Udaynarayanpur Tarun Sangha, Howrah

Sikher Bolidan Ed.6

Bosu,kumudini · 2010/04/16

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

শিখেৱ বলিদান।
শ্ৰীমতী কুমুদিনী বা বি,এ,
এখত।
সন।
The Right of the many posts animale
reproduotina, posurved.
৪ সাল।
शूना । भाना

সাম্য-স,
৬নং-কলেজ-স্কোয়ার, কলিকাতা হইতে
যুক্ত শচীন্দ্রপ্রসাদব কর্তৃক প্রকাশিত ও
উপেন্দ্রনাথ দাস দ্বারা মুদ্রিত।

1
উৎসর্গ
C
।
ICT
ভাই সুকুমার,
শিখেরা প্রাণ দিতেন,
তবু
ঈরকে ত্যাগ করিতেন না।
তােমার সুকোমল প্রাণ
তাঁহাদেরই মত
ঈশ্বরকে ভালবাসুক।
তােমার

No text on this page.

নিবেদন।
শিখের বলিদানের ৬ষ্ঠ সংস্করণ চিত্রে শােভিত
হইয়া প্রকাশিত হইল। বাংলা দেশের বালক
বালিকাদের ইহা আনন্দ দান করিলে সুখী হইব।
লেখিকা

সমাধি
ছােট গল্পের বই।
গল্পগুলি অঞ ও বিষাদ মাখান। পড়িতে পড়িতে
চক্ষের জল না ফেলিয়া থাকা যায় না। নায়ক নায়িকার
দুঃখে পাঠকের হৃদয় উদ্বেলিত হইয়া উঠে। সুন্দর
ছাপা ও বাঁধান। সােণার জলে নাম লেখা। মূল্য
এক টাকা মাত্র। ৬নং কলেজ-স্কোয়ার কলিকাতা,
এই ঠিকানায় পাওয়া যায়।

সূচীপত্র।
বিষয়।
পৃষ্ঠা
ট
শিখ-হাতি
তেগ বাহাদুর
ফতেসিংহ ও জরওয়ারসিংহ
মণিসিংহ
হকিকত
তরুসিংহ
সুবেগসিংহ
১৭ ২৭
০৪
Ps
৩৪
৪০
. . .
২

• পঞ্চনদীর তীরে
বেণী পাকাইয়া শিরে
দেখিতে দেখিতে ।
G
উরুর মনে
জাগিয়া উঠেছে শিখ
নির্মম নির্ভীক---

গুরু নানক

No text on this page.

শিখেৱ বলিদান।
অবিশাল প্রদেশ, তাহার নাম পাঞ্জাব। এই
.শিখ জাতি
পূন গিয়। শিখ
কতন উবার পুর্বের পানে
চাহিল নিৰিমিখ।'
রতবর্ষের উত্তরপশ্চিমাংশে পঞ্চনদ-বিধৌত যে
পাঞ্জাব প্রদেশে তেজোদৃপ্ত শিখজাতির অত্যুদয়
হইয়াছিল। মােগলদিগের ভারতবর্ষে আগমনের পূর্বে
পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে লাহােরের নিকটে নানক

শিখের বলিদান জন্মগ্রহণ করেন। মহাপুরুষ নানকের জন্মগ্রহণের পূর্বে পাঞ্জাব প্রদেশে ঋষিদিগের প্রচারিত বিশুদ্ধ, নির্মল একেশ্বরবাদ, নানা প্রকার কুসংস্কার এবং পৌত্তলিকতার অসার জালে জড়িত হইয়া অশেষ দুর্গতি প্রাপ্ত হইয়াছিল। ধর্মের অধােগতির সহিত পাঞ্জাবের হিন্দু- জাতিও অপরিসীম হীনাবস্থায় আসিয়া পেীছিয়াছিল। মহাপুরুষ নানক বিশুদ্ধ ধর্ম প্রচার করিয়া পাঞ্জাবের অধিবাসীবর্গকে এই হীনাবস্থা এবং কুসংস্কার-জাল ইতে উদ্ধার করিবার আয়ােজন করিয়াছিলেন। নানক শিখধর্মের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি এক পর- ব্রহ্মের উপাসনা প্রচার করেন। তিনি দেশপ্রচলিত কুসংস্কারের ঘাের বিরােধী ছিলেন। তাহার ধর্ম জাতিভেদ মানিত না। তাহার মৃত্যুর পর যে সকল মহাত্মা এই ধর্ম রক্ষার জন্য জীবন সমৰ্পণ করিয়াছিলেন, তাহাদিগের অটল ধর্মবিশ্বাস, অতুলনীয আত্মােৎসর্গ, সমগ্র পাঞ্জাব প্রদেশকে স্তম্ভিত করিয়াছিল। তাঁহাদের মহৎ দৃষ্টান্ত ও চরিত্রের প্রভাবে যে জাতির অভ্যুদয় হইয়াছিল, তাহার শৌর্য, বীৰ্য্য ও ধর্মবিশ্বাসে এক সময়ে প্রবল প্রতাপশালী দিল্লীশরের সিংহাসন পৰ্যন্ত কাপিয়াছিল। তাহারা যে “অলখ নিরঞ্জনের” পূজা

।
সির বলিনি
করিতেন, তিনিই উহার রক্ষার জন্য তাঁহাদিগকে
ভববন্ধন ছিন্ন করিবার শক্তি দিয়াছিলেন।
নানকের মৃত্যুর পর যে সকল মহাত্মার উপর
শিখধর্ম রক্ষার ভার অর্পিত হইয়াছিল, তাঁহাদিগকে
“গুরু” নামে অভিহিত করা হইত। নানক মৃত্যু
কালে অঙ্গ নামক তাঁহার প্রিয় শিয়কে গুরুপদে
অভিষিক্ত করিয়া যান। অঙ্গদের মৃত্যুর পর অমর দাস
এবং রামদাস গুরুপদ লাভ করেন। তৎপরে ১৫১
খৃষ্টাব্দে রামদাসের পুত্র অর্জু, নানকের উপদেশসমূহ
সম্পূর্ণরূপে হৃদয়ঙ্গম করিয়া তারা শিখ-সমাজের
আমূল সংস্কার সাধনে প্রবৃত্ত হন। তিনি নানকের
এবং অন্যান্য মহাত্মাদিগের অমূল্য উপদেশসমূহ
পুস্তকাকারে লিপিবদ্ধ করেন। এই অতুলনীয় পুস্তক
শিখদিগের আদিগ্রন্থ” নামে সুপরিচিত। যাহাতে
দেশের মধ্যে নির্মল, বিশুদ্ধ ধর্ম সুদৃঢ় হয়, তজ্জন্য
তিনি বিশেষ চেষ্টা করিয়াছিলেন। অর্জুনের মৃত্যুকালে
তাঁহার পুত্র হরগােবিন্দ ১১ বৎসরের বালক ছিলেন।
সুতরাং তাহাকে তাঁহার পিতৃ-অধিকার হইতে বঞ্চিত
করিবার জন্য নানাপ্রকার ষড়যন্ত্র করা হইয়াছিল। কিন্তু
অর্জুনের বিশ্বাসী শিষ্যগণ কর্তৃক তিনি গুরুপদে

শিখের বলিদান
অধিষ্ঠিত হন। হরগােবিন্দ শিখজাতিকে এক সামরিক
জাতিতে পরিণত করিবার সূত্রপাত করেন।
গগাবিন্দের শৌর্যপূর্ণ চরিত্র প্রভাব শিখদিগের মধ্যে
নবজীবন আনয়ন করিয়াছিল। এই সময় শিবগণের
সংখ্যাও বৃদ্ধি পাইয়াছিল এবং সাম্রাজ্যের মধ্যে তাহারা
এক স্বতন্ত্র ক্ষমতাশালী রাজ্য গঠন করিতে আরম্ভ
করিয়াছিলেন। গুরু হরগােবিন্দের পর তাহার পেত্র
হয়রায় গুরুপদে অভিষিক্ত হন, তৎপরে হররায়ের পুত্র
হরকিষেণ গুরু হন, কিন্তু তিনি আট বৎসর বয়সে
পরলােক গমন করেন। হরগােবিন্দের কনিষ্ঠ পুত্র গুরু
তেগ বাহাদুর -৬২২ খৃষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন।
অমৃতসরে তাহার বাসস্থান ছিল। ৫২ বৎসর বয়সে
তিনি গুরুপদে অভিষিক্ত হন। এই সময় দিল্লীর
সম্রাটের প্রসাদলাভাকাক্ষী বহু ব্যক্তি গুরুপদ লাভ
করিবার জন্য আগ্রহান্বিত হইয়াছিলেন। শিখগণ তে
বাহাদুরের ধর্ম ও চরিত্র প্রভাবে মুগ্ধ হইয়া তাহাকেই
এই পদ প্রদান করেন।
মােগল নরপতিগণ কর্তৃক অনবরত ও অমানুষিক
রূপে অত্যাচারিত হইয়াও শিখগণ অলােকসামান্য
দৃঢ়তার সহিত স্বধর্ম এবং স্বজাতিকে রক্ষা করিয়াছিলেন।
৪

শিখের বলিদান
মােগল সাম্রাজ্যের পতনের ক্লারম্ভেই শিখগণ পাঞ্জাব
প্রদেশে এক ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রীয়শক্তিরূপে দণ্ডায়মান
হন। শিখ-রাজ্যের স্থাপয়িতা রণজিৎ সিংহ ১৭৮০
খৃষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার অধীনে শিখগণ
যুদ্ধ-বিদ্যা উত্তমরূপে শিক্ষা করিয়াছিলেন। তিনি এই
শিখদিগকে লইয়া এমন এক সুশৃঙ্খলাপূর্ণ ফৌজ গঠন
রিয়াছিলেন যে, যাহাদিগের বিশ্বস্ততা এবং ধর্মের
একাগ্রতা, পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র অলিভার
ক্রমওয়েলের সৈন্যদিগের সহিতই তুলনীয় হইতে
পারে।

যিয় বলি তেগ বাহাদুর। বীগণ ননীর রক্ত তিলক ললাটে পরাল পঞ্চ নদীর তীরে। পড়িত যৰে এক ভাই সব চেয়ে বিষ নিজের বহি বলি দিতে হয় তাই- তে বাহাদুর ৪ বৎসর বয়সে শিখগণ কক বাহাদুর ৫২ বৎসর বয়সে শিখগণ কর্তৃক গুরুপদে অভিষিক্ত হন। তাঁহার গুরুপদ লাভের সময় আওরঙ্গজেব স্বীয় পিতা সাজাহানকে সিংহাসনচ্যুত এবং তিন ভ্রাতাকে হত্যা করিয়া দিল্লীর সিংহাসন অধিকার করেন। অধিকার করেন। আওরঙ্গজেব গোঁড় মুসলমান ছিলেন। তিনি হিন্দু জার উপর অত্যাচার করিতে কুণ্ঠিত হইতেন না। তাঁহার রাজত্বের সময় বহু

গিনি
গুরু তেগ বাহাদুর।
হিন্দু দেবমন্দিরের কাষ্ঠ প্রভাদি লইয়া মসজিদ নির্মিত
হইয়াছিল, হিন্দু কর্মচারীর সংখ্যা হ্রাস হইয়াছিল,
৭

