Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Geetanjali Ed.9th

Thakur ,rabindranath · 2010/01/2

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

গীতাঞ্জলি
নবম সংস্করণ
শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল্য ১• এক টাকা চারি আনা

প্রকাশক
শ্রীজগদানন্দ রায়
বিশ্বভারতী, শান্তিনিকেত্তন; বীরভূম।
শান্তিনিকেতন প্রেসে,
'জগদানন্দ রায় কর্তৃক মুদ্রিত।
শান্তিনিকেতন, বীরভূম।
}

বিজ্ঞাপন
এই গ্রন্থের প্রথম কয়েকটি গান পূর্বে অন্য দুই একটি পুস্তকে
প্রকাশিত হইয়াছে। কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে বে-সমস্ত গান
পরে পরে রচিত হইয়াছে তাহাদের পরস্পরের মধ্যে একটি ভাবে
ঐক্য থাকা সম্ভবপর মনে করিয়া তাহাদের সকলগুলিই এই পুস্তকে
একত্রে বাহির করা হইল।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শান্তিনিকেতন,
বােলপুর
৩১ শ্রাবণ, ১৩১৭

No text on this page.

সূচী ৫০০ ০ ০ ১২৭ ০০০ ৪০০ ••• p ০ ০ ••• ১১৩ ••• ০ ০ ০ ••• ২৫ ••• ৬৭ অন্তর মম বিকশিত কর অমন আড়াল দিয়ে লুকিয়ে গেলে আকাশ তলে উঠল ফুটে আছে আমার হৃদয় আছে ভরে আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্র ছায়ায় আজ বারি ঝরে ঝর ঝর আজ বরষার রূপ হেরি মানবের মাঝে আজি গন্ধবিধুর সমীরণে আজি ঝড়ের রাতে তােমার অভিসার আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে আজি শ্রাবণ-ঘন গহন-মমাহে 'আনন্দের সাগর থেকে আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ আমার এ গান চেড়েছে তার আমার এ প্রেম নয় ত ভীরু 'আমার একলা ঘরের আড়াল ভেঙে আমার খেলা যখন ছিল তােমার সনে আমার চিত্ত তােমায় নিত্য হবে আমার নয়ন-ভুলানো এলে আমার নামটা দিয়ে ঢেকে রাখি যারে ৩। ••• •• ১০ ••• ১৪৫ ৫০০ ১০২, ০০ ০ ০ ০ ০ ১৭ ৮১ • ১৫৭ ০০ ১৬২ . ••• ০ ০ ০ ••• ৪০০ ৪১ ০ ০ ০ ০ ০ ••• ••• ১১৮ ••• ••• ০০০ ••• $০ ••• ••• আমার মাঝে তােমার লীলা হবে আমার মাথা নত করে দাও আমার মিলন লাগি তুমি আমাৱে যদি জাগালে আজি নাথ আমি চেয়ে আছি তােমাদের সবাপানে আমি বহু বাসনার প্রাণপণে চাই আমি হেথায় থাকি শুধু আর আমায় আমি নিজের শিরে আর নাইরে বেলা না ছায়া আরাে আঘাত সইবে আমার জাবার এরা ঘিরেছে মাের মন আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে আলােয় আলােকময় করেহে আষাঢ় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল ‘আসমতলের মাটির পরে লুটিয়ে রব, উড়িয়েজা অভ্রভেদী বুথে এই করেছ ভালে, নিঠুর, এই জ্যোৎস্না রাতে জাগে আমার প্রাণ এই মলিন বস্তু ছাড়তে হবে এই মাের সাধ যেন এ জীবনমাঝে এই যে তােমার প্রেম, ওগাে একটি একটি করে তােমার একটি নমস্কারে, প্রভু, একলা আমি বাহির হলেন ৫৪ ••• . . . ০ ০ ০ ১০ ৪ ••• . ••• ••• ০০ ০ ০৫০ ১৬৮ ••• ••• ••• st একা আমি ফিরব না আর এবার নীরব করে দাও হে তােমার ••• ••• ৭১ ৪২ ৪০০ ••• . ৮২ ••• ••• ৮৪ ••• • • ৪ ৫ . . র ... ৭৫ ••• ••• এস হে এস, সজল ঘন, ঐরে তরী দিল খুলে ওগাে আমার এই জীবনের শেষ পরিপূর্ণতা ওগাে মৌন, না যদি কও ওরে মাঝি ওরে আমার কত অজানারে জানাইলে তুমি কথা ছিল এক-তরীতে কেবল তুমি আমি কবে আমি বাহির হলেম তােমারি গান গেয়ে কে বলে সব ফেলে যাবি কোথায় আলাে কোথায় ওরে আলাে কোন আলােতে প্রাণের প্রদীপ গর্ব করে নিইনে ও নাম, জান অন্তর্যামী, গান গাওয়ালে আমায় তুমি গান দিয়ে যে তােমায় খুঁজি •• গাবার মত হলি কোন গান ••• গায়ে আমার পুলক লাগে চাই গাে আমি তােমারে চাই চিত্ত আমার হারাল আজ চিরজনমের বেদনা ছাড়িনে, ধরে থাক এটে ছিন্ন করে লও হে মােরে ••• জগৎ জুড়ে উদাসুরে ••• ১২৮ •১৭৫ ০ ০ ০ ১৪৯ ••• ০১৫ ১০১ ০ ০ ০ ।। :: । ৯০ १२७ ••• • ০০ ০ | ৫৩ ০০০ . ১৬৪ ১৪৮ ১৭ . . . ০ ০ ০ ০ ০ ••• ••• ••• ১৬৯ ১৪১ . . . ০ ০ ০ ৯৪ জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ জড়ায়ে আছে বাধা, ছাড়ায়ে যেতে চাই জড়িয়ে গেছে সরু মােটা জননী, তােমার করুণ চরণখানি জানি জানি কোন আদি কাল হ'তে জীবন যখন শুকায়ে যায় জীবনে যত পূজা জীবনে যা চিরদিন ডাক ডাক ডাক আমারে তব সিংহাসনের আসন হতে তাই তােমার আনন্দ আমার পর অ’রা তােমার নামে বাটের মাঝে ’রা দিনের বেলা এসেছিল তুমি আমার আপন, তুমি আছ আমার কাছে তুমি এবার আমায় লহ হে নাথ, লহ তুমি কেমন করে’ গান কর যে গুণী তুমি নব নব রূপে এস প্রাণে, তুমি যখন গান গাহিতে বল তুমি যে কাজ করচ, আমায় তােমার দয়া যদি তােমার প্রেম যে বইতে পারি। তােনার সাথে নিত্য বিরােধ তােমার সােনার থালায় পাজাব আজ তােমায় আমার প্রভু করে রাখি ••• ০৮ ••• ••• ২৭ ••• ৯১ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ১০৬ p, ১৬৫ ৪০০ ০ ০ ০ ৭৮ ১৭১ ০৮০ . . . ১৫৮ ০০০ % ৪০ ৫০০ . ৭৪ ... ••• ১৩২ ৮৮ ••• ৩৯ ১৭৮ ০ ০ ০ ০৩০ '৯২ । ••• ১৬৩ ০০ ০ ০ ০ তােমায় খোজা শেষ হবে না মাের তাের শুনি নি কি শুনি নি তার পায়ের ধ্বনি দয়া করে ইচ্ছা করে আপনি ছােট হয়ে দয়া দিয়ে হবে গাে মাের দাও হে আমার ভয় ভেঙে দাও দিবস যা সাঙ্গ হ’ল দুঃস্বপন কোথা হতে এসে দেবতা জেনে দূরে রই দাড়ায়ে ধনে জনে আছি জড়ায়ে হায় ধায় যেন মাের সকল ভালবাসা ••• নদীপারের এই আষাঢ়ের নামটা যেদিন ঘুচাবে, নাথ নামাও নামাও আমায় তােমার নিন্দা দুঃখে অপমানে নিভৃত প্রাণের দেবতা নিশার স্বপন ছুটুল রে এই ••• পাবি না কি যােগ দিতে এই ছন্দেরে প্রভু আজি তােমার দক্ষিণ হাত প্রভুগৃহ হ'তে আসিলে যেদিন প্রভু তােমা লাগি আঁখি জাগে প্রেমে প্রাণে গানে গন্ধে আলােকে পুলকে পাঠাবে নাথ, কবে প্রেমের হাতে ধরা দেব’ ফুলের মতন আপনি ফুটাও গান ০ ০ ০ ••• ১৪৬ ••• ••• ৪৫ ৪৩ ০ ০ ০ ১৪৩ ৩৪ ৭ ০ ০০ ০ ০ প্রেমের দূতকে ১৭৪ ৫০০ ... ১৭২ ০ ০ ০ ৮০০ ple • ••• ৭ ১৮ ৫ . ••• ... ৮০০ १२ ০৮ ০ ০ ০ ৮ ০০ ••• ১৪৪ ••• ১৭৬ t ১৩১ ১৪২ t, t বজ্রে তােমার বাজে বাঁশি বাঁচান বাচি মারেন মরি বিপদে মােরে রক্ষা কর বিশ্বসাথে যােগে যেথায় বিহারে বিশ্ব যখন নিদ্রামগন ভজন পূজন সাধন আরাধনা । ভেবেছিনু মনে যা হবার তারি শেষে মনকে, আমার কায়কে মনে করি এইখানে শেষ মরণ যেদিন দিনের শেষে আসৰে তােমার দুয়ারে মানের আসন, আরাম শয়ন মুখ ফিরায়ে রব তােমার পানে মেঘের পরে মেঘ জমেছে মেনেছি, হার মেনেছি যখন আমায় বাঁধ আগে পিছ যতকালতুই শিশুর মত ••• যতবার আলাে জ্বালাতে চাই যদি তােমার দেখা না পাই প্রঃ যা দিয়েছ আমায় এ প্রাণ ভরি যা হারিয়ে যায় তা আগলে বসে যাত্রী আমি ওরে যেথায় থাকে সবার অধম দীনের হতে দীন•• যেথায় তােমার লুট হতেছে ভুবনে যেন শেষ গানে মাের সব রাগিণী পূরে ০ ০ ০ ০ ০ ••• ••• ••• ••• ৮৫ ••• • ০ ০ ৪৯ t ••• ১৩৫ ... . . . ১৫৫ ৮০০ ৮০ ১৪৭ ০ ০ ০ •• ৪০ ••• ১৪ ৩০০ ৪০০ ••• ১৭৭ ১৭৩ ০৪ ৫০০ রাজার মত বেশে তুমি সাজাও যে শিশুরে রূপসাগরে ডুব দিয়েছি লেগেছে অমল ধবল পালে শরতে আজ কোন্ অতিথি শেষের মধ্যে অশেষ আছে সংসারেতে আর বাহারা সবা হতে রাখব তােমায় সভা যখন ভাঙবে তখন সীমার মাঝে, অসীম তুমি সুন্দর, তুমি এসেছিলে আজ এতে সে যে পাশে এসে বসেছিল হেথা যে গান গাইতে আসা আশর হেথায় তিনি কোল পেতেছেন হে মাের দেবতা, ভরিয়া এ দেহ প্রাণ হে মাের চিত্ত, পুণ্য তীর্থে হে মাের দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান হেরি অহরহ তােমারি বিরহ ১৪০. bro ••• ৭৩ ৪৭ ১১৪ ৪০০ ••• ১২৪ ৩১

No text on this page.

গীতাঞ্জলি
আমার মাথা নত করে দাও হে তােমার
চরণ-ধূলার তলে।
সকল অহঙ্কার হে আমার
ডুবাও চোখের জলে।

গীতাঞ্জলি
নিজেরে করিতে গৌরব দান,
নিজেরে কেবলি করি অপমান,
আপনারে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়া
ঘুরে মরি পলে পলে।
সকল অহঙ্কার হে আমার
ডুবাও চোখের জলে।
আমারে যেন না করি প্রচার
আমার আপন কাজে ;
তােমারি ইচ্ছা কর হে পূর্ণ
আমার জীবন মাঝে।
যাচি হে তােমার চরম শান্তি,
পরাণে তােমার পরম কান্তি,
আমারে আড়াল করিয়া দাড়াও
হৃদয়-পদ্ম-দলে।
সুকল তাহার হে আমার
ডুবাও চোখের জলে।
soso

গীতাঞ্জলি
২
আমি বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই
বঞ্চিত করে বাঁচালে মােরে।
এ কৃপা কঠোর সঞ্চিত মোর
জীবন ভরে।
চাহিতে মোরে যা করেছ দান,
আকাশ আলােক তনু মনপ্রাণ,
দিনে দিনে তুমি নিতেছ আমায়
সে মহা দানেরই যােগ্য করে,
অতি ইচ্ছার সঙ্কট হতে
বাঁচায়ে মোরে।
আমি কখনাে বা ভুলি, কখনাে বাচলি,
তােমার পথের লক্ষ্য ধরে ;
তুমি নিষ্ঠুর সম্মুখ হতে
যাও যে সরে।
এ যে তব দয়া জানি জানি হায়,
নিতে চাও বলে’ ফিরাও আমায়,
পুৰ্ণ করিয়া ল’বে এ জীবন
তব মিলনেরই যােগ্য করে’
আধা ইচ্ছার সঙ্কট হতে
বঁচায়ে মােরে

গীতাঞ্জলি
কত অজানারে জানাইলে তুমি,
কত ঘরে দিলে ঠাঁই,
দূরকে করিলে নিকট, বন্ধু,
পরকে করিলে ভাই।
পুরানাে আবাস ছেড়ে যাই যবে
মনে ভেবে মরি কি জানি কি হবে,
নূতনের মাঝে তুমি পুরাতন,
সে-কথা যে ভুলে যাই।
দূরকে করিলে নিকট, বন্ধু,
পরকে করিলে ভাই।
জীবনে মরণে নিখিল ভুবনে
যখনি যেখানে ল’বে,
চির জনমের পরিচিত ওহে
তুমিই চিনাবে সবে।
তােমারে জানিলে নাহি কেহ পর
নাহি কোনাে মানা, নাহি কোনাে ডর,
সবারে মিলায়ে তুমি জাগিতেছ
দেখা যেন সদা পাই।
দূরকে করিলে নিকট, বন্ধু,
পরকে করিলে ভাই।

গীতাঞ্জলি
৪
বিপদে মােরে রক্ষা কর,
এ নহে মাের প্রার্থনা,
বিপদে আমি না যেন করি ভয়।
দুঃখ-তাপে ব্যথিত চিতে
নাই বা দিলে সান্ত্বনা,
দুঃখে যেন করিতে পারি জয়।
সহায় মাের না যদি জুটে
নিজের বল না যেন টুটে,
সংসারেতে ঘটিলে ক্ষতি
লভিলে শুধু বঞ্চনা
নিজের মনে না যেন মানি ক্ষয়।
আমারে তুমি করিবে ত্রাণ
এ নহে মাের প্রার্থনা,
তরিতে পারি শকতি যেন রয়।
অামার ভার লাঘব করি’
নাই বা দিলে সান্ত্বনা,
বহিতে পারি এমনি যেন হয়।
নম্র শিরে সুখের দিনে
তােমারি মুখ লইব চিনে,
দুখের রাতে নিখিল ধরা
যে-দিন করে বঞ্চনা,
তােমারে যেন না করি সংশয়।

গীতাঞ্জলি
অন্তর মম বিকসিত কর
নিৰ্ম্মল কর, উজ্জ্বল কর
সুন্দর কর হে।
জাগ্রত কর, উদ্যত কর,
নির্ভয় কর হে।
মঙ্গল কর, নিরলস নিঃসংশয় কর হে,
অন্তর মম বিকসিত কর,
অন্তরতর হে।
যুক্ত কর হে সবার সঙ্গে,
মুক্ত কর হে বন্ধ,
সঞ্চার কর সকল কর্মে
শান্ত তােমার ছন্দ।
চরণপদ্মে মম চিত নিস্পন্দিত কর হে,
নন্দিত কর, নন্দিত কর,
নন্দিত কর হে।
অন্তর মম বিকসিত কর
অন্তরতর হে।
২৭ অগ্রহায়ণ, ১৩১৪

গীতাঞ্জলি
প্রেমে প্রাণে গানে গন্ধে আলােকে পুলকে
প্লাৰিত করিয়া নিখিল দ্যুলােক ভূলােকে
তোমার অমল অমৃত পড়িছে ঝরিয়া ।
দিকে দিকে আজি টুটিয়া সকল বন্ধ
মুরতি ধরিয়া জাগিয়া উঠে আনন্দ ;
জীবন উঠিল নিবিড় সুপায় ভরিয়া
চেতনা আমার কল্যাণ-রস-সরসে
শতদল সম ফুটিল পরম হরষে
সব মধু তার চরণে তােমার ধরিয়া ।
নীরব অালেক জাগিল হৃদয় প্রান্তে
উদার ঊষার উদয়-হারুণ কান্তি,
অলস আঁখির অবরণ গেল সরিয়া ।
অগ্রহায়ণ, ১৩.৪ '

গীতাঞ্জলি
৭
তুমি নব নব রূপে এস প্রাণে।
স গন্ধে বরণে, এস গানে।
म তাঙ্গে পুলকময় পরশে,
এস চিত্তে সুধাময় হরষে,
এস মুগ্ধ মূদিত দুনয়ানে।
তুমি নব নব রূপে এস প্রাণে
এসে নির্মূল উজ্জ্বল কান্ত,
এস সুন্দর স্নিগ্ধ প্রশান্ত,
এসহে বিচিত্র বিধানে।
এস দুঃখে সুখে এস মৰ্ম্মে,
এস নিত্য নিত্য সব কর্মে,
এস সকল কৰ্ম্ম অবসানে।
তুমি নব নব রূপে এস প্রাণে।
।
৫
হায়ণ, ১৩১৪

গীতাঞ্জলি
ম্যাজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্র ছায়ায়
লুকোচুরি খেলা।
নীল আকাশে কে ভাসালে
শাদা মেঘের ভেলা।
আজ ভ্রমর ভােলে মধু খেতে
উড়ে বেড়ায় আলােয় মেতে ;
আজ কিসের তরে নদীর চরে
চখাচখির মেলা।
ভরে যাব না আজ ঘরে রে ভাই
যাব না আজ ঘরে,
ওরে আকাশ ভেঙে বাহিরকে আজ
নেব রে লুঠ করে।
যেন জোয়ার জলে ফেনার রাশি
বাতাসে আজ, ছুটছে হাসি,
আজ বিনা কাজে বাজিয়ে বাঁশি
কাটবে সকল বেলা।

১০
গীতাঞ্জলি
আনন্দেরি সাগর থেকে
এসেছে আজ বান।
দাড় ধরে আজ বরে সবাই,
টারে সবাই টান্।
বােঝা যত বােঝাই করি
কবরে পার দুখের তরী,
ঢেউয়ের পরে ধরব পাড়ি
যায় যদি যাক প্রাণ ।
আনন্দেরি সাগর থেকে
এসেছে আজ বান।
কে ডাকেরে পিছন হতে
কে করে রে মানা,
ভয়ের কথা কে বলে আজ
ভয় আছে সব জানা।
কোন্ শাপে কোন্ গ্রহের দোষে
সুখের ডাঙায় গাব বসে,
পালের রসি
ধরব
কসি
চব গেয়ে গান !
অানন্দেরি সাগর থেকে
এসেছে আজ বান ।
১৩১৪

