Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Mul Dhakur O Samalochana

Majumder,krishnacharan · 2010/04/17

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

মূল ঢকুর ওসমালােচনা।
অর্থাৎ
বারে কায়স্থ সমাজের বিবরণ।
শ্রীকৃষ্ণচরণ মজুমদার
কালকাতা
৪৬ নং পঞ্চাননতলা লেন, ভারতমিহির যত্রে,
সান্যাল এণ্ড কোম্পানি দ্বারা
মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
কাদা ১৮১৩।

No text on this page.

বিজ্ঞাপন। অনেক দিবস হইতেই আশা করিয়াছিলাম যে, মূল ঢাকুর এবং বারেন্দ্র-কায়স্থগণের বংশাবলী একত্র প্রকাশ করিব। কতি- পয় অনিবার্য কারণ বশতঃ সে আশা সম্পূর্ণরূপে সফল হইতে পারিল না। তন্নিমিত এইক্ষণ বারেন্দ্র-কায়স্থ সমাজের কুল- পঞ্জিকা মূল পদ্য ঢাকুর প্রকাশিত হইল। বংশাবলী যাহা সংগ্রহ হইয়াছে, তাহা অসম্পূর্ণ জন্য প্রকাশ যােগ্য নহে। বংশাবলী সম্পূর্ণ সংগ্রহ হইলেই প্রকাশিত হইবে। শ্ৰীযুক্ত গােবিন্দমােহন রায় বিদ্যাবিনােদ মহাশয় কথিত পদ্য “ঢাকুর” অবলম্বন পূৰ্ব্বক যে “ঢাকুর” নামক গ্রন্থ-রচনা করিয়াছেন, তাহার সমালােচনাও বর্তমান গ্রন্থ মধ্যে সন্নিবিষ্ট হইল। যাহারা বিদ্যাবিনােদ মহাশয়ের গ্রন্থপাঠ করিয়াছেন, তাঁহাদিগের মধ্যে হয়ত নানা জনে নানারূপ সিদ্ধান্ত করিয়া থাকিবেন। মূলঢাকুর খানি অবিকল মুদ্রিত হইল। যাহাদিগের নিকট হস্ত লিখিত মূলপদ্য ঢাকুর খানি আছে, তাঁহারা উহার সহিত ঐক্য করিলেই, ইহার যাথার্থ্য উপলব্ধি করিতে পারিবেন। মূল পদ্য ঢাকুরে বর্ণাশুদ্ধি প্রভৃতি যে সকল ভ্রম ছিল, কেবল তাহারই সংশােধন করা হইয়াছে মাত্র। ইহাতে যদি কোন ভ্রম পরিলক্ষিত হয়, তাহা হইলে অনুগ্রহ পূৰ্ব্বক তদ্বিষয় আমার বাড়ীর ঠিকানায় (জেলা রাজশাহী, পােষ্টাপিশ তাহেরপুর, গ্রাম ছাতারপাড়া) জ্ঞাপন করিলে বাধিত হইব।

{ • !
সামাজিক ব্যক্তিগন্ত্রের অনেকেই মূল ঢাকুর খানি প্রকাশ
করিবার জন্য আমাকে অনুরােধ করিয়াছিলেন। এইক্ষণ
তাঁহার অনুগ্রহ পূর্বক গ্রন্থখানি একবার পাঠ করিলেই, আমি
পরিশ্রম সফল জ্ঞান করিব।
শকাব্দ ১৮১৩।
''}
শ্ৰীকৃষ্ণচরণ মজুমদার।
বৈশাখ।

== = = উপক্রমণিকা অধুনাতন পাশ্চাত্য ভাষায় শিক্ষিত ব্যক্তিগণের মধ্যে অনে- কের ধারণা এই যে, এদেশীয় প্রাচীন কালের বিবরণ পরিজ্ঞাত হইবার উপযুক্ত কোনরূপ গ্রন্থ নাই। এবম্বিধ অলীক ধারণা, অনেকের একদা ছিল অথবা এইক্ষণও বর্তমান আছে এমত নহে। কিন্তু অনেকের এই অসার ধারণার অযথা প্রাধান্য দেশের ও সমাজের প্রভূত অপকার সাধন হইতেছে। কৌলীক সংস্কার- সঞ্চালনের অবশ্যম্ভাবী নিয়মানুসারে, এই ধারণা, আমাদিগের বংশধরগণের স্বাভাবিক সংস্কারে পরিণত হওয়া কি সমাজের অনিষ্টকর বিষয় নহে ? বাস্তবিক কি আমাদিগের পূর্ব পুরুষগণ এতই অসার ছিলেন যে তাহাদিগের সময়ের দেশের অবস্থা বা সামাজিক অবস্থা পরিজ্ঞাত হওয়া যায় এমন কোন কিছুই তাঁহারা রক্ষা করেন নাই? অন্য বিষয়ের চিহ্ন নন হইলেও সামাজিক বিষয় যাহা এইক্ষণ বৰ্তমান আছে, তদ্বারায় সামাজিক তত্ত্ব যথেষ্ট পরিমাণেই অবগত হওয়া যায়। পাল বংশীয়, শূর ও সেন বংশীয়দিগের রাজত্বের আনুপূর্বিক বিবরণ নাই বটে, কিন্তু তাহাদিগের অবস্থা সম্বন্ধে যাহা পরিজ্ঞাত হওয়া যায় তাহ কখনই নিন্দনীয় নহে। শূর ও সেন বংশীয়দিগের রাজত্বকালীন

२
মূল ঢাকুর ও সমালােচনা।
উপনিবেণী ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ সমাজের যে সকল বিবরণ বিদ্যমান
আছে, তদ্বারা তত্তৎ সমাজের এবং দেশের তদানীন্তন অবস্থাও
উপলব্ধি হয়।
বারেন্দ্র ও রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণ এবং বঙ্গজ ও রাঢ়ীয় কায়স্থগণের
সমাজের বিবরণ পরিজ্ঞাত হইবার যেরূপ গ্রন্থ আছে বারেন্দ্র
কায়স্থ সমাজেরও বিবরণযুক্ত তােপ গ্ৰন্থ আছে। বারেন্দ্র কায়স্থ
কুল বিষয়ক “ঢাকুর” নামক যে পদ্য গ্রন্থ বিদ্যমান আছে, তাহা
সংক্ষিপ্ত হইলেও তদ্বারায় উক্ত সমাজের বিবরণ বােধগম্য হয়।
এই “ঢাকুর” নামক গ্রন্থখানি কাশীদাসের কৃত মূল ঢাকুর
হইতে সংক্ষিপ্ত ভাবে যদুনন্দন কর্তৃক রচিত হয়। যদুনন্দন
তাহার অবলম্বিত কাশীদাসের ঢাকুরকে আদি ঢাকুর নামে
নির্দেশ করিয়াছেন। দুঃখের বিষয়, এই আদি ঢাকুর, বহু
যত্নেও আমরা এপর্যন্ত প্রাপ্ত হই নাই। যদুনন্দন আদি
ঢাকুরীর যে বর্ণনা দিয়াছেন, তাহাতে আদি ঢাকুর অতি বৃহৎ
গ্রন্থ ও তন্মধ্যে করণাদি যাবদীয় সামাজিক বিষয় বর্ণিত ছিল
ইহা প্রতীত হয়। কারণ যদুনন্দন বলেন যে,
সাড়ে তিনশত পাত করণ বর্ণন।
লিখিতে অসাধ্য হয় শুন সাধুজন।
পূর্বোক্ত আদি ঢাকুর ব্যতীতও আর এক খানি সামাজিক
বিবরণ ও কুল বিষয়ক গ্রন্থ ছিল। সেই গ্রন্থখানি সুপ্রসিদ্ধ
দেবীদাস খাঁর পৌত্র রঞ্জিৎ রায়ের কৃত এবং রঞ্জিতের “দোহা-
বলী” নামে পরিচিত ছিল। এই খানিও আমরা অনুসন্ধানে
প্রাপ্ত হই নাই। রঞ্জিতের রচনা সংস্কৃত, বাঙ্গলা, হিন্দী ও
পারসীতে মিশ্রিত ও অতি মধুর ভাবাপন্ন ছিল। আমার

উপক্রমণিকা।
স্বর্গীয় পিতামহ ও অন্যান্য প্রাচীন ব্যক্তি এবং কতিপয় প্রাচীন
মহিলাকে ঐ সকল কবিতা বলিতে শুনিয়াছি। তখন আমরা
ভাবি নাই যে উহা কোন সময় কাজে লাগিবে সুতরাং সকল
গুলি আমাদের স্মরণ নাই। প্রাচীন মহিলারা কবিতার লালিত্যে
মুগ্ধা হইয়া তাহার দোহা কণ্ঠস্থ রাখিতেন এবং কুল কাহিনীও
বিস্তর জানিতেন। এ সমাজের পূর্ধ্বতন প্রাচীন মহিলাগণ
গৃহিণীপণা ও কুলাকুলগণনায় শ্রেষ্ঠা ছিলেন। যাহা হউক, রঞ্জি-
তের দেহাবলী সম্বন্ধে এই প্রবাদ আছে যে নবাব সরকারের
কাৰ্য্যগতিকে নানাস্থানে তিনি পরিভ্রমণ ও নানা বিষয়ক দোহা
রচনা করেন। রঞ্জিৎ একদ। তাড়াশ গ্রামে ভ্ৰমণ করিতে গিয়া
তত্ৰত্য জমিদার বংশীয় হরদেব রায় সম্বন্ধে এই দোহা রচনা
করেন ;
হর দেবকে দেখেহেঁ তাড়াশকো গাঁওমে।
তা ফোটে যেস্কা নাম মে।
ভূল ভাটকা অতিথি যায়।
আগলা বাড়ী*দে বাতলায়।
আখের জো ধর্না দে।
কহে থােড়া চাউল লে ।
শশান্ রঞ্জিৎ কি বাং।
এস্কে। কৌন্ কহে কায়েৎকি জাত ?
হরদেব রায় বােধ হয় কৃপণাসয় ব্যক্তি ছিলেন। তজ্জন্যই
* যে সকল স্থানে ঝুলন ইত্যাদি পৰ্ব হয় তাহার জন্য তাড়াশে স্বতন্ত্র
বাটী আছে। অন্য সময় তাহাতে লােক জন থাকে না। এখনও অতিথিকে
থাকিবার জন্য ঐ সকল স্থান দেওয়া হয়।

৫ মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। তিনি তীব্র উক্তি করিয়াছেন। এরূপ উক্তি তৎকালীয় বারে কায়স্থ সমাজের আচার ব্যবহার ও দেবসেবা ও অতিথি-সেবা প্রভৃতি নিত্য আবশ্যকীয় কর্মের ব্যভিচারে স্বতঃই আসিয়া পড়িত। বারেন্দ্র কায়স্থ সমাজে তৎকালে দেবসেবা ও অতিথি- সেবা প্রভৃতি কর্মের বাহুল্য প্রচলন ছিল। কেবল বারেন্দ্র কায়স্থ সমাজেনহে তৎকালে উহা দেশাচার ছিল এরূপও নির্দেশ করা যাইতে পারে। যিনি যতই দরিদ্রাবস্থাপন্ন হউন না কেন, তাহাকে আতিথ্য সৎকার করিতেই হইত। সুতরাং তাহার ব্যভিচার দেখিয়া যে রঞ্জিৎ রায় তীব্র উক্তি করিবেন তাহাতে আর বিচিত্র কি ? অপ্রাসঙ্গিক হইলেও, আমরা রঞ্জিতের আর একটী দোহা উল্লেখ করিব। যথা,- রক্তবুদাম বিকালবেলা কালিন্দীর জলে গাে। বর্ষারে পা উপুশ্চ বাঁশীর স্বরে করে গাে । জাহান দিলাও বর্জসখী তাহার মধুর স্বরে গাে। নব ঝলকে রায় রতন কহে রঞ্জিৎ রায় গাে৷ বারেন্দ্র দেশ সম্বন্ধে কিছু উল্লেখ কর। এস্থলে প্রসঙ্গাধীন বলিয়াই বােধ হয়। যে স্থানের নামানুসারে সমাজের নাম হইয়াছে, তাহার ঐতিহাসিক ও ভৌগােলিক বৃত্তান্ত অবগত হইতে সকলেই অভিলাষী হইবেন সন্দেহ নাই। অতি প্রাচীন কালে, গৌড়নগর বরেন্দ্র দেশের রাজধানী সে সময় বরেন্দ্র দেশ কোন্ নামে অভিহিত হইত তাহা পরিজ্ঞাত নহে। ইহার পর পৌবন এই প্রদেশের রাজ- ধানী ছিল। চিন দেশীয় সুপ্রসিদ্ধ বৌদ্ধ পরিব্রাজক হিয়ংসং ছিল।

উপক্রমণিকা। পৌণ্ড্রবর্ধন হইয়া কামরূপ যাত্রা করেন। বগুড়ার অন্তর্গত মহাস্থান নামক প্রাচীন জনপদই যে পৌণ্ডবদ্ধন তাহা স্থানান্তরে কথিত হইয়াছে। এই কালে “বরেন্দ্র খও পৌণ্ডখণ্ড বা পৌণ্ড- দেশ নামে কথিত হইত। বরেন্দ্র নামের উৎপত্তি সম্বন্ধে সুপ্রসিদ্ধ প্রত্নতত্ত্ববিদ শ্ৰীযুত কানিংহাম মহােদয় বিশেষ যত্ন করিয়াছেন, কিন্তু তিনি যে সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছেন তাহা কখনই অনুমােদন বােগ্য নহে। তিনি বলেন যে বরেন্দ্র শব্দে ই বুঝায় ; এদেশ সম্বন্ধে তদ্রুপ কোন কাহিনী না থাকায় বারজন ভূঞার রাজত্ব অনুমান হয়। * এরূপ কিম্বদন্তী আছে যে পাল ঔপাধিক বারজন রাজা পশ্চিমাঞ্চল হইতে, পৌষনারায়ণী যােগে করতােয়। স্নানে আগমন করেন ; ইহারা পথিমধ্যে থাকিতেই যােগের সময় অতিবাহিত হওয়ায়, পুনরায় পােষনারায়ণী যােগ আগত হওয়া কাল পর্যন্ত ঐখানে বাস করেন। কিন্তু এজন্যও বরেন্দ্র বা বারেন্দ্র নামের উৎপত্তি হয় নাই। তারানাথের সংগৃহীত, পালবংশীয় ভূপালগণের বিবরণ পাঠে অবগত হওয়া যায় যে, পাল বংশের আদি পুরুষ গােপাল, বেহার ও মগধ জয় এবং গোপালের পুত্র দেবপাল উড়িষ্যা ও বরেন্দ্র অধিকার করেন। মুঙ্গেরে প্রাপ্ত প্রমাণানুসারে ; প্রথম গোপাল তৎপর ধর্মপাল ও তৎপরে দেবপালের নাম পরিজ্ঞাত হওয়া যায়। জেনারেল কানিংহাম সাহেবের মতে ৭৬৫ খৃষ্টাব্দে গােপাল গৌড় দেশে আধিপত্য বিস্তার করেন। কিন্তু ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্র বিশিষ্ট প্রমাণের দ্বারায় জেনারলের এ মত * Archcological Survey of India Vol. XV.

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। খণ্ডন করিয়া ৮৫৫ খৃষ্টাব্দ গােপালের রাজত্ব আরম্ভ এবং প্রত্যেকে পালবংশীয় রাজার রাজত্ব কাল গড়ে কুড়ি বর্ষ গণনা করিয়াছেন। আইন আকবরী ও ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্রের মতে ১০৬৬ খৃষ্টাব্দে বল্লাল সেনের রাজত্ব আরম্ভ কাল গণিত হয়। বারেন্দ্র ব্রাহ্মণদিগের কুলপঞ্জিকানুসারে কবি শূরের পুত্র মাধব শূর তৎপুত্র আদি শূর তৎপুত্র ভূ শূর তৎপুত্র ক্ষিতি নূর তৎপুত্র ধরা শূর। ধরা শূর পুত্রদ্বয় প্রদ্যুম্ন শূর ও বরেন্দ্র শূর। প্রদ্যুম্ন স্বীয় নামানুসারে “প্রদ্যুম্নেশ্বর” নামক হরিহর মূর্তি নির্মাণ করেন। বরেন্দ্র শূর রাজ্যশাসনে লিপ্ত ছিলেন, তাহার নামানু- সারে তদীয় শাসিত দেশ বরেন্দ্ৰাখ্যা প্রাপ্ত হইয়াছে। ঘটকগণ বলেন ;- প্রদ্যুম্ন বরেন্দ্রশ্চ ঘোতৌ নিভুজ্যস্ত চ প্রদ্যুম্ন যােগমার্গেচ বরেন্দ্র রাজ্য শাসনে। বরেন্দ্র শূরের পুত্র অনু শূর ; তৎপরেই বল্লাল সেনের পিতা বিজয় সেনের রাজত্ব লিখিত হইয়াছে। ঘটকগণ যে নিরবচ্ছিন্ন কল্পনার আশ্রয় গ্রহণ করতঃ সিদ্ধান্ত করেন নাই, তাহা বিজয় সেনের রাজত্ব গণনাতেই সবিশেষ প্রকাশ পায়। অনুশূরের পরেই বিজয় সেনের রাজত্ব। পাঠকগণ এস্থলে দেখিতে পাইবেন, শূর বংশ হইতে সেন বংশে রাজত্ব দূচনা হইয়াছে। সেনবংশের রাজত্ব কোনরূপ উত্তরাধিকার সূত্রে আরব্ধ হয় নাই; বহুবলের দ্বারা বিজয় সেনকে রাজত্ব গ্রহণ করিতে হইয়াছে। ভাগলপুরে প্রাপ্ত প্রস্তর প্রশস্তিতে একটা কবিতা আছে যে । বিজয়, গৌড়ের অধিপতিকে তাড়িত করেন।

উপক্রমণিকা। ৭ এরূপ প্রবাদ আছে যে “প্রদ্যুম্নশ্বরের মূর্তি গৌড়ের নিকট বর্তী বরি। ভূমিতে ছিল। বিজয় তাহার মন্দির নির্মাণ করিয়াছিলেন। উক্ত মন্দির মুসলমানগণ কর্তৃক ধ্বংস হয়। আমরা পূৰ্বে বলিয়াছি যে, বরেন্দ্র দেশের রাজধানী কিছুকাল পৌণ্ড্রবর্ধনে ছিল। * বরেন্দ্র শূর গৌড় নগরেই স্বীয় রাজধানী নির্মাণ করেন। বস্তুতঃ এই সময় বরেন্দ্র দেশের অন্য রাজ- ধানীর বিষয় পরিজ্ঞাত হওয়া যায় না। বিজয় সেন গৌড়ের অধিপতিকে তাড়িত করেন। সচরাচর যেরূপ ভাবে রাজ্য বিপ্লব দেখা যায়, তাহাতে প্রতীত হয় যে অনুশূরের সময় তদীয় রাজ্যের দৃঢ়তা ছিল না। বিজয় সেনের রাজত্ব সূচিত হওয়ার পূর্বে অনুশূরের অমাত্য ও সামন্তবর্গ স্বস্ব প্রধান থাকাই সম্ভব। এরূপ হইলে অনুশূরের পর ও বিজয় সেনের আরব্ধ কাল এতদুভয়ের মধ্যে কয়েক বৎসর গণণা হইতে পারে। প্রস্তাবান্তরে প্রদর্শিত হইয়াছে যে মহাস্থানই পৌণ্ড্রবর্ধন নগরী ছিল। স্কন্দ পুরাণে পৌখণ্ডে এই স্থান ও করতোয়া নদীর বর্ণনা আছে। পুও রাজার নাম হইতে “পৌণ্ড্রবর্ধন” নাম হয়। তর্পণদিঘীয় তাম্র শাসনে লিখিত আছে যে শ্রীবিক্রমপুর নিবাসী বল্লাল সেনের পুত্র লক্ষণ সেন “শ্রীপৌণ্ড্রবর্ধন ভুক্তান্তঃপাতি” অমুক গ্রাম দান করিলেন। বাখরগঞ্জের(তাম্রশাসনেও “পৌও বর্ধনন্ত কান্ত তিনি লিখিত আছে। কেশব সেনের প্রদত্ত তাম্র শাসনে “পৌণ্ড্রবর্ধনভুকান্তঃপাতি বঙ্গে বিক্রমপুর ভাগ প্রদেশে লিখিত আছে।।ইহার দ্বারায় প্রতীত হয় যে, কেশব সেনের রাজত্বকালেও পৌণ্ড্রবর্ধনের নামানুসারে সাম্রাজ্যের বিভাগ ছিল। বিক্রমপুর পৌণ্ড্রবর্ধনের অন্তর্গত জন্য করতােয়ার পুৰ্ব্ব হইতেই পৌবৰ্ধন বিভাগের আরম্ভ উপলব্ধি হয়। পৌখও পুরাণ-বর্ণিত পুণ্য জনপদ নিমিত্ত সেন রাজাগণও তাহার নামের ব্যতিক্রম করেন নাই।