শিখের বলিদান হিন্দুদিগের কার্যকলাপের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখিবার নিমিত্ত গুপ্তচর নিযুক্ত হইয়াছিল এবং হিন্দুদিগকে মুসলমান ধৰ্ম্মে আনিবার জন্য বিবিধ উপায় অবলম্বন করা হইয়াছিল। দেশের এইরূপ ঘাের দুরবস্থার দিনে শিখধৰ্ম্ম বহু বিবাধা সত্ত্বেও নির্ভয়ে প্রসার লাভ করিতেছিল। তে বাহাদুর গুরুপদ লাভ করিয়া ভারতবর্ষের সমগ্ৰ উত্তৰ- ভাগ ভ্রমণ করিতে আরম্ভ করেন। তিনি প্রত্যেক স্থানে মােগল রাজপুরুষদিগের অত্যাচার দর্শন কবি অতিশয় ক্ষুব্ধচিত্তে অমৃতসবে প্রত্যাবর্তন করিলেন। তৎপরে অমৃতসব হইতে চলিয়া আসিয়া শতদ্রু নদীক তীবে আনন্দপুর নামক গ্রামে বাস কবেন। একদিন আনন্দপুর গ্রামে তাহার শিষ্যমণ্ডলী একত্র হইলে কয়েকটী শিষ্য দণ্ডায়মান হইয়া হিন্দুদিগের দুঃখ ও দুর্দশা কাহিনীতাঁহার নিকট বর্ণনা করিলেন। তেগ বাহাদুর ক্ষণকাল নীরবে চিন্তা করিয়া এই সিদ্ধান্ত করিলেন যে, বলিদানের সময় উপস্থিত হইয়াছে, বলিদান না কবিলে এ অত্যাচারের নিবারণ হইবে না। তিনি শিষ্যমণ্ডলীকে সম্বােধন করিয়া বলিলেন, “ভক্তগণ! ঈশ্বরের পূজকদিগকে এই পৃথিবীতে অনেক

শিখের বলিদান
ক্লেশ, বহু যাতনা সহ্য করিতে হয়। দেশে পাপ ও
অত্যাচার বৃদ্ধি পাইলে কোন প্রিয় বস্তু বলিদান করিয়া
তাহা দূরীকরণের চেষ্টা করা হইয়া থাকে। বর্তমান
সময়ে দেশের কি ঘাের দুরবস্থা তাহা তােমরা দেখিতেছ,
এমন দিনে তােমরা কোন্ প্রিয়তম বস্তু উৎসর্গ করিয়া
তাহার উপশম করিবে ?”
তাহার সপ্তম বর্ষীয় পুত্র গােবিন্দসিংহ মনােযোগের
সহিত পিতার বাক্য শ্রবণ করিতেছিলেন। এই কোমল
কৈশােরকালে তঁাহার ধর্মবিশ্বাস দৃঢ় হইয়াছিল এবং
তঁাহার চরিত্রে আত্মোৎসর্গের বীজ অঙ্কুরিত হইয়াছিল।
তেগ বাহাদুর নীরব হইলে, তিনি, দণ্ডায়মান হইয়া
বলিলেন, “পিতা, শিখগণ আপনাকেই সর্বাপেক্ষা প্রিয়
জ্ঞান করে।”
পুত্রের এই বাক্য শ্রবণ করিয়া শিষ্যমণ্ডলী ও তেগ
বাহাদুর স্তম্ভিত হইয়া রহিলেন। তিনি ভাবি
দেখিলেন যে, পুত্রের উত্তর ঠিক তাহার সঙ্কল্পের অনুরূপ
হইযাছে। সমুদয় শিমণ্ডলী বুঝিলেন যে, গােবিন্দের
বাক্যে কি গৃঢ়ভাব লুকায়িত রহিয়াছে।
কিয়ৎকাল পরে তেগ বাহাদুর বলিলেনঃ “শিষ্যগণ,
যাও, সম্রাট এবং তাহার অনুচরবর্গের নিকট শিখধর্মের

শিখের বলিদান
শ্রেষ্ঠ প্রতিপন্ন কর তাহাদিগকে যে,
গুরুদিগকে তাহারা কখনও মুসলমান করিতে সক্ষম
হইবেন না।”
তেগ বাহাদুরের এই বাক্য সম্রাট আওরঙ্গজেবের
কর্ণগােচর হওযাতে তিনি তাঁহাকে তাহাব সম্মুখে
উপস্থিত হইতে আদেশ করেন। আওরঙ্গজেব, তে
বাহাদুরকে অতি সাদবে গ্রহণ করেন এবং তাহাকে
নানা প্রলােভন দেখাইয়া মুসলমান ধর্মে দীক্ষিত
করিতে চেষ্টা করেন। কিন্তু তেগ বাহাদুর অটল
রহিলেন।
অবশেষে সম্রাট তাহাকে বলিলেন, “হয় কোন
অলৌকিক ক্রিয়া সম্পাদন কর—না হয় মুসলমান ধৰ্ম্মে
দীক্ষিত হও; নতুবা তােমার শিরচ্ছেদন হইবে।”
তেগ বাহাদুর অবিচলিতভাবে এই দুই বিষয়েই
অসম্মতি প্রকাশ করিলেন। তঁাহার মৃত্যুর পূর্বে যে
কয়েক দিন তিনি কারাগৃহে আবদ্ধ ছিলেন, সে কযেক
দিনই ধর্মোপদেশ দান, প্রার্থনা এবং ঈশ্বরচিন্তায় যাপন
করেন। বন্দী অবস্থায় তিনি বহু হৃদয়গ্রাহী উপদেশ
বচনা করিয়াছিলেন। তন্মধ্যে তিনটী এস্থলে দেওয়া
হইল।
১০

শিবের বলিন
মৃত্যুর প্রাক্কালে তিনি প্রার্থনা করিতেছিলেন, এমন সময়ে
ঘাতক আসিয়া তাহার শিরচ্ছেদন করিল। ২ ?

শিখের বলিদান “ঈশ্বর আমার একমাত্র সহায় ও আশ্রয়, আমার মন তাহাতেই নিবদ্ধ থাকা কর্তব্য।” “মানবমন স্বভাবতই পাপের দিকে যাইতে চায়, মহাত্মাদিগের উপদেশ দ্বারা এই মনকে সেই পথ হইতে ফিরাইয়া আনিতে হইবে।” “গুরু তেগ বাহাদুর বলেন, বিশ্বাস ত্যাগ অপেক্ষা মৃত্যুই শ্রেয়।” তিনি মৃত্যুভয়ে কিছুমাত্র ভীত হন নাই বা চাঞ্চল্য প্রকাশ করেন নাই। মৃত্যুর প্রাক্কালে তিনি প্রার্থনা করিতেছিলেন, এমন সময়ে ঘাতক আসিয়া তাহার শিরচ্ছেদন করিল। এইরূপে ভারতবর্ষের মধ্যযুগে, একজন ধর্মবীরেব মৃত্যু হইল। তেগ বাহাদুৰ ধৰ্ম্মের জন্য আত্ম- বলিদান করিয়া জগতে ধৰ্ম্মেব ‘মহিমা স্থাপন করিয়া গিযাছেন। মৃত্যুর পর দেখা গেল, তাহার গলদেশে একখণ্ড কাগজে লেখা আছে, “শির দিয়া, শির্ব নে দিয়া !” “মাথা দিলাম, কিন্তু বিশ্বাস ত্যাগ কবিলাম না।” দিল্লী নগরের যে স্থানে তেগ বাহাদুরকে হত্যা করা হয়, সে স্থান সীসগঞ্জ নামে বিখ্যাত। তেগ বাহাদুরের ২

৭
শিখের বলিদান
সহিত মতিরাম নামক একজন শিখকেও হত্যা করা
হইয়াছিল।
তেগ বাহাদুবে মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র গােবিন্দ
সিংহ গুরুপদে অধিষ্ঠিত হন। তিনি তখন নয় বৎসবে
বালক। এই তরুণ বয়সে তিনি ধৰ্ম্মের গৃঢতত্বেব
অধিকারী হইয়াছিলেন। ধৰ্ম্মরক্ষা করিতে হইলে যে
বিপদ এবং ক্লেশ ভােগ কবিতে হয়, তিনি তাহা অবগত
ছিলেন।
তেগ বাহাদুরের শিরচ্ছেদনের সংবাদ সম্রাট
আওরঙ্গজেবের নিকট পেীছিলে তাহার দেহের কি কৰা
হইবে, তাহা জানিবার জন্য লােক পাঠান হইল।
আওরঙ্গজেব তেগ বাহাদুরের দেহ সৎকার কবিতে
অনুমতি না দিয়া এই আদেশ দিলেন যে, তাঁহাৰ দেহ
যেন ক্রমে ক্রমে গলিত হইয়া নষ্ট হইয়া যায়।
গােবিন্দ সিংহ এই আদেশ শ্রবণ করিয়া পিতৃদেহ
আনিবার জন্য দৃঢ়সঙ্কল্প করিয়া দিল্লী যাত্ৰা করিলেন।
পিতার দেহের প্রতি এই নৃশংস আদেশে তিনি
আত্মহারা হইয়াছিলেন। কিরূপে পিতার দেহ উদ্ধার
করিবেন, এই চিন্তা তাঁহাকে অস্থির করিয়া তুলিল।
তাঁহার কেবল কযেকজন অতি দরিদ্র ও অশিক্ষিত
D

শিবের বলিদান
অনুচব ছিল, তাহারা এই অসমসাহসিক কাৰ্য্য করিতে
সাহসী হইল না। কে সেই দুর্গম স্থান হইতে দেহ
উদ্ধার করিতে পারিবে ?
দিল্লীর পথে এক জন অতি নিম্নশ্রেণীর শিখ তাহার
পুত্রসহ গুরুগােবিন্দের সঙ্গী হন। তাঁহারা গুরু গােবিন্দ
সিংহের নিকট তেগ বাহাদুরের দেহ উদ্ধার করিয়া
আনিবার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করেন।
তাহারা বলিলেন, “মহাশয়, আমরা অতি হীন।
এই কার্যের সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত হইলেও আমাদিগকে এই
মহাকাৰ্য্য করিতে দিয়া ধন্য করুন।”
গগাবিন্দ সিংহ অনুমতি প্রদান করিলে, পিতা ও
পুত্র এই দুরূহ কাৰ্য্য সম্পাদনে গমন করলেন।
কিযদ্দর অগ্রসর হইলে পর কোন শকটচালকের
সহিত তাহাদের দেখা হয়। এই শকটচালকের
পরামর্শ ও সাহায্যে তাহাবা নিশীথে প্ৰহৰীবেষ্টিত গৃহ
হইতে তেগ বাহাদুবের দেহ উদ্ধার করিতে সমর্থ
হন।
যখন তাহারা গুরুর দেহ গৃহ হইতে বাহির করিতে-
ছিলেন, তখন পুত্র হঠাৎ বলিয়া উঠিলেন, “পিতা, যখন
প্রহরিগণ নিদ্রা হইতে উঠিয়া আসিয়া এই গৃহ শূন্য
১৪

