Belgaria Sudha Smriti Pathagar

Jog O Sadhana Ed.1

Bidyabhusan,satipati Ed. · 2010/03/19

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

যােগ ও সাধনা
ভট্রপল্লা নিবাসী
সতীপতি বিদ্যাভূষণ বিরচিত
a
-প্রকাশক
শ্রীমাণিকলাল ঘােষ
৯৮ নং নিমু স্বামীর লেন, কলিকাতা।
প্রথম সংস্করণ
১৩৪৭ সাল
মূল্য—দুই টাকা-মাত্র

Published by: -Maniklal Ghosh
Sulau Library.
93, Nimugossain's Lane, CALCUTTA
All Rights Reserved to the Pubiisher
Printed by :-PURNACHANDRA GNOSH
Ashutosh Printing Works
98, Nimu gossain's Lane ; CALCOTTA

সুচীপত্র
বিষয়
উপ ক্রণিকা
প্রথম অধ্যায়
যম
দ্বিতীয় অধ্যায়
'নয়ম ও সাধ্যায়
তৃতীয় অধ্যায়
আসন
সন্ধান
৩৯
পদ্মাসন
উদাসন, মুক্তাসন, বজ্রাসন
কিাসন
সিংহাসন
গােমুখাসন, বীরাসন
ধনুরাসন, মৃতাসন, গুপ্তালন, মৎস্যসন
পশ্চিমােনাসন বা উগ্ৰান
মৎস্যেন্দাসন, গােরক্ষাসন, উৎকটাসন, সঙ্কটাসন
ময়ূরাসন, কুক্কুটাসন, কৃৰ্ম্মাসন, উত্তান কুৰ্ম্মাসন, উস্তান মওকাসন
বৃক্ষাসন, মণ্ডুকাসন, গরুড়াসন, বৃষাসন, শলভাসন
মকরাসন, উষ্ট্রাসন, ভুজঙ্গাসন
যােগাসন
৪১
৪ ২
৪৩
s

ন? সুচীপত্র , বিষয় পৃষ্ঠা চতুর্থ অধ্যায় মুদ্রাকরণ মহামুদ্রা নভােমুদ্রা, উডড়ীয়ান বন্ধ Si 5ালন্ধর বন্ধ মলবন্ধ মহাব ২ মহাবধ ৫৮ খেচরী মুদ্রা বিপরীতকরণা মুদ। যােনিমুদ্রা বজ্ৰাণী মুদ্রা শক্তিচালনী মুদ্রা তাড়াগী মুদ্রা, মাণ্ডুকী মুহা. শাম্ভবী মুদ। পঞ্চ ধারণা মুদা, পার্থিবী ধারণ! মুদ্রা আসী ধারণা মুদ্রা আগ্নেয়া ধারণা মুদ্রা, বায়বী পার। মুদা আকাশ ধারণা মুদ্রা, অশ্বিনীমুদ। Jor ৬৪ পাশিনী মুদ্রা ঐ কাকী মুদ্রা, মাতঙ্গিনী মুদ্রা ভুজঙ্গিনী মুদ্রা পঞ্চম অধ্যায় যটুচক্র সূচীপত্র বিষয় পৃষ্ঠা ষষ্ঠ অধ্যায় সপ্তসাধন বাসার, বারিসার অগ্নিদার, বহিস্কৃত ধৌতি ১০ ৪ ৫ 4 প্রক্ষালন দন্ত ধৌতি, জিমল ধৌতি কর্ণর দ্বয় দৌতি, কপালৱন্ধ ধৌতি ঈদ্ধৌতি, বসন ধৌতি বাসােধৌতি, মলশােধন বস্তি প্রকরণ, নেতিযােগ গৌলিকীযােগ, ত্রাটক কপালভতি সপ্তম অধ্যায় প্রাণায়াম, স্থান নির্ণয় কাল নির্ণয় মিতাহার ১১১ ১১। ১১৮ নাড়ীশুদ্ধি । ১২২ ১৩১ मीरजादुटक উজ্জায়ী কুন্ত, শীতলী কুম্ভক ১৩৪ ভকি। কুম্ভক ভ্রামরী কুম্ভক ১৩৬ মূচ্ছ। কুম্ভক, কেবলী কুম্ভক

|
সুচীপত্র
. *,n", 2 + ৭ = + +
বিষয়
পৃষ্ঠা
অষ্টম অধ্যায়
প্রত্যাহার ও যােগবিয়
১৪৩.
নবম অধ্যায়
ধ্যান ও ধারণ
জ্যোতিধন
১৬০
প্যান
১৬৭
১৬৮
দশম অধ্যায়
সমাধি
ধ্যানযােগ-সমাধি
নাদযােগ-সমাধি, রসানন্দৰােগ-সমাধি
লয়সিদ্ধিযােগ-সমাপি, ভক্তিযােগ-সমাধি, জযােগ-সমাধি
একাদশ অধ্যায়
যােগের শ্রেষ্ঠতা নিরূপণ
দ্বাদশ অধ্যায়
দেহত
ত্রয়ােদশ অধ্যায়।
যােগোপদেশ
১৮৯

যােগ ও সাধন।
উপক্রমণিক।
বিশ্বনাথ ভূষণ
মহাশয় নিজ অশ্রমে ধ্যানমগ্ন। তাহার
বয়স যষ্টিবর্ষ অতিক্রম করিয়াছে। বর্ণ তপকাঞ্চনসন্নিভ, মুখমণ্ডল
শশা গুহীন, গাত্রে নামাবলী, স্বদেশ হইতে নাভি পর্যন্ত শুভ
যজ্ঞােপবীত বিলম্বিত। সম্মুখে শিষ্য কৃষ্ণগােপাল করযােড়ে উপবিষ্ট ।
কৃষ্ণগােপাল কিছু পূদে আসিয়াছেন
আসিয়াছেন; কিন্তু গুরুদেবকে ধ্যানমগ্ন
দেখিয়া নীরবে তাহার প্যানভঙ্গের অপেক্ষায় রহিয়াছেন। কৃ-
গােপাল প্রায় প্রৌঢ়ত্বের সীমায় পৌছিয়াছেন, দেখিতে সুরূপ।
কিয়ৎক্ষণ এইরূপে কাটিবার পর গুরুর ধ্যানভঙ্গ হইল ; তিনি
চক্ষু চাহিয়া প্রথমেই কৃষ্ণকে দেখিতে পাইয়া হাসিয়া বলিলেন,
“প্রথমেই কৃষ্ণ দর্শন! আজিকার দিন শুভ সন্দেহ নাই।”
শিষ্য শ্রী গুরুর চরণে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করিয়া বলিলেন, “আমার
প্রতি আপনার অসীম স্নেই, তাই এরূপ বলিতেছেন।”
গুরু বলিলেন, “তুমি শিষ্য'; তােমাতে আর পুত্রতে ত কোন
ভেদ নাই। শিষ্য যে পুতুল্য। তুমি কতক্ষণ আসিয়াছ ?”
শিষ্য উত্তর দিলেন, “অধিকক্ষণ নহে। আজ আমার চক্ষু
সার্থক, আপনার ধ্যান-কালীন মূর্তি আমার কখন দেখিবার সােভাগ্য

যোগ ও সাধনা
শিষ্য ।
গুরু বলিলেন, “উক, সে কথা । এখন কি জন্য আসিয়াছ,
তাহা বল। গৃহের সকল অঙ্গ ত?”
শিষ্য উত্তর দিলেন, “আপনার আশীর্বাদে সকলি কশল।"
গুরুর দৃষ্টি হঠাং গহের বহির্ভাগে নিবদ্ধ হইল ; তিনি প্রশ্ন
করিলেন, “ঘরের বাহিরে যে বিছানা প্রভৃতি রহিয়াছে, উহা
কাহার বলিতে পার ?”
আজ্ঞে, আমার ।
শুরু। তুমি কি বিদেশে তাইতেছ ?
শিষ্য । আজ্ঞে, না; এইখানে কিছুদিন
এইখানে কিছুদিন বাস করিবার ইচ্ছা
করিয়াছি।
শুরুর মুখ প্রসন্ন হাস্যে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল। তিনি বলিলেন,
“বড় আনন্দ হইল । কিন্তু হঠাৎ এ ইচ্ছা কেন?”
“আমার কোন কোন বিষয়ে কিছু জিজ্ঞাস্য আছে।”
“তুমি কোন বিষয়ে জিজ্ঞাসু ?"
“আজ্ঞে, যােগ সম্বন্ধে আপনার উপদেশ
গ্রহণ করিতে বড়ই
কৌতূহল হইয়াছে।”
শুরু। যােগ সম্বন্ধে !
শিষ্য। আজ্ঞে, হঁ্যা।
শুরু হাসিয়া বলিলেন, “তােমার এ অদ্ভুত কৗতূহল বটে!”
শিষ্য। আমার কৌতূহল নিবৃত্তি করুন।
গুরু। 'বেশ, তােমার যখন ইচ্ছা হইয়াছে, তখন আমি
—যথাজ্ঞান তােমাকে সে সম্বন্ধে বলিব। তবে একটি বিষয়ে
তােমাকে প্রতিশ্রুতি দিতে হইবে।
শিষ্য।
আল করুন।

যােগ ও সাধনা
গুরু। তুমি আমার উপদেশ
মনোযোগ
দিয়া শ্রবণ
করিবে এবং অনুভব করিতে চেষ্টা করিবে । কখনই নিজে নিজে
যােগাভ্যাস করিতে চেষ্টা করিবে না।
শিষ্য। নিজে নিজে অভ্যাসে আপত্তি কি ?
গুরু। আপত্তি
এমনও দেখা গিয়াছে, নিজে নিজে
চেষ্টা করিতে গিয়া বহু সাধক একেবারে অকৰ্ম্মণ্য হইয়া গিয়াছেন,
কেহ কেহ বা উন্মাদ হইয়াছেন, কেহ বা প্রাণ বিসর্জন দিয়াছেন।
শিষ্য। তবে কি ভাবে যােগসাধন করিতে হইবে ?
গুর অথবা উপদেষ্টার সহায়তা লইয়া যোগ করা বিধেয় ।
শিষ্য।
আপনার আদেশই পালন করিব।
তােমার কথায় সুখী হইলাম।
শিষ্য। যােগশব্দের অর্থ কি?
গুরু। মিলন ।
শিষ্য। মিলন।
গুরু। মিলন বৈকি। যদি বলি দুই আর দুই এ মেগ দিলাম,
তাহা হইলে কি বুঝিবে ?
শিষ্য। বুঝিবে যে চার হইল ।
কেন হইল ?
শিষ্য। দুই আর দুয়ে মিলিয়া চার হইল ।
গুরু। তাহা হইলে দেখ, মিলনই যােগ ।
শিষ্য। আজ্ঞে, ঠিকই বটে! যে যােগের দ্বারা যােগা হওয়া
যায়, তাহাও কি মিলন ?
গুরু। মিলন বৈকি।
শিষ্য। আমাকে বুঝাইয়া দিন।

যােগ ও সাধনা
আত্মা ও পরমাত্মার ( ব্রহ্মের) মিলনের নামই যােগ।
শিষ্য। এই মিলন কিরূপে হয় ?
গুরু। তাহা, এক কথায় একদিনে বুঝাইবার নহে।
সাধারণভাবে বলা যায়, চিত্তবৃত্তিনিরােধের নাম যােগ।
শিষ্য। চিত্তবৃত্তিনিরােধ কি ?
গুরু। তাহাই তােমাকে ক্রমশ: বলিব। এই চিত্তবৃত্তিনিরােধ
বুনিলেই যােগ কি, তাহা তুমি সম্যক্ প্রকারে বুঝিবে। যােগের
আটটি স্তর আছে।
শিষ্য। কি কি ?
গুরু। যম, নিয়ম, স্বপ্যায়, আসন, প্রাণায়াম, ধ্যান, ধারণা ও
সমাধি। ইহাকেই অষ্টাঙ্গ যােগ বলে ।
শিষ্য। এইগুলি না হইলে যােগ সম্পন্ন হয় না ?
প্রথমে যম অভ্যাস করিতে হইবে; যমে অভ্যস্ত
হইলে নিয়ম ; তাহার পর স্বাধ্যায়, ক্রমে আদন, প্রাণায়াম, ধ্যান,
ধারণা। এই সকলে অভ্যস্ত হইলে তবে সমাধিলাভ ঘটে
সমাধিই যোগের চরম অবস্থা অর্থাৎ তখনই আত্মার সহিত
পরমাত্মার মিলন হয় । তখন সাংকের যে পরমানন্দ লাভ হইয়া
থাকে, তাহার নিকট বিধাতার সৃষ্ট সকল বস্তুই তুচ্ছ, এমন কি,
বৈকুণ্ঠসও তখন তাহার হেয়ঃ বলিয়া মনে হয় না। সে সকল
কথা যথাস্থানে বলিব।
.শিষ্য। প্রথমে আপনি কোন্ বিষ বলিবেন ?
গুরু। যম ;
যম; কেন না, যম না বলিলে নিয়ম ঠিক বুঝিবে না
অথৰ ইহাতে ক্ৰমভঙ্গ হইবে।
শিষ্য। ক্রমভঙ্গ হইবে কেন?

১১
যোগ ও সাধনা
ধাপে ধাপে উঠাই নিয়ম। লাফাইয়া অন্য ধাপে উঠিতে
হইলে যে ধাপটি পড়িয়া থাকিবে, সে বিষয়ে কোন জ্ঞান হইবে না।
আর সে জ্ঞান না হইলে উহা অসম্পূর্ণ রহিয়া যাইবে। অসম্পূর্ণ জ্ঞানে
ঠিকমত ফললাভ হয় না, কিংবা উহাতে একেবারেই ফললাভ সম্ভব নহে।
শিষ্য । আপনি যাহা বলিবেন, তাহা কি আপনার কথা, না
ঋষিবাক্য?
গুরু। আমি কে ? ঋষিরা যাহা প্রত্যক্ষ সিদ্ধি দ্বারা বলিয়াছেন
এবং আমি গুরুর কৃপায় তাহা যতদূর বুঝিয়াছি, তাহাই তােমাকে
যথাজ্ঞান বলিব । তবে মনে রাখিও, আমি মানব, আমার ভয়-
প্রমাদ অব হাবী । আর এক কথা, যােগ সম্বন্ধে অনেকে
অনেক কথাই বলিয়াছেন; সকলের সকল মতের আলােচনার
প্রয়ােজনও নাই এবং তাহা সম্ভব ও নহে। তবে যে গুলি প্রার
সকলেরই অভিমত, তাহাই আমি তােমাকে বলিব।
• শিষ্য। ঋষিরা ত সব সংস্কৃত ভাষাতেই তাহাদের অভিমত,
প্রকাশ করিয়াছেন আপনিও কি তাহাই করিবেন ?
একথা জিজ্ঞাসা করিতেছ কেন?
আমার সংস্কৃতে তাদৃশ দখল নাই, তাহা ত আপনি
জানেন।
আমি বাঙ্গালাতেই সব বিষয় তােমাকে বলিবার চেষ্টা
তবে কখন। কখন দুই একটি সংস্কৃত প্রয়ােগ করিবার
আবশ্যক হইতে পারে; তবে তাহাতে বক্তব্য বিষয় ভারাক্রান্ত
হইবে না, এ ভরসা তােমাকে আমি দিতে পারি।
বলিয়া গুরু একটু হাস্য করিলেন ।
গুরুর হা দেখিয়া শিষ্য কিছু লজ্জিত হইলেন।
শিষ্য।

যােগ ও সাধনা
-নাই।
তাহা দেখিয়া গুরু বলিলেন, “ইহাতে লজ্জিত হইবার কিছুই
যে যুগে সকল ব্রাহ্মণ-সন্তানই সংস্কৃত
সংস্কৃত জানিতেন, এটা যে
সে যুগ নহে, তাহা আমি জানি। আর পানি বলিয়াই বাঙ্গাল
তামায় আমার বক্তব্য বলিব। আর এক কথা, যে ভাৰ সকলে
ঝে না, সে ভাষায় কোন কিছু বলা বিড়ম্বনা মাত্র এক হাতে
বলিবার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয় না। যাহা সকলে বুঝিবে না, তাহা
বলিয়া লাভ কি?
শিষ্য। আপনি যথার্থই বলিয়াছেন।
রু। তােমাকে এখন এখানে কিছুদিন অবশ্যই থাকি হইবে ।
শিষ্য। থাকিবার মানস লইয়াই আপনার নিকট আসিপ্লাহি।
গুরু। খুব আনন্দের কথা, এখানে গৃহ লােকের
আহাৰ্য্যের একান্তই অভাব। হয়ত তােমার খুবই অসুবিধা হইবে ।
শিষ্য। সে কি কথা! আপনার প্রসাদ পাই, তাহাতে
অসুবিধার কি থাকিতে পারে ! পূর্বজন্মে কত ভাগ্য করিয়াছি, তাই
উপযুপরি আপনার প্রসাদ গ্রহণ ঘটবে।
তুমি এখন বিশ্রাম কর। আমি এখন ছাত্রদিগকে
পাঠ দিব। প্রত্যহ সন্ধ্যার পর তােমার সহিত রােগ সম্বন্ধে
আলােচনা
করিব।
যম নিয়ম প্রভৃতি আটটি জামিলেই যােগ
সম্বন্ধে তুমি সকল কথা জানিবে ; কেন না, প্রসঙ্গক্রমে
কথাই আসিয়া পড়িবে ।
বলিয়া তত্বভূষণ মহাশয় গাত্রোখান করলেন।
১
অনেক

প্রথম অধ্যায়
-C**C:—
তোমাকে পূহ বলিহি, অষ্টাঙ্গ যােগ।
তাহ কি,
তোমার মনে আছে ?
শিষ্য।
আজ্ঞা, হ্যা।
সে গুলির নাম বল ?
শিষ্য। ম, নিয়ম, স্বাধ্যায়, আসন, প্রাণায়াম, ধ্যান, ধারণা
ও মাৰি ।
এখন আমাদের প্রথম আলােচ্য বিষয়-যম।
ভগবান
মনু বলেন, ম পাঁচ প্রকার। অহিংসা, সত্যবাক্য, ব্রহ্মচর্য্য, অকস্থত।
*
এবং অয়ে।
শিষ্য। এগুলির অর্থ বুঝাইয়া দিন।
ইহা বুঝাইয়া দিবার পূর্বে যমসম্বর্গে আর কোথায় কি
বলা হইয়াছে, তাহা জানিতে কি তােমার ইচ্ছা হয় না?
শিষ্য । হয় বৈকি। আমি ত জানি না, আপনি বলুন।
তবে ব্যস্ত হইও না। গরুড়পুরাণের ১৩ অধ্যায় আছে,
যম পাঁচ প্রকার, কিন্তু মনুর সঙ্গে কিছু প্রভেদ তাহাতে দেখা যায়।
শিষ্য। কি প্রভেদ ?

'যােগ ও সাধনা
১৪
গুরু। বলিতেছি। অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য এবং
অপরিগ্রহ। ইহাতে মনু-কথিত লক্ষণ ছাড়া যেমন একটি নূতন
কথা পাওয়া গেল—অপরি গ্রহ, তেমনি একটি কথা বাদ পড়িল,
সেটি অকল্প হা। বুঝিয়াছ?
শিষ্য। আজ্ঞা, হঁ্যা।
গুরু। গরুড়পুরাণের অধ্যায়ে আছে,
আছে, যম
দশবিধ।
যথা, ব্রহ্মচর্য, দয়া, ক্লান্তি, ধ্যান, সত্যকথা, অকতা, অহিংসা,
অস্তেয়, মাধুৰ্য্য এবং দম।
শিষ্য। তবেই ত খুব বড় গােল বাধিল । একই বিষয়ে একজন
বলিলেন পাঁচ, আবার একস্থানে পাচই বলা হইল বটে, কিন্তু
এই উভয় পাঁচে সম্পূর্ণ মিল নাই। আবার মধু বলিলেন, দশ ।
ইহার কোটা গ্রহণ করিব ?
(ঈষৎ হাসিয়া ) সকলগুলিই গ্রহণ করিবে।
শিষ্য। সে কি কথা! ইহা যে প্রলাপের মত ।
গুরু। আপাতদৃষ্টিতে তাহাই বােধ হয় বটে;
কিন্তু একটু
প্রাণিধান করিলেই বুঝিতে পারিবে, ইহা প্রলাপ ত নয়ই; অধিকন্তু
এই নিয়মের বিশেষ প্রয়ােজন আছে।
শিষ্য। আমি বুঝিতে পারিতেছি না, আপনি বুঝাইয়া বলুন।
গুরু। ইহাতে বিশেষ বিছু বুঝাইবার নাই। এক কথায়
বলি, শােন। এই যে সম্মুখে বড় তালগাছটা রহিয়াছে, তুমি
উহাতে উঠিতে পার ?
শিষ্য। ( বিস্মিত হইয়া):আজ্ঞে, না।
শিষ্য। কখন ওরূপ অভ্যাস করি নাই।

যােগ ও সাধনা বেশ। আচ্ছা, ঐ পেয়ারাগাছে উঠিতে পার ? শিষ্য। তা বােধ হয় পারি। গুরু। কেন পার ? শিষ্য। ছােটগাছ, ওঠা তেমন শক্ত নহে। গুরু। ইহাও তেমনই জানিবে । তােমার শক্তি কম ও অভ্যাস নাই, তাই তুমি তালগাছে উঠিতে পার না; কিন্তু ছােট বলিয়া পেয়ারাগাছে উঠিতে পার।—সেই রকম প্রথম পাঁচ প্রকার যমে অভ্যস্ত হইলে পরে ঐ দশ প্রকার যম আয়ত্ত করা কঠিন হইবে অর্থাৎ যখন এই পাঁচ প্রকার যম অভ্যাস দ্বারা তুমি শক্তি- লাভ করিবে, তখন ঐ দশ প্রকার যম অভ্যাস করা তােমার পক্ষে কঠিন হইবে না। বুঝিলে? শিষ্য। আজ্ঞা, হঁ্যা, বুঝিয়াছি। কিন্তু একটা কথা ? * শিষ্য। যদি কেহ দশ প্রকার যম আয়ত্ত করিতে না পারে, তবে কি তাহার যােগাভ্যাস হইবে না ? গুরু। না, তাহা নহে। যে যাহার শক্তি অনুসারে নিয়ম- গুলি পালন করিলে সিদ্ধিলাভ করিবে। শিষ্য। অহিংসা প্রভৃতির অর্থগুলি এখন বলুন । গুরু। তাহা একে একে বলিতেছি, শ্রবণ কর। অহিংসা শব্দের অর্থ কায়িক, মানসিক বা বাচিক অর্থাৎ দেহ, মন ও বাক্যের দ্বারা হিংসা না করা। এক কথায় যাহাতে কাহারও কোন অপকার না হয়, তাহাই পালন করা। মনকে এরূপভাবে প্রস্তুত করিতে হইবে যে, কিছুতেই তাহা যেন বিচলিত না হয়। শহিংসার পর সত্যবাক্য, সদা সত্যকথা বলিবে এবং সত্য

যোগ ও সাধনা
ব্যবহার করিবে। কারণ, সত্যের তুল্য অন্য বল্প নাই। ঋষিরা
বলিয়াছেন, যদি পাল্লার
পাল্লার একদিকে সহস্র অশ্বমেধ-যজ্ঞ রাখিয়া
অপর দিকে সত্য দ্বারা
দ্বারা পরিমাণ করা যায়, তাহা হইলে সত্যই
বেশী হইয়া থাকে। সত্যই মহত্ব।
শিষ্য। ব্যবহারিক সত্য কিরূপ?
গুরু। অর্থাৎ আমি যাহা নহি, তদ্রপ প্রমাণ করিবার চেষ্টা।
যেমন আমি বিনয়ী নই, অথচ বিনীতের ব্যবহার।
শিষ্য। বুঝিয়াছি, নিজের স্বরূপ গােপন করা।
গুরু। ঠিক বলিয়াছ। তাহার পর
অর্থ চুরি করা ন+ন্তেয় অন্তেয়। অর্থাৎ চুরি না করা।
যেরূপ অবস্থাতেই পতিত হও না কেন, কিছুতেই কাহারও জিনিষ
অপহরণ করিবে না।
শি। তবে যে শুনিয়াছি, মনু বলিযাছেন, তিনদিন যদি অল্প না
জুটে ব্রাহ্মণ ব্যতীত অপর লােকের ধন অপহরণে দোষ নাই ?
শুরু। ঠিকই শুনিয়াছ।
শি। কিন্তু আপনি বলিতেছেন, কোন অবস্থাতেই অপহরণ
করিবে না, তাহা হইলে ত মনুর সহিত বিরােধ উপস্থিত হয়।
গুরু। না, বিরােধ হয় না; কেন না, মনুর সে বিধি গৃহীর
পক্ষে, যোগীর পক্ষে নয়। আমরা বুঝিবার ভুলে অনেক বিষয়
গােল করিয়া ফেলি। কোন্ প্রসঙ্গে কাহাদের জন্য শাস্ত্রকার
কি নিয়ম গঠন করিয়াছেন, তাহা অনুধাবন করিয়া না দেখিয়াই
একটা কথার অর্থ সর্বত্র খাটাইতে যাই, ইহাতেই গোল বাধে।
শিষ্য। ঠিক বটে। আমার এত কথা জানা ছিল না।

১৭
'
ও সাম
শিষ্য।
:
নিষেধ আছে, সকল বিষয় সম্পূর্ণরূপে অবগত না হইয়া কোন
কথা কহিবে না ।
শিষ্য। অামার চঞ্চলতা মার্জনা করুন।
গুরু। না, না। তােমার কোন দোষ নাই। তুমি জিজ্ঞা,
তােমার প্রশ্নে কোন দোষই ঘটিতে পারে না।
অস্তেয়ের পর ব্রহ্মচর্য্য। এইবার তাহাই বলুন।
গুরু। ব্রহ্মচর্য সম্বন্ধে স্থানান্তরে বলিয়াছি। এখানে অতি সংক্ষেপে
ৰলিব। ব্রহ্মচর্য পালন অর্থে বীৰ্য্যধারণ। মনীষীরা বহিয়াছেন,
ব্রহ্মচর্য পালনেচ্ছু ব্যক্তিরা আট প্রকার স্বীসম্পর্ক পরিহার করিবে।
শিষ্য। সেই আটপ্রকার কি কি ?
গুরু। স্মরণ, কীর্তন, কেলি, প্রেক্ষণ, ওভাষণ, সংক,
অধ্যবসায় এবং ক্রিয়ানিষ্পত্তি ।
শিষ্য। এগুলি ব্যাখ্যা করিয়া বুঝাইয়া দিন।
স্ত্রীলােকের কথা মনে মনে আলােচনা ; তাহাদের
সম্বন্ধে পরস্পর কথা কওয়া ; স্ত্রীলােকের সহিত মেলামেশা করা;
তাহাদের দিকে সকাম দৃষ্টি নিক্ষেপ করা ; এলােকের সহিত
গােপনে আলাপ; তাহাদের সহিত মিলিত হইবার ইচ্ছ; সেই বিষয়ে
চেষ্টা বা বড় এবং সহবাস। এই আট প্রকার ব্যাপার হইতে
মনকে প্রতিনিবৃত্ত করিতে পারিলেই ব্রহ্মচর্য পালন করা হয়। এই
তােমাকে চারিটির কথা বলা হইল; মাত্র পঞ্চমটিই বাকি।
শিষ্য। পঞ্চম অপরিহ। ইয়াৰ তাৎপৰ্য,..
গুরু। কাহারও নিকট িগ্রহণ না করা অর্থাৎ কিই
কাহারও নিকট কিছু গান গ্রহণ করিবে না।
শি। যদি আমার কিছু না থাকে, তা হলে কি কৰিব?

না বলিয়া লইলে চুরি করা হইবে, আর বলিয়া লইলে প্রতিগ্ৰহ হইবে, তবে বাচিব কি করিয়া ? গুরু। “অদৃষ্টার্থত্যক্তদ্রব্য স্বীকারঃ পতিগ্ৰহঃ।” অর্থাৎ যেখানে কেহ সঙ্কর-পূৰ্ব্বক পরলােকের কল্যাণ-কামনায় দান করে, তাহাই গ্রহণ করাকে প্রতিগ্ৰহ বলে। সুতরাং ভিক্ষাকে পরি গ্রহের মধ্যে না ফেলাও চলে। মূলতঃ এই কথা হইলেও যতদূর সম্ভব কাহারও নিকট কিছু না হওয়াই ভাল, কেন না, যােগ হইতেছে চিত্ত- বৃত্তিকে সংযত করা। ইহাতে যতখানি পারা যায়, স্বাবলঙ্গী হওয়া কর্তব্য। এই তােমাকে গরুড়পুরাণের মতে পাঁচ প্রকার যমের কথা বলা হইল এবং মর মত চারি প্রকারের বলা হইল। মনু একটি কথা অধিক বলিয়াছেন। তাহা “অকল্কতা” । অর্থে দণ্ডহীনতা, কিম্বা পাপশূন্যতা অর্থাৎ দাম্ভিক কি পাপপরায়ণ হইবে না। সর্বদা পুণ্যাচার পালন করিবে। শিষ্য। গরুড়পুরাণের ১০৫ অধ্যায়ে যে দশবিধ যমের কথা বল হইয়াছে, তাহা এইবার বলুন। গুরু। বলি। তাহাতে বলা হইয়াছে, ব্রহ্মচর্য, দয়া, ক্লান্তি, ধ্যান, সত্যকথা, অকল্কতা, অহিংসা, অন্তেয়, মাধুৰ্য, এবং দম। ইহার মধ্যে ব্রহ্মচর্য, সত্যকথা, অকল্কতা, অহিংসা, েেয়র কথা পূর্কে বলা হইয়াছে। বাকি রহিল দয়া, শান্তি, ধ্যান, মাধুৰ্য্য ও দম—এই পাঁচটি । শিষ্য। একে একে এইগুলি বুঝাইয়া দিন। গুরু। শােন। দয়া অর্থে করুণা। তবে শাস্ত্রে ইহার তিন প্রকার নির্দেশ আছে। শি। সেইগুলি কি ?

১৯
গুরু। পদ্মপুরাণে বলা হইয়াছে, যত্নের সহিত পরদুঃখ-নাশ
করিবার আপনা হইতে যে ইচ্ছা হৃদয়ে উদয় হয়, তাহাই দয়া ।
সেই স্থানে আরও বলা হইয়াছে যে,
বলা হইয়াছে যে, সকল প্রাণীকে নিজের
মত যে দেখে এবং লােককল্যাণের নিমিত্ত হৃদয়ের যে বৃত্তি,
তাহাই দয়া।
একথা মৎস্যপুরাণেও আছে, বুঝিয়াছ?
শিষ্য। আজ্ঞা, হঁা, বুঝিয়াছি। তৃতীয়টি কি?
গুমু। একাদশীতত্ত্বে আছে, অপর ব্যক্তিতে, বন্ধুগণে এবং
শত্রুতে যে আপনার মত ব্যবহার, তাহাই দয়া । তাহা হইলে
বুঝ, দয়া কাহাকে বলে।
শিষ্য। এত বড় মহৎ কথা! আমরা মুখে দয়া দয়া বলি ;
কিন্তু দয়ার অর্থ যে কি ? তাহা ভাবিয়া দেখি না।
গুরু। এইবার ক্রান্তির কথা। কান্তি অর্থে ক্ষমা ।
কমা, বলিলেই ঠিক হইবে না; কেন না, যাহাকে দমিত করা
হয় না, তাহাকে আমরা সাধারণতঃ বলিয়া থাকি, “যাও, তােমাকে
ক্ষমা করিলাম।” কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাহাকে কি কমা বলে ?
-ন', তাহা ক্ষমা নয়, একটা আত্মপ্রবঞ্চনা মাত্র ; কারণ,
আমার শক্তি নাই যে তাহাকে দণ্ডদান করি, তাই বলি যে,
ক্ষমা করিলাম।
তবে ক্ষমা কি ?
গুরু। ক্ষমতা থাকিলেও অপকারীর অনিষ্ট না করা। ধ্যান
অর্থে ব্রহ্মের চিন্তা।
শিষ্য। এইবাৰ মাধুৰ্য কি বলুন।
গুরু। মধুর ব্যবহার অর্থাৎ প্রত্যেকের সহিত এরূপ ব্যবহার
করিতে হইবে, যাহাতে কেহ মনে দুঃখবােধ না করে।
শিষ্য।

যােগ ও সাধনা
২০
শিষ্য। দম অর্থে কি বুঝিব?
গুরু। তপঃক্লেশসহিষ্ণুতা।
শিষ্য। ঠিক বুঝিতে পারিলাম না।
তপস্যা করিতে হইলেই ক্লেশ অবশ্যম্ভাবী। সেই ক্লেশকে
অম্লানবদনে সহ্য করার নাম দম ।
শিষ্য। তাহা কিরূপে হইবে ?
বাহেন্দ্রিয় সকলকে নিগ্রহ অথং সংযত করা, একথ
বেদান্তসারে আছে। আবার কেহ কেহ বলেন, বিষয় হইতে
যাহার মন দূরে গিয়াছে, তাহার সেই মনকে ইচ্ছামত যে কোন
কাৰ্য্যে বিনিয়ােগ করা। এক কথায় অনাসক্ত হইয়া কৰ্ম্মসম্পাদন
করাকেই দম বলা যাইতে পারে। যােগাভ্যাসের প্রথম স্তর যম।
এই যম যখন আয়ত্ত হইবে, তখন দ্বিতীয় স্তর নিয়ম পালন
করিতে হইবে। এক একটি সােপান অতিক্রম করিয়া যেমন দ্বিতলে
উঠিতে হয়, সেইরূপ অষ্টাঙ্গ যােগের এক একটি স্তর অতিক্রম
করতঃ যােগের শেষ অবস্থা সমাধিত উন্নীত হইতে হয়
তোমাকে আমি যমের কথা
কথা বলিলাম। আগামী কল্য নিয়মের
কথা বলি।

দ্বিতীয় অধ্যায়
নিয়ম ও দধ্যায়
।
শিষ্য । আপনি আজ নিয়মের কথা বলিবেন বলিয়াছেন।
গুরু। হঁ্যা, বলিব নিয়ম দশ প্রকার।
শিষ্য। কি কি ?
গুরু। তপঃ, সন্তোষ, আস্তিকা, দান, দেবপূজা, সিন্ধান্তশ্ৰবণ,
শ্রী, মতি, জপ ও আহুতি। এইগুলি পালনের নাম নিয়ম।
শিষ্য। এইগুলি বুঝাইয়া বলুন।
গুরু। বলিতেছি। তপঃ অর্থাৎ তপস্যা।
শিষ্য। তপস্যা কাহাকে বলে।
গুরু। শাস্ত্রসম্মত দৈহিক ক্লেশজনক যে কষ্ট, তাহাকেই
তপস্যা বলা হয়। তপস্যা আবার তিন প্রকার ।
শিষ্য। তাহা কি কি ?
গুরু। শারীর, বাচিক এবং মানস ।
শিষ্য। শারীর তপঃ কাহাকে বলে ?
গুরু। দেবতা, ব্রাহ্মণ, গুরু ও প্রাঙ্গণের
পূজা, শৌচাচার,
সত্যকথন, ব্রহ্মচর্য এবং অহিংসা—এই সকল শারীর তপঃ।
শিষ্য। বাচিক তপঃ কি ?
গুরু। কাহাকেও অহিতকর বাক্য না বলা, সত্য ও প্রিয়বাক্য
বলা এবং নিজ বেদবিহিত অধ্যয়ন।

যােগ ও সাধনা
শিষ্য। মানসিক তপস্যা কি ?
মনের আহলাদজনক কাৰ্যসম্পাদন, মোনতা, সৌমত্ব,
আত্মনিগ্রহ এবং ভাবসংশুদ্ধি, ইহাকেই মানসিক তপস্যা বলে ।
ইহারও আবার প্রকারভেদ আছে।
শিষ্য। তাহা কি ?
গুরু। সাত্ত্বিক, রাজসিক ও তামসিক।
শিষ্য। সাত্ত্বিক তপস্যা কাহাকে বলে?
শ্রদ্ধার সহিত ফলকাঙ্গাশূন্য হইয়া যে যে তপ
আচরণ করা হয়, তাহাকে সাত্ত্বিক তপস্যা বলে ।
শিষ্য। রাজসিক কি?
দন্তের সহিত সৎকার মান পূজার্থ যে তপস্থা, তাহ
র,জসিক এবং অপরের অনিষ্টসাধনের উদ্দেশ্যে ও মূঢ়তাপ্রযুক্ত
অকারণ আত্মপীড়া উৎপাদন পূৰ্ব্বক তপস্থার নাম তামসিক।
শিষ্য। তপস্যার পর সন্তোষ। সেই সন্তোষ কাহাকে বলে ?
গুরু। সৰ্ব্বদা সন্তুষ্ট থাক। অর্থাৎ যখন যে অবস্থাই উপস্থিত
হউক না কেন, তাহাতে দুঃখিত না হওয়া। কেন না, সন্তোষ না
থাকিলে কেহই সুখী হইতে পারে না। যদি তােমাকে রাজা করা
যায়, তবে তুমি সম্রাট হইতে
হইতে চাহিবে, সম্রাট করিলে
চাহিবে-এইভাবে পর পর আভিক্ষা বাড়িয়াই চলিবে। আর
যদি তুমি সন্তুষ্ট থাক, তবে তােমার অভাব আসিতেই পারে না,
আর অভাব না থাকারই নাম সুখ। সুতরাং সন্তোষলাভ করা
একান্ত আবশ্যক, তার পর আস্তিক্য।
শিষ্য। আস্তিক্য অর্থে কি বুঝিব?
গুরু। যাহারা ঈশ্বর ও বেদে বিশ্বাসবান, তাহারাই আস্তিক।

যােগ ও সাধনা
সেই বুদ্ধি থাকার নাম আস্তিক্য। ঈশ্বরে বিশ্বাস ভিন্ন জগতে
কোন কিছুই সংসাধিত হয়
সংসাধিত হয় নাই, তাই এখানে আস্তিকতার
কথা বলা হইয়াছে।
শিষ্য। আস্তিকের দান। দানের অর্থ খুবই সহজ।
কিন্তু যাহার ধন নাই, সে দান করিবে কিরূপে?
গুরু। তুমি দানের 'অর্থ বুঝিতে পার নাই। ধনদান অব
দানেরই পৰ্যায়ভুক্তৃ; কিন্তু ধনদান ব্যতীত আরও জগতে এমন
কিছু দান করিবার আছে, যাহার কাছে ধন অতি তুচ্ছ ।
শিষ্য।
তাহা কি ?
জ্ঞান ও বিদ্যাদান। এ দানের তুলনা নাই। ত্যতীত
অভয়দান, আশ্রয়দান প্রভৃতিও কম বস্তু নয়। অবশ্য সাধারণ বিষয়ী
লােক দান অর্থে ধনদানই বুঝিয়া থাকেন; কিন্তু মনীষীরা দান
অর্থে জ্ঞান ও বিদ্যাদানই বুঝিয়া থাকেন।
শিষ্য। আজ্ঞে, আমরা মৃঢ়, তাই ঐরূপই বুঝিয়া থাকি।
গুরু। না, না ; তােমার ইহাতে লজ্জিত হইবার কিছুই
নাই । দেশের আবহাওয়া বর্তমানে যেরূপ হইয়াছে, পারিপার্শ্বিক
অবস্থা যেরূপ দাড়াইয়াছে, তাহাতে এরূপ ভাব অন্যায় বলিয়া মনে
হয় না। থাক্‌, তাহার পর দেবপূজা। আশা করি, দেবপূজার
অর্থ বুঝাইয়া দিতে হইবে না।
আজ্ঞে, তাহাই ত মনে হয়। তবে আমাদের জ্ঞান
নাই, তাই শঙ্কা হয় ।
গুরু। দেবপূজার অর্থ কোন ব্যাখ্যা করিবার প্রয়ােজন নাই।
কুলক্রমাগত দেবতার পূজা এখানে বুঝিতে হইবে এবং তৎসহ যতদুর
সম্ভব অন্যান্য দেবদেবীর পূজা। দেবপূজার পর সিদ্ধান্ত-শ্রবণ।
শিষ্য।

যােগ ও সাধনা
২৪
শিষ্য। সিদ্ধান্ত-শ্রবণের অর্থ বুঝিলাম না।
গুরু। শারে আলােচনার দ্বারা জ্ঞানিগণ যে সিদ্ধান্তে উপনীত
হইয়াছেন, তাহাই শ্রবণ।
শিষ্য। ইহার কি বিশেষ প্রয়ােজন আছে ?
গুরু। আছে বৈকি। কেহ নিখিল শাস্ত্র অধ্যয়ন করিতে
পারে না, বা পারা সম্ভবও নহে; কিন্তু চেষ্টা করিলে সিদ্ধান্ত
কথা শুনিয়া তদনুসারে কাৰ্য্য করিতে পারে, তাই সিদ্ধান্ত-শ্রবণের
কথা। বুঝিয়াছ?
শিষ্য। আজ্ঞা, হাঁ, বুঝিয়াছি। তাহার পর হী। হী অর্থে
কি বুঝিব?
শুরু। স্ত্রী মানে লজ্জা। লজ্জাই
মানুষের ভূষণ। লজ্জাহীন
মানুষ পশুর তুল্য, লজ্জাই মানুষকে মনুষ্যত্বে প্রতিষ্ঠিত করে, তাই
লজ্জার কথা এখানে বলা হইয়াছে।
শিষ্য। মতি কাহাকে বলে?
গুরু। মতি শব্দে বুদ্ধি। অনুশীলন ব্যতীত অন্যান্য বস্তুর
ন্যায় বুদ্ধিরও বিকাশ হয় না। তাই এখানে মতির কথা বলা
হইয়াছে। তাহার পর জপ।
শিষ্য। জপ কাহাকে বলে?
গুরু। বলিতেছি। এই জপের কথা কিছু বিস্তৃতভাবেই
বলিতে হইবে; কেন না, জপই যােগের একটি প্রধান বস্তু ।
ডান হাতের অঙ্গুলীতে সংখ্যা রাখিয়া ভগবানের নাম করাকেই
জপ বলা যায়। বিধিপূৰ্ব্বক মন্ত্র উচ্চারণের নামই জপ।
শিষ্য। এই বিধি কি ?
গুরু। বলিতেছি, শ্রবণ কর। নির্জন স্থানে তাশূন্য হই

যােগ ও সাধনা মনে মনে মন্ত্রোচ্চারণ করিতে হইবে; দক্ষিণ হন্তেয় অঙ্গুলীপ- মধ্যে অঙ্গুষ্ঠ দ্বারা জপ করিবে এবং বামহন্তে সংখ্যা রাখিবে । শিষ্য। দক্ষিণ হস্তেও যে পৰ্ব আছে, বামহস্তেও তাহাই। কিন্তু তাহাতে আর কত সংখ্যা রাখা সম্ভব ? এক শতের অধিক নহে। যেখানে বেশী সংখ্যা রাখিবার আশ্যক হইবে, সেখানে উপায় কি? গুরু। উপায় আছে বৈ কি। সেখানে একশত জপ হইলেই শত সংখ্যার কোন নিদর্শন রাখিলেই তাহা নির্ণয় করা যাইবে। সেই নিদর্শনের প্রত্যেকটিতে শত-সংখ্যক জপের প্রমাণ পাওয়া যাইবে এবং মােট সংখ্যার পরিমাণও বুঝা যাইবে । শিষ্য। এই নিদর্শন কি যে কোন বস্তুতেই হইতে পারিবে, না, তাহার কোন বিধি আছে ? শুরু। যে কোন বস্তুর দ্বারা হইবে না এবং বস্তুর তারতম্যে ফলের তারতম্যও ঘটিয়া থাকে। শিষ্য। কোন বস্তুর দ্বারা নিদর্শন রাখিবে? গুরু। মুক্তা, প্রবাল, রুদ্রাক্ষ ও স্ফটিক দ্বারা নিদর্শন রাখিবে। আবার যদি সােণা, রত্ন, মণি দ্বারা সংখ্যা রাখা যায়, তবে শতগুণ এবং ভদ্রাক্ষ বা রুদ্রাক্ষ দ্বারা সংখ্যা রাখিলে অযুত গুণ ফললাভ ঘটিয়া থাকে। শিষ্য। মন্ত্রোচ্চারণের বিধি কি ? শুরু। বিষয়বাসনা মন হইতে দূরে পরিহার করিয়া মন্ত্রে একাগ্রচিত্ত হইতে হইবে এবং অত্যন্ত দ্রুত কিম্বা অত্যন্ত ধীরে -মন্ত্রোচ্চারণ করিবে না। মুক্তার মালার মত এক একটি মন্ত্র উচ্চারণ করিবে। জপ আবার তিন প্রকার। শিষ্য । কি কি ?

যােগ ও সাধনা গুরু। বাচিক বা অক্ষরাবৃত্তি, মানস ও উপাংও। শিষ্য। এই তিনটী বুঝাইয়া দিন। গুরু। সাধারণভাবে জপ করার নাম অক্ষরাবৃত্তি বা বাচিক জপ বলা হয়। বর্ণ, স্বর ও পদের অর্থ বুদ্ধি দ্বারা গ্রহণ করতঃ যে জপ, তাহাকে মানস বলে এবং দেবগত চিত্ত হইয়া জিহ্বা ও ওই দ্বারা অল্পমাত্ৰ শ্ৰবণযােগ মন্ত্র উচ্চারণ করতঃ যে জপ, তাহাকে উপাং জপ বলে। আবার মাত্র জিহ্বা দ্বারা মন্ত্রোচ্চারণ পূর্বক জপাকে জিজপ ফলে। এই সকল জপানুসারে ফলের ও তারতম্য ঘটিয়া থাকে! জপের সময় কতকগুলি বিষয় পরিহার করাই নিয়ম। শিষ্য। কি কি পরিহার করিতে হইবে ? মূত্র ও মলত্যাগের যদি আশঙ্কা থাকে, তবে তখন জপ করিতে বসিবে না। এরূপ অবস্থায় জপ করিলে জপের ফললাভ, হয় না। জপের সময় মায়লা কাপড় পরিয়া থাকিবে না, কেশে ও যেন ধূলি প্রভৃতি না থাকে, এবং মুখেও দুর্গন্ধ না থাকে। এরূপ অবস্থায় জপ ও করিলে দেবতা প্রসন্ন হওয়া দূরে থাকুক, তিনি বিরূপ হইয়া থাকেন। আর ও, জপের সময় আলস্য, হাইতােলা, নিদ্রা, হাঁচি, থু ফেলা, নিম্নাঙ্গস্পর্শ এবং ক্রোধ ত্যাগ করিবে। শিষ্য। আপনি পূৰ্বে বলিয়াছেন, দক্ষিণহস্তের পর্বে জপ করিতে হইবে। ইহা কি প্রকার তাহা বুঝাইয়া বলুন। গুরু। বলিতেছি। তাহার পূর্বে তুমি বল, প্রত্যেক অঙ্গুলীতে কয়টি করিয়া পৰ্ব আছে ? শিষ্য। প্রত্যেক অঙ্গুলীতে তিনটি করিয়া মােট বাটি পৰ্ব আছে। গুরু। বেশ। তবে শুন, অনামিকার মধ্যপর্ব হইতে জপ ২৭ যােগ ও সাধনা আরম্ভ করিয়া ক্রমশ কনিষ্ঠার মূল হইতে উপর দিকে উঠিয়া প্রত্যেক অঙ্গুলীর সর্বোচ্চ পৰ্ব দিয়া একেবারে তর্জনীর মূলে গিয়া: জপ শেষ হইবে। ইহাতে মধ্যমাঙ্গুলীর দুই পর্ব বাদ পড়িল । ১২ হইতে দুই বাদ দিলে ১০ থাকে, সুতরাং এই নিয়মে প্রত্যেক বার দশ সংখ্যক জপ হইল। এই যে জপের নিয়ম বলা হইল, ইহা দেববিষয়ে জানিবে । শক্তিবিষয়ে পৃথক্‌ নিয়ম। শিষ্য। শক্তিবিষয়ে কি নিয়ম ? গুরু। ইহাতেও অনামিকার মধ্যপ আর করিয়া পূৰ্ব্ববৎ কনিষ্ঠার মূল দিয়া অষ্টকে লইয়া যাইয়া মধ্যম। হইতে নিম্নদেশে আসিবে এবং তর্জর মূলদেশে গিয়া শেষ হইবে ! দেববিষয়ে যেমন মধ্যমার দুই পর্ব বাদ পEে, বিষয়ে সেইরূপ তর্জনীর উচ্চ ও মধ্যপর্ব বাদ পড়িবে, এইমাত্র আবার শ্রীবিদ্যা-বিষয়েও কিছু প্রভেদ আছে। শিষ্য । সে কি রূপ ? গুরু। বিদ্যবিষয়ে মধ্যমার মূলদেশ হইতে জপ আরম্ভ করিয়া অনামিকার মূল হইয়া কনিষ্ঠার মূল হইতে ক্রমশঃ উর্দ্ধে উঠিয়া তর্জনীর মূলদেশ পর্যন্ত আসিতে হইবে। ইহা দ্বারা অনামিকার ও মধ্যমার মধ্যপূৰ্ব্বদ্বয় ত্যক্ত হইল। কোন কোন দেৰী বিষয়ে কিছু কিছু প্রভেদ আছে । যে যে বিষয়ে যে যে পৰ্ব বাদ পড়িল উহাকে মেরু বলে, মেরুদেশে নিষিদ্ধ। জপকালে অারও কতকগুলি নিয়ম আছে । শিষ্য। সে সব নিয়ম কি ? গুরু । অঙ্গুলী ফাক ফাক রাখিবে না এবং সকল অঙ্গুলী অভাগ কিছু বাকাইয়া রাখিবে। অঙ্গুলী ফাক করিয়া রাখিলে যােগ ও সাধনা ২৮ সেই ফাক দিয়া জপ গলিয়া পড়ে, তাই উহাতে ফল হয় না। অঙ্গলের রেখার উপরও জপ করিবে না, করলে সে জপ নিল হয় । গণনার বিধি উলঙ্ঘন করিয়া যে জপ করে, তাহার সেই জপ রাক্ষসরা গ্রহণ করে। হৃদয়ে হস্ত রাখিয়া এবং অকূলীগুলি বাকাইয়া কাপড় দ্বারা উভয় হস্ত ঢাকিয়া জপ করিবে। শিষ্য। আপনি জপসংখ্য রাখিবার জন্য সকল বস্তুর নির্দেশ করিয়াছেন, তাহা ত কলের পক্ষে সংগ্রহ করা সম্ভব তাহারা কি করিবে ? তাহারা কি জপ করিবে না। গুরু। তাও কি হয় ! শাকার এত নিৰ্ম্মম নয় । তাহারও বিধি আছে। শিষ্য। তাহাও বলুন। গুরু। লাক্ষা, কুষীদ, সিন্দুর, সিন্দুর, গােময় গেময় এবং করীষক—এই সকল দ্রব্য দ্বারা গুটিকা তৈয়ার করিয়া তাহার করিয়া তাহার দ্বারা জপসংখ্যা রাখিবে। চাল, পান, চন্দন বা মাটী--এ সকলের দ্বারা জপ- সংখ্যা রাখিবে না। তবে মটর প্রভৃতির দ্বারা রাখিতে পার। জপের অশেষগুণ। জপনিষ্ঠ ব্যক্তি নিখিল যজ্ঞের ফল লাভ করে ; জপের দ্বারা দেবতা তুষ্ট হন সকল কামনা সিদ্ধ করেন, এমন কি জপের দ্বারা মুক্তি পর্যন্ত লাভ হইয়া থাকে। জপনিষ্ঠ ব্যক্তির নিকট যক্ষ, রক্ষ, পিশাচ, গ্রহগণ এবং ভীষণ সর্পগণ ও ভয়ে অগ্রসর হইতে সঙ্কুচিত হয়। এই জন্যই জপের এত প্রশংসা। এই তােমাকে কথা মােটামুটি বলিলাম। জপ সম্বন্ধে অারও অনেক কথা আছে বটে, তবে এখানে তাহা আলােচ্য নহে। এইবার আহুতির কথা বলিলেই দশবিধ নিয়মের কথা সম্পূর্ণরূপে বলা হইবে।

যােগ ও সাধনা
শিষ্য । আহুতি কাহাকে বলে?
গুরু। দেবতার উদ্দেশ্যে মন্ত্রোচ্চারণ পুৰ্ব্বক-বিধিপূৰ্ব্বক স্থাপিত
অগ্নিতে ঘৃতনিক্ষেপ করাকে আহুতি বলে। ইহাকেই হোেম বলে।
এই তােমাকে দশবিধ নিয়মের কথা
নিয়মের কথা বললাম। অষ্টাঙ্গ যােগের
দুইটি অঙ্গ বলা হইল। তৃতীয় অঙ্গ স্বাধ্যায়।
শিষ্য। স্বাধ্যায় কাহাকে বলে ?
গুরু। নিজ নিজ বেদানুযায়ী অধ্যয়ন। অর্থাৎ যে ব্যক্তি যে
বেদের যে শাখার অন্তর্গত, তাহার পক্ষে সেই শাখা অধ্যয়ন।
ইহাকেই স্বাধ্যায়
বলে। তাহা হইলে তােমাকে যম, নিয়ম ও
স্বাধ্যায় বলা হইল। এইবার আসনের
আসনের কথা বলব। আজ এই
পয্যন্ত। আগামী কল্য আসনের কথা। আসনের কথা কিছু
বিস্তৃতভাবেই বলা হইবে। কেন না, আসন যােগের একটি
বিশিষ্ট অঙ্গ।

তৃতীয় অধ্যায়
আসন
শিষ্য। আজ আপনি আসনের কথা বলিলেন বলিয়াছেন।
গুরু। হ্যা, আমার তাহা স্মরণ আছে। তাহা ছাড়া অষ্টাঙ্গ
যােগের কথা বলিতে হইলে আসনের কথা আপনা হইতেই
আসিয়া পড়ে। আসন বহুবিধ। শিবসংহিতার মতে আসন
অসংখ্য, তাহার মধ্যে ৮৪টি প্রধান ; আবার ঐ ৮৪টির মধ্যে
১৪টি সর্বপ্রধান।
শিষ্য। ঐ চারিটি কি কি।
গুরু। বলিতেছি। কিন্তু এতদ্ব্যতীত ‘ঘের-সংহিতায়’ আসনের
কথা অন্যরূপ আছে।
শিষ্য। “ঘের-সংহিতা” কি বলিতেছেন?
গুরু। “ঘের-সংহিতা” বলিতেছেন, আসন জগতের প্রাণীর
তুল্য অর্থাৎ জগতে যত প্রকার প্রাণী আছে, আসনও তত প্রকার,
তাহার মধ্যে ৮০টির কথাই শ্রীসদাশিব বলিয়া গিয়াছেন , কিন্তু
মর্ত্যলােকে ৩২টি আসনই কল্যাণকারক। অর্থাৎ যােগসিদ্ধির
পক্ষে এই ৩২টি আসনই প্রশস্ত। আমি তােমাকে ঐ সকল
আসনের কথাই বলি।
শিষ্য। ঐ সকল আসনের নাম কি কি।
গুরু। সিদ্ধাসন, শাসন, ভদ্রাসন, মুক্তাসন, বাসন, স্বস্তি

যােগ ও সাধনা
কাসন, সিংহাসন, গােমুখাসন, বীরাসন,
বীরাসন, ধনুরাসন, মৃতাসন,
গুপ্তাসন, মৎস্যাসন মৎস্যেন্দ্রাসন, গােরক্ষাসন, পশ্চিমােত্তাসন,
উৎকটাসন, সঙ্কটাসন, ময়ূরাসন, কুক্কুটাসন, কৃর্শকাসন, উত্তান,
কুৰ্ম্মকাসন, উত্তানমণ্ডুকাসন, বৃক্ষাসন, মওকাসন, গরুড়াসন, বৃক্ষাসন,
শলভাসন, মকরাসন, উদ্ভাসন, ভূজঙ্গাসন ও যোগাসন। এই ৩২টি
আসনই যােগসিদ্ধির পক্ষে প্রশস্ত।
শিষ্য। এই সকল আসন কিরূপে হয় ?
গুরু। আমি একে একে বলিতেছি, তুমি শ্রবণ কর ; কিন্তু
এই স্থানে একটি কথা তােমাকে জানাইয়া রাখা উচিত।
শিষ্য। আজ্ঞা করুন।
গুরু। আমি আসনের কথা বলিব ; কিন্তু তাহা শুনিয়াই যে তুমি
নিজে নিজে ঐ সকল করিতে পারিবে, এখন মনে করি না।
শিষ্য। তবে কি করিতে হইবে ?
গুরু। শুরুর নিকট উপদেশ লইতে হইবে।
শিষ্য । সে কিরূপ?
গুরুর নিকট
উপস্থিত থাকিয়া তাহার
নির্দেশ মত
৫
সকল আসন করিতে হইবে। যাহাকে বলে হাতে-কলমে
শিক্ষা, আর তােমাদের ইংরাজী ভাষায় যাকে বলে, “এ্যাকটি-
ক্যাল্ নলেজ” তাহাই অর্জন করিতে হইবে।
শিষ্য। তবে এ সকল শুনিয়া লাভ কি।
গুরু। লাভ আর কিছুই নহে; ইহা মাত্র দিগদর্শন, অর্থাৎ
এই সকল শুনিয়া ঐ বিষয়ে মােটামুটি একটা ধারণা জন্মিবে এবং
ঐ ধারণার বশে ঐ সকল বিষয়ে আগ্রহ, আর আগ্রহ না হইলে
কোন কাৰ্য্যই করা সম্ভব হয় না, বুঝিছ ?

