Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Premer Pathar
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
প্রেমেৰপাকার।
( ক্লাসিক থিয়েটারে অভিনীত।)
নিত্যবােধ বিদ্যারত্ন-প্রণীত।
প্রকাশক,এনৃপেন্দ্রচন্দ্র বসু।
৯৩ নং মাণিকতলা স্ট্রীট, কলিকাতা,
১৩১১।
১ই পৌষ, রবিবার।
Calcutta:
Printed by T. C. Ash, at the
VICTORIA PRESS,
%, Goabagan Street,
প্রেমের পাথার।
প্রথম অক্ষ
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
( নবাবের দরবার।)
উজীর, সভাসদগণ, বন্দনাকারিণীগণ ইত্যাদি।
গীত।
বর্ণনাকারীগণ। মওলা নেহি'তের সানী তু হায় যেমিশা।
লারি দুনিয়া ফানি, তুঝকো মগর, হায় নেহি জওয়া।
কুর করতেইে তের,
তুনে এয়সা শা দিয়া,
যো হয় বহুৎ ঋস খেসাল,
খােদ।! তু হায় বেমিশাল।
মেহেরুসে তেরে, সব হো, আবনেহাল
ডিসেম্বই-- ৫ ০
২
প্রেমের পাথার।
১ম সভাসদ। সচ, হায়। অনেক পুণ্যফলে শা-আলমের মত
বাদশা পাওয়া যায়।
২য় সভাসদ। বাস্তবিকই বাদশার দানশক্তির কথা ভাবলে বিস্মিত
হয়ে যেতে হয়। যাচককে ফেরাৰ না, এই পণ প্রকাশ্য
ভাবে করে, সেই প্রতিজ্ঞা রক্ষা কত্তে পারা, কখনই সামান্য
নয়। দাতার বিষয়ে হাতেমতাই হাতেমের কথা
পড়েছিলুম, আর চক্ষে আমাদের সুলতানকে দেখলুম।
(নেপথ্যে ঘণ্টাধ্বনি)
(বন্দনাকারিণীগণ, সভাসদগণ ইত্যাদির)
গীত।
হের অদীন দীন শরণে।
হে রমণীয় কমনীয় বরণীয় বরণে।
নেহার শুভ্র প্রভাত-জ্যোতিঃ বিরাজিত কত বদনে।
হের বাঞ্ছিত বঞ্চিত, ভূষিত তাপিত চিত,
গত দুঃখ সুখ শাসনে।
হের বিচলিত ভীত, চকিত নিয়ত, শাসনে সতত পুলকিত চিত,
দুরিত দহন শম দম যত, বিরাজে রাজীব চরণে।
শা-আলম। তােমরা আমায় ভালবাস, তাই ব’লছো, ভালবাসায়
দোষ দেখা যায় না। দোষও গুণ বলে বােধ হয়, তাই
এমন কথা বলতে সাহস কক্ষ, নইলে হয় ত’ আমায়
তক্তের উপযুক্তও ভাবতে না। বন্ধুগণ ! তােমাদের সেবার
জন্য আমি আল্লা কর্তৃক প্রেরিত। প্রজার দুঃখ মােচন
করা আমার কর্তব্য, কর্তব্যপালনে সুখ্যাতি কি, অপালনেই
দোষ। সূর্যের তাপরূপে জল নিয়ে মেঘরূপে জল দেওয়ার
প্রেমের পাথার।
মতন, আমি প্রজার অর্থেই প্রজাকে সাহায্য করি।
সাহায্যের জন্য এত প্রশংসা পাওয়ার আমি সম্পূর্ণ অযােগ্য।
১ম সভাসদ। আহা! এমন মন কি মানুষের হয়।
শা-আলম। আজ কোন প্রার্থ উপস্থিত আছে ?
উলীর। না জঁহাপনা, আপনার দাতৃত্বগুণে এ রাজ্য অদীন,
তাই আপনার রাজ্যে অভাব নেই, অভাব জানাবার
লােকও নেই।
( মােসাফেরের প্রবেশ)
মােসাফের। শা-আলম, খােদার রাজ্যে অভাব জানাবার লােক
আছে, আর তােমায় রাজ্যে নেই। এ ভুল কথা।
শা-আলম। কে অভাৰ জানাবার লােক আছ এস, বল কি ব্যথায়
তুমি ব্যথিত। ৰ'লে দেও, কি সাহায্যে তােমার সে ব্যথা
অপনােদিত হবে। এ ধরবার চিরদিনের জন্য প্রার্থীর
নিকট উন্মুক্ত।
মােসাফেয়। সুলতান। আমি যা চাই, তুমি তা দিতে পারবে?
শা-আলম। মােসাফের! যাচকের বাসনা পূর্ণ করাই শা-আলমের
জীবনের ব্রত।
মােসাফের। সাহানশা! এই অহঙ্কারের কথা শুনেই একদিন
প্রাণে তুমুল ঝড় ব’হেছিল। সে ঝড়ের বেগ হৃদয়ের মধ্যে
ধরে রাখতে পারিনি। সেদিন থেকে এখনও বুঝতে
পারিনি—আল্লা ছাড়া আর কেউ দাতা হতে পারে।
সুলতান! আমার মনের কথা মিলিয়ে নিতে আল্লার নাম
ছেড়ে আজ আমি তােমার প্রার্থী।
প্রেমের পাথার।
শা-আলম। মােসাফের! বল, কি রত্ন পেলে তুমি সন্তুষ্ট হও?
মােসাফের। দাম্ভিক সংসারি ! যে রত্ন পেলে আমি সন্তুষ্ট হই, তা
দেবার ক্ষমতা, তােমার নেই। আমি যা চেয়ে সন্তুষ্ট, তা
তুমি দিতে পার?
শা-আলম। যদি আল্লার পায়ে মতি থাকে, মােসাফের! তােমার
কোন ইচ্ছা পূর্ণ করা কখনই অসম্ভব হবে না।
মােসাফের। সুলতান! এখনাে ভাব। এখনাে ভাববার অবসর দিচ্ছি,
এখনাে ব’লচি, ইচ্ছে করে নরকের পথ পরিষ্কার কর না।
শা-আলম। খোদা! আজ কি বিপদসঙ্কুল পরীক্ষায় আমায় ফেলতে
চাচ্চ। আল্লা, তােমার নাম নিয়ে যাচককে ফেরাব না শপথ
ক’রিচি। তােমারই আশীর্বাদে, এতদিন নিরাপদে সে
প্রতিজ্ঞা রক্ষা কত্তে সমর্থ হয়েছি। তােমার নাম নিয়ে আজ
ফের শপথ কচি মােসাফেরের প্রার্থনা পূর্ণ করবে।
তােমার নাম নিয়ে শপথ করেছি, তোমার নাম নিয়ে
শপথ ক’চ্চি, দেখো খােদা! মােসাফেরের প্রার্থনা যেন পূর্ণ
হয়। মােসাফের ? তুমি কি চাও বল, আল্লার কসম, আমি
তােমার প্রার্থনা পূর্ণ ক’বো। উজীর। জাহাপনা ! কি
কল্লেন ?
মােসাফের। কি, কি কল্লেন ! শা-আলম ! তুমি চিরসুখী হও,
জগদীশ্বর তােমার মঙ্গল করুন, আমি তােমার দান নােব না।
শা-আলম। ( তক্ত হইতে অবতরণ পূৰ্ব্বক) না মােসাফের, ও
কথা ব’ল না। আমি নতজানু হয়ে ব’চি, আমার প্রতিজ্ঞা
ভঙ্গ কর না। প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে আমায় অনন্ত নরকে
ফেলাে না। মান, সম, ঐশ্বৰ্য্য, সব দুদিনের জন্যে । আমায়
প্রেমের পাথার।
নশ্বর পার্থিব জিনিষ দিয়ে, আমার শেষের সম্বল পথখরচ
নিও না। জান কবুল, মােসাফের! কি চাও বল, আমি
এখুনি দোবাে।
মােসাফের। আল্লার নাম নিয়ে ফের শপথ কর—আমার প্রার্থন
পূর্ণ করবে।
শা-আলম। আমি খোদার নাম নিয়ে শপথ ক-িতোমার কোন
প্রার্থনা অপূর্ণ রাখবে না।
মােসাফের। তবে শােন সুলতান! আমি তােমার সিংহাসনের
সম্পূর্ণ অধিকার চাই।
শা-আলম। খােদা, খোদা, কে বলে প্রাণ ভরে ডালে মনের
বাসনা পূর্ণ হয় না। মােসাফের ! তাই মঞ্জুর।
সকলে। (নতজানু হইয়া ) ইয়ে আল্লা।
উজীর। খােদা, এ সংসার কি শয়তানের খেলাঘর।
মােসাফের। মঙ্গলময়! কি ক’ত্তে কি ক’ল্লম। দড়ি দিয়ে জল
বঁধতে গেলুম। জল বাঁধা হ’ল না, শুধু দড়িতেই গেরো
পড়লো। আল্লা! তুমি মনে বল দিও। আল্লা ছাড়া
আর কেউ দাতা হতে পারে, এ কথা একদিনে মনে
বিশ্বাস করিয়ে দিও না। আমায় আরো দেখতে দাও।
মেহেরবান্ আল ! আমায় আরাে দেখবার মরজী দাও।
( প্রকাশ্যে ) রাজ্যহীন ধরণীশ্বর ! এখুনি আমার মুকুট
পরিত্যাগ কর।
শা-আলম। নবাব সাহেব ! তােমার ঈপ্সিত ইরাণের মুকুট
নাও। বন্ধুগণ ! কার্যের জন্য হয়ত অনেক অপ্রিয় কথা
পেয়েচো, আমার ভালবাসা ভেবে, তা ভুলে যাও। আমার
প্রেমের পাথার
ভালবাসা ভেবে, নবীন ভূপতিকে আমারই মতন দেখাে।
আল্লা তােমাদের মঙ্গল করুন। নবীন ভূপতির অন্তরে
চিরানন্দ দিন। আমার রাজকার্যের অবসর আমার শেষ
সেলামের সহিত গ্রহণ কর।
( মওলার প্রবেশ )
মওলা। আপ্লাজান, আপ্পাজান, তুমি অমন করে দাড়িয়ে
রয়েছে কেন?
মােসাফের। ভূতপূৰ্ব্ব নবাব ! এই বোধ হয় একদিন নবাব
জাদা ছিল ?
মওলা। ভূতপূৰ্ব্ব নবাব এ কথা ব’লচ কেন ফকির? বাবা, আর
কি তুমি নবাব নও ?
মােসাফের। অবােধ বালক! তুমি যাকে ফকির ব’চো, সে
ফকির নয়। তােমার জনকের দানাভিমানের ফলে, সেই
এখন এ ভক্তের মালিক। তুমি আর নবাবজাদা নও,
তুমি গরীবের ছেলে। তুমি দীন হীন ভিক্ষুকের ছেলে।
মওলা। নবাব সাহেব! আমায় ভিক্ষুকের ছেলে বলবেন না।
যিনি ধৰ্ম্মপালনের জন্যে রাজ্যদান করেছেন, আমায় তঁার
ছেলে বলুন।
মােসাফের। গর্বিত বালক। তােমার শাস্তির প্রয়ােজন। আমি
এ রাজ্যের অধীশ্বর। আমি আদেশ ক’চ্চি, তােমার অলঙ্কার
খুলে দাও ।
মওল। যার বাপ সমস্ত রাজ্যদান কওে পারে, তার ছেলে
যাচককে, তুচ্ছ মতির মালা খুলে দিতে দুঃখ করে না।
প্রেমের পাথার
৭
(মালা প্রদান) বাবা! ফকিরের ছেলের গলায় মতির মালা
মানায় না। দেখ, আমি সব খুলে দিইচি।
মােসাফের। ছেলের মুখ চাইবার এখন সময় নয়, আমায়
রাজকোষ আর তােপখানা বুঝিয়ে দিয়ে, তুমি এখুনি আমার
রাজ্য পরিত্যাগ কর।
শা-আলম। নরপতি, আনুন।
উজীর। আল্লা! তােমার সব কাজই কি মঙ্গলের জন্যে।
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
(রাজপথ )
দানিশমন ও কতিপয় নাগরিকের প্রবেশ।
দানিশ। আরে আইয়ে, আইয়ে। মের কসুর না লেনা। আমি
আপনাকে দেখিনি। হয়েছে কি জানেন, একে মনে একটু
রাগ, আর দুঃখু হয়েছিল, তায় নির্জনে, রাস্তায় বসে,
কবিতা রচনা নিয়ে, একটু তন্ময় হয়ে পড়েছিলুম। তাই
হঠাৎ আপনাকে চিনতে পারিনি। ভাল করে দেখলে,
নিশ্চয়ই চিতে পারতুম। আপনি আমায় দেখেই
চিনেছেন, আর আমি আপনাকে চিনতে পারবে না, এটা
কি কথা হল ?
১ম নাগরিক। হ্যা সাহেব! মনে রাগটা হয়েছিল কেন ?
দানিশ। সে ভাই অনেক কথার কথা। আমি খুব বড় গাইয়ে
প্রেমের পাথর।
কি না, তাই এক আহাম্মুক আমার সরল তরল প্রাণে,
খানিকটে গরল ঢেলে দিয়েছিল।
২য় নাগরিক। ক্যা, সা গাওয়াইয়া যায় ?
১ম নাগরিক। আরে মিঞা বলছো কি! এর মতন গাইয়ে
পৃথিবীতে আছে ক’জন।
দানিশ। আর ভাই, তােমরা যে ক’দিন আছ, সেই ক’দিনই
আমার যা কিছু। সাহেব! সমজদার দুনিয়াতে থাকে
ক’জন। চাদের কদর, চকোরেই জানে; দাড়-কাকে ত
আর জানে না। ফুলের কদর, ভােমরাই জানে; কোলা
ব্যাংএতো আর জানে না। তেমনি, আমার গানের কদর,
তােমরাই জান, সকলেই ত’ আর জানে না।
২য় নাগরিক। গাইয়ে সাহেবের দেখছি কথা কইতে গেলেই
একটু কবিত্ব এসে পড়ে।
১ম নাগরিক। আরে ইনি যে একজন মস্ত কবি।
দানিশ। মিঞা জানেন না, তাই ব’লচেন। আমি ও সব কথায়
কিছু মনে করবে না। দুদিন পরে, উনিই দেখতে পাবেন,
আমার এক ভুবনবিখ্যাত কৰুণ সঙ্গীতে, দেশে দুঃখের
বন্যে ছুটে গেছে। মিঞা সাহেব! একটা সাদা কথা বুঝে
দেখ না, যদি আমি সুকবি আর মস্ত গাইয়ে না হব,
তাহলে খানদান-ঘরের ছেলে হয়ে আজ আমায় রাস্তা
হাঁটতে হবে কেন ?
৩য় নাগরিক। কেন সাহেব।
কেন সাহেব! গাইয়ে কিম্বা কবি হলে
হাঁটতে হয় ?
দানিশ। আরে না জী না। গানের পেছনে অনেক টাকা খরচ
• • • •,
W
প্রেমের পাখার।
।
J
=
করে ফেলিচি, তাই ত এই হাল। গান শেখাব বলে,
মাইনে করে কত সাকরে রেখেছি। আজ এক সাক
'মেদের ছেলের বিয়ে, খরচ দিতে হয়েছে। কাল দোসরা
করেদের ছেলে হাওয়া খেতে যাবে, খরচ দিতে হয়েছে।
এই রকম করে সমস্ত টাকাই খরচ করে ফেলিছি। এখন
আর তেমন পয়সা নেই, তাই গাড়ি চ'ড়েও বেড়াতে
পারিনে। মাইনে করেও সাকরে রাখতে পারিনে।
১ম নাগরিক। তাহলে সাকরেদের অভাবে বড় কষ্ট পাচ বল ?
দানিশ। আর কি করি ভাই, এখন ঠিকে রকমে সাকরেদ রাখচি।
নগৎ নগৎ পয়সা দিই, আর গান শােনাই, কিন্তু এখনকার
লােকগুলাে বড় পাজী।
১ম নাগরিক। কেন ওস্তাদ ।
দানিশ। আরে ভাই, সেই জন্যেই ত’ রেগেছিলুম। এখনও
ঠাউরে দেখলে বুঝতে পারূবে, রাগ আর দুঃখ আমার মুখে
মাখান রয়েছে।
১ম নাগরিক। আহা, এমন মাটীর মানুষকেও লােকে রাগিয়ে
দেয়। ওস্তাদজী! এমন রাগটা হয়েছিল কেন ?
দানিশ। আর ব’লবাে কি ভাই, এক বেটা ঝাঁকা মুটেকে ধরে
নগৎ দুটাকা দিয়ে, দু’দিনের জন্যে সাকরেদ ঠিক করলুম।
সে একদিন ঘণ্টাখানেক গান শুনেই বলে, ওস্তাদজী! আজ
আমার বড় অসুখ কচ্চে। আজ আর শুনতে পারবাে না।
আমি সে দিন তাকে ছুটী দিয়ে, তার পর দিন আসতে
বল্লম। বল্লে না বিশ্বাস যাবে, ভাল করে গান শেখাবার
জন্যে, সকাল থেকে ব’সেই রইলুম, সে বেটা আর এলো না।
প্রেমের পাখার।
তার পর তাকে বাড়ী গিয়ে ধরলুম। বেচারী অনেক কাদা
কাটা করে আর একদিন আসতে বল্লে। তার পর থেকে,
বাজা ঘাড়ে করে তার বাড়ী যাই, আর শুনি, বাড়ী নেই।
আজ বেটাকে রাস্তায় পেয়ে ধরেছিলুম। বন্ধুম, হয় গান
শােন, নয় টাকা ফেরত দাও।
১ম নাগরিক। তবে তাকে আজ বড় জব্দ করেছিলে বল ?
দানিশ। পাম কই; চৌকিদার ডেকে পেলুম্ না। এ ত’ আর
বিয়ে-বাড়ী নয়, যে না ডাকতেই চৌকিদার এসে হাজির
হবে। এ দুপুর বােদে কে বল মিটি মিচি লােকের উপকার
ক’ত্তে বেরুবে। কোন চৌকিদার হয় ত’ পান-ওলীর খাটের
তলা পাহারা দিচ্ছে, আর কেউ ছাগলে ইট খাচ্ছে কিনা,
তাই দেখছে।
২য় নাগরিক। তবে তাকে জব্দ করা হ’ল না বল ?
দানিশ। হ’ল আর কই, বেটা বলে গেল তোমার টাক ত’ শোধ
হয়েছে, একদিন গান শুনে এক টাকা শােধ দিইচি, আর
গান শােনায় মাথা খারাপ হয়েছিল, তাই এক টাকা,
ডাক্তার খরচ দিতে হয়েছে।
৩য় নাগরিক। বাঃ, বেশ ত বুঝিয়ে দিলে ! সাহেব, তােমার
বড় মন্দ কপাল, পয়সা নিয়েও কেউ তােমার গান শুনতে
চায় না।
দানিশ। চায় না কি, যখন হাতে টাকা ছিল, তখন কত লােকে
সাকরেদ হবার জন্যে সাধাসাধি ক’ত্তো।
৩য় নাগরিক। আচ্ছা সাহেব, আমরাও একদিন তোমার গান
শুনতে যাবে। এখন চল্প,ম।
প্রেমের পাখার।
১১
দানিশ। সেকি! এর মধ্যে যাবেন কি ? আমার সব কথা শুনে
না গেলে যে, আমার আধকপালে হবে। সাহেব, অনেক
দিনের পর আজ সমজদার পেয়েছি, গান না শুনিয়ে আর
আজ ছাড়চি নি।
২য় নাগরিক। রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে কি গান শােনা যায় সাহেব,
আজ থাক্।
দানিশ। দাড়িয়ে দাঁড়িয়েই বা গান শুনবেন কেন? আমি ধূলাে
ঝেড়ে দিচ্ছি, বসুন না। আরে, আমার খাতিরেই না হয়
বন সাহেব।
১ম নাগরিক। আরে একটু বসেই যাও না।
২য় নাগরিক। ব’সে না হয় থাকা গেল, কিন্তু গান শুনলে ডাক্তার
খরচ লাগবে, এই কথাতেই যে মন দমে যায়।
দানিশ। সে কি আর আপনাদের মতন , ললাকের লাগে।
সমজদার না হয়ে বড় গাইয়ের গান শুনতে গেলেই ডাক্তার
খরচ দিতে হয়। মুক্ত ভষ্মের চূণ, বাদশার জন্যে, যে সে
লােকের খেলে কষ্ট ত হবেই। সাহেব, মাওয়া পেট
রােগা ললাকেদের সয় না বলে কি আর খারাপ জিনিষ ?
১ম নাগরিক। আহা, কি কবিত্বপূর্ণ কথা, সাধির লেখাতেও
বােধ হয় এমন ভাব নেই।
'দানিশ। দোস্ত, এখন মুণ্ডু বসাইনি, এরই মধ্যে ব’লচে। পুতুল
হাছে। আগে দুই একটা গানটান শােন, তারপর যা
হয় ব’লো (মুখভঙ্গী সহকারে)।
১২ প্রেমের পাথার (ত) ইয়া ইয়। তেলেঙ্গল তক দি দিশ, তক দিদি, তৰু দি দি; (উঠিয়া) দিম তানানানা, নানানানা দিল, দিগ, দিগ, দিপ, তারানা দিগ দিগ দিগ তানানা তাক্ ধেট- তা পেট তেলেঙ্কাল তৰু দি দিম্। নামপুত্রের তেলেনা ফ্রেতে লো- rছুটিতে ছুটিতে) তেলে লেলে লেলে তেলে লেলে লেলেন- সকলের মস্তকের উপর বাজাইতে বাজাইতে ধকেটে তাগ, ধুম কেটে তাগ, গদি যেনে ধাড়া ধুম কেটে হাগ, গদি যেনে ধা। ( গান গাইবার কালে :-) ১ম নাগরিক। ওরেগাইয়ে সাহেবকে ধর। শিগগির জল আন, শিগগির জল আন্। ২য় ৩য় প্রহৃত বিহােৎ হাে গিয়া, বহোৎ হাে গিয়া, ব্যস্ কিজিয়ে। হইয়া উভয়ে। দালিশ। (গীতান্তে সেলাম করিয়া) আপকা মেহেরবাণী, আপকা মেহেরবাণী। জনাব! তা হলে আর একটা গান ধরি। (১ম সভাসদের প্রবেশ) ১ম সভাসদ। ছি, মানুষের শােণিত কি তােমাদের হৃদয়ে প্রবাহিত হয় না। অপরিচিত বন্ধুগণ ! আজকের দিন আমােদের নয়। চিরকালের মত, জীবনে অঙ্কিত রাখবার বিষাদময় দিন।
প্রেমের পাথর। দানিশ। জনাব! ও কথা আপনি ব’বেন না। ও কথা আমি বলবাে, ও হচ্ছে আমার দুঃখের কথা। ১ম নাগরিক। কি হয়েছে সাহেব ? ১ম সভাস। কেন, জান না কি, যে রাজা পিতামাতার অধিক কাজ করেছেন, যার অভয় কোলে, অনাহারের কষ্ট, অলীক উপন্যাসের মত, মনে করে এসেচ, যার কৃপায় সতত হাস্য- ময় সন্তান-সন্ততির বদন দেখতে পাচ্চো, জান না বন্ধুগণ! দানিশ। সেই রাজার রাজ্য এক ফকিরে ফাঁকি দিয়ে নিয়েছে। সকলে। কেন কেন ? দানিশ। কেন আর কি, রাজ্য চেয়ে নিয়েছে। সকলে। আল্লা, এ ক্যায়সী মজী। দানিশ। য়া, আমি কি বুদ্ধিমানের কাজই ক’রিচি। ভাগি আমি আমার দুঃখের কথাটা বলে ফেল্লম, নইলে ত’ বলে ফেলেছিল। আমি যেন বুদ্ধির জাহাজ রে ! ১ম সভাসদ। ঐ দেখ, রাজভক্ত প্ৰজা ! তােমাদের চ’খের সামনে দেখ, কোমল শয্যার উপর দিয়ে চলতে যাদের কষ্ট হ'ত, তারাই আজ, প্রকাশ্য রাজপথ, পদব্রজে অতিক্রম কচ্চেন। দানিশ। জয় মা আল্লা! আজ করুণ সঙ্গীত রচনা করে, দেশে দুঃখের বন্যে ছুটিয়ে দোব। হে বাবা খােদা ! গান লেখার কাগজের পয়সা জুটিয়ে দাও। হে বাবা খােদা ! গান লেবার কাগজের পয়সা জুটিয়ে দাও। [ দানিশমন্দের প্রস্থান।
১৪
প্রেমের পাথার।
( শা-আলম, মহাতাব,
মওলা, মহবুব, উজীর
এবং সভাসদৃগণের প্রবেশ )
শা-আলম। বন্ধুগণ! আল্লার দয়ায়, তােমাদের ভালবাসায়, আমি
প্রতিজ্ঞা পূর্ণ ক’রূতে সমর্থ হয়েছি। তবে দুঃখ কষ্ট
কেন? দুঃখীর দুঃখ আমি ভাল করে বুঝতে পারিনি।
পুত্রশােক কেমন, তা পুত্ৰবিয়ােগ না হলে জানা যায় না।
তাই দুঃখ শেখাবার জন্যে, সদয় আল্লা! আমায় দুঃখীর
অবস্থায় আলেন। বন্ধুগণ ! এ আমার অবনতির অবস্থা
নয়। আমি এতদিন সবল ছিলুম, আজ দুর্বল হয়েচি। আজ
হ'তে আমি স্বর্গীয় পিতা মাতার অধিক করুণার পাত্র।
আজ হ’তে দুঃখীর দুঃখ বােঝবার, জগদীশ্বরকে নিশ্চিন্ত মনে
ডাকবার অধিক অবসর হয়েছে। বন্ধুগণ ! আমার এ
আনন্দের দিনে কেউ বিষাদের ভাব এনাে না। আমি
আহলাদের সহিত আমার প্রতিজ্ঞা পূর্ণ ক’রিচি, আমায়
আহলাদের সহিত রাজ্য ত্যাগ কত্তে দাও।
উজীর। ধরণীশ্বর! যত উচ্চে আপনার মন, ততদূর উঠবার
ক্ষমতা আমাদের নেই। দীনবৎসল ! আদর্শদাতা! ফুলের
যদি সৌরভ গেল, তবে কি নিয়ে সে লােকের মন ধরে
রাখবে। প্রাণ গেলে মাটীর কায়া কতক্ষণ প্রফুল্ল থাকবে।
উঁহাপনা, আপনার অবর্তমানে কাকে নিয়ে এ রাজ্য
থাকবে। আপনি মেহেরবানী করুন। আমাদের ফিরিয়ে
দেবেন না। আল্লার নাম নিয়ে শপথ ক’চ্চি, আপনার
দানের হন্তা হতে এক কদ্দকও নেব না।
প্রেমের পাথার।
শা-আলম। ভাই! তােমাদের মত উপযুক্ত লােক রাজ্য ত্যাগ
কল্লে, রাজ্যের শ্রী অচিরে নষ্ট হবে। আমি তােমাদের
কাছে, আমার গরীব প্রজাদের রেখে যাচ্ছি। তােমরা
কার মুখ চেয়ে তাদের ফেলে যেতে চাচ্চ’ ? আমি জোড়করে
একটী ভিক্ষা চাচ্চি, আমার সদয় প্রজাগণ ! আমার
ভালবাসার বন্ধুগণ! আমার সে প্রার্থনা কি পূর্ণ ক’রূবে না ?
