Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Droupadi
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
দ্রৌপদী।
( কাব্য।
শ্রীজগদীশ্বরী দেবী প্রণীত।
বৃন্দাবনচন্দ্র ভট্টাচাৰ্য কর্তৃক
প্রকাশিত।
কলিকাতা,
৮২ নং কর্ণওয়ালিস্ ষ্ট্রীট, হাতিবাগান,
নিউটন প্রেসে
শ্ৰীশ্ৰীম রায় চৌধুরী দ্বারা মুদ্রিত।
রঙ্গপুর, ১৩১১।
মূল্য ॥ আট আন্যা মাত্র
No text on this page.
উৎসর্গ পত্র ।
পরম কল্যাণীয়া-
মে
শ্ৰীমতী বিরাজমােহিনী দাসী।
মুগ্ধ ;
বৎসে,
সর্বশ্রেষ্ঠ চিত্রকর বেদের বিভাগকর্তা মহর্ষি দ্বৈপায়ন
কোমল তুলিকাদ্বারা মহাভারত-রূপ-পটে যে উজ্জ্বল চিত্র
অঙ্কিত করিয়াছেন ; যে চিত্র বিলােকন করিয়া সমস্ত জগৎ
ভারবি প্রভৃতি মহাকবিগণ অদ্যাপি যে চিত্রের
অনুলিপি করিতে যাইয়া অপারগ হইয়াছেন, আজ একটি
নিরক্ষর-অন্তঃপুরবাসিনী স্ত্রীলােক তাহার অনুলিপি
লিখিতে প্রস্তুত হইয়াছে। জানিনা, এরূপ সাহসিকতা ও
ধৃষ্টতার অর্থ কি। চিকিৎসকের উপদেশে চারিমাসকাল
শয্যা হইতে উঠিবার অধিকার ছিল না। শুইয়া শুইয়া
কি করি, পেনসিল ও পত্রের সাহায্যে হিজিবিজি লিখিতে-
ছিলাম ; তাহারই ফল “দ্রৌপদী”। অরণ্যষষ্ঠীপূজার
সময়ে পুরন্ধীগণ ব্যজনে সিন্দুরদ্বারা ষষ্ঠীর প্রতিমূর্তি
কাঙ্কিত করেন। পুত্র কন্যাগণের নিকটে সেই ব্যজন
বাহির করা হয়, সেই চিত্র তাহাদিগের নিকটে আশীর্বাদ
স্বরূপে ব্যবহৃত হয়। তুমি আমার শিষ্যা, দেবগুরু পতি-
ভক্তিতে যশস্বিনী, তােমার নিকটে আমার এই অপকৃষ্ট
চিত্রেরও অনাদর হইবে না। সেই সাহসেই তােমাকে
এই “দ্রৌপদী” প্রদান করিতেছি ; ষষ্ঠীর প্রতিমূর্তির ন্যায়
এই আশীর্বাদ-স্বরূপ—“দ্রৌপদী” গ্রহণ কর।
আশীৰ্বাদিকা-
শ্রীজগদীশ্বরী দেবী।
No text on this page.
দ্রৌপদী
(কাব্য)
ভারবির বীরনারী ভারতে উদ্গীত
পার্থপার্থিবের বধূ যজ্ঞসেনসুতা
দ্বৈতবনে দাড়াইয়া ভৰ্ত্তারে সম্বােধি,
( আছাড়ি অম্বুধিবক্ষে পড়ি শৈবলিনী
উত্তাল-তরঙ্গ তুলি বক্ষঃ আলােড়িত
করে যথা) তেমতিরে কি যেন বলিয়া
আন্দোলিত করিতেছে স্বামীর হৃদয় ;
উষ্ম-শােণিতের স্রোত বহাইয়া সতী।
বসিয়া বসুধা-তলে অজিন-আসনে
বধেশ অধােমুখে বাসব-প্রতিম
রহিয়াছে, রহিয়াছে চারিদিগে ঘিরি
ভ্রাতৃ-চতুষ্টয়, হায় ! তেমতি বদনে
একাবৃকোদর বিনা বিষাদের রেখা
সুপ্রসিদ্ধ কিরাতাক্ষ্মনায় প্রণেতা।
দ্রৌপদী।
;
ভাতিতেছে সকলের।
দূরে দ্বৈপায়ন,
উজ্জ্বল-লেচনদ্বয়, প্রশস্ত-ললাট,
পৃষ্ঠে শােভে জটাভার, ভারতের রবি,
ভারতের শ্রেষ্ঠ কবি, ভারতী-সেবক,
শিষ্যবৃন্দে নিষেবিত, করেতে লেখনী,
ভূর্জপত্রে লিখিতেছে অতিসাবধানে
কৃষ্ণামুখ-উচ্চারিত-প্রত্যেক-অক্ষর
বৃদ্ধবিজ্ঞ ঋষিশ্রেষ্ঠ ; যথা বিজ্ঞাপক।
দাড়াইয়া মহীয়সী মহীন্দ্র-মহিষী,
মহেশমহিষী-সম উন্মুক্ত-চিকুর।
পৃষ্ঠে কৃষ্ণকেশভার, জলধর-সম,
নিতম্বের নিম্নাবধি পড়িছে গড়িয়া,
তাল্পে অল্পে আন্দোলিত সমীরণভরে।
জানিনা বিজুলি কেন উঠিল জুলিয়া,
নয়নে বদনে আর কপাল-ফলকে,
পাঞ্চালীর । পঞ্চপতি সহসা মূচ্ছিত।
উজলিল বনস্থলী সহশৈবলিনী,
ভয়েতে বুজিল চক্ষু হরিণী, হরিণ,
উড্ডীন বিহগকুল গগনমণ্ডলে
পাখা মেলি, স্থির যেন রহিল থমকি।
আহাৰ্য্য-হরিণ হেরি, লক্ষ্য করি তারে
Reporter.
দ্রৌপদী। ৩ ভীষণ শাৰ্দল ঐ লক্ষ দিবে দিবে, সহসা থমকি যেন দূরে দাঁড়াইল। সহসা লেখনী ত্যজি ঋষিদ্বৈপায়ন, কিছুকাল শিষ্য-সহ হইল স্তম্ভিত । আবাল্য যাঁহার ভয় নিত্য অবিদিত, সহসা সে ঋষি আজ উঠিল। চমকি। স্রোতস্বতী, সমীরণ নিজবেগ ছডি হঠাৎ সুস্থির হ’ল। স্তম্ভিত অম্বুধি। ক্রোধ-বিস্ফৰ্জিত সেই তাড়িতপ্রবাহ আলােকিয়া বনস্থলী, কৃষ্ণাকাদম্বিনী গর্জিয়া উঠিল। যাহে ভীমের মানস- উৎসাহ-ময়ূর, পিচ্ছ বিস্তারি নাচিল । কহিল দ্রৌপদী অামি দ্রুপদ-দুহিতা। পূজনীয়-বিপ্র যদি শফ্র হয় কভু ; তথাপি ক্ষমাই নয়; যাঁহার নিকটে সেই রাজাযজ্ঞসেন আমার জনক, ভ্রাতা মোর ধৃষ্টদ্যুমু, দ্রোণে বধিবারে যাহার উদ্ভব খ্যাত যজ্ঞানল হতে । সেই প্রতিশােধ-প্রিয়-অন্বয়ে জনমি, কি করিয়া ক্ষমি আমি শত্রু-নির্যাতন। জানিহে অজাতশত্রু, তব শত্রুনাই, শিখিলে এ ধৰ্ম্ম কোথা ? কে তার শিক্ষক। D
দ্রৌপদী।
যে ধৰ্ম্মে ক্ষমার্হ প্রভু, পত্নী-নিপীড়ক।
সেইরূপ অবস্থায় প্রকাশ্য-সভায়,
চক্ষুর উপরে শত্রু আনিয়া বনিতা,
করিলে ও অন্তরীয়বস্ত্র উন্মােচন।
তথাপি ক্ষমার্হ শত্রু যে ধর্মের বিধি।
এ ধৰ্ম্মের ফলে বুঝি ত্রিদিবনগরে
দেবস। ধরিয়াছে বক্ষে সিংহাসন
তােমার নিমিত্ত, পার্থ, পত্নী যােগ্য তব
দ্রুপদকুমারী নয়, নরকের দ্বার
উম্মুক্ত যাহার জন্য, নরক-যন্ত্রণা
এ জীবনে ভুঞ্জিলাম, পরজীবনেতে
ভুঞ্জিব আবার, তব মােগ্য নই আমি।
স্বামী তুমি, কি বলিৰ ? দেখি নাই কভু,
শুনি নাই কভু, প্রভু, ঈদৃশ ধরম।
সম্পদ, বিপদ-সখা ধৰ্ম্ম-তান্তরায়,
অন্তরে বিশ্বাস যদি তবে কান্ত, কেন?
