Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Rakhi Ed.2nd

Ray,annadashankar · 2009/11/29

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

রাখী
অন্নদাশঙ্কর রায়
দ্বিতীয় সংস্করণ
এ
पम मि
मन्म
সরকার এণ্ড,
কলিকাতা

একাকি
শ্রীসুধীরচন্দ্র সরকার
১০ কলেজ স্কোয়ার, কলিকাতা
প্রিন্টার-বি, সি, শেঠ, বি, এ, •
সেখ এণ্ড কোং প্রিন্টিং হাউস,
৮২নং বলরাম কে ষ্ট্ৰীট, কলিকাতা

হিরন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়ের
দক্ষিণ-করে
অমিরা দুজন দুই কাননের পাখী
একটি রজনী একটি শাখার শাখী
তােমার আমার মিল নাই মিল নাই
তাই বাঁধিলাম রাখী।

No text on this page.

সূচী
৬
১। তুমি কি পারিলে রাখিতে ধরি
তােমাদের তরে মিলনের গান গাই
পথের সাথী, পথেই মােদের দেখা
৪ ।
নিত্য প্রাতে নয়ন পাতে
এ ধরণী কত সুন্দরী
এই ভরা যৌবনের ডালি
বার বার আমি পথ ভুলে
মনের মানুষ মনেই থাকে
হে লােভনে মাের লােভ নাই
কত সাধনায় এলে যদি হয়
সুখের দিনের গান গাই
১২। আকাশের চাঁদ আকাশে থাকে
কার চুম্বন কাহারে দিয়াছি
১৪। মুখখানি ভুলে গেছি
চোখে চোখে কথা নয় গাে
কেমনে কহিব হৃদয়ে বহিব:
প্রথম কালের প্রিয়াটিরে
১৮। চির সৌন্দর্যের মাঝে
আমার মনের মেঘ
তােমরা দাড়ায়ে ছিলে

২১। ছুটেছি পর্বত পৃষ্ঠে
২২। এ তাে মিথ্যা নয়
দ্য হরি লয় ধন
২৪। এবার এসেছি নর লােকে
আমি যখন চলি
এই সৃষ্টি অতুল সুন্দরী
ব্যথার ব্যথী গাে
বাজারে বাজায়ে যৌন জয় শাখ
ততাদের জগতে দিন আসে যায়
আমি স্রষ্টা, আমি বুঝি
যখন আমি সৃষ্টি করি
এ বিশ্ব যেমনি হােক
আমার লেগেছে ভালাে

এই কবিতাগুলির রচনাকাল ১৯২৭-২৯ ও রচনাস্থল
ইউনােপ। পরে এগুলি রবীন্দ্রনাথের সংকেত
অনুসারে স্থলে স্থলে পরিমার্জিত হয়।

No text on this page.

রাখী
তুমি কি পারিলে রাখিতে ধরি’
হে সহচরি!
দুটি বাহু ঘিরে তীরে আঁকড়ি
এ মাের তরী।
হায় রে অবােধ তটদেশিনী
সুনীল তমালতলীকেশিনী
তুমি কি পারিলে রাখিতে ধরি
এ মাের তরী
বেণীপাশে এরে বৃথা পাকড়ি
হে সহচরী।
'আঁখির মিনতি বাঁধিল না রে
ঘর-ছাড়া রে।
এ কাঠ হৃদয় কঁাদিল না রে
ছাড়িতে কারে।

রাখী
কূল ছেড়ে আজ চলে যে ভেসে
নাহি জানে কোথা থামিবে এসে
সারি পাথার কোন্ সে পারে
লভিতে কারে।
আঁখি জলে ভাসা সাজে কি রে
ঘর-ছাড়ারে।
আজ ভেসে চলি কালের স্রোতে
মহাজগতে।
ঘাটে ঘাটে বাঁধা ঘটনা হতে
অকূল পথে।
আজ আমি চলি দুলে দুলে রে
মহা আকাশের কূলে কূলে রে
প্রতি দিবসের শাসন হতে
অ-কাল পথে।
দেশ ছেড়ে চলি বিরাট রথে
মহাজগতে।
যতদূর মম নয়ন যায়
সীমা কোথায় !
এরি কোলে ভানু জাগে ঘুমায়
তারা হারায়।

आधी
ঢেউ ফুটে ওঠে ঢেউ ঝরে গাে
ফেণায় ফেণয় থরে থরে গাে
বসন্ত নিতি তুলি বুলায়
দিক্‌-সিথায়।
সমীরণ নিতি বাঁশি বাজায়
“রাধা কোথায়।
পুন কোন্ বনে পড়িব বাঁধা
নূতনা রাধা !
পুন কোন্ বনে বাঁশরি-সাধা
আবার কাদা ।
পথের কোথাও শেষ কি আছে
পথিকের কোনাে দেশ কি আছে
ঘরের বাঁধনে নাই কি বাঁধা
নাই কি কাদা ।
সমাপিবে চির বাঁশরি-সাধা
সুচিরা রাধা।

রাখী
তােমাদের তরে মিলনের গান গাই
ওগাে জগতের তরুণ তরুণী যত!
তােমাদের সুখে সুখ মিলাবারে চাই
ওগাে জগতের তরুণ তরুণী যত ।
প্রিয়বাহুলীনা অয়ি তনু তনু-লতা
কানে কানে মৃদু সােহাগকূজনরতা
তােমারে নেহারি কী যে আনন্দ পাই
ওগাে নব বধূ কেমন বােঝাবাে কত
তােমাদের সুখে সুখ মলাবারে চাই
ওগাে জগতের তরুণ তরুণী যত।
তােমাদের বুকে চির মন্দার ফোটে
ওগগা জগতের তরুণ তরুণী যত !
শরৎ শেফালী ঝরে হাসি-ঝরা ঠোটে
ওগাে জগতের তরুণ তরুণী যত।
আঁখিতে আঁখিতে চপলা পড়েছে ধরা
চরণ-ধূলায় মরণে মিলায় জরা
কর-কঙ্কণে বীণা ঝঙ্কারি’ ওঠে
বক্ষবক বসন্ত-অবনত ;
মলয়-গন্ধি সুরা তােমাদের ঠোটে
ওগাে জগতের তরুণ তরুণী যত।
।
৪

তােমাদের কেহ লক্ষ্মী লভিলে রণে
ওগাে জগতের তরুণ তরুণী যত ।
তােমাদের কেহ দু’মুঠা ভরিলে ধনে
ওগাে জগতের তরুণ তরুণী যত।
তােমাদের কেহ বাণীরে মানায়ে বশ
শ্বেত চন্দনে ললাটে আঁকিলে যশ
তােমাদের কেহ ঘরে ডাকি জনে জনে
আপনা বিলায়ে দিলে দধীচির মতাে
কোনাে তথাগত একাকী চলিলে বনে
ওগগা জগতের তরুণ তরুণী যত।
তােমরা ধন্য তােমরা সফল ভাই
ওগাে জগতের তরুণ তরুণী যত।
সবার গর্বে সকলের জয় গাই
ওগাে জগতের তরুণ তরুণী যত!
পারিনি আপনি কুঁড়িটিরে ফুটাইতে
পরাভব শােক নিশ্বসে মাের চিতে
হে বন্ধু মম কিছু নাই কিছু নাই
হে বন্ধু আমি ব্যর্থতা লাজে নত।
তােমাদের সুখে সুখী হয়ে উঠি তাই
ওগাে জগতের তরুণ তরুণী যত।

রাখী
পথের সাথী, পথেই মােদের দেখা
পথের বাঁকে মােদের ছাড়াছাড়ি।
বিদায় দেহ চলি এবার একা
অকূল পথে একেলা দিই পাড়ি।
পথের সাথী ক্ষম আমায় ক্ষম
চোখের কোণে জল জমেনি মম
অলস বাহু অধীর রাহ সম
ব্যাকুল নহে রাখতে তােমায় কাড়ি
পথের সাথী, আমি কী নির্মম
পথের বাঁকে হেলায় চলি ছাড়ি।
পথের সাথী, চুকিয়ে দেছি কাদা
ফুরিয়ে আমার গেছে সকল চাওয়া।
হৃদয় আমার পড়বে কিসে বঁধা ?
হৃদয় যে মাের হাল্কা উদাস হাওয়া
পথের সাথী, এই হাওয়া সে কবে
পড়ল লুটে বাঁশির ভীরু রবে
কোন্ বধিরায় ডাকল “হে বল্লভে”,
গেল তার তিলেক সাড়া পাওয়া।
পরম চাওয়া চাইতে গেলেম যবে
চক্ষে আমার মিলিয়ে গেল চাওয়া।