-
শিবের নিন
দেখিবে, তখন তাহারা নিশ্চয়ই সম্রাটকে এই সংবাদ
দিবে এবং আমাদের পরিবার জন্য চতুর্দিকে চর প্রেরিত
হইবে। অতএব আমাকে হত্যা করিয়া এই স্থানে
রাখিয়া যান, তাহা হইলে আপনি নিরাপদে এই দেহ
লইয়া স্বস্থানে যাইতে পারিবেন।”
পিতা অপূর্ব লােচনে বলিলেন, “না বৎস, আমি
বৃদ্ধ হইয়াছি, আমাকেই তুমি হত্যা করিয়া রাখিয়া
যাও। তােমার নবীন বয়স, তুমি কার্যক্ষম পুরুষ,
এরূপ সময়ে তােমার জীবন নষ্ট করিও না। তুমি
বাঁচিলে দেশের উপকার হইবে এবং তুমিও সৎকাৰ্য
করিযা জীবন ধন্য করিতে পারিবে ! আর তুমি
সবলকায়, তুমিই গুরুর দেহ নিরাপদে নির্দিষ্ট স্থানে
বহন করিয়া লইয়া যাইতে পারিবে। আমার দ্বারা
একাৰ্য্য ভালরূপে সম্পন্ন হইবার সম্ভাবনা নাই।
অতএব তুমি আমাকে হত্যা কর।” এই বলিয়া পুত্রের
হস্তে একখানি তরবারী প্রদান করিলেন।
কিন্তু পুত্র কিরূপে পিতার প্রাণনাশ করিবেন ?
তিনি নিশ্চলভাবে দণ্ডায়মান রহিলেন।
অবশেষে পিতা পুত্রের মনােভাব বুঝিতে পারিয়া
স্বহন্তে আপনার প্রাণ বিনাশ করিলেন।

শিখের বলিদান
মৃত্যুকালে তিনি নিম্নলিখিতরূপে প্রার্থনা করিয়া-
ছিলেন, “হারা ব্যাকুলভাবে প্রার্থনা করিতে পাবেন,
তাঁহাদের সকল দুঃখের অবসান হয়, তাহাব। সমুদয়
ক্লেশ সহ্য করিতে পারেন। তাহাদের মুখ ধৰ্ম্মজ্যোতিতে
প্রতিভাত হয়, এবং তাহারা উদ্ধার পান।”
পুত্র পিতার দেহ বাচ্ছাদিত করিয়া রাখিয়া
তেগ বাহাদুরের দেহ লইযা নিরাপদে স্থানে গমন
করিলেন।

শিখের বলিদান ফতেসিংহ ও জরওয়ারসিংহ। --ীবন মৃত্যু পায়ের ভূত চিত্ত কিনা হন। রুগগাবিন্দসিংহের যত্ন ও চেষ্টায় শিখগণ এক প্রবল পরাক্রমশালী জাতিতে পরিণত হইয়া- ছিল—শিখধৰ্ম ভারতে এক অপূর্ব প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল। গােবিসিংহ তাহার চরিত্রের তেজে ও মহদৃষ্টান্তে, শিখদিগের মধ্যে ধর্মের বীজ অতি সুদৃঢ়- রূপে বপন করিতে সক্ষম হইয়াছিলেন। তিনি সত্য- ধর্মের জন্য মান-মৰ্য্যাদা, ধন-সম্পদ সকলই বিসর্জন দিয়াছিলেন। গুরু গােবিন্দ সিংহের আন্তরিক যত্নের ফলে বহুলােক শিখধর্ম অবলম্বন করিয়াছিল। সম্রাট এবং অন্যান্য মােগল কৰ্মচারিগণ এই অবস্থা দেখিয়া

শিখের বলিদান
স্থির করিলেন যে, গোবিন্দসিংহকে ইহাব ফলােগ
করিতে হইবে।
শি
গুগােবিন্দাসহ
১৭৬৫ সংবতে হঠাৎ একদিন এক দল মােগল সৈন্য
আসিয়া গােবিন্দসিংহের বাসস্থান আনন্দপুর গ্রাম
১৮

শিখের বলিদান
বেষ্টন কবিয়া ফেলিল। এই আকস্মিক বিপদপাতে
সাহসী শিখগণও বিহ্বল হইয়া পড়িল। গােবিন্দসিংহ
শিখদের ভবিষ্যৎ ভাবিয়া আকুল হইলেন। তিনি কি
কবিবেন, কিছুই বুঝিতে পাবিলেন না। যদি কযেকটি
যােদ্ধা লইয়া শক্রব্যুহ ভেদ কবিযা চলিয়া যাইতে চেষ্টা
কবেন, তাহা হইলে নিশ্চয়ই
সমুলে
বিনষ্ট হইবেন,
শিখধৰ্ম্ম বক্ষা কবিতে আব কেহ থাকিবে না। অন্যদিকে
শহতে ধন, প্রাণ, নান র্পণ কবাও ভযঙ্ক ব্যাপার ,
ইহা অপেক্ষা মৃত্যুই শ্রেযঃ। যখন মনে মনে এই চিন্তা
করিতেছেন, তখন মোগল পক্ষ হইতে এক দূত আসিয।
তাহাকে বলিল যে, যদি তিনি তৎক্ষণাৎ আনন্দপুর
পবিত্যাগ কবি যান, তবে তাহার কোন অনিষ্ট করা
হইবে না। গােবিন্দসিংহ এই দূতের বাক্য তেমন
বিশ্বাস করিতে পাবিলেন না , তথাপি গত্যন্তর না
দেখি সেস্থান ত্যাগ করিতে স্বীকৃত হইলেন।
পরদিন প্রাতঃকালে যেমন তাহারা আনন্দপুর
ছাড়িয়া কিয়ব গমন করিযাছেন, অমনি সমুদ
মােগল সৈন্য আসিয়া তাহাদিগকে ঘিরিয়া ফেলিল।
শিখগণ এই অচিন্তনীয় বিপদে হতবুদ্ধি হইয়া পড়িল।
তাহারা যে যেদিকে পারিল, পলায়ন করিল। কিন্তু

শিখের বলিদান
অনেকেই মুসলমান সৈ কর্তৃক হত হইল এবং বহু শিখ
শতগর্ভে প্রাণ বিসর্জন করিল।
গুরুগােবিন্দ তাহার বড় দুই পুত্র এবং কয়েকটি
বিশ্বস্ত অনুচর লইয়া রূপর নগরের দিকে প্রস্থান
করিলেন। তঁাহার স্ত্রী কয়েকটি সাহসী শিখের সহিত
দিল্লী নগরে গমন করিলেন এবং গােবিসিংহের
মাতা গুরি, ফতেসিংহ ও জরওয়ারসিংহ নামক দুই
পৌত্র লইয়া তঁাহার ব্রাহ্মণ পাচকের সহিত তাহার
গৃহে গমন করিলেন। কিন্তু যাহার উপর বিশ্বাস
স্থাপন করিয়া তিনি এই অসহায় শিশু দুইটাকে লইয়া
তাহার গৃহে আশ্রয় লইলেন, সেই বিশ্বাসঘাতক কৃতঘ্ন
ব্ৰহ্মণ তাহার মণিমুক্তা আত্মসাৎ করিয়া এই নিরাশ্রয়
শিশুদিগকে তথাকার মুসলমান শাসনকর্তা ওয়াজির
খার হয়ে অর্পণ করে এবং তাহাদের পথের অবলম্বন
স্বরূপ একটি অলঙ্কারেব বা অপহরণ করে।
গুরুগগাবিন্দের উপর ওয়াজির খাব মর্মান্তিক
আক্রোশ ছিল। সহসা ধন লাভে মানুষ যেরূপ উৎফুল্ল
হইয়া উঠে , নির্মম, নির্দয় ওয়াজির খাঁ, গুরুগােবিবে
প্রতি প্রতিহিংসাবৃত্তি চরিতার্থ করিবার উপায় স্বরূপ
এই দুইটা বালককে পাইয়া সেইরূপ আনন্দিত হইলেন।
।
২০

শিখের বলিদান ওয়াজির খাঁ মনে করিলেন যে, “ইহাদিগকে মৃত্যু- দণ্ডে দণ্ডিত কবিব না, কিন্তু ইহাদিগকে মুসলমান করিব । গুরুগােবিন্দের পুত্রকে যদি মুসলমান করিতে পারি, তবে তদ্দারা তাহাকে যে প্রকাব যাতনা দিতে পারিব, সেরূপ আর কিছুতেই হইবে না। আমি গােবিন্দ সিংহকে জানি, তাহার পুত্রের মৃত্যু হইলে তিনি শােক পাইবেন বটে, কিন্তু পুত্ৰ বিধর্মী হইলে তাহার যাতনা অসহনীয় হইবে।” মনে মনে এইরূপ চিন্তা করি ওয়াজির খাঁ বালক দুইটীকে তঁাহার নিকট আহ্বান করিলেন। কয়েক দিনের অনশনে, অযতনে সুকুমার শিশু দু’টি ক্লিষ্ট হইয়া পড়িয়াছিল। তাহাদিগকে শুষ্ক গােলাপ ফুলের ন্যায় দেখাইতেছিল। দুই ভাই যখন দরবার গৃহে পেীছিল, তখন একজন বাজকর্মচারী বলিলেন, “সিংহাসনে নবাব সাহেব বিরাজ- নান, তাঁহাকে সেলাম কব।” জরওযারসিংহ বলিল, “এক অকাল পুরুষ ভিন্ন আর কাহারও নিকট মাথা নামাইতে পারি না।” ওয়াজির খা তাহাদিগকে সম্বােধন করিয়া বলিলেন, “তােমার পিতা বিধর্মী, তাহার কাৰ্য ক্ষমার অযােগ্য,

শিখের বলিদান
কিন্তু তােমরা নির্দোষ শিশু, তােমাদের অবস্থা দেখিয়া
আমাব দযা হইতেছে। তােমরা যদি ইলাম ধৰ্ম্মে
দীক্ষিত হও, তবে তােমাদিগকে মুক্তি দিব এবং তােমা
বয়ঃপ্রাপ্ত হইলে তােমাদিগকে খুব সম্মানের পদ প্রদান
কবিব।”
কিন্তু এই বালক দুইটীব প্রাণে কতখানি তেজ ও
ধর্মবিশ্বাস, হৃদয় কতদূব ধর্মবলে গঠিত, তাহা ওয়াজিব
খার স্বপ্নেরও অগােচব ছিল। তিনি মনে কবিয়াছিলেন,
এই প্রলােভন বাক্যে মুগ্ধ হইয়া বালকগণ নিশ্চয়
অধর্ম ত্যাগ করিবে , এই সুকুমার বাল্যকালে
তাহাদের প্রাণেবমা কখনও ত্যাগ কবিতে পাবিবে
। কিন্তু তিনি ভুল বুঝিয়াছিলেন। যতেসিংহ ও
জবওয়ারসিংহ তাহার বাক্যে ক্ষেপও কবিল না।
পুনরায ওয়াজিব খা কঠোব স্বরে বলিলেন,
“তােমরা কি বাঁচিতে ইচ্ছা কর না? যদি প্রাণ
পাইতে ইচ্ছা কর, তবে এখনি মুসলমান হও, নতুবা
তােমাদিগকে জীবন্ত সমাধি দেওযা হইবে। তাহা
হইলে তােমাদের পিতা যে আমাদের বিরুদ্ধাচরণ
করিতেছেন, তাহার উপযুক্ত শাস্তি ভােগ করিবেন।”
কি, এত বড় কথা! মহাপুরুষ তেগ বাহাদুরের
২২

