Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Prem O Prakriti
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
नजे
No text on this page.
প্রেম ও প্রকৃতি। শ্রীনগেন্দ্রনাথ সােম-প্রণীত। W- কলিকাতা সন ১৩১৫ সাল। মূল্য বার আনা।
কলিকাতা—২৫ নং রায়বাগান ষ্ট্রীট, ভারতমিহির যন্ত্রে,
সান্যাল এণ্ড কোম্পানি দ্বারা মুদ্রিত
ও
২০১ নং কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট হইতে
শ্রীগুরুদাস চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক প্রকাশিত।
নিবেদন। ; প্রায় একাদশ বৎসর পূর্বে আমি ছােটনাগপুরের নিবিড় অরণ্যময় পার্বত্যপ্রদেশে কর্মসূত্রে পাঁচ বৎসর অবস্থিতি করিয়াছিলাম। ইংরাজী ১৮৯৭ সালের শীত ঋতুর প্রারম্ভে আমাকে কিছুদিনের জন্য নীরব জন- মানবশূন্য শৈলভূমে পূর্তকাৰ্য উপলক্ষে বাস করিতে হয় ; একাকী একটি বাঙ্গালার নিভৃত-কক্ষে বসিয়া আমাকে সেই দুর্বিষহ নিঃসঙ্গ প্রবাস যাপন করিতে হইয়াছিল। সুদীর্ঘ সময় অতিবাহিত করিবার জন্য আমি কল্পনাদেবীর শরণাপন্ন হই। তথায় এই কাব্যের ৩৪ সর্গ লিখিত হয়। তৎপরে গ্রহবগুণ্যে আমার আরব্ধ কাৰ্য বহু বৎসর অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়িয়া থাকে। দীর্ঘকাল- পরিত্যক্ত অরক্ষিত পাণ্ডুলিপি জীর্ণ ও কীটদষ্ট দেখিয়া আমার আর আশা ছিল না যে, উহা কখনও গ্রন্থা- কারে প্রকাশিত হইৰে। কয়েক বৎসর হইল, আমি বারত্ৰয়ে ভারতবর্ষের নানা দেশ পৰ্যটন করি ; সেই চির-স্মৃতিময় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা কবিতায় গ্রথিত করিয়া অৰ্ধবিস্মৃত অতীতের কল্পিত কামনা এক্ষণে পূর্ণ করিতে কৃতকার্য হইয়াছি। এজন্য আমি ভগবানের চরণে ভক্তি- ভরে প্রণাম করিতেছি।
সময়াভাবে এই গ্রন্থের মুদ্রাঙ্কণ কাৰ্য আমি
স্বয়ং দেখিতে পারি নাই। আমার শ্রদ্ধাস্পদ বন্ধু পণ্ডিত
শ্ৰীযুক্ত নিবারণচন্দ্র চৌধুরী মহাশয় সেই কাৰ্য্যের ভার
গ্রহণ করিয়া আমাকে চির-কৃতজ্ঞতা-পাশে বদ্ধ করিলেন।
এ কাৰ্যে তিনি আমার সহায় না হইলে আমি কখনও
এ গ্রন্থ প্রচারিত করিতে পারিতাম না। অষ্টম সর্গে
মালাবারের চিত্রখানি বিবিধভাষাবিদ পণ্ডিত যুক্ত
অমূল্যচরণ ঘােষ বিদ্যাভূষণ এম, এ, মহাশয় আমাকে
সংগ্রহ করিয়া দিয়াছেন; এজন্য আমি তাহার নিকট
কৃতজ্ঞতা-পাশে বদ্ধ রহিলাম। ইতি-
কলিকাতা,
নগেন্দ্রনাথ সােম
অগ্রহায়ণ ১৩১৫
ভূমিকা
পৃথিবী বিচিত্র শােভাময়ী। মনুষ্য ইহার শ্রেষ্ঠ জীব।
প্রেমই সেই শ্রেষ্ঠ জীবের শ্রেষ্ঠ ধৰ্ম্ম ।
প্রেমশূন্য
হৃদয়, মহা-মরুভূমি বা অশান্তির লীলাস্থল বলিলেও
অত্যুক্তি হয় না। মানবচিত্ত এত দুঃখপূর্ণ কেন ?
এত নিরাশার নিপীড়নে জর্জরীভূত কেন ?
জর্জরীভূত কেন ? এত অশান্তি
অনলে দগ্ধীভূত কেন ? মানব জীবন এত সুখশূন্য
কেন ? ইহার একমাত্র উত্তর,প্রকৃত প্রেমের অভাব।
প্রকৃত প্রেমলাভের উপায় কি ? দুর্বল হতভাগ্য
জীব বিশপ্রেমে আত্বদান করিতে পারে না। মর-প্রেম
হইতেই প্রকৃতি-প্রেমের উৎপত্তি। প্রকৃতি-প্রেমেই
বিশ্বপ্রেম চির-সংস্থিত। কিন্তু পথ বড় দুর্গম। সুতরাং
অনেককেই অর্জপথে গতিরােধ করিতে হয় ।
দৃঢ়চিত্তে সকল বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করিয়া প্রকৃতি-তত্ত্ব
আলােচনা করিলে সেই প্রেম লাভ হয়। এই বিশুদ্ধ
বিশ্বপ্রেমই সারধর্ম। ইহাই সংসারতাপক্লিষ্ট মানবকে
শান্তিদান করিতে সমর্থ । বর্তমান কাব্যগ্রন্থে এই
তত্ত্বেরই কঞ্চিৎ আলােচনা করিতে প্রয়াস পাইয়াছি।
কলিকাতা
গ্রন্থকার
অগ্রহায়ণ, ১৩১৫ সাল।
No text on this page.
১৯
প্রথম সর্গ ।
ত্রিবেণীতীরে।
ত্রিযামা যামিনী যায়,
ত্রিধারা ত্রিবেণী ধায়,
নীরবে জাহ্নবী-বারি বহিছে আঁধারে ;
ধরাবুকে নাই প্রাণ,
কোলাহল অবসান,
নিদ্রামগ্ন চরাচর স্তব্ধ চারি ধারে।
কি যেন দুর্বহ দুঃখে, শ্রান্ত প্রাণে ম্লানমুখে,
কৃষ্ণা-অষ্টমীর শশী অস্তমিত-প্রায় ;
ল’য়ে ক্ষীণ জ্যোতিঃ-কণা,
বিষাদে বিষঃমনা,
ধিকি ধিকি তারারাজী গগনের গায় ;
;
যেন প্রলয়ের ফেরে,
পশ্চিমে জলদ ঘেরে,
নিবিড় ধূমলকায় বিশ্ব আবরিয়া ;
গভীর গভীরতম, হয় নিশি গাঢ়তম,
ঈষ উন্মুক্ত আঁখি আলসে মুদিয়া।
প্রেম ও প্রকৃতি।
হহ কি নিবিড় তম ! পাষাণ মূরতি সম
ভৈরবী প্রকৃতি একি ব্যাপার তােমার !
দোলায়ে পল্লবশাখা,
ঝাপটি বিহগ পাখা,
থাকিয়া থাকিয়া
তুলে
বিষম চীৎকার।
•
চঞ্চলা দামিনী ফিরে, আতঙ্কে শিহরে ধীরে,
মুখে না ফুটিতে হাসি অধরে মিলায়
হরিছে আঁধার তার,
প্রফুল্ল হৃদয়-ভার,
তাই সে তড়িত-বালা ত্বরিতে লুকায় !
এই ভাগিরথী বামে, নিস্তব্ধ শশ্মশানপামে,
ধরাক্লান্ত জীবনের এ সুপ্ত আশ্রমে ;
অন্তিমের দীপরেখা, তৃষিত নয়নে একা,
দাড়ায়ে নিরখি আমি ত্রিবেণী-সঙ্গমে।
হৃদয়ে হৃদয় নাই,
মাখিয়া নিরাশা-ছাই,
উড়, উড়, চিতহারা আমি একজন।
বিরাগে তেয়াগি’ গেহ, ভুলি ধরণীর স্নেহ,
কি উদ্দেশে এ নিশীথে হেথা আগমন ?
মাের কি আশার শেষ, জীবনের অবশেষ !
আমি ভবে পথহারা আশ্রয়বিহীন ;
গড়ায় নয়ন জল,
গলিত মরম-তল
বিাদে ব্যথিত হিয়া বদন মলিন।
প্রথম সর্গ।
ত
JAAN
অমার আঁধার সম,
বিষম বিষাদ মম,
রবে কি, এমনি চির-জীবনে মিশিয়া,
অধরের ক্ষীণ হাসি,
তীব্র হলাহলরাশি,
রাখিব কি চিরদিন মরমে পুষিয়া ?
মানব জীবন বৃথা, যদি এ জ্বলন্ত চিতা,
জুলে চিরদিন ব্যাপি হৃদয়-গহন ?
যদি না নিতে পারি, সেচিয়া শান্তির বারি,
কি ফল রাখিয়ে তবে নশ্বর জীবন ?
মিথ্যা সে জ্ঞানের খনি, বিমল বিবেক-মণি,
ভস্মীভূত হয় যদি হৃদয় উদ্যান,
মিথ্যা চির অধ্যয়ন, শাস্ত্রসিন্ধু আলােড়ন,
বিষাদে বিলীন যদি আকাঙক্ষা মহান্ ।
দীপ্ত প্রেমবহিরাগ,
জীবনের যােগযাগ,
সুধু কি মিশিবে মম বিস্মৃতি সাগরে।
নিদারুণ শােকানল,
দহিয়ে হৃদয়তল,
পশিবে কি শূন্যময় সমাধি বিবরে !
সকলি হবে কি স্বপ্ন, বিফল প্রয়াস, যত্ন,
শূন্যগর্ভ বায়ু সম অনন্তে মিশিবে ।
এত সাধ আকাঙক্ষার, প্রাণ-পণ অনিবার,
অতীতে কি অবসান—সকলি নিবিবে ।
৪
প্রেম ও প্রকৃতি।
, না, না, হবেনা হেন, এ চিন্তা মানসে কেন ?
এ ভগ্ন দুর্বল বুকে বাস নিরাশার ;
যদি না ঘুচাই তম,
মানব-মানব-সম,
কেন এ ধরিত্রীবুকে জনম আমার ?
যাব বহু দূরদেশ,
করিব যে তীর্থশেষ,
হেরিব নিভৃত দেশ সুদুর্গম স্থল,
ভ্রমিব ধরার’পরি বজ্র-ঝঞ্ঝা বুকে ধরি,
দেখিব মানব হিয়া ধরে কত বল ?
মহাতত্ত্ব প্রকৃতির, রহস্য এ পৃথিবীর,
বুঝিব সাধক হয়ে স্বভাব-আশ্রমে ;
সতত বাসনা চিতে, জীব-জন্মে শান্তি দিতে,
দিবে না প্রকৃতি কি সে সান্ত্বনা মরমে !
যাব দূর পথ চেয়ে,
সংসার সাগর বেয়ে,
লুটিবে তাপিত প্রাণ বনছায়াতলে ;
হলে সন্ধ্যা মনােরম, নীড়ে যাবে বিহঙ্গম,
ভুবনে হাসিবে শশী জ্যোৎস্না উজ্জ্বলে !
আবেগে হারাব দিশা, হেরিয়া ভূষিতা নিশা,
হবে চন্দ্রকরােজ্জ্বলে চিত্ত ভরপূর !
কাননে চৈত্রের রাস, কুসুমে বিলাৰে বাস,
করিয়ে বিমুগ্ধ, লুব্ধ পরাণ আতুর !
প্রথম সর্গ।
দেখি’ সে রজত পথ, হবে ফুল্ল মনােরথ,
ভুলাবে দিবার জ্বালা, নিশার মাধুরী ;
পাইয়া বসন্ত-বনে,
বিধুরা যুবতী জনে,
কুঞ্জের আড়ালে যেন পিকের চাতুরী ।
জননী! জনমভূমি ! বিদায় দেহ গাে তুমি ;
চলিল তােমার শিশু ভবপৰ্যটনে ;
ফিরিব কি না ফিরিব,
পাপমুখে কি বলিব,
হে জননি! এ অধমে রাখিবে কি মনে ?
;
•
কে অদূরে গান গায় ? এ চিত্ত শিহরে তায়,
কে আসে নিকটে মাের ? কে হেন নিষ্ঠুর ?
পঞ্চমে ধরিয়ে তান, গায়িছে প্রেমের গান,
কে আসি বাজায় হেথা তন্ত্রী সুমধুর !
‘এ কি এ ! সন্ন্যাসী তুমি, ত্যজেছ সংসার-ভূমি,
তন্ত্রী কেন প্রেমগানে শিহরে পরাণ ।
ছি ছি ছি এমন কেন ? তােমার সাজে না হেন!
তুমি কর মনানন্দে বিভুগুণ গান।
তােমার জীবন নব,
ব্রহ্মচর্য ব্রত তব,
প্রাণে ব্যথা বাসি--তব চিত্ত যে তরল ।
এ কুসুমে
কেন,
অমিয়ে গরল হেন,
মার্তণ্ড বিতরে কি হে কৌমুদী বিমল !
কীট
৬ :
প্রেম ও প্রকৃতি।
ঈষদ্ হাসিয়া ধীরে, রাখিয়ে বীণাটি ফিরে
কহিলা সন্ন্যাসী সেই প্রদীপ্ত বয়ান ;
“ওরে মুখ কিবা কব,
প্রেম-পদে বাঁধা ভব,
প্রেম নাই বলে এই অবনী শ্মশান ।
বুঝিতে প্রেমের রীতি, ঘুরিছে জগৎ নিতি,
কে বা সে সন্ন্যাসী, গৃহা, যত জীবদল,
এই দীপ্ত হেমানলে, ঐশিক আকাঙক্ষাবলে,
আত্মদান দিতে সবে উন্মত্ত—পাগল ।
ওই রবি শশী তারা,
দেখ ছুটে দিক্-হারা,
তৃণ তরু লতা পুষ্প জ্যোতিষমণ্ডল ।
হতে সে প্রেমের দাস, উগ্রপ্রাণে বারমাস,
বিশ্ব ভুলি উল্কা সম ধাইছে কেবল ?
যাও কোন দূরদেশে,
দীন ভিক্ষুকের বেশে,
কি আশে যেতেছ বল কি ধন হারাই ।
নিরখি ও মুখ তব,
বুঝেছি বুঝেছি সব,
যাও চলি হেথা তব কোন কাজ নাই !”
শুনিয়ে বচন তার,
ত্যজিনু স্বদেশ-দ্বার,
অলােক-গমে যথা ছায়া অন্তর্হিত ।
দূরে হই উপনীত,
চিন্তায় সন্তপ্ত চিত,
বিহ্বল হৃদয় মাের তাপিত ব্যথিত ।
প্রথম সা
৭
কভু ধরি ধরি যাই, কভু দ্রুতপদে ধাই,
গঙ্গার তটেতে হেরি বিচিত্র কানন
স্বচ্ছ তরঙ্গিত নীর,
বায়ু বহে ঝির ঝির,
পরাণ শীতল করে সৈকত-শয়ন ।
মাতােয়ারা ঘুমঘােরে,
জড়িত স্বপন-ডােরে,
সারানিশ জ্ঞানহারা—প্রভাতা যামিনী ।
উবা সে ত্রিদিবরাগে, উদিতা পূরবভাগে,
ললাটে সিন্দরছটা হাসে হেমাঙ্গিনী!
;
শ্যাম মঞ্জরীর কোলে,
কিরণ ঝলকি দোলে,
কুসুমকুন্তলা লতা নাচিছে সমীরে ;
শ্যাম বসুধার অঙ্গে, জড়ায়ে রেখেছে রঙ্গে,
যেন বারাণসী সাটী মুকুতা-শিশিরে !
বিহগ মধুর গায়,
বংশীরব উথলায়,
মন্দিরে দেবতা-মঠে বন কুঞ্জবনে ;
নূপুর ঝঙ্কারে নারী,
কুম্ভ ঈখে, সারি সারি
চলেছে গঙ্গার জলে মরাল-গমনে।
শ্বেত তরঙ্গের প্রায়,
আবরি প্রান্তরকায়,
চলে গােঠে বৎসমালা কাতারে কাতার ।
প্রভাতের পরকাশে, পুলকপৃরিত হাসে,
বিকসিল ধরামুখ অনিন্দ্য শােভার ।
৮
প্রেম ও প্রকৃতি।
এ শিথিল মৃত-প্রাণে, কে যেন চেতনা আনে,
এই শুষ্ক দেহ-ভরে চলিনু আবার !
অনেক নগর ফিরি’
মধু বৃন্দাবন হেরি’
মথুরা দ্বারকা সারি, যাব হরিদ্বার !
দেখিব সে হৃষীকেশ, গােমুখীর চারুদেশ,
মর্ত্য প্রকৃতির বুকে শােভিত নন্দন !
কৈলাস বৈকুণ্ঠ দুটি একত্র সেখানে ফুটি,
রচিত ভূতলে নব আনন্দ-কানন।
হে প্রকৃতি ! এ কি হেরি! কে তােমা রয়েছে ঘেরি,
মেঘে সৌদামিনী—শৈলে ইন্দ্রধনু-হার !
স্বর্ণে শিখিপুচ্ছ নব, সেখানে যে সে বিভব ।
নয়নে পলক মাের পড়িবে কি আর ।
।
ক্ষিপ্রগতি বায়ু জিনি, খরস্রোতা স্রোতস্বিনী,
কোন্ দেশযাত্রী সখি উপলের পথে
ছিন্ন ভিন্ন তনুখানি,
বদনে উচ্ছাস বাণী,
কে জানে, নহে গাে ক্ষান্ত তবু কোন মতে !
;
পল্লবে ধরিছে ফুল, নীলাকাশে তারাকুল,
ত্যজি কান্তি পড়ি ভূমে হতেছে বিলীন ;
আবার আবার কেন,
নব প্রেমরাগে হেন,
ফুটিছে সঘনে পুনঃ প্রসূন নবীন !
প্রথম সর্গ।
এক রশ্মি নিবে যায়, নেত্র ফিরি দেখি হায়,
রশ্মি তার বক্ষপাতি অপরে হরিছে ।
আলাে আর অন্ধকারে, প্রকৃতির লীলাগারে,
হাসি অশ্রু পরস্পরে আবেগে চুমিছে।
;
মরণ মরণ নয়,
তবু ভ্রমে ভয় হয়
নিদাঘে জুড়াতে তৃষা সলিল শীতল।
ভেবে বুক ভেঙ্গে যায়,
পৌর্ণমাসী শশী হায়,
জড়পিণ্ডে সৌরকরে দীপ্তি সমুজ্জ্বল !
বহ্নিময় রণধূমে,
জগতের রঙ্গভূমে,
কি মােহ আঁধারে অন্ধ নয়ন আমার !
অন্তর্ভেদী অবিরল, সুধু জনকোলাহল,
সতত মুমুযুধ্বনি আৰ্ত্তের চীৎকার !
হে সুধারূপিণি অয়ি ! কি সান্ত্বনা মােহময়ী,
ও মুখে জড়ায়ে আছে সতত তােমার ?
তাই গৃহত্যাগী মন,
আশাভরে উচাটন,
হেরিতে তােমায় আজি হয় বারেবার ।
গােলাপ অধর তব,
অরুণ বরণ নব,
মেঘসম তরঙ্গিত কৃষ্ণ কেশভার,
আনন্দদায়িনী হাস, মধুর ও শ্যামবাস,
শয়নে স্বপনে সদা মুরতি শােভার !
১০
প্রেম ও প্রকৃতি।
ও তব স্বর্গীয় ডােরে, বাঁধ গাে বিমুগ্ধ করে,
মৃগসম
উদ্দাম জীবন ।
বিজ্ঞানেরে ভস্ম করি, তােমাতে চেতনা ধরি
এ ঘাের নিদ্রিত মন লভে জাগরণ !
যূথভ্রষ্ট
রূপহম্মে জ্যোতিঃ নিবে, যদি দেখা দেয় জীবে,
ঘনঘাের অমানিশি দুর্ভেদ্য আঁধার ;
তবু ওই শােভারাশি, ল’য়ে চির-সুধা-হাসি,
ঢালিবে অনন্ত প্রীতি হৃদয়-মাঝার !
মরুবহ্নি-প্রজ্বলিত, হিংসাকীট-মুখরিত,
হউক কাপট্য-লীলা নিত্য অগণন !
মলয় সুধীরে ব’বে, কুঞ্জবনে
উথলি রাখিবে মধু বাসন্ত-যৌবন !
পিকরবে,
হাে সত্য হােক্ ভুল, তুমি এ সৃষ্টির মূল,
আমি নবযাত্রী আজি সাম্রাজ্যে তোমার !
দাও গো করুণা করে : সে নবজীবন মােরে,
জীবনের কোটিকল্পে রত্ন সাধনার !
ইতি প্রথম সর্গ ।
দ্বিতীয় সর্গ।
হরিদ্বারে।
দুলে অপরাকায়া,
আছে রৌদ্র ছায়া,
গিরিবন-অন্তরালে কঁপে দিনকর
বনেতে কলিকা ফুটে, সমীর আবেগে ছুটে
হৃদয় উথলি উঠে সৌরভে সুন্দর ।
•
বনতুলসীর গন্ধ,
লভিয়ে ভ্রমর অন্ধ,
আশে পাশে চারিধারে করে গুঞ্জরণ ;
স্তব্ধতা নামিয়া অসে, তেয়াগি বিমান বাসে,
স্তিমিত সাঁজের ছায়ে প্রশান্ত ভুবন।
প্রেম ও প্রকৃতি।
একা অবসন্ন মনে,
নদীকূলে নিরজনে,
শুনি সে কল্লোল-ভাষ অফুট চঞ্চল !
কে যেন সুদূরে থেকে, কহে মৃদু
কণ্ঠে
ডেকে,
“কোথা হে পরাণ-বঁধু জীবন-সম্বল।”
কাপে হিয়া থর থর,
কার ওই কণ্ঠস্বর ।
এ বিজনে নিরজনে প্রকৃতি-সীমায় ।
মাের অন্যমনা হিয়া, নিরখিল দূরে গিয়া,
সোণার বল্লরী এক ভূতলে লুটায় !
কে তুমি বল গাে বালা, কানন করিয়া আলা,
আঁধারি নিলয় কার লুণ্ঠিত এ বনে ;
বিদেশী পথিক আমি, জানেন অন্তরযামী,
আমারে নাহিক ভয়, শুন লাে ললনে !
বিকসিত শতদল,
করে রূপ ঢল ঢল,
সরস বরষালতা তােমার যৌবন ;
তুমি কি সন্ধ্যায় সতি, নভে অরুন্ধতী জ্যোতিঃ।
কিম্বা বঙ্গ-শারদের চন্দ্রমা-কিরণ ?
বনমাঝে বনবালা,
পরি সৌন্দর্যের মালা,
অরুণ-কণক-রুচি কে তুমি সুন্দরি ?
এ ঘাের নির্জন দেশে, কেন ভিখারিণী-বেশে।
বিভূতি-মাখান-মণি দিক আলাে করি ।
দ্বিতীয় সর্গ।
পলায় সরমে ছুটি, দেখি তব আঁখি দুটি,
নয়ন মুদিয়ে লাজে বন-কুঙ্গিণী ;
দেয় দেখি বাহুপাশ, মৃণাল গলায় ফাঁস,
শুকায় গােলাপ সখি বিদ্যুতবরণী ।
ওই মুখ নিরমলে, কোন্ স্বর্গ-জ্যোতিঃ জ্বলে,
জ্যোৎস্না গরব হের করে দেয় চুর ;
পড়িছে তারার ছায়া, শােভিছে ও চারুকায়া,
নীল আকাশের তলে মােহন মুকুর !
এই দীন পান্থজনে,
মেহসুধা বরষণে,
কহ কি বিরাগে হেথা বিরাজ কামিনী
কাড়ি রত্ন অলঙ্কারে, এ গৈরিক জটাভারে,
নবীন যৌবনে কেবা সাজালে যােগিনী ।
কহ গো করুণা করি, মন-কৌতূহল হরি
অতৃপ্ত চিত্তের তাপ জুড়াই কোথায় ?
দেশ, কাল, পাত্র, নাই,
জীবন জুড়াতে চাই,
হায় আশা মায়াবিনী মরুভূ দেখায় !