রাখী
পথের সাথী, কুসুম না ফুটিতে
আমার শাখে মুকুল গেল ঝরে।
আর বিনে কখন অলক্ষিতে
আবার মুকুল ধরে কি না ধরে।
পথের সাথী, চলতে কি মাের সাধ !
পদে পদে নাই কি অবসাদ।
বাহির জুড়ে পাতা ঘরের ফঁাদ
তবু আমার পা পড়ে না ঘরে।
পা’য় লেগেছে ব্যর্থ চলার স্বাদ
সেই সুখে মাের বুক রয়েছে ভরে।
পথের সাথী, বিদায় দেহ তবে
ক্ষমাে তােমায় ভুলতে যদি পারি।
তােমার স্মৃতি স্বপ্ন যখন হবে
স্বপ্নে হয় তাে ঝবে আঁখিবারি।
পথের সাথী, ভুলব তােমায় বলে
হৃদয় মম কেমন যেন দোলে
হায় রে যে জন যাবেই যাবে চলে
বুকের বােঝ কেনই করে ভারি।
পথের সাথী, মর্মে তবু জ্বলে
তােমার শিখা-তােমারে শিখানারি ।

রাখী
3
নিত্য প্রাতে নয়ন পাতে লাগে নতুন আলাে
নিত্য আমি নতুন বাসি ভালাে
ওগাে আমার আজকে প্রাতের নতুন দেখা ফুল
এই জনমের শতেক ভুলের শতেকতম ভুল
তােমায় ভালােবাসি আমি সত্য ভালােবাসা
একটি দিনের একটু কঁদা-হাসা।
ওগাে আমার নতুন দিনের নতুন মনােরমা
কেমনে বলি তুমিই প্রিয়তমা।
এই কাননের লক্ষকোটীর সকল ক’টি ফুল
আমার দুটি মুগ্ধ চোখে প্রত্যেকে অতুল
সবায় ভালােবাসি আমি সত্য ভালােবাসা
ভাগ করে নিই সবার কাদা-হাসা। ।
প্রিয়ে তােমায় বৃন্ত হতে ছিন্ন করে পাওয়া
এমনতরাে নয়তাে আমার চাওয়া
আমার চাওয়া নয়ন মেলে সূৰ্য্য যেমন চায়
রাঙিয়ে দিয়ে পাকিয়ে দিয়ে রিক্ত ফিরে যায়
তেমনি গলােবাসি আমি সত্য ভালােবাসা
কাহারাে তরে নাই নিরাশা আশা।

ब्रांची
নিত্য রাতে নয়ন পাতে মিলিয়ে আসে আলাে
চিরনে তখন বাসি ভালাে।
সে আসে মাের তা ছেয়ে স্বপ্নদেশিনী
সেই কি দিনে এসেছিল ছদ্মবেশিনী ?
তারি পা’য় সপি আমার সত্য ভালােবাসা
নিত্য নব সব দুরাশা আশা।

রাখী
এ ধরণী কত সুন্দরী কত সুন্দরী
মানুষ সেও কী সুন্দর সে কী সুন্দর!
রূপসুধা পিই প্রাণ ভরি দু'নয়ান ভরি’
আনন্দরসে উথলায় মম অন্তর।
দেশে দেশে সেই শ্যামল কোমল ঘাসগুলি
লতাদের কোলে ফুলেদের কচি হাসগুলি
পাখী উড়ে যায় তরুদের বাহুপাশ খুলি’
ছায়ায় শিহরে তটিনীর তট-প্রান্তর।
সেই যে ধরণী সুন্দরী সেই সুন্দরী
পরদেশে এত সুন্দর এত সুন্দর!
মানুষ সে যে কী সুন্দর সে কী সুন্দর
ভালােবাসা তার ভালাে আহা কত ভালাে ।
মমতার রঙে রাঙা যে তাহার অন্তর
বাহির হার যত হােক সাদা কালাে।
দেশে দেশে নারী তেমনি দোলায় চিত্ত
শিশুদের সনে চরণে জাগিছে নৃত্য
জীবন ছাপায়ে মাধুরী ঝরিছে নিত্য
প্রেমের আগুন মর্ত করেছে আলাে।
মানুষ সে যে কী সুন্দর সে কী সুন্দর
ভালােবাসা তার ভালল আহা কত ভালাে।
০

রাফী
এ জীবন কী যে নন্দিত কী যে নন্দিত
বেঁচে আছি বলে ধন্য রে আমি ধন্য।
মানুষ আমারে ভালােবেসে দেয় সু-অমৃত
ধরণী আমায় ভালােবেসে দেয় অন্ন।
দেশে দেশে মাের তেমনি মধুর বন্ধন
আরেকের তরে একেরে ছাড়িতে ক্রন
যে যাই সেথা পাই প্রতি অভিনন্দন
মরণেও বুঝি এ ছাড়া হবে না অন্য।
এ জীবন কত নন্দিত কত নন্দিত
জন্মেছি বলে ধন্য রে আমি ধন্য।
১১

রাখী
এই ভরা যৌবনের ডালি
তােমার পায়ে রাখার আগে
হঠাৎ যদি মরণ এসে
একটি মুঠি ভিক্ষা মাগে
একটি মুঠি আয়ু আমার
পাত্রে তাহার দিব ঢালি’
তােমার তরে রইবে ভােলা
এই ভরা যৌবনের ডালি।
এই ভরা যৌবনের ডালি
মরণে এর ক্ষয় কতটুকু?
এক জনমের তেইশটি ফুল
নাই থাকে তাে নাই বা থাকুক
দিনে দিনে যা ভরেছি
একটি দিনে হবে খালি ?
কোন্ জন্মান্তরের ফুলে
ভরা এ যৌবনের ডালি ।
দিনে দিনে যা পেয়েছি।
যা ছিল মাের পাবার আশা
যা পেয়ে মাের মিটল না সাধ
শতেকারের ভালােবাসা-
১২

হঠাৎ যদি আজকে মরি
দেখবে সবই রেখে গেছি
কালের কোলে গেছি রেখে
যা পেয়েছি যা মেগেছি।
দিনে দিনে যা পেয়েছি
হােক না নিমেষেকের পাওয়া
যা ছিল মাের পাবার আশা
হােক না যুগান্তরের চাওয়া
মরার সাথে মরার তাে নয়
যা সয়েছি যা হয়েছি
আয়ুর সাথে যাবার তত নয়
যা চেয়েছি যা লয়েছি।
আমার ধনের নাই তুলনা
চক্ষে আমার স্বপ্ন-মণি
যা হেরি তা স্বপ্ন হেরি
কালাের কোলে আলাের খনি
কুৎসিতে পাই রূপের দিশা
হাটের ধূলায় কুড়াই সােনা
দিনের আলােয় স্বপ্ন হেরি
আমার ধনের নাই তুলল।

बाबी
নামটা আমার বাঁচবে না রে
মমূবে পুড়ে আয়ুর চিতায়
এই ভরা যৌবনের ধনের
ক্ষতি কি তায় ক্ষতি কি তায় !
আনন্দ মাের দুঃখে সুখে
এমনি রবে মৃত্যু-পারে
আমি তত ভাই রইব বেঁচে
নামটা আমার বাঁচবে না রে।
নামটা আমার বাঁচবে না রে
তােমার কানে পড়বে না সে
তােমার আসার আগেই যদি
আজকে হঠাৎ মরণ আসে।
তােমার পায়ে রাখার যা নয়
ভুলেই ধন্য কোবরা তারে
তােমার তরে বাঁচবাে আমি
নামটা আমার বাঁচবে না রে।
১৪