যােগ ও সাধনা
শিষ। আজ্ঞা, হঁ্যা, বুঝিয়াছি। তবে যােগ সম্বন্ধে : আপনি
যাহা বলিতেছেন, তাহা সকলই ত শিক্ষাসাপেক্ষ ?
গুরু। ঠিক বলিয়াছ। যাহা কিছু এ সন্ধন্ধে বলা হইতেছে,
সেই সকলেই গুরুর নিকট শিক্ষা করিতে হইবে।' পূৰ্বেই বলিয়াছি,
ইহা দিগদর্শন মাত্র।
শিষ্য। এইবার আসনগুলির কথা আমাকে সলুন ।
গুরু। আমি পর পর সকল আসনের কথাই বলিব, তুমি মন দিয়া
শ্রবণ কর। যদি তােমার কোথাও সন্দেহ হয়, আমাকে তাহা বলবে,
আমি যথাজ্ঞান তােমাকে তাহা বুঝাইতে প্রয়াস পাইব।
শিষ্য। প্রথমে সিদ্ধান, এই সিদ্ধাসনের কথাই বলুন।
গুরু। বলি; কিন্তু তৎপূৰ্বে আর একটি কথা বলা আবশ্যক।
শিষ্য। তাহা কি ?
সুক ।
কাহারও কাহার ও মতে স্বস্তিকাসন প্রথমেই অভ্যাস
করা উতি; কেন না, উহা সুখদায়ক ও কল্যাণ-কারক। তাই
তাহারা প্রথমেই প্ৰতিকাসনের কথা বলেন।
শিষ্য। এইখানে একটা কথা জিজ্ঞাসা করি।
বা।
শিষ্য। আসনের উদ্দেশ্য কি ?
গুরু। যাহাতে মনের চাঞ্চল্য উদ্বেগ না ঘটে, ইহাই
আসনের মােটামুটি উদ্দেশ্য ; আর এই জন্যই আসন যােগের
বিশেষ উপযােগী ও উপকারী।
শিষ্য। ইহা শিক্ষা করিতে কি বিশেষ প্রয়াস স্বীকার করিতে হয়?
গুরু। হয় বৈকি।
শিয়। ইহা কিরূপে অভ্যাস করিতে হয়?

যােগ ও সাধনা
।
অত্যন্ত সতর্কভাবে এবং সহিষ্ণুতা অবলম্বন না করিলে
ইহা শিক্ষা করা যায় না। এই আসনে সিদ্ধ
এই আসনে সিদ্ধ হইতে পারিলে
নিখিল সিদ্ধি সাধকের করায়ত্ত হয়।
শিষ্য। কখন বুঝিব যে আসন সিদ্ধ হইয়াছে ?
যখন দেখিবে যে, দেহ কম্পিত হইতেছে না ; শরীরে
কোনরূপ ক্লেশানুভব হইতেছে না বা মানসিক কোনরূপ চাঞ্চল্য
নাই, তখনই বুঝিবে যে, আসন সিদ্ধ হইয়াছে ।
শিষ্য। এখন বুঝিয়াছি।
সিদ্ধান
গুরু। এইবার প্রথম আসন সিদ্ধান, তাহাই বলিতেছি, ও,
কর। স্বীয় গুফ (গােড়ালী) দ্বারা নিজের যোনিৰ চাপিয়া
ধরিয়া অপর গুৰু দ্বারা লিঙ্গের উপর রাখিয়া চিবুকদেশ হৃদয়ের
উপর রক্ষা করিবে । তাহার পর স্থির এবং সােজা হইয়া বসিয়া
একদৃষ্টিতে দুই র মধ্যদেশ দেখিতে থাকিবে। এইরূপ ভাবে
বসার নাম সিদ্দাসন। যিনি এইভাবে উপবেশন করিতে সমর্থ
হন, তিনি যােগের অধিকার লাভ করিয়া থাকেন। এই সিদ্ধাসন
অন্য প্রকারেও হইতে পারে।
শিষ। সে কিরূপ?
যে কোন পায়ের মূলদেশ দ্বারা যত্নসহকারে যােনিস্থান
পীচন করিবে এবং উপরে উপর অপর পদ রাখিয়া উদ্ধানে
হইবে। তৎপরে স্থিরদৃষ্টি হইয়া হৃদয়ের মধ্যদেশ দেখিতে থাকিবে।
এই আসনের সময় কতকগুলি নিয়ম পালন করিতে হয় ।
শিষ। সেগুলি কি ?
গুরু। এই সময়ে চিত্তকে নিরুদ্বেগ
নিরুদ্বেগ করিবে, সংযতেন্দ্রিয়

যােগ সাধনা
হইবে এবং দেহ ঋজুভাবে সংস্থাপন করিবে। । যে সকল সাধক
পরজ্ঞান সাধন করেন, তাহাদের পক্ষে এই আসন অভ্যাস করা
একান্ত প্রয়ােজন। তন্ত্রশাস্ত্র বলেন, পৃথিবীতে ইহার তুল্য আসন
আর নাই। ইহার কল্যাণে অতি সহজেই সংসারসাগর উত্তীর্ণ
হইয়া উত্তম গতিলাভ হইয়া থাকে।
পআসন
এইবার পালনের কথা বলুন।
গুরু। নিজের দক্ষিণ পদ বাম উরুর উপর রাখিবে, তাহার
পর বামপদ দক্ষিণ উরুর উপর রাখিয়া দুই হন্ত পৃষ্ঠের উপর দিয়া
লইয়া গিয়া দুই পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলী সুদঢ়রূপে ধরিবে । তৎপরে
চিবুক বুকের উপর রাখিয়া নাসিকার অগ্রভাগ দেখিতে থাকিবে।
ইহারই নাম পদ্মসন।
শিষ্য। এই আসন অভ্যাসের উপকারিতা কি?
যে ব্যক্তি এই আসন অভ্যাস করিতে পারেন, তাঁহার
দেহ হইতে সকল প্রকার ব্যাধি দূর হইয়া যায় ।
যায়। কাহারও
কাহারও মতে এই আসনই সর্বশ্রেষ্ঠ। কাহারও কাহারও মতে
এই আসনের আরও অন্য গুণ আছে।
শিষ্য। কি গুণ আছে, তাহা আমাকে বলুন।
গুরু। বলি।
বলি। তাহারা বলেন, যাহারা যােগী নহেন, তাহাদের
এই আসনে অধিকার নাই। যিনি এই আসন অভ্যাস করিতে
সমর্থ হন, তাহার প্রাণবায়ু নাড়ীরন্ধে ঠিকমত প্রবাহিত হইয়া
থাকে। তদ্ব্যতীত প্রাণায়ামের সময় বায়ু শরীরের সকল স্থানে
পূর্ণরূপে প্রবেশ করিবে এবং ইহার অভ্যাসের ফলে প্রাণ ও
আপন বায়ুর রেচন ও পরণে সৰ্ববন্ধন হইতে মুক্ত হইয়া থাকে।

যােগ ও সাধনা
ভদ্রাসন
গুরু। এইবার ভদ্রাসনের কথা বলি শুন। দুই পায়ের দুই
গোড়ালী কোষের নিম্নভাগে বিপরিত ক্ৰমে বিন্যাস করিবে,
তাহার পর পৃষ্ঠদেশ দিয়া দুই হাত প্রসারণ করিয়া দুই পদের
দুই বৃদ্ধাঙ্গুলী দ্বারা জালন্ধর বন্ধ করিবে, তৎপরে নাসিকাগ্রভাগে
দৃষ্টি নিবদ্ধ করিবে। ইহা ভদ্রাসন নামে কথিত।
শিষ্য। আপনি যে জালন্ধর বন্ধের কথা বলিলেন, উহা কি প্রকার।
শুরু। গলাতে যে সকল
শিরা আছে, সেই সকল বন্ধন
করিয়া হৃদয়দেশে চিবুক রক্ষা করিলেই জালন্ধর বন্ধ হয়।
শিষ্য। এই আসনের কোন গুণ আছে কি?
গুরু। অবশ্যই আছে। যে ব্যক্তি এই আসনে সিদ্ধ হয়,
তাহার নিখিল রােগ বিনষ্ট হইয়া থাকে।
মুক্তাসন
গুরু। অতঃপর মুক্তাসন।
শিষ্য। মুক্তাসনের উপযােগীতা কি ?
গুরু। এই আসন সাধকবর্গকে অতি সত্বর সিদ্ধি দান করে।
শিষ্য। এই আসনের প্রকার কি, তাহা বলুন।
গুরু। পায়ুমূলে বাম পদের গােড়ালী বিন্যস্ত করিতে হইবে,
তাহার পর তদুপরি দক্ষিণ পদের গুল বিন্যস্ত করিয়া মস্তক
এবং গ্রীবা সমভাবে রাখিয়া দেহকে সরলভাবে স্থির রাখিয়া
উপবেশন করিলেই মুক্তাসন হইল।
বজান
এবার বাসনের কথা বলিব ।
শিষ্য। বলুন।

যােগ ও সাধনা প্রথমতঃ স্বীয় জুঘা" দুইটিকে বাতি করিতে হইবে; তদনন্তর গুহ্যদেশের উভয় পার্শ্বে পদ দুইটি বিন্যস্ত করিতে হইবে। তাহা হইলেই বজ্ৰাসন হইল । শিষ্য। ইহার প্রয়ােজনীয়তা কি ? এই আসন যােগীগণের পক্ষে সিদ্ধিদায়ক। স্বস্তিকাসন গুরু। এইবার স্বস্তিকাসনের কথা বিবৃত করিব। তুমি অবহিত হইয়া শ্রবণ কর। শিষ্য। আমি আপনার কথা বিশেষ মনোেযােগ দিয়াই শ্রবণ করিতেছি। শুধু শ্রবণ করিলেই চলিবে না, মনে মনে একট:: ধারণাও করিতে হইবে। আমি যথাজ্ঞান ধারণা করিতেও যত্ন লইতেছি। গুরু। উভয় জানু এবং উরুদ্বয়ের মধ্যভাগে উভয় পদতল বিস্ত করতঃ ত্রিকোণাকৃতি আসন বদ্ধ করিয়া সরলভাবে উপবেশন করিতে হইবে, তাহা হইলেই স্বস্তিকাসন হইল। শিষ্য । আমি শুনিয়াছিলাম, স্বস্তিকাসনের প্রকারভেদ আছে, তাহা কি ঠিক ? তুমি ঠিকই শুনিয়াছ । তন্ত্রান্তরে স্বস্তিকাসনের কথা অন্য রূপে বিবৃত আছে। শিষ্য। তাহা কি, জানিবার জন্য আমার কৌতূহল হইতেছে ! গুরু। তাহাও তোমাকে বলিতেছি, শ্রবণ কর। উরুর অন্তদেশে পদদ্বয় সুষ্ঠুভাবে স্থাপন করিতে হইবে এবং সরল- ভাবে সুখে উপবেশন করিলেই স্বস্তিকাসন হইল ।

যােগ ও সাধনা
করেন, তিনি
শিষ্য। এই আসনের ফল কি ?
গুরু। যে সাধক
আসনে সিদ্ধিলাভ
নিখিল রােগ হইতে অব্যাহতি লাভ করেন এবং অতি সত্বর
তিনি প্রাণায়ামে সিদ্ধিলাভ করেন। স্বাস্থ্যরক্ষার পক্ষে এই আসন
বিশেষ কার্যকরী। ইহা এত গুহ যে, যােগীরাও
গুহ্য যে, যােগীরাও ইহা গোপন
করিয়া থাকেন। বুঝিলে?
শিষ্য। আজ্ঞা হা।
সিংহাসন
গুরু । স্বীয় গুলফ দুইটি অণ্ডকোষের নিম্নভাগে বিপরীত ক্রমে
অর্থাৎ উল্টাভাবে স্থাপন করত উর্ধদিকে বহিষ্কৃত করিয়া জানু-
যুগল মাটীতে বিন্যাস করিতে হইবে, তদনন্তর জার উপরিভাগে
বদনম গুল বাক্তভাবে উন্নত করিয়া জালন্ধর বন্ধ আশ্রয় করতঃ
নাসিকার অগ্রভাগে দৃষ্টি স্থির রাখিবে। তাহা হইলেই সিংহাসন হইল।
শিষ্য। একটা কথা জিজ্ঞাসা করিতে ইচ্ছা হইতেছে ।
গুরু। স্বচ্ছন্দে জিজ্ঞাসা কর।
প্রশ্ন করতে সঙ্কোচ হয়।
সঙ্কোচ কিসের? তুমি শিক্ষার্থী,
শিক্ষার্থী, আমি শিক্ষক।
তােমার সংশয় দূর করাই আমার কর্তব্য। তুমি জান, সং শিষ্য না
হইলে গুরুর উৎকর্ষ হয় না?
শিষ্য। সে কিরূপ?
গুরু। আমি তােমাকে যাহা বলিব, তুমি যদি নির্বিচারে
তাহাতে সায় দিয়া যাও, তাহা হইলে আমার কি হইল ? আমি
ভাবিলাম, আমি অভ্রান্ত! ইহাতে আমার অধীত বিদ্যার উৎকর্ষ ত
হইল না, অধিকন্তু ক্রমশঃই অপকর্য হইবে । আর যদি তুমি

যােগ ও সাধনা
পর
প্রশ্ন করিয়া আমাকে বিব্রত কর, তাহা হইলে
আমার চেষ্টা
চেষ্টা হইবে, কি উপায়ে আমি তোমার প্রশ্নের
যথাযথ উত্তর দিয়া তােমার সংশয় দূর করিতে পারি। তােমার
পেশ্নের উত্তরের জন্য আমাকে শাস্ত্রচিন্তা করিতে হইবে, আমরই
ক্রমোন্নতি হইবে। এই জন্যই পণ্ডিতরা বলিয়াছেন,
বলিয়াছেন, “শাস্ত্র:
সুচিন্তিতমপি প্রতিচিন্তনীয়।” আমার কথা বুঝিয়াছ?
শিষ্য। আজ্ঞা হাঁ, বুঝিয়াছি।
গুরু। বেশ, তােমার জিজ্ঞাস্য কি বল ?
শিষ্য। আপনি যে জালন্ধর বন্ধের কথা বলিলেন, উহা কি ?
গুরু। উহা চতুরশীতি প্রকার বন্ধের অন্যতম।
শিষ্য। উহা কি প্রকারে সাধিত হয় ?
গুরু। গলদেশের শিরসমূহ বন্ধন করত হৃদদেশে চিবুক রক্ষা
করিলেই জালন্ধর বন্ধ হইয়া থাকে। এই বন্ধ দেবগণেরও দুভ।
গগামুখাসন
গুরু। মাটতে পদযুগল স্থাপন করিয়া পৃষ্ঠদেশের উভয় পার্শ্বে
রক্ষা করিবে, তৎপরে সরলভাবে নিজমুখ গােমুখবৎ উন্নত করতঃ
উপবেশন করিলেই গােমুখাসন সম্পন্ন হইল।
বীরাসন
এইবার বীরাসন। এই আসন যেরূপ সরল, তদ্রুপ
সাধারণের বিশেষ উপযােগী ।
শিষ্য। অনেকের মুখেই বীরাসনের কথা শুনিয়াছি । কি ভাবে
উহা সম্পন্ন হয়, তাহা বলুন।
গুরু। এক উরুদেশের উপর একটি চরণ রাখিতে হইবে।
এবং অপর উরুর উপর অন্য চরণ পাদ্দিকে রাখিলেই বীরাসন হইল ।

যােগ ও সাধনা
ধনুরাসন
গুরু। পদযুগল ভূমিতলে দণ্ডাকারে সমানভাবে প্রসারণ
করিতে হইবে, তাহার পর পৃষ্ঠদেশ বেড়িয়া দুই হস্ত দ্বারা ঐ
প্রসারিত পদদ্বয় ধারণ করিতে হইবে এবং শরীরকে মুকবৎ
বাকাইয়া রাখিলেই ধনুরাসন হইল।
শিষ্য। ইহার গুণ কি?
গুরু। যােগসিদ্ধির ইহা একটি প্রকৃষ্ট আসন।
মৃতাসন
গুরু। মৃতব্যক্তি যেভাবে ভূতলে শয়া থাকে, সেইরূপ থাকিলেই
মৃতাসন হইল । কেহ কেহ ইহাকে শবাসনও ৰলিয়া থাকেন।
এ আসনের প্রয়ােজনীয়তা কি ? :
গুরু। শান্তি অপনােদন এবং চিত্তের
এবং চিত্তের বিশ্রামের জন্য এই
আসন বিশেষ উপযােগী।
গুপ্তাসন
গুরু। জানু মধ্যে পদদ্বয় গুপ্তভাবে বিন্যস্ত করতঃ ঐ পদদ্বয়ের
উপরিভাগে গুইদেশ রক্ষা করিলেই গুপ্তাসন হইল।
মৎস্যাসন
গুরু। মুক্তপদ্মাসন বিন্যস্ত করত উতর কনুইর দ্বারা শিরঃ-
প্রদেশ পরিবেষ্টিত করিয়া শয়ন করিবে, তাহা হইলেই মৎস্যাসন হইবে ।
শিষ্য। ইহার যােগসিদ্ধি ব্যতীত অন্য উপযােগি আছে কি?
গুরু আছে বৈ কি। এই আসনে অভ্যস্ত হইলে নিখিল লােগ
শিষ্য।
আরােগ্য হয়।
পশ্চিমােনাসন বা উগ্রাসন
গুরু। ভূমিতলে পদদ্বয় দতকারে সয়লভাবে বিস্তীর্ণ করিয়া

যােগ ও সাধনা যত্নসহকারে হস্তদ্বয় দ্বারা উক্ত পদদ্বয় ধারণ করিয়া জঘযুগলের অভ্যন্তরভাগে শিয়ােদেশ বিন্যস্ত করিলেই পশ্চিমােত্তানাসন হইল। অত্যান্তরে ইহাকে উগ্ৰাসনও বলা হইয়া থাকে। শিষ্য। তন্ত্রান্তরে এ সম্বন্ধে কি বলা হইয়াছে ? গুরু। বলিতেছি, শুন । পদদ্বয়কে পরস্পর অসংলগ্নরূপে বিস্তীর্ণ করিয়া দুই হাত দিয়া দৃঢ়রূপে ধরিবে, তাহা হইলেই উগ্রাসন হইবে । শিষ্য। ইহার কি অন্য কোন গুণ আছে ? শুরু। অবশ্যই আছে। শিষ্য। তাহা জানিতে আমার কৌতূহল হইতেছে । গুরু। ইহার অনেক গুণ। তাহা তােমাকে একে বলিতেছি। যাহার এই আসনে সিদ্ধ হয়, তাহাদিগের জঠরাগ্নি অত্যন্ত বর্ধিত হইয়া থাকে—দেহের সকল গ্লানি ও অবসাদ দূরীভূত হয়। এই সাধকের বায়ু পশ্চিমপথে প্রবাহিত হয় এবং সকল প্রকার সিদ্ধি তাহার করতলগত হইয়া থাকে। সুতরাং সাধকগণের সৰ্বপ্ৰষত্রে ইহাতে অভ্যস্ত হওয়া কর্তব্য। ইহা অতীব গােপনীয় বলিয়া সাধারণের নিকট ইহা প্রকাশ করা কর্তব্য নহে। যাহাতে সিদ্ধ হইলে সর্ববিধ দুঃখ বিদূরিত হয়, সেই প্রাণায়ামসিদ্ধিও ইহা দ্বারা সম্ভব হয়। মাসন গুরু। উদদেশকে পৃষ্ঠদেশের মত সরলভাবে স্থির রাখিয়া সযত্নে অবস্থিত থাকিয়া বামপদ নত করিবে, তাহার পর দক্ষিণ জানুর উপর রাখিবে, তদুপরি দক্ষিণ কনুই সংস্থাপন করত দক্ষিপ হতের উপর মুখমণ্ডল গপন পূর্বক জয়ের মধ্যভাগে দৃষ্টি স্থির করিলেই মন্ত্রোসন হইল।

৪১
যােগ ও সাধনা
রোসন
গুরু। জঘা ও উরুদ্বয়ের মধ্যভাগে পদদ্বয় উত্তানভাবে রাখিয়া
গুপ্তভাবে সংস্থাপিত করিবে, পরে দুই হস্ত দ্বারা দুই পদের
গুলফদ্বয় সমাবৃত কণ্ঠদেশ সঙ্কোচ করিয়া নাসিকার অগ্রভাগে
স্থিরভাবে নিরীক্ষণ করিলেই গােরক্ষাসন হইল। এই আসনকে
সিদ্ধির অন্যতম কারণ বলিয়া জানিবে ।
উৎকটাসন
গুরু। দুই পদের দুই অঙ্গুষ্ঠ দ্বারা ভূমিস্পর্শ করিয়া গু-
দ্বয়কে অবলম্বনহীনভাবে শূন্যদেশে উত্তোলিত করিতে
এবং ঐ গুলফদ্বয়ের উপরিভাগে গুহাদেশ বিন্যস্ত করিলেই ইং-
কটাসন হইবে ।
সঙ্কটাসন,
বাম পদ এবং বাম জানু ভূমিতলে সংস্থান করিয়া
দক্ষিণ পদ দ্বারা বামপদ পরিবেষ্টন করিবে, পরে জানুযুগলের
উপর হস্তদ্বয় সংস্থাপিত করিলেই সঙ্কটাসন হইল ।
ময়ুরাসন
করতল দ্বারা ভূমি আশ্রয় করতঃ কনুইদ্বয়কে উদ্ধভাগে
নাভিদেশের দুই পার্শ্বে স্থাপন করিয়া মুক্তপদ্মাসনবৎ পদদ্বয় পশ্চা-
ভাগে উপরিদেশে উত্তোলন করিবে, পরে দণ্ডের ন্যায় ঋজুভাবে
শুন্যে উখিত হইলেই ময়ূরাসন হইবে ।
কুটাসন
মঞ্চে সমাসীন হইয়া মুক্তপদ্মাসন বন পৃৰ্ব্বক জাযুগল
এবং উরুর মধ্যদেশে হস্তদ্বয় সংস্থাপন করিতে হইবে এবং কনুইদ্বয়
দ্বারা সমাসীন হইলেই কুকুটাসন সম্পন্ন হইল।

যােগ ও সাধনা
৪২
কূর্মাসন
অণ্ডকোষের নিম্নভাগে গুল্ফ দুইটি বিপরীতক্রমে সংন্যস্ত
করিয়া মস্তক, গ্রীবা এবং দেই সরলভাবে রাখিয়া সমাসীন হইলেই
কৃাসন ইবে ।
উত্তান কূৰ্মাসন
গুরু। পূর্বে কুক্কুটাসন করিবে, তৎপরে দুই হস্ত দ্বারা দুই
কঁধ ধারণ করিয়া কৃৰ্ম্মের ন্যায় উত্তানভাবে অবস্থিত হইলেই
উত্তানৰ্ম্মা সন হইল।
উত্তানমণ্ডুকাসন
প্রথমে মণ্ডুকাসনে উপবিষ্ট হইবে, তাহার পর দুই
কনুই দ্বার মস্তক ধরিয়া মঙুকের ন্যায় উত্তীনভাবে
করিলেই উত্তানমণ্ডুকাদন নিষ্পন্ন হইল।
বৃক্ষাসন
গুরু। দক্ষিণ পদ বাম উরুর মূলভাগে সংস্থাপন করিবে।
পরে বৃক্ষের ন্যায় সরলভাবে অবস্থান করিতে হইবে, তাহা হইলেই
শুরু।
বৃক্ষাসন হইবে ।
মণ্ডুকাসন
গুরু। পৃষ্ঠভাগে নিজ পদদ্বয় দিয়া ঐ পদদ্বয়ের বন্ধ অনুষ্ঠ
দুইটি পরস্পর সংলগ্ন
করতঃ জানুযুগলকে সম্মুখভাগে রাখিলেই
মণ্ডুকাসন হইবে।
গরুড়াসন
গুরু। উরুযুগল এবং জঙ্ঘাদ্বয় দ্বারা ভূমি আক্রান্ত করিয়া
হাঁটু দুইটি দিয়া নিজ শরীরকে স্থির ভাবে রাখিতে হইবে, পরে ঐ
জানুদ্বয়ের উপর হস্ত স্থাপিত করিলেই গরুড়াসন হইবে।

যােগ ও সাধনা
বৃষাসন
গুরু। স্বীয় গুহ্যদেশ দক্ষিণ
গুলফের উদ্ধভাগে সংস্থাপন
করিবে, তাহার পর উহার বামভাগে বামপদ বিপরীতক্রমে অর্থাৎ উলটা
করিয়া ধরিতে হইবে, পরে মৃত্তিকা স্পর্শ করিলেই বৃষাসন হইবে ।
শলভাসন
গুর । মাটার দিকে মুখ করিয়া শয়ন করিবে, পরে বক্ষোদেশে
হস্তযুগল রাখিয়া ভূমিস্পর্শ করিয়া পদওয়
শূন্যে বিতস্তিপ্রমাণ
( এক বিঘত } ঊদ্ধে রাখিলেই শলভাসন হইবে ।
মকবাসন
গুরু। অধােমুখে শয়ন করিয়া ভূমিলে বক্ষোদেশ রাখিয়া
পদদ্বয় বিস্তারিত করিবে, পরে হস্তদ্বয় দ্বারা মস্তক ধারণ করিলেই
মকরসন হইবে। যােগসিদ্ধি ব্যতীত ইহার অপর একটি গুণও আছে।
শিষ্য। তাহা কি ?
গুরু । যাহারা শরীরের তেজ বুদ্ধি করিতে চাহে, তাহাদিগের
এই আসন বিশেষ ফলপ্রদ।
উদ্ভাসন
গুরু । অধােমুখে শায়িত হইয়া পদদ্বয় বিপরীতভাবে অর্থাৎ
উল্টা করিয়া পৃষ্ঠদেশে আনয়ন হস্তদ্বয় দ্বারা ঐ পদযুগল
ধারণ করিবে, পরে মুখ ও উদর সুদৃঢ়ভাবে সঙ্কুচিত করিলেই
উদ্ভাসন হইবে ।
ভুজঙ্গাসন
গুরু। নাভিদেশ হইতে পদের অঙ্গুষ্ঠ পর্যন্ত দেহের নিম্নাংশ
মাটীতে রাখিয়া হস্তদ্বয়ের তলদেশ দ্বারা ভূমি স্পর্শ করিয়া সব
উর্ধদিকে মস্তকোত্তলন করিলেই ভুজঙ্গাসন হইল।

যােগ ও সাধনা ৪৪ শিষ্য। ইহার বিশেষ গুণ কি? গুরু। এই আসন অভ্যাসের ফলে দেহাভ্যন্তরস্থ অগ্নি অতিশয় প্রদীপ্ত হয় এবং সর্ববিধ রােগ আশু প্রশমিত প্রশমিত হইয়া থাকে। যে সাধক এই আসন অভ্যাস করেন, তিনি অতি সহজেই কুল- কলিনীশক্তিকে জাগরিতা করিতে সমর্থ হন। যােগাসন গুরু। নিজ পদদ্বয় উত্তানভাবে অর্থাৎ চিৎ করিয়া জানুদয়ের উপর সংস্থাপন করিবে। পরে হস্তযুগল অসনের উপর উঠানভাবে রাখিতে হইবে। তাহার পর পূরক ও কুস্তক নিষ্পন্ন নাসিকার অগ্রভাগ নিরীক্ষণ করিলেই বােগাসন হইবে । মাত্রেরই ইহা সাধন করা একান্ত কর্তব্য। এই আমি তােমাকে আসনের কথা বললাম। এই প্রসঙ্গে মুদ্রার কথাও কিছু কিছু বলিতে হইবে। কেন মুদ্রা ও মােগসাধনের একটি প্রধান অঙ্গ। শিষ্য। আজ বলিবেন কি গুরু। না, আজ নহে। কারণ, একদিনেই সকল কথা ধারণা করিতে পারিবে না। আজ যাহা শ্রবণ করিলে, তাহা বিশেষ ভাবে চিন্তা করিবে। আগামী কল্য মু দার কথা বলিব।

চতুর্থ অধ্যায়
৭ )
০+*+:
মুদ্রা প্রকরণ
আজ তােমাকে মুদ্রার কথা বলিব । এ কথা পূর্বেই
বলিয়াছি। প্রথমতঃ মুদ্রা কয় প্রকার তাহাই বলিব ।
শিষ্য। মুদ্রা কয় প্রকার ?
গুরু । শিব-সংহিতা” বলিতেছেন, মুদা দশ প্রকার।
সে সকলের নাম কি?
গুরু। মহামুদা, মহাবন্ধ, মহামে, খেচরী, জালন্ধরব, মূলবন্ধ,
বিপরীতকরণ, উডডীয়ান, বজ্রোনী এবং শক্তিচালন। গ্রহ জামলেও
দশটি মজার উল্লেখ আছে।
আর কোন তন্ত্রে মুদ্রার কথা আছে ?
আছে বৈ কি।
বৈ কি। কিন্তু সকলের আলােচনা এক
সম্ভব নহে। তবে ‘ঘের সংহিতায় যাহা আছে, তাহাই এখানে
•
আমাদের আলােচ্য।
শিষ্য। ‘ঘেরগুসংহিতায় কয় প্রকার মুদ্রার কথা আছে ?
গুরু।
চিশ প্রকার।
শিষ্য ।
সেগুলির নাম কি ?
গুরু। মহামুদ্রা, নভােমুদ, উডীয়ান, জালন্ধর, মূলবন্ধ, মহাব,
মহামেধ, খেচরী, বিপরীতকরণী, যােনি, বড্রোনী, শক্তিচালনী,.

যােগ ও সাধনা
তাড়াগী, মাণ্ডবী, শাম্ভবী, পঞ্চধারণা, (পার্থিব, আন্তসী, বৈশ্বানরী,
বায়বী এবং আকাশী ), অশ্বিনী, পাশিনী, কাকী, মাতঙ্গী ও ভুজঙ্গিনী।
শিষ্য। যােগশিক্ষায় কি মুদ্রার প্রয়ােজন আছে ?
প্রয়ােজন নহে—ইহা একটি অপরিহার্য অঙ্গ।
শিষ্য। ইহার হেতু কি ?
গুরু। পরে বলিব। এমন কোন মুদ্রা কি ভাবে সম্পন্ন করিতে
হয়, তাহাই বলি। প্রথমেই মহামুদ্রা।
মহামুদ্রা
শিষ্য। বলুন।
গুরু। বাম গুল দ্বারা স্বীয় গুহ্যদেশ সুদঢ়ভাবে চাপিয়া
পরিবে, পরে দক্ষিণ পদ প্রসারিত করিয়া হস্ত দ্বারা পদের অঙ্গুলী
ধারণ করিবে এবং কণ্ঠদেশ সঙ্কোচ পূৰ্ব্বক জ্ব-দ্বয়ের মধ্যভাগে দষ্টি
স্থির রাখিলেই পণ্ডিতবর্গ-কথিত মহামুদ্রা হইল।
শিষ্য। মহামুদ্রা কি একই প্রকার, না—প্রকারান্তর আছে ?
গুরু। গ্ৰহজামলে’ প্রকারান্তর আছে।
শিষ্য। তাহা জানিতে কৌতূহল হইতেছে ।
গুরু। বলিতেছি শুন। বাম গুলফ দ্বারা যােনিদেশ পীড়ন
করত দক্ষিণ চরণ প্রসারণ পূর্বক দুই হস্ত দ্বারা ঐ চরণদ্বয়
সুদৃঢ়রূপে ধরিয়া মুখ কণ্ঠদেশে বিন্যস্ত করিবে, পরে কুম্ভক করিয়া
বায়ু বােব করিবে। তৎপরে ঐ কুম্ভক দ্বারা গৃহীত বায়
ধীরে রেচন করিতে হইবে। তাহা হইলেই মহা মুদ্রা হইল।
সর্পকে দণ্ড দ্বারা আঘাত করিলে সে যেমন দণ্ডের আকার ধারণ
করে, সেইরূপ এই মহামুদ্রা অভ্যস দ্বারা কুণ্ডলিনী ও সরলভাবে
ক্স বস্থিত। হন।

:৪৭
যােগ ও সাধনা
শিষ্য। মহামুদ্রার এত প্রশংসার কারণ কি?
গুরু। এই মুদার অশেষ গুণ।
শিষ্য। সেই গুণ কি?
গুরু। ঘের-সংহিতায় আছে-
‘ক্ষয়কাসং গুদাবৰ্ত্তং প্লীহাজীর্ণং অরথা।
নাশয়েৎ সর্বােগাং মহামুদ্রাতিসেনাৎ
অর্থাৎ মহামুদা অভ্যাসের ফলে ক্ষয়কাস, গুদাবৰ্ত্ত ( ভগন্দর ,
প্লীহা, অজীর্ণ, জর প্রভৃতি নিখিল ব্যাধির উপশান্তি ঘটিয়া থাকে,
“শিবসংহিতায়’ অবিধ ফলের কথাও আছে।
শিষ্য। শিবসংহিতা’ কি বলিতেছেন ?
গুরু। শিবসংহিতা” বলিতেছেন, যে সকল লােক অত্য
ভাগ্যহীন, তাহারাও যদি এই মহামুদ্রা অভ্যাস করে,
• তাহারা সিদ্ধিলাভ ত করেই, অধিকন্তু তাহাদের দেহাভ্যন্তর
নাড়ী সকল পরিচালিত হইয়া থাকে এবং যে বীৰ্য্য জীবদেহের
প্রাণশক্তি, সেই বীৰ্যও স্তম্ভিত হয় অর্থাৎ বীৰ্য্য প্রাণশক্তিকে
আকর্ষণ করিয়া স্থিরভাবে অবস্থান করিয়া থাকে। এই মুদ্রার
অভ্যাসের
নিখিল পাপ এবং রােগসমূহ ধ্বংস
উদগ্নি বৃদ্ধি পায়, দেহে লাবণ্যসঞ্চার হয়, জরা
হইয়া থাকে, ঈপ্সিত ফল ও আনন্দলাভ ঘটিয়া থাকে। ইহার
আর এক অসাধারণ গুণ এই যে, ইহার দ্বারা সাধক জিতেন্দ্রিয় হইয়া
থাকেন। ইহা অতীব গােপ্য এবং এই মুদ্রা কামদুঘ
সাধকের সকল কামনাই সিদ্ধ হইয়া থাকে। আবার ‘গ্ৰহজামলে
ইহার অন্যবিধ ফলও কথিত আছে।
শিষ্য। গ্ৰহজামল’ কি বলিতেছেন।
হয়,
কামদুঘ অর্থাৎ

.যােগ ও সাধনা
8
শুরু। “গ্ৰহজামলে মহাদেব পার্বতীকে বলিতেছেন, যে
যাপক এই মহামুদ্রায় অভ্যস্ত হন, তিনি
তিনি কোনরূপ ক্লেশতভাগ
করেন না এবং এমন কি, মৃত্যুও তাহার নিকট আসে না।
তাহার জঠরাগ্নি এরূ প বৃদ্ধি পায় যে, তিনি যদি বিষ পর্যন্ত
সেবন করেন, তথাপি তাহাও অচিরে জীর্ণ হইয়া যায়, অন্য পথ্য
তপথ্যের কথা আর কি বলিব! সৰ্ব্ববিধ রােগ – যথা ক্ষয়, কুষ্ঠ,
ভগন্দর, প্লীহা, অর্শ প্রভৃতি বিদূরিত হয়। উরা মৃত্যু দূর করিবার
শক্তিও ইহার আছে। মহামুদ্রার গুণ শ্রবণ করিলে ?
শিষ্য। আজ্ঞা হা।
নভেমুদ্রা
গুরু। সাধক কৃম্ভক যােগ দ্বারা সকল সময়ে
সকল কর্মে
স্থিরভূত এবং উৰ্দ্ধচিত্ত হইয়ঃ বায়ু, অবরােধ করিয়া থাকিতে
সমর্থ হইলেই নভােমুদা সাধিত হইল।
শিষ্য। ইহার গুণ কি ?
এই মুদ্রায় অভ্যস্ত হইলে সর্বপ্রকার ব্যাধি দূর হয়।
ইহার অপর নাম আকাশী মুদ্রা।
উড্ডীয়ানবন্ধ
গুরু। উদরদেশে নাড়ীর উদ্ধা এবং পশ্চিম দ্বারকে সমভাবে
আকুঞ্চিত করিতে হইবে।
শিষ্য। ঠিক বুঝিতে পারিলাম না।
গুরু। বুঝাইয়া দিতেছি । জঠরদেশের নিম্নভাগে যে গুহাদি-
চক্রে নাড়ীসমূহ বিদ্যমান, সেই সকলকে নাভির উদ্ধভাগে উত্তোলিত
করিতে সমর্থ হইলেই উড়ীয়ানবন্ধ হইল।
শিষ্য। ইহার ফল কি?

৪৯ যােগ ও সাধনা গুরু। “ঘেরণ্ডসংহিতা” বলিতেছেন- ‘সমগ্ৰাং বন্ধনাৎ হেতং উডডৗয়ানং বিশিষতে। উডড়ীয়ানে সমভ্যস্তে মুক্তি স্বাভাবিকী ভবেৎ। অর্থাৎ তন্ত্রশাস্ত্ৰেক্ত মুদ্রা সকলের মধ্যে এই উডডীয়ানবন্ধই সৰ্ব্বপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। ইহা দ্বারা অক্লেশে মুক্তিলাভ করা যায়। শিবসংহিতায় ও ইহার বিশেষ গুণ কথিত হইয়াছে। শিষ্য। কি বলা হইয়াছে বলুন। সাধক দ্বারা এই উড্ডীয়ানবন্ধ প্রত্যহ চারিবার সাধিত হয়, তিনি নাভিশুদ্ধি এবং বায়ুশুদ্ধি লাভ করেন। যিনি ছয়মাস একাদিক্রমে এই বন্ধের অনুষ্ঠান করেন, তিনি মৃত্যুকে পরাজয় করিতে সমর্থ হন। ইহা দ্বারা সাধকের জঠরাগ্নি তীব্র হয় এবং দেহজ ব্যাধি সকলও বিদূরিত হইয়া থাকে। শিষ্য। যে কোন স্থানেই ত ইহা অভ্যাস করা যায় ? গুরু। নির্জন স্থানে অভ্যাস করিতে হইবে এবং তৎকালে তথায় গুরুর উপস্থিতি প্রয়ােজন । ‘দত্তাত্রেয় সংহিতায়’ ইহার উপযােগিতা কথিত হইয়াছে। শিষ্য। তাহাতে কি আছে ? সাধক উড্ডীয়ানবন্ধ অভ্যাস করেন, তিনি যদি অতি বৃদ্ধ ও হন, হন, তবুও তিনি নবীন যৌবন লাভ নবীন যৌবন লাভ করেন এবং মরণজয়ী হয়েন। ইহার পর জালন্ধর বন্ধ । জালন্ধর বন্ধ শিষ্য । জালন্ধর বন্ধ কিরূপ ? স্বীয় কণ্ঠদেশ সঙ্কুচিত করিয়া হৃদ্দেশে চিবুক বিন্যাস করিতে হইবে, তাহা হইলেই জালন্ধর বন্ধ হইল। ৪

যােগ ও সাধনা
শিষ্য।
শিষ্য। ইহার ফল কি?
অভ্যাসে ঘােড়শ প্রকার আধার বন্ধ সংঘটিত
হয় এবং মৃত্যুজয়ী হওয়া যায়।
শিষ্য।
অন্য তন্ত্রে অপরবিধ কিছু কথিত হইয়াছে কি ।
গুরু। হাঁ, হইয়াছে।
শিষ্য। কোন তন্ত্রে হইয়াছে।
‘গ্ৰহজামল' এবং ‘শিবসংহিতা।
শিষ্য। ওই দুই মত বলুন।
গুরু। গ্ৰহজামল বলিতেছেন, কণ্ঠদেশ কুঞ্চিত করিয়া চিবুক
সুদৃঢ়রূপে হৃদয়ে সংস্থাপিত করিতে সমর্থ হইলেই জালন্ধর বন্ধ
হইয়া থাকে।
এ মতে ফল কি?
গুরু। দেহাভ্যন্তরস্থ অমৃত নিরন্তর পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান থাকে।
শিষ্য। শিবসংহিতা’ কি বলিতেছেন ?
গুরু। গলদেশের শিরাসকল বন্ধন বক্ষোদেশে চিবুক
বিন্যস্ত করিয়া কুম্ভক করিতে পারিলেই জালন্ধর হইল ।
শিষ্য। এ মতে ফল কি ?
ফলের কথা কিছু বলেন নাই, তবে বলিয়াছেন যে,
ইহা দেবগণের দুল ভ ।
শিষ্য। অন্য কোথাও ইহার ফলের কথা কিছু আছে?
গুরু। আছে।
শিষ। কি আছে বলুন।
গুরু। জলন্ধর বন্ধ—যাহা বলা হইল, তাহা প্ৰতিসিদ্ধ এবং
এই বন্ধ যােগীদিগকে সিদ্ধি দান করে। যে বিচক্ষণ
যে বিচক্ষণ সাধক এই

যােগ ও সাধনা
বন্ধ ছয় মাস অভ্যাস করেন, সিদ্ধি তঁাহার করতলগত হয়, ইহা
নিঃসন্দেহ। ইহার পর মূলবন্ধ। কিন্তু তাহার পূর্বে এ সম্বন্ধে
আরও কথা আছে।
শিষ্য। তাহা কি ?
গুরু। বলিতেছি, ওন। শিবসংহিতা' বলিতেছেন, যে সাধক এই
জালন্ধরবন্ধে অভ্যস্ত হন, তিনি তাহার ফলে সহস্ৰাৱকমল হইতে
যে অমৃত বিগলিত হয়, তাহা অপােভাগে আনয়ন করিতে সমর্থ
হন এবং সেই অমৃত পান করিয়া অমরত্ব লাভ করিয়া থাকেন,
যাহার সিদ্ধি কামনা করেন, তাহারা সযত্নে ইহা অভ্যাস করিবেন।
এইবার মূলবন্ধ বলিব।
মূলবন্ধ
শিষ্য। মূলবন্ধ কি প্রকারে সাধিত হয় ?
বাম গুল্ফ দ্বারা স্বীয় গুহ্যদেশ কুঞ্চিত করিয়া নাভি-
গ্রন্থি যত্নসহকারে মেরুদণ্ডে সংযােজিত করিতে হইবে, পরে দৃঢ়-
ভাবে পীড়ন করিবে। তৎপরে দক্ষিণ গু দ্বারা উপস্থকে সুদৃঢ়রূপে
সংবন্ধ করিতে পারিলেই মূলবন্ধ সিদ্ধ হইল
শিষ্য। ইহার ফল কি?
গুরু। ইহা জরানাশের বিশেষ উপযােগী।
শিষ্য। ইহার কোন মতান্তর আছে কি।
গুরু। আছে। বলিতেছি, শুন। গু দ্বারা গুহ্যদেশকে নিপীড়িত
করিয়া অপান বায়ুকে সংবদ্ধ করতঃ সজোরে ধীরে ধীরে উর্দদেশে
আকর্ষণ করিতে সমর্থ হইলেই মূলবন্ধ হইল। ইহা জবা-মৃত্যু
নাশ করিয়া থাকে।
শিষ্য। মূলবন্ধসাধনের অন্য ফল কি।

যােগ ও সাধনা সংসার-সমুদ্র হইতে যিনি উত্তীর্ণ হইতে ইচ্ছা করেন, তিনি নির্জন স্থানে অতি গুপ্তভাবে এই মূলবন্ধ অভ্যাস করিবেন। বায়ুসিদ্ধ হইতে হইলে ইহার তুল্য অন্য প্রক্রিয়া নাই, সুতরাং সাধক নিশ্চয়ই বায়ুসিদ্ধ হইয়া থাকেন । হইয়া থাকেন। এই জন্য এই জন্য অলস হইয়া এবং মৌনব্রত অবলম্বন করিয়া ইহার অভাসে সচেষ্ট হইতে হইবে ; ইহা ছাড়া ইহার আরও উপযােগিতা আছে। শিষ্য। তাহা কি। যিনি মূলবন্ধ অভ্যাস করিবেন, তিনি অতি সহজে যােনিমুদ্রায় সিদ্ধিলাভ করিতে পারেন এবং ইচ্ছা করিলে আকাশ- পথে বিচরণ করিতেও তিনি সমর্থ হন। মহাবন্ধ গুরু। এইবার মহাবন্ধ বলিব । শিষ্য। বলুন। প্রথমে বাম পদের গুফ দ্বারা পদদেশের মূলভাগ নিরােধ করিতে হইবে, পরে যত্নসহকারে দক্ষিণ চরণ দ্বারা বাম- পদের গুলফ নিপীড়ন করিয়া ধীরে ধীরে গুহ্যদেশকে বিচালিত করিতে হইবে, তৎপরে শনৈঃ শনৈঃ গুহৃদেশকে কুঞ্চিত করিয়া জালন্ধর ব" দ্বারা প্রাণবায়ুকে ধারণ করিলেই মহাবন্ধ সম্পন্ন হইল । শিষ্য। মতান্তরে এ বিষয়ে যদি কিছু বলা হইয়া থাকে, তাহাও সবিস্তারে বলুন। গুরু। শিবসংহিতায় কথিত আছে, বাম উরুর ঊর্ধ্বভাগে দক্ষিণ চরণ বিস্তারিতরূপে স্থাপন করতঃ যােনি এবং গুহ্যদেশ সঙ্কোচন পৃক অপান বায়ুকে উদ্ধগামী করিবে, পরে নাভিদেশস্থিত সমান বায়ুর সহিত উহাকে সংযােজিত করিয়া হৃদয়ভ্যন্তরস্থ প্রাণবায়ুকে

যােগ ও সাধনা
?
অধােমুখ করিতে হইবে। তৎপরে কুম্ভকযােগে প্রাণ ও অপান
বায়ুকে উদর মধ্যে দৃঢ়রূপে আবদ্ধ করিতে পারিলেই মহাবন্ধ হইল।
শিষ্য। মহাবন্ধের ফল কি
গুরু। ঘেরগুসংহিতা' বলিতেছেন।
মহাবন্ধ পরাে বন্ধে জরামরণনাশনং।
প্রসাদাদস্ত বন্ধস্য সায়েং সৰ্ববাঞ্ছিতম্ ।
অর্থাৎ নিখিল মুদ্রার মধ্যে এই মহাবন্ধই সর্বশ্রেষ্ঠ। এই
মুদ্রা জরা ও মৃত্যু নাশ করিয়া থাকে। ইহার প্রসাদে যাবতীয়
বাসনায় সিদ্ধিলাভ হইয়া থাকে । তদ্ভিন্ন ইহার আরও গুণ আছে ।
শিষ্য। তাহা কি ?
গুরু। শিবসংহিতা” বলিতেছেন, যে সাধক এই মুদ্রায় অভ্যস্ত,
তাহার শরীরের পুষ্টি ঘটে এবং অস্থিপঞ্জর ঢ়ভাব ধারণ করে,
তদ্ভিন্ন তার মন সর্বদা প্রল থাকে, অধিকন্তু তিনি তাহার
সকল মনােবাসনাই পূরণ করতে সমর্থ হন।
মবেধ
গুরু। দেখ, এই মহাবেধ সাধকের অতি প্রয়ােজনীয়।
শিষ্য। কেন?
কারণ এই যে, মহাবেধ অভ্যাস ব্যতীত মূল আর
মহাবন্ধ নিল। যেমন রমণীর
যতই কেন রূপ যােবন ও লাবণ্য
থাকুক না, সে যদি পুরুষের সহিত মিলিত না হয়, তবে যেমন
উহা তাহার বৃথা হইয়া থাকে, সেইরূপ মহাবেধ ব্যতীত মূল বন্ধ
বা মহাবন্ধ বৃথা।
শিষ্য। মহাবেধের নিয়ম কি ?
শুরু। পূর্বে যে মহাবন্ধের কথা বলা হইয়াছে, সেই প্রকারে