গীতাঞ্জলি
১১
তােমার সোনার থালায় সাজাব অাজ
দুখের অশ্রুধার।
জননী গো, গাঁথব তােমার
গলার মুক্তাহার।
চন্দ্রসূৰ্য্য পায়ের কাছে
মাল হয়ে জড়িয়ে আছে,
তোমার বুকে শোভা পাবে আমার
দুখের অলঙ্কার।
ধন ধান্য তােমারি ধন,
কি করবে তা কও!
দিতে চাও ত দিয়ে আমায়
নিতে চাও ত লওঁ ?
দুঃখ আমার ঘরের জিনিষ,
খাঁটি রতনই ত চিনি,
তাের প্রসাদ দিয়ে তারে কিনি,
এ মাের অহঙ্কার।

গীতাঞ্জলি
আমরা
বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ, আমরা
গেঁথেছি শেফালি-মালা।
নবীন ধানের মঞ্জরী দিয়ে
সাজিয়ে এনেছি ডালা।
এসগো শারদলক্ষী, তোমার
শুভ্র মেঘের রগে,
এস নিৰ্ম্মল নীল পথে,
এস ধৌত শ্যামল
সালো-ঝলমল
বনগিরি পর্বতে,
এস মুকুটে পরিয়া শেত শতদল
শীতল শিশির-ঢালা।

গীতাঞ্জলি
১৩
ঝরা মালতীর ফুলে
আসন বিছানাে নিভৃত কুঞ্জে
ভরা গঙ্গার কূলে,
ফিরিছে মরাল ডানা পাতিবারে
তােমার চরণমূলে।
গুঞ্জরান তুলিয়াে তােমার
সােনার বীণার তারে
বৃদু মধু ঝঙ্কারে,
হাসিটালা এর গলিয়া পড়িবে
ক্ষণিক অশ্রুধারে।
রহিয়া রহিয়া যে পরশমণি
বলকে অলককোণে,
পলকের তরে সকরুণ করে
বুলায়ে বুলায়ে মনে!
সােনা হয়ে যাবে সকল ভাবনা,
আঁধার হইবে অালা ।
১৩১৪

গীতাঞ্জলি
১৪
১২
লেগেছে অমল ধবল পালে
মন মধুর হাওয়া।
দেখি নাই কভু দেখি নাই
এমন তরণী বাওয়া।
কোন্ সাগরের পার হতে আনে
কোন্ সুদূরের ধন।
ভেসে যেতে চায় মন,
ফেলে যেতে চায় এই কিনারায়
সব চাওয়া সব পাওয়া।
পিছনে ঝরিছে ঝর ঝর জল
গুরু গুরু দেয়া ডাকে,
মুখে এসে পড়ে অরুণ কিরণ
ছিন্ন মেঘের ফাকে।
ওগো কাণ্ডারী, কেগাে তুমি, কার
হাসিকান্নার ধন।
ভেবে মরে মাের মন,
কোন্ সুরে আজ বঁধিবে যন্ত্র
কি মন্ত্র হবে গাওয়া।

গীতাঞ্জলি
.
আমার নয়ন-ভুলানাে এলে।
আমি কি হেরিলাম হৃদয় মেলে।
শিউলিতলার পাশে পাশে,
ঝরা ফুলের রাশে রাশে,
শিশির-ভেজা ঘাসে ঘাসে
অরুণরাঙা চরণ ফেলে
নয়ন-ভুলানাে এলে।

গীতাঞ্জলি
আলােছায়ার আঁচলখানি
লুটিয়ে পড়ে বনে বনে,
ফুলগুলি ঐ মুখে চেয়ে
কি কথা কয় মনে মনে।
তোমায় মােরা করব বরণ,
মুখের টাকা করহরণ,
ঐটুকু ঐ মেঘাবরণ
দু-হাত দিয়ে ফেল ঠেলে।
নয়ন-ভুলাননা এলে।
বনদেবীর দ্বারে দ্বারে
শুনি গভীর শঙ্খধ্বনি,
আকাশবীণার তারে তারে
জাগে তােমার অাগমনী।
কোথায় সােনার নূপুর বাজে,
বুঝি আমার হিয়ার মাঝে,
সকল ভাবে, সকল কাজে,
পাষাণ-গালা সুধা ঢেলে-
নয়ন-ভুলানাে এলে।
১৩১৪

গীতাঞ্জলি
১৭
১৪
জননী, তােমর করুণ চরণখানি
হেরিনু আজি এ অরুণ-কিরণ রূপে।
জননী, তােমার মরণহরণ বাণী
নীরব গগনে ভরি উঠে
চুপে চুপে।
তােমারে নমি হে সকল ভুকন মাঝে,
তােমারে নমি হে সকল জীবন কাজে ;
তনু মন ধন করি নিবেদন আজি
ভক্তিপাবন তােমার পূজার ধূপে।
জননী, তােমার করুণ চরণখানি
হেরিনু আজি এ অরুণ-কিরণরূপে।

গীতাঞ্জলি
১৫
বাঁচান বাঁচি মারেন মরি।
বল ভাই ধন্য হরি।
ধন্য হরি ভবের নাটে,
ধন্য হরি রাজ্যপাটে,
ধন্য হরি শ্মশানঘাটে
ধন্য হরি ধন্য হরি।
সুধা দিয়ে মাতান যখন
ধন্য হরি ধন্য হরি।
ব্যথা দিয়ে কাদান যখন
ধন্য হরি ধন্য হরি।
আত্মজনের কোলে বুকে
ধন্য হরি হাসি মুখে,
ছাই দিয়ে সব ঘরের সুখে
ধন্য হরি ধন্য হরি।
আপনি কাছে আসেন হেসে
ধন্য হরি ধন্য হরি।
ফিরিয়ে বেড়ান দেশে দেশে
ধন্য হৰি ধন্য হরি।
ধন্য হরি স্থলে জলে,
ধন্য হরি ফুলে ফুলে,
ধন্য হৃদয়-পদ্মলে
১১ চৈত্র, ১৩১৫ চণ-আলােয় ধন্য করি ।

গীতাঞ্জলি
১৬
জগৎ জুড়ে উদার সুরে
আনন্দ-গান বাজে,
সে গান কবে গভীর রবে
বাজিৰে হিয়া মাঝে ?
বাতাস জল আকাশ আলো
সবারে কবে বাসিব ভালো,
হৃদয় সভা জুড়িয়া তারা
বসিবে নানা সাজে ।
নয়ন দুটি মেলিলে কবে
পরাণ হবে খুসি,
যে-পথ দিয়া চলিয়া যাব
সবারে যাব তুষি।
রয়েছ তুমি এ-কথা কবে
জীবন মাঝে সহজ হবে,
আপনি কবে তােমারি নাম
ধ্বনিবে সব কাজ।
অষাঢ়, ১৩১৬

২০
গীতাঞ্জলি
১৭
মেঘের পরে মেঘ জমেছে,
আঁধার করে আসে,
আমায় কেন বসিয়ে রাখ
একা দ্বারের পাশে।
কাজের দিনে নানা কাজে
থাকি নানা লােকের মাঝে,
আজ আমি যে বসে আছি
তােমারি আশ্বাসে।
আমায় কেন বসিয়ে রাখ
একা দ্বারের পাশে।
তুমি যদি না দেখা দাও
কর আমায় হেলা,
কেমন করে কাটে আমার
এমন বাদল বেলা।
দূরের পানে মেলে আঁখি
কেবল আমি চেয়ে থাকি,
পরাণ আমার কেঁদে বেড়ায়
দুরন্ত বাতাসে।
আমায় কেন বসিয়ে রাখ
একা দ্বারের পাশে ।
আষাঢ়, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
২১
১৮
কোথায় আলো কোথায় ওরে আলো !
বিরহানলে জ্বালােরে তারে জ্বালে।
রয়েছে দীপ না আছে শিখা
এই কি ভালে ছিলরে লিখা,
ইহার চেয়ে মরণ সে যে ভালাে।
বিরহানলে প্রদীপখানি জ্বালে ।
বেদনা দূতী গাহিছে, “ওরে প্রাণ,
তােমার লাগি জাগেন ভগবান!
নিশীথে ঘন অন্ধকারে
ডাকেন তােরে প্রেমাভিসারে,
দুঃখ দিয়ে রাখেন তাের মান।
তােমার লাগি জাগেন ভগবান।”

গীতাঞ্জলি
গগনতল গিয়েছে মেঘে ভরি,
বাদল জল পড়িছে ঝরি ঝরি।
এ ঘোর রাতে কিসের লাগি
পরাণ মম সহসা জাগি
এমন কেন করিছে মরি মরি ।
বাদল জল পড়িছে ঝরি ঝরি।
বিজুলি শুধু ক্ষণিক আভা হানে,
নিবিড়তর তিমির চোখে আনে।
জানি না কোথা তানেক দূরে
বাজিল গান গভীর সুরে,
সকল প্রাণি টানিছে পথ পানে;
নিবিড়তর তিমির চোখে আনে।
কোথায় আলো কোথায় ওরে আলাে।
বিরহানলে জ্বালােরে তারে জ্বালাে।
ডাকিছে মেঘ, হাঁকিছে হাওয়া,
সময় গেলে হবে না যাওয়া,
নিবিড় নিশা নিকষ-ঘন কালাে
পরাণ দিয়ে প্রেমের দীপ জ্বালাে।
আষাঢ়, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
১৯
আজি শ্রাবণ-হন গহন-মােহে
গোপন তব চরণ ফেলে
নিশার মত নীরব ওহে
সবার দিঠি এড়ায়ে এলে।
প্রভাত আজি মুদেছে আঁখি,
বাতাস বৃথা যেতেছে ডাকি,
নিলাজ নীল আকাশ ঢাকি
নিবিড় মেঘ কে দিল মেলে?
কৃজনহীন কাননভূমি,
দুয়ার-দেওয়া সকল ঘরে,
একেলা কোন্ পথিক তুমি
পথিকহীন পথের পরে !
হে একা সখা, হে প্রিয়তম,
রয়েছে খােল এ ঘর মম,
সমুখ দিয়ে স্বপনসম
যেয়াে না মােরে হেলায় ঠেলে ।
আষাঢ়, ১৩১

২৪
গীতাঞ্জলি
আষাঢ় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল,
গেলরে দিন ব’য়ে।
বাঁধনহারা বৃষ্টি-ধারা
ঝরচে রয়ে রয়ে।
একলা বসে’ ঘরের কোণে
কি ভাবি যে আপন মনে,
সজল হাওয়া শূধীর বনে
কি কথা যায় কয়ে!
বাঁধনহারা বৃষ্টিধারা
ঝরচে র’য়ে র’য়ে।
হৃদয়ে আজ ঢেউ দিয়েছে
খুজে না পাই কূল ;
সৌরভে প্রাণ দিয়ে তুলে
ভিজে বনের ফুল।
আঁধার রাতে প্রহরগুলি
কোন্ সুরে আজ ভরিয়ে তুলি,
কোন্ ভুলে আজ সকল ভুলি
আছি আকুল হয়ে !
বাঁধনহারা বৃষ্টি-ধারা
ঝরছে র’য়ে র'য়ে ।
আষাঢ়, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
আজি ঝড়ের রাতে তােমার অভিসার,
পরাণসখা বন্ধু হে আমার।
আকাশ কাঁদে হতাশ সম,
নাই যে ঘুম নয়নে মম,
দুয়ার খুলি, হে প্রিয়তম,
চাই যে বারে বার।
পরাণসখা বন্ধু হে আমার ।
বাহিরে কিছু দেখিতে না পাই,
তােমার রথ কোথায় ভাবি তাই।
সুদূর কোন্ নদীর পারে,
গহন কোন্ বনের ধারে,
গভীর কোন্ অন্ধকারে
হতেছ তুমি পার
পরাণসখা বন্ধু হে আমার।
আষাঢ়, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
জানি জানি কোন্ আদি কাল হতে
ভাসালে আমারে জীবনের স্রোতে,
সহসা হে প্রিয় কত গৃহে পথে
রেখে গেছ প্রাণে কত হরষণ !
কতবার তুমি মেঘের হাড়ালে
এমনি মধুর
হাসিয়া দাড়ালে,
অরুণ-কিরণে চরণ বাড়ালে,
ললাটে রাখিলে শুভ পরশন।
সঞ্চিত হয়ে আছে এই চোখে
কত কালে কালে কত লােকে লোকে
কত নব নব আলােকে আলােকে
রূপের কত রূপ দরশন।
কত যুগে যুগে কেহ নাহি জানে
ভরিয়া ভরিয়া উঠেছে পরাণে
কত সুখে দুখে কত প্রেমে গানে
অযূতের কত রস বরষণ।
১০ ভাদ্র, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
তুমি কেমন করে গান কর যে গুণী
অবাক হয়ে শুনি, কেবল শুনি।
সুরের আলাে ভুবন ফেলে ছেয়ে
সুরের হাওয়া চলে গগন বেয়ে,
পাষাণ টুটে ব্যাকুল বেগে ধেয়ে
বহিয়া যায় সুরের সুরধুনী।
মনে করি অমনি সুরে গাই,
কণ্ঠে আমার সুর খুঁজে না পাই।
কইতে কি চাই, কইতে কথা বাধে,
হার মেনে যে পরাণ আমার কাছে,
আমায় তুমি ফেলেছ কোন্ ফাঁদে,
চৌদিকে মাের সুরের জাল বুনি ।
১০ ভাদ্র, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
২৪
অমন আড়াল দিয়ে লুকিয়ে গেলে
চলবে না।
এবার হৃদয় মাঝে লুকিয়ে বােসস
কেউ জানবে না কেউ বলবে না।
বিশ্বে তােমার লুকোচুরি,
দেশ-বিদেশে কতই ঘুরি,
বল আমার মনের কোণে
দেবে ধরা, ছবে না !
আড়াল দিয়ে লুকিয়ে গেলে
চবে না।
জানি আমার কঠিন হৃদয়
চরণ রাখার যােগ্য সে নয়,
সখা তােমার হাওয়া লাগলে হিয়ায়
তবু কি প্রাণ গবে না ?
না হয় আমার নাই সাধনা।
ঝরলে তােমার কৃপার কণা
তখন নিমেষে কি ফুটবে না ফুল
টকিতে ফল ফলবে না ?
আড়াল দিয়ে লুকিয়ে গেলে
চলবে না ।
১১ ভাদ্র, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
যদি
ভবে
তােমার দেখা না পাই প্রভু
এবার এ জীবনে,
তোমায় আমি পাইনি যেন
সে-কথা রয় মনে।
ভুলে না যাই, বেদনা পাই,
শয়নে স্বপনে।
যেন

৩০
গীতাঞ্জলি
।
এ সংসারের হাটে
আমার যতই দিবস কাটে,
আমার যতই দু’হাত ভরে ওঠে ধনে
কিছুই আমি পাইনি যেন
সে-কথা রয় মনে,
। যেন
ভুলে না যাই, বেদনা পাই
শয়নে স্বপনে।
।
যদি আলস ভরে
আমি বসি পথের পরে,
যদি ধূলায় শয়ন পাতি সযতনে,
যেন সকল পথই বাকি আছে
সে-কথা রয় মনে,
যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই
শয়নে স্বপনে।
.
ওগাে
যেন
যতই উঠে হাসি,
যতই বাজে বাঁশি,
যতই গৃহ সাজাই আয়ােজনে,
তােমায় ঘরে হয়নি আনা
সে-কথা রয় মনে,
ভুলে না যাই, বেদনা পাই
শয়নে স্বপনে। }
যেন

গীতাঞ্জলি
হেরি অহরহ তােমারি বিরহ
ভুবনে ভুবনে রাজে হে।
কত রূপ ধরে কাননে ভূধরে
আকাশে সাগরে সাজে হে।
সারা নিশি ধরি তারায় তারায়
অনিমেষ চোখে নীরবে দাড়ায়,
• পল্লবদলে শ্রাবণ-ধারায়
তােমার বিরহ বাজে হে।
ঘরে ঘরে আজি কত বেদনায়
তােমারি গভীর বিরহ ঘনায়,
কত প্রেমে হায় কত বাসনায়
কত সুখে দুখে কাজে হে।
সকল জীবন উদাস করিয়া
কত গানে সুরে গলিয়া ঝরিয়া
তােমার বিরহ উঠেছে ভরিয়া
আমার হিয়ার মাঝে হে ॥
১২ ভাদ্র, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
২৭
আর নাইরে বেলা নামল ছায়া
ধরণীতে,
এখন চরে ঘাটে, কলসখানি
ভরে নিতে।
জলধারার কলস্বরে
সন্ধ্যাগগন আকুল করে,
ওরে ডাকে আমায় পথের পরে
সেই ধ্বনিতে।
চরে ঘাটে কলসখানি
ভরে নিতে।
এখন',
বিজন পথে করে না কেউ
আসা-যাওয়া,
ওরে প্রেম-নদীতে উঠেছে ঢেউ
উতল হাওয়া।
জানিনে আর ফিরব কি না,
কার সাথে আজ হবে চিনা,
ঘাটে সেই অজানা বাজায় বীণা
তরণীতে।
চলরে ঘাটে কলসখানি
ভরে নিতে।
১৩ ভাদ্র, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
অাজ
বারি ঝরে ঝর ঝর
ভরা বাদরে।
আকাশ-ভাঙা আকুল ধারা
কোথাও না ধরে।
শলের বনে থেকে থেকে,
ঝড় দোলা দেয় হেঁকে হেঁকে,
জল ছুটে যায় একে বেঁকে
মাঠের পরে।
আজ মেঘের জটা উড়িয়ে দিয়ে
নৃত্য কে করে ?
লুটেছে ঐ
বুক
বৃষ্টিতে মোর ছুটেছে মন,
ঝড়ে,
ছাপিয়ে তরঙ্গ মাের
কাহার পায়ে পড়ে।
অন্তরে আজ কি কলরোল,
দ্বারে দ্বারে ভাঙল আগল,
হৃদয় মাঝে জাগল পাগল
আজি ভাদরে।
এমন করে কে মেতেছে,
বাহিরে ঘরে।
১৪ ভাদ্র, ১৩১৬

৩
গীতাঞ্জলি
এ . তােমা লাগি আঁখি জাগে;
দেখা নাই পাই,
পথ চাই,
ও মন ভালো লাগে।

গীতাঞ্জলি
ধূলাতে
বসিয়া দ্বারে
ভিখারী হৃদয় হা রে
তােমারি করুণা মাগে!
কৃপা নাই পাই
শুধু চাই,
সে-ও মনে ভালাে লাগে।
আজি এ জগৎ মাঝে
কত সুখে কত কাজে
চলে গেল সবে আগে।
সাথী,নাই পাই
তােমায় চাই,
সে-ও মনে ভালাে লাগে।
চারিদিকে সুধাভরা
ব্যাকুল শ্যামল ধরা
কাদায় রে অনুরাগে।
দেখা নাই পাই
ব্যথা পাই,
সে-ও মনে ভালাে লাগে ।
8 ভা, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
ধনে জনে আছি জড়ায়ে হায়
তবু জান, মন তােমারে চায় ।
অন্তরে আছ হে অন্তর্যামী,
আমা চেয়ে আমায় জানিছ স্বামী,
সব সুখে দুখে ভুলে থাকায়
জান মম মন তােমারে চায়।
ছাড়িতে পারিনি অহঙ্কারে,
বুরে মরি শিরে বহিয়া তারে,
ছাড়িতে পারিলে বাঁচি যে হায়
তুমি জান, মন তােমারে চায়।
যা আছে আমার সকলি কবে
নিজ হাতে তুমি তুলিয়া লবে।
সব ছেড়ে সব পাব তােমায়
মনে মনে মন তােমারে চায়।
১৫ ভাদ্র, ১৩১৮

গীতাঞ্জলি
এই যে তােমার প্রেম, ওগাে
হৃদয়হরণ!
এই যে পাতায় আলাে নাচে
সােনার বরণ।
এই যে মধুর আলস ভরে
মেঘ ভেসে যায় আকাশ পরে,
এই যে বাতাস দেহে করে
অমৃত ক্ষরণ।
এই ত তােমার প্রেম, ওগাে
হৃদয়হরণ!
প্রভাত আলাের ধারায় আমার
নয়ন ভেসেছে !
এই তােমারি প্রেমের বাণী
প্রাণে এসেছে।
তােমারি মুখ.ঐ নুয়েছে,
মুখে আমার চোখ থুয়েছে,
আমার হৃদয় আজ ছুয়েছে,
তােমার চরণ।
১৬ ভাদ্র, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
আমি হেথায় থাকি শুধু
গাইতে তােমার গান,
দিয়ে তােমার জগৎ সভায়
এইটুকু মাের স্থান।
আমি তােমার ভুবন মাঝে
লাগিনি নথ, কোনাে কাজে,
শুধু কেবল সুরে বাজে
আকাজের এই প্রাণ।
নিশায় নীরব দেবালয়ে
তােমার আরাধন,
তখন মােরে আদেশ কোরাে
গাইতে হে, রাজন্ !
ভােরে যখন আকাশ জুড়ে
বাজবে বীণা সােনার সুরে
আমি যেন না রই দূরে
এই দিয়াে মাের মান।
১৬ ভাদ্র, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
দাও হে অামার ভয় ভেঙে দাও।
আমার দিকে ও মুখ ফিরাও।
পাশে থেকে চিনতে নারি,
কোন্ দিকে যে কি নেহারি,
তুমি আমার হৃবিহারী
হৃদয় পানে হলিয়া চাও।
বল আমায় বল কথা
গায়ে আমার পরশ কর।
দক্ষিণ হাত বাড়িয়ে দিয়ে
আমায় তুমি তুলে ধর।
যা বুঝি সব ভুল বুঝি হে,
যা খুঁজি সব ভুল খুঁজি হৈ,
হাসি মিছে, কান্না মিছে
সামনে এসে এ ভুল ঘুচাও
১৬ ভাদ্র, ১৩১৬ .