শিখের বলিদান
পৌত্রদিগকে স্বধৰ্ম্ম হইতে বিচ্যুত করিবার চেষ্টা?
বালকদ্বযের পবিত্র মুখমণ্ডল ধৰ্মাললাকে উদ্ভাসিত হইয়া
উঠিল, অপূৰ্ব তেজে জ্বলিয়া উঠিল। তাহাদের ক্ষুদ্র
হৃদ উদ্বেলিত হইল, মুখে বাক্য সরিল না।
কিয়ৎকাল পরে তাহারা বলিল, “ওয়াজির খাঁ,
তুমি কি জান না যে, আমরা শিখ-বংশােদ্ভব, আমরা
গুরু নানকের বংশধর! আমাদিগকে বালক দেখিয়া
মনে কবিও না যে, আমাদের ধর্মবল নাই। আমরা
গােবিন্দসিংহের পুত্র, মৃত্যুভয়ে আমরা ভীত নই।
তােমার যাহা ইচ্ছা তাহা সম্পন্ন কর , কিন্তু নিশ্চয়
জানিও, আমরা মৃত্যুভযে কখনও ধর্ম ত্যাগ করিব
না। প্রাণের জন্য ধর্ম ত্যাগ করিব? না না, তাহা
অসম্ভব।”
“গত যো উহ ডলে যে সিজন হারখো বিছডিম হােয়ে।
ক্তিমানদে হিরদে বি পরমেশ্বরদ। পিয়ার স্থায়
উন্ননলয় নোত সচ্চ| জনম হয়।”
“জিদ মরণেতে জগ ভরে মেরে মন আনন্দ।
মরণেহী হে পাৰ্থীয়ে পুরণ পরমানন্দ।”
“যে সৃজনকর্তাকে ছাড়িয়াছে, সেই মরণে ডরায়।
যাহার হৃদয়ে ঈশ্বরানুরাগ, তাহার নিকট মৃত্যু সাচ্চা
জন্ম। মরণকে জগতের সকলে ডরায়, কিন্তু আমার

শিখের বলিদান মন মৃত্যুকে দেখিয়া বড় লনন্দিত হইয়াছে। মৃত্যুতেই আমি পরম পূৰ্ণানন্দকে পাইব।” বালকের মুখে একি তেজোময়ী বাণী ? ওয়াজিব খ ক্রোধে দন্ত ঘর্ষণ করিলেন এবং তৎক্ষণাৎ ঘাতক- দিগকে আদেশ করিলেন যে, বালক দুইটাকে একটী দেয়ালের ভিতর গাথিয়া ফেল। ঘাতকগণ বালক দুইটাকে নগরের প্রাচীবের নিকট লইয়া গিযা প্রাচীবেব এক অংশ ভাঙ্গিয়া ফেলিল এবং সেই ভগ্নস্থানে তাহাদিগকে দণ্ডায়মান করাইয়া প্রাচীর পুনবার্য গাঁথিতে আরম্ভ করিল। যখন তাহাদের জানু পর্যন্ত গাঁথা হইয়াছে, তখন ওয়াজির খাঁ পুনরায় তাহাদিগকে সম্বােধন কবি বলিলেন, “হতভাগ্যগণ। এখনও ভাবিয়া দেখ, এক দিকে ধন-সম্পদ ও ইসলাম ধর্মের আশীৰ্বাদ, অন্য দিকে মৃত্যু এবং অভিশাপ। তােমরা কাহাকে আলিঙ্গন করিবে?” গােবিন্দসিংহের পুত্রদ্বয় উত্তর করিল, “দুরাত্মন। তােমাব ন্যায় বর্বর ও নিষ্ঠুর ব্যক্তির ধর্ম গ্রহণ করা অপেক্ষা মৃত্যুই আমরা শ্রেয়ঃ জ্ঞান করি। আমরা আজ যে ধর্মের জন্য আঘােৎসর্গ করিলাম, মনে রাখিও, ৫ ২৪

শিখের বলিদান
সেই ভগ্নস্থানে তাহাদিগকে দণ্ডায়মান করাই।
প্রাচীব পুনরায় গাথিতে আরম্ভ করিল। (২৪ পৃঃ)
শীঘ্রই তাহার ভৈরবনাদে সমগ্র পাঞ্জাব প্রতিধ্বনিত
হইবে। আমরা স্পষ্ট দেখিতেছি, তােমাদের রাজত্ব

f শিখের বলিদান অবসানপ্রায়, তােমাদের অত্যাচারই তােমাদের কাল- স্বরূপ হইবে এবং মুসলমান রক্তে পাঞ্জাবপ্রদেশ শীঘ্রই বিধৌত হইবে।” ওয়াজির খাঁর পাষাণ হৃদয় এই বাক্যে কম্পিত হইয়া উঠিল। তিনি আর সে স্থানে থাকিতে পারি- লেন না। এইরূপে দুইটা নির্দোষ শিশু ধর্মের জন্য আপন জীবন বলিদান করিল। কতব ধৰ্ম্মবল, কত বেশী ধর্মপিপাসা, কত তেজ ও বিশ্বাস দ্বারা হৃদয় গঠিত হইলে, শিশু এইরূপে ধৰ্ম্মের জন্য প্রাণ দিতে পারে ? তাহাদের মৃত্যু সংবাদ যখন পিতামহীব নিকট পৌছিল, তখন তিনি মূচ্ছিতা হইয়া ভূতলে পতিত হইলেন- আব হাব চৈতন্য হইল না।

শিখের বলিদান
মণিসিংহ
৫।
--অমর মবণ রক্ত চরণ
নাচিছে সাগরণে
সময় হয়েছে নিকট
এখন বাধন ছিডিত হবে।
?
পঞ্চ নদীর তীরে
ভক্ত দেহের ৰক্ত নহা
মক্ত হইল কিরে
গত
তিদ্রু এবং যমুনাব, মধ্য প্রদেশ প্রাচীনকালে
মাল্য রাজ্য নামে অভিহিত হইত। মাল্য
বাজ্যের অন্তর্গত কিবােষাল নামক গ্রামে ভিকা নামে
এক কৃষক বাস করিতেন। তাঁহার পাঁচ পুত্র ছিল,
জ্যেষ্ঠেব নাম মণি। ১৪৫ বৎসর পূর্বে এই কিবােয়াল
গ্রাম আহম্মদ সাহ আবদালি কর্তৃক বিনষ্ট হইয়াছে।
গুরুগােবিন্দসিংহ যে সময়ে সর্বপ্রথম ধর্ম প্রচারার্থ
মাল্য প্রদেশে গমন করেন, সে সময়ে বহু লােক তাহার
২৭

শিবের বলিদান উপদেশ শ্রবণ করিতে আসিয়াছিল। এই সকল লােকের সহিত ভিকা তাহার পুত্র মণিকে লইয়া গােবিন্দ- সিংহকে দেখিতে আসিযাছিলেন। কয়েক দিন উপদেশ শ্রবণ করিবার পর ভিকা গৃহে ফিরিতে চাহিলে, মণি পিতার সহিত যাইতে অস্বীকার কবেন। মণিব বয়স তখন দশ বৎসব মাত্র। তঁাহার ধৰ্ম্মবুদ্ধি এখনও বিকসিত হয় নাই। তিনি শুধু বলিলেন, গুরুজির গৃহে যে পাযসায় প্রস্তুত হয়, তাহা আমাদের গৃহেব পাযস অপেক্ষা সুস্বাদু, অতএব আমি গুরুজির নিকটই থাকিব, আর গৃহে যাইব না। ভিকা অগত্যা তাহাকে ফেলিয়াই চলিয়া গেলেন, মনে কবিলেন আব কয়েক দিন পরে সে নিশ্চয়ই গৃহে ফিরিবে। কিন্তু মণি আর গৃহে গেলেন না। গােবিসিহ তাহার উপর বাসন মাজি- বার ভার দিলেন, তিনি আনন্দচিত্তে তাহাই কৰিতে লাগিলেন। গােবিলসিংহ মণির শ্রদ্ধা ও ভক্তি দেখি তাহাকে স্নেহ করিতে লাগিলেন এবং তাঁহাকে সিহ উপাধিতে ভূষিত করিলেন । গুরুগােবিন্দের শিক্ষা ও ধর্মোপদেশ লাভ করিয়া অবশেষে মণিসিংহ একজন পণ্ডিত ও ধাম্মিক ব্যক্তি বলিয়া গণ্য হন। মণিসিংহ চিরকাল অবিবাহিত ২৪

.
শিখের বলিদান
থাকিয়া এরূপভাবে ধর্ম প্রচার করিয়াছিলেন যে,
তাহাতে বহুলােক শিখধর্ম অবলম্বন করিয়াছিল।
তাহার উপদেশ অতিশয় চিত্তাকর্ষক হইত। তাঁহার এই
একটা বিশেষ গুণ ছিল যে, তিনি লোকের হৃদয়
বিশেষরূপে আকর্ষণ করিতে পারিতেন। তিনি সংস্কৃত,
পারসি ও গুরুমুখী ভাষায় পণ্ডিত ছিলেন।
মণিসিংহ শেষ জীবনে অমৃতসরে এক মেলা
বসাইতে ইচ্ছা করেন। তিনি উৎসাহী, মিষ্টভাষী
এবং সদাশয় পুরুষ ছিলেন। এই কারণে হিন্দু ও
মুসলমান, উভয় দলের রাজকর্মচারিগণের সহিত তাহার
সদ্ভাব ছিল। তিনি মেলা স্থাপনের উদ্দেশ্যে লাহােরের
শাসনকর্তার অনুমতি চাহিয়া পাঠাইলেন। শাসনকর্তা
বলিলেন যে, পাঁচ হাজার টাকা দিলে, মেলা বসাইতে
আজ্ঞা দিবেন। মণিসিংহ মনে করিলেন, মেলাতে
বহুলােকের আগমন হইবে, তাহারা যাহা দান করিবে,
তাহা হইতে পাঁচ হাজার টাকা অনায়াসেই দেওয়া
যাইতে পারিবে। তিনি শাসনকর্তার বাক্যে সম্মতি
জানাইয়া সমুদয় শিখকে নিমন্ত্রণ করিয়া পাঠাইলেন।
ক্রমে মেলার দিন নিকটবর্তী হইল, দলে দলে
শিখগণ মেলাভিমুখে আসিতে লাগিল। এদিকে চতুরু

শিখের বলিদান
তাহাকে লাব করিয়| লাহোর নগৰে লইয়া যাওয়া হইল।
। ১১ পৃঃ)
শাসনকর্তা ভাবিলেন, এই সুযােগে যদি শিখদিগের
নেতাদিগকে ধৃত করিতে পারি, তবে আমার আনন্দের

শিখের বলিদান
সীমা থাকিবে না। মনে মনে এইরূপ যুক্তি করিয়া
তিনি এক দল সৈন্য প্রেরণ করিলেন। কিন্তু সৈন্যের
আগমনবার্তা শ্রবণ করিব। শিখেরা পথ হইতে স্ব স্ব
গ্রামে প্রত্যাবর্তন করিল, সুতরাং আর মেলা বসিল না
এবং টাকাও সংগৃহীত হইল না।
টাকা দিবার নির্দিষ্ট দিন অতীত হইলে, লাহােবের
শাসনকর্তা মণিসিংহের নিকট পাঁচ হাজার টাকা চাহিযা
পাঠাইলেন। কিন্তু মণিসিংহ দবি, এত টাকা
কোথায় পাইবেন ? তিনি টাকা দিতে পারিলেন না।
অবশেষে তাহাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করিয়া লাহাের নগবে
লইয়া যাওযা হইল। তিনি বলিলেন যে, মেলা হইতে
টাকা পাইবেন, এই আশা কবিয়া ঐ টাকা দিতে
স্বীকৃত হইয়াছিলেন, কিন্তু বাতকর্মচারীদের দোষে
মেলা হয় নাই, সুতরাং তিনি টাকা দিতে অক্ষম।
কর্মচাবিগণ তাহার কোন কথাই শুনিল না, তাহারা
তাহাকে নানা প্রকাবে নির্যাতিত করিতে লাগিল।
অবশেষে মুসলমান ধর্ম অবলম্বন কবিলে তিনি মুক্তি
পাইবেন, ইহা তাহাকে জানান হইল।
মণিসিংহ মুসলমান হইবেন? আশৈশব যে
ধৰ্ম্ম শত অত্যাচার, শত ক্লেশ সহ করিয়া, পােষণ

