Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Kashturi
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
কস্তুরী
(কাব্য)
শ্রীগােবিন্দ চন্দ্র দাস প্রণীত।
কিমপ্যন্তি স্বভাবেন সুন্দরং বাপ্যসুন্দরং।
যদেৰ নােচতে যস্মৈ ভবেত্ত সুন্দর।
[ হিতােপদেশ ।
দ্বিতীয় সংস্করণ।
[ All rights reserved ]
কলিকাতা,
২১০৫ কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, নব্যভারত-প্রেসে,
শ্রীদেবীপ্রসন্ন রায়চৌধুরী দ্বারা মুদ্রিত
প্রকাশিত।
সূচী। বষয় পৃষ্ঠা। এর র পুতুল ৭ তিন প্রেম র ল ও প্রেমদা ১৪ তা ১৬ २० ফুল হাড়িয়া নদী দায় ২৪ ২৪ ন গুণ লা ২৮ মার ভালবাসা মি দিব ভালবাসা রহ-সঙ্গীত ৩৭ ৩৭ মান্য নারী হিনা এই এক নূতন খেলা ৪২ আজ কারে মনে হয় ? ৪৪ দিনান্তে ৪৬ মেঘ ৪৮ বৈশাখে । পরনারী কবি-বৈজ্ঞানিক ৩০ ৬৪ ৬৪ •• *, ৬৮ কে বেশি সুন্দর। বিধাতার অনুগ্রহ আমারি কি দোষ? আমারি যে দোষ বেশি পুণ্য কার ? মববর্ষ আকাশের খুকী মণিকুন্তলা মণির রচনা ৭ ৭৯ ৭১ ৮৪ ৪ ? ১৮ অতুলচন্দ্র বঙ্কিমচন্দ্র কার্তিকপূজা আমার বাড়ী উলঙ্গ রমণী চীনজাপান যুদ্ধ ••• ১০২ বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষৎ শৈল স্মৃতি গ্রন্থ-সংগ্রহ। প্ৰদাত্ৰীশ্ৰীমতী নিশারী ঘোষ, ৩১; পদ্মপুকুর রোড। ৭।
কস্তুরী
3
মধুপুর
সুন্দর পর্বতপূর্ণ শােভে মধুপুর,
আদি লাবণ্যের লীলা, যে সময়ে উছলিলা,
হঠাৎ জমিলা যেন মধুর মধুর !
গিরি পরে উঠে গিরি, স্বর্গের শ্যামল সিড়ি,
উপরে নন্দন বন নহে বেশী দূর,
অই শােন বাজে বটে, অমরীর কটিতটে,
ভাঙ্গিয়া কামের ঘুম ‘ঘুগু’র ঘুঙ্গুর !
অই তারা নাচে গায়, পিকবধূ পাপিয়ায়,
শজারু বাজায় পায় কাঞ্চন নুপুর।
আলিঙ্গনে সুরবালা, ছিড়েছে মুকুতা মালা,
নিঝরে সে নিরমল ঝরে মতিচুর!
তারাই চুম্বন দিতে, ফোটা পড়ে অবনীতে,
ফুটিয়া ‘মহুয়া ফুল মধুর মধুর!
সুন্দর পৰ্বতপূর্ণ শােভে মধুপুর
কস্তুরী
২
শৈলে শৈলে মধুপুর শশাভে মনােহর,
যেন এ প্রকৃতিরাণী, রচিয়াছে রাজধানী,
অরণ্য প্রদেশে মরি হিরণ্যগর)
উচু থাম তাল গাছে, শিরে শিরে ধরিয়াছে,
আকাশের নীল ছাদ—অনন্ত সুন্দর।
কিবা রাজ অট্টালিকা, উপরে উঠেছে শিখা,
জ্যোতির্ময় হেমকুন্ত দেব দিবাকর!
আরণ্য কুসুমে গাঁথা, রত্নসিংহাসন পাতা,
উপরে ‘
চাল’ ছাতা ‘সুরঙ্গী’ শিখর।
পদতলে পাদ্য অর্ঘ্য, ‘জয়ন্তী’ + ও তৃণবর্গ,
অপিছে অনন্ত কাল—যুগ যুগান্তর ।
শৈলময় মধুপুর বড়ই সুন্দর।
শৈলে শৈলে মধুপুর কত শােভা ধরে,
সুনীল তাম্বুর মত, গিরিশ্রেণী শােভে কত,
সৈন্যের শিবির যেন দিক দিগন্তরে।
চারি দিকে শালবন, যেন শিখ সৈন্যগণ,
শ্যামল সাঁজোয়া পরি শ্যাম কলেবরে,
নিশ্চল নির্ভীক দেহ, সংগ্রামে ডরে না কেহ,
বরষে অশনি যদি শত জলধরে,
কিংবা যদি প্রভঞ্জন, এক সঙ্গে করে রণ,
* মুরঙ্গী-পর্বত। ইহার শিখরে চাম্বল জাতীয় একটী ঘনপত্র বৃহৎ
বক্ষ ছত্রাকারে শােভা পাইতেছে।
জয়ৰী-নদী ।
মধুপুর
.
তেমনি কঠিন পণ—পদ নাহি সরে,
অথচ হানে না বাপ, লয় না পরের প্রাণ,
কেমন স্নেহের যুদ্ধ ! নিজে যদি মরে
নীরবে সকলি সয়, যথা রাম দয়াময়,
বাল্মীকির তপােবনে সন্তান-সমরে।
শৈলে শৈলে মধুপুর কত শােভ ধরে ।
উ
কত শৈলে কত শোভা রয়েছে ভরিয়া,
কোল হ'তে নামে কার, স্নেহের তরল হার,
নিঝরিণী খুকীরাণী হামাগুড়ি দিয়া,
বসুধা তাহার কাছে, বুক পেতে নিতে আছে,
পুলকে যেতেছে তার পরাণ প্লাবিয়া ।
চন্দ্রমা দিতেছে ‘চি, হাসাইয়া চারি দিক্,
পাখীরা গাইছে গান ‘ঘুম পাড়ানিয়া!
স্নেহময়ী মাসী পিসী, প্রতিবেশী ‘দিবানিশি,
প্রভাতে সন্ধ্যায় করে সােহাগ আসিয়া ।
জনমিলে বড় ঘরে, কে নাহি আদর করে,
কে না দেয় করতালি
কুতুহলে
দীন বালকের দেহ, ঘৃণায় ছোয়না কেহ,
পড়িলে পায়ের কাছে গড়াগড়ি দিয়া ।
অনন্ত শােভায় শৈল রয়েছে প্লাবিয়া।
গিয়া ?
৫
নানা শৈলে নানা বেশে শােভে মধুপুর,
কোথাওআরক্ত দেহ, মৃন্ময় পৰ্ব্বত কেহ,
।
s
কস্তুরী
।
পড়িয়া রয়েছে যেন প্রকাণ্ড অর ।
বরষার শত ধারে, বিদীর্ণ করেছে তারে,
অমর অসির ঘাম মরিয়াছে ?
কোথা সে বিদার হতে, কোথা সে বিশাল ক্ষতে,
গলিতেছে সরক্ত গৈরিক প্রচুর।
কোথাও কেটেছে হাড়, পাষাণ পর তার,
কত অস্থি গদাঘাতে হইয়াছে চুর!
যুগান্ত-যুগান্ত কিবা, খাইতেছে নিশিদিবা,
ফুরাইতে পারে নাই শিয়াল কুকুর!
বিশাল অসুর দেহে ভরা মধুপুর।
উষায় পাষাণ-শৈল হয় অনুমান,
অস্থির অঙ্গার স্তুপ, জ্বলিতেছে অপরূপ,
পূরব গগনে যেন দৈত্যের শ্মশান।
কে জানে এ মহানলে, কত যে যুগান্ত জ্বলে,
আরাে যে জ্বলিবে কত নাহি পরিমাণ,
সন্ধ্যায় সহস্র তারা, চেয়ে দেখে দেবতারা,
হইল কি না হইল ভস্ম-অবসান,
দানবের দৃঢ় অস্থি পৰ্বত-পাষাণ?
।
1
সায়াহ্নে পৰ্বত শােভা বড় মনােহর।
দিবাকর ধীরে ধীরে, নামে যবে গিরিশিরে,
কাঞ্চন চুচুক শােভে স্তনের উপর।
তেমনি পূরব ভাগে, আরেক পৰ্বতে জাগে,
মধুপুর
পূর্ণিমার সুধাপূর্ণ গাজা শশধর।
নভ তাহে নীল বুকে, পড়ে যেন অধােমুখে,
ধরণী ঘরণী টানে ছায়ার কাপড়।
সায়াহ্নে পর্বত শােভা বড় মনােহর ।
বড় শােভা মধুপুরে সুখ মধুমাসে,
মধুর ‘মহুয়া ফুলে, বধূর
ঘােমটা
খুলে,
পাহাড় পর্বত ভাসে মধুর উচ্ছ্বাসে !
দূত মুকুলের গন্ধে, কি উদাস কি আনন্দে,
করি যেন আবি ছায়া ছায়া মনে আসে,
যেন কোন পড়ে বাড়ী, গৃহস্থ গিয়েছে ছাড়ি,
মুড়া ঝাঁটা ভাঙ্গা হাঁড়ি রেখে ইতিহাসে !
আরাে যেন আম গাছে, এমনি মুকুল আছে,
দেখিয়াছি কোন্ দেশে দিক্ ভরে বাসে,
তাহারি একটু ঝজি, নাকে লেগে আছে অজি,
এখনি উড়িয়া যাবে, আরেক নিশ্বাসে।
কত মধু প্রাণে জাগে সুখ মধুমাসে।
'
বড় শােভা মধুপুরে সুখ মধুমাসে,
লইয়া উৎসাহ আশা, সুখশান্তি ভালবাসা,
ত্রিদিবের দেবতারা বেড়াইতে আসে।
কেবলি উল্লাস ক্ষুৰ্ত্তি, সকলি সজীব মুর্তি,
স্বর্গের আরােগ্য আনে বসন্ত-বাতাসে।
নবীন জলদ হর্ষে, অমৃতের ধারা বর্ণে,
কস্তুরী
কঙ্করে অঙ্কুর মেলে তরুলতা ঘাসে।
যেন রেণু বালুকায়, সবাই জীবন পায়,
মরণ ভুলিয়া যায় ধরণী উল্লাসে,
মধুময় মধুপুরে সুখ মধু মাসে !
বড় শােভা মধুপুরে সুথ মধুমাসে,
চঞ্চলা বালিকা পরী, চকোরীর গলাধরি,
খেলায় জোছনা যেতে রজত-আকাশে।
কেহ জহরুল’ ফুলে* চুমা খায় সখী ভুলে,
ফোটে অধরের দাগ গোলাপী-উচ্ছ্বাসে !
আতর তাহারি গন্ধ, তারি রস মকরন্দ,
উড়ে প্রভাতের অলি তারি অভিলাষে ।
পরীর প্রসাদ হায় কে না ভালবাসে ?
বড় শােভা মধুপুরে সুখ মধুমাসে !
উড়িছে বলাকা-শ্রেণী, বিশুভ্র বরফ-বেণী,
বিমল আকাশ-গঙ্গা নেমে যেন অাসে।
কিবা দিক্-বালিকার, বুজতের চন্দ্রহার,
নিবিড় নিতম্বে মরি থল থল ভাসে।
সন্ধ্যার শীতল বায়, নীল মেঘ সরে যায়,
বসন্ত আঁচল তার টানিছে উল্লাসে ।
লজ্জায় ডুবিছে রবি, সুরুচির চারু ছবি,
নিলাজ বেহায়া কবি তাই দেখে হাসে।
এত ‘ছি ছি। মধুপুরে সুখ মধুমাসে !
১৩১১ সন, মধুপুর, E, I. R.
* গোলাপী রঙ্গের ছােট ছােট ফুল।
আমার পুতুল *
আমার পুতুল,
এ নহে মােমের গড়া, পােড় মাটী রং করা,
এ যে মমতায় ভরা স্নেহের মুকুল,
এ নহে বিলাতী চীনা, এ নহে এ দেশে কিনা,
নন্দনের আমদানী পারিজাত ফুল,
আমার পুতুল !
২
আমার পুতুল,
সে কহে স্বর্গের কথা, সুখশান্তি পবিত্রতা,
অধরে অমৃত-গঙ্গা বহে কুল কুল,
ব্ৰহ্মা কমণ্ডলু পাতে, শঙ্কর ধরেন মাথে,
বাঁচায় সহস্র আশা নিরাশ-নিৰ্ম্মল,
আমার পুতুল!
।
আমার পুতুল,
কলপ লতার সম, ধমনী শিরায় মম,
শত শাখা প্রশাখায় স্থাপিয়াছে মুল,
যাহা চাই তার কাছে, সকলি তাহাতে আছে,
অন্নদার ঝাঁপি যেন অক্ষয় অতুল,
আমার পুতুল
* শ্ৰীযুক্ত বাবু দেবীপ্রসন্ন রায় চৌধুরীর কন্যা-সান্ত্বনা।
bu
কস্তুরী
৪
আমার পুতুল,
আনন্দ উল্লাসে ধায়, নাচিয়া আছাড় খায়,
কঁদিতে হাসিয়া ফেলে, কি সুন্দর ভুল!
তাহারি মধুর গীতে, আসে যেন পৃথিবীতে
নব-বসন্তের কোলে বন-বুলবুল,
আমার পুতু
আমার পুতুল,
ধরিয়া সে সােপাহাতে, বিকালে বেড়ায় সাথে,
উজলিয়া ‘মধুপুরে’ নিঝরের কুল,
কনক চরণে তার, করে যেন নমস্কার,
নােয়া’য়ে রজতশির সুখে ‘লুসীফুল’
আমার পুতুল !
আমার পুতুল,
কভু সে রজত সােতে, পাথরের নুড়ি পােতে,
পলাইয়া যায় জল করি কুল কুল,
সেও ছােটে পাছে তার, আরেক শােভার ধার,
আনন্দ উল্লাসে আমি অবশ আকুল !
আমার পুতুল।
* তৃণ জাতীয় ।
আমার পুতুল
৯
।
৭।
আমার পুতুল,
সে যখন কাঁদে রাগে, লাবণ্যে পূর্ণিমা লাগে,
হৃদয়ে উছলে রক্ত-তরঙ্গ তুমুল,
সত্যই তাহার মুখে, দেখি বিশ্ব মহাসুখে,
ঠিক বুঝি যশােদার হয় নাই ভুল ।
আমার পুতুল।
ৈ
আমার পুতুল,
হাসিভরা রাঙ্গাঠোটে, অরুণ ভাঙ্গিয়া ওঠে,
এ পারে পলাশ ফোটে ও পারে পারুল,
ললাটে সুন্দর সাদা, শরতের শশী আধা,
মিশিয়া ফুটেছে গালে যূথী জহরুল’!
আমার পুতুল!
আমার পুতুল,
যদি অলি দুই দলে, দেখে থাক শতদলে,
তবেই বুঝিবে তার সীতিকাটা চুল,
থাকে না চামেলী বেলী, দৌড়াইতে দেয় ফেলি,
কাণের খসিয়া পড়ে ‘ধুতকীর’ । দুল ?
আমার পুতুল!
3
। রক্তবর্ণ পুষ্প।
কন্তরী
।
1
আমার পুতুল,
কখনাে ঘােমটা মুখে, বালিসের ছেলে বুকে,
খাওয়ায় তাহারে বুনী—বেহুস বেকুল,
বুঝেনা চেতনা জড়, মাহি বুঝে আত্মপর,
জগতে জননী কই তার সমতুল ?
আমার পুতুল।
আমার পুতুল,
সে বলে আমারে তার, আমি বলি সে আমার,
আমাদের দু'জনের বিবাদের মূল,
গলা ধরে চুমা খাই, দু’জনারে দুজনাই,
কে কার দখলে ভাই ভেঙ্গে দেও ভুল!
আমার পুতুল।
১৩০১ সন, মধুপুর, E. I R
পুরাতন প্রেম
পুরাতন প্রেম,
পুরাতন ঘৃত
দুর্গন্ধ বিস্বাদময়,
বেদনার স্থানে
হৃদয়ে মাখিলে
অথচ অমৃত হয় ।
ফুলের সুরভি,
পরিমল সুধা,
গেলে বসন্তের নেই,
শুকনা চন্দন,
নিদাথে জুড়ায় দেহ!
পুরাতন কাঠ
৫
পুরাতন প্রেম ১১ সবুজ ঘাসের বড় আদরের বাসের আঙ্গুর, দু’দিনে পচিয়া তল, চিরদিন সম পবিত্র অমৃত শুষ্ক হরীতকী ফল। দু’দিনে শুকায় সুকোমল আস্তরণ, রহে চিরশুদ্ধ ঋষির আরাম শুষ্ক তৃণ-কুশাসন! শাওণের ধারা বরষে সতত, বিরামের নাহি লেশ, অযাচিত জলে অবনী ভাসায়, জলময় করে দেশ। শীতের বিশুষ্ক বিদারিত ধরা, মরে যবে পিপাসায়, মৃত জলদের এক ফোটা জল বিনা কে বাঁচায় তায় ? অতি আনন্দের অতি আহলাদের অতি পুলকের পরে, বিষাদের ছায়া যেখানে আছে, সে, সেখানে অপেক্ষা করে। চন্দ্র অস্ত গেলে, ঘাের অন্ধকারে, নক্ষত্র-নয়নে চায়,, বাদলের দিনে, চুপ চমকি না। ঝটিকা তুফানে, ১২ কস্তুরী দুপুরের রােদে, তরুতলে এসে, ছায়া হয়ে থাকে খাড়া, শীতল বাতাস, বহে কি কখন, তাহার অঞ্চল ছাড়া ? বা সন্দেহে ভরিলে হৃদয়, বিবেচনা হয়ে নাশে, পাপের কণ ধুইতে আমার, অশ্রু রূপে চখে আসে । যৌবনের জ্বালা জুড়’বার তরে, সেই যেন আসে জরা, দূর হ’তে হাত বাড়াইছে যেন শান্তির শিশির ভরা। একবিন্দু অশ্রু, একটা নিশ্বাস, একবার হাহাকার,- অকৃতজ্ঞ আমি, এখন তাহারে, নাহি দেই পুরস্কার। অষতনে আছে কোথায় পড়ি। বিশুষ্ক বীগ্নার মূল, এক ফোটা জল যদি পায় সেই, কে তাহার সমতুল ? ১৩৯১ সন, মধুপুর, E, I. R.
মধুকর
যাও মধুকর!
যেখানে বালিকা মেয়ে, হাসে কাদে গান গেয়ে,
শোভে শরতের চাদ, মুখের উপর,
প্রভাতের পদ্ম ঠোটে, চুমা খেতে মধু ওঠে;
যাও, সে বালিকা মুখে মুগধ ভ্রমর।
২
১।
যেখানে বিনােদী বালা, পরিয়ে বকুল মালা,
খোপায় গুজিয়া দিয়া গােলাপ সুন্দর,
বসি আরসীর পাশে, মুচকি মুচকি হাসে,
কিবা সে কৌমুদী-মাখা মুখ মনােহর।
বিলাস-বাসনা ভরে, দশনে টিপিয়া ধরে,
কখন কখন বালা আর অধর,
গাল হয় রাঙ্গা রাঙ্গা, লাজ হয় ভাঙ্গা ভাঙ্গা,
এমনি সময়ে তুমি যাও মধুকর ।
যাও হে যেখানে বউ, কাকালে তুলিয়া ঢেউ,
জলের কলসী কক্ষে-গমন মন্থর
ঢ ঢক্ শব্দ তায়, কলসী চুবান খায়,
আন্দোলিত অঙ্গে তার রূপের সাগর ।
এলা’য়ে পড়েছে চুল, ঝক বাধা অলিকুল,
মধুভরা বধুমুখ ঘােমটা ভিতর,
+
২
কস্তুরী
ঈষৎ ঘেমেছে গাল, হয়েছে গােলাপী লাল,
এই বেলা সন্ধ্যাবেলা যাও মধুকর!
4
৪
দেখিয়া বনের ফুল, করিও না পথে ভুল,
কি ছার কু কু কমল কেশর,
কার মুখে এত হাস, ফুটে আছে বারমাস,
শরত্র গয়ে খুলে মুখার নির্যর ?
চামেলী বেলীর কাছে, তেমন কি মধু আছে,
বিনে সেই বিলাসিনী কামিনী-অধর ?
বিল বাসনা বশে, আবেশে কঁচুলী খসে,
এই বেলা সন্ধ্যাবেলা যাও মধুকর !