ধরিলে মুকুট শিরে হীরক-ভূষিত।
কেন ভ্রাতৃ-চতুষ্টয়ে বিপৰ্যস্ত করি,
পাঠাইলে চারিদিগে, বুঝিনা বুঝিনা,
দিগ্বিজয়ে কিবা ফল পাইলে ? রাজত্,
আমন্ত্রিয়া, রাজমণ্ডলীরে, রাজদণ্ড।
কনক নির্মিত কেন করে ধরি ? রাজা;
দ্রৌপদী। মস্তকে ধরিলে শ্বেতচ্ছত্র চন্দ্রাতপ সম ব্যোম আবরিয়া মৌক্তিকে খচিত । আমন্ত্রিয়া ঋষিমগুলীরে, কেন নাথ, তঁাদের সহকর-বিধৃত-কলস- আবর্জিত-মন্ত্রপূত-সলিল-ধারায় নিজে অভিষিক্ত হলে, দাসীরে করালে, কি উদ্দেশে? রাজসূয় অনুষ্ঠান করি পূজনীয়-ঋষিবৃন্দে যজ্ঞীয়-উজ্জ্বল- অনল-জ্বালায় দগ্ধকলেবর করি। কি ফল ফলিল ? মৰ্ম্ম কিছুই বুঝি না। শৰ্মলাভ-হেতু ধৰ্ম্ম ; সে ধৰ্ম্মে কি ফল ; যাহার উত্তর-ফল শত্রুতে অর্পণ। বুঝেছি বুঝেছি নাথ, উদ্দেশ্য তােমার। আমা সৰ৷ অপেক্ষায়, সর্বাপেক্ষা উব, প্রিয় দুষ্ট দুর্যোধন, দুৰ্জ্জয় দুৰ্ম্মতি, কষ্ট করি, যুদ্ধ করি, রাজসূয় করি, বুদ্ধিব্যয়, অর্থব্যয়, কার শক্তিৰয়, যদি সে সমর্থ নয় সাম্রাজ্য লভিতে। এ জন্য এ কৃপাপাত্র তব অনুগত ভ্রাতৃগণে, ঋষিগণে, রাজগণে পুনঃ দেহপাত করাইয়া সাম্রাজ্য ভয়া, পাশা-ক্রীড়া ছলে তাহা দিলে দুৰ্যোধনে।
দ্রৌপদী। । ধন্য ভ্রাতা দুর্যোধন, ধন্য তব স্নেহ যাহে নিপতিত সদা; অবাধ নিঝর যথা গিরি-হৃদি ফাটি পড়ে ধরাতলে। দুৰ্য্যোধন হ’তে তব ভক্ত অনুকূল ভ্রাতা এ জগতীতলে কে আছে দেখি না। প্রকাশ্য-সভায় যিনি অন্তঃপুরহ’তে কেশে ধরি বনিতারে আনি গুরুজন- সমক্ষে সভার মাঝে উলঙ্গ করিতে আদেশিল দুঃশাসনে দুঃসহ দুঃশীল। পিতা, পিতামহ, গুরু সবার সমুখে বাম উরু দেখাইল, গর্বিত, মােহিত। গুঙ্গনা পূজনীয়া শাস্ত্রের নিদেশ উপেক্ষিয়া, উপেক্ষিয়া সদাচার-বিধি, লােকলজ্জা উপপক্ষিয়া নিৰ্লজ্জ পামর। প্রিয়ভক্ত ভ্রাতা সেই ; তুমি সদা তাহে অনুরক্ত ; নিজরক্ত বহাইয়া তার উপকার করিবার পার তুমি, প্রভু। নরবর, বর- করগণ কভু অত্যাচার নিশাচর ঈদৃশ করিতে পারে না পারে না; যাহা করিল কৌবর। ধরণী-গৌরব বলি যারা অহঙ্কত। কি কহিব? পতি তুমি, ঈদৃশ ব্যাপারে
দ্রৌপদী।
৭
অধােমুখে ধরাবক্ষে রহিলে বসিয়া
অদ্বিতীয় রাজা যিনি এ মহীমণ্ডলে।
পত্নী-অপহরীরে ক্ষমিছে কভু কেউ
দেখিয়াছ? দেখাইলে আশ্চর্য জগতে।
পারে না বর্বর, কভু কিরাত, দরদ,
চীন-আদিজাতি, পশুও পারে না,
পারে না বিহঙ্গ কিংবা পতঙ্গ কীটাণু।
ক্ষমাপতি, ক্ষমাগুণ যাদৃশ তােমার,
ঈদৃশ কাহার(ও) কভু হয়নি হবে না।
অক্ষমের গুগুণ মা।
ক্ষমাগুণে কভু
কেহ এ জগতে ক্ষমা-পতি হয় নাই।
ক্ষত্রিয়ের ক্ষমাগুণ অনিষ্ট-নিদান,
প্রত্যক্ষ তাহার ফল চক্ষে বিলােকিয়া,
আর কি বলিতে চাও? নিতান্ত বর্বর
অতীতে বিশ্বাস করে। তুমি কি তাহাও
বিশ্বাস করিতে ধন্য, পারনা পারনা।
কি যে উপাদানে বিধি তােমারে গড়িছে,
সর্বংসহা বসুমতী ; ক্ষমা নাম যার
তদংশেও তােমাগড়া অসম্ভব বুঝি।
সহিতে সহিতে ধরা সহিতে পারে না,
আমার সমান ক্রোধে কম্পিত হইয়া
গর্জন করিয়া করে অগ্নি উদগীরণ।
;
দ্রৌপদী।
সুতরাং সে ধরার অংশে তব দেহ
হয়নি নিৰ্ম্মিত, রাজা। হয়নি পবনে,
অগ্নি ত কখন(ও) নয়,
সলিল-কম্পনে
এ জগৎ আপ্লাবিত মুহুর্মুহু হয়।
জলধরে নিত্য হয় বিদ্যুৎ-স্করণ ;
সুতরাং জলে জন্ম তােমার দেহের
অসম্ভব ;
অম্ভোনিধি যাহার আশ্রয় ;
সতত বাড়বানল রত্নরাজিসনে
যাহে জ্বলে। জলধির দৃষ্টান্তে কি বুঝ ?