রাধী
বার বার আমি পথ ভুলে ভূলে
পথ খুজে মরি কত!
শূন্য-চারীর মত ।
অমা-আঁধারের গােলােকধাঁধায়
তারা খুজে মাের বেলা বহে যায়
প্রতি তারা যে গাে নয়ন ভুলায়
ধ্রুবতারা পাবাে কবে?
অন্য তারায় কী আমার বলা হবে !
দেয়ালি-রাতের এলােথেলাে চুলে
কর বুলাইব কত!
অন্ধ স্বামীর মতাে।
ঋতু-যুবতীর খোঁপাভরা ফুলে
ফুল খুজে মরি কত!
মুগ্ধ অলির মতাে।
কোন্ ফুল ছেড়ে কোন্ ফুলে বসি
ভেবে ভেবে গেল সারাটি দিবসই
প্রতি ফুল যে গাে অতুলা রূপসী
নিজ ফুল পাবাে কবে
অশ্য ফুলেতে কী আমার বলাে হবে !
চির ফানে পথতরু মূলে
বাসর যাপিব কত।
গৃহবিরহীর মতাে।

রাখী
রূপ-সায়রের উপকূলে কূলে
মুড়ি কুড়াইব কত!
বিমনা ক্ষ্যাপার মত।
কত না পরশ পলে পলে পাই
নয় নয় বলে ঠেলে চলে যাই
পরম পরশ কবে পাব ভাই
সাঁচা মণি পাবাে কবে
অন্য মাণিকে কী আমার বলাে হবে!
মাটীর ঘােমটা পদে পদে খুলে
আগুন খুজিব কত !
রূপখেয়ালীর মতাে।
ফুল্ল ধরার কাটা তুলে তুলে
আঙুল রাঙাব কত !
আত্মঘাতীর মতো।
আমার ধরণী শ্যামা অঙ্গরা
নাচে শিরে ধরি’ শােভার পসরা
কোথা রে মৃত্যু কোথা তার জরা
এ দেখা দেখিব কবে?
অন্য দেখায় কী আমার বলাে হবে !
নৃত্যের বেদী শতবার ধুলে
ধূলা লুকাইবে কত !
আয়ু শুধু হবে গত ।

বার বার আমি পথ ভুলে ভুলে
পথ খুঁজে মরি কত!
স্বপ্নচারীর মতাে।
সুন্দর এই স্বপনের মাঝে
সত্যের বাঁশি কত সুরে বাজে
কোন্ সুর ধরে যাব বুঝি না যে
নিজ সুর পাবাে কবে ?
অন্য সুরেতে কী আমার বলল হবে !
প্রভাতের আলাে আঁখিপুট ছুলে
স্বপ্ন ঢাকিব কত!
মিথ্যাচারীর মতাে।
১৭

রাখী
মনের মানুষ মনেই থাকে
মিথ্যে তারে বাইরে খুজি
শেষ করে দিই আয়ুর পুজি।
চোখের পাতায় যত্নে ঢাকি
রাত্রে যারে গােপন রাখি
মধ্যদিনে পাতার ফাকে
মিথ্যে তারে বাইরে খুজি
শেষ করে দিই আয়ুর পুজি।
মনের মানুষ মনেই থাকে
স্বপ্ন দেখি চক্ষু বুজি।
আমার আপন সৃষ্টি সে জন
মনের মানুষ আমার একা
বাইরে কি তার মেলে দেখা!
আমার মনের স্তরসে
তনু যে তার গড়ছি বসে
মায়ের কোলে শিশুর মতন
মনের মানুষ আমার একা
বাইরে কি তার মেলে দেখা।
আমার আপন সৃষ্টি সে জন
গায়ে যে তার আমি লেখা।
১৮

রাখী
আমায় আমি বাইরে খুজি
বাহিরকে হায় দেখ না রে
দূরে দূরেই রাখঃ তারে।
বিচিত্র তার চোখের চাওয়া
কেশের গন্ধ শাড়ীর হাওয়া
বিচিত্র তার পরশ বুঝি
বাহিরকে হায় দেখনু না রে
দূরে দূরেই রানু তারে।
আমায় আমি বাইরে খুজি
নাই চিনিলাম বিচিত্রারে।
2
বাহিরকে ভাই লবাে যেচে
নাই হলাে বা মনের মতাে
হায় রে মনােহর সে কত!
এবার আমি রইনু আশে
আপন মানুষ কখন আসে
মন যে এত মরূছে বেছে
মন কি আমার মনের মত ?
হায় রে মনােহর সে কত।
বাহিরকে তাই বাে যেচে
রইব না রে আত্মরত।
১৯

রাফী
হে লােভনে মাের লােভ নাই
নাহি যদি পাই ক্ষোভ নাই।
তুমি সুন্দরী তুমি সুধা
নয়নে আমার রূপ ক্ষুধা
চোখে চাই আমি বুকে চাই
সুখে চাই আর দুখে চাই।
তবু রাখি নাকো মিছে আশা
বচনে কিনা মনােভাষা
কারাে তরে কোনাে লােভ নাই
হারাই যদি তাে ক্ষোভ নাই।
তুমি পথে আর আমি পথে
চকিতের মতাে থামি পথে
চোখে ভরে লই যাহা পারি
কী যে রহস্য তুমি নারি!
কণা পরিমাণ কোনাে মতে
খুটে খুটে লই দূর হতে।
সাথে সাথে চলা হাতে ধরা
নাহি যদি হয় নাহি ত্বরা।
বাঁকে বাঁকে ভরা বাঁকা পথে
কেন কারে ধরে রাখা পথে।
।

রাখী
হে শােভনে আমি সাধিব না
নাহি যদি পাই দিব না।
তুমি চঞ্চলা তুমি পাখী
সাধ যায় বুকে বেঁধে রাখি
বাঁধিবার তরে কী বেদনা
সকল অর্ঘ্য নিবেদনা।
তবু রাখিব না মিছে আশা
পাখীরে বাঁধিতে নারে বাসা।
বাঁধিবার তরে সাধিব না
বাঁধা নাহি পড়ে কঁদিব না।
উড়িতে উড়িতে পাশাপাশি
নিমেষের ভালােবাসাবাসি।
বুকে ভরি’ লং যাহা পারি
কী অমৃতময়ী তুমি, নারি!
পলক চাহনি তিল হাসি
বুকে বাজাইল সুখ বাঁশী ।
এর বেশী পাওয়া অতি পাওয়া
নাহি যদি পাই নাহি ধাওয়া।
আকাশে আকাশে পাশাপাশি
এই ঢের ভালােবাসাবাসি।
২১

রাখী
১০
কত সাধনায় এলে যদি হায়
কেন এলে কেন এলে।
আমার সে মন
গেছে বহুখন
আমার এ মন ফেলে।
সে আমি কি আর সেই আমি আছি
যৌবন মুখে ভেসে চলিয়াছি
যে ঘাটে তােমায় ডেকেছিনু হায়
সে ঘাট রহিল পিছে।
আজি এত দূরে
আসি’ বন্ধু রে
কত অাসা হােলল মিছে।
কেন জানিলে না
রজনীর চেনা
রজনী পােহালে বাসি।
ক্ষণিক জীবন
প্রেম কতখন
বিফলে বাজাবে বাঁশী!
উতলা চরণ থির নাহি রহে
অভিসারিকার সুচির বিরহে
আপনি কখন ফিরে চলে মন
কুঞ্জ-বীথিকা হতে।
নিরাশার ব্যথা
স্বপনের কথা
তলায় দিনের স্রোতে।
২২

রাখী
নূতন রাতের
সারাদিন ভর
কোথা অবসর
অতীতের কথা ভাবি।
সাথে আসে ফের
নূতন রাতের দাবী।
ভাঙা বাঁশী তুলি লয়ে আর বার
করি প্রাণপণ ; হয়ত আবার
তেমনি নিরাশা
আঁখি নিনাশা
চুর করে দেয় হাসি।
ক্ষণিক জীবন
প্রেম কতখন
বিফলে বাজাবে বাঁশী ।
কেন করিলে না
প্রণয়ের দেনা
হাতে হাতে পরিশােধ।
কেন খেলা ছলে
করিলে সবলে
হৃদয় দুয়ার রােধ।
আঘাত আবরি’ যে জন সরিল
আঘাত পাসরি’ যে জন মরিল
ডাকো ডাকো ডাকো সাড়া পাবে নাকো
আমি তাে সে জন নই
আমার মাঝে কে
কবে গেল থেকে
ঠিকানা তাহার কই ?