কামনায় হয়ে হীন, হৃদয়ে হ'তেছি দীন,
কামনা পূর্ণিত পৃথী নিরন্তর চলে,
হ'য়ে কামনার দাস, নাহি ঘুচে হা হুতাশ,
বিদগ্ধ কামনা সদা নিরাশা-অনলে।
১৪ প্রেম ও প্রকৃতি। •••• A- হায় সে দুল্লভ প্রেম, শত কষ্টিক হেম, এই স্বার্থপর ভূমে কোথা আত্মদান ? প্রেমের পসরা কিনি, ধরা করে বিকি-কিনী তুলা দণ্ডে করি’ তার ওজন সমান। আছে শুনি শান্তিধাম, কোন্ দিকে, কার নাম ? লভে নর কামনার আশা বিসর্জনে । ভুলি স্নেহ, প্রেম, গেহ, অস্থি-চৰ্ম্ম করে দেহ, সারাটা জীবন যায় বৃথা অন্বেষণে ! কই সেই বিশ্বরূপ, মরচক্ষে অপরূপ, যুগান্ত সাধনে শুনি কণামাত্ৰ ফলে ; সাধনে পরাণ যায়, যন্ত্রণার বজ্ৰ-ঘায়, রােধিতে না পারি বেগ ক্ষুদ্র কীট-বলে ! ক্ষণিক জীবন-কালে, রহস্যের ইন্দ্রজালে এ নশ্বর নরতত্ত্ব বড় সুগভীর ; এই মহাজ্ঞানতত্ত্ব, নহে কার’ করায়ত্ত ; অথচ এ চিন্তাস্রোত প্রখর মদির। একটি ঝার ঘায়, গৃহে থাকা হ’ল দায়, ধরিব প্রকৃত সূত্র বাসনা মরমে; তাই হৃদে আশা পুরি গহনে বিজনে ঘুরি, নিবিড় কান্তারে ঘন অরণ্য দুর্গমে !
দ্বিতীয় সর্গ ।
কোথা সেই সত্য পথ, পূরিতে এ মনােরথ,
নিবাই এ দাবাগ্নির প্রচণ্ড দহন ।
কহ ত্বরা কৃপা করি ঘনাইছে বিভাবরী ;
আঁধারে প্রলয়-রূপা মূরতি ভীষণ !
“কে তুমি পথিকবর !
দীর্ণ শীর্ণ কলেবর,
কারে তুমি কর প্রশ্ন মধু-সম্ভাষণে !
কে তুমি ফুটালে আসি, বিষন্ন অধরে হাসি,
চাহ তুমি জ্ঞানতত্ত্ব কাহার সদনে ?
ছাড়ি সে যােগীন্দ্ৰজন, জ্ঞানপূর্ণ নিকেতন,
লভিবে মহান্ তথ্য ক্ষীণাঙ্গী দুর্বলে!
সহি সদা ক্লান্তি জরা, হৃদয় বিকারভরা,
হয়েছে তােমার পান্থ এ ঘাের বিরলে।
আমি ত অবলা নারী, জ্ঞানের কি ধার ধারি,
তামিও আশার ছলে হৃদয়েতে সারা;
ত্যজিয়ে সংসার তাই ভাল কাজ করি নাই,
হয়েছি বিহ্বল আজি ৰাতুলের পারা !
তােমার জ্ঞানের জ্যোতি, দেখি যে প্রখর অতি
বৃথা গৃহ তেয়াগিনু দূর আকাঙক্ষায় ;
চির-জন্ম-স্মৃতি-সুখ, সেই প্রাণ-বধুমুখ,
মরম উপাড়ি, তবু ভুলি গাে কোথায় ?
প্রেম ও প্রকৃতি।
ভ্ৰমিনু অনেক ঠাই কোথাও ত কিছু নাই,
এ শূন্য হৃদয়ে সুধু খেলে অন্ধকার ;
যেবা শূন্য করে গেল, সেই পুনঃ ফিরে এল,
নিয়ে প্রদীপ সখা জালিল আবার ।
সেই দীপশিখা-পরি, আমি কীট জুলে মরি,
উষ্ণ-ধূপ-গন্ধ-রস-প্রমত্ত-সৌরভে ;
ভাঙিল বালির বাঁধ, ভাবিয়ে হৃদয়াদ,
এ দশা লাগে যে ভাল থাকিয়ে রৌরবে ।
;
সাধনে ঘুচান-ব্যথা,
বিষম প্রাণান্ত-কথা,
জুড়াতে নিদাঘ-জ্বালা বহ্নি-সরােবরে
নারীর হৃদয়পুর,
কামনায় তৃষ্ণাতুর,
কেমনে বিদেশী বল, অন্য ধ্যান ধরে ?
••
হৃদি-বৃন্তে পারিজাত,
আমার সে প্রাণনাথ,
থাকুন সে বিশ্বনাথ নাহি সে ভাবনা
প্রাণনাথ বিনা আর, হিয়া কাড়ে সাধ্য কার,
তিনি দিয়াছেন তার দীক্ষার ধারণা।
বিশ্ব-বাঞ্ছাকল্পতরু
আমার জীবন-গুরু,
অপূর্ণ আজিকে নাহি রেখেছেন সাধ ;
ভুলে মাের,
কেটেছে সে ঘুম ঘাের ;
আর মন-সাধে পান্থ সেধ না হে বদি।
*
মন নাহি
দ্বিতীয় সর্গ।
১৭
«««
«১০
যতদিন বিশ্বে আমি, সে জন আমার স্বামী,
দূরে কি নিকটে সে যে চির-আপনার
গেছেন সংসার তুলে,
তা বলে কি রব ভুলে,
জন্মে জন্মে স্বর্গে মর্ত্যে বঁধা পদে তার।
;
দেখি মােরে অমুখী, বিরহবিধুরা দুঃখী,
এতদিনে বুঝি তার ব্যথার সঞ্চার ;
তাই স্মৃতিরূপ ধরি, সতত অধীর করি,
করেন হৃদয়-নাথ উদ্দেশ প্রিয়ার ।
এখন বুঝেছি সার, যদি কিছু থাকে আর,
তবে সে অমৃতময়ী প্রেম-মন্দাকিনী।
এই সুর-নদীজলে,
সাধ যায় ভেসে যাই দিবসমিনী !
সন্তরিয়ে কুতূহলে,
নাই তথা রবিশশী খরকর--অমানিশি,
স্নিগ্ধ শ্যাম বনচ্ছায় সে পূত-প্রণয় ;
বাঁধি ভাব-স্মৃতি-ডাের, থাকি প্রাণে হ'য়ে ভাের,
ভব-মরুভূমি মাঝে রচি’ স্বর্গায় ।
একাকিনী বিরহিণী,
গৃহহারা অনাথিনী,
ছিলাম যে এতদিন এবে নহি আর
জানিনা কি-ভাগ্যবলে, কোন্ করমের ফলে,
এ ভব-বিরহে পাই উৎস সান্ত্বনার ।
১৮
প্রেম ও প্রকৃতি।
ছাড়িলাম গৃহবাস,
বৈরাগ্যের পূর্বাভাষ,
কি সুখ হে উদাসি উদাসজীবনে ?
জাগ্রত মানসে হায়,
শত স্বর্গ সুষমায়,
সেই ফোটা ফুলরাশি গৃহের প্রাঙ্গণে !
আজো সে বাসরঘর,
হর্মে কম্পে থরথর,
লজ্জা-আবরণে ঢাকা আকাঙক্ষা মরমে ;
আজো সে প্রেমের হাসি, অধরের প্রান্তে আসি,
কোট ফোট করি তবু ফোটে না সরমে !
চারি চক্ষে সে চাহনি, আজিও নূতন গণি,
কি লাজে মুদিতে আঁখি অধীর পল্লব।
সে দুরন্ত অভিমান,
এখন আকুলি’ প্রাণ,
সােহগে নাশিতে চায় বঁধুর গরব ?
সেই ফুলশয্যা কোলে, অফুট কণ্ঠের বোলে,
অদৈর্ঘ্যে উল্লাসে হর্মে কত আকিঞ্চন!
কি আবেশে তন্দ্রা টুটে, কঙ্কণ ঝঙ্কারি, উঠে,
হৃদি উছলিত তায় শিহরি কেমন !
সে মোর অীত সুখ, এখন’ ভরিছে বুক,
জগতে নিরখি কোথা কণিকা তাহার ;
দেখিনু বৈরাগ্য পাছে, নিরাশা দাঁড়ায়ে আছে,
ব্যাদানি বিকট মুখ ঘন, তমসার !
দ্বিতীয় সর্গ।
১৯
ভুলিব কেমন করি, সকরুণ স্নেহ স্মরি,
স্মৃতির পীড়নে মাের বুক ভেঙ্গে যায় ;
তারে একা দূরে রাখি, আমার পরাণ-পাখী,
একেলা আকাশে কভু উড়িতে না চায়।
ঘুচেছে এ মনােভ্রান্তি,
তীর্থে কোথা মম শান্তি,
সতীর্থসার স্বামী-স্মৃতি-আরাধন!
হৃদয়-আঁধারে ধাের, প্রাণের দেবতা মাের,
সূজেছেন প্রেমতীর্থ--তৃপ্তি নিকেতন ।
তন্য তীর্থ নাহি চাই, স্মৃতি-মঠে নিত্য পাই,
এ চির-বিরহে তার দুল্ল ভদৰ্শন ।
শুন হে পথিকবর, মাের তীর্থ মনোেহর,
জীবনে মরণে স্বামী এ বুকে শােভন !
যদি সে আলয় মম,
নিবিড় অরণ্য সম,
রহে চির-অন্ধকারে ঢাকা অবিরল।
যদি না নয়ন মেলে,
রবিচন্দ্রকর খেলে,
সেই স্মৃতি-দীপ্তি হবে দেউটি-উজ্জ্বল।
যদি দেখি গৃহ-বেশ,
শূন্য পৃথী-অবশেষ,
ধূলিধূসরিত হেরি মণ্ডপ-বিতানে ;
যদি সে করাল ডাকে, প্রাচীরে পেচক হাঁকে
তবু রব বুক পেতে সে সুপ্ত শ্মশানে ।
২০:
প্রেম ও প্রকৃতি।
সে জীর্ণ কুটীরদ্বার, সুখাশ্রম অমরার,
কণ্টকিত বনগুল্ম-প্রমােদ-নন্দন !
সুমঙ্গল শখ-সম,
বাজিবে এ কর্ণে মম,
শিবার অশিব রব, ভুজঙ্গ গর্জন!
লয়ে শেষস্মৃতি তার,
বহিব এ দেহভার,
গৃহ-অভিমুখে তাই ত্বরিতগামিনী !
শুয়ে ছিনু ধরা’পরে,
পথশ্রম দূর তরে,
তুমি ত জাগালে ডেকে—“কে তুমি কামিনী’!
নহ পরিচিত মম,
তবু পরিচিত-সম,
কহিলাম বহু কথা হৃদি-রাগ ভরে ;
ইহাতে কি দোষ আছে, তুমি যে আমার কাছে,
পাবে পূজা ভ্রাতৃসম ভগিনী-আদরে !
দেখি চোখে কালরাত্রি, দোঁহে একপথ-যাত্রী,
দেখি এক-বেশ দোঁহে নিরাশা-দহনে ;
ইহাতে নাহিক সুখ, চল পান্থ গৃহমুখ,
বহুদিন গৃহহারা আমি এ জীবনে !
অপরাধ ক্ষমা কর, দুঃখিনীর দোষ হর,
আর না ফুটিছে ভায কম্পিত অধরে ;
যৌবনে যােগিনী বেশে, এই দূর বনদেশে,
নহি গাে নবােঢ়া বধূ সে মধু-বাসরে !”
দ্বিতীয় সর্গ।
হৃদে যেন ঘুম ছায়, চিত্রে পুতলীর প্রায়,
বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে রহিনু চাহিয়া ;
সম্বিতে ক্ষণেক পরে,
কহিলাম মৃদুস্বরে,
কণ্ঠ রুদ্ধ হয় তবু থাকিয়া থাকিয়া !
‘দেখি যে প্রেমেতে ভরা, তােমারি এ বসুন্ধরা,
বাসযােগ্য গৃহ তব প্রেম-মহিমায় ।
অপূর্ব তােমার শিক্ষা, পূর্ণ হৃদে উচ্চ দীক্ষা,
নারীর মহত্ত্ব চির-বিখ্যাত ধরায়।
;
বড় আশা আছে মনে, আৰ্য-তীর্থ-দরশনে,
গঙ্গোত্রী দেখিয়ে যাব বদরী, কেদার
ভাগ্যে যদি ফেরা ঘটে, হ’ব শিষ্য বিশ্বমঠে,
প্রেমের মহিমা ভবে বুঝিতে অপার !
সংসারতাপিতজন, চিত ঘাের উচাটন,
জ্বলে মরি বাসনার দগ্ধ হুতাশনে ;
তাই সঙ্গ ত্যজি তব,
হেরিতে এ চিতে ভব,
বহুল আয়াসে যাহা ফলে না জীবনে।
দেহ গগ বিদায় সতি, আমি অতি মন্দমতি,
বিজনে ছাড়িতে তােমা পরাণ না চায় ;
গহনে ফিরিব একা, সকলি অদৃষ্ট-লেখা,
বুঝি গাে হবে না দেখা, বিদায়—বিদায়।
২২
প্রেম ও প্রকৃতি।
নিবেদি’ তাহারে হেন,
বিদ্যুৎ বেগেতে যেন,
স্তব্ধ উপত্যকা-পথে চলিনু আবার ;
শ্যামল দুকূল সাজে,
তরুকোলে লতা রাজে,
মেঘ-সম বনরাজী ঘেরিয়ে দু’ধার।
হৃদয়-আবেগে ধাই, নেত্র ফিরে নাহি চাই,
চুম্বক ল’তেছে লৌহে সঘনে টানিয়া ;
প্রকৃতিবিভব যত,
পলকে পলকে শত,
শােভার তরঙ্গে যেন যেতেছে ভাসিয়া।
সহসা চেইনা হরে ; ভব-রাজ্য তুচ্ছ করে
বিশাল সাম্রাজ্য কার গগন-তোরণে!
তুষারধবল সাজ, ও কি দূরে হিমরাজ !
বিরাজে বিরাটরূপে অনন্ত জীবনে।
ইতি দ্বিতীয় সর্গ।
তৃতীয় সর্গ
হিমালয়ে।
হে প্রকৃতি! মায়াবিনী ! সৌন্দর্যের নিঝরিণী ।
কোথা সে বালিকা-হাস করুণ-অধরে ।
জ্যোৎস্না-আকুলিত নিশি, সৌরভে পূর্ণিত দিশি,
কাননে কুসুম খেলা-ভারকা অম্বরে !
কিম্বা সে বসন্তকালে,
সন্ধ্যার জলদজালে,
অপূর্ব বিমান-শােভা দিনান্তকিরণে ;
বিপুল পুলকভরা,
মােহমাখা বসুন্ধরা,
ঢালিত কি প্রীতি-সুধা জাগায়ে জীবনে!
২৪
প্রেম ও প্রকৃতি।
AAA
গভীর----গম্ভীর সব ! কোথা পিকভৃঙ্গরব !
তটিনীর কুলুকুলু সুমৃদুল তান !
বসন্ত প্রমােদ বন, সে যৌবননিকেতন ।
নয়নে দামিনী-দতি কণ্ঠে প্রেম-গান !
সকলি ডুবেছে হায়,
কণামাত্র নাহি তায়,
শিহরে সৌন্দৰ্য্য কিরে এ বিজন স্থলে !
সেই পত্র পুষ্পমেলা,
জীবনের ছেলেখেলা,
একি দৃশ্য অভিনব গাম্ভীর্যের বলে ।
পড়ে ধরা পরসাদে,
গর্জি শত বজুনাদে,
প্রবাহিয়ে স্ফটিকের তরঙ্গিত ধার ;
নগ্ন দীর্ঘ রুদল,
অঙ্গে হিম ঝলমল,
শিয়র পরশে নভােনীলিমার দ্বার ।
কটি বেড়ি সানুদেশে, এ কি এ বীভৎস বেশে।
ঘেরে আছে সুনিবিড় অরণ্য আঁধার ।
ভ্ৰমিছে নির্ভয়ে বলে,
নৃশংস শ্বাপদদলে
গরজে কেশরী-ছাড়ে শাল হুঙ্কার !
অহাে এ কি খরতর। যেন তীক্ষ্ণতম শর!
উড়ায় তুহিন-কণা দুরন্ত পবন !
কুয়াসার ধূমরাশি,
বিস্তারে বেড়েছে আসি,
বৰ্ম্ম-সম বীরতনু দিয়ে আবরণ।
তৃতীয় সগ।
* * । । ।
ভারত উত্তরে থাকি, পশ্চাতে তিববত রাখি’
ললাটে ভূস্বর্গ সম কাশ্মীর-কান্তার ;
রহিয়ে পূরবে চূমি, আসামের বনভূমি,
সৃজিয়াছে কিবা এক জলধি শোভার।
দেখায় গাম্ভীৰ্য যত,
হৃদয়ে সৌন্দৰ্য্য তত,
মনােমৃগ মুগ্ধকরি’ অপূর্ব ছটায় ।
বহুরত্ন-রত্নাকরে,
ভারকার দীপ্তিভরে,
এই হিমাদ্রির অঙ্গ রেখেছে সাজায় !
প্রভাতরবির কবে, আহা কি মাধুরী ধরে,
সােনার মুকুট পরি’ নীল শৃঙ্গমালা;
দৃপ্ত হেমেজ্জ্বিল কায়া, পড়ে কৃষ্ণতরুছায়া
ভবের বিভূতি যেন রহিয়াছে ঢালা !
মুঞ্জরিত তরুবুকে,
হাসে নিত্য নবসুখে,
চিত্ততৃপ্তিকর ফুল দিবসরজনী ;
রৌদ্রবর্ষা পরকাশে,
শরৎবসন্ত হাসে,
যখনি আসিবে ফুল্ল দেখিবে তখনি ।
নীহারমণ্ডিত হায়,
শ্যাম বনরাজী-গায়,
দেখিবে ছায়ার সহ বর্ণের বিকাশ;
এক মহীরুহে রতা, দেখিবে সহস্র লতা,
জড়প্রেমে বিশ্বপ্রেম অপূর্ব-প্রকাশ।
প্রেম ও প্রকৃতি।
বিস্ময়ে হইবে সারা,
হিমগিরি আত্মহারা,
দেহ বিচূর্ণিত ক’রি লুটিছে বিহবলে ;
হিয়ার ভিতরে তার,
ছিল কত মণিভার,
অনাদরে হেথা সেথা ছড়ায় উছলে ।
পদ্মরাগ মরকত,
জ্যোতিৰ্ম্ময় মণি যত,
আলিঙ্গি মৃত্তিকাবুক প্রণয়ে বিধুর !
আঁধারে আলােক যথা,
বিচিত্র মিলন তথা,
সে প্রেমপ্রসার কেবা বুঝে কত দুর ?
ঝঝর নিঝর ধারা,
ত্রিদিব ধার পারা
কোটী উপবীত-রূপে আনন্দে গড়ায় ;
কভু না শুকায় নীর,
স্নিগ্ধ স্বচ্ছ সুগভীর,
কোথা রুদ্র ঋতুরাজ বিক্রম হেথায় ?
বিহঙ্গ কুরঙ্গ সব,
সুরঙ্গ মাধুরী তব,
এই হেমন্তের রাজ্যে অসীম সুন্দর ;
শত রঙে সুরঞ্জিত, কি মাধুরী বিকসিত,
উড়ে প্রজাপতি শত বিশ্বমনােহর !
করে বসিয়ে ধ্যানে, হারাইয়ে বাহ্য জ্ঞানে,
কোথাও অটল-মূৰ্তি মুদিত নয়ন ।
হারায়ে হৃদয়-বলে,
কোথাও পাদপতলে
ভব-ভ্রমে দিশাহারা চঞ্চল জীবন।
তৃতীয় সর্গ ।
२१
সংখ্যাতীত জীব-বাস,
দেবকান্তি স্বপ্রকাশ,
সাম্যের সাম্রাজ্য হেন নাহি বুঝি আর
ত্রিদিব হইতে নামে, বিহরিতে হিমধামে
গন্ধর্ব, কিন্নর, যক্ষ, যত অমরার ।
নীরব নিশীথকালে, বিমল চন্দ্রিকা জালে,
হিমবান্ শােভাবান্ সুষমার ফুলে ;
শূন্যে হাসে তারাদল, হিমবাস স্নিগ্ধোজ্জ্বল,
বৃক্ষে বৃক্ষে জোনাকীর প্রদীপ বহুলে।
তরুশাখা হতে আলো, তান্ধকারে শােভে ভাল,
বিকীরিত বিশ্বজ্যোতি জোনাকী তপনে !
আমি
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্রতর, তুমি উচ্চ উচ্চতর,
রেখেছে প্রভেদ কোথা বিশ্বের নয়নে।
রবি শশী গ্রহ তারা,
ঢালে কি আলোকধারা
নিখিল ব্রহ্মাণ্ডবুক পুলকে ভরিয়া ;
এ প্রখর আলো মাঝে,
ত্রিলােক চমকি রাজে,
সন্ধ্যার প্রদীপরশ্মি আঁধার হরিয়া
!
রূপসীর রূপবিভা, প্রজ্জ্বলিত চক্ষে কিবা
ঘুচাইয়ে হৃদয়ের বিষাদ তিমির ;
নিবন্ত স্তিমিত জ্যোতি, বিতরে সৌন্দর্য্য অতি,
উথলি ভাবুক-বক্ষে উচ্ছাস মদির !
২৮
প্রেম ও প্রকৃতি
অনন্ত আলােক-খনি, দীপ্ত সূৰ্য্য দিনমণি,
সে ও যে কণিকা-কণা আলােকসাগরে
হে অন্ধ মানব মন, কি হেতু জ্ঞান ঘন,
ক্ষুদ্রে উচ্চে সমরূপে বিশ্ব জ্ঞান ভরে।
ওই সূৰ্য্য আত্মহারা,
ওই শশী সুধা পারা
ওই নীলিমার কোলে গ্রহ তারদিল ;
প্রদীপের রশ্মি ক্ষীণ, জোনাকীর দীপ্তি দীন
একাধার হতে আলাে লভিছে সকল।
উচ্চ শির ভূমে নত,
গুরু জ্ঞান গর্বহত,
বৃথা এ জীবন-মার্গে হেরি অহঙ্কার
সেই শক্তিকণা ফলে,
ক্ষীণ-শৌর্য বীৰ্যবলে,
হেলায়ে অঙ্গুলী ঘায়ে ভাঙে বজ্রসার।
নিশিদিন অনশনে,
বিরলে গ্রন্থের সনে,
কোথা সে একান্ত মন রত অধ্যয়নে ;
বিশ্বতত্ত্ব বুঝিবারে, ভ্ৰমি ভ্ৰম-অন্ধকারে,
গড়ায় কপােল বাহি’ ধরা দু’নয়নে।
ভবভূমে দেখি নর, জীব রাজ্যে শ্রেষ্ঠতর ,
সীমা-হারা জ্ঞানরাজ্য আয়ত্ত তাহার ;
তার ক্ষুদ্র পদতলে, কি কূট কৌশলবলে,
সুপ্ত শিশুটির মত ললাটে পারাবার ।
তৃতীয় সর্গ।
২৯.
মস্তিষ্কের কেন্দ্র হতে, কি চারু প্রতিভা-রথে,
স্বর্গসম মনােহারী শিল্পের বিকাশ ।
এই দুঃখপূর্ণ ধরা,
হইল মধুরতরা,
নিরখি সে শিল্পে শত সৌন্দৰ্য-প্রকাশ ।
দীর্ণ প্রাণ হ’ল ছাই, তবু কি রে অন্ত পাই,
অন্ত কি আছে রে কভু মর অন্বেষণে ?
এমন মানব হিয়া, কি কৌশলে তায় গিয়া,
দুরন্ত মাৎসৰ্য কীট দংশিছে সঘনে !
অদ্ভুত মাৎসৰ্য সৃষ্টি,
বৈশ্বানর সমদৃষ্টি,
মৃত্যু যেন ভয়ে ভীত বাসে আপনার।
দিবস রজনী যায়, যেন ঘূর্ণগ্রহ প্রায়,
দেখায় মাৎসর্য্য নব লীলা বারেবার ।
শান্ত স্থির নীলাম্বরে, নব ঘন জলধরে,
কোথা নীর—রক্তবৃষ্টি উল্কার পতন !
চির-অশান্তির স্থলে,
সারাটা জীবন জ্বলে,
তবু কোথা দর্পহত আনতবদন ।
শীতল চন্দন-আশে,
রােপি বিষতরু বাসে,
বিজড়িত ঊর্ধণা ভুজঙ্গের কায়!
নিশান্তে প্রভাত এল, ভাবিনু আঁধার গেল,
দেখিনু হৃদয় ঢেকে আছে কালিমায় !