উজীর। আঁহাপনা, যিনি সকলের প্রার্থনা পূর্ণ করেছেন, তাঁর
প্রার্থনা দীন প্রজারা পূর্ণ ক’রূবে, এমন ভাগ্য তাদের
নেই। তবে এইমাত্র বলতে পারি, যিনি সকলের সুখের
জন্যে নিজের সুখ ভাসিয়ে দিয়েছেন, খােদার মজীতে তার
ইচ্ছে কখনই অপূর্ণ থাকবে না।
শা-আলম। তবে দুনিয়ার মালীকের আদেশে আমার এই ইচ্ছে
পূর্ণ হ’, যে আমার অনুসরণ না করে, তােমরা রাজ্যের
উন্নতির জন্যে ফিরে যাও।
উজীর। সুলতান, বুঝতে পারলুম্ না, আপনি কোমল কি কঠিন।
[ শা-আলম, মহাতাব, মওলা এবং মহবুবের একদিকে
ও অন্য সকলের অন্যদিকে প্রস্থান।
প্রেমের পাথার।
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
( অন্তঃপুরস্থ লতাকুঞ্জ।)
(মায়ূসের প্রবেশ।)
মায়ূন্। খােদ, কি ক’ত্তে কি কলে । মেহেরবান, আমায়
আশ্রয় দিয়ে অকূলে ভাসিও না। দয়া করে ওমরাও
সাহেবের মন ফিরিয়ে দাও। নইলে, দু’দিনে সব প্রকাশ ।
হয়ে যাবে। দু’দিনের মধ্যে ওমরাও সাহেব বুঝতে পাবে,
মায়ুদই দিলুজান। এ জানা হলে, আর আমার স্থান হবে
না। দুনিয়ার অন্ধকারে একটী তারার মুখ চেয়ে আছি।
সে তারা সরিয়ে নিয়ে না। খােদা, অনেক দিনের পর বড়
আপনার লােক মিলিয়ে দিয়েছ, দু’দিন দেখতে দাও।
শুধু, চ’খের দেখা, দুদিন দেখতে দাও। মায়ূ, বেশী কিছু
চায় না। মায়ু, মনের বনে যে ফুল ফুটিয়েছে, খােদা।
মনের বনেই যেন তা শুখিয়ে যায়।
(গাহিতে গাহিতে সখীগণের প্রবেশ)
(গীত)
বিষাদে বিনােদ বসি বিরহ জাগায়ে কার।
কি সুখ স্মরণে মনে আন দুখ-পারাবার
কি কুঞ্জ কানন মাঝে, কোন বন-ভবনে,
হারায়ে এসেছ সখা সুখ-জীবনে ;
তুমি সুখ লাগি ছুয়েচ কি, প্রণয়েরি দুখ-তার।
তুমি সেধে কি দিয়েছ হৃদি, লইতে নয়ন-ধায়।
প্রেমের পাথার।
১৭
শ
মায়ু। মতিয়া, এত সাধা কাদা, মায়ু জানে না। বান্দার
মিলন বিরহ, দুইই সমান।
মতিয়া। তুমি পুরুষকে এক কথায় ভােলাতে পাবে, কিন্তু
স্ত্রীলােককে বােঝাতে পারবে না। তােমার মুখ দেখলে
বােধ হয়, কি যেন একটা বােঝা, তােমার বুকে চাপান
রয়েছে। মায়ূ, আর ত’ তুমি নিরাশ্রয় নও।
ওমরাও সাহেব, তােমার সহা। তুমি ইচ্ছে ক'লেই
তােমার দুঃখ সরাতে পার।
মায়ুস্। দুঃখ সরালে, কি নিয়ে থাকবে মতিয়া ! লাঞ্ছনা গঞ্জনাই,
যার জীবনের এক একটা দিনের সীমা শেষ করে দিয়েছে,
আদর যত্ন নিয়ে কি, সে কখন, থাকতে পারে ? গরীবের
গরীব হয়ে থাকাই ভাল। মায়ুস, অযত্নে জীবনের দিন
কাটিয়েছে; মায়ূ, অযত্নেই জীবনের দিন কাটিয়ে দিতে চায়।
মতিয়া। কাল কেঁদেছো বলে কি আজ কাৰে, তুমি ইচ্ছে করে
তােমার উন্নতি নিচ্ছে না কেন মায়ুস্?
মায়ু। বান্দার উন্নতি অবনতি, দুইই সমান। উন্নতির সাধ, কার
জন্যে ক’ববা মতিয়া ! যার উন্নতি দেহ্বার লােক আছে,
সেই উন্নতির সাধ করে।
(তােরাবের প্রবেশ)
তােরাব। মায়ূ, মায়ুস, এ সংসারে কি তুই এতই দুঃখী ? এ
উজ্জ্বল দুনিয়ায়, তাের উন্নতি দেবার কি একটী প্রাণ ও
নেই ? মনকে মিছে দুঃখ দিনি!
১৮
প্রেমের পাথার।
উন্নতি দেখতে চায়। তাের উন্নতি, তােরাব নিজের উন্নতি
মনে করে।
মায়ু। ওমরাও সাহেব! সুদি বান্দার ওপর মেহেরবানী ক’ত্তে
ইচ্ছে হয়, তবে নির্দয় ব্যবহার করুন। আদরের কথা
তুলবেন না। মায়ূসের হৃদয়, সব সইতে পারবে, খােদার
নাম নিয়ে বলচি, শুধু আদর সইতে পাবে না। অযত্নে
মায়ুসের জীবন গঠিত হয়েছে, অযত্ন ফুরিয়ে গেলেই,
মায়ুসের জীবন ফুরিয়ে যাবে।
তোরাব। তােকে গােপনে কিছু জিজ্ঞেস করবাে। খােদার
কসম, তুই মিথ্যে বলিনি।
[ সখীগণের প্রস্থান।
মায়ূন্। কি বলুন?
তােরাব। মায়ূ, কি ক'লে তুই সুখী হ’স ?
মায়ু। দুনিয়ায় যত অনাদর আছে, সব এক করে আমায় দিন।
আমি তাই পেলেই সুখী।
তােরাব। মায়ূ, আর কষ্ট পাবার সাধ করিনি। তুই সুখী
হয়ে আমায় সুখী কর। দেখ, তােরই মতন আমার
একজন ছিল। তােরই মতন সে কখন মুখ ফুটে কিছু
বলতো না। আমি তাকে সুখী ক’ত্তে পারিনি। তার
মতন একজনকে সুখী ক’ত্তে দে। মায়ু ! দুনিয়া থেকে
ভালবাসার প্রতিদান তুলে নিনি।
মায়ূ। ওমরাও সাহেব, আপনার কথায় একটা হারান গান
মনে পড়লাে।
তােরাব। কি গান মায়ু।
প্রেমের পাথার। ১৯ মায়ূন্। (গীত) যদি হিয়ার পাশেতে, অধীর পিয়াস- পুষে রাখ সখা, এসােনা। তুমি, দূরে থাক, কাছে এসােনা। আমার মানস-কমলে, মুদিত বাসনা, অরুণ-কিরণে খুলো না। আমার, হৃদয়ে তুফান তুলল না। তুমি, শুধু জান প্রাণে, অষতনে দুখ, বিরহে দারুণ বেদনা। তুমি, বোঝ না ত’ প্রাণে, অযতনে সুখ, যতনে কত যে যাতনা। শুধু, যতনে কত যে যাতনা তােরাব। মায়ূ, আর বিষাদের তরঙ্গ তুলিনি। তােরাবকে সব শােনা, শুধু, নিরাশ প্রণয়ের যাতনা শােনানি। আমায় দু’দিন ভুলিয়ে রাখ। চল, আমরা কোথাও যাই। মায়ুস্। সাহেব ! শীকারে যেতে ইচ্ছে হয় ? তােরাব। তাের ইচ্ছে হলেই, তােরাবের ইচ্ছে হবে । মায়ু। তবে চলুন [ উভয়ের প্রস্থান। । আলিজান ও জ্বলিলের প্রবেশ। জ্বলিল। বহুৎ আচ্ছা বাবা, খুব রগড়েই আছ। আলিজান। কে রে জলিল ?
প্রেমের পাথার।
জলিল। তােমার ভাইজান সাহেব। দেশের জন্যে ত’ আর প্রাণ
কঁদে না, নিজেই আমােদের ফরা ওড়াচ্চে। বাবা, ঢের ঢের
সখ, দেখেচি, তােমার ভাইজানের মতন, এমন তর বেতরর
সখ, কখন দেখিনি। কখন চুড়ি নিয়ে, কখন ছোঁড়া নিয়ে,
কখন ডিগবাজী খেয়ে, কখন এপাশ ওপাশ করে, দিনটা
কাটাচ্চে বেশ!
আলিজান। খােদা যদি কখন মুখ তুলে চায়, তবে তাের দিনও
এমনি করে কাটবে।
জ্বলিল। না বাবা! আমি একলসেঁড়ে হ’তে চাইনে। দেশের
দুঃখেই, আমার প্রাণ কেটে গেল। তুমি বরং, দেশের একটা
উপকার কর। গরীব পুরুষদের জন্যে, অমনি মেয়ে মানুষ
পাবার, একটা অজ্ঞা খুলে দাও । বাপজান! তােমার
অক্ষয় পুণ্য হবে। তোমার সুনামের ডঙ্কা, গুড়, গুড়,
গুড়, গুড়, করে, দুনিয়ায় বেজে উঠবে।
আলিজান। দুর পাগল !
কেন বাবা, কথাটা কি মনের মতন হ’ল না ? হা হত।
ভাগ্য দেশ ! তুমিও যেমন হতভাগা, তােমার লােক গুলােও
তেমনি হতভাগা। খােদ, সহরে এত লােক আছে, গরীব
পুরুষদের জন্যে, কেউ কিছু ক’লে না। খোদা, গরীব
পুরুষদের জন্যে কেউ কিছু কল্লে না।
আলিজান। আচ্ছা,
আচ্ছা, তুই লুরিস্থান থেকে এক জোড়া বাদী নিয়ে
আয়। আমি খরচা দেব।
জলিল। আলি সাহেব! এতক্ষণে খােদ। তােমায় সুমতি দিলে।
বাপজান ! আজ দুনিয়ায় তুমি অক্ষর কীৰ্ত্তি রেখে গেলে।
জ্বলিল।
প্রেমের পাথার।
লােকে নিজের প্রেমের জন্যে পাঁচিল টপকায়, আর তােমার
হুকুমে পরের প্রেমের জন্যে, আজ জ্বলিল লুরিস্থানে চল্লো।
খােদার প্রেম, কি প্রেম, কি প্রেম ! উহু হু হু, কি প্রেম,
কি প্রেম!
[ জলিলের প্রস্থান।
আলিজান। একে একে সকলেরই আশা মিটলাে। খােদা,
আমার আশা কি মিটবে না? প্রাণের ভেতর যে উচ্চ
আশার অনল জ্বেলে রেখেচি, চিরকাল কি তা, জ্বালা
থাকবে। কখন নয়। দুনিয়ায় দু’জন সুখী হবে না।
আলিজান, গায়ের রক্ত দেবে, তবু বিষয়ের অংশ দেবে না।
{ আলিজানের প্রস্থান।
চতুর্থ
গর্ভাঙ্ক।
( কক্ষ )
বিবি।
বাদলার কার্যে নিযুক্ত বিবিকে টানিতে
টানিতে কাকু ঃ-
কাকু। ওমা! বড্ড খিদে পেয়েছে যে।
এই যে বাবা, এইবার দিচ্চি। হাতের কাজটুকু
সেরে নি।
কাকু। অনেক ক্ষণ ত’ এইবার দিচ্চি, এইবার দিচ্চি, ক’চ্চি;
কবে আবার দিবি। হ্যা মা, ঘরে কি কিছু নেই। এই
প্রেমের পাথার।
রুমাল বিক্ৰী হ'লে তবে আমাদের পয়সা হবে, না?
আহা মা! আমার জন্যে তাের কত খাটতে হয় ।
বিবি। ছেলেকে খাওয়ার জন্যে খাটা কি, খাটা ব’লে মার মনে
হয় ? আমার মন্দ কপাল, তাই খেটেও তােমায় ভাল করে
খাওয়াতে পারিনে। এস বাবা! আমার সঙ্গে এস।
( উভয়ের প্রস্থান এবং দানিশের প্রবেশ)
দানিশ। ছেলের সঙ্গে ত’ বিবি, রান্নাঘরে ঢুকলো। এ সময় ডাকলে,
রাগ করবে না ত’? সেই দুটো টাকা নেওয়ার পর থেকে,
যেন কেমন, অপ্রতিভ অপ্রতিভ হয়ে গেছি। যা থাকে
কপালে, ডাকি—বিবি! একবার শিগগির এস, ঘর বড়
অন্ধকার।
নেপথ্যে। যাই।
দ্বানিশ। বিবি রাগ করুগ, আর যাই করুগ, কথা কিন্তু শােনে,
ডাকূলেই উত্তরটী দেয়। হাজার হক, ভালবাসে কি না?
(বিবির প্রবেশ)
বিবি। হাগা! তুমি দিন দিন কি হয়ে যাচ্চ ? রােদে কাঠ, ফাটছে,
আর ব’লচো কিনা, ঘর অন্ধকার।
দানিশ। রাগ ক’চ্চ কেন বিবি ? এই, তােমার অদর্শনে, আমার
ঘর অন্ধকার অন্ধকার বােধ হচ্ছিল কিনা, তাই ডাক্-
ছিলুম। তুমি এসে, সে অন্ধকারে যেন, জোচ্ছনা ফুটুয়ে
দিলে ! ব’সনাব’সনা।
বিবি। ছেলে ঘরে একলা খাচ্ছে, কি বলবে বল ?
দানিশ। এই ব’লছিলুম, তুমি কেমন আছ ?
প্রেমের পাথার। বিবি। আল্লা যেমন রেখেছেন, তেমনি আছি। এখন আমি যাই ? সানিশ। এটা ত’ রাগের কথা হ’ল বিবি ! তুমি আগে থাকতেই রাগ করে বলে, মনের কথা বলি কি করে ? বিবি। আমি ত’ রাগ করিনি, কি বলবে বলনা? দানিশ। এই ব’ছিলুম, তুমি আমায় কিছু পয়সা দিতে পার ? আমি চেলাটেল করবার জন্যে, সেদিনকার মতন তােমার মেহনতের পয়সা খরচ ক’রবাে না, কাগজ কিবাে। বিবি। দেখ, কালকের কথা দূরে থাক, আজকে খাবার মতনও কিছু নেই। এই রুমাল বিক্রী হলে, তবে আমাদের দিন চলবে। এমন অবস্থাতেও, কি বলে তুমি মিচিমিচি খরচ ক’ত্তে চাচ্চ। আমার কথা ছেড়ে দাও, তুমি পুরুষ- মানুষ, সহ ক’ত্তে পার। ছোট ছেলেটা, বেলা পর্যন্ত রােজ রােজ না খেয়ে থাকে, এ দেখেও কি তােমার, বাজে খরচ করবার সাধ মেটে না ? দানিশ। বিবি। তুমি কি-গুণের স্বামী পেয়েছ, তা বুঝলে না, কেবল টাকাই বুঝেছ। টাকা ত’ হাতের ময়লা, মনে কলেই বাদশার কাছ থেকে কিছু চেয়ে নিতে পাত্তম। আর চাইতেই বা হবে কেন। পয়সা রােজগার করবে। মনে করে, যদি কোন বড়লােকের কাছে গিয়ে, সেতারে গৎ ধরি ত’ টাকা। একটা তান মারি ত’ টাকা। তবলায় একটা চাটী লাগাই:ত’ টাকা। দেখ চো ত’ কত টাকার হিসেব দিচ্চি ? বল, রাবার জায়গা তােমার ঘরে আছে ? এই একটা সাদা কথা বােঝনা, যদি গাজর থেকে বাঁশী
২৪
প্রেমের পাথার।
করি, তা হলেও টাকা। যদি বল, সব গুনােই ত’ আর
বাজবে না, যেটা না বাজবে, সেটা খেয়ে ফেলবে।
বিবি। না, তােমায় বােঝাবার ক্ষমতা আমার নেই।
দানিশ। আর বােঝাবে কি বিবি। নগৎ নগৎ সব টাকা
পেয়েছ, এখন মুখভার ক’ত্তে যতই চেষ্টা করনা কেন,
কিছুতেই হবে না। এখন নক্ষ্মীটীর মতন কিছু দাও দেখি।
বিবি। সত্যি, হাতে কিছু নেই।
দানিশ। • তবে এখুনি বিদেশ যাবে কি করে ? হাত-খরচ ত’ কিছু
চাই ?
বিবি। এখুনি বিদেশ যেতে হবে, কাগজ কেনার পয়সা চাই,
এ সব কি বলছো ?
দানিশ। দেখ, তুমি ত’ জান, বরাবরই আমার দুঃখের গান তৈরী
কবার বড় সক। কিন্তু মনে দুঃখ আসে না। তাই আল্লা,
মেহেরবানী করে, আমার মনে দুঃখু করে দিলে। রাজ্যের
লােকেরা আল্লাকে কত দুচে। কিন্তু কেউ কি বুঝছে, এই
দুঃখের জন্যেই, আমার গান তৈরী করবার সুবিধে হ’ল ?
বিবি ! ক’জন লােক বােঝে, ভাল জল হবার জন্যে, আল্লা
গ্রামে আগুন লাগিয়ে দেয় ? যদি মােসাফের এসে রাজ্য না
চেয়ে নিত’, তা হলে কি আমার গান লেখার ইচ্ছে হত ?
| বিবি। হাগা ! কোন্ বাদশার কাছ থেকে, মােসাফেরে রাজ্য
চেয়ে নিয়েছে ?
দানিশ। আরে, আমাদের বাদশার কাছ থেকে। তাই ত’ গান
তৈরী করব বলে কাগজের পয়সা চাচ্চি। গানের ভাব টাব,
আমি নিৰ্জ্জুনে, রাস্তায় ব'সে, সব ঠিক করে রেখিচি।
প্রেমের পাথার
২৫
বিবি। যা! যে বাদশা গরীবের মা বাপ, তার রাজ্য ফকিরে
ঠকিয়ে নিলে !
দানিশ। আরে, নিলে না ত’ কি আমি মিচিমিচি কাগজের পয়সা
চাচ্চি ? এখন ফকির বাদশা হয়েছে, ফকিরের মন আর কত
উচু হবে, নিশ্চয়ই খাজনা বাড়াবে। তা হলেই খাজনা
দিতে পারুবাে না, কাজেই কয়েদখানায় যেতে হবে।
তাই এখুনি, বিদেশ যাবার কথা ব’চি। যদি কিছু লুকনো
টাকা থাকে ত’ এই বেলা বাগিয়ে সাগিয়ে নে।
(কাকুর প্রবেশ )
কাকু। হাঁ। বাবা! কোথায় মুকুননা টাকা আছে ? তুমি
আমায় একদিনও খো কিনে দাওনি। আজ দেবে ?
দানিশ। বাবা! কাকাতুয়া ! তুই আর চুমকুড়ি কাটিনি। আর দিন
কতক সবুর কর। তারপর দেখি, খেলনায় তাের ঘর বােঝাই
করে দেবাে। সামান্য খেলনা দেওয়া ত’ তুচ্ছ কথা। হাজার
টাকা, যার বাপের একটা গানের দাম, তার ছেলের আবার
খেলনার ভাবনা! বিবি ! কাগজের জন্যে পয়সা চেয়েছিলুম
বলে, মনে করনা আমি অক্ষম পুরুষ। ভালবাসার লােকের
কাছ থেকে, ছােট জিনিষ চাইতে লজ্জা করেনা, বরং অহলাদ
হয়। তাই চেয়েছিলুম বিবি ! তাই চেয়েছিলুম। তা তুমি
দিলে না। না দিলে, নেই নেই। এখন মাল পত্তর সব
বাঁধ।
বিবি। মাল পত্তর আর কি ? মালের মধ্যে ভাঙ্গা ঢােল আর
সেতার, আর পত্তরের মধ্যে ভাঙ্গা ব আর সাকি, আর
দুটো ছেড়া পােষাক।
২৬
প্রেমের পাথার।
দানিশ। পরের জিনিষটী বেশ, আর নিজের জিনিষটী খারাপ,
এ রােগ দেখ চি বিবি, তােমারও হয়েছে। আমার কিন্তু
তা নয়। আমার যা আছে, তাই ভাল। ওরে, তুই চোল
আর সেতারটা, মাথায় কর। বিবি! তুমি গুচিয়ে গাচিয়ে
একটা মােট বেঁধে নাও। আর আমি পথ দেখাতে দেখাতে
যাই, কেমন?
বিবি।
(মােট মাথায় তুলিতে তুলিতে)
গীত।
হায় নসিবে, আমার খোদা, এত যাতনা।
ও যে দুখ, বোঝেনা, মুখ দেখেনা, শােনে না মানা ।
নিশ। ও বিবি, রাগ করনা, রাগ করনা, দেখে নিও পরে।
তােমায় খাট বিছানা, সােণা দানা, দোবো থরে থরে ।
কাকু। তবে ত’ ফিবে কপাল, হ। বাবা, সত্যি বাবা-
দানিশ।
ওরে বাপ বলেছে, মিছে বলে, ভাবনা করুন।
[ সকলের প্রস্থান।
পঞ্চম গর্ভাঙ্ক।
(বন )
(তােরাব ও মায়ূসের প্রবেশ)
তােরাব। আমােদ করে শ্ম কার দেখতে এলি, এখানে এসেও ত’
তাের মন প্রফুল্ল হ’ল না। মায়ু! তাের জীবনে কি
জুয়ার ভাটা খেলে না?
প্রেমের পাথার।
২৭
মায়ুদ। সাহেব! প্রাণের ভেতর তরঙ্গ বয় কি না, জানি নি,
মায়ু, এক রকমে থাকতে ভালবাসে। মায়ূ, একরকমেই
থাকতে চায়।
তােরাব। আমায় ভুল বোঝাতে চেষ্টা করিনি। তুই সত্যি বল,
তুই কি কারুর ভালবাসায় পড়িছি ?
মায়ূন্। ওমরাও সাহেব! আমার সব সাধ আছে, শুধু ভালবাসার
তােৰ। এ সাধ যদি থাকতাে, তা হলে হয় ত’ তােরাব সুখী
হত। মায়ূ ! তুই যদি আমার দোস্ত, হ’য়ে থাকি,
তা হলে বোধ হয়, আমার জীবনের স্রোত ফিরে যায়।
মায়ূন্। সাহেব ! তাও কি কখন হয়? আপনি বিখ্যাত ওমরাও,
আর আমি পর-অন্ন-লালায়িত, দীনহীন, পথের কাঙ্গাল ।
আপনি আকাশের মত উদার হৃদয় নিয়ে, বিলাস-ভবনে
পালিত, আর আমি সঙ্কুচিত মনে, পর্ণকুটীরে, পরের ঘৃণার
হাসির জন্যে ব্যাকুল। সাহেব! এত অসমানে কখন
দোস্তি হয় না।
তােরাব। মায়ূ ! তুইই ইচ্ছে করে, এই অসমান রেখেছি।
তাের পর্ণকুটীরে থাকতে সাধ, তাই তুই থাকি। আমায়
পর ভেবে, তুইই আমার দেওয়া, পরের দেওয়া বলে মনে
করি। মায়ূ ! কি কল্লে এ প্রভেদ তােত আমাতে যায় ?
মায়ু। খােদার যদি কোন দিন মজী হয়, তা হলে বোধ হয়,
এ আলাদা থাকে না।
তােরাব। তাের মজী হলে, খােদার মজী হবে। মায়ুস! তুইই
আমার পােদা। দেখ, এ সংসারে আমার সব আছে, এক
২৮
প্রেমের পাথার।
ভালবাসা নেবার লােক নেই। আমার প্রাণ ভরা আকাঙ্ক্ষা
আছে, আমার আমােদভরা সাজান ঘর আছে। কিন্তু
একবার চেয়ে দেখ, সে আকাঙ্ক্ষা, আকাঙ্ক্ষার জন্যেই
রয়েছে; সে সাজান ঘর, সাজানর জন্যেই রয়েছে। তাের
একটী কথায় সব বদলাবে। মায়ুস! একবার বল, আবার
তাের ভালবাসার সাধ হয়েছে ?
মায়ু। সাহেব! যা হবার নয়, তা কখন হয় না।
তােরাব। খােদা ! খােদা! আজ যদি আমার দিঞ্জান
থাকতো।
মায়ু। দিলজানের কথা আর তুলবেন না। তাকে চিরদিনের
জন্যে ভুলে যান। সে পতিহী, তার কথা মনে ওঠাও
পাপ।
তােরাব। মায়ুস, তুইও দিলুজানের নিন্দে করিস্ ?
মায়ুস্। যে রমণী, আপনার প্রাণের হন্ত্রী, তার সুখ্যাত, আপনার
আশ্রিতের মুখে থাকতে পারে না। আপনার উচ্চ জীবনে
যে কণামাত্র কলঙ্ক দেবে, মায়ুস, তাকে ক্ষমা কবে
না। মায়ু, আপনার সেবার জন্যে জন্মেছে, আপনার
অল্পমাত্ৰ কলঙ্কের বিনিময়ে, বান্দা নিজের জান দিতে
পারে।
তােরাব। মায়ু ! যা বলি, তা কি সত্যি?
মায়ূন্। খোদার কসম, সত্যি।
তােরাব। সত্যি কি তা হলে, নিজের প্রাণের চেয়ে, তুই আমার
সুনাম ভালবাসিস?
