Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Bhubanmohini Prativa,part.2

Mookhopadhya,nobinchandra Ed. · 2009/12/23

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

ভুবনমােহিনী
প্রতিভা।
EDITED AND PUBLISHED BY
NOBINCHANDRA MOOKHOPADHYA.
দ্বিতীয় ভাগ।
আলবার্ট পেস্।
৩৭, মেছুয়াবাজার ধ্রুই, কলিকাতা।
শকাব্দা ১৭৯৯

No text on this page.

বিদ্বজ্জনবান্ধব
শ্ৰীযুক্ত কুমার রাজেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী
বাহাদুরের
এই গ্র
হৃদয়ের পবিত্র শ্রদ্ধা স্বরূপ উপহার
প্রদত্ত হইল।
ভাদ্র, ১৭৯৯ শকু।

No text on this page.

সূচিপত্র।
প্রবন্ধ।
পৃষ্ঠা।
অসুবােৎপীড়িত সুরলক্ষ্মী
ভারত-রাজলক্ষ্মী
১১
•••
২০
লক্ষ্মী রাণীর হৃদয়ােচ্ছাস
ইন্ট্রালয়-দর্শনে
২৯
::
পরাধীনের প্রণয়
৪৩
কে তুমি ?
মহাপ্রলাপ
দার্শনিক সংসার
সরস্বতী পূজা
৭৯
শ্মশান-দর্শনে
•
لا
পিতৃতর্পণ
অবনী-বৈচিত্র্য
•••
১০২
আশা-মরীচিকা
‘পহার

No text on this page.

ভুবনমােহিনী প্রতিভা
অসুবােৎপীড়িত সুরলক্ষ্মী
১
এস, সুরবাসি, প্রাণের সােদর
এস, প্রাণ ভরি’ করি আলিঙ্গন ;
এস, ভাই, সবে এক প্রাণে মিশি,
এক দুঃখে করি অশ্রু বিসর্জন।
২
এক সুখে ভাসি, এক মুখে হাসি,
এক বাক্যে সব প্রকাশি বেদনা ;
এক মৰ্মে গলি, এক প্রেমে ঢলি,
এক মন্ত্রে হই দীক্ষিত ; সাধনা
এক প্রতিজ্ঞায়, একই উদ্দেশে ;
একের উদ্বেগে অপরে বিকল ;
একের কারণে, সহস্র পরাণে
সাধিব প্রতিজ্ঞা-সাধিব মঙ্গল।

IN
ভুবনমােহিনী প্রতিভা
৪
এস, ভাই! এস, এক মদে মাতি,
এক পথে সবে করি বিচরণ ;
এক উৎসাহেতে হই উৎসাহিত,
এক বাক্যে করি প্রতিজ্ঞা সাধ
৫
এক বলে বলী, এক দম্ভে চলি,
এক হুহুঙ্কারে হুঙ্কারি সকলে ;
এক পরিণাম, এক পথে গতি,
এক পরকাল নিয়তি-শৃঙ্খলে
৬
শৃঙ্খলিত নিত্য ; এক পরমাণু,
এক রক্তে মাংস, এক বীর্ষে বল,
একই সঙ্কল্প সাধিব সাধিব,
গাইব গাইব বিজয়-মঙ্গল !
৭
লভিব লভিব বাঞ্ছা-কল্প-ফল,
উপাড়ি’ সুমেরু ভাসা’ব সাগরে,
বজ-বৃষ্টি-শিলা-বাত-উল্কাপিণ্ড
বক্ষঃস্থল পাতি’ সব অকাতরে ।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
৩.
৮
এস, ভাই! দেখ, অন্তর্ভেদি-দৃষ্টে
মরমে মরমে জ্বলে কি দহন।
দেখ, ভাই। দেখ, হৃদয়-ভিতরে
অনলের কালি পড়িতে কেমন ?
৯
এস, ভাই । মথি অদৃষ্ট-সাগর ।
উঠিবে উঠিবে অমৃত-আধার ;-
এস, সুধাপানে হইয়া অমর,
জয় জয় শব্দে কঁপাই সংসার।
F
১০
সাগরে গরল উঠিতেও পারে ;
উঠুক গরল-ভয় কি তাহাতে ?
দেবের অমৃত দেবতারা পাবে,
অসুরের ভক্ষ্য ল’বে অসুরেতে।
বাটিব অমৃত নিজ হস্তে আমি,
এক বিন্দু নাহি হবে অপচয় ;
অসুরে অর্পিয়া গরলের ভাণ্ড,
কৌশলে নাশির শত্রু সমুদয়।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা ।
১২
এই পাগলিনী এলাইয়া বেণী,
বসিল শ্মশানে শব-সাধনায় ;
যা’ করে করালী, যা’ করে মা কালী,
সাধিব মঙ্গল স্থিরপ্রতিজ্ঞায়।
যত দিন এই অদৃষ্ট-জলধি
লঙ্ঘিতে না পারি, তত দিন আর
ফিরিব না গৃহেবাধিব না কেশ
আহার বিহার বিলাস ব্যভার
১৪
করি’ পরিহার রহিব শ্মশানে।
সন্ন্যাসিনী বেশে সাধিব সাধনা ;
ত্যজিয়া বসন, পরিব বল্কল,
মাখিব বিভূতি-করি’ছি বাসনা !
ত্রিশূল কেবল সহায় শ্মশানে।
নিশা দ্বি-প্রহরে ঘাের অন্ধকারে
মহাঘােরে মাতি’ গম্ভীরে গাইব ;
হেরিব সুনীল নীরদ অম্বরে

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
নীরদবরণী, আলুয়িত বেণী,
উলঙ্গী, অধরে হাসি বিকসিত ;
স্থিরশান্তি-মাখা সদানন্দময়ী
স্থিরসৌদামিনী ! সুধাংশু-জড়িত
১৭
নীলাজ বদনে সুধার আঘ্রাণে "
প্রমত্ত ভ্রমর ভ্রমরী ঝঙ্কারে ।
মুক্তমেঘকেশী শান্তিময়ী শ্যামা
বরাভয় দিয়া তুষিবে আমারে !
১৮
উঠ, ভাই! বুক বান্ধ ধৈৰ্য্যগুণে,
আশ্বাসে শীতল হইয়া সকলে ;
এক দুঃখে গলি, করি’ গলাগলি,
এস, ভাই। সবে কঁদি প্রাণ খুলে।
ত্যজ আত্মপর, বিদ্বেষ, মূঢ়তা,
ত্যজ অভিমান, ভীরুতা, আলস্য,
দাসত্ব-শৃঙ্খল ছিন্ন করি’ ফেল,
কারামুক্ত হও ত্যজিয়া ঔদাস্য!

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
২০
এস, কাৰ্য্য-ক্ষেত্রে হই অবতীর্ণ,
সত্য-ক্ষেত্রে বুনি বিবেকের বীজ।
সাহস-সলিল সিঞ্চি’ অবিরাম
চতুৰ্বর্গ ফল করি সজীবিত।
২১
দেবের সন্তান-দেবতা আমরা
আমাদের তুল্য আছে কে সংসারে ?
আমাদের সঙ্গে সমকক্ষতায়
জিনেছে কে কবে ভুবন ভিতরে ?
২২
এত কোটি দেবে একে একে যদি
খসা’য়ে সুমেরু-প্রস্তর কেবল
সাগরেতে ফেলি, হ’বে সমভূমি
সুমেরুর শৃঙ্গ সাগরের জল!
২৩
আকাশের তারা একে একে যদি
গণি সকলেতে, কুলায় কি তবে ?
সাগরের জল একৈক গণ্ডুষ
পান করি যদি, সাগরাে শুকাবে।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
২৪
প্রত্যেকে যদ্যপি দীর্ঘ মরু-ক্ষেত্রে
তুলি মুষ্টি মুষ্টি বালুকা, তা হলে
মরুভূমি হবে. গভীর নিখাত!
প্রত্যেকের বিন্দু বিন্দু অশ্রু জলে
পূর্ণ হয়ে যাবে সিন্ধু, গােদাবরী !
প্রত্যেকের দীর্ঘ নিশ্বাসে নিশ্বাসে
প্রলয়ের ঝড় সৃষ্টি হয়ে, সিন্ধু,
সুমেরু, মেদিনী-কাপিবে সন্ত্রাসে।
উঠ ভাই! চক্ষু মেল, প্রিয়তম !
কতকাল রবে মােহ-নিদ্রাগত ?
কতকাল হৃদে পুষিবে বৃশ্চিক ?
কতকাল বিষে রবে জর্জরিত ?
।
২৭
কতকাল বক্ষে লুকা’বে অনল?
কতকালে হবে অমৃত উদ্ধার ?
কতকালে সবে হবে সজীবিত ?
কতকালে নিদ্রা ভাঙ্গিবে তােমার ?
।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
২৮
কতকালে চক্ষু পাবে দৃষ্টিশক্তি ?
কতকালে শ্রুতি হবে সচেতন?
কতকালে নিজ অস্তিত্ব বুঝিয়া
জাতীয় উৎসাহে ঢালিবে জীবন ?
২৯
কতকাল আর মানস-আকাশে,
র’বে চন্দ্রসূৰ্য্য তিমিরে মণ্ডিত ?
কতকালে রাহু চণ্ডাল নির্মম
দেব-বজ্রাঘাতে হইবে দণ্ডিত ?
৩০
কতকাল হিংসা, বিদ্বেষ রাক্ষসী
করিবে আপন প্রভুত্ব বিস্তার ?
কতকাল আর আলস্য-জড়তা
জড়িত থাকিবে জীবনে তােমার?
কয়টা র আছে বা সংসারে ?
কি করিতে পারে দানবে দেবের ?
আত্মবিস্মৃতিতে আচ্ছন্ন দেবতা,
তাই এ দুর্দশা, ভাই। তােমাদের।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
এক মাতৃগর্ভে জনমিয়া সবে
অজ্ঞান-তিমিরে অন্ধ হইয়াছ?
সােদরে সােদরে নাহিক সম্প্রীতি।
হিংসি’ পরস্পরে অধঃপাতে গেছ ?
এক রক্তে জন্ম, এক বীর্ষে তনু,
এক উদ্দেশেতে জন্মে’ছ সকলে ;
এক অদৃষ্টেতে আদিষ্ট হইয়া
অন্য পথে গিয়া ডুবিলে ?-ডুবালে ?
৩৪
ছি ছি, দেব! মনে হয় না কি ঘৃণা ?
ভুলি’ ভ্রাতৃভাব, ভুলিয়া আপনা,
স্বর্গবাসী হয়ে ডুবি’ছ নরকে ?
সহি’ছ দৈত্যের নির্মম তাড়না ?
৩৫ ,
দেখ দেখি স্মরি’ পূর্বের কাহিনী
কি ছিলে, কি হলে,কি হবে কালেতে?
গােটা কত দৈত্যে কেড়ে নিল স্বর্গ
সুরের ঔরষ সংসারে থাকিতে ?

১০
ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
৩৬
এক বিন্দু রক্ত থাকিতে হৃদয়ে
কে পারে দেখিতে হেন অত্যাচার ?
ধিক্ ধিক, দেব! ধিক্‌ সুর বংশে !
জানি না কি ইচ্ছা ইথে বিধাতার!
৩৭
জানি না এরূপে কত কাল রবে ?
হোক স্বর্গপুরী ঘাের রসাতল !
যাক বিশ্ব হ’তে ‘দেব’ নাম ধুয়ে ;
চাহি না—চাহি না—চাহি না মঙ্গল ।
৩৮
ছি! ছি! এ কি কথা ? এই কি নিয়তি ?
স্বর্গের শাসন অসুরের করে ?
বৈজয়ন্ত ধামে অসুরে বিহারে
দেবতারা বন্দী দৈত্য-কারাগারে ?
৩৯
ছি! ছি। রে বিধাতা! তােমার লিপির
এত বিচিত্রতা ?—এত বিড়ম্বনা ?
রাজত্ব ত্যজিয়া, দাসত্ব।তথাপি ,
পাপাত্মা দৈত্যের আশা.মিটিল না ?

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
১১
৪০
আর কি বলিব ? বুলিতে কি আছে ?
বলে বলে কণ্ঠ হয়েছে বিকল !
দীর্ঘ নিশ্বাসেতে শুকা’য়েছে বক্ষ,
কেঁদে কেঁদে আর চক্ষে নাই জল !
ভারত-রাজলক্ষ্মী।
কৃষ্ণ চতুর্দশী ;-ভয়ঙ্করী নিশি ।
ঘাের অন্ধকারে ঢাকা দশ দিশি!
নৈশ নীলাম্বরে নীল কাদম্বিনী
গম্ভীর গরজে ;-কম্পিত মেদিনী।
হাঁসি’ছে দামিনী বিকাশি’ দশন ।
ঘাের বজ্র-রাবে বধির শ্রবণ।
ঝলকে ঝলকে তপ্ত তেজোৱাশি
ক্ষরি’ছে,-পুড়ি’ছে সৃষ্টি ; দশ দিশি
চকিতে চকি’
পুন অন্ধকার।
শূন্য, জল, স্থল সব একাকার।
কোথা ধরাতল ?কোথায় আকাশ ?
কোথা সৃষ্টি-চিহ্ন মানব আবাস ?
=

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
কোথায় কান্তার-কোথায় প্রান্তর ?-
কোথায় ভূধর ?-কোথায় সাগর ?
কোথা নদ-নদী-তরু-তৃণ-দল,
কোথা গ্রাম-পল্লী-নগর সকল ?
কোথা যে কি, নাহি হয় অনুভব,
অন্ধকারে যেন মুছে গেছে সব!
কুটীরে দরিদ্র, মঠে যােগিবর,
পান্থালয়ে পান্থ, সৌধে নরেশ্বর,
দুর্গে সেনাপতি, বন্দী কারাগারে,
গৃহেতে গৃহস্ত, দৌবারিক দ্বারে,
জননীর কোলে সন্তান সন্ততি,
পতি-হৃদয়েতে পত্নী গুণবতী,
কোটরে বিহঙ্গ, কেশরী করে,
শাখে শাখামৃগ, ভুজঙ্গ বিবরে,
জলে জল-জন্তু, স্থলে স্থলচর,
বনে বন-বাসী, আকাশে খেচর,
যেখানে যে আছে—সকলে শঙ্কিত,
সকলে বিপন্ন, সকলে স্তম্ভিত ।
ভীম ঘনঘটা ঘাের গরজনে
ঘাের বজ্ৰ-নাদে, ঘন ভূকম্পনে
4

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
উথলে সমুদ্র,
টলে চরাচর,
খসে শৈল শৃঙ্গ, মর মর মর
শব্দে প্রভঞ্জন ভাঙ্গে বৃক্ষদল !
মহাপ্রলয়েতে ত্রৈলােক্যমণ্ডল
গেল সাতল। গেল এইবার
গেল রে গেল রে সৃষ্টি বিধাতার !
উন্মুক্ত প্রকৃতি, উন্মত্ত পবন,
উন্মত্ত মেঘের উন্মত্ত গর্জন,
উন্মত্ত করকা বৃষ্টি ঝম্ ঝমে,
উন্মভ বিদ্যুৎ চকে, চম্ চমে ।
উন্মত্ত অশনি উগারে অনল,
উন্মত্ত হুঙ্কারে ফাটে নভস্তল!
১
এ হেন ভীষণ দুর্যোগ নিশীথে
কালিতেছে কেবা দক্ষিণ শ্মশানে ?
শুন স্থির হয়ে! নওই শুন
স্বপ্নবৎঃশুনা যায় ক্ষণে ক্ষণে।
২
ফের শুন, ঘাের বিকট হুঙ্কার
চীৎকার চিক্রাহি হতেছে ভীষণ ।

১৪
ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
বিশ্ব কম্পমান, বিশ্ব শঙ্কাময় ;
শঙ্কার শঙ্কিত হ’তেছে জীবন!
ব্যাপার কি ? চল দেখিগে কল্পনে,
সৰ্ব্বত্রগামিনী সৰ্বত্ৰদর্শিনী,
তুমি ত্রৈলােকের জীবন্ত পুতুল
তুমি ত্রৈলােকের আদর্শরূপিণী !
৪
তােমার কৃপায় এ ভবমণ্ডলে
অদৃশ্য, অশ্রুত কি আছে আমার ?
তােমার কৃপায় পৃথিবীর মাঝে
কা’রে বা ডরাই ? আশঙ্কা কাহার ?
চলিনু, কল্পনে, শ্মশান উদ্দেশে
হৃদয়-মন্দিরে ব’স গাে আমার।
সঙ্কটে পড়িলে রক্ষা কর যেন,
কল্পনে ! কেবল ভরসা তােমার।
শৈশবেতে তুমি ক্রীড়া-সহচরী,
যৌবনের সখী প্রৌঢ়ে প্রিয় দূতী,

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
বার্ধক্যে বয়স্যা মরণের সঙ্গী,
জন্মান্তরে তুমি অগতি সদগতি !
৭
7
কল্পনে গো! ওই শ্মশান সৈকত
দেখে কি যে হ’ল- বর্ণিব কি করে ?
নিস্পন্দ হৃদয়,
কণ্টকিত দেহ
শিহরিল রক্ত প্রতি শিরে শিরে!
৮
তিমিরে ত্রৈলােক্য গভীর আবৃত।
গভীর ভীষণ শ্মশান ভুবন !
গভীর ভাবের আধার যেন রে,
গভীর হৃদয়ে আনন্দ-কানন!
৯
গভীর গর্জনে জ্বলিতেছে চিতা,
পুড়ি’ছে অনন্ত কোটী প্রাণী তায়।
শৃগাল কুকুরে করে গণ্ডগােল ;
কবন্ধ দানাতে নাচিয়া বেড়ায়।
শাঁখিনী, ডাকিনী, প্রেতিনী, পিশাচী,
চিৎকার ‘চিক্রাহি’ ছাড়ি’ছে সঘনে।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
চিতা মাংস লয়ে করে লােকালুকি,
কড়মড় অস্থি চিবায় দশনে।
কাড়াকাড়ি করে, ছুটে উভড়ে,
হাঁসে, নাচে, গায় আনন্দ অপার।
মুখে রক্ত-ধারা, হাতে সুর-পাত্র
দাড়া’য়ে ভৈরবী কাতারে কাতার!
১২
লক্ষ লক্ষ ভীম জটাজ টধারী
কাপালিক বসি’ ছিন্ন-শীর্ষ শবে
করিতেছে ধ্যান ভয়ঙ্কর দৃশ্য !
খায় চিতা মাংস—প্রম আসবে।
।
অদূরে ভীষণদর্শন এ হতে
ওই দেখ, হেন দেখ নাই আর,
বসি ব্যাচৰ্ম্মে উলঙ্গ পুরুষ
ঘােরকৃষ্ণুতনু প্ৰকাণ্ড ব্যাপার।
১৪
আসবু-আলস্যে আরাে ভয়ঙ্কর,
রক্ত লােল-চক্ষু ঘূরি’ছে কপালে।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
১.৭
করে সুরাপাত্র, মুখে রক্তধারা,
প্রতি কটাক্ষেতে বিদ্যুৎ বিলে !
বিকট দুর্গন্ধ উঠিছে সর্বাঙ্গে।
প্রতি লােমকূপে
জীবন্ত নরক!
প্রতি শ্বাসে ক্ষরে অনল-স্ফুলিঙ্গ,
রক্তলােলজিহ্বা করে লক্ ল !
দীর্ঘ জটাভার, দীর্ঘ শ্মশ্রু-রাশি,
দীর্ঘ বপুঃ স্পর্শ করি’ছে গগন ;
সম্মুখে হ’তেছে লক্ষ নরবলি,
লক্ষ রমণীর সতীত্বহরণ।
১৭
r
একি ভয়ঙ্কর ! একি নিষ্ঠ রতা ।
একি পাপাচার, পৈশাচিক রীতি।
গেল যে জগৎ, রসাতল গেল,
গেল এইবার, গেল সৃষ্টি স্থিতি।
কেও ভীমকায় বসি’ প্রেতভূমে ?
চেন কি উহারে-চেন কি মানব?