গীতাঞ্জলি
৩৪
আবার এরা ঘিরেছে মাের মন।
আবার চোখে নামে যে আবরণ।
আবার এ যে নানা কথাই জমে,
চিত্ত আমার নানা দিকেই ভ্রমে,
দাহ আবার বেড়ে ওঠে ক্রমে
আবার এ যে হারাই শ্রীচরণ।
তব নীরব বাণী হৃদয়তলে
ডােবে না যেন লােকের কোলাহলে।
'সবার মাঝে আমার সাথে থাক,
আমায় সদা তােমার মাঝে ঢাক,
নিয়ত মাের চেতনা পরে রাখ
আলােকে-ভরা উদার ত্রিভুবন।
১৬ ভাদ্র, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
৪৮
আমার মিলন লাগি তুমি
অচি কবে থেকে।
তোমার চন্দ্র সূৰ্য্য তােমায়
রাখবে কোথায় ঢােকে।
কত কালের সকাল সাঁকে,
তােমার চরণধ্বনি বাজে,
গােপনে দূত হৃদয় মাঝে
গেছে আমায় ডেকে ।
ওগাে পথিক, আজকে আমার
সকল পরাণ ব্যেপে
থেকে থেকে হরষ যেন
উঠচে কেঁপে কেঁপে।
যেন সময় এসেছে আজ,
ফুরালাে মাের যা ছিল কাজ
বাতাস আসে, হে মহারাজ,
তােমার গন্ধ মেখে ।
১৬ ভাদ্র, ১৩১৬

२
গীতাঞ্জলি
এস হে এস, সজল ঘন,
বাদল বরিষণে ;
বিপুল তব শ্যামল স্নৈহে
এস হে এ জীবনে।
এস হে গিরিশিখর চুমি,
ছায়ায় ঘিরি কাননভূমি ;
গগন ছেয়ে এস হে তুমি
গভীর গরজনে।
ব্যপিয়ে উঠে নীপের বন
পুলকভরা ফুলে।
উছলি উঠে কল রােদন
নদীর কূলে কূলে।
এস হে এস হৃদয়ভরা,
এস হে এস পিপাসাহর
এস হে আঁখি-শীতল-করা
ঘনায়ে এস মনে।
১৭ ভাদ্র, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
পারবি না কি যােগ দিতে এই ছন্দেরে,
খসে যাবার ভেসে যাবার
ভােঙবারই আনন্দে রে !

৪৪
গীতাঞ্জলি
পাতিয়া কান শুনি না যে
দিকে দিকে গগন মাঝে
মরণ বীণায় কি সুর বাজে
তপন-তারা চন্দ্রের
জ্বালিয়ে আগুন ধেয়ে ধেয়ে
জ্বলবারই আনন্দে রে !
পাগল-করা গানের তানে
ধায় যে কোথা কেই-বা জানে,
চায় না ফিরে পিছন পানে
রয় না বাঁধা বন্ধেরে
লুটে যাবার ছুটে যাবার
চারই আমলে রে !
সেই অনিন্দ-চরণপাতে
ছয় ঋতু যে নৃত্যে মাতে,
প্লাবন বহে যায় ধরাতে
বরণ গীতে গন্ধেরে
ফেলে দেবার ছেড়ে দেবার
মরবারই আনন্দে রে ।
১৮ ভাদ্র, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
নিশার স্বপন ছুটল রে এই
ছুটল রে !
টুটুল বাঁধন টুটুল রে !
রইল না তার আড়াল প্রাণে,
বেরিয়ে এলাম জগৎ পানে,
হৃদয়-শভদলের সকল
দলগুলি এই ফুটল রে, এই
ফুটুল রে।
দুয়ার আমার ভেঙে শেষে
সঁাড়ালে যেই আপনি এসে
নয়ন-জলে ভেসে হৃদয়
চরণ-তলে লুটুল রে !
আকাশ হতে প্রভাত-আলাে
আমার পানে হাত বাড়ালাে,
ভাঙা-কারার দ্বারে আমার,
জয়ধ্বনি উঠল রে, এই
উঠল রে !
১৮ ভাদ্র, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
শরতে আজ কোন্ অতিথি
এল প্রাণের দ্বারে।
অনিন্দ-গান গারে হৃদয়
আনন্দ-গান গারে।
নীল আকাশের নীরব কথা,
শিশির-ভেজা ব্যাকুলতা,
বেজে উঠুক আজি তােমার
বীণার তারে তারে।
।
শতক্ষেতের সােনার গানে
যােগ দেরে আজ সমান তানে,
ভাসিয়ে দে সুর ভরা নদীর
আসল জলধারে।
বে এসেছে তাহার মুখে
দেখরে চেয়ে গভীর মুখে
দুয়ার খুলে তাহার সাথে
বাহির হয়ে যায়।
১৮ ভা, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
৪০
হেথা সে গান গাইতে আলা আমার
হয়নি সে গান গাওয়া।
আজো কেবলি সুর সাধা, আমার
কেবল গাইতে চাওয়া।

৮
গীতাঞ্জলি
অামার লাগে নাই সে সুর, আমার
বঁধে নাই সে কথা,
প্রাণেরই মাঝখানে আছে
গানের ব্যাকুলতা!
আজো ফোটে নাই সে ফুল, শুধু
বহেছে এক হাওয়া।
আমি দেখি নাই তার মুখ, আমি
শুনি নাই তার বাণী,
কেবল শুনি ক্ষণে ক্ষণে তাহার
পায়ের ধ্বনিখানি ।
আমার দ্বারের
দ্বারের সমুখ দিয়ে সেজন
করে আসা-যাওয়া।
শুধু আসন পাতা হ’ল আমার
সারাটি দিন ধরে,
ঘরে হয়নি প্রদীপ জ্বালা, তারে
ডাব কেমন করে ।
আছি পাবার আশা নিয়ে, তারে
হয়নি আমার পাওয়া ॥
২৭ ভাদ্র, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
৪১
যা হারিয়ে যায় তা আগলে বয়ে
ইব কত আর।
আর পারিনে রাত জাগতে হে নাথ,
ভাবতে অনিবার।
আছি রাত্রি দিবস ধরে
দুয়ার আমার বন্ধ করে,
আতে যে চায় সন্দেহে তায়
তাড়াই বারে বার।
তাই ত কারো হয় না আসা
আমার একা ঘরে।
আনন্দময় ভুবন তােমার
বাইরে খেলা করে।
তুমিও বুঝি পথ নহি পাও,
এসে এসে ফিরিয়া যাও,
রাখতে যা চাই রয় না তাও
ধূলায় একাকার।
১ আশ্বিন, ১৩১৬
৪

গীতাঞ্জলি
৪২
এই মলিন বস্ত্র ছাড়তে হবে
হযে গাে এইবার
আমার এই মলিন অহঙ্কার।
দিনের কাজে ধূলা লাগি
অনেক দাগে হ’ল দাগী,
এমনি তপ্ত হয়ে আছে
সহ করা র ,
আমার এই
মলিন অহঙ্কার।
এখন ত কাজ সাঙ্গ হল
দিনের অবসানে,
হ'ল রে র আসার সময়
আশা এল প্রাণে।
স্নান করে আয় এখন তবে
প্রেমের বসন পরতে হবে,
সাবনের কুসুম তুলে
গাঁথতে হবে হার
ওরে আয় সময় নেই যে আর।
১৯ আশ্বিন, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
৪৩
গায়ে আমার পুলক লাগে,
চোখে ঘনায় ঘাের,
হৃদয়ে মাের কে বেঁধেছে
রাঙা রাখীর ডাের।
আজিকে এই আকাশ-তলে
জলে স্থলে ফুলে ফলে
কেমন করে মনােহরণ
ছড়ালে মন মের!
কেমন খেলা হ’ল আমার
আজি তােমার সনে।
পেয়েছি কি খুজে বেড়াই
ভেবে না পাই মনে ।
আনন্দ আজ কিসের ছলে
কাঁদিতে চায় নয়নজলে,
বিরহ আজ মধুর হয়ে
করেছে প্রাণ তাের!
২৫ আশ্বিন, ১৩১৬,

গীতাঞ্জলি
৪৪
প্রভু
আজি তােমর দক্ষিণ হাত
রেখাে না ঢাকি’!
এসেছি তােমারে, হে নাথ,
পরাতে রাখী।
যদি বাঁধি তােমার হাতে
পড়ব বাঁধা সবার সাথে,
যেখানে যে আছে, কেহই
র’বে না বাকি।
আজি যেন ভেদ নাহি রয়
আপনা পরে,
আমায় যেন এক দেখি হে
বাহিরে ঘরে।
তােমার সাথে যে বিচ্ছেদে
ঘুরে বেড়াই কেঁদে কেঁদে,
ক্ষণেক তরে ঘুচাতে তাই
তােমারে ডাকি।
২৭ আশ্বিন, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
৪৫
জগতে আনন্দ-যজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ।
ধন্য হল ধন্য হ’ল মানব-জীবন।
নয়ন আমার রূপের পুরে
সাধ মিটায়ে বেড়ায় ঘুরে,
শ্রবণ আমার গভীর সুরে
হয়েছে মগন।
তােমার যজ্ঞে দিয়েছ তার
বাজাই আমি বাঁশি।
গানে গানে গেঁথে বেড়াই
প্রাণের কান্না হাসি।
এখন সময় হয়েছে কি ?
সভায় গিয়ে তােমায় দেখি
জয়ধ্বনি শুনিয়ে যাব
এ মাের নিবেদন।
৩০ আশ্বিন, ১৩১৬
৪

৫8
গীতাঞ্জলি
৪৬
আলাের আলােকময় করেহে
এলে আলাের আলাে।
আমার নয়ন হ’তে আঁধার
মিলালাে মিলালাে।
সকল আকাশ সকল ধরা
আনন্দে হাসিতে ভরা,
যে-দিক্‌ পানে নয়ন মেলি
ভালাে সবি ভালো।
তোমার আলাে গাছের পাতায়
নাচিয়ে তােলে প্রাণ।
তােমার আলো পাখীর বাসায়
জাগিয়ে তােলে গান।
তােমার আলাে ভালবেসে,
পড়েছে মাের গায়ে এসে
হৃদয়ে মাের নিম্মল হাত
বুলালে বুলালাে।
২০ অগ্রহায়ণ, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
৪৭
আসনতলের মাটির পরে লুটিয়ে রব।
তােমার চরণ-ধূলায় ধূলায় ধূসর হ’ব।
কেন আমায় মান দিয়ে আর দূরে রাখাে,
চিরজনম এমন করে ভুলিয়ােনাকো,
অসম্মানে আন টেনে পায়ে তব।
তােমার চরণ-ধূলায় ধূলায় ধূসর হ'ব।
আমি তােমার যাত্রিদলের র’ব পিছে,
স্থান দিয়ে হে আমায় তুমি সবার নীচে।
প্রসাদ লাগি কত লােকে আসে ধেয়ে
আমি কিছুই চাইব না ত রইব চেয়ে ;
সবার শেষে বাকি যা রয় অহাই ল’ব।
তােমার চরণ-ধূলায় ধূলায় ধূসর হ’ব।
১০ পৌষ, ১৩১৬ ।

গীতাঞ্জলি
৪৮
রূপসাগরে ডুব দিয়েছি
অরূপ রতন আশা করি ;
ঘাটে ঘাটে ঘুরব না আর
ভাসিয়ে আমার জীর্ণ তরী।
সময় যেন হয়রে এবার
ঢেউ খাওয়া সব চুকিয়ে দেবার,
সুধায় এবার তলিয়ে গিয়ে
অমর হয়ে রব মরি।
যে গান কানে যায় না শােনা
সে গান যেথায় নিত্য বাজে
প্রাণের বীণা নিয়ে যাবে
সেই অতলের সভা মাঝে।
চিরদিনের সুরটি বেঁধে
শেষ গানে তার কান্না কেঁদে,
নীরৱ যিনি তাঁহার পায়ে
নীরব বীণা দিব ধরি।
১২ পৌষ, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
৪৯
আকাশ তলে উঠল ফুটে
আলাের শতদল।
পাপড়িগুলি থরে থরে
ছড়াল দিক-দিগন্তরে,
ঢেকে গেল অন্ধকারের
নিবিড় কালাে জল।
মাঝখানেতে সােনার কোষে
আনন্দে ভাই আছি বসে,
আমায় ঘিরে ছড়ায় ধীরে
আলোর শতদল।
J
আকাশেতে ঢেউ দিয়েছে
বাতাস বহে যায়।
চারদিকে গান বেজে ওঠে,
চারদিকে প্রাণ নাচে ছছাটে,
গগনভরা পরশখানি
লাগে সকল গায়।
ডুব দিয়ে এই প্রাণসাগরে
নিতেছি প্রাণ বক্ষ ভরে,
ফিরে ফিরে আঁমায় ঘিরে
বাতাস বহে যায়

গীতাঞ্জলি
দশদিকেতে আঁচল পেতে
কোল দিয়েছে মাটি
রয়েছে জীব যে যেখানে
সকলকে সে ডেকে আনে,
সবার হাতে সবার পাতে
অন্ন সে দেয় বাটি।
ভরেছে মন গীতে গন্ধে,
বসে আছি মহানন্দে,
আমায় ঘিরে আঁচল পেতে
কোল দিয়েছে মাটি।
আলাে, তােমায় নমি, আমার
মিলা অপরাধ।
ললাটেতে রাখ আমার
পিতার আশীর্বাদ।
বাতাস, তােমায় নমি, আমার
ঘুচুক অবসাদ,
সকল দেহে বুলায়ে দাও
পিতার আশীর্বাদ।
মাটি, তােমায় নমি, আমার
মিটুক সর্বসাধ।
গৃহ ভরে ফন্দ্রিয়ে তােলে।
পিতার আশীর্বাদ।
পৌষ, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
হেথায় তিনি কোল পেতেছেন
আমাদের এই ঘরে।
আসনটি তার সাজিয়ে দে ভাই
মনের মত করে।
গান গেয়ে আনন্দ মনে
ঝটিয়ে দে সব ধূলা।
যত্ন করে দূর করে দে
আবর্জনাগুলা।

গীতাঞ্জলি
=
জল ছিটিয়ে ফুলগুলি রাষ্য
সাজিখানি ভরে’
আসনটি তার সাজিয়ে দে ভাই
মনের মত করে’!
দিন রজনী আছেন তিনি
আমাদের এই ঘরে,
সকাল বেলায় তারি হাসি
আলোক ঢেলে পড়ে।
যেমনি ভোরে জেগে উঠে
নয়ন মেলে চাই
খুসি হয়ে আছেন চেয়ে
দেখতে মােরা পাই।
ভারি মুখের প্রসন্নতায়
সমস্ত ঘর ভরে।
সকাল বেলায় তারি হাসি
আলোেক ঢেলে পড়ে।
৫
এল। তিনি বসে থাকেন
আমাদের এই ঘরে
আমরা যখন অন্য কোথাও
চলি কালের তরে

গীতাঞ্জলি
০
দ্বারের কাছে তিনি মােদের
এগিয়ে দিয়ে যান ;-
মনের সুখে ধাইরে পথে,
আনন্দে গাই গান।
দিনের শেষে ফিরি যখন
নানা কাজের পরে
দেখি তিনি একলা বসে
আমাদের এই ঘরে।
তিনি জেগে বসে থাকেন
আমাদের এই ঘরে,
আমরা যখন অচেতনে
সুমাই শয্যাপরে।
জগতে কেউ
দেখতে না পায়
লুকানাে তঁার বাতি,
আঁচল দিয়ে আড়াল করে’
জ্বালান সারা রাতি।
ঘুমের মধ্যে স্বপন কতই
আনাগােনা করে,
অন্ধকারে হাসেন তিনি
আমাদের এই ঘরে।
পৌষ, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
নিভৃত প্রাণের দেবতা
যেখানে জাগেন একা,
ভক্ত, সেথায় খােল দ্বার,
আজ ল’ব তার দেখা।
সারাদিন শুধু বাহিরে
ঘুরে ঘুরে কারে চাহিরে,
সন্ধ্যাবেলার আরতি
হয়নি'আমার শেখা।
তব জীবনের আলােতে
জীবন-প্রদীপ জ্বালি’
হে পূজারী, আজ নিভৃতে
সাজাব আমার থালি।
যেথা নিখিলের সাধনা
পূজা-লােক করে রচনা,
সেথায় আমিও ধরিব
একটি জ্যোতির রেখা
১৭ পৌষ, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ
জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আস।
সাধক ওগাে, প্রেমিক ওগাে,
পাগল ওগাে ধরায় আস !
এই অকূল সংসারে
দুঃখ আঘাত তােমার প্রাণে বীণা ঝঙ্কারে।
ঘাের বিপদ মাঝে
কোন্ জননীর মুখের হাসি দেখিয়া হাস ।
তুমি কাহার সন্ধানে
সকল সুখে আগুন জ্বেলে বেড়াও কে জানে!
এমন ব্যাকুল করে’
কে তােমারে কাদায় যারে ভালবাস?
তােমার ভাবনা কিছু নাই
কে যে তােমার সাথের সাথী ভাবি মনে তাই।
তুমি
মরণ ভুলে
কোন্ অনন্ত প্রাণসাগরে আনন্দে ভাস।
১৭ পৌষ, ১৩১৬