৩০
প্রেম ও প্রকৃতি।
প্রকৃতি-ভঙ্গে হায়, পদে পদে চূর্ণ প্রায়,
দেখি নর তবু গর্বে উৰ্ধ করে শির ;
কোথা হৃত পরাজিত, সরমেতে সঙ্কুচিত,
বিক্রম প্রকাশ হেতু সতত অস্থির !
দাও এ অবােধে হায়, হে হিমাদ্রি ভীমকায়,
তােমার জীবন-শিক্ষা বাঞ্ছিত সুন্দর!
লয়ে এই ছন্নমতি, আমি যে অনন্যগতি,
দুরাকাঙক্ষা-বশে আজি বহু অগ্রসর !
প্রতি নব তরুপত্রে,
স্নিগ্ধচারু শ্যামছত্রে,
প্রতি নিঝরের তব তরঙ্গ ধারায় ;
তব প্রতি শিলাসনে, তৃণগুল্মপুস্পবনে,
জীবের জীবন দেব রয়েছে জড়ায়।
তব উচ্চ শৃঙ্গ উঠে,
নীলিমার বক্ষ ফুটে,
আতঙ্কে আগ্রহে গ্রহ দূরে সরে যায় !
দেখি উব্ধ করতল, ভেঙেছে বিহগবল,
আশ্রয় পাইয়ে মেঘ আলিঙ্গি ঘুমায়।
•
যেন রবি খুঁজে পায়, ও রাজমুকুট হায়,
মধ্যমণি-রূপে তায় শােভিতে উজ্জ্বল
বিভুল পাগল পারা, অন্বেষণে পথহারা,
নির্ণয় করিতে নারে-বাসনা বিফল ।
তৃতীয় সর্গ।
‘পরে,
শােভিতে
বুকের
শশী সদা সাধ করে,
তারকা সাজাতে চায় কর্ণের কুণ্ডল ;
শৃঙ্গ হতে শৃঙ্গোপরে,
বন হতে বনান্তরে,
হয় সদা লক্ষ্যভ্রষ্ট ঘুরিয়ে কেবল !
তােমার বিপুল শােভা, জগতের মনােলােভা,
কত নব নব স্মৃতি ফুটাইয়ে জাগে।
কবি হয় ভাবভােলা, হিয়া করে হেলা দোলা,
মুগ্ধমুখে হেরি তােমা নয়নেরি আগে।
অনন্ত সৌন্দৰ্য্য সনে, রঙ্গে শক্তি রত রণে,
মর প্রকৃতির দিয়ে অমর জীবন
তাই শােভা পুঞ্জে পুঞ্জে, তােমার ও কেলিকুঞ্জে,
প্রসাদ লভিতে দেব করেছে শােভন।
আগন্তুক তব দ্বারে, বন্দি রাগে হিয়াগারে,
পশে কি মানবভাষা ও কর্ণকুহরে ;
স্নেহ, প্রেম, সুধা, প্রীতি, এ ভাঙা জীবন-গীতি
বহায় কি ভাব, কোন বিশাল, অন্তরে !
প্রকৃতি কি কাদে দুঃখে, এলোচুলে অধােমুখে,
বিরাটপুরুষবক্ষে জাগাতে চেতনা ;
যুগান্তসাধনা ফলে,
গৃঢ় রহস্যের বলে,
বিকাশে কি অভিনব ধ্যানের ধারণা!
৩২
প্রেম ও প্রকৃতি।
দুরন্ত প্রাবৃট শেষে, শরতের পরবেশে,
ফুলমালে করে বালা কবরীবন্ধন ।
বিজড়িত অঙ্গে সাটী, নানা রঙে পরিপাটী,
তুমি দাও বেড়ী তায় ধূম আবরণ।
নিঝর কোমলকায়,
ঢালিয়ে তুষার তায়,
নবনীত তনু কর বিষম কঠোর ;
কভু লীলা মনােহর, কভু ক্রীড়া ভয়ঙ্কর,
কভু ৰুদ্ৰ কভু ভাবে গলিয়ে বিভাের ।
;
বিহগ কাতরে শ্বাসে, হারায়ে মধুরভাষে,
পক্ষপুট বিস্তারিয়া উড়ে না আকাশে
এত শােভা থরেথর, কহ তবে গিরিবর,
কেন হয় অর্ধস্ফুট মুদিত হতাশে !
বুঝেছি-বুঝেছি আমি, অনন্তভূধরস্বামী,
মূঢ় মনে সদা মাের কামনা তরল।
অটল বিশাল স্থির, তব জ্ঞান সুগভীর,
অখণ্ড নিয়তি সম প্রচণ্ড প্রবল।
তব লীলা অনুপম,
চঞ্চলা তটিনী-সম,
নহে প্রাণহীন কভু-পীড়নে অধীর ;
গুরু গরিমার বলে, তােমার হৃদয়তলে,
অসীম অগাধ প্রেম মহাসিন্ধুনীর ।
তৃতীয় সগ
গুৰুত্ব গাম্ভীৰ্য্য সহ,
তব স্নেহ অহরহ,
বিতরে জীবনীশক্তি আশ্রিতে তােমার ;
কভু যে আদর দিয়া, দাও সবে বাড়াইয়া
অধিক উচ্ছাসে ক্ষান্ত কর হে আবার।
নহে ভয়ঙ্কর স্থল,
তােমার হৃদয়তুল
মূঢ় আমি নারিনু যে বুঝিতে প্রথমে ;
বহু-বহু পরিমাণ, ধারণা, সাধনা, জ্ঞান,
লইয়া পশিতে হয় তােমার আশ্রমে।
দেখিতে সৌন্দৰ্য-খনি, দুল্লভ পরশমণি,
স্থূল সূক্ষম সর্বদর্শী দৃষ্টি প্রয়ােজন,
আয়াসে আয়ত্ত যাহা, অনায়াসে কোথা তাহা
অজ্ঞান-কল্পনা শুধু নিরাশ-স্বপন।
নহে প্রকৃতির ভুল, জড়-চেতনার মূল
তুমি হে আদর্শ সেই পুরুষ সুন্দর।
বীৰ্য-সম বীৰ্য্যাধার, তুমি ধর অনিবার,
তাই সে প্রকৃতি তােমা সাধে নিরন্তর।
••
দারুণ ভূকম্প ঝড়ে, সমুদ্র উথলে পড়ে,
চরাচর থরথর উঠে যে কঁপিয়া ;
অশনি নিপাতে ঘন,
আকুলিত ধরাবন,
কুটিতে প্রতিধ্বনি কর হুঙ্কারিয়া ।
৩৪
প্রেম ও প্রকৃতি।
। । । ।
অসীম তােমার তত্ত্ব,
কি উন্নত ও মহত্ত্ব ;
প্রকৃতিপুরুষ তুমি কর অভিনয় ;
দেবদেহ ধরাধামে, তব হিমাচল নামে ;
বিহরে তােমার চিতে কি শক্তি চিন্ময় ।
•
নয়নে ঘুমের ঘাের, কোন্ স্বপ্নে হয়ে তাের,
নিরখি লুটাই ভূমে অবশ হইয়া ;
অবসাদে টলমল,
করে তনু অবিরল,
মৰ্ম্ম ছিড়ে বাসনা যে উঠে গুমরিয়া ।
সুশীতল নিরমল, প্রাণ জুড়াবার স্থল,
একমাত্র তব পাশে হেরি এ নয়নে ;
এ মত্ত মাতঙ্গ মন,
ধায় কোন্ পথে বল প্রচণ্ড গমনে।
দুরাশায় নিমগন
••
আশায় নিরাশ হয়ে, প্রাণে কি পিপাসা ল’য়ে
হৃদয়ে কাতরা ধনী গৃহে ফিরে যায়
আমার কি মহাযশা,
পরিণামে সেই দশা
এ ঘাের সঙ্কটে আসি বল কে বাঁচায় ?
চিরতরে অবগাহি, আমি যে ডুবিতে চাহি,
জীবতাপহারী তব জ্ঞানসিন্ধুজলে ;
হৃদিপিণ্ড উপাড়িয়ে, তাই সব বিসর্জিয়ে
গৃহছাড়ি ভিক্ষু হয়ে আসিয়াছি চলে।
তৃতীয় সর্গ ।
কহ কোন্ অভিলাষে, আবার ফিরিব বাসে,
উজানে বহিছে সেথা দুঃখের লহরী;
করি নৈশ-নিদ্রাহত, ভীষণ দংশনে শত,
রক্ত শুষি করে পান স্মৃতিনিশাচরী।
আহা কি মহান সাজ ধর তুমি বিশ্বরাজ,
ভুলাইয়ে মােহমন্ত্রে জুড়ালে আমায় ;
লহ আপনার করি, সুগভীর জ্ঞানে ভরি,
হৃদে দুর্বলতা ধরি ঘৃণিত লজ্জায়।
হে সৌম্য—হে সুদর্শন । হে ভূস্বর্গ-নিকেতন !
দেহ গো বিদায় দেখা হবে কি আবার ।
কোথা সে ত্রিলােক রাজে, বিশ্বকাব্য-বীণা বাজে,
নিসর্গমানসসরঃ রুচি দেবতার।
কি আশা আসিল ঘেরি, শৈত্যে স্বর্গপথ হেরি,
চলে দ্রুত তরী যেন প্রখর পবনে ;
ধাই যত দূর-দূর,
প্রাণ তত তৃষাতুর,
পড়েছে কি মুগ্ধ মৃগ উরগ নয়নে।
ইতি তৃতীয় সর্গ ।
No text on this page.
চতুর্থ সর্গ
আগ্রায়।
স্বর্গের স্বপন-সম,
এ কি এ নয়নে মম,
একি অলকার দৃশ্য কূলে যমুনার ?
দীপ্ত প্রভাতের রবি,
জাগাইছে মর্ত্যে কার স্মৃতি মহিমার !
সুধবল সৌধছবি,
সমাধি-শ্মশান মাঝে, ত্রিদিবসৌন্দৰ্য-সাজে,
ধরণীর বুকে এক মহাতীর্থ-সম।
দেখি শােভা থরেথর মুগ্ধ বিশ্ব চরাচর,
যেন কল্পনার এক রাজ্য নিরুপম।
৩
প্রেম ও প্রকৃতি।
।
ঊর্ধে চন্দ্রাতপ-নীল, কি শুভ্ৰ মৰ্ম্মরলীলা,
রতনে খচিত কিবা শিল্প বিমােহন।
কি রম্য তােরণ-দ্বার,
নিত্য নব সুষমার,,
প্রতিভার পুষ্পবৃষ্টি–অপূৰ্ব সৃজন!
জগতে নন্দনবন, কি উদ্যান সুশোভন,
সজ্জিত বিবিধ তরু লতা ফলফুলে !
প্রফুল্লচন্দনবাস,
করবীকেতকীহাস,
সুমন্দ সমীরে প্রাণ চিরতরে ভুলে।
শত প্রস্রবণমেলা, করে ইন্দ্রধনু খেল।
তপন ছড়ায়ে দেয় কররেখা তার ;
পিক কুহুরণ ফুটে, গগন চমকি উঠে,
মলয় বহিছে সুধু বসন্তসম্ভার !
চরণ চুমিয়া ধায়,
সুরঙ্গে তরঙ্গকায়,
কালিন্দীকল্লোল আহা কি মৃদু মধুর !
দিবসে নিশীথে সাঁঝে, পশিয়ে প্রাণের মাঝে,
সুধার হিল্লোলে হিয়া করে ভরপূর !
ছাড়ি দূর হিমগিরি, আসিনু এ দেশে ফিরি
হেরিতে প্রেমের চিত্র অপূর্ব মহান্ !
আঁধার শ্মশানবাসে,
ত্রিলােক উজলি হাসে
যুগ যুগান্তর ধ’রি স্মৃতি দীপ্তিমান।
চতুর্থ সর্গ ।
అన
গভীর হৃদয় যার,
আছে, মহাশক্তি তার,
সেই মহামৃত্যুঞ্জয় এ মর-জীবনে।
শক্তির বিকাশে তার, অমরত্ব অনিবার,
সেই সে ধীমান ভবে জীবনে মরণে।
আঁধার বিস্মৃতি যথা,
সে শক্তি উজ্জ্বল তথা,
মৃত্যু কোথা—চিরদিন জাগ্রত মরণে!
কালমৃত্যু নীলিমায়,
নব উষজ্যোতিঃ হায়,
প্রেমিক অমর চির অনন্তশয়নে।
চির আকাঙক্ষার লাগি, থাকে চির-স্বপ্নে জাগি,
সতত মানসে হেরে ধ্যানে সে মুরতি ;
উল্লাসে বিভাের প্রাণ,
উন্মীলিয়া দুনয়ান,
উদার হৃদয় করে অনন্ত আরতি।
করাল সমাধিবুকে,
নিষ্ঠুর মৃত্যুর মুখে,
স্মৃতিহীন চিহ্নহীন স্তব্ধ শূন্যতায় ;
কে জাগে অলক্ষ্যে থাকি, কার সে সতৃষ্ণ আঁখি,
হইয়ে পলক-হার মুখ পানে চায়।
প্রেমের সাধনা বলে, এ বিশ্বে সকলি ফলে
প্রেমের শকতি হের ঐশ্বৰ্য মহান্ ।
কি স্মৃতি রেখেছে তুলে যমুনার উপকূলে,
এ মর্ত্যে অমরাবতী প্রত্যক্ষ প্রমাণ।
.
প্রেম ও প্রকৃতি।
উন্মত্ত অধীর প্রাণ,
মান কীৰ্ত্তি অবসান,
শ্রান্ত সুখ-লালসায় জীবনসন্ধ্যায়।
তবু চেয়ে অনিমিখে, একান্তে ধরার দিকে,
রাখিতে প্রেমের স্মৃতি সতত ধেয়ায় !
সেই ধ্যানে, সে ধারণে,
বিশুষ্ক হৃদয়বনে,
ফুটে উঠে পারিজাত ত্রিদিবের ফুল !
ধরার মৃত্তিকা’পরে,
সৌন্দৰ্য্য সৃজন তরে,
সে প্রেমসাধনা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে অতুল।
প্রণয়ে তামর হব,
চিরদিন বেঁচে রব,
ফুটে রবে রূপজ্যোতিঃ শােভার যৌবন ;
বাহিত জীবনপথ, চিরপূর্ণ মনােরথ,
অনন্ত সে অনুরাগ চির-আরাধন!
সে কামনা পূর্ণ হলে বিশাল অবনীতলে
নাহি রহে আকাঙক্ষার দুর্দম যাতনা ;
কিন্তু সে আকাঙক্ষা-তৃপ্তি, প্রভাহীন রাগীপ্তি
নহে কভু প্রেম-আশী জীবের বাসনা।
প্রেমিক গভীরতম, শূন্য আকাশের সম,
নাহি চাহে হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা নির্বাণ!
তৃপ্তি—জড়পিণ্ড প্রায়,
সুপ্ত, মগ্ন, লীনতায়
দুর্বহ সে জীবনের সমাধি-শয়ান ।
চতুর্থ সর্গ। ৪১ AWAA বাসনা প্রবলনদী, বহিবে যে নিরবধি, ফুটিবে সৌরভ-ভরা তটে ভাবফুল ; চক্ষে কামনার তারা, টল টল মাতুয়ারা, রজত-কিরণে আশা-রজনী আকুল ! কত স্মৃতি জেগে ওঠে, চিত্ত কি আবেগে ললাটে, স্মৃতির উপরে স্মৃতি তবু না ফুরায় ! দূর অতীতের কথা, শতসুখ, শতব্যথা, উচ্ছাস-হিল্লোলে যেন উজান বহায় ! হিয়া করে দুরু দুরু, বর্ষা মেঘ গুরু গুরু, সুপ্ত বননীড় সম নীরব আবাসে; ফুলের সৌরভ ভারে, কুটীরগবাক্ষদ্বারে, উন্মুক্ত অলকারাজী উড়িছে বাতাসে ! স্তব্ধ হেমন্তের দিন, তীব্র রৌদ্র তেজোহীন, আলসে কপােত দূর কাননে কুহরে ; মেঘে স্নিগ্ধ নীলাম্বর, বিজনে বসিয়ে চিত্র আঁকে কার তরে ! ঢুলু ঢুলু দ্বিপ্রহর, উজ্জ্বল মাধবী রাতে, কৌমুদীরঙ্গপাতে, সিত সমুজ্জ্বল ছবি বকুলবাসরে, উষার কনকরেখা, মুছে কি চুম্বন-লেখা, রক্তিম অরুণ-রাগ মাখায়ে অধরে!
৪২
প্রেম ও প্রকৃতি
সুখে দুঃখে ভাবরাশি,
উঠে কিবা পরকাশি,
যেন ইন্দ্রধনুলীলা বরযার কালে,
দূর-দূর—অতিদূর, স্বপ্নময় গীত-সুর,
জাগ্রত ঝিঝিট যেন চিরমধু ঢালে ।
সেই পূর্ণ-স্মৃতিভরা, মধুরে মধুরতরা,
সদ্যমুকুলিত পুষ্প মানসমাঝারে,
কি মাধুর্যে মনােমদ,
সৌন্দর্য্যের কোকনদ,
প্রেমের জ্বলন্ত স্মৃতি যমুনাকিনারে !
বুঝিতে হয় নি ভুল, প্রেমে হৃদি চিরাকুল,
স্থির চিত্ত জেগেছিল চাহি লক্ষ্য-পানে ;
নিরখি সে ধ্রুবতারা,
হয় নাই পথ-হারা,
মনােমৃগ ছুটে ছিল অব্যর্থ সন্ধানে।
হ’ল সিদ্ধ মনস্কাম, সৃজি এ আনন্দধাম,
প্রেমের সাধনা পূর্ণ সৌন্দৰ্যবিকাশে ;
হেরি এ সৌন্দৰ্যরাশি, স্তম্ভিত জগতবাসী,
আসি আগন্তুক কেহ না ফেরে নিরাশে!
তাই সুরতীর্থসম, ভূ-ভারতে নিরুপম,
শােভার নন্দনবন—আগরা-নগরী;
নয়ন জুড়াতে হায়,
তাই পঙ্গপাল-প্রায়,
আসে হেথা লক্ষ পান্থ দিবাবিভাবরী।
চতুর্থ সর্গ ।
৪৩
বিমল প্রদোষকালে, নেহার’ তাজের ভালে,
শােভিত ধবলকান্তি কি নীল-আভায় ;
ফুটিলে কনক রবি, কি বর-বরণ ছবি,
খেলে কিবা স্নিগ্ধভাতি গােলাপী ছটায় !
কভু কান্তি সমুজ্জ্বল,
পীতবর্ণ ঝলমল,
ঝলসে সুবর্ণ-সম মধ্যাহ্নমিহিরে ।
যবে কৃষ্ণমেঘে ছায়, কব কি সৌন্দৰ্য তায়,
শুভ্রকান্তি পরিণত নীলাভায় ধীরে।
ক্রমে যত বাড়ে বেলা,
বিচিত্র বর্ণের খেলা,
ফেরে শতরঙে চিত্র চারুনাট্যশালে ;
হৃদয় জড়ের পারা, স্তব্ধ, মৌন, দিশাহারা,
আঁখি-তারা অনিমিখমুগ্ধ ইন্দ্রজালে !
যবে পৌর্ণমাসী নিশি, জ্যোৎস্নাত
ত দশদিশি,
মর্ত্যে কোন্ ত্রিদিবের দ্যুতিঃ দলমল !
বিশ্বের সুষমা হরি,
মুগ্ধা মধু বিভাবরী,
রচিয়াছে সৌন্দর্য্যের চিরলীলাস্থল ।
;
নানারত্নে পরিপার্টি, রজতমণ্ডিত সাটী,
স্ফীত বর-অঙ্গখানি রেখেছে ঘেরিয়া ;
ব্রহ্মাণ্ডের রূপজ্যোতি, শােভাকুঞ্জে মূর্তিমতী,
নেহারে জগতবাসী বিস্ময়ে মজিয়া ।
৪৪
প্রেম ও প্রকৃতি।
ও কি ধ্বনি মনােহরা ! বাজে বীণা সপ্তস্বরা,
এ হেন মধুরধ্বনি আছে কি জগতে ?
নহে গীতি কল্পনার, ঢালে ত্রিদেবের ধার,
কি মূর্ত রাগিণীরাগ সজীব মরতে !
রেখাে এ মাধুৰ্য কম, ভুলায়ে পরাণ মম,
সৌন্দৰ্য্য প্রবাহ ঢালি চির এ নয়নে ;
রহিব সাধক হয়ে,
মানব জনম লয়ে,
হে সৌন্দৰ্য্য ! তােমার এ রম্য উপবনে।
নিরখি আকুল প্রাণ,
দেবতাবাঞ্ছিতস্থান,
স্বচ্ছ, স্নিগ্ধ, স্তব্ধ, শ্যাম কালিন্দীর কূলে ;
নিৰ্ম্মম হৃদয়হীন,
জ্ঞানশূন্য চিরদিন,
আসিলে হেথায় মুগ্ধ হয় ভাবে ভুলে !
হে ঐশ্বৰ্যময়ী তব । কি অপূর্ব শােভা নব,
ঝলে চারু বর-অঙ্গ শুভ্র মুক্তাহারে ;
মসীদ মিনার কত, হম্মাচূড়া শত শত,
পল্লবিত তরুচ্ছায়া বত্মের দু'ধারে !
সমুদ্রতরঙ্গপ্রায়,
কি জন-কল্লোল হায়
কি গণ্য পণ্যবীথি নেত্রবিমােহন।
মর্মরে বিন্যস্ত কিবা, ফলপুষ্পপত্রশােভা,
অপূর্ব শিল্পের কীৰ্ত্তি বিদিত ভুবন ।
চতুর্থ সর্গ।
৪৫
চারু-চিত্রপট-সম,
কিবা দুর্গ অনুপম,
সমুচ্চ কিরীটচূড়া পরশে গগন ।
বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হই, জগতে তুলনা কই,
অভ্রভেদী সিংহদ্বার কি দিল্লী-তােরণ !
মতি-মজীদের গলে, লােলমুক্তা জ্যোতিঃ ঝলে,
নাগিনা মসজিদ-চুড়ে সােণার মাধুরী ;
অমল অঙ্গুরী-বাগে,
ত্রিদিবমন্দার জাগে,
খাসমহলের মাঝে বৈজয়ন্তীপুরী।
দর্পণে দর্পণে আঁকা, শত ইন্দ্রধনু বাঁকা,
শি-মহলের দৃশ্য মরি কি সুন্দর ।
প্রাচীরের প্রতি ভাগে, খচিত কি শিল্পরাগে,
সম্মন-বুরুজ-কক্ষ চির-মনােহর ।
প্রতি হৰ্ম্মে স্বর্গছবি, বিচিত্রভাস্কর-কবি,
অঙ্কিত করিল কোন্ তুলিকা ধরিয়া
কি স্বপ্ন মদিরময়, শােভার তুফান বয়,
দিব্যালােকে মূর্তিমতী সজীব হইয়া ।
এখন বিদায় হই,
হে নিত্যসৌন্দৰ্যময়ী,
রবে ও সৌন্দৰ্য গাঁথা জীবনে মরণে ;
ও রূপ বিদ্যুৎ-হার, মম চক্ষে অনিবার,
জুলিবে গাে চিরদিন উজ্জ্বল বরণে!
৪৬
প্রেম ও প্রকৃতি।
প্রেমের আদর্শ তব, থাক্ হৃদে হ'য়ে নব,
হৃদয়ে ধরুক সজীব মহীতলে ।
মহাসিদ্ধি সাধনার, যুগব্যাপী আকাঙক্ষার,
আশার ফুটন্ত ফুল এ বিশ্বমণ্ডলে।
ইতি চতুর্থ সর্গ।
পঞ্চম সর্গ
০০
তীর্থের পথে।
হে তীর্থ ! হে রম্যভূমি ! কি স্বপ্ন মাধুর্যে তুমি,
ভাসিছ নয়নে মাের এ দূর গহনে;
বিশ্বের সৌন্দৰ্যরাশি, হেথায় যেতেছে ভাসি,
মধুর উজ্জ্বলরূপে তরুণ যৌবনে ।
কনক ধবল চূড়ে,
উষার অঞ্চল উড়ে,
মদির প্রকৃতিমুখ রক্তরাগময় !
