Makardah Saraswat Library, Howrah
Farasi Biplobe Ruso
Front matter
No text on this page.
ফরাসী বিপ্লনে রুশাে
শ্রীঅতুলকৃষ্ণ ঘােষ
১) :)
মূল্য ১, এক টাকা।
Printed by
SACUNDRA NATH MITRA.
at the
Vidyodaya Press
16/1 A, Beodon Street
CALCUTTA,
Published by
Fine Art Printery
14 College Square North
CALCUTTA.
No text on this page.
এই পুস্তকের বিক্রয়লব্ধ অর্থ
ছাত্র ও যুব আন্দোলনের প্রসারকল্পে
ব্যয়িত হইবে ।
অতুলকৃষ্ণ ঘােষ
কলাগাছী, বৈশাখ ১৩৪৭।
No text on this page.
উৎসর্গ
স্বর্গীয় জননীর ঐশ্রীচরণে
অতুল।
১৬৭১
উৎসর্গ
মানুষ কেঁদে বলে ওগাে আমার বড় সাধের ঘর
ভেঙ্গে গেল কিন্তু আমি চিরদিন ঘর ভেঙ্গে যেতে দেখলে
বড় আনন্দ পাই। তােমরা আমাকে হয়ত দুষ্ট ও খল
মনে করবে কিন্তু আমি ভগবানের নাম নিয়ে বলতে পারি
যে, ঘর ভাঙ্গা দেখতে যে আনন্দ সে আনন্দের মাঝে
আমার দুষ্টামি কিছুই নেই। এ যে আজকার কথা
তা নয়, যখন আমি ছােট্ট শিশুটী ছিলাম, যখন মায়ের
কোলের কাছে শুয়ে রূপকথা শুনতাম, সেই সময় হতেই
আমার এমনিতর স্বভাব।
আজ সেই সুদূর অতীতের দিকে চাইলে একটা কথা
খুবই মনে পড়ে। মা আমাকে একটা রূপকথা বলতেন।
সবটা ঠিক আমার মনে নেই, তবে যেটুকু আমার মনে
খুব আনন্দ দিত, যেটুকু আমার প্রাণ নাচিয়ে তুলত,
সেইটুকু এখনও আমার মনে আছে। সন্ধ্যার পর মা
সরস্বতীর খগহস্ত হতে যেমন নিষ্কৃতি পেতাম, অমনি
সুরু করে দিতাম,—“মা, ঘর পুড়ক ছাই খাই’ সেই
রূপকথাটা বল ত”। মা তার এই ক্ষ্যাপা ছেলেটীকে
ঘুম পাড়াবার জন্য আরম্ভ করতেন :-
( ২ )
“এক সওদাগরের একটা পাখী ছিল, পাখীটা
দিনরাত বলত, “ঘর পুড়ক ছাই খাই”। সওদাগর
কেন জানি না, পাখীটাকে খুব লক্ষ্মীমন্ত মনে করত,
তাই তার সেই অলক্ষুণে পাখী যখনই বলত, “ঘর পুড়
ছাই খাই” অমনি সওদাগর ভারি খুসী হয়ে তাকে ভাল
ভাল খাবার দিত। ক্রমে সত্য সত্যই সওদাগরের
ঘরগুলি এক একখানি করে পুড়তে লাগল। এইনা
পাখীটা হলাে সওদাগরের বউএর দুই চোখের বিষ।
সওদাগরের বউ পাখীটাকে বাড়ী থেকে দূর করে দেবার
জন্য বিশেষ পীড়াপীড়ি করতে আরম্ভ করল, কিন্তু
সওদাগর কিছুতেই রাজী হয় না । সওদাগর বলে।
“ও পাখী আমার ঘরের লক্ষ্মী ওর হতে আমার মঙ্গল
হবে।” সওদাগরের বউ যখন কিছুতেই পাখীটাকে
দূর করতে পারল না, তখন মনে মনে গুমরাতে লাগল।
তার পর সওদাগর যেমন বাইরে যায়, সওদাগরের বউ
তখন পাখীটাকে খুব মারপিট করে। “আর অমন
অলুক্ষণে ডাক ডাকবি—এই বলে পাখীটার ডানা মুচড়ে
দেয়। পাখীটা তখন প্রাণের দায়ে বলে, “নাগাে, আর
বলব না”। আবার সওদাগর যেমন বাড়ী আসে অমনি
ছাই খাই”। এমনি ভাবে দিন
যায় আর একখানি করে ঘর পুড়ে পুড়ে, সওদাগর শেষে
বলে “ধর
পুড়ক
( ৩ )
পথে এসে দাড়াল। অন্ন নেই, বস্ত্র নেই, কপর্দক শূন্য
হয়ে বড় আদরের পাখীটাকে হাতে নিয়ে, সওদাগর এক
নদীর তীরে এসে বলল, “মা লক্ষ্মী, আমার সবইত পুড়ে
গেল, এখন তােকে কি খাওয়াব মা” ? তখন
তখন পাখীটী :
সওদাগরের মুখের দিকে চেয়ে ডাকল,
“ঘর পুড়ুক সােনা হােক
ঘর পুড় ক সােনা হােক।”
পাখী ডাকতে ডাকতে ঘরের দিকে ছুটে চলল, সওদাগরও
তার সঙ্গে চলল। বাড়ীতে এসে সওদাগর দেখল যে সব
ছাইগুলাে সােনা হয়ে গেছে তখন সে বউকে ডেকে বলল,
‘ওরে পােড়ার মূখী চেয়ে দেখ কত সােনা, আজ আমরা
রাজার চেয়েও ধনী ! এতদিনে আমার প্রাণের পাখী
গান ধরেছে,
“ঘর পুড়ক সােনা হােক।”
আজ মনে পড়ে ছেলে বেলায় একদিন মায়ের মুখে
রূপকথার মাঝে শুনছিলাম, “ঘর পুড়ক ছাই খাই”।
ছেলেবেলায় শুনে আনন্দ পেতাম, তাই সেই গানটী
এখনও ভুলতে পারি নি, যেখানে যাই সেখানে গাই,
‘ঘর পুড়ক ছাই খাই'। কত ঘরে, কত প্রাণে আগুন
জ্বালিয়েছি, তার খােজ কি ? যে আগুন জ্বালিয়েছি
তার ফুল্কি যে ধীরে ধীরে কোনে কোনে
জ্বলতে
( ৪ )
আরম্ভ করেছে। সওদাগরের বউএর মত, কত জন
আমাকে গালাগালি দিয়েছে, কতজন ধরে মেরেছে,
তবুও
সেই একই গান গেয়ে চলেছি, ‘ঘর পুড়ক ছাই
খাই, ঘর পুড় ক ছাই খাই।
ওরে আগুন দেখে তােরা ভয় পাস কেন, আগুনের
রং ত কালাে নয়, অমন কাচা সােনার কান্তি ত কোথাও
পাবি নে, তবে তােরা দেখে পালাস কেন ? আগুন যখন
জ্বলতে থাকে, তখন ত বােধ হয়, কে যেন প্রাণের
আনন্দে হাসছে ; হাসি দেখে তােরা ভয় পাস কেন?
আয় তােরা কে আসবি, আজ এই হাসির লহরে
সাতার দিতে হবে। এমন আনন্দের দিনে ঘরের কোনে
বসে থাকতে কি ভাল লাগে ? যেখানে বাঁধন সেখানে
আগুন জ্বলিয়ে দে, যেখানে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস
সেখানে আগুন জ্বালিয়ে দে, তার পর আগুনের মত
লিক লিক করতে করতে হাসতে হাসতে ছুটে বেরিয়ে
আয় । ঘর ভেঙ্গে যাক, কপাট পুড়ে যাক, হাওয়া এসে
আগুনকে নাচিয়ে তুলুক, আর সেই তাণ্ডব নৃত্যে তােরা
সব যােগ দিয়ে “মা ভৈঃ বলে ছুটে বেরিয়ে আয়।
সবাই মিলে একবার গান ধরে দে, “ঘর পুড়ক ছাই খাই,
ঘর পুড়ক ছাই খাই”।
ঐযে আগুন জ্বলে উঠল, আকাশ লালে লাল হয়ে
গেল। ওদিকে হঠাৎ কেমন আকাশও বুঝি ভেঙ্গে পড়ল।
ঘর ভেঙ্গেছিস এবার আকাশ ভাঙ্গতে হবে। ঐযে
আকাশে মেঘ গুড়ম গুড়,ম করে গান ধরে দিল,
বিজলী চিকমিক করে নেচে গেল। বাতাস শো শো শব্দ
করে কানে কানে প্রাণে প্রাণে মরমের কথা কয়ে গেল।
শিলারাশি মাথার উপর ঠক্ ঠক্ করে পড়ে আশীর্বাদ
করে গেল।
এমন দিনে
সব আনন্দ হতে, সব
আশীৰ্বাদ হতে বঞ্চিত হয়ে তােরা কি দূরে থাকতে চাস?
•ওরে পাগলা, ওরে ভােলা, ঐ দ্যাখ ময়ুরের দিকে
চেয়ে, মেঘের ডাক শুনে ময়ূর ময়ুরী কেমন পাখা মেলে
নেচে উঠেচে, চেয়ে দ্যাখ ঐ পাখার কেমন
তােরাও আয়, দুই হাতে এগিয়ে দিয়ে, বুকভরা আনন্দ
নিয়ে ছুটে বেরিয়ে আয়। বাংলার ছেলে, বাংলার মেয়ে,
সাধের ময়ূর ময়ূরী আয় তােরা, ছুটে চলে আয়, আজ এই
ঘনায়মান আকাশে, আনন্দের গান গাইতে গাইতে,
তাণ্ডব নৃত্য নাচতে নাচতে ছুটে বেরিয়ে আয়। তার
পর দেখবি তারই থেকে একদিন শান্তির ধারা ছুটে এসে
সারা ভারত, সারা জগৎকে ভাসিয়ে দেবে। তার পর
সত্যই একদিন আসবে যখন গাইব,
“ঘর পুড়ক সােনা হােক :
ঘর পুড়ক সােনা হােক।”
এ গান ধ্বংসের গান নয়, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে
দেহে মনে প্রাণে সমাজের প্রতি স্তরে যে স্তুপীকৃত
আবর্জনা জমাট হয়ে রয়েছে তাকে ধ্বংস করে, সেই
ধ্বংসের মধ্য দিয়ে যে সৃষ্টি, এ হচ্ছে, সেই সৃষ্টির গান ।
কৈশােরের অনাবিল আনন্দের মধ্যে যার কাছে
এ গান শুনেছিলাম আজ তিনি পরলােকে, আর নিঃস্ব
সন্তান সংসারের ঘাত প্রতিঘাতে শ্রান্তি, ক্লান্তি ও
রিক্ততার মধ্যে—ছেলেবেলার সেই সঙ্গীত ধ্বনি লক্ষ্য
করে ছুটে চলেছে অজানার সন্ধানে। হে জননী, জীবনের
পথে তােমার কাছে অনেক কিছুর সন্ধান পেয়েছিলাম,
এ মর জগতের-কথা ও ব্যথা যদি পর পারে পৌছায়
তবে এই প্রার্থনা জানাই যেন তােমার আশীৰ্বাদ আমার
মনুষ্যত্বকে রক্ষা করে, যেন তােমারই হস্ত আমাকে
চালিয়ে নিয়ে যায়। ছেলে বেলায় তুমি এক পাগলা
সওদাগরের কাহিনী শুনিয়েছিলে, রূপকথার রহস্য
পুরীতে সন্তানের মন প্রাণ নিয়ে যেয়ে তার মধ্যে প্রেরণা
জাগিয়ে দিয়েছিলে, বাংলার ছেলেমেয়েদের রূপকথার
হেয়ালির মধ্য দিয়ে সত্যিকার সন্ধান দিতে ব্যস্ত ছিলে,
তাই তােমার নাম স্মরণ করে তােমারই চরণে ফরাসী
দেশের পাগলা ছেলে রুশাের কাহিনী উৎসর্গ করিলাম।
ফরাসী বিপ্লবেরুশো
প্রথম অধ্যায়
ফরাসী বীর রুশাের কথা বলিতে গেলে হৃদয়ের
ব্যথা ভাষাকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলে, প্রাণ কঁদিয়া উঠে,
হৃদয় বিদ্রোহী হইয়া সমাজ ও সভ্যতার বাহিরে যাইয়া
কল্পনার এক নূতন রাজ্যে নূতন সিংহাসন প্রতিষ্ঠা
করিবার প্রয়াস পায়। হায়রে সমাজ, হায়রে সভ্যতা,
তােরা কেমন করিয়া স্বাধীন উন্মুক্ত প্রাণীকে তােদর
পেষণে তিলে তিলে পঙ্গু করিয়া দিস, তােদের বিষ
কেমন করিয়া ধীরে ধীরে শত শত মহাপ্রাণকে জর্জরিত
করিয়া দেয়, তােদের অসাধ্য কিছুই নাই, তােরা মানুষকে
পশু করিয়া দিতে পারিস, আবার পশুকে তােদের
সম্মাহিনী চাকচিক্যে বিভূষিত করিয়া দেবতার আসনে
বসাইয়া দিতে পারিস।
হায়রে মানুষ, তােরা মানুষ হইয়া আজিও মানুষ
চিনিতে পারিলি না! মানুষ যেদিন মানুষের মত
ঈড়াইতে যায় তুই সেদিন সকলের প্রথমে তার সম্মুখে বিপ্ন
ফরাসী বিপ্লবে রুশাে
সমাজ যে।
হইয়া উপস্থিত হইবি। তাের এ কি স্বভাব বুঝি না যে
মানুষকে তুই মানুষের মত দেখিতে পারিস না, তুই চাহি
যে সকলেই সমাজের চির প্রচলিত পদ্ধতি অনুসরণ করিয়া
তাহারই দুয়ারে নিজেকে বলি প্রদান করে।
একটা সৃষ্টি, সৃষ্টির যে আদি নাই অন্ত নাই এবং মানুষই
যে এই সমাজের স্রষ্টা, এ কথা তুই ভুলিয়া যাস কেন ?
মানুষ যে স্রষ্টা, কল্পনা যে তার শক্তি, তাইত সে নূতন
কল্পনা, নূতন ভাবুকতা, নূতন নূতন সৃষ্টি দিয়া সমাজকে
জাগ্রত ও উদ্বুদ্ধ করিতে চেষ্টা করে, কিন্তু তুই মানুষ
হইয়া এমনি মানুষকে কেন এত আঘাত, এত ব্যথা দিস!