শিখের বলিদান
তাঁহাকে শূলে চড়াইয়া দেহের সমুদয় সন্ধিস্থান ছিন্ন করা হইল। (৩৩ পৃঃ)
করিলেন, 'এই বৃদ্ধকালে মৃত্যুভযে তা পরিত্যাগ
করিবেন।

শিখের বলিদান
তিনি জলদগম্ভীর স্বরে শাসনকর্তা ও নিকটস্থ
কয়েকটি শিখকে বলিলেন—“এই দেহ নশ্বর, আজ
অধৰ্ম্ম ত্যাগ করিযা এই দেহ রক্ষা করিলে কল্য
নিশ্চযই ইহা মৃত্যুর কবলে পতিত হইবে। ঘাতকের
তববাবী কি আমার অবিশ্বব আত্মার কোন ক্ষতি
কবিতে পারিবে ?
পরিশেষে তাহাকে শূলে চড়াইয়া দেহের সমুদয়
সন্ধিস্থান ছিন্ন করা হইল। এই মহাপুরুষ আদি
গ্রন্থে উপদেশ আবৃত্তি করিতে করিতে অনন্তধামে
গমন করিলেন।

শিখের বলিদান E- হকিকত। অন্ধ বিপথ ছাড, দেবে মার কশাল। কাছে সন ৮ পটা এবার যাত্রী তোমাৰ পলি- সলমান বাজত্বের সময় ভারতে পারসীক ভাষা রাজভাষা ছিল। রাজকাৰ্য্য লাভ কবিতে হইলে বর্তমান সময়ে যেরূপ ইংরাজী ভাষায় অভিজ্ঞ হওয়া প্রয়ােজন, সে সময়ে সেইরূপ প্রত্যেকের পারসীক ভাষা শিক্ষা করিতে হইত। ইহার উপর যদি কেহ আরবী ভাষায় বুৎপন্ন হইতেন, তবে বাজ- পুরুষগণ তাহাকে অত্যন্ত সম্মান করিতেন। এই সকল কারণে সে সময়ে প্রত্যেক হিন্দু ও মুসলমান বালককে, মুসলমান শিক্ষকের অধীনে রাখিয়া বিদ্যা- শিক্ষা দেওয়া হইত। ৩৪ শিখের বলিদান ১৮০৯ খৃষ্টাব্দে শিয়ালকোট সহরে এইরূপ এক মুসলমান বিদ্যালযে হকিকত নামক সপ্তমবর্ষীয় এক শিখবালক অধ্যয়ন করিতেন। হকিকত অত্যন্ত মনাে- যােগের সহিত সপ্তদশ বর্ষ পর্যন্ত এই বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। এই সময়ে একদিন শিক্ষকের অনুপ- স্থিতিকালে কয়েকটি মুসলমান ছাত্র হকিকতের সহিত অসদ্ব্যবহার এবং তাহার ধর্মের প্রতি বিদ্রুপ করে। হকিকত স্বধর্মের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন সহ করিতে না পাবি যুক্তিযুক্তভাবে তাহাদের সহিত তর্ক করেন। শিক্ষক পুনবায বিদ্যালয়ে উপস্থিত হইলে মুসলমান বালকগণ তাহাকে বলে যে, হকিকত মুসলমান ধর্মের নিন্দা করিযাছে। শিক্ষক অতিশয় ক্রোধান্বিত হইয়া হকি- কতকে বলিলেন, “তুমি কি মুসলমান ধর্মের নিন্দা কবিছ ?” হকিকত কিছুমাত্র ভীত না হইয়া বলিলেন, “হাঁ, আমি নিন্দা করিয়াছি, কিন্তু উহারাই সর্বপ্রথমে আমি যে এক পৰমেশ্বরের পূজা করি, তঁাহার অবমাননা করে, সুতং আমি সহ্য করিতে না পারিয়া ঐরূপ বলিয়াছি।”

শিখের বলিদান
শক্ষক চীৎকার করিযা বলিযা উঠিলেন, “কাফের,
তােমাকে ইহার ফলভােগ করিতে হইবে।”
তিনি এই ঘটনা নগরের কাজির নিকট প্রকাশ
করেন। কাজি অতিশয় দুর্দান্ত ও নিষ্ঠুর ছিলেন, তিনি
তৎক্ষণাৎ হকিকতকে কারাগারে আবদ্ধ করিলেন।
শিয়ালকোটের শাসনকর্তা আমির বেগ, অতিশয়
দলু ও বুদ্ধিমান ব্যক্তি ছিলেন। তিনি হকিকতকে
উদ্ধার করিতে চেষ্টা করেন, কিন্তু কিছুতেই কোন
ফল হইল না। কাজি এবং বহু আইনজ্ঞ মুসলমানের
বিচারানুসারে হকিকতের প্রাণদণ্ডের আদেশ হইল।
কিন্তু তাহাকে একথাও জানান হইল যে, যদি তিনি
মুসলমান ধৰ্ম্ম অবলম্বন কবে, তবে তাঁহাকে মুক্তি
দেওয়া হইবে। কিন্তু হকিকত মুসলমান হইতে
সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করিলেন।
হকিকতের মেহণীল পিতা মাতা হকিকতের এই
প্রাণদণ্ডাজ্ঞা শ্রবণ কবিয়া একেবাবে আকুল হইয়া
পড়িলেন। তাঁহাদের একমাত্র সন্তান, যাহার উপর
তাঁহাদেব সকল বল, ভবসা, আশা, গৌরব ব্যস্ত,
তাহাকে এইরূপ নির্দযভাবে হত্যা করা হইবে? আহা,
এ যাতনা যে অসহনীয়। হকিকতের পরিবর্তে যদি

শিখের বলিদান
তাঁহাদেব প্রাণ লইয়া তাহাকে মুক্তি দেওয়া হয়,
তাহাতেও তাহারা প্রস্তুত।
মাতা, কাজিব পদযুগল ধারণ করিয়া অনেক অনুনয়
বিনয় করিলেন, কাজিকে সৰ্বষ দান কবিতে চাহিলেন,
কিছুতেই তাহার পাষাণ হৃদয় গলাইতে পারিলেন
। অবশেষে নিরুপায় হইযা অভাগিনী মাতা
হকিকতের নিকট আসিলেন।
মাতা পুত্রকে বলিলেন, “বৎস! তুমি কেন এইরূপে
মৃত্যু আলিঙ্গন করিতেছ? মুসলমান হও, মুসলমান
হইলেও তুমি ত চিরকালই মাতার আনন্দদায়ক ও
গৌরবম্বরূপ হইয়া থাকিবে। বাছা, আমাকে ছাড়িয়া
যাইও না, তুমি ব্যতীত আর আমার কেহ নাই।”
হকিকত অপূর্ণলােচনে বলিলেন, “না, মা, আমি
অবিশ্বাসী কখন হইব না, আমি শিখবংশকে কখনও
হীন করিব না, ধৰ্ম্মত্যাগ অপেক্ষা মৃত্যুই শ্রেয়ঃ জ্ঞান
কবি। তুমি আমার শরীরের বিষয় ভাবিও না, কিসে
আমার অমব আত্মার মঙ্গল হইবে, তাহাই চিন্তা কর।”
হকিকতেব মাতা মূচ্ছিত হইয়া পড়িলেন।
হকিকতের পিতা বা মল ও বহু হিন্দু দর্শক
হকিকতের প্রাণবক্ষা করিবার জন্য শাসনকর্তা আমি

শিখের বলিদান
মাতা কাজির পদযুগল ধারণ কবিয়া অনেক অনুনয় বিনয় কন্নিশন। (৩৭ পৃঃ)
বেগকে অনুরােধ করিলেন, কিন্তু আমির বেগ, বহু
চেষ্টা করিয়া তাহাকে রক্ষা করিতে পারিলেন না।

শিখের বলিদান
তিনি হকিকতকে মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করিতে
বলিলেন, কিন্তু হকিকত বলিলেন, “না, তােমাদের
যা ইচ্ছা তাই কর, আমি ধর্ম ত্যাগ করিব না।”
অবশেষে ঘাতকের তরবারীর আঘাতে তাহার
মস্তক ছিন্ন হইল।
যে ভগবানের জন্য তিনি প্রাণ
উৎসর্গ করিলেন, অমর আত্মা তাহারই সহিত মিলিত
হইল।

শিখের বলিদান
Se@
তরুসিংহ।
-লক্ষ বক্ষ চিরে
নাক ঝাকে প্রাণ পক্ষা সমান
চুট যেন নিজ নাড়ে-
সুমা
T
সলমান বাজতের অবনতির সময় যখন ভারতবর্ষ
বৈদেশিক আক্রমণে ব্যতিব্যস্ত হইয়া উঠিয়া-
ছিল, তখন ভারতের উত্তর-পশ্চিমভাগে শিখসি হগণ,
মধ্যভাগে জাঠগণ এবং দক্ষিণভাগে মহাবাষ্ট্ৰিযগণ
অতিশয পরাক্রমশালী হইয়া উঠিযাছিল। বৈদেশিক
আক্রমণকারিগণ এতদূর ক্ষমতাশালী ছিল যে, সমগ্র
মােগল-সাম্রাজ্য তাহাদের ভয়ে অতিশয় ভীত হইযা
পডিয়াছিল। এই সুযােগে জাঠগণ তাহাদের রাজা-
দিগের সহায়তায় এবং মহারাষ্ট্রিযগণ দুর্গম পৰ্বতে
আশ্রয় লইযা মােগল-সাম্রাজ্য লুণ্ঠন করিত এবং
সাধ্যমত মােগল-গৌৰব খর্ব কবিতে কুণ্ঠিত হইত না।
৪

শিখের বলিদান শিখদিগের কোন সৈন্যসামন্ত অথবা দুর্গম দুর্গ ছিল না। সুতরাং তাহারা মােগলদিগের বিরুদ্ধাচরণ কবিতে সাহসী হয় নাই। মােগল-সম্রাট মহারাষ্ট্রীয় ও জাঠদিগকে দমন কবিতে অক্ষম হইয়া এই নিরীহ, শান্ত, শিখদিগের উপর অত্যাচার করিতে আরম্ভ কৰিলেন এবং তাহাদিগকে সমূলে উৎপাটন কবিতে কৃতসঙ্কল্প হইলেন। বান্দার অনুচরবর্গের সহিত গােবিন্দসিংহের শিষ্য- গণেৰ তত সদ্ভাব ছিল না। বান্দা যখন মােগল- সম্রাটের বিরুদ্ধাচরণ কবি কৃতকার্য হইয়াছিলেন, প্রথমে কিছুকাল তাহার উপরই সম্রাটের অতিশয় বিদ্বেষ ছিল, তৎপরে বান্দাকে হত্যা করা পর, গােবিন্দের শিষদিগের উপর তাহার ক্রোধাগ্নি প্রজ্জ্বলিত হইল। উনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে খাঁ জাহান নামে এক ব্যক্তি লাহােরের শাসনকর্তা ছিলেন। তিনি, তঁাহার এলাকাব মধ্যে ঘােষণা কবিলেন যে, প্রত্যেক গ্রামের চৌকিদার যেন কোন সিংহকে তাহার গ্রামে বাস কবিতে না দেয় এবং যদি কোন গ্রামে তাহাদিগকে দেখিতে পাওয়া যায়, তবে তৎক্ষণাৎ যেন তাহাদিগকে তখন ৪

