Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Kabitabali Ed. 1st

Bandhopadhyay,hemachandra · 2009/11/24

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

KABITABALEE. A POETICAL SELECTION- BY BABU HEM CHANDRA BANERJI. PUBLISHED ' by ATUL CHANDRA BANERJI. Fingriti on. কবিতাবলী। শ্ৰীযুক্ত হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক বিরচিত। শ্ৰীঅতুলচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক প্রকাশিত। প্রথম সংস্ক NEW SCHOOE-BOOK PRESS. CALOOT 1899;

CALCUTTA.
PRINTED BY B. L. CAKRAVARTI. AT THE
NEW SCHOOL-Book PRESS.
8 Diron's Lane,

সূচীপত্র। পৃষ্ঠা। ৪ । । । .. ••• ০ ০ ০ ০ এ । বিষয় ১। যমুনাতটে পদ্মের মৃণাল ৩। জীবন-সঙ্গীত ৪। লজ্জাবতী লতা ৫। জীবন মরীচিক। ৬। অশােক তরু ৭। চাতক পক্ষীর প্রতি ৮। পরশমণি ৯। গঙ্গার উৎপত্তি , ১০। চিন্তাকুল যুব শচী-বিলাপ s ০ ০ ০ ১ ১৯ ২২ ২৫ ••• ••• ••• ৩৩ ••• কাশী দৃশ্য •• ৪০০ ৪ ১৩ । বৃত্রাসুর বধ ৪

৫৮
po
( ৩১
১৪। শিশুর হাসি
১৫। আশাকানন
১৬। স্বর্গারােহণ
১৭। দধীচির অস্থিদান
১৮। সতীশূন্য কৈলাস
.
৭৪
৮৯

কবিতাবলী।
* *
উপক্রমণিকা।
যে রচনা পাঠ করিতে করিতে পাঠকের হৃদয়ে অনির্বচনীয়
আনন্দ ও চমৎকার রূসের আবির্ভাব হয়, তাহার নাম কাব্য।
রচনার যে গুণ থাকাতে উহা পাঠ করিলে মনে উক্তরূপ আনন্দ,
চমৎকার ও বিস্ময় প্রভৃতির উদয় হয়, তাহার নাম রস। সুতরাং
রসই কাব্যের আত্মা অর্থাৎ জীবনস্বরূপ। যে রচনাতে কোন
প্রকার রস নাই, তাহাকে কাব্য বলা যাইতে পারে না।
অনেক পাঠকের মনে এরূপ সন্দেহ উপস্থিত হইতে পারে, যে,
যদি কেবল আনন্দজনক রচনাই কাব্য হইল, তাহা হইলে, যে
গ্রন্থে শোক, ক্রোধ, ভয় ও ঘৃণাজনক বিষয়ের বর্ণনা আছে,
লােকে তৎসমুদয়কে কিরূপে কাব্যশব্দে নির্দেশ করিয়া থাকে।
কিঞ্চিৎ বিবেচনা করিলেই এইরূপ সংশয়ের সুন্দর মীমাংসা

.
কবিতাবলী।
হইতে পারে। কেন না, যে সকল স্থলে শােকাদির বর্ণনা দেখিতে
পাওয়া যায়, তাহা পাঠ করিলেও পাঠকের মনে শােকাদিমিশ্রিত
এক প্রকার অনির্বচনীয় আনন্দের অনুভব হইয়া থাকে।
সীতার বনবাস গ্রন্থের করুণরসপূর্ণ স্থল গুলি পাঠ করিলে
সকলের হৃদয়ে শােকের উদয় হইয়া থাকে যথার্থ বটে, কিন্তু
উহা পাঠ করিতে কেহই দুঃখানুভব ও অনিচ্ছাপ্রকাশ করেন
না। প্রত্যুত সকলেই আগ্রহসহকারে উহা পাঠ করিয়া এক
অভূতপূর্ব আনন্দ অনুভব করিয়া থাকেন। কোন বিষয়ে আনন্দ
জন্মিলে, তাহাতে আগ্রহ ও অভিনিবেশ হওয়া অসম্ভব,
সুতরাং এরূপ স্থলেও শােক, দুঃখ, ক্রোধ ও লজ্জাদিজনিত যে
এক প্রকার অলােকসাধারণ আনন্দ জন্মে, তাহাতে আর
সন্দেহ নাই।
রস সৰ্ব্বশুদ্ধ দশ প্রকার। যথা :-আদি, বীর, করুণ, হাস্য,
রৌদ্র, ভয়ানক, বীভৎস, অদ্ভুত, শান্ত ও বৎসল।
নায়ক নায়িকার প্রণয়বর্ণন করিলে আদিরস হয়। শকুন্তলা,
সীতার বনবাস প্রভৃতি আদিরসের উদাহরণস্থল।
যুদ্ধ, ধৰ্ম্ম, দয়া ও দান প্রভৃতি বিষয়ে যে অবিচলিত উৎসাহ,
তাহার নাম বীর রস। অর্জুন, নেপােলিয়ন প্রভৃতি যুদ্ধবীর ;
যুধিষ্ঠির,সক্রেতিস প্রভৃতি ধৰ্ম্মবীর ; জীমূতবাহন, হাউয়ার্ড প্রভৃতি
দয়াবীর; এবং কর্ণ, হরিশ্চন্দ্র প্রভৃতি দানবীর। মেঘনাদবধ
কাব্যে বীররসের বর্ণনা আছে।
প্রিয় বস্তুর বিয়ােগ অথবা অপ্রিয় বস্তুর সমাগমে যে শােক .
উপস্থিত হয়, তাহার নাম করুণ রস। নীলদর্পণ নাটকে করুণ
রসের বর্ণনা আছে।
;
৪

উপক্রমণিকা।
•
বাক্য, বেশ ও চেষ্টাদি দ্বারা পাঠক বা দর্শকের হাস্যোদ্রেক
হইলে হাস্যরস হয়। “বুড়াে শালিকের ঘাড়ে রোঁয়া, একেই কি
বলে সভ্যতা” ইত্যাদি গ্রন্থে হাস্যরসের বর্ণনা আছে।
ক্রোধের উদ্দীপক রচনাতে রৌদ্ররস প্রকটিত হয়। বেণীসংহার
নাটকের স্থানে স্থানে রৌদ্ররস।
যে বর্ণনা পাঠ করিলে হৃদয়ে ভয়ের সঞ্চার হয়, তাহা দ্বারা
ভয়ানক রস প্রকটিত হয়।
ঘৃণাজনক বর্ণনাতে বীভৎস রস প্রকটিত হয়।
যে রচনা পাঠ করিলে হৃদয়ে বিস্ময়ের উদয় হইয়া থাকে,
তাহাতে অদ্ভুত রস প্রকটিত হয়।
যাহা পাঠ করিতে করিতে মনে বৈরাগ্য, তত্ত্বজ্ঞান প্রভৃতির
উদ্রেক হয়, তাহার নাম শান্তরস,
পুত্রাদির প্রতি পিতা মাতা প্রভৃতি গুৰুজনের মেহ বর্ণন
স্থলে বৎসল রস প্রকটিত হয়।
কাব্য।
কাব্য দুই প্রকার ; দৃশ্য ও শ্ৰব্য। অভিনয়যােগ্য কাব্যকে
দৃশ্য কাব্য বা নাটক কহে। যথা—নীলদর্পণ।
যে সকল কাব্য অভিনয়ের উপযুক্ত নহে, কেবল শ্রবণ
পাঠের যােগ্য, তাহার নাম শ্ৰব্য কাব্য। যথা-রামায়ণ,
মহাভারত, মেঘনাদবধ, সীতার বনবাস প্রভৃতি।
শ্ৰব্য কাব্য তিন প্রকার ; গদ্য, পদ্য, ও মিশ্র। ছন্দোবন্ধযুক্ত
রচনাকে পদ্য, আর ছন্দোবন্ধবিহীন রচনাকে গদ্য কহে। যে
রচনা এই উভয়ের সংস্রবে রচিত, অর্থাৎ যাহাতে গদ্য ও পদ্য

i
কবিতাবলী।
।
উভয়ই থাকে, তাহার নাম মিশকাব্য বা চম্পূ। পদ্যকাব্য যথা-
রামায়ণ, মেঘনাদবধ প্রভৃতি। গদ্যকাব্য যথা-সীতার বনবাস,
রামের রাজ্যাভিষেক প্রভৃতি। মিশ্ৰকাব্য যথা-বসন্তসেনা প্রভৃতি।
গুণ।
1
যাহা দ্বারা কাব্যের উৎকর্ষ সাধিত হয়, তাহার নাম গুণ।
গুণ তিন প্রকার ; মাধুৰ্য্য, ওজ৭ প্রসাদ।
যে গুণ থাকিলে কাব্য শ্রবণমাত্র চিত্তকে আর্দ্র ও দ্রবীভূত
করে, তাহার নাম মাধুৰ্য্য গুণ। সমাসবিহীন অথবা অল্পসমাসযুক্ত
সুললিত রচনা দ্বারা মাধুৰ্য গুণ প্রকটিত হয়। শৃঙ্গার, করুণ,
শান্ত ও বৎসল রসে এই প্রকার রচনা প্রশংসনীয়। যথা-
পতিশােকে রতি কঁাবে, । বিনাইয়া নানাছাদে,
ভাসে চক্ষু জলের তরঙ্গে।
কপালে কঙ্কণ মারে,
রুধির পড়িছে ধারে,
কাম অঙ্গ ভস্ম লেপে অঙ্গে।”
যে গুণ থাকিলে কাব্যের শ্রবণ বা পাঠমাত্র শ্রোতা বা পাঠকের
হৃদয় বিস্তৃত অর্থাৎ উদ্দীপ্ত হইয়া উঠে, তাহার নাম ওজোগুণ।
কঠোর ও দীর্ঘসমাসবহুল পদসমূহের স্যটনদ্বারা ওজোগুণ প্রকটিত
হয়। বীর, বীভৎস ও রৌদ্রসে এইরূপ রচনা প্রশস্ত। যথা-
‘মহারুদ্ররূপে মহাদেব সাজে,
ভভম্ভ ভভম্ভ শিঙ্গা ঘের বাজে”। ইত্যাদি।
কাব্যের যে গুণ থাকতে, পাঠমাত্র তর্থবোধ হয়, ও চিত্ত তাহা
হইতে বিনিবৃত্ত না হইয়া শুষ্ক কষ্ঠে অগ্নির ন্যায় শীঘ্র প্রবেশ করে,
তাহাকে প্রসাদ গুণ কহে। যথা-
-

উপক্রমণিকা।
“পাখী সব করে রব রাতি পােহাইল,
কাননে কুসুম-কলি সকলি ফুটিল।” ইত্যাদি।
==
দোষ।
: যাহারা কাব্যের অপকর্ষ সাধন করে, তৎসমুদয়কে দোষ কহে।
দোষ নানাবিধ। তন্মধ্যে নিয়ে প্রধান প্রধান গুলির উল্লেখ করা
যাইতেছে।
শ্রুতিকটুতা। বিনা কারণে র্কশ শব্দের প্রয়ােগ। যথা-
‘কঠোর তপােনুষ্ঠানে মুনি চূড়ামণি
মােক্ষ লক্ষ্য করি কাল কাটায় অমনি।”
শান্তরসে কোমলপদ বিন্যাস করাই উচিত, এখানে তাহার
বৈপরীত্য হইয়াছে।
চ্যুতসংস্কৃতি -ব্যাকরণের দোষ। যথা-
“সৌজন্যতা হেরি তিনি হন পরিতােষ”
এস্থলে “সৌজন্যতার পরিবর্তে “সৌজন্য”, বা “সুজনতা,”
ও পরিতােষের পরিবর্তে “পরিতুষ্ট,” হওয়া উচিত।
অ প্রযুক্ততা।-যে শব্দ অভিধানে পাওয়া যায়, কিন্তু সচরাচর
যাহার ব্যবহার নাই, তাহা প্রয়ােগ করিলে অ প্রযুক্ত দোষ
হয়। যথা-
“ঈশাক্ষের উষৰ্বধে ধে মারা গেল মার
নাকেতে নির্জরগণ করে হাহাকার।”
উষৰ্ব্ব ধ (অগ্নি), নাক (স্বৰ্গ), নির্জর (দেবতা), এই তিনটা
শব্দ অভিধানে আছে বটে,কিন্তু ইহাদের প্রয়ােগ প্রায় দেখা যায় না।
অসমর্থতা—যে শব্দ যে অর্থের প্রতিপাদক নহে, সেই শব্দ
সেই অর্থে প্রয়ােগ করিলে অসমর্থতা দোষ হয়। যথা-

ন
কবিতাবলী।
‘অামার বাক্যেতে দেহ রাধার নন্দন।
বিরাট তনয় বুঝি কর বিতরণ।”
এস্থলে কর্ণ (কান) ও উত্তর, (প্রশ্নের উত্তর) এই দুই অর্থ
বুঝাইবার জন্য যথাক্রমে “রাধার নন্দন” ও “বিরাটতনয়” এই
দুইটী শব্দ প্রযুক্ত হইয়াছে।
নিরর্থকতা-~যে পদের কোনরূপ সার্থকতা ও উপযােগিতা
নাই, তাহার প্রয়ােগ। যথা,
“সকলেই সমভাবে সদাসর্বক্ষণ,
আমার হৃদয়সুখ করিছে সাধন।”
এই স্থলে “সদা” “সৰ্ব্বক্ষণ’ এই দুইটা শব্দের মধ্যে একটা
নিরর্থক।
অশ্লীলতা—অশ্লীল তিন প্রকারের হইতে পারে।
সূচক, ঘৃণাজনক ও লজ্জাকর।
নিহতার্থতা-অনেকার্থক শব্দের অ প্রসিদ্ধ অর্থে প্রয়ােগ।
যথা-“তোমার গােরসে গাে পাইব করতলে” এস্থলে প্রথম
“গো” শব্দের অর্থ বাক্য, দ্বিতীয়ের অর্থ স্বর্গ। ইহা অপ্রসিদ্ধ।
ক্লিষ্টতা—দীর্ঘ দীর্ঘ সমাস থাকাতে অর্থ প্রতীতির যে ব্যাঘাত
হয়, তাহার নাম ক্লিষ্টত। যথা-
ক্ষীরােদ তনয়া পতি-বাহনের ডরে।”
ক্ষীরোদতনয় লক্ষ্মী, তাহার পতি বিষ্ণু, তঁাহার বাহন গড়।
অনবীকৃত-এক শব্দের বার বার ব্যবহার। যথা-
দেখিয়া সুরেন্দ্রধনু, দেখিয়া লােহিত ভানু,
দেখিয়া জলধিজনু, কত সুখে ভাসে সেই ভাবুকের হিয়া।”
এখানে “দেখিয়া” এই শব্দটা বার বার প্রযুক্ত হইয়াছে।
ন

উপক্রমণিকা। পুনরুক্ততা-ভিন্ন ভিন্ন শব্দদ্বারা এক বিষয়ের উপর্যপরি বর্ণন, যথা- “সে শােভা তাহারি, রূপের মাধুরী, বচনচাতুরী, হেরিয়া উথলে ভাব।” এস্থলে “রূপের মাধুরী” এই বিষয়টা পুনরুক্ত হইয়াছে। প্রসিদ্ধিবিরুদ্ধতা-কবিদিগের প্রসিদ্ধি বা লােক প্রসিদ্ধির বিরুদ্ধবর্ণন করা। যথা- “চন্দ্রের উদয়ে, নলিনীনিচয়ে, বিকাশে সরসীজলে।” চন্দ্রের উদয়ে কুমুদেরই বিকাশ হয়, পদ্মের নহে। সন্দিগ্ধতা—কোন পদের অর্থ একরূপ, কি অন্য প্রকার হইবে, এরূপ সন্দেহ। যথা- “কি ছার মিছার কাম-ধনু রাগে ফুলে ভুরুর সমান কোথা ভুরুভঙ্গে ভুলে।” এস্থলে কামদেব নিজ ধনুর প্রতি রাগ, অনুরাগ, অর্থাৎ পক্ষ- পাতহেতুক যে ফুলিয়া গর্বিত হন তাহা নিস্ফল। অথবা ফুলদ্বারা কামধনুর যে রাগ অর্থাৎ ফুলনির্মিত কামধনুর যে বক্রতা, তাহাতে কোন ফল নাই, এই উভয়ের কোন্ অর্থ প্রকৃত, তদ্বিষয়ে সন্দেহ উপস্থিত হইতেছে। গ্রাম্যতা—অপভাষার ব্যবহার, বা ইতরজনােচিত ভাবের প্রয়োগ। যথা- “ৰ্চাদে দেখি সােহগে শালুক ফুটে জলে আখু আশে মার্জার যেমন মুখ মেলে।” এস্থলে, পূৰ্ব্বার্ধে উত্তম ভাব প্রকাশ করিতে অপভাষার প্রয়ােগ এবং উত্তরাদ্ধে সাধুভাষায় ইতর ভাবের প্রতীতি।

কবিতাবলী।
অনৌচিত্য—দেশ, কাল, পাত্র, রস, আচার,ব্যবহার প্রভৃতির
বিপরীত বর্ণনা। যথা-
'বিভীষণ বলে শুন বৈদেহীরমণ,
মানেতে অগ্রজ মাের সম দুর্যোধন।”
বিভীষণ দুর্যোধনের পূর্বে প্রাদুভূত হইয়াছিলেন, অতএব
এস্থলে কালের অনুচিত প্রয়ােগ হইয়াছে।
ছন্দঃপতন—লক্ষণানুযায়ী, মাত্ৰাপরিমাণ, লঘুগুরুবিভাগ,
অক্ষরসংখ্যা অথবা যতিসংস্থানের ব্যতিক্রম। যথা-
“রত্নাকর ভাবিয়া পশিনু জলধিজলে।”
পয়ারে চতুর্দশ অক্ষর, পঞ্চদশ অক্ষর হয় না।
দূরান্নয়—যে দুই পদের পরস্পর আকাঙ্ক্ষা আছে, তাহারা
অত্যন্ত দূরে থাকিলে দুরান্বয় দোষ হয়। যথা-
“নিস্পীড়িত জর্জরিত, ফ্রান্সদেশ ঋদ্ধিযুত,
কত হল জৰ্ম্মন্যুদ্ধেতে।”
এস্থলে “কত’ ও ‘নিষ্পীড়িত” এই দুইটি পরস্পর সম্বন্ধ শব্দ
অনেক ব্যবধানে রহিয়াছে।
অলঙ্কার।
যেরূপ হার, বলয় প্রভৃতি অলঙ্কার শরীরের শােভা সম্পাদন
করে তদ্রুপ অনুপ্রাস, উপমা প্রভৃতি, কাব্যের অঙ্গস্বরূপ শব্দ ও
অর্থের শােভাসম্পাদনপূৰ্ব্বক, রসকে পরিপুষ্ট করিয়া দেয় বলিয়া,
উহাদিগকে অলঙ্কার কহে।
অলঙ্কার দুই প্রকার ; শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কার। শব্দের
পরিবর্ত করিলে যেস্থলে অলঙ্কারের বিপর্যয় হয়, অর্থাৎ যেখানে

উপক্রমণিকা। অলঙ্কারদ্বারা কেবল শব্দেরই সৌন্দৰ্য্য সাধিত হইয়া থাকে, তাহাকে শব্দালঙ্কার কহে; আর যে স্থলে শব্দের পরিব করিলেও অলঙ্কারের ব্যাঘাত হয় না, অর্থাৎ যেখানে অলঙ্কার দ্বারা অর্থের বৈচিত্র সাধিত হয়, তাহার নাম অর্থালঙ্কার। • • শব্দালঙ্কার। বাঙ্গালা ভাষায় যে সমুদয় শব্দালঙ্কার প্রচলিত আছে, তন্মধ্যে অনু প্রাস, যমক ও শেষ এই তিনটী প্রধান। অনুপ্রাস। যে স্থলে স্বরবর্ণের বৈসাদৃশ্য থাকিলেও একস্থানােচ্চাৰ্যমাণ ৰ্যঞ্জনবর্ণের পুনঃ পুনঃ আবৃত্তি হয়,তাহাকে অনুগ্রাস কহে। যথা- “নহে সুখী সুমুখী নিরখি নন্দিনীরে, অসম্বর অম্বর, অম্বর পড়ে শিরে।”(১) স্ম রসুন্দর কাতর মানস হে, তব সে সব চারু রুচীবিরহে ।”(২) “চুতমুকুলকুলসঞ্চল-লিকুল- গুণ গুণ রঞ্জন গানে, মদকল কোকিল কলরব সঙ্কুল রঞ্জিত বাদনতানে।”৩ যমক। অর্থ থাকিলে, একাকার দুইটা শব্দ, যদি এক অর্থের বাচ না হইয়া এক শোকের মধ্যে প্রযুক্ত হয়, তাহা হইলে যমকা লঙ্কার হয়। প্রয়োগভেদে যমক চারি প্রকার হইতে পারে।

19.
কবিতাবলী।
আদ্য-ষমক, মধ্যযমক, অন্ত্যষমক ও মিশ্রযমক। কোন স্থলে
একাকার শব্দয়ের মধ্যে একটা নিরর্থক, অপরটী সার্থক, দুইটাই
নিরর্থক বা দুইটাই সার্থকও হইতে পারে; কিন্তু যেস্থলে দুইটাই
সার্থক, তথায় উহাদের পরস্পর ভিন্নার্থবােধক হওয়া আবশ্যক।
ক্রমে উদাহরণ প্রদত্ত হইতেছে।
অদ্যযমক।
“ভারত, ভারতখ্যাত আপনার গুণে,
রাজেন্দ্র রাজেন্দ্র প্রায় তাহার বনে।”
মধ্যযমক।
“পাইয়া চরণ তরি, তরি ভবে আশা,
তরিবারে সিন্ধু ভব, ভব সে ভরসা।”
অন্ত্যযমক।
‘আট পণে আধ সের আনিয়াছি চিনি,
অন্য লােকে ভুরা দেয়, ভাগ্যে আমি চিনি।"
মিশ্রযমক।
“মনে করি করী করি কিন্তু হয় হয়,
অদৃষ্ট অদৃষ্ট কভু তুষ্ট নয় নয়।”
যেস্থলে একটা শব্দ দুই বা বহু অর্থে প্রযুক্ত হয়, তথায় শ্লেষ
নামক অলঙ্কার হইয়া থাকে। যথা-