স্পৃহনীয়-রতনে ও লােভি মানুষের
জন্মে ভয় ; পাছে যদি অগ্নি উহা হয়।
জ্বলন্ত-তেজের সনে সমুজ্জ্বল-ক্ষমা
থাকিবে হৃদয়ে ; দেখি যেন কেহ কভু
বুঝে না। বুঝিলে' পুত্র শিক্ষার সময়
ভয়শূন্য হয়ে শিক্ষা প্রতি মনােযােগ
এ ক্ষমা নহে কল্যাণ-নিদান,
অকল্যাণ-হেতু বটে। বুঝিলে কিঙ্কর
ক্ষমা আছে, ক্রমে প্রভু-শয়নে শয়ন
করে ; করে পরিধান বসন প্রভুর ।
পাদুকায় পদার্পণ করি ভাগ্যধর,
গৃহিণীর প্রতি করে কটাক্ষবর্ষণ।
‘তাহার কল্যাণ হেতু তাহার শাসন
;
দ্রৌপদী।
নিতান্ত কর্তব্য ইহা শাস্ত্র-অনুমত।
নরেন্দ্র, মুনীন্দ্ৰবৃন্দ ক্ষমার আধার
তথাপি ধর্ষণে তেজে উত্তপ্ত হইয়া
দগ্ধ করে অবজ্ঞা ; যথা তপ্ত-জল।
অতিশৈত্য বুঝি, বুঝি চন্দ্রেরে গিরীশ
ললাটে, লােচনানলে দগ্ধ করিবারে,
রাখিয়াছে। রাখিয়াছে তােমারে তেমতি
বিধাতা শাব-নেত্ৰ-দহন-উপরে।
অধৃষ্য-তপন কিংবা দহনে কদাপি
কেহ কি অর্পণ করে জানি, পাণিতল।
বিধাতা ও তেজস্বীর সন্নিধানে বুঝি
অগ্রসর হতে ভীত ; সাক্ষী দুৰ্য্যোধন।
নিরীহ-মীনেরে করে মানুষে ভোেজন,
কুম্ভীরের কাছে ভীরু’নহে অগ্রসর।
ছাগ ও হরিণ, হের নরের আহার,
শার্দল, কেশরী নয় ; বরঞ্চ তাহারা
মানুষ-শোণিতে করে তৃষ্ণা-নিবারণ ।
সূৰ্য্যবংশ চন্দ্রবংশ এক-সূৰ্য্যহ’তে
বাহিরিছে দুইশাখা, তবে কেন রাজা,
তােমাতে সূর্যের তেজ হেরিতে না পাই ?
বুঝেছি সূর্যের তেজ চন্দ্রে সংমিত
হয়ে, আলােকিতমাত্র, করে শশধরে,
দ্রৌপদী।
৫
;
ডুবে যায় উষ্ম গুণ তার শৈত্যগুণে,
তােমাতে না দেখি তাই উষ্ম-সূৰ্য্য-তেজ।
কিন্তু, কার্তবীৰ্যাৰ্জ্জুন চন্দ্রবংশােদ্ভব
হইয়াও করিয়াছে বিপক্ষ দলন।
কুন্তভােজ-রাজপুত্রী কুন্তী তেজস্বিনী
তঁাহার নন্দন তুমি কিরূপেতে বলি ?
তােমারে সম্বােধে যদি “পার্থ” বলি কেহ,
ম্রিয়মাণ হই আমি লজ্জায় তখনি।
“দ্রৌপদী” বলিলে আমি তেমনি লজ্জিতা
হই ; যেন করি আমি মাটীতে প্রবেশ ।
দিগ্বিজয়ে ভীমার্জুন, মাদ্রীসুতদ্বয়,
গিয়াছিল প্রণমিতে দেবীর নিকটে।
প্রত্যেকেরে আশীষিয়া প্রত্যেকেরে পৃথা
বীরনাদে বীরাঙ্গমা কহিতে লাগিল।
“যাও বৎস, দিগ্বিজয়ে বিজয়-নিশান
সমীরণে কঁপি যেন কঁপায় জগৎ।
পাণ্ডবের বীরগ যেন ভূমগুলে,
গর্বভরে কহে কঁপি ; স্বর্গের দেবতা
দেখি যেন হয় ভীত, বিস্মিত, স্তম্ভিত।
তব প্রত্যাগম-অগ্রবর্তী হয়ে যেন
তােমার বিজয়-গাথা আসে কর্ণপুটে।
শত্রুর ভয়েতে ভীত-জীবিত তােমারে
দ্রৌপদী।
;
প্রত্যাগত দেখিবারে ভােজরাজসুতা
চাহে না চাহে না, কুন্তী ক্ষত্রিয়কুমারী,
বরঞ্চ হইব তুষ্ট, সম্মুখসমরে
হাসিমুখে আলিঙ্গিছ সেই রণভূমি,
শ্রুতিসুখকর বার্তা যদি শুনি আমি ।
অন্ধকারে না নাশিয়া ফিরে কি তপন ?
বরঞ্চ ঢলিয়া পড়ে তস্তাচল-শিরে
হাসিমুখে। অন্ধকারে পৃষ্ঠপ্রদর্শন
করে না কদাপি
সূর ;
কদাপি করে না
তেমতি ক্ষত্রিয়শূর শত্রুরে সমরে
পৃষ্ঠপ্রদর্শন ; মাের আদেশ মানিবে,
নিশ্চয় জানিবে এই আদেশ আমার।
প্রসবি অনলে যথা অরণি সুন্দরী
সেই অগ্নিতেজে তেজস্বিনী হয় পুনঃ,
নিবিলে অনল হয় ভস্মে পরিণত ;
তেমতি তােদের তেজে কুন্তী তেজস্বিনী
হতে ইচ্ছে, যদি হও ভারত-প্রদীপ
নির্বাপিত দৈবদোষে, পতঙ্গ-পতনে,
সমর-প্রাঙ্গণে হায় ! পাণ্ডুরাজাঙ্গনা
অঙ্গারেতে পরিণত হবে অঙ্গসহ।
ইহলােক আলােকিয়া অলৌকিক-তেজে
যাও বৎস, পরলােকে, তাহে শােক নাই,
দ্রৌপদী “রােগে মৃত্যু ক্ষত্রিয়ের ঘৃণার্থ, গর্হিত,” এ উক্তির পক্ষপাতী তােদের জননী।” সেই কুন্তী ধরিয়াছে প্রথমে উদরে তােমারে কি মহারাজ, হয় কি বিশ্বাস ? কুন্তীর সহিত নাথ, কহিছে দ্রৌপদী, তমােময় কুরুকুল নিঃশেষ করিতে ভারতের সূৰ্য্য তুমি হও অগ্রসর, আলােকি ভারতভূমি, আলােকি আকাশ তান্তমন্দির-গুহা লউক আশ্রয়, পরিপন্থি-ধ্বান্ত, কান্ত ন্ত এ মিনতি মাের। বিনাশি ফিরিবে না, ভারতের রবি, বরঞ্চ বিশ্রাম নিবে অস্তাত্রি-শিখরে। হাসিয়া দ্রৌপদী-দিবা তুমি-দিবাকর- সহ হবে অস্তমিত চিরসহচরী। শিদ্যুতি বলি চন্দ্রে কলঙ্কের রেখা দেখিতে সমর্থ সবে। কে পারে জগতে দুর্নিরীক্ষ্য-সূৰ্যে কভু এ চক্ষে লােকিতে অঙ্কে কি কলঙ্ক আছে ; ছাড়ি শীতলতা করই আশ্রয় তেজে, পাণ্ডুকুল রবি। অথবা পঞ্চত্ব-লাভ পঞ্চ-পাণ্ডবের হউক, দ্রৌপদী কহে । যাহা তোমাদের নিয়ত সাধর্ম, নাথ, বুঝেছি, বুঝেছি।
দ্রৌপদী
পঞ্চত্ব না হলে কভু দুষ্ট দুঃশাসন,
পারে কি করিতে এত নিগ্রহ পত্নীর।
পঞ্চজনহিতকারী পাঞ্চজন্য নিয়ে
পাঞ্চালীর সখা ঐ পঞ্চমুখপ্রিয়
সে শঙ্খনিনাদে বিশ্ব চমকিত করি
কি কহিছে বাসুদেব ? বসুধাবাসব,
কি ভ্রান্তি ! বধির তুমি শোননা শ্রবণে।
নরহরি হরি তব পক্ষেতে রহিতে
হরিবিরহিতপক্ষহ’তে কিসে ভয় ?