যােগ ও সাধনা
প্রথমে মহামুদ্রার অনুষ্ঠান করিতে হইবে। তাহার পর উড্ডীয়ান
বন্ধ করিয়া কুম্ভক করতঃ বায়ু নিরােধ করিবে ; এইরূপ করিলেই
মহাবেধ মুদ্রা সম্পাদিত হইবে।
শিষ্য । ইহারও কি প্রকারান্তর আছে ?
গুরু। আছে বৈ কি।
শিষ্য। তাহা বলুন ।
গুরু। শিবসংহিতা” বলিতেছেন, প্রাণবায়ু ও অপনবায়ুর একত
স্থাপন করিয়া কুন্তক দ্বারা উদরকে বায়ুপূর্ণ করিতে হইবে, তৎপরে নিতম্ব
দ্বয়কে তাড়না করিলেই মহাবেধ মুদ্রা হইবে ।
শিষ্য । ইহা দ্বারা কি উপকার পাওয়া যায়।
গুরু। যিনি মহাবেধ মুদ্রার সহিত প্রত্যহ মহাবন্ধন ও মূলবন্ধন
মুদ্রার অনুষ্ঠান করেন, তিনিই সাধকশ্রেষ্ঠ এবং তিনি ।
মৃত্যুর দ্বারা আক্রান্ত হন না। ইহার আরও গুণ আছে ।
শিষ্য। সেই গুণ কি ?
এই মুদ্রায় অভ্যস্ত হইলে বায়সিদ্ধিলাভ হয় এবং ইহার
দ্বারা জরা ও মৃত্যু জয় করা যায়। তবে ইহা অত্যন্ত গােপনীয় ।
খেচরীমুদ্রা
গুরু। খেচরীমুহা অতি প্রসিদ্ধ। সকল সাধকের ইহা অভ্যাস
করা একান্ত কর্তব্য
শিষ্য। ইহা আমাকে সবিস্তারে বলুন।
গুরু। বলিতেছি, বিশেষ মনােযােগ সহকারে শুন ।
শিষ্য। আমি আপনার সকল কথাই মনোেযােগ দিয়া শুনিতেছি।
গুরু। শুনিয়া আনন্দ হইল । আমি জানি যে, তুমি শুনিতেছ,
তথাপি মনােযােগের কথা এই জন্য বলিতেছি যে, ইহা একটি

যােগ ও সাধনা
শিষ্য।
সৰ্বজনপ্রসিদ্ধ মুদ্রা। তুমি হয়ত অনেকের নিকট অনেক বকা
শুনিতে পাইবে। বক্তা যদি প্রকৃত সাধক হন, তবে তাহার
নিকট যাহা শুনিবে, তাহা অভ্রান্ত। কিন্তু বক্তা যেখানে মেকী,
সেখানে বড়ই গোলের কথা। ইহা যদি তুমি বিশেষ মনােযােগ
সহকারে শুন, তবে মেকী কি আসল, তাহা অতি সহজেই
ধরিতে পারিবে। আমার কথা
আমার কথা বুঝিয়াছ ?
আজ্ঞা হা।
বেশ, তবে শুন। জিহ্বার অবেভাগে
যে নাড়ী
আছে, প্রথমে তাহাকে ছেদন করিতে হইবে, তদনন্তর জিহ্বার
অগ্রভাগকে জিহ্বার তলদেশে পরিচালিত করিতে হইবে;
মাখন দিয়া জিহ্বাকে দোহন করিবে অর্থাৎ জিহায় মাখন লাগাইয়া
তাহ টানিবে এবং লৌহনিৰ্ম্মিত জিঙ্গলেখনী দ্বারা কর্ষণ করিতে
হইবে। কিছুদিন এইরূপ প্রক্রিয়া করিলে জীহ্বা সুদীর্ঘ হইবে,
ক্রমে এইরূপ অভ্যাস দ্বারা জিহাকে এরূপ দীর্ঘ করিবে
উহা অনায়াসে উভয় জ্বর মধ্যভাগ স্পর্শ করিতে সমর্থ হয়।
তাহার পর যখন জিহ্বা তালুমধ্যে প্রবেশ করিতে সমর্থ হইবে, তখন
কপালকুহকের মধ্যে উৰ্দ্ধভাগে বিপরীত ক্রমে জিহ্বাকে প্রবেশ করাইয়া
দ্বয়ের মধ্যস্থলে দৃষ্টি স্থির রাখিতে পারিলেই খেচরীমুদ্রা হইল।
শিষ্য। কপালহর কাহাকে বলে ?
গুরু। তালুদেশে যে গহবর আছে, তাহারই নাম কপালকুহর।
‘শিবংসহিতার মতে খেচরী মুদ্রা এই নিয়মের সম্পূর্ণ বিপরীত।
শিষ্য। সে কিরূপ?
গুরু। নির্জনস্থানে বাসনে উপবেশন করিয়া জ্বয়ের মধ্যে
দৃষ্টিক্ষেপ করিবে, তাহার পর জিহ্বার উপরিভাগস্থ তালুকুহরে জিহ্বাকে
গে,

যােগ ও সাধনা বিপরীতক্রমে উত্তোলিত করিয়া যত্নসহকারে বিন্যস্ত করিলেই খেচরীমুদ্রা হইবে। শিষ্য। খেচরীমুদ্রার গুণ কি? গুরু। ইহার এত গুণ যে, তাহা বলিয়া শেষ করা যায় না। তথাপি আমি ইহার কতকগুলি গুণ বলিতেছি। যে সাধক এই খেচরীমুদ্রায় অভ্যস্ত হন, তিনি মূচ্ছা, ক্ষুধা বা তৃষ্ণায় আক্রান্ত হন না। আলস্য ও তাহার উপর প্রভাব বিস্তার করিতে সমর্থ হয় না; তিনি ব্যাপি ও জরা- গ্রস্ত হন না, তাহার দেহ দেবতুল্য হইয়া থাকে। অগ্নি তাহাকে দাহ করিতে পারে না, বায়ু শুষ্ক করিতে সমর্থ হয় না, জল তাহার দেহকে সিক্ত করিতে পারে না, এমন কি, সর্পও তাঁকে দংশন করিতে সমর্থ হয় না। এই সাধক অতীব লাবণ্যশালী হন এবং তিনি সমাধি লাভ করিয়া থাকেন। কপাল ও মুখের সংযােগে তাহার রসনায় নানা প্রকার রসসঞ্চার হইয়া থাকে এবং আনন্দের উদ্ভব হইয়া থাকে। জগতে এমন কোন বস্তু নাই, যাহা তাঁহার জিহ্বায় অনুভূত হয় না-কখন লবণরস, কখন কখনও বা তিক্ত, কখন কষায় রস। আবার কখন বা মাখন, ঘৃত, দধি, ঘােল, মধু, দ্রাক্ষা—এমন কি অমৃতরস পর্যন্ত অনুভূত হইয়া থাকে। শিষ্য। ইহার আর কোন গুণ আছে ? আছে। শিষ্য। তবে তাহাও বলুন। গুরু। “শিবসংহিতা' বলিতেছেন, পেচরীমুদ্রায় সিদ্ধ কুক্তি মগ- পাপসাগর হইতে উদ্ধার লাভ করতঃ স্বর্গে গমন করিয়া শেষ সুপভোগ করেন ও তদনন্তর ভােগের অবসান হইলে পৃথিবীতে সবংশে জন্ম লাভ করিয়া থাকেন। এখন বুঝিলে কি, কেন এই মুদ্রার এত প্রশংসা ?

যােগ ও সাধনা শিষ্য। আজ্ঞা হা, বুঝিয়াছি। গুরু। এইবার বিপরীতকরণী মুদ্রা। বিপরীতকরণী মুদ্রা গুরু। নাভীদেশের মূলভাগে সূৰ্য্যনাড়ী এবং তালুদেশের মূল- 'ভাগে চন্দ্রনাড়ী অবস্থিত আছে। ব্ৰহ্মরন্ধ স্থিত সহস্রদলকমল হইতে যে অমৃতধারা বিগলিত হইয়া থাকে, সেই অমৃত সূৰ্য্যনাড়া পান করিয়া থাকে। এই হেতু জীবনিচয় মৃত্যুমুখে পতিত হয় । কিন্তু যদি চন্দ্রনাড়ী দ্বারা ঐ অমৃত পান করিতে পারা যায়, তবে কোন ক্রমেই মৃত্যু হয় না। মােগবলে উৰ্দ্ধদেশে সূৰ্য্য- নাড়ী এবং আধােদেশে চন্দ্রনাড়ীকে আনয়ন করা আবশ্যক। শিষ্য। কি উপায়ে ইহা সম্ভব ? গুরু। এই বিপরীতকরণী মুদ্রা অভ্যাস করিলেই সম্ভব । শিষ্য। কি ভাবে এই মুদ্রা সাধিত হয় ? গুরু। ভূতলে মস্তক স্থাপন করিয়া হস্তদ্বয় বিস্তারিত করিয়া মৃত্তিকাতে পাতিত করিবে করিবে এবং চরণদ্বয় উদ্ধদিকে উন্নত করিয়া কুম্ভকযােগে বায়ুরােধ করিলেই বিপরীতকরণী মুদ্রা হইল। শিষ্য। মতান্তর কিছু আছে ? গুরু। শিবসংহিতা” বলিতেছেন, নিজের মস্তক ভূমিতলে বিন্যস্ত করিয়া পদ হয় উর্দদেশে শূন্যে তুলিবে, তার পর কুম্ভকযোগে বায়ু অবরুদ্ধ করিলেই বিপরীতকরণী মুদ্রা হইবে। শিষ্য। ইহার ফল কি ? যে সাধক প্রত্যহ এই মুদ্রার সাধন করিয়া থাকেন, তিনি জরা ও মৃত্যু হইতে পরাভূত হন না এবং প্রলয়কালে ও তিনি অভিভূত হন না।

যোগ ও সাধনা কথা যােনিমুদ্রা গুরু। সিদ্ধাসনের পূৰ্বেই বলিয়াছি। প্রথমে সেই সিদাসনে উপবেশন করিয়া কর্ণযুগল দুই অঙ্কুষ্ঠের দ্বারা, চক্ষুদ্বয় দুই তর্জনীর দ্বারা, নাসারন্ধ দ্বয় দুই মধ্যম দ্বারা এবং মুখমণ্ডল দুই অনামিকা দ্বারা রুদ্ধ করিতে হইবে। পরে কাকীমু দার দ্বারা প্রাণবায়ুকে আকর্ষণ করিয়া অপান প্রভৃতি বায়ুর সহিত সংযুক্ত করিবে। তাহার পর দেহস্থিত ষট্চক্রকে ধ্যান করিয়া হু হংসঃ এই দুইটি মন্ত্র দ্বারা কুলকুণ্ডলিনীকে জাগ্রত করিতে হইবে এবং জীবাত্মার সহিত মিলিত কুলকুণ্ডলিনীকে সহস্রদলকমলে উত্থাপন পূর্বক সাধককে এইরূপ চিন্তা করিতে হইবে যে, আমি শক্তিশালী হইয়া পরমশিবের সহিত সঙ্গম প্রবৃত্ত হইয়া পরমানন্দ উপভােগ এবং বিহার করিতেছি, তথা শিবশক্তির সহিত সংযুক্ত হওয়ায় আমিই সেই সচ্চিদানন্দময় ব্রহ্ম । এইরূপ হইলেই যােনি- মুদ্র। সাধিত হইল। শিষ্য। ইহা অতি কঠিন ব্যাপার। গুরু। কঠিন ব্যাপার বলিয়াই এই মুদ্রা অতি গােপনীয় এবং ইহা দেবগণের ও দুভ ! যে সাধক এই মুদ্রা সাধন করিতে সমর্থ হন, তিনিই সিদ্ধিলাভ করেন। তদ্ভিন্ন ইহার দ্বারা সমাধিলাভ করা যায় না। শিবসংহিতা” বলিতেছেন, প্রথমে পূরক যােগ দ্বারা মনকে স্বীয় মূলাধারপদ্মমধ্যে বায়ুর সহিত পূরণ করিবে। তৎপরে যােনিদেশ সঙ্কুচিত করিয়া যােনিমুদ্রা সাধন করিতে হয়। শিষ্য। যােনিদেশ কাহাকে বলে ? গুরু। গুহ্যদ্বার হইতে লিঙ্গ পর্যন্ত স্থানের নাম যােনিদেশ বলিয়া অভিহিত।

যােগ ও সাধনা: শিষ্য। তারপর বলুন। গুরু। তাহার পর ব্রহ্মযােনিমধ্যে কামদেবের ধ্যান করিতে হইবে। শিয়া। কামদেবের ধ্যান কি রূপ ? গুরু। কামদের বন্ধু কফুলের মত শােণিতবর্ণ, কোটি সূর্যের মত সমুজ্জ্বল এবং কোটিচন্দ্রের মত সুশীতল । এইভাবে কামদেবকে ভাবনা করিয়া তাহার উদ্ধভাগে পরমশক্তির ধ্যান করিবে । শিষ্য। পরমাশক্তির ধ্যান কি ? গুরু। পরমাশক্তি অগ্নিশিখার ন্যায় সূক্ষ্ম এবং চৈতন্য কাপ, তিনি পরমাত্মার সহিত একীভূতরূপে বিদ্যমান। তাহার প্রাণায়াম দ্বারা গুলাদি লিঙ্গত্রয়ের (স্কুল, ও কার ? অবয়বক্ত জীবাত্মা গুনিসহ সুষুমার রন্ধ মার্গ দ্বারা ব্ৰহ্মমার্গে গমন করিয়া থাকেন : শিরােদেশ অধােমুখ কমলকণিকার অভ্যরে পরমাত্মার সহিত কুণ্ডলিনীশক্তি সঙ্গতরূপে বিদ্যমান, তাহা কইতে তেজঃশালী পাটলবণ আনন্দময় অমৃতধারা ক্ষরিত হইতেছে। যােগবলে জীবায়। মূলাধার হইতে উদ্ধোতি হইয়া সেই অমৃত পান করেন । এবং পুনৰ্ব্বার পদদেশে অবতরণ করিয়া মূলাধারে অবস্থিত ব্রহ্মযােনিতে প্রবেশ করেন। জীবাত্মার এইরূপ ব্ৰহ্মথোনিতে গমনাগমনরূপ প্রাণায়াম সাধক মাত্রাযােগে অভ্যাস করিবেন। শিষ্য । কয়বার প্রাণায়াম করিতে হইবে ? তিনবার। তাহার পর চিন্তা করিবে। ব্রহ্মযােনিগতা কুণ্ডলিনী মুলাধারপদ্মে পরমাত্মার প্রাণস্বরূপিণী হইয়া বিদ্যমান রহিয়াছেন। এই প্রকারে যাতায়াতের পরে আবার ঐ জীবাত্মা কালাগাদি শিবাত্মক ব্ৰহ্মযােনীতে লীন হইতেছেন, এইরূপ ভাবনা করিতে হইবে। ইহারই নাম যােনিমুদ্রা। সকল মুদ্রার মধ্যে এই

যােগ ও সাধনা
মুদ্রাই শ্রেষ্ঠ ইহার
শ্রেষ্ঠ ইহার সাধনায় সাধক নিখিল কর্মই সম্পাদন
করিতে সমর্থ ।
শিষ্য। যােনিমুদ্রা সাধনের ফল কি।
যে সাধক যােনিমুদ্রা সাধন করিতে পারেন, তিন
ব্রহ্মহত্যা, প্রাণহত্যা, মদ্যপান, গুরুপত্নীগমন প্রভৃতি এমন অতিপাতক
নাই, যাহা তাহাকে স্পর্শ করিতে পারে। পৃথিবীতে যত কিছু
পাতক উপপাতক আছে, এই নােনিমুদ্রার সাধনে সে সকলই
তৎক্ষণাৎ দূরীভূত হয় এবং যিনি মুক্তিলাভের ইচ্ছা করেন, তিনিও
ইহার সাধন করিবেন।
বজ্রোণী মুদ্রা
গুরু। অতঃপর বজ্রোণীমুদ্রার কথা বলিব। উভয় হস্তের
করতল মৃত্তিকাতে স্থিরভাবে রাশিয়া উযুদেশে
উযুদেশে পদদ্বয় ও মস্তক
উত্তোলিত করিলেই বজ্রোণীমুদ্রা হইল।
শিষ্য। ইহার ফল কি?
গুরু। এই মুদ্রাসাধন করিলে, দেহ বলশালী হয় এবং আয়-
বৃদ্ধি হইয়া থাকে। ইহা মুদ্রাযযাগসমূহের শ্রেষ্ঠ, নােগীদিগের
মুক্তির হেতু, পরম হিতকারী এবং ইহা যােগীদিগকে সিদ্ধি দান
করে। সাধক এই মুদ্রার কপায় বিন্দুসিদ্ধ হয়।
শিষ্য। বিসিদ্ধি কি ?
গুরু। দেহীদিগের বিন্দ অর্থাৎ বীর্য্যই সকল শক্তির—সকল
স্বাস্থ্যের মূল। এই মুদ্রার সাধনে সেই বিন্দুধারণের শক্তি জন্মায়।
ইহাকেই বিসিদ্ধি বলে। বিসিদ্ধি ব্যক্তির পৃথিবীতে কোন কাৰ্যই
অসাধ্য নহে। এমন কি, ভােগী পুরুষও যদি এই মুদ্রার সাধন
করেন, তবে তিনিও সকল বিষয়ে সিদ্ধিলাভ করেন।

যােগ ও সাধনা
শক্তিচালনী মুদ্র।
গুরু । এইবার শক্তিচালনীমুদ্রার কথা বলিব ; কিন্তু তাহার
পূৰ্কে কিছু গুহ্যকথা বলিব।
শিষ্য। ইহা কি পরে বলিলে চলিবে না ?
গুরু ।
।
শিষ্য। ইহার কারণ কি।
গুরু। কারণ এই যে, এই গুহ কথা না জন্মিলে শক্তিচালনী
মুদ্রা বুঝা যাইবে না।
শিষ্য। বেশ, তবে বলুন
নরদেহে পরমদেবতা কুলকুণ্ডলিনীশক্তি সাৰ্ধতিয়বেষ্টিত।
( সাড়ে তিন পাক বেষ্টিত) সপিনীবৎ
মূলাধারপঝে নিদ্রাগত
ভাবে বিদ্যমান।
শিষ্য । আমি একটা প্রশ্ন করিতে পারি ?
স্বচ্ছন্দে।
শিষ্য। এই মুদ্রাতত্বে মধ্যে মধ্যে সহস্রদল, কুলকুণ্ডলিনী প্রভৃতি
কতক গুলি শব্দ শুনিতেছি। কিন্তু ঠিক বুঝিতে পারিতেছি না।
গুরু। তুমি ঠিকই বলিয়াছ। ইহার পর যখন ষট্‌চক্রভেদের
কথা বলিব, তখনই ইহার অর্থ হৃদয়ঙ্গম হইবে। এখন মাত্র
কথাগুলি জানিয়া রাখ। এইবার শুন। সেই কুলকুণ্ডলীনীশক্তি
যতকাল নিদ্রিতাবস্থায় থাকেন, ততকাল কোটি কোটি যােগের
অভ্যাসও যদি করা যায়, তথাপি জ্ঞানলাভ হয় না, জীব পশুবং
অজ্ঞান থাকে। যেমন তালা খুলিতে হইলে চাবির আবশ্যক সেইরূপ
ব্ৰহ্মদ্বার খুলিতে হইলে কুলকুণ্ডলিনীকে জাগরিত করিতে হইবে। এই
মুদ্রাসাধনের কতকগুলি অপরিহার্য বিধি আছে।

যোগ ও সাধনা ৬২ শিষ্য। কি বিধি আছে ? প্রথমত বস্ত্র দ্বারা নাভি প্রদেশ বেষ্টন করিতে হইবে। তাহার পর নির্জন কক্ষে যাইয়া এই মুদ্রা অভ্যাস করিতে হইবে । উলঙ্গ হইয়া কিম্বা গৃহের বাহিরে এ কাৰ্য্য হইবে না। শিষ্য। নাভিবেষ্টনের কোন নিয়ম আছে ? গুরু। স্থা। বিতস্তি প্রমাণ লম্বা এবং চারি আঙ্গুল বিস্তৃত ( চওড়া) কোমল, শ্বেত সূক্ষ্ম বই নাভিবেষ্টনে প্রশস্ত। ঐ কাপড়কে কটির কাপড়ের সহিত সংযুক্ত করাই নিয়ম। তাহার পর ভস্ম দ্বারা সৰ্বাঙ্গ লিপ্ত হইয়া সিদ্ধাসনে উপবেশন করিবে। তৎপরে দুইটি নাসারন্ধ দ্বারা প্রাণবায়ু আকর্ষণ পূর্বক সৰলে অপান বায়ুর সহিত যুক্ত করিতে হইবে। যতক্ষণ পর্যন্ত বা সুষুম্না নাড়ীর ভিতরে প্রবেশ করিয়া প্রকট না হয়, অশ্বিনীমূদ্রা দ্বারা গুহ্যদেশ শনৈঃ শনৈঃ কুঞ্চিত করিতে হইবে। এইরূপে অবস্থিত হইয়া নিশ্বাস রােধ করতঃ কুম্ভকযােগে বায়ু নিরােধ করিলে সর্পাকৃতি কুলকুণ্ডলিনীশক্তি প্রবুদ্ধা হয়েন এবং উদ্ধমার্গে উখিত হইয়া থাকেন। তাৎপর্য এই যে, এইরূপ হইলে কুলকুণ্ডলিনীশক্তি সহস্রদলকমলে পরমাত্মার সহিত মিলিত হন। শিষ্য। এই মুদ্রা কি সাধনা না করিলেই নহে? গুরু। ইহা অবশ্য কর্তব্য। কেন না, এই শক্তিচালনীমুদ্রায় অভ্যস্ত না হইলে যােনিমুদ্রায় সিদ্ধিলাভ করা যায় না। সুতরাং পুব্বে এই মুদ্রা অভ্যাস করিয়া পরে যােনিমুদ্রা অভ্যাস করা নিয়ম। শিষ্য। ইহার কি প্রকারভেদ আছে ? গুরু। আছে । শিবসংহিতা' বলিয়াছেন, আধার কমলে যে কুণ্ডলিনীশক্তি নিদ্রিতাবস্থায় বিরাজমানা, নিদ্রিতাবস্থায় বিরাজমানা, পূর্বে তাহাকে প্রবুদ্ধ।

যােগ ও সাধনা করিয়া সবলে অপানবায়ু আকর্ষণ করিতে হইবে। এই আকর্ষণ করাকেই শক্তিচালনী মুদ্রা বলা হয় । শিষ্য। এ মুদ্রা অভ্যাসের ফল কি ? গুরু। এই মুদ্রায় অভ্যস্ত হইলে জরা-মৃত্যুর ভয় থাকে না ; এই নিমিত্ত যে সকল সাধক সিদ্ধি কামনা করেন, তাহারা সৰ্ব্ব- প্রযত্নে এই মুদ্রা অভ্যাস করিবেন। যিনি ইহা অভ্যাস করেন, সিদ্ধি তাহার করতলগত এবং বিগ্রহসিদ্ধি লাভ হয় ও নিখিল রােগ দূরীভূত হয়। তাড়াগীমুদ্রা গুরু। পশ্চিমােত্তান আসনে উপবিষ্ট হইয়া জঠরদেশকে তড়াগ- সদৃশ করিয়া কুম্ভক করিলেই তারাগী মুদ্রা হইল। মুদ্রাসমূহের মধ্যে এই মুদ্রা প্রধান। ইহা অভ্যাসে জরা-মৃত্যুর ভয় তিরােহিত হয়। মাকৗমুদ্রা গুরু। মুখগহ্বর মুদ্রিত করিয়া উদ্ধভাগে তালুগহরে রসনার মূলভাগকে চালিত করতঃ জিহ্বার দ্বারা সহস্রদল-কমল হইতে নির্গত অমৃতধারা পান করিতে পারিলেই মাকীমুদ্রা হইল। শিষ্য। ইহার ফল কি? গুরু। এই মুদ্রায় অভ্যস্ত ব্যক্তির দেহে বলি ও পলিত সঞ্চারিত হয় না। কেশরাশি পক্কতা প্রাপ্ত হয় না এবং তাহার যৌবন চিরদিন অব্যাহত থাকে। শাম্ভবীমুদ্রা গুরু। উভয় প্রার মধ্যদেশে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া চিন্তাষােগ দ্বারা পরমাত্মাকে নিরীক্ষণ করিতে পারিলেই শাবী মুদ্রা হইল। সকল শাস্ত্রই ইহাকে অতি গুপ্ত বলিয়াছেন।

যােগ ও সাধনা শিষ্য। ইহার ফলের কথা বলুন। গুরু। ইহা এত গােপনীয় যে, তন্ত্র বলিতেছেন, বেদ, পুরাণ প্রভৃতি শাস্ত্রসমূহ বেশ্যার মত প্রকাশমান, কিন্তু শাম্ভবীমুদ্রা কুল-স্ত্রীর ন্যায় গােপনীয়। শাম্ভবীমুদ্রা পরিজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি আদিনাথ সদৃশ, নারায়ণ তুল্য এবং তিনি সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার স্বরূপ, এমন কি, তঁহাকে ব্ৰহ্ম ও বলা যায়। পঞ্চধারণামুদ্রা এইবার পঞ্চধারণামুদ্রা। শিষ্য। পঞ্চধারণা কি কি ? গুরু। ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুদ ও ব্যোম। এই পাঁচটি জাগতিক পদার্থ অর্থাৎ জগতের উপাদান। তদনুসারেই ইহার নামকরণ হইয়াছে—পাবী, আন্তসী, আগ্নেয়ী, বায়বী ও আকাশী । প্রথমে পার্থিবী ধারণার কথা বলিতেছি। পার্থিবীধারণামুদ্র। গুরু। পৃথিবীতত্বের বর্ণ হরিতালবং। লকার। লং) ইহার বীজ, ইহার মুক্তি চতুষ্কোণ এবং ইহার দেবতা ব্রহ্মা, ইহাই হইল পৃথিবী- যােগবলে এই পৃথিবীতত্বকে হৃদয়ের ভিতর সমুখিত করিয়া চিত্তের সহিত হৃদ্দেশে সংহত করিতে হইবে, তাহার পর প্রাণবায়ু আকর্ষণ করতঃ পঞ্চঘটিকা ( প্রত্যেক ঘটিকা ২ দণ্ড) অবধি কুম্ভক- সহকারে ধারণ করিয়া থাকিতে সমর্থ হইলে পার্থিবীধারণামুদ্রা হইবে। ইহার আর একটি নাম অবােধারণামুদ্রা। শিষ্য । ইহার গুণ কি ? গুরু। যে যােগী ইহাতে অভ্যস্ত হন, তিনি পৃথিবী জয় করিতে সমর্থ হন।

পুস্তকে কোন দাগকাটা, পাতা ছেড়া
মও লিখল এব: সাত দিনের মধ্যে
ফেরৎ না দিলে জরিমানা দিতে হইবেযােগ ও সাধনা
শিষ্য । পৃথিবী জয় করিতে সমর্থ হন। এর মানে ?
গুরু। তাৎপৰ্য্য হইতেছে এই যে, পার্থিব কোন ব্যাপারে
তাহার মৃত্যু ঘটা সম্ভব নহে। যে সাধক প্রত্যহ এই মুদ্রা সাধন
করেন,
তিনি মৃত্যুঞ্জয় হইয়া সমগ্র পৃথিবী পরিভ্রমণ করিয়া
থাকেন।
আন্তসীধারণামুদ্র।
অন্ত মানে জল। এই জলতত্বের বর্ণ শ চন্দ্র এবং
• কুন্দপুষ্পসদৃশ শ্বেতবর্ণ, ইহার মূর্তি চতুল্য, বকার ( বং) ইহার
বীজ এবং ইহার দেবতার নাম বিষ্ণু। যােগবলে হৃদয়ের অভ্যন্তরে
এই জলতত্বের উদ্ভব করিতে হইবে। তৎপরে প্রাণবায়ুকে আকর্ষণ
করতঃ অনন্যচিত্তে পঞ্চঘটিকা পর্যন্ত কুম্ভক সহযােগে ধারণ করিতে
পারিলেই আন্তসীমুদ্রা হইল ।
শিষ্য। ইহার গুণ কি ?
গুরু। যিনি এই মুদ্রায় অভ্যস্ত হন, জল হইতে তাহার
কোনরূপ ভয় থাকে না, অধিকন্তু পৃথিবীর সকল দুঃখও তাহা
হইতে দূরে থাকে।
শিষ্য। ইহার প্রকারান্তর আছে কি?
আছে। নাভিপ্রদেশে কুম্ভকযােগে প্রাণবায়ুকে পঞ্চঘটিকা
অবধি ধারণ করিতে হইবে, তাহা হইলেই আন্তসীমুদ্রা হইল।
কিন্তু সাবধান, ইহা অতি গােপনে রাখিবে এবং প্রকাশ হইলে
সিদ্ধিহানি অবশ্যম্ভাবী।
শিষ্য। ইহা গােপন রাখার তাৎপর্য কি?
গুরু। তাৎপৰ্য এই যে, সাধক কখনই একথা প্রকাশ করিবেন
যে তিনি আন্তসীমূদ্রায় সিদ্ধ।

যােগ ও সাধনা আগ্নেয়ৗদারুণ মুদ্রা গুরু। অগ্নিতত্বের স্থান নাভিপ্রদেশ। এই তত্বের বর্ণ ইন্দ্র- গােপতুল্য রক্তবর্ণ, রকার (রং) ইহার বীজ, ত্রিকোণমূৰ্ত্তি এবং ইহার দেবতা রুদ্র। এই অগ্নিতত্ব তেজঃশালী, জ্যোতিষ্মন এবং সিদ্ধি প্রদ। অন্তরে যােগ প্রভাবে এই তত্ত্বের উদ্ভব করাইতে হইবে। পরে অনন্তচিত্ত হইয়া কুম্ভকযােগে প্রাণবায়ুকে ধারণ করিলেই আগ্নেয়ী- ধারণামুদ্রা হইল। ইহার প্রকারভেদ ও আছে। শিষ্য। তাহা কি? কুম্ভকযােগে পঞ্চঘটিকা যাবৎ প্রাণবায়ুকে নাভির উদ্ধ- দেশে ধারণ করারই নাম আগ্নেয়ীধারনামুদ্রা। শিষ্য। ইহার ফল কি ? গুরু। যে রােগীর যে রােগীর এই মুদ্রা আয়ত্ত, তাহার সংসারে ভয় দুরে পলায়ন করে, অগ্নি হইতে তার কোন ভয় থাকে না, তিনি যদি প্রচণ্ড অগ্নিমব্যেও ঝাপ দেন, তথাপি তাহার কোন অনিষ্ট হইবে না। বায়বীধারণামুদ্রা গুরু। বায়ুতত্বের বর্ণ পিষ্ট, অঞ্জন ধুম্রবৎ কৃষ্ণবর্ণ, যকার (যং) ইহার বীজ এবং ইহার দেবতা স্বয়ং ঈশ্বর । তত্ত্ব সত্ত্বগুণসম্পন্ন। কুম্ভক সহকারে প্রাণবায়ুকে অাকর্ষন করিয়া পঞ্চঘটিকা অবধি বায়ুতত্বকে কুম্ভকযোগে ধারণ করিতে হইবে, তবেই বায়বীমুদ্রা হইবে। শিষ্য। ইহার প্রকারান্তর কি? গুরু। নাভি ও জ্বর, মধ্যস্থলে দুই প্রদেশ পরিমিত স্থানে কুম্ভক- যােগে পঞ্চঘটিকা অবধি প্রাণবায়ুর অবরােধই বায়বী-ধারণামুদ্রা।

৬৭
যােগ ও সাধনা
শিষ্য। ইহার ফল কি?
গুরু । সাধকরা এই মুদ্রাকে শ্রেষ্ঠ বলিয়া থাকেন; কেন না,
ইহার দ্বারা জরা ও মৃত্যু দুরীভূত হয় এবং বায়ুতে ইহার মৃত্যু
কাচ দটে না। তদ্বতীত এই মুদ্রার অভ্যাসে আকাশে ভ্রমণ
করবার শক্তি জন্মে।
আকাশীধারণামুদ্রা
শুরু। নির্মল সাগরসলিলবৎ আকাশতকের বর্ণ, ইহার বীজ
কার ( ইং ) এবং ইহার দেবতা সদাশিব। অনন্তচিত্ত
অনন্যচিত্ত হইয়া
যােগবলে কুন্তক সহকারে প্রাণবায়ুকে আকর্ষণ করিয়া পঞ্চবটিকা
পর্যন্ত স্থির রাখিলেই আকাশীমূদ্রা হইল। ইহা আবার অন্যবিধ ও
তারে কথিত আছে।
শিষ্য। তাহাও আমাকে বলুন।
গুরু। . যােগী জয়ের
ক্রয়ের মধ্যে সযত্নে কুম্ভক দ্বারা পঞ্চঘটিকা
পর্যন্ত প্রাণবায়ুকে ধ্যান করিলেই আকাশমুদ্রা সম্পন্ন হইল।
শিষ্য। ইহার উপযোগিতা কি ?
যে সাধক ইহাকে অভ্যাস করেন, তিনি দেবত্ব এবং
শক্তি এই উভয়ই লাভ করেন; তিনি মৃত্যুর অধীন হন না।
তাৎপর্য এই যে, তিনি ইচ্ছা না করিলে মৃত্যু তাহাকে গ্রাস
করিতে সমর্থ হয় । তদ্ব্যতীত মহাপ্রলয়েও তিনি অবসাদ
প্রাপ্ত ও বংশ হন না।
অশ্বিনীমুদ্রা
গুহদ্বার বার বার কুঞ্চিত ও প্রসারিত করিতে
থাকিলেই অশ্বিনীমুদ্রা হইল। ইহাকে শক্তিপ্রবােধকারিণী বলিয়া ও
অভিহিত করা হয়।
০

যােগ ও সাধনা
শিষ্য। ইহার দ্বারা কি উপকার পাওয়া যায় ?
গুরু। ইহার অভ্যাসে গুহ্যরােগ বিনাশ প্রাপ্ত হয়, দেহে
বলধন ঘটে, শরীরের পুষ্টি হয় এবং অকালমৃত্যু নিবারিত হইয়া থাকে
সন্দেহ নাই।
পাশিনীমুদ্রা
গুরু। স্বীয় পদদ্বয় কক্ষের পাশ দিয়া পৃষ্ঠদেশে লইয়া গিয়া সুদৃঢ়ভাবে
বন্ধন করিলেই পাশিনীমুদ্রা হইল। এই মুদ্রাসাধনে পুষ্টিলাভ ঘটে।
কাকীমুদ্রা
গুরু। ওষ্ঠদ্বয় কাকচক্ষুবং করিয়া শনৈঃ শনৈঃ বায়ু পান
করিলেই কাকীমুদ্রা হইল। এই মুদ্রার সাধক কখনও কোনরুপ
ব্যাপি কর্তৃক আক্রান্ত হন না।
মাতঙ্গিনীমুদ্রা
গুরু। আকঃ জলে নিমজ্জিত হইয়া
প্রথমে নাসার দ্বারা
আকর্ষণ করিয়া মুখদার দিয়া বিনির্গত করিবে ; তৎপরে
মুশদ্বার দিয়া জল গ্রহণ করিয়া নাসারন্ধ, দ্বারা সেই জল বাহির
করিয়া দিবে। এইরূপ বার বার করিলেই মাতঙ্গিনীমুদ্রা হইবে ।
শিষ্য। ইহার দ্বারা কি উপকার পাওয়া যাইবে ?
গুরু। সাধক এই মুদ্র সাধন করিলে দেহে মাতঙ্গের মত
শক্তি লাভ করেন এবং জরা ও মৃত্যুকে জয় করিতে সমর্থ হন।
তিনি যেখানেই কেন বাস করুন না, সর্বত্রই সুখলাভ করেন।
তবে ইহা অতি নির্জনস্থানে সাধন করিতে হইবে।
ভুজঙ্গিনীমুদ্রা
বদনমণ্ডল সামান্য পরিমাণ প্রসারনপূর্বক গলদেশ দ্বারা
বায়ু পান করিতে সমর্থ হইলেই ভুঙ্গিনীমুদ্রা হইল।

যােগ ও সাধনা ইহ জরা-মৃত্যুনাশক এবং ইহার দ্বারা দেহের যাবতীয় বাবি বিনাশ প্রাপ্ত হয়। এই আমি তােমাকে নিখিল মুদার কথা বলিলাম। তবে এ সন্ধে তােমাকে যে শিক্ষা দিব, সযত্নে তাহা পালন করিও। ইহা সাধারণকে কখনই শিক্ষা দিবে না, বা তাহাদের সহিত আলোচনা করিবে না। যাহারা ভক্তিমান, বিশ্বাসী এবং গুরুভক্ত, তাহ- দিগকেই ইহা শিক্ষা দিবে। শিষ্য। আপনি পূর্বে বলিয়াছেন, মুদ্রা কি এবং যোগদাপনে উহার উপযোগিতা বা কি, তাহা পরে বলবেন। এখন তাই শানিতে ইচ্ছা করি। গুরু। আমাদের দেহের ভিতর কুলকুণ্ডলিনীশক্তি আছে, সেই কুলকুণ্ডলিনীই সকল শক্তির আধার। শযু। উহা কি, তাহা আমাকে বিস্তারিতকপে বলুন। গুরু। উহা বুঝিতে হইলে ষট্চক্রভেদ বুকা আবশ্যক। তবে তাহাই বলুন। বেশ। আগামী কল্য তােমাকে ষটচক্রভেদ বলব। তাহা হইলেই তুমি বুঝিতে পারিবে, কুলকুণ্ডলিনী কোথায় অবহিত এবং তাহার শক্তিই বা কি। শুধু তাহাই নহে, আমাদের দেহে কোথায় কি অবস্থিত আছে, তাহাও জানিতে পারিবে। জানিলে তুমি চমৎকৃত ও মুগ্ধ হইবে এবং হংসঙ্গে দেহতত্বের অনেক কিছু জানিতে পারিবে।

পঞ্চম অধ্যায়
ঘট চক্র
শিষ্য। আপনি আজ ষট্‌চক্রের কথা বলিবেন বলিয়াছেন।
গুর! হাঁ, তাহা আমার স্মরণ আছে। এই ষট্‌চক্র জানিতে
পারিলেই তুমি বুঝিতে পারিবে, দেহের ভিতর কোথায় রা ষট্‌চত্র
অবস্থিত আছে, এবং নাড়ীসমূহ ৭ বা কোথায় কিরূপে বিদ্যমান
আবার ঐ নাড়ীসমূহের দ্বারা কি কৰ্য্য সম্পন্ন হয়।
শিষ্য। আমাদের দেহে প্রধান নাড়ী কয়টি ?
গুরু। তিনটি মূল নারী, অন্যান্য নাড়ী ইহারই শাখা প্রশাখা ।
শিম্য। ঐ তিনটির নাম কি ?
গুরু। ইড়া, পিঙ্গল ও সুষুম্না।
শিষ্য। ইহারা কোথায় কি ভাবে বিদ্যমান ?
গুরু। বলি । মেরুদণ্ডের বহির্দেশে বামভাগে ইড়া, দক্ষিণ
ভাগে পিঙ্গলা এবং মধ্যভাগে সুম্না নাড়ী বিদ্যমান।
গিষ্য। ইহার আকৃতি প্রকৃতি কিরূপ।
গুরু। ইড়া নাড়ী চন্দ্রের ন্যায় প্রভাযুক্তা, পিঙ্গলা নাড়ী সূৰ্যস দৃশ
দীপ্তিশালিনী এবং সুষুম্না নাড়ী চন্দ্র, সূৰ্য্য এবং অগ্নি—এই তিনের
মিলিত তেজঃসম্পন্ন । ইহার বর্ণ ধুতুরাপুষ্পের ন্যায়। এই সুষুম্ন
নাড়ীই সকল নাড়ীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ ।
শিষ্য। ইহা শ্রেষ্ঠ কেন?

৭১ যােগ ও সাধন গুরু ! কারণ, ইহা সত্ব রজঃ ও তম-এই ত্রিগুণসম্পন্ন। শিষ্য । ইহার অবস্থানের স্বরূপ কি ? গুর । ইহা মূলাধার পক্স হইতে মস্তক সহস্রদল কমল পর্যন্ত বিস্তৃত আহে। ঐ সহশ্রাল কমলের মধ্যভাগে একটি আছে, সেই ছিদ্র হইতে কে নাড়ী বহির্গত হইয়াছে, তাহার নাম ঐ বড় নাড়ীর দুইটি মুখ। এক মুখ লিঙ্গমূল পর্যন্ত এবং অপর মুখ মস্তক অবধি বিস্কৃতভাবে বিদ্যমান। শিষ্য। এই নাড়ী কি খুবই তেজংশালিনী গুরু। ঠিকই বলিয়াছ। এই ৰন্দ্ৰ নাড়ী দীপশিখার মত দীপ্তিশালিনী। এই বজ নাড়ীর এই বজ্ৰ নাড়ীর মধ্যভাগে চিত্রিনী নামে আর একটি নাড়ী আছে। ইহা লুতন্তুর ন্যায় অতীব সূক্ষ্ম এবং ইহার আদি, অন্ত ও মধ্যভাগ প্রণবযুক্ত। তাৎপর্য এই যে, এই নাড়ী ব্রহ্মা-বিষ্ণু- শিবাত্মক। দেহের মধ্যে যে ষপ আছে, তাহারই সংযােগসূত্ৰৰূপে এই চিত্রিনী নাড়ী শােভমান । শিষ্য। এই ষট্‌পদ্মের নাম কি। গুরু। মূলাধার, স্বাধিষ্ঠান, মণিপূরক, অনাহত, বিশুদ্ধ ও আজ্ঞা। যাহারা যােগাভ্যাস করেন, তাহারা ব্যতীত এই নার্ভ কাহারও বোধগম্য হয় না। দেহের কোন স্থানে এই ষট্‌পদ্ম অবস্থিত? সুষুম্না নাড়িতে এই পদ্ম ছয়টি অঙ্কিত অবস্থায় আছে। যে যােগী প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞানার্জন করিয়াছেন, তিনিই উহা পরিজ্ঞাত হইতে সমর্থ। এই চিত্রিী নাড়ীর মধ্যভাগেই ব্ৰহ্মনী বিরাজিত।

মােগ ও সাধনা ৭২ শিষ্য। উহা কি ভাবে আছে ? গুরু। মূলাধার পদ্মে মহাদেব বিরাজমান। সেই মহাদেবের মুখবিবর হইতে শিরঃস্থিত সহস্রদল পৰ্য্যন্ত এই ব্ৰহ্মনাড়ী বিস্তৃত রহিয়াছে। যৎকালে চিত্ত এই ব্রহ্মনাড়ীতে সংযুক্ত হয়, তৎকালে সুষুমানাড়ী কম্পিত হইতে থাকে। তাহার ফলে সমস্ত দেহই এক বিপুল আনন্দে উচ্ছসিত হইয়া পড়ে। শিষ্য। ঐ ব্ৰহ্মনাড়ী কিরূপ? গুরু। ইহা বিদ্যুৎমালাবৎ দীপ্তিশালিনী, মুনিজনহৃদয়ের যজ্ঞােপ- বীতের ন্যায় শােভামানা, অতি সূক্ষ্ম, বিশুদ্ধ জ্ঞানশালিনী, নিত্যসুখ- স্বরূপা এবং অনাবিল জ্ঞানস্বরূপা। শিষ্য। ঠিক বুঝিতে পারিলাম না । গুরু। ইহার তাৎপর্য এই যে, যিনি এই ব্রহ্মনাড়ীতে চিত্ত নিবিষ্ট করিতে সমর্থ হন, তিনিই নিৰ্ম্মল আত্মজ্ঞান, নিরবচ্ছিন্ন সুখ এবং পরিশুদ্ধ স্বভাব লাভ করেন। শিষ্য। মূলাধার পদ্ম কোথায় অবস্থিত ? গুরু। মূলাধার বা আধার পদ্ম লিঙ্গের নিম্নদেশে এবং গুহের উদ্ধ'ভাগে বিরাজমান। এক কথায় লিঙ্গ এবং গুহ-এতদুভয়ের মধ্যস্থলে অবস্থিত। শিষ্য। মূলাধার পদ্ম কি ? গুরু। মূলাধার পদ্ম অর্থে ব্ৰক্ষর; কেন না, ব্রহ্মনাড়ীর মুখদেশে মূলাধার পদ্ম শােভমান। ঐ ব্রহ্মার হইতেই অবিরত সুধাধারা ক্ষরিত হইতেছে বলিয়া ঐ স্থান পরম রমণীয় ঐ স্থান সকল পদ্মেরই গ্রন্থিসদৃশ। যােগিগণ বলেন যে, ব্ৰহ্মদ্বারই সুষুম্ননাড়ীর মুখ।

৭৩ যােগ ও সাধনা শিষ্য। ইহার নাম মূলাধার হইল কেন? শুরু। ইহা কুণ্ডলিনী প্রভৃতি নাড়ীসমূহের আধার বলিয়াই ইহার নাম মূলাধার। শিষ্য। এই পদ্ম দেখিতে কিরূপ? গুরু। এই পদ্ম রক্তবর্ণ, ইহার দল চারিট এবং উহ নিম্ন- দেশে বিকসিত। শিষ্য। ঐ দল গুলি অমনই আছে, না, তাহাতে কিছু বিন্যস্ত আছে ? দল চারিটি পূৰ্বাদিক্রমে ব শ ষ স~-এই চারিটি অক্ষর বিন্যস্ত আছে। ঐ অক্ষরগুলির বর্ণ তপ্তকাঞ্চনসদৃশ। শিষ্য। তাহা হইলে কিরূপ দাড়াইতেছে ? গুরু। দাড়াইতেছে এই যে, ঐ মূলাধার পদ্ম রক্তবর্ণ, চারদল বিশিষ্ট এবং সেই দল গুলিতে পূৰ্বদিক হইতে আরম্ভ করিয়া গলিত স্বর্ণের বর্ণযুক্ত চারিটি অক্ষর অর্থাৎ বংশং সং সং বিন্যস্ত। আবার এই পদ্মের মধ্যভাগে দীপ্তিশালী চতুঃকোণবিশিষ্ট পৃথিবীচক্র বিদ্যমান। শিষ্য। পৃথিবীচক্র কিরূপ। গুরু। এই পৃথিবীচক্র আটটি মূলদ্বারা বেষ্টিত, উহার বর্ণ পীত, এবং বিদ্যুতের তার কোমল । ইহার মধ্যভাগে পৃথীবীজ লং বিরাজিত আছে। শিষ্য। এই পৃথীবীজের স্বরূপ কি। গুরু। এই পৃথীবীজের চারটি হাত এবং তিনি বিবিধ ভূষণে বিভূষিত, ঐরাবতারূঢ় এবং ইন্দ্রদেবতাত্মক। এই বীজের ক্রোড়ে নবােদিত সূৰ্য্যবং লােহিতবর্ণ এক শিশু বিরাজিত। তাহাকেই সকলে ব্রহ্মা বলিয়া অভিহিত করিয়া থাকেন। '।

যােগ ও সাধনা
৭8
শিষ্য । ঐ হাত কয়টি কি ?
ঋক, যজু, সাম ও অথৰ্ব্ব, এই চারিটি হস্তস্বরূপ
বেদ ব্রহ্মার মুখ হইতে ফুরিত হইয়াছে।
শিষ্য। স্ফুরিত হইয়াছে। কেন, ব্রহ্মা কি বেদ রচনা করেন নাই ?
গুরু। না, বেদের কর্তা কেহই নাই। শ্ৰতি বলিতেছেন,
“ন কচিং বেদকর্তা চ বেদস্মৰ্ত্তা পিতামহঃ।” অর্থাৎ বেদের
রচয়িতা কেহ নাই, ব্রহ্মা বেদের স্মরণকা মাত্র। এই নিমিত্তই
বেদ সনাতন। এই পৃথিবীচক্রে দেবী ডাকিনী বাস করিয়া থাকেন।
শিষ্য। এই দেবীমূর্তি কিরূপ ?
গুরু। এই দেবীর হাত চারিটি, চক্ষু লােহিতবর্ণ এবং দ্বাদশ
সূয্যের ন্যায় দীপ্তিশালিনী। পূর্বে যে শিশুরূপী ব্ৰহ্মার কথা বলা
হইয়াছে, এই ডাকিনী দেবীও তাহার ন্যায় রূপ ধারণ করিয়া
শােভা পাইতেছেন।
শিষ্য। ডাকিনী দেবী এখানে বিরাজিত কেন ?
গুরু। শক্তি বা প্রকৃতি ব্যতীত যে কোনরূপ কাৰ্য্যই হইতে
পারে না, ইহা হইতে তাহারই আভাস পাওয়া যাইতেছে। দেব ব্রহ্মা,
দেবী ডাকনী অথবা ব্রহ্মা পুরুষ, ডাকিনী প্রকৃতি। প্রকৃতি ও
পুরুষের মিলন ব্যতীত এ জগতে কোন কিছুই সংঘটিত হইতে
পারে না, তাই ব্রহ্মা এখানে শক্তির সহিত বিরাজমান। বুঝিয়াছ ?
শিষ্য। আজ্ঞা হাঁ। তাহার পর বলুন!
পূর্বে যে বর্জনাড়ীর কথা বলা হইয়াছে, তাহার
মুখপ্রদেশে মূলধারপদ্মের দলমধ্যে একটি ত্রিকোণ যন্ত্র আছে ।
এই যন্ত্রটি বিদ্যুতের ন্যায় দীপ্তিশালী, মনােরম ও বিলাসাম্পদ।
শিষ্য। এই যন্ত্রের নাম কি ?