উপক্রমণিকা। ০ “অতি বড় বৃদ্ধ পতি সিদ্ধিতে নিপুণ, কোন গুণ নাহি তার কপালে আগুন। কুকথায় পঞ্চমুখ কণ্ঠভরা বিষ, কেবল আমার সঙ্গে দ্বন্দ্ব অহর্নিশ। গঙ্গা নামে সতা, তার তরঙ্গ এমনি, জীবনস্বরূপা সে, স্বামীর শিরােমণি। ভূত নাচাইয়া পতি ফিরে ঘরে ঘরে, মরে পাষাণ বাপ দিল হেন বরে।” এই স্থলে ‘গুণ’ ‘কু’ ‘তরঙ্গ’ ‘জীবন’ প্রভৃতি শব্দ শ্লিষ্ট। অত, এব এ সন্দর্ভে দুইটা পৃথক পৃথক অর্থের বােধ হইতেছে। অর্থালঙ্কার। অর্থালঙ্কার অনেক, তন্মধ্যে প্রধান প্রধানগুলির লক্ষণ ও উজাহরণ নিম্নে লিখিত হইতেছে। উপমা। একধৰ্ম্মাক্রান্ত ভিন্নজাতীয় বস্তুদ্বয়ের সাদৃশ্য বর্ণনকে উপমা কহে। যদি একবৰ্ম্মবিশিষ্ট ভিন্নজাতীয় বস্তুদ্বয়ের পরস্পর সাদৃশ্য ‘যথ।” “সম” “ভুল” প্রভৃতি শব্দদ্বারা প্রকটিত হয়, তাহা হইলে “পূর্ণ উপমা” অলকার হয়। যাহার সহিত তুলনা করা যায়,তাহাকে উপ- মন, ও যাহার তুলনা করা যায়, তাহাকে উপমেয় বলে। যথা - “সৰ্বসুলক্ষণবতী ধরাধামে যে যুবতী লােকে বলে পদ্মিনী তাহারে। সেই নাম নাম যার, সেরূপ প্রকৃতি তার কত গুণ কে কহিতে পারে।

• কবিতাবলী। পতিব্রতা পতিতা অবিরত সুশীলতা আবিভূত হৃৎপােসনে। কি কব লজ্জার কথা লতা লজ্জাবতী যথা মৃত প্রায় পর পরশনে।” এস্থলে পদ্মিনী উপমেয় ও লজ্জাবতী উপমান। যে স্থলে এক উপমেয়ের দুই বা ততােধিক উপমানের সহিত তুলনা করা যায়, তাহাকে মালােপমা কহে। যথা- ‘‘যথা চাতকিনী কুতুকিনী ঘন দমশনে যথা কুমুদিনী প্রমােদিনী হিমাংশুমিনে, যথা কমলিনী মলিনী যামিনীষােগে থেকে শেষে দিবসে বিকাশে পাশে দিবাকরে দেখে, হলাে তেমতি সুমতি নরপতি মহাশয় পরে পেয়ে সেই পুরী পরিতুষ্ট অতিশয়।” রূপক। উপমেয়ে যে উপমানের আরােপ, তাহার নাম রূপক। রূপক- স্থলে উপমানের উল্লেখ থাকা আবশ্যক, নতুবা অতিশয়ােক্তি হইয়া পড়ে। রূপকস্থলে তুল্যার্থক শব্দ ও সমানধৰ্ম্মবাচক শব্দের ব্যবহার হয় না; কিন্তু কোথাও কোথাও রূপ” বা “স্বরূপ” শব্দ ব্যবহৃত হইয়া থাকে। যথা- “নয়ন কেবল নীল উৎপ, মুখ শতদল দিয়া গঠিল রাখিয়াছে গণি অধরে নবীন পলব দিল। এস্থলে নয়নাদি উপমেয়ের সহিত উৎপলাদ উপমনের এভেনির্দেশ হইয়াছে। রূপ শব্দের ব্যবহারে যথা- কুলে দন্তপাতি ।

উপক্রমণিকা। “অখন হৃদয়াকাশ বিষম বিপত্তিরূপ মেঘদ্বারা ঘােতর আচ্ছন্ন * তখন কেবল অশয়ু প্রাহিত হইয়া তাহাকে পরিষ্কৃত করিতে থাকে।” উৎপ্রেক্ষা। প্রস্তুত বিষয়ের সহিত উপমানের উৎকট সাদৃশ্যহেতুক যে এক প্রকার অভেদের ন্যায় নির্দেশ, তাহার নাম উৎপ্রেক্ষা। ‘যেন’ ‘বুঝি’ প্রভৃতি শব্দের প্রয়ােগ দ্বারা উপমান ও উপ- যেগত সাদৃশ্যের উৎকটরূপ প্রতীতি হইলে উৎপ্রেক্ষা হয়। যথা- “এই যে প্রিয়ার কোলে নিদ্রিত কুমার প্রভাতের তারা যেন উরসে উষার।”(১) ‘অরুণে উদয়াচলে হেরি সুধাকর ভয়েতে হইল বুঝি পাণ্ডুকলেবর।” (২) উৎপ্রেক্ষা দুই প্রকার ; বাচ্যণ ও প্রতীয়মানা। যে স্থলে উপমান ও উপমেয়ের সাদৃশ্য ‘যেন’ ‘বুঝি’ প্রভৃতি শব্দদ্বারা প্রকটিত হয়, তথায় বাচা; আর যেস্থলে যেন’ ‘বুঝি’ প্রভৃতি শব্দ শ্বাকে না, তথায় প্রতীয়মান। প্রতীয়মান যথা- “অয়ি সুখময়ি উষে, কে তােমারে নিরমিল বালার্কসিবফোঁটা কে তােমার শিরে দিল ?” স্মরণালঙ্কার। কোন বস্তু দেখিয়া সাদৃশ্যহেতুক পূৰ্ব্বদৃষ্ট সদৃশ পদার্থের শুকে স্মরণালঙ্কার কহে। যথা- noo কবিতাবলী। ‘প্রফুল্ল নলিনে অলি খেচিতেছে হেরি, বাছার চঞ্চল আঁখি সদা মনে করি।” ভ্রান্তি মান্। অত্যন্ত সৌসাদৃশ্য জানাইবার উদ্দেশে সদৃশ বস্তুতে সদৃশ অন্তর কবিপ্রতিভখাপিত অর্থাৎ কাল্পনিক ভ্রমকে ভ্রান্তিমান এসঞ্চার কহে। বাস্তবিক ভ্রান্তিকে অলঙ্কার বলা যায় না। যথা- “দেখ সখে, উৎপলাক্ষী সরোবরে নিজ অক্ষি- প্রতিবিম্ব করি দরশন, জলে কুবলয়ভ্রমে, বার বার পরিশ্রমে ধরিবারে করয়ে যতন।” এই স্থলে বর্ণিত ভ্রমটী কবির কল্পনােত্থাপিত, বাস্তবিক নহে। M সন্দেহ। যদি প্রস্তুত বিষয়কে অপ্রস্তুত বলিয়া সংশয়, কবির প্রতিভা- কারা উত্থাপিত হয়, তাহা হইলে উহাকে সন্দেহ অলঙ্কার কহে। ধ- “এই সরলা যুবতী কি যৌবনতর নববিকসিত বল্লরী, অথবা লাবণ্যসাগরের বেলোচ্ছলিতলহরী।” সাহিত্যদর্পণ। প্রকৃত প্রস্তাবে সন্দেহ উপস্থিত হইলে অলঙ্কার হইবে না। যথা-একি, সর্প না রঞ্জু।

উপক্রমণিকা। • এ । অতিশয়ােক্তি। উমেয়ের একবারে উল্লেখ না করিয়া যদি উপমানকেই। উপমেয়রূপে নির্দেশ করা যায়, তাহা হইলে উহাকে অতিশয়ােক্তি কহে। যথা- “সূতিকাগৃহেতে সতী প্রবেশ করিল, যথাকালে পূর্ণশশী কোলেতে লইল।” এস্থলে দিলীপের মহিষী রঘুকে প্রসব করিলেন। রঘু উপ- মেয় এবং পূর্ণশশী উপমান। কিন্তু রঘুকে পূর্ণশশী বলিয়া নির্দেশ হইয়াছে। অপহৃতি। প্রস্তুত বস্তুর প্রতিষেধ করি। তৎসদৃশ অপ্রস্তুত বস্তুর স্থাপন করাকে অপহ্নতি কহে। যথা- “এ নহে নভােমণ্ডল, কিন্তু সরিৎপতি তারকাযুবক নহে, উহা ফেনপাতি।” E) ব্যতিরেক। উপমান অপেক্ষা উপময়ের উৎকর্ষ বা অপকর্ষ বর্ণনকে ব্যতিরেক কহে। উপমেয়ের উৎকর্ষ যথা- “কে বলে শারদশশী সে মুখের তুলা পদনখে পড়ি তার আছে কত গুলা।” উপমেয়ের অপকর্ষ যথা- দিনে দিনে শশধর, দেখা যায় ততর, পুন তার হয় উপচয়।

কবিতাবলী। নরের নশ্বর তনু, হইলে ক্রমশঃ তনু আর ত নূতন নাহি হয়।” নিদর্শনা পদার্থদ্বয়ের বা বাক্যার্থদ্বয়ের পরস্পর অন্বয় অনুপপন্ন বলিয়া, উভয়ের মধ্যে যে সাদৃশ্য কল্পনা, তাহাকে নিদর্শনা কহে। যথা- “ নিশার স্বপনসম এ তোর বারতা রে দূত! অমরবৃন্দ যার ভুবলে কাতর, সে ধনুর্দ্ধরে রাঘব ভিখারী, বধিল সম্মুখ রণে? ফুলদল দিয়া কাটিল কি বিধাতা শাল্মলী তরুবরে।” এস্থলে ভিখারী রাঘবকর্তৃক ধনুর্দ্ধর বীরের প্রাণসংহার ও ফুল- দল দিয়া শাল্মলীতর ছেদন•এই উভয়, তুল্যরূপে অসম্ভব, এইরূপ অর্থ বুঝিতে হইবে। দৃষ্টান্ত। বর্ণনীয় বস্তুর দৃঢ়তাসম্পাদনার্থ ভিন্নবাক্যে তৎসদৃশ বিষয়া- স্তরের বর্ণনকে দৃষ্টান্ত কহে। যথা- “ধন্য দময়ন্তি! ধন্য ধর গুণাবলী, যার বলে হরিলে নলের মন-অলি, আকর্ষে যে জলধির লহরী প্রবল তার চেয়ে আর কি চন্দ্রের শ্লাঘা বল।” এস্থলে অলির হরণ ও জলধির আকর্ষণ পরস্পর ভিন্ন ধৰ্ম্ম।

উপক্রমণিকা।
একধৰ্ম্ম ভিন্নশব্দ প্রতিপাদিত হইলে প্রতিবস্তুপমা অলঙ্কার
হয়। যথা-
“দেখ দেখ কোটালিয়া করিছে প্রহার।
হায় বিধি চাদে কৈল রাহুর আহার ॥”
বিভাবনা।
যে স্থলে কবির প্রৌঢ়োক্তিনিবন্ধন কারণ ব্যতিরেকে কার্যের
উৎপত্তি বর্ণিত হয়, তথায় বিভাবনা অলঙ্কার হয়। যথা-
“ভূষণ ব্যতীত শােভে, তনু সুকোমল।
ভয় নাহি তবু আঁখি সতত চঞ্চল।”
এস্থলে যৌবনরূপ কারণ উহ।
বিশেষােক্তি।--
কারণসত্ত্বেও কার্যের অনুৎপত্তি হইলে বিশেষােক্তি অলঙ্কার
হয়। যথা-
“গৰ্বহীন বহুধনে,
চাপল্যশূন্য যৌবনে,
মহত্বের এই ত লক্ষণ।
অসঙ্গতি।
কাৰ্য কারণ ভিন্নধারে অবস্থিত হলে অসঙ্গতি অলঙ্কার
হর। যথা-
“মহাত্মারে সমাদরে পূজয়ে সকলে,
কিন্তু লঘুচিত্ত জনে গরবেতে ফুলে।”

• কবিতাবলী। এস্থলে গর্বের কারণ এক আধারে ও গৰ্বরূপ কাৰ্য অন্য আধারে বর্ণিত হইয়াছে। যথা- শিবের কপালে রয়ে প্রভুরে আহুতি লয়ে, জানি বাড়িল কিবা গুণ। “একের কপালে রহে, অন্যের কপাল দহে, অাগুনের কপালে আগুন।” সমাসােক্তি। যদি সমান কাৰ্য্য, সমান লিঙ্গ, বা সমান বিশেষণ দ্বারা প্রস্তুত অচেতন বস্তু, তির্যজাতি প্রভৃতি বিষয়ে অপ্রস্তুত বস্তুর ব্যবহার অর্থাৎ মনুষ্যোচিত ব্যবহারাদির সমারােপ হয়, তাহার নাম সমসােক্তি। যথা- “হায় রে তােমারে কেন দূষি ভাগ্যবতি ! ভিখারিণী দাসী এবে তুমি রাজরাণী। হরিপ্রিয়া মন্দাকিনী, সুভগে তব সঙ্গিনী অর্পেণ সাগরবরে তিনি তব পাণি সাগর সমীপে তব তার সহ গতি।” এস্থলে যমুনার উপর কামিনীর ধৰ্ম্মের আরােপ হইয়াছে। অপ্রস্তুত প্রশংসা। অবস্থার বৈসাদৃশ্য বা সৌসাদৃশ্য হেতুক, অথবা কাৰ্যকারণভাব- নিবন্ধন অপ্রস্তুত বস্তুর বানদ্বারা প্রস্তুত বিষয়ের প্রতীতি হইলে অপ্রস্তুত প্রশংসা কহে। সৌসাদৃশ্যনিবন্ধন যথা-

উপক্রমণিকা।
“চাতকে যাচিলে জল হইয়ে কাতর।
মৌনভাবে কভু কি থাকছে জলধর?”
এস্থলে, দাতা যাচককে বিমুখ করিতে পারে না, এই অর্থ
বুঝাইতেছে।
প্রস্তুত বিষয়ের উল্লেখ থাকিলে অপ্রস্তুত প্রশংসা না হইয়া
দৃষ্টান্তালঙ্কার হয়।
অর্থস্তরন্যাস।
সামান্য বস্তুর দ্বারা বিশেষ ও বিশেষ বস্তুদ্বারা সামান্যের সমর্থন
অর্থাৎ দৃঢ়তাসম্পাদন হইলে অর্থান্তরন্যাস অলঙ্কার হয়। যথা-
“সহসা না কর কাৰ্য্য ধৈৰ্য্য বঁাধ হৃদে,
বিবেক বিরহে কষ্ট ঘটে পদে পদে।”
এস্থলে সামান্য দ্বারা বিশেষেরুসমর্থন হইতেছে।
“দশে মিলে করিলে মহৎ কাৰ্য্য হয়
তৃণের সমূহ রজ্জ, হয়ে বাঁধে হয়।”
এস্থলে বিশেষ দ্বারা সামান্যের সমর্থন হইতেছে। দৃষ্টান্ত
অলঙ্কারে সামান্যবিশেষভাব নাই।
০
বিরােধ।
যেস্থলে পাঠমাত্র বিরােধের প্রতীতি, কিন্তু পৰ্যবসানে ভঞ্জন
হয়, তাহার নাম বিরােধ অলঙ্কার। যথা-
‘অচক্ষু
সর্বত্র চান, অপদ সর্বত্র গতাগতি
কর বিনা বিশ্ব গড়ি, মুখ বিনা বেদ পড়ি,
সবে দেন কুমতি সুমতি।”

১০ কবিতাবলী। ঈশ্বরের পক্ষে সকল সম্ভবে বলিয়া, পৰ্যবসানে বিরোধের ভঞ্জন হইতেছে। বিষম। বিসদৃশ বস্তুদ্বয়ের সঘটন হইলে বিষম অলঙ্কার হয়। যথা- রত্নাকর ভাবি পশিনু জলবিজলে, কোথা রত্ন উদর পূরি। লোনাজলে।” উল্লেখ। এক মাত্র পদার্থের বিধি প্রকারে উল্লেখ করলে উল্লেখ অলঙ্কার হয়। যথা- ‘বিদ্যা নামে তার কন্যা, আছিল। পরম ধন্যা, রূপে ল], গুণে সম্ভবতী এস্থলে বিদ্যারে লক্ষ্মী ও সরস্বতীরূপে উল্লেখ করা হই- যাছে। স্বভাগে। পদার্থবিশেষের প্রকৃত অবস্থার বর্ণন যদি চমৎক রজনক হয়, তাহা হইলে, তাহাকে স্বভা-বাক্তি অলঙ্কা। বলে। যথা- (১) “পাখী সব করে রব রাতি পােহাইল, কাননে কুসুমকলি সকলি ফুটিল, রাখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে, শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে।” ইত্যাদি।

উপক্রমণিকা।
১/৩
(২) খরতর বেগে রথ পিছু পিছু ধায়,
ঘাড় বাঁকাইয়া ঘােড়া পুনঃ পুনঃ চায়।
শরীরের পূর্বভাগ শরাঘাত ভয়ে,
সম্মুখের দিকে যেন যাইছে সাধিয়ে।
শ্রমেতে বিবৃতমুখ, হ’তে দুই ভিত,
পড়িছে ঘাসের গ্রাস অর্ধেক চর্বিত।
দেখ দেখ দীর্ঘ লক্ষে ঐকৃষ্ণসার,
ভূমি হতে শূন্যেতে যাইছে বহুবার।”
দীপক।
যে স্থলে কতকগুলি প্রস্তুত ও কতকগুলি অ প্রস্তুত পদার্থের
এক ধৰ্ম্ম অর্থাৎ এক গুণক্রিয়ার সহিত সম্বন্ধ বর্ণিত হয়, অথবা
অনেক ক্রিয়ার একমাত্র কর্তৃকারক থাকে, তথাঃ দীপক অলঙ্কার
হয়। যথা:
“জগজ্জিগীষু শিশুপাল অধ্যাপ পূৰ্ব্ব জন্মের বলাবলেপে অবলিপ্ত
হইয়া জগতের যাবতীয় জীবকে উৎপীড়িত করিতেছে। সতী স্ত্রী
ও নিশ্চল প্রকৃতি জন্মান্তরেও পুরুষের অনুগামিনী হয়।”
এস্থলে প্রস্তুত “নিশ্চল প্রকৃতি ও অপ্রস্তুত “সতী স্ত্রী
উভয়ের এক অনুগমনক্রিয়ার সহিত সম্বন্ধ হইয়াছে। অনেক
ক্রিয়ার এক কর্তা। যথা-
‘ভাই তুমি এখানে নিশ্চিন্ত হিয়াছ, কিন্তু তােমার প্রণয়িনী
তােমর সংবাদ না প.ইয়া দুশ্চিন্তায় কাতর হইয়া উন্মত্তের ন্যায়
উঠিতেছেন, পড়িতেছেন, তােমার শয়নগৃহের দিকে দৌড়িতে
ছেন, হাসিতেছেন, কঁদিতেছেন। অতএব আর তােমার বিদেশে

১াণ
কবিতাবলী।
বিশ্ব করা উচিত নহে।” এখানে এক “প্রণয়িনী” কয়েকটা
ক্রিয়াপদের কর্তৃকারক।
০
ব্যাজস্তুতি।
নিন্দাচ্ছলে স্তুতি, বা স্তুতিচ্ছলে নিন্দা সূচিত হইলে ব্যাজস্তুতি
অলঙ্কার হয়। যথা-
‘সভাজন শুন,
জামাতার গুণ,
বয়সে বাঁপের বড়।
কোন গুণ নাই, যেথা সেথা ঠাই,
সিদ্ধিতে নিপুণ দড়।
মান অপমান,
সুস্থান কুস্থান,
অজ্ঞান জ্ঞান সমান।
নাহি জানে ধৰ্ম্ম, নাহি মানে কর্ম,
চন্দনে ভস্ম জ্ঞেয়ান।”
এস্থলে নিন্দাচ্ছলে মহাদেবের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রভৃতি গুণের
উল্লেখ পূর্বক স্তব করা হইয়াছে।
“খরধার করকা বর্ষিয়া জলধর,
চুতলি দলিলভ কীৰ্তি মহত্তর।”
এস্থলে স্মৃতিচ্ছলে মেঘের নিন্দা হইতেছে।
ছন্দঃ প্রকরণ।
বর্ণসংখ্যা বা মাত্ৰাসংখ্যার কোন প্রকার নিয়মিত পরিমাণ বা
বিভাগ অনুসারে পদাবলীর যে আবৃত্তি, তাহার নাম ছন্দ।
হল দুই প্রকার; মিত্র ক্ষর ও অমিত্রাক্ষর।
চামি চরণের কোনটার শেষ শব্দের সহিত যদি অন্য চরণের

উপক্রমণিকা।
১•
শেষস্থ শব্দের উচ্চারণগত মিল থাকে, তবে তাহক চিত্র
ক্ষর ছন্দ কহে। মিত্রাক্ষর ছন্দে, হয় কেবল চরণের অন্তে, না
হয় চরণ ও পদ উভয়ের অন্তেই মিল হইতে পারে। তােটক,
পয়ার প্রভৃতি ছন্দে কেবল চরণের অন্তেই মিল থাকে, কিন্তু,
ত্রিপদী প্রভৃতি ছন্দে চরণ ও পদ উভয়ের অন্তেই মিল থাকে।
যথা-
“কাড়ি নিল মৃগমদ নহিল্লোলে,
কাঁদে রে কলঙ্কী চঁাদ মৃগ লয়ে কোলে।
পয়ার।
“অভিনব বারি
স্বভাব তাহারি
নীচ মুখে বেগে ধায়।
কীট, রজ, তৃণ,
ভাসে অগণন,
পাণ্ডুর বরণ তায়।”
অমিত্রাক্ষর ছন্দে চরণের অন্থে মিল থা;ৰু না, ও লেখক
যেখানে ইচ্ছা বিরাম কেিত পারেন। অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচনা
করিবার নিয়ম পয়ার রচনার ন্যায়। কোথাও কোথাও উহার
বৈপরীত্যও থাকে। মেঘনাদবধ প্রভৃতি অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত।
মিত্রাক্ষর ছন্দ।
মিত্রাক্ষর ছন্দ নানাপ্রকার। তন্মধ্যে পয়ার, ত্রিপদী, চৌপদী,
ললিত ও একাবলী এই কয়েকটাই প্রধান।
পদ্য পাঠ করিতে করিতে মে স্থলে নিশ্বাস ত্যাগ ও পুনর্বার
গ্রহণ, অর্থাৎ বিরাম করিতে হয়, তাহার নাম যতি।
প্রতি চরণে, এত অক্ষরের পর যতি পড়িবে, এরূপ নিয়ম