ই ফান, ১২৯১ সন।
ময়মনসিংহ।
সারদা ও প্রেমদা
১
সারা পশ্চিমে ডুবে, প্রেমদা উঠিছে পূবে,
জীবন-গগন মধ্যে আমি দাঁড়াইয়া,
অপূৰ্ব্ব সুন্দরী উষা, অপূর্ব সন্ধ্যার ভূষা,
পৃথিবীর দুই প্রান্ত উঠেছে প্লাবিয়া ।
২
প্রেমদা বা হাত টানে, সারদা ধরেছে জানে,
বুঝিতে পারি না আমি কোন্ দিকে যাই,
দোহারি সমান স্নেহ, বেশ কম নহে কেহ,
দু’জনে ওজনে তুল চু ভুল নাই।
}
সারদা ও প্রেম . 1 1 == ৭। । দোহারি সমান জোর, প্রাণ ছিড়ে যায় মাের, দু’জনেই চাহে তারা পুরাপুরি নেয়, দু’জনেই করে অশা, পরিপূর্ণ ভালবাসা, ভিলমাষা নাহি চাহে কেহ কারে দেয় । ১ ৪ সারদা যাইতে ডাকে, প্রেমদা ধরিয়া রাখে, ঠেকেছি বিষম দায়—বিষম সঙ্কটে, কে হয় বেজায় খুসি, কারে কৃষি কারে তুষি এমন দাঙ্গা দায় কারা নাকি ঘটে ? চেতে প্রেমদার পানে, সারদাও মরে প্রাণে, বুঝিনা কেমন হিংসা-এ কেমন আড়ি, দু’জনেই বলে তারা, কেবল তােমারে ছাড়া, অনন্ত ব্ৰহ্মাণ্ড চেলে তাও দিতে পারি। প্রেমদা পদ্মার কুলে, কোমল শেফালী ফুলে করিয়া বাসর-শয্যা ডাকিছে আমায়, সারদা চিলাই-তীরে, আম কাঠ দিয়ে শিরে, আঁচিল বিছায়ে ডাকে চিতা-বিছানায় । নাহি নিশি নাহি দিন, দু'জনেই নিদ্রাহীন, দুই দিকে দুই সিন্ধু গর্জিছে সমানে, পাষাণ-হৃদয়-দামী, পানামা যােক আমি, ীরে ধীরে ভােলে নামি দুজনার কানে। । | rA
১৬
কস্তুরী
৮
যদি কভু ভুলে চুকে, কারাে নাম আনি মুখে,
অমনি আরেক জন অভিমানে ভাের,
নড়িতে চুলকণা, সাপিনীরা ধরে ফণা,
ভয়ে ভয়ে সদা আছি হয়ে গরুচোর।
কিবা ঘুম কিবা জাগা, দু’জনে পিছনে লাগা,
পারি না তিষ্ঠিতে বড় পড়েছি ফাপরে,
একটু নাহিক স্বস্তি, জ্বালায়ে ফেলিল অস্থি,
হায়! হায়! লােকে কেন দুই বিয়া করে ?
৩ অগ্রহায়ণ, ১৩০১ সন।
কলিকাতা।
দেবতা
আমি যারে ভালবাসি সে ত গাে দেবতা,
সে ত গাে মানুষ নয়, সে ত নহে ক্ষুদ্রাশয়,
মানুষের সনে সে ত নাহি কহে কথা।
অনন্ত গগনবৎ, মহতের সে মহৎ,
সে জানে না নতভাব সে শুধু উচ্চতা
আমি যারে ভালবাসি সে ত গাে দেবতা।
5
২
আমি যারে ভালবাসি দেবতা সে জন,
আমিও দেখিনি তারে, কে কবে দেখিতে পারে,
দেবতা
৩
=
মানবের আখি দিয়া দেবতা কেমন ?
মানুষে মানুষ দেখে, কাব্যে কবিতায় লেখে,
সে শুধু ধ্যানের বস্তু, ধ্যান করে মন!
আমি যারে ভালবাসি দেবতা সে জন।
সে ত গাে দেবতা আমি যারে ভালবাসি,
শরত শশীর আলাে, পদ্মবনে যদি ঢালে,
হইলে হইতে পারে মানবী রূপসী।
বিজলী অাখির ঠার, তারি বটে অহঙ্কার,
তুলনা মিলেনা সেই দেব রূপরাশি ।
সে ত গাে দেবতা আমি যারে ভালবাসি।
৪
সে ত গাে দেবতা আমি ভালবাসি যারে,
সে নহে সামান্য নারী, তারে কি চুইতে পারি,
সে যে পূর্ণ দেবত্বের স্পর্ধা-অহঙ্কারে।
আলিঙ্গন চুমাচুমি, সে ত করি আমি তুমি,
ধিক্ সে দেবত্বে যদি ছোয়া যেত তারে।
সে ত গাে দেবতা আমি ভালবাসি যারে।
T
আমি যারে ভালবাসি দেবতা সে জন,
সে নহে সায়াহ্ন উষা, সে পরে না বেশভূষা,
সে উলঙ্গ মহাকালী, নাহি আবরণ।
অকল্প অরূপ-রূপ, কে জানে সে কোন্ রূপ,
+
১৮
কস্তুরী
আমি ত জানি না তার আছে প্রাণমন।
আমি যারে ভালবাসি দেবত সে জন।
।
আমি যারে ভালবাসি সে ত গাে দেব,
তার নাই প্রেম স্নেহ, সে নহে মানুষ কেহ,
মানুষে বুঝিবে কিসে দেবতার কথা ?
তােমরা কণার কণা, অতি ক্ষুদ্র একজনা,
তােমরা কেবল জান আদর মমতা !
আমি যারে ভালবাসি সে ত গাে দেবতা !
৭
সে ত গো দেবতা আমি যারে ভালবাসি,
চির-আলিঙ্গন তার, চিরকাল হাহাকার,
আছে তার অশ্রুজল রাশি রাশি রাশি।
মানুষ চাহে না তাহা, পবিত্র পুণ্যের সাহা,
সে চায় বিলাস-ভােগ শুধু হাসাহাসি !
সে ত গাে দেবতা আমি যারে ভালবাসি
আমি যারে ভালবাসি তাে সে জন,
সে জানেনা মনে-রাখা, সে জানেনা কাছে-থাকা
সে যে করে আগে আগে দূরে পলায়ন ।
প্রাণ দিলে মন দিলে, তােমাদের প্রেম মিলে,
সে চাহেনা বিনিময়-কেনা-কাটা মন।
আমি যারে ভালবাসি দেবতা সে জুন।
দেবতা
{
}
সে ত গাে দেবতা আমি ভালবাসি যারে,
আমি শুধু চাহি তার, ঘৃণা গালি তিরস্কার,
সে যে করে অবহেলা উপেক্ষা আমারে।
আমি চাহি বারমাস, হা হুতাশ দীর্ঘশ্বাস,
অপমান অনাদর যত দিতে পারে।
সে ত গো দেবতা আমি ভালবাসি যারে ।
আমি যারে ভালবাসি দেবতা সে জন,
আমি চাহি তার তরে, হৃদয়ের স্তরে স্তরে,
কালকূটে জ্বলে যেন কালান্ত দহন ।
আমি চাহি কণ্ঠভরা, শােণিত-শােষণ-করা
তাহার নিরাশ-চিন্তা—নিশি-জাগরণ।
আমি যারে ভালবাসি দেবতা সে জন।
আমি যারে ভালবাসি সে ত গাে দেবতা,
উদ্বেগ উৎকণ্ঠা তার, অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা আর
প্রাপ্তিহীন চির-ভিক্ষা-চির-দরিদ্রতা,
আমি বড় ভালবাসি, তার বিদ্রুপের হাসি-
দ্রব-মরণের সেই মহা মধুরতা!
আমি যারে ভালবাসি সে ত গাে দেবতা।
১৩ই চৈত্র, ১২৯৮ সন।
কলিকাতা।
পদ্মফুল
৫
কি খেণে দেখি তোরে পদ্ম মনােহর,
পরাণ পাগল করা,
কি আছে ও মুখে ভরা,
কি মধু মাখানাে তাের কোমল অধর ?
বারে কি যে দিয়া,
পাগল করিলি হিয়া,
এত গুণ গায় তাের কেন মধুকর ?
কি দিয়ে করিলি পদ্ম পাগল অন্তর ?
২
কি সুধা মাখনাে তোর হাসি মনােহর
অমরা করিয়া খালি,
এত সুধা কোথা পালি,
কলঙ্কে লজ্জায় দেখ ম্লান সুধাকর ।
দেথিলেরে তাের হাসি,
অস্তাচলে যায় শশী,
পারেনা দেখতে মুখ দিনে শশধর ।
এত সুধা পালি কোথা কুসুম সুন্দর ?
t
এমন রূপের রাশি পালি কোথা ফুল ?
আরাে কত ফুল আছে;
=
}
পদ্মফুল
}
.
1
।
ফুটে থাকে গাছে গাছে,
কেহ ত করে না প্রাণ এমন আকুল !
এমন মধুর বাস,
এমন মধুর হাস,
দেখিনি এমন কোন মঞ্জরী মুকুল।
এমন রূপের রাশি পালি কোথা ফুল ?
৪
কেন রে দেখি তােরে পদ্ম মনােহর ?
ঘেষিতে পারিনা কাছে,
গায়ে তাের কাটা আছে,
বেড়িয়া রয়েছে তােরে কাল-বিষধর
যদিও সাহস করি,
তবু ভয় ডুবে মরি,
হায়, কি বিপদে আজ ফেলিল ঈশ্বর।
কি খেণে দেখি তােরে পদ্ম মনােহর।
১লা চৈত্র, ১২৯৩ সন।
শীতলপুর বাগানবাটী-শেরপুর,
ময়মনসিংহ।
পাহাড়িয়া নদী
১
সরলা আমার যেন পাহাড়িয়া নদী।
মিশিয়া দু'ফোটা জল, সুনির্মল সুশীতল,
২২
কস্তুরী
T।
লুকাইয়া চুপে চুপে বহে নিরবধি।
সরলা আমার যেন পাহাড়ি নদী।
२
সরলা আমার যেন পাহাড়িয়া নদী,
আছে তরঙ্গ-ভ, নাহি জানে রসঙ্গ
নীরবে খুজিয়া ফিরে কোথায় নীরাধি!
সরলা আমার যেন পাহাড়িয়া নদী।
সরলা আমার যেন পাহাড়িয়া নদী,
বাহিরে কঙ্কর ভরা, যেন মরুভূমি মরা,
অন্তরে অগাধ জল-নাহিক অবধি।
সরলা আমার যেন পাহাড়িয়া নদী।
১
সরলা আমার যেন পাহাড়িয়া নদী,
অভিমানে ওঠে ফুলে, ফেনায়ে উচ্ছ্বাস তুলে,
পদাঘাতে গিরি ভাঙ্গে পথ রােধে যদি !
সরলা আমার যেন পাহাড়িয়া নদী।
সরলা আমার যেন পাহাড়িরা নদী,
উষার আতা পায়, জ্যোস্না চন্দন গায়,
লাবণ্যে ভুবন ভাসে আকাশ অবধি।
সরলা আমার যেন পাহাড়িয়া নদী
সরলা আমার যেন পাহাড়িয়া নী!
এক গুয়ে-তেজীয়ান, অথচ তরল না,
পাহাড়িয়া নদী
২৩
নীরবে সে নতমুখে বহে নিরবধি।
সরলা আমার যেন পাহাড়িয়া নদী।
৭
ন
সরলা আমায় যেন পাহাড়িয়া নদী,
নাহি সভ্যতার লেশ, আরণ্য অসন্ত বেশ,
ঠেলে ফেলে হীরা মণি সেধে দেও যদি।
সরলা আমার যেন পাহাড়িয়া নদী।
সরলা আমার যেন পাহাড়িয়া নদী।
ফুলময়ী লতা হেলে, গলা ধরে বুক মেলে,
কি জানি তাহারে আহা ফেলে যায় যদি
সরলা তাহার যেন মেহের ননদী।
সরলা আমার যেন পাহাড়িয়া নদী।
করিণী সে গতি রাখে, হরিণী চাহিয়া থাকে,
আকুলা কোকিল ডাকে কুলে নিরবধি।
সরলা আমার যেন পাহাড়িয়া নদী।
সরলা আমার যেন পাহাড়িয়া নদী।
তাহারি দয়ার দানে, তারি স্নেহ-বারি পানে,
বাঁচে বন-পশুপাখী কীটাণু অবধি।
সরলা আমার যেন করুণার নদী।
সরলা আমার যেন পাহাড়িয়া নদী।
ছয় ঋতু ফলে স্কুলে, ও পূত চরণমূলে,
কস্তুরী
।
২৪
অপিয়া অঞ্জলি তারে পূজে নিরবধি।
সরলা আমার যেন মহিমার নদী।
সরলা আমার যেন পাহাড়িয়া নদী।
কোন্ দেশে—কত দূরে, আজ সে যে ফিরে ঘূরে,
কোথা বা হৃদয় পেতে রয়েছে জলধি ।
সরলা প্রেমদা মোর প্রেমময়ী নদী।
১ই মাঘ,১৩০১ সন।
মধুপুর, E. 1. R,
বিদায়
১
চলিলাম প্রাণময়ি! চলিলাম আজি,
পরাণে পাষাণ চেপে ছাড়িয়া তােমায়,
এই ভাসাইনু তরী, জানিনা বঁচি কি মরি,
জানিনা দৈবের বশে যাইব কোথায়।
অনন্ত সলিল রাশি, গর্জিতেছে অট্ট হাসি,
প্রলয়-পয়ােধি যেন উছলিয়া যায়।
এই ব্ৰহ্মপুত্ৰ-জলে, এই শূন্য বক্ষস্থলে,
এই যে অনন্ত শূন্য ধূধু দেখা যায়,
চলিলাম প্রাণময়ি ছাড়িয়া তােমায়।
।
*
২.
|
যাই যে নাহি সে খেদনাহি দুঃখ তায়,
ভুলিয়াও সে ভাবনা নাহি করি মনে
r
বিনয়
৭
5
কেবল রহিল দুখ, অই পূর্ণচন্দ্রমুখ
পূরেনি আকাঙ্ক্ষা যারে নিরখি নয়নে
এত কষ্টে এত ক্লেশে, এত যারে ভালবেসে,
ছাড়িয়া যাহারে যাই বিধি-বিড়ম্বনে,
একটী মুহূৰ্ত্ত হায়, দেখিতে নারিনু তায়,
এই বিদায়ের কালে, চারু-চন্দ্রাননে,
ভরিল না চিত্ত তার একটা
চুম্বনে।
এই দুঃখ প্রাণময়ি, রহিল অন্তরে,
অই মণিময়ীমূৰ্ত্তি বুকে বসাইয়া,
অন্তিম বিদায়ে হায়, ও কম-কমল পাম,
নয়নের শেষ-অশ্রু উপহার দিয়া,
এই চিরদগ্ধপ্রাণ, করিব যে বলিদান,
প্রেম-যজ্ঞে স্বাহা-স্বধা মন্ত্র উচ্চারিয়া,
সে আকাঙ্ক্ষা, সে বাসনা, পরিপূর্ণ হইল না,
প্রাণের আগুন আজি প্রাণে লুকাইয়া,
যাই, প্রণময়ি, প্রাণ পাষাণে বাঁধিয়া ।
৪
কোথা যাই প্রাণময়ি, ছাড়িয়া তােমায় ?
তােমারে ছাড়িয়া যাই, হৃদয়ে বিশ্বাস নাই,
অথচ তরণী খানি দ্রুত ভেসে যায়,
দুর্নিবার স্রোতজলে, এই ব্ৰহ্মপুত্র চলে,
দেখিতে দেখিতে এই আসি কোথায় ?
যাই তবে চন্দ্রাননে, রাখিও রাখিও মনে,
স
২৬
কস্তুরী
কেমনে ভুগিব তােরে হায় হায় হায় ?
ৰাই প্রিয়ে প্রাণমরি-বিদায়! বিদা।
==
ভা, ১২৮৯ স।
ব্রহ্মপুত্র নদ।
গুণ গুণ গুণ।
গুণ গুণ গুণ!
নব বসন্তের বনে, মধুতপ্ত সমীরণে,
আবির উড়ায়ে হাসে উষার অরুণ ।
এমন সময়ে অলি, এসে চাহে গলাগলি,
কুসুমের কাণে কহে শুন সই শুন,
গুণ গুণ গুণ!
মালতী মাধবী কয়, দূর হও দুরাশয়,
জানি তুমি জাতিকুল নাশে সুনিপুণ ?
গুণ গুণ গুণ!
কহিছে যুথিকা জাতী, জানি তুমি নারীঘাতী
হৃদয় শুষিয়া হায় শেষে কর খুন!
গুণ গুণ গুণ!
হেসে বলে সূৰ্য্যমুখী, কাহারে করেছ সুখী।
চিনিহে তােমারে তুমি ডাকাত দারুণ।
গুণ গুণ গুণ!
গােপাল কহিছে তারে, কেন সাধ বারে বারে,
Bেহায় বেল্লিক তাের মুখে কালীচু।
গুণ গুণ ২। ৮ « 1 গুণ গুণ গুণ! কামিনী লজ্জায় মরে, হেসে গলে খসে পড়ে, বলে পােড়ামুখ তোর ও মুখে আগুন! গুণ গুণ গুণ! পরাণে পাষাণ চাপা, শরমে বলিছে চাপা, আজ যে আদর বড় কাতর করুণ ? - বলিছে মতিয়া বেলী, পদাঘাতে গেলে ঠেলি, ফিরে কি এসেছ দিতে কাটা ঘায়ে লুণ ? গুণ গুণ গুণ! চতুরা চামেলী কয়, মনে মুখে এক নয়, মুখে ধাশী, হাতে ফাঁসি, পিঠে তুণ ! গুণ গুণ গুণ । হেসে বলে গন্ধরাজ, আতরেতে কিবা কাজ, বাড়ী গিয়ে মাথ আজ পিঁয়াজ রসুন। গুণ গুণ গুণ! আদরে শিমূল কয়, এস অলি মহাশয়, সকলই আছে শুধু মধুটুকু উন। গুণ গুণ গুণ। সন্ন্যাসী বলিছে হেসে, তােমারেও বুঝি শেষে, বিভূতি মাখিয়া দেয় কেতকী গ্রন। গুণ গুণ গুণ । ২ কার্তিক, ১৩০১ রুন। निकांना - । । t * h ,
হেলা।
আমারে সকলি করে হেলা !
সােণার রেণুটী পেলে, রত্নাকরাে হাত মেলে,
তরঙ্গে তৃণেরে মারে ঠেলা ।
আমারে সকলি করে হেলা!
२
সকলেই করে অনাদর ।
মেঘের আসন পাতে, হিমাদ্রি আপন মাথে,
ধূলা ফিরে দেশ দেশান্তর!
সকলেই করে অনাদর।
সকলেই করে অষতন!
কুসুম অঞ্জলি দানে, বসন্ত এগুয়ে আনে,
শীত এলে মলিন কানন।
সকলেই করে অযতন !
৮ই অগ্রহায়ণ, ১৩০১ সন।
কলিকাতা।
r
আমার ভালবাসা। আমি তারে ভালবাসি অস্থিমাংস সহ, অমৃত সকলি তার—মিলন বিরহ। বুঝিনা আধ্যাত্মিকতা, দেহ ছাড়া প্রেম-কথা, কামুক লম্পট ভাই যা কহ তা কহ। কোথায় স্থাপিয়ে মূল, ফোটে প্রেম-পদ্মফুল ? আকাশ-কুসুম সে যে কল্পনা-কলহ। আত্মম্ন আত্মায় যােগ, বুঝিনা সে উপভােগ, অদেহী আত্মারে আগে কিসে ছুয়ে লহ ? তােমাদের রীতি নীতি, বুঝিনা পবিত্র ধ্রুতি, তােমরা কি পৃথিবীর নরলােক নই ? আমি ভাই ভালবাসি অস্থিমাংস সহ। २ আমি তারে ভালবাসি অস্থিমাংস সহ। আমি ও নারীর রূপে, আমি ও মাংসের স্থলে কামনার কমনীয় কেলি-কালীদহ- E
৩০
কস্তুরী
ও কর্দমে-অই পক্ষে
অই ক্লেদে-ও কলঙ্কে,
কালীয় নাগের মত সুখী অহরহ।
আমি তারে ভালবাসি অস্থিমাংস সহ।
আমি তারে ভালবাসি অস্থিমাংস সহ।
ধরার মানুষ আমি,
আমি ভাই মহাকামী,
আমার আকাঙ্ক্ষা সে যে মহা ভয়াবহ।
আলিঙ্গনে ভাঙ্গেচুরে,
শ্বাসে হিমালয় উড়ে,
চুম্বনে চূর্ণিত হয় গ্রহ উপগ্রহ।
আমাদেরি কেলি ভরে,
পৃথিবী উলটি পড়ে,
ও নহে সাগরে বান তােমরা যা কহ।
মনে মনে বুকে,
অগ্নি উঠে গিরিমুখে,
ভূমি কম্পে কাপে বিশ্ব ভয়ে অহরহ ?
আমি তারে ভালবাসি অস্থিমাংস সহ।
৪
আমি তারে ভালবাসি অস্থিমাংস সহ।
আমি মহাকাম-পতি,
সরলা সে মহারতি,
মরিলে মরণ নাই, নাহিক বিরহ।
আমার ভালবাসা
অনঙ্গ অনঙ্গ রঙ্গে,
সদা থাকে এক সঙ্গে,
সে আমার আমি তার মহা গলগ্রহ।
ইহকালে পরকালে,
জীবনের অন্তরালে,
প্রীতির প্রসন্নমুর্তি জাগে অহরহ।
মমাদের নির্বাণ নাই,
আমরা না মুক্তি চাই,
অনন্ত ধ্বংসের বর তােমরাই লহ।
আমাদের ভালবাসা অস্থিমাত্র সহ।
।
আমি তারে ভালবাসি অস্থিমাংস সহ,
জানি না নিষ্কাম কৰ্ম্ম,
বুঝিনা নিষ্কাম ধৰ্ম্ম,
বুঝি না “ঘােড়ার ডিম” তােমরা কি কহ ?