১৮
ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
নহে যক্ষ, রক্ষ, গন্ধৰ্ব্ব, দেবতা,
নহে ভূত, প্রেত, পিশাচ, দানব।
১৯
নিষ্ঠ র তান্ত্রিক রীতি ওর নাম,
বড়ই নির্মম-বড় পাপাচার !
ওরি অত্যাচারে হয়ে উৎপীড়িতা
উন্মত্ত প্রকৃতি ছাড়ি’ছে হুঙ্কার !
২০
ওই দেখ দূরে অপূর্ব ষােড়শী,
ভারতের রাজলক্ষী ওঁর নাম।
ওরি উৎপীড়নে হ’য়ে উৎপীড়িত
ছাড়িয়া যেতেছে আৰ্যদের ধাম।
বহুদিন হ’তে ছিল আৰ্য-গৃহে
মমতা-বন্ধন কাটিতে কি পারে ?
যায় যায় আর চলে না চরণ,
স্নেহের আবেগে কাঁদে উচ্চৈঃস্বরে ।
২২
রাজগৃহ হ’তে রাজ-লক্ষী যায়,
দেখিয়া শশাকেতে কান্দি’ছে প্রকৃতি,
.
৭

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
১৯
ঝরে অশ্রুধারা, ক্ষরে শিলাবৃষ্টি,
আঁধারিয়া পথ রুধিতেছে গতি।
২৩
চমকি’ বিদ্যুৎ প্রদর্শি’ছে শঙ্কা,
হুঙ্কারি’ জলদ, হুঙ্কারি’ পবন
জাগাইছে আৰ্য্যে, কিন্তু কে তা শুনে ?
ভক্তির কুহকে মুগ্ধ আৰ্য্যগণ।
২৪
মুক্তির মােহেতে নিদ্রাগত আৰ্য্য,
কোথা’ কি হতেছে কে দেখে চাহিয়া ?
দুর্দশা-সাগরে ডুবা’য়ে সংসার
রাজ-লক্ষী যায় ভারত ছাড়িয়া !
।
ঘাের পাপাচার, ঘাের নিষ্ঠ রতা,
কোমল হৃদয়ে সহিতে কি পারে ?
নিরুপায় ভাবি’ আর্যরাজলক্ষী
আত্ম সমর্পিল যবনের করে!

२०
ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
লক্ষ্মীরাণীর হৃদয়ােচ্ছ সি।
১
এস যুবরাজ! পঁড়াও দেখি হে!
বলি দুট কথা যাইবার কালে ;
বলি দুট কথা হৃদয় খুলিয়া,
অবজ্ঞা কর না অভাগিনী বলে ।
২
ভারত দেখিয়া যেতেছ কি গৃহে ?
ভারত কি দেখা হইল তােমার ?
যাইবার কালে একবার এস,
দেখে যাও ঘাের অন্ধকারাগার।
দেখে যাও এই অভাগীর দশা।
দেখে যাও হৃদে জ্বলে কি অনল!
দেখে যাও মৰ্ম্মে জাগিছে কি শােক।
দেখে যাও মম নয়নের জল!
৪
re
দেখে দীনহীন ঘৃণা ক’র নাক,
এরূপ দুর্দশা হয়েছে সম্প্রতি।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা ।
এখন হয়েছি তরঙ্গের তৃণ,
ছিনু আমি পূৰ্বে নন্দন-ব্রততী।
৫
ইতিপূৰ্বে ছিনু অতি ভাগ্যবতী,
সৌভাগ্যের ক্ষেত্র ছিল পরিসর।
ছিনু বরদার রাজরাজেশ্বরী ।
স্বামী ছিল মম রাজ-রাজেশ্বর!
৬
কিছুই না জানি, কিছুই না শুনি,
বিনা মেঘে হ’ল অশনি সম্পাত।
নৈতিক বিচারে, সভ্যের চক্ৰেতে
সুখ-স্বপ্ন ভগ্ন হ’ল অকস্মাৎ!
s
পূৰ্ব দিন স্বামী, রাজা সিংহাসনে ;
পরদিন হ’ল বন্দী কারাগারে।
পূৰ্ব দিন ছিনু রাজ-রাজেশ্বরী,
পর দিন হৈনু অভাগী সংসারে।
।
আমারি রাজত্ব, আমারি সর্বস্ব,
মম অন্তঃপুর, প্রাসাদ ভবন,

২২
ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
রাত্রি প্রভাতেতে আমি কেহ নই ;
বা’র হতে হ’ল পরের মতন!।
৯
সূর্যের উত্তাপ দেখি নাই কভু,
দেখি নাই কভু বাহির তােরণ,
অন্তঃপুর ছাড়ি’ এক পদ কভু
করি নাই আমি অন্যত্র গমন !
১০
আজি অভাগিনী বাহিরিয়া পথে,
সকল সমক্ষে দাঁড়া’য়েছে আসি’;
আজ অভাগিনী তােমার সাক্ষাতে
একে একে সব ক’বে দুঃখ রাশি!
১১
তােমার সাক্ষাতে গা’বে দুঃখ-গীত,
নাই লজ্জা, নাই জীবনের ত্রাস !
নাই কুল মান, নাই অবরােধ,
নাই উদরাম, নাই গৃহবাস !
১২
দেখ, এই দেখ, এক বস্ত্র ভিন্ন
দ্বিতীয় বসন নাহিক অঙ্গের,

ভুবনমােহিনী প্রতি ভা।
s
দেখ, যুবরাজ! রাজ-প্রতিনিধি,
কাঙ্গালিনী মােরে করেছে পথের !
দেখ, যুবরাজ! হয়েছি রাক্ষসী ।
দেখ রুক্ষ কেশ, কঙ্কালের ভার ।
আমিই আছিনু বরদার রাণী,
দেখিয়া, এখন চিনে সাধ্য কার ?
১৪
দেখ, যুবরাজ! দেখ মাের দশা,
এই এক দৃশ্য দেখ ভারতের !
দেখেছ আহাদে হাস্যের তরঙ্গ,
দেখ হাহাকার দারুণ শশাকের।
যুবরাজ! তুমি দীর্ঘজীবী হও,
অবলার দিব্য লাগে হে তােমারে।
কায়মনঃপ্রাণে পূজিব তােমায়,
করি নিমন্ত্রণ; এস কারাগারে !
L
আসিয়া এ দেশে কত কি দেখিলে,
বিবিধ বিধানে হইলে হে সুখী।

২৪
ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
বিবিধ বিধানে হইলে সন্তুষ্ট,
ভারতের স্বপ্ন সৌভাগ্য নিরখি’ !
১৭
নানামতে কত পাইলে সম্মান,
পাইলে প্রণামী, সুখ্যাতি, সাবাসি,
যাইবার কালে বিষাদ-কাহিনী,
শুনে যাও দুট কারাগারে আসি।
দেখিলে বিবিধ আনন্দ-উচ্ছাস,
শশাকের উচ্ছাস দেখ একবার,
দেখিলে কাশ্মীর স্বর্গীয় ভবন,
নরক দেখিয়া যাও বরদার!
১৯
দেখিলে বিচিত্র প্রাসাদ ভবন,
দেখে যাও মাের অন্ধকারাগার।
দেখিলে বিচিত্র আলােকের শােভা,
দেখ পুনরায় নিবিড় আঁধার ।
৭
=
শুনিলে বন্দনা, বাদ্য সুললিত,
সঙ্গীতে শীতল করিল পরাণ ;

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
২
যাইবার কালে এস কারাগারে,
শুনে যাও উষ্ণ সন্তাপের গান।
দেখিলে বিবিধ অনল উৎসব,
দেখ হে আমার হৃদয়-অনল
জ্বলি’ছে কিরূপে, ইহার কি জ্বালা,
এস হে দেখাই চিরি’ বক্ষঃস্থল।
২২
শুনিয়াছি তুমি পর দুঃখ বুঝ,
শুনিয়াছি তুমি দয়ার সাগর,
আজ তব দয়া বুঝিতে পারি,
এস দেখি মাের সঙ্গে, গুণাকর।
আমার প্রাণেশ বঞ্চেন যেখানে,
এক রাত্রি তথা হইবে থাকিতে।
কারাগৃহে তােমা পূজিয়া আমরা,
প্রাণ উপহার দিব তব হাতে।
২৪.
চল কারাগারে; চল মাের সঙ্গে,
চল দেখা দিতে বরদা ঈশ্বরে;

ভুবনমোহিনী প্রতিভা।
অন্ধকারাগৃহে নিরবে একাকী,
প্রাণেশ আমার বনে কাতরে।
২৫
যুবরাজ! তুমি এসেছ ভারতে,
আনন্দিত সবে দেখিয়া তােমাকে ;
সকলের মুখে হাসির তরঙ্গ,
কেবৃন্ধ আমরা পুড়ি মনােদুঃখে?
যুবরাজ! আমি দুঃখিনী অবলা,
জানি না আদর সম্মানের রীতি ;
জানি না কি হ'লে হইবে সন্তুষ্ট,
সন্তুষ্ট করিতে আছে কি শকতি ?
২৭ :
নাই স্বর্ণ র হীরা মুক্তা মপি,
কি দিয়া সন্তুষ্ট করিব তােমায়
দয়াময়! শুদ্ধ দয়া করি বুদি
পদার্পণ কর নাথের কায়ায়।
প
২ ।
যুবয়াজ! এল দেখে যাও চক্ষে,
তোমাজের হৈতে কি হয়েছে মাের।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
২৭
তােমাদের হৈতে এই ভায়তের,
ঘটেছে কেমন বৈচিত্র্য কঠোর ।
তােমাদের হৈতে মহারাষ্ট্রপতি,
হারাইয়া রাজ্ব, বন্দী কারাগারে
তােমাদের হৈতে আমি লক্ষ্মী রাণী
পথের কাঙ্গালী হয়েছি সংসারে।
তােমাদের হৈতে হয়েছে সকলি,
বাকি কিছু নাই হইবার আর ;
বাকি আছে প্রাণ, এস যুবরাজ!
তাও আজ দিব লঙ উপহার।
কোথা নর্থব্রুক। তুমি শুদ্ধ এস,
তুমিই করেছ দুর্দশা এমন।
তুমিই দিয়াছ চাঁদেতে কলঙ্ক,
বরদার ভাগ্যে তুমিই শমন।
তুমিই নির্মল ব্রিটিশ গৌরবে
কলঙ্ক-কালিমা করেছ অর্পণ;

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
ভারতের চিহ্ন যত দিন রবে,
উড়িবে তােমার সুকীৰ্ত্তি-কেতন।
৩৩
M
নর্থব্রুক! এই চলিলে ত দেশে,
সম্বন্ধ ঘুচা’য়ে ভারতের সনে,
ক’দিনের জন্য এসেছিলে এথা,
যাইতে হবে যে ভাবুনি কি মনে ?
৩৪
নর্থব্রুক! এসে দু’দিনের জন্যে
চির দিন তরে কিনিলে অখ্যাতি।
ব্রিটিশ শাসনে ঘুচালে বিশ্বাস,
রাখিলে সংসারে সভ্যতার খ্যাতি !
স
দিন, মাস, যুগ সকলই যায়,
যায় ধন, জন,—কিছুই থাকে না।
সুকীর্তি, কুকীর্তি এই মাত্র থাকে,
এই মাত্র হয় সর্বত্র ঘােষণ।
৩৬
দিব্য কীৰ্ত্তি রেখে চলিলে স্বদেশে,
আশীর্বাদ করি দীর্ঘজীবি হও;"

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
আমায় কাঁদা’য়ে সুখে থেক তুমি
বিদেশীয় বন্ধু !—অন্য তুমি নও ।
যুবরাজ ! শােক বুঝেছ কি মাের ?
দেখিতে পেয়েছ হৃদয়-অনল ?
হলে কি দুঃখিত অভাগীর দুঃখে ?
নিভা’তে পার কি এই কালানল ?
৩৮
যুবরাজ! বড় যন্ত্রণা —ইহার
জ্বালায় অস্থির। ভষ্ম হয় বুক।
যুবরাজ ! এই দেখে যাও চক্ষে,
দেখিলে অনেক শান্ত হবে দুখ ।
1
।
ইন্দ্রালয় দর্শনে।
| কিবা
হেরি রে এ যে সকলি সুন্দর ।
সকলি নবীন মনােহরুতর,
সকলি সুখের, সকলি প্রেমের,
সকলি অপূৰ্ব্ব মাধুরি।
সকলি আহলাদ, সকলি আনন্দ।

৩০
ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
সকলি প্রফুল্ল, সকলি সুগন্ধ!
সকলি যথেষ্ট, সকলি অসংখ্য,
সকলি সচ্ছল ;-আমরি !
আহা !
মরি রে, এ যে নবীন জগতে
নব অভ্যুদয় দেখিতে দেখিতে;
নবীন শীতল সরস পবন,
নব রবি, শশী, নবীন গগন,
নবীন নক্ষত্র, নব গ্ৰহদল,
নবীন শ্যামল স্বচ্ছ ধরাতল ।
নবীন উদ্ভিজ্জ, নবীন শেখর,
নবীন সরিৎ, নবীন সাগর।
নবীন প্রান্তর, নবীন কানন,
নবীন জগতে নব জীবগণ,
নবীন তরুর নবীন শাখায়
নবীন পল্লব, নব বৃন্ত, তায়
নবীন নবীন কুসুম বিকাসে,
নৰ পরিমল নবীন বাতাসে
নবীন প্রদেশে বিতরি’ছে ধীরে।
নবীন বরন্তু বিকাশ, কিবা রে,
1y

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
নবীন মিকুঞ্জে নব পিকবন্ধু
কুহরে পঞ্চমে ছড়াইয়া মধু।
নবীন লতিকা নবীন বরণে
নবীন অমিয় ফল আভরণে
নবীন সুন্দর সেজেছে কেমন?
আহা! কি শােভা রে কোথা এলে মন? |
এযে-
সকলি নবীন, সকলি অতুল,
সকলি সকল সুন্দরের মূল।
সকলি সুখের, সকলি প্রেমের,
সকলি অপূৰ্ব্ব মাধুরি।
সকলি আহাদ, সকলি আনন্দ,
সকলি প্রফুল্ল, সকলি সুগন্ধ,
সকলি যথেষ্ট, সকলি অসংখ্য,
সকলি সচ্ছল নেহারি ।
এথা-
নাই রােগ, শােক, জন্ম, মৃত্যুভার,
নাই ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ক্রোধ, অহঙ্কার,
নাই আত্মগ্লানি, নাই শত্রুভয়,
নাই পক্ষপাত (সরলতাময়!),
।
f
}
,
+1
ম

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
নাই হিংসা, দ্বেষ, দম্ভ, অভিমান,
নাই পরনিন্দা, পর-অপমান,
নাই শান্তিভঙ্গ, রাজভয় নাই।
নাই দণ্ডভয়, করপীড়া নাই,
নাই দরিদ্রতা, নাই হাহাকার,
নাহিক দাসত্ব-প্রভুত্ব-বিচার !
নাই অধীনতা-সকলে স্বাধীন,
সকলে সুন্দর সকলে প্রবীণ,
সকলে আপন হৃদয়ের রাজা,
সকলের কিবা বক্ষঃস্থল তাজা ।
সকলেই যুবা, সকলে রসিক,
সকলে ভাবুক প্রাজ্ঞ সমধিক,
সকলেই এক, এক প্রাণমন,
এক কলেবর, একই গঠন,
একতা, বীরতা, সমতা, সজ্ঞানে
হৃদয়ের স্ফুর্তি প্রকাশে বদনে
নয়নে ললাটে নিকলে প্রতিভা,
বর্ণ যেন তপ্ত কাঞ্চনের আভা ;
অপূর্ব সৌরভ প্রকাশি’ছে গাত্রে,
সুধার আবেস প্রকাশি’ছে নেত্রে ;