হায়রে কল্পনা, তােকে যে বরণ করিয়া লইয়াছে,
তারই মাথার উপর দিয়া ঝড় ঝঞ্ঝা বহিয়া গিয়াছে।
বজ্র কড়, কড়, শব্দ করিয়া তাহাকে বিস্ত করিবার চেষ্টা
করিয়াছে, বিদ্যুৎ তাহার চমক দিয়া তাহাকে পথভ্রষ্ট
করিবার আয়ােজন করিয়াছে, কিন্তু কল্পনার স্থান এতই
উচ্চে যে সে বজ্রনিনাদকে তুচ্ছ করিয়া নিভৃতে, নীরবে
কি এক নূতন শব্দ শুনিতে পায়, বিদ্যুএর চমককে
তুচ্ছ করিয়া অন্ধকারের মধ্যেও কি যেন এক স্নিগ্ধ
আলােকে পুলকিত হইয়া উঠে। এই কৰ্ম্ম কোলাহলের
মধ্যে কল্পনা সাধকের প্রাণে একটা নূতন সঙ্গীত জাগাইয়া
ফরাসী বিপ্লবে রুশাে
;
দেয়—তাহার হৃদয়বীণা
নূতন
রাগিণীতে ঝঙ্কার দিয়া
উঠে; হৃদয়তন্ত্রী নূতন সুরে জাগ্রত হইয়া নিত্য নূতন
সৃষ্টির মাঝে খেলা করিতে থাকে। মানুষ তখন নূতন
সমাজ, নূতন সভ্যতা, নূতন ধর্মের আলােকে উদ্দীপ্ত
হইয়া সৃষ্টির বিচিত্র খেলায় যােগ দেয়।
সার্থক এই খেলা ! ধন্য সেই মানুষ, যে জগতে
এমনি খেলা খেলিয়া যাইতে পারে, ধন্য সেই বীর, এমনি
খেলায় যে প্রাণ দিতে পারে, ধন্য সেই সাধক, এমনি
সৃষ্টির জন্য যে নিজেকে আহুতি দিতে পারে। কল্পনার
বীরপুত্র ফরাসীবীর রুশশা জগতের ইতিহাসে যে নূতন
ভাবুকতার সৃষ্টি করিয়া গিয়াছেন, নূতন চিন্তা, নূতন
আদর্শ দিয়া তিনি যে সুন্দর ছবি আঁকিয়া রাখিয়া
গিয়াছেন, তার সৌন্দৰ্য্য আমাদের প্রাণে যে কত কথা
বলিয়া যায়, তাহা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না, সে ছবির
শিল্পকলা সবটুকু হৃদয়ঙ্গম করিতে না পারিলেও, যেটুকু
বুঝিতে পারি, তাহাতেই একবাক্যে বলিতে পারি যে
রুশােই কল্পনায় ও সৌন্দর্য্যে ইউরােপের আদি গুরু।
ভাবুকতা ও কল্পনার শৈলশিখরে আজ যাহার স্থান
সেই মহাপুরুষ কেমন করিয়া জীবন কাটাইলেন, তাহা
ভাবির বিষয়। জগতে ভাবুকতা ও কল্পনাক্ষেত্রে
ফরাসী বিপ্লবে রুশো
চক্ষের
যাহারা আজ বরণীয় তাঁহাদের প্রায় সকলের জীবনই
দুঃখ ও বেদনায় পরিপূর্ণ। জীবনে ব্যথা না পাইলে
হৃদয়তন্ত্রী বােধ হয় বাজিয়া উঠে না, মৰ্ম্মস্থানে আঘাত
বাজিলে বােধ হয় মর্মের কথা জাগে না।
জল, বক্ষের বেদনা, হৃদয়ের তপ্তশ্বাস, ইহারাই বােধ
হয় ভাবুকতা ও কল্পনাকে জগতে মূৰ্ত করিয়া তুলিতে
পারে। ঘন ঘন বজ্রনির্ঘোষ, তুমুল ঝঞা ও বিদ্যুতের
চিকিমিকি যেমন প্রকৃতির ছবিকে সুন্দর ও মনােরম
করিয়া তুলে, মানুষের জীবনেও চক্ষের জল ও বক্ষের
বেদনা বােধ হয় তেমনি ভাবে মানুষের জীবনে এক নূতন
সৌন্দৰ্য্য আনিয়া দেয় আর তখন মানুষ কল্পনার স্রোতে
ভাসিয়া গিয়া জগতে নূতন কিছু সৃষ্টি করে।
মানুষ অভাবে না পড়িলে জগতের অভাব বুঝিতে
পারে না, মাতৃহীন না হইলে মায়ের অভাব অনুভব
করা যায় না, অর্থহীন না হইলে অর্থের মূল্য বুঝা যায় না;
অভাবই মানুষের প্রাণে একটা সাহানুভূতি জাগাইয়া
দেয়। অভাব ধীরে ধীরে মানুষের চোখের সামনে
জগতের দুঃখ দৈন্যকে প্রত্যক্ষ করিয়া দেয়, মানুষ একে
একে পৃথিবীর প্রকৃত স্বরূপটী উপলব্ধি করে। তাই জগতে
যাহারা বড় হইয়াছেন তাঁহারা সকলেই জীবনে এই
ফরাসী বিপ্লবে শাে
অভাবকে বেশ ভাল করিয়া অনুভব করিয়াছেন; দারিদ্র্য
দুঃখ ও ব্যথা তাঁহাদের জীবনের উপর দিয়া একটা
ঝার মত চলিয়া গিয়াছে। আহার অনিদ্রার মধ্য
দিয়া চিন্তার পর চিন্তার মধ্যে হাবুডুবু খাইয়া জগতকে
তাঁহারা নূতনভাবে দেখিয়াছেন ও বুঝিয়াছেন। অদৃষ্টের
চক্রে কে যে কোথায় গিয়া দাড়ায়, তাহা বলা যায় না,
ঘটনার ফেরে মানুষ কোথা হইতে কি ভাবে কোথায়
আসিয়া পড়ে সে কথা ভাবিয়াও স্থির করা যায় না।
অদৃষ্টকে এড়াইয়া জগতে কেহ কোন দিন বড় হইতে
পারে নাই। জগতে যাহারা মহৎ কিছু করিবেন, তঁাহারা
যেন পূর্ব হইতেই তাহার জন্য নির্দিষ্ট হইয়া আসেন।
বিঘ্ন ও বিপদ অনেক সময় তাঁহাদের গ্রাস করিয়া
ফেলিতে চায়, কখন কখন মনে হয় তাঁহাদের ধ্বংস
অনিবাৰ্য, কিন্তু অদৃষ্টের হস্ত এমনিভাবে তাঁহাদের রক্ষা
করে যে মানুষ তাহা ধারণাও করিতে পারে না।
ফারাসীবীর রুশাের জীবনও এমনিভাবে ঘটনা
স্রোতের মধ্য দিয়া বহিয়া গিয়াছে। তাহার জীবনের
করুণ কাহিণী ধীরভাবে পাঠ করা যায় না, সে কাহিনী
পড়িতে পড়িতে চক্ষে জল আসে, হৃদয়ে ব্যথা লাগে,
প্রাণ কঁদিয়া উঠে।
ফরাসী বিপ্লবে রুশো ১৭১২ খ্ৰীঃ অব্দে জেনেভা (Geneva) নগরে রুশাে জন্মগ্রহণ করেন। হায়! হতভাগ্য শিশু, তুমি যে জীবনে দুঃখ ও দৈন্যের মধ্যে হাহাকার করিবে, তােমার জন্মদিনই তাহার সূচনা করিয়াছিল। তুমি জন্মিবামাত্র মাতৃহারা হইলে, পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ মাতৃস্নেহের আস্বাদ হইতে চির দিনের জন্য বঞ্চিত হইলে, সূতিকা গৃহেই তােমার উপর দিয়া অদৃষ্টের কি ভীষণ পরিহাস চলিয়া গেল, তাহা তুমি বুবিতেও পারিলে না। জীবনে যেদিন তুমি প্রথম সে অভাব বুঝিতে পারিলে, সেদিন তােমার কঁদিবার মতও শক্তি রহিল না। মানুষ বেদনা পায়, কঁদিয়া তৃপ্তিলাভ করে, কিন্তু তুমি এমনই মন্দ- ভাগ্য যে মায়ের স্নেহের স্মৃতি লইয়া, চোখের জল দিয়া সে স্মৃতির পূজা করিতে পারিলে না। তুমি কঁদিয়াছ, অনেক কঁদিয়াছ, পিতাপুত্রে উভয়ে মিলিয়া একসঙ্গে কত চোখের জল ফেলিয়াছ ; কিন্তু মাতৃস্নেহের অতৃপ্ত পিপাসা কিছুতেই মেটে নাই। পিতা রুশাের জননীকে প্রাণ দিয়া ভালবাসিতেন। সেই প্রাণপ্রিয় পত্নীর বিয়ােগে তিনি মাতৃহীন শিশুকে সকল প্রকারে মায়ের অভাব ভুলাইয়া রাখিতে চেষ্টা করিতেন। স্বর্গীয়া পত্নীর কথা মনে ;
ফরাসী বিপ্লবে রুখে
করিয়া রুশাের পিতা সময়ে সময়ে এমন করুণ কাহিনী
আবৃত্তি করিতেন যে বালক রুশাে তাহা শুনিয়া কাদিয়া
ফেলিতেন। এমন অনেক দিন গিয়াছে যে পিতাপুত্রে
উভয়ে মিলিয়া সেই করুণ কাহিনী স্মরণ করিতে করিতে
অবিরত চোখের জল ফেলিয়াছেন। রুশাের পিতা
রুশশাকে যেমন প্রাণ দিয়া ভালবাসিতেন, অন্যান্য
সন্তানকে তেমন বাসিতেন না। একদিন তিনি অপর
এক পুত্রকে নির্দয়ভাবে প্রহার করিতে আরম্ভ করেন,
কিন্তু ভ্রাতৃবৎসল রুশাে ছুটিয়া যাইয়া নিজের ভ্রাতাকে
আগুলিয়া দাড়াইলেন, দুই একটী কশাঘাত তাঁহার
পৃষ্ঠে পতিত হইবামাত্র ক্রুদ্ধ পিতা শান্ত হইলেন।
এমনিভাবে রুশশা সেদিন স্বীয় ভ্রাতাকে পিতার
নির্দয় ব্যবহার হইতে উদ্ধার করেন।
যে বালক নিজের
ভ্রাতাকে এত ভালবাসিত, পিতাকে এত ভক্তি করিত,
সে যদি মাতৃস্নেহের ছায়ায় একদিনও দাড়াইতে পারিত
তবে মায়ের স্মৃতিকে কি ভাবে পূজা করিত তাহা কে
বলিতে পারে !
রুশাের পিতা ঘড়ির কাজ করিতেন, আট নয় বৎসর
পৰ্যন্ত তিনি তাঁহার পিতার সহিত অবস্থান করেন।
এই সময়ের মধ্যে বালক রুশাে অনেক গল্পের বই পড়িয়া
ফরাসী বিপ্লবে রুশাে
ফেলেন এবং ভবিষ্যৎ জীবনে তিনি যে Nouvelle
Heloise লেখেন তাহার অনুপ্রেরণা এই শৈশবেই পান।
অল্প বয়সে অনেক গল্প পড়িয়া রুশশা সুন্দর গল্প বলিতে
পারিতেন, গল্প বলিতে বলিতে তিনি সময়ে সময়ে আনন্দে
অধীর হইয়া উঠিতেন। Plutarch ( প্লটার্চ)
এর বই পড়িয়া তিনি বেশ কিছু জ্ঞানলাভ করেন।
রােম ও স্পার্টার Republic Government (গণতন্ত্র
শাসন) সম্বন্ধে এই অল্প বয়সেই তিনি যথেষ্ট অভিজ্ঞতা
সঞ্চয় করেন। স্পার্টার বীরত্বের কাহিনী পড়িতে পড়িতে
তাঁহার হৃদয় নাচিয়া উঠিত। স্পার্টাবাসিগণ শিশুকাল
হইতে দেশের জন্য নিজেদের উৎসর্গ করিয়া দিত। স্পার্টান
রমণীদের পুত্রের প্রতি ব্যবহারের কাহিণীতে তিনি
চমৎকৃত হইয়া যাইতেন। নােম ও স্পার্টার গণতন্ত্রের
শাসন ও শিক্ষাপ্রণালী পাঠ করিয়া তিনি নিজের
হৃদয়ে উহার একটী ছবি অাকিয়া লইয়াছিলেন
এবং নানাস্থানে মতের পার্থক্য থাকিলেও এ কথা
খুবই সত্য যে ভবিষ্যঞ্জীবনে Contract Socialএর
মধ্যে অনেক স্থলেই ইহার ছায়াপাত হইয়াছে।
আট নয় বৎসর বয়সে যে চিন্তা তাঁহার হৃদয়ে অঙ্কুরিত
হইয়াছিল, ভবিষ্যতে সেই চিন্তা প্রস্ফুটিত হইয়া
ফরাসী বিপ্লবে রুশো
Contract Social নামক মৌলিক গ্রন্থে বিকাশ
লাভ করিয়াছিল। শৈশবে রূপকথার হেঁয়ালির মত
হৃদয়ে যে কল্পনা আসিয়াছিল, তাহাই যে দূর
ভবিষ্যতে এক নূতন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সূচনা করিয়া জগতকে
মােহিত করিয়া দিবে একথা কে ভাবিয়াছিল ?
কিন্তু এ আনন্দের জীবন রুশাের ভাগ্যে বেশী দিন
ঘটিয়া উঠে নাই, পিতার স্নেহের ছায়ায় তিনি বেশী দিন
বাস করিতে পারেন নাই। তাঁহার পিতা ১৭২০ খ্রীঃ
অব্দে বালক রুশােকে তাহার এক খুল্লতাতের নিকট
সমৰ্পণ করিয়া জেনেভা ত্যাগ করিয়া চলিয়া যান।
পিতার এই আকস্মিক স্থানত্যাগে রুশশাকে জগতে
এক নূতন সমস্যার মধ্যে পড়িতে হইল, তাঁহার খুল্লতাত
তাঁহাকে গ্রামের এক Pastor এর নিকট পাঠাইয়া
নিষ্কৃতি লাভ করিলেন। এই ধর্মযাজকের নিকট তিনি
কিছুকাল সুখ ও শান্তির মধ্যে কালাতিপাত করেন, পরে
শিক্ষানবীশ ভাবে Notaryর কাজ শিখিতে আরম্ভ
করেন। নােটারীর কাজে নিযুক্ত হইয়া তিনি এ
বিষয়ে একেবারেই অনুপযুক্ত প্রতিপন্ন হন। পরে
তিনি ( Engraving) খােদাই কাৰ্যের শিক্ষা-
নবিশী আরম্ভ করেন। তিনি যাহার নিকট
.
ফরাসী বিপ্লবে শাে
শিক্ষানবিশী করিতেন, সেই প্রভুর সম্বন্ধে তিনি
যে সামান্য বিবরণ লিখিয়া গিয়াছেন, তাহা পাঠ করিলে
রুশাের তৎকালীন মানসিক অবস্থা কিছু জানা যায় ।
তিনি লিখিয়াছেন, “আমার প্রভু M. Sucommoy
একজন উগ্র প্রকৃতির যুবক ছিলেন। তিনি অতি
অল্প সময়ের মধ্যেই আমার শৈশবের বৃত্তিগুলিকে
নষ্ট করিয়া দিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। আমার
হৃদয়-বৃত্তিগুলিকে নাশ করিয়া, ভাবরাশিকে পিষিয়া
ফেলিয়া আমার অন্তরে বাহিরে দাসত্বের ছাপ
অঙ্কিত করিয়া দিবার সঙ্কল্প করিলেন।” এমনভাবে
দিন কাটাইতে কাটাইতে, স্নেহ, দয়া, মায়া হইতে দূরে
থাকিয়া রুশাের প্রাণ বিদ্রোহী হইয়া
উঠিল। একটু
স্নেহ ও ভালবাসা পাইলে যাহার জীবন হয়ত সুন্দর
ফুলের মত ফুটিয়া উঠিতে পারিত, ক্রমাগত নির্দয়
ব্যবহারে সেই হৃদয় কঠিন হইয়া উঠিল। দিনের পর
দিন এই ভাবে কাটিতে লাগিল।
ধীরে ধীরে রুশশা কুসংসর্গে পড়িলেন। Verat
(ভেরাট) নামে তাহার প্রভুর একজন লােক ছিল;
লােকটী ছল চাতুরী দ্বারা বালক রুশােকে চুরি করিতে
শিখাইল। তাহার পরামর্শে রুশশা প্রতিদিন প্রত্যুষে
ফরাসী বিপ্লবে রুশাে
স্বীয় প্রভুর ক্ষেত্র হইতে ভাল ভাল Asparagus
( একজাতীয় মৃণাল ) লইয়া অতি সামান্য মূল্যে বিক্রয়
করিয়া তাহাকে টাকা দিতেন। ভেরাট তাহার পরিবর্তে
রুশশাকে সকালে খাইতে দিত, কিন্তু পরিশেষে এই
চুরি ধরা পড়িল, এবং রুশশাকে তাহার প্রভু অতি
নির্দয়ভাবে প্রহার করিলেন। জগতে এমনি ঘটনা
চিরদিন চলিয়া আসিতেছে। খল ও দর হাতে
পড়িয়া নির্দোষ লােক এমনিভাবে শাস্তি পায়। সয়তান
নিজের দুষ্ট বুদ্ধি দিয়া অপরকে পাপ পথে পরিচালিত
করিয়া নিজে আত্মগােপন করে, আর সেই নিরীহ
মানুষটিকে শাস্তি ভােগ করিতে হয়। ইহার পরেও রুশাে
আর একদিন কিছু ফল চুরি করিতে গিয়াছিলেন, কিন্তু
সেদিনও ধরা পড়িয়া উত্তমরূপে শাস্তিলাভ করেন। বালকের
স্বভাব সে কিছু ভাল খাইতে চায়, কিন্তু হতভাগ্য রুশশাকে
হাতে করিয়া দুটী ভাল খাবার দিবার জগতে কেহই ছিল
,তাই তাহাকে চৌর্যবৃত্তি অবলম্বন করিতে হইয়াছিল।
পিতার ক্রোড়ে পরম স্নেহে কাল কাটাইয়া, স্বীয়
প্রভুর এই নির্দয় ব্যবহার হার অসহ্য হইয়া উঠিল।
শৈশবে সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে লালিত পালিত হইয়া
এই শিক্ষানবিশী তাঁহার নিকট এক ঘৃণিত কাজ বলিয়া
,
ফরাসী বিপ্লবে রুশাে
বােধ হইল। তাঁহার সমস্ত প্রাণ বিদ্রোহী হইয়া উঠিল।
তঁাহার প্রভু তাহাকে প্রায় প্রতিদিনই অতি নির্দয়ভাবে
প্রহার করিতেন। তিনি নিজে লিখিয়া গিয়াছেন,
“The frequent blows that I received from
my master, with my private and ill-chosen
friend rendered me reserve and unsociable
and almost deranged my brain.” (আমার
প্রভুর নিকট হইতে আমাকে এবং আমার এই বন্ধুকে
সদাসর্বদা যে অত্যাচার সহ্য করিতে হইত, তাহা আমাকে
গম্ভীর-প্রকৃতি ও অসামাজিক করিয়া তুলিয়াছিল, এমন
কি আমার মস্তিষ্ককেও বিকৃত করিয়া তুলিয়াছিল।)
এমনি করিয়া একটী একটী করিয়া দিনের পর দিন
কাটিতে লাগিল, রুশাের মন প্রাণ তিক্ত হইয়া উঠিল।
একদিন তিনি বেড়াইতে বাহির হইয়াছেন, সন্ধ্যা হইয়া
গিয়াছে, এমন সময়ে নগরের দ্বার বন্ধ হইয়া গেল।
রুশশা দেখিলেন তাঁহার অদৃষ্টে তীব্র কশাঘাত আছে,
তাঁহার প্রভু হয়ত তাহাকে নির্দয়ভাবে বেত্রাঘাত
করিবেন। অপমান ও লাঞ্ছনার কথা মনে করিয়া অনেক
ভাবিয়া চিন্তিয়া যােল বৎসরের বালক রুশশা জন্মের মত
পথ বাহিয়া চলিতে আরম্ভ করিলেন।
ফরাসী বিপ্লবে শো
মানুষের জীবনে এমনই এক একটা সন্ধিক্ষণ আসিয়া
উপস্থিত হয়।
১৭২৮ খ্রীঃ অব্দে যােল বৎসর বয়সে যে
বালক সংসারের পথ ধরিয়া যাত্রা শুরু করিল, ভগবান্
তাহাকে কোন পথ দিয়া কোথায় লইয়া যাইবেন, তাহা
কে জানে! অদৃষ্টের চক্রে, ঘটনার স্রোতে, তাঁহার
জীবন কোন্ পথে যাইবে, তাহা কে বলিতে পারে ?
একটু স্নেহ, দয়া, ও মায়া যাহাকে সুন্দর ও মনােরম
করিয়া তুলিতে পারিত, অত্যাচার, অবিচার ও নির্দয়
ব্যবহার আজ তাহাকে কেমন করিয়া গড়িয়া তুলিবে
তাহারই বা ঠিক কি ? অদৃষ্টের উপর কাহারও হাত
নাই; অদৃষ্টের খেলা রহস্যপূর্ণ।
১৩
দ্বিতীয় অধ্যায়
যােল বৎসরের বালক অত্যাচার ও উৎপীড়ন সহ্য
করিতে না পারিয়া পথ ধরিয়া চলিল। যে পথে রূশাে
চলিলেন, সে পথ ধরিয়া কত জন বিনষ্ট হইয়াছেন, কতজন
বিপথগামী হইয়াছেন তাহার সংখ্যা কি ? এ পৃথিবীতে
যাহারা ভাবুক ও উদার তাহাদের অদৃষ্টে দুঃখ ও কষ্ট
আসিবেই আসিবে। যাহার হৃদয় যত কোমল, আঘাত
তাহার তত বেশী বাজিবে। নিজের বাল্যজীবনের কথা
লিখিতে গিয়া রুশশা বলিয়াছেন,
"I have frequently fatigued myself by
running after and stoning a cock, a cow, a
dog or an animal I saw tormenting another
only because it was conscious of possessing
superior strength."