নারী আমি নারী আমি, নারি তা বুঝিতে।
নরপতি, নরকারি তােমারে রক্ষিতে
আপনি নিযুক্ত কৃষ্ণ ধরি সুদর্শন।
কেন ভ্রান্ত তুমি নাথ, ভ্রাতৃচতুষ্টয়
ভুচতুষ্টয় তব তুমি নারায়ণ,
কেন লক্ষ্যভ্রষ্ট তুমি ? লক্ষ্যভ্রষ্ট কভু
নারায়ণ হইয়াছে শুনি নাই নাথ।
অসুরে হরিছে লক্ষ্মী, এই চতুভু
বিনাশি
অসুরে লক্ষী উদ্ধার ; যেমতি
অযোধ্যার রাজলক্ষী উদ্ধারে রাঘব।
তােমার হস্তেতে নাথ, সদা ভ্রাম্যমাণ
ছিল এই রাজ্যচক্র। সে চ• এখন
অপিয়াছ কার হস্তে ? সে কি যােগ্য তার?
;
১৬
দ্রৌপদী।
দেখ না ভারতভূমি আমার সমান
অনাথার, প্রায়, নাথ, হের অশ্রমুখী,
কাঁদিয়া আকুল হয়ে কাঁদায় জগৎ।
ভারতের দুঃখে ও কি তােমার হৃদয়
না হয় আপ্লত, যারে সদা সাবধানে
প্রীতিনেত্রে বিলােকিতে, পালিতে ভূপতি,
নিজ স্বার্থ বিসর্জিয়া, যার সুখ লাগি,
সতত সতর্ক ছিলে, ভুলিলে কি তারে ?
সর্বকৰ্ম্ম, সর্বধৰ্ম্ম, পরিহরি রাজা,
যার সুখবৃদ্ধি হেতু ছিলে যত্নপর।
অর্চনা, বন্দনা, কিম্বা যজ্ঞানুষ্ঠান,
ব্রাহ্মণ-সেবন-আদি প্রতিকার্যে সদা
বিদ্যা, বুদ্ধি, ধৰ্ম্ম, নীতি, স্বাস্থ্য, আয়ুঃ, বল,
ধন, ধান্যে সমুন্নতি 'ভারতভূমির
হউক ; বলিয়া ছিল প্রার্থনা তােমার।
নিজের উন্নতিহেতু ছিলনা কদাপি।
যাহার উন্নতিচিন্তা করিতে করিতে
জাগিয়া ঘুমাতে, তুমি, জাগিতে নিদ্রায়।
হায় ! নাথ, দেখ তার কি দশা এখন।
দুঃশাসনপাপহস্তে সমর্পিয়া তারে,
স্বার্থান্ধপাথর ঐ রাজা দুৰ্য্যোধন
কোষপূর্ণ করিতেছে, নানা উপায়েতে
দ্রৌপদী।
প্রজার সর্বস্ব দুষ্ট করিয়া লুণ্ঠন।
তৃণগৃহপৃষ্ঠে দিয়া গনলে আসন,
যে করে তাহাতে গৃহরক্ষার প্রার্থনা,
করুক প্রার্থনা সেই স্বার্থান্ধ হইতে
প্রজার উন্নতি। হয়, নিৰ্দ্ধন করিয়া
বসুধারে, বসুধারা নিজকোষ গৃহে
রষিছে নিরন্তর পাপী দুর্যোধন।
ভীষণ শ্বাপদ বুঝি, বুঝি মধুরতা
গোদুগ্ধ গাভীর রক্ত, মাংস অস্থি আদি
কিছুই ছাড়ে না, তাই রাজা দুৰ্যোধন
তামৃত লভিয়া পুনঃ তামৃত উদ্দেশে
নির্দয় রূপেতে নিত্য মথিছে ভারত।
অবশ্য ইহার ফল উঠিবে নিশ্চয়
কালকূট বাড়বাগ্নি; যাহা নিবাইতে
পারিবে না কেহ কভু ; যাহার প্রভাবে
ক্ষণেকে ক্ষত্রিয়কুল হইবে নিৰ্ম্মল ।
জলধার। বরষিলে, তক খাদ্য সার
পিলে পাদপমূলে, তার বাসভূমি
রাখিলে নিয়ত পরিস্কৃত, হন্তরায়
নিবারিলে নির্বাধ হাতপ, হাতপাঃ,
নির্বাপমেঘের জল, নিলাধজোছগ,
নিধিসমারভোগে অধিকার দিলে ।
দ্রৌপদী।
অজস্র সহস্রফল নিরন্তর তরু
বিতরে প্রচুরতর সুপক্ক আপনি।
দেখনা ধন্যিদিশস্থ আতপ বরষা
ভােগী, ভােগী, প্রান্তরেতে আহাৰ্য্য নরের
বুকে ধরি নিজরসে পরিপুষ্ট করি
আপন জীবন ত্যজি ৰিতরে মানুষে।
• দেখনা কদলীত পমিষ্টকল
বিতরি পালকহস্তে সন্ততির সহ,
আলিঙ্গে মঙ্গলময়ী-জননী-অবনি।
আপন কল্যাণহেতু প্রজার কল্যাণ
তরুর দৃষ্টান্তে সদা বুদ্ধিমান্ রাজা,
সংসাধিবে ; অতিলোভে প্রজার বিনাশ,
প্রজার বিনাশে ধ্রুব রাজার বিনাশ।
আহারে গাভীর হয় দুগ্ধের বর্ধন,
দুগ্ধের বর্ধনে হয় বৎসের বর্ধন,
পালক প্রচুরদুগ্ধে হয় অধিকারী,
বর্ধিত বৎসেও হয় তারি উপকার।
এ সমস্ত না চিন্তিয়া গাভীর আহারে
যে করে কার্পণ্য ; পুনঃ নির্দয় হইয়া
কৃশবৎসে না করিয়া করুণাবর্ষণ
অত্যন্ত দোহন করে ; তার পরিণাম
কি বুঝাব ? মহারাজ, তুমি ধৰ্ম্মরাজ,
দ্রৌপদী।
;
;
এ সব উদ্দেশ্য নাথ, অবশ্য তােমার
স্থানপ্রাপ্ত হয় নাই ; কৰ্তব্যতা বােধ,
স্বধৰ্ম্ম ও দয়া তােমা করিছে প্রেষিত,
ধৰ্ম্মজ্ঞান, দয়াবৃত্তি কর্তব্যতাবােধ
পাপাত্মার কভু নাই ; পাপী দুৰ্য্যোধন।
স্বার্থান্ধ না বুঝে স্বার্থ ; আশ্চৰ্য্য এ বড়!
আশ্চৰ্য্য এ বড়! তারে তুমিও না বুঝ।
প্রপ্রীড়িত প্রজাগণ ; তােমার বিরহে
অত্যন্ত কাতর তারা ; এ আশ্চর্য্য বড়।
সময় বুঝনা রাজা ; যদি অরণ্যানী
ত্যজি রাজ্যে গিয়া কর অভয়প্রদান,
অসহায় প্রজাগণে; তা হলে নিশ্চিত
রাজভক্ত প্রজাগণ, জীবনের আশা
ত্যজিয়া তােমার হেতু হবে অগ্রসর
কোষােম্মুক্ত করল গ্রহিয়া স্বকরে।
তােমারে করিতে রাজা মিলি প্রজাগণ
এসেছিল ধৃতরাষ্ট্র নিকটে; কি তুমি
তাহাও বিস্মৃতি জলে বিধৌত করেছ ?