যােগ ও সাধনা গুরু । এই যন্ত্রের নাম ত্রৈপুর। এই বৈপুর যন্ত্রের অভ্যন্তরে কদর্প নামক বায়ু অবস্থিত। শিষ্য । এখানে কন্দর্প বায়ু কি নিমিত্ত অবস্থিত ? গুরু। এই কন্দর্প বায়ুই দেহের সর্বাংশে বিচরণ করিয়া থাকে। তাহার ফলেই জীবাত্মা তাহার অধীন হইয়া মানবদেহে অবস্থিতি করেন। এই কন্দর্প বায়ু কোটি সূর্যের ন্যায় দীপ্তিমান্ এবং বন্ধুলী পুষ্পপেক্ষাও গাঢ় রক্তবর্ণ। এই ত্ৰৈপুর যমধ্যে লিঙ্গরূপী স্বয়ম্ভু বিরাজমান। শিম্য । ইহার মূর্তি কিরূপ ? গুরু। ইহার দেহ গলিত স্বর্ণের ন্যায় কোমল অর্থাৎ তাহার দেহ অতিশয় রমণীয়। তিনি পশ্চিমাভিমুখে অপােমুখে অবস্থিত। ইহাকে একমাত্র ধ্যান ও তত্ত্বজ্ঞান দ্বারাই লাভ করা যায়। শিষ্য। তাঁহার মূর্তি কিরূপ? নবপল্লবের মত তাহার বর্ণ, পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় সমুজ্জ্বল কান্তি; সুতরাং অতিশয় স্নিগ্ধ । তিনি বারাণসীবাসশীল, বিলাস- সম্পন্ন এবং তাহার আকৃতি নদীর আবর্তের ন্যায় গােলাকার। শিষ্য। ইহার দেবী কে এবং তাহার অবস্থিতিই বা কিরূপ? গুরু। এই স্বয়ম্ভ লিঙ্গের উদ্ধভাগে জগনােহকারিণী, পদ্মসূত্রের ন্যায় অতিক্ষু, কুলকুণ্ডলিনী অর্থাৎ মহামায়া অবস্থিত করিয়া সেই মূলাধার পদ্মমধ্যে নিয়ত বিলাসে ব্যাপৃত আছেন। ব্রহ্মনাড়ী হইতে প্রবাহিত সুধাধারা মুখব্যাদান করিয়া ব্ৰহ্মদ্বারের মুখ আচ্ছাদন করত সেই সুধাধারা পান করিতেছেন। শঙ্খ যেরূপ আবৰ্ত্ত, সেইরূপভাবে আবর্তিত হইয়াই তিনি অবস্থিত। তিনি প্রজ্জ্বলিত দীপশ্রেণীস্বরূপা এবং মেঘাভ্যন্তরস্থ বিদ্যুতের ন্যায় পরিশােভিত।।

যােগ ও সাধনা ৭ ৬ শিষ্য। তিনি কি ভাবে অবস্থিত? গুরু। সর্প যেমনভাবে বেষ্টিত হইয়া থাকে, তিনিও সেইরূপভাবে বারত্ৰয় বেষ্টিত হইয়া সেই স্বয়ম্ভুলিঙ্গের মস্তকে শয়ন করিয়া আছেন, এই জন্যই ইহার নাম কুলকুণ্ডলিনী। ইহার পূর্বে এককবার কুলকুণ্ডলিনীর কথা বলিয়াছি। এখন বুঝিলে, কুলকুণ্ডলিনী কি ? শিষ্য। আজ্ঞা । ইহার এরূপ ভাবে থাকিবার কারণ কি ? গুরু। ইহার কারণ এই যে, এই মহাতেজঃশালিনী কুলকুণ্ডলিনী সেই মূলাধার পদ্মে অবস্থান করতঃ কোমল কাব্যপ্রব সকল রচনা করিয়া অতিশয় ভেদ ক্রমবিশিষ্ট হইয়া মত্ত ম??লের গুঞ্জনের ন্যায় অনবরত অব্যক্ত অথচ মধুর ধ্বনি করিতেছেন। ইনিই শ্বাস-প্রশ্বাসের গমনাগমন নিয়ন্ত্রিত করিয়া প্রাণিগণের প্রাণ- রক্ষা করিয়া থাকেন। এই কুলকুণ্ডলিনীর দেহমধ্যে অতীব কুশলা, সাতিশয় জ্ঞানদায়িনী কলা বিদ্যমান। শিষ্য। কলা অর্থে কি বুঝিব ? গুরু। চৈতন্যময়ী প্রকৃতি। শিষ্য। ইহার কাৰ্য্য কি ? গুরু। বলি শােন। এই কলা বা প্রকৃতি নিত্যাননস্বরূপ, বিদ্যুল্লতাবৎ দীপ্তিশালিনী। এই দীপ্তি এত সমুজ্জ্বল দে, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের তাবৎ বস্তুই তাহার দীপ্তিতে দীপ্তিমান ! ইনিই নিত্যজ্ঞানের প্রকাশরূপা, পরমেশ্বরীরূপে জয়যুক্ত হইয়া বিরজানা। ইহাই হইল মূলাধার পদ্মের স্বরূপ । শিষ্য। আর একটু বিশদভাবে বুঝাইয়া বলুন। গুরু। দেখ, পূৰ্ব্বে ও বলিয়াছি, এখনও বলিতেছি, একবার মাত্র গুনিলেই সকল বস্তু বােধগম্য হয় না। বার বার বার বার অধ্যয়ন ৭৭ যােগ ও সাধনা করিতে হয়, অন্তনিহিত ভাৰসকল উপলব্ধি করিতে হয়,—সর্বোপরি গুরুর উপদেশ গ্রহণ করিতে হয়। এ গুরুত্ব বিষয়, অত সহজ নয়। যাহারা মনে করে, গ্রন্থ দেখিয়াই সকল বুঝিব, তাহারা ভ্রান্ত। শি। তবে এ সব আলােচনায় ফল কি? ফল এই যে, এই বিষয়ে আগ্রহের উদ্রেক করা মাত্র। আমার সে বিষয়ে কিছুমাত্র ধারণা নাই, আমি ত সে বিষয়ে কিছুমাত্র আকৃষ্ট হইতে পারি না-পারা সম্ভবও নহে। এই প্রেরণা হইতে কে'তৃহলের উদ্রেক হয়, কৌতূহল উক্তি হইলে তবে সে বিষয়ে প্রচেষ্টা হয়, প্রচেষ্টা হইতেই সিদ্ধিলাভ ঘটে। এই জন্যই আলাচনার প্রয়ােজন আছে। শিমু । এ কথা স্বীকার করিতেই হইবে। গুরু । আমি তােমাকে সংক্ষেপে আর একবার মূলাধার পদ্মের কথা বলি ।. পূর্বে যে ব্ৰহ্মনাড়ীর কথা বলিয়াছি, তাহার মুখেই মূলাধার পদ্ম অবস্থিত। এই মূলাধার পদ্ম চারিটি দলযুক্ত, রক্তবর্ণ এবং পূৰ্ব্বদিক্‌ হইতে আরম্ভ করিয়া ঐ দলচতুষ্টয়ে যথাক্রমে ব শং যং সং এই কয়টি অক্ষর বিদ্যমান। ইহাতে পৃথ্বীদেবতাত্মক চতুষ্কোণ মণ্ডল, সেই মণ্ডলের আট দিকে আটটি ত্রিশূল এবং মধ্যভাগে লং বীজ অঙ্কিত। এই মূলাধার পদ্মে শিশুরূপী ব্রহ্মা বিরাজিত, বেদচতুষ্টয় তাঁহার মুখশােভা, তিনি চতুৰ্ব্বাহু, ভূষণমণ্ডিত এবং ঐরাবতারূঢ়। পৃথিবীচক্রে ইহার বাস, ইনি তথায় ডাকিনী নাম্নী শক্তির সহিত অবস্থান করিতেছেন। মূলাধার পদ্মের দলমধ্যে বিদ্যুদাভ ত্রিকোণাকৃতি যন্ত্র, চতুর্দিকে রক্তবর্ণ কাৰ্প বায়ু প্রবাহিত। ঐ ত্রিকোণমধ্যে অধোমুখে নবােগত পল্লবসদৃশ স্বয়ম্ভুলিঙ্গ বৰ্তমান; এই লিঙ্গের উদ্ধভাগে সার্থত্ৰিতয়বেষ্টিত কুলকুণ্ডলিনী বিরাজিত। এই কুলকুণ্ডলিনীই চৈতরূপিণী প্রকৃতি। এই প্রকৃতিই জানিগণের

যােগ ও সাধনা
৭৮
জ্ঞানলাভের একমাত্র কারণস্বরূপা। ইহাই হইল সংক্ষেপে মলাধারপদের
স্বরূপ। যিনি এই কোটিসূৰ্য্যসদৃশ তেজংশালিনী দেবীকে নগম্য
করিতে পারেন, তিনি বৃহস্পতিত্বলা নরােত্তম এবং সর্বশাস্ত্রাবিং হইয়া
থাকেন। শুধু তাহাই নয়, যিনি এই কুলকুণ্ডলিনীকে উপলব্ধি করিতে
সমর্থ হন, এমন কোন ব্যাধি জগতে নাই, যে এরূপ ব্যক্তিকে আক্রমণ
করিতে পারে। এরূপ সাধক সর্বসময়েই নিৰ্ম্মলস্বভাব, সান এবং
বিবিধ স্তবাদি রচনা দ্বারা দেবতা ও গুরুকে প্রসন্ন করিতে সমর্থ ।
কথায় বলা যায়, ইহার অসাধ্য জগতে কিছুই নাই।
শিষ্য। আজ্ঞা হাঁ, এইবার ভালভাবেই বুঝিয়াছি। এবারের
পর কোন্ পদ্ম।
স্বাধিষ্ঠান।
এইবার তাহারই কথা বলিব। পূর্পে
বলিয়াছি, লিঙ্গের মূলদেশে অর্থাৎ সুষম্না নাড়ীর মধ্যদেশে চিত্রিনী
নাড়ী আছে। তাহা তােমার স্মরণ হয় কি?
শিষ্য। আজ্ঞা হা, হয়
বৈ
বেশ। সেই চিত্রিনী নাভীতে একটি পদ্ম বিরাজমান।
শিষ্য। এই পদ্মের আকৃতি কিরূপ?
গুরু। উহা সিদ্রবৎ অরুণবর্ণ, সুদৃশ্য এবং ইহা বড় দল।
ঐ দলগুলি বিদ্যুৎ সমুজ্জ্বল।
শিষ্য। ঐ দলে কি আছে ?
গুরু। ছয়টি অক্ষর।
শিষ্য। অক্ষরগুলি কি ?
বং ভং মং যং রং ও, লং। ইহারই নাম স্বাধিষ্ঠান পন্ন।
শিষ্য। ইহাতে আর কিছু নাই ?
• গুরু। আছে বৈ কি। ক্ৰমে সবই প্রকাশ পাইবে
পাইবে। এই
कि

৭৯
যােগ ও সাধনা
পদ্মে মধ্যস্থলে অর্ধচন্দ্রসদৃশ শ্বেতবর্ণ বরুণচক্র বিরাজিত। ইহাকেই
বরুণের জামণ্ড বলে। ইহারই মধ্যে শারদীয় চক্ষুবং নিম্মল
মকরবাহন বরুণবীজ বং অবস্থিত আছে।
শিষ্য। বরুণবীজের আধার কে?
গুরু। বরুণবীজের আধারভূত স্বয়ং বরুণদেব। তাহার অঙ্কে
পীতবস্ত্রপরিহিত, নবযৌবনসম্পন্ন, শ্রীবৎসলাঞ্ছিত এবং
কৌস্তুভাদিপরিশােভিত চতুহস্ত শ্ৰীনারায়ণ বিরাজিত।
শিষ্য। ইহার শক্তি কি ?
গুরু। এই বরুণচক্রে রাকিনীশক্তি বিদ্যমান। ইনি নীলপদ্ম
তুল্য কান্তিমতী, বিবিধ অস্ত্রধারিণী, অলঙ্কতা এবং উন্মত্তচিন্তা।
ইনিই এই পদ্মের শক্তি ও পুরুষ নারায়ণ ।
শিষ্য। ইহা দ্বারা কি উপকার হয় ?
গুরু। যিনি এই পদ্মকে উপলব্ধি করিতে সমর্থ হন, তিনি
ষড়রিপু ধংস করিতে সমর্থ হন।
শিষ্য। ষড়রিপু কি ?
গুরু। কাম, ক্রোধ, লােভ, মােহ, মদ ও মাৎসৰ্য এই ছয়টি রিপু।
শিষ্য। ইহার আর কি গুণ আছে, বলুন।
গুরু। অজ্ঞান অন্ধকারাচ্ছন্ন মানবের জ্ঞানসূর্যের উদয় হওয়ায়
ঐ অজ্ঞানান্ধকার তিরােহিত হয় ও কবিত্ব শক্তি জন্মে।
শিষ্য। সংক্ষেপে আর একবার বলুন।
গুরু। চিত্রিনী নাড়ীতে একটি বড় দলপদ্ম আছে, ইহা বিদ্যুতের
ন্যায় প্রজ্জোল, ঐ ষড়দলে বং
য রং লং বর্ণগুলি
বিদ্যমান। উহাতে শারদীয় চন্দ্রের কাজ ৩ভ্রবর্ণ বকুণবীজ বং
বিরাজিত। এই পদ্মে বরুণদেবের অঙ্কে নবযৌবনসম্পন্ন নীলবর্ণ

যােগ ও সাধনা চতুভ জ নারায়ণ অবস্থিত এবং নীলবর্ণা চতুভুজ রাকিনীশক্তি অধিষ্ঠিত। ইহা সংক্ষেপে স্বাধিষ্ঠান পদ্মের স্বরূপ। ইহার পর মণিপুর পদ্ম । শিষ্য । তাহা বলুন। গুরু । পূর্বে যে ষড়দল স্বাধিষ্ঠানপদ্মের কথা বলিয়াছি, সেই পদের উদ্ধভাগে নাভিমূলে দশদলবিশিষ্ট এক পদ্ম আছে। ইহারই নাম মণিপুর পদ্ম। শিষ্য । ঐ দশ দলে কোন্ কোন্ বীজ নিহিত ? গুরু। এই পরে বর্ণ গাঢ় নীল এবং উহার দশ দলে যথাক্রমে উৎ ঢং ণং তং থং দং ধং নং পং ও ফং-এই দশটি বর্ণ বিন্যস্ত। শিষ্য। এই সকল অক্ষরের বর্ণ কি? গুরু। উহাদের বর্ণ নীলপদ্মবং এবং অত্যন্ত তেজঃশালী। শিষ্য। ইহার মণ্ডল কিরূপ? গুরু। ইহাতে অগ্নির অধিষ্ঠানভূমি ত্রিকোণযুক্ত এক মণ্ডল বিদ্যমান। ইহা অরুণবর্ণ এবং নবােদিত সূর্যের ন্যায় লােহিত বর্ণাভা। এই ত্রিকোণের বহির্ভাগে তিনটি দ্বার বিদ্যমান এবং তাহাতে বহ্নিবীজ বিন্যস্ত। শিষ্য। বহিবীজ কাহাকে বলে ? রং। ইহাই হইল বহিবীজ। শিষ্য। ইহার স্বরূপ কি? গুরু। এই বহ্নিবীজ মেষাধিরূঢ়, নবােদিত সূৰ্য্যতুল্য এবং চতুহস্তমুক্ত, এইভাবে ধ্যান করা কর্তব্য। ইহার ক্রোড়ে উজ্জ্বল সিদ্রবং বর্ণসম্পন্ন ভস্মলিপ্তদেহ, সৃষ্টি ও লয়কারী,বৃদ্ধ, ত্রিনয়ন, সর্বাভীষ্টপ্রদ, রুদ্ররূপী মহাকাল বিরাজ করিতেছেন, মহাকালের এক হতে বর এবং অপর হস্তে অভা শােভা পাইতেছে।

৮১ যােগ ও সাধনা শিষ্য । ইহার শক্তির নাম কি? গুরু। লাকিনী । শিষ্য । ইনি দেখিতে কিরূপ, এবং ইহার গুণই বা কি ? গুরু। ইনি নিখিল শুভদাত্রী, সর্বকল্যাণকারিণী, চতুর্হস্তা, তপ্ত- কাঞ্চনবাভা, পীতবস্ত্রপরিধানা, নানারত্নালঙ্কারভূষিতা এবং এবং সদানন্দ- ময়ী। ইহাই মণিপুরপদ্ম। সে সাধক এই মণিপুরপদ্মকে ধ্যানগম্য করিতে সমর্থ হন, তিনি সৃষ্টি, স্থিতি এবং সংহার কাৰ্য্যে পারগ। তাহার মুখে বাণী বস্থাদায়িনী দেবী সরস্বতী নিয়ত বাস করিয়া থাকেন। শিষ্য। সরস্বতী বাস করেন, এ কথার তাৎপর্য ? তাৎপৰ্য এই যে, সেই সাধক অশেষ জ্ঞানসম্পন্ন হন। মণিপুরপত্মের আর নাম নাভিপদ্ম। ইহার পর অনাহত পদ্ম । শিষ্য। অনাহত পদ্মের কথা বলুন। গুরু। বলি, শােন। মণিপুর বা নাভিপশ্নের উদ্ধ'ভাগে হৃৎ- প্রদেশে বন্ধুকপুতুল্য দ্বাদশদল পদ্ম আছে, তাহারই নাম অনাহতপদ্ম । শিষ্য। ইহার অক্ষরসংখ্যা কত? গুরু। ইহার দ্বাদশদলে দ্বাদশটি অক্ষর, যথা -কং খং গং বং ৬ চং ছং জং ঝং এবং টং এবং ঠং এইগুলি যথাক্রমে বিন্যস্ত আছে। শিষ্য। ইহাদের বর্ণ কিরূপ? গুরু। এই সকলের বর্ণ প্রোজ্জ্বল সিন্দুরের ন্যায় । ইহাদের ভিতর ষটকোণবিশিষ্ট এবং ধূমবর্ণ বায়ুমণ্ডল বিরাজমান। এই যটকোণের মধ্যেই বায়ুৰীজকে ধ্যান করা কর্তব্য। বায়ুবীজ কি ? শিষ্য। যং। শিষ্য। ইহার মূর্তি কিরূপ।

যােগ ও সাধনা গুরু। ইহা ধুম্রবর্ণ, মাধুৰ্য্যবিশিষ্ট, চতুর্যন্ত, কৃষ্ণসারাধিরূঢ় এবং সৰ্ব্ব প্রধান। শিষ্য। ইহার পুরুষ কে? গুরু। ঈশান। শিষ্য। তাহার মূর্তি কিরূপ এবং তাহার ধ্যান কি ? গুরু। ইনি কৰুণানিধান, মালিহীন এবং শ্বেতবর্ণ ; ইহাই ইহার ধ্যান। এই দেব ঈশান স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল—এই ত্রিভুবনবাসী। ইনি নিখিল জীবের অভয়দানকারী এবং বরদাতা বলিয়া কথিত। শিষ্য। ইহার শক্তি কে? গুরু। কাকিনী। শিষ্য। তাঁহার মূর্তি কিরূপ ? গুরু। ইনি নবীন বিদ্যুতের ষ্ঠায় পীতবর্ণা, নয়নত্রিতয়যুক্তা এবং মঙ্গলকারিণী ইনি সৰ্বালকারভূষিতা, সদানন্দময়ী, যােগিগণের হিতকারিণী, আনন্দবিলা, ইহার অন্তঃকরণ সদাই অমৃতময়ী। ইনি চতুভুজা; সেই তুচতুষ্টয়ে যথাক্রমে পাশ, কঙ্কাল, বর এবং অভয় বিরাজ করিতেছে এবং ইহার গলদেশে অস্থিমাল। শােভা পাইতেছে। শিষ্য। ইহাতে আর কি আছে? গুরু। এই পদ্মের কর্ণিকার অর্থাৎ বীজকোষের মধ্যে কোটি বিদ্যুৎতুল্য কোমলদেহা, কল্যাণবিধায়িনী, ত্রিনয়ন, ত্রিকোণা নামধারিণী অন্য এক শক্তি বিরাজমান এবং উহার মধ্যে সুবর্ণবৎ এক বাণলিঙ্গ বিদ্যমান। এই বাণলিগের শিরােদেশ সূক্ষ্মরন্ধ যুক্ত অর্থাৎ মণির উপর যেরূপ সূক্ষ্ম ছিদ্র শােভা পায়, ঠিক তপ । শিষ্য। সংক্ষেপে অনাহত পদ্মের কথা একবার বলুন। গুরু। বলিতেছি। হৃদ্দেশে বন্ধুকপুষ্পৰৎ লালবর্ণ, হদিশদলযুক্ত, যােগ. ও সাধন ক হইতে ঠ পৰ্যন্ত দ্বাদশটি অক্ষরসমন্বিত পদ্ম আছে, সেই পদ্মে ধম্নবর্ণ ষট্‌কোণাকৃতি বায়ুমণ্ডল, ঐ ষট্‌কোণাভ্যন্তরে চারিহস্তযুক্ত কৃষ্ণসারবাহন বা বীজ যং, তাহার মধ্যে দুইটি হস্তযুক্ত শুক্লবর্ণ ঈশানদেব, বিদ্যুতের ন্যায় বর্ণবিশিষ্ট। চতুভুজা কাকিনী শক্তি এবং পদ্মমধ্যস্থ বীজকোষে ত্রিনয়না ত্রিকোণা নামধেয়া বিদ্যুদ্বরণ শক্তি এবং স্বর্ণতুল্য তেজঙ্কর বাণলিঙ্গ বিরাজমান। বুঝিয়াছ ? শিষ্য। আজ্ঞা হা। এখন ইহার ফল কি, তাহাই বলুন। গুরু। যে ব্যক্তি এই অনাহত পদ্মকে হৃদয়ে ধ্যান করিতে সমর্থ হয়, সেই ব্যক্তি বৃহস্পতিতুল্য হন এবং তিনি স্বর্গ মর্ত্য ও পাতালের রক্ষা বা ধ্বংস করিতে সমর্থ। এক কথায় বলা যাইতে পারে, তিনি কেবল বৃহস্পতির নহে—জগতের ঈশ্বর হইয়া থাকেন। এ অনাহত পদ্ম কল্পবৃক্ষের ন্যায় সর্বকামনা পূরণ করিতে পারে। এই এই পদ্মই মহাদেবের আবাসভূমি কৈলাসতুল্য, নিকম্প দীপশিখাসদৃশ জীবাত্মা কর্তৃক পরিশােভিত এবং সূর্যমণ্ডলের ন্যায় তেজসম্পন্ন। তাহার সম্বন্ধে অন্যবিধ মতও বিদ্যমান । শিষ্য। সে মত কি ? গুরু। অনেকে বলেন, পূর্বে যে দ্বাদশদল পদ্মের কথা বলা হইয়াছে, তাহার মধ্যভাগে গোেপন অপর এক পদ্ম আছে, তাহার দল আটটি। এই অষ্টদলপদ্মই কল্পবৃক্ষস্বরূপ। এই কল্পবৃক্ষের মূলদেশে মহাদেব প্রভৃতি দেববৃন্দ বিরাজমান। ঐ স্থানই হংসাকৃতি জীবাত্মার অধিষ্ঠানস্থান। সাধক ইষ্টদেবতাজ্ঞানে সেই জীবাত্মাকে ধ্যান করিতে পারিলে নিখিল অভিষ্টই লাভ করিতে সমর্থ হন। এই অনাহত পদ্মকে যিনি ধ্যান করিতে পারেন, তিনিই সকল যােগর মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তিনি সকল রমণীর মনােঙ্গয়ে সমর্থ, অথচ ইন্দ্রিয় জয় করা তাহাতেই সম্ভব।

যােগ ও সাধনা
৮৪
তিনি অসাধারণ কবিত্বশক্তি লাভ করেন ও নারায়ণের ন্যায় সর্বময় কর্তৃত্বই
তিনি অর্জন করেন। বেশী কি বলিব, পর-শরীরে প্রবেশলাভ করিবার
শক্তিও তিনি অর্জন করেন। ইহাই হইল অনাহতপদ্ম সম্বন্ধে শেষ কথা।
শিষ্য। ইহার পর কোন্ পদ।
গুর। বিশুদ্ধাগ্য।
শিষ্য। ইহা কোথায় বর্তমান ?
গুরু। কণ্ঠদেশে।
শিষ্য। ইহাতে কয়টি দল আছে ?
গুর। ষােড়শটি স্বরবর্ণ।
শিষ্য; ষােলটি স্বরবর্ণ ! স্বরবর্ণ ত চৌদ্দটিই জানি।
গুরু। চোটি স্বরবর্ণের নাম কর।
অ আ ই ঈ উ ঊ ঋ ঋ ৯ এ ঐ ও ঔ ।
বেশ। ঐ গুলির সহিত অং অঃ এই দুইটি যােগ
করিলেই মােলটি হইল।
শিষ্য। কিন্তু ঐ দুইটি ত অই মাত্র। তবে কি বুঝিব
অকার তিনটি ?
গুরু; না, অকার একটিমাত্র ।
শিষ্য।
শিষ্য। তবে ?
গুরু। ঐ দুইটি অন্য কিছুই নহে, উহারা অনুস্বর ও বিসর্গ ।
কিন্তু ঐ দুইটি পৃথক উচ্চারণ করা সম্ভব নহে বলিয়া অকারযুক্ত করিয়া
উচ্চারণ করিতে হয়। এই পদ্মমধ্যে পূর্ণচন্দ্রবৎ গােলাকৃতি আকাশমণ্ডল
বিদ্যমান। বিজ্ঞানসম্পন্ন, হিমচ্ছায়াবৎ তে হস্তীর উপর আরূঢ়,
শ্বেতবর্ণ পাশ অঙ্কুশ বর ও অভয়চারি হন্তে এই চারিটি ধারণ
করতঃ মনু পরিশােভিত, অকশচক্রের ক্রোড়দেশে দশবাহ, ব্যাচ

যােগ ও সাধনা
পরিহিত, পঞ্চমূখ, ত্রিনেত্র, গৌরীর সহিত একাঙ্গ দেবাদিদেব
মহাদেব বিরাজিত রহিয়াছেন।
শিষ্য। এই পদ্মের শক্তি কে? তাহার মূর্তি কিরূপ?
গুরু। শাকিনী, ইনি পীতাম্বরধারিণী এবং চন্দ্রবিম্ব-নির্গত সুধাপানে
সদাই আনন্দচিতা, ইনি চতুস্তা। সেই হস্তচতুষ্টয়ে বাণ, ধ, পাশ
ও অঙ্কুশ ধারণ করিয়া অাছেন। এই পমের কণিকার অভ্যন্তরে বিশুদ্ধ
নিৰ্ম্মল চন্দ্রমণ্ডল শােভিত আছে।
শিষ্য। এই চন্দ্রমণ্ডলের স্বরূপ কি?
গুরু। ইহা আর কিছুই নহে; ইহা হইতেছে, লক্ষ্মীযুক্ত ও
জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তির মোক্ষদ্বার বা নির্বাণদ্বার ।
শিষ্য। ইহার শক্তি কি ?
গুরু। ইহার শক্তি অসীম।
শিষ্য। কি সে শক্তি?
গুরু। এই বিশুদ্ধখ্য পদ্মে যে যােগী নিরন্তর সমাহিত থাকেন,
তিনি যদি ক্রোধযুক্ত হন, তাহা হইলে তিনি মুহূৰ্তমধ্যে এই
ত্রিভুবন প্রচলিত করিতে সমর্থ হন।
শিষ্য। ইহার শক্তি ত অদ্ভুত ।
গুরু। তােমাকে
তােমাকে ইহার শক্তির কথা অবক কি বলিব, সেই
যােগ যখন ত্রিভুবনচালনে রত হন, তখন কি ব্রহ্মা, কি রুদ্র
এমন কি, স্বয়ং বিষ্ণু পর্যন্ত তাহাতে বাধা দিতে সমর্থ হন না,
সূৰ্য্য বা গণপতি প্রভৃতির কথা আর কি বলিব।
শিষ্য। ইহার অার কি শক্তি আছে ?
গুরু। সেই যােগী কবি, কামী, জ্ঞানী, শান্তচিত্ত, সৰ্বলােদশী,
সৰ্ব্বলােকহিতৈষী, রােগশূন্য, শোকহীন চিরজীবী হয়।

যােগ ও সাধনা ৮৬ সূর্যের যেরূপ অন্ধকাররাশি বিদূরিত করেন, তেমনই নিখিল বিপাশি দূর করিতে সমর্থ । শিষ্য। সংক্ষেপে বিশুদ্ধাখ্যপদ্মের কথা বুঝাইয়া বলুন। কেন, তুমি কি উহা ধারণা করিতে পার নাই ? শিষ্য। আজ্ঞা হাঁ, ধারণা করিতে পারিয়াছি ; তবে বিক্ষিপ্ত- ভাবে শ্রবণ করিয়াছি, তাই আর একবার সংক্ষেপে শুনিতে চাই। গুরু। বেশ, আমি বলিতেছি, তুমি শ্রবণ কর। কণ্ঠদেশে ষােড়শদলযুক্ত এবং ঘােড়শ স্বরবর্ণ বিশিষ্ট এক পদ্ম বিদ্যমান, ইহার নাম বিশুদ্ধাখ্য পদ্ম এবং ইহা ধূম্রবর্ণ। ঐ পদ্মের অভ্যন্তরে আকাশমণ্ডল বিদ্যমান; ঐ মণ্ডলমধ্যে শ্বেতহস্তিবাহন চতুর্যন্ত মনু আছেন। ঐ মনুর ক্রোড়দেশে একদেহে হরগৌরী শশাভিত আছেন ; তথায় শাকিনী নাম্নী শক্তি এবং নিকলঙ্ক চন্দ্রমণ্ডল বিরাজমান। ঐ চন্দ্রমণ্ডল জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তির নির্বাণদ্বার। সংক্ষেপে ইহাই হইল বিশুদ্ধাব্য পদ্ম। ইহার পর অজ্ঞাপদ্ম । শিষ্য। আজ্ঞা পদ্মের স্বরূপ কি? গুরু। তুমি কি পূৰ্বে আজ্ঞামের নাম শুন নাই ? শিষ্য । আজ্ঞা হাঁ, শুনিয়াছি ; কিন্তু উহার স্বরূপ জানি না। তাই প্রশ্ন করিতেছি। গুরু। তােমার প্রশ্ন সঙ্গত, ইহা স্বীকার করিতেই হইবে তবে আমাকে আজ্ঞাপদ্ম বুঝাইয়া দিন। গুরু। বুঝাইতেছি, শ্রবণ কর। আজ্ঞা পদ্ম কোথায় অবস্থিত ? গুরু। উভয় জ্বর মধ্যভাগে আজ্ঞাপন্ন অবস্থিত। শিষ্য। এই পশ্নের দল অবশ্যই আছে ? শিষ্য।

যােগ ও সাধনা
গুরু। অবশ্যই আছে। দল ব্যতীত কি পন্ন হওয়া সম্ভব?
শিষ্য। ইহার দল কয়টি ?
গুরু । ইহার দল দুইটি।
শিষ্য । ইহার বর্ণ কিরূপ?
গুরু। নিষ্কলঙ্ক চন্দ্ৰমাৎ ইহার বর্ণ শুভ্র এবং ইহা যােগিগণের
ধ্যানস্থান স্বরূপ।
শিষ্য। ইহাতে কি কি বর্ণ আছে ?
ঐ দুইটি দলে হ এবং ক্ষ—এই দুইটি বর্ণ বিদ্যমান।
শিষ্য। এই পদ্মে আর কি কি আছে ?
গুরু। উহার মধ্যভাগে বিদ্যামুদ্রা, কপাল, ভমরু এবং জপমালা
বিভূষিতা চহস্তবিশিষ্ট। নির্মূলচিত্তা ষড়বদন এক শক্তি বিরাজিতা।
শিষ্য। ঐ শক্তির নাম কি ?
গুরু। হাকিনী।
ঐ পদ্মের অভ্যন্তরভাগ কিরূপ?
গুরু। এই পদ্মের অভ্যন্তরভােগ সূক্ষ্মাকার মন এবং যােনি-
সদৃশা কণিকায় এক শিবলিঙ্গ বিদ্যমান।
শিষ্য। ঐ শিবলিঙ্গের একটি নাম অবশ্যই আছে।
গুরু। নিশ্চয়ই।
শিষ্য। লিঙ্গের নাম কি?
গুরু। ইতর ।
শিষ্য। ইতরলিঙ্গের স্বরূপ কি?
গুরু। এই শিবলিঙ্গ বিদ্যুন্মালাবৎ দীপ্তিশালী, ব্রহ্মজ্ঞানলাভের
প্রবােধক এবং বেদাদি নিখিল শাস্ত্রের প্রণস্বরূপ।
শিষ্য কি প্রকারে ইহার ধ্যান করিতে হয় ?
শিষ্য ।
।

যােগ ও সাধনা গুরু। যােগী ব্যক্তি একাগ্ৰমনে এবং যথাক্রমে হাকিনী শক্তি, মন, ইতরনাম শিবলিঙ্গ এবং পরিশেষে প্রণবচিন্তা করতঃ ধ্যানস্থ হইবেন। শিষ্য। এই ধ্যান দ্বারা কি ফললাভ করা যায় ? গুরু। যিনি এইভাবে অর্থাৎ আজ্ঞাপদ্মে যথাক্রমে হাকিনী- শক্তি মন, ইতরনামক শিবলিঙ্গ এবং ' প্রণব ধ্যান করিতে সমর্থ হন, তিনি ঋষিশ্রেষ্ঠ, সর্বজ্ঞ, নিখিলবো, সর্বদশী, সৰ্বলােক- হিতৈষী এবং নিখিলথাৰিৎ হইতে সমর্থ হন। শিষ্য। আর কি ফললাভ করা যায়? গুরু। তিনি পর কারে প্রবেশ করিবার শক্তিলাভ করেন এবং সর্বশক্তিমান হইয়া থাকেন। শিষ্য। সর্বশক্তিমান অর্থে কি বুঝিব? গুরু। তাৎপৰ্য এই যে, এ জগতে তাহার কোন বস্তু বা কাৰ্য্যই দুর্লভ নহে। এই পদ্মের অন্তচক্রে- অচক্র কি? যে স্থানকে পরমশক্তিস্থান কহে, উহাই অন্তশ্চক্র। উহা জ্বর উদ্ধভাগে অবস্থিত। সেই অন্তশ্চক্রে বিশুদ্ধজ্ঞান ও জ্ঞেয়স্বরূপ অন্তরাত্মা অবস্থিতি করিতেছেন। শিষ্য। ইহা দেখিতে কিরূপ? শুষ্ক। এই অন্তরাত্মা প্ৰলিত দীপশিখার ন্যায় উজ্জ্বল এবং প্রণবাত্মক। এই প্রণবের উদ্ধাদেশ অর্ধচন্দ্র দ্বারা পরিশােভিত। আর ইহারও উপরে বিন্দুরূপী মকার শােভা পাইতেছে। শিষ্য। মকার একক না, উহাতে অপর কিছু আছে? গুরু। মকার একক নহে। উহাতে এক শিবলিঙ্গ বিদ্যমান। শিষ্য। তাহার আকৃতি কিরূপ? শিষ্য।

যােগ ও সাধনা
গুরু। ঐ শিবলিঙ্গ বলরামসদৃশ শ্বেতবর্ণ এবং চন্দ্রসমূহের
স্যায় ধবল এবং তিনি নারূপী ।
শিষ্য। আজ্ঞাপদ্ম ধ্যানের ফল কি?
গুরু। এই আজ্ঞাপদ্ম পরমানন্দের আলয়। ইহাতে যাহার
চিত্ত স্থির হর, সে পরম গুরুর আরাধনা করত অন্তরীক্ষে পুরী
নিৰ্মাণ করিতেও সমর্থ হয়।
শিষ্য। অন্তরীক্ষে পুরী নির্মাণের তাৎপর্য কি?
গুরু। তাৎপৰ্য্য এই যে, উত্তমরূপে আজাপদ্মে চিত্ত লীন
হইলে নিরালম্বমুদ্ৰাতত্ব জ্ঞাত হওয়া যায়।
শিষ্য। ইহার ফল কি ?
গুরু। ইহার ফল এই যে, যিনি ইহাতে অভ্যস্ত হইতে সমর্থ
হন, তিনি আত্মজ্যোতিকতাদর্শনে সমর্থ হন।
শিষ্য। আত্মজ্যোতিঃকলাদর্শনের কল কি ?
গুরু। আত্মজ্যোতিঃকদর্শন হইলেই নিখিল ব্রহ্মাণ্ডের আয়-
স্বরূপ অবগত হইতে পারা যায়। বুঝিছ ?
শিষ্য। আজ্ঞা হা। আর একটা কথা ।
গুরু। কি বল।
শিষ্য। আপনি পূর্বে অন্তরাত্মার কথা বলিয়াছেন। সে সম্বন্ধে
কিছু জানিতে ইচ্ছা করি।
গুরু। কি জানিতে চাই?
শিষ্য । উহার বর্ণ কিরূপ, উহাতে কি আছে, ইত্যাদি ।
শুরু। দীপশিখার ন্যায় ঐ অন্তরাত্মা দীপিশালী, প্রভাত
কালীন সূর্যবং তেজাসম্পন্ন। এই অন্তরাত্মাকে আকাশ ও পৃথিবীর
মধ্যস্থল বলিয়া চিন্তা করিতে হইবে।

মােগ ও সাধনা
শিষ্য।
এবং
। ঠিক বুঝিতে পারিলাম না।
গুরু। বুঝাইয়া দিতেছি। অন্তরাত্মা অর্থাৎ ঐ জ্যোতিঃ শির
প্রদেশ হইতে মূলাধারপস্থিত পৃথিবীচক্র অবধি বিস্তৃতরূপে বিদ্যমান।
এই স্থানেই সূৰ্য্য, চন্দ্র এবং অগ্নির তেজশালী নিখিল জগতের
সাক্ষীস্বরূপ ষড়ৈশ্বৰ্য্যসম্পন্ন অক্ষয় ও অব্যয় ঈশ্বরের সাক্ষাৎকার
লাভ হয়। আর এই স্থানই বিষ্ণুর অতুলনীয় প্রমােদভবনস্বরূপ ।
শিষ্য। আজ্ঞাপদ্মজ্ঞানের ফল কি ?
গুরু। এই আজ্ঞাপন্নে মনােনিবেশ পূৰ্ব্বক যদি কোন যােগী
প্রাণত্যাগ করেন, তাহা
করেন, তাহা হইলে তিনি অবিনাশী, জন্মরহিত,
ত্রিজগতের আদিভূত
সনাতন, বেদান্তবেদ্য পরমপুরুষে
লয় প্রাপ্ত হন অর্থাৎ তিনি মুক্তিলাভ করেন, এ বিষয়ে সন্দেহ নাই।
শিষ্য। পূর্বে আপনি নাদরূপী মহাদেবের কথা বলিয়াছেন,
কিন্তু সে সম্বন্ধে বিস্তৃতভাবে কিছু বলেন নাই।
গুরু। বলিতেছি। দিদলপদ্মের উর্দ্ধে যে নারূপী মহাদেব
আছেন, তাহার উদ্ধৃভাগ বায়ুর বিলীনস্থান। তিনি দ্বিহস্ত। সেই
হস্তদ্বয় দ্বারা বর ও অভয় মুদ্রা ধারণ করিয়া বিদ্যমান। তিনি
নিৰ্ম্মল এবং স্থির প্রকৃতি। তাহার দর্শনে ফল অনন্ত।
শিষ্য। সেই ফল কি?
গুরু। যােগী যৎকালে ঐ গুরুর পাদপদ্ম ধ্যান করিতে করিতে
ঐ নারূপী মহাদেবকে দর্শন করিতে সমর্থ হন, তখনই তিনি
বাকৃসিদ্ধি লাভ করিয়া থাকেন।
শিষ্য। বাকৃসিদ্ধির অর্থ কি?
অর্থ এই যে, তঁাহার বাক্যের শক্তি এরূপ অমােঘ হয়
যে, তিনি যাহা বলিবেন, তাহাই হইবে। তােমাকে এই চক্রের কথা

যােগ ওঁসাধনা ; বলিলাম। ইহা হইতে বুঝিতে পারা যাইতেছে যে, যােগশিক্ষ করিতে হইলে ইহার প্রয়ােজনীয়তা কত অধিক। শিষ্য। ইহা না জানিলে কি যােগসাধন হয় না ? । এই ষট্‌চক্র পরিজ্ঞাত না হইলে কেহই যােগমার্গে অগ্রসর হইতে সমর্থ হয় না। এই ঘটুচক্রের সহিত আর একটি বিষয় সম্যক্ প্রকারে পরিজ্ঞাত হওয়া অত্যাবশ্যক। শিষ্য। সেটি কি? সহার পন্ন। শিষ্য। পূৰ্বে সহস্রার পন্মের নাম শুনিয়াছি বট ; কিন্তু সম্যক্ অবগত নাহি গুর । বলিয়াছি ত, ইহা পরিজ্ঞাত হওয়া বিশেষ আবশ্যক। ইহা পরিজ্ঞাত না হইলে যোেগপথে অগ্রসর হওয়াই সম্ভব হয় না। শিষ্য। ইহা কোন স্থানে অবস্থিত ? গুরু। ইহা আজ্ঞাপদ্মের উদ্ধদেশে বিরাজমান । শিস। ঠিক বুঝিলাম না। আজ্ঞাপদ্মে যে নাদরূপী মহাদেবের কথা বলিয়াছি, তাহার উছ ভাগে শঙ্খিনী নাড়ী বিদ্যমান। কেমন মনে আছে ত ? শিষ্য। আজ্ঞা হা। বেশ। সেই শঙ্খিনী নাড়ীর মস্তকে শূণ্ঠাকার স্থান আছে। সেই স্থানে যে শক্তি বিরাজ করিতেছেন, তাহার অধঃ- প্রদেশে এই প্রস্ফুটিত সহস্রদল কমল বিদ্যমান। শিষ্য। ইহার বর্ণ কিরূপ? গুরু। পূর্ণচন্দ্রবৎ শ্বেতবর্ণ এবং ইহার মুখ অধোদিকে প্রসারিত। শিষ্য। এই পদ্ম দেখিতে কিরূপ?

যােগ ও সাধনা
৯২
শুরু। ইহার অকৃতি অতি
আকৃতি অতি মনােরম এবং উহার ফুল গুলি
প্রাতঃকালীন সূর্যের কার দীপ্তিসম্পন্ন। অকারাদি পঞ্চাশটি বর্ণ
বিন্যস্ত এবং ইহা নিত্যানন্দস্বরূপ।
শিষ্য। এই পদ্ম কি মাত্র প্রস্ফুটিত রহিয়াছে, না, ইহাতে
অন্যান্য পদ্মের ন্যায় শক্তি প্রভৃতি বিদ্যমান আছে।
গুরু। দেহাভ্যন্তরস্থ পদ্মমাত্রেই ঐ সকল বিদ্যমান। এই সহস্রার
পদ্মের মধ্যভাগে নিষ্কলঙ্ক পূর্ণচন্দ্র নিরন্তর সমুজিত থাকিয়া জ্যোৎস্না-
রাশি বিকীরণ করিতেছেন। সেই জ্যোৎস্নালোকে তৎপ্রদেশ অতীব
শােভাশালী হইয়া সম্পূর্ণ ধারণ করিয়াছে।
ধারণ করিয়াছে। আর ঐ চা
হইতে বিনির্গত অমৃতধারা যেন হাস্যের মত তথায় বিরাজমান।
শিষ্য। ইহার যন্ত্র কি প্রকার এবং কোথায় আছে ?
গুরু। ইহার অভ্যন্তরভাগে বিদ্যুতের ন্যায় জ্যোতিশালী,
ত্রিকোণ এক যন্ত্র আছে। সেই যন্ত্রের মধ্যে দেবগণের বরূপ
যে আত্মা, তাহার অতি গোপন এক শূন্যস্থান আছে।
শিষ্য। এই স্থান পােপন কি নিমিত্ত ?
গুরু। ইহার কারণ এই যে, এইস্থান পরমানন্দ উপভােগের
মূল, অতিসূক্ষ্ম এবং পূর্ণচন্দ্র তেজঃসম্পন্ন।
শিষ্য। ইহার শিব কোথায় ?
গুরু। এই স্থানেই আকাশরূপী পরমায়ার স্বরূপ, আনন্দস্বরূপ
এবং নিখিল জীবের মােহান্ধকার বিশানী সদাশিব বিরাজিত।
শিষ্য। তিনি এইস্থানে অবস্থান করিতেছেন কেন?
গুরু। এই স্থানে অবস্থান পূৰ্ব্বক তিনি যােগীগণক যুবারা
বিতরণ করিয়া আত্মজ্ঞান দান করিতেছেন। ইনি স্বয়? তাবৎ
সুখনিৰহের আশ্রয় এবং তিনিই সকলের একমাত্র ঈশ্বর।

যােগ ও সাধনা
।
শিষ্য। তিনিই একমাত্র ঈশ্বর ?
হা, তিনিই একমাত্র ঈশ্বর। তাই তাহাতেই এই সকল
আর এই জন্যই এই স্থান শিবস্থান বলিয়া কথিত ।
শি। সকল শােকই কি ঐ স্থানকে শিবলােক বলিনা মানিবে ।
গুরু। না। যিনি যে দেবতার উপাসক, তিনি সেই দেবতারই
স্থান বলিয়া উহা নির্দেশ করেন। বৈষ্ণবরা ইহাকে বিষ্ণুস্থান ;
শক্তিস্থান, শৈবরা শিবস্থান, গাণপত্যরা গণপতির স্থান,
ইত্যাদি। আবার কেহ কেহ উহাকে প্রতি পুরুষের মিলনস্থান
বলিয়া অভিহিত করিয়া থাকেন। উহা ব্রহ্মের স্থান। ঐ স্থানই
উপাসকের অভীষ্ট স্থান ; সুতরাং ইহাই আনন্দনিকেতন ব্রহ্মস্থান।
ফি। ইহা জানিতে পারিলে কি ফললাভ হইয়া থাকে?
গুর। কি ফল যে পাওয়া না যায়, তাহা ত বলিতে পারি না।
শিষ্য। তথাপি আপনি খুলিয়া বলুন।
ওর। শাস্ত্র বলিয়াছেন, যে সাধক এই সহস্রদল সকল সম্যক্‌-
প্রকারে জ্ঞাত হইয়া সংষতচিত্তে সেই পরমাত্মার সহিত স্বীয় মনের
আনয়ন করিতে সমর্থ হন, অর্থাৎ পরমাত্মাতে স্বীয় মন
নিয়ােজিত করিতে সমর্থ হন, তিনি স্বর্গ, মর্ত্য এবং পাতাল -এই
ত্রিভুবনের কোথাও আর বন্ধ থাকেন না। তাহার আর পুনর্জীবন
হয় না; জগতের যাবতীয় শক্তি তিনি অধিগত করিতে পারেন ।
তিনি নিজ শক্তিবলে সৃষ্টি, স্থিতি ও সংহারে সমর্থ, অধিক কি,
তিনি শূন্যে ভ্রমণ করিতে পারেন ও তাহার বাকৃসিদ্ধি জন্মে।
শিষ্য। তবে ত দেখিতেছি, এই শক্তি লাভ করিতে পারিলে
ঈশ্বরের সমকক্ষ হওয়া যায় ।
সে বিষয়ে আর সন্দেহ নাই।

যােগ ও সাধনা
৯৪
শিষ্য। সহস্রদল কমল সম্বন্ধে কি আর কিছু বক্তব্য নাই ?
গুরু। না, এখনও অবশে আছে।
শিষ্য। তবে হাহা বলুন।
গুরু। এই সহস্রার পদ্মের মধ্যে অনাগ্নী ষােড়শ কলা বিদ্যমান।
শিষ্য। ইহার স্বরূপ কি
গুরু। এই কলা বক্তবর্ণ এবং তাহা
রক্তবর্ণ এবং তাহা নিৰ্মলা। ইহ পরে
সূক্ষ্মতাও অপেক্ষা একশত ভাগ সূত্র। ইহা বিদ্যুৎ কোমল,
‘নিত্যপ্রকাশমানা এবং অধােমুখী।
শিষ্য। ইহার কাৰ্য্য কি?
গুরু। ইহা হইতে পারে পরস্পরাগত আনা হইতে
যে সুধাধারা বিগলিত হইতেছে, এই অমানাঙ্গী কল তাহাকেই
ধারণ করিয়া আছেন।' এই কলার মধ্যভাগে নির্বাণ নামক আর
একটি কলা বিদ্যমান, ইহা কেশাগ্রর সহস্রভাগের মত , দ্বাদশ
সূৰ্য্যবং তেজস্বী, অৰ্দ্ধচক্রাকৃতি, জীবসকলের জ্ঞানলাভের একমাত্র
করাণভুত, অভীষ্ট দেবতাস্বরূপ এবং মাহাত্মবতী।
শিষ্য। ইহার নাম কি?
গুৰু। ইহারই নাম মহাকুণ্ডলিনী।
শিষ্য। ইহার কার্য কি?
গুরু। ইনি তজ্ঞানদাত্রী। অর্থাৎ যে সাধক ইহাকে চি
করিতে সমর্থ হন, তিনি তত্ত্বজ্ঞান লাভ করেন।
শিষ্য। ইহার শক্তি কি?
গুরু। আছে।
শিষ্য। তাহার নাম কি?
গুরু। নিৰ্ব্বাণ শক্তি।

যােগ ও সাধনা শিষ্য। ইহার আধার স্থান কোথায়? গুরু। নির্বাণ কলার মধ্যদেশে ইনি অবস্থান করিতেছেন। শিষ্য। ইহাকে দেখিতে কিরূপ? এই নির্বাণশক্তি কোটিসূৰ্য্যবং দীপ্তিশালিনী, ত্রিভুবন- জননী। ইনি কেশাগ্র অপেক্ষাও কেশাগ্র অপেক্ষা ও সূক্ষ্ম, অতি গােপনীয়, জীব- নিবহের জীবম্বরূপা, নিরবচ্ছিন্ন আনন্দময়ী এবং ইহার প্রভাব দ্বারা মুনিদিগের হৃদয়ে নিয়ত আনন্দধারা প্রবাহিত। শিষ্য। ইহার শিবন কি নাই ? গুৰু। অবশ্যই শিবস্থান আছে। শিষ্য। উহার কোন স্থানে শিবস্থান অবস্থিত? গুরু। ইহার মধ্যস্থলে শিবস্থান। শিষ্য। তাহার স্বরূপ কি আমাকে বলুন। ঐ স্থান নিৰ্ম্মল, নিত্যানন্দস্বরূপ, পরমসুখের আনন্দ- জ্ঞানস্বরূপ এবং যােগিগণের একমাত্র বােধগম্য। শিষ্য। শিবস্থান বলিয়া না বুঝিয়া অন্য দেবতার স্থানও ক বলিতে পারি ? গুরু। নিশ্চয়ই। সে কথা ত পূৰ্বেই একবার বলিয়াছি। যে যে মতাবলম্বী, সে সেই মতেই ইহার স্থান নির্দেশ করিবে। যেমন বৈষ্ণবরা বিষ্ণুস্থান, ইত্যাদি। শিষ্য। কি উপায়ে ইহা সম্যক জ্ঞাত হইতে পারা যায় ? গুরু। সাধক গুরুমুখ , হইতে, যম নিয়মাদি সম্যক্ প্রকারে শিক্ষা করিয়া যখন বিশুদ্ধ জ্ঞানসম্পন্ন হইবেন, তখন তাহার নিকট হইতে মােক্ষপথের দ্বারভূত এই ঘটুচক্রের ক্রমবিকাশ বিধিপূর্বক শিক্ষালাভ করিবেন।

যােগ ও সাধনা শিয়া। তাহার পর? তৎপরে হু এই বীজে তেজ ও বায়ু দ্বারা প্রতপ্ত কুলকুণ্ডলিনীচক্রকে মূলধারপদ্মে এবং পূর্বোক্ত স্বয়ম্ভু লিঙ্গ ভেদ পূৰ্ব্বক সহস্রদল কমলে আনয়ন পূর্বক ভাবনা করিবেন। শিষ্য। কি উপায়ে সহস্রারপদ্মে কুণ্ডলিনীকে আনিতে হয়। গুরু। গােরসংহিতা” বলিতেছেন, সেই দ্বার অর্থাৎ মােক্ষদ্বার মুখদ্বারা আবৃত করিয়া বহ্নিবীজ (রং) দ্বারা মনে মনে ভাবনা করত সপ্তা পরমেশ্বরীকে জাগরিত করিতে হইবে । শিষ্য। একটু পরিষ্কার করিয়া বুঝাইয়া দিন। কথায়-মূলাধার হইতে ব্রহ্মরন্ধের অভ্যন্তর দিয়া সহস্রারপ পৰ্য্যন্ত যে পথ বিদ্যমান, হুঙ্কার দ্বারা কুল- কুণ্ডলিনীকে সেই স্বয়ম্ভুলিঙ্গ ভেদ করিয়া পূর্বোক্ত পথযােগে সহস্রদলকমলে আনয়ন করিয়া ভাবনা করিতে হইবে। শিষ্য। আপনি যে কুলকুণ্ডলিনীর কথা বলিলেন, তিনি কি ভাবে অবস্থান করিতেছেন? গুরু। দেবী কুলকুণ্ডলিনী যপদ্ম অর্থাৎ মূলাধার, স্বাধিষ্ঠান, মণিপুর, অনাহত, বিশুদ্ধ এবং আজ্ঞা—এই ঘটুপদ্মের ভিতর দিয়া পূৰ্ব্বকথিত লিঙ্গ- শিষ্য। কোন্ লিয়? গুরু। পূর্বে যে তিনটা শিবলিঙ্গের কথা বলিয়াছি, সেই লিজয়। অর্থাৎ মূলাধারস্থিত বয়ম্ভুলিঙ্গ, হস্পষ্ম বাণলিঙ্গ, এবং আজ্ঞাচক্রের কর্ণিমধ্যস্থিত ইতালিঙ্গ। কেমন মনে পড়িয়াছে ? শিষ্য। আজ্ঞা, খ। গুরু। তার পর শােন। ঐ লিঙ্গকে ভেদ করত নাড়ীর যোগও সাধ সন্নিকটস্থ পরমশিবে শােভা, পাইতেছেন। এক কথায় কুলকুণ্ডলিনী মূলাধারাদি ষট্‌পদ্মকে অতিক্রম করিঙ্গা অতিক্রম করিয়া এনাড়ীর সহশ্রদলপদ্মে আগমন করিয়া পরমশিবের সহিত শােভিত হইতেছেন। শিষ্য। এই নাড়ীর আকৃতি কিরূপ? এই নাড়ী বিদু্যতের স্থায় দীপ্তিশালী এবং অতি, নির্মলা, নিত্যা ও অজ্ঞাত। শিষ্য। ঠিক বুঝিলাম না। গুরু। তাৎপর্য এই যে, প্রকৃষ্ট " সাধনা ব্যতীত তাহাকে অবগত হওয়া সম্ভব নহে। শিষ্য । যদি অসম্ভব, তবে কি কেহই বলত হইতে পারেন না। গুরু। না, তাহা নহে। বলিয়াছি ত, প্রকৃষ্ট সাধনা চাই, তবেই তাহাকে অবগত হওয়া যায়। শিষ্য । ইহার ফল কি ? গুরু। যদি কোন সাধক এই সূক্ষ্ম নাড়ীকে বগত হইতে সমর্থ হন, তবে তাহার মােক সুনিশ্চিত শিষ্য। ইহাতে কি জীবাত্মার কথা কিছুই নাই ? গুরু। অবশ্যই আছে। শিষ্য। তবে বলুন। *; গুরু। বলিতেছি, শােন। সুধী যােগী সেই কুলকুণ্ডলিনীকে জীবাত্মার সহিত সহস্রদলপদ্মশ্বৰূপ গৃহে বন করত ইফ- দাত্রী ভগবতীর ধ্যান করিবে। শিষ্য। এই দেৰী কে ? : গুৰু। ইনি নবয়সের আপা'চৈতরূপিণী, সর্বশ্রেষ্ঠ এ বাভীষ্টফলদারিনী।

যোগ ও সাধনা শি। ঐ দেবী কি একীস্থিত, না স্থানত্যাগ ও করেন? ৩। প্রয়োজনমত সৃনত্যাগ করেন। শিষ্য। সেই প্রয়ােজন কি? গুরু। বলি। সেই দেবী পরমশিবের নিকট হইতে অলক্তবৎ পরমামৃত পান পূর্বক পূর্ণানন্দে বিরাজ করিয়া থাকেন এবং সাধককে পূৰ্ণানন্দ দান করেন। কিন্তু তৎপৰে পূৰ্ব্বকথিত ষট্‌পদ্মের অভ্যন্তর দিয়া আবার তিনি মূলাধারপদ্মে প্রবিষ্ট হন। শি। কি উপায়ে সাধকের এরূপ অবস্থা ঘটে ? গুরু। বুদ্ধিমান্ যােগী যােগম অবলম্বন করতঃ এই অমৃত- ধারা সম্যক্ ত হই তাহার দ্বারা দেহরূপ ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যস্থিত মেধসমূহে তৃপ্তিবিধানে সমর্থ হইয়া থাকেন। সুতরাং সকলেই এই যচক্র সম প্রকায়ে জ্ঞাত হওয়া একান্ত আবশ্যক। শি। উহা দ্বারা কোন্ কোন্ অভীষ্ট সিদ্ধ হইবার সম্ভাবনা? গুরু। বটুচক্রবর্ণল এস কিছু বলা হইয়াছে। । এ সম্বন্ধে আর কিছু বিষয় নাই ? গুরু। আছে। শিষ্য। তাহা শুনিতে বাসনা হইতেছে। গুরু। শান্ত এসখন্ধে আর যাহা বলিয়াছেন, তাহা আমি তোমাকে বলিতেছি, শােন। যে বােগী এগুরুর চরণপদ্ম ধ্যানপূর্বক পরমানন্দ উপভােগ করিতে সমর্থ হন, যে পণ্ডিত ব্যক্তি সংষতচিত্তে যম-নিয়মাদি অভ্যাস করতঃ এই অতি গোপনীয় যক্রম অবগত হইতে সমর্থ হন, তাহাকে আর কখনও এই দুঃখময় সংসারে প্রত্যাগমন করিতে হয় । আমি কি বলি, মাখলৰ কালে তার বিনাশ ঘটে । পুনম পান্না বান্না তাঁহার হৃদয় সকল সময়েই আমপূর্ণ শিল্প। .

