কিছু হয় নি? সবাই বলতাে
—ওই তাে মালিক! আমার পৈত্রিক সম্পত্তির আদায়-তহশীল—সবই
এক সঙ্গে হতে লাগলাে। মা স্ত্রীলােক, আমি ছেলেমানুষ, দাদামশায়
দুর্দান্ত জমিদার! কালেক্টরীর তৌীতে কেমন করে গােলক বােসের
নামের জায়গায় শিবনারায়ণের নাম পত্তন হ’লল- আমি তা জানিনে।
জানবার দরকারও যে হবে কোন দিন-মনেও করি নি ।
রাজ্যের। জমায়ের সম্পত্তি ফাকি দিয়ে নিলে—শিবনারাণ?
কালী। শিবনারায়ণ কাকে বাদ দিয়েছেন-বলতে পারেন ?
আমার বয়স দুখন সতের-আঠের-নেহাৎ ছেলেমানুষ তাে নই? হঠাৎ
মামা গেলেন মারা।
প্রথম অঙ্ক ] পতিতা রাজেশ্বর। হ্যা, মনে আছে-রেলওয়ে কলিসানে ;তারপর কি হলাে ? কালী। (সুধাংশুকে দেখিয়া ) থােকা, এই দিকে এসে তত লক্ষ্মী- ভাইটা! (সুধাংশু কাছে আসিল) এটি আপনার ছেলে বুঝি কাকাবাবু? ঠিক-কাকীমার মত মুখ ! মামুখী পুত্র সুখী! মেয়েটা কতবড় হলাে ? রাজ্যেশ্বর। তা বাইশ তেইশ বছর হলাে বৈকি?-হ্যা, তােমার মামার মৃত্যুর পর কি হলাে? আমি তাে তখন গায়ে থাকতো না। সব কিছু জানিও নে ! কালী। বলছি! যাও তাে থােকা, দুটো পান আর একটু দোকা নিয়ে এসাে ত ভাই। সুধা। দিদি তাে পান খায় না; এলাচ দানা-আর সুপুরীকাটা আবাে? রাজ্যেশ্বর। তাের পিসিকে ব’লগে যা- [সুধাংশুর প্রস্থান। কালী। পিসি? পিসি কে বলুন তাে ? রাজ্যেশ্বর। মাতুদিদি-বেজ’দার বড়দি। বেজ’দা মারা গেলেন- তারও স্থান নেই, তােমার খুড়ীমা মারা গেলেন-এদেরও দেখবার কেউ নেই। সেই থেকে মাতুদি আমার সংসারেই আছেন। কালী। মাতুপিসি ?—আমায় বড় ভালবাসতেন! আজও তেমনি চুচিবাই আছে তাে? রাজ্যের। তুমি তারপর কি হলো বলতােতােমার মামার মৃত্যুর পর ? কালী! মামার তােত ছেলেমেয়ে কিছুই ছিল না। হঠাৎ শােনা ২৬ পতিতা [ দ্বিতীয় দৃশ্য ! গেল—মামীমা কমাস অন্তঃসত্বা ! তারপর রণা, মানে আপনার জামাই হয়। জন্ম নিয়ে অনেক কথার সৃষ্টি হয়েছিল। ব্যাপারটা জানে সবাই- তবে বড়লােকের বাড়ী,একটা ছেলেরও আবশ্যক-সম্পত্তিটা সগােত্রে থেকে যায়; কাজেই কিছুদিন ঢাকৃঢাক গুড়গুড় করে শেষে সব চুপচাপ ! রাজ্যেশ্বর। তুমি জান সে সব ব্যাপার ? কালী। সম্পত্তি আমারই। আমাদের বুড়াে মােক্তার খামধনবাবু আমায় মােকদ্দমা করতে বলেছিলেন ; তা আপনিও যেমন-আমার আর কি বলুন তাে?—এক মুঠো ভাত আর দু’থানা কাপড় - যেখানে থাকবে, ভগবান জুটিয়ে দেবেন। আপন মামার ঘরের কেলেঙ্কারী বাজারে রাষ্ট্র হবে—দূর হেগে ছাই! আমি চেপে গেলাম। রাজ্যেশ্বর। এতাে আমার জানা ছিল না। শুধু এই কারণেই তাে আমার মেয়ে স্বামীত্যাগ করতে পারে। কালী। হ্যা, তা তাে পারেই! ওঁর আসল কথা গােপন করে বিয়ে দিয়েছিলেন। রাজ্যেশ্বর। “নষ্টে মৃত প্রব্রজিতে ক্লাবে চ পতিত পতৌরজ সন্তান, পতিত নিশ্চয়। ( জ্যোৎস্না প্রবেশ করিল। জ্যোম। কে জারজ সন্তান বাবা ? কালী । ও কিছু নয়—ও কিছু নয়। এইটি বুঝি আপনার মেয়ে কাকা বাবু? বেশ ডাগর হয়ে উঠেছে দেখছি ? ওকে আমি দেখেছিলাম -এই এতটুকু। রাজ্যেশ্বর। হ, শােন কালীনাথ! জ্যোৎস্নাকে আমি কিছু গােপন করতে চাই নে। স্যাৎ। কার কথা হচ্ছে বাবা?
প্রথম অঞ্চ ]
পতিব্রতা
রাজ্যের। যার সঙ্গে তােমার বিয়ে হয়েছিল।
জ্যোৎস্না। তিনি কি ?
রাজ্যেশ্বর। সে জারজ, পতিত—সুতরাং বিবাহ অসিদ্ধ।
জ্যোৎস্না। তাতে কি হয়েছে ?
রাজ্যেশ্বর। আদালতে একথা প্রমাণ হলে আমি আবার তােমার
বিয়ে দিতে পারি।
জ্যোৎস্না। আদালতে এই কথা আপনি বলবেন?
রাজ্যেশ্বর। শিবনারায়ণ দত্তর সম্পর্ক যদি লােপ হয়, এ কথা আমি
আদালতে বলতে পারি।
জ্যোৎস্যা। সম্পর্ক তত নেই কিছু—তবে আপনি এত বিচলিত
হচ্ছেন কেন ?
রাজ্যেশ্বর। এতদিন জানতেন, সম্পর্ক ধুয়েমুছে গেছে । এখন।
দেখছি, তার দাগ আজও যায় নি ! মুখে বলি—ওরা আমাদের কেউ
নয় ; কিন্তু একথা কিছুতেই ভুলতে পারিনে—আমি শিবনারায়ণ দত্তর
নাতির হাঁটু ছুঁয়ে তার হাতে আমার মেয়েকে সম্প্রদান করেছি। সাক্ষী
ছিল হােমের অগ্নিসাক্ষী ছিল নারায়ণ শিলা।
জ্যোৎস্না। তবে ?—যা মুছবার নয়, তা মুছতে যাচ্ছেন কেন?
রাজ্যেশ্বর। তাই ভাবছি মা। রাজার বিচারে যদি প্রমাণ
Fয়, তুই তার কেউ নস—আমার মনে আর কোন ক্ষোভ থাকবে না।
কালী। আপনি এক কাজ করুন কাকাবাবু ! কলকাতায় গিয়ে
ইন্দু-লর অথরিটি—এমন কোন উকিলের পরামর্শ নি। আমার তাে
নে হয়—বেশ ভাল মােকদমা হবে।
জ্যোৎন্সা। আপনি কে?
কালী। আমি কে?-শােনাে কথা! কাকাবাবু, আপনার মেয়ে
২৮
পতিব্রতা
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
আমায় জিজ্ঞাসা করছে–আমি কে? আমি তাের দাদা রে পাগলী-
আমি তাের দাদা।
জ্যোৎস্না। আমার স্বামীর আপনি কে ?
কালী। সেই কথাই তাে হচ্ছে বােন্! ঘটনা যদি সত্যি হয়—কেউ
, কোন সম্পর্কই নেই তার সঙ্গে।
জ্যোৎস্না। আপনি এ কাজ করবেন না বাবা! আপনার দুর্নাম
হবে -অধর্ম হবে। যারা বেঁচে আছেন, তাঁদের সঙ্গে বিবাদ করুন।
যিনি তিন বছর হলাে মারা গেছেন, তার মুখে আর কালি মাখাবেন না !
[ প্রস্থান।
কালী। আপনার মেয়ের তত শাশুড়ীর উপর খুব টা আছে
দেখছি ?
রাজ্যেশ্বর। ওর জন্যেই তাে ভাবনা কালীনাথ ! এত দিন দেখা হয়
নি, বেশ ছিল। এখন তার সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা কয়েছে—হিন্দু-স্ত্রী,
এতদিনের সংস্কার !
কালী। দেখা কি করে হলাে ?
রাজ্যেশ্বর। বােটানিক্যাল গার্ডেনে বেড়াতে গিয়েছিলাম-এরা দুই
ভাইবােন সঙ্গে। সেখানে প্রথম দেখা হয়। তারপর আবার দু'দিন
সন্ধান করে আমাদের কাতার বাসায় যায়।
কালী ।
বলেন কি? আপনার কলকাতার বাড়ীতে গিয়েছিল ?
অথচ রণা তাে জানতাে না-জ্যোৎস্না ওর স্ত্রী!
রাজ্যেশ্বর। -কেমন করে জানবে?
কালী। কি সাংঘাতিক ছেলে মশাই ? পরস্ত্রী জেনেও এই রকম?
রাজ্যেশর। কেন? ওর চরিত্র কি-
প্রথম অঙ্ক ] পতিব্রতা কালী। সে আর বলবেন না কাকাবাবু! কলকাতায় যে কত ভদ্র- লােকের সর্বনাশ করেছে, তার আর কি বলব! আমিই আগলে নিয়ে বেড়াই তাই—নইলে এতদিন পাড়ার ছেলেরা মেরে সাবড়ে দিত। রাজ্যেশ্বর। তুমি বলছ কি কালীনাথ। কালী। নিজের স্ত্রী মনে করুলে ও বুঝি যেত? রাজ্যেশ্বর। নিজের স্ত্রী মনে করবার কোন হেতুই ছিল না ওর পক্ষে। কালী। তাতেই বুঝুন, ভায়ার আমার চরিত্রটি কেমন! আর ওর কাজই ত ওই রাজ্যেশ্বর। এখানে আমার বাড়ীতে আসতে পারে ? কালী। তা আর পারে না? খুব পারে। ওর অসাধ্য কিছু নেই কাকাবাবু--বিশেষতঃ স্ত্রীলোেকসংক্রান্ত ব্যাপার। আমি তাে আপনাকে সেই কথাই জানাতে এলাম। অবশ্য জামায়ের সঙ্গে আপনি পূৰ্ব্ব-বিবাদ মিটিয়ে ফেলতে চান্, সে আলাদা কথা! এখন আপনার সব কথাতেই রাজী হবে, জ্যোৎস্নাকে প্রলােভন দেখাবে, চিঠি লিখবে- ও যখন যার উপর ঝোঁক। রাজ্যেশ্বর। আচ্ছা ধর, জ্যোৎস্না যদি আপনা হতেই চলে যায় ? না -তা আমি যেতে দেব না ! কালী। নিশ্চয় দেবেন না। আজ নিয়ে যাবে—আজ ওর চোখে নেশা লেগেছে। সাত দিন পরে যখন নেশা কেটে যাবে, তখন লাথি মেরে তাড়িয়ে দেবে ! আপনার উপর যে রাগ আছে, সেই রাগ ঝাড়বে -ওই বেচারীর উপর । রাজ্যেশ্বর। ছেলেটা রকম অধঃপাতে গেছে!বল কি কালীনাথ ?
পতিব্রতা
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
কালী। যাবে না? ওই মা, আর ওই ঠাকুরদা-বংশটি কেমন
দাড়িয়েছে-একবার ভেবে দেখুন দেখি ? তার উপর, “যৌবনং
ধনসম্পত্তি প্রভুম্ অবিবেকতা”—চারটাই বর্তমান ! আচ্ছা, আমি
এখন উঠি। আমি এখানেই আছি, মাঝে মাঝে আসবাে। আমি
যতক্ষণ আছি—কিছু করতে পারবে না ! আমায় যমের মত ভয় করে।
তবু, সাবধানের বিনাশ নেই। আপনি একটু সাবধানে থাকবেন
মেয়েটিকে একটু নজরে নজরে রাখবেন। এ তাে আর আপনার সহর
নয় ?-যা ঘটেছে, তাতেই হয়তাে গায়ে কত কথা উঠবে! আচ্ছা
কাকাবাবু—উঠি তাহলে?
রাজ্যেশ্বর। এস বাবা!
কালী। হ্যা, মাতৃপিসি গেলেন কোথায়? তাকে একটা পেরণাম
করে যাই।
রাজ্যের। সুধা,
সুধা, তাের পিসিকে একবার ডেকে দে তাে !
( বাহিরের দিকে গেলেন)।
( মাতঙ্গিনীর প্রবেশ )
কালী। এই যে পিসি !
মাত। কে-আমাদের গােলকের ছেলে ?
কালী। ( প্রণাম করিলেন) চিনতে পেরেছ পিসি ?
মাত। চোখে আর ভাল ঠাওর হয় না বাবা! তা তােমার মা
কোথায় ?
কালী। মামাদের কলকাতার বাড়ীতেই ছিলেন ; বছর দেড়েক
হলাে-গঙ্গালাভ করেছেন।
মাত। বউ মারা গেছে ?-বেঁচেছে—হাড় জুড়িয়েছে তার ! সেবার
দেখা হলাে, কত কাদলে—ভাইবৌয়ের হাত-তােলায় আছি ঠাকুরঝি ?
প্রথম অঙ্ক ]
পতিব্রতা
আহা, স্বামীর অমন রাজার সম্পত্তি ! তুই সব উড়িয়ে পুড়িয়ে দিলি
বিয়েথাও করলিনি। মাগীর আর কি সুখ হবে বল?
কালী। তােমরা বুঝি তাই শুনেছ ?~-হায় রে আমার কপাল !
সম্পত্তি তার বাবা যে সব গ্রাস করে নিলেন—অমন সর্বগ্রাসী রাহু এ
তল্লাটে আর ছিলেন ।
মাত। আমরা শুনলাম—তুই সব বিক্রি করেছিস ?
কালী। তােমরা ওই রকম শােন! আমি বিক্রি করবাে ?-আমার
বড় টাকার অভাব কিনা! ও কথা থাক্ ; তুমি এখন কেমন আছ
পিসি?
মাত। আমাদের আর থাকাথাকি কি বল ?-তােরা ভাল আছিস
দেখে চলে যেতে পারলে বাঁচি।
কালী। এখনও নাইতে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগে ?-কটা ডুব দিলে
তবে মাথা ডােবে ?
( রাজ্যেশ্বর পুনরায় ঘরে প্রবেশ করিলেন।
কালী। আমার একদিন ইস্কুলকামাই করিয়েছিলে—মনে আছে
পিসি? সে-পিসি যত ডুব দেয়, কিছুতেই আর মনের সন্দেহ যায় না !
এইবার দেখ, বাবা, মাথাটা ডুবলাে কি না? কসে-কম বুঝলেন কাকা-
বাবু-আড়াইশাে ডুব,। তাতেও যখন সন্দেহ ঘুচলাে না, আমি পিসির
ঘাড়টি ধরে মিনিটখানেক জলে ডুবিয়ে রাখি—তখন হাঁপাতে হাঁপাতে
পিসিমা উঠে বলেন-“এইবার হয়েছে বাবা?” আচ্ছা, এখন আসি
তাহলে? কাল তােমার এখানে চারটি পেসাদ পাব পিসি! থােড়ের
কি একটা ঘণ্ট রাঁধতে ?-সেইটা রে'ধ পিসি ! আচ্ছ—আসি
কাকাবাবু।
[ এস্থান।
৩২ পতিতা [ দ্বিতীয় দৃশ্য মাত। কেলােটার কথায় জামায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে না রাজু জামাই চিরদিনের, ঝগড়া চিরদিন থাকে না। রাজ্যেশ্বর। ও আমার জামাই না দিদি! কেন বারবার জামাই জামাই করছে ? মাত। এতে তার আর কি ক্ষেতি বল ? সে পুরুষমানুষ- বেটাছেলে যেতে যাবে তােমার মেয়ের জন্মটাই বেথায়! এত লেখাপড়া জান-এটা আর বুঝতে পারুলে না ভাই ? রাজ্যেশ্বর। সুধা-সুধা । ( সুধাংশু প্রবেশ করিল) সুধাংশু। কি বাবা ! রাজ্যের। সুধা! যাতে-দেখতে, তাের দিদি কি করছে ? সুধাংশু। দিদি তাে ছাদে বেড়াচ্ছে। তুমি দিদিকে বকেছ, তাই দিদির রাগ হয়েছে—না বাবা ? রাজ্যেশ্বর। আমি আবার কখন্ ব’লাম্ তাের দিদিকে? সুধাংশু। সেই—আমি যখন ঘর থেকে চলে যাই । রাজ্যেশ্বর। নারে—না, আমি তাের দিদিকে কিছু বলিনি। সুধাংশু। না বলে বুঝি শুধু শুধু দিদি কাদছিল ?বুঝি শুধু শুধু দিদির মুখ শুকিয়ে গেছে—মুখে হাসি নেই ? রাজ্যের। জ্যোৎলা কঁদছিল ? আমায় দেখে আবার চোখের জল মুছে ফেললাে। রাজ্যেশ্বর। আচ্ছা, যা তত সুধা, তাের দিদিকে ডেকে নিয়ে আয় তাে আমার কাছে। সুধাংশু। আচ্ছা, আমি ডেকে আছি ; তুমি নিজে দিদির মুখের দিকে চেয়ে দেখ—আমার কথা সত্যি কি মিথ্যে? [ এবান। সুধাংশু। ;
প্রথম অঙ্ক ] পতিব্রতা মাত। এখনও সাবধান হও রাজু, এখনও বুঝে দেখ! যদি মত দাও, আমি জামাইকে ডাকিয়ে হাতে ধরে সব মিটমাট করে দিচ্ছি। নিজের জিদ বজায় রাখতে গিয়ে মেয়েটার সর্বনাশ করে না দাদা! রাজ্যেশ্বর। দিদি ! তােমরা যে কালের মানুষ, সেকাল আর নেই এটি ভুলে যেওনা। তােমরা লাথিঝাটা খেয়ে শশুরঘর করেছ—স্বামীর পা-পূজো করেছ। আজকালকার মেয়েদের তােমরা বুঝবে না। আমি আমার মেয়েকে জানিবুঝি ? মাত। যতই এ কাল থােক না ভাই, মেয়েমানুষ চিরদিন মেয়ে- মানুষই থাকবে! সে তার মায়ের মেয়ে-ঠাকুরমা-দিদিমার নাতনী। জ্ঞান হবার পর আবার তাকে দেখলাে—তার কথা শুনলে ; তারপর অমন রাজপুত্তর স্বামী! রাজ্যেশ্বর। সে যদি স্বামী চায়—স্বামীর কাছেই যাবে ; তবে আমার সঙ্গে আর সম্পর্ক থাকবে না। মাত। কি জানি ভাই, কি যে কথা বল—আমি ওর মানেই বুঝিনে! যা ভাল বােঝ ভাই--কর। মা-মরা মেয়ে-ছােট থেকে মানুষ করেছি। এতদিন বাপের বাড়ী রইলাে-এখন বড় হয়েছে, আপনার জিনিস চিনেছে! যার জিনিস, তার হাতে তুলে দেওয়াই ভাল-এই তাে আমরা বুঝি ? [ এহান। ( জ্যোৎস্না প্রবেশ করিল। জ্যোৎকা। আমায় ডাকৃছিলেন বাবা! রাজ্যেশ্বর। হ্যা মা—তুমি ছিলে ?-না মা, কেঁদোনা কেঁদোনা ; তুমি আমার কথা বোেঝরণের উপর আমার কোন রাগ নেই; বরং ওকে আমার বেশ পছন্দই হয়েছে। দেখলে না ?ওর কথার উত্তর
৩৪
পতিব্রতা
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
আমি দিলাম না—পাছে আমার মন নরম হয়। ব্যক্তিগত সম্বন্ধ আমি
এর মধ্যে আনতে চাইনে।
জ্যোৎকা। সে আমি বুঝতে পারি বাবা !
রাজ্যেশ্বর। দেখ, তুমি বড় হয়েছ—লেখাপড়া শিখেছ ; আমি
তােমায় স্বাধীনতা দিয়েছি-স্বাতন্ত্র দিয়েছি। এখন তােমার কর্তব্য কি
-তােমায় স্থির করতে হবে।
জ্যোৎস্না। না বাবা, আমি স্বাধীনতা চাইনে—আপনি আমায়
আদেশ করুন।
রাজ্যেশ্বর। আদেশ আমি তােমাদের কোনদিন করিনি—আদেশ
আজও করবাে না। তুমি যদি তােমার স্বামীর কাছে যেতে চাও
যেতে পার। আমি বাধা দেব না।
জ্যোত্মা। তিনি তােত আমায় যেতে বলেননি—আমি কেন যাব ?
রাজ্যেশ্বর। সে নিজে যদি আসে?—যদি শ্ৰদ্ধা সন্ত্রম দেখিয়ে
তােমায় বাড়ী নিয়ে যেতে চায় ?
জ্যোৎস্না। আপনি আমায় বলে দিন ! ভালমন্দ আমি কি জানি
বাবা ?
রাজ্যেশ্বর। না—আমি কিছু বলবাে না। তােমায় কতবার বলেছি
মা, প্রতি মানুষের জীবন স্বতন্ত্র জীবনের সমস্যা স্বতন্ত্র ! সম্পূর্ণ একক
নিঃসঙ্গ হয়ে নিজের জীবনের সমস্যা মানুষকে সমাধান করতে হয় ।
তােমার জীবনের সমস্যার দিন সামনে—সেদিন আমি থাকবাে না!
এখন থেকে তােমায় নিজে পথচলা অভ্যাস ক’তে হবে। আমি তােমায়
কিছু দিন সময় দিচ্ছি—এরপর আমায় জানিও! এই কয়দিন তুমি
চিন্তা কর—বিচার কর।
চো। তখন আমি যদি আপনার সঙ্গে একমত হতে না পারি ?
প্রথম অৰু]
পতিব্রতা
রাজ্যেশ্বর। তুমি তােমার পথে চলবে—আমি আমার পথে চলবে।
তাতে আমার দুঃখ হবে নিশ্চয়ই। কিন্তু মানুষের ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের
চেয়ে তার স্বাধীন চিন্তাকে আমি বেশী মূল্যবান মনে করি। হ্যা, স্বাধীন
চিন্তার মূল্য নিশ্চয়ই বেশী ! তুমি চিন্তা কর—আমার জন্যে ভেবনা !
আমার কষ্ট একটু হবে, তাতে কি? বৃহৎ সত্যের কাছে মানুষ
কিছু-না-কিছু-না ! ন মাতান পিতা ন বন্ধু ন ভ্রাতা !—এই হচ্ছে
জীবন, বুঝলে মা?
[ এহান।
( জ্যোৎস্না একা বসিয়া বসিয়া পিতার উপদেশই ভাবিতে লাগিল ।
তৃতীয় দৃশ্য
চাপাপুকুর-গ্রাম—জমিদারবাবুর বাগানবাড়ীর বাহিরের ঘর-একজন বৈষ্ণব
ভিখারীকে সঙ্গে লইয়া রণেনের প্রবেশ—সঙ্গে সঙ্গে সনাতনের একে ;
কালীনাথ সেইখানে ছিল।
বণেন। সােনাদাসােনা।
সােনা। কি গাে থােকাবাবু!
রণেন। আমি আজই রাত্রের ট্রেণে কলকাতায় রওনা হচ্ছি।
জিনিস-পত্রগুলাে ঠিক করে দিও—বিছানা সুটকেস। যা, দেখ
কাদা রইলাে এখানে। কাজকর্ম যা সব ছিল-মিটিয়ে এলাম (বৈষ্ণব
ভিখারীকে লক্ষ্য করিয়া) গাও তাে ?—কি গাইছিলে; ভাল লাগছি
গানখানা।
•
৩৬
পতিব্রতা
[ তৃতীয় দৃশ্য
গান
বিরহিনী কমলিনীর দারুণ অভিমান,
শুকালাে মুখের হাসি-আঁখিদুটি ম্লান।
কুঞ্জ দুয়ারে গেলে কহে না সে কথা,
শ্যাম বঁধুয়ার আর সহেনাক ব্যথা।
একা কমলিনী রাই, বৃন্দা-বিশাখা নাই,
মানিনীর কথা ক’য়ে জুড়াবে শ্যামের প্রাণ।
তাই বলি যাও শ্যাম ! ধর চরণে,
এখনি যাইবে রাধা পাণি ভরণে-
যমুনায় গেলে তার, দেখা মেলা হবে ভার,
যতই কদম্বতলে বাঁশরীতে তােল ন।
রণেন।
কালা!
ঠাকুরমশায়, আজ তাে আর সময় নেই—নইলে এর উত্তরটা শুনে
যেতাম।
কালী। কেন হে—তাড়াতাড়ি কিসের ?
রণেন। রাত্রের ট্রেণে কলকাতায় রওনা হচ্ছি।
কালী কেন ?-কি হলো এর ভিতর ?
বৈষ্ণব। উতােরটা শুনবেন না বাবু?
বণেন। তােমার শ্যামের তাে মুখ বন্ধ-উত্তর দেবে কে?
বৈষ্ণব। কেন বাবু?-সখীরা দেবেন ! ললিতা, বৃন্দা, বিশাখা-
রসের ভাড়ারীইতাে সখী বাবু।
কালী। আচ্ছা আচ্ছা—তুমি গাও ঠাকুর! ট্রেণ রাত সাড়ে
সাতটায়, এখন সবে পাঁচটা।
বণেন। না কালদা-তােমার কাছেই অনেক দরকারী কথা আছে।
প্রথম অঙ্ক ]
পতিব্রতা
কালী।
বাবাজী! তুমি বরং ঘণ্টাখানেক পরে একটু ঘুরে এস, কাজটা আগে
হয়ে যাক্ ; এসব রসের কথা, মনটা বেশ শান্ত না থাকলে
বৈষ্ণব। আচ্ছা বাবু, একটু ঘুরেই আছি।
[ এস্থান।
দেখা হ’লল বৌমার সঙ্গে ?
রণেন। হয়েছেও বটে—আবার হয়নিও বটে!
কালী। হেঁয়ালী রাখ ভাই, সাদা কথা বল।
রণেন। দেখা হলাে-কথা কইলে না !
কালী। তুমি কি দানপত্রখানা হাতে তুলে দিলে ?
রণেন। সামনে ধলাম—ফিরে দেখলে না !
কালী। ঝটা মার, ঝাটা মার ! তােমার মন পড়েছে তাই,
নইলে, তুমি যা খরচ করতে চাইছ, তাতে তুমি চল কলকাতায়—আমি
তােমায় লণ্ডন, প্যারি, নিউইয়র্ক থেকে অর্ডার দিয়ে মেয়ে আনিয়ে বিয়ে
দিয়ে দিচ্ছি।
রণেন। তুমি কি ভাবছ, আমি সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে এসব কচ্ছি ?
কালী। তবে কিসের জন্যে কচ্ছ—শুনি? এত টাকার সম্পত্তি
হাতে পেয়ে কেউ ছাড়ে ?
রণেন। আমার ইচ্ছে—কারও উপর অবিচার না হয় ।
কালী। অবিচার যা হবার—বহু আগেই হয়ে গেছে। আজকের
সুবিচারে সে দিনের অবিচার তাে ঢাকা পড়বে না ?
রণেন। তবু—আমার কর্তব্য।
কালী। আমি ওসব বুঝিনে ভাই, মেয়েটার উপর ঝোক পড়ে
থাকে—বল? আমি আনার ব্যবস্থা করছি। জোর করে আবাে-
রাজু বােস আমার সঙ্গে পারবে ? এই তাে, এখানে এসেই এক ঘন্টার
পতিব্রতা [ তৃতীয় দৃশ্য মধ্যে সে দিন ভাব করে ফেললাম। আবার মাথায় লাঠি মায়ুতে বল, সটান গিয়ে মেরে আসছি। তুমি যে কোন কাজের না! সাত দিন ধরে একটা স্ত্রীলােককে বশ কতে পারলে না ভায়া? অথচ শুনি, সে তােমার স্ত্রী! রণেন। বিয়ে তাে হয়েছিল- কালী। হয়েছিল তাে, চুলের ঝুটি ধরে টেনে নিয়ে এস-না ? আর না-হয়, তুমিই আগে বল—“নেই মাংতা’! নইলে সে আগে বলবে ‘নেই মাংতা’—আর তুমি তাই সইবে? বুঝতে পারি না ভাই, কি রকম পুরুষ মানুষ তুমি ! রণেন। স্ত্রীলােকের উপর অত্যাচার করাই যে পুরুষেরা পুরুষত্ব বলে মনে করে, আমি তাদের দলে নেই। যাক, তােমায় দু’টো কাজের কথা বলে নেই তুমি এখানকার কর্তা। এ সম্পত্তি বােসেদের। ঠাকুর্দার ইচ্ছা ছিল, এ সম্পত্তি আমার স্ত্রীকে দেওয়া হয়। আমি তাই দিয়েছি, কিন্তু ও নেয় নি ! কালী। বেশ তােতােমার স্ত্রী যদি না নেয়, ও তালুকটার আয়ব্যয়ের হিসাবে ঠিক রেখে, কালেক্টরীর খাজনা দিয়ে যা থাকবে আমি ব্যাঙ্কে জমা রেখে দেব। তারপর দু’পাঁচ বছর পরে তুমি যা হয় রণেন। ঘঁা, আপাততঃ তাই ; তারপর ভবিষ্যতের কথা ভবিষ্যতে যা হয় হবে। আমি তাহলে উঠি কালী। এখনি উঠবে কি হে? রাত্রি সাড়ে সাতটায় গাড়ী- রণেন। একবার ভট্টচায্যিপাড়ায় যেতে হবে। ওদের ওখানে একটা টিউবওয়েলের বন্দোবস্ত করা দরকার।
প্রথম অঙ্ক ] পতিতা কালী। আমার উপর তো ভার দিলে—আবার তুমি নিজে টিউব- ওয়েলের কি ব্যবস্থা করবে ? রণেন। তা বটে ! আচ্ছা, তাহােক—এটা আমি নিজেই না হয় ব্যবস্থা করে দিয়ে যাই। হ্যা, আর দেখ কাদা! খাতেরআলি বছিল—ওদের পাঠশালার চালা ঘরখানায় আর কুলুচ্ছে না; তাই আমি মনে করেছি, ওগুলাে ফেলে দিয়ে খানতিনেক কোঠা ঘর তুলে দেবকি বল ? কালী। ডিক্রী ডিসমিস্ নিজে সেরে তারপর আমায় জিজ্ঞাসা করছাে! এতে কি রায় আমি দেব বল ? রণেন। না না—ভার তােমার উপর। আমি শুধু কতকগুলাে কাজ ঠিক করে দিচ্ছি। কালী। বেশ তত ভায়া, তােমার জিনিস—তুমি যা ইচ্ছে কবে, তাই হবে। তােমার গাঁয়েও—স্কুল, ডিসপেন্সারী, লাইব্রেরী—এসবও তাে দরকার? ভদ্রলােকেরা আমায় বলছিলেন কাল। রণেন। ওসব ঠিক হয়ে যাবে ; আমি ভাবছি- কালী। বুঝেছি ভায়া, তুমি ভাবছ—কেন এসব! কার জন্যে ! রণেন। না, তা নয় ; আমি ভাবছি—কি এমন অপরাধ করেছি, যার জন্যে আমার সঙ্গে কথা পৰ্য্যন্ত কইল না? ঠাকুর্দা মশাই যে অন্যায় করেছিলেন, তার প্রায়শ্চিত্ত করূতে গেলাম আমায় একবার বসতে বললে না! শুধু দলিলটা ফিরিয়ে দিয়ে বললে, আমি এসব জানিনে-যা বলতে হয় বাবাকে বলবেন। কালী। রাজ্যেশ্বর বােস মেয়েটির মাথা একেবারে খেয়েছে। নিজে আমার কাছে বলেছে, কোর্ট থেকে তােমাদের বিয়ে অসিদ্ধ প্রমাণ করে মেয়ের আবার বিয়ে দেবে।
৪০ পতিতা [ তৃতীয় দৃশ্য রণেন। তা না-হয় দেবে—আমি তাে আর বউ আন্তে যাইনি। আমার সঙ্গে কথা কইলে, কি বসতে বললে-দোষ হতাে? কালী। এ দিকে দিনরাত পুরুষ চরিয়ে বেড়াচ্ছেন !–ফের যদি তুমি ওদের নাম কর! আমি তিন দিনের ভিতর ককাতায় গিয়ে তােমার বিয়ে দিয়ে দিচ্ছি। এ আমি যদি না করি— রণেন। তুমি থাম কাদা—বিয়ের আবশ্যক হলে আমি তােমায় ববাে। ওই বুঝি সেই বৈষ্ণবঠাকুর আসছে। (নেপথ্যে গান ও খােলর বাদ্য)। কালী। তুমি ভায়া, সবাইকে নাই দিয়ে একেবারে মাথায় তুলে দিয়েছ! জমিদার বাবুর খাসকামরায় হুটু বলতে ফকির আসে, বৈষ্ণব আসে, প্রজা আসে-ব্যাটারা গেটের কাছে ধর্ণা দেবে না আড়াই ঘণ্টা ধরে! রণেন। এস এস, ঠাকুর এস—গাও। গান রাই! কেন তুই করলি এমন দারুণ অভিমান, কুঞ্জঘারে বারে বারে কেঁদে গেছে প্রাণকান ! তাের মান কি এত বড় হলো রাই- সময় থাকতে মানের গােড়ায় ঢেলে দেরে ছাই! তাের মানের চেয়ে বঁধু বড় তাও কি জানা নাই ? শ্যামের মুখে নেইক হাসি, বাঁশীতে নেই তান— ঢের হয়েছে, এইবেলা রাই ; ভাসিয়ে দে তাের মান ; দুয়ারে দাড়ায়ে বঁধু, হাসিমুখে ডেকে আন্।
প্রথম অঙ্ক ]
পতিব্রতা
৪১
( সনাতনের প্রবেশ)
সােনা। খােকাবাবু!