মায়ু। ছি মায়ুস্! কি বলতে কি বু’ল্লি।
প্রেমের পাথার।
গীত।
ভুলে আছ, ভাল আছ, এই যে ভাল।
কে কাকে কি ভাবে দেখে, তা দেখে কি এলে গেলো।
নীরবে প্রণয়-জলে,
কোথা কে কি ভাবে চলে।
তা দেখে কি পাবে প্রাণে, আঁধারে আলো।
তােরাব। মায়ুস! তােকে চিনতে পলু না।
মায়ু। সাহেব ! শীকারে চলুন ?
তােরাব। তােকে নিয়ে বেশী জঙ্গলে যেতে, সাহস হচ্ছে না।
মায়ু। তবে আমায় তঁাবুতে রেখে, আপনি একলা শীকার ক’ত্তে
যান। যখন শী কার দেখাবেন বলেছেন, তখন আপনাকে
শীকার ক’ত্তেই হবে।
তােরাব। তাই চ। খোদা! কি শোনালে? মায়ু! আগে
তােকে চিনতে পারিনি। প্রাণময় মায়ুস্! আগে তােক
বুঝতে পারিনি। আগে বুঝতে পারিনি, মায়ুস, প্রাণের
চেয়ে আমার সুনাম ভালবাসে। মায়ু, ভালবাসে ; মায়,
ভালবাসা জানতে দেয় না।
[ উভয়ের প্রস্থান।
(শা-আলম, মহতাব, মওলা ও মহবুবের প্রবেশ।)
মহবুব। দাদা! আর চ’তে পাচ্চিনি যে।
মওলা। চুপ কর ভাই, বাবা শুনতে পাবে। বাবার আর ভাবনা
বাড়ানি।
মহতাব। ধরণীশ্বর ।
.
প্রেমের পাথার।
শা-অালম। ধরণীশ্বর কাকে ব’চো বিবি! যে স্ত্রীর হাত ধরে
বনে বনে ঘুরচে, তাকে বলছো? যে ক্ষিদেয় কাতর,
চলতে পাচ্ছে না, এমন ছেলেদের মুখের দিকে তাকিয়েও
তাকাচ্চে না, তাকে ব’চো ?
মহতাব। তােমার পায়ে পড়ি, ওসব কথা আর তুলােনা। তােমার
মুখ দেখলে, বুক ফেটে যায়। তুমি কারুর ভাবনা ভেবো-
। নিজের দিকে তাকাও। যখন সুদিন ছিল, তখন টের
ভাবনা ভেবেচো, আল্লার মজীতে, এখন ছেলেদের এমনি
হওয়াই ভাল।
শা-আলম। বিবি! ভাবতে বারণ করে না। ঢের ভাবনা
আমার সামনে পড়ে। নিজের জন্যে কোন দিন ভাবিনি,
ভাবতেও প্রাণ চায় না। আমার ভাবনা, বেগম! তুমি ।
আমার ভাবনা, তোমার ছেলেদের চ’খের জল। আমি
থাতে, আমার ভাবনা ছাড়ি কি করে বিবি !
মহতাব। দেখ, আমি তােমার স্ত্রী। আমায় ভালবেসে, আমার
ওপর মেহেরবানী ক'রে, আমায় চিরজীবনের সঙ্গিনী করেছ।
সুখের দিনে, সুখের ভাগ দিয়েছ। আল্লার মরজীতে, আজ
দুঃখের দিন এসেচে। আমায় দুঃখের অংশ দাও। তােমার
ভাবনা-বােঝা বইবার, আমায় অধিকারিণী কর।
শা-আলম। বিবি । অদিরিণি! তুমি চিরকাল সুখে পালিতা।
এ বিজন কাননে, পরের ভাবনা, তুমি কেমন করে বইবে ?
মহতাব। আদর্শ দাতা! যিনি তােমার দান অক্ষুন্ন রাখবার জন্যে,
তােমার প্রাণে অসীম শক্তি দিয়েছেন, পৃথিবীশ্বরের প্রাণে
স্ত্রী পুত্রের হাত ধরে, বনে বনে ঘােরবার বল দিয়েছেন,
!
প্রেমের পাথার।
তিনিই আজীবন সুখে পালিতা-তােমার দাসীকে, ভাবনার
বোঝা বইবার ক্ষমতা দেবেন।
শা-আলম। খােদা! আমার ওপর তােমার অসীম মেহেরবানী।
কে বলে আমায় গরীব ? আমার দীন প্রজারা ! দেখে যাও,
তােমাদের সুলতান গরীব নয়, অমুল্য ধনে ধনী। বিবি।
কি ক'লে তুমি সুখিনী হও?
মহতাব। নিশ্চিন্ত মনে একটু বিশ্রাম কর। এ ছাড়া আর
আমি কিছু চাইনে।
শা-আলম। আচ্ছা, তাই হক।
মহবুব। দাদা! আরাে কি আমাদের চ’তে হবে ?
শা-আলম। মহবুব! আমার কাছে এস। বড় কষ্ট হচ্ছে, নয় ?
মহবুব। না বাবা! কষ্ট ত’ হয়নি। মা বলে দিয়েছে, যতদিন না
তুমি আবার তেমনি হবে, ততদিন, কষ্ট হতে নেই।
শা-আলম। হা ঈশ্বর ।
মহতাব। আবার মনে দুঃখু অন্চিা? তুমি নিশ্চিন্ত মনে
একটু বিশ্রাম কর।
(তােরাবের পুনঃ প্রবেশ )
তােরাব। মায়ুস্ ! তুই আমায় পাগল ক’লি। আমি বড় সাধ
করে, তােকে ভালবেসেছিলুম। খােদা! যাকে ভালবাসতে
প্রাণ চায়, তাকে আমার ভালবাসা, ভাল করে নিতে দাও
কেন? মায়ুস্! তুই যদি প্রাণময় মায়ুস, না হ’তি, তা
হলে হয় ত’ মনকে বােঝাতে পাত্তম। কিন্তু আর
বােঝাবার যাে নেই। খােদার কসম নিয়ে তুই বলিচিস্
৩২
প্রেমের পাথর
নিজের প্রাণের চেয়ে, তুই আমার সুনাম ভালবাসি। যা।
কে এ ভুবনমােহিনী ? খোদা! আমার সুনামের জন্যে, যে
নিজের প্রাণ দিতে পারে, আমায় কলঙ্ক-সাগরে ফেলবার
বিনিময়ে কি, সে ভালাবাসা দিতে পাবে না। ফকির ।
আজ আমি তােমার সুখের পথে, কণ্টক হ’লুম। তােমা-
রই ভুবনমােহিনী স্ত্রীর সতীত্ব নষ্ট করবার ভয় দেখিয়ে, আমি
মায়ুসের সঙ্গে দোস্তি করবো। মায়ু। এইবার বুঝতে
পিরবাে, নিজের প্রাণের চেয়ে আমার সুনাম ভালবাসি
কি না। এইবার বুঝতে পাবো, আমায় কলঙ্ক-সাগরে
ভাসিয়ে দেওয়ার চেয়ে, তোর অনিচ্ছের দোস্তি বড়
কি না। ( প্রকাশ্যে ) মােসাফের ? আমি বড় বিপন্ন।
শা-আলম। কে তুমি ভাই ! বল, এ দীনহীন, তােমার কি উপকারে
আসতে পারে ?
তােরাব। ফকির সাহেব! আমি একজন সওদাগর। বাণিজ্যের
জন্যে স্থানান্তরে যাচ্ছিলুম। এ জঙ্গলে এসে আমার স্ত্রী
অতিশয় বিপন্ন হয়েছে। আমার স্ত্রীকে দেখবার জন্যে
আমার নিকট এক টা ও স্ত্রীলােক নেই। আপনাকে মহানুভব
দেখে, দুঃখের কথা জানাচ্চি। আপনি মনে ক'লে, একটা
অবলার প্রাণ রক্ষা হয়।
শা-আলম। ভাই ! স্ত্রীলােকের মধ্যে, একমাত্র আমার স্ত্রী
আছে। তার দ্বারা তােমার কোন উপকার হতে পারে ?
তােরবি। মােসাফের! দয়া
মােসাফের ! দয়া করে যদি আপনার
পাঠান, তা হলে আমার কি উপকার হয়, তা আমি এক
মুখে প্রকাশ ক’ত্তে পারিনে।
স্ত্রীকে
প্রেমের পাথার।
শা-আলম। আচ্ছা ভাই, চল। একজন স্ত্রীলােকের দ্বারা যতটুকু
হতে পারে, আমার স্ত্রী হ’তে কখনই তার অন্যথা হবে না।
তোরাব। আমি সঙ্কুচিত হয়ে, একটা কথা জানাতে ইচ্ছা করি।
শা-আলম। কি বল ?
তােরাব। আমার স্ত্রী পরদানসীন।
শা-আলম। আমায় কি যেতে বারণ ক’চ্চ?
তােরাব। আপনি সাধু, আপনাকে বারণ ক’বার ক্ষমতা, আমার
নেই। তবে এইমাত্র বলতে পারি, আপনি না গেলেও
আপনার বিবিকে অধিকক্ষণ রাখবােনা। আমার তঁাবু
এই নিকটেই। মােসাফের । বিপন্না স্ত্রীলােককে বাঁচাতে কি
আদেশ হয় ?
শা-আলম। ভাই! এর আর মতামত কি। যাও ভাগ্যবতি ।
ভগবানের আশীর্বাদের পাত্রী হতে যাও। মঙ্গলময় খােদা !
আজ যদি আমায়, এখানে, এ অবস্থায় না আন্ত, তা হলে,
এ উপকার কবার আনন্দ, বােধ হয়, এ জীবনে হত না।
মহতাব। প্রভু!
প্রভু! ছেলেরা রইলাে, এদের দেখাে।
শা-আলম। যাও পুণ্যবতি ! এমন কাজ আর, কখন পাবে না।
মহবুব।
মা! বেশী দেরি করিস্ নি, শীগগির আসি। তােকে
অনেকক্ষণ না দেখলে মন কেমন করবে।
তােব। আমি একটু পরেই তােমাদের মাকে দিয়ে যাবে।
( মহতাবের প্রতি আমার সঙ্গে আসুন।
[ মহতাব সহ তােরাবের প্রস্থান।
৩৪
প্রেমের পাথর।
ষষ্ঠ গর্ভাঙ্ক।
(লুরিস্থানের হাট )
ক্রীতদাসী-বিক্রেতাগণ, ক্রীতদাসীগণ ও জ্বলিল ইত্যাদি।
ক্রীতদাসীগণ।
গীত।
এমন মনের মতন কই প্রেমিক সুজন।
যে রাখতে পারে, বেঁধে মন।
মধু ভরা টাটকা কলি, ফুটে উঠেছে,
এখন মন ভোলাতে, সাধের অলি, কই লে জুটেছে,
আমার বুক ভেঙ্গেচে, মুখ খুলেচে, খ’সেচে বাধন।
জ্বলিল। আরে বাহােবা, কি বাহহাবা, এ যে চাঁদের হাটরে।
যা! এখন কোটা কিনি ? না বাবা, কোনটা ছাড়তে
পাবে না। প্রাণ যায়, ভিক্ষে মেগে খাব। তবু চখের
সানে, আর কাউকে নিয়ে যেতে দেবাে না।
১ম বিক্রেতা। কি সাহেব! পছন্দ হয় ?
জলিল। বাবা ! পছন্দর কথা যদি বলে, ত’ শােন। হঠাৎ বেজায়
রকমের পছন্দ হয়ে পড়েছে। তােমাদের অক্ষয় পুণ্যি হবে,
দেশের উপকারের জন্যে, এদের দিয়ে দাও।
(দ্বিতীয় ক্রীতদাসী-বিক্রেতার প্রবেশ।)
২য় বিক্রেতা। জাহান্নমে গেল, সব জাহান্নমে গেল। ভাইজান।
রােজকার বস্তু হয়েছে, লুরিস্থানের ব্যাবসা উঠে গেছে।
১ম বিক্রেতা। সে কি ?
প্রেমের পাথার।
২য় বিক্রেতা।
নতুন বাদশার হুকুম। এ মুলুকে আর বাদী
বেচা হবে না।
জলিল। বাপজান! এ যে বিটকেল আওয়াজ হ’ল। এত কাজ
থাকতে, হঠাৎ বাঁদী বেচা বন্ধ হ’ল কেন ?
২য় বিক্রেতা। সাহেব, সবই আমাদের বরাত ।
জ্বলিল। তােমাদের বরাত নয় বাবা! তােমাদের বরাত নয় ।
সবই আমার কপাল। আহাহাহা, খােদা ! গরীবের দুঃথু
কেউ দেখলে না। খােদা! গরীবের দুঃখু কেউ দেখলে না।
(রক্ষিগণ সহ প্রথম সভাসদের প্রবেশ এবং ছদ্মবেশে
মােসাফেরের অনুগমন ও সকল কাৰ্য অবলােকন।)
১ম সভা। আর কেউ বিক্ৰয়ার্থ আছে ?
২য় বিক্রেতা। (সেলাম করিয়া) না খোদাবন্দ!
১ম সভা। নূতন বাদশার মজীতে, আমি সকলকে খরিদ ক’রুলুম।
দরবারে এই কাগজ দেখিয়ে, উপযুক্ত মূল্য নাওগে যাও।
বন্দিনীগণ ! মহানুভব বাদশার দয়ায়, তােমরা মুক্ত হলে।
রাজকোষ হতে, উপযুক্ত পাথেয় নিয়ে, নিজের নিজের বাড়ী
ফিরে যাও। হাসিমুখে, সোণার সংসার পেতে, নূতন আত্মীয়
স্বজনকে নিয়ে, সুখিনী হওগে যাও।
ক্রীতদাসীগণ।
(সুরে) সেলামৎ সাহান্শা, কায়েম রক্ষে।
মুকভি উস্কে, দায়ে রক্ষে।
কনিজে না বিকতি হ্যায়, সহর মে।
কেঁও উসূসে খৃস্ না, আল রহে।
প্রেমের পাথার।
1 *
( দানিশ, বিবি ও কাকুর প্রৱেশ।)
দানিশ। ঝুট, হ্যায়, বুট, হ্যায়। সব খােসামুদের দল। রুটীর
টুকরো-চাওয়া মােসাফেরের ভাল, খােদা কখন করবে না।
১ম সভা। বেবফা! কাজের ফলভােগ কবার জন্যে দুনিয়া সৃষ্ট
হয়েছে। তুমি নিজের কাজের ফল ভােগ করগে যাও।
ইস্কো গ্রেফতার করে। (অন্য সকলের প্রতি) তােমরা
অামার সঙ্গে এসো।
বিবি। আল্লা! কি ক'লে ?
[ রক্ষিগণ সহ প্রথম সভাসদের প্রস্থান।
( ক্রীতদাসীগণের ও বিক্রেতাগণের অনুগমন)
জলিল। ও হােঃ হােঃ হােঃ, দেখতে দেখতে চলে গেল রে,
দেখতে দেখতে চলে গেল !! সবই বরাত। “অভাগা
যথায় যায়, সাগর ওখাতে চায়।”
[ জলিলের প্রস্থান।]
দানিশ। দেখ সাহেব, তুমি বড় নক্ষ্মী হয়। এই তুমি আমার
হাত বেঁধে রেখেটো, তবু যেন আমার কত আহলাদ হচ্চে।
আহা, তুমি এমন ভাল নেক, অার তুমি কিনা পাহারোলার
কাজ কর। কি অবিচারটা দেখেছো ? তুমি যদি আমার
সঙ্গে যাও, তা হলে, আমি তোমায় ভাল চাকরী করে দিতে
পারি। হাগা চৌকিদারের পো, আমার সঙ্গে যাবে ?
১ম রক্ষী। হাসে দিন্দাগী মাৎ করে।
দানিশ। ওঃ, ওর সঙ্গে আবার দিদাগী করবে। ভারি লোক
কি না, ক্ষমতা ত’ কত। ওরে ! তুই ত’ হুকুমের চাকর,
প্রেমের পাখার।
নিজের ইচ্ছেয় আমায় ছাড়তে পারি, তবে বুঝি তুই মানুষ,
নইলে ত’ তুই পাহারােলা।
১ম রক্ষী। আ যাও, নেই ছেড়েগা।
দানিশ। নেই ছােড়ড়গা? তবে ত’ ভারি বাহাদুরী হােগা।
১ম রক্ষী। (দানিশকে টানিতে টানিতে) আ যাও।
কাকু। বাবাকে ছেড়ে দে, নইলে কামড়ে দোব।
( দানিশকে ছাড়াইবার চেষ্টা করণ।)
মােসাফের। আর কেন, নিজের বুদ্ধির দোষে অনেক অন্যায়
ক’রিচি। রাজভক্ত প্রজাকে, আর কষ্ট দোবনা।
(অগ্রসর হওন।)
দানিশ।
। মােসাফের! আমায় বঁাচাও। তুমি আমার ধর্মবাপ।
আমার মিচি মিচি ধরে নিয়ে যাচ্ছে।
মােসাফের। সত্যিই তােমায় মিচি মিচি ধরে নিয়ে যাচ্চে।
( ছদ্মবেশ উন্মুক্ত করিয়া) আমি হুকুম ক’চ্চি, আমার
শরণাগতকে ছেড়ে দাও।
১ম রক্ষী। জঁহাপনা !
দানিশ। ক্ষমাশীল ধরণীশ্বর, আমি না জেনে সুলতানকে তুমি
বলিছি। আমি না জেনে, দয়ার অবতার জাহাপনার নিন্দে
ক’রিচি। গােলামের কসুর মাপ হবে না।
মােসাফের। ছেলের কথায় বাপে রাগ করে না, সরলহৃদয়
রাজভক্তপ্রজা! আমিই তােমার নিকট দোষী। তুমি বিনা
দোষে শাস্তি পেয়েছ। বল, কি পুরস্কারে তােমার কষ্টের
লাঘব হয় ?
৪
প্রেমের পাথার
দানিশ। জাহাপনা, যদি দয়া করে এ দাসকে কিছু দেন, তবে এই
দিন, যে এই রক্ষীগুলাের ওপর যেন কতৃত্ব ক’ত্তে পারি।
মােসাফের। আচ্ছা, তাই মঞ্জুর। আজ হতে তােমায় ফৌজী
অফসরের শ্রেণীভুক্ত কল্লেম। আমার নামাঙ্কিত সীল গ্রহণ
কর। সসম্রমে ফৌজদার সাহেবকে নিয়ে যাও। আমি
বিদেশ যাত্রা ক’রিচি, কিছু দিন পরে, আবার তােমার সঙ্গে
দেখা হবে।
[ মােসাফেরের প্রস্থান।
দানিশ। বলি, কি গাে, চৌকিদারের পাে! এখন বেঁধে নিয়ে চল ?
১ম রক্ষী। জনাব, মাফ, কিজিয়ে।
দানিশ। বিবি! একবার পাথর-চাপা কপালটা বোঝ। এ
মােট মাথামে করে। বিবি! একবার দাড়ানর ভঙ্গীটা
দেখেছো? একেই বলে গয়িবী চাল।
১ম রক্ষী। জনাব, আইয়ে।
সানিশ। চলো।
[ কায়দা করিয়া পা ফেলিতে ফেলতে হানিশের প্রস্থান
এবং উহার অনুকরণে কাকুর পক্ষেপণ ও অপরাপর
সকলের অনুগমন।
প্রেমের পাথার।
সপ্তম গর্ভাঙ্ক।
(জঙ্গল-পার্শ্বস্থ নদীতীর।)
গাহিতে গাহিতে জেলে ও জেলেনীর প্রবেশ।
গীত।
লেসে।
উভয়ে।
জেলেনী।
আমার রগ করে টন টন।
লােকের রঙ্গ দেখে, অঙ্গ জ্বলে, মন করে গন গন্।
বল্ দেখিনি সােণামণি, এমন কেন মন,
বলি, মনের মতন হয়নি কি তাের, তাইতে রে এমন।
জেলেনী।
ওরে একটা দুটো মাচের তরে, বসে বাবু ভায়া।
টোটী গেঁথে, ছিটী ফেলে, হাপসে ওঠে কায়া
আবার, ধীর বাতাসে, ফানা ভাসে, টোপ, ঘােরে বন্ বন্।
ওরে জাল ভরা মাচ তুলতে রে বল, ক’জন তাের মতন।
জেলে। বলি, হঁা ভাই চাদমুখী!
জেলেনী। কি ভাই চাদমুখে।
জেলে। আজ জাল দিয়ে নদীর মুখ ঘিরে ফেলা যাক, তারপর সব
মাচ ঘেঁকে নেওয়া যাবে, কি বলিস্?
জেলেনী। হাঁ, হ, হাম্ সবমেই রাজী।
জেলে। তাের যে ভারি ফুতি রে ?
জেলেনী। কি করবাে প্রাণনাথ ! এটা আমার বয়েসের দোষ।
৪০
প্রেমের পাথার।
জেলে। ওরে, আগে জাল দিয়ে নদীর মুখ বেঁধে ফেল, তারপর
যত পারি, এয়ারকি করিস, বুঝলি ?
জেলেনী। আচ্ছা প্রাণনাথ! তােমার মতেই মত দিলুম
[ জাল দিয়া নদীর মুখ বাঁধিতে বঁধিতে উভয়ের প্রস্থান।
(শা-আলম, মওলা ও মহবুবের প্রবেশ।)
শা-আলম। য! এ যে নদীর তীর এলো। তবে কি সওদাগরের
বু নেই। আমি ইচ্ছে করে, তবে কি আমার বিবিকে
সাপের বিবরে পাঠালুম। আল্লা, আমার কি কল্লে ? আমার
কি দোষ দেখে, আমার গুণবতী স্ত্রীকে আমার দ্বারাই বিপদে
ফেলালে ? আমার অকূল সাগরের একমাত্র অবলম্বন-শাখা,
পরবদিগার! কি দোষ দেখে সরিয়ে নিলে ? সে যে বড়
সাধ করে, আমার ভাবনার ভাগী হতে চেয়েছিল। আল্লা,
তাই কি তাকে সরিয়ে দিলে ? বিবি ! কে জান্ত’, ছেলেদের
মুখ আর দেখতে পাবে না বলে, আমার ছেলেরা রইলো,
এদের দেখে বলেছিলে ?
মহবুব। (কয়েকটী বন্য ফল কুড়াইয়া) বাবা! কেমন ফল গুলি
দেখ, তুমি খাবে ?
শা-আলম। আর খেতে ব’ল না, আর পাব না। যে খাওয়া
খেয়েচি, বােধ হয়, এ জীবনে আর ক্ষিদে হবে না।
মহবুব। দাদা, আমার বড্ড ক্ষিদে পেয়েছে, আমি এগুলি সৰ
খাবাে।
মওলা। খাও ভাই, আমার এখনও ক্ষিদে পায়নি।
(মহবুবের ভক্ষণ।)
প্রেমের পাথার।
৪১
শা-আলম। মঙ্গলময় আল্লা! তােমার সব কাজই মঙ্গলময় ব'লে
জানি। দয়াময়! আমার চির-জীবনের সংস্কার, মন থেকে
সরিয়ে দিও না। আমি উপকারের জন্যে আমার বিবিকে
পাঠিয়েছি। উপকার করবার মনেও, ললাকের মন্দ হয়, এ
বিশ্বাস আমার মনে হতে দিও না। আমার বিবিকে
নিরাপদে ফিরিয়ে এনে দাও। আমি নিজের ইচ্ছেয়, কি
ক’লম? আল্লা, আমার কি ক'ল্লে ?
মহবুব। দাদা, দাদা, আমার গা কেমন কচ্চে, আমায়
মওলা। কি খেতে, কি খেলি ভাই ? বাবা, বাবা !
মহবুব। আমার মাথা কেমন কচ্চে, আমায় কোলে নাও।
মওলা। অজানা ফুল, না খেয়ে, কেন ভাই, তােকে খেতে দিয়ে-
ছিলুম। মহবুব, মহবুব, কথা ক’ ভাই ! বাবা, মহবুবের
চ’কে আর পলক পড়চে না, মহবুব যে আর কথা কইচে না!
শা-আলম। যা, বাঃ, বেশ! আল্লা, এ কি কল্লে ? খােদা, কেন
আমার আপনার কাউকে রাখচো না? দয়াময়! বলে
দ ও, কেন আমার বিকে, আমাকে দিয়েই, অজানা পুরুষের
হতে দে ওয়ালে ? কেন আমার নয়ন-আনন্দ শাজাদাকে,
বনের বিষফল খেতে মজী দিলে ? আল্লা, পাপ পুণ্যের
বিচারক! বুঝিয়ে দাও, এ সব আমার কি কাজের ফল।
মঙ্গলময়! বলে দাও, কি মঙ্গলের জন্যে, এ কাজ কল্লে ?
যে জন্যেই ক'রে থাক, তুমি মঙ্গলময়। যা করেছ, বেশ
করেছ। খােদ! তােমার জিনিষ তুমি নেবে, আমি জোর
করে কি করবাে। তেজোময় আল্লা! শক্তিময় আল্লা ! তুমি
৪২ প্রেমের পাথার। সকল জায়গায় আছ। আমি তােমার কোলে, তােমার জিনিষকে দিয়ে গেলুম। আর আমার ভাবনা নেই। আর আমার ভাববার দরকার নেই। মওলা। বাবা, বাবা, কি হল? শা-আলম। কি হবে ? কিছুই নয়। ঘুমুতে ঘুমুতে একটা স্বপন দেখেছিলুম, ঘুম ভেঙ্গেছে, তবু স্বপনের ধাের কাটেনি। মওলা। বাবা, উঠে দাড়ালে যে? মহবুব কি একলা পড়ে থাকবে ? শা-আলম। একলা কেন ? একলা কে থাকে ? যার জিনিষ, সে হাতে করে নিয়েছে। আর আমার ভাবনা নেই। আর আমার ভাববার দরকার নেই। { শা-আলম ও মওলার প্রস্থান। ( মৃত ব্যাঘ্র লইয়া জনৈক ফৌজদার ও তৎ- পশ্চাতে দানিশের প্রবেশ।) দানিশ। আরে, মাৎ দৌড়ো, মাৎ দৌড়ো, তেনী ঠারো জী। ফৌজদার। কি হয়েছে, ফৌজদার সাহেব ? দানিশ। এই ব’লছিলুম, এই বাঘটা আপনি মেরেচেন, না, আমি মেরিচি ? ফৌজদার। এ ক্যা কহেনা সার? পানিশ। আহা, ক্যা কয়না আর কি ? আপনি আর আমি ছাড়া ত’ এখানে আর কেউ নেই ? একজন ত’ মেরেচেই, হয় বলুন আমি মেরিচি, আপনি কঁাধে করেছেন ; নয় বলুন,
প্রেমের পাথার।
৪৩.
আপনি কঁাধে করেচেন আর আমি মেরিচি। বলুন
সাহেব, কোটা সত্যি?