কবিতাবলী।
নাই, অর্থ ও উচ্চারণের সুশ্রাব্যতার প্রতি মনােযােগ রাখিয়া
যেখানে ইচ্ছা বিরাম করিতে পারা যায়। পয়ার ছনে সচরাচর
অষ্টম অক্ষরের পর যতি পড়িয়া থাকে।
,
পয়ার ছন্দের প্রত্যেক পংক্তিতে, চতুর্দশ অক্ষর থাকে, এবং
সপ্তম বা অষ্টম অক্ষরের পর,
যতি পড়ে।
যথা-
“কৃষ্ণের বচন শুনি বললেন দেবী
বিষম পুত্রের শােক মনে মনে ভাবি।”
পয়ারের প্রত্যেক পংক্তিতে দুইটী করিয়া সমুদয়ে চারিটী চরণ।
প্রতি পংক্তির প্রথম চরণে আট অক্ষর ও দ্বিতীয় চরণে ছয় অক্ষর।
৫
পয়ার চনা করিবার নিয়ম।
(১) যদি প্রথম শব্দটা দুই অক্ষরের হয়, তবে দ্বিতীয় ও তৃতীয়
এই দুইটী শব্দ প্রত্যেকে দুই অক্ষরের, অথবা একটী চারি ও
অপয়টী দুই অক্ষরের হইবে। যথা-
“কন্যা দেখি দ্বিজ কিবা হইল অজ্ঞান।” (১)
“দেখ দ্বিজ মনসিজ জিনিয়া মূরতি।” (২)
(২) যদি প্রথম শব্দষ্টী তিন অক্ষরের হয়, তাহা হইলে দ্বিতীয়
শব্দটীও তিন অক্ষরের হইবে। যথা-
“সামান্য মনুষ্য বুঝ না হবে এ জন।”
(৩) যদি প্রথম শব্দটা চারি অক্ষয়ের হয়, তবে দ্বিতীয় শব্দটা
চারি অক্ষরে, অথবা দ্বিতীয় ও তৃতীয় শব্দ প্রত্যেকে দুই অক্ষরের
হইবে। যথা-
এত

উপক্রমণিকা।
৫.
সিংহগ্রীব বন্ধুজীব অধরের তুল (১)
খগরাজ পায় লাজ নাসিকা অতুল।” (২)
উৰ্দ্ধ বাহু করিয়া আকর্ণ টানি গুণ”। (৩)
(৪) প্রথম ও দ্বিতীয় দুইটী শব্দ দুই অক্ষরের হইলে, তৃতীয়
শব্দটী চারি অক্ষরের হইবে, অথবা তৃতীয় ও চতুর্থ এই দুইটী শব্দ
প্রত্যেকে দুই বা তিন অক্ষরের হইবে। যথা-
‘এত যদি কহিলেন-শ্রীকাম মাতারে” (১)
“হেন পুত্র বনে রাজা পাঠান কি দোষে” (২)
“এক সত্য পালহ পিতার অঙ্গীকার” (3)
পূর্বে পয়ার দুই পংক্তি ও চারি চরগে নিবদ্ধ হইত। এক্ষণে
অনেকে চারি পংক্তি অর্থাৎ আট চরণে এক একটা পয়ারের শ্লোক
শেষ করেন। এই পংক্তি গুলির মধ্যে প্রথমটীর তৃতীয়ের সহিত
মিল হয়, অথবা প্রথমটী চতুর্থের, সহিত মিলে ও দ্বিতীয়টী
তৃতীয়ের সহিত মিলে। কখনও বা এইরূপে একটী বা দুইটা
শ্লোক সাঙ্গ করিয়া শেষে দুইটী পরস্পর মিলের পংক্তি থাকে।
এইরূপ কৌশলে যে সকল পয়ার নিষ্পন্ন হয়, তাহাদের নাম পৰ্য্যায়-
সম, অর্ধসম ও শেষসম। উদাহরণ পুস্তকের মধ্যে অনুসন্ধান
করিলে দেখিতে পাইবে।
রঙ্গিল পয়ার।
যে পয়ারের চতুর্থ অক্ষর অষ্টম অক্ষরের সহিত মিলে, তাহার
নাম রঙ্গিল পয়ার। ইহা এক প্রকার লঘুত্রিপদী। যথা-
“দেখ দ্বিজ মনসিজ, জিনিয়া মূরতি
পদ্মপত্র, যুগ্মনেত্র, পরশয়ে শ্রুতি।”

১ly.
কবিতাবলী।
ভঙ্গ পয়ার।
প্রথম চরণে মিত্রাক্ষরমিলিত পদদ্বয়ে আট আট অক্ষর ও
দ্বিতীয় চরণে চতুর্দশ অক্ষর, অর্থাৎ ভঙ্গ পয়ারের প্রথম চরণ
আট অক্ষরে নিবদ্ধ হয় ও তাহার পুনরাবৃত্তি দ্বারা দ্বিতীয় চরণ
হয়। যথা-
“পণে জাতি কে চায়, পণে জাতি কে চায় ;
প্রতিজ্ঞায় যেই জিনে সেই লয়ে যায়।”
.
হীনপদ পয়ার।
প্রথম চরণে আট অক্ষর ও দ্বিতীয় চরণে চতুর্দশ অক্ষর। যথা-
“তব উপদেশ বাণী
অন্তরে জাগিছে মাের-দিবস রজনী।
এক্ষণে অনেকে পয়ারের চতুর্দশ অক্ষরের পর ‘হে’ এই এক
অক্ষর, বা দুই, তিন, চারি, পাঁচ বা ছয় অক্ষর পর্যন্ত বসাইয়া
পয়ারের মূতন নূতন প্রকার রচনা করেন। পঞ্চদশ অক্ষরের
একটা উদাহরণ নিম্নে প্রদত্ত হইল।
“কেন না শুনেছি পুরা তিন লােকে কয় হে
জলেতে কাটয়ে জল, বিষে বিষক্ষয় হে।”
ত্রিপদী।
ত্রিপদী ছন্দে তিনটী করিয়া পদ থাকে এবং পদে পদে ও
চরণে চরণে মিত্রাক্ষর হয়, অর্থাৎ প্রথম ও দ্বিতীয় পদের পরস্পর
মিল থাকে আর তৃতীয় পদটী যুগ্ম চরণের তৃতীয় পদের সহিত
মিলে। ত্রিপদী দুই প্রকার ; লঘুত্রিপদী ও দীর্ঘ ত্রিপদী।'

উপক্রমণিকা।
১৷•
লঘুত্রিপদী।
লঘুত্রিপদীর প্রথম ও দ্বিতীয় পদে ছয় ছয় অক্ষর ও শেষ পদে
আটটী অক্ষর থাকে। যথা-
কৈলাস ভূধর
অতি মনোহর,
কোটি-শশি পরকাশ।
গন্ধৰ্ব্ব কিন্নর,
যক্ষবিদ্যাধর,
অষ্পকেগণের বাস।”
তরল ত্রিপদী।
প্রথম ও দ্বিতীয় পদে ছয় ছয় অক্ষর এবং শেষ পদে নয়
অক্ষর। যথা-
“শুনি সবিশেষ,
করিল প্রবেশ
হাতে স্বর্গ প্রায় প্রায় রে।
কহিছে মদনে
নৃপের সদনে,
দেখিবে চল তথায় রে।”
ভঙ্গ লঘুত্রিপদী।
ইহার প্রথম চরণে দুইটী পদ থাকে, এই দুইটা পদ আটটা
করিয়া অক্ষরে নিবদ্ধ এবং পরস্পর ও যুগ্ম চরণের শেষ পদের সহিত
মিলিত। দ্বিতীয় চরণটী লঘুত্রিপদী। যথা-
“ওরে বাছা ধূমকেতু, মা বাপের পুণ্যহেতু
কেটে ফেল চোরে, ছেড়ে দেহ মােরে,
ধৰ্ম্মের বান্ধহ সেতু।”

sho
কবিতাবলী।
।
হীনপদা লঘুত্রিপদী।
প্রথম চরণে আটঅক্ষরযুক্ত একটি মাত্র পদ থাকে, কিন্তু
দ্বিতীয় চরণ অবিকল ত্রিপদীর ন্যায়। যথা-
“বহে মারুতলহরী
অঙ্গ পুলকিত,
প্রাণ উচ্ছসিত
অন্তর সুখী করি।”
দীর্ঘ ত্রিপদী।
দীর্ঘ ত্রিপদীতে প্রত্যেক চরণে ছাব্বিশটী অক্ষর থাকে, প্রথম
ও দ্বিতীয় পদে আট আটটট করিয়া যােলটী' ও শেষ পদে দশটী।
যথা-
“ভবানীর কটুভাষে লজ্জা হৈল কৃত্তিবাসে
ক্ষুধানলে কলেবর দহে।
বেলা হৈল অতিরিক্ত, পিত্তে হৈল গলা তিক্ত,
বৃদ্ধ লােকে ক্ষুধা নাহি সহে।”
ভঙ্গ দীর্ঘত্রিপদী।
ইহার প্রথম চরণে দশ অক্ষরযুক্ত দুইটী পদ থাকে, এই দুইটা
পরস্পর ও শেষ চরণের শেষপদের সহিত মিলে। দ্বিতীয় চরণটী
অবিকল দীর্ঘ ত্রিপদী। যথা-
“হায়রে বিধাতা নিদারুণ, কোন্ দোষে হইলি বিগুণ,
আগে দিয়া নানা দুখ, মধ্যে দিন কত সুখ,
শেষে দুখ বাড়ালি দ্বিগুণ।
}

উপক্রমণিকা।
১৮
হীনপদ। দীর্ঘত্রিপদী।
ইহার প্রথম চরণে দশ অক্ষরযুক্ত একটী পদ থাকে, কিন্তু
দ্বিতীয় চরণ দীর্ঘাত্রিপদী। যথা :
“কহে লক্ষ্মী শুন গৌরীপতি,
কহিতে না বাক্য সরে, অন্ন নাহি মাের ঘরে
আজি
বড়
দৈবের দুর্গতি।”
চতুষ্পদী বা চৌপদী।
চতুষ্পদী ছন্দে মিত্রাক্ষরাদির নিয়ম ত্রিপদীর ন্যায়, বিশেষের
মধ্যে এই, অন্ত্য পদ অন্যান্য পদ অপেক্ষা সচরাচর অল্পাক্ষরযুক্ত
হইয়া থাকে। চৌপদী দুই প্রকার ; দীর্ঘ ও লঘু।
দীর্ঘ চৌপদী।
ইহার প্রথম তিন পদে আট আট অক্ষর ও শেষ পদে ছয়,
অক্ষর থাকে। কখন কখন এই নিয়ম অপেক্ষা অক্ষর অল্পও হয়,
অধিকও হয়। যথা-
“মিছা দারা সুত লয়ে,
মিছ সুখে সুখী হয়ে,
ষে রহে আপনা কয়ে, সে মজে বিষাদে।
আর সব মিছা ফেন,
ভারত পেয়েছে টের গুরুর প্রসাদে।”
সত্য ইচ্ছা ঈশ্বরের
লঘু চতুষ্পদী।
ইহার প্রথম তিন পদে ছয়টা করিয়া আঠারটা অক্ষর
শেষ পদে সচরাচর পাঁচ অক্ষর থাকে, কিন্তু শেষ পদে ইহা অপেক্ষা
। অল্পও অক্ষয় হয়। যথা-

১৮d.
কবিতাবলী।
“গুণযােগ্য মান,
যদি লােকে স্থান,
পাইয়া ম্লান, তােমার মুখ ।
তব গুণ ধনে,
জানে কত জনে,
ভাবি দেহ মনে, ছাড়িয়া দুখ।”
হীনপদা চতুষ্পদী।
এই ছন্দও লঘু দীর্ঘাদিভেদে নানা প্রকার হইতে পারে।
যথা-
“ওরে আমার মাছি।
আহা কি নম্রতা ধর, এসে হাত ঘােড় কর, ,
কিন্তু কেন বারি কর তীক্ষ্ণ গুড় গাছি।”
ললিত।
ললিত ছন্দে চৌপদীর ন্যায় রিটী পদ থাকে, বিশেষের মধ্যে
এই, চৌপদীর প্রথম তিন পদে পরস্পর মিল থাকে, ললিতের
কেবল প্রথম দুই পদে মিল, তৃতীয় পদে মিল থাকা আবশ্যক নহে।
এই ছন্দ লঘু ও দীর্ঘ ভেদে দুই প্রকার।
লঘু ললিত।
ইহার প্রথম দুই পদে ছয় ছয় অক্ষর, শেষ পদে একাদশ অক্ষর
ও ষষ্ঠ অক্ষরের পর যতি। যথা-
নয়ন কেবল, নীল উৎপল,
মুখ শতদল, দিয়া গঠিল।
কুন্দে দন্ত পাতি, রাখিয়াছে গাঁথি,
অধরে নবীন পল্লব দিল ।

উপক্রমণিকা
shele
দীর্ঘ ললিত।
প্রথম দুই পদে আট আট অক্ষর, শেষ পদে পঞ্চদশ অক্ষর ও
অষ্টম অক্ষরের পর যতি। যথা-
“বিধুত-কলঙ্কী বলে, কলঙ্ক ধরেছে গলে,
আমি মলে আর তার কি অধিক পুষিবে,
ভুজঙ্গের সঙ্গে থাকা, অঙ্গে তার বিষ মাখা,
সে চন্দনে দৈল দেহ, কেবা তারে কষিৰে।”
একাবলী।
এই ছন্দে প্রতি চরণে একাদশ অক্ষর থাকে ও ষষ্ঠ বা পঞ্চম
অক্ষরের পর যতি পড়ে। যথা-
“উষাতে কৌমুদী হয় মলিনী,
নিদাঘে ম্লানা যেন কমলিনী।”
দ্বাদশ অক্ষর থাকিলে ও ষষ্ঠ বা সপ্তম অক্ষরের পর যতি পড়িলেও
একাবলী হয়। যথা-
“অস্তগত হয় যবে নিশাপতি,
মহীকে উজালে খদ্যোতভাতি।”
মিশ্রছন্দ।
এক্ষণে পয়ার, ত্রিপদী, চতুষ্পদী প্রভৃতি পরস্পর মিশ্রিত
করিয়া নূতন নূতন ছন্দ রচিত হইতেছে। ইহাদিগকে মিশ্রছন্দ
কহে। একটা মাত্র উদাহরণ দেওয়া যাইতেছে।
রসাল কহিল উচ্চে স্বর্ণ লতিকারে,
শুন মাের কথা ধনি, নিন্দ বিধাতারে।

কবিতাবলী। নিদারুণ তিনি অতি, নাহি জয়া তব প্রতি তেঁই ক্ষুদ্রকায় করি, সৃজিলা তােমারে।” পণ্যে, পদের কোমলতাসম্পাদন করিবার জন্য কতকগুলি সংযুক্ত বর্ণ বিযুক্ত করিতে হয়, অর্থাৎ সংযােগের মধ্যে আকার প্রভৃতির আগম হয়। যথা- সংযুক্ত বর্ণ। বিযুক্ত বর্ণ। বর্ণ। বরণ। দর্শন। দরশন,। গরন। বরিষা। নিরদয় ইত্যাদি। পদে এরূপ অনেক শব্দ ব্যবহৃত হয়, যাহা গদ্যে ও চলিত ভাষায় ব্যবহৃত হয় না। যথা-“উপজে” “নেউটাল” এবে” ইত্য নি। এতদ্ভিন্ন অনেক স্থলে ব্যাকরণের সূত্রের বিপর্যয় করিতে হয়। সে যাহা হউক, এই সকল নিয়ম পুস্তকে নির্দেশ করিয়া শেষ করা যায় না, পদ্য পাঠ করিতে করিতে পাঠক স্বয়ং এ সকল নিয়ম বুঝিতে পারিবেন। উপরে যে সকল ছন্দের লক্ষণ ও উদাহরণ প্রদত্ত হইল, তদ্ভিন্ন বাঙ্গালা ভাষার উন্নতির সহিত আরও অনেক প্রকার নুতন ও সংস্কৃতমূলক ছন্দ অধুনা এই ভাষায় প্রবেশ করিতেছে। এই সকলের বিশেষ দেখিবার জন্য বাবু নীলমণি মুখােপাধ্যায় প্রণীত নববােধ ব্যাকরণের ছন্দঃপ্রকরণ পাঠ কর। গজ্জন। . বর্ষা। নির্দয়।

শিহাবলী।
যমুনা তটে।
আহা কি সুন্দর নিশি চন্দ্রমা উদয়,
কৌমুদী-রাশিতে যেন ধৌত ধরাতল !
সমীরণ মৃদু মৃদু ফুলমধু বয়,
কল কল করে ধীরে তটিনীর জল ।
কুসুম পল্লব লতা নিশার তুষারে
শীতল করিয়া প্রাণ শরীর জুড়ায়,
জোনাকির পতি শােভে তরু-শাখা’পরে,
নিরিবিলি ঝি ঝি ডাকে, জগত ঘুমায় ।
হেন নিশি একা আসি, যমুনার তটে বসি,
হেরি শশী দুলে দুলে জলে ভাসি যায়।

কবিতাবলী।
কে আছে এ ভূমণ্ডলে, যখন পরাণ
জীবন-পিঞ্জরে কঁদে যমের তাড়নে,
যখন পাগল মন ভজে এ শ্মশান
ধায় শূন্যে দিবানিশি প্রাণ-অন্বেষণে,
তখন বিজন বন, শান্ত বিভাবরী,
শান্ত নিশানাথ-জ্যোতি বিমল আকাশে,
প্রশস্ত নদীর তট, পর্বত,উপরি,
কার না তাপিত মন জুড়ায় বাতাসে।
কি সুখ যে হেন কালে, গৃহ ছাড়ি বনে গেলে,
সেই জানে প্রাণ যা’র পুড়েছে হুতাশে।
ভাসায়ে অকূল নীরে ভবের সাগরে
জীবনের ধ্রুবতারা ডুবেছে যাহার,
নিবেছে সুখের দীপ ঘাের অন্ধকারে,
হুহু করি দিবানিশি প্রাণ কাঁদে যা’র,
সেই জানে প্রকৃতির প্রাঞ্জল মুরতি,
হেরিলে বিরলে বসি গভীর নিশিতে,
শুনিলে গভীর ধ্বনি পবনের গতি,
কি সান্ত্বনা হয় মনে মধুর ভাবেতে।
জানি মানব মন, হয় হেন কি কারণ,
অনন্ত চিন্তার গামী বিজন ভূমিতে।

যমুনা তটে।
হায় রে প্রকৃতি সনে মানবের মন
বাঁধা আছে কি বন্ধনে বুঝিতে না পারি,
নতুবা যামিনী দিবা প্রভেদে এমন,
কেন হেন উঠে মনে চিন্তার লহরী ;
কেন দিবসেতে ভুলি’থাকি সে সকলে
শমন করিয়া চুরি লয়েছে যাহায় ?
কেন রজনীতে পুনঃ প্রাণ উঠে জ্বলে,
প্রাণের দোসর ভাই বন্ধুর জ্বালায়?
কেন (বা) উৎসবে মাতি, থাকি কভু দিবা রাতি,
আবার নির্জনে কেন কাঁদি পুনরায় ?
ধৰ্ম্ম,
বসিয়া যমুনা তটে হেরিয়া গগন,
ক্ষণে ক্ষণে হলাে মনে কত যে ভাবনা,
দাসত্ব, রাজত্ব, আত্মবন্ধুজন,
জরা, মৃত্যু, পরকাল, যমের তাড়না,
কত আশা, কত ভয়ে, কতই আহলাদ,
কতই বিষাদ আসি হৃদয় পূরিল,
কত ভাঙি, কত গড়ি, কত করি সাধ,
কত হাসি, কত কঁদি, প্রাণ জুড়াইল!
রজনীতে কি আহলাদ, কি
মধুর রসাস্বাদ,
বৃন্তভাঙা মন যার সেই সে বুঝিল।

পদ্মের মৃণাল।
।
৮
পদ্মের মৃণাল এক, সুনীল হিল্লোলে,
দেখিলাম সরােবরে ঘন ঘন দোলে
কখন ডুবায় কায়,
কভু ভাসে পুনরায়,
হেলেদুলে আশেপাশে তরঙ্গের কোলে
পদ্মের মৃণাল এক সুনীল হিল্লোলে।
শ্বেত আভা স্বচ্ছ পাতা,
পদ্ম শত দলে গাঁথা,
উলটি পালটি বেগে স্রোতে ফেলে তােলে
পদ্মের মৃণাল এক সুনীল হিল্লোলে।
এক দৃষ্টে কতক্ষণ,
কৌতুকে অবশ মন,
দেখিতে, শশাকের বেগ ছুটিল কল্লোলে-
পদ্মের মৃণাল এক তরঙ্গের কোলে।
সহসা চিন্তার বেগ উঠিল উথলি
পদ্ম, জল, জলাশয় ভুলিয়া সকলি,
অদৃষ্টের নিবন্ধন, ভাবিয়া ব্যাকুল মন
অই মৃণালের মত হায় কি সকলি ?
রাজা রাজ-মন্ত্রী-লীলা, বলবীৰ্য শ্রোতঃশীলা,
সকলি কি ক্ষণস্থায়ী দেখিতে কেবলি ?-
অই মৃণালের মত নিস্তেজ সকলি ।