এ ঘাের নির্জন বনে, কুসুম সৌরভ সনে,
সুবাসিত সমীরের প্রমত্ত হৃদয়।
৪৮
প্রেম ও প্রকৃতি।
ঊর্ধে—শৈলশৃঙ্গকোলে, কি শুভ্র সুষমা দোলে,
নিরখি বিভাের আঁখি পলকবিহীন।
রজতবরণ বাসে,,
বিদগ্ধ পরাণ হাসে,
বিস্মৃতি ভুলায় গত দুঃখ-ভরা দিন।
আদরে প্রকৃতি রাণী, শােভার নিকুঞ্জখানি,
কোমল চম্পক করে র’চেছে হেথায়,
এ বিরলে বনবালা,
চৌদিক করিয়ে আলা,
ললিত লাবণ্য মাখি ঢলে কি লীলায়।
শান্ত স্নিগ্ধ নীড়-বাসে, চক্ষে চারু-চিত্র-হাসে,
এ পুণ্য আশ্রম তব মরি কি মধুর।
নিত্য হেথা সুখ-আশে,
হৃদয়ের মহােল্লাসে,
সুগন্ধে অন্ধমনঃ-অলি ভরপুর।
দেখাও প্রেমের ছবি, হে বিশ্বের মহাকবি,
অমােঘ সাধনফলে প্রেমের ঈশ্বর ।
যে প্রেম কণিকা পেয়ে,
রশ্মির রেখাটি ছেয়ে,
এই মর্ত্যভূমি তব এতই সুন্দর।
দেখি ও দেবতা-মুখ,
কি হর্ষে পূর্ণিত বুক,
হৃদয়ের অনুরাগ কি রাগে রঞ্জিত
নয়নে কি নবদৃষ্টি, স্নেহের কি পুষ্পবৃষ্টি,
অধরে কি মধুভাষ কারুণ্যে প্লাবিত।
পঞ্চম সর্গ।
৫৯
কার ধ্যানে একমনে,
সুপ্তনীড় নিরজনে,
বরষ বিস্মৃতিগর্ভে যেতেছে ডুবিয়া !
তবু কোন্ জ্যোতিঃ হায়, শুভ্র শুকতারা প্রায়,
আধ ঢুলু ঢুলু চোখে রেখেছ মাখিয়া !
এ কি দেখা চিরদিন, দেবপ্রাণ নিদ্রাহীন,
কি ভাব-আবেশে মরি দিবস-যামিনী;
বদন নীরব রহে, প্রাণে কি লহরী বহে,
অন্তঃশিলা-ফল্প-সম অন্তরবাহিনী।
-
কি প্রেম গভীরতম, শ্মশান ত্রিদিব-সম,
নির্বাণ বাসনা-বহ্নি -মর্ত্যের উচ্ছাস।
তপ্ত কল-কোলাহলে, আকাঙক্ষার লীলাস্থলে,
এ কোন্ মহান্ শান্তি ঘুচায় হতাশ !
বিশ্বপ্রেম দেবধৰ্ম্মে, আরাধিয়ে মর্মে মৰ্ম্মে,
কে চাহে ছুটিতে আর বিলাসবিভ্রমে।
এ প্রেম হৃদয়ে লই
সতত মরিয়ে রই,
এ মরণে চির-তৃপ্তি—চেতনা মরমে !
এ চেতনা ধরি বুকে, রব এ ধরায় সুখে,
পােহাব অজ্ঞান-ঘােরা তমসা-রজনী ;
ঘুচিবে ঘুমের ঘোের, ছিড়িবে স্বপন-ডাের,
রবে না আঁধারে ভরা অটবী অবনী।
প্রেম ও প্রকৃতি
এ লক্ষ্য ধরিব ছুটে,
ঢাকি প্রাণ পক্ষপুটে,
সজীব রাখিব প্রেম মূরতি সুন্দর ;
সাধনা-জীবনপথে, পূর্ণিবে এ মনােরথে,
তােমারি পদাঙ্কে রাখি প্রাণের নির্ভর।
সকলি ডুবায়ে দিব, ও আদর্শ বক্ষে নিব,
হৃদয়ে অঙ্কিত করি আলেখ্য মহান্ ;
প্রেমের ভিখারী আমি, প্রেমরাজ্যে তুমি স্বামী,
ও প্রেমসাগরে ডুবি লভিব নির্বাণ ।
দেখিয়া ধরার দুঃখ
কাতর তােমার মুখ,
তাই মৌন-যােগী দেব এ তীর্থ বিজনে;
তাই প্রেম শতধারে,
প্রবাহিত হৃদাগারে,
সৃজি প্রতি-তীর্থে মঠ ভারত-ভুবনে।
নাহি কোন ভেদাচার, চিরমুক্ত রুদ্ধদ্বার,
সবে সম অধিকার তােমার মন্দিরে ;
কি মহাত্মা ক্ষুদ্রমতি,
সবার সমান গতি,
হৃদি-রক্তে অর্ঘ্য ঢালি যে দিবে সুধীরে !
চণ্ডাল বরেণ্য যথা, ক্ষেত্ৰ-সম মুক্তি তথা,
সর্বস্ব বিসর্জি যথা আত্মবলিদান।
কিবা সতী, কি অসতী, কি অগতি মহামতি,
প্রেমের সাধক হলে সকলে সমান
পঞ্চম সর্গ।
৫১
এ রম্য প্রকৃতি-বাসে,
সকলি পুলকে ভাসে,
এ অতিথি দগ্ধমতি হে দেব মহান্ ।
মরুতে ফুটাও ফুল, হােক্ প্রাণ প্রেমাকুল,
শুনাও সে সর্বজয়ী বিশ্ব-প্রেমগান !
দাও প্রেমে নব বল,
সাধনার মােফল,
স্বর্গ মর্ত্য এক হােক না রাে বিচার ;
শ্মশান-সাম্যের প্রায়,
চিত্তদাগ মুছে হায়,
দাও দেব তীব্র জ্যোতিঃ উচ্চ প্রতিভার ।
তটিনীতরঙ্গ প্রায়,
এ নরজীবন যায়,
পরাণে জাগিয়া উঠে অনন্ত উচ্ছাস!
এত যে ধরার স্মৃতি অমিয় জীবন-গীতি,
মরণের মহাস্বপ্নে হয় কি বিকাশ ?
এক প্রশ্ন নিরন্তর, সংশয় কি ঘােরতর,
সন্দেহে বিশ্বাসে সুধু বেধে ওঠে রণ ।
স্মৃতি-বিস্মৃতির মাঝে,
রহি জগতের কাজে,
হরষে হতাশে মজি করি আলাপন ।
মর্ত্য-মৃত্তিকার 'পরে কেন জন্ম রাগভরে,
ডুবাইয়ে পূর্বস্মৃতি বিস্মৃতির জলে ;
আশায় জীবন ধরি,
পলকে পলকে মরি,
না জানি এ বিবর্তনে কোন্ সুধাফলে ।
প্রেম ও প্রকৃতি।
জড়েতে জীবনী দিয়ে,
অণু পরমাণু নিয়ে,
নশ্বরতা ভুলে ধরি অমর সত্ত্বায় ;
এ দেহ রবে না ভবে,
সকলি বিলীন যবে,
স্মৃতি কি বিম্বিত রবে জাগ্রত আত্মায় ?
শ্যামালতা ফুল-ফলে,
চিত্রিত কি নদী জলে,
বহিছে রজতধারা নিৰ্ম্মল দর্পণে।
চাহিয়ে তরঙ্গ পানে,
শুনিয়ে কল্লোল গানে
হয়ে যাই দিশাহারা সৌন্দৰ্য-প্লাবনে।
বহিতেছ নিরবধি, হে কলনাদিনী নদি!
দক্ষিণের এ উর্বর উজ্জ্বল প্রান্তরে।
প্রত্যেক হিল্লোলে তব, মৃত-সঞ্জীবনী নব,
চেতাও এ মৃতকল্পে নবরাগভরে !
অতীতের মহাস্মৃতি,
জীবনের মহাগীতি,
কি অমর-কণ্ঠ লয়ে তুলিছ সে তান;
ভাবুক ভাবিয়ে সারা,
কবি-চিত্ত আত্মহারা,
শুনি এ বিশ্বের মাঝে সঙ্গীত মহান্ ।
রবে কি বিমুখ আর, নামাতে হৃদয়-ভার,
অমল শ্যামল স্নিগ্ধ চারু উপকূলে !
সে অপূর্ব কাব্যকথা, জুড়াতে প্রাণের ব্যথা,
তট-তরু স্মৃতি-ফুলে রেখেছে কি তুলে ।
পঞ্চম সর্গ।
সুধার এ তরঙ্গিণী
ঢালিছ কি প্রবাহিণী,
তাপিত মর্ত্তের
বুক
করিতে শীতল ?
তােমার নির্মল জলে,
লভে কি কঙ্কাল-দেহ সুকান্তি উজ্জ্বল ?
অবগাহি কুতূহলে,
ঢাল কি তৃষিত প্রাণে, করুণ কোমল গানে,
ত্রিদিবঝঙ্কার ল’য়ে সান্ত্বনা মােহিনী, ;
কি
মৃদু
কল্লোল-কলে
তীরবন ফুলফলে
সরসি’ বিকশি উঠে হাসায়ে মেদিনী।
;
আহা কি হৃদয়-হারী, তরঙ্গিত নববারি,
কূলে কূলে স্ফীতবক্ষে মৃদুল উচ্ছল ;
মধুর মাধুরীময়,
উচ্ছাসে তুফান বয়,
পবনে অঞ্চল উড়ে, কুন্তল চঞ্চল !
কভু বা মন্থরগতি, সরমে কম্পিত অতি,
কি চিন্তায় মৌনমুখি অমৃতভাষিণি !
নামে কি বিষাদ-নিশি, আবরিয়ে দশদিশি
ঘেরি চিরবিরহের তমসা-যামিনী !
ও ফুল্ল অধরে হাসি, যায় যে আঁধারে ভাসি,
বিশুষ্ক গােলাপ যেন প্রখর কিরণে ;
কেন তব রূপরাণি, শুকায় হৃদয়খানি
প্রকৃতির দাবদগ্ধ নিদাঘ-দহনে !
৫৪,
প্রেম ও প্রকৃতি।
7
চামুণ্ডা প্রকৃতি-করে,
রূপ কি মরণে ডরে,
পােড়ে কি সৌন্দৰ্য্য কভু মাৎসর্য্য চিতায় ?
কালের ঝটিকা আসি, এ বিশ্বের রূপরাশি,
নিবিড় বিস্মৃতি-বুকে কভু কি নিবায় ?
জ্ঞানচক্ষে শােভা যবে, ফুটিয়া উঠিবে ভবে,
অনন্ত কালেও কভু হবে না নির্বাণ ;
প্রকৃত সৌন্দৰ্যছবি,
উমার ললাটে রবি,
কুসুম সুবাস কভু হরে কি শ্মশান ?
চাহি সে হৃদয়াগার,
বজ্রসম ধৈৰ্যভার,
চাহি এ কোমল বুকে বৰ্ম্ম দৃপ্তোজ্জল !
অধরে করুণ ভা, অমৃত পূরিত হাস,
বক্ষে পুষি মহাজলি—তীব্র হলাহল।
;
এ হৃদে তুলিয়ে নিব, সর্বস্ব লুটায়ে দিব,
দুর্ভেদ্য পাষাণে হবে জীবনী সঞ্চার
শবের মুদিত আঁখি, চাহিতে রবে না বাকি,
থাকিলে করাল তৃষা চির-আকাঙক্ষার !
হৃদয়ে পূর্ণিত ব্যথা, এত যে আশার কথা,
দেবতা। আমার কেন পরাণে জাগাও ;
তব শততীর্থধামে,
বিধাতার পুণ্যনামে
কে ছুটে বাঁধিতে আসে হৃদয় উধাও!
পঞ্চম সর্গ।
পাতিয়া দিয়াছি বুক,
সহিতে নির্মম দুঃখ,
চলেছি কণ্টকাকীর্ণ পথে কামনার ;
মহাঝা শিরে ধরি, দুরারােহ শৃঙ্গোপরি
উঠিতে বিকল প্রাণ ছুটে অনিবার।
অনাদি ঈশ্বর তুমি, তােমারি এ বিশ্বভূমি,
তােমারি অনন্ত লীলা অনন্ত সৃজন;
প্রকৃত বাস্তব যাহা, বিফলে কি যায় তাহা,
কঠোর কৰ্ম্মের চক্ষে শােভে কি স্বপন ?
তৃষার নাহিক শেষ, কোথা তৃষা-অবশেষ,
দেখিব তােমার সেই শােভনা-নগরী
বারাণসী শােভাধার,
বিশ্বব্যাপী কীৰ্ত্তি যার,
সৌরভে সমগ্র ধরা রহিয়াছে ভরি।
সে মহাশ্মশানবাসে, আনন্দকানন হাসে,
রত্নকিরীটিনী সৌধ-মন্দিরমালায় ;
পূর্ণিমা আকাশে বসি, ঘােড়শী রূপসী শশী,
স্বর্ণকান্তি ঢলঢল কি পুণ্য প্রভায় !
•
যাই তবে বিশ্বাত্মন, রহ যােগে নিমগন,
ধেয়ানে তােমার দেব সকলি লক্ষিত
পলকে দুঃখের ত্রাস, পলকে হর্ষের হাস,
কটাক্ষে সৃজিত সৃষ্টিকটাক্ষে চূর্ণিত ।
প্রেম ও প্রকৃতি।
ও কি রে বিচিত্র ঘটা ! উর্ধে ললাটে হরজটা,
নিবিড় গম্ভীর ছটা ভীষণ দর্শন ;
ধ্ব ধ্বক অগ্নি জ্বলে, শত চন্দ্র করােজ্বলে,
ভবের বিলাস মরি বিচিত্র শােভন।
নীলিমায় ;
দেখিনু বিস্ময়ে ফিরি, ধূম্রচূড় ব্ৰহ্মগিরি
লটপট উৰ্ম্মিজাল
চুম্বে
পাষাণ মূরতি ধরি,
চির-বাহ্যজ্ঞান হরি,
ভুলি মর্ত্য-জন্ম-দুঃখ গৌতম ধেয়ায় !
হেরে পুনঃ মুগ্ধ মন,
নিদাঘের নবঘন,
ঝরে পূত গােদাবরী ধারা নিরমল ;
পৃজিতে পরমপদ,
চিররুচি কোকনদ,
রেখ ধ্যানে ধারণায় অন্তিম সম্বল।
ইতি পঞ্চম সর্গ।
ষষ্ঠ সর্গ।
কাশীধামে।
ও কি মৰ্ত্ত সুশােভিনী,
হেমামুদকিরীটিনী,
রক্তিম অশোক-রাগ বাসন্তী উষায় ;
নিম্নে শ্যাম ধরাতল,
ঊর্জে রশ্মি-শতদল,
বিকসিত কি উজ্জ্বল হিরণ্যপ্রভায় !
বিশ্বাকাশে বারাণসী, পূর্ণিমার হেমশশী,
ভূলােকে দুঃলােকে তার তুলনা কোথায় ;
কি জ্ঞানে সাধনবলে,
স্বর্গ মর্ত্ত চরাচর চরণে লােটায় ।
অদ্বিতীয় ভূমণ্ডলে,
প্রেম ও প্রকৃতি।
•••AAA
এম এ
জাগে কি চেতনা চিতে, বিশ্বব্যথা নিবারিতে,
শান্তির সাম্রাজ্য মর্ত্যে অপূর্ব সুন্দর ;
সাধনার পূর্ণ সৃষ্টি, শােভার সুবর্ণ-বৃষ্টি,
ধূসর ধূটি-ভালে অর্ধ শশধর ।
এ সংসার মহামরু, শান্তি-কাম-কল্পতরু,
ধরেছে বুকেরপরে কি স্নিগ্ধ ছায়ায় ;
ভবদুঃখে ভাঙ্গাবুক, ভে কি সান্ত্বনা সুখ,
এ তীর্থনিবাসে আসি জীবনসন্ধ্যায় ।
আহা কিবা মনােহারী, হেমহ সারি সারি,
দীপ্তমণি-সমুজ্জ্বল-ভাগিরথী-তীরে ;
কি সুচারু ঘটশ্রেণী, যেন কুসুমিত বেণী,
প্রফুল্ল বসন্তাগমে কাননের শিরে ।
মন্দিরে মন্দিরে কত,
শিবলিঙ্গ শত শত,
দেবতা তেত্রিশ কোটী আনন্দে নিবসে ;
সতীর্থ একস্থলে,
মহারুদ্র-তপােবলে,
কি পুণ্য প্রতিভা-রশ্মি ব্রহ্মাণ্ড পরশে !
মহাকীৰ্ত্তি যথা তথা,
তট-সৌন্দর্য্যের কথা,
ললিত গাথার সহ বিদিত ভুবনে ;
দু’ধারে বরুণা অসি, মধ্যে শােভে বারাণসী,
কটিতে হিল্লোল-মালা মেখলা-শােভনে।
বছ সর্গ।
অদূরে কানন-বেণী,
মেঘসম বিন্ধ্যশ্রেণী,
অঙ্কিত গগনপটে সুনীল আভায় ;
অঙ্কেতে নিকুঞ্জবন, চিরশান্তিনিকেতন,
কি তাপহারিণী ছায়া—ত্রিতাপ জুড়ায় ।
কল্পনার পূর্ণ স্ফুর্তি, অপূর্ব গঙ্গার মূর্তি,
মরি কি মধুর মর্ত্যে মকরবাহিনী ;
মহাশিল্পী কোন্ জাতি -কি করুণ তাঁখি ভাতি,
জুড়ায় জীবন-তাপ দিবস-যামিনী !
?-
কত রাজরাজেশ্বর,
রচিয়াছে মনােহর,
মন্দিরপ্রাসাদমালা বিচিত্র গঠনে ;
শুদ্ধকৰ্ম্ম-ফল-হেতু,
মরজন্মজয়কেতু,
কি বরবরণে উড়ে কীৰ্ত্তির গগনে !
;
রামনগরের কিবা, সুন্দর মন্দির বিভা,
আহা কি হৃদয়হারী শিল্প সুশােভন ;
মাধুর্যে খােদিত সব,
ভারতের পুরাণের কীৰ্ত্তি অগণন।
মণ্ডি সর্ব অবয়ব,
ঊর্ধে মহাব্যোমপথ,
ভাস্করের চক্ররথ,
সপ্ত-অশ্ব-রজ্জ্ব ধরি অরুণ চালায় ;
রাবণের লক্ষ ব্যথা, রাঘবের স্মৃতিকথা
উৎকীর্ণ মন্দিরগাত্রে কি শিল্পশােভায়।
৬০
প্রেম ও প্রকৃতি
সুবর্ণ মন্দির মাঝে, বিশ্বে বিশ্বনাথ রাজে,
কাশীর কনক-কণ্ঠে দিব্যরত্নহার ।
যাঁর পদ বুকে ধরি, মর্ত্যলােক স্বর্গোপরি,
বিশ্বে এ কি অভিনব দৃশ্য অমরার !
হেথায় ত্রিতাপহারী, বরষে শান্তির বারি,
তাপীর মরুভূ-বক্ষে অমৃত-আসার ;
নিদাঘের রৌদ্রবুকে, যেমতি পরশে সুখে,
তুষার-শীতল-ধারা নব-বরষার !
এ তীর্থে বিয়ােগ-জালা, বিশ্বের করুণা ঢালা,
কে আসি মুছায় তপ্ত নয়নের নীর ;
মহাশােক ঝাঘায়, নিমেষে নিবারি হায়,
অলক্ষ্যে থাকিয়ে করে হৃদয় সুস্থির !
চিত্তের কলুষগত,
কাম, ক্রোধ, হিংসা হত,
বুকভরা দাবাগ্নির কি মহানির্বাণ ।
হেথা আত্ম-পরজন,
সবি আপনার ধন,
জীবনের ভেদাভেদ সবি অবসান ।
জীবের পরমগতি, মহিমার কি শকতি,
ভক্তির জীবন্ত চিত্রে পূর্ণিত জীবন ;
গৃহে গৃহে দ্বারে দ্বারে, উচ্ছসিত শতধারে,
কি অপূর্ব করুণার প্রীতি-প্রস্রবণ।
ষষ্ঠ সর্গ ।
অবিরাম কি সাধনা,
পূজা, যােগ, আরাধনা,
হােমকুণ্ডে প্রজ্জ্বলিত সদা হােমানল ;
জীব নিত্য বারমাস, করে সুখে কল্পবাস,
বিমল জাহ্নবীজলে জীবন শীতল।
সংখ্যাতীত দেবমূর্তি, বিশ্ব-বিধাতার ঘূর্তি
স্নিগ্ধ, শান্ত, সমুজ্জ্বল, ত্রিদিব-মাধুরী;
মহাজ্ঞান কল্পনার,
বিশ্বসংসারের সার,
বিশ্বমাঝে চিরনব বিশ্বরাজপুরী !
সিদ্ধ জীব মনােরথ,
উম্মুক্ত মুক্তির পথ,
পুণ্যপদে দেয় পাপ অন্তিম আহুতি;
চৌষী যােগিনীপাটে, মণিকর্ণিকার ঘাটে,
উঠে ঊর্ধে মহাশক্তি-জীবনের দ্যুতিঃ !
;
ধন্য বিশ্বে বিশ্বনাথ, করি চির প্রণিপাত,
বিশ্বব্যাপী তব পূজা এ বিশ্বমন্দিরে ;
প্রতিদেহে হৃদিস্থল, তুমি তায় সমুজ্জ্বল,
উষার কনকালােকে সন্ধ্যার তিমিরে।
ঘুরিলাম দেশে দেশে, পান্থ কাঙালের বেশে,
দেখিতে তােমার মুখে অনিন্দ্য মাধুরী ;
গিয়াছিলে লয়ে যেথা, আমি গিয়াছিনু সেথা,
হাতে ধরে ঘুরায়েছ এ অবনীপুরী।
প্রেম ও প্রকৃতি।
দেখায়েছ তুমি যাহা, আমি দেখিয়াছি তাহা,
দিব্য-চক্ষে তব দেব দুল্লভ-দর্শন।
যা কিছু দিয়েছ মােরে, লয়েছি তা বুকে ধরে,
চিরজনমের ঋণ শােধিতে আপন।
দেখিনু ত্রৈলােক্যনাথে, জীর্ণ দেহে হিমবাতে,
হিমচূড়ে তীর্থরাজ ভবতীর্থসার!
দেখিনু নয়ন-ভরি,
কি দুর্গম শৈলারণ্যে নির্জনে কেদার !
মৃত্যুমুখ পরিহরি,
দেখি আরাে তীর্থ-শতে, হেলি’ ঘাের হিমপথে,
ভবেশ-বিলাসকুঞ্জে ফিরেছি আবার ।
সুরচিত্তবিমােহিনী দেখি কাশীবিলাসিনী,
অন্তিমে বৈকুণ্ঠপথ মণিকর্ণিকার।
এই বারাণসী ধাম,
আনন্দকানন নাম,
পৃথীলে শশীকলা-ত্রিশূল উপরি,
মণিমন্দিরের মাঝে, ভুবন-মােহিনী সাজে,
মর্ত্যে ভবরাণী রাজে কাশীপুরেশ্বরী !
আৰ্ত্ত-বাসে অবতীর্ণা, সে অন্নদা অন্নপূর্ণা,
হর্ষে অন্ন হেরি মত্ত অন্নের কাঙ্গাল
তপ্ত-অশ্রু যায় মুছে,
চির-চিত্তব্যথা ঘুচে,
নামে জীবনের ভার থাকে না জঞ্জাল !
ষষ্ঠ সর্গ।
AWAA
কত সাধু শুদ্ধাচারী, দণ্ডী, যােগী, ব্রহ্মচারী,
এই পুণ্যভূমি মাঝে আনন্দে বিহরে।
জীবনের শেষদিন, শান্তি কোলে হ'তে লীন,
নীরবে প্রতীক্ষা সহে সুধীর স্থবিরে !
শান্তিময় এই স্থান,
উঠে উর্দ্ধে বেদগান,
পুণ্যকণ্ঠ হ’তে সদা উল্লাস ঝঙ্কার
সকলি হরষে ভাষে, দ্বিধাশূন্য দেববাসে,
শান্তির সরসে সবে দিতেছে সাঁতার!
ওই মন্দিরের কোলে, শঙ্খ ঘণ্টা উতরােলে,
আরতি উৎসবে মত্ত পুরবাসী জন ;
ভক্তি প্রেমে কৃতাঞ্জলি, ঢলে পড়ে গলাগলি,
নয়নে তরঙ্গ ধার, উন্মাদ নৰ্ত্তন !
আকাশে উদিছে শশী, জ্যোৎস্না পড়িছে খসি, .