ফৌজদার। আমার হক ছিনিয়ে নিতে চেষ্টা করবেন না। আমি
ফৌজী লােক।
দানিশ। আর আমিই কি, ফৌজী লোক নই নাকি ?
ফৌজদার। ফৌজী হয়ে আপনি, মিথ্যে কথা বলছেন কেন ?
আপনার বন্দুক এখনও ভরা রয়েছে, তা দেখছেন ?
দানিশ। যা, যা! ভরা রয়েছে, তাই ত’! তা হ’লই বা
সাহেব, বন্দুক
বন্দুক ভরা থাকলে কি আর, বাঘ মারা
যায় না?
ফৌজদার। কি করে বাঘ মারূবে?
দানিশ। কেন, বন্দুকের উল্টো পিঠ দিয়ে মারবে। আচ্ছা,
ব’লুন দেখি সাহেব, এক হাতে ঢাল, আর অন্য হাতে
তরােয়াল নিয়ে, দুটী হাত জোড়া করে, সেপাইয়েরা কি
করে তােক ধরে ?
ফৌজদার। আরে, এ কোথাকার পাগল ? মেরা হক, ম্যয় নেহি
ছেড়েগা, হামনে এ সের মারা, হানে লে যাগা।
[ দানিশকে ভূপাতিত করিয়া প্রস্থান।
দানিশ। আরে, আরে, আমার পক। হাড়গুলো সব ভেঙ্গে গেল
যে !! গোঁয়ার গােবিন্দ ফৌজী লােকগুলাের রকমই
আলাদা। খোদা, কি যে করি। না, শুধু হাতে বাড়ী
ফিরে গেলে, আমার অভ্রমের একশেষ হবে। হে আল্লা!
আমি চ’খ বুজে থাকি, দু চারটে মরা বাঘ আমার পায়ের
কাছে ঠেকিয়ে দে। নিদেন আধখানা। এই যে একটা
.৪৪ প্রেমের পাথার মরা ছেলে রয়েছে, আমি এই শীকার ক'রিচি বলবো। আরে ফৌজদার! জন্তু শীকার করা ত’ মুটের কাজ। যদি মানুষ শীকার ক’ত্তে পারিস, তবেই বলি হা। [ মহবুবকে লইয়া দানিশমন্দের প্রস্থান। (শা-আলম ও মওলার পুনঃ প্রবেশ।) শা-আলম। মানুষ, এই আছে, এই নেই। একটু আগে, এই- খানেই শাজাদা ছিল, আর নেই। মওলা, এইখানেই তােমার আদরের ভাইকে খােদর হাতে দিয়ে গেছি। এই তৃণশয্যার উপরেই, তোমার পথ শ্রান্ত ভাই, চিরদিনের মতন বিশ্রাম ক’চ্ছিল। এই গগনস্পর্শী তরু, অনন্ত নিদ্রায় শয়িত -তােমার ভাইয়ের কষ্ট হবে বলে, মুখে রােদ লাগতে দেয়নি। এই খরবাহিনী নদী, তোমার ভাইকে সুখী ক’ত্তে, কোমল সঙ্গীত নিয়ে ভেসে যাচ্ছিল। যারা তােমার ভাইকে সুখে রেখেছিল, তারা আছে। নেই কেবল, তােমার ভাই । মওলা। বাৰা, কি কল্লে দুঃখু যায় ? শা-আলম ! কি ক'লে দুঃখু যায় ? জগৎ থেকে নিজের একটা আলাদা দুঃখু বার করে না নিলেই, দুঃখু থাকে না। মওলা, স্থির জেনে রেখাে, নিজেকে যার ভাসিয়ে দেবার ক্ষমতা আছে, সেই দুঃখু সরাতে পারে। মওলা। খােদ, আমি ত’ তা হলে বাবার দুঃখু সরাতে পারি। নিজেকে ভাসিয়ে দিলে দুঃখু যায়। আমি নিজেকে
প্রেমের পাের।
৪৫
ভাসিয়ে দেবো। খােদা, আমার দুঃখু, তুমি সরিও। বাবার
মুখে অাদের হাসি, আবার তুমি ফুটিয়ে দিও।
[ মওলার জলে ঝম্প প্রদান।
( নেপথ্যে জলে কম্পপ্ৰদান শব্দ হওন।
নেপথ্যে। ওরে! ছেলে পড়েছে, ছেলে পড়েছে।
শা-আলম। যা, যা, খোদা, খােদা, এই কি তােমার মনে ছিল ?
এ জগতে আমার সম্বন্ধ লােপ করবে বলেই কি, এই
কল্লে? মওলা, মওলা, আর শব্দ নেই। জল যেমন
স্থির ছিল, তেমনিই স্থির হয়ে আছে। মঙ্গলময়, বেশ
করেছ। যা করেছ, বেশ করেছ। আমার শান্তি-সৌধ,
ভাল করে ময়দানে পরিণত করেছ, বেশ করেছ।
তুমি মঙ্গলময়। মঙ্গলের জন্যে, আমার ভাবনা শেষ করে
দিয়েছ।
আজ থেকে, আর আমার ভাবনা নেই।
আজ থেকে, আর আমার ভাবনা নেই। আজ আমার
বড় আনন্দের দিন। খােদা! ধৰ্ম্মের বিচারক! আজ
আমার বড় আনন্দের দিন।
শা-আলমের প্রস্থান।
(জলমগ্ন মওলাকে লইয়া নদীগর্ব হইতে
জেলে এবং জেলেনীর উত্থান)
জেলেনী। ছি, দুই পুরুষ মানুষ হ'য়ে, একটা ছেলে তুলতে
পারুলিনি, আর আমি মেয়ে মানুষ হয়ে তুলুম। তাের
গলায় দড়ি। তােল, আস্তে আস্তে তাে।
৪৬
প্রেমের পাথার।
জেলে। আস্তে তােলা, জোরে তােল, দুইই সমান। মরার
কি কখন লাগে রে ?
জেলেনী। খােদ, কষ্ট পাওয়াই কি সার হ’ল ? যখন তুলিচি,
তথন এর সদগতি করবাে। চল, একে কবরে দিইগে
যাই।
[ মওলাকে লইয়া জেলে ও জেলেনীর প্রস্থান।
(শা-অলিমের পুনঃ প্রবেশ।)
শা-আলম। না, একটীবার। শুধু, এ জন্মের মতন একটীবার
দেখবো। বনের ফল! তােমার গুণে, ক্লান্ত শাজাদা
জিরুচ্চে। উত্তাল তরঙ্গিণি নদি! তােমার কোলে, অনন্ত
কালের জন্যে, আমার বড় আদরের ছেলে, নিদ্রা যাচ্ছে।
তাই, আর একটাবার তােমাদের দেখতে এলুম। আর
আস্বাে না। কিন্তু খােদা, তুমি কি ক'লে ? কার সঙ্গে
বাজীতে হা’লে ? এখনও ত’ আমার মাথার ভেতরে
ভেতরে জড়ান, ভাবনার শেকড় সরিয়ে দিতে পাল্লে না ?
এখনও ত’ এ জগতে, আমার সম্বন্ধ লােপ করে, আমায়
চিরদিনের জন্যে, ভুলিয়ে দিতে পাল্লে না? তবে কি
কল্লে ? খোদা, তােমার হা’র। দেখ, তুমি পাল্লে না,
আমি আমায় ভাসিয়ে দিই, আমি আমায় ভুলিয়ে দিই।
(ঝম্প প্রদানােদ্যোগ এবং মােসাকেরের প্রবেশ।)
মােসাফের। সুলতান, সুলতান! এ জগতে সয়ে থাকায়ই সুখ।
(পটক্ষেপণ।)
দ্বিতীয় অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
( উদ্যান।)
গাহিতে গাহিতে সখীগণের প্রবেশ।
সখীগণ।
গীত।
ওই চুরি করে চাঁদের হাসি, হাসতেছে কমল।
ওগো, তাই না দেখে, জাকুল অলি, ভাবে ঢল ঢল
সুখেতে গাইচে পাখী গান,
মানিনীর মান ভেঙ্গেচে, গেছে অভিমান
সমীরে উঠলো কাণে কাণ;
হেসে বুঝে নিলে ধরা, যতন করার ফল।
রূপেতে, মন কি ভেলে, মন না হলে, মনে বল
[ সখীগণের ও
(জ্বলিল ও আলিজানের প্রবেশ )
জ্বলিল। সকলই বরাৎ বাবা! সকলই বরাৎ।
আলিদান। বরাৎ কি রে ?
৪৮
প্রেমের পাথার।
জ্বলিল। আর বাবা, বৎ নয় ত’ কি? আমি শালা, লুরিস্থান
পৰ্য্যন্ত, বাদীর জন্যে দৌড়লুম, আমার বরাতে কিছু জুটলো
, আর তােমার ভাইজান, বনে বসে দুধের বাটীতে
চুমুক মাল্লে ।
আলিজান। চুমু মাল্লে কি রে ?
জলিল।
সে বাবা, এক রকম চুমু কই। বাপজান ! তোমার ভাই
সাহেব, বন থেকে যে কি টেয় ধরে এনেছে, তা ত আর
দেখনি। সে মুখখানা দেখলে লাউ, ব’নে যেতে বাবা,
লাট্ট ব’নে যেতে। আহা হা হা, দেশের লােক নিয়ে
প্রেম করা হ’ল না রে। দেশের লােক নিয়ে, প্রেম করা
হ’ল না।
আলিজান। তুই সে খবর পেলি কি করে ?
জলিল। বাবা, গাঁয়ে আগুন লাগলে কি আর, পীরের ঘর
বঁচে ?
আলিজান। (স্বগত) সব মাচী হ’ল। মুখ এখনই সব প্রকাশ
করে ফেলবে। পাঁচ কাণ হলেই, তােরাব সাবধান
হবে। এ সুযােগ, কখন হতে দেব না। ( প্রকাশ্যে )
দেখ, জলিল! তুই একটা কাজ কর, ইস্পাহানের জঙ্গলে,
এখুনি চলে যা। সেখানে তাের মনের মতন, ঢের মেয়ে
মানুষ পাবি।
জলিল। যা! বল কি !! হ্যা বাপজান ! আজকাল সহর ছেড়ে
কি তবে, জঙ্গলে মেয়ে মানুষের আমদানি হয়েছে ?
আলিজান। হ্যা, হঁা, দেখলিনি! ভাইজান জঙ্গল থেকে মেয়ে
মানুষ ধরে আলে। দেখিস, এ কথা যেন কাউকে
প্রেমের পাথার।
বলিসনি, তা হলে তারাই সব হাত করবে, তাের বরাতে
আর কিছুই জুটবে না। আমার সঙ্গে আয়।
জলিল। চল বাবা ! খোদা, দেশের লােক নিয়ে দু’দিন প্রেম
ক’ত্তে দে। খােদা, দেশের লােক নিয়ে দু’দিন প্রেম
ক’ত্তে দে।
[ উভয়ের প্রস্থান।
( তোরাব ও মায়ূসের প্রবেশ।)
মায়ূন্। সাহেব, বন্দিনীকে মুক্ত করে দিন। খােদা আপনার
ভাল ক’রূবেন।
তােরাব। মায়ুস, যা হবার নয়, তা হয় না।
মায়ুস। তবে তার মত নিয়ে, তাকে বিয়ে করবার চেষ্টা করুন।
তােরাব। না, আমি তাতেও সম্মত নই।
মায়ু। ওমরাও সাহেব! বান্দার কথা রাখুন। ইচ্ছে করে
আপনার অকলঙ্ক চরিত্রে কলঙ্ক দেবেন না। আপনার
কিসের অভাব ? আপনি ইঙ্গিতে যদি আপনার মনের কথা
প্রকাশ করেন, তা হলে, শত শত ভুবনমােহিনী রমণী,
আপনার চরণ সেবা করবার জন্যে উপচিকা হয়ে আসে।
সাহেব ! আপনার মতন বিখ্যাত ওমরাহের, স্ত্রীলোকের
উপর অত্যাচার করা সাজে না।
তোরাব। আমি জেনে অন্যায় ক’চ্চি। আমায় বোঝালে, কোন
ফল হবে না।
মায়ুস্। আমার অনুরােধে তবে মনকে ফেরাতে চেষ্টা করুন।
তােরাব। অনুরােধে কি মন ফেরান যায় আমি ত’ কত অনুরােধ
প্রেমের পাথার।
ক’রিচি, অনুরােধে কি তুই, পর্ণকুটীর ছাড়তে পেরিচিস্?
অনুরােধে কি তুই, আমার সঙ্গে দোস্তি ক’ত্তে পেরেছিস্?
মায়ুস্। সাহেব! আপনাতে আর আমাতে ! চাদের তুলনা, চঁাদের
সঙ্গেই হয়, জোনাকির সঙ্গে হয় না। আপনি দয়া করে
বন্দিনীকে মুক্ত করে দিন। আল্লা আপনাকে চিরসুখী
করবেন।
}
তােরাব। তা যদি পাত্তম, তা হলে সরলাকে বন্দিনী করে
আন্তু নি। শােন্, তাের কাছে আজ কোন কথা লুকুবে
আমি তাের সঙ্গে বন্ধুত্ব করবার জন্যে, পাগল হইচি,
আমি তােকে আপনার করে রাখবে বলেই, সরলাকে
বন্দিনী করে রেখেছি। খােদার কাম নিয়ে বলচি, তুই
যদি আমার হয়ে থাকি, তা হলে এখনি তাকে মুক্ত
করে দিই।
মাস্। সাহেব, আমি ত’ আপনারই, নতুন করে কি করে হব ?
ভালবেসে, অনুরােধ রাখেন বলেই, জোর করে এতদিন,
নিজের ইচ্ছে বজায় রাখতে পেরিচি। আর যদি আপনার
ভালবাসা না থাকে, আর যদি আমার ইচ্ছে রাখবার সাধ
না থাকে, তবে জোর করে ইচ্ছে বজায় রাখবার ক্ষমতা
আমার নেই। কিন্তু সাহেব, আপনার ভালবাসার মায়ূসের
প্রাণের ভেতর লুকুনো, একটা কথা মনে করে রাখবেন।
আকাঙ্ক্ষা মেটার চেয়ে, আকাঙ্ক্ষা পুষে রাখা সুন্দর। ফোটা
ফুলের চেয়ে, ফোবার মতন ফুল সুন্দর। প্রাণের আশা
মিটে গেলেই, সাধ ফুরিয়ে যাবে। জল খেলেই, জল ভাল
লাগা, মন থেকে চলে যায়।
প্রেমের পাথির।
তােরাব। মায়ুস্! রহস্যময়ী কথা তুলে আর আমায় পাগল করে
দিনি। তাের গােলমেলে কথা প্রাণপণে বুঝতে চেষ্টা করি,
তবু পারিনি। তােকে দেখে মনে হয়, কি যেন একট
রহস্যের ছবি, তুই আমার সানে ধ’রিচি। মায়ূন্।
নিজেকে তুই ধরা দে। আমি অনেক সয়েছি, আর সইতে
পারুবাে না। ভালবাসার কসম, তুই আমার সঙ্গে দোস্তি
কর। তাের মুখের কথা পেলেই, আমি বন্দিনীকে মুক্ত
করে দিই।
মায়ু। সাহেব, দোস্তি হলেই বিবাদ হয়। আপনার সঙ্গে
বিবাদ কত্তে ইচ্ছে হয় না, তাই আমি আপনার সঙ্গে দোস্তি
ক’ত্তে চাইনে।
তােরাব। মায়ূ ! কথায় ভােলাতে চেষ্টা করিনি। আজ শেষ
জবাব দে। যদি দোস্তি ক’ত্তে অনিচ্ছুক হ’, তা হলে
বন্দিনীর উদ্ধারের আশা চিরকালের জন্যে, ত্যাগ কর।
তােরাব খোদার নাম নিয়ে প্রতিজ্ঞা করেচে, হয়, সে তাের
বন্ধুত্ব লাভ করবে, নয়, চিরদিনের জন্যে নিজেকে কলঙ্ক
সাগরে ভাসিয়ে দেবে।
মায়ু। (স্বগত) হা ঈশ্বর ! আমায় এ কি বিপদের মাঝে
ফেল্লে? একদিকে অবলার সতীত্ব নাশ, আর অন্যদিকে
আমার জীবনানন্দ প্রিয়তমের, আমার কলুষিত সহবাসে,
অবশ্যম্ভাবী শশাচনীয় পরিণাম। বিজ্ঞান ! তুই হ'য়ে
মরিনি কেন? ( প্রকাশ্যে) সাহেব! ভাববার জন্যে
একদিনের সময় দিন। আশ্রিত-পালক! আমার কোন
কথা ঠেলেনি, মেহেরবানী করে এ কথাটাও রাখুন।
প্রেমের পাথার।
তােরাব। আচ্ছা মায়ু! ভাববার জন্যে, একদিনের সময় রইলো,
মনে রেখাে, শুধু একটা দিন। অনেক দিনের মনে-
মিলনো কথা, আবার আমার মনে উঠেছে। অনেক
দিনের প্রাণে-লাগা চাউনি, আবার আমি দেখতে
পেইচি। অনেক দিনের মৰ্ম্মে মর্মে জড়িত স্বর, আবার
আমার কাণে বেজেচে। মায়ুস, তোর এত অনিচ্ছের
জন্যে, সত্যিই তাের উপর আমার সন্দেহ হয়। তুমি
স্থির জেনে রেখাে, আর আমি তােমায় সময় দিতে
পাবাে না। তুই ভাব, আমি চ’লুম।
(তােরাবের প্রস্থান।
মায়ুস্। দিলজান, নতুন করে মিলনের সাধ, আর কি তাের
মনে হয় ? পাষাণ প্রাণ নিয়ে, মান অভিমানের খেলা
খেলতে, আর কি তোর প্রাণ চায়? মায়ু, এখনও
মনের
জোর
কর, এখনও
চ’খের দেখার
লোভ
সাম্লাতে পাল্লে, সােণার সংসার ছারখার হয় না মায়ু,
মনকে বুঝিয়ে দে, সব জমীতে মজদ হয় না। না না,
ভুল বুঝলুম। মিলন না হলে একজন সতীর সতীত্ব
যাবে। স্বামী বেঁচে থাকা, নিজের স্বার্থ। নিজের
স্বার্থের জন্যে, পরের ওপর কলঙ্কের বােঝা দোব কেন ?
স্ত্রীলােক হয়ে স্ত্রীলােকের ইজ্জতের দিকে তাকিয়ে দেখবাে
না কেন? খোদা! স্ত্রীলােকের ইজং বাঁচাতে আমি নিজের
বিপদ ডেকে নােব, যদি তােমার মরজী হয়, মায়ুকে তুমি
দেখাে।
[ মায়ুসের প্রস্থান।
প্রেমের পাথার।
( আলিজানের প্রবেশ।)
আলিজান। সুযোগ, সুযােগ, সুন্দর সুযােগ এসেচে।
এই
সুযােগের বলেই, আমি আমার কর্তব্যের পথ করে নেব।
তোরাব, এতদিনে নিজের বিপদ ডেকে এনেছ। তোমার
আনীত স্ত্রীলােকের বশতপন্ন করে, আমি তােমারই
সর্বনাশ কৰ্ব্বো। এ সৰ্ব্বনাশ অন্য কিছু নয়। হয়,
তােমার মৃত্যু ; নয়, চির-কারাবাস। নরক! তুমি আমার
সাহায্য কর। শয়তান ! তুমি আমার হৃদয়ে বল
দাও। আমি আর কিছু চাইনে, শুধু তােমার সাহায্য
চাই।
[ অলিজানের প্রস্থান।
(গাহিতে গাহিতে সখীগণের প্রবেশ।)
গীত।
সখীগণ।
রঞ্জিয়া রাগে প্রতীচি ধূসর শির।
নলিনী মলিনী করি মিহির।
ডুবিল বিষাদে,
গণি পরমাণে,
হেরে দশ ধরণীর ॥
ঘোমটা খুলিয়া, নিশি শশীর,
হাসি মুখ হেরি, হেসে অধীর,
ঘসিতে তারকা,
হিয়াতে মলয়,
উঠে ফোটে নাগ
[ সখীগণের প্রস্থান।
৫৪ প্রেমের পাথার। দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক (কক্ষা। ) (মহবুবকে লইয়া দানিশমন্দের প্রবেশ) দানিশ। বিবি, ও বিবি, বিবি গো। ( বিবির প্রবেশ।) বিবি। কি গো ! কি হয়েছে, অমন ক’চ্চ কেন ? দানিশ। মড়া আমার কঁাধে এসে যে, দানা পেয়েছে বিবি ! বিবি। ও আবার কি কথা? ও কথা মুখে আনতে নেই। দানিশ। তুমি ত’ বল্লে মুখে আনতে নেই, আর এদিকে যে, আমার কাধে চেপে বসেছে। মহবুব। ওগাে, সত্যি আমি দানা পাইনি। আমার বড় লাগছে, আমায় ছেড়ে দাও। দানিশ । ঐ শােন বিবি, ঐ শােন। ছোড়া আমার সর্বনাশ কল্লে। হাগা, তুমি কি ? সােণার চাদ—কার টুকটুকে ছেলের "ণের কথা বলছো। এস বাবা! আমি বাঁধন খুলে (তথা করণ ) ব? এতােয়ারের দানা-পাওয়া মড়া ছুঁলে ? ই, আমি জেয়ান্ত। বল ত’ লাফাই। তে ত’ পাবেই। তার আর গরীব, ছেলে পিলে নিয়ে বিবি। অক, দিচ্চি। দানিশ। যা! কল্লে মহবুব। ওগো, আমি মড়া , দানিশ। দানা পাওয়া মড়া, লাফ, নতুন কথা কি ? হেই বাবা, আমি
প্রেমের পাথার।
. ৫৫
ফল
ঘর করি, আমার ওপর কেন ? তােমায় যােড়। মেড়া দেব।
তুমি মাণিক, মেহেরবানী করে একবার মর। মর ত’
বাবা, লক্ষ্মী বাবা আমার, একবার তেমনি করে মর।
মহবুব। ওগাে! আমি ত’ মরিনি।
দানিশ। মরনি! তবে কি মটকা মেরে পড়ে ছিলে বাবা ?
মহবুব। না গো, হেঁটে বাবার সঙ্গে যেতে যেতে, বড় ক্ষিদে
পেয়েছিল, তাই, অনেক গুলো ফল খেয়েছিলুম।
খেয়েই গা ঘুরে উঠলো, আর কিছুই মনে নেই। যখন
আমার মাথা একটু ভাল হ’লতখন তােমার পিঠে বাঁধা
বইচি দেখলুম।
বিবি। হঁাগা, তুমি ভার্চ কি ? ফল খেয়ে ঘাের লেগে অজ্ঞান
হয়ে পড়েছিল, এখন জ্ঞান হয়েছে। এ আর বুঝতে
পাচ্চো না ?
দানিশ। বুঝতে যেন পান্ন, বিবি ! কিন্তু তা হলেও একে ম’ত্তে
হবে।
বিবি। কেন ?
দানিশ। কেন আর কি ? একে নিয়ে আবার সময়, এ রাজ্যের
অনেক লােক, একে আগেকার বাদশার ছেলে বলে চিতে
পেরেছিল। আমি ত’ আর জানিনি বিবি! যে, এ মটকা
মেরে পড়েছিল। তাই সকলকে মরা ছেলে বলেছি।
ভাগ্যিস্ এর পরিচয় পেয়েছিলুম। নইলে শীকার করেছি
ব’লে ব’তুম। বাদশার ছেলে শুনে, ইনাম পাবার আশায়,
একে কঁাধে করে আলুম, শেষে বাড়ীর কাছে এসে,
ছোঁড়াটা বেঁচে উঠলো।
প্রেমের পাথার
বিবি। যা! বাদশার ছেলে। আল্লা! শাজাদাকে দীর্ঘজীবী
করুন।
দানিশ। বাঃ, বেশ মজার কথাই ত’ বলে । একে এখুনি যে
মত্তে হবে। রাজ্য গু লােক, একে মরা দেখেচে।
তারা ত’ আর বুঝবে না, যে এ গুণের ছেলে, মরা
সেজেছিল। একে জেয়াস্ত দেখলেই, আমায় যাদুকর
বলে ধরে নিয়ে গিয়ে, ফাঁসিকাঠে ঝোলাবে। তা হচ্চে
। যখন মরা সেজেছিল, তখন একে ম’ত্তেই হবে।
বিবি। বালাই, কখন ম’রূবে না। শাজাদাকে বাঁচানর জন্যে,
যদি বাদশার হিল্লে ছাড়তে হয়, জেনাে তাও মঞ্জুর।
( কাকুর প্রবেশ।)
কাকু। শাজাদা কে মা? তুমি বুঝি ভাই, বাদশার ছেলে?
ওঃ, আজ থেকে তুমি ভাই, আমার বন্ধু হলে, কেমন ?
মহবুব। আচ্ছা ভাই।
দানিশ। আরে, বা রে কপাল ! একে বিবির ধাক্কা সাম্লাতে
পারিনে, তার ওপরে ছেলে এসে বলেন বন্ধু।
কাকু। বাবা, আমাদের ফটকে চাবি দেওয়া কেন ?
দানিশ। তাের বাপু! সব কথায় কথা কইবার দরকার কি ?
কাকু। ওঃ!
নেপথ্যে। দরয়ান, দরয়া!
দানিশ। বিবি ! ও বিবি ! ঐ শােন। বাদশার ওখান থেকে
বুঝি লােক এসেছে।
কাকু। এলােই বা, কিসের ভয়? আমায় ফটকের চাবি দাও
আমি ভেতরে ডেকে আচি।
প্রেমের পাথার।
দানিশ। তাের আর বাহাদুরী ক’ত্তে হবে না। পারিস ত’
এই ঘরে একটা চাবি দে।
নেপথ্যে। নয়া ফৌজদার, সাব সে কা হ্যায়। জলদি দরওয়াজা
খােলাে।
দানিশ। ওরে আর দেরি করিনি। ব, বাবা বাড়ী নেই।
কাকু। আমি ফৌজদারের ছেলে। কাকে ভয় করে, আমি
মিথ্যে কথা কইব ?
দানিশ। আ গেল! এখন বীরত্ব ফলাতে এলো। আরে! বল না,
বাবা বাড়ী নেই। ও বিবি! দেরি হয়ে যাচ্ছে যে।
তুমিই না হয় বল।
বিবি। গা! আমি বলব কি ?