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
1
মধুপানে মত্ত, প্রেমে ডগ মগ।
ভাবে ঢল ঢল ধর গাে, ধর গাে!
কল্পনে! আমায় আনিলে কোথায়!
এরে বলে কোন নগরী ?
এ আবার কোন আনন্দবাজার ।
এ আবার কোন্ মাধুরী ?
এযে, এক ছাঁচে ঢালা, একই গঠন,
অসংখ্য অনন্ত প্রাসাদ ভবন ;
কাঞ্চনের কড়ি, রজতের ইট,
মুকুতার চুণে রতনে নির্মিত ;
হীরকের দ্বার, অলিন্দ ঝলকে,
হীরার কলস ধক ধক্ ধকে ;
অত্যুচ্চ বৃহৎ হৰ্ম্মরাজি-শিরে
বিচিত্র বসনে মাণিক ঝালরে
উড়ে সারি সারি বিচিত্র নিশান,
অবারিত দ্বারে নাই দ্বারবান,
কোন স্থানে যেতে কারাে বাধা নাই,
যাহারে নেহার অভিন্ন সবাই ;
প্রতি কক্ষদেশ অপূৰ্ব সজ্জিত,
অপূৰ্ব্ব বঙ্গেতে অপূর্ব রঞ্জিত ;
।
1
।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
অপূৰ্ব বসনে অপূৰ্ব ভূষণে
অপূৰ্ব্ব রমণী রূপের কিরণে :
কক্ষে কক্ষে খেলে স্থির সৌদামিনী
কক্ষে কক্ষে যত সুস্থির যৌবন
নাচিছে হাসি’ছে গাই’ছে সুস্বরে।
বাজি’ছে মুরলী, মৃদঙ্গ, মন্দিরে,
বীণা বংশী, স্বর-তরঙ্গ-লহরী,
মধুর মধুর উছলে, আমরি ।
আনন্দে বিভাের, সুধা পান করে,
হয়ে মাতােয়ারা গায় মধুস্বরে,
হয়ে মাতােয়ারা গায় প্রেমগীত,
কি শুনি রে!-শুনে হইমু মােহিত!
১
কল্পনে গাে, এ কি স্বর্গেতে আনিলে ?
সম্মুখে ও কি গাে বিরজা বিরাজে?
সুবর্ণ-সলিল-প্রবাহ সুন্দর,
সুবর্ণের হংস চরে মাঝে মাঝে।
২
সুবর্ণে গঠিত সহস্র সােপান,
সুবর্ণের নৌকা, রতনের আঁড়;

r
ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
দেববিদ্যাধরী লইয়া হৃদয়ে
ভেসে যায় তুরী কাতারে কাতার।
সুবৰ্ণ সােপানে অসংখ্য নাগরী
করি’ছে সুন্দর সুখাবগাহন,
আহা! কি নগর!-কি আনন্দ ধাম।
নরে:কি ভাবিতে পারে এ কেমন ?
৪
অন্যদিকে ও কি ?-বৈজয়ন্তপুরী ?
কোটি জলধনু কান্তি-শােভমান,
কোটি চন্দ্রদ্যুতি একত্র ভাতি’ছে,
হেরিয়া পুলকে শীহর, পরাণ ;
পুরী দ্বারে দ্বারে পরীর, প্রহরী,
দেব দেবাঙ্গনা প্রকোষ্ঠে বিরাজে;
অসংখ্য পতাক উড়ে সৌধ-শিরে,
তােরণে দুন্দুভি জয়রাবে বাজে !..
৬
ভিতরে বাজি’ছে আনন্দ-আরতি,
গাই’ছে অপসরে স্তুতি সুললিত,

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
দেবতাবেষ্টিত দেব পুরন্দর
আনন্দে শুনি’ছে অপূর্ব সঙ্গীত !
৭
সুধার আবেসে ঢুলু ঢুলু আঁখি,
হৃদয়-আনন্দ উছলে বাক্যেতে;
বিদ্যাধরীগণ যােগাই’ছে সুধা,
সুধাপান করে যত অমরেতে।
be
সম্মুখে অপূৰ্ব্ব নন্দনউদ্যান ;
মুহূর্তে মুহূর্তে নূতন নূতন
ফুটে পারিজাত বিতরে সুগন্ধ,
বিতরে অমিয়,—পিয়ে অলিগণ!
৯
নানাবর্ণ ফুল, নানাবর্ণ অলি,
নানাজাতি মধু সুগন্ধ সচ্ছল ;
অপূৰ্ব বিলাস অপূর্ব সুখেতে,
স্বচ্ছন্দ অমরা, স্বচ্ছন্দ সকল।
এধা সন্ধ্যা গায়ত্রী বেদ সঙ্গীত সাহিত্য
জ্ঞান সত্য ধর্ম মূর্তিমান সর,

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
মূর্তিমান প্রেম, মূর্তিমতী দয়া,
মুর্তিমান সাম্য, বীরত্ব, গৌরব।
১১
মূর্তিমান বুদ্ধি, বিবেক, বৈরাগ্য,
মূৰ্ত্তিমা শুভ, ভাগ্য, গতি, মুক্তি,
মূর্তিমান্ শৌর্য, একত্ব, বিশ্বাস,
পুণ্য, পরকাল, কীৰ্ত্তি, মায়া, ভক্তি।
১২
মূর্তিমতী পূজা, তপস্যা, সমাধি,
যাগ, যজ্ঞ, হােম, বহ্নি, বায়ু, জল।
মূর্তিমান মেঘ, অশনি, বিদ্যুৎ,
নক্ষত্র, চন্দ্রমা, সূর্য, গ্রহ দল।
১৩
হেন সভাস্থলে, বলিব কল্পনে,
বলিব আমার দুঃখ সবিশেষ ;
বলিব মর্ত্যের দুর্দশা-কাহিনী,
বলিব নরক-নিবাসের ক্লেশ !
১৪
=
দেখাইব চিরি’ দগ্ধ বক্ষঃস্থল,
তবকে তরকে জলে কি দহন।
৪

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
দেখাইব খুলি’ মাথার উষ্ণীষ,
শত্রু-পদাঘাত জাগিছে কেমন!
১৫
দেখা’ব চরণে শৃঙ্খলের ক্ষত,
দেখাইব মৰ্ম্মে দাসত্বের ব্যথা!
দেখাইব স্কন্ধে ভীম কর-ভার,
বলিব প্রকাশি’ দারিদ্র্য-বারতা !
১৬
বল, গাে কল্পনে!.কেবা দেবরাজ ?
বল কার কাছে গাই দুঃখগীত ?
দুর্দশার স্রোতে ভাসে মর্ত্যলোেক,
শুনি’ পুরন্দর হবে’ কি দুঃখিত ?
১৭
কল্পনে গাে ! তুমি পাপ, পুণ্য, জ্ঞান,
আলল, অন্ধকার, আকাশ, জলধি,
চন্দ্র, সূৰ্য্য, তারা, গ্রহ, স্বর্গ, পৃথ্বী,
পাতাল, নরক, সুখ, দুঃখ আদি
সকলের, দেবি ! জীবন্ত আদর্শ, -
বালক, যুবক, প্রবীণ, প্রাচীন,

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
৩৯
অন্ধ, খঞ্জাতুর, বধির প্রভৃতি
সকলে সংসারে তােমার অধীন।
১৯
তােমার সহায়ে ফুটিতেছে বাক্য,
তােমার সহায়ে গাই দুঃখগীত ;
তােমার সহায়ে পেরেছি জানিতে
সংসারে আমরা বিধি-বিড়ম্বিত !.
২০
তােমার সহায়ে আজি সুরলােকে
দেবসভাস্থলে খুলিব হৃদয় ;
দেখি--দেখি’ শুনি’ মর্ত্যের দুর্দশা
দেবের করুণা হয় কি না হয় ?
২১
দেবরাজ! এই ত্রয়স্ত্রিংশ কোটি
দেবতাবেষ্টিত ত্রিদিব-সভায়
আমি মৰ্ত্তবাসী শত্রু-উৎপীড়িত,
দীন হীন ক্ষীণ জীবম্ত প্রায়
২২
দাড়ায়েছি, দেব! করনাক ঘৃণা ;
করি প্রণিপাত সবার চরণে;

৪০
ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
অমর-উচিত জানি না বন্দনা,
অপরাধ কিছু ভাবিও না মনে।
দেবরাজ! বড় দুর্দশায় পড়ি
এসেছি ত্রিদিবে দেবতা-সদনে,
এমন মনুষ্য নাই মর্ত্যলােকে
আমার দুর্দশা বুঝে কিম্বা শুনে।
২৪
চন্দ্রসূৰ্য্যবংশ হয়েছে নির্বাণ,
হয়েছে অবনী তিমিরে আবৃত।
আঁধারে উড়ি’ছে খদ্যোতের পাতি,
পেচকে গাই’ছে কর্কশ সঙ্গীত।
২৫
স্বার্থের
ভানুর মন্দিরে হনুর প্রভুত্ব,
অন্যায়ের রাজ্য, ন্যায় পদানত,
সমুদ্রে ভাসে মর্ত্যলোক,
সত্যের গৌরব হইয়াছে হত ?
২৬
নাই ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, ভীমার্জুন,
রাবগ-দমন রাম ধনুৰ্ধৰু, .

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
৪১
নাই ব্যাস, নাই বাল্মীকি ধীমান,
নাই সে হস্তিনা, অযােধ্যানগর ।
২৭
নাই ধনুর্বাণ, নাই তলওয়ার,
নাই ভল্ল, নাই মল্লবীরপনা,
নাই আস্ফালন, নাই হুহুংকার,
নাই ঘনঘাের দুন্দুভি-ঘােষণা!
২৮
দ্যর পীড়ন হয়েছে মর্ত্তেতে
আত্মরক্ষা করি হেন শক্তি নাই।
পৃথিবী হয়েছে গভীর নিদ্রিত,
আশ্রয় কে দেয় ? কোথায় দাড়াই ।
>
২৯
নাই পিতা মাতা, নাই বন্ধুজন,
নিরাশ্রয় শিশু আছি গােটাকত।
উদরাম বিনা ক্ষুধায় অস্থির,
দ্যর পীড়ন স’ব আর কত?
+
দেহে রক্ত নাই, তবু রক্ত চাহে,
দিলে অস্থিতে করে বেত্রাঘাত !

৪২
ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
ত্রাহি ত্রাহি ডাকি। কে শুনে সে কথা ।
কোথায় দাড়াই!—রক্ষা কর, নাথ !
কাদিলে দ্বিগুণ হয়ে ক্রোধান্বিত,
বঁধিয়া শৃঙ্খলে প্রহারে দ্বিগুণ ;
রাখে কারাগারে বক্ষে দিয়া শিলা,
শুনে না বিনতি কাতর বচন।
৩২
জঠর-অনল নিবা’বার তরে
ভিক্ষা করি আনি—তারা অংশ চায়।
‘দিব না’ বলিতে হয় না সাহস,
কবলিত গ্রাস বলে কেড়ে লয়।
হইনু আশ্রিত—রক্ষা কর, নাথ।
নহে মরুভূমি হ’ল মর্ত্যদেশ।
হইল শ্মশান!—দহিল সকল!
যাহা যাহা ছিল হল সব শেষ।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
পরাধীনের প্রণয়।
ধীরে ধীরে যায়—ফিরে ফিরে চায়
থমকি থমকি’ দাঁড়ায় ওই।
প্রণয়বন্ধন কঠিন কেমন,
যাইতে চরণ উঠিছে কই ?
২
“যাইতে হবে না,—ফিরে এস, নাথ।
দুখে সুখে দিন কাটিয়া যাবে ।
উদরের দায়ে তােমা হেন ধনে,
বিদেশে দাসত্বে বেচিতে হবে!
“স্মরিয়া এ কথা ফেটে
অহে নাথ ! ফিরে এস হে ঘরে ;
যেমন অবস্থা, তেমনি থাকিব,
রাজত্ব পাইব তােমারে হেরে।
৪
“শত সম্রাটের ধন তুমি মাের!
তব অধরের মধুর হাসি,

৪৪
ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
ইন্দ্রের ইন্দ্ৰত্বে বিনিময় হক,
বলিলেও আমি ভাল না বাসি ।
“তােমার তুলনা আছে কি জগতে ?
তুলনার ধন তুমি কি আমার ?
আঁধারের আলাে, নির্জীবে জীবন,
সংসার বন্ধন, সংসারের সার !
“আকাশের চাদ, নক্ষত্রের পাঁতি,
নন্দন-সৌরভ, পুষ্পের মধু,
মলয় বসন্ত, সুগন্ধ সমীর,
কিশলয় দাম ; বঁধু হে! শুধু
৭
“এ সবার সঙ্গে তোমার তুলনা
হইবে না; চাঁদে কলঙ্ক আছে,
নিৰ্বাত-বন্ধুর-দগ্ধ-শৈলময়
চাঁদ কিসে লাগে তােমার কাছে ?
“পরের প্রত্যাশী পরাধীন চাঁদ,
পরের কিরণে ফুটিয়া থাকে।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
৪৫
তুমিও বাঙ্গালি পরের প্রত্যাশী,
পরাধীন জীব, পরের সুখে
থ
“ফুটে থাক, দেখ পরের নয়নে!
পরের কিরণে তােমার জ্যোতিঃ,
এই সে কারণে তােমার সহিতে
চাদের তুলনা করি হে যদি-
1
১০
“তাহা করিব না; বংশক্রমাগত
এরূপ দশা ত ছিল না তােমার।
সে দিননা তােমার প্রখর রশ্মিতে
উজলিতেছিল সমগ্ৰ সংসার!
১১
“সে দিননা তােমার সুকীৰ্ত্তি বাতাস
যশের সৌরভ বহন করে,
অরণ্য সুমেরু সিন্ধু অতিক্রমি’
আসমুদ্র ক্ষিতি, প্রত্যেক ঘরে,
১২
“বিতরিতেছিল; সেই বাতাসেতে
ফুটেছিল কত অরণ্য ফুল!
।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা ।
সেই বাতাসেতে সিন্ধু উদ্বেলিয়া
কেঁপেছিল ক্ষিতি, সুমেরু মূল !
“নক্ষত্রের পাঁতি দিবসে লুকায়,
অরণ্য-উদ্ভিদ নন্দন হয় ;
যে কুসুমে কীট করে নিবসতি,
তা’র মধু কভু পবিত্র নয় !
১৪
“মলয় সমীর সমান বহে না,
বসন্তের শোভা রহে না চির,
কিশলয় কালে শুখাইয়া খসে ;
তুমি যে আমার অটল—স্থির।
“নিশ্চয় করিয়া তুমি যে আমার ;
আমি তব দাসী সেবিয়া তােমা,
কত জন্ম গেল, কত জন্ম যাবে ।
কত অপরাধ করেছ ক্ষমা !
}
“অমূল্য সম্পত্তি তােমার প্রণয়,
জীবনে জীবিত, মরণে সাথি ।

৪৭
ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
অপার্থিব ধন তােমার আদর,
তােমারি চরণে আমার গতি।
১৭
“সংসার অরণ্য ভয়াল দুর্গম।
তাহে জন্ম-অন্ধ অবলা জাতি,
দুর্গমের পথে সম দুঃখী হয়ে
একমাত্র, নাথ ! তুমিই সঁথি !
১৮
“কিসে সুখে র’ব, কিসে সুখী হ’ব,
এই মাত্র চিন্তা হৃদয়ে লয়ে
ফির দিবানিশি, আমি অভাগিনী
তােমার এ দুঃখ দেখি হে চেয়ে !
5।
“দরিদ্র বঙ্গেতে দাসত্ব ব্যবসা,
বাণিজ্য শিল্পের গৌরব গেছে,
গেছে অর্থনীতি, বিজ্ঞান-কৌশল,
জীবনি সামর্থ্য বাকি কি আছে ?
২০
“বেড়েছে সভ্যতা, উপাধির ঘটা ।
রাজা, রায়, রয়া, রায় বাহাদুর, -
=

৪৮
ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
গ্রাও কমাণ্ডার, স্ট্যার, বা রাংলার,
এমে, বিএ আদি হয়েছে প্রচুর !
২১
“ডেপুটী, মুন্সেফ, উকীল, কৌন্সেলি,
নেটিব সিভিল কেরাণী যত,
মাষ্টার, ডাক্তার, চাপাসি, পদাতি,
বাবু বাহাদুর!—গৌরব কত !
২২
“নামে বড় ঘটা, কাৰ্যেতে কাঙ্গালি,
সভ্যতা ব্যতীত দেখিনা আর।
বাক্যে বাহাদুর, বক্তবাগীশ,
অন্দরে বীরত্ব !—তিষ্ঠান ভার ।
“দাসত্বে বিকা’বে অমূল্য জীবন,
বাঙ্গালি-ললাটে বিধাতা বুঝি
বসি’ অন্ধকারে এই কালবাক্য
লিখিল চখের পলক বুজি ?
২৪
“ফিরে এস, নাথ! যাইতে হবে না ;
কোথায় যাইবে দাসীরে ছেড়ে ?