পরের মৃণাল।
দৃষ্ট বিরােধী যার, নাহি কি নিস্তার তার,
কিবা পশুপক্ষী আর মানবমণ্ডলী ?
লতা, পশু, পক্ষী সম,
মানবেরো পরাক্রম,
জ্ঞান, বুদ্ধি, যত্ন বলে বাঁধা কি শিকলি ?
অই মৃণালের মত হায় কি সকলি ।
কোথা সে প্রাচীন জাতি মানবের দল
শাসন করিত যারা অবনীমণ্ডল ?
বলবীৰ্য্য পরাক্রমে,
ভবে অবলীলাঞ্জমে
ছড়াইত মহিমার কিরণ উজ্জ্বল
কোথা সে প্রাচীন জাতি মানবের দল ?
বাঁধিয়ে পাষাণস্তুপ,
অবনীতে অপরূপ,
দেখাইলা মানবের কি কৌশল বল—
প্রাচীন মিসরবাসী- কোথা সে সকল ?
পড়িয়া রয়েছে স্তুপ,
অবনীতে অপরূপ,
কোথা তারা, এবে কারা হয়েছে প্রবল
শাসন করিতে এই অবনী-মণ্ডল।
অতুল্য অবনীতলে,
জগতের অলঙ্কার আছিল যে জাতি,
জ্বালিল উন্নতিদীপ অরুণের ভাতি;
এখন মহিমা জ্বলে,
কে আছে সে নরন্য কুলে দিতে বাতি ?
এই কি কালের গতি, এই কি নিয়তি।

কবিতাবলী। ম্যারাথ, থার্মপলি হয়েছে শ্মশানস্থলী, গিরীস আঁধারে আজ পােহইছে রাতি ;- এই কি কালের গতি এই কি নিয়তি। যার পদচিহ্ন ধরে, অন্য জাতি দম্ভ করে, আকাশ, পয়ােধি-নীরে ছড়াইতে ভাতি- জগতের অলঙ্কার কোথায় সে জাতি ! দোর্দণ্ডপ্রতাপ যার কোথায় সে রােম? কঁপিত যাহার তেজে মহী, সিন্ধু, ব্যোম ! ধরণীর সীমা যার, ছিল রাজ্য অধিকার, সহস্রবৎসরাবধি একাদিনিয়ম- দোর্দণ্ডপ্রতাপ আজি কোথায় সে রােম। সাহস, ঐশ্বর্যে যার, ত্রিভুবন চমৎকার সে জাতি কোথায় আজি, কোথা সে বিক্রম ? এমনি অব্যর্থ কি রে কালের নিয়ম। কি চিহ্ন আছে রে তার রাজপথ দুর্গে যার, পৃথিবী বন্ধন ছিল, কোথায় সে রােম ? নিয়তির কাছে নর এত কি অক্ষম? } আরবের পারস্যের কি দশা এখন ? সে তেজ নাহিক আর, নাহি সে তজ্জন । সৌভাগ্য-কিরণজালে, উহারাই কোন কালে

পরের মৃণাল।
-
করেছিল মহাতেজে পৃথিবী শাসন।
আরবের পারস্যের কি দশা এখন।
পশ্চিমে হিস্পানীশেষ, পূবে সিন্ধু হিন্দুদেশ,
কাফর যবনবৃন্দে করিয়া দমন,
উল্কা সম অকস্মাৎ হইল পতন!
‘দীন’ বলে মহীতলে,
যে কাণ্ড করিলা বলে,
সে দিনের কথা এবে হয়েছে স্বপন
আরবের উপন্যাস অদ্ভুত যেমন !
আজি এ ভারতে, হয়, কেন হাহাধ্বনি।
কলঙ্ক লিখিতে যার, কঁদিছে লেখনী ।
তরঙ্গে তরঙ্গে নত
পদ্মমৃণালের মত
পড়িয়া পরের পায় লুটায় ধরণী।
আজি এ ভারতে কেন হাহাকার ধ্বনি।
জগতের চক্ষু ছিল,
কত রশি ছড়াইল,
সে দেশে নিবিড় আজ ভাঁধার রজনী
পূর্ণগ্রীসে প্রভাকর নিস্তেজ যেমনি
বুদ্ধিবীৰ্য বাহুবলে,
সুধন্য জগতী-তলে,
ছিল যারা আজি ভারা অসার তেমনি।
আজি এ ভারতে কেন হাহাকার ধ্বনি।
-
কোথা বা সে ইন্দ্রালয়, কোথা সে কৈলাস ?
কোথা সে উন্নতি-অশ, কোথা সে উল্লাস ?

জীবন সঙ্গীত।
বলল না কাতর স্বরে
বৃথা জন্ম এ সংসারে,
এ জীবন নিশার স্বপন ;
দারা, পুত্র, পরিবার, তুমি কার কে তোমার,
বলে জীব করাে না ক্রন্দন।
মানব-জনম সার,
এমন পাবে না আর,
বাহ্যদৃশ্যে ভুলাে না রে মন।
কর যত্ন হবে জয়,
জীবাত্মা অনিত্য নয়,
অহে জীব কর আকিঞ্চন।
করাে না সুখের আশ,
পরাে না দুখের ফাঁস,
জীবনের উদ্দেশ্য তা নয়,
সংসারে সংসারী সাজ,
কর নিত্য নিজ কাজ,
ভবের উন্নতি যাতে হয়।
দিন যায়, ক্ষণ যায়,
সময় কাহারাে নয়,
বেগে ধায়, নাহি রহে স্থির
সহায় সম্পদ বল,
সকলি ঘুচায় কাল,
আয়ু যেন শৈবালের নীর।
সংসার-সমরাঙ্গনে
যুদ্ধ কর দৃঢ় পণে;
ভয়ে ভীত হও না মানব ;
।

জীবন সঙ্গীত। ৮ কর যুদ্ধ বীৰ্য্যবান, যায় যাবে যা প্রাণ, মহিমাই জগতে দুর্লভ। মনােহর মূৰ্ত্তি হেরে, ওহে জীব অন্ধকারে, ভবিষ্যতে করাে না নির্ভর ; অতীত সুখের দিনে পুনঃ আর ডেকে এনে চিন্তা করে হয়ে না কাতর। সাধিতে আপন ব্ৰত স্বীয় কাৰ্যে ও রত, এক মনে ডাক ভগবান ; সঙ্কল্প সাধন হবে, ধরাতলে কীৰ্ত্তি রবে, সময়ের সার বর্তমান। মহাজ্ঞানী, মহাজন, যে পথে করে গমন, হয়েছেন প্রাতঃস্মরণীয়, সেই পথ লক্ষ্য করে স্বীয়কীৰ্ত্তি-ধ্বজা ধরে, আমরাও হবে বরণীয়। সময়-সাগর-তীরে, পদাঙ্ক অঙ্কিত করে, আমরাও হব হে অমর ; সেই চিহ্ন লক্ষ্য করে অন্য কোন জন পরে যশাে-দ্বারে আসিবে সত্বর। করাে না মানবগণ, বৃথা ক্ষয় এ জীবন, সংসার-সমরাঙ্গন মাঝে সঙ্কল্প করেছ যাহা, সাধন করহ তাহা, রত হয়ে নিজ নিজ কাজে। ৩০

লজ্জাবতী লতা।
o:
০
ছুইও না ছুইও না উটি লজ্জাবতী লতা।
একান্ত সঙ্কোচ করে,
এক ধারে আছে সরে,
ছুঁইও না উহার দেহ রাখ মাের কথা।
তরু লতা যত আর,
চেয়ে দেখ চারি ধার
ঘেরে আছে অহঙ্কারে—উটি আছে কোথা ।
আহা ওইখানে থাকদিওনাক ব্যথা।
ছুইলে নখের কোণে
বিষম বাজিবে প্রাণে
যেও না উহার কাছে খাও মাের মাথা!
ছুঁইও না ছুইও না উটি লজ্জাবতী লতা!
লজ্জাবতী লতা উটি অতি মনােহর।
যদিও সুন্দর শোভা
নাহি তত মনােলােভা,
তবুও মলিন বেশ মরি কি সুন্দর।
যায় না কাহার পাশে,
মান মর্যাদার আশে,
থাকে কাঙ্গালির বেশে একা নিরন্তর,
লজ্জাবতী লতা উটি মরি কি সুন্দর।
নিশ্বাস লাগিলে গায়,
অমনি শুকায়ে যায়,
জানি কতই ওর কোমল অন্তর !

লজ্জাবতী লতা।
-
হায় এই ভূমগুলে, কত শত জন,
দণ্ডে দণ্ডে ফুটে উঠে,
অবনীমণ্ডল নুঠে,
শুনায় কতই রূপ যশের কীৰ্ত্তন।
কিন্তু হেন ম্রিয়মাণ,
সদা সঙ্কুচিত-প্রাণ,
রমণী, পুরুষগণে কে করে যতন ?
স্বভাব মৃদুল ধীর,
প্রকৃতিটি সুগম্ভীর,
বিরলে মধুরভাষী মানস-রঞ্জন;
কে জিজ্ঞাসি তাহাদের করে সম্ভাষণ ?
সমাজের প্রান্তভাগে,
তাপিত অন্তরে জাগে,
মেঘে ঢাকা অভাহীন নক্ষত্র যেমন,
ছুইও না উহার দেহ করি নিবারণ।
লজ্জাবতী লতা উটি মানস-রঞ্জন।

জীবন মরীচিকা।
জীবন এমন ভ্রম আগে কে জানিত রে ।
হ'য়ে এত লালায়িত কে ইহা যাচিত রে।
প্রভাতে অরুণােদয়,
প্রফুল্ল যেমন হয়,
মনােহরা বসুন্ধরা কুহেলিকা আঁধারে।
বারিদ, ভূধর, দেশ,
ধরিয়া অপূৰ্ব বেশ,
বিতরে বিচিত্র শােভা ছায়াবাজি আকারে।
কুসুমিত তরুচয়,
ব্ৰহ্মাণ্ড ভরিয়ে রয়,
ঘ্রাণে মুগ্ধ সমীরণ মৃদু মৃদু সঞ্চারে।
কুলায় বিহঙ্গদল,
প্রেমানন্দে অনর্গল,
মধুময় কলনাদ করে কত প্রকারে।
সেইরূপ বাল্য কালে, মন মুগ্ধ মায়াজালে ;
কত লুব্ধ আশা আসি স্নিগ্ধ করে আত্মারে।
‘পৃথিবী ললামভূত, নিত্য সুখে পরিপ্লত,”
হয় নিত্য এই গীত পঞ্চভূত মাঝারে।
ব্ৰহ্মাণ্ড সৌরভময়
মঞ্জু কুঞ্জ মনে হয়,
মনে হয় সমুদয় সুধাময় সংসারে।
মধ্যাহ্নে তাহার পর,
প্রচণ্ড রবির কর,
যেমন সে মনােহর মধুরতা সংহারে।

জীবন-মরীচিকা। থাকে কুহেলি অন্ধ, থাকে কুসুম-গন্ধ, ডাকে বিহগ-কুল সমীরণ ঝঙ্কারে। সেইরূপ ক্রমে যত, শৈশব, যৌবন গত, মনােমত সাধ তত ভাঙে চিত্ত-বিকারে। সুবর্ণ-মেঘের মালা, লয়ে সৌদামিনী ডালা, আশার আকাশে আর নিত্য নাহি বিহারে। ছিন্ন তুষারের ন্যায়; বাল্য-বাঞ্ছা দূরে যায়, তাপ-দগ্ধ জীবনের ঝঞ্ঝাবায়ু-প্রহারে। পড়ে থাকে দূর-গত, জীর্ণ অভিলাষ যত, ছিন্ন পতাকার মত ভগ্ন-দুর্গ-প্রাকারে। জীবনেতে পরিণত, এই রূপে হয় কত, মর্ত্যবাসি-মনােরথ, দগ্ধ বিধাতা রে! ধৰ্ম্ম-নিষ্ঠা-পরায়ণ, সুচারু-পবিত্ৰ-মন, বিমল স্বভাব সেই যুবা এবে কোথা রে। অসত্য-কলুষ-লেশ, বিঁধিলে শ্রবণদেশ, কলঙ্কিত ভাবিত যে আপনার আত্মারে। কোথা সে দয়ার্দ-চিত্ত, সংকল্প যাহার নিত্য, পর-দুঃখবিমােচন এ দুরন্ত সংসারে। অত্যাচার, উৎপীড়ন, করিবারে সংযমন, না করিত যেই জন ভেদাভেদ কাহারে। মানিত অনুরােধ, জানিত তােমােদ ; সে তেজস্বী-মহোদয় বাঞ্ছা এবে কোথা রে।

৫ কবিতাবলী। কত যুব যৌবনেতে, চড়ি আশা-বিমানেতে, ভাবে ছড়াইকে তকে প্রভা-আভা রে। তুলিকে কীৰ্ত্তির মঠ, স্থাপিৰে মঙ্গল ঘট, প্রণই ধারণী-তল দিকে নিত্য পূজা রে। কৈহ বা জগতে ধন্য, বীর-বৃশে অগ্রগণ্য, হয়ে চাহে চরণেতে বাঁধিরে ধরে। দেশে-হিতৈষী কেহ ভাবিয়া অসীম স্নেহ ব্রত করে প্রাণ দিতে স্বজাতির উদ্ধারে। কার চিত্তে অভিলাষ, হবে সারদার দাস, পিবে সুখে চিরদিন অমরতা সুধারে। কালের করাল স্রোতে, ভাসে যবে জীবনেতে, এই সব আশালুব্ধ প্রাণী থাকে কোথা রে ! কিশাের গাণ্ডীবধারী, জামদগ্ন্য,দৈত্যহারী, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কালিদাস কত ডােবে পাথারে। কৃতান্তের আশীর্বাদে, দিবানিশি কেহ কঁাদে, বিষম বৈধব্য-দশা-নিগড়েতে বাঁধা রে। দারুণ অপত্য-তাপে, দেখ গে কেহ বিলাপে, অন্নাভাষে জমনী কোথা বক্ষ বিদরে। আগে যদি জানিতাম, পৃথিবী এমন ধাম, তা হলে কি পড়িতাম আনায়ের মাঝারে ! কোথায় গেল সে প্রণয়, যে সখ্যতা-পাশে মন ছিল সদা রে। বাল্যকালে মধুময়,

জীবন-মরীচিকা।
সহপাঠী কেলিচর,
অভেদাত্মা হরিহর,
এবে তাহাদের সঙ্গে কতবার দেখা রে !
পতঙ্গপালের মত,
কর্মক্ষেত্রে অবিরত,
পকাৰ্য্য সাধনে রত,
কে বা ভাবে কাহারে ?
আহা পুনঃ কত জন,
করিয়াছে পলায়ন
মর্ত্য-ভূমি পরিহরি শমনের প্রহারে।
গগন-নক্ষত্রবৎ,
তাহারাই অকস্মাৎ,
প্রকাশে চিৎ কভু মৃদুরশ্মি মাখা রে।
আগে ছিল কত সাধ,
হেরিতে পূর্ণিমা চাদ,
হেরিতে নক্ষত্ৰশােভা নীলনভাে-মাঝারে।
বসন্ত বরষাকালে,
পিকবর, মেঘজালে,
হেরিতে দামিনী-লতা, কি আনন্দ আহা রে।
সে সাধ-তরঙ্গ-কুল,
এবে কোথা লুকাইল,
কে ঘুচালে জীবনের হেন রম্য ধাঁধা রে।
বিশুদ্ধ পৰিত্ৰ মন,
স্বর্গবাসি-সিংহাসন,
পঙ্কিল করিল কে রে দগ্ধচিত। অঙ্গারে।

অশােকতরু। কে তােমারে তরুবর, করে এত মনােহর, রাখিল এ ধরাতলে, ধরা ধন্য করে ? এত শােভা আছে কি এ পৃথিবী ভিতরে। দেখ দেখ কি সুন্দর, পুষ্প-গুচ্ছ থরে থর, বিরাজে শাখীর’পর সদা হাস্যভরে- সিন্দুরের ঝারা যেন বিটপী' উপরে। মরি কিবা মনােলোভা, ছড়ায়ে রয়েছে শােভা, আভা যেন উথলিয়া পড়িছে অম্বরে। কে আনিল হেন তরু পৃথিবী ভিতরে ? বল বল তরুবর, তুমি যে এত সুন্দর, অন্তরও তােমার, কি হে, ইহারি মতন ? কিম্বা শুধু-নেত্রশােভা মানব যেমন ? আমি দুঃখী তরুবর, তাপিত মম অন্তর, জানি মনের সুখ, সন্তোষ কেমন ; তরুবর, তুমি বুঝি না হয়ে তেমন ? অরে তরু খুলে বল, শুনে হই সুশীতল, ধরণীতে সদানন্দ আছে এক জন- হয় সন্তাপে যারে করিতে ক্রন্দন।

অশােকত।
জানিতাম তরুবর,
যদি হে তব অন্তর,
দেখাতাম একবার পৃথিবী তােমায়
মানবের মনচিত্রে কি আছে কোথায়।
কত মরু, বালুপ,
কত কাটা, শুদ্ধ কূপ,
ধূ ধূ করে নিরবধি অন্ধ ঝটিকায়
সরসী, নিঝর, নদী,কিছু নাহি তায়।
তা হলে বুঝিতে তুমি, কেন ত্যজি বাস-ভূমি,
নিত্য আসি কঁদি বসি তােমার তলায় ;
ত্যজে নর, ধুরি কেন তােমার গলায়।
তুমি তরু নিরন্তর,
আনন্দে অবনীপর,
বিরাজ বন্ধুর মাঝে, স্বজন-সােহাগে !
তরুবর, কেহ নাহি তােমারে বিরাগে।
ধরণী ফরান পান,
সুরন্স সুধা সমান ।
দিবানিশি বার মাস সম অনুরাগে,
পবন তােমার তরে যামিনীতে জাগে।
স্রোতােধারা ধরি পায়, কুলু কুলু করি ধায়,
আপনি বরষা নীর ঢালে শিরােভাগে ;
তরু রে বসন্ত তােরে স্নেহ করে আগে।
কল-কণ্ঠ মধুমাসে,
তোমারি নিকটে আসে,
শুনাতে আনন্দে বসে কুহু কুহু রব ;
তরুবর তােমার কি সুখের বিভব ।

১৮
কবিতাবলী।
তলদেশে মখমল,
তৃণ করে ঢল ঢল,
পতঙ্গ তাহাতে সুখে কেলি করে সব,
কতই সুখেতে তরু শুন ঝিল্লিরব ।
আসি সুখে পাতি পাতি, ছড়ায়ে বিমল ভাতি,
খদ্যোত যখন তব সাজায় পল্লব
কি আনন্দ তরু তাের হয় অনুভব !
•
তরু রে আমার মন,
তাপ-দগ্ধ অনুক্ষণ,
কেহ নাই শােকানলে ঢালে বারিধারা ;
আমি তরু, জগতের স্নেহ-মুখ হারা!
জায়া, বন্ধু, পরিবার,
সকলি আছে আমার,
তবু এ সংসার যেন বিষতুল্য কারা;
মনে ভাল, কেহ মােরে, বাসে না তাহারা।
, এ দোষ কাহারাে নয়,
আমিই কলঙ্কময়,
আমারি অন্তর হায়, কলঙ্কেতে ভরা-
আমি, তরু, বড় পাপী, তাই ঠেলে তারা।
বড় দুঃখী তরু আমি,
জানেন অন্তরযামী,
তােমার তলায় আসি ভাসি অশ্রু-নীরে,
দেখিয়া জীবের দুখ ভবের মন্দিরে।
এই ভিন্ন সুখ নাই,
তরু তাই ভিক্ষা চাই,
পাই যেন এই রূপে কাদিতে গম্ভীরে,
যত দিন নাহি যাই বৈতরণী তীরে।

চাতকপক্ষীর এতি।
এক তিল আছে আর অন্য যদি কেহ আর,
আমার মতন দুঃখী আসে এই স্থানে,
তরু, তারে দয়া করে তুষিও পরাণে।
০
চাতকপক্ষীর প্রতি।
কে তুমি রে বল পাখি,
সােণর বরণ মাখি,
গগনে উধাও হয়ে,
মেঘেতে মিশায়ে রয়ে,
এত সুখে সুধামাখা সঙ্গীত শুনাও ?
বিহঙ্গ নহ ত তুমি,
তুচ্ছ করি মর্ত্যভূমি,
জ্বলন্ত অনল প্রায়
উঠিয়া মেঘের গায়,
ছুটিয়া অনিল-পথে সুস্বর ছড়াও?
অরুণ-উদয়-কাষে,
সন্ধ্যার কিরণ-জালে
দূরগগনেতে উঠি,
গাও সুখে ছুটি ছুটি,
সুখের তরঙ্গে যেন ভাসিয়া বেড়াও।

কবিতাবলী।
সঙ্গীত ঝরে,
আকাশের তারাসহ
মধ্যাহ্নে লুকায়ে রহ,
কিন্তু শুনি উচ্চৈঃস্বরে,
শূন্যেতে
আনন্দ-প্রবাহ ঢেলে পৃথিবী জুড়াও।
একাকী তোমার স্বরে
জগত প্লাবিত করে,
শরতের পূর্ণ শশী
বিমল আকাশে বসি,
কৌমুদী ঢালিয়া যথা ব্ৰহ্মাণ্ড ভাসায়,
পাতায় নিকুঞ্জ গাঁথা,
গোলাপ'অদৃশ্য যথা,
সৌরভ লুকায়ে রয়,
যখনি পবন বয়,
সুগন্ধ উথলি উঠি বায়ুরে খেপায়।
সেই রূপ তুমি, পাখি,
অদৃশ্য গগনে থাকি,
কর মুখে বরিষণ
সুধার অনুক্ষণ
ভাসাইতে ভূমণ্ডল সুধার ধারায়।
যত কিছু ভূমণ্ডলে
সুন্দর মধুর বলে-

চাতকপক্ষীর প্রতি।
নবীন মেঘের জল,
মুক্তা মাখা তৃণদল
তােমার মধুর স্বরে পরাজিত হয়।
পাখী কিম্বা হও পরী,
বল রে প্রকাশ করি,
কি সুখ চিন্তায় তোর
আনন্দেহয়েছ তাের ?
এমন আহলাদ আহা স্বরে দেখি নাই।
তাের এ আনন্দময়,
সুখ-উৎস, কোথা রয়,
বন কিম্বা মাঠ গিরি
গগন হিল্লোলে হেরি--
কারে ভালবেসে এত ভুল সমুদয়।
গগন বিহারী পাখি
জগতে নাহি রে দেখি,
গীত বাদ্য মধুর
হেন কিছু মনােহর
তুলনা হইতে পারে তােমার যাহায়।
যে আনন্দে আছ ভােরে
তাহার তিলেক মােরে
পাখী তুমি কর দান,
তা হলে উন্মত্ত প্রাণ
কবিতা-তরঙ্গে ঢালি দেখাই ধরায়।

পরশ মণি।
কে বলে পরশমণি অলীক স্বপন।
ওই যে অবনী-তলে,
পরশ-মাণিক জ্বলে,
বিধাতানিৰ্ম্মিত চারু-মানব-নয়ন।
পরশমণির সনে,
লৌহ অঙ্গ পরশনে,
সে লৌহ কাঞ্চন হয়, প্রবাদ বচন,
এ মণি পরশে যায়,
ৰাণিক ঝলসে তায়,
বরিযে কিরণ-ধারা নিখিল ভুবন।
কবির কল্পিত নিধি,
মানবে দিয়াছে বিধি,
ইহারি পরশুগুণে মানব-বদন
দেবতুল্য রূপ ধরি,
আছে ধরা আলাে করি,
মাটীর অঙ্গেতে মাখা সােণার কিরণ।
।
পরশ-মাণিক যদি অলীক হইত,
কোথা বা এ শশধর,
কোথা বা ভানুর কর,
কোথা বা নক্ষত্র-শােভা গগনে ফুটিত ।
কে রাখিত চিত্র করে
চাঁদের জোছনা ধ'রে,
তরঙ্গ মেঘের অঙ্গে সুখেতে মাখায়ে?
কেবা এই সুশীতল
বিমল গঙ্গার দল
ভারত-ভূষণ করি রাখিত ছড়ায়ে ?