আমি শুধু চাই-চাই,
চাহিতে বিরক্তি নাই,
না পেলে অনন্ত-ভিক্ষা জীবন দুৰ্বহ।
হায় হায় কেবা জানে,
কি মহা গহ্বর প্রাণে,
কোটি বিশ্বে নাহি ভরে সে যে পােড়াদহ ।
এস ভাই মহাসুখে,
তােমাদেরে.(ঙ) লই বুকে
শক্রমিত্র অৰিভেদে যে যেখানে বহ।
- *
*
P
কস্তুরী
এস সুধা, এস বি,
এস পুষ্প কি তুলিশ,
এস অগ্নি, এস জল, এস গন্ধবহু!
আমার স্বার্থের আশা,
মহাস্বার্থ ভালবাসা,
এস হে আমার বুকে করি অনুগ্রহ।
অরূপ আত্মায় ভাই,
ভরে না এ গড়খাই,
আমি ভালবাসি তাই অস্থিমাংস সহ,
এস হে আমার বুকে করি অনুগ্রহ।
৫
আমি ভালবাসি তারে অস্থিমাংস সহ,
আমি নাহি বুঝি পাপ,
নাহি বুঝি অভিশাপ,
কনকের গৃহে কিসে নরক সংগ্রহ !
জড় কিসে নীচতুচ্ছ,
আত্মা কিসে মহাউচ্চ,
আমি ত বুঝিনা ভেদ, তােমরাই কই!
সে কি গাে সােহহং নয় ?
‘আমি’ পূর্ণ বিশ্বময়,
অনন্ত পুরুষ আমি আদি পিতামহ।
প্রকৃতি দেহাব্ধ মম,
প্রাণাধিক প্রিয়হান
মহাকাল দেখে নাই তাহার বিসহ।
L
1
==
আমার ভালবাসা
তাহারে করিতে ঘৃণা,
অধিকার আছে কি না,
তােমরা দিগগজ জ্ঞানী’ তােমরাই কহ।
চখে চখে চখ বোজা,
হাতা’য়ে পীরিতি খোজা,
তার চেয়ে এ যে সােজা, চখে দেখে লহ।
সে আমার আমি তার,
নাহিক বাকল সার,
এক আত্মা দুজনার অনাদি আবহ।
আমি তারে ভালবাসি অস্থিমাংস সহ।
আমি তারে ভালবাসি অস্থিমাংস সহ।
সুন্দর কুৎসিত হোক,
উলঙ্গ অবৃত রৌক,
কুরুচি বলিয়া কর কলঙ্ক-নিগ্রহ !
থাক্ তার মহাকুষ্ঠ,
আমি যে তাতেই তুষ্ট,
তােমরা দেখনা নয় ভয়ে দূরে রই!
চন্দন আতর সম,
তার পূর্য প্রিয়মম,
শরীরে মাখিলে যায় যাতনা দুঃসহ!
থাক্ তার শত পাপ,
থাক শত অভিশাপ,
'
.
T
কুরী
সে আমার বিধাতার মহা অগ্রহ।
আমি তারে ভালবাসি অস্থিমাংস সহ।
আমি তারে ভালবাসি অস্থিমাংস সই।
আজো তার ভন্মছাই,
বুকে রেখে চুমা খাই,
আজো সে গায়ের গন্ধ বহে গন্ধবহ।
আনন্দ উল্লাসে খুলি,
আজো তার চুল গুলি,
গলায় বাঁধিয়া আহা জুড়াই বিরহ।
আজো আর প্রতিচ্ছায়,
ধরিয়া নূতন কায়া,
বপনে আসিয়া করে সপত্নী-কলহ।
আজো সে লাবণ্য তার,
সুধা-মন্দাকিনী ধার,
ভরে ব্রহ্ম-কমণ্ডলু আদি পিতামহ।
আমি তারে ভালবাসি অস্থিমাংসসহ।
১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৩ সন।
কলিকাতা।
৫
আমি দিব ভালবাসা।
কারা, কে নিবি আয়
আমি দিব ভালবাসা যে যত চা!
কার বুকে কত বল, কার চখে কত জল,
দেখি কার প্রাণে কত হায় হায়।
পারিবি কে রে নিতে আয় আয় ।
২
আমি দিব ভালবাসা, কে নিবি আয় ।
দিয়েছি এক বিন্দু, উথলে পড়ে সিন্ধু,
বালুতে বেলাভূমে আছাড় খায়।
তটিনী দেশে দেশে, ফিরে উদাসী বেশে,
জনমে আর নাহি ঘরে সে যায়।
কে নিবি ভালবাসা, আয় আয় ।
আমি দিব ভালবাসা, কে নিবি আয়,
দিয়াছি নব মেঘে, তড়িতে জ্বলে বেগে,
রাখিতে নারে বুকে জলদ তায়।
পড়িছে ভয়ঙ্কর, কঁপায়ে চরাচর,
ঙ্গে য়ে ধরাধর অশনি যায়।
আমার এ ভালবাসা, কে নিবি আয়।
আমি দিব ভালবাসা, কে নিবি আয়।
দিয়াছি ফোটা ফুলে, তাই সে বিনা মূলে,
কাতুরে আতর মধু বিহু ।
কস্তুরী
ঘৃণায় অপমানে, নীরবে মরে প্রাণে,
করে সে পতঙ্গের চরণ যায় !
আমি দিব ভালবাসা কে নিবি আয় ।
আমি দিৰ ভালবাসা কে নিবি আয় ।
দিয়েছি শশধরে, তাই সে বাঁচে মরে,
পুষ্পিত পৌৰ্ণমাসী-অমানিশায়।
পশারি স্নেহে বাহু, আহলাদে ধরে রাহু,
সুজন কুজন বুঝেনা হায়!
আমি দিব ভালবাসা, কে নিবি আয়।
*
আমি দিব ভালবাসা, কে নিবি আয় ।
পাষাণে বেঁধে বুক, নিয়েছে জ্বালামুখ,
পারেনা সামালিতে উগারে তায় ।
তরল সে অনলে, পীরিতি সােতে চলে,
মরণ-ভগীরথ অাগে সে যায়।
আমার এ ভালবাসা, কে নিবি আয়।
৭
আমার এ ভালবাসা, কে নিধি আয় ।
চাতক পাখীগুলি, নিয়েছে ঠোটে তুলি,
ভিজেন পারাবারে সে ঠোট, হায়,
অনন্ত সে পিপাসা, অনন্তু মহা আশা,
অনন্ত আকাশে সে আকাশ চায় ।
আমার এ ভালবাসা, কে নিবি আয়।
বিরহ-সংগীত
মিলন হইতে দেবি বরঞ্চ বিরহ ভাল,
দেখিব বলিয়া আশা মনে থাকে চিরকাল।
নিরাশা নাহিক জানি,
• সদা শুনি দৈববাণী,
মৃত-সঞ্জীবনী ভাষা—“বাসিভাল! বাসিভাল”।
যে দিকে—যে দিকে চাই,
তােমারে দেখিতে পাই,
অনন্তু ব্ৰহ্মাণ্ড বিশ্ব বিশ্বরূপে কর আল’ ।
মিলনে বিরহ ভয়,
অাকুল করে হৃদয়,
চুম্বিতে চমকি উঠি নিশি বা পােহায়ে গেল।
৬ই আশ্বিন, ১২৯৪।
শেরপুর-ময়মনসিংহ।
সামান্য নারী
সামান্য নারীটা তার কত পরিমাণ ?
শূন্য করে গেছে যেন সমস্তটা প্রাণ ।
একটু গিয়াছে হাসি,
একটু গিয়াছে কান্না,
একটু আঁখির জলে মাখা অভিমান ?
একটু চুম্বন গেছে,
একটু নিশ্বাস দীর্ঘ,
একটুকু আলিঙ্গন তৃণের সমান।
.
কস্তুরী
যা গেছে, সে ক্ষুদ্র গেছে,
একাণ্ড ব্রহ্মাণ্ড আছে,
তবে যে ভরে না কেন তার শূন্ট স্থান।
সামান্য নারীটা তার কত পরিমাণ
২শ তা-১২১৬ সন ।
শীতলপুর বাগান বাটী-শেরপুর,
ময়মনসিংহ।
চাহিনা
চাহিনা-ঘৃণিত প্রেমে নাহি প্রয়োজন,
জীবনের যত সাধ হয়েছে পূরণ !
নাহি আর উচ্চ আশা, চাহিনারে ভালবাসা,
চাহিনা দেখিতে তাের চারু চন্দ্রানন।
বুঝিয়াছি মিছামিছি, পাষাণে পরাণ দিছি,
বিনিময়ে চিরদিন করিব রােদন।
বুঝেছি বুঝেছি হায়, কোটি যুগ তপস্যায়,
এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত হবেনা কখন,
এমনি-এমনি ভাবে, জীবন বহিয়া যাবে,
তীরে তীরে চিচিহ্ন করি প্রক্ষালন।
ধনিয়া দিগন্ত সব, নিরাশার হাহাব,
এমনি হৃদয়ে নিত্য করিবে গর্জন।
চাহিনা—ঘণিত প্রেমে নাহি প্রয়ােজন?
চাহিনা
'আহা-
কত কাল পাষাণি রে এই ভবে আর,
গণিব রজনী দিৱা তিথি মাস বার ?
চাহিয়া চাহিয়া হায়, রবিশশী অস্ত যায়,
তথাপি দুঃখের দিন যায় না আমার ;
আকাঙ্ক্ষা বাসনা যত, গিয়াছে জন্মের মত,
হৃদয়ে দগধ-চিহ্ন সুধু আছে তার।
এত ধ্বংসরাশি বুকে, প্রাণ পূর্ণ এত দুখে,
প্রেমের নন বন এত ছারখার,
তথাপিতথাপি হায়, জীবন নাহিক যায়,
সেই ভমরাশি পানে চাহি বারবার,
কাতরে করুণা ভিক্ষা করিহে তােমার ?
চোখে একটু দেখা বেশী কিছু না রে,
দূরে আঁড়াইয়া থেক’, চেয়ে দেখ বা না দেখ
আমিই দেখিয়া নিব পাষাণি তোমারে !
কমােনা একটা কথা, দেখিব সে নীরবতা,
এত যত্নে এত দিন পূজিয়াছি কারে ;
দেখিব পাষাণময়ী, প্রেম কই—প্রাণ কই,
এতদিন প্রাণময়ী ডাকিয়ছি যারে।
দেখির অমৃত লতা, কোথা গেল বিষন্ন,
বিষাক্ত হৃদয় নিয়ে পরখিব তারে।
দেখে চিনি কি না চিনি, দেখি লে সরােজিনী।
1
৪০
কস্তুরী
মানিনী মানসসরে উষার তুষারে!
চোখের একটু দেখা বেশী কিছুনা রে !
সামান্য দেখাটী সেই শুধু প্রাণ চায়,
দেখিব চোখের দেখা, দাড়াইয়া থেকে একা,
প্রেমের সুবর্ণরেখা বিরহ-বেলায়।
ও শরীর কদাচিত, করিব না কলঙ্কিত,
নরের মলিন করে ছোঁবনা তােমায়।
গায়ের বাতাস মাের, গায়ে না লাগিবে তাের,
ভঁড়াব যে দিক দিয়া বায়ু বয়ে যায়।
অতি যত্নে-সাবধানে, অতিদূর ব্যবধানে,
ত্রিদিব স্বপন সম দেখিব তােমায় !
চোখের একটু দেখা শুধু প্রাণ চায় ?
জানি না--
এই বাসনাটী ভর কত রত্ন ধন,
সকলি লভিব যেন হইলে পূরণ !
যাহা জগতের প্রিয়, যাহা কিছু অদ্বিতীয়,
যাহা মানষের ভাগ্যে ঘটে না কখন,
যে সুখ-সম্পদ রাশি, রশিশী অভিলাষী,
গগনে গগনে বার করে অন্বেষণ !
এ বাসনা ভরা তাই, যত চাই তত পাই,
দেবের সৌভাগ্যে ইহা পুরে কদাচন।
ধরার দরিদ্র হায়, আজি সে সম্পদ পায়,
-
–
চাহিনা
s
পাষাণি করুণা যদি কর বিতরণ।
অই বাসনাটা ভরা কত রত্ন ধন ।
}
যা-
কি কাজ স্মৃতির জ্বালা বাড়াইয়া আর ?
উপরে পড়ক ছাই, যাতনা ভুলিয়া যাই,
দেখিয়াছি এই রূপে নিভিতে অঙ্গার।
হায় রে জানি না আগে, যে আগুন প্রাণে লাগে,
কিরূপে কেমনে নিবে যাতনা তাহার,
কিরূপে কেমনে নিবে, কিসে প্রাণ জুড়াইবে,
কে দিবে বলিয়া হায়, এত দয়া কার ?
সত্যই কি অন্বেষিলে, ধরায় করুণা মিলে,
তা হলে কি হত হায় দহিতে আমার ?
জানে না নিঃস্বার্থ দয়া স্বার্থের সংসার।
৭
থাকুক নিঃস্বার্থ দয়া,—বিনিময় করি,
নাহি মিলে প্রতিদান, কোথা এ বিচার স্থান ?
পুণ্যের পৃথিবী এই ? হরি। হরি! হরি।
সুধা বলে বিষ দেয়, দিবে বলে প্রাণ নেয়,
আর না ফিরায়ে দেয় যদি প্রাণে মরি।
প্রেমে এত প্রবঞ্চনা, আত্মদানে বিড়ম্বনা,
কধির প্রার্থনা করে প্রতি ভয়ঙ্করী।
দেখিয়া পরের দুখ, চিরিয়া না দেয় বুক,
আত্মহত্যা নাহি করে করুণা সুন্দরী!
।
৪২
কস্তুরী
ছিন্নমস্তা রূপে হায়, বিনাশিছে আপনার
বিশ্বাস বিশ্বাসঘাতী আপনা পারি।
সকলি—সকলি কি রে, ছুইলে এ পৃথিবীরে,
শিখে প্রবঞ্চনা পাপ ছলনা চাতুরী ?
নাহি মিলে প্রতিদান বিনিময় করি ?
১২৯-ময়মনসিংহ।
এই এক নূতন খেলা।
আয় বালিকা খেলবি যদি, এই এক নূতন খেলা!
রেখে দে তাের টোপাঠালি,
সারা দিনই খেলি খালি,
মাটীর বেনুন মাটীর ভাত,হাত ধুইয়ে ফেলা ?
পুতুল টুতুল রেখে দিয়ে,
চল বকুলের বনে গিয়ে,
“বৌ বৌ বৌ খেলি মাের ফুলল-সন্ধ্যা বেলা !
আয় বালিকা খেলবি যদি, এই এক মূতন খেলা!
আয় বালিকা থেবি যদি, এই এক নূতন খেলা ।
“না ভাই! তুমি দুষ্ট, বড়,
আঁচল টেনে আকুল কর,
ভােমার কেবল ঘােটা খুলে উলা করে ফেলা।
চুপ চুপ চুপ, কনে কারে, এই এক মূতন খেলা!
এই এক নূতন খেলা
০
আয় বালিকা খেলবি যদি, এই এক নূতন খেলা!
“না না, আমি তােমার সনে,
যাবনা আর বকুল বনে,
চখে মুখে বুকে তুমি ফুল দে’ মার’ ডেলা?”
চুপ চুপ চুপ, কসনে কারে,-এই এক নূতন খেলা ।
৪
আয় বালিকা খেলবি যদি, এই এক মূতন খেলা ।
“তােমার কেবল কুসুম খোঁজা,
কাণে গেঁজা, খোপায় গোঁজা,
আমি অমন বইতে নারি ফুলের বােঝা মেলা !”
চুপ চুপ চুপ, কনে কারে, এই এক নূতন খেলা ।
আয় বালিকা খেলবি যদি, এই এক নূতন খেলা।
“তােমার সনে গেলে ছাই,
সকাল আতে ভুলে যাই,
ভয়ে মরি এলা যেতে সবুজ সন্ধ্যা বেলা!”
চুপ চুপ চুপ, কনে কারে—এই এক নুতন খেলা!
আয় বালিকা খেবি যদি, এই এক নূতন খেলা!
“তুমি কেবল বনে যেয়ে,
মুখের পানে থাক চেয়ে,
লজ্জা করে। আর যাবনা নিত্যি সন্ধ্যা বেলা।।
চুপ চুপ চুপ্ , কনে কারে—এই এক নূতন খেলা।
৪৪
কস্তুরী
৭
আয় বালিকা খেবি যদি, এই এক নুতন খেলা ।
“তুমি বড় লক্ষ্মীছাড়া,
ছেড়ে দেওনা
খাড়াখাড়া,
আকুল করে বকুল গাছে কোকিল ডাকে মেলা!”
চুপ চুপ চুপ , কনে কারে-এই এক নূতন খেলা!
৮
আয় বালিকা থেবি যদি, এই এক নূতন খেলা ।
“না ভাই তুমি দুষ্ট বড়,
এক্টী বলে আরটী কর,
কঁকি দিয়ে কোলে নিয়ে চুমাে খেয়ে গেলা!”
চুপ চুপ চুপ, কনে কারে—এই এক নূতন খেলা ।
২৫শে চৈত্র-১২৯৭ সন।
শেরপুর, ময়মনসিংহ।
আজ কারে মনে হয় ?
১
আজ কারে মনে হয় ?
মেঘাচ্ছন্ন দশদিশি, ভেদ নাই দিবা নিশি,
অবিরল ঝরে জল অন্ধকারুময় ।
আজ কারে মনে হয় ?
চপলা চমকে ঘন, ঘন ঘন গরজন,
কে জানে আমার কেন আঁখি জলময় ।
আজ কারে মনে।
আজ কারে মনে হয়
৪৫
ভিজিতেছে তরুলতা, কাঁপিতেছে ফুল পাতা,
নীরব নিঝুম এই উপবনময়।
আজ কারে মনে হয় ?
৪
পিছনে ধানের খেত, বেঙ ডাকে ‘তে গেত
ভাসিয়া যেতেছে মাঠ জলে জলময়।
আজ কারে মনে হয় ?
সম্মুখে মুকুরে জল, কুমুদ কলার দল,
ভাসিয়া রয়েছে তাহে রক্ত-কুবলয় !
আজ কারে মনে হয় ?
বাগানের এক পাশে, কেতকী কুসুম হাসে,
ভাদরে বিদেশী বলে বিদরে হৃদয়।
আজ কারে মনে হয় ?
৭
মেউয়া ডাকে পিপী ডাকে, বক উড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে,
দিবালা পরিছে রজত-বলয় ।
আজ কারে মনে হয়
একটু দেখিনা আলাে, আকাশ তরল কালাে,
অন্ত গলিয়া যেন গেল সমুদয় ।
আজ কারে মনে হয় ?
কস্তুরী
ভিজা বুক ভিজা মন, ভিজা গেছে দুনয়ন,
সমস্ত পৃথিবী শুদ্ধ ভিজা সমুদয় ।
আজ কারে মনে হয়?
পরবাসে-বনবাসে, এ ভরা ভাদর মাসে,
কে থাকে বরষা দিনে একা এ সময় ?
আজ কারে মনে হয় ?
২৭শে ভাদ্র, ১২৯৬ সন।
ইতলপুর বাগানবাটী-শেরপুর,
ময়মনসিংহ।
দিনান্তে
একবার
দিনান্তে দেখিতে দিও চারু চন্দ্রানন,
প্রতির প্রতিমা প্রিয়ে করুণার মন।
সংসারের শত দুখে,
যে যাতনা জ্বলে বুকে,
ভুলিব প্রাণের সেই তীব্র জ্বালাতন।
দেখিব নয়ন ভরি,
দাড়াইও প্রাণেশ্বরি,
দেখিব ললা কি করিয়া চুরি কর মন!
দিনান্তে
৭
ইন্দ্রজাল রূপরাশি,
দেখায়ে ফুলের হাসি,
দেখি কেমনে কর পরেরে আপন।
দিনান্তে দেখিব তব চারু চানন !
জীবনের এ দুর্দিনে ঘাের অন্ধকারে,
কে বলিবে কত পুণ্যে,
দেখিলাম দূর শূন্যে,
দয়াময়ী ধ্রুবতারা হাসিতে তােমারে !
দেখিনু স্বর্গীয় রূপে,
হৃদয়ের অন্ধকূপে,
ঢালিতে কৌমুদী শুষ্ক প্রতি পারাবারে।
নিরাশার বরবে,
যে বুক বিদীর্ণ হবে,
কোকিল-কোমল-কষ্ঠে জাগাইলে তারে,
দিনান্তে দেখিব প্রিয়ে সরলা তােমারে।
প্রাণমন দগ্ধ এই ঘাের মরুভূমি,
এই মরু পিপাসায়,
বিশুষ্ক কণ্ঠের হায়,
একটী সলিল বিন্দু সুশীতল তুমি,
এ পাপ সংসার হায় ঘাের মরুভূমি!
প্রফুল্ল কুসুমভা,
প্রাণে ঢালল অনিবার,
৪
কস্তুরী
সঞ্জীবনী আশালতা ছায়াময়ী তুমি,
এপাপ সংসার হায় ঘাের মরুভূমি।
৪
দিনান্তে দেখিতে দিও চারু চন্দ্রানন,
ভরিবে এ শূন্যবুক শূন্য প্রাণমন!