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
যত দুঃখ স’য়ে, উপবাসী রয়ে,
দিনান্তে দেখিব নয়ন ভরে।
২৫
“চাহিনা সম্মান, সম্পদ, সৌভাগ্য,
অর্থ, অট্টালিকা, বিলাস রাশি,
ভােগ, তৃষ্ণা, শান্তি, রত্ন, অলঙ্কার,
সৌন্দৰ্য্য, সুশয্যাকারিণী দাসী।
২৬
“দরিদ্রতা স’ব, বৃক্ষতলে রব,
নগরে মাগিয়া খাইব, তবু
অমুল অতুল তােমা হেন নিধি
পরের করেতে দিব না কভু।
২৭
“প্রাণের ভিতরে অতি যত্ন করে,
লুকায়ে রাখিব অমূল্য নিধি,
অপরের হাতে, কভু কোন মতে,
দিব না, দৈবাৎ দেই হে যদি,
২৮
—শূন্য প্রাণ ধরে, যাহারে তাহারে
দিব না; যে জন রতন চিনে,
M
}

ভুবনমােহিনী প্রতিভা ।
t
.
হৃদয়ের ধন রাখিতে যে জন
আমার মতন যতন যানে,
।
2.
“তাহারেই দিব, কিন্তু ফিরে নিব
তখনি আবার ; দিনেক তরে,
রাখিতে নারিব, যখন লইব
কষিত কাঞ্চনে কষিব ফিরে ।
M
“ওজন করিব, পরীক্ষি’ দেখিব,
হৃদয়ে লুকায়ে রাখিব নিধি ;
দরিদ্রের ধন, অমূল্য রতন,
কত পুণ্য ফলে পেয়েছি যদি,
৩১
1
“অতি নিরজনে অতি সঙ্গোপনে
হেরিব একাকী সতর্ক ভাবে,
শব্দমাত্র পেলে লুকা’ব অঞ্চলে,
পাছে কে কোথায় দেখিতে পাবে।
৩২
তােমা নিধি তরে যা আছে সংসারে,
অকাতরে তাহা অজিতে পারি,

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
বিলাস বৈভব, সম্পদ, গৌরব,
এর কাছে তুচ্ছ গণনা করি।
“যেখানেই থাকি, যদি চক্ষে দেখি,
যদি একত্রেতে থাকিতে পারি,
দারিদ্র্য-যন্ত্রণা, দাসীত্ব-বেদনা,
রােগ, শােক, ক্লেশ মনে কি করি ?
৩৪
“অন্ধ কারাগারে, দুর্গম কান্তারে,
দেশান্তে দীপান্তে যেখানে রই।
যে কোন যন্ত্রণা, যে কোন বেদনা,
নিগ্রহ, নিরাশা, যতই সই,
“নিদাঘ-তপনে, তৃষিত পরাণে
মরুভূমে যদি পড়িয়া থাকি,
কিসের নিরাশা, কিসের পিপাসা
তােমায় যদ্যপি নয়নে দেখি ?
“আশ্রয় বিহনে, বিনা আবরণে
হিমান্তে অসহ হিমানী স’য়ে,
}

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
বরিষার বারি মস্তকেতে ধরি,
হৃদয়ের নিধি হৃদয়ে লয়ে,
৩৭
“চির দিবানিশি অকুলেতে ভাসি’
হৃদয়েতে যত হইব সুখী,
প্রাসাদ বাসিনী, সৌভাগ্য শালিনী,
মম সম সুখী হইবে সে কি ?
“মৃত্যুশয্যা’পরে, যন্ত্রণা পাথারে
সহস্র ভুজঙ্গে দংশিবে যবে,
তখনাে এ ধনে হেরিলে নয়নে,
অমৃত-প্রবাহ হৃদয়ে ব’বে।
అని
“জীবিত-ঈশ্বর! প্রাণ-সহচর।
কোথা যাবে তব দাসীরে ফেলে ।
করি যােড় হাত, ফিরে এস, নাথ।
অধীনীরে একা ফেলিয়ে গেলে।
৪৩
“অবলার প্রাণ কুসুম সমান,
বজ্র-সম তব বিরহানল
*

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
সহিতে নারিবে, জহিবে দহিবে
দেহ, মনােবৃত্তি, জীবন-বল ।
৪১
।
“তােমার বিহনে মরিব পরাণে,
মরিব নিশ্চয়, দেখিও পরে।
এক তিল ছাড়ি থাকিতে না পারি,
এ দীর্ঘ বিচ্ছেদ স’ব কি করে ?
8२
“তােমার কারণে সংসার-ভবনে
খেলাধুলা ল’য়ে রয়েছি বসি’;
তােমার লাগিয়া, সকল ত্যজিয়া
জ্বলন্ত অনল মাঝারে পশি’
৪৩
খুঁজিতেছি সুধা-শান্তিনিকেতন,
মরুভূমে খুজি কমল দল ;
তােমারি কারণে নিরেট পাষাণে
খুঁজি’ছি সুখদ শীতল জল !
=
৪৪
“তােমারি কারণে সাগর জীবনে
পশে’ছি রতন লাভের তরে;

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
তােমারি কারণে অসাধ্য সাধনে
হয়েছি নিযুক্ত পৃথিবী’পরে।
৪৫
“তােমারি কারণে হৃদয়-গগনে
একমাত্র আশা নক্ষত্র ভাতে;
তােমারি কারণে সংসার কাননে
বেঁধেছি কুটীর, থাকিব তাতে।
৪৬
“তােমারি কারণে হৃদয়ে গােপনে
পুষেছি বৃশ্চিক আদর করে ;
তােমারি কারণে পাগল পরাণে
হাসি কঁদি, গাই হৃদয় ভরে।
*
৪৭
“তুমি অভাগীর মনের উৎসাহ,
তুমি একমাত্র প্রাণের প্রাণ ;
তুমি সৰ্বসার, জীবন-আধার,
তােমাভিন্ন দাসী জানে না আন।
৪৮
“তুমি আশা, তুমি ভরসা আমার,
তুমিই উৎসাহ, হৃদয়, বল ।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
তুমি নিরাশ্রয়ে আশ্রয়-পাদপ,
তুমি পিপাসার শীতল জল !
৪৯
“তুমি অন্ধকারে উজ্জ্বল আলােক,
সংসার সাগরে তরণী মম ;
তুমি ধৰ্ম্মঅর্থকামনােক্ষ ভবে,
কে আছে আমার তােমার সম ?
“ভবে তুমি মাের উপাস্য দেবতা,
তন্ত্র মন্ত্র ধ্যান সাধনা আদি ;
যােগ, উপাসনা, তপস্যা, সমাধি,
তব পাদপদ্মে সকলি বিধি।
৫১
“তুমি সত্য-ধৰ্ম্ম-জ্ঞান-মুক্তি-গতি,
তব ব্ৰহ্মবাক্যে অটল জ্ঞান ;
তব আজ্ঞা মম নিয়তি লিখন
তুমি ইষ্টীপূর্ত, ধারণা, ধ্যান।
“জাগ্রতে নিদ্রিতে শয়নে স্বপনে
তব চিন্তা বিনা জানি না আর,

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
যে দিকে যা দেখি, যে দিকে যা’ শুনি,
সকল পদার্থে তুমিই সার।
“এস, নাথ ! যেতে হবে না দাসত্বে,
চল ত্যজি’ গৃহ অরণ্যে যাই।
এ ছার সংসার, ছার পরিবার
আমার বলিতে কিছুই নাই।
৫৪
“মনুষ্য-সংসারে কি হবে থাকিয়া ?
শােক, তাপ জরা দারিদ্র্যানলে
দিবানিশি যুথা হাহাকার শব্দ,
দিবা নিশি যথা জীবন জ্বলে,
“যথা স্বার্থসিদ্ধি একমাত্র কাৰ্য্য,
যথা সত্য, ধৰ্ম্ম, বিবেক নাই,
যথা বিষয়ীর ঘাের আর্তনাদ
নিষ্ঠুরাভিনয় দেখিতে পাই,
“যথায় কালের ঘাের আস্ফালনে,
যথায় পাপির চীৎকার রবে

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
মুহুর্মুহু ভয়, ঘৃণায় অস্থির,
ছি! ছি! ছি! তথায় কি রূপে র’বে?
“মিথ্যা রঙ্গলীলা, মিথ্যা খেলাধূলা
মিথ্যাময় সব বিচিত্রতা নয়।
ছি, ছি ! এ সংসারে -এ হেন নরকে
মুহূর্তৃেক আর থাকিতে কি হয় ?
৫৮
“সকলেই এক ঈশ্বরের জীব ;
কিন্তু পরস্পরে সাম্যমাত্র নাই।
একজনে এথা অযুতের প্রভু !
কেহ হাসে-কেহ কাদি’ছে সদাই।
৫৯
“কোটি কোটি প্রাণী একের সেবায়,
একের আজ্ঞায় সৃষ্টি রসাতল ।
একের শাসনে কম্পিত জীবনে
কোটি কোটি প্রাণী ঘূরিছে কেবল।
“একজন যেন মন্ত্রমুগ্ধ করি
রেখেছে সংসার। (এ কি বিড়ম্বনা!)

৫৮
ভূবনমােহিনী প্রতিভা।
একের অসিতে সংসার নাশিতে
কি জন্য আদিষ্ট হ’ল এক জনা ?
৬১
“একের সাক্ষাতে অবনত মাথে
রয়েছে সংসার ! একি বিচিত্রতা !
একের কারণে অযুত পরাণে
হৃৎপিণ্ড ছিড়ি দেয় কেন এথা ?
৬২
“একের জন্যেতে অযুত জনেতে
কেন করে হৃদে রুধির সঞ্চয় ?
একের সেবায় কেন রক্ত দেয়
বক্ষঃস্থল চিরি জীব সমুদয় ?
৬৩
“একে এথা করে অপরে পীড়ন,
একের আদেশ অদৃষ্টের মত
মানে সবে এথা-এ হেন সংসারে
আছে কি থাকিতে কিঞ্চিৎ মুহুর্ত ?
৬৪
“ছি, ছি, নৃশংসতা। স্বার্থের লাগিয়া
ঘৃণিত দৈহিক, সম্ভোগের তরে

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
নররক্ত পাত? রুধিরের নদী
ব’য়ে যায়, ক্ষণে সম্মুখ সমরে !
“স্বার্থের কারণে এত নিষ্ঠুরতা?
মনুষ্য হইয়া দৈত্যের ব্যভার ?
স্বার্থের কারণে মিত্রদ্রোহী নর
যে সংসারে ; এই সেই ত সংসার।
“পিতাপুত্রে এথা স্বার্থের বিচার।
জননীর স্নেহে-স্বার্থের গরল ।
দাম্পত্য প্রণয়ে স্বার্থের ভুজঙ্গ!
স্বার্থসিদ্ধিমাত্র উদ্দেশ্য কেবল।
+
৬৭
‘শঠের সাম্রাজ্য, নৃশংসের খনি,
কাপট্য নিবাস স্বার্থের রাজত্ব,
এই সে সংসার? এ যে ছায়াবাজী।
মিথ্যা নাট্যভ্রম—অসার—অনিত্য।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
কে তুমি?
কে তুমি? তােমারে আঁখি হেরে বার বার।
মনে এই হয় মাের,
‘জীবনের সহচর’
যাবে জীবনের সনে ত্যজিয়া সংসার।
তাই কি ভুলিতে নারি মূরতি তােমার ?
২
শয্যায় যখন থাকি, মুদিত-নয়ন,
স্বপনের সহযােগে গভীর নিদ্রার ভােগে
তখনাে হৃদয়ে তােমা করি দরশন,
তাই মনােহর মুর্তি মােহিল নয়ন ?
যখন যে দিকে করি নয়ন সঞ্চার,
ভূতলে ত্রিদিবে কিবা, বিরাজিত রাত্রিদিবা,
মানস মােহন ওই মূরতি তােমার
স্মৃতির হিল্লোলে মৃদু দুলে অনিবার।
৪
কখনাে আকাশে তােমা করি দরশন।
সুনীল অম্বরােপরি দামিনী মিশাল, মরি,
* এটী শৈশবের রচিত।

ভুবনমোহিনী প্রতিভা।
কৌতুক করহ
সদা ঝলসি’ নয়ন।
নিশাকরে পশি’ কভু যুড়াও জীবন।
কভু
রৌদ্রময় তুমি মার্তণ্ড মণ্ডলে
প্রকাশি’ প্রখর কর
মানস পরীক্ষা কর,
বুঝি বা প্রণয় কোপ প্রদর্শন ছলে।
নতুবা আঁখির তৃপ্তি হইবে কি বলে ?
৬
আবার নেহারে আঁখি শােভার সদন,
নব জলধর সম
আ’মরি কি অনুপম ?
কিন্তু কার তরে তুমি করি’ছ রােদন ?
বৃষ্টি ছলে তাই অশ্রু হয় বরিষণ ।
দিবা নিশি যে মুছি’ছে নয়ন সলিলে,
তুমি কি তাহার তরে, বল, শুনি সত্য করে,
আশার আকারে ধরা ফেল কভু ভুলে ?
অথবা এ আশা মাত্র কৈবল্য জন্মিলে ?
৮
যা’র তরে আঁখি-নীর ঝর ঝর ঝরে,
’র যদি সেই মত ক্ষরে অশ্রু অবিরত,

ভুবনমোহিনী প্রতিভা।
সেও যদি ঝাঁপ দেয় প্রেম-সরােবরে,
তবে যাতনার শেল ফুটে কি অন্তরে?
৯
কিন্তু আমি চিরমুগ্ধা না জানি কারণ,
জানে কি বিহঙ্গী-প্রাণ নিষাদ-নিশিত বাণ,
পরাভবি’ বায়ুবেগে আসিয়া কখন
পশিয়া হৃদয়ে, হায়, নাশিবে জীবন?
কিম্বা বন-পাদপের উন্নত শাখায়
রাখিয়া শাবক পাখী পালে’’র কাছে থাকি,
জানে কি সে ভুজঙ্গিনী দংশন আশায়
করিয়াছে সে তরুর কোটর আশ্রয় ?
১১
এই যে হৃদয়-গ্রন্থি সুদৃঢ় বন্ধন ;
শাণিত দুরাশা-অসি অস্থির ভিতরে পশি
চকিতে শতধা করি’ করিবে ছেদন ।
সুখ-দীপ নিবাইবে কালের পবন !
জান কি, প্রাণেশ ! তুমি পার কি বলিতে ?
তােমায় নিরখি কেন চাহে এ চঞ্চল মন।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
সংসারের সুখাশায় জলাঞ্জলি দিতে ?
যন্ত্রণা-অনল কেন জ্বলিতেছে চিতে ?
কে জানে যে, জ্বলে কেন? কে আর বলিবে
বিষের যাতনা কত ? কিসে সে বুঝিবে তত,
আশীবিষ বিষদন্তে যা’রে না দংশিবে ?
জ্বলে কেন ?—অভাগীই সে কথা বলিবে।
১৪
সেই দিন,যবে, আহা, আছে কি স্মরণ ?
ডিষার অঞ্চলে ঢাকা, স্মৃতির দুয়ারে আঁকা
যেই মূর্তি হেরেছিল এ দীন নয়ন,
সেই দিন ছিড়িয়াছে সংসার বন্ধন।
সেই দিন জ্বলিয়াছে হৃদয়-নিলয় ;
সে অবধি অনুক্ষণ
শোকরূপ সমীরণ
উত্তেজি’ বিচ্ছেদানল প্রবাহিত হয়।
ঢালি অশ্রু বারি রাশি,-তবু ক্ষান্ত নয়।
সেই উষাকালে সেই শরত সময়
সেই শশী স্নান কায় দরশন করি’ হায়,

৬৪
ভুবনমােহিনী প্রতি।
কাঁদিলাম যেই দিন স্মরিয়া তােমায় ;
সেই হ’তে গেছে সুখ ত্যজিয়া আমায়।
১৭
তবে যেই দ্বার রুদ্ধ দুঃখের কাঁটায়,
কে করিল পরিষ্কার
এ সেই হৃদয়-দ্বার,
কে তবে পশিল ? নাহি জানি, পুনরায়
সুখ-আশে নিরাশার বিলাস শালায়।
১৮
কে তুমি? তুমি কি সেই হৃদয়ের ধন,
পরিণয় সূত্রে গাঁথি প্রেমের কুসুম পাতি
দিয়াছিলে গলে মাের যুড়া’তে জীবন?
হায়, সে সুখের দিন কোথায় এখন ?
১৯,
সে দিনের সে উৎসব স্মৃতির মন্দিরে
আগে প্ৰদানিত সুখ, এখন বাড়ায় দুখ,
ভারপ্রপীড়িত এই অসার শরীরে,
যত দিন প্রাণ বায়ু বহিবেক ধীরে ;
२०
এই জীবনের স্রোত সংসার প্রান্তরে
হইবেক প্রবাহিত,
যত দিন এই মত

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
মিলিবে না যত দিন অনন্ত সাগরে,
ততদিন এই স্মৃতি জাগিবে অন্তরে।
২১
দুঃখভারশীৰ্ণ বপুঃ কালের কবলে
যেই দিন সমর্পিব, সেই দিন প্রক্ষালিব
হৃদয়ের মলিনতা সুখসিন্ধু জলে ;
হইবেক স্মৃতি দগ্ধ চিতার অনলে।
মহাপ্রলাপ।
4
১
অগাধ গম্ভীর স্থির জ্ঞানময়,
হে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড আধার-ঈশ্বর।
হে নিত্য অনন্ত চিন্তাতীত বিভাে !
হে সত্য স্বরূপ প্রভাে পরাৎপর ।
२
অভাব স্বভাব সকলি তুমি হে,
তােমাতেই তুমি-তুমি জান তােমা।
তােমার অনন্ত ক্রীড়া জলধিতে
জীব জলবিম্ব, কি বুঝিবে সীমা ?
।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা। তােমার অদ্ভুত অনন্ত তরঙ্গে এ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড ফেন-সমন্নিভ! নীল নভঃপটে বিদ্যুৎ চমকে ; জীব বলে ‘আমি জাগি, ওহে বিভাে! ৪ পলকে পলকে উৎপত্তি, বিনাশ, তুমি সে উৎপত্তি, বিনাশ আপনি। তুমি ধৰ্ম্মাধৰ্ম্ম, কুকৰ্ম্ম সুকৰ্ম্ম, তুমি হে অচিন্ত্য হৃদিচিন্তামণি। ৫ ভ্রান্ত ভব-জীব চিন্তে কি পারিবে ? তুমিই তােমারে চিন, হে চিন্ময়! তােমার কর্তব্য তুমি করে থাক, জীব বলে আমি করি সমূদয় ! ৬ জলে থাকে মীন—জলকে চিনে না, তৃষ্ণায় সতত আকুল পরাণী । তুমি সে সলিল—তুমিই সে মীন- তুমি সে পিপাসা-পীড়িত আপনি।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
৭
তুমি হে অদ্বৈত, সৰ্ব্ব-বিশ্বময়,
নরকে স্বরগে সর্বত্র সমান।
ভ্রান্তভেদবুদ্ধি ক্ষুদ্ৰজ্ঞান জীব
তােমারে স্বতন্ত্র করে অনুমান!
৮
তােমার অস্তিত্বে সন্দিগ্ধ মানব,
তােমায় অচিঁতে দেয় ফুল জল,
বদ্ধপরিকরে ডাকে হে তােমারে ;
“কোথা দয়াময় কর হে মঙ্গল !”
f
ভক্তিমুগ্ধচিত্তে দেয় পুষ্পমালা,
পুষ্প কি স্বতন্ত্র, ওহে বিশ্বময় ?
যে তােমারে পূজে সে কি তােমা ভিন্ন?
কে পূজে কাহারে—এই ত বিস্ময়।
আস্তিক, নাস্তিক, ভণ্ড-গণ্ড, গোড়া,
কি বলে সে কথা বুঝিতে পারি না।
‘তােমা হতে তুমি স্বতন্ত্র এ কথা
কখনাে আমার প্রাণেতে সহে না!

