Dipsikha Library, Howrah

Kabita-prasanga Ed.9

Bose,jogindranath · 2010/04/29

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

বুক-কমিটার ১৯১০ সালের ২৬ এ জুলাই এর ৭ ১ ন পত্রানুস
এন্ট্রান্স স্কুলের উচ্চশ্রেণীর জন্য অনুমোদিত।
ঐ বসে বা নবেম্বরে কলিকাতা গজেটে অদেশ প্রকাশিত।
কবিতা-প্রসঙ্গ।
{ এন্ট্রান্স স্কুলের তৃতীয ও চতুর্থ শ্রেণীর উপযোগী
মাইকেল মধুসূদন দত্তেব জীবন চবিত লেখক
শ্ৰীযােগীন্দ্রনাথ বসু, বি, এ,
প্রণীত।
-০
জীবে প্রেম, স্বার্থত্যাগ, ভক্তি নারায়ণ
সকল শিক্ষাৰ সাব রাখিও অবণে
নবম সংস্করণ।
বা ১৩১৮।
মূল্য আট আনা।

CAI (UTTA
L'ANTUD IV (C NEOGI
TH VABABIBHALAR PRE
OL 2, llachua Ba ar Street,
৩০ নং কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট হইতে
•ত প্রেস ডিপজিটাৰী বক্তৃক
প্রকাশিত।

উৎসর্গ-পত্র।
যাহার আশীর্বাদে ও অধ্যাপনাগুণে
আমি বাঙ্গালা সাহিত্যে জ্ঞানলাভ করিয়াছিলাম,
যিনি আমার বাল্যরচনা পাঠ করিয়া প্রীতিপ্রকাশ করিলে
আমি আপনাকে কৃতার্থ মনে করিতাম,
আমার সেই পৰমারাধ্য শৈশব-গুক
দক্ষিণ বাবাশ বঙ্গ-বিদ্যালযেব পূর্ব প্রধান শিক্ষক
পণ্ডিত ব্রজনাথ ভট্টাচার্য
মহাশয়ের উদ্দেশে
এই গ্রন্থ
ভক্তিসহকারে উৎকৃষ্ট হইল।

No text on this page.

বিজ্ঞাপন। ভাষা শিক্ষার সঙ্গে বালক বালিকাগণের হৃদয়ে হাতে সম্ভাব উদ্দীপিত হয়, তাহা লক্ষ্য রাখিয়া কবিতা-প্রসঙ্গ রচিত হইল। ইহার অধিকাংশ কবিত। ভারতীয় ঐতিহাসিক, পৌরাণিক বা মহাপুরুষ- বিশেষের চরিতমুলক ঘটনা অবলম্বনে লিখিত। যে কয়টী মনঃকল্পিত, তাহাতে এক একটা সদুপদেশ পরিস্ফুট করিবার প্রয়াস পাইয়াছি। জঁবে প্রেম, স্বার্থত্যাগ এবং ভগবানের প্রতি ভক্তিই সকল শিক্ষার সার এবং সকল শাস্ত্রেব চরমণ ক্ষ্য। এই লক্ষ্যভ্রষ্ট হইয়া অধ্যয়ন বা অধ্যাপনা করিলে ফললাভের সম্ভাবনা নাই ভাবিয়া, প্রায়, সকল কবিতাতেই তদনুকুল ভাব ব্যক্ত করিবার চেষ্টা করিয়াছি। প্রসঙ্গগুলির মধ্যে একটী নাটকাকারে রচিত হইয়াছে। অবসর ক্রমে, তাহা অভিনয়নুকরণে আবৃত্তি করাইলে বালকগণ শিক্ষার সঙ্গে কৌতু- কও লাভ করিবে। যুধিষ্ঠির ও ব্রাহ্মণবেশী ইন্দ্রের এবং পুরুরাজ ও অলেক- জানরের কথােপকথনও এইরূপ আবৃত্তি করা যাইতে পারে। অভিনয়- শুকরণে আবৃত্তি-প্রথা (Retation) আমাদিগের বিদ্যালয়সমূহে বর্তমান নাই ; কিন্তু ইহা প্রচলিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। যে বয়সে আমাদিগের বালকবালিকাগণ ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হয়, সেই বয়সে যেরূপ ভাষ! ও যেরূপ ভাব আয়ত্ত হইবার সম্ভাবনা, কবিতা-প্রসঙ্গে আমি তাহাই ব্যবহার করিযাছি। কোন কারণে ইহার কোন স্থান পরিবর্তনবােগ্য বোধ হইলে যদি কেহ অনুগ্রহপূর্বক নির্দেশ করিয়া দেন, আমি কৃতজ্ঞচিত্তে তাহা সংশোধনের চেষ্টা করব। কবিতা-প্রসঙ্গ, প্রধানতঃ, বালক বালিকাগণের জন্য রচিত হইলেও, আমি আশা করি, ইহা সাধারণ পাঠকপাঠিকাগণেরও চিত্তবিনোদনে সমর্থ হইবে। ইতি বৈদ্যনাথ, দেওঘর। চৈত্র, ১৩০৭ ।

বর্তমান সংস্করণ সম্বন্ধে বক্তব্য। ; বাঙ্গালা ভাষা এক্ষণে ম্যাটি কিউলেসন পরীক্ষার অন্যতম বিষয়রূপে নির্দিষ্ট হইয়াছে। কিন্তু বিশ্ব- বিদ্যালয় পরীক্ষার্থীদিগের জন্য কেবল গদ্য পুস্তকই নির্বাচন করিয়া থাকেন। গদ্যের সঙ্গে পদ্য পাঠ না করিলে ভাষার মাধুৰ্যজ্ঞান হয় না। এইজন্য হেয়ারস্কুল, হিন্দুস্কুল প্রভৃতি প্রধান প্রধান বিদ্যালয়ের উচ্চশ্রেণীতে পদ্য গ্রন্থ পঠিত হইয়া থাকে । কবিতা- প্রসঙ্গ প্রথমে ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষার্থীদিগের জন্য রচিত হইয়াছিল ; কিন্তু এক্ষণে ইহা অনেক উচ্চ ইংরার্জ বিদ্যালয়ে পঠিত হইতেছে। সম্প্রতি কমিটী ইহা উচ্চ ইংরাজী বিদ্যালয়ের উপযােগী বলিয়া বিশেষরূপে অনুমােদন করিয়াছেন। সুতরাং উচ্চ ইংরাজী বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ অসঙ্কোচে ইহা পাঠ্য- পুস্তকরূপে নির্বাচন করিতে পারেন। ভরসা করি টেক-বুক-কমিটীর অনুকূলতা ইহার অধিকতর প্রচার সম্বন্ধে সাহায্য করিবে। ইতি কলিকাতা কার্তিক ১৩১৮ টেট-বুক- সূচী পত্র। পৃষ্ঠা। বিষয় ১ ১। মহাপ্রস্থান। ১৭ ২৪ ০ ০ ০ । । । ৩৪ ৪২ ৪৮ ২। মাতৃ-স্নেহ। ৩। পুরু-রাজ ও আলেকজান্দর ৪। প্রবাসিপুত্রেৰ মাতা। ৫। শ্রীচৈতন্যের প্রতি বিষ্ণুপ্রিয়া ৬। অনাথিনী । ৭। তুকারাম চরিত। ৮। কপিলাশ্রম। একনাথস্বামী। ১০। আত্মোৎসর্গ । ১১। মহারাজ্ঞী ভিক্টোরিয়ার স্বপ্ন। ১২। দধীচের তমুত্যাগ :: ০ ০ ০ ৭৪ ৮৮ ০ ০ ০ ০ ০ ১৩। ধ্রুবের তপস্যা। ১১১ ১২ ১৪। স্বর্গারােহণ। ১৫। চিত্র-দর্শন। ১৬। সার্বসাময়িক বন্দনা। :: ১৩০

No text on this page.

কবিতা-প্রসঙ্গ।
:0;
114.10
৫০ ,.356.
মহাপ্রস্থান।
জরা-মৃত্যু-২
[ কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর রাজা যুধিষ্ঠির, সংসারের প্রতি বীতরাগ হইয়া
পত্নী ও ভ্রাতৃগণের সহিত মহাপ্রস্থান করেন । নিসন্নিবিষ্ট কবিতাটী
উক্ত সুপরিচিত ঘটনা অবলম্বনে রচিত হইয়াছে। মুলের সহিত, কোন,
কোন বিষয়ে, ইহার পার্থক্য লক্ষিত হইবে।]
হিমাচল পর পারে,
ধৌত মন্দাকিনী-ধারে
বিরাজিত ত্রিদিব-নগর।
-হীনদেশ,
নাহি রােগ, শােক, ক্লেশ,
মর্ত্যবাসি-চক্ষু-অগোচর ॥
সেথা রবি, শশধর,
বিতরে বিমল কর,
সমীরণ বহে ফুল-বাস।
অম্লান কুসুম ফুটে,
অমৃত-নিঝর ছুটে,
বসন্ত বিরাজে বারমাস ।
সেথা মন্দাকিনী-জলে হংস, হংসী, দলে দলে,
কেলি করে স্বর্ণপদ্মবনে।
পরি পারিজাত-মালা
স্মিত-মুখী দেববালা
খেলে, নিত্য নন্দনকাননে।
* লাকিনী-ধারে = স্বর্গগজাপ্রবাহে।

কবিতা-প্রসঙ্গ। পুষ্পিত মন্দার’পৰে বসিয়া, পঞ্চম স্বরে, পিক, সেথা, তুলে কুহুতান। ফুলরেণ মাখি গায়, ভৃঙ্গ গুণ গুণ গায়, সুখে করি মকরন্দ পান | সেথা যত জলধর, নেত্ৰ-মন-স্নিগ্ধকর, গরজয়ে সুমধুর নাদে। মণিময় গৃহ-চূড়ে দামিনী-পতংক। উড়ে, নিত্যোৎসব প্রাসাদে, প্রাসাদে। সেথা পুণ্যবান জন, করি লীলা সম্বরণ, দেবরথে করেন প্রয়াণ। সমাদবে সুররাজ সুধম্ম-সভার: মাঝ সুখাসনে দেন তারে স্থান । জ্ঞাতি-বধে ক্ষুমতি যুধিষ্ঠির মহীপতি চলেছেন সে দেশের পানে। দীর্ঘ পথ না ফুরায়, বাধা, বিঘ্ন পায় পায়, শত চিন্তা জাগিছে পরাণে। দুর্গম সে পথ মাঝ, চলিয়া আসিতে, আজ, পড়েছেন মাদ্রী-সুত-দ্বয়। যেন লতা তরুচ্যুত পতিতা দ্রুপদ-সুতা, নিপতিত ভীম, ধনঞ্জয় । * সুধম্মা দেবরাজের সভ মহাপ্রস্থান। ' শােকচ্ছায়ে বিমলিন, নরপতি, আভাহীন, মেঘাবৃত যেন দিবাকব। অন্তবে চিন্তা ভাব, কষ্টেব নাহিক পাব, ধীবে, ধীবে হন অগ্রসব । লৌহ-যষ্টি শােভে কবে, করু-চৰ্ম্ম পৃষ্ঠ'পবে কব* শশাভিত বাম হাতে। চলেছেন একেশ্বব, সালে মাত্র সহচব সাবমেয় ধাইছে পশ্চাতে। অববিয়া নভস্থল, উঠিয়াছে হিমাচল, “সিদ্ধমার্গ”। বিবাজিত বুকে। সে পথে কবেন গতি, হৰিনাম উচ্চাবিযা মুখে কোথাও জলদ-জাল বেড়ি শৃঙ্গ সুবিশাল, কোথা মেঘে ঝলসে দামিনী। মেঘমন্দ্র পবাজিয়া, শৈল দেহ বিদাবিয়া, কোথাও বা ছুটে স্রোতস্বিনী। ভূর্জপত্র মর মব, নিরেব ঝব ঝর, গিরিচর-শ্বাপদগজ্জন । একত্র মিলিয়া সব উঠিছে গম্ভীব রব, শুনি হয় বধির শ্রবণ। দৃট পদে নরপতি করঙ্ক = কমণ্ডলু। । সিহ্মমার্গ =সিদ্ধ পুরুষদিগের অবলম্বিত নাগ , অর্থাৎ সিদ্ধপুরুষগণ যে পথ দিয়া গমনাগমন করেন।

কবিতা-প্রসঙ্গ। কোথা পাতাে মুখ শিলা, প্রকাশি ভৈরব লীলা, পথ-পাশে আছে দাঁড়াইয়া। কোথা কোন তরু’পরে বনফুল, থরে থরে, ফুটিয়াছে, দি আমােদিয়া। বেণুপুঞ্জে অন্ধকার, কোথা পথ দেখা। ভার, আঁধারে গরজে অজগর। ভয়লেশ নাহি মনে, হৃদে স্মরি নারায়ণে, নরপতি হন অগ্রসর । হিমশিলা পদে ফুটে, শােণিত-প্রবাহ ছুটে, মর্মভেদ করে শীত বায় । নাসা-অক্ষি-শ্রুতি মূলে হিম যেন বিধে শূলে, থর থর কাপে সর্বকায় । তরু, লতা ক্রমে শেষ, অমল ধবল বেশ, গিরিশৃঙ্গ তুষার-মণ্ডিত। অতি লঘু বায়ুশুর, টলি পড়ে কলেবর, উত্তমাঙ্গ হয় বিঘূর্ণিত ॥ : *, তবু রাজা অগ্রে ধান, ক্রমে পথ অবসান, মেরুশৃঙ্গ ক্রমে দৃশ্য হয়। শিরে তার, কি মাধুরী। শােভে জ্যোতির্ময়ী পুরী, সুখপূর্ণ ত্রিদশ-আলয় । অস্ফুট বীণার তান, মােহিত করিয়া প্রাণ, দুর হতে প্রবেশে শ্রবণে।

মহাপ্রস্থান। হবিয়া মন্দাব-গন্ধ আসে বাযু মন্দ মন্দ, স্নিালােক উথলে তপনে। ফুল দুর্গমপথ, পূর্ণপ্রায় মনােরথ, হেবি রাজা আনন্দে মগন। সাবমেয় ফেলে শ্বাস, ভাবি, বুঝি, পূর্ণ আশ লাল কবয়ে আন্দোলন। নবপতি অগ্রে চান, সম্মুখে দেখিতে পান, আসিছেন দ্বিজ এক জন । অম্লান কুসুম-হার কণ্ঠদেশে শােতে তাব, পবিধান অম্লান বসন । দ্বিজে দেখি নবপতি সাষ্টাঙ্গে কবেন নতি, ক’ন বিপ্র সুমধুব ভাষে। “হে সাহসি ! কেবা তুমি ? জাননা এ দেব-ভূমি ? আসিয়াছ কোন অভিলাষে ? “স্বর্গপুবে প্রবেশিতে বাসনা যদ্যপি চিতে, অশুচি কুকুব কেন সনে ? “জান না কি সুনসীব+ বজ্রাঘাতে চূর্ণি শিব এইদণ্ডে বধিবেন প্রাণে ?” কমােড় নরেশ্বর কহিলেন, “দ্বিজবর আমি, রাজা পাণ্ডুর নন্দন । } নাসীর = ইন্দ্র।

কবিতা-প্রসঙ্গ।
“ত্যজিয়া মরত-বাস
করিয়াছি অভিলাষ,
পশিব অমর-নিকেতন।
“সঙ্গে ছিল ভ্রাতা, দারা
পথে নিপতিত তারা,
আমি মাত্র আছি অবশেষ।
না জানি কি ভাবি মনে এই শ্বান মাের সনে
আসিয়াছে, সহি বহু ক্লেশ ॥g
“ভালবাসে যে আমারে, কেমনে ত্যজিব তাবে ?
সাথে করি ল’ব স্বর্গধাম।
“নিরখিয়া নারায়ণে,
বৈকুণ্ঠে কমলা সনে,
উভয়ে হইব সিদ্ধ কাম।
“কর, দেব ! আশীর্বাদ,
পূর্ণ যেন হয় সাধ,
হরি-পদে লভি দোহে লয় ।
“হরিময় চরাচর,
পশু, পক্ষী, কীট, নর,
কোন জীব ত্যজ্য তঁার নয় ।
হাসি ক’ন দ্বিজবর,
“কি বলিলে, নরেশ্বর !
মুঢ় সম একি অভিলাষ ?
“স্বর্গপুরে আগমন
করি, কভু, কোন জন
করে নাই তব সম আশ ।
“কৃমি, কীটে আকুলিত,
মল, মূত্রে সদা প্রীত,
লালাস্রাব নিয়ত বদনে।
* খান = কুকর (অকারান্ত পুংলিঙ্গ শব্দ)।