রাখী
আজি অকারণে
জাগাও স্মরণে
কবেকার কত স্মৃতি।
স্মৃতি এলে ফিরে ফেরে কি সখি রে
হারানাে দিনের প্রতি।
প্রথম দেখার সে যে বিস্ময়
একই রূপ দেখা ত্রিভুবনময়
মৃগ সম সুখে
সে যে প্রেম বয়ে ফেরা।
এত দিন বাদ
হলাে তব সাধ
তারি অভিনয় হেরা।
মৃগনাভি বুকে
যুবার জীবন
ফোটাব কেমনে
কিশােরের কোকনদ!
কোকনদ পরে পড়িবে কী করে
কিশােরী-তুমি’র পদ?
বধিরা দেবীর প্রসাদ প্রারথী
পূজারী নিয়ে গিয়াছে আরতি
সেদিনের ডাকে সাড়া দিলে যা’কে
আমি সে পূজারী নই।
যে পূজা থেমেছে আজি তার মিছে
হবাে নাকো অভিনয়ী।
২৪

রাখী
কত দাও খোঁচা বলি” “গেছে বােঝ
তােমার প্রেমের রীতি
যত না চপল
ততধিক খল
তােমার মুখের প্রীতি।
আজীবন নাহি রয় যে অপেখি
আপনা-পসরা সাচা প্রেম সে কি ?
সে কি সুগভীর ? সে কি অনধীর ?
সে কি প্রেম ? সে কি সােনা ?
গেছে গেছে বােঝ তােমার সে খোঁজা
নিছক শিকারীপনা।”
বেশ তাই হােক
মুছে ফেল শােক
আমারি যতেক ত্রুটী।
অক্ষমে ক্ষমা
করাে নিরুপমা
পলাতকে দাও ছুটী।
চিরটি জীবন এক ঠাই থেমে
করে তবে পূজা নিস্ফল প্রেমে
আপনা পরখি মিটাইয়াে, সখি
পর-বিচারের সাধ।
আজি শুধু ক্ষমা
করাে নিরুপমা
বিমুখের অপরাধ।

রাখী
সুখের দিনের গান গাই, আর
দুখের কথা ভাবি
হাল্কা পাখায় নামবে যখন
বিষয় বােঝার দাবী
যখন তলার টানে
টাবে ধূলার পানে
মেঘের ভারে শবে আকাশ
বেলাশেষের তানে
তখন পাখী কবে কী ?
কণ্ঠে লয়ে গানের সুধা
দুঃখকেও ববে কি
সুখশেষের গানে ?
চপল সুরের গান গাই, আর
গভীর কথা ভাবি
মুক্ত পাখায় ঘিবে যখন
বাঁধা নীড়ের দাবী
যখন বাহুর টানে
টাবে বুকের পানে ।
রঙে রঙে রাঙবে আকাশ
বেলা শেষের পনে
তখন পাখী করূবে কী!

রাখী
কষ্ঠে লয়ে গানের সুধা
বদ্ধ হৃদয় ভরূবে কি
মুক্তিশেষের গানে ?
সহজ হাসির গান গাই, আর
কঠিন কথা ভাবি
চোখের পাখায় জমবে যখন
চোখের জলের দাবী
যখন ভাটার টানে
লবে বিচ্ছেদ পানে
ফুলে ফুলে কঁদবে আকাশ
বেলা শেষের তানে
তখন পাখী কবে কী!
কণ্ঠে লয়ে গানের সুধা
আশার জীবন ধরূবে কি
প্রেমশেষের গানে?
তরুণ প্রাণের গান গাই, আর
জরার কথা ভাবি-
অধীর পাখায় লাগবে যখন
ক্লান্তি কালের দাবী
যখন শিথিল টানে
টাবে আরাম পানে

তন্দ্রালসে ঢুলবে আকাশ
বেলা শেষের পানে
তখন পাখী কবে কী ?
কণ্ঠে লয়ে গানের সুধা
যৌবনলােক গড়বে কি
স্বপ্নশেষের গানে ?
ক্ষণিক আলাের গান গাই, আর
ঝরার কথা ভাবি
তৃপ্ত পাখায় বাজবে যখন
স্নিগ্ধ সাঝের দাবী
যখন নিবিড় টানে
গবে ধরার পানে
আঁধার হয়ে আবে আকাশ
বেলা শেষের তানে
তখন পাখী কবে কী?
কষ্ঠে লয়ে গানের সুধা
মুগ্ধ মরণ মরবে কি
সর্বশেষের গানে ?
২৮

রাখী
১২
আকাশের চাঁদ আকাশে থাকে
সে তাে নাহি জানে কে তারে ডাকে?
কাহার কণ্ঠে কিসের তৃষা
কে কোথা জাগিছে বিরহ নিশা
সে তাে নাহি তার ঠিকানা রাখে
আকাশের চাঁদ আকাশে থাকে।
ধরার চকোর থাকি ধরায়
কারে চায় আর আঁখি ঝরায়।
এত দূর সে কি উড়িতে পারে
আপনি আসিবে কে তার দ্বারে।
যে আসে সে নয় যারে সে চায়
ধরার চকোর থাকে ধরায়।
আকাশের চাঁদ সে কি কাঁদে না ?
কারাে কাছে নাই তারে কি দেনা ?
এত দূর হতে যায় না দেখা
তাররা আঁখিপাতে কালিমা লেখা।
একা ঘুরে মরে ঘর বাঁধে না
আকাশের চাঁদ সে কি কাঁদে না ?

রাফী
ধরার চকোর বােঝে না অত
আপনার কোণে আপনা রত।
কঁদে আর সেই কাদার ফাকে
কেবল ডাকে সে কেবল ডাকে।
নাহি যায় শােনা দূর যে কত
ধরার চকোর বােঝে না অত।
৩০

রাখী
কার চুম্বন কাহারে দিয়াছি
স্মরণ তাে আর নাই।
আমি চুম্বন বাহী।
একের অধরপুটে ধরিয়াছি
অপরের মদিরাই।
আমি চুম্বনবাহী ॥
তুমি যদি, প্রিয়, সুখ পেয়ে থাকো
একটু অশ্রু ঢালল।
(তারে) এতটুকু বাসস ভালাে।
যার জ্বালা নিলে তারে ভুলােনাকো
একটি সলিতা জ্বলল।
(তার) এতটুকু বাসাে ভালো।
কাহার হৃদয় কাহারে দিয়াছি
সে আমার মনে নাই।
আমি অন্তর-বাহী।
তার ভালােবাসা তােরে বাসিয়াছি
প্রাণ আকুলিছে তাই।
আমি অন্তর-বাহী।
তুমি যদি, প্রিয়, মন নিয়ে থাকে।
একটু বিমনা হও।
তার ব্যথা বুকে বও।

রাখী
যার ধন নিলে তারে ভুলােনাকো
তার পরিচয় লও।
তার ব্যথা বুকে বও।
কার পূজাটুকু কাহারে দিয়াছি
আমার স্মরণ নাই।
আমি উপচার-বাহী।
একের চরণতলে আনিয়াছি
অপরের মালিকাই।
আমি উপচার-বাহী।
তুমি যদি, প্রিয় করে তুলে থাকো
বিলম্ব করাে করাে।
এতটুকু তারে স্মরাে ।
যার মালা নিলে তারে ভুলােনাকো
তারে পরাইয়া পরে।
এতটুকু তারে স্মরাে।
কাহার আমারে কাহারে দিয়াছি
মনে নাই মনে নাই।
আমি যে আপনাবাহী।
তার হয়ে আমি তাের হইয়াছি
প্রাণ উদাসিছে তাই।
আমি যে আপনাবাহী।

রাখী
ভুমি যদি, প্রিন্স, মােরে পেয়ে থাকো
ছাড়া জাও ছাড়া দাও।
ভাহারি মতাে হারাও
যার সব নিলে তারে ভুলােনাকো
চার মতল বিতরাও।
তাহারি মত হারাও।

১৪
মুখখানি ভুলে গেছি ভুলিনি চুম্বন
হে অর্ধবিস্মৃতা।
অধর নেহারে যবে অধর স্বপন
আঁখি ঝুরে বৃথা।
জীবনের আর পারে তুমি গেছ ভেসে
বাহিতে লাগিছ পথ দেশ হতে দেশে
আমার অধরে ওগাে তােমার উদ্দেশে
আজো জ্বলে চিতা।
তনুখানি ভুলে গেছি ভুলিনি চুম্বন
হে অর্ধবিস্মৃতা।
অধরে জড়ায় যবে অধর স্বপন
বাহু ঝুরে বৃথা।
কবে তুমি এসেছিলে কবে তুমি গেলে
অলখিতে একবার কবে চুমি’ গেলে
আমার অধরে ওগাে কখন সাজিলে
আমার বনিতা।
*
৩ঃ