রণেন। কি গা, সােনাদা?
সােনা। তিনি এসেছেন—আপনি একা একা এসেছেন!
রণেন। তিনি কে ?
সােনা। মা-লক্ষ্মী! বৈষ্ণব ঠাকুর, কালীবাবু—তােমরা একটু
এখান থেকে সর; মাঠাকরুণ এখানেই আসবে
কালী। আঃ মলাে ! কে তাের মাঠাকরুণ হলাে যে, তার জন্যে
এতখানি অভ্যর্থনা হচ্ছে ?
সােনা। কালীবাবু যেন ন্যাকা—কিছুই বােঝে নি! আমার বৌমা
গােবৗমা !
কালী। তাই বা ব্যাটা! তা-না, শুধু শুধু তিনি’ ‘তিনি
ক'লে কি বুঝবাে ?
রণেন। ঠাকুর ! এই নাও বশি। সােনা যাও—তাকে
এইখানে ডেকে নিয়ে এস।
[ বৈষ্ণব ঠাকুর ও সনাতনের প্রস্থান।
1
কালী। আমায় আবার কিসের লজ্জা? তুমি আমার বৌমাও
বটে—ছােট বােও বটে। তা বেশ হয়েছে তােমার জিনিস, তুমি
বুঝে পড়ে নেও সব!
{ কালীনাথের প্রস্থান।
( সনাতন ও জ্যোৎস্নার প্রবেশ )
সােনা। এস মা এস-তােমার কাছে বুড়াের এই মিনতি মা-লক্ষী!
৪২ পতিব্রতা [ তৃতীয় দৃশ্য দয়া করে যখন নিজের ঘরকে এসেছ—আর ঘর ছেড়ে যেও নি। আমার এই ছন্নছড়া খােকাবাবুটিকে ঘরবাসী কর মা–ঘরবাসী কর! [ সনাতনের প্রস্থান। •• রণেন। বস-দাড়িয়ে রইলে কেন? জ্যোৎস্না। আমি তখন আপনার সঙ্গে কোন কথা বলিনি ; আপনি বােধ হয় আমার উপর রাগ করেছেন? রণেন। না, রাগ করিনি-প্রাণে বড় দুঃখ পেয়েছিলাম; কিন্তু এখন আর কোন দুঃখই নেই—তুমি নিজে পায়ে হেঁটে আমার ঘরে এসেছ! সােনাদার মত তােমার কাছে আমার ঐ একই মিনতি--যখন এসেছ, আর চলে যেও না! জ্যোৎস্না। আমার সব কথা আপনাকে বলতে এসেছি ; না বললে আমার তখনকার আচরণের কোন অর্থ আপনি বুঝতে পারবেন না। শুধু শুধু আমায় অপরাধী করবেন না—আমি আপনার বিচারে চির- অপরাধিনী হয়ে থাকতে চাই না ! রণেন। আমায় ‘আপনি’ ব’ছ কেন ? ‘আপনি যে বড় দুরের সখােধন জ্যোৎস্না ! কাছে এসেও দূরে থাকতে চাও ? কেন—আমি কি দোষ করেছি ?—আমি তাে তােমার স্বামী ? জ্যোত্মা। আমি কি করে তােমায় আমার প্রাণের কথা বােঝাব! তুমি জান, অতি শিশুকালে আমাদের বিয়ে হয় ; বিয়ে কি, স্বামী কি ব,তখন আমি কিছুই জানিনে। রণেন। সেই তােমায় দেখেছিলাম ফুলশয্যার রাতে!-আমার আজও মনে আছেতােমার গলার যুইয়ের মালার মতই তুমি পবিত্র, শু, সুন্দর! তারপর দেখলাম সেদিন বােটানিক্যাল গার্ডেনে। দেখে
প্রথম অঙ্ক ]
পতিব্রতা
৪৩
চিনতে পারিনি নিশ্চয়! কিন্তু বারবার মনে হয়েছে, কাকে দেখলাম?
-কে এ আমার পূর্বজন্মের অতি পরিচিত প্রিয়জন।
জ্যোৎস্না। আমার কথা শেষ করতে দাও। আমি এখানে বেশীক্ষণ
থাকতে পারবাে না।
রণেন। তুমি চলে যাবে।
জ্যোৎস্না। আমায় যেতে হবে। চোদ্দ বছর তুমি তাে আমার কোন
খোজ করনি?
রণেন। আমি খোঁজ করেছি—কিন্তু তােমাদের কোন সন্ধান
পাই নি।
জ্যোৎঙ্গা। এই চোদ্দ বছর আমি বাপ-মার কাছে ছিলাম। শেষের
সাত বছর বাবা একাই ছিলেন। মায়ের মত করে বাবা আমায় মানুষ
করেছেন।
রণেন। সে বােঝা কঠিন নয় জ্যোৎস্না।
জ্যোৎস্না। বাবার কাছে আমি শুধু মেয়ে নই—তার জ্যেষ্ঠ সন্তান,
একমাত্র বন্ধু। তিনি কখনাে কারাে সঙ্গে মেশেন না। যা কিছু তার
পরামর্শ, আলােচনা—সবই আমার সঙ্গে। নিজে আমায় লেখাপড়া
শিখিয়েছেন।
রণেন। তুমি কি বলতে চাও—বল ?
জ্যোৎস্না। বলছি-তুমি মন দিয়ে শােন। যেদিন তুমি এখানে
এস—তােমায় আমায় প্রথম দেখা হলাে, বাবা আমায় বাড়ীতে নিয়ে গিয়ে
সব কথা বলেন।
রণেন। শুধু যা ঘটেছিল—তাই বললেন ?
জ্যোৎলা। না, আরও বললেন-স্বামীর সঙ্গে আমার মিলনে বাধা
কোথায় ?
৪৪
পতিতা
[ তৃতীয় দৃশ্য
রণেন। হা-আমিও শুনেছি। প্রথম কাদার মুখে ; তারপর
সন্ধান করে আরও জেনেছি! আমি তাে ঠাকুর্দার পাপের প্রায়শ্চিত্ত
করেছি। তিনিও মৃত্যুকালে তার অন্যায় বুঝেছিলেন।
যে জমি নিয়ে
দের বিবাদ আরম্ভ—সে জমি এবং তার সঙ্গে আমার এই গ্রামের সমস্ত
সম্পত্তি আমি তােমায় দান করেছি। তােমায় দানের অধিকার আমার
আছে। তুমি ইচ্ছা করলে এ সম্পত্তি নিজে নিতে পারতােমার
বাবাকেও দিতে পার।
জ্যোৎস্না। আমার সব কথা এখনও তােমায় বলা হয় নি।
রণেন। তােমার বাবা কি কোন যুক্তিই শুনবেন না?
জ্যোৎস্না। না; তার মুখে ওই এক কথা—দত্ত-চৌধুরীদের সঙ্গে
বােসেদের কোন সম্পর্ক নেই, থাকতে পারে না। আমাদের বাড়ীতে তুমি
গিয়েছিলে; কিন্তু আমার ইচ্ছা নয়, তুমি ও বাড়ীতে যাও। বাবা জানতে
পারলে তােমায় অপমান করতে পারেন।
রণেন। তাই তুমি আমার সঙ্গে ভাল করে কথা কইলে না?
জ্যোৎস্না। তুমি কেন গিয়েছিলে সেখানে ? যেখানে তােমার আদর
নেই, অভ্যর্থনা নেই—সেখানে কেন যাও? যদি আমার জন্য গিয়ে থাক,
আমি তােমার পায়ে ধরে ব’ছি—আর যেওনা সেখানে কোনােদিন !
রণেন। তুমি যদি আমার কাছে থাক, আমি কেন যাব জ্যোৎস্না ?
তুমি তাে জান, আমি শুধু তােমার জন্য গিয়েছি—তােমায় আমি চাই ।
তুমি সে দলিলখানা তােমার বাবাকে দেখিয়েছিলে ?
জ্যোৎস্না। তিনি দেখেনি-ছিড়ে ফেলে দিলেন। তারপর আগুন
দিয়ে সেই ছেড়া টুকরােগুলাে পুড়িয়ে ফেললেন !
রণেন। এত রাগ আমার উপর।
জ্যোৎ। আমি তখন তােমার সঙ্গে কথা কইনি। এখন শুধু এই
প্রথম অঙ্ক ] পতিতা ৪৫ কথাটি বলতে এসেছি, আমায় তুমি ক্ষমা কর—আমায় তুমি ভুল বুঝে না ! রণেন। আমি যদি তােমায় আমার বাড়ীতে নিয়ে যাই—আমার সঙ্গে তুমি যাবে না জ্যোৎস্না ? জ্যোৎস্না। আমি তােমায় এতদিন দেখিনি—তবু, এতদিন তােমার কথাই ভেবেছি। আমার মা সতী, ঠাকুরমা সতী, দিদিমা সতী-জ্ঞানে অজ্ঞানে তােমারই কথা আমি ভেবেছি। স্বামী আমার কাছে ব্যক্তি নয় -ভাব ! আজ তােমার বিশিষ্ট রূপ দেখেছি-মূর্তি দেখেছি। সাংসারিক জীবনে যদি তােমায় আমায় আর কখনাে দেখা না হয়, তবু আমি চিরদিন তােমারই! রণেন। কিন্তু আমি তাে তােমার মত ভাবরাজ্যের মানুষ নই জ্যোৎস্না? আমি সংসারের সাধারণ লােক—আমি সংসার ক’তে চাই । আমার এই বিশাল জমিদারী, তুমিই বলেছ - ছন্নছাড়া হয়ে পড়ে আছে। কার অভাবে আমার এই দশা? এতদিন তুমি ছিলে না - আজ তােমায় এত কাছে পেয়েও, তােমায় ধ’রূতে পারবে না জ্যোৎস্না ! জ্যোৎস্না। আমায় তুমি ক্ষমা কর ! যদি কোন দিন বাবাকে শান্ত করতে পারি, আমি আপনি তােমার কাছে আবে—আমার একটি কথাও মিথ্যে না ! রণেন। আচ্ছ-তুমি যাও ! বুঝলাম, সংসারে আমি একা! একটু আশা হয়েছিল তােমায় দেখে--ভেবেছিলাম, তুমি আমায় ছাড়তে পারবে না; কিন্তু তুমি তাে মানুষ ভালবাস না জ্যোৎস্না, তুমি ভালবাস ধৰ্ম্ম ! একদিন হয়তাে বুঝবে—কিন্তু সেদিন মানুষ কোথায় থাকবে—কে জানে ?—সােনাদা!
৪৬
পতিতা
[ তৃতীয় দৃশ্য
(সনাতনের প্রবেশ)
সােনা। কি দাদাবাবু!
রণেন। এঁকে দিয়ে এস—এদের বাড়ীতে।
সােনা। সে কি মা-লক্ষ্মী! তুমি চলে যাবে? আমি ভেবেছিলাম,
দাদাবাবুর সঙ্গে তুমি কলকেতার বাড়ীতে যাচ্ছ।
রণেন। সােনাদা! তােমার দাদাবাবুর জন্যে তুমি একাই যা
'আঁকুপাঁকু করে মর সংসারে আর কেউ তার কথা ভাবে না ।
সােনা। না, ভাবে নি! তুমি সব বুঝ কিনা?
রলেন। যাও–যাও, সােনা—আর দেরী করাে না বেশী। সন্ধ্যে
হয়ে গেল—ওঁকে বাড়ী রেখে এস।
সােনা। আমার দাদাবাবুর উপর রাগ করনি ত বৌমা ?
জ্যোৎত্রা। আমি কি রাগ করতে পারি শােনা! তুমি মাঝে
মাঝে আমার কাছে যেও সােনা!
সােনা। যাব বৈকি মা-লক্ষ্মী!—মার ঘরে ছেলে যাবে নি ?
রণেন। জ্যোৎস্না ! তুমি এমনি করে আমার জীবনের সব আলাে
নিভিয়ে দেবে!
জ্যোৎস্না। আমায় ক্ষমা কর—তুমি আবার বিয়ে করে সুখী হয়!
ভগবান যদি কখনাে দিন দেন-আমি ফিরে আসবাে। ( মাটিতে মাথা
রাখিয়া প্রণাম করিল)।
দ্বিতীয় অল্প প্রথম দৃশ্য বাগবাজারের গলীর মধ্যে বস্তীর বাড়ী। ভিতরে একটা সুন্দরী তরুণী—যেন কাহার প্রতীক্ষায় ! অনতিদুরে একখানি বৃহৎ ত্রিতল-বাটী। ত্রিতল- বাটীর জানালা হইতে কালীনাথ দু'চার বার উকি মারিয়া বধুটীকে দেখিল-ঘােমটা দিয়া বধু মুখ ঘুরাইল। তারপর কে দরজায় টোকা মারিল। তরুণী অতি সন্তর্পনে দরজা খুলিল-তরুণীর নাম “তরলা”। কেরে?-কুড়নী ? কুড়নী। হ্যা বৌদি-আমি? দোর খােল—কথা আছে। তরলা। (দরজা খুলিল) কি কথা? কুড়নী। বাবু আবার তােমায় চিঠি দিয়েছেন—এই নাও ! তরলা। তুই বলিস নি-আমি চিঠি ছিড়ে ফেলেছি ? কুড়নী। বল তাে! তা শুলাে কই? আমায় খাবার কিনে দিলে, চারটে পয়সা দিলে—এই দেখনা ? এক, দুই, তিন, চার-তুমি যদি একখানি চিঠি নেক বৌদি ! বাবু বলেছে—একটি সিকি দেবে ; নিবে চিঠি ? তরল। হা—লিখবাে বৈকি? যা—দূর হ, বেরাে মুখপুড়ি! এই বয়েস থেকে এই সব কাজ শিখছ ?-পাজী মেয়ে কোথাকার। কুড়নী। আমায় ডেকে পয়সা দিলে আমি বুঝি নেব না-বারে মজা ?
৪৮ পতিব্রতা প্রথম দৃশ্য তরলা। চুপ, কয় সর্বনাশী-চেঁচাসনে অমন করে! হারে, তােক কি জিজ্ঞাসা কমলে? কুড়নী। জিজ্ঞাসা করলাে—পত্তর পড়েছিলে কিনা ? তরলা। তুই কি বললি? কুড়নী। আমি বললাম-হু? পত্তর পড়ে একবার ফিক করে একটু হাসলাে, তারপর চোখমুখ লাল করে আমার দিকে চেয়ে বলে খবরদার! আর চিঠিখানা কুটি কুটি করে ছিড়ে ফেলে। তরলা। ফিক করে হেসেছিল বল্লি কেন? আমি তাে হাসিনি ! । কুড়নী। না–হাসনি আবার? আমি যেন আর হাসি চিনতে পারি নে! হাসলে ঠোটের ফাক দিয়ে আবার বলে হাসনি ! এই রকম- এখন যেমন হাসছে। তরল। হারে! কালীবাবু ছাড়া আর সেখানে কেউ ছিল ? কুড়নী। হু; না না—কেউ ছিল না। তবে কালীবাবু আমায় বলে দিয়েছিলেন—রাজাবাবু ছিল বলি। তােমার পায়ে পড়ি বৌদি! চিঠি লিখে রাখাে, আমি সন্ধ্যের পর এসে নিয়ে যাব। তুমি যদি বােজ একখানা করে চিঠি দাও, আমি বােজ একটা করে সিকি পাই। একমাস পরে আমার কত সিকি হবে—আমি মাড়ী আর হার গড়াব। তরল। তুই বেরােশতেকথােয়ারি। কুড়নী। তা তুমি আমায় যত পার—গালাগাল দিয়াে ; কিন্তু সন্ধ্যের পর এসে চিঠি যেন পাই ?—আমার মাথা খাও বৌদি, আমার মরা মুখ দেখ ! তরলা। তােমার ভারি আঙ্কারা হয়েছে ! কুড়নী। সন্ধ্যের পর যখন তােমার বর বাড়ী থাকে না—আর তুমি জানালার ধারে বসে হাওয়া খাও ! ।
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
পতিব্রতা
৪১
( সারদা প্রবেশ করিল।
সারদা। কে গা—বৌমা ? বৌমানুষ সদর দরজায় দাড়িয়ে আবার
কার সঙ্গে কথা এতক্ষণ ধরে!
তরলা। দেখে যাওনা নিজের চোখে-কার সঙ্গে কথা কইছি ?
সারদা। ও; তাইতাে বলছি বাছা! তুমি সােমত্ত-বৌ, রাস্তা দিয়ে
দিনরাত লােকজন যায়—ভালমন্দ মানুষ তাে আছে?
তরলা। আছে—তা জানি। আমি যদি দিনরাত তােমার ওই
অন্ধকূপে না থাকতে পারি ?-গায়ে একটু বাতাস লাগালে আর
মহাভারত অশুদ্ধ হবে না !
সারদা। তা কাজগুলাে সেরে গায়ে বাতাস লাগালে তাে পারতে?
বেলা তিনটে বেজে গেল—কলে জল এসেছে ; এক ডাই এটো বাসন
রান্নাঘরের চারিধারে থৈ থৈ করছে! এখন কি গায়ে বাতাস লাগাবার
সময় বৌমা ?
তরলা। আমি তাে বলেছি, ঝি-চাকরের কাজ আমি পারবাে না।
আমার দ্বারা ওসব হবে না।
সারদা। ওসব হবে না তাে কি হবে শুনি?—চুল এলাে করে,
কেদারার উপর এলিয়ে পড়ে নভেল-নাটক পড়া?—এ বাড়ীতে ওসব
বেহায়াপনা চলবে না—তা তােমায় বলে দিচ্ছি বাপু! আমার কাছে
স্পষ্ট কথা!
তরলা। উঃ—“কেদারায় এলিয়ে’! চারিদিকে চেয়ার-কেদারা
সব ঝ ঝল করছে কিনা ?
সারদা। ছেলে বাড়ী আসুক, তাকে বলি-তােমার সােহাগের
বিবি-বৌ শুয়ে বই পড়বেন, এক ডজন চেয়ার-কেদারা এনে দাও মাথায়
৪
পতিতা
[ প্রথম দৃশ্য
মােট করে! ওরে আবাগী ! ছেড়াদুটোর মুখের দিকে একটু চেয়ে
দেখিস?—তারা যে খেটে খেটে মুখ দিয়ে রক্ত তুলছে ?
তরলা। তা দরকার কি সংসার করবার ? আমি তাে কতদিন
বলেছি—হয় ঝি-চাকর রাখ, না-হয় আমায় বাপের বাড়ী পাঠিয়ে দাও।
স্ত্রীকে খেতে দেবার ক্ষমতা যার নেই—সে বিয়ে করতে যায় কেন?
সারদা। খেতে পরতে দেবার ক্ষেমতা ছিল, তুমি অলক্ষ্মী আতে
-তােমার দৃষ্টিতে সব উড়েপুড়ে গেল যে -লক্ষ্মী!
তরলা। হাউড়েপুড়ে গেল বৈকি! আ-হাহা! বিয়ের বৌ এসে
দেখে গেছে হাতীশালে হাতী, ঘােড়াশালে ঘােড়া, লােক-লস্কর অতিথি-
কুটুম, নাচগান, বাজীবাজনা, বাঁধা বােসনাই—তারপর যেই বৌ এসে
পাল্কী থেকে নেমে চারিদিকে চেয়ে দেখলল—আর হুস করে সব উড়ে
গেল! বুড়াে মাগীর মুখে একটু আটকালাে না?
সারদা। না—আটকালাে না! চুপ, কম্ হারামজাদী! যত বড়
মুখ না—ততবড় কথা! ছােট মুখে বড় কথা—গায়ে যেন বিষ ঢেলে
দের!
তরলা। হারামজাদী বললে যে বড়!-হারামজাদী কথার মানে
জান ?
সারদা। না—জানিনে। বিদ্বান বৌয়ের কাছে শিখবাে এবার !
তরল। খবরদার বলছি, ও রকম ঘােটলােকের গালাগা আমায়
দিতে পারবে না। এবার কিছু বল্লাম না—কিন্তু আর যদি কখনাে
শুনি?
সারদা। কি করবি—তুই আমার ?
তরল। জান, আমার গায়ে জোর আছে ?-আমি ইস্কুলে
লাঠিখেলা, সড়কিখেলা, তলােয়ার-খেলা শিখেছি?
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
পতিব্রতা
সারদা। শিখেছ তাে আমার মাথা কিনেছ আর কি ?
তরল। তােমায় আমি সাবধান করে দিচ্ছি—আগে থেকে! ফের
ওরকম চাষাড়ে গালাগাল দিয়েছ কি-আমি ও শাশুড়ী-টাশুড়ী ব'লে
মানবাে না! জানতত, আমার কাছে ধারালাে ছুরি আছে ?—তােমায়
কেটে কুচি কুচি করে ফেলব! তােমার কোন ছেলে তােমায় বক্ষে
কর্তে পারবে না—সবার চেয়ে আমার গায়ে জোর বেশী ।
( মন্মথ প্রবেশ করিল।
মন্মথ। কি—কি হয়েছে কি ? শাশুড়ী-বৌয়ের ঝগড়া শুনতে যে
রাস্তায় তােক জমা হয়েছে।
তরল। হয়েছে নাকি? তাহলে তাদের ডেকে এনে একটু
মিষ্টিমুখ করিয়ে দাও না?
সারদা। ওই শােন-বাবা শােন! আড়ালে দাড়িয়ে কিছু শুনেছিলে
ত? এইবার মুখের উপপার চাপাটা একবার শােন ?উঃ, বাবা-
বৌয়ের মুখে এই সব কথা! তুমি এর প্রতিবিধান কর বাবা ?-নইলে
এ বাড়ীতে আমি এক ফোটা জল- ক্রন্দন )
মন্মথ। মা, তুমি চুপ কর। (তরলার প্রতি) কি বলেছিলে মাকে ?
তরলা। যা বলেছি –শুনেছ তাে। আবার আমায় জিজ্ঞাসা করা
কেন? -
মন্মথ। মাকে তুমি কুচি কুচি করে কাটবে বলেছিলে ?
তরলা। ব’ললেই বুঝি অনি কুচি কুচি করে কাটা হলাে।
মন্মথ।
কেন বলেছিলে ?
তর। তার আগে উনি কি বলেছিলেন, সেটা একবার জিজ্ঞাসা
করে দেখা ?
পতিতা
[ প্রথম দৃশ্য
মন্মথ। উনি যাই বলুন—উনি আমার মা।
তরলা। তােমার মা-আমার তাে মা না ?
মন্মথ। তােমারও মা-তােমার শাশুড়ী।
তলা। শাশুড়ীর মত থাকেন তাে শাশুড়ী ! নইলে আবার
কিসের শাশুড়ী? শাশুড়ী বসে বসে আমার বাপ-মা তুলবেন, আর
আমি সেই শাশুড়ীর পা-ধােয়া জল খাব?—আমি তা পারবােনা !
( প্রস্থানােত)।
মন্মথ। যেওনা-শােন!
তরলা। কি ?
মন্মথ। মায়ের পা ধরে ক্ষমা চাও-পা ধর !
[ তরলা নীরবে স্থির হইয়া পঁাড়াইয়া রহিল ]
মন্মথ। ধর—শীগগির পায়ে ধর ! গোঁ হয়ে দাড়িয়ে থেক না-
সময় আমার খুব বেশী নেই ; এখুনি বেরুতে হবে। তারপর ক্ষমা চাওয়া
হ'লে সাত হাত মেপে নাকখৎ দেবে!
তরল। আমি পারব না।
মন্মথ। পারবে না ? তােমার ঘাড় যে সেই পারবে ! শােন—মা
বুড়াে হয়েছেন, কাজকর্ম সব পেরে ওঠেন না--তার সেবা করবার লােক
নেই। আমাদের দু’ভাইকে খেটে খেতে হয়, দিনরাত কাছে থাকতে
পারিনে ; তাই তােমায় বিয়ে করেছিলাম। ঠাকুরচাকর রাখতে খরচ
পড়ে। বিয়ে করলে বিনি পয়সায়, শুধু পেটতায়—রাধুনী-চাকরাণী
দুইই পাওয়া যায়।
তরলা। ওই বিয়ে করেছ আমায় ?
মর্থ। নিশ্চয়ই। নইলে তােমার কি ধারণা—কাচের শশা-কেসে
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
পতিব্রতা
রেখে পাঁচজনকে সুন্দরী স্ত্রী দেখাবার জন্য তােমায় বিয়ে করেছি? তুমি
আমার মায়ের দাসী-দস্তুর মত দাসী ! Slave tradeএর সময় হলে
তােমাকে কিনতে হতাে নগদ পয়সা খরচ করে নাও পায়ে ধর !
সারদা। থাক্ থাক্ বাছা—আর পায়ে ধরতে হবে না।
মন্মথ। তুমি কোন কথা ক’য়ােনা মা। ও আগে পায়ে ধরবে—
তারপর অন্য কথা !
তরলা। তুমি জোর করে আমায় শাশুড়ীভক্ত বৌ ক'রে তুলবে
নাকি ?
মন্মথ। হা—নিশ্চয়ই! দাড়িয়ে দাড়িয়ে তর্ক করনা ওরকম!
তরলা। আমি পারব না! আঁঃ—ভারি আমার স্বামী কিনা ?
বলে—ভাত দেবার কেউ নয়, নাক কাটবার গোসাই! (গমনােত)
মন্মথ। তুমি যেতে পাবে না! ( হাত ধরিয়া) আমি যা বলছি-
তাই তােমায় করতে হবে।
তরল। কি—মারবে নাকি ?
মন্মথ। নিশ্চয়ই ! আমার হাতেই তােমার মৃত্যু!
তরলা। তােমার হাতে? তুমি জান, আমি জিৎসুর প্যাচ
জানি? আমার সঙ্গে তুমি পারবে?—হাত ছেড়ে দাও।
এখনাে স্বামী
গুরুলােক বলে কিছু বলছি নে।
মন্মথ। আমায় রাগিয়াে না তরলা !—এইবেলা আমি যা বল্লাম,
তাই কর ; নইলে ভাল হবে না বলছি।
তরলা। ভাল থােক আর নাই হােক, আমি যা পিরবাে না
বলেছি—কার সাধ্যি, সে কাজ আমায় দিয়ে করায় ?
মন্মথ। আচ্ছা-র’সস! (তরল প্যাচ করিল, মন্মথ সালাইল)।
সারদা। ওরে বাপরে-কি দস্যি বৌরে বাবা !
৫৪
পতিতা
[ প্রথম দৃশ্য
মন্মথ। আজ তােমারই একদিন কি আমারই একদিন ! এই
যে ?
( উঠানের কোণ হইতে একটী বাঁশ তুলিয়া লইল)
সারদা।
ওরে মন্মথ-থাম্ থাম্ বাবা ।
মন্মথ। তুমি সরে যাও মা-ওকে আমি আজ যমের বাড়ী পাঠাব।
তরলা। (ত্রিতল বাটার দিকে চাহিয়া ) ও মশাই—শুনছেন?
আপনারা সাক্ষী, আমার স্বামী আজ আমায় যমের বাড়ী পাঠাবেন ।
আমি যদি যমের বাড়ী যাই, আপনারা ওঁর শ্রীঘরের ব্যবস্থা করবেন।
মন্মথ। আবার পাড়ার লােক ডেকে জড়াে কচ্ছে সর্বনাশী।
তরলা। না?-তুমি লাঠি দিয়ে ঠোবে আর আমি চুপটা করে
সয়ে থাকবাে? ( শাশুড়ীর পিছনে লুকাইয়া) মারনা ?—আগে মাতৃ
হত্যা করতে হবে–তারপর লাঠি আমার মাথায় পড়বে।
মন্মথ। মা–তুমি সরে যাও!
( কালীনাথ প্রবেশ করিল।
কালী। কি—কি?—ব্যাপার কি আপনাদের? ছিঃ ছিঃ ! কি
করছেন মশাই ? লাঠি রেখে দিন।
মন্মথ। আমি আপনাদের ডাকিনি।
কালী। আপনি ডাকেন নি—কিন্তু আপনার স্ত্রী ডেকেছেন। লাঠি
রেখে দিন। এস ভায়া—ভিতরে এস।
( রণেন্দ্র প্রবেশ করিল।
অপেন। থাক্-থাক, আমি এর মধ্যে আসবাে না; তুমিই এদের
বিবাদ মীমাংসা করে দাও কাদা !
মৎ। আমার ঘরের বিবা-মীমাংসা করতে হয়, আমিই
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
পতিব্রতা
ক’রবাে; আপনারা কেন উপপড়া হয়ে এখানে এসেছেন? চলে যান
এখান থেকে ।
কালী। শুছাে-রণেন ?
রণেন। আপনাদের বাড়ীতে এরকম ঝগড়া বােজ দুবেলা হয়ে থাকে
—আমি ঘরে বসে বসে দেখি। ভদ্রলােকের পাড়ায় এটা কি ভাল?
তরল। আপনারা এসেছেন—বেশ করেছেন ! এ বাড়ীতে ওঁর
যা অধিকার, আমারও তাই,—আমি বলছি, আপনারা থাকুন।
আপনারা আমায় রক্ষা না করেন তাে একজন নারী হত্যা হবে ।
কালী।
এ কথা শােনার পর আমরা চুপ করে থাকতে পারিনে!
আমাদের কর্তব্য আছে তাে?
মন্মথ। আপনারা বড়লােক আছেন-আপনারাই আছেন! পাশের
বাড়ীতে বড়লােক আছে বলে কেউ আর বৌশাসন করবে না?
রণেন। এস কালদা-এদের সঙ্গে তর্ক করা মিছে।
( তরলা রণেন্দ্রকে আসিয়া প্রণাম করিল।
আপনি আমাকে প্রণাম করবেন না-প্রণাম করবেন না !
তরলা। আপনি আমায় চিনতে পারলেন না?
রণেন। কে! তরল-তুমি ?
তরলা। হা—আমি ?
রণেন। তুমি এখানে?
তরলা। এই তাে আমার শ্বশুরবাড়ী। এই তাে সামনে আমার
পূজনীয়া শাশুড়ী ! আর পাশে দাড়িয়ে—এই মহাবীর, ইনি হচ্ছেন
আমার পতি-পরমগুরু!
রণেন। হুগলী জেলার কোন্ পাড়াগায় তােমার বিয়ে হয়েছিল,
শুনেছিলাম যে !
একি!
পতিতা
[ প্রথম দৃশ্য
তরলা। হ্যা—আমার শ্বশুরবাড়ী সেইখানেই। স্বামী কলকাতায়
বাসা করেছেন।
কালী। তােমাদের জানা-শােনা আছে নাকি ?
তরল। ওঁদের বাড়ী আমি যেতাম যে ! কাকীমা কেমন
আছেন? আপনারা এবাড়ীতে আছেন নাকি?
রণন। না—এবাড়ী আমি নতুন কিনেছি। আগের বাড়ী ছিল
ভাড়াটে বাড়ী। মা বছর তিনেক মারা গেছেন।
তরল। মারা গেছেন ?--আহা, আমায় বড় ভালবাসতেন।
( মন্মথর প্রতি একটু ভদ্রতাও জান না? ভদ্রলােকেরা দাড়িয়ে আছেন
এতক্ষণ ধরে-একটু বসবে’লতেও জান না?
মন্মথ। হ্যা-তা আপনারা ব’সলে পারতেন ?
রণেন। থাক—আর দরকার নেই।
মন্মথ। না না-সেকি হয়? আমি মাদুর আনছি।
রণেন। আপনার এখানে জায়গাও তাে খুব বেশী নেই! তা
দেখুন মশায়-হ্যা, আপনার নাম?