রজতঅঞ্চলা ধরা বরাঙ্গ উজ্জ্বল।
আস্তে ব্যস্তে কুলনারী, জ্বালি’ দ্বীপ সারি সারি,
বসায় তারকা যেন খচিয়ে ভূতল !
মহিয়সী বর্ষীয়সী, নিরালা নিভৃতে বসি,
যােগীর পরম ধ্যানে এবে নিমগন ;
বব ব ব রবে,
উন্মত্ত অধীর সবে,
কি পবিত্র শিবস্তোত্রে ধ্বনিত গগন।
৬৪
প্রেম ও প্রকৃতি।
-A^^^^^
বিধবা যুবতী যত,
যৌবন-বিলাস-গত,
শুষ্ক রূপপদ্মফুল বৈধব্য-অনলে ;
মসুখ পদে দলে,
বিশ্বনাথ পদতলে,
অর্পিছে জীবনমন তিতি আঁখিজলে।
;
সে মহা-তারতি যবে, কে চিতে নীরব রবে,
কে বুঝিবে ভক্তির কি ত্রিদিব উচ্ছাস ;
যেন করি আত্মদান, বিশ্বে ভক্তি মূৰ্ত্তিমান,
সৌরভে সহস্র যেন মন্দার বিকাশ।
সে মহা-আরতি গীতি, যেন শ্রুতি-বেদস্মৃতি,
-অতীত নৈমিষারণ্যে-পুণ্য তপােবনে ;
বিরচিয়ে সুমণ্ডল,
যেন আৰ্য ঋযিদল,
অধিষ্ঠিত শিববাসে শিব-আরাধনে।
তাহাে কি মহান্ ভক্তি, অহহ কি ঐশিকশক্তি,
কি মহাশক্তির তেজে সবি তেজোময় ;
এই তেজোময়ী কাশী, শিবশক্তি পরকাশি,
এ মহীমণ্ডলে মহা-মুক্তির নিলয় !
বার্ধক্যে যৌবন-স্মৃতি, নৈরাশ্যে আশার গীতি,
পাপীর আঁধার বুকে পুণ্যের কিরণ !
কলু কুহকজালে,
বিমল আলােকমালে,
জাগে কি প্রাণের মাঝে ত্রিদিব-স্বপন।
মষ্ঠ সর্গ।
••••
;
ল’ভি তেজ সর্বদম, ক্ষুদ্রজীব বজ্রসম,
সাধনে তেজের বাস এ তীর্থনিলয়ে ;
এ তীর্থে সাধক যেই, শিবত্বে সুযােগ্য সেই,
বিশ্বপ্রেমে প্রেমময় সর্বত্যাগী হয়ে ।
সার্থক এ চক্ষে আমি, দেখিনু তৈলঙ্গস্বামী,
জীবনে সর্বস্ব-ভােলা, ভােলা ভােলানাথ
নাহি কোন হেলাদোলা, বিশ্বপ্রেমে আত্মভােলা,
জীবন্ত শিবের মূর্তি—জাগ্রত সাক্ষাৎ!
অপূর্ব জ্ঞানের খনি,
কোটী রশ্মিময় মণি,
জ্ঞানময়ী বারাণসী জ্ঞানের সদন ;
জীবজন্মে লভি জ্ঞান, স্বর্গসুধা করি পান,
জ্ঞানের গভীর নীরে হয় নিমগন ।
জ্ঞানে কি গভীর নীতি, জ্ঞানে কি অসীম প্রীতি,
জ্ঞানে কি আঁধার চিত্ত উজ্জ্বল উদার ;
জ্ঞানে জীব সৰ্বসহা, জ্ঞানে শক্তি সর্ববহা,
জ্ঞানে কি উদ্ভেদ শত রহস্য অপার ।
নহে কভু
দিশেহারা,
জ্ঞানের আঁখির তারা,
অন্ধ নিরাকার-তত্ত্বে নিরখে সাকার।
দিব্যদৃষ্টি ফুটাইয়া, ভবভ্রম ঘুচাইয়া,
দেখায় প্রকৃততত্ত্ব আলােক উষার !
প্রেম ও প্রকৃতি।
ধরি জীব শিবজ্ঞানে, শিবসম শিবধ্যানে,
জীবনে মরণে শিব শিবের সঙ্গমে।
শিব-আশে শিব-গেহ, শিবপ্রেমে শিবদেহ,
শিবের সদনে শিব-শিব সে চরমে।
এস তবে বিশ্বস্বামী, এ বিশ্বে নিন আমি,
যেতেছি তৃণের সম ভাসিয়ে অকূলে ;
এস হে হৃদয়ে শিব,
ভক্তি-অর্ঘ্যে পূজা দিব,
গাঁথি বরগুঞ্জমালা চিত্ত-বন-ফুলে ।
;
প্রেমের পুলক-গীতি, জীবনের চিরপ্রীতি,
জীবনের চিরসুখ ও প্রেম-ছায়ায় ;
সংসারের মরীচিকা, কি প্রখর অগ্নিশিখা,
সতত বিহবলে জীবে কেন এ ধরায়।
তােমারি সংসারগেহ,
তােমারি স্বর্গীয় স্নেহ,
তােমারি অনন্তলীলা নিত্য দুঃখসুখ ;
কভু হর্ষে বুকভরা, কভু জ্বালা ভয়ঙ্করা,
হাসি অশ্রুমাখা চির সংসারের মুখ ।
শােক, তাপ, লজ্জা, ভয়, করে রুদ্র-অভিনয়,
নিত্য এ সংসার-সিন্ধু করি বিধূনিত ;
কেহ ত নহেক স্থির, চঞ্চল জীবন নীর,
কাল-পদ্ম-পত্র-মাঝে সদা আন্দোলিত।
ষষ্ঠ সর্গ।
কামনা ঘুরিছে বেগে, ছয় রিপু থাকে জেগে,
প্রতি নরনারী বুকে জ্বলে হুতাশন ;
আত্মসংযমের কথা,
শুনিয়াছি যথা তথা,
লৌকিক আচারে দেখি সহস্র বন্ধন।
যথা শত প্রলােভন,
ধনরত্ন অর্গণন,
সদা বিলাসের ক্রীড়া, বিহার উদ্যানে ;
অহার মাঝারে পশি, চৰ্ম্মকুশাসনে বসি
কে আছে বসিয়ে বল মজিয়ে ধেয়ানে।
পরিধানে দীনবেশ, অযতনে রুক্ষ কেশ,
শিরে বিমণ্ডিত জটা মলিন বয়ান ;
তজে ভােগ অকাতরে, বুকে কিন্তু রাখে ধরে,
ভস্মীভূত বাসনার বিদগ্ধ শ্মশান!
জানি সত্য বলে যাহা, ভ্রমেও ভাবিনা তাহা,
বুঝেও প্রকৃত তত্ত্ব না বুঝে অজ্ঞানী;
অহাে কি মােহের ফেরে, ভূমণ্ডল আছে ঘেরে,
এ মােহমায়ায় মুগ্ধ বিচঞ্চল প্রাণী।
•
সে প্রেম ঔষধি খরা, হরে মৃত্যু হরে জরা,
অমােঘ অমৃত রসে দেয় প্রাণ ভরি;
কি ব্যাধি যাতনা ঘায়,
দুঃখের জীবন যায়,
দণ্ডে দণ্ডে পলে পলে মরমেতে মরি।
৬৮ প্রেম ও প্রকৃতি। চারিদিকে শত ব্যথা, অথচ সে প্রেম-কথা, বিশ্বের মাঝারে সবে কহে অবিরাম ; মর-প্রেমে শতছল, বিদরিছে মৰ্ম্মতল, জাগ্রত জীবন্ত তবু সেই প্রেমনাম। কঠোর সংসার-মুখে, পাষাণ-বন্ধুর বুকে, স্বর্ণ-সূত্র-রেখাবৎ প্রেম-তরঙ্গিণী ? স্নিগ্ধ জ্যোতিঃ ফুটে রহে, কভু নিবে কভু বহে, অরুণ করুণ-রেখা আঁধারে যেমনি। ; উদার সে হৃদাকাশ, মহতী প্রেমের বাস, দেখায় অনন্ত প্রেমে একান্ত অন্তরে সাধনার বিপৰ্যয়, উচ্চনীচ গতি হয়, উঠে হলাহল সুধা মথিত সাগরে। নানা বর্ণে বিশ্ব’পরে, জীবরাজ্য ভেক ধরে, অবাস্তব ভস্মরাশি বিকাইছে হাটে ; বাস্তব সে প্রেমসুধা, নাশে জীবনের ক্ষুধা, সুধু শুনি নাম তার গীতে কাব্যে নাটে। কোথায় সে আকিঞ্চন, দিশাহারা অন্বেষণ, দেখি সেই পথযাত্রী সবে উদাসীন। তবু সে রমণী বােলে, ফিরিব কি গৃহকোলে, লয়ে অন্ধ মনােমৃগ উদ্দেশবিহীন।
ষষ্ঠ সর্গ।
কহে কিছুদিন গতে, সেই বৌদ্ধমঠপথে
দীর্ঘশ্মশ্রুবিলম্বিত যােগী একজন ;-
“কি অরণ্যে কি গহনে, কি আশ্রমে নিকেতনে,
অচেত হইলে শূন্য এ নর জীবন।
দেখ তীর্থ আছে যত, চাঞ্চল্যে সকলি হত,
সকলি বৃথা যে চিত্ত হইলে চঞ্চল।
চিত্ত স্থির যদি হয়,
গৃহ বন কিছু নয়,
আঁধারে আলােকে জ্যোতিঃ সম সমুজ্জ্বল।
দেখ এ প্রকৃতি পানে, কি নিকুঞ্জে, কি শ্মশানে,
নিবিড় কান্তারে আর গৃহের উদ্যানে ;
বন-যুথিকার হাস, মালঞ্চে মালতী বাস,
আছে কি প্রভেদ কোন
দূর
ব্যবধানে।
বন-কোকিলের স্বর,
পিঞ্জরেও মনােহর,
ঝঙ্কারে মধুর কণ্ঠ চির-মধুময় ;
একজাতি সুরসাল,
তমাল, পিয়াল, তাল,
আস্বাদে বরণে কভু ভিন্নরূপ নয় ।
পর্বতঅরণ্যতলে, যে ভীমদাবাগ্নি জ্বলে,
সাগর নীলিম বুকে বাড়ব অনল ;
জলে যে অনল জ্বলে, জ্বলে সে অনল স্থলে,
দহনে সমান দোহে উত্তাপে প্রবল।
৭০
প্রেম ও প্রকৃতি
তেমনি জানিবে মনে, কিবা গৃহে কিবা বনে,
ভেদ কোথা নাহি বিশ্বে প্রেম আরাধনে ;
সুধু ত্যাগ চিত্ত চায়, আর কিছু নাহি তায়,
এ ত্যাগে সুগম পথ প্রেমনিকেতনে।
;
বুঝিতে প্রেমের তত্ত্ব, হও প্রকৃতিতে মত্ত,
কঠোর পুরুষ হেতু প্রকৃতি কোমল ;
লভিতে হইলে শিক্ষা, তার পাশে লও দীক্ষা
এ বিশ্ব-প্রকৃতি প্রেম-শিক্ষার্থীর স্থল।
;
আনন্দ যুদিরে চাও, প্রকৃতির রাজ্যে যাও,
এ মর-আবাসে সুধু দুঃখ বিড়ম্বনা ;
অন্ধ স্বার্থ সিদ্ধি বিনা, হৃদয়ে হইয়ে দীনা,
অন্য কোন অভিলাষ এ ধরা ধরে না।
সুধীরে সংযত হয়ে,
দুর্নিবার চিত্ত লয়ে,
যেতে হয় সে প্রেমের অনন্ত নিলয় ;
না ধরিলে সত্য পথ, নহে পূর্ণ মনোেরথ,
বিজ্ঞপ্রদর্শিতপথ কভু মিথ্যা নয়।
হৃদয়ের অন্ধকার,
মেঘ-স্তুপ গুরুভার,
দূর
করি প্রেমধামে কর বিচরণ ;
রিপু-কুলে পদে দলে, জ্ঞানের অতলজলে,
দাও দগ্ধ বাসনারে চির বিসর্জন।
ষষ্ঠ সর্গ।
;
দেখ চেয়ে কালবশে, উদ্ধা হতে তারা খসে,
একে একে শোভা যত হতেছে বিলীন
জীবনে যৌবন ছিল, লক্ষ্যে কে লুটে নিল,
পরেতে করিল জরা বার্ধক্যে শ্রীহীন।
দেখ জ্ঞান-চক্ষু মেলি, রহস্যের দেশে হেলি,
বিশ্বের বিভব সব হতেছে অন্তর ;
এক যায় আর আসে,
নূতনের পরকাশে,
বিধাতার বিশ্বরাজ্য সতত সুন্দর।
কিন্তু যে হারায়ে দিশে, অতীত আঁধারে মিশে,
অনন্তের দ্বারে তার বিফল রােদন
নব সৌন্দর্য্যের সৃষ্টি, তার অগােচর দৃষ্টি,
সহস্র সাধনা পরে ব্যর্থ আকিঞ্চন।
নূতন সম্বন্ধ যত,
নুতনের করগত,
নূতনের
কর্মক্ষেত্রে
নূতন সৃজন;
আলসে যাপিয়ে দিন,
পুরাতন লক্ষ্যহীন,
চাহে তার পানে সুধু বাড়াতে বেদন।
আছে তবে যা তােমার,
চিনে লও আপনার,
আছে আত্ম-প্রকৃতিতে সে প্রেম মহান্ ;
সাধ তায় নিরবধি, ইন্দ্রিয়েরে জ্ঞানে বােধি,
লভিবে অনন্ত-প্রেমে সে মহা-নির্বাণ।”
৭২
প্রেম ও প্রকৃতি।
শুনি সে সাধুর কথা স্বরগের সে বারতা,
সহসা মধুরধ্বনি পশিল শ্রবণে ।
তটিনী উজান বয়,
মেদিনী মাধুরীময়
করুণ অরুণরাগে তরুণযৌবনে!
বিশ্বে মহাপ্রেম-ধাম,
মােক্ষতীর্থ শিবনাম,
জীবাত্মার মুক্তিক্ষেত্র প্রেমনিকেতন ;
আধ ঢুলু ঢুলু আঁখি, চিরদিন চেয়ে থাকি,
জীবনে জাগায় নিত্য প্রেমের স্বপন।
মহাপ্রেম বক্ষে ধরে, যােগমগ্ন হের হরে,
জীবতরে জ্ঞানৱঙ্গ প্রেম-অবতার ;
প্রকৃতিরূপিণী ওই, জ্ঞানময়ী ব্ৰহ্মময়ী
পশ্চাতে ছায়ার সম বিভূতি শােভার !
কোন্ রহস্যের দেশে, ফুটে ওঠে নববেশে,
হিমানী-দলিত মম আশার প্রসূন !
এ শূন্য হৃদয়বাসে, কে যেন উজলি আসে,
জাগায়ে নবীনস্মৃতি বাসনা দ্বিগুণ !
কোথায় লুকায়ে ছিল, ধাঁধা দিয়ে দেখা দিল,
মূর্তিমতী সৌন্দর্যের সাম্রাজ্য সুন্দর ;
প্রকৃতির চিরবাস,
কোটী শশী পরকাশ,
ত্রিদিবের চিরবাঞ্ছা মর্ত্যের ভিতর !
ষষ্ঠ সর্গ।
হে প্রকৃতি, শােভা-হারা, বিশ্ব-গগনের তারা,
চলেছি বিশ্বের পথে তব মুখ চাই;
যত দূর চলে দৃষ্টি, শােভার কি রত্ন-বৃষ্টি,
শুধু হেরি মহাসৃষ্টি আপনা হারাই।
বজ্রবিঘ্ন তুচ্ছ করি,
দৃঢ়বক্ষে লক্ষ্য ধরি,
করেছি জীবন-পণ তােমারি সাধনে।
তাই তব হৈমদ্বার, চিরমুক্ত অনিবার,
তৃষিত আকুল পান্থে নিরখি তােরণে !
দেখি চক্ষে অনিবার মন্দাকিনী স্রোতধার,
জীবনের শতগাথা তুলিছে মর্মরে ;
ঘনশ্যাম তটভূমি, সহস্র হিল্লোল চুমি,
ডাকিছে আবেগে মােরে কোটীকলস্বরে !
;
মাের সিদ্ধ যােগাসন, করে নিত্য বিরচন,
ও চম্পককরল অঞ্চল বিছায়ে
আবেশে অধীর চিতে এ জীবনে মুক্তি দিতে,
তাই কি ডাকিছ কণ্ঠে দু’বাহু জড়ায়ে !
;
শ্যাম স্নিগ্ধোজ্জ্বল মুখে, স্নেহ-মধুভরা বুকে,
করে মুগ্ধ চিরলুব্ধ এ চিত্তভ্রমরে ;
ফুটাইয়া রূপরবি,
বসন্ত বর্ষার ছবি,
ভুলাও এ বিশ্বে হাসি ও শ্যাম অধরে ।
৭৪
প্রেম ও প্রকৃতি
ফুটে কি ত্রিদিব-ভাষা, জাগায়ে শতেক আশা,
মৰ্ম্মে বিলােড়িত কোন্ অমর উচ্ছাস ;
কি প্রেমে পূরিত গেহ, প্রাণে কি অগাধ স্নেহ,
কি মােহমদিরা-ভরা ক্ষণ-মৰ্ত্তবাস !
সৌরভে ফুটন্ত ফুল,
করে নিত্য প্রাণাকুল,
চারিদিকে বিশ্বরাজ এ বিশ্ব-মন্দিরে ;
লুণ্ঠিতা প্রকৃতিবালা,
সৌন্দর্য্যের হেমথালা,
রাখিয়ে চরণে তব আনন্দে অধীরে।
ক্ষুদ্রাকাঙক্ষা বিসজ্জিয়ে,
হৃদিরক্তে সুরঞ্জিয়ে,
প্রকৃতি-মাঝারে প্রেমে সাধি একবার ;
দেখি সে সংযােগস্থলে, কি মণি-মাণিক্য জ্বলে,
ঝরে কোন্ অরবিন্দে মকরন্দ-ধার !
ইতি ষষ্ঠ সর্গ।
সপ্তম সর্গ
পুরুষােত্তমে।
হে আদি সৃষ্টির রূপ, কি মহান্ অপরূপ,
এ মহা-তীর্থের পাশে বারিধি তােমার !
বিস্ময়ে চৌদিকে চাই, আদি নাই, অন্ত নাই,
কোথা এ ব্যাপ্তির শেষ তব পারাবার !
ভঙ্গে কুটী-ভরে, হেলায় ইঙ্গিত করে,
জাগাও কি অধীরতা প্রকৃতি-জীবনে;
হৃদয়ে কি অভিলাষ, পূরাইতে কোন্ আশ,
এ ভীম তাণ্ডব তব শয়নে স্বপনে !
প্রেম ও প্রকৃতি
আছাড়ি গরজে কূলে,
উৰ্ম্মিমালা ফুলে ফুলে,
ছুটে আসে লক্ষ ফণী ফণা বিস্তারিয়া ।
কি ভীষণ ! কি কল্লোল ! কি উন্মত্ত উতরােল !
প্রলয়-বিষাণ বাজে ব্ৰহ্মাণ্ড ব্যাপিয়া !
তরঙ্গে মিশায় কায়,
মিশি শােভে সুষমায়,
বালুকা রজতশুভ্র সৈকত সুন্দর!
পৃথ্বী-উপকূল-রেখা, যতদুর যায় দেখা,
হিল্লোলিত ততদূর তরঙ্গ-ভূধর !
প্রমত্ত ভৈরব রণে,
বিশাল সৃষ্টির সনে,
জাগায়ে রেখেছ কোন্ অতৃপ্তি ভীষণ !
কি বহ্নি হৃদয় দহে,
কি কাল-পবন বহে,
কি আকাঙ্ক্ষা তেজে করি’ চিত্ত বিলােড়ন ।
চক্ষে ঘুমঘাের নাই, আছ অনিমিষে চাই,
নাহি তন্দ্রা, নাহি সুপ্তি, নাহি অবসাদ!
বাড়ব-অনল বুকে, পুষিয়া দুর্বহ দুঃখে,
জগতে ফেলেছ আনি প্রলয়-প্রমাদ !
কি ঐশী-শক্তির বলে, দেবতা-দানব দলে,
ও বুকে মন্দরগিরি করিয়া স্থাপন ;
বাসুকীরে রজ্জ, করি, পুচ্ছ বিষ-তুণ্ড ধরি,
তােমার ও হৃদিসিন্ধু করিল মন্থন ;
সপ্তম সর্গ।
বিমান চুম্বন করে,
তরঙ্গ তরঙ্গ’পরে,
তপন শিহরি উঠে খসি পড়ে তারা।
পাণ্ডুর-অধর শশী,
বিমল বরণ মসী,
চরাচর থরথর বিশ্ব দিহাবা !
বক্ষের শােণিত সম, রত্নরাজী, প্রিয়তম,
দুল্লভ ত্রিদিবে যাহা এ মর্ত্যে অতুল ;
ঐরাবত পারিজাত, বিষকুম্ভ সুধাসাথ,
ইন্দিরা কি সুধাধরা-সৌন্দর্য্যের ফুল ।
তােমার চোখের পরে, সুরবৃন্দ সুধা হরে,
উচ্চৈঃশ্রবা, ঐরাবত, পারিজাত ফুল ;
বিষ্ণু লন বিষ্ণুপ্রিয়া, বিষদিগ্ধ দৈত্যহিয়া,
হরভাগ্যে হলাহল এ কেমন ভুল!
হৃদয় করিয়া খালি, সবি পরে দিলে ডালি,
শুন্য—শূন্য-শূন্যময়, অন্তর-আগার ;
তাই কি বিরামহারা, দুরন্ত
সে দিন হইতে তুমি মহাপারাবার !
উন্মাদ-পারা,
তােমার তরল বুকে,
ও সৌম্য উদার মুখে,
ছিল কোন্ ভালবাসা প্রেমের লহরী ।
কোন্ স্নেহ কোন্ প্রীতি, জীবনের কোন্ গীতি,
ফুটাইয়া ছিলে প্রাণে দিবা বিভাবরী।
৭৮
প্রেম ও প্রকৃতি
কহ সিন্ধু , কোন পাপে, জ্বল হেন মনস্তাপে,
সুখের কানন কি হে পােড়ে দাবানলে !
কি নৈরাশ্য জড়াইয়া, পড়ে নিত্য আছাড়িয়া,
তােমার উত্তপ্ত বুক বেলায় বিলে !
অহহ কি মনের ভ্রমে, পূততীর্থ সমাগমে,
আবার—আবার—চিত্ত কুহেলিকাময়।
হে জলধি মহাকায়, বুঝিতে নারি যে হায়,
তােমার নিগুঢ় তত্ত্ব রহস্যনিচয় ।
তােমার বরণ হরি, এ বিশ্ব সুন্দর মরি,
শ্যামলা ধরিত্রী উর্ধে নীলিম আকাশ;
কদম্ব কি ফোটে হেসে, তমাল তরুণ বেশে,
মুগ্ধফুলবাসে বন নিকুঞ্জউল্লাস!
এ পৃথী তােমার কোলে, যেন ক্ষুদ্ৰশিশু দোলে,
জননীর স্নেহ অঙ্কে সুষমা ছটায় ;
কি বিশাল আবরণে,
আবরিয়া সযতনে,
দিতেছ করুণা ঢালি প্রেম মমতায়।
তুমি কি বিশ্বের বল, জীবনের লীলাস্থল,
অসীম শকতি সহ বীৰ্য-তরুমূল !
বিকশিত দেবজ্যোতি, প্রতিভা প্রদীপ্তমতি,
রত্নাকরে কর ধরা সৌন্দৰ্য-বহুল।
সপ্তম সর্গ।
যায় দিবা, নিশা আশে, রবি, চন্দ্র, তারা হাসে,
তুমি সৃজ সৌন্দর্য্যের মূর্তি বিমােহন;
পূর্ণিমা তােমার শিরে, রচে কি মাধুরী ধীরে,
ভাসে কি আনন্দে বুকে তরুণ তপন !
ল’য়ে ষড় ঋতুদলে,
কর ক্রীড়া কুতূহলে,
কালে কালে কি
মধুর
চিত্র সুশােভন ;
শীতের নিস্তব্ধ বেলা, বরষা-হিল্লোল খেলা,
দুরন্ত নিদাঘে ঘাের তরঙ্গ-গর্জন ।
আসে অমাতিথি যবে,
বিস্ময়ে নিরখে সবে,
কি স্বচ্ছনীলিমাময় মূরতি তােমার ;
কি আবেগে আলােড়ন,
কি ভীষণ গরজন,
প্রলয়ে উথলে যেন মহা-হাহাকার !