আরাে যে বাসনা আছে,
বলিব আসিলে কাছে,
কি কাজ আগেই তাহা বলিয়া এখন ?
, না, না, ও তীক্ষ্ণধার,
বুকে ঢাকা তরবার,
পারিনা যে না বলিয়া কেটে যায় মন।
প্রাণের লুকান কথা—একটা চুম্বন!
খাবণ-১২৮৯ সন।
ময়মনসিংহ।
মেঘ
অই মেঘ আসে।
আমি যে দেখিগাে খালি, ও যেন মনের কালী,
উড়িয়া বেড়ায় কার সুদীর্ঘ নিশ্বাসে।
আমি যেন শুনি কার, বুক-ভাজা হাহাকার,
জগতের অবহেলা ঘৃণা উপহাসে।
অই মেঘ আসে ।
--
৪৯
অই মেঘ আসে।
যেন সে প্রাণের জ্বালা, অগিছে তড়িত মালা,
রহিয়া রহিয়া হায় নব নীলাকাশে,
জমিয়া জমিয়া তারি, যেন সে আথির বারি,
পেয়ে করুণা কার দেশে দেশে ভাসে।
অই মেঘ আসে !
অই মেঘ আসে ।
আমি যেন দেখি কার, দুৰ্ব্বহ জীবন ভার,
শ্লথ মন্দ অবসন্ন হতাশে নিরাশে,
উন্মাদের মত ছুটে, পাহাড়ে সে মাথা কুটে,
মৃত্যুর অপেক্ষা করে মহা অভিলাষে।
অই মেঘ আসে।
৪
অই মেঘ আসে।
ও যেন মৰ্ম্মের কথা, ও যেন মৰ্ম্মের ব্যথা,
বলিবে বলয় , রে রেখেছিল আশে,
সে যেন দিলনা কাণ, আহত সে অভিমান,
করিতেছে আত্মহত্যা মহা অবিশ্বাসে !
অই মেঘ আসে!
অই মেঘ আসে।
ও যেন অন্তিম-হিক্কা, ও চাহেনা দয়া ভিক্ষা,
নাহি চাহে অনুগ্রহ কৃপা করুণা সে,
কস্তুরী
আপনা ফিরায়ে লওয়া, তেজে লাজে ভন্ম হও,
আপনার চেয়ে যেন বেশি ভালবাসে।
অই মে আসে।
অই মেঘ আসে।
পরাণে বিষাদ এত, কাহারে বলেন সে ত,
গােপনে রাখিতে চায় ঘাের অট্টহাসে,
নীচতার মহাকূপ, যেন উচ্চ অপরূপ
সমুদ্র হইয়া উড়ে উপর আকাশে।
অই মে আসে।
৭
অই মেঘ আসে ।
সে চাহে আঁধারে থাকে, আপনা লুকায়ে রাখে,
জগতের দূরতম-দূরে এক পাশে,
সে দেয় শশাঙ্ক রবি, নিয়ে আলােক সাক,
নয়নের অন্তরালে লুকায় উদাসে !
অই মেঘ আসে ।
৮
অই মেঘ আসে !
জগতে নাহি যে আর, আপনি ও আপনার
নিষ্ঠুর সংসারে কেহ ভুলে না সম্ভাষে,
পরদুখে সুখী যারা, ময়ূর ময়ুরী তারা,
দেখিয়া উহারে দেখ নাচিছে উল্লাসে।
অই মেঘ আসে।
বৈশা।
অই মেঘ আসে ।
যদি সে বরষে তার, করুণ নয়নাসার,
ভুলিয়া কখনাে আহা অদম্য উচ্ছ্বাসে,
বিশ্বাসঘাতক জাতি, চাতক উল্লাসে মাতি,
রহিয়াছে উৰ্দ্ধমুখে তারি পান আশে!
অই মেঘ আসে।
অই মেঘ আসে।
পাঁজর ভাঙ্গিয়া তার, বাহিরিলে হাহাকার,
করুণায় বিশণী চমকে তরাসে,
কর্দমে ভেকের দল, করে ঘাের কোলাহল,
কুরুচি বলিয়া হায় ক্রোধে উপহাসে।
অই মেঘ আসে!
এই চৈত্র-১৬৩১ সৰ।
মধুপুর, E. 1. R.
বৈশাখে ।
বৈশাখে বহে ঝড়,
শবদ ভয়ঙ্কর,
ভাঙ্গিছে বাড়ী ঘর,
যেতেছে খড় উড়ি,
কাচা ও পাকা আম,
আপাকা কাল জাম,
কস্তুরী
সকলি ডালে মূলে
ফেলিছে ভাঙ্গি চুরি!
দু’হাতে টেনে ছিড়ে,
পল্লব তরুশিরে,
বাছে না লতা পাতা,
বাছে না ফুল কুঁড়ি,
আঁধার শূনা মাঠ,
আঁধার পথ ঘাট,
পড়েছে জামরুল
তলাতে ঝুরি ঝুরি!
প্রলয় মেলে পাখা,
গভীর কালী মাখা,
গরজে নীলমেঘে,
আকাশে ঘুরি ঘুরি,
অথবা দৈত্যগণ,
করিয়ে প্রাণপণ,
করেছে অবরোধ
সোণার সুরপুরী ।
তাই সে দেবপুরে,
তাই সে দেবাসুরে
সুধার লাগি যেন
করিছে হুড়াহুড়ি,
চপলা সুরবালা,
লইলে জয়মালা,
বৈশাখে ।
ভীষণ যুণ মাঝে
খেলিছে লুকোচুরি!
বসিয়ে ওশােরায়,
আঁধার দেখে তায়,
জৈমিনি বলে ডাকে
সভয়ে বুড়াবুড়ী,
মেয়েরা দলে দলে,
ছুটেছে আমতলে
লইয়া সাজি ডালা-
কি শােভা কি মাধুরী
কেতন ফুল-রথে,
আঁচল উড়ে পথে,
টমকে আগে আগে
দৌড়িছে এক ছুড়ী,
ত্রিদিব জয় করা
গৌরব
পূরেনি এখনও
উনিশ কিবা কুড়ি!
কি জানি কাখে কাখে,
গােপনে চেপে রাখে,
হাসিয়া কুটপাট,
দিলে যে শুড়শুড়ি,
বাহিরে না না, না না,
ভিতরে যােব আনা,
বুক ভরা,
কস্তুরী
বাজে সে তানা, নানা,
মধুর তানপুরী।
আরেক ওশােরায়
বসিয়ে মােহ যায়,
দেখিয়ে বুড়া পতি
সে রূপ সে মাধুরী,
তুফানে লজ্জা লাজ
উড়িয়া গেছে আজ,
লেগেছে সুষমার
পূর্ণিমা পূরাপূরি?
শিরার মরা গাঙ্গে,
জোয়ারে পার ভাঙ্গে,
যৌবন দিতে চাহে
ফিরিয়ে হামাগুড়ি,
জরার পদতলে,
ঠেলিয়া নব বলে,
উঠিতে চাহে তার
বাসনা-গয়াসুরী ?
নিশীথ চিতাভূমে,
অনিন ছিল ঘুমে,
জগিয়া সেও দিছে
হৃদয়ে মােড়ামুড়ি,
বাহিরে ভাঙ্গা সৰ,
ভিতরে অভিনব,
বৈশাখে ।
কেমন মধুময়
প্রেমের সে চাতুরী!
ছিড়িয়ে পড়ে বোটা,
মুকুতা ফোটা ফোটা,
কেন সাদা সাদা
মেঘের শিল নুড়ি,
দেবতা করে পূজা,
যেন সে শ্বেতভুজা,
মাখিয়ে পারিজাতে
কুঙ্কুম ও কস্তুরী ।
লইয়ে কাখে ডালা,
হেলিয়ে আসে বালা,
যেন সে ফুলধনু
মদন আসে যুড়ি,
চাহিল, চাহিলাম,
হাসিল, হাসিলাম,
ফেলিয়ে গেল আম,
পরাণ করি চুরি!
আকূল লাজে হায়,
দুকুল নাহি পায়,
কেমন মনােহর
সে মােচড়ামুচুড়ি,
ঢাকিতে এক পাশ,
আরেক পরকাশ,
কস্তুরী ব্যাকুল-মেঘবাস- ভূধরে কি মাধুরী! থামিল জল ঝড়, প্রশান্ত চরাচর, অশান্ত আমি শুধু আজিও অলি পুড়ি, দেখিনে তারে আর, সরলা সে আমার, বছর হ’ল গত, ধিক ধিক্ চাকুরী । ২৫শে চৈত্র-১৩০১ সন । মধুপুর, E. I. R. পরনারী। আজ, সে যে পরনারী কেন তবে বল চঁাদ, দেখাও সে মুখ ছাদ, সে নবলাবণ্য-আভা-সুষমা তাহারি ? কেন নিতি নিতি আসি, দেখাও তাহার হাসি, হৃদয়-সমুদ্র সে কি সামালিতে পারি ? সে যে পরনারী! সে যে পরনারী। তােমরা কুসুমগণ, কেন সাধ অকারণ, মধুর অধর-সুধা লইয়া তাহারি ?
পরনারী।
৫৭
কেন হে গােলাপ লাল, পেতে দেও তারি গাল,
তামি কি তাহারে আর চুমাে খেতে পারি ?
সে যে পরনারী।
৪
সে যে পরনারী।
তারি আলিঙ্গন দিয়া, ধরিও না জড়াইয়া
যদিও--যদিও ‘কুসু’ আছিল আমারি,
চুয়ােনা লতিকা কেহ, আমার এ পাপ-দেহ,
জনমের মত আজ দেহে ছাড়াছাড়ি।
সে যে পরনারী।
৪
সে যে পরনারী।
তােমরা জলদ কুল, রাখিও না তার চুল,
ও নবীন নীলিমায় গগনে বিথারি,
নিরালা একেলা পেয়ে, চুপে চুপে পাছে যেয়ে,
আর কি সে ঝিঙ্গাফুল গুঁজে দিতে পারি ?
সে যে পরনারী।
সে যে পরনারী।
তাহার ললিত গানে, আধা সাধা আধা মানে,
বষিয়া স্বর-সুধা মুনিমনােহারী,
নিশীথে কোকিলগণ, কেন কর সম্ভাষণ ?
কাণাকাণি করিবে যে লােক-পাপাচারী।
সে যে পরনারী।
r
কস্তুরী
সে যে পরনারী।
কেন গাে চপলা তার, চপল আখির ঠার,
হানিতেছ বার বার দিদাহকারী ?
ঘলিছে পুড়িছে মন, কেন কর জ্বালাতন ?
আর ত তাহার পানে চাহিতে না পারি,
সে যে পরনারী।
সে যে পরনারী!
তাহারি সুরভি শ্বাস, মলয়ায় কর বাস,
তুমি কিহে সমীরণ ফুলবনচারী?
চুয়ােনা ছুমােনা তবে, চুইলে যে পাপ হবে,
আর কি তাহার হাওয়া পরশিতে পারি ?
সে যে পরনারী।
৮
সে যে পরনারী।
মধুময় পুষ্পদোল, তাহারি পুষ্পিত কোল,
জম্বীর কুসুমে ফোটা যৌবন তাহারি,
বসন্ত কি মধু মাসে, আমারেই দিতে আসে ?
সে অঙ্কে কলঙ্ক ভরা আজি দু’জনারি।
সে যে পরনারী।
সে যে পরনারী।
তােমরা কি হে নক্ষত্র, জ্যোতির্ময় প্রেমপত্র,
অন্ধকারে সন্ধ্যাদূতী দিয়ে গেছে তারি ?
পরনারী।
আর সে প্রণয়-কথা, সে আদর সে মমতা,
চুপে চুপে চুরি করে পড়িতে না পারি,
সে যে পরনারী।
সে যে পরনারী
কেন সে আমার তরে, সারানিশি কেঁদে মরে ?
সজল সরােজ-আখি ঊষা বলে তারি ।
দেখিয়া যন্ত্রণা সার, দুর্ভাগা আমি কি আর,
চুমিয়া ও চারু-চখ মোছাইতে পারি ?
সে যে পরনারী!
সে যে পরনারী
প্রাণভরা প্রিয়ধন, বুকভরা আভরণ,
যদিও সে একদিন আছিল আমারি,
তবুও হয়েছে পর, শতজন্ম অগােচর,
দু’জনার নামে আজ কলঙ্ক দোহারি।
সে যে পরনারী।
সে যে পরনারী।
যত কিছু উপহার, সব অপবিত্র তার,
মিলনের স্বর্গ সেও নরক আমারি,
কেবল পবিত্রতম, তার সে বিরহ মম,
।
কস্তুরী
বঙ্গীয় অনল সম প্রাণদাহকারী।
পুড়িয়া হইতে ছাই, আদরে নিয়েছি তাই,
হেন প্রেম-উপহার ভুলিতে কি পারি ?
কহিও সে ‘কুসুমেরে সে যে পরনারী।
১২ই চৈত্র-১২৯৭ সন।
শেরপুর, ময়মনসিংহ।
কবি-বৈজ্ঞানিক।
ক্ষিতি অপ তেজ বায়ু ব্যোমের অধিক,
না জানিত পূর্ধ্বতন আর্য্য-বৈজ্ঞানিক।
কিন্তু এবে উহা ছাড়া নব উপাদান,
অনেক চেষ্টার পরে হয়েছে সন্ধান।
কামিনীর কমনীয় মুখ মনােহর,
সুপবিত্র শান্তি শোভা লাবণ্য সুন্দর,
পার্থিব পদার্থ দিয়া কভু কদাচিত,
অতুল এ রূপ রাশি হয় নি সৃজিত।
পুষ্পবাস শশীসুধ-শারদ জ্যোৎস্নায়,
খুজে ও মােহিনীশক্তি নাহি পাওয়া যায়।
ভিন্ন উপাদানে উহা হয়েছে নির্মাণ,
দেখিতেই উছলিয়া উঠে মনপ্রাণ।
অদ্ভুত এ ভূত যাহা স্ত্রীমুখে অধিক,
আবিষ্কার করেছেন কবি-বৈজ্ঞানিক।
৮ই শ্রাবণ-১২৯• সন।
কলিকাতা।
কে বেশি সুন্দর ?
কে বেশি সুন্দর ?
বালিকা যুবতী—দুই, কারে দেখি কারে থুই,
আমার নিকটে লাগে দুই মনােহর।
লাবণ্যে সৌন্দর্য্যে দোহে, প্রাণ মােহে-মন মােহে,
বাঁশবনে ডােম কাণ’ তেমনি ফাফর!
কারে বেশি ভালবাসি, কে বেশি সুন্দর ?
२
কে বেশি সুন্দর ?
যুবতীর ভরা গায়, লাবণ্য উছলে যায়,
নয়নে নলিন নীল, মুখে শশধর।
বালিকা তারকা হাসে, নিষ্কলঙ্ক নীলাকাশে,
সদা শুক্লপক্ষপূর্ণ ক্ষুদ্র কলেবর।
কারে রাখি কারে দেখি, কে বেশি সুন্দর ?
কে বেশি সুন্দর ?
শতমুখে ভালবাসে, তরঙ্গে মাতঙ্গ ভাসে,
যুবতী পদ্মার মত বহে খরতর।
ফুলবনে করে খেলা, প্রদোষ প্রভাত বেলা,
অনাবিল প্রেমধারা বালিকা নিঝর।
কারে থুয়ে কারে দেখি, কে বেশি সুন্দর ?
৪
কে বেশি সুন্দর ?
প্রভাতের শতদলে, পরিপূর্ণ পরিমলে,
কস্তুরী
যুবতী সহস্ৰকরে ফেটে মনােহর।
শিশিরের শেফালিকা, নিশি-শেষে সে বালিকা,
খসে পড়ে ছোয় পাছে একটা ভ্রমর।
করে ধুয়ে কারে দেখি, কে বেশি সুন্দর ?
কে বেশি সুন্দর ।
যুবতী বিজলী বালা, ত্রিভুবন করে আলা,
সগর্বে চরণাঘাতে ভাঙ্গে ধরাধর !
বালিকা জোনাকী হাসে, স্নেহের কিরণে তাসে,
শিখেনি অশনি-লীলা আখি ইন্দির।
কারে বেশি ভালবাসি, কে বেশি সুন্দর ?
*
কে বেশি সুন্দর ?
পদ্মবন পায় ঠেলি, রাজহংসী করে কেলি,
যুবতীর ঢেউয়ে কঁপে মানসের সর!
লাজুক বালিকা টুনী, চুরি করে গান শুনি,
ত্রিদিবের এক ফোটা দ্রব-সুধাকর !
কারে বেশি ভালবাসি, কে বেশি সুন্দর।
৭
কে বেশি সুন্দর ?
আরক্ত সন্ধ্যার রবি, যুবতীর মুখ-ছবি,
অভিমানে হয় স্নান বিবাদে কাতর,
বালিকা উষার মত, ফোটে যত শােভা তত,
রাঙ্গা মুখে দেখা যায় ভাঙ্গা ভাঙ্গা ডর!
কারে বেশি ভালবাসি, কে বেশি সুন্দর ?
কে বেশি সুন্দর ?
৮
কে বেশি সুন্দর ?
রাহু যেন উৰ্দ্ধশ্বাসে, দু’বাহু তুলিয়া আসে,
রমণী তেমনি আসে বুকের উপর ।
দূরে যদি শব্দ শােনে, বালিকা লুকায় কোণে,
খনির মণির মত ম্লান মনােহর।
কারে বেশি ভালবাসি, কে বেশি সুন্দর ?
কে বেশি সুন্দর ?
জুমার রাক্ষসী নারী, শতজন্ম অনাহারী,
দিনে রেতে খেয়ে চুমা ভরেনা উদর!
বালিকা অত না বােঝে, চুমা খেতে চখ বােজ,
ছুইতে শিহরি উঠে কদম্ব-কেশর।
কারে বেশি ভালবাসি, কে বেশি সুন্দর।
কে বেশি সুন্দর ?
যুবতী আসিতে ঘরে, গৃহ কঁপে পদভরে,
বিজয়ী বীরের মত নির্ভয় অন্তর ।
বালিকা বলে কথা, কোলের বালিস যথা,
পিছ দিয়া ফিরে থাকে লাজে জড়সড় ।
কারে বেশি ভালবাসি, কে বেশি সুন্দর?
২৬শে চৈত্র=১২৯৮ সন।
শেরপুর, ময়মনসিংহ।
বিধাতার অনুগ্রহ।
কেন মুখ হায় হায়, বৃথা নিল বিধাতা
কমল গােলাপ গায় কাঁটা দিছে বলিয়া ?
লইয়া কুসুম-শোভা, জগজন মনােলােভা,
দু’মাসে বসন্ত কাল যায় যা চলিয়া।
প্রকৃতির শ্যামবুকে, কোমল কুসুমমুখে,
নিদাঘে অনল রবি দিছে দি’ জ্বালিয়া,
শরতের সুধাকরে, শত-শুভ্র কলেবরে,
দিয়েছে কলঙ্ক-কালী, আরাে দি’ ঢালিয়া ।
বলনা কি ক্ষতি তায়, ও তে বা কি আসে যায়,
কেন নিন বিধাতায় ছল ছুতা ধরিয়া ?
দেও ধন্যবাদ সুখে,
নারীর কমলমুখে,
দেয়নি যে দাড়িগোঁফ অনুগ্রহ করিয়া ।
১২৮৮–১২৮৯ সন।
ময়মনসিংহ।
আমার কি দোষ ?
আমি যে বেসেছি ভাল, আমারি কি দোষ ?
তুমি যে দিয়েছ দেখা,
দাড়াইয়া একা একা,
আমারি কি দোষ ?
হৃদয়ে ঢালিয়া দিয়া সহস্র সন্তোষ ?
তুমি যে রয়েছ চেয়ে,
নিরালা একেলা পেয়ে,
ফুটিয়া পদ্মের মত প্রভাত-প্রদোষ ?
আমারি কি দোষ খালি ?
মিছে দেও গালাগালি,
ঠাকুরাণি, ঠেকাইয়া বৃথা -র রােষ ।
আমি যে বেসেছি ভাল, অগারি কি দোষ ?
আমি যে বেসেছি ভাল, আমার কি দোষ ?
তুমি যে এলায়ে চুল,
হেলাইয়া বক ফল
দাড়ালে নিকটে আসি- ভুল বেহে'-
আদরে লইলে নি,
হাতে টেনে হাত খানি,
বল না কেমনে জানি যে আপশোস ?
আমি যে বেসেছি ভাল, আমাবি কি দোষ ?
আমি যে বেসেছি ভাল, অামার কি দোষ ?
তুমি যে লিখিলে ছাই,
সে কি আর মনে নাই ?
তােমারি তােমারি আমি-কপা দেলখোস।
সে ত গো ফেলিনি ছিEে,
তােমারে দিয়েছি ফিরে,
কস্তুরী
এখনাে পরাণে বাজে নীরব-নির্ঘোষ ।
আমি যে বেসেছি ভাল, আমারি কি দোষ ?
৪
আমি যে বেসেছি ভাল, আমারি কি দোষ ?
তুমি যে চুমিলে ঠোটে,
আজো শিরা বেয়ে ওঠে,
আজিও তেমনি প্রাণ করে পরিতােষ !
তুমি যে দিয়েছ স্পর্শ,
শত সুখ শত হর্ষ,
আজিও উছলে তাহা উঠে হৃদকোষ।
আমি যে বেসেছি ভাল, আমার কি দোষ ?