‘অর্থাৎ যখন আমি দেখিতাম যে একটা কুকুট, গরু,
কুকুর বা অন্য কোন প্রাণী নিজেকে শক্তিশালী মনে
করিয়া অপর কোন প্রাণীর উপর অত্যাচার করিতেছে,
তখন আমি প্রায়ই সেই প্রাণীটীর অনুসরণ করিয়া
তাহাকে ঢিল মারিতাম। যে বালক একটা পর
a -
১১
ফরাসী বিপ্লবে রুশাে
উপর সামান্য অত্যাচার সহ করিতে না পারিয়া ঢিলের
সাহায্যে অত্যাচারীকে দূর করিয়া দিত, বিধাতা সেই
বালকের অদৃষ্টে এত অত্যাচার ও অবিচার লিখিয়া
রাখিয়াছিলেন। যাহার কোমল হৃদয় একটা সামান্য •
প্রাণীর কষ্ট দেখিয়া কাঁদিয়া উঠিত, যে উৎপীড়িতের পক্ষ
অবলম্বন করিয়া, অত্যাচারীকে শাস্তি দিবার জন্য ছুটিয়া
শ্রান্ত ও ক্লান্ত হইয়া পড়িত, জগৎ তাহাকে কি সুন্দর
পুরস্কারই দিয়াছে।
এমন নির্মম ব্যবহার পাইয়া রুশাে পথে আসিয়া
একটু পথ দেখিতে পাইলেন, নিরাশার মাঝে আশার
একটু ক্ষীণরশ্মি দেখা দিল। পথে ঘুরিতে ঘুরিতে তিনি
সেভয়ের ( Savoy) অন্তর্বর্তী একটি গ্রামে আসিয়া
উপস্থিত হইলেন। স্থানীয় পুরােহিত তাহার প্রতি সদয়
ব্যবহার করিয়া তাহাকে Madam de Waren (ম্যাডাম
ডি ওয়ারেন্) এর নিকট একখানি পরিচয়পত্র দিলেন।
Madam de Waren ক্যাথলিক ছিলেন, তিনি
গির্জা হইতে ফিরিয়া আসিবামাত্র রূশাে পরিচয়
পত্রখানি লইয়া তাহার নিকট অগ্রসর হইলেন। তিনি
বালক রুশােকে সস্নেহে গ্ৰহণ করিয়া তাহার খাবার
বন্দোবস্ত করিয়া দিলেন। গৃহহারা রুশাের এমনিভাবে
ফরাসী বিপ্লবে রুশাে
একটু স্থান মিলিল। মাতৃহীন বালক স্বীয় প্রভুর
অমানুষিক অত্যাচারে জর্জরিত হইয়া
পুরােহিতের সাহায্যে এই দয়ার্ডহৃদয়া নারীর আশ্রয়
লাভ করিলেন।
কিছুদিন ইহার আশ্রয়ে কাটাইয়া একদল যাত্রীর
সহিত রুশাে ইটালী অভিমুখে যাত্রা করিলেন। যাইবার
সময় Madam de Waren তাঁহাকে নিষেধ করিয়াছিলেন,
কিন্তু রুশশা শুনিলেন না, পরে পথের দুঃখ কষ্ট সহ
করিতে না পারিয়া আবার তিনি ম্যাডাম ডি ওয়ারেনের
নিকট ফিরিয়া আসিলে, তিনি রুশােকে সস্নেহে গ্রহণ
করিলেন।
"Poor child," said she, in an affectionate
voice, "art thou here again.'
(তিনি সস্নেহে বলিলেন, “হতভাগ্য বালক, তুমি
আবার ফিরিয়া আসিয়াছ!”)
ম্যাডাম ডি ওয়ারেন্ সত্যই রুশােকে বড় ভাল
বাসিতেন। রুশশা যখন তাহার নিকট উপস্থিত হইলেন,
তখন তিনি তাঁহার গৃহের একজনের কাছে রুশশাকে
নিজের বাটীতে রাখিবার ইচ্ছা প্রকাশ করিয়া বলিয়া-
f86677, "They may tell as they please but
ফরাসী বিপ্লবে শো
since Providence had sent him back, I am
determined not to abandon him.” (afte
লােকে যা খুসী বলুক, ভগবান্ যখন তাহাকে পুনরায়
আমার নিকট পাঠাইয়াছেন, তখন আমি উহাকে ত্যাগ
করিব না।)
ম্যাডাম ডি ওয়ারেণের নিকট রুশ পরম সাদরে
কালাতিপাত করিতে লাগিলেন। সুন্দর পল্লীতে বাস
করিয়া প্রকৃতির স্বাভাবিক সৌন্দৰ্য্য রুশোর হৃদয়ে
প্রতিদিন নূতন নূতন ছবি আঁকিয়া দিত আর ভাবুক
রুশে বিভাের হইয়া নিজেকে তাহার মধ্যে ডুবাইয়া
দিতেন। ম্যাডাম ডি ওয়ারেণের নিকট রুশশা যে
কত ভাবে ঋণী তাহা বলিয়া শেষ করা যায় না। তঁাহার
সংস্পর্শে রুশাের হৃদয়ে নূতন চিন্তা, নূতন ভাবুকতা
আসিতে লাগিল। তিনি শিল্প, সঙ্গীত প্রভৃতি নানা
বিষয়ের চর্চা করিতে লাগিলেন। এমনি ভাবে তিনি
জগতের চারিদিকের একটু সন্ধান পাইলেন। যে বালক
শিক্ষানবিণী করতে যাইয়া অাবন্ধ হইয়া পড়িয়াছিল,
সে আজ ঈদয় ও মস্তিষ্কের বৃত্তিগুলিকে বিকশিত
করিবার এক অপূর্ব সুযোেগ পাইল। এইখানেই রুশো
প্রকৃতির মধ্যে এক অপরূপ সৌন্দর্য্যের সন্ধান পান,
ফরাসী বিপ্লবে রুশাে
এবং সময়ে সময়ে সেই সৌন্দর্যের মধ্যে নিজেকে
সমাধিস্থ করিয়া রাখিতেন। ভবিষ্যৎ জীবনে কল্পনা ও
সৌন্দৰ্য দিয়া তিনি যে সকল চিত্র অঙ্কিত করিয়া
জগতকে মােহিত করিয়া গিয়াছেন, সেই সৌন্দর্য্য
ও কল্পনার আস্বাদ তিনি এইখানেই প্রথমে হৃদয়ঙ্গম
করেন।
পিতৃমাতৃহীন রুশােকে এমন নিবিড় ভাবে আর
কেহই ভালবাসে নাই। গৃহহীন, অর্থহান আতুরকে
এমন করিয়া আর কেহ বুকে টানিয়া লয় নাই। ম্যাডাম
ডি ওয়ারেণ সম্বন্ধে অনেকে অনেক কথা বলিয়াছে, কেহ
কেহ তাহাকে অনেক কটু কথা শুনাইয়াছে, কিন্তু আমি
তাঁহার হৃদয়ের দিকে চাহিয়া এত মুগ্ধ হইয়া যাই যে
তাঁহার কোন দোষ আমার কাছে দাড়াইতে পারে না।
যৌবনের সন্ধিক্ষণে রুশশা যখন কখনও কখনও বিপথে
ছুটিয়া যাইতেন, তখন তিনি রুশােকে সেই পথ হইতে
রক্ষা করিবার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করিয়াছিলেন।
তিনি মনে করিয়াছিলেন যে রুশাে হরি প্রেমে মুগ্ধ
হইয়া কুপথ হইতে প্রত্যাবর্তন করিবেন। ইহা যদি
কলঙ্কই হয়, তবে সে কলঙ্ক তাঁহার সুন্দর জীবনকে
আরও সুন্দর করিয়া তুলিয়াছে।
১৮
ফরাসী বিপ্লবে রুশাে
রুশশা যেদিন রােগশয্যায় মৃতপ্রায়, সেদিন কে তাহার
প্রাণরক্ষা করিয়াছিল, কে সেই অবাধ্য যুবককে শিশুটীর মত
ঔষধ ও পথ্য দিয়াছিল! রুশশার কথায় বলিতে গেলে
বলিতে হয় :-
"By inconceivablo care and vigilance,
she saved my life and I am convinced she
alone could have done this."
তিনি এমন যত্ন ও সতর্কতা অবলম্বন করিয়া আমার
জীবন রক্ষা করেন যে তাহা ধারণাতীত। আমার দৃঢ়
বিশ্বাস তিনি ভিন্ন অন্য কেহ এরূপ করিতে পারিতেন না।
রুশাের শিয়রে বসিয়া একমনে তাহার শুশ্রুষ
করিয়া বন্ধুর মত এক একটী করিয়া ফল মুখে দিয়া তিনি
তাহার জীবন রক্ষা করেন। অসুখের পর অবসাদগ্রস্ত
রুশাের জন্য নূতন গৃহে যাইয়া নূতন ভাবে জীবন
কাটাইবার ব্যবস্থা করিয়া দেন। প্রকৃতির নানা দৃশ্যের
মাঝে কতদিন কতভাবে তাঁহাদের জীবন কাটিয়া গিয়াছে,
ঘটনার পর ঘটনা রঙ্গীন তুলিকার মত তাঁহাদের জীবনে কত
ছবি আঁকিয়া দিয়া গিয়াছে। আবেগ, উচ্ছাস, ভালবাসা
একত্র হইয়া তাহাদের জীবন সার্থক করিয়া দিয়াছে।
একদিন এমনি আবেগভরে রুশশা বলিয়াছিলেন ;-
ফরাসী বিপ্লবে কুশাে
"Oh," said I to this dear friend embracing
her with tears of tonderness and delight,
"this is the abode of happiness and innocence,
if we do not find them here together it will
be in vain to seek them elsewhere."
( হৃদয়ের আবেগ ও আনন্দে অশ্রুপূর্ণ নেত্রে এই
প্রিয়বন্ধুকে আলিঙ্গন করিয়া আমি বলিলাম যে ইহাই
প্রকৃত সুখ ও নির্দোষ আনন্দের স্থান, এখানে যদি তাহা
পাই, তবে অন্য কোথাও পাইব না!)
এই সময় রুশাের মনে দুই এক সময় অদ্ভুত
চিন্তা আসিত। এই চিন্তা তাহাকে দুই এক সময়ে
বড়ই অস্থির করিয়া তুলি । তিনি নিজে কি
অবস্থায় দিন কাটাইতেছেন, তাহা বসিয়া বসিয়া
ভাবিতেন আর প্রশ্ন করিতেন, “সত্যই কি আমি
নিরয়গামী হইব, সত্যই কি আমি ধ্বংসপ্রাপ্ত
হইব?” একদিন তিনি একটী ঢিল হাতে লইয়া স্থির
করিলেন যে এই ঢিলটা যদি সম্মুখের একটা গাছে
লাগাইতে পারেন, তবে তিনি স্বর্গে যাইবেন, আর যদি
তাহা না পারেন, তবে তিনি নিরয়গামী
হইবেন।
এইরূপ মনে করিয়া তিনি ঢিল নিক্ষেপ করিলেন এবং
ফরাসী বিপ্লবে শাে
ঢিলটী গাছে গিয়া লাগিল। তখন ক্ষণিকের জন্য তাঁহার
মন শান্ত হইল বটে, কিন্তু প্রায়ই এইরূপ নানা প্রকারের
চিন্তা আসিয়া তাহাকে উত্যক্ত করিত।
এইরূপে কখনও উচ্ছল প্রেমিক, কখনও ছাত্রভাবে
তিনি জীবনের কিছুদিন কাটাইয়া দিলেন। ঘটনা-
স্রোতে ভাসিয়া তিনি কোথায় যাইয়া উঠিবেন, তাহা
কেহই, জানিত না। মানুষ ঘটনাস্রোতে এমনিভাবে
ভাসিয়া চলে, পথে ভগবান্ যদি তাহাকে তুলিয়া লন,
তবেই সে ধন্য হয়। রুশাের জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়
এমনিভাবে চলিতে থাকে। যােল বৎসর বয়সে পথে
বাহির হইয়া ঊনত্রিশ বৎসর পর্যন্ত এইভাবে কাটিয়া
যায়। এই সময়ের মধ্যে তিনি দুঃখ যেমন পাইয়াছিলেন
আনন্দও তেমনি পাইয়াছেন। কিন্তু তিনি জানিতেন
যে অনেক কষ্ট, অনেক দুঃখ তাহার জন্য পূঞ্জীভূত
হইয়া রহিয়াছে।
KRS WAT
4b
SPARTA
99.
HAKAFUAT
IWREH
তৃতীয় অধ্যায় । এমনি করিয়া ম্যাডাম ডি ওয়ারেণের সহিত রুশাের জীবনের এক অধ্যায় কাটিয়া গেল। এত সুখ ও শান্তি রুশাের ভাগ্যে ভগবান বেশী দিন লিখেন নাই। দুঃখ- ভােগের জন্য তিনি জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন তাই আবার উনত্রিশ বৎসর বয়সে ভাগ্যপরীক্ষার জন্য বাহির হইলেন। এবার প্যারিসে আসিয়া তিনি অনেক চেষ্টা করিলেন, কিন্তু অদৃষ্ট যাহার প্রতি প্রসন্ন না হয়, তাহার কোন দিক দিয়া কিছু সুবিধা হয় না। বার বার বৃথা চেষ্টা করিয়া পরিশেষে ১৭৪৩ খৃঃ অব্দে তিনি কতকটা স্থির হইলেন। একটু স্থিতিলাভ করিবার পর তিনি সাহিত্য ও সঙ্গীতের চর্চা করিতে আরম্ভ করিলেন। সঙ্গীত শিখিবার জন্য রুশাে কত পরিশ্রম করিয়াছিলেন, তাহা মনে করিলে আশ্চর্য্য হইতে হয়। ম্যাডাম ডি ওয়ারেণের নিকট হইতে একখানি সঙ্গীত পুস্তক সংগ্রহ করিয়া তাহারই সাহায্যে তিনি প্রথম সঙ্গীতে মনােনিবেশ করেন ! রুশাের কণ্ঠস্বর তেমন সুন্দর ছিল না। গান গাহিবার ক্ষমতা তাঁহার তেমন
ফরাসী বিপ্লবে রুখে
;
কিছু ছিল না তবু কেন জানি না, সঙ্গীত শিখিবার জন্য
তাহার প্রাণে একটা তীব্র আকাক্ষা জাগিয়া উঠিল এবং
তিনি দিনের পর দিন এই সাধনায় নিজেকে নিমজ্জিত
করিয়া রাখিলেন।
সঙ্গীতের ন্যায় সুন্দর পবিত্র ভাব আর কিসে আনিয়া
দেয় জানি না। সুমধুর সঙ্গীত শ্রবণে প্রাণ যেমন করিয়া
নাচিয়া উঠে
এমনটি বােধ হয় আর কিছুতেই হয় না।
সঙ্গীত স্বর্গের সৃষ্টি, তার প্রতি ঝঙ্কারে হৃদয়তন্ত্রী যেন
সাড়া দিয়া উঠে; কিন্তু এই পবিত্র সঙ্গীত যখন মানুষকে
মােহ ও মদিরার দিকে আকর্ষণ করে, তখন সে ধ্বংসের
পথে অগ্রসর হয়। সঙ্গীতচর্চা করিতে গিয়া কতজন
ধীরে ধীরে কুপথে চলিয়া গিয়াছে, তাহার ইয়ত্তা
নাই। রুশাের জীবনে সঙ্গীতচর্চা তেমন সুফল প্রদান
করে নাই।
প্যারিস নগরে পূর্ণ যৌবনে সঙ্গীত
চর্চা করিতে গিয়া, তিনি যে বিপথে পরিচালিত
হন নাই, একথা ঠিক করিয়া বলা যায় না। তাহার
জীবনের এই অধ্যায় কলঙ্ক ও কালিমায় পূর্ণ ;
প্যারিসে তিনি এমন অনেক জঘন্য কাজ করিয়াছিলেন,
যাহা কেহ কোন দিনও সমর্থন করিতে পারে না।
প্যারিসে অবস্থান করিয়া কিছুদিন পরে তিনি একজন
ফরাসী বিপ্লবে রুশো
অশিক্ষিত মূর্খ নারীকে নিজের স্ত্রী বলিয়া গ্রহণ করিলেন।
এই নারীকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করিয়া তিনি জীবনে এক ভুল
করেন। তাঁহার পত্নী “Theresa Lavasseur (থেরেসা
লেভেসিয়ার) মূখ হইলেও, তিনি তাঁহাকে অত্যন্ত
ভালবাসিতেন। এই পত্নীর গর্ভে রুশাের পাচটী সন্তান
জন্ম গ্রহণ করে, কিন্তু রুশাে এই সন্তানগুলির প্রতি পশুর
মত ব্যবহার করিয়াছেন। প্রত্যেক সন্তান ভূমিষ্ঠ হইবার
পরই তিনি তাহাদিগকে পরিত্যক্ত শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট
হাসপাতালে ( Foundling_IHospital ) রাখিয়া
আসিয়াছেন। রুশাের জীবনের এই ঘটনা তাঁহাকে
পশুরও অধম করিয়া তুলিয়াছে এবং ভবিষ্যৎ জীবনে
তিনি এই কথা মনে করিয়া অনেক অনুতাপ
করিয়াছেন।
এই ঘটনার কথা মনে করিলে,তাহার পত্নী (Lavasseur)
ল্যাভেসিয়ার এর কথা মনে আসে। উদ্ধৃঙ্খল রুশাে
মােহের মধ্যে পড়িয়া যে কাজ করিয়াছিলেন, লেভে-
সিয়ারের মাতৃহৃদয় তাহা কেমন করিয়া সমর্থন করিল,
মা হইয়া তিনি কেমন করিয়া নিজের সন্তানকে এমন
করিয়া পরিত্যাগ করিতে পারিলেন। মােহমুগ্ধ রুশাে,
এই নারীকে প্রকৃতির শিশু” child of nature বলিয়া
২৪
ফরাসী বিপ্লবে রুশাে
গিয়াছেন, কিন্তু আমরা তাঁহাকে একটা প্রাণহীন জড়-
পদার্থ ভিন্ন অন্য কোন ভাবে দেখিতে পারি না। তাহার
মাতৃহৃদয় যদি সন্তানকে রাখিবার জন্য আগ্রহ প্রকাশ
করিত, তাহা হইলে হয়ত রুশো এই জঘন্য কাজ হইতে
নিরস্ত হইতে পারিতেন। পশুর মত কাম প্রবৃত্তি চরিতার্থ
করিয়া তাহারা স্বীয় সন্তানগুলিকে যে ভাবে ত্যাগ
করিয়াছেন, সে কলঙ্ক মুছিবার নয়। জগতের নরনারী
এ কাহিনী শুনিলে শিহরিয়া উঠিবে।
উনত্রিশ হইতে প্রায় উনচল্লিশ বৎসর পর্যন্ত রুশাে
প্যারিসে এই ভাবে কালাতিপাত করেন। নানুষ যে
কখন কি ভাবে একটা মহত্ত্বের পথ অবলম্বন করিয়া ধন্য
হয়, তাহা ভাবিয়া পাওয়া যায় না। শত সহস্রবার
চেষ্টা করিয়াও যাহা লাভ করা যায় না, হঠাৎ এক সুবর্ণ
সুযোেগ আসিয়া তাহা করিয়া দিয়া যায়। জগতের এই
সমস্ত ঘটনা বড় বড় লােকের জীবনে এত বহুল পরিমাণে
দৃষ্ট হয় যে দৈবকে অস্বীকার করিয়া চলা এক প্রকার
অসম্ভব। পুরুষকারের স্থান জগতে চিরদিন আছে ও
থাকিবে, কিন্তু দৈবকে অস্বীকার করিবার কোন উপায়
দেখি না। জগতে এমন অনেক ঘটনা দেখা যায় যে
মানুষ পুরুষকার বলে যাহা সমস্ত জীবন ধরিয়া করিতে
ফরাসী বিপ্লবে রুশাে
পারে নাই ; দৈবচত্রে তাহা অতি সহজে অল্প সময়ের
মধ্যে সুসম্পন্ন হইয়াছে।
রুশাের জীবনে অদৃষ্টের খেলা এত বেশী যে ভাবিয়া
বিস্মিত হইতে হয়। ষােল বৎসর বয়সে যে, পথ ধরিয়া
বাহির হইল, ২৯ বৎসর বয়স পর্যন্ত ঘের উজ্জ্বলতার
মধ্যে কালাতিপাত করিল, ৩৯ বৎসর পর্যন্ত যে ইন্দ্রিয়
বৃত্তির চরিতার্থের জন্য স্বীয় সন্তান পৰ্য্যন্ত ত্যাগ করিতে
পারিল, তঁাহার হৃদয় যে কেমন করিয়া বিশ্ববাসীর রুদ্ধ
বেদনায় হাহাকার করিয়া উঠিল, তাহার কোন মীমাংসা
হয় না। ১৭৪৯ খৃঃ অব্দে প্রায় চল্লিশ বৎসর বয়সে
হঠাৎ রুশাের জীবনের এক নৃতন অধ্যায়ের সূচনা হইল।
ডিজন { Dijon) কলেজ হইতে “নৈতিক জীবনের উপর
শিল্প ও বিজ্ঞানের প্রভাব” (moral influence of the
arts and sciences) সম্বন্ধে প্রবন্ধ লিখিবার জন্য এক
পুরস্কার ঘোেষণা করা হয়। এই সূত্রে রুশো যে প্রবন্ধ