৬৪
গীতাঞ্জলি
তুমি আমার আপন, তুমি আছ আমার কাছে,
এই কথাটি বলতে দাও হে বন্দুতে দাও !
তােমার মাঝে মাের জীবনের সব আনন্দ আছে,
এই কথাটি বলতে দাও হে বলতে দাও!
আমায় দাও সুধাময় সুর,
আমার বাণী কর সুমধুর,
আমার প্রিয়তম তুমি, এই কথাটি
বলতে
দাও
হে বলতে দাও!
এই নিখিল আকাশ ধরা
এই যে তােমায় দিয়ে ভরা,
আমার হৃদয় হতে এই কথাটি
বতে দাও হে বলতে দাও।
দুখী জেনেই কাছে আসি,
ছােট
বলেই ভালবাস,
আমার ছোট
মুখে
এই কথাটি
বতে দাও হে বন্দুতে দাও।
মাঘ, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
৫৪
৫৪
নামাও নামাও আমায় তােমার
চরণতলে,
গলাও হে মন, ভাসাও জীবন
নয়নজলে।
একা আমি অহঙ্কারের
উচ্চ অচলে,
পাষাণ আসন ধূলায় লুটাও
ভাঙ সবলে।
নামাও নামাও আমায় তােমার
চরণতলে।
কি ল’য়ে বা গর্ব করি
ব্যর্থ জীবনে।
ভরা গৃহে শূন্য আমি
তােমা বিহনে।
দিনের কর্ম ডুবেছে মাের
আপন অতলে
সন্ধ্যাবেলার পূজা যেন
যায় না বিফলে।
নমাও নামাও আমায় তােমার
।
চরণতলে ৷
মাঘ, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
৫৫
আজি
গন্ধবিধুর সমীরণে
সন্ধানে ফিরি বনে বনে ?
আজি ক্ষুব্ধ নীলাম্বর মাঝে
এ কি চঞ্চল ক্রন্দন বাজে!
সুদূর দিগন্তের সকরুণ সঙ্গীত
লাগে মাের চিন্তায় কাজে
আমি খুজি কারে অন্তরে মনে
গন্ধবিধুর সমীরণে।
=
ওগো
জানি না কি নন্দনরাগে
উৎসুক যৌবন জাগে।
আজি আম্রমুকুল-সৌগন্ধ্যে,
নব পল্লব-মৰ্ম্মর ছন্দে,
চন্দ্র-কিরণ-সুধা-সিঞ্চিত অম্বরে
অশ্রু-সরস মহানন্দে
আমি পুলকিত কার পরশনে
গন্ধবিধুর সমীরণে।
s
।
ফাল্গুন, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে।
তব অবগুষ্ঠিত কুণ্ঠিত জীবনে
কোরাে না বিড়ম্বিত তারে।
আজি খুলিয়াে হৃদয়দল খুলিয়াে,
আজি ভুলিয়াে আপনপর ভূলিয়াে,
এই সঙ্গীত-মুখরিত গগনে
তব গন্ধ তরঙ্গিয়া তুলিয়াে।
এই বাহির
ভুবনে
দিশা হারায়ে
দিয়াে ছড়ায়ে মাধুরী ভারে ভারে
অতি নিবিড় বেদনা বনমাঝেরে •
আজি পল্লবে পল্লবে বাজেরে,
দূরে গগনে কাহার পথ চাহিয়া
আজি ব্যাকুল বসুন্ধরা সাজেরে।
পরাণে দখিণ বায়ু লাগিছে,
কারে দ্বারে দ্বারে কর হানি মাগিছে,
এই সৌরভ-বিহ্বল রজনী
কার চরণে ধরণীতলে জাগিছে ?
ওগাে সুন্দর, বল্লভ, কান্ত,
তব গম্ভীর আহ্বান করে ?
২৭ চৈত্র, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
তব সিংহাসনের আসন হ'তে
এলে তুমি নেমে,
মাের বিজন ঘরের দ্বারের কাছে
দাড়ালে নাথ, থেমে
একূল বসে আপন মনে
গাইতেছিলেম গান,
তোমার কানে গেল সে সুর
এলে তুমি নেমে,-
মাের বিজন ঘরের দ্বারের কাছে
দাড়ালে নাথ, থেমে।
তােমার সভায় কত না গান
কতই আছেন গুণী ;
গুণহীনের গানখানি আজ
বাজল তােমার প্রেমে
লাগল বিশ্ব-তানের মাঝে
একটি করুণ সুর,
হাতে লয়ে বরণমালা
এলে তুমি নেমে,
মোর বিজন ঘরের দ্বারের কাছে
দাড়ালে নাথ, থেমে।
২৭ চৈত্র, ১৩১৬

গীতাঞ্জলি
৬৯
৫৮
তুমি এবার আমায় লহ হে নাথ, লহ।
এবার তুমি ফিরে না হে-
হৃদয় কেড়ে নিয়ে রহ।
যে-দিন গেছে তােমা বিনা
তারে আর ফিরে চাহি না,
যাক সে ধূলাতে !
এখন তােমার আলােয় জীবন মেলে
যেন
জাগি অহরহ।
কি আবেশে, কিসের কথায়,
ফিরেছি হে যথায় তথায়
পথে প্রান্তরে,
এবার বুকের কাছে ও মুখ রেখে
তােমার আপন বাণী কহ।
কত কলুষ কত ফাঁকি
এখনাে যে আছে বাকি
মনের গােপনে,
আমায় তা’র লাগি আর ফিরায়ো না,,
তারে আগুন দিয়ে দহ।
২৮ চৈত্র, ১৩১৬

৭০
গীতাঞ্জলি
জীবন যখন শুকায়ে যায়
করুণা-ধারায় এসে !
সকল মাধুরী লুকায়ে যায়,
গীতসুধারসে এসাে।
কৰ্ম্ম যখন প্রবল আকার
গরজি উঠিয়া ঢাকে চারিধার,
হৃদয়প্রান্তে হে নীরব নাথ
।
শান্ত চরণে এসাে।
আপনারে যবে করিয়া কৃপণ
কোণে পড়ে থাকে দীনহীন মন,
দুয়ার খুলিয়া, হে উদার নাথ,
রাজ-সমারোহে এসাে।
বাসনা যখন বিপূল ধূলায়
অন্ধ করিয়া অববাধে ভুলায়
ওহে পবিত্র, ওহে অত্রি,
রুদ্র আলোকে এসাে।
২৮ চৈত্র, ১৩১৬
।

গীতাঞ্জলি
৭১
এবার নীরব করে দাও হে তােমার
মুখর কবিরে।
তা’র হৃদয়-বাঁশি আপনি কেড়ে
বাজাও গভীরে।
নিশীথরাতের নিবিড় সুরে
বাঁশিতে তান,দাওহে পূরে,
যে তান দিয়ে অবাক কর
গ্রহ শশীরে।
যা-কিছু মাের ছড়িয়ে আছে
জীবন মরণে,
গানের টানে মিলুক এসে
তােমার চরণে।
বহুদিনের বাক্যরাশি
এক নিমেষে যাবে ভাসি,
একলা বসে শুনব বাঁশি
অকূল তিমিরে ॥
চৈত্র, ১৩১৬

१२
গীতাঞ্জলি
বিশ্ব যখন নিজামগন,
গগন অন্ধকার ;
কে দেয় আমার বীণার তারে
এমন ঝঙ্কার।
নয়নে ঘুম নিল কেড়ে,
উঠে বসি শয়ন ছেড়ে,
মেলে আঁখি চেয়ে থাকি
পাইনে দেখা তার।
গুঞ্জরিয়া গুঞ্জরিয়া
প্রাণ উঠিল পূরে
জানিনে কোন্ বিপুল বাণী
বাজে ব্যাকুল সুরে।
কোন্ বেদনায় বুঝি নারে
হৃদয়ভরা অশ্রুভারে,
পরিয়ে দিতে চাই কাহারে
আপন কণ্ঠহার।
৪ বৈশাখ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
সে যে পাশে এসে বসেছিল
তবু জানি নি।
কি
ঘুম তােরে পেয়েছিল
হতভাগিনী।
এসেছিল নীরব রাতে,
বাণখানি ছিল হাতে,
স্বপনমাঝে বাজিয়ে গেল
গভীর রাগিণী।
৫
জেগে দেখি দখিণ হাওয়া
পাগল করিয়া
গন্ধ তাহার ভেসে বেড়ায়
আঁধার ভরিয়া।
কেন আমার রজনী যায়
কাছে পেয়ে কাছে না পায়,
কেন গাে ত’র মালার প্রশ
বুকে লাগে নি ।
১২ বৈশাখ, ১৩১৭,

৭৪
গীতাঞ্জলি
তােরা শুনিস্ নি কি শুনিস্ নি তার পায়ের ধ্বনি,
ঐ যে আসে, আসে, আসে।
যুগে যুগে পলে পলে দিনরজনী
সে যে আসে, আসে, আসে।
গেয়েছি গান যখন যত
আপন মনে ক্ষ্যাপার মত
সকল সুরে বেজেছে তার
আগমনী-
সে যে আসে, আসে, আসে!
কত কালের ফাগুন দিনে বনের পথে
সে যে আসে, আসে, আসে।
কত শ্রবণ অন্ধকারে মেঘের রথে
সে যে আসে, আসে, আসে।
দুখের পরে পরম দুখে,
তারি চরণ বাজে বুকে,
সুখে কখন বুলিয়ে সে দেয়
পরশমণি!
সে যে আসে, আসে, আসে ।
৩ জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
৬৪
মেনেছি, হার মেনেছি।
ঠেলতে গেছি তােমায় যত
তামায় তত হেনেছি।
আমার চিত্তগগন থেকে
তােমায় কেউ যে রাখবে ঢেকে
কোনােমতেই সইবে না সে
বারেবারেই জেনেছি।
অতীত জীবন ছায়ার মত
চর্চ পিছে পিছে,
কত মায়ার বাঁশির সুরে
ডাকচে আমায় মিছে।
মিল ছুটেছে তাহার সাথে,
ধরা দিলেম তােমার হাতে,
যা আছে মাের এই জীবনে
তােমার দ্বারে এনেছি।
৭ জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭

৭৬
গীতাঞ্জলি
একটি একটি করে তােমার
পুরানাে তার খােলদা,
সেতারখানি
নূতন
বেঁধে তােলে।
ভেঙে গেছে দিনের মেলা,
বসূবে সভা সন্ধ্যা বেলা,
শেষের সুর যে বাজাবে তার
আসার সময় হােলাে-
সেতারখানি
নুতন
বেঁধে তোলে ।
দুয়ার তােমার খুলে দাওগাে
আঁধার আকাশ পরে,
সপ্ত লােকের নীরবতা
আসুক তােমার ঘরে।
এতদিন যে গেয়েছ গান
আজকে তারি হাে অবসান,
এ যন্ত্র যে তােমার যন্ত্র
সেই কথাটাই ভালো।
সেতারখানি
নূতন
বেঁধে তােলে।
৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
৭৭
কবে আমি বাহির হলেম তােমারি গান গেয়ে
সে ত আজকে নয় সে আজকে নয়।
ভুলে গেছি কবে থেকে আসৃচি তােমায় চেয়ে
সে ত আজকে নয় সে আজকে নয়।
ঝরণা যেমন বাহিরে যায়,
জানে না সে কাহারে চায়
তেমনি করে ধেয়ে এলেম
জীবনধারা বেয়ে
সে ত আজকে নয় সে আজকে নয়।
কতই নামে ডেকেছি যে,
কতই ছবি একেছি যে,
কোন্ আনন্দে চলেছি, তার
ঠিকানা না পেয়ে
সে ত আজকে নয় সে আজকে নয়।
পুষ্প যেমন আলাের লাগি
জেনে রাত কাটায় জাগি,
তেমনি তােমার আশায় আমার
হৃদয় অাছে ছেয়ে
সে ত আজকে নয় সে আজকে নয় ।
৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
তােমার প্রেম যে বইতে পারি
এমন সাধ্য নাই।
এ সংসারে তােমার অামার
মাঝখানেতে তাই
কৃপা করে রেখেছ নাথ
অনেক ব্যবধান
দুঃখ সুখের অনেক বেড়া
ধনজনমান।
আড়াল থেকে ক্ষণে ক্ষণে
আভাসে দীও দেখা--
কালো মেঘের ফাঁকে ফাঁকে
রবির মৃদু রেখা।

গীতাঞ্জলি ৭১ শক্তি যারে দাও বহিতে অসীম প্রেমের ভার একেবারে সকল পর্দা ঘুচায়ে দাও তার। না রাখ তার ঘরের আড়াল না রাখ তার ধন, পথে এনে নিঃশেষে তায় কর অকিঞ্চন। না থাকে তার মান অপমান, লজ্জা সরম ভয়, এ তুমি সমস্ত তার বিশ্ব ভুবনময়। এমন করে মুখােমুখি সানে তােমার থাকা, কেবলমাত্র তােমাতে প্রাণ পূর্ণ করে রাখা, এ দয়া যে পেয়েছে, তার লােভের সীমা নাই- সকল লােভ সে সরিয়ে ফেলে তােমায় দিতে ঠাঁই। ১০ জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
৬৮
সুন্দর, তুমি এসেছিলে আজ প্রাতে
অরুণ বরণ পারিজাত ল’য়ে হাতে।
নিদ্রিত পুরী, পথিক ছিল না পথে,
একা চলি’ গেলে তােমার সােনার রথে,
বারেক থামিয়া, মাের বাতায়ন পানে
চেয়েছিলে তব করুণ নয়নপতে।
সুন্দর, তুমি এসেছিলে আজ প্রাতে।
স্বপন আমার ভরেছিল কোন্ গন্ধে,
ঘরের আঁধার কেঁপেছিল কি আনন্দে,
ধূলায় লুটানাে নীরব আমার বীণা
বেজে উঠেছিল অনাহত কি আঘাতে।
কতবার আমি ভেবেছিনু উঠি-উঠি,
আলস ত্যজিয়া পথে বাহিরাই ছুটি,
উঠি যখন তখন গিয়েছ চলে
দেখা বুঝি আর হ’ল না তােমার সাথে।
সুন্দর, তুমি এসেছিলে আজ প্রাতে।
১৭ জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
কামার খেলা যখন ছিল তােমার সনে
তখন কে তুমি তা কে জান্ত!
ছিল না ভয় ছিল না লাজ মনে
জীবন বহে’ যেত অশান্ত।
তুমি ভােরের বেলা ডাক দিয়েছ কত,
যেন আমার আপন সখার মত,
হেসে তােমার সাথে ফিরেছিলেম ছুটে
সেদিন কত না বন-বনা।
ওগাে সেদিন তুমি গাইতে যে-সব গান
কোনাে অর্থ তাহার কে জান্ত!
শুধু সঙ্গে তারি গাইত আমার প্রাণ,
সদা নাচত হৃদয় অশান্ত।
হঠাৎ খেলার শেষে আজ কি দেখি ছবি,
স্তব্ধ আকাশ, নীরব শশী রবি,
তােমার চরণপানে নয়ন করি নত
ভুবন দাড়িয়ে আছে একান্ত ।
৯৭ জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
ঐরে তরী দিল খুলে।
তাের বােঝ কে নেবে তুলে !
সানে যখন যাবি ওরে
থাক্ না পিছন পিছে পড়ে
পিঠে তারে বইতে গেলি,
একলা পড়ে রইলি কূলে।
ঘরের বােবা টেনে টেনে
পারের ঘাটে রাখুলি এনে,
তাই যে ভোরে বারে বারে
ফিরতে হ’ল গেলি ভুলে।
ডারে আবার মাঝিরে ডাক্,
বােঝ তােমার যা ভেসে যা
জীবনখানি উজাড় করে
সঁপে দে তা’র চরণ-মূলে
১৮ জৈষ্ঠ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
৭১
চিত্ত আমার হারাল আজ
মেঘের মাঝখানে,
কোথায় ছুটে চলেছে সে
কোথায় কে জানে।
বিজুলী তার বীণার তারে
আঘাত করে বারে বারে
বুকের মাঝে বজ্র বাজে
কি মহা নে ?
পুঞ্জ পুঞ্জ ভারে ভারে
গম্ভীর নীল অন্ধকারে
জড়ালরে অঙ্গ আমার
ছড়াল প্রাণে।
পাগল হাওয়া নৃত্যে মাতি’
হ’ল আমার সাথের সাথী,
অট্টহাসে ধায় কোথা সে
বারণ না মানে।
১৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭

৮৪
গীতাঞ্জলি
१२
ওগাে মোন, না যদি কও
না-ই কহিলে কথা !
বক্ষ ভরি বইব আমি
তােমার নীরবতা।
স্তব্ধ হয়ে রইব পড়ে,
রজনী রয় যেমন করে’
জ্বালিয়ে তারা নিমেষ-হারা
ধৈৰ্যে অবতা।
{
হবে হবে প্রভাত হবে
আঁধার যাবে কেটে।
তোমার বাণী সােনার ধারা
পড়বে আকাশ ফেটে ।
তখন আমার পাখীর বাসায়
জাগবে কি গান তােমার ভাষায় ?
তােমার তানে ফোটাবে ফুল
আমার বনলতা?
১৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
৮৫
৭৩
যতবার আলাে জ্বালাতে চাই
নিবে যায় বারে বারে !
আমার জীবনে তােমার আসন
গভীর অন্ধকারে।
যে লতাটি আছে শুকায়েছে মূল
কুঁড়ি ধরে শুধু,
নাহি ফোটে ফুল,
আমার জীবনে তব সেবা তাই
বেদনার উপহারে।
পূজাগৌরব পুণ্যবিভব
কিছু নাহি, নাহি লেশ,
এ তব পূজারি পরিয়া এসেছে
লজ্জার দীন বেশ।
উৎসবে তার অাসে নাই কেহ,
বাজে নাই বাঁশি সাজে নাই গেহ,
কঁদিয়া তোমায় এনেছে ডাকিয়!
ভাঙা মন্দির-দ্বারে ।
২১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
৭৪
সবা ই’তে রাখব তোমায়
আড়াল করে’
হেন পূজার ঘর কোথ। পাই
আমার ঘরে!
যদি আমার দিনে রাতে,
যদি অামার সবার সাথে
দয়া করে দাও ধরা, ত
রাব ধরে।
মান দিব যে তেমন মানী
নই ত আমি,
পূজা করি সে আয়োজন
নাই ত স্বামী।
যদি তােমায় ভালবাসি,
আপনি বেজে উঠবে বাঁশি,
আপনি ফুটে উঠবে কুসুম
কানন ভরে ॥
জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
বজে তােমার বাজে বাঁশি,
সে কি সহজ গান ?
সেই সুরেতে জাগব আমি
দাও মােরে সেই কান।
ভুলব না আর সহজেতে,
সেই প্রাণে মন উঠবে মেতে
মৃত্যু মাঝে ঢাকা আছে
যে অন্তহীন প্রাণ।
সে ঝড় যেন সই আনন্দে
চিত্ত-বীণার তারে
সপ্ত সিন্ধু দশ দিগন্ত
নাচাও যে বাঙ্কারে।
আরাম হ’তে ছিন্ন করে
সেই গভীরে লও গাে মােরে
অশান্তির অন্তরে যেথায়
শাস্তি সুমহান্ ।
২১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
দয়া দিয়ে হবে গো মাের
জীবন ধুতে।
নইলে কি আর পারব তােমার
চরণ ছুতে।
তােমায় দিতে পূজার ডালি
বেরিয়ে পড়ে সকল কালী,
পরাণ আমার পারিনে তাই
পায়ে থুতে।
এতদিন ত ছিল না মোর
কোনাে ব্যথা,
সৰ্ব্ব অঙ্গে মাখা ছিল
মলিনতা
আজ ঐ শুভ্র কোলের তরে
ব্যাকুল হৃদয় কেঁদে মরে,
দিয়াে না গাে দিয়াে না আর
ধূলায় শুতে।
২৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
৭৭
সভা যখন ভাঙবে তখন
শেষের গান কি যাব গেয়ে ?
হয় ত তখন কণ্ঠহারা
মুখের পানে র’ব চেয়ে।
এখনাে যে সুর লাগে নি
বাজবে কি আর সেই রাগিণী,
প্রেমের ব্যথা সােনার তানে
সন্ধ্যাগগন ফেলবে ছেয়ে ?
এতদিন যে সেধেছি সুর
দিনেরাতে আপন মনে
ভাগ্যে যদি সেই সাধনা
সমাপ্ত হয় এই জীবনে
এ জনমের পূর্ণ বাণী
মানস-বনের পদ্মখানি
ভাসাব শেষ সাগরপানে
বিশ্বগানের ধারা বেয়ে।
২৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭
.