বসি তীরে আনমনে, গত স্মৃতি-স্বপ্ন সনে,
আলসে বহিয়া যায় দিবস ধূসর !
অনন্ত তরঙ্গ-ধার, বিশ্ব করে তােলপাড়,
সংগ্রামে উন্মত্ত যেন লক্ষ মহীধর।
অধীর তড়িত-বেগে, সহসা উঠেছে জেগে,
নবীন উদ্যমে যেন ঘুমভরা বুক !
বসন্ত সমীর স্পর্শে, জীবন্ত স্মৃতির হর্ষ,
এ কোন উল্লাসভরা উন্মাদের সুখ! :
৮০
প্রেম ও প্রকৃতি।
গভীর—গভীরতর,
প্রাণ তব রত্নাকর,
এ বিশ্ব-সৃষ্টির তুমি অপূৰ্ব বিকাশ !
বিরাট ব্ৰহ্মাণ্ড ছায়া,
সজীব সৌন্দৰ্য-কায়া,
তােমার ও অঙ্গ বেড়ি হয় সপ্রকাশ।
জীবনী জাগিয়া ওঠে, কামনা-কুসুম ফোটে,
বিকশিত হয় কত স্মৃতি-শতদল ;
ঘুমায়ে পড়ে যে আশা, অধরে নিরুদ্ধ ভাষা,
হেরি বিশ্ব-প্রতিভার রূপ সমুজ্জ্বল।
যবে রুত্ৰমূৰ্তি ঝড়ে, মস্তক লুটিয়া পড়ে,
হৃদয় পাষাণবৎ নিষ্পন্দ নিশ্চল ;
চরণ বসিয়া যায়,
ভূমে রথচক্র প্রায়,
তুচ্ছ এ মানব-গৰ্ব যায় রসাতল ।
কোন্ ছার ক্ষুদ্ৰনর,
ক্ষুদ্রাদপি ক্ষুদ্রতর,
কি ক্ষুদ্র কীটাণু-আঁখি অন্ধতমসায় ;
শিরােরক্ত সঞ্চালনে,
সৃষ্টিতত্ত্ব অন্বেষণে,
ঘুরে ঘুরে আত্মহারা, আঁধার গুহায় ।
হেরি তুঙ্গ শৈলসম, উৰ্ম্মিরাশি ভীমতম,
স্তব্ধ মৌন জড়জীব নির্বাকের প্রায় !
বিকট বদন মেলি,
মনে হয় অবহেলি,
ব্ৰহ্মাণ্ড গ্রাসিতে চায় রাক্ষসী ক্ষুধায় !
সপ্তম সগ।
৮১
কিন্তু তটপ্রান্তে আসি’
ধৌত করি বালুরাশি,
ফিরে যায় ঊর্মিমালা পশ্চাতে আবার ;
আবার তেমনি করে, তেজোদৃপ্তরাগভরে,
আবেগে চুম্বন করে অধর ধরার !
কি নীল নিৰ্ম্মল জলে,
বিশ্বের বরণ জ্বলে,
কি মহামূরতি তায় প্রকট আভাষে ;
কি নব-আবেগ-ভরে,
কঁপে বক্ষ থরথরে,
যুগযুগান্তের মহাশক্তির উচ্ছ্বাসে !
নীলনভে নীলকান্তি, নীলে নীল-নীলভ্রান্তি
আকাশপাতাল নীল একত্বে বিলীন ;
উত্তাল তরঙ্গধার,
যেন নীলাক্সের হার,
নয়নে নীলাম্বুময় সৃষ্টি সীমাহীন।
মর্ত্তে পুরীতীর্থ তুমি, শােভন-বৈকুণ্ঠ-ভূমি,
প্রেমের সাগরে হেথা আনন্দ-তুফান ;
তব পুণ্যময় বাসে,
কোটী তীর্থযাত্রী আসে,
প্রেমের স্বরূপ হেরি বিমুগ্ধ পরাণ ।
কি মহান্ প্রেম সেই, ভেদাভেদ নাশে যেই,
ঘুচায় চিত্তের ঘাের ঘৃণিত বিকার;
ব্রাহ্মণ চণ্ডাল নাই এক লক্ষ্য এক ঠাই ;
উচ্চ নীচ তুচ্ছ গণে প্রেম সসার।
৮২
প্রেম ও প্রকৃতি।
কি মহামন্দির মাঝে, প্রেমের মূরতি রাজে,
প্রেমের ঈশ্বর ভবে--প্রেমে জগন্নাথ ;
প্রেমের সাগরে ভাসি, ছড়াইয়া প্রেমরাশি,
বিরাজিত প্রেমরাজ্যে প্রেমে প্রতিভাত।
যে প্রেমে হৃদয় স্থির, নাশে জ্বালা সুগভীর,
যে প্রেমে অনন্ত তৃপ্তি শয়নে স্বপনে ;
জীব যেই প্রেম-আশে, আত্মহারা ধরাবাসে,
মুছেনা যাহার স্মৃতি জীবনে মরণে!
রসনা নিষিক্ত জলে, যে মধু-অমৃত-ফলে,
যার সঞ্জীবন-রসে অমর জীবন ।
কণিকা লভিতে যার, প্রমত্ত এ ত্রিসংসার,
দেবাসুরে মিলি নিত্য করে মহারণ ?
সে প্রেম কি এ ধরায়,
পাব বিনা সাধনায়,
মরুচিত্তে ভক্তিধারা অমৃত-সেচনে ;
হে দেবতা! প্রেমময়,
সেই প্রেমে এ হৃদয়,
ভরিবে কি চিরতরে উথলি জীবনে।
হে সুন্দর ! হে মহান্ ! বিশাল-বিপুল-প্রাণ।
অনন্ত সুনীল সিন্ধু কহ হে আমায়।
বিধির মুরতি সম,
ও কি মূর্তি অনুপম,
হৃদয়-দর্পণে তব বিম্বিত ছায়ায় ।
সপ্তম সর্গ।
গভীর গর্জন সহ,
কি রাগিণী অহরহ,
এ কর্ণকুহরে পশে কি বিচিত্র সুর ;
কি বীণা আলাপ সনে বিশুষ্ক হৃদয়-বনে,
বসন্তসৌরভে চিত করে ভরপূর !
;
নীল উৰ্ম্মি নীলাম্বরে, মিশে গেছে স্তরে স্তরে,
কি নীল কৌস্তুভ-আভা বিকীর্ণ ধরায় ;
কোথা প্রাণে জাগে ভয়, প্রেমীচিত্ত প্রেমে লয়,
আলিঙ্গনে আত্মহারা তরঙ্গে ঝাঁপায় !
এ দেবনিবাসে আসি, প্রেমের উল্লাসে ভাসি,
হেরি এ প্রেমের রাজ্যে আনন্দ অপার
হেরিতে প্রেমের রূপ,
বিশ্বমাঝে অপরূপ,
কি জীব-প্রবাহ চলে কাতারে কাতার ।
এস প্রেম সুধাধরা, হেরি রূপ চিতইরা,
এবার হইব শান্ত অশান্ত-জীবনে।
এবার প্রকৃতি-বুকে ঘুমাব মনের সুখে
এবার ডুবিয়া রব তােমারি স্বপনে।
হে পবিত্র তীর্থভূমি, সাধক-আশ্রয় তুমি
তুলিছ কি প্রেমানন্দে জীবন-কল্লোল ।
সহস্র প্রেমার্জ হিয়া, পথজে লুটাইয়া,
ভক্তির সঙ্গীতে প্রাণ করে উতরােল।
৮৪
প্রেম ও প্রকৃতি।
যেতেছিনু গৃহমুখ,
পুষি বক্ষে মৰ্ম্মদুঃখ,
শুনি সে সাধুর কথা শান্তির আশায় !
পথে বিকশিয়া স্মৃতি, শুনায়ে মধুর গীতি,
হে প্রেম ! তীর্থের পথে ঘুরালে আমায় !
শােভনা প্রকৃতি যথা, প্রেমের বিকাশ তথা,
প্রণয়ের চিত্র চির-সৌন্দর্ষে জড়িত।
বিশ্ব-সৌন্দর্য্যের সার, প্রকৃতির প্রেমাগার,
এমন সুখদ-কুঞ্জ কোথায় রচিত।
কি রূপ সৌন্দৰ্য্য সনে প্রকৃতি-জীবন-বনে,
ফোটে হৃদয়ের বৃন্তে প্রণয়ের ফুল !
চক্ষে আছে দৃষ্টি যার, হেরে সে সৌন্দৰ্য তার,
কোন্ গুণে সে মাধুৰ্য ভুবনে অতুল !
কি গুণে প্রেমের জ্যোতি, মধুর—মধুর অতি,
কি গুণে প্রেমীর হিয়া কুসুম-কোমল ।
কোথা প্রেমরূপ সম, আছে রূপ অনুপম,
চক্ষে সে রূপের জ্যোতিঃ কি স্নিগ্ধ উজ্জ্বল।
হে প্রকৃতি ! শ্যামমুখে,
সুগভীর স্বচ্ছ বুকে,
কি পবিত্র কি নিৰ্ম্মল প্রেমের বিকাশ।
সে কম হৃদয়াগারে,
উথলয়ে শতধারে,
সিন্ধুসম তরঙ্গিত অমর উচ্ছ্বাস্।
সপ্তম সর্গ।
৮৫
হেরি আত্মপর ভুলে,
ললাটে শত বাহুতুলে,
পূত দেবতীর্থতলে সমুদ্র বিশাল ।
মহা প্রেমােচ্ছ,সে তার, বিকম্পিত চারিধার,
রহস্য-জড়িত এক মহা-ইন্দ্রজাল ।
দূর শূন্য-বক্ষ-ফুটে,
কি মহা ঝঙ্কার উঠে,
শান্তির কি স্নিগ্ধধারা বরষে ধরায় !
কি মৃদুল হৰ্ষরেখা, তাধরের প্রান্তে দেখা
দেয় যেন শারদের কৌমুদী-প্রভায় ।
কে যেন অলক্ষ্যে হেসে, কহে মৃদু ভালবেসে,
এস পান্থ, এস মাের বিরাম মন্দিরে।
নিসর্গের লীলাস্থল, কি সুন্দর সুশীতল,
আসিয়া নেহার হেথা আলােকে তিমিরে।
প্রকৃতির রমবন,
দেব-নাট্য-নিকেতন,
মরি কি
মধুর
চির-সংযােগের স্থল।
অপার অমেয় স্নেহ,
সৌন্দর্যমণ্ডিত গেহ,
সন্ধ্যার তারকা সম রশ্মি-সমুজ্জ্বল !
হে প্রকৃতি। সুহাসিনি ! মম চিত্ত-বিনােদিনি।
বল কোথা যাব বালা—আর কতদূর!
দ্রৌপদীর সাটী সম, রাজ্য দূর-দূরতম,
আমি শ্রান্ত দাও মােরে সান্ত্বনা মধুর !
ইতি সপ্তম সর্গ।
No text on this page.
অষ্টম
সর্গ।
Rose
মালাবারে।
অভ্রভেদী অবিরল,
ঊর্ধশির মদল,
মালাবার ! শােভে তব বরকলেবরে !
কি কাম-কানন শােভা,
জগতের মনােলােভা,
প্রকৃতির লীলাস্থল—কবি মন হরে ।
বিকশিত ফুলবন,
নারিকেল-কুঞ্জঘন,
সুন্দর শ্যামল কান্তি বনানী ছায়ায় ;
জড়ায়ে পাদপদলে,
লতিকা সােহাগে ঢলে
বিহগ কূজনে বসি কৌতুকে কুলায়।
৮৮
প্রেম ও প্রকৃতি।
অমিয়-মাখান মুখে,
সুরভিজড়িত বুকে,
প্রফুল্ল কেতকী প্রাণ করে ভরপূর !
সরােবরে ঢল ঢল,
বিকশিত শতদল,
সুরভি-উচ্ছাস-ভরা মদির—মধুর !
নবপ্রেমরাগসনে,
কুসুমিত উপবনে,
সুহরিত পত্ররাজি হাসে সুষমায় ;
সুধীর সমীর চলে,
ছায়াময় বনতলে,
তাঞ্জলি ভরিয়া তরু প্রসন ছড়ায়।
নব দূর্বাদলে ভরা, শ্যামবাসে প্রাণহরা,
বারাণসী সাটী সম উজল প্রান্তর।
রজত-বাপীর পাশে, ঝাঁকে বাঁকে উড়ে আসে,
শ্বেতপদ্মদাম-সম বলাকা সুন্দর !
চারুচিত্র সম পটে,
তটিনীর তটে তটে,
হৃদয়-উল্লাসে রুরু নাচিয়া বেড়ায় ;
প্রমােদ-পূরিত বুকে, মুখ
রাখি মুখে মুখে,
কপােতকপাের্তী দুটি জীবন জুড়ায় ।
কাননের কমছবি, কি সরস এ অটবী,
পল্লবে পল্লবে ফোটে পদ্মরাগফুল ;
ত্রিদিব-সৌরভে তার, ছুটে কি অমিয়ধার,
উন্মত্ত অলির দল ঝঙ্কারি আকুল !
অষ্টম সর্গ।
৮৯
"A" "... ArA
চন্দন নন্দন-বাসে,
ললিত লবঙ্গ হাসে,
মধুর মালঞ্চ শােভে শ্যামল শােভায়
এলালতা ঘিরে তায়, চুমে কি আদরে হায়,
মালতী মল্লিকা-স্তপ নিকুঞ্জ-ডালায় !
লয়ে নব পরিমল,
বায়ু বহে অবিরল,
কুঞ্জে কুঞ্জে ফুটাইয়ে নানাজাতি ফুলে ।
ঘনশ্যাম স্নিগ্ধতায়,
নয়ন জুড়ায়ে যায়,
চাহিয়া চাহিয়া সুধু মুকুলে মুকুলে !
কি নব বসন্ত সনে, বসন্ত-বিনােদ-বনে,
পঞ্চমে দীপক-রাগে পিক তুলে তান ;
শ্যামার সুন্দর স্বর,
সুধা ঢালে নিরন্তর,
মরম বিঁধিয়া পশে সঙ্গীত মহান্ ।
বসায়ে আনন্দ মেলা,
এমন সৌন্দর্য খেলা,
খেল কি প্রকৃতি বালা সাগরের কূলে !
এমন শােভার হার, কেবা গাঁথে অনিবার,
সাজাতে তােমার কণ্ঠ সুষমা-বহুলে !
কে মহাসাধক সেই, ও রূপে ডুবেছে যেই,
তৃপ্তি ভরি’ আছে যার এ মরজীবনে ;
নামায়ে হৃদয়ভার,
সার্থক জনম যার,
ও রূপসৌন্দৰ্য হেরি’ যুগল নয়নে !
প্রেম ও প্রকৃতি।
নাহি আর অন্যকাজ, সংসারের লােকলজ,
সকলি ভুলিয়ে ভাসে উল্লাসের নীরে ;
পলক না পড়ে হায়,
সুধু তব মুখ চায়,
প্রভাতে মধ্যাহে রাতে আলােকে তিমিরে ?
এ কোন্ বিচিত্র কান্তি, জীবনে জনমে ভ্রান্তি,
এ কোন্ কোমল শান্তি আননে তােমার ?
এ কোন্ বঙ্গের বনে, মলয়ার সমীরণে,
ত্রিদিব-কুসুম-বাসে মত্ত চারিধার !
এ কোন্ শীতল ছায়া, ভুবনমােহিনী মায়া,
বনের বিহগকণ্ঠে পরিচিত গান ;
সেই প্রাণকাড়া সুরে,
কে বাঁশী বাজায় দূরে,
কি স্নেহ-সম্ভাষে করে আত্মহারা প্রাণ ।
ঘনচ্ছায়া-সমম্বিত, জটাজুট-বিলম্বিত,
কি পবিত্র কি নীরব পাপ-আশ্রম ;
শান্তির নিভৃত গেহ, জুড়ায় জীবন দেহ,
কোথা এ ভূতলে হেন স্থল মনােরম !
দুগ্ধফেন শষ্যাবৎ,
পুস্পময় বনপথ,
নিকুঞ্জ-বিতান আহা ভুবনে অতুল !
সুদূর গ্রামের ছবি,
নিরখি মােহিত কবি,
শাখাপত্রজালে যেন তােড়া-বাঁধা ফুল !
অষ্টম সর্গ।
ও চারুমণ্ডপে হায়, কারা ওই গান গায়,
ওরা কি অশ্লয়ােরূপা বন-বিহঙ্গিনী ?
ওরা কি এ মৰ্ত্তবাসে, স্বরগের সুধাহাসে
স্বভাবের সােহাগিনী বালা-বিমােহিনী
!
থাক তবে চিরতরে, ও রূপে ভুবন-ভরে,
প্রকৃতির ভরাবুকে বিহঙ্গী লীলায় ;
জনমে সৌন্দৰ্য্য যার, দারিদ্র্য সাজেনা তার,
ফোটে কি স্বর্গের ফুল এ মরু-ধরায় ?
সৌন্দৰ্য্য ! তােমারি ধ্যানে, সতত হারাই জ্ঞানে,
কি উগ্র আকাঙক্ষা লয়ে অতৃপ্ত বিলাসে ;
এ কোন্ নেশার ঘাের, জড়িত জীবনে মাের,
বাঁধিতে প্রণয়ে তােমা এ বক্ষনিবাসে ।
বুঝাও সে সারতত্ত্ব, অনিত্য কি তুমি নিত্য,
মিথ্যার কুজঝটি-ঘেরা অথবা স্বপন।
বৃথা মােহমায়া বশে,
আশার ছলনা পশে,
সাহারা মরুতে সৃজি তটিনী-শােভন।
তুমি কি জীবন-শেষে, শব-দেহে নগ্নবেশে,
শ্মশানে চিতার ভস্মে কর আলিঙ্গন ?
তুমি কি মিশিয়া,ধীরে, অনন্ত কালের নীরে,
হয়ে স্মৃতি-ছায়া ভ্রম এ তিন ভুবন।
৯২
প্রেম ও প্রকৃতি।
তুমি কি হে মৃত্যুনামে,
জীবনের শেষ-যামে,
এ পাঞ্চভৌতিক দেহে বিচিত্র বিকার ;
এ মরুধরার বুকে,
দাও কি জীবের মুখে
চির-তৃষ্ণাহারী স্নিগ্ধ বারি-পিপাসার ।
কে নিবীয় জ্ঞান-রবি, কে মুছে তােমার ছবি,
কে আনে হৃদয়ে ব্যথা অশ্রু এ নয়নে ?
কে হৃদে চেতনা হরি’ রাখে জড়পিণ্ড করি’
ধরণীর এক প্রান্তে দুর্বহ জীবনে।
কে করে চাতুরী ছল, ‘এ রহস্য কি অতল’
বলিয়া ভুলায় সদা জননী সমান ।
অবােধ শিশুর সম, হৃদে কি বুঝাব মম,
আশার ছলনে ভুলি’ রব কি অজ্ঞান ?
চাহি না আশার ছলে,
মজিতে ধরণীতলে,
চাহি না স্বপ্নের সুখ ভুলিয়া বিভ্রমে ?
লভিব প্রকৃত যাহা,
কে বলে দুর্লভ তাহা,
বধিব—বাঁধিব বুক মরিয়া মরমে।
সৌন্দৰ্য-নদীর কূলে
কি মােহ আবেশে ভুলে,
জীবন, যৌবন, রূপ—সকলি বিলয় ;
হেসে উঠে তরুলতা, শ্যামায়িত কি মমতা,
সৌরভে অধীর হয়ে শিহরে মলয় ।
অষ্টম সর্গ।
কি ফুল মাধুর্যে ভরা,
কি গীতি মধুরতরা,
কি দৃশ্য ! হেরিয়া চির মুগ্ধ এ নয়ন।
কি ধীর সমীর বয়,
কি প্রেম মদিরময়,
আজন্ম নেশার ঘােরে টলে এ জীবন ।
কি কাল-প্লাবনে হায়,
বিশ্ব-বক্ষ ভেসে যায়,
যায় রূপ, যায় শােভা, যায় এ যৌবন
যে বুকে সে প্রেম ছিল, সে কি পুনঃ ফিরে নিল,
এ প্রাণে রাখিয়ে দাগ—স্মৃতির দংশন !
বুকে বিষজ্বালা জ্বলে,
এ আঁখি ভরিছে জলে,
ফোটে ইন্দ্রধনু-হাসি ও কার অধরে !
এমনি প্রখর স্মৃতি, এমনি মােহিনী গীতি,
এমনি জড়িত চির এ চিত্তপঞ্জরে !
;
মৃত্তিকা কি রাখে ধ'রে, হৃদয়ে যতন করে
সে প্রেম অমৃত-বীজ আদরে গােপনে ;
পুনঃ কি জন্মের ফলে, বিকশে ধরণীতলে,
অতীতের সে অঙ্কুর তমাল-বরণে !
আসে কি বিশ্বের পরে, পুনু নবদেহ ধরে,
প্রেমের মূরতিখানি পারিজাত ফুল ;
সেই প্রণয়ের মালী, দেয় কি নবীন ডালি,
চির মধুরসে ভরা অমৃত-অতুল !
৯৪
প্রেম ও প্রকৃতি
থাকে কি স্মৃতির সনে, বিজড়িত সঙ্গোপনে,
সেই মুখ, সেই হাসি, সে লােল চাহনি !
সে অঙ্গ-লতিকাহার, চঁচর-চিকুর-ভার,
সে কম-কোরক কান্তি এ মনােমােহিনী!
বিজড়িত ফুলমালে,
সেই বাহুলতা-জালে,
আজ’ সেই নাগপাশে বদ্ধ আলিঙ্গন ।
এ শুষ্ক অধরে মাের, এখনাে রক্তিমা ঘাের,
এখনাে পীযুষ-মাখা বিদ্ধ সে চুম্বন !
হে প্রকৃতি ! রূপরাণি, হেরি ও বয়ানখানি,
আমি আত্মহারা দেবি ও রূপ-উদ্যানে !
বরষি করুণাসার,
রচিলে কি শােভাধার,
কুসুমকানন মাের জীবন-শ্মশানে।
ফুটিছে তারকা-ফুল,
গগন কিরণাকুল,
মরি কি সুনীল নভে চন্দ্রিকা-লহরী;
রজনীগন্ধার বাসে,
মৃদু মৃদু মধুহাসে,
যুবতী-যৌবন সম শােভে বিভাবরী।
যে দিকে চাহি গাে ফিরে, আমারে রেখেছ ঘিরে,
প্রেমের ভিখারী করি’ কি সুখ-সদনে।
সৌন্দর্য্যের ছায়াপথে, ভ্রমি যে কল্পনা-রথে,
বিমানে তড়িত ধরি মেঘের গর্জনে।
অষ্টম সর্গ।
আধ অশ্রু আধ হাসি, আলাে ছায়া পরকাশি,
ফুটে যে নিদাঘ-রৌদ্র-বরষা-প্লাবন !
শরৎ কি সুষমার,
হেমন্ত কি খুরধার,
বসন্তে কি পূর্ণিমার উজ্জ্বল কিরণ !
তন্দ্রায় নয়নে মাের,
টেনে আনে ঘুমধাের,
শ্যামলা মেদিনী-অঙ্ক কুসুম-শয়ন !
জননীর স্নেহধার,
অঞ্চল-বাতাসে কার,
সায়ারে ঝুরু ঝুরু বহে সমীরণ ।
কণ্ঠের সুভাষ আনে,
কুহু কুহু পিক গানে,
সেই প্রণয়ের ভাষা মন্ত্র-সঞ্জীবনী।
সুবর্ণ রুচির তনু,
শ্রাবণের ইন্দ্রধনু,
নয়ন পলকে বাঁধা সহস্র দামিনী।
;
কি সুখ বাসরে খেলা, কি ফুল ফুলের মেলা,
বিশ্বপ্রেম সাধনার মহাতীর্থভূমি ;
আসিয়াছি বহু আশে, ত্যজি দূর গৃহবাসে,
হেরিতে তােমার মুখ—শােভাস্বর্গ তুমি ?