মূল ঢকুর ও সমালােচনা। তারানাথের বাক্যে বিশ্বাস স্থাপন করিলে, অর্থাৎ দেবপাল কর্তৃক বরেন্দ্র অধিকৃত হইলে, বরেন্দ্র শূরের সময় সম্বন্ধে কিছু গােলযােগ হয় বটে; কিন্তু প্রকৃতরূপে গবেষণা করিলে সে গােলযােগে রহস্য উন্মেষণের তাদৃক ব্যাঘাত ঘটে না। দেবপাল তদীয় রাজত্বের শেষভাগে বরেন্দ্র অধিকার করেন। তাহা হইলে, সেই সময় নবম খৃষ্টাব্দের শেষ ও দশম খৃষ্টাব্দের প্রথম ভাগ হয়। ১০৬৬ খৃষ্টাব্দে বল্লালের ও ১০৪০ খৃষ্টাব্দে বিজয় সেনের রজত্বের আরব্ধ কাল ইহা অনেকেই সিদ্ধান্ত করেন। বিজয়ের রাজত্বের পূর্বে ও অনুশূরের রাজত্বের অবসানে যে কিছুকাল প্রধান অমাত্য বা সামন্তগণ স্বস্ব প্রধান ছিল ইহা কথিত হইয়াছে। অথবা এই সময় কিছুকাল গৌড় অন্য রাজার শাসনে ছিল। সুতরাং অনুশূরের রাজত্ব কাল কিছু দীর্ঘ সময় নির্ণয় করিলে, দশম খৃষ্টাব্দের প্রথম ভাগে এ দেশের বরেন্দ্র” আখ্যা ও দেবপাল কর্তৃক তদীয় পরাজয় অসম্ভবরূপে প্রতীয়মান হয় না। বরেন্দ্র শূরের সময় অবিসংবাদিত না হইতে পারে; ফলে তাহার নামানুসারে যে এতদ্দেশের এ অংশ বরেন্দ্র নামে অভিহিত হইয়াছে তাহাতে অনুমাত্র সন্দেহ নাই। অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড, গোঁড় ইত্যাদি নরপতিগণের শাসিত দেশ যেমন তত্তৎ নামে পরিচিত বরেন্দ্র ও তাহাই বটে। তারানাথ ও ঘটকদিগের গ্রন্থালােচনায়, এবং ফেরিস্তা ও আইন আকবরী পাঠে বরেন্দ্র প্রদেশের সীমা পরিজ্ঞাত হওয়া যায়। উত্তরে হিমালয় ও কোচ রাজ্য, দক্ষিণে পদ্মাবতী বা পদ্মানদী, পুঝে করতােয়া নদী, পশ্চিমে মহানদী ইহাই বরে- ন্দ্রের সীমা। কোন কোন মতে পূর্ব সীমা ব্ৰহ্মপুত্ৰ ( যমুনা) উপক্রমণিকা। ৯ নদ; কিন্তু করতােয়ার পূর্বভাগ বরেন্দ্র আখ্যা প্রাপ্ত নহে। করতােয়ার পূর্ব ভাগ নিম্নভূমিও সাধারণতঃ ভড় নামে খ্যাত। প্রাচীনকালে বরেন্দ্র দেশে প্রবাহিত নদী মধ্যে করতােয়া মূল ও প্রধান ছিল, এরূপ অনুমিত হয়। স্মাৰ্ত্তগণ নদীদিগকে শ্রাবণে রজস্বলা বলিয়া বর্জন করিয়াছেন। কিন্তু করতােয়া সম্বন্ধে ব্যবস্থা এই যে “অথীদৌ কর্কটে দেবী হং গঙ্গা রজ- স্বলা। সৰ্বারস্তাবহান্যঃ করতােয়াম্বুবাহিণী। শাস্ত্রে কথিত হয়, হরগৌরীর বিবাহকালীন শঙ্করের করতল হইতে পতিত তােয় হইতে এই পবিত্র নদীর উৎপত্তি হয়। সুতরাং হিমালয়- কেই ইহার উৎপত্তি স্থান নির্দেশ করা যায়। কাল মাহত্ম্যে করতােয়া গর্ভ অনেক স্থানেই বালুকাপূর্ণ হইয়াছে। স্বত্বেও এই নদী প্রধান থাকিবার বিষয় প্রতীত হয়। আমা- দিগের গবেষণার ফল এই যে করতােয়া একদা তিনটী স্রোত বা শাখায় বিভক্ত হওতঃ পূনর্ভবা, করতােয়া ও তিস্রোতা নামে প্রবাহিত হইত। উক্ত পুনর্ভবা, করতােয়া এবং বরেন্দ্রের দক্ষিণ সীমান্থ পদ্মা নদীই, বরেন্দ্র প্রদেশে শাখাপ্রশাখা বিস্তার করিয়া আছে। বরেন্দ্রের মৃত্তিকা সৰ্ব্বত্র সমতল নহে। যে সকল স্থানের মৃত্তিকা “বরীণ” বা “খিয়ার” নামে কথিত তাহার নিকটে এবং স্থানে স্থানে যে সকল নিম্ন ভূমিখণ্ড আছে তাহাও সাধারণতঃ ভড় নামে কথিত হয়। এই সকল ভড়ের মধ্যে কতিপয় বৃহৎ বিল আছে। ভড়ে বুনা ধান্য এবং “বরীণ”ও “খিয়ারে” নােপা- ধান্য জন্মিয়া থাকে। ইহা ব্যতীত বরেন্দ্র প্রদেশের মৃত্তিকায় যব, গােধুম,ইক্ষু, তঁত প্রভৃতি মূল্যবান শস্য অতি প্রাচীনকাল হইতে মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। •• উৎপন্ন হইতেছে। তুত হইতে যে রেশম জন্মে তাহার বাণিজ্য অতি বিস্তীর্ণ ছিল। চিন জাতিরা বরেন্দ্র খণ্ড হইতে রেশম ও অন্যান্য পণ্য দ্রব্য লইয়া যাইত। ভারতবর্ষের অন্য প্রদেশের হউক এই প্রদেশের লােকদিগের সহিত কথিত বাণিজ্য নিবন্ধন চীনদিগের বিশেষ সখ্যতা ছিল। এই সখ্যতা বৌদ্ধ- ধর্মাবলম্বী রাজন্যবর্গের সময় অধিকতর ঘনিষ্ঠ হইয়াছিল। মুসলমানগণের রাজত্ব কালে পটুগিজ ও ফরাশি প্রভৃতি ইয়াে- বােপীয় জাতিরাও এখণ্ডে বাণিজ্যার্থে আগমন করিয়াছিলেন। একদা সূৰ্য্যবংশীয় মহাবল গৌড়ভূপাল ও তদ্বংশধরগণ বাণ ও কাঘােজবংশীয় রাজন্যবর্গ ; পালবংশীয় ও শূরবংশীয়গণ এবং সেনবংশীয় কতিপয় নৃপতি, বরেন্দ্র খণ্ডের স্থান বিশেষে রাজধানী নির্মাণ করতঃ প্রজাপালন করিয়াছিলেন। পালবংশীয় রাজন্যবর্গ বৌদ্ধমতাবলম্বী ছিলেন। এতদ্ব্যতীত অন্যবংশীয় রাজাগণ হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং বিষ্ণু ও শিবােপাসক ছিলেন। পালবংশীয় রাজন্যবর্গ বৌদ্ধধর্মাবলম্বী ছিলেন বলিয়া তাহারা বিরুদ্ধ ও প্রাচীন মতাবলম্বী হিন্দুগণের সহিত কখনই অশিষ্টা- চরণ করেন নাই। প্রত্যুত তাহারা হিন্দুদিগকে সন্ধিবিগ্রহাদি গুরুতর কাৰ্য্যে নিয়ােগ এবং হিন্দুগণের দেবসেবাদির জন্যও ভূমিদান করিতেন। ইহা হিন্দু ও বৌদ্ধ উভয়েরই মহত্বের পরিচায়ক বটে। মুসলমানগণের সময়েও দীর্ঘকাল বরেন্দ্র খণ্ডেই বাঙ্গলার রাজধানী ছিল। বাঙ্গলার সমগ্র মুসলমান শাসন কাল মধ্যে যে একজনমাত্র হিন্দু রাজাছিলেন সেই রাজা কংশ বরেন্দ্রবাসী। . বরেন্দ্র খণ্ডের অন্তর্গত মহাস্থান, যােগীর ভবন, ক্ষেত্ৰনালা, উপক্রমণিকা। ১১ পাহাড়পুর, দেবীকোট, দেবস্থালা, মঙ্গলবাড়ী ও নিমগাছী প্রভৃতি স্থানে পূর্বতন ভূপালগণের কীৰ্ত্তিরাজির ভগ্নাবশেষ এখনও বিদ্যমান আছে। তান্ত্রিক দলের প্রাধান্ত কালে এই প্রদেশের অন্তর্গত ভবানীপুর, থালতা চেহাটা ও কুশুম্বী প্রভৃতি স্থানে যে সকল কালিকা মূর্তি স্থাপিত হইয়াছিল তাহার সেবাদি এখনও পরিপাটিরূপে সম্পন্ন হইয়া থাকে। বল্লাল সেন সদাচার সম্পন্ন ব্রাহ্মণ দিগকে বরেন্দ্রে সংস্থাপন পূৰ্ব্বক এপ্রদেশের গৌরব বৃদ্ধি করিয়াছেন। তিনি নিজে বারেন্দ্র দেশীয় অনিরুদ্ধ নামা পণ্ডিত শ্রেষ্ঠের শিষ্য ছিলেন।” সুতরাং বারেন্দ্র খণ্ডের প্রতি তদীয় সমধিক অনুরাগ থাকাই সম্ভব। যাহা হউক বারেন্দ্র ব্রাহ্মণগণ এইক্ষণ যে সকল গ্রামী- ণের পরিচয় প্রদান করেন সেই সকল গ্রাম এই প্রদেশের অন্তু- গত বটে। বারেন্দ্র বিপ্রকুলে, কুলুভট্ট, মযুরভট্ট, উদয়াচাৰ্য্য প্রভৃতি পণ্ডিতগণের উৎপত্তি। বারেন্দ্র কায়স্থ সমাজের কুলগ্ৰন্থ পদ্যভাষায় রচিত ‘ঢাকুর’ মুদ্রিত হইল। উক্ত গ্রন্থে সামাজিক স্থানের যে সকল নাম আছে তন্মধ্যে, মহিমাপুর, খামরা, কেলে, চোয়া, রঘুনাথপুর, মাণিকদিহি, সেকন্দরপুর, দুর্লভপুর, কেঁচুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর সাধুখালী, গাজনা, রামদিয়া ব্যতীত যাবদীয় গ্রাম বরেন্দ্রখণ্ডের ও তৎপূৰ্ব্বদিগস্থ ভড়ড়র অন্তর্গত। বারেন্দ্র কায়স্থ সমাজের ও অন্যান্য সমাজের কতিপয় স্থানের নাম একরূপ • দেখা যায়। কিন্তু সেই সকল স্থান যে এক তাহার কোন প্রমাণ নাই। মূল ঢাকুর পাঠে প্রতীত হয় যে, বারেন্দ্র কায়স্থ সমাজে বল্লালী মতা গৃহীত হয় নাই এবং তাহাদিগের পূর্ব পুরুষগণ মূল ঢকুর ও সমালােচনা। ব্রাহ্মণগণের ভৃত্য হইয়া এদেশে আগমন করেন নাই। এই সমাজের গঠন প্রণালী,প্রচলিত নিয়মও ব্যবহার তাহাই সপ্রমাণ করে। ভৃত্যু বলিলেই আজি কালি বেতনভােগী চাকর বুঝায়। ঘােষ, বসু প্রভৃতি সেরূপ ভৃত্যু ছিলেন না। তঁাহরা কোনরূপ বেতন গ্রাহী না হইয়া দ্বিজ সেবা করিতেন। কান্যকুজাধিপতি স্বীয় অধিকার হইতে যে সকল ব্রাহ্মণ প্রেরণ করিয়াছিলেন তাহারা অবশ্যই তর্দেশীয় পণ্ডিতবর্গের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। তৎকালীন হিন্দু সমাজে ব্রাহ্মণগণের যেরূপ আধিপত্য ছিল- ব্রাহ্মণগণ যেরূপ বেদাদিশাস্ত্রে সুপণ্ডিত ও ধর্মপরায়ণ ছিলেন, তাহাতে অপর বর্ণ সকল তাহাদিগের সেবা করা যে সৌভাগ্য মনে করিবেন, ইহা বরং সঙ্গত কথা। আমাদিগের প্রকাশিত ঢাকুর গ্রন্থে কাশীদাসের দ্বিজভক্তি সম্বন্ধে লিখিত হইয়াছে যে- আজন্ম ব্রাহ্মণ সেবা কৈলা অবেতনে। আমরা যে পদ্য ঢাকুর প্রকাশ করিলাম, তাহাতে কায়স্থ- গণকে শূদ্র সংজ্ঞায় আনয়ন করিয়া, শূদ্র হইতে যে কায়স্থ শ্রেষ্ঠ ইহাই বর্ণিত হইয়াছে। পদ্য ঢাকুর কর্তার মতে ব্রহ্মার পদে শূদ্রের উৎপত্তি হওয়ার পর শূদ্রগণের মধ্যে যাহারা বর্ণাচার ধর্ম আচরণ করে, তদ্ধেতু ব্ৰহ্ম। তাহাদিগকে আলিঙ্গন করায় তাহারা কায়স্থ নামে কথিত হয়। ফলতঃ গুণ কৰ্ম্মানুসারে বর্ণাচার ধর্মের আচরণ হেতু কায়স্থগণ শূদ্র হইতে স্বতন্ত্র ইহাই পদ্য ঢাকুরের মত। ইহার পােষকতা জন্য ঢাকুর কর্তা, ভবদেব ভট্টকৃত হারিত বচন উদ্ধৃত করিয়াছেন। কায়স্থ জাতির ক্ষত্রিয়ত্ব প্রতিপাদনের নিমিত্ত অনেকেই সচেষ্টিত আছেন। তাঁহারা বারেন্দ্র শ্রেণী কায়স্থ কুলপঞ্জিকার উপক্রমণিকা। ঐ মতকে নিতান্ত অসার ও অসমিচীন স্বরূপ বােধ করিতে পারেন। কেবলমাত্র আমাদিগের কুলগ্রন্থে নহে, দক্ষিণরাঢ়ীয় ও বঙ্গজ কায়স্থগণের কুলগ্রন্থেও আদিশূর আনীত পঞ্চ কায়স্থ, শূদ্র সংজ্ঞায় বর্ণিত হইয়াছেন। পঞ্চবিপ্রের বংশধরগণের কুলগ্রন্থেও পঞ্চভৃত্য শূদ্র জাতীয় বলিয়াই পরিচিত। ঘটকগণ বঙ্গীয় কায়স্থ জাতিকে শূদ্র ভাবে বর্ণন করায়, ক্ষত্ৰিয়ত্ব প্রতিপাদন কারীরা বলেন যে ঘটকগণ নিতান্ত মূর্খ ছিলেন, তাহাতেই কোন বিষয় বিচার না করিয়া কায়স্থকে শূদ্র বলিয়াছেন। আধুনিক ঘটকগণ মূখ বটেন; কিন্তু বল্লাল সেন যখন কৌলীণ্য মৰ্যদা সংস্থাপন করেন, তাহার পর হইতেই কয়েক শতাব্দী যাবত যে ঘটকগণ মুখ ছিলেন এমত অনুমান করা অসঙ্গত। কেন না শাস্ত্রজ্ঞ ও সদ্বংশীয় ব্রাহ্মণগণের প্রতিই কুলকাহিণী রক্ষা করি- বার ভার অর্পিত হয় । পুরাণাদি শাস্ত্র পাঠেও প্রতীত হয় যে, এক সময় গুণ কৰ্ম্মের বিভাগ দ্বারা ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র জাতির নির্ণয় হইত। একদা ব্রাহ্মণ পুত্রও ব্রাহ্মণের কর্তব্য সকল শাস্ত্রানুমােদিত ভাবে প্রতিপালন না করিয়া কাম ক্রোধাদির অধীন হইলে ক্ষত্রিয় ও কৃষিপরায়ণ হইলে বৈশ্য এবং হিংসাদি নিকৃষ্ট বৃত্তিপ্রবণ হইলে শূদ্র নামে কথিত হইতেন। এরূপ গুরুতর প্রশ্নের সিদ্ধান্তে যে শাস্ত্রালোচনার প্রয়ােজন তাহা এস্থলে করা সঙ্গত নহে, এবং তদ্রুপ করিবার শক্তি ও গ্রন্থকারের নাই। আমা- দিগের বক্তব্য এই যে, ঘটকগণ কায়স্থদিগকে শূদ্র নামে অভি- হিত করায়, কায়স্থ জাতির ক্ষত্রিয়ত্ব বিষয়ে কোন দোষ বৰ্ত্তি- আছে, একথা বলা যাইতে পারে না। শাস্ত্রেই উক্ত আছে যে, ১৪ মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। বঙ্গদেশে ব্রাহ্মণ ও শূদ্র ভিন্ন জাতি ছিল না। তৎকালে এদেশে ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য যিনিই আগমন করিয়াছেন, তিনিই শূদ্র সংজ্ঞায় কথিত হইয়াছেন। স্পষ্টতঃই দৃষ্ট হইতেছে যে, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, এদেশে আগমন মাত্রেই শূদ্রত্ব সংজ্ঞা প্রাপ্ত ও শাস্ত্রের লিখিত শূদ্রবং শাসনাধীন হইয়াছেন। সুতরাং এমতাবস্থায় ঘটকগণ কোন ভ্রমের কাৰ্য্য করেন নাই। তাহারা তদানীন্তন ব্যবহার অবলােকন করিয়াই কায়স্থ দিগকে শূদ্র সংজ্ঞায় নির্দেশ করিয়াছেন মাত্র। পদ্যটকুরে সামাজিক বারেন্দ্র কায়স্থগণের যে সকল বংশ বর্ণিত হইয়াছে, তৎবহিভূত বাহাত্তর ঘরের উপাধি প্রাপ্ত ও সামাজিক বারেন্দ্র কায়স্থগণের তুল্য ঔপাধিক কতিপয় কায়স্থ বংশ বহুকাল যাবত বরেন্দ্র ভূমিতে বাস নিবন্ধন, তাহারাও “বারেন্দ্র কায়স্থ” নামেই পরিচয় প্রদান করেন। এই সকল কায়স্থগণের বংশধরগণ মধ্যে কেহ কেহ উত্তর কালে বারেন্দ্র ভূমি পরিত্যাগ ও অন্যত্র বাস করা সত্বেও তাহাদিগের বংশধরগণ আপনাদিগকে বারেন্দ্র নামেই পরিচিত করেন। কেবল যে , ইহারাই এরূপ পরিচয় প্রদান করে এমত নহে। ঢাকুরে বর্ণিত, কায়স্থ বংশেরও কোন কোন বংশ রাঢ় ও বঙ্গে বাস করা স্বত্বেও বারেন্দ্র নামেই কথিত হয়েন। পদ্যটকুরে যেরূপ ভাবে বর্ণিত হইয়াছে তদ্বারা উপলব্ধি হয় যে, পূর্ধ্বতন সময়ে অর্থাৎ পদ্যটকুরের সমকালেও সামাজিক সপ্তবংশীয় কায়স্থ ব্যতীত, বরেন্দ্র ভূমি নিবাসী আদিম কায়স্থগণ বারেন্দ্র সংজ্ঞা প্রাপ্ত হয় নাই। ফলে ইহাও অনুমান করা অসঙ্গত নহে যে, সামাজিক কায়স্থগণের তুল্য উপাধিক ও অপরাপর নীচ ভাবাপন্ন কায়স্থগণ উপক্রমণিকা। ১৫ হইতে সামাজিক কায়স্থগণকে পৃথক করণাভিপ্রায়েই ঢাকুর রচিত হইয়াছে। বস্তুতঃ বারেন্দ্র নামধেয় অপরাপর কায়স্থ বংশ হইতে ঢাকুরে বর্ণিত সামাজিক কায়স্থ বংশ যে শ্রেষ্ঠ ও পুরুষ পরম্পরাগত সদাচারসম্পন্ন তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। প্রাগুক্ত নীচভাবাপন্ন বংশ হইতেও কতিপয় ঘর সদাচারসম্পন্ন ও সদ্গুনান্বিত হইয়া এবং কমলার কৃপাবলে উত্তরকালে সামা- জিক শ্রেষ্ঠ বংশের সহিত আদান প্রদান করতঃ সমাজে প্রবেশ লাভ করিয়াছেন। এই সকল ঘরের মধ্যে আদান প্রদানের তারতম্যানুসারে মৰ্যদারও তারতম্য হইয়াছে। সামাজিক কায়স্থগণের প্রধান লক্ষণ এই যে, তাহারা কোন কালেই দাস্যাদি নীচ কৰ্ম্মের আশ্রয় গ্রহণ করেন নাই। বঙ্গ- দেশীয় হিন্দু রাজত্বের শেষাবস্থায় ও সমগ্র মুসলমান শাসন কালে সামাজিক কায়স্থবংশের অনেকেই রাজকার্য সম্পাদনার্থ রাজা- মাত্য নিয়ােজিত ছিলেন। ফলতঃ ইহার। লিপিব্যবসা ব্যতীত অন্য কোন অপকৃষ্ট কাৰ্য করেন নাই। সামাজিক সম্প্রদায় ব্যতীত নীচ ভাবাপন্ন যে সম্প্রদায় আছেন, তাহাদিগের মধ্যেও বহু কাল যাবত লিপিব্যবসার দ্বারায় জীবিকা নির্বাহ করিয়া আসিতেছে এমন বংশও বিরল নহে। পূর্ধ্বতন কালে, বিশেষতঃ ঢাকুর প্রণেতার সমকালে যে নীচ ভাবাপন্ন কায়স্থগণ সদাচার সম্পন্ন ও বিদ্যাবিভব সম্পন্ন ছিলেন না ইহাই প্রতীয়মান হয়। সামাজিক কায়স্থগণ ব্যতীত অপরাপর কায়স্থগণ সদাচার সম্পন্ন ও বিদ্যাবিভব সম্পন্ন থাকিলে তাহাদিগের প্রতি সামাজিক কায়স্থগণের দ্বেষ বা ঘৃণার কোন বিশদ কারণ অবলক্ষিত হয় না। তৎকালে এই সকল বংশ মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। প্রকৃত পক্ষে ক্ষমতা শালী হইলে, একমাত্র বংশ মৰ্যদা হীন জন্য তাদৃক ঘৃণিত হইবার সম্ভব নহে। “চাকুর”প্রণেতার সমকালীয় সামাজিক কায়স্থগণের অবস্থা ও আমাদিগের সমকালীয় সামাজিকগণের অবস্থার বিষয় চিন্তা করিলে বাস্তবিক হৃদয় দুঃখে অভিভূত হয়। এ দুঃখ, বংশ মৰ্য্যদার হীনতা জন্য উদ্ভব হয় না। একদা আমাদের পূর্ব পুরুষগণ স্বীয় প্রতিভা ও ক্ষমতা বলে যে সকল কার্য সম্পাদন, তঁাহারা যেরূপ সুখ স্বচ্ছন্দে কালাতিপাত করিয়াছেন, তাহাকে স্মৃতিপথে আনয়ন পূৰ্ব্বক, আমাদিগের বর্তমান দুরাবস্থার সহিত তুলনা করিলে হৃদয় নিতান্ত ব্যথিত হয়, সন্দেহ নাই। আমরা অধুনাতন কালে বিদ্যাবুদ্ধি ও প্রতিভাহীন হইয়াছি; পূৰ্ব্ব পুরুষের অনুরূপ কোন ক্ষমতাই আমাদির হৃদয়ে বর্তমান নাই। পূৰ্ব্ব পুরুষের সামগ্রী একমাত্র বংশ মৰ্যদাই গৌরব করিবার জন্য বর্তমান আছে। কিন্তু বিদ্যাবিভব ব্যতীত এই গৌরব রক্ষা হওয়া কস্মিন কালেও সম্ভবপর নহে। পদ্যচাকুরে যে সকল বংশ উল্লিখিত হইয়াছে সেই সকল বংশ কাল ক্রমে বিস্তার হইয়া সমাজ স্থান ব্যতীত কোন্ কোন্ স্থানে বসতি করিয়াছেন এবং উত্তরকালে যে সকল বংশ উপ- নিবেশী হইয়া অথবা অন্য সমাজ হইতে আসিয়া কিংবা এদেশের আদিম নিবাসী কায়স্থগণের মধ্যে যাহারা, বারেন্দ্র সমাজে প্রবেশ লাভ করিয়াছেন, সেই সকল বিবরণ এপৰ্য্যন্তও সম্পূর্ণ সংগৃহীত না হওয়ায়, আমাদিগের বহুকাল পােষিত ইচ্ছা সত্বেও বর্তমান পুস্তক সহ প্রকাশিত হইতে পারিল না।

মূল ঢকুর ও সমালােচনা।
শুন সবে কহি এবে, কর অবধান।
কায়স্থ ঢাকুরী মধ্যে, যেমন প্রমাণ।
কুবঞ্চ (১) নগরে বাস, নাম কাশীদাস
কুলে সুপ্রধান, বটে উত্তম সমাজ।
সৎকুলে উদ্ভব তার, জানে সৰ্ব্বজনে।
আজন্ম ব্রাহ্মণ সেবা, করে অবেতনে।
যবে আদিশূর রাজা, মহাযজ্ঞ কৈলা।
পঞ্চ ব্রাহ্মণ সনে পঞ্চ কায়স্থ আইলা।
তাহাতে কুলজি, সৃষ্টি কৈলা দাসবর।
বল্লাল মৰ্যদা, পরে হইল বহুতর।
সেই আদবের মতে, লিখিনু চলিয়া।
ইথে অপবাদ মম লইবে ক্ষমিয়া।
যখন ব্রহ্মার পদে, শূদ্রের উৎপত্তি।
কায়স্থ হইলা মাত্র, ভাব ক্ষুদ্র মতি।
(১) কেহ কেহ বলেন যে কুবঞ্চ, কোলাঞ্চ প্রদেশের অপভ্রংশ। কোলাঞ্চ
কানাকুজান্তৰ্গত প্রদেশ। এই স্থানেই বঙ্গদেশীয় শ্রেষ্ঠ কায়স্থগণের আদি
নিবাস স্থল। এই স্থান হইতেই সকলে আসিয়া এদেশে উপনিবেশী হয়েন।

১৮
মূল ঢাকুর ও সমালােচনা।
বর্ণাচার ধর্ম তাহে, কৈলা আচরণ।
তবে গাত্রে তুলি ব্ৰহ্মা, দিলা আলিঙ্গণ।
সেই সে কারণে কৈলা, কায়স্থ আভাস।
দুগ্ধ হইতে হয় যেন (১) মিষ্টান্ন প্রকাশ ।
যােড়শ লক্ষণে কৈল, কায়স্থ প্রধান।
অবেতনে দেব সেবা, কৈলা মতিমান।
তথাহি শ্লোক।
আচার বিনয় বিদ্যা প্রতিষ্ঠা তীর্থদর্শন।
নিষ্ঠ। শান্তি তপােদানং নবধা কুল লক্ষণং ।
তথাহি শ্লোক।
বিদ্যাবস্ত শচীধীর দাতা চ পরােপকারক।
রাজসেবা ক্ষমাশীল কায়স্থ সপ্ত লক্ষণং ।
এতৎ বিস্তার শাস্ত্রে, আছয়ে লিখিত।
উত্তম ক্রিয়াতে হইলা, কায়স্থ ব্যক্ষিত ।
কায়স্থ হইতে শূদ্র, নীচ ভাবে গেলা।
নীচ কর্মে নীচ রীতি, নীচে রত হৈলা।
এমতে কায়স্থ, শূদ্র, হইল দুই নাম।
নীতি রীতি সৰ্ববিদ কায়স্থ প্রধান।
তথাহি শ্লোক।
গঙ্গা ন তােয়ং কণকং ন ধাতু তৃণং ন দর্ভঃ পশবাে ন গাবে।
প্রজাপতেঃ কায়া সমুদ্ভবাচ্চ কায়স্থবর্ণা ন ভবন্তি শূদ্রা।
(১)' অন্য একখানি হস্তলিখিত গ্রন্থের পাঠ,
“ইক্ষু হইতে হয় যেন মিষ্টান্ন প্রকাশ।

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা।
১৯
অস্যর্থ।
ততায় সঙ্গে মস (১) নহে যথা গঙ্গাজল।
=
কনক উত্তম যৈছে, ধাতু মধ্যে গণি।
তৃণ মধ্যে দুৰ্ব্বা যেন, পবিত্র বাখানি।
পশু মধ্যে গাভী যেন, তেমত জানিবা।
কায়স্থ শূদ্রের সংখ্যা, নহে কদাচিৎ
ফলতঃ কায়স্থ ব্যাখ্যা উত্তম আচারে।
ইহার বিস্তার সব, আছে শাস্ত্রান্তরে।
পূৰ্বেতে আছিল এক, মিছিলে করণ।
অধমে উত্তমে হইল, কাৰ্য্য প্রয়ােজন।
তদন্তরে বল্লাল মৰ্যাদা, যার হইল।
ছােট বড় ভেদাভেদ, কিছু না রহিল।
কলিতে বল্লাল সেন রাজা মহাশয়। (২)
পরাক্রমে মহাবল গৌড় ভূমে হয়।
তাহার কর্তৃত্ব কৰ্ম্ম না যায় বর্ণনা।
হােম শেষে পঠি ভাগ করিতে লাগিল।
(১) মস শব্দের অর্থ পরিমাণ করা। এ স্থলের অর্থ এই যে গঙ্গাজল
সাধারণ জল নৃহে।
(২) অন্য খানির পাঠ এই যে,
সুখসেন পুত্র বল্লাল সেন মহাশয়।
।

९०
মূল ঢাকুর ও সমালােচনা।
কাহাকে কুলীন পদ, দিয়া বাড়াইল।
কাহার কুলীন পদ, কাড়িয়া লইল।
পুত্রান্তে কন্যাতে কুল বান্ধিতে লাগিল।
এইত অধৰ্ম্ম বীজ, সঞ্চয় হইল।
কেহ কেহ রাজ আজ্ঞা, করিল গ্রহণ।
কেহ নবকৃত পদ করিলা নিন্দন।
বারেন্দ্র কায়স্থ, বৈদ্য, বৈদিক ব্রাহ্মণ।
বল্লাল-মৰ্য্যাদা নাহি লইলা তিন জন।
উৎপাত করিয়া রাজা, না থুইল দেশ।
স্বস্থান ছাড়িয়া সবে, গেলা অবশেষ।
বলল যেমন করে, তাহার তাহা হয়।
উত্তমকে ছােট করি, নিজকে বাড়ায়।
শূদ্রকে দিলা কুল, কায়স্থ নিন্দিত।
আপন প্রভুত্ব বলে, করে অনুচিত।
এক দিন মনে কৈলা, বসি সিংহাসনে।
অনাচার আচরিব, ভাবে মনে মনে ॥
নীচ অন্তুজ জাতির, জল নাহি খায়।
তাহাকে আচরে রাজা, হইয়া নির্ভয়।
কুক্ৰিয়া করিতে রাজার, নাহি ধৰ্ম্ম-ভয়।
যে কেহ নিয়ে, তাহে দুর করি দেয়।
আপনি যে মতে কন্যা, আনিল হরিয়া।
তাহার বৃত্তান্ত কিছু, শুন মন দিয়া ।
এক দিন রাজা গেলা, মৃগয়া করিতে।
ঝড় বৃষ্টি দুৰ্যোগ, হইল আচম্বিতে ।

মূল ঢাকুর ও সমালোচনা।
ত্যজিয়া বিপিন রাজা, গেলা লােকালয়ে।
তথায় বসতি করে, ডােমের আশ্রয়ে।
সেই রাত্রি তথায়, রহিল উপবাসী।
মিলিলেক ডােমকন্যা, প্রাতঃকালে আসি।
অতি শুভ্র দধি, বাঁশের বেতিতে লৈলা।
পরম যতন করি, রাজভােগে দিলা ॥
তাহাতে সন্তুষ্ট রাজা, হইলা বহুতর।
দিলা রাজা ধন রত্ন, বস্ত্র অলঙ্কার।
বিবাহ করিব বলি, লইয়া আইলা ঘরে। (১)
যেবা শুনে যেবা জানে, শত নিন্দা করে।
যদি কালক্রমে রাজা, শুনে নিন্দাবাণী।
সৰ্বস্ব হরিয়া তারে, তাড়ায় তখনি ।
ব্রাহ্মণ পণ্ডিত আনি, করায় বিচার।
শাস্ত্রমতে কাৰ্য করি, কিদোষ আমার। (২)
তদন্তরে এক দিন, রাজার নয়।
শাস্ত্র অধ্যয়নে চলে, ব্রাহ্মণ আলয়।
তথায় পড়ুয়া সব, কৌতুক করিয়া ।
কহে বাকছলে মাত্র, বিস্তর নিন্দিয়া ॥
তব পিতা বল্লাল, কামে মত্ত হয়ে।
আনিয়াছে ডােমকন্যা, করিবেক বিয়ে ॥
একদা বল্লাল সেন যে কোন নীচ জাতীয় কন্যাকে আনয়ন করেন
সে প্রবাদ উত্তর বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ দিগের মধ্যেও আছে।
(২) এই স্থলে “স্ত্রীর দুফুলাদপি” ইত্যাদি শ্লোক আছে।

২২
মূল ঢাকুর ও সমালােচনা।
এত শুনি রাজ-সূত, মনে দুঃখ পেয়ে।
চলিল পিতার কাছে, ক্রোধান্বিত হয়ে।
সম্ভমে পিতাকে, কিছু না কহি বচন।
সম্মুখে আছিল ঝারী, বারী সংপূরণ ।
ক্রোধেতে সেই জল ফেলে মৃত্তিকায়।
নিম্নগামী জল মাত্র নীচ পথে যায় ।
জলের দৃষ্টান্তে কহে রাজাকে বচন।
পরম পবিত্র হয়ে নীচেতে গমন । (১)
ইঙ্গিতে বুঝিয়া রাজা কহে প্রত্যুত্তর।
হস্তিকে ভ্রমর হয়ে দিলেক ঝঙ্কার । (২)
অনেক ভাবিয়া রাজা বিবাহ না কৈল।
তথাপি ডােমের কন্যা ছাড়িতে নারিল।
(১) এই স্থলে একটা শ্লোক আছে। তাহা লক্ষণ সেনের রচিত এরূপ
প্রবাদ শুনিতে পাওয়া যায়।
শ্লোকটী এই ;-
শৈত্যং নাম গুণ স্তবেব সহজ স্বাভাবিকে স্বচ্ছ
কিংক্রম শুচিতাং মচান্তি শুচয়ঃ স্পর্শেন যস্যপরে।
কিঞ্চান্যৎ কথয়ামিতে স্তুতিপদং যজ্জীবনং জীবনং
ত্বঞ্চেস্লোচ পথেন গচ্ছসি পয়ঃ কস্তাং নিষেদ্ধং ক্ষম।
(২) এস্থলে একটা শ্লোক আছে। ইহা বল্লালের রচিত এমন প্রবাদ।
শ্লোক এই ;-
তাপাে নাপ গতাস্তু নচ কৃষা ধৌতান ধূলী স্তননা
ন স্বচ্ছন্দকারি কন কবলঃ কা নাম কেলি কথা।
দুরােৎক্ষিপ্ত করেন হস্ত করিনা পৃষ্টানবা পদ্মিনী।
পারদ্ধে মধুপৈর কারণ মহাে হৃঙ্কার কোলাহল।

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা।
২৩
তদন্তরে আর এক শুন বিবরণ।
ধনাৰ্থে বিদেশ গত রাজার নন্দন।
তাহার বণিতা সাধ্বী থাকে নিজধামে।
বিরহিনী হয়ে আছে পদ্ম-নিরীক্ষণে ॥
দারুণ বসন্ত ঋতু হইল প্রধান।
বিরহিণী যুবতীর শমন সমান।
দয়িত বিলম্ব মনেতে ভাবিয়া ।
লিখিলা স্বকৃত শ্লোক নিজ অঙ্গুলী দিয়া।
যথা ধনাৰ্থে পতি গত দূরদেশ।
বিলম্ব কিমর্থে না জানি বিশেষ।
ইদানিং ষড় রিপু দণ্ডধারী।
বসন্ত দুরন্ত সদা মন্দকারী ।
তথাহি শ্লোক।
পতত্যবিরতং বারী নৃত্যন্তি শিখিনো মুদা।
অদ্যকান্তঃ কৃতান্তবা দুঃখস্তান্তং করামে।
এই শ্লোক নিজ ঘরে লিখিতে লিখিতে।
আইলা বল্লাল সেন ভােজন করিতে ।
ব্যস্ত হয়ে গেলা কন্যা লজ্জিত হইয়া।
বুঝিলেন মহারাজ শ্লোক পড়িয়া।
সেই ক্ষণে শত দাড় নৌকা আনাইয়া
ধীবরগণকে চুক্তি করি পাঠাইলা। (১)
(১) বল্লাল সেন পুত্র সমীপে নিম্নোক্ত কবিতা প্রেরণ করেন যথা
সন্তপ্তা দশমধ্বজাদ্যগতিন সন্তাপিত নির্জলে
তুৰ্য্যং দ্বাদশৰৎ দ্বিতীয় মতিমগ্নেকাদশে ভস্তনী।

२8 মূল ঢাকুর ও সমালেচনা। দিবারাত্রি মধ্যে না আন লক্ষণে। তবে তাে নিশ্চয় বন্দী হবে কত দিনে। তাহারা আনিল গিয়া লক্ষণ সেনেরে । সন্তুষ্ট হইয়া রাজা তা সব আচরে। (১) ব্রাহ্মণ দিগকে তাহা কহন না যায়। শুনি রাজসভাসদ হইল বিস্ময়। ইহা দেখি ভৃগু নদী কায়স্থ প্রধান। নিষেধ করিলা নৃপে বুঝায়ে প্রমাণ। অনেক দৃষ্টান্ত দিয়া রাজাকে কহিলা। মহাকোপে নৃপবর নন্দীকে রুষিলা। নন্দী বন্দী হৈলা এই হেন কাযে। বলিতে লাগিল। নন্দী মরি আমি লাজে । সা যধী নৃপ পঞ্চমস্য ভবিতা – সপ্তম বর্জি প্রাপ্রোত্যষ্টং মবেদনাং প্রথমহে তুর্ণ তৃতীয়ভব। (১) কৈবৰ্ত্ত সম্বন্ধে এই প্রবাদ আছে যে, বল্লাল সেন ধীরর শ্রেণী হইতে ইহাদিগকেই উন্নত করেন। এখনও সৎ ব্রাহ্মণগণের মধ্যে কেহ কেহ কৈব- ক্তের প্রদত্ত জল পান করেন না। পূর্বে অনাচরণীয় জাতির পুরােহিত ছিল না। বল্লাল সেন ইহাদিগকে আচরণীয় করিবায় ইহারা পুরােহিতের প্রার্থনা তিনি কল্য প্রাতে পুরােহিত দেওয়া যাইবে বলেন। পরদিন প্রাতঃকালে ইহারা পুরােহিত চাহিলে, রাজা পুরােহিতের উপযুক্ত অন্য লােক দেখিতে না পাইয়া,ঝাড়ুদার হাড়ি যে উপস্থিত ছিল তাহাকেই পুরােহিত হইবার জন্য আদেশ করেন। বাস্তবিক ইহাদিগের পুরােহিত কিন্তু অনাচরণীয়। এ দেশে অনে- কেই কৈবৰ্ত্তের হস্তের জল পান করে, কিন্তু তাহার পুরােহিতের জল পান করে না। কোন কোন স্থলে পতিত ব্রাহ্মণেরাও ইহাদিগের পৌরহিত্য কর্ম করে। করে ;

মূল ঢকুর ও সমালোচনা।
মনেতে ভাবিলা, পঠী আলাদা করিব।
বল্লাল মৰ্যদা মাত্র, কিছু না লইব।
এত ভাবি লিখন লিখিলা নরদাসে।
তেঁহ আসি মিলিলেন নন্দী সমপাশে।
আছিল মুরারি চাকী কুটুম্ব প্রধান।
তাহাকে আনিল নন্দী করিয়া সম্মান।
তিন জন এক স্থানে বসিয়া নির্জনে।
রাজার চরিত্র দোষ ভাবে মনে মনে।
বল কিবা পরামর্শ উপায় কি করি।
এস্থানে থাকিলে রাজা হইবেক অরি ॥
এসব মিছিল মধ্যে না থাকিব আর।
হেন সঙ্গে না করিব আহার বিহার।
পরমার্থ ক্রিয়া হীন হইতে লাগিল।
ভাবি দেখ মহাশয় জাতি নাহি রৈল ॥
কলিতে ম্লেচ্ছ রাজা হইবে প্রধান।
বুঝিলাম তার সব হইল সোপান।
এস্থান ছাড়িয়া চল যাই অন্য দেশে।
তথাতে থাকিৰ গিয়া মনের হরিষে।
এথাতে থাকিলে রাজা করিবে অন্যায়।
ইহা ভাবি স্থান ত্যাগ করিয়া পালায়।
দুরন্ত রাজার চর নিরন্তর ফেরে।
ধরিয়া নিবেক রাজা মারধর করে।
সহায় রহিত স্থলে শক্র শঙ্কা হয়।
সেই চেষ্টা কর যাতে ধরিতে না পায়।

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা।
তাহাতে দিলেক নন্দী হিত-উপদেশ।
এক পরামর্শ এই আছয়ে বিশেষ।
এই স্থানে ছিল পূর্বে শিব নগরায়।
তাহার সন্তান হইল দুই মহাশয়।
শলকুপ, শরগ্রাম দুই ধামে স্থিতি।
ধনবান মহাবল কীৰ্ত্তিবন্ত অতি।
তথাতে যাইয়া যদি হই এক ঠাঁই।
তবে সে বল্লাল হাতে রক্ষা মাত্র পাই।
এই ভাবি ভৃগুনন্দী আর নরদাস।
মুরারি চাকীরে লইয়া গেলা নাগপাশ।
পরম আদরে নাগ সম্মান করিয়া।
তিন জনে তিন বাসা দিলা নিরুপিয়া।
নন্দী গাঁতি, চাকী গতি, দাস গাতি গ্রামে।
প্রথমে করিল বাস এই তিন ধামে ॥
তথা হইতে সমাজ করিল যে যে স্থানে।
পরেতে লিখিব সব নাম নিদর্শনে।
জটাধর, কর্কট নাগ, দুইকে লইয়া।
কহিল রাজার কথা সব বিবরিয়া।
নাগ কহে শুনিয়াছি বল্লাল চরিত।
তার মত গ্রহণেতে বড় বিপরীত।
অতএব নিবেদন করি সন্নিধানে।
করিয়া স্বতন্ত্র শ্রেণী থাক শুদ্ধ মনে।
দাস, নন্দী, চাকী, নাগ, এই তাে ভাবিয়া ।
করিল। বারেন্দ্র শ্রেণী হর্ষ যুক্ত হৈয়া ।

মূল চাকুর ও সমালােচনা।
২৭
সিংহ, দেব, দত্ত ঘর আনিলা যতনে।
রাখিলা আপন মতে স্থান নিরুপণে।
পঠীর বন্ধন সব কহিতে লাগিল।
সৰ্ব্ব সমাধানে এই ভাব নিরুপিলা ।
তিন ঘর সিন্ধভাব, নন্দী, চাকী, দাস।
নাগ, সিংহ, দেব, দত্ত, সাধ্যতে প্রকাশ
পঠীর বন্ধন কৈল, ভাবি চারিজন।
কুলবান্ধা অকৰ্তব্য শুনহ কারণঃ
কন্যা কিম্বা পুত্রে যদি কুল বান্ধা হয়।
উভয়েতে হবে দোষ জানিহ নিশ্চয়।
কন্যাগত করা কুল বড় অনুচিত।
দৈৰে ধনহীন হৈলে হবে বিপরীত।
কুলের গরিমা করে যশের লাগিয়া ।
বর্ধমানা হলে কন্যা, নাহি দিলে বিয়া ।
কন্যা কালাতীত যদি কোন ক্রমে হয়।
হইবে পাতক গ্রস্থ জানিহ নিশ্চয়।
অতএব কুল বান্ধা নিষেধ একারণে।
নবকৃত কুল বান্ধা কোন প্রয়ােজন।
সকলের মূল কুল, দান গ্রহণ
সর্বশাস্ত্রে এই নীতি লিখে বর্ণাচারে।
চাৰি যুগ ক্রমে চলে সেই ব্যবহারে।
এখন কলিতে রাজা বল্লাল প্রধান।
তার মত যেই লয় সে অতি অজ্ঞান।