১৫
গীতাঞ্জলি
৭৮
ওহে
চিরজনমের বেদনা,
চিরজীবনের সাধনা।
তােমার আগুন উঠু ত জ্বলে,
কৃপা করিয়াে না দুর্বল বলে;
যত তাপ পাই সহিবারে চাই,
পুড়ে হােক্ ছাই বাসনা।
অমােঘ যে ডাক সেই ডাক দাও
আর দেরি কেন মিছে ?
যা আছে বাঁধন বক্ষ জড়ায়ে
ছিড়ে পড়ে যাক্ পিছে।
গরজি’ গরজি'শঙ্খ তােমার
বাজিয়া' বাজিয়া উঠু এবার
গর্ব টুটিয়া নিদ্রা ছুটিয়া
জাগুক তীব্র চেতনা ।
৬ জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
৭৯
(%)
তুমি যখন গান গাহিতে বল
গর্ব আমার ভরে উঠে বুকে ;
দুই আঁখি মোর করে ছলছল,
নিমেষহারা চেয়ে তোমার মুখে।
কঠিন কটু যা আছে মাের প্রাণে
গলিতে চায় অমৃতময় গানে,
সব সাধনা আরাধনা মম
উড়িতে চায় পাখীর মত সুখে ।
তৃপ্ত তুমি আমার গীতরাগে,
ভালাে লাগে তােমার ভালাে লাগে,
জানি আমি এই গানেরি বলে
বসি গিয়ে তােমারি সম্মুখে।
মন দিয়ে যার নাগলৈ নাহি পাই,
গান দিয়ে সেই চরণ ছুয়ে যাই,
সুরের ঘোরে আপনাকে যাই ভুলে,
বন্ধু বলে ডাকি মাের প্রভুকে ।
.৭ জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭

৯২
গীতাঞ্জলি
৮০
৯ :
ধায় যেন মাের সকল ভালবাসা
তােমার পানে, তােমার পানে, তোমার পানে।
যা য় যেন মাের সকল গভীর অশ।
তােমার কানে, তােমার কানে, তােমার কানে
চিত্ত মম যখন যেথায় থাকে
সাড়া যেন দেয় সে তােমার ডাকে,
যত বাঁধা সব টুটে যায় যেন
তােমার টানে, তােমার টানে, তােমার টানে।
বাহিরের এই ভিক্ষাভরা থালি,
এবার যেন নিঃশেযে হয় খালি,
অন্তর মাের গােপনে যায় ভরে
তােমার দানে, তােমার দানে, তােমার দানে।
হে বন্ধু মাের, হে অন্তরতর,
এ জীবনে যা-কিছু সুন্দর
সকলি আজ বেজে উঠুক সুরে
প্রভু,
তােমার গানে, তােমার গানে, তােমার গানে।
২৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
৮১
তারা দিনের বেলা এসেছিল
আমার ঘরে,
বলেছিল, একটি পাশে
রইব পড়ে।
বলেছিল, দেবতা সেবায়
আমরা হব তােমার সহায়,-
যা-কিছু পাই প্রসাদ ল’ব
পূজার পরে।
এমনি করে দরিদ্র ক্ষীণ
মলিন বেশে
সঙ্কোচেতে একটি কোণে
রৈল এসে।
রাতে দেখি প্রবল হয়ে
পশে আমার দেবালয়ে,
মলিন হাতে পূজার বলি
হরণ করে।
২৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭

৯৪
গীতাঞ্জলি
৮২
তারা তােমার নামে বাটের মাঝে
মাশুল লয় যে ধরি।
দেখি শেষে ঘাটে এসে
নাইক পারের কড়ি।
তারা তােমার কাজের তাণে
নাশ করে গাে ধনে প্রাণে,
সামান্য যা আছে আমার
লয় তা অপহরি।
আজকে আমি চিনেছি সেই
ছদ্মবেশীদলে।
তারাও আমায় চিনেছে হায়
শক্তিবিহীন বলে।
গােপন মূর্তি ছেড়েছে তাই,
লজ্জাসরম আর কিছু নাই,
পঁড়িয়েছে আজ মাথা তুলে
পথ অবরােধ করি।
২৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
এই জ্যোৎস্না রাতে জাগে আমার প্রাণ;
পাশে তােমার হবে কি আজ স্থান ?
পাব অপূর্ব সেই মুখ,
রইবে চেয়ে হৃদয় উৎসুক,
বারে বারে চরণ ঘিরে ঘিরে
ফিরবে আমার অশ্রুভরা, গান ?
সাহস করে তােমার পদমুলে
আপনারে অজ ধরি নাই যে তুলে,
পড়ে আছি মাটিতে মুখ রেখে,
ফিরিয়ে পাছে দাও এ আমার দান ।
আপনি যদি আমার হাতে ধরে
কাছে এসে উঠতে বল মােরে,
তবে প্রাণের অসীম দরিদ্রতা
এই নিমেষেই হবে অবসান।
২৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
৮৪
•
কথা ছিল এক-তরীতে কেবল তুমি আমি
যাব অকারণে ভেসে কেবল ভেসে
ত্রিভুবনে জাবে না কেউ আমরা তীর্থগামী
কোথায় যেতেছি কোন্ দেশে সে কোন্ দেশে।
কূলহারা সেই সমুদ্রমাঝখানে
শােনাব গান এক্লা তোমার কানে,
ঢেউয়ের মতন ভাষা-বঁধিন-হারা
আমার সেই রাগিণী শুবে নীরব হেসে।
আজো সময় হয়নি কি তার, কাজ কি আছে বাকি ?
ওগাে ঐ যে সন্ধ্যা নামে সাগরতীরে।
মলিন আলােয় পাখা মেলে সিন্ধুপারের পাখী
আপন কুলায়মাঝে সবাই এল ফিরে।
কখন্ তুমি আবে ঘাটের পরে
বাঁধনটুকু কেটে দেবার তরে?
অস্তরবির শেষ আলোটির মত
তরী নিশীথমাঝে যাবে নিরুদ্দেশে।
৩০ জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭
।

গীতাঞ্জলি
৮৫
আমার একলা ঘরের আড়াল ভেঙে
বিশাল ভবে
প্রাণের রথে বাহির হতে
পারব কবে ?
প্রবল প্রেমে সবার মাঝে
ফিরব ধেয়ে সকল কাজে,
হাটের পথে তােমার সাথে
মিলন হবে,
প্রাণের রথে বাহির হতে
পাৰৰ কৰে
নিখিল-মশা-কাময়
দুঃখে সুখে,
ঝাঁপ দিয়ে তার তরঙ্গপাত
ধরব বুকে।
মন্দভালাের আঘাত-বেগে
তােমার বুকে উঠব জেগে,
শুনব বাণী বিশ্বজনের
কলরবে ।
প্রাণের রথে বাহির হতে
পারব কবে ?
১ আযা, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
-
একা আমি ফিরব না আর
এমন করে’
নিজের মনে কোণে কোণে
মােহের ঘোরে।
তােমায়
একলা বাহুর বাঁধন দিয়ে
ছােট করে ঘিরতে গিয়ে
আপনাকে যে বাঁধি কেবল,
আপনু ডোরে।
যখন আমি পাব তােমায়
নিখিল মাঝে
সেইখনে হৃদয়ে পাব
হদর-রাজে!
এই চিত্ত আমার বৃন্ত কেবল,
তারি পরে বিশ্বকমল
তারি পরে পূর্ণ প্রকাশ
দেখাও মােরে।
২ আষাঢ়, ১৩১৭
;

গীতাঞ্জলি
৯৯
৮৭
আমারে যদি জংগলে আজি নাথ,
ফিরে না তবে ফিরাে না, কর
করুণ আঁখিপাত।
নিবিড় বন-শাখার পরে
আষাঢ় মেঘে বৃষ্টি ঝরে,
বাদলভরা আলস ভরে
ঘুমায়ে আছে রাত।
ফিরে না তুমি ফিরাে না, কর
করুণ অাঁখিপাত।
বিরামহান বিজুলিঘাতে
নিদ্রাহারা প্রাণ
বরষা জলধারার সাথে
গাহিতে চাহে গান।
হৃদয় মাের চোখের জলে
বাহির হ’ল তিমিরতলে,
আকাশ খোঁজে ব্যাকুল বলে
বাড়ায়ে দুই হাত।
ফিরে না তুমি ফিরে না, কর ।
করুণ তাঁখিপাত।
ও অযাট, ১৩১৭

১০০
গীতাঞ্জলি
৮৮
ছিন্ন করে লও হে মােরে
আর বিলম্ব নয়।
ধূলায় পাছে ঝরে পড়ি
এই জাগে মাের ভয়।
এ ফুল তােমার মালার মাঝে
ঠাঁই পাবে কি, জানি না যে,
তবু তােমার আঘাতটি তার
ভাগ্যে যেন রয়।
ছিন্ন কর ছিন্ন কর
আর বিলম্ব নয়।
কখন যে দিন, ফরিয়ে যাবে,
আসবে আঁধার করে,
কখন্ তােমার পূজার বেলা
কাটবে অগােচরে।
যেটুকু এর রং ধরেছে,
গন্ধে সুধায় বুক ভরেছে,
তােমার সেবা লও সেটুকু
থাকতে সুসময়।
ছিন্ন কর ছিন্ন কর
আর বিলম্ব না ।
৩ , ১৩১৭
।

গীতাঞ্জলি ৮৯ চাই গাে আমি তােমারে চাই তেমার আমি চাই- এই কথাটি সদাই মনে বতে যেন পাই। আর যা-কিছু বাসনাতে ঘুরে বেড়াই দিনে রাতে মিথ্যা সে-সব মিথ্যা, ওগো তোমায়, আমি চাই। রাত্রি যেমন লুকিয়ে রাখে আলোর প্রার্থনাই-- তেমনি গভীর মােহের মাঝে তোমায় আমি চাই। শান্তিরে ঝড় যখন হানে শান্তি তবু চায় সে প্রাণে, তেমনি তােমায় আঘাত করি তবু তােমায় চাই । ৩ আষাঢ়, ১৩১৭

গাঞ্জলি
আমার এ প্রেম নয় ত ভীরু,
নয় ত হীনবল,
শুধু কি এ ব্যাকুল হয়ে
ফেলবে অজল ?
মন্দমধুর সুখে শােভায়
প্রেমকে কে ঘুমে ডােবায় ?
তোমার সাথে জাগৃতে সে চায়
তানন্দে পাগল।
নাচো যখন ভীষণ সাজে
তীব্র তালের আঘাত বাজে,
লায় ত্রাসে পালায় লাজে
সন্দেহবিহ্বল।
সেই প্রচণ্ড মনােহরে
প্রেম যেন মোর বরণ করে,
ক্ষুদ্র আশার স্বর্গ তাহার
দিক্‌ সে রসাতল।
৪ আষাঢ়, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
১০৩
আরাে আঘাত সইবে আমার
সইবে আমারাে।
আরাে কঠিন সুরে জীবনরে বাঙ্কারাে।
যে রাগ জাগাও আমার প্রাণে
ব্রজে নি তা চরমতানে,
নিঠুর মূচ্ছনায় সে গানে
মূৰ্ত্তি সঞ্চারাে।
লাগে না গাে কেবল যেন
কোমল করুণা,
মৃদু সুরের খেলায় এ প্রাণ
ব্যর্থ কোরাে না।
জলে উঠু সকল,হুতাশ,
গজ্জি’ উঠুক সকল বাতাস,
জাগিয়ে দিয়ে সকল আকাশ
পূর্ণতা বিস্তাররা।
৪ আষাঢ়, ১৩১৭
২

তাঞ্জলি
এই করেছ ভালো, নিঠুর,
এই করেছ ভালাে!
এমনি করে হৃদয়ে মাের
তীব্র দহন জ্বালাে।
আমার এ ধূপ না পােড়ালে
গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে
আমার এ দীপ না জ্বালালে
দেয় না কিছু আলো।
যখন থাকে অ৮ে খানে
এ চিত্ত আমার
আঘাত সে যে পরশ তব
সেই ত পুরস্কার।
অন্ধকারে মোহে লাজে
চোখে তােমায় দেখি না যে,
বজে তােলে আগুন করে
অামার যত কালাে।
৪ আষাঢ়, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
রই দাড়ায়ে,
দেবতা জেনে দূরে
আপন জেনে আদর করিনে।
পিতা বলে’ প্রণাম করি পায়ে,
বন্ধু বলে দু-হাত ধরিনে
আপনি তুমি অতি সহজ প্রেমে
আমার হয়ে এলে যেথায় নেমে
সেথায় সুখে বুকের মধ্যে ধরি,
সঙ্গী বলে তােমায় ধরিনে
]
•
ভাই তুমি যে ভাইয়ের মাঝে প্রভু,
তাদের পানে তাকাই না যে তবু,
ভাইয়ের সাথে ভাগ করে মাের ধন
তোমার মুঠা কেন ভরিনে।
ছুটে এসে সবার সুখে দুখে,
দাড়াইনে ত তােমারি সম্মুখে,
সঁপিয়ে প্রাণ ক্লান্তিবিহীন কাজে
প্রাণসাগরে ঝাপিয়ে পড়িনে।
৫ আষাঢ়, ১৩১৭

১০৬
গীতাঞ্জলি
৯৪
তুমি যে কাজ করচ, অামায়
সেই কাজে কি লাগবে না ?
কাজের দিনে আমায় তুমি
আপন হাতে জাগাবে না ?
ভালােমন্দ ওঠাপড়ায়,
বিশ্বশালার ভাঙাগড়ায়
তােমার পাশে দাড়িয়ে যেন
তােমার সাথে হয় গাে চেনা
ভেবেছিলেম বিজন ছায়ায়
নাই যেখানে আনাগােনা
সন্ধ্যাবেলায় তােমায় আমায়
সেথায় হবে জানাশোনা।
অন্ধকারে একা একা
সে দেখা যে স্বপ্ন দেখা,
ডাকো তােমার হাটের মাঝে
চলুচে যেথায় বেচাকেনা।
৬ আষাঢ়, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
১০৭
'বিশ্বসাথে ৰোগে যেথায় বিহারে
সেইখানে যোগ তােমার সাথে আমারাে।
নয়ক বনে, নয় বিজনে,
নয়ক অামার অাপন মনে,
সবার যেথায় আপন তুমি, হে প্রিয়,
সেথায় আপন আমারাে।
}
t;
সবার পানে যেথায় বাহু পারাে,
সেইখানেতেই প্রেম জাগিবে আমায়রা;
গােপনে প্রেময় না ঘরে,
আলোর মত ছড়িয়ে পড়ে,
সবার ভুমি আনন্দধন, হে প্রিয়,
আনন্দ সেই আমারে।
৭ আষাঢ়, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
ডাক ডাক ডাক আমারে,
তােমার স্নিগ্ধ শীতল গভীর
পবিত্র আঁধারে।
ভুচ্ছ দিনের ক্লান্তি গ্লানি,
দিতেছে জীবন ধূলাতে টানি,
সরাকণের বাক্যমনের
সহস্র বিকারে ।
মুক্ত কর হে মুক্ত কর আমারে,
তােমার নিবিড় নীরব উদার
অনন্ত আঁধারে।
নীরব রাত্রে হারাইয়া যাক
বাহির আমার বাহিরে মিশাক,
দেখা দিক্‌ মম অগুরতম
অখণ্ড আকারে ।
৭ আষাঢ়, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
৯৭
যেথায় তােমার লুট হতেছে ভুবনে
সেইখানে মের চত্ত যাবে কেমনে?
সেনাব ঘট সূৰ্য তারা
নিচে তুলে 'লাের ধারা,
অনন্ত প্রাণ ছড়িয়ে পড়ে গগনে।
সেইখানে মাের চিত্ত যাবে কেমনে?
॥
যেথায় তুমি বস’ দানের আসনে,
চিত্ত আমার সেথায় যাবে কেমনে?
নিত্য নূতন রসে ঢেলে
আপনাকে যে দিচ্চ মেলে,
সেথা কি ডাক পড়বে না গাে জীবনে।
সেইখানে মাের চিত্ত যাবে কেমনে?
৮ আষাঢ়, ১৩১৭

১১০
গীতাঞ্জলি
৯৮
ফুলের মতন আপনি ফুটাও গান,
হে আমার নাথ, এই তু তােমার দান
ওগাে সে ফুল দেখিয়া তানিন্দে আমি ভাসি,
আমার বুলিয়া উপহার দিতে আসি,
তুমি নিজ হাতে তারে তুলে লও স্নেহে হাসি,
দয়া করে’ প্রভু রাখ মোর অভিমান।
তার পরে যদি পূজার বেলার শেষে
এ গনি ঝরিয়া ধরার ধূলায় মেশে,
কাতি কিছু নাই,তব করতলপুটে
অজস্রধন কত লুটে কত টুটে,
আমার জীবনে ক্ষণকাল তরে ফুটে,
চিরকাল তরে সার্থক করে প্রাণি
তারা
৯ অষ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
১১১
মুখ ফিরায়ে রব তোমার পানে
এই ইচ্ছাটি সফল কর প্রাণে।
কেবল থাকা, কেবল চেয়ে থাকা,
কেবল আমার মনটি তুলে রাখা,
সকল ব্যথা সকল আকাঙক্ষায়
সকল দিনের কাজের মাঝখানে।
}
নানা ইচ্ছা ধায় নানাদিক পানে,
একটি ইচ্ছা সফল কর প্রাণে
সেই ইচ্ছাটি রাতের পরে রাতে
জাগে যেন একের বেদনাতে,
দিনের পরে দিনকে যেন গাঁথে
একের সূত্রে এক আনন্দগানে।
১: আষাঢ়, ১৩১৭