মন্মথ। শ্ৰীমন্মথ নাথ ঘােষ।
রণেন। দেখুন মন্মথবাবু ?—স্বামীস্ত্রীতে কি শাশুড়ী-বৌতে ঝগড়া
যতই না হয়, ততই ভাল !
মন্মথ। আজ্ঞে হ্যা—তাতাে বটেই।
রণেন। তা কি জন্য ঝগড়া হয় ?
মন্মথ। কথাটা কি জানেন ?—আমার স্ত্রী, উনি আপনার সঙ্গে
এখন যে রকম মিষ্টিমিষ্টি কথা কইছেন, সবার সঙ্গে ঠিক ওরকম কথা
ক’ন না,—অর্থাৎ ( সারদার প্রতি) মা! তুমি সরে যাও।
[ সারদার এহান ]
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
পতিব্রতা
৫৭
রণেন। অর্থাৎ কি?
মন্মথ। আপনারাই ওর মাথাটা খেয়ে দিয়েছেন। বড়লােকের সঙ্গে
মিশে চালটা বেশ একটু হয়ে গেছে লম্বা !—এদিকে আমার অবস্থা
মশাই, হাতে মাখতে মুখে কুলােয় না! তার উপর মায়ের যে মুখদোষ
একেবারে নেই—তা বলিনে ! আমিও একটু বীর-ভাবাপন্ন, উনিও একটু
বীরাঙ্গনা !—এই পাঁচটা মিশলে জিনিসটা এইরকম দাড়ায়।
কালী। যাই হােক মশায়! দিনকাল খারাপ-আপনার মাকে
একটু সাবধান করে দেবেন; আর তাে সেকাল নেই? এখন আর
সেকালকার মত বৌশাসন করা চলে না।
তরল। এই সােজা কথাটা ওঁরা আদৌ বাঝেন না! ওঁর মাও না
উনিও না। উনি এখন যেমন বেশ গুছিয়েগাছিয়ে কথাগুলি বলছেন—
সদাসর্বদা ওরকম কথা কন না; তারপর স্বভাবটী যেমন গোঁয়ার
কণ্ঠস্বরও তেমনি কর্কশ। আমি আবার ইংরিজি ইস্কুলে পড়েছিলাম
কিনা?—পতি পরম গুরু বিশ্বাস করিনে।
রণেন। তুমি বড় দুষ্ট, তরলা।
তরলা। এখন তাে ওকথা বলবেনই।
এখন
রণেন। যাক যাক্ ; মন্মথবাবু! আপনি তরলার সঙ্গে একটু
ভাল ব্যবহার করবেন—ও আমার ছােট বােন ! মা ওকে বড়ই
ভালবাসতেন।
মন্মথ। তাহলে আপনি তাে আমার বড়কুটুম্ব হলেন দেখছি।
তাহলে একটু জলখাবার ব্যবস্থা ?
রণেন। থাক্ থাক্-আপনি ব্যস্ত হবেন না ! জলখাবার আর
একদিন হবে।
কালী। গরীবের ঘর ব’লছেন—যদি দরকার হয় বিশপঞ্চাশ টাকা,
পতিব্রতা
[ প্রথম দৃশ্য
বাবুলাে পাশেই রইলেন, একবার একটা কাকপক্ষীর মুখে খবরটা দিলেই
-বুঝলেন কিনা?
রণেন। আপনি কিছু মনে করবেন না মন্মথবাবু! তরল, তােমার
বিয়েতে যৌতুক কিছু দেওয়া হয়নি—ম বেঁচে থাকলে নিশ্চয় দিতেন।
এইখানা ফিরিয়ে দিলে আমি বডডই রাগ করবে (তরলার হাতে একশ’
টাকার নােট দিলেন)—এস কাদা।
মন্মথ। একি! চলে যাচ্ছেন যে ?
রণেন। আজ বড় দরকার আছে। আর একদিন আসবে-নমস্কার।
[ কালীনাথ ও রণেত্রের প্রস্থান।
মন্মথ। দেখি, কি দিল ?--একশ’ টাকার নোেট ।
তরলা। হবে ?--
মন্মথ। ও তােমার কে হয় ?
তরলা। উনি মেয়েদের স্পাের্টিং ক্লাবের সেক্রেটারী ছিলেন। আমি
সেই ক্লাবে খেলা শিখতাম।
মন্মথ। ঘনিষ্ঠতা হলে কি করে ?
তরলা। এমন তত মানুষে মানুষে হয়—আমাদেরও হয়েছিল।
মন্মথ। তুমি ওদের বাড়ীতে যেতে ?
যেতাম-নইলে আর ওর মায়ের সঙ্গে আলাপ হবে কি
করে ?
মন্মথ। ওরা খুব বড়লােক ?
তরল। রাজা বললেই হয়। ।
(সালার প্রবেশ)
সারা। তা আগে বলতে হয় বৌমা ? বাড়ীর পাশে তােমার এমন
আত্মজন থাকে—আর আমি আবাগী তােমাকে দিয়ে ঝি-চাকরের কাজ
দ্বতীয় অঙ্ক ]
পতিব্রতা
Fরাই ? বাসন তােমাৰ মাজতে হবে না বাপু!-আমি এখনই লােক
জাগাড় কচ্ছি!
তরলা। -বাসন আমিই মাজবাে। ( মন্মথর প্রতি) তুমি যাও,
এ টাকা ফিরিয়ে দিয়ে এস। এ টাকা তুমি আমায় নিতে দিয়ােনা !
সারদা। এসব তােমার কি পাগলামি বৌমা ? দাদা হয়, আদর
F’রে দিলে—আর তুমি ফিরিয়ে দেবে?
তরলা। • তােমরা শুধু নিতেই শিখেছ ! কিছু নিলে যে কিছু দিতে
য়, তা তাে জানােনা !
সারদা। তুমি মিছে রাগ কচ্ছ বৌমা ! আমি জানি, আসাযাওয়া
দওয়ানেওয়ায় মানুষের কুটুম্বিতে। মন্মথ! তুই কালই বাবু দুটোকে
এখানে খাবার নেমন্তন্ন করে আয়। আজকের দিনে বােন বলে কে
বির করে—বল দেখি? নিজের বােনকেই লােকে বড় দেখে-আর এতো
তান বােন।
তরলা। কি করবে-রাখবে টাকা? বল, এখনও ফিরিয়ে দেবার
উপায় আছে। শুধু টাকা ফিরিয়ে দিলে হবে না, তােমায় এপাড়া থেকে
উঠে যেতে হবে ;-রাজী আছ ?
সারদা। না—এ মেয়েটার মাথা খারাপ !
[ সারদার এস্থান।
মন্মথ। টাকা আমি ফিরিয়ে দিতে পারি তরল ! আমি গরীব
লাভী নই। কিন্তু আমি মানুষ চিনি। বে তােমায় টাকা দিয়েছে, অতি
Tদা মনে দিয়েছে। তােমার মনে কু থাকতে পারে, ওর মনে নেই।
ওকে আমি অপমান করতে চাইনে। যাক; আজ বাসন মাজবার
তরল। আমি মাজছি। তুমি যাও-কাপড়-চোপড় ছাড়গে!
[ মন্মথর এহান।
পতিব্রতা [ প্রথম দৃশ্য তরলা ত্রিতল-বাটীর দিকে চাহিয়া দেখিল—কালীনাথ হাসিতেছে । কি মনে করিয়া সে একগলা ঘােমটা টানিয়া দিল ; সেই সময় তার বাড়ী ঢুকিল। ; তারক। কে গা! কাদের বৌ ? তরলা। ঘােষেদের নতুন বৌ গাে ! তারক। এ আবার কি রঙ্গ বৌদি ? এই এতদিন আছ, কখনাে তাে মুখপদ্মে ঘােমটা দেখিনি। আজ যে হঠাৎ একেবারে কলা-বৌ। তরলা। অনেক ভেবে চিন্তে দেখলাম্ ঠাকুর-পাে, তােমার গােবর- গণেশ দাদাটির জন্য একটি কলাববায়ের দরকার। তারক। তা তুমি যাই বল বৌদি, দাদা কিন্তু আমার সদাশিব ! তরলা। হু-তাই মাঝে মাঝে তাণ্ডব নাচেন! একটু আগে হয়ে গেল যে—তুমি তাে দেখলে না? তারক। ঝগড়া করেছিলে বুঝি মায়ের সঙ্গে? মাকে কিছু না বললে দাদা কখনাে কথা বলেন না! তরলা। সংসারে একা তােমাদেরই মা আছে। আর তাে কারাে মা নেই ? তারক। বৌদি! কেন বল দেখি, মার সঙ্গে তুমি ঝগড়া কর? মায়ের কথার জবাব না দিলেই তাে পার ? উনি বকে বকে আপনিই থেমে যান। তরল। সেইটে কেমন পারিনে ঠাকুর-পাে। তারক। তুমি দুটোদিন সবুর কর বৌদি ! আমি কোঠাবাড়ী ভাড়া নেব, ঝি রাখবাে, তােমায় লাইব্রেরীর মেম্বার করে দেব—তুমি শুধু দুটা করে খাবে আর ঘুমােবে, আর দিনরাত ডিটেকটিভ নভেল পড়বে। তরলা। আর খাবার জোগাড়—সেটা কোথেকে হবে ? রায়া
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
পতিব্রতা
তারক।
সে একটা প্ল্যান আমার মাথায় আছে।
তরলা। কি প্ল্যান ? হােটেল থেকে ভাত আনাবে ?
তারক। উহু! আমি বিয়ে করব—আমার বৌ ভাত বেধে
খাওয়াবে তােমায়। কেমন ?—এইবার মনের মত কথাটা হয়েছে তাে?
ওতয়ের ভাত পেয়ে বৌদির মুখে হাসি দেখে কে!
তরলা। সত্যি ঠাকুর-পাে, তুমি বিয়ে কর! তুমি বিয়ে করলে
তােমার বৌকে বক্বােবােকবাে-তাহলে আর শাশুড়ীর সঙ্গে ঝগড়া
হবে না।
তারক। সে বেচারীর অবস্থাটা একবার ভেবে দেখ?--সে একবার
মায়ের বকুনি খাবে আর একবার তােমার ?
তরল। তুমি তাে ভালবাসবে?—তারই জোরে সে সব সইতে
পারবে গাে--সব সইতে পারবে। এখন এস - ভাত খাবে এস! সেই
কোন্ সকালে বেরিয়ে গেছ! ভাত খেতে খেতে বৌয়ের গল্প করে,
শুনবােখন।
তারক। বৌয়ের গল্প আমি কচ্ছি, না তুমি কচ্ছ?—বেশ তাে!
( মন্মথ ঘর হইতে বাহির হইল)
তরলা। ওগাে-শুনছো ?
মন্মথ। কি ?
তরল। ঠাকুর-পাে রাগ করেছে।
তারক। আঃ বৌদি।
তরলা। বলছে, সাতদিনের ভিতর যদি ওর বিয়ে না দাও তাে,
রাগ করে ভাত খাবে না—আজ থেকেই খাবে না !
মন্মথ। কি যে ইয়ারকি কর, আর হি হি করে হাস—আমার ভাল
লাগে না!
[ প্রথম দৃশ্য
তরলা। (গলায় বস্ত্র দিয়া কি করলে আপনার ভাল লাগে, তাই
বলুন! আপনার কেনা দাসী তাই করবে ।
মন্মথ। সেই এটো বাসনের গাদা এখনাে সেইভাবে পড়ে আছে।
তুমি তাে মাজবে না? বুড়াে মাকে দিয়ে আর কোন্ লজ্জায় বাসন
মাজাই!
যাই—দেখি, নগদ পয়সা কবলে লােক পাই কিনা ?
হয়-
তারক। দরকার নেই দাদা! আমায় বলতে হয় আগে ? আমি
এখুনি মেজে ফেছি। বাসন মাজতে আবার ভারি ভাবনা কিনা ?
বৌদি ওসব কাজ কখনন করেনি, ও পারবে কেন?
তরলা। ঠাকুর-পাে ! আমার মাথা খাও, আমার মরামুখ দেখ—
তুমি যদি এটো বাসনে হাত দেবে। আমি তােমায় ভাত দিয়ে এখুনি
মেজে ফেলছি।
[ তারকের এস্থান।
মন্মথ। (প্রস্থানােত তরলার প্রতি ) শােন !
তরল। কি?
মন্মথ। তােমার মতলবটা কি, আমায় বুঝিয়ে বলতে পার ?
তরলা। না, আমি নিজেই আমার মতলব বুঝতে পারিনেতােমায়
বােঝাবাে কি করে।
মম্মথ। আর পাঁচজন গেরস্তের বউয়ের মত সংসারধর্ম কবে—না
রােজ বােজ নতুন নতুন কেলেঙ্কারি করবে ?
তরলা। নাগাে না—আমি সত্যি বলছি, এখন থেকে আমি খুব ভাল
হব। রােজ সকালে উঠে ফুল-বিল্বপত্র তুলে আগে শাশুড়ীর পূজো
করব ; তারপর স্বামীর পা-পূজো করে তবে চা খাব। তুমি তিনটে
দিন আমায় পরীক্ষা করে দেখ ?
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
পতিব্রতা
মন্মথ। না তরল, তােমার এ ছেলেমানুষী কি কখনাে যাবে না?
তরল। তা যেতে পারে—যখন বুড়াে হব, চুল পাকবে, দাত পড়বে,
কান শুনতে ধান শুবােসেই সময় আমি খুব গম্ভীর হব ! দেখ, তুমি
কিন্তু আমায় দেরী করিয়ে দিচ্ছ !
মন্মথ। আমি দেরী করিয়ে দিচ্ছি?
তরল। দিচ্ছ না? স্বামী রাতদিন প্রেমালাপ কল্লে স্ত্রী কি করে
ঘরের কাজ করে বল? তুমিই তাে আমায় আদর দিয়ে দিয়ে একটা আস্ত
বাদর তৈরী করেছ ! (তারকের উদ্দেশে ) ঠাকুর-পাে ! আমি একেবারে
ভাত বেড়ে নিয়ে যাচ্ছি। ( মন্মথর প্রতি) তুমি ঘরে এসে একটু বস না?
ঠাকুর-পােকে ভাত দিয়ে তােমায় চা তৈরী করে দিচ্ছি। ঠাকুরপাে আজ
ভাল চা এনেছে!
[ উভয়ের প্রস্থান।
রণেরে কলিকাতার বাড়ী—সুবিস্তীর্ণ হলঘর। রণেন্দ্র, ভবেশ, গিরি
সােমেন, হরিলাল, মাণিক প্রভৃতি বন্ধুগণ ; পুরা মজলিশি
গান চলিতেছে।
গান
তুমি যদি আমায় সখি ভাল বাসিতে!
দুরে না থাকিয়া যদি কাছে আসিতে,
কত সুখের হ'তে ধরা,
জীবন যৌবন-ভরা,
সকল দুঃখ-ব্যথাহরা তােমার মুখের হাসিতে ।
৬৪
পতিব্রতা
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
[ গীতান্তে রণেন্দ্র সিড়ি দিয়া উপরে উঠিল এবং তৎক্ষণাৎ
সেখান হইতে নামিয়া আসিল ]
রণেন।
আরে—আরে ; না:-এ বেটার মতলব খারাপ!
ভবেশ। কি হে রণেনকার মতলব খারাপ?
রণেন। এসে বলছি।
ভবেশ। সঙ্গে যাব ?
রণেন। না—আমি যাব আর আসবাে !
[ রণেনের এস্থান।
গিরিন। ধিন্ ধিন্ ধিন্ ধিন্ নাতি নাতি কেটে কেটোেক,
নাথুন্না নাথুয়া, দাগাথুন্না দাগাথুন্না।
মাণিক। আরে গিরিন! তুমি কি ক্ষেপে গেলে নাকি হে? ও কি
আরম্ভ করেছে ?
গিরিন। বােলটা মিলিয়ে নিচ্ছি। আচ্ছা বেজা, তালটা কিরে ?
গৌরসারেঙ, না?
ব্রজেন্দ্র। তুই বাপু, আর বিদ্যে জাহির করিনি! “তাবচ্চ শােভতে
মুখে যাবৎ কিঞ্চিভাষতে” গোঁড়সারেঙ, কথাটা কার কাছে
শুনেছিস?
গিরিন। আরে গেলে যা !—এটা আবার মহা ওস্তাদ হয়ে উঠলাে
যে? তােকে রেফার কচ্ছি—তাই তাের পরম ভাগ্যি মনে করি।
ব্ৰজেন। বল না—গৌড়সারেঙ, তােকে কে শেখালাে ?
গিরিন। শেখাবে আবার কে?-হারমােনিয়ম-শিক্ষায় লেখা আছে
গৌড়সারেঙ,।
ব্ৰজেন। আরে, সেটা তাল নয়রে মূখু-সেটা সুর!
!
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
পতিব্রতা
গিরিন। তাল এবং সুর তফাৎ কি ? What is a difference
between ota and 73?
ভবেশ। কোন তফাৎ নেই ভাই—তােমরা একটু থাম! রাস্তায়
যেন কিসের গােলমাল হচ্ছে।
গিরিন। না না—আমি একটা academical discussion করতে
চাই! সত্যি কি তফাৎ সুর এাণ্ড তাল ?—গানের জন্য দুটাই চাই!
আমি এ সম্বন্ধে একটা আর্টিকেল লিখব ?
ব্ৰজেন। দোহাই বন্ধু, ঐটে বাদ দেও! জগতে সঙ্গীত ছাড়া আরও
অনেক প্রবন্ধ লিখবার বিষয় রয়েছে, যেটা সম্বন্ধে তুমি কিছু জান না,
সেইটাই তােমায় লিখতে হবে।
গিরিন। আমি বরাবর তাই করি—that's my speciality!
তুমি জান, বাংলা সাহিত্য সম্বন্ধে প্রবন্ধ লিখে আমি পি-এইচ ডি পেয়েছি
—অথচ একখানি বাংলা বই পড়িনি।
ব্ৰজেন। এটা কি করে সম্ভব হলে গিরিন?
গিরিন। আমি সুবল মিত্রের ডিকসনারি থেকে বাংলা সাহিত্যের
সিনপসিস্ পড়েছি—that's enough for a thesis প্রবন্ধ যে
লিখতে জানে, বিষয়ের জন্য তার আটকায় ? One should know the
art-তুমি দেখাে, সঙ্গীত সম্বন্ধে আমি লিখবােই। ওই গৌড়সারেঙ,
এমন ইন্টারেষ্টিং ব্যাপার করে তুলবে যে, ইউনিভারসিটি আর একটা
পি-এইচ ডি না দিয়ে পারবে না ! গৌড় এণ্ড সারেঙ-গৌড় that is
Bengal, সারেঙ,—যে ষ্টীমার চালায় ; সুতরাং গৌড়সারেঙ, আর
ভাটয়াল যে একই অরিজিনের সঙ্গীত—এ আমি প্রমাণ কয়বােই!
ব্ৰজেন। হা—মৌলিক গবেষণা বটে।
পতিব্রর্তা
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
( রণেন, তারক ও গুপে গুণ্ডা এভৃতির প্রবেশ)
'রণেন। ( গুপের প্রতি) কেন তুই ছেলেটাকে শুধু শুধু মারলি ?
গুপে। আমরা বাবু সাপের জাত! আগে কিছু বলিনি, ঐ শালাই
তাে আগে আমার হাত ধরলাে !
রণেন। (তারকের প্রতি) তুমি ঐ বাড়ীতে থাক না?
তারক। আজ্ঞে হ্যা।
রণেন। তুমি ওর হাত ধরেছিলে?
তারক। তার আগে ও বেটা কথা বলিতে পারিল না)।
গুপে। বল শালা-বল! নিজের বাড়ীর কুচ্ছে—নিজে বল! আমি
বাবু পথ দিয়ে যাচ্ছি—ভালমানুষটীর মত। ওদের বাড়ীর একটা বৌ শিস
দিয়ে আমায় ডাকলে বাবু!
তারক। ফের মিথ্যে কথা ?— হাত ধরিয়া টান মারিল )
গুপে। দেখছে বাবু—শালার রকম দেখছাে? শালার হাত ধরলে
চিচি করে, ছেড়ে দিলে পাকসাঢ় মারে।
রণেন। ফের যদি তুমি এই গলি দিয়ে যাও, আমি তখুনি পুলিশ
ডেকে তােমায় ধরিয়ে দেব।
গুপে। তােরই বাড়ীর সরকার বাবু! সেই যে-বাবু মাঝে মাঝে
আসে-আর মাঝে মাঝে কোথায় চলে যায় !
রণেন। তা কি হয়েছে?
গুপে। সেই বাবুই তাে ব’ক্সে-দেখ না, যদি মেয়েমানুষটাকে হাত
করতে পারিস? নইলে আমার কি দরকার বাবু? দশটা মেয়েমানুষ
আমার পাছু লেয় নােজ!
বেশ। উ-ব্যাটা আমার স্বয়ং কামদেব আর কি? আসর
গরম কহে মেথনা !
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
পতিব্রতা
৬৭
গিরিন। -কতক দিয়ে পালা শেষ করে ফেলনা ভাই।
রণেন। এ গলিতে তুমি আসতে পাবে না!
গুপে। কেন বাবু? কোম্পানীর রাস্তা—এততা আর তােমার
দেশের জমীদারী লয় ?
রণেন। দেশের জমীদারী কি না, যে দিন ধবে—দেব দেখিয়ে !
গুপে। তা পঞ্চাশ জন লােক নিয়ে একটা লােকের পাছু লাগলে
সে আর কি করতে পারে বাবু।
রণেন। পঞ্চাশ নয় রে—একা আমি! ( গুপে গুণ্ডার হাত
ধরিল)।
গুপে। তুমি আমায় বেকায়দায় ধরেছ বাবু!
রণেন। তােমার হাতখানা পিষে গুড়ো করে ফেলতে পারি-
বুঝেছ ?
গুপে। তােমার হাত বড় কড়া বাবু-কজিতে জোর আছে বাবু।
রণেন। তােমায় জব্দ করতে দশ সেকেণ্ড লাগবে না-কানমলা
খাও! আর কখনাে ছেলেমানুষের গায়ে হাত তুলবে না—ভদ্রঘরের
মেয়েদের দিকে নজর দেবে না।
গুপে। স্যায়, নিজের কান আর নিজে মলতে বলবেন না। ঐ কথা
বলার জন্যে আমি একবার এক শালা মাষ্টারকে মার দিয়েছিলাম।
স্যার, কানটা আর মলবাে না—ঐটা মাপ করে দিন হুজুর!
রণেন। আচ্ছা, যাও-যাও এখান থেকে; যা বল্লাম, মনে থাকে
যেন! (তারকের প্রতি) তােমার নাম কি?
[ গুপে ওর এইন।
তারক। প্রতারকনাথ ঘােষ।
রণেন। তুমি মন্মথবাবুর ভাই
৬
পতিতা
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
তারক। আজ্ঞে হ্যা।
রণেন। তুমি বােধ হয় শুনেছ, তােমার বৌদিকে আমি চিনি-
সে আমার ছােট বােনের মত।
তারক। আজ্ঞে হাশুনেছি।
রণেন। গুপে কি করেছিল আজ ?
তারক। বৌদি জানলার কাছে দাড়িয়েছিলেন। ও রাস্তায় দাড়িয়ে
বৌদির সঙ্গে কথা কচ্ছিল।
রণেন। কে আগে কথা কয়? তরলা-না গুপে ?
তারক। তা আমি ঠিক জানিনে। আমার মনে হয়, গুপেই
আগে কথা কয়।
রণেন। তরলা কথার জবাব দিতে গেল কেন? জা বন্ধ করে
চলে গেলেই তাে পারতাে ?
তারক। কেউ কোন কথা বললে উনি উত্তর না দিয়ে থাকতে
পারেন না-ওই তাে ওর দোষ!
রলেন। একটা কথা জিজ্ঞেস করবাে-কিছু মনে করে না?
তারক। না—আপনি জিজ্ঞেস করুন্।
ভবেশ। ওহে রণেন, তােমরা তাে বেশ লােক হে! এতক্ষণ যা
চলছিল, সেটা সাৰ্বজনীন! তােমরা দুজনে কানে কানে কথা বলতে
লাগলে আমরা কি করি বলতাে ভাই—আমরা চুপটি করে বসে
থাকব ?
রণেন আমি যাচ্ছি—এই দু’মিনিট! তােমরা ততক্ষণ চাটা
থাও না ?
গিরিন। সঙ্গীত সম্বন্ধে academical discussion—সেটা হতে
হ’তে বন্ধ হলাে। সেইটে বরং চলুক না?
দ্বিতীয় অঙ্ক ] 'পতিব্রতা রণেন। যা’হয়, কর। (তারকের প্রতি) হ্যা—আমার কথা হচ্ছে। এই, তােমার দাদাতে আর তােমার বৌদিতে কি তেমন মিল নেই ? তারক। আমারও তাই মনে হয়। রণেন। দোষ কার ? তারক। দোষ বােধ হয় কারােই না; কিন্তু মেলে না—প্রায়ই তর্ক হয়, ঝগড়া হয়, রাগারাগি চলে। রণেন। আচ্ছা, তুমি এখন বাড়ী যাও। গুপে গুণ্ডা আর কিছু করতে সাহস করবে না ; তবে তােমার বােদিকে বলে দিও-সকলের সব কথার উত্তর দেওয়ার প্রলােভনটা তাকে ছাড়তে হবে। বলল- আমি বলেছি। তারক। আপনার কথা যদি শােনেন। এখন তাহলে আসি। [ রণেনকে নমস্কার করিয়া প্রস্থান করিল। ভবেশ। এতক্ষণে কথা শেষ হলাে—তবু ভাল। মধু, একখানা সখীসংবাদ ধর ভাই! মধু। রাত হয়ে গেল—আজ আর থাক ভাই ! ভবেশ। আরে—উঠবেই তাে। কেউ আর তােমায় ধরে রাখছে ! একটা রসের গান শুনতে ইচ্ছে হ’লল—এমনিই তাে যখন-তখন গেয়ে থাকি। গিরিন। হ্যা, গানটা গেয়ে ফেল—“মধুরেণ সমাপয়েৎ করে দাও ! আমার academical discussionএর একটু সাহায্য হবে।
পতিতা
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
গান
কার কথা কহিল সে কানে কানে,
চুরি করে কে চেয়েছে শ্যামের পানে !
কুঞ্জে চন্দ্রাবলী বসিয়া একা,
( ভাবে) কেমনে গােপনে পাবে শ্যামের দেখা।
ছল ছল দু’নয়ন কি অভিমানে,
তাহার প্রাণের কথা বল কে জানে!
ভবেশ। বাঃ বাঃ বেশ-খাসা গেয়েছ !
গিরিন। এইবার তাহলে ওঠা যাক! আয় বেজা-আয় মধু!
[ ভকেশ ও রণেন ব্যতীত সকলের প্রস্থান।
ভবেশ। কিহে রণেন্দ্র! ব্যাপার কি ?-অত গভীর কেন
ভাই!
বণেন। আমি ভাবছি—
ভবেশ। কি ভাবছ ?
রলেন। কত কি!-বন্ধনহীন জীবনের অসংখ্য দুশ্চিন্তা ! এ তােমরা
বুঝবে না—বেশ আছ !
ভবেশ। বেশ ভাই! আমরা তাে জানতেম—“অন্নচিন্তা চমৎকার ;
বলতেই হবে, সেটি কেমন—তুমি জান না ! তবু দেখি, তােমার গাম্ভীর্য্য
আর যায় না !
রণেন। তােমায় তােত সব বলেছি।
ভবেশ। দেখ—তুমি একটা বিয়ে কর; বলতে, পাত্রী দেখি-
রণেন। থাক-থাক ভাই! আর ওকথা। একটা জায়গায় বেড়াতে
•
যাবি?
ভবেশ। কোথায় ?—তােমাদের দেশে?
রণে। হ্যা, ধ, তাই।
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
পতিব্রতা
৭১
ভবেশ। আচ্ছা, নিয়ে চল—মিলন করিয়ে দিয়ে আসি।
রণেন। সে পথ বন্ধ—একেবারেই বন্ধ!
ভবেশ। একবার দূতী হয়ে যাই তাে? তারপর যা হয়! কিন্তু
এদিকের ব্যাপারটি তাে বুঝলাম না কিছু ?—ও ছােরাটির সঙ্গে অত
কি কথা !
রণেন। কেন—তাতে কি হয়েছে! ছােরাটি কি ?
ভবেশ। না—আর কিছু না; তবে ওদের বাড়ীতে বেশ একটি
তরুণী!
রণেন। দেখেছ?—নজর পড়েছে সেদিকে?
ভবেশ। তােমার উপরের ঘর থেকে দেখেছি-গলিতেও দেখেছি।
আমাদের আর ভয় কি? আমরা অতি নিরীহ জীব ! তবে তুমি একটু
সাবধানে থেক।
রণেন। কেন বল দেখি?
ভবেশ। নজর তােমার উপর। আমি বহুবার দেখেছি, হাঁ করে
মাের ঘরের দিকে চেয়ে ।
রণেন। ওসব কথা রাখ ভাই। আমার অবস্থাটা শােন—আমায়
ACICO 6970165 ! Man delights me not, nor women neither.
ভবেশ। পেছিয়ে গেলে ভাই! এটা নাইটি, সেনচুরি মুড ;
বর্তমান যুগ হামলেটের যুগ নয়, বরং ডজুয়ানের যুগ বলা যেতে পারে-
যাবৎ জীবেৎ সুখং জীবেৎ ঋণং কৃত্বা হুইস্কিং পিবেৎ! আজকের মানুষ
আইডিয়াল-মরীচিকার পেছনে দৌড়াতে চায় না, তারা মানুষের মত
বাঁচতে—জীবনের সুখ-সৌন্দৰ্য্য ভােগ করতে চায় ।
রণেন। কিন্তু এমন দুর্ভাগাও তত পৃথিবীতে আছে, অদৃষ্ট যাকে সব
চোখের সামনে ধরে তখুনি ছিনিয়ে নিয়েছে।
.
१२
পতিব্রতা
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
ভবেশ। তার পরিবর্তে কিছুই দেয় নি ?—আমি বিশ্বাস করি নে ;
জীবনের আইন বড় সূক্ষ্ম রণেন! অদৃষ্ট মানুষকে একদিকে যেমন বঞ্চিত
করে থাকে, অন্যদিকে ঠিক তেমনি সেই বঞ্চনার ক্ষতিপূরণ করে
থাকে—
রণেন। কিন্তু কই ?—আমার ক্ষতি তাে আজও পূরণ হ’ল না
ভাই ।
ভবেশ। তােমার কতখানি ক্ষতি হয়েছে—আমি তাে ভাই, এখনাে
ভাল বুঝতে পারিনি! আগে ক্ষতিই ধাৰ্য্য হােক?—তবে তাে ক্ষতি
পূরণের দাবী মঞ্জুর হবে ?
রণেন। তাইতাে বলছি; আগে চল—নিজের চোখে দেখবে?
তারপর বিচার করবে। তােমায় সত্যি বলছি ভবেশ, জীবনে আমি সুখী
হতে পার্কেম! আমি নিজের অধিকার হারিয়েছি, অথচ আমার নিজের
কোন দোষ নেই।
ভবেশ। দেখি—তােমার ভাগ্য আর আমার হাতযশ! দূতীর
কাজ তত কখনাে করিনি?—দেখা যাক ; আচ্ছা, তাহলে আসি ভাই।
রণেন। কবে যেতে পারবে ?
ভবেশ। তােমাদের দেশ তত নিকটেই ; শনিবার গিয়ে সােমবার
আসা যাবে তাে ?
রণেন। হারে ?-দু’একটা দিন থাকবি নে ?
ভবেশ। তাহলে আর একটা হপ্তা অপেক্ষা করলাষ্ট সাটার-ডে
আছে; সােমবারটা যদি দরকার হয়, ফ্রেঞ্চ লিভ নেব-কি বল ?
রণেন। আমার আর একটি দিনও কলকাতায় ভাল লাগছে না!
ভবেশ! তবে এই শনিবারই চল—যাহা বাহায়, তাহা তিল্লায়।
তুমি ভাই একটু হাস—তােমার শুনাে মুখ আমার ভাল লাগে না।
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
পতিব্রতা
৭৩
রণেন। হাসি ?-রবীন্দ্রনাথের “কচ ও দেবযানীর লাইনগুলাে
মনে পড়ে ?
•••হায় সখা, এত স্বর্গপুরী নয় !
পুষ্পে কীটসম হেথা তৃষ্ণা জেগে রয়
মৰ্ম্মমাঝে, বাঞ্ছা ফিরে বাঞ্ছিতেরে ঘিরে,
লাঞ্ছিত ভ্রমর যথা বারম্বার ফিরে
•••মুদিত পদ্মের কাছে।•••
হেথায় সুলভ নহে হাসি !
ভবেশ। বাস্তবিক। মানুষের জীবন এমন জটিল !