মহাপ্রস্থান। L “হেন জীবে ল’য়ে তুমি পশিবে স্বরগ-ভূমি ? ছি! ছি! ভূপ! বলিলে কেমনে? শুনিলে এ হেন ভাষ, করিবেক উপহাস স্বর্গপুরে দেব-শিশুগণ । ‘হাসিবেন দেবরাজ, পাইবে বিষম লাজ, উন্মত্ত ভাবিবে সৰ্ব্বজন। “দেব-সঙ্গ মাগে যেই অশুচির সঙ্গ সেই যদি নাহি পারে ত্যজিবারে। ‘ছিদ্রান্বেষী সুরপতি, রুষ্ট হয়ে তার প্রতি, হেথা স্থান নাহি দেন তারে। ভূপ! কুক্কুরে ছাড়িয়া দাও, কিম্বা স্বর্গ ছাড় তার তরে। "ত্যজ অসম্ভব আশ, একত্র করাতে বাস দেবলােকে কুকুরে, অমরে। “তােমারে কুকুর সাথ। হেরিলে ত্রিদশনাথ মহাকুদ্ধ হবেন নিশ্চয় । “সত্নে মহাসিন্ধু তরি, কুলেতে আনিয়া তরী, ডুবাইতে কি হেতু আশয় ? জানি আমি রমাপতি প্রসন্ন তােমাতে অতি, নরদেহে 'আসিয়াছ হেথা । স্বর্গপুরে চল তবে, যথা ভ্রাতৃগণ সবে, দ্রুপদ-দুহিতা সতী যেথা। "যদি, স্বর্গ চাও, ৮ কবিতা-প্রসঙ্গ। “কুকুরে করহ দূর, অই শােভে স্বর্গপুব, বিলম্বেতে কিবা প্রয়ােজন ? “হের শ্রীমন্দির-চূড়ে বতন-পতাকা উড়ে, বিরাজিত যথা নারায়ণ ।” এত বলি দ্বিজবর, প্রসারি দক্ষিণ কর, শিলাখণ্ড করিয়া গ্রহণ। কুকুরে মারিতে যান, নরপতি পিছে ধান, করে ধরি কহেন বচন । “নিরীহ, আশ্রিত পাণী, কেন, দ্বিজ ! তাবে হানিফ করিবেন কলুষ-সঞ্চার। একাকী তাজিয়া তায় ত্রিদিবে পশিতে, হায় । নাহি মনে বাসনা আমার। স্বর্গপুরে নাহি কায, ফিবিব মরত মাঝ, পূজিব সেথায় নারায়ণে। “প্রতি জীবে ভগবান করিছেন অধিষ্ঠান, খান বলি ত্যজিব কেমনে? এত বলি নরপতি উদ্দেশে করিল নতি শ্ৰীমন্দির-কেতু লক্ষ্য করি । প্রণমি দ্বিজেরে, সুখে, ফিরিলা মরত-মুখে উচ্চারিয়া “শ্রীহরি শ্রীহরি ।” সহসা দুন্দুভি-শব্দ, ভুবন করিয়া স্তু, মহাশূন্তে হইল ধ্বনিত। * নি- এর কমিয়া।

মহাপ্রস্থান । জিনি কোটী শশধর অপুৰ্ব্ব বিমল কর দশদিক্‌ করিল প্লাবিত। পু+নি ০, + 8 “যথা ধৰ্ম্ম তথা জয়” শব্দ উঠে বিশ্বময়, গান করে গন্ধৰ্ব্ব, কিন্নর। নৃপতি চৌদিকে চান, কোথা, বিপ্র ! কোথা খান। বিস্ময়ে স্তম্ভিত কলেবর।।।।। , দেখেন সমুখ দেশে দাড়ায়ে উজ্জ্বল বেশে ধৰ্ম্ম সনে নিজে সুরপতি। গাথিয়া মন্দার-হার, বামে দাড়াইয়া তঁার, চিত্ররথ হরষিত মতি । ***" । যুধিষ্ঠিরে সম্বােধিয়া, স্নেহভরে আলিজিয়া, ক’ন ধৰ্ম্ম মধুর বচনে। “ধন্য বৎস! ধন্য তুমি পবিত্রিলে মর-ভূমি, ধন্য স্বর্গ তব আগমনে । “মিলি দেবেন্দ্রের সনে যুকতি করিনু মনে পরীক্ষা করিতে তব মন। “সারমেয়-বেশ ধরি, ধরাতলে অবতরি, সঙ্গ তাই করিনু গ্রহণ। “ব্ৰত তব শেষ আজ চল, এবে, নররাজ। নারায়ণ যথা বিরাজিত । “শ্রীপদে দিবেন স্থান কৃপাসিন্ধু ভগবান, পাবে ফল চির আকাক্ষিত ।

কবিতা-প্রসঙ্গ।
শুনিয়া ধম্মের বাণী,
যুধিষ্ঠির নৃপমণি
দর দর নেত্রে বহে ধারা।
বদনে না সরে ভাষ,
ঘন ঘন বহে শ্বাস,
আনন্দেতে যেন আত্মহারা ।
ভূমিতলে লুটাইয়া,
ধৰ্ম্মরাজে প্রণমিয়া,
পূজা করি ত্রিদশ-ঈশ্বরে।
বন্দিয়া বিবুধগণে,
হৃদে স্মরি নারায়ণে,
পশিলেন অমর-নগরে ।
মাতৃ-স্নেহ।
বৈশাখের খর রবি উঠেছে আকাশে ;
ঝরিছে অনল-ধারা,
তাপদগ্ধ বসুন্ধরা,
শুষ্ক-প্রায় বন-ভূমি দাবানল-শ্বসে ।
স্তব্ধ লােকালয় এবে, যেন প্রাণিহীন ;-
মানব নিভৃত স্থলে,
পকুল তরুতলে,
বিহগ পত্রের মাঝে, হয়েছে নিলীন।

মাতৃস্নেহ।
১১
}
কেবল, বিশুদ্ধ কণ্ঠে, লক্ষ জলধবে
তৃষিত চাতকদল
যাচিছে “ফটিক জল,”
কথা বা দ’য়েল এক ডাকে ক্ষীণ ঋবে ।
}
থাকিয়া, থাকিয়া তপ্ত মধ্যাহ্ন-পবন,
আন্দোলিয়া তরুশিব,
ইহুববে সুগভীব,
বাষ-উষ্ণ-শ্বাস যেন কবিছে ক্ষেপণ।
,
নাহি অন্য শব্দ কোথ, নবিব সকা ,
কিন্তু একি পবমাদ ।
কেন হেন আর্তনাদ,
উঠিল বিদাবি, হায় ! গগন মণ্ডল ?
‘আগুন। আগুন।” বলি উথলিল বােল
শিশু, যুবা, দলে দলে,
উদ্ধশ্বাসে সবে চলে,
“কি হলাে। কি হলাে!” মুখে সবাকাব বােল।

১২
কবিতা-প্রসঙ্গ।
)
( ৭
দেখিতে দেখিতে ধূম ব্যাপিল আকাশ ;
জ্বলে অগ্নি “ধক ধক”
শিখা তুলি “লক লক”,
লােলজি, চাহে গৃহ করিবারে গ্রাস ।
“হুহু মুহু" শব্দে বহ্নি গরজে ভীষণ ;
আকাশে স্ফুলিঙ্গ ছুটে,
“ফট ফট” শব্দ উঠে
অনলের সঙ্গ পেয়ে মাতিল পবন ।
ব্যতিব্যস্ত পল্লীবাসী চারিদিকে ধায় ;
কেহ ছুটে বারি তরে,
কেহ বা চীৎকার করে,
আসন, বসন, শয্যা কেহ টানে হায় ।
(
}
দাড়াইয়া একদিকে মলিন বদন,
বিষাদে সজল আঁখি,
লাজে আধ মুখ ঢাকি,
অগ্নি পানে চাহি যত পুরাঙ্গনাগণ।

মাতৃস্নেহ।
১৩
১১ )
চারিদিকে শিশু গুলি ঘিরে দাড়াইয়া
সজল নয়নে হায়।
মাতৃমুখ পানে চায়,
কভু অনলের দিকে দেখিছে চাহিয়া।
)
“ধুধু ধূধূ” জলে বহি যেন দাবানল ;
গৃহ হ'তে গৃহ-চুড়ে
স্ফুলিঙ্গ পড়িছে উড়ে
কার সাধ্য সে অনলে ঢালে বিন্দু জল ।
)
!
সহসা রমণী এক কাঁদি উচ্চৈঃস্বরে, -
ওগাে মাের কি হইল।
সুরমা কোথায় গেল ?”
বলিয়া ধাইলা সেই অগ্নির ভিতরে।
তিন বৎসরের মেয়ে সুরমা তাহার,
আপন শয্যার পরে
ছিল বাছা নিদ্রাভরে
হেনকালে হুতাশন ঘিরিল আগার।

১৪
কবিতা-প্রসঙ্গ।
)
( ১৫
চমকিয়া উঠি শিশু অগ্নির গজ্জনে,
বাহির হইতে যায়,
পথ খুজি নাহি পায়,
“মা, মা” বলি উচ্চৈঃস্বরে ডাকে প্রাণপণে ।
“ভয় নাই” বলি মাত ছুটি অগ্নিপানে,
শিশুরে তুলিয়া বুকে,
চুম্ব দিলা চাদ মুখে ;
কে বুঝিবে, কিবা শান্তি আজ মার প্রাণে ?
১৭
}
শিরােদেশে দীপ্ত বহ্নি উঠিল গজ্ঞিয়া
ভরাশি ও পাকার,
গৃহ করি অন্ধ কাব,
সহসা সম্মুখদেশে পড়িল খসিয়া।
১৮
)
ব্যাকুল জননী কিছু না পান উপায় ;
শিগুরে হৃদয়ে রাখি
যতনে অঞ্চলে ঢাকি,
উন্মাদিনী-সম দ্বারে ছুটিলেন, হায় !

মাতৃ-স্নেহ।
১৯ )
পলাইলা গ্রাস, ভাবি, বুঝি বা অনল,
বুভুক্ষু রাক্ষস প্রাম,
ছুটিয়া পশ্চাতে হায় !
আক্রমিল জননার বিলােল অঞ্চল।
৫
অনল-প্রতিম-সমা শােভিলা জন
“দাউ দাউ”,
কেশদলে
দীপ্ত বাহু-শিখা জ্বলে,
অনল-মণ্ডিত বাস লােটায় ধরণী।
২১ )
অদ্ধদগ্ধ কলেবর বস্ত্রের অনলে ;
তবুও শিশুরে লয়ে,
যতনে রাখি হৃদয়ে,
অগ্নিরাশি লঘি মাতা পড়িলা ভূতলে।
( ২২ )
ঘিরিল-চোদিক হ’তে যত বন্ধুজন ;
কেহ বা বীজন করে,
কেহ মুখে বারি ধরে,
সতনে চুষে কেই শিশুর বদন।

কবিতা-প্রসঙ্গ ।
( ২৩
}
হাসিল অবােধ শিশু হেরি নিজ জনে ;
জানে না জননী তার
কেন পড়ি শবাকার,
“উঠ মা, উঠ মা বলি ডাকে প্রাণপণে।
২৪
}
শিশুর করুণস্বরে লভিয়া চেতন,
একটী বারের তরে
চাহি মাতা, স্নেহভরে,
জনমের মত, হায়! মুদিলা নয়ন।

পুরুরাজ ও আলেকজান্দর। বীরবর আলেকজান্দর দিগ্বিজয় উপলক্ষে ভারতবর্ষে আগমন করিলে পঞ্চনদের অন্যতম নরপতি পুরুরাজ তাহার সহিহ তুমুল সংগ্রাম করিয়াছিলেন। যুদ্ধে পরাজিত হইলেও তিনি ক্ষত্রিয়ো- চিত মৰ্য্যাদা বিসর্জন করেন নাই। নিম্নসন্নিবিষ্ট কবিতাটী পুরুরাজ ও আলেকজান্দরের ইতিহাস-এসিদ্ধ কথোপকথন অৰ- লম্বনে রচিত হইয়াছে। রাজসভা মাঝে মাসিদন-পতি সমাসীন সিকন্দর। ঘিরি নরনাথে বীতিহােত্র-রূপী, শত, শত বীরবর । মুকুতাখচিত শ্বেতচ্ছত্র চার শােভা পায় রাজশিরে। দাড়াইয়া পাশে সুবেশ কিঙ্কর চামর দুলায় ধীরে। উজ্জ্বল বদন, বীরগর্বে ভরা নয়নে জ্যোতির ভাস্। যৌবনের স্মৃতি উথলিত দেহে, অধরে মধুর হাস্ বীতিহােত্র-রূপী = অগ্নিতুল তেজস্বী।

কবিতা-প্রসঙ্গ। মহিমা-মণ্ডিত প্রশস্ত ললাটে অঙ্কিত প্রতিভা-রেখা। “রাজরাজেশ্বর” বিধাতার লিপি রহিয়াছে যেন লেখা। পাত্র, মিত্র যত দাঁড়ায়ে সম্মুখে, দূরে ফিরে রক্ষিদল। নীরব-গম্ভীর সবার বদন, স্তব্ধ রাজ-সভাউল || সহসা অদূরে শৃঙ্খলের ধ্বনি, অস্ত্র-ঝনৎকার সনে, বীর-পদশব্দ, কাপাইয়া সভা, চমকিল সৰ্বজনে। বন্দী পুরুরাজে লয়ে রক্ষিদল প্রবেশিল সমাঝে। ব্যাধগণ মিলি আনিল বাধিয়। যেন মত্ত মৃগরাজে ॥ বিশাল উরস, শাল প্রাংশু, মহাকায় ; আপন জ্যোতিতে আপনি উজ্জ্বল নবােদিত রবিপ্ৰায় । মণিবন্ধে বঁধা লােহার শৃখল, দীর্ঘ ভুজযুগ, লােহার শৃঙ্খল গলে ;

পুরুরাজ ও আলেকজান্দর। ১৯ তবু মহিমায় উজ্জলবদন, নেত্রে অগ্নিশিখা জ্বলে । হেরি সে মূরতি সভজন যত, চমকি মুহুর্ত তরে, আপনা পাসরি, শির নােয়াইয়া, নমিলা সন্ত্রম-ভরে । নিজে সিকন্দর, নিমেষের তরে, চমকিল। সিংহাসনে। প্রসারিয়া কর অভ্যর্থিতে তঁায় বাসনা হইল মনে। শাল তরু প্রায়, উচ্চ করি শির, দাড়াইলা বীরবর। অনিমেষ আঁখি, নিরখি সে ঠাম, মুগ্ধ বীর সিকন্দর । সভাসদ এক পুরুরাজ-পাশে আসিয়া কহিলা ঠায় ; “একি ব্যবহার ? হও নতজানু ; বন্দী তুমি, এবে, রায়” ! নীরবে বীরেন্দ্র, কটাক্ষে কেবল, চাহিলা তাহার পানে। বােধ হ’ল তার মৰ্ম্মদেশ কেহ বিধিল বিষাক্ত বাণে।