ধৰ্ম্মতঃ তুমিই রাজা, জানে প্রজাগণ
ছলে ওকৌশলে তােমা করি নির্বাসিত
লয়েছে বিপুল রাজ্য ; সে যে,রাজা নয়
জানে প্রজাগণ তাহা, রাজভক্তি তারে
;
দ্রৌপদী ।
করে না এ হেতু ; পুনঃ তার আচরণে
উপদ্রুত, উত্তেজিত, পুনঃ প্রধুমিত,
সামান্য ফুৎকারে অগ্নি নিশ্চয় জ্বলিবে,
জ্বলিয়া করিবে দগ্ধ ধৃতরাষ্ট্রকুল।
বরিকুল-চূড়ামণি-কে
-কেশরীকেশব,
তােমার সহায়, রাজা, পাঞ্চালাধিপতি
দ্রুপদ পুত্রের সহ খড়গপাণি ঐ
তােমার কারণে আছে, কর নেত্রপত
কিসে তুমি অসহায় ? যাহার গাণ্ডীব
গর্জনে অধৈৰ্য্য হয় মানব, দানব,
অমরের মৃত্যুভয়ে ভাবে পরমদ।
তৃতুল্য কৌরবেরা, গণেন। দ্রৌপদী,
কৃতান্তের কালদণ্ড সমান ভীষণ
হের না এ গদা, রাজা, গদাগ্ৰজ যারে
নিয়ত প্রশংসা করে ; গদাধরসম
যদি হয় গদাধর তব বৃকোদর,
কারে ভয় কর ? তুচ্ছ কর্ণ, দুঃশাসন,
সিংহের সাহায্য লভি ভয় কি জন্ধুকে ?
রমণী বলিয়া মােরে ভাবিবে না, প্রভু,
ক্ষত্রিয়কুমারী আমি, যে রক্তে ক্ষত্রিয়
জনমি বীরজে করে এ বিশ্ব বিস্মিত।
ষার স্তন্যদুগ্ধে হয় শােণিতের বল,
দ্রৌপদী।
স্নায়বিকল, আর হৃদয়ের বল,
নির্বোধপুরুষজাতি রমণীজাতিরে
বিলাসসামগ্রী বলি, ভাবে নিরন্তর
তান্তরেতে। তারায়-কান্তারে স্বকরে
কৰ্ত্তিত করিয়া কান্ত, হব তাগ্রসর ।
নহে পাঞ্চালিকাসম এ পাঞ্চালী তব,
পাঞ্চজন্যনাদে যার বীৱমদে মন
নৃত্য করে ; ইচ্ছা করে নিজ করে হাসি-
গ্রহিয়া উন্মত্ত ভাবে প্রবেশি সমরে।
দু:শাসন-করােক্ত-বিপুল-কবরী
দ্রৌপদ। অদ্যাপি পুনঃ করেনি বন্ধন।
কি আর লজ্জার কাছে ? লজ্জানিবারণ-~-
বস্ত্র উন্মােচিতে যবে হ’ল অগ্রসর
দদুঃশাসনদূষ্যপাণি; সভাস্থলে,
কি আছে লজ্জার আর দ্রৌপদীর প্রভু,
তদবধি নগ্ন। আমি, নিশ্চয় জানিনবে।
কৃষ্ণা আমি ; পঞ্চমুখ নিয়ত যাহার
স্তুতিপাঠে রত ছিল
; দুর্দম দানব
হরিতে উদ্যত যারে ; কোথা ভূতপতি ?
কোথা পতিমম ? হায় ! কোথা ভীমপতি ?
ভূমে পতি শবতুল্য নিশ্চেষ্ট হেরিনু।
শুনেছি বাসের মুখে শিবসীমন্তিনী,
দ্রৌপদী।
কৃষ্ণা পূর্বে মুক্তকেশী অসি নিয়ে করে,
নগ্নবেশে প্রবেশিছে সমরপ্রাঙ্গণে,
দানবের ভয়ে যবে আমরমগুলী
আশ্রয় লইয়াছিল গহনকাননে।
নগ্নতীক্ষ্ণখরধারঅসি করে করি
কৃষ্ণা অনুবর্তী হয়ে দেববধূগণ
অবতীর্ণ হয়েছিল ; তেমতি সমরে।
বুঝাইব ভারতীয়াভগিনীগণেরে
তােমাদের অসহায় একটী ভগিনী
দুর্বত্তদসুর করে হয়েছে লাঞ্জিতা।
নিবে না, ভগিনীগণ, প্রতিশােধ তার ?
রক্ষক বলিয়া মােরা পুরুষ জাতিরে
সসম্মানে সদা করি অর্চনা, বন্দনা।
প্রপীড়িত হইলেও ক্ষুধায় তৃষ্ণায়,
উদর বাঁধিয়া করি আহার অর্পণ ;
তার বুঝি প্রতিদান এ ঘাের লাঞ্ছনা,
বরঞ্চ বঞ্চক যদি লাঞ্ছনপ্রয়ােগ
করিয়া পাঞ্চালীর তীক্ষঅসিধারে
কৰ্ত্তিত করিয়া শিরঃ পাতিত করিত,
বুঝিতাম অনুগ্রহ গ্রহগণ মােরে
করেছে নিশ্চয় ; হায় ! বুঝিনা কারণ,
এমন বিপুলসভা হয়নি কখন।
;
দ্রৌপদী।
গণিকার নৃত্য যারা পিতা পুত্রে কভু
এক সভা আরােহিয়া বিলােকে না, হায় !
হায়! তারা দ্রৌপদীর প্রতি একুৎসিত
লজ্জাকর-ত্যাচার-বিলোকনহেতু
একত্রিত হইয়াছে সে মহাসভায় !
সে আমােদ বিলোকিতে সবে সমবেত !
ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপাচার্য্য, অশ্বথামাদি
বীরগণ পিতাপুত্রে মিলিত সকলে,
বৃদ্ধরাজধৃতরাষ্ট্র সভা ধিরূঢ়।
সমাজের ভয়ে আর কনভয়ে
পাপী ও প্রত্যক্ষে পাপ করিতে পারে না।
বৃদ্ধপিতা, বৃদ্ধগুরু, বৃদ্ধপিতামহ,
সবার সম্মুখে পুনঃ সমাজ করিয়া
বল করি কুলবধূ সায় আনিয়া,
কনিষ্ঠ ভ্রাতার দ্বারা নগ্ন করিবারে
অনুমতি দিল জ্যেষ্ঠ ; কনিষ্ঠসোদর
বস্ত্র উন্মোচিতে, লজ্জা ! প্রবৃত্ত তখনি,
কি বলিব ? হায়! হায়! সবার সম্মুখে
কুলজারে কটাগিয়া নিজউরুদেশ
বস্ত্র উন্মোচিয়া তারে দেখাইল পাপ।
রহিল না ধৰ্ম্ম,
আর সহিল
এই বসুন্ধরা দেবী, হায়রে! তখনি
;
এ পাপ
দ্রৌপদী।
বজনিনাদেতে কেন কাপিল না ধরা,
অগ্নিউগিরণ করি, ভস্মে, পরিণত
করিল না সেই ক্ষণে, সে ক্ষত্রিয়সভা।
প্রাপঅভিনয়কারী সেই রঙ্গায়
গ্রাসিল না কেন ধরা ? যে ধরা, স্বামীর
* অত্যাচারে অভিভূত, ভূতপতিজায়া-
সমান আদর্শসতী সীতা তেজস্বিনী,
মানবের পাপচক্ষুঃ তারে বিলােকিতে
অসমর্থ, ভাবি তারে করিছে উদরে।
তৃণাবর্ত, বাতাবৰ্ত্ত, সে পাপ-বত্মের
বিধ্বংসিতে প্রবর্তিত হ’লনা তখনি।
সভাশিরে, কিংবা মাের শিরেতে তখনি
হইল না বজ্রপাত! গম্ভীর গর্জনে
অম্বুদের। কুম্ভিশ্রেষ্টপৃষ্ঠে আরোহিয়া
জম্ভারির বৃথা দম্ভ, ধরিয়া দম্ভোলি।
অস্তোনিধি স্ফীত হয়ে হস্তিনানগরী
করিল না জলমগ্ন, কবে রে, প্রলয়
করিবে করাল কাল ? অপেক্ষ। কি আর ?