২৮
মূল ঢাকুর ও সমালোচনা।
কন্যার লইলে কড়ি মহাপাপ হয়।
ঘাের নরকানলে সে পাপী ডুবয়।
সে পাপ নিবৃত্তি নাহি করে বিত্তবলে।
হন্ হন্ নরকানলে যমদূত ফেলে।
বল্লাল মৰ্যাদা হলে অবশ্য ঘটয়।
কুলের কারণে মহা পাপ গ্রস্থ হয়।
ব্ৰতাদি নিয়মে ধৰ্ম লাভ হয় যত।
কুলক্ষয় জন্য তার নিশ্চয় পাতক।
অতএব কুল বান্ধা অকৰ্ত্তব্য হৈল।
সিদ্ধ, সাধ্য দুই ভাব প্রসিদ্ধ গনিল।
দান গ্রহণ শ্রেষ্ট ভাব করণ তাৎপৰ্য্য।
কুলাকুল দুই হৈতে লাভ শোৰ্য্য বীৰ্য্য। (১)
(১) “ভৃগুনন্দী বারেন্দ্র কায়স্থ কুলে যে সকল নিয়মাবধাৰণ করিয়াছিলেন,
তাহা অতি সন্নিয়ম বলিতে হইবেক। তৎকালে বারেল কায়স্থ কুলে কন্যা কি
পুত্রগত কূল ছিল না। বিবাহে কন্যা মুল্য গ্রহণ করা অতি ঘৃণিত কর্ম ছিল।
দান গ্রহণ এই দুই কুল ধৰ্ম্ম ছিল। আদান প্রদানের শ্রেষ্ঠতা, মধ্যম ও অধম
ভাবানুসারে কুলে শৌৰ্য্য সমাবেশ এবং নিন্দা হইত।”
বারেন্দ্র কায়স্থ সমাজ সংস্থাপনকারীগণ বহুদর্শিতা বলে স্বকীয় সমাজের
যে সকল কুল বিষয়ক নিয়ম অবধারণ করিয়া গিয়াছেন তাহা এমনই সমাজের
উপযােগী হইয়াছিল যে, তৎপরিবর্তনের আবশ্যকতা কখনই হয় নাই। বল্লালী
মৰ্যদা প্রাপ্ত সমাজে উদয়নাচাৰ্য ও দেবীবর ঘটক এবং পুরন্দর খা কর্তৃক অনেক
পরিবর্তন সংঘটন হইরাছে। ইহারা যে পরিবর্তন করিয়াছেন, তাহাতেও কিন্তু
তত্তৎ সমাজে এখনও পরিতুষ্ট নহেন। রাঢ়ীয় ঘটকগণ দেবীবরের মেল বন্ধনেও
রঘুনন্দনের স্মৃতিতে এবং নিমাই সন্ন্যাসে বিরক্ত হইয়া যে রূপ উক্তি করেন
তাহা পাঠকগণের জ্ঞাতার্থ উদ্ধৃত করিলাম ;-

মূল চাকুর ও সমালােচনা।
২৯
সিদ্ধ ঘরে প্রধান টা যদি হয় ।
সাধ্য ঘরে সিদ্ধ যত বিগ্রহের প্রায়।
সাত ঘর একত্র লইয়া পঠী বদ্ধ কৈলা।
তৎপশ্চাৎ আধ ঘর সরমা হৈলা ।
সরমা বৃত্তান্ত শুন, কষ্ট শূদ্র মতে।
তাহাকে রাখিল নন্দী নিজ ভৃত্য রূপে।
নর সুন্দর নাম তার সরমা পদ্ধতি।
নীচ কৰ্ম্ম করে নিজে নীচ শূদ্র জাতি।
আত্ম-খেদ করে সরমা মহাশয়।
আমাতুল্য লােক যত বল্লাল সভায়।
চৈয়ে ছোড়া বড় দুষ্ট নিমা তার নাম।
যাে বেটা মােটা বুদ্ধি ঘটে করে খাম।
কানার সিদ্ধান্তে ন্যায় গৌতমাদি হত।
প্রাচীন স্মৃতির মত নন্দাহাতে গত ।
শচী ছেলে নিমে বেটা নষ্টবুদ্ধি বড়।
মাতা পিতা দুই ত্যাগী সন্ন্যাসেতে দড়।
এই কালে রাঢ়ে বঙ্গে পড়ে গেল ধুম।
বড় বড় ঘর যত হইল নিধুম।
কিছু পরে সংকেতের বংশে এক ছেলে।
নামে খ্যাত দেবীবর লােকে যারে বলে ।
সেই ছেড়া মনে করে কুলে করে ভাগ।
তদবধি কুলে আছে ছত্রিশের দাগ।
দোষ দেখি কুল করে একি চমৎকার।
অজ্ঞান কুলীন পুত্র কুলে হয় সার।

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা।
তাসবার মৰ্যদা হৈল বহুতর।
আমি সে রহিনু মাত্র হইয়া নাচার।
আমি না থাকিব আর অদ্য হইতে।
যদি মােরে দেও কুল থাকিব এথাতে।
একথা শুনিয়া হাসি কহে নন্দী চাকী।
আজি হইতে অর্ধ ভাব আর অর্ধ ফাকি ।
এই কথা শুনি পরে নাগ জটাধর।
উত্মাতে খেদালে তারে দেশান্তর।
সেই হৈতে সরমা গেল অন্য দেশে।
বারে প্রধান মধ্যে কভু নাহি মিশে ॥ (১)
এই মতে পঠা বদ্ধ বরেন্দ্রে হইল।
বল্লাল মৰ্যদা কেহ কিছু না লইল।
উত্তম কায়স্থ, বংশে উত্তম আচার।
সমাজে বান্ধিল তার লয়ে সপ্ত ঘর ।
(১) “সরমা নাপিত ছিলেন, দাস নন্দী চাকি সরমা হইতে উপকার প্রাপ্ত
হইয়া তাহাকে সমাজে চ লন করেন, চাকি প্রভৃতি সরমার কন্যা গ্রহণ করিয়া-
ছিলেন” সম্বন্ধ নির্ণয় ১০৫ পৃঃ। কবিতা পাঠেই বিলক্ষণ প্রতীত হইবে যে
বিদ্যানিধির এই কথা সম্পূর্ণ অলীক। বিদ্যানিধি মহাশয়ের ঐ মতটী পড়িয়া
আমাদের একটা গল্প মনে হইল। একজন বড় সাহেব এদেশের আচার ব্যবহার
সম্বন্ধে একটী প্রবন্ধ লিখেন যে ভারতবাসীরা চিঠির অরন্তের প্রথমেই “শ্রীদুর্গা”
লিখে। “শ্রী” শব্দ “সার” (Sir) শব্দের অপভ্রংশ তাহাতে সন্দেহ নাই। তবে
দুর্গা শব্দের অর্থ ঠিক জানা যায় নাই। কিন্তু হিন্দুরা ন্যায় শাস্ত্রের যেরূপ ভক্তি
করে তাহাতে উহাকে ন্যায়ের টীকাকার দুর্গাদাসকেই নিশ্চয় বুঝায়। সুতরাং
শ্রীদুর্গার অর্থ “সার দুর্গাদাস! বিদ্যানিধি মহাশয় কেমন করিয়া জানিলেন
যে সরমা নাপিত ছিলেন এবং দাস নন্দী চাকী তাহার কন্যা গ্রহণ করেন?
At

মূল ঢকুর ও সমালােচনা।
জল দুগ্ধ একত্ৰতে একাধারে রৈলে
হংস যথা দুগ্ধ খায় জল নাহি গেলে।
সপ্ত ঘর লইয়া হইল কাৰ্য্য প্রয়ােজন।
বাহাত্তর ঘরের কথা শুন দিয়া মন ॥
সন্ন্ বত্রিশ ঘর চাকর রাজার ।
চল্লিশ ঘর ভাবান্তরে হৈল স্বতন্তর।
ইহার বিস্তার লিখে আদি কুলজিতে।
কিঞ্চিৎ লিখিব আমি উদ্দেশ জানিতে।
এই বাহাত্তর ঘর নহে সমাজিত।
রারেন্দ্র শ্রেণীতে কিন্তু হৈলা উপনীত।
চাকর বত্রিশ ঘরের শুনহ আচার।
শূদ্রের সন্তান বটে ব্যবসা কাহার। (১)
তাহার কারণ কথা করহ শ্রবণ।
সৰ্ব্বদা করিত রাজা তাম্বুল চক্মণ ॥
তাহাদের কাদে চড়ি যায় সােয়ারিতে।
চলিতেন রাজা পান খাইতে খাইতে।
তাহা দেখি সভাস নিষেধ করিল।
সেই সে কারণে শূদ্র “কাহারে” হইল।
অক্ষম অকৃতবন্ত নীচ শূদ্র যত।
ধনহীন গুণহীন নীচ কৰ্ম্মে রত ।
নিলা নন্দী কাড়ি যার বাদা ঘাড়ে ছিল।
কায়স্থ সমাজ মধ্যে মিশিতে লাগিল।
(১) স্থান বিশেষের কাস্থ নামে পরিচিত আচার ভ্রষ্ট জাতি যে কাহারের
কাৰ্য করে তাহা চাকুর সমালােচনায় লিখিত হইয়াছে।

৩২
মূল ঢকুর ও সমালােচনা।
তাসবায় বাড়াইতে রাজার হৈল মন।
প্রধান কায়স্থ সঙ্গে ঘটায় করণ।
আর আর পঠীতে গিয়া মিলিতে লাগিল।
বারেন্দ্র পঠীতে কিন্তু তারা ত্যজ্য হৈল ।
চল্লিশ ঘরের এবে শুন তারতম।
কেহবা নিন্দিত ত্যজ্য, কেহবা উত্তম।
তাহার তাৎপৰ্য এবে কর অবধান।
আছিল প্রধান রাজা নিত্যশুর নাম। (১)
বিবাহ আনন্দ কাৰ্য্য করিতে লাগিল।
ক্রমে বাহাত্তর বিবাহ তেঁহ কৈলা।
বিবাহ করিল রাজা দেশ বিদেশে।
নীচকূলে নীচবংশে কৈলা অবশেষে।
কালক্রমে সন্তান সবার হৈতে লাগিল।
ক্ষেত্র পুত্র বলি তাদের পরিচয় হৈল ।
শুনিয়া কুপিত তেঁহ ডাকে তা সবারে।
ক্রোধেতে কাটিতে তেঁহ চলিলা নির্ভয়ে ॥
তাহারা পলায়ে গেল বল্লাল নিকট।
বল্লাল ঘটান কাৰ্য উত্তমের সাত ।
ইহা দেখি ভৃগুনন্দী আর নরদাস।
মুরহর চাকী তিন উত্তম সমাজ।
তুচ্ছ করি ত্যজিলেন তাহা সবাকারে।
করিলা বারেন্দ্র পঠা মিলি সপ্ত ঘরে।
(১) হস্ত লিখিত অন্য একখানি ঢাকুরে নিত্য শূরের পরিবর্তে নিত্যানন্দ
নাম লিখিত আছে।

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা।
আদি মূল তিন জন,
তিন জন, আর নাগবর।
সমাজ করিল সবে হয়ে স্বতন্তুর ।
দাস নন্দী চাকী, নাগ সহায় করিয়া।
বল্লাল সহিত জিদ্দি দিলেক ভাঙ্গিয়া ।
নরদাস, মুরারি চাকী, কুটম্ব প্রধান।
তাহা লৈয়া কৈলা পঠী নন্দী বলবান।
তুচ্ছ করি বল্লাল মৰ্যদা নাহি লৈলা ।
সিদ্ধ সাধ্য ভাব তেঁহ প্রচার করিলা।
দৈব বলে বল্লাল হয় গৌড় অধিপতি।
নীচ প্রিয় দেখি তারে ত্যজে সাধুমতী।
প্রধান কায়স্থ তিন ষােড়ষ লক্ষণে।
দ্বিজ গুরু দেবার্চনা কৈল। সৰ্ব্বক্ষণে ॥
নীচবংশ, ক্রিয়া হীন, নীচ রীতি যত।
তাহা পরিত্যাগ করি কৈলা শুদ্ধ মত ।
এমন সুকীর্তি নাহি ছিল আর।
সৰ্ব্ব শাস্ত্র বিধানেতে রাখে কুলাচার।
দাস, নন্দি, চাকি, তিন পঠী বদ্ধ কৈল।
সাধ্য ঘরে, মৰ্যদাতে সিদ্ধভাব হৈল ।
নাগ, সিংহ, দেব, দত্ত, সাধ্য চারি ঘর।
ইহা মধ্যে নাগ ঘরের মৰ্যদা বিস্তর।
যে স্থানে সমাজ শ্রেষ্ঠ যার বংশ যথা।
সংক্ষেপে কহিব কিছু পাচালিতে গাঁথা।
ক্রমে বংশাবলি ক্রিয়া লিখি বিস্তারিত।
আদিস্থানে মূলজবংশ লিখিব কিঞ্চিৎ ।

৩৪
মূল ঢাকুর ও সমালােচনা।
প্রথমে দাসের আদি কর অবধান।
কাশীশ্বর দাসের জ্ঞাতি নরদাস নাম।
সৎকুলে জনম তার শ্রেষ্ঠকুল ক্রিয়া।
উত্তম হইল ভাব সৰ্ব্বত্র ব্যাপিয়া।
তাহার কুল কৰ্ম্ম অসংখ্য বর্ণন।
লক্ষ্মীযুক্ত, মুক্ত হস্তে ছিলবহুধন।
কুলে শীলে যশবন্ত ষােড়শ লক্ষণে।
জন্ম গোঁয়াইল তেঁহ দ্বিজ সম্ভাষণে।
কি কব কুলের ব্যাখ্যা না যায় বর্ণন।
এযাবত নন্দী, চাকীর দান গ্রহণ ॥
যখন কুলজি সৃষ্টি হইতে লাগিল।
পদ্ধতি বিচারে শ্রেষ্ঠ দাস ঘর হৈল ।
নন্দী চাকীসহ পঠিতে সমান।
বিশেষ কায়স্থের আদি দাসও প্রধান।
নরদাস বংশ।
নরদাস ঠাকুর নাম,
কুবঞ্চ নগর ধাম,
আছিলেন স্বরাজ্য আশ্রয়ে।
মাতামহ পৌরষ,
পৃথিবীতে যার যশ,
অদ্যাবধি মহিমা ঘােষয়ে।
অত্রি গােত্র কহি সার, লিখে তিন প্রবর,
অসিত বিশ্বাবসু প্রবরয়।

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা।
কত দিনান্তর,
গৌড়ভূমে দাসবর,
বাকি গ্রামে বসতি করয়।
চারি পুত্র তথা হৈল,
ভুবন বঙ্খরে রৈল,
সৰ্ব্ব জেষ্ঠ্য স্থিত বাকি গ্রাম।
মধ্যম বােধপুরে গেলা, বগুড়া কনিষ্ঠ রৈলা,
এই তিন সমাজ হৈল নাম।
শ্রেষ্ঠ ভাব হৈল বাঁকি, কাৰ্য্য কৈল নন্দী চাকী,
দান গ্রহণ সমতা গণনা।
বােধপুরে, বঙ্খরে মধ্যমভাব, চন্দ্র আচ্ছাদিয়া আর,
সৎকরণ হৈলেক জানা।
বগুড়াতে যেহ রৈলা,
ধনহীন হৈয়া গেলা,
প্রধান করণ নাহি হয়।
একারণ নিম্নাম,
হৈলা বগুড়া ধাম,
অমূলজ ভাবেতে জানায়।
হরিপুর, নাগড়া, গুধি,
মধুকল্য গােত্রবাদী,
এই তিন স্থান ঢাকুরিতে।
কিন্তু গুধি পাইল নিধি, সদয় হৈল বিধি,
কাৰ্য্য কৈল নন্দী চাকী সাথে ।
হরিপুরের ভাব কষ্ট, কাৰ্য নাহি হৈল শ্রেষ্ঠ,
মধ্যবিত কাৰ্য কেহ কৈল।
কেহ বলে কেহ নিন্দে, কাৰ্য্য সব নীচ সম্বন্ধে,
সমাজ সম্মান নাহি রৈল ॥
আর এক দোষ বলে, জ্ঞাতি সব অন্তে মিলে,
কেহ গেল দক্ষিণ শ্রেণীতে।

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা।
কেহবা বঙ্গেতে গেলা, কেহবা বারেন্দ্র রৈলা,
তার কাৰ্য নহিল প্রধান।
অষ্ট মুনিষা, পােতাজিয়া, নিরাবিল বাছিয়া,
খামরা, সরিসা, বাজুস।
ইথে যার কাৰ্য্য নাই, তাহাকে সন্দেহ ভাই,
এই মাত্র কুলজি প্রকাশ ।
নাগড়া নিম্নাম ভাব, তাহা লিখি কিবা লাভ,
কষ্ট শূদ্র মধ্যে গণনা।
নাহি জানা, চেনাশুনা,
ভাব কষ্ট সৰ্ব জনা,
অন্যান্য পঠীতে মিশিল ।
এইত দাসের শ্রেণী, সমাজ প্রধান জানি,
বাকি গ্রামবাসী যত দাস।
বহু গােষ্ঠী ক্রমে হৈয়া, স্থানে স্থানে রৈল যাইয়া,
সেই সব হৈল সমাজ।
কেহ সাধু খালি রৈলা, কেহ স্থানান্তরে গেলা,
পদস্থ হৈলা সর্ব স্থানে।
কুলে শীলে কীৰ্ত্তিবন্ত,
মহিমা নাহিক অন্ত,
সমাজ প্রধান বলি গণে।
সেই বংশে বাণী রায়, বাঙ্গলায় রায় রাএা হয়,
কংশ, গােপাল জমিদার।
রামভদ্র, রামনাথ,
মজুমদার আখ্যাত,
কাননগু সেরান্তা বাঙ্গলার।
ইহাদের জ্ঞাতি বংশ, যথা যথা অবতংশ,
সেই জন কায়স্থ প্রধান।

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা।
৩৭
মচমলি, ময়দানদীঘি, বিপছিল, চৌপাকি,
পাবনা, মালঞ্চি আদি স্থান।
কেঁচুয়া ডাঙ্গা, মেহেরপুরে, মানিকদি, গঙ্গাতীরে,
ঘরগ্রাম স্থানে প্রচলিত।
নিরাবিল ভাবশুদ্ধ,
পঠী মধ্যে আবদ্ধ,
সংক্ষেপে কহিনু কিঞ্চিৎ ।
ইহা বহিভুত দাস,
করিহ বিশ্বাস,
যদি দেখ কোন জন।
সে সব জানিহ মাত্র, কাৰ্য্য চলার নিমিত্ত,
পঠী মধ্যে ভাব সাধারণ।
নন্দী বংশ।
মূল।
কহিব নন্দীর শ্রেণী, টাকুরিতে যাহা শুনি,
নন্দী হইতে পঠীর আদি
কাপ গােত্রের সার, সংসারে বিখ্যাত আর,
যার মতে বান্ধা হইল কুল।
নন্দী সে প্রধান ঘর, ভৃগু আরাধিয়া হর,
সপ্ত পুত্র হইল বিদ্যমান।
শ্ৰীকণ্ঠ, শিব, শঙ্কর, কৌতুক, বাল্মিকী আর,
শেষ পক্ষে কাণু, মাধব দুই নাম।
বাল্মিকী নিঃসন্তান,
ছয় পুত্র বিদ্যমান,
ভাব শ্রেষ্ঠ হইলা মাধব কাণ।

৩৮
মূল ঢাকুর ও সমালোচনা।
উপযুক্ত কুলে শীলে, প্রধান বারেন্দ্রমেলে,
প্রকাশিত যেন চন্দ্র ভানু।
সৰ্ব্বজেষ্ঠ্য সহােদর,
শ্ৰীকণ্ঠ নিন্দিত নর,
তেঁহ হইতে কানু মাধব বাড়িল।
অগ্রজ থাকিতে হয় কনিষ্ঠের বন্দন।
দধি দুগ্ধ সৰ্ব্বাগ্রে ঘৃতেতে ভােজন।
কুলে শীলে দুই ভাই বাড়ে সৰ্বমতে।
উত্তম হইলা ভাবে বরেন্দ্র ভূমিতে।
শিব, শঙ্কর আদি ভাই চারিজন।
ছােট আর মধ্যমভাবে হইলা নিরুপণ ॥
কানু, মাধবের বংশ ভাবেতে প্রধান।
মধ্যবিত ভাব শিব, শঙ্কর সন্তান।
সাধারণ হইল ভাব আর বংশ যত।
এইত কহিনু পূৰ্ব্ব কুলজির মত।
ছয় জন যে যে স্থানে করিলেক স্থিতি।
সেই সব স্থান হইল সমাজ বসতি।
ভৃগু নন্দী দূত,
শ্রীকানু, মাধব নাম ।
বল্লার (১) ছাড়িয়া, গেল পােতাজিয়া,
সমাজ বসতি গ্রাম।
অতি গুণ যুত,
(১) এই স্থান বরেন্দ্রভূমির অন্তর্গত নন্দীগ্রামের নিকটবর্তী। এই
প্রদেশ অতি প্রাচীন ও বাসের অনুপযােগী হওয়ায় বােধ হয় ইহার পূর্বদিগে
মি ভুমিতে নুতন স্থান পােতাজিয়াতে বাস করেন।

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। কাণুর সন্তান, তিন যােগ্য বান, কেহ অষ্ট মুনিশা গেলা। কেহবা কালাই, গঙ্গা তীরে যাই, কেহ পােতাজিয়া রৈলা । মাধব সন্তান, সব যােগ্য বান, সবই পােতাজিয়া স্থিতি। বহু কাল পরে, স্থান স্থানান্তরে, কেহবা করিলা গতি। দু ভায়ের বংশ, গুণে অবতংশ, নির্মল কুলের যশে। বহু গােষ্ঠী হইয়া, স্থানে স্থানে যাইয়া, রহিলেক মাত্র শেষে। আদি কুলজিতে, লিখে বিস্তারিতে, বংশাবলী ক্রিয়া যত। কিঞ্চিৎ আভাস, ইদানিং প্রকাশ, লিখি আমি তার মত । প্রধান সমাজ মধ্যে অষ্ট মুনিশা গ্রাম। উত্তম ক্রিয়াতে ব্যাখ্যা হইলা প্রধান। সৰ্ব্ব বিদ্যা নিপুণতা সৰ্বাদরনীয়। অসীম অনন্ত গুণে কেহ তুল্য নয়। যবে মানসিংহ (১) রাজা বাঙ্গলাতে আইলা। জানিয়া উত্তম বংশ সম্মান করিলা। (১) মানসিংহ ১৫৮৯ খৃষ্টাব্দে একবার বাঙ্গলার শাসন কর্তা হইয়া , কয়েক বৎসর শাসন করেন। তৎপর আর একবার তিনি সম্রাট কর্তৃক শে

৪০
মূল ঢাকুর ও সমালােচনা।
কানুন দপ্তর শ্রেষ্ঠ বাঙ্গলাতে হয়।
সে দপ্তরে চাকর কৈলা গােপীকান্ত রায়। (১)
নেউগি খেতাব দিলা সন্তুষ্ট হইয়া।
নিজ গ্রাম খানি দিলা মিলিক লিখিয়া ॥
কুলেশীলে ধনে জ্ঞানে শাস্ত্রেতে তৎপর।
বারে প্রধান বলি মহিমা যাহার।
তঁাহার কর্তৃত্বে কৰ্ম্মে কিবা দিব সাক্ষী।
গােপীরায়ে কন্যা দিয়া চতুর (২) হৈলা চাকি।
মুরারি চাকির কভু নহে ত সন্তান।
তথাপি চতুর চাকীর হইল সম্মান।
তাহার দৃষ্টান্ত যৈছে উত্তমের সাতে।
অতি নীচ উত্তম হয় কহে শাস্ত্র মতে ।
এমত ক্ষমতাপন্ন অশেষ মহিমা।
কত শত কীৰ্ত্তি তার কত কব সীমা ।
জ্ঞাতিগণ কেহ কেহ দেও গৃহে স্থিতি।
কেহ সিংহ ডাঙ্গা গিয়া করিলা বসতি।
প্রেরিত হইয়াছিলেন। আকবরের সময় বগুড়ার অন্তর্গত সেরপুরে একটা
ছাউনী ছিল। তাহাতেই মরা সেরপুর নাম হয়। মানসিংহ করতােয়া
তটস্থ এই স্থানেও কিয়ৎ কাল ছিলেন।
(১) গােপীকান্তের অধঃস্তন ১২ পর্যায়ের নাম জানা গিয়াছে। সুতরাং
তিনি মানসিংহের সমসাময়িক ছিলেন।
(২) এরূপ প্রবাদ আছে যে নীচ কায়স্থ চতুর নামক কোন ব্যক্তি স্বীয়
সুন্দরী কন্যা গােপীরায়কে দান করিয়া চাকির মধ্যে গণ্য হয়। এই চতুর
চাকি-বংশ মুখ্যচাকী বংশ হইতে হীন ভাবে আছে।

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা।
৪১
যে যেখানে গেল তথা হৈল যশনিধি।
যশ ভাৰ যশ কীৰ্ত্তি ঘােষে অদ্যাবধি।
কাণুর সন্তান কেহ পােতাজিয়া ছাড়িয়া।
আমরা, কালাই, বাস চাকরি লাগিয়া ।
পূর্ণিয়া সহরেতে প্রধান চাকরি।
নির্মল কুলের ব্যাখ্যা কহিছে ঢাকুরি
শিবানন্দ সরকার সেই বংশােদ্ভব।
নিরাবিল কাৰ্য যত করিলেন সব।
কিকব করণ ব্যাখ্যা ঘন দুগ্ধ ক্ষীর।
তাহাতে মিশ্রিত সব হইল কপূর।
তাহার সন্তান মধ্যে রায় রাজ্যধর।
পাতসার নিকটে হইল মৰ্যদা বিস্তর ।
আরবী পারসী দুইকুল ফাজিল।
পাতসার দরবারে ছিল বাঙ্গলার উকীল ।
সেই সব বংশ কেহ কালাই, গঙ্গাতীরে।
কেহ চিথলিয়া রহে কেহ চণ্ডীপুরে।
কেহ সাধুখালি এল কেহ দিল্পসার।
কেহ বা রহিমপুর, মনিদহ আর ।
প্রসিদ্ধ গণনা যার বারেন্দ্র মিছিলে।
অর্থাৎ ক্রটি কায নাহি কোন কালে।
চতুর্বিংশতি পুরুষ ভৃগু অবধি করিয়া ।
উত্তম মধ্যম কাৰ্য যাইছে চলিয়া।
এই সে উত্তম ব্যাখ্যা জানিহ নিশ্চয়
পুরুষানুক্রমে অপকৃষ্ট কাৰ্য্য নয়।

৪২.
মূল ঢাকুর ও সমালােচনা।
কটকে চাকরি কৈল মাধব সন্তান।
পােতাজিয়া থাকি কৈলা সমাজ প্রধান।
তথা হইতে দেবীদাস খাঁ মহাশয়।
রহিল। মহিমাপুরে জাহ্নবী আশ্রয় ।
প্রধান চাকরি কৈলা নবাব সরকারে।
বিদ্যা বুদ্ধি কুল শুদ্ধ উত্তম আচারে ॥
উত্তম সমাজ মধ্যে উত্তম গণনা।
উত্তম কায়স্থ ব্যাখ্যা করে সর্বজনা।
পারস্য বাঙ্গালা শাস্ত্র ব্যাকরণ আদি।
আরবী পারসী হিন্দি বিদ্যা নানাবিধ ।
যতেক মহিমা তঁার নাহি লিখা যায় ।
দেব তুল্য বাক্য হইল কায়স্থ সভায়।
বার ঘর কায়স্থ তেঁহ সংগ্রহ করিয়া।
উত্তমের তুল্য পদ দিলা বাড়াইয়া ।
সৰ্ব্বার্থে উত্তম বটে উত্তম কুলক্রিয়া।
কেহ বা মহিমাপুরে কেহ পােতাজিয়া ॥
যে বংশে জন্মিয়া ছিল কাশীশ্বর রায়।
ঈশ্বর হইলা বশ যার তপস্যায় ।
অসীম অনন্ত গুণ পরম বিদ্যান।
তস্যপুত্র জগদানন্দ গুণে অনুপম।
তস্যপুত্র পঞ্চতার শুনহ বিস্তার।
রমাকান্ত, গােপীকান্ত, দেবীকান্ত আর ॥
সৰ্বানুজ ভবানীকান্ত একপক্ষে হয়।
পক্ষান্তরে সর্ব জেষ্ঠ্য হইল রূপরায়।

মূল ঢকুর ও সমালােচনা।
সগােত্রে বিবাহ তেঁহ না বুঝিয়া কৈলা।
পিতৃ কোপে গিয়া ভূতে গ্রামেতে রহিলা। (১)
রমাকান্ত আদি আর ভাই চারিজন।
তাসবার বংশে সব শ্রেষ্ঠ আচরণ ॥
এইত করিনু কিছু মহিমা কীৰ্ত্তন।
আদি ঢাকুরীতে আছে অনেক বর্ণন।
শিব শঙ্কর দুই জনের মতেক সন্তান।
সৎকুলে করিল কাৰ্য্য রহিল সম্মান।
করমজা, বেথুরিয়া কেহ কেহ রহিল।
রহিমপুর, মেহেরপুর সমাজ করিল ॥
কেহ হামকুড়া রৈল কেহ মহেশ রোহাল।
প্রধান সমাজ এই লিখিল সকল ॥
সৎকরণ করিয়া কেহ কার্যের গৌরবে।
অষ্ট মুনিশা, পােতাজিয়া রৈল অন্য ভাবে ?
আর এক শুন শিবনন্দীর সন্তান।
ইচ্ছলটে তেঁহ করণে প্রধান।
পাতসাহী চাকরী ক্ৰমে পশ্চিমেতে গেল।
সে স্থানে বিবাহ করি পুনঃ দেশে আইলা।
জ্ঞাতি কুটম্ব সবায় করিলা নিমন্ত্রণ।
হাতে সরা স্ত্রীলােকের আছে পরিক্রম।
(১) অন্য হস্ত লিখিত গ্রন্থের পাঠ;-
পিতৃকোপে ভূতে নামে অভিহিত হৈলা।
ভূতে গ্রামেতেই থাকুন বা ভূতে নামেই কথিত হউন, কাৰ্যটী গর্হিত করিয়া
ছিলেন্ন সত্যবটে! এবং সেই কারণে তদংশ অবসাদ গ্রস্থ ছিলেন। এ আঘাত
চিরকাল থাকিবে।

৪৪
মূল ঢাকুর ও সমালােচনা।
সবাকে সম্মান করি আলয়ে আনিলা ।
ভােজন করিতে মাত্র সকলে বসিলা।
তবে কন্যা স্বর্ণ থালে পরমান্ন লয়ে।
সভা মধ্যে দিতে গেলা নমনা হয়ে।
মনেতে ভাবিলা কন্যা কারে আগে দিব।
কোমান গরমান আমি কেমনে চিনিব ।
শুন মেরা ধাই হম পুঁছে এক বাত।
খবরদার হােকে কহ আগু দেই কাত ।
হাম নাহি জানে কোমান গরমান।
কহ শুনি কাকর (১) পাতমে দেঙ্গে পরমাণ।
নববধূ মুখে হিন্দি কথা শুনিয়া ।
উঠিলেন জ্ঞাতি সব অন্ন ত্যজিয়া।
সেই হেতু কাকর পাতের নন্দী সবে বলে।
করন গৌরবে মাত্র পঠী মধ্যে চলে ।
(১) এই “কাকর” হইতেই এই বংশীয়েরা “কাকর পাতের” নন্দী বলিয়া
পরিচিত। এবং এই অবসাদ অদ্যাপিও আছে। বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ সমাজেও
এইরূপ একটী সদৃশ ঘটনা আছে। ভাদুড়ী বংশীয় প্রচণ্ড খা বাদ সাহার সৈন্তা-
ধ্যক্ষ ছিলেন এবং কাৰ্য বশতঃ কিছুদিন বােহিলাখণ্ডে থাকিয়া তথায় বিবাহ
দেশে আসিয়া সমাজত্ হইবার উদ্যোগ করেন; কিন্তু তদীয় পত্নী
বাঙ্গালীর মেয়ে নহে জন্য তাহার জাতীর প্রতি সন্দেহ হওয়ায় প্রধান প্রধান
ব্যক্তিরা পরিত্যাগ করেন। খাঁ মহাশয় অর্থবল বা যে রূপেই হউক কয়েকজন
ব্যক্তিকে বাধ্য করেন। তদবধি ইহারা রহেলা পঠী নামে ও অবসাদ ভাবে
পরিগণিত। পরে অনুসন্ধানে উক্ত কন্যা ব্রাহ্মণ জাতীয় প্রমাণ হওয়ায় সুবুদ্ধি
গার পুত্র কর্তৃক অবসাদ অপহরণ হয়।

মূল টাকুর ও সমালােচনা।
৪৫
তিথুলিয়া, আটঘরিয়া নহিল চলন।
বল্লার রহিল মাত্র যত জ্ঞাতিগণ।
হইল শ্রেষ্ঠভাব প্রধান গণন।
সাধারণ ভাবে মাত্র হইলা চলন।
কেহ বা বল্লার গৈলা কেহ হৈলা ছাড়া।
কেঁউগাছি, কামার গাঁও আর আর পাড়া।
এইত ভৃগুর বংশ যে সকল স্থানে।
উত্তম মধ্যম ভাব কনিষ্ঠ বিধানে।
চাকি বংশ।
সিদ্ধ মধ্যে সুপ্রধান, ত্রৈলােক্য দেব চাকি নাম,
চক্রবর্ত্ত গ্রামেতে বসতি।
গৌতম গােত্রের সার,
লিখে পঞ্চ প্রবর,
কায়স্থ প্রধান উৎপত্তি।
সকুল সৎকীৰ্ত্তিবন্ত,
মহিমা নাহিক অস্ত,
গানপত্য মন্ত্রেতে দীক্ষিত।
সেবি দেব গজানন,
হইল এক নন্দন,
মুরহর চাকি শুদ্ধমতি।
যশে গুণে অনুপম,
বসতি মৌরট গ্রাম,
শেষে এক বিবাহ করিল।
প্রতিজ্ঞায় ঠেকি দায়,
অতি নীচে কাৰ্য্য হয়,
যষ্ঠ পুত্র তাহে উপজিল।