আমি যে বেসেছি ভাল, আমারি কি দোষ ?
তুমি যা করেছ-পুণ্য,
সব গুলি দেষি শূন্য,
আমার সকল পাপ,—এত কি আক্রোশ ?
আগে ত বলনি পাপ,
আজ কর অভিশাপ,
দংশিয়া ফণীর মত শেষে ফোস ফোস !
আমি যে বেসেছি ভাল, অমারি কি দোষ ?
আমি যে বেসেসি ভাল, আমারি কি দোষ ?
এ বুদ্ধি কোথায় থুয়ে,
চুমা খেলে বুকে শুয়ে ?
আমারি কি দোষ ?
৬৭
এখন বিবাদ বটে, তখন আপােষ।
রমণীর মত আর,
দেখি নাই জানােয়ার,
কৃতঘ্ন বিশ্বাসঘাতী-নাহি মানে পােষ।
আমি যে বেসেছি ভাল, আমারি কি দোষ ?
৭
আমি যে বেসেছি ভাল, আমারি কি দোষ ?
আমি ত বাসিতে পারি,
তুমি যে তুমি যে নারী,
তুমিই কি এত দিন আছিলে উপােষ ?
আজি বা হয়েছ পর,
শতমৃত্যু-দূরতর,
গেছে সে উৎকণ্ঠা নয় গেছে কণ্ঠশােষ।
আমি যে বেসেছি ভাল, অমারি কি দোষ ?
৮
আমি যে বেসেছি ভাল, অমারি কি দোষ ?
তুমি যে রয়েছ চেয়ে,
নিরালা একেলা পেয়ে,
অমন আখির ঠারে কার থাকে হােস ?
অমন চাঁদের হাসি,
অধরে অমৃত রাশি,
কে না বল বাসে ভাল, কে না পরিতােষ ?
গােলাপী দুইটী গালে,
কে না ভোলে ? লালে লালে
কস্তুরী
একত্র শোভিছে যেন প্রভাতপ্রদোষ।
আমারি কি দোষ খালি ?
মিছে দেও গালাগালি,
ঠাকুরাণি, ঠেকাইয়া বৃথা কর রোষ ।
আমি যে বেসেছি ভাল, আমারি কি দোষ?
২রা জ্যৈষ্ঠ ১২৯৭ সন।
জয়দেবপুর, ঢাকা।
আমারি যে দোষ।
১
আমারি যে দোষ, ভালবেসেছি তাহায়।
সে যে কুরুচির হাড়ী,
বাঙ্গালী কুলের নারী,
নিরালা একা না পেলে ফিরে নারি চায় ।
নয়নে নয়নে কথা,
সে বােঝে না অশ্লীলতা,
বাঙ্গালীর বােক। বউ-বুঝনি কি যায় ?
আমারি যে দোষ, ভালবেসেছি তাহায় !
২
আমারি যে দোষ, ভালবেসেছি তাহায় !
সে যে পড়ে শাড়ী-ধূতি,
ফুটিয়া বোেয় জ্যোতি,
‘মারি কি দোষ ?' কবিতাটা পড়িয়া কেহ কেহ আমারি যে দোষ
বুৰিয়াছেন, তাহাই ইহাতে লিখিত হইয়াছে।
আমারি যে দোষ ?
২৯
এলােমেলাে চুল তার বাতাসে উড়ায়।
পাণ খায়-রাঙ্গা ঠোঁটে,
মুখ ভরে রক্ত ওঠে,
বাড় ভেঙ্গে খায় ভয়ে সুরুচি পলায়।
আমারি যে দোষ, ভালবেসেছি তাহায়।
আমারি যে দোষ, ভালবেসেছি তাহায়।
শােনে না অপরে যথা,
কোণে কাণে কম কথা,
সে বােঝেনা অশ্লীলতা আছে ইশারায় ।
ঘোমটার তলে হাসি,
চুরি করা জ্যোৎস্না রাশি,
অপবিত্র এর সম নাহি এ ধরায়,
আমারি যে দোষ, ভালবেসেছি তাহার !
অমারি যে দোষ, ভালবেসেছি তাহায়।
মনে মনে ভালবাসে,
লুকায়ে নিকটে আসে,
চুপে চুপে কঁাদে হাসে, পাছে শােনা যায় ।
আদরে ধরিয়া গলা,
থাক দুটো কথা বলা,
চুম্বনে সুরুচি তার চূর্ণ হয়ে যায় !
বােঝে না যে হতভাগী এত বড় দায় ।
কস্তুরী
আমারি যে দোষ, ভালবেসেছি তাহায়।
দিনে নাহি দেখি ঘরে,
রেতে আসে দু’পহরে,
সে বেরুলে তারি শােভা উষা পরে গায় ।
সে কালে বিদায় দিতে,
একটুকু বুকে নিতে,
শীলতা পড়িয়া সেই চাপে মারা যায়।
বােঝে না যে হতভাগী এত বড় দায়।
আমারি যে দোষ, ভালবেসেছি তাহায় ।
ঘোমটা লজ্জার লেপ,
খুলে সে না পরে কেপ’
করুণ আখিতে সে যে অরুণ ভুলায় ।
কচি খুকী-কঁচা হেম,
সংকোচে রাখে সে প্রেম,
বডিভরা ভালবাসা লেডী সে না হয় ।
আমারি যে দোষ, ভালবেসেছি তাহায় !
আমারি যে দোষ, ভালবেসেছি তাহায় !
সে আননে-সে কুসুমে,
কাম জাগারতি ঘুমে,
ছি ছি ছি! তারে কি অার চখে দেখা যায়
আমারি যে দোষ।
সে পারে না ‘রুম্ রােজ
রাখে না রুচির খােজ,
বদনে মদন-ভস্ম পাউডার শােভায়,
সে করে না কামজয় দিগ্বিজয় হায় !
আমারি যে দোষ, ভালবেসেছি তাহায় !
সে জানে না প্রতৃিভাব,
সে জানে না ‘ফিরি লাভ’
পরপুরুষের ছায়া দেখে ভয় পায় ।
যায় না বাগান-পাটী,
ভেরি আগ্নি-ভেরি ডাটি,
ইয়ারের ডিয়ারের চীয়ারে ডরায়।
কোণে বসে ভালবাসে, শীলতা কোথায় ?
আমারি যে দোষ, ভালবেসেছি তাহায় !
জোরে সে জানে না কথা,
লাজে গলে ননী যথা,
সাক্ষ্মণ লেকচার দিতে পারে না সভায়।
সে জানে না সাম্যনীতি,
প্রেমে ধর্মে মাখা গীতি;
ধৰ্ম্মে এক প্রণয়েতে ‘অনন্ত যথা,
দীপ্ত যুথা গ্যাসালােকে,
পাপ অনুতাপ শোকে,
१२
কস্তুরী
পবিত্র প্রণয়ী যথা শত চখে চায়,
গেলনা সে হতভাগী সমাজে তথায়।
নিরাকার নাহি বুঝে,
ইতর ক্ষেতর’ পূজে,
উপবাসে পিপাসায় সারাদিন যায় !
একটু মাখন রুটি,
চা কি কফি-ডিব দু’টী,
অভাগিনী একটু না ব্রেকফাষ্ট খায় ।
কি মজা সমাজে গেলে বুঝিল না হয় ।
সে ত অতি দূরে দূরে,
স্বপনের মত ঘূরে,
নিজের চরণ-শব্দে নিজেই ডরায়।
অতি আস্তে চুপে চুপে,
যদি আসে কোন রূপে,
চুরি করে শুধু সে যে চুমাে খেতে চায়।
বােঝেনা যে হতভাগী, এত বড় দায় ।
আমারি যে দোষ, ভালবেসেছি তাহায় ।
সে করেনি বিএ পাশ,
বেথুন-কেতনে বাস,
করেছে বাসর-বাস বিয়ে কঁাসে হায় !
সে জানে না ক্লিওপেট্রা,
মেরীরাণী এটু সেট্রা,
পবিত্র প্রণয় তবে শিখিবে কোথায় ?
আমারি যে দোষ?
৭৩
সে লেখে ‘তোমারি আমি,
প্রাণময় প্রিয় স্বামি।
বােদ বান নাহি খেলে তার কবিতায়।
' দেয় নি সে কোর্টশিপে,
বেছে নিতে টিপে টিপে
ফাটন্ত যৌবন-ভরা জাকেটে জামায় ।
সে বলে না সাদাসিদে,
মুখে লাজ পেটে খিদে,
দূরে দূরে চুরি করে দেখিতে সে চায়।
আঁধারে জোনাকী কিবে,
মনােহর জ্বলে নিবে,
কনকের কণা যেন খণেকে হারায়,
বােঝেনা যে হতভাগী পাপ কত তায়!
আমারি যে দোষ, ভালবেসেছি তাহায়।
কিনে দিনু উল সূতা,
বুনিল মােজা যুতা,
যত করে ছল ছুতা কত কব তায়।
পাইল পুরস্কার,
করিল থিয়েটার,
গেল সে একদিন অবল-মেলায় ।
এত উন্নতির দিনে,
নাহি দেখি তারে বিনে,
ফিটেনে চড়িয়া যে না ইডেনে বেড়ায়।
৭
।
৭৪
কস্তুরী
যত লেডী যত মিস,
কার না রয়েছে কি-
মুখভ্রষ্ট-ফুলে ফুলে পাতায় পাতায় ।
সে আছে আঁধার কোণে,
কারাে কথা নাহি পােন,
ভয়ে মরে রবি শশী দেখে পাছে তার।
কে জানে যে কত কুড়ি,
সে করেছে চুমাে চুরি,
দিন নাই রাত নাই—প্রদোষ উষায়।
আমারাে কুরুচি বেশি,
তারি সনে মেশামেশি,
শুনিয়া সুরুচিদের সূচী বিধে গায়।
বােঝেনা যে হতভাগী এত বড় দায়।
আমারি যে দোষ, ভালবেসেছি তাহায়।
এবে সে যে দেশে আছে,
কয়ে দিব কার কাছে,
থাকিলে সমাজ তথা সেথা যেন যায়।
এ এ, বি এ, পাশ হবে,
বিশেও আবিয়ে রবে,
মিথুন-মেলা-কোর্টশিপ তায়।
স্বর্গ-মন্দাকিনী পাশে,
চৌরঙ্গীর শ্যাম ঘাসে,
আনন্দে নন্দনে যেন বেড়িয়া বেড়ায়।
বেশি পুণ্য কার ?
৭৫
মেনকার নাচঘরে,
থিয়েটার যেন করে,
যৌবন-জুবিলি দেয় দেবের সভায় ?
• আর যেন দেবপুর,
করে না সে চুমাে চুরি,
কুরুচি ভাসিয়া যেন আসে না পদ্মায়।
যেন অশ্লীলতা দোষে,
আর নিন্দা নাহি ঘােষে,
ঠাকুরাণী না ঠেকায় ফিরে পুনরায় ।
কয়ে দিব দেবদেশে যদি কেহ যায় ।
৩•শে শ্রাবণ-১২১৭ সন ।
জয়দেবপুর, ঢাকা।
বেশি পুণ্য কার ?
চরণ নূপুর,মল, পাদপদ্ম-সুবিমল,
নিতম্ব-বিলম্বী হৈম চারু চন্দ্রহার,
কটিতে কিঙ্কিণী সাজে, রুনু রুণু রুণু বাজে,
কে জানে ও হাসি কিম্বা লােদন তাহার!
শ্রবণে কুণ্ডল, দুল, নাসায় নােলক, ফুল,
সীমন্তের সিথী যেন গাথা তারকার,
হাতে চুরি, বাজু, বালা, হৃদয়ে মুকুতা মালা,
কমলে শােভিছে যেন নিশির নীহার।
বেড়িয়া জলদ চুল, শশাতে প্রজাপতি কুল,
৭৬
কস্তুরী
যুবতীর অষ্ট অঙ্গে অষ্ট অলঙ্কার,
নীলাম্বরে প্রশ্নকরে বেশি পুণ্য কার ?
ই আষাঢ়-১২৯০ সন।
কলিকাতা ।
নববর্ষ-১২৯১।
১
এস বর্ষ ! আশাপূর্ণ হৃদয়ে তােমায়
প্রতিপূর্ণ প্রাণে করি শুভ আবাহন,
কাতরে কাকুতি করি, করুণা কৃপায়
প্রাণের একটী আশা করিও পূরণ !
३
চাহিনা বিলাস-ভােগ নিকটে তোমার,
নাহি চাহি সুখশান্তি কিংবা রাজ্যধন,
দুর্ভিক্ষে ভারতবাসী করি হাহাকার,
ক্ষুব্ধ নহি শত শত ত্যজিলে জীবন ।
ক্ষুব্ধ নহি সূৰ্য্যবংশ গেছে অস্তাচলে,
চন্দ্রবংশ হইয়াছে রাহু কবলিত,
সরযূ যমুনা দেহে সুপবিত্র জলে,
ভালই করেছে পাপ করি প্রক্ষালিত ।
৪
কে চাহে সে গত পাপ ফিরে পুনৰ্ব্বার,
কে আছে ভারতে আজি নির্বোধ এমন ।
নববর্ষ।
সে অসাম্য সে অশান্তি-শেষ যাহা আর
গেলে বাঁচি ভারতের যত রাজগণ।
সমগ্র ভারতে সাম্য করুক বিরাজ,
থাকুক পরস্পরে উচ্চনীচ ভেদ,
নয়ন সফল হয় দেখি যদি আজ,
আছে ভারতবর্ষে জাতীয় বিচ্ছেদ।
বিন্ধ্যাচল হিমাচল হৌক সমভূমি,
মিশুক ধূলির সনে কিরীট কাঞ্চন ।
সে বৈষম্য
দূর
করি পার যদি তুমি,
দেখাইও সাম্যভাব পবিত্র কেমন !
এক স্বার্থে পরস্পর না হলে জড়িত,
এক দুঃখে না করিলে ব্যথা অনুভব,
এক কাৰ্যে না হইলে চিত্ত উৎসাহিত,
অমর-অদৃষ্টে ঘটে অনন্ত রৌরব।
৮
মুর্থ সেই যেই করে বৃথা পরিতাপ,
ভারতীয় ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যের পতনে,
অত্যাচার অবিচার-প্ৰজার বিলাপ
শােনেনি বধির--অন্ধ দেখেনি নয়নে।
৯
কিন্তু দূরদর্শী দূরে দেখে ভবিষ্যৎ
এ পতনে কি উথান বিরাট বিশাল,
৭৮ কস্তুরী অনিবাৰ্য্য অভিলাষ পবিত্র মহৎ কি যে সে জাতীয় শক্তি সঞ্চারিছে কাল। ক্ষুব্ধ নহি- পেয়েছি যদ্যপিও স্বতন্ত্র-শাসন, হইয়াছে শ্বেতকৃষ্ণে সহস্র প্রভেদ, সহিছে ভারতবাসী শত উৎপীড়ন তথাপি মুহূর্ত মাত্র নাহি করি খেদ ! এই কষ্ট, এই লজ্জা, এই উৎপীড়ন, করিছে ভারতবর্ষে সাম্য আনয়ন ? দেও বর্ষ ভক্তি শিক্ষা জন্মভূমি প্রতি, ভ্ৰাতৃভাবে সকলেরে কর সম্মিলিত, দ্বেষ হিংসা পরস্পর ঈর্ষা পাপমতি, মনের মালিন্য যত কর প্রক্ষালিত, ১২ এই ভিক্ষা, এই আশা, এই আকিঞ্চন- এই সাম্য চাহি বর্ষ নিকটে তােমার, নরকের রাজ শব্দ করি প্রক্ষালন, পতিত ভারতবর্ষ করহে উদ্ধার। ২৬শে চৈত্র১২৯• সন। ময়মনসিংহ।
আকাশের
খুকী।
আকাশের খুকী,
এ মেঘের কোল থেকে, ও মেঘের কোলে যায়,
লাফাইয়া ঝাপাইয়া হইয়ে কৌতুকী,
কোলে কোলে করে খেলা, শাওণে সায়াহ্ন-বেলা,
এই দেখি এই নাই এই মারে উকি ।
হাসিয়া ভৈরব রবে, বাখানে জলদ সবে,
করতালি শুনে উঠে ধরণী চমকি,
আমি ও চপলা মেয়ে, বড় সাধে দেখি চেয়ে,
জলদের ‘বাহবায়’ আমি বড় সুখী।
আমারাে পরাণ নাচে, যাইতে ওদের কাছে,
আমারাে অমনি ছিল মেয়ে সােণামুখী,
আমি বড় ভালবাসি আকাশের খুকী।
১০ই আশ্বিন, ১৩০০ সন।
কলিকাতা।
মণিকুন্তলা।
মৃত্যু-রাত্রি প্রায় ৩ ঘটিকা, ১৪ই কার্তিক, ১৩০০ সন ।
২১৪ নং কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
সারদা ! নেও কোলে,
এই যে যেতেছে মেয়ে, তােমার নিকটে ধেয়ে
এখানে কিছুতে ও যে রহিলনা আর,
পৃথিবীর ধুলা খেলা, দিয়েছি সারা বেলা,
কস্তুরী
ভুলিলনা ক্ষুদ্র মন ক্ষুদ্র বালিকার ।
আদর যতন কত, করিয়াছি অবিরত,
ও যেন ভেবেছে উহা কত বােঝা ভার,
রাখিয়াছি কোলে কাখে, কারাে কোলে নাহি থাকে,
কেবল আকুল কোলে যাইতে তােমার,
এখানে কিছুতে ও যে রহিল না আর।
২
এখানে কিছুতে ও যে রহিলনা আর।
জ্বলে মরে পিপাসায়, তথাপি কিছু না খায়,
পৃথিবীর কিছু ভাল লাগেনা উহার ।
কেবল ‘অখিট’ শুধু, খাইবে তোমার দুদু
সারদা ! এত কি মেয়ে চাতকী তোমার ?
কত আছে ছেলে পিলে, ভােলে তারা যা তা দিলে,
একটী পেয়ারা পেলে অনিন্দ অপার,
সুসাল নানা ফল, পবিত্র গঙ্গার জল,
কিছুতে ভোলেনি মন মণিকুন্তলার !
এমন দারুণ মেয়ে দেখি নাই আর ।
এমন দারুণ মেয়ে কোপা আছে কার ?
সরল চঁাদের হাসি, তরল জোসনা রাশি,
দেখিলে ভোলেনা আহা প্রাণমন যার ?
সুনীল সায়াহ্নকাল, আকাশের নীল চালে,
ফুটিলে ঝিঙ্গার ফুল নব তারকার,
কোথায় এমন মেয়ে, আনন্দে দেখেনা চেয়ে,
মণিকুন্তলা।
দেখিয়ে তােলেনা আহা প্রাণমন যার?
এমন দারুণ মেয়ে কোথা আছে কার ?
৪
এমন দারুণ মেয়ে দেখি নাই আর,
ঊষার সিদূর ডিবা, প্রভাতে খুলিতে কিবা,
ছড়িয়ে পড়িয়ে গেলে সি দূর তাহার,
দিবালা হেসে উঠে, হেসে কুবলয় ফুটে,
বদনে ফুটে না হাসি কোন্ বালিকার ?
দিয়েছি মাথার কিরা, তথাপি চাহেনি ফিরা,
এমন দারুণ মেয়ে সারদা তোমার।
এ দেশে কিছুতে ও যে রহিলনা আর ।
কে জানে কেমন মেয়ে সারদা তােমার,
বসন্তের ফুলবন, দেখিয়া ভােলেনি মন,
এমন মােহন রূপ কোথা আছে আর ।
অধরে আতর হাসি, অন্তরে অমিয় রাশি,
লাবণ্যে ভুবন ভাসে ফুল-বালিকার,
বনের পতঙ্গ পােকা, নিরেট নির্বোধ বােকা,
তারাও বাসিয়া ভাল চুমাে খায় তার,
তারাও দেখিয়া হায়, শতমুখে গুণ গায়,
সুবৰ্ণ-সােহগে সন্ধ্যা তােষে অনিবার,
কেবল ভোলেনা মেয়ে সারদা তোমার।
এমন দারুণ মেয়ে দেখি নাই আর,
শীতল মলয়ানিলে, গায়ে হাত বুলাইলে,
কস্তুরী
পুলকে শিহরে নাহি তনুমন কার ?
শ্যামা পাপিয়ার ডাকে, কার না থমকি থাকে,
ধমনীর আধা পথে রুধিরের ধার ?
কার না আখির হায়, নিমেষ ভুলিয়া যায়,
জ্বলন্ত জোনাকী দেখে অনন্ত বাহার ?
এর চেয়ে কি খেলনা কোথা পাব আর ?
৭
এর চেয়ে কি খেলানা কোথা আছে আর ?
নিদাযের পর রবি, বরষার জল ছবি
নীল নীরদের বুকে তড়িতের হার !
শরদে গরদ পরা, মনোেহরা বসুন্ধরা
কাশ কুসুমের বনে-কাণে কর্ণিকার !
হেমন্ত রাজার মেয়ে, সুন্দরী সন্ধ্যার চেয়ে,
কোন্ পুতুলের গায় এত অলঙ্কার ?
শীতের হরিণ যুথ, প্রকৃতির প্রিয় সুত,
প্রভাতে শ্যামল ঘাসে মুকুতা তুষার,
এর চেয়ে কি খেলানা কোথা আছে আর ?