আছে কি অধিক পাপ ? থাকিতে পারে না,
কোথা রাম জামদগ্ন্য ? যার ক্রোধাগ্নিতে
নগু-তীক্ষ্ণ-কুঠারের ধারারূপ
দুর্বত্ত-ক্ষত্রিয়-কণ্ঠ-চু ত-রক্তধারা
দ্রৌপদী। অজস্র অর্পিল উষ্ম-পূত-ঘৃতাহুতি কোথা রাম ? প্রশমিত কেন ক্রোধানল ? শিষ্য-ভীষ্ম হতে নাকি তিনি পরাজিত ? শুনিয়াছি, ভীষ্ম-উষ্ম-গ্নেয়গিরির সহিতে না পারি, উষ্ম-অজ-নিসৃত--- শর-শত-ধাতুদ্রব ; ভঙ্গ দিল রণে। দেবব্রত সত্যব্রত দৃঢ়ত যিনি, অাকৌমার ব্রহ্মচর্যব্রতেতে দীক্ষিত। সেই ভীষ্ম কি করিয়া সেই সভাতলে অধিষ্ঠিত ? অনুষ্ঠিত যাহে হেন পাপ। গবিতরামের যিনি গর্বিতগুরুর গর্বচূর্ণকারী; যার ভয়ে দেবাসুর সদাভাত ; সদাভীত মহর্ষিমণ্ডলী যার সত্যনিষ্ঠা ব্রহ্মচব্যনিষ্ঠা হেরি। জানি না, ভগিনীগণ, তিনি কার ভয়ে সভাস্থলে জড়াভূত, কেন কণ্ঠরোধ হয়েছিল ? কোথা গেল শৌর্য, বীৰ্য্য তার ? ঘাঁহাকে আশ্রয় করি, ঈদৃশ গর্বিত মহাপাপ দুর্যোধন ; কার ভয়ে তঁার বাক্যস্ফৰ্ত্তি হইল না ? কি করি এ পাপ- অভিনয় বিলােকিল ? বুঝি না বুঝি না, কোথা তার সত্যব্রত ? কোথা বা বীরতা ? ; ৩।
দ্রৌপদী।
দহস্ত হ’তে এই একটী রমণী
অসহায় নিজকুলবধূরে রক্ষিতে
পারিল না; ধরিল না তখনি কামুক
উচ্ছেদিতে গঙ্গাত কুলাঙ্গারগণে।
আমরা, অমরবালা-সমান সমরে
প্রবেশিব, বিনাশিব বৈরিকুরুকুলে ।
যুঝিব যখন মােরা, বুঝিব তখন
কি করেন দেবব্রত ? সাধুচূড়ামণি,
ব্রীড়াঅবনতমুখে সমুখে আমারে
তদবস্থ হেরি, শুনি করুণদেন,
সভায় ছিলেন যিনি, করেনি করুণা,
কিছুই শুনেনি যেন বধিরের প্রয়
তারাজ মন্ত্রীবর, দেখেনি কিছুই,
অর্ধাঙ্গরােগীর মত গঙ্গেয় তখন
নিজঅঙ্গচালনে ও ক্ষমতাবিহীন।
দেখিব ভগিনীগণ, আস্ফালিব যবে
স্ফটিকসদৃশ স্বচ্ছধারা তরবারি।
বিজুলির মত জ্বলি শত্রুস্কন্ধদেশে
প্রযুক্ত হইবে, যবে ভুজঙ্গীর মত
শত্রুপ্রাণবায়ুপনে ধাবিত হইবে,
কি করেন,ভীষ্মদেব দেখিব তখন ।
হবে কি না হবে তঁার হবে মিলন ।
দ্রৌপদী ।
দুৰ্য্যোধনরক্ষাহেতু কোদণ্ড টঙ্কারি
হবে নাকি অগ্রসর দোর্দণ্ড প্রতাপে,
ধীরতার সহ কোথা যাবে বধিরতা
মূঢ় অন্ধতা ; ভার হইৰে প্ৰস্থিত।
উত্মরশ্মিসম ভীষ্ম হবে অগ্রসর,
মেদিনীরে তাপাণ্ডবা দুৰ্য্যোধনহেতু
করিবারে, ধৰ্ম্মসেতু সেই মহারথী।
জানিবে, ভগিনীগণ, নিশ্চয় জানিবে ;
যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষত্রিয়ের প্রতিকূলে যদি
কুলগুরু অবতীর্ণ ; উদীৰ্ণ বিক্রমে
পূজার ব্যবস্থা তঁার বিশিখ-বর্ষণ।
তামরা ভগিনীগণ, ক্ষত্রিয়কুমারী,
ভুলিব না সে ব্যবস্থা সমর প্রাঙ্গণে।
দুৰ্যোধন প্রতি তার কৃপাপ্রবণতা।
উন্মত্তকৃপাণগ্রে দেখাব জগতে।
ভীষ্মের পবিরক্ত করিবারে পান
কৃষ্ণার নাচিবে কৃষ্ণা অসি-নিশাচরী।
ক্ষত্রিয়া হইয়া কেন দয়া ভিখারিণী
হইব ? ভগিনীগণ, দেখনা ভাবিয়া।
ভিক্ষায় কে কোথা কবে পেয়েছে সম্মান ?
বিনয়ের বিনিময়ে এ লাঞ্ছনা ম*।
অয়োময়-হৃদয়েতে বর্ষি অশ্রুজল
দ্রৌপদী।
;
আর্দ্র করি, কোমলতা কে পারে আনিতে?
শক্তিবিনিময়ে ভক্তিলাভ সুনিশ্চিত।
শত্ৰুবলিদান করি ; শত্রুর শােণিতে
করিব ভগিনীগণ, শক্তি আরাধনা !
যার গর্ভে বাস করি, যাঁহার শােণিতে,
পরিপুষ্ট হয়ে কালে প্রসূত হইয়া,
পুনশ্চ যাহার
স্তন্যদুগ্ধে প্রবর্ধিত
হস্তপ্রক্ষালনজল লবণের সহ
যাহার করিয়া পান ধরে না বদনে
হাসি রাশি, দেহে বল, হৃদয়েতে বল,
লাবণ্যতরঙ্গ অঙ্গে জোছনার মত,
উছলি পড়িছে ; তারে চিনে না পামর,
চিনে না সে দেবতারে, দাসী মনে করে,
দুবৃত্তপুরুষজাতি।” তার প্রতিশােধ
নিবে না ভগিনীগণ, শক্তিস্বরূপিণী
আরাধ্য দেবতা স্বামী ; তাহার অৰ্চ্চনা
অবশ্য করিব মােরা, আত্ম-সুখবলি
দিব তার পদে ; কিন্তু জানিবে নিশ্চিত,
শক্তিসত্ত্বে প্রেমে পূজা ; অশক্তের পূজা,
"আত্মরক্ষা স্বার্থ যেন আছে তার মাঝে
পতিব্রতা মােরা কভু জ্বলন্তঅনল—
প্রবেশে হই না ভীত, মরণের ভয়
।
দ্রৌপদী।
২৭
নাই কভু ; তবে কেন সমরের ভয় ?