দানিশ। না হয়, আজকের মতন ছেলের জবানীতেই বল্লে।
নেপথ্যে। দেরি করাে না, বাড়ীতে কে আছ ? জবাব দাও।
দানিশ। কি করি, নিজেই ছেলে হয়ে জবাব দি। ওগো! বাবা
বাড়ী নেই, শীকার ক’ত্তে গেছেন।
নেপথ্যে। এলে, উজীর সাহেবের কাছে যেতে বলবেন।
দানিশ। আচ্ছা, বলবো গাে। ইয়ে আল্লা, ঘাম দিয়ে জ্বর
ছাড়লো। বাপ্ রে ! কি বিপদেই পড়েছিলুম। বিবি।
শীগগির করে দু’চারটে দামি দামি জিনিষপত্র বাঁধ,
এখানে আর থাকা হবে না।
বিবি। কেন? ফল খেয়ে ঘাের লেগেছে, এ কথা বাদশা বিশ্বাস
ক’রূবে না, তোমায় কে বলে ?
দানিশ। আরে, বাদশা বিশ্বাস করবে, এ কথাই বা তােমায়
কে বল্লে ? ধাঁ করে তােমার ওড়নাখানা দেও ।
প্রেমের পাথার।
(ওড়নার দ্বারা মুখ আবৃত করিয়া) চল, খিড়কীর দোর দিয়ে
বেরিয়ে পড়ি। (কাকুর প্রতি) ওরে, আয় না।
কাকু। আমি ফৌজদারের ছেলে, আমি মুকুনো পথ দিয়ে যাব ?
দানিশ। আরে, তুই ত তুই, তাের বাপ যাবে।
কাকু। কক্ষন নয়।
হাম নেহি যাঙ্গা।
দানিশ। নেহি যাঙ্গা কি ? অবিশ্যি যেতে হবে। আমি বলছি,
যেতে হবে।
কাকু। (আস্তীন গুড়াইয়া) কভি নেহি।
দানিশ। কবি নেহি কি, আল বৎ যানে হােগা। চলো।
[ ঘুসি শাড়িতে লাড়িতে উভয়ের প্রস্থান,
ও সকলের অনুগমন।
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
(বন্দীগৃহ )
বিষন্নভাবে মহাতাব উপবিষ্টা।
(মায়ুসের প্রবেশ)
মায়ূন্।। বন্দেগী বিবি সাহেব! কাল রাত্রে, ভাল ঘুম হয়েছিল?
মহাতাব। ময়ু! তােমার হৃদয় আছে, তবু এ কথা জিজ্ঞেস্
কোচ্ছ কেন ? এখন কি আমার নিশ্চিন্ত মনে, ঘুমনর সময়
দেখলে? তুমি ত’ জান, এখনও নিজের বাবার উপায়
ক’ত্তে পারিনি, এখনও একজনের ভাবনা-ভরা প্রাণে,
ভাবনার বােঝ তুলে দিয়ে, ভাবনা সরাতে পারিনি। তবে
প্রেমের পাখার।
কি করে ঘুমনর কথা তুলচো? কূল-কিনারা-হীন সাগরের
মাঝখানে, তরী ছিদ্র হতে দেখলে, নিশ্চিন্ত মনে কেউ
কি, ঘুমুতে পারে ?
মায়ু। পারে না বিবি সাহেব, কিন্তু মিছে ভেবে, শরীর খারাপ
ক'লে কি হবে ? ভেবে যার উপায় বেরুবে না, তা ভেবে
অশান্তি বাড়ালে, মনের জোর কমবে বই, বাড়বে না।
আমি বরং বলি, বিবি সাহেব! তুমি মনের জোর
কর।
মহাতাব। ময়ুস্ ! তোমার মহৎ অন্তঃকরণের গুণে, যদি আমায়
ভক্তির চ’খে দেখে, আমার দুঃখে দুঃখী হয়ে থাক, তবে
আমার ভাবনা সরাতে, আমার দুর্বল মনের বল বাড়াতে,
আমায় মুক্তির উপায় বলে দাও। তােমার উপকারের
বিনিময়, আমি দিতে পারবো না। কিন্তু মায়ূ ! ধর্মের
বিচারক একজন আছেন, তিনি তােমায় চিরসুখী করবেন।
তুমি মনে ক'লে, হয় ত, আমার উদ্ধার হয়।
মায়ূন্। মিথ্যে কথা বলতে পাবে না। বােধ হয়, এ গরীবের
একটী ভালবাসার প্রাণের বিনিময়ে, তােমার উদ্ধার হতে
পারে।
মহাতাব। মায়ূ ! প্রাণের বিনিময় কত্তে হবে না। কারুর
প্রাণ যাবে না, ধৰ্ম্ম তােমায় রাখবেন। যদি বিপন্নাকে
বাঁচাতে, যদি অবলার সতীত্ব রক্ষা ক’ত্তে নিজের বিপদ ডেকে
আন, তবে বিপদ, সম্পদ হয়ে তােমার সেবা করবে। যদি
আল্লার নাম, কোন দিন প্রাণ ভরে ডেকে থাকি, যদি স্বামীর
পায়ে অচলা ভক্তি রেখে থাকি, তবে দেখে মায়ুস! আমার
প্রেমের পাথার
কথা কখন মিথ্যে হবে না। আমার উদ্ধারের বিনিময়ে,
কখনও তোমার প্রিয়জনের প্রাণ হারাতে হবে না।
মায়ুস। (স্বগত) মায়ুস, আর কি চা’, সতীর আশীৰ্বাদ
পাবি, তোর কলুষিত দেহে, এমন সুযােগ আর আবে না।
( প্রকাশ্যে ) বিবি সাহেব, তুমি নিশ্চিন্ত হয়ে থাক।
মায়ুস, আদর পেতে গরীব, ভালবাসার লােকের কাছ
থেকে, আদর নিতে গরীব, কিন্তু সতীর সম্মান রাখতে
গরীব নয়।
মহাতাব। মায়ূ, বেশী কি বলবো, আল্লা তোমায় চিরসুখী
করুন।
মায়ূন্। (স্বগত) এ দিন কি আমার কখন হবে ?
(প্রকাশ্যে ) বিবি সাহেব! এ দুটী উপায়ের মধ্যে তুমি
কোন উপায়ে মুক্ত হতে চাও?
মহাতাব। কি দুটী উপায় মায়ূ ?
মায়ুস্। দেখ, তুমি
মন দিয়ে শােন। সাহেবের এক বিবি
ছিলো, সে বড় গরীবের মেয়ে, সে ঠিক আমারই মতন
দেখতে। তার যৌবনের পদার্পণের পূর্বে, একদিন এক
মােসাফের, সাহেবের বাড়ী এসে, তার জন্মপত্রিকা দেখে
বলে যায়, এই স্ত্রীলােককে যে পত্নী ভাবে গ্রহণ করবে,
তার জীবননাশের সম্ভাবনা। তাই ওমরাও সাহেব, অনিচ্ছা
সত্ত্বেও, পিতার আদেশ মত, স্ত্রীকে বাড়ী থেকে তাড়িয়ে
দেয়। আমার সঙ্গে সাহেবের প্রথম দেখা হয়ে পৰ্যন্ত,
সাহেবের নিভান আগুন জ্বলেছে। অপূরন্ত প্রাণের অনেক
কথা মনে জেগে উঠেছে। তাই, আশ্রিতের মত আমায় না
প্রেমের পাখার।
2,
দেখে, আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব কত্তে চান। আমি সাহেবকে
ভালবাসি। আমার মত চেহারার লোকের দ্বারা ভয়
জেনে, ভয়ে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব কত্তে চাইনে। আমার প্রভুর
সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপনের বিনিময়ে, তুমি মুক্ত হতে পার। মুক্ত
ক’রবার এই আমার প্রথম উপায় বিবি সাহেব !
মহাতাব। দ্বিতীয় উপায় কি মায়ুস্?
মায়ু। দ্বিতীয় উপায় এই, যে যখন তুমি কুৎসিত প্রস্তাব শুনবে,
তখন ভাবার জন্যে একদিনের সময় নেবে। সেই
এক দিনের মধ্যে, আমি তােমায় নিরাপদ স্থানে রেখে
অবো।
( আলিজানের প্রবেশ ও লুকায়িত ভাবে প্রস্থান।)
মহাতাব। যদি ওমরাও সাহেব এক দিনের সময় দিতে সম্মত না
হয় ?
মায়ূন্। নিশ্চয় হবে। তুমি স্থির জেনে রেখাে, আমার সঙ্গে দোস্তি
করবার জন্যেই, সাহেব তােমায় বন্দিনী করে রেখেছেন।
মহাতাব। আমি তােমার দ্বিতীয় প্রস্তাবে সম্মত।
মায়ূন্। আপনার যা মরুজী বিবি সাহেব ! দেখুন, ভবিষ্যতে কি
আছে বলা যায় না, আপনি গুপ্ত দ্বারের চাবি রাখুন। যদি
একদিনের মধ্যে আপনাকে উদ্ধার কত্তে না পারি,
তবে আপনি নিজেই পালাবেন। বিবি সাহেব, গরিবের
সেলাম নিন।
মহাতাব। মায়ুস, খোদা তোমায় চিরসুখী করুন।
প্রেমের পাথার। মায়ুস্। আমার আশ্রয়দাতার মঙ্গলই আমার মঙ্গল। আশীর্বাদ করুন, ওমরাও সাহেবের যেন অমঙ্গল না হয়। [ মায়ুসের প্রস্থান। ( সন্তর্পণে পদবিক্ষেপ করিয়া আলিজানের প্রবেশ) মহাতাব। কে আপনি? আলিজান। যে নরপশু তােমায় বন্দিনী করে রেখেছে, আমি তারিই সহােদর। আমার সঙ্গে এলে, তুমি এই মুহূর্তেই উদ্ধার হতে পার, আর অসহায় স্ত্রীলােকের উপর অত্যাচার- কারীর দণ্ড দিতে পার। মহাতাব। দণ্ড দেবার সাধ আমার মনে নেই, আমি উদ্ধার হতে পাল্লেই, নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করি। আলিজান। কেন কুচরিত্র লোককে প্রশ্রয় দেবে ? আজ তুমি আমার সাহায্য পেয়েছ, তাই মুক্ত হতে পারবে। কিন্তু ঘটনাচক্রে, কে বলতে পারে, সকলেই আমার সাহায্য পাবে। আমার ভাই এর শিক্ষা হওয়া প্রয়ােজন। ভাল কাজ ক’ত্তে কেন তুমি পশ্চাৎপদ হ’চ্চ? মহাতাব। আমায় কি ক’ত্তে বলেন ? আলিজান। আমার সঙ্গে তোমায় আসতে বলি। আমার ভাই এর বিরুদ্ধে, সতীত্ব নাশের অভিযােগ ক’ত্তে বলি। মহাতাব। আপনার প্রস্তাবে আমি সম্মত নই। আলিঙ্গান । বােধ হয়, মায়ুসের ভরসায় এতদূর ব’তে সাহস ক’চ্চ। তুমি স্থির জেনে রেখাে, যদি আমার কথায় এখন সম্মত না হও, তা হলে শুধু তােমার বিপদ নয়, মায়ুসেরও সম্বন্ধ এ জগৎ হতে লােপ হবে।
প্রেমের পাথার।
মহাতাব। তার কি অপরাধ?
আলিজান। কি অপরাধ বিশ্বাসঘাতকতা অপরাধ। গুপ্ত দ্বারের
চাবি দেওয়া অপরাধ। আমায় মিছে দেরী করিয়ো না।
ৰল, তুমি আমার কথায় সম্মত কি না?
মহাতাব। আপনার শরণাগত হওয়া ছাড়া দ্বিতীয় উপায় নেই
আলিজান। তবে আমার সঙ্গে এস। দুনিয়া এমনিই জিনিষ।
সােজা কথায় কেউ কারুর বাধ্য নয়। কায়দায় ফেল,
দুষমন দোস্ত হবে। সরল ব্যবহার কর, দোস্ত, দুষমন হবে।
[ আলিজান ও মহাতাবের প্রস্থান।
(তােরাব ও মায়ূসের প্রবেশ।)
তােরাব। মায়ূ, এখনও অবসর দিচ্চি, বিবেচনা করে উত্তর
দাও।
মায়ু। সাহেব ! আপনার কথায় আর বার বার অসম্মত করাবেন
না। আমায় মাপ করুন, আমি নীচ হয়ে, মহতের সঙ্গে
দোস্তি ক’ত্তে পারবাে না।
তােরাব। খােদা! আমি নির্দোষী, মায়ুস, শেষে আমায় দূষাে না।
মায়ুস। মায়ুস্ কাউকে দোষে না, এ দুনিয়ায় দোষবার যদি তার
কিছু থাকে, তবে নিজের কপাল।
তােরাব। নিজের কপাল নয়, মনের জেদ। দেবে এস, মনের
জেদের জন্যে, তােমার ভালবাসার প্রভুকে কেমন করে
কলঙ্কসাগরে ভাসিয়ে দাও। এ কি মায়ুস, ছি, আমার
ভালবাসার লােকের এই কাজ ।
মায়ুস। (নতজানু হইয়া) দয়াময় প্রভু! বান্দা বিশ্বাসঘাতক,
৬৪ প্রেমের পাথার। তাই আপনার সঙ্গে দোস্তি ক’ত্তে চায় না। কেন আপনি জেনেও জানেন না ? বান্দাকে ভালবাসতে চাইলে, সুখ- কানন মরুভূমিতে পরিণত হয়। তােরাব। আমি এতদিনে বুঝতে পেরেছি, তােকে ভালবাসি ব’লে তাের জন্যে নিজের প্রাণের বিনিময় কত্তে পারি, কিন্তু বিশ্বাসঘাতককে জীবিত রেখে, জগতের প্রাণের বিনিময় কত্তে পারিনে। তাের লীলা খেলা ফুরিয়ে যাবার আজ শেষ দিন। মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত হ’। মাস্। মায়ূ, মৃত্যুকে ভয় করে না। শুধু, মরণের পূর্বে, বান্দা একবার জাতে চায়, পাপের প্রতিফল দিয়ে, ওমরাও সাহেব মায়ুকে ক্ষমা করেছে। তােরাব। মায়ূ, অপরাধ নিনি। জীবনদন্তে তাের পাপের প্রায়শ্চিত্ত হবে। মায়ুস্। ওমরাও সাহেব, অপরাধ নয়। আমি মন খুলে ব’চি, অপরাধ নয়, গােলামের ওপর আপনার অনন্ত মেহেরবানী। তােৰ। ( পিস্তল দ্বারা মায়ুসের ললাট লক্ষ্য করিয়া) এইবার শেষ সময়। আর অবসর পাবিনি, খােদাকে শেষ স্মরণ করে নে। মায়ু। ওমরাও সাহেব, আমার খােদা আমার চখের সামনে রয়েছে, মায়ুসের খােদাকে স্মরণ ক’ত্তে হয় না। দিন রাত সে চ’খের সামনে খােদাকে দেখে। তােরাব। মায়ুস, মায়ু ! (সবলে মামুসের কেশাকর্ষণ এবং পরকেশ উন্মুক্ত হন।).
প্রেমের পাথার।
একি ! একি!! বন্ধু তুই কে? দিজান, দিলুজান, মায়ু,
একটীবার বল, আমি দিলজান।
মায়ু। ওমরাও সাহেব, আপনার প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করুন। দয়া
করে আমায় গুলি করুন। অকিঞ্চিৎকরের আকিঞ্চন,
গরীবের ওপর মেহেরবান হয়ে উপেক্ষা কু’বেন না।
তােরাব। দিজান, এই আমাৱ গুলি করা। ( হস্তচুম্বন)
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
বন।
( জাল হস্তে মওলার অাগমন এবং গাহিতে
গাহিতে জেলে ও জেলেনীর প্রবেশ।
গীত।
তবু মন পাওয়া কি যায়।
আমার হেলে দুলে, ক্ষেপলা ফেলে, গা কোমর টাটায় ?
কাজের সময় কাজি, কাজ ফুরুলে পাজি,
আমায় হামে হাল, নাকাল করে, তাতেও নয় রাজী
আমার হাড়ির হলে, াল কুকুরে, ক’ত্তছে হায় হায়।
আমি চমকে উঠি, ভেবে ভেবে, খেদ্দেরের জ্বালায় ।
শেকল নাড়া দিয়ে জোরে, আমায় ভােরেতে ওঠায়।
এখন মানে মানে, বাচলে ৰচি, ব্যাবসা করা থাক্ মাথায়।
মওলা। আল্লা, আমার কপালে এত লিখেছিলে ?
[ সকলের প্রস্থান।
প্রেমের পাথার
(জ্বলিলের প্রবেশ।)
জলিল। কই বাবা, এত ঝােপ ঝাপ খুঁজে ম’লুম, কই, মেয়ে
মানুষ ত’ পেলুম না। জ্বলিল রে! সবই তাের বরাত।
বাবা, যখন এদ্দর আশা গেছে, তখন জান যায়, সসা ভি
আচ্ছা, তবু মেয়ে মানুষ না নিয়ে ফিরবো না। কোথায়
আর ঘুরে মরুবাে, এই খানেই ওৎ পেতে থাকি। (নেপথ্যে
মলের শব্দ ) ওই যে বাবা, রুনু ঝুনু আওয়াজ হচ্চে। তবে
আলি সাহেবের কথা ত’ ঠি। জ্বলিল রে ! তাের অদৃষ্টে
আজ কেল্লা দখল। ওমরাও সাহেব যেমন ফাঁকি দিয়ে
নিয়ে গেছে, আমিও তেমনি করে নিয়ে যাব। এই দিকেই
বোধ হয় আসছে।
চট, ক'রে এই গাছটার ওপর উঠে
পড়ি। আগে ছুড়িদের ভাব খানা বুঝে নি।
(জ্বলিলের বৃক্ষরােহণ এবং স্ত্রীবেশে দানিশ, পশ্চাতে
বিবি, মহবুব ও কাকুর প্রবেশ।)
জলিল। এ যে বাবা, গাই বাছুরে হ’ল ।
বিবি। ওগো, গায়ের কাপড় খোলােনা, এখানে ত’ আর কেউ
দেখতে হাচে না।
দানিশ। সাবধানের মার নেই বিবি, সাবধানের মার নেই।
যদুিই কেউ আড়ালে আবডালে থাকে।
জ্বলিল। না বাবা, আর দেরি করা হবে না, ধাঁ করে বলে
ফেলি, নইলে, যদিই কেউ এসে বেহাত করে ফেলে।
( বৃক্ষ হইতে অবতরণ )
কাকু। ঐ দেখ বাবা, গাছ থেকে কে নাচে।
প্রেমের পাথার।
৬৭
জ্বলিল।
দানিশ। (সভয়ে) কে নাচে, জিজ্ঞেস্ করুনা। ওগাে, আমি
অবলা স্ত্রীলােক, আমার ওপর অত্যাচার করাে না।
কাকু। (জ্বলিলের প্রতি) কে তুই ?
অলিল। আমি বাবা, একজন লােক। জঙ্গলে এসে, আমার স্ত্রীর
বড় অসুখ করেছে কিনা, তাই সেবা করবার জন্যে মেয়ে
মানুষের সন্ধান ক’চ্চি। ওই ধেড়ে বিবিটী যদি অামার
সঙ্গে যায়, তা হলে আমার স্ত্রীর বড় সেবা করা হয়।
দানিশ। (ঈষৎ ওড়না তুলিয়া) পর পুরুষের সঙ্গে গেলে যে, আমার
ধর্ম যাবে গো !
কাকু। তুই গাছের ওপর উঠিছিলি কেন ?
মনের ত’ আর ঠিক নেই বাবা। তাই পথ ভুলে, হঠাৎ
গাছের ওপর উঠে পড়িছিলুম। (দানিশের নিকট গিয়া )
বিবি সাহেব ! দয়া করে যদি একবার আমার পরিবারের
সেবা কত্তে আস, তা হলে আমায় কিনে রাখ।
দানিশ। (ঘোটা খুলিয়া ) তবে চল বন্ধু ! তােমার পরিবারের
সেবা করিগে যাই।
জ্বলিল। আরে বাবা, এ যে মদ্দা রে ।
(পলায়ন)
দানিশ। বন্ধু, আশা দিয়ে নিরাশ ক'রাে না, আমায় সেবা ক’ত্তে
নিয়ে চল।
বিবি। মিন্সে যেন সং।
[ দানিশের অনুসরণ ও সকলের প্রস্থান।
(শা-আলম ও মােসাফেরের প্রবেশ।)
শা-আলম। কি ধাঁধা, কি ধাধা! অনন্ত সময়-সাগরে আমি
একটী জলবুদ। নিজের কিছুই ক্ষমতা নেই। সময়-
৬৮
প্রেমের পাথার।
সাগরের তরঙ্গে—উঠছি, আবার তরঙ্গে মিলিয়ে যাব।
বুদ্বুদ জলই। তবু যেন জল থেকে একটু আলাদা। আমি
যেন তেনি সব। তবু নিজের আমার যেন একটু আলাদা।
কই, কোটাকে নিয়ে আমি। আমার মনে ক'লে, সমস্ত
দুনিয়া আমার। আর না মনে ক'ল্লে, আমার বলে কিছুই
নেই। কি ধাধা, কি স্বাধা। মা বােঝা এত ধাঁধা চ’খের
সামনে ভাসছে, তবু ত’ মানুষের জ্ঞান হয় না। তবু ত’
মাটীর পুতুল অহঙ্কার ক’ক্তে ছাড়ে না। খােদা, এর চেয়ে
আর মজার কথা দুনিয়ায় নেই। মাটীর পুতুল অহঙ্কার
করে। অজানা দেশে দুদিনের জন্যে এসে, মাটীর পুতুল
আমার আমার করে। মাটীর পুতুল আবার মাটীর গুতুল
ভাঙ্গায় কঁাদে। সব মিছে, সব মিছে, মিছের মধ্যেও
যদি কিছু ভাল থাকে, তবে সংসার-খেলা-ঘরে যে খেলতে
পাঠিয়েছে, তাকে সুখী করা। খােদা, তুমি সুমতি দাও।
আমি খেলা দেখিয়ে যেন তােমায় সুখী কত্তে পারি।
বিপদে সম্পদে যেন তােমায় সমান ভাবে ডাকতে পারি।
এ স্বপ্নময় জীবনে স্বপ্ন দেখায়, রহস্যময়ের রহস্যময়ী কীর্তি
ব’লে যেন বুঝতে পারি। মঙ্গলময়, আর আমি কিছু চাইনে।
চাইবার আর আমার কিছু নেই।
[ শা-আলমের প্রস্থান।
মােসাফের। আর
আর একটু; আর একটু এগিয়ে গেলেই তােরণের
কাছে পৌছুবে। মঙ্গলময়, তােমার কাজ তুমি কর ।
জগৎকে ভাল করে জানিয়ে দাও, শা-আলম পৃথিবীর
মানুষ নয়, শা-আলম স্বর্গের দেবতা।
[ মােসাফেয়ের প্রস্থান।
প্রেমের পাখার।
అని
পঞ্চম গর্ভাঙ্ক।
গীত।
( লতাকুঞ্জ।)
গাহিতে গহিতে সখীগণের প্রবেশ)
সখীগণ।
সইলো সই, কইলাে সেগো বস্ ।
বুৱে নােব কেমন চতুর, জানে কত ছল।
সে যে সই পরাণ নিয়ে বেঁধে দেছে পরের হিমে,
যাদুভরা বাধন দিয়ে, পেতে প্রেমের কল।
আয় লাে অায় যত্ন করে, আনিগে তারে ধরে,
শেষে, বেঁধে জোরে, প্রেমের জােরে, দোব প্রতিফল।
নারীর মন মজান অমনি কি হয়, দু’ফোটা ফেলে চখের জল ।
[ সখীগণের প্রস্থান।
(তােরাব ও দিজানের প্রবেশ)
তােরাব। মায়ূস, এত বিপদে তুই পড়িছিলি?
দিলজান। ওমরাও সাহেব, স্ত্রীলােকের রূপই শত্রু। কোন
রকমে বাঁচবার উপায় থাকলে, আপনার পরিত্যক্তা দিলজান
মায়ুস্ হয়ে আপনার কাছে আসতাে না। অপ্রিয় পেয়ে,
তখন কতই সুখী হয়েছিলুম, কিন্তু এখন বুঝচি, আবার
এখানে না এসে, মায়ূসের মরাই ভাল ছিল।
তােরাব। দিলজান, ও কথা বলিনি, ও কথায় আমার প্রাণে
আঘাত লাগে। ময়ু, সে কথা কি মনে পড়ে?
দিজান। কোন্ কথা সাহেব।
প্রেমের পাথার। তােরাব। সেই জঙ্গলে যা বলেছিলি—“আমার সব সাধ আছে, শুধু ভালবাসার সাধ নেই”। সে কথা আজও আমার প্রাণের ভেতর গাঁথা রয়েছে। অনাদৃতা দিলজান, এক বার বল, আবার তোর ভালবাসার সাধ হয়েছে। দিজান। তখনকার কথা মনে হলে, আমার বড় লজ্জা হয়। ওমরা ও সাহেব, সে সব কথা তুলে, আর আমার লজ্জা দেবেন না। তােৱাব। মায়ু, আমি পাগল। পাগলের কথায় কিছু মনে করিনি। দিহ্মান, আগেকার কথা কি মনে পড়ে ? সে আজ অনেক দিনের কথা। অনেক দিন আগে, এইখানেই আমি তাের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে ছিলুম। চাদের আলো আমার ঘুমন্ত মুখের ওপর এই- খানেই পড়েছিল। আমি জেগে উঠে দেখলুম, তুই একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে রইচি। তাের লজ্জা- ভরা সে মুখ, আজ ও আমার প্রাণে জেগে রয়েছে। মায়ুস, আমার তখনকার মুখ কি তাের মনে পড়ে ? দিলজান। সাহেব, তুমি স্ত্রীলােক হলে এ কথা জিজ্ঞেস ক’ত্তে না। স্ত্রীলােক লজ্জার বাঁধের ভেতর থাকে, তাই মুখ ফুটে সব বলতে পারে না। সাহেব, তুমি ত’ জান, চওড়া নদীর চেয়ে, বাঁধের মুখের নদীর জোর কত বেশী । তােরাব। ঠিক বলিচি মায়ুস, তাের সব কথাই ঠিক। আজও আমি আবার তেমনি করে শুই, তুই তেম্নি করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখ। দিলজান। আগে তেমনি চাঁদের আলো আসুক।
প্রেমের পাথার।
৭১
গীত।
তােরাব। আমার হৃদয়-গগনে যে, দিন রাত্তিরই চাদের আলাে
মায়ু!
