Bally Sadharan Granthagar

Ausmoti

Sarswati, Debi, Srimati Prabhabati · 2009/08/6

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

আট-আনা-সংস্করণ-গ্রন্থমালার অস্টনবতিতম গ্রন্থ
আয়ুষ্মতী
শ্ৰীমতী প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স,
২০৩১১, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
চৈত্র-১৩৩০

কর্ণওয়ানস
iজ পাধায়
প্রকাশক
শ্রীহরিদাসহ ১০৩/১১,
চট্টোপাধ্যায়
| গুরুদাম
কালকাতা
প্রসঙ্গ
প্রিন্টার-নরেন্দ্রনাথ কেঁাঙার
ভারতবর্ষ প্রিন্টিং ওয়াকস্
২০৩১১, কর্ণওয়ালিস থ্রট, কলিকাতা

সাহিত্য-জগতে প্রবেশ করার সময় হতে এখনও
পৰ্যন্ত যাদের অযাচিত অনুগ্রহ আমি
পেয়ে আসছি, সেই সকল মহাত্মার
নামে এই বইখানি সাদরে
উৎস করলুম।
খাটুয়া পােঃ, গ্রাম,
জেঃ ২৪ পরগণা।
শ্রীপ্রভাবতী দেবা সরস্বতী
१॥२॥२8

No text on this page.

আয়ুষ্মতী “পবিত্র। আহ্বানটী বড় গম্ভীরে, এত গম্ভীরে যে পবিত্র চমকাইয়া উঠিল, তাহার মুখখানা একেবারে শুকাইয়া উঠিল। উত্তর দেওয়া যুক্তিযুক্ত কি না, তাহা তখন তাহার ভাবিবার অবকাশ ছিল না। এই শান্ত সুন্দর জ্যোৎস্না-প্লাবিত যামিনীতে সে এরূপ আহ্বান শুনিবার জন্য মােটেই প্রস্তুত হয় নাই। নির্জন চন্দ্রকরােজ্জ্বল ছাদের উপর সুদুর হইতে ভাসিয়া-আসা পাপিয়ার কলতান ও সুদূর হইতে বহিয়া-আসা বসন্ত- পবনের মদিরময় স্পর্শে সে আপনাকে ভুলিয়া গিয়াছিল, কল্পনার চোখে সে কত কি দেখিতেছিল, কত মােন আপনার চারিদিকে, প্রাণের ভিতর বুনিতেছিল, এই একটা কঠোর গম্ভীর আহ্বানে তাহার মনের মােহময়

আয়ুষ্মতী
তুল খসিয়া পড়িল, তাহার সােণার স্বপন টুটিয়া গেল,
মােহজাল ছিড়িয়া গেল। নিমেষে তাহার চোখের
সম্মুখ হইতে শুভ্র জ্যোৎস্না বিদূরিত হইয়ঃ অন্ধকার সারা
ধরখানা যেন প্লাবিত করিয়া ফেলিল।
অন্যায় তাহারই।
সে তো জানে, তাহাকে এমনি
কঠোর গম্ভীর আহ্বান এক দিন শুনিতে হইবে, বুকে কঠিন
আঘাত লইতে হইবে। চাদের আলাে, পাখীর সুর, এ
সব শুধু কল্পনাতেই সাজে, বাস্তব জীবনে এ গুলি লইয়া
মানুষ জীবন কাটাতে পারে না। তাহাকে সংসারের
নিষ্পেষণে পীড়িত হইতেই হইবে, এবং সেদিন পাখীর সুর
তাহার কাণে অতি কটু বলিয়া অনুভূত হইবে, চাদ
উঠিলেও চারিদিকে অন্ধকার বলিয়া তাহার ধারণা বদ্ধমুল
থাকিয়া যাইবে।
হা, যথার্থই অন্যায় তাহার ; তাহার সাথে ভীষণ
বিপদ, মাথার উপর কি ভার বােঝা, তবুও সে চাদের
আলাে পাখীর গান উপভোগ করিতে চায়, তাও আবার
মন প্রাণ ঢালিয়া, একেবারে তাহার মাঝে নিজের অস্তিত্ব
বিলীন করিয়া দিয়া। এ কি মুখতার কাজ নহে ?
“পবিত্র ।
না, আর এ ভাবে বসিয়া শুইয়া থাকা চলে না, ডাকের

আয়ুষ্মতী পর ডাক আসিতেছে, তাহাকে সাড়া দিতেই হইবে। সকল জড়তা অপসারিত করিয়া সে উত্তর দিল “যাচ্ছি।” কিন্তু চরণ চলিতে চায় না যে, সে যে ভাঙ্গিয়া পড়িতে চায়। বিপদ আসিতেছে মনে করিয়াও দিন কাটানো যাইতে পারে, সে আসিবে নিশ্চিত, তাহা জানিয়া ব্যর্থ ভাবে না হয় চাহিয়া থাকিলে হয়। এ যে আসিয়াছে, এখন ইহাকে কোনও ক্রমে এড়াইয়া যাইতে পারিলেই যে বাঁচা যায়। ভবশঙ্কর মুখােপাধ্যায় এক গৃহে বসিয়া ধূমপানে নিযুক্ত। এটা একেবারেই অভাবনীয়, যেহেতু সারাদিন এবং রাত্রি বারটা পর্যন্ত জমিদার মহাশয় বন্ধুহীন থাকিতেন । পুত্র ও তাহার সাক্ষাৎ পাইত না, কেন না দিন- রাতই তিনি “বড় ব্যস্ত থাকিতেন। আজ তিনি একা অন্তঃপুরে একটা কক্ষে—এ কি আশ্চর্যের কথা নহে? তাহার মুখখানি মুখখানি অতিরিক্ত গম্ভীর, সে গম্ভীরতা তাহার আহ্বানে কতকটা প্রকাশিত হইয়া পড়িয়াছিল। পায়ে পায়ে জড়াইয়া যাইতেছিল, এমনি অবস্থায় পবিত্র গৃহপ্রবেশ করিল। তাহার সুগৌর মুখখানা তখন পাংশু বর্ণ ধারণ করিয়াছে, চোখ তুলিয়া পিতার পানে তাহার চাহিবার ক্ষমতা ছিল না।

আয়ুষ্মতী ৪ যথার্থই ভবশঙ্কর এমনি রাশভারি লােক ছিলেন। বড় একটা তিনি কথা বলিতেন না, পাছে মৰ্যাদা নষ্ট হইয়া যায়। তাহার অগাধ গাম্ভীর্য নষ্ট হইয়া যাইত, কবল একস্থানে-বন্ধুদের কাছে। “এসেছ পবিত্র, এখানে বসে-কথা আছে।” কি কথা তাহ। পবিত্র জানিত। তাহার বুক কাপিতেছিল, ফরাসের এক পার্শ্বে অতি কুষ্টিত ভাবে সে বসিয়া পড়িল। ভবশঙ্কর অনেক্ষণ নীরবে তামাক টানিতে লাগিলেন। সে কলিকার তামাক পুড়িয়া ছাই হইয়া গেল, ভৃত্য আসিয়া আবার ছিলিম বদলাইয়া দিয়া গেল। তামাক টানিতে টানিতে ভবশঙ্কর বলিলেন “এক- জামিন হয়ে গ্যাছে তােমার? কেমন দিলে ?* আজ পাঁচ সাত দিন পবিত্র বাড়ী আসিয়াছে, এ কয়দিন এ প্রশ্ন তাহাকে যে করিবেন, পিতার এ সময়টুকুও হইয়া উঠে নাই। পুত্রও প্রাণপণে বরাবর পিতাকে এড়াইয়া চলিত, কাজেই নিজে হইতে এ সংবাদটা পিতাকে দিবার আবশ্যকতা বিবেচনা করে নাই। নতমুখে সে উত্তর দিল “একজামিন ভালই দিয়েছি, সবাই বলছে ভাল হয়েছে, পাস হতে পারব।”

আয়ুষ্মত
“হু!” পিতা খানিক নীরব হইয়া রহিলেন, পবিত্রও
তেমনি ভাবে মাথা নত করিয়া বসিয়া রহিল। শুধু যে
এই কথাটা জিজ্ঞাস! করিনুই পিতা ডাকেন নাই,
আরও যে কথা আছে তাহা সে জানিত, তাই তাহার
বুকের মধ্যে মৃদু কম্পন চলিতেছিল।
পিতা গড়গড়াটা সরাইয়া রাখিলেন, গম্ভীর মুখে
তেমনিই সুরে বললেন একটা কথা তুমি এ পর্যন্ত আমায়
জানাও নি, তুমি বোধ হয় বুঝতে পারছ কথাটা কি।”
পবিত্র নীরব।
ভবশঙ্কর গজিয়া বলিলেন “উত্তর দাও—তুমি বিয়ে
করেছ এ কথাটা কেন আমায় জানাও নি? চুপ করে
রইলে যে, হল, উত্তর দাও।”
অপরাধী পুত্রের মুখে একটা কথাও সরিল না।
ক্র নয়নে পুত্রের দিকে চাহিয়া ভবশঙ্কর বলিলেন,
“আজ কাল এমনই লায়েক ছেলে হয়েছ বটে, যে, কোন
রকমেই আমায় আর গ্রাহের মধ্যে আনতে চাও না।
কিন্তু জানো, নিজেকে নিয়ে যােগ্য মনে করলেই যােগ্য
হতে পারা যায় না, তুমি এখনও আমার হাতের মধ্যে
আছ ?”
“দোষ করেছি বাবা-

আয়ুষ্মতী
পবিত্র পিতার চরণতলে বসিয়া পড়িল, “আমার মাপ
করুন। তাহার চোখ দিয়া অশ্রু গড়াইয়া পড়িল।
মাতৃহীন সন্তান সে, চিরটা কাল যদিও সে দূরে দূরে
আছে, তথাপি পিতার স্নেহ-দৃষ্টি সৰ্ব্বদা তাহার উপর।
একটাবার মাত্র সে দোষ করিয়াছে। মাপ চায়, এই কথাটা
শুনিয়াই পিতার ক্রোধ কপূরের ন্যায় উবিয়া গেল। তথাপি
তিনি কৃত্রিম গাম্ভীর্য বজায় রাখিয়া বলিলেন “হ্যা, তুমি
দোষ করেছ, আর এ দোষ বড় কম নয় যে, সামান্য মাপ
করুন বললেই মিটে যাবে। তুমি জানো, আজ তুমি
আমার বংশমর্যাদাকে নিতান্ত খেলার জিনিসের চোখে
দেখেছ, আর তাকে নিয়ে ইচ্ছানুরূপ ব্যবহারও করেছ।
লােকে হাসতে হাসতে প্রাণ দিতে পারে, তবু নিজের
মৰ্যাদা কিছুতেই বিসর্জন দিতে পারে না। আর তুমি-
তুমি কি না এত বড় বংশের একটা মাত্র ছেলে, আমার
জীবদ্দশাতেই আমার মুখে, আমার পিতৃপুরুষের মুখে
চুণকালী দিয়ে এলে ?”
গভীর মর্মবেদনায় তাহার কণ্ঠস্বর বিকৃত হইয়া উঠিয়া-
ছিল। পবিত্র একবার চোখ তুলিয়া পিতার পানে চাহিয়া
তখনি নয়ন নত করিল।
ভবশঙ্কর একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, “যাক,

আয়ুষ্মতী
এ জন্যে তােমায় এখন বেশী বল মিছে, কারণ, ব্যাপারটা
এখন অতীতে মিশে গেছে। যাকে বিয়ে করেছ, তাকে
কোথায় রেখে এসেছ?
অস্ফুট কণ্ঠে পবিত্র বলিল “সেখানে।”
“সেখানে কোথায়, কলকাতায় ?”
পবিত্র বলিল “হা।*
জ কুঞ্চিত করিয়া ভবশঙ্কর বলিলেন, “এ কাজ তােমার
উচিত হয়েছে কি ? আজ নয়, কাল সকালেই তােমায়
যেতে হবে, তাকে আনতে হবে। এই দেখ, তােমার
দাদাশ্বশুর আমায় পত্র দিয়েছেন, তাতেই আমি সব জানতে
পেরেছি।”
কম্পিত হস্তে পবিত্ৰ পত্ৰখানা গ্রহণ করিল।
পিতা গম্ভীর ভাবে বলিলেন “শােন, তােমাদের এখন
তরুণ বয়েস, এ বয়সে প্রায়ই মানুষের হিতাহিত বিবেচনা
শক্তি থাকে না, এ বয়সে তারা একটা রােখের বশে
চলে থাকে। একদিন আমারও এ দিন ছিল, যেদিন রােখের
বশে-থাক সে কথা; তোমায় বলি, তুমি বিদ্বান, বিদ্যার
সার্থকতা যে জ্ঞান, সেই জ্ঞানের দ্বারা নিজের মনােবৃত্তিকে
মার্জিত করে তুলো, স্রোতের মুখে তৃণের মত ভেসে যেয়ে
না। আমি তােমার বিয়ের সম্বন্ধ ঠিক করেছিলুম, তুমি

জানিনে তার এই বিবাহিত জীবনটর আগে,
আয়ুষ্মতী
আমার সে সঙ্ক ব্যর্থ করে অপরিচিত কোন একটা
বাপিকাকে জীবনের সঙ্গিনী করলে জানিনে। এও
কে সে, কোথা হতে এসেছে, বা এর পরে তার কি ঘটতে
পারে। খেয়ালের বশে তাকে সঙ্গিনী করলে, হয় তাে
এমনও হতে পারে, জানতে পারবে, সে-
হঠাৎ থামিয়া গিয়া তিনি বলিলেন “না, ভবনের
কাছে প্রার্থনা করছি, তােমার জীবনটা যেন সুখময় হয়,
দুঃখের কণামাত্র যেন তােমাকে বইতে না হয়। প্রথমটা
আমার অত্যন্ত রাগ হয়েছিল, দুঃখ হয়েছিল, কিন্তু এখন
আমি তোমায় আশীৰ্বাদ করছি। যাও, তোমায় আর
আমার দরকার নেই। কিন্তু কাল সকালে তােমার
যাওয়া চাইই, আমার পুত্রবধূর পাকস্পর্শ বিশেষ সমারােহের
সঙ্গেই হবে।”
ধীরে ধীরে পবিত্র বাহির হইয়া গেল।
গমনশীল পুত্রের সুঠাম সুদীর্ঘ দেহের পানে চাহিয়া
ভবশঙ্কর একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিলেন, স্বৰ্গগতা পত্নীর
স্মৃতি বহুকাল পরে তাহার মনে জাগিয়া উঠিল।
সে বড় কম দিনের কথা নয়, তেইশ বৎসর পূর্বে
ছয়মাসের শিশু পবিত্রকে রাখিয়া সাধ্বী সতী পতিব্রতা

আয়ুষ্মতী
পত্নী চক্ষু নিমীলিত করিয়াছিলেন। পবিত্রের ছোট
মাসীমা উমা তখন মাত্র দ্বাদশবর্ষীয়া বালিক, বাল
বিধবার আর কেহ না থাকায় দিদির সংসারেই থাকি-
(তন। এই মেয়েটা পবিত্রকে বুকের মধ্যে টানিয়া লইয়া
মানুষ করিতে লাগিলেন।
নামে মাসীমা হইলেও পবিত্রের যথার্থ মা তিনিই।
গর্ভধারিণী মা তাহাকে অতি শিশু রাখিয়া গিয়াছেন, উমা
তাহাকে জগৎ চিনাইয়া দিলেন।
বাস্তবিক উমা ছিলেন বলিয়াই পবিত্র বঁচিল, নচেৎ
মায়ের সঙ্গে সঙ্গে বােধ হয় সেও চলিয়া যাইত।
আজও উমা এই সংসারের কত্রী, পবিত্রের মাসীমা।
উমার সুব্যবস্থায় সংসার যথাক্রমে চলিতেছে, নচেৎ এ
সংসার বোধ হয় একটা দিনও থাকিত না, কোথা হইতে
কি উড়িয়া যাইত, তাহার কিছুমাত্র ঠিক নাই।
'?
পবিত্র যতটা প্রলয়কাণ্ডের আশা করিয়াছি, ততটা
হইল না, ইহাতে তাহার মনটা অত্যন্ত প্রসন্ন হইয়া উঠিল।
বিবাহটা যথার্থই সে রােখের বশে করিয়া ফেলিয়াছিল।

আয়ুষ্মতী
পূরবী মেয়েটা দেখিতে সুন্দরী, কিন্তু তাহার পরিচয় সে
কিছুই পায় নাই, পরিচয় গ্রহণ করিবার আবশ্যকতাও
বােধ করে নাই। বন্ধুরা এই বিবাহ যাহাতে রহিত হয়
তাহার চেষ্টা করিয়াছিল, কিন্তু তাহাতে তাহার জেদ
আরও বাড়িল বই কমিল না।
পূরবীর দাদামহাশয় অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে কন্যাদান
করিয়া নিশ্চিন্ত হইলেন। এ সংসারে পূরবীর সাল ছিল
এই দাদামহাশয়টী, আর কেহই তাহার ছিল না। মা বাপ
কবে যে অনতে বিলীন হইয়া গিয়াছে, সে কথা তাহার
মনেই নাই। জ্ঞান হইয়া অবধি সে দাদামহাশয়কে দেখিয়া
আসিতেছে, আর আপনার লােক কাহাকেও সে জানে না।
বিবাহের রাত্রে সে পূর্ণ দৃষ্টিতে পবিত্রের পানে চাহিল,
তাহার হৃদয় পূর্ণ হইয়া উঠিল, পবিত্রের অনিন্দ্য কান্তির
মধ্যে সে আপনাকে হারাইয়া ফেলিল।
বিবাহের পরদিনই পবিত্র চলিয়া গেল, যাইবার সময়
সে বলিয়া গেল, সে পিতাকে সব কথা জানাইয়া পূরবীকে
বাড়ী লইয়া যাইবে।
চারদিনেব কথা সে বলিয়া গিয়াছিল, কিন্তু চারদিনের
স্থানে দশ বার দিন চলিয়া গেল, তাহার কোনও সংবাদ
পাওয়া গেল না।
০

আয়ুষ্মতী নাতনীর সিন্দুর-শােভিত সীমন্তের পানে চাহিয়া বৃদ্ধ জলধর আর দীর্ঘনিঃশ্বাস রােধ করিতে পারেন না। অব- শেষে তাহাকে সম্পূর্ণ গােপন করিয়া, তিনি সব কথা ধুলিয়া ক্ষমা চাহিয়া বেহাইকে একখানা দীর্ঘ পত্র লিথিয়। ফেলিলেন। সেই পত্ৰই ভবশঙ্করের হস্তগত হইয়াছিল। পত্ৰখানা পাঠাইয়া দিয়াও তিনি নিশ্চিন্ত হইলেন না, কে জানে ঠিকানা ভুল হইল না তো। “দিদি, ঠিকানাটা একবার দেখি, যেখান। পবিত্র দিয়ে গেছে তােকে।” পূরবী তখন উনানে আগুন দিতেছিল, বাহিরে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল “কি দাদা?” জলধর জিজ্ঞাসা করিলেন “পবিত্রের ঠিকানাটা তোর কাছে আছে না?” পূরবীর মুখখানা আরক্ত হইয়া উঠিল, সে নিজের বাক্স হইতে পবিত্রের লেখা ঠিকামার কাগজখানা আনিয়া দাদামহাশয়ের হাতে দিয়া সরিয়া পড়িল। পবিত্রের সহিত তাহার পবিত্র বিবাহ-বন্ধন, সে তো না হয় আজ কয়দিনের মাত্র, কিন্তু ইহার বহুপূৰ্ব্ব ইতেই পবিত্র তাহাদের পরিচিত। এই বৃদ্ধ দাদামহাশয় ও নাতনীটিকে পবিত্র বরাবরই অত্যন্ত দয়ার চোখে দেখিত,

আয়ুষ্মতী
১২।
এবং অনেক কাল হইতে ইহাদের সাহায্যও করিয়া আসি-
এই অসীম দয়ার বশবর্তী হইয়াই সে পঞ্চদশ
বর্ষীয়া পূরবীকে বিবাহ করিয়া বৃদ্ধকে দারুণ দায় হইতে
উদ্ধার করিয়াছে।
পুরবী উনানে আগুন দিতে দিতে পবিত্রের কথাই
ভাবিতেছিল, আর তাহার দুইটা বড় বড় চোখ ধীরে ধীরে
অপূর্ণ হইয়া উঠিতেছিল।
নিষ্ঠুর--
কথাটা আপনা
আপনি বলিয়া ফেলিয়াই সে
চমকাইয়া উঠিল। সে নিঠুর বলিতেছে কাহাকে,
পবিএকে ? পবিত্র এ পর্যন্ত যে ব্যবহার তাহাদের সহিত
করিয়াছে, তাহা নিষ্ঠুরতার পরিচায়ক, না, অসীম দয়ার
নিদর্শন ? ছিঃ, সে কাহাকে নিষ্ঠুর বলিতেছে,যে
দয়বান, কৃপাবান তাহাকে ?
স্বামীর সাহত্ত্বের কথা ভাবিতে গিয়া কখন তাহার
চোখের জল মিলাইয়া গেল, তাহার চক্ষু প্রদীপ্ত হইয়া
উঠিল ; সে দুই হাত কপালে ঠেকাইয়া বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠ
বলিয়া উঠিল, “তিনি যে আমার দাদামশাইকে ভীষণ দায়
হতে উদ্ধার করেছেন, আমার কুমারী নাম খণ্ডন করে
সধবা নারী শ্রেণীতে স্থান দিয়েছেন ভগবান, তার মঙ্গল

আয়ুষ্মতী
কর। তিনি আমার গ্রহণ করুন বা না করুন, আমি
যেন সারা জীবন কালের মধ্যে এক টাবারের জন্যও তার
গুণগান করতে বিরত না হই।”
সন্ধ্যার পরে জ্যোৎস্নালােকিত ছাদের উপর বেড়াইতে
বেড়াইতে সে এই কথাই ভাবিতেছিল।
কোন সুদূরে
সেই পল্লীগ্রামখানি, তাহার চিরকাঙ্ক্ষিত স্বামী ভবন।
আজ এমনি সময়ে এমনি শুভ্র চাদের আলােয় সে ভবনটী
সিক্ত হইয়া গিয়াছে। গ্রামের মুক্ত বাতাস মুক্ত ভাবে বহিয়া
যাইতেছে। গ্রামের উন্মুক্ত আকাশের তলে গাছের বন
পাতার আড়ালে লুকাইয়া পাখী অবাধ গান গাহিতেছে ।
আর এই সুদূর কলিকাতায়—
“দিদি—দিদিমণি, পূরবী
“কি দাদা-
স
দাদামহাশয় নিচে হইতে ডাকিলেন “এ দিকে আয়
একবার, দেখে যা কে এসেছে ।
কে আসিয়াছে, স্বামী আসিয়াছেন কি ? পূরবীর
বুকটা পুকাবেগে কাপিয়া উঠিল।
তখনই সে সে আবেগকে দমন করিয়া ফেলিল-না,
তিনি কেন, তিনি নহেন। আর কেহ হয় তো আসিয়াছে,
দাদু তাই ডাকিতেছেন।

আয়ুষ্মতী ১৪ নিচে নামিতেই সে দাদামহাশয়ের গৃহে আর একটা লোকের কবর শুনিতে পাইল। এ স্বর তাহার চির- পরিচিত, বুকের মধ্যে স্তরে স্তরে এই সুরই জমিয়া আছে। পবিত্র ফিরিয়াছে। সে দয়াবান, সে প্রতারণা করে নাই, একটা নারী-হৃদয় একেবারে ব্যর্থ করিয়া যায় নাই, সে ফিরিয়া আসিয়াছে। রাত্রে স্বামী-স্ত্রীর মিলন হইল। পবিত্র জিজ্ঞাসা করিল, “চারদিনের যায়গায় এতদিন হয়ে গেল, তুমি কি ভাবছিলে পূবৰী ?” পূরবী মাথা নাড়িয়া বলিল “কিছুই না।” “কিছুই না বই কি ?* পবিত্র তাহার মুখখানা নাড়িয়া দিয়া বলিল “এটা তােমার একেবারে মিথ্যে কথা পূরবী ; নিশ্চয়ই ভাবছিলে জুয়াচোর, ঠক, কেমন ? পূরবী তাহার মুখখানা চাপিয়া ধরিয়া বলিয়া উঠিল, অমন কথা বলে না, 'মুখেও এন না। আমার ভাবনা কি বল। আমি কোথাকার কে, দরিদ্র, নগণ্য একটা নারী মাত্র, তুমি দয়া করে আমায় স্ত্রীরূপে গ্রহণ করেছ— “চুপ, চুপ, বড় বেশী বলে যাচ্ছ, পূরবী, তােমার চেয়ে তােমার কথাটার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশী, সেটা মনে করে কথা বল।” •

আয়ুষ্মতী
পূরবী রুদ্ধকণ্ঠে বলিল “পথের ধূলোকে আদর করে
মাথায় যদি স্থান দাও, সে যে সেই ঘৃণ্য ধূলো মাত্র তা সে
কিছুতেই ভুলবে না। আর সত্যিও সে কথা যে সে
ধূলােই থাকবে, সােণার মত দ্যুতি ধরবার কিম্বা সােণার
সমান মূল্যে দাঁড়াবার ক্ষমতা তার কিছুতেই নেই। তুমি
আমায় আদর করে গ্রহণ করলেই কি আমি ভুলে যাব
আমি কি? পথের ভিখারিণী হতে রাজরাণী হয়ে কি ভুলে
যাব—আমি কি ছিলুম ?”
ব্যগ্রকণ্ঠে পবিত্র বলিল, “যাক যাক, ও সব কথা ছেড়ে
দাও। ধূলাে আর স্বর্ণরেণুর তুলনা করবার জন্যে আমি বিশেষ
ব্যস্ত নই, তা বোধ হয় জানছে। আর যদি সে তুলনা
দিতে তুমি চাও, তবে আমায় অতটা উচু না করে নিচের
পদবীতে ফেল। ধূলাে রাজার মাথায় স্থান পায় না, কিন্তু
রাজার শক্তি যে প্রজা, সেই প্রজা কৃষকের কাছে ধূলো
কি রকম আদরের জিনিস তা বোধ হয় জান। কৃষক ধান
তােলে, আবার প্রার্থনাও করে রাখে, আসছে বছর যেন
এই ধূলাে মাথায় গায়ে মেখে সে জীবন ধারণের সার্থকতা
লাভ করতে পারে।
পূরবী শুধু জলভরা বড় বড় দুইটা চোখ মেলিয়া
স্বামীর দিকে চাহিয়া রহিল-এত বড় মহান্ কথার

আয়ুষ্মতী
উপর তাহার তুচ্ছ কথা পাড়িবার সাহস আর তাহার
হইল না।
পবিত্র বলিল “এখন আমার বাড়ীর কথা শুনবে পূরবী,
না, ওই সব তুচ্ছ কথায় আপনাকে একেবারে মগ্ন করে
রাখবে, বল?”
ধীর কণ্ঠে পূরবী বলিল, “বাবা শুনেছেন?”
পবিত্র বলিল, “দাদামশায়ের পত্ৰখান। তাকে সব কথা
জানিয়ে দিয়েছে। এক রকম হল ভাল, কেন না, এ কথা
যে কি করে আমি তাকে বলব তা কিছুতেই ভেবে ঠিক
করতে পারছিলুম না। আমার সামনে যে কি বিপদ
জাগছিল, তা বােধ হয় অনুভবে কতকটা বুঝতে পারবে
পূরবী। বাবার বংশমর্যাদার জন্যেই আমার বড় ভয় ছিল,
ভেবেছিলুম, তার সেই বংশমর্যাদা আমার দ্বারা নষ্ট হল,
তিনি কখনও এ সহ্য করবেন না; কিন্তু বেশী আশ্চর্যের
কথা—তিনি সহজেই এটা মেনে নিলেন।”
বিস্ময়ে পূরবী বলিল “মেনে নিলেন ?”
উৎসাহিত কণ্ঠ পবিত্র বলিল “নিলেন বই কি?
প্রথমটার আমায় খানিকটে বলেন, তার পর হুকুম
দিলেন, আমায় আজ এখানে এসে তােমায় নিয়ে যেতে
হবে। তােমার যে আমার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে, অত বড় একটা

১৭
আয়ুষ্মতী
সম্মাননীয় বংশের একমাত্র বধু তুমি, এটা বিশেষ
সমারােহের মধ্যে দিয়ে সব লােককে জানিয়ে দিতে হবে,
আনন্দে পূরবীর চোখ দুইটী প্রােজ্জ্বল হইয়া উঠিল।
সে তবে তাহার স্বামিভবনে প্রবেশ করিবার অনুমতি
পাইয়াছে। তাহার এতদিনকার প্রার্থনা নারায়ণের
চরণােপান্তে পৌঁছিয়াছে, তাহার প্রার্থনার ফল সে
পাইয়াছে।
মনের আবেগে সে, সে রাত্রে কত কথাই বলিয়া ফেলিল
ঠিক নাই, এত কথা সে জীবনে কখনও বলে নাই।
“দাৎকে বলেছ ?”
পবিত্র মাথা নাড়িয়া বলিল, “না, তাড়াতাড়িতে তােমায়
নিয়ে যাওয়ার কথা বলতে পারি নি। সকালে বলব এখন
সে কথা।”
পরদিন সকালে পবিত্র জলধরের কাছে বলিল, “বাবা
আপনার নাতনীকে নিয়ে যাবার জন্যে আমায় পাঠিয়ে
দিয়েছেন।”
বৃদ্ধ তখন একখানা অতি পুরান জীর্ণ খাতায় কি
পড়িতেছিলেন, ধীর কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিলেন কাকে,
পূরবীকে ?”