লিখেন, তাহা তঁাহার প্রতিভা সকলের সমক্ষে প্রকাশ
করিয়া দেয় এবং তিনি নিজেও এইবার সম্যকরূপে কিছু
বুঝিতে পারেন। ১৭৫১ খৃঃ অব্দে তিনি এ বিষয়ে যে
পুস্তক প্রকাশ করেন, তাহা সেই সময়কার এক
আলােচনার বিষয় হইয়া দাড়াইয়াছিল। ১৭৫৪ খৃঃ অব্দে
ফরাসী বিপ্লবে রুখে
তিনি আর একবার ডিজন ইউনিভার্সিটির পুরস্কার
পাইবার জন্য চেষ্টা করেন, কিন্তু এবার তিনি অকৃতকাৰ্য্য
হন। এবার তিনি মানুষের মধ্যে
অসামঞ্জস্যের মূল।
কারণ কি এবং এই অসামঞ্জস্য প্রকৃতির কোন বিশেষ
নিয়ম দ্বারা পরিচালিত কি না, এ বিষয়ে যে প্রবন্ধ
লিখেন, তাহা প্রতিযােগীতায় পুরস্কার না পাইলেও,
তাহার নাম সাধারণের নিকট সুপরিচিত করিয়া দিল।
What was the origin of inequality among
men and is it authorised by the laws of
Nature.—এই প্রবন্ধ মুদ্রিত ও প্রকাশিত হইলে,
সকলেই রুশােকে জানিতে পারিলেন। ১৭৫৬ খ্রীঃ অব্দে
তিনি ‘Madam de Epinay' ম্যাডাম ডি এপিনের কৃপায়
রুশােমন্ট মরেনসির (Mont inorency) বনের এক
প্রান্তে এক আশ্রমে বাস করিতে লাগিলেন।
নিকট উন্মুক্ত ময়দানের মধ্যে বাস করিয়া রুশশা পরম
আনন্দে দিন কাটাইতে লাগিলেন। প্রকৃতির সৌন্দর্যের
মধ্যে ম্যাডাম ডি হণ্ডেলফ (Madam de Hondelof )
এর সহিত অতি সুখে তঁাহার জীবন কাটিতে লাগিল।
ম্যাডাম ডি হণ্ডেলফের সহিত তাঁহার এত ঘনিষ্ঠতা
অনেকের চক্ষে ভাল লাগিল না, এ বিষয়ে অনেকে অনেক
ফরাসী বিপ্লবে রুশাে
কথা বলিতে লাগিল। পরিশেষে মনোমালিন্যের সৃষ্টি
হওয়ায় রুশাে এস্থান ত্যাগ করিলেন।
প্রতিভা কখনও গড়িয়া ভােলা যায় না, উহা মহৎ
লােকের জন্মলব্ধ সম্পত্তি। কেহ তাহার বিনাশসাধনও
করিতে পারে না। প্রতিকূল ঘটনা তাহাকে কিছুদিনের
মত ঢাকিয়া রাখিতে পারে; কিন্তু একদিন না একদিন
তাহা প্রকাশ পাইবেই পাইবে। রুশাের প্রতিভা ঘটনা-
চক্রে এতদিন সুপ্ত ছিল, আজ তাহা যেমন জাগিয়া উঠিল,
অমনি সমস্ত দেশ তাঁহাকে চিনিতে পারিল। ইহার পর
বার বৎসর ধরিয়া বিকারগ্রস্ত রােগীর ন্যায় তিনি
ক্রমাগত পুস্তকের পর পুস্তক লিখিতে আরম্ভ করিলেন।
এই বার বৎসরের মধ্যে তিনি যে সব পুস্তক লিখিয়া-
ছিলেন, তাহাই সমস্ত ইউরােপে এক নূতন প্রাণের
সঞ্চার করিয়া দেয়। রুশাের লেখনী সৌন্দর্য্যে, কল্পনায়,
ভাবুকতায় সমস্ত ইউরােপে এক নূতন জাগরণের সাড়া
বহিয়া আনিল। রুশাের পুস্তক পাঠ করিয়া ফরাসী জাতির
চিন্তা কোন্ পথে গিয়াছিল, তাহারা কি প্রেরণা পাইয়া -
ছিল, তাহা স্থানান্তরে বলিব এ স্থানে শুধু এই বলিতে চাই
যে এত অল্প সময়ের মধ্যে এত অধিক বয়সে, এত প্রশংসা
খুব কম লােকের ভাগ্যেই ঘটিয়াছে। ১৭৫৩ খৃঃঅব্দ হইতে
২৮
ফরাসী বিপ্লবে রুশাে
১৭৬২ খৃঃঅব্দ,এই অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি “The Second
Discourse.' "The Nauvelle Heloise', 'Emili',
এবং Contract Social' প্রভৃতি পুস্তক লিখিয়া ফেলেন।
রুশাের জীবনে একটা নিদারুণ ব্যথা ছিল, সমস্ত
আমােদ ও উচ্ছ্বাসের মধ্যেও এই ব্যথা প্রকাশ পাইত।
তাহার প্রাণ কি যেন কি চাহিত, তাহার হৃদয়ে শান্তি
ছিল না। তাই ম্যাডাম ডি ওয়ারেণের আশ্রয় পাইয়াও
তিনি ইটালি অভিমুখে যাত্রা করিয়াছিলেন। পথ হইতে
ফিরিয়া আসিয়া আবার ম্যাডাম ডি ওয়ারেণের নিকট
আসিলেন সত্য, কিন্তু প্রকৃতির শান্ত সৌন্দর্যের মধ্যে
বসিয়া তিনি অনেক কথা ভাবিতেন, নরকের চিন্তা সময়ে
সময়ে তাঁহাকে বড়ই কষ্ট দিত। হৃদয়ের এই অভাব
কি দিয়া পূরণ করিবেন, তাহা তিনি ভাবিয়া পাইতেন
। তাই উচ্ছ ঙ্খলতার মধ্যে, চঞ্চলতার মধ্যে নিজেকে
ছাড়িয়া পথে পথে ঘুরিয়া বেড়াইতেন।
হার হৃদয়ে যে কি ক্ষত লুকান ছিল, তাহা সকলে
বুঝিতে পারে না। শিল্পী যেমন একটা সৌন্দর্য্যের ছবি
মনের মধ্যে ধারণা করিয়া তাহা ফুটাইয়া তুলিতে চায়,অথচ
পারিয়া একটা অব্যক্ত যাতনা অনুভব করে, রুশাের
প্রাণেও তেমনি কি যেন একটা বেদনা কঁদিয়া বেড়াইত।
চতুর্থ অধ্যায়।
এমনি ভাবে ঘটনাস্রোতে ভাসিতে ভাসিতে এতদিনে
রুশশা নিজের ঘরের সন্ধান পাইলেন। যাহা তিনি মাঝে
মাঝে অনুভব করিতেন, আজ তিনি তাহা হৃদয়ঙ্গম
করিলেন। যিনি একদিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে শীর্ষ স্থান
অধিকার করিবেন, তিনি কেমন করিয়া নিজেকে
খােদাইয়ের কাজে শিক্ষানবীশ ভাবে মনােনিয়ােগ
করিতে পারেন! যাহার নিজের কোন স্থান নাই, সেই
যে কোন স্থানে নিজেকে বদ্ধ রাখতে পারে, কিন্তু রুশাের
মত এত বড় প্রতিভা কি কখনও এক ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠে
আবদ্ধ থাকিতে পারে ? কখনও শিক্ষানবীশ, কখনও
ভৃত্য, এমনই কত স্থানে কত অবস্থায় তিনি দিন
কাটাইয়াছেন। অভাবের তাড়নায় মানুষ যতদূর
নিম্নগামী
হইতে পারে, রুশাে ততদূর নামিয়াছিলেন, এমন
কি চুরি করিতেও তিনি পশ্চাৎপদ হন নাই। দুটী অন্নের
জন্য নতজানু হইয়া অপরের কৃপা ভিক্ষা পৰ্য্যন্ত করিতে
হইয়াছে, কিন্তু আবার যেমনই একটু স্থান অধিকার
করিতে পারিয়াছেন, অমনি তাহার বিদ্রোহী প্রাণ ছুটিতে
আরম্ভ করিয়াছে।
ফরাসী বিপ্লবে রুশো
এমনি করিয়া নানা প্রকার অবস্থার মধ্য দিয়া সমাজ
ও ধৰ্ম্মকে তিনি ঠিক ঠিক ভাবে চিনিয়াছিলেন এবং
চিনিয়াছিলেন বলিয়াই তিনি বিদ্রোহী হইয়াছিলেন ।
জগতে যাহারা নেতৃত্ব করিতে আসেন, তাহারা চিরদিনই
একটা অসাধারণ ক্ষমতা লইয়া জন্মগ্রহণ করেন, পরে
যিনি যেমন অবস্থার মধ্যে দাড়ান, তিনি তারই মধ্য দিয়া
কিছু গড়িয়া তুলেন। নেতার কাজ কিছু সৃষ্টি করা
এবং সেই সৃষ্টির মধ্যেই আমরা তাঁহার নেতৃত্বের অভি-
ব্যক্তি .দখিতে পাই। কিন্তু সময় ও ঘটনা এমনি ভাবে
আসিয়া
দাড়ায়
মাঝে মাঝে মনে। হয়
যেন
কোন নেতা ধ্বংসের মধ্যে
খেলা
করিতে আসেন। রুশােকে অনেকেই মনে
করেন তিনি ধ্বংসের খেলা খেলিবার জন্যই আসিয়া-
ছিলেন, ফ্রান্সের বিপ্লবের মধ্যে রুশােকে অনেকে
এমনিভাবে জড়িত করিয়াছেন যে সাধারণ লােকে মনে
করে যে রুশাে একটা ধ্বংসের আয়ােজন করিয়া
গিয়াছিলেন। ফরাসী বিপ্লবের গুরু যে রুশাে, সে
বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই, ফরাসী বিপ্লবের সর্বপ্রথম
বিদ্রোহী যে রুশশা সে বিষয়ে কোন মতদ্বৈধ নাই।
কিন্তু রুশাে শুধু ধ্বংসের খেলা খেলিয়া যান নাই, তিনি
ফরাসী বিপ্লবে রুশাে
এক নূতন সৃষ্টির চিত্র রাখিয়া গিয়াছেন, হয়ত একদিন
সে চিত্র আমাদের সমাজে সত্য হইয়া উঠিবে।
মানুষ স্বভাবতঃ সুন্দর, সরল ও পবিত্র। রুশাে
আমাদের সম্মুখে সেই স্বাভাবিক অবস্থার একটী আদর্শ
দিয়া গিয়াছেন। মানুষকে তিনি তার স্বাভাবিক
অবস্থায় (state of nature) ফিরিয়া আসিতে
বলিয়াছেন। মানুষ নিজের দোষে নানা প্রকার অস্বাভাবিক
{ Artificial ) ব্যবস্থা দিয়া নিজেকে অতি ক্ষুদ্র করিয়া
রাখিয়াছে, সমাজে নানা প্রকার অত্যাচার, অবিচার ঘিরিয়া
রহিয়াছে তাই রুশো মানুষকে ডাকিয়া বলিয়াছেন “এস
ফিরে এস, তােমাদের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এস।”
এই একই কথা তিনি নানা দিক দিয়া নানা ভাবে
মানুষের নিকট বলিয়া গিয়াছেন। কখনও শিক্ষার কথা
বলিতে বলিতে, কখনও বা রাজনীতির কথা বলিতে
বলিতে, কখনও বা গল্প, হাসি তামাসাচ্ছলে, সেই একই
বাণী তিনি নানা ভাবে সমাজে প্রচার করিয়া গিয়াছেন।
এই বাণী প্রচার করিতে তঁাহাকে অনেক দুঃখ ও উৎপীড়ন
সহ্য করিতে হইয়াছে, স্বদেশ হইতে বহিস্কৃত হইয়া পথে
পথে অন্নহীন, গৃহহীন অবস্থায় তঁাহাকে দিন কাটাইতে
হইয়াছে।
ফরাসী বিপ্লবে রুশো
অত্যাচার, উৎপীড়ন ও নানাপ্রকার
নানাপ্রকার কুৎসা
তাহাকে উত্যক্ত করিয়া তুলিয়াছিল। দুঃখ ও উৎপীড়ন
তাহাকে ততটা বিচলিত করিতে পারে নাই; কিন্তু
তাহার শত্রু পক্ষ যখন তাঁহার বিরুদ্ধে নানা প্রকার মিথ্যা
কুৎসা প্রচার করিতে লাগিল, তখন তিনি অধীর হইয়া
উঠিলেন। রুশের প্রথম জীবন যেভাবেই অতিবাহিত
হউক না কেন, ১৭৫৩ খৃঃ অব্দের পর হইতে, তঁাহার
জীবন একটী মহৎ চিন্তা ও আদর্শ লইয়া ভরপুর ছিল,
আন্য কোন চিন্তা তঁাহার হৃদয়ে স্থান লাভ করিতে পারে
নাই। এই সময় হইতে প্রকৃতির শিশুর ন্যায়, তিনি
তাহার জীবন নূতনভাবে পরিচালিত করেন, সত্য কথা
বলিতে গেলে বলিতে হয় যে এই সময় রুশাের পুনর্জন্ম
হইল। এবার তিনি নূতন আলােকের সন্ধান পাইয়া
জগতে নূতন বাণী প্রচার করিতে অগ্রসর হইলেন, এই
সময় ইচ্ছা করিলে তিনি প্রভূত পরিমাণে ধনৈশ্বৰ্য্য লাভ
করিতে পারিতেন, ইচ্ছা করিলে নিজেকে ভােগের মধ্যে
নিমজ্জিত করিয়া রাখিতে পারিতেন, কিন্তু শত প্রলােভন
সত্ত্বেও রুশাের প্রাণ সেদিকে আকৃষ্ট হইল না। নূতন
ভাবে বিভাের হইয়া, নূতন আদর্শে অনুপ্রাণিত হইয়া
তিনি দারিদ্রকে বরণ করিয়া লইলেন।
ফরাসী বিপ্লবে রুশাে
এ ত্যাগ
যিনি দারিদ্রের তাড়নায় পথে পথে অনাহারে ঘুরিয়া
বেড়াইয়াছেন, যাহার জীবনের অধিকাংশ সময় পরের
গৃহে অতিবাহিত হইয়াছিল, যিনি অন্নের অভাবে ক্ষুধার
জ্বালায় চুরি পর্যন্ত করিয়াছেন, সেই রুশাে আজ শত
প্রলােভন সত্ত্বেও ধন, ঐশ্বৰ্য্যকে তুচ্ছ করিয়া এক মহৎ
আদর্শের জন্য নিজেকে নিয়ােগ করিলেন।
যে কত মহান তাহা হৃদয়ঙ্গম করাও কঠিন। সমস্ত
সম্পদ তুচ্ছ করিয়া সহজ ও সরল জীবন বরণ করিয়া
লইয়া তিনি এক এক পৃষ্ঠা গান নকল করিয়া প্রতি
পৃষ্ঠায় ছয় আনা উপাৰ্জন করিয়া নিজের জীবিকা নির্বাহ
করিতে লাগিলেন। জগতের ইতিহাসে বীরের অভাব
নাই, কিন্তু রুশাের মত এমন বীর খুব কমই আছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে কামানের সম্মুখে অনেকে যুদ্ধ করিয়াছেন কিন্তু
এমনভাবে নিজেকে তিলে তিলে আহুতি দিয়া ক’জন
লােক নিজেকে উৎসর্গ করিয়াছেন ? অস্ত্রের ঝঙ্কার,
কামানের গর্জন, ইতিহাসে কত দৃশ্যের উদঘাটন করিয়াছে
সত্য, কিন্তু রুশাের জ্বালাময়ী লেখনী সৌন্দর্য্য ও কল্পনার
রঙীন তুলিকা দিয়া যেরূপ মনােরম চিত্র অঙ্কিত করিয়া
গিয়াছে, পৃথিবীর সমস্ত ইতিহাসে সেরূপ আর একটাও
খুঁজিয়া পাওয়া যায় না।
ফরাসী বিপ্লবে রুশাে কিন্তু রুশাের অদৃষ্টে কি ছিল! দেশে প্রকৃত শিক্ষা বিস্তার করিবার জন্য সমস্ত শক্তি ও চিন্তা দিয়া তিনি যে মৌলিক গ্রন্থ রচনা করিলেন তাহা তৎকালীন ফরাসী গবর্ণমেন্টকে সন্ত্রস্ত করিয়া তুলিল। তাঁহার ( শিক্ষা সম্বন্ধীয় পুস্তক ) Emile ও ( রাজনীতি সম্বন্ধীয় পুস্তক) Contract Social প্রকাশিত হইবামাত্র প্যারিসের তদানীন্তন পার্লামেন্ট, জেনেভা ও বার্ণের কাউন্সিল তাহাকে একজন বিদ্রোহী বলিয়া দেশ হইতে দূর করিয়া দিলেন। যিনি চিন্তা ও কল্পনা দিয়া অশিক্ষিত সমাজকে প্রকৃত সমাজের আদর্শ দেখাইয়া গিয়াছেন, যিনি শাসন- পদ্ধতি নূতনভাবে প্রকাশ করিয়া শাসনতন্ত্রকে সাম্য ও ঐক্যের ভাবে উদ্বুদ্ধ করিয়াছেন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিনি জগৎগুরু, তিনি স্বদেশ হইতে নির্বাসিত হইলেন। স্বদেশ হইতে নির্বাসিত হইয়া রুশশা আবার পথ ধরিয়া চলিতে আরম্ভ করিলেন। যােল বৎসর বয়সে যে বালক পথ ধরিয়া চলিতে আরম্ভ করিয়াছিল, পথই বুঝি চিরদিন তাহার আপনার হইয়া রহিল। কত স্থানে কতভাবে ঘুরিলেন, কিন্তু কোথাও তাহার আশ্রয় মিলিল না, পরিশেষে Frederick the Great, (ফ্রেডারিক দি গ্রেট এর কৃপায় নেচেটেলের ক্যান্টনে (the
ফরাসী বিপ্লবে রুশাে
anton of Nenchatel) একটু আশ্রয় লাভ
করিলেন। ভলটেয়ার (Voltaire ) তাঁহার পরম
শত্রু ছিলেন, সুইজারলণ্ড ভলটেয়ারের নিকট রুশাের
থাকিবার উপায় ছিল না। ভলটেয়ার তার বিরুদ্ধে
নানাপ্রকার কুৎসা প্রচার করিতে লাগিলেন, ফলে রুশাে
ফ্রেডারিক্ দি গ্রেটের আশ্রয় ত্যাগ করিয়া ব্রিনিতে
অবস্থান করিবার চেষ্টা করিলেন। ব্রিনিতে যাইবামাত্র
সেখানকার গবর্ণমেন্ট তাহাকে সে স্থান হইতে
लूट
করিয়া
দিলেন। ব্রিনি হইতে বিতাড়িত হইয়া নানাপ্রকার
অবস্থাচক্রে পড়িয়া ১৭৬৬ খৃঃ অব্দে রুশাে ইংলণ্ডে
হিউমের নিমন্ত্রণ পাইয়া তাহার নিকট বাস করিতে
লাগিলেন, কিন্তু কিছুদিন পরে তিনি বুঝিতে পারিলেন
যে হিউম ভলটেয়ারের সহিত একযােগে তাহার বিরুদ্ধে
কাজ করিতেছেন। ইংলণ্ডেও নানাপ্রকার অত্যাচার
অবিচার তাহাকে বিস্ত করিয়া তুলিল, তখন হঠাৎ
একদিন গােপনে তিনি পলায়ন করিয়া ছদ্মবেশে নৃতন
এক নাম ধারণ করিয়া ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিলেন।
ছদ্মবেশে নূতন নাম ধারণ করিয়া Tyrechateauতে
কিছুদিন অবস্থান করেন, পরে ১৭৬৭ খৃঃ অব্দে প্যারিসে
ফিরিয়া আসেন।
ফরাসী বিপ্লবে রুশাে
নানাপ্রকার উৎপীড়ন সহ্য করিয়া এমনিভাবে দেশ
হইতে দেশান্তরে পথে পথে তিনি ঘুরিয়া বেড়াইতে
লাগিলেন। তাহার শত্রুপক্ষ তাহার বিরুদ্ধে নানাপ্রকার
কুৎসা প্রচার করিতে লাগিল। রুশাের কোমল হৃদয়ে
এত কুৎসা ও গ্লানি অসত্য হইয়া উঠিল, তঁাহার মহৎ
অন্তঃকরণ মানুষের নীচতায় বিদ্রোহী হইয়া উঠিল।
তিনি প্যারিসে বসিয়া ক্রোধে, ক্ষোভে, নিজে নিজের
জীবনী লিখিয়া Confessions' বলিয়া এক পুস্তক
লিখিতে আরম্ভ করিলেন। এই পুস্তকে তিনি তাঁহার
জীবনের সমস্ত ঘটনা লিখিয়া গিয়াছেন। রুশােকে
সত্যভাবে বিচার করিতে হইলে এই পুস্তক পাঠ করা
দরকার। এই পুস্তক লিখিবার প্রারম্ভে তিনি যে কয়টা
কথা বলিয়াছেন, তাহা পাঠ করিলেই বুঝিতে পারা যায়
যে তিনি জীবনে কত গ্লানি, কত ব্যথা সহ্য করিয়াছেন।
প্রারম্ভেই তিনি লিখিয়াছেন :—
“I have entered on a performance which
is without example, whose accomplishment
will have no imitator, I mean to present my
fellow mortals with a man in all integrity
of
nature and this man shall be myself.