রণেন। যে, একজনের জীবনের সমস্যা সম্বন্ধে আর একজন চিন্তা
করে কিছুই করতে পারে না। আচ্ছা, তােমায় ধরে রাখব না—তুমি
এস ভাই!
ভবেশ। আচ্ছা !
[ এস্থান।
[ রণেন্দ্র একখানি বই লইয়া একমনে পড়িতে লাগিল
একটু পরে ধীরে ধীরে নীলু ভৃত্য প্রবেশ করিল।
রণেন। কিরে নীলু?
নীলু। বাবু, খাবার হয়ে গেছেন; এই বেলা গরমগরম দুটা খেয়ে
নেবেন কি?
রণেন। কেন—তােমাদের ঘুম আসছে নাকি?
নীলু। আজ্ঞে, না বাবু! ঘুম কেন আসবেন? তবে রাত্তির অধিক
হয়ে গেছেন কিনা ?
রণেন। আচ্ছা"এক কাজ কর, তােমরা সবাই খেয়ে নাও; তারপর
৭৪
পতিব্রতা
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
বেশ আরাম করে এক ছিলুম তামাক খাও। যদি গাঁজা খাও তাে,
পায়খানার ওধারে গিয়ে খেও।
নীলু। কি যে বলেন বাবু?
রণেন। কেন—তুমি গাঁজা খাওনা ?
নীলু। আজ্ঞে না-ওনার কথা হচ্ছে না ; আপনি সেবা না করলে
কি আমরা খাতি পারি বাবু?
রণেন। তাহলে পুরােদমে বেশ মৌজ করে একছিলুম গাঁজা খেয়ে
তারপর আমায় ডেকো।
নীলু। যে আজ্ঞে বাবু!
রণেন। খবরদার—যেন এদিকে গন্ধ না আসে।
অমন কথা বলবেন না বাবু-আমি বড় নজ্জা পাই! আপনি
মনিব-অন্নদাতা! পিতের মত ! ঐ একটু দুশ্চরিত্তির আছে বাবু।
নইলে একেবারে ধােয়া গঙ্গাজল। ওনার গন্ধ যেদিন আপনার নাকে
এসবে, সেদিন ওনাকে গঙ্গার জলে বিসর্জন করে দেব ।
রণেন। আচ্ছা—আচ্ছা, আধঘণ্টা পরে এস।
[ নীলুর প্রস্থান।
নীলু।
(তালার প্রবেশ )
রপেন। একি তরলা—তুমি? তুমি এতরাত্রে আমার এখানে।
তরলা। তােমার সঙ্গে দেখা করতে।
রণেন। কেন ?
তরল। দরকার আছে—বলছি।
রণেন। তুমি এইভাবে এলে তােমায় কেউ দেখতে পায়নি ?
তরলা। দারােয়ানকে বলেছি রাজাবাবুর দেশ থেকে আসছি-
আমি তার আত্মীয়।
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
পতিব্রতা
৭৫
রণেন। সে তােমার কথা বিশ্বাস করলাে ?
তরলা। দুই হাত তুলে সেলাম করলে !
রণেন। যাক—কেন এলে জানতে পারি কি?
তরলা। আমি তােমার এখানে থাকবাে।
রণেন। আমার এখানে থাকবে?
তরলা। কেন?—তুমি আমায় দুটী খেতে দিতে পারবে না ? না
হয়, তােমার বাড়ীতে ঝি থাকে তাে ?—আমি ঝিয়ের মত থাকবে, ঘরের
কাজকর্ম করবাে।
রণেন। তােমার স্বামী!
তরলা। তিনি আমায় ত্যাগ করেছেন।
রণেন। ত্যাগ করেছেন! কি অপরাধে ?
তরলা। আমি রাস্তায় একটি লােকের সঙ্গে কথা কয়েছিলাম।
রণেন। শুনেছি সেকথা। আমি তাকে শাসন করে দিছি, সে
আর তােমাদের গলিতে যাবে না।
তরলা। সে যাক, না যাক—সেকথা নয় ; আমার স্বামী শেষকথা
বলে দিয়েছেন।
বণেন। কি তার শেষকথা ?
তরল। আমার সম্বন্ধে তাঁর কোন মােহ নেই; তিনি আমায়
নিষ্কৃতি দিয়েছেন।
রণেন। তুমিও কি নিষ্কৃতি চাও নাকি ?
তরলা। মন্দ কি?—মােহ আমারও কিছু নেই।
রণেন। আমার এখানে কেন এলে?
তর। সকলের আগে তােমার কথা মনে পল ; তাই তােমার
কাছেই এলাম।
পতিতা
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
রণেন। আমি যদি তােমায় স্থান না দিই?
তরল। যেখানে দু’চোখ যায়, সেইখানেই যাব ।
রণেন। একটি রাত্তির তুমি যদি আমার বাড়ীতে থাক, কাল আর
তােমার স্বামীর ঘরে ফিরে যাওয়ার কোন উপায় থাকবে না—এ কথা
ভেবে দেখেছ ?
তরল। আমি কিছু ভাবিনি! শুধু এই জানি, যেখান থেকে চলে
এসেছি—সেখানে আর ফিরবাে না
(তারকের প্রবেশ )
তারক। রণেন বাবু! এই যে বৌদি—যাক, তবু ভাল ।
রণেন। এস তারক! তােমার এই পাগল বৌদিকে বাড়ী নিয়ে
যাও!
তারক। বৌদি।
তরল। আমি যাব না !
তারক। আমরা তােমার কি করেছি যে, এমন করে আমাদের মুখ
পােড়াবে ? কাল সকালে আমরা পাড়ায় বেরুতে পারবাে ?--
তরল। খুব পারবে—তােমাদের আটকাবে না কিছু!
তারক। কেন?—আমাদের তুমি মানুষ বলেই গ্রাহ্য করনা নাকি?
তরল। একা তােমাকেই যা-কিছু শ্রদ্ধা করি ঠাকুর-পাে? তােমারই
জন্যে এতদিন ওবাড়ীতে আছি! তুমি ছেলেমানুষ—মনে কষ্ট পাবে । ;
কি আর হবে! ভেব—আমি মরে গেছি! এ বাংলা দেশ-তােমার
দাদার বিয়ে আবার হবে, নতুন বৌদি পাবে-ভাবনা কি ভাই? তখন
আমার কথা আর মনে পড়বে না !
রণেন। এ সব পারিবারিক ব্যাপারে আমার কোন কথা বলা উচিত
নয়! তবু আমার বাড়ীতে যখন এসেছ, আমার কথা বলা দরকার।
দ্বিতীয় অঙ্ক ] পতিব্রতা ৭৭ তরলা ! তারক যখন নিতে এসেছে, তুমি ওর সঙ্গে বাড়ী যাও। তারপর, সময়ে সব মিটে যাবে। তরল। তাহলে আপনি আমায় আপনার বাড়ীতে থাকতে দেবেন বলুন? রণেন। বাড়ীতে আমার মা নেই, বােন নেই—তুমি পরস্ত্রী। আমি স্বীকার করি তরলা, তােমার জীবনে সুখ নেই ! তবু ইচ্ছা করলেই তুমি তােমার অদৃষ্ট বদলাতে পার না! যেখানেই যাও না—অদৃষ্ট সঙ্গে যাবে ; স্বামীর হাত ছাড়ালেই অদৃষ্টের হাত ছাড়ানাে যায় না! তারক। আমি তােমার পায় ধরে বলছি বৌদি, তুমি ফিরে চল কেউ তােমায় কিছু বলবে না। আমি রােজগার করে তােমাকে খাওয়াব -দাদার অন্ন তােমার খেতে হবে না ! তরলা। ঠাকুর-পাে, তুমি ছেলেমানুষ ! আমি তােমার আপনার না তােমার মা, তােমার দাদাই তােমার আপনার ? তারক। তুমি কোন কথা ব’লনা—এস.আমার সঙ্গে। তরল। (রণেনকে লক্ষ্য করিয়া তুমি আমায় আশ্রয় দিতে সাহস কর না ? রণেন। তােমায় আশ্রয় দেওয়া সহজ নয় তরলা ! আমি সমাজবন্ধন ভাঙ্গতে চাই নে ; তাতে আমারও কল্যাণ নেই-তােমারও কল্যাণ নেই। যাও তরল, বাড়ী যাও! তরলা। ঠাকুর-পাে এস, আমি চল্লাম। কোথায় তা জানিনে। (রণেনের প্রতি) তুমি অদৃষ্টকে ভয় কর। আমি ভয় করিনে। রণেন। তুমি ভাবছ, ঘরে বন্ধন-বাইরে মুক্তি। তাই মুখে বলছে, অদৃষ্টকে ভয় কর না। আমার অভিজ্ঞতা তােমার চাইতে ঢের বেশী ! আমি বলছি, ঘরেও বন্ধন-বাইরেও বন্ধন ; মুক্তি কোথাও নেই তরলা ! তরলা। আমিতাে মুক্তি চাইনে,-আমি জানি, হয়তাে কুটোর মত স্রোতে ভেসে যাব—জীবনে কোনও কূলকিনারা পাব না! তবু, এখন যেমন আছি-তার চেয়ে সেইই ঢের ভাল ! চল ঠাকুর-পাে! !
তৃতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
রাজ্যেশ্বর বাবুর বাড়ীর সংলগ্ন বাগান—জ্যোৎস্না, সুধাংশু ও বিমল।
গান
পথহারা পথিক সে–এসেছিল পথভুলে ;
আর কি আসিবে পুনঃ মাের জীবনের কুলে ?
হয়তাে বিধেছে কাঁটা পায়,
বুক ভেঙ্গে গেছে বেদনায় !
পূজা উপচার দেছে নীরবে চরণমূলে।
তখন চাহিনি ফিরে—নেইনি মাথায় তুলে।
বিমল। বা, তুমি তাে চমৎকার গাও ।
সুধাংশু। আমার চেয়ে দিদি ভাল গায় বিমলদা !
বিমল। বটে ?
সুধাংশু। আচ্ছা বিমলদা ! সুধাংশু মানে যা, বিমলচন্দ্র মানেও তাই ?
!
-না?
বিমল। হ্যা; তাইতাে ?—তাহলে তুমি আর আমি এক।
সুধাংশু। দিদি নিজে কিছু না ; সুধাংশুরও জ্যোৎস্না, আবার
বিমলচরেও জ্যোৎসা-না ?
জ্যোৎজা। তুমি ভারি বক্তা হয়েছ—দেখছি যে!
সুধাংশু। আচ্ছ। বিমলদা, জ্যোৎন্তার কোন মানে হয় নানা ?
জ্যোৎ, কোৎজা, জ্যোৎলানা না-আছে আছে, জ্যোৎনার মানে
ছে।
• তৃতীয় অঙ্ক ] পতিব্রতা ৭১ বিমল। কি বল দেখি? সুধাংশু। আমি জানি-কৌমুদী কৌমুদী; দিদির মানে “ব্যাকরণ- কৌমুদী”! কিন্তু “ব্যাকরণ কৌমুদী’তে তাে গান নেই—“বীণার ঝঙ্কারে’ গান আছে! জ্যোৎস্না। উঃ! ছেলেটা এত বতেও পারে! সুধাংশু। বাবা বলেছেন, আমি বড় হলে উকিল হব। আমাদের জমি-জমা কারা কেড়ে নিয়েছে তাদের কাছ থেকে আমি উকিল হয়ে সব জমি কেড়ে নেব। তাই এখন থেকে আমি বক্তৃতা করতে শিখছি। বিমলদা, আপনিও তাে উকিল? বিমল। হ্যা, তবে তােমার মত বড় উকিল নয়—ছােটখাট উকিল। সুধাংশু। আমি তাে এখনাে উকিল হইনি—উকিল হব। কি রকম করে উকিল হব শুবেন ? বিমল। কল। । সুধাংশু। এই শুনুন— কানে কানে বলিল) আমায় একটা চিটী কাটুন; “উ', এইবার ‘কিল’—উকিল। [ দৌড়াইয়া অস্থান। বিমল। তােমাদের দুই ভাইবােনের প্রকৃতি ঠিক উলটো-তুমি যেমন গভীর, ও তেমনি হাল্কা! জ্যোৎজা। তা ঠিক। আমার মনের চারিধারে মেঘ জমতে থাকে- সুধা মাঝে মাঝে ঝােড়ো হাওয়ার মত এসে সে সব সরিয়ে দেয় ; নইলে, আমি বােধ হয়—আমি বােধ হয় এতদিন পাগল হয়ে যেতাম। বিমল। জীবনকে সহজ ভাবে নিতে হয়, তবেই জীবন থেকে কিছু পাওয়া যায়। নইলে—যদি বেশী কিছু আশা কর, প্রায়ই ঠকতে হয়। Like gambling-অন্ধ নিয়তি কলকাঠি নাড়ছে। যার ভাগ্যে যা এল। •
পতিব্রতা
[ প্রথম দৃশ্য
জ্যোৎস্না। আপনার কি জীবন সম্বন্ধে এই রকম ধারণা ?
বিমল। আমার কিছু ধারণা নেই। মানুষ কিছুদিন বেঁচে থাকে—
তারপর মারা যায়। যে ক’দিন বেঁচে থাকে, কেউ সুখে থাকে—কেউ
থাকে না!
জ্যোৎস্না। আপনি কেমন আছেন ? সুখে আছেন—না সুখে নেই ?
বিমল। ঠিক বুঝতে পারি নে ! তবে হানা, মন্দই বা কি ?-এক
রকম ভালই আছি।
জ্যোৎস্না। আপনি লেখাপড়া জানেন, চমৎকার স্বাস্থ্য আপনার,
টাকা-কড়িও আছে, অবস্থা ভাল—আপনি বিয়ে করে সংসারী হন না
কেন ?
বিমল। ঠিক তােমাকেও আমি ঐ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা কতে পারি,
জ্যোৎস্না !
জ্যোৎস্না। কি প্রশ্ন ?
বিমল। তুমি স্ত্রীলােক, তােমার বাবা আছেন, অবস্থাও খারাপ না,
বিয়ের বয়স উত্তীর্ণ হয়েছে বােধ হয়—তুমি আজও বিয়ে করলে না
কেন?
জ্যোৎস্না। আমার বিয়ে হয়নি—আপনাকে কে বলে ?
বিমল।
কবে আবার তুমি আমাদের ফাকি দিয়ে বিয়ে করলে !
তােমার বিয়ে হলে আমি একটা নিমন্ত্রণের পত্র পেতাম না ?
জ্যোৎজা। সত্যি বলছি, আমার বিয়ে হয়েছে বিমলদা!
বিমল।
হয়ে থাকে হয়েছে-মিষ্টান্ন ইতরে জনাঃ, আমরা ইতর
মানুষ—আমাদের একদিন খাইয়ে দিও।
জ্যোৎস্না। আপনার ধারণা আমার বিয়ে হয়নি?
বিমল। আমার একার নয় ; আমার মনে হচ্ছে, যেন তােমার
তৃতীয় অঙ্ক ]
পতিব্রতা
৮১
বাবারও সেই রকম ধারণা ! তবে যদি মনে মনে স্বয়ম্বরা হয়ে থাক, সে
অবশ্য আলাদা কথা !
জ্যোৎস্না। বাবা কি আপনার কাছে আমার বিয়ের কথা পেড়ে-
ছিলেন ?
বিমল। অবশ্য, তার চিঠি পড়ে তার সঙ্গে কথা কয়ে আমারও তাই
মনে হয়েছে। কিন্তু তুমি ঠিক বলছে জ্যোৎস্যা, তােমার বিয়ে হয়েছে?
জ্যোৎস্না। আমার বিয়ে হয়েছে, আমার স্বামী আছেন; আর ঠিক
এই সময়টিতে তিনি এই গাঁয়েই আছেন!
বিমল। কতদিন বিয়ে হয়েছে ?
জ্যোৎস্না। বহুকাল-এক যুগেরও বেশী ।
বিমল।
অথচ তােমার বাবা মীরাট থেকে তার করে আমায় এখানে
নিয়ে এলেন।
জ্যোৎস্না। কি?—আমার সঙ্গে বিয়ে দেবার জন্য?
অন্ততঃ তার সঙ্গে কথা কয়ে আমার তাে তাই মনে হয়েছে।
আর আমি এত বােকা—তার কথায় আগাগােড়াই ভুল বুঝে আসছি।
No, I am not such a fool-বেশ লােক তাে তােমার বাবা !
জ্যোৎস্না। কেন ?কোন পাকা কথাবার্তা
বিমল । নিশ্চয়—বিয়ের দিনস্থির পর্যন্ত হয়ে গেছে।
জ্যোৎস্না। বলেন কি!-কবে ?
বিমল। কাল কলকাতায় যাবার কথা। হু, তাই বটে-I see !
জ্যোৎস্না। কি ?
বিমল। খুব গােপনে বিয়ে দেবার পক্ষপাতী তিনি। তাই বলছিলেন
বটে, আত্মীয়স্বজন কাউকে জানাবেন না। বিয়ের পর দিনই আমার সঙ্গে
তােমার মীরাট যাওয়ার কথা।
বিমল।
৮২
পতিতা
[ প্রথম দৃশ্য
জ্যোৎস্না। এতদূর ! অথচ আমি এর কিছুই জানি নে ?
বিমল। এদিকে তােমার বিয়ে হয়ে গেছে এক যুগেরও বেশী ।
স্বামী জীবিত-এই গাঁয়েই উপস্থিত!-তুমি যে আমায় মহা ধাধায়
ফেললে জ্যোৎস্না !
জ্যোৎস্না। আপনি কি ভেবেছেন-বলুন তাে?
বিমল। আমি কিছু ভাবি-টাবিনি জ্যোৎন্সা ! ভাবনাচিন্তা আমার
ভাল আসে না। তবু, আমার যেন মনে হচ্ছে—তােমার বাবা কি রকম
একটা গণ্ডগােল পাকিয়ে বসে আছেন। ঐ যে তােমার বাবা আসছেন
এই দিকে—আমি একবার সন্দেহটা ভঞ্জন করে নিই।
জ্যোৎস্না। আমার সামনে আর জিজ্ঞাসা করবেন না—আমি একটু
সরে দাড়াই; নইলে বড় লজ্জায় পড়বেন !
বিমল। তা একটু লজ্জায় পড়নই না!
জ্যোৎস্না। না—আমি যাই ।
[ এস্থান।
( রাজ্যের প্রবেশ করিলেন)
রাজ্যেশ্বর। এই যে বিমল, খােলা হাওয়ায় একটু বেড়াচ্ছ বুঝি?
তা বেশ—তা বেশ।
বিমল। হু; আপনার কাছে একটা প্রশ্ন আছে, আমি একটা
ধাধায় পড়েছি।
র। কি বলতাে বাবা—বলতাে ?
বিমল। আপনি যে বিয়ের কথা বলেছিলেন, সেটা কার সঙ্গে কার
-বলুনতে?
রাজ্যের। কার সঙ্গে কার’-তার মানে ?
তৃতীয় অঙ্ক ] পতিব্রতা
৮৩
বিমল। মানে হচ্ছে এই, বিয়ের কনেই বা কে--আর পাত্রই
বা কে ?
রাজ্যেশ্বর। ও কিছু না-শেষ পর্যন্ত ঠিক হয়ে যাবে। All's
well, that ends well.
বিমল। তা তাে বুঝলাম, কিন্তু কার সঙ্গে কার বিয়ে ?
রাজ্যেশ্বর। ওটা আমার একটা suggestion; তুমি জ্যোত্মাকে
বেশ পছন্দ কর—আর জ্যোৎস্নাও তােমাকে বেশ শ্রদ্ধা করে। আমি
ভেবেছিলাম, তােমরা যদি-বুঝলে কিনা ?
বিমল। আজ্ঞে হ্যা-তা বুঝেছি; তবে জ্যোৎকার যে আগে
একবার বিয়ে হয়ে গেছে, একথা তাে আগে আমায় বলেন নি ?
রাজ্যেশ্বর। সে কিছু-না কিছু-না ; সে বিয়েই -একটা
ছেলেখেলা!
বিমল। কিন্তু জ্যোৎস্না সে ছেলেখেলা আজও ভােলে নি ।
রাজ্যেশ্বর। আমার ইচ্ছে, সে যেন ভােলে ; আর যত শীগগির
ভলে—তার পক্ষে ততই ভাল।
বিমল। কিন্তু আপনি জ্যোৎস্নার দিক দিয়ে কথাটা একবার ভেবে
দেখেছেন কি?
রাজ্যেশ্বর। সে ছেলেমানুষ ; আমি তাকে যা ব’লবাে, সে কাজ সে
•
করবে।
বিমল। আপনি ভাবছেন যে, সে আজও সেই ছােট মেয়েটাই
আছে! সে যুবতী, শিক্ষিতা, তার নিজের স্বাধীন মত আছে—একথা
ভুলে যাবেন না !
রাজ্যেশ্বর। আমি সমস্তই জানি বিল! আমি শুনেছি, সে নিজে
শিবনারায়ণের নাতিকে বলে এসেছে—তুমি আমার কেউ নও। আমার
৪
পতিব্রতা
[ প্রথম দৃশ্য
৩
মেয়ে তাে সে ? ওবংশের সঙ্গে কোন সম্পর্ক তার থাকতে পারে না।
সেই ইস্তক, সে ছোড়াও তাে এ গাঁয়ে আর আসে না।
বিমল। আমার বিশ্বাস, জ্যোৎস্নার মনের কথাটা আপনি ঠিক
বুঝতে পারেন নি। তার স্বামী এই গায়েই আছেন, সে খবরও জ্যোৎস্না
রাখে।
রাজ্যের। কবে এসেছে আবার ?
বিমল। তা জানি না, তবে তিনি এসেছেন !
রাজ্যেশ্বর। আমরা কাল কলকাতায় যাব। তােমার সঙ্গে বিয়ে
হলে জ্যোৎস্না আর কোন আপত্তিই করবে না। একটা সংস্কার অবশ্য
ওর মনে আছে, কিন্তু তুমিই ওকে সুখী করতে পার বিমল !
বিমল। কিন্তু আমি ভাবছি, এ বিয়ে তাে আইনতঃ সিদ্ধ হবে না ?
তার উপর জ্যোৎস্না যদি আপত্তি তােলে, আমি কি করতে পারি-
বলুন?
রাজ্যেশ্বর। আমি ভেবেছিলাম তুমি জ্যোৎস্নাকে
জ্যোৎস্নাকে ভালবাস,
জ্যোৎস্নাও তােমাকে ভালবাসে !
বিমল । জ্যোস্নাকে আমি ভালবাসি। জ্যোৎস্না আমায় ভালবাসে
কি না জানিনে। তাছাড়া, এখনকার প্রশ্ন তাও নয়—একদিন যে
জ্যোৎস্নার বিয়ে হয়েছিল, এ ঘটনাকে আপনি অস্বীকার কচ্ছেন কেমন
করে ?—হিন্দু আইনে তাে ডাইভােরস্ নেই !
রাজ্যের। ডাইভােসের আবশ্যক নেই—আমি বিয়ে স্বীকার
কচ্ছিনা। রণেন যদি নালিশ করে, তবেই তাে সে প্রশ্ন উঠবে? আমার
বিশ্বাস, ও নালিশ করবে না।
বিমল। কিন্তু সমাজ তত আমাদের বিয়ে স্বীকার করবে না?
রাজ্যের। তুমি সমাজের ভয় কর ?
তৃতীয় অঙ্ক ]
পতিব্রতা
৮৫
বিমল। আমার কথা নয় ; কিন্তু জ্যোৎস্নার সম্মান আহত হবে।
সে কি তা সহ্য করতে পারবে?
রাজ্যেশ্বর। আমি তাকে এতদিন সেই শিক্ষাই দিয়েছি ?
বিমল। আচ্ছা, আমি এসম্বন্ধে স্পষ্টভাবে জ্যোৎস্নার সঙ্গে আলােচনা
করতে চাই।
রাজ্যেশ্বর। না না -আগে আমরা কলকাতায় যাই। আপত্তি যদি
করে, তখন না-হয় বিয়ে নাই হবে ! একদিন তুমি ওর সঙ্গে স্ত্রী-
স্বাধীনতা সম্বন্ধে আলােচনা কর। ওকে তুমি বােঝাও, রণেনের সঙ্গে
ওর বিয়ে—কিছুই না, It was only a child's play! মীরাটে
আমি তােমার বাবার কাছে সব কথা বলি—তিনি খুব রাজী ছিলেন।
তারপর হঠাৎ মারা গেলেন—Now you are master of yourself,
you can do what you like.
বিমল। আচ্ছা, আমি পাঁচরকম আলােচনা করে আগে ওর মনটা
বুঝে দেখি ?
[ এছানােত।
রাজ্যেশ্বর। বিমল, তােমার হাত ধরছি বাবা–তুমি আমায় বক্ষে
কর! তুমি পার—জ্যোৎস্না সত্যি তােমায় শ্রদ্ধা করে। তুমি ছাড়া
আর কারাে সঙ্গে আমি ওর বিয়ে দিতে পারি নে ! কোন কিছুর লােভ
যে তুমি অন্যায় করতে পার না, জ্যোৎস্না তা জানে!
বিমল। আপনাকে বেশী কিছু বলতে হবে না, আমার নিজের
আগ্রহও কম নয়। জ্যোৎস্নার মত মনস্বিনী মেয়েকে স্ত্রীরূপে পাওয়া
কম সৌভাগ্য নয়।
[ এস্থান।
( কালীনাথের প্রবেশ)
কালী। কাকাবাবু-কাকাবাবু!
৩
পতিব্রতা
[ প্রথম দৃশ্য
এস
রাজ্যেশ্বর। কে--কালীনাথ ? বাবা-এস! কদিন যে
আসনি বড় ?
কালী। না—আসতে পারিনি। রণা এসেছে। একবেটা মাতাল
বন্ধুকে নিয়ে পরশু রাত্তির বেলা এসে হাজির! দুদিন বাবুদের মদের
যােগাড় দিচ্ছি—আর বলেন কেন ? যার ধন তার ধন নয়, নেপােয় মায়ে
দই। এখন আমি-ব্যাটা হ’লাম চাকর, আর উনি হলেন মনিব ? হুকুম
চালাচ্ছে কি ?
রাজ্যেশ্বর। বলকি কালীনাথ ! রাতদিন মদ খাচ্ছে ?
কালী। শুধু মদ! সঙ্গে বুঝি তার উপকরণ নেই ?
রাজ্যেশ্বর। গাঁয়ের বুকের উপর বসে এই সব কাণ্ড ক’চ্ছে ?
কালী। তিনি যে বড়লােক। তাঁর ধারণা—এ রাজ্যই তাঁর।
তেমনি জুটেছে ওই সােণামালী-ওইই হচ্ছে এখন ওর ইয়ার!—আমার
হয়েছে নরকে বাস ! থাকগে ; একদিন জ্যোৎস্নাকে একটু সাবধানে
রাখবেন; কিছু বলা যায় না, যদি কোন ফাকে—
রাজ্যের। আচ্ছা, তা এখন আবার কেন এল এখানে ?
কালী। আমার তাে মনে হয়, কি একটা কাণ্ড করে পুলিশের ভয়ে
ফেরার হয়েছে।
রাজ্যের। কি কাণ্ড তােমার মনে হয় ?
কালী। নিশ্চয়ই খ্রীলােক-ঘটিত ব্যাপার ! হয় গুম-খুন-না হয়
নিয়ে ভেগেছে ; দিনরাত ছােট্ট একটা ঘরে বসে ফির-ফার--
ফির-ফাষ ক’চ্ছেই!
রাজ্যের। আমি তাে মেয়ে নিয়ে কালই কলকাতায় যাচ্ছি!
কালী। সেই ভাল ; তাড়াতাড়ি করে বিয়েটা হলে হয়? তখন
আর আপনার দায়িত্ব কিছু থাকবে না।
;
তৃতীয় অঙ্ক ]
পতিব্রতা
৮৭
;
কালী ।
রাজ্যেশ্বর। কিন্তু তুমি যা পরামর্শ দিয়েছিলে—তা হ’ল না বাবা!
বিমল জাতে পেরেছে, জ্যোৎস্নার একবার বিয়ে হয়েছে।
কালী। কে বলেছে?
রাজ্যেশ্বর। বােধ হয় জ্যোৎস্না নিজেই।
কালী। আপনি আর দেরী করবেন না কাকাবাবু! রণার সঙ্গে
জ্যোৎস্নার দেখা হবার আগেই, আপনি বরকনে কলকাতায় নিয়ে যান।
জ্যোৎস্নার উপর রণার খুব ঝোঁক আছে ; যদি এসে হাতেপায়ে ধরে
স্ত্রীলােকের মন, বড় নরম কিনা? মন-গলাবার কৌশলটা খুব ভাল
জানে।
রাজ্যেশ্বর । বিমল বলছিল, আইনতঃ-
প্রথম বিয়ে অস্বীকার করলে আর বে-আইনি। আমি
আপনাকে ভাল পণ্ডিতের ব্যবস্থা আনিয়ে দেব—আপনি মন স্থির করে
ফেলুন !
রাজ্যেশ্বর। আচ্ছা ধর-রণেন যদি নালিশ করে?
কালী। নালিশ অমনি করলেই হলাে ? ভয় নেই ওর ?—জন্ম
নিয়ে টান পড়বেন আদালতে ? ওদিক দিয়ে ও যাবে না; তারপর
আমি আছি। ওর এখনাে আশা আছে, জ্যোৎস্নার মন নরম করাবে !
আপনি দেখবেন-যেন দুজনে দেখাসাক্ষাৎ না হয় ।
রাজ্যেশ্বর। আচ্ছা কালীনাথ, তুমি একবার আমার ঘরে এস ;
তােমার সঙ্গে আমার একটা বিশেষ পরামর্শ আছে-একটু নির্জনে যাওয়া
আবক!
কালী । আমি তত বেশীক্ষণ বসতে পারবে না? রণাকে তাে
আমিই আটকে রেখেছি। এখানে—এই ফাকে আবার জ্যোত্রার সঙ্গে
দেখা করতে না আসে ?
৮৮
পতিব্রতা
[ প্রথম দৃশ্য
রাজ্যেশ্বর। তাহলে কাল সকালে একবার এস।
[ দুইজনের দুইদিকে প্রস্থান।
বিমল।
( বিমল ও জ্যোৎস্নার প্রবেশ)
বিমল। একথা তাে তুমি আমায় আগে কোনদিন বলনি ?
জ্যোৎস্না। আমিই ঠিক জাতেম না! বাবার নিষেধ ছিল, তাই
কেউ কিছু বলে নি ! শুধু মরবার আগে মা একটু আভাস দিয়েছিলেন ;
তবে আমার মন সব জান্তাে !
এখন তুমি কি করবে জ্যোৎস্না ?
জ্যোৎস্না। আকাশ পাতাল শুধু ভাবছি, কিন্তু সমস্যার সমাধান
তাে কিছুই খুঁজে পাচ্ছি না!
বিমল।
তােমার স্বামীর সঙ্গে কতদিন দেখা হয়নি ?
জ্যোৎস্না। বিয়ের পর চোদ্দ বছর দেখা হয়নি । তারপর একমাস
আগে দুবার দেখা হয়েছে!
( সুধাংশুর প্রবেশ)
সুধাংশু। দিদি, কে এসেছে দেখ ! বিমলদা, আপনি বুঝি চেনেন
কে ?
জ্যোৎস্না। কে রে সুধা ? কাকেও তাে দেখছি নে।
সুধা। (অন্তরালে প্রচ্ছন্ন রণেনকে লক্ষ্য করিয়া) বারে—আপনি
ততা বেশ লােক! আসুন ;-এই যে দিদি এখানে! বাবা এখন নেই।
( সসঙ্কোচে ধীরে ধীরে রণেনের প্রবেশ)
সুধা। আপনাকে কেউ কিছু বলবে না। একে ভয় করতে হবে
—ওতাে আমাদের বিমলদা। বিমলদাকে চেনেন না বুঝি? বিমলদার
সঙ্গে দিদির বিয়ে হবে।
জ্যোৎ। আঃ সুধা, তুমি অত্যন্ত অসভ্য!
।
তৃতীয় অঙ্ক ]
পতিব্রতা
বিমল। আপনারই নাম বুঝি রণেনবাবু? আসুন,-নমস্কার!
রণেন। না—আমি যাচ্ছি। আমার ভুল হয়েছিল ?
বিমল । কিছু ভুল হয়নি মশায় ! এসতো সুধা, আমরা একটু
বেড়িয়ে আসি?
সুধা। আচ্ছা বিমলদা, দিদি যে আমায় অসভ্য ব’ললে—তার মানে?
আমি কি মিছে কথা বলেছি ? আপনার সঙ্গে দিদির বিয়ের সম্বন্ধ
হচ্ছে না ?
বিমল। আঃ-
সুধা। বাবা আমায় বলেছেন যে ! রণেনবাবু, আপনি থাকবেন
তাে এখানে? আপনাকে নিমন্ত্রণ করবে।
বিমল। তুমি এস সুধা !