আয়ুষ্মতী
১৮
পবিত্র উত্তর দিল “হ্যা।”
জলধর বলিলেন “তােমার বাবার মত হয়েছে ? রাগ
করেন নি, তুমি তার অমতে বিয়ে করেছ শুনে ?”
সংক্ষেপে পবিত্র উত্তর দিল “না।”
“ভারি খুসি হয়েছি শুনে। নিয়ে যাবে—আচ্ছা, তা
নিয়ে যেয়ো, আমার তাতে আর কি আপত্তি থাকবে
ভাই ? তােমার জিনিস, তােমার যা ইচ্ছা তাই এখন
করতে পার। এতটুকু বেলা হতে মানুষ করেছি, এই
পনেরটা বছর আমারই কোলে মানুষ হয়েছে। প্রথমটায় –
তা একটু কষ্ট হয় বই কি। না,তার আর কষ্টই বা
কি– তবে-
তাহার মলিন চোখ দুটি বুঝি ধীরে ধীরে অপূরিত
হইয়া উঠিতেছিল। মুখখানা আরও নিচু করিয়া তিনি ঝ
করিয়া চোখ দুইটা মুছিয়া ফেলিয়া বলিলেন, “বেশ তো,
এর বেশী আনন্দের কথা আর কি থাকতে পারে, কেই বা
আশা করতে পারে।” বলিতে বলিতে তিনি হাসিয়া
উঠিলেন।
এ হাসি যে কিসে তৈয়ারী, তাহা পবিত্র
* বুঝিয়াছিল, তাই সে মাথা নত করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল।
পূরবী চলিয়া যাইবে—বৃদ্ধ দাদামহাশয় ভারী ব্যস্ত।
তাহার জন্য বাজারে বাজারে ঘুরিয়া বাক্স, সাবান কাপড়

আয়ুষ্মতী
১
সেমিজ প্রভৃতি কিনিতেছিলেন, সিন্দুরের কোটা কাটা
চিরুনি প্রভৃতি কিছুই বাদ গেল না।
এই সব কিনিতেছিলেন আরথাকিয়া থাকিয়া তাহার
চোখ দুইটা জলে ভরিয়া উঠিতেছিল, মনে হইতেছিল, পনের
বৎসরের মধ্যে একটা দিন যাহাকে কোলছাড়া করেন
নাই, সে আজ চলিয়া যাইতেছে ; কে জানে কতদিন বাদে
সে ফিরিবে ।
বেলা প্রায় বারটার সময়ে ঘৰ্ম্মসিক্ত দেহে হাঁফাইতে
হাঁফাইতে জলধর দুজন কুলীর ঘাড়ে সওদা চাপাইয়া বাড়ী
আসিয়া পৌছিলেন।
ব্যস্ত পূরবী তাড়াতাড়ি তাহার হাত হইতে বেশী গুটি
কত জিনিস নামাইয়া লইয়া, তাহাকে বসাইয়া জিনিসপত্র
সব গৃহে তুলিল। জলধর সহাস্যমুখে সবগুলি তাকে
বুঝাইয়া দিতে লাগিলেন।
অনর্থক এতগুলা টাকা ব্যয়ের কথা শুনিয়া পূরবী রাগ
করিয়া বলিল, “আচ্ছা দাদু, এত টাকা খরচ করে এই
জিনিসপত্র কেনবার কি মানে ছিল ?
দাদুর প্রফুল্ল মুখখানা নাতনীর এই তিরস্কারে
শুকাইয়া এতটুকু হইয়া গেল। তিনি আমতা আমতা করিয়া
বলিলেন “তুই চলে যাবি দিদি, একেবারে খালি হাতে,

আয়ুষ্মতী
সত্যিই একটা হাড়ি বাগদির মেয়ের মত উঠবি সেখানে,
তাই এই গোটাকত জিনিস কিনে আনলুম। এমনই
তো কপাল যে তাের হাতে শুধু কাচের চুড়ি দিয়েই
পাঠাতে হচ্ছে, তা আর কি করব ? সম্বলের মধ্যে আছে
এই ছােট গুটি তিনেক ঘর নিয়ে ছােট বাড়ীখানা, আর
পেনসান কুড়িটী টাকা মাসিক আয় মাত্র—
রক্তিম মুখে পূরবী বলিল “তারই তো এই ষাট সত্তর
খানেক টাকা জলাঞ্জলি দিয়ে এলে দাঃ। কুড়ি টাকা
মাসিক আয় হতে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে যা দুটি একটা টাকা
সঞ্চয় করেছিলে, তা এমনি করেই ঘুচিয়ে দিলে; এর পর
তােমার কি উপায় হবে বল তো?”
দাদা মহাশয় নিজের কেশশূন্য মাথায় হাত বুলাইতে
বুলাইতে অক্ষুটে যেন আপনা আপনিই বলিলেন, আবার
আসছে মাসে কুড়িটা টাকা তো পাব। একটা মানুষ
মাত্র, আলু সিদ্ধ ভাত খেয়েই একটা বেলা কেটে যাবে,
আর একটা বেলাযা হয় কিছু খেয়ে-
তাহার সেই মুখখানার পানে চাহিয়া হঠাৎ উচ্ছ্বসিত
হইয়া কাঁদিয়া উঠিয়া পূরবী চলিয়া গেল।
এমনি করিয়াই বৈকাল আসিয়া পড়িল, সন্ধ্যার ট্রেণে
তাহারা যাইবে, এখনই বাহির হইতে হইবে।
=

২১
আয়ুষ্মতী
দাদুকে বিদায় প্রণাম করিতে গিয়া পূরবী কাদিয়া
আকুল হইল। অতি কষ্টে আপনাকে সামলাইয়া লইয়া
দাদু তাহাকে বুকের মধ্যে টানিয়া লইয়া বিকৃত কঠে
বলিলেন “কাঁদছিস কেন দিদি, মেয়েদের বাঞ্ছিত স্বামিগৃহে
যাচ্ছিস, এ যে বড় সৌভাগ্যের কথা। প্রাণভরে আশীর্বাদ
করছি, যেন স্বামী গৃহেই তাের জীবন কেটে যায়, কোন
দিনকার কলঙ্কের বাতাস তাের গায়ে এসে যেন না লাগতে
পারে।
পূরবী উচ্ছসিত রােদন চাপিতে চাপিতে বলিল “তুমি
সেখানে যাবে না দাদু ?”
পবিত্ৰ পিছন হইতে ব্যগ্রকণ্ঠে বলিল “আপনি যাবেন
দাদু, বউভাতের সময় বাবা আপনাকেও নিমন্ত্রণের
চিঠি দেবেন।”
“বাব দাদু-নিমন্ত্রণ পেলেই যাব।”
বিদায় লইয়া তাহারা উভয়ে চলিয়া গেল।
যতক্ষণ দেখা যায়, বৃদ্ধা শুনয়নে চাহিয়া রহিলেন।
তাহার পর ফিরিয়া গিয়া বিছানায় শুইয়া পড়িলেন।
সে দিন তিনি আর উঠিলেন না, রাত্রে আহারাদিও
করিলেন না, তাঁহার প্রিয় হুক কলিকা অনাস্বাদিত
অবহেলিত পড়িয়া রহিল।

নূতন বধু আসিয়াছে, শুধু বাড়ীতে বলিয়া নয়, গ্রামেও
একটা গোল উঠিয়াছে। এই বিস্ময়কর বিবাহ, বিস্ময়ের
পাত্রী নববধুকে দেথিতে দলে দলে গ্রামের মেয়েরা আসা
যাওয়া করিতেছে।
জমীদারের একটা মাত্ৰ পুত্রের এরূপ গােপন বিবাহ
আশ্চর্যের কথাই বটে।
রামময় মুখােপাধ্যায় তামাক টানিতে টানিতে মাথা
দুলাইয়া বলিলেন “হু', নিশ্চয়ই এর কোনও কারণ আছে,
নইলে এমনটা হয়? এত গােপনে—গা ঢাকা দিয়ে বিয়ে ;
আচ্ছা রােসো, আমি সবই বের করে নিচ্ছি। যদি না
পারি আমার নাম রামময় মুখুয্যেই নয়।
ভগবানের আশ্চৰ্য্য সৃজন এই পল্লীবাসী বৃদ্ধ গুলা,
ইহাদের উর্বর মস্তিষ্কে যথার্থই অনেক চিন্তা স্থান পায়,
এবং ক্রমে বড় বৃক্ষরূপে পরিণত হয়।
রামময়ের এরূপ করিবার আরও কারণ ছিল।
জমীদারের সহিত কয়েকটা মােকর্দমায় হারিয়া গিয়া
তাহার জমীদার-বিদ্বেষ আরও বৃদ্ধি পাইয়াছে। এমন
এক দিন ছিল, যে দিন তিনি সমান চালে জমীদারের

আয়ুষ্মর্তী
সহিত চলিয়াছেন, শুনা যায়, দশ এগার পুরুষ পূর্বে
ইহাদের সব একই ছিল, দশ এগার পুরুষ মাঝে ব্যবধান,
পুরুষানুক্রমিক বিবাদ ক্রমশঃ বৃদ্ধিই পাইতেছে।
অদৃষ্টের বশে রামময় শেষ কালটায় ক্রমাগত হরিয়াই
যাইতেছিলেন। যত হারিতেছিলেন ততই তাহার বিদ্বেষ
বাড়িয়া চলিতেছিল। এখন তিনি ভবশঙ্করের সামান্য
একটু ত্রুটি খুঁজিবার জ ব্যস্ত। যেরূপেই হােক, সকলের
চোখে তাহাকে অপদস্থ করাই তাহার ইচ্ছা।
এই গোপন বিবাহের পঙ্কোদ্ধার করিবার জন্য রামময়
উঠিয়া পড়িয়া লাগিলেন,-ভদ্রলােকের কাহার নিদ্রা
এককালে দূরীভূত হইয়া গেল বলিলেও চলে।
উমা পবিত্রের পত্নীকে পাইয়া যথার্থই বড় আনন্দিত।
হইয়াছিলেন। সেই আনন্দের মধ্যে তাহার চক্ষু দিয়া জল
গড়াইয়া পড়িয়াছিল, স্বর্গগতা ভগিনীকে উদ্দেশ করিয়া
নীরবে তিনি প্রণাম করিলেন।
পবিত্র ও পূরবীকে প্রথমেই তিনি ঠাকুর ঘরে লইয়া
গিয়া প্রণাম করাইলেন। তাহার পর ভবশঙ্করের শয়ন কক্ষে
উভয়কে লইয়া গিয়া, দেয়ালে বিলম্বিত মৃত ভগিনীর ফটো
দেখাইয়া, বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলিলেন, “একে প্রণাম কর
পবিত্র, তুমিও প্রণাম কর না।”

আয়ুষ্মতী
২৪
পবিত্র বিদ্রোহীভাবে বলিল “কেন?”
বিস্ময়ের সুরে উমা বলিলেন, “কেন আবার কি পাগলা
ছেলে? তাের মা যে, প্রণাম করবি নে ?”
পবিত্র উমার শান্ত স্নিগ্ধ মুখখানার পরে দৃষ্টি রাখিয়া
বলিল “এটা আমায় ভুল বুঝাচ্ছ মা। আমার মা একমাত্র
তুমি, এ জগতে আর আমার কেউ মা নেই। ছবিকে
আগে প্রণাম করে আমার কি তৃপ্তি হবে না, আমি আগে
তােমারই পায়ের ধুলো মাথায় দিই।”
নত হইয়া সে উমার পায়ের ধূলে তুলিয়া মাথায়
দিল।
“আ ছি ছি বাবা, কি করিস, তার কিছু ঠিক নেই”
বলিতে বলিতে উমা তাহার মুখখান বুকের ভিতর চাপিয়া
ধরিলেন, উদ্বেলিত অশ্রু আর মানা মানিল না, সকল মানা
অতিক্রম করিয়া তাহা পবিত্রের মাথার উপর ঝর ঝর
করিয়া পড়িতে লাগিল।
“ওরে, আমি যে তাের মাসীমা, এই যে তাের মা,
আমার দিদি। আচ্ছা পাগল, না হয় আমার বড় দিদি
বলেই প্রণাম কর, তাতে তাে কিছু তাের আসবে যাবে
।”
পবিত্র মাথা নাড়িয়া বলিল “না, তা আসবে যাবে

আয়ুষ্মতী
০
না। প্রণাম করছি, কিন্তু সেটা কেবল তােমার খাতিরে,
তােমার বড় বােন বলে, আমার মা বলে নয়।”
সে প্রণাম করিল, পূরবী ও প্রণাম করিল।
পুত্র ও পুত্রবধু আসিয়াছে সংবাদ পাইয়াও ধীর
প্রকৃতি ভবশঙ্কর ব্যস্ত হইয়া উঠিলেন না। মনট। চঞ্চল
হইয়া নিশ্চয়ই উঠিয়া ছল, অবাধ্য মনকে তিরস্কার করিয়া
ধীরে সুস্থে হাতের কাজ শেষ করিয়া ঠিক নিয়মিত সময়েই
অন্তঃপুরে আসার জন্য ভবশঙ্কর গাত্রোত্থান করিলেন।
দেওয়ান বনমালী রায় বলিলেন “খােকা বাবু সেই
ভােরবেলা বউমাকে নিয়ে এসেছেন, বেলা একটা বাজে,
আপনার একবারও এর মধ্যে বউমাকে দেখার অবকাশ
হল না বাবু?”
তাড়া দিয়া উঠিয়া ভবশঙ্কর বলিলেন “নিয়ে এসেছে
ভালই, কাজ ফেলে রেখে আমাকেও যে ছেলেমানুষের
মত বউ দেখতে ছুটতে হবে, এমন কোনও কথা নেই।
বউ তো পালাচ্ছে না, হচ্ছে।”
তাড়া খাইয়া বৃদ্ধ বনমালী রায় আমতা আমতা করিয়া
সরিয়া গেলেন। ছোট বেলা হইতে এই বৃদ্ধ এ সংসারে
প্রতিপালিত, আজীবন তিনি কুমার, নারী মাত্রই তঁাহার
মা। সকলে তাহাকে ক্ষেপাইত,-বিধাতা বনমালী রায়ের

আয়ুষ্মতী
২৬
অদৃষ্টে বিবাহ লিখিতে ভুলিয়া গিয়াছেন। কথাটা যথার্থ ই
সত্য, তাই এই পঞ্চান্ন বৎসর বয়স পর্যন্ত বনমালী রায়
অবিবাহিত।
পবিত্র ছিল বনমালী রায়ের বড় প্রিয়। অন্তঃপুরে
মাসীমা উমার কাছ হইতে সে মাতৃস্নেহ পাইয়াছিল,
বাহিরে বনমালী রায়ের নিকট হইতে সে পিতৃস্নেহ লাভ
করিয়াছিল। পবিত্র যাহাতে দশটা লােকের মধ্যে একটা
লােক হইয়া মাথা তুলিয়া দাড়াইতে পারে, বনমালী রায়ের
দৃষ্টি সেদিকে বড় তীক্ষ ছিল। সেই পবিত্র বিবাহ করিয়াছে,
তাহার স্ত্রী আসিয়াছে, বনমালী রায়ের হৃদয়ে আনন্দ
ধরিতেছিল না।
আনন্দে অধীর তিনি—সম্মুখে যাহাকে দেখিতেছিলেন,
তাহাকেই এই সুসংবাদ দিতেছিলেন, পবিত্র বউ লইয়া
আসিয়াছে। বলিতে গেলে তাহার দ্বারাই এ সংবাদটা
সমস্ত গ্রামে বিস্তারিত হইয়া পড়িয়াছিল।
গ্রামের লােক আসিয়া বউ দেখিয়া গেল, আর পবিত্রের
যিনি পিতা, তিনি জমীদারির কাজে এত বিব্রত যে, পুত্রবধূর
মুখখানা দেখিবার অবকাশ পর্যন্ত তাহার নাই। বনমালী
রায় ছটফট করিয়া বেড়াইতেছিলেন, মনের মধ্যে অনেক
গুলা কঠিন কথা স্তরে স্তরে জমা হইতেছিল, কিন্তু সব
*

२१
আয়ুষ্মতী
কথা বলা হইল না, ভবশঙ্করের মুখ দেখিয়াই তাহাকে
পলাইতে হইল।
অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়াই বশঙ্কর পুত্রবধুর মুখ
দেখিলেন। উমা পার্শ্বে দাড়াইয়া উৎসুকনেত্রে তঁাহার
মুখের দিকে চাহিয়াছিলেন, কিন্তু ভবশঙ্কর একটা কথাও
বলিলেন না, নিজের মত ব্যক্ত করিলেন না, মুখখানাও
যেমন ছিল তেমনিই রহিয়া গেল, একটুও পরিবর্তিত হইল
। আশ্চর্য্য মানুষ যা হোক।
নিত্যকার মত আহারাদি শেষে একঘণ্টা বিশ্রাম
করিয়া ভবশঙ্কর বহিরে চলিয়া গেলেন। বাহিরে গিয়া
বনমালী রায়কে ডাকিয়া বলিলেন, “কতকগুলো জিনিসপত্র
কলকাতা হতে কিনে আনতে হবে তােমাকে, আর
এখানে আসছে রবিবারে সমাজ খাওয়ানো হবে, তার
বন্দোবস্ত কি করছ ?”
মাথা চুলকাতে চুলকাইতে বনমালী বলিলেন “আমি
তো কিছুই করছিনে তার জন্যে।”
“কিছুই করছ না?” উগ্ৰস্বরে ভবশঙ্কর বলিলেন “বেশ
লােক তুমি। আমার চেয়ে এ দিকে সব বিষয়ে তােমার
বুদ্ধি বেশী, এটার বেলায় এ রকম কঁচা কাজ করছ কেন?
দেখছ, পবিত্র বিয়ে করে বউ নিয়ে এল। জানো, যদিও

আয়ুষ্মতী
চুপি চুপি সে বিয়ে করেছে, তবু যে মেয়েটা আমার পুত্রবধূ
হয়েছে, তাকে এখন সমাজে পরিচিত করে দেওয়া তার
কাজ নয়, আমার কাজ। পাক স্পর্শ তো করতে হবে,
যাতে লোকে জানতে পারবে, পবিত্রের বিয়ে হয়েছে।
আর সেটা কিছু বেশী রকম সমারােহের মধ্যে দিয়েই করা
আমার ইচ্ছে ; তাই আমি ভাবছি, শুধু খাওয়ালেই হবে
, সকলের হাতে একটা করে টাকা দেওয়া যাবে--- আর
সমাজের প্রত্যেক বাড়ীতে পবিত্রের বিয়ে উপলক্ষে বড়া
থালা বাটা দিতে হবে, কেমন ?”
আনন্দে বনমালী রায়ের মুখ দিয়া কথা বাহির হইতে-
ছিল না, কিন্তু এ আনন্দ প্রকাশের স্থান নয়, তাহা হইলেই
এখনই ছেলেমানুষ বলিয়া তাহাকে তাড়া খাইতে হইবে।
“যে আজ্ঞে।
রামময় বাবুর বাড়ী পর্যন্ত
ভবশঙ্কর বলিলেন “নিশ্চয়ই। আসুন বা না আসুন,
আমাদের নিমন্ত্রণ করা অবশ্য কর্তব্য কাজ। আমি
এইবার সমাজসুদ্ধ লােকের নামের একটা তালিকা করি
গিয়ে মুহুরীকে নিয়ে, আর তুমি ও তােমার এ দিককার
কাজ সেরে এসাে আমার কাছে।”
ইহার পর অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তালিকা প্রস্তুত
হইয়া গেল, রামময় বাবুও বাদ পড়িলেন না।

আয়ুষ্মতী সেই দিনই বনমালী রায় মহা আনন্দে জিনিস- পত্রাদি কিনিতে কলিকাতায় যাত্রা করিলেন। মাঝের কয়টা দিন গােলমালের মধ্য দিয়া ঝা ঝ। করিয়া কাটিয়া গেল, রবিবার আসিয়া পড়িল। সমাজের লােক জমীদার-বাড়ী নিমন্ত্রিত। বাড়ীতে মহা কোলাহল পড়িয়া গিয়াছে। দাদামহাশয়ও আজ প্রাতে কলিকাতা হইতে আসিয়াছেন। তাহার পুরবীর শ্বশুরালয়, রাজা শ্বশুর, এ সব দেখিয়া তাহার হৃদয়ে আনন্দ আর ধরিতেছিল না। তিনি চারিদিক বেড়াইয়া দেখিতে- ছিলেন, অবসর মত বনমালীবাবু তাহার সহিত আসিয়া মিলিতেছিলেন। উভয় বৃদ্ধতে মিলিয়া গিয়াছিল বেশ। দুপুর বেলায় কৰ্ম্মান্ত বনমালী হাঁফাইতে হাঁফাইতে আসিয়া জলধরের পার্শ্বে বসিয়া পড়িলেন। জলধর তখন তামাক টানিতে টানিতে প্রসন্ন মনে চারিদিকে চাহিতে- ছিলেন। একদিকে যত ভদ্রের সম্মিলন। পিছনের দরজায় রাজ্যের ভিখারী আসিয়া জুটিয়াছে। তাহাদের কোলাহলে পিছন দিকটাও পূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে।

আয়ুষ্মতী
আকাশে পাতলা মেঘ ভাসিয়া আসিয়াছে, ফানের
রোতে তাই মন্দীভূত।
বাহির বাটীতে বিশাল
সামিয়ানার নিচে শত শত লােকের পাতা করিয়া দেওয়া
হইয়াছে, বসিলেই হয়।
একবার সম্মুখে, একবার পশ্চাতে চাহিয়া প্রফুল্ল মুখে
জলধর জিজ্ঞাসা করিলেন “এ সবই রাজাবাবুর প্রজা ?”
সগর্বে বনমালী হুকায় একটা টান দিয়া বলিলেন
“নিশ্চয়ই।
এই নিশ্চয়ই কথাটার মধ্যে খানিকটা মিথ্যা কথা
ছিল বই কি। কারণ, ইহার মধ্যে রামময় বাবুরও প্রজা
আছে, একা ভবশঙ্করেরই নাই।
কিন্তু প্রভুর মর্যাদা বাড়াইতে বনমালী অনায়াসে
গ্রামের পর গ্রামের নাম করিয়া চলিলেন, এবং সগর্বে
জানাইলেন, এ সবই তাহার প্রভুর জমিদারী।
আহার স্থানে পাতা পড়িয়াছিল, কিন্তু কেহই বসিল
না—একস্থানে সমবেত হইয়া গােল পাকাইতে লাগিল।
গোলমাল দেখিয়া বনমালী উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিলেন, বলিলেন
“আপনি একটু বসুন, আমি দেখে আসি ব্যাপারখানা
যেখানে অনেক লােক জমা হইয়াছিল, বনমালী

আয়ুষ্মতী
দেখিলেন, তাহাদের মাঝখানে দাড়াইয়া গম্ভীর মুখে
রামময় বাবু।
“এ কি, আপনারা সব দাঁড়িয়ে রইলেন যে? পাতা
হয়েছে, বসবেন চলুন ; রামময় বাবু, আপনিও চলুন।”
গম্ভীর কণ্ঠে রামময় বাবু বলিলেন “আমি খেতে
আসিনি।*
“খেতে আসেন নি।”
বনমালী একেবারে থতমত খাইয়া গেলেন—“খেতে
আসেন নি, তবে কি করতে এসেছেন ?”
তেমনি সুরে রামময় বাবু বলিলেন “সমাজের এতগুলি
লােকের যাতে জাতিপাত না হয়, যাতে তাদের জাতধৰ্ম্ম
অক্ষত অটুট থাকে, আমি তাই করতে এসেছি।”
“কিসে জাত ধৰ্ম্ম নষ্ট হবে রামময়, আমার বাড়ী
খেলে ?*
পিছন হইতে এই স্থির কথা শুনিয়া বনমালী সচকিতে
ফিরিয়া দেখিলেন, পিছনে দাড়াইয়া ভবশঙ্কর, তাহার দুটি
চক্ষু হইতে অগ্নি ঝরিয়া পড়িতেছে।
রামময় বাবু চোখ তুলিয়া সেই অগ্নিস্পর্শী চোখের
উপর ঠিক রাখিলেন; সংযত কণ্ঠে বলিলেন, “হ্যা, আপনার
বাড়ী খেলে লােকে জাত ধৰ্ম্ম হারাবে।
35

আয়ুষ্মতী
ভবশঙ্কর উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিয়া কি বলিতে যাইতে-
ছিলেন, হঠাৎ সে কথাটা সামলাইয়া লইয়া বলিলেন, “কিন্তু
সমাজের এই সব লােকেরাই তাে এই কয়েক মাস আগে
পূজোর তিন দিন আমার বাড়ীতে খেয়েছে, তখন ওদের
জাত ধৰ্ম্ম যায় নি ?”
স্থির ভাবে রামময় বাবু বলিলেন, “না তথন যায় নি,
যাবার কথাও ছিল না। এখন যাবার কারণ হয়েছে,
তাই কেউ খাবে না।”
“কি কারণ হয়েছে রামময় ?”
রামময় বলিলেন, “কারণ তপনার ছেলে এক বেশ্যার
মেয়েকে বিয়ে করে এনেছে, তাই সমাজ জানতে পেরে
আপনার বাড়ীর আহারাদি বর্জন করতে চায়।”
“বেশ্যার মেয়ে ? রামময়, মুথ সামাল করো।
ভদ্র,
লােকের মেয়ের নামে এ রকম অপবাদ, এ কথনই সহ
হয় না।”
ভবশঙ্কর কুদ্ধ সিংহের ন্যায় গর্জিয়া উঠিলেন, উপস্থিত
আত্মীয় স্বজন সকলেই প্রমাদ গণিলেন। কিন্তু রামময় বাবু
দমিলেন না। ধীরকণ্ঠে বলিলেন, “বিনা প্রমাণে আমি
একজন ভদ্রকন্যার উপরে এই দোষারােপ করছিনে ;
আপনার সঙ্গে আমার বিবাদ-বিসম্বাদ থাকতে পারে,

আয়ুষ্মতী
আপনার নির্দোষ পুত্রবধূর সঙ্গে নেই, কিম্বা তা নিয়ে
আপনাকে নির্যাতিত করতে আসি নি ।
সত্য যা
তাকে অনায়াসে সকল সময়েই সকলের সামনে প্রকাশ
করতে পারা যায়। যথা সারা
যথা সাধর। 'সত্যকে
সত্যকে অন্যায়ের
অনুরোধে কখনই চেপে রাখেন না, আর তা রাখতে
গেলেও থাকে না। করণ সত্যের জয় সৰ্বৰ, সৰ্বল।
তার উপর হাজার মিথ্যাব বােঝ। চাপও ना
কন, মচ্ছাদিত আপ্লনের মত সে
উঠবেই।”
কথা গুলা শে করিয়া এই যথার্থ সাধু লোক এক বার
বিশাল গুফ তা ন লন। তাহার উনার মুখখান।
দেখি নাই ? -মিম গেলেন, তাঁহার মুখ খান।
বিমা হইয়া উঠি ।
তীক্ষ দৃষ্টি নন!! ??? তাহৰ মুখখানা
দেখি "ইলেন, বললেন “মি আজ তিন দিন
কাট। শুনছি, ভেবেছিলুম
༢:༣
2
দময়। পতি; 5 সর্পের মত গর্জিয় ভবশঙ্কর বললেন
“আমি জানি, জেনে শুনে আমি
হঠাৎ তিনি থামিয়া গেলেন, কণ্ঠস্বর মুহূর্তে নরম

আয়ুষ্মতী ৩৪ করিয়া ফেলিয়া বলিলেন, “আজ তিন দিন তুমি জেনেছ, তবু এ খবরটা আমায় জানাও নি কেন রামময় ?” রামময়বাবু অপ্রস্তুতের মত মুখখানা করিয়া বলিলেন “সেইটুকুই আমার অায় হয়ে গেছে, তা আমি স্বীকার করছি। কিন্তু কি করে আমি জানাব বলুন? আর আমাকে ও তার পরেই সহরে যেতে হয়েছিল, আজ সকালে মাত্র ফিরে এসে শুনলুম সমাজ সুদ্ধ নিমন্ত্রণ, আমাকেও দয়া করে বাদ দেন নি। ভাবলুম--যাক নিমন্ত্রণ স্থলে গিয়েই সব বলা যাবে। তা বলে এত বড় একটা অনাচার যে সমাজের মধ্যে অনায়াসে চলে যাবে, তা কোন মতেই হতে পারে না। হিন্দুর জাত—এ কি বড় মুখের কথা ? হিন্দুর আর আছে কি ? একে একে সে সবই বিসর্জন দিয়েছে, জাতটাকে শুধু আঁকড়ে ধরে পড়ে আছে। এ জাত যদি যায় তবে হিন্দুর সব গেল। আর হিন্দু বলে পরিচয় দেবার মুখ তার আর রইল না। জাত- কি জানেন মশাই, বড় ঠুনকো জিনিস, যেন কাচের বাসন। লােহার মত শক্ত হলে ভাবার ভয় থাকত না, যা খুসি অনাচার এর মধ্যে চালালেও চলতে পারত, কি বলুন ? তিনি যতক্ষণ জাতির মর্যাদা প্রকাশ করিতেছিলেন, ৩৫ আয়ুষ্মতী ভবশঙ্কর ততক্ষণ রাগে জ্বলিয়া যাইতেছিলেন। রাম- ময়ের সংসারের কথা তাহার কাছে গোপন ছিল না। নিষি খোলস পৈতাখানা গলায় ঝুলাইয়া রাখিয়া, সমাজের চোখে বংশমর্যাদা জাতি গৰ্ব অক্ষুন্ন রাখিয়া যত কিছু ব্যভিচার সবই তিনি অনায়াসে করিয়া যাইতেন, কিছুই বাধিত না। আজ সে সব কথা ভবশঙ্কর বলিতে পারিতেন, কিন্তু বলিবার মত সময় এ তো নয়। তাহার নিজের গৃহের কলঙ্ক যে এ, তিনি যে একটা কথা বলার অধিকার আজ হারাইয়াছেন। সকলের মুখের পানে তিনি একবার চাহিলেন। নিমন্ত্রিতদের উদরে প্রবল ক্ষুধা, তাহারা আহারার্থ আসিয়াছে, ক্ষুধিত তৃষিত নেত্রে তারা পাতার পানে চাহিতেছে, তবু উদরের প্রবল ক্ষুধা, বক্ষের প্রবল তৃষ্ণা চাপিয়া ও তাহারা মাথা দুলাইয়া বলিতেছে, “হঁ্যা, এ ঠিক কথাই বটে। জাত–বাপরে, আমাদের আর আছে কি? জাত যদি যায়, আমরা তবে বেঁচে মরে থাক ব যে ! হ্যা, এ যথার্থ সত্য কথাই বটে। হিন্দুর আর কিছু নাই, গর্ব করিবার মত যাহা কিছু ছিল, সবই তাহারা হারাইয়াছে, তাহারা এখন আঁকড়াইয়া ধরিয়া আছে

আয়ুষ্মতী
এই জাতিটাকে। এত বড় ব্যভিচার-ভাবিবার কথা
নয় কি ?
ভবশঙ্কর খানিক চুপ করিয়া দাড়াইয়া থাকিয়া শেষটা
রুদ্ধ কণ্ঠে বলিয়া উঠিলেন “পবিত্র যাকে বিয়ে করে এনেছে,
সে যে যথার্থ বেশ্যার মেয়ে সে প্রমাণ তুমি আমায় দিতে
পারবে ?”
রামময় বাবু বলেন “নিশ্চয়ই পারব। আপনি
শােনা কথায় বিশ্বাস করতে চান না, এ তাে ভাল কথা।
পবিত্রের দাদাশ্বশুর শুনছি এসেছেন, তাকে ডাকুন,
সকলের সামনে তিনি নিশ্চয়ই এ কথা গোপন কর
রাখতে পারবেন না।
“সেই ভাল কথা-
ভবশঙ্কর পিছন ফিরিতেই
পাইলেন,
পবিত্রকে। সে প্রস্তুতে পরিণত হইয়া গিয়াছিল, তাহার
বুকের রক্ত জমিয়া আলিয়াছিল। আ জ তাহার চির
গতি, চিরমা: পিতা সমাজের চোখে একপ অবমানিত
হইলেন, ইহার কারণ কি সেই নয় ?
“পবিত্র—
পিতা গর্জিয়া উঠিলেন “য ----তোর আদরের দাদা-
শ্বশুরকে ডেকে আন।”