এক স্বামী বিনা এই সমস্ত ভুবন
মেই চক্ষে হেরি ; যেন নিজগর্ভজাত
যথা দুর্গা অনর্গলদয়ানিঝরিণী
সমস্ত জগৎ ভাবে নিজগর্ভজাত ;
জগদম্বনামে খ্যাত শ্যুনিতম্বিনী।
আমরাও নারী জাতি, হৈমবতী-সতী-
সমান, সমস্তবিশ্ব স্নেহচক্ষে সদা
নেহারিক পুত্রসম ।
যে পাপ মলিন--
. কাম-তৃষ্ণা-তরঙ্গিত-অপাঙ্গে হেরিবে,
উত্তমাঙ্গ ঢুত তার স্কন্ধকন্দ হ'তে
করিতে ধাবিত যেন হয় অসিলতা ;
শম্ভুজায়অসি যথা শুম্ভ নিশুন্তের ।
সতী-শিরােমণি সীতা,লাবণ্য-চন্দ্রিকা,
কি দু গ্রহ! দশ গ্রীব তাহারে নেহারি
হরি হরি হরি নিল জলধির পারে
পাপাত্মা পাশব-বলে । হায় রে । জানকী
তার রক্তে বহাইতে নারিল মেদিনী,
আত্মরক্ষা করিতে ও অশক্ত হইয়া
কেবল কঁাদিয়া বৃদ্ধবিহগে কাদাল
অশ্রুসিক্তদেহ পুনঃ রক্তসিক্ত হয়ে
সীতাহেতু অশ্রুসহ ত্যজিল পরাণ
*. -
!
২৮ দ্রৌপদী। ; ধাৰ্মিক বিহঙ্গরাজ ; কিন্তু ভীষ্ম, দ্রোণ ভুজঙ্গম্মুখে আৰ্ত্তাভেকীর সমান-- দ্রৌপদীরে হেরিয়া ও করিল না কিছু। মদনবিহ্বলদশস্কন্ধেরে হেরিয়া, বিসর্জিল বেদবতী আনলে পরাণ ; কিন্তু কাত্যায়নী সেই দনুজরাজের প্রস্তাবে উপেক্ষা করি, গর্বিতবচনে বলিল, “লইতে ইচ্ছা, বাধা নাই তাহে যুদ্ধে জয় করি লও, যাইব আপনি।” কালীর অকাল-জাত-জলদ-গর্জনে উত্তেজিত দৈত্যকুল, সমরে আসিয়া চলি গেল, ফিরিল না, পুনশ্চ অদ্যাপি। মুক্তাহার পরিহরি মুণ্ডমালা পরি, শত্রুর শােণিতে দেহ চৰ্চিত করিয়া, কি শিক্ষা দিয়াছে কালী রমণী জাতিরে । যার অনুগত হয়ে স্বামীর সােহাগ ভুলিয়া, সমরাঙ্গনে সুরাঙ্গনাগণ অবতরি তরবারি দক্ষ করে ধরি রণদক্ষদৈত্যরক্তে বহাইলা নদী। আমরাও সেই জাতি, সেই মহাব্ৰত অনুষ্ঠিয়া উদযাপিব, শকুরুকুল- পশুকুল বলি দিয়া, শােণিতধারায় দৌপদী। ২৯ = শীতল করিব ধরা। চল ত্বরা করি। আৰ্ত্তৰন্ধু কৃষ্ণচন্দ্র, সিন্ধু করুণার সিন্ধুপরিখার মাঝে দ্বারকাপুরীতে, যথারীতি যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষায় শিক্ষিত যদুকুলবধূ আর যদুকুলবালা সবারে করেছে, তারা সবে বীরবরা। ধৰ্ম্মনীতি প্রভৃতিতে যিনি অদ্বিতীয়। শ্রীকৃষ্ণভূষণা ধর। উশণা-গীতি- পুষ্পমৌলি-দি বস্পতি-নগরীর প্রতি ভঙ্গী করিছে ; সেই কৃষ্ণ-অনুষ্ঠিত কারে বুঝিনু, এতদিনে প্রয়ােজন। • কৃষ্ণের ভগিনী ভদ্ৰা কৃষ্ণের সমান তাশ্বচালনায় কিংবা অস্ত্রচালনায় সুশিক্ষিতা ; ক্ষিতিতলে কে তুল্য তাহার ? যদুকুলবধূচতুরঙ্গিনীসহায়ে কৃতুল্য সুভদ্রারে সারথি করিয়া, আরােহিয়া কপিধ্বজে অর্জুনসমান গাওঁবিকোদণ্ড ধরি উতরিব রণে। পাঞ্চজন্য বাজাইয়া ভদ্রা বীরবধু, মম নিনাদিত দেবদত্ত-শঙ্খ-ভব- দুঃসহ-নিনাদ সহ ব্যোম-ভূমি সহ কাপাইবে যুগপৎ শত্রুর হৃদয়।
দ্রৌপদী। প্রশান্তজলধিসম শান্ত-শান্তনবে অস্ত্ররাশি-প্রভঞ্জনে তরঙ্গ তুলিব। শিখণ্ডী আমার জ্যেষ্ঠ ; তারে নারী ভাবি ধরে না ধনুক ভীষ্ম। অশ্মতীক্ষ্ণশর মম করােম্মুক্ত যবে উঠিবে, উড়িবে গৃপঙক্তিসম ব্যোমে শােণিত-পিপাসু দেখি কি করি করে ব্রত রক্ষা তার দেবব্রত। রণচণ্ডী শিখণ্ডি-ভগিনী আখণ্ডলে রক্ষিলেও ছাড়িবে না তারে। ভূমণ্ডল অকৌরব করিবে দ্রৌপদী। ভীষ্মপূজা উদ্যাপিয়া, তারে বিসর্জিয়া, অসীম-তানন্তকাল-জলধি-সলিলে। দেখাব গুরুরে তার শিষ্যসীমন্তিনী তার যােগ্য বটে কিনা ? কনকবলয় করে না কেবল শােভা এই করমূল, সহিতে সমর্থ সত্য মোঞ্জীর আঘাত। কেবল তঁাহার শিষ্য তার মন্ত্রপূত- প্রদত্ত-অস্ত্রের পূজা করে না; তাঁহার প্রিয়তমা পাঞ্চালীও করে অস্ত্র পুজা। পূজিত সে অস্ত্রপুঞ্জে ফুষ্পবৃষ্টি করি, পিতৃবন্ধুদ্রোণাচার্য্যে করিয়া অর্চনা মৃন্ময়শিবের তুল্য সংহারমুদ্রায়
দ্রৌপদী।
বিসর্জিয়া, অগ্রসর কর্ণ-অগ্রে হব
অর্জুন-মহিষী তঁার তৰ্জ্জুনসহিত :
রণাকাঙক্ষা নিবারিবে, শরবারিরাশি
বরষি হরষি তারে বুঝাইয়া দিব,
কারে “দাসী” বলেছিলে, চিন কি তাহারে ?