चाची
নামখানি ভুলে গেছি ভুলিনি চুম্বন
হে অর্ধবিস্মৃতা।
অধর নেহারে যবে অধর স্বপন
মন ঝুরে বৃথা।
মধু মােরে দিয়ে গেছ কোন কুসুমের
আমার মন সে মিছে দিশা খোঁজে এর
আমার অধরে ওগাে পদ্মিনী জুনের
এ যে স্বাদাম্বিতা।

চোখে চোখে কথা নয় গাে বন্ধু
আগুনে আগুনে কথা
অবাক নয়নে মােরা চেয়ে থাকি
জ্বলে যায় চটুল।
তােমার চাহনি আমার চাহনি
এ কী নিগূঢ় দোহার দাহনি
ছাই হয়ে যায় চেতনা বেদনা
আকুলতা ব্যাকুলতা।
মুখে মুখে কথা নয় গাে বন্ধু
আগুনে আগুনে কথা
অবাক অধরে মােরা ছুয়ে থাকি
জ্বলে যায় মুখরতা।
তােমার পরশ আমার পরশ
এ কী নিগূঢ় দোহার হরষ
ছাই হয়ে যায় বাসনা যাতনা
অধীরতা মদিরতা।

রাখী
বুকে বুকে কথা নয় গাে বন্ধু
আণ্ডনে আগুনে কথা।
অবাক অধরে মােরা রয়ে থাকি
জ্বলে যায় মত্ততা।
আমার মরণ তােমার মরণ
এ কী নিগূঢ় দোহার বরণ
ছাই হয়ে যায় নিষ্ঠুর নিলাজ
ক্ষুধালােল তপ্ততা।
৩৭

রাখী
কেমনে কহিব
হৃদয়ে বহিব
তােমার আননখানি গাে রাণি
তােমার আনন-ছায়া ?
ভালােবাসিয়াছি
হৃদয় দিয়াছি
তবু কি হৃদয় জানি গাে রাণি
আপন হৃদয়-মায়া ?
সাধ যায় বলি তােমার সকলি
সব তুমি নিয়ে নিয়াে গাে প্রিয়
নিয়াে মাের নিয়াে মােরে।
আমারে ভুলায়ে আমার কুলারে
আপনারে ভরে দিয়াে গাে প্রিয়
রহিও পরাণ ভরে।
সকল জীবন
.
করি’ অর্পণ
মরণ বরণ মালা গাে বালা
জনম জনম সপি।
ওই তব নাম জপি’ অবিরাম
জুড়াই মরম জ্বালা গাে বালা
অনন্ত কাল জপি।
৩

রাখী
বলিব না কভু
সাধ যায় তবু
বলিব না হেন বাণী গাে রাণি
রহিব মৌন পারা।
ভালােবাসিয়াছি
হৃদয় দিয়াছি
তবু কি আপনা জানি গাে রাণি
আমি যে আপনা-হারা !

রাখী
১৭
প্রথম কালের প্রিয়াটিরে হার
কেহ তাে রাখে না মনে
তেয়াগে কুঞ্জবনে।
নিশার স্বপন বাসি হয়ে যায়
মধ্যদিনের রণে
জীবন মরণ ক্ষণে।
কর হতে খসে বাঁশরি যখন
করপুটে আসে অসি
কেমনে রহিব বসি।
রথের অশ্ব হলে উন্মন
সমরাঙ্গনে পশি’
বিদায় লই রূপসী।
কত না ঝঙ্কা কত না অশনি
কত যন্ত্রণা হানে
চির অশান্তি-রাণে।
চরণে চরণে অবসাদ গণি
মরণ-দলন প্রাণে
সংগ্রাম মাঝখানে।
।
৪০

একাকী দিনের বেদনা বাসনা
একা একা যায় ভােলা
হৃদয়-দুয়ার খােলা।
কে হয়ে কখন পিপাসার কণা
দেয় ক্ষণিকের দোলা
তরঙ্গ-কলরােলা ।
প্রথম কালের প্রিয়াটিরে হায়
কেমনে রাখিব মনে
যৌবন জাগরণে!
বনে যে বাঁশরি সাধিয়াছি, তা’য়
রাখিয়া এসেছি বনে
ভাঙা স্বপনের সনে।
৪১

রাখী
১৮
চির সৌন্দর্যের মাঝে
আঁখি মাের যারই পানে চায়
সেই হাঁকে “বিদায়! বিদায়।”
এই গিরি এই বন
এই তরু এই তৃণ দল
ধরণীর এ অপূৰ্ব স্থল
একটি পলকে মাের
যেই হলাে নয়নের নিধি
অমনি কাপায়ে দিল হৃদি।
গিরি বলে বন বলে
তরু বলে তৃণ বলে, “হায় !
আঁখি হতে বিদায় বিদায়।
এই যে প্রথম দেখা
দোহাকার এই দেখা শেষ।”
এই মতাে প্রতিটি নিমেষ।
আদিকাল হতে শুধু
রূপে রূপে আঁখি অভিসারী
প্রাণ তবু রূপের ভিখারী।
মিলনের চারি চোখে :
জ্বলে যেন মিলনের চিতা
যত চাই তত চাই বৃথা।
৪২

চির আনন্দের মাঝে
চলিয়াছি রজনী দিবস
তবু মাের অন্তর বিবশ।
ভালাে যাহাদের বাসি
একে একে তারা রয় সরে
একা চলি লােক-লােকান্তরে।
একটি পলকে যারে
প্রাণ চেনে মন বলে, “এই”-
বুকে লয়ে দেখি বুকে নেই।
মাতা বলে ভ্রাতা বলে
জায়া বলে শিশু বলে, “হায়।
কোল হতে বিদায় বিদায়।
এই যে প্রথম প্রেম
দোহাকার এই প্রেম শেষ।”
এই মত নিমেষ নিমেষ।
জমক্ষণ হতে শুধু
জনে জনে ক্ষণে ক্ষণে পাওয়া
ফেলে ফেলে ভুলে ভুলে যাওয়া।
মিলুনের বাহুপাশে
কোথা যেন আছে কোন ফঁাকি
যত পাই তত পাওয়া বাকী।

১৯
আমার মনের মেঘ
নেমে গেছে আকাশের দিকে
লতায়েছে পর্বত চূড়ায় ।
সকলের উর্দ্ধে আমি
চলিয়াছি নিমিখে নিমিখে
পূর্ণ হইতে পূর্ণতায়।
শত লক্ষ দুঃখ মাের
পক্ষ লয়ে ছেয়েছে অম্বর।
সেই মেঘে ঢেকে গেছে আলাে।
স্বচ্ছেদ হ্রদের মুখে
লেখা মাের স্বচ্ছন্দ অন্তর।
—ওরা মাের হৃদয় জুড়ালাে;
ওরা মাের ভার নিল
পথিকের বােঝা নিল তুলে
ও আকাশ ওই যে পৰ্বত।
আমার চরণ হতে
শ্রান্তি নিল ভ্রান্তি নিল খুলে
শুভ করি’ দিল মাের পথ।
শ্যামল কোমল দুৰ্বা,
ধেনু চরে, পাখী করে খেলা,
নিরালায় ঝিমায় কুটীর।
প
৪৪

ধরণীর এক প্রান্তে
হেথায় অলস কাটে বেলা
ত্বরা নাই দিন রজনীর।
এই খানে রেখে যাই
কালিকার যতেক বেদনা
অতীতের যতেক সঞ্চয়।
এরা ভালােবাসি’ লবে
আমার রক্তের প্রতি কণা
এর হবে আরাে শােভাময়।
পূর্ণতা হইতে মােরে
মুক্তি দেবে পূর্ণতার পথে
পথিকের মিত্র এরা সব।
আমার সর্বস্ব লয়ে
আমারে বসায়ে দিলে রথে
ধন্য হবে ধরার উৎসব।
মরণে মরণে আমি
প্রতি দিন নামাইব মেঘ
আঁখি-হতে হানিব বরষা।
এই মৃত্তিকার মর্তে
ঢেলে ঢেলে স্বর্গের আবেগ
বার বার করিব সরসা।
৪৫