ফরাসী বিপ্লবে রুশো I know my heart and have studied mankind, I am not made like anyone, I have been acquainted with, perhaps like no one in existence; if not better, I, at best, claim origi. nality and whether nature did wisely in breaking the mould with which she formed me, can only be determined after having read this work, Whenever the last trumpet shall sound I will present inyself before the Sovereign Judgę, with this book in my hand and loudly proclain, thus have I acted, there were my thouglıts, such was I With equal freedom and veracity have I related what was laudable or wicked, I have concealed no crimes, added no virtues, and it I have sometiines introduced superfluous ornaments, it merely to occupy a void accompanied hy detect of memory I may have supposed that certain which I knew only to be probable, but have never asserted as truth, a conscious falsehood. Such as I was, I have declared myselt, somelvas
ফরাসী বিপ্লবে রুশাে
.
tiones vile and despicable, at others, virtuous,
gonerous and sublime even as thou hast read
iny inmost soul : Power eternal, assejuble
round the throne, and iinmortal throng of
iny mortals, let them listen to my confessions,
let them blush at iny depravity, let them
tremble at my sufferings, let each in his turn
expose with equal sincerity the tallings and
wanieriags of his heart, and, it he dare, ever,
1. Ivits better than that man
“Confessions” এর প্রারম্ভেই রুশো। এমনিভাবে
নিজের সম্বন্ধে লিখিয়াছেন। নিতান্ত দারিদ্র্য ও কষ্টের
মধ্যে তিনি ‘Confessions' লেখা শেষ করেন। ১৭৭৮
খৃঃ অব্দে এরমেনন ভিলাতে ( Ern?non villa) তিনি
ম্যাডাম ডি গিরেডিনের (Mulam (le Giradin)
আতিথ্য স্বীকার করেন এবং সেই স্থানেই ১৭৭৮ খৃঃ অব্দে
২রা জুলাই তিনি অকস্মাৎ দেহত্যাগ করেন। রুশোর এই
আকস্মিক মৃত্যু সম্বন্ধে নানা জনে নানা কথা বলেন ;
কেহ কেহ মনে করেন যে তিনি আত্মহত্যা করিয়াছিলেন।
হায় অদৃষ্টের কি মর্মান্তিক পরিহাস! শিক্ষাক্ষেত্রে
সমাজে, রাষ্ট্রীয় জীবনে, ধর্মের মধ্য দিয়া যিনি আজ
ফরাসী বিপ্লবে রুশাে
ছিল।
জগতে বরণীয় তঁহারই অদৃষ্টে এমনি শশাচনীয় পরিণাম
রুশােকে ভাল করিয়া জানিতে হইলে তাহার
Confessions” পাঠ করা উচিত। তাহাকে ভাল
করিয়া বুবিতে হইলে তাহার জীবনের ভাবরাশি
হৃদয়ঙ্গম করা দরকার। তঁাহার Emili ও Contact
social না পড়িয়া কেহ তাহাকে ঠিকভাবে বুঝিতে
পারিবেন না। অতি সন্তর্পণে ও সংক্ষেপে রুশাের
পরিচর দিয়া এইবারে তাঁহার চিন্তা ও কল্পনার রাজ্যে
আমরা একবার দর্শক হইব। হার Enviliকে
তিনি কি ভাবে শিক্ষা দিয়াছেন তাহার Contract
socialএ তিনি কি ভাবে নূতন আদর্শের প্রতিষ্ঠা
করিয়াছেন তাহা বুঝিতে চেষ্টা করিব।
•
পঞ্চম অধ্যায়
Rongseau's idea of civil Religion and
Education
জগতের ইতিহাসে ধর্ম ও শিক্ষার স্থান সকলের
উপরে।
জাতীয় উন্নতির মূলে জাতীয় ধর্ম ও শিক্ষা
চিরদিন জগতের ইতিহাসে অভিনব
অভিনব ফল প্রকাশ
করিয়াছে। ইতিহাস পর্যালােচনা করিলে বেশ বুঝিতে
পারা যায় যে শাসনই বল, সংস্কারই বল, সকলেরই
ভিত্তি মানুষের ধর্ম বিশ্বাসের উপর। এই ধর্মকে আশ্রয়
করিয়া সমাজ, শাসন ও সভ্যতা গড়িয়া উঠিয়াছে।
আবার সমাজ ও সভ্যতা যেদিন ধীরে ধীরে নূতন
আলােকে উদ্ভাসিত হইয়া উঠে, তখন ধৰ্ম্মও যেন কি এক
নূতন ভাবুকতা, নূতন প্রেরণা লইয়া আবিভূত হয়।
এমনিভাবে ধৰ্ম্মের উপর সমাজ ও সভ্যতা গড়িয়া উঠে,
আবার সভ্যতার সংস্পর্শে ধৰ্ম্মেরও নূতন রূপ নূতন
ভাবের আবির্ভাব হয়। ধর্মের প্রথম অবস্থায় ধৰ্ম্ম যেন
কেমন জড়ের মত, কিন্তু সভ্যতার সংস্পর্শে ধৰ্ম্ম যেন
রূপান্তর গ্রহণ করে। আদিম অবস্থায় মানুষের ধর্ম
যেন মানুষকে বাঁধিয়া রাখে, কিন্তু সভ্যতার সঙ্গে সঙ্গে
৪১
ফরাসী বিপ্লবে রুশ
ধৰ্ম্মও যেন ধীরে ধীরে প্রসার লাভ করে। সক্রেটীস
প্রভৃতির জীবনী পাঠ করিলে বুঝিতে পারা যায় যে
আদিম ধৰ্ম্ম মানুষের উন্নতির পক্ষে যেন কেমন অন্তরায়।
রুশাের সময়ে খ্রীষ্ট ধর্ম বড়ই সঙ্কীর্ণ ছিল।
কুসংস্কার দুর্বলতা প্রভৃতির আবর্জনা লইয়া খ্ৰীষ্টধৰ্ম্ম
উন্নতির পক্ষে অন্তরায় হইয়া উঠিয়াছিল। সেদিন
ধৰ্ম্ম শাসনতন্ত্রকে আবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছিল।
"So far from binding the heart of the
citizen to the state it weans from this, as
from all other earthly ends."
ends.”—জনশক্তির
অন্তরকে রাষ্ট্রের চতুস্পর্শে কেন্দ্রীভূত করা দূরে থাকুক,
ধৰ্ম্ম তখন অন্যান্য পার্থিব আদর্শ ও সম্পদের ন্যায়
রাষ্ট্রশক্তি হইতেও তাহাদিগকে বিচ্ছিন্ন করিয়া লইয়া
যাইত।
সেদিন ধৰ্ম্ম জনসম্প্রদায়কে শাসনতন্ত্রের মধ্যে নূতন
ভাব জাগ্রত করিয়া দেওয়া দূরে থাকুক, সকল প্রকার
পার্থিব উন্নতি হইতে দূরে টানিয়া রাখিয়াছিল। খ্ৰীষ্ট
ধৰ্ম্ম সেদিন কতগুলি নীতি দিয়া বেড়ার মত ঘিরিয়া
মানুষকে তাহার উন্নতির পথ বন্ধ করিয়া দিয়াছিল।
ব্যক্তিগত জীবনে সে ধর্ম মন্দ ছিল না, কিন্তু রাষ্ট্রজীবনে
৪২
ফরাসী বিপ্লবে রুশাে সে ধৰ্ম্মের স্থান অতি সামান্যই ছিল। ধর্মের আদিম অবস্থায় মানুষের অন্ধবিশ্বাস এত প্রবল থাকে যে অনেক সময় তাহা সভ্যতা ও স্বাধীনতার অন্তরায় হইয়া দাড়ায়। অন্ধকার গৃহে বেশী দিন বাস করিলে, পরে চোখে আলাে যেমম সহ্য হয় না, তেমনি কুসংস্কারাচ্ছন্ন লােকের পক্ষে সভ্যতা ও স্বাধীনতার নূতন আলােক প্রথম প্রথম অসহ্য বােস হয়। সভ্যতা ও স্বাধীনতার ভাবরাশি লইয়া রুশাে যেদিন নূতন শাসনতন্ত্র গড়িয়া তুলিবার আয়ােজন করিলেন, তখন তদানীন্তন খীষ্টান ধৰ্ম্ম তাহার পথে অন্তরায় হইয়া দাড়াইল। তিনি দেখিলেন যে প্রচলিত ধর্মের সংস্কার করিতে না পারিলে, ধর্মবিষয়ে স্বাধীনতা না আনিতে পারিলে, রাষ্ট্রজীবনে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করা সম্ভব নয় ; তাই তিনি তদানীন্তন কুসংস্কারাচ্ছন্ন খ্রীষ্টধর্মকে সজীব করিয়া তুলিবার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হইলেন। তিনি নানাদিক দিয়া নানাভাবে ধর্ম সম্বন্ধে নিজের মত ব্যক্ত করিতে লাগিলেন। তিনি ধর্মকে ব্যক্তিগতজীবনে ও রাষ্ট্রজীবনে দুই দিক দিয়া ভাল করিয়া বিচার করিয়া ধর্ম সম্বন্ধে অনেক কথা লিখিয়া গিয়াছেন। ব্যক্তিগত জীবনে যে ধৰ্ম্ম চলিতে পারে, একটা জাতির পক্ষে রাষ্ট্র- ৪৩
ফরাসী বিপ্লবে রুশো
জীবনে সে ধৰ্ম্ম উন্নতির অন্তরায় হইতে পারে, তাই তিনি
স্পষ্ট ভাষায় বলিয়া গিয়াছেন –
.
“The dogmas of the civil religion should
be few and simple
The existence
of a God of power, reason, goodness and
loving providence; the life to come, the
happiness of the just and the punishinent ef
the wicked, the sanctity of the social contract
and of the Law-Such are the dogmas to be
affirmed. As for the dogmas to be repudiated,
I limit them to a single one-intolerance
But whoever dares to say,
"outside of the Church none can be saved,"
ought to be driven out of the state ; unless
indeed the state is the Church and the Pontiff,
the chief Magistrate."
রুশাের এই রাষ্ট্রীয় ধর্ম ( Civil religion) বুঝিতে
হইলে তৎকালীন প্রচলিত খ্রীষ্ট ধর্মের ইতিবৃত্ত পাঠ করা
দরকার। সে সময় ধর্মের নামে যে কত প্রকার
কুসংস্কার দেশকে ছাইয়া ফেলিয়াছিল, তাহা ভাবিলে
সহজেই বােঝা যায় যে রুশাের পক্ষে রাষ্ট্রীয় ধর্ম (Civil
৪১
ফরাসী বিপ্লবে রুশ
religion) সম্বন্ধে এ ভাবে লেখা খুবই স্বাভাবিক।
সত্য কথা বলিতে গেলে সে সময় খ্রীষ্টান ধর্মের নামে
কুসংস্কার আসিয়া জুটিয়াছিল, আর ভগবানের সিংহাসন
মহা প্রতাপশালী (1ope )এর দ্বারা অধিকৃত হইয়াছিল
Pope হইয়াছিলেন মুক্তিদাতা, তিনি কাহাকেও মুক্ত
বলিলেই সে নির্বাণ লাভ করিত, আর অন্ধবিশ্বাস ছিল
মানুষের শক্তি ও ভক্তির প্রধান অবলম্বন । ইহার
ফলে শিল্প, বিজ্ঞান, দর্শন প্রভৃতির স্থান ছিল
, সমাজ, সভ্যতা ও স্বাধীনতা ধীরে ধীরে লােপ
পাইতেছিল।
অন্য দিকে আধ্যাত্মিক উন্নতির নামে Clurcli
নানা প্রকার ক্ষমতা করায়ত্ত্ব করিয়া নিজেদের ভােগস্পৃহা
চরিতার্থ করিতে লাগিল। দিন দিন Churcl)এর মধ্যে
নানা প্রকার Corruption ( পাপ) প্রবেশ করিতে
লাগিল।
এমনি সময় রুশাে তাহার Civil religion ( রাষ্ট্রীয়
ধর্ম) সম্বন্ধে লিখিতে আরম্ভ করিলেন। এ সময় এইরূপ
এক ধর্মের বিশেষ প্রয়ােজন হইয়াছিল এবং জনসম্প্রদায়
ইহা চাহিতেছিল, তাই রুশাের এই ধৰ্ম্মসংস্কার এত
সহজে এত শীঘ্র দেশবাসী গ্ৰহণ করিল। অন্ধ বিশ্বাসকে
৪
ফরাসী বিপ্লবে রুশো
দূর করিয়া দিয়া ইতিহাস ও বিজ্ঞানদর্শিত যুক্তির দ্বারা
তিনি ধৰ্ম্মকে স্থাপিত করিয়া দেশকে স্বাধীনতা ও
সভ্যতার দিকে লইয়া
গিয়াছিলেন । Churcliga
ভােগবিলাসের পথ রুদ্ধ করিয়া প্রচলিত ধৰ্ম্ম যাহাতে
সত্য সত্যই মানুষকে উন্নত করে, তিনি তাহারই চেষ্টা
করিয়া গিয়াছেন।
It was the part of his mission to stem the
tide of materialism then running strong in the
westero parts of Europe. It was at the
root also of his daring attempt to strip
Christianity of all that was doubtful or irra
tional and so reconcile religion with the proved
facts of science and history."