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
১১
এ জৈব জগত; মায়ামরীচিকা
মিথ্যা ভ্রান্তিপূর্ণ অসিদ্ধ অসার !
জ্ঞানের গভীর সুতীক্ষ দৃষ্টিতে
যাবে ভ্রান্তি অন্ধকার।
দেখ, জীব
প্রকৃতি প্রকৃত প্রবাহের প্রায়,
সৰ্ব্বদা বিয়ােগ ব্যবধান মাঝে
জন্মিছে, জরি’ছে, মরি’ছে, তথাপি
এ বিশ্ব-রহস্য কেহ নাহি বুঝে।
এ জৈব জগতে কেবল যন্ত্রণা,
কেবল দুর্দশা, দুরাশা দুষ্কর।
জরা, ব্যাধি, শােক, সন্তাপে সতত
ব্রাহি ত্রাহি জীব ডাকে নিরন্তর ।
}
১৪
এত দেখে—তবু শিখে না মানব।
কেমন বিচিত্র কুহক মায়ার ।
সংসারের ঘাের কষাঘাতে সদা
অস্থির, তথাপি যা’ করে সংসার !

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
১৫
সংসার অকূল দুঃখের সমুদ্র,
কিরূপে তরিব, এই বড় ভয়!
আশার পসরা লইয়া মস্তকে,
ডুবিলাম বুঝি দেখ, বিশ্বময় !
জুয়ারের জল যায় বয়ে যায় !
অবিরাম গতি, দাবায় না কাল।
দিন অনুদিন তনুমন ক্ষীণ,
জীবনজড়িত জড়তা-জঞ্জাল।
১৭
কি জন্য আসিয়া, কি করে যেতেছি ?
বুঝিতে সময় দিল না আমায় !
জলের জলে মিলাই’ছে।
ধিক রে জীবন! যৌবন তােমায় ।
বুদুদ
এ শুভ্র স্ফটিক বিমল যৌবন,
এ রূপের কান্তি সুবর্ণ-সুষমা,
এ যশঃ-সৌভাগ্য, কীর্তি, ধন, জন,
জ্ঞান, গৰ্ব সব বিদ্যুত উপমা।
।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
১৯
হে গর্বিত, অন্ধ, ভ্রান্ত, মহামত্ত,
অসুরাবতার বলিষ্ঠ সম্রাট।
ফুলাইয়া বক্ষঃ দম্ভে চলিতেছ ;
ধীরে চল ; চক্ষে দেখে যেও বাট ।
২০
জীবের সুদিন জলের লিখন,
দেখিতে দেখিতে মিলাইয়া যায়।
আজিকে তােমার রাজত্ব অবনী,
কাল পরিণত সমাধি শয্যায় ।
২১
আজিকে প্রকৃতি শান্ত আছে, তাই
চলিতেছ দম্ভে ফুলাইয়া ছাতি ।
কাল কার্যক্রমে এই সে প্রকৃতি
ওই বক্ষঃস্থলে মারি’ বজ-লাথি
২২
ভূমেতে পাড়িবে তব রাজবপুঃ !
রাজছত্ৰদণ্ড, রাজসিংহাসন
বজ্রমুষ্ঠাঘাতে চূর্ণ হয়ে যাবে।
রহিবে কেবল স্বপ্নের স্মরণ !

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
২৩
সর্বোচ্চ আসনে বসি’ মান্যবর,
জগতে বুঝাও;—নিজে বুঝিয়াছ ?
জ্ঞান-অভিমান-গর্বিত হৃদয়ে
বিজ্ঞ বলাই’ছ ;-আপনা চিনেছ ?
২৪
পদে পদে ভাব স্বার্থ আপনার,
মুখে বল ‘করি পরের মঙ্গল !
সাম্য, রাজনীতি, সমাজ লইয়া
বল কত কথা ;বুঝ সে সকল ?
দূর হ রে মূখ।-প্রবঞ্চক !-ভণ্ড ।
বড় বড় বাক্যে প্রতার মানবে ।
সত্যের পবিত্র নাম ল’য়ে মুখে,
অসত্য আচর! এ’র ফল পাবে
২৬
কিছু স্থির নয়, ওরে ভ্রান্ত মন!
আমার আমার কর পরিহার ।
ছাড় দম্ভ কর নিস্বার্থ তপস্যা,
ভুল অহংকার অসার পসার !

१२
ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
২৭
লৌকিক যশেতে অন্ধ হইও না ;
তাহাতে কেবল দুরাশা বাড়িবে।
কামনা-বিজয়ী হতে পার যদি,
মুক্তি যে কি বস্তু বুঝিতে পারিবে।
২৮
প্রপঞ্চ-আত্মক-দেহ-পিণ্ড মাত্র
দুঃখের কারণ জানিহ নিশ্চয় ;
প্রকৃতি পুরুষে স্বতন্ত্র রাখিতে
পারিলে, পরম পুরুষার্থ হয় ।
২৯
অজ্ঞানে আশার করে উপাসনা !
আশা সে দুঃখের নিদান নিশ্চয়।
নিষ্কাম অপস্যা শুনিতে কঠোর ;
পরিণাম কিন্তু আশ্চর্য সুন্দর ।
অহাে বিশ্বময়। অভাব-আধার ।
রক্ষাকর, নাথ! বড় দুঃখী আমি।
ঘাের কষাঘাতে জর্জরিত তনু!
শান্তির নিদান এক মাত্র তুমি।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
৭৩
মনের আবেগে বলি কত কথা ;
তুমি সে বলও আমার কি দোষ ?
যা’ কর্তব্য হয়, তাই কর, প্রভাে।
সুখ দুঃখে মাের সমান সন্তোষ ।
দার্শনিক সংসার।
গগন, তপন, পবন, পাখার,
পৃথিবী প্রভৃতি প্রপঞ্চ ধাতার,
নক্ষত্র, চন্দ্রমা, গ্রহ, ছায়াপথ,
দিবা, রাত্রি আদি কাল ক্রমাগত,
প্রাতঃ, সন্ধ্যা, উষা, নিদাঘ, বরিষা,
নিয়তি বত্মেতে নিত্য যাওয়া আসা
এ সব অনাদি, নিত্য নিরবধি
রহিয়াছে—রবে। ভবের এ বিধি
কবে সৃষ্ট হ’ল ? কবে ধ্বংস হবে ?
কবে ছিল নাক ? কবে না রহিবে ?
কে পারে বলিতে ? ভাবিতে হৃদয়
বিস্ময়ে স্তম্ভিত! অন্ধকারময়
•

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
sy
হেরি দশদিশি,নভঃ, রবি, শশী,
অনিল, সলিল, কাল, দিবা, নিশি
ছিলনা যখন, কি ছিল তখন?
কি ছিল কোথায় ভাব দেখি মন ।
ভাবিতে পারিনা, বড় অন্ধকার ।
আশা ভরসাদি অকূল পাথার !
মন, প্রাণ, ধ্যান, ধারণা সকল,
যত কিছু সব ধূ ধূ ধূ কেবল !
যত কিছু তার কোন কিছু নাই;
অন্ধকার !-না না, কোথায় বা তাই ?
কোথায় বা তুমি ? কোথায় বা আমি ?
কোথায় অন্তর ? কোথা অন্তর্যামী
বিধাতা কোথায় ? উহুঃ, কি যন্ত্রণা।
দারুণ অসহ ভাবিতে পারি না ।
রে উন্মত্ত মন! কাজ নাই ভাবি
কাজ নাই ঘাের অকূলেতে ডুবি’;
নিজে অতি ক্ষুদ্র পরমাণু প্রায়
পরমাণুপুঞ্জসমষ্টি, ধরায়
যন্ত্রের পুতুল যন্ত্রে ঘূরি, ফিরি,
যন্ত্রে শব্দ হয়, যন্ত্রে গান করি।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
৭৫
যন্ত্রে হাসি কঁদি, যন্ত্রে অভিনয়
জীব রঙ্গভূমে, নাট্য ভ্রমময়
সংসার ! ক’দিন র’বে এ মােহিনী ?
পলকের কাৰ্য) পােহাবে রজনী,
সর্বশেষ অঙ্ক সমাপ্ত হইবে,
যন্ত্র-যবনিকা পড়িয়া রহিবে ।
অহং আত্মারাম জাগি যত দিন
পরমায়ু সংখ্যা ঠিক্ তত দিন।
তত দিন আর কত দিন হবে ?
সংখ্যা শতবর্ষ চৈতন্য রহিবে ।
এই শতবর্ষ অনন্তের সহ
উপমা করিলে,—আমি নাই কেহ
এত ক্ষুদ্র; কিম্বা অস্তিত্ব বিহীন।
অস্তিত্ব অনন্তে হয়ে গেছে লীন !
জীবের চেতনা নিদ্রার স্বপন।
তথাপি সংসারে,-আমি এক জন ?
ক্ষুদ্রাদপি ক্ষুদ্র অপূর্ণ অর্ধাঙ্গ
উন্মত্ত জীবের দেখ দেখি রঙ্গ!
অজেয় জিনিতে যায় কুতূহলে,
অকথ্য প্রলাপ যাহা নয় বলে।

ভূবনমােহিনী প্রতিভা।
অনন্ত হইতে অনন্ত যে জন,
নিত্যাপেক্ষা নিত্য, নিত্য নিরঞ্জন,
ভবিষ্যের অগ্ৰ অতীত-অতীত,
পূর্ণ পরাৎপর স্বয়ং সচ্চিত,
স্বতন্ত্র ভাবিতে হ’য়েছ ব্যাকুল ?
কখন সন্দেহ কভু বল ভুল,
কভু বল আছে, কভু বল নাই;
রঙ্গ দেখে অঙ্গ জ্বলি’ছে সদাই।
কতটুকু চিন্তা? কতটুকু জ্ঞান ?
কতটুকু বুদ্ধি ? কতটুকু প্রাণ
মনুষ্যের ? তাই ভাবিবে ঈশ্বরে ?
বৃথায় বক্তৃতা কুতর্ক বিস্তারে
কেন পণ্ডশ্রম ? যশের লালসা
হয়ে থাকে যদি, মিটিবে সে আশা।
কিন্তু কাৰ্য কিছু হবে না হবে না।
কভু হয় নাই, কভু হইবে না।
কোটিকল্প যুগ প্রজ্ঞা, প্রীতি, ভক্তি,
বিশ্বাস, সাধনা সাধি’ লভি, মুক্তি,
অনন্ত ভজিতে শিখ, তার পর
ব্রহ্ম-উপাসনা।-ব্ৰহ্ম পরাৎপর
?

তুবনমােহিনী প্রতিভা।
৭৭
তর্কেতে মিলে না, তাদৃশ উদ্ধেতে
জ্ঞান কি বিশ্বাস পারে না পৌছিতে।
প্রেমিক প্রেমেতে কান্দিয়া পাগল ।
ভাবুক ভাবেতে অগাধ বিহবল ।
সেই মাত্র সুখ, সেই মােক্ষ ভবে,
সেই সত্য, তাও প্রলাপে সম্ভবে !
সংসার প্রলাপে বিহবল সতত,
স্বার্থ কয়নে অস্থির উন্মত্ত ।
যশের লালসা অতি তীব্রতর
বৈষম্য বিরােধ অতি ভয়ঙ্কর !
“আমি বিজ্ঞ, প্রাজ্ঞ, প্রতিভাসম্পন্ন।
“কবি, দার্শনিক, জ্ঞানি-অগ্রগণ্য।
“আমি ধনী, মানী, যশস্বী সংসারে!
“আমি এক জন ! আমি কি কাহারে
“গণি ? সংসারেতে কে আমার মত ?
“আমি রাজা—পৃথ্বী মম পদানত !
“আমি প্রভু; তুমি সেবক আমার ।
“আমি শ্রেষ্ঠ, তুমি নিকৃষ্ট, ধাতার
“লিখন এ সব, অদৃষ্টের মত
“পাল মম আজ্ঞা, দেখেছ শাণিত

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
“তরবারি ? জান মম বাহুবল ?
“আমি বলীয়ান ;-তােমরা কেবল
“সেবক আমার ! আমারি কারণে
“জন্মেছ ভূতলে, আমি যদি প্রাণে
“বধি তােমাদিগে—মরিবে নিশ্চয়।
“আমি যদি রাখি, তবে কারে ভয় ?
“আমার তৃপ্তিতে তােমাদের তৃপ্তি,
“আমার গতিতে তােমাদের গতি!
“আমি যাহা ক’ব—পাষাণের রেখা,
“আমার যে আজ্ঞা—বিধাতার লেখা
এরূপ বৈষম্য, অহহ! নিরুপায়,
এ অন্তঃপ্রবাহ দেখাব কাহায় ?
জন্মমাত্র সবে সমান সংসারে
সকলেই দায়ী সকলের তরে।
সকলের ভােগ্য স্বাধীনতা-নিধি,
দাসত্ব, প্রভুত্ব, কাল্পনিক বিধি !
থাকুক সভ্যতা, সুশিক্ষা, সমাজ,
পাশ্চাত্য বিধানে নাহি কোন কাজ।
দূর কর মিথ্যা ভণ্ডের ভণ্ডামি।
বৈষম্য বিচার কিসের ? কে তুমি ?

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
৭৯
আমি তুমি ভিন্ন কি আছে সংসারে ?
তুমি পূজ—আমি পূজিব তােমারে।
সরস্বতী পূজা।
১
কবি কুঞ্জবনে তুলিতে কুসুম
কে যাবি রে সাথে আয়,
যদি যুড়াবি তাপিত প্রাণ।
শোক, তাপ, জরা, যন্ত্রণা তথায়
অনায়াসে ভুলা যায় ;
ভবে সেই মাত্র সুখ স্থান!
২
দেবতা-বাঞ্ছিত ত্রিদিব আলয়
কতই বা শােভা ধরে ?
সে’ত কপােলকল্পিত কথা।
অকল্পিত স্বর্গ
দেখসে অবনী’পরে,
আহা, সকলি সুন্দর তথা ?
কবি-হৃদ-কুঞ্জ

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
কোথা পারিজাত দেবের পীযূষ,
ইন্দ্রের অমরাবতী,
তা’কি দেখেছ কখন ও চখে ?
ভ্রান্ত মানবের সুখতৃষ্ণা হেতু
বাসনা প্রবল অতি,
তাই স্বরগ স্বপনে দেখে।
৪
E
কত উচ্চ স্থানে আছে সে স্বরগ,-
স্বরগই কত দূর ?
স্বর্গ কোথায় আছে কে জানে ?
কবি-হৃদ-স্বর্গ সীমান্য রাজ্য
জীবন্ত অমরাপুর
অতি পবিত্র উন্নত স্থানে।
৫
থাকে যদি সুধা, থাকে পারিজাত,
ইন্দ্রের অমরাবতী,
তবে আছে তা’ কবির হৃদে।
থাকে যদি সুখ, শান্তি, স্বাধীনতা,
পবিত্র ভকতি, প্রীতি,
তবে আছে তা’ কবির হৃদে।
.