[ সুধাকে লইয়া বিমলের প্রস্থান।
রণেন। কাদার কাছে শুনলাম বটে, তােমার বাবা তােমার আবার
বিয়ে দিচ্ছেন। বিশ্বাস করিনি। তাই নিজে তােমায় জিজ্ঞাসা করতে
এসেছিলাম।
জ্যোৎস্না। তুমি আবার কেন এখানে এলে ? আমি তাে তােমায়
বারণ করেছি, এ বাড়ীতে তুমি এস না! বাবা তােমার আসা পছন
করেন না ! তােমায় দেখতে পেলে হয়তাে অপমানও করতে পারেন ।
তুমি এসেছ, অথচ আমি তােমায় বসতে বলতে পারছি না।
রণেন। ব’সবার তাে আর দরকার নেই জ্যোৎস্না ! আমি যে কথা
জিজ্ঞাসা করতে এসেছিলাম, তার উত্তর পেয়েছি। আচ্ছা, আমি চল্লাম।
জ্যোৎস্না। কি উত্তর পেয়েছ ?
রণেন। আর কি উত্তরের দরকার ? তােমার বরের সঙ্গে প্রত্যক্ষ
আলাপ পর্যন্ত হয়ে গেল।
০ পতিব্রতা [ প্রথম দৃশ্য জ্যোৎজা। নিজের স্ত্রীকে এইভাবে তুমি অপমান করতে চাও ! রণেন। আমি স্ত্রীকে অপমান কচ্ছিনা স্ত্রী আমায় অপমান কচ্ছে? অপরাধ কার জ্যোৎস্না ! জ্যোৎস্না। বাবার যা ইচ্ছে, তাই বলতে পারেন ; আমিও যে তাই ক’রবাে—এই কি তােমার ধারণা? রণেন। প্রত্যক্ষ দেখছি, তােমার বাবার কথায় তুমি স্বামীত্যাগ করেছ। কি করে বুঝবাে, তােমার বাবার দ্বিতীয় আজ্ঞা তুমি লঙ্ঘন করবে ? জ্যোৎস্না। আমি বাবার আদেশে তােমার ঘর না করতে পারি । কিন্তু তাতে কি স্বামীত্যাগ করা হয়? তুমি জান, বাবা বৃদ্ধ—তাকে ছেড়ে যাওয়া আমার পক্ষে কত কঠিন। রণেন। শােন জ্যোৎস্না! যদি তুমি স্বামী চাও, এই দণ্ডে আমার সঙ্গে চলে এস ; নইলে কাল হয়তাে আমায় পাবে না। তােমার বাবা তােমায় আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেবেন। আজ আমি তােমায় ছাড়বাে না জ্যোৎস্না! যদি আমায় ভালবাস-চল আমার সঙ্গে ; এতে কোন অন্যায় নেই! জ্যোৎস্না। বাবার প্রাণে বড় আঘাত লাগবে ! রণেন। আজ যদি তুমি আমার সঙ্গে না এস, আমি তােমায় বলছি জ্যোৎস্না! তােমার বাবা বিমলের সঙ্গে তােমার বিয়ে দেবেন। আমি কালদার কাছে শুনেছি—বিয়ের সব ঠিকঠাক। জ্যোৎস্না। বাবা আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমার বিয়ে দিতে পারেন না ! মপেন। পণ্ডিত এসে তােমায় বােঝাবেন, তােমার আগের বিয়ে কিছুই এতদিন তুমি কুমারী আছ! তারপর তােমার বুড়াে বাবার তৃতীয় অঙ্ক ] পতিব্রতা অনুবােধ ; তার উপর বিমল তােমায় ভালবাসে—বিমল বড়মানুষ ! আমার ঠাকুর্দা তােমার ঠাকুর্দাকে জেলে দিয়েছিলেন, তােমার হাত ধরে তােমার বুড়াে বাপ চোখের জল ফেলবেন—সে চোখের জলে আমি কোথায় ভেসে যাব। জ্যোৎস্না। আমি জানি, হিন্দুর মেয়ের একবারই বিয়ে হয়। বিয়ে আমার হয়েছে। রণেন। আমি শুনেছি, তােমার বাবা এমনও বলেছেন, যদি দরকার হয়, বিমল আর তুমি প্রথমে মুসলমান হবে ; তারপর, তােমাদের বিয়ে হয়ে গেলে তােমরা সবাই শুদ্ধি নিয়ে আৰ্যসমাজভুক্ত হবে ! জ্যোৎস্না। আমি কোন আইন জানিনে, কোন সমাজ জানিনে— আমি জানি, তুমিই আমার স্বামী ! তবে বাবা আমায় বড় ভালবাসেন, মায়ের মৃত্যুর পর মায়ের মত যত্ন করেই আমাদের দুই ভাইবােনকে মানুষ করেছেন--যদি পারি, যতদিন পারি তাঁর মনে কষ্ট দেব না ! রণেন। আর, আমার মনে কষ্ট দিতে তােমার কোন আপত্তি নেই ; জ্যোৎস্না ? জ্যোৎস্না। আমার বিশ্বাস, তুমি আমার প্রাণের কথা বুঝবে। স্বামীস্ত্রী একপ্রাণ-এ শুধু শাস্ত্রের কথা নয় ; আজ একথা আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি। তুমি আমায় বিশ্বাস কর, তুমি আমায় রক্ষা কর আমি বড় সঙ্কটে পড়েছি। রণেন। তাইতাে আমি তােমায় বলছি জ্যোৎস্না, আমার সঙ্গে এস! এখানে থাকলে আমি তােমায় হারাব, তুমি আমায় হারাবে। এখানে সবাই ষড়যন্ত্র করছে, কি করে আমাদের স্বামীীর ভিতর চরম বিচ্ছেদ হয় !
পতিব্রতা
[ প্রথম দৃশ্য
( রাজ্যেশ্বরের প্রবেশ)
রাজ্যেশ্বর। জ্যোৎস্না !
জ্যোৎস্না। বাবা আপনার পায়ে পড়ি, আমার মিনতি--আপনি
একটি কথাও বলবেন না।
রাজ্যেশ্বর। না—আমি শুধু জনূেতে চাই, শিবনারায়ণের নাতি
আমার ভিটেয় কেন ?
রণেন। শিবনারায়ণের নাতি আপনার ভিটেয় কখনই আসতাে না,
যদি না আপনি তার স্ত্রীকে আটকে রাখতেন। আমি আমার স্ত্রীকে
নিতে এসেছি।
রাজ্যেশ্বর। তােমার স্ত্রী ! কে
কে তােমার স্ত্রী ? আমি তােমার
স্ত্রীকে চিনি নে।
রণেন। তাহলে চিনিয়ে দিতে হচ্ছে। আমার স্ত্রী শ্ৰীমতী
জ্যোৎস্নাময়ী দাসী—এই আমার সামনে, আপনার মেয়ে !
রাজ্যেশ্বর। আমার মেয়ে কুমারী—আজও তার বিয়ে হয়নি। তুমি
এখান থেকে যেতে পার।
রণেন। জ্যোৎস্না, তুমি বল তােমারও কি এই মত ? তােমা
মুখের কথা শুনলে 'তবে আমি এখান থেকে চলে যাব, নইলে যাব না
তুমি বল, তুমি কুমারী !
জ্যোৎস্না। বাবা, জানেন তাে-শশুরজামায়ে ঝগড়া হয়, তার ফলে
সতী দক্ষযজ্ঞে দেহত্যাগ করেন।
( সনাতনের প্রবেশ)
সােনা। বাবু-বাবু—থােকাবাবু!-
রলেন। কি গাে সােনা ?
সােনা। সর্বনাশ হয়েছে বাবু! তােমার বন্ধু ভবেশ বাবুবে
তৃতীয় অঙ্ক ]
পতিব্রতা
পুলিশে গেপ্তার করেছে। একদল কনষ্টেবল সারা বাগান ঘিরে
ফেলেছে ;-তােমার খোঁজ করছে—তােমার নামে নাকি ওয়ারেন্ট
আছে !
রণেন। আমার নামে পুলিশের ওয়ারেন্ট, ভবেশকে গ্রেপ্তার
করেছে—এসব কি বলছে সােনাদা? কেউ বুঝি তােমায় ঠাট্টা
করেছে ?
সােনা। ঠাট্টা আবার কে করবে বাবু ? আমি নিজের চোখে
দেখে এলাম। বুড়াে হয়ে মরতে চলেছি, আমি আর পুলিশ চিনিনে
থােকাবাবু?
রণেন। আচ্ছা, আমি যাচ্ছি -তুমি যাও সােনাদা! পুলিশের
বাবুকে গিয়ে বল, বাবু আসছেন। ( জ্যোৎস্নার প্রতি) জ্যোৎস্না !
সােনা। না বাবু—তােমার পায় পড়ি থােকাবাবু, তুমি সেখানে
আর যেওনা। তুমি এগাঁয়ে আর থেকো না—তুমি সরাসর অন্য কোন
জায়গায় চলে যাও!
রণেন। আঃ সােনাদা, ছেলেমানুষী করােনা—যা বললাম তাই
কর। আমি দু’মিনিটে যাচ্ছি। ( জ্যোৎস্নার প্রতি) জ্যোৎস্না বল
তােমার বাবার কথা সত্যি, না মিথ্যে।
সােনা। আমি কি করে সেখানে যাব থােকাবাবু! আসবার সময়
দিউড়ির দোরের কাছে কালীবাবুর সঙ্গে দেখা হ'লােকালীবাবু চুপি
চুপি আমায় বলে দিলে যে, তুই আর এদিকে আসিসনি—তুই বাবুর
পেয়ারের চাকর, বাবুকে না পেলে বাবুর বদলে তােকে ধরে নিয়ে
যাবে!
রণেন। তা নিয়ে যায় যাবে—তুমি যাও এখান থেকে।
সােনা। “নিয়ে যায় যাবে,-বাঃ রে ! আমায় পুলিশে নিয়ে যাবে-
১৪ পতিতা [ প্রথম পৃষ্ঠ আর তুমি কিছু বলবে না? আমি কাচ্চাবাচ্চা লিয়ে থাকি, আমার ইস্ত্রী আছে, বুড়া বয়েসে আমায় পুলিশে ধরে নিয়ে যাবে—আর তুমি কিছু বলবে না?—বেশতাে! রণেন। তুমি চুপ করে দাড়িয়ে থাক—যেতে হবে না কোথাও। ( জ্যোৎস্নার প্রতি) জ্যোৎস্না ! আমি তােমায় বলছি শেষবার, যদি তুমি আমায় স্বামী বলে স্বীকার কর—এই মুহূর্তে কারও মুখ না চেয়ে আমার সঙ্গে চলে এস। যদি না এস, আমি বুঝবাে-এ সংসারে আমি একা, আমি তােমার কেউ না তুমি আমার কেউ না ! রাজ্যেশ্বর। জ্যোৎস্না! তুই কিছু বলিনে ; ওর কথার জবাব দেওয়ার কোন দরকার করে না ! ( ব্যস্তসমস্তভাবে কালীনাথের প্রবেশ) কালী। এই যে ভায়া—তুমি এখনাে এখানে দাড়িয়ে! শীগগীর যাও—পালাও! আমি গাড়ী ডেকে এনেছি। ষ্টেশনের দিকে যেওনা —সেখানে পুলিশ আছে। সােনা-ব্যাটাকেও সঙ্গে নিয়ে যাও, নইলে ওটাকেও ধরবে। সােনা। কি হবে বাবু-কি হবে ? কালী। বেশী কিছু না—বছর পাঁচেক করে জেল ! রণেন। কিসের charge? Charge sheet দেখেছ ? কালী। ই-ৰৌচুরী। রণেন। বৌচুরী! তুমি কি বলছ কাদা? কালী। কাদা তাে বলছে না—ব’লছে পুলিশ। তােমার কল- কাতার বাড়ীর পাশে খােলর বীতে কে এক মন্মথ ঘােষ থাকে। তুমি যেদিন এখানে এল, সেই রাত থেকে তার বউ এমতী তােবাল
তৃতীয় অঙ্ক ]
পতিব্রতা
।
দাসীকে পাওয়া যাচ্ছে না। মন্মথর ভাই তারক ঘােষের ধারণা—তুমি
এই কাজ করেছ !
রাজ্যেশ্বর। বাঃ বাঃ—চমৎকার! শিবনারায়ণের উপযুক্ত বংশধরই
বটে। একটি স্ত্রীলােকে এইভাবে ঘরছাড়া করে এসেছ আমার মেয়েকে
মজাতে ? যাও এখান থেকে তুমি আমার মেয়ের কেউ নও!
জ্যোৎ। বাবা-বাবা, তােমার পায় পড়ি বাবা ।
কালী। আপনি আর এর উপর মাথাগরম করবেন না কাকাবাবু!
কেসটা ভয়ানক complicated—ছেলেটাকে বাঁচাতে হবে তাে ?
রণেন।
জন্য তােমার মাথা ঘামাবার আবশ্যক করে না
কালা! বাঁচি মরি—আমিই বুঝবে। এস সােনা! (জ্যোৎস্নার
প্রতি) জ্যোৎস্না, আমি চল্লাম! তােমার সঙ্গে আর দেখা হবে না।
আমার ঠাকুন্দা অন্যায় করেছিলেন, আমি যথাসাধ্য তার প্রায়শ্চিত্ত
করেছি—তবু তােমাদের মন পাইনি! মনে রেখ, তুমিই আমায় ত্যাগ
করলে--আমি তােমায় ত্যাগ করিনি। একদিন এভুল তুমি বুঝবে।
বুঝবে—তােমার জীবনে তােমার পরম শত্রু তােমার বাবা; কিন্তু সেদিন
আমায় আর পাবে না।
•
[ সনাতন ও রণেনের স্থান।
দ্বিতীয় দৃশ্য
চাপাপুকুর। জমিদারবাবুর কাছারী বাড়ী।
কালীনাথের ঘর। কালীনাথ ও তারক পরস্পর কথা কহিতেছে।
রক। তাহলে এখানে তাকে আনেনি ?
কালী। দূর পাগল ! এখানে কখনাে আনতে পারে? এ যে তার
পৈত্রিক জমীদারী। এখানে আলে লােক-জানাজানি হবে না?
তারক। তাহলে কোথায় নিয়ে গেল? আচ্ছা, রণেনবাবু তাে
কলকাতা থেকে বরাবর এখানেই এসেছিলেন ?
কালী। তারপর বরাবর এখান থেকে সেখানে গিয়ে উঠেছে-
অত্যন্ত সহজ ব্যাপার!
তারক। কোথায় গেল ! আমি তাে কলকাতা সহর পাতি পাতি
করে খুঁজে দেখেছি।
কালী। কলকাতায় খুজলে কি হবে? কলকাতায় কি থাকতে
পারে?
তারক। এখন যদি বৌদির দেখা পাই, আমি কেঁদে াঁর দু’পায়
ধরে বলি—তুমি ফিরে এস, আমার দাদাকে বাঁচাও !
কালী। তাের দাদার অসুখ নাকি ?
তারক। অসুখ আর কিছুই না—তিনি চুপটা করে শুয়ে থাকেন,
কারও সঙ্গে কথা কন না, রােজ জ্বর হয়।
কালী। আহা, দেখ দেখ—খুজে দেখ ! আজকালকার ছেলেগুলাে
বৌ বৌ ক'রেই সারা হলাে। আর, বেগুলােও হয়েছে তেমনি - একটু
যদি দয়াধৰ্ম্ম থাকে। এই দেখ না, রণার বোঁটা ?
তৃতীয় অঙ্ক ]
পতিব্রতা
তারক। আচ্ছা কালীবাবু, আপনার কি বিশ্বাস—রণেনবাবু এই
কাজ করেছেন? আমার কিন্তু
কালী।
দেখ তারক, কথাটা হচ্ছে কি জান ? আমার বিশ্বাস
অবিশ্বাসের কথাই নয় ! পুলিশ যখন সন্দেহ করেছে, তখন আমার তত
মনে হয়—ভিতরে কিছু গলদ আছে !
তারক। বাইরে ঐ রকম ভদ্রলােক-আশ্চৰ্য্য ।
কালী। মানুষ চেনা কি সহজ তারক ?
তারক। যদি একবার মুখখামুখি রণেনবাবুর দেখা পাই ! আচ্ছা,
রণেনবাবু এখন কোথায় আপনার ধারণা কালীবাবু ?
কালী। তারক, তুমি এরকম বুদ্ধিমান ছােরা হয়ে আমায় এই
প্রশ্নটা করলে ? তােমাদের সে যতই অন্যায় করে থাক, আমার সঙ্গে
যে তার নাড়ীর টান রয়েছে-আমি জালেও তােত তােমায় বলতে
পারবাে না!
তারক। আমার বিশ্বাস, রণেনবাবু নির্দোষী। একবার যদি তার
দেখা পাই, পুলিশ তাকে কেন সন্দেহ করলল—সেটা জানা যাবে ।
কালী। পুলিশ ঠিকই সন্দেহ করেছে ! তােমাদের উপর সত্যি বড়
অত্যাচার হয়েছে। আচ্ছা, তুমি একবার কাশীতে সন্ধান করে দেখনা ?
নিজের বাড়ীতে নেই—বাড়ী ভাড়া করে আছে নিশ্চয়ই!
তারক। কাশী তত আর ছােটখাট জায়গা নয়, কোথায় তাদের
পাব?
কালী। আমার এক বন্ধু চিঠি লিখেছে। আমি বলতাম না; কিন্তু
না-এর একটা মীমাংসা হয়ে যাক। তুমি গিয়ে দেখা কর একবার।
বন্ধু সন্দেহ করে, ১৭নং গােধুলিয়া রােডের সামনে রণেনকে একটা বাড়ী
৭
১৮
পতিব্রতা
[ তৃতীয় দৃশ্য
থেকে বেরিয়ে আসতে দেখেছে। ঠিক কোন্ বাড়ীটা-
ঠিক কোন্ বাড়ীটা—সে ঠিক ধরতে
পারে নি।
তারক। আমি রণেনবাবুর সঙ্গে দেখা করবে; তবে দাদার বড়
অসুখ—তিনি একটু ভাল হলেই আমি যাব।
কালী। দেখাে বাবা, মিঠে কথায় কাজ সেরে ; ঝোঁকের মাথায়
যেন খুনজখম করে বসােনা। তুই ছেলেমানুষ—ইচ্ছা হয়েছে একবার
ঘুরে আয়। তাের হাতে টাকাকড়ি নেই বােধ হয়? এক কাজ ক
বাবা, এই পঁচিশটা টাকা রেখে দে,বিদেশবিভূই জায়গা? (টাকা
দিল )।
তারক। (টাকা লইয়া) আপনার এ টাকা আমি যেমন ক'রে
পারি শােধ দেব। আপনার এ উপকার আমি কখনাে ভুলবাে না!
কালী। তাহলে আর দেরী করিস নে। দেখি বাবা, রাগের
মাথায় ছেলেটাকে যেন প্রাণে মারিসনে! একটা অন্যায় করে ফেলেছে
-দশ বছর জেল খাটুক, কিন্তু প্রাণে বেঁচে থাক! আমার সাক্ষাৎ
মামাতাে ভাই-আয় আয়।
[ উভয়ের প্রস্থান।
দৃশ্যান্তর শ্রীশ্রীরাধাগােবিন্দজীউর ঠাকুরবাড়ী-সংলগ্ন বাগান। রাস উপলক্ষে ঝুমুর গান হইতেছে। সনাতন ও কালীনাথ সেখানে উপস্থিত আছে। গান মনের মানুষ কেমন ধারা, তােদের বলি শােন ওরে অবােধ ম ! বেদ-পুরাণে কোরাণে তার পায় না দেখা কোন জন। সহজ হ'তে অতি সহজ- আরাে সহজ সে, আপনি এসে হয়গাে উদয় হৃদয়-আকাশে! চল, শুরু, যেমন ভাসে, আপন ভাবে আপনি হাসে, সে আকাশে শ্রাবণমাসে হয় না বারি বরিষণ। জেতের বিচার নেইকো তাহার, বামুন কায়েত শুড়ি কাহার একই সাথে কক্লেন আহার গুরুর কৃপায় সবাই তাহার গােপনে পায় দরশন।
১০০
পতিতা
[ তৃতীয় দৃশ্য
রাজেশ্বর, বিমল, জ্যোৎস্না প্রভৃতিকে দূর হইতে আসিতে দেখিয়া কালীনাথ
তাড়াতাড়ি অগ্রসর হইয়া তাহাদিগকে অভ্যর্থনা করিতে
করিতে বলিল—
কালী। আসুন আসুন—আপনি কার উপর অভিমান করবেন
বলুন তাে কাকাবাবু?—আপনার পৈত্রিক সম্পত্তি, পৈত্রিক ঠাকুর।
এই সম্পত্তি নিয়েই তাে গােলমাল !
রাজ্যেশ্বর। হু; এই রাধাগােবিন্দ আমার প্রপিতামহের প্রতিষ্ঠা
প্রথম যেদিন বেদখল হ’ল কালীবাবা সাতদিন জলস্পর্শ করেন নি
বিমল। আপনি বসুন-গান শুনুন ; ওসব পুরােন কথা আর
তুলবেন না।
সনাতন। এস ম-লক্ষ্মী! আমার দাদাবাবু এখানে নেই, তবু তুমি
আছ—আমি মনে একটু শান্তি পাই মা! দাদাবাবুর নামে যে যা রটাচ্ছে,
ওর সব মিথ্যে মা—আমি বিশ্বাস করিনে।
জ্যোৎত্যা। তুমি চুপ কর সােনাদা! এখন ওসব কথা কইবার
দরকার নেই।
ওহে ওস্তাদ—এইবার গান ধর!
কালী।
( দুইটা মেয়ে গান ধরিল )
গান
( আমি তােমার তরে কাঁদি
ওগাে পাগলা বরের কনে-
তুমি কিসের তরে মনের কথা
শুকিয়ে আছ মনে মনে ;
আমি জানি গো জানি
ও মা'শিবানী।
তৃতীয় অঙ্ক ] পতিব্রতা ১০১ পাড়ায় হয় কানাকানি, বরকে তােমার পর ভেবে কেউ-- কয়নি কথা তার সনে। আমি দেখিনি এমন ! তােমার ঝরে দুনয়ন বরের তরে বাপের ঘরে সরে নাকো মন ! পর যে ছিল আপন হল- (তুমি) পর করিলে আপন জনে। ( গান চলিতেছে--ইতিমধ্যে গুপে গুণ্ডার প্রবেশ) গুপে। এই কালীবাবু! বাবা, এইখানে লুকিয়ে রয়েছে। তবু ভাল তােমার দর্শন মিললল । [ গুপেকে লইয়া কালীনাথের প্রস্থান। বিমল ও জোৎস্না গুপেগুণ্ডাকে লক্ষ্য করিল এবং কালীনাথ তাহাকে লইয়া কি করে, সনাতনকে সেই সন্ধান লইতে উপদেশ দিল। দৃশ্যান্তর পুনরায় বাগানবাড়ী-বাহিরের ঘর। গুপে ও কালীনাথ। কালী। তুই বেটা, এখন পর্যন্ত ধাওয়া করলি? গুপে। কলকাতায় তােমার দর্শন যদি না মেলে তাে, এখানে না এসে কি করি আর? এখন আর তিনশাে টাকা বার কর লক্ষ্মী-ছেলেটার ১০২ পতিতা [ তৃতীয় দৃশ্য কালী । কালী। এখানে বাসের মেলা বসেছে ; যাই কি করে ? তারপর-খবর কি? গুপে। তারপর আর কি ? কাশীর আটঘাট সব ঠিক করে ফেলেছি! বাছাধনের সেদিকে আর চালাকিটা চলবে না! এইবার ঠিক হয়েছে। শালা আমায় অপমান করলাে—দশজনের সামনে। কালী। তরল চুড়িটে ঠিক রণার হাতে গিয়ে পড়েছে তাে? গুপে। পড়বে না আবার ? এদিকে 'তুমি বাবা এখানে বসে বসে কলকাঠি নাড়ছ! কালীবাবু, তুমি কি কম খেলােয়াড় ? ঠিক জায়গায় বাল হাজির করে দিইছি। এইবার বাবা আমায় বশিস্ দাও- ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাই সে তাকা ছোঁড়াটা এখন কোথায় ? গুপে। সে বেটা হন্যে কুকুরের মত বৌদি বৌদি করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি কাশী থেকে এলে আমায় এসে ধরেছে , বলে— পুলিশে দেব ! কালী। তুই কি বললি? গুপে। আমি বল্লাম-শালা! ফের যদি ওকথা বলবি তাে, জুতিয়ে মুখ ছিড়ে দেব ! শালা—জাননা আমায় ? ঘুঘু দেখেছ, ফাদ দেখনি শালা? আমার কাছে চালাকি। কালী। তুই যে শুধু শুধু চ’টেই খুন হলি! তাকার উপর রাগ — আমার সামনে মুখ খিচুচ্চি কেন ? এইবার তাকাকে ঠিকানাটা দিয়ে দিবি-বাস! গুপে। হ্যা, আমি ঠিকানা দি—আর শালা এসে আমায় বলুক, “তুই কোথায় ঠিকানা পেলি?—তাহলে তুই জানতিস”? অমন কঁাচা কা পে করে না ! দিতে হয়, তুমি দাও—আমি ওর মধ্যে নেই বাবা !
?
তৃতীয় অঙ্ক ]
পতিতা
কালী। তুই ব্যাটা, তাের ঐ গ্রামরি চালটা ছাড়, দিকিনি ?
বুদ্ধির বেরােসপতি! এতই যদি বুদ্ধি তাে, তিন-তিনবার জেল খেটে-
ছিলি কেনরে হতভাগা ?
গুপে। সেটা বুদ্ধির দোষে নয় কালীবাবু—সেটা বরাতের দােষে।
তুমি ত এখানকার রাজা আছ কালীবাবু ! এইবার আমায় বিদায় করে
দাও বাবা !
কালী। ব্যাটা যেন ঘােড়ায় জিন দিয়ে এল ? দেখতে পাচ্ছিস,
এখানে ঠাকুরবাড়ীর রাস চলছে। রাসের পরই তাে কলকাতায় যাব।
সেখানে গিয়ে যা হয়—
গুপে। ওসব আমি বুঝিনে কালীবাবু! তুমি দেবে তাে দাও;
আর না দাও তাে, ঐ রণেনবাবুর স্ত্রীকে আমি সব কথা বলে দেব !
কালী ।
সে ভয় আমায় দেখানে গুপে—আটঘাট বেঁধে তবে
কালীনাথ কাজ করে। রণেনবাবুর স্ত্রী-আমার ভারি পতিব্রতা স্ত্রী
কিনা? স্বামীর ভাবনায় তার ঘুম নেই সারারাত !
গুপে। আহা, রাগ কর কেন কালীবাবু? আচ্ছা এ বেলা না হয়,
তােমার এখান থেকে রাতের গাড়ীতে কলকাতায় যাব। চল না
তােমাদের এখানকার ঝুমুর গান শুনে আসি; যাবার সময় কিন্তু তিনশাে
টাকা আমার চাই।
কালী। না—তুই বেটা আর এ চেহারা নিয়ে দশজনের সামনে
হাজির হােসনে! টাকা—টাকা অমনি গাছের ফল কিনা।
গুপে। গাছের ফল কিনা—এক্ষুণি দেখিয়ে দিতে পারি বাবা।
ঢের হয়েছে—থা, আর দেখাতে হবে না। তুই বেটা
ঠাট্টাও বুঝিনে? তাের টাকা দেব না?—তুই কতবড় কাজ করেছিস।
কালী।
১•৪
পতিতা
[ তৃতীয় দৃশ্য
আর একটা কাজ করতে পারিস বাবা ? নে—এই দশ টাকা নে-
কলকাতায় গিয়ে আমােদ-আহলাদ করি।
গুপে। কি কাজ বাবা ?—ধা করে একেবারে দশটা টাকা বায়না
দিয়ে বসলে ! এইবার দেখছি, তুমিই এখানকার রাজাবাবু হবে
কালীবাবু!
কালী। শােন্-তুই ছাড়া এ কাজ আর কেউ পারবে না ( পিস্তল
দেখাইল)—এই দেখ,।
গুপে। কি বাবা–আবার পিস্তল কেন বাবা! গুলি করে মারবে
নাকি?
কালী। চেঁচাসনি বেটাচ্ছেলেসােনা বেটা আবার কোন্ ফাকে
শুবে !
গুপে। এ তুমি কোথায় পেলে কালীবাবু ? এর মালিক কে ?
কালী। শশান্ না—বলি; এর মালিক আপাততঃ কেউ নেই।
এইটে নিয়ে তুই কলকাতায় যা।
গুপে। তারপর পুলিশ আমায় ধরু?
কালী। আমার কথাটাই আগে শােন? এটা কোন গতিকে যদি
তাকার হাতে দিতে পারি—তাহলেই ষাঁড়ের শত্রু বাঘে মারে! আর
পারিস—গঙ্গার জলে ফেলে দিবি।
গুপে। ও বাবা-ভেবে চিন্তে খুব চাল বের করেছ বটে ! তুমি
আমার গুরুদেব কালীবাবু-নমস্কার! কিন্তু এটি পেলে কোথায় ?
কালী। তাের অত খবরে দরকার কিরে বাপু! তােকে যা বল্লাম,
তাই কর দেখি? যদি কাজ হাসিল হয়—মবল টাকা বকশিস
পাবি।
গুপে। আচ্ছা, আচ্ছা-দাও; শালা আমায় অপমান ক’ দশজনের
তৃতীয় অঙ্ক ]
পতিব্রত
ক
সামনে! সেই দিনই জানি, ওশালার মরণ বাড় বেড়েছে। এটা
তাকাকে দেব-কিন্তু বাবা কাশীর ঠিকানা আমি বলবাে না ; শালা
আমায় ধরবে।
কালী। আচ্ছা আচ্ছা—সে ব্যবস্থা আমি ক’রবাে। দেখি বাবা,
সাবধানে রাখি
( সনাতনের প্রবেশ)
সােনা। কালীবাবু—এই চিঠিখানা একবার দেখতে?
কালী। কে রে?-বেটাচ্ছেলে সােনা বুঝি?
সােনা। বাপ তুলনি বলছি কালীবাবু—ভাল হবে না! তুমি
বড়লােক আছ–আছই; বাপ-মা সবার সমান।
কালী। তবে রে বেটা-মুখের উপর জবাব ? ব্যাটার মুখ জুতিয়ে
ছিড়ে দেবাে না ব্যাটা! গুপে, দে তো ব্যাটাকে ঘাড় ধরে বার করে
দে তাে; ব্যাটা! আমার উপর গােয়েন্দাগিরি কৰ্তে এসেছ—ব্যাটা?
গুপে দেবার করে দে ব্যাটাকে।
গুপে। গুপে তােমার চাকর-দবােয়ান কিনা? তুমি বসে বসে
হুকুম চালাবে—আর গুপে সেই হুকুম তামিল করবে! সে বান্দা আমায়
পাওনি কালীবাবু ?—আমার কাছে নগদা কারবার, ফেল কড়ি মাখ
তেল। আগের টাকা শােধ কর আগে—তারপর—পরের কথা; তবু
তাে একটা ফাউ কাজ নিয়েছি।
সােনা। তােমার গুপে তাে এলাে নিএইবার তুমি এস কালীবাবু?
আমিও গয়লার পাে! জুতাে বার কর দেখি-মামাতাে ভাইয়ের ভাত
খেয়ে গায়ে কত জোর করেছ ? কত জোড়া জুতা ঘরে রেখেছ ?
তবে রে বেটাচ্ছেলে—যতবড় মুখ নয়, ততবড় কথা? এ
আর মেণীমুখাে রণেন দত্তকে পাওনি?
কালী।
পতিব্রতা
[ তৃতীয় দৃশ্য
;
[ কালীনাথ আসিয়া সনাতনের ঘাড় ধরিল ; প্রথমে জ্যোৎস্না পরে
রাজ্যের প্রবেশ করিলেন ]
জ্যোৎকা। এ কি! বাবা–বাবা, অপনি একবার এইদিকে
আনুন! আপনার সামনে কথাটা হওয়া দরকার।
সনাতন। এসএস মা-লক্ষ্মী! একবার দেখ—নিজের চোখে
দেখে যাও—এইবার আমি যদি তােমার ঘাড়টা ধরি, তােমার মানটা
কোথায় থাকে কালীবাবু ?
রাজ্যেশ্বর। একি কালীনাথ-ছিঃ ! সনাতন চুপকর; জ্যোৎস্না !
কি বলতে চাও-বল ?
জ্যোৎস্না। আমি প্রায়ই শুনতে পাই, সােনাদার সঙ্গে উনি অত্যন্ত
দুৰ্বব্যহার করেন ! আজ নিজের চোখে দেখলাম। (কালীনাথের প্রতি)
অনেক প্রজা আপনার আচরণে ক্ষুন্ন, মুখে কেউ কিছু বলতে সাহস
করেনা!