১১২
গীতাঞ্জলি
অাবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে
অাসে বৃষ্টির সুবাস বাতাস বেয়ে
এই পুরাতন হৃদয় আমার কাজি
পলক দুলিয়া উঠিছে বার বাজি’,
নূতন মেঘের ঘনিমার পানে চেয়ে।
হবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে।
রহিয়া রহিয়া বিপুল মাঠের পরে
নব তৃণদলে বাদলের ছায়া পড়ে।
“এসেছে এসেছে” এই কথা বলে প্রাণ,
“এসেছে এসেছে” উঠিতেছে এই গান,
নয়নে এসেছে, হৃদয়ে এসেছে ধেয়ে।
বার গাঢ় এসেছে আকাশ ছেয়ে।
ট, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
আজ বরষার রূপ হেরি মানবের মাঝে ;
চলেছে গরজি, চলেছে নিবিড় সাজে।
হৃদয়ে তাহার নাচিয়া উঠেছে ভীমা,
খাইতে খাইতে ললাপ করে চলে সীমা,
কোন্ তাড়নায় মেঘের সহিত মেঘে
বক্ষে বক্ষে মিলিয়া বৰ্জ বাজে ।
বরষার রূপ হেরি মানবের মাঝে।
পুঞ্জে পুঞ্জে দুরে সুদূরের পানে
দলে দলে চলে, কেন চলে নাহি জানে।
জানে না কিছুই কোন্ মহাদ্রিতলে
ভীর শ্রাবণে গলিয়া পড়িবে জলে,
নাহি জানে ত’র ঘন ঘোর সমারোহে,
কোন সে ভীষণ জীবন-মরণ রাজে।
বরষার রূপ হেরি মানবের মাঝে।
ঈশান কোণেতে ঐ যে ঝড়ের বাণী
গুরু গুরু রবে কি করিছে কানাকানি
দিগন্তরালে কোন্ ভবিতব্যতা
স্তব্ধ তিমিরে বহে ভাষাহীন ব্যথা,
কালো কল্পনা নিবিড় ছায়ার তলে
ঘনয়ে উঠেছে কোন্ আসন্ন কাজে।
বরষার রূপ হেরি মানবের মাঝে ।
১১ জামাত, ১৩১৭

১১৪
গীতাঞ্জলি
১০২
হে মাের দেব, ভরিয়া এ দেহ প্রাণ
কি অমৃত তুমি চাহ করিবারে পান?
আমার নয়নে তােমার বিশ্বছবি
দেখিয়া লইতে সাধ যায় তব কবি,
আমার মুগ্ধ শ্রবণে নীরব রহি,
শুনিয়া লইতে চাহ আপনার গান
হে মাের দেবতা, ভরিয়া এ দেহ প্রাণ,
কি অমূত.তুমি চাহ করিবারে পান।
আমার চিত্তে তােমার সৃষ্টিখানি
রচিয়া তুলিছে বিচিত্র এক বাণী।
তারি সাথে প্রভু মিলিয়া তােমার প্রীতি
জাগায়ে তুলিছে আমার সকল গীতি,
আপনারে তুমি দেখিছ মধুর রসে
আমার মাকারে নিজেরে করিয়া দান
হে মাের দেব, ভরিয়া এ দেহ প্রাণ
কি অমৃত তুমি চাহ করিবারে পান।
১৩ আষাঢ়, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
১১৫
১০৩
এই মাের সাধ যেন এ জীবন মাঝে
তব আনন্দ মহাসঙ্গীতে বাজে।
তােমার আকাশ, উদার আলােকধারা
দ্বার ছােট দেখে ফেরে না যেন গাে তারা,
ছয় ঋতু যেন সহজ নৃত্যে
আসে
অন্তর মাের নিত্য নূতন সাজে।
তব অনিন্দ আমার অঙ্গে মনে
বাধা যেন নাহি পায় কোনাে আবরণে।
তব আনন্দ পরম দুঃখে মম •
জ্বলে উঠে যেন পুণ্য আলােকসম,
তব আনন্দ দীনতা চূর্ণ করি
ফুটে ওঠে ফেটে আমার সকল কাজে ॥ X
১৩ আষাঢ়, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
১০৪
এলা আমি বাহির হলেম
তােমার অভিসারে,
সাথে সাথে কে চলে যাের
নীরব অন্ধকারে ?
ছাড়াতে চাই অনেক করে’
ঘুরে চলি, যাই যে সরে’,
মনে করি অাপদ গেছে,
আবার দেখি তারে।
ধরণী সে কঁপিয়ে চলে,
বিষম চঞ্চলতা।
সকল কথার মধ্যে সে চায়
কইতে আপন কথা।
সে যে আমার আমি, প্রভু,
লজ্জা তাহার নাই যে কভু,
তারে নিয়ে কোন্ লাজে বা
যাব তোমার দ্বারে।
১৪ আষাঢ়, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
আমি চেয়ে আছি তােমাদের সবাপানে।
স্থান দাও মােরে সকলের মাঝখানে।
নীচে সব নীচে এ ধূলির ধরণীতে
বেথা আসনের মূল্য না হয় দিতে,
যেথা রেখা দিয়ে ভাগ করা নেই কিছু,
যেথা ভেদ নাই মানে আর অপমানে,
স্থান দাও সেথা সকলের মাঝখানে।
a
যেথা বাহিরের আবরণ নাহি রয়,
যেথা আপনার উলঙ্গ পরিচয়।
আমার বলিয়া কিছু নাই একেবারে,
এ সত্য যেথা নাহি ঢাকে আপনারে,
সেথায় পঁাড়ায়ে নিলাজ দৈন্য মম
ভরিয়া লইব তাঁহার পরমদানে।
স্থান দাওমেরে সকলের মাঝখানে ?
১৫ =াষাঢ়, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
অামায় আমি নিজের শিরে
বইব না।
নিজের দ্বারে কাঙাল হয়ে
রইব না।
যােবা তােমার পায়ে ফেলে
বেরিয়ে পড়ব অবহেলে,
কোনাে খবর রা না ওর
কোনাে কথাই কইব না।
আমায় আমি নিজের শিরে
বইৰ না।
t
t
বানামাের যারেই পরশ
করে সে,
কালােটি তার নিবিয়ে ফেলে
নিমেষে।
ওরে সেই অশুচি, দুই হাতে তার
যা এনেছে চাইনে সে আর,
ছেমার প্রেমে বাজবে না যা
সে আর আমি সইব না।
আমায় আমি নিজের শিরে
বইব না ।
১৫ আষাঢ়, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি ১০৭ হে মাের চিত্ত, পুণ্য তীর্থে জাগরে ধীরে- এই ভারতের মহা-মানবের সাগরতীরে। হেথায় দাড়ায়ে দু-বাহু বাড়ায়ে নমি নর-দেবতারে, উদার ছন্দে পরমানন্দে বন্দন করি ভারে। ধ্যান-গম্ভীর এই যে ভূধর, নদী-জপমালা-খৃত প্রান্তর, হেথায় নিত্য হের পবিত্র ধরিত্রীরে, এই ভারতের মহামানবের সাগর-তীরে। কেহ নাহি জানে কার আহ্বানে কত মানুষের ধারা দুর্বার স্রোতে এল কোথা হতে সমুদ্রে হ’ল হারা। হেথায় আৰ্য, হেথা অনাৰ্য্য হেথায় দ্রাবিড়, চীন- শক হুনদল পাঠান মােগল এক দেহে হ’ল লীন।

গীতাঞ্জলি
পশ্চিমে আজি খুলিয়াছে দ্বার,
সেথা হতে সবে আনে উপহার,
দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে
যাবে না ফিরে,
এই ভারতের মহামানবের
সাগরতীরে ॥
রণধারা বাহি, জয়গান গাহি
উন্মাদ কলরবে
ভেদি মরুপথ গিরি-পর্বত
যারা এসেছিল সবে,
তারা মাের মাকে সবাই বিরাজে
কেহ নহে নহে দূর,
আমার শােণিতে রয়েছে ধ্বনিতে
তা’র বিচিত্র সুর।
হে রুদ্রবীণা, বাজো, বাজে, বাজে,
ঘৃণা করি দূরে আছে যারা আজো,
বন্ধ নাশিবে, তারাও আসিবে
দাড়াবে ঘিরে,
এই ভারতের মহামানবের
সাগরতীরে।

গীতাঞ্জলি
হেথা একদিন বিরামবিহীন
মহা ওঙ্কারধ্বনি,
হৃদয়তন্ত্রে একের মন্ত্রে
উঠেছিল রণরণি।
তপস্য-বলে একের অনলে।
বহুরে আহুতি দিয়া
বিভেদ ভুলিল, জাগায়ে তুলিল
একটি বিরাট হিয়া।
সেই সাধনার সে আরাধনার
যজ্ঞশালায় খােলা আজি দ্বার,
হেথায় সবারে হবে মিলিবারে
আনত শিরে,-
এই ভারতের মহামানবের
সাগরতীরে ।
সেই হােমানলে হের আজি জ্বলে
দুখের রক্ত শিখা,
হবে না সহিতে মৰ্ম্মে দহিতে
আছে সে ভাগ্যে লিখা।
এ দুখ বহন কর মাের মন,
শােনরে একের ডাক।
যত লাজ ভয় কর কর জয়
অপমান দূরে যাক্‌ ।

গীতাঞ্জলি
দুঃসহ ব্যথা হয়ে অবসান
জন্ম লভিবে কি বিশাল প্রাণ।
পােহায় রজনী, জাগিছে জননী
বিপুল নীড়ে,
এই ভারতের মহামানবের
সাগরতীরে।
এস হে আৰ্য, এস অনাৰ্য্য,
হিন্দু মুসলমান।
এস এস আজ তুমি ইংরাজ,
এস এস খৃষ্টান ।
এস ব্রাহ্মণ, শুচি করি মন
ধর হাত সবাকার,
এস হে পতিত, হােক অপনীত
সব অপমানভার।
মা’র অভিষেকে এস এস ত্বরা
মঙ্গলঘট হয়নি যে ভরা,
সবার পরশে পবিত্র-করা
তীর্থনীরে।
আজি ভারতের মহামানবের
সাগরতীরে।
১৮ আষাঢ়, ১৩১৭
=

গীতাঞ্জলি
১০৮
যেথায় থাকে সবার অধম দীনের হতে দীন
সেইখানে যে চরণ তােমার রাজে
সবার পিছে, সবার নীচে,
সব-হারাদের মাঝে।
যখন তােমায় প্রণাম করি আমি,
প্রণাম আমার কোন্‌খানে যায় থামি,
তােমার চরণ যেথায় নামে অপমানের তলে
সেথায় আমার প্রণাম নামে না যে
সবার পিছে, সবার নীচে,
সবহারাদের মাঝে।
s
অহঙ্কার ত পায় না নাগাল যেথায় তুমি ফের
রিক্তভূষণ দীনদরিদ্র সাজে
সবার পিছে, সবার নীচে,
সব-হারাদের মাঝে।
সঙ্গী হয়ে আছ যেথায় সঙ্গীহীনের ঘরে
সেথায় আমার হৃদয় নামে না যে
সবার পিছে, সবার নীচে
সব-হারাদের মাঝে।
১৯ আষাঢ়, ১৩১৭

১২৪
গীতাঞ্জলি
হে মাের দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান,
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।
মানুষের অধিকারে
বঞ্চিত করেছ যারে,
সম্মুখে দাড়ায়ে রেখে তবু কোলে দাও নাই স্থান
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।
মানুষের পরশেরে প্রতিদিন ঠেকাইয়া দুরে
ঘৃণা করিয়াছি তুমি মানুষের প্রাণের ঠাকুরে।
বিধাতার রুদ্ররোযে
দুর্ভিক্ষের দ্বারে বসে
ভাগ করে খেতে হবে সকলের সাথে অন্নপান।
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।
তােমার আসন হতে যেথায় তাদের দিলে ঠেলে
সেথায় শক্তিরে তব নির্বাসন দিলে অবহেলে।
চরণে দলিত হয়ে
ধূলায় সে যায় ব’য়ে
সেই নিম্নে নেমে এস নহিলে নাহিরে পরিত্রাণ।
অপমানে হতে হবে আজি তােরে সবার সমান।

গীতাঞ্জলি
‘রে তুমি নীচে ফেল সে তােমারে বাঁধিবে যে নীচে
পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তােমারে পশ্চাতে টানিছে
তাভানের অন্ধকারে
আড়ালে ঢাকিছু যারে
তােমার মঙ্গল ঢাকি গড়িছে সে ঘোর ব্যবধান।
তাপমানে হ’তে হবে তাহাদের সবার সমান।
শতেক শতাব্দী ধরে” নামে শিরে অসম্মানভার, •
মানুষের নারায়ণে তবুও কর না নমস্কার !
তবু নত করি আঁখি
দেখিবারে পাও না কি
নেমেছে ধূলার তলে হান পতিতের ভগবান,
অপমানে হতে হবে সেথা তােরে সবার সমান।
০
দেখিতে পাও না তুমি মৃত্যুদূত দাড়ায়েছে দ্বারে,
অভিশাপ আঁকি দিল তােমার জাতির অহঙ্কারে।
সবারে না যদি ডাক,
এখনােসরিয়া থাক,
আপনারে বেঁধে রাখ চৌদিকে জড়ায়ে অভিমান
মৃত্যুষাঝে হবে তবে চিতাভস্মে সবার সমান।
, আষাঢ়, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
১১০
ছাড়িসনে, ধরে থাক্ এটে,
ওরে হবে তাের জয় !
অন্ধকার যায় বুঝি কেটে,
ওরে আর নেই ভয়।
ওই দেখ পূর্বাশার ভালে
নিবিড় বনের অন্তরালে
শুকতারা হয়েছে উদয় ।
ওরে • আর নেই ভয়!
এরা যে কেবল নিশাচর
অবিশ্বাস আপনার পর,
নিরাশ্বাস, আলস্য সংশয়,
এরা প্রভাতের নয়।
ছুটে আয়, আয়রে বাহিরে
চেয়ে দেখ, দেখ্ উর্দশিরে,
আকাশ হতেছে জ্যোতির্ময়
ওরে আর নেই ভয়।
২১ আষাঢ়, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
১২৭
১১১
আছে আমার হৃদয় আছে ভরে
এখন তুমি যা-খুসি তাই কর।
এমনি যদি বিরাজ অন্তরে
বাহির হতে সকলি মাের হর।
সব পিপাসার যেথায় অবসান
সেথায় যদি পূর্ণ কর প্রাণ,
তাহার পরে মরুপথের মাঝে
উঠে রৌদ্র উঠু খরতর।
}
এই যে খেলা খেচ কত ছলে
এই খেলা ত আমি ভালবাসি।
একদিকেতে ভাসাও আঁখিজলে
আরেক দিকে জাগিয়ে তােল হাসি।
যখন ভাবি
সব খােয়ালেম বুঝি,
গভীর করে’ পাই তাহারে খুঁজি,
কোলের থেকে যখন ফো দূরে
বুকের মাঝে আবার তুলে ধর।
২১ আষাঢ়, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
গর্ব করে নিইনে ও নাম, জান অন্তর্যামী,
আমার মুখে তােমার নাম কি সাজে ?
যখন সবাই উপহাসে তখন ভাবি আমি
আমার কণ্ঠ তােমার গান কি বাজে ?
তােমা হতে অনেক দূরে থাকি
সে যেন মাের জানতে না হয় বাকি,
নামগানের এই ছদ্মবেশে দিই পরিচয় পাছে
মনে মনে মরি যে সেই লাজে।
অহঙ্কারের মিথ্যা হতে বাঁচাও দয়া করে
রাখ আমায় যেথা আমার স্থান!
আর সকলের দৃষ্টি হতে সরিয়ে দিয়ে মোরে
কর তোমার নত নয়ন দান।
আমার পূজা দয়া পাবার তরে,
মান যে সে না পায় কারো ঘরে,
নিত্য তোমায় ডাকি আমি ধূলার পরে বসে
নিত্যনূতন অপরাধের মাঝে ।
২২ আষ, ১৩১৭

১১৩
কে বলে সব ফেলে যাবি
মরণ হাতে ধরবে যবে-
জীবনে তুই যা নিয়েছি
মরণে সব নিতে হবে।
এই ভরা ভাণ্ডারে এসে
শূন্য কি তুই যাবি শেষে ?
নেবার মত যা আছে তাের
ভালো করে নে তুই তবে।
আবর্জনার অনেক বােক
জমিয়েছি যে নিরবধি-
বেঁচে যাবি, যাবার বেলা
ক্ষয় করে’ সব যাসরে যদি।
এসেছি এই পৃথিবীতে,
হেথায় হবে সেজে নিতে
রাজার বেশে চরে হেসে
মৃত্যুপারের সে উৎসবে।
২৩ আষাঢ়, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
১১৪
নদীপারের এই আষাঢ়ের
প্রভাতখানি
নেরে, ও মন, নেরে আপন
প্রাণে টানি।
সবুজ নীলে সােনায় মিলে
যে সুধা এই ছড়িয়ে দিলে,
জাগিয়ে দিলে আকাশ তলে
গভীর বাণী
নেরে, ও মন, নেরে আপন
প্রাণে টানি।
এমনি করে চলতে পথে
ভবের কূলে
দুই ধারে যা ফুল ফুটে সব
নিরে তুলে।
সেগুলি তাের চেতনাতে
গেঁথে তুলিস্ দিবস রাতে,
প্রতিদিনটি যতন করে’
ভাগ্য মানি’
নেরে, ও মন, নেরে আপন
প্রাণে টানি।
২৫ আষাঢ়, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
১১৫
মরণ যেদিন দিনের শেষে আসবে তােমার দুয়ারে
সেদিন তুমি কি ধন দিবে উহারে ?
ভরা আমার পরাণখানি
সম্মুখে তা’র দিব আনি,
শূন্য বিদায় করব না ত উহারে-
মরণ যেদিন আসূবে আমার দুয়ারে।
কত শবৎ বসন্তরাত,
কত সন্ধ্যা, কত প্রভাত
জীবনপাত্রে কত যে রস বরষে ;
কতই ফলে কতই ফুলে
হৃদয় আমার ভরি তুলে
দুঃখ সুখের আলো ছায়ার পরশে
যা- কিছু মাের সঞ্চিত ধন
এত দিনের সব আয়ােজন
চরমদিনে সাজিয়ে দিব উহারে
মরণ যেদিন আসূবে আমার দুয়ারে
২৫ আষাঢ়, ১৩৭