কে জানে কেমন মেয়ে সারদা তােমার,
কিছুতে ভােলেনা মন, বৃথা যত্ন আকিঞ্চন,
একমাত্র তুমি আহা সব যেন তার ।
একটু বােঝেন হাবা, কত ভালবাসে বাবা,
কত ভালবাসে মামা মামী অনিবার,
কত ভালবাসে ‘টুকী’, ছােট বােন সােণামুখী,
"
মণিকুন্তলা।
কত ভালবাসে দাদা স্নেহের আধার,
কত ভালবাসে দীদী, যার ও নয়ননিধি,
যার ও প্রাণের প্রাণ জীবন যাহার ।
কি বিস্ময়! ভয়ঙ্কর। সকলেরে ভাবে পর,
একেবারে লেশ নাই স্নেহমমতার,
মা-আদুরে হেন মেয়ে দেখি নাই আর ।
নেও কোলে নেও মেয়ে সারদা তােমার,
সৃষ্টির আদিম সাম্য, পবিত্র মুহূৰ্ত্ত ব্রাহ্ম,
অপবিত্র হয় নাই জাগরণে কার,
কু চিন্তার কু বাতাসে, পাপের প্রতপ্ত শ্বাসে,
জন্মেনি কলঙ্ক সেই শান্তি সুষমার !
উচ্ছিষ্ট করেনি কেহ, অভােগ্য এ কালদেহ,
শুভ্র শশধর ঢালে শুভ্র জ্যোতি তার।
গগন তারকাপূর্ণ, ঢালিছে কিরণ চুর্ণ,
রজনী খুলেছে তার নীল রত্নাগার !
অমলিন অনাঘ্রাত, স্বর্গীয় শিশিরে স্নাত,
বহিছে মলয়ানিল সুরভি-সম্ভার।
শান্তিময় ঋষিভােগ্য, সুধাময় দেবযােগ্য,
পুণ্যময় মহাকাল মহা তপস্যার,
পূর্বাচল কণ্ঠচ্ছেদি, ব্ৰহ্মরন্ধ্র নভ ভেদি,
ছুটিছে অরুণজ্যোতি মহা সহস্রার।
অব্যয় সচ্চিদানন্দ, অনন্ত অমৃতকল,
৮৪:
কস্তুরী
প্রকাশ জ্যোতির্ময় ব্ৰহ্মলােকদ্বার।
তপস্বীর তপােরথে, জ্ঞানময় মহাপথে,
যায় ব্রহ্মময়ী মেয়ে সারদা তােমার।
লও সে স্নেহের বুকে, থাক্ মেয়ে চিরসুখে,
এ জীবনে তার তরে ভাবিবনা আর,
ছিন্নমুণ্ড ছিন্নবাহু, আমি চিরদগ্ধ রাহু,
একাকী ভ্রমিতে থাকি জগত সংসার।
নেও কোলে নেও মেয়ে সারদা তােমার।
১৭ই কার্তিক-১৩০ • সন।
কলিকাতা।
জননী আমার ।
[ মণিকুন্তলার রচিত।
মণির ৬৭ বৎসর বয়সের সময় মণির মা'র মৃত্যু হয়। শিশুশিক্ষা তৃতীয়-
ভাগ এবং বােধোদয়ের কিয়দংশ পৰ্যন্ত মণি পড়িয়াছিল। এই কবিতাটা
কোন সময়ে লিখিয়াছে, জানি না, মণির মৃত্যুর পরে ইহা দেখিয়াছি। শুনিয়াছি,
তাহার স্বামীর নিকটে তাহার রচিত আরাে কবিতা আছে। মণি জীবিত
থাকিতে, সে পদ্য লিখিতে পারে, জানিতাম না । যাহা হউক, এই কবিতাটী
তাহার পদ্য লিখিবার স্মৃতিচিহ্নরূপে অবিকল উদ্ধত কয়িয়া রাখিলাম।
কোথা রহিলে গাে জননী আমার
আমার দুঃখেতে দুঃখী কে হবে গাে আর
স্নেহমাখা বােলে, কে করিবে কোলে।
এমন এ পৃথিবীতে কে আছে আমার।
কোথা রহিলে গাে জননী আমার।
জননী:আমার।
৮৫
কোথা রহিলে গাে জননী আমার
বিশাল ব্রহ্মাণ্ডে মাগাে কে.অাছে আমার ?
আমি যদি মরি প্রাণে
কে কাদিবে আমার জন্য
স্নেহময় জননী ভিন্ন দেখি অন্ধকার।
কোথা রহিলে গাে জননী আমার।
কোথা রহিলে গাে জননী আমার ।
বড়ই পাষাণ মাগাে হৃদয় তােমার।
আমাকে একাকি ফেলে।
মা তুমি কোথায় গেলে
একটু হলনা দয়া হৃদয়ে তােমার।
কোথায় রহিলে গাে জননী আমার।
৪
কোথা রহিলে গাে জননী আমার।
তুমি ভিন্ন এ সংসারে কে আছে আমার
যে দিকে ফিরাই আখি
কেবলি নিষ্ঠুর দেখি।
আমার দুঃখেতে দয়া হয়না গাে কার।
কোথা রহিলে গাে জননী আমার ।
কোথা রহিলে গাে জননী আমার।
আমার দুর্দশা মাগাে দেখে একবার।
কস্তুরী
দেখ একবার চেয়ে,
দেখ গাে পাষাণি মেয়ে,
জ্বলিয়া পুড়িয়া হৃদয় হতেছে অঙ্গার।
কোথা রহিলে গাে জননী আমার।
কোথ-রহিলে গাে জননী আমার।
এ দুঃখিনী বলে মনে হয় নাকি আর ?
কেমনে রহিলে গিয়ে
পাষাণের মত হয়ে
তােমার স্নেহের মণি ভাসিছে অকুল পাথার,
কোথা রহিলে গাে জননী আমার।
৭
কোথা রহিলে গাে জননী আমার।
গেলে কি জন্মের মত আসিবে না আর।
গেলে ফেলে দুঃখিনীরে
আর না আসিবে ফিরে
আর ত সহে না মা গাে এ দুঃখ-ভার।
কোথা রহিলে গাে জননী আমার।
৮
কোথা রহিলে গাে জননী আমার।
মাগাে যদি না আসিবে আর।
এস তবে এস হেথা
কহি গো দুঃখের কথা
জনমের মত মাগগা ডাকি একবার।
কোথা রহিলে গগা জননী আমার।
অতুল। *
“যাব না মা যাব না”-
'দশ বছরের আহা বালক অতুল,
মায়ের বুকের ধন মমতার ফুল,
কত পুণ্য কত ধৰ্ম্ম তপস্যার ফল,
বিধাতা দিয়েছে বর ভরিয়ে অঞ্চল !
চিরদুঃখ বৈধব্যের স্বর্গীয় সান্ত্বনা,
সশরীরে দৈববাণী ক্ষুদ্র এক কণা!
বুকেতে রাখিতে গেলে শ্বাসে গলে যায়,
পিঠেতে রাখিতে লাগে দূরদেশ তায়।
স্বপনে হারায়ে যায়, জাগ্রতে সংশয়,
আপনারে অবিশ্বাস আপনারে ভয়!
এ হেন প্রাণের ধন-এ হেন অতুল,
সলিলে ভাসায়ে আখি নীল সুদি ফুল,
‘যাবনা’ বলিয়ে মা’র ধরিল আঁচল,
সাজিয়া মামারা ডাকে “চল ঢাকা চল,
ছুটি ফুরাইয়া গেছে, আজ যাওয়া চাই,
পরীক্ষায় ফেল হ'বি করিলে কামাই।”
শুনিয়া মায়ের হিয়া স্নেহ করুণায়,
গলিয়া নয়ন পথে বের হতে চায়।
বিক্রমপুর-ব্রাহ্মণগ্রাম-নিবাসী মহেন্দ্রচন্দ্র মােয়র একমাত্র পুত্র।
২৫শে আখি, ১৩•• যৰ ।
-
৮৮৮
কস্তুরী
২.
ভারতের শাসন-চারি দিকে জল,
বিশাল বরুণ-রাজ্য হাসিছে কেবল
বিরাট তরঙ্গ ভঙ্গে, শুভ্র ফেণময়
ফুৎকারে উড়িছে থু থু-ভীষণ—বিস্ময়।
নদীনদে শত জিঁহা করিয়ে প্রসার,
গ্রাসিয়াছে সারা দেশ, চিহ্ন নাহি আর।
অনন্ত অতলস্পর্শ অগাধ গহ্বর,
ব্যাদিত কেবল এক মহা দামোদর !
তৃতীয় প্রহর গত শরতের বেলা,
কৃষ্ণকায় মহাসিংহ মেঘে করে খেলা ।
রবির পরিধি লাল মাংসপিণ্ড প্রায়,
এ উহার মুখ থেকে কেড়ে নিয়ে খায় ।
কি বিশাল লম্ফ ঝম্ফ বিশাল গর্জন,
বিকট ভ্রুকুটি ভঙ্গে করে আক্রমণ !
পড়ি তার প্রতিচ্ছায়া সলিল ধবলে,
জাগিয়াছে জলসিংহ পাতালের তলে।
এক খানি ছােট নাও বেয়ে যায় ধীরে,
আকুলা জননী দেখে দাড়াইয়া তীরে
স্নেহময় সে চাহনি—সে বন্ধন হায়,
দাড়ের আঘাতে যেন ছিড়ে ছিড়ে যায়।
দুরাশা তথাপি তারে গাঁট দিয়া দিয়া,
যত বার ছিড়ে যায় যােড়া দেয় গিয়া?
অতুল।
মমতার পুরুভুজ সে কি কভু মরে ?
এক ভুজ কাট যদি শত ভুজ ধরে ।
ছৈয়ের ভিতর থেকে বালক অতুল,
কূল পানে চেয়ে চেয়ে নাহি দেখে কুল।
সলিলে হয়েছে অন্ধ নয়নের পথ,
তরাসে হয়েছে অন্ধ দূর
ভবিষ্যৎ।
উপরে আকাশ অন্ধ, নীচে অন্ধ জল,
বুকের ভিতরে অন্ধ তমস কেবল।
এত অন্ধকারে ভয়ে বাড়াইলা হাত,
যােজন যােজন দূরে দু’জনে তফাৎ!
মায়ে পেয়ে হায় সেই শেষের বিদায়,
গােধূলীর কোল থেকে রবি অস্ত যায় ?
চলে গেল রেলগাড়ী রেখে গেল ধূম,
মলিন করিয়া মার জাগরণ ঘুম!
শরতের শুক্লা ষষ্ঠী—যামিনী সুন্দর
লইয়া পাথালি কোলে শিশু শশধর,
ছাড়িয়া সূতিকাগার—তমাে সুগভীর,
গগন-অঙ্গনে যেন হয়েছে বাহির !
এসেছে পাড়ার মেয়ে তারা সমুদয়,
দেখিতে বিধুর মুখ সুধার নিলয় !
আনন-সলিলে ভাসে কুমুদ বিমল,
পুলকে পাগল যেন চকোরের দল,
৯০
কস্তুরী
উপবনে হাসে যত কুসুম বালিকা,
সুগন্ধা রজনীগন্ধা স্বর্ণ-শেফালিকা।
ব্যাপিয়া বিশাল বঙ্গ কেবল উল্লাস,
জননী-মেহের আজ বি-অধিবাস!
বাজে শঙ্খ বাজে ঘণ্টা বাজে ঢাক ঢোল,
পাড়া পাড়া বাড়ী বাড়ী মহা গণ্ডগোল ;
এসেছে প্রবাসী পিতা পতি পুত্র ভাই,
আনন্দ-সাগরে যেন ভাসিছে সবাই।
নূতন বসন অর নূতন ভূষায়,
সুখের সজীব-বিম্ব শিশু শোভা পায় ।
খেলিতেছে নব বেশে বালক বালিকা,
স্বস্তিক মঙ্গল মুখে পারিজাতে লিখা ।
ব্যাপিয়া বিশাল বঙ্গ কেবল মিলন,
জননী-স্নেহের আজ মহা উদ্বোধন।
৪
একখানি গ্রাম ভাসে জলময় মাঠে,
গঙ্গা মৃত্তিকার ফোটা সাগর-ললাটে
এক খানি বাড়ী তায় আঁধার কেবল,
কলঙ্কী শশাঙ্ক তার পরিচয় স্থল !
জগত উজ্জ্বল যার রজত কিরণে,
সে নহে সমর্থ তার তমম নিবারণে!
জড়ের জীবন জাগে অমৃতে যাহার,
শত মৃত্যু ঢালে তাহে সুধাকর তার!
অতুল।
৯১
কোমল শীতল আলাে তারার হীরক,
অযুত অঙ্গার খণ্ড জ্বলে ধ্বক্ ধ্ব!
জগত-জীবন স্নিগ্ধ শীত সমীরণ,
সেও যেন বহে বুকে বাষ্পীয় মরণ।
ডাকিছে নিশার কাক সেও অমঙ্গল,
উপরে আকাশ কঁাপে নীচে কাপে জল!
পেচক কর্কশ কণ্ঠে দেয় রূঢ় তালি,
একটী মায়ের বুক রহিয়াছে খালি।
দুই হাতে অভাগিনী টেনে ছিড়ে চুল,
চীৎকারে আকাশ ভাঙ্গে ‘অতুল অতুল !
অস্ত গেছে দশমীর দীপ্ত শশধর,
আচ্ছাদিয়া অন্ধকারে অাকাশ গহ্বর ;
যেন কার ভবিষ্যের ভীষণ উদরে,
তারকার স্বপ্নগুলি হাবু ডুবু করে ।
তৃতীয় প্রহর গত নিখিল ভুবন,
একই শয্যায় শুয়ে ঘুমে অচেতন।
তরুলতা ঘুম যায়,
যায়, ঘুম যায় ফুল,
পল্লবের কোলে কোলে ঘুমায় মুকুল।
অাকাশে হেলান দিয়া ঘুমায় পৰ্বত,
সম্মুখে সমুদ্র পাতা মহাশ্যাবৎ !
নিরাশার নিষ্পেষিত মহা মরুভূমে,
কত বক্ষ অস্থিচুর্ণ আছে ঘোর ঘুমে ।
৯২
কস্তুরী
ঘাসে ঘাসে ঘুম যায় কত অশ্রুজল
সৈকতে শােকের শ্বাস ঘুমেতে বিল।
দিক্বদ্ধ শ্যামমাঠ অনিবদ্ধ নীবি,
স্থলিত অঞ্চল অঙ্গে ধুমায় পৃথিবী!
অনন্ত শান্তির সুধা ভুগিছে সবাই,
একটী মায়ের চখে শুধু ঘুম নাই !
চিরদাহ জাগরণ তার বুকে দিয়া,
ঘুম যায় চিতাচুল্লী নিবিয়। নিবিয়া।
দাঁড়ায়ে বাহির বাড়ী অভাগী জননী,
ভাবিতেছে শূন্য পানে চেয়ে একাকিনী,
আসিয়াছে বাড়ী বাড়ী ছেলেপিলে সব,
বিজয়ার বিসর্জন উৎসব নীরব।
কোলে নিয়া জননীরা আপন সন্তান,
কপােলে দিয়েছে চুম্ব শিরে দূৰ্ব্বাধান!
সকলে পেয়েছে বুকে বুকভরা ধন,
আমার অতুল দেরি করে কি কারণ?
অরুণের অগ্র জ্যোতি মৃদু পরকাশ,
প্লাবিয়া রজত স্বর্ণে
পূরব আকাশ ।
অভাগিনী পাগলিনী আনন্দে ভাসিয়া,
দুই ভুজ মেলে যায় কোলে নিতে গিয়া !
চীৎকারে অতুল মাের আসিতেছে অই,
খুজিতে উড়িল কাক কই, কই, কই ?
মুরছিয়া ধরাতলে পড়িলা জননী,
তুলিতে সহস্র কর মেলে দিনমণি।
বঙ্কিমচন্দ্র।
শেফালী ঝরিল আগে তারকা নিৰিল,
রজনী সজনী তার শশাকে প্রাণ দিল ।
দেখিল পাড়ার শেষে লােকজন জমি,
জননী স্নেহের সেই বিজয়া দশমী ।
এই কার্তিক-১৩০ • সন।
কলিকাতা।
বঙ্কিমচন্দ্র।
১
সায়াহ্ন-ছাব্বিশে চৈত্র-তের শত সন,
এক পায়—দুই পায়, বসন্ত চলিয়া যায়,
শ্যাম মমতায় মেখে বন উপবন ।
তার সে বিদায়-ভােজ, মধু খায় রােজ রােজ,
ফুলের গেলাস ভরি মধুকরগণ !
তরুণ তমাল গাছে, কি জানি কি লিখা আছে,
কোকিল করিছে পাঠ সে অভিনন্দন।
উড়ায়ে রুমাল ছাতা, মূতন পল্লব পাতা
আনন্দ জানায় যেন নীরবে কানন।
বসন্ত বিদায় আজ, সভাপতি দ্বিজরাজ,
সুধাকরে করে তার শেষ সম্ভাষণ,
সায়াহ্ন-~-ছাব্বিশে চৈত্র-তের শত সন্ ।
২
সায়াহ্নছাব্বিশে চৈত্র-হায় হায় হায়,
বঙ্কিম বসন্ত কবি আগে তার যায় ।
৯৪
কস্তুরী
সইয়ে নবীন হেম, অক্ষরে অক্ষয় প্রেম,
চন্দ্রনাথ প্রিয়বন্ধু দীনবন্ধু রায়,
ব’রে সবে হাতে হাতে, লইয়ে আসিলে সাথে,
পারিজাত বন থেকে শ্যামা পাপিয়ায়!
ছিঃআশা ছিন্নবাসা সাজাইলে বঙ্গভাষা,
শীতের শিশির মুছে মলয় হাওয়ায় !
এখনাে পূরেনি তার, সময়ের অধিকার,-
সায়াহ্ন-ছাব্বিশে চৈত্র, হায় হায় হায়।
বঙ্কিম বসন্ত-কবি আগে তার যায় ।
বাঙ্গালার মহাকবি ভারতভূষণ,
সাজাইলে কত সাজে কাব্য উপবন ।
কমল কমলমণি, পবিত্র প্রেমের খনি,
‘কাণা কড়ি দিয়ে সে যে কিনে রাখে মন!
সতুরে সারথি করি, আরক্ত কপােলে মরি,
আপনি সমরে ধরে ফুলশরাসন।
‘সূৰ্য্যমুখী’ সূৰ্যমুখী, স্বামীর সুখেই সুখী,
স্নেহে প্রেমে মমতায় কোথায় এমন ?
কোমল ‘কুন্দের’ মালা, প্রীতির নৈবেদ্য বালা,
কি সুন্দর করিয়াছে আত্ম-নিবেদন।
বিষ নহে সুবৃক্ষ, পরশিছে অন্তরীক্ষ,
তারকা হীরার ফুলে তীখণ কিরণ,
জগতের একধারে, সুদূর সাগর পারে,
আলাে করিয়াছে সে যে বৃহৎ বৃটন,
বঙ্কিমচন্দ্র।
কত ফুলে সাজাইলে ভাষা-ফুলবন !
পূজনীয় প্রিয়কবি, ফুটাইলে যে মাধবী,
বিমল,বিমলা’ রূপে গড়মারণ!
হৃদয়ে লুকায়ে শূল, হাসে কঁদে চাঁপাফুল,
আকুল আয়েষা চির আনত আনন।
রজনী রজনীগন্ধা, আললা করে দিবা সন্ধ্যা,
প্রেম-পূর্ণিমায় তার বেলফুলবন !
ফুল দিয়ে সিদ কাটে রমণী কেমন!
৪
বঙ্গের বসন্তকবি ভারতভূষণ,
কত ফুলে সাজাইলে ভাষা ফুলবন ।
রােহিণীর সমতুল, বিধবা বকুল ফুল,
কোন্ দেশে ফোটে হেন মধুমাখা মন ?
কি শােভা পুকুর পারে, গােবিন্দ তুলিয়া তারে,
ইন্দিরা লভিলা যেন নিজে নারায়ণ !
অভিমানে উচ্ছ্বসিতা, অপূৰ্ব্ব অপরাজিতা,
কি সুন্দর ভ্রমরের মধুর মরণ,
উঠিতে রাঙ্গা রবি, নিৰ্ম্মল সরল ছবি,
ফুলদলে শিশিরের ধীরে পলায়ন!
কত সাজে সাজাইলে ভাষা-ফুলবন!
ছুমিই আনিয়া দিলে সুষমা শ্যামল,
আগে ছিল রুখু রুখু, না ছিল লাবণ্য
কস্তুরী
r
মরা গাঙ্গে ছুটাইলে জোয়ারের জল?
দুই জনে চুচুবি, দুই জনে ডুবাডুবি,
প্রতাপ শৈবালে যুদ্ধ-কাপে দেবদল ।
এমন আদর্শ বীর, কোথা আছে পৃথিবীর,
পিণাকীর চেয়ে এ যে প্রতাপ প্রবল ?
তুমি ফুটাইলে এই অনল-কমল।
তুমিই সাজালে ভাষা শ্যাম সুষমায়,
বালিকা প্রল অনি, গড়াইলে দেবীরাণী,
বিদ্যুতে মাখিয়া ফুল দেব-প্রতিভায় !