দিলজান। আমি কিন্তু এমন একটা কথা মনে করে দিতে
পারি, যাতে সে চাদের আলো নিমেষে মিলিয়ে যাবে।
তােরাব। দিলজান, আমি সে কথা শুবাে না। সে কথা
তােকে মনে কত্তে দেবো না। আয়, আমরা একটু বসি।
[ উভয়ের উপবেশন।
( গাহিতে গাহিতে সখীগণের প্রবেশ )
সখীগণ।
দেখলো সই, মিশলো দুটী প্রাণ।
প্রাণের হাসি, উঠলো ভাসি, প্রকাশে বয়ান ।
ফুটলো চঁাদে চঁাদের হাসি, মিলিয়ে গেল দুখরাশি,
আলােকে ভাসিয়ে ধরা, পুলক করে দান।
হৃদয়-তীরে, থেলচে ধীরে, প্রেমের তুফান।
(রক্ষিগণ সহ গ্রেপ্তারী পরােয়ানা হস্তে বেগে
আলিজানের প্রবেশ )
অলিজান। গ্রেপ্তার করো, চিরবন্দী থাকার উপযুক্ত—এই সেই
সতী-হরণকারী।
দিজান। মেহেরবান, কি ক'লে ? সাপের সুন্দর চেহারা দেখে
কেন ভুলে ? (অচৈতন্য হওন )
তােরাব। আলিজান, তুমি বন্দী করাতে এসেচো ? দুনিয়া,
দুর্ফাক হয়ে যাও। ভাই ভাইকে বন্দী করায়, এ দুনিয়ায়
ভাই ভাইকে বন্দী করায়।
আলিজান। দু' জনকেই গ্রেপ্তার কর।
৭
প্রেমের পাথর।
ষষ্ঠ গাঙ্ক।
(ইস্পাহানের নগতেরণ )
(এক দিক্ দিয়া নাচনাওয়ালী সহ প্রথম নাগরিকের
আগমন ও উপবেশন এবং অন্য দিক্ দিয়া
দ্বিতীয় ও তৃতীয়ের প্রবেশ।)
২য় নাগরিক। হাহে, এ আবার এদের কিরকম নিয়ম হল ?
আগে ত’ এরকম ছিল না। দিনের বেলা, খােদ ঝ। ঝ।
ক’চ্ছে, এমন সময় রাজ্য নিস্তব্ধ, ফটক বন্ধ, ব্যাপার
খানা কি বল দেখি? এখন ঠিক যেন রাত্তির করে ফেল্লে হে!
৩য় নাগ। বােধ হয়, বাদশা মরায়, রাজ্য নিয়ে কিছু গােলমাল
হচ্চে।
১ম নাগ। তুমি ঠাওরাতে পারনি হে, ঠাওরাতে পারনি।
কিছুই গােলমাল হয়নি। এটা হচ্ছে, সব ওমরাওদের
চালাকী।
২য় নাগ। এ আবার কিরকম চালাকী মশয় ?
১ম নাগ। এই ত বাপু ! এটা আর বুঝতে পারে না? ওহে,
বুঝিয়ে দাও, বুঝিয়ে দাও।
৩য় নাগ। আপনিই বুঝিয়ে বলুন না ?
১ম নাগ। আচ্ছা, শোন শােন। চুরি বেশ হয় দিনে, কি
রাত্রে ?
৩য় নাগ। রাত্রে।
প্রেমের পাথর।
১ম নাগ। তাই দরবারের লােকেরা দিনের বেলা সকলকে ঘুমুতে
আর রাত্তির বেলা সকলকে জেগে থাকতে হুকুম দিয়েছে,
তা হলেই রাজ্যে আর চুরি হতে পাবে না। এটা
. কি বাপু, কম সেয়নামী।
৩য় নাগ। সকলে দিনের বেলায় ঘুমােয় জেনে, এখানকার
চোরেরা যদি দিনে চুরি করে, তা হলে ?
১ম নাগ। চোর ত’ আর বাপু, তোমার মতন পণ্ডিত নয় ;
চোরেরা জানে, রাত্তিরেই চুরি ক’ত্তে হয়।
২য় নাগ। ঠিক বলেছেন মশয়, আহা আপনার কি বুদ্ধি ।
১ম নাগ। বাপু, আমাদের মতন বুদ্ধি কি আর একেবারেই
হবে ? আগে মন-মাটীকে বেশ করে খেড়ো, তারপর
ভাল ভাল কেতাবের বীজ পোঁত, তবে না আমাদের
মতন আক্কেল পাবে। বাপু, এই বুদ্ধিটুকুর জন্যে, কত
সাধীর গােলেস্তান বােলেস্তান চিবিয়ে খেতে হয়েছে।
২য় নাগ। আপনার কি কাজ কর্ম করা হয় ?
১ম নাগ। কিছুই নয়। গাইয়ে বাজিয়ে মানুষ, মনের আনন্দে
ঘুরে বেড়াই। কেবল সঙ্গীত নিয়েই থাকি। মান্যের
স্বরূপ যদি কেউ কিছু দেয়, দয়া করে নিই।
২য় নাগ। আপনার তােড়জোড় দেখে, আমিও ঠিক ঠাওরে-
ছিলুম।
১ম নাগ। তা ত’ বাপু, ঠাওরাতে পারবেই। মনের মতন গলাটী
করবার জন্যে, কত কোকিল পুড়িয়ে খেতে হয়েছে। শুধু
গলা মিষ্টি হলেই গাইয়ে হয় না, রাগে অধিকার থাকা চাই
আমার অধিকারের কথাটী একবার শােন। একদিন
৭
৭৪
প্রেমের পাথার।
আমার এক নবাব বন্ধুর বাড়ী গেছি, আমায় না দেখেই,
গাইবার জন্য ঢের সাধ্য সাধনা, শেষে দয়া করে তার
অনুরােধ এড়াতে না পেরে, এক দীপক রাগ ধরলুম।
বল্লে না বিশ্বাস যাবে, গাইতে গাইতে আমি ত’ গরম হয়ে
গেলুম। আর নবাব দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগলো।
শেষে যখন দেখলুম, বেচারী পুড়ে মরে, তখন ধ’লুম এক
মেঘমল্লার। মল্লার না শুনে, নবাব জলে ভিজে, শীতে কেঁপে
সারা। বাপু, আমাদের মতন রাগে কি আর মানুষের
অধিকার হয় ?
৩য় নাগ। আপনার গান শেখা হয়েছিল কোথায় ?
১ম নাগ। সে বাপু, অনেক কথার কথা। আমি ব’ই বা কত,
তুমি শুবেই বা কত। আমার গানের কথা খুলে লিখুলে,
গাড়ি গাড়ি কেতাব হয়ে যায়।
( দানিশ, বিবি, কাকু ও মহবুবের প্রবেশ।)
দানিশ। ইয়ে আল্লা!
১ম নাগ। ইয়ে আল্লা! ঐ দেখ, “ই” এর কাছে বেসুর
হয়েছে।
দানিশ। কি বাবা, পীরের কাছে মাদো বাজী হচ্চে? ওস্তাদ,
আমার সঙ্গে ফাইগিরি করো না। ভাব বাতলে যদি
একটা তেহাই মারি, তা হলে সুর ত’ সুর, তােমার মুণ্ড,
পর্যন্ত ঘুরে যায়।
১ম নাগ। আমার সঙ্গে তার ? আমার ছুকরীর গানের
তুমি তাল দিতে পাবে না।
প্রেমের পাথার।
৭৫
নাচুনাওয়ালী। ( উঠিয়া তাল ঠুকিতে ঠুকিতে) আও, লাগে
লড়াই।
দানিশ। আরে, কর কি ! কর কি !!
নাচুওয়ালী। ওস্তাদ, আমার সাথে লড়াই দিতে পাল্লে না,
হ’টিয়ে গেল?
দানিশ। হ’টে গেল কি? জয় বাবা খোদা, তুমি মুখ তুলে চেও।
বিবি, গান লাগাও।
বিবি। হ্যাগা! তুমি হলে কি ?
দানিশ। আমি কুছ, কথা নেই শােনেগা।
(নাচনাওয়ালীর গীত, দানিশের অঙ্গভঙ্গী সহকারে নৃত্য
এবং নাগরিকগণের “আরে বাহােবা বিবি,
বাহােবা” ইত্যাদি বাক্য প্রয়ােগ।)
নাচুনাওয়ালী।
গীত।
যাওহে বিদেশী বঁধু, কাজ কি তােমার প্রেম করে।
তুমি এই অছ, এই যাবে চ'লে, ম’রবে অ’লে অন্তরে।
তোমার সঙ্গে প্রেম করা,
যেন ছেড়া জালে মাছ ধরা,
মান খুইয়ে জ্যান্তে মরা, ধার করা পরের তরে।
( সশব্দে তােরণদ্বার উদঘাটিত হওন এবং
চতুর্থ ও পঞ্চম নাগরিকের প্রবেশ।)
৪র্থ নাগ। খুন ক'রাে না, খুন করে না।
৫ম নাগ। (৪র্থকে ধরিয়া) খবরদার! পালাবার চেষ্টা করাে না।
প্রেমের পাথার।
৪র্থ নাগ। আমি ছাড়া, আমার বুড়ো বাপ মার আর কেউ
নেই। আমায় দয়া করে বাঁচাও, দয়া করে আমায় খুন
করাে না।
(ষষ্ঠ নাগরিকের প্রবেশ।)
৬ষ্ঠ নাগ। কঁহা খুন ? কিধার খুন ? কি হয়েছে?
৪র্থ নাগ। আমায় প্রাণে মাত্তে চায়, আমার গর্দান নিতে
চায়।
৬ষ্ঠ নাগ। বদমাইস ! ছােরা নাবা, হাত ছেড়ে দে।
৫ম নাগ। এগিয়ে এসো না। ওইখানেই দাড়াও। আমার
কাজে যে বাধা দেবে, সেই রাজবিদ্রোহী বলে গণ্য হবে।
দরবারের পরােয়ানা দেখ।
(পরােয়ানা প্রদান।)
৬ষ্ঠ নাগ। দেখি ? (পরােয়ানা গ্রহণ করিয়া পাঠ) একজন ইচ্ছা
পূৰ্ব্বক গর্দান দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করেছে। নিজের
গর্দান না দিয়ে, যদি কেউ তাকে উদ্ধার ক’ত্তে চেষ্টা করে,
তবে সে রাজবিদ্রোহী বলে গণ্য হবে। আপনার পরােয়ানা
ফিরিয়ে নিন।
(পরোয়ানা প্রত্যর্পণ )
২য় নাগ। তবে তুমি আপত্তি ক’ কেন ?
১ম নাগ। টাকা নিতে গিছলে কেন বাপু? মানুষে যেমন
কাজ করে, তেমনি ফল পায়, বুঝলে?
৪র্থ নাগ। আমি মন্দ কাজের জন্যে টাকা নিইনি। বুড়াে বাপ
মা, না খেতে পেয়ে মরে দেখে, হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে,
টাকা নিয়েছিলুম।
২য় নাগ। ওহে, নিজের কাজে চল। এখানে থাকাও খারাপ,
বুঝলে?
৫ম নাগ। শীগগির এস।
৪র্থ নাগ। এই বারেই আমায় খুন করবে। আর একটু এগিয়ে
গেলেই, আমায় খুন করবে। কে দয়ালু আছ, গরিবকে
বাঁচাও। খােদা, আমায় বাঁচাবার কি কেউ নেই ?
২য় নাগ। চলে এস হে, চলে এস।
৪র্থ নাগ। খােদ, আমায় বাঁচাবার কি কেউ নেই? খোদা,
আমায় বঁচাবার কি কেউ নেই ?
( বেগে শা-আলমের প্রবেশ।)
শা-আলম। সাহায্য প্রার্থী বিপন্ন বন্ধু! সাহায্য প্রার্থী বিপন্ন বন্ধু ।
এই যে তােমার দাস।
৫ম নাগ। কে তুমি?
শা-আলম। আমি ব্যথিতের দাস। মঙ্গলময় আল্লার মঙ্গলময়ী
ইচ্ছায়, আমি টের কেঁদেছি। কঁদার দুঃখু টের পেয়েছি।
তাই, যে কঁদে, আমি তার দাস।
মে নাগ। জান, একে বাঁচানর বিনিময়ে তােমায় কি ক’ত্তে
হবে ?
শা-আলম। না।
৫ম নাগ। নিজের গর্দান দিতে হবে। নিজের গলার রক্ত, একটু
একটু করে, বার করে দিতে হবে।
শা-আলম। আমি আহলাদের সহিত তাতেও সম্মত। যাকে
বাঁচাব বলেছি, যাকে অভয় দিইচি, তার জন্যে জীবন দেওয়া
বেশী মনে করিনে। দয়া করে, এর বদলে আমার গর্দান
নাও। দয়া করে বিপন্নকে মুক্ত করে দাও। যে মরুতে
চায় না, দয়া করে তাকে মৃত্যুর হাত থেকে অব্যাহতি
দাও।
৪র্থ নাগ। আদর্শ দাতা! কে তুমি?
৫ম নাগ। পাগলের মতন কি ব'চো। একে বাঁচানর বদলে
তুমি কি পাবে? কি পাবার বিনিময়ে, তুমি নিজের গর্দান
দেবে ?
শা-আলম। কি পাব? এর চেয়ে আর মানুষে পেতে পারে না।
মঙ্গলময় খোদা আমায় সুখী ক’ত্তে পাল্লে না। আমি
মানুষ হয়ে এক জনকে সুখী ক’ত্তে পিরবাে।
৫ম নগ। এখনও বুঝে দেখ।
শা-আলম। যে দিন দুনিয়ায়, আমার ব’লবার কেউ না থাকায়,
দুনিয়া আমার হয়েছে, সেই দিনই ঢের বুঝিচি। বােঝবার
সাধ আর আমার নেই।
৫ম নাগ। তবে গলা বাড়িয়ে দাও।
শা আলম। আমি প্রস্তুত।
( সহসা আফগানশা ও বিশিষ্ট ওমরাহগণের প্রবেশ
ও অসিদ্বারা
অভিবাদন।)
আফগানশা। পরদুঃখকাতর, উচ্চমনা, নবীন ধৰ্ম্মরক্ষককে
খােদ। দীর্ঘজীবী করুন।
( অপর দিক্ দিয়া মােসাফেরের প্রবেশ।)
মোসাফের। আদর্শ দাতা, দানবীর নরপতি, সুলতান শা-আলমকে
খোদা চিরসুখী করুন।
আফগানশা। কে শা-আলম? (শা-আলমকে চিনিয়া) সুলতান!
সুলতান!
[ মােসাফেরের প্রস্থান।
(নেপথ্যে পুষ্পবৃষ্টি।)
শা-আলম। একি! একি ! (ওমরাহদের প্রতি) কে তোমরা?
আমার পায়ে ফুল পড়ছে কেন ?
আফগানশা। এ আপনার উচ্চ হৃদয়ের উপযুক্ত সম্মান। খােদার
মরুজীতে, আজ আপনি রাজ্যেশ্বর ।
শা-আলম। আমি রাজ্যেশ্বর ?
আফগানশা। আপনি রাজ্যেশ্বর। পারস্যসম্রাটের উত্তরাধিকারী
না থাকায়, বিশিষ্ট ওমরাহবর্গের পরামর্শে, এই স্থির হয়েছে,
যে অপর রাজ্যের কোন যথার্থ হৃদয়বাকে সম্রাট রূপে
বরণ করা হবে। তাই, তােরণদ্বার আবদ্ধ রেখে, হৃদয়বান্
পরীক্ষা করবার জন্যে, এই অভিনয়ের সৃষ্টি। খােদার
মরুজীতে, আপনিই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। তারই
ইচ্ছায়, আজ আপনি রাজ্যেশ্বর।
শা-আলম। সে ইচ্ছ। আর একবার খােদার হয়েছিল। তারই
ইচ্ছায় রাজ্যেশ্বরের পদ আর একবার নিয়েছিলুম। কিন্তু
যে আমি, সে পদ নিয়েছিল, সে আমি আর আমাতে
নেই। আমি নিজের ইচ্ছেয়, তােমাদের দেওয়া পদে
সেলাম ক’চ্চি। রাজ্যেশ্বর হবার সাধ আর আমার নেই।
আফগানশা। আপনাকে এই পদ নিতেই হবে। কোরাণ
সাম্নে রেখে, পরীক্ষোত্তীর্ণকে সম্রাট করবাে, শপথ ক’রিচি;
আমাদের প্রতিজ্ঞা কখনও অপূর্ণ থাকবে না।
৮০
প্রেমের পাথার
শা-আলম। রাজ্যেশ্বরের পদ আমি নােব না।
অফিগান শা। আমরা জোর করে দেব।
শা-আলম। যা! আবার আমি রাজ্যেশ্বর। আজ আবার আমি
সুলতান। আর, আমার সে? আজ সে কোথায় ? আমার
সুখ দুঃখের সমান ভাগ গ্রহণকারিণী আনন্দরূপিণী সে
কোথায় ? খােদা, এক হ'য়ে সকলে অকুলে ঝাঁপ দিয়েছিলুম।
সকলে ভেসে গেল। দুনিয়ার মালীক, আমায় আলাদা
তুলো না। দুনিয়ার মলীক, আমায় আলাদা তুলো না।
( অবসন্ন ভাবে উপবেশন )
আফগানশা। সুলতানকে ধর, সুলতানকে ধর।
(সহসা পুষ্পমাল হস্তে বন্দনাকারিণীগণের প্রবেশ ।)
গীত।
বন্দনাকারিণীগণ। ধর হে ধরণীধর, হৃদি উপহার।
সবাকার তুমি সার, সকলে তােমার।
ভাব-নয়নে নেহার কবি, নব প্রভাতের মােহন ছবি,
উজল বিভায় আলোকিত করে, হৃদয়ে করুণা-ধার।
ওহে ধরণীনন্দন পারিজাত হার, ওহে কবিতা-সবিতা হৃদয়ে সবার,
ছুটুক করুণাকণা প্রেম বিধাতার
হৃদয়ে তােমার,
ওহে হৃদয়েরি সার,
বিষাদ-আঁধার, হক প্রেম-পারাবার,
তুমি থাক সুখে, রাখ সুখে, মিনতি সবার।
দানিশ। আহা, কেন গলা বাড়য়ে দিলুম না রে! সকলই বরাৎ
বাবা, সকলই বরাৎ!
(পটক্ষেপণ)
তৃতীয় অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
( রংমহল)
আলিজান, জ্বলিল, নর্তকীগণ।
গীত।
নর্তকীগণ।
তুমি, না মজে মজালে কেন চাদিনী নিশায়।
নিশা বিষাদে কি যায় ?
মেহার সরসী’পরে, জোছনা বিছানা ক'রে,
চাদে ধ'রে কুমুদিনী কত কথা কয়।
কাতরে শুধু গাে শশী, মুখ পানে চায়।
ওই. আড়ালে পাপিয়া হাঁকে, মলয় হাওয়ায়।
জলিল। আলি সাহেব, আমি দেশের লােক নেই মাংতা।
নিজের প্রাণে ফুরতি থাকলেই, দেশের লােকের ফুতি,
০
ব্যাস !
আলিজান। আর কি নিবি বল?' আমােদর জন্যে, অনেক দিন
উমেদারী ক’রিচি। আশ মিটিয়ে আজ, আমােদ করে
নে। আর এক পেয়ালা সিরাজী সাপ।
৮২
প্রেমের পাথার।
জলিল। দাও বাবা! আনার বিবি, এইবার তুই আমার সঙ্গে
দোস্তি কর। দেখ, ভাই, তাের ওপরে, আমার বড় মন
পড়েছে।
১ম নর্তকী। মিয়া সাহেব, তােমার ওপরেও আমার বড় মন
পড়েছে।
জ্বলিল। মাইরি! আনার, তবে দুটো এলাচ খেয়ে যাও।
( দ্বাররক্ষকের প্রবেশ )
দ্বাররক্ষক। বন্দেগী হাজরৎ, দু’জন ফকির আপনার সঙ্গে দেখা
ক’ত্তে চায়।
আলিজান। ফকির! এখুনি নিয়ে এস। সবকোই তফাৎ হেযাও।
সবকোই তফাৎ হাে যাও।
[ দ্বাররক্ষক ও নর্তকীগণের প্রস্থান।
জলিল। আনার, ( ইচ্ছা পূৰ্বক হাঁচিয়া) হঁাচ্ছে।
আলিজান। নিকালো শুয়ার।
[ জ্বলিলের প্রস্থান।
(ফকির বেশে হােসেনআলি ও গফুরের প্রবেশ )
আলিজান। কাজের কি ক'লে ?
হােসেন। এইবার আপনার মত হলেই হয়।
আলিজান। মত নয়, মত নয়,
এখুনি শেষ করে ফেল। নইলে
সমস্ত বিফল হবে। কারাগার বন্দীশূন্য হবার আদেশ
হয়েছে। নতুন সুলতানের সম্মানের জন্যে, সকলে মুক্ত
হবে। 'তােরাব মুক্ত হবে, আলিজানের দুষমন মুক্ত হবে।
আমায় টাকা ফিরিয়ে দাও। তােমার দ্বারা আমার কোন
উপকার হবে না ।
।
'প্রেমের পাথার।
•
হােসেন। ওমরাও সাহেব, এবারের কথায় নড় চড় হবে না।
বিশ্বাস না হয়, সঙ্গের লােক দেখুন।
আলিজান। কে তােমার লােক? তুমি, কে তুমি?
গফুর। আপনার নফর।
আলিজান। পাবে ?
গফুর। না পারি, জান দেবে।
আলিজান। কি চাও?
গফুর। হাজার থান মােহর।
আলিজান। কাজ শেষ হলে পাবে। এখুনি রক্ত এনে দেখাও।
আজ যে তােরাবকে খুন কত্তে পাবে, কাল
আলিজানের দোস্ত।
গফুর। কয়েদখানার পাশ?
হােসেন। এর সাহায্যে, তুমি অনায়াসে যেতে আসতে পারবে।
গফুর। (লইয়া) হােসেন সাহেব, একজনে এ কাজ হয় না,
দু’জনের অনুমতি চাই।
আলিজান। দিয়ে দাও। যা চায়, এখুনি দিয়ে দাও। এক
প্রহরের মধ্যে যদি এ কাজ ক’ত্তে পার, আলিজান তােমার
গােলাম হয়ে থাকবে।
হােসেন। আর একজনের পরােয়ানা না ও। (পরােয়ানা প্রদান )
মনে রেখো আজকার সঙ্কেত কাফিয়া। কাফিয়া বলে
পরিচয় দিলে, তােমরা দুইজনেই প্রবেশ ক’ত্তে পাবে।
গফুর। ওমরাও সাহেব, সেলাম নিন। (স্বগত) খােদ, অনেক
দিনের মনের আশা মিটিয়ে দিলে ।
[ গফুরের প্রস্থান।
৮৪
প্রেমের পাথার
নেই।
আলিজান। এ কে ?
হোসেন। লুরিস্থানের একজন ঘাতক। সেখানে অন্ন হয়নি,
তাই আমার আশ্রয়ে এসেছে। এরই নজরবন্দিতে, এখন
মহাতাব বিবি।
আলিজান। আর মহাতাব বিবি, মহাতাব বিবি নয়। আর
তাকে সম্মানের প্রয়োজন তাকে বেইজ্জৎ কর।
বিচারে সাহায্য কবার জন্যেই, তাকে বেগমের আদরে
রেখেছিলুম। গর্বিত ভিক্ষুকরমণী সে সম্মান বুঝতে
পারেনি। এইবার কাজের উপযুক্ত শাস্তি দাও। তােরাবের
মৃত্যুসংবাদ পেলে, ঘৃণিতাকে জীবন্তে কবর দেবে।
হােসেন। ওমরাও সাহেবের সকল হুকুমই তামিল হবে।
আলিজান। আমার সঙ্গে এস।
[ আলিজান ও হােসেনআলির প্রস্থান।
( এবং জ্বলিল ও ১ম নর্তকীর প্রবেশ )
অলিল। আরে শােননা, শোননা, চট কেন বিবি, চট কেন ?
দেখ, এ ঘরে কেউ নেই।
১ম নর্তকী। নেই ত’ কি হয়েছে? কি ব’বি ব’ল, না ?
জলিল। এই ব’লছিলুম, তাের কোকিলের ডাক কেমন লাগে ?
১ম নৰ্তকী। যা, যা, চালাকী ক’ত্তে হবে না।
জলিল। গুণ, গুণ, গুণ, গুণ, গুণ, গুণ, গুণ।
১ম নর্তকী। ও আবার কি হচ্ছে ?
জ্বলিল। কমলিনি, আমি তােমার ভ্রমর হইচি।
১ম নর্তকী। দূর গুবরে পােকা !
[ জ্বলিলের গালে চপেটাঘাত করিয়া ১ম নর্তকীর প্রস্থান
প্রেমের পাথর।
৮৫
জলিল। যা, গালে চড় মার্ক্সে। এ মুল্লুকে আর থাকব না
বাবা। আলিজান, শুয়ার বলে, আমার গালে চড় মাল্লে ।
যদি কখন মানুষ ভােলনি শিখতে পারি, তবেই আবার
ইস্পাহানে ফিরবে।
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
(পথ।)
( দানিশমন্দের প্রবেশ)
দানিশ। না বাবা, দিন ত’ আর চলে না। এই আবাব পত্তর
যা কিছু ছিল, তা বেচে কিনে ত’ এই কটা দিন কাটলো !
এখন রােজকার না ক'লে আর চলবে না। আরে, মনে
বুঝি ত’ চলবে না। এখন রােজকার করি কি করে !
আমার হয়ে রােজকার করে দাও, যদি না নি’, দু’শাে কথা
শুনিও। তা ত’ নয়। কেবল রােজকার কর। আরে
বাপু! এটা ত’ বুঝতে হয়, আমি রােজকার করি কি
করে? হ্যা, এমন যদি দেখতুম, যে ছােট ছােট বােবা
মেয়েরা, এক-গা গয়না পরে, নিরিবিলি রাস্তায়, এলা
বেড়িয়ে বেড়াচ্ছে, তখন রােজকার না করি, দু কথা বলতে
পার। কিন্তু বাবা, তা হবার যাে নেই। যেখানে গয়না গাঁটি,
সেই খানেই সঙ্গিন্ খাড়া করে পাহারা ! ভাল আপদই
হয়েছে। হে বাবা খোদা! আমি আড়ালে'ড়াই, একটা
৮
• ৬
প্রেমের পাথার।
গয়না-পরা হাবা মেয়ে মানুষ জুটিয়ে দে। একটা গয়না গান
হাবা মেয়ে মানুষ জুটিয়ে দে।
[ দানিশমন্দের প্রস্থান।
( গফুরের সহ মহাতাবের প্রবেশ)
গফুর।
আজকের মতন কথা রাখ, আজকের মতন কথা রাখ।
ছেলের সঙ্গে আয় ! মা, ভয় পানি, ছেলের সঙ্গে আয়।
মহাতাব। বাবা, আমায় কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?