১
যােগ ও সাধনা
থাকে এবং তিনি শান্ত ও সাধুদিগের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি বলিয়া
পরিগণিত হইয়া থাকেন।
শিষ্য। শাস্ত্র ও সম্বন্ধে আর কিছু বলিয়াছেন কি?
অনেক কথাই বলিয়াছেন।
শিষ্য।
সে সকল জানিবার জন্য বই কৌতূহল হইতেছে।
সকল কথা বলিবার এ স্থল নহে এবং তাহা মাত্র
কাণে শুনিয়াও বিশেষ লাভ নাই
শিষ্য। তবে কি আর কিছুই জানিতে পারিব না ?
গুরু। অবশ্যই পাইবে। আমি সংক্ষেপে আর কিছু বলিয়াই
এই প্রসঙ্গ ত্যাগ করিব।
শিষ্য। বলুন।
তজ বলিতেছেন, যে সাধক দেবের পাদপদ্মে
মনােনিবেশ করতঃ চিত্তকে সংযত করিয়া মােক্ষলাভের একমাত্র
উপাঙ্গ পরিশুদ্ধ এবং শাস্ত্রসম্মত এই অতি গােপনীয়
যচক্রের
ক্রমগুলি জ্ঞাত হইতে সমর্থ হন এবং এমন হইয়া কি দিবা,
কি রাত্রি, কি উভয় সন্ধ্যা-সকল সময়েই এই বিদ্যা অধ্যয়ন
করেন, তিনিই স্বীয় অভীষ্টদেবের পাদপদ্মে আয়লাভ করতঃ
আনন্দ সাগরে ভাসমান হইতে পারেন, ইহাতে সন্দেহ মাত্র নাই।
শিষ্য। অতি অদ্ভুত এই ঘটুচক্র বিবরণ।
গুরু। অতি অদ্ভুত, সে বিষয়ে সন্দেহ নাই।
শিষ্য। এ সম্বন্ধে আর কিছু বলিবেন না কি?
গুরু। পূর্বে যটুচক্রের বিবরণ সম্যক বিকৃত করিয়াছি।
শিষ্য। নিজেই টুকভেল করিতে প্রয়াস পাই।
গুরু। না, কখনও এ কাৰ্য্য করিও না।
কই

যােগ ও সাধনা
শিষ্য। তবে কি উপায়ে করিব ?
গুরু। যদি তােমার ষটচক্র সাধন করিতে আগ্রহ জন্মিয়।
থাকে, তাহা হইলে তুমি উপযুক্ত উপদেষ্টার অনুসন্ধান কর।
শিষ্য উপযুক্ত উপদেষ্টা কোথায় পাইব?
যদি তােমার আকুল আগ্রহ থাকে, তবে ভগবান
অবশ্যই মিলাইয়া দিবেন। ভারত আজও যােগিহীন হয় নাই।
শিষ্য। উপযুক্ত উপদেষ্টা পাইলে কি করিব ?
• গুরু। তুমি তাঁহার নিকট উপদেশ গ্রহণ করিবে, পরে
তাহার উপদেশমত এই সাধনে অগ্রসর হইবে । কখনও বিনা
গুরূপদেশে, কেবল মাত্র পুস্তক দেখিয়া এই প্রচেষ্টায় ব্যাপৃত হইও
, তাহাতে বিপদ ঘটিতে পারে।
শিষ্য। কি বিপদ ঘটিতে পারি ?
গুরু। সর্বপ্রকার বিপদ ঘটতে পারে। এমনও দেখা গিয়াছে
যে, নিজে নিজে . সাধন করিতে গিয়া কেই বধির, কেহ উন্মাদ,
কেহ অঙ্গ হারাইয়াছে—আবার কেহ বা দম বন্ধ হইয়া মৃত্যুমুখে
পতিত হইয়াছে।
কেন এমন হয় ?
দেখ, আমরা অন্ততঃ জীবনে কি দেখি? দেখি যে,
সাধারণ ক্রীড়াতেও উপদেষ্টার প্রয়ােজন হয়। যখন ইহা দেখা
যায়, তখন এরূপ শুরু বিষয়ে উপদেষ্টার প্রয়ােজন হইবে, তাহা
বােধ হয় বিশদভাবে বুঝাইয়া না বলিলেও চলে।
শিষ্য। একথা অবশ্য স্বীকার্য।
গুরু। তবেই বােঝ, উপদেষ্টার প্রয়ােজন কিরূপ। আর একটি
কথা তােমাকে স্মরণ করাইয়া দেই।
শিষ্য।

যােগ ও সাধনা শিষ্য। আদেশ করুন। কেবল এই ষট্‌চক্র নহে, শাস্ত্রোক্ত যে কোন সাধন- বিষয় কখনও গুরুর উপদেশ ব্যতীত নিজে নিজে সাধন করিতে চেষ্টা করিছে না। লােক ইহাতে বিপদগ্রস্ত হইয়াছে, ইহা আমি জানি। কিরূপ বিপদ, তাহা তাে তােমাকে বলিয়াছি, আমার কথা বুঝিতে পারিয়াছ? শিষ্য। আজ্ঞা হা। শুরু। বেশ। আজ এই পর্যন্ত।

ষষ্ঠ অধ্যায়
সম্প্রসাধন
গুরু। যােগশিক্ষা করিতে হইলে সপ্তসাধনে সিদ্ধিলাভ করা
আবশ্যক। শুধু আবশ্যক কেন, ইহাতে সিদ্ধিলাভ করিতে না
পারিলে যােগসিদ্ধি অসম্ভব।
শিষ্য। সপ্তসাধন কি?
দেহগুদ্ধির জন্ধ সাত প্রকার ক্রিয়া।
শিষ্য। সেগুলি কি কি?
শােধন, দৃঢ়তা, স্থৈর্য, ধৈৰ্য্য, লাঘব, প্রত্যক্ষ এবং
নির্লিপ্ততা। এই সাতটিই দেহের সপ্তসাধন বলিয়া কথিত।
শিষ্য। এইগুলি আমাকে বুঝাইয়া বলুন।
গুরু। ষটুকৰ্ম্ম দ্বারা দেহের শােধন হইয়া থাকে। আসন
অভ্যাসের ফলে দৃঢ়তা সম্পাদিত হয়। মুদ্রায় অভ্যস্ত হইলে
চিত্তের স্থৈর্য আসে। প্রত্যাহার দ্বারা ধৈৰ্য আসিয়া উপস্থিত হয়।
শিষ্য। প্রত্যাহার কি ?
পশ্চাৎ বলিব, এখন শােন। প্রাণায়াম অভ্যাস করিলে
লাঘবতা ঘটিয়া থাকে। ধ্যান দ্বারা নিজ আত্মা মধ্যে ধ্যেয় অর্থাৎ
যাঁহাকে ধ্যান করা যায়, তাঁহার দর্শন ঘটে এবং সমাধি দ্বারা
নিলিপ্ততা অর্থাৎ বাসনাহীন হইয়া থাকে।
শিষ্য। এই সকল অভ্যাসের ফল কি?

যেম ও সাধনা
গুরু। মুক্তি। যাহারা এই সকলে অভ্যস্ত হয়, তাহা
মুক্তিলাভ করিতে সমর্থ হয়।
শিষ্য। পূর্বে যে ষট্‌কৰ্ম্ম বলিয়াছেন, সে ষট্‌কর্ম কি ?
গুরু। যটকৰ্ম্ম হইতেছে, ধৌতি, বস্তি, নেতি, লেলিকী,
ত্রাটক এবং কপালভাতি।
শিষ্য। ইহার ফল কি?
• গুরু। ষট্‌কর্ম দ্বারা শরীরের চেতনা-সঞ্চার হইয়া থাকে। ধেতি
চারি প্রকার। অন্তধৌতি, দন্তধৌতি, হৃন্ধেতি এবং মূলশােধন।
শিষ্য। ধৌতি দ্বারা কি ফললাভ করা যায় ?
এই চারিটি ধোতি দ্বারা দেহ নিৰ্ম্মল হয়। আবার
গ্রহশামলের মতে এই ঘটুকর্মে কিছু প্রভেদ আছে।
সে প্রভেদ কি?
গুরু। সে মতে ধৌতি, গজকরিণী, বস্তি, লাৌলি, নেতি ও
কপালভাতি।
শিষ্য। এইখানে একটা কথা জানিয়া লই।
গুরু। কি বল।
শিষ্য। ষট্‌ক কি প্রত্যেক সাধককেই করিতে হইবে।
শিষ্য।
শিষ্য। তবে কাহারা করিবে ?
গুরু। যাহাদের দেহে মেদের আধিক্য আছে এবং যাহাদের
দেহ শ্লেষ্মায় পূর্ণ, কেবলমাত্র তাহারাই ঘটুকর্ম করিবে। অষ্টের ইহা
করিবার আবশ্যক নাই।
শিষ্য। তাহার পর বলুন।
গুরু। অন্তধৌতি আর চারি প্রার।

রােগসাধনা
* শিষ্য। কি কি ?
গুরু। বাতসার, বারিসার, বহ্নিসার এবং বহিস্কৃত।
; কার
শি। বাসার কি?
প্রথমতঃ নিজ ওষ্ঠদ্বয় কাকচক্ষুর ন্যায় করিতে হইবে।
পরে ঐরূপভাবে ধীরে ধীরে বার বার বায়ু আকর্ষণ করিয়া উদরের
মধ্যে পরিচালিত করিতে হইবে । তৎপরে মুখ দিয়া উহা রেচন
করিৰে। ইহাই হইল বাহার।
শিষ্য। ইহার নাম বাসায় কেন?
গুরু। বাত শব্দে বায়ু। তাই জ্ঞানীগণ ইহার বাসার নাম
প্রদান করিয়াছেন।
শিষ্য। ইহার ফল কি?
গুরু। ইহার দ্বারা . দেহের বিশুদ্ধতা সম্পাদিত হয়, নিখিল
রােগ দূরীভূত হইয়া থাকে এবং ইহার দ্বারা জঠরাগ্নি বিশেষরূপে
বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়া থাকে। ইহার পর বারিসার।
বারিসার
শিষ্য। বারিসার কি প্রকার ?
গুরু। মুখ দ্বারা জল আকণ্ঠ পূরিয়া উহা ধীরে ধীরে পান
করিতে হইবে। কিছুক্ষণ ঐ জল জঠরমধ্যে পরিচালিত করিবার
পর গুহদেশ দিয়া উহা রেচন করিবে। ইহারই নাম বারিলার।
শিষ্য। ইহার ফল কি?
গুরু। এই বারিসার সাধন করিলে দেহের নির্মল ঘটে এবং
দেবদেহ লাভ করা যায়। এই জন্যই অতীৰ যত্নের সহিত ইহার
সাধন করা কর্তব্য।

যােগ ও সাধনা অগ্নিসা শিষ্য। অগ্নিসারের কথা বলুন। গুরু। বলি, শােন। নিশ্বাস রুদ্ধ করত নাভি গ্রন্থি একশতবার মেরুপৃষ্ঠে সংযুক্ত করিতে হইবে। ইহারই নাম অগ্নিসার ধেতি। শিষ্য। ইহার অভ্যাসের ফল কি? গুরু। ইহা যােগীদিগকে পরম সিদ্ধি প্রদান করে এবং ইহার দ্বারা উদরাময়জনিত ব্যাধি সমূহ সমূলে দূরীভূত হইয়া উদয়াগ্নি বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়া থাকে। ইহা অতি গােপনীয় । এমন কি, গণেরও ইহা দুষ্প্রাপ্য। তা ছাছা ইহার দ্বারা যােগীপুরুষ দেব- দেহও লাভ করিয়া থাকে। বহিতখেতি গুরু। ওষ্ঠযুগল কাকচক্ষুবৎ করিয়া বায়ু দ্বারা উদর পূর্ণ করিতে হইবে, পরে ঐ বায়ু উদরাভ্যন্তরে অন্ধ্র প্রহর পর্যন্ত রাখিয়া অপােমার্গ দ্বারা চালিত করিতে হইবে, ইহারই নাম বহিভূতধৌত। ইহা অত্যন্ত গােপনীয়, কাহারও নিকট প্রকাশ করা কর্তব্য নহে। শিষ্য। ইহা যদি গােপনীয় হয়, এবং প্রকাশ করাও অনুচিত, তবে ইহার বহুল প্রচার হইয়াছে কেন? গুরু। গােপনীয় অর্থে-যে সাধক ইহার অভ্যাস করেন, তিনি ইহা গােপন রাখিবেন, ইহাই হইল তাৎপৰ্য। বুঝিয়াছ? শিষ্য। বুঝিয়াছি। তাহার পর কি? প্রাণন। | প্রকালন গুরু। নাভিমগ্ন জলে অবস্থান করতঃ শক্তিনাড়ীকে বাহির করিয়া রাখিবে এবং যতক্ষণ না তাহার মলসমূহ পরিস্কৃত হয়, গ ও সাধনা শিষ্য। * - ততক্ষণ উহাকে ধৌত করিবে। এখন দেখিবে, উহা উত্তমরূপে ধৌত হইয়াছে, তখন ঐ নাড়ীকে যথাস্থানে সন্নিবিষ্ট রাখিবে। শিষ্য। ইহার উপকারিতা কি? যে সাধক ইহাতে অভ্যস্ত হন, তাঁহার দেহ দেব দেহ- তুল্য হয়। ইহাও গােপনীয় এবং যােগিগণের অবশ্য কর্তব্য। অবশ্য কর্তব্য কেন ? তান্তরে কথিত হইয়াছে যে, যে যােগী নাভীক্ষালন করেন, তিনি মহাকাল রাজরাজেশ্বর সদৃশ হইয়া থাকেন। শিষ্য। কি প্রকারে ইহা করিতে হইবে। কেবলমাত্র প্রাণবায়ু ধারণ করিতে সমর্থ হইলেই এই ক্ষালন-যােগ সাধিত হইয়া থাকে। এই ধৌতি না করিলে দেহশুদ্ধি। হয় না, এবং নাড়ীর শ্লেষ্মা, পিত্ত প্রভৃতি দোষ দূরীভূত হয় না। এই স্থানে আর একটি কথা বলিয়া রাখি। শিষ্য। কি। গুরু। পূর্বে যে বহিস্কৃতখোতির কথা বলিয়াছি, তাহার সম্বন্ধেই কিছু বলিব। শিষ্য। বলুন। সাধক যতদিন অদ্ধমকাল নিখাস নিশ্বাস অবরুদ্ধ করিতে সমর্থ না হন, ততদিন তিনি যেন এই ধৌতি অভ্যাস না করেন। শিষ্য। গুরু। তাহাতে বিপদ ঘটিতে পারে; বহিস্কৃত খেতি যতক্ষণ চলিবে, ততক্ষণ নিশ্বাস রুদ্ধ করিয়া রাখিতে হইবে। অতঃপর দস্তধৌত । দখেতি গুরু। দখোন্ত পচ প্রকার।

যােগ * পালা শিষ্য। কি কি ? রুরু। দন্তমূলধৌতি, জিহ্বামূলধৌতি, কর্ণ বধৌতি, দন্তধৌতি ও কপাল ধোতি । শিষ্য । কি উপায়ে এই সকল ধৌতি সাধিত হয়। “গুরু। বলিতেছি। প্রথমতঃ দন্তমূলধৌতি। খয়ের কিংবা বিশুদ্ধ মাটী দ্বারা যতক্ষণ পর্যন্ত না দন্তসমূহের মল দূরীভূত হয়, ততক্ষণ মার্জন করিবে। শিষ্য। ইহা কি না করিলেই নয় ? গুরু। ইহা অবশ্য কর্তব্য। শি। কেন ? গুরু। শাস্ত্র বলিয়াছেন, যােগসাধন ব্যাপারে দমূলধতিই যােগিগণের পক্ষে সৰ্বশ্রেষ্ঠ। প্রত্যহ প্রভাতে এই ধৌতির অনুষ্ঠান করিতে হইবে। দন্তরক্ষাই ইহার একমাত্র উদ্দেশ্য। জিহ্বামূলধধৗতি গুরু। তর্জনী, মধ্যমা এবং অনামিকা--এই তিনটি অঙ্গুলী গলদেশে প্রবেশ করইয়া জিহর মূলদেশ পর্যন্ত মার্জন করিতে হইবে। শিষ্য। ইহার উদ্দেশ্য ? গুরু। উদ্দেশ্য এই যে বার বার এইরূপ করিলে শ্লেয়াদোষ দূরীভূত হইয়া থাকে। ইহার অন্য উপযােগিতাও আছে। শিষ্য। তাহা কি ? এই শােধনদ্বারা জিহ্বা দীর্ঘ হয় এবং জরা, মৃত্যু ও রােগ- সমূহ বিনাশ প্রাপ্ত হয়। জিহ্বাধৌতি সম্বন্ধে আরও কিছু বলিবার আছে । শিষ্য। বলুন। গুরু। খেচরীমুদ্রার কথা তােমার মণ আছে?

যােগ ও সাধনা শিষ্য। আজ হুঁ, আছে। গুরু। খেচরীমুদ্রায় দীর্ঘজিহ্বার প্রয়ােজন হয়, তাহাও বােধ হয় তােমার মনে আছে। শিয়। আজ হ, আমার স্মরণ আছে। গুরু। বেশ। জিহ্বামূলধধৗতি .. সেই খেচরী মুদ্রার সহায়তা করে; কেন না, জিমূলধেতিতে লৌহযন্ত্র ব্যবহার, মাখন মার্জন এবং বার বার জিহ্বা আকর্ষণ করা আবশ্যক। প্রত্যহ এই ধৌতির অনুষ্ঠান করিলে জিহ্বা দীর্ঘ হইয়া থাকে। কর্ণৱন্ধদ্বয়ধেতি গুরু। তর্জনী এবং অনামা অঙ্গুলী দ্বারা উভয় কর্ণের বন্ধ দয় প্রতাহ মার্জন করিবে। ইহাই বন্ধ হয়ধৌতি । শিষ্য। ইহার ফল কি? সাপক প্রতাই ইহার অভ্যাস করেন, ঠাহার নাদায় প্রকাশিত হইয়া থাকে। কপালরঙ্কুধৌতি গুরু। দক্ষিণ হস্তের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দিয়া কপালদেশ উত্তমরূপে মার্জন করিলেই কপালর ধৌতি সম্পন্ন হইল । শিষ্য। ইহার দ্বারা কি উপকার হইয়া থাকে ? গুরু। এই 'ধােতি অভ্যাসের ফলে শ্লেষ্মদোষ বিনষ্ট হয় এবং নাড়ী নিৰ্ম্মল হইয়া থাকে। তা ছাড়া, ইহার দ্বারা দিব্য- দৃষ্টিও লাভ করা যায় । শি। ইহার অনুষ্ঠান করা কখন বিধেয় ? শুরু। প্রত্যই নিদ্রাভঙ্গের পর, আহারের পর এবং সন্ধ্যার সময় এই ধেতি অনুষ্ঠান করা কর্তব্য। অতঃপর জৌতি ।

যোগ ও সাধনা
শুরু।
হৃদ্ধৌতি
গুরু। হৃদ্ধোতি তিন প্রকার।
শিষ্য। উহ। কি কি ?
শুরু। দণ্ডধৌতি, বমনধেতি এবং বাসােধেতি।
শিষ্য । ঐ সকল কি প্রকারে অনুষ্ঠান করিতে হয় ?
প্রথমতঃ দণ্ডধেতির কথা বলি শুন। রম্ভাদণ্ড অর্থাৎ
কলার মাজ, হরিদ্রাদণ্ড অর্থাৎ হলুদগাছের ডাটা অথবা বেত্ৰদণ্ড
দ্বারা হৃদয়ের অভ্যন্তরে বার বার ধীরে প্রবেশ করাইবে এবং
বাহির করিবে । ইহাকেই দণ্ডধৌতি কষ্টে।
শিষ্য। হৃদয়ের ভিতর কতদূর প্রবেশ করাইতে হইবে ?
গুরু। হৃৎপিণ্ডের উপরিভাগ পর্যন্ত।
শিষ্য। ইহার দ্বারা কি ফল লাভ করা যায় ?
গুরু। যিনি হৃদধৌতি সাধন করেন, তাঁহার মুখ দিয়া কফ, পিত্ত ও
ক্লেদসমূহ নির্গত হইয়া যায়, ফলে হৃদ্রোগ দূরীভূত হয়।
বমনধেতি
শুরু। বুদ্ধিমান সাধক আহারের পর আকণ্ঠ জল পান করিবেন।
তৎপরে কিছুক্ষণ উৰ্দ্ধচক্ষে অবস্থান করতঃ বমন দ্বারা ঐ জল নির্গত
করিয়া দিবেন, ইহাই হইল বনধেতি।
শিষ্য। ইহার ফল কি?
গুরু। ইহার অভ্যাসের ফলে কফ ও পিত্ত নাশ হয় ।
বালােধৌতি
এইবার বাসােধৌতির কথা বলিব। চার আঙ্গুল
চওড়া খুব মিহি কাপড় ধীরে ধীরে গ্রাস করিতে হইবে এবং
তাহা বাহির করিয়া লইতে হইবে। ইহাই হইল বাসােধতি।
।

যােগ ও সাধনা
শিষ্য। ইহার দ্বারা কি উপকার হয়।
গুরু। এই বাসােধেতি অভ্যাসের ফলে
গুল্ম, জ্বর, প্লীহা,
কুঠ, কফ এবং পিত্ত প্রভৃতি নােগ দূরীভূত হইয়া থাকে।
শিষ্য। আপনি যে চতুরঙ্গুল বিস্তৃত বন্ধের কথা বলিলেন,
তাহা লগে কতখানি হইবে, তাহা ত বলিলেন না।
গুরু। দৈর্ঘ্যে ঐ বস্ত্র পঞ্চদশ হন্ত হওয়াই বিধি। আবার
রুদ্রযামলের মতে ঐ বস্তু দ্বাত্রিংশ হস্ত হওয়াই বিধি। ঐ তন্ত্র
আরও বলেন যে, য়ে সাধক ইহাতে অভ্যস্ত হন, তিনিই যােগিত্ব
লাভ করিতে পারেন। তাঁহার মন্ত্রসিদ্ধি হয় এবং তিনি মৃত্যুকেও
জয় করিতে পারেন । অতঃপর মূলশােধন।
যুগশােধন
শিষ্য। মূলশােধন কি?
গুরু। মূল অর্থাৎ গুহ প্রদেশ। যতক্ষণ মূলদেশ প্ৰক্ষালিত না
হয়, ততক্ষণ আপনবায়ুর ক্রুরতা বিদ্যমান থাকে।
শিষ্য। কেন?
গুরু। কারণ এই যে, গুহদেশেই আপন বায়ু অবস্থান করে।
শিষ্য। কি উপায়ে মূলশােধন হয়?
গুরু। হরিদ্রার মূল, অভাবে নিজ মধ্যমাঙ্গুলীর দ্বারা জল
দিয়া বার গুহদেশ ধুইয়া ফেলিতে হইবে। ইহাকেই
মূলশােধন বলে।
শিষ্য। ইহার ফল কি?
গুরু। মূলশােধন করিলে কোষ্ঠকাঠিন্য এবং আমাজীর্ণ দূরীভূত
হয়। অতীত ইহার দ্বারা কান্তিবৃদ্ধি, দেহের পুষ্টিসাধন এবং
জঠরাখি পরিবর্জিত হইয়া থাকে।

যােগ ও সাধনা
বপ্রকরণ
শুরু। বন্তি দুই প্রকার।
শিষ্য। কি কি ?
গুরু। জলবস্তি এবং শুবস্তি। জলে , ও লৰস্তি এবং স্থলে
বস্তি সাধন করিতে হয়।
শিষ্য। কি উপায়ে উহা করিতে হয়?
শুরু। নাভিমগ্ন জলে গিয়া উৎকটাসনে উপবেশন করিতে
হইবে। তৎপরে গুদেশ আকুঞ্চন ও প্রসারণ করিতে হইবে। এইরূপ
করাকেই জলবন্তি বলা হয়। আর এক প্রকার অলবন্তি আছে।
শিষ্য। তাহা কি ?
গুরু। এলের ভিতর পশ্চিমােত্তান আসনে উপবেশন করিবে
তৎপরে ক্রমে ক্রমে অধােভাগে: বচিালনা করিতে হইবে।
তাহার পর অশ্বিনীমূদ্রা দ্বারা গুহদেশ আকুঞ্চিত ও প্রসারিত করিলেই
জলবন্তি সাধিত হইয়া থাকে।
শিষ্য। ইহার উপকারিতা কি?
শুরু। যে সাধক কলৰন্তিতে অভ্যস্ত হন, তাঁহার প্রমে
উদাত্ত এবং ভূর বায়ু দূরীভূত হয়। তিনি নীলােগ ও মানতুল্য
হইতে পারেন। তদ্ভিন্ন অহাৰ কোষ্ঠদোষ ও আমগত দোষ দূরীভূত
হইয়া ঠাগ্নি পরিবর্ধিত হয়।
নেভিযােগ
গুরু। এইবার বিশেষ খ্যাত নেতিয়ােগের কথা বলি।
সাধক মাত্রেরই ইহাতে অভ্যস্ত হও কর্তব্য; অথবা নেতিযােগ
জানিলে যােঙ্ক হওই সম্ভব নহে।
শি। এই যােগ কি এক?
:-

যােগ ও সাধনা
গুরু। বিতন্তি অর্থাৎ এঘিত পরিমিত সূক্ষ্ম সূতা নাসাভ্যন্তরে
প্রবেশ করাইয়া দিবে। তৎপরে ঐ সূতা মুখ দ্বারা বাহির করিয়া
ফেলিতে হইবে। ইহাই হইল নেতিযােগ ।
শিষ্য। ইহার ফল কি?
যে সাধক নেতিযােগে সিদ্ধিলাভ করেন, তাহার শ্লেষ্মা-
দোষ দূরীভূত হয় এবং তিনি দিব্যদৃষ্টি : লাভ করিয়া থাকেন।
তব্যতীত শিয়ােরােগ এবং ক্রুশ্লেষ্মও নিবারিত হইয়া থাকে।
লৌলিকীযােগ
গুরু। এইবার লেলিকীয়ােগের কথা বলিব। নিজ জঠরকে
প্রবলবেগে উভয় পার্শ্বে ভ্রামিত করিতে সমর্থ হইলেই লেলিকী-
যােগ সিদ্ধ হইল।
শিষ্য । ইহার উপযােগিতা কি?
যে সাধক এই লৌলিকীযােগে সিদ্ধিলাভ করেন, তাঁহার
রােগসমূহ বিনাশ প্রাপ্ত হয় এবং দেহস্থিত অগ্নি পরিবদ্ধিত হইয়া
থাকে। গ্ৰহমলে ইহার একটু স্বাতন্ত্র্য লক্ষিত হয়।
শিষ্য। তাহা কি ?
গুরু। জঠরের নিম্নাংশ প্রচণ্ডবেগে পরিচালিত করিলেই লেলিকী-
যােঙ্গ হইল। ইহার ফলে পরিপাকশক্তি বৃদ্ধি এবং অগ্নিমান্দ্যাদি
রােগসমূহ বিনষ্ট হইয়া থাকে।
ত্রাটক :
শুরু। যতক্ষণ না চক্ষু হইতে নির্গত হয় ততক্ষণ পর্যন্ত
নির্নিমেষলােচর্কে কোন সূৰস্তুর উপর দৃষ্টিনিক্ষেপ করিয়া অবস্থান
করিতে হইবে। ইহাই ত্রাটকযােগ।
শি। ইহারও কোন প্রয়ােজন আছে?

গুরু। জবাই আছে। তাহা হইতেছে এই যে, যাহারা শাম্ভবীমুদ্রা অভ্যাদ করিতে ইচ্ছুক, তাঁহাদের এই ত্রাটকযোেগ দ্বারা বিশেষ সহায়তা হইয়া থাকে। তদভিন্ন ইহার দ্বারা চক্ষুরােগ দূরীভূত হইয়া দিব্যদৃষ্টি লাভ ঘটিকা থাকে। ইহাও গােপনীয় । কপালভাতি গুরু। কপালভাতি তিন প্রকার। বাতক্রমকপালভাতি, ব্যংক্রম- কপালভাতি এবং শীতক্রমকপালভাতি। শিষ্য। ইহার দ্বারা কি উপকার হয়? গুরু। ইহার দ্বারা সাধকের শ্লেষ্মদোষ নিবারিত হইয়া থাকে। এইবার বাতক্রমকপালভাতির কথা বলিব । শিষ্য। বলুন । গুরু। ইড়া অর্থাৎ বামনাসিকা দ্বারা বায়ু পূর্ণ করিয়া পিঙ্গলার দ্বারা অর্থাৎ দক্ষিণ নাসিকা দ্বারা উহা রেচন করিয়া ফেলিবে ; আবার দক্ষিণ নাসিকা দ্বারা বায়ু পূর্ণ করিয়া ৰাম নাসিকা দ্বারা রেচন করিবে। শিষ্য। সাধারণভাবে এই কাজ করিলেই চলিবে? না। পূরণ বা রেচন সময়ে কখনই বেল দিবে না, ধীরে ধীরে আপনা হইতেই হাতে পূর্ণ ও বহির্গত হয়, সে বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করিবে। শিষ্য । ইহার উপকারিতা কি? গুরু। ইার দ্বারাও সাধক দোষ হইতে নিতিলাভ করিয়া থাকেন। এইবার ব্যক্ৰমৰুপালভাতির কথা শােন। ঝংক্রম অর্থাৎ বিপরীতভাবে কাৰ্য্য করার নাম ব্যুৎ, ইহা জান ত ? শিষ্য। আ হ । শুরু। বেশ। প্রথমে উভয় নাসিকার তারা জল না যােগ ও সাধনা ১১৪ করিবে, পরে নাসিকার দ্বারা উহা বহির্গত করিয়া দিবে। তৎপরে মুখ দ্বারা জল গ্রহণ করিয়া নাসিকায় দ্বারা উহা বহির্গত করিয়া ফেলিলেই ব্যুৎমকপালভাতি হইল। শিষ্য। ইহা একবার করিলেই চলিবে ? বার বার করিতে হইবে। এই যােগ অভ্যাস দ্বারাও কফদোষ নিবারিত হইয়া থাকে। শিষ্য। শীৎক্ৰমকপালভাতি কি প্রকার ? গুরু। বলি। প্রথমে মুখ দ্বারা শীৎকার করত জল গ্রহণ করিবে। তৎপরে উহা নাসিকা দ্বারা বাহির করলেই শীৎক্ৰম- কপালভাতি সিদ্ধ হইল। শিষ্য। ইহাতে কি ফল পাওয়া যায়? যে সাধক এই যােগ অভ্যাস করিতে সমর্থ হন, তাঁহার দেহকান্তি কন্দর্পের তুল্য হইয়া থাকে এবং তিনি বার্ধক্য, করা হইতে দেহকে সম্পূর্ণরূপে রক্ষা করিয়া নীরােগ হইয়া থাকেন। এই আমি তােমাকে সপ্তসাধনের কথা বিবৃত করিলাম। যােগ অভ্যাস করিতে হইলে এই সকলের আচরণ অবশ্য কর্তব্য। এই আমি তােমাকে যম, নিয়ম, মুদ্রা ও আসনের কথা বিবৃত কমিলাম এবং ইহার আনুসঙ্গিক যাহা, তাহাও তােমাকে বলিয়াছি। অতঃপর প্রাণায়ামের বিষয় বলি।

পঞ্চম অধ্যায়
প্রাণায়াম
পরদিন প্রাতে কতনিত্যক্রিয় গুরু শিষ্যকে উদ্দেশ করিয়া
বলিলেন, আমি অন্য প্রাণায়ামের কথা বিবৃত
কথা বিবৃত করিব।
প্রাণায়াম একটি গুরু বিষয়।
শিষ্য। প্রাণায়ামের উপকারিতা কি?
গুরু। ইহার উপকারিতার কথা বলিয়া শেষ করা যায় না ।
পরে উহা বিস্তারিত বলিবার ইচ্ছা রহিল। এখন সংক্ষেপে বলি ।
যে মানব প্রাণায়াম সাধন করিতে পারেন, তিনি দেবতুল্য হন,
সান্দেহ নাই। প্রাণায়াম অভ্যাস করিতে হইলে চারিটি বিষয়ে
পূর্কে অবহিত হইতে হইবে। প্রথমতঃ উপযুক্ত স্থান নির্বাচন,
দ্বিতীয়তঃ বিহিত সময় ; তৃতীয়তঃ মিতাহার এবং চতুর্থতঃ নাড়ীশুদ্ধি।
শিষ্য। এইগুলি কি অবশ্য কর্তব্য।
গুরু। অতি অবশ্য কর্তব্য।
শিষ্য। তবে বলুন, উহা শুনিতে আমার বিশেষ কৌতূহল হইতেছে।
আননির্ণয়
এরূপ স্থান নির্ণয় করা
উচিত, যেস্থানে সাধনার
কোনরূপ ব্যাঘাত না ঘটে। যেমন দূরদেশে, বনে, রাজধানী এবং
জনবহুল স্থানে।

যােগ ও সাধনা
১১৬
শিষ্য। ইহাতে কি দোষ ঘটে ?
গুরু। দূরদেশে যদি যােগারস্ত করা হয়, তবে মনে অবিশ্বাস
জন্মিয়া থাকে।
শিষ্য। অবিশ্বাস জন্মিবে কেন?
গুরু। দেখ, মানুষ যাহাই করুক, প্রথমাবস্থায় তাহার মনে
কিছু ভয়ের সঞ্চার অবশ্যম্ভাবী। দূরদেশে যাইতে মনের সেই
প্রফুল্লতা থাকে না-থাকা সম্ভবও নহে। সেই জন্য চিত্তপ্রসাদের
নিমিত্ত দূরদেশ গমন নিষিদ্ধ। বন অরক্ষিত। সেখানে দেখিবার
কেহ নাই, অথচ হিংস্রশ্বাপদাদির আক্রমণের সম্ভাবনা সর্বদাই
বিদ্যমান। ইহাতে মন উদ্বিগ্ন হইয়া থাকে। মন যদি স্থির না
হয়, তবে সাধন করিবে কে?
শিষ্য এ কথা ঠিক।
গুরু। প্রধানও পরিত্যাজ্য, এই হেতু যে, যােগ অভ্যাস
প্রকাশিত হইয়া পড়ে।
শিষ্য। যােগ অভ্যাস ত নিন্দনীয় কাৰ্য্য নহে যে, প্রকাশ
হইয়া পড়িলে নিন্দা হইবে।
গুরু। তুমি ভুল বুঝিতেছ। পূর্বেই বলিয়াছি, এমন অনেক
সাধনা আছে, যাহা গােপনীয়। সুতরাং গােপনীয় বস্তু প্রকাশ করা
উচিত নয়, শশাস্ত্রেও নিষেধ আছে। ইহা কি তােমার স্মরণ নাই ?
শিষ্য। আজ্ঞা, স্বরণ আছে।
গুরু। রাজধানীও যােগসাধনার অনুকূল নহে।
শিষ্য। কেন?
গুরু। যদি সাধারণ জনবহু স্থান পরিত্যাগ করিতে হয়,
তবে রাজধানী বে ত্যাগ করিতেই হইবে, তাহা বলাই বাহুল্য।

১১৭
যােগ ও সাধনা
শিষ্য।
গুরু।
বিশেষ রাজধানীতে বই লােকের বাস হওয়ায় কৌতূহলপ্রবল
ললাকের সংখ্যাও অত্যধিক। যাহারা অবশ্যই বিরক্ত করিবে।
তবে কিরূপ স্থানে যোগ অভ্যাস করিতে হইবে ?
যে প্রদেশের রাজা ধৰ্ম্মপরায়ণ, যে স্থানে আহাৰ্যবস্তু
সুলভ ও সুপ্রাপ্য, অথচ প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়, অথচ সে
দেশে কোনরূপ উপদ্রব বর্তমান না থাকে, সেইরূপ দেশই যােগ
অভ্যাসের প্রকৃষ্ট স্থান ।
শিষ্য । যেখানে সেখানে বসিয়াই কি যােগসাধনা করিবে ?
না। তাহারও নিয়ম আছে
শিষ্য। সে নিয়ম কি?
শুরু। বলি। সেইরূপ দেশে কুটীর নির্মাণ করিতে হইবে।
কুটীরটা উত্তমরূপে প্রাচীর দ্বারা ঘিরিতে হইবে। ঐ প্রাচীরের
ভিতরই হয় কৃপ, নয় পুষ্করিণী থাকা আবশ্যক।
শিষ্য। অর্থাৎ প্রয়ােজনীয় জলের জন্য ব্যস্ত হইতে না হয়।
কুটীরটী কিরূপ হইবে ?
গুরু। কুটীয়টি অধিক উচ্চ ও হইবে না, আবার অত্যন্ত নিম্ন ও
হইবে না-মাঝামাঝি
হইবে। উহা নিয়ত পরিষ্কার
পরিচ্ছন্ন রাখিবার জন্য গােময় দ্বারা উত্তমরূপে লেপন করিতে
হইবে। ঐরূপ করিলে কোনরূপ কীটাদির আবির্ভাব সম্ভব হইবে
না। এইরূপ কুটীরই যােগসাধনার উপযুক্ত। স্থান সম্বন্ধে পরে
আরও কিছু বলিবার ইচ্ছা রহিল।
কালনির্ণয়
গুরু। কাল অর্থাৎ কোন্ কোন্ ঋতুতে যােগার প্রশস্ত
আর কোন্ কোন্ ঋতুতেই বা অপ্রশস্ত, তাহাই এইবার বলিব।
রকমের

যােগ ও সাধনা ১১৮ শিষ্য। শিষ্য। যোগান্তের কি কালনির্ণয়ও আছে ? গুরু। আছে বৈ কি। দেখ, এসব কথা যাহারা লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন, তাঁহারা বহুদর্শিতার ফলেই তাহা উপলব্ধি করিয়াছিলেন । ইহা ভুলিলে চলিবে কেন? শিষ্য। ভুলি নাই। আমি মাত্র জানিয়া লইতেছি। বসন্ত ও শরৎ ঋতুই যােগারম্ভের প্রশস্ত কাল। কেন ? গুরু। কারণ এই যে, বসন্ত ও শরৎ ঋতু ব্যতীত অহং হেমন্ত, শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষা ঋতুতে যােগারম্ভ করিলে দেহ রােগ- গ্রস্ত হইয়া পড়ে। তাই ঐ কয়মাস নিষিদ্ধ। তবে এরমধ্যে একটা কথা আছে। শিষ্য। কি ? গুরু। উহা ঋতুর অনুভব। শিষ্য। সে কি রকম ? যে যে মাসে যে যে ঋত্ব অনুভূত হইয়া থাকে, তাহা মাঘ হইতে বৈশাখ পর্যন্ত চারি মাসে বসন্ত ঋতু হইয়া থাকে। চৈত্র হইতে আষাঢ় পর্যন্ত গ্রীষ্ম ঋতু আষাঢ় হইতে আশ্বিন পর্যন্ত বর্ষা ঋতু অনুভব করা যায়। ভাদ্র হইতে অগ্রহায়ণ পৰ্যন্ত শরৎ ঋতু অনুভূত হয়, কার্তিক হইতে মা পর্যন্ত হেমন্ত ঋতু অনুভূত হয় অরি অগ্রহায়ণ মাস হইতে ফাঙ্গন মাস পর্যন্ত চারি মাস শীত ঋতুর অনুভূতি হয়। এই মতে যৎকালে বসন্ত ও শরৎ ঋতু অনুভূত হয়, সেই কালেই যােগার বিধেয় ; কেন না, ঐ সময়ে যােগ আরম্ভ করিলে সিদ্ধিলাভ সুনিশ্চিত। অতঃপর মিতাহারের কথা বলি।

যােগ ও সাধনা
মিতাহার
শিষ্য। মিতাহার বলিতে কি বুঝিব?
গুরু। এ সম্বন্ধে যাহা বলিব, তাহাতেই উপলব্ধি
মিতাহার কি।
শিষ্য। মিতাহারও কি যােগীর কর্তব্য?
গুরু। অবশ্যই। একটা চলিত কথা আছে জান ত ?
শিষ্য। কি ?
গুরু। বাঁচিবার জন্য খাই, খাইবার জন্য বাঁচিও না।”
অর্থাৎ যে আহার করিলে শরীর নীরােগ হয় ও বলবৃদ্ধি করে, দৃশ
আহারই কর্তব্য। একথা সকলের পক্ষে যেমন--যােগীর পক্ষেও
তেমনই। বিশেষতঃ যােগীর উহা অত্যাবশ্যক।
শিষ্য। কেন?
যে ব্যক্তি অতিরিক্ত ভােজন করিয়া যােগাভ্যাস করে, সে
বিবিধ রােগে আক্রান্ত হইয়া থাকে এবং তাহার সাধনা বিন্দুমাত্রও
ফণযুক্ত হয় না।
শিষ্য। সাধক কি সকল জিনিষই পরিমিত খাইবে ?
মিতাহার অর্থে বুঝিতে হইবে, যে যে বস্তু
যােগীর পক্ষে বিহিত, সেই সেই বস্তু পরিমিত আহার করা।
শিষ্য ; তাহা হইলে যােগীরও নিষিদ্ধ আহাৰ্য আছে।
গুরু। আছে বৈ কি।
শিষ্য। তাহা কি ?
গুরু। বিহিত আহাৰ্য্য বস্তু কি, তাহা জ্ঞাত হইলে নিষিদ্ধ
জানিতে বিলম্ব হয় না অর্থাৎ যাহা খাইবার বিধি আছে,
তব্যতীত আর সবই নিষিদ্ধ।
:

যােগ ও সাধনা
১২০
শিষ্য। বিহিত বস্তু কোনগুলি?
গুরু। শালিধান্তের মণ্ড, যবের ছাতু, ময়দা বা আটা, মুগের
ভাল, মাষকলাই, ছােলা,-এইগুলি অন্নের মধ্যে বিহিত।
শিষ্য। ফলের মধ্যে কি কি বিহিত ?
গুরু। কুল, করঞ্জ, কঁাকুড়, কলা, আম - এই সকলই আহাৰ্য্য।
শিষ্য। তরকারী কি কি খাইতে পারে ?
গুরু। পটোল, এচোড়, মানকচু, ডুমুর, কঁচকলা, উটেকলা,
থোড়, মুলা, বেগুন, এই সকল তরকারী যােগীরা ব্যবহার করিবেন।
শিষ্য। আর শাক ?
গুরু। চালশাক, কালশাক, পলতা, বেততাশাক এবং হিঞ্চাশাক
এই পাঁচটি শাকই যােগীর পক্ষে বিহিত। তথ্যতীত যে সকল
দ্রব্য নিৰ্ম্মল, সুমধুর, স্নিগ্ধ ও সুরসযুক্ত, সে সকল
দ্রব্যও যদি
নিষিদ্ধ না হয়, তবে তাহা দ্বারা সন্তোষ সহকারে আহার করিবে।
শিষ্য। উদর চুক্তি করিয়া থাইতে আপত্তি নাই ত?
গুরু। না না, উদর স্ফুর্তি করিয়া নহে।
শিষ্য। তবে কিরূপ আহার করিবে ?
গুরু। ঐ সকল দ্রব্যের দ্বারা উদরের অর্ধেক পূর্ণ করিবে।
শিষ্য। অর্ধেক খাইবে ?
শিষ্য। সে কি রকম?
গুরু। উরকে সিকি ভাগ জল দিয়া পূর্ণ করিয়া লইবে
এবং সিকিভাগ বায়ু চলাচলের জন্য খালি মাখিবে। ইহাই হইল
মিতাহার। যােগ কেন, যিনিই এই নিয়মে আহার করিবেন,
তিনিই নীরােগ ও দীর্ঘজীবী হইবেন সন্দেহ-নাই।

১২১
যােগ ও সাধনা
শিষ্য। কোন্ কোন্ বস্তু নিষিদ্ধ ?
গুরু। যাহা বিহিত, তা ছাড়া আর সকলই নিষিদ্ধ। তবে
কতকগুলি সম্বন্ধে বিশেষ নিষিদ্ধ আছে।
শিষ্য। সেগুলি কি ?
গুরু। কটু দ্রব্য, অন্ন, লবণ, তিক্ত, কোনরূপ ভাজা জিনিষ
যেমন চালভাজা মুড়ি ইত্যাদি, ঘােল, অপর শাক, মগু, তাল,
দধি, পাকা কঁঠাল, কুলখ, মসূর ডাল, পাণ্ডুফল, কুমড়া, ডাটা,
লাউ, কঁচাকুল, কদবেল, চালতা, কদ, বাতাবী লেবু, তেলাকুচা,
লকুচ, রসুন, মৃণাল, কামরাঙ্গা, পিয়াল, হিঙ্গ, শাল্মলী ও পান
বিশেষ ভাবে নিষিদ্ধ। বিশেষতঃ যােগের আরম্ভ কালে সৰুণ
বিধি-নিষেধ মানিয়া চলাই কৰ্তব্য, এ ছাড়া আরও আছে।
শিষ্য। ঐ সকল কি?
মাখন, ঘৃত, ক্ষীর, গুড়, আকের চিনি, নারিকেল,
ডালিম, আঙ্গুর, আমলকী এবং অফল নিষিদ্ধ।
শিষ্য। মুখ শুদ্ধির ব্যবস্থা কি।
গুরু। এলাচ, জাতিফল, লবঙ্গ, জন্ধু, হরীতকী এবং খেজুর
এই সকল দ্রব্য বিহিত। মােট কথা যে সকল
করিলে সহজে জীর্ণ হয়, যাহা স্নিগ্ধ, যাহার দ্বারা ধাতুর পুষ্টি হয়,
সেইরূপ প্রীতির বন্ধু ভােজন করাই যােগীদিগের কর্তব্য। বিশেষ
যাহারা প্রথমে যােগাভ্যাস করিবেন, তাহাদের পক্ষে।
শিষ্য। আর কি নিয়ম পালন করিতে হইবে ?
গুরু। যে সকল বস্তু কঠিন, যে আহাৰ্য্য গ্রহণ করিলে পাপ,
যাহা দুর্গন্ধযুক্ত, বাসি অত্যন্ত ঠাণ্ডা, অথচ উগ্র, এই সকল দ্রব্য
ভােজনে বিরত থাকিবে।

যােগ ও সাধনা
১২২
শিষ্য। আর কোন নিয়ম আছে কি ?
আছে।
শিষ্য।
শিষ্য। তবে বলুন।
বলি। প্রাতঃস্নান, উপবাস, দেহক্লেশকর কাৰ্য, একাহার,
অনাহার, এ সকলই যােগীর পরিত্যাজ্য। অবশ্য এক প্রহর কাল
যদি অনাহারে থাকে, তবে তাহাতে দোষ হয় না। প্রাণায়াম:
অভ্যাস করিতে হইলে এই সকল নিয়ম পালন করা অবশ্য কর্তব্য।
শিষ্য । পুষ্টিকর কোন বস্তু গ্রহণ করিতে পারেন ?
শুরু। ক্ষীর ও খৃত সেবন করিবে । প্রত্যহই বা আহার
করা উচিত ।
কয়বার আহার করিবার নিয়ম ?
গুরু। দুই বার।
শিষ্য। কখন কখন ?
গুরু। মধ্যাহ্ন ও সায়ংকাল। শাস্ত্র বলিয়াছেন, মর্ত্যবাসী।
মানবগণের দুইবার আহার প্রশস্ত। দিবাভাগে মধ্যাহ্ন সময়ে এবং
রাত্রিতে দেড় প্রহরের মধ্যে।
শিষ্য।
দেড় প্রহরের পর আহার কি অবিধি ?
গুরু। বৈধ আহার করিতে হইলে দেড় প্রহরের মধ্যে করাই
বিধেয়। যােগিদিগের বৈধ আহার অবশ্য কর্তব্য, একথা পূর্বেই
বলিয়াছি।
অতঃপর নাড়িশুদ্ধি।
নাড়ীশুদ্ধি
শিষ্য। নাড়ীশুদ্ধি কি অবশ্য কর্তব্য ?
অবশ্য কর্তব্য। কেন না, শাস্ত্র বলিতেছেন, কুশাসন,
ব্যাচ, ' মৃগচর্ম, কলাসন অথবা লালনে পূর্বমুখ

১২৩
যােগও সাধনা
গুরু।
মুখ হইয়া প্রথমে নাড়ীশুদ্ধি করিতে হইবে, তৎপরে প্রাণায়াম
অভ্যাস করিতে হইবে।
শিষ্য। নাড়ীশুদ্ধি কি এবং কি প্রকারেই উহা করিতে হয় ?
দেখ, নাড়ীসমূহ মলদ্বার পূর্ণ, সেই জন্য নাড়ীর
ভিতর অবাধে বায়ু চলাচল করিতে পারে না। যদি বায়ু চলাচল
হয়, তাহা হইলে প্রাণায়াম হইবে কি প্রকারে ? প্রাণায়াম ত
বায়ু লইয়াই ব্যাপার! সেই জন্য পূর্বে নাড়ীশুদ্ধি আবশ্যক। নাড়ীশুদ্ধি
আবার দুই প্রকার।
শিষ্য। কি কি ?
সমনু ও নিম্মনু ।
শিষ্য। বুঝিলাম না।
মন্ত শকে মন্ত্র । যেগুলে বীজমন্ত্র দ্বারা নাড়ীশুদ্ধি
করা হয়, সে স্থলে তাহার নাম সমনু। আর যেস্থলে ধেতি কৰ্ম্ম
দ্বারা নাড়ীশুদ্ধি করা হয়, তাহাকে নিৰ্ম্ম নাড়ীশুদ্ধি বলা হয়।
সমনু নাড়ীশুদ্ধি কি প্রকারে করিতে হয় ?
গুরু। ষটুকর্মের বর্ণন সময় ধৌতিকৰ্ম্ম বলা হইয়াছে। সেই
ধোতিকৰ্ম্মই যে নিৰ্ম্মনু নাড়ীশুদ্ধি তাহাও বলিয়াছি। এখন সময়
নাড়ীশুদ্ধি বলিতেছি।
বলুন ?
প্রথমে পদ্মাসনে উপবেশন করিবে। তারপর
প্রভৃতির ব্যাস করিবে। তৎপরে শ্রীগুরুর অনুমতি গ্রহণ
প্রাণায়াম সাধনের জন্য নাড়ীশুদ্ধি করিবে।
শিষ্য। এত ব্যাপার!
এখনও হয় নাই, শােন। তাহার পর বায়ুবীজ অর্থাৎ
শিষ্য।
শিষ্য।

যােগ ও সাধনা ১২৪ “ংএর ধ্যান করিবে। ঐ বীজ ঘােড়শ বার চাপ দ্বারা বাম- নাসারন্ধু দিয়া পূরণ করিবে। ইহার নাম পূরক। শিষ্য। বায়ুবীজের মূর্তি কিরূপ? গুরু। বায়ুবীজ তেজোময় এবং ধূম্রবর্ণ। তারপর শােন। ঘােড়শবার জপদ্বারা বায়ুপূরণের পর আবার ঐ বীজ চৌষটিবার জপার বায়ু ধারণ করিয়া থাকিবে। ইহাকে কুন্তক কহে। তৎপরে ঐ বীজ বত্রিশবার জপ করত সেই বায়ু ধীরে ধীরে ত্যাগ করিবে। ইহার নাম রেচক। শিষ্য। তারপর ? তারপর যােগপ্রভাবে নাভিমূল হইতে অগ্নিতত্বকে সমুখিত করিয়া প্রথিবীকে ঐ অগ্নিতত্বে সংযুক্ত ধ্যান করিতে হইবে। শিষ্য। অগ্নিতও নাভিমূলে কেন ? গুরু। কারণ, নাভিমূলই অগ্নিতত্বের স্থান। শিষ্য। তারপর? গুরু। তারপর অগ্নিবীজ অর্থাৎ “রং” যােলবার জপ দ্বারা বাম নাসায় বায়ুপূরণ করিয়া রেচক করিতে হইবে । ওপরে ঐ বীজ দ্বারা চৌষট্টি বার জপ করিয়া কুম্ভক করিবে । তারপর আবার ঐ বীজের বত্রিশ বার জপম্বারা রেচক করিবে। অর্থাৎ ধীরে ধীরে বাম নাসিকা দ্বারা বায়ু ত্যাগ করিবে। শিষ্য। তারপর। গুরু। তারপর নাসিকার অগ্রভাগে জ্যোৎস্নাযুক্ত চবিষের ধ্যান করিতে হইবে। শিষ্য। কোন্ বীজ জপ করিতে হইবে ?