৩৭
আয়ুষ্মতী
ধীরে ধীরে পবিত্র সরিয়া গেল, ভবশঙ্কর অগ্নিবর্ষী
দৃষ্টিতে তাহার পানে চাহিয়া রহিলেন-“অপদার্থ--” এই
কথাটা একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাসের মত তাহার মুখ হতে
বাহির হইল ।
ধসের অমন পথে? সনে হার দুটি পড়িয়া -
ছি: গৃহাদের
দমন---: ক ? এই দারুণ
অপমান হইতে, মা রি-সংকক : বৃদ্ধ
যেন একেবারেই অন্তু কবে, মময়র এ কই? সপ
মি: হোক, নাম?
ক এ তানি
তার লা ই ন ::
নর মধ্যে ৩ ও মৃ শুন উছিল, মাঝখানে
দাড়াইয়া রামম বাবু। 'হা মুন: পুলক পূর্ণ হয়।
উঠিয়াছে, চক্ষু দুট: দীপ্ত ।
ধীরে ধীরে লধর আসিয়া বশরের সাথে দাইলেন,
তিনি পবিত্রের মুখে অy দুচার কথায় ব্যাপার। কতক
শুনিয়াছেন মাত্র, বিশ্বের কাসিম তাহার পথে কাপ্ত হইয়া
পড়িয়াছিল, চলিতে গিয়া পা দুখানা থর থর কঁপিতেছিল।
কতক্ষণ তিনি দাড়াইয়া রহিলেন, ' ঘৃণায় দুঃথে
লজ্জায় ভবশঙ্কর একটা কথা বলিতে সমর্থ হইলেন

আয়ুষ্মতী অনেক্ষণ পরে আপনাকে সামলাইয়া লইয়া কুব্ধ কণ্ঠে তিনি বলিলেন ব্যাপারটা শুনতে পেয়েছেন?” জলধর উত্তর দিতে গেলেন, কণ্ঠ কাপিয়া গেল- কি ? “এর বিরুদ্ধে কোনও কথা আপনার বলবার আছে ? আমি আপনাদের অপরিচিত, একটী বার মাত্র আপনার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, আপনার নাতনির সঙ্গেও তাই। পবিত্রও আপনাদের পরিচয় বিশেষ জানে না; ছেলে মানুষ সে, খেয়ালের ঝোকে আমায় কিছু না জানিয়েই বিয়ে করেছে। আপনাদের 'কেফিয়ৎ আপনা- দেরই দিতে হবে, আমরা দিতে পারব না।” একটু থামিয়া বিকৃত কণ্ঠে তিনি বলিলেন “শুধু আমারই নয়, পবিত্রের ও মান সম্রম মৰ্যাদা আপনার একটা কথার পরে নির্ভর করছে। সমাজের চোখে এখন একেবারেই ঘৃণ্য হতে পারি-শুধু আপনার একটা কথায়। বলুন, উত্তর দিন— জলধন থর থর করিয়া কাপিতেছিলেন। পৃথিবী তাহার চক্ষের সম্মুখে তখন গাঢ় অন্ধকারে নিমগ্ন, ভব- শঙ্করের কথা কাণে আসিতেছিল, চোখে তাহাকে দেখিতে পাইতেছিলেন না।

আয়ুষ্মতী
তাহার ভাব দেখিয়া সন্দিগ্ধ ভবশঙ্কর বলিলেন “বলুন—
উত্তর দিন, আপনার নাতনি যথার্থ (4ঙ্গাপভজাত কিনা?
বলুন সে-
বিস্ফারিত নেত্রে জলধর শুধু তাহার পানে চাহিয়া
রহিলেন।
অস্থির ভবশঙ্কর তাহার একখানা হাত চাপিয়া ধরিয়া
বলিলেন “এখনও চুপ করে দেখছেন কি? বলুন, সত্য ।
তাকে ব্যক্ত করে দিন। বলুন—স আপনার মেয়ের
সন্তান, আপনার মেয়ে---
“হ্যা—সে পতিতার গর্ভজাতা, আমার মেয়ে--
“হতভাগ্য—নরাধম”
জোরে অলধরের হাতখানা ছুড়িয়া
ফেলিলেন যে জলধর সে বেগ সামলাইতে না পারিয়া হুমডি
খাইয়া পড়িলেন।
জনতাব পানে ফিরিয়া রুদ্ধ কণ্ঠে ভবশঙ্কর বলিলেন
“যথার্থ কথা এ। রামময়, আমার জিনিস পত্র নষ্ট হল,
হােক, আমার অনেক অর্থ অপব্যয় হল—তাও হােক,
আজ আমার পরম বন্ধুর কাজ করেছ তুমি, আমায় এত
গুলি লােকের জাতিপাতরূপ মহাপাহক হতে রক্ষা করেছ।
ভগবান আছেন, নইলে আজ যথার্থ আমার সর্বনাশ হত ;

আয়ুস্মত
৪০
এতবড় একট, পাপ আমার দ্বারাই সমাজে আজ চলন
হয়ে যেত।
একবার জলধরের পানে তীব্র জ্বলন্ত চোখে চাহিয়া
দ্রুতপদে তিনি চলিয়া গেলেন। জনতা ও ক্রমে ক্রমে
ছড়াইয়া পড়িল। খাওয়া না হোক, জাতি তো বাচিয়া
গত, দরে প্রবল ক্ষুধার তাড়না সত্ত্বেও সকলেই এ কথা
মানিয়া লইল।
নির্জন গৃহের মধ্যে পড়িয়া মুহমান পূরবী, পার্শ্বে
বাস:: বৃদ্ধ জলধর।
আজ সাস্বনার এমন কোনও ভাষা নাই, যাহা জলধর
তাহার এই কাতরা নাতনীটির হৃদয়ে ঢালিয়া দিতে
পারেন। তিনি তাহার স্নায়খানা নিজের হৃদয় দিয়া অনুভব
করিতেছিলেন, তাই তিনিও আজ এ মুহূর্তে নির্বা।
নিজের হাতে তিনি আজ তাহার বড় আদরের নাতনীর
সর্বনাশ করিলেন, তাহার আশ্রয় ঘুচাইলেন। ইহার বেশী
যন্ত্রণা আর কিসে থাকিতে পারে, এ অপেক্ষা ভয়ানক
কথা আর কি হইতে পারে ? জগতে পূরবী ছাড়া তাহার
আর আছে কি?

৪১
ময়ুষ্মতী
কিন্তু তথাপি তিনি তো এ জীবন্ত সত্যকে গােপন
এ
রাখিতে পারিলেন না। তিনি তােমারিতেনই এ ঘটনা
একদিন ঘটিতে পারে, তাহার পূরবী একটীমাত্র কথায়
রাজরাণী হইতে পথের ভিখারিরও অধম হইতে পারে।
পবিত্র যখন তাহাকে ডাকি গেল, তখন তিনি তাহার
মুথে সামান্য দুই একটা কথা শুনিয়াই বুঝিতে পারিয়াছিলেন,
অঞ্জ (সেই প্রতি মুহূর্তের অপেক্ষি দিনটা আসিয়াছে।
৪ দিনে পিছাইয়া গেলে ও যে ফল, অপর হলেও সেই
যে সত্য উচ্ছাদিত ছিল, একবার মাত্র নাড়া
পাইয়া ক্রমে ক্রমে তাহা সেই স্মকেও নিজের রূপ দান
করিয়া ফেলিয়াছে, মিথ্যা সত্যের স্পর্শে জীবন্ত সত্যরূপেই
বিকাশ পাইয়াছে। ইহাকে এখন কি দিয়া ঢাকিয়া রাখা
যায় ? লোহ পর্যন্ত ইহার শকিতে বিগলিত হইয়া
পড়িবে যে।
তিনি গােপন করিতে পারিলেন না, এই অবশ্য প্রকাশ্য
কথার উপর আর কথা বলা বাজিবে না বলিয়াই স্বীকার
করিয়া লইলেন, হ, সে তাহাই, যাহা লােকে বলিতেছে।
পূরবীর পরবর্তী অবস্থার কথা যখন মােটামুটি ভাবেই
রিয়াছিলেন, তাহা যে এতদুর শােচনীয় হইয়া উঠিতে
পারে, তাহা তাহার ধারণাতেও আসে নাই।

আয়ুষ্মী
৪২
সারাদিন পুরবী আজ জলস্পর্শ করে নাই। বধূবেশ
তখনও তাহার হে,যে মুহূর্তে এই ভয়ানক কথাটা কাণে
আসিল, তাহার চারিপাশের মেয়েরা যখন ঘৃণার সহিত
পতিতার মেয়ে বলিয়া তাহাকে ত্যাগ করিয়া চলিয়া
গেলেন, তখনই সে বাতাহত কদলীর প্রায় লুটাইয়া
পড়িল। তার পর কখন দাদামহাশয় আসিয়া পার্শ্বে
বসিয়াছেন, সে তাহার কিছুই অবগত নয়।
অত বড় বাড়না—অত গােলমাল সব নীরব ;
বাড়ীতে যে মানুষ আছে, তাহাও জানা যাইতেছে না।
ঐজালিকের কুহকময় দণ্ডস্পর্শে মুহূর্তে কোলাহল মুখরিত
সৌধ যেন নিদ্রামগ্ন হইয়া পড়িয়াছে।
দাস দাসীগণ এঘর ওর করিতেছে, অতি সন্তর্পণে,
যেন কে ঘুমাইয়া পড়িয়াছে, একটু শব্দ হইলেই তাহার
নিদ্রাভঙ্গ হইবে। ভবশঙ্কর সেই দুপুর হইতে উপরের
ঘরে গিয়া দ্বার-রুদ্ধ করিয়াছেন, পবিত্র কোথায় উধাও
হইয়া গিয়াছে তাহার ঠিক নাই। আজকার এই কাণ্ডের
সেই যে মূল, তাহাতে তাহার অনুমাত্র সন্দেহ ছিল না।
উমা ঠাকুর-গৃহে পড়িয়া ছিলেন, বার-বার মাথা খুড়িতে
ছিলেন, তাঁহার আর্ত স্বরটা এক একবার কঠ চিরিয়া
বাহির হইয়া পড়িতেছিল—ঠাকুর, এ কাহার পাপে ?
৩

আম্মির্তী
যাহারই পাপে হোক, উমার মনে হইতেছিল, এই
সময়টায় পবিত্রের মা যে নাই এ ভালই ইয়াছে। তাহার
বুকে যে আঘাত লাগিয়াছে, পবিত্রের মায়ের বুকে যে
ইহার চেয়েও বেশী আঘাত লাগিত এই তার ধারণা।
অন্য সময় তিনি স্বর্গগতা ভগিনীর জন্য শােক করিলেও
এই সময়টা প্রাণ ভরিয়া বলিয়া উঠিলেন “বেশ করেছ
ঠাকুর, দিদিকে তুমি নিয়েছ, কিন্তু আমায় কেন এর আগে
নিলে না দেব, তা হলে আমাকেও তাে আজ এ জ্বালা
সইতে হত না।
সকলের চেয়ে বেশী মৰ্ম্মে আঘাত লাগিয়াছে কাহার?
পূরবী ভাবিতেছে আমি গিয়াছি, একেবারেই মরিয়াছি;
আর যে তাহাকে জীবনাপেক্ষা ভালবাসে, সে ভাবিতেছে
আমিই আমাকে হত্যা করিলাম, নারায়ণ, আমার এ
পাপের প্রায়শ্চিত্ত কি?
সন্ধ্যার মৃদু অন্ধকার বাহির আচ্ছন্ন করিবার আগে
গৃহ আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। বাহিরে তরল অন্ধকার ক্রমে
যত গাঢ়ত্ব প্রাপ্ত হইতে লাগিল, গৃহের অন্ধকার তত বেশী
বাড়িতে লাগিল।
একটা দীর্ঘনিঃশাসের সঙ্গে কথাটা উচ্চারণ করিয়াই

আয়ুষ্মতী
৪৪
পূরবী চমকাইয়া উঠিল--হা ভগবান, এ শব্দটা মুখে
আনিবার চেয়ে অনাই যে ভাল। (ক তাহার মা,
পতিতা একটা নারী, যে নিজের দেহ বিক্রয় করিয়া
“নারায়ণ,” আক্তভাবে অভাগিনী বাদিয়া উঠিল,
“পৃথিবীর শ্রেষ্টধন হতে আয় বঞ্চিত করলে প্রভু ?
যাকে দেখিনি যাকে তোমার উপরে ন দিয়েছি, তাকে
'এমন করে আমার ১ার সামনে আঁকলে? আমার মা
বলে ডাকবার অধিকারটুকু দিলে না গো ?
মৎস্যকে ভাল হইতে স্থলে পুলিশে সে যেমন করিয়া
আছড়াইতে থাকে, মাতৃনাম- পূরবীও তেমনি
ছটফট করিতে লাগিল; নিজ কক্ষে বসির দামহাশয়
দেখিতে লাগিলেন, তথাপি মুখ ফুটিয়' একটা সান্ত্বনার
বাণী তিন উচ্চারণ করতে পারলেন না।
খানিকক্ষণ ছটফট করিয়া হঠাৎ সে উঠিয়া বসিল,
দুই হাতে দাদামহাশয়ের একখানা হাত চাপিয়া ধরিয়া
উন্মাদিনীর মত বলিল “দাদামশাই—দাদামশাই, সত্যি কথা
বল, সত্যি বল, আমার মা, তােমার মেয়ে, সত্যিই সে
পতিতা একটা নারী ছিল? সেই পতিতা নারী—যারে
দেখলে ঘৃণায় লােকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, যাদের ইহলােক
আছে পরলােক নেই, যারা এই দেহটাকে কেনা-বেচার

৪৫
আয়ুষ্মতী
--
জিনিস মনে করে—দাদামশাই, বল দাদামশাই আমার
মা যার অদেখা মূর্তিটাকে মনের মধ্যে কল্পনা করে নিয়ে
আমি সতীরাণী দুর্গা-মুত্তিকে দেখেছি, -কোর সেই মা-
সে মা নয়, মেয়ে নয়, বােন নয়, সে পতিতা—সে স্বণ্য
পতিতা নারী মাত্র । দাদামশাই, আজ আমায় ভুলিয়ে
না, জগতের সামনে যার নগ্নমূৰ্তি বেরিয়ে পড়েছে, আমার
সনে তাকে ঢাকতে চেয়ো না, জগতের চোখে যে
পতা মূর্তিতে প্রকাশ হয়েছে, আমার সামনে তাকে
সতী মূৰ্তিত প্রকাশ করতে চেয়ো না; সত্যি বল দাদা-
মশাই তোমার পায়ে পড়ি, সত্যি বল সে যথার্থ কি-
“সে যথার্থই তাই দিদি, সে মহিমময়ী সতী নয়, সে
নকের প্রতিনা, সে রাক্ষসী।
হাহাকার করি। কালিয়া পূরবী দামশায়ের বুকের
উপর লুটাইয়া পড়িল, উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ বলিল “তবে কেন
মশাই, সব জেনে শুনে পতিতার মেয়ের বিয়ে দিলে
কন? যদি বিয়ে না দিত-তবে আজ এমন করে
তােমার মেয়ে। আমার মায়ের কলঙ্ক জগতে প্রকাশ
হতাে না, মা বলে ডাকতে গিয়ে এরকম যন্ত্রণায় আমার
বুকটা ছিড়ে পড়ত না। আমায় এনে এদেরও অপমান
| সইতে হত না। তুমি কি করলে দাদামশাই, পতিতার

• আয়ুষ্মতী
৪৬
G
মেয়ের বিয়ে দিয়ে সবদিকে আগুন ধরিয়ে দিলে যে।
আমিই যে আজীবনকাল জলে মরব দাদামশাই।
আগুনে
তােমার পূহে, তুমি বড় ভালবাস বলেই কি তাকে
এমনি করে বেড়াআগুনে ফেললে গো ?”
“দিদি আমার চোখের গুল বৃদ্ধ আর চাপিয়া রাখিতে
সমর্থ হইলেন না। “বুঝতে পারি নি দিদি, মুহূর্তের জন্যে
আপনহারা হয়ে গেছলুম। এতদিন অনেক আগেই যে
* তাের বিয়ে হয়ে যেত পূরবী, অনেক পাত্ৰই তাে এসেছিল ;
মনে তখনও এ জ্ঞানটা জেগে ছিল, তাই তাদের সব
ফিরিয়ে দিলুম। পবিত্রকে ফিরাতে পারলুম না, ভাবলুম,
আর কেন ? তাের জীবনটাকে সুখময় করবার লােভ আমি
সামলাতে পারলুম না, তাের বিয়ে দিলুম।
দাদামহাশয়ের বুকের মধ্যে মুখখানা রাখিয়া পূরবী
ফুপাইয়া ফুপাইয়া কাঁদিতে লাগিল। অনেকক্ষণ কাদিয়া
সে নিজেই শান্ত হইল। মুখখানা তুলিয়া কণ্ঠ পরিষ্কার
করিয়া বলিল, “দাদামশাই, একবার
কথা—আমার পাপিনী মায়ের কথা, তুমি তাে সবই
কাননা।”
একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া জলধর বলিলেন, “জানি
দিদি, সব কথা তােকে এক দিন বলব ভেবেছিলুম। তার পর
বলাে

৪৭
आइभको
তুই নিজের ইচ্ছামত বিয়ে করতিস, ভগবানের ইচ্ছায়
তা হল না।
“আঃ, তা যদি বলতে দাদামশাই কক্ষনে আমি
বিয়ে করতুম না।”
দুই হাতে সে মাথা টিপিয়া ধরিল, হৃদয়ের উত্তেজনা
কতকটা প্রশমিত করিয়া বলিল “বল দাদামশাই।”
তাহার অশ্রুসিক্ত মুখখানা বুকের মধ্যে চাপিয়া ধরিয়া
আবেগ রুদ্ধ কঠে দাদামহাশয় বলিলেন, “সে কথা এখন
শুনবি দিদি? হ্যা, এখনই শােন, এখনই এই অপমানের
মধ্যে দিয়েই সেটা শুনে নে। তাের দিদিমা তাের মা
বিধবা হওয়ার পরেই মারা যায়। বিধবা মেয়ে তারাকে
আমি বুকের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলুম, কেউ যেন তার
নাগাল না পায়; কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি তাকে আটক
করে রাখতে পারলুম না। একটা রাতের ভােরে আমি
ঘুম হতে উঠে আর তাকে দেখতে পেলুম না।
কোথায় গেল সে, খুজে খুজে কোথাও তার দেখা
পেলুম না, অবশেষে আমি আশা ছেড়ে দিয়ে বসলুম,
জানলুম সে মরে গেছে, সে আর নেই।
বছর আট নয় পরে তার খােজ পেলুম। অভাগিনী
ব্যারামে পড়ে আমায় খবর দিয়ে পাঠিয়েছে, একবার শেষ

আয়ুষ্মতী
৪৮
দেখা দেবার জন্যে। তার সুখের সাথীরা তখন তাকে
ফেলে রেখে চলে গেছে, তার আর কেউ তখন নেই যে
তার মুখে একট্রো জল দেয়।
কিছুতেই থাকতে পারলুম না। ভাবলুম, যাব না,
সে কলঙ্কিনীর মুখ আর দেখব না, কিন্তু থাকতে পারলুম
কই? স্নেহ যে নিম্নগামী, নদীর স্রোত যেমন বয়েই
যায়, ফেরে না, এই স্নেহও তেমনি একটানা চলেছে, এ
আর ফেরে না। থাকতে পারলুম না বলেই বেরিয়ে
পড়লুম।
গিয়ে দেখলুম, সত্যই তার দুর্দশা তখন চরম সীমায়
দাড়িয়েছে। সে একখানা খোলার ঘরের বারাণ্ডায় মাটীর
ওপরে পড়ে আছে, মৃত্যুর কালিমা তার সারা মুখখানায়
ব্যাপ্ত হয়ে পড়েছে। সে, একদৃষ্টে পথের পানে চেয়ে,
তার মাথার কাছে বসে একটী দু'বছরের শিশু, মাগো,
মাগো বলে কাদছে।
হা অভাগিনী, আমার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
ভেবেছিলুম, ক্ষমা করব না, কিন্তু ক্ষমা করলুম, তার মাথা
বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে কাদতে লাগলুম।
সে কিছুতেই মরতে পারছিল না, মেয়েটাকে কার
কাছে সে দিয়ে যাবে, কে তার এই পাপের চিহ্ন গ্রহণ

৪১
আয়ুষ্মতী
করবে? কেউ যে নিতে চায় না। পতিত। কেউ কেউ
মেয়েটাকে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু নিজে যে “থে এসেছিল,
তা সে বুঝেছিল, তাই মেয়েটী যাতে পথে না আসে,
মরতে গিয়েও সেদিকে তার দৃষ্টি ছিল। না, সে কিছুতেই
তার মেয়েকে এ নরকে দেবে না, তার মেয়েকে সে
বাচিয়ে যাবে। নিজের ইহ পরকাল সে নষ্ট করেছে, সে
বুঝেছে নরক কি।
আমার হাতে মেয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে সে চোখ মুদে।
সে মেয়ে কে দিদি, তাও কি বলতে হবে, সে মেয়ে
তুই,—সে তুই পূরবী।
আর্তভাবে পূরক বলিয়া উঠিল “দাদা, দাদামশাই-”
দাদামশয় ও নাতনী উভয়ের চোখের জলে বুক
ভাসিতে লাগিল।
বাহিরে খটাখট খড়মের শব্দ শুনা গেল, পরমুহূর্তেই
ভবশঙ্করের গম্ভীর কথা ভাসিয়া আসিল “পবিত্র—
পবিত্র বাড়ীর সীমানাতেও ছিল না।
“উমা-
ঠাকুর ঘর হইতে উমা উত্তর দিলেন।
“উমা, সেই বেতাকন্যা আর
বেশ্যাকন্যা আর তার দাদামশাই
কি এখনও আমার বাড়ীতে আছে? আমার পবিত্র
.

অসম্মতী
পিতৃভিটেকি এখনও
কি এখনও তাদের পদস্পর্শে কলঙ্কিত
হচ্ছে।”
স্তকণ্ঠে উমা বলিলেন “দেখি নি দাদামণি।”
ভবশঙ্কর গর্জিয়া বলিলেন “যদি থাকে—এখনই বার
হয়ে যেতে বল, এই রাত নটায় একখানা টেণ আছে
কলকাতায় যাবার। ঝিকে বলে দাও দেওয়ানকে বলতে,
যেন একখানা পাল্কী এখনই ঠিক করে দেয়। এখনই
যাওয়া চাই, নইলে
“দাদামশাই-* পূরবী উচ্ছসিত হইয়া কাঁদিয়া উঠিল,
“ওরা একটা দিনও আমাদের এখানে থাকতে দেবে না।”
অন্ধকার গৃহে কিছুই দেখা যাইতেছিল না। দাদামশাই
সেই অন্ধকারেই তাহার মাথায় হাত বুলাইয়া দিতে দিতে
বলিলেন, “তা তত দেবেই না দিদি। ওদের সঙ্গে
আমাদের সব সম্পর্কই যে চুকে গেল।”
“সব গেল দাদামশাই, সব গেল—
পূরবী শুধু ফুলিতে লাগিল, চোখে আর জল আসিতে
ছিল না।
ভেজানো দরকার একটু ফাক দিয়া আলােক রেখা
আসিয়া গৃহমধ্যে পড়িল, তাহার সঙ্গে সঙ্গেই দরজাটা
খুলিয়া গেল, একটী লণ্ঠন হন্তে দরজায় দাঁড়াইয়া উমা।

আয়
“বউ মা-*
মুহূর্তে পূরবী আপনাকে সামলাইয়া লইয়াছিল, না,
ইহাদের কাছে কিছুতেই দুর্বলতা প্রকাশ করা হইবে না,
এখন শক্ত হইতে হইবে-বুক পাষাণে বধিতে হইবে।
সে উত্তর দিল না, বউ মা আহ্বান—এ যে বিদ্রুপ
মাত্র। সে তো বউমা নয়, এ বাড়ীর সঙ্গে তাহার আর
সম্পর্ক কিসের।
উমা ডাকিলেন “পূরবী-”
“কেন” বড় ক্ষীণকণ্ঠে পূরবী উত্তর দিল।
এ দিকে এসো মা, একটা কথা শোন।
রুদ্ধ কণ্ঠে পূরবী বলিল “আমি সবই শুনেছি মা, আপনি
পাল্কী আনতে আদেশ দিন, আমি চলে যাচ্ছি।
আপনাদের এই গহনা গুলো
গহনাগুলা সে খুলিয়া পার্শ্বে রাখিয়াছিল; কাপড়
জামা ইহারই মধ্যে খােলা হইয়া গিয়াছে ; সেই কাপড়ের
উপর গহনাগুলা তুলিয়া সে উমার পায়ের কাছে রাখিল।
এ দৃশ্যে উমার চোখ দিয়া কয়েক ফোটা জল গও
বাহিয়া গড়াইয়া পড়িল, খানিকক্ষণ তিনি কথা বলিতে •
পারিলেন না। মুখ ফিরাইয়া চোখ মুছিয়া অশ্রুবিজড়িত
কণ্ঠে তিনি বলিলেন “কেন মা, এ সব গা হতে খুলেছ?”

আয়ুষ্মতী
স্থির কণ্ঠে পূরবী বলিল, “এসব আর আমার কি
অধিকার আছে মা, আমার সব সম্পর্কই যখন উঠে গেল,
আমি যখন এক নিমেষে সব হারালুম, মিথ্যে এ ভার
বইবার আর কি দরকার আমার মা ? আমি তাে আর
আপনাদের কেউ নই। বাড়ীর দাসীরও যে অধিকার
আছে, আমার
বলিতে বলিতে হঠাৎ উচ্ছসিত হইয়া সে কাদিয়া
উঠিল। আত্মসম্বরণে অসমর্থ। উম আলােটা ধপ করিয়া
ফেলিয়া ছুটিয়া পলাইলেন।
খিড়কীর দরজায় আসিয়া পাল্কী দাড়াইল; ভবশঙ্কর
উপরের বারাণ্ডা হইতে গুরুগম্ভীরস্বরে ডাকিয়া আদেশ
দিলেন “উমা, ওদের যা যা জিনিস আছে, নিয়ে চলে যেতে
বলে দাও, পাল্কী এসেছে।
টিনের বাক্সটা বাড়ীর ভৃত্য বাহির করিয়া দিল। বৃদ্ধ
দাদামহাশয়ের কম্পিত ছাতখানা শক্ত করিয়া ধরিয়া পূরবী
অগ্রসর হইল। যাইবার সময় একবার উমার সহিত দেখা
করিবার ইচ্ছা ছিল, একবার পবিত্রের পা দুখান বুকের
মধ্যে চাপিয়া ধরিবার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু কিছুই হইল না।
অন্ধকার ভেদ করিয়া পাল্কী নির্বাক দুইটা প্রাণীকে
বহন করিয়া ষ্টেশনের পথে ছুটিল।

আত্মত্মর্তী
৬
তাহার পরেও দুই দিন চলিয়া গেল, পবিত্রকে
কোথাও পাওয়া গেল না। উমা ঠাকুর ঘরে পড়িয়া
অসহায়ে অনিদ্রায় কাদিতেছেন, ভবশঙ্করের মুখখানা
অন্ধকারে পূর্ণ হইয়া গিয়াছে। যদিও তিনি ব্যস্ততা
প্রকাশ করেন নাই, তথাপি তাহার মুখ দেখিলেই তাহার
মনের উৎকণ্ঠা সহজেই ধরা যাইতেছে।
দুই দিন পরে তিনি বাহিরে আসিলেন, সম্মুখেই পড়িয়া
গেলেন দেওয়ান বনমালী রায়। ভবশঙ্করের কালিমামাখা
মুখের পানে চাহিয়া তিনি আস্তে আস্তে সরিয়া পড়িতে
ছিলেন, কণ্ঠ সংযত করিয়া ভবশঙ্কর বলিলেন, “দেওয়ান,
পবিত্রের কোনও খবর জান কি ?”
একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বনমালী বলিলেন “না।”
“না?” ভবশঙ্কর একেবারে স্তব্ধ হইয়া গেলেন ;
একটু পরে বলিলেন “কেউ তার কথা বলতে পারলে না,
কেউ তাকে দেখেনি?”
তাহার কণ্ঠে যে কি আকুলতা বাজিয়া উঠিল, তাহ
বনমালী বুঝিলেন। পিতার বেদনাতুর হৃদয় এইখানেই
প্রকাশ হইয়া পড়িল। কঠোরতার আবরণে এ কি

আয়ুষ্মতী
৫৪
গােপনে রাখা যায়, এ কি লুকাইয়া থাকিবার জিনিস ?
আঘাত পাইলেই এ যে প্রকাশ হইয়া পড়িবে।
মাথা নাড়িয়া বনমালী বলিলেন “কেউ না বাবু, কেউ
তার কথা বলতে পারলে না, কেউ তাকে দেখেনি।”
উচ্ছসিত কণ্ঠে ভবশঙ্কর বলিয়া উঠিলেন “তবে সে
কোথায় গেল?”
দুই হাতে দেওয়ানের দুইটী হাত ধরিয়া কম্পিতকণ্ঠে
ভবশঙ্কর বলিলেন “পবিত্র শুধু আমারই নয় বনমালী, সে
তােমারও ছেলে, বরং আমার চেয়ে সে তােমাকেই বেশী
চেনে, বেশী ভালবাসে। বনমালী, এ সংসারে আমার
পবিত্র ছাড়া আর কেউ নেই, আমার জীবন সর্বস্ব ওই
ছেলেটী। পবিত্র তােমারও তাে তাই বনমালী, তােমারও
এ জীবনে পবিত্র ছাড়া আর আছে কে? তুমি কি কাজে
যাচ্ছ, জমীদারির কাজে ? ফেলে দাও কাগজপত্র, ফেলে
দাও সব। পবিত্রকে যেখান হতে পার নিয়ে এসো। আমার
বাড়ী একেবারে শূন্য হয়ে গেছে, আমার বুক একেবারে
খালি হয়ে গেছে। আমার সর্বস্ব যাক বনমালী, আমার
পবিত্রকে শুধু তুমি এনে দাও, তার মুখখানা একবার
আমার দেখাও।
তাহার কণ্ঠ রুদ্ধ হইয়া আসিল, দেওয়ানের হাত

আহত
ছাড়িয়া দিয়া তিনি তাড়াতাড়ি সম্মুখের গৃহে ঢুকিয়া
পড়িলেন।
বনমালী আগেই পবিত্রের সন্ধান পাইয়াছিলেন ; সে
পার্শ্ববর্তী গ্রামে তাহার এক বন্ধুর বাড়ী চলিয়া গিয়াছে।
পিতৃস্নেহ কতদূর, এই স্নেহ-সমুদ্রের মধ্যে রসি ফেলিয়া তিনি
তাহাই দেখিতেছিলেন। এইবার নিশ্চিন্ত মনে পবিত্রকে
আনিতে তিনি যাত্রা করিলেন। মনটা অত্যন্ত ঘূর্তিযুক্ত,
যেহেতু পবিত্রকে পিতার রােষাগ্নিতে আর পড়িতে হইবে না।
ভবশঙ্কর নিদারুণ মন্ত্রণায় ছটফট করিয়া বেড়াইতে-
ছিলেন, যত ক্রোধ সব গিয়া পড়িতেছিল পূরবীর উপর।
ভগবান না করুন, যদি পবিত্রের কিছু হইয়া থাকে, তিনি
পূরবীর বক্ষে স্বহস্তে অস্ত্রাঘাত করিবেন। হােক নারী-
হত্যা, সে নারীকে অনায়াসে হত্যা করিতে পারা যায়, যে
পিতার স্নেহময় বক্ষ হইতে পুত্রকে ছিনাইয়া লয়। এ
রাক্ষসীকে হত্যা করায় পাপ অর্শে না।
বৈকালে বনমালী ফিরিলেন, ভবশঙ্করকে সংবাদ দিলেন
পবিত্র আসিয়াছে, সে বাহিরে দাঁড়াইয়া আছে, সাহস
করিয়া পিতার সম্মুখে আসিতে পারিতেছে না।
ভবশঙ্কর একটা আশ্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিয়া বাঁচিলেন,
মুখ হইতে অন্ধকারের রেখাটা সরিয়া গেল।
০