শিখের বলিদান
শাসনকর্তার সম্মুখে উপস্থিত করা হয়। তিনি আরও
ঘােষণা করিলেন যে, যে কেহ কোন সিংহের মাথা
লইযা আসিতে পারিবে, তাহাকেই পুৰস্কার প্রদান
করা হইবে। তিনি সিংহদিগেব বন্ধুবর্গের কার্যা-
কলাপের প্রতিও দৃষ্টি রাখিবার জন্য গুপ্তচব নিযুক্ত
করিলেন।
এইরূপে গােবিন্দসিংহেব ধ্বংসেব পথ পরিষ্কার
করা হইল। ইহার ফলে বহু তবলমতি, অল্পবিশ্বাস
সিংহ ধৰ্মত্যাগ করিল এবং নির্ভীক, বিশ্বাসী শিখগণ
দেশ হইতে পলায়ন কবি বনে জঙ্গলে আশ্রয় লইলেন
এবং অনেকে ধম্মের জন্য আপন প্রাণ বলি দিলেন।
যে বিশ্বাসী তেজষা শিখগণ বনে আশ্রয় লইযা-
ছিলেন, তাহারা একটি দল গঠন করেন, তাহ। পান্থ
নামে অভিহিত হইত।
এই অসহায় ও নিবাশ্রয় দল
খাদ্যদিব অভাবে অতিশয কেশ পাইতেন। এই জন্য
অন্যান্য সিংহগণ তাহাদিগকে সাহায্য করিতেন। এই
পান্থদল গুরুপদের উত্তরাধিকারীরূপে বিবেচিত হইতেন,
সুতরাং সমুদায় শিখজাতি তাহাদিগকে সম্মান করিতেন।
ভাই তরুসিংহ তাহার বিধবা মাতা ও কুমারী
ভগ্নীর সহিত পাঞ্জাবের এক ক্ষুদ্র গ্রামে বাস করিতে।
৪

শিখের বলিদান
শিখদিগের এই দুর্দিনের সময় তাহার বয়স পঞ্চবিংশ
বর্ষ ছিল। তিনি চাষ কবিয়া যাহা পাইতেন, তাহা
নিজেব ব্যবহারে না লাগাইয়া পবসেবায় অর্পণ
করিতেন।
তঁাহার মাতা ও ভগিনী গ্রামের সম্পন্ন, গৃহে ধান
ভানি যাহা পাইতেন, তাহাতেই অতি কষ্টে তাহাদের
সসা ত্রা নির্বাহ হইত। কিন্তু সাংসারিক অবস্থা
এরূপ হীন হইলে কি হয়, তাহাদের হৃদয়, মন ঐশ্বরিক
ধনসম্পদে পূর্ণ ছিল। এমন দিন যাইত না, যেদিন
তাঁহারা গুরুর উপদেশ না শুনিতেন অথবা কোন
ধর্মগ্রন্থ পাঠ না করিতেন।
তৰুসিংহের হৃদয় পবিত্র, বদনমণ্ডল সবলতা ও
পবিত্রতার সুষমায পূর্ণ ও চরিত্র নির্মল ছিল। তাহার
অত্যাচাব ও উপদ্রব অগ্রাহ্য করিবার তেজ ছিল এবং
তিনি ধৰ্ম্মে গভীর বিশ্বাসী ছিলেন।
একদিন কোন ব্যক্তি লাহােরের শাসনকর্তার নিকট
সংবাদ দিল যে, তরুসিংহ পান্থদিগকে খাদ্য ও পাশ্য
দ্বারা সাহায্য করিতেছেন। লাহােরের শাসনকর্তা
তৎক্ষণাৎ তাহাকে ধৃত করিতে কয়েকজন সিপাহী
প্রেরণ করিলেন। যখন তাহারা তরুসিংহের গৃহৈ গমন
০
৪৩

শিখের বলিদান
করিল, তখন তিনি আপনি আসিয়া আত্মসমর্পণ
করিলেন। সিপাহিগণ যখন তঁহাকে ধরিয়া লইয়া
যাইতেছিল, তখন পথিমধ্যে কয়েকজন শিখ তাহাকে
তাহাদেব হস্ত হইতে উদ্ধার করিবার সংকল্প করিয়া-
ছিল।
তকসিংহ ইহা শ্রবণ করিয়া তাহাদিগকে বলিলেন,
“যদিও এখন তােমরা আমাকে ইহাদের হস্ত হইতে
উদ্ধার কবিতে সক্ষম হও, তথাপি ইহাব পরে নিশ্চয়ই
অসংখ্য মুসলমান সৈন্ত আসিয। এই গ্রাম ছাইয়া
ফেলিবে এবং আমাদের সর্বনাশ কবিবে। ভ্রাতৃগণ !
যাও, গৃহে ফিরিয়া যাও, আমাকে মুক্ত করিবাব
প্রয়ােজন নাই, আমি আমার নির্দোষিতার উপর
বিশ্বাস কবি এবং আশা করি যে, শাসনকর্তা আমাকে
মুক্তি দিবেন। আর যদি আমি মুক্তি না পাই, তবুও
অসংখ্য লােকের জীবন নাশ করিয়া আমি বাঁচিতে চাহি
, চিৰদিনের জন্য আমি এ পৃথিবীতে আসি নাই।
ঋষি, মুনি, মহাপুরুষগণ সকলেই এই নশ্বৰ দেহ ত্যাগ
করিয়া গিয়াছেন, আমিও একদিন ইহা ত্যাগ করিব।
ভাবিয়া দেখ, আমাদের গুরুগণ এই ধর্মের জন্য কতই
ক্লেশ সঙ্ক কবিয়াছেন ? ঘাতক কর্তৃক তাহাদের
88

শিখের বলিদান
সন্তানগণের হত্যা পর্যন্ত তাঁহাদিগকে দর্শন করিতে
হইয়াছে। তাহাদের দৃষ্টান্ত দেখিয়া আমরা যদি
বিশ্বাসীর ন্যায় কার্য করিতে না পারি, তবে অত্যন্ত
পরিতাপের বিষয় হইবে।”
তরুসিহের এইরূপ প্রাণস্পশী উপদেশ শ্রবণ
করিয়া সমাগত শিখগণ বলিয়া উঠিল, “ভাই তরুসিংহ,
ঈশ্বর তােমাকে আশীর্বাদ করুন, আমরা তােমার
উপদেশই শিরােধার্য্য করিলাম।” এই বলিয়া তাহারা
গৃহে প্রত্যাগমন করিল।
তরুসিংহকে লাহােরের কারাগারে বন্দী করা
হইল। পবদিন প্রভাতে যখন তাঁহাকে রাজদরবারে
উপস্থিত করা হইল, তখন তিনি দরবার গৃহে প্রবেশমাত্র
ভৈরবনাদে বলিয়া উঠিলেন, “শ্রীব গুরুজিকি খাসা,
বা গুরুজিকি ফতে।”
দববার গৃহ কম্পিত হইয়া
উঠিল। শাসনকর্তা
রােষবষাযিলােচনে তরুসিংহের প্রতি দৃষ্টিপাত
করিলেন এবং তাহাকে কি বলিতে যাইতেছিলেন,
কিন্তু তরুসিংহ তাহাকে নিবৃত্ত করিয়া বলিলেন, “আমি
তােমার কি ক্ষতি করিযাছি যে আমার এইরূপ অবস্থা
করিলে ? আমি দবিদ্র, চাষ-বাস করিয়া কোনরূপে
৪৫

শিখের বলিদান দিনাতিপাত করি, নিয়মমত গবর্ণমেন্টের খাজানা প্রদান করি এবং যে টাকা উদ্বৃত্ত থাকে, তাহা ধর্মের জন্য দান ২ কবিয়া থাকি। আমার প্রতি অত্যাচার করিয়া তুমি পাপ সঞ্চয় করিও না। সকল ধর্মই বলে, যে বাজা অন্যায় কাৰ্য্য কৰে, নবকই তাহাব উপযুক্ত স্থান।” তরুসিংহের এইরূপ তেজপূর্ণ বাকো শাসনকর্তা জ্বলিয়া উঠিলেন এবং তাহাকে শূলে চড়াইয়া অশেষ- রূপে যাতনা দিতে লাগিলেন। তাহাব দেহ ক্ষত- বিক্ষত হইল, সৰ্বাঙ্গ রুধিবধাবায় প্লাবিত হইয়া গেল। তথাপি একটিও যাতনাব্যঞ্জক শব্দ তাহার মুখ হইতে নির্গত হইল না। তাহার মুখে প্রফুল্লতা ফুটিয়া উঠিল। তিনি ক্রমাগত একমাত্র নিত্যনিরঞ্জন অকাল পুরুষেব নামােচ্চারণ করিতে লাগিলেন। দুই ঘণ্টা ধরিয়া তাঁহাকে অসহনীয় যাতনা দেওয়া হইল, অবশেষে ঘাতকগণ ক্লান্ত হইয়া পড়িলে তাঁহাকে কারাগারে লইয়া যাওয়া হইল। পরদিন প্রভাতে তিনি পুনরায় রাজবাবে নীত হইলেন। শাসনকর্তা তরুসিংহের অসামান্য সহিষ্ণুতা দেখিয়া আশ্চর্যান্বিত হইলেন। তিনি ভাবিলেন যে, এইরূপ ব্যক্তিকে যদি মুসলমান করিতে পারি, তবে ৪৬

শিধের বলিদান
সে মুসলমানদিগের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হইবে। ইহাকে
আব যাতনা না দিয়া, প্রলােভন দেখাইয়া কাৰ্যসিদ্ধির
চেষ্টা দেখি।
তিনি তরুসিংহকে বলিলেন, “দেখ, তরুসিংহ,
তুমি যদি ইসলাম ধর্ম অবলম্বন কর, তাহা হইলে এ
সকল যন্ত্রণা আর সহ্য কবিতে হইবে না।”
তরুসিংহ উত্তর কবিলেন, “কি। বিশ্বাসঘাতক
হইয়া জীবন রক্ষা করিব? না, তাহা হইবে না, আমার
মস্তক দিয়া এই বেণী ও * ধৰ্ম্ম রক্ষা করিব।”
শাসনকর্তা পুনরায় বলিলেন, “দেখ, তােমার ধর্ম
তােমাকে কত যাতনা দিতেছে। ধর্ম তােমাকে সুখ
দিতে পারে নাই, উপরন্তু দারিদ্র্য, নানা প্রকার ক্লেশ
ও চিন্তা দ্বারা তােমাকে জর্জরিত করিয়াছে। ভাবিয়া
দেখ, মুসলমান হইলে তুমি কত সুখে থাকিবে, দেশে
মধ্যে তুমি একজন ধনী ও মানী বলিয়া গণ্য হইবে।
তােমাকে এত ধন সম্পত্তি প্রদান করিব যে, তদ্দারা
তুমি তােমার যৌবনকাল বিলাসে কাটাইতে পারিবে
এবং বৃদ্ধাবস্থাও তােমার সুখে যাইবে।”
{
* শিশগণ বেণীক্ষা ধর্মের এক অঙ্গ বলিয়া বিবেচনা করেন।
৪৭