রাখী
২০
তােমরা দাড়ায়েছিলে রহিলে দাড়ায়ে
আমি ছুটে এসেছিনু চলি ছাড়ায়ে।
হে অচল হে অটল হে মৌন পাষাণ
তােমরা জুড়িয়া রহ শূন্যের শ্মশান!
মেঘ-বলিত জটা ওগাে বনস্পতি
তােমরা করহ তপ স্থিরমনা যতি।
আমি সূৰ্য্যসুত, আমি দুরন্ত যৌবন
এই শ্যামা অপ্সরার রাখি নিমন্ত্রণ।
আমারে ভুলাবে বলে কত এর ছলা।
সব হেরি লবাে তাই অবিশ্রান্ত চলা।
আমার ভেঙেছে ধ্যান লাগিবার আগে
বস্কল গিয়াছে খসি’ পরম বিরাগে।
মাের তরে নহে নহে অন্ধ বিভাবরী
আমি চলি সারা পথ রৌদ্র হাতে করি।
আমি সূৰ্য্যসুত, আমি জ্বলন্ত যৌবন
আমারে দিয়াছে ডাক সৰ্ব্ব প্রলােভন।
এই রূপসীর সরে’-সরে’-যাওয়া বাস
আঁখির চুম্বন যাচে আমার সকাশ।
তাই আমি এসেছি চলিনু ছাড়ায়ে
তােমরা দাড়ায়েছিলে রহিলে দাঁড়ায়ে।
৪৬

রাখী
ছুটেছি পর্বত পৃষ্ঠে আমরা ক'জন
সাথে সাথে ছুটিয়াছে অতল মরণ।
হয় তাে এখনি হবে জীবনের শেষ
চকিতে করিবে সীতা পাতাল প্রবেশ।
জীবনের মরণে মাঝখানে কাপে
মুহূৰ্ত্ত একটি মাত্র। তবু কী প্রতাপে
আমরা চালাই রথ ! আমরা উদ্দাম,
সেটুকু মুহূর্ত নাই মােদের বিশ্রাম।
কোথা মরণের ভয় ? মােরা হেসে খেলে
ছুটিছি দুর্গম পথ অতি অবহেলে।
হে তাপস, কার লাগি কর তুমি শােক!
আমরা এ জগতের কোটি কোটি লোেক
কাহারাে তাে কোনাে দুঃখ নাই? আমরা যে
থামিব না জীবনের মরণের মাঝে
একটিও সামান্য নিমেষ, সেই দুখে
দুঃখ হলাে বনবাসী। তপস্বীর বুকে
দুঃখ সে লভিল গুহা, রহিল একাকী
জগতের পানে তার মুদি’ দিয়া আঁখি।
মােরা কোটি কোটি প্রাণী চলি হেসে খেলে
সূর্য তারকার মতাে অতি অবহেলে।
সাথে চলে অপার শূন্যতা, মােরা তবু
কোনাে খানে মধ্যপথে হারাবাে না কভু।

এ তাে মিথ্যা নয়
মন মাের ছড়ায়েছে ত্রিভুবনময়।
তাই বাসি ভালাে
হ্রদের মুকুর পরে পর্বতের কালাে ।
বনানীর শ্যাম
নিবিড় অর্জন সম নেত্রের আরাম।
ওই যে প্রপাত
বাঁধিয়াছে আকাশের অবনীর হাত
সেও মাের প্রিয়।
আঁখিতে বাঁধিয়া দিল কিসের রাখী ও ?
বিহঙ্গের মেলা
জলের বুদুদসম জলে করে খেলা।
তা’রা মাের চিতে
এক হয়ে মিশে গেছে একই শােণিতে।
আর ওই তরী
আলস্যমন্থর সুখে চলেছে সন্তরি’
সেও মাের প্রাণ!
নহিলে আমার প্রাণে কেন আগে গান?
কেন লাগে নাচ ?
আছি গাে আছি গাে বন্ধু সকলের কাছ।
৫
*
১৮

রাখী
নহে, মিথ্যা নহে
সবার আসঙ্গ লভি সবার বিরহে !
যদি ভুলে যাই,
কাল যদি মনে নাহি রয় এই ঠাই,
তবু জানি স্থির
সব ঠাই ব্যাপিয়াছে আমার শরীর।
আমার অজ্ঞাতে
যেথায় যে-কেই আছে আমি আছি সাথে।
৪৯

রাখী দস্ত হরি’ লয় ধন তার তরে আছে কারাগার আমি হরে লই শােভা মােরে দণ্ড কী দিবে ইহার। ওগাে দণ্ডধর, আমি পরাক্রান্ত দস্যু ধরা দিতে নাহি মাের ডর। এ রাজপুরীতে মম আঁখি দুটি দু’মুঠা ভরিল কত দীর্ঘকার নীলা ভূধরের রজত হরিল। তবু ক্ষান্তি নাই- যত পাই তত মাের বাড়িয়া চলিছে দুরাশাই। তুমি রাখিয়াছ খােলা তোমার এ ভাণ্ডারের দ্বার রি হতে আমি দস্য আমি লভি ঐশ্বৰ্য্য আম। দিনে দিনে দিনে “আপন বৈভব অর্জি তােমার অজস্রতম ঋণে।

রাখী
ভক্ত দিয়ে যায় পূজা
তার তরে আছে পুরস্কার।
আমি দিয়ে যাই প্রেম
মােরে মূল্য কী দিবে ইহার।
ওগাে মহারাজ,
আমি অযাচক ভক্ত
মােরে মিথ্যা নাহি দিয়াে লাজ
এ রাজপুরীতে মম
আঁখি হতে যে সুধা ক্ষরিল
তুষারে সে দিল তাপ
তৃণ মূলে আরাে অন্য দিল।
সে যে কত ঠাই
কত চিহ্ন রেখে গেল
আমি তার কিছু জানি নাই।
আমি রাখিয়াছি খােলা
আমার এ হৃদয়ের দ্বার
তারি হতে যত পারাে
তুমি লওঁ পূজা আপনার।
দিনে দিনে দিনে
আপনারে প্রিয় করে
আমার অজস্রতম ঋণে।

রাফী
২৪
এবার এসেছি নরলােকে। এও ভালাে।
প্রকৃতি ভুলায়েছিল মানব দুলালাে।
আমি মানবের কবি। এই তাে আমার
আপনার দেশ। এই মাের তপস্যার
উদার অরণ্য। অশান্ত জন লয়ে
এর নির্জনতা শান্তি আনে এ হৃদয়ে।
যেথা যাই আপন জনের দেখা পাই ।
ওরা যেন প্রতীক্ষিয়াছিল পথ চাহি
আমাকেই! চলি যবে, ওরা সাথে চলে।
আমারে শুনাতে কথা শত কণ্ঠে বলে
শত কানে। অসম্তা এ মহানগরী
এর অঙ্গময় কত কৃষ্ণ তিল ধরি’
এমন সুন্দরী! আমার এ পােবনে
এই যেন মেনকা দাড়ায়ে কাল গণে
ক্লান্তমুখী আকুল লােচনা। ইঙ্গিতেই
ঢলিয়া পড়িবে বক্ষে, দ্বিধালেশ নেই।
সব ভালাে লাগে হেথাত মিথ্যা কাজ ;
যে বিপুল ব্যস্ততায় জীবনের মাঝ
মৃত্যু করে আনাগােনা, স্মৃতি দেয় মুছি’ ;
যত অশুচিত ক্রমে হয়ে ওঠে শুচি
আপনারে ধুয়ে মেজে ; যত ক্রুর প্রেম

রাখী
ভস্ম করে ধরিত্রীর বক্ষ-চেরা হেম
বিনিদ্র উৎসব কক্ষে নির্লজ্জ তাণ্ডবে ;
যে নিপ্ৰেম দৈন্য বয়ে গৃহহারা সবে
শীতে কাঁপে ভিক্ষা হাঁকি’; যত তুচ্ছ ছল
কপােলর রঙে ঢাকা যত অশ্রু জল ;
অধরের রঙে আঁকা যত মিথ্যা হাস ;
ভুরূ যুগ আকর্ণিয়া যে নেত্র বিলাস
মুখখানি কাছে আনি’ যত চাটু কথা -
ভালাে লাগে মানবের সব দুৰ্বলতা।
আমি মানবের কবি ; এই তাে আমার
নায়ক নায়িকাগুলি ঘিরে’ চারিধার।
ইহাদের ভালবেসে হেরি দিন যামী
তৃপ্তিহীন অনিমেষ। পুণ্য এই নরলােক
আমার তপস্যা লয়ে পুণ্যতর হােক।