২০ কবিতা-প্রসঙ্গ। মধুর বচনে পুরুরাজে তবে সম্বােধিয়া সিকন্দর । কহিলেন, “আমি সাহসে তােমার পরিতুষ্ট, বীরবর! “যে বীরত্ব তুমি দেখায়েছ রণে, নাহিক তুলনা তার। “কহ কি বাসনা ? ণ-যােগ্য তব দিব, আজি, পুরস্কার। “ধন, জন, মান কিবা প্রয়ােজন ? লহ, যাহা ইচ্ছা হয় । “রাজ্য চাহ যদি, দিব তােম, বার । ভারত করিয়া জয় । বীরের সম্মান বীর না রাখিলে, কে রাখিবে তবে আর? “তব বীরপপা অতুল জগতে ; দিব যােগ্য পুরস্কার।” কহিল নরেন্দ্র, “ভাগ্যবান তুমি, মহাবীর সিকদার। “কিন্তু পুরা প্রতিদ্বন্দ্বী তব ভুলিওনা, বীরবর! আশ্রিত যে জন, তৰ কাৰ্য্য তরে করিয়াছে রক্তদান।

পুরুরাজ ও আলেকজান্দর। ; “যােগ্য পুরস্কার বিতরি তা সবে বাড়াও তাদের মান। “কৃপার ভিখারী নহি আমি তব, নাহি চাহি ধন, মান। “জন্ম ক্ষত্ৰকুলে, সাধি ক্ষত্ৰধৰ্ম্ম, আনন্দে ত্যজিব প্রাণ”। লজ্জিত বীরেন্দ্র কহিল সম্রমে, “কহ মােরে, নররাজ ! “কি বাসনা তব ? কোন্ কাৰ্য্য সাধি তুষিব তােমারে আজ ?” কহিলা পৌরব, “তুষিতে আমারে বাসনা যদ্যপি মনে। “প্রচার আদেশ, লুণ্ঠন হইতে নিবারহ সেনাগণে॥ গাে, ব্রাহ্মণ, নারী রক্ষা কর, বীর । রক্ষ যত দেবালয়। বীরশ্রেষ্ঠ তুমি, দেখাও জগতে বীর কভু দস্যু নয় । “কাপুরুষ যেই অনাথ, দুর্বলে করে সেই অত্যাচার। “কিন্তু আর্ন্তজনে অভয়-প্রদান বীরের ধরম সার”।

কবিতা-প্রসঙ্গ। “তথাস্তু, নৃমণি" ! কহিলা বীরেন্দ্র, “বাসনা হবে পূরণ। “সেনাগণ মম তব রাজ্যে কেহ করিবে উৎপীড়ন। “কিন্তু, বীরবর । নু ধই তােমারে, বল মােরে এক বার। “মহত্ত্বেব তব উপযুক্ত আমি কি করিব ব্যবহার। নীরবি গণেক কহিল রাজেন্দ্র, “এই মাের নিবেদন। “রাজা আমি, কর মাের প্রতি রাজ-যােগ্য আচরণ ।” শুনি সিকদর সিংহাসন হতে নামিলা সম্রম-ভরে। পুরুরজ-পাশে গিয়া, পাশ কঁার খুলিলা আপন করে। করে কর ধরি, অতি সমাদরে, বসাইলা নিজাসনে। সভাজন যত, চিত্রার্পিত প্রায়, নেহায়ে দুইজনে। মুগ্ধ পুরুরাজ, অপূর্ণ আঁখি, গদ গদ কণ্ঠস্বর ।

পুরুরাজ ও আলেকজান্দর।
কহে, “সত্য আজি
পরাজিলে মােরে,
মাসিদন-অধীশ্বর!”
শত কষ্ট হতে
উঠিল অমনি,
“ধন্য ধন্য”, “জয় জয়।”
“তােমাদের যােগ্য তােমরা কেবল,
নাহি
তুল্য
বিশ্বময় ॥”
ধন্য সিকন্দর” । ‘ধন্য পুরুরাজ” ।
গাইল চারণ-দল।
“যুগ, যুগান্তর
তােমাদের যশ
ঘােষিবে অবনীতল ॥”
“ধন্য পুরুরাজ” । গায় আজ কবি,
‘ভারত-সন্ততিসার।
পরাজয়ে জয়ী
তুমি বারমণি।
তুল্য হব নাহি আর ॥
৫.
* চারণ = বলনাকারী, স্তুতিপাঠক।

প্রবাসিপুত্রের মাতা।
৩।
(১)
* আপন জীবন-ব্ৰত করিতে সাধন,
গিয়াছে প্রবাসে তার নয়নের মণি
না পেয়ে সংবাদ তার চিন্তাকুল মন,
বিরলে নয়ন-ধারা ত্যজেন জননী।
(২)
যে পথে গিয়াছে পুত্র, সেই পথ পানে
চাহিয়া জননী দিন করেন যাপন ;
উন্মাদিনী সম, আহা! ছুটেন সেখানে,
যেখানে পুত্রের নাম করে কোন জন ।
পশি দেবালয়ে, কভু, যােড় করি কর,
মাগেন সজল আঁখি সুতের কুশল ;
কহিতে পুত্রের নাম রুদ্ধ হয় স্বর,
বিক কপােল বহি ঝরে নেত্র-জল।
( ৪ )
কতই নিশীথ মা’র কাটে জাগরণে,
স্বপ্নবেশে কতদিন কঁাদেন জননী,
কতবার পদ-শব্দ শুনিয়া অঙ্গনে
জিজ্ঞাসেন বার খুলি, “এলে যাদুমণি ?”

প্রবাসিপুত্রের মাতা।
২৫
;
পাকিলে উদ্যানে ফল, আসিবে তনয়,
ভাবিয়া, জননী তুলি রাখেন যতনে ;
কত অন্ন জননীর পৰ্যষিত হয়,*
কতবার রচি শষ্যা কাঁদেন বিজনে।
কত দিন, কত মাস, কতই বৎসর,
এইরূপে গেল চলি; পুত্রের সংবাদ
আসিল ;-আঁখি মা’র ঝরে ঝরঝর ;
ভাবেন, বিধাতা বুঝি ঘটাল প্রমাদ ।।
(৭)
এক দিন জননীর কোন আত্ম-জন
কহিল তাহারে আসি, “তনয় তােমার
রহেছে যথায়, শুনি পান্থ একজন
আসিয়াছে তথা হতে, পাৰে সমাচার।”
(৮)
* আলুথালু কেশ, বাস ছুটিলা জননী,
যথায় পথিক সেই; জিজ্ঞাসিল। তঁায়,
“হেরেছ কি তুমি মাের নয়নের মণি ?
কি বলেছে বাছা তার অভাগিনী মায়?
পর্ষষিত-বাসি ।

২৬
কবিতা প্রসঙ্গ।
(৯)
কহিলা সম্ভমে পান্থ,-“তব পুত্র সনে
নাহি ছিল, ভদ্রে ! মাের পূর্ব পরিচয় ;
সংবাদ তাহার তবে কহিব কেমনে ?
বিশাল সে পুরী, ক্ষুদ্র গ্রাম সে ত নয়।”
(১০)
বড় সাধে বাদ বিধি করিল ঘটন,
নিরাশ জননী, তবু প্রবােধিয়া মনে,
উথলিত অশ্রুধারা করি সম্ববণ,
কহিলা পথিকে ধীর, মধুর বচনে।
(১১)
“পরিচয়ে, পান্থবর। নাহি প্রয়ােজন,
নিজ গুণে পরিচিত তনয় আমার ;
যে দেশে যেখানে থাক্‌, সেথা সৰ্ব্বজন
চিনিবে তাহারে, জানি ব্যবহার তার ।
(১২)
“বীরত্বে, ধীরত্বে, প্রেমে, আত্ম-বিসর্জনে,
থাকে যদি পরিচিত সেথা কোন জন,
বল, শুনি ;-কাৰ্য্য তার বিচারিয়া মনে
বুঝিব, সে বটে কি না আমার নন্দন।”

প্রবাসিপুত্রের মাতা।
২৭
( ১৩ }
কহিলা পথিক, মনে মানিয়া বিস্ময়,
“হেন বাণ, কভু, দেবি ! শুনি নাই আর
কোন (ও) জননীর মুখে ; বুঝিনু নিশ্চয়,
নহে সে অযােগ্য পুত্র, হেন মাতা যার ।
•
(১৪)
“হেরিয়াছি সেথা, এবে, কহিব তােমায়,
ভীষণ সংগ্রাম-ক্ষেত্র ; অশনি সমান
গর্জিছে কামান যথা, বিদ্যুতের প্রায়,
ঘুরিছে, বলসি আঁখি, উলঙ্গ কৃপাণ।
( ১৫ ।
“রুধিরে বহিছে স্রোত, অাহত মানব,
তৃষায় আকুল কণ্ঠে, করিছে চীৎকার,
ছিন্নঅঙ্গ, ভিন্নশির। লুটিতেছে শব,
রণমত্ত সেনাদল গর্জে “মার মার”।
(১৬)
“দাড়ায়ে সে রণক্ষেত্রে যুবা এক জন,
ক্ষতদেহে রক্তস্রোত ছুটিতেছে, হায় !
দৃঢ় করে ধরি বীর জাতীয় কেতন,
যুঝিতেছে রণে, যেন মসিংহ প্রায়।
শর = বিদারিত মস্তক।

কবিতা-প্রসঙ্গ।
(১৭)
“অগণ্য অরাতি-সৈন্য, ঘিরি বীরবরে,
কাড়িয়া লইতে কেতু করে প্রাণপণ,
কিন্তু হেন শক্তি কার? বাঁধা বজ্রকরে,-
ভূ দিয়া রণে শেষে ধায় শত্রুগণ ।
(১৮)
“জয়ােল্লাসে বীরবর প্রবেশে নগরে,
হর্ষে মগ্ন পুরবাসী করে যশােগান ;
নিজে অগ্রসরি রাজা, মহা সমাদরে,
জয়মাল্য দিয়া, বীরে করেন সম্মান।
(১৯)
“সেই কি তনয় তব, কহ গাে, ওননি।”
জিজ্ঞাসিলা পান্থ ; মাতা করিলা উত্তর,
“এ হেন তনয় যার ধন্যা সে রমণী,
কিন্তু, পান্থ! পুত্র মম আরাে গুণধর।*
(২)
বিস্মিত পথিক -কহে “হেরেছি নয়নে
একদা বৈশাখ-শেষে নীল জলধর
ব্যাপিয়াছে ব্যোমদেশ, হুঙ্কারি সঘনে,
ছুটিছে অশনি, বেগে বিদারি অম্বর।

প্রবাসিপুত্রের মাতা।
( ২১ )
“ঝলসিয়া আঁখিযুগ চমকে দামিনী,
হু হু”, “হু হু” ঘাের রবে বহে প্রভঞ্জন,
সন্তাড়িত বায়ুবলে ধায় প্রবাহিণী
উদ্দাম-তরঙ্গ-ভঙ্গী করি প্রদর্শন।
১
( ২২ )
“হেন কালে তরী এক তটিনী-হৃদয়ে
করিতেছে টলমল ; পােতায়ােহিগণ
‘সামাল, সামাল’ বলি ডাকিছে সভয়ে,
গেল বুঝি, গেল তরী, হ’ল নিমগন ।
“দুলিছে তরঙ্গে তরী, রক্ষা নাই আর,
ডুবিল, ডুবিল হায় ! ডুবিল অতলে ;
মাতৃক্রোড়ে ছিল এক শিশু সুকুমার,
সহসা সে তরী হ’তে গেল পড়ি জলে ।
( ২৪ )
অমনি অদৃশ্য তরী, পােতাৰােহিগণ
আপন, আপন প্রাণ রক্ষিবারে হায় ।
রঞ্জু, কাঠ, যাহা হেরে, করে আলিঙ্গন ;
অপরের পানে কেহ ফিরিয়া না চায়।

কবিতা-প্রসঙ্গ।
( ২৫
)
“হেন কালে যুবা এক, বদ্ধপরিকর,
বাম হস্তে জননীর বাঁধিয়া বসন,
দক্ষিণে শিশুরে তার তুলি অংস পর
চলেছেন তার মুখে করি সন্তরণ।
}
“ফেনিল তরঙ্গমাল। বক্ষোদেশে তঁার
করিছে আঘাত বলে, তবু অবিচল,
সন্তরি’ চলেছে যুবা, রোধে সাধ্য কার ?
ক্লান্ত বাহু, তবু তাহে ঐরাবত-বল ।
२१
)
“কূলে উপনীত ক্রমে ; শত কণ্ঠস্বরে
উঠে চারিদিক হতে “জয়, জয়” ধ্বনি,
কেহ নমে পদে, কেই আশীর্বাদ করে ;
সেই কি নয় তব ? কহগাে, জননি।”
( ২৮ )
চিন্তি ক্ষণকাল মাতা করিল উত্তর,
“না পারি বুঝিতে আমি কেবা এইজন;
মম পুত্র-যােগ্য যুব; কিন্তু পান্থবর।
হেরে থাক অন্য কিছু, কর নিবেদন।

প্রবাসিপুত্রের মাতা।
৩১
( ২৯ )
কহিলা পথিক, দেবি! হেরেছি নয়নে
প্রশান্ত-নিভৃত’, সেথা, আশ্রম শােভন,
ক্ষুদ্র প্রবাহির্ণী এক কুলু কুলু স্বনে
বহে সে আশ্রম-অঙ্গ করি প্রক্ষালন।
৩০
)
'প্রদোষে মধুবভাষী বিহঙ্গ-নিকর
গায় সেথা বিভু গুণ হরষিত মনে,
আপনি চন্দ্রমা, নিজে, দেব দিবাকর
সাজান সে পুণ্যাশ্রম কনক-কিরণে
156 ।।৭.৭০
"
( ৩১ )
t!
।
‘কুসুমসুবাসে সেথা দিক্‌ আমােদিত,
বিভূষিত তরুরাজী মরকত-সাজে ;
সুন্দর কুটীর কত পর্ণ আচ্ছাদিত
শােভে শ্রেণীবদ্ধ, সেই আশ্রমের মাঝে।
( ৩২ )
ক
‘অনাথ, আতুর, মহাব্যাধিগ্রস্ত জন
সে আশ্রমে করে বাস ; প্রশান্ত মূরতি
ধুবা এক তা সবায় করেন পালন,
বিসর্জিয়া নিজ সুখ, পরহিতে মতি ।

কবিতা-প্রসঙ্গ।
( 33 )
“পূতি গন্ধে লোেক যার যায় পলাইয়া,
কমি, কীটে ক্ষত যার দংশে অনুক্ষণ,
হেন জনে ক্রোড়ে যুব যতনে তুলিয়া,
ক্ষতে তার মহৌষধ করেন লেপন ।।
( ৩৪ )
f;
“কত কাল গত ;-তবু অক্লান্ত যুবক,
নীরবে জীবন-ব্রত করেন পালন ;
অনাথের পিতা, প্রভু, সুহৃদ, সেবক,
জানে, না চেনে তায় জগতের জন।
( ৩৫
}
দ্বাদশ বরষ হেন গত ধীরে ধীরে,
অচিন্ত্য বিধির লীলা, বুঝে সাধ্য কার ?
প্রবিষ্ট সে ব্যাধি এবে যুবার শরীরে,
কে জানিবে, দণ্ড ইহা কিম্বা পুরস্কার ?
“নাহি তার এবে সেই কান্তি নিরমল ;
স্ফীত কর, পদ, রােগে জীর্ণ কলেবর ;
কৰ্ত্তৰ-সাধনে যুবা তথাপি অটল,
সে এশাত মুখচ্ছবি তথাপি মুর।

প্রবাসিপুত্রের মাতা।
৩
( ৩৭
“সঙ্গে লয়ে, স্নেহ-ভরে, ব্যাধিগ্রস্তগণে
করেন আনন্দে যুবা হরিগুণ-গান ;
দিবানিশি এই মন্ত্র জপ মনে মনে ;-
“হ’ক প্রভো! হক এই বিশ্বের কল্যাণ।
(.
৩৮
,
“দেবব্রত নাম তার ; মানব-সমাজে
জানে, না চেনে কেহ; কে করে আদর ?
একাকী বিরলে যুবা রত নিজ কাজে ;
সাক্ষী মাত্র শুধু সেই ব্রহ্মাণ্ড-ঈশ্বর।”
( ৩৯
নীরব পথিক ; মাতা ধ্যান-মগ্ন-প্রায়
আছিলেন এতক্ষণ ; বিষাদ-আঁধার
ক্ষণেক সে মুখচ্ছবি ঢেকেছিল, হায় !
মেঘমুক্ত শশি সম শােভিল আবার।
৪ ০
)
সম্বােধি পথিকে ধীর মধুর বচনে
কহিল জননী ; “পান্থ ? না করি সংশয় ;
অপুর্ব চরিত তার শুনিয়া বলে
বুঝি যুবক সেই আমার অনয় ।