এ কাজ করিতে যাইয়া রুশােকে অনেক নিন্দা ও
গ্লানি সহ্য করিতে হইয়াছে। যাহাদের স্বার্থে তিনি
আঘাত দিয়াছিলেন, তাহারা তাঁহাকে চতুর্দিক দিয়া
আক্রমণ করিয়া ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিয়াছিল, কিন্তু
পুরুষসিংহ রুশাে সমস্ত বাধা বিঘ্ন উপেক্ষা করিয়া নিজের
কৰ্তব্য করিয়া গিয়াছেন। তাঁহার প্রচারিত বাণীকে
আশ্রয় করিয়া ধীরে ধীরে আজ খ্রীষ্টানধর্ম
সমাজ,
সভ্যতা ও শাসনতন্ত্রের উপযােগী হইয়া উঠিয়াছে।
ফরাসী বিপ্লবে রুশো
অষ্টাদশ শতাব্দীর খ্ৰীষ্টান ধর্ম পুস্তকেই লিপিবদ্ধ আছে,
আজ যে খ্রীষ্টান ধৰ্ম্ম জগতে সাম্য ও ঐক্যের নিশান
তুলিয়াছে, সে ধর্মের বাণী প্রচার করিয়াছিলেন ফরাসী
বীর রুশাে।
আজ তাহারই বাণী প্রতি
গৃহে প্রচারিত
হইতেছে কিন্তু এমন একদিন গিয়াছে যখন রুশাের
দেশবাসী তাহাকে নাস্তিক ভণ্ড মিথ্যাবাদী বলিয়া
প্রচার করিয়া তাহাকে কত না। লাঞ্ছনা দিয়াছে।
লাঞ্ছনা ও উৎপীড়ন স: করিয়াও রুশশা জগতে তাঁহার
রাষ্ট্ৰীয় ধৰ্ম্ম (civil religion) প্রচার করিয়াছেন। আজ
সমস্ত ইউরােপ তাহার ভাবরাশি বরণ করিয়া লইয়াছে
এবং দূর ভবিষ্যতে একদিন হয়ত সমস্ত জগৎ তাঁহার
রাষ্ট্রীয় ধৰ্ম্মকে (civil religion) নিজেদের রাষ্ট্রজীবনে
প্রতিফলিত করিবে।
ফরাসী বীর রুশশা যে শুধু ধৰ্ম্ম সম্বন্ধে নিজের
স্বাধীন মত ব্যক্ত রুরিয়াছিলেন তাহা নহে, সমাজের
প্রতি অবয়ব ধীরভাবে পরীক্ষা করিয়া তিনি যাহা ভাল
মনে করিয়াছেন তাহা সমাজকে বলিয়া গিয়াছেন।
রুশাের মধ্যে একটা বিশেষত্ব ছিল এই যে তিনি সমস্ত
জিনিষ স্বাধীনভাবে বিচার করিয়া স্বাধীন মত ব্যক্ত
করিতেন, একটা প্রচলিত পদ্ধতির দাসত্ব করা তাঁহার
৪৭
ফরাসী বিপ্লবে রুশো
স্বভাব ছিল না। ধৰ্ম্ম সংস্কার করিতে যাইয়া। তিনি
যেমন নির্ভীকভাবে তাহার রাষ্ট্রীয় ধৰ্ম্ম (civil religion)
লিখিয়া গিয়াছেন, প্রকৃত শিক্ষাবিস্তারের জন্য তেমনি
ভাবে তিনি তাহার Emili লিখিয়া গিয়াছেন।
মানুষকে তিনি পূর্ণ মানুষভাবে দেখিতে চাহিয়াছিলেন
তাই তিনি তাহার পূর্ণ-বিকাশের জন্য নূতন শিক্ষার ব্যবস্থা
করিয়া গিয়াছেন। মানুষ ত শুধু দেহ, মস্তক বা হৃদয়
নয়, মানুষ এই সমস্তের সমষ্টি। মানুষের সব চেয়ে শ্রেষ্ঠ
সম্পন্ তাহার হৃদয় ও মস্তিষ্ক এবং এই দুইটীর পূর্ণ
বিকাশই মনুষ্যত্ব। নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য
তিনি যেমন নৃতন ধৰ্ম্মের প্রচার করিয়া গিয়াছেন, মস্তিষ্কের
উন্নতির জন্য তেমনি নূতন এক শিক্ষাপদ্ধতি প্রচার করিয়া
গিয়াছেন। হৃদয়টীকে সরস করিবার জন্য ধর্মকে সজাগ
করিয়া দিয়া, মস্তিষ্ককে উর্বর করিবার জন্য কল্পনার এক
নূতন সাম্রাজ্য সৃষ্টি করিয়া রুশাে মানব জাতির এক
মহান্ কল্যাণ সাধশ করিয়া গিয়াছেন। রুসসা তঁাহার
বড় সাধের Emiliকে কল্পনা ও সৌন্দর্যের এক নূতন
জগতের মধ্য দিয়া এমনিভাবে গড়িয়া তুলিয়াছেন যে
তাহার মধুরতা সকলকেই মুগ্ধ করিয়া দেয়। হৃদয়টীকে
সুন্দর ও পবিত্র করিতে হইলে কল্পনার রাজ্যের মধ্য
৪৮
ফরাসী বিপ্লবে রুশ দিয়াই তাকে লইয়া যাইতে হয়। জাৰ্মাণ দার্শনিক গেটেও অন্যভাবে ঠিক এই কথাই বলিয়া গিয়াছেন। কল্পনার রঙ্গীন ছবি জীবনটাকে যেন সুন্দর ও মধুর করিয়া তুলে, বাস্তব জগতে তীক্ষ্ণ শর যেন কৈশোেরকে কঠিন ও নির্মম না করিয়া দেয়। মানুষের জীবনটীকে সুন্দর করিয়া ফুটাইয়া তুলিতে হইলে তাহার কোন্ অবস্থায় তাকে কি ভাবে চালনা করা উচিত, তাহা রুশাে সুন্দর ভাবে বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন। তাহার Emili (এমিলি) তে তিনি লিখিয়াছেন - "The most dangerous period in human life lies be: ween hirth and the age of twelve. It is the time when errors and vices spring up, while as yet there is no means to destroy them When the means of destruction are ready, the roots have gone too deep to be pulled up. If the infant sprang at one bound from his mother's breast to the age of reason, the present type of education would be quite suitable, but its natural growth calls for quite a different training. Never tell the child what he can't under. tand: no descriptioas, no eloquence', no figures
ফরাসী বিপ্লবে রুশাে
of speech, no poctry. The time has not come
for feeling or taste. Continue to be clear and
coli, the time will come only too soon when
ylill must adopt another tone,
অনেকে মনে করেন যত শীঘ্র পারি, ছেলেটাকে
বুদ্ধিমান করিয়া তুলিব। কেহ কেহ এই উদ্দেশ্যে
এমনি ভাবে উন্মত্ত হইয়া উঠেন যেন মনে হয় যে তাহারা
পিটাইয়া পাটাইয়া ছেলেটাকে কৰ্ম্মকারের লােহার
লম্বা করিয়া তুলিবেন। কিন্তু মানুষ ত একখণ্ড লৌহ
নয় যে তাহাকে একটু উত্তপ্ত করিয়া হাড়ির আঘাতে
বড় করিয়া তুলিব। মানুষের একটা স্বাভাবিক গতি
আছে। সে গতিকে রােধ করিয়া অন্য কিছু করিতে
হইলে কোনদিনও তাহার মঙ্গল সাধন হইতে পারে
, হিতে বিপরীত হইয়া দাড়ায়। অন্য দিকে আর
এক প্রকারের লােক আছেন, যাঁহারা ছেলেটিকে আইন
কানুনের মধ্যে বাঁধিয়া রাখিয়া তাহাকে শান্ত, শিষ্ট, নম্র
ও ভদ্র করিয়া তুলিবার চেষ্টা করেন। তাহারা ভুলিয়া
যান যে মানুষ একটা গণিত শাস্ত্রের Formula
নয় যে অর স্থিতি ও গতির কোন পরিবর্তন
para fata Fichoty হইবে না। ইহারা ভুলিয়া যান যে মানুষের মন নানাদিক দিয়া নানা অবস্থার মধ্য দিয়া নানাভাবে প্রসার লাভ করে। ছেলেদের সম্বন্ধে বলিতে যাইয়া রুশশা আবার বলিয়াছেন- "Although modesty is iatural to man, it is not natural to children Modesty only begins with the knowledge of evil; how should children without knowledge of evil have the feeling which results from it ? To give them lessons in modesty and good conduct is to teach them that there are things shameful and wicked and to give them a secret wish to know what these things are. Sooner or later they will find out, and the first spark which touches the imagination will certainly hasten the awakening of the Senses. Blushes are the signs of guilt, true innocence is ashamed of nothing · Philosophy in the form of maxims is only fit for thosethe experienced Youth should never deal with ফরাসী বিপ্লবে রুশাে with the general, all its teaching should deal individual instances . if all the philosophers in the world should prove that I am wrong, and you feel that I am right, that is all what I ask. রুশাের শেষের এই কয়টী কথার মধ্য দিয়া বােঝ যায় যে আত্মবিশ্বাসের প্রতি তাহার কত প্রগাঢ় অনুরাগ ছিল। নিজের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস না থাকিলে কেহ কোন- দিন জগতে উন্নত হইতে পারে না। রুশাের জীবন! আত্ম বিশ্বাস যেমন ভাবে প্রতিফলিত হইয়াছিল, অমনটী খুব কমই দৃষ্টি গােচর হয়। শিক্ষা সম্বন্ধে তঁাহার যাহা বিশ্বাস, তাহা লিপিবদ্ধ করিতে যাইয়া তিনি দেশ হইতে নির্বাসিত হইয়াছিলেন। যে (Emili) এমিলি লিখিয়া তিনি জগতে অমর হইয়া গিয়াছেন, তাহারই জন্য তৎ- কালীন গবর্ণমেন্ট তঁহাকে দেশ হইতে নির্বাসিত করেন। মানুষ অর্থ, বিদ্যা, বুদ্ধি ও পরিশ্রম করিয়া জগতে শিক্ষা প্রচার করিয়াছে সত্য কিন্তু রুশাের মত এমন জীবন সৰ্বস্ব পণ করিয়া খুব কম লোেকই দেশে শিক্ষা বিস্তার করিয়াছেন। নিৰ্বাসিত রুশাে পথে পথে অনাহারে অনিদ্রায় কত কষ্টই না পাইয়াছেন, তবুও তিনি তাহার
ফরাসী বিপ্লবে রুশাে
মত অটল রাখিয়াছিলেন। রুশাে চলিয়া গিয়াছেন,
কিন্তু আজও তাহার Emili ঘরে ঘরে বিরাজ করিয়া
শত সহস্র Emili সৃষ্টি করিতেছে। হয়ত এমন একদিন
শীঘ্রই আসিবে যখন রুশাের Ermili (এমিলির
উদ্দেশ্য সাধিত হইবে।
৩
ষষ্ঠ অধ্যায়’
Roussea'us idea of state, Property and
Individuality.
জগতের ইতিহাসের কথা ধ্বংস ও গঠন। কত রাজ্য ও
রাজার ধ্বংস হইয়াছে এবং গড়িয়া উঠিয়াছে এই 'লইয়াই
ইতিহাস। ইউরােপের ইতিহাসে Stat ( রাষ্ট্র) লইয়া
কত যুগ ধরিয়া মাথা কাটাকাটি চলিতেছে, কিন্তু আজ
পর্যন্ত তাহার মীমাংসা হইল না। Stati
রাষ্ট্র এর
উৎপত্তি কোথা হইতে, তাহা কিভাবে
তাহা কিভাবে পরিচালিত
হওয়া উচিত তাহার অধিকার কতটুকু এই বিচার
করিতে গিয়া কত মতবাদ যে বাহির হইয়াছে, তাহা
বলিবার নয়। ২t:ut ( সম্বন্ধে কিছু বলিতে যাওয়া
আমার পক্ষে দু সাহসের কথা, এর এক একটি বিষয়
বিস্তৃতভাবে বলিতে হইলে এক একখানি পুস্তক হইয়া
পড়ে। সমাজ যে কেমন করিয়া সমাজের রূপ ধরিল,
কেমন করিয়া শাসন পদ্ধতির সৃষ্টি হইল, কেমন করিয়া
State রাষ্ট্র এর আবির্ভাব হইল সে এক বিরাট
৫৪
ফরাসী বিপ্লবে রুশো ~- ইতিহাস। Patriarchal Government, Matriarcbial Government, Monarchy, Bureueracy, Dennoemen ঘটনা স্রোতে যে কেমনভাবে ধীরে ধীরে তনরূপে আবির্ভাব হইল, তাহা ভাবিয়া বিস্ময় নিতে হয়। এই সমস্ত বিভিন্ন ধরণের भगमन -তন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হইল বিভিন্ন হইল বিভিন্ন ধরণের রাষ্ট্র বিদুতানের ফলে । ভাবে প্ৰতি লাভ করিয়াছে তাহা বলিবার নয়। Mill লসাহেবের ।।ilit.)'itli s! ( উপযোগিতাবাদ। হইতে আরম্ভ করিয়া futi tualis!! ব্যকিব- - cialism { সনাজ , Anar lixo { ভাজতন্ত্র, প্রভৃতি কত মতেরই যে প্রতিষ্ঠা হইয়াছে এ: হইবে তাহা কে জানে! ভিন্ন ভিন্ন •ত ভিন্ন ভিন্ন শাসনতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করিয়াছেন, কেহ বা শাসন তন্ত্রকে একেবারে উঠাইয়া দিবার চেষ্টা করিয়াছেন। কত প্রকার :: :: ( রাষ্ট্র এর কল্পনা যে ইতিহাসে গেলা করিয়াছে করিয়াছে তাহার যথাযথ পর্যালােচনা এক 5:সাধ্য ব্যাপার। প্রত্যেক দেশে উন্নতি ও অবনতির সঙ্গে তদুপযােগী state ( রাষ্ট্র) গতি গড়িয়া উঠিয়াছে Evolution
ফরাসী বিপ্লবে রুশাে
( আবৰ্ত্তন) ও Devolution ( বিবৰ্ত্তন) যে
মানুষের পক্ষেই প্রযােজ্য তাহা নহে শাসন ও শাসনতন্ত্রের
মধ্যেও একটা Evolutio ( আবর্তন) ও Devolution
( বিবর্তন) আছে ।
আমাদের ভারতবর্ষের অবস্থা আজ কি শােচনীয়।
যেখানে অশােক ও চন্দ্রগুপ্তের শাসন পদ্ধতি বিরাজমান
ছিল, যেখানকার অতি পুরাতন ইতিহাসে Democracy
(গণতন্ত্র )র অস্তিত্ব দেখা যায়, সেই ভারতবর্যে আজ
Bureaucracy (আমলাতন্ত্রের) যথেচ্ছ শাসন বিদ্যমান।
দেশের উন্নতি ও অবনতির সঙ্গে শাসনতন্ত্র পরিবর্তিত
হয়। ফরাসী জাতিও একদিন অবনতির পথে নামিয়া-
ছিল, - আভিজাত্যের অত্যাচারে সমস্ত দেশ চঞ্চল ও
বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠিয়াছিল। সম্রাট লুই যে কতদূর
উচ্চ ঙ্খল হইয়া উঠিয়াছিলেন তাহা তাহার কথা হইতে
বেশ অনুভব করা যাইতে পারে। ফরাসীদেশে লুই এর
উদ্ধত বানী “I am the state” –‘আমিই রাষ্ট্র ইহা
এখনও একটা প্রচলিত বানী হইয়া রহিয়াছে। বােধ হয়
এই কথা শুনিয়াই ফরাসীগণ state কে কেমন করিয়া
গড়া উচিত তাহা ভাবিতে শিখিয়াছিল।
ফরাসীবীর রুশাে এই state ( রাষ্ট্র) সম্বন্ধে
ফরাসী বিপ্লবে রুখে
মীমাংসা করিতে অগ্রসর হন। জগতে তিনি অনেক
কিছু শিক্ষা দিতে আসিয়াছিলেন, অনেক কিছু সৃষ্টি
করিতে আসিয়াছিলেন তাই stat ( রাষ্ট্র) কে ভাল
করিয়া বুঝিয়া তাহাকে তিনি এক নূতন রূপে সাজাইয়া
আমাদের সম্মুখে রাখিয়া গিয়াছেন।
তঁাহার পূৰ্ব্বে
অনেকে অনেক ভাবে state (রাষ্ট্র। এর সমালােচনা
করিয়া গিয়াছেন সত্য, কিন্তু তাহার মত এমন সুন্দর
ছবি কে আঁকিয়া গিয়াছেন কি না সন্দেহ।
-State ( রাষ্ট্র) সম্বন্ধে বিচার করিতে যাইয়া
socialisin ( সমাজতন্ত্র ।
এবং Individualism
( ব্যক্তিত্ববাদ) এই দুইটা Extre() (শেষ) সীমায়
আসিয়া অনেকে হাবুডুবু খাইয়াছেন। কিছুদূর বেশ
অগ্রসর হইয়া শেষে অকূল পাথারে পড়িয়া কি করিবেন
দিশা পান নাই। Socialism ( সমাজতন্ত্রবাদ) এর
আদ গুরু Karl Marx ( কাল মাক্স) তাহার পথ
এক প্রকার দেখাইয়া গিয়াছেন এবং তাহার পর হার
শিষ্য লেনিন রুশিয়ার ব্যাপারে চোখে আঙ্গুল
দিয়া দেখাইয়া গিয়াছেন কিন্তু Individualism এবং
utilitarianism এর সব চেয়ে বড় পাণ্ডা মিল সাহেব
কিছুদূর অগ্রসর হইয়া নিজেই ফঁপরে পড়িয়া গিয়াছেন।
ফরাসী বিপ্লবে কুশশা সত্য বলিতে গেলে, মিলের অবস্থা দেখিলে দুঃখও হয়, হাসিও পায়। তার utilitarianistn এর সংক্ষিপ্ত defination ( সংজ্ঞা) না দিয়া পারিলাম না। তিনি লিখিয়াছেন “The creed which accepts as the foundation of moral utility or the greatest happiness principle holds that actions are right in proportion as they tend to promote happiness, wrong is they tend to proluce the reverse of happiness. By happiness is intended pleasure and the absence of pixi: : by unhappiness pain and the privation of pleasure." এইভাবে সংজ্ঞা দিয়া কিছুদূর অগ্রসর হইয়াই মিল সাহেব আবার নিজমুখেই বলিতেছেন - "Better to be a Socrates dissatisfied than a fool satisfied.* অর্থাৎ মুখ হইয়া সুখভােগ করা অপেক্ষা পণ্ডিত হইয়া দুঃখ ভােগ করা অপেক্ষাকৃত ভাল। এমনই ভাবে তিনি তার utilitarianisan খাড়া করাইয়া state ( রাষ্ট্র) এর বিরুদ্ধে অনেক কথা বলিয়াছেন। state সম্বন্ধে তিনি সর্বশেষে এমনি ভাবে লিখিয়াছেন :- ৫৮ ফরাসী বিপ্লবে রুখে “The worth of a state in the long run, is the worth of the individuals composing it; and the state which postpones the interest of their mental expansion and elevation to a little more of administrative skill. or of that semblance of it which practice gives in the details of business ; a state which dwarfs its men in oriler that thy may be inore docile instruments, in its lands even for beneficial purposes-will i that with sinall men 11 great thing can really be accomplished ; and that the perfection of machinery to which it has sacriticed everything will in the end avail it nothing for want of viral power which in order that the machine might work inore sinonthly, it has prefered to banisha." ill তাহার প্রচারিত utilitarianisil এবং indivi- (dualis সম্বন্ধে অনেক বিষয় ভাবিবার ও শিখিবার আছে সত্য, কিন্তু কেহ যেন তাহা পড়িয়া হঠাৎ ভুল না করেন। state সম্বন্ধে কিছু বলিতে গেলে মিল সাহেবকে বাদ দেওয়া যায় না, কথা প্রসঙ্গে মিলের নাম
রাসী বিপ্লবে রুশাে
আসিয়া পড়ে। ( state) সম্বন্ধে ভাল করিয়া বুঝিতে
হইলে রুশােকে যেমন ভাল করিয়া বােঝা দরকার,
মিলকেও তেমনি করিয়া দেখা উচিত। তাঁহারা দুইজনে
দুইদিক দিয়া লিখিয়া গিয়াছেন সত্য, কিন্তু দুটা দিকই
ভাল করিয়া বিচার করা কর্তব্য।
মানুষকে মানুষের উপযুক্ত ধৰ্ম্ম ও শিক্ষা দিয়া রুশশা
তাহাকে তঁহার state এর আদর্শ দিয়া যাইতে ভূলিয়া
ata at I "A free citizen in a free state is
the ideal of Rousseau” অর্থাৎ স্বাধীন state
মানুষ স্বাধীনভাবে বাস করিবে ইহাই রুশাের আদর্শ।
“His dream was to unite the external strength
of a great nation with the tree discipline, the
healthy order of a small one Rousseou was
the apostle of a small state. For good or
for evil-perhaps for good and for evil--the
strongest force in Europe during the first three
quarters of the nineteenth century was the
spirit of nationality. To some minds, this will
seem the strongest condemnation of Rousseau's
ideal”
"He was keeply aware that the tide of events,
ফরাসী বিপ্লবে শো still more the tide et opinion, rao strong ag iinst the small state He had little or no hope of constructing large state to his view. All he strove for was to strengthen the smaller communities in the mintenance of their own ideal against the force or treachery of their more powerful neighbours, He had seen that the one chance of doing so lay in some form of federation." কিন্তু state (রাষ্ট্র) কে বড় করিতে যাইয়া তিনি individual (ব্যক্তি) কে উপেক্ষা করেন নাই। তাহার আদর্শ হইল—“A free citizen in a free state অর্থাৎ স্বাধীন state ( রাষ্ট্র) এ স্বাধীন মানুষ। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখিবার জন্য মিল সাহেব state (রাষ্ট্র) কে উপেক্ষা করিয়া individual (ব্যক্তি) কে কড় করিতে যাইয়া দুকূল হারাইয়াছেন। কিন্তু রুশাে state ( রাষ্ট্র) কে অক্ষুন্ন রাখিয়া individual (ব্যক্তি) কেও স্বাধীনতা দিয়াছেন এবং এইস্থানেই রুশাের বিশেষত্ব। “The individual,” he argues, "has existence in the imagination of the individualist. In himselt he is nothing but no sa ve ফরাসী বিপ্লবে রুখে a 'stupid and a limited animal it is in and through the state that he becomes a reasoning being and a man." state এবং individual এর কথা বলিতে বলিতে মানুষের সম্মুখে নিজের আদর্শ রাখিয়া তিনি মানুষকে লক্ষ্য করিয়া বলিয়াছেন :— ।। "The citizen must arm himselt with courage and constancy. Everyday of his life he must say in his inmost heart what the Polish Palatine exclaimed at the Diet : Mars pericals ran literatum quam quictum servititum- Kather the perils of freedom than slavery and peace Individual (ব্যক্তির) এর সহিত state এর সম্পর্ক ও কর্তব্য বলিয়া তিনি state এর সহিত property ( সম্পত্তি) র সম্বন্ধ আলােচনা করিয়াছেন। state, individual e property og fuadt 99209157 একসূত্রে গ্রথিত হইয়াছে। কোনটীকে বাদ দিয়া কোনটীর অস্তিত্ব নাই। “Property was to him the corner stone of society ; it was presupposed in the very
ফরাসী বিপ্লবে কশাে
*
*
SO
existence of the 'state'. It was, in fact, the
hope of turning an usurpation into a right,
of converting a precarious into a fixed tenure
that brought the individual from liberty
into Servitude, from the natural to the civil
state. But the right thus created is the
greatest of all wrongs.