মূল ঢকুর ও সমালোচনা।
গুণে হইল
মুরারি চাকির দূত,
অদ্ভুত,
কানু দেব প্রথম পক্ষেতে।
শেষ পক্ষে ছয়জন,
শুন তার বিবরণ,
যার যশ ভুবন বিখ্যাত।
শিব, বীর, সূদন,
কাম, কুমার, মদন,
এই অষ্ট মূরি সন্তান।
কাণুদেব সৰ্ব্বজেষ্ঠ, রূপে গুণে অতি শ্রেষ্ঠ,
পঠী মধ্যে মৰ্যদা প্রধান।
কাণু মাতৃ আজ্ঞাক্রমে, রহিলা সরিষা গ্রামে,
ভ্রাতৃগণ সকল ত্যজিয়া।
বিবাহ সৎকুলে কৈল, তাহে দুই পুত্র হইল,
এক ভাই গেলা বাজুরসে।
তথা কৈলা জমিদারি, বাঙ্গলার দেওয়ান গিরি,
মহিমা হইল সৰ্ব্ব দেশে।
সরিষাতে যেহ রৈলা, শ্রেষ্ঠ কুল ক্রিয়া কৈলা,
দাস, নন্দী, নাগ তিন সনে।
সৰ্ব্ব বিদ্যা নিপুণ,
কায়স্থ যােড়শ গুণ,
নিরাবিল মধ্যে যারে গণে।
মুরারি মৌরটে রয়ে, শেষে ছয় পুত্র লয়ে,
শেষকালে বড়ই ভাবিত।
ভৃগু নন্দী, নরদাস, আসিয়া মুরারি পাশ,
ছয় পুত্র করিল। চলিত ।

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। ৪৭ দুই পক্ষ সমতা হইল, মুরারি আনন্দ পাইল, সুকরণ হইতে লাগিল। পঠী মধ্যে প্রধান, মুরহর সন্তান, চাকি দেব প্রধান লিখিল। দুই পক্ষের পুত্রগণ, মােক্ষ মােক্ষ যত জন, যথাযথ করিলা বসতি। কুলজ সমাজ স্থান, সেই জন প্রধান, প্রধানের যথা হয় গতি। সিমলা, হেলঞ্চ গ্রাম, অষ্ট মুনিষা প্রধান, মেদোবাড়ী, কেঁচুয়াডাঙ্গা আর। বাজুস, গােবিন্দপুর, নল মুড়া, অতি শূর, সেকন্দরপুর কহি সার। গাজনা, দুর্লভপুর, শ্যামনগর গঙ্গাতীর, মহেশ রোল, ঢাকঢৌর স্থান। সকলের কুলক্রিয়া, নিরাবিল বাছিয়া, কাৰ্য্য কৈলা সবাই প্রধান। ইহা মধ্যে কোনজন, হইলে পদস্খলন, হয় যেন বিষ্ণু তৈলের চাড়া। যদি দাস নন্দী সূনে, কাৰ্য্য করে প্রধানে, পুনরপি হয় সেই খাড়া । ইহাপর চাকি ঘর, উক্তা খােল, কাড়িয়ার, পানা নগর, কুমারি, জানিব । উত্তম ভাব, মধ্যবিদ আর সব, পঠী মধ্যে চলন গণিবা । দুই ঘর

৪৮
মূল ঢকুর ও সমালােচনা।
চাচকিয়া হয় চাকি, অনেক করিয়া ফাকি,
মধ্যবিৎ ভাবেতে চলিলা।
রামদিয়া, বাগুটিয়া,
হেমরাজপুর দিয়া,
দিলপশার কেহ বা রহিলা
মহৎ গমন হইলে,
নিন্দা নাহি কোন কালে,
এই সার দেখি সৰ্ব্বক্ষণ।
উত্তম মধ্যম ভাবে,
পঠী মধ্যে চলে সবে,
কুলকার্যে প্রধান গণন।
ইহা বহির্ভূত চাকি, কেবল জানিবে ফাঁকি,
জোড়াতাড়া দিয়ে পরিচয়।
কেহ সত্য করি মানে, কেহ নিন্দে তুচ্ছ জ্ঞানে,
বহু গােষ্ঠী কে করে নিম্নয়।
রঘুনাথ পুরের চাকি,
সেই এক ঘর লিখি,
কষ্টভাব জানহ নিশ্চয়।
এইত সকল স্থান, কহি সব বিদ্যমান,
পূৰ্ব্ব কুলজিতে যাহা কয়।
নাগ বংশ।
সাধ্য মধ্যে নাগবর,
কর্কট, জটাধর,
শুন এবে কহি পরিচয়।
সৌপায়ন গােত্র সার,
পঞ্চ প্রবর তার,
সৌপায়ন আঙ্গিরস।

মূল ঢকুর ও সমালােচনা।
৪৯
বাম্পত্য অবসার,
নৈবধব প্রবর,
এই পঞ্চ জানিব বিধান।
প্রধান কায়স্থ বংশ,
হইলেন অবতংস,
কুবঞ্চ নগর ছিল ধাম।
নাগ দিয়া জমিদারী, প্রতিজ্ঞাতে তাহা ছাড়ি,
তথা হইতে বঙ্গভূমে আইলা।
শশলকুপা বাড়ী করি, তারা উজাল জমিদারী,
জগপতি আখ্যাত হইল।
সুশীল আচারবস্ত, মহিমা নাহিক অন্ত,
বর্ণাচার ধৰ্ম্মেতে নিপুণ।
বল্লালের মত ছাড়ি, ভৃগুনন্দী, নরহরি,
মুরহর দেব তিন জন।
পশ্চিম হইতে যবে, (১) আইলা এদেশে সবে,
নাগ হইতে হইল স্থাপন।
(১) ভৃগুনন্দী, নরদাস ও মুরহর দেব চাকি এদেশের আদিম নিবাসী
নহেন। ইহারা পশ্চিমাঞ্চলে স্থিত কুবঞ্চ নগর হইতে এদেশে আগমন করেন।
“গৌড়ে ব্রাহ্মণ” নামক বঙ্গীয় ব্রাহ্মণ কায়স্থ প্রভৃতি জাতির সমাজ বিষয়ক
গ্রন্থ প্রণেতাও বারে কায়স্থ সম্বন্ধে একটী গুরুতর ভ্রম করিয়াছেন। তিনি
উক্ত গ্রন্থের বারেন্দ্র কায়স্থ বিবরণে উল্লেখ করিয়াছেন যে, দত্ত ব্যতীত আর
সকলেই এদেশীয় আদিম কায়স্থ। সুবিজ্ঞ গ্রন্থকারের এই সিদ্ধান্তে আমরা
দুঃখিত হইয়াছি। তিনি কিরূপে জানিলেন যে দত্ত ব্যতীত সকলেই এদেশীয়
আদিম কায়স্থ ? কোনরূপ প্রমাণ ব্যতীত এইরূপ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া
কি দূষণীয় নহে? যে ঢাকুর গ্রন্থ অবলম্বনে তিনি বারেন্দ্র কায়স্থের বিবরণ
লিখিয়াছেন তাহা কিম্বা সামাজিক জনশ্রুতি ঐ কথার পােষকতা করে না।

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। শুনিয়া বল্লাল রীতি, তিনকে করিল স্থিতি, সৎ মতিমন্ত মহাশয়। নবকৃত কুল লৈলে, নাহি ফল কোন কালে, হেন যুক্তি নাহি শাস্ত্রে কয়। প্রত্যুতঃ, দাস, নন্দী প্রভৃতি যে এদেশের আদিম নিবাসী নহেন তাহাই স্পষ্ট- ভাবে প্রকাশ আছে। সামাজিক বিবরণ ও কিম্বদন্তীকে যদি অবিশ্বাস করা হয়, তবে সামাজিক ইতিবৃত্ত লিখিবার সামগ্রী কোথায় ? প্রবীণ গ্রন্থকার লিখিয়াছেন যে বারেন্দ্র কায়স্থগণের বল্লাল সেন কর্তৃক বারেন্দ্ৰাখ্যা প্রদত্ত হয় ; ইহা অবিশ্বাস করিবার কারণ নাই। তবে তাহাদিগের মধ্যে বল্লালী কৌলীন্য মৰ্য্যাদা কেন অবধারণ হয় নাই তাহা নির্ণয় করা কঠিন ব্যাপার। এবং অনুমানে এবিষয় মীমাংসা করিতে প্রবৃত্ত হওয়াও উচিত নহে। গ্রন্থকার এবম্প্রকার বিচক্ষণতা প্রকাশ করা সত্ত্বেও, বারেন্দ্র কায়স্থগণকে এদেশের আদিম বলিয়া স্বীয় পাণ্ডিত্যকে যে মলিন করিয়াছেন, তজ্জন্য আমরা দুঃখিত হইলাম। দাস, নন্দী প্রভৃতি উপাধিক কায়স্থগণ বঙ্গীয় আদিম কায়স্থগণের মধ্যে বিদ্যমান আছে জন্য, নরদাস, ভূগুনন্দী প্রভৃতির ঔপনিবেশিক হওয়া অসঙ্গত নহে। তাহারা উপনিবেশী না হইলে, এদেশীয় আদিম কায়স্থগণ কখনই তাহাদিগের প্রতি সম্মান প্রদান করিত না। তিনিই বলিয়াছেন “কিন্তু বঙ্গজ কুলে দাস মহাপাত্র অখ্যাত ও নন্দী ও চাকির অচল সংজ্ঞা। দক্ষিণ রাঢ়ীয় কুলে দাস সিদ্ধ মৌলিক ও নন্দী বাহাত্তরে।” তিনি অন্যান্য সমাজের ইতিহাসও আলােচনা করিয়াছেন। তাহাতেও প্রকাশ আছে যে, তুল্য ঔপাধিক ব্যক্তিগণ বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন রূপ মৰ্যাদাপন্ন। সুতরাং তুল্য ঔপাধিক ব্যক্তিগণ যে বংশেও পৃথক তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। তাহা হইলে ইহারা যে এদেশের আদিম নিবাসী সে যুক্তি ও সিদ্ধান্ত কিছুতেই স্থির থাকিতে পারে না। অপিচ উক্ত গ্রন্থকার উক্ত পুস্তকের নবম অধ্যায়ে (২৪৩ পৃষ্ঠা দেখুন) বলিয়াছেন “বারেন্দ্র কায়স্থ কুলে প্রথমােক্ত ৪টা উপাধি বিশিষ্ট কায়স্থ (ঘােষ বসু আদি) দেখিতে পাইয়া “সম্বন্ধনির্ণয় কৰ্ত্তা” বারেন্দ্র কায়স্থগণকে এ দেশের আদিম

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা।
সত্য, ত্রেতা, দ্বাপরাদি,
চারি যুগ অবধি,
কায়স্থের যে মত চলন।
যাতে রক্ষা কুলমান, সেই হয় সুবিধান,
সেই সব ধৰ্ম প্রকরণ।
বিরােধীয় ব্যবহার, করা মহা অবিচার,
আদ্যোপান্ত যেমত চলিত।
পূৰ্ব্বাবধি যাহা শুনি,
সেই মত কর শ্রেণী,
পঠীবদ্ধ করহ বিহিত ।
নাগ মুখে শুনি বাণী, করিল বারেন্দ্র শ্রেণী,
সন্তুষ্ট হইয়া তিন জন।
সিদ্ধ সাধ্য ভাব দুই, প্রসিদ্ধ করিল এই,
কাৰ্য করণেতে তারতম।
তিনজন ভাবি চিতে, সিদ্ধ পদ নাগে দিতে,
বহুরূপে যতন করিল।
নাগ কৈল সম্মান, তিনকে করিল মান,
সিদ্ধপদ তিনের হইল ।
নাগ হইল সাধ্যবর,
সবার চলন ঘর,
সিদ্ধ তুল্য মর্যাদা পাইল।
এসব প্রস্তাব যত,
আদি ঢাকুরীর মত,
বিশেষিয়া বিস্তার বর্ণনা
নিবাসী বলিয়া জ্ঞান করিয়াছেন তাহা সত্য বােধ হয় না। কায়স্থগণের টী
শ্রেণীতেই এদেশীয় আদিম শূদ্র প্রবেশ করিয়াছেন।” আবার কিছু পরেই
(২৫৩ পৃষ্ঠা দেখুন) তিনি কোন যুক্তিতে বলিলেন যে দত্ত ব্যতীত সকলেই
আদিম নিবাসী ?

৫২
মূল ঢাকুর ও সমালােচনা।
কত দিনান্তর,
জটাধর নাগর,
সরগ্রামে বসতি করিল।
সােলকুপ, সরগ্রাম, এই দুই নাগের ধাম,
পঠী মধ্যে উত্তম লিখিল ।
কর্কট সন্তান সব শেলকুপা রৈল।
ক্রমে বংশ বৃদ্ধি হয়ে নানাস্থানে গেল।
সমাজ প্রধান মধ্যে শেলকুপা হয়।
যে যথা রহিল গিয়া মূলে পরিচয় ৷
সে বংশে গড়,রধ্বজ বাণেশ্বর নাম।
দুই সহােদর হইল অতি অনুপম।
গড়ুরধ্বজ সুত দুই, কহিব বিস্তার ।
ঘন শিব নাগ, কালিদাস রায় আর।
কালিদাস পুত্র রাজা রাজবল্লভ হইল।
মুনসফ জানিয়া পাতসা রাজটীকা দিল।
রাজা রাজবল্লভ নাম মুনসফ কারণ।
সংক্ষেপে কহিনু আমি শ্ৰীযদুনন্দন।
হস্তি নিশি নরপতি বিদিত ভুবনে।
বারেল মৰ্যাদাবন্ত জানে সৰ্ব্ব জনে।
তস্য পুত্র কেশব, গােবিন্দ দুই জন।
গগাবিন্দ সন্তান হইল রঘুনাথ রায়।
নবরত্ন তুল্য সভা বিখ্যাত যাহার।
এ বংশেতে মূখ নাহি কহে পরম্পর।
লালগ্রামি দাস মধ্যে কৈল পরিণয়।
তাহার সন্তান হইল তিন মহাশয় ।

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা।
তার মধ্যে জ্যেষ্ঠভাব রামনারায়ণ।
গাজনাতে বিবাহ কৈলা উত্তম করণ।
সিদ্ধশ্রেষ্ঠ তিন ঘরে করণ প্রকাশ।
জমিদারি গেলে কৈলা বাগদুলী বাস।
তস্য পুত্র গঙ্গারাম মেলে না পাইয়া ।
নীচে বিবাহ করি, গেলা নিৰ্ব্বংশ হইয়া ।
হরিরাম স্যানুজ শুনহ উচিত।
ভস্ম আচ্ছাদিত বহ্নি নহে প্রজ্বলিত।
প্রত্যেক করণ সব সগুণ লিখিতে।
বিস্তর বাহুল্য হয় না লিখি তাহাতে ॥
এবে কহি আর সব জ্ঞাতিগণ কথা।
শ্রেষ্ঠভারে যেই জন, রহিলেক যথা।
গড়ুরধ্বজ বাণেশ্বর দুয়ের সন্তান।
যে যে স্থানে রহিলেন ত্যজিয়া স্বস্থান।
জানকীনাথ পত্র নবিশ এই বংশ জাত।
নানাবিধ বিদ্যারত্ন, নানাশাস্ত্র জ্ঞাত।
খােসনবিশ বড় তাহা পাতসা জানিয়া।
রাখিলেন দিল্লীশ্বর মুন্সী গিরি দিয়া।
বাদসাহী
মুলুকপরে যাহার কলম।
এহেন চাকরিযােগ্য হয় কোন জন ॥
তাহার সন্তান এক হরিহর রায়।
হরিহরা গ্রামে তার ছিল পূৰ্বাশয় ।
যার কীৰ্ত্তি মূর্তিমান অদ্যাপিও লিখে।
সৎকরণান্বিত জানে সর্বলোকে।

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। সেই বংশোদ্ভবগণ স্বস্থান ত্যজিয়া। রামনগর রৈল কেহ কাটাপুখরিয়া। আর জ্ঞাতি কেহ পাথরলে গেল। কেহ বা মালঞ্চি, সিঙ্গা বসত করিল। গাঁড়াদহ, নন্দনগাছী, ফতেউল্লাপুর। পলাসবাড়ী, ফিলগঞ্জ গেল কেহ দূর । ঘুড়কা, সারিয়াকান্দি, গবড়া গ্রাম। উদ্দিঘরি, বালিয়াপাড়া এই সব নাম। এইত শােলকুপা নাগ রৈল যে যে স্থানে। উত্তম মধ্যমভাব কনিষ্ঠ বিধানে। আদি মূলভাবে পূৰ্বাবধি সৎকরুণ। এবে ভাব নষ্ট কৈল কোন কোন জন। তথাপি সর্পের যেন খােলশ বদলাইলে পুনশ্চ নূতন কায় সৰ্ব্বলােকে বলে। এবে কহি জটাধর নাগের সন্তান। সরগ্রাম বাস কৈল সমাজ প্রধান। সােণাবাজু জমিদারি ভাগ্যবান অতি। প্রধান করণ সব ধৰ্ম্ম কার্যে মতি। সেই বংশোদ্ভব মধ্যে ছিল রূপ রায়। যাহার মহিমা যশ অদ্যাপি ঘােষয় । নাগ মধ্যে রূপরায় আর সব ধোড়া। শশলকুপার নাগ যেন বিঘাতিয়া বােড়। (১) (১) বিঘাতি বােড়ার সহিত শােলকুপার নাগদিগের তুলনা হইবার তাৎ- পৰ্য্য এই যে, রূপরায় অর্থাৎ সরগ্রামীর স্থায় তাহাদিগের শ্রেষ্ঠ করণের

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা।
বিঘাতি বােড়ার বিষ নীচ মুখে ধায়।
তাহার তুলনা নহে বলি সরগাঁয়।
সরগ্রামি মধ্যে মাত্র নাগেন্দ্র ছাড়া।
আর যত নাগ তার ভাব কিন্তু বােড় ।
একথা কহিলামাত্র নেউগী গােপী রায়।
রূপরায়ের ভগ্নীপতি সাক্ষী কৈল তায় ॥
কিন্তু মেধী, খােজাপাড়া আর মচমলি।
প্রধান মৰ্য্যাদাভাব জানিবা সকলি ।
নাগেন্দ্র সন্তান কেহ মেদবাড়ী বাস।
যাহার মহিমা যশ ভূতলে প্রকাশ।
প্রধান প্রধান কার্য নিরাবিলে কৈল।
সিদ্ধতুল্য ভাব মান মর্যাদা বাড়িল ।
চাকরি প্রধান কৈল মহিমা অপার।
সরগ্রামি নাগ মধ্যে শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যা যার।
আর এক কহি মাত্র নাগ ডাঙ্গা পাড়া।
করণ গৌরবে মাত্র হইলেন খাড়া।
অভাব। বােড়া সর্পের বিষ উদ্ধা মুখে উঠিতে পারে না; যে স্থানে দংশন করে
সেই স্থান গলিত হয়। ইহাতেই বিঘাতি বােড়ার বিষ নীচে মুখে ধায় বলা
হইয়াছে। আবার, নাগদিগের মধ্যে রূপরায় ব্যতীত আর সকলকেই “ধােড়া”
বলা হইয়াছে। ফলতঃ এই সকল তুলনার দ্বারা রূপ রায়ের শ্রেষ্ঠ প্রতিপাদন
করাই ঢাকুর কর্তার উদ্দেশ্য বটে। অষ্ট মুনিশার নেউগী খেতাব প্রাপ্ত গােপী-
কান্ত রায়, রূপরায় সম্বন্ধে ঐ সকল কথা বলেন তাহাও লিখিত আছে। আমা-
দিগের সমাজের স্ত্রী পুরুষ সকলের মুখেই “নাগ মধ্যে রূপরায় আর সব ধোঁড়া”
কবিতা শুনিতে পাওয়া যায়।

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা।
সমাজের মধ্যে তার হইল গণন।
নিৰ্ম্মল প্রধান কুলে দান গ্রহণ।
গশােবাড়ী মধ্যে নাগ দুই একজন।
ভাব রক্ষা মতে কৈলা উত্তম করণ।
আর সব নাগগণ রহিল জড়িয়া।
চলিতে না পারে কেহ হামাগুড়ি দিয়া। (১)
আড়ানিয়া নাগ পরে পঠী মধ্যে আইল।
দৈবে কেহ সৎকরণে গণনা হইল।
নরণিয়া, সিথলিয়ার নাগ কষ্ট ভাব।
আদি কুলজিতে তার নাহিক প্রস্তাব।
এইত করিনু সব নাগের বর্ণন।
ইহা বহিভূত নাগ জান অকারণ।
সিংহ ঘর।
সিংহ সাধ্য ভাব,
শুনহ প্রস্তাব,
বারে মিছিলে গতি।
ব্যাস সিংহ দাস,
করতজা বাস,
অশেষ গুণের ভাতি।
সিংহ কুল মাঝে,
খ্যাত সৰ্ব্ব কাজে,
দেবতা করিল বশ।
(১) ইহার তাৎপর্য এই যে, অন্যান্য নাগগণ সৎকরণে বঞ্চিত হইয়া
ফুলক্ষর জন্য নীচ মধ্যে পরিগণিত হইল।

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। ৫৭ বর মাঙ্গিল, পঞ্চপুত্র হৈল, শুনহ তাহার যশ। কেহ করতজা, স্বস্থানে রহিল, কেহ বা যােজন কান্দী । পরীক্ষিত দিয়া, কেহবা রহিলা, মহিমা অশেষ বিধি। আদি কুলজিতে, ব্যাখ্যা নানা মতে, এসব স্থলের মান। দৈবে নিধি হৈল, মহিমা বাড়িল, চোয়ার সিংহের নাম। চাকি নন্দী দাসে, প্রধান সমাজে, নিবারিল কাৰ্য্য যত। প্রধান উদ্ভব, চলিলা উত্তম মত ৷ দেবী দাস সুতে, মহিমা পুরেতে, প্রথম করণ কৈল। সেই সে কারণে, বরেন্দ্র প্রধানে, পরম যতন পাইল। মহিমাপুরের, মহিমা গুণের, পরশে পাথর প্রায়। লােহা, তামা, কাসা, যাহাকে পরশে সকলি কাঞ্চন হয় । সব সিংহ কষ্ট, চেঁয়া হইল শ্রেষ্ঠ, করণ গৌরব করি। করণ গৌরব,

৫৮
মূল ঢাকুর ও সমালােচনা।
ছিল,
বিলুপ্ত হইল,
মূলজয়ে
লইতে লইতে কড়ি।
মূলজ জানিয়া,
এবে উধুনিয়া
হইল চলন ঘর।
সিংহের কাহিনী,
যাহা কিছু জানি,
শুনহ কায়স্থ বর।
দেববংশ।
শুন সবে দেববংশ করি নিবেদন।
কাণা সােণার দেব হইল বারেন্দ্রে গণন।
সাধ্য মধ্যে খ্যাত হইল, এক দেব নাম।
তাহার সন্তান তিন অতি অনুপম।
শ্রীধর, মধুদেব, জ্ঞান দেব নাম।
দেব করণ হইল অন্য যত মান।
বুধ দেব কুল দেব বারেন্দ্রে রহিল।
সাধ্য মধ্যে দুই ধারা প্রসিদ্ধ হইলা।
আলিমান গােত্র তার প্রবর তিন হয় ।
কাশ্যপ অবসার নৈবধব পরিচয়
যখন বল্লাল সেন পঠীবদ্ধ কৈল।
কোন ক্রমে মহারাজা নিতে না পারিল ।
ইহা শুনি ভৃগুনন্দী আনিয়া তাহারে।
সাধ্যভাবে রাখিল করণ চলিবারে ॥

মূল চাকুর ও সমালােচনা।
সেই বংশে বাণাধিপতি গুণাকর নাম।
শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠ অতি গুণধাম।
সেই সে দেবের আদি শুনহ বিস্তার।
তারা গুণা বাস কৈল মহিমা অপার ।
রাধাবল্লভ চৌধুরী সেই বংশে হয়।
করিলা অনেক কাৰ্য্য বারেন্দ্র আশ্রয় ।
গণিবা পঠীর মধ্যে এই দেব ঘর।
কুল কার্যে ব্যাখ্যা তার জানিবে বিস্তর।
এই ত ঢাকুর মধ্যে শুনিলে নিশ্চয়।
কাগদহ, হিড়িমদিয়া, আর চিথলায় ।
আর সব জ্ঞাতিগণ অন্য ভাবে গেলা।
কুল দেব সন্তান সব কষ্ট হইল।
আর এক কহি শুন দেব অনুপম।
চড়িয়া গ্রামেতে বাস শুকদেব নাম ।
শুকদেব পুত্র বাসুদেব তালুকদার।
তাহার যশের কথা শুনহ বিস্তার ।
ধনবান কীৰ্ত্তিবন্ত বিষয় ব্যাপারে।
তার পুত্র চাকরি কৈলা নবাব সরকারে।
সেই বংশে উড়বিলা বলরাম রায়।
পিতামহ কাৰ্য কৈলা বারেন্দ্র আশ্রয় ।
নিরাবিল কাৰ্য সব করিতে লাগিল ।
দাস নন্দী চাকি সবে অন্ন ভুক্ত হৈল ।
তাহার সন্তান সব বাড়িল সম্রমে।
বায়ান্ন লক্ষের কর্তা পুরুষানুক্রমে

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা।
তাড়াস-বাসী দেব করণে প্রধান।
সৰ্বঘর ব্যাপিত হইয়া পাইলা সম্মান।
তৎপরে কহি এক দেব পরিপাটী।
আৰ্য্যবর মণ্ডল বাস কৈলা বর্ধনকুঠী।
তার পুত্র ভগবান করিয়া চাতুরী।
রাজা ভগবান মৈলে নিলা জমিদারী ।
যবে মানসিংহ রাজা বাঙ্গলাতে আইলা।
নয় আনা সাত আনা ভূমি বণ্টন করিল।
ক্রমে ক্রমে ভাগ্য লক্ষ্মী প্রচুর হইল।
হস্তি নিশি রাজটীকা পাতসা করিল।
তাহার সন্তান হৈল কুমুদা নন্দন।
তস্য পুত্র রঘুনাথ বড়ই সৎগুণ ।
মনােহর তস্য সুত তস্য পুত্র হরি।
রাজা বিশ্বনাথ তস্য সুত নামধারী ।
প্রধান বারেন্দ্র সনে কুল ক্রিয়া কৈলা।
বারেন্দ্র সমাজ মধ্যে মৰ্যাদা পাইলা।
নিরাবিল সিদ্ধ ঘরে হইল করণ।
সেই অনুসারে দেব সমাজে চলন।
এই কহিলাম তিন দেবের বিচার।
ইহা বহির্ভূত দেব নাহি ব্যবহার।
তবে যদি কোন দেব পঠী মধ্যে হয়।
তাহাকে করিবে শঙ্কা অপদেব প্রায়।

দত্তবংশ।
যখন বারেন্দ্র পঠী হইল গঠন।
দত্ত সাধ্য ঘরে গণ্য শুন বিবরণ।
কাউননাড়ী, বটগ্রামি দুই দত্ত মূল।
করণের তারতম্যে ব্যাখ্যা হইল কুল।
আগে আগে যে মেল মিছিলে কাৰ্য্য ছিল।
ধনহীন হয়ে সব লুপ্ত হয়ে গেল।
বটগ্রামি দন্ত মধ্যে নারায়ণ নাম ।
রাধানগর বাস কৈল গুণে অনুপম
সেই বংশে কেহ কেহ সকরণ কৈল।
মধ্যম ভাবেতে তারা পরিচিত হৈল ।
এবে সব লুপ্ত হৈল হয়ে ধনহীন।
কেহ বা নিৰ্ব্বংশ হৈল না রহিল চিন।
কাউননাড়ী দত্ত কেহ রূপাট, সেঘুপুরে।
পূৰ্বে পূর্বে ভাল কাৰ্য্য ছিল সব ঘরে।
এবেত চতুর্থ পঞ্চ পুরুষ ক্রমেতে।
মন্দাগ্নি না হৈল কড়ি লইতে লইতে।
অতএব দত্তঘর নীচে প্রবেশি।
পঠী মধ্যে প্রচলিত হইতে নারিলা।
এইত কহিনু সপ্ত ঘরের আদি মূল।
সিদ্ধকুল তিন ঘর হয় সমতুল।
সাধ্য চারি ঘর মধ্যে তারতম।
সিদ্ধ তুল্য নাগঘর জানিবা নিয়ম ॥

৬২
মূল ঢাকুর ও সমালােচনা।
তৎপর মধ্যবিধ সিংহকে জানিবা ।
তদাপেক্ষা নীচ ভাব দেবকে জানিব ।
দত্তই দেবের তুল্য জানিক নিশ্চয়।
এই চারি ভাবে সপ্ত ঘরের নির্ণয়।
ছােট বড় মধ্যম ভাব হইলে গঠন।
করণ তাৎপর্যে তাহা জানিবে নিয়ম।
মূলজ সমাজ স্থান বুঝার কারণ।
সপ্ত ঘর সিদ্ধ সাধ্য লিখি নিদর্শন।
সমাজ গঠন যবে হইতে লাগিল।
এই সপ্ত ঘর মাত্র সামাজিক হইল ।
তৎপর যত দেখ সপ্ত ঘর ছাড়া।
এই সব দায় দিয়া সেই হয় খাড়া ।
তাহার বৃত্তান্ত কিছু লিখা ভাল নয়।
প্রধানে করণ করি যশ মান লয় ।
লিখিলেও নিন্দা হয় গুন সর্বজনে।
লিখিলে ভাব সব জানিবে কেমনে।
দাস, নন্দী, চাকি, নাগ, সিংহ, দেব, ছয়।
আধুনিক অমূলজ এই দায় দেয়।
জ্ঞাতি বিচারিলে কিন্তু অমূলজে মিশে।
কাৰ্য প্রয়ােজন সর্ব ঘরেতে প্রকাশে।
পরস্পর নিন্দা করে অমূলজ বলে।
যাত্নিক হইয়া কিন্তু সৰ্ব্ব ঘরে চলে।
এসব ঘরের ভাব সবে নাহি জানে।
যে ভাবে মিশিল আসি শুন সৰ্বজনে

মূল চাকুর ও সমালােচনা।
জামালি, কুদরতি, দুখায়তি আর ।
হালধরা, নামকরা, পঞ্চম প্রকার। (১)
সংগ্রহ কৃত ঘরের তিন ভাব হয়।
উত্তম, মধ্যম, নীচ এই তিন কয় ॥
এই নষ্টভাবে হইল কতকগুলি ঘর।
নিশানা পঠীর মধ্যে নাহি সব তার।
করণ গৌরবে কেহ ভাবােত্তম হৈল।
কেহ বা মধ্যম ভাবে সৰ্ব্বত্র চলিল।
কারাে কিন্তু পূৰ্বভাব নহে উপেক্ষিত।
আর পঞ্চ ঘর পরে হইল উপনীত
পরে সপ্তদশ ঘর পাইল সম্মান।
প্রাণপণে কুলকাৰ্য্য করিয়া প্রধান।
যাহার বিংশতি লােকে বল্লাল মৰ্য্যাদা।
নয়শ চুরানব্বই শকে ছিল না একদা ।
এই সব কালে নহে সপ্তদশ ঘর।
দুই তিন পঞ্চ সপ্ত পুরুষমাত্র সার ॥
পূৰ্ব্বকাৰ্য্য করণ বিচারি না দেখে।
স্বৰ্গাপূবৰ্গভাব শুনি ধান্দা লাগে।
যার যত ভালমন্দ করণ বলিতে।
নিন্দাবাদ হয় জন্য নারিনু লিখিতে ।
(১) জানমালি ইত্যাদি শব্দের প্রকৃত অর্থ জানিলেও কবির অভিপ্রায়
ঠিক বােধগম্য হয় না। ফলতঃ এই সকলকে আধুনিক ও নীচ ভাবে বর্ণনা করাই
তাঁহার উদ্দেশ্য এরূপ অনুমান করা যাইতে পারে।