পরশমণি। ২৯ নানা রঙ্গে নানা ফুল মরাল, হরিণ, মৃগে, পৃথিবী শােভিয়া ? ইন্দ্রধনু-আললা তুলে সাজায়ে বিহঙ্গকুলে, কে রাখিত শিখি-পুচ্ছে শশাঙ্ক আঁকিয়া ? দিয়েছে বিধতা যেই.এ পরশমণি- স্বর্গের উপমাস্থল, হয়েছে এ মহীতল, সুখের আকর তাই হয়েছে ধরণী। কি আছে ধরণী অঙ্গে, নয়ন-মণির সঙ্গে, হয় মানব-চিত্তে আনন্দদায়িনী !– নদী জলে মীন খেলে, বিটপীতে পাতা হেলে, চরেতে বালুকা ফুটে, তৃণেতে হিমানী, পক্ষী-পাখা উড়ে যায় পিপীলি শ্রেণীতে ধায়, কঙ্করে তুষার পড়ে, ঝিনুকে চিক্কণী । তাতেও আনন্দ হয়- অরণ্য কুজঝটিময়, জ্বলন্ত বিদ্যুৎলতা, তমিস্রা রজনী। - ইহাই পরশমণি পৃথিবী ভিতরে ; ইহারি পরশ-বলে সখায় সখার গলে পরায় প্রেমের হার প্রফুল্ল অন্তরে ; শিখায় প্রেমের বেদ, ঘুচায় মনের ভেদ, প্রণয়-আহ্নিক করে সুখের সাগরে।

২৪
কবিতাবলী।
ধন্য এই ধরাতল,
প্রেম-ভােগবতী-জল
পবিত্র করেছে যারে খুলিয়া নিঝরে ;
যেখানে বেড়ায় ছুটি,
সখারূপে মননসুখে পৃথিবী উপরে।
কৈান্ পুণ্যে হেন নিধি, মানবে পায় রে বিধি-
গেল চলে চির দিন এই আশা ধরে ।
যুগল নক্ষত্র দুটি,
অপূর্ব মাণিক এই পরশ-কাঞ্চন।
স্নেহরূপ কত ফুল,
ফুটায় মণি অতুল,
ইহার পরশে ধরা আনন্দ কানন ।
জননী-বদন-ইন্দু,
জগতে করুণা-সিন্ধু,
দয়াল পিতার মুখ, জায়ার বদন,
শত-শশিরশ্মি-মাৰা,
চারু-ইন্দীবর আঁকা,
পুত্রের অধর ওষ্ঠ নলিন-আনন,
সােদরের সুকোমল,
স্ব-মুখ নিরমল,
পবিত্র প্রণয়পাত্র গৃহীর কাঞ্চন
এই মণি পরশনে,
হয় সুখ দরশনে,
মানব জনম সার সফল জীবন।
কে বলে পরশমণি অলীক স্বপন।

গঙ্গার উৎপত্তি।
হরিনামামৃত
পানে, বিমােহিত
সদা আনন্দিতনারদ ঋষি,
গায়িতে গায়িতে
অমরাবতীতে
আইল একদা উজলি দিশি।
হরষ অন্তরে
মহা সমাদরে
স্বগণ-সংহতি অমরপতি,
করি গাত্রোত্থান,
করিয়া সম্মান,
সাদর-সন্তাষে কােষে অতিথি।
পাদ্য-অর্ঘ দিয়া
মুনিরে পূজিয়া
চন্দ্রাগ্নি প্রভৃতি অমরগণ ;
করিয়া মিনতি
কহে, “ঋষি-পতি
কহ কৃপা করি, করি শ্রবণ,
কি রূপে উৎপত্তি হলাে ভাগীরথী
গাও পােবন প্রাচীন কথা।
বেদের উকতি, তােমার ভারতী,
অমৃত-লহরী-সদৃশ গাথা।”

কবিতাবলী। গুণি-বিশারদ, মুনি সে নারদ, ললিত পঞ্চমে মিলায়ে তান, আনন্দে ডুবিয়া নয়ন মুদিয়া তুম্ব বাজাইয়া ধরিল গান। “হিমাদ্রি অচল দেব-লীলা-স্থল যােগীন্দ্র-বাঞ্ছিত পবিত্র স্থান ; যাহার উপর নিসর্গ নিরখি জুড়ায় প্রাণ। অমর, 'কিন্নর, যাহার শিখরে সদা শােভা করে অসীম অনন্ত তুষার-রাশি ; যাহার কটিতে ছুটিতে ছুটিতে জলদ-কদম্ব জুড়ায় আসি। যেখানে উন্নত মহীরুহ যত প্রণত উন্নত-শিখর-কায় ; সহ বৎসর অজর অমর অনাদি ঈশ্বর মহিমা গায়। সেই হিম-গিরি শিখর উপরি অঙ্গিরাদি যত মহর্ষিগণ, অসিত প্রত্যই ভকতির সই ভজিতে ব্রহ্মাণ্ড-আদি-কারণ।

গঙ্গার উৎপত্তি। হেরিত উপরে নীলকান্তি ধরে শূন্য ধূ ধূ করে ছড়ায়ে কায় ; হেরিত অযুত অযুত অদ্ভুত নক্ষত্র ফুটিয়া ছুটিছে তায়। * মণ্ডলে মণ্ডলে শনি, শুক্র, চলে ঘুরিয়া ঘেরিয়া আকাশময় ; হেরিত চন্দ্রমা অতুল উপমা ভানু-উদয়। অতুল, উপমা, চারি দিকে স্থিত দিগন্ত বিস্তৃত হেরিত উল্লাসে তুষার-রাশি; বিস্ময়ে প্লাবিত, বিস্ময়ে ভাবিত অনাদি পুরুষে, আনন্দে ভাসি।” বলিতে বলিতে আনন্দ-বারিতে, দেবষি হইল রােমাঞ্চ-কায় ; ঘন ঘন স্বর গভীর প্রখর তাপুর ধ্বনি বাজিল তায়। গায়িল নারদ ভাবে গদগদ “এমন ভজন নাহি রে আর, ভূধর-শিখরে ডাকিয়া ঈশ্বরে গায়িতে অনন্ত-মহিমা তার।

কবিতাবলী। ইহার সমান ভজনের স্থান কি আছে মন্দির জগত-মাঝে ; জলদ-গর্জন, তরঙ্গ-পতন, ত্রিলােক চমকি যেখানে বাজে। কিবা সে কৈলাস, বৈকুণ্ঠ নিবাস, অলকা, অমর, নাহিক চাই; ‘জয় নারায়ণ বলিয়া যেমন ভুবনে ভুবনে ভ্রমিতে পাই।” নারদের বাণী শুনি অভিমানী অমর-মণ্ডলী বিমর্ষ হয় ; আবার আদে, গভীর নিনাদে সঙ্গীত-তরঙ্গ বেগেতে বয়। ৫. ঋষি কয়জন সন্ধ্যা সমাপন করি এক দিন বসিলা ধ্যানে ; দেবী বসুন্ধরা মলিনা কাতরা কহিতে লাগিলা আসি সেখানে ;- “খ ঋষিগণ, মানব-সংসার হলাে এবার ; সমুলে নিধন হলাে ছার খার ভুবন আমার অনাবৃষ্টি, তাপ, সহে না আর।”

গঙ্গার উৎপত্তি। শুনে ঋষিগণ ক'রে দৃঢ় পণ যােগে দিল মন একান্ত চিতে কঠোর সাধনা ব্ৰহ্ম-আরাধনা করিতে লাগিলা মানব হিতে। । মানব-মঙ্গলে ঋষিরা সকলে কাতরে ডাকিছে করুণাময় মানবে রাখিতে নারায়ণ-চিতে হইল অসীম করুণােদয়। দেখিতে দেখিতে হলো চম্বিতে গগন-মগুল তিমিরময় ; মিহির, নক্ষত্র, তিমিরে একত্র অনল, বিদ্যুত, অদৃশ্য হয়। ব্ৰহ্মাণ্ড ভিতর নাহি কোন স্বর অবনী, অম্বর, স্তম্ভিত প্রায় নিবিড় আঁধার ; জলধি হুঙ্কার, বায়ু-বজ নাদ নাহি শুনায়। নাহি করে গতি গ্ৰহদুল-পতি, অবনী মণ্ডল নাহিক ছুটে, নদ নদী জল হইল অচল নিঝর না ঝরে ভূধর ফুটে।

কবিতাবলী। ৪ দেখিতে দেখিতে পুনঃ আচম্বিতে গগনে হইল কিরণােদয় ; ঝলকে ঝলকে অপূর্ব আলােকে পূরিল চকিতে ভুবন-ত্রয় ! শূন্যে দিল দেখা কিরণের রেখা, তাহাতে আকাশে প্রকাশ পায়— অতুল চরণ সলিল-নিঝর বহিছে তায়। ৰহ্ম সনাতন ৩ বিন্দু বিন্দু বারি পড়ে সারি সারি ধরিয়া সহস্র সহস্র বেণী দাঁড়ায়ে তারে । কমণ্ডলু করে আনন্দে ধরিছে কমলযােনি। । গভীর গর্জনে দেখিনু গগনে ব্ৰহ্ম-কমণ্ডলু হতে আবার জলস্তম্ভ ধায়, রুজতের কায়, মহাবেগে বায়ু করি বিদার। ভীম কোলাহলে নগেন্দ্র অচলে সেই বারিরাশি পড়িল আসি, সাজিয়া সুন্দর মুকুটে ধরিল সলিল রাশি। ধর-শিখর

গঙ্গার উৎপত্তি।
স্তম্ভের গঠন
রজত বরণ
অনন্ত গগন ধরেছে শিরে,
হিমানী-আবৃত
হিমাদ্রি পর্বত
চরণে পড়িয়া রয়েছে ধীরে।
চারিদিকে তার
রাশি ও পাকার
ফুটিয়া ছুটিছে ধল ফেণা,
ঢাকি গিরি-চূড়া,
হিমানীর গুড়া
সদৃশ খসিছে সলিল-কণা--
ভীষণ আকার
ধরিয়া আবার
তরঙ্গ ধাইছে অচল-কায়,
নীলিম-গিরিতে হিমানী রাশিতে
ঘুরিয়া ফিরিয়া মিশায়ে যায়।
হইল চঞ্চল
হিমাদ্রি অচল ;
বেগেতে বহিল সহস্র ধারা,
পাহাড়ে পাহাড়ে তরঙ্গ আছড়ে
ত্রিলোেক কপিল আতঙ্কে সারা।
ছুটিল গর্বের্বতে গোমুখী-পর্বতে
তরঙ্গ সহস্ৰ একত্র হয়ে,
গভীর ডাকিয়া
আকাশ ভাদিয়া
পড়িতে লাগিল পাষাণ লয়ে।

কবিতাবলী। বেগে বক্রকায় স্রোতস্তম্ভ ধায় যােজন অন্তরে পড়িছে নীচে; নক্ষত্রের প্রায় ঘেরিয়া তাহায় শ্বেত ফেণ-রাশি পড়িছে পিছে। তরঙ্গ-নির্গত বারি কণা যত হিমানী চূর্ণিত, আকার ধরে ; ধুমরাশি প্রায় ঢাকিয়া তাহায় জলধনু-শােভা চিত্রিত করে। শত শত ক্রোশ জলের নির্ঘোষ দিবস রজনী করিছে ধ্বনি, অধীর হইয়া প্রতিধ্বনি দিয়া পাষাণ খসিয়া পড়ে অমনি। ছাড়ি হরিদ্বার শেষেতে আবার ছড়ায়ে পড়িল বিমল ধারা, স্রোতস্বতী জল বহিল তরল-পারার পরা। শ্বেত, সুশীতল অবনী মণ্ডলে সে পবিত্র জলে হইল সকলে আনন্দে ভাের, ‘জয় সনাতনী পতিত-পাবনী’ ঘন ঘন ধ্বনি উঠিল ঘাের।”

চিন্তাকুল যুবা।
শীতল বাতাস বয়; জলের কল্লোল।
রাঙ্গা রবি-ছবি লয়ে খেলায় হিল্লোল।
ধীরে ধীরে পাতা পঁপে, পাখী করে গান।
লােহিত-বরণ ভানু অস্তাচলে যান।
বিচিত্র গগনময় কিরণের ঘটা।
হরিদ্রা, পাটল, নীল, লােহিতের ছটা।
হেরিয়া ভবের শােভা, জুড়ায় নয়ন।
শীতল শরীর সেবি মলয় পবন ।
হেন সন্ধ্যাকালে যুবা পুরুষ নবীন।
প্রময়ে নদীর কূলে একা একদিন।
ললাটের আয়তন, সুচারুবরণ।
লােচনের আভা তার মুখের কিরণ।
দেখিলে মানুষ বলি মনে নাহি লয়।
সুরপুর-বাসী বলি মনে ভ্রম হয়।
শাপেতে পড়িয়া যেন ধরার ভিতরে।
পূর্ব কথা আলােচনা করিছে কাতরে ।

কবিতাবলী।
•
এক দৃষ্টে এক দিকে রহি কত ক্ষণ ।
কহিতে লাগিল
যুবা
প্রকাশি তখন।
“দেবের অসাধ্য রােগ, চিন্তার বিকার।
প্রতিকার নাহি তার বুঝিলাম সার।
নহিলে এখনাে কেন অন্তর আমার
ব্যথিত হতেছে এত, দহনে তাহার ।
চারিদিকে এই সব জগতের শোভা।
কিছুই আমার কাছে নহে মনােলােভা।
এই যে অলক্তময় ভানুর মণ্ডল।
এই সব মেঘ যেন জ্বলন্ত অনল ।
এই যে মেঘের মাঝে দিবাকর ছটা।
সােণার পাতায় যেন সিঁদুরের ঘটা।
এই শ্যাম দুর্বাদল এই নদীজল।
মণ্ডিত লােহিত রবি-কিরণে সকল ।
নিরানন্দ রস-হীন সকলি দেখায়।
নয়নের কাছে সব ভাসিয়া বেড়ায়।
মনের আনন্দে ওই পাখী করে গান।
জানায় জগত জনে রবি অস্ত যান।
ঊর্ধপুচ্ছ গাভী ওই পাইয়া গোধূলি ।
ধাইতেছে ঘরমুখে উড়াইয়া ধূলি।
কৃষক, রাখাল, আর গৃহী যত জন।
সেবিয়া শীতল বায়ু, পুলকিত মন।

চিন্তাকুল যুবা।
পৃথিবীর যত জীব প্রফুল্ল সকল।
অভাগা মানব আমি অসুখী কেবল
ত্যজি গৃহ-কারাগার এমু নদীতটে।
দেখিতে ভবের শােভা আকাশের পটে।
ভাবিনু শীতল বায়ু পরশিলে গায়।
চিন্তার বিষের দাহ নিবারিবে তায়।
চিন্তা-বিষে মন ফর জ্বলে একবার।
নিরুপায় সেই জন, বুঝিলাম সার।
এ ছার’—এমন কালে, প্রিয়সখা তার।
আসি, পাশে দাড়াইয়া, করে নমস্কার।
একাকী এখনাে হেথা কিসের কারণ
বলিয়া সুধায় তায়, সেই বন্ধু জন ।
“এস এস এস ভাই, প্রাণের কমল।
দেখ বুকে হাত দিয়ে হলাে কি শীতল ।
ভেবেছি আমি হে সার নরক সংসার।
প্রাণী ধরিবার ঘাের কল বিধাতার।
সাধু পুরুষের নয় রহিবার স্থান।
ভীষণ নরক কুগু কূপের সমান।
দৌরাত্ম্য, নিষ্ঠরাচার, ধরা-অলঙ্কার।
দ্বেষ, পরহিংসা, অর নৃশংস আচার।
দম্ভ, অহঙ্কার, মিথ্য', চুরি, পরদার।
প্রতারণা, প্রতিহিংসা, কোপ অনিবার।

কবিতাবলী।
নরহত্যা, অনিবার্য সংগ্রাম দুরন্ত।
কত লব নাম তার নাহি যার অন্ত।
পরিপ্লত বসুন্ধরা, এই সব পাপে।
স্মরণ করিতে দেহ থর থর কঁপে।
প্রতিকার কিসে তার বল দেখি ভাই।
এই দেখ নদীজলে ঝাঁপ দিতে যাই।”
এই কথা বলি তারে আলিঙ্গন করি।
যেতে চায় নরসখা, সখা রাখে ধরি।
ছিছি ভাই পাগলের মত কত বল।
কাপুরুষ-কথা কেন মুখে এ সকল ।
“ওহে সখে, কি বলিবে, বুঝি হে সকল ।
বুঝাইতে নারি ভাই মনেরে কেবল।
কেমনে এমন দেহ ধারণ করিব।
কেমনে সংসার-পাপে ডুবিয়া রহিব।
আমার আমার করি সকলে পাগল।
হায় রে আপন পর জানে না কমল।
মনের মতন লোক মেলে নারে ভাই।
বল বল সাধু জন কোথা গেলে পাই।
ধৰ্ম্মশীল অকুটিল আছে কয় জনা।
কে না মিথ্যা বলে, কে না করে প্রতারণা
ইচ্ছা করে একেবারে পৃথিবী যুড়িয়া।
নূতন মানব জাতি আনি হে গড়িয়া।

চিন্তাকুল যুবা।
কেন ভগবান হেন পৃথিবী রচিল।
কলুষ-পাথারে পরে কেন ডুবাইল।
মাটীর শিকলে কেন আত্মা, মন বাঁধা।
আলো আঁধারিয়া করি কেন দেন ধাঁধা
মনে হয় ভেদ করি দেহের পিঞ্জর।
বিভু পাশে গিয়ে যােড় করি দুই কর।
সুধাই এ নরলােক-সৃজন-কারণ।
আর আর লােক সব করি দরশন।
সঠিক বলিছে তােমা না করি গােপন ।
এত দিন কোন কালে ফুরাইত রণ।
শুধু সেই অভাগিনী, তােমা কয় জন ।
পরকালভয়, ভাবি, পিতার কারণ।”
বলিতে বলিতে দোহে কথায় ভুলিয়া
নদী হতে কত দূরে আইল চলিয়া।
রমণীয় রূপ ধরে ভূতল গগন।
পরিয়া শারদ-শশী-রজত-ভূষণ।
আলো পেয়ে কাক ডাকে দিবস ভাবিয়া ।
রজনী রমণ হাসে রহস্য দেখিয়া ।
শীতল বাতাস বয়, যুড়ায় শরীর।
পাতায় পাতায় পড়ে নিশির শিশির।
বিমল গগনে হাসে চঁাদের মণ্ডল।
নীল জলে যেন শ্বেত কমলের দল।
r
৪

কবিতাবলী।
চারি দিকে প্রকৃতির শােভা অগণন।
মহিমা হেরিয়া হয় ভকতি জনন ।
যােড় করে দুই জনে মুদিয়া নয়ন।
বিভুগান করে প্রেমে ভক্তিতে মগন ।
“আনন্দে মিলাও তান, গাও রে বিভুর গান,
জয় জগদীশ বল মন
ত্যজ রে অনিত্য খেলা, ত্যজ রে পাপের মেলা
ভজ রে তাহার শ্রীচরণ ।
মহিমার ধ্বজা লয়ে,
বিমানে বিরাজ হয়ে,
চারিদিকে তারাগণ ধায়।
সাজিয়া মােহন সাজে,
বসিয়া ভবের মাঝে,
শশধর তঁার গুণ গায় ।
দিবস হইলে পরে,
প্রচণ্ড রবির করে,
প্রকাশে ভঁহার মহাবল।
স্থাবর, জঙ্গম, জল,
ব্যোম, বায়ু, মহীতল,
তার গুণ গাহিছে কেবল।
ভজ রে তাহার নাম, খোঁজ রে তাহার ধাম,
সেই জন ভবের ভাণ্ডারী।
সেই প্রভু ভয়ঙ্কর,
যমে যারে করে ডর,
সেই জন ভবের কাণ্ডারী ।

শচী-বিলাপ।
করেছি অনেক পাপ,
সহিব অনেক তাপ,
দয়াময় দয়া কর নরে।
ঠেল না চরণে ক'রে,
দেখা যেন পাই পরে,
এই নিবেদন পাপী করে।”
শচী-বিলাপ।
সায়াহ্নে সখীর সনে, বসিয়া নৈমিষবনে
শচী কহে সখীরে চাহিয়া।
“বল আর কত দিন, এ বেশে হেন শ্রীহীন
থাকিব লো মরতে পড়িয়া !
হেরে অমরাবতী, চপলা, দুঃখেতে অতি,
আছি এই মানব-ভুবনে।
ঘুচে মনের ব্যথা, জাগে নিত্য সেই কথা,
পুনঃ কবে পশিব গগনে।
স্বপনে যদ্যপি ছাই, সে কথা ভুলিতে চাই,
দেবেরে স্বপন নাহি আসে ।
জাগ্রতে সে দেখি যাহা, চিত্ত দগ্ধ করে তাহা,
প্রাণে যেন মরীচিকা ভাসে।

৪
কবিতাবলী।
নয়নের কাছে কাছে, সতত বেড়ায় আঁচে,
স্বরগের মনােহর কায়া।
সকলি তেমতি ভাব, দৃষ্টি-পথে আবির্ভাব,
কিন্তু জানি সকলি সে ছায়া !
ভ্রান্তি যদি হত কভু, কিছুক্ষণ সুখে তবু
থাকিতাম যাতনা ভুলিয়া ;
পােড়া মনে ভ্রান্তি নাই
দেবের কপালে ছাই,
বিধি সৃজে অস্বপ্ন করিয়া ।
অমৃত করিলে পান,
তবে বা জুড়াত প্রাণ,
সে উপায় নাহিক এখন।
কিরূপে, চপল, বল,
নিবসি এ ভূমণ্ডল,
চিরদুঃখে করিব যাপন।
মানবের এ অাগারে, থাকি যেন কারাগারে,
পূরিয়া নিশ্বাস নাহি পড়ে!
অতি গাঢ়তর বায়ু,
আই ঢাই করে আয়ু,
বুক যেন নিবদ্ধ নিগড়ে !
নয়ন ফিরাতে ঠাঁই, কোথাও নাহিক পাই,
শূন্য যেন নেত্ৰ-পথে ঠেকে।
সুখে নাহি দৃষ্টি হয়, চারিদিক বহ্নিময়,
আগুনে রেখেছে যেন ঢেকে।

শচী বিলাপ।
৪১
হায়! এ মাটীর ক্ষিতি, পায়ে বাজে নিতিনিতি,
শিলা যেন কঠোর কর্কশ ।
শুনিতে না পাই ভাল, শব্দ যেন সৰ্বকাল,
কর্ণমূলে ঝটিকা-পরশ !
এ ক্ষুদ্র ক্ষিতিতে থাকি, কেমনে শরীর রাখি,
সখি রে! সকলি হেথা স্থূল !
নিত্য এ খবতা-জ্ঞান, আকুল করে পরাণ,
কেমনে যে বাঁচে নর-কুল।
অমর—মরণ নাই
কত কাল ভাবি তাই,
এত কষ্টে এখানে থাকিব।
যখনি ভাবি লো সই, তখনি তাপিত হই,
চির দিন কেমনে সহিব।
নর জন্ম ভাল সখি,
মৃত্যু হয় বিষ ভখি,
মরিলে দুঃখের অবসান।
অনুদিন অনুক্ষণ,
নিদ্রাহীন অস্বপন,
জ্বলে না লো তাদের পরাণ ।
বরং সে ছিল ভাল, নাহি যদি কোন কাল,
দেখিতাম স্বরগ নয়নে।
আগে সুখ পরে পীড়া, আগে যশঃ পরে ব্রীড়া,
জীবিতের অসহ্য সহনে !