১২৫
যােগ ও সাধনা
“ঠং” বীজ। এই ঠং বীজ ষােড়শর জপ দ্বারা বাম
নাসিকায় বায়ু পূরণ করিতে হইবে।
শিষ্য। ইহা হইল পূরক। কুম্ভকও কি এই বীজদ্বারা করিতে হইবে।
গুরু। না। ইহা বরুণ বীজের দ্বারা করিতে হইবে।
শিষ্য। বরুণবীজ কি?
গুরু। “ব”। চৌষট্টি বার এই বরুণবী জপারা কুম্ভক
যােগে ঐ বায়ু ধারণ করিতে হইবে । তাহার পর ধ্যান করিবে।
শিষ্য। কি ধ্যান করিব?
ধ্যান করিতে হইবে এই যে, নাসিকার অগ্রভাগে
অবস্থিত চন্দ্রবিম্ব হইতে যে সুধাধারা ঝরিয়া পড়িতেছে, সেই
সুধাধারা দ্বারা দেহাবস্থিত নিখিল নাড়ী বিধেত হইয়া যাইতেছে।
ধ্যানের পর রেচক করিতে হইবে।
রেচকের বীজ কি ?
গুরু । পৃথিবীজ।
শিষ্য। পৃথি বীজ কাহাকে বলে ?
গুরু। “লং”। এই বীরু দক্ষিণ নাসিকায় বত্রিশবার জপদ্বারা
ঐ ধৃত বায়ু ত্যাগ পূর্বক রেচক করিবে। ইহাই হইল সময়
নাড়ীশুদ্ধি। এই প্রকারে নাড়ীশুদ্ধি করিয়া সুদৃঢ়রূপে আসনে
উপবিষ্ট হইয়া প্রাণায়াম অভ্যাস করিতে হইবে। কিন্তু
কুম্ভকের কথা বলিয়াছি, তাহা আট প্রকার।
শিষ্য। কি কি ?
শুরু। সহিত, সূৰ্যভেদ, উজামী, শীতলী, ভপি, জামী,
মূচ্ছ। এবং কেবলী।
শিষ্য। ঐ গুলির কথা মাকে বলুন।
শিষ্য।
ন

যােগ ও সাধনা গুরু। প্রথমে সহিত কুম্ভক। কিন্তু সহিত কুম্ভকও বিবিধ। শিষ্য। সে কি প্রকার ? গুরু। সগর্ত ও নিগর্ভ। বীজমন্ত্র উচ্চারণ করিয়া যে কুম্ভক করিতে হয়, তাহা সগর্ভ কুম্ভক। শিষ্য। নিগর্ভ কুম্ভক কাহাকে বলে ? যে কুম্ভক বীজমন্ত্রবর্জিত, তাহাই নিগর্ভ কুন্তক। শিষ্য। সগর্ভ কুম্ভক কি প্রকার করিতে হয়। গুরু। পূর্ব বা উত্তরমুথে সুখাসনে উপবেশন করিবে, তৎপরে ব্ৰহ্মার ধ্যান করিতে হইবে। শিষ্য। ব্রহ্মার ধান কি প্রকার ? শুরু। ব্রহ্মার রূপ রক্তবর্ণ, তিনি অকাররূপী এবং রজোগুণ- যুক্ত। এই ভাবেই ব্রহ্মার ধ্যান করিবে। তাহার পর “অং” বীজমন্ত্র দক্ষিণ নাসিকায় ষােলবায় জপদ্বারা বায়ুপূরণ করিবে। তৰে এখানে একটা কথা আছে। কি ? গুরু। কুম্ভক করিবার করিবার পূর্বে এবং বায়ুপূরণ করিবার পর উডীয়ান বন্ধের আচরণ করিতে হয়। তাহার পর শ্রীহরির ধ্যান করিবে। শিষ্য। এই ধ্যান কিরূপ। গুৰু। হরি সত্বগুণবিশিষ্ট, উপকাররূপী এবং কৃষ্ণবর্ণ। তৎপর উং” এই মন্ত্র চৌষটিবার জপদ্বারা কুম্ভক করিয়া ঐ পূরিত বায়ু ধারণ করিবে। তারপর শিবের ধ্যান করিবে। শিষ্য। এই ধ্যান কি প্রকার ? গুরু। শিব তমােণবিশিষ্ট, মাররূপী এবং শ্বেতবর্ণ । ইহার শিষ্য।

১২৭ যােগ ও সাধনা বীজ “মং”। এই “মং” বীজ বত্রিশবার জপদ্বারা বাম নাসিকা- যােগে ঐ পূরিত বায়ু রেচন করিতে হইবে। তৎপরে অমুলােম- বিলােম ক্রমে বার বার জপ করিতে হইবে। শিষ্য। অনুলােম বিললাম কি ? শুরু। জপের সাধারণ নিয়ম বাম নাসিকার পূরণ ও দক্ষিণ নাসিকার রেচন। আর দক্ষিণ নাসিকায় পূরণ ও বাম নাসিকায় রেচন করিলেই অনুলােম-বিলােম হইল। বায়ু পূরণের আরম্ভ হইতে কুম্ভরের শেষ মধ্যমা, কনিষ্ঠা, অনামিকা ও অঙ্গুষ্ঠ দ্বারা 'নাসাপুট ধারণ করিবে। ইহাই সগর্ত প্রাণায়াম। যে প্রাণায়ামে বীজমন্ত্র নাই, কেবল মাত্র পূরক, কুম্ভক ও রেচক করিলেই চলে, তাহাই নিগর্ভ প্রাণায়াম। ইহাতে মাত্রা রাখিতে হয়। শিষ্য। মাত্রা কি ? বাম জানুতে বাম হাত ঘুরাইতে যেটুকু সময় লাগে, তাহাই মাত্রা। শিষ্য। এই মাত্রার সার্থকতা কি ? গুরু। এই মানুসারেই ত্রিবিধ প্রাণায়াম সাধন হইয়া থাকে। শিষ্য। ত্রিবিধ প্রাণায়াম কি কি? শুরু। উত্তম, মধ্যম এবং অধম। বিংশতি মাত্রা উত্তম, যােড়শ মাত্রা মধ্যম এবং দ্বাদশ মাত্রা অধম। শিষ্য। এই মাত্রা গণনার নিয়ম কি ? মাত্রা পূরকেই করিলেই চলিবে কি শুরু। না না। পূরকে এক ‘গুণ মাত্রা রেচকে দ্বিগুণ এক কুম্ভকে চতুগুণ। শিষ্য। ঠিক বুঝিলাম না। ।

যােগ ও সাধনা ১২৮ গুরু। বুঝাইয়া দিতেছি। মনে কর, যে ব্যক্তি উত্তম প্রাণায়াম সাধন করিবে, তাহার পক্ষে পূরকে বিংশতি মাত্রা, কুম্ভকে তাহার চতুগুণ অর্থাৎ অশীতি মাত্রা এবং রেচকে দ্বিগুণ অর্থাৎ চল্লিশ মাত্রা। বুঝিলে ? শিষ্য। আজ্ঞা হা। গুরু। এইরূপ মধ্যম মােড়শ মাত্রা প্রাণায়ামে পূরকে ১৬, কুম্ভকে ৬৪, এবং রেচকে ৩২। অধম দ্বাদশ মাত্রা প্রাণায়ামে পূরকে ১২, কুম্ভকে ৪৮ এবং রেচকে ২৪। শিষ্য। এই তিন প্রকার ব্যতীত অন্যবিধ প্রাণায়াম আছে কি। গুরু। অবশ্যই আছে। কেন না, সকলের শক্তি সমান নহে। শিষ্য। তাহা কি প্রকার ? ঐ তিন প্রকার প্রাণায়াম সমাধানে যদি কেহ অপারগ সে ৪, ১৬ ও ৮ মাত্রা প্রাণায়াম করিলেই তাহার কাৰ্য্য সিদ্ধি হইবে। ইহাও যদি কেহ না পারে, তাহা হইলো পক্ষে সে ১, ৪ ও ২ মাত্রা প্রাণায়াম। করিবে ইহার কারণ এই যে, কেবল মােগসাধন নহে, প্রত্যেক ব্যক্তির নিত্য- কর্যে ও প্রাণায়াম অব কর্তব্য। অন্যান্য ক্রিয়ানুষ্ঠানে ত আছেই। যােগীর পক্ষে ইহা অবশ্য কর্তব্য। শিষ্য। ইহার হেতু কি? গুরু। এই প্রাণায়ামই যােগের মূল উপাদান। সম্যক প্রকারে প্রাণায়ামে অত্যন্ত না হইলে যােগাভ্যাস হইতেই পারে না। গুরু। চিত্তস্থিরতাই যােগের মূলসূত্র। সেই চিত্তের স্থিরতা আনয়নে একমাত্র প্রাণায়ামই সমর্থ। তাহা হইলেই দেখা যাইতেছে, ১২৯ যােগ ও সাধনা ত ইহার উপযােগিতা কি? এই প্রাণায়ামের দ্বারাই প্রাণকে নিগ্রহ করা যায় আর প্রাণনিগ্রহ হইলেই দেহ দোষসমূহ ধ্বংসপ্রাপ্ত যেমন ধাতুসমূহ অগ্নিসংযােগে নিৰ্ম্মলতা প্রাপ্ত হয়, সেইরূপ প্রাণনিগ্রহ দ্বারাই ইন্দ্রিয়কৃত দোষ সমুদায় বিদূরিত হইয়া থাকে । সেই জন্য যােগশাস্ত্রে পণ্ডিতগণ বলিয়া গিয়াছেন যে, বােগসাধক পুরুষ সৰ্ব্ব প্রত্নে প্রাণায়াম সাধন করিবেন। কারণ, প্রাণ আপন বারে নিরােধই প্রাণায়াম বলিয়া অভিহিত হইয়া থাকে। প্রাণায়াম অর্থে প্রাণসংযমন । কেন না, প্রাণবায়কে দেহাভ্যন্তরে নিরুদ্ধ কবিয়া রাখাকেই প্রাণসংযমন বলা হইয়াছে, সুতরাং প্রাণায়ামের উপযােগিতা কি, তাহা অবশ্যই বুঝিছ ? শিষ্য। আজ্ঞা হাঁ, বুঝিয়াছি। এইখানে একটা কথা জিজ্ঞাস্য আছে ! গুরু। বুল। শিষ্য । প্রাণায়ামসিদ্ধির কোন লক্ষণ আছে কি ? অগাং কি উপায়ে বুঝিব যে, প্রাণায়ামসিদ্ধি ঘটিয়াছে ? গুরু। অবশ্যই আছে। শিষ্য। তাহা কি। প্রথমে অধম মাত্রা প্রাণায়ামসিদ্ধির কথা বলিতেছি। যখন দেখিবে যে, অধম মাত্রা প্রাণায়ামের ফলে দেহ হইতে স্বেদ নির্গত হইতেছে, তখনই বুঝিবে যে অধম মাত্রা প্রাণায়াম সিদ্ধ হইয়াছে। অধম মাত্রা প্রাণায়াম সিদ্ধির লক্ষণ এই যে, তৎকালে দেহে মেরুকম্প উপস্থিত ইহয়া থাকে। শিষ্য। মেরুকম্প কি ? মেরুদণ্ডের গায় একটি নাড়ী গুহদেশ হইতে ব্রহ্মদেশ পর্যন্ত ৫

যােগ ও সাধনা
বিস্তৃত আছে। ঐ নাড়ীর নাম মেরু। যৎকালে মধ্যম মাত্রা
'প্রাণায়ামে সিদ্ধিলাভ হয়, তৎকালে ঐ মেরুনাজী কম্পিত হইতে
থাকে। উহাকেই মেরুকম্প কহে।
শিষ্য। উত্তম মাত্রা প্রাণায়ামসিদ্ধির লক্ষণ কি ।
গুরু। উত্তমমাত্রা প্রাণায়ামে সিদ্ধিলাভ হইলে সাধকের ভূমি
ত্যাগ করিবার শক্তি জন্মে।
শিষ্য। সে কিরূপ?
গুরু। তাহা হইতেছে এই যে, সাধক পৃথিবী ত্যাগ করিয়া
মার্গে উত্থিত হইতে সমর্থ হন। তিনি নিখিল রােগ হইতে
মুক্ত হইতে সমর্থ হন, তাহার পরমাত্মশক্তি লাভ হইয়া থাকে
এবং সাধক দিব্যজ্ঞান লাভ করিতে সমর্থ হন। তদ্ব্যতীত তিনি
এক অনির্বচনীয় আনন্দলাভ করেন তিনি নিখিল
সুখের অধিকারী হইয়া থাকেন।
শিষ্য । স্বেদনিৰ্গম, মেরুকম্প ও পৃথিবীত্যাগ—এই তিনটি অধম,
মধ্যম ও উত্তম প্রাণায়াম সিদ্ধির লক্ষণ।
ঠিক তাই। তা ছাড়া সে সাধক মুক্তিলদাত্রী
চারিটি অবস্থাকেই প্রাপ্ত হইয়া থাকে।
শিষ্য। সেই চারিটি অবস্থা কি কি।
গুরু। অন্তি, প্রাপ্তি, সংবিৎ এবং প্রসাদ।
শিষ্য। ইহাদের স্বরূপ কি।
গুরু। আমি তােমাকে তাহা মােটামুটি বিবৃত করিতেছি। যাহার
দ্বারা পাপপুণ্যজনিত ফলের ক্ষয়প্রাপ্তি ঘটিয়া চিত্ত নিরবলম্বনে অবস্থিতি
করিতে সমর্থ হয়, তাহাই অস্তিনামে অভিহিত হইয়া থাকে।
শিষ্য। প্রাপ্তি কি?
**

যােগ ও সাধনা
গুরু। ঐহিক
ও পারত্রিক—সর্ববিধ কাম, লােভ, মোেহ
প্রভৃতি যাহাতে ধ্বংস হয়, তাহাই প্রাপ্তি নামে কথিত ।
শিস। সংবিং কাহাকে বলে ?
গুরু। অতীত ও অনাগত নিকটবর্তী দূরবর্তিত্ব হার
দ্বারা লয়প্রাপ্ত হইয়া থাকে এবং যে জ্ঞান দ্বারা. সূৰ্য্য, চন্দ, নক্ষত্র,
ও গ্রহগণের তুল্য বলশালী হওয়া যায়, তাহাকেই সংবিৎ বলা হয় ।
শিষ্য। প্রসাদের স্বরূপ কি।
গুরু। যাহার দ্বারা মন ও পঞ্চবায়ু প্রসাদ লাভ করে এবং
ইন্দ্রিয়গণ কেবলমাত্র ইন্দ্রিয়ের জন্যই ব্যবহৃত হয় অর্থাৎ ভােজনের
জন্যই ভােজন, দর্শনের জন্যই দর্শন-ইত্যাদি। ইহার তাৎপর্য
এই যে, কোন কিছুতেই আসক্তি থাকিবে না, সকল বিষয়েই
অনাসক্ত যে
যে অবস্থাতেই পাওয়া যায়, তাহাকে প্রসাদ নামে
অভিহিত করা হইয়া থাকে। তবে কুম্ভকের প্রকারভেদ আছে।
শিষ্য। তাহা কি কি?
গুরু। কুম্ভক আট প্রকার ; যথা—সহিত, সূৰ্যভেদ, উজ্জায়ী,
শীতলা, ভস্তিকা, ভ্রমরী, মূচ্ছ। এবং কেবলী। পূর্বে যে কুম্বকের
কথা বলা হইল, উহাই সহিত কুম্ভক। অতঃপর সূৰ্য্যভেদ কুম্ভক।
শিষ্য। সূর্যাভেদকুম্ভক কি প্রকার ?
সুৰ্যভেদ কুস্তক
প্রথমে জালন্ধরবন্ধ করিবে। আশা করি জালন্ধর বন্ধর কথা
তোমার স্মরণ আছে।
শিষ্য। আজ্ঞা হাঁ, তাহা আমার বেশ স্মরণ আছে।
গুরু। বেশ । তারপর দক্ষিণ নাসিকায় বায়ু পূরণ করিয়া
অত্যন্ত যত্নের সহিত কুম্ভক করতঃ ঐ বায়ুধারণ করিবে।

যােগ ও সাধনা
গুরু।
শিষ্য ।
কতক্ষণ ধারণ করিতে হইবে ?
যতক্ষণ না কেশ। ও নখমূল হইতে ধৰ্ম্ম নির্গত হয়,
ততক্ষণ ঐ বায় ধারণ করিয়া থাকিতে হইবে । এইখানে একটা
কথা বলিয়া রাখি। বায়ু পঞ্চপ্রকার তাহা জান কি ?
শিষ্য। আজ্ঞা হাঁ, জানি ।
গুরু ।
কি কি বল দেখি ।
শিষ্য। প্রাণ, অপান, সমান, উদান ও ব্যান ।
গুরু। এই বায়ু অন্তরিন্থ। বহিঃস্থ বায়ুও পঞ্চবিধ।
শিষ্য। তাহা কি কি ?
গুরু। তুমি যখন অন্তরস্থ নাম জ্ঞাত আছ, তখন
অবশ্যই তােমার বহিঃস্থ বায়র কথা জানা থাকা সম্ভব।
শিষ্য । আমার ত স্মরণ হইতেছে না।
স্মরণ আছে, কিন্তু ধরিতে পারিতেছ । ভাল,
আমিই স্মরণ করাইয়া দিতেছি। নাশ, কূৰ্ম্ম, ককর, দেবদত্ত এবং
ধনঞ্জয়। কেমন, এইবার স্মরণ হইয়াছে কি ?
শিষ্য। আজ্ঞা হাঁ, ইহা ত আমার অজ্ঞাত নহে।
গুরু। তাই বলিতেছিলাম, তুমি জান, কিন্তু স্মরণ করিতে
পারিতেছ । আচ্ছা, এই সকল বায়ুর অবস্থান কোথায়
জান কি ?
শিষ্য। আজ্ঞা না।
প্রাণবায় হৃদয়ে, আপন বায়ু ওহদেশে, সমান বায়ু
নাভিদেশে, উদান বায় কণ্ঠে এবং ব্যানায়ু সমগ্র দেহ ব্যাপি
নিরন্তর প্রবাহিত হইতেছে ।
শিষ্য । বহিঃস্থ বায়ুর অবস্থান স্থান কোথায়।

যােগ ও সাধনা
।
গুরু। নাগবায়ু - উদগারে, কুৰ্ম্মবায় উন্মীলনে অর্থাৎ চক্ষ উন্মেষে।
কুকর বায় ক্ষুংকারে অর্থাং চিলে, দেবদত্ত বায় জুনে অর্থাৎ
হাই তােলায় এবং ধনঞ্জয় রায় দেহের সর্বাঙ্গ ব্যাপিয়া বিদ্যমান ;
কিন্তু দেহ গতপ্রাণ হইলেও মৃতদেহেও এই বায় প্রবাহিত হইয়া থাকে ।
শিবসংহিতা’তে এই বায়র বিষয়ে কিছু অন্য রকম বর্ণিত আছে !
শিষ্য। তাহা কিরূপ?
গুরু। শিবসংহিতা' বলিতেছেন, হৃদয়ভাগে দিবালিঙ্গবিভূতি
এক দিব্য পদ্ম বিদ্যমান আছে। ঐ পদ্ম ক হইতে ১ পর্যন্ত দ্বাদশটি
অসুর দ্বারা পরিশােভিত। অনাদি কৰ্ম্মসংপুষ্ট এবং অহঙ্কার দ্বারা ব্যাপ্ত
প্রাণ সেই পদ্মেই অবস্থান করে। বৃত্তিভেদে প্রাণের নাম বহুবিধ।
শিষ্য। সে সকলের নাম কি ?
সে সকলের নাম বর্ণনা করিতে কেহই
করিতে কেহই সমর্থ নহে।
তাহার মধ্যে প্রাণাদি দশ বায় প্রধান। এই দশ প্রাণ নিজ নিজ
কম্মের দ্বারা প্রেরিত হইয়া কৰ্ম্ম সাধন করিয়া থাকে ।
দশটির পাঁচটি শ্রেষ্ঠ।
শিষ্য। কোন পাঁচটি শ্রেষ্ঠ ?
প্রাণ, অপান, সমান, উদান ব্যান। ইহার মধ্যে
প্রাণ ও আপনি সর্বশ্রেষ্ঠ । ইহাদের অবস্থান স্থান কা
পূর্বের মত, তাহাতে কোন মতভেদ নাই।
শিষ্য। ইহাই সূৰ্যভেদ কুম্ভক ?
গুরু। হাঁ, তবে এখনও কিছু বক্তব্য আছে।
শিষ্য। কি বলুন ।
গুরু। যে সময় কুম্ভ করিতে হইবে, তখন ঐ প্রাণাদি
বায়ু সমুদায়কে পিঙ্গলা মাড় আরা বিভিন্ন করিয়া নাভিমূল হইতে
৩

যােগ ও সাধনা ১৩৪ ক সমান বায়ুকে উত্তোলিত করিতে হইবে। তার পর ধৈর্য্যের সহিত তীব্রবেগে বামনাসাপুট দ্বারা রেচন করিতে হইবে। তারপর আবার দক্ষিণ নাসাপুট দ্বারা বায় পূরণ করিয়া সুষুম্নাতে কুন্তক করত পুনরায় বামনাসাপুট দ্বারা রেচন করিতে হইবে। বার বার এইরূপ করিলেই সূর্য্যভেদ কম্ভক সম্পন্ন হইবে। শিষ্য। ইহার দ্বারা কি ফল লাভ করা যায় ? গুরু। ইহার দ্বারা জরা ও মৃত্যুকে জয় করা যায়, কুল- কুণ্ডলিনী শক্তি প্রবােধিতা হইয়া থাকেন এবং শরীরাভ্যন্তরস্থ অগ্নি বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়া হইয়া থাকে। অতঃপর উজ্জায়ীকুম্ভক। { উজ্জায় কুম্ভক গুরু। বহিঃস্থিত বায়ু উভয় নাসিকা দ্বারা এবং অন্তরস্থ বাস হৃদয় ও তলদেশ দ্বারা আকর্ষণ করত কুন্তক দ্বারা মুখাভ্যন্তরে ধারণ করিতে হইবে। তাহার পর মূখ প্রক্ষালন করিয়া জালন্ধর মুদ্রা অনুষ্ঠান করিতে হইবে। এই প্রকারে শক্তি অনুসারে কুম্ভক করত বায়ধারণ করিলেই উজ্জায়ীকুন্তক অনুষ্ঠিত হইল। শিষ্য। ইহার ফল কি ? যে সাধক এই উজ্জারীকুন্তকে সিদ্ধিলাভ করেন, তিনি ইহার প্রভাবে নিখিল কর্মে সিদ্ধিলাভ করিয়া থাকেন। তা ছাড়া ইহার প্রভাবে শ্লেষ্মা, দুষ্ট বায়, অজীর্ণ, আমবাত, ক্ষয়, কাস, জর, প্লীহা প্রভৃতি নিখিল রোগ বিদূরিত হয়। যিনি জরা মৃত্যুকে জয় করিতে ইচ্ছা করেন, তিনি এই উজ্জয়ীকুম্ভক সাধন করিলেই উহাতে সমর্থ হইবেন। শীতলীকুম্ভক গুরু। জিহ্বা দ্বারা বা আকর্ষণ করিয়া কুন্তকষােগে শনৈঃ

১৩৫
যােগ ও সাধনা
শনৈঃ উদরমধ্যে বায়ুপূরণ করিতে হইবে। তৎপরে কিছুকাল
সেই বায় ধারণ করিয়া রাখিয়া উভয় নাসা দ্বারা রেচন করিলেই
শীতলীকুম্ভক সম্পন্ন হইল।
শিষ্য। ইহাতে কি ফল লাভ করা যায় ?
এই শীতলীকুম্ভক সাধন দ্বারা অজীর্ণ, কফরােগ এবং
পিওজনিত সকল রােগ দূরীভূত হয়।
ভৱিকাকুস্তক
গুর। অতঃপর ভস্তিকাকুক।
শিষ্য। ইহার নাম ভকি হইল কেন?
ভা কাহাকে বলে জান?
শিষ্য। আজ্ঞা না।
কামাররা যারা আগুনে বাতাস দেয় তাহা ভা।
তাহা হইলে হাপরের অপর নাম ভা।
গুরু। ঠিক তাই। সেই ভা বা ভন্ত্রিক যন্ত্র দ্বারা যে
ভাবে বায়ু আকৃষ্ট হইয়া থাকে, সেই প্রকারে উভয় নাসার দ্বারা
বায়ু আকর্ষণ করত শনৈঃ শনৈঃ উদরে বায়ু পরিচালিত করিতে হইবে।
শিষ্য। এইরূপ কতবার করিতে হইবে ?
গুরু। কুড়িবার। বায়ু পরিচালিত হইলে সেই বায়ু কুম্ভক
দ্বারা ধারণ করিয়া থাকিতে হইবে। তাহার পর ভম্বিকা দ্বারা
যেভাবে বায় বিনির্গত হইয়া থাকে, সেই প্রকারে নাসিকাদ্বারা
ঐ বায়ু বাহির করিয়া দিতে হইবে। ইহাই হইল ভন্ত্ৰিকাকুম্ভ।
শিষ্য। এই কুম্ভক কয়বার অনুষ্ঠিত করিতে হইবে?
গুরু। তিনবার।
শিষ্য। ইহার ফল কি?
!

যােগ ও সাধনা ১৩৬ গুরু। এই ভন্ত্ৰিকাকুম্ভকসাধন প্রভাবে কোনরূপ অধিব্যাধি- দ্বারা সাধক আক্রান্ত হন না-দিন দিন আরােগ্য লাভ ঘটিয়া থাকে। ভ্রামরীকুম্ভক অতঃপর ভ্রামরীকুম্ভকের কথা বলিতেছি। যেরূপ স্থানে কোনরূপ জীবজন্তুর শব্দ কর্ণগােচর হয় না, সেইরূপ স্থানে রাত্রির মধ্যভাগে অতিক্রান্ত হইলে সাধক নিজ হস্ত দ্বারা স্বীর কর্ণদ্বয় আবদ্ধ করিয়া পূরক ও কুন্তক করিবে। এইরূপে কুন্তকের অনুষ্ঠান দ্বারা সাধকের দক্ষিণ কর্ণে বিবিধ প্রকার শব্দ আসিয়া পৌছিবে। শিষ্য। ঐ শব্দ কোথা হইতে আসে ? গুরু। ঐ শব্দ শরীরের অভ্যন্তরদেশ হইতে উত্থিত হয় । শিষ্য। আপনি যে নানাবিধ শব্দের কথা বলিলেন, ঐ সকল শব্দ কোন কোন জীবজন্তুর শব্দের মত ? প্রথমে ঝিল্লীরব, তৎপরে বংশীধ্বনি, তাহার পর মেঘ- গর্জনবৎ ধ্বনি কর্ণে প্রবেশ করিবে। অনন্তর ঝকরীনামক এক প্রকার বাছ আছে, তাহার কনি শুনিতে পাইবে ; তৎপরে দুমরের শুন্ গুন্ শব্দ ; তৎপরে ঘন্টা, কাংস্য, তুরী, ভেরী, মৃদঙ্গ ; আনন্দদুন্দুভি প্রভৃতির শব্দ কর্শে আসিয়া প্রবিষ্ট হইবে । এই ভাবে প্রত্যহ বিভিন্ন প্রকার শব্দ সাধকের শ্রুতিমুলত হইবে । শিষ্য। ইহাই কি ভ্রামরীকুম্ভক? গুরু। না। আরও আছে। শােন, অবশেষে হৃদয়ন্থিত অনাহত নামক দ্বাদশদলযুক্ত পদ্মের মধ্যদেশ হইতে মনােরম শব্দ এবং সেই শব্দের প্রতিশব্দ কর্ণগােচর হইবে । তাহার পর নিমীলিত নয়ন সাধকের হদয়মধ্যে সেই দ্বাদশদলপদ্মের প্রতিধ্বনির অন্তর্গত জ্যোতিদর্শন হইবে ।

১৩৭
যােগ ও সাধনা
শিষ্য। এই জ্যোতি কি ?
গুরু। জ্যোতিই পরব্রহ্ম । সাধকের মন সেই পরব্রহ্মে সংযুক্ত
হইয়া ব্রহ্মরূপী শ্রীবিষ্ণুর পরমপদে লয়প্রাপ্ত হইয়া থাকে। সাধক
এইভাবে ভ্রামরীকুম্ভক সিদ্ধি লাভ করিয়া থাকেন।
শিষ্য। ইহার ফল কি ?
গুরু। ইহার ফল সম্বন্ধে অধিক কি বলিব ভ্রারীকুম্ভকে
সিদ্ধিলাভ করিলে সাধক সমাধি সিদ্ধি লাভ করিয়া থাকেন।
মূৰ্ছাকুক
প্রথমে পৃথিত বিধানানুসারে কুম্ভক করত নিখিল
বস্তু হইতে মনকে প্রতিনিবৃত্ত করিতে হইবে। তদনন্তর জদ্বয়ের
মধ্যভাগে আজ্ঞাপুর নামক যে দ্বিদলযুক্ত শ্বেতবর্ণ পদ্ম বিদ্যমান,
তাহাতে স্বীয় মন সংযুক্ত করিয়া ঐ পদ্মে অবস্থিত পরমাত্রাকে
লয় করিলেই মৃচ্ছকুম্ভক হইয়া থাকে।
শিষ্য । ইহার দ্বারা কি ফল লাভ হয় ?
গুরু। এই কুম্ভক দ্বারা পরমানন্দের সঞ্চার ঘটিয়া থাকে।
কেবলীকুন্তক
গুরু। অতঃপর কেবলীকুম্ভকের কথা বলিব। বিশেষ মনােযােগ
সহকারে ইহা প্রণিধান কর। দেহীর যখন সবায় নিগম ও প্রবেশ
হয়, তৎকালে ‘হং’ ও ‘সঃ এই শব্দ দুইটি উচ্চারিত হইয়া থাকে।
শিষ্য। ঠিক বুঝিলাম না।
গুরু। আচ্ছা, বুঝাইয়া দিতেছি। যে সময় শ্বাসবায়ু বাহির
হইয়া আসে, সে সময় ‘হংকার শব্দ উচ্চারিত হয় এবং যে সময়
শাসবায়ু দেহাভ্যন্তরে প্রবেশ করে, সে সময় ‘সঃ কার শক্ত
ধ্বনিত হইতে থাকে।

যােগ ও সাধনা sob শিষ্য। শিষ্য । ঐ ‘হংকার এবং সরকার কি ? হংকারকে বিশ্বস্বরূপ এবং সরকারকে শক্তিস্বরূপ বলিয়া অবগত হইবে। শিষ্য “হংসঃ” শব্দ হইল কেন ? গুরু। কারণ এই যে, হংসঃ শব্দ যেমন “সােহং” সেইরূপ, এই জন হংসঃ শব্দ হইয়াছে। অজপা কাহাকে বলে জান? অজপা কাহাকে বলে ? গুরু। উক্ত পুরুষ ও প্রকৃতিময় শব্দই অজপা গায়ত্রী। শিষ্য ' আচ্ছা, এই নিশ্বাসবায়ুর কি কোন সংখ্যা আছে ? আছে বৈ কি। , শিষ্য। সেই দংখ্যা কত ? একুশ হাজার ছয় শত। তাহা হইলে কি বুঝিব যে, নিশ্বাস ও প্রশ্বাস উভয়ে মিলিয়া ঐ সংখ্যা নিষ্টি হইয়াছে। ২১ হাজার বার প্রবিষ্ট হয় সংখ্যাতেই বাহির হইয়া থাকে। শিষ্য। ইহা কি কেবল দিবাভাগের সংখ্যা ? না। দিব। ও রাত্রির মধ্যে ঐরূপ ঘটিয়া থাকে। জীব মাত্রেরই এইরূপ জানিবে । শিষ্য। অজপাগায়ত্রী কোথায় জপ হয় ? গুরু। মূলাধার, হৃদয় পদ্ম এবং নাসাপুটদ্বয়। শিষ্য। মৃধার কোথায় ? গুরু। গুহ্য ও লিঙ্গমূলের মধ্যভাগকেই মূলাধার বলে । শিষ্য। হৃদয়পদ্ম কি ? শিম। ।

১৩৯ যােগ ও সাধনা পূর্বে যে অনাহত পদ্মের কথা বলিয়াছি, তাহাকেই হৃদয়পদ্ম বলিয়া জানিবে । শিষ্য। নাসাপুটদ্বয়- গুরু। অর্থাৎ ইড়া ও পিঙ্গল নাড়ী। ইড়া ও পিঙ্গলা নাড়ীর কথা পূৰ্ব্বে বলিয়াছি, তাহা বােধ হয় স্মরণ আছে। শিষ্য। আজ্ঞা হা। গুরু। বেশ। এই স্থানত্রয় হইতে অজপাগায়ত্রী উচ্চারিত হইয়া থাকে । আবার এই শ্বাসবায়ুর পরিমাপ আছে। শিষ্য । সেই মাপ কিরূপ? ইহার বহির্ভাগে গতির স্বরূপ পরিমাণ ৯৬ আঙ্গুল । তদ্ব্যতীত ইহারও পরিমাণ অন্য রূপ। তাহা কি ? গুরু। ইহার বহির্দেশে স্বাভাবিক গতি ১২ আঙ্গুল। গীতকালে ইহার পরিমাপ ১৬ আঙ্গুল ; আহারকালে ২০ আঙ্গুল। যে সমম পথপৰ্যটন করা তৎকালে ইহার পরিমাপ ২৪ আঙ্গুল। নিদ্রার সময় ইহার পরিমাপ ৩০ আঙ্গুল। মৈথুন সময়ে ইহার পরিমাপ ৩৬ আঙ্গুল এবং যৎকালে ব্যায়াম অনুষ্ঠিত হয়, তৎকালে ইহার পরিমাপ আরও অধিক হইয়া থাকে। শিষ্য। ইহাই কি স্বাভাবিক পরিমাপ? শিষ্য । হয়, শিষ্য। যদি ইহার ব্যতিক্রম হয়? তাহাতে অনেক দোষ ঘটিয়া থাকে । শিষ্য। কি কি দোৰ ঘটে ? গুরু। বলিতেছি। খাসবায়ুর বহির্ভাবে স্বাভাবিক গতির পরিমাপ *

যােগ ও সাধন।
১৪ ০
১২ আঙ্গুল, তাহা পূর্বেই বলিয়াছি। যদি ঐ পরিমাপ ১২ আঙ্গুলের
চাইতে কম হয়, তবে পরমায়ু বুদ্ধি প্রাপ্ত হইয়া থাকে।
শিষ্য । যদি অধিক হয়, তবে তাহার ফল কি ?
গুরু। দ্বাদশাঙ্গুলীর অধিক
অধিক হইলে পরমায়ু কম। যায়।
কুম্ভকসাধনে প্রাণবায়ুই মূল কারণ বলিয়া জানিবে ।
শিষ্য। কেন?
গুরু। দেহে যতক্ষণ প্রাণবায়ু বিদ্যমান থাকে, ততক্ষণ কখনই
জীবের মৃত্যু হয় না, ইহা প্রত্যক্ষ সিদ্ধ । কেমন ?
শিষ্য। আজ্ঞা হা।
গুরু। তবেই দেখ, প্রাণবায়ুর উপমােগিতা কি। সকল বিষয়েই
প্রাণবায়ু প্রধান। প্রাণ না থাকিলে ত দেহ কিছুই নহে-
পঞ্চভূতের সমষ্টি মাত্র । জীব যাবৎকাল জীবিত থাকে, তাবৎকাল
যথাবিহিত সংখ্যায় অজপাগায়ত্রী জপ করিয়া থাকে। দেহের
অভ্যন্তরে প্রাণবায়ুর সমাগম হইলেই উভয় নাসিকা দ্বারা বা
আকর্ষণ করিয়া কেবলীকুম্ভক সাধন করিতে হইবে ।
শিষ্য। কতবার এইরূপ করিতে হইবে ?
প্রথম দিন এক হইতে চৌষটিবার পর্যন্ত
পৰ্য্যন্ত এইভাবে
বায় আকর্ষণ করিতে হইবে।
প্রত্যহ কতবার করিতে হইবে ।
গুরু। আটবার।
শিষ্য। আটবার। যদি কেহ না পারে, তবে সে কি কেবলী-
কুম্ভক সাধন করিবে না ?
তাও কি হয়! যে সাধৰু আইবার সাধনে অশক্ত
হইবেন, তিনি পাচবার সাধন করিবেন। . .
শিষ্য।

১৪১ যােগ ও সাধনা শিষ্য । শিষ্য। শিষ্য । হা। কোন্ কোন্ সময়। প্রাতঃকাল, মধ্যাহ্নকাল, সায়ংকাল, রাত্রির প্রথম যামের শেষ ভাগে এবং রাত্রি চতুর্থ প্রহরের প্রারম্ভে। পাঁচবারের কম হইলে চলিবে না? অশক্তের পক্ষে তিনবারও চলিবে । শিষ্য। তাহার ত একটা সময় আছে । গুরু : অবশ্যই আছে। প্রাতঃকাল, মধ্যাহ্নকাল ও সায়ংকাল । প্রত্যেক বার কি একই নিয়মে সাধন করিতে হইবে ? প্রত্যেক বারই একই সংখ্যায় সাধন করিতে হইবে । ইহার সহিত অজপামও যথা নিয়মে জপিতে হইবে। শিষ্য। যথানিয়ম কি ? গুরু। নিয়ম এই যে, প্রত্যহ কিছু কিছু অর্থাৎ এক হইতে পাঁচ বার পর্যন্ত বৃদ্ধি করিতে হইবে। ইহাই হইল কেবলকুম্বক সাধন প্রণালী । শিষ্য। ইহার ফল কি ? ইহার ফলের কথা অধিক কি বলিব, বে কেবলীকুন্তকে সিদ্ধিলাভ করিয়াছেন, তিনিই প্রকৃত যােগ পৃথিবীতে তাহার অসাধ্য কৰ্ম্ম কিছুই নাই। এই আমি তােমাকে মােটামুটি প্রাণায়ামের কথা বলিলাম । তবে আর একটু কথা আছে । শিষ্য। কি ? গুরু। প্রাণায়াম ত্রিবিধ। ইহাও জানিয়া রাখ। শিষ্য। তাহা কি কি? গুরু। লঘু, মধ্য ও উত্তরীয় ।

যােগ ও সাধনা
১৪২
শিষ্য
এই কয়টি আমায় বুঝাইয়া বলুন।
অগর্ভ স্থানেই এই ত্রিবিধ প্রাণায়াম অবগত হইবে ।
পূর্বে সগর্ভ ও অগর্ভ প্রাণায়ামের কথা বলিয়াছি, তাহা বােধ
হয় তােমার স্মরণ আছে ?
শিষ্য। আজ্ঞা হা।
গুরু। সেই সঙ্গে মাত্রার কথাও
কথাও বলিয়াছি, আশা করি,
তাহাও স্মরণ আছে ?
শিষ্য। আজ্ঞা হঁ আছে।
গুরু। বেশ। সেই মাত্রার দ্বাদশ সংখ্যক লঘু ; ইহার দ্বিগুণ
মধ্য, এবং চতুগুণ উত্তরীয় নামে কথিত হইয়া থাকে। এই
প্রাণায়ামের বলেই যােগীরা সকল কার্যে সিদ্ধিলাভ করেন এবং
সকল কার্যসাধন ও তাহাদের অনায়াস সাধ্য। ইহাই যে যােগের
দ্বারস্বরূপ, তাহাই তােমাকে বলিয়াছি। স্বধর্মনিষ্ঠ প্রত্যেক গৃহীরও
যথানিয়মে প্রাণায়াম করা উচিত। কারণ, প্রাণায়াম ব্যতীত জপ,
পূজা-কিছুই সফল হয় না। যে ব্যক্তি যথাবিধানে প্রত্যহ
প্রাণায়াম করে, তাহার শরীরে কোনরূপ ব্যাধি প্রবেশ করিতে
সমর্থ হয় না। সুতরাং প্রাণায়ামের আবশ্যকতা কত, তাহা সহজেই
বুঝিতে পারা যাইতেছে।

অষ্টম অধ্যায়
প্রত্যাহার ও মােগবিন্ন
গুরু। অত:পর প্রত্যাহার বলিব ।
শিষ্য। প্রত্যাহার কি ?
প্রত্যাহার আর কিছুই নহে, নিখিল বিষয়ে উপেক্ষ।
শিষ্য। একটু বুঝাইয়া বলুন।
গুরু। চিত্ত যে সকল বিষয়ে চাঞ্চল্য প্রাপ্ত হইয়া ইতস্ততঃ
বিক্ষিপ্ত হয়, সেই সকল বিষয় যইতে মনকে প্রতিনিবৃত্ত করিয়া
আত্মার বশতপন্ন করাই প্রত্যাহার । কথায় আৰু প্ৰতিষ্ঠ
হওয়ার নামই প্রত্যাহার । কি পুরষ্কার, কি তিরস্কার, কি সুশ্রাব্য,
কি অশ্রাব্য-যে কোন বিবরণ হউক না কেন, প্রত্যাহার সম্পন্ন
ব্যক্তি কিছুতেই অবসন্ন ན། ། সকল বিষয় হইতেই মন
প্রতিনিবৃত্ত হইয়া আয়ার বশীভূত হইয়া থাকে।
হইয়া থাকে। সুগন্ধ, দুর্গন্ধ,
মধুর, অম্ল, তিক্ত, কষায়—যেরূপ বাসযুক্ত খাদ্যই হউক, প্রত্যাহার
ক্ষমতাপন্ন ব্যক্তির নিকট সকলই তুল্য। কিছুতেই তিনি বিচলিত
হন না। কেন না, তাহার মন আত্মার বশীভূত । মন যাহার
বশীভূত, তাহার নিকট সকলই সমান হইবে।
শিষ্য। এ সকল না হইলে ত সােগের বিঘ্ন ঘটিয়া থাকে ?
গুরু। অবশ্যই বিঘ্ন ঘটে। যােগের বিঘ্ন সম্বন্ধে শিবসংহিতায়’
অতি চমংকাররূপে কথিত হইয়াছে। যােগসাধন করিতে হইলে

যােগ ও সাধনা ১৪৪. সে সকল জ্ঞাত হওয়া অত্যাবশ্যক। কেন না, তাহা না জানিলে সে সম্বন্ধে সাবধান হওয়া যায় না। এ সম্বন্ধে যতগুলি বিঘ্ন আছে, তাহার মধ্যে বিষয়-বাসনা বা বিষয় সম্ভোগই যােগসাধনের অর্থাৎ মুক্তিলাভের প্রধান কটক। নারীসম্ভোগ বিষয়সম্ভোগরই অন্তর্গত উত্তম-শয্যা, মনােহর আসন, সুন্দর বসন-ভূষণ এবং অর্থ সংগ্রহ, এ সকল ও গােগসাধনের মহান প্রতিবন্ধক। পাণ, ভােজনবিলাস, যান- বাহন, রাজ্য, ঐশ্বৰ্য্য, প্রভুত্ব, সােণা, রূপা, গন্ধদ্রব্য, মণিরত্ন, পাণ্ডিত্য বেদপাঠ এসকলও যােগবিঘ্ন বলিয়া জানিবে । শিষ্য। পাণ্ডিত্য যােগবিন্ন কেন? গুরু। পাণ্ডিত্য শব্দের অর্থ পাণ্ডিত্যাভিমান জানিবে। প্রকৃত পাণ্ডিত্য যেখানে, সেখানে অহঙ্কারাদির স্থান নাই, বরং বিষয়ই সেই স্থান অধিকার করে; কিন্তু পাণ্ডিত্যাভিমান মানুষকে অহঙ্কার- পূর্ণ করে, এই জন্যই পাণ্ডিত্য অর্থাৎ পাণ্ডিত্যাভিমান যোগবিঘ্ন বলিয়া কথিত হইয়াছে। শিষ্য। বেদপাঠ যোগবিপ্ন কেন ? গুরু। বেদপাঠ করিতে হইলে হ্রস্ব, দীর্ঘ, পুত, মাত্রা প্রভৃতি বিষয়ে মনকে মনকে ব্যাপৃত রাখিতে মন যদি সেই বিষয়েই বাপৃত থাকে, তবে পরমার্থ ধ্যানে মন নিবিষ্ট হইবে কিরূপে? বলিয়াছি ত, নিজ আত্মার সহিত পরমাত্মার সংযােগ সাধনই যােগ । এই সকল যােগবিন্তু। ইহার পর ব্যসনবিভু । শিষ্য। ব্যসনবিঘ্ন কি ? গুরু। নৃত্য, গীত, বশী, বীণা, মৃদঙ্গ ( চামড়ার বাদ্যযন্ত্র সকল ), হাতী, ঘােড়া, স্ত্রী পুত্র প্রভৃতি সংসার—এক সকলও যােগ

১১৫
যােগ ও সাধনা
পথের বিপ্ন।
পর যে বিঘ্নের কথা বলি, তাহা শুনিয়া
তুমি বিস্মিত হইবে। তাহা হইতেছে ধৰ্ম্মবিঘ্ন ।
শিষ্য। সেই ধৰ্ম্মবিঘ্ন কি, তাহা বলুন
?
প্রাতঃন প্রভৃতি শাস্ত্রোক্ত স্নান, পূজাধিক্য, নিরন্তর
অতিথি সৎকার, নিত্য হােম, ব্রত, উপবাস, নিয়মপালন, মৌন
অথাৎ বাগিন্দ্রিয় নিগ্রহ, ইন্দ্রিয় নিগ্রহ অর্থাৎ উপস্থচ্ছেদন, ধ্যেয়তা,
সূলধ্যান, মন্ত্রজপাদি, দান, সৰ্বত্ৰখ্যাতি বাপীকূপতড়াগাদি প্রতিষ্ঠা,
যজ্ঞ, চালায়ন, কছুব্রত, তীর্থপৰ্য্যটন, ইত্যাদি ধৰ্ম্মবিঘ্ন বলিয়া জানিবে ।
শিষ্য। ঐ সকল ধৰ্ম্মবিপ্ন কেন ?
মনকে একমাত্র পরমাত্মার সন্ধানে নিযুক্ত না রাখিলে
কখনই সিদ্ধিলাভ হয় , মন ঐ সকল ব্যাপারে নিযুক্ত
থাকিলে একাগ্রতা আসে না।
অতঃপর জ্ঞানবিঘ্ন।
শিষ্য। একটু খুলিয়া বলুন।
গুরু। গােমুখাসন প্রভৃতি যে কোন প্রকার আসন করত।
ধােতিযােগ দ্বারা নাড়াধৌতিকরণে প্রবৃত্ত হওয়া ; নাড়ীস্থান বিজ্ঞান
অর্থাৎ দ্বিসপ্ততি সহস্র নাড়ীর মধ্যে কোন স্থানে কোন নাড়ী
অবস্থিত তাহারই অনুসন্ধানে ব্যাপৃত থাকা; প্রত্যাহার করিবার জন্য
চক্ষু, কর্ণ প্রভৃতি ইন্দ্রিয়সমূহ নিরােধ ; লৌহ শৃল দ্বারা উপস্থ বন্ধন ;
লৌহনিৰ্ম্মিত কাটা দ্বারা চক্ষু অথবা উপস্থ বিদ্ধ করণ ; বায়ু সঞ্চালনের
জন্য কুক্ষিদেশ চালন ; এবং নাড়ীকৰ্ম্ম অর্থাৎ নিরন্তর বায়ুদ্বারা
নাড়ীধৌতিকরণ প্রভৃতিকে জ্ঞানবিঘ্ন বলিয়া অবগত হইবে।
শিষ্য। এ সকল যদি বিঘ্ন, তবে যেগােপদেশে এ সকলের
কথা বিবৃত আছে কেন?
ঐ সকল প্রাথমিক অবস্থা। যে সাধক সে অবস্থা
;