৬৪
মূল চাকুর ও সমালােচনা।
আদি চাকুরীতে মাত্র সেই অভিমত।
বিস্তার আছয়ে নিন্দা কাৰ্য ক্রটি যত ।
সাড়ে তিনশত পাত করণ বর্ণন।
লিখিতে অসাধ্য হয় শুন সাধুজন ॥
এ কারণে ভাব ক্রিয়া যেরূপে চলিত।
লিখিনু তাহার সার সংক্ষেপে কিঞ্চিৎ।
সপ্ত ঘরের আদি মূল করণ তারতম।
ইহাতে বুঝিয়া পূৰ্ব্ব ভাবের গঠন।
তাৎপৰ্য লইয়া বিচার করিবা ।
দান গ্রহণ বলে কুল উত্তম জানি।
যদি থাকে আদি মূল ভাবে ভাল হয়।
দানগ্রহণ (১) দিয়া কুল কুলজিতে কয়।
সিদ্ধভাবে উত্তমেতে যাহার করণ।
হস্তিদন্তে স্বর্ণ যৈছে রসালে মার্জন।
(১) “দান গ্রহণ” শব্দের অর্থ এস্থলে কন্যাদান এবং গ্রহণ করা। আচার,
বিনয়, বিদ্যা, প্রতিষ্ঠা, তীর্থদর্শন, নিষ্ঠা, শান্তি, তপ, দান এই নয়টী কুলের লক্ষণ
এবং ইহা বল্লাল সেনের প্রদত্ত কুলমৰ্যাদার পরিচায়ক এরূপ কথিত হয়। বল্লাল
সেনের এই “নবধা” কুল-লক্ষণে বিলক্ষণ বিচক্ষণ ও পবিত্র আছে সন্দেহ
নাই। কিন্তু “দান” শব্দ কেবল “কন্যাদান” প্রতিপাদক হওয়ায়, উত্তর কালে,
কৌলীন্য মৰ্য্যাদা প্রাপ্ত ব্যক্তিগণের পক্ষ হইতে উদয়নাচাৰ্য্য ও দেবীবর ঘটক
এবং পুরন্দর খাঁ, “দান” শব্দের শ্রেষ্ঠ সাধন করিতে গিয়া, অনেক কঠিন নিয়ম
সংস্থাপন করিয়াছেন। যদি কুললক্ষণ “নবধা না হইয়া “দশ” অর্থাৎ কেবল
সৎ কুলে কন্যাদান নহে, সৎ কুল হইতে কন্যা গ্রহণও করিতে হইবে, তাহা
হইলে, বােধ হয় কুলীনগণের স্বেচ্ছাচার অনেক প্রতিহত হইত।

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা।
সিদ্ধিতে সিদ্ধিতে তুল্য প্রধান করণ।
জম্বুদ হেম যৈছে উজল বরণ ।
সিদ্ধ যদি প্রধান নাগে কাৰ্য্য করে।
গজদন্তে রত্নহার যেমন প্রকারে ॥
নিরাবিল প্রধান সিংহে যদি কাৰ্য্য হয়।
তথাপি উত্তমভাব জানিহ নিশ্চয়।
চন্দ্রের মালিন্য যেন নহে নিন্দা স্থান।
সেই অনুভবমাত্র জানিবা বিধান।
দেব দত্ত ঘরে যদি ক্রমে কাৰ্য হয়।
চন্দ্র যেন মেঘে ঢাকি রাখয় নিশ্চয়।
এইত কহিল ভাব কুলজ করণে।
অমূলজে কুলনাশ জান সৰ্ব্বস্থানে।
সিদ্ধ বিনা কাৰ্য ক্রটি অতীব প্রধান।
ক্ষত বিগ্রহের প্রায় না থাকে সম্মান।
সিদ্ধের প্রধান ত্রুটি বড় সর্বনাশ।
সাধ্যঘরে হয় তার মর্যাদার হ্রাস।
দৈবে যদি সিদ্ধ ঘরে এক ক্রটি হয়।
তাহাসে দোষ কভু গ্রাহযােগ্য নয়।

ঢাকুর সমালােচনা। পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে, আমাদিগের ইতিবৃত্ত লিখিবার যে প্রবৃত্তি জন্মিয়াছে, তাহা মন্দ নহে। কিন্তু এই শিক্ষা-বলে, আমরা যে কতকগুলি মন্দ বিষয় লাভ করিতেছি, তাহা বােধ হয়, কেহই অস্বীকার করিবেন না। অধুনাতন, ইতিবৃত্তের নাম করিয়া, আমাদিগের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের অনে- কেই সত্যের অপলাপ ও অপরের সহিত নিরর্থক কলহ করিতে শিখিয়াছেন। এত দিন আমাদিগের ধারণা ছিল, এই দোষ প্রধানতঃ পাশ্চাত্য শিক্ষাবিশিষ্ট ব্যক্তিগণের মধ্যেই বর্তমান আছে। দুঃখের বিষয়, এই রােগ, যাহারা পাশ্চাত্য শিক্ষার গৌরবের ফলভাগী হইতে ইচ্ছুক নহেন, তাহাদিগের মধ্যেও প্রবেশ লাভ করিয়াছে। সমালােচ্য গ্রন্থের বিজ্ঞাপনের আরম্ভেই গ্রন্থকার বলিতেছেন “সামাজিক বারেন্দ্র কায়স্থকুলের বংশ-বিবরণ-যুক্ত পুস্তকের নাম ঢাকুর বা ঢাকুরী। এই শব্দ কোন্ ভাষা হইতে সমুৎপন্ন, মূল, কি অপভ্রংশ, তাহা জানিতে পারা যায় নাই।” গ্রন্থকার ঢাকুর শব্দ সম্বন্ধে জানিতে পারেন নাই। কিন্তু এ সম্বন্ধে আমরা যেরূপ মনে করি, তাহা প্রকাশ করিতেছি। “ক” শব্দের উত্তর শীতার্থ উরপ প্রত্যয় করিয়া ঢকুর শব্দ * ঢাকুর অর্থাৎ কায়স্থ জাতি ও বারেন্দ্র কায়স্থ সমাজের ইতিবৃত্ত। গােবিন্দমােহন রায় বিদ্যাবিনােদ বারিধি কর্তৃক সঙ্কলিত। শকাব্দ ১৮১। এই সমালােচনা “নবজীবন” নামক মাসিক পত্রিকার ৫ম ভাগে প্রকাশিত হইয়াছিল। এইক্ষণ তদপেক্ষা কিছু বন্ধিত করিয়া প্রকাশিত হইল।

মূল ঢকুর ও সমালােচনা।
নিষ্পন্ন হইয়াছে। ঢকুর শব্দের অপভ্রংশ যে ঢাকুর, তাহাতে
কোন সন্দেহ নাই। দৃষ্টান্ত স্বরূপ “ঠকুর” শব্দের অপভ্রংশ
“ঠাকুর” আহ উল্লেখ করা যাইতে পারে। এক্ষণে জিজ্ঞাস,
ঢকুর বা ঢাকুর শব্দের এ স্থলে অর্থ কি ? ঢাকের স্বভাব বিশিষ্ট
বা উচ্চ শব্দ বােধক যে সামগ্রী, তাহাই ঢাকুর নামে কথিত।
কুল গ্রন্থ যে আমাদিগের দেশে উচ্চ শব্দ বােধক সে কথার উল্লেখ
করা বাহুল্য মাত্র। ইহাতে যাহা কথিত হয়, তদপেক্ষা উচ্চ
বা শ্রেষ্ঠ কথন আর নাই। বঙ্গদেশে ঢাকই এক মাত্র উচ্চ শব্দ
বিশিষ্ট বাদ্যযন্ত্র। কোন প্রকাশ্য কথা কেহ গােপন করিতে
উদ্যত হইলে, লােকে বলে “ঢাকে ঢেলে কথা!” অপিচ,
জনশ্রুতি বলিতেছে যে, পূৰ্বতন কুলাচাৰ্যগণ যখন কুলকাহিনী
বলিতেন, তখন বাদ্য হইত এবং তাহারা বাদ্যসহ অঙ্গ ভঙ্গি
পূৰ্ব্বক কুলকাহিনী কীৰ্ত্তন করিতেন। আমরা এখনও দেখিতে
পাই যে, কোন কোন স্থলে, কুলাচার্যগণ তাকিয়াতে আঘাত
পূৰ্ব্বক কুলকাহিনী বর্ণন করেন। এক্ষণ বঙ্গদেশ সভ্যতাভিমানী,
সেই জন্যই আমরা বহুবিধ পরিবর্তন অবলােকন করি। পূর্বে
যে ঢাকের বাদ্য হইত, তাহাতে আর বিচিত্র কি ? সুতরাং
“ঢকুর” শব্দ হইতে, যে ঢাকুর শব্দ নিষ্পন্ন হইয়াছে তাহা প্রমা-
ণিত হইল। *
* ‘ঢাকুর’ বা ‘ঢেকুর’ শব্দ বঙ্গসাহিত্যে অন্যত্র পাওয়া যায়। ধর্মমঙ্গলে
আছে ;
“বিপক্ষ করিলে বল,
বাড়িৰে নদীর জল,
অরি প্রবেশিতে নারে পুর।
অপর প্রার্থনা শুন,
ত্ৰিষষ্টির গড় পুন,
নাম হবে অজয় ঢাকুর।”

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। এইরূপ ভাবে কোন কিছুর নামকরণ বা উপাধি যে পূর্বে হইত, তাহার বিস্তর প্রমাণ, পাঠকগণ অনুসন্ধান দ্বারায় পরি- জ্ঞাত হইতে পারিবেন। আমরা এস্থলে একটা সাদৃশ্য প্রদর্শন করিতেছি। নাটোরের প্রাতঃস্মরণীয়া রাণী ভবানীর একমাত্র কন্যা তারার বিবাহে যে মহতী ঘটা ও অপর্যাপ্ত অর্থ ব্যয় হইয়া- ছিল, এমন আর বঙ্গদেশে, বােধ হয়, কখন হয় নাই। যাহা হউক, এই বিবাহে বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ সমাজের রাণীর মতের যাব তীয় কুলীন একত্রিত হইয়াছিলেন। ইহাদিগকে আহারের সময় অনুসন্ধান করিয়া লওয়া নিতান্ত অসম্ভব হওয়ায় অধুনাতন কলিকাতাস্থ ঢােল মহাশয়দিগের পূর্বপুরুষ (ইহার নাম স্মরণ নাই) সকলকে বলিয়া দেন যে, আমি ঢােল বাজাইলেই আপনারা আহারে গমন করিবেন। ইনি একজন শ্রেষ্ঠ কুলীন ছিলেন। ঢােলের বাদ্যের জন্য সকলে ইহাকে ঢােল নামে অভিহিত করেন। তদবধি ইহার বংশধরগণ ডােল উপাধিতে পরিচিত। এই সাদৃশ্য দ্বারা পাঠকগণ বিলক্ষণ হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিবেন যে, ইহার বহুপূর্বে ঢাকুর শব্দ যে পূৰ্ব্ব কথিত ভাবেই উৎপন্ন হইয়াছিল, তাহাতে সন্দেহ নাই। গ্রন্থকার বিজ্ঞাপনে বলিয়াছেন যে “যদি কোন সামাজিক বারেন্দ্র কায়স্থ মহােদয়ের কৌলিক ইতিহাস সম্বন্ধে সন্দেহ হয়, তবে তিনি পদ্য ঢাকুরের সহিত গদ্য ঢাকুরের ঐক্য করিয়া লই- ধৰ্ম্মমঙ্গলের যে ভাগে এই গড়ের বর্ণনা আছে, তাহার নাম ‘ঢেকুর পালা বা ‘ঢাকুর পালা। সুতরাং ঢাকুর শব্দ আদিতে যে অর্থেই ব্যবহৃত হউক, ধর্মমঙ্গলে যে স্থান বাচক তাহা বেশ বুঝা যায়। সেই ঢাকুর হইতে ঢাকুর গ্রন্থ রচিত হয় নাই ত? নবজীবন সম্পাদক।

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। বেন।” মুদ্রান্ত্রের প্রসাদে তঁাহার গ্রন্থখানি সাধারণের পাঠ করা সহজ। কিন্তু পদ্য ঢাকুর সেরূপ নহে। যে পদ্য ঢাকুরের সহিত, গদ্য ঢাকুরের ঐক্য করিতে অনুরােধ করিয়াছেন, সে খানি মুদ্রিত করিলেন না কেন? গ্রন্থকার বলেন, সেইখানি অবিকল মুদ্রিত করিতে ইচ্ছুক ছিলাম, কিন্তু তাহার রচনা প্রণালী বৰ্ত্তমান কৃতবিদ্য সমাজের প্রীতিকর হইবে না বলিয়া, প্রচলিত বাঙ্গালা সাধু ভাষাতে প্রকাশিত হইল। গ্রন্থকার এই স্থলে, ‘আধুনিক কৃতবিদ্য সমাজ’ শব্দের কিরূপ অর্থ করেন, তাহা বলিতে পারি না। আমরা, আধুনিক কৃতবিদ্য সমাজ বলিলে, বিপ্লব-প্রয়াসী ইংরেজি-নবিশ সম্প্রদায়কেই সাধারণত বুঝিয়া থাকি। এই সম্প্রদায় যে সকল মানসিক রােগগ্রস্ত, গ্রন্থকার সেরূপ নহেন। প্রাচীনের প্রতি অভক্তি, ইহাদিগের একটী প্রধান রােগ। প্রবীণ গ্রন্থকার তাহার উপশম না করিয়া বরং প্রশ্রয় দান করিয়াছেন, এজন্য আমরা দুঃখিত হইলাম। সামাজিক কুল কাহিনী যিনি অবগত হইতে ইচ্ছুক—স্বজাতি ও স্ববংশের প্রতি যিনি ভক্তিমান, সামাজিক ও কুল গ্রন্থের রচনা প্রণালী যেরূপই হউক না কেন, তিনি অবশ্যই পাঠ করিবেন। গ্রন্থকার বলেন “আমাদিগের একান্ত ইচ্ছার বিষয় এই যে, বাঙ্গলার কায়স্থগণ মধ্যে যে শ্রেণীবিভাগ আছে, তাহার অন্যথা করিয়া বর্তমান চারিটী শ্রেণী এক হইয়া যায়। তিনি আরো বলেন যে, “সমাজ বহির্ভূত নিম্নশ্রেণীর বারেন্দ্র কায়স্থ কুলে কন্যা পুত্রের আদান প্রদান করণাপেক্ষা দক্ষিণ রাঢ়ীয় প্রভৃতি প্রসিদ্ধ কায়স্থ কুলে বৈবাহিক ক্রিয়া সম্পন্ন করা কর্তব্য।” কায়স্থগণের শ্রেণীবিভাগ না থাকে তাহা সকলেই ভাল বলিয়া স্বীকার করি- ৭০ মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। বেন। কিন্তু কাৰ্যতায় ইহার ফল ভােগ করা সহজসাধ্য নহে। গ্রন্থকার সমাজ বহিভূত নিম্ন শ্রেণীর বারেন্দ্র কায়স্থগণকে অতি- ঘৃণার চক্ষে দেখিয়াছেন। তাহাতেই তিনি তংসম্বন্ধে বিচক্ষ- ণতা রক্ষা করিতে পারেন নাই। তিনি অন্য শ্রেণীর কায়স্থ- গণের সমাজিক ইতিবৃত্ত আলােচনা করিলে পরিজ্ঞাত হইবেন যে, যাহাদিগের সহিত বৈবাহিক সম্বন্ধ সংস্থাপন কর। তিনি গৌরব মনে করেন, সেই সমাজ, ধনেন কুলং’ বাক্যের প্রভাবে সমাজ বহিভূত নিম্ন শ্রেণীর কতিপয় ঘরের অর্থাৎ বাহাত্তর ঘরের অন্তর্গত যােড়শ ঘরের সহিত বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন করি- য়াছেন। ইহাতে তাহাদিগের সমাজ বর্ধিত্ব ও পরিপুষ্টতাই লাভ করিয়াছে। ধনের আদর চিরকালই আছে ও থাকিবে। তবে পাশ্চাত্য সভ্যতার সংঘর্ষণে ধন সকলের শ্রেষ্ঠ ও কার্যকরী। এই সভ্যতা যতই বৃদ্ধি হইবে ধনেরও ততই অভাব হইবে । এবং ধনাগমের বিবিধ নূতন দ্বারও উন্মুক্ত হইবে। এক্ষণে গ্রন্থকার যাহাদিগকে ঘৃণার চক্ষে দেখিতেছেন, তাহাদিগের ধনবৃদ্ধি ও বিদ্যাবত্তার সহিত, উত্তরকালে আপনাদিগকে আলি- জন করিতে হইবে ইহা বলা বােধ হয় অসঙ্গত নহে। গ্রন্থকার বলিয়াছেন “বংশমর্যাদা যে ভাবে আদৃত হইতেছে, কালে এ ভাব না থাকিলেও প্রাচীন সদ্বংশ, কোন না কোনরূপে জনসমাজে আদৃত হইবেই হইবে।” প্রাচীন সদ্বংশগুলি যে কালে কোন না কোনরূপে আদৃত হইবে এরূপ অনুমান ভ্রান্তি- জনক। কারণ সদ্বংশজগণ যদি পূৰ্বপুরুষের গৌরব রক্ষা ও স্বীয় গৌরবের বিকাশ না করেন তবে জনসমাজ কেন তঁাহা- দিগকে আদর করিবেন ?

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। ৭১ বিজ্ঞাপনের পরেই গ্রন্থকারের বংশৰর্ণনা। ইহা গ্রন্থকারের প্রাচীন বন্ধু শ্ৰীযুক্ত জগদ্বন্ধু তর্কবাগীশ মহাশয় কর্তৃক সংস্কৃত ভাষায় রচিত। বন্ধুর প্রতি অনুরাগ বশতঃ যাহা রচিত হই রাছে তদ্বিষয়ে কিছুই বক্তব্য নাই। গ্রন্থকারের বংশ বর্ণনার পরেই একখানি সার্টিফিকেট মুদ্রিত হইয়াছে। সেখানি এইরূপ যথা :-শ্ৰীযুত গােবিন্দমােহন রায় বিদ্যাবিনােদ বারিধি মহাশয় বারেন্দ্র শ্রেণী কায়স্থবংশা- বলীঘটিত একখানি গ্রন্থ প্রণয়ন করিয়াছেন। আমি তাহার সমস্ত শ্রবণ করিয়াছি, ঐ গ্রন্থ ঢাকুর নামক প্রাচীন কায়স্থকুল পঞ্জিকা আদর্শ করিয়া তাহার সহিত ঐক্য সংরক্ষণ পূৰ্ব্বক রচিত হইয়াছে। বারেন্দ্র কায়স্থ মহােদয়গণ ইহার আদ্যোপান্ত পাঠে স্বজাতি বংশ বিবৃতি পরিজ্ঞাত হইতে পারিবেন। ইতি শ্রীগুরুচরণ সরকারস্য লিপিরিয়ং। বারেন্দ্র কায়স্থ সমাজে গ্রন্থকার অপরিচিত নহেন। তবে তিনি এই সার্টিফিকেটের আশ্রয় গ্রহণ করিলেন, ইহার তাৎপর্য কি ? সার্টিফিকেটের দ্বারায় অনুমান হয় যে, হস্তলিখিত গ্রন্থ থানি গ্রন্থকার তাহার নিকট পাঠ করেন। আমরা জানি যে মুদ্রিত গ্রন্থের সময়, সরকার মহাশয় জীবিত ছিলেন না। সরকার মহাশয় উক্ত সমাজে প্রাচীন, বিদ্যা বুদ্ধি সম্পন্ন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন। এই মনে করিয়া তাহার প্রদত্ত সার্টিফিকেটের " আশ্রয় গ্রহণ করিয়া থাকিলে সে স্বতন্ত্র কথা। কিন্তু কোন বিজ্ঞ সামাজিক ব্যক্তি এই সার্টিফিকেটের উপর নির্ভরপর হইয়া সমালােচ্য গ্রন্থকে মূল ঢাকুরের টুকাপি বলিয়া স্বীকার করিবেন কি না সন্দেহ। ইহা বলাও অসঙ্গত নহে যে আজি কালিকার १२ মূল ঢকুর ও সমালােচনা। সাটিফিকেট দেখিলে সকলের মনে বিলাতি সভ্যতার উচ্চ অঙ্গ মনে পড়ে। যাহা হউক গ্রন্থকার স্বনাম ধন্য পুরুষ বলিয়াই আমাদিগকে এসম্বন্ধে কথা বলিতে হইল। ইহার পর গ্রন্থকার মঙ্গলাচরণ করিয়াছেন। মঙ্গলাচরণেও তর্কবাগীশ মহাশয়ের রচিত বংশ বর্ণনার কতিপয় বাক্যের পুনরুল্লেখ পূৰ্ব্বক স্বীয় বিশেষণ করিবার পর গ্রন্থকার বলি- তেছেন ; সােহং করােমি কায়স্থকুল গ্রন্থমবিস্তরং। গােবিন্দমােহন রায়াে ঢকুৱাখ্যং প্রত্নতঃ। এই সকলের পর, মূল গ্রন্থ আরম্ভ হইয়াছে। গ্রন্থকার এই স্থলে কায়স্থ জাতি সম্বন্ধে সবিশেষ আলােচনা করিয়াছেন। অনেক দিন হইতেই কায়স্থগণের ক্ষত্রিয়ত্ব বিষয়ে আন্দোলন চলিয়া আসিতেছে। সেই সকল পুরাণ কথা লইয়া, সেই স্কুল পুরাণের চন্দ্রসেন রাজার অন্তৰ্ব্বত্নী মহিষীর গর্ভজাত পুত্র মহর্ষি দাভের 'আশ্রিত কায়স্থ, সেই পদ্মপুরাণের সৃষ্টিখণ্ডের চিত্র- গুপ্ত কায়স্থ, * সেই পুরাণ, সেই তন্ত্র প্রভৃতির সাহায্যে, গ্রন্থকার স্বীয় বিচক্ষণতা প্রতিপাদন করিতে প্রয়াস পাইয়াছেন। কিন্তু বাস্তবিক যাহা স্থির মীমাংসা করা সহজ নহে। পুরাণ ইতিহাস যে স্থলে, কোন পক্ষকে অধিক বা কোন পক্ষকে অল্প পরিমাণে সমর্থন করে, সে স্থলে এইরূপ বাগ্‌বিতণ্ডাকে, কলহ ব্যতীত আর কি বলা যাইতে পারে ? এইরূপ খাস বিলাতি ধরণের বাগ- বিতণ্ডায় আমরা কোন স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পারি না; * বৈদ্যগণ গুপ্ত নামে পরিচয় দান করেন। চিত্রগুপ্তের বংশ ক্ষত্রিয় হও মায় দোষ কি?

মূল টাকুর ও সমালােচনা। অথচ আপনার তত্ত্বজ্ঞতা বা পাণ্ডিত্যের ভাণ পূৰ্ব্বক, বিপক্ষকে হীন করিবার জন্য অগ্রসর হইয়া, আপনার শ্রেষ্ঠতাকে মলীন বা অধিকতর তর্কাবন্ধ করিয়া থাকি। বিজ্ঞ গ্রন্থকার “করণ” শব্দের মীমাংসা করিতে যাইয়া, ভরত মল্লিকের প্রতি যে বাক্য প্রয়ােগ করিয়াছেন, তাহা দৃষ্টান্তস্বরূপ আনয়ন করিলেই উহা প্রতীয়মান হইতে পারিবে। গ্রন্থকার কলেন “ভরত মল্লিক এদেশের একজন আধুনিক লােক, জাতিতে বৈদ্য। নিজে বর্ণসঙ্কর, তাই কায়স্থকে বর্ণসঙ্কর রূপে প্রতিপাদনে বিশেষ যত্ন করিয়াছেন।” পাঠকগণ দেখিতে পাইবেন যে, ভরত মলিক যে “করণ' শব্দের উল্লেখ করেন, তাহা নানার্থক ও বৈশ্য হইতে শূদ্রা-গৰ্ভজাত জাতি বিশেষ এবং কায়স্থ উভয়কেই বুঝায়। তাহা গ্রন্থকারও স্বীকার করেন। তবে তাহার আপত্তি এই যে “দ্বিজশব্দ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এই তিন জাতিকেই বুঝায়, তাই বলিয়া কি এই তিন জাতি অভিন্ন ?” এই শেষােক্ত স্থলে আমাদিগের মত এই যে, ত্রিবর্ণ যখন অভিন্ন ছিল, তখনই দ্বিজত্বের আরম্ভ ও উত্তরকালে গুণ কৰ্ম্মের বিভাগ দ্বারায় ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য নামকরণ হইয়াছে। সুতরাং ভরত মল্লিক যে “করণ’ শব্দের দ্বারা বর্ণসঙ্কর জাতি বিশেষ এবং কায়স্থ উভয়কে বুঝিবেন, তাহা বিচিত্র নহে। বৈশ্য হইতে শূদ্রা-গৰ্ত্তজাত একই ব্যক্তির সন্তানগণ, গুণ কৰ্ম্মানুসারে দ্বিবিধ সংজ্ঞায় অভিহিত হইতে যে পারে, তাহা কি তিনি অসঙ্গতরূপে অনুমান করিয়াছেন ? অপিচ অগ্নিপুরাণ কায়স্থগণের ক্ষত্রিয়ত্ব প্রতিপাদনের বিরুদ্ধ। এই পুরাণে ঘােষ প্রভৃতি উল্লেখ থাকায় যে ঐ বচন প্রক্ষিপ্ত, গ্রন্থকারের এ যুক্তি সঙ্গত নহে। পঞ্চবিপ্রসহ ৭৪ মূল টাকুর ও সমালােচনা। যখন কায়স্থপঞ্চ এদেশে আইসেন, তখনও তাহাদিগের মধ্যে ঐ উপাধি ছিল। সুতরাং তাহাদিগের পুৰ্ব্ব পুরুষগণের ঐ উপাধি থাকা অসম্ভব নহে। এখনও ঐরূপ উপাধি কোলাঞ্চ প্রদেশে থাকার বিষয় আমরা অবগত আছি। তবে উচ্চারণে তারতম্য আছে মাত্র, যথা, “বসু” “বসা” ইত্যাদি। গ্রন্থকার অগ্নি পুরাণের বচনের কোন এক অংশকে অমৌলিক ও প্রক্ষিপ্ত বলিতেছেন। আমরা যদি অগ্নি পুরাণের বচনকে প্রক্ষিপ্ত বলি, তাহা হইলে বিরুদ্ধবাদীরা, স্কন্দপুরাণাদির বচনকেও প্রক্ষিপ্ত বলিলে, তাহাতে আমাদিগের কি কোন যুক্তিযুক্ত প্রত্যুত্তর আছে? যাহা যখন যাঁহার বিরুদ্ধে হইবে,তথনই তাহাকে প্রক্ষিপ্ত বলিলে এবং এইরূপ তকমার্গে ভ্রমণ করিলে, সমুদায় শাস্ত্রই প্রক্ষিপ্ত বচনের বােঝা হইয়া পড়ে এবং তাহা হইলে শাস্ত্রের প্রতি আস্থা থাকে কৈ? আর এরূপ তর্কের মূল্যই বা কি হইবে ? আধুনিক অবস্থা এইরূপ দাড়াইয়াছে যে, কায়স্থগণ ক্ষত্রিয় নামে আপনাদিগকে পরিচিত করিলে, বৈদ্যগণ তাহার প্রতি- বাদ এবং বৈদ্যগণ আপনাদিগকে সেন বংশীয় বলিলে, কায়স্থগণ তাহার প্রতিবাদ করেন। উভয়েই পাণ্ডিত্যাভিমানে, উভয়েই ঈর্ষা প্রাবল্যে, সত্য বা প্রকৃত মীমাংসায় উপস্থিত হইতে অনিচ্ছুক। এ বিষয়ে আমাদের বক্তব্য আছে। বৈদ্যগণ আপনাদিগকে অম্বষ্ঠ নামে অভিহিত করেন। কথঞ্চিৎ আলােচনা করিলেই অম্বষ্ঠ এবং কায়স্থ শব্দ যে একা- ক, তাহা বিলক্ষণ প্রতীত হইবে। স্কন্দপুরাণের রেণুকা মাহাত্ম্য পাঠে অবগত হওয়া যায় যে, মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। ৭৫ চন্দ্রসেন মহিষী গর্ভবতী থাকায় মহর্ষি দাভ্য পরশুরামের নিকট তাহার গর্ভ রক্ষাৰ্থ প্রার্থী হওয়ায় ও গর্ভস্থ সন্তান ক্ষত্ৰ ধৰ্ম্মানুযায়ী হইবে না, ইহা প্রতিশ্রুত হওয়ায়, গর্ভ রক্ষা হয়। -কায়ান্থাে গর্ভ উত্তম। তস্মাৎ কায়স্থ ইত্যাখ্যা ভবিষ্যতি শিশু শুভাঃ। ইহার দ্বারায় প্রতীয়মান হয় যে, শিশু তৎকালে “কায়াতে’ ( মাতৃকায়াতে) স্থিত, তজ্জন্যই কায়স্থ নামকরণ হইয়াছে। এবং মহর্ষি রামাজ্ঞয়া সদাভ্যেন ক্ষত্ৰধৰ্ম্মাহিষ্কৃতঃ। কায়স্থ ধৰ্ম্মাদততস্মৈ চিত্রগুপ্ত যঃ স্বতঃ। তাহাকে ক্ষত্ৰ ধৰ্ম্ম হইতে বহিষ্কৃত ও চিত্রগুপ্ত ধর্ম প্রদান করেন। এক্ষণে “অম্বষ্ঠ” সম্বন্ধে বিবেচনা করা হউক। অম্বা হইতে যে অম্বষ্ঠ শব্দ নিষ্পন্ন হইয়াছে, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। অম্বাতে অর্থাৎ মাতাতে (মাতৃ গর্ভেতে স্থিত যে শিশু তাহাই অম্বষ্ঠ নামে অভিহিত হইয়াছে। সুতরাং “কায়াতে” স্থিত এবং “অম্বাতে” স্থিত যে একই কথা, তাহা অস্বীকার করিবার যােগ্য নহে। গ্রন্থকার ভবিষ্য পুরাণের “বর্ণাবর্ণদ্বয়ঞ্চৈব অম্বষ্ঠ্যা দাশ সত্তম” উল্লেখ করিয়া বলেন, যে “এই অম্বষ্ঠ হইতেই বােধ হয় অম্বষ্ঠ ক্ষত্রিয় বংশের উৎপত্তি হইয়াছে। ভবিষ্য পুরাণের অম্বষ্ঠ চিত্রগুপ্তের অন্যতম পুত্র। তাঁহার এক পুত্রের দ্বারা অম্বষ্ঠ ক্ষত্রিয় বংশ উৎপত্তি হইলে, তদীয় অন্যতম পুত্র সৌরসেনা, অহীফণা প্রভৃতির বংশও তাহাদিগের নামেই পরিচিত হইত। যেমন কুরু, পাণ্ডু প্রভৃতি, ইহাদিগের বংশ উৎপত্তি হওনান্তর ঐ নামেই

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা।
পরিচিত হইয়াছে। অথবা যেরূপ বলীরাজার পুত্র, অঙ্গ, বঙ্গ,
পুণ্ড ইত্যাদি হইতে তাহাদিগের শাসিত দেশের নামকরণ
হইয়াছে, সেইরূপ হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু তেমন কোন
পুষ্ট প্রমাণ না থাকায় গ্রন্থকারের অনুমান সম্পূর্ণ অলীক।
সুতরাং আমরা কায়স্থ ও অম্বষ্ঠকে যে এক ও অভিন্ন মনে করি-
লাম, তাহা পরিহার যােগ্য নহে।
আমরা এ স্থলে আর একটা কথা বলিয়া রাখি। পদ্মপুরাণ
বলিতেছেন ;-
ক্ষণং ধ্যানাস্থিতস্যাস্ত সৰ্ব্বকায়াদ্বিনির্গতঃ।
ক্ষ
চিত্র গুপ্ত ইতি খ্যাত ধৰ্ম্মরাজ সমীপতঃ
ব্ৰহ্মকায়ােড়বাে যস্মাৎ কায়স্থ বর্ণ উচ্যতে।
ভবিষ্য পুরাণও এইরূপ স্বীকার করেন। ইহাদিগের মধ্যে
মহর্ষি দালভ্যের রক্ষিত চন্দ্রসেন তনয়ের উল্লেখ নাই। অপিচ
স্কন্দপুরাণে উক্ত আছে যে, মহর্ষি দালভ্য চন্দ্রসেন তনয়কে ক্ষত্র
ধৰ্ম্ম বহিষ্কৃত করিয়া চিত্রগুপ্ত ধর্ম প্রদান করেন। ইহাতে অনু-
মান হয় যে, শেষােক্ত গ্রন্থ পূর্বোক্ত গ্রন্থাদির পূর্বে রচিত হওয়ায়
ঐ বিষয়ের উল্লেখ নাই।
পদ্মপুরাণ-ব্রহ্মকায় হইতে চিত্রগুপ্তের উৎপত্তি ও তদনু-
সারে কায়স্থ আখ্যা বলিতেছেন; স্কন্দ পুরাণ দ্বারায় বলা হইয়াছে
যে চন্দ্রসেন তনয় মাতৃকায়াতে স্থিত জন্য “কায়স্থ” নামে উক্ত
হয়। চিত্রগুপ্তই আদি, তজ্জন্য তিনি ব্ৰহ্মকায়া হইতে উৎপত্তি
বলিয়া উক্ত হইবেন, ইহা বিচিত্র নহে। সুতরাং তিনি ব্ৰহ্মকায়