আয়ুষ্মতী
••
চোরের মত পবিত্র আসিয়া দরজার ভিতরে দাড়াইল।
ভবশঙ্কর অতৃপ্ত চোখে পুত্র মুখপানে চাহিয়া রহিলেন,
শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিলেন “তুমি কোথা গিয়েছিলে
পবিত্র ?”
পবিত্র কথা কহিতে পারিস না, ভয়ে লজ্জায় ঘৃণায় সে
মুখ তুলিয়া পিতার পানে চাহিতে পারিল না।
তাহাকে সম্মুখে বসিতে আদেশ দিয়া গেহপূর্ণ কণ্ঠে
পিতা বলিলেন, “তুমি এত কুষ্টিত হচ্ছে! কেন পবিত্র
ছেলেমানুষি বুদ্ধির বশে একটা কাজ করে ফেলেছিলে,
আমাকে কিছু না জানিয়ে। তখনও আমি যেমন তােমায়
ক্ষমা করেছিলুম, এখনও তেমনি তােমায় ক্ষমা করছি।
সমাজে আমার উচু মাথা হেঁট হস্নেছে, একটা প্রায়শ্চিত্ত
করলেই আবার যা তাই হব, সমাজে আবার আমি প্রভুত্ব
করতে পারব। আমি সমাজের কর্তা, আমায় সমাজচ্যুত
করবে, এত বড় ক্ষমতা কার আছে? সেদিন কার অপমান
যার জন্যে, তাকে সেই দিনই দূর করে দিয়েছি । খেয়ালের
অশে একটা কাজ করেছিলে, তার জন্যে তােমার ওপরে
আঁখি ওরুদণ্ড অর্পণ করব না।”
পবিত্র স্তব্ধভাবে বসিয়াই রহিল, সে মুখখানা ও তুলিতে
পারিল না।

আয়ুতী
ভবশঙ্কর তীব্র কণ্ঠে বলিলেন, “কিন্তু আশ্চৰ্য্য স্পর্ধা সেই
পতিত কন্যার আর তার দাদামশায়ের,জেনে শুনে
ভদ্রলােকের সাত মারতে আসে, এতটা সাহস কারও হতে
পারে না। তোমা ছেলে মানুষ পেয়ে চোখে ধূলাে দিতে
পেরেছিল, আমারও দিতে পারত যদি না সমাজ জানতে
পার। উঃ, দামােদর রক্ষা করেছেন।
আমার পুত্রবধূ
সে, মােদরের পূজার যােগাড়ও হয় তো তাকে করতে
ইত, কোনও দিন না কোন দিন ভােগ দেবারও ক্ষমতা
তার হাত।। কি হতো তবে-উঃ!”
আতঙ্ক তিনি শিহরিয়া উঠিলেন, ললাটে হাত দুখানা
ঠেকাইয়া বলিলেন, “তিনিই প্রকাশ করে দিলেন। মঙ্গলময়
তিন ভক্তের মঙ্গলই বা করেন। অশির দামােদর
বড় এত, তিনি তো ঘুমন্ত দেবতা নন যে, যে যা করবে
সব হয়ে যাবেন। মায়ের সঙ্গে জুয়াচুরি চলতে পারে,
দেবতার সঙ্গে যদি চলত, তা হলে এ পৃথিবীতে পাপ পুণ্যের
পাথকা কিছুই থাকত না।”
বনমালী রায় নীরবে মাথা নত করিয়া দাড়াইয়া কর্ত
বাবুর দীর্ঘ লেকচার শুনিয়া যাইতেছিলেন। হতদারি।
পূবীকে তিনিই সে রাত্রে টিকিট কিনিয়া ট্রেনে তুলিয়া
দিয়া আসিয়াছেন। পূরবীর সেই শান্ত অথচ শোকপূর্ণ

আয়ুষ্মতী ৫৮ মুখখানার কথা তাহার মনে দেদীপ্যমান। সর্বস্ব দান করিয়া তেমনিই শান্তভাবে অকম্পিত পদক্ষেপে চলিয়া যাইতে পারে শুধু নারী, পুরুষ পারে না। তাহার চোখে তখন এক ফোটা জল ছিল না, মুখখানার উপরে তখন তাহার কি গম্ভীর ভাব ফুটিয়াছিল। ট্রেণে তাহাকে উঠাইয়া দিয়া বৃদ্ধ বনমালী রায় কিছুতেই অশ্রু সম্বরণ করিতে পারেন নাই। হায় হতভাগিনী, মাত্র কয়দিন পূর্বে আনন্দ উজ্জল বক্ষে এই দেশের মাটীতেই পদার্পণ করিয়াছিলে না। তখন কত আশা ছিল তােমার বুকে, সুখের ভবিষ্যৎ চিত্র তুমি কতই আঁকিয়াছিলে! আজ সব বিসর্জন দিয়া, অন্ধকার হৃদয় বাহির ভরিয়া লইয়া যাইতেছ কোথায় ? সে উদ্বেগ ব্যাকুল নেত্রে দূর গ্রামের পানে চাহিতে- ছিল, কিন্তু মাঝে যে সূচিভেদ্য বিরাট বিপুল অন্ধকাররাশি, দৃষ্টি তাহার এ অন্ধকার ভেদ করিতে পারে কি ? ট্রেন ছাড়িয়া দিয়াছিল, সে রাত্রে বাড়ী ফিরিয়া বৃদ্ধ 'বনমালী ঘুমাইতে পারেন নাই। শ্বশুরালয় হইতে চির- নির্বাঞ্চিতা অভাগিনী পূরবীর মুখখানা কেবল তাহার মনে জাগিয়া উঠিতেছিল, তাহার ব্যথা অনুভব করিয়া আর্তস্বরে তিনি ভগবানকে ডাকিয়াছিলেন।

আমুমতী
আজ ভবশঙ্করের দীর্ঘ লেকচার শুনিয়া তিনি দীর্থ
নিঃশ্বাস ত্যাগ করিলেন, ধীর কণ্ঠে বলিলেন “আমার
অপরাধ ক্ষমা করিবেন আপনি, একটা কথা বলবার আদেশ
আমি চাচ্ছি। ভগবান জাগ্রত, কিন্তু একজনের মঙ্গল
করে আর একজনের অমঙ্গল করেছেন, এতে তাকে দয়াময়
বলা যায় না।”
ভবশঙ্কর জিজ্ঞাসা করিলেন “কার অমঙ্গল ?”
বনমালী উত্তর দিলেন “যে মেয়েটা এসেছিল।”
জ কুঞ্চিত করিয়া ভবশঙ্কর মুখ ফিরইলেন।
সাহস করিয়া বনমালী বলিলেন, “রাগ করবেন না
বাবু, আমি যা বলছি, এটা রাগের কথা নয়। আপনার
এতে মঙ্গল হল, আপনার দেবতা তার স্পর্শ হতে নিতি
পেলেন, কিন্তু একটা সত্য কথা বলছি বাবু, দেবতা কি
শুধু ওই একটা আধারেই ন্যস্ত আছেন, না, সর্বজীবে,
চরাচরের মধ্যে বিদ্যমান। আছেন? সে পতিতার
মেয়ে, এই তার অপরাধ, কিন্তু সত্যের দিক
হতে চেয়ে বলুন, সেই পতিতার মধ্যেও কি নারায়ণ
ছিলেন না? নারায়ণ জাগ্রত, সে তো ঠিক কথা, শরণ
জীবজগৎ যখন বিদ্যমান রয়েছে, তার মধ্যে নারায়ণও
রয়েছেন। জীবজগতের অস্তিত্ব যদি অস্বীকার করা যেত,

আসুমতী
নারায়ণের অস্তিত্বও আমরা অস্বীকার করতে পারতুম।
আপনি জ্ঞানী, কিন্তু সব বুঝেও এই বিষম ভুলটা করে
ফেলেছেন যে বাবু, একটা পাথরের মধ্যেই আপনার
দেবতাকে দেখছেন, সৰ্ব্বভূতে দেখতে পান নি। আর সে
অভাগিনী, ধরে নিচ্ছি পতিতার মেয়ে সে, কিন্তু সে কি
পাপে পতিতা হয়েছে ? সে নিজে পবিত্র, নিষ্ঠাচারিণী,
তার শুচিতাই কি তাকে তুলে দেবে না, পতিতা মায়ের
পাপের প্রায়শ্চিত্ত তাকেই যে করতে হবে, এমন কোনও
কথা আছে কি ?”
ধীর স্বরে ভবশঙ্কর বলিলেন, “যদি এই হিসাবেই কথাট।
বলে থাকে। বনমালি, তবে এই কথার শেষ আমায় এই
খানেই করতে দাও। সমাজ গঠন হয়েছে ধৰ্ম্মের জন্য,
সমাজকে হেলা আমরা কখনই করতে পারব না। সমাজের
অনুবঙী হয়ে শৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে আমাদের চলতে হবে,
এই হচ্ছে সমাজের উদ্দেশ্য। সত্যকে চিনতে পেরেছি,
কিন্তু তা বলে সমাজের বিরুদ্ধে চলতে পারব না। আমা-
দর মধ্যে এমন ঢের লােকই তো আছে যারা বলে,
বিশ্বাস করে, সর্বজীবে ঈশ্বর বিরাজিত, তবু কেন তারা
ভিন্ন ভাবে চলে, শুচিতাকে কেন বঁচিয়ে যায়? মেয়েদের
কথা আমি ধরিনে, কারণ অল্পেতেই তারা খুব বেশী করে

আৰুমতী
ধরে নে,-আমি পুরুষদের কথা বলছি। যারা মহামহো-
পাধ্যায় পণ্ডিত, যাদের হৃদয় জ্ঞানের আলােয় উদ্ভাসিত,
তারাই বা কেন এতদূর স্পশ্যাম্পৃশ্য বেছে চলেন ? অনেক
হিন্দু রান্না ঘরের চালে মুরগী বসলে কেন তারা ঘরের
ভিতরকার জিনিস পত্র ফেলে দেন। কুয়া ইদারা—এ সব
অন্য জাতি দ্বারা কেন তারা স্পষ্ট হতে দেন না। এই
বিচারটাকে তারা সমাজের মধ্যে শ্রেষ্ঠ আসন দিয়েছেন,
এই বিচারের বশেই পতিতার মেয়ে কিছুতেই সমাজে
প্রবেশলাভ করতে পারবে না, সমাজের দ্বার তার কাছে
চিররুদ্ধ। পতিতার ছেলে অথবা মেয়ে তাদের পতিতা
মায়ের পাপের ফল ভােগ করবেই, সমান তার শুদ্ধাচারিতা
জানলেও তাকে গ্রহণ করবে না। অস্বীকার করছি
নে, জ্ঞানীর হৃদয়ে যে ভগবান আছেন অজ্ঞানীর
হৃদয়েও তিনি আছেন, পুণ্যাত্মার মধ্যেও যিনি, পাপাত্মার
মধ্যেও তিনি। সবাই যদি সেটা বুঝে চলত, পাপীকে
ক্ষমা করত, বিধর্মীকে সমান অধিকার দান করত,
আমিও করতে পারতুম। সমাজে বাস করতে গে”ে,
সমাজের অনুশাসন মেনেই
সে রকম স্থলে সত্যকেও গোপন করে রাখতে
আমার চলতে

আয়ুষ্মতী
বনমালী ধীরে ধীরে সরিয়া গেলেন। পিতার সম্মুখ
হইতে পবিত্রও উঠিয়া গিয়া বাঁচিল।
উমার সহিত তাহার দেখা হইল, উমা নিঃশব্দে তাহার
মাথাটা বুকের মধ্যে চাপিয়া ধরিয়া চোখের জল ফেলিলেন।
অভাগিনী পূরবীর মর্মভেদী উচ্ছাসের কথা তাহার মনে
পড়িতেছিল। পূরবীর এ সৰ্ব্বনাশ তাহার পবিত্রের দ্বারাই
হইয়াছে, তাই তিনি নীরব, অন্য কেহ হইলে তিনি বােধ
হয় রাগিয়া উঠিতেন।
পবিত্রের অবিন্যস্ত চুলগুলা সরাইয়া দিতে দিতে রুদ্ধ
কণ্ঠে তিনি বলিলেন, “কাজটা মােটেই ভাল হয় নি পবিত্র।
আহা, সরলা বালিকা সে, কিছু জানে না, তার ওপরে এই
গুরুদণ্ডটা দেওয়া উচিত হয় নি। আচ্ছ। পবিত্র, একটা
কথা তােকে আমি জিজ্ঞাসা করি, বিয়ের আগ্রহট। তাের
বেশী ছিল, না, তাদের বেশী ছিল ?”
“আমার মাসীমা-পবিত্র মাসীমার কোলের মধ্যে
মুখ লুকাইয়া রাখিল, মুখ তুলিতে তাহার লজ্জা
করিতেছিল।
“তোর ছিল? তুই যখন তাদের বলেছিলি, তারা
তখনি রাজি হয়েছিল কি?
পবিত্র মুখ তুলিল, বলিল, “না মাসীমা, তারা প্রথমে

৬৩.
আয়ুষ্মী
•
কিছুতেই রাজি হয় নি। শেষে আমার জেদে পড়েই
বুড়ো বিয়ে দিতে রাজি হল।”
মাসীমা অনেকক্ষণ নীরব হইয়া থাকিয়া বলিলেন,
'আচ্ছ। যা এখন।
নীরব শয়ন গৃহে পবিত্র একা।
তাহার মনে হইতেছিল, সেই দিন দুপুরে পলায়নের
পূর্ব মুহূর্তে একবার পা টিপিয়া টিপিয়া চোরের মতন সে এই
গৃহের দ্বার পর্যন্ত আসিয়াছিল ; তথন পূরবী ধূলায় মূৰ্ছিতপ্রায়
পড়িয়া। চোখের জলে ওইখানটায় ঢেউ খেলিয়া যাইতে-
ছিল, এখনও যেন সে স্কুলের দাগ সেখানে রহিয়াছে।
কি অসহ মর্মবেদনাতেই সে কঁদিতেছিল। বড়
আকাঙ্ক্ষার বস্তু সে লাভ করিয়াছিল, ভগবানের চোখের
একটা কুটীতে সে সব হারাইয়া ফেলিয়া, অবশেষে
ভিখারিনীর চেয়েও অধম হইয়া সে দেশত্যাগ করিল।
পবিত্র দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া শুইয়া পড়িল।
পূরবী ফিরিয়া আসিয়াছে।
পূরবী ফিরিয়াছে, কিন্তু যে পুরবী গিয়াছিল, এ সে
পূরবী নয়। সে পূরবী হাসিতে হাসিতে সম্মুখে পূর্ণ

আয়ুষ্মতী ৬৪ নাই। আশার আলাে দেখিয়া এস্তপদে গিয়াছিল, এ পূরবী হৃদয়ে দারুণ অন্ধকার লইয়া, ভবিষ্যৎ অন্ধকার করিয়া, চোখের জলে ভাসিতে ভাসিতে ফিরিয়াছে ; তাই বলি- তেছি, এ সে পূরবী নয়, এ পূরবীর ছায়া মাত্র। আর কথায় কথায় তাহার হাসি তেমনভাবে উচ্ছসিত হইয়া উঠে না, দাদামহাশয়ের সহিত সে কৌতুক আর এখন জোর করিয়া যদি সে হাসিতে যায়, সে চেষ্টাতে হাসি আসে না, আসিয়া পড়ে চোখে অশ্রু ; তাড়াতাড়ি মুখ ফিরাইয়া সে পলাইয়া যায়। কাজ কর্ম নেহাৎ না করিলে নয়, তাও যদি নিজের জন্য হইত, সে কিছুই করিত না, কিন্তু দাদামশাই যে আছেন তাহাকে যে খাওয়াইতেই হইবে; তাই সে আবার তেমনিই- আগের মত প্রভাতে উঠিয়াই সংসারের কাজে লিপ্ত হয়। কিন্তু তাই বা কত? সামান্য রন্ধন পরিবেশন, বাসন মাজা, জল তােলা; অবকাশ যে গোটা দিন। সমস্ত দিনট। তবুও সে ভাবিবার সময় পাইত না, কিন্তু রাত্রি তো আছে। আনন্দপূর্ণ গৃহ একেবারে নিরানন্দ হইয়া গিয়াছে, বীণা বাজিতে বাজিতে থামিয়া গিয়াছে; তার ছিড়িয়া গিয়াছে, তাই এ বীণা আর বাজিয়া উঠে না। বৃদ্ধ দাদা- মশাই কেশশূন্য মাথায় হাত বুলাইতে বুলাইতে ভাবেন,

৬৫
আয়ুষ্মতী
এ আবার কি হইল?, আবার কি করিলে সেই আনন্দপূর্ণ
দিন ফিরিয়া আসিবে ?
নাতনীর বিষাদ-মলিন মুখখানার পানে চান, আর
তাহার হৃদয় জুড়িয়া হাহাকারের সুর বাজিয়া উঠে।
এক এক দিন তিনি তাহাকে ধরিয়া বই পড়িতে বসান,
নিজে স্তব্ধভাবে শুনিতে বসেন। শুনিতে নিতে মনটা
কোথায় চলিয়া যায়, বইয়ের দিকে আর মন থাকে না।
তাহার পর পড়িতে পড়তে পূরবী হঠাৎ থামিয়া যায়;
দাদামশাইয়ের পানে চাহিয়া দেখে তিনি গভীর চিন্তামগ্ন।
তখন জিজ্ঞাসা করে, “শুনছে। দাদামশাই ?”
দাদামশাই হঠাৎ চমকাইয়া উঠেন, সে চমকানিটা
তাহার নিজের কাছেই অনুভূত হয়, তিনি লজ্জিত হইয়া
উঠিয়া বলেন “শুনছি বই কি দিন, বেশ শুনছি। আর
একবার ওই জায়গাটা পড় দেখি, কি পড়লি মনে
হচ্ছে না।”
দাদামহাশয়ের অবস্থাটা মনে করিয়া গভীর বেদনায়
পূরবীর হৃদয় ভরিয়া উঠে, বই বন্ধ করিয়া সে উঠিয়া পড়ে
আজ থাক দাদা, কাল তােমায় আবার শুনাব।”
কিন্তু এমন করিয়া তো দিন কাটে না।
গোপন ব্যথা জাগিয়া দুইটী হৃদয়ের মধ্যে? হাসিতে গেলে
এ কি ভীষণ

আয়ুষ্মতী
হৃদয়ের ক্ষততে আঘাত লাগিয়া কেন টন টন করিয়া উঠে?
এ ক্ষতকে শুষ্ক করিতে হইবে যে, ঔষধ দিতে হইবে যে ;
দিন দিন বাড়িতে দিলে তো চলিবে না।
সে দিন দুপুরে পূববী আহবান্তে ছাদ হইতে শুরু
কাপড় তুলিয়া আনিতে গিয়াছিল। নিচে দাদামশাইয়ের
বাগ্র আহ্বান শুনিল “পূরবী—শিগগীব আয় দিদি, একটা
মজা দেখে যা।”
পূর্বেকার একটা কথা পূরবীর মনে জাগিয়া উঠিল,
সেদিনও দাদামশাই এমনি ব্যগ্র কণ্ঠে তাহাকে ডাকিয়া-
ছিলেন, ছুটিতে ছুটিতে নি. গিয়া সে পবিত্রকে দেখিতে
পাইয়াছিল।
কাপড় তােলা ফেলিয়া পূরবী তাড়াতাড়ি নিচে
নামিয়া গেল।
“এই দেখ দিদি, তাের অন্তে কি এনেছি।
শুভ্র লােম বিশিষ্ট ক্ষুদ্র একটী কাবুলী বিড়ালের ছানা।
চোখ দুইটী তার সুলোহিত, লােমগুলি খুব বড় বড়।
তাহার গলায় আবার রেশমী ফিতায় মাথা গুটিকত
বিশুষ্ক মুখে একবার চাহিয়া পূরবী ফিরিবার উদ্যোগ
করিল। ব্যগ্র দাদামহাশয় বলিলেন “যাচ্ছিস যে?

৬৭
আয়ুষ্মতী
পূরবী বলিল কি করব দাদা, ছাদে কাপড়গুলাে সব
পড়ে আছে, সেগুলো তুলে আনি গিয়ে। এই বৈশাখের
বাতাস, উড়ে পথে গিয়ে পড়বে এখন।”
জলধর বলিলেন এক আধ মিনিটেই উড়ে গিয়ে
পড়ছে না। কেমন বিড়ালের ছানাটা বল দেখি।”
সংক্ষেপে পূরবী উত্তর দিল “শ।”
উৎসাহিত বৃদ্ধ বলিলেন, “তা একবার জিজ্ঞাসা কর
কোথায় পেলুম। নরেনবাবুর বিড়ালের একটামাত্র ছানা
এ; তারা কি কিছুতে দিতে চায়? নেহাৎ আমি না কি
নাছোড়বান্দা, তাই কত করে নিয়ে এলুম। তারা বলেছে,
তিন দিন অন্তর একবার করে ছানাটাকে তাদের দেখিয়ে
আসতে হবে, আর খুব বেশী করে মাছ দুধ খাওয়াতে
বে। তা হলে তো দিদি, মাছ দুধ একটু বেণী করে
নিতে হবে, নইলে তো চলবে না।”
“আচ্ছা দেখা যাবে” বলিয়া পূরবী আবার ফিরিতেছিল,
বিড়াল ছানাটীর সম্বন্ধে তাহলে এতটা উদাসীন। দেখিয়া
তাহলে
বৃদ্ধ হতভম্ব হইয়া গিয়া বলিলেন আবার যাচ্ছিস যে?
“ছাদে কাপড়গুলাে-
রাগত সুরে দাদামহাশয় বলিলেন “দূর হােক গিয়ে
কাপড়, এটাকে তুই নিবি না আমি কোলে করে বসে থাকব?”

আয়ুষ্মতী
বিড়াল ছানাটীর সম্বন্ধে গােপন কথা পূরবীর মনে
এবার স্ফট হইয়া জাগিয়া উঠিল। বৃদ্ধ দাদামহাশয় কোন
কিছুর মধ্যেই তাহাকে আকৃষ্ট করিতে পারিতেছিলেন না।
নরেনবাবুর বাড়ীতে অজস্র অপমান স্বীকার করিয়াও
তিনি শুধু তাহাকে একটু অন্যমনস্ক করিবার জন্য বিড়াল
ছানাটা আনিয়াছেন। স্নেহ-প্রবণ হৃদয়ের কথা ভাবিয়া
পূরবী তাড়াতাড়ি অন্যদিকে মুখ ফিরাইল, চোখের পাতা
বার বার ফেলিয়া জলটুকু শুষিয়া লইয়া জড়িত কণ্ঠে
বলিল “বিড়ালছানা আমার কি করবে দাদা? আমি
এই বিড়ালছানা নিয়ে কি করব? না, এ তুমি ফিরিয়ে
দিয়ে এসাে—যদি আমার জন্যেই একে তুমি এনে থাক।
আমি তো ছেলেমানুষ নই যে বিড়ালছানা নিয়ে খেলা
করব।”
“তুই ছেলেমানুষ নােস। মাত্র পনের বছর বয়েসেই
এ অভিজ্ঞতাটা কোথায় লাভ করলি দিদি?”
তাহার হাতখানা টনিয়া তাহাকে কোলের মধ্যে
চাপিয়া ধরিয়া বৃদ্ধ হাহাকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিলেন
“তােকে এই বয়সেই এত ভাবতে কে শেখালে পূরবী ?
তুই তো এক দিনও ভাবতিস নে, এক দিনও তো তাের
চোখে জল দেখি নি, আমার সঙ্গে হেসে খেলেই যে তাের

আয়ুষ্মতী
* দিন যাচ্ছিল। এই বিড়ালের ছানা নিবি বলেছিলি,
বলেছিলি কাবুলী বিড়ালের ছান। যদি পাস, আর কিছু
তুই চাস নে, আজ সে কথা তােকে কে ভুলিয়ে দিলে
দিদি ? মাত্র পনর বছর বয়েসেই সকল সুখ সাধ বিসর্জন
দিলি কার জন্যে দিদি ?”
“ও কি করছ দাদা-ও কি, ছিঃ, কঁদছো কেন?”
পূরবী তাড়াতাড়ি নিজের অঞ্চল দিয়া তাহার মুখ
মুছাইয়া দিতে লাগিল পাগল হয়েছ না কি?
কোথাও কিছু না—কেঁদে বাড়া মাথায় করছে। এরকম
করে কাঁদতে আছে কি? দিন দিন যেন তুমি ছেলে-
মানুষের অধম হচ্ছে। দাদা। চুপ কর বলছি--চুপ না
করলে সত্যি আমি এমন রাগ করব যে—কিছু খাব না।”
দাদামহাশয় চুপ করিয়া গেলেন, খানিকক্ষণ কথা
কহিতে পারিলেন না। পূরবী ও.চুপ করিয়া দাদামহাশয়ের
মাথায় হাত বুলাইয়া দিতে লাগিল।
“একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলি। দাদামহাশয় বলিলেন ।
“তবে বিড়াল ছানাটাকে দিয়ে আসি?”
পূরবী শান্ত কণ্ঠে বলিল “না, দেবে কেন ? এনে
যখন, থাক। ওর জন্যে মাছ দুধের বন্দোবস্ত করে দেওয়া
যাবে।
ও বেশ খেলে বেড়াচ্ছে বেড়াক। তুমি ভাল

আয়ুষ্মতী
হয়ে বস দাদু, তােমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিয়ে
তার পর কাপড়গুলাে তুলে আনব এখন। ইস্ তােমার
মাথার চুল যে একেবারে সব পেকে গেছে দাদামশাই,
সত্যি তােমার চেহারাটা বড় খারাপ হয়ে গেছে।”
দাদামাশয় হাসিবার বৃথা চেষ্টা করিয়া বলিলেন
“আজই বুঝি তাের চোখে পড়ল পূরবী ? ওরে, ও
আজকের পাকা চুল নয়, চুল পাকতে শুরু হয়েছে সেই দিন
যেদিন তারা আমার একলা ফেলে চলে গেল। তার পরে
তোকে পেয়ে আমার পাকা চুল আবার কাচিয়েছিল রে,
আমার যৌবন আবার ঘুরে আসছিল, হঠাৎ সেদিন স্বপ্ন
টুটে গিয়ে দেখলুম, মিথ্যে স্বপ্নে ভুলে ছিলুম, আমায় ডিঙিয়ে
কোন দিন ত্রিশটা বছর চলে গেছে। আমি জোর করে
বাড়াতে গেলুম; সেদিন সমাজের সামনে, কিন্তু ষাট বছরের
বার্ধক্য হঠাৎ আমায় আক্রমণ করে আমার হাটু কঁপিয়ে
ফেলে দিলে, ষাট বছরের মাথা থর থর করে কেঁপে আর
উচু হল না, ষাট বছরের দৃষ্টিহীনতা ঘুরে এল। ওরে
দিদি, বুকে টের আঘাত সয়েছি, কিন্তু এ আঘাত কিছুতেই
সইতে পারলুম না। উঃ, আমার বুকটায় একটু হাত বুলিয়ে
দে দিদি ; দেখ একবার, বুকের মধ্যে আমার কি
রক্ষা করছে।
•
;

৭১
আয়ুষ্মতী
পূরবী তাড়াতাড়ি তার বুকে হাত বুলাইয়া দিতে
লাগিল। পাণ্ডুর মুখে দাদামশাই বলিলেন, “কি জানি,
হঠাৎ কেন বুকটায় এই রকম ব্যথা ধরা আরম্ভ হয়েছে।
মাথা ঘুরে ওঠে, চোখ অন্ধকার হয়ে যায়, মনে
প্রাণটা এখনই বেরিয়ে যাবে।”
উদ্বিগ্ন হইয়া পূরবী বলল “একটা ডাক্তার ডাক কি
দাদা? এ রকম করে অথ পুষে রাখা-
একটু হাসিবার চেষ্টা করিয়া দাদামহাশয় বলিলেন
“দূর, পাগল হয়েছিস দিদি? ওই সেরে গেল, ওর অন্তে
ভাবনা? ভয় নেই, তাের, ভয় নেই রে আমি এখনি
মরব না, আমি মরলে তুই পাড়াবি কোথায়, কে তােকে
দেখবে ? ভগবান এখন অামায় কক্ষনো নেবেন না।
যা তুই, কাপড় তুলে আন গিয়ে, আমি ততক্ষণ একটু
শুয়ে থাকি চুপ করে।”
এক কথাতেই বুকের ব্যথাটা সারিয়া গেল, কিন্তু
পূরবী আশ্বস্ত হইল না ;
তেমনি ব্যগ্র ব্যাকুল ক)
বলিল “তা আনছি দাদু, পরে আনলেই চলবে এখন।
তােমার বুকটা ততক্ষণ হাত বুলিয়ে দিই দাদামশাই,
তুমি একটু ঠাণ্ডা হয়ে ঘুমাও দেখি। এই ঠিক দুপুরবেলা,
তাই বুকের মধ্যে তােমার আনচান করছে।

আয়ুষ্মতী
१२
ছােট শিশুর মত দাদামহাশয়কে শােয়াইয়া সে তাহার
বুকে পিঠে হাত বুলাইয়া দিতে লাগিল।
০
এম-এ পাসের খবর বাহির হইলে দেখা গেল, পবিত্র
সমানের সহিত পাস করিয়াছে।
বাড়ীতে আনন্দের উচ্ছ্বাস প্রবাহিত হইতে লাগিল।
ভবশঙ্কর গ্রাম্য দেবী চণ্ডীর নিকট ষােড়শােপচারে পূজা
পাঠাইয়া দিলেন, বাড়ীতে দামােদরের ষােড়শোপচারে
পূজা হইল, সােণার সিংহাসনে ঠাকুরকে বসাইয়া মুক্তার
ঝালর দেওয়া পাখা দ্বারা বাতাস করা হইত। অনেক
রিদ্র জমীদার বাটী হইতে খাদ্য ও বস্ত্র লাভ করিল,
গ্রাম সুদ্ধ লোেক এই উপলক্ষে জমীদার বাটীতে আহার
করিয়া গেল। আসিলেন না কেবল রামময়বাবু। বরাবর
তিনি কখনই আসিতেন না, বউভাতের দিন ভবশঙ্করকে
অপদস্থ করিবার ইচ্ছাতেই তিনি আসিয়াছিলেন। আজ
তিনি না আসিলেও কোনও ক্ষতি হয় নাই, যেহেতু কেই
সেদিকে অত দৃষ্টি দেয় নাই।
এই আনন্দ উচ্ছাস তিনজনকে স্পর্শ করিতে পারে
নাই। একজন বনমালী। দুঃখিনী পুরবীর বিদায়কালীন

আয়ুষ্মতী মুখখানা তাহার মনে জাগিতেছিল; সে শােকদৃশ্য মনে করিয়া আজিকার এ আনন্দোচ্ছাস মােটেই তাহার ভাল লাগিতেছিল না; কিন্তু এ না করিলেও তো নয়, বেতন- ভােগী ভৃত্য যে তিনি। যদি তিনি বেতনভোগী ভৃত্য না হইতেন, তাহা হইলে আজ কথনই তিনি এ আনলোচ্ছ্বাসে যােগ দিতেন না। আর আজিকার এ আনন্দোচ্ছাস হৃদয় শােকাকুল করিতেছিল পবিত্রের। পবিত্রের মুখ মলিন, চকিতে এক আধবার লােক দেখানো হাসির রেখা যদিও তাহার মুখে ফুটিয়া উঠিতে- ছিল, অহা জোর করিয়া টানিয়া আনা মাত্র। হায়, যদি আজ সে থাকি-তবেই না সে যথার্থ আনন্দ পাইত? হৃদয়ে যাহার আগুন জ্বলিতেছে, বাহিরে প্রচুর জল গায়ে ঢালিয়া তাহার কি শান্তি ? এ সাফল্যে সে একটুও আনন্দ লাভ কধিতে পারে নাই ; তাহার মনে হইতেছিল, যে মরিতে সিয়াছে তাহাকে আর সাজাইয়া লাভ কি ? শ্মশানে বাসর-শয্যা কেন ? যে হৃদয়ের শান্তি, আনন চিরতরে হারাইয়াছে, তাহাকে শাস্তি আনন্দ দিবার জন্য কেন ঐ মিথ্যা প্রয়াস? পবিত্রের মলিন মুখথান। হঠাৎ কাৰ্যনিরুত উমার

আয়ুষ্মতী
৭৪
চোখে একবার পড়িয়া গেল ; তাহার মনেও না কি শান্তি
ছিল না; তাই পবিত্রের মুখখানা দেখিবামাত্র তিনি
তাহাকে ধরিয়া ফেলিলেন। নির্জনে তাহাকে ডাকিয়া
বসাইয়া বলিলেন “সবাই আনন করছে বাবা, তাের
আনন্দ নেই কেন বল দেখি?”
হাসি টানিয়া আনিয়া পবিত্র বলিল “আনন্দ নেই, সে
কি কথা মাসীমা ? এমন দিন, এদিনে আমার আনন্দ
থাকবে না ? আমারই পাসের খবর, আমারই জন্যে এত
আয়োজন, খাওয়ানো, পূজা দেওয়া,-আমার আনন্দ হবে
তাে কার হবে মাসীমা ?
শেষের দিকে তাহার কথার মধ্যে প্রচ্ছন্ন ব্যথা বাজিয়া
উঠিয়াছিল, সুরটা কেমন যেন বদলাইয়া গেল, সে নিজে
তাহা লক্ষ্য করিল না, কিন্তু তীক্ষ্ণবুদ্ধিশালিনী উমা তাহা
লক্ষ্য করিলেন।
পবিত্রের মাথায় হাত দিয়া করুণ সুরে তিনি বলিলেন
“আমায় ভুল বােঝাতে চেষ্টা করিসনে পবিত্র, তােকে আমি
যতটা চিনি, এতটা আর কেউ চেনে না। তাের ঐ টেনে
আনা হাসি দিয়ে তাের বাবাকে তুই তােলাতে পারিস.কিন্তু
আমাকে তুই ভােলাতে পারবিনে বাবা। আমি সব বুঝতে
পারছি, সব জানতে পারছি, কিন্তু জেনে কি করব বল?