যােগ ও সাধনা ১৪৬ হইতে উন্নীত হইয়াছেন, তাহারই সম্বন্ধে এ সকল অবগত হইবে। মম, নিয়ম প্রভৃতি যাহা এবং বলা হইয়াছে, সে সকলই যােগ মার্গে উন্নীত হইবার সােপান মাত্র। যেমন কোন দ্বিতল সৌধে উঠিতে হইলে এক একটি সােপান উত্তীর্ণ হইয়া উপরে উঠিতে হয়, এবং অতিক্রান্ত সােপানগুলি ত্যক্ত হইয়া থাকে, সেইরূপ জানিবে, তুমি যদি নিরন্তর নিম্ন সােপানেই বিচরণ কর, তবে কি করিয়া তুমি সৌধের শিখরদেশে উপস্থিত হইবে। বুঝিয়াছ ? শিষ্য। আজ্ঞা হাঁ, বুঝিয়াছি । গুরু। ইহার পর ভােজন বিপ্ন আছে। শিষ্য। ভােজন বিঘ্ন কি? যে সকল ভােজ্যে দেহে নূতন রসের সঞ্চার হইয়া থাকে, এ প্রকার ভােজন হইতে বিরত হইবে । অর্থাং যাহাতে রবৃদ্ধি হয়, তাহা সর্বথা পরিত্যাজ্য। শিষ্য। এর কারণ কি? কারণ এই যে, ঐরূপ ভােজন দ্বারা জিহ্বার মলদেশ স্ফীত হইয়া থাকে। ফলে বেদনার সঞ্চার হইয়া যােগসাধনে বিঘ্ন ঘটাইয়া থাকে। অবশ্য এ সকল নিয়ম সকল যােগীর জন্য নহে। শিষ্য। সকল যােগী বলিতেছেন? গুরু। যােগী চারিকার, মৃদু সাধক, মধ্যসাধক, অধিমাত্র সাধক এবং অধিমাত্ৰতম সাধক। শিষ্য। কাহারা ঐ সকল লক্ষণাক্রান্ত, একে একে বুঝাইয়া দিন। গুরু। প্রথমে মৃদুসাধকের কথা বলি। যে ব্যক্তি মন্দোৎসাহী, অর্থাৎ যাহার উৎসাহ অতি অল্প ; সুসংমূঢ় অর্থাৎ প্রতিভাশূন্য, রােগগ্রস্ত, গুরুনিন্দাকারী অর্থাৎ যে ব্যক্তি গুরুর কার্যের উপর

'১৪৭
যােগ ও সাধনা
•
দোষ আরােপ করে এবং গুরুর নিন্দা করিয়া থাকে ; লােভী ;
কাৰ্যে রত; বহুভােজনশীল ; স্ত্রীজিত অর্থাৎ স্ত্রীর বশীভূত ;
চল; পরিশ্রমকাতর ; পরাধীন ; অতি নিষ্ঠুর ; মন্দাহাররত এবং
মানবী –ইহারাই মৃসাধক বলিয়া কথিত ।
শি। ইহারা কি সিদ্ধিলাভ করিতে পারে না?
পারে। তবে যদি বিশেষ যত্ন করে, বারো বৎসরে
সিদ্ধিলাভ করিতে পারে । তবে ঐরূপ ব্যক্তির প্রতি গুরুর একটা
কিয় লক্ষ্য রাখা কর্তব্য।
শিষ্য। কোন বিষয়ে ?
শুরুর কর্তব্য, এই সব সাধককে মন্ত্রযােগ প্রদান করা।
কেন না, মৃদুসাধক মন্ত্রযােগেরই অধিকারীমাত্র।
শিষ্য। মন্ত্রযােগ কি?
শুরু। মন্ত্রযোগ চারি প্রকার জান ।
শিষ্য। আজ্ঞা না ।
শুরু। মযােগ, হঠযােগ, লয়যোগ ও রাজােগ। ঐ চারি
প্রকার যােগীর জন্য চাৰি প্রকার বােগ বিহিত হইয়াছে। বুঝিছ ?
শিষ্য। আজ্ঞা হাঁ, বুঝিয়াছি। এইবার মধ্যসাধকের কথা বলুন।
গুক । যে সাধক সমবুদ্ধি অর্থাৎ যাহার বুদ্ধি তীক্ষ ও নয় কি
অত্যন্ত স্থূল ও নয় ; যিনি ক্ষমাশীল, যিনি পুণ্যার্জন আকাঙ্ক্ষা করেন,
যিনি প্রিয়ভাষী এবং যিনি কোন কার্যেই ব্যাপৃত
নন, তাহাকে
মধ্যসাধক বলা হইয়া থাকে।
শিষ্য ।
মশা সাধককে কোন্ যােগ দেওয়া কৰ্তব্য?
এরূপ সাধককে লয়যােগ দেওয়াই বিহিত ; কিন্তু পরীক্ষা
করিয়া নির্ণয় করিয়া লইতে হইবে।

যােগ ও সাধনা
১৪৮
শিষ্য। অধিমাত্র সাধকের লক্ষণ কি ?
যে সাধক স্থিরবৃদ্ধি, বয়সাধননিরত, স্বাধীন, বীৰ্য্যবান,
মহাশয়, দয়াবান, ক্ষমাশীল, সত্যনিষ্ঠ, শোৰ্য্যবান্, লয়যােগে শ্রদ্ধাশ,
গুরু-পাদপদ্ম-পূজারত এবং নিয়ত যােগাভ্যাসরত, তিনিই অধিমাত্র
সাধক বলিয়া কথিত হন।
শিষ্য। ইহার পক্ষে কোন যােগ প্রশস্ত ?
হঠযােগ। সকল অঙ্গের সহিত হযােগই এই সাংককে
দেওয়া কৰ্ত্তব্য।
শিষ্য। ইনি কত দিনে সিদ্ধিলাভ করিতে পারেন।
ছয় বৎসরে।
শিষ্য। এইবার অধিমাত্রতম সাধকের কথা বলুন :
গুরু। যিনি মহাবীৰ্য্যশালী, মােহহীন, নিরাকুল, নবযৌবনযুক্ত,
পারমিতাহারী, জিতেলিয়, ভয়শূন্য, শুদ্ধাচারবান, সুদক্ষ, দাত',
সকল লােকের উপর
অনুকুল, সকল বিষয়ে অধিকারী, স্থিরধী,
বুদ্ধিমান, যথেচ্ছস্থাবস্থিত, ক্ষমাশী, সুশীল, ধৰ্ম্মনিষ্ঠ, গুপ্তচেষ্ট,
প্রিয়ভাষী, শান্ত, বিশ্বাসযুক্ত, দেবতা পূজাপরায়ণ, জনসঙ্গে বিরক্ত
চিত্ত, ব্যাধিশূন্য, সর্ব বিষয়ে সর্বাপেক্ষা অগ্রসর এবং যিনি ব্রত
পরায়ণ–তাহাকেই অধিকমাত্রতম সাধক বলিয়া জানিবে ।
শিষ্য। ইহাকে কোন্ যােগ দেওয়া উচিত?
গুরু। রাজবােগ। তবে শুধু রাজষােগ কেন, সকল যােগই
অবিচারে ইহাকে দেওয়া যাইতে পারে, ইহাতে সন্দেহের অবকাশ
মাত্র নাই।
শিষ্য। কত দিনে ইনি সিদ্ধিলাভ করেন?
গুরু। তিন বৎসরের মধ্যেই ইনি সিদ্ধিলাভ করিয়া থাকেন,

১৪৯
যােগ ও সাধনা
"
তাহাতে সন্দেহ নাই। মােগীর সে সকল কর্তব্য অাছে, তাহার
মধ্যে প্রতিকোপাসনা অবশ্য কর্তব্য।
শিষ্য। প্রতিকোপাসনা কি।
শুরু। ছায়াপুরুষ সাধন।
শষ্য। এই সাধনের ফল কি?
এই সাধন দ্বারা দষ্ট ও অষ্ট উভয়বিধ ফলই পাওয়া
যায় এবং ছায়াপুরুষ দর্শন হইলেই দেহ পবিত্র হইয়া থাকে।
শিষ্য। কি উপায়ে ছায়াপুরুষ দর্শন ঘটে ?
গুরু। সুনির্মল রৌদ্র কিরণে অনিমেষ নয়নে সূর্য কিরণ
ইহাতে সঞ্জাত নিজ ছায়া দেখি। আকাশে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেই
আকাশের উপরিভাগে স্বপ্রতীক স্বরূপ ছায়াপুরুষ দর্শন ঘটে।
শি। আর একটু পরিষ্কার করিয়া বলুন।
শুরু। সুর্যের দিকে পিঠ করিয়া পাড়াইলে অনিমেষ নয়নে
আন্দাজ পাঁচ মিনিট নিজের ছায়া দেখিয়া তৎপরে সূর্যের নিম্নভাগের
আকাশের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ কৰিলে সেই স্থানে আকাশব্যাপী বিরাট
ছায়াপুরুষ দৃষ্টিপথে পতিত হইবে। ইহা প্রত্যক্ষ ব্যাপার।
ইহারও কিছু নিয়ম আছে
কি নিয়ম।
গুরু। নিয়ম এই যে, একটি বিষয়ে সাবধান হইতে হইবে ।
বিষয়টি হইতেছে এই যে, যে সময় ছায়া দেখিতে হইবে, সে সময়
যেন মুদ্রা ভঙ্গ না হয়।
শষ্য । মুদ্রাভঙ্গ কি ?
গুরু। চক্ষুর নিমেষ না পড়ে এবং অঙ্গ প্রত্যঙ্গাদি সঞ্চালন হইবে না।
ইহার কে ফুলের কথা বলিতেছি, তদ্ধ্যতীত আরও ফল আছে।
শিষ্য ।

যােগ ও সাধনা
শিষ্য । সে ফল কি?
যে সাধকের ছায়াপুরুষের দর্শন, ঘটে, তিনি সর্ববিষয়ে
বিজয় লাভ করিয়া থাকেন এবং বায়ু জয়
করত শূন্যে বিচরণ
করিতে সমর্থ হন। এমন কি, যে সাধক সর্বদা এই ষােগ অভ্যাস
করিয়া থাকেন, ছায়াপুরুষের কৃপায় তিনি পূর্ণানন্দময় পরমাত্মার
সাক্ষাংলাভ করিতে সমর্থ হন। আরও কতকগুলি বিষয়ে স্বপ্রতীক
দর্শন অতীব শুভকর।
শিষ্য। সেই বিষয়গুলি কি।
গুরু। যাৱাকালে, বিবাহ সময়ে, শুভ কৰ্ম্মের অনুষ্ঠানকালে,
সঙ্কট অবস্থায় এবং পাপক্ষয় অথবা পুণ্যবৃদ্ধির সময়ে ছায়াপুরুষ
দর্শন করা একান্ত কর্তব্য। ছায়াপুরুষ দর্শন করিয়া ঐ সকল ক
করিলে সেই সকল কৰ্ম্ম সফলতা লাভ করিয়া থাকে।
নিরন্তর এই যােগ সাধন করেন, তিনি নিজ হৃদয়ের মধ্যেই ছায়াপুরু
দর্শন করিতে সমর্থ হন, ইহাতে সন্দেহের কোন কারণ নাই।
এই সাধন দ্বারা সাধক সংযতেন্দ্রিয় এবং মুক্তিলাভ করিতে সক্ষম
হন। এই প্রসঙ্গে আত্মদর্শন ও নাদানুসন্ধান আসিয়া পড়ে।
শিষ্য। কি উপায়ে আত্মদর্শন হইয়া থাকে?
গুরু। উভয় অঙ্গুষ্ঠ দ্বারা নিজের অবণ যুগল, তজ্জনীদ্বয় দ্বারা,
নয়ন যুগল, মধ্যমাঙ্গুলী দিয়া, নাসারন্ধ দ্বয় অনামিকা ও কনিষ্ঠাঙ্গুলী
দ্বারা মুখমণ্ডল সুদৃঢ়ভাবে রুদ্ধ করিতে হইবে। তৎপরে বার বার
বায়ু সাধন করিলেই সাধক জ্যোতি সম্পন্ন জীবাত্মাকে দর্শন করিতে
সমঞ্চ হইবেন।
শিষ্য। আত্মদর্শনের ফল কি?
গুরু। ইহার ফল অমি।
এক মুহূর্তের জন্যও
ফে সখিক

যােগ ও সাধনা
শিষ্য ।
জীবাত্মার দর্শন করিতে সমর্থ হন, তিনি নিখিল পাপ হইতে মুক্তি
লাভ করেন এবং অন্তে পরমাগতি প্রাপ্ত হইয়া থাকে। যে সাধক
নিরন্তর এই যােগ অভ্যাস করেন, তিনি নিজ মুল দেহের কথা
বিস্মৃত হইয়া স্বয়ং তন্ময় হইয়া থাকেন।
তন্ময় অর্থে কি বুঝিব?
তাৎপর্য এই যে, সে সময় তাঁহার আর দেহাভিমান
বিদ্যমান থাকে না। লােক লোচনের অন্তরালে যে সাধক এই
যােগ অভ্যাস করেন, তিনি যদি মহাপাপীও হন, তথাপি এই
যােগ প্রভাবে অনায়াসে মুক্তিলাভে সমর্থ হন। এই যােগ বােগেশ্বর
মহাদেবের অতীব প্রিয়, সুতরাং সর্ব প্রকারে ইহা গোপন রাখা
আবশ্যক। অপর নাদানুসন্ধান।
শিষ্য। নাদানুসন্ধান কি।
গুরু। নাদ শব্দে শব্দ।
শিষ্য। এ সাধন কিরূপ?
যে সাধক' আত্মদর্শনে সমর্থ হন, তিনি ক্রমশঃ না
প্রত্যক্ষ করিয়া থাকেন।
শিষ্য। ইহা প্রত্যক্ষ হইল কিরূপে বুঝিব?
গুরু। এই নাদ যখন প্রত্যক্ষ হইতে আরম্ভ হয়, তৎকালে
প্রথমাবস্থায় ঝিল্লীরব, মত্ত ভ্রমর গুঞ্জনবৎ ধ্বনি, বীণাত্ম এবং
বেণু বাদ্যের তুল্য ধ্বনি ঐতিগােচর হইতে থাকে। তৎপরে উহাতে
অভ্যস্ত হইলে ঘণ্টা ববের তুল্য ধ্বনি এবং মেঘ গর্জন তুল্য ধ্বনি
শ্রুতিগােচর হইতে থাকে। তৎপরে শঙ্খধ্বনি, সমুদ্র গর্জন ধ্বনি এবং
দেব ভি ধ্বনি প্রভৃতি কর্ণগােচর হইতে থাকে। সকলের শেষে
প্ল তস্বরে সমুচ্চারিত প্রণবধ্বনি শ্ৰৰণগােচর হইয়া থাকে।

যােগ ও সাধনা শিষ্য। ইহার ফল কি? সাধক যখন সম্পূর্ণরূপে ঐকান্তিকভাবে সেই ধ্বনিতে আত্মসমর্পণ করিতে সমর্থ হন, তখন তাহার লয়ের অবস্থা অর্থাৎ সমাধিলাভ ঘটিয়া থাকে; এতদ্ব্যতীত এই নাদের অন্য ফলও আছে । শিষ্য। সেই ফল কি? গুরু। সেই নাদ দ্বারা বিভিন্ন প্রকারে ষট্‌কম্ম সাধনও হইয়া থাকে । শিষ্য। তাহা কিরূপ? মনে কর, তুমি ভীষণ অরণ্যে এক সিংহের সম্মুখে পছিলে। সে তােমাকে হত্যা করিতে উদ্যত। তুমি যদি নাদ সাধনে সিদ্ধ হইয়া থাক, তাহা হইলে তুমি তখনই ঘণ্টাধ্বনি স্মরণ করিলেই ঘণ্টাধ্বনি শুনিতে পাইবে, অমনি তুমি কুম্ভক দ্বারা আত্মাকে সিংহের হৃদয় মধ্যে প্রবিষ্ট করাইবে। সিংহ সেই মুহূর্তে তােমার প্রতি আকৃষ্ট ও তােমার বশীভূত হইয়া পড়িবে । সে তােমার এমন বশীভূত হইবে যে, তাহার ইচ্ছাশক্তি বলিয়া কিছুই থাকিবে না; তােমার ইচ্ছাই তখন তাহার ইচ্ছা হইবে। তখন তুমি যেখানে ইছ সেইখানেই সিংহকে পরিচালিত করিতে পারিবে। অধিক কি, তাহার পৃষ্ঠে আরােহণ করিয়া যথেচ্ছা ভ্রমণ করিতে পারিবে। এই জন্য প্রকৃত মােগীরা হিংস্র জন্তু সমাকুল ভীষণ অরণ্য মধ্যে বাস করিতে পারেন । এখন বুঝিয়াছ, যােগী ঋষিরা হিংস্র জন্তু সমাকুল গভীর অরণ্য মাঝে বাস করিতে সমর্থ হন কেন! শিষ্য। আজ , বুঝিয়াছি। যে সময়ে যােগীর চিত্ত ঐ নাদে ঐকান্তিকভাবে বিশ্রাম লাভ কয়েন তখন, তিনি নিখিল বাহ বন্ধু ভুলিয়া নাদের সহিত প্রশান্ত অর্থাৎ লয়প্রাপ্ত হন এক কথায়,তখন তাহার পূর্ণ সমাধি

যােগ ও সাধনা
লাভ হইয়া থাকে। অধিক কি, সত্ত: রজঃ ও তমঃ এই ত্রিগুণের
সকল কার্য জয় করিতে সমর্থ হন। শাস্ত্রে বলিয়াছে, সিদ্ধাসন
তুল্য আসন, কুম্ভক তুল্য বল, খেচরী
তুল্য মুদ্রা এলং নাদের
তুল্য পয়সাধন আর কিছুই নাই। এই প্রসঙ্গে আর একটি বিষয়
বলিয়া এই প্রসঙ্গ শেষ করিব।
শিষ্য। তাহা কি।
গুরু। যােগােপদেশ গ্রহণের বিধি।
শিষ্য। ইহা অবগত হওয়া অত্যন্ত আবশ্যক বটে । আপনি
বলুন ।
গুরু। অবশ্য সংক্ষেপে বলিব , কেন না, বিস্তারিতভাবে বলিবার
এ স্থান নহে। আবশ্যক হইলে পদ্ধতি দেখিয়া লওয়া আবশ্যক।
সাধক প্রথমতঃ গুরু স্থির করিয়া লইবেন।
শিষ্য। কিরূপ গুরু আবশ্যক?
গুরু।
তন্ত্রে গুরুর লক্ষণ যেরূপ বিবৃত হইয়াছে, তদনুসারে
গুরু নির্ণয় করিবে। তবে গুরু যে (যােগী হওয়া প্রয়ােজন, তাহা
বলাই বাহুল্য। গুরু স্থির হইলে, তাহার নিকিট দীক্ষিত হইবার
দিন স্থির করিয়া লইতে হইবে। তৎপরে সেই নির্ধারিত দিনে
প্রথমতঃ গুরুকে প্রণাম করিয়া আদি যােগী মহাদেবকে প্রণাম
করিবে। ক্রমে ক্রমে গুরুর নিকট আসন প্রভৃতি যােগের অঙ্গ
অল্প শিক্ষা করিয়া গুরুর সন্তোষ বিধান করিবে।
শিষ্য। কি উপায়ে গুরুর সন্তোষ বিধান করিতে হইবে ?
গুরু। গাভী, সুবর্ণ, বস্ত্র প্রভৃতি দ্বারা তাহার সন্তোষ বিধান
কৰ্ত্তব্য। সেই দিন যােগ শিক্ষার্থী নানাবিধ মালিক কার্য সম্পাদন
ও ব্রাহ্মণ ভােজন করাইবে। ব্রাহ্মণগণহাতে পরিতুষ্ট হন, সে

যােগ ও সাধনা
১৫৪
বিষয়ে বিশেষ সাবধান হইবে। তৎপরে শিবালয়ে গমন পূর্বক যথা-
নিয়মে যোেগ গ্রহণ করিবে।
শিষ্য। কিরূপ স্থানে যােগাভ্যাস করিবে।
স্থান সম্বন্ধে পূর্কে বিস্তারিতরূপে বলা হইয়াছে।
কি তােমার স্মরণ নাই।
শিষ্য। আজ্ঞা , স্মরণ হইয়াছে।
গুরু। সেইরূপ * নির্জন স্থানে প্রথমতঃ পদ্মাসনে উপবেশন
করিয়া অঙ্গুলী দ্বারা উভয় নাসারন্ধ, নিরােধ করতঃ কুম্ভক অভ্যাস।
করিতে হইবে। ইহাই হইল সংক্ষেপে যােগ ধারণের বিধি। অতঃপর
ধ্যান বিষয়ে আলােচনা চলিবে।

নব তাধ্যায় *)+(*- খান ও ধারণ শিষ্য। ধ্যান বলিতে কি বুঝিব? গুরু। সাধকের মন ধ্যেয় বস্তুতে নিবিষ্ট হইয়া মাত্র তাহাকেই দেখে, অপিচ অন্য পদার্থের অস্তিত্বও চিত্তে স্থান পায় না, সাধকের সেই অবস্থাই ধ্যান নামে কথিত হইয়া থাকে। শাস্ত্র আরও বলিয়াছেন, ধ্যেয় বস্তুকে চিন্তা করিতে করিতে মন যখন তাহাকেই নিশ্চল হইয়া যায়, ততুদশী মুনিরা সেই অবস্থাকেই ধ্যান নামে অভিহিত করিয়াছেন। শিষ্য। এ সম্বন্ধে দার্শনিকদিগের মত কি? গুরু। বেদান্ত দর্শন বলিতেছেন, ইন্দ্রিয় সমূহের বৃত্তিগুলিকে পরমব্রহ্মে অভিনিবিষ্ট করার নামই ধ্যান। এই জন্যই যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম ও প্রত্যাহারে সমর্থ না হইলে ধ্যান করা সম্ভব হয় না। সেই নিমিত্ত তােমাকে যম, নিয়মাদি এরূপ বিস্তৃতভাবে বলিয়া আসিয়াছি। বস্তুতঃ ঐ পাচটিকে সাধক যতক্ষণ না আয় করিতে সমর্থ হয়, ততক্ষণ সে ধ্যানের অধিকারী হয় না। ধ্যানে সিদ্ধিলাভ করিলেই সাধক ভগবত্তি দর্শনের অধিকারী হইয়া থাকে। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে কৃষ্ণ স্বয়ং বলিতেছেন, “ভক্তের ধ্যানের দ্বারা আকৃষ্ট হইয়া আমি নিত্যদেহী এবং সকল দেবতারও মূৰ্ত্তিধারী।” এই ধ্যান আবার তিন প্রকার।

* *যোগ ও সাধনা শিষ্য। কি কি ? গুরু। স্থূলধ্যান, জ্যোতিধ্যান এবং স্প্যান । শিষ্য। সুলধ্যান কি? গুরু। সাধক নয়ন যুগল মুদিত করিয়া নিজ হৃদয় দেশে এইরূপ চিন্তা করিবেন যে, এক অসাধারণ অমৃত সাগর বিদ্যমান রহিয়াছে। সেই অমৃত সমুদ্রের মধ্যস্থলে রত্নময় এক দ্বীপ শােভা পাইতেছে। সেই দ্বীপের চতুর্দিকে রত্নময় বালুকা সমূহ বিস্তৃত হইয়া অপূৰ্ণ শ্ৰীসম্পন্ন হইয়াছে। শিষ্য। অতি চমৎকার স্থান । গুরু। ঐ রত্নবেদীর চারিদিকে কদম্ব বৃক্ষসমুহ পুষ্পগন্ধ বিকীর্ণ করিয়া সুগন্ধ বিস্তার করত অতীব শােভা' ধারণ করিয়া রহিয়াছে। অগণিত কদম্বফুল প্ৰক্ষ টিত হওয়ায় বৃক্ষ সমূহের সৌন্দর্য্যের আর সীমা-পরিসীমা নাই। কেবল কদম্ব পুষ্পই নহে,-ঐ সকল কদম্ব বৃক্ষের চতুর্দিকে মালতী, মল্লিকা, জাতি, যুথী, নাগেশ্বর, বকুল, চম্পক, পারিজাত, স্থলপদ্ম প্রভৃতি নানা জাতীয় তরুসমূহ ঐ রত্নদ্বীপকে পরিবং বেষ্টন করিয়া অপূর্ব সৌন্দর্য বিকশিত করিতেছে-সুগন্ধি পুষ্পসমূহের সেগন্ধে চতুর্দিক আমােদিত। শিষ্য । কি মনােহর স্থান। তারপর ? সাধক মনে মনে এইরূপ চিন্তা করিবেন যে, উদ্যানের মধ্যস্থলে অতীৰ মনােহর এক কল্পবৃক্ষ নিজ মহিমায় সমুন্নত শিরে দণ্ডায়মান। ঐ বৃক্ষের শাখা চারিটি। শিষ্য। চারিটি শাখা কেন? শুরু। ঐ শাখা আর কিছুই নহে, চারিটি বেদের আশ্রয়স্থল। শিষ্য। চারি বেদ কি কি।

যােগ ও সাধনা
শিষ্য।
ঋক, যজু, সাম ও অথৰ্ব্ব। এই চারিটি শাখা সদ্যঃ-
প্রহ্ম, টিত পুষ্প ও ফল সমূহের দ্বারা পরিশােভিত। মধু আহরণের
জন্য ভ্রমরকুল অবিরত গুন্ গুন্ স্বরে পুষ্পে পুষ্পে পরিভ্রমণ করিয়া
বেড়াইতেছে। কোকিলগণ সেই বৃক্ষের শাখায় বসিয়! নিরন্তর
কুহু কুহু করিয়া সকলের মন হরণ করিতেছে।
এমন স্থান জগতে আছে।
গুর। আছে বৈকি। সাধক এইরূপ ভাবনা করিবেন যে, ঐ
কল্পবৃক্ষের তলায় মণি মাণিক্য মরকত খচিত এক অপূৰ্ব্ব মণ্ডপ
পরম শােভা ধারণ করিয়া বিরাজমান হিয়াংছ সেই অপূৰ্ব্ব মণ্ডপে-
পরি হীরক খচিত এক সুবর্ণ পর্যঙ্ক শােভা পাইতেছে আর সেই পৰ্যঙ্কে
নিজে অভীষ্টদের বিরাজ করিতেছেন। গুরুদেব যেভাবে অভীষ্টদেবের
ধ্যান, রূপ, বাহন, ভূষণ প্রভৃতি উপদেশ দিয়াছেন, সাধক সেইভাবেই
তাহার চিন্তা করিবেন অর্থাৎ ধ্যান করিবেন। ইহাই হইল মুলধ্যান ।
ইহার আবার প্রকারান্তর আছে।
তাহা কিরূপ ।
শুরু। ব্ৰহ্মরন্ধে, সহস্রার নামক যে সহস্রদল পদ্মের কথা পূর্বে
বলিয়াছি, আশা করি, তুমি তাহা বিস্মৃত হও নাই ?
শিষ্য। আজ্ঞা না, তাহা আমার বেশ স্মরণ আছে ।
বেশ। সাধক এইরূপ চিন্তা করিবেন যে, ঐ সহস্রদল
পদ্মের বীজকোষ মধ্যে অপর একটি হেৰুঃশালী শুভ্র দ্বাদশ দল বিশিষ্ট
পন্ন শােভা পাইতেছে । উক্ত দ্বাদশ দলে যথাক্রমে হ স ফ ম ল যা
র যুং হ স খ ফ্রেং এই দ্বাদশটি বীজ নিহিত আছে।
শিষ্য। আর কিছু আছে কি?
গুরু। আছে; আমি বলিতেছি, তুমি শুনিয়া যাও। এই
শিষ্য।

যােগ ও সাধনা
না;
শিষ্য।
দ্বাদশ দল পদ্মের মধ্যে কণিকার উপর অ ক খ এই তিনটি বর্ণে
তিনটি রেখা এবং হ ল ক্ষ এই তিনটি বর্ণে তিনটি কোন সংযুক্ত
হইয়া বিদ্যমান; ইহার মধ্যভাগে প্রণব বিদ্যমান।
শিষ্য। প্রণব কি ।
গুরু। ওঁকার। সাধক এইরূপ ভাবনা করিবেন যে, ঐস্থানে
অতীব মনােহর নাদবিন্দুযুক্ত এক রমণীয় পীঠ শােভা পাইতেছে ।
শিষ্য। ঐ পীঠ কি শূন্য অবস্থায় আছে ?
ঐ পীঠের উপর দুইটি হংস 'বিদ্যমান। তদব্যতীত
ঐ স্থানে পাদুকা বিদ্যমান। সাধক এইরূপ চিন্তা করিবেন যে,
ঐস্থানে গুরুদেব বিদ্যমান রহিয়াছেন।
গুরুদেবের মূৰ্তি কিরূপ।
গুরু। তাহার দুইটি হন্ত, দুইটি নয়ন এবং তিনি শ্বেতবস্ত্র পরিহিত,
তাহার শরীর সু-শুভ্র গন্ধদ্রব্য দ্বারা অনুলিপ্ত এবং তাহার গলদেশে
শ্বেতবর্ণ পুষ্পের মালা শােভা পাইতেছে। তাহার বামভাগে লােহিত
বর্ণা শক্তি পরিশােভিতা হইতেছেন। এইভাবে শান্ত, বর ও অভয়-
প্রদ গুরুর চিন্তা করিতে সমর্থ হইলেই স্কুলধ্যান সম্পন্ন হইল ।
ইহাই প্রকারান্তর স্থূলধ্যান।
শিষ্য। এই দুই প্রকারের মধ্যে
যে কোন একটি অবলম্বন
করিলেই কি স্থূলধ্যান সম্পন্ন হইবে ?
গুরু। অবশ্যই। যে কোন একটি পথ অবলম্বন করিলেই
সিদ্ধি অবশ্যম্ভাবী। আর এক প্রকার স্কুলধ্যান কথিত আছে ।
শিষ্য। তাহা কিরূপ?
শুরু। কঙ্কালমালিনী তন্ত্র বলিতেছেন যে, সাধক এই চিন্তা
করিবেন যে, সহস্রদল সহস্রার পয়ে দীপ্তিশালী অন্তরাত্মা অধিষ্ঠিত

যােগ ও সাধনা । রহিয়াছেন। তাহার উপরিভাগে নাদবিন্দুর মধ্যস্থলে অতীব তেজঃ- শালী এক সিংহাসন শােভা পাইতেছে। সেই সিংহাসনের উপর নিজ অভীষ্টদেব বীরাসনে বিরাজমান করিয়াছেন। শিষ্য। তাহার আকৃতি কিরূপ? তাহার বর্ণ রজত পর্বতের ন্যায় শুভ্রবর্ণ, নানাবিধ আভরণ দ্বারা তিনি বিভূষিত, তিনি শ্বেত বসন পরিহিত এবং তাহার গলদেশে শ্বেত পুষ্পের মালা শােভা পাইতেছে। তার হস্তে বর ও অপর হস্তে অভয় বিদ্যমান। তঁাহার বাম উরুলেশে শক্তি বিরাজমান। গুরুদেবের কারুণ্যপূর্ণ দৃষ্টি চতুর্দিকে পরিব্যাপ্ত। শিষ্য। শক্তির অবস্থান ভঙ্গী কিরূপ? গুরু। শক্তি নিজ বাম বাহুর দ্বারা গুরুদেবের বরবপু ধারণ করিয়া শােভা পাইতেছেন। শক্তির পরিধানে রক্তবস্তু এবং ঐ বাম করে রক্তপ ধারণ করিয়া রহিয়াছেন। এইরূপে গুরুর নাম স্মরণ করিয়া তাহার ধ্যানে আত্মসমাহিত হইলেই পূলধ্যান সম্পন্ন হইল। নীলতন্ত্রে আবার অন্যরূপ সুলধ্যান আছে। শিষ্য। তাহা কি প্রকার ? গুরু। ব্ৰহ্মরন্ধে, যে সহস্রদল পদ্মের কথা বলিয়াছি, সেই পদ্মের উপর হংস বাহনে উপবিষ্ট শ্রীগুরুর চিন্তা করিতে থাকিবে। শিষ্য। গুরুদেবের মৃত্তি কিরূপ ? গুরু। তিনি পূর্ণচন্দ্রবৎ শ্বেতবর্ণ। তাহার দিব্য শরীর সুবিমল গন্ধ ও পুষ্পসৌরভে সুগন্ধীকৃত। তঁাহার বদন কমল সদা প্রসন্ন, স্মিতহাযুক্ত। সৰ্ব্ববেদময় গুরুদেবের করকমলে বর, অঙর এবং পদ্ম পরিশােভিতমান। এইরূপে গুরুদেবের ধ্যান করিতে সমর্থ হইলেই স্থূলধ্যান সম্পন্ন হইবে। অতঃপর জ্যোতিধন ;

যােগ ও সাধনা ১৬০ জ্যোতির্ধান শিষ্য। জ্যোতিধ্যান কি প্রকার । গুরু। মূলাধার শিষ্য। মূলাধার কাহাকে বলে ? গুহদেশ ও লিঙ্গমূল-এই উভয়ের মধ্যবর্তী যে স্থান তাহাকেই মূলাধার কহে। সেই মূলাধারে কুলকুণ্ডলিনীশক্তি মহা ভুজগীরূপে অবস্থান করিতেছেন এবং ঐ স্থানেই জীবাত্মা দীপ- কণিকাবং বিরাজমান রহিয়াছেন। ঐস্থানে জ্যোতিরূপী পরব্রহ্মের ধ্যান করিতে সমর্থ হইলেই সুলধ্যানে সিদ্ধিলাভ হইবে। ইহার প্রকারান্তর আছে। শিষ্য। তাহা কি ? গুরু। যুগলের অভ্যন্তরভাগে এবং মনের উদ্ধদেশে যে কার- ময় ও শিমালা পরিশােভিত জ্যোতি বিদ্যমান রহিয়াছে, সেই জ্যোতিকেই পরমব্রহ্ম জ্ঞানে ধ্যান করিতে পারিলেই জ্যোতিধ্যান সম্পন্ন হইল। এই ধ্যানে সিদ্ধিলাভ করিতে সক্ষম হইলেই সাধক যােগসিদ্ধি লাভ করেন এবং তাহার আত্মপ্রত্যক্ষতাশক্তি লাভ হইয়া থাকে। শিষ্য। স্কুলধ্যান যেরূপ বিস্তৃতভাবে বলিলেন, জ্যোতিধানত সেরূপভাবে বলিলেন না। গুরু। দেখ, স্থূল না বুঝিলে সূক্ষ্ম বুঝা সম্ভব হয় না, একথা সৰ্ববাদীসম্মত, আশা করি তুমিও ইহা মান? শিষ্য। অবশ্যই মানি ? তাহা হইলেই বােক, ধূলধ্যান কেন বিস্তারিত ভাবে বলিয়াছি। সুলধ্যানে সিন্ধিলাভ না করিলে জ্যোতিধানই বল আর ১৬১ যােগ ও সাধনা কুণ্ডলিনী সূক্ষ্মধ্যানই বল, কিছুই আয় করা সম্ভব নহে। তজ্জন্য স্কুলধ্যানের বিস্তারিত আলােচনা আবশ্যক। অতঃপর সূক্ষ্মপ্যান। সুক্ষ্মধ্যান শিষ্য । সূক্ষ্ম ধ্যান কি প্রকার ? যে সাধকের ভাগ্য অতি সুপ্রসন্ন, তাহারই শক্তি জাগরিত হইয়া থাকেন। শিষ্য। জাগরিত হইয়া কুণ্ডলিনীশক্তি কি করেন? ঐ জাগরিতা কুণ্ডলিনীশক্তি আত্মার সহিত মিলিত হইয়া লােচনবন্ধ পথে বহির্গত হইয়া উহ্মদেশে যে রাজমার্গ অবস্থিতি করিতেছে, সেই স্থানে পরিভ্রমণ করিয়া থাকেন । করিয়া থাকেন। যে সময়ে ঐ রাজমার্গে ভ্রমণ করিতে থাকে, তৎকালে ঐ রাজমার্গের সূক্ষ্মত্ব উহার চাঞ্চল্য জন্য সেই কুণ্ডলিনীশক্তিকে ধ্যানযোগে দর্শন করিতে কেহই সমর্থ হয় না। তবে কি উপায়ে সিদ্ধিলাভ হইবে ? গুরু। বলিতেছি। সাধক শাম্ভাবী মুদ্রার অনুষ্ঠান করত কুণ্ড- লিনীশক্তির ধ্যান করিবেন, তাহা হইলেই তিনি সূমধ্যানে সিদ্ধি- লাভ করিবেন। এই ধ্যান অতীব গােপনীয় ; অধিকন্তু ইহা দেবতা- গণের পক্ষেও সুলভ নহে। শিষ্য। এই তিন ধ্যানের বিশেষত্ব কি ? গুরু। বিশেষত্ব এই যে, সুলধ্যান হইতে জ্যোতিধান শত গুণ শ্রেষ্ঠ এবং জ্যোতির্ধান হইতে সূক্ষ্মধ্যান লক্ষ গুণে শ্রেষ্ঠ। আমি তােমাকে এই সুদুলত ধ্যানযােগ বর্ণন করিলাম। মােট কথা এই যে, যাহা হইতে আত্ম সাক্ষাৎকারলাভ ঘটিয়া থাকে, তারাই ধ্যানসিদ্ধি হয়। এখন বুঝিলে কি, ধ্যান কাহাকে বলে এবং শিষ্য।

যোগ ও সাধনা
১৬২
তাহার প্রয়ােজনীয়তাই বা কি? যম, নিয়মাদি সবই সমাধিলাভের
জন্য প্রয়ােজন। প্রত্যেকে পরস্পর আজ্ঞানীভূত । যমে অভ্যস্ত না
হইলে নিয়ম পালন করা সম্ভব নয়। সেইরূপ পর পর জানিবে,
ধানের পর ধারণা।
শিষ্য। ধারণা কাহাকে বলে?
এ সম্বন্ধে বিভিন্ন মতবাদ দেখা যায়।
শিষ্য। সেই সকল মতবাদ কি ?
গুরু। আমি একে একে বলিতেছি, তুমি প্রাণিধান কর।
বেদান্ত বলিতেছেন, অদ্বিতীয় বস্তু সেই পরমব্রহ্মকে অন্তরে প্রিয়
দ্বারা ধারণ করার নামই ধারণা।
শিষ্য। অপরে কি বলিয়াছেন?
গুরু। অভিধানকার হেমচন্দ্র বলিয়াছেন, ধেয় বস্তুকে অর্থাৎ
যাহাকে ধ্যান করা যায়, তাহাতে চিত্ত স্থির করার নামই ধারণা
নামে অভিহিত।
শিষ্য। অপরের মত কি ?
গুরু। বিষ্ণুপুরাণ বলিতেছেন, চিত্তের সমস্ত শক্তিকে আধারে
অর্থাৎ ধ্যেয় বস্তুতে স্থাপিত করাকেই শুদ্ধ ধারণা বলিয়া অবগত
হইবে ।
শিষ্য।
এ সম্বন্ধে অন্য কোনও মত আছে কি?
গুরু। এ সম্বন্ধে আরও বহু মতবাদ আছে। কিন্তু আমি
মাত্র গরুড়পুরাণের কথা বলিয়াই শেষ করিব।
কেন না, যিনি
যাহাই বলুন, মােট কথা সকলেরই এক।
শিষ্য। সকলের মতই কি এক?
গুরু। অবশ্যই।

যােগ ও সাধনা শিষ্য। ঠিক বুঝলাম না। গুরু। ঝাইয়া দিতেছি । সকলের মতবাদ একই রকম, এই =্য যে, সকলেই স্বীকার করেন, ধোয় বস্তুতে আনবেদনই অবশ্য উপায় বা পথ অবস্থা সংজ্ঞা সম্বন্ধে পার্থক্য আছে। তাহা হইলেও মােট ক এক । আরও পরিষ্কার করবার একট। লৌকিক উদাহরণ দিতেছি। মনে কর, তুমি কলিকাতায় যাইবে আমিও যাইব, আমি যদি রেলপথে নাই, তাহা হইলে কলিকাতায় সেছি এবং তুমি যদি জলপপে যাও, তাহা হইলে তুমিও সেই কলিকাতায় যাইবে। এখানে যেমন আমাদের উভয়ের লক্ষ্য এক, কেবলমাত্র পথ পৃথক মা, সেইরূপ ধারণা বা লক্ষ্য যে কোন সম্বন্ধে একই, মাত্র পথ পৃথক। কেমন এইবার বুঝিয়াছ ? শিষ্য। আজ্ঞা হা, এইবার বুনিয়াছি । বেশ । শিষ্য। ৩ এখন গরুড়পুরাণের মত কি, তাহা বলুন। গুরু। গরুড়পুরাণ বলিতেছেন, পরমব্রহ্মকে চিন্তে সুষ্ঠুভাবে ধারণ করার নামই ধারণা। শিষ্য। সেই একই কথা। গুরু। তাহা ত হইবেই, তবে গরু পুরাণ আরও কিছু বলিয়াছেন। শিষ্য। তাহা কি ? গুরু। দ্বাদশবার প্রাণায়াম করিতে যে সময় অতিবাহিত হইয়া কে, সেই সময় পর্যন্ত পরমব্রহ্মে অভিনিবেশ সহকারে চিত্ত স্থির করিয়া রাখিতে পারিলেই ধারণায় সিদ্ধিলাভ হইয়া থাকে। শিষ্য। এই মতে পার্থক্য আছে বটে। গুরু। পার্থক্য বিশেষ নাই; কারণ ইনিও সেই ব্রঙ্গে চিত্ত-

যোগ ও সাধনা
১৬৯
নিবেশ করাকেই ধারণা বলিয়ছেন। তবে একটা কথা ইনি মাত্র
পরিস্কার করিয়া দিয়াছেন।
শিষ্য। কি ?
গুরু। সকলেই বলিয়াছেন, বক্ষে চিত্ত স্থির করার নাই ধার,
কিন্তু কতক্ষণ পৰ্য্যন্ত চিত্ত রি রাখিতে হইবে, তাহা কেহই বলেন
নাই। গরুড়পুরাণ তাহাই পরিস্ফুট করিয়া দিয়াছেন। এইমাত্র প্রভেদ।
শিষ্য। তাহা বটে।
এই আমি তােমাকে ধারণার কথা বলিলাম ; অতঃপর
সমাধির কথা বলিতে পারিলে যােগ সম্বন্ধে সকল কথাই প্রায়
বলা হইবে।
শিষ্য। প্রায় কেন ?
গুরু। প্রায় এই জন্য নে সমাধির পর যোগীর কর্তব্য সম্ব:+
কিছু উপদেশ দিবার থাকে ।

দশম অধ্যায়
সমাধি
শুরু। অতঃপর যােগাভ্যাসের যে শেষ অবস্থা-সমাধি, তাহাই
তােমার নিকট বর্ণন করিব। যে ব্যক্তি বহু ভাগ্যবান, সেই ব্যক্তিই
জমাধিযােগ লাভ করিয়া থাকেন।
শিষ্য। কিরূপ ব্যক্তি সমাধি লাভ করেন ?
গুরু। যাহার, উপর শ্রী গুরুদেবের কৃপাবারি বর্ষিত হয়, প্রক
নিরন্তর যাহার প্রতি সুপ্রসন্ন এবং গুরুর প্রতি যাহার অচলা ভক্তি
বিদ্যমান, তিনিই এই সমাধিযােগ লাভ করিতে সমর্থ হন। অধিকারী
না হইলে সমাধিযোগ লাভ করা কখনই সম্ভব নহে।
শিষ্য। কোন ব্যক্তি অধিকারী ?
যে সাধকের দিন দিন বিদ্যা, শ্রী গুরু এবং আপনার
প্রতি সম্যক প্রতীতি জন্মিয়া থাকে এবং দিন দিন যে সাধকের
মনে প্রবােধোদয় হইতে থাকে, সেই সাধকই সমাধিযােগ সাধনের
অভ্যাসে অধিকারী হইয়া থাকেন।
শিষ্য । সমাধি কি ?
গুরু। সমাধি আর কিছুই নহে, দেহ হইতে মনকে পৃথক করত
পরমাত্মার সহিত একীভূত হইতে পারাকেই সমাধি কহে।
শিষ্য। সমাধির ফল কি?

যােগ ও সাধনা ইহা দ্বারা সকল অবস্থা হইতেই মােক্ষলাভ ঘটিয়া থাকে। শিষ্য। সেই অবস্থায় সাধকের মনের ভাব কিরূপ হয় ? সাধকের তৎকালে এইরূপ ধারণা জনে স্বয়ং ব্রহ্ম, ব্ৰহ্মই আমি, ব্রহ্ম হইতে আমি পৃথক নহি অর্থাৎ ব্রহ্মের পৃথক সঃ নাই। আমি শেকশূন্য, নিতামুক্ত ও স্বভাববান অর্থ ব্ৰহ্ম-প্রকৃতি এবং আমি সচ্চিদানন্দ স্বরূপ । শিষ্য। সচ্চিদানন্দের তাৎপর্য কি? গুরু । সং-চিং-আনন। সং শব্দে সত্য, চিং সত্য, চিং শব্দে জ্ঞান এবং আনন্দে শব্দে নিত্যানন্দ। তাহা হইলে ছাইতেছে এই যে, সাধকের তংকালে ধারণা হইবে যে, আমি সত্যময়, জ্ঞানময় এবং নিত্যানন্দময়। যৎকালে সাধকের মনে এইরূপ ধারণা হইবে, তখনই বুঝিতে হইবে যে, তিনি সমাধিতে সিদ্ধিলাভ করিয়াছেন । সমাধি আবার প্রকার । ধানযােগ সমাধি, নাযােগ-সমাধি রসানযােগ-সমাধি, লয়সিদ্ধিবােগ-সমাধি, ভক্তিযোেগ-সমাধি এবং রাজযােগ-সমাধি। ঐগুলি আমাকে বুঝাইয়া দিন। গুরু। দিতেছি। ছয়টি উপায় অবলম্বন করিয়া ঐ ছয় প্রকার সমাধিলাভ ঘটিয়া থাকে। শাম্ভবী মুদ্রা অবলম্বন করিয়া ধ্যানযােগ- সমাধি আচরণ করিলে উহাতে সিদ্ধিলাভ হয়। কুম্ভকের কথাও তােমার স্মরণ আছে বােধ হয় ? শিষ্য। আজ্ঞা হা। শুরু। তাহার মধ্যে ভ্রামরী নামক মুদ্রা অবলম্বন করিয়া রসা- ননযােগ-সমাধি লাভ হয়। খেচরী মুদ্রা অবলম্বন করিয়া নদৰােগ সমাধি লাভ হইয়া থাকে। যােনিমুদ্রা অবলম্বন করিয়া লসিদ্ধি শিষ্য । { ১৬৭ যােগ ও সাধনা যােগ-সমাধি লাভ হয়। ভক্তি অবলম্বন করিয়া ভক্তিযােগ সমাধি সিদ্ধি হইয়া থাকে এবং মনােমুগ্ধ। কুম্ভক অবলম্বন করিয়া রাজযােগ সমাধি লাভ ঘটিয়া থাকে। এইবার একে একে ঐ ছয় প্রকার যােগ বিস্তারিত ভাবে বলিব। ধ্যানযােগ-সমাধি প্রথমতঃ ধ্যানযােগ-সমাধি। শাম্ভবী মুদ্রার অনুষ্ঠান করত আত্মাকে প্রত্যক্ষ করিতে হয় । তৎপরে বিন্দুময় ব্রহ্মদর্শন করিয়া সেই বিন্দুস্থানে নিজ মনকে নিয়ােজিত করিতে হইবে । তাহার পর ব্রহ্মর স্থিত ব্রহ্মলোকময় আকাশের মধ্য গুলে জীবাত্মাকে আনয়ন করিতে হইবে এবং মস্তকস্থিত ব্ৰহ্মলোকময় আকাশকে জীবাত্মার মধ্যে আনিতে হইবে । এইরূপে জীবাত্মাকে পরমাত্মাতে বিলীন করত নিত্যানন্দময় এবং মুক্ত হইতে সক্ষম হইলেই সাধক ধ্যানযােগ সমাধি সিদ্ধি লাভের অধিকারী হন। নাদযােগ-সমাধি শিষ্য। নাদযােগ-সমাধি কি প্রকার। প্রথমে খেচরী মুদ্রার অনুষ্ঠান দ্বারা স্বীয় রসনাকে উঞ্জ- গামী করিয়া রাখিতে হইবে। শিষ্য। ঠিক বুঝিলাম না। তালুকুহরহিত অমৃতকুপে রসনাকে সংযুক্ত করিয়া রাখিতে হইবে। ইহা দ্বারা অন্য সকল প্রকার ক্রিয়া পরিত্যক্ত হই। সমাধিলাভ ঘটিয়া থাকে। ইহাকেই অর্থাৎ এই সমাধিকেই নাদযােগ-সমাধি আখ্যা দেওয়া হইয়াছে। রসানন্দযােগসমাধি ভ্রামরী কুম্ভক অনুষ্ঠান করিয়া শনৈঃ শনৈঃ অনতিবেগে

যােগ ও সাধনা
শ্বাসবায়ু পরিত্যাগ করিতে হইবে। এই যােগ সাধন সময়ে শরীরের
অভ্যন্তরে ভ্রমর গুঞ্জনধ্বনিবৎ শব্দ শ্রুতিগোচর হইতে থাকে।
শিষ্য। তাহার পর ?
গুরু। দেহাভ্যন্তরে যে স্থান হইতে ঐ পানি সমুখিত হইয়া
থাকে, মনকে সেই স্থানেই নিবিষ্ট করিতে পারিলেই রসানযোগ
সমাধি হইয়া থাকে।
শিষ্য। ইহার নাম বসানন্দ হইল কেন ?
গুরু। ইহার দ্বারা সােহহং’ অর্থাৎ অামিই ব্রহ্ম এই জ্ঞান
জন্মিয়া থাকে। তাই যােগী প্রত্যহ পরম আনন্দ উপভােগ
করিতে সমর্থ হন বলিয়াই এই সমাধির নাম বসানন্দবােগ-সমাধি।
লয়সিদ্ধিযােগসমাধি
প্রথমে সাধক ঘােনিমুদ্রার অনুষ্ঠান পূর্বক আপনাকে
শক্তিস্বরূপ মনে করিবেন।
শিষ্য। শক্তিস্বরূপ শফে কি বুঝিব?
গুরু। তাৎপৰ্য এই যে সাধক আপনাকে স্ত্রী এবং মাত্মাকে
পুরুষ স্বরূপ মনে করিবেন ।
শিষ্য। তাহার পর ?
গুরু। তাহার পর সাধক মনমধ্যে এইরূপ ধারণ করিবেন
যে, পুরুষস্বরূপ পরমাত্মার সহিত বীরূপে বিবেচিত নিজের শৃঙ্গার
রসযুক্ত বিহার সম্পাদিত হইতেছে, ইহাকেই বয়সিদ্ধিযােগ-সমাধি
কহে। লয় অর্থাৎ পরমাত্মাতে নিজেকে একেবারে লয় করিয়া দেওয়া,
ভক্তিযােগসমাধি
গুরু। সুদৃঢ় ভক্তি এবং পরমালাদের সহিত নিজ ইষ্টদেবকে
হায়াতরে চিন্তা করিতে থাকিবে। এইরূপ করিতে থাকিলে

যােগ ও সাধনা আনন্দাশ্রু বিগলিত হইতে থাকে, শরীর পুলকিত হইয়া উঠে এবং মন নিত্যভাব প্রাপ্ত হইয়া থাকে। এই সমাধি দ্বারা মনের উন্মীলন হইয়া থাকে অর্থাৎ পরব্রহ্মের সাক্ষাৎকার লাভ হইয়া থাকে। ইহাই ভক্তিযােগ নামে কথিত। রাজযােগ-সমাধি গুরু। মনােমুগ্ধা কম্বকানুষ্ঠান করত মনকে পরমাত্মার সহিহ একীভূত করিতে হইবে। করিতে হইবে। এই প্রকারে মাত্মার সহিত মনের সংযােগ হইলেই সমাপিলাভ ঘটে। এই সমাপিই রাত্মযােগ সমাধি নামে অভিহিত হইয়া থাকে। শিবশংহিতায় অন্য প্রকার রাজযােগ- সমাধির বিবৃত আছে। শিষ্য। তাহা কি ? গুরু । শিবসংহিতা বলিতেছেন -প্রথমে চটচক্র অতিক্রম করিয়া ক্ষুদ্র ও বৃহৎ ব্রহ্মাণ্ডের বাহিরে যথােক্ত প্রকার প্রতীক চিন্তা করিতে হইবে । শস্য ; প্রতীক চিন্তা কি ? গুরু। তাৎপর্য এই যে, এই প্রকার চিন্তা করিতে হইবে যে, আমি ব্রহ্মাণ্ডে অবস্থিত নহি এবং আমার দেহও নাই-মাত্ৰ ছায়া- শরীর বিদ্যমান রহিয়াছে। তৎপরে সেই শুন্যময় ছায়াশরীর আশ্রয় করিয়া এরূপ ভাবে মহাশূন্য চিন্তা করিতে হইবে যে, কোন স্থানেই যেন সেই মহাশূন্যের বাবা বা বিপত্তি উপস্থিত না হয়। শিষ্য। বাধা কি? গুরু। ধ্যান সময়ে ইয়াভ্যন্তরে অন্য কোন বস্তু প্রতিভাত ইলেই মহাশুন্যানের এটিয়া আদি নাই, অন্ত নাই, মধ্য নাই—অথচ কোটি ভাস্কর তুল্য তেশালী ও যােগ ও সাধনা ১৭ ৫ কোটি নিশাকরবৎ সুশিল জ্যোতিৰ্ম্ময় প্রতীয়মান মহাব্যাম ধ্যান করিতে সক্ষম হইলে অবশ্যই সিদ্ধিলাভ হইয়া থাকে। যিনি অলসতা পরিহার পূর্ষক প্রত্যহ নির্ধারিত সময়ে এইরূপ ধ্যান করিতে পারেন, তাহার সিক্কিলভ সুনিশ্চিত। শিষ্য । কত দিনে সিকিলাভ ঘটে ? ঐ প্রকার ধ্যান কে সাধক করিতে পারেন, তিনি ! এক বৎসর মধ্যে অবশ্যই সিদ্ধিলাভ করেন। অর্দ মুহূর্তের জন্য ও যে সাধক তাহার মন এই ধ্যান বিষয়ে নিশল রাখিতে সমর্থ হন, তিনিই প্রক: যােগ নামে অভিহিত হন এবং তিনি সর্বলােক পৃজিত হন সন্দেহ নাই। শিষ্য। ইহার ফল কি ? এই রাযােগ সাধন দ্বারা সাধক নিখিল পাপ হইতে অব্যাহতি লাভ করেন। তাহাকে সংসারে আর পুনরাগমন করিতে হয় না এবং তাহার মৃত্যুমুখে পড়িবার সম্ভাবনাও থাকে না অর্থাৎ তিনি মৃত্যুকে জয় করিতে সমর্থ হন। এই জন্য যােগ মাত্রেরই কর্তব্য—স্বাধিষ্ঠান পথাবলম্বন করত এই যােগে সিদ্ধ হওয়া। এই ধ্যানের মাহাত্ম্য এত যে, স্বয়ং সদাশিব পঞ্চমুখে তাহা বিবৃত করিতে সমর্থ নন, কেবল যে সাধক ইহাতে . সিদ্ধিলাভ করেন, তিনিই ইহার মাহাত্ম অবগত আছেন। এই ধ্যান দ্বারা বিচিত্র দর্শন শক্তি প্রভাবে সাধক ব্ৰহ্মলােক, দেবলোক, পাতাললােক, শিবলােক প্রভৃতির স্বরূপ অবগত হইতে সমর্থ হন। তদ্ব্যতীত তিনি অনিমা, ঘিমা প্রভৃতি অঃৈশ্বৰ্যসম্পন্ন হইয়া থাকেন, ইহাতে সন্দেহের অবকাশ মাত্র নাই। এই রাযোগ ছাড়া রাজাধিরাজযােগও আছে। শিষ্য। রাজাধিরাগে কি ?