২
কবিতাবলী।
জানি সখি, গুল্ম ছাড়ি, তৃণদলে না উপাড়ি,
মহাঝড় তরুতেই বহে।
জানি সবসহা ভিন্ন, উত্তাপে না হয়ে খি,
অগ্নিদাহ অন্যে নাহি সহে।
!
তথাপি অন্তর দহে, এ ঘৃণা না প্রাণে সহে,
পূৰ্ব্ব-কথা সদা পড়ে মনে।
যে গৌর ছিল আগে, বাসবের অনুরাগে,
কার হেন ছিল ত্রিভুবনে !
কেমনে ভুলিব বল, মেঘে যবে আখণ্ডল,
বসিত কাৰ্ম্মক ধরি করে।
তুই সে মেঘের অঙ্গে, খেলাতি কত রঙ্গে,
ঘটাকার লহরে লহরে !
কি শোভা হইত তবে, বসিতাম কি গৌরবে
পার্শ্বে তার নীরদ-আসনে।
হইত কি ঘন ঘন,
মৃদু মন্দ গরজন,
মেঘ যবে দুলাত পবনে!
সুমেরু-শিখরে যবে, সুখে খেলিতাম সবে,
অমর সঙ্গিনী-গণ সহ,
উপরে অনন্ত শূন্য,
অনন্ত নক্ষত্ৰ-পূৰ্ণ,
সদা স্নিগ্ধ সদা গন্ধবহ;

শচী-বিলাপ।
ভ্ৰমিত নিৰ্ম্মল বায়, ফুটিয়া ফুটিয়া তায়,
কত পুষ্প সুমেরু শােভিত,
নিৰ্ম্মল কিরণ শােভা, সখি রে! কি মনােলােভা,
মেরু অঙ্গে নিত্য বরষিত ।
সখি সেই মন্দাকিনী, চিরান-প্রদায়িনী,
দেবের পরশ-সুখকর।
চলেছে নন্দন তলে,
উছলি মধুর জলে
ভাবিতে রে হৃদয় কাতর।
!
কার ভােগ্যা এবে তাহা, কার ভােগ্য এবে আহা,
আমার সে নন্দনবিপিন !
কে ভ্ৰমিছে এবে তায়, কেবা সে আঘ্রাণ পায়,
পারিজাতে কে করে মলিন।
জগতের নিরুপম, সখি। পারিজাত মম,
দৈত্য-জায়া পরিছে গলায় !
যে পুষ্প শচীর হৃদি, স্নিগ্ধ করিবারে বিধি
নিরমিলা অতুল শােভায় !

কাশী-দৃশ্য।
ওই দেখ বারাণসী বিরাজিছে গগনে--
বিশাল সলিল-রাশি
সম্মুখে চলেছে ভাসি,
জাহ্নবী-কোলেতে যেন হাসিতেছে স্বপনে !
শোভিছে সল-কোলে সারি সারি সাজিয়া
শত-সৌধ-চুড়া-মালা
কপালে কিরণ ঢালা,
স্তম্ভ’পরে স্তম্ভবর,
গবাঙ্গ গবাপর
কাধে কঁাধে বাধা যেন শূন্যদেশ যুড়িয়া !
০
উঠেছে সলিল-গর্ভে বারি-দর্প নিবারি
কত শিলাময় মঠ,
কত অট্টালিকা-পট,
জা, কটি, স্কন্ধদেশ অৰ্দ্ধনীরে প্রসারি।

৪৫.
কাশী-দৃশ্য।
শোভিছে পাষাণময়ী কাশী হের সােপানে-
শিলা বঁধা স্থলে জলে
সােপানের শ্রেণী চলে ;
ঊর্ধ-দেশে সৌধশ্রেণী ;
নিম্নে সােপানের বেণী
চলেছে সলিলতলে সরীসৃপ-বিধানে।
উঠিতে রবিচ্ছবি প্রাচীনের আকাশে,
কলরবে কলকল
করে জাহ্নবীর জল ;
দিগন্তে সে কলরব উঠে নিশি-বাতাসে।
প্রাণীময় যেন কূল নরড়েছে চিত্রিত !
ঘাটে ঘাটে ছত্রতলে
পথে, মঠে, স্থলে, জলে,
কত বেশে নারীর
আসে যায় নিরন্তর,
কোলাহলে কাশী যেন দিবানিশি জাগ্রত।
ওই দেখ উড়িতেছে “মাধােজীর ধরারা”
শূন্য ভেদি কাছে তার
ওই দেখ উঠে আর
দ্বিচূড়া মজীদ ওই, আলমগীর-পাহারা

কবিতাবলী।
ওই দিল্লীশ্বর-ছায়াতলে এই নগরী,
এই উচ্চ শিলা ঘাট,
এই পাহাড়ের পাট,
শত-চূড়া অট্টালিকা,
ক্ষুদ্র যেন পিপীলিকা,
অগাধ, সলিলে কিম্বা ক্ষুদ্র হেন সফরী !
হের হে দক্ষিণে তার আজো বৰ্ত্তমান
হিন্দুর উন্নতিছায়া
মানমন্দিরের কায়',
মানসিংহ-রাজ-কীৰ্ত্তি খ্যাত সব স্থান ;
=
অঙ্কিত কতই রূপ দেহেতে উহার
গ্রহাদি-নক্ষত্র-গতি
গণনার পদ্ধতি,
গ্রহণ-অয়ন-চক্র
পূর্ণ, খণ্ড, রেখা, বক্র,
ভারতের “গ্রীন উইছ” ওই আগেকার।
পড়েছে সূর্যের আলাে বর্ণের কলসে ;
ঝকিছে দেখ রে তায়
যেন সূৰ্য্য শত কায়,
সুবৰ্ণ-মণ্ডিত-চূড়া—দে উলের পরশে !

কাশী-দৃশ্য।
কাশী-মধ্যস্থলে ওই সুবর্ণের দেউটি-
ওই বিশ্বেশ্বর-ধাম,
ভারতে জাগ্রত নাম;
হিন্দু ধর্মের শিখা,
ওই মন্দিরেতে লিখা ;
অনন্তকালের কোলে জ্বলে ওই দেউটি ?
এ দিকে নদীর পারে বৃক্ষরাজি উপরে
অর্ধ বপু উৰ্দ্ধ করে
যেন বায়ুস্তর ধরে,
দুর্গা-মন্দিরের চূড়া বিরাজিছে অন্তরে ;
চলেছে তাহার তলে বলরাজি-কালিমা
শূন্য-কোলে রেগা মত
তরু-শ্রেণী-সারি যত,
স্বভাবের চিত্রকরা,
স্বভাবের শোভা-ধারা,
হরিত বরণে ঢাকা স্বভাবের প্রতিমা।
উঠেছে অদূরে তার দ্রবময়ী-সলিলে
স্ত,পাকার সৌধরাশি,
যেন সলিলেতে ভাসি,
কোলেতে গঙ্গার মূর্তি নিন্দা করে ধবলে।

৮
কবিতাবলী।
পুরাণের ব্যাসকাশী ছিল ঐ ভুবনে,
ওই চইতের গড়,
বুরুজ-গম্বুজ-ধড়
সুদৃঢ় প্রস্তরে ঢাকা,
ব্যাস-মূৰ্ত্তি চিত্রে আঁকা,
কাশী: রাজ-নিকেতন ওই সিংহ” ভবনে।
হে দুর্গে দুর্গতি-হরা কাশীশ্বর-গৃহিণী—
ভিখারী শিবের তরে
স্থাপিলে কি মৰ্ত্ত’পরে
এ সুন্দর বারাণসী, ওগাে শিব-মােহিনী ?
যাই থাক তব মনে, হে নগেন্দ্র-বালিকে,
মনােবাঞ্ছা পূর্ণ তব,-
একত্র করিলা ভব
কাশীতলে দয়াময়ি! দীনদুঃখী পালিকে ।
আমি মা ভিখারী এই ভব-রাজ্য-ভতরে,
কে দিবে আমারে ভিক্ষা-
পাব কি আমার দীক্ষা
প্রবেশিলে ওই পুরে অর্ধদগ্ধ অন্তরে ?
দুধারে বরুণ, অসি,
এইকাশী -বারাণসী,
বিরাজে গঙ্গার কুলে ধ্বজা তুলে অম্বরে।

বৃত্রাসুর বধ।
-[*]
হেথা ইন্দ্রে ঘাের-রণে দৈত্য-বীর যত
ঘেরিল নিমেষকালে। তুমুল সংগ্রাম
বাজিল বাসব সঙ্গে। কাম্বােজ, খড়ক,
খরখুর, ধবলক্ষ, ঘেরিল পুষ্পকে
স্বদল সহিত এককালে। সুর-পতি
যুঝিতে লাগিলা রণ-মদে। পশু-রাজে
বন-মাঝে নিষাদ ঘেরিলে, উন্মাদিত
পশু-রাজ ভীম লক্ষ ছাড়ি, ভ্রমে যথা
দশদিকে লণ্ডভণ্ড করি ব্যাধ-কুলে ;
তীক্ষ নখে, দস্তাঘাতে খণ্ড খণ্ড করি
নিক্ষিপ্ত তােমর, ভল্ল, কুঠার, মুদগর,-
তেমতি সুরেন্দ্র-রথ-গতি। ক্ষণে পূর্বে,
ক্ষণপরে উত্তরে আবার, অকস্মাৎ
পশ্চিমে, দক্ষিণে—যেন খেলে তড়িদ্দাম
সর্বস্থান দিগন্ত ব্যাপিয়া একেবারে !
যুঝিছে দনুজদল অসীম বিক্রমে,
ভিন্দিপাল, ভীষণ পরশু, প্রড়েন,

কবিতাবলী।
;
.
এ
নিমেষে নিমেষে ক্ষেপি ইন্দ্ররথোপরে।
কাটিছে সে অস্ত্র কুল ইন্দ্ৰমহাবল
ভুজ-দ ও মুণ্ড সহ শরে ; উড়াইছে
খণ্ড উরু বিশিখে বিন্ধিয়া ; ঘা, বাহু,
কক্ষ, বক্ষ, ললাট বিন্ধিছে লক্ষ বাণে।
নিরস্ত্র দনুজ-সৈন্য হৈল অচিরাৎ ;
পড়িল সমরক্ষেত্রে কোটি দৈত্য বীর
ছাড়ি সিংহনাদ। ক্রোধে দৈত্য সেনা তবে
ধাইল উপাড়ি বৃক্ষ, ছিড়ি শৈল-চূড়-
ছুটিল সচল যেন অরণ্য, ভূধর !
ছুটিল পুষ্পক শূন্যে মেঘ-মন্দ্রে ডাকি ;
নিনাদিল ধুনুগুণ ইন্দ্রের কাৰ্ম্মকে,
ছাইল কম্ব-কুল ঘনঘির-পথ,
সুর-পুরী অন্ধকার হৈল ক্ষণকালে ।
পড়িল কাম্বোজ, হলায়ুধ মহাসুর
খরখুর, খড়ক, পিঙ্গল, শ্বেতকেশ,
সেনাধ্যক্ষ আরো শত শত। ভঙ্গ দিল
দৈত্যদল রণস্থল ছাড়ি—ফেলি অস্ত্র,
গিরিশৃঙ্গ, মহাম-রাজি ; ফেলি রথ,
অশ্ব, হস্তী! ছুটিল তেমতি ঊর্ধ্বশ্বাসে
বায়ু-মুখে উড়ে যথ। কাশ! কিম্বা যথা
মহাঝড় উঠিলে ভূবরে, ধায় বড়ে

বৃত্রাসুর বধ।
পশু-পাল, পশু-পাল সহ ঊৰ্দ্ধশ্বাসে,
প্রাণভয়ে, পুচ্ছ তুলি করি ঘাের রব।
হেথা মহাসুর বৃত্র জয়ন্ত উদ্দেশে
ছুটে ঝটিকার গতি। হেরি মহারথ
কার্তিকেয় আদি সুর রক্ষিতে কুমারে,
চালাইলা দিব্য যান বেগে দ্রুততর ;
ছুটিলা অনল, দিবাকর, অম্ব-পতি,
বায়ু-কুলপতি প্রভঞ্জন ভীম দেব,
করাল অস্তক-মুৰ্ত্তি যম দণ্ড-ধর।
জ্বালাময় তিনচক্ষু ভীষণ হুঙ্কারি,
দাড়াইল দৈত্যরাজ, সুর-রথি-গণে
হেরি দূরে। হেরি দৈতে, যম দণ্ড-ধর,
কালিম-জলদ-বর্ণ, ঘাের স্বরে ভাষি,
কহিলা অমর-বৃন্দে—“হে দেব সেনানি,
শ্রান্ত সবে, বহুরণে যুঝিলা তােমরা,
ক্ষণকাল লভ হে বিশ্রাম—আমি যুঝি
দৈত্য-রাজে ক্ষণকাল আজি।” চাহি তবে
সম্বােধিলা বৃত্রাসুরে-“হে দানব-পতি
পরেত-পতিরে আজি ভেট রণভূমে।”
প্রেত-পতি বাক্যে বৃত্ৰ দুৰ্জ্জয় হুঙ্কারি
কহিল “হে ধৰ্ম্মরাজ, এত যদি সাধ
যুঝিতে বৃত্রের সহ-ধর দণ্ড তবে ;

২
কবিতাবলী।
প্রহারে বিদীর্ণ
।
হের দেখ রাখিনু ত্রিশূল, আজি ইহা
না ধরিব অন্য দেব-রণে, ইন্দ্ৰমুতে
কিম্বা ইন্দ্রে না আঘাতি’ আগে।” পার্শ্বদেশে
বিন্ধিলা ভৈরব শূল মনঃশিলাতলে
দৈত্য-পতি, ভীম গদা ধরিলা সাপটি,
ঘুরাইল ঘন স্বনে ঘুরাইলা যম
প্রচণ্ড করাল দণ্ড। দুই কী যেন
বন-মাঝে রণ-মদে করে করাঘাত,
তেমতি আঘাতে পেঁাহে দোহা। দণ্ড, গদা
নভস্তল ঘোর রব
উঠিল গগনে, ঘূর্ণ-পাকে ডাকে বায়ু,
চূর্ণ মনঃশিলা চারি চরণ ঘর্ষণে।
দ্বন্দ্ব-যুদ্ধ-বিশারদ দোহে, কেহ নারে
নিবারিতে কারে ; ভ্রমে নিরন্তর ঘুরি
দুই ঘন মেঘ যেন শূন্যে ভয়ঙ্কর।
প্রেত-রাজ কালদণ্ড ঘর্ঘরে ঘুরায়ে,
আঘাতিল ভীমাঘাত বৃত্র-মুষ্টি-তলে।
সে আঘাতে ফিরে দণ্ড-ফিরে বৃত্রগদা
গজদন্ত-বিনির্মিত বলে। (তখন) অসুর
বামস্কন্ধে শমনের ভীষণ বেগেতে
করিলা প্রচণ্ডাঘাত গদা ঘুরাইয়া।
যমরাজ বসিলা আঘাতে ভগ্ন-কটি,

বৃত্রাসুর বধ।
দ্রুম যথা ছিন্নমূল পড়ে মড় মড়ি।
তুলিল তখন দৈত্য ভয়ঙ্কর শূল
লক্ষ্য করি জয়ন্তের বিচিত্র পতাকা।
দিল। রড় দেব-রথি-গণ ঝড়-বেগে
হেরি সে ভীষণ অস্ত্র। দূর হইতে হেরি
চালাইলা পুষ্পক বিমান ইন্দ্রাদেশে
মাতলি,—ছুটিল প্রথ ঘন-দলে দলি
ঘর্ঘর নিনাদে ঘাের ত্রিদিব চমকি ;
জয়ন্তের প্রথমুখে পথ আচ্ছাদিয়া
দাড়াইল ক্ষণকালে। বিদুতের গতি
বাস-অমরনাথ, ছাড়ি সে স্যন্দন,
আরােহিলা উচ্চৈঃশ্রবা অশ্ব কুলেশ্বর।
শােভিল সুনীল তনু তনু-চ্ছদ ভেদি,
শুভ শুভ্র ভেদি যথা শশাভে নীলাম্বর।
স্ফটিক জিনিয়া স্বচ্ছ সুদিব্য কবচ,
শিরস্ত্রাণ- দৃঢ়, জিনি কঠিন অয়স ;
অপূর্ব কিশ্রণ-ছটা কিরীট আকারে
বেড়েছে নিবিড় কেশ—আভা ছড়াইয়া
স্বর্ণমেঘ মালা যেন ঘেরেছে মস্তক।
জ্বলিছে সহস্র অক্ষি।—ভীষণ দম্ভোলি
শূন্যে তুলি সুরনাথ অশ্বে আরােহিল।
ঠল নক্ষত্ৰগতি উচ্চৈঃশ্রবা হয়

কবিতাবলী।
মহাশূন্য ভেদ করি ; সুমেরু ছাড়িয়া
উচ্চ এবে দৈত্য-বপুঃনগেন্দ্র সদৃশ ;
বক্ষঃ-সমসূত্রে তার পক্ষ প্রসারিয়া
স্থির হৈলা অশ্বপতি।-ভাকিল দম্ভোলি
শত জীমুতের মন্দ্রে বাসবের করে।
হেরি ঘাের ঘন স্বরে ভীষণ অসুর
কহিলা নিনাদি উচ্চে—“হা, দন্তী বাসব,
ভাবিলে রক্ষিবে সুতে বৃত্রের প্রহারে !
কর তবে এ শূল-আঘাত সম্বরণ
পিতা পুত্র দুই জনে।--বেগে দিলা ছাড়ি।
ছুটিল ভৈরব শূল ভীম মূর্তি ধরি
মুহাশূন্য বিদারিয়া, কালাগ্নি জুতি ল
প্রদীপ্ত ত্রিশূল অঙ্গে। হেন কালে, হায়,
বিধির বিধান-গতি কে পারে বুঝিতে,
বাহিরিল শ্বেতবহু কৈলাসের পথে
সহসা বিমান-মার্গে, শূল মধ্যস্থলে
আকষি
অদৃশ্য
হৈল নিমেষ ভিতরে।
অদৃশ্য হইল শূল মহাশূন্য-কোলে।
হেরিয়া দনুজ-পতি কাতরহৃদয়
কহি। কৈলাসে চাহি, দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি,
“হা শম্ভু, তুমিও বাম!”—দগ্ধ হতাশ্বাসে
ছুটিলা উন্মাদপ্রায় হুঙ্কারি ভীষণ,

বৃত্রাসুর বধ।
সে দহন
ছিন্ন মস্ত-রাহু যেন! অগ্নি-চক্রাকার
ঘুরিল ত্রিনেত্র ঘাের-দন্তে কড় নাদ!
প্রলয়-ঝটিকা-গতি আসিয়া নিকটে
প্রসারি বিপুল ভুজ ধরিল। সাপটি
ইন্দ্রকরে ভীমবজউচ্ছিন্ন করিতে
অবর। বজদেহে জ্বালা ধক ধক
জ্বলিতে লাগিল ভয়ঙ্কর !
মহাসুর সহিতে না পারি গেল দূরে
ছাড়ি বজ ; ঘাের নাদে বিকট চিৎকারি,
লক্ষে লক্ষে মহাশূন্যে ভীম ভুজ তুলি’
ছিড়িতে লাগিল গ্রহ-নক্ষত্র-মণ্ডলী,
ছুড়িতে লাগিলা ক্রোঞ্জে-বাসবে আঘাতি
আঘাতি’ বিষমাঘাতে উচ্চৈঃশ্রবা হয়।
ব্ৰহ্মাণ্ড উচ্ছিন্ন প্রায়-কপিল জগৎ,
উজাড় স্বর্গের বন-উড়িল শূন্যেতে
স্বর্গ-জাত তরু-কাণ্ড! গ্রহ-তারা-দল,
খসিতে লাগিল যেন প্রলয়ের ঝড়ে!
উছলিল কত সিন্ধু, কত ভূমণ্ডল
খণ্ড খণ্ড হৈল বেগে—চূর্ণ রেণুপ্রায় ।
সে চীৎকারে, সে কম্পনে বিশ্ববাসী প্রাণী
চন্দ্র, সূৰ্য, শূন্য, গ্রহ, নক্ষত্র ছাড়িয়া,
ছুটিতে লাগিল ভয়ে, রােধিয়া শ্রবণ,