গফুর। তাের গচ্ছিত টাকার সুদ দিতে। মা, ঢের ধার দিইচিস্।
অনেক দিনের পাওনা সুদ, আমায় একটু শােধ ক’ত্তে দে।
মহাতাব। কি ব'চো বাবা ?
গফুর। কিছু বলিনি, কিছু বলিনি। তােমার ঋণ শোধ ক’বার
আমায় একটু শােধ ক’ত্তে দাও। চিরকাল গরিবকে
দিয়েচ, গরিবের কাছে থেকে কখন নাওনি, আজ নে মা,
ছেলে বলে ছেলের দেওয়া আজ নে।
মহাতাব। বাবা, কি দেবে দাও। তুমি আমায় মা বলে ডেকেচ,
অনেক দিন ছেলের আদর পাইনি, এ আদর আমি জীবনে
ভুলতে পারবাে না।
গফুর। ছেলের মতন ছেলেয় মা বলতে পারেনি। নীচবংশে
যার জন্ম, সে তােমায় মা বলেচে। খুন করা যার জীবিকা,
সে তােমায় মা বলেচে। মা ! ভাল কাজ কখন করিনি,
একদিন ভাল কাজ ক’ত্তে দে। জীবনে টের খুন ক’রিচি।
ঢের খুন ক’রিচি বলে, বিপদের দিনে কেউ দয়া করেনি।
একদিন, এক দেবতায় করেছে। সে দেবতা আর
কেউ নয়, সে গরীবের বাপ। সে আমার বাপ। যার চ’খ,
শুধু,
প্রেমের পাথর।
৮৭
দিয়ে জল পড়ে, সে তার বাপ। সে লুরিস্থানের দেবতা।
'সে লুরিস্থানের ভূতপূৰ্ব্ব নবাব, সুলতান শা-আলম। আয়
মা ! তাের অনেক দিনের ঋণ শোধ করবি আয়।
মহাতাব। কি ঋণ বাবা?
গফুর। একদিন চখের জল ফেলে বলেছিল, তােকে বাঁচিয়ে
দু’জন বিপদে পড়েছে। তােকে বাঁচিয়ে দু’জন ইস্পাহানের
কারাগারে আছে। এই পরােয়ানা নে। তাদের খােলদা
করে দে মা ! ছেলের একটু খানি ঋণ শােধ কর ।
মহাতাব। বাবা! যে দেওয়া দিলে, জীবনে কখন ভুলতে পাবে
না। যদি কখন দিন পাই--
গফুর। যদি কখন দিন পা’, খুনী বলে ঘেন্না করি নি। আমায়
বাপে ঘেন্না করেনি। মা ! মা হয়ে, তুই ঘেন্না করিনি।
মহাতাব। বাবা, বাবা,-
গফুর। চল্ মা, ইস্পাহানের কারাগারে চল্। তাের উপকারীকে
উদ্ধার করবি চ। জগৎকে ঋণে বেঁধেচিস্, আজ ছেলের
দেওয়া সুদে, নিজের ঋণ মুক্ত ক’বি চল।
[ মহাতাবকে লইয়া গফুরের প্রস্থান।
( দানিশের প্রবেশ।)
দানিশ। যা ! এ কি জুটয়ে দিলে বাবা। আমি কোথায় চাইলুম
ঘাস, তুমি হাজির কলে বাঁশ। কোথায় একটা হাবা মেয়ের
আশায় বসে আছি, জুটলাে কি না, মেয়েমানুষ সঙ্গে করা
এক তেরেঙ্গা জোয়ান। না বাবা, আমার দ্বারা আর
রােজকার করা হ’ল না। খােদা! এ জন্ম ত’ অমনি
কেটে গেল। আর যদি কখন জন্মাতে হয়, আমায় পুরুষ
৮৮ প্রমের পাথার- মানুষ করো না, মেয়ে মানুষ করে দিও। নিজে দিব্যি থাকা যাবে। কাজের ঘানিকাঠে, দিনরাত মিন্সেকুে জুড়ে রাখবো। রােজকার করে ময়ূবে সে, আর সুখটুকু করবাে আমি। ( জ্বলিলের প্রবেশ।) জলিল। কে ও ? দানিশ। আ মােলো, এ যে সেই বেটা রে! আবার বুঝি মেয়ে মানুষের চেষ্টায় ফিচে। জ্বলিল। কথা ক’চিনি যে ? যেটা ঘাপটি মেরে দাড়িয়ে রয়েছে দেখেছো ! তুই বেটা চোর, তৈম্ চোট্টা হ্যায়। দানিশ। যার চুরি যার বাবা, তার কাছে সকলেই চোট্টা হ্যায়। তাের বড় চুরি গেছে, তাের বড় চুরি গেছে। জ্বলিল। আমার চুরি গেছে কি রে ব্যাটা? সাত সঙ্গিন খাড়া করে, আমার কাছে পাহারা দেয়, অামার চুরি গেছে ? ব্যাটা, জোচ্চোর কঁহাকা! দানিশ। তাের মন চুরি গেছে। মেয়ে মানুষের নজরায়, তাের প্রাণ ঝামা হ'য়ে গেছে। জ্বলিল। য়া, এইবার যে একটু দমিয়ে দিলে বাবা! দানিশ। (স্বগত) যদি কিছু হয় ত’ এর কাছেই হবে। (প্রকাশ্যে) তুই অনেক চেষ্টা ক’রিচি। জঙ্গলে গিয়েও, সুবিধে ক’ত্তে পারিনি। মেয়ে মানুষ মনে করে, ব্যাটা ছেলে ধরেছিলি। হয়রান্ হইচি। ভালবেসে হয়রান্ হইচি। জলিল। সত্যি বাবা, যা ব’লেচ, সব সত্যি। সত্যিই বাবা, আমার =
প্রেমের পাথার।
মন চুরি হয়ে গেছে। ফকির সাহেব! তুমি বাবা, একটা
* উপায় কর। মানুষ ভােলানর একটা মন্তর শিখিয়ে
দাও। আমি তােমার গােলাম হয়ে থাকবে বাবা,
আমি তােমার গােলাম হয়ে থাকবাে।
দানিশ। পাঁচশাে টাকার পূজো দিবি বল?
জলিল।
দোব বাবা, কিন্তু পরখ করে নিয়ে দোব।
দানিশ। কোন ভয় নেই, সব ঠিক হয়ে যাবে। যেখানে যেতে
ব’লবাে, টাকা নিয়ে কাল যা। বেটা, মেরা সাথ,
অও।
জ্বলিল। চল বাবা, ফকির সাহেব! তুমিই আমার আশা ভরসা।
( উভয়ের প্রস্থান।
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
( কয়েদখানার দ্বারদেশ।)
বন্দুক হস্তে পাহারায় নিযুক্ত প্রথম দ্বাররক্ষক এবং
মহাতাবকে লইয়া গফুরের প্রবেশ
ও অন্তরালে অবস্থান।
গফুর। মা, দেখতে পেয়েছ? ওই ইস্পাহানের কারাগার। এই
কারাগারে তােমার উপকারী বন্দী হয়ে আছে। যাও মা,
ভয় পেয়ােনা, একটুও ভয় পেয়োনা। এই পরোয়ানা
প্রেমের পাথার
দেখিয়ে, তােমার উপকারীকে উদ্ধার করে আন। যদি
কেউ জিজ্ঞেস করে, কে ? উত্তর দিও কাফিয়া।
মহাতাব। যদি আমায় চিনে ফেলে?
গফুর। মনের জোর কর, কখন চিন্তে পাবে না। আমার যাবার
উপায় থাকলে যেতুম, কিন্তু দু’জনে গেলে চলবে না। যদি
দুষমন আসে, বাধা দেবার কেউ থাকবে না। যাও, খুব
সাবধানে যাও।
মহাতাব। বাবা, একলা যেতে যে পা ওঠে না।
গফুর। মা, খুন কত্তে আমার সাহস হয়, আর উপকারীকে উদ্ধার
ক’ত্তে তোর পা ওঠে না ? যা মা, একলা বলে ভয় পানি।
ভাল কাজ ক’তে যাচ্চি, দুনিয়ার মালীক খােদা তাের
সঙ্গে থাকবে।
মহাতাব। তবে চলুম বাবা। (কারাগারের নিকট গমন।)
গফুর। খােদ, তুমি দেখো। দুনিয়ার মালীক, তুমি দেখো। মা
আমার, এ গেল। একলা যে কখন যায়নি, সে আজ
একৃা গেল।
দ্বাররক্ষক। কে তুমি? (মহাতাবের পরােয়ানা প্রদর্শন।)
গুপ্তপরিদর্শক ! স্ত্রীলােক গুপ্তপরিদর্শক ! কে তুমি ?
মহাতাব। কাফিয়া।
দ্বাররক্ষক। ভেতরে যাও।
( কয়েদখানায় মহাতাবের প্রবেশ।)
গফুর। খােদা, বড় মান বাঁচালে। পাপীকে সকলে ঘৃণা করে,
কেবল ঘৃণা করে না খােদা। দুষমনকে কেউ আদর করে
, কেবল আদর করে দুনিয়ার মালীক খােদা।
প্রেমের পাথার
৯১
( দ্বিতীয় দ্বাররক্ষকের প্রবেশ)।
দ্বি রক্ষক। দরজায় কে ?
প্রঃ রক্ষক। দোস্ত।
দ্বি রক্ষক। দু ঘণ্টার ঘড়ি বেজেছে। খােদর নাম নিয়ে নিশ্চিন্ত
হও।
প্রঃ রক্ষক। আল্লা তোমায় সুখে পাহারা দিতে দিন।
[ প্রথম দ্বাররক্ষকের প্রস্থান ।
গফুর। কি ক'লম, নিজের ইচ্ছায় কি ক’ল্লম? কয়েদখানায়
ঢুকেছে, আর যদি বেরুতে না দেয় ! খােদ, তুমি মুখ তুলে
চাও। আমায় কূলের কাছে এনে ডুবিয়ো না। আমি
তনেক আশায় বুক বেধেচি। আমার অমেক দিনের সাধ,
ছায়াবাজীর মতন মিলিয়ে দিও না।
দ্বি রক্ষক। দরজার কাছে কে ?
তােরাব। কাফিয়া।
দ্বি রক্ষক।
পরােয়ানা দেখি ? (তোরাবের পরােয়ানা প্রদর্শন।)
বেরিয়ে যাও। এ কি! শেকল পরা কাফিয়া ! অসম্ভব !
অসম্ভব ! (বহির্গমনেচ্ছুক মহাতাবকে ধরিয়া) তুমি কে?
মহাতাব। কাফিয়া।
দ্বিঃ রক্ষক। কাফিয়া ! তিন জন কাফিয়া হতে পারে না।
কারাগারই তাের উপযুক্ত স্থান।
গফুর। (অগ্রসর হইয়া) পারস্যসম্রাটের মজীতে, কাফিয়া কখন
বন্দী হয় না।
দিঃ রক্ষক। (তুৰ্য্যধ্বনি করিয়া) কে তুমি?
১২
প্রেমের পাথার।
মহাতাব। পালাও, পালাও, কাফিয়া দাড়িয়ে থাকে না। কাফিয়া
দাড়িয়ে থাকে না।
মায়ুস। চলে এস, চলে এস, এখুনি চলে এস। ওই আছে,
ওই আচে, এখুনি চলে এস।
[ তােরাবকে লইয়া মায়ূসের প্রস্থান।
গফুর। ( ফটক ধরিয়া) বাদশার নাম নিয়ে আবার বলচি ।
কাফিয়াকে এখুনি মুক্ত করে দাও। যদি জান্ বাঁচাতে চাও,
কাফিয়াকে বন্দী করে রেখাে না।
ছিঃ রক্ষক। কে তুমি ?
গফুর। কাফিয়ার দোস্ত, এই আমার পরিচয়।
মহাতাব। গফুর, পালাও, পালাও, এখনি পালাও।
(সহসা ছােরা হস্তে গুপ্ত কারারক্ষকবর্গের প্রবেশ
ও গফুরকে বন্দী করণ।)
গফুর। (স্বগত) আল্লা, কি ক'লে ? ভাল কাজ কত্তে এসে,
আমি বন্দী হ’লুম! দুনিয়ায় ভাল কাজ ক’ত্তে বন্দী হয়, খুব
সাক্ষী রাখলে, দুনিয়ায় ভাল কাজ ক’ত্তে বন্দী হয়।
দ্বি রক্ষক। শয়তান ! এই তাের উপযুক্ত শাস্তি।
গফুর। মা, পাল্লম না, পাল্ল ম না। আমি মুক্ত ক’ত্তে এনে, বন্দী
করে দিলুম।
মহাতাব। বাবা, মুক্ত হওয়া যদি খোদার মজী হয়, আমায় কেউ
ধরে রাখতে পারবে না। যদি পার, নিজে মুক্ত হও।
যদি সন্ধান পাও, কাফিয়াদের সাহায্য করে
প্রেমের পাথার।
( আলিজান ও হােসেনআলির প্রবেশ)।
আলিজান। এ কি! গফুর বন্দী ?
গফর। ওমরাও সাহেব, মনিবের কাজ ক’তে এসে, কাফিয়া বন্দী
হয়েছে।
হোসেন। এখনি মুক্ত করে দাও।
গফুর। (মুক্ত হইয়া) আলি সাহেব! দুনিয়ায়, মাত্তে গেলে, ম’ত্তে
হয়।
[ গফুরের প্রস্থান।
আলিজান। এ কিরকম কথা, হােসেন সাহেব ?
দ্বি রক্ষক। এরই মতন, কাফিয়া বলে আরও দুজন পালিয়ের্চে।
আলিজান। সে কি! কে তারা ?
মহাতাব। (কারাগারের অভ্যন্তর হইতে) যদি শুতে চাও তারা
কে, তবে শোন। একজন তােমার সহােদর, আর একজন
আনার উদ্ধারকারিণী –তােমার সহােদরের স্ত্রী।
হােসেন। মহাতাব কি করে এলো ?
আলিজান। দুষ, মনি, সব দুষ,মনি। চার দিকে দুষ,মনির আগুন
জ্বলেছে। এ আগুন যে নেবাতে পারবে, অর্ধেক বিষয়
বক্সিস্। তােরাবের গর্দান যে দেখাতে পারবে, অর্ধেক
বিষয় বসি।
হােসেন। আলি সাহেব, কচ্চেন কি?
আলিজান। ক’চ্চি কি ? নিজের প্রাণের জালা খুলে দেখাচ্চি।
আমায় বারণ করো না, যার লােকনিদের ভয় আছে, তাকে
বারণ কর। নিন্দের ভয়, আর আমার নেই। যার আশা
প্রেমের পাথর।
আছে, সে লােকনিন্দে নিয়ে থাকুক। আমার আশা ফুরিয়ে
গেছে। আমার অনেক দিনের যত্নে আঁকা ছবি, মুছে
গেছে। হােসেন সাহেব! যে আমার বুকের মাংস তুলে
নিয়েছে, তাকে গ্রেপ্তার কর। শয়তানীকে এক ফোটা
জল না খাইয়ে রাখ। যদি দুষমন মাত্তে পারি, আমার
অর্ধেক দৌলৎ বসি।
[ আলিজানের প্রস্থান।
হোসেন। বিশ্বাসঘাতিনী রমণীকে লৌহশৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রাখ।
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
-
( প্রান্তর)
(স্ত্রীবেশে সঞ্জিত কাকুকে লইয়া ফকির বেশে
দানিশমনের প্রবেশ)
দানিশ। বেঁ। কিন্তু, কিত, রর ভে।
কাকু। বাবা, বেড়ে মন্তর ঠিক করেছো, বো কিন্তু কিত,
রর ভো।
দানিশ। বাবা কাকাতুয়া, এইবার তুই যদি লাগ, মাফিক্ কথা
ক’টা ক’য়ে যেতে পারি, তা হলেই টাকা গুলো হাত
ক’রিচি। দেখে বাবা, কাজের সময় যেন সব কেঁচিয়ে
ফেলো না। যেমনটী শিখিয়ে দিইচি, হুবহু ব’লে যেও। ব্যাস,
তা হলেই কাজ ফরসা।
প্রেমের পাথার।
কাকু। তােমায় কিছু বলতে হবে না। যেমনটা বলে দিয়েছে,
ঠিক তেম্নিটী পাবে। কিন্তু বাবা, তােমার কাজ হলে,
আমায় জড়িয়ে ধরুবার একটা পাশ-বালিশ কিনে দিতে হবে।
দানিশ। একটা কেন বাবা, ডাইনে বাঁয়ে চিনির নৈবিদ্দি
দোব।
কাকু। বসে পড়, ব’সে পড়, কে আসছে।
(দানিশের চক্ষু মুদ্রিত করিয়া উপবেশন )
দানিশ। এইবার আরম্ভ কর।
কাকু। (নতজানু হইয়া) গুরুজী ! পও লাগে, গুরুজী ! পাও
লাগে।
( জ্বলিলের প্রবেশ।)
জলিল। য়া, এ কে রে ! খােদা, সবাইকার কাছেই সবাই যায়,
আমার কাছে কিন্তু কেউ আসে না। হঁাগা বিবি ! তােমার
কি হয়েচে গা ?
কাকু। (দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া) আমার খস আমায় দেখতে
পারে না।
জ্বলিল। যা! সে কি !! তােমায় দেখতে পারে না? এমন তুমি,
তােমায় দেখতে পারে না? দেখ বিবি, ব’তে সাহস হয়
না, যদি একান্তই দেখতে না পারে, তা হলে ব’লছিলুম
কি না-
কাকু। দূর, দূর, দূর, দুর।
জ্বলিল।
এঃ ! একেবারে মুড়ো ঝ (টা। জলিল রে ! কি বরাতই
করিছিলি ?
প্রেমের পাথর।
দানিশ। ( চক্ষু উন্মীলিত করিয়া ) কিসের গােল ?
কাকু। গুরুজী ! পও লাগে।
জলিল। সর বেটী, সৰু। গুরুজী ! আমার আগে পাও লাগে।
ধানিশ। (কাকুর প্রতি) তফাৎ হো যাও।
জ্বলিল। আরে তফাৎ হ' বেটী, তফাৎ হ’। আবার, কথা শোেনা
হ’ল না। আহাহাহা, কিবে চলনের ভঙ্গী রে ।
[ কাকুর প্রস্থান।
এ ত’ কোমর দুলিয়ে চলা নয় বাবা, বুকে পাথর বসান।
ফকির সাহেব, প্রাণ যায়। আমায় চট করে মন্তরটা
দিয়ে দাও।
দানিশ। আমার পূজো ?
জ্বলিল। সব এনিচি বাবা, এই নাও।
( টাকার থলি প্রদান)
দানিশ। তাের ওপর বড় খুসী হইচি। মন্তর শােন্। যাকে বশ
ক’ত্তে ইচ্ছে হবে, তার কাছে গিয়ে, বক দেখানর মতন
করে বলবি বো কিত, কিত, জ্বর ভে। তা হলেই সে
তাের জুতাের সুতলা হয়ে যাবে।
জ্বলিল। যা, এই টুকু মন্তর ! তবে ত’ বাবা, কাজ মেরে দিইচি।
আর আমায় পায় কে! এইবার বাবা, দেখে নেব।
কঁাচা-বয়িসী লােক দেখিচি কি, বোঁ কিত, কিত,
ভ্রর ভে।
দানিশ। আমি আশ্রমে যাব।
জলিল। সে কি বাবা, আগে পরখ করিয়ে যাও। দেখ ত’ বাবা,
ঠিক ব’চি কিনা? বে। কিত, কিত, ভ্ররর
ভে।
প্রেমের পাথার। ৯৭ দানিশ। ব্যাস্ বাবা, ঠিক হয়েছে। (কাকুর প্রবেশ।) কাকু। বাবা, আমার ওপর দয়া হবে না ? অলিল। একবার ছেড়ে দেব না কি! দি’ এক মন্তর ছেড়ে। বেটী ভারি দুর দূর করেছে। বো কিন্তু কিন্তু জ্বর ভো। কাকু। উ হু হু হু, বড় চোট লেগেছে, বড় চোট লেগেছে। হ্যা ভাই, তুমি কে ভাই ? জ্বলিল। এখন তোমার খসকে কেমন লাগচে ভাই ? কাকু। প্রাণ যায়, প্রাণ যায়, আমায় পায়ে রাখ। প্রাণেশ্বর, প্রাণেশ্বর- জ্বলিল। আরে, বাহােবা কি বাহােবা! প্রাণেশ্বরি, প্রাণেশ্বরি। কাকু। (গীত।) তুমি আড় নয়নে রসের নাগর। নয়না হেনােনা। যেন মজিয়ে ধীরে, খোদার কিরে, ফিরে যেওনা। ( আবেরে ও পেয়ারে) তোমার মুচকে হাসা, চটকা নেসা, সন্দ সদাই হয়। ছােট্ট কলির কোমল প্রাণে, কতই বল সয়; এখন কয় যা কবে, সইবো সবে, লােকজে কি রয় মানা ? দানিশ। আরে কর কি! কর কি !! (তুড়ি দেওন) কাকু। (কৃত্রিম বিস্ময় সহকারে) এই! তুই কে রে? জলিল। একি হ’ল বাবা! এযে, গাছে তুলে মই কেড়ে নেওয়া হ’ল ?
১৮
প্রেমের পাথার।
দানিশ। যাকে তাকে অমন করে মন্তর ছেড়োনা, মারা যাবে,
মারা যাবে। (কাকুর প্রতি আমার সঙ্গে আয়।
[ দানিশ ও কাকুর প্রস্থান।
জলিল। ওঃ, মারা যাবে। কি আমার দয়াল পুরুষ গো! মারা
যায় যাবে। আমি বাবা, শুচিনি। দিই এক মন্তর ছেড়ে।
বো কিন্তু কিন্তু ভর ভো।
(কাকুর পুনঃপ্রবেশ।)
কাকু। প্রাণেশ্বর, প্রাণেশ্বর !
নেপথ্যে দানিশ। পালিয়ে আয়, পালিয়ে আয়।
(কাকুর প্রস্থান)
জ্বলিল। আরে ! কোথেকে এ আপদ এসে জুটলো গা। দেব
নাকি, আর একবার মন্তর ছেড়ে। না, থাক। উহ', আর
একবার দি’। কাজ নেই, ছােট মেয়ে, আবার কেঁদে
ফেলবে! এখন বাবা, আমার সঙ্গে চালাকী করা অমনি
নয়। একটু মুখ বেঁকিয়েচে। কি, বোঁ কিত, কিত,
ভ্রর ভে।
( জ্বলিলের অঙ্গভঙ্গী সহকারে প্রস্থান।
( দিলজান ও তােরাবের প্রবেশ।)
দিঞ্জান। আস্তে, খুব আস্তে, চেঁচিয়ে কথা কোয়ােনা। শুনতে
পাবে। কাণের কাছ দিয়ে গুলি বেরিয়ে গেছে। আবার
গুতে পাবে। শ্রাবণের মেঘ, আবার ডেকে উঠবে।
মাথার ভেতর দিয়ে, আবার বিদ্যুৎ চলে যাবে। পালিয়ে
এস, পালিয়ে এস। যতক্ষণ পার, কেবল পালিয়ে এস।
প্রেমের পাথার। ৯৯ ওই, ওই ডেকেচে। জীবনের বাঁধ ভাঙ্গতে, সাগরের কল্লোল আবার ডেকে উঠেচে! পালিয়ে এস। বালির বাঁধে ত’ সাগরের ঢেউ সইবে না। উল্কাপাতের মতন পালাও। ধরণীর বুকে, ক্ষিপ্তগ্রহের মতন ছুটে এস। [ উভয়ের প্রস্থান। ( আফগানশার সহিত অনুচর-বেষ্টিত শা-আলমের প্রবেশ।) শা-আলম। কে দু’জন ওদিক্ দিয়ে গেল, আফগানশা? আফগান। অপরিচিত কোন পথিক। শা-আলম। অসম্ভব নয়, কিছুই অসম্ভব নয়। এরাও যেন, কি এক লুকুনো প্রাণের জ্বালা নিয়ে ছুটচে। শান্তিময় খােদা, তােমার অফুরন্ত করুণার বারি, ধরণীর শােক-শীর্ণ বুকে দাও। দুনিয়ার মলিন ধূসর মুখে, সােণার উষা আবার ফিরিয়ে নিয়ে এস। আফগান। সুলতান, অতীতের স্মৃতি মনে আবেন না। শা-আলম। আফগানশা, যে দাগ প্রাণের ওপর পড়ে গেছে, সে দাগ মুছে ফেশ্বর জল, দুনিয়ায় নেই ! আফগান। সাহানশা, আনন্দ-ভ্রমণে, বিষাদের ভাব কি, পারস্য- সম্রাটের সাজে ? শা-আলম। না, কখনাে নয়। কর্তব্যের বিস্তৃত পথ খুলে দিয়েছে। যেখানে নিয়ে যেতে সাধ হয়, চলো। ( সকলের প্রস্থান।
প্রেমের পাথার।
পঞ্চম গর্ভাঙ্ক
( রাজপথ।)
মূল্যবান্ পরিচ্ছদে অযথারূপে সজ্জিত হইয়া
জেলে ও জেলেনীর প্রবেশ ।
জেলে। বলি হ্যা ভাই, জেলেনী ভাই।
জেলেনী। কি ভাই, কেন ভাই, কি ব’লচি ভাই, কাণের কাছে
এসে বা ভাই, রাস্তার মাঝখানে কি, চেঁচিয়ে কথা কওয়া
ও বাবা, তুই যে কবি গাইতে আরম্ভ ক’ল্লি রে !
জেলেনী। প্রাণনাথ ! কাচা বয়েসে, অমন দুটো চাট্টে সবাই
বলে থাকে।
জেলে। তা বলে বলুক, ছেলেবেচা টাকা পেয়ে, অত গরুমে
উঠতে নেই, আবার গােলমাল হয়ে পড়বে! চল,
নিজের কাজে যাই। জাত-ব্যবসা কি ছাড়তে আছে ?
জেলেনী।
তবে, তাই চল্।
( বাক্স লইয়া কাকুর এবং ঘণ্টা বাজাইতে
বাজাইতে দানিশের প্রবেশ।)
কাকু। চাই ভাল ডাক্তার, সস্তায় বিকিয়ে যায় ! চাই ভাল
ডাক্তার।
দানিশ। চলে আয় খদ্দের! সস্তায় ডাক্তার যায়! সস্তায়
ডাক্তার যায় !