রাখী
আমি যখন চলি যখন চলি
ডাইনে বামে বিশ্ব চলে সাথে।
বাতাস সে দেয় পথের দিশা বলি
আকাশ এসে হাতটি মিলায় হাতে
হাতছানি দেয় চন্দ্র তপন তারা
এই জনারি সঙ্গ কাঙাল তারা
তাদের চলা আমার চলা বিনে
শূন্যপথে কখন যেত থামি।
বিশ্বজগৎ চালাই রাত্রে দিনে
সবার সঙ্গে চলি যখন আমি।
যখন আমি থামি যখন থামি
পৃথ্বী আমার জড়িয়ে ধরে পায়।
সেই সােহাগীর আলিঙ্গনে আমি
মরণ সুখে রই যে বাধা হয়।
আসন করে সবুজ আঁচল খানি
আধ-আঁচরে সঙ্গে বসায় রাণী
তাহার বসা আমার বসা বিনে
সবুজকে যে কতাে ধন ধলা ।
যৌবনেরে বাঁচাই মরণ দিনে
যখন আমি থামাই আমার চলা।
৫১

রাখী
এই সৃষ্টি অতুল সুন্দরী
আমি এর প্রিয়।
এই পৃথ্বী উর্বশী অপ্সরী
অনির্বচনীয়।
কোটী যুগ কোটী কল্প ধরি
এই সৃষ্টি এমনি সুন্দরী
কোটী যুগ কোটী কল্প ভরি’
আমি এর প্রিয়।
এই পৃথ্বী উর্বশী অপ্সরী
অনির্বচনীয়।
আমি আছি তাই তাে এ আছে
আছি দুই জনা।
এত মােরে ভালােবাসিয়াছে
শ্যামা সুরাঙ্গনা।
অরুণ সিদুর পরিয়াছে
আমি আছি তাই সতী আছে
অলিম শূন্যতার মাঝে
আছি দুই জনা।
এত মােরে ভালােবাসিয়াছে
শ্যামা সুরাঙ্গনা।

এখী
এক খানি স্বপনের মতাে
দু’খানি জীবন।
মরণে মরণে অব্যাহত
গাঢ় আলিঙ্গন।
কে জানে রে কাল যায় কত
একখানি স্বপনের মতাে
পাশাপাশি ঘন তন্দ্রাহত
দু’খানি জীবন
মরণে মরণে অব্যাহত
গাঢ় আলিঙ্গন।
ওগাে শুধু তুমি আর আমি
আর নাহি কেহ।
একা মােরা নারী আর স্বামী
রচিয়াছি গেহ।
ভরিয়াছি দিবা আর যামী
ওগাে শুধু তুমি আর আমি
কোনাে খানে কেহ নাই থামি’
আর নাহি কেহ।
একা আছি সখী আর স্বামী ।
বিরচিয়া গেহ।

রাখী
২৭
ব্যথার ব্যথী গাে, বেদনা আমার
তুমি কি পারিবে বুঝিতে!
আমি যে রয়েছি এই অমরার
অমৃত রতন খুজিতে।
মধুর জীবন মধুর মরণ
ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলে যুগল চরণ
দুটি মুঠি মাের করেছি ভরণ
দুঃখ সুখের পুজিতে।
তবু পাই নাই অমৃত রতন
এ ব্যথা পারিবে বুঝিতে !
ব্যথার ব্যথী গাে বেদনা আমার
তুমি কি পারিবে দূরাতে !
আমি যে রয়েছি এই অমরার
সুধা ভাণ্ডার পূরাতে।
বিতরি গীতিকা বিলাই গন্ধ
ছবির সঙ্গে মিলাই ছন্দ
যে দিকে ছড়াই যত আনন্দ
অঞ্জলি নারি ফুরাতে।
তবু দিই নাই সুধা অমল
এ ব্যথা পারিবে দূরাতে !

রাখী ব্যথার ব্যথী গাে, বেদনা আমার তুমি কি পারিবে বহিতে । আমি যে রয়েছি বিশ্বজনার আত্মীয়তম হইতে। আকুল করেছে অন্তর মম কোটী প্রেমিকের আশা নির্মম তরঙ্গদলে চন্দ্রমা সম মিনতি যে নারি সহিতে তবু হই নাই আত্মীয়তম এ ব্যথা পারিবে বহিতে! ব্যথার ব্যথী গাে, বেদনা আমার তুমি কি পারিবে বাড়াতে ! আপনি রয়েছি আমি আপনার বেদনার সীমা ছাড়াতে। করে তুলে লই কর বন্ধন বুকে সকলের সব ক্রন্দন নিখিলের তরে তন মন ধন চলি যে হারাতে হারাতে। তবু রচি নাই নন্দন বন- এ ব্যথা পারিবে বাড়াতে। ৫৮

রাখী
২৮
ৰাজায়ে বাজারে যৌবন জয় শাখ
মরণে দিয়াছি ডাক।
কভু আতঙ্কে দুর্ভাবনায়
কভু অপরের শুভ কামনায়
কভু আনন্দে কভু বেদনায়
বাজায়ে বাজায়ে শাখ
মরণে দিয়াছি ডাক।
বলেছি বলেছি এসাে হে অচেনা মিত
জ্বালাতে অকাল চিত।
যেতে আমি তিল বিলম্ব করিব না
বিলাপে প্রলাপে গগন বিদৰিব না
রেখে নাহি যাবাে চরম চিহ্ন কণা
এসাে হে অচেনা মিতা
জ্বালাতে অকাল চিত।
ভালােবাসি আমি প্রাণপণে বাসি ভালাে
প্রাণের প্রদীপে আলাে।
ভালােবাসি মাের প্রতি কান্না ও হাসি
মান অপমান কলঙ্ক রাশি রাশি
ভালােবাসি মাের শত ভালােবাসাবাসি
প্রাণভরে বাসি ভালাে
প্রাণের প্রদীপে আলাে।

রাখী
দাও যদি দেবে নিয়ে সে আলােটুক
দেখি সে কেমন সুখ ।
সে কেমন সুখ–নিমিষে নিবিয়া যাওয়া
ছুঁয়ে যাবে যবে একটি ফুয়ের হাওয়া
হাতে হাতে পাবাে সব চাওয়া সব পাওয়া
নিবাও এ আলােটুক
দেখি সে কেমন সুখ।
অথবা ইহাতে অনল আহুতি দেবে
পূর্ণ করিয়া নেবে।
দীপ্ত শিখায় জ্বলে যে প্রদীপ খানি
তৃপ্ত তাহারে করিবে চিতায় আনি
অনলােৎসবে তারে বুভুক্ষু মানি’
অসীম অনল দেবে
তৃপ্ত করিয়া নেবে।
বাজারে বাজায়ে যৌবন জয় শাখ
মরণে দিয়াছি ডাক।
বলেছি কখন আসিবে শীতল জরা
তখন আর কী হবে কী হবে মরা
সে লজ্জা হতে বাঁচাও আমারে ত্বরা
বাজারে বাজায়ে শাখ
মরণে দিয়াছি ডাক।
.