কবিতাবলী।
কৈলাস, বৈকুণ্ঠ, ব্ৰহ্মলােকে !—সে প্রলয়ে
স্থির মাত্র এ তিন ভুবন !-মহাকাল
শিব-দূত কৈলাস-দুয়ারে, নন্দী দ্বারী
কপিতে লাগিল ভয়ে । কপিতে লাগিল
ব্রহ্মলােকে ব্রহ্মার তােরণ ঘন বেগে।
কপিল বৈকুণ্ঠ-দ্বার ঘাের কোলাহল
সে তিন ভুবন মুখে, ঘন উচ্চৈঃস্বর—
“হে ইন্দ্র, হে সুরপতি, দম্ভোলি নিক্ষেপি”
বধ বৃত্রে-বধ শীঘ্র-বিশ্ব লােপ হয়!”
এতক্ষণ সুরপতি ইন্দ্র সে দুৰ্য্যোগে
ছিল হত-চেত: প্রায়--বিশ্ব-কোলাহলে
স্বপন-জাগ্রত যেন, বজ্র দিল ছাড়ি ;
না ভাবিলা না জানিল ছাড়িলা কখন।
ছুটিল গর্জিয়া বজ্র ঘাের শূন্যপথে,
ঊনপঞ্চাশৎ বায়ু সঙ্গে দিল যােগ,
ঘাের শব্দে ইরম্মদ-অগ্নি অঙ্গে মাখি,
আবর্ত, পুষ্কর মেঘ ডাকিতে ডাকিতে
ছুটিতে লাগিল সঙ্গে। সুমেরু উজলি
ক্ষণপ্রভা খেলাইল ; দিঙ্গুল যেন
ঘাের রঙ্গে সঙ্গে সঙ্গে ঘুরিয়া চলিল।
ঘুরিতে ঘুরিতে বজ চলিল অম্বরে
যেখানে অসুরপতি বিশাল-শরীর,

বৃত্রাসুর বধ।
---
বিশাল-নগেন্দ্র-তুল্য, ভীষণ আঘাতে
পড়িল বৃত্রের বক্ষে,—পড়িল অসুর,
বিন্ধ্য- ধরাধর যেন পড়িল ভূতলে !
বহিল নিরুদ্ধশ্বাস ত্রিভুবন যুড়ি।
বহিল বৃত্রের শ্বাসে প্রলয়ের ঝড়।
“হা বৎস, হা রুদ্রঋড়” বলিতে বলিতে
মুদিল নয়নত্রয় দুর্জয় দানব।
দহিল ঐন্দ্রিলা-চিত্ত প্রচণ্ড হুতাশে,
চিরদীপ্ত চিতা যথা। ব্রহ্মাণ্ড যুড়িয়া
ভ্রমিতে লাগিল বামা—উন্মাদিনী এবে।

শিশুর হাসি।
কি মধু মাখানাে, বিধি হাসিটি অমন
দিয়াছ শিশুর মুখে !
স্বর্গেতে আছে কি ফুল,
মত্তে যার নাহি তুল,
তারি মধু দিয়ে, কি হে, করিলে সৃজন ?
সৃজিলে কি, নিজ-সুখে ?
কিম্বা, বিধি, নর-দুখে
মনে করে,—ও হাসিটি করেছ অমন ?
জানি না তুমিই কি না আপনি ভুলিলে
সৃজনের কালে, বিধি!
গড়েছ ত এত নিধি,
উহার মতন, বল কি আর গড়িলে ?
নবনীর সর ছাকা,
সুন্দর শরত-রাকা,
তরুণ প্রভাত কি হে কোমল অমন ?

শিখর হাসি।
কা’রে গড়েছিলে আগে?
কারে বেশি অনুরাগে,
জন করিলে, বিধি, সৃজিলে যখন ?
ফুলের লাবণ্য, বাস,
অথবা শিশুর হাস,
কারে, বিধি, আগৈ ধ্যানে করিলে ধারণ ?
ছিল কি হে নর-জাতি-সৃজনের আগে
এ কল্পনা তব মনে ?
অথবা শশি-কিরণে
গড়িলে যখন-এরে গড় সেই রাগে ?..
দেখায়ে ছিলে কি উটি সৃজিলে যখন
অমৃত-পিপাসুদেবে ?
কি বলিল তারা সবে
দেখিল যখন ওই হাসিটি মােহন ?
অমৃত কি, ওহে বিধি, ভাল ওর চেয়ে ;
তবে কেন ছাড়ে তারা
সুধা-অন্ধ দেবতারা-
অমৃত অধিক মধু ও হাসিটি পেয়ে ?

কবিতাবলী। কিম্বা চেয়েছিল তারা, তুমিই না দিলে ; দিয়াছ এতই, হায় ! চিরসুখী দেবতায়, দুঃখী মানবের তরে ওটুকু রাখিলে ? দেখিলে শিশুর হাসি জীবিত যে জন কে না হাসে, কে না চায় আবার দেখিতে তায়? একমাত্র আছে ওই অখিল-মােহন- জাতি, দেশ, বর্ণভেদ, ধৰ্ম্মভেদ নাই শিশুর হাসির কাছে, সবি পড়ে থাকে পাছে, যেখানে যখনি দেখি তখনি জুড়াই । নাহি পর, আপনার, নাহি দুঃখ, সুখ, দেখিলে তখনি মন মাধুরীতে নিমগন, কি যেন উথলি উঠি, পূর্ণ করে বুক! । আয় আয় আয়, শিশু, অধরে ফুটায়ে ওই স্বরগের উষা, ওই অমরের ভূষা, তুলিয়া হৃদয়ে-দে রে মানবে ভুলায়ে :

শিখর হাসি।
হে বিধি, নিয়াছ সব, করেছ উদাসী,
এক হৃদয়ের আলো
উহারে করাে না কালাে,
অতুলনা দীপ ওটিনিও না ও হাসি।
চাহি না শীতল বায়ু, মুকুল-অমিয়,
চন্দ্র-কর বারি-কোলে
নাচিয়া নাচিয়া দোলে,
তাও নাহি চাই, বিধি,—ও হাসিটি দিও
ভাসরে চাদের কর—হাসরে প্রভাত,
ডাক পাখি, প্রিয় সুরে
দোল পাতা ঝুরে ঝুরে
পিঠে করি প্রভাকর-কিরণ-প্রপাত ;
উঠুক মানব-কণ্ঠে ললিত সঙ্গীত,
বাজুক অর্গান, বাঁশী,
তরল তালের রাশি
ছুটুক নৰ্তকী-পায় করিয়া মােহিত
কিছুই কিছুই নয়
ও হাসির তুলনায় ;
জশতে কিছুই নাই উহার মতন।
কি মধুমাখনাে বিধি, হাসিটি অমন
দিয়াছ শিশুর মুখে।

আশাকানন। বঙ্গে সুবিখ্যাত দামােদর নদ ক্ষীর-সম স্বাদু নীর ; বৃক্ষ নানাজাতি বিবিধ লতায় সুশােভিতু উভ তীর ; বিন্ধ্যগিরি শিরে জনমি যে নদ দেশ দেশান্তরে চলে, সিকতা-সজ্জিত সুন্দর সৈকত সুধৌত নিৰ্ম্মল জলে ; পবিত্র করিল। যেনদের কূল সুকবিকঙ্কণকবি, ফুটায়ে কবিতা কুসুম মধুর বাণীর প্রসাদ লতি ; রস- বিম্বলিত ভারত অমৃত-ভাষী যে নদ নিকটে আশাকানন। p জনমি সুক্ষণে বাঁশীতে উম্মত্ত করেছে গউড়-বাসী। সেই দামােদর তীরে এক দিন অরুণ-উদয়ে উঠি, দেখি শূন্যমার্গে ধরণী-শরীরে কিরণ পড়িছে ফুটি; দশ দিশ ভাতি, • পড়িছে কিরণ আকাশে মেঘের গায়, হরিদ্রা, লােহিত বরণ বিবিধ গগনে চারু শােভায় ; গগনললাটে চুর্ণ-কায় মেঘ স্তরে স্তরে স্তরে ফুটে, কিরণ মাখিয়া • পবন উড়িয়া দিগন্তে বেড়ায় ছুটে। পড়ে সূৰ্য্য-রশ্মি দামােদ-জলে আলাে করি দুই কূল ; পড়ে তরু-শিরে তৃণ-লতা-দলে রঞ্জিয়া প্রভাতি-ফুল। হেরি চারু শােভা ভ্রমি ধীরে ধীরে পরশি মৃদু পবন- সংসার-যাতনে হৃদয় পীড়িত, চিন্তায় আকুল মন।

কৰিাবণী। ভ্রমি কত বার কত ভাবি মনে শেষে শ্রান্তি-অভিভূত, বসি চক্ষু মুদি কোন বৃক্ষতলে ক্রমে তন্দ্রা আবির্ভূত ; ক্রমে নিদ্রা-ঘােরে অবসন্ন তনু পরাণী আচ্ছন্ন হয়, স্বপন-প্রমাদে সংসার-ভাবনা পাসরি সমুদয় ; ভাবি যেন নব নবীন প্রদেশে ক্রমশঃ কতই যাই, আসি কত দূর ছাড়ি কত দেশ কানন দেখিতে পাই। অতি মনোহর। কানন রুচির যেন সে গগন-কোলে, কিরণে সজ্জিত ঈষৎ চঞ্চল পবনে হেলিয়া দোলে ; বিটপে ভূষিত সরল সুর দেহ, সাজায়ে তাহাতে রােপিলা যেন বা কেহ। শােভে বন মাঝে বিচিত্র তড়াগ প্রসারি বিপুল কায় । বরণ হরিত বৃক্ষ সারি সারি আশাকানন। মেঘের সদৃশ সলিল তাহাতে, দুলিছে মৃদুল বায়। বারিশােভা করি কমল, কুমুদ কত সে তড়াগে ভাসে ; কত লচর করি কলধ্বনি নিয়ত খেলে উল্লাসে ; ভ্রমে রাজহংস সুখে কণ্ঠ তুলি, মৃণাল উপাড়ি খায় ; রৌদ্র সহ মেঘ তড়াগের নীরে ডুবিয়া প্রকাশ পায় ; তড়াগসলিলে প্রতিবিম্ব ফেলি কত তরু পরকাশে। পাশে হেলিয়া হেলিয়া তরঙ্গ তার ভাঙ্গিয়া ভাঙ্গিয়া ভাসে ; দুলিয়া দুলিয়া বায়ুর হিল্লোলে তটেতে সলিল চলে ; উড়িয়া উড়িয়া সুখে মধুকর বেড়ায় কমল দলে ; শ্যামা দেয় শীস, বন হৃষ্ট করি ভ্রমে সে ললিত তান; প্রতিধ্বনি তার পূরি’ চারিদিক আনন্দে ছড়ায় গান ;

কবিতাবলী। ঝরে সুমধুর কোকিল-ঝঙ্কার সকল কাননময়, মধুবৃষ্টি যেন ঘন কুহুরবে, শ্রুতি বিমােহিত হয়। তড়াগের তীরে হেরি এক প্রাণী বসিয়া সুদিব্য কায়া, করেতে মুকুর হাসিতে হাসিতে হেরিছে আপন ছায়া, মনোহর বেশ নিরখি সে প্রাণী ক্ষণে ক' নহে সুস্থির, ' নেহারি মুকুর নিমেষে, নিমেষে আনন্দে যেন অধীর যেন অপরূপ দেই । মুকুরের শোভা কত প্রতিবিম্ব তায়, পড়িছে ফুটিয়া হেরিছে সে প্রাণী হইয়া বিহ্বল প্রায়। জিজ্ঞাসি তাহারে কিবা নাম, কোথা ধাম, বসিয়া সেখানে কি হেতু সেরূপে করি কিবা মনস্কাম। হাসিয়া তখন কহিলা সে প্রাণী “আমারে না জান তুমি ? ; আসিয়া নিকটে আশাকানন। ন আশা মম নাম স্বরগে নিবাস, এবে সে নিবাস, ভূমি ; মানবের দুঃখে অমরের পতি পাঠাইলা ভূমণ্ডলে, দেবরাজ দয়া করিয়া মানবে আমায় আসিতে বলে থাকি চিরকাল সুখে স্বৰ্গপুরে ধরতে কিরূপে আসি, মরতে কেমনে স্বর্গের বিরহ সহিব তাহে জিজ্ঞাস ; শুনি শচীপতি করি আশীর্বাদ হাতে দিল। এ দর্পণ, কহিলা “দেখিবে ইথেযবে মুখ পাবে সুখ ততক্ষণ ; যে পরাণী ইথে দেখিবে বদন পাইবে অতুল সুখ, যাও ধরাতলে তাপিলে হৃদয় দর্পণে দেখিও মুখ । তদবধি আমি আছি ভূমণ্ডলে পুরী সৃজি এই স্থানে ; মানবের দুঃখ নিবারি জগতে জুড়াই তাপিত প্রাণে ;

কবিতাবলী।
যখন হৃদয়ে
স্বর্গের সৌন্দর্য্য
দেখিতে বাসনা হয়,
নিরখি দর্পণ
তুষি সে বাসনা,
শীতল করি হৃদয়।
হেরি চিন্তা-রেখা
ললাটে তোমার,
হবে বা তাপিত জন,
ভুলিবে যাতনা
ভাবনা সকলি,
' এ পুরী কর ভ্রমণ।

স্বর্গারােহণ। বলিলা কৃতান্ত (১) “খোল খোল দ্বার? খোল দ্রুতগতি হিরন্ময় জ্যোতি দ্বার” ডাকি অনুচরে মুখেতে প্রীতির ভার ; ‘সরি’ সংসার- লীলা আপনার, শ্রীমধুসূদন আসে, সম্ভাষি আদরে শহরে তাহারে বাণী-পুত্র-গণ-পাশে। কবি-কুঞ্জ-ধাম, পবিত্র কানন অমর ভবনে যাহা, নিরজন স্থান সদা মধুময় দেখাও উহারে তাহা ; যাও দ্রুতগতি যাও যাও সবে সুখে বংশীধ্বনি কর, সুন্দর মালিক। মস্তক উপরে ধর। কুসুমে গাঁথিয়া কবিতাবলী। ভুঞ্জ বহু দুখ সংসার-কারাতে শ্রীমধু দুঃখেতে আসে, ত্বরা করি যাও যশােগীতি গাও লও কবি-কুঞ্জ-বাসে।” খুলিল ত্বরিতে উত্তর তোরণ, সঙ্গীত ঝঙ্কারে ধায় ; দিগঙ্গনা-গণ দেবদূত সঙ্গে রঙ্গে যশােগীত গায়। ** এস এস সুখে বাণী-বর-পুত্র, বঙ্গের উজ্জ্বল মণি, স্বভাবের শিশু সুধাতে পালিত কল্পনা-হীরার খনি ; বাল্মীকি-হােমর মধুর সুতন্ত্রীধারী অকাল-কোকিল, মরুল-তরু, অনীর দেশের বারি। .এস ভাগ্যবান, কবি-কুঞ্জ-ধামে চির সুখে কাল হর, চিরজীবী হয়ে চির আকাঙিক্ষত জয়-মাল্য শিরে পর।” সুমন্ত্রে দীক্ষিত স্বর্গারােহণ। বলিতে বলিতে ঘেরিলা সকলে মণ্ডলী করিয়া আসি ; দিগঙ্গনা-দল শীর্ষ সাজাইল হাসি। কুমের দামে (৩) সখীগণ চলে কবি-কুঞ্জবনে কলকণ্ঠ ঝরে সুরে, কুসুম-বাসিত সুমন্দ মলয় সুগন্ধ বিতরে দূরে। ঘন কুহু-ধ্বনি, ভ্রমর-ঝঙ্কার, শ্যামার সুন্দর, তান ; বেণু-বীণা-ত অস্ফুট কাকলি পুলকিত করে প্রাণ। ভুলে মৰ্ত্ত-শােক, মধু সে আস্বাদ পায় অতুল আনন্দে নয়ন বিস্ফারি কবি-কুঞ্জ পানে চায়। চারিপাশে বামা মধুর কীৰ্ত্তন আকাশে, পবনে, ঘ্রাণে সুবাসিত মধুর সঙ্গীত ঝরে। মধুমত্ত কবি } কলকণ্ঠ-স্বরে করে, কবিতাবলী। যবে উতরিলা কবি-কুঞ্জ-ধামে শরীরে রােমাঞ্চ ধরি, “কবি ধন্য তুমি : শ্রীমধুসূদন ধ্বনিল কানন ভরি। সদা মধুময় - (৪) কবিকুঞ্জ সেই সুমিষ্ট সকলি তায়, স্বভাবের গুণে সকলি সুন্দর ক্ষণেরূপভেদ পায় ; এই ইন্দ্রধনু- তনু মনােহর, গগন উজ্জ্বল করে, ঝলকে ঝলকে ক্ষণ পরে এই বিজলী সুহাস্য ধরে ; সতত সুন্দর শরতের শশী সুনীল-অম্বরে ভাসে, সতত সুন্দর কুসুমের রাশি তরু-কোলে-কোলে হাসে ; স্বভাবের গুণে, সরসীর নীর ক্ষীরসম শোভা পায়, নদী-নদ-বারি প্রবাহ ঢালিয়া যায় ; অমৃত সঞ্চারি স্বর্গারােহণ। মধুময় যত নিখিল জগতে সকলি সেখানে ফলে, অতাপ অনল, অশােক বাসনা, গিরি, তরু, বায়ু, জলে। লীলা সাঙ্গ করি, হলে অবসর ওহে বঙ্গ-কুল-রবি, যতদিন ভবে থাকিব বাঁচিয়া ভাবিব তােমর ছবি ;- আকর্ণ-পূরিত সেই নেত্ৰ-দ্বয়, সুহৃৎ-রঞ্জন ভাণ, মধুচক্র-সম সরল কোমল প্রাণ ; আনন্দ-লহরী শােভিত আশার ফুলে, উৎসাহ-ভাসিত বদন-মণ্ডল মধুর ভাণ্ডার ভাষার নির পঙ্কজ বান্ধব-কুলে ; বীর-অবয়ব, বীরভাষা-প্রিয়, গৌড়-সন্ততি-সার, প্রিয়ম্বদ সখা প্রণয়ের তরু, কামিনী-কণ্ঠের হার ; সাহিত্য-কুসুমে প্রমত্ত মধুপ, বঙ্গের উজ্জ্বল রবি, ৭

বঃ
কবিতাবলী।
তোমার অভাবে
দেশ অন্ধকার
শ্রীমধুসূদন কবি।
দধীচির অস্থি দান
নগেন্দ্র-অঞ্চলে-যেথা নগেন্দ্র-সম্ভব।
তটিনী অলকানন্দা কল কল স্বরে
কহিছে, অটবী-অঙ্গ ধীরে প্রালিয়া,
“দিনমণি অস্তগত”—উরিলা সুরেশ
ছাড়িয়া অম্বরপথ। বিশাল বিস্তৃত
রম্য সে অরণ্য-দেশ !–সন্ধ্যার তিমির,
গাঢ়তর স্নেহে যেন দিয়া আলিঙ্গন,
আদরে ধরেছে সুখে অটবী-সখীরে !
অরণ্য-ভিতরে কত মহীরুহ-রাজি
পলাশ, শিরীষ, বট, অশ্বথ, শাল্মলী,
জটে জটে, স্কন্ধে স্কন্ধে, জড়ায়ে জড়ায়ে
নিঃশব্দে ভাবিছে যেন ভীম-বাত্যা-তেজ !