ঢাকুর ও সমালােচনা। ৭৭ হইতে উৎপত্তি এরূপ অনুমিত হইলেও, চন্দ্রসেন তনয় যে মাতৃকায়াতে স্থিত জন্য কায়স্থ নামে অভিহিত ও উত্তরকালে অষ্ঠ নামে বিবেচিত হইবেন, বিশেষ প্রণিধান করিলে, ইহা অযৌক্তিক বােধ হইবে না। বিষ্ণু পুরাণে “অম্বষ্ঠ” নামক জাতির উল্লেখ আছে। পাণিনী অষষ্ঠ শব্দের অর্থ দেশ বিশেষ ও ক্ষত্রিয় জাতি বিশেষকে নির্দেশ করেন। সুপ্রসিদ্ধ মহাভারতকার প্রাগুক্ত দুই অর্থেই অম্বষ্ঠ শব্দ ব্যবহার করিয়াছেন। ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্র অনুমান করেন যে, এই অম্বই ক্ষত্রিয় শ্রেণী হইতেই সেনবংশীয় রাজগণ উদ্ভব হইয়া থাকিবেন। তিনি আরও অনুমান করেন যে, পূৰ্বতন কালে, উত্তর পশ্চিম প্রদেশে, অম্বষ্ঠ নামক যে ক্ষত্রিয় জাতি ছিল, উত্তরকালে সাধারণে তাহাকেই মনুক্ত অম্বষ্ঠ (ইহারা ব্রাহ্মণের ঔরস ও বৈশ্যার গর্ভজাত বর্ণসঙ্কর জাতি বিশেষ) নামক জাতিতে পরিগণিত করিয়া থাকিবে। আমাদিগের দেশের প্রাচীন সংস্কার এই যে, সেনরাজগণ বৈদ্যবংশীয় ছিলেন। ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্র প্রমুখ ব্যক্তিগণ সেনবংশীয় রাজগণকে ক্ষত্রিয় প্রতিপাদনে বিশেষ যত্ন করিতে, ছেন। যদি সেন রাজগণ ক্ষত্রিয় সাব্যস্থ হয়েন, তবে তাহার ফলভাগী বৈদ্যগণ কেন না হইবেন ? বরং “সােমবংশীয়” উল্লেখ থাকায় “ঔষধি নাথ” বা বৈদ্যবংশীয় অধিকতর যুক্তিসঙ্গত। ব্ৰহ্ম ক্ষত্রিয় বাক্যের দ্বারা ক্ষত্রিয় অনুমান করিলেও বৈদ্যগণের ক্ষত্রিয় হওয়া অসঙ্গত নহে। আমাদিগের গ্রন্থকার শ্রীমদ্ভাগ- বতের বিতথ রাজার বংশের শেষ ব্যক্তি ক্ষেমকের প্রসঙ্গে বলিতেছেন, যে “কলিতে মেক হইতেই যদি ব্ৰহ্ম ক্ষত্রিয়- ৭৮ মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। কুলের অবসান হইয়া থাকে, তবে সেনবংশীয়দিগের ব্ৰহ্মক্ষত্রি- যত্ব কিরূপে সঙ্গত হইতে পারে ? এ প্রশ্নের সদুত্তর সহজসাধ্য নহে। এ বিষয়ের অবশ্যই কোন কারণ আছে, ফল কথা সেন রাজগণ ক্ষত্রিয় ছিলেন।” ‘এ প্রশ্নের উত্তর সহজ সাধ্য নহে অথচ সেন রাজগণ ক্ষত্রিয় ছিলেন’ ইহার তাৎপৰ্য কি একখানি তাম্রফলকে বা প্রস্তর খণ্ডে লিখিত বাক্য, যাহা' প্রকৃত পক্ষে দ্ব্যর্থঘটিত বলিয়াই সকলে স্বীকার করিবেন, তাহা যে বাস্তবিক দ্ব্যর্থ করিবার জন্যই লিখিত হইয়াছিল, এরূপ অনুমান করা অসঙ্গত নহে এবং এ স্থলে একটি অর্থ পরিগ্রহণ করিয়া অপরটি পরিবর্জন করা কিছুতেই সমীচিন বােধ হয় না। তাম্রশাসনে লিখিত “সােন বংশ” শব্দ দ্ব্যর্থঘটিত। আবার “ব্ৰহ্ম ক্ষত্রিয়” শব্দের অর্থ কেহ প্রধান ক্ষত্রিয় বলিতেছেন, কেহ “বিতথের কুল” অর্থ করিতেছেন ; কেহ কেহ বলিতেছেন, ব্রাহ্মণের ঔরস ও ক্ষত্রিয়ানীর গর্ভ জন্যই ব্ৰহ্মক্ষত্রিয় শব্দ ব্যবহৃত হইয়া থাকিবেক। ইহার যাথার্থ্য অবধারণ করা সহজ নহে। আমাদিগের ঘটকগণের গ্রন্থ কিন্তু বল্লালসেনের অব্যবহিত পরেই রচিত হইতে আরম্ভ হয় *। এই সকল গ্রন্থ এবং জন- শ্রুতি বিশেষতঃ বক্তিয়ার খিলিজীর বঙ্গবিজয়ের সমকালীয় ব্যক্তিগণের প্রমুখাৎ, লাক্ষ্মণেয় সেন সম্বন্ধে মুসলমান ইতিহাস- * গ্রন্থকার বলিয়াছেন যে, কুলজ্ঞগণ সেন রাজগণ সম্বন্ধে প্রকৃত তত্ত্ব জানিতেন না। গ্রন্থকারের এই কথা অতি অসার। বিপ্রগণের কুলশাস্ত্র দ্বারা প্রতীত হয় যে, বল্লাল সেনই কুলীন ব্রাহ্মণগণকে ঘটক নিয়ােগ করেন। এবং কুলীন ও পণ্ডিত ও সদাচার সম্পন্ন বিপ্রেরাই ঐ কায করিতেন। সুতরাং ইহারা জানিতেন না বলিলে কথাটা কেমন হয় ?

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। বেত্তা মেনহাজউদ্দীন যে সকল কথা শুনিয়া লিপিবদ্ধ করিয়াছেন, তাহা কিছুতেই অবিশ্বাসযােগ্য নহে। তিনি সেন রাজগণকে বৈদ্য বলিয়াই উল্লেখ করেন। সুপ্রসিদ্ধ আবুলফজল সেন রাজগণকে কায়স্থ বলিয়াছেন, ইহার তাৎপৰ্য এই বােধ হয় যে, আকবরের দরবারের প্রধান প্রধান পণ্ডিতগণ “অম্বষ্ট” ও কায়স্থকে অভিন্ন বলাতেই তিনি সেন রাজগণকে কায়স্থ উল্লেখ করিয়া থাকিবেন। কায়স্থ ও বৈদ্যজাতির আচারগত কিছু বৈলক্ষণ্য থাকিলেও ইহাদিগকে স্বতন্ত্র অনুমান না করিবার হেতু আছে। কারণ আমরা দেখিতে পাইতেছি যে, অদ্যাপিও পাশ্চাত্য কায়স্থগণ উপবীত ধারণ ও ক্ষত্রিয়বৎ অশৌচাদি প্রতিপালন করেন। বেহার অঞ্চলের কায়স্থগণ উপবীত ধারণ না করিলেও গায়ত্রী জপ করিয়া থাকেন। রাজা রাজ বল্লভের পূর্বে বৈদ্যজাতি উপবীত ধারণ করিতেন কি না সন্দেহ। আন্দুলের রাজা রাজনারায়ণ দেবের পূর্বে বঙ্গীয় কায়স্থগণ মধ্যে উপবীত ধারণ ও ক্ষত্রিয়বৎ অশৌচাদি প্রতিপালনের চেষ্টা, বােধ হয়, না হইয়াই থাকিবে। বিক্রমপুর ও সােণার গ্রাম পরগণাতে এমন অনেক বৈদ্য ও কায়স্থ বংশীয় লােক আছেন, যাঁহাদিগের পূৰ্ব্বপুরুষের মধ্যে কন্যাপুত্রের আদান প্রদান চলিত। বিক্রমপুরে আদিশূর ও বল্লালসেনের রাজধানী ছিল। পঞ্চ কায়স্থ প্রথমে ঐ স্থানেই বিপ্রগণ সহ সমাগত হয়েন। পূৰ্বে উক্ত প্রদেশে কোন কোন বৈদ্য ও কায়স্থ বংশে কন্যাপুত্রের আদান প্রদানের প্রথা থাকায় ইহাই প্রমাণিত হইতেছে যে, কান্যকুজাগত পঞ্চ কায়স্থ আদি- শূরের সবংশীয় ও বৈদ্যগণ তাহার বঙ্গীয় জ্ঞাতি বিধায়, সদাচার- মূল ঢকুর ও সমালােচনা। সম্পন্ন পঞ্চ কায়স্থের সমকালে না হউক, তাহাদিগের উত্তরকালে উক্ত প্রথা প্রচলিত হইয়াছিল। এখনও চট্টল ও কুমিল্লা প্রদেশের স্থানবিশেষে কায়স্থ ও বৈদ্যজাতি মধ্যে বৈবাহিক ক্রিয়া সম্পন্ন হইতেছে। আমরা দেখিতে পাই যে, যে সমাজে যতই ধনবান ও বিদ্বানের আবির্ভাব যখনই হইয়াছে, সে সমাজের বন্ধন তখনই অধিক দৃঢ়তর ও অন্য হইতে স্বাতন্ত্র্য লাভ করিয়াছে। রাজা রাজবল্লভ বৈদ্যজাতির কতকগুলি ঘর লইয়া একটা স্বতন্ত্র দল সৃষ্টি ও কতকগুলি প্রথা প্রচার করেন। উত্তরকালে ঐ দলই পরিপুষ্ট হয়। আমরা অবগত আছি যে, কুমিল্লা প্রদেশে এক সম্প্রদায় আচারভ্রষ্ট “খায়স্থ আছে, তাহারা শুড়ী প্রভৃতি শূদ্র- জাতির সহিত কন্যার বিবাহ প্রদান করে, কিন্তু তাহাদিগের কন্যা গ্রহণ করে না। এবং যে কন্যাকে দান করে, তাহার কৃত রন্ধন দ্রব্য ভক্ষণ করে না। জেলা নােয়াখালীর অধীন ছাপনাই ষ্টেষণ ও পঞ্চরাম আউট পােষ্টের অধীন এবং ফেণী সব ডিবিশনের অধীন এক সম্প্রদায় লােক আছে, তাহারা আপনাদিগকে “খায়েস্থ” নামে পরিচিত করে। ইহাদিগকে অনেকে কায়স্থ বলেন। বল্লাল সেন নাকি ইহাদিগের পূর্ব পুরুষ দ্বারায় কাহারের কৰ্ম্ম করান, ইহারা এখনও কাহারের ব্যবসা করিয়া থাকে। ময়মনসিংহের নেত্রকোণা সবডিভিশনেও এক সম্প্রদায় অচারভ্রষ্ট কায়স্থ আছে। ইহারা আচারভ্রষ্ট বা নীচ কৰ্ম্ম করে বলিয়া কায়স্থ মাত্রই তদ্রুপ নহেন। পতিত ও আচারভ্রষ্ট কোন সম্প্রদায় হইলে, আতি মাত্রেই তাহার ফলভাগী নহে। যাহা হউক, কমলার কৃপায় মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। ও পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসাদে ইহাদিগের মধ্যে যাহারা ধনী ও বিদ্যান হইতেছে, তাহারা কিন্তু স্বাতন্ত্রলাভের চেষ্টায় আছে। ঘটকগণের মধ্যে অধিকাংশই সৎ ব্রাহ্মণ। ইহাদিগের পূর্ব- পুরুষগণ বিশেষ বিদ্যাবুদ্ধি সম্পন্ন ছিলেন। নতুবা তাহাদিগের প্রতি বংশের নামাদি রক্ষণের ভার অর্পিত হইবে কেন? “বৈদ্য- গণের অনেকের সেন উপাধি আছে, সেনবংশীয় রাজগণ সেনান্ত নামে বিখ্যাত এই ধারণা বলেই ঘটকগণের বুদ্ধিতে বৈদ্যগণ সেনবংশীয় বলিয়া অনুমিত হইয়াছে, এমন কথা বলা যাইতে পারে না। কারণ ভীমসেন, চন্দ্রসেন প্রভৃতির “সেন” শব্দ যে নামের একটী অংশ তাহা বিলক্ষণ তাহাদিগের জানা ছিল। কায়স্থ ও অন্যান্য কতিপয় জাতিতেও সেন উপাধি আছে। বাস্তবিক সেনবংশীয় রাজগণ বৈদ্য ছিলেন, এই জন্যই, ঘটকগণ ও জনশ্রুতি তাহাদিগকে বৈদ্য বলিয়া প্রমাণ করি- তেছে। তাহাদিগকে বৈদ্য ঠিক রাখিয়া, কায়স্থই করুন বা যাহাই করুন, সে স্বতন্ত্র কথা। এ পর্যন্ত বৈদ্য ও কায়স্থ জাতি এক মূল হইতে উৎপত্তি এরূপ বলা হইল, এজন্য কেহ এরূপ মনে করিবেন না যে, আমরা উদ্ধৃঙ্খলতা-পরতন্ত্র হইয়া বহুকালগত সমাজবন্ধনকে ছিন্ন করিতে উদ্যত হইয়াছি। প্রকৃত যুক্তির অনুসরণ করিলে “কায়স্থ” ও “অম্বষ্ঠ” যেরূপ ভাবে পরিগৃহীত হইতে পারে, তাহাই আলােচিত হইয়াছে মাত্র। বহুকালগত সামাজিক স্বাতন্ত্রে কায়স্থ ও বৈদ্যজাতি বিভিন্নভাবে আছেন। “পরধর্ম ভয়াবহ পরিগ্রহণ করিলে সমাজ স্বপদে প্রতিষ্ঠিত থাকিবে কেন!

৮২ মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। আমাদিগের আর একটি নিবেদন এই যে, কায়স্থগণ আপনাদিগের ক্ষয়িত্ব প্রতিপাদন করিতে যাইয়া নিরর্থক তর্কের বিষয়ীভূত না হয়েন। কায়স্থগণ ক্ষত্রিয় হইলেও ব্রাহ্ম- ণের নিম্নে ব্যতীত, কখনই ব্রাহ্মণের সমানে হিন্দুসমাজে স্থান লাভ করিতে পারিবেন না। বঙ্গদেশে, ব্রাহ্মণের নিমেই কায়স্থ- গণ আসন লাভ করিয়াছেন। কায়স্থগণ হিন্দু সমাজে যে অধি- কার বিস্তীর্ণ করিয়া এক্ষণে বর্তমান আছেন, তাহা বাস্তবিক ক্ষত্রিয়ত্ব হইতে নূন নহে! বঙ্গদেশে প্রথমে ব্রাহ্মণ ও শূদ্র ভিন্ন জাতি না থাকায়, তদানীন্তন বিপ্রগণ কায়স্থগণকে শূদ্রবৎ শাসনাধীন করিয়াছেন। এই জন্য স্মৃতিশাস্ত্রে কায়স্থগণ শূদ্রবং শাসনাধান মাত্র এবং বহু পুরুষপরম্পরায় ঐ ভাবেই তাহারা চলিয়া আসিতেছেন। ইহাতে কায়স্থজাতির অগৌরব কি, তাহা আমরা বুঝিতে সমর্থ নহি। কায়স্থজাতির ক্ষয়িত্ব সম্বন্ধ গ্রন্থকারের ক্ষুদ্র পুস্তকের প্রায় অর্ধাংশে আলােচিত হইয়াছে। বােধ হয় এই জন্যই তিনি সমালােচ্য গ্রন্থকে কায়স্থজাতির ইতিবৃত্ত নাম দিয়াছেন। কিন্তু এই ইতিবৃত্তে গ্রন্থকারের নিকট আমরা আরও গুরুতর গবেষণা পাইবার আশা করিয়াছিলাম। কায়স্থজাতির ক্ষত্রিয়ত্ব বর্ণনের পরেই গ্রন্থকার স্বীয় সমা- জের ইতিহাস লিখিয়াছেন। তিনি সমাজ সংগঠন বৃত্তান্ত হইতে আরম্ভ করিয়াছেন। গ্রন্থকার বলেন যে সমাজ সংগঠনের প্রধান উদ্যোগী ভৃগুনন্দী, নরদাস ও মুরারি চাকি বল্লালের অসদাচরণ ও ভ্ৰষ্টাচারে বিরক্ত হইয়া বল্লালী মতানুসরণ করেন নাই এবং নাগদ্বয়ের যত্নে মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। বারেন্দ্র কায়স্থ-সমাজ সংগঠন হয় এরূপ কুলপঞ্জিকায় লিখিত আছে। তিনি আরও বলেন যে “মতান্তরে বারেন্দ্র কায়স্থ- সমাজ সংগঠনকারিগণ বল্লালের পরবর্তীকালে কুল প্রধান দেবীবর ঘটকের ন্যায় বারেন্দ্র কায়স্থ-সমাজের পূর্ব নিয়ম অনেকটা পরিবর্তন পূৰ্ব্বক বর্তমান সমাজ সংগঠন করেন। * দেবীবরের দ্বারা বল্লালী মত যেরূপ পরিবর্তিত ও নুতন রূপে সংগঠিত হইয়াছে,ভৃগুনন্দীর দ্বারায়ও বারেন্দ্র কায়স্থ-সমাজ সেইরূপে পরিবর্তিত হইয়াছে। সুতরাং দক্ষিণ রাঢ়ীয় ও বঙ্গজ সমাজ হইতে, বারেন্দ্র কায়স্থ-সমাজ অনেক পৃথক হইয়া পড়ি- আছে। সে যাহা হউক বারেন্দ্র কায়স্থ-সমাজ সংগঠন সম্বন্ধে উল্লিখিত শেষােক্ত মতই যে বিশুদ্ধ ইহা বিলক্ষণ প্রতীত হয়।” গ্রন্থকার “মতান্তরে” শব্দ ব্যবহার করায় বােধ হয় যে, বারেন্দ্র কায়স্থগণের সমাজ সংগঠন বিষয়ে অন্যমত আছে। ঢাকুর অথবা সামাজিক কিম্বদন্তী ব্যতীত এ সমাজের ইতিহাস পরিজ্ঞাত হইবার অন্য কোন উপায় নাই। সেই ঢাকুরও সামাজিক কিম্বদন্তী একই বাক্যের পােষকতা করিতেছে। উভ- যেই প্রমাণ করিতেছে, বারেন্দ্র কায়স্থ-সমাজ-সংগঠনকারিগণ বল্লালের সমসাময়িক। সুতরাং প্রাগুক্ত মতান্তরের জন্য স্বতন্ত্র কোন মত না থাকায় উহাকে আমরা গ্রন্থকারের মত সাব্যস্থ করিয়াছি। তিনি যে গুঢ় অভিসন্ধিতে ঐরূপ মতে উপনীত হইয়াছেন, তাহা আমরা পশ্চাৎ আলােচনা করিব। গ্রন্থকার বলিয়াছেন যে, দেবীবরের দ্বারা যেরূপ বল্লালী মত পরিবর্তিত ও নূতন রূপে সংগঠিত হইয়াছে, ভৃগুনন্দীর দ্বারায়ও বারেন্দ্র কায়স্থ-সমাজ সেইরূপ পরিবর্তিত হইয়াছে। সুতরাং ৮৪ মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। দক্ষিণ রাঢ়ীয় ও বঙ্গজ সমাজ হইতে বারেন্দ্র সমাজ অনেক পৃথক হইয়া পড়িয়াছে।” সামাজিক পাঠক! আপনার। গ্রন্থ- কারের এইরূপ বাক্য ও সিদ্ধান্তকে কি চিন্তাশীল ও তত্ত্বদর্শী মস্তিষ্কের ফল বলিবেন? গ্রন্থকার শাস্ত্রে ব্যুৎপন্ন বটেন কিন্তু তিনি যে ঐতিহাসিক রহস্য—বিশেষতঃ স্বকীয় সমাজের ঐতি- হাসিক রহস্য উন্মেষণে এমন অসারবান হইবেন, তাহা আমা- দিগের ধারণা ছিল না। আমরা গ্রন্থকারকে জিজ্ঞাসা করি যে, তিনি কেমন করিয়া কোন্ সূত্রে জানিলেন যে, দেবীবরের ন্যায় ভৃগুনন্দীর দ্বারা বারেন্দ্র সমাজ পরিবর্তিত ও নূতন রূপে সংগঠিত এবং এই জন্যই দক্ষিণ রাঢ়ীয় ও বঙ্গজ সমাজ হইতে বারেন্দ্র সমাজ অনেক অংশে পৃথক হইয়া পড়িয়াছে ? নিজের চিন্তা- শক্তির সমক্ষে যাহা যখন আসিল তাহা বলিয়া ফেলিলে চলিবে কেন? তিনি যে গুরুতর মতটী পরিব্যক্ত করিয়াছেন তাহার মূল কি ? বংশাবলীও এস্থলে প্রমাণ নহে। এইরূপ ভাবে কোন মত ব্যক্ত করিতে তুলনা সাপ করে। দুইটা পদার্থের পরস্পর তুলনা ব্যতীত ঐরূপ কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না। ঐরূপ কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হইবার পূর্বে আদৌ তুলনার সামগ্রীর প্রয়ােজন করে। রাঢ়ীয় ঘটকগণের গ্রন্থে বল্লালী মৰ্যাদা ও দেবীবর ঘটকের মেলবন্ধন আছে। সুতরাং এই স্থানে বলা যাইতে পারে যে, দেবীবর বল্লালী মতের পরি- বৰ্তন করিয়া নূতন ভাবে সমাজ সংগঠন করেন। কেন না এস্থলে বল্লালী মৰ্যাদা ও দেবীবরের মেলবন্ধন এতদুভয়ের বিশিষ্ট প্রমাণ দ্বারাই তুলনা হইতেছে যে বল্লালী মৰ্যাদা ও মেলবন্ধন সামগ্রীটি কি ? বল্লালী মৰ্যাদা ও মেলবন্ধন এতদুভয়ের অস্তিত্ব মূল চাকুর ও সমালােচনা। জীয়ায় উভয়েই প্রমাণিত হইতেছে। তবেই এস্থলে এরূপ সিদ্ধান্ত করিয়া লওয়া যাইতে পারে যে, দেবীর বল্লালী মতের পরিবর্তন করিয়া মেল বন্ধন করেন। এইক্ষণ জিজ্ঞাস্য এই যে, ভূগুনন্দী সম্বন্ধে কি এবম্বিধ কোন প্রমাণ আছে ? ভূগু যে বল্লালী মতের পরিবর্তন করেন, তাহা প্রদর্শন করিবার সামগ্রী কোথায় ? গ্রন্থকার অথবা সমালােচক এই দুই জনের এক জনের মস্তিষ্কে ইহার সামগ্রী আছে বলিলে কি চলিবে ? ভৃগু নন্দী বল্লালী মতের পরিবর্তন করেন বলিলেই, ভৃগুর পূর্বে যে, বারেন্দ্র কায়স্থ সমাজের অস্তিত্ব ও তাহাতে বল্লালী মৰ্য্যাদা বিদ্যমান ছিল তাহাও বুঝিতে পারা যায় ; তাহা হইলে সুতরাং অধিকতর প্রমাণ আবশ্যক করে। পাঠক। আপনাদিগকে একটা কথা বলি। আইন-আদালতে গ্রন্থকার ও সমালােচক উপস্থিত হইলে, যিনিই বাদী বা প্রতি বাদী হউন না কেন, গ্রন্থের মধ্যে গ্রন্থকার কোন প্রমাণ দেন নাই, ইহা দৰ্শাইলেও কি সমালােচক প্রমাণ উপস্থিত করিতে বাধ্য হইত? আইন আদালতে বিচারক এক জন, গ্রন্থকার এক জন ও সমালােচক এক জন; উকিল যতই থাকুক না কেন, কিন্তু ভাবিতেছি, এস্থলে বিচারক এক জন নহেন। সুবিজ্ঞ পাঠক! বিচার করুন যে, গ্রন্থকারের সিদ্ধান্তানুসারে ভূগুনন্দীর পূর্বে বারেন্দ্র কায়স্থ ও বলাল্লী মতের অস্তিত্ব জিজ্ঞাস্য হইতে পারে কি না ? এই দুই বিষয়ের প্রমাণ কি? ভূগুনন্দী বল্লালী মতের পরিবর্তন করিয়াছেন, এই ধ্রুববাক্য বলিলেই এই সমাজে যে বল্লালী মত ছিল, তাহার পরিচায়ক সামগ্রী চাই। আমরা পূর্বেই বলিয়াছি যে, গ্রন্থকারের বংশাবলীর দ্বারায় মূল ঢাকুর ও সমালোচনা। ইহার প্রমাণ হয় না। গ্রন্থকারের অবলম্বিত ঢাকুরের মধ্যে ইহার প্রমাণ নাই। সামাজিক কিম্বদন্তীতেও ইহার প্রমাণ নাই। তবে আর প্রমাণ কোথায় ? সামাজিক এরূপ গুরুতর বিষয় বিশিষ্ট যুক্তি ও প্রমাণ ব্যতিরেকে একমাত্র আজগবী অনুমানের দ্বারায় সিদ্ধান্ত করা কখনই প্রবীণতা ও তত্ত্বজ্ঞতার কাৰ্য্য নহে। সামাজিক ইতিবৃত্ত অতি গুরুতর সামগ্রী। সামাজিক রহস্য গবেষণা করিতে হইলে, সমাজের মুখাপেক্ষীভাবে তাহা সম্পাদন করিতে হয়। অন্য কোন বিষয় গবেষণা বা তাহার রহস্য ভেদ কালে যেরূপ স্বীয় স্বাধীনভাবের বিকাশ করা যায়, সামাজিক রহস্য গবেষণায় সেরূপ সম্ভবে না। অনেক বিষয় বিশেষতঃ সামাজিক বিষয় গবেষণা অথবা সংগ্রহকালে আমাদিগকে দুইটা নিয়মের বশবর্তী হইয়া অগ্রসর হইতে হয়। প্রথমতঃ একদা সমাজে যাহা সংঘটন হইয়াছে এবং দ্বিতীয়তঃ এইক্ষণ সমাজে যাহা বর্তমান আছে তৎপ্রতি সবিশেষ লক্ষ্য পূৰ্ব্বক রহস্য উন্মেষণ করা আদৌ কৰ্তব্যকৰ্ম্ম। এতদভাবে যে গবেষণা হইবে তাহার ফল অবশ্যই অকিঞ্চিৎকর ও সমাজের পীড়াজনকও বটে। অপিচ সামাজিক ইতিবৃত্ত বলিলে একদা সমাজে যাহা সংঘটন হইয়াছে ও সমাজে যাহা বর্তমান আছে তাহাকেই বুঝায়। সুতরাং তদালােচনা একমাত্র স্বীয় কল্পনাবিন্তিত হইলে তাহা অতি অকিঞ্চিৎকর সন্দেহ নাই। গ্রন্থকারের আদর্শ পদ্য ঢাকুরে লিখিত আছে যে, বারেন্দ্র কায়স্থ সমাজ সংস্থাপনকারী ভৃগুনন্দী, নরদাস ঠাকুর ও মুরারী দেব চাকী ইহারা তিনজনে বল্লাল সেনের সমসাময়িক। গ্রন্থ- কার বলেন যে, ‘বারেন্দ্র কায়স্থ সমাজ সংস্থাপনকারিগণ যে মূল ঢকুর ও সমালােচনা। ৮৭ বল্লালের সমসাময়িক নহেন, তাহার বিশিষ্ট প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায়।” গ্রন্থকার এই স্থলে ভৃগুর অধঃস্তন কয়েক পৰ্যায়েরমাত্র উল্লেখ করিয়া একটা গুরুতর বিষয়ের মীমাংসা করিতে প্রয়াস পাইয়াছেন। গ্রন্থকার ভৃগুর অধঃস্তন চতুর্দশ পৰ্য্যায়ের উল্লেখ করেন। কিন্তু আমরা ভৃগুর সমসাময়িক অন্যান্য ব্যক্তিগণের পর্যায়ের যে হিসাব সংগ্রহ করিয়াছি, তাহাতে বর্তমান পর্যায়ের উর্ধে ১৬। ১৭ পর্যায়ের নামের তালিকা পাইয়াছি। কিন্তু তাহাতেও ভৃগুর সমকালীয় ব্যক্তিগণের নাম পাই নাই। গ্রন্থ- কার কিরূপ উপায়ে, ভৃগুর বংশের বর্তমান শেষ পর্যায়ের কয়েক পুরুষমাত্র উর্দ্ধে ভূগুকে সংস্থাপন করিলেন তাহা আমরা জ্ঞাত নহি। বরং এই বিষয়ে ভৃগুর বংশীয় কতিপয় প্রাচীন ব্যক্তির নিকট হইতে আমরা প্রতিবাদ প্রাপ্ত হইয়াছি। আর গ্রন্থকারের অবলম্বিত পদ্য ঢাকুরে আছে যে, চতুর্বিংশতি পুরুষ ভৃগু অবধি করিয়া । উত্তম মধ্যম কাৰ্য্য যাইছে চলিয়া। গ্রন্থকার এ কথার বাদ প্রতিবাদ কিছুই করিলেন না কেন? গ্রন্থকার বলেন যে আমাদের কুলের লিপিবদ্ধ বংশাবলী আছে, তদনুসারে বর্তমান অধঃস্তন পুরুষ হইতে গণনা করিয়া উৰ্দ্ধতন আদিপুরুষ কতসংখ্যক হন তাহা আমরা বলিতে পারি।” তৎপরে বলেন যে “বৰ্তমান সময়ে আমরা ভৃগুনন্দীর অধঃস্তন চতুর্দশ পুরুষ দেখিতে পাইতেছি। যদি গড়ে প্রত্যেক পুরুষের জীবনকাল সাড়ে তেতাল্লিশ বৎসরও ধরা যায়, তাহা হইলেও ভৃগুনন্দী প্রভৃতি যে এয়ােদশ শকাব্দের শেষ ভাগে বর্তমান ছিলেন ইহাই বুঝা যায়। কিন্তু বল্লালসেন একাদশ শকাব্দের ৮৮ মূল টাকুর ও সমালোচনা। প্রথম ভাগে যে দান-সাগর পুস্তক প্রণয়ন করেন তাহার প্রমাণ পাওয়া যায়। অতএব বল্লালের দুই শত বৎসরের পরে যে বারে কায়স্থসমাজ সংগঠিত হইয়াছে তাহাতে আর কোন সন্দেহ নাই। মিত্র মহাশয়ের মতানুসরণ করিলেও অন্ন আড়াই শত বৎসর পরে সমাজ সংগঠন হয়। অতএব এত- দ্বারায় স্পষ্টই জানা যাইতেছে যে, ভৃগুনন্দী, নরদাস ও মুরারী চাকী কোন মতেই বল্লালের সমসাময়িক নহেন। বল্লালের বহু পরে তৎকৃত সামাজিক নিয়মের পরিবর্তন পূর্বক ইহারা সিদ্ধ সাধ্য ভাবে নূতন সমাজ প্রতিষ্ঠিত করিতে সচেষ্ট হয়েন।” ভৃগুনন্দী প্রভৃতির সময় সম্বন্ধে গ্রন্থকারের যে সকল কথা আমরা উপরে উদ্ধৃত করিলাম তাহার সকল গুলিই প্রতিবাদ যােগ্য। গ্রন্থকারের ভ্রমপ্রদর্শন করিবার পূর্বে একটা গল্প মনে পড়িল। “একজন হিন্দুস্থানীর পেটের উপর কয়েকটা প্লীহাদাগার চিহ্ন ছিল। কোন লড়াইর কথা উঠিলেই সে বলিত যে আমি ঐ লড়াই ফতে করিয়াছি। তাহার প্রমাণ স্বরূপ পেটে গুলি প্রবেশের চিহ্ন এখনও বৰ্তমান আছে। আমাদের গ্রন্থকারও কেবল নিজের বংশের কুর্শীনামাতেই সকল বিষয় উদ্ধার করিয়াছেন। যদিও তিনি বিদ্যাবিনােদ ঔপাধিক ব্যক্তি, তথাপি তিনি যে বিষয় মীমাংসা করিতে উপস্থিত হইয়াছেন তাহার অনুরূপ কাৰ্য অবশ্যই সম্পাদন করিবেন। সুপ্রসিদ্ধ ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্র অন্যান্য ঘটনার উল্লেখ ও নিজের বংশের কুশীনামার দ্বারায় আদি-শূরের সময় নির্ণয় করিয়াছেন। সুতরাং আমাদিগের গ্রন্থকার যে একমাত্র স্বীয় অসম্পূর্ণ তালি- কার বলে তেমন একটা কিছু করিতে উদ্যত হইবেন তাহা মূল চাকুর ও সমালােচনা। বিচিত্র নহে। আক্ষেপের বিষয় এই যে, কয়েকটা গুরুতর ভ্রমের জন্য প্রবীণ গ্রন্থকারের সহিত বাকযুদ্ধ করিতে হইতেছে। গ্রন্থকারের বংশাবলী সম্বন্ধে এইক্ষণ আলােচনা করা যাউক। আমার স্মরণ হয় যে, নানাধিক ৮ বর্ষ পূৰ্বে আমি কিছু দিন উধু- নিয়া ছিলাম। গ্রন্থকারও সেই সময় বাড়ীতে ছিলেন। শ্ৰীযুক্ত কৃষ্ণসুন্দর রায় মহাশয়ের নিকট, তাহাদের বংশাবলী চাহিবায় তিনি অনেক অনুসন্ধানের পর, আমাকে কীটদষ্ট কয়েক খানি পুরাতন কাগজ প্রদান করেন। ঐশ্রীকৃষ্ণ নামের পরেই ঐ কাগজের প্রথম খানিতে প্রথমেই লিখা ছিল “ভৃগুর বংশ মাধ- বের ধার।।” তাহার কিছু পরে লিখিত ছিল যে “আদি কাশী- শ্বর রায় তস্য পুত্র আনন্দচন্দ্র রায় ও লােকবিন্দ রায়। আনন্দ- চন্দ্র রায়ের পুত্র জগদানন্দ রায় তস্য পুত্র রূপরায় ও মাধব রায় তস্য পুত্র” ইত্যাদি। আমি,ঐ সকল কাগজে ঐরূপ ভাবে যাহা লিথিত ছিল, তাহাকে আধুনিক কুশীনামাকারে লিখিয়া লই। এবং আমার লিখিত সেই কাগজের একখণ্ড নকল গ্রন্থ- কার জানিতে পারিয়া আমার নিকট হইতে গ্রহণ করেন। অন্যূন ৭০। ৮১ বর্ষ পূৰ্বে ঐ তালিকাখানি লিখিত হওয়া সম্ভব। কারণ এইক্ষণ যে সকল ব্যক্তি জীবিত আছেন তাহাদিগের ৩৪ পৰ্য্যায় পূর্বের নাম উহাতে সন্নিবেশিত ছিল। ইহার দ্বারায় পাঠকগণ দেখিতে পাইবেন যে, কাশীশ্বর রায় যদি মাধবের পুত্র হইত তবে ঐ কাগজে নিশ্চয়ই উল্লেখ থাকিত। “মাধবের ধারা” লিখা আছে বলিয়া বিদ্যাবিনােদ মহাশয় যদি কাশীশ্বরকে তাহার পুত্র সাব্যস্থ করিয়া থাকেন, তবে তিনি নিতান্ত ভ্রান্ত। এইক্ষণ ঢাকুর গ্রন্থখানি কোন সময়ে রচিত হইয়াছে তাহার