জ্বলন্তঅনলকল্প একটী একটা
সুতীক্ষ-বিশিখে তার স্পর্ধা; অহঙ্কার,
আভিজাত্য, শৌর্য, বীৰ্য্য, ধাষ্ট বুঝাইব।
অবশেষে দুর্যোধনআশালতা সই,
পার্থের প্রতিজ্ঞা সহ, কর্ণের মস্তক
বিচ্ছিন্ন করিব, তীক্ষ্ণদিব্যউ গ্ৰশরে।
রণভূমে দুঃশাসনজম্মুকে হেরিয়া
উল্লম্মিবসিংহাসম, করে খড়গ ধরি।
এই কেশদাম-স্পর্শ করেছে যে করে,
অগ্রে সেই পাপহস্ত করিয়া ছেদন,
নৃসিংহের সম তার বক্ষবিদারণ
করিবে ভীমের বধু, ভীমারূপ ধরি।
যে হৃদয়ে পাপইচ্ছা করিত পােষণ
তাহা হ’তে বিনিঃসৃত রুধিরের ধারা
পান করি, সুধাসম আত্মার তর্পণ
করিব, তােদেরে দিব সে যুব পিতে।
তােমাদের সহ আমি সে মদিরাপানে
৩২ দ্রৌপদী। উন্মত্ত হইব, সখি, প্রতিজ্ঞা ভীমের নিত্য-প্রতিনিধি-পত্নী আমিই পালিব ! শকুনির দুশ্চেষ্টার দিব প্রতিদান পাশ-ক্রীড়াকারিহস্ত ছেদন করিব। তােমাদের সহ আমি মথি রথগজ শােণিকলেবরে কুরুকুলাঙ্গার দুৰ্য্যোধন-অগ্রবর্তী হইব আহবে। দেখিব এ ভূমণ্ডলে আগু-পাণ্ডব- বধূর অমােঘবেগ কে ফিরাতে পারে ? প্রথমেই গদাঘাতে ঊরুভঙ্গ তার করিব, অনঙ্গবশে যে উরু আমারে দেখাইল, দেখাইব, সে পাপের ফল যে জিহ্বায় পাপকথা কহিল দুৰ্ম্মতি, বগলামুখীর মত আকর্ষণীযােগে আকর্ষিয়া সেই জিহবা দণ্ডের প্রহারে কি বলিছ ? বুঝাইব, পাঞ্চালিকা নয় পঞ্চপাণ্ডবের বধূ পঞ্চালদুহিতা। মধুবর্ষি-সুকোমল-সুরূপ-কুসুম যার ইচ্ছা সেই তুলে বৃন্তচ্যুত করি, আদরে গলায় পরে, বিম্লান হইলে ফেলাইয়া দেয় দূরে। কোমলতা গুণে পাইন এ প্রতিফল প্রসূন-সুন্দরী।
দ্রৌপদী।
কিন্তু অগ্নিশিখা ঐ, গৃহ-অন্ধকার
দূর করে, আলােকিত করে গৃহস্থল।
রন্ধন করিয়া দেয় সুমিষ্ট আহার,
নিজের রূপের ছটা বিক্ষিপ্ত করিয়া,
বুঝাইয়া দেয় বিশ্বে দৃশ্য চরাচর।
কিন্তু তারে স্পর্শ করে কাহার শকতি ?
নয়নে রূপের ছুটা বিকিরণ করি,
বিজুলি কেমন খেলে জলদের গায়,
সেই সৌদামিনীস্পর্শে মরণ নিশ্চয়,
কে পারে এ বিশ্বমাঝে তারে বাধা দিতে ?
এ দৃষ্টান্ত রমণীর বুঝাইয়া দিব।
রমণী ও মণি যদি নেহারে, হরিতে
নির্ভীকঅভীক, দস্যু, তস্করের মনে
দুরাকাঙক্ষ। সেইক্ষণ জাগরূক হয়।
যেমনি রুদ্রের রৌদ্ৰপ্ৰভনেত্রনল
জুলি উদ্গিরিয়া ভস্ম করেছিল কামে;
তেমতি শর্তীর চক্ষে অনল জুলিয়া
কামুকে করিবে ভস্ম কামের সহিত।
কি কহিব ? মহারাজ তােমরা যখন
শবপ্রায়” রহিয়াছে, তখন পাঞ্চালী
কালিকা সাজিয়া করে ধরি কল
শত্রুর কর্ভিমুণ্ডে মেদিনী ছাইবে,
৫
দ্রৌপদী।
।
শরক্তে বহাইবে খরস্রোতঃনদী,
এত কহি তেজস্বিনী, যশস্বিরাজার
মনস্বিনীবধূ কৃষ্ণা নিবৃত্ত হইল।
ভীমের লােচনে দীপ্ত অগ্নি উদিগরিল,
স্বেদবিন্দু ললাটেতে, দেহে স্বেদজল
বহিরিল, ধমনীতে বহিল তখনি
উষ্মবক্তস্রোতঃ, রক্ত বদনমণ্ডল
হইল, অরক্তনেত্র কোকনদপ্রায়।
দাড়াইল বৃকোদর ; সে ভীমমৃরতি
দেখি ভীত বনচারী, কেশরী, শার্দল
ভয়ে ভীত বিহঙ্গম উড়িল আকাশে।
দাড়াইল বেদব্যাস, ললাটফলকে
ফুটিল অনল চক্ষুঃ, ক্রোধের আবেগে,
হৃদয়ের শক্তি যেন জাগ্রত হইয়া
বিদ্যুতের মত প্রতি শিরায় শিরায়
প্রবাহিত হ’লশিরে দীর্ঘ জটাভার
গর্জিয়া উঠিল যেন ; ভুজঙ্গের মত
ফণাধরি ; রূদ্ররূপী দ্বৈপায়ন ঋষি,
আবৃত্তিল ; দ্রৌপদীর প্রত্যেক ভারতী
দ্রৌপদীর বাণী যেন প্রতিধ্বনি হয়ে
ব্যাসশৈল প্রতিঘাতে পুনঃ আবৰ্ত্তিল।
প্রকৃতি মারুত-মধূচ্ছিষ্ট-শলাকায়
দ্রৌপদী
•
ধরিল সে শব্দরাশি; ব্যোমযন্ত্র যােগে
শােনাইতে বিশ্বে।
হােথা বিশ্বনাথবন্ধু
ক্রোধােদ্দীপ্তত্রিলােচনা গর্জিয়া উঠিলা,
দৃঢ়মুষ্টি-অকলঙ্ক-তীক্ষ্ণ-তরবারি
গ্রহিলা পুনশ্চ দেব। ; নেত্রজ্যোতি পড়ি,
জ্বলিল সে অসিলতা ঝ ঝক্ করি,
ব্যোমকেশ আতঙ্কেতে সিহঁরি উঠিল।
দেবসভাতলে সচী দেবেন্দ্রের বামে
রত্নসিংহাসনে সভা আলােকিত করি
রূপের ছটায়, আর ভূষণচ্ছটায়,
উপবিষ্টা, সহসা সে উঠি দাড়াইলা
ক্রোধ বিস্ফর্জিতা, শৌৰ্য উগারে অগনি,
অশনি লইলা করে পতিকর হতে।
হােথায় দ্বারকাপতি গণে পরমাদ,
অষ্টাধিকষােড়শসহস্র বরনারী
একেবারে রত্নাসনে পদাঘাত করি,
একেবারে দাড়াইলা, সবে একেবারে
কোষােম্মুক্ত অসিলতা করে ক্রোধাবেগে।
ক্রোধােদ্দীপ্ত-বিলােচন-জ্যোতিতে মিশিয়া
অঙ্গজ্যোতি, রত্নজ্যোতি, তপনের জ্যোতি,
Phonograph.
দ্রৌপদী।
নিপতিত উদ্দীপিত তরবারি পরে।
একেবারে উত্থাপিত তরবারি শ্রেণী
ঝকঝকি জ্বলি উঠে বিজুলির মত।
ঝনঝনি শব্দ দু’ল অসিআস্ফালনে,
ভূষণের ঝণৎকার মিশি তার সনে
সৌন্দৰ্য্য মাধুর্যে আজ শৌর্য্যের মিশ্রণ
হেরি খুতমতি কৃষ্ণ ভাবে পরমাদ।
সম্পূর্ণ
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.