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
৮১
৬
কবি কুঞ্জবন জীবন্ত নন্দন
স্বর্গাদপি গরীয়সী;
আমি কি দিব তুলনা আর ?
বৃক্ষে মােক্ষ ফলে, ফুলে সুধা গলে,
পত্রে শান্তি ছায়ারাশি,
মূলে ভক্তি প্রেম ধারা তার।
৭
অনন্ত প্রসর বিবেক প্রান্তর
প্রেমের পরিখা বেড়া,
তাহে অমৃত প্রবাহ বহে।
(মাঝে) অতি মনােহর শান্তি সরােবর,
মােক্ষ-বৃক্ষ, বল্লী-বেড়া,
চরে চৈতন্য-সারস তাহে।
শ্বেত স্বচ্ছল জ্ঞানের কমল
প্রস্ফুটিত সারি সারি,
তাহে প্ৰীতি-মকরন্দ রে ।
মনােভৃঙ্গ তা’য় মত্ত, মধু খায়
ফুলে ফুলে সবে উড়ি;
সুখ-প্রমত্ত ঝঙ্কার ছাড়ে।
-

৮২
ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
৯
।
কুঞ্জ-চারি-তীরে, বৃক্ষ চারিধারে
ফলপুষ্প পত্রে নত,
চির অশুষ্ক অচ্যুত তাহা।
সুযশ-সমীরে সুগন্ধ বিতরে,
বিশ্ব তাহে আমােদিত,
সুখ কিরূপে প্রকাশি, আহা!
১০
নিকুঞ্জ কুটীরে কল্পনা কুহরে,
প্রতিভা পাপিয়া গায়,
স্বরে অমিয় লহরী উঠে ।
অবনী মােহিয়া আকাশ শদিয়া
উচ্ছাস উঠিয়া তায়
স্বর অম্বর ভেদিয়া ছুটে !
সরসীর
কূলে লতাকুঞ্জ তলে
ভাবুক প্রেমিকচয়,
বসি’ পুলক পূর্ণিত প্রাণে।
কাব্য-কুন্দফুলে মালা গাঁথি’ গলে
পরি’ছে মাধুরীময়,
কিবা গায় মধুমত্ত মনে !
২

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
১২
পুষ্প মকরন্দ পরাগ সুগন্ধ
রসাল পীযুষ ফল,
সব যদৃচ্ছা ভুঞ্জিছে সুখে।
ইচ্ছা যার যাহা, লভিছে সে তাহা,
চাহি যতন বল,
কবি কল্প বৃক্ষতলে থেকে
১৩
কিসের অভাব ? কিসের অসুখ ?
যা চাহ, তা মিলে তথা।
তথা অনন্ত ঐশ্বর্য রাশি।
তথায় যা নাই, ব্রহ্মাণ্ডে তা নাই,
আর কি কহিব কথা,
সুখ উথলিছে দিবানিশি ।
১৪
মণিময় খাতে প্রেমধারা পাতে
বহে নদী চতুষ্টয়,
নাম, ধৰ্ম্ম অর্থ কাম মােক্ষ।
অনন্ত প্রবাহে নিত্য নদী বহে,
কে জানে কোথায় যায়।
তীরে দেব নর যক্ষ রক্ষ
!

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
১৫
বসি’, পরপারে যেতে ইচ্ছা করে,
যাইতে পারে না কেহ,
পারী জমেনা সময় মাঝে।
কালের আশ্বাসে আছে তারা বসে,
যায় নিশা, আসে অহঃ,
নিত্য সাক্ষী রাখি’ প্রাতঃসাঁঝে।
১৬
আজি শুভ দিন স্বৰ্গৰ্মৰ্ত্ত জুড়ি’
আনন্দ-উন্মত্ত সবে,
ভবে বসন্ত পঞ্চমী তিথি ।
দেব নর যক্ষ রক্ষ গন্ধৰ্বাদি
জয় জয় জয় রবে
গায় জ্ঞানদা ব্রহ্মাণী স্তুতি।
১৭
শান্তি-সরােবরে জ্ঞানাঙ্কুজ’পরে
জ্ঞান-রাজরাজেশ্বরী,
সঙ্গে বিদ্যা বুদ্ধি সখী দ্বয়
বিহরে, অধরে হাস্য সুধা ক্ষরে,
করে বীণা, আহা মরি,
রূপে ত্রিভুবন তনময় !
=

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
১৮
বাল্মীকি, ব্যাসাদি, বাণ, ভবভূতি,
ভারবি, শ্রীহর্ষ কবি,
তথা কালিদাস মহামতি
ল’য়ে কাব্য পুষ্পহার পুস্পাঞ্জলি মা’র
পাদপদ্ম’পরি’ সঁপি
কিবা গাই’ছে সুস্বরে স্তুতি।
১৯
দুঃখী বঙ্গ কবি কোথায় কি পাবে ?
দারিদ্র্য সম্বল সার,
আর কি আছে ? কি দিয়া পূজে ?
অন্ধ খঞ্জাতুর বধির যে জাতি,
স্কন্ধেতে দাসত্ব-ভার,
সৃহে দুর্দশা-দুন্দুভি বাজে!
২০
তারা কভু পারে, যােড়শােপচারে
জ্যেষ্ঠ শ্রেষ্ঠ পুত্ৰসম,
হ্যা মা! পূজিতে ও পদতল ?
পূর্ণব্রহ্মময়ি কৃপাময়ি অম্ব!
জগদম্বা তুমি সত্য,
মম একমাত্র আশা-স্থল।

৮৬
ভুবনমোহিনী প্রতিভা।
২১
প্রসন্নে! বরদে। জ্ঞানদে! মােক্ষদে।
দে মা, পদ দুটী হৃদে,
আমি একান্তে ধরেছি তরে।
গাঢ় মন প্রাণে প্রেমা চন্দনে
চর্চি’ জ্ঞান-পুষ্প পদে
যেন দিতে পারি প্রাণ ভরে।
শ্মশানদর্শনে।
এই ভাগীরথী, এই তীর ভূমি,
ওই ভয়ানক শ্মশান সৈকত।
ওই চিতা-বহ্নি অনন্ত জিহ্বায়
দংশে নর-দেহ,-গঞ্জে মেঘবৎ।
ওই স্তুপে স্তুপে শ্মশান-কলস,
ওই স্তুপে স্তুপে কঙ্কাল-কপাল!
ওই স্তুপে স্তুপে চিতা-ভস্ম-রাশি,
ওই লক্ষ লক্ষ গৃধরাজপাল !

৮৭
ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
ওই ফিরে যত শবভুক পশু,
কুকুর শৃগালে করে কোলাহল ;
ওই শুন শুন বিকট চীৎকার,
ওই দেখ দেখ পিশাচের দল ।
৪
ওই দেখ দেখ বিকট ব্যাপার।
ওই দেখ মুখে রুধিরের ধার ।
ওই দেখ খায় দগ্ধ নরমাংস,
ওই দেখ দেখ চাহিয়ে আবার
৫
মহাশ্মশানেতে ফিরে মহাকাল
করে ভীম গদা, বিদ্যুৎ ঝলকে,
সঙ্গে শতদূত, যম-অবতার,
হাসে খিট খিট, ঝলকে ঝলকে
৬
উগারি অনল, চক্ষু রক্ত লােল
দীর্ঘ পাণ্ডু গুম্ফ, শ্মশ্রু ভয়ঙ্কর !
ভীম আস্ফালনে ফিরে প্রেত-ভূমে,
নররাহুতি ঢালে চিতা’পর !

৮
ভুবনমােহিনী প্রতিভা
৭
দেখ পুনঃ দেখ চতুর্দিকে চেয়ে,
এরূপ আশ্চৰ্য্য দেখনি কখন ;
অষ্টাদশ কোটি অপােগও শিশু
দাড়ায়ে সম্মুখে হাসি’ছে কেমন!
বালকের মতি নাই জ্ঞান-লেশ,
নাই সুখ দুঃখ হিতাহিত বােধ ;
নাই ভয়, নাই শােক মনস্তাপ,
অভাগার। সব নিতান্ত নির্বোধ ।
থ
ওই যে অনল শ্মশান-সম্মুখে
জ্বলি’ছে অনন্ত জিহ্বা বিস্তারিয়া ;
জননী ওদের পুড়ি’ছে উহাতে ;
অজ্ঞান শিশুরা দেখি’ছে চাহিয়া !
দেখি’ছে কৌতুক ; হাসি’ছে অহলাদে
চিতানলে ভাবি’ অনল-উৎসর।
অভাগা শিশুরা কিছুই বুঝে না।
কালি যে কি হবে—নাই অনুভব।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
৮৯
১১
পুড়ি’ছে জননী, পুড়ি’ছে সোদর,
পুড়িবে অচিরে আপনারা সব !
এ সকল কথা কিছুই বুঝে না,
সঁড়া’য়ে দেখি’ছে অনল-উৎসব ;
১২
আহা ! আজ সপ্ত শত বর্ষ গত
জনকের মৃত্যু হয়েছে বিপাকে,
শােক-জর্জরিতা অভাগী জননী
ছিল দুগ্ধপােষ্য শিশু ক’টা দেখে ।
সপ্ত শত বর্ষ বিধৰ্মী তস্করে
নিষ্ঠ র যন্ত্রণা দিয়েছে কেবল ;
সুঠেছে ভাণ্ডার, হরেছে সতীত্ব ।
যাহা যাহা ছিল, হয়েছে সকল !
১৪
বীরের গৃহিণী, বীরের জননী,
এত অপমান সহিতে কি পারে ?
ঘাের মনস্তাপে ত্যজিল পরাণ,
শিশুদিগে করি অনাথ সংসারে।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
১৪
মরেছে জননী।
কেবা বুঝে তাহা?
মৃতা মা’র বুকে পড়িয়া সকলে,
করে স্তন পান, ধাধসে পরাণ
রহে কোন রূপে ঈশ্বর কৌশলে ।
১৫
ঈশ্বরের জীব বাচে কোনরূপে;
নাহি শিক্ষা, দীক্ষা, জ্ঞান-সংস্কার
জীবন্ত প্রায় দুগ্ধপােষ্য গুলি
উদরের তরে ফিরে আপনার!
সব অপােগও অদৃষ্টক্রমেতে,
কয়টী বালক হ’ল জ্ঞানবান্ ;
জানিল আমরা কাঙ্গালি সংসারে,
জানিল,—জননী ত্যজেছে পরাণ ।
জানিল জননী অকালে, বিপাকে
হারা’য়েছে স্বামী, বীর পুত্রগণে।
জানিল জননী তস্করের করে
হারা’য়ে সতীত্ব অমূল্য রতনে,

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
৯
১৮
ঘাের অপমানে ত্যজেছে পরাণ !
মৃতা মা’র দুগ্ধে জীবিত আমরা।
ভাবিয়া দুর্দশা, শ্মশানে বসিয়া
দুই একবার কাদিল তাহারা!
১৯
আপনার দুঃখে কাদিতে শিখিল,
দেখিল বিধাতা, দেখিল শমন।
ছদ্মবেশী কাল করিল বঞ্চনা,
সুধা বলি দিল গরল ভীষণ !
২০
সুধা ভাবি’ নিল বিষ-পাত্র করে,
অমর হইব ভাবিল বালক।
যে খাইল বিষ সেই অচেতন,
সেই পরিহরি’ গেল ইহলােক।
২১
অকালেতে কাল হরিল তাদিগে,
জানি কি আছে অদৃষ্টে আবার,
কোথা গেলে, ভাই! এস একবার,
দেখে যাও আজ বঙ্গে হাহাকার।

4
৯২
ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
২২
কোথা, প্যারী দাদা! কোথা গেলে ভাই!
সজ্জন সুশীল সত্যপরায়ণ।
নিদারুণ শােক-বজ্র মারি’ হৃদে,
কোথা গিয়ে বসি’ রহিলে এখন ?
২৩
অবােধ হৃদয় সকল ভুলিয়া
ধৈৰ্য্য ধরেছিল তােমার আশায় !
তুমি, দাদা! শেষে এই কি করিলে ?
ডুবাইলে ভেলা ভরা দরিয়ায় ।
২৪
অজ্ঞান শিশুর মরে বিষপানে,
সহিত না তাহা তােমার হৃদয়ে।
দাসত্ব-নিগড়ে বদ্ধ ছিলে, তবু
কত দিক্ রেখেছিলে বুক দিয়ে !
২৫
আজ, প্যারী দাদা। নূতন যন্ত্রণা,
নূতন শশাকেতে কাঁদাইয়া, ভাই।
জননীর সঙ্গে একই চিতাতে
পুড়ি’ছ, পঁড়া’য়ে দেছিতেছি তাই,
।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
২৬
আজ, গুণ-ধাম ! তব হেন ভেয়ে,
হারা’য়েছি, আর পাব না দেখিতে
আজ, দাদা! এসে দেখে যাও চক্ষে
কুকুর-কীৰ্ত্তন হয়েছে বঙ্গেতে।
২৭
কে আছে আমার ব্যথার ব্যথিত ?
মরমের ব্যথা কাহারে জানাই ?
যে অনল হৃদে জ্বলি’ছে রে, তাহা
বক্ষঃস্থল চিরি’ কাহারে দেখাই ।
২৮
অন্তস্তলস্পর্শী যেই বহ্নিশিখা
হৃৎপিণ্ড দগ্ধ করি’ছে আমার ।
এ’র কি দারুণ ভয়ঙ্কর জ্বালা।
যা’র জ্বালা, সেই জানে আপনার?
২৯
হৃদয়-চিতাতে জ্বলি’ছে যে বহ্নি,
সলিল সিঞ্চিলে লক্ষ বর্ষ তা’য়
নিবিবে না, পুন হইবে প্রবল।
রাবণের চিতা জলে কি নিবায়।
২
--*

ভুবনমােহিনী প্রতিভা ।
৩০
তবে কি নিৰ্ব্বাণ হবে না এ চিতা ?
তবে কি হইবে ভস্ম এ হৃদয় ?
তবে কি এ জ্বালা স’ব চির দিন ?
তবে কি এ চিতা নিবা’বার নয় ?
৩১
নিবিবে না কেন? হইবে নির্বাণ,
নিবায় যাহাতে, কর দেখি তাই।
সলিলে না নিবে, নাই বা নিবিল ?
অসুরের রক্ত ঢাল দেখি, ভাই।
৩২
ধর খড়গ-কাট রুধিরের গঙ্গা !
তােল রক্ত—ঢাল কলসী কলসী,
নিবিবে না কেন?-অবশ্য নিবিবে!
হৃদয়ের বহ্নি যাবে কোথা ভাসি’!
৩৩
রক্তাহুতি দিয়া নিবাও এ চিত;
নহে সংক্রামক হইয়া অনল,
ব্যাপি’ দশ দিশি দহিবে প্রত্যেকে,
দহিবে জীবন-দহিবে সকল ।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
পিতৃতর্পণ।
১
(আজ) মহাবিষুব সংক্রান্তি ভারতে,
এস, ভাতৃগণ, এস গঙ্গাতীরে,
এস, ভাই, আজ বহুদিন অন্তে
তুষি পিতৃলােকে তর্পণের নীরে।
L
২
জাহ্নবীর জলে স্নান করে, ভাই,
ধর কোষা কুশ পবিত্র হইয়া ;
কায়মনপ্রাণে ভাবি’ পিতৃপদ,
তােল গঙ্গাজল কোশায় ভরিয়া।
হিন্দুবংশে যদি হিন্দু থাক কেহ,
থাক রে সুপুত্ৰ বংশের তিলক,
তর্পি তিন কোষা গঙ্গোদক তবে
সন্তুষ্ট করহ আজি পিতৃলােক !
৪
জন্ম বৃদ্ধি সুখ স্বাদের হইতে,
হেন পিতৃলােকে আছ রে ভুলিয়া ?
তৃষ্ণার্ত পিতরঃ শুকণ্ঠে ওই
ডাকে শূন্যপথে-শুন কাণ দিয়া।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
৫
“হিন্দুবংশে যদি হিন্দু থাক কেহ
হও কুপুত্র কুলের অধম।
হও হিন্দুবীর্যে যথার্থ সন্তান,
তবে পিতৃদুঃখে ব্যথিবে মরম।
৬
“তবে পিতৃব্যথা বাজিবে পরাণে,
দিবে জলপিণ্ড তিতি’ অশ্রনীরে।
শুনি’ পিতৃলোেক দুর্দশা-কাহিনী
কখনাে র’বে না নিশ্চিন্ত অন্তরে।
৭
“পুত্ৰ রে ! কি কব দুঃখের বারতা ?
সহস্র বৎসর আছি উপবাসে !
আছি তৃষ্ণাতুর শুষ্করুদ্ধকণ্ঠে
দীন হীন ক্ষীণ জীবন্মত বেশে।
“নয়নের অশ্রু নয়নে শুকায়,
সন্তাপের শ্বাস মিশায় বাতাসে।
আজ কত বর্ষ কেমন যে আছি,
ভ্রমেও সে কথা কেহ না জিজ্ঞাসে।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
থ
“যে দিন হইতে হিন্দু-ভাগ্য-শশী
ঢাকিয়া গিয়েছে যবন-জলদে,
সে দিন হইতে আছি উপবাসী।
আছি তৃষ্ণাতুর! পুত্ৰ রে জল দে!
১০
যে দিন হইতে আৰ্য্য-শৌর্য-সূৰ্য্য
গ্রাসিয়া ফেলেছে যবন-রাহুতে,
সে দিন হইতে আছি উপবাসী।
আছি তৃষ্ণাতুর বিশুদ্ধকণ্ঠেতে।
১১
যে দিন হইতে আৰ্যরাজলক্ষী
হরিয়া ল’য়েছে যবন-তস্করে।
সে দিন হইতে আছি উপবাসী,
আছি তৃষ্ণাতুর—আছি প্রাণে মরে।
১২
“যে দিন হইতে ইন্দ্রের অমরা
পিশাচের স্পর্শে অশুচি হয়েছে,
সে দিন হইতে আছি উপবাসী।
সে দিন হইতে সকলি গিয়েছে।

৯৮
ভুবনমােহনী প্রতিভা।
১৩
“যে দিন হইতে এ কনক পুরী
বানরে পােড়ায়ে করিয়াছে ছাই,
সে দিন হইতে আছি উপবাসী,
সে দিন হইতে আর কিছু নাই।
১৪
“যে দিন হইতে সিংহের আহার
কুক্কুর শৃগালে করেছে ভক্ষণ,
সে দিন হইতে আছি উপবাসী ।
পুত্ৰ রে ! সকলি নিয়তি-লিখন ।
“যে দিন হইতে সােণার সংসার
পরের পদেতে বিকা’য়ে গিয়েছে
সে দিন হইতে শুকা’য়েছে সিন্ধু,
হিমাদ্রির শৃঙ্গ নত হইয়াছে।
১৬
“যে দিন হইতে যবন-সমুদ্র
উত্তাল তরঙ্গে প্রবেশি’ ভারতে,
গিরি-নদ-নদী-সিন্ধু-জনপদ
ভাসায়ে দিয়েছে দুর্দম স্রোতেতে।
T