‘right of
the first occupant' is a 'feeble right'. He
brushes aside all individualist foundations ot
property, in particular the argument from
Formation, clearly elaborated by the
Roman Jurists. He recognist's from the first
- and recognises more unequivocally than
Kant was to do a generation later that
property was only possible in and through
the State. To bim, as we have seen, Property
is the creation of the State and it rests with
the State to make any regulations for its
tenure, that the 'general will' may approve,
subject of course, to the limitation, that all
such provisions must be general in their
scope that none of them shall be directed
ফরাসী বিবে রুশো either to the advantage or the prejudice of particular classes or particular individuals. state ও সম্পত্তি যে কত ঘনিষ্টভাবে মিশ্রিত এবং সম্পত্তির উপর state এর অধিকার সম্বন্ধে তিনি নানাস্থানে নানাভাবে নিজের প্রকাশ করিয়াছেন। তিনি তাহার Emili তে অল্প কয়েকটা কথা দিয়া state, individual ও property এই তিন বিষয়ে তাহার মত খুব পরিষ্কার করিয়া বলিয়া গিয়াছেন। তাঁহার 'Emili তে তিনি লিখিয়াছেন - "State itselt is founded on the right of Property." "This right," he adds, is inviolable and sacred tor the 'state' so long as it remains private and individual. But directly it is considered as a right common to all the eitizens, it is sub-ordinated to the general will, and the general will can angul it Far from desiring the state to be poor, I should wish, on the contrary, to see all property in its hands and no individual admitted to any share of the common stock save in proportion to his services +
কৰাণী বিপ্লবে শাে
My desire is not absolutely to destroy private
property-for that is impossible - but to keep
it within the narrowest bounds : to give it
a standard, a rule, a curb to restrain it,
direct it, sublue it and kcep it always
subordinate to the public good. In a word
I desire that the property of the state should
be as large, as strong and that of the
individual, as small, as weak as possible,"
রুশো individual (ব্যক্তি) কে state (রাষ্ট্র)
অপেক্ষা ছোট করিয়া তাহার স্বাধীনতা হরণ করেন নাই,
পরন্তু তিনি তাহার সত্যকার স্বাধীনতার পথ পরিস্কার
করিয়া দিয়াছেন। যেখানে সাম্য নাই, সেখানে
স্বাধীনতা বেশী দিন থাকিতে পারে না। সাম্য ও
স্বাধীনতার জন্যই তিনি individual কে ছোট করিয়া
state কে বড় করিয়াছেন।
মিল স্বাধীনতার ( Liberty ) কথা বলিতে যাইয়া
( Equality ) সাম্যের কথা একেবারেই ভুলিয়া
গিয়াছিলেন, কিন্তু দূরদর্শী রুশাে বুঝিয়াছিলেন যে, যে
সমাজে সাম্যভাব নাই সেখানে সকলের স্বাধীনতা থাকা
সম্ভব নয়, তাই তিনি সাম্য ও স্বাধীনতা যাহাতে এক
ফরাসী বিপ্লবে শো
বিরাজ করিতে পারে তাহারই জন্য individual কে
state তাপেক্ষা অনেক ছােট করিয়া গিয়াছেন।
মিল সাহেব স্বাধীনতার জন্য অনেক ভাবিয়াছিলেন
কিন্তু তাহার সে স্বাধীনতা কিছুদূরে গিয়া উচ্চঙ্খলতা
আনিয়া দিত। রুশাে স্বাধীনতার কথা অন্য দিক দিয়া
ভাবিয়াছিলেন। তিনি বুঝিয়াছিলেন যে সামভাব
সংস্থাপিত না হইলে স্বাধীনতা প্রথম প্রথম আনন্দের
বিষয় হইলেও পরিশেষে উচ্ছলতায় পরিণত হইবে,
সবল দুৰ্বলকে পীড়ন করিবে, সমাজে আবার দরিদ্রের
স্বাধীনতা লােপ পাইবে। তাই তিনি সাম্যভাৰ
সংস্থাপনের জন্য বদ্ধপরিকর হইয়াছিলেন। অনেকে
রুশাের এই সাম্যভাবকে নানা প্রকারে ব্যাখ্যা করিয়া
তাহার প্রকৃত অর্থ বিকৃত করিয়া ফেলিয়াছেন। সাম্যভাব
বলিতে রুশাে যাহা বুঝাইয়াছিলেন, তাঁহারা তাহা না
বুঝিয়া বা বুঝিয়াও না বুঝিয়া নানাপ্রকার বিকৃত
ব্যাখ্যা করিয়া গিয়াছেন। রুশো নিজে এই সাম্যভাবের
কথা আলােচনা করিয়া বলিয়া গিয়াছেন :-
E'We must not understand by this term
that the amounts of power and wealth are
to be absolutely the same but that the
ফরাসী বিপ্লবে শাে
none
regard to wealth no citizen shall be rich
enough to buy another and
poor
enough to be forced to sell himself. ...... It is
just because the force of circuinstances is
always tending to destroy equality, that the
force of legislation ought always to tend
towards maintaining it."
রুশশা যে শুধু সাম্যভাবের একটা কল্পনা দিয়া গিয়াছেন
তাহা নহে, তিনি তাহা কি ভাবে সমাজে প্রয়ােগ
করা যাইতে পারে সে কথাও স্পষ্ট ভাষায় বলিয়া
গিয়াছেন। যে সাম্যভাব স্থাপনের জন্য নানাদিক দিয়া
নানাবিধ উৎকট বিধিব্যবস্থা আসিয়াছে, রুশাে তাহা
অতি সহজ ও সুন্দরভাবে সামান্য কয়েকটা কথা বলয়া
পরিষ্কার করিয়া গিয়াছেন। সাম্যভাব স্থাপনের উপায়ের
কথা বলিতে গিয়া তিনি বলিয়াছেন :
It is to be done not directly but indirectly:
not by robbing the owner of his possessions,
but by depriving him of the means of amassing
them; not by building alms-houses for the
poor but by saving the citizen from becom.
ing so.
ফরাসী বিপ্লবে শাে
কাের এই প্রকারের মত শুনিলে তাহাকে
socialist বলিয়া মনে হয়।
তিনি socialist না
হইলেও socialism এর বীজ তাহার মধ্যে ছিল।
সাম্যভাব স্থাপনের জন্য তাঁহার মত শুনিয়া socialist
দের Progressive income tax স্থাপনের মতের কথা
মনে হয়। socialism এর বীজ অন্তর্নিহিত রাখিয়া
stateকে খুব বড় করিয়া রাখিয়াও রুশশা ব্যক্তিগত
স্বাধীনতার কথা কখনও ভুলেন নাই। স্বাধীনতা সম্বন্ধে
যে তিনি কত গভীরভাবে ভাবিয়াছিলেন, ব্যক্তিগত
স্বাধীনতার জন্য তিনি যে কত ব্যাকুল হইয়াছিলেন
তাহা এই কয়েকটী কথা হইতে বেশ বুঝিতে
পারা যায় ;
'I am aware,' h: writes, that the project
of enfranchisement is beset with difficulties.
What I fear is not only the mistaken self
interest, the vanity and the prejudice of the
Even wore these obstacles overcome,
I should still fear the vices and meanness of the
serfs. Liberty is a strong food, but it needs
a stroog digestion; it demands a healthy
stomach to-bear it. I laugh at those degraded
masters.
ফরাসী বিপ্লবে শো peoples who rise in revolt at a word from an intriguer, who dare to speak of liberty in total ignorance of what it means and their hearts full of every slavish vice, imagine that to be free, it is enough to be a rebel. Highsouled and holy Jiberty, if these poor men could only know thee, if they could puly learn What is the price which thou art and guarded, if they could only be taught how far sterner are thy laws than the baril yoke of the tyrant--they would shrink from thee hundred times more than from slavery ; they would fly from thee in terror as froin a thunder at Won a ৪ to crush them." (Serf) দাসদের কথা বলিতে বলিতে স্বাধীনতার সাধন যে কত কঠিন এবং Serf রা যে তাহার কত অযােগ্য তাহা তিনি আন্তরিকতার সহিত প্রকাশ করিয়াছেন। Serf দের কথা ভাবিতে তাহার কষ্ট হইত, তাহাদের হীনতা ও দুর্বলতা তাহাকে কষ্ট দিত, কিন্তু স্বাধীনতার পূজারী রুশাে তাহাদের স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখিয়া গিয়াছেন।
ফরাসী বিপ্লবে রুশে
Serf দের শত দোষ শত দুৰ্বলতা সত্ত্বেও তিনি তাহাদের
স্বাধীনতার জন্য প্রানপণে চেষ্টা করিয়াছেন। তাহারা
অযােগ্য হইতে পারে, অধঃপতিত হইতে পারে, কিন্তু
তবুও রুশাে তাহাদের স্বাধীনতা দিবার জন্য বলিয়া
গিয়াছেন।
Rousseau boldly asserts that justice will
not have been done, unt:i tarv are made not
only civily but politically free.
এমনি ভাবে তিনি ধনী, দরিদ্র, পণ্ডিত মূখ সকলেরই
ব্যক্তিগত স্বাধীনতার জন্য চেষ্টা করিয়া গিয়াছেন। state
কে বড় করিতে যাইয়া তিনি ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে খর্ব
করেন নাই।
রুশাে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার জন্য অনেক চেষ্টা করি-
য়াছেন সত্য, কিন্তু তিনি কখনও উচ্ছ,ঙ্খলতার প্রশ্রয় দেন
এক ইস্তে স্বাধীনতা দিয়া অন্ত হস্তে তিনি
উচ্ছলতা নিবারণ করিবার জন্য শাস্তি বিধান করিয়া
গিয়াছেন।
Individual এর উচ্ছলতা নিবারণের
জন্য Stateএর শাস্তি দিবার ক্ষমতা আছে, এ কথা
তিনি পরিষ্কার করিয়া বলিয়া গিয়াছেন। শাস্তি সম্বন্ধে
আলােচনা করিয়া তিনি লিখিয়াছেন :-
নাই।
ফরাসী বিপ্লবে রুশ
"Every criminal is a rebel and a public
enemy. It is as such, rather as citizen, that
he suffers."
এমনি ভাবে তিনি সাম্য, স্বাধীনতা ও শাসনের
ব্যবস্থা করিয়া ন্যায় ও ধর্মের উপর এক নূতন সমাজের
ভিত্তি স্থাপন করিয়া গিয়াছেন। দিন দিন তাহার
প্রচারিত আদর্শের দিকে সমাজ গড়িয়া উঠিতেছে। রুশাে
যে যুগে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, সে সময়ে একমাত্র রুশাের
পক্ষেই এমন এক আদর্শ সমাজ ও স্বাধীনতার কল্পনা করা
সম্ভব ছিল।
কল্পনার বরপুত্র রুশাে কল্পনাবলে সুদূর
ভবিষ্যংকে বুঝিয়া তাহার মত করিয়া মানুষকে মানুষ
হইতে বলিয়া গিয়াছেন। ধন্য সেই বীর, ধন্য সেই দেশ,
যে দেশে এমন বীরপুৰ জন্মগ্রহণ করে।
সপ্তম অধ্যায়।
Rousseau the father of Romanticisin
commands a unique place in literature,
কবির কথায় বলিতে গেলে বলিতে হয় যে, ফলটীর
একটা দিক লাল দেখিলে যেমন বুঝিতে পারা যায় যে ফলটা
পাকিয়া আসিয়াছে, তেমনি কোন জাতির সাহিত্যক্ষেত্রে
কল্পনা ও সৌন্দর্য্যের নূতন আলােক দেখিলেই বুঝিতে
পারা যায় যে জাতীয় জীবনের উত্থানের দিন আগত
প্রায়। ফ্রান্সের গর্ভীর দুর্দিনের মধ্যেও এই কথাটীর
সত্যতা প্রমাণিত হইয়াছে। আর্থিক, নৈতিক ও আধ্যা-
ত্মিক অবনতির মধ্যেও ফ্রান্সের বীরপুত্রগণ সাহিত্যের
মধ্য দিয়া নূতন ভাবুকতা দিয়া ফরাসী জাতিকে নূতন
ভাবে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিলেন।
প্রতিদিন কৰ্ম্ম ও কোলাহলের মধ্যে বাস করিয়া
মানুষের জীবন যেন কেমন একটা একটানা একঘেয়ে
রকমের হইয়া দাড়ায়। বাস্তব জগতের কঠোর ও নির্মম
পেষণে মানুষের হৃদয় যেন কেমন শুষ্ক ও নিরস হইয়া
এমন একটানা জীবন লইয়া শুষ্ক হৃদয়ে কোনও
উঠে।
ফরাসী বিপ্লবে শাে
একটা জাতি কখনও বাচিতে পারে না। কোন জাতিকে
বাঁচাইয়া রাখিতে হইলে তাহার হৃদয়টী ফুলের মত
প্রস্ফুটিত রাখিয়া নূতন নূতন কল্পনা ও ভাবুকতা দিয়া
তাহাকে সজীব রাখিতে হয়। একমাত্র জাতীয় সাহিত্যই
জাতিকে এমনভাবে কর্মপ্রেরণা ও ভাবুকতা দিয়া সজীব
রাখিতে পারে। সাহিত্যের এমনই আশ্চর্য্য শক্তি যে,
যে জাতির সাহিত্য উজ্জ্বল, সে জাতির ভবিষ্যৎ কখনও
মলিন হইতে পারে না। সাহিত্যের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে
জাতির জাগরণ যেন স্বতঃই আসিয়া পড়ে।
জগতের ইতিহাসে যিনিই যে কোন দিন কোন মহৎ
কাজ করিয়া গিয়াছেন, তাঁহাকে সাহিত্যের আশ্রয় লইতে
হইয়াছে। ধৰ্ম্মনীতিই হউক, রাজনীতিই হউক বা সমাজ
নীতিই হউক, সমস্ত জাতিকে একভাবে উদ্বুদ্ধ করিতে
হইলে সাহিত্যকে আশ্রয় করিয়াই তাহা করিতে হইবে।
আচাৰ্যই হউন প্রচারকই হউন, নিজ নিজ ভাব জাতীয়
সাহিত্যে প্রতিফলিত করিতে হইবে, তবেই সমস্ত জাতি
তাহা গ্রহণ করিতে পারে। স্বাধীনতার ইতিহাসে যিনি
জাতীয় সাহিত্যের মধ্যে স্বাধীনতার উদ্দীপনা জাগাইতে
পারিয়াছেন, তিনিই সে জাতির পুরােহিত, তাহারই
মন্ত্রে অনুপ্রাণিত হইয়া সে জাতি স্বাধীনতা লাভ করে।
ফরাসী বিপ্লবে শাে মধ্যে সাম্য ও ঐক্যের মন্ত্রদাতা রুশাে সাহিত্য জগতে যে ভাবুকতা ও কর্মপ্রেরণা জাগাইয়া দিয়া গিয়াছেন তাহারই ফলে ফ্রান্সে এক নূতন ইতিহাসের সৃষ্টি হইয়াছে। সাহিত্য জগতে যে রুশাের স্থান কত উচ্চে, তাহা নির্ণয় করা কঠিন। নিভৃতে প্রকৃতির সৌন্দর্যের মধ্যে বাস করিয়া তিনি মানুষের একটানা জীবনের মধ্যে সাহিত্যের মধ্য দিয়া তাহাকে সৌন্দর্যের একটা ছবি দিয়াছিলেন। মানুষ সাহিত্যের সেই সৌন্দর্যের নিজেকে নিবিষ্ট করিয়া তৃপ্তিলাভ করিত। রুশাে সাহিত্য ক্ষেত্রে অপরূপ কল্পনা দিয়া মানুষকে এই নির্মম কঠোর বাস্তবজগত হইতে অনেক দূরে এক নূতন কল্পনার নন্দন- কাননে লইয়া তাহাকে নূতন ভাবে অনুপ্রাণিত করিয়া গিয়াছেন। সৌন্দর্য্য ও কল্পনার এই নূতন ছবি শুধু ফ্রান্সে নয়, সমস্ত জগতের সাহিত্য ক্ষেত্রে এক নূতন আলাে, নূতন প্রাণ আনিয়া দিয়াছে। কল্পনা ও সৌন্দর্যের এই নূতন ভাব Romanticism নাম ধারণ করিয়াছে। এই Romanticism সম্বন্ধে বলিতে গিয়া প্রফেসর হারফোর্ড বলিয়াছেন :- Romanticisin which brought life and light in the literary world was the product of ৭১
রাণী বিবে রুশাে
a
Rousseau's genias and he has rightly
rightly been
called the 'father of Romanticism.'