কল্পনা-কালিন্দীতটে, গড়িলে আনন্দ মঠে,
ভারত ভবিষ্য স্বর্গ সুমেরু ছায়ায়।
শিখালে সন্তানধৰ্ম্ম, জননীর প্রিয়কৰ্ম্ম,
মহাবীর সত্যানন্দ মহাপ্রাণতায়!
তুমি সাজাইলে ভাযা অনন্ত শােভায় !
৭
তুমি সাজাইলে ভাষা নানা আভরণে,
কত রঙ্গ কত রস, কমলাকান্তের বশ,
লিখিলে রহস্য কত বিজ্ঞানে দর্শনে ?
বুঝাইলে যােগ ভক্তি, কৃষ্ণের অসীম শক্তি,
দেখালে আদর্শ নর দেব নারায়ণে!
ঝেড়ে পছে ধূলামাটা, হিন্দুর আসল-খাটী,
বুঝাইলে দয়াধৰ্ম্ম দেশবাসীগণে।
তােমার স্বাধীন মত, শরতের রৌদ্রবৎ,
উপহার । শ্মশান ধুইয়া তীরে, চিলাই বহিছে ধীরে, কলতানে মৃদুগানে বনে বনে ঘূরি, অকস্মাৎ পাশে তার, বহে মন্দাকিনী ধার- ভীষণ গর্জনে পদ্মা ব্যোম ভাঙ্গি চুরি! চড়িয়া কুসুম-ভেলা, করিতে সলিল-খেলা অমর বালিকা এক-অপূৰ্ব্ব মাধুরী- ভুলে মরতের পথে, ভাসিয়া আসিয়া সােতে, লাগিল শ্মশান ঘাটে--রূপে দেশ পূরি। ? ‘কুঙ্কুম দিয়েছি আগে সরলারে, সেই রাগে অভিমানে মুখ ভার করে থাকে ছুড়ী, কখনাে বা মােটা মােটা, আখি হ’তে পড়ে ফোটা, কেলিকদমের মত দুই-দশ-কুড়ি। মলিন ছায়ার মত, ম্রিয়মাণ অনুগত, কভু সাজে ‘কলাবউ' সে কালের বুড়ী, তাই গাে করি দান, ভাঙ্গিতে সে অভিমান, প্রেমদার পাদপদ্মে প্রেমের কস্তুরী । ৩০শে জ্যৈষ্ঠ ১৩০২ স। কলিকাতা।
No text on this page.
বঙ্কিমচন্দ্র
৯৭
অলিতেছে ভারতের গগনে গগনে।
প্রতিভার দীপ্ত রবি, বাঙ্গালীর মহাকবি,
কেন অস্ত যাও অজি অগস্ত্য গমনে,
ঢালিয়া আঁধার ঘন ভাষা-ফুলবনে ?
যাবে তুমি? এ জগতে কে না বল যায় ?
কেহ গেলে হাসে লোকে, কেহ গেলে কঁাদে শশাকে,
পরাণ বিদরে কারে করিতে বিদায়।
বসন্ত বাঁচিয়ে থাক্, নিদাঘ শিশির যাক,
কুলার বাতাসে আর তুষের ধুয়ায় !
বার মাস নিতি নিতি, থাকুক পূর্ণিমা তিথি,
চলে যাক্ অমা-রাহু ক্ষতি নাহি তায় ।
তুমি থাক মােরা যাই, আমরা যে ভস্ম ছাই,
কি হবে এ কোটি কোটি রেণু-কণিকায় ?
আমরা পথের ধূলি, কর্দম কঙ্কর গুলি,
আমরা নীচের নীচ পড়ে থাকি পায় ।
বিধিয় অপূৰ্ব দান, দেশের গৌরব মান,
তুমি কবি-কহিনুর কিরীট চূড়ায় !
মােরা যাই, তুমি থাক’, সুখী কর মায়!
৯
গভীর বসন্ত নিশি—গভীর গগন,
কলিকাতা নিমতলে, দিতেছে গঙ্গার জলে,
ধােয়াইয়া ভারতের বুকভরা ধন।
পাতিয়ে অঞ্চল-ঢেউ,-আঁধারে দেখিনি কেউ,
কস্তুরী
মহা যত্নে মন্দাকিনী করিছে গ্রহণ।
পাইয়া কবির ছাই, আনন্দের সীমা নাই,
চলেছে পতিরে দিতে ডগমগ মন।
কত যুগ-যুগান্তর, হৃতরত্ন রত্নাকর,
দেবতা লুঠিয়া নিছে করিয়ে মন্থন,
পরশে কবির ছাই, ফিরিয়ে পাইবে তাই,
লবণাক্ত জলে হবে সুধা অতুলন!
ইন্দিরা জন্মিবে শঙ্খে, পারিজাত হবে পঙ্কে,
শুকুতি পরশে হবে মুকুতা সৃজন!
শৈবাল প্রবাল হবে, সুধাকর ফেন সবে,
হইবে কলপতরু তৃণ তরুগণ !
পাষাণে পড়িলে দাগ, হবে মণি পদ্মরাগ,
অঙ্গারে হইবে হীরা কৌস্তুভ রতন,
সত্যই কবি কি মরে ? বোঝেনা অবােধ নয়ে,
কবি করে ত্রিদিবের নব আয়ােজন,
আনন্দে অমর বনে কবির চরণ।
২৭শে চৈত্র-১৩০০ সন।
কলিকাতা।
কার্তিকপূজা।
কার্তিক। তুমি কি সেই দেবসেনাপতি ?
তুমি সে উমার ছেলে, ময়ূরে চড়িয়া এলে,
পারীন্দ্রে বেড়ায় যেই পাহাড়ে পার্বতী ?
কার্তিকপূজা।
তােমারি মা গিরিকন্যা, জগতে রমণী ধন্য,
দশভুজ দশ অস্ত্র ধরে ভগবতী ?
চরণে অসুর দলে, যে রমণী মহাবলে,
সে মহিষ-মর্দিনীর তুমি কি সন্ততি ?
কার্তিক ! তুমি কি সেই দেবসেনাপতি ?
কার্তিক, তুমি কি সেই দেবসেনাপতি ?
প্রলয় বিষাণধারী, তুমি কি সংহারকারী
ত্রিপুরারি ত্রিশূলী সে শিবের সন্ততি ?
যােগীন্দ্র তােমারি পিতা, যোগাসন করে চিতা,
গলে পরে হাড়মালা ভূষণ বিভূতি ?
সর্পের বলয় হাতে, রুদ্রাক্ষ শােভিত সাথে,
সদ্যছিন্ন বাঘছাল পরিধান ধুতি ?
প্রচণ্ড নয়নানলে, কীট সম কাম জ্বলে,
ললাটে জ্বলিছে সদা শশিদিনপতি ?
মস্তকে বিশাল জটা, গঙ্গার তরঙ্গ ঘটা,
আতঙ্কে মাতঙ্গ ভাসে—মহা বেগবতী।
অমৃত ঠেলিয়া পায়, গরল সমুদ্র খাম,
তােমারি কি মৃত্যুঞ্জয় পিতা পশুপতি ?
কার্তিক ! তুমি কি সেই শিবের সন্ততি ?
কার্তিক! তুমি কি সেই দেবসেনাপতি।
তুমি কি সে মহাশূর, বধিয়া তারকাসুর,
উদ্ধারিলা দেবতার সে অমরাবতী ?
১০০
কস্তুরী
তুমিই কি ভুজবলে, পুনরায় দেবদলে,
দানব-দাসত্ব হ’তে করিলে মুকতি ?
তােমারি কি সুরপুরে, জয় বৈজয়ন্তী উড়ে
সুবর্ণ সুমেরুচূড়ে ওহে সুররথি ?
তুমি কি সে ষড়ানন সুরসেনাপতি ?
৪
তুমি কি কুমার সেই দেবসেনাপতি ?
তােমারে পূজিলে মেলে, তব সম বীর ছেলে,
সে নাশে তােমারি মত দেশের দুর্গতি ?
সে ফেলে সজোরে ছিড়ি, জননীর দাসীগিরি,
তাহারাে কি পদভরে কঁপে বসুমতী ?
তাররা কি হিমাদ্রি লঙ্কা, বাজে সে বিজয় ডঙ্কা,
তাহারাে চরণে বিন্ধ্য করে কি প্রণতি?
হায় সে ছেলের লাগি, সারা রাত জাগি জাগি,
করে কি তােমার পূজা যত কুলবতী ?
তুমি কি কার্তিক, সেই দেবসেনাপতি ?
৫
কার্তিক! তুমি কি সেই দেবসেনাপতি ?
কোথা তবে কৰ্ম্ম চর্ম, এই কি বীরের কৰ্ম্ম ?
এ দেখি বিষম কৃপা কেরেপের প্রতি।
কোথা বা সে মলিকচ্ছ, সে বুঝি গয়ংগচ্ছ,
আগচ্ছ ঢাকাই ধুতি ত্ৰিকচ্ছে বসতি।
বিজয় কিরীট খুলে, এলবার্ট এলে তুলে,
পায়ে মেফিল্ড, জুতা--ফুলবাবু অতি !
১০১
কার্তিকপূজা।
কোথা সে পিঠের তৃণ, কোথা সে ধনুকগুণ,
কামুক বহিতে হাতে, নাহি কি শকতি ?
কার্ত্তিক! তুমি কি সেই সুরসেনাপতি ?
কার্তিক ! তুমি কি সেই দেব-যােদ্ধাপতি ?
ছাড়িয়া বীরের সাজ, আসিতে হল না লজি,
তােমারে এখানে এসে ফিরে গেল মতি ?
বাঙ্গালার জলবায়ু, বিনাশে আরােগ্য আয়ু,
দেবতাররা এমনি কি ঘটায় দুর্গতি ?
সত্য এ মাটীর দোসে, হৃদয়ের বল শেষে,
শোণিতে থাকেন। তেজ মোটে এক রতি ?
এ মৃদু মলয় বায়, উদ্যম উড়িয়া যায়,
অবশ শিথিল তা ধীর গতি ?
সত্যই পিকের ডাকে, হাতে না ধনুক থাকে,
কুহুরবে পক্ষাঘাত করে কি বসতি ?
মৰ্ম্মর-অস্থির করে মেমে পরিণিত ?
৭
কার্তিক তুমি কি সেই দেবসেনাপতি ?
এ বেশে তোমারে পূজি, কি ফল আমি না ঝি,
জন্মে শুধু কতগুলি জড় পাপমতি !
পরিচ্ছদ ফুলকেঁাচা, ব্যথা পেনের খাে,
পদাঘাতে পীলা-ফাটা-এই শেষ-গতি।
যাহা কিছু উচ্চ শিক্ষা, উদ্দেশ্য দাসত্ব-ভিক্ষা,
ঘােট বড় সকলের একই পদ্ধতি।
১০২
কস্তুরী
সকলি কবন্ধাকার, মুখ আর পেট সার,
বায়ুভরা বেলুনের কথারি উন্নতি।
কেবলি রুচির পুচ্ছ, জ্বালাইতে করে উচ্চ,
কাব্যের কনক লঙ্কা-মহা রূপবতী।
কেবলি সমাজ শশাধে, কুরুচির গােড়া খােদে,
নাশিতে অশােক বনে বসন্ত-ব্রততী ।
এ হেন ‘বেবুন’ বংশ, একদিনে হল ধ্বংস,
জগতের লাভ বই নাহি কোন ক্ষতি।
দুর্ভিক্ষ আকাল যায়, হাহাকার, হায়, হায়,
কুটীরে কৃষক করে আনন্দে বসতি।
আসে শূয়র পালে, কাজ নাই কোন কালে,
বৃথা আরাে অপবিত্র করে বসুমতী।
একটা সিংহের ছানা, অরণ্যে বসায় থানা,
রচে শৈল-সিংহাসন-সাজে পশুপতি।
বাবুভর বাঙ্গলার কি হবে হে গতি ?
১৬ই কার্ত্তিক, ১৩০১ সন।
কলিকাতা।
আমার বাড়ী।
কোথা বাড়ী—কোথা ঘর, কি শুধাও ভাই ?
হায় সে দুঃখের কথা, মলিন মরম-ব্যথা,
প্রাণপণে আমি যে তা ভুলে যেতে চাই ।
আমার বাড়ী।
১০৩
অরণে পরাণ পােড়, বুক যেন ভাঙ্গে চোরে,
হায় সে দারুণ জ্বালা আজো কমে নাই।
কলিজা ধমনী শিরা, মনে লয় ফেলি ছিড়া,
নিজের শরীর নিজে কামড়াইয়া খাই।
সে অগ্নি-কাহিনী যাহা, কেমনে বলিব তাহা,
মনে না হইতে আগে পুড়ে হই ছাই।
বলনা বলিব কিসে, মরি যে দারুণ বিষে,
আমি যে দেখিছি এর দেশে ওঝা নাই।
কোথা বাড়ী--কোথা ঘর, কি শুধাও ভাই ?
২
কোথায় বসতি মাের, কি শুধাও ভাই ?
যে দেশে আছিল বাড়ী, চিহ্ন মাত্র নাহি তারি,
সে দেশ পুড়িয়া গেছে, হয়ে গেছে ছাই
রাবণের চিতা সম, জ্বলে জন্মভূমি মম,
ধুইয়া শ্মশান সেই বহিছে চিলাই।
সে দেশ থাকি যদি, তবে কিহে নিরবধি,
দেশে দেশে ঘূরি আর কঁদিয়া বেড়াই ?
কোথায় বসতি মাের কি শুধাও ভাই ?
কোথায় বসতি মোর কি শুধাও ভাই ?
যে দেশে আছিল ঘর, আমি সে দেশের পর,
সে দেশে যাইতে মাের অধিকার নাই।
আমারি-আমারি দেশে, আমারে খেদায় এসে,
আমারি মায়ের কোলে নাহি মাের ঠাঁই।
১০৪
কস্তুরী
ইংরাজের রাজনীতি, দেয় না সে বগীতি,
জ্বলন্ত দীপকরাগে প্রাণ খুলে গাই!
ছিন্নজিহ্বা সিংহ সম, জীমূত গর্জন মম,
হৃদয়-কন্দরে নিত্য নীরবে লুকাই।
কোথা বাড়ী কোথা ঘর, কি শুধাও ভাই ?
৪
কোথায় বসতি মোর কি শুধাও ভাই ?
কেহই শােনেনা যাহা, তুমি কি শুনিবে তাহা,
এ দুঃখ বলিতে নাহি ত্রিভুবনে ঠাই ।
এ জগতে আছে যারা, সকলি পিশাচ তারা,
প্রকৃত মানুষ কারে দেখিতে না পাই ।
সব বেটা ঘুষখোর, সব বেটা জুয়াচোর,
ধ্বজাধারী’ ‘অকিফলা যার দিকে চাই।
‘তু করিতে মেলে হাত, হেন পায় ধরা জাত,
এমন বিবেকশূন্য দেশের বালাই।
কুকুরের চেয়ে নীচু, যদি আর থাকে কিছু,
আমি যে এদেরি বলি ঘৃণা করি তাই।
বলিব কাহার কাছে, কে বল মানুষ আছে,
দয়াল ধাৰ্মিক বীর কোথা গেলে পাই ?
করিতে অৰ্ত্তের ত্রাণ, কার বল কঁাদে প্রাণ ?
তেমন মানুষ বুঝি ত্রিভুবনে নাই।
কোথায় বসতি মাের কি শুধও ভাই ?
কোথায় বসতি মাের গুনিয়া কি ফল ?
তুমি কি পারিবে তার, ঘুচাইতে হাহাকায়,
আমার বাড়ী।
১০৫
মুছাইতে আখিভরা শােক-অশ্রুজল ?
তুমি কি দেখেছ বুঝে, এত বল আছে ভুজে,
ছিড়িতে পারিবে তার লােহার শৃঙ্খল ?
হৃৎপিণ্ড বিদারিয়া, বুকের শােণিত দিয়া,
পারিবে নিবা’তে তার দাহ-দাবানল ?
কোথায় বসতি তবে শুনিয়া কি ফল ?
কি হবে শুনিয়া ভাই কোথা বাড়ী ঘর ?
যে দেশে আছিল বাড়ী, সে দেশের নরনারী,
স্বর্গের শিশুর মত সরল অন্তর।
দ্বেষ নাই হিংসা নাই, যেন সব ভাই ভাই,
কেবলি স্নেহেতে ছিল মাখা পরস্পর ।
ছিল সবে শান্তিমুখে, সতত প্রসন্নমুখে,
শতদলে গাঁথা যেন শতদল থর ?
কত ছিল খেত খােলা, শস্যপূর্ণ ছিল গােলা,
ইন্দিরার যেন সব মন্দির সুন্দর।
সবারি আছিল হাল, গােয়ালে গরুর পাল,
দুধেভাতে সকলেই পূরিত উদর।
আছিল নিঃশঙ্ক মনে, প্রিয় পরিবার সনে,
মা বােন্ সুন্দরী হলে নাহি ছিল ডর?
নিশীথে পতির বুকে, সতী ঘুমাইত সুখে,
কাড়িয়া নিত না কোন দানব পামর ।
সে দেশে আছিল ভাই সুখে নারীনর।
কস্তুরী
৭
সে দেশ আছিল ভাই দেবনিকেতন,
ধার্মিক প্রজার প্রিয়, দেবােপম পূজনীয়,
সে দেশে আছিল রাজা কালীনারায়ণ ।
জননী সমান জানি, সত্যভামা ছিলা রাণী,
মমতার মন্দাকিনী স্নেহ-প্রস্রবণ।
রাজবালা কৃপাময়ী, কপার তুলনা কই ?
রাজেন্দ্ৰ নামেতে ছিল রাজার নন্দন!
নাহি ছিল অবিচার, নাহি ছিল ব্যভিচার,
নাহি ছিল অনাথার করুণ ক্রন্দন!
যার খেত সে অবশ্য, পাইত তাহার শস্য,
পারিতনা লুঠে নিতে চোর মন্ত্রিগণ ।
সে যায়নি অধঃপাতে, সে খেত’ আপন হাতে,
নিজেই নিজের রাজ্য করিত শাসন,
প্রজার কল্যাণে হিতে, সে চাহিত প্রাণ দিতে,
দেশের মঙ্গলে সদা আছিল যতন ।
কৃষি শিল্প ব্যবসায়, রাজ্যের উন্নতি যায়,
তাহাতে অজস্ৰ অৰ্থ করিত বর্ষণ,
প্রজার শিক্ষার তরে, কত যত্নে সমাদরে,
গ্রামে গ্রামে বিদ্যালয় করিত স্থাপন ;
নাহি ছিল জলকষ্ট; রােগে না হইত নষ্ট,
দেশে কভু নাহি ছিল অকাল মরণ,
কাটাইয়া জলাশয়, স্থাপিয়া চিকিৎসালয়,
প্রজার অভাব দুঃখ করিত মােচন।
আমার বাড়ী।
১০৭
ছিল ‘প্রজাহিতৈষিণী প্রজা-হিতসংসাধিনী,
রাজার সে অদ্বিতীয় কীৰ্ত্তি অতুলন;
কিন্তু তা কোথায় আজ, কোথা সেই মহারাজ
ডুবেছে সূর্যের সহ সহস্র কিরণ !
সে যে ছিল দেবপুর দেবনিকেতন।
-
৮
যে দেশে আছিল বাড়ী, সে যে দেবপুর,
সেখানে ছিলনা পাপ, নাহি ছিল পরিতাপ,
সে দেশে ছিলনা ভাই দানৰ অসুর!
ক্ষুধা তৃষ্ণা অনাহারে, মরিতে হত না কারে,
দরিদ্র ভিখারী অন্ধ অনাথ আতুর,
রাজার দয়ার দানে, সকলে বাচিত প্রাণে,
শ্রাবণের ধারা সম প্রভূত প্রচুর !
বিনা দোষে নির্বাসিত, কারে না করিয়া দিত,
হাতী দিয়ে ভেঙ্গে ঘর করিত না চূর!
কিম্বা গৃহ পােড়াইয়া, সে দিত না খেদাইয়া,
সে ছিলনা আততায়ী পাপিষ্ঠ নিষ্ঠুর !
সে ছিল ভগিনী ভ্রাতা, সে যে ছিল পিতা মাতা,
সে যে ছিল সকলের মাথার ঠাকুর।
হায়, কোথা গেলা আজ, দেবপুর-দেবরাজ,
হৃদয়ে হানিয়ে বাজ রাজাবাহাদুর ।
যে দেশে আছিল বাড়ী, সে যে দেবপুর ।
৭
যে দেশে আছিল ভাই বসতি আমার,
সে দেশে চিলাই তীরে, বিধৌত রজত নীরে,
১০৮
কস্তুরী
আজিও শুশানশষ্যা আছে সারদার !
কুমুদ কমলে হায়, শরত সাজায় তায়,
সায়াহ্ন জ্বালায়ে দেয় দীপ তারকার,
কুয়াসা ধূমের রূপ, শিশির দিতেছে ধূপ,
বাজায় মঙ্গল-শঙ্খ হংস অনিবার।
প্রভাত পাখীর স্বরে, বসন্ত বন্দনা করে,
পবিত্র প্রণয়গীতি গাইয়া তাহার !