৭৫
আয়ুষ্মতী
•••
তাের মাসীকেও ২ দলে ফেলিসনে পবিত্র, তাের মাসীমা
পুরুষ নয়, নারী; তার বুক পাষাণ দিয়ে গড়া ন; রে ;-
গর বুকে মা জেগে আছে।
তাহার চোখ দিয়া দুই ফোটা ফুল গড়াইয়া পবিত্রের
ললাটের উপর পড়িয়া গেল সান বাপার ব্যথী এক
জনকে পাইয়া আজ পবির হৃদবিগ লত ইয়া গেল,
মার্সীমার স্নেহময়
(
কোলে ছোটবেলার মতই মখানা
লুকাইয়া রুদ্ধ কণ্ঠে সে ডাকিল “সীমা
চট করিয়া চোখ মুছিয়া ফয়। উমা বলিলেন “তুই
তাে প্রায়ই কলকাতা যাওয়া আসা করিস পবিত্র-*
মুখ তুলিয়া পবিত্র বলি “তাতে কি মাসীমা ?
মাসিমার মনের কথা স্পষ্ট সে জানিতে পারি।
চাপা সুরে মাসীমা বলিলেন “একবার সেখানে যাস
বাবা ।
আহা ! বড় ব্যথা বুকে নিয়ে তারা দুষ্মন বিদায়
নিয়েছেরে, তাদের সে ব্যথা অনুজব করার শক্তি কারও
নেই ।
সমাজ অবহেলে নিজের কর্তব্য পালন করে গেল,
সে বাজ যারা বুক পেতে নিলে, তাদের পানে একবার
ফিরেও চাইলে না। সমাজ নিষ্ঠুর ; তাের বাপ তার
বেশী নিষ্ঠুর, তা বলে তুইও কি নিষ্ঠুর হবি পবিত্র ? তাের
নিষ্ঠুর হলে চলবে না তো বাপ, সে যে তাের বিবাহিত।

আয়ুষ্মতী
৭৬
যে ধৰ্ম্ম-ত্যাগের ভয়ে তোর বাপ তাকে দুর দুস
করে তাড়িয়ে দিলে, সেই ধম্মকেই সাক্ষী রেখে যে তাকে
তুই গ্রহণ করেছিস, অমন করে তাড়িয়ে দেওয়া তাের তো
মানবে না। তার কলঙ্ক তােকেই যে ঢাকতে বে রে,
তাকে আড়াল করে তােকেই যে সবার সামনে বের হতে
হবে। স্বামী স্ত্রী সম্পর্কটা তো উড়িয়ে দেবার নয়, হিন্দু
শাস্ত্র স্বামী স্ত্রী সম্বন্ধে কি বলেছে সেটা জানিস কি? না
বাবা, তােকে যেতে হবে, তােকে তাদের বুঝতে
হবে। যদিও সে এখানে আসবার অধিকার না পায়
“মাপ কর মাসীমা, আমি যেতে পারব না।”
বিস্মিত। মাসিমা বলিলেন, “কেন, তাের লজ্জা হবে ?
তাতে লজ্জা কি বাবা, এতে তাের দোষ কি ? সত্যিই
তুই জানতিস্ নে কার মেয়ে, না জেনে বিয়ে করেছি।
তার পর তাের বাবা--সমাজ জানতে পেরে, যে দণ্ড
অর্পণ করেছে,
তাতে তাের কি অপরাধ পবিত্র ?
আমি বলছি, এতে কোনও লজ্জা নেই তাের, তুই যা
একবার। আহা, তাদের মুখখানা একবার মনে করে।
দেখ দেখি বুকে কি যন্ত্রণা সইছিস, তবু যেতে পারবি নে?'
দৃঢ় অথচ শান্ত সুরে পবিত্র বলিল “না মাসীমা, তবুও

আয়ুষ্মতী
যেতে পারব না। আমি সমাজ মানিনে, ধৰ্ম্ম মানিনে,
কেবল মানি বাবাকে। বাবার আদেশ আমি লন
করতে পারব না। মাসীমা, বাবাকে আমি আর অপদস্থ
করতে পারব না। মাসীমা সত্যি বাবাকে ততটা হৃদয়হীন
ভেব না, বাবার যা জ্ঞান আছে, আর কারও তা নেই
বলেই আমার ধারণা। সেই দিনটার কথা একবার মনে
কর দেখি মাসীমা, সমাজের লােক আমাদের বাড়ী, তার
মাঝখানে যখন প্রকাশ হল আমি পতিতার মেয়েকে বিয়ে
করে এনেছি, তখন বাবার উচু মাথা কি রকম শুইয়ে
পড়ল। মাসীমা, বাবা আমার সে দোষ ধলেন না, ধরতে
পারলেন না, সেই কুলকলঙ্ক ছেলে আমি, আমারই দুদিন
অনশনে তিনি পাগল হয়ে উঠেছিলেন। না মাসীমা,
আমি আমার এমন বাপের আশে কখনই অমান্য করতে
পারব না, আমি সেখানে কিছুতেই যেতে পারব না, আমি
এমনি ভাবেই থাকব। তাদের অদৃষ্টে কষ্ট ছিল, সে কষ্ট
ভােগ করেছে, আজীবন কাল করবেও; আমার অদৃষ্টে কষ্ট
ছিল, ভােগ করেছি, ভােগ করবার জন্যে প্রস্তুত আছি।
আমার সমাজ যাক, ধৰ্ম্ম যাক, বিবাহিতা স্ত্রী যাক, আমায়
বাবার যােগ্য ছেলে হবার আশীৰ্বাদ শুধু কর।”
“পবিত্র

আয়ুষ্মতা
৭৮
উমার মুখ দিয়া আর কথা বাহির হইল । পবিত্রের
মাথাটা বুকের মধ্যে চাপিয়া ধরিলেন।
“তাই যদি হয়, তবে তাই আশীর্বাদ করছি বাবা,
ভগবানের কাছে প্রার্থনাও করছি তাই।"
একটুখানি ***? থাকিয়া বলিলেন “কিন্তু আমি যে
থাকতে পারছি ন পবিত্র, আমি বউমাকে লুকিয়ে এক,
থানা পত্র দেব কি ? তাের কৰ্ত্ত তুই পালন করে যা,
আমার কর্তব্য কি এই-ই নয় ? আহা, তার জন্যে আমার
বড় কষ্ট হচ্ছে।”
পবিত্র শুষ্ক মুখে বলিল “না মাসীমা, তােমার ও পত্র
দেওয়া উচিত নয়। বাবা যদি বলেন দিতে পার, কিন্তু
বাবাকে না জানিয়ে পত্র দিলে বাবাকে অপমানিত করা
হবে মাত্র।”
“তবে থাক
আর খানিক চুপ করিয়া থাকিয়া উমা কাৰ্য্যোদ্দেশে
উঠিয়া গেলেন, পবিত্র ও বাহিরে চলিয়া গেল।
বাহিরে তখন রীতিমত একটা সভা বসিয়া গিয়াছে।
আজ ভবশঙ্করের মুখে হাসি ধরিতেছে না। সচরাচর
তাহার মুখে হাসি বড় কমই দেখা যায়, আজ হৃদয়ের
আনন্দ মুখে উছলাইয়া উঠিতেছে। টোলের পণ্ডিত

৭১
আয়ুষ্মতী
শিরােমণি মহাশয়কে উদ্দেশ করিয়া তখন তিনি বলিতে-
ছিলেন, “বুঝেছেন, শি রামণি মশাই, আজকার দিনে
রাময়ের দেখা নেই। আর মাস কত আগে সেই দিনটার
কথা মনে করুন দেখি একবার। বাস্তবিক আমি সেদিন
মােটে ভাবিনি, রামময় আমার বাড়ী আসবে। আপনারা
তো বরাবরই দেখে আসছেন, সে কথনও আমার বাড়ীর
ছায়া মাড়ায় না, হঠাং সে সেদিন এসে হাজির। উদ্দেশ্য
তার আমায় লাঞ্ছিত, অপমানিত করা কি না, তাই এসে
সভায় সেদিন মহাভারত গেয়ে গেল। আজকার দিনে
তার খোজ নেন দেখি ? আজ যে মা সুদ্ধ লােক এসে
খে", গেল, আমার, পবিত্র এম-এ পাশ করেছে, আজ
কি সে এ দিক মুখো হবে?*
শিরােমণি মহাশয় একটিপ নস্য লইয়া মুখথানা বিকৃত
করিয়া বলিলেন “আরে রাম, তার কথা আর বলবেন
না।
অমন লােক যদি দুনিয়ায় আর একটা দেখা যায়।
বুঝেছেন—নিজের ঘরে কত অমাচার ব্যাভিচারিতা না
চলে যাচ্ছে, তাতে কোনও দোষ নেই, দোষ হল আপনার
বেলাতেই।
মনে মনে একটু অসন্তুষ্ট হইয়া ভবশঙ্কর বলিলেন “কিন্তু
এটা তো ভাবা উচিত, আমরা জেনে শুনে বিয়ে দিয়েছি

আয়ুষ্মতী
৮০
কি না? এতাে মশাই জানা কথা, আমি এ বিয়ের কিছুই
জানিনে। আমার একটামাত্র ছেলে, তার বিয়ে সে কি
বড় মুখের কথা? বিয়ের কথা জানতে পারলে আমিই
যে পঞ্চাশ খানা মায়ের লোক তখনি এক করতুম।
আমায় না বলে-ছেলে মানুষ, খেয়ালের বশে একটা কাজ
করে ফেলেছে, তার জন্যে রামময়ের এতটা করা উচিত
হয় নি। আমায় যদি আগে একটিবার চুপি চুপি জানাত
যদি অত হৃদ্যতারই দরকার ছিল তার, সেইটেই না সব
চেয়ে ভাল কাজ হতো, দেশে দেশে এ কলঙ্কের বার্তা
ভেসে যেত না। বুঝেছেন শিরােমণি মশাই, এ হচ্ছে
কেবল শক্রতা, শত্রুতা করবার জন্যেই সে নিমন্ত্রণ নিয়ে
এসেছিল। কিন্তু বাছা আমায় সমাজচ্যুত করবেন ! এমন
কি ক্ষমতা আছে তার? আমি নিজে হচ্ছি সমাজের মাথা।
আমার ছেলে না জেনে না শুনে বেশ্যাকন্যাকে বিয়ে করে
এনেছে বলে আমিও যে তাকে গ্রহণ করব, এমন কথা
কিছুতেই হতে পারে না। এই যে জানতে পারবামাত্র
সেটাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলুম, আর একটা রাত
পৰ্য্যন্ত আমার বাড়ীতে থাকতে দিলুম না। বলি ভয়টা
বেশী তার না আমার। আমারই জাতিপাত হবে,
ধর্মপাত হবে, তার তো কিছুই হবে না।”

৮১
আয়ুষ্মতী
শিরােমণি ঘাড় কাত করিয়া সােশ্লাসে বলিয়া উঠলেন
“ঠিক কথা বলেছেন ; সত্য কথা বলেছেন।
বলবেন না, আপনি কি যে রস লোক ? কথাতেই আছে-
ষে যেমন ভার সইতে সক্ষম, ভগবান তার ঘাড়ে নি
ভার দেন, তার সাক্ষী আপনিই। ভার সইবার মত
ক্ষমতা আপনার আছে বলে আপনার ঘড়ে এ ৩৭ ৬ একটা
জমিদারী, এত বড় একটা সমাজ। সমাজের উচ্চ আশ
আপনি। সেদিন পতিতার মেয়েকে ত্যাগ করে যে আদর্শ
দেখিয়েছেন, তাতে চারদিকে ধন্য ধন্য পড়ে গেছে। সবাই
বলছে, সমাজে এমন লােক আর হবে না।
রামমগ্ন বাবু
দেখছেন ভগবান আপনার অনুকুল, কেন না আপনাকে
লাঞ্ছিত সমাজচ্যুত করবার ন্যই তিনি অত লােকের
সামনে কথাটা পাড়লেন, কিন্তু ফল হল সম্পূর্ণ উন্টে!, দেশে
আপনার নামে জয় জয়কার পড়ে গেল। ব্যাপার ?'ইর
দেখে তিনি এখন পেছিয়ে গেছেন, তাইতে বড় একটা
লােকের সামনে বারও হন না।”
অতিরিক্ত প্রশংসাবাদে স্ফীত হইয়া বশর তামাক
টানিতে লাগিলেন।
হইতে আস্তে আস্তে
সরিয়া পড়িল।
পবিত্র দূর

আয়মতী
বুকের সে যেন ত স ম ন ! হয়ত দুচারদিন
ভাল যায়, এক এক দিন যাক কি রকম ব্যথা ধরে, বৃ
জলধর অসীম নাম নীল ইয়া যান, তথাপি পাছে পূরবী
ভয় পায় তাই মুখ ফুটিয়া কিছুই বলেন না।
কিন্তু তিনি না বলি ও পূব? হাত নিজের
বেদন' সে ভুলিয়া গেল ইচ্ছ। কয়', এক দিন তাকে
কিছু না জানাইয়া সে ডাক্তার ডাকল।
ডাক্তার আসিয়া পরীক্ষা করিলেন, মিৰ মুখে বলিলেন
হৃৎপিণ্ডের ব্যায়াম হয়েছে, খুব সাবধানে রাখা দরকার ।
একটু বেশী রকম ধাক} খেলে হার্ট ফেলও করতে পারে।”
ব্যাকুল ভাবে দাদামহাশয়ের বুকে হাত বুলাইয়া দিতে
দিতে কক কণ্ঠে পূরবী ডাকিল “দু-
তাহার মনে সঙ্গে সঙ্গে জাগিয়া উঠিল, আর বুঝি সে
বহু বলিয়া ডাকিতে পাইবে না, তাহার এ ডাক ও বুঝি
চিরকালের মত ফুরাইয়া যায় । জগতে মাসয়া সে একটা
মাত্র স্নেহপূর্ণ হৃদয় পাইয়াছে, সে হৃদয় ও বুঝি ছাড়া হয়।
চির ভাগনী সে, মা বলিয়া সে ডাকিতে পায় নাই, মা
নাম মুখে আনিতে তাহার কণ্ঠ জড়াইয়া যায়, দাদামশাইকে
ডাকিয়া সে একাধারে সব নামে ডাকারই সার্থকতা লাভ
*

আয়ুষ্মতী
রিত। তাহার অইবশে বুঝি তাহার দাদুও যান।
অভাগিনী ঠাৎ ছসিত হইয়া কানিয়া উঠি, আবার
ডাকি, “দাদামশাই।”
“অঃ পাগ, পে অল? কেন, বল দেখি ? ডাক্তার
- গাছ মামার ডিজি হয়েছে, কোন সময়ে হাট
ফেল করবে, তাই ঝি? আরও সব নিছক মিথ্যে
কথা, তা বু বুঝতে পারছিন নে ? ডাক্তাররা অমনি
বাড়িয়ে বলে, রোগ না হলেও এ রােগ হয়েছে ; সামান্য
একটু সর্দি জ্বর হলে :বে ব্রংকাইটিস, মকিয়ে বুকে পিঠ
ব্যথা হলে বলব নিউমােনিয়া। ছেলে মানুষ ই, ওদের
চালাকি বুঝবি কি করে? ওদের মতলব কি তা জানিস ?
যাতে তাকে বেশী কল দেওয়া হয়, কারণ, টাকা বেণী
পাবে; আমি তােকে এই জই বারণ করেছিলুম না-
ডাক্তার আনিস নে অনর্থক উৎকণ্ঠা বাড়িয়ে তুলবি ?
দেখ, বুড়োর কথা সত্যি হয় কি ন ?”
কিন্তু এ কথার পূরবী ভুলিল না, সে অপূর্ণ নেত্রে
বলিল “না দাদামশাই, তোমার চেহারাও বড়ড খারাপ
হয়ে গেছে, তুমি দেখতে পাচ্ছে। না-তাই
দাদামহাশয় তাহাকে তাড়াইয়া গেলেন, মুখ বিকৃত
করিয়া বলিলেন “আমার শরীরের অবস্থা আমি বুঝব না

আয়ুষ্মতী
৮৭
তো বুঝবে কি ওই ডাক্তারটা? একটা নল বুকে পিঠে
বসালেহ সে আমার চেয়ে বেশী জেনে গেল আর কি ?
যা যা তাের কাজ কর গে যা, বড়ালটাকে পাওয়া গে
রান্নাঘরে ক খুটখুট করে নড়ছে, হয়তো সে পােড়ারমুখ।
গিয়ে পেটের জালায় দুধ চুরি করে খাচ্ছে । থাবে না?
বা কেন? তুই তাে তাকে পেট ভরে খেতে নিবি নে,
কাজেই তাকে চুরি করে খেতে হয়। সত্যি যদি খায়,
তা হলে কিন্তু কখনো বলতে পারবি নে বিড়ালে মাছ
খেয়েছে, দুধ খেয়েছে।”
পূরবী উৎকণ্ঠিত ভাবে বলল “না, কিছু খেতে পারণে
দাদামশাই, সব ভাল করে ঢাকা আছে। কিন্তু দাদা-
মশাই
“আবার দাদামশাই ? নাঃ, এমনি করে বিরক্ত করে
যদি মারিস-তবে আমি আর বাঁচব কয়দিন বল দেখি
তুই এমনি করেই তাে আমায় খাচ্ছিস। নে, কাজ না
তো
থাকে ওই বইখানা নে দেখি, কাল বিকালে লাইব্রেরী হতে
তাের পড়ার জন্ঠে এনেছিলুম ; তা তুই যা মুখ ভার করে
থাকি, আমার মােটে সাহস হয় না তাের কাছে দিতে।”
পূরবী বইখানা হয়া আসিয়া বসিল, নেহের সুরে
বলল “না দাদু, আর আমি কক্ষনাে তােমার অবাধ্য
;

আয়ুষ্মতী
আবার তেমনি হব, তেমনি আমরা দুজনে খেলা করব,
বই পড়ব, তুমি ভাল হয়ে ওঠ দাদামণি।”
বিরক্ত বৃদ্ধ বলিলেন “আবার ওই কথা, আমার কি
হয়েছে বল দেখি? তুই বড্ড বেশী বাড়িয়ে তুলেছিস পূরবী,
• রকম করলে আমি আর কক্ষনো তাের সঙ্গে কথা
লব না।”
“না না দাদামশাই, আর কক্ষনো ও সব কথা মুখে
নব না, আর বব না।”
পূরী নিজের বেদন' ভুলিয়া দাদামশায়ের বেদনা দূর
করিবার চেষ্টায় ফিরি লাগিল! যাহাতে তাহার
অনুমাত্র কষ্ট না হয় সে দিকে দৃষ্টি রাখিল। সে হাসিকে
‘স বিদায় দিয়াছিল, সেই হাসিকে সে আবার ফিরাইয়া
অনিল, আবার তেমনি খেলিতে পড়িতে লাগিল।
পূরবী হাতে এক একদিন ছাদে লইয়া গিয়া বসিত
সে দিনে সন্ধ্যার সময় দাদামহাশয়কে ছাদে বসাইয়া তাহার
প্রিয় সেতারটি তাহার হাতে দিয়া বাজাইবার জন্য দৃঢ়
অনুরােধ করিয়া বসিল।
বহাল তিনি সেতার বাজানাে বন্ধ করিয়াছেন,
পূরবীর বিবাহের পর এই দুই বৎসর তিনি সেতারে কাত
দেন নাই। মাড়সার জালে ও ধূলায় সর্বাঙ্গ আবরিত

আয়ুষ্মতী
৮৬
করিয়া সেহরী দেওয়ালেই ঝুলিতেছিল, বহুকাল পয়ে
আজ সে আবার জলধরের হাতে পড়িল।
কিন্তু সুর যে ঝঙ্কারিয়া উঠে না।
যে সুরে সে গান
গাহিত, আনন্দের সে সুর যে কোথায় হারাইয়া গিয়াছে।
রুদ্ধকণ্ঠে তিনি বলিনে “কি করতে আর সেতার দিলি
দিদি, এতে যে কোন সুরই ঠাতে পারছি নে।”
ধরা ধরা কণ্ঠ পূরবী বলিল “পারবে না, পাবে।
দুইটী বছরে সুর বেসুরে চলে গেছে, একটু চেষ্টা কর,
এখনি সে সুর মিলে যাবে দাদামশাই।"
সেতারে সুর উঠিল, কিন্তু এ তো সে সুর নয় ।
সুরের তালে তালে আনলে হৃদয়ের রক্ত উচ্ছলিত হইয়া
উঠিত, সে সুর কোথায় গেল? এ যে কদিনভর সুর,
বেদনাভরা গান, আহা হা, সে আনন্দ কই রে, সে দিন
কই ।
সুর অনেক ক্ষণ ঘুরয়া ফিরিয়া উঠিয়া নামিয়া নিস্তব্ধ
হইয়া গেল ; পূরবী গােপনে চোখ মুছিল।
“দাদু, এ কি সুর এনে ফেললে সেতারে, এ যে কান্না
ভরা, ব্যথায় মাথা। সে সুর তােমার কোথায় গেল
দাদু ?
রুদ্ধকণ্ঠে দাদামশাই উত্তর দিলেন “হারিয়ে ফেলেছি

আয়ুষ্মতী
.
যা হয়ে গেছে তাকে আর খুঁজে পাচ্ছি নে।
এ জীবনটায় একটানলোকসানই ১লেছে , লাত
কিছুতেই নেই। লোকসান অনিবার্য বলে-
নিজের যা সঞ্চি , ২, ৪ একে একে হারিয়ে ফেলছি।
কত কোনো ক্ষনস আবার খুজে পায়, আমি
তা কখনও পাইনি, আর পাবার আশাও নেই।
অনেকনি পথ চলে শান ক্লান্ত হয়ে এখন য়ে এসে
বসে পড়েছ। এন মনে করছ কত ছিল, কত গেছে,
কিছু কখনও পাইনি। পাবার আশা করিনি যে, এমন
কথা
भाम
এখন ও ওমার বাবার মমতা
নেই *
“কি পাবার আশা করেছিলে দাদামশাই ?* পূরবীর
ক কাপিয়া গেল।
ধীর কণ্ঠে দাদামশ দিলেন “সব হারিয়ে আসার
পথে ও বু , কি আশা করেছিলুম, দিদি, সে কথা বলা
ভার। মরতে বসেও মানুষে মশা তে ছাড়ে না ভাই।
জলে ডুবে মরছে, তবু একটা খড় পেয়েও আঁকড়ে ধরে
বাঁচতে চায়। আর সে সব ব্যর্থ কথা বলে কি কাজ হবে
দিদি, কিছু ফল নেই।”
“চৌধুরী মশাই- বাড়ী আছেন কি?”

হায়তা اا পূরবী সচকিত হইয়া বলিয়া উঠিল “কে তােমায়, ডাকছে দাদামশাই?” সুরে দাদামহাশয় বলিলেন “কে আর ডাকবে? নিচের পথের উপর হইতে আবার কে ডাকিল *চাধুরীমশাই- “চল দাদামশাই, তােমায় নিচে যেতে হবে। ভদ্রলােক ডাকছেন দেখা তো দরকার। দাদামহাশয়কে বাহিরের ঘরে পৌছাইয়া দিয়া সে পর ঘরে চলিয়া গেল। জলধ? দরজ' লিয়া দিতেন, ' দরকায় দাড়াইয়া বনমালী। কি কাৰ্য্য বাপদেশে তিনি কলিকাতায় আসিয়াছিলেন, এই সময়টায় একবল দুঃখিনী পূরবীকে দেখিয়া যাইবার প্রলোভন তিনি এড়াইতে পারেন নাই। আজই হার ফিরিয়া যাইবার অন্য ভবশঙ্করের আদেশ ছিল, তিনি সে আদেশ ঘন করিবেন ভাবিয়াছিলেন। মনটা ভােদার কি রকম অপকৃতিস্থ হইয়া গিয়াছিল, প্রভুর আর সব আদেশ তিনি বর্ণে বর্ণে প্রতিপালন করিয়া আসিতেছেন এ, আদেশ তিনি পালন করিবেন না।

আয়ুষ্মতী
”
ধনীকে দেখিতে সবাই আছে, দরিদ্রের যে কোই নাই।
ধনী অনায়াসে সমাজের মাপ হইয়া দাড়ায়, ধরিতে গেলে
সমাকে সে নিজের ইচ্ছানুসাৰেই চালিত করে। দরিদ্র
সেই সমাজের পেষণে পেষিত ইয়' নীরবে শুধু চোখের
জই ফেলিয়া যায়।
দরিদ্রের দুঃখ বনমালী বুঝিতেন, সমাজের পীড়নে
পীড়িতদের বাধা তিনি বুক দিয়া অনুভব কবিতন! তাই
সময়ের বিরুদ্ধে দাড়াইবার সুন্য, সমাজ সংসারের সহিত
যুদ্ধ করিবার জন্য তিনি সর্বদাই প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু হায়,
নগণ্য লােক তিনি, সমাজ তার কথা কাণেই তুলে না।
তাহার যুক্তির সারবত্ত্বা অনুভব না করিয়াই হাসিয়া
একেবারে উড়াইয়া দেয়। যদি কোনও একজন ধনী
পৃষ্ঠপোষক তিনি পাইতেন, তাহার কথা সমাঙ্গ শুনিত,
তাহার যুক্মিত চলুক বা না চলুক, অত ভাবিয়াও
দেখিত বটে। প্রভু শঙ্কর তাহার সম্পূর্ণ বিরােধী
ছিলেন। পরস্পর বিপরীত পথে চলিলেও, তিনি যথার্থই
প্রভুর ভক্ত ছিলেন, ভবশঙ্করের সংসাবই তাহার আপন
সংসার ছিল।
আজ এই বাড়ীখানার দরজায় আঘাত করিয়া ডাকিতে
ডাকিতে তাহার মনে ভবশঙ্করের কুদ্ৰ মত্তি জাগিয়া উঠিল।

আয়ুষ্মতী
যদি কোনও ক্রমে তিনি শুনিতে পান বনমালী ১২নং
কলুটোলায় গিয়াছিলেন, তাহা হইলে তিনি কি বক্ষা
রাখিবেন ?
কিন্তু পিছাই কারও ইচ্ছা ছিল না, যাহাই হোক চিনি
সহ করিবেন, যে দণ্ডই ভবশঙ্কর দিন না কেন, তিনি তাহা
মাথা পাতিয়া এহণ করিবেন।
দরজা খুলিবা মাত্র বনমালী দেখিলেন, সম্মুখে এধর।
দুই বৎসর আগে তিনি যে জলধরকে দেখিয়ছিলেন,
তাহার সহিত, ইহার আরুত মিলাইয়া বনমালী বিস্মিত
হইয়া চাহিয়া রহিলেন। দুই ট বৎসর মাথার উপর নিয়া
যেন বহিয়া গিয়াছে, তাই সে সটান দীর্ঘ দেহ আর নাই,
তিনি অনেকটা কাবুইয়া পড়িয়াছেন।
“প্রণাম করি চৌধুরী মশাই—*
তিনি প্রণাম করিতেই জলধর অত্যন্ত সচকিত হইয়া
পিছাইয়া আসিলেন, লােকটি যে কে তাহা মােটে চিনিতেই
পারিলেন না।
বনমালী অগ্রসর হইয়া বলিলেন, “আমায় চিনতে
পারছেন না বােধ হয় ? আমি ভবশঙ্কর বাবুর দেওয়ান
বনমালী রায়। দু বছর আগে নূরপুরে আপনার সঙ্গে
আমার দেখা হয়েছিল, মনে করে দেখুন।