মালাবারযাই তবে,
অতিথির মনে রবে,
তাে মার আতিথ্য-ব্ৰত—পুণ্যের নিলয় ;
তব তালী-বনশােভা, পথিকের মনােলােভা,
ভারতের শ্যামতীৰ্থ হেম-জ্যোতির্ময়।
প্রেম ও প্রকৃতি।
রক্ত পদ্মরাগ-রাগে, প্রভাতে অরুণ জাগে,
হাসে তরু, হাসে লতা, হাসে ফুলফল ;
সকলি আনন্দে হাসে, তােমার বৈকুণ্ঠ-বাসে
কি সুন্দর সরলতা জীবন বিমল ।
কি ভাবে হৃদয় ভুলে,
সুনীল সমুদ্র কূলে,
কি উচ্ছাসে তরঙ্গের সফেন-চুম্বন ;
আহা কি সুন্দরীতরা, নিশীথিনী মনােহরা,
তারকাখচিত নীল নিথর গগন।
হে শ্যামাঙ্গি! শ্যামহাসে, থাক চির চিত্তবাসে,
দাও তৃপ্তি চিরপ্রেমে হে তৃপ্তিদায়িনি ।
পূরিতে এ মনােরথে, জ্বাল অন্ধকারপথে,
প্রেমের প্রদীপরশ্মি বিশ্ববিমােহিনী।
হ’ল বহুদিন গত
মাের চিত্ত বজ্রাহত,
দাবাগ্নি-দহনে শুষ্ক হৃদয়-কানন ;
বর্ষ স্নেহধারা সুখে,
মঞ্জরি’ উঠুক বুকে
নবীন নধর কান্তি প্রেমের নন্দন।
ইতি অষ্টম সর্গ ।
নবম সর্গ।
কুমারিকা-অন্তরীপে।
ভারতের সীমাশেষ,
কি বিচিত্র রম্যদেশ,
কি বিপুল বারিধির ভৈরব গজ্জন।
বিলােল নীলাম্বুরাশি, সৈকত চুম্বিছে আসি,
কুমারিকা-অন্তরীপে বিমুগ্ধ নয়ন।
!
'
জীবনী-রূপিণি অয়ি। প্রকৃতি। প্রশান্তিময়ি।
কর শান্ত ভবৱাত্যা-বিক্ষুব্ধ জীবন।
শক্তি-স্বরূপিণী তুমি, সৌন্দর্যের লীলাভূমি,
ও রূপপ্রবাহে ভেসে যেতেছে ভুবন।
প্রেম ও প্রকৃতি।
গেছে সে কৈশাের হায়, যৌবন ত যায় যায়,
নেহারি তােমারে তবু তেমনি নয়নে ;
ওঠে তারা ফোটে ফুল,
নদী করে কুলুকুল,
বনকুঞ্জ শিহরায় বিহঙ্গ কুজনে।
ফুটাইছ রবিকরে, বজ্ৰ সম শক্তিভরে,
জীব-তরু-মৃত্তিকায় বিশ্বের যৌবন।
নীল কাদম্বিনী কোলে, সােণার দামিনী দোলে,
ঝলকে ঝলকে তুলে রূপের প্লাবন।
নিৰ্ম্মল প্রভাতে হায়, প্রমত্ত মলয় বায়,
শিরায় পশিয়ে আনে তীব্র শিহরণ ।
ধরা যেন ধরা নয়,
সৌরভিত তাময়,
জাগায় হিয়ার মাঝে ত্রিদিব কম্পন।
মধুর সায়াহ্ন কালে, জলদের অন্তরালে,
রক্তিম তপনে শ্যাম বসুধা সুন্দর ;
দোলায়ে শীর্ষক দলে, বিমুক্ত পবন চলে,
উথলে তরঙ্গে যেন হরিতসাগর।
।
নিকুঞ্জ-কুসুম বাসে, কি হর্ষে জগৎ হাসে,
অলির গুঞ্জন-ভরা মঞ্জরী মুকুলে;
কি নব বীণার তান,
বিমােহিত করে প্রাণ,
'ত্রিদিব ঝঙ্কার কোন্ মরমেতে তুলে ?
নবম সর্গ।
ঢালি কম স্নিগ্ধ ধারা, ঢল ঢল শুকতারা,
ধরে কি উজ্জ্বল নীলে মাধুরী-শােভন ;
হেসে ওঠে ফুলরাণী, হর্ষে ভরা মুখখানি,
আধ তন্দ্রা ঘুমঘােরে জাগায় চেতন।
উদ্যানে, কাননে, বনে,
নব প্রভাতেরি সনে,
রক্তিম কুসুমকায়া—আকাশ উজ্জ্বল ;
বরষিয়ে কণ্ঠ-মধু, গায়িছে বিহগ-বধু,
বক্ষে ঝরে অমৃতের নিঝর বিমল !
বিমল সরসী-কায়, ক্ষুদ্র শ্বেততরী প্রায়,
হংসহংসী মনসুখে দিতেছে সাঁতার ;
ছড়াইয়ে পরিমল,
শিশিরিত শতদল,
কোমল মৃণাল-বৃন্তে দোলে অনিবার।
পাপিয়া খুলিয়া প্রাণ, কি-উচ্ছাসে ধরে তান,
চমকিত দিক্-বধূ মেদিনী শিহরে ;
বিভাস রাগিণী যেন, মুর্তিমতী হ’য়ে হেন,
বাজায় বিনােদ-বীণা প্রভাতী বাসরে।
হেমাভ মধ্যাহ্ কায়,
ঢাকা : ধূমকুয়াসায়,
নীলগিরি শ্রেণী’পরে বনরাজী গায়,
কদরের ভাগে ভাগে, আলাে আর ছায়া জাগে,
সমীর হিল্লোলে দুলে দিবস গড়ায় ।
১০০
প্রেম ও প্রকৃতি।
ঢালি, অভিনব প্রীতি, বন-কপােতের গীতি,
সুদূর-বিস্মৃত-স্মৃতি ভাসাইয়া আনে
শ্লথতামদালসে, না জানি কেমনে পশে
উদাস-জড়িত এক বাসনা পরাণে!
কোন্ সান্ত্বনার স্বর, ধ্বনিতেছে নিরন্তর,
শৈলচ্ছায়ে প্রবাহিত তটিনীর স্বরে ?
ছায়াময় বনপথে, পূরিতে কি মনােরথে,
বর্ষে তরু পুষ্পসার পত্রের মৰ্ম্মরে।
হৃদে কি-মদিরা ঢালে, সান্ধ্য সৌরকরজালে,
রক্তরাগে বহুিময় গােধূলি গগন !
দশদিক সুরঞ্জিত,
বিশ্বমুখ উজলিত,
জ্যোতির্ময় হৈমদ্বার দেখি’ উদঘাটন।
হে সৌন্দৰ্য! মধুময়,
বিশ্বপ্রেম লােপ হয়,
তুমি যদি না রহিতে এ সৃষ্টি ব্যাপিয়া ;
কি মােহ-শক্তির বলে, তােমার ও পদতলে,
দানব মানব দেব রয়েছে মজিয়া !
মুকুলে অফুট হাস,
বক্ষে রুদ্ধ মধু বাস,
ফুটিয়া উঠিছে তায় প্রসূন সুন্দর !
বিশাল মরুর তলে,
উত্তপ্ত বালুকা চলে,
তায় বীজাঙ্কুরে শম্প শােভে মনােহর ।
১৫১
*
‘নবম সর্গ।
...
...
ওই মেঘশিরে কিবা, জ্বলন্ত-কিরণ-বিভা,
চারু চিত্রপট যেন সােণালী সন্ধ্যায়।
মােহিনী শ্যামাঙ্গী ধরা, সন্ধ্যায় মধুরতরা,
চক্ষে ঢালে ঘুমধাের কি স্নিগ্ধ সুধায় !
শুভ্র অভ্র নভঃ পরি, শত নবরশ্মি ধরি’
কোন্ প্রাণ-হরা জ্যোতিঃ বিতরে বিমান ?
খুলি পূর্বাশার দ্বার, ছুটে কি আলােকধার,
সুরাগে রঞ্জিত করি’ ঊষার বয়ান !
কালাবর্তে ঘুরি’হায় গ্রহ হ’তে গ্রহ ধায়,
করি’ সৃষ্টি অভিনব শত ভূমণ্ডল !
শ্যামরাজ্য বিভাসিত, প্রাণী-কণ্ঠ-নিনাদিত,
নীল সিন্ধু তরঙ্গিত মেঘে ঝরে জল !
.
শ্যামানন্ত আলােকিত, বিশ্ব-আঁখি ঝলসিত,
ইন্দ্রায়ুধে কি মাধুৰ্য রৌদ্র-হেম-ছায় ;
নীরব নিথর সব,
মেঘমন্দ্রে ঝিল্লীরব,
বধিরি’ শ্রবণ-পথ ঝঙ্কারে মাতায়।
বিশ্বরাজ্যে চিরনব, সৌন্দর্য্যের কি বিভব,
এ স্বর্গ-আশ্রমে দেবি হেরিনু নয়নে ;
এখন বুঝিনু তত্ত্ব,
সৌন্দর্যের কি মহত্ত্ব,
সাধে যারে:জীবকুল জীবনে মরণে।
১০২
প্রেম ও প্রকৃতি।
দৃঢ় আয়ত্তের মুখে,
এস দেখি, এস বুকে,
নিরাশ-অনলে দগ্ধ হৃদয় জুড়াই!
ও প্রেমে নিমগ্ন হয়ে, স্বর্গের বারতা লয়ে,
এ ভবশ্মশান মাঝে প্রেমগীতি গাই।
শুনি’ সে প্রেমের গান,
জাগিবে ঘুমন্ত প্রাণ,
জাগিবে উদ্যম নব, আশা সুমহান্ ;
শিখাও সে গীতি তবে, এনেছ আশ্রমে যবে,
আর যে ঘুরিতে নারে শ্রান্ত এ পরাণ।
সে পীরিতি অবিনাশী, মম হৃদে পরকাশি’
মিশাও অনন্তসনে চিরদিন তরে
জন্ম, মৃত্যু, জরা যত,
হৃদিরাজ্যে করি’ হত,
শিখাও মানবে তব সে সিদ্ধ নির্ভরে।
কৰ্ম্ম-কুরুক্ষেত্ৰ-ভবে,
সাজি’ জীব মহাহবে,
কে চাহে বিস্মৃতি-বুকে লভিতে মরণ !
বসি প্রেমযােগাসনে,
দীর্ঘ যুগ-আরাধনে,
কে না চাহে আমরত্ব প্রেমের সদন ?
;
ডুবে কল্প কাল-নীরে, হয় সৃষ্টি ঘুরে ফিরে,
জীবনে সম্পূর্ণ কোথা প্রেম-আরাধনা
বাঁধিয়ে
মৃত্যুর ভাের,
স্বার্থের ছলনা ঘাের,
ঐহিক সুখের আশে নিষ্ঠুর যাতনা !
নবম সর্গ।
১০৩
কোথা প্রেম-নিদর্শন, যবে প্রেমী অদর্শন।
প্রকৃত প্রেমের ভবে আধার কোথায় ?
হে প্রকৃতি জান তুমি, সংসার শ্মশানভূমি,
সে রাজ্য প্রতিষ্ঠা তবে বৃথা কি হেথায় ?
.
কেন তবে আশাবশে, রাজ্যে তব প্রজা পশে,
এ জীবনে নবযজ্ঞ করি আয়ােজন ;
চৌদিকে আনন্দ রব,
কার. তরে এ উৎসব,
উদ্দেশে কি অভিনব কল্পনা সৃজন ?
নহি আমি জাতিস্মর, পূর্বজন্ম স্মৃতি-কর
পশে এ চির-রুদ্ধ হৃদয় আঁধারে ;
চির অন্ধকীট সম,
আবরিত দৃষ্টি মম,
সৌরভে হইয়ে হারা ঘুরি চারিধারে।
রহে প্রেম চিরতরে, জন্ম হ’তে জন্মান্তরে,
দুরন্ত আকাঙ্ক্ষা হেরি হেন মনে লয় ;
লভিতে সর্বস্ব ধন,
জীবন যৌবন মন
অর্পিতে ধরণী মাঝে উধাও হৃদয় !
জানি কি ক্রটি-ফলে, এ বিরহ-চিতা জ্বলে,
হৃদিপিণ্ডে ভস্মস্তুপ করিয়ে গঠন ;
সে ঠাই রেখেছ কোথা, এ বঘ্নি নির্বাণ যথা,
জনমের চিরসাধ করিতে পূরণ।
১০৪
প্রেম ও প্রকৃতি।
কে আঁখি উন্মুক্ত করে বিঁধে সূক্ষদৃষ্টি-শরে,
জীবদুঃখে প্রধুমিত হৃদয়-গহন ;
তত্ত্ব যে বুঝিয়ে ভবে, প্রেমের কাঙ্গাল হবে,
সে বুঝে বিরহে কিবা রহস্য গােপন ।
বারেক ফিরালে দৃষ্টি, কোথা স্রষ্টা কোথা সৃষ্টি,
অনন্ত সাধনে কভু না দেখি নির্ণয়।
ডুবিলে ডুবিয়ে যাই, তবু তার অন্ত নাই,
চিত কি ধৈর্য ধরে হ'লে মৃত্যুঞ্জয় !
জীবে যবে এত শােক, আছে পরে শান্তিলােক,
যার তরে কল্পিত এ দুর্জয় সাধনা !
রেখেছ কি অন্ধকারে, রুদ্ধ ভবকারাগারে,
রাখিতে এ বুকে চির প্রেমের ধারণা।
*
লীলাভেদে ভেদ কায়, এক ধ্যান ধারণায়,
শত রূপে একরূপ হে বিশ্ব-রূপিণি!
জন্ম জন্ম ঘুরি’ হায়, যুগ বর্ষ মাস যায়,
পােহাতে কি চির-অন্ধ তামসী যামিনী।
--
ল’ভিতে তােমার দেখা, বিশ্ব মাঝে আমি একা,
জীবনে জীবন কোথা মরণে মরণ ;
বিষম বাজে যে প্রাণে,
এ"সুদূর ব্যবধানে,
কেন তুমি দূরে ত্যজি এ মনােবন।
নবম সর্গ।
১০৫
মর্ত্যে নিত্য লীলাময়ী, বিশ্বপ্রেমে প্রেমময়ি,
• রেখনা দুরন্ত ক্ষোভ পরাণে আমার ;
ব’স প্রেমে হৃদে এসে,
সে চারুহাসিনী বেশে,
যার তরে এ ভীষণ সংগ্রাম দুর্বার ।
;
ওই প্রেমমুখ চাই,
বিশ্বজ্ঞান মনে নাই,
গৃহসুখস্মৃতি সব বিস্মৃত জীবনে ;
অর্ধাহারে অনশনে,
শৈলশিরে বনে বনে,
কাটায়েছি কত বেলা বসি আনমনে।
ভুলিয়াছি প্রীতি স্নেহ, চির আরামের গেহ,
তব আকর্ষণ-মােহ মদিরা বিহবলে ;
দাবদগ্ধ পিপাসার, কি অতৃপ্তি অনিবার,
হ’ল প্রাণ ছারখার মরু-মহীতলে।
দেখিতে তোমার মুখ,
বিদরে বিচূর্ণ বুক,
সতত অধীর হিয়া এ মর-নিবাসে ;
মাতুয়ারা জ্ঞানহারা, মুচ্ছিত মুমুমু পারা,
লালসা লােলুপ মনঃ বিমুগ্ধ বিলাসে।
;
এস সব যাই ভুলে, তােমারে হৃদয়ে তুলে,
তন্তু সম বাহুবেষ্টনে বেড়িয়া ;
দেখিয়ে তােমার রূপ, পলে পলে অপরূপ,
ঘুমায়ে পড়িব তব সৌন্দর্যে ডুবিয়া ।
১০৬
প্রেম ও প্রকৃতি।
গায়িব তােমারি গান, দাও সে উদার প্রাণ,
রচিয়ে মােহিনী গাথা কবিত্বে তােমার ?
দীন-মর্ত্য-জীব-দুঃখে, ঝরে নয়নায়ু বুকে,
তবু গাে নীরব কোথা ঝঙ্কার বীণার !
হৃদয়ে যে ব্যথা ধর,
জীবনের তাপহর,
কোথা মনে হয় হেরি ও রূপ-গরিমা ?
কি পবিত্র সুগভীর,
বক্ষে তব প্রেম-নীর,
নাশে চির অভিশপ্ত পাপের কালিমা।
বিশ্ব-বিমােহিনী সাজে, চিত্ত-মরু-ভূমি মাঝে,
দিয়া শান্তি সুশীতল জুড়াও জীবনে ;
তােমারি আশায় হায়, কক্ষচ্যুত গ্রহ প্রায়,
ঘুরিয়াছি ভূমণ্ডল হৃদয় দহনে।
বিদেশী পথিক-বেশে,
তৃণ-তরু-শূন্য দেশে,
স’য়েছি নিদাঘ-জ্বালা প্রখর ভীষণ ;
অনাথ কাঙাল সাজে,
যাপি’ পর্ণাশ্রম মাঝে,
ঘনঘাের বর্ষানিশি জলদগজ্জন।
বিশ্ব হ’তে বিশ্ব’পরে, জন্ম হ’তে জন্মান্তরে,
অভিনব সুরপুরে প্রবেশিব গিয়া ;
ধরিয়া তােমার কর,
সাধিব গাে নিরন্তর,
তােমারি প্রেমেতে রব প্রেমিক হইয়া।
নবম সর্গ।
SCA
ও প্রেমে প্রেমিক যেই, প্রেমহ্রদে ডুবে সেই,
লভিবে অনন্ত প্রেমে অনন্ত নির্বাণ ;
প্রকৃতির প্রেম সম, কোথা প্রেম অনুপম,
জড়িত প্রকৃতি প্রেমে অনাদি মহান্ ।
পূর্ণ সদা মনােরথ, প্রকৃতির প্রেম পথ,
যে পারে ধরিতে জ্ঞানে বাসনা বর্জিয়া ;
অহহ তার কি আনন্দ,
চেতনায় চিদানন্দ,
রহে চির, যথা পুষ্পে সৌরভ মিশিয়া !
দেখাও এ অবসানে, সঞ্জীবনী সুধাদানে,
হে বিশ্ব-প্রকৃতি প্রেমে সৌন্দৰ্য মহান্ ।
বিরাম-মন্দির তব,
চারুতায় অভিনব,
এ ক্ষুদ্র হিয়াটি লয়ে কর নিরমাণ।
শিখাইয়া আত্মদান,
দিয়া শিক্ষা দীক্ষা জ্ঞান,
মহামন্ত্রে কর মােরে সন্ন্যাসী প্রবীণ ;
লালসা ঘুচায়ে হায়, বিভূতি মাখায়ে গায়,
দাও দণ্ড কমণ্ডলু, পিধানে কৌপীন!
হবে প্রেমে উচ্চ গতি, এ পার্থিব রতিমতি,
ভস্ম হয়ে যাবে যত কামনা বিপুল ;
জুড়াবে ঝরিবে সব, ঘুচে যাবে হাহারব,
ভবের বিদগ্ধ তাপ হইবে নিৰ্ম্মল।
"১০৮
প্রেম ও প্রকৃতি।
কে এই সম্মুখে মম,
প্রদীপ্ত তারকা সম,
অহাে কি প্রখর জ্যোতিঃ ঝলসে নয়ন।
ও কি রে বিদ্যুৎ ছটা, কি তীব্র রূপের ঘটা,
ও যে চির পরিচিত আপনার জন
‘দাড়ালে সম্মুখে এসে, কি অপূর্ব চারুবেশে,
কোন্ পুণ্যফলে হেথা প্রবাস-সঙ্গিনী ;
প্রকৃতির পুণ্যাশ্রমে,
পুনঃ দেবী মনোরমে,
কি ভাবে দিলে গাে দেখা হে বরভামিনী।
ত্যজি তােমা হরিদ্বারে, ঘুরিলাম শােভাগারে,
হৃদে লয়ে প্রেম-তৃষা দারুণ দহন;
যতই চলেছি বেয়ে,
প্রকৃতি মায়াবী মেয়ে,
ততই জড়ায়ে মােরে করেছে বন্ধন!
;
আমি যেতেছিনু ফিরে, কি, অঞ্চল-জালে ঘিরে,
রেখেছে ভুলায়ে মােরে মােহিনী-মায়ায় ;
বুক ভরে কত সাধি, নয়ন ভরিয়া কাঁদি,
এ প্রেম বন্ধন ঘাের ছাড়ান যে দায়!
ফুরাতে মমবাণী, উত্তরিলা বীণাপাণি,
মধুকণ্ঠে সপ্তস্বরা বীণা বাজে হায় ;
হইনু মূকের প্রায়
কি নিঝর উথলায়,
মরমে পশিল ভাষ সুধার ধারায় ?...
নবম সর্গ।
১০৯
“ভ্রাতঃ—হ’ল বহুদিন, পথশ্রমে তুমি ক্ষীণ,
কি মহান্, কি গভীর তােমার সাধন;
প্রিয়শিশু প্রকৃতির,
বরপুত্র পৃথিবীর,
:তােমার দুর্জয় ব্রত হয়েছে পূরণ ।
অদম্য আকাঙক্ষানলে, দগ্ধ তুমি পলে পলে,
আকাঙক্ষার চিতা জ্বলে হৃদয় শ্মশানে ;
এ হেন আকাঙক্ষা যার, আছে কি অসাধ্য তার,
ফুটেছে বাঞ্ছিত ফুল জীবন-উদ্যানে !
;
ফুটায়ে নিৰ্ম্মল জ্ঞানে, প্রগাঢ় প্রকৃতি ধ্যানে
ডুবিয়া গিয়াছ প্রেমে কি সুধা-সাগরে ;
কি বিস্মৃতি আত্মহারা, হয়েছ পাগল পারা,
তাই আর অন্য ভাব জাগে না অন্তরে।
ভ্রমিতে ভ্রমিতে চিত, কোথা হ’ল উপনীত,
ভাবি দেখ একবার মুদিয়া নয়ন;
স্মৃতির ব্রততীজাল, ; বিজড়িত চিরকাল,
ও সুদূর আশ্রম তব চিত্তবিমােহন।
লভ গাে সাধক তুমি, দুল্লভ প্রেমের ভূমি,
অপূৰ্বসাধনা তব আজি সমাপন;
আমিও এসেছি তাই, এস গাে দু’জনে যাই,
আর কি সুখের দিন হবে গাে এমন।”
১১০
প্রেম ও প্রকৃতি।
‘বিশ্ব বিমােহিনী তুমি, ছেড়ে পুনঃ বাসভূমি,
আবার এসেছ ফিরে দুর্গম কান্তারে ।
এবার কি সঙ্গে করি, লয়ে যাবে করে ধরি,
এসেছ আদরে তাই ডাকিতে আমারে।
“শুন হে পথিকবর,
আমি ফিরি নাই ঘর,
হে ভ্রাতঃ! নিরখি তব হৃদয়বেদন ;
তুমি রত পৰ্যটনে,
তীর্থে তীর্থে বনে বনে,
আমি যে অলক্ষ্যে ছিনু ছায়ার মতন!
!
দুইজনে সম ব্যথী, কাননে কান্তারে সাথী,
ভেঙেছে তােমার বুক
कि
বজ
বিঁধিয়া
অতিথি আমার পাশে,
জনশূন্য বনবাসে,
কেমনে তােমারে ত্যজি যাব গাে চলিয়া।
বড় বাঞ্ছা হ’ল মনে, তব চিত্ত অধ্যয়নে,
প্রাণে কিসে দিবে শান্তি মরমে সান্ত্বনা !
যে আশে নিরাশ আমি, হারায়ে জীবন-স্বামী,
সে আশা কেমনে পূরে দেখিতে বাসনা !
তুমি জ্ঞানী মহিমা, আমি নারী হীন-জ্ঞান,
হৃদয়ে সমান কিন্তু ব্যথা দু’জনার ;
জ্ঞানেতে আসিবে শান্তি, অজ্ঞানে কি রবে ভ্রান্তি,
গৃহে শান্তি তবে কি হে ভ্রম ললনার !
নবম সর্গ :
১১১
বুঝেছি সত্যের সার, কোথা সত্য পাবে আর,
মাের লক্ষ্যে উপনীত তুমি জ্ঞানবান্ ;
আনন্দে ভরিছে বুক, হেরি তােমা গৃহমুখ,
এখন বুঝেছ সেই তীর্থ কি মহা ?
সেই প্রেমতীর্থে চল, এ বিশ্বে ত্রিদিব-স্থল,
মরি কি মধুর শান্তি বিরাজে সেথায় !
জীবনে মরণে আমি, স্মরিয়া দেবতা-স্বামী,
পূজিব জীবন ভরি লুটায়ে যেথায়।”
‘যাই তবে চল চল,
হেরি চির শান্তিস্থল,
অমােঘ তােমার কথা বুঝিনু সুধীরে ;
কি মধুর জ্যোতিঃ ঝলে, সন্ধ্যার প্রদীপ জ্বলে,
কি রশ্মি ভাতিছে মম বিরাম-মন্দিরে ?