শিখের বলিদান
তাহার হস্ত পদ রায় দৃঢ়রূপে একটা চক্ৰেৰ সহি বাধিয় গতকগিকে
তাহ। দুবাইতে আশ করিলেন। (০৯ পৃঃ)
তরুসিংহ বলিলেন, “না, আমি কখনও স্বধর্মত্যাগী
হইব না, আমি কখনও তুর্ক হইব না।”
৪৮

শিখের বলিদান শাসনকর্তা ইহাতে অতিশয় ক্রোধান্বিত হইয়া তঁাহার হস্তপদ রদ্বারা দৃঢ়রূপে একটা চক্রের সহিত বাঁধিয়া, ঘাতকদিগকে তাহা ঘুরাইতে আদেশ করিলেন। তরুসিংহের দেহ নিষ্পেষিত হইয়া যাইতে লাগিল, তথাপি তিনি একটি দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিলেন না, বরং শারীরিক যাতনা তাহার ধর্মোৎসাহ দ্বিগুণ বর্ধিত করিল। তাঁহার অভূতপূর্ব সহিষ্ণুতা, প্রাণস্পর্শী ধর্মবিশ্বাস দেখিয়া শাসনকর্তা, ঘাতকগণ ও দর্শক- মণ্ডলী বিম্ময়াপ্লুত হইল। কোন্ বলে বলীয়ান্ হইয়া তিনি এই অসম্ভব ক্লেশ সহ্য করিতেছেন, তাহা শাসনকর্তার বােধগম্য হইল | কাহার মুখ দেখিয়া তরুসিংহ এত যাতনার মধ্যেও অটল রহিয়াছেন? তিনি কে? যিনি এরূপ অসহনীয় ক্লেশের মধ্যেও এত আনন্দ দিতেছেন ও নব- বলের সঞ্চার করিতেছেন? তিনি সেই সর্বশক্তিমান্ মহান্ পরমেশ্বর, যাহার প্রকাশে মানব-হৃদয় আনন্দে পরিপূর্ণ হইয়া উঠে, মানব দেবত্ব লাভ করে এবং অসীম ক্ষমতাশালী হয়। তিনিই তরুসিংহকে পাৰিক দুঃখ, কষ্টের অতীত করিলেন। ৪৯

শিখের বলিদান
আমি বেণ ও মত এই তোমাকে দান করিব। ৫১ পূ.)
তাহাকে চক্র হইতে নামান হইল। শাসনকর্তা
পুনরায় বলিলেন, “তরুসিংহ, শিখধর্ম ত্যাগ কর,

শিখের বলিদান
ইসলামধর্ম লও, নতুবা ,তােমার বেণী কর্তন করা
হইবে।”
তরুসিংহ উত্তর করিলেন, “ভাল, তাহাই হইবে,
কিন্তু আমি বেণী ও মস্তক একত্রেই তােমাকে দান
কবিব।”
অতঃপর তাহাকে পুনরায যন্ত্রণা দেওয়া হইতে
লাগিল, কিন্তু ভক্ত বীরের চক্ষু হইতে এক ফোটা
অশ্রুও নির্গত হইল না। সাধুর এইরূপ অবস্থা দেখিয়া
শাসনকর্তা ও সমুদয লােক অতিশয় ভীত হইয়া পড়িল
এবং অর্ধমৃত তরুসিংহকে শিখদিগের হতে অর্পণ
করিয়া সে স্থান হইতে পলায়ন করিল। শিখগণ
তরুসিংহকে এক ধৰ্ম্মশালায় লইয়া গিয়া সেবা-শুশ্রুষা
করিলেন। তথায় কযেকদিন জীবন্মত্যুর সন্ধিস্থলে
থাকিয়া ভাই তকসিংহ অমবলােকে অমরদিগের সহিত
মিলিত হইলেন।

শিখের বলিদান সুবেগসিংহ -আগুন মােদর খেলার জিনিষ, দুধ মােয়দের পায়ের দাম লাহার হাের নিবাসী ভাই সুবেগসিংহ জাতিতে জাঠ ছিলেন। তাঁহার পূর্বপুরুষগণ সম্ভ্রান্ত লােক ছিলেন এবং তাঁহারা রাজকার্য দ্বারা জীবিকানির্বাহ করিতেন। তিনি যৌবনে লাহােরের শাসনকর্তার পারিষদবর্গের মধ্যে পরিগণিত এবং বিংশতি গ্রামের শাসনকর্তা হইয়াছিলেন। তিনি পারসী ভাষা সুন্দর- রূপে জানিতেন এবং নিজের অধ্যবসায়ে গুরুমুখী ভাষা শিক্ষা করিয়াছিলেন। এই দুই ভাষায় জ্ঞান থাকায় তাহার অত্যন্ত উপকার হইয়াছিল। শিখধৰ্ম সম্বন্ধে যখনই কোন বাদবিসম্বাদ উপস্থিত হইত, তখনই মুসলমান কর্মচারিগণ তাঁহার পরামর্শ লইতেন। .

শিবের বলিদান
দিল্লীর তদানীন্তন সম্রাট মহম্মদ সাহ, শিখধর্মের
প্রতি এই অনুগ্রহ প্রকাশ করিয়া, ভাই সুবেগসিংহের
মৰ্যাদা অধিকতর বৃদ্ধি করিয়াছিলেন। সুবেগসিংহের
সবজসিংহ নামে এক পুত্র ছিল। তিনি সবজসিংহকে
পারসী ও আরবী ভাষায় উচ্চ শিক্ষা দিয়াছিলেন এবং
গুরুমুখী ভাষায়ও তাহার অধিকার জন্মিয়াছিল।'
সবজসিংহের পাঠ্যাবস্থার শেষকালে, অষ্টাদশ বর্ষ
বয়সের সময় একদিন তাহার সহিত তাহার শিক্ষকের
ধৰ্ম্ম সম্বন্ধে তর্ক হয়। সে সময় হিন্দু ও মুসলমানের
মধ্যে ভয়ঙ্কর শত্রুতা ছিল, প্রত্যেক হিন্দু প্রত্যেক
মুসলমানকে তাহার শত্রু মনে করিত এবং প্রত্যেক
মুসলমান প্রত্যেক হিন্দুর প্রতি তদ্রুপ বিদেষভাব
পােষণ করিত।
ইহার পূর্ব শতাব্দীতে আওরঙ্গজেব ও তাঁহার
উত্তরাধিকারিগণ হিন্দুদিগের উপর অতিশয় অত্যাচার
করিতেন এবং শিখগণও মুসলমানদিগকে নানা প্রকারে
ব্যতিব্যস্ত করিয়া ফেলিতেন। এই সময়ে মােগল
সাম্রাজ্য দুর্বল হইয়া পড়ে এবং প্রায় প্রত্যেক প্রদেশে
বহু ক্ষমতাশালী ব্যক্তি ও দুর্দান্ত দম্য শাসনকর্তাদিগের
বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হয়।

শিবের বলিদান সুতরাং এইরূপ গােযােগের সময় ধর্ম সম্বন্ধে তর্ক হওয়া স্বাভাবিক। দুর্ভাগ্যবশতঃ শিক্ষক এবং ছাত্রের মধ্যে কয়েকটি অসম্ভাবের কথা হয়, তাহাতে শিক্ষক ক্রোধান্বিত হইযা এই কথা তথাকার শাসন- কর্তার নিকট জ্ঞাপন করেন। ইহাতে সুবেগসিংহ ও তাঁহার পুত্র উভযে ধৃত হইযা বিচারার্থ রাজদরবারে নীত হন। দরবারে উপস্থিত হইলে তাঁহাদিগকে বলা হইল যে, ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হইলে তাহাদিগকে ছাড়িয়া দেওয়া হইবে । 'সুবেগসিংহ বলিলেন, “তােমাদেব দণ্ডাজ্ঞা হউক, এই কাল ধন্য হউক, তােমাদেব চক্রযন্ত্র ধন্য হউক এবং আমাদের এই শরীব যাহা ধর্মের জন্য ক্ষয় হইবে, তাহাও ধষ্ণ হউক। মুসলমান হইলে যদি আমরা মৃত্যুর হাত হইতে রক্ষা পাইতাম, তাহা হইলে তাহা এক প্রকার ভাল বটে, কিন্তু মুসলমান হইলেও ত একদিন মৃত্যুব কবলে পডিতে হইবে, তবে ধর্ম ত্যাগ করিয়া কেন বৃথা অন্যায়রূপে জীবন বক্ষা করিব?” শাসনকর্তা বহু শিখকে ধর্মের জন্য মরিতে দেখিয়া- ছেন, কিন্তু সুবেগসিংহের ন্যায় মুসলমান শাস্ত্রাভিজ্ঞ ৫৪

শিখের বলিদান
ব্যক্তির মুখে মুসলমান ধর্মের বিরুদ্ধে এইরূপ বাক্য
শ্রবণ করিয়া তিনি হতবুদ্ধি হইয়া পড়িলেন। তিনি
মনে করিতেন যে, মূখ ও শাস্ত্রে অনভিজ্ঞ ব্যক্তিগণই
মুসলমান ধর্মের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে , কিন্তু
সুবেগসিংহ যে এইরূপ উত্তর দিবেন, তাই তিনি একে-
বারেই মনে করেন নাই।
শাসনকর্তা সমুদয় শিখ জাতিকে বিনষ্ট করিতে
কতস-কল্প হইলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ ঘাতকদিগকে
ডাকিয়া পাঠাইলেন এবং সুবেগসিংহ ও সবজসিংহকে
চক্রযন্ত্রে আবােহণ করাইযা অশেষরূপে যন্ত্রণা দিতে
আদেশ করিলেন। তঁাহাবা উভয়েই “অকাল অকাল”
উচ্চারণ করিতে লাগিলেন। এক ঘণ্টা যাতনা দেওয়ার
পর তাহাদিগকে কিছুকালের জন্য বিশ্রাম করিতে
দেওয়া হইল। পুনরায় তাহাদিগকে নানারূপ প্রলাে-
ভন দেখান হইল, কিন্তু কিছুতেই তাঁহাদেব ধর্মবিশ্বাস
টলিল না।
তৎপরে শাসনকর্তা সবজসিংহকে সম্বােধন করিয়া
বলিলেন, “বালক, তােমার পিতার বৃদ্ধাবস্থা, তিনি
জীবনের সমস্ত আনন্দ উপভােগ , করিয়াছেন।
সুতরাং তিনি এখন জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হইয়া

শিখের বলিদান মরিতে ইচ্ছুক হইতে পােরন; কিন্তু তােমার এই অল্প বয়স, তুমি এখন পৃথিবীর আনন্দ কিছুই সম্ভোগ কর নাই, তুমি কেন মৃত্যুকে আলিঙ্গন করিবে? মুসলমান হইলে তােমার জীবন রক্ষা পাইবে ও নানা প্রকার সুখ সুবিধা ভােগ করিবে।” সবজসিংহ উত্তর করিলেন, “আমি ধৰ্মত্যাগ করিব না।” এই কথা শ্রবণ করিয়া শাসনকর্তা তাহাকে এক শুন্তে বাঁধিয়া চাবুক মারিতে এবং অত্যন্ত তপ্ত লৌহ- দ্বারা তাঁহার সর্বাঙ্গ পুড়াইয়া দিতে আদেশ করিলেন। তৎক্ষণাৎ আদেশ প্রতিপালিত হইল। তিনি যাতনায় কাতর হইয়া চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিলেন, “আমাকে মুক্ত কর, আমাকে মুক্ত কর , আমি মুসলমান হইব।” শাসনকর্তা বালকের এই বাক্যে আদিত হইয়া সুবেগসিংহকে আহবান করিলেন এবং পুত্রের মত পরিবর্তনের কথা তাহাকে বলিলেন। ধর্মের জ্যোতিতে উচ্ছসিত পিতার মুখমণ্ডল দর্শন করিয়া সবজসিংহের মৃত্যুভয় দূর হইল।