আয়ুষ্মতী
ন।
“নূরপুর-ভবশঙ্কর বার দেওয়ান
জলধর চমকাইয়া উঠিলেন, কতক্ষণ তিনি কথা বলিতে
পাছিলেন না
নিজেকে
সামলাইয়া
বলিনে
“আসুন, আসুন, বসুন। সত্যই আমি চিনতে পারি
5োথে মোটেই আর দেত শইনে বনমালী
বাবু, নিবই বা কি করে ? এই যে, এই পােষে
সুন।”
‘সিতে বসতে বল বলন “এই দুই বছরেই
আপনার .5াখ এত খাপ হয়ে ল ..ধু মশাই ?
তখন তাে বশত (
পেন নেগেছি।
নৈরাশ্যের হাসি বৃদ্ধের মুখে ফুটিয়া উঠিল। একটা
নিঃশ্বাস ফেয়ি :নি বলেন, 'সে এক দিন গেছে
বনমালী বাবু। নিতে যাচ্ছে, সে ধিরে আসছে না।
দিন যাওয়াব স স শরি বল,চাখে :ষ্টি, দিন
দিন সবই যাচ্ছে। এখন হয়ে যাচ্ছে বনমালী বাবু,
বয়েস বাড়ছে না !
এবার একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস হার
বক্ষ বিদীর্ণ করি। বাহির হইয়া গেল।
ব্যথিত বনমালী তাহার অন্ধকার শোকাচ্ছন্ন মৃগনার
পানে চাহিয়া রহিলেন, নিজের অজ্ঞাতসারে কখন একটা
নিঃশ্বাস ফেলিলেন তাহার ঠিক নাই।

আয়ুষ্মতী “তার পর—সেখানে সব ভাল আছেন? পবিত, তার বাপ, মাসীমা?” বনমালী বাড় কাত করিয়া বলিলেন “সবাই ভাল আছে। বৃদ্ধ আত্মভােলা এক এক করিয়া কত প্রশ্ন করিয়া চলিলেন তার ঠিকই নাই, বনমালীও তাহার প্রশ্নের উত্তরে দিয়া যাইতে লাগিলেন। ঘুরিয়া ফিরিয়া আবার পবিত্রের কথা সিয়া পড়িল- “বনমালীবাবু, পবিত্র মার এক বারও কলকাতায় আসে নি, আজ দু বছরের মধ্যে ?” বনমালী মিথ্যা বলিতে পারিলেন না, এই সরল হৃদয় মৃত্যুপথযাত্রী অতি বৃদ্ধের কাছে মিথ্যা কথা বলিতে তাহার কণ্ঠ জড়াইয়া আসিল, তিনি বলিলেন “হ্যা, সে তো প্রায়ই আসে। * প্রায়ই আসে? বৃদ্ধ চুপ করিয়া গেলেন। প্রায়ই আসে, কিন্তু তাহাতে তাহার কি? বিশাল কলিকাতা সহর, ইহার মধ্যে তাহারা দুটিতে কোথায় এক কোণে পড়িয়া আছেন, কে তাহার খােজ রাখে ? এখানে আসলেই যে তাহাদের কাছে তাহার আসিতেই হইবে, এমন কোনও কথা নাই। } আয়ুষ্মতী . তাহাদের সহিত তাহার তো সব সম্পর্কই উঠিয়া গিয়াছে, তবে সে আনিবেই বা কেন ? সম্পর্ক উঠি। গিয়াছে, হায় রে, কথাটা বলা যত সহজ, কাছে যদি তাহাই হইত! দাগ (যে বুকের মাঝে একেবারে চিরতরে অঙ্কিত হইয়া গিয়াছে, এ যে কিছুতেই উঠিতেছে +1। চিত সে স্বলিয়াছে, এ অগ্নি যে কিছুতেই নিধ্বাপিত ইতেছে না। সম্পর্ক নাই, জোর করিয়া এই কথাটা বলিলেই কি ইল, তাহাই কি সম্ভব হয় কখনও ? কম্পিত কণ্ঠে তিনি ডাকিলেন বনমালী বাবু” বনমালী উত্তর দিলেন “বলুন- চকিতে বক্তব্যটাকে ২াপিয়া জলধর বলসেন “না, বছিলুম কি, কি, অসকার দিনটা এখানে থেকে যাবেনা ?” তিনি যে কি একটা থাভরা কথা প্রকাশ করিতে গিয়া হঠাৎ তাহ; চাপিয়া গেলেন, বুদ্ধিমান বনমালী তাহা বুঝিলেন ; সে প্রসঙ্গে আর কথা না তুলিয়া তিনি বলিলেন “এসেছি যখন অবশ্যই পেকে যাব বই কি? আমি রে আমার নির্বাসিত। মাকে একবার দেখতে এসেছি চৌধুরী মশাই, শুধু দেখেই যাব না, আমার মায়ের হাতের রান্না পর্যন্ত খেয়ে যাব। সমার খায় নি, তা বলে আমায় অন্ন

আয়ুষ্মতী
৯৪
দিতে তিনি সেন চতনা হন। 'আমি ভবশঙ্কর নই,
আমি পবিত্র নই, আমি সমাছালক, আমি মায়ের
ছেলে । মা ই নে না .কন, ছেলের কাছে তিনি
চিরন্দা। এক ওর ডকুন আমা: মাকে, আমিই তাঁকে
বলছি, শীগগ করে তামায় !? • • নিতে হবে।”
&ি ই বুক পৃরী ‘
কই এসব হইতে পারিল
না, নিজের কথা মনে কয় নাই সে মরমে মরিয়া
যাইতেছিল, নিজের হীনতা ?? কানে সুট হইয়া
উঠিতেছিল।
বনমা নিজেই গিয়া তাই ! ? দাড়ালেন, হাসি
মুখে বলিনে “তোমার এত কুণ্ঠ সাজবে ন}
মা লক্ষ্মী? ছেলেকেই য: $ করে চলবে তুমি. তা
হলে অসঙ্কুচিত তা তুমি লা ও ককথায়? ওরকম
করলেই চলবে না মা, বেশ ঝ* এই বুড়োকে তাড়ান
কৌশল তোমার। কিন্তু বুড়ো ছেলে মার বড় নাছোড়
'বান্দা ; সে মায়ের আঁচল কিছুতেই ছাড়বে না। তোমায়
ভাত রাঁধতেই হবে, আমার একাল ভাত দিতেই হবে।
থাইয়েই যে তাড়াবে সে হতে পাবে না।”
পূরবী নত মুখে রুদ্ধ কণ্ঠে বলিল, মার হাতের ভাত
আপনি পাবেন কাকা?”

আয়ুষ্মতী তাহার কাকা সম্বােধনে অত্যন্ত খুসি হইয়া উঠিয়া বনমালী বলিয়া উঠিলেন “খাব না, আলবং খাব । তুমি একবার ভাত নিয়ে দেখ না মা, হাঁড়ি আজ তােমার কাবার করে ছাড়ব। পেটে আমার কি খিদে তা মা হয়ে জানতে পারছ না মা ?" “কিন্তু আমি যে পতিতার মেয়ে কাক- রুক্ষ কণ্ঠে বনমালী বলিয়া উঠিলেন “আবার সেই পচা পুরানো কথা, শুনে শুনে কাণ ঝালাপালা হয়ে গেল। এ জগতে পতিতই বা কে আর মহৎই বা কে মা ? পতিত মহৎ এক জায়গা হতে এসেছে, এক জায়গায় যাবে, কাৰ্য্য- কালে সেখানেই তার বিচার হবে, সে জন্যে আমাদের তো এতটা মাথা ঘামানোর কোনও দরকার দেখছি নে। তােমায় আমরা পেয়েছি, তােমার পতিতা মাকে তো পাইনি যে, তার পাপ ওজন করে দেখতে যাব। মায়ের বাপের পাপে সন্তান যদি বৃণিত হয়, তাকে যদি দণ্ড দেওয়া হয়, দণ্ডদাতার জন্যেই যে অনেক দণ্ড তােলা থাকবে না, পরিণামে সে দণ্ড তো কেউ রদ করতে পারবে না। অশ্রুসজল নেত্রে পূরবী নত হইয়া বনমালীর পায়ের ধূল তুলিয়া লইয়া মাথায় দিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। চকিতে

আয়ুষ্মতী
১৬
কখন সে গোপনে চোখের জল মুছি ফেলিয়াছিল, থে,
সংযত শুকণ্ঠে সে বলিল “বসুন কাকা, আমি ভাত বসিয়ে
দিয়ে আসি।”
“শীগগির কিন্তু মা, বড় থিদে পেয়েছে।
প্রসন্নমনে পূরবী চলিয়া গেল।
সে বিবাহটা যে বিবাহই নয়, ভবশঙ্কর তাহা সপ্রমাণ
করিতে কিছুমাত্র কুটি করেন নাই । কাটাপাড়ার
বদ্ধিষ্ণু জমিদার বাবুর একমাত্র সুন্দরী মেয়ের সহিত পুনর্বার
পবিত্রের বিবাহ দিবার জন্য তিনি এবার নামিয়া পড়িলেন।
পবিত্রের মুখ শুকাইয়া গেল, আবার বিবাহ ? তাহার
ধম্মসঙ্গত বিবাহ যে হইয়া গিয়াছে।
অসহায়ের সহায় মাসীমাকে সে গিয়া ধরিল “তোমাকেই
এর একটা উপায় করতে হবে মাসীমা, নইলে চলবে না।
মাসীমা বলিলেন “আমি কি করব বাবা?
“বিয়েটা যেমন করেই হােক বন্ধ রাখতে হবে।”
ইদানিং পবিত্র পূর্বের স্বভাবই প্রাপ্ত হইয়াছিল।
আগেকার মতই সৰ্ব্বদা হাসিত, পড়াশুনা করিত, মাসীমার
কাজে সাহায্য করিতে আসিয়া অভ্যস্ত হন্তে একটা

১৭
আয়ুষ্মতী
করতে গিয়া আর একটা করিয়া অপ্রতিভ হইয়া হাসিত।
সে যে এখনও সেই কয়টা বৎসর পূর্বের স্মৃতিখানা মনের
মধ্যে জাগাইয়া রাখিয়াছিল, উমা তাহা জানিতেন না।
শেষ কালটায় পবিত্রের ছেলেমানুষী ভাবটা পুনরায়
প্রত্যাবর্তন করিয়াছিল বলিয়া তিনিও সকলের মত ভুল
বুঝিয়াছিলেন।
বিস্মিত ভাবে তিনি পবিত্রের পানে চাহিলেন, পবিত্র
অপ্রতিভভাবে অন্যদিকে মুখ ফিরাইল।
উমা বলিলেন “বিয়ে করবিনে, সে প্রতিজ্ঞা এখন তুই
অটুট রাখতে চাস পবিত্র ?”
পবিত্র অন্যদিকে মুখ রাখিয়াই উত্তর দিল “হ্যা
মাসীমা। আমার বিয়ে তাে হয়েছে, আবার বিয়ে করা
পাপের কাজ নয় কি?
“কিন্তু সে স্ত্রীকে তুই আর গ্রহণ করতে পারবিনে
তো পবিত্র, নিজের মুখেও তাে বলিছ।”
পবিত্র অন্তরে দৃষ্টিলাভ করিয়া পূরবীর মূর্তিখানা
একবার দেখিয়া লইল, তাহার পর বলিল, “সত্যি সে কথা,
আমি তাকে গ্রহণ করতে পারব না। কিন্তু তবুও মাসী,
আমি আর বিয়ে করতে পারব না, তুমি একবার বাবাকে
কোনও রকমে এ কথাটা বললে-

।
আয়ুষ্মতী
উমা শিহরিয়া বলিলেন “তুই ক্ষেপেছিস পবিত্র, আমি
দাদামণিকে এই কথা বলতে ? তার সামনে আমি
মােটে কথাই বলতে পারিনে, এ কথ বলব কি করে?”
পবিত্র ছড়িল না, বিশেষ করয়া তাহাকেই ধরিয়া
বসিল, “পারব না বললে চলবে ন, মাসীমা, তােমাকেই ও
কাজ করতে হবে, তুমি ছাড়া আর কেউই পারবে না
আমি বলতে পারতুম সীম', কিন্তু ভেবে দেখলুম, আমার
বলা উচিত নয়, বাবাকে সেটা স্পষ্ট ঝেড়ে ফেলা হয়।
বাবার আত্মাভিমানে একটা দারুণ অাঘাত লাগবে, ৫ে
আমি নিজে তার মুখের 'পরে জবাব দিয়ে দিলুম
মাসীমা—”
এমন আর্তভাবে সে মাদীনা বলিয়া ডাকিল যে, মাসীমা
আর স্থির থাকতে পারলেন না, লিলেন, “তাই হবে রে,
তাই বলব। আমিই না হয় কথাটা তুলে দেব কাণে
তিনি আমায় তার পর যাই বলুন। তােকে আমি স্পষ্টতা
তার সামনে গিয়ে দাড়াতে দেব না, তার সে রাগের ঝড়টা
আমার ওপরেই প্রথমটা এসে পড়ুক, আমার দ্বারা ৫তিহত
হয়ে সেটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ক, তােদের বেশী ধাক্কা
দিতে পারবে না। আচ্ছ। যা, আমি বলব এখন, তার
মঞ্চে প্রস্তুত হয়ে থাক গিয়ে।”

আয়ুষ্মতী
সমস্ত দিনের মধ্যে অন্তঃপুরে ভবশঙ্করের পদার্পণ হইত
এক টীর মা, আহারের সময়। উমা ভাবিয়া রাখিলেন,
সেই সময় কথাটা তু যাইবে।
কিন্তু ভবশঙ্করের স্ত্রীর মুখের পানে চাহিয়াই তাহার
বক্তব্য তিনি হারাইয়া ফেলিলেন। তাহার এতখানি
বংস হইয়াছে, অাজও ছোটবেলার মত তিনি সহসা
ভবশঙ্করের সম্মুখে বাহির হইতে পারিতেন না, কোন কথা
জিজ্ঞাসা করতে গেলে কণ্ঠ : ড্রাইয়া আসিত।
কিন্তু না বলিলেও যে নয়, পবিত্রের কাছে তিনি যে
স্বীকার করিয়া আসিয়াছেন।
বলি বলি করতে করতে ভবশঙ্করের অাহার শেষ
কইয়া গেল, তিনি গণ্ডুষ করিলেন ।
আর চুপচাপ থাকা সঙ্গত নয়। বশর এখনই গির।
শয়নকক্ষে প্রবিষ্ট হইয়া দ্বারাদ্ধ করিবেন, ঘন্টা খানেক
বিশ্রাম করিয়া অাবার বাহিরে যাইবেন।
ক পরিষ্কার করিয়া তাড়াতাড়ি ডাকিলেন “দাদা-
মণি-একটা কথা
ভবশঙ্কর বলিলেন “কি বলছ উমা ?”
উমা ধীরে ধীরে বলিলেন “পবিত্রের ইচ্ছে-
ভঞ্চিত কমিয়া ভবশঙ্কর বলিলেন “কি পবিত্রে

আয়ুষ্মতী
১০০ ।
T
ইচ্ছে ? যা বলবে ঝ। করে বলে ফেল, আমি আর বসতে
পারছি নি।”
তাহার কুঞ্চিত জযুক্ত গম্ভীর মুখ, ততােধিক গম্ভীর
কথা শুনিয়াই উমার বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস করিতেছিল,
অতি কষ্টে তিনি বলিয়া ফেলিলেন “পবিত্রের ইচ্ছা নয় যে,
সে এ বিয়ে করে, সে অামায় তাই
“বস করে গর্জিয়া উঠিয়া ভবশঙ্কর বললেন “বলতে
চাও, তার ইচ্ছে সেই পতিতা-কন্যাকে নিয়ে এসে সংসার
পাতবে, আমার পবিত্র ভিটে কলদ্ধি করবে ?
কাপিয়া উঠিয়া উমা বলিলেন “না, সে সে কথাও
বলছে না। সে সে স্ত্রীকে গ্রহণ করবে ন', কিন্তু এ বিয়েও
করবার তার মত নেই।”
ভবশঙ্কর হাসিলেন, তখনই মুখের সে কর্কশ হাসি
মিলাইয়া গেল- “আশ্চৰ্য্য কথা উমা, তার মতলব আমি
বেশ বুঝেছি। সে বিয়ে করবে না, তার মূল উদ্দেশ্য সে সেই
বেকন্যাকেই চায়। আমার বংশের কলঙ্ক হয়ে জন্মেছে সে,
কিন্তু আমি বেঁচে থাকতে এ স্পর্ধা তার কখনই সাজবে না।”
তাহার স্বর অত্যন্ত কঠিন।
“আচ্ছা, তাকে একবার আমার কাছে পাঠিয়ে দাও
গিয়ে, আমি উপরের ঘরে চললুম।”
2

আয়ুষ্মতী
অসংযত পদে খট খট খড়মের শক করিতে করিতে
তিনি সিড়ি বাহিয়া উপরে চলিয়া গেলেন।
তিনি তো গেলেন, বি ও পবিত্র যায় কি করিয়া ?
পিতা যে কঠোর বিচারক, বার বার তাহার অপরাধ তো
তিনি মার্জনা করবেন না। দুইবার গুরুতর অপরাধ
করিয়া সে মার্জনা পাইয়াছে, এবারে তাহার দণ্ড নিশ্চিত।
সে দণ্ডের কথা ভাবিয়া পবিত্র ভীত হইয়া উঠিছিল।
কিন্তু ওই যে “বি * আহ্বান -- সাধ্য কি তাহার, চুপ
করিয়া থাকে সে? তাহাকে যাইতেই হইবে যে, লুকাইয়া
থাকার ক্ষমতা থাকিয়াও যে নাই। চুম্বক যেমন লোহকে
আকর্ষণ করিয়া আনে, ভবশরের আহ্বানও তেম
সকলকে আকর্ষণ করিয়া কাছে আনিয়া ফেলে।
পায়ে পায়ে তাহাকে অগ্রসর হইতেই হইল, সেই
দরজাটার কাছে আসিয়াই সে থামিয়া গেল।
কর্কশ কণ্ঠ পিতা ডাকিলেন “এ দিকে এসাে, ওখানে
দাড়িয়ে কেন?”
পবিত্র কক্ষে প্রবেশ করিল।
“তােমার মাসীমাকে তুমি যে কথা বলেছ, তা শুনলুন।
তােমার উদ্দেশ্য কি, আমি তা শুনতে চাই।”
পবিত্র নীরব

আয়ুষ্মতী
১০২
অন্তরের ক্রোধরূপ বহি পূর্ণরূণেই প্রকাশিত হইয়া
পড়িতে চাহিতেছিল, বুদ্ধিমান ভবশঙ্কর তাহাকে দমন
করিয়া শান্ত কণ্ঠে বলিলেন “তোমার ইচ্ছা বেখাকন্যাকে
আবার এ ঘরে ফিরিয়ে আনা ?”
পবিত্র রুদ্ধ কণ্ঠে বলিল “না বাবা, আমি আপনার পা
চুয়ে প্রতিজ্ঞা করেছি, আপনার অনুম!ি না পেলে আমি
তার মুখ দেখব না। আমি আপনার ছেলে বাবা, আমার
কথা, আমার প্রতিজ্ঞা অটল।”
একটু খুসি হইয়া ভবশঙ্কর বনে “হা, সে প্রতিজ্ঞার
কথা যেন মনে থাকে, কখনও যেন ভুল না হয় : আমার
পবিত্র ভিটে বেঙ্গকন্যার পদস্পর্শে কলঙ্কিত হয়েছিল,
যদিও সে ঠাকুর পূজার যােগাড় করেনি তবু সে সে ঘরে
প্রবেশ লাভ করেছিল, এর জন্য আমায় প্রতিমত প্রায়শ্চিত্ত
করতে হয়েছে। আবার সেই বেশ্যা কন্যা আমার ভিটেয়
পা দিবে-কখনও তা হতে পারবে না।”
পবিত্র নত মুখে বসিয়া রহিল।
তামাক টানিতে টানিতে ভবশঙ্কর বলিলেন “তার পর
বিয়ে করতে নারাজ কেন, শুনি?
পবিত্র নীরব।
নলটা মুখ হইতে সরাইয়া ভবশঙ্কর বলিলেন “চুপ করে

আয়ুষ্মতী
রইলে যে?
একটা কোনও কারণ আছে তো যার জন্যে
তুমি বিয়ে করতে চাও না। সে কারণটা আমায় বুঝিয়ে
বলে দাও, তবে তো বুঝব।”
ধীর স্বরে পবিত্র বলল “কারণ কিছু নেই।”
“কিছু নেই ?”
ভবশঙ্কর বিস্মিত ও রাগত হইয়া উঠিয়াছিলেন, কঢ়
দৃষ্টিতে পুত্রর পানে চাহিয়া বললেন “কারণ কিছু নেই, এ
কথা বলে বুঝাতে পারে। উমকে, তার চোখে ধূলো তুমি
সহজেই দিতে পারে, আমায় পার না তা জানো? আমি
কি সহজেই তােমার ছেড়ে দিব না পবিত্র, এর কারণ
আমি নিশ্চয়ই শুনব, তবে তোমায় ছাড়ব।”
উচ্ছ্বসিত হইয়া পবিত্র বলিয়া উঠিল “সত্যি কথা
বলছি বাবা, কারণ আমি নিজেই বুঝে উঠতে পারি নে।
আমায় ক্ষমা করুন বা , এবারের মতন আমায় ছেড়ে দিন,
আমি বিয়ে করব না, করতে পারব না। আপনি যদি
তাদের কিছু না বলতে পারেন, আমার আদেশ দিন,
আমি নিজে গিয়ে তাদের বলে আসছি এ বিয়ে হবে না।
সব দোষ আমি আমার ঘাড়েই নিচ্ছি বাবা।”
ভবশঙ্কর গর্জিয়া বলিলেন কিন্তু—যত দিন আমি বেঁচে
থাকব, তুমি অপকৰ্ম্ম করলে কথা শুনতে হবে আমাকেই,

আয়ুষ্মতী
১০৪
আর তােমার কাজের ফল আমায় ভােগও করতে হবে।
শােন পবিত্র, বার বার আমায় তুমি লোকের কাছে
লাঞ্ছিত অপমানিত করে এসেছ। এবারেও ব্যাপারটাকে
তুমি যত ছোট বলে মনে করছ, সত্য এটা তত ছোট নয়।
দেশে দেশে এ বিয়ের নিমন্ত্রণ পত্ৰ গেছে, আজ বিকেল
হতে আত্মীয়েরা আসতে আরম্ভ করবেন খবর পেয়েছি।
আর পাঁচদিন মাত্র বাকি আছে বিয়ের। এখন এ বিয়ে
ভেঙ্গে দিতে যাওয়া যে কতদুর নির্বুদ্ধিতার কাজ, সেটা যে
তােমার মত শিক্ষত বুদ্ধিমান ছেলেকে আমায় বুঝিয়ে
দিতে হচ্ছে, এইটাই বড় দুঃখের কথা। দেখ, ছেলে
মানুষ সব সময়ে সকল জায়গায় খাটে না, মাথা ঠিক করে
কাজ করতে হয়। বেশ্যাকন্যা তােমার স্ত্রী হতে পারে না,
তােমার যথার্থ স্ত্রী হবার অধিকার আছে এই মেয়েটার ।
যাও, বেশী ছেলে মানুষি করে না, বয়েস হয়েছে একটু
বুদ্ধি বিবেচনা করে কাজ করতে শেখ। তােমায় এ বিয়ে
করতেই হবে, এই আমার মােট কথা। ও সব উড়াে
ভাবনা ঝেড়ে ফেলে যথার্থ ভাবনা ভাব গিয়ে।
পবিত্র কি বলিবে তাহা ভাবিয়া ঠিক করিতে পারিতে-
ছিল না, তাই তেমনই চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। পাছে
আবার যে কোনও কথা বলিয়া বসে তাই ভবশঙ্কর

আয়ুষ্মতী
গড়গড়া সরাইয়া রাখিয়া একটা হাই তুলিয়া এলিলেন
“যাও যাও, বড় ঘুম আসছে, আর বসতে পারহিনে। কই
উঠলে পবিত্র ?
একরুপ প্রায় জোর করিয়া পবিত্রকে উঠাইয়া দিয়া
তিনি তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করিয়া দিলেন।
বাহিরে আসিয়াই পবিত্রের একটা কথা মনে পড়িয়া
গেল, দরজায় আঘাত করিয়া সে ডাকিল বাবা?”
“এখন যা বাপু, একটু ঘুমিয়ে উঠি, তার পরে যা বলার
থাকে, বলিস।
অগত্যা ভগ্নমনে পবিত্র ফিরিল ।
.

কিছুতেই না, ভবশঙ্করের কথা কিছুতেই নড়চড় হইবে
না। এ কি যে সে লোক—যে কথা মত কাৰ্য্য করিবে
? ভবশঙ্করের যে কথা সেই কাজ।
বাড়ীতে বিবাহের ধুম পড়িয়া গেল। বড় জাকের
বিয়ে, গ্রামে একটা সােরগােল উঠিল। আত্মীয় আত্মীয়াতে
বাড়ী ভরিয়া উঠিল।
পবিত্তের মালিন শুষ্ক মুখখানার পানে চাহিয়া উমা
কিছুতেই শান্তি পাইতেছিলেন না। কিন্তু তাহা হইলই
বা, ভবশঙ্করের কঠিন আদেশ পালন করিয়া যাইতেই
হইবে, ভবশঙ্করের কথার উপরে কথা বলে এমন ক্ষমতা
কাহার?
পবিত্রের মলিন মুখখানার পানে চাহিয়া বনমালী
সাহসে ভর করিয়া একবার ভবশঙ্করের সম্মুখে অগ্রসর
হইয়া পড়িলেন, মাথা চুলকাইয়া খানিকটা আঁা উ করিয়া
শেষে বলিলেন “বাবু, একবার পবিত্রের মুখের পানে
তাকিয়ে দেখে তার পরে কাজটা করতে হতাে না কি?
পবিত্রের মনে মােটে শান্তি নেই, সে কেবল লুকিয়ে

১৩৭
আয়ুষ্মতী
ভবশঙ্কর তাহাকে তাড়াইয়া গেলেন, “যাও যাও,
তােমাকে আর তার পক্ষ সমর্থন করতে আসতে হবে না
বনমালী, নিজের চরকায় তেল দাও গিয়ে। আমার ছেলে,
আমি যা খুসি করব, তাতে কারও কথা বলতে আসার
দরকার দেখছিনে।
তাই বটে, আs পবিত্র তাহার নিজের ছেলে, কিন্তু
এমন এক দিন আসিয়াছিল, যে দিন এই দাম্ভিক
অবশঙ্করই বনবালীর দুখানা হাত চাপিয়া ধরিয়া অপূর্ণ
নেত্রে কণ্ঠে বলিয়াছিলেন “পত্রি শুধু আমার একারই
না বনমালী, বরং আমার চেয়ে পবিত্র তােমাকেই জানে,
চেনে-শালবাসে-- হায়রে! অল্প সেই কি না বলিতেছেন,
পবিত্র আর কাহার ও নহে,
আর কারও পবিত্রের
সম্বন্ধে কথা বলার অধিকার নাই; পবিত্র আজ তাহার
সম্পূর্ণ একার, পবিত্রের উপর অধিকার তাহারই।
ধীরে ধীরে বিশুস্ক মুখে বনমালী সরয়া গেলেন।
দুপুর বেলা আহারানি সমাপ্তে বাহিরে আসিবেন,
অপূর্ণ নেত্রে উমা বলিলেন “দাদামণি, ছেলেটার পানে
একবার চেয়ে দেখেছেন কি? সে যে খাওয়া দাওয়া
ছেড়ে দিয়েছে, হাসি তার মুখ হতে মিলিয়ে গেছে-*
হঠাৎ তীব্র কষ্টে ভবশঙ্কর বলিয়া উঠিলেন “উমা।”

আয়ুষ্মতী
১০৮
উমা একেবারে এটুকু হইয়া গেলেন, তাড়াতাড়ি
পাশ কাটাইয়া দাইলেন।
তেমনি ঝ ঝালো সুরে ভবশঙ্কর বলিলেন “তোমাদের
মনে করে রাখ: উচিত, পবিত্রের সম্বন্ধে আমি কতটা
সতর্ক আছি, পবিত্র আমার কি জিনিস। আমি দেখছি
তোম। সকলেই আমায় উপদেশ দিতে আসছে,
যেন পত্ৰিকে আমি বলি দিতে নিয়ে যাচ্ছি। দে”,
এক টা
কথ! বলি শােনে, সতর্ক হয়ে কথা বলো,
যা তা মুখে আসবে আর বলে যাবে, তা করো না।
পবিত্রকে মানুষ করেছ বই যে পবিত্র তােমার আপনার,
আমার কেউ নয় এতো না। তোমাদের বাপ ছেলের
মাঝখানে দাড়াতে আসা একেবারেই অসঙ্গত, এটা
।
মনে রেখো।”
উমার মনে কথাটা বড় জোরেই গিয়া বালি, মনে
হইল বুকথন। শতধা হইয়া যায়। হা রে নারী, তুই শুধু
অপার মেহ ঢালিয়া মানুষই করিয়া গিয়াছিস, নিজের
সবটাই দান করিয়া বসিয়াছিস, প্রতিদান পাওয়া দূরের
কথা, তােকেই যে ছটিয়া ফেলা হইতেছে। কোথায়
ছিলেন সেদিন ভবশঙ্কর-যেদিন পবিত্রের মা শিত
পবিত্রকে দ্বাদশবর্ষীয়া ভগিনীর হাতে দিয়া বড় শান্তিতে

আয়ুষ্মতী
চক্ষু মুদিয়াছিলেন ? বালিক। উমা সেই শিশুকে কি করিয়া
এত বড় করিয়া তুলিয়াছেন, তাহা একমাত্র ভগবানই
আনেন। কত বিনিদ্র রাত্রি গিয়াছে, কত দিন সাহার পর্যন্ত
হয় নাই। পবিয়ের অসুখ হইলে সে ভােগটা ভােগ করিত
ভশঙ্কর ঔষধপত্র ও চিকিৎসকের ব্যবা করিয়া
দিয়া খালাস, উমার অক্লান্ত সেবা, তিনি কি লক্ষ্য করিয়া-
ছন? বোধ হয় নয়। যদি লক্ষ্য করিতেন, তবে আজ সেই
পবিত্র উমার কেহ নয়,–এ কথাটা এমন করিয়া কি বলতে
পারিতেন ?
হায় রে নারী, শুধু দিয়াই গিয়াছিস,
তোর সে দেওয়া একেবারেই অসার্থক হইয়া গেল রে।
হােক, তাই হোক, ভগবান, তাই হোক। পিতা-
পুত্রে মিলন হােক, ইহার বেশী প্রার্থনার জিনিস আর কি
থাকিতে পারে ? উমাও তো তাই চান। পবিত্রের স্ত্রী
আসুক, তাহার হাতে তাহার সংসার বুঝাইয়া দিয়া তিনি
দুদিন হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচেন।
বাড়ীর ভিতরে তো কাক, চিল বসিবার 'যো নাই।
ছেলেপুলের চঁা ভা, তাদের মায়েদের চীৎকার, কোথাও
গর, কোথাও হাসি, কোথাও কান্না। পবিত্র সব ছাড়িয়া
তেতালার ঘােট ঘটা আয় করিয়াছে। সে একেবারে
নিচে আসাই প্রায় ছাড়িয়া দিয়াছে।

আয়ুষ্মতী
১১০
বিবাহের তখনও দিন তিনেক দেরী, উমা বারাণ্ডায়
বসিয়া আত্মীয়দের সহিত গল্প করিতেছিলেন। পবিত্র
যে মােটেই নিচে আসে না, একটিবার দেখা করে না,
জনৈকা মহিলা ইহাই লইয়া দুঃখ প্রকাশ করিতেছিলেন।
উমা তাড়াতাড়ি পবিত্রের দোষ ঢাকিবার জন্য বলিতে
ছিলেন, কি বলব দিলি, ছেলে লজ্জায় মুখ দেখাতে পারছে
না। বলছি বাপু অমন কাণ্ড আকছার হয়ে আসছে,
তোরই নতুন নয়, তবু সে বলে-না মাসীমা, আমি বেরুতে
পারব না। কি বলব ভাই, আস্ত পাগল, এত বিঙ্কে
শিখেছে, তবু যদি ছেলেমানুষি যায়।
কিশােরীর দল হাসিয়া উঠিল, বিকম্পিত প্রায় হাসিকে
গােপন করিয়া ফেলিয়া গম্ভীর মুখে উমা বলিলেন, “সত্যি,
ও অমনি পাগলা ছেলে। যেটা করতে নেই বলব,
সেইটেই ঠিক করে বসবে। ওর মাকে প্রণাম করতে
•লব, ছেলে আমায় নমস্কার করে বসবে।”
বলিতে বলিতে অনেকদিন আগেকার সস্ত্রীক পবিত্তের
কথাটা মনে পড়ি। গেল, তিনি হঠাৎ অন্যমনস্ক হইয়া
গেলেন।
মাসীমা
পিছনে সফিতে তিনি ফিরিয়া দেখিলেন, সিড়ির উপর
.