৩৪
কবিতা-প্রসঙ্গ।
(৪১)
••
“সুখে থাক বাছা মাের করি আশীর্বাদ
পূর্ণ হ’ বাঞ্ছা তার বিধাতার বরে ;
এতদিনে বিধি মাের পূরাইল সাধ
ধন্য হনু হেন পুলে ধরিয়া উদরে।”
(৪২)
সর্বসিদ্ধিদাতা হরি করিয়া স্মরণ,
নিশ্চিন্তা ফিরিলা মাতা আপন ভবনে ;
সেই দিন হ’তে, আর কভু, কোন জন
না হেরিলা অবিন্দু মাতার নয়নে ॥
শ্রীচৈতন্যের প্রতি বিষ্ণুপ্রিয়া।
চৈতন্য - দেব, সন্ন্যাসশ্রম গ্রহণ করিয়া, জননী শচীদেবী ও পত্নী
বিষ্ণুপ্রিয়াদেবীকে পরিত্যাগপূর্বক, নীলাচলধামে শেষজীবন অতিবাহিত
করিয়াছিলেন। তাহার নীলাচল গমনের কয়েক বৎসর পরে, বিষ্ণুপ্রিয়া-
দেবী তাহাকে নিম্নলিখিতমশ্নে পত্র প্রেরণ করিয়াছিলেন।
ফাল্গুন-পূর্ণিমা-নিশা আজি নবদ্বীপে,
কোথা, নবদ্বীপচন্দ্র । উৎসব হিল্লোলে
নাচে নবদ্বীপ-পুরী। মল্লিকা-সুবাস
হরি সমীরণ অই বহে ধীরে ধীরে ;

শ্রীচৈতন্যের প্রতি বিষ্ণুপ্রিয়া ।
ছড়ায়ে কিরণ-ধারা, নীল নভেমাঝে
শােভিছেন নিশানাথ ; জল, স্থল, নভঃ
বিমল কিরণে দীপ্ত। পাপিয়ার গান
দূর গ্রামান্তর হতে পশিছে শ্রবণে।
মঞ্জরিত চুতশাখে বসিয়া পুলকে
গায় পিকবর অই। পুরবাসী যত,
উচ্চে হরিধ্বনি করি, চলে রাজপথে ;
‘ক উল্লাস আজি সেথা! আপনি জাহ্নবী,
সে আনন্দ-স্রোত যেন ধরি নিজ বুকে,
তুলিয়া তরঙ্গ-বাহু, মধুর কল্লোলে,
পাইছেন সিন্ধুপানে। শুভদিনে আজ,
মত্ত নবদ্বীপবাসী ;-বিষ্ণুপ্রিয়া তব
আঁধার কুটীরে শুধু কঁদিছে নীরবে ।
তব জন্মদিন আজ। অই চারিদিকে
বাজে শঙ্খ, বাজে ঘণ্টা, জ্বলে দীপাবলী ;-
হরি-সংকীৰ্ত্তনে মাতি সুধা-স্রোতে যেন
ভাসমান নবদ্বীপ। কিন্তু দেখ, নাথ।
কি দশায় আছে আজ পরিজন তব।
লুটায়ে ধরণীতলে, পাগলিনী প্রায়,
কাঁদেন জননী অই ; শূন্য গৃহ-মাঝে
কাঁদি অভাগিনী আমি! শুনি লােকমুখে,

কবিতা-প্রসঙ্গ।
জননীর অশ্রু তুমি হেরিলে শৈশবে
পড়িতে মুচ্ছিত হয়ে ; স্রোতরূপে আজ
বহে সেই অশ্রুধারা, না জানি কেমনে
ভুলিয়া রয়েছ তবে। গুন, প্রাণেশ্বর!
“কোথা গেলি বাপ,” বলি, নাম ধরি তব
ডাকেন জননী অই ; এস একবার,
জুড়াও মায়ের প্রাণ। তােমা পুত্র ছাড়ি,
কি দশা। মায়ের, আজ, দেখ ভাবি মনে।
•
;
কি বলিব, প্রাণেশ্বর ! মরম মাঝারে
জ্বলে অগ্নিশিখা যার, পারে কি সে কভু
জানাতে কি আলা তার ? বিষ্ণুপ্রিয়া তব
কি দশায় আছে, আজ, জানেন বিধাতা
দগ্ধ মৰ্ম্মদেশ তার। চাহি চারিদিকেও
হেরি শূন্যময় সব ; সেই গৃহ, দ্বার,
সেই শুষ্যা,যে শষ্যায় শেষ দিনে, নাথ।
বসায়ে দাসীরে, নিজে, ও করকমলে
সাজাইলে কৃপাগুণে ;—সকলি তেমন
এখন (৩) রয়েছে, প্রভাে! কিন্তু তােমা বিনা
শ্মশান এ পুরী; গৃহ—শূন্য বনস্থলী ।
যাই নিত্য, দিবা-শেষে, সুরধুনী-কূলে
বারি আনিবার তরে। হেরি অনিমেষে

শ্রীচৈতন্যের প্রতি বিষ্ণুপ্রিয়া।
৩৭
উড়ায়ে কেতন, কত আসিতেছে তরী ;
মধুর সঙ্গীত ধ্বনি উঠে কারাে মাঝে ;
বারিকুম্ভ লয়ে কক্ষে, একদৃষ্টে আমি
থাকি আশা-পথ চেয়ে। মনে হয় মাের,
স্মরি অভাগীর দুঃখ, সে তরণী'পরে
ফিরিছ স্বদেশে তুমি। যতক্ষণ তরী
রহে দূরে, আশা লয়ে থাকি চেয়ে আমি
চলি গেলে জ্ঞান হয় ভেঙে গেল বুক,
দর দর ঝরে অশ্রু।
সন্ধার তিমির
হয় ক্রমে ঘনীভূত ; ডাকেন জননী,
“বউমা! হ’ল যে সন্ধ্যা, কেন মা, দাড়ায়ে ?
চল ফিরি যাই ঘরে।” ইচ্ছা হয় মাের
থাকি দাড়াইয়া সেথা; কিন্তু নাহি পারি,
ফিরি শূন্যগৃহে, অশ্রু মুছিতে মুছিতে। '
যাই যবে, মান-আশে জাহ্নবীর কুলে,
কত কথা উঠে প্রাণে। মনে পড়ে, নাথ।
বালিকা-বয়স যবে, সখীগণ সনে,
খেলিতাম কত সেথা। শিবলিঙ্গ গড়ি,
যতনে তুলিয়া ফুল, আনি বিদল,
পূজিতাম ভক্তিভরে। নিরখি নয়নে
প্রবীণা রমণী সবে মগনা ধোনে,

৩৮
কবিতা-প্রসঙ্গ।
•
আমিও তাদের মত বসিতাম কভু
আঁখি মুদি ; কি যে ধ্যান, কে জানিত তবে !
কাপিত হৃদয়, কভু
শুনিয়া শ্রবণে
পদশব্দ ; চমকিয়া হেরিতাম, তুমি
ভুবনমােহনরূপে দাড়ায়ে নিকটে
হাসিছ মধুর হাসি। জননী আমার
কহিতেন কতদিন, দেবশিশুগণ
পবিত্র জাহ্নবী-নীরে, জলকেলি তরে,
হন আসি অবতীর্ণ ; ভাবিতাম আমি,
ত্যজিয়া ত্রিদিবধাম, দেবশিশু তুমি
অবতীর্ণ নবদ্বীপে ; মানবে কি কভু
সম্ভবে সে হেনরূপ! একদৃষ্টে চাহি
থাকিতাম মুখপানে; স্বপ্নদৃষ্ট সম,
সে মূরতি আজ (ও) নাথ! জাগিছে অন্তরে ;-
কিন্তু সে অতীত কথা কি কাজ স্মরণে ?
কি কাজ জাহ্নবীবারি সিঞ্চিয়, প্রাণেশ ।
ও তুলসীর মূলে ? ভুলেছ যখন
অভাগীরে, পূর্বকথা কি কাজ স্মরণে ?
কোথা নীলাচল, নাথ! কোথা নবদ্বীপে
কঁদে বিষ্ণুপ্রিয়া তব ! এ পাপ নয়ন
সে পবিত্র পুরী, প্রভাে! হেরে নাই কভু।

শ্রীচৈতন্যের প্রতি বিষ্ণুপ্রিয়।
মন্দির সম্মুখে
চির গৃহ:রুদ্ধা দাসী। তবু, প্রাণেশ্বর !
মানস-নয়নে যেন হেরি দিবানিশি
সে সুন্দর ধামে তােম। দেখি জগন্নাথে
বিরাজিত শ্ৰীমন্দিরে ; মুগ্ধ আঁখি হেরি
ভুবনমােহন রূপ।
হেরি যেন ভক্তবৃন্দ সঙ্গে লয়ে তুমি
নাচিছ আনন্দভরে, উদ্দে বাহু দুটি,
প্রেমে রােমাঞ্চিত তনু, শত চন্দ্র জিনি
শােভে বদনের কান্তি, ঝরে দুনয়নে
ধারারূপে প্রেম-অশ্রু; ফণু ফণু বােলে
চরণে নুপুর বাজে। অনিমেষ হয়ে
চাহি মুখ পানে আমি ; ইচ্ছা হয় মাের
তেয়াগিয়া লাজ, ভয়, যেথা রাখ তুমি
অই শ্ৰীচরণ দুটী, পাতি দেই সেথা
এ মম হৃদয়, নাথ! কঠিন পাষাণে
ব্যথা পাছে পাও পদে ; কিন্তু, কি বলিব,
সরমে না পারি যেন।
কভু হেরি তােমা
দাড়াইয়া সিন্ধুতীরে পূর্বাকাশ-ভালে,
উজলিয়া নীরনিধি উঠিছেন যথা
পূর্ণবিশ্ব সুধাকর, একদৃষ্টে চাহি
সেই দিক পানে তুমি। বিলের মত,
কভু বা সুধাংবিৰ হেরি সিন্ধু-জলে

৪৩
কবিতা-প্রসঙ্গ।
নাচিতে তরঙ্গ সঙ্গে, বাহু প্রসারিয়া,
“হা কৃষ্ণ! এলে কি তুমি ?” বলি উচ্চৈঃস্বরে
ধাইছ ধরিতে তায়। আবার কখন
হেরি যেন সিন্ধুনীরে লম্ফ দিয়া তুমি
পড়িছ উন্মত্তপ্রায় , চীৎকার করিয়া
কঁদি অভাগিনী আমি, না পারি রাখিতে
সরমের বাঁধ আর। জিজ্ঞাসেন মাত।
“বউমা, বউমা ! কেন সহসা এমন,
উঠিলে চীৎকার করি ?” না পারি বলিতে
কি যে মরমের ব্যথা, কাঁদি শুধু খেদে।
জানি আমি, প্রাণেশ্বর ! নহ তুমি শুধু
একমাত্র অভাগীর ; নর, নারী যত
আছে, সকলেরি তুমি।
শুনি সাধুমুখে,
প্রেম-জলনিধিরূপে অবতীর্ণ তুমি
এ শুষ্ক মরত-ভূমে। ক্ষুদ্র নারী আমি,
কি সাধ্য আমার, তুচ্ছ সংসার-বন্ধনে
বঁধিৰ তােমারে আমি ? যে প্রেমজলধি,
অতিক্রমি বেলা, চাহে করিতে প্লাবিত
বিশাল অবনী-তল, কে সেনারী আমি
ক্ষুদ্র এ হৃদয়-ঘটে রােধিব তাহারে ?
কিন্তু জেনে, অনে, তব, না মানে এবােধ,

শ্রীচৈতন্যের প্রতি বিষ্ণুপ্রিয়া।
৪১
দুৰ্বল নারীর প্রাণ।
পুরুষ কখন
নারী প্রাণে কি যাতনা পারে না বুঝিতে,
কঠোর হৃদয় তার। কিন্তু নরদেহে
নারীর হৃদয় তব ; ভেবে দেখ তুমি,
তব প্রাণারাম যদি লুকাতেন কভু
অন্তর হইতে তব, উন্মত্তের মত,
কৃষ্ণরে, বারে! মাের পরাণের ধন,”
বলিয়া উঠিতে কাঁদি। চিরদাসী তব,
কত বর্ষ আজ, নথ ! হেরেনি নয়নে
অই পাদপদ্ম তব, শশানেনি শ্রবণে
( ইষ্টদেব তুমি তার) তব মধু-বাণী,
কি দশা তাহার তবে ? তুমি না বুঝিলে
কে বুঝিবে, কি বেদনা আজ দুঃখিনীর ?
চাহে অধীনী তব বাঁধিতে তােমারে
আবার সংসার-বাঁধে। কে হেন নিষ্ঠুর
পতি-দরশন-আশে যান সতী যবে,
চাহে ফিরাইতে তঁায় ? যে মহা পরাণ
ছুটেছে অনন্ত পানে, কি কাজ তাহারে
ফিরায়ে সংসারে আর ? বিষ্ণুপ্রিয়া তব
করে সে সাধ, প্রতাে ! কি ভাগ্য তাহর
আবার তােমারে লয়ে পশিবে সংসারে।

৪২
কবিতা-প্রসঙ্গ।
অলীক সে স্বপ্ন, নাথ ! একবার শুধু
এস ফিরে বঙ্গদেশে ; কাঁদেন জননী,
দেখা তারে দিও নাথ ! একবার শুধু
ভুবনমােহন রূপে দাড়ায়াে অঙ্গনে,
দাঁড়াতে যেমন তুমি ; অন্তরাল হ'তে
দেখিব নয়ন ভরি; অন্তরে, বাহিরে
ও সুন্দর মুক্তি হেরি জুড়াইব আঁখি।
জানি কৃপাময় তুমি, যে ডাকে তােমারে,
পূরাও বাসনা তার ; ডাকে বিষ্ণুপ্রিয়া,
ভুলাে না তাহারে, তবে -নিবেদন ইতি।
;
অনাথিনী ।
( প্রকৃত ঘটনা অবলম্বনে রচিত )
হৃদে ধরি মেঘ-ছায়া
সায়াহ্নে সুনীল-কায়া,
জয়ন্তী * চলেছে ধীরে, ধীরে
পলাশ, পিয়াল, শাল,
শেফালিকা, নক্তমাল
শােভা পায় স্রোতস্বতী-তীরে ।
।
* জয়ন্তী সাঁওতালপরগণার কাটাড় ও মধুপুরের মধ্যে স্থিতা ক্ষুদ্র
পার্বত্য নদী। অধিকাংশ সময় বালুকাময়ী, কিন্তু বর্ষাগমে বেগবতী ও
খরস্রোতা।