শিখের বলিদান
ও?
শাসনকর্তা তাহাকে এক সুতে বাঁধিয়া চাবুক মানিতে এবং অতান্ত
ও লােহার। তাহার সর্বাঙ্গ পুড়াইয়া দিতে আদেশ করিলেন। (৫৬ পৃঃ)
সুবেগসংহ তাহাকে বলিলেন, “পুত্র, কাহারও দেহ
চিরকাল বর্তমান থাকে না এবং থাকিবেও না, তুমি
৫৭

. শিখের বলিদান মৃত্যুভয়ে ভীত হইও না, কেন না আত্মা অমর। যাহার। দেহ অপেক্ষা ধর্মকে মূল্যবান জ্ঞান করেন, তাঁহারাই অমর হন। দেখ, প্রাদ, মনিসিংহ, হরিচাদ প্রভৃতি সাধুগণ ধর্মের জন্য কত স্বার্থত্যাগ, এমন কি আত্মােৎ- সর্গ কবিয়াছিলেন। ধর্মই ইহাদিগকে জগতের শ্রদ্ধাব পাত্র এবং পরলােকে সম্মতি প্রদান করিয়াছেন।” শাসনকর্তা প্রথমতঃ সুবেগসিংহের এই সকল বাক্য নীরবে শ্রবণ করিতেছিলেন, কিন্তু যখন দেখিলেন যে, তঁাহার বাক্য সবজসিংহে হৃদয়ে বিদ্ধ হইতেছে, তখন তিনি সুবেগসিংহকে পুত্রের সহিহ বাক্যালাপ কবিতে নিষেধ করিলেন। আবেগসিংহ নীরব হইলে সবজসিংহ শাসনকর্তাকে বলিলেন, “আমি নির্বোধ তাই তােমাদ্বাৰা প্ৰতাৰিত হইযাছি, আমার জীবন লও, আমি ধৰ্ম্মকে ধবিয়া থাকিব।” পুনবায তাহাদিগকে যন্ত্রণা দেওয়া হইল এব অর্ধমৃতাবস্থায় তাহাদিগকে কাবাগৃহে লইয়া যাওয়া হইল। সেই দিনই কাবাগাবে সবজসিংহের মৃত্যু হয় এবং সুবেগসিংহ কযেকদিন অতিশয় ক্লেশে অতিবাহিত করিয়া অবশেষে মুক্তি পান। ০ ৫৮ শিখের বলিদান ধৰ্ম্ম রক্ষার জন্য শিখ জাতিব জীবন বিসর্জনের অপূৰ্ব্ব কাহিনী ভারতের অতীত ইতিহাসের গৌরবের বস্তু। পঞ্চ নদীর তীরে শিখগণ এক সময়ে যে জীবন্ত বিশ্বাসের দৃষ্টান্ত দেখাইয়া গিয়াছেন, তাহাতে ভারত- ভূমি ধন্য হইয়াছে। ধর্মের অপূৰ্ব্ব বলে বলী হইয়া তাহাবা অসীম ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদিগকে সামান্য তৃণবৎ জ্ঞান কবিতেন। তাঁহারা ধর্মের তেজ ও জ্যোতিতে পবিপূর্ণ ছিলেন। যাহা জগতের অধীশ্বরের পূজা করেন, তাহারা পৃথিবীর ভয়ে কখনও বিশ্বাস ত্যাগ কবিতে পারেন না। – সম্পূর্ণ

গ্রন্থকত্রীর প্রণীত অন্যান্য পুস্তক
জাহাঙ্গীরের আত্মজীবনী।
মূল্য ১, এক টাকা।
প্রথম সংস্করণ নিঃশেষিত হইয়া গিয়াছে।
২১৪ পৃষ্ঠাব্যাপী সুবৃহৎ গ্রন্থ, কাগজের মলাট,
বিলাতী বাঁধাই, সুন্দর সােনার আলে
নাম লেখা।
পুস্তকের প্রারম্ভে সাম্রাজ্ঞী নুরজাহানের চারিবর্ণে
মুদ্রিত সুন্দর একখানি ছবি আছে এবং
ভিতরে ২০ খানি হাফটোন
ছবি আছে।
মোগল বাজবের ভিতরকার চিত্র যদি জানিতে চান এব’
তিন শত বৎসর পূর্বে ভারতবর্ষের সামাজিক এবংরাজনৈতিক
ইতিহাসের আভ্যন্তরীন আলেখ্য যদি দেখিতে চান, তবে এই
পুস্তকখানি পাঠ করুন। ব্যক্তিগত চরিত্রের ছায়াপাত থাকে
বলিয়া আত্মজীবনী মাত্রেই পাঠকের চিত্তাকর্ষক হইয়া থাকে।

* • এই হিসাবে জাহাঙ্গীরের আত্মজীবনী আধুনিক নাটক নভেল অপেক্ষা শতগুণে অধিক চিত্তাকর্ষক এবং শিক্ষাপ্রদ , কারণ ইহার মধ্যে মােগল বাদশাহদিগের রাজাপুরের ঐতিহাসিক আলেখ্য সম্রাট জাহাঙ্গীরের নিজের লেখনীর দ্বারা চিত্রিত রহিয়াছে। ইহা কোনও গ্রন্থকারের কাল্পনিক চিত্র নহে, কি নিজের কল্পনা এবং অনুমানের দ্বারা অতিরঞ্জিত ইতিহাস নহে। তিনশত বৎসর পূর্বে সম্রাট জাহাঙ্গীর স্বহন্তে আপনার ঘটনাবহুল জীবনের যে ইতিহাস লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছিলেন, ইহা তাহারই অনুবাদ। বহুদেশীয় বিদ্যালয় সমূহের ডাইরেক্টর কর্তৃক এই পুস্তকখানি সমুদয় স্কুল কলেজের প্রাইজ পুস্তকরূপে নির্দিষ্ট হইয়াছে। অল্পদিনের মধ্যেই প্রথম সংস্করণ নিঃশেষিত হইয়া গিয়াছে। ইহাই এই পুস্তকের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রশংসা। ইহা স্বদেশের ইতিহাসপ্রিয় প্রত্যেক ব্যক্তির অবশ্য পঠনীয় গ্রন্থ এবং প্রত্যেক লাইব্রেরীতে রাখিবার উপযুক্ত পুস্তক। মেরী কার্পেন্টার। মূল্য • আনা মাত্র। এই বিদুষী ইংরাজ মহিলার নিকট ভারতের নারীগণ যে কত ঋণী, তাহা ইহার জীবনী পাঠ করিলেই সকলে জানিতে পারিবেন। শিক্ষা এবং চরিত্রের মাধুৰ্যে নারীজীবন যে কত সদগুণে সুশােভিত হইতে পারে, মেরী কার্পেন্টারের জীবনী তাহার উজ্জ্বল দৃষ্টান্তমূল।

ve
ভারতের দ্বিতীয় কবি সার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এই পুস্তক সম্বন্ধে লিখিয়াছেন—
তােমার প্রণীত “মেরী কার্পেন্টার গ্রন্থখানি উপহার পাইয়া
প্রীত হইলাম। আমার ছেলেদের পড়িবার জন্য ইতিপূলে
তােমাব “শিখের বলিদান" একখানি আনাইয়াছিলাম। বইখানি
পডিয়া ছিড়িয়া শেষ করিয়া ফেলিতে বিলম্ব হয় নাই। দুঃখের
বিষয়, ঘৰৰ ছেলদের হাতে দিব মত এমনতব বই ‘ব
বাঙ্গালায় নাই। ভারতবর্ষের ইতিহাস হইতে সকল প্রকার
বীরত্বের দৃষ্টান্ত সংগ্রহ করিয়া তােমাকে বই লিপিবাব শুন্য
অনুরােধ করিবার অবসর প্রতীক্ষা কবিতেছিলাম, আজ এই
যােগে তাহা জ্ঞাপন করিলাম।
মেরী কার্পেন্টাৰ বীরাঙ্গনা। ইহারা কোন বিশেষ দেশের
নহেন-ইহাব। বিশ্বের অধিবাসিনী —এইজন্য ইহা সকল
দেশের স্ত্রীলােকেরই পূজনীয় এবং পুরুষেরও ভক্তির পাত্রী।
তথাপি ইহাদেব কর্মক্ষেত্র অনেকটা, পরিমাণে আমাদের
অপরিচিত হওয়াতে দেশের সাধারণ রমণীদের নিকট ইহাদের
দৃষ্টান্ত হৃদয়ঙ্গম হয় না। শিক্ষিতা বাহারা আছেন, তাহারা এই
গ্রন্থেব শিক্ষা দি যথার্থই হৃদয়ে গ্রহণ করেন, তবে উপকাৰ
পাইবেন। ইতি ১২ই আষাঢ়, ১৩১৩।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

•
হাইকোর্টের ভূতপূৰ্ব বিচারপতি পরলােকগত
সার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় লিখিয়াছেন :—
নারিকেলডাঙ্গা, কলিকাতা।
১৫ই আষাঢ়, ১৩১৩।
“শিখের বলিদান” এব
“মেবী কার্পেন্টার” নামক দুইখানি পুস্তক সাদরে গ্রহণ করিয়াছি
এ ধন্যবাদের সহিত প্রাপ্তিস্বীকার করিতেছি। দুইখানি
পুস্তকের কিয়দংশ পাঠ করিয়াছি এবং পাঠ করিয়া প্রীত হইয়াছি।
গ্রন্থদ্বয়ের ভাষা সরল ও বিশুদ্ধ । তাহাদের বিষয় যদিও বিভিন্ন
কিন্তু উভয়ই উন্নত ও পবিত্রভাব উদ্বােধক। ঈশ্বরের নিকট
প্রার্থনা করি, গ্রন্থকত্ৰী সাহিত্য-জগতে প্রভূত ষশােলা করুন।
গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
Babu Surendra Nath Banerjee, the
Great Orator and political leader of
Bengal, writes in the “Bengalee, of the
2ud August, 1906-
For some time two little books in Bengalee
Sokher Balıdan and a life of Miss, Mary Cerpenter
by Kumari Kumudini Mitra, B, A, have been lying
The Authoress in the daughter of
Babu Krishna Kumar Mitra, the well-known
Editor of the Sangibani newspaper
IVe have
ead the books with pleasure and profit. The style
is simule gand vigorous, and there is a fascinating
air of sincerity which has a charm, all its own
They ought to be in the hands of every one of
o our table
our children

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Sikher Bolidan Ed.6

Author
Bosu,kumudini
Title
Sikher Bolidan Ed.6
File name
Sikher Bolidan Ed.6
Text
OCR done
Citation
1925
Published
2010/04/16
Publisher
Sachindra Prasad Bosu, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
79
Library
Udaynarayanpur Tarun Sangha, Howrah
Classification
Bengali Fiction
Keywords
Bosu,Kumudini
DLI number
511455
Barcode
4990010018600.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
IvB1cJLpVyS
Download PDF

Sikher Bolidan Ed.6