দধীচির অস্থি দান।
বিরাজিছে অরণ্যানী দেখিতে তেমতি,
হাসি, কান্না, ক্রোধ যেন একত্র মিশ্রিত !
কোথা শান্ত স্থির ভাব, কোথা ভয়ঙ্কর,
কোথা বা তমসা-পূর্ণ বিবর্ণ মলিন।
ধীর-পদে, শরীর ঘাের অন্ধকারে
চলিলা বাসব বক্র অরণ্য-বলতে,
শুনিতে শুনিতেকত-ফেরু-ঝিল্লী রব,
বিকট তক্ষক-নাদ, ভল্লুক-চীৎকার,
পেচকের খোর ধ্বনি, কেশরী-গর্জন,
ভয়াতুর বিহঙ্গের পক্ষের নিস্বন,
শাখাচ্যুত পল্লবের শ্বব্দ মৃদুতর,
পবনের স্ব স্ব সুঘাের নিশ্বাস।
নিবিড় তিমিরাচ্ছন্ন পল্লব-রাজিতে
দেখিল খদ্যোত-দুতি শােভিছে কোথাও
সাজাইয়া তরুরাজি অপরূপ রূপে-
কোটি মণিখণ্ড যেন অটবী-মস্তকে!
কোথাও আবার শাখা-জটা ভয়ঙ্কর--
নিশাচর যেন ঘাের ঘন অন্ধকারে
প্রসারণ করে কর !-দেখিতে দেখিতে
চলিল অমরনাথ কৌতুকে মগন ।

কবিতাবলী।
নিরখিলা এক স্থানে আসি কিছু দূরে
রমণী-মণ্ডলী-শােভা বন-অন্ধকারে
রজনী-সীমন্তে যথা তারকার দাম
শােভে, শূন্য শােভা করি, মৃদুল-রশ্মিতে
আলিঙ্গন পরস্পরে মধুর সম্ভাষ
জিনি কলকণ্ঠ-ধ্বনি—সুখের মিলনে
প্রবাসী ভাসয়ে যথা স্বদেশী লভিয়া !
নির্বাসিত কিম্বা যথা ফিরি নিজালয়ে !
দেখিতে লাগিল। ইন্দ্র পৌলোমী-বল্লভ
সে সুদৃশ্য মনোহর অদৃশ্য ভাবেতে,
মহাকুতূহল-মগ্ন ; দেখিলা বিস্ময়ে,
ফেই বা শিখ-িমূৰ্ত্তি ছাড়িয়া সুন্দর,
ধরিছে সুন্দরতর, সুর-বিমোচন,
অপূর্ব অঙ্গনা-রূপ, লাবণ্য-মণ্ডিত !
কেহ সুখে কুহু-কণ্ঠ-রূপ পরিহরি
নিন্দিছে শশাঙ্ক-জ্যোতি রূপের ছটায়-
অনুপম চারু কান্তি রতিকান্তি জিনি।
কহিছে কোন ললনা সুচামর কেশ
লুটিছে চরণ-পার্শ্বে-ভ্ৰমিছে যেমন
মধুকর-কুল রক্ত-কমল উপরে।

দধীচির অস্থি দান।
কহিছে, “হা কত কাল, অদৃষ্ট রে আর,
সুরাঙ্গনা এ দুর্গতি ভুঞ্জিবে ধরায়।
ধিক্ দেবগণে দৈত্য-রণে পরাজিত ।
ধিক্‌ ইন্দ্রে,-জিষ্ণুনামে কলঙ্ক তাহার।”
হেনকালে অগ্রসরি সুরেন্দ্র বাসব
রমণী-মণ্ডলী-পার্শ্বে দিল দরশন ;
পৃষ্ঠেতে কাৰ্ম্মকদীপ্ত, ত্ন-বিভাময়,
জ্বলিছে উজ্জ্বল করি অরণ্য বিশাল।
হরষিত হংসীকুল নিরখিলে যথা
মরালে মণ্ডল-মাঝে, হরষিত তথা
দেবাঙ্গনাগণ ইন্দ্রে হেরিলা চৌদিকে,
দ্রুত সুধাইলা স্বর্ণ উদ্ধার কিরূপে ?
।
কহিল, “হে শচীনাথ, দারুণ যন্ত্রণা
এত দিনে অবসান ; আর না হইবে
সহিতে প্রবাস-ক্লেশ, হৃদয়ের দাহ,
পশু-পক্ষিরূপে ছদ্মবেশে ধরাবাসে।
ত্রিদিবে
অসুর-দল:প্রবেশ অবধি
পলাইনু মােরা সবে—দাবাগ্নি যেমন
প্রবেশিলে বনে, ধায় কুরঙ্গিনীদল—
তদবধি অনন্ত যাতনা হে সুরেশ ;

কবিতাবলী।
কেহ বিহঙ্গিনী-রূপে বৃক্ষের আশ্রয়ে,
কেহ বা কুরঙ্গী, কেহ ক্রৌঞ্চী-বেশ ধরি,
মাতঙ্গী, শার্দলী কেহ, কেহ বা মহিষী,
হা অদৃষ্টকেহ রূপে বরাহী, জম্বুকী।
সে দুর্দৈব-অবসান এত দিনে দেব,
অমরী-উদ্দেশে আই)'লা স্বর্ণ উদ্ধারিয়া-
হে সুরেন্দ্র শচীপতি অ(ই)স এইখানে
অভিষেক করি তােমা অমর উৎসবে।
বলি ধা(ই)লা নানা জনে পুষ্প-অন্বেষণে,
গাঁথি মালা সাজাইতে মহেন্দ্র-শীর্ষক,
ঝুলাইতে পুষ্প-হার/সুরেশ-গলায়,
অমর-সঙ্গীতে ধন পুলকিত করি।
ক্ষুব্ধ-চিত্ত পুরন্দর-যথা বলহীন
কেশরী পিঞ্জর-মাবে—ছাড়িলা নিশ্বাস
গভীর প্রবল বেগে ! হায় রে ভূতলে
দেবেন্দ্র ভিক্ষুক আজি দৈত্য-ভুজ-দাপে।
আশ্বাসে করিলা শান্ত সুরকন্যাদলে;
সুম গম্ভীর স্বরে কহিলা প্রকাশি,
কি হেতু ধরায় গতি; কহিলা যে হেতু
গতি তার দধীচি-আশ্রমে শিবাদেশে ;

দধীচির অস্থি দান।
যে বারতা দিলা তঁারে সুমেরু-শিখরে
ইন্দ্ৰ-বাক্যে হরষ-বিষাদে ভাগ্যদেব।
কহিলা অঙ্গনা-দল ‘হে পৌলমীনাথ,
কিছু অগ্রে দধীচির পবিত্র আশ্রম।
দয়ার সাগর ঋষি ঋষি-কুল-চূড়া,
অদ্বিতীয় সুরলােকে !. জেনেছি আমরা
যে অবধি ভূমণ্ডলে বাস, হে সুরেশ ;-
জীব-উপকারে ঋষি জগতে অতুল।
ব্ৰত—পর-উপকার, স্বার্থ-পরিহার ;
কল্পনা, কামনা, চিন্তা-পরের মঙ্গল ;
কি বা কীটে, কি পতঙ্গ সদা দয়াশীল
মুনীন্দ্র কৃপার সিন্ধু—জীব-ডা-মণি।
জীবন দিবেন তিনি দেবের কল্যাণে,
না চিন্ত; অমরপতি !” দেখাইলা পথ।
চলিল। সুরেশ ধীরগতি।
কতগণে
দেখিলা গগন-প্রান্তে তরুণ কিরণ,
চারু মূর্তি প্রভাকর শূন্যে সাম্য-ভাব।
খেলিছে কুরঙ্গ-রাজি ; অজিন-রঞ্জিত
শােভিছে কুটীর দ্বার ; শ্রুতি-সুখকর
স্তুতি-ধ্বনি চারিদিকে উচ্চে উচ্চারিত
;-

কবিতাবলী।
কোথাও ভাস্কর-স্তোত্রে ললিত-লহরী,
গায়ত্রী-বন্দনা কোথা, সন্ধ্যা-আরাধনা,
বিশদ সুরেতে বেদ-সঙ্গীত কোথাও,
কোন খানে “মহিঃ” মহা স্তব পাঠ।
শিষ্য-বৃন্দ, আনন্দে ঘেরিয়া তপােধনে,
শুনিছে মহর্ষি-বাক্য-অনন্য-মানস ;
হায় রে যেমতি বাগীশ্বরী বীণাধ্বনি
শুনিতে উৎসুক-চিত্ত অমর-মণ্ডলী
সৃষ্টির উৎসব দিনে-পদ্মাসনা যবে
দেব-চিত্ত-মােহকর শুনান ভারতী।
কহিছেন মহা ঋষি, কি রূপে কলহ,
সৰ-জীব-দুখ-মূল, আইল ধরায় !
}
০৫
এক দিন-হায় কেন উদিল সে দিন—
জলধি-সম্ভবা বিষ্ণু-জায়া স্বর্গধামে
চাহিল। বিরিঞ্চি-পাশে, সৃষ্টিতে অতুল,
অপরূপ রত্ন কোন(ও) সৃজি দিতে তারে।
বিধাতা সৃজিলা ফল অতুল ভুবনে
কান্তি, চন্দ্র-শােভা জিনি— ভ্রান্তি নিরখিলে ;
সৌরভ, জিনিয়া চারু সুরভি পীযূষ,
অমর দনুজ ঘাের দ্বন্দ্ব যার লাগি,

দধীচির অস্থি দান। ব্ৰহ্মাণী মােহিলা হেরি, চাহিলা সে ফল । ক্রোধান্ধ কেশব-জায়া ; দেবী-বৃন্দ-মাঝে উপজিল ঘাের দ্বন্দ্ব চিন্তি বিধাতা নিক্ষেপিলা বিষময় ফল ধরাতলে। } তদবধি ঈর্ষা, দ্বেষ, হত্যা, এ জগতে ! নর-রক্তে নিমজ্জিত এ ধরণী-তল ! রণস্রোত প্রবাহিত সে অবধি ভবে- মানব-নিধনে যাহা নিত্য মহামারি ! কত দিনে বুঝিবে রে মনু-সন্তান কি কুটিল ব্যাধি, লােভ! কি কূট গরল নরকুল দেহে, দ্বন্দ্ব !কবে সে বুঝিবে আত্মার পশুত্ব-লাভ সমর-প্রাঙ্গৰে ! কুটিল, কূট-কটাক্ষী, হত্যা ভয়ঙ্করী সাধিতে যা পারে ভবে, নারে কি রে তাহা অমর-নন্দিনী দয়া সরলা সুন্দরী ? কবে নরকুল-অবনী-সীমন্ত-রত্ন- মিলি সখ্যভাবে সুখে নিত্য ছড়াইবে ভ্রাতৃত্বের সুখ-ধারা ; যথা সে সুখদা, বিমল-তরঙ্গা গঙ্গা পুণ্যভূমি মাঝে ছড়ান সলিল-ধারা মানবে রক্ষিতে।

কবিতাবলী।
হা দেব কমলাপতি, দেব বিশ্বম্ভর।
হর বিশ্ব-ভার শীঘ্র এ ভ্রান্তি ঘুচায়ে-
ভ্রান্ত নরকুলে, দেব, কর চিরসুখী ;
হৃষীকেশ, ইও, প্রভাে মানবে সদয় !”
;
পৌলমী-ভরসা ইন্দ্র, মুগ্ধ ঋষি-ভাষে,
অলক্ষ্যে অদৃশ্যভাবে ছিল। এতক্ষণ,
পূর্ণ-জ্যোতি দেব-কান্তি এবে প্রকাশিলা।
নীরদ-লাঞ্ছন কেশ প্লাবিত কিরণে,
বক্ষেতে বিশাল বৰ্ম্ম-ভাস্কর যেমন
প্রভাতে অরুণােদয়ে কুহেলি-আবৃত।
শােভিছে অতুল তু; সুন্দর কাৰ্ম্মক
কাদম্বিনী কোলে যাহা চির শোভাময় ।
=
জ্বলিছে সহস্র অক্ষি, যথা, তারা-দল
নিশীথে শর্বরী-কোলে! উঠি তপােধন
সশিয্যে, সম্রমে, সুখে.অতিথি সম্ভাষি,
যোগাইলা মৃগ-চৰ্ম্ম – পবিত্র আসন।
গতি ?
জিজ্ঞাসিলা সুশীতল গম্ভীর বচনে
“আশ্রমে কি
হেতু
কিবা অভিলাষ ?”
ভগ্নচিত্ত অখণ্ডল নেহারি নির্মল
কৃপালু ঋষির মুখ,—ভগ্ন-চিত্ত যথা

দধিচীর অস্থি দান।
দয়ালু দর্শক-বৃন্দ নবমীর দিনে
যূপকাষ্ঠে বান্ধে যবে নির্দয় কামার,
মহিষ-মণিী দশভুজা মুর্তি আগে,
অসহায় ছাগ, মেষ পূজায় অর্পিতে !
কে পারে আনিতে মুখে, সে নিষ্ঠুর বাণী
কে পারে চাহিতে অন্যেপ্রাণভিক্ষা-দান,
পেয়ে হৃদয়ে ব্যথা ? কে.হেন দারুণ
প্রাণীমাঝে !—নিস্পন্দ, নিস্তব্ধ পুরন্দর!
।
হেরি ঋষি, ক্ষণকালে, ধ্যানেতে জানিলা
অতিথির অভিলাষ ; গদ গদ স্বরে
মহানন্দে তপোধন কহিলা তখন,
“পুরন্দর, শচীকান্ত ?—কি সৌভাগ্য
মম,
জীবন সার্থক আজি—পবিত্র আশ্রম।
এ জীর্ণ-পঞ্জর-অস্থি পঞ্চভূতে চার
হয়ে অমরােদ্ধাবে নিয়ােজিত আজি !
হ দেব, এ ভাগ্য মম স্বপ্নের(ও) অতীত !”
এতেক কহিয়া ধীরে মহা তপােধন—
শুদ্ধ-চিত্তে পট্টবস্ত্র, উত্তরীয় ধরি,
গায়ত্রী গম্ভীর-স্বরে উচ্চারি সঘনে,
আইলা অঙ্গন-মাঝে ; কৈলা অধিষ্ঠান

কবিতাবলী।
সুনিবিড় সুশীতল, পল্লব-শােভিত,
শত-বাহু বটমূলে। আনি যােগাইলা,
সা-নেত্ৰ শিষ্য-বৃন্দ, আকুল-হৃদয়,
যােগাসন, গাঙ্গেয় সলিল সুবাসিত !
জ্বালিল চৌদিকে ধুপ, অগুরু, গুগ্গুল,
সজ্জরস ; সুবাসিত কুসুমের স্তর
চর্চিত চন্দন-রসে রাখিল চৌদিকে ;
মুনীন্দ্রে তাপ-বৃন্দ মাল্যে সাজাইলা।
তেজঃপুঞ্জ তমুকান্তি জ্যোতি সুবিমল
নিৰ্ম্মল নয়নদ্বয়ে, গণ্ড, ওষ্ঠাধরে !
সুললাটে আভা নিরুপম! বিলম্বিত
চারু শ্মশ্রু, পুণ্ডরীক-মাল্য বক্ষঃস্থলে।
বসিলা ধীমান্—আহা ললিত দৃষ্টিতে
দয়াদ্র হৃদয় যেন প্রবাহে বহিছে।
চাহি শিষ্য-কুল-মুখ, মধুর সম্ভাষে
কহিলেন, অ-ধারা মুছায়ে সবার,
সুধা-পূর্ণ বাণী ধীরে ধীরে ;-“কি কারণ,
হে বৎস-মণ্ডলী, হেন সৌভাগ্যে আমার
কর সবে অশ্রুপাত ? এ ভব মণ্ডলে
পর-হিতে প্রাণ দিতে পায় কতজন?

দধীচির অস্থি দান ।
হিত-ত-সাধনেতে হৃদয়ে বেদনা ?
হায় রে অবােধ প্রাণী—এ নশ্বর দেহ,
ত্যজিলে পর-হিতে, কিসে নিয়ােজিবে ?
লভি জন্ম নরকুলে কি ফল হে তবে?
অনুক্ষণ জীবনের স্রোতোধারা ক্ষয়,
হয় সে কতই রূপে!«কেন তবে হেন,
ঘটে যদি কার (ও) ভাগ্যে সে দুলত যােগ,
কাতর নরের চিত্ত সে ব্ৰত সাধনে ?
হে ক্ষুব্ধ তাপস-বৃন্দ, হে শিষ্য-মণ্ডলী,
জগত-কল্যাণ হেতু নরের সৃজন,
নরের কল্যাণ নিত্য সে ধর্মপালনে ;
নিঃস্বার্থ মােক্ষের পথ এ জগতী-তলে।”
ঋষিবৃন্দে আলিঙ্গন দিলা এত বলি,
আশীষিলা শিষ্যগণে; কহিলা বাসবে-
“হে দেবেন্দ্র, কৃপা করি অন্তিমে আমার
কর শুচি দেহ মন বারেক পরশি।”
অগ্রসরি শচীপতি সহস্রলোচন
তপােধন শিরস্পর্শি কর-কমলে,
কহিলা আকুল স্বরে—শুনি ঋষিকুল
হরষ-বিষাদে মুগ্ধ-কহিলা বাসর

কবিতাবলী।
‘সাধু শিরােরতু ঋষি তুমিই সাত্বিক।
তুমিই বুঝিলা সার জীবের সাধন!
তুমিই সাধিলা ব্ৰত এ জগতী-তলে
চির মােক্ষ-ফল-প্রদ—নিত্য হিতকর।
জীবময় নররূপী—অকূল জলধি,
ভাসিছে মিশিছে ভায় জলবিম্ব প্রায়
জীবদেহ অনুদিন! এ ভব-মণ্ডলে
অক্ষয় তরঙ্গময় জীবন-প্রবাহ।
ক্ষুদ্র-প্রাণী-দেহ-য়ে, এ সিন্ধু সলিল
হ্রাস বৃদ্ধি নাহি জানে—নিয়ত গভীর
স্রোতােময় ! অহিত জগতে নহে তায় ;
অহিত—নিলে প্রাণীদেহের নিধনে!
প্রাণী মাত্রে–কি মহৎ, কিবা ক্ষুদ্রতম
সাধিতে পিরয়ে নিত্য মানবের হিত,
সাধিতে পিরয়ে নিত্য অহিত নরের,
আপন আপন কাৰ্যে জীবন ধারণে।
বালি-বৃন্দ যথা নিত্য রেণু পরিমাণে
বাড়ে, দিবা, বিভাবরী, সাগর-গর্ভেতে,
ক্রমে প—দ্বীপাকার—ক্রমশঃ বিস্তৃত
বৃহৎ বিপুল দেশ তরু গিরিময়,

দধীচির অস্থি দান।
তেমতি এ নরকুল
উন্নত সদাই,
সাধু কাৰ্য্যে মানবের—প্রতি অহরহ।
কৰ্ত্তব্য নরের নিত্য স্বার্থ পরিহার,
জীবকুল-কল্যাণ-সাধন অনুদিন !
পর-হিত-ব্ৰত ঋষি ধৰ্ম্ম যে পরম ;
তুমিই বুঝিয়া ছিলে উদ্যাপিলে আজ।
মুছ অঞ ঋষিবৃন্দ,--ঋষি-কুল-চূড়া •
দধীচি পরম-পুণ্য লভিলা জগতে।
কি বর অর্পিব আর নিষ্কাম তাপস,
চাহিলা কোন বর, এ সুকীৰ্ত্তি তব
প্রাতঃস্মরণীয় নিত্য হবে নরকুলে !
তব বংশে জন্মি মহা-ঋষি দ্বৈপায়ন
করিবে জগত খ্যাত এ আশ্রম তব
পুণ্য বদরিকাশ্রম পুণ্যভূমি মাঝে।”
বলিয়া রােমাঞ্চ-তনু হইলা বাসব
নিঃখি মুনীমুখে শােভা নিরমল !
আরম্ভিলা তারস্বরে চ দ গান,
উচ্চে হরি-সংকীৰ্ত্তন মধুর গম্ভীর,
বাষ্পকুল শিষ্যবৃন্দ-ধ্যানমগ্ন ঋষি
মুদিল নয়নদ্বয় বিপুল উল্লাসে।

কবিতাবলী।
মুনি শােকে অকস্মাৎ অচল পবন,
তপনে মৃদুল রশ্মি, স্নিগ্ধ নভস্তল,
সমুহ অরণ্য ভেদি সৌরভ উচ্ছাস,
বন, লতা, তরুকুল শােকে অবনত।
দেখিতে দেখিতে নেত্র হইল নিশ্চল,
নাসিকা নিশ্বাস-শূন্য, নিস্পন্দ ধমনী,
বাহিরিল ব্ৰহ্মতেজ ব্ৰহ্মরন্ধ ফুটি,
নিরুপম জ্যোতিঃপূর্ণ-ক্ষণে শূন্যে উঠি,
মিশাইল শূন্য-দেশে। বাজিল গম্ভীর
পাঞ্চজন্য—হরিশঙ্খ ; শূন্য-দেশ ঘুড়ি
পুষ্পাসার বরষিল মুনীন্দ্রে আচ্ছাদি!--
দধীচি ত্যজিল তনু দেবের মঙ্গলে।

সতীশূন্য কৈলাস।
দীর্ঘ ত্রিপদী।
ছিন্ন হইল সতী-দেহ,* শূন্য হৈল শিব-গেহ,
বামদেব কিরস-বদন।
চাহেন কৈলাসময়,
দেখেন কৈলাস নয়,
অন্ধকার বিঘাের ভুবন।
সতী-মুখ-বিভাসিত যে আলােক শােভা দিত,
পুলকিত কুসুম-কানন।
পেয়ে যে কিরণমালা,
সুবৰ্ণ মণি উজলা,
সে আলােক নহে দরশন।
শুষ্ক কল্পতরু সারি,
শুষ্ক মন্দাকিনী বারি,
শূন্য-কোল সতী-সিংহাসন।
নিস্তব্ধ জগত-প্রাণ,
নিরুদ্ধ সৌরভ ঘ্রাণ
কণ্ঠে বদ্ধ বিহঙ্গ-কূজন।
নদী শুয়ে রেণু’পর
কান্দিছে বৃষভবর,
প্রাণশূন্য মৃগেন্দ্র বাহন।
হেরিয়া ত্রিপুর-হর,
দুরে রাখি বাঘার
বসিলেন মুদি ত্রিনয়ন।
সুদর্শনচক্রে ছিন্ন হইবার পর।

কবিতাবল্পী। অনিন্দ-আলয় জিনি, আজি চিন্তাময় তিনি ধ্যানে ধরি সতী-দেহ ছায়া। ছুড়ে ফেলি হাড়-মাল, করে দলি ভস্মজাল, বিভূতি-বিহীন কৈলা কায়া। মুখে “সতি”-“সতি স্বর, বিনির্গত নিরন্তর, দিগম্বর বাহ-জ্ঞাম-হীন। করে জপমালা চলে, মুখ ‘বববম্বলে, অন্য শব্দ সকলি মলিন। জটালগ্ন ফণি-মালা মিলাইয়ে জিহ্বা-জ্বালা, লুকাইল জটার ভিতর! নিস্পন্দ পবনস্বন, নিরানন্দ পুষ্পগণ অপ্রস্ফট ঝরে রেণুপর। থামিল গঙ্গার রব, নির্বাক প্রমথ সব কৈলাস জগৎ অচেতন। কদাচিৎ মা মা” নাদে, অসম্বিৎ নন্দী কঁাদে, “ব” শব্দ সহ সম্মিলন। কৈলাস-অম্বরময়, তারা, সূৰ্য্য অনুদয়, ক্ষণকালে নিবিল সকল। তমঃ-ছন্ন দিগাকাশ, কেবলি করে উল্লাস নীলকণ্ঠ.কণ্ঠের গরল। ধ্যানমগ্ন ভােলানাথ, স্কন্ধে কভু তুলি হাত, সতীরে করেন অন্বেষণ।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Kabitabali Ed. 1st

Author
Bandhopadhyay,hemachandra
Title
A Poetical Selection
File name
Kabitabali Ed. 1st
Text
OCR done
Citation
1899
Published
2009/11/24
Publisher
Atulachandra Bandhopadyay
Language
Sanskrit
Pages
132
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Bandhopadhyay,Hemachandra
DLI number
512766
Barcode
4990010019809.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
IxUaZ3918hw
Download PDF

Kabitabali Ed. 1st