৯০
মূল ঢাকুর ও সমালােচনা।
বিচার করা হউক। গ্রন্থকার বলেন যে “পারসী ও আরবী
ভাষাতে যাহারা সুদক্ষ ছিলেন উক্ত পুস্তকে তাঁহাদিগেরই প্রশং-
সাবাদ লিখিত আছে। এতদ্বারা বোধ হয় যে, এই পুস্তক
ইংরেজ অধিকারের কিয়ৎকাল পূৰ্বে বা তাহার প্রথমাবস্থাতে
লিখিত হইয়াছে।” পদ্য ঢাকুরে আমরা তাড়াশের জমিদার
বংশের পূর্ব পুরুষ বলরাম রায়ের নাম দেখিতে পাই। তাড়াশে
বলরামের কৃত অনেক কীৰ্ত্তি আছে। তাহার কৃত দোলমঞ্চের
গাত্রে এই শ্লোক আছে,
শ্রীকৃষ্ণায় নমঃ শাকেহপ্রবেদতর্কেন্দু মিতে প্রাসাদ
মুত্তমং শ্রীকৃষ্ণায় দদৌ শ্রীল বলরাম মহাত্মনে শকাব্দ ১৬৪০।
প্রাগুক্ত শ্লোকের দ্বারায় প্রতীয়মান হইতেছে যে, ১৬৪০ শকে
তিনি জীবিত ছিলেন। এইক্ষণ ১৮১১ শক। এতদুভয়ে
বিয়ােগ করিলে ১৭১ বৎসর লদ্ধ হয়। আমরা অন্যান্য প্রামা-
ণিক ঘটনায় অবগত হইয়াছি যে, এই সময় তাহার বয়স পঞ্চাশ
বৎসরের উর্দ্ধ ছিল। সুতরাং এই সময় বলরামের পুত্র ব্যতীত
পৌত্রের সময়ের আরম্ভ বলা যাইতে পারে। অতীত কাল
সম্বন্ধে এতাদৃশ অবিসম্বাদিত ও পুষ্ট প্রমাণ আর কিছুই নাই।
ঢাকুরে লিখিত আছে ;-
শুকদেব পুত্র বাসুদেব তালুকদার।
তাহার যশের কথা শুনহ বিস্তার ।
ধনবান কীৰ্ত্তিবন্ত বিষয় ব্যাপারে।
তাঁর পুত্র চাকরী কৈলা নবাব সরকারে।
সেই বংশে উদ্ভবিলা বলরাম রায়।
পিতামহ কাৰ্য কৈলা বারেন্দ্র আশ্রয় ॥
৭ ”

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা ৯১ * তাহার সন্তান সব বাড়িল সম্রমে। বায়ান্ন লক্ষের কর্তা পুরুষানুক্রমে। * এই স্থলে পাঠকগণ দেখিতে পাইবেন, বলরাম রায়ের পুত্র কি পৌত্রের সময় যদুনন্দন কাশীরামদাস কৃত আদি ঢাকুরী হইতে এই ঢাকুর সংগ্রহ করেন। কারণ, নতুবা “বায়ান্ন লক্ষের কর্তা পুরুষানুক্রমে’ কখনই লিখিত হইত না। এইরূপ হইলে নিশ্চয়ই দেড়শত বর্ষ পূৰ্ব্বে ঢাকুর যদুনন্দন কর্তৃক সংগৃহীত বা রচিত হয়। সেই সময় ভৃগুর বংশের চব্বিশ পৰ্য্যায় হইলে, নূন কল্পে এই দেড়শত বৎসরে অন্যূন ৫ পৰ্য্যায় হওয়া অসম্ভব নহে। এবং তাহা হইলে মােট ২৯ পৰ্য্যায় হয়। আমাদিগের সমাজ মধ্যে ভৃগুর বংশের বৃদ্ধি সমধিক। অন্যের ৪ পৰ্যায়ের সময়ে যে ভৃগুর ৬ পৰ্য্যায় হইয়াছে, তাহা আমরা ইদানিং যে সকল কুশীনামা লইয়াছি, তাহাতেই প্রমাণ করিবে। ইচ্ছা করিলে গ্রন্থকারও ইহা সহজেই হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিবেন। অপিচ আমরা নরদাসবংশীয় ব্যক্তিগণের মধ্যে কোন কোন শাখা বংশের ও চাকী বংশের এবং কাণর বংশের ১৭ ও ১৮ পর্যায়ের নান জানিতে পারিয়াছি, কিন্তু সেই সকলের পূর্বে বংশকা নদাস, মুরারী চাকী বা ভৃগুর নাম পাই নাই। সুতরাং গ্রন্থ- কার এই সকল সবিশেষ অনুসন্ধান না করিয়া, আপনার বংশের কয়েক পর্যায়ের উল্লেখ করিয়া, কিরূপে তিনি সিদ্ধান্ত করিলেন * নাটোরের রাজ সংসার “বায়ান্ন লক্ষের ঘর” বলিয়া পরিচিত। বল- রামের জেষ্ঠ রামরায় ও বলরামের পুত্র পৌত্রাদি এই ঘরের দেওয়ান ছিলেন। ।

৯২ মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। যে ভৃগু প্রভৃতি বল্লালের সমসাময়িক নহেন ? আমরা এবিষয়ে যে সকল প্রমাণের উল্লেখ করিলাম, তদালােচনা করিলে পাঠক- গণ বুঝিতে পারিবেন যে গ্রন্থকার কেমন সামান্যভাবে একটী গুরুতর মত পরিব্যক্ত করিয়াছেন। যদি পদ্য ঢাকুরের প্রতি তাহার আস্থা না থাকে, তবে তিনি উহার সার সংকলনে ব্রতী হইলেন কেন? ঢাকুর পুস্তকে লিখিত আছে যে, ভৃগুনন্দী ক্রমে বল্লালের অসদাচরণের প্রতিবাদ করায় এক সময় রাজা কর্তৃক বন্দী হয়েন। এবং এই সময় হইতেই তিনি বল্লালের বিরুদ্ধাচারী হইয়া, তাহার অধিকারশূন্য স্থানে বাস ও বল্লালের মত বিরুদ্ধে সমাজ- গঠন করিবার সংকল্পে নরদাস ও মুরারী চাকীকে একত্র করিয়া শিব-নাগের পুত্র জটাধর ও কর্কট-নাগের সমীপে গমন করেন। এবং তাহার সহিত পরামর্শ করতঃ তাহার সাহায্যে বারেন্দ্র কায়স্থ সমাজ গঠন করেন। আমাদিগের গ্রন্থকার এই স্থলে বলিতেছেন যে “এই সময় ইহাদিগের পরমাত্মীয় জটাধর এবং কর্কটনাগ নামক দুই ভ্রাতা শশলকুপা গ্রামে বাস করিতে ছিলেন। ইহার। ভৃগুনন্দী প্রভৃতির প্রধান সহায় হওয়াতে অবিলম্বে সমাজ সংগঠনকার্য সম্পন্ন হইয়া উঠিল। জটাধর ও কর্কট নাগ সামান্য ব্যক্তি ছিলেন না। ইহাদিগের পিতা শিব- নাগ যশােহর ও রাজশাহী জেলাতে বিস্তীর্ণ জমিদারী করিয়া- ছিলেন, তাহার মৃত্যুর পর দুই ভ্রাতা দুই স্থানে বাস করেন। জটাধর নাগ রাজশাহীর শরগ্রামে এবং কর্কট নাগ যশােহরের শেলকুপা গ্রামে বাস করিতেছিলেন।” গ্রন্থকার এই স্থলে অারব্য উপন্যাসের ন্যায় গল্প করিয়াছেন। কেননা, নাগ-

মূল ঢাকুর ও সমালোচনা।
দ্বয়ের, শৌলকুপায় বাস করা ও শিব নাগের যশােহর ও রাজশাহী
জেলাতে বিস্তীর্ণ জমীদারী থাকা, এই সকল কথা, কি সূত্রে,
কোন যুক্তিতে আসিল তাহার কিছুই উল্লেখ করেন নাই; আর
তখন ইংরেজের রাজত্ব এবং রাজশাহী ও যশােহর জেলাও হয়
নাই। ফল, পদ্য ঢাকুরে এই কথা লিখিত আছে যে ;-
এই স্থানে ছিল পূৰ্বে শিবনাগরায়।
তাহার সন্তান ছিল দুই মহাশয়।
শেলকুপ শরগ্রাম দুই ধামে স্থিতি।
ক্ষ
তিন জনে তিন বাসা দিলা নিরুপিয়া।
নন্দী গাঁতী চাকী গাঁতী দাস গাঁতী গ্রামে।
গ
তথা হইতে সমাজ করিলা যে যে স্থানে।
পরেতে লিখিব সব নাম নিদর্শনে।
পদ্য ঢাকুরের এই অংশ পাঠে প্রতীয়মান হইবে যে গ্রন্থকারের
পূর্বোক্ত অনুমানের কোন মূল নাই। জটাধর ও কর্কট, ভৃগু
নন্দী, নরদাস ও মুরারী চাকীকে বাসের জন্য নন্দী গাঁতী, দাস
গাঁতী ও চাকী গাঁতী, এই তিন স্থান প্রদান করেন। আমরা
অনুসন্ধান দ্বারায় অবগত হইয়াছি যে এই স্থানত্রয় বরেন্দ্র ভূমির
মধ্যগত।
আমাদিগের গ্রন্থকার শৌলকুপ ও নন্দীগ্রামকে বরেন্দ্রভূমির
অন্তর্গত নহে বলিয়া একটা গুরুতর ভ্রমের কারণ করিয়াছেন।
বরেন্দ্রভূমির ইতিহাস অনুসন্ধান করিতে যাইয়া, ঐ সকল স্থান
যে বরেন্দ্র ভূমির মধ্যগত তাহা আমরা বিলক্ষণরূপে অবগত

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। হইয়াছি। আমরা অনুমান করি যে, বল্লালসেনের উৎপীড়ন ভয়েই, সম্ভবতঃ ভৃগুনন্দী সৰ্ব্ব প্রথমে বরেন্দ্র ভূমির মধ্যগত নন্দীগ্রাম নামক স্থানে বাস করেন। এই সময় বরেন্দ্র ভূমিতে, পালবংশীয় রাজাদিগের রাজত্বের শেষাবস্থা। সুতরাং বল্লাল সেনের পূর্ণ অধিকার না থাকাই সম্ভব। কারণ মহীপাল ও কতিপয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভূমিগণ সেই সময় প্রতাপ সম্পন্ন ছিলেন। সুবিজ্ঞ ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্র ও কনিংহাম সাহেব বিশিষ্ট হেতু প্রদর্শন দ্বারা এই কথা সপ্রমাণ করিয়াছেন। * আমরা এই ক্ষণ গােত্র ও প্রবর সম্বন্ধে গ্রন্থের অপরাদ্ধ ভাগ আলােচনা করিব। বারেন্দ্রকায়স্থসমাজে যে কয়েকটা বংশ আছেন, তাহার মধ্যে নন্দীবংশের কাশ্যপ গােত্র ও কাশ্যপ, অত্সার ও নৈব এই তিন প্রবর। চাকীবংশের গৌতম গােত্র ও গৌতম, আঙ্গীরস, বাম্পত্য, অপসার ও নৈব এই Rajendra Lall Mitter', Inilo-Aryana, Vol. II, p 260. Juurnal of Asiatic Society. Vol. XLIV, P. 188. Archæolagical Survey of India. Vol. XP, p. 160. মহীপাল, ন্যায়পাল ও তৃতীয় বিগ্রহপালের রাজত্ব দশম খৃষ্টাব্দ হইতে একাদশ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত গণিত হয়। বল্লাল সেনের রাজত্ব ১০৬৬ খৃঃ অঃ ও লক্ষণ সেনের রাজত্ব ১১০৬ খৃঃ অঃ হইতে গণনা করা যায়। পালবংশীয় রাজন্যবর্গ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিলেন। তাহারা সেনবংশীয় নৃপতি বর্গের শত্ৰুদিগের প্রতি যে অনুগ্রহ প্রকাশ করিবেন, সেইরূপ অনুমান যুক্তিমূলক বটে। এবং তাহা হইলে বরেন্দ্র ভূমিতে বাস করিয়া ভৃগুনন্দীর সমাজ সংগঠন যে সহজ ব্যাপার ইহা প্রতীত হয়। বৌদ্ধ ও হিন্দু মত বিভিন্ন হইলেও বরেন্দ্র ভূমির বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী নৃপালগণ হিন্দু মতের প্রসারণ বিষয়ে কখনই অন্তরায় হয়েৰ নাই। মন্ত্রীত্ব ও সন্ধিবিগ্রহ প্রভৃতি গুরুতর রাজকার্যে ইহারা হিন্দু দিগকে নিয়ােগ করিতেন।

মূল ঢকুর ও সমালোচনা। ; পঞ্চ প্রবর। সিংহ বংশের বাৎস্য গােত্র ও নাগ বংশের সমান প্রবর। এই স্থলে বলিয়া রাখা কর্তব্য যে কোন কোন দেববংশ নন্দীবংশের সহিত সমান গােত্র। গ্রন্থকার বলেন যে “গােত্র শব্দে বাস্তবিক আদি পুরুষ বুঝায় এবং ব্রাহ্মণ ভিন্ন অন্য কোন জাতির গােত্র প্রবর্তক নাই; ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রাদির গােত্র পুরােহিত সম্পর্কেই ব্যবহৃত হইয়া থাকে।” আৰ্য্যধৰ্ম্মশাস্ত্রের এই বাক্য আমরাও অবনত মস্তকে স্বীকার করি। সমান গােত্রে ও সমান প্রবরে অর্থাৎ সমান বংশে বিবাহ করা আর্য্যধর্মশাস্ত্রের মত নহে। ইহার কারণ অনেকেই অনুমান করেন যে, একই বংশের স্ত্রী পুরুষদ্বারায় সন্তান উৎপন্ন হইলে, তাহারা হীনবল ও ক্ষীণমনা হইয়া থাকে। গ্রন্থকার ইহাতে আপত্তি করিয়া বলেন, “ইতিহাস পুরাণাদিতে দেখা যায়, বহুকাল যাবত ক্ষত্রিয়জাতি সবংশে বিবাহ করিয়া আসিয়া- ছেন অথচ তাহাদিগের মধ্যেই অধিকাংশই শােৰ্যবীৰ্যশালী বীরপুরুষ এবং সেরূপ বীরপুরুষ ব্রাহ্মণ জাতিতে নাই।” গ্রন্থ- কার শাস্ত্রবিদ ও পণ্ডিত। ইতিহাস ও পুরাণাদি বিলােড়ন করিলে তিনি পরিজ্ঞাত হইবেন, যে সময় ক্ষত্রিয়গণের মধ্যে সবংশ বিবাহ প্রথার পূর্ণ প্রসারণ হইয়াছিল, তখন তাহাদিগের বাস্তবিক গৌরবের সময় নহে। যদুবংশ প্রভৃতি মামাতু পিসাতু ভাই ভগিনীতে ও পাণ্ডবেরা এক পত্নীতে উপগত ছিলেন। ইহার কি কোনই মন্দ ফল তাহাদিগের বংশধরগণ লাভ করেন নাই ? বাস্তবিক ক্ষত্রিয়গণ এই সময় হইতেই ক্ষীণবীৰ্য্য, হীন- বল ও অল্পায়ু অপত্য উৎপাদন করিয়াছেন।

মূল ঢাকুর ও সমালোচনা। সবংশবিবাহ যে দুষণীয় তাহা উনবিংশ শতাব্দীর বিদ্যাভি- মানী জৰ্মাণজাতিগণ সম্প্রতি উপলব্ধি করিতে সমর্থ হইতে ছেন। জৰ্মাণ-রাজবংশীয় ব্যক্তিগণ যে হীনমনাদিহইয়া থাকেন তাহার কারণ, জৰ্মাণ শারীরতত্ত্ববিদেরাও সবংশ বিবাহকেই নির্দেশ করিয়াছেন। কিন্তু এই গুরুতর বিষয় সম্বন্ধে বহুকাল পূৰ্বে সৰ্ব্বলােকদর্শী ত্রিকালজ্ঞ আৰ্য শারীরতত্ত্ববিদ মহর্ষিগণ বলিয়াছেন- অতুল্য গােত্ৰাং বৃষ্যাঞ্চ প্রহৃষ্টাং নিরুপদ্রবাং। শুদ্ধতাং ব্ৰজেন্নারীমপত্যার্থী নিরাময়ঃ । চরক সংহিতা। অতুল্য গােত্রা, বৃষ্যা, প্রহৃষ্টা ও শুদ্ধ-স্নাতা নারীতে গমন করিবার ব্যবস্থা দিয়াছেন। অবশ্য ইহার কারণ এই যে, বৃষ্যা, প্রহৃষ্টাদি নহে, এরূপ নারীতে গমন করিলে পুরুষ দুৰ্বল ও সন্তান হীনবল ও ক্ষীণমস্তিষ্ক সম্পন্ন হইয়া থাকে। ইহা হইলে, তুল্য গােত্রাও যে ঐ ফল প্রসব করে, তাহা বরং অধিকতর যুক্তি সঙ্গত। অপিচ সবংশ বিবাহ করিবার নিয়মে ব্যভিচারাদি অন্যরূপ অনর্থও ঘটে, এজন্যও বিপ্রগণ উহা পরিবৰ্জন করিয়া- ছেন। যাহাই হউক, বিশাল আৰ্য্যধৰ্ম্ম-শাস্ত্র বাহাকে নিষিদ্ধ বলেন, তৎসম্বন্ধে ভম প্রতিপাদন করিতে অগ্রসর হওয়া আমা- দিগের পক্ষে ধৃষ্টতামাত্র। যাঁহারা পাশ্চাত্য জ্ঞানতরঙ্গে দোলায়- মান, তাঁহারা বুঝিতে পারিবেন যে, উনবিংশ শতাব্দীর আচার্য্য জাশ বা শৰ্ম্মণগণ’ কি বলিতেছেন। গ্রন্থকার বলেন যে সগােত্র বিবাহ ব্রাহ্মণের পক্ষেই সৰ্ব্বথা নিষিদ্ধ। কেননা, ব্রাহ্মণের গােত্র ও বংশ অভিন্ন ও এক।

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। কন্দ্রিয় বৈশ্যের সেরূপ নহে। সুতরাং ইহাদিগের সগােত্র বিবাহ নিষিদ্ধ নহে। রঘুনন্দন ভট্টাচাৰ্য মহাশয়, মনু ও শাতাতপ বচনে দ্বিজাতি শব্দের উল্লেখ দৃষ্টে, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য সম্বন্ধে উক্তরূপ বিবাহ নিষিদ্ধ বলিয়াছেন। ইহার মতে কেবল শূদ্রের সগােত্র বিবাহ দূষণীয় নহে। কিন্তু সপিণ্ড ও সমানােদক সম্বন্ধে দ্বিজাতি ও শূদ্রের কোন বিশেষ নাই। বঙ্গীয় স্মাৰ্তদিগের মতে, বঙ্গদেশে ব্রাহ্মণ ও শূদ্র ভিন্ন জাতি নাই । কায়স্থগণ ক্ষত্রিয় হইলেও পাতিত্য নিবন্ধন শূদ্রবৎ ব্যব- হৃত হইয়া আসিতেছেন। কিন্তু তাহা হইলেও, কায়স্থগণ আৰ্য্য বংশীয় নিবন্ধন, শূদ্রের ন্যায় সপিণ্ড ও সমানােদক বর্জন করিয়া সবংশ বিবাহ কোন দিনই করেন না এবং এইরূপ বিবাহ যে সৰ্ব্বথা দূষণীয় তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় এই যে, আমাদিগের গ্রন্থকার আ্যাভিমানী হইয়াও সবংশ বিবাহ সম্বন্ধে স্বীয় মত ব্যক্ত করিয়াছেন। এই মত পরিব্যক্ত করায়, তিনি কেবল স্বকীয় সমাজে নহেন, সমগ্র কায়স্থ সমাজেই নিন্দিত হইয়াছেন। বারেন্দ্র কায়স্থ সমাজে বহুকাল যাবৎ সবংশ বিবাহ প্রথা প্রচলিত নাই। বিগ্র জাতির অনুকরণে যে ইহরা ঐরূপ প্রথা পরিহার করেন, তাহাতে গ্রন্থকারের আস্থা নাই। তিনি বলেন ‘ব্রাহ্মণ জাতির অনুকরণ করিলে কেবল সগােত্র নহে সমান প্রবর বিবাহও দূষণীয় হয়। * * * চাকী ও নন্দীবংশের অ- সার ও নৈব প্রৰর সমান, বিশেষতঃ নাগ ও সিংহ বংশ ভিন্ন গােত্র হইলেও সমান প্রবর। * * * বারেন্দ্র কায়স্থগণ সগােত্র বিবাহ করিবেন না কিন্তু সমান প্রবর বিবাহ করিবেন, ইহা শাস্ত্র ১৮ মূল ঢকুর ও সমালােচনা। ও যুক্তি উভয়েরই অনুমােদিত নহে। পরন্তু কোন কোন দেব- বংশ কাশ্যপ গােত্র আছেন। ইহাদিগের সহিত নন্দীবংশের কন্যা পুত্রের আদান প্রদান করিতেছে। এস্থলে সগােত্র বিবাহ হইতেছে। শাস্ত্র ও যুক্তি অনুসারে এরূপ দুষণীয় নহে। অস- পিণ্ড ও অসমানােদক স্থলে উভয় নন্দীবংশেও বৈবাহিক ক্রিয়া দূষণীয় হয় না।” গ্রন্থকার এই স্থলে স্বীয় বিচক্ষণতা ও পাণ্ডিত্য মলীন করিয়াছেন, এজন্য দুঃখিত হইলাম। বিপ্র স্মাৰ্ত্ত ভট্টাচার্যের আসন অধিকার পূৰ্ব্বক গুরুতর ব্যবস্থা প্রদান করতঃ তিনি যে প্রগতা প্রদর্শন করিয়াছেন, তাহা লজ্জার বিষয় বটে। অনেকে কায়স্থগণকে বর্ণসঙ্কর রূপে প্রতিপাদন করেন। তাঁহাদিগের উক্ত রূপ সিদ্ধান্ত যে ভ্রান্তিমূলক ও বিদ্বেষজনক তাহা নিরপেক্ষ ভাবে পুরাণাদি শাস্ত্রের আলােচনা করিলেই প্রতীয়মান হয়। কায়স্থগণ বর্ণসঙ্কর হইলেও আৰ্যত্ব নিবন্ধন, এস্থলে সবংশ বিবাহ করিবার অধিকারী নহেন। আরও একটা কথা এই যে, বঙ্গদেশে ব্রাহ্মণ ও শূদ্র ভিন্ন জাতি প্রথমাবস্থায় না। থাকায়, শূদ্রবং শাসনাধীন জন্য যে কায়স্থগণ ক্ষত্রিয়ত্ব বা আৰ্যত্ব নষ্ট করিয়া সবংশ বিবাহ করিবেন, ইহাও কোনরূপে সঙ্গত সিদ্ধান্ত নহে। বারেন্দ্র কায়স্থ-সমাজ মধ্যে চাকী ও নন্দীবংশের সমান প্রবর অথবা কোন দেববংশের সহিত নন্দীবংশের সমান গােত্র কিম্বা নাগ ও সিংহবংশের সমান প্রবর থাকিলেও, ইহাদিগের বংশ কখনই এক নহে। এই সকল বংশকর্তার নাম স্বতন্ত্র এবং ব্যক্তিও স্বতন্ত্র ছিলেন। সুতরাং পূৰ্বরূপ সমান গােত্র বা সমান ১৯ মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। প্রবর, ইহাদিগের মধ্যে যে বৈবাহিক ক্রিয়া চলিয়া আসিতেছে, তাহা যে সমান বংশে হয়, একথা কখনই বলা যাইতে পারে না এবং এই জন্যই ঐরূপ ভাবে উক্ত সমাজে কন্যা পুত্রের আদান প্রদান বহুকাল হইতে চলিয়া আসিতেছে। উত্তরকালে, সমান গােত্রীয় কিন্তু বংশে পৃথক, অথচ এক ঔপাধিক কতিপয় ঘর ঐ সমাজে প্রবেশ লাভ করে। এমত স্থলে, ঐ সকল ঘর বংশে যে পৃথক, সামাজিকগণ ইহার বিশদ প্রমাণ না পাওয়া হেতু, সমান গােত্রীয় এক ঔপাধিক ব্যক্তিগণের মধ্যে বৈবাহিক সম্বন্ধ সংস্থাপন করেন না। এইরূপ ব্যবহারে সামাজিকগণের দুরদর্শীতা ও আৰ্যত্বাভিমানের সবিশেষ প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। সুতরাং আমাদিগের গ্রন্থকার, বারেন্দ্র কায়স্থ সমাজে সবংশ বিবাহ প্রথা আছে বলিয়া যে বাক্য উল্লেখ করিয়াছেন, তাহা নিতান্ত অশ্রদ্ধেয়। উক্ত সমাজে রূপরায় নামক এক ব্যক্তি সবংশ বিবাহ করিয়া হীন হইয়াছিলেন। পদ্য ঢাকুর রূপরায়ের অপকার্যের উল্লেখ করিয়া, তাহার অপর ভ্রাতাগণের আচরণ যে শ্রেষ্ঠ তাহা বর্ণন করিয়াছেন। ইহা ব্যতীত সামাজিক জনশ্রুতিও ঐ কথা সপ্রমাণ করে। পূৰ্ব্বকথিত ভাবে সগােত্র বিবাহ উক্ত সমাজে প্রচলিত থাকায়, ঢাকুরে লিখিত “সগােত্র বিবাহ’’দ্বারায় সবংশবিবাহই প্রমাণিত হইতেছে। ব্যক্তি বিশেষের কোন সামাজিক কুকীর্তি, যে কোন চেষ্টাতেও, কখনই বিদূরিত হয় । স্মৃতি তরঙ্গে যাহা উদ্বেলিত হয়, সমাজ মারুতে যাহা বহ- মান, তাহাকে বিনাশ করিবার আশা করা অসঙ্গত। আমরা এইক্ষণ নন্দীবংশ বা গ্রন্থকারের বংশ সম্বন্ধে আলাে- চনা করিব। গ্রন্থকার ভৃগুবংশীয় রূপায়ের বংশধর। তিনি ১০৩ মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। রূপয়ায় সম্বন্ধে পদ্য ঢাকুরে যাহা আছে, তাহাই যদি প্রকাশ করিতেন, তবে তৎবিষয়ে আমাদিগের বলিবার কিছুই থাকিত । কিন্তু তিনিই স্বকীয় পূর্ব পুরুষ রূপরায়ের হীনতা আরও প্রকাশ করিয়া দিয়াছেন। আত্মরক্ষা বা রূপরায়ের কৃত কুকাৰ্য সমর্থন করিবার পূৰ্ব্বে, তাহার বিবেচনা করা কর্তব্য ছিল যে, কোন সামাজিক কলঙ্ক ঐরূপ প্রক্ষালনে কখনই ধৌত হয় না বরং অধিকতর গাঢ় হইয়া থাকে। তিনি নিজ পক্ষ অনাহূত ভাবে সমর্থন করিতে যাইয়া, নিজ পক্ষকে তর্কের বিষয়ীভূত ও সমর্থনাধীন করিয়াছেন। ইহার দোষী অবশ্য তিনি। তিনি যখন অনাহূতভাবে অন্যায় সমর্থন করিয়াছেন, তখন অবশ্যই সমালােচক স্বরূপ আমাদিগকে তৎসম্বন্ধে আলােচনা করিতে হইতেছে। আমরা যে আলােচনা করিব, তাহা গ্রন্থকারের শ্রুতিকটু বা মর্ম ব্যথা জনক হইতে পারে, কিন্তু ইহার নিমিত্ত- ভাগী তিনি স্বয়ং। পদ্য ঢাকুরে রূপারায় সম্বন্ধে লিখিত আছে ;- স্বগােত্রে বিবাহ তিনি না বুঝিয়া কৈলা। পিতৃ রাগে গিয়া ভূতে গ্রামেতে রহিলা। এই শেষের ছত্র আর একখানি হস্তলিখিত ঢাকুরে আছে যেঃ- পিতৃকোপে ভুতে নামে অভিহিত হৈলা। কথাত এই। ইহার জন্য গ্রন্থকার বেদপুরাণ স্মৃতি কত কি আনিয়াছেন। অতিপূৰ্ব্বকালে ব্রাহ্মণেরা সগােত্রে ও ক্ষত্রিয়েরা মামাতু পিসাতু আদি ভাই ভগিনীকে বিবাহ করিত বলিয়া শিবের গীত তুলিয়াছেন। ফলে, তিলকে তাল প্রমাণ করিয়াছেন।