অনাথিনী। ৪৩ আরণ্য-কপােত আসি, তটতরু’পরে বসি, তুলিতেছে বিষাদের স্বর। তরুপ কাপাইয়া, শস্যগুচ্ছ দোলাইয়া, সন্ধ্যানিল বহে সুখকর। দূর হতে শােভা পায়, নীল মেঘমালা প্রায়, শৈলরাজী দিগন্তের কোলে। শিরে তার ক্ষীণ রেখা, রশ্মি-মালা যায় দেখা ; কাশফুল বায়ু ভরে দোলে । আঁকা বাঁকা পথে, পশুপাল লয়ে সাথে, রাখাল-বালক চলি যায়। দিবা হেরি অবসান, কোথা উচ্চে তুলি তান, কৃষক-যুবক গীত গায় । ক্রমে অন্তমিত রবি, ধূসরিত বনচ্ছবি, ঘিরি আসে সন্ধ্যার তিমির । বাদুড় উড়িয়া যায়, শিবা গ্রাম-মুখে ধায়, মৃগশিশু হইল বাহির। নদীতটে মনােহর শােতে কৃষকের ঘর, ফোটে দীপ তাহার ভিতরে। বালিকাগণ খেলে কোথা হৃষ্টমন, বাজে বাঁশী কোন গৃহান্তরে। * ঘুঘু জাতীয় পক্ষী বিশেষ। ইহার স্বর অতি গভীর ও বিষালো- পক। বিহার অঞ্চলে ইহার সাধারণ নাম “পাড়।” বালক, ৪৪ কবিতা-প্রসঙ্গ। কেবল একটী ঘরে আঁধার বিরাজ করে, গৃহবাসী ভাসে অশ্রুজলে। পতিহীনা ফুলরাণী কঁদে শিরে কর হানি, শিশু দুটী লােটে পদতলে ॥ পতি, পুত্র লয়ে পাশে, সে বিজন বনদেশে অভাগিনী পেতেছিল ঘর । আজ বিশ্ব শূন্যময়, ফুলরাণী নিরাশ্রয়, পতি তার গেছে লােকান্তর। পাতার কুটীরে বাস শাক-অন্ন বারমাস, শতচ্ছিন্ন মলিন বসন। তাতেও আছিল সুখ, হা বিধাতঃ । আরাে দুখ ভালে তার করিলে ঘটন। তিলেক জুড়াতে ঠাই অভাগীর কোথা নাই, কেহ নাই করিতে সান্ত্বনা। প্রভাতে অন্নের তরে শিশু দুটী কার ঘরে যাবে, তাই বিষম ভাবনা। রুমে নিশা অগভীর, জগৎ নিদ্রিত, স্থির, অভাগীর নাহি নিদ্রা-লেশ ; ছিন্নবাসে ঢাকি মুখ, করতলে চাপি বুক, ভাবে নিজ মর্মভেদী ক্লেশ। উল্কামুখী নদী-কুলে বিকট নিনাদ তুলে, দুরে বুক গর্জে সুগভীর।

অনাথিনী।
৪৫
চমকিয়া উঠে প্রাণ, বলে, “রাখ ভগবান্ !”
দর, দর নেত্রে বহে নীর।
শেষ হল বিভাবরী,
কাঞ্চন-বসন পরি,
উঠে রবি বিশ্ব আলােকিয়া।
অভাগীর শিশু দুটী,
ঘুমধাের হ’তে উঠি,
‘মা’ ‘মা’ বলে আইল ধাইয়া।
“কি আছে, দে না, মা! খেতে, কিছু ত খাইনি রেতে
মৌয়া, * শূদ যা আছে, মা! ঘরে।
“মাগো! তাের পায়ে ধরি, ক্ষুধায় জ্বলে যে মরি,
এক মুঠো দে, মা! দু’ভায়েরে।”
হেরি শিশুদের মুখ,
অভাগীর ফাটে বুক,
কি যে দিবে, ভাবিয়া না পায়।
ঘরে যে কিছুই নাই,
বনফল তুলি তাই
দিয়া দোহে, বলে, “তােরা আয়।--
“দুটী ভায়ে সাবধানে খেলা করে এইখানে,
আমি যাই ভিক্ষা মাগিবারে।
“যেও না নদীর কাছে, সেথা ‘কাদানাে’+ আছে,
ছােট ছেলে আছাড়িয়া মারে।”
* মৌয়া বা মহুল সাওতাল পরগণার দরিদ্রদিগের একটী এখান
খাদ্য।
+ সাওতাল পরগণার অশিক্ষিতদিগের পূজিত প্রেতবিশেষ। শূকর,
কুকুট ও মদ্য ইহার পুজার উপকরণ। এ দেশের অনেক স্থানে উহার
পূজা প্রচলিত আছে।

৪৬ কবিতা-প্রসঙ্গ। দুনয়নে অবিরল ভিক্ষাপাত্ৰ লয়ে হাতে, এত বলি বনপথে অভাগিনী, সম্বরি বসন, জয়ন্তী হইয়া পার, মুছিয়া নয়নধার, ভিক্ষা-আশে করিল গমন। অনাহারে, অবসাদে চলিতে চরণ বাধে, সরমে না সরে মুখে বাণী। ধারা বহি পড়ে জল, দ্বারে দ্বারে ভ্রমে ফুলরাণী। সারা দিন ভিক্ষা করি, লােকালয় পরিহরি, অভাগিনী ফিরে নিজ ঘরে। কিন্তু, একি পরমাদ। বিধাতা সাধিল বাদ, কালমেঘ উড়িল অম্বরে । বায়ু বহে ঘাের রােলে, চঞ্চলা দামিনী খেলে, বরষে মুষলধারে জল। কড় কড় হানে বাজ, অভাগিনী পথ-মাঝ দাঁড়াইতে নাহি পায় স্থল। শীতে তনু কম্পান্বিত, তবুও ব্যাকুল চিত, রুদ্ধশ্বাসে ধায় গৃহপানে। ছেলে দুটী ভাঙ্গা ঘরে রহেছে কেমন করে, অভাগীর তাই পড়ে মনে । আঁচল ধরায় লুটে, কুশাঙ্কুর পায় ফুটে, আনহারা ধায় নদী-তীরে।

অনাথিনী। '৪৭ কিন্তু সেই স্রোতস্বতী, হেরে এবে বেগবতী কূলে, কুলে পরিপূর্ণ নীরে। নাহি সে নিৰ্ম্মল জল, সুমধুর কল কল, সে তটিনী নাহি যেন আর। উত্তাল তরঙ্গ-ভঙ্গে ছুটিয়া চলেছে রঙ্গে কার সাধ্য হয় নদীপার ॥* মায়ে দেখি শিশু দুটা নদীকূলে আসে ছুটি, “আয় মা” “আয় মা, ঘরে” বলে। শিশু কঁাদে অনাহারে, মা কি গাে থাকিতে পারে? অভাগিনী ঝাপ দিল জলে । শিলা যদি পড়ে তায়, ভাসাইয়া লয়ে যায়, অভাগীর কি সাধ্য সাঁতারে ! দাড়াতে নাহিক বল, গর্জিয়া তরঙ্গ-দল আছাড়িয়া ফেলে একেবারে । “মাগাে! তুই কোথা গেলি,” “আয় মা, আয় মা,” বলি শিশু দুটী ডাকে উচ্চৈঃস্বরে। ভিক্ষান্ন যতনে ধরি, বাহুযুগ উদ্ধ করি, অভাগিনী চির তরে। * পার্বত্য নদী সকলের প্রকৃতি এইরূপ। বৃষ্টিপাতের সঙ্গে সঙ্গে জলে পরিপূর্ণ হয়, এবং সে সময় তাহাদিগের বেগ এরূপ প্রবল হয় যে, মানুষের কথা দুরে থাকুক, বন্য মহিষ পর্যন্ত নদী অতিক্রম করিতে পায়ে না

৪৮
কবিতা-প্রসঙ্গ।
অনাথার দুঃখভার
দেখিতে না পারি আর
জয়ন্তী* যেন গাে আজ তায়,
শান্তিময় নিজ কোলে
যতনে লইলা তুলে ;
সব জ্বালা জুড়াইল হায় !
তুকারাম-চরিত।
মহারাষ্ট্রীয় ভাষা হইতে অনুবাদিত।
তুকারাম মহারাষ্ট্রদেশের একজন প্রসিদ্ধ কবি এবং অসাধারণ ভক্তিমান
মহাপুরুষ ছিলেন। তাহার রচিত পদাবলী অতনামে পরিচিত।
মহাবাষ্ট্রদেশে ইহা “গীতা” ও “দেবী-মাহাত্মের ন্যায় সমাদরে পঠিত
হইয়া থাকে। সংসারের প্রতি বীতরাগ হইয়া তুকারাম “বৈরাগ-ব্রত’
অবলম্বন করিয়াছিলেন । একবার পন্টরপুর নামক দাক্ষিণাত্যের কোন
তীর্থক্ষেত্রে সাধু সম্মিলন” হইলে তুকারাম সমবেত সাধুদিগের অনুবোধে
নিম্নলিখিত রূপ আ ত্ম-পরিচয় প্রদান করিয়াছিলেন। তাঁহার জীবনের
প্রধান প্রধান ঘটনা, প্রায় সমস্তই, ইহাতে সংক্ষেপে বর্ণিত আছে ;--
আত্মকথা, সাধুগণ। বলিবারে নাই
কিন্তু জিজ্ঞাসিছ সবে, কহিতেছি তাই।
শূদ্র জাতি, করিতাম বৈশ্য-ব্যবসায়,
পূজিতাম কুল-পূজ্য দেব বিঠোবায় ॥
* জয়ন্তী দুর্গার অপর নাম।
বিঠোব। বিষ্ণুর মূর্তিভেদ। বিঠোব। নাম সম্বন্ধে নিম্নোদ্ধত সুন্দর
আখ্যায়িকাটী “পন্টপুর-মাহাত্ম” নামক মহারাষ্ট্রীয় গ্রন্থে দেখিতে পাওয়া
যায়। পুণ্ডরীক নামক কোন ব্রাহ্মণকুমার যৌবনে একান্ত দুঞ্জিয়াসক্ত
ও পিতামাতার অবাধ্য ছিলেন। তিনি দুর্বিনীত ব্যবহারে পিতামাতাকে
সবাই ব্যথিত করিতেন। একদা পৰ্বেপলক্ষে পিতা, মাতা এবং

তুকারাম-চরিত । পিতা, মাতা পরলােক করিলে গমন। সহিলাম নিদারুণ দুঃখের পীড়ন। দুর্ভিক্ষের গ্রাসে মাের গেল ধন, মান ; অন্ন বিনা জ্যেষ্ঠ পত্নী ত্যজিলেন প্রাণ । বড় লজ্জা হল, কিন্তু কি করিব হায় ! ক্ষতি হ'ল, করিলাম যত ব্যবসায়। নিদারুণ ক্লেশ আর না পারি সহিতে, করিলাম স্থির এই বিচারিয়া চিতে ; বিঠোবার ভগ্ন গৃহ সংস্কারি যতনে, কাটাইব কাল সেথা ভজন, সাধনে। প্রতিবাসিগণের সঙ্গে পুণ্ডরীক কাশী গমন করিয়াছিলেন। সন্ধ্যার প্রাক্কালে, তাহারা কাশীর অনতিদূরে, কোন সাধু পুৰুষের আশ্রমের সমীপে, উপস্থিত হইয়া, সেখানে, রাত্রি যাপন করিবার সঙ্কল্প কবিলেন । রাত্রিতে পুণ্ডরীকের নিদ্রা হইতে ছিল না। তিনি দেখিতে পাইলেন, তিনটা রমণী, এক এক কুম্ভ জল মস্তকে সইয়া, আশ্রমে প্রবেশ করিলেন । রমণীগণ কিয়ৎক্ষণ পবে প্রত্যাবৃত্ত হইলে পুণ্ডরীক দেখিলেন যে, আশ্রমের মধ্যে প্রবেশের সময় তাহাদের দেহ ঘোর কৃপবর্ণ ছিল, কিন্তু এক্ষণে তাহা জ্যোতিতে ও সৌন্দর্য্যে সমুজ্জ্বল হইয়াছে। সেরূপ জ্যোতি মনুষ্যদেহে দৃষ্ট হয় না। পুণ্ডরীক, তখন, ভূ-নত হইয়া, ইহাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলেন। রমীগণ বলিলেন, “আমরা গঙ্গা, যমুনা এবং সরস্বতী। এই আশ্রমস্থিত মহাপুরুষ, পিতামাতার সেবায় এরূপ ব্যাপৃত যে, তাহার, কখনও, আমাদিগের জলে স্নান করিতে যাইবার অবকাশ হয় না; সেই জন্য আমরা নিজেই তঁহার নিকট উপস্থিত হইয়াছি। তুমি যে আমাদিগকে কৃষ্ণকায়া দেখিয়াছিলে, তাহার কারণ এই যে, দিবসে লক্ষ লক্ষ পাপীর নাবগাহনে আমাদিগের দেহ কৃষ্ণবর্ণ হয়; কিন্তু পিতৃ- মাতৃভক্ত এই মহাপুরুষের সংস্পর্শে আমরা আবার আমাদিগের স্বাভাবিক কবিতা-প্রসঙ্গ। সুগায়কগণ যবে গাইতেন গীত, বা ধরিতাম আমি হয়ে শুদ্ধচিত । একাদশী-দিনে আরন্তিনু সংকীর্তন অভ্যাস আমার তাহে না ছিল কখন ? সাধুগণ-বিরচিত গুটি কত গান, লই কণ্ঠস্থ করি, হয়ে ভক্তিমান। নির্মলতা লাভ করি।” দেবীগণ এই বলিয়া, পুণ্ডরীককে পিতামাতার প্রতি ব্যবহার সম্বন্ধে উপদেশ প্রদানপূর্বক, অন্তহিত হইলেন। পিতৃ- দ্রোহী পুণ্ডরীকের হৃদয় বিগলিত হইল। পিতৃ-মাতৃ-ভক্ত যদি গৃহে বসিয়া সৰ্বসিদ্ধিপ্রদায়িনী গঙ্গা, যমুনা এবং সরস্বতীর দর্শনলাভ করিতে পারেন, তবে আর কাশীধামে যাইবার প্রয়োজন কি, এই ভাবি। পুণ্ডরীক পিতামাতার সঙ্গে সেখান হইতে গৃহে প্রত্যাগমন করিলেন, এবং একান্তঃকরণে পিতামাতার সেবায় নিযুক্ত হইলেন। কিয়ৎকাল পরে নারায়ণ, পুণ্ডরীকের পিতৃ-মাতৃ-ভক্তি পরীক্ষার জন্য, তাহার নিকট উপস্থিত হইয়া দেখিলেন যে, পুণ্ডরীক পিতামাতার পদসেবায় নিযুক্ত রহিয়াছেন। গৃহাভ্যন্তরে দৈবজ্যোতির আবির্ভাব দর্শনেও পুঙৰীক পিতামাতার সেবা হইতে বিরত হইলেন না। তিনি পার্শ্বদিকে দৃষ্টিপাত করিয়া দেখিলেন যে, ভগবান স্বীয় জ্যোতির্ময়ী মুক্তিতে তাঁহার গৃহে অবতীর্ণ হইয়াছেন। পিতামাতার সেবায় নিরস্ত না হইয়া, পুণ্ডরীক, ভগবানের অভ্যর্থনার্থ, নিকটস্থিত একখানি ইষ্টক তাহাকে, অসীন হইবার জন্য, প্রদান করিলেন। বহুক্ষণ পর্যন্ত ভগবা সেই ইষ্টকের উপর দণ্ডায়মান রহিলেন। অবশেষে পুণ্ডরীক, স্বেচ্ছানুরূপ পিতৃ-মাতৃ- সেবা করিয়া, নিকটে উপস্থিত হইলে, ভগবান তাঁহাকে অভিলষিত বর প্রার্থনা করিতে বলিলেন। পুণ্ডরীক বলিলেন, “তবে আপনি যেমন দাড়াইয়া আছেন, সর্বদা আমার সম্মুখে সেইরূপ দাড়াইয়া থাকুন। আমি যেন পিতামাতার সেবা করিতে করিতে, সকল সময়, আপনাকে এইরূপ দেখিতে পাই।” ভগবান “তথাস্তু” বলিয়া বর প্রদান করিলেন। মহারাষ্ট্রভাষায় ইষ্টককে ‘বিট” বলে। “ব” শব্দ গৌরসুচক :-