গীতাঞ্জলি
দয়া করে ইচ্ছা করে আপনি ছোট হয়ে
এস তুমি এ ক্ষুদ্র আলয়ে।
তাই তােমার মাধুৰ্য্যসুধা
ঘুচায় আমার আঁখির ক্ষুধা,
জলে স্থলে দাও হে ধরা
কত আকার ল’য়ে।
বন্ধু হয়ে পিতা হয়ে জননী হয়ে
. আপনি তুমি ছােট হয়ে এস হৃদয়ে।
আমিও কি আপন হাতে
করব ছােট বিশ্বনাথে ?
জানাব আর জাব তোমায়
ক্ষুদ্র পরিচয়ে ?
'৬ হাষাঢ়, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
১১৭
ওগাে আমার এই জীবনের শেষ পরিপূর্ণতা
মরণ, আমার মরণ, তুমি কও আমারে কথা
সারজনম তােমার লাগি
প্রতিদিন য়ে আছি জাগি,
তোমার তরে বহে বেড়াই
দুঃখসুখের ব্যথা ;
মরণ, আমার মরণ, তুমি
কও আমারে কথা।

১৩৪
গীতাঞ্জলি
যা পেয়েছি, যা হয়েছি
যা-কিছু মাের আশা
না জেনে ধায় তােমার পানে
সকল ভালবাসা।
মিলন হবে তােমার সাথে,
একটি শুভ দৃষ্টিপাতে,
জীবনবধূ হবে তােমার
নিত্য অনুগতা ;
রণ, আমার মরণ, তুমি
কও আমারে কথা !
বরণমালা গাঁথা আছে
আমার চিত্তমাঝে,
কবে নীরব হাস্যমুখে
আসবে বরের সাজে।
সেদিন আমার র’বে না ঘর,
কেই-বা আপন, কেই-বা অপর
বিজন রাতে পতির সাথে
মিলবে পতিব্রতা।
মরণ, আমার মরণ, তুমি
কও অামারে কথা ।
২৬ আষাঢ়, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
১১৮
যাত্রী আমি ওরে !
পারবে না কেউ রাখতে আমায় ধরে।
দুঃখসুখের বাঁধন সবই মিছে,
বাঁধা এঘর রইবে কোথায় পিছে,
বিষয়বােবা টানে আমায় নাচে,
ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে যাবে পড়ে।
p
যাত্রী আমি ওরে।
চলতে পথে গান গাহি প্রাণ ভরে।
দেহ-দুর্গে খুলবে সকল দ্বার,
ছিন্ন হবে শিকল বাসনার,
ভালােমন্দ কাটিয়ে হব পার
চলুতে র’ব লােকে লােকান্তরে।

১৩৬
গীতাঞ্জলি
যাত্রী আমি ওরে।
যা-কিছু ভার যাবে সকল সরে।
আকাশ আমার ডাকে দূরের পানে,
ভাষাবিহীন অজানিতের গানে,
সকাল সাঝে পরাণ মম টানে
কাহার বাঁশি এমন গভীর স্বরে !
যাত্রী আমি ওরে-
বাহির হলেম না জানি কোন্ ভােরে।
তখন কোথাও গায়নি কোনো পাখী
কি জানি রাত কতই ছিল বাকি,
নিমেষহারা শুধু একটি আঁখি
জেগে ছিল অন্ধকারের পরে।
।
যাত্রী আমি ওরে।
কোন্ দিনান্তে পৌছব কোন্ ঘরে।
কোন্ তারকা দীপ জ্বালে সেইখানে,
বাতাস কঁাদে কোন্ কুসুমের ঘ্রাণে,
কে গো সেথায় স্নিগ্ধ দুনয়ানে,
অনাদিকাল চাহে আমার তরে।
২৬ আষাঢ়, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
1
১১৯
উড়িয়ে ধ্বজা অভ্রভেদী রথে
ঐ যে তিনি, ঐ যে বাহির পথে।
আয়রে ছুটে টানতে হবে রসি,
ঘরের কোণে রইলি কোথায় বসি’ ?
ভিড়ের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে গিয়ে
ঠাই করে’ তুই নেরে কোনােনতে।
কোথায় কি তোর আছে ঘরের কাজ,
সে-সব কথা ভুলতে হবে আজ।
টারে দিয়ে সকল চিত্তকায়া,
টারে ছেড়ে তুচ্ছ প্রাণের মায়া,
চলরে টেনে আলােয় অন্ধকারে
নগর গ্রামে অরণ্যে পর্বতে।
.
ঐ যে চাকা ঘুরচে ঝঝনি,
বুকের
মাঝে
শুচ
কি সেই ধ্বনি ?
রক্তে তােমার দুচে না কি প্রাণ?
গাইচে না মন মরণজয়ী গান ?
আকাঙক্ষা তাের বাবেগের মত
ছুটচে না কি বিপুল ভবিষ্যতে?
২৬ আষাঢ়, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
১২
ভজন পূজন সাধন আরাধনা
সমস্ত থাকু পড়ে।
রুদ্ধদ্বারে দেবালয়ের কোণে
কেন আছিস্ ওরে ?
অন্ধকারে লুকিয়ে আপন মনে
কাহারে তুই পূজিস্ সঙ্গোপনে,
নয়ন মেলে দেখ দেখি তুই চেয়ে
দেবতা নাই ঘরে।

গীতাঞ্জলি
১৩৯
তিনি গেছেন যেথায় মাটি ভেঙে
করচে চাষা চাষ,
পাথর ভেঙে কাটুচে যেথায় পথ,
খাটুচে বারাে মাস।
রৌদ্র জলে আছেন সবার সাথে,
ধূলা
তাহার লেগেছে দুই হাতে ;
তারি মতন শুচি বসন ছাড়ি
আয়রে ধূলার পরে!
]
মুক্তি ? ওরে মুক্তি কোথায় পাবি,
মুক্তি কোথায় আছে ?
আপনি প্রভু সৃষ্টিবাঁধন পরে
বঁধা সবার কাছে।
রাখােরে ধ্যান থাকরে ফুলের ডালি,
ছিড়ক বস্ত্র, লাগুক ধূলাবালি,
কৰ্ম্মযােগে তঁার সাথে এক হয়ে
ঘৰ্ম্ম পড় ক ঝরে।
২৭ আষাঢ়, ১৩১৭

১৪০
গীতাঞ্জলি
সীমার মাঝে, অসীম তুমি
বাজাও আপন সুর ।
আমার মধ্যে তােমার প্রকাশ
তাই এত মধুর !
কত বর্ণে, কত গন্ধে,
কত গানে কত ছন্দে,
অরূপ, তােমার রূপের লীলার
জাগে হৃদয়পুর।
আমার মধ্যে তোমার শোভা
এমন সুমধুর।
তােমায় আমায় মিলন হলে
সকলি যায় খুলে,
বিশ্বসাগর ঢেউ খেলায়ে
উঠে তখন দুলে।
তােমার আলােয় নাই ত ছায়া,
আমার মাঝে পায় সে কায়া,
হয় সে আমার অশ্রুজলে
সুন্দর বিধুর।
‘আমার মধ্যে তােমার শােভা
এমন সুমধুর।
২৭ আষাঢ়, ১৩.৭
৫
৭

গীতাঞ্জলি
১৪১
১২২
তাই তােমার আনন্দ আমার পর
তুমি তাই এসেছ নীচে।
আমায় নইলে, ত্রিভুবনেশ্বর,
তােমার প্রেম হত যে মিছে।
আমার নিয়ে মেলেছ এই মেলা, .
আমার হিয়ায় চলচে রসের খেলা,
মাের জীবনে বিচিত্ররূপ ধরে
তোমার ইচ্ছা তরঙ্গিছে।
তাই ত তুমি রাজার রাজা হয়ে
আমার হৃদয় লাগি
কিরচ কত মনােহরণ-বেশে
নিত্য আছ জাগি।
তাই ত, প্রভু, হেথায় এলে নেমে,
তােমারি প্রেম ভক্ত প্রাণের প্রেমে,
মূর্তি তােমার যুগল-সম্মিলনে
সেথায় পূর্ণ প্রকাশিছে।
২৮ আষাঢ়, ১৩১৭

১৪২
গীতাঞ্জলি
১২৩
মানের আসন, আরাম শয়ন
নয় ত তােমার তরে
সব ছেড়ে আজ খুসি হয়ে
চল পথের পরে।
এস বন্ধু তোমরা সবে
এক সাথে সব বাহির হবে,
আজকে যাত্রা করব মােরা
অমানিতের ঘরে।
নিন্দা পরব ভূষণ করে
কাটার কষ্ট,
মাথায় করে
তুলে ব
অপমানের ভার।
দুঃখীর শেষ আলয় মেঘা
সেই ধূলাতে লুটাই মাথা,
ত্যাগের শূন্যপাত্রটি নিই
আনন্দরস ভরে।
২৯ আষাঢ়, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
১৪৩,
১২৪
প্রভুগৃহ হতে আসিলে যেদিন
বীরের দল
সেদিন কোথায় ছিল যে লুকানাে
বিপুল বল।
কোথায় বৰ্ম্ম, অস্ত্র কোথায়,
ক্ষীণ দরিদ্র অতি অসহায়,
চারিদিক হতে এসেছে আঘাত
অনর্গল,
প্রভুগৃহ হতে আসিলে যেদিন
বীরের দল।
প্রভুগৃহ মাঝে ফিরিলে যেদিন
বীরের দল
সেদিন কোথায় লুকালাে আবার
বিপুল বল।
ধনুশর অসি কোথা গেল খসি,
শান্তির হাসি উঠিল বিকশি;
চলে গেলে রাখি সারা জীবনের
সকল ফল,
প্রভুগৃহ মাঝে ফিরিলে যেদিন
বীরের দল।
৩১ আষাঢ়, ১৩১৭

১৪৪
গীতাঞ্জলি
১২৫
ভেবেছিনু মনে যা হবার তারি শেষে
যাত্রা আমার বুঝি থেমে গেছে এসে।
নাই বুঝি পথ, নাই বুঝি আর কাজ,
পাথেয় যা ছিল ফুরায়েছে বুঝি আজ,
যেতেঁ হবে সরে’ নীরব অন্তরালে
জীর্ণ জীবনে ছিন্ন মলিন বেশে।
কি নিরখি আজি, এ কি অফুরান লীলা,
এ কি নবীনতা বহে অন্তঃশীলা।
পুরাতন ভাষা মরে’ এল যবে মুখে,
নবগান হয়ে গুমরি উঠিল বুকে,
পুরাতন পথ শেষ হয়ে গেল যেথা
সেথায় আমারে আনিলে নূতন দেশে।
৩১ আষাঢ়, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
১১৫
আমার এ গান ছেড়েছে তার
সকল অলঙ্কার ;
তােমার কাছে রাখেনি আর
সাজের অহঙ্কার।
অলঙ্কার যে মাঝে পড়ে
মিলনেতে আড়াল করে,
তােমার কথা ঢাকে যে তার
মুখর ঝঙ্কার।
।
তােমার কাছে খাটে না মাের
কবির গরব করা,
মহাকবি, তােমার পায়ে
দিতে চাই যে ধরা।
জীবন ল’য়ে যতন করি
যদি সরল বাঁশি গড়ি,
আপন সুরে দিবে ভরি
সকল ছিদ্র তার।
০
১ শ্রাবণ, ১৩১৭

১৪৬
গীতাঞ্জলি
১২৭
নিন্দা দুঃখে অপমানে
যত আঘাত খাই
তবু জানি কিছুই সেথা
হারাবার ত নাই।
থাকি যখন ধূলার পরে
ভাবতে না হয় আসনতরে,
দৈন্যমাঝে অসঙ্কোচে
প্রসাদ তব চাই।
(*
লােকে যখন ভালাে বলে,
যখন সুখে থাকি,
জানি মনে তাহার মাঝে
অনেক কাছে ফাঁকি।
সেই ফাকিরে সাজিয়ে লয়ে
ঘুরে বেড়াই মাথায় ব’য়ে,
তােমার কাছে যাব, এমন
সময় নাহি পাই ।
২ শ্রাবণ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
১৪৭
১২৮
রাজার মত বেশে তুমি সাজাও যে শিশুরে,
পরাও যারে মণিরতন-হার,
খেলাধূলা আনন্দ তা’র সকলি যায় ঘুরে,
বসন-ভূষণ হয় যে বিষম ভার।
ছেড়ে পাছে আঘাত লাগি,
পাছে ধূলায় হয় সে দাগী,
আপনাকে তাই সরিয়ে রাখে সবার হতে দূরে,
চলতে গেলে ভাবনা ধরে তার,
রাজার মত বেশে তুমি সাজাও যে শিশুরে
পরাও যারে মণিরতন-হার।
কি হবে মা অমনতর রাজার মত সাজে,
কি হবে ঐ মণিরতন-হারে ।
দুয়ার খুলে দাও যদি ত ছুটি পথের মাঝে
রৌদ্র বায়ু ধূলা কাদার পাড়ে।
যেথায় বিশ্বজনের মেলা
সমস্তদিন নানান খেলা,
চারিদিকে বিরাট গাথা বাজে হাজার সুরে,
সেথায় সে যে পায় না অধিকার,
রাজার মত বেশে তুমি সাজাও যে শিশুরে
পরাও যারে মণিরতন-হার।
২ শ্রাবণ, ১৩১৭

১৪৮
গীতাঞ্জলি
জড়িয়ে গেছে সরু মােটা
দুটা তারে
জীবন-বীণা ঠিক সুরে তাই
বাজেনারে।
এই বেসুরাে জটিলতায়
পরাণ আমার মরে ব্যথায়,
হঠাৎ আমার গান থেমে যায়
বারে বারে।
জীবন-বীণা ঠিক সুরে আর
বাজেনারে।
এই বেদনা বইতে আমি
পারি না যে,
তোমার সভার পথে এসে
মরি লাজে।
তােমার যারা গুণী আছে
বতে করি তাদের কাছে,
দাড়িয়ে থাকি সবার পাছে
বাহির দ্বারে।
জীবন-বীণা ঠিক সুরে আর
বাজেনারে।
৩ শ্রাবণ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
১৪৯
১৩:
শাবার মত হয়নি কোনাে গান,
দেবার মত হয়নি কিছু দান।
মনে যে হয় সবি রইল বাকি
তােমায় শুধু দিয়ে এলেম ফাঁকি,
কবে হবে জীবন পূর্ণ করে’
এই জীবনের পূর্ণ অবসান !
আর সকলের সেবা করি যত
প্রাণপণে দিই অর্ঘ্য ভরি ভরি।
সত্য মিথ্যা সাজিয়ে দিই যে কত
দীনবলিয়া পাছে ধরা পড়ি।
তােমার কাছে গােপন কিছু নাই,
তোমার পূজায় সাহস এত তাই,
যা আছে তাই পায়ের কাছে আনি
অনাবৃত দরিদ্র এই প্রাণ।
৭ শ্রাবণ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
আমার মাঝে তোমার লীলা হবে,
তাই ত আমি এসেছি এই ভবে।
এই ঘরে সব খুলে যাবে দ্বার,
ঘুচে যাবে'সকল অহঙ্কার,
আনন্দময় তোমার এ সংসারে
আমার কিছু আর বাকি না রবে।
মরে গিয়ে বাঁচব আমি, তবে
আমার মাঝে তােমার লীলা হবে
সধ বাসনা যাবে আমার থেমে
মিলে গিয়ে তােমারি এক প্রেমে,
দুঃখ সুখের বিচিত্র জীবনে
তুমি ছাড়া আর কিছু না রবে ।
৭ শ্রাবণ, ১৩১৭
১

গীতাঞ্জলি
১৩২
দুঃস্বপন কোথা হতে এসে
জীবনে বাধায় গণ্ডগোেল।
কেঁদে উঠে জেগে দেখি শেষে
কিছু নাই আছে মার কোল।
ভেবেছিনু আর কেহ বুঝি,
ভয়ে তাই প্রাণপণে যুঝি,
তব হাসি দেখে আজ বুঝি
তুমিই দিয়েছ মােরে দোল।
এ জীবন সদা দেয় নাড়া
ল’য়ে ভা’র সুখদুখ ভয় ;
কিছু যেন নাই গাে সে ছাড়া,
সেই যেন মাের সমুদয় ।
এ ঘাের কাটিয়া যাবে চোখে
নিমেষেই প্রভাত-আলােকে,
পরিপূর্ণ তােমার সম্মুখে
থেমে যাবে সকল কল্লোল।
.
# শ্রাবণ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
গান দিয়ে যে তােমায় খুঁজি
বাহির মনে
চিরদিবস মাের জীবনে।
নিয়ে গেছে গান আমারে
ঘরে ঘরে দ্বারে দ্বারে,
গান দিয়ে হাত বুলিয়ে বেড়াই
এই ভুবনে।
কত শেখা সেই শেখালো,
কত গােপন পথ দেখালাে,
চিনিয়ে দিল কত তারা
হৃদ্‌গগনে।
বিচিত্র সুখদুখের দেশে
রহস্যলােক ঘুরিয়ে শেষে
সন্ধ্যাবেলায় নিয়ে এল
কোন্ ভবনে!
৯ শ্রাবণ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
১৩৪
তােমায় খোজা শেষ হবে না মাের,
যবে আমার জন্ম হবে ভাের।
চলে যাব নবজীবনলােকে,
নূতন দেখা জাগবে আমার চোখে,
নবীন হয়ে
নূতন সে আলােলাকে
পরব তব নবলিনাের।
তােমায় খোঁজা শেষ হবে না মাের
তােমার অন্ত নাই গাে অন্ত নাই,
বারে বারে নূতন লীলা তাই।
আবার তুমি জানিনে কোন্ বেশে
পথের মাঝে দাড়াবে, নাথ, হেসে,
আমার এ হাত ধরবে কাছে এসে,
লাগবে প্রাণে নূতন ভাবের ঘাের।
তােমায় খোঁজা শেষ হবে না মাের।
১০ শ্রাবণ, ১৩১৭