ইতি নবম সর্গ।
No text on this page.
দশম সর্গ।
বিরামমন্দিরে।
এস বুকে ধরি ছায়া,
ত্রিদিব-মােহিনী মায়া,
ওই সে আমার শান্ত পুণ্য-নিকেতন।
ও নিভৃত গৃহতলে,
রক্ত পদ্মরাগ ঝলে,
উথলে কি স্নিগ্ধ-রশ্মি কি নবকিরণ !
ওই সে লতিকা-কুঞ্জ, সুখদ কুটীরপুঞ্জ,
মরি কি ত্রিতাপ-হারী পল্লব-বিতান
কি স্নিগ্ধ সমীর ধীর,
চিররম্য নদীতীর,
মৃদুল হিল্লোলে নামি গিয়াছে সােপান।
১১৪
প্রেম ও প্রকৃতি।
এসেছে স্বর্গের আলাে, স’রেছে আঁধার কালাে,
নয়নে লেগেছ ভাল এ চিত্র সুন্দর ।
লাঘব বুকের ভার,
বক্ষে সৌন্দর্য্যের সার,
যার অন্বেষণে গত যুগযুগান্তর !
রেখেছি কতই স্মৃতি, শুনেছি অনন্তগীতি,
সঙ্গীতে আলােকে ফুলে হিয়া উদ্ভাসিত ;
প্রকৃতির রম্যস্থান,
তুঙ্গ উপত্যকা-শৃঙ্গ অরুণ-রঞ্জিত ।
বনগিরি দৃশ্যমান,
সৌন্দৰ্য্য জুড়ায় প্রাণ, দেয় তৃপ্তি সুর-তান,
বিমুগ্ধ নয়ন কত বিচিত্র শােভায় ;
হৃদয় শীতল করে,
যথা রৌদ্র রবিকরে
তাপিত বাপীর বুক মেঘের ছায়ায় ।
এ কি জুড়াবার স্থল, তৃষার হিমানীজল,
শ্রান্তির সুখ-শয্যা নিশীথ-শয়নে;
এ কি জীবনের গেহ, পূরিত বিমল স্নেহ,
সমীর চুলায় পাখা মধুর বিজনে !
এই সেই নদীকূল, কনক চম্পক ফুল,
মদির সৌরভে চির বসন্ত বিকাশে;
এই সে প্রাচীন বট, ভগ্ন জরাজীর্ণ মঠ,
বকুল-সেফালী-কুঞ্জে ঝরিছে বাতাসে।
দশম সর্গ।
মধুর প্রণয় গীতি,
সারা জীবনের স্মৃতি,
বিজড়িত জন্মান্তের অমৃত বল্লরী;
জরাজন্ম মৃত্যুহরা,
সুন্দরে সুন্দরীতরা,
যেন মূর্তিমতী শান্তি ছায়ারূপ ধরি ।
ভ্ৰমিলাম বহুদেশ,
স্বর্গ-চিত্র অবশেষ,
হে শ্যামা-প্রকৃতি তব মুখ কি শােভার ;
তোমার কোমল বুক,
ধরে কি সান্ত্বনা সুখ,
এ-প্রাণ-বিরামভূমি কোথা আছে আর ।
তুমি হাস সুধাহাসি, চিরমুগ্ধ মর্ত্যবাসী,
প্রেমের নিঝর বহে ও রূপ-লীলায় ;
বিশ্বের বাসনা অয়ি, তুমি রাণি রূপময়ি !
অতুল ঐশ্বৰ্য সাজে তােমারি ধরায় ।
এস চির স্নিগ্ধ-শান্তি দেখায়ে করুণ-কান্তি,
নীরবে প্রাণের গেহ কর সমুজ্জ্বল ;
আমি সিদ্ধ সাধনায়,
কোটী উগ্র কামনায়,
লভিতে প্রেমের সুধা চির নিরমল ।
দেখি এ জীবন শেষে,
ঊর্ধে-বহু ঊৰ্ধ দেশে,
অমৃত-ভাণ্ডার-ভরা সুধাংশুমণ্ডলে ;
এ চিত-চকোর মাের, তৃষায় উন্মাদ ঘাের,
ওই মৃত্যুহরী রস হরিতে বিহলে!
প্রেম ও প্রকৃতি
দূরান্তর পর্যাটন,
মৃত্যুসম অবসাদ,
কত মহা-প্রাণপণ,
বিশ্বতত্ত্ব অধ্যয়ন এ মরজীবনে।
জীবনের সুখসাধ,
সকলি বিস্মৃত, ওই লক্ষ্যের সাধনে।
ওই সৃষ্টি, ওই সুখ,
ওই আশা, ওই দুঃখ,
ওই স্মৃতি, ওইরূপ, ও জন্ম-সাধনা !
ওই কাম, ওই মােক্ষ,
ওই ধৰ্ম্ম, ওই লক্ষ্য,
ওই তাপ, ওই হর্ষ, ও চির-কামনা।
এখন মিটেছে সাধ, ঘুচেছে সে পরমাদ,
ঘুচেছে নয়নে এবে সে তমসা ঘাের;
আর না যেতেছে দেখা, সে গভীর চিহ্ন-রেখা,
উজানে তরঙ্গ কোথা বহে প্রাণে মাের ।
সায়াহু জীবন চলে, কি স্নিগ্ধ আলােক ঝলে,
যাও দূরে সরে যাও তামসী যামিনী।
ফুটাই গাে রাগভরে, নব অরুণের করে,
শান্তির প্রফুল্ল ফুল জীবন-মােহিনী ।
যুগরুদ্ধ যাতনায়,
অতীতে মিশায়ে যায়,
জীবনের বহুসাধ অন্ধু বিম্ব প্রায় ;
শুনি আশার ভাষে,
তৃপ্তিহারা মর্ত্তবাসে,
বিষাদ জলদজালে শূন্যবক্ষ ছায় !
দশম সর্গ। Wa- নহে অসম্ভব কথা, সকলি সম্ভব যথা, হয় ত অদৃষ্টলিপি নিৰ্ম্মম এমনি ; হয় ত নীচত্ব হেরে, দারুণ ঘৃণার ফেরে, ছিল গাে পাষাণী হয়ে প্রকৃতি-রমণী ! কালেতে ব্যথিত প্রাণ, অভিশাপ অবসান, স্নেহেতে দ্রবিল হিয়া—নয়ন তরল ! বজ্র-হৃদিপিণ্ড কেটে, ও চিত্ত পাষাণ ফেটে, প্রবাহিল নিঝরের ধারা অবিরল। নদীবহে কুলুকুল, সােহগে ফুটিল ফুল, জাগিয়া উঠিল প্রাণ অমিয় পরশে ! দিবস আগত যেথা, গভীরা রজনী সেথা, কালিমা-মণ্ডিত হয়ে কেমনে নিবসে ! শীতল শ্যামল স্থল, লুপ্ত জন-কোলাহল, জাগাও আমারে দেবি জাগাও জাগাও! ত্যজি অবসাদ ঘাের, বিরাম-মন্দিরে মাের, ব’সি তুমি প্রভাতের নবগীতি গাও । দেখ তব আলাপনে, গৃহ মঞ্জু কুঞ্জবনে, পিকগীতে বসুধার নব উদ্বোধন! আমিও এসেছি ফিরে, তিতি কত আঁখিনীরে, দাও খুলে উচ্ছাসের সুখ-প্রস্রবণ !
১১৮
প্রেম ও প্রকৃতি।
সাধন হয়েছে শেষ,
হেরি ও মােহিনী বেশ,
মরি কি মধুর শ্যাম মূরতি উজ্জ্বল
তব মুখে অশ্রু হাসি, এ জীবনে ভালবাসি,
ও রূপ-সাগরে ডুবি’ হয়েছি বিহল !
এখানে রহিব বসি, হেরিতে মানসী শশী,
জুড়াবে আকাঙক্ষা মাের জুড়াবে জীবন!
এ নির্জন উপবনে, তৃণ, তরু, লতা সনে,
রবে বাঁধা জন্মশােধ প্রাণের বন্ধন।
এখানে স্মৃতির ছবি, ফুটন্ত প্রভাত রবি,
তেমনি রক্তিম রাগে করে ঢল ঢল ;
প্রাণের নিভৃতকুঞ্জে,
তৃষারূপী অলি ভুঞ্জে,
শান্তির শীতল মধু বিমল তরল !
আশার ত তৃপ্তি নাই, শূন্য নিরাশার ঠাঁই,
চঞ্চল অধীর প্রাণ শয়নে স্বপনে ;
হই যত অগ্রসর,
সরে তত দূরতর,
শােভন শ্যামল গিরি ত্বরিত গমনে।
সবি ভস্মীভূত যথা,
স্মৃতি কি দুল্লভ তথা,
কতক্ষণ স্থায়ী বল সৌন্দৰ্য্য ভুবনে ?
মুগ্ধ যার মুখ চাই, সে যে শ্মশানের ছাই,
পলক পড়িতে ভর সহে না নয়নে।
দশম সর্গ।
১১
যায় মাস বর্ষ দিন,
ক্রমে তনু তেজোহীন,
দিন দিন দিন গণি, দিন চলে যায়।
সম্মুখে যে আলাে ছিল, ফুৎকারে নিয়ে দিল,
বিস্মৃতি-আঁধার-বুকে স্মৃতি কি মিশায় ?
কারে বলি প্রেম তবে, সে স্মৃতি বিস্মৃত যবে,
স্মৃতিশূন্য প্রাণে কোথা প্রেমের নিলয় ?
প্রেম কি জীবন-যােগে, নশ্বর পার্থিব ভােগে,
মর্ত্যের শ্মশানভস্মে লভে কি বিলয় ।
সংশয়ে প্রেমের নাশ, হা হুতাশ অবিশ্বাস,
প্রকৃত বিশ্বাসে প্রেম অচল অটল ;
পূর্ণ প্রাণে প্রেমাধারে, যে জন সাধিতে নারে,
প্রেমের সাধনা তার মূর্খতা কেবল !
;
মৃত্যু-অন্ধকারে হায়, যদি প্রেম মিশে যায়,
স্মৃতি, চিহ্ন-রেখা, সবি লভে অবসান ;
সবি শূন্য-কুক্ষিগত, সবি দগ্ধ, বজ্রাহত,
যদি চির বিসর্জনে এ স্মৃতি নির্বাণ ।
যদি চির শূন্যাগারে,
মরণের পরপারে,
থাকে জনহীন দেশে নির্বাণ ভীষণ ।
জীবাত্মার নাহি লেশ,
চিরশেষ অবশেষ,
সুধু শেষ হয় যদি মর্ত্যের মরণ।
১২০
প্রেম ও প্রকৃতি
নাদি হৃদি, নাহি আশা, নাহি স্মৃতি, নাহি ভাষা,
কি দুঃখ তাহায় বল প্রেমিক সুজন ?
তুমি ত ধরায় থাকি, কিছু ত রাখনি বাকি,
তােমার কর্তব্য-শেষ—প্রেম আরাধন।
কুটিল সন্দেইজালে, সমগ্র জীবন কালে,
হ’য়ােনা নিরাশ কভু-হ’য়ােনা অধীর।
বাঁধি
বুকে নব বল, রাখ ধরে লক্ষ্য স্থল,
বহাও তন্ময় প্রাণে উচ্ছাস মদির !
প্রেমিক প্রেমিকা হও, দুঃখে রও সুখে রও,
প্রেমের সাধনা জেনাে নিষ্কাম সাধনা ;
তজ সুখ, ত্যজ আশা, ভাঙ্গ বাসনার বাসা,
মর-তৃষা নহে প্রেম-ভবের যাতনা !
থাকে যদি স্বর্গভােগ,
কৰ্ম্মের অনন্ত যােগ,
থাকে সাধনার সিদ্ধি-পবিত্র গরিমা
থাকে মহা-আকাঙ্ক্ষার,
চিরভােগ্য পুরস্কার,
থাকে যদি আনন্দের সুখ-মধুরিমা।
সে আশা করনা ভবে, ভাগ্যে থাকে ভােগ হবে,
নিবৃত্তিতে প্রবৃত্তির তৃষা কর দূর ;
কঠোর সাধনা দুঃখে,
আজন্ম ব্যথিত বুকে,
প্রেমের লুকান মুর্তি মধুর—মধুর।
দশম সর্গ ।
১২১
কি সৌন্দর্যে মুগ্ধ আঁখি, অনিমেষে চেয়ে থাকি,
দেখি সেই স্নিগ্ধরশ্মি নয়ন বিভাের ।
দূরে—দূরে—চির-দূরে,
নিভৃত হৃদয় পুরে,
মগ্ন হয়ে ভাবে মজি রজনী উজোর ।
দুঃখের নাহি ত হেতু, উড়াও আনন্দ-কেতু,
সৌন্দৰ্যসাগরে প্রেমী চির ডুবে যাও;
থাকিতে এ দৃষ্টি জ্ঞানে, বিহ্বল কেন হে প্রাণে,
মগন হইয়া ভাবে নিরাশা নিবাও!
উদ্ভান্ত প্রেমিক হয়ে, উন্মত্ত প্রলাপ বয়ে,
করিও না কলঙ্কিত উদ্দেশ্য মহান্ !
মানব জীবনে কিবা, উজ্জ্বল জ্ঞানের বিভা,
রেখাে চির প্রজ্বলিত প্রেমিক ধীমান্ ।
সৃষ্টির রহস্য যত,
থাকুক আঁধার-গত,
থাকুক আশার শত চাতুরী অপার ;
ভবিষ্যের বিমােহিনী, থাক্ তৃষা কুহকিনী,
থাকুক অনন্তলীলা নিত্য-নিরাশার।
প্ৰেমী নিজ পথে চল,
নিঃসম্বল হীনবল,
সম্বল বলের সেথা নাহি অধিকার ;
তেজোবহি হৃদয়ের, সে সাধনা প্রণয়ের,
. সহায় হইবে তব ব্রতে অনিবার।
* -
১২২
প্রেম ও প্রকৃতি।
ma
হের হে নয়ন ভরি, আহা কি সুন্দর মরি,
এই সেই গৃহ-তীর্থ মহাপুণ্যস্থল ;
নাহি তীর্থ প্রয়ােজন,
তাপিতের চিরস্বৰ্গ কি স্নিগ্ধ শীতল।
দূরদেশ পর্যটন,
কোথা উদাসিনী তুমি, এই সে মধুর ভূমি,
শান্তির অমৃত
উৎস বহিছে হেথায়
জুড়াইয়া গেল প্রাণ,
হ’ল জ্বালা অবসান,
শুভদিনে বরাননে রয়েছ কোথায় ?
••
সুদূর প্রবাসে মিলে,
বিজনে সঙ্গিনী ছিলে,
কত সুশীতল স্নেহে জুড়ালে জীবন ।
পুনঃ দেখা দিয়ে শেষে, সে তাপহারিণী বেশে
মিটাইলে হৃদয়ের চির-আকিঞ্চন।
সেই শেষ দেখা দিয়া, কোথায় লুকালে গিয়া,
সচকিতে ছায়া সম হে ছায়ারূপিণি ?
আজিও নয়নে মাের,
নিবারি তমসা ঘাের,
ঝলকি ঝলকি উঠে সে রূপদামিনী।
পূর্ণ মাের মনােরথ, আঁধারে দেখায়ে পথ,
মনে হয় ভুল নাই রাখিয়াছ মনে ;
জননী-আদর-ভরে,
স্পর্শিলে কোমল করে,
শিশু কি আনন্দ লভে কব তা কেমনে!
দশম সগ।
১২৩
প্রাণে ঢালিয়াছ সুধা, মিটেছে আত্মার ক্ষুধা,
জনমের চিরদুঃখ চির অবসান
জগতেও এই মত, ঢালি শান্তি অবিরত,
জুড়াও বিশ্বের দেবি বিদগ্ধ পরাণ ।
অস্থিমাংস বিজড়িত, রক্তবীৰ্য প্রবাহিত,
নরনারী দেহে চির কামনা বিপুল ;
কামমােহে কি অধীর, অনুরাগ ধরিত্রীর,
প্রেমের সাধনা বিনা হয় কি নিৰ্ম্মল ?
হবে না হবে না কভু, হলেও জ্ঞানের প্রভু,
বিশাল হৃদয় চাই প্রেমেতে উদার ;
কাপট্য কলুষ নাই,
হেন তপস্যার ঠাই,
সে শুধু প্রেমীর বুক বিশ্বের মাঝার।
ঘৃণিত চণ্ডালবেশী,
হীনমতি নরদ্বেষী,
নিৰ্ম্মম প্রকৃতি যার ক্রর কৰ্ম্মফলে ;
সেও লভে প্ৰেমবলে, আনন্দে অবনীতলে,
প্রীতির অমিয়ধারা হৃদয়-গরলে।
t
প্রেমেতে স্বর্গের ছবি, কোথা স্বর্গ রচে কবি,
রুচিভেদে কল্পনার বিচিত্র বিকার।
নয়নে নিৰ্ম্মল জ্যোতিঃ, প্রাণে চির মধুমতী
এই সে বাঞ্ছিত ধন মর আকাঙ্ক্ষার !
প্রেম ও প্রকৃতি।
ডুবিয়া সৌরভ হ্রদে, অন্ধ মৃগ মৃগমদে,
অধীর উন্মত্ত হয়ে চারিদিকে ধায় ;
অলক্ষ্যে কি সুধাধার,
নাভির মণ্ডলে তার,
কি পূর্ণ-ভাণ্ডার-ভরা সুবাস ছড়ায় ।
;
হে শােভনা! হে সুহাসি ! হে প্রকৃতি অবিনাশি।
তােমারি প্রেমের রাজ্য লইয়া আমায়
যুগ যুগান্তর ধরে, ক্ষুব্ধ ছিনু যার তরে,
সে যে ছিল চিরদিন লুকায়ে হেথায় !
এ সুখ-সৌন্দৰ্য-ভার, পুণ্যাশ্রম অমরার,
এ গৃহ-বিনােদ-বনে বিশ্ব-বিনােদিনী,
পূরায়ে প্রাণের আশ, বাঁধ মাের চিরবাস,
পােহাইতে প্রবাসের জীবন-যামিনী !
কি বিচিত্র মরদেশ,
নাহি তৃষা-আশা-শেষ,
প্রেম ও প্রকৃতি দুটি সৃষ্টির জীবন ।
মিশে দেহে পরস্পরে,
জীবতাপ দূর করে,
এ মরু-হৃদয়ে রচি তৃপ্তি-নিকেতন।
অধীর প্রেমের বুক,
চুমিতে প্রকৃতি মুখ,
তাই কি প্রকৃতি পানে বিদ্যুৎ গমনে-
ছুটে প্রেম আত্মহারা, বিশ্বমাঝে দিশাহারা,
বঁধি তপ্ত আলিঙ্গনে—সরাগ চুম্বনে।
দশম সর্গ ।
•
ওই যে পৰ্বত-শিরে, গৃহে, বনে, নদীতীরে,
নিভৃত কানন-কুঞ্জে আঁধার গুহায়
উদ্যানে ফুলের দলে,
সুনীল সিন্ধুর জলে,
ধবল সৈকতে বসি বালুকাবেলায়,
করি চির আরাধন, হয়ে যােগে নিমগন,
হেরিনু অপূর্ব যুগ্ম ! কি সৃষ্টি সুন্দর !
সে যুগের লীলাস্থল, এই গৃহ নিরমল,
ঝলে কি প্রভাত-তারা রশ্মি মনােহর।
সুধা-সৌন্দর্যের সার,
বিশ্ব-বাঞ্ছা ফুলহার,
ঢালে কি মাধুরী-রাশি এ মর নয়নে ;
কোথা স্বর্গ, কোথা সুখ, কোথা প্রেম-মাখা মুখ,
এই সে, এই সে হেথা, এ মঞ্জু ভবনে !
এই সে-প্রীতির রাশি, প্রেমের প্রমােদ হাসি,
এই সে ইন্দ্রের তৃপ্তি বিশ্বের বিলাস!
এই চিত্র অমরার, হর্ষোচ্ছাস অনিবার,
ফুল্ল পারিজাতদলে শান্তির নিবাস।
এস প্রাণে—এস ধ্যানে, এস হৃদে—এস জ্ঞানে,
এ জৈব প্রেমের সহ হে বিশ্ব-প্রকৃতি।
যুগ্ম বাহু প্রসারিয়া, গৃহদ্বারে দাড়াইয়া,
বাঁধি বক্ষে জন্মান্তের ল’য়ে সুখ-স্মৃতি।
প্রেম ও প্রকৃতি।
নশ্বর নগেন্দ্র কবি,
নির্জনে অঙ্কিল ছবি,
চিত্রিত রবে কি প্রাণে স্মৃতি মহিমায় ।
এই প্রেম, এ প্রকৃতি,
জীবনে জীবন্ত নিতি,
হৃদয়ে রাজীব চির রঞ্জিত শােভায় ।
সমাপ্ত।
পরিশিষ্ট। চতুর্থ সর্গ। ৪৫ পৃষ্ঠা ; ৫ম পংক্তি—মতি-মজীদের গলে’-আগরাদুর্গ-মধ্যস্থিত শ্বেত মৰ্ম্মর বিনির্মিত রজতশুভ্র ভজনালয়। ৬ষ্ঠ পংক্তি—নাগিনা মজীদ-আগরাদুর্গে বেগমদিগের জন্য নির্মিত শ্বেত মৰ্ম্মর প্রস্তরের অতি সুন্দর মজীদ। ৭ম পংক্তি—‘অমল অঙ্গুরী-বাগে’-আগ্রা-দুর্গাভ্যন্তরস্থ উদ্যান- বিশেষ। ৮ম পংক্তি-‘খাস মহল’আগরা দুর্গাভ্যন্তরে বেগমদিগের জন্য সুন্দর প্রাসাদ। ১০ পংক্তি—‘শিশ মহল’-আগ্রা দুর্গাভ্যন্তরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দর্পণ দ্বারা নির্মিত স্নানাগার বা হামমি। ১২শ পংক্তি—সম্মন-বুরুজ’—বিবিধ বর্ণের প্রস্তর-খচিত অতি সুন্দর প্রাসাদ-কক্ষ। আগ্রা-দুর্গ মধ্যে যমুনাতীরে অবস্থিত। পঞ্চম সর্গ। ৫৬ পৃষ্ঠা ; ১ম-১২শ পংক্তি-ও কি রে বিচিত্র ঘটা—অন্তিম সম্বল’-- মধ্যভারতের ত্র্যম্বকতীর্থে ব্ৰহ্মগিরির উর্দ্ধতম শিখর- দেশ গােদাবরী নদীর উৎপত্তি স্থল। মহাদেবের জটা হইতে গােদাবরী নিঃসৃত হইতেছে। পৰ্বতের সেই অংশ ঠিক জটার ন্যায় মনােহর দৃশ্য। পার্শ্বে বৃক্ষতলে ধ্যানমগ্ন মহামুনি গৌতমের প্রতিমূর্তি।
ন
পরিশিষ্ট।
ষষ্ঠ সর্গ।
৫৯ পৃষ্ঠা।
এম পংক্তি—অপূৰ্ব্ব গঙ্গার মূর্তি’-রামনগরে কাশীরাজের
প্রাসাদভবনের গঙ্গাতীরে প্রবেশদ্বারের বাম প্রকোষ্ঠে
শুভ্র মৰ্ম্মরনিৰ্মিত গঙ্গাদেবীর প্রতিমূর্তি।
৬২ পৃষ্ঠা।
৬ষ্ঠ পংক্তি—“হিমচূড়ে তীর্থরাজ’-বদরিকাশ্রম।
৬৯ পৃষ্ঠা-১ম পংক্তি-বৌদ্ধমঠ পথে’-বারাণসীর উপকণ্ঠে
সারনাথ নামক স্থানের বৌদ্ধস্তুপ।
সপ্তম সর্গ।
৮৩ পৃষ্ঠা ;
৭ম ও ৮ম পংক্তিপ্রেমীচিত্ত প্রেমে লয়,-তরঙ্গে পায়।
কথিত আছে যে, চৈতন্যদেব প্রেমে আত্মহারা হইয়া
নীল সমুদ্রকে নীলমাধবজ্ঞানে আলিঙ্গন করিতে গিয়া
তরঙ্গে ঝাপ দিয়াছিলেন।
অষ্টম সর্গ।
৯০ পৃষ্ঠা ৭ম পংক্তি--এ কোন্ বঙ্গের বনে’—মালাবার
প্রদেশের
প্রাকৃতিক সৌন্দৰ্য্য প্রায় বঙ্গদেশের
অনুরূপ।
1
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.