কালী। আমি কি করি না করি, তার হিসেবনিকেশ কি আমায়
তােমার কাছে দিতে হবে জ্যোৎস্না?
জ্যোৎস্না। হা-দিতে হবে। সেইজন্যই আমি এলাম। আজ থেকে
সাতদিনের ভিতর আপনি সমস্ত হিসেবনিকেশ তৈরী করে রাখবেন।
আমার উকিল কৈফিয়ৎ নেবেন ।
কালী। তুমি—তুমি জ্যোৎসা! এই সব কথা তুমি আমায়
বলতে সাহস কর?
জ্যোৎস্না। হাসাহস করি। কেননা, এ সম্পত্তির মালিক আমি।
কাণী। মালিক তুমি ! কি স্বত্বে তুমি মালিক হয়েছ, সেটা
গুগতে পাই ?
তৃতীয় অঙ্ক ]
পতিতা
জ্যোৎস্না। কেন পাবেন না? আমার স্বামী আমায় দান
করেছেন, আপনি নিশ্চই জানেন।
রাজ্যেশ্বর। জ্যোৎস্না ! তােমার স্বামী দান করেছেন? তিনি
দান করবার কে ? তার কি অধিকার ?
জ্যোৎস্না। বাবা। আপনি এতে কথা কইবেন না। আপনার আদেশ
আমি মাথায় করে নিয়েছি-স্বামীর সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নেই।
কিন্তু তিনি যে আমার স্বামী, একথা আমি অস্বীকার কৰ্ত্তে পিরবাে না।
রাজেশ্বর। অস্বীকার করতে পরবে না?
জ্যোৎস্না। না বাবা!
রাজেশ্বর। তাহলে তার সঙ্গে তােমার চলে যাওয়াই উচিত ছিল।
সেদিন সে যখন নিতে এসেছিল, তুমি যাওনি কেন ?
জোনা। এ সম্পত্তি আমার স্বামী আমায় দান করেছেন। তাঁর
দান না নিয়ে আমি তাকে অসম্মান করতে পারিনে।
রাজ্যের। দান করেছেন—দান করেছেন। তিনি দান করবার
কে? আমার পৈতৃক দেবত্তর সম্পত্তি আমার মেয়েকে দান করে তিনি
বাহাদুরী দেখাচ্ছেন ! জ্যোৎস্না, এ দান নেওয়া তােমার উচিত হয়নি।
কালী। আপনি আর মাথা গরম করে জ্যোৎস্নার উপর রাগ
কবেন না কাকাবাবু ! ও ছেলেমানুষ, ওকে যা বুঝিয়েছেও তাই
বুঝেছে।
জ্যোৎস্না। বাবা, আপনি আমার কথা ভাল করে শুনুন। অমি এ
দান নিতাম না—নিতে বাধ্য হয়েছি—কালীবাবু, আমি ছেলেমানুষ
নাই! সম্পত্তি যিনি তত্ত্বাবধান করছেন, আমার বিশ্বাস—তিনি
অত্যাচারী, অসৎ, মিথ্যাবাদী; সুতরাং এ সম্পত্তি আমি তার হাতে আর
রাখতে পারিনে।
;
১০৮
পতিব্রতা
[ তৃতীয় দৃশ্য
গুপে। বাঃ বাঃ বাঃ, আপনি বড় ভাল কথা বলেছেন মাঠাকরুণ,
ঠিক কথা ! কালীবাবু বড় মিথ্যুক—বড় পাজী ! আপনি ওর মুখের
মত জুতাে দিয়েছেন মা!
কালী। তুই থাম্ বেটা, সময় বুঝে রাঙের উপর বসান চড়াচ্ছে!
-দেখছেন কাকাবাবু, আপনার মেয়ের আচরণ দেখছেন? আমি
কোথায়
গুপে। মাইরি কালীবাবু, মাঠাকরুণ কিন্তু বড় সত্যি কথা বলেছেন !
তুমি বাবা—একটি আস্ত হারামজাদা !
কালী। আরে গেল যাবেটা নাই পেয়ে যে ভারি বাড়িয়ে তুললাে
দেখছি ?
!
গুপে। তা তুমি রাগ কর আর যাই কর কালীবাবু—আমি তােমায়
কেয়ার করিনে ! আমার হাতে তুমি আছ বই, আমি তােমার হাতে
নেই বাবা!
রাজ্যেশ্বর। এ লােকটি কে কালীনাথ ? একে যেন কলকাতার
রাস্তায় দেখেছি।
গুপে। হা-হা, ঠিক-ঠিক
ঠিক-ঠিক! আমি তাে বাগবাজারের
গুপেগুণ্ডা আছি—আমায় কে না চেনে? আমি মশায় ভাড়াটে গুণ্ডা।
উনি আমায় ভাড়া করে এনে সব পয়সা দিলেন না! এখন এখানে বসে
জমিদারী চাল দেখাচ্ছেন বাবু!
রাজ্যেশ্বর। কালীনাথ, আমি তােমায় জানতেম ভাল লােক।
এই সব মানুষ তােমার সঙ্গী?
গুপে। আমায় সঙ্গী না করে উনি কি করবেন বাবু ? ওঁর যে
অনেক নােংরা কাজ করতে হয়। সে সব কাজ তাে আমি ছাড়া আর
কেউ পারবে না !
তৃতীয় অঙ্ক ]
পতিব্রতা
কালী।
জ্যোৎস্না। আজ চল্লাম; কিন্তু আপনাকে যা বলেছি, তা যেন হয় ।
আমার আরও বিশ্বাস, আমার স্বামীর নামে যে দুর্নাম রটেছে-তার
মূলেও আপনি!
গুপে। হ্যা—এ্যা, ঠিক কথা মাইজী—আপনি ঠিক ধরেছেন।
সব নষ্টের মূল-ওই উনি! উনি এখান থেকে বসে বসে কলকাটি
ঘােরাচ্ছেন!
গুপে-হতভাগা পাজী ব্যাটা! বেররা এখান থেকে-
বেরাে বলছি।
গুপে। তুমি ভয় পাচ্ছ কেন কালীবাবু! যা বলেছি—ব্যাস, ওই
পর্যন্ত। আর একটা কথাও না। এর উপর কথা বললে যে ধরা পড়ে
যাব বাবা!—আর কি বলি? আমি তেমন নই।
জ্যোৎত্র। যদি মােকর্দমা বাধে, তােমায় যদি সাক্ষী মানি—তুমি
সত্যি কথা বলবে তাে ?
গুপে। না মাজী—সেটা আর হবার উপায় নেই। সত্যি কথার
সঙ্গে আমার ভাসুর-ভাদ্রবৌ-সম্বন্ধ ! ও আমি বলতে পারব না !
[ প্রস্থান।
কালী। কেন? তুমি কি স্বামীকে বাঁচাবার জন্য আমার নামে
নালিশ কৰ্বে নাকি জ্যোৎস্না!
জ্যোৎস্না। দরকার হয় যদি—নিশ্চয়ই করবে ।
কালী। যাক—স্ত্রী যে এতখানি পতিব্রতা, খবরটা জানতে পালে
রণেন বেচারী প্রাণে একটু শান্তি পেত! ফেরারী আসামী—ঠিকানাও
ততা জানা নেই। নইলে একখানা টেলিগ্রাম করে খবরটা জানিয়ে
দিতাম !
জ্যোৎ। বাবা! এই মানুষকে আপনি বিশ্বাস করেন—বন্ধু বলে
পতিব্রতা [ তৃতীয় দৃশ্য মনে করেন? নিজের চোখে এর স্বরূপ-মূর্তিটা একবার বেশ ভাল করে দেখুন । কালী। রূপ-মূর্তি দেখবে, তােমার বাবা নয়—তুমি নিজে ! তােমার স্বরূপ-মূর্তিটাও আদালতে প্রকাশ পাবে। যে উকিল-বন্ধুটীর পরামর্শে তুমি এই সব কচ্ছ, তিনি সম্পর্কে তােমার কে হন, সেটাও সবাই বেশ ভাল করে বুঝবে ! স্বামীর সম্পত্তির লােভে পতিব্রতা সাজলেই সতীশ্রী হওয়া যায় না। রাজ্যেশ্বর। কালীনাথ—কালীনাথ ! জ্যোৎস্নাকে তুমি না ঘােট বােন বল? ছিঃছিঃ! একথা তােমার মুখ দিয়ে বেরুলাে—তুমি এই কথা বল্লে ? তােমার সঙ্গে পরামর্শ করে তবে আমি বিমলকে এখানে আনিয়েছি। তুমি জান, তােমার কথা কত মিথ্যে! চল জ্যোৎ—আমি এখানে থাকবাে না ! জ্যোৎস্না। ওর যা শিক্ষাসহবৎ, তাতে এ ছাড়া অন্য কথা ওঁর মুখ দিয়ে বেরুতে পারে না বাবা! যে পরের অনুদাস, সে অসহায় নারীকে এমনি করেই অপমান করে থাকে বটে! যা ; আমার সময় নেই- আমি শেষকথা বলে যাচ্ছি। এ সম্পত্তি আমার—আজ থেকে এক সপ্তাহের ভেতর আমি দখল নেব, আপনি হিসেব নিকেশ তৈরী করে আমার উকিলের কাছে পাঠিয়ে দেবেন—আর এই এক সপ্তাহের ভেতর আপনি বাগান ছেড়ে অন্য কোথাও যাবেন। [ জ্যোৎস্না ও রাজ্যের চলিয়া গেলেন।
চতুর্থ অঙ্ক
দৃশ্য
কাশী রণেন্দ্রর কক্ষ। রণেন পাইচারি করিতেছে। তরলা এক
পাশে বসিয়া খুব গম্ভীরভাবে কি একটা সেলাই করিতেছে।
রণেন। তুমি অত্যন্ত অন্যায় করেছ তরলা !
তরলা। আমি বলছি, আমি অন্যায় করিনি।
রণেন। অন্যায় করনি ?
তরলা। না; কিসে অন্যায় হলাে—শুনি?
রণেন। তুমি কি বলে ঘর ছাড়লে শুনি?
তরল। আমার তাে ছােট কুঁড়ে ঘর! তােমার অত বড় প্রকাণ্ড
অট্টালিকা, দাসদাসী, জমিদারী—সব ছেড়ে এখানে এসে রয়েছ কেন
শুনি?
রণেন। তুমি জান, আমি বাড়ী থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছি।
তরলা। তােমারও জানা উচিত ছিল, আমিও ইচ্ছে করে আসিনি
ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছি।
রণেন। সেই কথাই তাে তােমায় জিজ্ঞাসা করছি—স্বামীর সঙ্গে,
শাশুড়ীর সঙ্গে তাে কত বৌয়ের ঝগড়া হয়—তুমি ঘরের বাইরে কেন এলে?
আমি তােমায় কত বারণ করেছি, কত বুঝিয়েছি—তুমি কারাে কথা
কানে ললে না !
তরল। আমি স্বামীর জন্যেও ঘর ছাড়িনি, শাশুড়ীর জলেও ঘর
ছাড়িনি,—ওদের সঙ্গে নিয়ে আমি চলতে পারতাম।
রণেন। তবে ?
১১২
পতিতা
[ প্রথম দৃশ্য
তরলা। নিজে বঁড়শী দিয়ে মাছ ধরে, মাছ ডাঙায় তুলে, তারপর
মাছকে গালাগাল দেওয়া মাছ! আমি বঁড়শীতে চার করেছি করেছি-
ও আমার সখ ! তুমি কেন চার খেলে ?-তােমার যে দেখছি তাই
হলাে !
রণেন। এ তুমি কি বলছ তরল ? আমি তােমার কথার একটি
বর্ণও বুঝতে পারছি না।
তর। তা এখন তাে পারবেই না! (কিছুক্ষণ পরে) আমার উপর
তুমি কতখানি অন্যায় করেছ—তুমি জান ?
রণেন। না !
তরলা। শােন-আমি বুঝিয়ে বলছি। আমার অন্য জায়গায় বিয়ে
হ’তে দেওয়া তােমায় অন্যায় হয়েছিল। তুমি জাতে—আমি তােমায়
ভালবাসি। তুমি জাতে--তােমায় ছাড়া আর কাউকে ভালবাসতে
পারবাে না। আমি লাজলজ্জার মাথা খেয়ে একথা তােমায় কতবার
বলেছি—তুমি গ্রাহই করনি।
রণেন। আমার যে বিয়ে করবার উপায় ছিল না তরল ! আমার
তখন বিয়ে হয়েছে—স্ত্রী জীবিত।
তরলা। জানি-জানি, ভারি তত বিয়ে—আর ভারি তাে স্ত্রী।
জীবনে যার সঙ্গে এক দিনও দেখা হলাে না,—সে তােমার স্ত্রী তুমি
নিজে ইচ্ছে করে, শুধু রঙ্গ দেখবার জন্যে অন্যের সঙ্গে আমার বিয়ে হতে
দিলে। আমার মনে নেই ?—তুমি আমায় বলেছিলে, তিন দিনে আমায়
ভুলে যাবে।
রণেন। কথাটা কি নিতান্তই মিথ্যে তরল?
তরলা। হানিতান্তই মিথ্যে। তিন দিন-তিন বছরেও যদি
একটি দিনের জন্যে তােমায় ভুলতে পারতাম, আমি স্বামীর ঘর ছাড়তাম
?
•
চতুর্থ অঙ্ক ]
পতিব্রতা
! তবু, আর পাঁচজন কুলস্ত্রীর মত স্বামীর ঘরই করছিলাম। তুমি
কেন রােজ সকাল বেলা আবার আমার চোখের সানে এসে দাড়াতে ?
রণেন। আমি জানতাম না তরলা, তুমি ওই বস্তীর বাড়ীতে থাকতে
তরল। —তুমি তাে কিছুই জানতে না?—আমারই সব দোষ ।
প্রথম চিঠি কে লিখেছিল ?
রণেন। চিঠি!
তরলা। হা গাে হ্যা, চিঠি—দেখাতে পারি। প্ৰথমখানা রাগ
করে ছিড়ে ফেলেছিলাম। তার পরের সবগুলােই আছে।
রণেন। আমি তােমায় চিঠি লিখেছি।
তরল। নিজে লেখনি—সেইটিই তােমার বাহাদুরী! বেনামীতে
লিখেছিলে—নিজে ধরাছোঁয়া দাওনি।
রণেন।
এ সব কি বলছ তরল? আমি তােমায় বেনামীতে চিঠি
লিখেছি ?
তরল। তুমি তাে জান না, আমি কত চেষ্টা করেছিলাম। যেদিন
তুমি আমার হাতে একশাে টাকা তুলে দিলে, সেই দিনই আমি আমার
স্বামীকে বলেছিলাম—টাকা ফিরিয়ে দাও, অন্য পাড়ায় উঠে চল।
যায়নি--তার ফল সে পেয়েছে। এখন তােমরা সবাই বলছে—আমার
দোষ ! আমি কখনাে স্বীকার করূবাে না! (ক্ষণিক চিন্তার পর) দোষ
যাই হােক, মরবাে আমিই—সে আমি জানি।
রণেন। তােমায় টাকা দেওয়ার ভিতরে আমার কোন অসৎ উদ্দেশ্য
ছিল না তরলা ! তুমি মাকে মা বলে ডাকতে, তােমার কোন কষ্ট
হয়-
তরলা। জানি জানি, তােমরা সবাই দয়ালু! বন্তীতে আরও অনেক
গরীব লােক ছিল—কৈ তাদের দয়া করতে পারতে? (ক্ষণিক চিন্তার পর)
১১৪ পতিব্রতা [ প্রথম দৃশ্য তা যাক, বেশ করেছ টাকা দিয়েছ—বেশ করেছ চিঠি লিখেছ। গালাগালি দাও-হাসিমুখে সইবাে। এতদিন পরে আমি তােমায় পেয়েছি, আমি তােমায় ছাড়বােনা; তুমি আমার! ( রহস্যজনক মৃদু হাসি) রণেন। কিন্তু আমি তােমায় চিঠি লিখেছি, তােমার এ ধারণা ভুল ! তরল। চিঠি দেখবে?—আচ্ছা দেখাচ্ছি! (চিঠি বাহির করিয়া) এই দেখ—চিঠি দেখ ! রণেন। একি!-এযে কালদার হাতের লেখা ! তরলা। তা জানি—শুধু হাতের আঁখর নয়, তারই জবানী; তবে, তােমার জন্যে লেখা। লােকটি তােমার পরম সুহৃৎ! তার একান্ত ইচ্ছে ছিল, আমি ঘর থেকে বেরিয়ে তােমার সঙ্গে কোথাও চলে যাই। আমি জানি, সে তােমার শত্রু; কিন্তু আমার পরম বন্ধু ! আমার মনটি সে বুঝেছিল! রণেন। এখন আমি জলের মত সব বুঝতে পাচ্ছি তরলা ! কিন্তু আমার এ কলঙ্ক-! (ক্ষোভ ও অবসাদ) তরল। কি আবশ্যক সচ্চরিত্র হবার সুনামে? আমারও ‘সতী’ নামের মােহ ছিল। মনকে অনেক বুঝিয়েছি। রলেন। কিন্তু আমার তাে শুধু নামের মােহ নয় তরলা ! আমি আমার স্ত্রীকে ভালবাসি। তরলা। তুমি তাকে ভালবাসতে পাবেনা। যে বাপের কথায় স্বামী ছাড়তে পারে, তাকে আমি মেয়েমানুষ বলিনে—মেয়েমানুষের প্রাণ তার নেই। তাকে নিয়ে তুমি জীবনে সুখী হতে পারবে না। সবদিক যে রক্ষা করতে যায়, তার কোনদিক রক্ষা হয় না! রণেন। তুমি ঠিক বলেছ তরল ! আমি ভাল থাকতে অনেক চেষ্টা করেছি, জীবনে কখনাে কারাে অনিষ্ট করিনিতার ফলে পেলাম
চতুর্থ অঙ্ক ]
পতিব্রতা
১১৫
.
কলঙ্ক ! হয়তাে আমি সবদিক রক্ষা করবাে ভেবেছিলাম, তাই বােধ
হয় কোন দিকই রক্ষা হলাে না।
তরলা। (কৃত্রিম গাম্ভীৰ্য্যসহকারে) তােমার বড় দুঃখ হচ্ছেনা।
রণেন। তােমার কাছে মিছে কথা কইব না তরলা—দুঃখ হয়েছিল।
গােবিন্দলালের মত আমারও মনে হয়েছিল—“রাজার মত ঐশ্বৰ্য্য, রাজার
অধিক সম্পদ, অকলঙ্ক চরিত্র। অকলঙ্ক চরিত্রের একটা মােহ আছে,
একথা কে অস্বীকার করবে ?”
তরলা। (রহস্যময় মৃদু হাসি। কিন্তু যে কলঙ্ক
ভালবাসে।
{ সহসা অস্বাভাবিক জোরের সহিত) না—তুমি চুপ করে গম্ভীর হয়ে
থাকতে পাবে না। আমার সঙ্গে তােমার হাসতে হবে, তােমায় বলতে
হবে—এই ভাল এই ভাল ! এই বেশ হয়েছে ! ( সহানুভূতির সহিত)
তােমার নামে নালিশ হয়েছে, তাই তুমি ভাবছ? আমি নিজে
ম্যাজিষ্ট্রেটকে গিয়ে বলে আসবাে, আমি স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে ঘর
ছেড়েছি—কেউ আমায়, ঘরের বার করেনি। তােমার নাম কেউ
জানতেও পারবে না! তুমি এস—নাইবে এস। কার জন্যে এত
ভাবনা? যে একদিনও তােমায় ভালবাসেনি, তার জন্যে এত ভাবনা
কেন-শুনি? ভেবে ভেবে কি চেহারা হয়েছে, একবার আরসিতে
মুখখানা দেখ দেখি ?
রণেন। আঃ-কি কচ্ছ তরলা? তুমি কি পাগল হলে নাকি ?
তরল। ( মৃদু কলহা) সত্যি আমি পাগল ! এতদিন আমায়
দেখছ—তবুও বােঝনি, আমি পাগল ? আজ আমি তােমায় পেয়েছি,
তােমায় সহজে ছেড়ে দেব না; তবে তােমার স্ত্রী যদি আমার কাছে
এসে তােমায় ভিক্ষে করে নেয়, তবেই তােমায় ছেড়ে দিতে পারি।
তাকে ব’লবাে-তিনদিন আমার কাছে থাক; কি করে ভালবাসতে
১১৬
পতিতা
[ প্রথম দৃশ্য
হয়, কি করে ভালবাসার মানুষকে সেবা করতে হয়—আমার কাছে
শিখে যাও! ( অত্যন্ত ছেলেমানুষের মত) আম গান গাইতে ইচ্ছা
হচ্ছে। তােমার পায় পড়ি, একখানা গান গাই—কি বল? সত্যি,
আমি বেশ ভাল গাইতে পারি। বিশ্বাস হলাে না ?
রণেন। কে তােমার কথা অবিশ্বাস করছে? তােমার গান তাে
শুনেছি, যখন তুমি ইস্কুলে পড়তে
তরলা। গান আর আজকের গান—অনেক তফাৎ।
গানের সমস্তটাই আমি, আর সে গানের সমস্তটাই গান! তাহলে
গাই ?
গান
পরশ রতন প্রাণে আছে,
কলঙ্কেতে আর কি ডরি ?
ঝাঁপ দিয়েছি তুফান মাঝে-
যা হয় হবে, বাচি মরি।
কলঙ্কে তার কি থাকে ভয়,
যার তরে সে কলঙ্কিনী-পাশে যদি রয়।
(তার) লজ্জা সরম ধরম করম—কিছুই কিছু-নয় ।
কোন শাসন মানে না মন-বাঁধনহারা মত্তকরী।
রণেন। চমৎকার! তুমি বেশ আছ তরল। আমার মাঝে মাঝে
তােমার উপর হিংসা হয়।
তরল। হিংসা হয়!-কেন হিংসা হয়? বা—বেশ তো ! তুমি
মনে কচ্ছ, আমি খুব হাল্কা—আর তুমি খুব গভীর মানুষ?
রণেন। আচ্ছা, আমি তখন যদি কাশী না এসে কলকাতায় চলে
যেতাম, তুমি কি করে আমার দেখা পেতে তরল ?
চতুর্থ অঙ্ক ]
পতিব্রতা
১১৭
তরল। সেটি হবার উপায় ছিল না তােমায় কাশী আসতেই
হােত! আমি তােমায় কাশী এনেছি ; তবে কালীনাথবাবু আমার পরম
বন্ধু ! তিনি সহায় ছিলেন বলে, তুমি সহজেই চলে এসেছ। তােমার
কাছে আমার এই মিনতি, সাতদিন আমি তােমার সেবা ক’রবােতুমি
এখানে থাক।
রণেন। তরলা শােন-তােমার কাছে মুখে বড়াই করে কোন লাভ
নেই; এ সংসারে শুধু একটা নারীই তার যথাসর্বস্ব দিয়ে আমায়
ভালবেসেছে—তাকে ছেড়ে যাবার শক্তি আমার নেই।
তরলা। দোষ সব চেয়ে বেশী আমার স্বামীর। সে আমায় চায়নি;
যদি চাইতাে, আমি আসতেম না। আমি তাকে বলেছিলাম-তুমি
'আমায় অন্য কোথাও নিয়ে যাও। কেন সে নিয়ে গেল না?
রণেন। তাই বুঝি তার উপর রাগ করে—
তরলা। রাগ হয় না!—তুমিই বল ? সে জানতাে, আমি তােমায়
ভালবাসি। ইচ্ছে করলে আমায় রক্ষা করতে পারতাে-কেন করলে
না? তুমি বলতে চাও—সে স্বামীর কর্তব্য করেছে ?
রণেন। কিন্তু তােমার স্বামী বেশ ভাল লােক তরল।
তর। কে অস্বীকার করছে ?-খুব ভাললােক ! আর, ভাললােক
বলেই তাে তাঁর স্ত্রী ঘরে থাকলাে না। তিনি এত ভাললােক যে, তাঁর
ধারণাই হ’ল না—আমি ঘর ছেড়ে চলে যেতে পারি! বুড়াে মিসে-
মা মা করেই অস্থির ! বেশ হয়েছে- উচিত শান্তি হয়েছে। একবার
যদি দেখা হততা, দুটো কথা শুনিয়ে দিতাম।
। (নেপথ্যে) বৌদি—আমি তারক; কলকাতা থেকে
আসছি, বিশেষ দরকার—একটাবার তােমার সঙ্গে দেখা করবে। যদি
এ বাড়ীতে থাক, উত্তর দাও
তারক।
১১৮
পতিতা
[ প্রথম দৃশ্য
তরলা। একি-এযে ঠাকুর-পাের গলা ! সে এসেছে এতদূর
কলকাতা থেকে ?
রণেন।
তরলা। হ্যা, তারই গলা !
রণেন। দেখা করবে নাকি ?
তরল। বেচারী এতদুর কষ্ট করে এসেছে;—আমায় বড় ভালবাসে।
ওকে ডাক।
রণেন। আমি ডাকতে পারব না—আমি এখানে থাকতেও
পারবাে না। তুমি ডাক—আমি ছাতে যাই।
তরলা। না, সে হবে না-তােমায় থাকতে হবে। ও নিজের চোখে
দেখে যাক-ওর দাদাকে গিয়ে বলুক।
রণেন। কি ছেলেমানুষী করছাে তরলা ! আমি কি করে ওর
কাছে মুখ দেখাবাে? ও আমায় দেবতা বলে জানতাে!
তরল। আমাকেও দেবী বলে জানতাে। আমি যদি মুখ দেখাতে
পারি, তুমি কেন পারবে না? কলঙ্ক বেশী কার? স্ত্রীলােকের—না
পুরুষের? ভালবাসাটা চাও, অথচ কলঙ্কের আঁচ গায় লাগবে না - তা
হয় না! চুপ করে বসে এই চেয়ারে।
( নেপথ্যে। উপরে কে আছেন মশাই! এক গ্লাস
খাবার জল—আপনাদের প্রভুভক্ত দারােয়ান তাও দিতে চায় না।
জলটা পাঠিয়ে দেবেন অনুগ্রহ করে—আমি আর উপরে যেতে
চাই নে !
তরল। (উচ্চৈঃস্বরে) ঠাকুর-পাে! আমি এই বাড়ীতেই আছি-
ভূমি উপরে এস।
চতুর্থ অঙ্ক ]
পতিব্রতা
১১১
;
( রক প্রবেশ করিল।
তরল। এস ভাই-এস বসাে। একি! চোখ লাল, চুল
উসকোখুসকো-গাড়ী থেকে নেমেই আসছ বুঝি?
তারক। হু।
তরলা। ও—তােমার জলতেষ্টা পেয়েছে ব’লছিলে ; বসসা জল
আনছি।
তারক।
জল আনতে হবে না—আমার জলতেষ্টা পায় নি ; আমি
মিথ্যে কথা বলেছি।
তরল। কেন মিথ্যে কথা বললে ?
তারক। নইলে তােমার দর্শন পাওয়া যেত না।
তরল। তুমি কি আমার খোজে কাশীতে এসেছ?
তারক। না—হরগৌরী দেখতে এসেছি।
তরলা। কেন শুধু শুধু আমার খোঁজে এলে?-আমি তােমাদের
কেউ নই !
তারক। তুমি সহজে সম্পর্ক ঝেড়ে ফেলতে পার-কানাে উপর
তােমার দরদ' নেই ! মানুষ বাঁচুক মরুক, সংসার হাজুক মজুক
তােমার নিজের সুখ হলেই হলাে! পৃথিবীতে সবাই যদি তােমার মত
হতাে, তাহলে আমার আবার কোন দরকারই থাকতাে না।
তরলা। থা—আর বাহাদুরী করতে হবে না। তুমি ছেলেমানুষ
—সব কথার মানে বােঝ না ; আর তােমায় বুঝিয়েই বা লাভ কি ?
তারক। আমাকে তােমার বােঝাতে হবে না ! একটা সংসার তুমি
দুপায়ে ভেঙে চলে এলে-কোন্ মুখে কথা বল ? লজ্জা করে না।
( রণেনকে লক্ষ্য করিয়া) রণেনবাবু-আপনার মুখে যে আর রা-শফল
নেই ! আপনি মুখ তুলুন ;-আমার সঙ্গে আলাপ করুন?
পতিতা
[ প্রথম দৃশ্য
!
রণেন। আজ আর আমি তােমায় কোন কথা বলব না তারক।
কারণ, বলা মিছে।
তারক। আপনি এখনও সাধুতার ভাণ করেন নাকি?—চমৎকার !
গুপে গুণ্ডাকে আপনি পুলিশে দিতে চেয়েছিলেন ?
রণেন। তুমি তাে আমার নামে ওয়ারেন্ট বার করেছ?
তারক। পুলিশ যখন আপনাকে সন্দেহ করে—আমি অস্বীকার
করেছিলাম ; ইস্পেক্টরকে বলেছিলাম—আপনার হৃদয়হীন! তিনি
অল্প একটু হেসে বলেছিলেন—ছােকরা, তােমার এখনাে মানুষ চিনতে
অনেক দেরী !–কেন আপনি আমাদের এ সর্বনাশ করলেন ?
তরল। আঃ ঠাকুর-পাে—তুমি একেবারে নোৎ শিশু! একথা
কেউ কাউকে জিজ্ঞাসা করে? আর জিজ্ঞাসা করলেই সে বুঝি ঠিক
উত্তর দেয় ? তােমাদের সর্বনাশ কেউ করেনি-আমি চলে আসায়
তােমাদের কোন ক্ষতি হয়নি!
তারক। না—ক্ষতি হয়নি! তুমি জান কিনা?
তরল। আমি জানি-তােমার মা সুখে আছেন, তােমার দাদা
সুখে আছেন ; শুধু তুমিই কেবল এদেশ সেদেশ হৈ হৈ ক’চ্ছে ! লক্ষ্মীটা
আমার—আর মন খারাপ ক’র না; তােমার আবার নতুন বৌদি
আসবে! একটু ডাগর মেয়ে দেখে তােমার দাদার বিয়ে দিয়াে-আমার
কথা আর মনে পড়বে না !
তারক। তােমার হাসি দেখে আমার সর্বাঙ্গ জ্বলে যাচ্ছে! তুমি এ
ঘর থেকে চলে যাও-আমি তােমার মুখ দেখবে না ! তােমার জন্য
আমি এখানে আসিনি—আমি রণেনবাবুর সঙ্গে বােঝাপড়া করতে
এসেছি।
তরলা। রণেনবাবুর কোন দোষ নেই- সমস্ত দোষ আমার! যা
;
চতুর্থ অঙ্ক ]
পতিব্রতা
১২১
বােঝাপড়া করতে হয়, আমার সঙ্গেই করতে হবে। কিন্তু তােমার
সঙ্গেই বা কি বােঝাপড়া ক’রবাে ঠাকুর-পাে? তােমার দাদাকে ডেকে
নিয়ে এস -- তাকে একটা কথা মনে করিয়ে দেব।
তারক। বৌদি বৌদি! তােমার পায়ে পড়ি, দাদার নাম তুমি
করাে না-তার কথা বলা তােমার সাজে না। যদি একটি দিনের তরেও
দাদাকে তুমি চিনতে পারতে—তােমার এদশা হতাে না !
তরলা। আক্ষেপের দরকার নেই ঠাকুর-পাে! তােমার
দাদাকেও চিনি-দাদার ভাইকেও চিনি। বড় যে বীরত্ব দেখিয়ে
বলেছিলেন, তুমি যাও যেখানে খুসী—আমি চাইনে তােমায় ! ভেবেছিলেন
—কোথায় আর যাবে? দুবেলা দুমুঠো ভাত আর কাপড় দিয়ে দাসী
কিনে রেখেছি ! আসতেতে পেরেছি ?—কেউতে আটকাতে পারে
নি! দেখেতাে যাচ্ছে, তাঁকে খবর দিয়ে--বেশ আছি, সুখে আছি ;
কারও জন্য আমার কোন কষ্ট নেই।
তারক। কুলের বৌ কুলের পার হয়ে এসেছ, তাই বাহাদুরী
ক’চ্ছাে? এখানে বসে আমার যে দাদাকে তুমি গাল দিচ্ছ, একদিনের
তরেও বুঝেছিলে—তিনি তােমায় কত ভালবাসেন? তুমি চলে আসার
পর সেই যে বিছানা নিয়েছিলেন—আর ওঠেন নি।
তরল। ঠাকুর-পাে ঠাকুর-পাে ! কি বলছো তুমি ?
তারক। হ্যা, সেই শােয়াই তার কাল। কেউ রাখতে পারলাে
—কত চেষ্টা করলাম ! মুখে শুধু এককথা, বড়বৌ-বড়বে।
তরল। ঠাকুর-পাে! তুমি সত্যি বলছো?—তােমার দাদা নেই।
তারক। না—নেই! এসব কথা আবার কেউ মিথ্যে করে বলে
থাকে নাকি ?