১৭১
যােগ ও সাধনা
গুরু। পূর্বে যে ছয় প্রকার সমাধির কথা
কথা বলিয়াছি, ইহা
তাহা হইতে পৃথক্‌।
শিষ্য। এই সমাধি কিরূপে লাভ হইয়া থাকে ?
এমন একটি মাঠ নিৰ্বাচন করিয়া লইতে হইবে, যেখানে
কীট পতাদি একেবারেই না থাকে। সেই মাঠের উপর স্বস্তিকাসনে
উপবেশন করিয়া সযতে শ্রী গুরুর পূজা করিয়া ধ্যান করিবে ।
শিষ্য । এই ধ্যান কিরূপ?
গুরু। বেদান্তমতানুসারে জীবাত্মাকে নিরালম্ব জ্ঞান করত এবং
ধ্যান পূর্বক বুদ্ধিমান সাধক নিজেও তন্ময় হইবেন ।
শিষ্য । তারপর ?
তারপর মনকেও তদ্রুপ নিরালম্ব অর্থাৎ বৃত্তিহীন করিয়া
নিস্তব্ধ হইবেন । এই প্রকার ধ্যান দ্বারা মহাসিদ্ধি লাভ হয়, সন্দেহ
নাই । সাধক মনকে যখন এই রূপ বৃত্তিহীন করিতে সমর্থ হন,.
তখন তিনি স্বয়ং পূর্ণতা লাভ করিয়া থাকেন। যে সাধক নিরন্তর
এই যােগ সাধন করিতে পারেন, তিনি ধারণা করেন যে,
ভুগতে অহং পদবাচ্য অপর কেহই নহেন, কেবল আত্মাই সর্বদা
সর্বত্র বিরাজমান রহিয়াছেন।
বন্ধন ও নাই-মুক্তিও
নাই; কারণ, সেই সময় সাধক ব্ৰহ্ম ভিন্ন অপর কোন বই
দেখিতে পান না। যিনি প্রত্যহ এই যোগ অভ্যাস করেন, তিনিই
প্রকৃত জীবমুক্ত পুরুষ, ইহাতে সন্দেহ নাই।
এই সাধক ধন্য ।
অবশ্যই ধন্য।
আরও শােন। যেই সাধক সােহমন্মি”
অর্থাৎ আমিই সেই ব্ৰহ্ম, এইরূপ ধ্যানের সহিত জীবাত্মা পরমাত্মার
ঐফা স্থাপনে সমর্থ হল -
।

যােগ ও সাধনা
১৭২
শিষ্য। জীবাত্মা ও পরমাত্মার ঐক্য স্থাপন কি ?
অহং ও তৎ অর্থাৎ আমি ও তিনি এই ভেদবাচক
উভয় ভাব ত্যাগ করত একমনে
স্বরূপ চিন্তা করিতে
পারেন, সেই সাধকই ভক্ত ও সৰ্বলােকপূজ্য। এই বিশ্ব জগৎ
ব্রহ্ম, ব্ৰহ্ম ব্যতীত অপর কিছুই নাই, এই অধ্যারােপ এবং অপবাদ
দ্বারা যাহাতে নিখিল বস্তুই লয় পাইতেছে, যােগী সৰ্ব্বক পরিত্যাগ
করত সেই নিখিল কারণের কারণ ব্রহ্মের আশ্রয় গ্রহণ করিবেন
শিষ্য। অধ্যারােপ ও অপবাদ কি ?
বতে অবস্থার আরােপকেই অধ্যারােপ কহে ।
শিষ্য। বঝিলাম না।
গুরু। বুঝাইয়া দিতেছি।
মনে কর, যেমন রজুতে সর্প দুম
হয়, সেই সময় রছুতে সর্পের আরােপ হইয়া থাকে ।
যখন বৃন্দুতে
সর্প ভ্রম হয়, তখন বিবর্তস্বরূপ সর্পের রজুতা ব্যতীত সর্পতা
কিছুতেই উপলব্ধি হয় না; ইহাই অধ্যারােপ ।
ব্রাহ্মের
'বিবর্তস্বরূপ এই অজ্ঞানরূপ নিখিল জগতের একমাত্র অদ্বয় ব্রহ্মত্ব
বাতীত অপর বস্তত্ব কোনরূপেই সম্ভব হইতে পারে না। ইহাকেই
এমনিবন্ধন আরোপিত বস্তুর সত্বা নির্ণয় করত প্রকৃত বস্তুর সংস্থাপনকেই
অপবাদ বলে।
শিষ্য। এই অধ্যারােপ এবং অপবাদ শক প্রয়োগের সার্থকতা
কি, বুঝাইয়া দিন।
গুরু। সার্থকতা এই যে, ইহার দ্বারা একমাত্র অদ্বয় ব্রহ্মেই ,
“নিখিল, জগত প্রপঞ্চই বিলয় পাইতেছে। অর্থাৎ ব্রহ্ম ব্যতীত অন্য
কোন বস্তুর বা জগৎ প্রপঞ্চের পৃথক সত্বাই থাকিতেছে না। যাহারা
মূঢ়, তাহারা, পূর্ণরূপ সচ্চিদানন্দ স্বরূপ পরােক্ষ ব্রহ্মকে পরিত্যাগ

১৭৩
যােগ ও সাধনা
করিয়া ভ্ৰমসমাকুল পরােক্ষ নিখিল জগৎকে ভ্রান্তিশে অপরােক্ষ
অর্থাৎ, প্রত্যক্ষ বিবেচনা করিয়া নিরন্তর সংসারে যাতায়াত করিতেছে ।
শিষ্য।
পরােক্ষ ও অপরােক্ষ জ্ঞানের ফল কি?
যে সাধক এই চরাচর জগৎকে পরােক্ষ জ্ঞান করিতে
সক্ষম হন এবং যাহার সেই পরমব্রহ্মে অপরোক্ষ জ্ঞানের উদয়
হয়, তিনি সনুদায় ব্ৰহ্মাণ্ড পরিহার করিয়া সেই পরমব্রহ্মে লীন
হইয়া থাকেন, সুতরাং সাধক জ্ঞান লাভ করিবার জন্য সবক্ষিত,
হইয়া যাহাতে অজ্ঞানের উদয় না হয়, সেইরূপ অভ্যাস করিবেন।
শিষ্য । ইহার ফল কি ?
সাধক যদি নিরন্তর এইরূপ অভ্যাস করেন, তাহা হইলে
স্ব প্রকাশ পরমাত্মা স্বয়ং প্রকাশমান্ হইয়া থাকেন। এইরূপ অবস্থায়
বুদ্ধিবৃত্তির পরিমার্জন নিমিত্ত তাহার আর গুরুর উপদেশের আবশ্যক
করে না; যেহেতু সেই স্বপ্ৰকাশ পরমাত্মার ব্রহ্মের অনুশীলনের
ফলে আপনা হইতে জ্ঞানসূৰ্য প্ৰভাসিত হইয়া থাকে।
এই জ্ঞান লাভের উপায় কি ?
গুরু। বাক্য এবং মন যাহাকে প্রাপ্ত না হইয়া প্রতিনিবৃত্ত
হইয়া থাকে, সেই ব্ৰহ্মসাধন দ্বারা সুবিমল জ্ঞান আপনা হইতেই
স্ফুরিত হয়। রাজযােগ হঠযােগ পরস্পর অঙ্গাঙ্গীভূত ।
শিষ্য । ইহার কারণ কি?
কারণ এই যে, হঠযোগ ব্যতীত রাজবােগ এবং রাজযােগ
ভিন্ন হঠযােগ কোনরূপেই সফল হয় না । সুতরাং সাধক গুরু-
নির্দেশানুসারে হঠযােগ অভ্যাস করিবেন। সেই সাধকেরই জীবন
ধারণ সার্থক, যিনি ইন্দ্রিয় সমূহকে নিগ্রহ করিতে সমর্থ। এই
প্রসঙ্গে একটা কথা বলিয়া রাখি।
শিষ্য ।

‘যােগ ও সাধনা ১৭৪ শিষ্য । শিষ্য। কি ? গুরু। যে সাধক বুদ্ধিমা, তিনি যতদিন না যোগাভ্যাসে পরিপক্ক হন, ততদিন পরিমিত অন্ন গ্রহণ করিবেন। অতিরিক্ত আহার গ্রহণ করিলে তিনি কিছুতেই সাধনে সাফল্য লাভ করিতে সক্ষম হইবেন না। যােগীর কব্য কি ? গুরু। যােগীর কর্তব্য অনেক ; তবে সকল কথা এখানে বলিব না, পরে বলিবার ইচ্ছা রহিল । এখানে সংক্ষেপে অতি প্রয়ােজনীয় দুই একটি কথা বলিব । শিষ্য। বলুন। গুরু। তিনি যখন সভামধ্যে অবস্থান করবেন, তখন প্রকৃত সাধুভাষা ব্যবহার করিবেন অথবা বহুভাষী হইবেন না এবং দেহ- রক্ষার জন্য সবিশেষ যত্ন লইবেন। জনসঘ সৰ্বপা পরিত্যাগ করিয়া চলিবেন। এইরূপ না করিতে পারিলে তিনি কখনই সিদ্ধিলাভ করিতে সমর্থ হইবেন না। শিষ্য। একটা কথা জিজ্ঞাসা করিতে ইচ্ছা হইতেছে । গুরু। কি তােমার জিজ্ঞাস্য, তাহা অসঙ্কোচে বল । শিষ্য। গৃহীর কি যােগাভ্যাস করিতে পারে না ? গুরু। অবশ্যই পারে। শিষ্য। তাহাদের পক্ষে নিয়ম কি ? গুরু। নিয়ম অনেক কিছুই আছে। আমি এ স্থানে সংক্ষেপে তােমাকে কিছু বলিতেছি। যাহারা গৃহস্থাশ্রমে থাকিয়াই যােগাভ্যাস করিতে ইচ্ছা করেন, তাহারা জনসঘ পরিত্যাগ করিয়া গুপ্তস্থানেই যােগাভ্যাস করিবেন।

১৭৫
যােগ ও সাধনা
শস্য। তাহারা কি স্তক্ষেপ করন না। কন। সংসারের
কোন কাৰ্য্যেই ?
গুরু। মধ্যে মধ্যে করিবেন বৈ কি। কিন্তু নিলিপ্তভাবে, কেবল
ব্যবহারের নিমিত্তই সঙ্গ বিষয়ে বাহ অনুরাগ দেখাইবেন;
অরে
সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত থাকিবেন। যেহেতু তামােচিত কর্মের জন্য নিখিল
পাপ পুণ্য নিমিমাত্র বলিয়া অবগত হইবে। কারণ জ্ঞান দ্বারা
ঐ সকল দোষ দূরীভূত হইয়া ওকে। সুতরাং সেই বাহ্যিক অনু-
স্থানে কিছুমাত্র দোষ হওয়া সম্ভব নয়। নিৰ্ম্মল ব্যক্তি হইয়া
এই প্রকার স্থির করিয়া গৃহী ব্যক্তি ও সনি ঐ প্রকার আচরণ
করিতে সমর্থ হন, তবে তিনিও মে সিদ্ধিলাভে সক্ষম হন, তাহাতে
সন্দেহের অবকাশ মাত্র নাই।
শিষ্য। তারপর ?
যে সাধক গুহাশ্রমে বাস করিয়াও নাম কপ বিবর্জিত
এবং পাপ পুণ্য হইতে মুক্ত হইতে পারেন, তবে ইহাকে গৃহস্থ
বলিয়া অভিহিত করলেও তিনি মুক্তপুরুষ। এইরূপ গৃহী ব্যক্তি
কখনই কোনরূপ পাপ বা পুণ্যে লিপ্ত হন না। অধিক কি, অবশ্য
করণীয় কার্যের জন্য যদিও তাহাকে পাপকর্ম করিতে হয়, তথাপি
তিনি সেই পাপের ফলভাগী হন না। বুকিয়াছ ?
শিয়। আজ্ঞা ।
গুরু। আমরা প্রকৃত বিষয় হইতে অনেক দুরে আসিয়া পড়িয়াছি।
এখন সেই সমাধি সম্বন্ধে আর যাহা আছে, তাহা বলিতেছি।
শিষ্য। বলুন।
গুরু। তােমাকে সমাধি যােগের কথা সকলই বলিলাম, অবশ্য
এ সম্বন্ধে বিভিন্ন মতও যে নাই, তাহা নহে।

যােগ ও সাধন
১৭৬
"
শিষ্য; এ সম্বন্ধেও ভিন্নমত আছে নাকি?
গুরু। অবশ্যই আছে ।
শি। তাহা কি বুঝাইয়া বলুন।
গুরু। বলিতেছি। রাজযােগ-সমাধি, উন্মনী অথব; সহজাবহু
প্রভৃতি যে কোনরূপ গে ইক না কেন, সে সবই একমাত্র
আত্মাতেই সংসাধিত হয়। কি জল, কি হল, কি পৰ্বতশিখর,
কি জালামালামাকু অগ্নিরাশি—এক কথায় সর্বত্র স্থানে সে
একমাত্র অদ্বিতীয় বিষ্ণুই বিরাজমান আছেন। এই জগতের সকলই
বিষ্ণুময় অর্থাৎ ব্রহ্মস্বরূপ।, কি ভূচর, কি খেচর, নিখিল প্রাণী,
জীবজন্তু, বৃক্ষ, লতা, গুল্ম, বল্লী, তৃণ, জল, পর্বত-এ সকই
সেই একমাত্র অদ্বিতীয় ব্রহ্মস্বরূপ। যিনি যােগী, তিনি আত্মাতেই
ব্রহ্মাণ্ডের তাবৎ বস্তুই দর্শন করিয়া থাকেন, অর্থাৎ ব্রহ্ম ব্যতীত
ভগতের কোন কিছুরই পৃথক সত্ত্বা নাই। জীবাত্মা পরমাত্মার
ছায়া স্বরূপ।
শিষ্য।
শিষ্য।
ছায়া স্বরূপ কেন।
গুরু। কারণ, পরমাত্মা অয়, শাশ্বত এবং সর্বশ্রেষ্ঠ।
পরমাত্মা যদি অদ্বয় হন, তবে সকল প্রাণীতেই তিনি
কিরূপে বিদ্যমান থাকেন?
আচ্ছা, মনে কর, আকাশে পূর্ণচন্দ্রের উদয় হইয়া স্বচ্ছ
সরােবরে তাহার প্রতিবিদ পড়িয়াছে, সেই সময় তুমি সেই জল
আলােড়িত করিলে শত শত চন্দ্র সেই তরঙ্গে প্রতিভাত হয় কি না?
শিষ্য। অবশ্যই হয়।
বেশ। তৎকালে শত শত চড় প্রতিভাত হয় বলিয়া
কি চন্দ্রও এত শত শত ?

১৭৭, যােগ ও সাধনা শিষ্য। না, তাহা নহে; তাহা ভ্রান্তি মাত্র। ইহাও সেইরূপ ভ্রান্তি মাত্র। প্রকৃতপক্ষে চন্দ্র যেমন এক, কেবল তরঙ্গাভিঘাতের জন্য শত শত দেখায়, তদ্রুপ সেই অদ্বিতীয় ব্রহ্মই একমাত্র প্রকৃত, অপর সকলই তাহার কায়ামাত্র । আরও পরিস্কার করিয়া বলুন । গুরু। বলিতেছি। জীবদেহে জীবাত্মারূপী পরমাত্মার অংশ আবদ্ধ হইয়া কেবলমাত্র শরীরস্থ চৈতন্যশক্তি রূপেই অবস্থিত হইয়া থাকে। আবার যখন দেহবন্ধন হইতে বিমুক্ত হইয়া বীতরাগ এবং বাসনাশূন্য হয়, তখনই সেই ব্রহ্মের সহিত সম্মিলিত হইয়া থাকে। এইরূপে সকল বাসনা ত্যাগ করত সমাধি সাধন করিতে হয়। নিজ দেহ, পুত্র কলত্র, বান্ধব, ধন-জন, বিষয়-সম্পং সকল বিষয়ই অনাসক্ত হইতে পারিলে তবেই সমাধিসিদ্ধি লাভ হইয়া থাকে। এই তােমাকে অষ্টাঙ্গ যােগের সমস্ত বলিলাম। ইহা হইতে বুঝিবে, যােগ কি এবং কি উপায়েই বা যােগে সমাধি লাভ হইয়া থাকে। ভাগ্যবান ব্যক্তিরই যােগসাধনের ইচ্ছা যােগসাধনের ইচ্ছা ঘটিয়া থাকে। আর তাহার মধ্যে যিনি অধিক ভাগ্যবান, তিনিই যােগমার্গ অবলম্বন করিয়া থাকেন এবং যিনি সর্বাপেক্ষা ভাগ্যবত্তম তিনিই সদ্গুরুর সঙ্গলাভে কৃতার্থ হন। সদ্গুরু লাভ না হইলে কখনই যােগমার্গ নির্বিঘ্ন হয় না। যিনি যােগভ্যাস করিতে ইচ্ছা করেন, তিনি মাত্র পুস্তক অবলম্বন করিয়া যেন যােগমার্গে পদার্পণ না করেন। • শিষ্য। ইহার কারণ কি? গুরু। যােগ সাধন সময়ে এমন সঙ্কট অবস্থা উপস্থিত হইতে পারে যে, তৎকালে যােগী গুরু ব্যতীত কেহই সেই অবস্থা হইতে উদ্ধার করিতে সমর্থ নহেন।

যােগ ও সাধনা ১৭৮ শিষ্য। তবে গ্রন্থের প্রচার কি জন্য ? গ্রন্থ প্রচারের উদ্দেশ্য এই যে, লােক যোেগ কি, তাহার ফলই বা কি,—তাহা অবগত হইয়া যােগমার্গ অবলম্বন করিতে সে সমর্থ কি না; কিম্বা অবলম্বন করা কর্তব্য কি না,-তাহাই মাত্র স্থির করিয়া লইবে। যদি সে মনে করে যে, যােগমার্গ অবলম্বন করিতে সমর্থ হইব, তবেই সে সদ্গুরুর অন্বেষণ করিবে। যদি তাহার অদৃষ্ট সুপ্রসন্ন হয়, এবং মুক্তি লাভ থাকে, তবেই সদ্গুরুর সঙ্গলাভ হইয়া থাকে। শিষ্য। এক জন্মেই কি মুক্তিলাভ হয় ? শুরু। পূৰ্ব্বজন্মের সংস্কার না থাকিলে, এক জন্মেই ৰােগসিদ্ধি হওয়া সম্ভব নহে। বহুজন্ম সাধনার ফলে কোন এক জন্মে মুক্তি বা নির্বাণ লাভ হয়। যােগ দ্বারাই মুক্তিলাভ হইয়া থাকে শিষ্য। ইহার কারণ কি? গুরু। তাহা এক কথায় বুঝাইবার নহে। অতঃপর বােগ শ্রেষ্ঠ কেন, তাহাই বলিবার প্রয়াস পাইব। ক একাদশ অধ্যায় -:"***C:- মােগের শ্রেষ্টতা নিরূপণ গুরু। যােগের শ্রেষ্ঠতা প্রতিপাদন করিতে হইলে অনান্য শাস্ত্রের আলােচনা প্রসঙ্গতঃ আসিয়া পড়ে এবং ব্রহ্মই যে নিত্য ও সত্য, সে কথাও বিশেষভাবে প্রতিপাদন করা উচিত। শিষ্য। ব্রহ্ম কি? গুরু। এই জগতে নিষ্ফল চিন্ময় ব্রহ্মই সত্য ও নিত্য। আর সকল বস্তুই অসত্য ও অনিত্য। কেন না, তাহার আদি বা অন্ত কিছুই নাই ; সুতরাং সেই চিন্ময় ব্রহ্ম ব্যতীত অপর কোন বস্তুই সত্য নয়। শিষ্য। আমরা যে এই সকল বিভিন্ন বস্তু দেখিতে পাই, সেই সকল কি? গুরু। আমরা এই যে, পৃথিবী, জল, বায়ু, মনুষ্য, প্রভৃতি নানা প্রকার ভেদ দেখিতে পাই, তাহা কেবল অবিদ্যা সিলসিত ভ্রান্তি স্তি পরম্পরা মাত্র অর্থাৎ মৃগতৃষ্ণিকার মত ভ্রান্তি মাত্র। তাহা ছাড়া অপর কিছুই নহে। শিষ্য। ইহার কারণ কি? গুরু। ইন্দ্রিয়রূপ উপাধি দূরীভূত না হইলে চিন্ময় অয় এনে

গ ও সাধনা
কখনই কোন কারণেই ভেদ জ্ঞান প্রতারিত হয় না।
ইহাই বলা হয় যে, খণ্ড জ্ঞান অবিদ্যা বিলসিত দুম মাত্র, আর
অখণ্ড জ্ঞানই পূর্ণব্রহ্ম স্বরূপ।
শিষ্য। ভ্রান্তির হেতু কি ?
গুরু। বিবাদরত তাকিকগণের বিভিন্ন মতই ভ্রান্তির কারণ। তাই
বিভিন্ন মতাবলী তার্কিকগণ নিজ নিজ মত স্থাপনের জন্য পরস্পর
তর্ক করিয়া শ্রেয়ঃ সাধনের পথে বিনু উপস্থিত করিয়া থাকেন।
ফলে সাধারণ লােক সেই তিমিরেই রহিয়া যায়।
শিষ্য। এই সকল যাহারা চলেন, তঁাহারা কি পাপ
হইতে মুক্তিলাভ করেন না ?
গুরু। তাহারা পাপ হইতে মুক্তিলাভ করেন, ইহা সত্য কি,
তঁাহারা যে অজ্ঞনান্ধকারে ও ভ্রান্তিময় মােহ-বিবরে আবব্ধ
পড়েন, তাহও সত্য।
শিষ্য। ইহার কারণ কি ?
কারণ এই যে, এই সকল মতাবলী ব্যক্তি নানা
কাৰ্য্য দ্বারা পাপ ও পুণ্য সঞ্চয় করেন, তাহার ফলে ইচ্ছা থাক
বা ন থাক, কৰ্ম্মবশে অবশ হইয়া এই জর-মরণশীল দেহ ধারণের
জন্য বার বার পৃথিবীতে যাতায়াত করিতে বাধ্য হন। কোনরূপে
তাহারা মুক্তিলাভ করিতে পারেন না।
শিষ্য। পুণ্য করিলেও পুনর্জন্ম হয় ?
গুরু। অবশই হয়। কেন না, কর্ম-তা সে সং হউক বা
অসং হউক, কৰ্ম্ম করিলেই তাহার ফলভােগ অবশ্যম্ভাবী। পুণ্য
ত অনন্ত নহে, এক না দিন এক দিন তাহার ক্ষয় আছেই।
হইলেই পৃথিবীতে পুনরাগমন অনিবাৰ্য। অবশ্য পুণ্য

১৮১ যােগ ও সাধনা ভাগন্তে সঁহারা জন্ম গ্রহণ করেন, জগতে তাহারা সুখলাভ করেন, আর পপতােগান্তে যাহার জন্মগ্রহণ করে, তাহারা দুখভােগ করে এই মাত্র প্রভেদ। বুঝিয়াছ? শিষ্য আজ্ঞা হা। শুরু। আবার নৈয়ায়িক, দার্শনিকরা অত্যন্ত তীক্ষধী। তাহারা বলেন, আত্মা সর্বগত এবং বহুসংখ্যক। প্রত্যক্ষবাদী চাকমতাবলী ব্যক্তির প্রত্যক্ষবাদী। যাহা প্রত্যক্ষ নহে, তাহারা তাহা বিশ্বাস করেন না, কেবল কন্তক করিয়া থাকেন। তাহারা স্থিরনিশ্চয় ইয়াছেন, যে বস্তু বাহ্য ইন্দ্রিয় দ্বারা প্রত্যক্ষ করা যায় না, তাহার সুত্ব আদৌ নাই, এই জন্য তাহারা স্বর্গ প্রভৃতি স্বীকার করেন না, কেন না, তাহা ত দেখা যায় না; যাহাকে দেখা যায় না, তাহা কি প্রকারে স্বীকার করিব ? লোকিক উদাহরণে ইহ। বলা যায় যে, কেহ তাহার বৃদ্ধ-প্রপিতামহ অথবা তদূর্জ অন্য কোন পৃ পুরুষকে প্রত্যক্ষ করিতে পারে না, তাই বলিয়া কি স্বীকার করিতে হইবে যে, তাহারা ছিলনে না, কেন না তাহাদিগকে ত আর প্রত্যক্ষ করা সম্ভবপর হয় না? তা বটে। শুরু। এইবার বুঝিয়াছ? শিষ্য। আজ্ঞা হা। এ সব বিষয়ে শাধ্যেক্ত প্রমাণ কিছুই নাই ? গুরু। অবশ্যই আছে। শিষ্য। তাহা কি ? শুরু। এ সম্বন্ধে অতি বলিতেছেন লে, “কারীৰ্যা বৃষ্টিকামো যজেত।” অর্থাৎ বৃষ্টি কামনা করিয়া কারীরী যাগ করিবে। এখন হউক, পূর্বে এই কারীরী যাগ করিলে অবশ্যই বৃষ্টি হইত। শিষ্য।

যােগ ও সাধনা শিষ্য। আশ্চর্য কথা! তারপর ? গুরু। তারপর শ্রুতি অন্যত্র বলিয়াছেন, “যজেত স্বৰ্গকামঃ।” অর্থাৎ স্বর্গ কামনা করিয়া যাগ করিবে। যাহার একটা কথা সত্য হয়, তাহার অপর কথা অবশ্যই সত্য হইবে। কারণ, সে সত্যবাদী। দেখা যাইতেছে, অতি-প্রমাণানুসারে কারীরী যাগ করিতে বৃষ্টি হয়, তখন স্বর্গ কামনা করিয়া যাগ করিলে অবশ্যই স্বর্গলাভ হইবে। এই যুক্তি দ্বারা মহর্ষি জৈমিনি তাহার বিরুদ্ধ পক্ষের যুক্তি সকল স্থির করিয়া স্বর্গের অস্তিত্ব প্রমাণ করিয়াছেন। শিষ্য। অনান্য পণ্ডিতরা কি বলেন? গুরু। বিজ্ঞানবাদী পণ্ডিতরা বলেন, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড শুধু জ্ঞান প্রবাহ মাত্র। আবার শূন্তবাদী বৌদ্ধেরা বলেন, ঈশ্বরও নাই- জগতও নাই। আবার অন্য আবার অন্য মতাবলম্বী বৌদ্ধেরা বলিয়া থাকেন ঈশ্বর নাই, কিন্তু শূন্যমূলক ব্ৰহ্ম আছে । অন্য এক মতাবলম্বী বৌং সম্প্রদায় বলেন, জগৎ নাই, ঈশ্বর আছেন। শিষ্য। সাংখ্যবাদীরা কি বলেন ? গুরু। তাহারা বলেন, প্রকৃতি এবং পুরুষ-এই দ্বিবিধ তক হইতেই এই জগৎ সৃষ্ট হইয়াছে। আবার প্রকৃতি একমাত, কিন্তু পুরুষ বহুসংখ্যক । এই সকল পণ্ডিতরা কেহ ঈশ্বর মানেন, আবার কেহ তাহা মানেন না। মােট কথা, উহারা প্রকৃত তপথে স্থির থাকিতে না পারিয়া স্ব স্ব মুক্তি দ্বারা বিবিধ প্রকার সিদ্ধান্ত করিয়া থাকেন। ইহাদের কাহারও মতের সহিত কাহারও মতের মিল নাই। এই নিমিত্ত ইহারা পরমার্থ পথ হইতে সম্পূর্ণ পৃথক হইয়া পড়িয়াছেন, নিজ নিজ বুদ্ধি অনুসারে বেরবাদ ও নিরীশ্বরবাদ নিরূপণ করিয়া লইয়াছেন। ইহারা সকলেই লােকব্যামোেহকারক।

১৩
যােগ ও সাধনা
শিষ্য। ইহার তাৎপর্য কি?
গুরু। ইহারা লােককে কেবল মােহপক্ষেই নিমজ্জিত করিতে
ছেন ! ইহার ফলে এই হইতেছে যে, ইহারা সকলেই মুক্তিপথ
হইতে বই রে সরিয়া পড়িতেছেন।
শিষ্য। ইহার ফলে আর কি হইতেছে ?
গুরু । এই অজ্ঞানান্ধকারময় কূপে পতিত হইয়া ইহাদিগকে বার
বার সংসারে আসিতে হইতেছে ।
শিষ্য।
তবে প্রকৃত পথ কি ?
গুরু। যােগমার্গ অবলম্বন। কেন না, বিবিধ শাস্ত্র পর্যালােচনা
করিয়া ইহাই স্থির সিদ্ধান্ত হইয়াছে যে, নিখিল শাস্ত্র অপেক্ষা
যােগশাই সৰ্বশ্রেষ্ঠ। যিনি যােগজে সম্যক্ প্রকার জ্ঞানলাভ
করিতে সক্ষম হন, তিনি নিখিল তত্বই জ্ঞাত হইতে সমর্থ হন।
এই নিমিত্ত সকলেরই মােগশাস্ত্রে পরিশ্রম করা কর্তব্য। বেদ কথিত
সকল কম বিবিধ।
শিষ্য । কি কি ?
গুরু। কর্মকাণ্ড জ্ঞানকা। ইহাদের মধ্যে জানাও
দুই প্রকার।
শিষ্য। সেই দুইটি কি ?
খণ্ড জ্ঞান ও অখণ্ড জ্ঞান।
শিষ্য। কর্মকাণ্ড কি এক প্রকার ?
গুরু। না, ইহাও দুই প্রকার।
শিষ্য। কি কি?
গুরু। নিষেধ অরূপ ও বিধি স্বরূপ।
শিষ্য । এই উভয়ের ফল কি?

যােগ ও সাধনা
১৮৪
গুরু। নিষিদ্ধ কর্মের অনুষ্ঠান করিলে পাপ সঞ্চয় এবং বিহিত
ত্রিবিধ কর্মের অনুষ্ঠান করিলে পুণ্যলাভ হইয়া থাকে।
শি। কি কি ত্রিবিধ কৰ্ম্ম ?
গুরু। নিত্য, নৈমিত্তিক ও কাম্য ?
শিষ্য। ইহাদের স্বরূপ কি।
গুরু। নিত্য-যাহা না করিলে পাপ হয়। নৈমিত্তিক মা
নিমিতের জন্য উপস্থিত হয়। যেমন দশহরা স্নান প্রভৃতি। আর
কাম্য-যাহা কামনা করিয়া অনুষ্ঠিত করা হয়। যেমন যাগ, যজ্ঞ,
ব্ৰত প্রভৃতি।
শিষ্য। ঐ তিনটির ফল কি ?
গুরু। নিত্যকর্ম দ্বারা দৈনন্দিন পাপ সকল দূরীভূত হইয়া
থাকে এবং নৈমিত্তিক ও কাম্য কর্মের অনুষ্ঠান দ্বারা মানবের পুণ্য
সঞ্চয় হইয়া থাকে।
শিষ্য। কৰ্ম্মফল কি প্রকার ?
শুরু। দুই প্রকার।
শিষ্য। কি কি?
শুরু। স্বর্গ ও নরক।
শিষ্য। দুইটির ফল কি?
গুরু। স্বর্গলাভের ফল সুখভোগ এবং নরকের ফল নানারূপ
দুঃখভােগ। এই জগৎ প্রপঞ্চই কর্মবন্ধনময় ; পাপ বা পুণ্য যে
কই কর না কেন, তাহার ফললােগ অবশ্যই করিতে হইবে;
কোনরূপেই তাহার ব্যতিক্রম হইবে না। কিন্তু পূর্বেই বলিয়াছি,
পাপ কা পুণ্য ক্ষয় হইলে পুনরায় জীব সংসাৰৰ্ত্তে পড়িয়া থাকে।
ইহসংসারে জীবের বন্ধন দুইটি ।

১৮৫
যােগ ও সাধনা
শিষ্য। সেই দুইটি কি?
গুরু। একট পাপময় ও অপরটি পুণ্যময়।
শিষ্য। পুণ্য ও জীবের বন্ধন?
গুরু। বন্ধন বৈ কি।
শিষ্য। কেন?
গুরু। কারণ এই যে, তাহার ফলভােগ করতে হয় । যাহাতে
ফলভােগ করিতে হয়, তাহাই বন্ধন। হইতে পারে বন্ধন
সুখময়, কিন্তু তথাপি বন্ধন। এই বন্ধন হইতে মুক্ত হইতে না
পারিলে জীবের নিস্তার নাই।
তবে জীব কি করিবে ?
ফলজনক সকল কর্মই ত্যাগ করিতে হইবে।
শিষ্য
গুরু। ফলভােগের জন্যই জীবকে পুনঃ পুনঃ সংসারে আসিতে হয়।
সুতরাং নিত্য নৈমিত্তিক বা কাম্য সকল প্রকার কৰ্ম্মে অাসক ত্যাগ
করতঃ যােগসাধনে রত হওয়াই একমাত্র কর্তব্য। কারণ, একমাত্র
যােগই মানবকে নিৰ্বাণ মুক্তি প্রদান করিতে পারে।
শিষ্য। মানব কি ইহা পারে ?
গুরু। অবশ্যই পারে। প্রকৃত যােগই ইহার নষ্টান্তস্থল।
শিষ্য। কি কৰ্ম্ম করিলে সংসারে পুনরায় প্রত্যাগমন করিতে
হয় না?
গুরু। আত্মদর্শন, আত্মসাধন এবং আত্মনিদিধ্যাসন। নিয়ত
এইরূপ করিতে সমর্থ হইলে এই সংসারে আর পুনরাগমন করিতে
হয় না, একথা শ্রুতি বলিয়াছেন। সুতরাং সকলেরই এই বাক্য
কেন ?
অনুসরণ করা একান্ত কর্তব্য।

যােগ ও সাধনা ১৮৬ শিষ্য। আত্মদর্শনাদি কি ? গুরু। যিনি পুণ্য ও পাপকর্মে বুদ্ধিবৃত্তি পরিচালিত করিয়া থাকেন, সেই আত্মাই আমি। অামা হইতেই এই চরাচর ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্ট হইয়াছে ; আমার দ্বারা নিখিল জগং প্রভাসিত হইতেছে এবং যথাকালে আমাতেই লয় প্রাপ্ত হইবে। আমি যাহাকে জগৎ বলিয়া অভিহিত করি, তাহা আমা হইতে স্বতন্ত্র নহে। যে বস্তু আম হইতে পৃথক, তাহা অবস্তু বলিয়া জানিবে অর্থাৎ কিছুই নহে। পূর্বে যে জল তরঙ্গে চন্দ্রের উপমা দিয়াছি, অর্থাৎ জল তরঙ্গে এক চন্দ্র যেরূপ শত শত প্রতিভাত হয়, তদ্রুপ আত্মাও মায়া কল্পিত হইয়া অসংখ্য বলিয়া মনে হয়। সুতরাং উহা ভ্রান্তিমাত্র, বলিয়া জানিবে । স্বপ্নদৃষ্ট পুরুষের সহিতও ইহার তুলনা দেওয়া যাইতে পারে। শিষ্য। স্বপ্নষ্ট পুরুষ কি? গুরু। উহা আর কিছুই নহে। তুমি বা আমি অথবা অন্য কেহ যেমন স্বপ্নাবস্থায় নিজেকে বহুরূপে কল্পনা করিয়া থাকে, সেই- রূপ জাগ্রত অবস্থাতেও একমাত্র আত্মাই নানা প্রকার জগং কল্পনা করিয়া লইতেছে। ইহাকে সর্প-রজুর স্থায় জানিবে । শিষ্য। সর্পরজু কি ? গুরু। রঞ্জুতে সর্প ভ্রম হয় এবং ৩ক্তিতে রজত ভ্রম হইয়া থাকে। সেই ভ্রম যখন অপনীত হইয়া প্রকৃত জ্ঞান হয়, অর্থাৎ, রঞ্জুকে রজু বলিয়া মনে হইলে যেমন ভ্রান্তিবিভূতি অলীক সর্প-- জ্ঞান দূরীভূত হয়, সেই প্রকার যেখানে আত্মাকে জগৎ ভ্রান্তি হয়, সেখানে প্রকৃত আত্মজ্ঞান ভ্রান্তিমূলক মিথ্যাভূত এই বিশ্বজগৎও তিরােহিত হইয়া থাকে। সুতরাং থাকে। সুতরাং দেখা যাইতেছে, যে পৰ্য্যক্ত

১৮৭
যােগ ও সাধনা
আত্মজ্ঞান না হয়, সেই পর্যন্ত এই ভ্রান্তির নিরূপণ কিছুতেই দূরীভূত
হইতে পারে না। রঞ্জু যেন কোন কালেই সর্পে পরিণত হইতে
পারে না, আত্মাও তদ্রুপ কোন কালেই জগং রূপে পরিণত হইতে
পারে না।
শিষ্য ।
। এই জগৎ কি?
গুরু ! নশ্বর ও অনিত্য।
শি! ইহার কারণ কি ?
গুরু । কারণ এই যে, ইহা প্রতিদিন অনবরতই ধবংস প্রাপ্ত
হইতেছে ।
শিষ্য। ধ্বংস ত দেখিতে পাই না।
গুরু। আত্মজ্ঞান না হইলে ইহার স্বরূপ উপলব্ধি করা সম্ভব
হইয়া উঠে না।
শিষ্য। তাহা কিরূপে নির্ণয় হয় ?
গুরু। বিজ্ঞ ব্যক্তিরা নির্ণয় করেন।
শিষ্য। কোন্ বিজ্ঞ ব্যক্তি?
গুরু! আত্মতত্বজ্ঞ ব্যক্তি।
শিষ্য। তঁাহারা কি বলেন?
গুরু। ইহারা বলেন যে, প্রকৃত শুদ্ধ আত্মতত্ত্বজ্ঞান না জন্মিলে
ইহার স্বরূপ কল্পনা করা আকাশকুসুমবৎ অসম্ভব। এই জগৎ আর
কিছুই নহে, পরমাত্মার বিবৰ্ত মাত্র।
শিষ্য। বিবৰ্ত্ত কাহাকে বলে ?
গুরু। বিবর্ত শব্দটির প্রতিশব্দ না দিয়া অন্য প্রকারে বুঝাইয়া
দিতেছি।
শিষ্য। তাহাই উত্তম।

যােগ ও সাধন
Sob
গুরু। প্রান্তির জন্য সর্প যেমন রঞ্জুর বিবৰ্ত্ত হইয়া থাকে, এই
জগৎও তদ্রুপ পরমাত্মার বিবৰ্ত্ত মাত্র ।
শিষ্য। কিরূপ?
গুরু। আত্মা অদাহ, অচ্ছেদ্য, অশাে, অক্লেষ্ট, অজয়, অমর
এবং অবিনশ্বর।
শিষ্য। ইহার মানে বুঝিলাম না।
গুরু। কোনটার মানে ? বল, বুঝাইয়া দিতেছি ।
শিষ্য। অদাহ, অচ্ছেদ্য, প্রভৃতি।
গুরু। আচ্ছা, আমি একে একে বলিয়া যাইতেছি, তুমি ঐ
সকল প্রাণিধান কর।
শিষ্য।
বলুন
গুরু। অদাহ • যাহাকে অগ্নির দ্বারা দহন করিতে পারা যায় না।
অচ্ছেদ্য-যাহাকে অস্ত্রাদির দ্বারা ছেদন করা যায় না ; অশােধ্য
যাহাকে বাতাতপে শােষণ করিতে পারে না; অন্যে- যাহাকে
দুর্গন্ধ পূরিষাদি ক্লিন্ন করিতে অসমর্থ ; অজয়-যাহাকে পরাস্ত করা
যায় না ; অমর-যার কখনও মরণ নাই; অবিনশ্বর--যাহার
বিনাশ নাই। এইবার বুঝিয়াছ?
শিষ্য। আজ ।
গুরু। আচ্ছা, এই সম্বন্ধে তােমার আর কি জিজ্ঞাস্য আছে,
বল, বুঝাইয়া দিতেছি।
শিষ্য। আত্মর স্বরূপ কি?
আত্মা আকাশ নহেন, বায়ু নহেন, তেজ নহেন, জল
নহেন, পৃথিবী নহেন, পঞ্চভৌতিক পদার্থও নহেন ; এমন কি, ঈশ্বর
হইতে তৃণ গুল্ম লতা পর্যন্ত কোন বাই নহেন।
==

১৮৯
যােগ ও সাধনা;
শিষ্য। তবে ইহা কি ?
গুরু। তিনি পূর্ণস্বরূপ এবং অদ্বিতীয়।
শিষ্য। ইহার হেতু কি ।
গুরু। হেতু এই যে, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সকল বস্তুই কালবশে ধ্বংস..
প্রাপ্ত হয়, কিন্তু বাক্যের অগােচর অদ্বিতীয়
অগােচর অদ্বিতীয় আ ত্মাই অবিনাশ
অর্থাৎ তিনি নিয়তই বৰ্ত্তমান।
শিষ্য। ইহাকে উপলদ্ধি করা কি সম্ভব ?
গুর। অবশ্যই সম্ভব।
ক পে সম্ভব ?
এ সাধক মিথ্যা বিস্কৃতি সংসার এবং নিখিল সক্ষ
ও বাসনা পরিত্যাগ করত আপনাকে, অর্থাং জীবাত্মাকে পরমাত্মার
সহিত সংযুক্ত করতে সমর্থ হয়, সেই সাথকই আপনাতে নিজেকে
দেখিতে সমর্থ হয়।
শিষ্য।
আপনাতে নিজেকে দেখা-মানে?
শুরু। অর্থাৎ জীবাত্মাতে পরমাত্মার সাক্ষাৎকার লাভ করা।
এইবার বুকিয়াছ ?
শিষ্য। আজ্ঞা হা।
গুরু। সেই প্রকার সাবক কাঠোর সমাধি বলে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড
বিস্মৃত হইয়া অসীম সুপাত্মক আত্মার সাক্ষাৎকার লাভ করিয়া
নিত্যানন্দ ভােগ করেন।
শিষ্য। এই পরিদৃশ্যমান জগতের স্রষ্টা কে?
গুরু। অঘটনঘটনপটীয়সী মায়া।
শিষ্য। মায়া সৃষ্টি করিয়াছেন।
গুরু। হাঁ। তিনিই এই মিথ্যাভূত জগতের সৃষ্টিকারিণী ;

যােগ ও সাধন
তিনি ব্যতীত অপর কেহই, বিশ্ববিজয়িনী নহে। সেই জন্য আত্মজ্ঞান
দ্বারা যৎকালে মায়া দূরীভূত হইয়া থাকে, তৎকালে সাধকের পক্ষে
এই জগং প্রপঞ্চের অস্তিত্ব থাকে না। যােগীর নিকট পরিশ্যমান
নিখিল বস্তুই হেয়।
শিষ্য। ইহার কারণ কি?
গুরু। কারণ এই যে, এ সকলই মায় বিভূতি মাত্র। তাই
তজ্ঞ যােগীর নিকট দেহ-ধন-জনাদি সুখকর সকল পদাং ই প্ৰীতি-
প্রদ হয় না। এই জগৎ প্রপঞ্চই ত্রিবিধ ভাবাপন্ন।
শিষ্য । ঐ তিনটি ভাব কি কি ?
গুরু । মিত্রভাব, অবিভাব এবং উদাসীন ভাব। ব্যবহার দ্বারা
সকল পদার্থে ই এই তিন ভাব দেখিতে পাওয়া যায় ।
শিষ্য। এই তিনটি ভাবের তাৎপর্য কি?
গুরু। যে বস্তু সুখকর, তাহাই মিত্রভাব ; যে বস্তু কর,
তাহাই অবিভাব; আর যাহা দুঃখজনক বা সুখদায়ক নহে, তাহাই
উদাসীন ভাব।
শিষ্য। ইহা কি সকলের পক্ষে একরূপ?
গুরু। না। নিখিল পদার্থ একজনের নিকট দুঃখদায়ক, আর
অপরের পক্ষে সুখদায়ক এবং অন্য এক ব্যক্তির নিকট উদাসীন ।
শিষ্য। একটু বুঝাক্ট বলুন।
গুরু। যেমন এক বিজেতা রাজা স্বীয় সৈঞ্চবর্গের নিকট সুপ
জনক, শত্রুসৈক্ষের নিকট দুঃখদায়ক এবং অন্য দেশীয় লােকজনের
পক্ষে উদাসীন। বুঝিছ ?
শিষ্য। এ । তবে
এ দুৰেখাৰু, অন্য কানে বুঝাইতেছি।
;

১৯১
যোগ ও সাধনা
শিষ্য। তাই বলুন।
যেমন কোন রূপবতী রমণী তাহার স্বামীর পক্ষে সুখ
জনক, কিন্তু তাহার সপত্নীগণের পক্ষে দুঃখদায়ক এবং সপী ব্যহীহ
অপর কামিনীদিগের পক্ষে উদাসীন। বুঝিয়ছ ?
শিষ্য। এইবার ঠিক বুঝিয়াছি।
গুরু। এই তিনটি সকল বস্তুতেই আছে।
শিষ্য। কোন কোন বস্তুতে ?
গুরু। এই অবনীতলে যাহা কিছু নয়ন গােচর হয়, সেই
সকল বস্তুতে, স্থবার, জঙ্গমাদিতে ইহা পূর্ণভাবে বিরাজিত আছে।
অধিক কি, আত্মস্বরূপ আত্মাতেও উপাধিভেদে এই ব্রিভাবের সত্ত্বা
দেখা যায়।
শিষ্য। এই ত্রিভাবের অতীত কেহ কি নাই ?
গুরু। আছে বৈকি।
শিষ্য। কে তিনি?
জ্ঞানবলে কেবলমাত্র প্রকৃত যোগী ব্যক্তিরাই এই ত্রিভাবের
অতীত হইতে পারেন। তাহা ছাড়া আর কেহই সমর্থ নহেন।
আর কিছু জিজ্ঞাস্য আছে ?
শিষ্য। আজ্ঞা হাঁ, আছে।
গুরু। কি?
শিষ্য। জগতের কি অস্তিত্ব নাই ?
গুরু। যদি জগতের অকল্পনা করা যায়, তবে বিবেচনা
করিতে হইবে যে, একমাত্র চিৎস্বরূপ ব্রহ্ম হইতেই এই চরাচর
আৎ সম্ভব হইয়াছে।
শি। আর যদি কাগজে আস্তিত্ব না না হয়।

যােগ ও সাধনা
১৯২
গুরু। তাহা হইতে সই অদ্বিতীয় চিন্ময় ব্রহ্মই একমাত্র বিদ্যমান
আছেন, অপর কিছুরই অস্তিত্ব নাই ।
এই পৃথিবীর পরিণাম কি ?
শিষ্য ।
প্রলয় :
প্রলয়ে কি ঘটে ?
প্রলয়কালে এই পৃথিবী বিদীর্ণ হইয়া জলে কয় পাইয়;
থাকে এবং জল তেড়ে, তে বায়ুতে, বায়ু আকাশে, আকাশ অবিদ্যাতে
এবং অবিছ; সেই পরমব্রহ্মে লয় হইয়া যায় । মায়! ত্রি গুণময়ী ।
শিষ; ; এই তি গুণ কি ?
সত্তঃ, রজঃ ও তমঃ, স্বরূপ, দুঃখরূপিণী এবং দুরন্ত ।
শিমু , কি কি ?
বিক্ষেপ শক্তি ও আবরণ শক্তি।
শিষ্য । এই দুই শক্তির স্বরুপ কি?
গুরু। যে শক্তি সত্যস্বরূপ পরম
হইতে জাবকে ?
রায়ি থাকে, তাহার নাম বিক্ষেপ শক্তি। আর
ব্ৰহ্মকে আবরিত করে, তাহাই আবরণ শক্তি। তাই অজ্ঞানরূপিণী
মায়া স্বীয় আবরণ শক্তি প্রভাবে নির্বিকার নিরঞ্জন ব্রহ্মকে অবহিত
করিয়া বিক্ষেপ শক্তির প্রভাবে তঁাহাক ই আবার জগৎ আকারে
প্রতীয়মান কবিয়া..
" আবার বিভিন্ন গুণবােগে
বিভিন্ন—ত্তি ধারা
বিভিন্ন
খা মন তমে গুণাধিকা হইয়া থাকেন, তখন তিনি
দুপ নামে অভিহিত হন এবং সেই সময় তদুপস্থিত চৈতন্য ।
নামে অভিহিত হইয়া থাকেন

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Jog O Sadhana Ed.1

Author
Bidyabhusan,satipati Ed.
Title
Jog O Sadhana Ed.1
File name
Jog O Sadhana Ed.1
Text
OCR done
Citation
1940
Published
2010/03/19
Publisher
Sulav Library, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
196
Library
Belgaria Sudha Smriti Pathagar
Classification
Bengali Essays
Keywords
Jog
DLI number
511127
Barcode
4990010018303.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
JNjm1ZOVvoi
Download PDF

Jog O Sadhana Ed.1