What then was Romanticism? Primerily
as we have hinted, it was an extraordinary
development of imaginative sensibility
It has subt!er fascination which rests
partly upon wnder, but partly also npon
recognition.' For, its peculiar quality lies in
this, that in appirantly detaching
us from
real world, it seems to restore us to reality
at a higher point-to emancipate us from the
*prison of actual,' by giving us spiritual
rights in a universe of the mind, exempt
from the limitations of matter, and time and
space but appealing at countless points to
the instinct for that which endures and
subsists,
In every direction, current
beliefs and current institutions forced the
romantics to formulate their owo ideals, with
results which told sometimes for revolt and
sometimes for reaction, sometimes for fierce
intervention in affairs, sometimes for quiscent
FatÂT TATS PT11
or scornful seclusion from them
but
never
even in Scott and Keats permitted complete
unconcern.
Hence Romanticism beyond all other
movements is impregnated with speculative
elements, its poets are teachers and prophets
ardent reformers, philosophic reactionaries,
innovators in religion or in criticisin or in
history.
A true Romantic in temperament,
Rousseau drove two conclusions home in the
generation from which the firsĆ Romantic
poetry immersed : the worth and dignity as
man and the power of natural scenery to
respond to his needs. Emili nade an epoch
in education by its persuasive picture of
mind arranging by itself---in a judiciously
arranged environment-at all that it needs
to know. The social contract was an attempt to
construct poiitics on the basis of the principle
that every man has equal and unalienable
rights.
ফরাসী বিপ্লবে কণে
The Romantic realism assumed three closely
connected forms, in the three spheres of Politics,
History and Re igion.”
ফরাসী জাতির স্বাধীনতার ইতিহাসে জাতীয়
সাহিত্যের মধ্যে স্বাধীনতার উদ্দীপনা জাগাইতে একই
সময় অনেক মহাপুরুষের আবির্ভাব হয়। একমাত্র
রুশােই যে এ মহাব্রতের সাধক ছিলেন, তাহা নহে।
তাহার ন্যায় Voltaic ও সাহিত্য জগতে এক নূতন
চিন্তা, নূতন ভাবুক তার সৃষ্টি করেন। রুশে
ভল্টেয়ার দুইজন দুই দিক হইতে ফ্রান্সে এক বিরাট
বিপ্লবের বীজ বপন করিয়া যান, তাহাই কালক্রমে
ফল প্রসু হইয়া ফরাসী বিপ্লব উপস্থিত করে।
রুশাের স্থান উচ্চে কি ভল্টেয়ারের স্থান উচ্চে সে
প্রশ্নের কোন মীমাংসা হয় না। ভল্টেয়ার রুশাের
পরম শত্রু হইলেও, দুইজনেই যে প্রতিভাবান পুরুষ ছিলেন
এ বিষয়ে কোন মতদ্বৈধ নাই। তাহাদের মত ও পথের
পার্থক্য সত্ত্বেও তঁাহারা উভয়েই যে জাতীয় ইতিহাসের
শ্রেষ্ঠ সম্পদ, এ কথা অস্বীকার করিবার উপায় নাই।
ভল্টেয়ারের Spirit ছিল Destructive (ধ্বংস প্রবণ)
কশাের Spirit ছিল Constructive( গঠনশীল )।
ফরাসী বিপ্ন শাে
ও সমাজের মধ্যে স্বাধীন চিন্তা জাগাইবার জন্য ভল্টেয়ার
যেমন তীব্রভাবে সমালােচনা করিয়াছেন, তাহা
বলিবার নয়। ভল্টেয়ার দেখিলেন যে তদানীন্তন Churcl
দ্বারা প্রচলিত ধর্ম মানুষের স্বাধীন চিন্তা হরণ করিয়া
মানুষকে জড়ত্বে পরিণত করিতেছে। তাই তিনি ধর্ম
সম্বন্ধে এমনভাবে শ্লেষবাণী প্রচার করিতে লাগিলেন
যে ধীরে ধীরে মানুষের অন্ধবিশ্বাস দূর হইতে লাগিল।
ভল্টেয়ার মানুষের
অন্ধবিশ্বাস
দূর
করিবার জন্য, মানুষের
মধ্যে স্বাধীন চিন্তা জাগাইবার জন্য ধর্মসম্বন্ধে শুধু
শ্লেষবাণী প্রচার করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই। যদি তিনি
মানুষের অন্ধ বিশ্বাস সম্বন্ধে তীব্রভাবে সমালােচনা করিয়া
খটি ধৰ্ম্মকে বাঁচাইয়া শ্লেষ বিদ্রুপ করিতেন, তাহা
হইলে কোন কথা ছিল না। কিন্তু তিনি অন্ধবিশ্বাস
দূর করিতে গিয়া স্বাধীন চিন্তা জাগাইতে গিয়া ধৰ্ম্মের
অস্তিত্ব অস্বীকার করিয়া এক মহাভুল করিলেন এবং
এই স্থানেই তাহার সহিত রুশাের প্রধান পার্থক্য।
Church কে ধ্বংস করিবার প্রবৃত্তি তাহার মধ্যে
এত প্রবল হইয়া উঠিয়াছিল যে তিনি State সম্বন্ধে
Conservative ছিলেন। ধর্ম বিষয়ে নাস্তিক ও
State সম্বন্ধে Conservative হইয়াও, তিনি ইতিহাস
১
ফরাসী বিপ্লবে রুশো
সম্বন্ধে যেমনভাবে আলােচনা করিয়া গিয়াছেন, তেমনটা
বােধ হয় আর কেহ করিতে পারেন নাই।
ভল্টেয়ার যেমন ধৰ্ম্ম সমাজকে তীব্রভাবে
আক্রমণ করিয়াছেন, রুশােও সে বিষয়ে নিরস্ত হন নাই।
রুশােও ধ্বংসের বাণী প্রচার করিয়াছেন কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে
তিনি গঠনের উপায়ও বলিয়া গিয়াছেন । ভল্টেয়ার শুধু
ধ্বংসের কথাই বলিয়া গিয়াছেন, রুশে। সৃষ্টির কথাও
বলিয়াছেন :-
প্রকৃতি মানুষকে সুন্দর ও সুখী করিয়া গড়িয়াছে,
কিন্তু সমাজ তাহাকে সঙ্কীর্ণতা ও পাপের পাথে লইয়া
গিয়াছে। সমাজ সম্বন্ধে এইরূপ মত প্রকাশ করিয়া
তিনি তাহার ‘Contract Social' এ সমাজের মধ্যে কেমন
করিয়া মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং সামাজিক একতা
প্রতিষ্ঠা হইতে পারে তাহা দেখাইয়া গিয়াছেন। সমাজের
দোষ দেখাইয়া তিনি তাহাকে ধ্বংস করিতে বলেন নাই,
উহারই মধ্যে থাকিয়া প্রকৃতির নির্মল আনন্দ কেমন
করিয়া সৃষ্টি করা যায় তাহা দেখাইয়া গিয়াছেন। এই
ভুল ভ্রান্তিপূর্ণ পঙ্কিল সমাজের মধ্য দিয়া মানুষ কেমন
তাবে তাহার স্বাভাবিক অবস্থায় “State of Nature”
ফিরিয়া যাইতে পারে, Contract Socialএ তিনি
ফরাসী বিপ্লবে কণে সেই বাণী প্রচার করিয়া গিয়াছেন। ভল্টেয়ার ক্রমাগত ধ্বংসের কথা বলিয়াছেন, কিন্তু রুশো ধ্বংসের কথা বলিবার সঙ্গে সঙ্গে সৃষ্টির কথাও বলিয়া গিয়াছেন। রুশাে ও ভল্টেয়ার যে সাহিত্যের মধ্য দিয়া বিপ্লবের বীজ বপন করিয়া গিয়াছিলেন, তাহাকে জীবিত ও ফলপুষ্পশোভিত রাখিবার জন্য তাহাদের শিষ্যবৃন্দ ও সমসাময়িক অনেক লেখকও প্রাণপণ চেষ্টা করিয়াছেন। শত বাধা ও বিপত্তি সত্ত্বেও রুশাের ভাবরাশি দিন দিন সাহিত্যের মধ্য দিয়া তাহার দেশবাসীর হৃদয়ে এক নূতন প্রেরণা জাগাইয়াছিল। নর নারী সকলেই তাহার প্রতিভার নিকট মস্তক অবনত করিল। ম্যাডাম রােল্যাণ্ড বালিকা বয়সে রুশাের একজন একনিষ্ঠ শিষ্যা ছিলেন। সাহিত্যক্ষেত্রে তিনি যশস্বিনী হইয়া গিয়াছেন। কশাের অপর প্রধান শিষ্যা ছিলেন Germine Necker, তিনি ১৭৬৬ খৃঃ অব্দে এক সম্ভ্রান্ত ধনী পরিবারে জন্ম- গ্রহণ করেন। রুশাের পুস্তকাবলী পাঠ করিয়া তিনি এতদূর চমৎকৃত হন যে সুইডেনের দূত Barande Stael Holsteenকে বিবাহ করিয়া বিপ্লবের প্রান্তে Constitutional partyর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
ফরাসী বিপ্লবে রুশো
।
১৭০৭
সাহিত্য-ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ প্রতিপত্তি লাভ করেন,
স্বাধীনতাকে জীবনের আদর্শ রাখিয়া তিনি অনেক কাজ
করিয়া যান।
রুশাের অপর একজন শিষ্য Bernerdin (বার্ণার্ডিন)
এর নাম উল্লেখযােগ্য। তিনি
খৃঃ অব্দে
হ্যাভবেতে জন্মগ্রহণ করেন। ইনি এক অদ্ভুত প্রকৃতির
লােক ছিলেন, নানা প্রকার কল্পনা লইয়া তিনি নানা স্থানে
নানাভাবে ঘুরিয়া বেড়ান। প্রকৃতির শিশুদের জন্য
এক প্রকার শিক্ষার স্থান তৈয়ারী করিয়া তদানীন্তন
কলুষিত সমাজ ও সভ্যতার বাহিরে যাইয়া তিনি এক
শান্তিপূর্ণ স্বাধীন ধর্মরাজ্য গঠনের চেষ্টা করেন। এই
সমস্ত ব্যাপার লইয়া তিনি নানাপ্রকার অবস্থার মধ্য
দিয়া জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি কিছুদিন রুশাের
সহিত একত্রে কাল কাটান। রুশাে তাহার এই
অনুরক্ত শিষ্যকে আন্তরিকভাবে ভালবাসিতেন।
বার্ণাডিন তাহার ভ্রমণবৃত্তান্ত প্রভৃতি লিখিয়া ফরাসী
সাহিত্যে কীৰ্ত্তিলাভ করিয়া গিয়াছেন।
এমনিভাবে রুশাের প্রেরণা লইয়া অনেকে অনেক
ভাবে সাহিত্যের মধ্য দিয়া সমাজে একটা বিপ্লব সৃষ্টি
করিবার চেষ্টা করিয়া যান। রুশশা, তঁাহার শিষ্যবৃন্দ
৮১।
ফরাসী বিপ্লবে শাে
ও তাঁহার সমসাময়িক অনেকে বিপ্লবের উদ্যোগপৰ্ব শেষ
করিয়া যান। Beaumarchais তাঁহার নাটকের মধ্য
দিয়া বিপ্লবের সাহায্য করিয়া যান, তিনি তাঁহার নাট্যের
মধ্যে একস্থানে বলিয়াছেন ;
"I am a citizen," he cried, 'that is to
say something wholly new, unknown, unheard
of in France. I am a citizen-that is to say
what you should have been two hundred
years ago, what perhaps you will be twenty
years hence,"
এমন কি ১৭৭৪ খৃঃ অব্দ পর্যন্ত Citizen (নাগরিক)
কথাটী পর্যন্ত একটা নূতন কথা ছিল। এমনি করিয়া
কেহ স্বাধীনতার কথা বলিয়া, কেহ নূতন ধরণের শিক্ষার
আলােক দিয়া, কেহ বা কাল্পনিক এক সমাজের ছবি
আঁকিয়া, কেহ বা Citizen ( নাগরিক) প্রভৃতি নূতন
কথা আনিয়া সমস্ত দেশবাসীর মনের গতি পরিবর্তন
করিবার চেষ্টা করিয়া গিয়াছেন।
মনের গতি যদি
পরিবর্তন করা যায়, মনকে যদি বিদ্রোহী করিয়া ভােলা
যায়, তাহা হইলে বিপ্লবের সৃষ্টি করিতে কালবিলম্ব হয়
। সাহিত্যের মধ্য দিয়া ফরাসীর বীর পুত্রগণ সমস্ত
ফরাসী বিপ্লবে রুশাে
জাতিটীর মনের গতি পরিবর্তন করিয়া দিয়াছিলেন।
একদিকে যেমন নূতন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বাহির হইল, সেইরূপ
নানাদিক হইতে নাটক, কাব্য, সঙ্গীত, সংবাদপত্র ও
Pamphlet (পুস্তিকা) বাহির হইয়া সমগ্র জাতিকে
বিক্ষুব্ধ করিয়া তুলিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর সাহিত্য
রাজনৈতিক আন্দোলন চালাইবার যন্ত্রস্বরূপে ব্যবহৃত
হইতে লাগিল। নানা দিক দিয়া বহুসংখ্যক সংবাদপত্রও
Pamplet। পুস্তিকা) বাহির হইতে লাগিল।
রঙ্গমঞ্চে নাটকের মধ্য দিয়া এমন সব অভিনয় হইতে
লাগিল যে, মানুষের মন প্রাণ ধীরে ধীরে বিপ্লবের দিকে
চলিতে লাগিল।
“The Revolution was already in action,"
said Nepoleon, “when in 178.4 Beaumarchais's
Marriaye de Figars appeared upon the Stage,”
অর্থাৎ ১৭৮৪ খ্ৰীঃ অব্দে Beaunarchaiss এর
Marriage de Figars নাটকের অভিনয় দেখিয়া
নেপােলিয়ান বলিয়াছিলেন যে বিপ্লব আরম্ভ হইয়া
গিয়াছে।
সংবাদ পত্রের মধ্য দিয়া, নাটকের মধ্য দিয়া যে
ভাব বিস্তার লাভ করিতেছিল, সঙ্গীতের মধ্য দিয়াও
ফরাসী বিপ্লবে শাে
সেই ভাব দেশের হৃদয়ের মধ্যে খেলা করিতে লাগিল।
নানা প্রকার জাতীয় সঙ্গীত, জাতীয় সৈনিকদের মনে
একটা নূতন ভাব আনিয়া দিল, তাহারা যুদ্ধক্ষেত্রে
যাইবার সময় সেই গান গাহিতে গাহিতে চলিত।
সাহিত্যের মধ্য দিয়া যখন এমন ভাবে বিপ্লবের
মন্ত্র প্রচারিত হইতে লাগিল, তখন চতুর্দিক হইতে
নেতৃবৃন্দ তাহাদের অগ্নিময়ী বক্তৃতা দিয়া জনসম্প্রদায়কে
উত্তেজিত করিয়া তুলিলেন। এই সমস্ত বক্তার মধ্যে
Mirabeau সকলের শ্রেষ্ঠ ছিলেন। Vinecenuesএ
কারারুদ্ধ হইয়া আভিজাত্য সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে তাহার
ঘৃণা আরও বর্ধিত হইল। স্বীয় প্রতিভাবলে তিনি যে
অগ্নিময়ী বাণী প্রচার করিয়া গিয়াছেন, তাহা ইতিহাসের
পৃষ্ঠা চিরদিন উজ্জ্বল করিয়া রাখিবে। আরও অনেকে
অগ্নিময়ী বাণীর প্রচারে জনসম্প্রদায়কে উদ্ দ্ধ করিয়া-
ছিলেন। নেপােলিয়ন এই সকল বাশ্মীদের মধ্যে
সকলের শেষে আবিভূত হন।
এমনিভাবে রুশশা ও ভল্টেয়ার যে মহাব্ৰত আরম্ভ
করিয়াছিলেন, দিন দিন দলে দলে অনেক মহাপ্রাণ
নিজেদের আহুতি দিয়া সেই মহাব্রত উদ্যাপন করেন।
জাতীয় সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান প্রতিদিন নূতন ভাবুকতা
a
৮৪
ফরাসী বিপ্লবে রুশাে বহিয়া আনিয়া দেশবাসীর কানে কানে অনেক নূতন আশার কথা বলিয়া যাইত। রুশাের কল্পনার রঙীন তুলিকা তাঁহার দেশবাসীর হৃদয়ে এক নূতন সমাজ ও শাসন- তন্ত্রের ছবি আঁকিয়া দিল, তাহারা দলে দলে তাহার প্রতিষ্ঠার জন্য অগ্রসর হইল । হইল। এমনিভাবে রুশাে সাহিত্যের মধ্যে বিপ্লবের এক বিরাট উদ্যোগপৰ্ব সমাধা করিলেন অন্তর্জগতের বিপ্লব এমনিভাবে গড়িয়া উঠিল, সুযােগ ও সুবিধার অপেক্ষায় প্রকৃত, বিপ্লব কিছুদিন পরে ধ্বংস ও সৃষ্টির এক তাণ্ডবলীলাপ্রকট করিয়া জগতের সমস্ত অত্যাচারী আভিজাত্য সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি করিল। Equality, Fraternity and Liberty—সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার নূতন বাণী বহন করিয়া ধীরে ধীরে ফরাসীদেশে এক বিরাট বিপ্লব আসিয়া উপস্থিত হইল। করিলেন
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.