স্নেহের নয়নাসারে, বরষা ধােয়ায় তারে,
ঢালিয়া নবীন মেঘে নব জলধার।
দেবদেশে ছিল ভাই বসতি আমার ।
দেবদেশে ছিল ভাই দেবনিকেতন,
যত তরু যত লতা, সবি কল্পতরু তথা,
সে দেশের যত বন সকলি নন্দন!
সে দেশের স্রোতস্বিনী, সকলেই মন্দাকিনী,
সকলি অমৃতগঙ্গা সুধপ্রস্রবণ !
সে দেশের স্বর্ণভূমি, হায় কি বুঝিবে তুমি,
তরঙ্গিয়া উঠিয়াছে সুমেরু কেমন ?
সে দেশে ‘মাণিকা বিলে”, মাণিক-কমল মিলে,
কি ছার সে মানসের হেম পদ্মবন !
আন্দোলিয়া নীল বারি, জল নিতে কুলনারী,
সলিলে গলিয়া পড়ে তরল কাঞ্চন!
সে দেশে নারীর ঠোঁটে, পারিজাত ফুল ফোটে,
নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে বহে সুধা সমীরণ,
আমার বাড়ী ।
১০৯
তাদেরি আননে হয়, সে দেশের চন্দ্রোদয়,
তাদেরি চরণে ডুবে কনক তপন!
তাদেরি করুণা স্নেহে, নব বল আসে দেহে,
জরামৃত্যু করে যেন দূরে পলায়ন,
অমৃত তাদেরি কথা, সে আদর সে মমতা,
জুড়ায় বুকের ব্যথা জ্বালাপােড়া মন।
সে দেশে রমণী দেবী, আমি তারে নিত্য সেবি,
জননী ভগিনী রূপে পূজি শ্রীচরণ,
সে দেশে ত পর নাই, সবি পিতা সবি ভাই,
প্রাণের অধিক মাের সকল আপন।
সে যে ছিল দেবপুর দেবনিকেতন।
কি হবে শুনিয়া ভাই কোথা বাড়ী ঘর ?
যে দেশে আছিল বাড়ী, আজি তার নরনারী,
শােকে দুখে বিষাদিত ব্যথিত কাতর।
সয়তান লাগিয়া পিছে, কলম কাড়িয়া নিছে,
তাহারা হয়েছে আজ পশু বনচর,
তাহারা ভূতেরে পূজে, যুত খায় মাথা গুজে,
পিঠে খায় কীল কুনি, গালে খায় চড়!
নীরবে সকলি সহে, মরার মতন রহে,
মা বােন্ সতীত্বহারা করে ধড় ফড়!
ভাবিছে অদৃষ্ট সার, এই লিপি বিধাতার,
এত কাপুরুষ করে দৈবের নির্ভর,
এত গেছে অধঃপাতে, পিশাচের পদাঘাতে,
১১০
কস্তুরী
অরণে নয়নে অশ্রু বহে দরদর ।
হায় সে দেশের কথা, দুঃখময় সে বারতা
আমি যে রেখেছি বুকে চাপিয়া পাথর !
কি হবে শুনিয়া ভাই কোথা বাড়ী ঘর ?
২৪শে বৈশাখ-১৩০২ সন।
মধুপুর, E. I. R,
উলঙ্গ রমণী।
বড় ভালবাসি তোরে উলঙ্গ রমণি।
উদলা উজ্জ্বল বেশ, সৌন্দর্য্যের একশেষ,
চৌদিকে চাদের শােভা উছলে যেমনি।
নাহি বিঘ্ন নাহি বাধা, অতি শুভ্র—অতি সাদা,
অতি জ্যোতির্ময় দীপ্ত দেবদেহ খানি।
যে অঙ্গে যেখানে চাই, কোন আবরণ নাই,
বিতরে অনন্ত তৃপ্তি দিবস রজনী।
বিমল রূপের ডালি, বদান্যতা ভরা খালি,
কারে বলে কৃপণতা জানে না কখনি,
ক্ষীরােদ সিন্ধুর মত, সীমান্ত শােভা কত,
চেয়ে চেয়ে, চেয়ে চেয়ে অবশ চাহনি।
বড় ভালবাসি তােরে উলঙ্গ রমণি।
২
বড় ভালবাসি তােরে উলঙ্গ রমণি
!
গিয়াছে সঙ্কোচ ভয়, লাজ লজ্জা সমুদয়,
উলঙ্গ রমণী।
১১১
সরল শােভার তুই শত প্রস্রষণী ।
নাহি শঙ্কা নাহি ত্রাস, নাহি গুপ্ত অভিলাষ,
নিৰ্ম্মল জ্বলন্ত রূপ যথা সৌদামিনী,
ছলনা বঞ্চনা নাই, স্বপ্ৰকাশ সৰ্ব্বদাই,
নাহি কোন লােক-নিনা, নাহি কোন গ্লানি
সরলা আপনা ভােলা, সৰ্ব আবরণ খােলা,
কুরুচি বলিয়া লােকে করে কানাকাণি ?
তবু তােরে ভালবাসি উলঙ্গ রমণি !
.
আমি বড় ভালবাসি উলঙ্গ রমণী,
উলঙ্গ গোপিনীকুলে, কাল কদম্বের মূলে,
কালিন্দীর কাল জলে কমলের শ্রেণী !
কেহ ভাসে কেহ ডুবে, যেন চন্দ্র থুবে থুবে,
নীলসিন্ধু ভেদি আহা উঠিছে এখনি
সে লাবণ্য মুক্তবক্ষে, কে পারে সহিতে চক্ষে,
নগন জঘনে কাম মগন আপনি।
যমুনার মত বয়ে, কে না যায় জল হয়ে,
দেখিলে সে মােহময় নম্বনে চাহনি।
আমি বড় ভালবাসি উলঙ্গ রমণী ।
৪
জ্বরে ভালবাসিতাম তােমারে গোপিনি।
সামান্য লজ্জার লাগি, যদি না লইতে মাগি,
চুরি করে যে বসন নিল নীলমণি ।
দু’দিকে দুহাত দিয়ে, দুকুল রাখিতে গিয়ে
১১২
কন্তরী
অকূলে ডুবিলি বৃথা কাঞ্চন তরণি ?
ক্ষুদ্র ও কমলপাতে, পৰ্বত ঢাকে কি তাতে ?
বৃথা যত্ন, বৃথা চেষ্টা, ওরে অবােধিনি।
ঘৃণালজ্জা মানপ্রাণ, প্রেমের দক্ষিণ দান,
কেননা পারিলি দিতে, কুষ্ঠিত এমনি?
যে যাহারে ভালবাসে, সে ত বুকে যায় আসে,
নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে তার ওরে গােয়ালিনি,
অন্তরে বাহিরে তার, কোথা থাকে অন্ধকার ?
আপনি সাধিয়া সে যে সাজে উলঙ্গিনী !
হিয়ার ভিতরে তাের, নিয়া যদি মনােচোর,
দেখাতি উলঙ্গ করি হৃদয় ধমনী,
আরাে ভালবাসিতাম তােরে গােয়ালিনি!
আমি বড় ভালবাসি উলঙ্গ রমণী,
অসুর-শােণিত-নদে, নাচে শ্যামা রণমদে,
গৈরিক-প্রবাহে যেন মত্ত মাতঙ্গিনী ।
কিংবা রক্ত-সিন্ধু জলে, নীল বাড়বাগ্নি জ্বলে,
নিয়ে গগন নীলে শত দিনমণি !
অধরে সে অট্টহাসি, মাখা দৈত্য রক্তরাশি,
সুরক্ত চলনে রক্ত জবাফুল জিনি।
বিলী স্বর্গের সিড়ি, বুকভরা নীলগিরি
আরক্ত উষায়, রক্তে ভাসিছে তেমনি।
অসুরের মুণ্ডমালা, নীলব করে আলা,
শােভে যেন নভ নীলে জ্যোতিষ্কের শ্রেণী ?
উলঙ্গ রমণী ।
মনে শয়নে অাছে, ফুলধনু রেখে কাছে-
কে বলে মরেছে কাম, কেবলি কাহিনী।
সুন্দরী নারীর রাগে, ফুল ফোটে আগে আগে,
শরত বসন্তে জাগে পূর্ণিমা রজনী।
এত রূপে হায় হায়, কে না ভােলে মােহ যায়
আপনি লুটায়ে পায়, পড়ে শূলপাণি ।
আমি বড় ভালবাসি উলঙ্গ রমণী ।
আরাে ভালবাসিতাম শিব-সিমন্তিনি।
যদিও আপনাহার, বিশ্ব-প্রেমে মাতােয়ারা,
যদিও নাশিতে পাপ রণে উন্মাদিনী,
যদিও ধরার ভার, হরিতে এ অবতার,
পুণ্যের প্রতিষ্ঠা হৌক, তবু ত জননী,
ভগিনী, দুহিতা নারী, সৃজন পালন তারি,
মমতার মােম সে যে স্নেহের নবনী।
তার হাতে অসি খাড়, দুধের ঝিনুক ছাড়া?
দু’হাতে অভয় বর থাকে থা জানি,
প্রেমময়ী রমণীর, করে শোভে ছিন্নশির,
কার গাে পীরিতে রাঙ্গা অবনী এমনি ?
শরীর শিহরে ত্রাসে, সৌন্দৰ্য-রাক্ষস গ্রাসে
নতুবা শিবের মত ভাঙ্গা বুক খানি,
ও রূপের পদতলে, ঢালিতাম কুতূহলে,
দেখিতাম প্রাণ ভরি দিবস রজনী,
আমি বড় ভালবাসি উলঙ্গ রমণ।
৭
বুক ভরা অপরূপ, যেন আলিঙ্গন স্তুপ,
১১৪
১১৪
কস্তুরী
সব চেয়ে ভালবাসি শ্মশানে রমণী।
সে লাবণ্য অতিমুক্ত, পুণ্যযুক্ত জয়যুক্ত,
চৌদিক বেড়িয়া তার উঠে হরিধ্বনি।
নাহি হিংসা নাহি দ্বেষ, নাহি সুখ দুঃখ ক্লেশ,
নিৰ্বাপিত প্রবৃত্তির প্রতিমা যেমনি !
অথবা তাহারি কাছে, ব্রহ্মাণ্ড নিবিয়া আছে,
জাগ্রত অনন্ত শক্তি আছে একাকিনী,
তপস্যা সমাধি ধ্যানে, প্রবুদ্ধ মুনির প্রাণে,
অতিমুক্ত স্বপ্ৰকাশ চৈতন্যরূপিণী ।
অর্ধেন্দু ললাটে তার, শত জ্যোতি পূর্ণিমার,
শান্তির নিলয় যেন নয়নের মণি !
প্রভাতের পদ্মগালে, সুধা বাড়া পুষ্প থালে,
অমৃত-চুম্বন-চিহ্ন রয়েছে তেননি।
কি সুন্দর রাঙ্গা ঠেঠে, উষার তরঙ্গ ওঠে,
প্লাবিয়া কুসুম কুদ দশনের শ্রেণী !
বিরাট বিশাল উচ্চ-স্পর্শে দিনমণি।
যেন দিয়ে ক্ষুদ্র ধরা, সে বুক গেল না ভরা,
আরাে চাহে কোটি বিশ্ব এমনি এমনি।
নিষ্কলঙ্ক নিৰ্ব্বিকার, যৌবনের জ্যোৎস্না তার,
নিত্যবুদ্ধ সত্যশুদ্ধ আনন্দরূপিণী ।
সে মুক্ত রূপের কাছে, সৌন্দর্য্য কোথায় আছে
লাবণ্যে ভাসিয়া গেছে আকাশ অবনী।
চীনজাপান
১১৫
শ্যামের বাঁশীর গান, শিবের শিঙ্গার তান,
ডুবায়ে উঠিছে আরাে উচ্চে হরিধ্বনি।
‘বল হরি হরি বল’, কাঁপিতেছে দিত্মণ্ডল,
চমকি চিলাই চায় ক্ষুদ্র প্রবাহিনী।
তাহার শিয়রে আসি, উলঙ্গ রূপের রাশি,
শ্মশানে শুইয়া আছে; দিগন্ত ব্যাপিনী
জ্বলিছে প্রতিভা তার, কি সুন্দর মহিমার,
নিম্প্রভ করিয়া যেন চিতার অগিনি।
সেই যে চিলাইব চিতা, আজো প্রাণে প্রজ্জ্বলিতা,
ব্ৰহ্মাণ্ড ভরিয়া সেই উঠে হরিধ্বনি।
আমি বড় ভালবাসি উলঙ্গ রমণী ।
৫ই অগ্রহায়ণ-১২৯৭ সন।
মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ।
চীনজাপান যুদ্ধ।
যা হয়েছে এই ঢের, থারে জাপান,
বুঝেছি বুঝেছি তাের, আছে বেশ, গায়ে জোর,
উদ্ধত যুবক তুই বীর বলবান্ !
নববীৰ্য্যে নবােৎসাহে,নিত্য নব জয় তাহে-
মারিতে পারিস বেশ, বন্দুক কামান !
নিত্য তাের নবস্ফুৰ্ত্তি, গর্বিত মাৰ্ত্তণ্ড মূর্তি,
জ্বলিয়া উঠিছে পূবে বিরাট বিমান।
কস্তুরী
তাের ও গর্বিত সেনা, প্রশান্তে অশান্ত ফেনা,
‘উইলাে’ ঠেলিয়া জোরে উঠিছে উজান।
‘কিউরণ’ ভাসাইয়া, ‘উইজি ধরিলি গিয়া,
ফুৎকারে উড়ায়ে ‘চিফু’ রেণুর সমান।
‘মানচুরিয়া’ মান চুরিয়া মােদেন’ মুখে নিয়া,
‘প্রাচীর’ ভাঙ্গিতে চাস করি থান্ খা!
‘কোরিয়া’ কাড়িয়া নিলি, পিগাঙ্গ’ ফেলিলি গিলি,
বিরাট বিশাল চীন ভয়ে কম্পমান!
যা হয়েছে এই ঢের, থারে জাপান।
২
যা হয়েছে এই ঢের, থামূরে জাপান।
আর রণে কাজ নাই, তােরা যে আপন ভাই,
এসিয়া মায়ের ভােরা স্বাধীন সন্তান।
তােরাই ভরসা তার, তােরা তার অহঙ্কার,
তােরাই জগতে তার রেখেছি প্রাণ।
আশা তার জলে স্থলে, মহাশক্তি মহাবলে,
আবার করিবি ভোের নব দিনমান ।
লঙ্ঘিরা ‘অমর নদ’, লজিয়া ‘বৈকাল হ্রদ,
‘ইউরেলে উড়াইবি বিজয় নিশান।
ভাসাইবি রণতরী, ‘কাস্পীর সাগর’ পরি,
রাথিবি সে ককেসস্ দ্বারে দ্বারবান্।
তাের যে রে এসিয়ার স্বাধীন সন্তান।
যা হয়েছে এই ঢের, থামরে জাপান,
তাের যে রে ভাই ভাই, ভুলেছিস, মনে নাই ?
চীনজাপান যুদ্ধ।
১১৭
তােরা যে রে সহােদর একই সমান।
এক রক্ত এক মাংস, এক বংশ দুই অংশ,
তােরা যে রে এক দেহে হাত দুই খান।
এক জল এক বায়ু, একই জীবন আয়ু,
তােরা যে করিস্ মার এক স্তন পান।
এক কোলে এক বুকে, একত্র আছি সুখে,
তাহাতে বিবাদ কেন—রণে আগুয়া ?
যা হয়েছে এই ঢের, থারে জাপান।
ও
যা হয়েছে এই ঢের, থামরে জাপান,
ক্ষমা কর ভাই বলে, কাজ নাই আয় চলে,
ভেঙ্গেছি চীনের ত বড় অভিমান।
ছিল যে বিশ্বাস অন্ধ, তার চেয়ে সব মন্দ,
জগতের গুরু সেই জ্ঞানে গরীয়া,
অসীম বিশাল বিশ্ব, আজিও তাহার শিষ্য,
তাহারি চরণতলে সকলের স্থান!
তার চেয়ে মহােন্নতি, আরাে আছে উর্ধগতি,
আরাে যে জগতে জাতি আছে বুদ্ধিমান,
তার নদী তার হ্রদ, তার দেশ জনপদ
তাহার সামর্থ্য শক্তি শিলপ বিজ্ঞান,
রাজনীতি যুদ্ধনীতি, স্বজাতি স্বদেশপ্রীতি,
তাহার হইতে শ্রেষ্ঠ আছে সুমহান,
ছিলনা বিশ্বাস তার, ছিল বড় অহঙ্কার,
১১৮
কস্তুরী
ভেঙ্গেছি সে বড়াই স্পর্ধা অভিমান,
ষা হয়েছে এই টের, থামূরে জাপান।
যা হয়েছে এই ঢের, থারে জাপান,
আয় আয় আয় ফিরে, মায়ের মাথার কিরে,
আয় ভবিষ্যৎ-অন্ধ উদ্ধত অজ্ঞান।
কেন আর আত্মদ্রোহে, মাতিয়া মরি মােহে,
করিস্ আপন রক্ত আপনিই পান ?
হা রে এসিয়ার জাতি, অবিবেকী আত্মঘাতী,
এমনি করিয়া নাকি লভিৰি নিৰ্বাণ ?
শুধু তােরা দু’টী ভাই, এ ছাড়া জীবিত নাই,
আর যে সকলি মৃত তাতার তুরাণ,
ককেসিয়া কি পারস্য, সবারি মৃতের হাস্য,
আরব নীরব, মৃত বেলুচি আফগান!
মালয় লেয়স নয়, আনাম আনাম নয়,
আব্ৰহ্ম-ভারত ভস্ম-নেপাল ভুটান।
পশ্চিমের মহা ঝড়ে, পৃথিবী ভাঙ্গিয়া পড়ে,
এসিয়া পেষিয়া যাবে হয় অনুমান!
কেবল তােরাই বাকি, তাও বুঝি যাস্ নাকি,
হা অদৃষ্ট, হা কপাল, হায় ভগবান,
এসিয়া আফ্রিকা হবে—অহল্যা পাষাণ?
এখনও সময় আছে, থারে জাপান,
অই যে সাগর পীতে, রুষ আর ফরাসীতে,
চীনজাপান যুদ্ধ।
১১৯
হরষিতে আছে চেয়ে খাড়া করে কাণ!
বৃটনের রণতরী, পূরব সাগর পরি,
খুজিছে কোথায় ছিদ্র কোথায় সন্ধান।
তাের হলে বলহীন, আঘাতে আঘাতে ক্ষীণ,
হইলে অবশ অঙ্গ প্রায় ম্রিয়মান,
সিংহ ও ভল্লুকে বাঘে, ছিড়ে খাবে চীনা ছাগে,
পাবিনা প্রসাদ তুই কণিকা সমান।
এখনও সময় আছে, থারে জাপান।
৭
এখনও সময় আছে, থারে জাপান,
এত শুধু নহে জয়, নহে শুধু অভুদম,
ভিতরে বিষম ক্ষয়-মহা অবসান।
চাহিয়া দেথরে পাছে, মহামৃত্যু চেয়ে আছে,
বাড়াইছে ভবিষ্যত্ জিহ্বা লেলিহান ।
আগে এক-পরে দুই, চীনের পরেই তুই,
গরাসিবে তােরে মূখ গোঁয়ার অজ্ঞান ?
অই দেখ ইউরােপ, ওছাইয়া আছে কোপ,
যায় বুঝি এসিয়ার এবার গর্দান ।
এখনাে সময় আছে, থামরে জাপান।
৮
এখনাে সময় আছে, থামরে জাপান,
ধিক্ ও উন্নতি শিক্ষা, ধিক্ ও সভ্যতা দীক্ষা,
দেখে না যে ভবিষ্যৎ, দেখে বর্তমান।
কি করিবে রেলগাড়ী, কি করে জাহাজ তারি,
১২০
কন্তুরী
যদি তা অদৃষ্ট রাজ্যে না পৌছায় জ্ঞান।
কি করে সে তার-পথে, যদি সেই রাজ্য হতে,
পায় সংবাদ সত্য ধ্রুব বর্তমান।
একি রে উন্নতি তবে, অধধাগতি কারে কবে ?
মরিবার আগে তাের নাড়ী বলবান,
এখনাে সময় আছে, থারে জাপান।
৭
এখনাে সময় আছে, থারে জাপান,
এক শৃঙ্গে করি ভর, ওঠে নাই নিরন্তর,
অনন্ত উন্নত অই গিরি হিমবান।
যদি থাকে বন ছাড়া, প্রকাণ্ড গ্রাধ খাড়া,
উড়াইয়া ফেলে তারে ভীষণ তুফান।
মিলে মিশে দুই ভাই, থাক্ তােরা এক ঠাঁই,
এক আত্মা, এক দেহ, এক মনপ্রাণ।
তা হলে ও ভীমদেহ, সাধ্য কি চুইবে কেহ,
ভাঙ্গিতে পারিবি ‘আল্প’ ধরে দিলে টান।
পশ্চিমের শশিরবি, আবার কাড়িয়া লবি,
দাপটে করিবি ধরা পুনঃ কম্পমান,
প্রশান্তের মহা ঢেউ, সাধ্য কি সহিবে কেউ,
‘আণ্ডিস’ উড়িয়া যাবে ভাসিবে ‘সুদান’!
যা হয়েছে এই ঢের, থারে জাপান।
১৯শে কার্তিক, ১৩০১ সন।
কলিকাতা।
}
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.