তুকারাম-চরিত।
৫১
সাধু-পাদোদক নিত্য করিতাম পান ;
লােকভয় অন্তরেতে না দিতাম স্থান।
কায়মনােবাক্যে দেহ সঁপি আপনার,
করিতাম যথাসাধ্য পর-উপকার।
জন্মিল বিরাগ ঘাের সংসারের প্রতি,
আত্মজন-বাক্যে আর না রহিল মতি।
সত্যাসত্য সাক্ষী করি আপনার মনে,
লােকের গঞ্জনা-বাক্য না শুনি শ্রবণে,
স্বপ্নে গুরুদত্ত মন্ত্র করিয়া গ্রহণ,
করিলাম হরিনামে বিশ্বাস স্থাপন।
কবিত্ব-শকতি ক্রমে উপজিল মনে
স্থাপন করিনু চিত্ত বিঠোবা-চরণে ॥
হইল নিষেধ পরে কবিতা-লেখায় *
বড় কষ্টে কয়দিন গিয়াছিল তায়।
ইহার অর্থ পিতা বা গুরুজন। “ইষ্টকোপরি বর্তমান পিতা পরমেশ
এই অর্থে বিঠোবা শব্দ ব্যবহৃত হইয়া থাকে। বিঠোবার অপর নাম
বিঠঠল বা পাণ্ডুরঙ্গ। বিঠোবার অধিষ্ঠান বশতঃ পন্টরপুর দাক্ষিণাত্যের
একটী প্রসিদ্ধ তীর্থক্ষেত্র হইয়াছে।
তুকারাম শূদ্র হইয়াও ভক্তি-কথা প্রচার করিতেছেন দেখিয়।
রামেশ্বর ভট্ট নামক কোন ব্রাহ্মণ তুকারামকে কবিতা রচনা করিতে
নিষেধ করেন এবং লিপিবদ্ধ অভ-সমুহ ইন্দ্রাণীর জলে নিক্ষেপ
করিতে আদেশ করেন। ভগবানের অনুগ্রহে তুকারাম পাণ্ডুলিপি-পুস্তক
পুনর্বার প্রাপ্ত হন। এই রামেশ্বর পরে তুকারামের একজন প্রধান
শিষ্য হইয়াছিলেন।

কবিতা-প্রসঙ্গ।
বিসর্জিয়া গ্রস্থ মাের ইন্দ্রাণী-নীরে,
ত্যজিতে পরাণ গেনু বিঠোবা-মন্দিরে।
অপার করুণাসিন্ধু দেব নারায়ণ
কহিলেন মােরে সেথা আশ্বাস-বচন ।
বিস্তারিয়া কহি যদি সব বিবরণ,
অল্পে না ফুরাবে, তায় কিবা প্রয়ােজন?
কি দশায় আছি এবে প্রত্যক্ষ সকল ;
ভবিষ্যতে কি ঘটিবে জানেন বিঠঠল।
কৃপাময় হরি মাের নিজ ভক্তগণে
ত্যজেন, স্থির ইহা বুঝিয়াছি মনে।
তুকা বলে, পাণ্ডুরঙ্গ যে কথা বলান।
তাহাই সম্বল মাের নাহি অন্য জ্ঞান।
তুকারামের বিনীত ব্যবহার ও অকপট ভক্তি দর্শন করিয়া সমবেত
সাধুগণ অত্যন্ত প্রত হইয়াছিলেন। তাহারা তাহাকে জীবন্মুক্ত পুরুষ
বলিয়া প্রশংসা করিতেন। আত্মাভিমান-শূন্য, সরল-স্বভাৰ তুকারামের
তাহ। প্রীতিকর বোধ হইত না। তিনি একদিন একটী অঙ্গে সাধুগণের
নিকট বলিয়াছিলেন ;-
এই নিবেদন মাের, শুন, সাধুগণ !
অধম, পতিত আমি অতি অভাজন।
আমারে সম্মান হেন উচিত না হয় ;
এত সমাদর মাের মােগ্য কতু নয়।
আমি যে কেমন, মাের চিত্ত জানে তাই ;
সত্য সত্য আজও, মাের মুক্তি ঘটে নাই।
;

তুকারাম-চরিত। আপনার মনে তােক এক ভাবে থাকে, বাহিরের জন হেরে অন্য ভাবে তাকে। আত্ম-পরিচয় কিবা কহিব সবায় ? বহু ক্লেশ এ জীবনে সহিয়াছি, হায় ! লাঙ্গল মর্দন করি বলীবদ্দগণে, পারি নাই ব্যবসায়ে পােষিতে স্বজনে ॥ তাই এ বৈরাগ্য-ব্রত করেছি গ্রহণ, কি প্রশংসা ইথে মাের আছে সাধুগণ ? স্বভাবত: অর্থ মাের হয়েছিল ক্ষয়। অল্পমাত্র দানে শুধু করিয়াছি ব্যয়। পত্নী, পুত্র প্রতি আমি হইয়া উদাস, আপন লঘুতা মাত্র করেছি প্রকাশ । সরম হইল বড় দেখাতে বদন, আশ্রয় লই তাই বিজন কানন। আপন উদর-জালা নাশ করিবারে ; নিৰ্ম্মম হইয়াছি ভুলি পরিবারে। ৩ * ব্যবসায়ীরা, দ্রুতগমনের জন্য, আপনাদিগের ভারবাহী বলীবর্দ- দিগের লাঙ্গল মর্দন করিয়া থাকে। তুকারামের এ কথা বলিবার উদ্দেশ্য এই যে, যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়া, এমন কি, বলীবর্দদিগকে ক্লেশ প্রদানরূপ অথকাৰ্য্য পৰ্য্যন্ত করিয়াও, সংসার প্রতিপালন করিতে পারি নাই । তবে আমার সংসারত্যাগের জন্য প্রশংসা কি ?

৫৪
কবিতা-প্রসঙ্গ।
ছিল উপায়, বনে গিয়াছিনু তাই ;
প্রশংসার কথা ইথে কিছুই ত নাই ;
থাকিতাম দিবানিশি উদাসীন মনে ;
“” দিতাম, না বিচারি লােকের বচনে ॥
পূর্ব পিতৃগণ মাের ছিলা ভক্তিমান ;
তেঁই আমি বিঠোবায় সঁপেছি প্রাণ।
আমি যে বৈরাগ্য-ব্রত করেছি গ্রহণ;
সে কেবল সংসারের সহি নিপীড়ন ।
কিন্তু, সাধুগণ ! মাের চিত্ত এই চায় ;
ভক্তিগুণে যেন নর এই পথে ধায়।
তুকারামের প্রশংসা শ্রবণ করিয়া ছত্রপতি শিবাজী তাহাকে দর্শনের
জন্য অত্যন্ত উৎসুক হন এবং আপনার কোন উচ্চপদস্থ কর্মচারীকে
তাঁহার নিকট প্রেরণ করেন। পাছে বিষয়ী ব্যক্তির সংসর্গে আসিলে
বিষয়-স্পৃহা বর্ধিত হয়, এই আশঙ্কায় তুকারাম শিবাজীব নিকট গমন
করিতে স্বীকৃত হন নাই। তিনি তাহার পত্রের প্রত্যুত্তরে নিম্নানুবাদিত
কয়েকটী অভঙ্গ প্রেরণ করিয়াছিলেন। অবশেষে শিবাজীই স্বয়ং আসিয়া
তুকারামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ।
বিশ্বস্রষ্টা, এ জগৎ করিয়া সৃজন,
করেছেন আপনার লীলাপ্রকটন।
সপ্ৰেম লিপিতে তব হতেছে প্রত্যয়,
ধৰ্ম্মজ্ঞ, চতুর তুমি, সাধু সদাশয়।
গুরুর চরণে তব আছে স্থির মতি।
বিশ্বাস আছয়ে দৃঢ় ধরমের প্রতি।

তুকারাম-চরিত।
পবিত্র এ “শিব” নাম সার্থক তােমাতে ;
প্রজাদের ভাগ্য-সূত্র ধৃত তব হাতে ॥
ধ্যান, যােগ, ব্ৰত আর জপ, আরাধন
করিয়াছে মুক্ত তব সংসার-বন্ধন ;
দেখিতে আমারে তব হইয়াছে আশ,
পত্রেতে তােমার তাহা করেছ প্রকাশ ।
কিন্তু নিবেদন মাের শুন, নরবর !
তােমার পাত্রের এই দিতেছি উত্তর ॥
কানন-নিবাসী আমি, উদাসীন-বেশে
বাসনাবিহীন হয়ে, ভ্রমি দেশে দেশে ।
বস্ত্র বিনা ধূলিময়, অতি কদাকার ;
শীর্ণদেহ, করি নিত্য ফলমূলাহার ।
শুষ্ক কর, পদ ;—সদা বিকট আকৃতি,
দেখিলে আমারে তুমি না পাইবে প্রীতি।
বন্ধুভাবে করি আমি এই নিবেদন,
মােরে দেখিবার কথা তুলনা, রাজন্ ।
যাব যে তােমার কাছে, কি ফলিবে ফল ?
পথশ্রম মাত্র মোর ঘটিবে কেবল |
সৰ্ব্ব-অন্তর্যামী যিনি তােমারে সদয় ;
তাই লিখিতেছি হেন লিপি সবিনয় ।
তা’না হলে বিঠঠলের সেবক যে জন,
অপরের কৃপা সে কি চাহে কদাচন ?

কবিতা-প্রসঙ্গ।
রক্ষক, পালক মাের প্রভু ভগবান,
কেবা আছে এ জগতে তাহার সমান?
চাহিতে তােমার কাছে নাহি কিছু আশ,
ছাড়িয়াছি, ছিল মনে যত অভিলাষ ।
ত্যজিয়া বিষয়সাধ, সংসারের কাম
লভিয়াছি বিনা করে নিবৃত্তির গ্রাম।
সতী যথা চাহে মাত্র নিজ প্রাণেশ্বরে,
তেমতি ব্যাকুল প্রাণ বিঠঠলের তরে।
কিছু নাহি হেরি ভবে শুধু নারায়ণ ;
তােমারেও তঁার মাঝে করি দরশন।
ভাবিতাম তােমারেও বিঠঠল বলিয়া,
কেন তবে হেন লিপি দিলে পাঠাইয়া?
সাধুগুরু রামদাস, শিষ্য তুমি তার,
অচলা ভকতি পদে রাখিবে তাহার ।
অন্য গুরু প্রতি তব চিত্ত যদি ধায়,
তাঁর প্রতি ভক্তি তবে কিসে রবে, হায় !
তুকা বলে, শুন, ওগাে বুদ্ধির সাগর ।
ভক্তিতে ভক্তের মােক্ষ ঘটে নিরন্তর।
* শিবাজীর গুরুর নাম রামদাস স্বামী। তিনিও একজন অসাধারণ
পুরুষ ছিলেন। পাছে তুকারামের প্রতি ভক্তির আতিশয্যে রামদাস
স্বামীর প্রতি শিবাজীর ভক্তির হ্রাস হয়, সেই আশঙ্কায় তুকারাম তাহাকে
এইরূপ লিখিয়াছিলেন।

তুকারাম-চরিত।
কিন্তু বল,
মুক্ত আছে ভিক্ষাপথ, হবে ক্ষুধা-নাশ,
লজ্জা নিবারিতে পথে আছে ছিন্ন বাস ।
পাষাণ উত্তম শয্যা করিতে শয়ন,
আকাশ হইবে মাের অঙ্গ আবরণ।
পর-অনুগ্রহ তবে চাহিব কি আশে ?
আয়ুমাত্র ক্ষয় হয় বাসনার বশে }}
সম্মান-প্রয়াসী জন রাজ-গৃহে যায় ।
শান্তি কভু
মিলে কি সেথায় ?
সমাদর পায় সেথা ধনবান জন,
দরিদ্রের ভাগ্যে মান না মিলে কখন।
বেশ, ভূষা, আড়ম্বর হেরিলে নয়নে,
মৃত্যুসম বিভীষণ বােধ হয় মনে
হয়ত এ সব কথা করিয়া শ্রবণ,
বিরক্ত আমার প্রতি হবে তব মন ।
কিন্তু আমি জানি ভাল, অন্তর্যামী যিনি,
মাের প্রতি নিরদয় না হবেন তিনি।
গরীয়ান্ সেই জন সাধু সদাচার,
কঠোর সংযমে নিত্য দিন গত যার ;
ব্ৰত, প্রায়শ্চিত্ত সদা করে অনুষ্ঠান ;
সংসার-কামনা সদা করে তুচ্ছজ্ঞান ||
তুকা বলে, ধনিজন! তােমাদের মান
নশ্বর, আমরা কিন্তু চির-ভাগ্যবান।

কবিতা-প্রসঙ্গ।
এই মহাযােগ নিত্য সাধিও যতনে,
শুভ যাহা, ঘৃণা কভু করিও না মনে।
যে কাৰ্য্য করিলে হয় পাপের সঞ্চার,
যতনে করিও তাহা নিত্য পরিহার ॥
তােমার অধীনে যদি থাকে খল জন,
তাদের বচনে কভু নাহি দিও মন ।
গুণী কেবা, রাজ্য কেবা করিছে রক্ষণ,
বিচার করিয়া তাহা দেখিবে, রাজন।
সকলি ত জান, ভূপ! কি বলিব আমি,
অনাথ, দুৰ্ব্বলে কভু ভুলিও না তুমি ।
শুনিলে এ গুণ তব প্রীতি পাব মনে,
কাজ নাই, নরবর ! বৃথা দরশনে ।
সাক্ষাতে না হবে, ভূপ! কোন ফলোদয়,
বৃথা কাজে দিন মাত্র হইবেক ক্ষয়।
দু' একটী কাজ, যাহা ভাল বুঝি মনে,
হক প্রম, তাই লয়ে রহিব যতনে।
সর্বজীবে এক আত্মা দেব নারায়ণ,
এই সার কথা সদা রাখিও স্মরণ
“আত্মা-রামে” চিত্ত সদা স্থাপন করিবে,
গুরু রামদাসে নিত্য আত্মায় হেরিবে ।
মানব-জনম তব ধন্য, নরপতি।
তােমার গৌরবে পূর্ণ হ’ক বসুমতী।

তুকারাম-চরিত।
তুকারামের সমস্ত জীবন এইরূপ নিস্পৃহতা, তেজস্বিতা ও বিনয়ের
উদাহরণে পরিপূর্ণ ছিল। আয়ুষ্কাল পূর্ণ হইলে তুকারাম নিম্নলিখিত
অভঙ্গে সকলের নিকট বিদায় গ্রহণ কবিয়াছিলেন
আত্মজন, পরজন যে হও, সে হও।
পাণ্ডুরঙ্গ-শ্রীচরণে শরণ গে লও।
জানায়ে প্রণাম মাের গুরুজনগণে
শেষ নিবেদন মাের রাখিও স্মরণে।
পড়ে যদি মধুভাণ্ডে মক্ষিকা কখন,
সে কি আর উড়িবারে চাহে কদাচন ?
সময় বারেক যদি গত কভু হয়,
সে ত আর কোন দিন ফিরিবার নয় ।
সিন্ধুসনে ভাগীরথী হয় যদি লীন,
ফিরিতে পশ্চাতে সে কি চাহে কোন দিন ?
এই নিবেদন তবে চরণে সবার,
যাইতেছে তুকারাম ফিরিবে না আর।
অনন্তর নিজের পত্নীৰ কথা উল্লেখ করিয়া অনুগত শিষ্যদিগকে
বলিয়াছিলেন ;-
যা ছিল প্রাণের কথা বলেছি সকল ;
একটী এখনও বাকী রয়েছে কেবল।
চলিলাম আমি আজ অমর-সদনে।
রহিলেন পত্নী মাের মরত-ভবনে।

কবিতা-প্রসঙ্গ।
জান, তিনি গৃহকাৰ্য্যে নহেন চতুরা ;
নাহি মুখে মিষ্টবাণী, বড়ই মুখরা।*
কি বলিব, সাধুগণ ! তােমা সবে আর,
মাের অনুরােধে সবে নিও তার ভার ।
বহু উপকারে তার আছি আমি ঋণী।
বক্সে, বস্ত্রে বাধি তারে করেছি গৃহিণী ।।
পাণ্ডুরঙ্গ! ঋণ তার করি বিমােচন,
খুলে দাও উভয়ের দাম্পত্যবন্ধন।
তুকা বলে, দয়াময় হরির কৃপায় ।
ঋণ শােধ তুকারাম মুক্তিপথে ধায়।
ইহার পর তুকারাম সমাগত ব্যক্তিগণের নিকট শেষবিদায় গ্রহণ
করিয়া বলিয়াছিলেন ;-~
চলিনু আপন দেশে, গুন, বন্ধুগণ!
‘রাম রাম” সবে মাের করহ গ্রহণ ॥
এই হল শেষ দেখা সকলের সনে ।
ভবের সম্বন্ধ-পাশ ছিন্ন এত দিনে।
* তুকারামের পত্নী অবলাই অতি মুখরা ও কর্কশ-স্বাবা বলিয়া
বর্ণিত হইয়াছেন।
+ বিবাহের সময় হিন্দু দম্পতী পরস্পরের বাঞ্চল দ্বারা সম্বদ্ধ হন।
দেশে বরকার এইরূপ বন্ধনকে গাঁটছড়া বাঁধা বলে।
। আমার রাম রাম” গ্রহণ করিও, অর্থাৎ আমার বিদায়নমস্কার
অবগত হইও। রাম রাম” উচ্চারণপূর্বক নমস্কার জানাইবার প্রথা
ভারতীয় অনেক জাতিরই মধ্যে প্রচলিত আছে।