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
৯৯
১৭
“সে দিন হইতে সব অপবিত্র ।
পুত্র রে কাজেই আছি উপবাসী।
ভারত-সমুদ্রে নাই জলবিন্দু,
যাহা দেখ, উহা হিন্দু-রক্তরাশি ।
“গঙ্গা যমুনাদি সপ্ত নদ নদী
দেখিতেছ চক্ষে আজো বহিতেছে
জল নহে উহা হিন্দুদের রক্ত,
হিন্দু-মজ্জা-মাংসে বালুকা জন্মেছে
১৯
“দেখি’ছ, লতায় ফুটে যে কুসুম ;
বৃক্ষশাখে দুলে সুরসাল ফল ;
ক্ষেত্রে শােভে শস্য নয়নরঞ্জন,
কি দেখি’ছ ? হিন্দু-মেদ ও সকল !
২০
“দেখি’ছ সুমেরু নীল-বিন্ধ্যাচল,-
হিন্দুদের অস্থি কঙ্কাল-প্রমাণ।
দেখি’ছ যে সব দেশ জনপদ,
কি দেখি’ছ ?উহা হিন্দুর শ্মশান!
।

।
ভূবনমােহিনী প্রতিভা।
২১
“কি দিয়া তৰ্পণ করিবি রে পুত্র ?
হিন্দুরক্ত বিনা পানীয় ত নাই।
তবে যদি পার—বলি উপদেশ,
পার বা না পার—চিন্ত দেখি তাই।
২২
“হেন পুত্র যদি থাক কোন জন,
ভাঙ্গিয়া গঠিতে পার এ সংসারে ?
ভারত-সমুদ্র, সপ্ত-নদ-নদী
হেঁচিয়া ফেলিতে পার স্থানান্তরে!
২৩
“আবার সগর বংশ যদি জন্মে
ভীম বাহুবলে কাটে পারাবার !
বংশ উদ্ধারিতে জন্মে ভগীরথ,
আনে দ্রবময়ী গঙ্গারে আবার ;
২৪
“আবার যদ্যপি জন্মে এক ভীষ্ম,
নব কুরুক্ষেত্রে করে রে তর্পণ,
আকণ্ঠ পূরিয়া পান করি তবে,
করি যুগান্তের তৃষ্ণা নিবারণ।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
২৫
“আবার যদ্যপি জন্মে এক রাম ;
কোদণ্ড ফলায় কাটিয়া সরযূ,
আব্ৰহ্ম প্লাবিয়া করে রে তর্পণ,
তবে তৃষ্ণা শান্তি হতে পারে কিছু!
২৬
“যে শরশয্যায় আছি রে শয়িত,
যে অমল-শিখা জ্বলে রে বক্ষেতে।
আবার যদ্যপি জন্মে ধনঞ্জয়,
ভােগবতী গঙ্গা আকর্ষি’ শরেতে
২৭
“নিবায় এ বহ্নি, তবেই নিবিবে,
অন্যথা এ দাহ দহিবে ভীষণ !
থাক যদি কেহ রাম, ধনঞ্জয়,
কর্ণ, ভীমসেন—করহ তর্পণ।
২৮
“থাক যদি কেহ বংশে ভগীরথ,
বাজা’য়ে দুন্দুভি আন জাহ্নবীরে ;
আব্রহ্ম প্লাবিয়া করহ তর্পণ ;
মুক্তি লভি’ সবে যাই স্বর্গপুরে।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
অবনী-বৈচিত্র্য।
সাগর-অম্বরা বিশাল মেদিনী
শয়িত অনন্ত অম্বর-শয্যায় ;
আদিত্য আপনি আমােক সঞ্চারে,
শিওরে পবন চামর দুলায়।
২
প্রিয় সহচরী প্রকৃতি সুন্দরী
আপার হস্তে পরিচর্যা করে।
অজর অমর রূপসী ষােড়শী
বিলাস বিভঙ্গে ভুলায় সংসারে।
রূপে কি গৌরবে, মানে কি বৈভবে,
নাহিক জীবন্ত তুলনা যাহার,
হেন নারী-রত্ন লভিব বলিয়া,
না হয় সংসারে ভাবনা কাহার ?
৪
আশায় উন্মত্ত মানবের মন
বুঝে না উহার নিগুঢ় বারতা।
ও যে সর্বনাশী রাক্ষসী বিশেষ
কালভুজঙ্গিণী মণিতে মণ্ডিত।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
৫
যে ছুঁয়েছে ওরে সেই মজিয়াছে ;
তাহারি জনম গিয়াছে কাঁদিতে।
সেই সে বুঝেছে ও মৃগতৃষ্ণিকা
ক্ষণিক তৃষিত কুরঙ্গে ধাধিতে !
৬
কোথা যদুকুল ? কোথা রঘুকুল ?
কোথায় কৌরব পাণ্ডবের দল ?
কোথায় হস্তিনা ? কোথা ইন্দ্রপ্রস্থ ?
কোথায় দ্বারকা, কোথায় কোশল ?
?
৭
কোথা আফুসিয়া ? কোথায় রােস্তম ?
কোথায় তৈমুর, মামুদ, চেঙ্গেজ ?
কোথা বাহু-বল-গর্বিত-স্পর্ধিত
দুর্দম মােগল পাঠানের তেজ ?
৮
সাহা কি সুলতান, মোগল, পাঠান,
আরব আফগান কোথায় এখন ?
কোথা সে আর ভারত-ঈশ্বর ?
কোথা কহিনুর ময়ুর-আসন ?

১০৪
ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
T
৯
কোথা হেরেক্টাল, আলেক্‌-জাণ্ডার ?
কোথা বােনাপার্ট বীর-চূড়ামণি ?
কোথা হানিবল ? কোথায় সিজর ?
কোথা সে দিনের ক্লাইব কেরাণী?
১০
কোথায় কণিক, চাণক্য চতুর ?
কোথায় মেকিয়াভেলি ভয়ঙ্কর
কূট-বুদ্ধি-দাতা, কঠিন হৃদয় ?
সত্য-বিসম্বাদী প্রচ্ছন্ন তস্কর ?
১১
সকলে গিয়েছে, সকলি হয়েছে,
রয়েছে কেবল কীর্তির প্রাঙ্গন।
ঘাের হত্যাভূমি বিকট শ্মশান
কুরুক্ষেত্র আদি শত নিদর্শন।
১২
দেখিয়া না বুঝে অজ্ঞান মানব
আশার কুহকে উন্মত্ত জীবন।
দাঁড়াইয়া সেই শ্মশানভূমেতে
আবার দেখায় নটের নৰ্ত্তন।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
আবার দুরাশা চরিতার্থ তরে
চতুর্দিকে ওই ছুটি’ছে উন্মাদ!
জলন্ত পাবকে পড়িতে পতঙ্গ
আবার ছুটি’ছে একি এ প্রমাদ ?
১৪
আমার আমার আমার বলিয়া
করি’ছে পাগলে ঘাের গণ্ডগােল !
তােমার কেবল চরমের শয্যা
চারি হস্ত ভূমি—সমাধি-সম্বল।
কারু নয় পৃথ্বীপৃথ্বীর সবাই ;
প্রকৃতি স্বয়ং বলে এই কথা।
রাজত্ব দাসত্ব সর্বনেশে শব্দ
কে আনিল ভবে, সে এখন কোথা ?
পাই যদি সেই দরে আবার,
শুধাই তাহায় গােটা দুই কথা !
দেখি একবার কেমন সে জন,
দেখাই তাহারে মরমের ব্যথা !

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
১৭
সমাজের সৃষ্টি কে করিল আগে ?
রাজত্ব দাসত্ব তাহারি সৃজন,
তাহারি সৃজিত অঙ্কুরে সংসারে
বিষময় ফল ফলি’ছে এখন।
১৮
কোথা ভাই সব প্রকৃতির পুত্র।
সমাজ-শৃঙ্খল বিমুক্ত, স্বাধীন,
সদানন্দুচেতা, সত্য-ব্রহ্ম জ্ঞানী,
আত্ম-পর-শূন্য, স্বার্থ বােধহীন।
১৯
দেখ’সে তোমরা আমাদের দশা।
আমাদের দুঃখ, দারিদ্র্য, যন্ত্রণা,
রোগ, শােক, তাপ, স্বার্থ-কয়ন,
পরাধীন প্রাণে প্রহার-বেদনা ।
২০
দেখে যাও আজ সংসারের দশা,
সকলি বিকৃত হয়েছে এখন
দেখে যাও, ভাই! আমাদের পদে
দাসত্ব সেজেছে, দেখিতে কেমন?

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
১০ ৭
২১
দেখে যাও, ভাই! ভবঙ্গ-ভূমে
নটের কল্পিত নাট্য-অভিনয় !
ভাড়ের ভণ্ডামী, পুতুলের নৃত্য,
পাগলের হাস্য কৌতুহলময়।
২২
দেখে যাও, ভাই! বিকট শ্মশানে
পিশাচের ঘাের কলহ কোন্দল,
হিংসা, নিষ্ঠুরতা, নর-রক্ত-পান ;
শূন্য-বিদারিত ভয়ঙ্কর গােল !
২৩
দেখে যাও এক বীভৎস রঙ্গেতে
রঞ্জিত পৃথিবী, পূর্ববৎ নাই ;
এখন এ পৃথী দেখিয়া তােমরা
কখনাে চিনিতে পারিবে না, ভাই!
২৪
ঐ শুন দূরে রুসিয়া হুঙ্কারে,
দহে টাকী ঘাের অন্তর দাহেতে ;
ফান্স ক্ষত দেহে দিতেছে প্রলেপ,
প্ৰসিয়া গম্ভীর গৌরব-মদেতে।
F

১০৮
ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
২৫
দু’দি লইয়া অস্থির ইংলণ্ড,
তথাপি বাসনা দুই দিক চাই!
রহস্য দেখিয়া হাসিছে পাঠান,
আতঙ্কে কম্পিত ভারত সদাই।
২৬
বড়াই লইয়া ব্যস্ত বৃটনীয়া,
কত দিকে কত দেখায় চটক্ ;
কন্যারে ভৎসিয়া, বধূকে বুঝায়,
তথাপি শয়তান না মানে আটক।
২৭
এক রজু দ্বারা বিংশ কোটি নরে
বাঁধিয়া নাচায়, যেরূপে বাসনা,
দীর্ঘকাল পরে পদাঘাতে শীর্ণ
অর্ধমৃত জীবে যা কর করুণা।
২৮
মড়ার উপরে খাঁড়ার আঘাত,
বলিতে কহিতে নাহিক সংসারে।
নিজ্জীবের রক্ত করিয়া শােষণ,
জীবন্তের পদ পূজি’ছে সাদরে !

ভুবনমােহিনী প্রতি।
২৯
আজ রাজপুত্র এসেছে ভ্রমিতে,
দাও ভারতীয় দেহের রুধির ;
আজ কাবুলিয়া নাড়িয়াছে মাথা,
দাও ভারতীয় কাটিয়া শরীর।
রুসিয়ায় বল দেখাবার তরে
ভিক্টোরিয়া হবে ভারত-ঈশ্বরী ;
অবনত মাথে, আয় ভারতীয়া ।
দে দেহের রক্ত হৃৎ-পিও ছিড়ি।
কি করে ভারত ? ভারত নির্জীব,
বিংশ কোটি মৃত লইয়া অঙ্কেতে
পৃথিবীর মাঝে ভারত শ্মশান!
করে বৃটনীয়া যা ইচ্ছা মনেতে ।
নাই ভারতের তীক্ষ্ণ তরবারি,
জানে না ভারত ছাড়িতে হুঙ্কার ।
মার আর রাখ, যা’ কর বৃটন,
যা’ কর সকলি সঙ্গত তােমার।

১১৫ ভুবনমোহিনী প্রতিভা। ৩৩ তুমি বলীয়ান্ দুৰ্বল ভারত, ভারত তােমার ক্রীড়ার পুত্তল, তুমি হর্তা কর্তা বিধাতা উহার, তুমিই উহার ভরসার স্থল ! ৩৪ মার কাট আর শােষহ রুধির, বিশ্বাসঘাতক নহে ভারতীয় প্রত্যয় না হয় খােল ইতিহাস, শঙ্কটে ভারত রাখে বুক দিয়া। অসভ্য বর্বর আর যত বল রাজদ্রোহী নয় হিন্দুর সন্তান। নহে মিথ্যাবাদী কপট, বঞ্চক, সত্য রক্ষা হেতু দিতে পারে প্রাণ। ৩৬ সরল স্নেহের কাঙ্গাল আমরা স্পষ্ট বাক্যে রুষ্ট হয়াে না, বৃটন। সরল হৃদয়ে বলিয়াছি যাহা, আবার বলিব মনের বেদন-

ভুবনমােহিনী প্রতিভা
১১১
৩৭
শুন বা না শুন, ইচ্ছা সে তােমার,
স্পষ্ট স্পষ্ট ক’ব না করিব ডর ;
নিগ্রহের চক্ষে দেখ যদি, তাহে
দুৰ্ব্বলের বল আছেন ঈশ্বর !
এই যে ভারত জীবন্ত শ্মশান,
মানব-গৌরব-সমাধি-প্রাঙ্গণ।
কত হ’ল গেল সম্রাট বাদশা,
তাহাদের চিতা নিভেছে এখন!
৩৯
যা হবার তাহা হইয়া গিয়াছে,
দেখেছে ভারত অনেক উৎসব,
দেখেছে অনেক রাজসূয় যজ্ঞ,
দেখেছে অনেক সম্পদ বৈভব ।
৪০
যখন বৃটন লভে নাই জন্ম,
তখন ভারত রাজরাজেশ্বরী,
সে দিনের শিশু হইয়া বৃটন
উপেক্ষে ভারতে, ওই দুঃখে মরি !

১১২
ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
৪১
রুসিয়ার ভয়ে রাজসূয় কেন ?
কেন আড়ম্বর সামান্যের তরে ?
বিশ্বাস সারল্যে তুষিলে ভারতে
শত রুসিয়ায় কি করিতে পারে ?
৪২
ভারতের বল করিয়া শােষণ,
বিপক্ষ দমন সহজে হবে না ;
দিল্লীর দরবার আড়ম্বর সার,
চটকে কটক আটক বু’বে না !
৪৩
বিপদে সম্পদে ভারত তােমার,
দাও ভারতের হস্তে তরবার,
একত্রে সদম্ভে বিংশ কোটি নরে
জয় জয় শব্দে ছাড়ক হুঙ্কার !
৪৪
ভারত যদ্যপি পায় তরবারি,
কার সাধ্য তবে প্রবেশে এথায় ?
থাকুক রুসিয়া-রুস কোন্ তুচ্ছ ?
দিতে পারে পৃথ্বী জিনিয়া হেলায়

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
১১৩
৪৫
দাও স্বাধীনতা, খােলহ শৃঙ্খল,
দেখ ভারতের কত বাহুবল !
তাহা না করিয়া শুষিলে রুধির,
আপনার দোষে মজা’বে সকল !
আশা-মরীচিকা।
১
নিত্য মনােহর শ্যামল সুন্দর,
অগাধ অপার গম্ভীর গগন,
নিত্য বিরাজিত বাঙ্ন-অতীত,
আত্ম-শ্রান্তিহর—শান্তির কারণ।
২
কাল-শৈলশির-আসননাপবিষ্ট,
পরম চরম বিজয়ী সম্রাট,
মহাজ্ঞান-প্রভা—মুকুট-কিরিটী,
স্বতঃ পরন্তপ-পুরুষ বিরাট,

১১৪
ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
৩
প্রকৃতির বজ্র-গদা-দণ্ডধারী,
প্রকৃত প্রত্যক্ষ সিদ্ধ সত্য প্রভাে,
সাক্ষাৎ সাযুজ্য, সালােক্য, নিৰ্বাণ,
জ্ঞানময় কান্তি ধ্যানময় বিভাে!
৪
এ বিশ্ব-ব্যাপার কাৰ্য কারণ্যাদি,
অদ্ভুত অনন্ত সাম্য শক্তিময়,
অদ্ভুত মহিমা, মায়ার কুহকে
বিমুগ্ধ ব্রহ্মাণ্ড ! হায়, কি বিস্ময় ।
হায়, জ্ঞান-তৃষ্ণা ! দুরাশা বঞ্চিত,
বিদ্যুৎ ধরিতে অন্যাস অশনি ?
হায় ! কি উদ্ভান্ত জীবন্ত প্রলাপ,
বিমুগ্ধ পতঙ্গ হেরিয়া অগিনি।
৬
উৎকট তৃষ্ণায় আকুল সংসার।
তৃষ্ণা—মহতৃষ্ণা ! শাস্তিমাত্র নাই
যে দিকে নিরখ অনন্ত প্রান্তর
আশা-মরীচিকা প্রতারে সদাই।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
৭
সৰ্ব্বদা বিমুগ্ধ উন্মত্ত অন্তর,
কি জানি কি ভাবে বুঝিতে পারি না।
অহাে বিশ্বময়, ব্রহ্মাণ্ড-বিজয়ী!
অহহা প্রাণারাম! আর ভুলায়াে না।
৮
আর ঘুরায়াে না আশার আবর্তে,
দেহি, শান্তি দেহি তাপদগ্ধ প্রাণে,
অনন্ত! অভাবে দৈহি মে আশ্রয় ;
বড়ই যন্ত্রণা বাসনা-প্রাঙ্গণে !
৯
সম্পদ, সৌভাগ্য, কীৰ্ত্তি অর্থ-যশঃ,
যত লাভ করে মিটিবে না আশা,
বাড়িবে যন্ত্রণা, হাহাকার আর
বাড়িবে উৎকট আগ্নেয়-পিপাসা !
১০
জ্ঞান-তৃষ্ণা—সত্য-সুখের সামগ্রী ;
কিন্তু জ্ঞান-সিন্ধু কোথায় কে জানে ?
মরীচিকা-মুগ্ধ মনুষ্য-সংসার
কি বলে সে কথা বুঝিতে পারিনে।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
১১
সমাজ, সভ্যতা, সাম্য, রাজনীতি,
বিজ্ঞান, দর্শন কি শিখাবে জ্ঞান ?
উন্নতি বলিয়া উন্মত্ত মানব,
কিসের উন্নতি ? এই ত প্রমাণ
১২
প্রত্যক্ষে, পণ্ডিত, মূখ, ধনী, মানী,
সম্রাট ভিক্ষুকে বৈষম্য বিরােধ ।
ছি, ছি রে সুসভ্য উন্নত সমাজ ।
ছি, ছি সামাজিক সজ্ঞানানুরোধ !
কুতর্ক-কষে আবরিয়া সত্য,
কি জ্ঞান শিখাবে পণ্ডিত ধীমান ?
ভ্রমে ভ্রান্ত তুমি স্বার্থের সেবক,
উদ্দেশ্য তােমার ক্ষুদ্র, যশ, মান!
১৪
হে সমাজপতি বলিষ্ঠ সম্রাট।
তব অভিসন্ধি কে বুঝিতে পারে ?
সিন্ধু শুষ্ক করে তােমার কুতৃষ্ণা !
তুমি সভ্য-শ্রেষ্ঠ মনুষ্য সংসারে।