২৯
তােদের জগতে দিন আসে যায়
পূরবের হাসি পশ্চিমে ভায়
গৃহ কাজ সারি’ কবরী এলায়
তারকিত কুন্তলা।
জন কলােল তালে তালে বাজে
জীবন মরণ পারাবার মাঝে
প্রেম বাহিরায় অভিসার সাজে
যৌবন উচ্ছলা।
খোঁজ নাহি রাখি আমি সে সবার
আমার জগতে আমি একা, আর
সারা বেলা জুড়ে একেলা আমার
খেলা ঘর গেঁথে চলা।
খসে পড়ে ইট ধ্বসে পড়ে ছাত
ভিৎ নড়ে নড়ে ওঠে অচিরাৎ
গড়িতে গড়িতে বেঁকে যায় হাত
এক আর হয়ে ওঠে।
ক্লান্ত দুবাহু পাশে মুরছায়
বুক নিঃশ্বসে ঘন নিরাশায়
কত কল্পনা মিছা হয়ে যায়
শিলাপটে নাহি ফোটে।

রাখী
তবু এক মনে বসি’ এক ঠাই
ইটের উপরে ইট গেঁথে যাই
নাহি অবসাদ অবকাশ নাই
সমাপ্তি নাহি জোটে।
জানিনা কখন দিন আসে কি না
আলাে সুরে কঁপে আঁধারের বীণা
আমার নােচনে জাগরণ-জিনা
মায়া-অঞ্জন মাখা।
নিদ নাই শুধু স্বপনে স্বপনে
খেলাঘর রচা চলেছে গােপনে
কত যে কল্প কাটিল এমনে
আঁখি-পল্লব ঢাকা।
শ্রবণে পশে না হাসি ক্রন্দন
যেন এ ত্রিলােক নিঃস্পন্দন
অপেখিছে মম মনােমন্থন
সুধা কবে হবে ছাঁকা।
প্রলাপের মতাে কারা গরজায়
রাজীকর সম আসি তরজায় ॥
নাটবেদীপরে আসে আর যায়
বহুরূপী অভিনেতা।

রাখী
শিশু ভুলাইয়া লুঠি’ করতালি
ওরা ভাবে ওরা রবে চিরকালই
শ্মশান মশাল দিকে দিকে আলি’
ওরা ভাবে ওরা জেতা।
যুগে যুগে কর হানি’ মাের দ্বারে
স্বপন আমার টুটাইতে নারে
চকিতে মিলায় বিস্মৃতি পারে
সত্য দ্বাপর ত্রে।
কবে হবে দিন পাবাে তার দেখা
যার লাগি আমি রাত জাগি একা
অন্তরাকাশে অরুণাভ-রেখা
উজলি উঠিবে কবে।
গাঁথা খেলাঘর ঝলকি’ ঝলসি’
কবে সে জ্বলিবে অচলা উষসী
আমার মানসী আমার রূপসী
আমাতে উদয় হবে।
আমারে ছাপায়ে আমার টুটায়ে
আমার অমিয়া পড়িবে লুটায়ে
ত্রিভুবন
আসি’ তিয়াষা মিটায়ে
প্রাণমন ভরি লবে।
আমার সৃষ্টি আমারে মােহিয়া
আপনারে দিয়া সবারে শােহিয়া

খেলাঘর খানি নিশেষে দহিয়া
বাহির হইবে না কি?
লােক হতে লােকে যাবে না কি উড়ে
রবি শিখা সম দূর হতে দূরে
আমারে লইবে পুর হতে পুরে
আপন বক্ষে ঢাকি।
ততাদের জগতে দিইনি আমারে
দিয়ে যাবাে মাের তিলােমারে
যুগ হতে যুগ চলিবে একা রে
সখারে আড়াল রাখি।

রাখী
আমি স্রষ্টা, আমি বুঝি বেদনা তােমার।
ওগাে অষ্টা, এই সৃষ্টি মােদের দোহার
চির বেদনার লীলা। আমরা দু’জনা
দুই ঠাই গড়ি বসে একই খেলনা।
বাসনার রুদ্ধবাষ্প চিত্ত বিদারিয়া
অঙ্কুরি পল্লবি’ ওঠে। প্রসবার্ড হিয়া
নভােনীল হয়ে রয় তবু বাষ্পকুল।
যত ফুল ফুটাইতে চায় তত ফুল
ফোটে না তাে? তারা নীহারিকা থেকে ।
সেই সব আকাশ কুসুম লয়ে, হায়,
আময়া সতত পূর্ণ। কোটি সম্ভাবনা
কোনাে মতে বাষ্প হতে ফুল হইল না,
রহে গেল জনম এড়ায়ে। এ যে ব্যথা,
তােমার আমার এ অপূর্ণ সম্পূর্ণত,
কারে ক’বাে? কে শুনিবে? ওই যার হাসে,
ওই যারা কাঁদে, ওই যারা অবিশ্বাসে
মাথা নেড়ে যায়, ওরা কভু জানে না তাে
একটি কুসুমশিশু রহিলে অজাত
কী অক্ষম বাসনায় মােৰা মরে যাই।
ওগাে স্রষ্টা, সে মৃত্যুর তুলা নাই, নাই !
সে মৃত্যুর শেষ নাই। নীল বাষ্পকুল

রাখী
এই যে আকাশ, এ শ্মশানে কোটী ফুল
দগ্ধ হন্তু অজাত অ-মৃত।
সে দাহনি
অনুক্ষণ বক্ষে বহি’ দিতে হয় গণি
যে কটি কুসুম, সেই কটি দুর্লভ খেলনা
অনুক্ষণ ভাঙি গড়ি আমরা দু’জনা।
ওগাে স্রষ্টা, এ বেদনা নয় বােঝাবার ;
আমি স্রষ্টা, তাই বুঝি বেদনা তােমার ।
৩৬

.
যখন আমি সৃষ্টি করি
আপন রবি আপন তারা
আপন প্রাণের আগুন হতে
বৃষ্টি করি উল্কা ধারা
যখন আমার বক্ষতটে
পুলক-ভূমিকম্প ঘটে
দীর্ঘশ্বাসের ঝড় ডেকে যায়
আঁখির অথির সাগর সারা
তখন ওগাে স্বষ্টা তােমার
দুঃখ সুখের পাই কিনারা ।
তখন তোমার সঙ্গ লভি
বিশ্বহিয়ার হে একাকী
তােমার চরণপাতের সাথে
চরণপাতে ছন্দ রাখি।
তমার হাতে হাতটি ভরে
তখন চলি কালের পরে
শিশুর মতাে খেলার সুখে
থামতে থাকি
চলতে
থাকি।
সৃষ্টি আমার ছায়ার মত
পিছনে রয় ধূলায় ঢাকি'।

৩২
এ বিষ যেমনি হােক
এরে আমি করিনু স্বীকার
লই আপন হাতে
এর রাজ সিংহাসন ভার।
আর মাের খেদ লেশ নাই
যা লয়েছি বুঝে লববা তাই।
এ যদি দুঃখের হয়
সে আমার গােপনীয় দুখ
অজানা কাটার মতাে
বুকে থাক্ চির জাগরূক।
তারে অপসারিবার নয়
তারি সাথে জাগুক হৃদয়।
মনােমতাে নাহি হলে
কার সনে করিব কলহ ?
আমার আপন সৃষ্টি
কেন হবে আমার অসছ?
বন্ধ-হারা ছন্দপান্বিতা
আমারি এ অবাধ্য কবিতা

রাখী
উচ্ছ্বসিত বাক্যসম
তারা-সূৰ্য্য ধার চারিভিতে
সেই সব পলাতকে
কেমনে বাঁধিব মহাগীতে
সেই মম নিগুঢ় ভাবনা
আমারে রাখুক একমনা।
কী কাম মৃত্তিকা মথি’
উল্লাসি উন্মাদি অরণ্যানি
কুসুম প্রসবি’ যায়
সে বার কেমনে বাখানি?
দুৰ্ব্বার কামনাখানি মাের
নীরৰে ঝরাক চির লাের।
এ বিশ্বের বিশ্বকৰ্মা
তাঁরে মম কোটা নমস্কার
র গড়া সিংহাসন
বীর্য্যে করি অধিকার।
তাঁর বাক্য তার মনস্কাম
নিজ বক্ষে আমি ধরিলাম।

রাখী
আমার লেগেছে ভালল
পরিপূর্ণ এ বিশ্ব সংসার
যেন কোন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার
সর্বধনাধার ।
যাহা চাই তাও আছে
যাহ নাহি চাই আছে তাও
অকুলান নাই রে কোথাও
নাই অযথাও।
এত দুঃখ যত সুখ
চেয়েছি পেয়েছি অবিরত
ভাবনা যাতনা যত শত
সবি মনােমতাে।
সুন্দরে কুৎসিতে মিশা
ছবিখানি নিখুৎ রচনা
এর বাড়া আমি পারিব না
এ যে অতুলনা ।

।
রাখী
অর্থ বুঝি নাই বুঝি
সবিস্ময়ে করি নেত্রপাত
শ্রদ্ধাভরে জোড় করি হাত
করি প্রণিপাত।
৭১

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Rakhi Ed.2nd

Author
Ray,annadashankar
Title
Rakhi Ed.2nd
File name
Rakhi Ed.2nd
Text
OCR done
Citation
1926
Published
2009/11/29
Publisher
M.c. Sarkar And Sons,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
86
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Ray,Annadashankar
DLI number
513138
Barcode
4990010020144.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
JIL9Rowj4vS
Download PDF

Rakhi Ed.2nd