আয়ুষ্মতী
নড়াইয়া পবিত্র ! তাহার মুখখানা অত্যন্ত ভার, আর
তেমনি আরক্ত হইয়া উঠিয়াছে ; বড় বড় চক্ষু দুইটা
অস্বাভাবিক আরক্ত, যেন ফাটিয়া পড়িতে চায়।
সন্ত্রস্ত। উম বলিয়া উঠিলেন “এই যে পবিত্র
কম্পিত কণ্ঠে পবিত্র বলিল “এদিকে এসে মাসীমা,
কথা আছে শোনো
“কি কথা বাবা- তাড়াতাড়ি উমা তাহার কাছে
গিয়া দাড়াইলেন। তাহার হাতখানা চাপিয়া ধরিয়া
পবি বলিল, “আমার ঘরে চল মাসীমা
“এ কি রে পবিত্র, তাের হাতখানা এত গরম কেন ?
তাের মুখখানাও যেন কি রকম দেখাচ্ছে? তাের কি
জ্বর এসেছে না কি? দেখি গাটা--
একটু হাসিয়া তাহার থানা সাইয়া দিয়া পবিত্র
বলিল থাক মাসীমা, এখন গা দেখতে হবে না। চল তো
আমার এরে, তার পর দেখে এখন। অনর্থক লােককে
জানিয়ে কেবল ব্যস্ত করা হবে না।
নিজের পা তাহার স্থিরভাবে পড়িতেছিল না, তথাপি
উমাকে টানিতে টানিতে তেতালায় সে ছোট থানায়
লইয়া গেল। উমাকে বসাইয়া তাহার কোলে মাথা দিয়া
ইয়া পড়িয়া অত্যন্ত শ্রান্তভাবে সে হাফাইতে লাগিল।

আয়ুষ্মতী
১১২
.
উমা তাহার কোর্টের বােতাম খুলিয়া গাত্রের তাপ
পরীক্ষা করিয়া চমকিয়া উঠিলেন, বিবর্ণ মুখে বলিলেন
“ইস গা যে তাের পুড়ে যাচ্ছে পবিত্র, এতটা জ্বর হয়েছে,
এ নিয়ে তুই নিচে গিয়েছিলি আমায় ডাকতে? এখান
হতে কাউকে ডাকতে পাঠালেই হতো, তাের জ্বর হয়েছে
শুনলে কি নিচে থাকতুম ?”
শ্রান্ত পবিত্র বলিল “শুধু শুধু সকলকে ব্যস্ত করে”
বাধা দিয়া উমা বলিবেন, শুধু শুধু ? কি ভয়ানক গরম
হয়েছে তাের গা, আমার কোলে মাথা দিয়ে আছিস,
কোল যেন পুড়ে যাচ্ছে।
“একটা বালিস দাও মাসীমা, তুমি শুধু আমার মাথায়
হাত বুলিয়ে দাও, তা হলেই হবে এখন
উমা সন্ত্রস্ত বলিয়া উঠিলেন ষাট বাছা আমার, আমার
কোল থাকতে বালিস মাথায় দিবি কেন বাবা? এই
তো বেশ শুয়ে আছিস, কোনও অসুবিধা হচ্ছে না তো?”
নড়িয়া চড়িয়া ভাল করিয়া শুইয়া পবিত্র বলিত
অসুবিধে ? বিলক্ষণ মাসীমা, তুমি বোধ হয় জানাে না,
তােমার কোলে মাথা দিয়ে যােব বলেই তোমায় নিজে
গিয়ে ডেকে আনলুম। তিনদিন বাদে বিল, আর
আমার জ্বর হয়েছে শুনে সবাই ব্যস্ত হয়ে উঠবে, তাই

আয়ুষ্মতী
কাউকে জানালুম না। কাল সকালেই আবার ভাল হয়ে
যাব, রাত্রেই জ্বর ছেড়ে যাবে এখন, কিছু ভাবনা করে
মাসীমা।”
উদ্বিগ্ন কণ্ঠে মাসীমা বলিলেন “তাই হােক বাছা,
তাই হােক। দামােদর করুন, রাত্রের মধ্যেই তাের জ্বরটা
ছেড়ে যায়, কাল সওয়া পাঁচ আনার
সওয়া পাঁচ আনার হরির লুট
দিই আমি।”
বড় শান্তিময় কোল এ ;-পবিত্র নিশ্চিন্ত হইয়া
শুইয়া রহিল।
জ্বরের প্রবল বাতনা। অনেক কাল পরে তাহার এর
হইয়াছে, চার পাঁচ বৎসর প্রায় জ্বর হয় নাই। ঘরের
যন্ত্রণায় যতই সে ছটফট করিতেছিল, উমা ততই ব্যস্ত হইয়া
উঠিতেছিলেন। তিনি ঠিক জানিয়েছিলেন, দারুণ মনাে-
কষ্টেই পবিত্র শরীরকে অবহেলা করিয়াছে, তাহার ফলেই
এই জ্বর হইয়াছে। এখন ভালয় ভালয় বরটা ছাড়ি
গেলে যে বাঁচা যায়, আর তিন দিন পরে যে বিবাহ।
যন্ত্রণায় ছটফট করিতে করিতে পবিত্রের ঘুম আসিয়া-
ছিল, হঠাৎ ঘুমের ঘােরে সে পূরবী—পূরবী করিয়া
চেঁচাইয়া উঠিল।
হায় রে অভাগা-

আয়ুষ্মতী ১১৪ উমার চোখে জল আসিয়া পড়িল। ধন্ঠ রে তুই পতিতা-কন্যা, সার্থক তাের জীবন গ্রহণ। একজনের অফুরন্ত ভালবাসা কি নিবিড় ভাবে তােকে বেষ্টন করিয়া আছে, ধন্য তাের নারীজন্ম জগতে সকলেই তােকে ঘৃণা করিয়াছে, সকলে তােকে তাড়াইয়া দিয়াছে, কিন্তু যে তােকে বরণ করিয়াছিল, তাহার হৃদয়ে এখনও পূর্ণ- রূপে জাগিয়া আছিস তুই। “পত্রি—বাবা-* চেঁচাইয়া উঠিয়াই পবিত্রের তন্দ্রা দূর হইয়া গিয়াছিল, অত্যন্ত লজ্জিত হইয়া সে নিদ্রিতের ভাবে পড়িয়া ছিল। তাহার এ ছলনাটুকু মেহময়ী মাসীমা সহজেই ধরিতে পারিলেন। তাহাকে লজ্জিত করিয়া তােলা তাহার উচিত ময় জানিয়া তিনি চুপ করিয়া গেলেন, আর ডাকিলেন না। রাত্রি প্রায় দশটার সময় ভবশঙ্কর নিজের গৃহে আসিয়া পবিত্রকে ডাকিবার জন্য ভূতকে পাঠাইয়া দিলেন। তখন পবিত্র ঘুমাইয়া, উমা তাহার মাথা উপাধানে রক্ষা করিয়া অল্প অল্প বাতাস করিতেছিলেন। ভৃত্যকে বলিয়া দিলেন বল গিয়ে বিজের বড় জয় এসেছে, সে এখন যেতে পারবে না। কাল সকালে জ্বর ছাড়লে তার পরে যা হয় তাই বলবেন।

১১৫ আয়ুষ্মতী পবিত্রের বড় অর, ভবশঙ্কর চঞ্চল হইয়া উঠিলেন নিজকে সংযত করিয়া রাখিবার প্রচুর চেষ্টা সত্ত্বেও তিনি সে চঞ্চলতা গােপন করিতে পারিলেন না, আহারের পর নির্দিষ্ট বিশ্রাম সুখের আশা ত্যাগ করিয়া তিনি উঠিয়া পড়িলেন। তেতালার ঘরের রুদ্ধ দরজার কাছে দাঁড়াইয়া ডাকিলেন “পবিত্র- ভােজানাে দরজা খুলিয়া উমা বাহির হইয়া আসিলেন, চুপি চুপি বলিলেন “ডাকবেন না দাদামণি, ঘুমিয়ে পড়েছে, বড় যন্ত্রণার পরে একটু ঘুম এসেছে, এতে জ্বরটা ছাড়লে ও ছাড়তে পারে।” ব্যাকুল কণ্ঠে ভবশঙ্কর বলিলেন বড় জ্বর এসেছে ?” শুকঠ উমা বলিলেন “উঃ, সে আর বলবার কথা নয়। ব্যগ্রভাবে ভবশঙ্কর বলিলেন “তবে মাথাটা ধুইয়ে দাও উমা, আমি নাথ ডাক্তারকে একবার ডাকতে পাঠাই, এসে একবার দেখে শুনে যাক। উমা বলিলেন “আজই ডাক্তার ডাকবার কোন দরকার নেই দাদামণি, ভগবান করুন যেন দরকারও না হয়। মাথা আমি বেশ করে ধুইয়ে দিয়েছি, তাই ঘুমুতে পেরেছে।

আয়ুষ্মতী
আপনাকে তার জন্যে কিছু ভাবতে হবে না, আমি তার
কাছে আছি। এতকাল তাকে এমনি করেই তো বুকে
করে মানুষ করেছি দাদামণি-
তাহার কণ্ঠস্বর আর্ত হইয়া উঠিল।
ভবশঙ্কর ফিরিলেন বটে, কিন্তু শান্তি কিছুতেই পাইলেন
। পরদিন প্রাতে উঠিয়াই তিনি পবিত্রের খোজ
লইয়া জানিতে পারিলেন, তাহার জর সামান্য আধ
ডিগ্রি কম পড়িয়াছে মাত্র, এখনও একশ চার ডিগ্রি অর
রহিয়াছে।
মাথায় হাত দিয়া তিনি বসিয়া পড়িলেন।
পবিত্রের জ্বর ছাড়িল না, উত্তরােত্তর বাড়িয়া চলিতে
লাগিল। ভবশঙ্কর আকুল ক) ডাকিলেন “উমা–
রুদ্ধকণ্ঠে উমা বলিলেন “দাদামণি, দেখছেন কি?
আপনারই নির্বুদ্ধিতার দোষে ছেলে হারাতে বসেছেন।
আপনার যমজ বড় না আপনার ছেলে বড়, এইবার বলুন
দাদামণি, এইবার একবার পবিত্রের , মুখখানার পানে
চেয়ে বলুন, আপনার ছেলের চেয়ে আপনার সমাজ বড়,
তাই সমাজকে ত্যাগ কিছুতেই করতে পারবেন না, আর
সেই সমাজের পায়ের তলায় তাই হাসতে হাসতে ছেলেকে
বলি দিচ্ছেন। দাদামণি

১১৭
আয়ুষ্মতী
বলিতে বলিতে উমা ক্ষুদ্রা বালিকার ন্যায় উচ্ছ্বসিত।
হইয়া কাঁদিয়া উঠিলেন।
ভবশঙ্কর মাথা নত করিয়া বসিয়া রহিলেন, তাহার
চক্ষু হইতে অজ্ঞানে কখন দুই ফোটা জল ঝরিয়া পড়িল।
বাহিরে আসিয়া দেওয়ানকে ডাকিয়া বলিলেন
বনমালী, সেখানে টেলিগ্রাম করে দাও বিয়ে হবে না,
পবিত্রের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। আর কলকাতায় গিয়ে
আজই ডাক্তার নিয়ে ফিরে আসা চাই। অর্থের দিকে
চেয়াে না, যা লাগবে তাই দিয়ে দুজন বড় ডাক্তার নিয়ে
এসাে।
তিনি পবিত্তের পার্শ্বে গিয়া বসিলেন, অনুশােচনায়
হৃদয় তাহার তখন পুড়িয়া যাইতেছিল।

১২
দিন যায় না যায় না করিয়াও দিন তাে চলিয়া
যাইতেছে। যত দিন যাইতেছে, পূরবী দাদামশায়ের অবস্থা
দৃষ্টে ততই ব্যাকুল হইয়া উঠিতেছে ।
প্রথম প্রথম সে বুঝিতে পারি না, দাদামহাশয় কেন
তাহার সুমুখে ঔষধ খাইতে চান না, আড়ালে খাইতে
চান; কিন্তু দুচার দিন না যাইতেই সে মূল সত্যকে
অবিষ্কার করিয়া ফেলিল। দাদামহাশয় এক দিন চুপি
চুপি জানালাপথে ঔষধ ফেলিয়া দিতেছিলেন, হঠাৎ সেই
সময়ে পূরবী গৃহে প্রবেশ করিয়াই তাহা দেখিতে পাইল।
তাহাকে দেখিবামাত্র বৃদ্ধ অপ্রস্তুত হইয় হাতখানা টানিয়া
লইলেন।
“কি করছিলে দাদামশাই ?”
দাদামহাশয় বিছানায় শুইয়া পড়িয়া হাফাইতেছিলেন,
উত্তর দিতে পারিলেন না।
অভিমানে দুঃখে ক্ষোভে পূরবী উচ্ছ্বসিত হইয়া কাদিয়া
বলিল তােমাদের সবারই ইচ্ছে যাতে আমি পথে বাড়াই,
কেউ মুখে স্পষ্ট দূর দুর বলে তাড়িয়ে
তাই না?

১১৯
আয়ুষ্মতী
দিলে, তুমি স্পষ্ট • সেটা বলতে পারছ না, ভাবে প্রকাশ
করছো।
দাদামহাশয় তাহার হাতখানা ধরিয়া কাছে বসাইলেন
-“আচ্ছা, সত্যি করে বল দেখি দিদি, মিথ্যে এ টাকা
পয়সা ব্যয় করা হচ্ছে না কি? যে পাখী উড়ে যাবার
জন্যে ব্যস্ত, তাের এ ভাঙ্গা খাচায় কয়দিন সে আটকে
থাকবে, তাই একবার বল দেখি ভাই ? যাবার বেলায়
এখন কোথায় যাতে শান্তিতে যেতে পারব তাই করবি,
তা নয় যত ওষুধ বিশুধ এনে গেলাচ্ছিস। না দিদি, আর
ওই তেত, টক ওষুধগুলাে আমায় গেলাসনে, আমি আর
যেতে পারব না।”
পূরবী চুপ করিয়া বসিয়া রহিল, উত্তর দিতে পারিল
সে ভাবিতে লাগিল, তাহারই অদৃষ্টের কথা। ।
তাহারই বা অদৃষ্টে না আসিয়াছিল কি ? সবার কেমন
মা থাকে, তাহারও তেমনি মা ছিল, ভগবান মা দিয়া
কাড়িয়া লইলেন, এমন করিলেন যে, মা নামটার উপর
তাহার ঘৃণা জন্মিয়া গিয়াছে। তাহার পর স্নেহময় দাদা-
মশাই, তিল তিল করিয়া দিন দিন বুকের রক্ত তাহার
বুকে ঢালিয়া যিনি তাহাকে মানুষ করিয়া তুলিয়াছেন,
যাহার অসীম মেহ পাইয়া সে পিতার আদর মায়ের

আয়ুষ্মতী
মেহের অভাব কখনও অনুভব করিতে পারে নাই ; তাহার
পরে দেবতুল্য স্বামী, রাজার মত শ্বশুর, সবই তাে সে
পাইয়াছিল। মেয়েরা যাহা আকাঙ্ক্ষা করে, সে আকাঙ্ক্ষা
তাহার পূর্ণ হইয়াছিল, কোন পাপে তাহার সে সব গেল ?
অবশেষে তাহার একমাত্র অবলম্বন দাদামহাশয় ও মহা-
প্রস্থানের পথে পা বাড়াইলেন। কি পাপে—ওগাে দয়াল
ঠাকুর, একবার ডাকিয়া বলিয়া দাও, কি পাপে পূরবী
সব পাইয়াও' হারাইতে বসিয়াছে ? তাহার বড় ব্যথার
সান্ত্বনা দিতে একটু কিছু রাখিলে না প্রভু? এমন অদৃষ্ট
দিয়াও তাহাকে পাঠাইয়া ছিলে গাে?
একটা নিঃশ্বাস ফেলিয়া পূরবী ডাকিল “দাদামশাই-*
“বড় শীত করছে ভাই, গায়ে একখানা কাপড় দিয়ে
ঢেকে দেও।”
কিয় দিন অল্প অল্প জরই চলিতেছিল, আজ প্রবল জ্বর
আসিয়া পড়িল। পূরবী রাধাবাড়া ফেলিয়া রাখিয়া
দাদামহাশয়ের পার্শ্বে আসিয়া বসিল।
বৈকালের দিকে যখন জ্বর কম পড়িয়া আসিল, বৃদ্ধ
তখন চোখ মেলিলেন।
“তুই আজ খেয়েছিস পূরবী ?”
পূরবী মাথা কাত করিয়া বলিল “খেয়েছি দাদা।”

খাসনি।
.
আয়ুষ্মতী
দাদামহাশয় যথাশক্তি দৃষ্টিপাত করিয়া তাহার বিশুস্ক
মুখখানা দেখিয়া লইলেন; তাহার হাতখানা শিথিল হস্তে
ধরিয়া টানিয়া আনিয়া নিজের বুকের উপর রাখিয়া বলি-
লেন “এ মিথ্যে কথা কেমন করে বললি ভাই পূরবী ?
তাের শুকনাে মুখখানাই যে বলে দিচ্ছে তুই আজ কিছু
আমার চোখে ধূলো দিতে চাচ্ছিস ভাই, সেটা
সহজ হল না তো।
পূরবী চুপ করিয়া রহিল।
দাদামহাশয় বলিলেন “আজ আমার একটু জ্বর বেশী
হয়েছে বলে তুই খেলিনে পৰ্যন্ত, আচ্ছা পাগল মেয়ে তো
যা–ভাত খেয়ে আয় ভাই, খেয়ে এসে বস।
বিড়ালটাকে খেতে দিয়েছিস ?”
পূরবী বলিল “তাকে খানিকটে দুধ খাইয়েছি দাদা।”
দাদা বলিলেন “তার পেটটা বুঝলি, নিজেরটা বুঝলি
নে? নাঃ, তুই ভারি বিরক্ত করে তুললি আমাকে। ওঠ,
যা পারিস চারটা খেয়ে আয় গিয়ে।”
পূরবী বলিল “আজ ভাত রাঁধিনি দাদা মশাই, থাক
গিয়ে, একটা দিন বই তো নয়, খাবার খেয়ে কাটিয়ে
দেব এখন।
উৎকন্তীত দাদামহাশয় বলিলেন “খাবার খােয় কাটি
তুই।

আয়ুষ্মতী
১২২
দিবি? দুর, তাও কি হয় রে ? যা–ভাত বেঁধে আমার
এই ঘরে এনে খাবি, নইলে কোনমতেই হবে না পূরবী ;
আমার দিব্য, আমি তাের হাত ধরছি, অমত করিস নে।”
তিনি হাত ধরিতেই পূরবীকে উঠতে হইল।
আজ পুরবীকে আহার করানাে চাই-ই। দেহের
মধ্যে বড় যন্ত্রণা। জ্ঞানবান বৃদ্ধ বুঝিতে পারিতেছিলেন, প্রাণ
পাখী উড়িয়া যাইবার জন্য অত্যন্ত ব্যগ্র হইয়া উঠিয়াছে।
মায়ার বাধন সহজে কাটিতে পারিতেছে না, তাই ছটফট
করিতেছে। নিজের নাড়ী নিজেই তিনি পরীক্ষা করিতে-
ছিলেন, আর নাড়ী খুঁজিয়া পাওয়া যাইতেছে না।
কথাটা পূরবীকে তিনি এখনই বলিতে সাহস করেন নাই।
এ বার্তা এখনই সে পাইবে, যাহা আসিতেছে তাহাকে
গ্রহণ করিতেই হইবে, আগে আহারটা তার হইয়া যাক।
ইহার পরে তাহার যাহা অদৃষ্ট-লিপি তাহা তাে ফলিবেই,
আজিকার দিনটা নারায়ণ, তাহার আহার পর্যন্ত রক্ষা
মুত্যু যন্ত্রণা কি, পূরবী তাহা জানে না, কখনও কাহারও
মৃত্যুকালে সে উপস্থিত ছিল না। অসহ যন্ত্রণা চাপিতে গিয়া
দাদামহাশয়ের মুখখানা বিকৃত হইয়া উঠিতেছিল ; ঝুকিয়া
তাহার মুখের উপর পড়িয়া পূরবী বলিল “অমন করছে।

আয়ুষ্মতী
কেন দাদামশাই, বুকটা বড় ব্যথা করছে কি ? একবার
ডাক্তার বাবুকে ডাকি দাদামশাই?”
বিকৃত মুখে হাসিবার চেষ্টা করিয়া দাদামহাশয় বলিলেন,
“নারে, ডাক্তার ডাকতে হবে না, কিছু যন্ত্রণা হচ্ছে না।
তাের ভাত হয়েছে পূরবী ?*
“এই হল দাদামশাই—
দাদামহাশয় বলিলেন একবার দেখে আয় দেখি হল
কি না। বেশী করে জ্বাল দে, এখনই হয়ে যাবে এখন।
কাঠের উনানে চড়িয়েছিস তো?”
পূরবী বলিল “হ্যা দাদামশাই।”
তবে যা শিগগির
সে সম্মুখ হইতে অদৃশ্য হইবামা দাদামহাশয়ের দুই
চোখ দিয়া জল গড়াইয়া পড়িল।
কিছু জানে না, সংসার যে এর কাছে এখনও
অপরিচিত। মৃত্যুর নাম সে বরাবর শুনিয়াই আসিয়াছে,
মৃত্যু যে কি ভাবে আসে, কি ভাবে গ্রহণ করে, এ যে
তাহ বিন্দুমাত্র অবগত নয়। নারায়ণ, শেষকালটায় কি
এমনিই অবিশ্বাস জন্মাইয়া দিলে প্রভু ? তাহার. যাইবার
সময় উপস্থিত, বহুদিন হইতেই তো তিনি এই আহ্বানের
প্রত্যাশায় আছেন। এই অভাগিনীর ব্যবস্থা সেই জন্যই

আয়ুষ্মতী
১২৪
তাে আগেই তিনি করিয়া দিলেন, কিন্তু কি করিলে
নারায়ণ, তাহার সে আশ্রয় এমন করিয়া কাড়িয়া লইলে
কেন? তাহার অন্তে সে দাড়াইবার স্থান এই বাড়ীখানি
পাইবে, কিন্তু খাইবে কি ? সামান্য যে টাকা তিনি
পেনসান পাইতেন, তাহার অন্তে তাহা তো বন্ধ হইয়া
যাইবে? হা নারায়ণ, তাহার অদৃষ্টে শেষের জন্য কি
ব্যবস্থা করিয়া রাখিয়াছ?
পূরবী তাড়াতাড়ি ভাত খাইয়া চলিয়া আসিল। সে
খাওয়া নামেই মাত্র, দুই গ্রাস কোনও জমে উদরে গেল
মাত্র। আজ তাহার মনটা বড় বেদনায় ভরিয়া উঠিয়া-
ছিল, চারিদিক যেন হু হু করিতেছে, মনের কোন এক
গােপন স্থান হইতে কে যেন আর্ত-কণ্ঠে বলিয়া উঠিতেছে,
সব গেল রে, সব গেল।
এ পাশের বাসা ডাক্তার বাবুর ; দাদামহাশয়ের নিকটে
আগে না গিয়া সে ছাদের উপর চলিয়া গেল। ডাক্তার
বাবুর স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিতে পারিল, তিনি
বাড়ীতেই আছেন। তাহাকে একবার এখনি পাঠাইয়া
দিবার অনুরােধ করিয়া সে নামিয়া দাদামহাশয়ের নিকট
আসিল।
শেষ পথযাত্রী তখন তাহারই আগমন প্রতীক্ষা

১২৫
আয়ুষ্মতী
করিতেছিলেন, চোখ দুইটা তঁাহার দরজার উপরে
পড়িয়াছিল। পূরবী প্রবেশ করিতেই ক্ষীণকণ্ঠে বলিয়া
উঠিলেন “একটু জল দে ভাই, বড় তেষ্টায়—
পূরবী তাড়াতাড়ি গ্লাসে জল ঢালিয়া তাহার মুখে
দিতে গেল।
“এ কোন জল দিদি, কলের জল না গঙ্গাজল ?”
পূরবী উত্তর দিল “কলের জল দাদামশাই।”
দামহাশয় মাথা নাড়িয়া বলিলেন “কলের জল এখন
আর দিসনে দিবি, গঙ্গাজল নিয়ে আয়, আমায় গঙ্গাজল দে।”
পূরবী গঙ্গাজল আনিয়া তাহার মুখে ঢালিয়া দিল।
“আঃ, বড় তৃপ্তি রে, বড় তৃপ্তি পূরবী, আমার কাছে
এসে বস ভাই, যাতে তাের মুখখানা দেখতে পাই
উদ্বেগব্যাকুল কণ্ঠে পূরবী বলিল “তুমি অমন করছ
কেন দাদামশাই ?"
একটু হাসির রেখা মৃত্যু-মলিন মুখে ফুটিয়া উঠিল, “আর
যে দেরী নেই রে ভাই, মরণ যে পায়ে পায়ে এগিয়ে
আসছে, আমায় তার বুকে তুলে নিয়ে সকল আলা জুড়িয়ে
দেবে বলে; আমি তার স্বরূপ আকার এইবার যে স্পষ্ট
দেখতে পেয়েছি রে ভাই।”

আয়ুষ্মতী “দাদা-দাদা মশাই, আমি যে ডাক্তার বাবুকে ডেকে এলুম- শুষ্ক কণ্ঠ শুষ্ক নেত্র তাহার, আর যে জল আসিতেছে । হায় ভগবান, পূৰ্ব্বেই নয়নের জল বহাইয়া দিয়াছ, আজ এই শুষ্কতা দান করিলে কেন ? হৃদয় যে আলিয়া যায়, এক বিন্দু বারি দাও, ওগো এক বিন্দু বারি দাও। বৃদ্ধ হাফাইতেছিলেন। আর ডাক্তারের দরকার কি দিদি? তুই ছেলেমানুষ, বুঝতে পারিসনি, কিন্তু আমি তো বুঝতে পারছি সব। আমার নাড়ী ছেড়ে গেছে, আমার বুকের ভেতর বড় যণায় ফেটে যাচ্ছে। আর বেশীক্ষণ নয় রে, যাবার সময় হয়েছে। উঃ, তােকে কোথায় রেখে চললুম রে, কার হাতে তােকে দিয়ে যাচ্ছি। পবিত্র হায়-পূরবী-* অসহ্য যন্ত্রণায় তিনি ছটফট করিতে লাগিলেন, আর্ত কঠে পূরবী ডাকিতে লাগিল “দাদা, দাদু, দাদামশাই।” ডাক্তার আসিলেন, তখন শেষ মুহূর্ত। রােগী দেখিয়াই ডাক্তার যাইতে পারিলেন না, প্রতিবাসী বৃদ্ধের শেষ সময় পর্যন্ত তাহাকে তাহার শয্যাপাৰে বসিয়া থাকিতে হইল।

১২৭
আয়ুষ্মতী
ধীরে ধীরে অতি ধীরে বৃদ্ধের শেষ সময় আগত হইল।
নিশ্চল পূরবী মাথার কাছে বসিয়া।
শান্ত কণ্ঠে ডাক্তার বলেন, “অমন করে বসে
থাকলে চলবে না মা, তুমি এই বিছানার এই দিকটা ধর,
আমি ও-দিক ধরি, চল দুজনে বাইরে বার করি। তার
পর যা করার আমি করব এখন।”
বিকৃত কণ্ঠে পূরবী বলিল “কিছু দরকার নেই বাবা,
দাদামশাই তার ঘরের ভেতরেই শেষ নিঃশ্বাস ফেলে যান।
এই শেষকালটায় নাড়ানাড়ি করে, তার যন্ত্রণাকাতর দেহকে
আর যন্ত্রণা দিয়ে কি লাভ হবে বাবা?
“পূরবী-একবার হরিনাম,
কথা বাহির হইতেছিল না, কিন্তু জ্ঞান তখনও সম্পূর্ণ
ছিল।
রুদ্ধ কণ্ঠে পূরবী দাদামহাশয়ের কানের কাছে মুখ
লইয়া গিয়া হরিনাম উচ্চারণ করিতে লাগিল। শুনিতে
শুনিতে কখন বৃদ্ধের চোখ দুইটা চিরতরে মুদিয়া আসিল ;
শূন্য দেহখানা সংসারে পড়িয়া রহিল সাক্ষ্যস্বরূপ, প্রাণ
অনন্তের পথে উধাও হইয়া গেল।

পাইয়া যে
দুঃখ পাইয়া,
বেদনা
পাইয়া
দামহাশয়ের স্নেহময় কোলে পূরবী লুকাইত, সে
দাদামহাশয় আর নাই ; জগতে একটা মাত্র লােককে সে
আপনার বলিয়া জানিয়াছিল, তাঁহাকেই জড়াইয়া ধরিয়া
সে বাড়িয়া উঠিয়াছিল। তিনি চলিয়া গিয়াছেন, ছিন্নলতার
মত পূরবী মাটীতে পড়িয়া রহিল।
দিন তবু বহিয়াই যাইতেছিল একটা দিনও থামিয়া
রহিল না।
দিনের পর দিন গিয়া সপ্তাহ, সপ্তাহের পর সপ্তাহ গিয়া
এমনি করিয়া মাসও বহিয়া যায় যে।
হা রে পতিতার মেয়ে, সব হারাইয়া জগতে বাঁচিয়া
থাকিবার দরকার আর কেন তাের ? নিদারুণ রৌদ্র
তাপে শুখাইয়া ওরে ফুল, তবু কেন আজও তুই বর্তমান ?
ঝরিয়া মাটীতে পড়, একেবারে গুছাইয়া যা, মাটীর সহিত
মাটী হইয়া মিলিয়া যা।
কাজ নাই, কৰ্ম্ম নাই, উদ্দেশ্য কিছুই নাই, তবুও
কেন বাঁচিয়া থাকা, কর্মহীন, উদ্দেশ্যহীন জীবনটাকে
নিমেষে শেষ করিয়া ফেলা যায় না কি?
মাস,
et

১২১
আয়ুষ্মতী
এ যে তাহার নিত্যকার ভাবনা, এক আধবারের
ভাবনা তো নয়, এ যে তার চিরসাথী? ডাক্তারবাবু,
তাহার স্ত্রী তাহার এই দুঃসময়ে মেয়ের মতই তাহাকে
টানিয়েছেন। তাহারা অভাগিনীর জীবনের সকল কথাই
শুনিয়াছিলেন, নাকি দুঃখিতও হইয়াছিলেন । তাহারা
এই মেয়েটাকে ভেবে হইতে দেখিয়া আসিতেছেন,
তাহার পরিচয় ইহারশ পাইয়াছিলেন।
সেদিন দুপুরে হঠ। ডাক্তার বাবুর নূরপুর হইতে ডাফ
আসিয়াছিল, জমার পুর সাংঘাতিক ব্যারাম, আজই
যাওয়া চাই।
পূরীকে তাহার স্ত্রী প্রত্যহ নিক্ষের বাটাতে লইয়া
যাইহেল, বিশেষ অবশ্যক ব্যতীত নিজের বাড়ীতে তাহাকে
যাইতে দিতেন না। সুন্দরী যুবতী সে, পাড়ায় মন
প্রকৃতির লোকেরও অভাব ছিল না।
পূরবীকে ডাকিয়া তিনি সংবাদটা দিবা মাত্র পূরবীর •
মুখখানা সাদা হইয়া গেল, দাড়াইতে অসমর্থ: ইয়া সে
বসিয়া পড়িল।
গম্ভীর মুখে ডাক্তার বলিলেন “অত ভেঙ্গে পড়ছে।
কেন মা, সাহস নিয়ে এসাে। আমি যা বলি, তাই
শোনাে। যাবে আমার সঙ্গে সেখানে ?