৫৪
গীতাঞ্জলি
যেন
আমার
শ্যে গানে মাের সব রাগিণী পূরে,
সব আনন্দ মেলে তাহার সুরে।
যে আনন্দে মাটির ধরা হাসে
অধীর হয়ে তরুলতায় ঘাসে,
যে আনন্দে দুই পাগলের মত
জীবন-মরণ বেড়ায় ভুবন ঘুরে
সেই আনন্দ মেলে তাহার সুরে।
যে আনন্দ আসে ঝড়ের বেশে,
ঘুমন্ত প্রাণ জাগায় অট্ট হেসে।
যে আনন্দ দাড়ায় আঁখি-জলে
• দুঃখব্যথার রক্ত শতদলে,
যা আছে সব ধূলায় ফেলে দিয়ে
যে আনন্দে বচন নাহি ফুরে-
সেই আনন্দ মেলে তাহার সুরে।
১১ শ্রাবণ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
১৩৬
যখন আমায় বাঁধ আগে পিছে,
মনে করি আর পাব না ছাড়া
যখন আমায় ফেল তুমি নীচে
মনে করি আর হব না খাড়া।
আবার তুমি দাও যে বাঁধন খুলে,
আবার তুমি নাও আমারে ভূলে,
চিরজীবন বাহুদোলায় তব
এমনি করে কেবলি দাও নাড়।
ভয় গায়ে তন্দ্রা কর ক্ষয়,
ঘুম ভাঙায়ে তখন ভাঙো ভয়।
দেখা দিয়ে ডাক দিয়ে যাও প্রাণে,
তাহার পরে লুকাও যে কোন্ খানে,
মনে করি এই হারালেম বুঝি,
কোথা হতে আবার যে দাও সাড়া
১১ শ্রাবণ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি ১৩৭ যতকাল তুই শিশুর মত রইবি বলহীন, অন্তরের অন্তঃপুরে থারে ততদিন। তাল্প ঘায়ে পড়বি ঘুরে, অল্প দাহে মববি পুড়ে, অল্প গায়ে লাগলে ধূলা করবে যে মলিন- অন্তরের অন্তঃপুরে থারে ততদিন। যখন তােমার শক্তি হবে উঠবে ভরে প্রাণ আগুন-ভরা সুধা ভঁহার করবি যখন পান, বাইরে তখন যারে ছুটে, থাকবি শুচি ধূলায় লুটে, সকল বাঁধন অঙ্গে নিয়ে বেড়াবি স্বাধীন, অন্তরের অন্তঃপুরে থারে ততদিন। ১৪ শ্রাবণ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
আমার চিত্ত তােমায় নিত্য হবে
সত্য হবে
ওগাে সত্য, আমার এমন সুদিন
ঘটবে কবে?
সত্য সত্য সত্য জপি,
সকল বুদ্ধি সত্যে সপি,
সীমার বাঁধন পেরিয়ে যাব
নিখিল ভবে,
সত্য, তােমার পূর্ণ প্রকাশ
দেখব কবে!
তােমায় দূরে সরিয়ে, মরি
আপন অসত্যে।
কি যে কাণ্ড করি গো সেই
ভূতের রাজত্বে।
আমার আমি ধুয়ে মুছে
তােমার মধ্যে যাবে ঘুচে
সত্য, তােমায় সত্য হব
বাঁচব তবে,
তােমার মধ্যে মরণ আমার মরবে কবে
১৫ শ্রাবণ, ১৩১৭

তাঞ্জলি
১৩৯
তােমায় আমার প্রভু করে রাখি
আমার আমি সেইটুকু থাক্ বাকি।
তােমায় আমি হেরি সকল দিশি,
সকল দিয়ে তােমার মাঝে মিশি,
তােমারে প্রেম জোগাই দিবানিশি,
ইচ্ছা আমার সেইটুকু থাক বাকি।
তােমায় আমার প্রভু করে রাখি।
তােমায় আমি কোথাও নাহি ঢাকি
কেবল আমার সেইটুকু থাক্ বাকি।
তােমার লীলা হবে এ প্রাণ ভরে
এ সংসারে রেখেছ তাই ধরে,
রইব বাঁধা তােমার বাহুডোরে
বাঁধন আমার সেইটুকু থাক্ বাকি।
তােমায় আমার প্রভু করে রাখি!
১৫ শ্রাবণ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
১৪০
যা দিয়েছ আমায় এ প্রাণ ভরি
খেদ র’বে না এখন যদি মরি।
রজনীদিন কত দুঃখে সুখে
কত যে সুর বেজেছে এই বুকে,
কত বেশে আমার ঘরে ঢুকে
কতরূপে নিয়েছ মন হরি,
খেদ রবে না এখন যদি মরি।
জানি তােমায় নিইনি প্রাণে বরি,
পাইনি আমার সকল পূর্ণ করি।
যা পেয়েছি,ভাগ্য বলে মানি,
দিয়েছ ত তব পরশখানি,
আছ তুমি এই জানা ত জানি
যাব ধরি সেই ভরসার তরী।
খেদ র’বে না এখন যদি মরি।
১৬ শ্রাবণ, ১৩১৭
এ

১৫০
গীতাঞ্জলি
১৪১
ওরে মাঝি ওরে আমার
মানবজন্মতরীর মাঝি,
শুনতে কি পাস্ দূরের থেকে
পারের বাঁশি উঠছে বাজি।
তরী কি তাের দিনের শেষে
ঠেবে এবার ঘাটে এসে ?
সেথায় সন্ধ্যা-তান্ধকারে
দেয় কি দেখা প্রদীপরাজি ?
যেন আমার লাগচে মনে,
মন্দ মধুর এই পবনে
সিন্ধুপারের হাসিটি কার
আঁধার বেয়ে আছে আজি।
আসার বেলায় কুসুমগুলি
কিছু এনেছিলেম তুলি,
যেগুলি তার নবীন আছে
এই বেলা নে সাজিয়ে সাজি
১৮ শ্রাবণ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
১৬১
১৪২
মনকে, আমার কায়াকে,
শুমি একেবারে মিলিয়ে দিতে,
চাই, এ কালাে ছায়াকে।
ঐ আগুনে জ্বলিয়ে দিতে
ঐ সাগরে তলিয়ে দিতে,
ঐ চরণে গলিয়ে দিতে,
দলিয়ে দিতে মায়াকে-
মনকে, আমার কায়াকে।
যেখানে যাই সেথায় একে,
আসন জুড়ে বসতে দেখে
লাজে মরি, লওগগা হরি’
এই সুনিবিড় ছায়াকে।
মনকে, আমার কায়াকে।
তুমি আমার অনুভাবে
কোথাও নাহি বাধা পাবে,
পূর্ণ একা দেবে দেখা,
সরিয়ে দিয়ে মায়াকে
মনকে, আমার কায়াকে।
১৯ শ্রাবণ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
১৪৩
আমার নামটা দিয়ে ঢেকে রাখি যারে
মরচে সে এই নামের কারাগারে।
সকল ভুলে যতই দিবারাতি
নামটারে ঐ আকাশ পানে গাঁথি,
ততই আমার নামের অন্ধকারে
হারাই আমার সত্য আপনারে।
জড় করে ধূলির পরে ধূলি
নামটারে মাের উচ্চ করে তুলি।
ছিদ্র পাছে হয়রে কোনােখানে
চিত্ত মম বিরাম নাহি মানে,
যতন করি যতই এ মিথ্যারে
ততই আমি হারাই আপনারে
২১ শ্রাবণ, ১৩১৭ :

গীতাঞ্জলি
১৪৪
নামটা যেদিন ঘুচাবে, নাথ,
বাঁচব সেদিন মুক্ত হয়ে
আপন-গড়া স্বপন হতে
তােমার মধ্যে জনম লয়ে।
ঢেকে তােমার হাতের লেখা
কাটি নিজের নামের রেখা,
কত দিন আর কাটবে জীবন
এমন ভীষণ আপদ বয়ে।
T
সবার সজ্জা হরণ করে
আপনাকে সে সাজাতে চায়।
সকল সুরকে ছাপিয়ে দিয়ে
আপনাকে সে বাজাতে চায়।
আমার এ নাম যাক্ না চুকে,,
তােমারি নাম নেব’ মুখে,
সবার সঙ্গে মিলব সেদিন
বিনা-নামের পরিচয়ে।
২১ শ্রাবণ, ১৩১৭

১৬৪
গীতাঞ্জলি
১৪৫
জড়ায়ে আছে বাধা, ছড়িয়ে যেতে চাই,
ছাড়াতে গেলে ব্যথা বাজে।
মুক্তি চাহিবারে তােমার কাছে যাই
ঢাহিতে গেলে মরি লাজে।
জানিহে তুমি মম জীবনে শ্রেয়তম,
এমন ধন আর নাহি যে তােমাসম,
তবু যা ভাঙাচোরা ঘরেতে আছে পপার
ফেলিয়া দিতে পারি না যে।
তােমারে আবরিয়া ধূলাতে ঢাকে হিয়া
মরণ আনে রাশি রাশি,
আমি যে প্রাণ ভরি’ তাদের ঘৃণা করি
তবুও তাই ভালবাসি।
এতই আছে বাকি, জমেছে এত ফাঁকি,
কত যে বিফলতা, কত যে ঢাকাটাকি,
আমার ভালাে তাই চাহিতে যবে যাই
ভয় যে আসে মনােমাকে।
২২ শ্রাবণ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
১৬,
১৪৬
তােমার দয়া যদি
চাহিতে নাও জানি
তবুও দয়া করে
চরণে নিয়ােটানি।

গীতাঞ্জলি
আমি যা গড়ে তুলে
আরামে থাকি ভুলে
সুখের উপাসনা
করিগাে ফলে ফুলে-
সে ধূলা-খেলাঘরে
রেখাে না ঘৃণা ভরে,
জাগায়াে দয়া করে
বহ্নি-শেল হানি।
সত্য মুদে আছে
দ্বিধার মাঝখানে ;
তাহারে তুমি ছাড়া
ফুটাতে কেবা জানে!
মৃত্যু ভেদ করি,
অমৃত পড়ে ঝরি,
অতল দীনতার
শূন্য
উঠে ভরি।
পতন ব্যথা যাবে
চেতনা আসি বাজে,
বিরােধ কোলাহলে
গভীর তব বাণী।
৫
২২ শ্রাবণ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
১৬৭
১০৭
?
জীবনে যত পূজা
হল না সারা,
জানিহে জানি তাও
হয়নি সারা।
সে ফুল না ফুটিতে,
ঝরৈছে ধরণীতে,
যে নদী মরুপথে
হারালাে ধারা,
জানিহে জানি তাও
হয়নি হারা ।
জীবনে আজো যাহা
রয়েছে পিছে
জানিহে জানি তাও
হয়নি মিছে।
আমার অনাগত
আমার অনাহত
তােমার বীণা-তারে
বাজিছে তারা,
জানিহে জানি তাও
হয়নি হারা ।
৮
২৩ শাবণ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
।
১৪৮।
'
একটি নমস্কারে, প্রভু
একটি নমস্কারে
সকল দেহ লুটিয়ে পড়ুক
তােমার এ সংসারে।
ঘন শ্রাবণ মেঘের মত
রসের ভারে নম্র নত
একটি নমস্কারে, প্রভু,
একটি নমস্কারে
সমস্ত মন পড়িয়া থাক
তব ভবন-দ্বারে।
নানা সুরের আকুল ধারা
মিলিয়ে দিয়ে আত্মহারা
একটি নমস্কারে, প্রভু,
একটি নমস্কারে
সমস্ত গান সমাপ্ত হোক
নীরব পারাবারে।
হংস যেমন মানসযাত্রী,
তেমনি সারা দিবসরাত্রি
একটি নমস্কারে, প্রভু,
একটি নমস্কারে
সমস্ত প্রাণ উড়ে চলুক
২৩ শ্রাবণ, ১৩১৭
মহামরণ-পারে।

গীতাঞ্জলি
১৪৯
জীবনে যা চিরদিন
রয়ে গেছে আভাসে
প্রভাতের আলােকে যা
কোটে নাই প্রকাশে,
জীবনের শেষ দানে
জীবনের শেষ গানে,
হে দেবতা, তাই আজি
দিব তব সকাশে,
প্রভাতের আলােকে যা
কোটে নাই প্রকাশে
কথা তারে শেষ করে
পারে নাই বাঁধিতে,
গান তারে সুর দিয়ে
পারে নাই সাধিতে।
কি নিভৃতে চুপে চুপে
মােহন নবীনরূপে
নিখিল নয়ন হতে
ঢাকা ছিল, সখা, সে
প্রভাতের আলোকে ত
ফোটে নাই প্রকাশে।

১৭
গীতাঞ্জলি
ভ্রমেছি তাহারে লয়ে
দেশে দেশে ফিরিয়া
জীবনে যা ভাঙা গড়া
সবি তারে ঘিরিয়া।
সব ভাবে সব কালে
আমার সবার মাঝে
শয়নে স্বপনে থেকে
তবু ছিল একা সে
প্রভাতের আলােকে ত
ফোটে নাই প্রকাশে
কত দিন কত লােকে
চেয়েছিল উহারে,
বৃথা ফিরে গেছে তারা
বাহিরের দুয়ারে।
আর কেহ বুঝিবে না,
তােমা সাথে হবে চেনা
সেই আশা ল’য়ে ছিল
আপনারি সকাশে,
প্রভাতের আলােকে ত
ফোটে মাই প্রকাশে।
২৪ শ্রাবণ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
১৭১
১৫০
তােমার সাথে নিত্য বিরােধ
আর সহে না,
দিনে দিনে উঠচে জমে
কতই দেনা !
সবাই তােমায় সভার বেশে
প্রণাম করে’ গেল এসে,
মলিন বাসে লুকিয়ে বেড়াই
মান রহে না।
কি জানাব চিত্তবেদন,
বােবা হয়ে গেছে যে মন,
তােমার কাছে কোনাে কথাই
আর কহে না।
ফিরায়াে না এবার তারে
লও গাে অপমানের পারে,
কর তোমার চরণ-তলে
চির-কেনা।
২৫ এাণ, ১৩১৭
।

१२
গীতাঞ্জলি
১৫১
প্রেমের হাতে ধরা দেব
তাই রয়েছি বসে;
অনেক দেরি হয়ে গেল,
দোষী অনেক দোষে।
বিধিবিধান-বাঁধন-ডােরে
ধরতে আসে, যাই যে সরে’,
’র লাগি যা শাস্তি নেবার
নেব’ মনের তােষে।
প্রেমের হাতে ধরা দেব
তাই রয়েছি বসে।
লােকে আমায় নিন্দা করে,
নিন্দা সে নয় মিছে,
সকল নিন্দা মাথায় ধরে
রব সবার নীচে।
শেষ হয়ে যে গেল বেলা,
ভাল বেচা-কেনার মেলা,
ডাকতে যারা এসেছিল
ফিরল তারা রােবে।
প্রেমের হাতে ধরা দেব’
তাই রয়েছি বসে ।
২৫ শ্রাবণ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
১৭৩
সংসারেতে আর যাহার
তামায় ভালবাসে
তারা আমায় ধরে রাখে
বেঁধে কঠিন পাশে।
তােমার প্রেম যে সবার বাড়া
তাই তােমারি নূতন ধারা,
বঁাধনাকো, লুকিয়ে থাক
ছেড়েই রাখ দাসে।
আর সকলে, ভুলি পাছে
তাই রাখে না একা।
দিনের পরে কাটে যে দিন,
তােমারি নেই দেখা।
তােমায় ডাকি নাই বা ডাকি,
যা খুসি তাই নিয়ে থাকি।
তােমার খুসি চেয়ে আছে
আমার খুসির আশে ।
২৫ শ্রাবণ, ১৩১৭

১৭৪
গীতাঞ্জলি
প্রেমের দূতকে পাঠাবে নাথ কবে?
সকল দ্বন্দ্ব ঘুচবে আমার হবে।
আর যাহারা আসে আমার ঘরে
ভয় দেখায়ে তারা শাসন করে,
দুরন্ত মন দুয়ার দিয়ে থাকে,
হার মানে না, ফিরায়ে দেয় সবে।
সে এলে সব আগল যাবে ছুটে,
সে এলে সব বাঁধন যাবে টুটে,
ঘরে তখন রাখবে কে আর ধরে
তার ডাকে যে সাড়া দিতেই হবে
আসে যখন, একুল আসে চলে,
গলায় তাহাঁর ফুলের মালা দোলে,
সেই মালাতে বাঁধবে যখন টেনে
হৃদয় আমার নীরব হয়ে রবে।
২৫ শ্রাবণ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
১৭৫
১৫৪
গান গাওয়ালে আমায় তুমি
কতই ছলে যে,
কত সুখের খেলায়, কত
নয়ন-জলে হে।
ধরা দিয়ে দাও না ধরা,
এস কাছে, পালাও ত্বরা,
পরাণ কর ব্যথায় ভরা
পলে পলে হে।
গান গাওয়ালে এমনি করে’
কতই ছলে যে !
কত তীব্র তারে, তোমার
বীণ সাজাও যে,
শত ছিদ্র করে জীবন
বাঁশি বাজাও হে।
তব সুরের লীলাতে মাের
জনম যদি হয়েছে তাের,
চুপ করিয়ে রাখ এবার
চরণতলে হে,
গান গাওয়ালে চিরজীবন
কতই ছলে যে।
২৫ শ্রবণ, ১৩১৭

৩৭৬
গীতাঞ্জলি
মনে করি এইখানে শেষ
কোথা বা হয় শেষ!
আবার তােমার সভা থেকে
আসে যে আদেশ।
নূতন গানে নূতন রাগে
নূতন করে হৃদয় জাগে,
সুরের পথে কোথা যে যাই
পাই সে উদ্দেশ!
সন্ধ্যাবেলার শােনার আভায়
মিলিয়ে নিয়ে তান
পূরবীতে শেষ করেছি
বখন আমার গান
নিশীথ রাতের গভীর সুরে
আমার জীবন উঠে পূরে,
তখন আমার নয়নে আর
রয় না নিদ্রালেশ
২৫ শ্রাবণ, ১৩১৭

গীতাঞ্জলি
১৭৭
১৫৬
শেষের মধ্যে অশেষ আছে,
এই কথাটি, মনে
আজকে আমার গানের শেষে
জাগচে ক্ষণে ক্ষণে।
সুর গিয়েছে থেমে, তবু
থামতে যেন চায় না কভু,
নীরবতায় বাজচে বীণা
বিনা প্রয়ােজনে।
তারে যখন আঘাত লাগে,
বাজে যখন সুরে
সবার চেয়ে বড় যে গান
সে রয় বহুদূরে।
সকল আলাপ গেলে থেমে
শান্ত বীণায় আসে নেমে,
সন্ধ্যা যেমন দিনের শেষে
বাজে গভীর স্বনে।
২৬ শ্রাবণ, ১৩১৭

১৭৮
গীতাঞ্জলি
১৫৭
দিবস যদি সাঙ্গ হ’লনা যদি গাহে পাখী,
ক্লান্ত বায়ু না যদি আর চলে,
এবার তবে গভীর করে ফেল গাে মােরে ঢাকি
অতি নিবিড় ঘন তিমিরতলে।
স্বপন দিয়ে গােপনে ধীরে ধীরে
যেমন করে ঢেকেছ ধরণীরে,
যেমন করে ঢেকেছ তুমি মুদিয়াড়া আঁখি,
ঢেকেছ তুমি রাতের শতদলে।
পাথেয় যার ফুরায়ে আসে পথের মাঝখানে,
ক্ষতির রেখা উঠেছে যার ফুটে,
বসনভূষা মলিন হ’ল ধূলায় অপমানে
শকতি যার পড়িতে চায় টুটে,
ঢাকিয়া দিক্ তাহার ব্যথা
করুণাঘন গভীর গােপনতা,
ঘুচায়ে লাজ ফুটাও তারে নবীন ঊষাপানে
জুড়ায়ে তা'রে আঁধার জলে।
৩০ শ্রাবণ, ১৩১৭

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Geetanjali Ed.9th

Author
Thakur ,rabindranath
Title
Geetanjali Ed.9th
File name
Geetanjali Ed.9th
Text
OCR done
Citation
1929
Published
2010/01/2
Publisher
Vishwabharati Shantiniketan,birbhum
Language
Sanskrit
Pages
196
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Thakur ,Rabindranath
DLI number
511056
Barcode
4990010018239.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
J6cvYGhitr5
Download PDF

Geetanjali Ed.9th