রণেন। --মন্মথবাবু মারা গেছেন?
১২২
পতিব্রতা
[ প্রথম দৃশ্য
তারক। হ্যা, মারা গেছেন; তােমরা দুজনে তাকে মেরে ফেলেছ
-তুমি আর তুমি ? আমি বলছি, তিনি রােগে মারা যান নি—তােমরা
দায়ী! তুমি স্বামীঘাতিনী-গলায় কলসী বেঁধে গঙ্গায় ডুবে মরগে !
—মানুষের কাছে ও মুখ আর দেখিও না ।
( সকলে কিছুক্ষণ নীরব )
রণেন। তারক—শােন! তােমাদের বংশে কলঙ্ক রটেছে, তােমার
দাদা মারা গেছেন—তােমাদের এ ক্ষতি পূরণ হবার নয়। এর জ
মূলতঃ আমি দায়ী—আমি স্বীকার কচ্ছি! এর জন্য আমায় কি করতে
হবে, তুমি আমায় বল ?
তারক। আপনার লজ্জা করে না? গরীবের সর্বনাশ করে
আপনি ক্ষতিপূরণ করবার আশা করেন ! ভাবছেন, গরীব মানুষ
দুপাঁচশাে টাকা পেলেই সব ভুলে যাবে ! কিন্তু আপনার মত বড়মানুষকে
আমি মানুষ বলেই গ্রাহ্য করি নে।
রণেন। আমি টাকা দিয়ে তােমার ক্ষতিপূরণ করতে চাইনে ভাই ?
তুমি আমায় ভুল বুঝাে না—আমি আমার কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত
করবাে।
তারক। প্রায়শ্চিত্ত করবে? এখনাে তােমার সাধুতার মুখােস্
বলল না ? হ্যা—তােমায় প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। আইনের হাতে
তােমায় দেব না—তােমায় শাসন করবাে আমি।
তারক তাড়াতাড়ি জামার ভিতর হইতে পিস্তল বাহির করিয়া গুলী করিল ;
তরলা তারকের হাত ধরিতে-অনভ্যস্ত তারক লক্ষ্যভ্রষ্ট হইল—গুলী
দেওয়ালের গায়ে লাগিল । সকলে কিছুক্ষণের জন্য স্তম্ভিত।
তরল। (তারকের গা। ধরিয়া ঝাকুনি দিয়া)-ঠাকুর-পাে
ঠাকুর-পাে !
চতুর্থ অঙ্ক ]
পতিব্রতা
রণেন। ভয় নেই তরলা ! গুলী কারাে গায়ে লাগেনি।—ছিঃ
তারক, তুমি এত উত্তেজিত হলে! একবার ভেবে দেখলে না !
তারক। আপনি, আপনি! ( তারক আর কোন কথা কহিতে
পারিল না)।
তরলা। (রণেন্দ্রের নিকট গিয়া ) তুমি আর কখনাে আমার খোজ
করােনা। ঠাকুর-পাে এস! আমি তােমার সঙ্গে যাব।
[ তরলা তারককে লইয়া চলিয়া গেল।
( একজন সার্জেন্ট ও পুলিশের প্রবেশ)
সার্জেন্ট। ইস্ মােকামসে পিস্তোলকা আওয়াজ আয়া?
পুলিশ। জী খােদা, ! ( পিস্তল কুড়াইয়া পাইয়া) পিস্তল
মিল গিয়া হুজুর !
সার্জেন্ট। (রণেনের প্রতি। তুম্ গুলী চালায়া ?
( রণেন নীরব রহিল )
সার্জেন্ট। তােমারা পিন্তোল ? কিকো পর গুলী চালায়া ?
রণেন। যাকে গুলী করেছিলাম—সে পালিয়েছে।
সার্জেন্ট। পিষোল কঁহাসে মিলা?
( রণেন নীরব রহিল।
সার্জেন্ট। জমাদার-হাতকৌড়ি লাগাও।
(পুলিশ রণেন্দ্রের হাতে হাতকড়ি লাগাইল)
[ সকলের প্রস্থান।
পঞ্চম অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
চাপাপুকুর-রাজ্যেশ্বরের বাড়ীসংলগ্ন বাগান। বিমল চেয়ারে বসিয়া,
জ্যোৎস্না জড়ের মত নীরব-সােনা মালী তাহাদের পায়ের
কাছে পড়িয়া আছে।
সােনা। তােমায় আর বেশী কথা কি বলবাে মা-লক্ষ্মী। তমার
বাবার মনে যাই থাক, তুমি এবংশের বউ। যেমন কোরে হােক, আমার
দাদাবাবুকে র’ক্ষে কর মা! আমি জানি, ঐ কালসাপের কাজ! সময়
বুঝে এখন ফণা তুলে দাড়িয়েছে।
বিমল। আমি যা বুঝছি, তাতে ঐ পিস্তলটাই সব চেয়ে মারাত্মক
—আর পিস্তলের মালিকই আসল culprit !
সােনা। আমি দিলাসা করে বলতে পারি বাবু-পিস্তল ঐ
কালীবাবুর। ওই-ই আমার বাবুকে প্রাণে মারবার জন্যে ভাড়াটে গুণ্ডা
পাঠিয়েছিল।
বিমল। তুমি কি করে জানলে পিস্তল কালীবাবুর ?
শােনা। যে দিন বাগানে ও আমায় অপমান করলাে, সেইদিন
দোরের পাশ থেকে আমি কিছু কিছু দেখেছি। কলকাতার সেই গুপে
গুণ্ডার কথা মনে পড়ে বাবু?—সেই ছােট ছােট করে চুলছাঁটা-টেনে
টেনে কথা বলে ?
মিল। হ্যা, মনে পড়ে। মেলার সময় একবার কালীবাবুর কাছে
এসেছিল।
পঞ্চম অঙ্ক ] পতিব্রতা সােনা। হা—সেই দিনই তাে ? বিমল । সে স্ত্রীলােকটি কোথায় গেল সেও এক সমস্যা ! তার তাে পাত্তাই নেই! সােনা। স্ত্রীলােক ছিলই না বাবু! আর যদি থেকে থাকে, কালীবাবু নিজে বার করে আমার বাবুর ঘাড়ে চাপিয়েছে। ও কি কম শয়তান ?-ও সব মিথ্যে বাবু—সাজানাে মােকদ্দমা ! আমার বাবু পরের বৌ বার করবে ?—তার সেই চরিত্তির ? মা-লক্ষ্মী! ও সব কথা নিয়ে তুমি মন খারাপ ক’র না। আমি এই—এতটুকু বেলা থেকে হাতের চেটোয় করে মানুষ করেছি। আমি জানিনে ? জজসাহেবের কাছে গিয়ে আমি সত্যি কথা বলবাে। তুমি যদি সাহেবের কাছে গিয়ে কেঁদে পড় মা, তাহলে নিশ্চয়ই দাদাবাবুকে সাহেব ছেড়ে দেবে! বিমল। হ্যা, সাহেব তােমার বাবুর সম্বন্ধী কিনা ? সােনা। বাবু! আপনি জাননা-ওরা আমাদের মত হিংসাকারী নয়। ওরা সত্যি মিথ্যা সব বুঝে। বিমলা। কালীবাবু সত্যিই যদি এই সমস্ত করে থাকে, আমি কিন্তু ওর বুদ্ধির তারিফ করি । সােনা। আপনি জুয়াচোরের বুদ্ধির তারিফ, কর বাবু? আমি বলি, ও বুদ্ধি বুদ্ধিই না—ঐ যতদিন ধরা না পড়ে। তবে আমি তােমায় ব’লছি বাবু, ওর সর্বনাশ হবেই-ও কেউ আটকাতে পারবে না। আমার দেবতার মত বাবু! তারই ভাত খেয়ে যে নেমকহারাম এমন করে তাকে ছন্নছাড়া করলে—তার সর্বনাশ হবেই। আমার আর কিছু বলবার নেই মা! আমি তাে আইনের প্যাচ বুঝিনে—আমি দিনরাত ভগবানেরে ডাকছি। তিনি যদি উপায় করেন, তবেই রক্ষে। আমি তিন দিন হাজতে গিয়ে থােকাবাবুর পায়ে ধরে কেঁদেছি—তুমি কেন
১২৬
পতিব্রতা
[ প্রথম পৃষ্ঠ
এমন কচ্ছ? আমায় বােক বুঝিয়ে দেয় বাবু! বলে—“সেনােদা!
তুমি আমােদ কর ; কার সাধ্য আমায় জেল দেয় ? তিন দিন বাদে
খােলস পাব।”-দেখ দেখি কথা !
বি। কাগজে যা পড়লাম, তাতে তােমাদের উকিলই কেটাকে
আরও খারাপ করে তুলেছে। সে একবার বলে, আমার মকেলের
মাথা খারাপ-revolutionary দলে ওঁর যােগ আছে ; কখনাে বলে,
suicide করবেন বলে, এদানী ওঁর কাছে সদাসর্বদা পিস্তল থাকতাে।
নিজের উকিলের এই সব কথা-rotten, nonsence !
সােনা। ওই দেখুন বাবু! আমি তাে কিছু বুছিনেকালীবাবু
উকিল দিয়েছে। কালীবাবুর শেখান কথা সেই উকিল বলছে। ওরে
বাপরে! আমার তত টাকাকড়ি কিছু নেই—সব কালীবাবুর হাতে।
সে যা করবে—তাই হবে। ওরে বাপরে!-হে ভগবান! কি ক'লে
ভগবান—বাবু আমার থাকতে বঞ্চিত ! তুমি বাবু দয়া করে— বিমলের
পায়ে ধরিল)।
বিমল। সােনাদা, সােনাদা! ওঠ, ওঠ ।
জ্যোৎস্না। আমার গায়ের সব গয়না দিচ্ছি বিমলদা! আপনি
মােকর্দমার তদ্বির করুন ; ভাল উকিল দিয়ে আপনি নিজে তাঁকে সব
কথা বুঝিয়ে বলুন!
[ সকলে সাশ্চর্য্যে দেখিল—একটি বিধবা তরুণী ঘরে প্রবেশ করিতেছে ।
মুখতুলিতেই দেখা গেল—সে সদ্যোবিধবা তরলা।]
তরল। আপনার নাম জ্যোৎস্নাময়ী দাসী ?
জ্যোৎ। হা—আপনি কে?
তরলা। বলছি—এদের এখান থেকে যেতে বলুন! আপনার সঙ্গে
আমি নির্জনে কথা বলতে চাই।
পঞ্চম অঙ্ক ]
পতিব্রতা
১২৭
জ্যোৎস্না। বিমলদা! আপনি একটু বাবার কাছে গিয়ে বসুন।
সােনাদা-
সােনা। হা—যাচ্ছি মা ! কাল মকদ্দমার দিন, আমি আজ
আবার কলকাতায় যাব; বিমলবাবু যদি আমার সঙ্গে যেতেন! আমি
ততা আর বলতে পারি নে মা-লক্ষ্মী! কিসের জোরে বলবাে ?
জ্যোৎস্না। তুমি যাও সােনাদা—আমি সব ব্যবস্থা করবাে।
[ বিমল ও সনাতনের প্রস্থান।
তরলা। তােমার সব কথা আমি জানি-তােমার স্বামীর কথাও
জানি!
!
জ্যোৎস্না। তুমি তুমি সেই!
তরল। আমার নাম তরল। নাম নিশ্চয়ই শুনেছ ?
জ্যোৎস্না। হু-শুনেছি ; তুমি কি করতে এসেছ এখানে?
তরলা। তােমায় একটি কথা বলতে।
জ্যোৎস্না। আমার ধারণা, আমার স্বামী যে বিপদে পড়েছেন—সে
শুধু তােমারই জন্য!
তরলা। তােমার ধারণা সত্যি—সব অনিষ্টের মূল আমি !
জ্যোৎস্না। পিস্তল তােমার কাছে ছিল ? তুমিই ওঁকে গুলী
মারতে গিয়েছিলে ?
তরলা। এ কথা তােমার মনে হওয়া কিছু বিচিত্র নয়। আমার
সম্বন্ধে তােমার কোন ভাল ধারণা থাকতে পারেনা; তবু তােমায় বলছি,
তুমি বিশ্বাস কর আমি খুব খারাপ না !
জ্যোৎস্না। তুমি কি বলতে চাও—বল !
তরলা। তােমার স্বামীর কাছে তােমার কথা শুনে আমারও তােমার
১২৮ পতিব্রতা [ প্রথম দৃশ্য উপর রাগ হয়েছিল! ভেবেছিলাম, তুমি বুঝি ইচ্ছে করেই স্বামীত্যাগ জ্যোৎস্না। এখন কি মনে হয় ? তরলা। বলছি—তুমি আমার সঙ্গে বাঁকা কথা বলে ঠাট্টা করােনা। আমি তােমার শত্রু নই-বন্ধু । জ্যোৎস্না। তুমি কি চাও?-কি দরকার তােমার । তরল। আমি তােমার কাছে এসেছি, তােমার সঙ্গে একটু কথা . কইব বলে। তুমি আমায় ঘৃণা করােনা। আমার নামে কলঙ্ক রটেছে বটে—তােমার নামও নিষ্কলঙ্ক নয়। কত লােক কত বলে--সব কথা হয় তত তােমার কানেই যায় না! স্ত্রীলোেক যদি সহজভাবে স্বামীর ঘর করে তার কলঙ্কের আর শেষ নেই। জ্যোৎস্না। তুমি এরকম থান কাপড় পরেছ কেন? আমি তােমায় এভাবে দেখবাে—মনে করিনি! তরলা। স্ত্রীলােকের স্বামী ছাড়া কোন গতি নেই। যতদিন স্বামীর কাছে ছিলাম, এই সহজ কথাটা বুঝতে পারিনি! বুঝতে পারলুম—যে মুহূর্তে গাড়ী হাওড়া স্টেসন ছাড়ল। আমি তােমার স্বামীকে ভাল বাসতাম —বিয়ের পরও তাকে ভুলতে পারি নি ! তিনি যদি একটু দুর্বলতা দেখাতেন, আমি কোথায় ভেসে যেতাম—জানিনে! কিন্তু তিনি আমায় রক্ষা করেছেন। লােকের চোখে না-হােক, নিজের কাছে আমি ভাল আছি! তিনি তােমায় ছাড়া কাউকে কখনাে ভালবাসেন নি। তুমি এমন স্বামী পেয়েও তাঁর সেবা করতে পারলে না-তুমিও আমারই মত হতভাগী ! হাজতে ব’সে তােমার কথাই ভাবছেন তিনি। জ্যোত্মা। আমি কি করব—বলতে পার? আমি অকূল সমুদ্রে ভাসছি! কি করে তাকে বাঁচান যায় জান ?
পঞ্চম অঞ্চ ]
পতিব্রতা
১২৯
তরলা। তুমি বুঝতে পারছ না? তাঁর মােল আনা অভিমান
তােমার উপর। তিনি নিজে ইচ্ছে করে মকদ্দমায় জড়িয়েছেন।
জ্যোৎস্না। আমার কি দোষ? আমি বাবার মনে কষ্ট দিতে পারি
নে! আচ্ছা, কি ঘটনা ঘটেছিল—তুমি জান ?
তরলা। জানি জানি—সব জানি আমার চোখের সামনেই ঘটে।
আমি যে সেখানে ছিলাম।
জ্যোৎস্না। সত্যি বল, আমার স্বামীর কোন দোষ আছে ?
তরল। না—তিনি একেবারেই নির্দোষ, নিষ্কলঙ্ক।
জ্যোৎস্না। তাহলে তুমিই কেন জজ সাহেবের কাছে গিয়ে সব সত্যি
কথা বলনা ?
আমার সত্যি কথা বলবার উপায় নেই। আমি সত্যি
কথা বললে আর একটা ছেলে মারা যায়—সে আমার দেওর।
লােকের কথায় ভুল বুঝে সে তােমার স্বামীকে গুলী করতে গিয়েছিল।
আমি তাকে বাঁচাতে চাই!.
জ্যোৎস্না। তাহলে সেইই গুলী করেছিল?—পিস্তল তার?
তরলা। সে কোথায় পিস্তল পাবে ? তাকে দিয়ে এই কাজ করাবার
জন্য তার হাতে পিস্তল দেওয়া হয়। আমি বুঝতে পাচ্ছি, এর মূলে কে?
সে আমার সর্বনাশ করেছে, তােমার স্বামীর সর্বনাশ করেছে, আমার
দেওরকে উত্তেজিত করেছে! অতি সাংঘাতিক মানুষ। কিন্তু তাকে
ধরাছোয়া যায় না—এমনি হুসিয়ার ! আমার দেওর সত্যি কথা বলতে
খুব রাজী—আমিই কেবল তাকে আটকে রেখেছি। আমার কেবলই
মনে হচ্ছে—তুমি গেলে সব দিক রক্ষা পাবে।
জ্যোৎস্না। তুমি একটু ব’সস ভাই! আমি একটু বিমলদার সঙ্গে
পরামর্শ করে বাবাকে বলে আসি।
পতিব্রতা [ প্রথম দৃশ্য ( সুধাংশুর একেশ ) সুধা। দিদি ! আমি বাবার কাছে একখানা নতুন গান শিখেছি শুনবে ? -- জ্যোৎস্না। সুধা! এই দেখ, তাের এক দিদি এসেছেন। সুধা। হ্যা দিদি ! রণেনবাবু তােমার বর? আমি ভেবেছিলাম- তােমার বিয়েই হয় নি! আমি কেমন করে জানব বল ?তুমি রাগ করলে ? জ্যোৎস্না। ও কথা যা। তুমি তােমার এই দিদির সঙ্গে গল্প কর-আমি আসছি। ( জ্যোৎসার স্থান। সুধা। তুমি আমার দিদি, তা এতদিন আসনি কেন ? তরলা। তুমি আমায় আতে যাওনি বলে ? সুধা। তুমি কোথায় থাকতে ?—কোথায় আতে যাব? তরলা। কেন—আমার শ্বশুরবাড়ী ? সুধা। তােমার শ্বশুরবাড়ী আছে ? তরল। হু-আছে বৈকি? সুধা। তবে তুমি পিসিমার মত কাপড় পরেছ কেন? এ কাপড়ে তােমায় ভাল দেখাচ্ছে না! তরল। ভাল কাপড় আমার পরতে নেই! তুমি কি গান শােনাবে বলেছিলে-শে। সুধা। আচ্ছা, শেন-গলা বাবারড় ভালবাসেন। *
পঞ্চম অঙ্ক ]
পতিব্রতা
গান
আমার সকল দুঃখহারী গিরিধারী।
( আমার) কেঁদেই যদি যাবে জীবন
( আমি ) হরি ব'লে যেন কানতে পারি ।
যদি এ জীবন চলে
সুখশান্তির ছায়াতলে !
সকল সুখের সার সুখ তুমি
জীবন-পদ্মদলে !
এই কথা যেন ভুলে নাহি যাই,
তােমারে না পেলে কিছু পাই নাই
তুমি ডাক দিলে, সকল তেয়াগি
যেন চলে যেতে পারি।
তরল। ও কে এলােতােমাদের বাড়ীতে ?
সুধা। ওতাে কাদা-বাবার কাছে এসেছে।
ও এখানে কেন ?
সুধা। যাই আমি--দিদিকে ডেকে আনিগে।
দ্বিতীয় দৃশ্য
রাজ্যেশ্বর বাবুর ঘর। রাজ্যেশ্বর ও কালীনাথ।
রাজ্যের চিন্তামগ্ন।
কালীনাথ। আপনি আমার উপর সেদিন শুধু শুধু চটে গেলেন
কাকাবাবু! আপনার অসুখ শুনেও আমি আসতে পাচ্ছিনি। কোন
লজ্জায় আর আসি বলুন?
রাজ্যের। অসুখ আমার বিশেষ কিছু না ভাল লাগছেনা কিছু!
১৩২ পতিব্রতা [ দ্বিতীয় দৃশ্য কালীনাথ। জ্যোআ যদি ঐ রকম করে আমায় না বলতাে। ধরুন, আমায় তত একরকম তাড়িয়েই দিলে ; কিন্তু আমিও বােস বংশ- একবার ‘না’ বললে, ‘হ্যা’ করায় কার সাধ্যি! আমি সেইদিনই বাগান ছেড়ে দিয়েছি। রাজ্যেশ্বর। তুমি বাগানে আর নেই ? কালীনাথ। আপনি বলেন কি কাকাবাবু! আমি সেই মানুষ? আপনারই তাে ভাইপাে? যে কথা—সেই কাজ । রাজ্যেশ্বর। তুমি কোথায় আছ তাহলে ? কালীনাথ। গাঁয়ের বাড়ীতেই আছি। তারপর রােজ কলকাতায় যেতে হচ্ছে! তবু আলীপুরে কেস হচ্ছে তাই—নইলে, যদি কাশীতে গিয়ে মােকদ্দমার, তদ্বির করতে হতাে, তাহলে হয়েছিল আর কি! রাজ্যেশ্বর। কি রকম বুঝছো? ছেড়ে দেবে না সাজা হবে? কালীনাথ। ও সব কি জানেন কাকাবাবু-বাঘে চুলে আঠারাে ঘা! কেউ বলছে, সেই মাগীটাকে খুন করে গঙ্গায় লাস্ ভাসিয়ে দিয়েছে । অবিশ্যি, সে প্রমাণ করা কঠিন! কিন্তু এদিকে কেঁচো খুঁড়তে খুঁড়তে কেউটে সাপ উঠেছে। রাজ্যেশ্বর। সেকি ? কালীনাথ। যে রিভলভারটা পাওয়া গেছে, সেটা ১৯১৭র যুদ্ধের সময় জামানী থেকে আসে! তার উপর, ভায়াও তাে আমার শান্ত ছেলেটি নন? কোথায় কোন্ ক্লাবের সেক্রেটারী ছিলেন ; সেখানে লাঠিখেলা, চুরিখেলা, এই সব শেখানাে হত, সমস্তটা জড়ালে আসা একটি গল্প হয় ! রাজ্যেশ্বর। আমি এ সম্বন্ধে কোন কথাই বলতে চাই নে—আমার বলা উচিত না। একেবারে যদি সম্বন্ধ লােপ পেত, তাহলে আর কোন ভাবনাই ছিলনা। মেয়েটা ;
পঞ্চম অঞ্চ ] পতিব্রতা কালীনাথ। কিছু যদি মনে না করেন কাকাবাবু-একটা কথা আপনাকে নিবেদন করি। রাজ্যেশ্বর। বেশ তাে-বলই না! কালীনাথ। বিমলের সঙ্গে জ্যোৎস্নার বিয়ে দিলেই আপনি করতেন ভাল! বিয়েও দিলেন না, অথচ রাজ্যেশ্বর। অথচ’ কি? তােমার সঙ্কোচ করবার কোন দরকার নেই! তুমি বলই না ? কালীনাথ। না থাক; আপনার শরীর খারাপ! তারপর, আমি ব’লে আর কেন দোষের ভাগী হই ?—সময়ে সবই জানতে পারবেন। রাজ্যেশ্বর। না—তুমি বল ; আমার শরীর ভালই আছে। কালীনাথ। রাস্তাঘাটে আর কান পাতবার উপায় নেই। আমার যে আবার আসতে কাটে—যেতে কাটে ; ওদিকে মামাত ভায়ের বৌ, এদিকে খুড়তুতাে বােন! অথচ আমি জানি, জ্যোৎস্নার অত্যন্ত pure character! কিন্তু পাড়াগাঁ—এটা তাে মানতে হবে ? রাজ্যেশ্বর। কেন?—গাঁয়ে কি এই সমস্ত কথা নিয়ে খুব আন্দোলন চলছে ? কালীনাথ। ওদিকে রণেন আর সেই মাগী --আর এদিকে জ্যোৎ আর বিমল ! বিমল-জ্যোৎস্নার নামে যে দুর্ণাম রটেছে, এদের দুজনের বিয়ে দিলেই তা মিটে যাবে। তবে হু-জ্যোৎসা তাহলে আর বাগান- বাড়ীর সম্পত্তিটা পায় না; তবে বিয়ের আগে সে যদি ওটা আপনাকে দান করে তারপর আপনি যদি বিমলের সঙ্গে ওর বিয়ে দেন, তাহলেই বােধ হয় সব দিক র’ক্ষে হয় ! রাজ্যের। আঃ কালীনাথ কালীনাথ-ওসব কথা এখন থাক। আমার ভাল লাগছে না কিছু!
১৩৪
পতিব্রতা
| দ্বিতীয় দৃশ্য
(মাতঙ্গিনীর এবেশ)
মাত। হারে কেলাে ! তােকে আমি কি বল্লাম ?
কালীনাথ। কি বল্লে পিসি ?
মাত। বল্লাম না—এসব কথা রাজুকে বলিস্ নে ? ওর মন ভাল
নেই, শরীর ভাল নেই ?
কালীনাথ। কিন্তু কথাগুলােও তাে ওঁর শােনা দরকার ?
মাত। হ্যা দরকার বৈকি! তােমার আর ভাইপােগিরি ফলাতে
হবেনা-ভারি আমার সুহৃদ কিনা ? তাের এতবড় আম্পদ্ধ, তুই
জ্যোৎস্নার নামে ঠেস দিয়ে কথা বলে আবার এই বাড়ীর চৌকাঠ
মাড়া!
কালীনাথ। আমি তাে সেইজন্যেই ক্ষমা চাইতে এসেছি পিসি।
হঠাৎ সেদিন মাথাটা গরম হয়ে উঠলাে—ফস করে কথাটা মুখ দিয়ে
বেরিয়ে গেলাে পিসি।
মাত। মুখ দিয়ে অমনি বেরিয়ে গেলেই হােল ? রাজুর যেমন কা-
উনি পরামর্শ করবার আর মানুষ পেলেন না! ওটা কি কম শয়তান ?
আমি ওর নাড়ীনক্ষত্র সব জানি। ওর মা-মাগী যদ্দিন বেঁচে ছিল,
তাকে হাড়েহাড়ে জ্বালিয়েছে। তারপর রণেনের স্কন্ধে ভর করেছে
নইলে, কি না ছিল ওদের? বাপের অমন সম্পত্তি তিন-নয়-ছয় করে,
এখন আবার দাদামশায়ের নামে দোষ দেওয়া হয় !
রাজ্যের। আঃ দিদি ! চুপ কর চুপ কর—কি বলছ?
কাশীনাথ। ওসব কিছু-না
কিছু-না কাকাবাবু! পিসি আমায় বড্ড
ভালবাসে! তবে পিসির ওই বকুনি রােগ ! মার কাছে শুনেছি, মাত
পিসির মুখের তােড়ে বিয়ের তিন বছর পরেই পিসেমশায় দেশান্তরী হন--
পঞ্চম অঞ্চ ] পতিতা মাত। একেবারে কাশী দশাশ্বমেধ-ঘাটে গিয়ে সন্ন্যাসী! যদ্দিন বেঁচেছিলেন, পিসির ভয়ে আর দেশমুখাে হন নি ! শুনলে শুনলে রাজু, মুখপােড়ার কথার ছিরি? কি ছেলেরে বাবা ! মুখে ওর কোন কথা আটকায় না ! [ এস্থান। কালীনাথ। আজ তাহলে উঠি কাকাবাবু? পিসি বড্ড রেগেছে! জ্যোৎত্যা কোথায়? তাকে একবার বলে যেতাম—আমি ইচ্ছে করে ওকথা বলিনি, মুখ দিয়ে হঠাৎ বেরিয়ে গেল ! আমারও তাে রক্ত- মাংসের শরীর কাকাবাবু—আমিও কিছু পরমহংস হয়ে উঠিনি? রাগ, দ্বেষ, অভিমান—সবই তাে আছে কিছু কিছু! জ্যোৎস্না, দিদি—একবার এই দিকে এস’তাে ভাই। ( জ্যোৎস্নার প্রবেশ) জ্যোৎস্না। আমি পাশের ঘরেই ছিলাম। বাবার সঙ্গে যে কথা বলেছেন, সবই শুনতে পেয়েছি। কালীনাথ। তা পাবে বৈকি দিদি—পাবে বৈকি! আমি তাে আর লুকিয়ে চুরিয়ে কোন কথা বলিনি? বাপের ব্যাটা হবে-হক কথা বলবে ! কি বলেন কাকাবাবু ? জ্যোৎস্না। আপনি কেন আমার স্বামীর নামে কলঙ্ক রটিয়েছেন ? আজ যে তিনি হাজতে আটক আছেন, তার মূলেও আপনি ! কালীনাথ। আমি তােমার কথা কিছু বুঝতে পাচ্ছিনে জ্যোৎস্না । তােমার স্বামী !—তােমার কোন্ স্বামী ? রণেন—না বিমল ? রাজ্যেশ্বর। কালীনাথ, তােমার ন্যাকামাে অসহ! আমি বুঝতে পাচ্ছি—আজ তুমি আমাদের সবাইকে অপমান করবে বলে এখানে এসেছ।
পতিব্রতা
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
কালীনাথ। আমি আপনাদের ভালর জন্যেই এখানে এসেছিলাম।
আপনারা যদি অন্যরকম বােঝেন-বুঝুন! আমি আর কি করতে পারি ?
ভাল, আমি চল্লাম! তবে যদি বিপদে পড়েন, অভিমান করে থাকবেন
-একটা কাকপক্ষীর মুখে খবর দিলেই আমি চলে আসবে। আমি
আপনাদের কখনাে পর ভাবিনি।
( এছানােত)
(তালার প্রবেশ)
তরল। কালীনাথবাবু, যাবেন না—আমারও একটা কথা আছে।
কালীনাথ। তুমি কে?-তােমায় তাে চিনতে পাচ্ছি না। কোথায়
দেখেছি—বলতাে ? চেনা চেনা বলে মনে হচ্ছে মুখখানা !
তরল। চিনতে খুবই পাচ্ছেন। কিছুক্ষণ আগে যার কথা বলছিলেন
-যাকে রণেনবাবু খুন করেছেন বলে আপনার ধারণা!
কালীনাথ। ওতােমারই নাম তরল? বটে! তুমি বেঁচে আছ ?
খুনের চার্জটা তাহলে ক্যাসে হবে! রণেনকে বাঁচাবার পরামর্শ
করতে এসেছিলাম ; কিন্তু এরা যে তাকে বাঁচাতে চান না—তাতে
জানিনে।
তরলা। রণেনবাবুর বদলে আপনি যে মারা যাবেন?-তার খবর
রাখেন ?
কালীনাথ।
-এখনাে খবর পাই নি ! খবরটা বুঝি তােমার
কাছেই আগে এল ?
তরল। হ্যা, আমার কাছেই আগে এল ! সেই পিস্তলটীর
সন্ধান পাওয়া গেছে-আপনি যেটা কলকাতার গুপে গুপ্তাকে
দিয়েছিলেন!
পঞ্চম অঞ্চ ] পতিব্রতা ১৩৭ কালীনাথ । বেশ তাে - তােমাতে আর গুপে গুণ্ডাতে বােঝাপড়া [ এহান। (তরল। আসিয়া রাজ্যেশ্বর বাবুকে প্রণাম করিল ) রাজ্যেশ্বর। তুমি কে মা ! তরল। আমি আপনার মেয়ে—আপনার কলঙ্কিনী মেয়ে। আমার পরিচয় পেলে আপনি আমায় ঘৃণা করবেন বাবা ? রাজ্যেশ্বর। কলঙ্ক রটতে তাে দেরী হয়না মা! কত সামান্য কারণে কলঙ্ক রটে-বিশেষ স্ত্রীলােকের নামে। আমার কাছে তােমার কোন দরকার আছে মা? তরলা। হ্যা বাবা–আছে। আপনি আপনার জামাইকে বাঁচান--- মেয়েকে বাঁচান! দেখছেন না—মেয়ে আপনার দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে! রাজ্যেশ্বর। আমি কি করবাে মা! বিচারক যদি তাকে দোষী মনে করেন- আমি কি করতে পারি ? তরল। আমি জানি তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ! রাজ্যেশ্বর। আমার বাবাও ছিলেন সম্পূর্ণ নির্দোষ। আমি হাজার চেষ্টা করেও তার জেল আটকাতে পারিনি। তার নিঃশ্বাস শিব- নারায়ণের নাতির মাথায় পড়েছে। ওকে তাে রক্ষে করা যাবে না- ওকে জেল খাটতেই হবে। জ্যোৎস্না। বাবা-আপনি আমায় শাপ দিচ্ছেন। রাজ্যেশ্বর। না মা—তােমায় শাপ দিচ্ছিনে! তােমায় কি শাপ দিতে পারি? তুমি আমার লক্ষ্মী মেয়ে ! আমি জানি, তােমার বুক ভেঙে গেছে। আমার প্রাণ কি স্থির থাকতে পারে মা?