কপিলাম। ৬১ সবার চরণে আমি করি এ মিনতি, দীন আমি, কৃপা সবে রেখে মাের প্রতি। যাই তবে, বন্ধুগণ ! যাই নিজধাম, বল সবে “রামকৃষ্ণ বিঠলের নাম। কপিলাম ও অবিরাম কল, কল বহিছে তটিনী এক, কূলে শােভে কপিল-আশ্রম। লতাম, পাতায় ঘেরা প্রশান্ত, নিভৃত দেশ, সদা স্নিগ্ধ, সদা মনােরম। ব্যাপিয়া অম্বরতল, স্থির মেঘমালা সম, দূরে তার শােভে হিমালয় পরি মরকত-বাস, শৈবাল-ভূষণ দেহে, শােভে তথা মহীরুহচয় । * এই কবিতায় উল্লিখিত মহর্ষি কপিল সাস্থ্যবক্তা ও সগর-সন্তান- গণের সহকর্তা কপিল হইতে স্বতন্ত্র ব্যক্তি। কারণ “মহাবস্তু অবদান” নামক বৌদ্ধগ্রন্থে তাহাকে গৌতমগোত্রীয় বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। তাহার সম্বন্ধে উক্ত গ্রন্থে এইরূপ লিখিত আছে ;-“হিমালয় সমীপে কপিল নামে এক মহানুভব, মহৈশ্বর্যশালী ও মহাজ্ঞানী ঋষি বাস করি- তেন। তাঁহার আলম স্থানটী অতি বিস্তীর্ণ, রমণীয়, পত্ৰপুষ্পদিসম্পন্ন ও স্বচ্ছ-সলিলযুক্ত ছিল।” ডাক্তার রামদাস সেন প্রণীত বুদ্ধদেব ১৪ পৃষ্ঠা। শাক্যবংশীয়গণ ইহার শরণাগত ছিলেন এবং ইহারই নামানুসারে তাহাদিগের রাজধানী কপিলবস্তু নামে প্রসিদ্ধ হইয়াছিল।

কবিতা-প্রসঙ্গ। করি ঝর ঝর নাদ, শিলা-খণ্ডে প্রতিহত, নিত্য সেথা ঝরে নিঝরিণী। কাপায়ে সরল-পত্র * হিমস্নিগ্ধ সমীরণ করে সদা মরমর ধ্বনি। শিলা হতে শিলান্তরে কন্ত রিক মৃগকুল লম্ফ দিয়া করে বিচরণ। ঋষি-বালকের কণ্ঠে শুনি নিত্য বেদপাঠ, “অগ্নিমীলে” । গায় শুকগণ। পূত হােম-গন্ধি ধূম, প্রসারিয়া চারিদিকে অামােদিত করে বনস্থল। সায়াহ্নে কুটীর-দ্বারে, মুনি-বাল সহ মিলি ক্রীড়া করে কুরঙ্গম-দল । এলাইয়া কেশ-ভার, সচলা-প্রতিম-সম খেলে সেথা ঋষি-বালাগণ। নাহি অলঙ্কার দেহে, বলে আবৃত তনু, তবু রূপে উজলে কানন । মাতৃহীন মৃগশিশু ঋষিকুমারীর ক্রোড়ে সুখে সেথা লভয়ে বিরাম। * “সবল-হিমালয় প্রদেশজাত স্বনাম-প্রসিদ্ধ তরু বিশেষ। + “অগ্নিমীলে পুরােহিতং যজ্ঞস্য দেবজিং। (হাতারং রত্নতমং।” ঋগ্বেদের প্রথম মন্ত্র।

কপিলাশ্রম। সম, দূর বনান্তর হতে ব্যাধ-ভীত বিহঙ্গম লভে আসি সুখ-শান্তি-ধাম । প্রসারিয়া পক্ষপুট, অরণ্য-কুকুট সেথা রবিকরে করে বিচরণ। বিচিত্র পতত্র তাব কোমল অঙ্কুলে তুলি ক্রীড়া করে মুনি-শিশুগণ। সংসারের কোলাহল পারে পশিতে সেথা, গ্লানি, হিংসা নাহি পায় স্থান। আনন্দ, উৎসের উথলয়ে দিবানিশি, জীবে প্রেম নিত্য বৰ্তমান । সন্তোষ-অমৃত পানে অমর সে দেশে সবে, নাহি শােক, নাহি মৃত্যুভয়। কল্যের সম্বল নাই, তবু সদানন্দ লােক, চিরশান্ত, চিরপ্রীতিময়। শিশুর মধুর হাসি প্রবীণের মুখে সেথা শুভ্র জ্যোৎস্না সম বিরাজিত। পুণ্য ভাগবত-কথা, মন্দাকিনী-ধারা সম, যুবা-মুখে নিত্য প্রবাহিত । শিরে শুক্ল জটাভার, তবু যৌবনের স্ফ ৰ্ত্তি স্থবিরের অন্তরে সেখানে। কঠোর সংযম-ব্ৰত তরুণের হৃদে সদ, ব্রতসাধ বালকের প্রাণে ।

৬৪ কবিতা-প্রসঙ্গ। সর্বজীবে সমভাব, পৃথিবী স্বর্গের সম, নাহি পাপ, নাহি তাপ, খেদ। প্রকৃতির সদাব্রতে সম অধিকারী সবে, ধনী, দুঃখী নাহি ভেদাভেদ । সংসার-অনলকুণ্ডে দগ্ধ হয়ে নর, নারী আসে সেথা লভিতে বিশ্রাম। আনন্দে সহস্র কণ্ঠে, কাপাইয়া বনরাজী, নিত্য উঠে পরব্রহ্ম নাম । দীর্ঘ দেবদারু এক, প্রসারিয়া শাখা-বাহু, শােভে সেই আশ্রমের মাঝে। নিবিড় পল্লবাবলী শিরে চন্দ্রাতপ সম, শিলাসন মূলদেশে সাজে। জড়ায়ে কোমল বাহু কানন-বল্লরী কত, উঠিয়াছে ঘিরি তরুবরে । যুবকে, স্তবকে ফুল ফুটিয়া শােভিছে তায়, মৃদুগন্ধ ছুটে বায়ুভরে। মহর্ষি কপিল সেথা বসিয়া সায়াহ্ন,কালে, শিষ্যবৃন ঘিরিয়া তঁাহারে। মহারাজ শুদ্ধোদন দাঁড়ায়ে সম্মুখে তার সঙ্গে লয়ে সিদ্ধার্থ কুমারে। প্রশান্ত মূরতি শিশু, বদনে করুণামাখা, জ্ঞান-জ্যোতি-উজ্জল নয়ন।

কপিলাশ্রম। স্বভাব-সুন্দর হাস্য শােভিছে অধর-প্রান্তে, অঙ্গে শােভে রাজ-আভরণ ॥ দক্ষিণেতে দেবদত্ত সুঠাম, সুন্দর তনু, বীরগর্বে ভাতিছে বদন। ক্ষুদ্র পৃষ্ঠে শােভে তৃণ, ক্ষুদ্র অসি কটিদেশে, বাম করে ক্ষুদ্র শরাসন।* বাজ-সভাসদ যত দাড়াইয়া করপুটে, রক্ষবৃন্দ দাড়াইয়া দূরে। মহর্ষির মুখপানে চাহি অনিমেষ সবে, কারাে মুখে বাক্য নাহি ফুরে। উপায়ন-দ্রব্য কত, সাজাইয়া থরে থরে, রাখিয়াছে রাজভৃত্যগণ। যজ্ঞীয় সম্ভার যত, তীর্থোদক কুম্ভে ভরা, পট্টবাস, রজত, কাঞ্চন। সন্ধ্যার আরক্ত আভা, রঞ্জিয়া পাদপরাজ, মহর্ষির পড়েছে বদনে। . * দেবদত্ত শুদ্ধোদনের ভ্রাতুস্পুত্র এবং শুক্লোদনের পুত্র। বৌদ্ধগ্রন্থ- সমুহে ইহাব স্বভাব অতি প্রচণ্ড বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে। ইনি বুদ্ধ- দেবের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিয়া একটি নবধর্ম সংস্থাপনের সঙ্কল্প করিয়া- ‘ছলেন এবং ইহারই উত্তেজনায় রাজা অজাতশত্রু আপনার পিতা বিসরকে হত্যা করিয়াছিলেন। ইনি ভগবান বুদ্ধদেবকেও হত্যা করিতে উদ্যোগী হইয়াছিলেন। ইহার সম্বন্ধে Rhys Davids প্রণীত Buddhism নামক পুস্তকের প্রথম সংস্করণের ৫২, ৬৮, ৭৬, এবং ১৮১ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।

কবিতা-প্রসঙ্গ।
দেহে,
উজ্জ্বল সে গৌরকান্তি
দ্বিগুণ শােভিছে তাহে,
শুভ্র কেশ কাঁপে সমীরণে ॥
প্রাচীন বয়স ঋষি,
তবুও
সৌষ্ঠব
লােল চর্ম, তবু সমুজ্জ্বল।
প্রশস্ত ললাট-দেশ,
দীর্ঘায়ত কলেবর,
পীনস্কন্ধ, স্যার বক্ষঃস্থল *
জগতের দুঃখ ভারে কাতর পরাণ, তাই
আঁখি দুটী সদা বিগলিত।
সে প্রেম-করুণ-দৃষ্টি যার’পরে পড়ে কভু,
প্রাণ তার হয় পুলকিত ।
চাহি সে মুখের পানে
সংসার-নিমগ্ন জন
ভুলি যায় বিষয়-বাসনা।
নিদারুণ মনস্তাপে
প্রাণ জর্জরিত বার
সেও ভুলে মরম-বেদনা।
সেই চরণের প্রান্তে আসে জুড়াবার তরে
পুত্রহারা কত অভাগিনী ।
সে সহাস্য মুখচ্ছবি নিরখি শিশুর প্রাণে
আনন্দের ছুটে প্রবাহিনী।
লইয়া কুমারধয়ে
মহারাজ থাোদন
মহর্ষির নমিলা চরণে।
* স্বার-বিশাল।

কপিলাশ্রম।
৬৭
প্রশান্ত নয়নে ঋষি, নৃপমুখ-পানে চাহি,
কহিলেন মধুর বচনে।
“স্বাগত এ দেশে তুমি, শাক্য-বংশ-অধিপতি।
ধন্য আজ বনবাসিগণ।
“পূর্ণমনােরথ সবে
তব দরশন লভি,
আনন্দেতে মগ্ন তপােবন ।
“ধন্য, মহারাজ! তুমি, সিদ্ধার্থ কুমার যার,
তব সম কেবা ভাগ্যবান্।
“ঋষির কুমার সবে
উচ্চে জয়ধ্বনি করি,
করে, অই, তব গুণ-গান।
“হের, মহারাজ ! এই বৈখানস ঋষি যত
এনেছেন প্রীতি-উপায়ন।
“সুগন্ধ কুসুম কেহ, ধান্ত, দুর্বা কারও হাতে,
কেহ লয়ে সুরভি চন্দন ।
যতনে ভরিয়া ঘটে
মহাঋষি অই শুদ্ধাচার।
“সুদূর গঙ্গোত্রি হতে
এনেছেন তব তরে,
মহারাজ! লও উপহার ॥
“গান্ধার-প্রদেশবাসী
উগ্রতপ ঋষি অই
এনেছেন সুধাসম ফল।
সর্বত্যাগী মহামুনি
পর্ণাদ, অঞ্জলি ভরি,
এনেছেন নিরের জল ।
“পবিত্র নুতন মধু

৬
কবিতা-প্রসঙ্গ।
“নূতন নীবার-অশ্নে
স্বহস্তে পায়স রাঁধি
ব্ৰতশীল অই তপস্বিনী।
“মূর্তিমতী ব্ৰহ্মবিদ্যা, যেন, সিদ্ধি লয়ে করে,
দাড়াইয়া হের দাক্ষায়ণী ।
“অচিঁতে, নরেন্দ্র ! তােমা,
কুঙ্কুম, চন্দন ল'য়ে
আসিয়াছে যত ঋষিবালা।
“অর্ঘ্য-পাত্র লয়ে করে
গাইছে মঙ্গল-গীতি,
করে শোভে কুসুমের মালা।
“আমিও সবার সনে কায়মনােবাক্যে আজ
নরনাথ! করি আশীর্বাদ।
“সিদ্ধার্থ কুমারে লয়ে হও চিরজীবী তুমি,
পূর্ণ হ’ক হৃদয়ের সাধ !
“কোদণ্ড-টঙ্কারে তব, দিবামুখে তমাে যথা,
দূরে যাক দুষ্ট দস্যগণ।
“বৰ্বর তুরাণ, চীন, বালিক কপটাচারী
সুদূরে করুক পলায়ন ।
“প্রতাপে, নরেন্দ্র ! তব
এ দুর্গম বন-ভূমে
সুখে বসে তাপস-সমাজ।
“অতিথি লভিয়া তােম, তেঁই, আয়ােজন হেন
ঋষিগণ করেছেন আজ।
“স্বাগত এদেশে তুমি, ধৰ্ম্মগােপ্তা মহীপতি
শুভাগত সিদ্ধার্থ কুমার !