প্রেমের পাথার।
কাকু। বাবা! এ ব্যাবসা বদলে ফেল, এতে কিছু হবে না।
দানিশ। আরে বাবা, এক দিনেই কি আমির ওমরাও হয়ে পড়া
যায় ? দু’দিন দেথনা।
কাকু। তবে বাবা, তুমি বাক্সটা মাথায় কর; আমি ঠিক তােমার
মতন ঘণ্টা বাজাতে পারবাে।
দানিশ। হ্যা, এই বাক্সই মাথায় ক’তে পারে না, আবার ঘণ্টা
বাজাবে! চ'লে চল, চলে চল।
কাকু। আচ্ছা বাবা, যেমন তুমি আমায় নাকাল কচ্চো, তেনি
খােদ্দেরের কাছে ব’লে দোব, ছেলেকে মুটে সাজিয়ে নিয়ে
বেড়ায়।
দানিশ। লক্ষ্মী বাবা, তা কি বলতে আছে ? এই তােদের জন্যেই
ত’ খাটুচি; নইলে যে টাকাটা রােজকার ক’রিচি, এলার
খরচ হ'লে, এক বচ্ছর কেটে যায় । ওরে দু’জন লােক
আচে, ওদের পাড়াও কত্তে হবে। একটু গা ঢাকা
দিই আয়। আজ তাের বরাতে খুব মেঠাই খাওয়া আছে,
বুঝলি?
কাকু। ( বিরক্তি সহকারে) আচ্ছা বাবা, চলো চলে।
[ উভয়ের প্রস্থান।
( মােসাফের ও মওলার প্রবেশ।)
t
মােসাফের। গর্বিত বালক! একদিন অনেক অহঙ্কার দেখিয়ে
ছিলে, আজ ভাব দেখি, তুমি কে?
মওলা। তখন শাজাদা ছিলুম ; অপমানিত হতে, আজ আমি
আপনার ক্রীতদাস।
১০২
প্রেমের পাথার।
মােসাফের। কখন নয় ; খোদার মজীতে, আজও তুমি শাজাদা।
শুধু, দুনিয়ার মালীক অহঙ্কার সইতে পারে না, তাই শাজাদা
হয়েও, আজ তুমি বান্দা।
মওলা। খােদা ! এত অপমান করে রাখবে বলে কি, আমায়
জীবিত রেখেছিল।
মােসাফের। শাজাদা, দুঃখিত হ’য়ােনা। তােমার উদ্ধারকারী
ধীবরের কাছ থেকে, অপমানের উদ্দেশ্যে, তােমায় ক্রয়
করিনি। বালক, স্থির জেনে রেখাে, দুনিয়ায় এমন শক্তিধর
পুরুষ নেই, যে সুলতান শা-আলমের পুত্রের অপমান ক’ত্তে
পারে !
মওলা। খােদ, তুমিই জান, এ কিরকমের ফকির।
( কাকুর সহিত দানিশের পুনঃ প্রবেশ।)
দানিশ। ছোড়ার সঙ্গে এতক্ষণ কিসের কথা বাবা। এ ত’ গতিক
ভাল নয়, কি আর বলবে! হয় ত’ নিজের বাহাদুরী কচ্চে।
যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ। দেখাই যাকুন। ডুবি ডুবি
লা, ত’ ডুবে ডুবে বা। (অগ্রসর হইয়া) কি মশাই, ভাল
আছেন ?
মােসাফের। কে আপনি ? ( চিন্তা করিয়) এ যে ফৌজদার।
দানিশ। আমায় চিন্তে পাচ্চেন না! বড়ই আশ্চর্যের বিষয় !!
আমি হচ্ছি এখানকার বাদশার হাকিম। আমার এক
একটী ঔষধের এম্নি গুণ, যে একটীবার মাত্র খেলেই,
অশীতিপর বৃদ্ধ, যুবার ন্যায় কার্যক্ষম হয়।
মােসাফের। ফৌজদার সাহেব! আমি তােমাকেই খুজছিলুম।
প্রেমের পাথার। ১০৩ দানিশ। যা, এ যে বকেয়া নাম ধরে ডাকে রে ! না মশায়, আমার লােক ভুল হয়েছে। সত্যিই আপনি আমার অচেনা। (কাকুর প্রতি) ওরে! চলে আয়, চ'লে আয়। মােসাফের। ফৌজদার, পালিও না। তােমার বাড়ী চল। দানিশ। আমার আবার বাড়ী কোথায় মশায় ? আমার বাড়ী নেই, ঘর নেই, দোর নেই, চাল নেই, চুলাে নেই, আমি একটা লক্ষ্মীছাড়া। মােসাফের। তবে যে বল্লে, তুমি বাশার হাকিম। দানিশ। সে আমি অন্যভাবে বলেছিলুম। তা, যা বলে ফেলিচি, তার ত’ আর চারা নেই। এখন দয়া করে, আমায় ছেড়ে দিন। মােসাফের। যুবক, ধর্মের কসম, সত্য বল, তুমি লুরিস্থান থেকে পালালে কেন? দানিশ। গােয়েন্দা সাহেব, আমায় বিপদে ফেলবেন না। খােদায় কসম, আমি যাদুকর নই। শাজাদা মহবুব, মরেনি। সে এখনও আমার বাড়ীতে জীবিত আছে। মােসাফের। সত্যই ফৌজদার! তুমি আমার ছেলের অধিক কাজ করেছো। দানিশ। জাহাপনা। আপনি !! সন্তান বলে আর আমায় লজ্জা দেবেন না। মােসাফের। মহবুবকে আশ্রয় দেওয়ায়, তােমার সমস্ত অপরাধ ক্ষমা ক’রিচি। আমায় শাজাদার কাছে নিয়ে চলাে। দানিশ। চলুন। কাকু। (জনান্তিকে) বাবা, দিব্যি মেটাই খাওয়ালে যাহ’ক। ( সকলের প্রস্থান
১০৪
প্রেমের পাথার
ষষ্ঠ গর্ভাঙ্ক
( বক্তিয়ারী পৰ্বতের উপত্যকা)
উন্মত্তভাবে দিজান, পার্শ্বে তােরাব।
তােরাব। দিল্জান, দিলজান, একটুখানি চুপ কর।
দিলজান। না, না, একটুখানি চুপ করা ভাল নয়। আমায়
একেবারে চুপ করিয়ে দাও। পিস্তলের একটুখানি আওয়া-
জের সঙ্গে সঙ্গে, যাতনা-ভরা ময়ূসের জীবনের যবনিকা
ফেলে দাও ।
তােরাব। ছি দিলজান ! ইচ্ছে করে কষ্ট পানি।
দিজান। কষ্ট, কিসের কষ্ট? ওমরাও সাহেব ! তোমার প্রাণের
আশঙ্কা নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে, উদ্বেগ-ভরা জীবনের
গােনা দিন কাটানর চেয়ে, মায়ূসের মৃত্যুযাতনা বেশী ?
ওপরে অব্যয় জ্যোতি করুণাবান্ খােদা,
অনন্ত আকাশের মাঝখানে আমার প্রত্যক্ষ দেবতা তুমি ;
আমি তােমাদের নামে শপথ ক’চ্চি, মরণের যাতনা আর
মায়ুসের নেই। মায়ূকে মেরে ফেলে সুখী কর। জীবনে
কারুর আদর পাইনি এ দুনিয়ায়, তুমিই আমায় আদরে
রেখেচে।। আজ আদর শেষ করে দাও। পায়ে পড়ি,
আজ আমায় মত্তে হুকুম কর। তােমার যত্নের ভাের আগা
করে না দিলে, মায়ুসের প্রাণ, কিছুতেই বেরুবে না।
ওমরাও সাহেব, আমায় মুক্ত করে দিয়ে সুখী কর।
কথন নয়।
প্রেমের পাথার।
তােরাব। তােকে ছেড়ে, কি নিয়ে থাকবে মায়ূস ! নিষ্ঠর!!
কাকে ছেড়ে যাবি ? তােরাব, মান ঐশ্বৰ্য্য চায় না।
এ দুনিয়ার, সমস্ত ধন রত্নের অধীশ্বর হতে চায় না।
শুধু, চির-অনাদৃতা, অযত্ন-পালিত, উত্তাপ-মলিনা, দিগ্ধান
চায়। তেরি কসম, তােরাব খোদা চায় না। তােরাব
দিজান চায়।
দিজান। প্রভু! ঈশ্বর!! আমায় পেলে সুখী হও ? নাও। তােমার
পায়ে উৎসর্গ করা প্রাণ, আবার তােমার পায়ের কাছে
রইলাে। যত্নে, অযত্নে, যাতে ইচ্ছে হয়, রেখাে।
[ চরণতলে পতন।
তােরাব। ( দিলজানের মস্তক ক্রোড়ে লইয়া) মায়ূ, একটু
জিরােও। (স্বগত) খােদা, আমার পাপে দিলজানকে কষ্ট
দিও না। মরুভূমে স্বর্ণসরােজিনি ফুটিয়ে দিয়ে, জীবনের
মধুর প্রভাত, নিশার নিবিড় অন্ধকারে পরিণত করাে না,
যাতনাময়ী দিলজানকে নীরবে ঘুমুতে দাও। আমার উদ্বে-
লিত হৃদয়ের অশান্ত তরঙ্গকে, একটুখানির জন্যে স্থির করে
রাখ।
( পৰ্বতশৃঙ্গের উপর আলিজানের উত্থান)
আলিজান। একটু খানির জন্যে নয়। চির কালের জন্যে, আজ
স্থির হয়ে থাকবে। এক গুলি নষ্ট করেছ! এক গুলিতে পিস্তল
খালি হয় না, তুমিও একটু খানি ঘুমােও। আজকের মতন
একটু খানি ঘুমিয়ে নাও। আজকের ঘুমুনােই, তােমার
জীবনের শেষ ঘুমননা করব।
প্রেমের পাখার তােরাব। ঘুমিয়েছে, অনেক যাতনা পেয়ে সরলা ঘুমিয়েছে। সংসার ! চাতুরীময় সংসার ! আর তােমার কোলে ফিরে যাব । দুনিয়া, দুমনি নিয়ে সুখী হ’। আমি ধ্যানের প্রতিমা পেইচি। আমি ধ্যানের প্রতিমা নিয়ে সুখী হব। বড় ঘুম এলাে, একটু শুই। ( শয়ন) আলিজান। (অগ্রসর হইয়া) এইবার, এইবার সুযােগ পেইচি, এমন সুযােগ আর জীবনে পাব না। (অপর শৃঙ্গ হইতে লুকায়িত ভাবে গফুরের অবতরণ।) গফুর। নিলজ্জ শয়তান! এ দুনিয়ায়, মাত্তে গেলে ম’ত্তে হয়। আলিজান। (পিস্তল দ্বারা তােরাবকে লক্ষ্য করিয়া) এইবার, এইবার। গফুর। ৭ পিস্তল দ্বারা আলিজানকে লক্ষ্য করিয়া) খােদ, তুমি মনে বল দাও। দুনিয়ার মালীক, তুমি মনে বল দাও। ( আফগানশার সহিত দীর্ঘবর্শাধারী অনুচর- বেষ্টিত শা-আলমের প্রবেশ।) শা-আলম। উন্মাদ যুবক, নিরস্ত হও। দুনিয়ায় খুন করা বড় নয়। এ দুনিয়ায় ক্ষমা করা বড়। খুন কত্তে শিখাে না। দুনিয়ায় ক্ষমা কত্তে শেখ। গফুর। নূতন কথা, দুনিয়ায় খুন করা বড় নয়। দেবতায় বলেছে, দুনিয়ায় খুন করা বড় নয়। সাহানশা! লুরিস্থানের রাজলক্ষ্মী, ইস্পাহানের কারাগারে। (গফুরের অদৃশ্য হওন)
প্রেমের পাথার।
১০৭
শা-আলম। সে কি!
আফগান। গ্রেফতারের আদেশ দিন।
শা-আলম। না, ভয়ার্তের অনুসরণ করো না। দুৰ্বলকে পীড়ন,
খােদার প্রতিনিধি সাহানশার ধর্ম নয়। তােরাবের প্রতি)
সওদাগর সাহেব, তােমার স্ত্রী ভাল আছে ?
তােরাব। কে আপনি?
আফগান। পারস্যসম্রাট, তােমার সম্মুখে ; অবনত মস্তকে দাড়াও।
শা-আলম। হতভাগ্য যুবক! চাতুরী করে যার স্ত্রী হরণ
করেচো, আমিই সেই মােসাফের।
আলিজান। সুলতান। আমার প্রাণদণ্ডের আদেশ দিন। আমারই
বুদ্ধির দোষে, লুরিস্থানের রাজলক্ষ্মী ইস্পাহানের কারাগারে।
শা-আলম। বেশ, সম্রাজ্ঞীকে সসম্ভ্রমে রাজ-অন্তঃপুরে আন।
[ কতিপয় অনুচর সহ আফগানশার প্রস্থান।
দিলজান। সাহানশা, এ দুনিয়ায় কেউ দোষী নয়। পতিহন্ত্রী
দিল,জানের অদৃষ্ট দোষী। কাউকে হত্যার আদেশ দেবেন
। আমায় হত্যা করুন। ধৰ্ম্মের পালক,
ধৰ্ম্মের পালক, অপরাধীকে
হত্যা করুন?
শা-আলম। উন্মত্তা বালিকা! যে শিখা হৃদয়ে পোষণ করে
রেখেচো, তার চেয়ে অধিক শাস্তি দুনিয়ায় নেই। খােদ,
অশান্তির অনল চির-নিৰ্বাপিত করে দাও। ধরণীর মলিন
হৃদয়, স্বর্গীয় শ্যামল আভায় আবার বিভাসিত কর।
ধরিত্রীর কোমল বুকে, শান্তির উৎস আবার ছুটিয়ে দাও।
জন্মভূমির চিরপ্রফুল্ল বদন, সন্তান-যাতনায় আর কাতর
রেখাে না। ধৰ্ম্মের শুভ্রজ্যোতিতে মাতৃভূমির পুণ্য নিকেতন
১০৮
প্রেমের পাথার।
চির-উজ্জ্বল করে রাখ। খােদা, পাপীর হৃদয়ে শান্তি দিন।
জ্যোতির্ময়ের করুণা-কণা ধরণীর তাপদগ্ধ বুকে বিকীর্ণ
সপ্তম
গর্ভাঙ্ক।
( উদ্যান)
জ্বলিলের প্রবেশ।)
জলিল। এইবার বাবা, আর কারুর নিস্তার রাখ চিনি। এই হানা
দেবার জন্যে, ঘাটী আগলে দাড়ালুম। কঁচা-বয়িসী লােক
দেখেছি কি, অমনি বো কিত, কিত, রর ভে।
একবার কাউকে পেলে হয়।
প্রথম নর্তকীর প্রবেশ।
১ম নর্তকী। কি মিঞা সাহেব ! এদ্দিন ছিলে কোথায় ?
জলিল। দেখে বাবা ! একবার বিদ্যে শেখার মজাটা দেখ।
এখনও মন্তর ছাড়িনি, এরই মধ্যে আমার জন্যে প্রাণ ধড়,
ফড় কচ্চে।
১ম নর্তকী। কি সাহেব, কথা ক’চ্চেনা যে, রাগ করেচো বুঝি ?
জ্বলিল। (হাসিয়া) আনার বিবি, তাের ওপর কি রাগ ক’ত্তে
পারি? জ্বলিল, সব পাবে, শুধু, তােকে কষ্ট দিতে পারবে না।
বিবিজান ! তুমি নিশ্চিন্ত হয়ে থাক। আমি তােমারই
হয়ে থাকবে। বুঝলে?
প্রেমের পাথার।
১ম নর্তকী। মিঞা সাহেব, সেই ভাবনাতেই, আমার ঘুম হচ্চে
না। মাইরি ভাই! তােমায় দেখলেই, তােমার জন্যে,
আমার প্রাণটা, কেমন কেমন করে ওঠে।
জলিল। যা! তবে ত’ রাজঘােটক হয়ে গেছে। তােকে
দেখলেও, তাের জন্যে আমার প্রাণটা, কেমন কেমন করে
ওঠে। এই ব’লচি কি, আমার লজ্জা কচ্চে।
১ম নর্তকী। কি বলবি, বলনা?
জ্বলিল। এই বলছিলুম, তুই যদি আমার জানের জান হয়ে
থাকি, তা হলে আমি তােকে, মানুষ ভােলানর মন্তর
শেখাই। আনার রে! তুই যে আমার কি ক’রিচি, তা
আর তােকে কি বলবাে।
১ম নর্তকী। তাের আবার কি ক’রিচি রে ?
গীত।
তুমি, সাদা মনের কপাট ভেঙ্গে, প্রাণ, খানি করেছ চুরি।
এখন মুচকে হাসা তােমার হাতে, হেঁচকে টানা, প্রেমের ডুরি।
শুধু, হয়না যেন ভালবাসা,
মােচনের মুরগী পােষা,
মাকে টোপ দিতে আসা, ওরে বাস ছোটা, আধ-ফোটা কুড়ি।
(জ্বলিলের নৃত্য এবং আনারের বস্ত্র ধারণ)
১ম নর্তকী। দুর মিন্সে! কাপড় ছাড়! এরে!!
[ প্রথম নর্তকীর প্রস্থান।
অলিল। বিবি ! পালাবে কোথায়? বো কিন্তু কিত, জ্বর ভো।
এইবার তােমায় লাট্ট বানাবো বাবা, লাউ বানাবো।
বোঁ কিত, কিত, জ্বর ভে।
[ জ্বলিলের প্রস্থান।
জলিল।
১১০ প্রেমের পাথার। (জেলে ও জেলেনীর প্রবেশ।) জেলেনী। বলি, কি সােনার চাদ! তাের ঢলাঢলিই সাৰ হ’ল ? একটা মাচও তুলতে পাল্লিনি? যা, তুই কোন কম্মের নােস। জেলে। দোষ আমার, না তাের ? জেলেনী। কি রকম ? জেলে। কিরকম আবার কি ? গীত। | দোষ, ওরে গিটি করা সোণার যাদু ! তােমায় চিনিচি। জেলেনী। থাক্ থাক্ তাের, মুরদ জেনেছি। জেলে। তোর ভারি ভুরি, জারি জুরি, বুঝতে পেরেচি। জেলেনী। ও তের, হালকা কাটা তলায় নাকো, আমার কি বল। ফেলতে গেলে, হয় গো দেরি, মিছে কর রােষ ; ও তুই, ক্ষ্যালা রাখিস বাগিয়ে ধরে, ঘোচাব আপােষ। উভয়ে। এখন, তো ক'রে থে, মুখের বড়াই, তােমায় বুঝিচি। [ উভয়ের প্রস্থান। ( জ্বলিলের পুনঃ প্রবেশ।) জলিল। যা! একি হ’ল বাবা। পাঁচ পাঁচশাে টাকা জল দিলুম। এই বাবা, নাকে কাণে খৎ। আর কখন মেয়ে মানুষের পেছুনে ঘুরবে না। এতদিন যদি খােদাকে ডাকতুম, মুখের চালাকি ছেড়ে দিয়ে, সত্যিই যদি দেশের কাজে লাগতুম, তা হলে ইহকাল পরকাল হত। আমি যেমন আহাম্মুক, আমার তেমনি সাজা হয়েছে। এ পাচশাে টাকা ঠকা নয়, এ আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত। আনার! বেশ মন্তর শিখিয়ে দিয়েছি। এ দুনিয়ায়, মানুষ ।
প্রেমের পাপার।
বশ ক’ত্তে হলে, মানুষের ভাল কত্তে হয়। ভালবাসাই,
এ দুনিয়ায়, মানুষ বশ করবার মন্তর।
( অলিলের প্রস্থান।
অষ্টম গর্ভাঙ্ক।
( দরবার )
সিংহাসনে শা-আলম ও মহাতাব, নিম্নে আফগানশা ও
সভাসদগণ, এক পার্শ্বে তােরাব ও দিলজান, অপর
পার্শ্বে আলিজান ও হােসেন্আলি।
শা-আলম। হােসেনআলি! সন্তোষের সহিত, তােমার অন্যায়
উপায়ে অর্জিত সম্পত্তি, নিরাশ্রয়কে প্রদান কর। আলি-
সাহেব! যে প্রায়শ্চিত্ত, তুমি নিজের ইচ্ছেয় গ্রহণ করেছো,
যথার্থ তা তােমার উপযুক্ত। তুমি অনুতাপদগ্ধ হয়ে,
সংসার ছেড়ে, মোসাফিরি নিতে যাচ্চ, যাও। উচ্চ কার্যে
ব্ৰতী হও।
করুণাময় খােদা, তােমার অশান্ত হৃদয়কে
আর, ওমরাও সাহেব! অত্যাচারপ্রাপ্ত
তােমায় ক্ষমা করেছেন, সেজন্য তার কাছ থেকে
তুমি মুক্ত হতে পার। কিন্তু দীন মােসাফেরের প্রাণে,
যে আঘাত করেছে, তার জন্যে, তােমায় শাস্তি নিতে
হবে। তােমার হৃদয়বতী স্ত্রী, তােমায় যে শাস্তি দেবেন,
খােদা করুন, সেই শাস্তিতেই যেন তােমার পাপের
প্রায়শ্চিত্ত হয়।
১১২ প্রেমের পাথার। দিলজান। সাহানশা। আপনার আদেশে, ধর্মের দিকে লক্ষ্য রেখে, স্ত্রী তার পূজনীয় পতিকে এই শাস্তি দিচ্ছে, যে মনােবৃত্তি দমনে অক্ষম, ঘাের মিথ্যাবাদীর শ্রেণীভুক্ত হয়ে, তার স্বামী চিরদিনের জন্যে নিন্দনীয় হয়ে থাকুক। শা-আলম। বালিকা! তােমার আত্মত্যাগ, নিশ্চয়ই প্রশংসনীয়। খােদা করুন, দ্বিতীয় মৃত্যু সদৃশ এই অপমান, যেন তােমার অদৃষ্টের দোষ খণ্ডন করে। আফগান। সুলতান ! এক মােসাফের, আপনার কৃপা-ভিক্ষুক হয়ে, হারদেশে অপেক্ষা কক্ষে। --আলম। আফগান-শা! যাচকের জন্য, এ দরবার চির- উন্মুক্ত থাক। মনে পড়ে, অনেক দিন আগে, একজন মােসাফের সাহায্য প্রার্থী হয়ে এসেছিল ? আজও আবার একজন এসেছে। খােদা! এই আশীৰ্ব্বাদ কর, যাচকের প্রার্থনা পূর্ণ ক’ত্তে না পারার আগে, শা-আলমের অস্তিত্ব যেন, জগৎ থেকে লােপ হয়ে যায়। ( মােসাফেরের প্রবেশ) মােসাফের। খােদা নবীন ভূপতিকে দীর্ঘজীবী করুন। ধরণীশ্বর। অনেক দিনের যাতনার বােঝা নিয়ে, দাম্ভিক ফকির, আজ আবার তােমার পায়ের কাছে দাড়িয়েছে। যে মােসাফের, ভগবান্ ছাড়া, আর কারুর কাছে কখন মাথা হেঁট করেনি, দানবীর নরপতি! অন্তরের সহিত সেই মােসাফেরের সেলাম নাও। সুলতান! আজ আমি তােমার প্রার্থী। ( সিংহাসন হইতে শা-আলমের এবং মহাতবের অবতরণ।) {
প্রেমের পাখার।
১১৩
-আলম। বন্ধু, কি চাও বল? শা-আলম, চিরদিনই প্রার্থীর
দাস।
মােসাফের। (নতজা হইয়া) জাহাপনা! তােমার দেওয়া রাজ্য,
ফিরিয়ে নাও। নিশ্চিন্ত মনে আমায়, ভগবান্কে ডাকবার,
আবার অবসর দাও। সুলতান! হিংসা ভরা প্রাণ নিয়ে
পরীক্ষা কত্তে এসে, তােমার কিছু ক’ত্তে পারুম না। তুমি
নবাব ছিলে, সম্রাট হলে আমার কিন্তু যথেষ্ট শাস্তি হল।
তাপহর! আমার আলাৰ বােঝ তুলে নাও। আমি
খােদাকে নিয়ে সুখী ছিলুম, আমায় খােবাকে নিয়ে আবার
সুখী হতে দাও।
শা-আলম। (হন্ত ধারণ করিয়া উঠাইয়া) নির্লিপ্ত মহাপুৰুষ!
দেওয়া রাজ্য ফিরিয়ে নিলে, সুখী হও ? দাও।
মােসাফের। সাহানশা! এতদিনে আমি মুক্ত হ’লুম। এতদিনে
খােদাকে ডাক্বার, আবার আমার অবসর হ’ল। বাদশা।
দান কত্তে গেলে, দক্ষিণে দিতে হয়,
(শাজাদাদ্বয়কে লইয়া দানিশমুলের প্রবেশ)
দক্ষিণ স্বরূপ, তােমার অমুল্যর, হারান ছেলে দুটী নাও।
খােদা সকলের মল করুন। প্রেমময়ের প্রেমের সংসারে,
সকলে যেন, শা-আলমের মতন প্রেমের জিনিষ সওদা
করে। বুঝে চলতে পারে, সকলের কাছেই, সংসার মরুভূমি
নয়, এ শান্তিময় প্রেমের পাথর।
মহাতাব। বাবা, এ প্রেমের পাথারে, শুধু দিলুজানই নিরানন্দ
প্রাণে রইলো ?
১১৪
প্রেমের পাখায়।
গীত।
মােসাফের। মা ! কখন নয়। দ্বিতীয় মৃত্যু সদৃশ অপমানেই, তার
অদৃষ্টের দোষ খণ্ডন করেচে। বুঝে চ’তে পাল্পে, সক
কাছেই, এ সংসার সংসার নয়, এ প্রেমের পাখার।
নিশ। বাবা, এ প্রেমের পাথরে, নাকানিচোবানি না খাইয়ে,
তােমার অপােগও শিশুর, একটা ধবার খুট দাও।
অফিগান। তুমি, সুলতানের সাহায্যে প্রতিপালিত হবে।
(বন্দনাকারিনীগণের গাহিতে গাহিতে প্রবেশ)
বন্দনাকারিণীগণ।
আজি দশ দিশি প্রেমে হাসিয়া।
প্রেমের পবনে, জলদ নিলীন, চঁদিমা উঠেছে ভাসিয়া
হৃদি মঞ্জু কুঞ্জ ভবনে,
জাগে প্রেম-বিধু, মধু-পবনে,
আঙ্গি প্রেমমধুরী, প্রেমমম্ন প্রাণে, নীরবে যেতেছে বহিয়া।
আজি, প্রেমের পাখানে, ফিরেছে গান,
অধীর হিয়ার, থেমেছে তান,
শুধু, মুখরিত যত, প্রেম-তটিনী, প্রেমের পাথারে আসিয়া ।
যবনিকা পতন।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.