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। ১০১ উপরােক্ত কবিতার দ্বারায় প্রকাশ পায় যে, রূপরায় সগােত্রে বিবাহ করেন। আমরাও পুরুষানুক্রমে জানিয়া আসিতেছি যে, তিনি সগােত্র বিবাহ করেন। এবং তজ্জন্য সমাজে দূষণীয় হয়েন। ইহার সগােত্র বিবাহ যে দোষের হয় নাই, তাহা প্রতি- পাদন জন্য গােত্র ও প্রবরের অবতারণা করিয়া, শূদ্রের সগােত্র বিবাহ দূষণীয় নহে, তা উল্লেখ করিয়াছেন। পাঠকগণকে গ্রন্থকারের দুইটা কথা আমরা স্মরণ রাখিতে অনুরােধ করিতেছি। প্রথম, পুস্তকের প্রায় অর্ধাংশই তিনি কায়স্থজাতির ক্ষয়িত্ব প্রতিপাদন করিয়াছেন। দ্বিতীয়, তিনি সদাচার আৰ্যত্বের কারণ এবং উহা যে আর্যাবর্তের ব্রাহ্মণগণের নিকট শিক্ষনীয় তাহা প্রমাণ করিয়াছেন। সমান গােত্র ও প্রবরে বিবাহ স্বীকার করায় কেহ মনে করিবেন না যে, রায় মহাশয়ের কথাই সাব্যস্থ হইল। প্রত্যুত, তাহা নহে। কারণ, রূপারায়ের বিবাহ, যেমন সমান গােত্র ও সমান প্রবরে কন্যা পুত্রের আদান প্রদান উল্লেখ করা হইল, যদি সেই ভাবে সগােত্রে হইত, তাহা হইলে তৎসম্বন্ধে তাঁহার পিতা, ভ্রাতা বা প্রধান সামাজিকগণের বিরাগের কোন কারণ ছিল না। যেহেতু ঐরূপ বিবাহ সমাজে বহুকাল হইতে প্রচ- লিত ছিল। এবং এই জন্য ইহা দৃঢ়তার সহিত বলা যাইতে পারে যে, ঐ বিবাহ পূর্বোক্ত রূপ সগােত্রে না হইয়া সবংশেই হইয়াছিল। গ্রন্থকার ইহা প্রমাণের অসুবিধা জন্য কাশীশ্বর রায়ের পিতা মাধবকে সাব্যস্থ করেন। ইহার তাৎপৰ্য এই যে, তাহা হইলে রূপরায়ের উর্ধে ৪ পুরুষ হয় মাত্র। সুতরাং এই ৪ পর্যায়ের নাম সকলের স্মরণ থাকা ও বিবাহ সবংশে নাহওয়া ১৩২ মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। স্পষ্টতঃ সাধারণের বােধগম্য হইতে পারে। যাহা হউক, ঢাকু- বের লিখিত “সগােত্রের অর্থ “সবংশে” ইহাও নিশ্চিত। ইহার প্রমাণ সামাজিক জনশ্রুতি ও ব্যবহার। আরও একটা কথা এই যে, যে সময় এই ঘটনা হয়, তখন বরেন্দ্র ভূমিতে শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ পণ্ডিত বিস্তর ছিলেন। যদি এই বিবাহ সবংশে না হইয়া সগােত্রে হইত, তাহা হইলে, এ বিষয়ে কোনই বাকবিতণ্ডা হও- যার সম্ভাবনা বা সামাজিকগণের দ্বেষের কারণ ছিল না। কারণ জগদানন্দ রায় দ্বিতীয় দার গ্রহণ ও নৈতা বশতঃ পুত্ররূপরায়কে ত্যাগ করিতে পারেন কিন্তু সামাজিকগণ পরিত্যাগ করেন ইহার কোন গুরুতর কারণ নাই কি ? এস্থলের পুষ্ট প্রমাণ সামা- জিক জনশ্রুতি বা ব্যবহার ভিন্ন আর কি হইতে পারে ? বারিধি মহাশয়, সামাজিক জনশ্রুতি ও ব্যবহার সবিশেষ পরিজ্ঞাত থাকাই সম্ভব। এরূপ জনশ্রুতি আছে যে ঐ বিবাহের জন্য রূপরায়কে সকলেই বিশেষ হেয়জ্ঞান করিতেন। এবং এই কারণে তাহার নাম না করিয়া সকলে “ভূতে রায়” বা ভূতে পাওয়া রায় (এরূপ কাৰ্য্যকে তদানীন্তন সামাজিকগণ ভূতে পাওয়ার ফল বলিবেন ইহা আশ্চৰ্য্য নহে) বলিতেন এবং সাধা- রণে তঁাহার বাসস্থানকে “ভূতে” বা “ভূতিয়া” বলেন। গ্রন্থকার বলিয়াছেন, “ঢাকুরে লিখিত আছে যে, রূপরায় জানিয়া সগােত্রে, বিবাহ করেন, ইহা যদি সত্য হয় তবেও তাঁহার কোন দোষ নাই, কেননা ঢাকুর পুস্তকে লিখিত আছে যে,দৈবে যদি সিদ্ধ ঘরে এক ক্রটি হয়, তাহার সে দোষ কভু গ্রাহযােগ্য নয়।” গ্রন্থকার একটুকু অভিনিবেশ সহকারে দেখিলে বুঝিতে পারিতেন যে, ঢাকুরই রূপরায়কে মলীন

মূল ঢাকুর ও সমালোচনা।
করিয়াছে।
করিলাম ;
আমরা মূল ঢাকুর হইতে সেই অংশ উদ্ধৃত
* জগদানন্দ গুণে অনুপম ॥
তস্য পুত্র পঞ্চ তার শুনহ বিস্তার।
রমাকান্ত দেবীকান্ত গােপীকান্ত আর ।
সৰ্বানুজ ভবাণীকান্ত এক পক্ষে হয়।
পক্ষান্তরে সজোষ্ঠ হইল রূপরায়।
স্বগােত্রে বিবাহ তেঁহ না বুঝিয়া কৈলা।
পিতৃকোপে গিয়া ভূতে গ্রামেতে রহিলা।
রামকান্ত আদি আর ভাই চারিজন।
তা সবার বংশে সব শ্রেষ্ঠ আচরণ ॥
রামকান্ত আদি অপর চারি ভ্রাতার শ্রেষ্ঠ আচরণ লিখিত
আছে। ইহা পাঠে বিলক্ষণ প্রতীত হয় যে, রূপরায়ের আচরণ
শ্রেষ্ঠ ছিল না, এবং তিনি ও তদ্বংশীয়েরা ঢাকুর প্রণয়ন কালেও
সমাজে ঘৃণিত ছিলেন । এ কারণে তদ্বংশীয়েরা সমাজপ্রমুখ
ব্যক্তিগণের সহিত সমতা লাভ করিতে পারেন নাই।
আবার দেখুন, গ্রন্থকার কায়স্থজাতিকে ক্ষত্রিয় প্রতিপাদনের
জন্য সবিশেষ যত্ন করিয়াছেন। এবং সদাচারকেই আৰ্যত্বের
কারণ নির্দেশ করিয়াছেন। আর এই সদাচার যে ব্রাহ্মণগণের
নিকট শিক্ষনীয়তাহাও বলিয়াছেন। গ্রন্থকারের স্বীয় সমাজের
আচার ব্যবহার যে অত্যুৎকৃষ্ট, তাহা স্পর্ধা সহকারে প্রকাশ
করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, আমাদিগের সমাজের বিধবা
নারীর আচার ব্যবহার যতী ও ব্রহ্মচারীর ন্যায় পবিত্র। তিনিও
নিজে বােধ হয় বুঝেন যে, সবংশ বিবাহ অতি হেয় কথা ।

১০৪ মূল ঢকুর ও সমালােচনা। কিন্তু তাহা হইলে কি হইবে ? তিনি নিজের ওকালতী বা নিজ পক্ষ সমর্থন করিতে বসিয়াছেন। যেরূপেই হউক, তাহাকে নিজ পক্ষ সমর্থন করিতেই হইবে। যদিচ তিনি বিদ্যাবিনােদ ঔপাধিক ব্যক্তি, কিন্তু তাহা হইলে কি হয় ? ওকালতী ব্যতীত এরূপ সমর্থন আইসে না। আবার ইয়ােরােপীয়েরা এখন স্মৃতির (যদিচ দায়ভাগ মাত্র) ব্যবস্থাপক। কাযেই তিনি ব্যবস্থা দিতেছেন যে, সপিণ্ড ও সমানােক স্থল ব্যতীত একই বংশে বিবাহ দূষণীয় নহে। কেন? সপিণ্ড ও সমানােদক স্থলটা বাদ দিবার প্রয়ােজন কি ? জার্মণ বা স্কুন্দনেবিয়ান আৰ্যগণের ত ঐরূপ স্থলে আদান প্রদান চলে। ব্রাহ্মণের এহেন বিকুটে সদাচার দ্বারায় আৰ্যত্বের অনুগামী না থাকিয়া উহাদিগের সদা- চারযুক্ত আৰ্য্য হইলে ক্ষতি কি? স্মরণাতীত কাল হইতে আমাদিগের মধ্যে বিপ্রজাতির অণুকরণে সবংশে বিবাহ নাই। দুঃখের বিষয় গ্রন্থকার প্রত্নতত্ত্ব দ্বারায় পূর্বপুরুষের সুকীৰ্ত্তি গােপন করিবার জন্য কিছুমাত্র চিন্তা না করিয়া, স্মাৰ্ত্ত ভট্টা- চার্য্যের আসন অধিকার পূর্বক একটী গুরুতর ব্যবস্থা প্রদান করিলেন। তিনি নিজে এ ব্যবস্থার অনুগমন করিতে পারেন। কিন্তু সামাজিকগণ তাহাকে উচ্ছল স্বভাববিশিষ্ট ব্যতীত আর কি বলিবেন ? সুবিজ্ঞ সামাজিক পাঠক! আমি এ বিষয়ে অধিক বলিয়া আপনাদিগের সহিষ্ণুতা আক্লিষ্ট করিতে ইচ্ছুক নহি। আপনারা ক্ষণকাল চিন্তা করিলেই সবিশেষ উপলব্ধি করিতে সমর্থ হইবেন। বারেন্দ্র কায়স্থ সমাজ, কোন্ সময় সংস্থাপন হইয়াছে, তদ্বি- যয়ে কিছু আলােচনা করা এস্থলে সমীচিন বটে। আমাদিগের মূল ঢকুর ও সমালােচনা। ১০৫ গ্রন্থকারের সিদ্ধান্ত যে একমাত্র কাল্পনিক ও নিতান্ত অলীক ও অশ্রদ্ধেয় তাহা এ পর্যন্ত যাহা আলােচিত হইয়াছে, তদ্বারাই বিশদরূপে প্রতীত হইবেক। পদ্য ঢাকুরে লিখিত আছে (ইহা সামাজিক কিম্বদন্তীও বটে) যে একদা বল্লালসেন বিবিধ অসদাচরণে লিপ্ত হইয়া একজন নীচ কন্যাকে রাজধানীতে আনয়ন ও নীচ জাতিদিগকে আচরনীয় করেন। ভৃগুনন্দী ইহার প্রতিবাদ করিবায় বল্লাল তাঁহাকে বন্দী করেন। তিনি বল্লালের অধিকার শূন্য স্থানে যাইয়া নরদাস ও মুরারি চাকির সহিত পরামর্শ পূৰ্ব্বক বারেন্দ্র কায়স্থ সমাজ সংগঠন করেন। ঢাকুরের এই কথা যে সত্য তাহা উত্তর বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ দিগের সামাজিক কাহিনী দ্বারায় প্রমাণিত হয়। উত্তর বারেন্দ্রগণ বলেন যে একদা বল্লাল সেন নীচজাতীয় কোন কন্যা আনয়ন করায় লক্ষ্মণসেনের সহিত তৎ- পিতার বিরােধ ঘটে। লক্ষ্মণসেন পিতার বাসস্থান ত্যাগ করিয়া গৌড়ে বাস করেন। এই সময় বারেন্দ্র ব্রাহ্মণগণের মধ্যে দুইটা দল হয়। লক্ষ্মণ সেনের পক্ষাবলম্বীরা গােড়ের নিকট উত্তর বারেন্দ্রে বাস ও তদ্ধেতু উত্তর বারেন্দ্র আখ্যা প্রাপ্ত হয়। (১) (১) “তু ভাদুড়ী বল্লালসেনের সভায় উপস্থিত থাকিয়া কৌলীন্য মর্যাদা প্রাপ্ত হন, তুর পুত্র ভল্লুকাচাৰ্য্য তৎপুত্ৰ দিবাকর হইতে করঞ্জ গাঞির প্রথমােৎপত্তি হয়। উত্তর বারেন্দ্র কুলে সেই করঞ্জ গ্রামি ব্রাহ্মণ বিদ্যমান আছেন। দ্বিীয়তঃ সিহরী গ্রামি স্বর্ণরেখ বল্লাল সেনের সভাতে উপস্থিত ছিলেন। স্বর্ণরেখের পুত্র কিঙ্কিনীদেব তৎপুত্র চল দক্ষিণ বারেন্দ্র ও অচল উত্তর বারেন্দ্র আখ্যা প্রাপ্ত হয়েন। তৃতীয়তঃ চম্পটী গাঞি সম্বন্ধে উত্তর বারেন্দ্র কুস গ্রন্থে লিখিত আছে, ভট্টনারায়ণ বংশীয় অজ, প্রজ ও মনু; ইহাদের বংশ উত্তর বারেন্দ্র দেশে বতি ১০৬ মূল ঢকুর ও সমালোচনা। আমরা উত্তর বারেন্দ্র বাহ্মণ সমাজের যে সকল বৃত্তান্ত প্রকাশ করিলাম তাহা এবং ঢাকুরের লিখিত বাক্য ও কিম্বদন্তীর দ্বারায় করে। এবং তাহাদের সন্তানেরাই উত্তর বারেন্দ্রকুলে চম্পটী গ্রামিণ। বারেন্দ্র কুলাচাৰ্য্যগণ কর্তৃক রক্ষিত বংশাবলী দৃষ্টে জানা যায়, ভট্টনারায়ণ বংশীয় আদি মাধব চম্পট গ্রামীণ। এবং আদি মাধব বল্লাল সেনের সভাতে উপস্থিত ছিলেন। আদি মাধবের পুত্র অভিমন্যু তৎপুত্র বৎসাচাৰ্য তৎপুত্র অজ, প্রজ, মনু, মার্তণ্ড; অতএব সম্ভবতঃ বল্লালসেনের রাজত্বের একশত বৎসর পরে, বারেন্দ্র শ্রেণীর এক শাখার উত্তর বারেন্দ্র আখ্যা হইয়া থাকিবে।” গৌড়ে ব্রাহ্মণ। উত্তর বারেন্দ্র নামক প্রস্তাব। প্রাগুক্ত সিদ্ধান্তকে সমীচিন স্বরূপ গ্রহণ করা যাইতে পারে না। ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্র মহােদয় বিশিষ্ট প্রমাণের দ্বারা ইহা স্থির ভাবেই সিদ্ধান্ত করি- য়াছেন যে, বল্লালসেনের রাজত্ব আরম্ভ ১০৬৬ খৃঃ অব্দে ও তৎপুত্র লক্ষ্মণ সেনের রাজত্ব অরম্ভ ১১০৬ খৃষ্টাব্দ হইতে হইয়াছে। বল্লালসেন কোন সময় কৌলীন্য মৰ্যাদা সংস্থাপন করেন,তাহা জানিতে পার। যায় না। বল্লালের রাজত্ব কাল চল্লিশ বৎসর। এই দীর্ঘ রাজত্বের কোন ভাগে কৌলীন্য মৰ্য্যাদা সংস্থাপন হইয়াছে, ইহা বােধ হয় যুক্তি ও অনুমান দ্বারা স্থির করিয়া লওয়া যাইতে পারে। যৌবন ও প্রৌঢ়াবস্থাই শারীরিক ও মানসিক বল এবং কার্য করিবার প্রকৃত সময়। সুতরাং আমরা অবধারণ করিয়া লইতে পারি যে, বল্লালের রাজত্ব আরম্ভ হইবার দশ বৎসর পরে তিনি কৌলীন্য মৰ্যাদা সংস্থাপন করেন। এইরূপ অনুমানের পর আরাে একটা বিষয় বিবেচনা করা কর্তব্য হইতেছে। রাজসন্নিধানে প্রাচীন ও পণ্ডিত ব্যক্তিগণের যে আহ্বাহন হইত, ইহা বােধ হয় সকলেই স্বীকার করিবেন। তাহা হইলে, যে সকল প্রাচীন ব্যক্তি ও পণ্ডিতগণ কৌলীন্য মৰ্য্যাদা প্রদানকালে, রাজ সভায় উপস্থিত ছিলেন, তাহারা সকলে না হউন, অনেকেই যে সপুত্ৰ উপস্থিত বা তৎকালে পুত্রবান হইয়াছিলেন, তাহা তৎকালীয় দেশাচার দ্বারায় অনুমান করিয়া লওয়া যাইতে পারে। এবং এ অনুমান কিছুতেই পরিহার যােগ্য নহে।

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। ১০৭ প্রমাণ হইতেছে যে, বল্লালসেনের রাজত্ব কালেই বারেন্দ্র কায়স্থ- সমাজ সংগঠন হয়। এ সম্বন্ধে এতদপেক্ষা বিশিষ্ট প্রমাণ আর কিছুই প্রয়ােগ হইতে পারে না। (১) লক্ষ্মণ সেনের সহিত কোন সময়ে বল্লাল সেনের মনান্তর ঘটে, তাহার নিশ্চয়ত্মক কথা কিছুই লিপিবদ্ধ নাই। হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলমান রাজাদিগের ইতিহাস পর্যালােচনা করিলে, প্রতীয়মান হয় যে, পিতার বার্ধক্য ও পুত্রের যৌবন কালেই পিতা পুত্রে মনান্তর সংঘটন হইয়া থাকে। বল্লালসেনের বার্ধক্য কালে ও লক্ষ্মণ সেনের যৌবন কালের পরেই উভয়ের মধ্যে যে মনান্তর সংঘটন হয় নাই, তৎবিষয়ে কোন উল্লেখ না থাকায় আমরা অনুমান করিয়া লইতে পারি যে, বল্লাল সেনের রাজত্বের শেষাবস্থায় কৌলীন্যমৰ্যাদা সংস্থাপনের পর, লক্ষ্মণ সেনের সহিত তৎপিতার মনান্তর ঘটে, এবং এই সময়েই উত্তর বারেন্দ্র বিভাগ হয়। ক্রতু ভাদুড়ী ও স্বর্ণরেখ বল্লাল সভায় উপস্থিত ছিলেন। কৌলীন্য মৰ্যাদা কালে তাহারা প্রাচীন অনুমান করিলে, তাহাদিগের পুত্রের সময় শেষ হইয়া পৌত্রের সময় আরদ্ধ হয়। সুতরাং ইহাদিগের পৌত্রগণ করঞ্জ ও সিহরী গ্রামী বিধায় বল্লালের রাজত্বের একশত বৎসর পরে উত্তর বারেন্দ্র বিভাগের অনুমান যুক্তি সঙ্গত নহে। (১) বল্লাল ব্রাহ্মণগণ কর্তৃক ‘শঙ্করগৌড়েশ্বর” নামে অভিহিত হইয়াছেন। গৌড়ে ব্রাহ্মণ প্রণেতা শ্যামলবর্ম নামক নৃপতির একখানি তাম্রশাসনের প্রতি লিপি মুদ্রিত করিয়াছেন। কিন্তু মূল তাম্রশাসনখানি কেহ দেখিয়াছেন কি , জানা যায় নাই। শ্যামল বৰ্ম্মার গৃহহাপরি গৃ পতিত হওয়ায় তিনি এদে- শীয় ব্রাহ্মণগণ দ্বারায় শান্তি করাইয়া কোন ফল না পাইয়া বারানশীর পশ্চিম কর্ণাবতী সমাজের যশােধর নামক বেদজ্ঞ বিপকে আনয়ন এবং “বঙ্গ বিষয় পাঠে বিক্রমপুর ভূক্তান্তে” সামন্তসার নামক গ্রাম দান করেন। এই দান পত্রে শ্যামলবৰ্মা “মহারাজাধিরাজ বৃষভশঙ্কর গৌড়েশ্বর” বিশেষণে ভূষিত এবং “শাকে- খ শুন্য বিধৌশকাব্দে বৈশাখস্য সিতে দশস্যাং” অর্থাৎ ১০১ শকের বৈশাখ মাসে লিখিত। তাম্রশাসনের রচয়িতা সামন্ত চূড়ামণি। এই সময় হইতেই মূল 'ঢকুর ও সমালােচনা। গ্রন্থকার সদাচারকেই আৰ্যত্বের কারণ এবং সদাচার যে আর্যাবর্ভের ব্রাহ্মণের নিকট শিক্ষণীয়, ইহ উল্লেখ করা সত্ত্বেও যে বংশ-বিবাহ রূপ অসদাচরণের পােষক করিয়াছেন, তাহাতে আমরা দুঃখিত। গ্রন্থকার দাস বংশের বিবরণের টাকাতে, দাস শব্দের অর্থ করিতে যাইয়া স্বীয় তত্ত্বজ্ঞতার পরিচয় প্রদান করত, যে সিদ্ধান্ত করিয়াছেন, তজ্জন্য আমরা তাঁহার নিকট কৃতজ্ঞ হইলাম। ইহার দ্বারায় শাস্ত্রের মর্ম পরিস্ফুট ও সাধারণের ভ্ৰম অপসারিত হইবেক। গ্রন্থকার বলেন, সামাজিক কায়স্থগণ ক্ষত্রিয় হইলেও বঙ্গবাস নিবন্ধন শূদ্রবৎ দাসােপাধি প্রাপ্ত এবং ক্ষত্রিয়ের সংস্কার বৰ্জিত হইয়াছে। শূদ্রের দাসােপাধি নিমিত্ত জাতি মাত্রেই দাস্য পরায়ণ নহে। ঋগবেদের দাস শব্দের অর্থ শত্রু এবং দাস শব্দ কখনই শূদ্র পরিচায়ক নহে। পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণের মত এই যে, আৰ্য্যগণ অন্যত্র হইতে আসিয়া ভারতে উপনিবেশী হয়েন। কিন্তু বিশাল হিন্দুশাস্ত্রে একথার কোন বিন্দু বিসর্গ দৃষ্টিগােচর হয় না। আমাদিগেরও মত এই যে, আর্যজাতি অৰ্য্যাবর্তেই জাত এবং আৰ্যত্ব ঐ স্থানেই প্রসূত হইয়াছে। আৰ্যগণ অন্যত্র হইতে আসিয়া ভার- এদেশের বৈদিক ব্রাহ্মণের বসতি হয়। ইহার ও বল্লালের সময় প্রায় এক। উভয়েই শঙ্করগৌড়েশ্বর বিশেষণে ভূষিত। উভয়ের রাজত্বও একস্থানে হই- তেছে। সুতরাং ইহারা অভিন্নই প্রতীয়মান হয়েন। সে যাহা হউক, বল্লালের সময়ও এদেশে বৈদিক ব্রাহ্মণ ছিল এবং তাহাদিগের মধ্যে বল্লালী বিধানও নাই। “বায়ে কায়স্থ, বৈদ্য, বৈদিক ব্রাহ্মণ। বল্লাল মৰ্য্যাদা নাহি লৈল তিন জন।” এই কথা অসার নহে।

মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। তের উপনিবেশী হয়েন, এই অসার ও আজগবী মতের দ্বারা যাঁহাদিগের মস্তিষ্ক বিকৃত হইয়াছে, তাহারা সমালােচ্য গ্রন্থের এই স্থলটী পাঠ করিলে অবশ্যই শিক্ষালাভ করিয়া প্রকৃতিস্থ হই- বেন। কি পরিতাপের বিষয়। আমরা স্বকীয় শাস্ত্রের আলােচনা করিয়া, বৈদেশিকের অমৌলিক ও ভ্রান্ত মতের অনুসরণ করিতেছি। আমরাও গ্রন্থকারের সহিত বলিতেছি যে, বৈদিক জনগণই আৰ্য্য এবং ব্রহ্মাবৰ্ত্ত ও ব্রহ্মর্ষি দেশই যে আর্যজাতির আদি নিবাস স্থান, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই সমালােচ্য গ্রন্থের বিজ্ঞাপনে গ্রন্থকার আর একটী গুরুতর ও বিশেষ প্রয়ােজনীয় বিষয়ের অবতারণা করিয়াছেন। বিষয়টা এত গুরুতর যে, গ্রন্থকার উদার ভাবে সমগ্ৰ কায়স্থ জাতির সমীপেই সেই বিষয়টী উত্থাপন করিয়াছেন। বস্তুতঃ, আরও গভীর ভাবে বিবেচনা করিলে, এই ভীষণ আক্রমণ হইতে যাহাতে কায়স্থ জাতি নহে, সমগ্র হিন্দু জাতি অব্যাহতি লাভ করিতে সমর্থ হয়, তদ্রুপ প্রতিকারের চেষ্টা করা সকলেরই কর্তব্য বটে। গ্রন্থকার বলেন,—“বিশেষ বক্তব্য এই যে, ইদানীং কায়স্থ সমাজে এক ভীষণ রােগের প্রবেশাধিকার দেখা যাইতেছে। শীঘ্র যদি ইহার প্রতি বিধানের চেষ্টা করা না যায়, অতি অল্পদিন মধ্যে এই রােগের প্রবল আক্রমণে কায়স্থ সমাজের যারপর নাই দুর্দশা উপস্থিত হইবে। “ইদানীং মধ্যবিত্ত ও ধনহীন সামাজিকগণ, কন্যাদান- ব্যাপারে যেরূপ যন্ত্রণা ভােগ করিতেছেন, তাহা প্রায় সকলেরই বিদিত আছে। কিছু দিন পূৰ্ব্বে, কন্যাকৰ্ত্ত। যথাসাধ্য ৰা- ১০ ১১০ মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। লঙ্কার সহ সদৃশবরে কন্যাদান করিতেন, ইহাতে বরপক্ষ কোনই আপত্তি করিতেন না। আপত্তি করা নিন্দনীয় কাৰ্য মধ্যে পরিগণিত ছিল। সম্প্রতি উহার সম্পূর্ণ বিপরীত ব্যবহার দৃষ্ট হইতেছে। কন্যার পিতা কোন কোন স্থলে সৰ্বস্ব ব্যয় করিয়াও বরপক্ষকে সন্তুষ্ট করিতে পারেন না। আজকাল যিনি একাধিক কন্যার পিতা, তাহার বিপদের পরিসীমা নাই। কিরূপে প্রাণাধিক কাগুলিকে সৎপাত্রস্থ করিবেন এই চিন্তানলে তাঁহার শরীর মন ছারখার হইয়া যায়। অনেকের সুশীতল মস্তিষ্ক সন্তপ্ত হইয়া চিরকালের নিমিত্ত বিষম রােগগ্রস্থ হইয়া পড়ে। কন্যা দায়ে মহা বিপদগ্রস্ত কোন মহাত্মা বলিয়াছেন “হ্রস্ব-গৃহাঃ স্কুল-পটাঃ-বগােধূম-শালিনঃ। প্রলয়েহপিনসীদন্তি যদি কন্যা ন জায়তে”। তাৎপৰ্যার্থ এই যে, সামান্য গৃহ এবং সামান্য অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান থাকিলেই পরম সুখে থাকা যায় যদি কন্যা না জন্মে। সামান্য দুঃখে কবি, একথা বলেন নাই। পিতা মাতার নিকটে পুত্ৰও যাহা কন্যাও তাহাই। কেবল সমাজের নিদারুণ অত্যাচারে নিপীড়িত হইয়াই কবি, স্নেহময়ী কন্যার সম্বন্ধে পিতার অযােগ্য বাক্য প্রয়ােগ করিতে বাধ্য হইয়াছেন। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজপুত জাতি, নিদারুণ সামাজিক দুনীতি বশতঃ কন্যা সম্বন্ধে ইতি পূৰ্ব্বে যে, অমানুষিক ব্যবহার করিয়াছেন তদ্বিষয় স্মৃতি পথারূঢ় হইলেও শরীর কন্ট- কিত হন। ইতিহাস পাঠক 'ণের এ বিষয় বিলক্ষণ বিদিত আছে। আমাদিগের সামাজিকগণ কি কন্যাদান সম্বন্ধীয় কুরীতির প্রশ্রয় দিয়া সমাজকে ছারখার করিবেন ?” আমরাও গ্রন্থকারের সহিত একান্তঃকরণে বলিতেছি যে, মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। ১১১ আমাদিগের সামাজিকগণ কি কন্যা-দান সম্বন্ধীয় কুরীতির প্রশ্রয় দিয়া সমাজকে ছারখার করিবেন ? আমারও বিনীত ভাবে বারে কায়স্থ সমাজের সুবিজ্ঞ মহােদয়গণ সমীপে আরও নিবেদন করিতেছি যে, ১ম। পদ্য ঢাকুর পাঠে বিলক্ষণ প্রতীত হইবে যে, কন্যা মূল্য গ্রহণ করা এ সমাজের নিয়ম নহে। পূর্বতন সময়ে কেহই কন্যামূল্য গ্রহণ করিতেন না। সকলেই স্ব স্ব অবস্থানুরূপ বস্ত্রা- লঙ্কারাদি দ্বারায় সৎপাত্রে কন্যাদান করিতেন। এ প্রথা যে নিতান্ত পরিত্র তাহাতে অনুমাত্র সন্দেহ নাই। পূর্বতন সময়ে যাহারা নিতান্ত দরিদ্র ছিলেন--যাহারা স্বজন বন্ধুবান্ধব দিগের আশ্রয়ে থাকিয়া কোনরূপে জীবিকা নির্বাহ করিতেন, তাঁহারাও কন্যামূল্য গ্রহণ করা অতি পাপজনক কাৰ্য মনে করিতেন। এইক্ষণ সমাজস্থ কোন কোন ব্যক্তি কন্যামূল্য গ্রহণরূপ ঘৃণিত ও পাপজনক প্রবৃত্তির বশবর্তী হইতেছেন; এই ঘৃণিত ও পাপ- জনক প্রবৃত্তি যাহাতে দূরীভূত হয়, তদ্বিষয়ে সমাজের সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক। ২য়। পাত্ৰমূল্য (বরমূল্য বা পুত্ৰমূল্য নামেও কথিত হয়) গ্রহণ করিবার পদ্ধতি পূর্বে এ সমাজে অবশ্যই ছিল। সমাজে। সিদ্ধসাধ্য এই দুই ভাব থাকায়, সিদ্ধগণ যখন সাধ্যগণের সহিত পুত্রের সম্বন্ধ স্থাপন করিতেন, তখন মৰ্যাদা স্বরূপ সিদ্ধগণ অর্থ গ্রহণ করিতেন। কিন্তু সমতুল্য ঘরে আদান প্রদান করিলে ঐরূপ অর্থ গ্রহণ করিবার রীতি ছিল না। বশ মৰ্য্যা- দিতে আজি কালি কেহই ইচ্ছুক নহেন। এক রােগের উপশমের উপক্রমেই অপর রােগ দেখা দিয়াছে ! এখন সমান দার মূল্য ১১২ মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। অসমান, লঘু গুরু এ সকলের কোন ভেদাভেদ বা বিচার নাই। অর্থম্পৃহা বা উদরান্নের মূল্যস্বরূপ বরমূল্য গ্রহণ করার প্রথা হইয়া উঠিতেছে। এখন কন্যার পিতা ঘােতর নারকী; বরের পিতা স্বর্গের দেবতা ! আজি কালিকার দিনে অভাব বেশী হইয়াছে বলিয়া, তাহা পূরণ করিবার জন্য কি অন্য কোনরূপ সদুপায় নাই ? সামাজিকগণ এরূপ অসদুপায়ের বশবর্তী হইলে অভাব বিনাশের নিমিত্ত সদুপায়ের চেষ্টাই বা কোথা হইতে আসিবে ? অপিচ কন্যার প্রতি পিতা মাতার যে স্বাভাবিক স্নেহ মমতা জন্মিয়া থাকে, তাহাও যে ক্ৰমে অপসারিত হইবে ? কি নিদারুণ পরিতাপের বিষয় ! অর্থের মােহিনীশক্তি বলে- সামাজিকগণের অদূরদর্শিতার ফলে কন্যার প্রতি পিতা মাতা স্বাভাবিক স্নেহমমতাশূন্য নিষ্ঠুরহৃদয় হইতেছেন। সামাজিকগণ এই নূতন ধরণের বর মূল্য গ্রহণ করিবার প্রবৃত্তিকে সৎপথে পরিচালিত করেন, ইহা আমাদিগের একান্ত অনুরােধ। এ সকল বিষয় আলােচনার এস্থল নহে। তবে প্রসঙ্গাধীনে কিছু সীমা লঙ্ঘন করা হইয়া থাকিলেও সামাজিক পাঠকগণ অবশ্যই ক্ষমা করিবেন। আমরাও আশা করি যে, যে সকল প্রথা বা আচার ব্যবহার প্রকৃতপক্ষে সমাজের নিয়ম বিরুদ্ধ, তাহাদিগকে পরিবর্জন করিতে সকলেই যত্ন করিবেন। গ্রন্থে সামান্যরূপ আর যে সকল ভ্রম প্রমাদ বিদ্যমান আছে, সে সকল উল্লেখ নিষ্প্রয়ােজন। আমরা গ্রন্থকারের উপসংহার ভাগ সম্বন্ধে একটা কথা বলা আবশ্যক বােধ করিতেছি। গ্রন্থ- কার এই স্থলে উদার ও নিঃস্বার্থ অবলম্বন করিতে পারেন নাই। কেননা, কাকিনীয়া প্রভৃতি স্থানের বংশের ন্যায়, অন্যত্র যে মূল ঢাকুর ও সমালােচনা। • সকল বংশ আছেন, তাঁহাদিগকে পরিবৰ্জন করিয়াছেন তাহার কারণ আমরা অনুমান করিতে অসমর্থ। যদি তাহার অনভিজ্ঞতা বশতঃ এরূপ হইয়া থাকে, তবে তাহা স্বতন্ত্র কথা ! যাহা হউক, পয়দা প্রভৃতি স্থানের জমিদার বংশ ও অন্যান্য স্থলের মধ্যবিত্ত বংশ যাহারা পরবর্তী সময়ে সমাজে কোন না কোন রূপে গৃহীত হইয়াছেন, তাহাদিগের বিষয় উল্লেখ না করিয়া তিনি স্বকীয় অনুদারতা ও সামাজিকতত্ত্বের অনভিজ্ঞ তার পরিচয় দিয়াছেন। আমরা এইক্ষণ গ্রন্থকারের উপ- সংহার সহ সমালােচনারও উপসংহার করিলাম। সম্পূর্ণ।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Mul Dhakur O Samalochana

Author
Majumder,krishnacharan
Title
Mul Dhakur O Samalochana
File name
Mul Dhakur O Samalochana
Text
OCR done
Citation
1891
Published
2010/04/17
Publisher
Sanyal And Co.,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
126
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Chaki Bangsha
DLI number
510514
Barcode
4990010016288.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
JCkBqhQArPK
Download PDF

Mul Dhakur O Samalochana