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
১১৭
তুমি কূট বিধি ব্যবস্থা-প্রণেতা !
তুমি হর্তা কর্তা বিধাতা দুৰ্বার !
তুমিই জগতে শ্রেষ্ঠ ভাগ্যবান্,
সেবক তােমার সমগ্র সংসার।
তুমি যাহা বুঝ, অন্যে তা বুঝে না,
তুমি মহামান্য মনুষ্য-সংসারে !
তুমি বুদ্ধিমান শ্রেষ্ঠ স্বার্থপর,
শ্রেষ্ঠ বলবান্ ! প্রণতি তােমারে!
১৭
সাম্য স্বাধীনতা গৃঢ় ভিত্তি মূলে
তব রাজনীতি, (মুখেই সকল !)
কাৰ্যতঃ কঠোর প্রভুত্ব বিস্তারি’
সংসারে পরাও দাসত্ব-শৃঙ্খল।
১৮
নিত্য রক্ত, মজ্জা করিয়া শােষণ,
বেড়েছে লালসা, সৰ্ব্বদা তৃষিত!
দাড়াও, দাঁড়াও, মিটিবে সে তৃষ্ণা ।
প্রকৃতি সম্প্রতি রয়েছে নিদ্রিত।

১১৮
ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
১৯
কত উর্দ্ধে তুমি উঠিবে বলিষ্ঠ ?
কত স্বেচ্ছাচার আচরিবে বলে ?
ভীম-বজুরাবে জাগিবে প্রকৃতি,
ভীম বজ্ৰবাহু অর্পি ওই গলে !
२०
মারি’ বজ্রগদা, ভূমে ফেলাইয়ে
শিখাবে দাসত্ব কেমন যন্ত্রণা।
শিখাইবে কারে বলে সাম্য নীতি,
শিখাইবে পরপীড়ন-বেদনা।
২১
শিখা’বে কে তুমি-কেবা সাধারণ,
( সে কথা কথায় শিখাবার নয়, )
দুই চারি দিন যা ইচ্ছা তা কর,
অবশ্য হইবে সত্যের উদয় !
২২
অবশ্য ভাঙ্গিবে নিদ্রা প্রকৃতির !
কা’র সাধ্য রােধে সে দুর্দম গতি ?
লক লক্ জিহ্বা বিকট ব্যাদান
বিস্তারি’ যখন গ্রাসিবে এ ক্ষিতি,

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
১১৯
কে তখন তার নিকটে দাঁড়াবে ?
উগারিবে অগ্নি ঝলকে ঝলকে।
প্রলয়ের ভীম ঘনঘটা, ঘাের
বজ নিকলিবে ললাট-ফুলকে ।
২৪
প্রতি লােমকূপে বজ্ৰবহ্নিশিখা
বাহিরিবে, দগ্ধ করিবে সংসার।
উত্তাল অনল তরঙ্গ গজ্জিবে,
চতুর্দিকে হবে ভীম হুহুঙ্কার ।
২৫
রাজা তুমি—তুমি দাস প্রকৃতির।
তব রাজদণ্ড সাধারণ বল,
সাধারণ চিত্ত তব সিংহাসন,
মুকুট তােমার নহেক কেবল।
২৬
সাধারণ উহা দিয়াছে তােমায়,
অক্ষম দেখিলে লইবে কাড়িয়া,
তুমি কে ?তুমি ত কাষ্ঠের পুতুল।
না বুঝ—প্রকৃতি দিবে বুঝাইয়া।

১২
ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
উপহার।
১
ধন্য, শত ধন্য, পূৰ্ব্ব-বঙ্গ-ভূমি!
তুমি রত্নগর্ভা রত্নপ্রসবিনী,
ধন্য পুত্ররত্ন ধরেছ কক্ষেতে,
ধন্য পুণ্যবতী, সৌভাগ্যশালিনী।
২
অতি নিশাঘােরে, নিবিড়ান্ধকারে
কংস-কারাগারে দেবকী যেমন,
অতি দুঃখ, অতি দুর্দশা দশায়
প্রসবিল পুত্ৰ-অমূল্য রতন !
তুমিও জননী, তেমনি দুর্দিনে
তেমনি শৃঙ্খলবন্ধন দশায়,
তেমনি নিবিড় অন্ধকারাগৃহে,
তেমনি গভীর তিমির নিশায়,
L
৪
প্রসবিলে পুত্ৰ-অমূল্য রতন,
দেখিয়া আহলাদে গায় আলাদিনী;

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
১২১
গায় একা, কেহ শুনে বা না শুনে,
নাই বা শুনিল ?—শুনিব আপনি।
৫
মনপ্রাণ ভরে করি আশীৰ্বাদ,
দীর্ঘজীবী হ’ক কুমার তােমার,
রত্ন-গর্ভে! পুনঃ প্রসব রতন !
পুনঃ ধন্য ধন্য গাউক সংসার।
৬
মাতঃ পূৰ্ব্ব-বঙ্গ! করি প্রণিপাত,
আশীৰ্বাদ কর সােদর সন্তানে,
মা! বড় অভাগী-জননী আমার,
অপুত্রিকা শত পুত্র বিদ্যমানে!
৭
আছে মহারাজাধিরাজ সম্রান্ত,
গৌরাঙ্গ গরবে গর্বিত অন্তর,
গৌরাঙ্গ মন্ত্রেতে দীক্ষিত শিক্ষিত,
গৌরাঙ্গ চরণে ভক্তি গুরুতর।
৮
ছিছি! ঘৃণা করে। বলিব না আর
দুঃখে অন্তৰ্দাহ হতেছে সদাই।

১২২
ভুবনমােহনী প্রতিভা।
জননী-যন্ত্রণা কেহই বুঝে না,
পুত্র সত্ত্বে বলি অপুব্রিক। তাই!
৯
জননী-বৎসল সন্তান যে কী,
সকলেই দুঃখী দরিদ্র সংসারে,
সকলের শিরে দাসত্ব পসরা,
উদরাম তরে পরদ্বারে ফিরে।
১০
কিরূপে নিকারে জঠর-যন্ত্রণা,
এই চিতানলে দহে অনুক্ষণ,
যাদের এ দশা, তারা কি রূপেতে
করিবে মায়ের দুর্দশা মােছন?
১১
ভিক্ষুকের কথা কে শুনে কর্ণেতে ?
ক্ষত দেহে কেবা দেয় প্রলেপন ?
সগুণের শিরে করি’ পদাঘাত,
অসতের সেবা করে ধনিগণ,
অজ্ঞান, অশিক্ষা সহচর স্বার,
চাটুতা

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
১২৩
অর্থশূন্য মিথ্যা সন্ধানে যাদের
গতি মুক্তি জ্ঞান, যাদের জীবন
১৩
অর্থমদে ঘাের মত্ত দিবানিশি,
বিলাসে বিতাের কর্তব্যে বিরত।
যারা অন্ধকারে নিরখে বিদ্যুৎ,
নরকে নিরখে স্বর্গ শত শত।
১৪
জাতীয় সাহিত্য জাতীয় মহত্ত্ব
কাহারে যে বলে তারা তাকি জানে?
মিথ্যা আড়ম্বরে সম্মানের তরে
কাজেই বিক্রীত গৌরাঙ্গ চরণে।
জননীর মুখ উজ্জ্বলিত যারা,
যাদের উদয়ে পবিত্র স্বজাতি,
যাহাদের ক্ষুদ্র পর্ণ কুটীরেতে
দিবারাত্রি ভাতে পূর্ণচন্দ্ৰজ্যোতিঃ
তাহাদের মৃদু ক্ষীণ কণ্ঠ স্বর
ধনীর বিস্তৃত বিলাস ভবন

১২
ভূবনমােহিনী প্রতিভা।
ভেদিয়া ভিতরে প্রবেশিতে নারে ?
তাহে ধনী গর্বে বধির-শ্রবণ !
১৭
অন্ধ আঁখি, হৃদি শুষ্ক মরুময়,
নাই প্রতি ভক্তি, সদা হাহাকার !
স্বার্থ স্বার্থ শব্দ! স্বার্থ উপাসনা,
স্বার্থসিদ্ধি ভিন্ন জানে না ক আর ।
১৮
ধন্য পূর্ববঙ্গ রত্ন-প্রসবিনি!
হেন ধনী-গৃহে রত্ন প্রসবিয়া,
সংসারে রাখিলে অপূৰ্ব্ব খেয়াতি,
(যুগল রতন) কোলেতে লইয়া
১৯
সুখে থাক, মাতঃ! মনে রেখ যেন,
করিও প্রার্থনা আমাদের তরে,
তােমার মঙ্গলে সমস্ত মঙ্গল,
তাতেই, মা! এত আহলাদ অন্তরে।
२०
তােমার যুগল পুত্র কন্যা ধন্য ;
উজ্জ্বলিত হ’ক সাহিত্য সংসার ;

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
উজ্জ্বলিত তুমি হয়েছ এখনি ;
অতুল উন্নতি হউক তােমার !
২১
কুমার-স্থাপিত সাহিত্য-সমাজে
বর্ষে বর্ষে যেন ফলে সুধা-ফল ।
বর্ষে বর্ষে বঙ্গ সাহিত্য-সরসে
ফুটুক অপূৰ্ব্ব নূতন কমল ।
২২
ভাই ভগ্নী দুটি দীর্ঘজীবী হয়ে,
সাধুন বঙ্গের মহতী উন্নতি,
আশ্চৰ্য্য কথন, অপূর্ব মিলন ;--
এক গৃহে যুগ্ম লক্ষী সরস্বতী।
;
*
হেন কন্যা পুত্র যাঁহার গৃহেতে,
ধন্য সেই পিতা, মাতা গুণবতী।
কুলের গৌরব রাজেন্দ্র ধীমান,
কুল-লক্ষী-রূপা কৃপাময়ী সতী।
২৪
দেবি কৃপাময়ি! কুমার রাজেন্দ্র !
তােমাদিকে কভু দেখিনি নয়নে,

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
পিঞ্জরের পাখী দেশান্তরে থাকি,
দেখিব যে কভু আশা নাই মনে।
২৫
দূরদেশে থাকি, মনশ্চক্ষে দেখি,
মুগ্ধ হইয়াছি তােমাদের গুণে,
তোমাদের স্নেহ সাগরের মত
অনন্ত অসীম ; বর্ণিব কেমনে ?
প্রাসাদ, পৰ্যঙ্কে থাকিয়া তােমরা
কুটীর-নিবাসী দুঃখী ভিক্ষাজীবি
দম্পতিকে মনে কর ; সর্বক্ষণ
বিস্মিত হৃদয়ে এই মাত্র ভাবি।
২৮
তােমাদের স্নেহ নিস্বার্থ নিৰ্ম্মল,
—নন্দন বিধৌত অমৃতের ধারা,
হৃদয় প্রবাহে হয়ে প্রবাহিত,
স্বর্গীয় সুখেতে ভাসিতেছি মােরা !
২৯.
সুখে থাক ভাই, সুখে থাক ভগ্নি,
দুঃখী দম্পতিরে রে’খ যেন মনে।

ভুবনমােহিনী প্রতি।
১২৭
বঙ্গের দুর্দশা করিতে মােচন
দীর্ঘজীবী হয়ে থাক দুই জনে।
দুস্থ বঙ্গভাষা, বঙ্গীয় সাহিত্য
তােমাদের দ্বারা হইবে উন্নত,
হেন আশ্বাসেতে বাঁধিয়াছি বুক!
নিদ্রিত হৃদয় হয়েছে জাগ্রত।
দেবের দুর্লভ কবিত্ব-কুসুম
ফুটুক নিবিড় কণ্টক কাননে।
তথাপিও যেন না ফুটে—না ফুটে
হেন দগ্ধ ভস্ম বঙ্গের উদ্যানে।
৩২
কিংশুকেতে আর পারিজাতে যথা
তারতম্য কেহ বুঝিতে না পারে,
যে দগ্ধ দেশেতে, কাচ কাঞ্চনেতে
নাহিক প্রভেদ; সমান কদরে
1
স্ফটিক মাণিক বিকাইয়া যায়,
সাগর পােম্পদে সমান যেখানে,

১২৮
ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
মৃগেন্দ্র, শৃগাল, দেবতা, চণ্ডাল,
সমস্ত সমান করে যেই স্থানে ;
৩৪
সে দেশে কবিত্ব কেন বল দেখি ?
কবিত্ব তথায় বিপদ বিশাল ।
প্রায় সপ্তকোটি
মনুষ্য যে দেশে,
সে দেশের কবি অন্নের কাঙ্গাল ।
তাহ'তেই বলি কাজ নাই আর!
কাজ নাই আর কবিত্ব বঙ্গেতে,
যেমন আঁধার, থাকুক তেমনি ;
কেন বিদ্যুদ্দাম নয়ন ধাধিতে ?
মরুভূমে কেন ফুটিয়া কুসুম
শুখায় রবির প্রখর কিরণে ?
বৃন্তের কুসুম বৃন্তে শুষ্ক হয়ে
খসে পড়ে, কেহ দেখেনা নয়নে।
বড় মনস্তাপে বলিতেছি, ভাই।
এ দেশে কবিত্ব বিড়ম্বনা সার,

১২৯
ভুবনমােহিনী প্রতি।
বড় মনস্তাপে বলিতেছি, ভগ্নি ।
বঙ্গে কবি জন্ম কাজ নাই আর।
এ দগ্ধ দেশেতে তােমরা দু’জন
স্বর্গীয় শীতল প্রবাহ সুধার,
তােমাদিগে দেখে, দগ্ধ হৃদয়েতে
হয়েছে প্রভূত আশার সঞ্চার ।
৩৯
এ দগ্ধ দেশেতে তােমরা দুজন
মরুভূমে পদ্ম, পিপাসার নীর,
তােমাদিগে দেখে বাধিয়াছি বুক,
ব্যাকুল হৃদয় হয়েছে সুস্থির।
৪০
এ দগ্ধ দেশেতে তােমরা কবির
বিপদে সহায়, দুর্বলের বল,
নিদাঘ-উত্তাপে এ দীর্ঘ প্রান্তরে
তােমরা কবির শান্তি-তরুতল।
৪১
ভীষণ নৈশিক আঁধার গগনে
একটি নক্ষত্র তােমরা দু’জনে,

ভুবনমােহিনী প্রতিভা।
সংসার-সাগরে কবি-কর্ণধার,
তাই লক্ষ্য করি’ যাবে লক্ষ্য স্থানে।
৪২
অশেষ গুণের আধার তােমরা ।
দুঃখী আমি কিছু নাই ত আমার ।
আছিল হৃদয়,-তাহাও দিয়াছি,
এখন দিতেছি আত্ম-উপহার!
সম্পূর্ণ।
PRINTED BY ASBOOTOSH GHOSE AND CO.

শুদ্ধি পত্র। শুদ্ধ rc পৃষ্ঠা পংক্তি অশুদ্ধ ১৬ ঔরষ নিস্পন্দ ঐ ১২ কোটী ঐ চিৎকার ঔরস নিস্পন্দ ৪ কোটি চীৎকার ২৬ ১৫ যুর্বয়াজ যুবরাজ ২৯ ১ যানে পাপির জানে পাপীর ১৬ ১৩ সংসার? সংসার। ১২ সমুদয় বজমুষ্ট্যাঘাতে ৭০ ৭২ ১১ তপস্থা ৮৪ সমূদয় বজমুষ্ঠাঘাতে অপত্য জুড়ি’ দেছিতেছি কারণ্যাদি প্রতি ভক্তি, ভিক্ষাজীবি ৯ २० ১১৪ ৭ যুড়ি’ দেখিতেছি করণাদি প্রীতি-ভক্তি, ভিক্ষাজীবী ১২ ৪ ১২৬ ১০ ১২৭ ৪ দুস্থ ५०

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Bhubanmohini Prativa,part.2

Author
Mookhopadhya,nobinchandra Ed.
Title
Bhubanmohini Prativa,part.2
File name
Bhubanmohini Prativa,part.2
Text
OCR done
Citation
1877
Published
2009/12/23
Publisher
Albert Press,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
149
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Mookhopadhya,Nobinchandra
DLI number
510932
Barcode
4990010018128.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
IXOyTjkZ3d2
Download PDF

Bhubanmohini Prativa,part.2