১৩৮ পতিতা [ দ্বিতীয় দৃশ্য জ্যোৎস্না। আপনি কি কিছুতেই তাকে ক্ষমা করতে পারেন না বাবা ? ! রাজ্যেশ্বর। জ্যোৎস্না শােন ! আমি সেই যুগের মানুষ—যখন কলেজে পড়ে লােক ইয়ং বেঙ্গল হত। হিন্দুর যা কিছু আচরণ—আমার কাছে ছিল কুসংস্কার ! আমি ছিলাম একটা আস্ত কালাপাহাড়! তারপর দুর্দিন এলাে—এই ঘটনা ঘটলাে! বাবার জেল হ’লআমাদের নামে কলঙ্ক টলাে, ভিটেমাটি সব উচ্ছন্ন গেল--বাবা জেলে মারা গেলেন। সারাজীবন সুথে কাটিয়ে সত্তর বছর বয়েসে শিবনারায়ণ দত্ত তাঁকে জেলে দিল। তারপর থেকে আমার ধ্যানজ্ঞান হলো শুধু বাবা ! শ্রাদ্ধ করলাম, তর্পণ করলাম! সাত বছর ধরে বাবার কথা ভেবেছি—এখন আমার জীবনে একমাত্র সত্য—“পিতা স্বর্গ পিতা ধর্মঃ পিতাহি পরমন্তপঃ”! আমি পরম হিন্দু হ’লাম—যােবনের সমস্ত কুসংস্কার আজ আবার নতুন করে বিশ্বাস করছি ! আজও প্রতিরাত্রে আমি বাবাকে স্বপ্ন দেখি। ( বিমল পাশের ঘর হইতে আসিল) বিমল। তবে মেয়েকে আধুনিক ক’রবার চেষ্টা করেছিলেন কেন? রাজ্যেশ্বর। বিমল, যে বিশ্বাস আমি নিজে তপস্যা করে পেয়েছি, সেটা কারাে উপর চাপাতে চাইনে। বিমল। কিন্তু জ্যোৎস্না আপনারই মেয়ে। এ যুগের সমস্ত শিক্ষা ওর উপর ব্যর্থ হয়েছে। ওকে স্বামীর কাছে যেতে আদেশ দিন। রাজ্যেশ্বর। আদেশ দিতে হবে ? বিমল। হঁ্যা দিতে হবে। আমি যদি জ্যোত্মাকে পেতাম-ধৰ্ম্ম সমাজ আমি কিছুই মানিনে—আমার জীবন ধন্য হয়ে যেত!—তবু আমিই বলছি—স্বামীই ওর ধ্যান, স্বামীই ওর জ্ঞান, স্বামীর পাশেই ওর যথার্থ খান।
পঞ্চম অঙ্ক ]
পতিব্রতা
রাজ্যের। একটা জায়গায় আমি ভুল করেছি বিমল! আমার
মনে ছিল না, জ্যোৎস্না মেয়েছেলে নয়!
বিমল। আপনি আদেশ দিন—জ্যোৎস্নার উপর রাগ করবেন না !
রাজ্যেশ্বর। না-রাগ করব না! কার উপর রাগ করবাে
বিমল? কিন্তু কার কাছে যাবে জ্যোৎস্নাস্বামী তাে ওর জেলে!
তরলা। আমার ধারণা, উনি দেখা করলেই তার মতিগতি অন্য
রকম হবে--তিনি বাঁচবার চেষ্টা করবেন !
রাজ্যেশ্বর। বাবার চেষ্টা করলেই বাঁচা যায়—এই কি তােমার
ধারণা মা? জীবন সম্বন্ধে তােমার কোন অভিজ্ঞতা হয়নি মা!
জ্যোৎস্না। আমি তার সঙ্গে দেখা করতে যাব বাবা! আপনি
আদেশ দিন।
রাজ্যেশ্বর। বেশ, আমি তােমায় আদেশ দিচ্ছি—তুমি যাও
( জ্যোৎস্না পিতার পায়ের ধুলা লইয়া দাঁড়াইল)
রাজ্যেশ্বর। এবাড়ীতে আর ফিরে এস না। আজ থেকে তুমি এ
সংসারের কেউ নও!
জ্যোৎস্না। বাবা-
রাজ্যেশ্বর। আমি তােমায় অভিশাপ দিচ্ছিনে! যদি ভগবানের
কাছে প্রার্থনা করা সম্ভব হতাে, আমি প্রার্থনা করতাম—স্বামীর ঘরে
তুমি সুখে স্বচ্ছন্দে থাক। কিন্তু সে প্রার্থনা আমি করতে পারিনে।
জ্যোৎস্না। বাবা-
রাজ্যেশ্বর। না না—এ মান-অভিমানের কথা নয় মা ! এখানে
আর আমাদের কারাে সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই ! আমি আলাদা-তুমি
আলাদা-তােমার ধর্ম তুমি পালন কবে—আমার ধর্ম আমি পালন
কব! বেশ—তুমি যাও।
১৪০
পতিব্রতা
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
[ জ্যোৎস্না ধীরে ধীরে চলিয়া গেল। সুধাংশু কখ আসিয়া একপাশে
দাড়াইয়াছিল ; বিমল চলিয়া গেলে সে পিতার নিকট আসিল। ]
সুধাংশু। বাবা—দিদি চলে গেল ?
রাজ্যেশ্বর। ঠা, চলে গেল।
সুধাংশু। কোথায় গেল?
রাজ্যেশ্বর। জানিনে—তবে এ বাড়ীতে আর ফিরে আসবে না।
সুধাংশু। সে কি বাবা ?কেন আসবে না ?
রাজ্যেশ্বর। এখন শুধু তুমি আর আমি রইলাম সুধা। আমরাও
এখানে থাকবাে না আর! তারপর আমিও যাবাে- তখন থাকবে তুমি
একা ! যাবার সময় আমার একটী আদেশ থাকবে—তুমি কখনাে
তােমার দিদির মুখ দেখ না; যদি দেখা হয়, মুখ ফিরিয়ে নেবে। জেনাে
—ও আমাদের কেউ নয় ।
সুধাংশু। বাবা, দিদি আমাদের কেউ নয় ?
রাজ্যেশ্বর। কেউনা সুধা—কেউনা ও শিবনারায়ণের নাতবৌ-
ও আমার মেয়ে নয় !
তৃতীয় দৃশ্য আলিপুর হাজতঘর-রণেন্দ্র ও কালানাথ। কালীনাথ। আমার সাধ্যে যা কুলােয়, তা তাে করেছি ভাই। জলের মত টাকা খরচ করে ভাল ভাল উকিল দিচ্ছি; কিন্তু আজ যা শুনলাম, তাতে তাে আমি একেবারে হতভম্ব হয়েছি। কি যে ক’রবাে- কিছুই তাে বুঝতে পাচ্ছিনে! রণেন। কি হলাে আবার । কালীনাথ। কি শত্রুই জুটেছে তােমার শ্বশুর ! আমার সেই দিনই সন্দেহ হয়েছিল—আমাদের পক্ষের উকিলকে ঘুষ খাইয়েছে রাজ্যের বােস! তােমার পক্ষের উকিল নইলে বলে বসলে—তুমি বিপ্লবীদের দলে ছিলে ! একি কেউ কখনাে বলে ? এখন আমি কাকে বিশ্বাস করি, আর কাকে অবিশ্বাস করি—তাই বল ? রণেন। তােমায় কিছু করতে হবে না কাদা! উকিলের কোন দরকার নেই। তােমরা শুধু অনুগ্রহ করে আমার সঙ্গে দেখা করতে এস না। আমি যতক্ষণ একা থাকি–বেশ থাকি। কাশীনাথ। এ তােমার অভিমানের কথা ভাই! অবিশ্যি, অভিমান হওয়াই স্বাভাবিক; নইলে স্ত্রী কার শক্র হয় ? সে নিজে উঠে পড়ে লেগেছে, যাতে তােমার ফাসি হয়—তাই নাকি করবে! সেই ব্যারিষ্টার- ছােকর হাত ধরে দিনরাত বেড়াচ্ছেন-ইংরিজি লেখাপড়া-শেখা বিদুষী—দেখলে হাড় জ্বলে যায়! বাপ-বেটীতে মিলে এমনি ক'রে সংসারটাকে ছারে খারে দিলে গা ! তবে আমিও দেখে নেব—আমিও শীগগির মরছি নে! আমিও বােস বংশের ছেলে। আমার নিজের ভাই নেই, একটা মাত্র ভাই-মায়ের আপন সহােদরের ছেলে। তুই কি ! t ।
১৪২
পতিব্রতা
[ তৃতীয় দৃশ্য
••
আমার কম যত্নের ধন? তােকে যারা মারবার চেষ্টা ক’চ্ছে, আমি
তাদের কখনাে ক্ষমা করবে না।
রণেন। কালদা! তােমরা মর বাঁচ, মারামারি কর কাটাকাটি
কর, মামলা-মােকদ্দমা কর—যা খুসী করতে পার ; আমায় সে কথা
শােনাতে এস কেন রােজ রােজ ?-আমার কারাে সঙ্গে কোন সম্পর্ক
নেই—তােমার সঙ্গেও না, রাজ্যের বােসের সঙ্গেও না, তার মেয়ের
সঙ্গেও না। আমি নিঃসঙ্গ-একাকী! এখানকার আসামীরাই আমার
সব চেয়ে আপনার। তুমি যাও কাদা—আর এখানে এসে না।
কালীনাথ। তুমি যেতে ব’লছ—চলে যাব বৈকি ভাই! আসতে
বারণ করছ-বেশ, আর আসবে না; কিন্তু এইটুকু তুমি বুঝতে পারলে
ভাই—তােকে ভালবাসি বলেই বার বার আসি। নাড়ীর টানে যে
টেনে আনে! আমি যে ক'দিন আছি, বিরক্ত একটু করবাে ; আমি মরে
গেলে—তখন আর কেউ বিরক্ত করতে আসবে না।
রণেন। নানা কাদা! তুমি দুঃখ ক’র না—আমার মন-মেজাজ
ভাল নেই দাদা! হঠাৎ তােমায় রূঢ় কথা বলে ফেলেছি—আমায় ক্ষমা
কর দাদা !
কালীনাথ। তাের উপরে কি আমি কখনাে রাগ করেছি ভাই—যে
আজ ক্ষমা করব ? এতবড় রাজার সম্পত্তি-একটা ছেলে নেই যে,
ভােগ করে ? তখন তােকে এত করে বুঝিয়ে বল্লাম ভাইও রাজ্যের
বােস ভয়ানক লােক! ওদের বাপ-বেটীর মনের অন্ত তুমি পাবে ?
রবেন। ও কথা থাক কাদা! তুমি অন্য কথা বল।
কাশীনাথ। আর কি বলব? আমার যে প্রাণের ভিতর হু-হু
করে অলে যাচ্ছে ভাই! তুমি দানই কর আর যাই কর—ও বাগানবাড়ীর
সম্পত্তি আমি রাজ্যেখমের মেয়েকে ভােগ করতে দেব না। শিবনারায়ণ
পঞ্চম অঙ্ক ] পতিব্রতা ১৪৩ দত্তর সম্পত্তি ভােগ করবে সেই দ্বিচারিণী বেশ্যা?-আর আমি তাই বেঁচে থেকে দেখবাে ? রণেন। উঃ-মাগো! তুমি যা হয় করে—আমায় কিছু জিজ্ঞাসা করাে না। কালীনাথ । রাজ্যেশ্বর যদি সেই ছেড়াটার সঙ্গে মেয়েটার বিয়েও দিত, তাহলেও না হয় বুঝতাম। কাউকে কেয়ার করেন না। আবার এমন বেহায়া, আমায় হাসতে হাসতে বলা হচ্ছে—আমার এই বন্ধুটা খুব ভাল ব্যারিষ্টার ; ইনি যদি আমার স্বামীর মােকদ্দমার তদ্বির করেন- আপনাদের কোন আপত্তি আছে? আমার রাগে সৰ্ব্বশরীর জলে গেল। আমিও মুখের উপর জবাব দিয়েছি—বল্লাম, “কেন?—ত্রিসংসারে আর ব্যারিষ্টার নেই নাকি ? কালীনাথ বােস আজও বেঁচে আছে- শিবনারায়ণ দত্তর সম্পত্তি এখনও বজায় আছে।” ( জেল-সুপারিন্টেণ্ডেন্টের প্রবেশ ) জেলসুপারিন্টেন্টে। রণেনবাবু?—আপনার স্ত্রী আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। রণেন। আপনি আমায় আমার ওয়ার্ডে নিয়ে চলুন—আমি আর কারও সঙ্গে দেখা করবাে না আজ সুপারিন্টেন্টে। সে কি রণেনবাবু? মেয়েটাকে দেখে মনে হলাে সাক্ষাৎ লক্ষ্মী! তাঁর সর্বাঙ্গ কাপছে—ভাল করে দাড়াতে পাচ্ছেন না। একটা ভদ্রলােক, বােধ হয় তার ভাই হবেন—তিনি সঙ্গে আছেন। কালীনাথ। (রণেনের প্রতি) ওই—সেই। তাকে এখন পর্যন্ত সঙ্গে করে এনেছে ? কি ভয়ানক স্ত্রীলােক রে বাবা—খুরে খুরে নমস্কার।
১৪৪
পতিব্রতা
[ তৃতীয় দৃশ্য
সুপারিন্টেন্টে। আপনি কে মশায় ?—ভদ্রলােকের স্ত্রীর সম্বন্ধে
তাঁর স্বামীর কাছে এই রকম মন্তব্য করছেন! যা বলতে হয়, আপনি
বাইরে বলবেন ; এখানে ওরকম কথা বলবেন না !
কালীনাথ।
ভেতরের কথা কিছু কিছু জানি বলেই বলছি-নইলে
আমি বা কেন বলতে যাব ? আমার দরকারই বা কি?
সুপারিন্টেন্টে। মশাই! আমরাও কিছু কিছু মানুষের চরিত্র
জানি। আজ বিশ বছর এই কাজ করছি—ভালমন্দ মানুষ দেখলেই
বুঝতে পারি। রণেনবাবু! আপনি কারােও সঙ্গে দেখা করতে চাননা
—তা জানি; সেইজন্যে এমনিই তাকে বিদায় করে দিচ্ছিলাম। কিন্তু
মেয়েটা বড় কাঁদতে লাগলাে। আমি আপনাকে অনুরােধ করে বলছি,
আপনি একটাবার তাঁর সঙ্গে দেখা করুন।
রণেন। আচ্ছা যান-নিয়ে আসুন।
[ সুপারিন্টেন্টের প্রস্থান ।
রণেন। কাদা! এইবার তােমায় যেতে হবে।
কালীনাথ। একবার ইচ্ছে ছিল, দাড়িয়ে শুনি—কি কথা বলে ?
রণেন। তােমার থাকবার আইন নেই তুমি যাও !
কালীনাথ। আচ্ছা; তােক ছেড়ে যেতে কি পা ওঠে-না মন চায় ?
জেল অবিশ্যি তাের হবেই-তবে বছর দশেকের ভিতর যদি হয়, তবেই
বুঝি গুরুবল ! যদ্দিন ফিরে না যাবে, আমায় ভরতের মত শূন্য পুরীতে বসে
তােমার রাজি আগলাতে হবে। কাল রাতে তাই ভগবানের নাম করে
বলছিলাম—ভগবান! আমার এ শাস্তি কেন ?—আমি তাে চাইনি।
(সুপারিন্টেন্টের সঙ্গে বিমল ও জ্যোৎস্নার প্রবেশ)
বিমল। এস বােন—এস! তুমি যে কাপছ জ্যোত্য? বােস এই
চেয়ারে।
পঞ্চম অঙ্ক ]
পতিব্রতা
১৪৫
সুপারেন্টেণ্ডেন্ট। আপনি এখনাে এখানে দাড়িয়ে আছেন ?—চলে
যান এখান থেকে।
কালীনাথ। যাচ্ছি মশায়—যাচ্ছি! আচ্ছা রণেন, তাহলে আসি।
( জ্যোৎস্নাকে লক্ষ্য করিয়া রণেন্দ্রের প্রতি) ঢং দেখে আর বাচিনে।
বলে—“যাদু জান কত রঙ্গ, ধান ভান, চিড়ে কোট, বাজাও মৃদঙ্গ।”
[ প্রস্থান।
সুপারেন্টেন্টে। রণেনবাবু! এই ভদ্রলােকটি প্রায়ই আপনার
কাছে এসে থাকেন। আপনি জানবেন, উনি আপনার বন্ধু নন—শত্রু।
বিমলবাবু! স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন—এখানে অন্য লোেক
থাকার কথা নয় ; লােকাচারও নয়--আইনও নয়; কিন্তু আপনার
বােনের শরীর ও মনের যে অবস্থা দেখছি,—বিশেষ, এদের স্বামীস্ত্রীর
ভিতর যে সম্প্রীতি নেই—একথা বােঝা কঠিন নয়; এরূপ ক্ষেত্রে আমার
ইচ্ছা নয়, রণেনবাবুর স্ত্রী একা থাকেন। আমি আপনাকে এখানে
থাকতে অনুমতি দিচ্ছি। যদি বুঝতে পারেন, ইনি বেশ প্রকৃতিস্থ
হয়েছেন—তখন আপনি বাইরে চলে যাবেন I depend on your
discretion.
বিমল। Thanks. Much obliged !
[ সুপারিন্টেন্টে, প্রস্থান করিল।
( সকলে কিছুক্ষণ নীরব থাকিল ; রণেন্দ্র বিমল ও জ্যোৎস্নাকে দেখিল)
রণেন।-আপনার নাম বিমলবাবু ?
বিমল। হ্যা।
রণেন। কি কতে এসেছেন আপনি?
বিমল। জ্যোৎস্না একা আসতে পারছিলেন না—আমি সঙ্গে করে
এনেছি।
১৪৬
পতিতা
[ তৃতীয় দৃশ্য
রণেন। আপনি বুঝি আজকাল জ্যোৎস্নার সব চেয়ে বড় বন্ধু ।
আপনিই ওঁকে আগলে নিয়ে বেড়ান?
বিমল। আপনি কাকে অপমান করতে চান ? আমাকে না
জ্যোৎস্নাকে ?
রণেন। আমি কাউকে অপমান করতে চাইনে। আমি একা
থাকতে চাই।
বিমল। আপনার স্ত্রী আপনার সঙ্গে দেখা ক’রুতে এসেছেন।
রণেন। দেখা তাে হয়েছে—এইবার আপনি ওকে নিয়ে যান।
বিমল। আপনি ওঁর সঙ্গে কথা কইবেন না?
রলেন। আমার তাে কইবার মত কোন কথাই নেই! সংসারে
কারও সঙ্গে কোন সম্পর্ক আমার নেই—আপনারা যেতে পারেন।
বিমল। আপনি এতখানি heartless জালে আমি জ্যোৎঙ্গাকে
সঙ্গে করে এখানে আতেম না!
রণেন। হার্টের গুমাের আর করবেন না বিমলবাবু!—কি মূল্য
আছে হার্টের? মানুষের হৃদয়ের ভাবকে আমি একদিন খুবই বড় করে
দেখতাম। আজ বুঝেছি, ওর কোন মূল্য নেই। আমার হৃদয় ভেঙে
গেছে! আঘাত দিতে কেউ টা করেন নি—এই জ্যোৎস্নাময়ী দাসীও
! আপনারও কিছু অংশ আছে। কিন্তু তাতে কি হয়েছে ?
আমি বেঁচে আছি। আরও আঘাত যদি আপনারা করেন, তারপরও
বেঁচে থাকবাে।
বিমল। আপনি কি বলছেন রণেনবাবু? জ্যোৎস্নাকে আমি ছােট
বেলা থেকে দেখছি। ওর বাপ আমার সঙ্গে ওর বিয়ের প্রস্তাব করেন।
তখন আমার অমতের কোন কারণই ছিল না। আমি জানতেম—উনি
কুমারী। আমি সেইজন্যই এসেছিলাম। কিন্তু যখন শুনলাম ওর বিয়ে
পঞ্চম অঙ্ক ]
পতিব্রতা
১৪৭
;
হয়েছে, সেই দিন থেকে আমি ওঁর বড় ভাই—ওঁর বন্ধু। আমি কিছু
মানি নে; কিন্তু আপনার স্ত্রীর আচরণ দেখে বুঝেছি—সতীধৰ্ম্ম বাঙ্গালীর
মেয়ের কাছে কত বড়! ইহজীবনের কোন সুখের প্রলােভনে এ ধৰ্ম্ম
তারা ছাড়তে পারে না—আজ আমার এই বিশ্বাস।
রণেন। স্বামীস্ত্রীর সম্বন্ধ—সাংসারিক সম্বন্ধ। যারা সংসার কমবে,
স্ত্রীর পাতিব্ৰত্য সম্বন্ধে তারাই আলােচনা করুক। আমি ফৌজদারী
মােকদ্দমার আসামী—আমি সমাজেরও নই, সংসারেরও নই।
বিমল। ফৌজদারী মােকদ্দমার আসামী হলেই মানুষের জাত যায়
। বিশেষ, আপনার অপরাধ এখনাে প্রমাণ হয় নি। কত সামা
কারণে—বিনা দোষে মানুষের দণ্ড হয়েছে। সেজন্য তাদের স্ত্রীপুত্র,
বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সম্বন্ধ লােপ হয় না। তবে আপনি যদি এই সুযােগে
স্ত্রীর সঙ্গে সম্বন্ধ লােপ করতে চান, সে অবশ্য অন্য প্রশ্ন ! আপনি স্বামী
ইচ্ছা করলেই পারেন।
জ্যোৎস্না। বিমলদা, আপনি বাইরে আমার জন্যে অপেক্ষা করুন।
আমি ওঁকে একটি কথা বলে চলে যাব।
বিমল। আচ্ছা ; নমস্কার রণেনবাবু! আমার মিনতি, ইচ্ছে করে
নিজের জীবন আর আপনার সাধ্বী স্ত্রীর জীবন-এভাবে নষ্ট
;
করবেন না।
[ এখান।
(দুইজনই কিছুক্ষণ নীরব)
জ্যোৎস্না। তুমি কি আমার সঙ্গে কথা কবে না?
রণেন। আমার যা কিছু বলবার ছিল, একদিন তােমায় নিঃশেষে
বলেছি। আজ আর বলবার মত কোন কথা নেই।
জ্যোৎস্না। আমি তােমার কাছে এসেছি-বাবাকে ছেড়ে, বাবাকে
১৪৮
পতিব্রতা
[ তৃতীয় দৃশ্য
সুধাকে চিরদিনের মত কাঁদিয়ে। আর সেখানে ফিরে যাব না—আমার
যাবার পথ বন্ধ।
রণেন। আরও সংসারে সমাজে লােকালয়ে ফিরে যাবার পথ
বন্ধ—তুমি নিজের চোখেই দেখছে। আমি কি করতে পারি ?
জ্যোৎস্না। তবু তুমিই আমার একমাত্র আশ্রয় ! আমি যে কত
নিরুপায়, তা জেনেও তুমি আমার উপর অভিমান করে থাকবে?
( পায়ের কাছে বসিয়া পড়িল)।
রণেন। আমি কতদিন তােমায় পাবার স্বপ্ন দেখেছি। আমার
সে স্বপ্ন বার বার ভেঙ্গে গেছে। এ কি! পায়ের কাছে পড়ে
কেন ?
জ্যোৎস্না। থাক্-আমি এইভাবেই বেশ আছি! তুমি ব্যস্ত
হয় না; তুমি বস। তুমি আমার উপর অভিমান করে কেন এমন
মিথ্যে কলঙ্কের মধ্যে নিজেকে জড়ালে ? আমার জন্যে তুমি এখানে
এ কথা ভাবতে যে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে !
রণেন। মিথ্যে কলঙ্ক—তােমায় কে বলেছে জ্যোৎস্না ?
জ্যোৎস্না। আমার মন। আমি চিরদিন জানি, আমার স্বামী
নিষ্কলঙ্ক।
রণেন। নির্দোষী কাশীশ্বর বােসকে শিবনারায়ণ দত্ত জেলে
দিয়েছিলেন। তােমায় পাবার জন্যে আমি সে পাপের প্রায়শ্চিত্ত
ক’তে চেয়েছিলাম। তখন বুঝতে পারিনি, প্রায়শ্চিত্ত এইভাবে
আসবে!
জ্যোৎন্সা। আমায় ডেকেছিলে, আমি তখন আসতে পারি নি-
আমি তােমার কাছে অপরাধী! এখন আমি শুধু জানতে চাই, তুমি
আমায় স্ত্রী বলে স্বীকার করবে কি না?
পঞ্চম অঙ্ক ]
পতিব্রতা
১৪১
রণেন। তুমি আমার স্ত্রী। আমি কতদিন তােমায় চেয়েছি
পাইনি! আজ তুমি নিজে এসেছ—আজ আমার তােমায় নেবার
উপায় নেই !
( গুপে গুণ্ডা, কালীনাথ, সনাতন ও তরল প্রবেশ করিল)
গুপে। আরে—এসই না কালীবাবু! এক সঙ্গে যাব।
কালীনাথ। এ মাগীটা আবার কোখেকে এসে জুটলাে রে গুপে?
তরলা। আশে পাশেই ছিলাম-আপনি দেখতে পান নি।
কালীনাথ। ও-বটে! (রণেনকে দেখাইয়া গুপের প্রতি) এই তাে
তাের রণেনবাবু। তােরা কি কথাবার্তা কইবি ক—আমি চল্লাম।
গুপে। আরে—একটু দাড়াওনা কালীবাবু ? কিসের এত ভয়?
কালীনাথ। ভয় আবার কিসের ? বেলা হয়ে গেছে যে-নাইতে
খেতে হবে না ?
গুপে। না-হয় আজ এইখানেই নাওয়া খাওয়া করবে ?
( বিমল ও জেল-সুপারিন্টেণ্ডেন্টের প্রবেশ )
বিমল। (কালীনাথকে দেখাইয়া ) He is the real culprit;
আর, ( গুপেকে দেখাইয়া ) এই লােকটাই সব জানে।
জেল-সুপা। Oh, I sse! Thats all right. ( গুপেকে লক্ষ্য
করিয়া) ওহে! শােন—মােকদ্দমা সম্বন্ধে তুমি কিছু বলতে চাও?
গুপে। ( প্রস্থানােত কালীনাথের প্রতি) এই কালীবাবু—কোথা
যাও বাবা?—তােমায় সাপের গর্তে পুরেছি বাবা! সুপারেন্টেন্টেবাবু
- দুজন কনেষ্টবল ; এই বাবুটাকে একটু নজরবন্দী রাখবে।
কালীনাথ। আরে গেল যা—এটা যে ভারি বাড়াবাড়ি করে
তুললে ! বেটা ছটাকে মাতাল
পতিব্রতা
[ তৃতীয় দৃশ্য
আছে ।
জেল-সুপা। (প্রস্থানােত কালীনাথের প্রতি) সেকি আর হয়
মশাই! ( ইঙ্গিত করিল-কনেষ্টবল কালীনাথের কাছে গেল)।
( গুপের প্রতি ) তুমি বল, তােমার কি বলবার আছে—আমি লিখে
নিই।
গুপে। ব’ছি স্যার—সব ব’ছি! আপনি আগে ওঁকে গ্রেপ্তার
করুন। (কনেষ্টবলের প্রতি) এইবার এস তাে ভাই ! আমার হাতদুটো
বাঁধ ধাঁধ বাঁধ-লজ্জা করে না। আমার হাতে লাগবে না—অভ্যেস
এর আগে দুবার হয়ে গেছে। এইবার একবার জজ
সাহেবের কাছে চল—ঘুরে আসি। ( জ্যোৎস্নার প্রতি) মা-লক্ষ্মী!
ভেবেছিলাম, সত্যি কথা আমার মুখ দিয়ে বেরুবে না--এই কালীনাথ
বাবুর জন্যে আমার বােধ হয় তাও বলতে হবে !
কালীনাথ। মুখ সামলে কথা ববি গুপে-বড় বাড়িয়ে তুলেছ
রাঙ্কেল!
গুপে। আমাকে এখন রাস্কেল বলল না কালীবাবু! আমি এখন
তােমার জীয়ন-কাঠি মরণ-কাঠি! রণেনবাবু, সেদিন আমায় আপনি
খুব গালাগাল দিয়েছিলেন; কিন্তু কাকে আগে তাড়ানাে দরকার ছিল,
সেটা আজই জানতে পারবেন !
জেল-সুপা। তুমি যে কি বলবে বলেছিলে ?
গুপে। আসুন না স্যার—একেবারে জজ সাহেবেব কাছে গিয়ে
বলি? এখানে বল্লে কালীবাবুর বড় লজ্জা হবে যে! আনুন
আনুন, আপনারা যা ভাবছেন—তার চেয়ে ঢের বেশী । আমিই কেবল
জানি সব কথা !
জেল-পা। জজের কাছে গিয়ে সব সত্যি কথা বলরে তাে তুমি ?
গুপে। আমি একবার চেষ্টা করে দেখবাে স্যার! তবে অভ্যেস
পঞ্চম অঙ্ক ]
পতিব্রতা
নেই—যদি মুখ দিয়ে না বেরােয় ; তাই তাে বলছি মাজী! তুমি সামনে
থেকো, তাহলেই পারব। তবে আমায় দুটী বছর ঠেলবে বাবু
তা ঠেলুক ; আপনি একটু সহায় থাকবেন স্যার—আমায় আর কালী-
বাবুকে একথানিতে জুড়ে দেবেন! সােদা-আছ তত ভাই ?
সােনা। ঠিক আছি ভাই—ঠিক আছি!
গুপে। ব্যস-এইবার কুইক মার্চ! নিয়ে চলুন স্যার।
[ তলা, জ্যোৎস্না ও রণেন ব্যতীত সকলের প্রস্থান।
(জ্যোৎস্নার প্রতি) আমি তােমার জন্যে বাইরে দাড়িয়ে
আছি। (রণেনের প্রতি) আপনি আমার মুখ দেখবেন না। আমি
আপনার দুষ্ট গ্রহ।
[ স্থান।
রণেন। তুমি কি চলে যাচ্ছ জ্যোৎস্যা?
জ্যোৎস্না। কোথায় যাব?—আমার তাে যাবার জায়গা নেই আর।
আমি সমস্ত দিন এই আদালতেই থাকবে।
রণেন। তারপর, যখন আদালত বন্ধ হয়ে যাবে—তখন কোথায়
যাবে ?
জ্যোৎস্না। আমার বিশ্বাস, তার কাগেই তুমি মুক্তি পাবে।
রণেন। যদি মুক্তি না পাই—তােমার ঠাকুর্দার অভিশাপ আমার
মাথায়।
জ্যোৎঙ্গা। আর আমার ভয় নেই—তুমি আমায় স্ত্রী বলে স্বীকার
করেছ! আমি সঙ্কটার ব্রত নিয়েছি, আমি সত মায়ের সতী কন্যা
আমার পূজো মিথ্যে নয় ! এই নাও, তােমার কপা. মায়ের সিদূরের
টিপ দিয়ে দিই—মা সঙ্কটা তােমায় এ সঙ্কটে রক্ষা কবেন।
পতিব্রতা
[ তৃতীয় দৃশ্য
( বিমলের প্রবেশ)
বিমল। তমার সঙ্কটাতের গুণ আছে জ্যোৎস্না! তােমার সঙ্কটা
মা মুখ তুলে চেয়েছেন—আর ভয় নেই! রণেনবাবু, গুপে সব স্বীকার
করেছে। আপাততঃ আপনি জামিনে খালাস! তারপর আদালতে
প্রমাণের ভার আমার উপর। রণেনবাবু-Cheer up my friend !
Now you are a free man, (সােনাতন প্রবেশ করিয়া “দাদাবাবু,
দাদাবাবু” বলিয়া রণেন্দ্রকে জড়াইয়া ধরিল)
সােনা। মামী! আর তত তােমায় ছাড়বােনা মা; এইবার
ঘকে চল—ঘরের লক্ষ্মী।
বিমল। সােনা—আমায় যে আর দেখতেই পাচ্ছ না?
সােনা। দেবৃতা দেবতা—তুমি দেবতা!
( জ্যোৎস এথমে স্বামীকে পরে বিমলকে প্রণাম করিল)
বিমল। থাক থা—আমায় ওসব কেন? যা-নেহাৎ যখন প্রণাম
করলে, তখন একটা আশীৰ্বাদ তাে করতে হয় ? আচ্ছা আচ্ছা
জএয়ােস্ত্রী হও, পাকা চুলে সিদূর পর—আর ইংরিজি লেখাপড়াটা
ভুলে যাও ; ওটার সঙ্গে সঙ্কটাতের মিল নেই।
( জেল-সুপারিন্টেন্টে কালীনাথকে হাতকড়া লাগাইয়া লইয়া আসিল।
জেলা-সুপা। রণেনবাবু—আপনি তাে চলে যাচ্ছেন।
যাচ্ছেন। আপনার
শূ হান আপাতত আপনার মাননীয় কাদা পূর্ণ করবেন। আসুন
কালীবাবু! আপনার আবার এখনাে নাওয়া খাওয়া হয় নি।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.