আয়ুষ্মতী
আবার সেখানে—সেই সমাজের নিন্দা, ভবশঙ্করের
তাড়না, এই কয় বৎসরের মধ্যে সে কথা সে তো একটুও
ভুলিতে পারে নাই ।
সে রুদ্ধকণ্ঠে বলিল “না বাবা?”
ডাক্তার তেমনি স্নেহপূর্ণ কণ্ঠে বলিলেন “কেন
যাবে না মা?”
“আর কি আমার সেখানে যাবার মত মুথ আছে বাবা,
আজ কয় বছর আগে যা বটনা হয়ে গেছে, এখনও সে
কথা আমার মনে যে জ্বলন্ত অক্ষরে অক। রয়েছে।
দূর দূর করে তাড়ানোর পরে আবার কোন মুখ নিয়ে
সেখানে যাব বাবা?
পূরবীর কণ্ঠ কাপিতে লাগিল।
ডাক্তার এক মুহূর্ত নীরব থাকিয়া বলিলেন “কিন্তু এও
মনে কর মা, পবিত্র তােমার স্বামী, সে রােগশয্যায়।
লােকটী আমায় খবর দিয়েছে, পাগলের মত আব-তাবল
বকে গেলেও আমি তাকে জিজ্ঞাসা করে অনেক খবর
জেনে নিয়েছি। তোমার কাছে তাকে নিয়ে যাবার চেষ্টা
করেছিলুম, কিন্তু সে হঠাৎ ছােট্ট ছেলের মত কেঁদে উঠে
বললে—মাপ করবেন, মার কাছে আমি এ মুখ আর
দেখাতে পারব না। ভগবান যদি দিন দেন, আমিই এসে

আয়ুষ্মতী
তাকে নিয়ে যাব, আর যদি পবিত্রের কি, তার
সেখানকার সম্পর্ক সত্যিই উঠ যাবে, তার মা। সেখানে
যেতে হবে না।”
পূবী দুই হাতে বা ক্ষ চাপিয়া ধরিল।
“বাবা-ঠারই ক ৫ * নিন।
গান যদি
সই সত্যিকার দিনটি আধুফিবাসে দেন, তখন আমি
যাব বাবা, আমার মাথার সখ এখনও হয়নি।”
তাড়াতাড়ি বাড়া , ..সবছানায় শুইয়া পড়িয়া
টাইয়া কাদিতে লাগল।
সতই এর অব। ৭. নি খারাপ হইয়া
আসিতেছি; এখন তাহার পূণ৭ কর অবস্থা। বিকারের
কেঁাকে সে কেবল পূৰীক : +৩ছিল, ক্ষমা চাহি
ছিল।
৬। পশে বসিয়া তাহার
নিজের কায্যফল দাঁতেছি ,
কলকাতা হইতে
আসিয়া,
পোঁছাইলেন প্রকাশ সে সময় তাহাকে দেখিতে-
ছিলেন, সেই সময়ে পৃবি এ দু:, হল।
সংযত কণ্ঠ প্রকাশ বা লিলন “আপনি নিজেই
নিজের সর্বনাশ ডেকে এনে:ইন শঙ্করবাবু। আমার
কথা শুনে রাগ করবেন ন!, মম'য় অপরিচিত ভাববেন

আয়ুষ্মতা
না। আপনি আমায় চেনেন না, কিন্তু পবিত্র আমায়
বেশ
চেনে, আমিও তার জন্যে আপনাকে চিনেছি।
ধৰ্ম্মের না করে অধৰ্ম্মকে আশ্রয় করেছেন, তার ফলেই
আপন দুইটা নর-নারী হত্যা করতে বসেছেন। আপনার
ছেলেকে আপনি নিজের হাতে হত্যা করছেন, ভবশঙ্কর
বাবু, কার জন্যে করছেন ? সমাজের
পানে চেয়ে,
সমাজকে অক্ষত রাখতে আপনি যে নিজের সর্বস্ব হারাতে
বসেছেন। একটা কথা জিজ্ঞাসা করি ভবশঙ্কর কাবু,
আমাদের সনাতন হিন্দু ধৰ্ম্ম কি এতই অদার, এতই
কুসংস্কারে ঢাকা? এই সনাতন হিন্দুধর্ম তো আগে এত
সীৰ্ণ ছিল না, আপনাদের মত সমাজপতির হাতে পড়ে
এর কতই না দুর্দশা হচ্ছে। সমাজ যাদের পেলে
গৌরবান্বিত হতে পারত, তাদের আপনারা সমাজ হতে
তাড়িয়ে দিচ্ছেন সামান্য একটা ত্রুটি ধরে, অন্য সময়
তাদের বুকে পেয়ে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে, এমনি
করেই আমাদের সমাজ, ভাল লােক হারিয়ে মন্দ লােককে
বুকে ধরে যত রাজ্যের কুসংস্কার সমস্ত গায়ে জড়িয়ে মেখে
বসে আছে। সমাজকে আপনি রক্ষা করতে গেলেন
পতিতার মেয়ে যেন সমাজে প্রবেশ লাভ করতে না পারে,
ন্তু সত্যিকার চোখ খুলে একবার দেখুন দেখি—এই
কে

আয়ুষ্মতী
সমাজের বুকেই কত না অাজ সন্তান আছে, অথচ তারা
বেশ সম্মানিত ভাবে দিন কাটাচ্ছে। যতক্ষণ না প্রকাশ
হয় ততক্ষণ সে চলে যায়, আর প্রায়ই প্রকাশ হয় ও না।
অব ধৰ্ম্মের ‘দক দিয়ে যদি বলেন, আপনার ধৰ্ম্ম কি
তাকে পুত্ররূপে গ্রহণ করলেই গরিয়ে যাবে? ধৰ্ম্ম
বলতে আপনি কি বোঝেন ভবশঙ্কর বাবু, আমি তাই
আয় জিজ্ঞাসা করি? পাপের ভয়ে শিউরে উঠেছিলেন,
এই যে দুটি নর-নারী হত্যা করছেন নিজের হাতে, এ কি
পাপ নয় ? বাপ হয়েছেন কি একমাত্র স্নেহের সন্তানকে
সমারে কল্পিত সম্মের পায়ে বলি দেবার জন্টে? ছি ছি,
এখন ও জানি চুপ করে ভাবছেন, সামনে ছেলে অনন্তের
পথে যাত্রা করছে, কে শেষ নাম শুনবেন তাই কি?
বাপের উপযুক্ত কাজ শুধু এইটেই আপনার বাকি আছে
করতে? আমার একমাত্র ছেলে যদি এ কাজ করতে
ভবশঙ্কর বাবু, সত্যি কথা বলতে কি, আমি আমার ছেলেকে
সৰ্বস্তঃকরণে ক্ষমা কতুম, কারণ সে যথার্থ মানুষের
করেছে, একটা জীবনকে একেবারে ব্যর্থ হয়ে যেতে দেয়,
নি, জগতের সুখ আহলাদ ভোগ করবার অধিকার দিতে
আপনার পাশে তাকে টেনে নিয়েছে। এমন মহৎ
কাজ কয়ন করতে পারে ভবশঙ্কর বাবু।

আয়ুষ্মতী
১৩২
করতে ধৰ্ম্ম হারাব না, গবান বিরূপ হবেন না, বরং
তিনি আশীর্বাদই করনে।”
নিৰ্ম্মম ভবশঙ্করের হৃদয় বিগলিত হইয়া গিয়াছিল, রুদ্ধ
কণ্ঠে তিনি শুধু বলিলেন “ডাক্তার বাবা-
প্রকাশ বােস উগ্রক সংযত করিয়া বলিলেন “বুঝেছি,
আপনার অনুতাপ কুয়েছে। এখন ৩ ছেলেকে বাচাতে
পারবেন ভবশঙ্কর বাবু, আমায় আপনি আদেশ কন
আমি পৃরবাঁকে এনে দেব, সে আমার বাড়ীতে আছে ।
আপনা: শুভ অদৃষ্ট তাই অমন মেয়েকে পুত্র বধূরূপে লাভ
করতে পেরেছেন। বুঝতে হয়েছেন, গভীর আঘাত
পবিত্রের বুকে, সে না এলে পবিত্রকে বাঁচাতে পার।
যাবে না। যদি ছেলেকে বাঁচাতে চান, সত্যরূপে
ভগবানকে পেতে চান, পতিতার মেয়ে বলে ঘৃণা না করে
তাকে আনুন। সমাজ আপনার হাতে, সমাজ কিছু
করতে পারবে না। আর যদও কিছু বলে—বলতে দিন
তা। যে সমাজ এত অনুতার সে সমাজে বাস করার
চেয়ে ত্যাগ করা ভাল।
দেবতা ঘুমিয়ে নেই, তিনি
দা জাগ্রত, তিনি আপনার কাজের ফলাফল বিচার
করবেন। বলুন, আদেশ করুন, আমি পূরবীকে কাল
সকালের মধ্যে এনে দিই।”

আয়ুষ্মতী
তাহার হাত দুখানা দুই হাতে চাপিয়া ধরিয়া সজল
চোখে রুদ্ধকই ভবশঙ্কর বলিয়া উঠিলেন “তাই করুন
ডাক্তার বাবু , পূববীকে এনে দিন। আমি যে মুখে মাকে
আমার তাড়িয়েছি, সেই মুখ ফিবে
সেই মুখ ফিবে তাকে ডাকতে
পারছিনে, পুত্রকে বিসর্জন দিতে এসেছি, তবু সঙ্কোচে
তার সামনে গিয়ে গানে গাছি নে। আপনি কে
এনে দিন, আমার পবিত্র কে বাঁচান! পকিব ছাড়া আর
আমার কেউ নেই ডাক্তার বাবু, পরি—
ঠাহার কণ্ঠ একেবারেই কদ্ধ হইয়া গেল।
রাত্রের ট্রেনে ডাকার কলকাতা চলিয়া গেলেন।

১৪
শঙ্কিত বক্ষে কম্পিত পদে আজ দীর্ঘ পাচ বৎসর পরে
পূরবী পাক্ষী হইতে নামিল।
“বউ মা-
বহুকাল পরে এ কাহার আদরের আহ্বান; পূরবী
অবগুণ্ঠন তুলিয়া দেখিল সমুখে উমা।
“মা”
উমার পদতলে সে লুটাইয়া পড়িল। উম হাকে
টানিয়া বুকে তুলিয়া লইলেন, বিকৃত কণ্ঠে বলিলেন,
এসেছিল মা, আস। তাের ঘরে তুই ফিরে আয়, তাের
সিঁথার সি দূরের জোরে পবিত্র আমার বেঁচে উঠুক মা?”
উচ্ছসিত ভাবে তিনি কাদিয়া উঠিলেন।
সম্পূর্ণ নিরানন্দ পুরী, একটা উচ্চ কথা পর্যন্ত
কাও. মুখে নাই, সব চুপচাপ। পূরবীর প্রাণ।
হাঁপাইয়া উঠিল, “কেমন আছেন না তিনি?”
কে, পবিত্র ? দেখবি আয় মা-দেখবি আয়।”
সতের দিন অবিরত বিকারের ঝেকে য়োগের সঙ্গে
যুদ্ধ করিয়া কাল সকাল হইতে পবিত্র নীরবে পড়িয়া

১৩৭
আয়ুষ্মতী
আছে। সে যে আঁচিয়া আছে এটুকু জানা যাইতেছে
শুধু তাহার মাথা নাড়াতে।
ভবশঙ্কর পুত্রের মাথার শিয়রে তেমনি আড়ষ্টভাবে
বসিয়া। তাহার দত্ত ভীষণ আঘাত পুত্রের কদর বিদীর্ণ
করিয়া দিয়াছে, তবুও সে মুখ ফুটিয়া একটা কথা বলে
নাইপিতৃদত্ত দণ্ড বুকে ধরিয়া নীরবে সে মৃত্যু বরণ
করিতেছে। এ কি পিতার পক্ষে বড় কম পরিতাপের কথা
যে, তিনি নিজেই পুত্র হত্যা করিলেন। ডাকায়
বলিয়াছেন বড় মন্দ নয়; একেবারে হত্যা করিলেই তাে
এর চেয়ে ভাল ছিল, তিনি যে তাহাকে তিলে তিলে দখ
করিয়া অবশেষে মৃত্যুমুখে তুলিয়া দিলেন।
আজ যাইতেছে কাহার-তাহার না-সমাজের। বুক
ভাঙ্গিয়া যাইতেছে কাহার ।
ভকণ্ঠ তিনি ডাকিলেন পবিত্র-পত্রি-
কে উত্তর দিবে ?
পবিত্র, বড় আয়ের পবিত্র আমার, একবার চা}
বাবা, একবার কথা বলে যা বাবা, তাের চির অপরা
চির পাতকী বাপকে মানা করে যা, এমন করে বুকের
মধ্যে ভীষণ ক্ষত উৎপন্ন করে যাসনে রে ।
উচ্ছসিত ভাবে তিনি পুত্রের মাথায় হাত বুলাইতে

আয়ুষ্মতী
বুলাইতে পাগলের মত ডাকিতে লাগিলেন ওরে, যে ভুল
করেছি আমি তা সংশােধন করব, তাের বুকে যে ক্ষত
উৎপন্ন করেছি আমি, তাতে আমিই শান্তির প্রলেপ দেব।
পবিত্ত, পবিত্র, আমার জীবনাধিক, একবার চেয়ে দেখ,
তাের হতভাগা বাপের কথা শুনে যা।
ওরে, তাকে এমনি
করে আগুনের মধ্যে ফেলে যাস নে। হা নারায়ণ.-*
মুক্তকঠে বৃদ্ধ কঁদিতে লাগিলেন “আমি যা পাপ
করেছি তার শাস্তি আমায় অঙ্গ রকমে দাও, পুত্রকে
কেড়ে নিয়ে না, এমন করে আমার শেষ জীবনটা চিতার
আগুনে ফেলে তিলে তিলে দগ্ধ করো না। দামােদর
নিজের হাতে তােমায় পূজো করি, নিজের হাতে তােমায়
তুলসী দেই, সে কি এই জন্যেই ঠাকুর, আমার একান্ত
ভক্তির পুরষ্কার কি এই দিচ্ছ তুমি? তবে কি তুমি যথার্থই
কিছু নও, সত্যিই কি তুমি পার মাত্র। যদি আমার
পবিত্রের কিছু হয়, ওগাে ঠাকুর, তােমায় যে হাতে আমি
ল্য হতে পূজা করে আসছি, সেই হাতে নিয়ে গিয়ে
পুরে ফেলে দিয়ে আসব, যে মুখে তােমার প্রশংসা গান
কমেছি, সেই মুখে প্রচার করব, কিছু নেই, দেবতা নেই,
ভগবান নেই। আমায় রক্ষা কর-তুমি যে যথার্থ আছ
সে বিখান আমার ভেঙ্গে না নারায়ণ।

আয়ুষ্মতী
দ; বাহি: ছায়' উম! ---ঝর ঝর করিয়?
5. * এল ফ': ৩ ; এলেন। পূৰী শক্ত কাঠের
মড়া ,
(51; একফাট! গুল
আসি ন; ;
কাহ; ৬: দা:ব: নেহিলেন ।
“মণ এ:পন । ৬
বউ ম , এই ধ? এস *
' বশঙ্কর সব গুন শ
: ৬াইল
(म, घाम
৫ার হন সুর
চাখের সম্মুখে স্পষ্টরূপে ফুট উঠিল। সে ও নাই,
কাবার শক্তি বনসায়া ফেলিয়া ছল ; তাহার
মনােভাব স্পষ্ট • তা মুখে । উঠিয়াছিল, যাহা দেখিয়া
ভবশঙ্করের স্থান দিয়া উঠিল-আহ, ও অগিল।
“ব-বউ মা-”
এই প্রথম তার সাধন, কঠ কপি উঠি “কস
না, এখানে বস। আমি তোমার বিষয় পর দিন
মা; সাবিত্রী যেমন করে মরা স্বামীকে বা>িয়েছিলে,
তােমাকেও তেমনি করে আমার পবিত্রকে ফিরিয়ে আনতে
হবে না। আজ আমার পাত্রকে স্বার্থই আমি তোমায়

আয়ুষ্মতী
১১০
।
দান করল।
এত দিন প্রাণ ধরে কাউকে দিতে পারি
নি মা, এমন কি উমাকেও না, আজ তোমার হাতে কে
দিলুম। দেখব–মি যদি যথার্থ সতী হও, আমার
পত্ৰিকে তুমিই কেবল ফিরতে পারবে ।
যায়গা তােমার ছেড়ে দিয়ে আমি চললু, কাল সকালে
আমি যেন খবর পাই পবিত্রকে তুমি ফিরিয়েছ।
মা-বস এখানে।
জ্ঞানশূন্য বৃদ্ধ পূরবীর হাতখানা ধরিয়া পবিত্রের
পার্শ্বে বসাইয়া দিয়া শ্লথ পদে বাহির হইয়া পড়িলেন।
সারা দিন রাত ঠাকুর ঘর তাহার কাটিয়া গেল,
অজস্র চোখের ওলে ভাসিম রুকণ্ঠে কেবল ডাকিতে
ছিলেন “ঠাকুর-বিশ্বাস হারাতে দিয়ো না,
ন', বিশ্বাস
রাখ আমার, আমায় নরশিচ আকারে পরিবহিত কর
না নারায়ণ, আমি যঃ আমায় তাই কর।*
ডাক্তারেরা আজ এখনই ছিলেন, কারণ আজিকার
রানিই অত্যন্ত সঙ্কটের । যদি আফ্রিকার রাত্রিটা কোনও
বমে কাটাইয়া দেওয়া যায়, জানা যাইবে পবিত্র বালি।
( সমস্ত রাত্রি উন্মুখ হইয়া অনিদ্রায় বৃদ্ধ কাটাইয়া
দিলেন – এই বুঝি কান্না শোনা যায় ওই না উমা চীৎকার
করিয়া উঠিল---পবিত্র-পবিত্র

১৪১
আয়ুষ্মতী
সকালের আলো গৃহ-মধ্যে প্রবেশ করিল। সঙ্গে সয়ে
কে সানন্দে চীৎকার করি! ডে' কিল-“ভব বা ।
তিনি কোথায়?"
ক উওর বিল ১৮ ঘ।"
ডাক্তার স ফ -দু: আঘাত করিয়া ৫কিলেন
“শিগণ নয়। খুলনবশ : বা:, 'দী করন না।”
• প্রহস্তে শক্ত লি’, ‘তে ঐ পি • কম্পিত
কণ্ঠে ৯িজ্ঞাসা করলেন “কি ' র বাবা ।”
“খুব ভাল, পবি এ যাএা রক্ষা পেয়েছে, আর
কোন ভয় নেই..- সানন্দে ডাক্তার বোস ভংশ রকে
আলিঙ্গন করলেন।
বন্ধুর দুই মাথ নিয়া আনা গড়াইয়া পড়িল--
--
“সত্য কথা বলেছেন ডাক্তার বাবু?
ডাক্তার বােস বলেন “পের কাছ অামি ছেলের
সম্বন্ধে মিথ্যা কথা বলার সাহস, করনে বশর বাবু।”
“নারায়ণ— ফিরিয়া মাটিতে লুটাইয়া পড়িয়া কও
কণ্ঠে ভবশঙ্কর বলিলেন, “তুমি তবে সত্যই আজ দেবতা
বড় পরীক্ষাস্থলে কলেছিলে, কর্তব্য হারিয়ে ফেলেছি,
সন্দেহ মন দুলছিল। চিরাতি এ দাসকে এ পরীক্ষা
করার কি দরকার ছিল ভগবান? বুঝেছি প্রক, মিথ্যা

আয়ুষ্মতী
১৪২
ধম্যের অার করতুম, সমায়ের স্বদ্ধা কম, আমায়
ধূলাের চেয়েও যে নত হতে হবে, আত্মমর্যাদায় স্ফীত হয়ে
তা ভুলে গিয়েছিলুম, আঘাত দিয়ে আমায় সাবধান
করে 'ল।”
অস্থর চঞ্চল পদে তিনি পবিবে গহে চালন,
সম্মুখেই শুমূখী উমা।
বক সিজ্ঞাসা কবিলেন, “বি ভাল হয়েছে উম:,
জ্ঞান য়ে দু ৩, কথা বলেছ ?”
উমা বললেন, “হ্য, সে এখন বেশ কথা বলছে।"
“উ মা কোথায় উমা?"
উমা বলিলেন “বউ মা তার কাছে বসে আছে।
“বউ মা .. বউ মা-
কর গৃহ প্রবিষ্ট ইকামাত্র পৃষী সরিয়া গিয়া এক
পাশে দাড়াইল।
পবে শান্ত হাসিমাখা মুখের পানে চাহিয়া বৃদ্ধ
ভবশঙ্কর হৃদয়ে অসীম বল পাইলেন,“পূরবীর দুখানা
হাত দুটাতের মধ্যে লইয়া রুদ্ধ কাঠ বলিলেন “মা লক্ষ্মী,
তাই . সতী, তাই সাবিত্রীর মত মরা স্বামীকে
ফিরি:য় আনতে পেরেছি, পবিতকে আবার দেখতে
দিয়েছিস। মা, পাঁচ বছর আগে কি করেছি, কি বলেছি,

১৪ ৩
আয়ুষ্মতা
সে সব ভুলে যা, আজ আমার গৃহকে তুই পূর্ণ করে রাখ
মা, তাের হাসিতে আমার গৃহ করে উঠুক। পকিকে
আমি তোকে খুন করেছি, ওর ওপ৫ে শ' কার এখন এক।
তাের, আণী পার করছি মা, তুই 'য়ুষ্ম হয়ে থাক।”
সকল নেত্ৰ পূবার পায়ে ধূ লইল। আজ
এই বিপুল আনন্দের মানে {{র সারাক্ষপান!
জুড়িয়া একটা ব্যথা আগয়া উঠল-- দামশাই, দা,
আজ এই শিলনের দিনে কোথায় তুমি?”
বৃদ্ধ এ মিলন দেখিতে পাইনে ন', এ বড় ক্ষোভের
उशि अपनी मनन बाबर मत किदिवा साडेन
এখন তিনি পরলােকে। কিন্তু আমাদের বিশ্বাস, তার
পরলোকগ? আত্মাই এই মিলন ঘটাইয়া দিয়াছে। পূরবীর
জন্য তিনি জয়ন্তে সুশ হইতে পারেন নাই, মরিয়া ও শান্তি
পান নাই। তাহার আত্মা এবারে যথার্থই মুক্তিলাভ
করিল।
সমাপ্ত

আট-ন!-সংস্করণ-গ্রন্থমালা স্য সংরণের মই- ক.গ, ছা, ধাই কান্দের। -অধুনিক শ্রেষ্ঠ লেখকের পুস্তকই প্রকাশিত হয়।-- বলে যাহ! কেই ভাবেন না, অশও করেন নাই, আমরা এই এখন এক। বিকাকেও হার মত হইয়াছে- এ বি ই নুন সৃষ্টি। বঙ্গসাহি? অধিক প্ররের আশায় ও যাকাত সৰু : ব্যক্তিই উৎকৃষ্ট পুস্তক পাঠ সমর্থ হন, সে মহান দেশে আমার এই হনি ‘আট-এ সংস্করণ প্রকাশ করছি। মালবাসীদের সুবিধার্থ, নাম, রেট্রে করা হয় । গ্রাহকদিগের নক নবপ্রকাশিত পুস্তক ৬ি: প: ডাকে প্রেরিত হয়। পূর্ব প্রকাশিতগুলি এক সঙ্গে যা পত্র লিবিয়, স্বাবধানুযায়ী, পৃথক পৃথকও লইতে পারেন। ডাকবিভাগের নুন নিয়মানুসারে মাশুলের হার বন্ধ হওয়ায়, গ্রাহক দিগের প্রতি পুস্তক তিঃ পিঃ ডাকে ৬০ লাগিবে । অগ্রাহাম wo লাগিবে । হকদিগের কোন বিষয় জানিতে হইলে, “গ্রাহক-নম্বর” সহ পত্র দিতে হইবে। প্রতি বাঙ্গালী মাসে একখানি নুতন পুস্তক প্রকাশিত হয়; ১। অভাগী ( ৭ম সংস্করণ)—রায় জলধর সেন বাহাদুর। ২। ধর্মপাল ( ৩৪ সং)-রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, এম-এ। ৩। পল্লীসমাজ (ঠ সং)-এরৎচত্র চট্টোপাধ্যায়।

[ ২ ১৩। ২৪ 1 । ” কাঞ্চনমালা ( ২৪ সং)- শাহপ্রসাদ শাসী, এম-এ। 'বা:- বব (২য় স:)-শব এ গুপ্ত, এম-৪, বিএল। वाली ३६ मा শসুদী-নাথ ঠাকুর, বি-এ। ই+:+: . সীমোহন সেনগুপ্ত। শাশ্বত ‘ণী ( ২য় সং - রাধাকমল মুখােপাধ্যায়। ১। বড়বাড়ী। ৭ম সংস্করণ --রায় ৷ চলধর সেন বাহাদুর। ১০। গ (১৮ স -শং ন এট্টাপাধ্যায়। * {{সস বন্মেপাশায়, এম-এ। " ও ‘মথ্যা । ৩য় স} -- শবপন, ল পাল। ৫২'র বালা, ২ দ" । - হরিসাধন মুখােপাধ্যায়। সরে। রঞ্জন বন্দোপাধ্যায়। " (২য় মৰণ। -মী হেমনলিনী দেবী। মা: ( ২য় সংকরণ -- শমী নিরুপমা দেবী। বেগ : { না: ৫) নাথ বন্দোপাধ্যায়। কল "ও"ী ( ৪ সস্করণ - উপেন্দ্ৰনাথ দত্ত। ১৯। বিশ্বদল-যমেহন সেনগুপ্ত। ছালদা: বাড়ী (১ স}-মুনীপ্রসান সাধিকারী। ২১। ধূপ: । । ২) --হােমৰমার রায়। ২২। লীলা ম-মনােমােহন রায়, ২৩। সুখের ঘর ( ২৪ স• )—শকাল প্রসন্ন দাশগুপ্ত, এম-এ। ২৪। মধুম-ধমতী অনুরূপা দেবী। ২৫। রলির ডায়েরী-মী কাঞ্চনমালা দেবী। ফুলের তােড়া-মী ইন্দিরা দেবী। ৫। ফরাসী বিপ্লবের ইতিহাস-ঐসুরেনাথ খােয়। ২৮। সীমন্তিনী-দেবেন্দ্রনাথ বসু। ২। বি-এ।

[ ৩ }
২৯। নব্য-বি . - Yপক গরু' টা ষা, এম এ ।
১০। নববর্ষের মুe---সরল দেবী
৩১। " নি.. (২ * }
৩। ফিবনাশ-শীফে ন পু, এম.এ. বি-এল ।
৫ে২ সা:; { ( স ) নীরেনাথ ,
৩৪। :রী ;.ব্য:.::
জেলছবি- লাল গঙ্গোপায় :
খ.তা: । কারসপন মুখোপাধ।
০৭। ' ব্রা ন-১০,ব. 1 : (২য় ঋণ
১৮। -বিশা: অবন? ১. মিই।
৩১। হরিশ ""৩ ঋণ। ২ * সব সেন বাহাদুর
ন সরে -- শকালীন দাশপ, এম-এ।
৪১। পরিণা---এ কল কর, এম-এ।
৪২। পীরানী-যোগেনা ;
৪০। ভবানী--- নিকৃষ্ণ বসু ।
৪৪। অমিয় -- যোগে মার! গে!!
৪। অমিতা ( ২ * } পান্নালাল বন্দোপাধ্যায়, বি-এ।
৪৬। প্রত্যাবর্ত -..হেপ্রেস ঘােষ, বসুমী-সম্পাদক।
৪৭। দ্বিতীয় শ-শ্ৰী নরেশচন্দ্র সেন গুপ্ত, এম-এ, ডি-এল ।
৪৮। ছবি ( ২য় সং)-এরং {ট্টোপাধ্যায়।
১৯। মনােরমা ( ২য় স; - মত সরবাল বসু।
৫০। সুরেশের শিক্ষা (২য়স)-বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়, এম-এ।
৫১। নাচওয়ালীউপেনাথ ঘোষ।
৫। প্রেমের কথা-ললিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, এম-এ ।
৫। গৃহহারা- বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Ausmoti

Author
Sarswati, Debi, Srimati Prabhabati
Title
Ausmoti
File name
Ausmoti
Text
OCR done
Citation
1923
Published
2009/08/6
Publisher
Gurudas Chattopadhaya And Sons, Calcutta
Language
Sanskrit
Pages
158
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Other Genres.
Keywords
Story
DLI number
512341
Barcode
4990010019427.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
JrOMHljFwE1
Download PDF

Ausmoti