কপিলাম। “জীব, বৎস দেবদত্ত ! সুপথে হউক মতি, আশীৰ্বাদ লও উপহার ॥” নীরব হইল। ঋষি। অঞ্জলি বাঁধিয়া শিরে কহিলেন রাজা শুদ্ধোদন। “কৃতার্থ এ দাস আজ, কৃতার্থ কুমারদ্বয়, সবে মােরা সার্থক-জীবন। “অই পাদপদ্ম হেরি পবিত্র করিতে দেহ, বহুদিন ছিল অভিলাষ। মিটিল বাসনা আজি, শুভ দরশন লভি, পূর্ণ হ’ল হৃদয়েব আশ । “ঋষি, ঋষিপত্নী-গণ, সবার চরণ-তলে করযোড়ে করি প্রণিপাত। “মানব-জনম মম সফল হইল আজি, শিরে ধরি লইনু প্রসাদ। সপ্তম বরষ গত এই রাজপুত্র-দ্ব, শিক্ষাকাল এসেছে দোহার ! “যােগ্য উপদেশ-দানে কৃতার্থ করুন দোহে, নিবেদন চরণে সবার । “দুষ প্রকৃতি অতি এই শিশু দেবদত্ত, ক্ষত্র-ধৰ্ম্ম যেন মূর্তিমান। “রক্ষক প্রহরিবৃন্দে শাসয়ে কুটী করি, ক্রীড়া তার লয়ে ধনুর্বাণ ।

৭০
কবিতা-প্রসঙ্গ।
“দুষ্ট তুরঙ্গমগণে
দমন করিয়া বলে,
বীর-শিশু করে আরােহণ।
‘শুনিলে পরুষভাষ
কোষমুক্ত করে আসি,
ভয়ে তার ভীত পুরজন।
এই বহ্নি-গর্ভ মেঘে ক্ষমা, প্রীতি বারি যদি
নাহি থাকে, হবে সর্বনাশ ।
বিশাল এ শাক্য-রাজ্য হবে ভস্মরাশিময়।
? জাকুল পাইবে বিনাশ ।
‘‘সিদ্ধার্থ কুমার মাের
প্রশান্ত-স্বভাব অতি,
করুণায় সদা বিগলিত।
‘আত্মপর নাহি-জ্ঞান, মূর্তিমান শম, দম
হৃদে তার যেন বিরাজিত।
“এই তপােবনে আসি কহিছে কুমার মােরে,
‘হের, পিতঃ! কি সুন্দর স্থান।
“যাব না কপিলাবন্তে, রহিব এখানে আমি,
কর মােরে এই আজ্ঞা দান ॥”
“মিলিলে এ সত্ব গুণ
উগ্র ক্ষত্র-তেজ সনে
কুমারের হবে সুমঙ্গল।
‘রাজর্ষি জনক সম
হইবে কুমার মাের,
শান্তি-রাজ্য হবে ধরাতল ।
“অই পাদপদ্ম-তলে
সঁপিতে এ শিশু দুটী
তাই দাস চরণে আগত।

কপিলাম।
৭১
‘বরি শিষ্যরূপে দোহে কৃতার্থ করুন্ মােরে,
শাক্যবংশ চিরু-পদানত ।
নীরবিল মহীপতি,
মধুরবচনে ঋষি
কহিলেন রাজা শুদ্ধোদনে।
চিন্তা নাই, মহারাজ।
করিব উপায় আমি
শিক্ষা দিতে রাজপুত্রগণে ॥
‘অতি সুকুমার দোঁহে, পালিত প্রাসাদ-সুখে,
নাহি জানে তপােবন-ক্লেশ।
‘কিব। প্রয়ােজন তায় ?
সঙ্গে লয়ে উভয়ের
যাও তুমি ফিরি নিজদেশ।
‘শিষ্য মম বিশ্বামিত্র, + মহা জ্ঞানবান্ ঋষি,
তব সনে করিব প্রেরণ।
'আপনার যােগ্য গুরু
লভিবে কুমার তব,
মণিসহ মিলিবে কাঞ্চন।
যথায় রােহিণীকূলে লুম্বিনী উদ্যান তব ?
“লিপিশালা” করিও নির্মাণ।
বসিয়া কুমার সেথা
গুরুর চরণ প্রান্তে
লভিবেক অপার্থিব জ্ঞান।
+ ইনি বৈদিক বা পৌরাণিক বিশ্বামিত্র নহেন।
। কপিলাবস্তুতি উপবন বিশেষ । কয়েক বৎসর হইল, এই উপবন,
তৎস্থিত অশােক-নিৰ্ম্মিত স্মরণশু এবং কপিলাবস্তুর ভগ্নাবশেষ আবি-
দ্রুত হইয়াছে।

१२
কবিতা-প্রসঙ্গ।
“সিদ্ধার্থের যশােরবি, করি আশীৰ্বাদ আমি,
শাক্যবংশ করিবে উজ্জ্বল।
জ্ঞানের আলােকে তার দূরে যাবে মােহ-তম,
প্রভাময় হবে ভূমণ্ডল |
“রাজচক্রবর্তী কত
সিদ্ধার্থের পদতলে,
মহারাজ! হইবে লুষ্ঠিত।
“অ সসাগরা ধরা
ব্যাপি মহারাজ্য এক
পুত্র তব করিবে স্থাপিত।
কিন্তু সিদ্ধার্থের রাজ্য মনে রেখ, নবপতি।
নহে সিন্ধু, ভূধর, কানন ।
যুগ, যুগান্তর ব্যাপি
মানব-হৃদয়-রাজ্য
এই শিশু করিবে শাসন |
“মহষি অসিত যাহা কহিলা জনম-কালে
সদা, নৃপ ! বাখিও স্মরণে।।
"বেঁধ না সংসাবে তারে, কি ফল জাহ্নবী-স্রোত
বাঁধি বৃথা বালুকা-বন্ধনে ?
* মহধি অসিত, হিমালয়ন্থিত আপনাব আশ্রন হইতে বুদ্ধদেবের
জন্মকালীন অদ্ভুত লক্ষণ সকল দর্শন করিয, তাহাকে দেখিবার জন্য,
কপিলাবস্তুতে আগমন করিয়াছিলেন। তিনি কুমাবকে দর্শন কবি।
বলিয়াছিলেন, “হে শুদ্ধোদন । তোমার এই কুমার সম্যক সম্বুদ্ধ হইবেন,
গৃহবাসী হইবেন ন', নিশ্চিত ইনি প্রব্রজ্যা-তেজ ধারণ কবিবেন ও লোক,
হিত প্রচার করিবেন।”
বামদাস সেন প্রণীত বুদ্ধদেব ৩৯.৪৩ পৃষ্ঠা।

কবিতা-প্রসঙ্গ। ৭৩ “দূর ভবিষ্যৎ কথা কে পারে জানিতে কবে, মানবের জ্ঞানের অতীত। “কিন্তু 'বােধিসত্ব’ নাম এ শিওর ভালে যেন হেরি আমি রহেছে লিখিত ।” নবিবি মুৰ্ত্ত ঋষি, সম্বােধিয়া শিষ্যগণে, কহিলেন, শুন, বৎসগণ । “দিবা অবসান এবে, রাজ-অতিথিরে লয়ে যা ও সবে, করই সেবন । “ক্লান্ত পথশ্রমে সবে, সেবিবে যতন করি, যথাযােগ্য দিবে পানাহার। “রহিবে ছায়ার সম, যার যথা অভিরুচি সেইরূপ করিবে সৎকার।” প্রণমিয়া ঋষিগণে রাজা শুদ্ধোদন তবে ফিরিলেন আপন শিবিরে । সন্ধ্যা সমাগত হেরি পােবন-দেবালয়ে ভেরী-ধ্বনি উঠিল গম্ভীরে। ঋষির কুমারী যত উচ্চে শঙ্খধ্বনি করি, আগুবাড়ি লইলা সন্ধ্যায় । ধূপ, গুগগুলের গন্ধ আমােদিন বনস্থল, ধীরে নিশা নামিলা ধবায় ।

একনাথ স্বামী | একনাথ স্বামী মহারাষ্ট্রদেশের একজন অতি প্রসিদ্ধনামা ধার্মিক পুৰুষ। তিনি খ্রঃ ১৫৪২ অব্দ হইতে ১৬১০ অব্দ পর্যন্ত বর্তমান ছিলেন। মহারাষ্ট্রীয় জাতির ধর্ম শিক্ষার জন্য তিনি সমগ্র রামায়ণ, ভাগবতের একাদশ স্কন্ধ ও ভগবদগীতাদি গ্রন্থের অনুবাদ করিয়াছিলেন। সাহাদিগেব আবির্ভাবে ভারতবর্ষ পূণ্যভূমি হইয়াছে, একনাথ স্বামী তাঁহাদিগের অন্যতম। তঁাহার জীবন ভগবদ্ভক্তি ও জীবানুকম্পার উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে পরি- পূর্ণ। নিম্নলিখিত কবিতাটি তাহার জীবনের একটি প্রকৃত ঘটনা অব- লম্বনে রচিত। ] অতীত গৌরব-কথা গাহি কলতানে বহিছেন পুণ্যতােয়া নদী গােদাবরী ; সুশােভিত উভ' তীর প্রাসাদে, উদ্যানে, তার মাঝে প্রতিষ্ঠান” পবিত্র নগরী * ধবল মন্দির-চূড়া শােভে কোথা কুলে, কোথাও সােপান শ্রেণী নির্মিত প্রস্তরে, কোথা শ্যাম তরুরাজী পূর্ণ ফলে, ফুলে তটিনীর চাকশােভা সম্বদ্ধিত করে। * প্রতিষ্ঠান এক সময় মহারাষ্ট্রপতি শালিবাহনের রাজধানী ছিল । ইহা দাক্ষিণাত্যের অন্যতম তীর্থ বলিয়া পরিচিত।

একনাথ স্বামী।
৭৫
কলুষ-নাশিনী নদী,সুধাসম নীর
পূজেন জাহ্নবী জ্ঞানে দাক্ষিণাত্য-জন ; *
কোথা ক্ষীণ স্রোত, কোথা আবৰ্ত্ত গভীর,
বিরাজে পুলিন কোথা ব্যাপিয়া যােজন।
৪
পুণ্যক্ষেত্র প্রতিষ্ঠান শােভে নদী-তীরে,
দেশ, দেশান্তর হতে তীর্থযাত্রিগণ
আসে সেথা, স্নান হেতু গােদাবরী-নীরে,
পূজিতে “পৈঠন-নাথে” + মােক্ষের সদন।
প্রতিষ্ঠানে দ্বিজবর একনাথ নাম
আছিলেন কোন জন, হ’ল বহু দিন,
জিতেন্দ্রিয়, সত্যবাদী, সৰ্ব্ব গুণধাম,
সংসারে থাকিয়া বিপ্র ব্রহ্মপদে লীন।
দাক্ষিণাত্যবাসিগণ গােদাবরীকে ভাগীরথীর নাায় ভক্তি করিয়া
থাকেন এবং গঙ্গা নামে অভিহিত করেন।
+ প্রতিষ্ঠানের অপর নাম “পৈঠন।” “পৈঠন-নাথ” প্রতিষ্টনের
অধিষ্ঠাত্রী নেতাবিশেষ।

৭৬
কবিতা-প্রসঙ্গ।
পূজা, যাগ, বেদপাঠ, অতিথি-সেবন
ছিল নিত্য ব্রত তঁার, দয়ার সাগর
স্ত্রী পুরুষ, বাল বৃদ্ধ, চণ্ডাল ব্রাহ্মণ
করিতেন যথাযােগ্য সবে সমাদর।
একদা বৈশাখ মাসে, মধ্যাহ্ন-সময়,
স্নানাহ্নিক সমাপিয়া গোদাবরী-নীরে,
ফিরিছেন একনাথ আপন আলয়,
তটিনী-সৈকত-পথে অতি ধীরে ধীরে
আনান্তে ললাট শুভ্র চন্দনে চর্চিত,
পরিধান পটুবাস, ধৌত কলেবর ;
ব্ৰত-খিন্ন দেহ, তবু তেজ উদ্ভাসিত,
ভূতলে উদিত যেন দ্বিতীয় ভাস্কর।
হেরিলেন দ্বিজবর, শিশু একজন
কাঁদিতেছে “মা মা বলি, অবসন্ন প্রায়,
তপ্ত বেণুময় পথে করিয়া শয়ন ;
নাহি কেহ অভাগারে প্রবােধিতে হয় ।

একনাথ স্বামী ।
৭৭
চণ্ডাল-বালক সেই, জননীর সনে,
প্রভাতে আসিয়াছিল গােদাবরী-কুলে ;
দুঃখিনী জননী তার কাষ্ঠ-অন্বেষণে
গিয়াছিল, হতভাগ্যে রাখি তরুমূলে।
১১
হেরি মায়েরে শিশু, ব্যাকুল পরাণ,
বাহির হইয়াছিল খুঁজতে মাতায়
কোথায় জননী তার না জানে সন্ধান,
“মা মা” বলি কাদি শুধু ভ্ৰমিয়া বেড়ায় ।
১২
ক্রমশঃ বাড়িল বেলা, তপন কিরণে
ধরিল সৈকত ক্ৰমে মূর্তি ভয়ঙ্কর ;
পারি চলিতে আর, অবসন্ন মনে,
পড়িল লুটায়ে শিশু ক্লান্ত কলেবর ।
“ছট ফট” করে শিশু তপ্ত বালুকায়,
ক্ষণেক লুটায়ে পড়ে, দাড়ায় আবার ;
স্নান করি কত জন সেই পথে যায়,
মুখ পানে চাহি কেহ নাহি দেখে তার ।

৭৮
কবিতা-প্রসঙ্গ।
১৪
কি জানি অশুচি তার ছায়া-পরশনে
স্নান-পুত দেহ পাছে হয় কলুষিত,
তাই কেহ, দূরে তারে নিরখি নয়নে,
যাইছেন অন্য পথে, ভয়ে সঙ্কুচিত ।
অঙ্গুলি-সঙ্কেতে কেহ দেখাইয়া তায়
কহেন অপর জনে, “লীলা বিধাতার,--
জানি কি হেতু এরা জনমে ধরায়,
মরণে কেন না খণ্ডে বসুধার ভার ?”
কেহ বা নিরখি তারে কোপে কম্পমান,
কহেন কর্কশ ভাষে, লক্ষ্য করি তারে;
“আর বুঝি, হতভাগা ! মিলিল না স্থান,
মরিতে আসিলি, তাই, পথের মাঝারে ?”
১৭
অগ্রসরি একনাথ, মধুরবচনে,
কহিলেন সােধিয়া চণ্ডাল-কুমারে ;-
“উঠ, বৎস! ভয় নাই, এস মাের সনে,
কাদিও না, মায়ে পুনঃ পাবে দেখিবারে ।

একনাথ স্বামী
১৮
অবসন্ন-তনু শিশু, কি দিবে উত্তর ?
ধন-উষ্ণ-শ্বাস মাত্র করে নিক্ষেপণ ;
আঁখি-যুগে অশ্রুধারা ঝরে দরদর,
জিদা প্রসারিয়া করে পিপাসা জ্ঞাপন।
১৯
মুহূর্ত চিন্তিয়া বিপ্র, অতি সযতনে,
বালকে তুলিল। ক্রোড়ে প্রসারিয়া কর ;
নয়নের ধারা তার মুছিয়া বসনে,
হইলেন গৃহপানে পুনঃ অগ্রসর
পরশি সে স্নিগ্ধতনু দেহ পুলকিত,
বাহু যুগে বেষ্টি শিশু ধরিল তাহায় ;
আনন্দে বিহ্বল অঙ্গ, আঁখি নিৰ্মীলিত,
দুরে গেল তাপ, তার জুড়াইল কায় ।
মল-ক্লেদ-পূৰ্ণ শিশু, তবুও তাহারে
ক্রোড়ে লয়ে একনাথ, তনু রােমাঞ্চিত,
হেরিলেন, চণ্ডালিনী আসিছে অদূরে,
অশ্রুজলে দুঃখিনীর হৃদয় প্লাবিত।

কবিতা-প্রসঙ্গ।
একি দৃশ্য ! দেশবাসী নমে যার পায়,
অস্পৃশ্য চণ্ডাল-শিশু ক্রোড়দেশে তাঁর !
চিত্রাপিতসমা নারী, কি বলিবে, হায় !
লুটাইয়া পড়ি ভূমে নমে বার বার।
লভি হারানিধি বামা আনন্দে মগন,
ছুটে মাতৃক্রোড়ে শিশু বাহু প্রসারিয়া;
মাতা, পুত্র, একনাথ, সুখী তিন জন,
কে অধিক সুখী, সবে দেখ বিচারিয়া।
আত্মােৎসর্গ।
উড়ে,
উজলিয়া বনপথ
ছুটেছে কনক-রণ,
ঘূরে চক্ৰ সঘনে ঘর্ঘর।
সগর্বে স্যন্দনচুড়ে
রক্ষোরাজ-কেতু
হেরি ভয়ে নমে বনচর।
শুনি সে ঘর্ঘর স্বন
বনবাসী জীবগণ
সসমে দশদিকে ধায়।

আত্মােৎসর্গ । নিঃশ্বাসে উড়ায়ে ধূলি, মহা শুণ্ড উর্দ্ধে তুলি, গজরাজ বদৃষ্টে চায়। আরণ্য মহিষগণ, শৃঙ্গ করি আস্ফালন, নিরখয়ে আরক্ত নয়নে। ভল্লুক বিবরে ছুটে, কপি তৰু-শাখে উঠে, মৃগ-যুথ ধায় উল্লম্ফনে । চকিত বিহঙ্গ সব তুলে উচ্চ কলরব ; কেকারবে উড়ে শিথিগণ। গুল্ম-অন্তরালে থাকি, শশক স্তিমিত আঁখি, ভীত করে নিরীক্ষণ । অন্ধকার শাখা’পরে বসিয়া, বিরাগ ভরে, পেচক কর্কশ তুলে নাদ। আন্দোলিত তরুশাখে ঝি ঝি দ্বিগুণিত ডাকে, ঋষিগণ গণেন প্রমাদ । ফেন-সমাবুত কায় বাজিদল বেগে ধায়, চক্রাঘাতে বাহিরে অনল । শিলাখণ্ড বিচূর্ণিত, লতা, গুল্ম নিষ্পেষিত, বিলােড়িত হয় বনস্থল। বর্ণ যিনি জলধর, সুবিশাল কলেবর, বুথ’পরে রাজা দশানন। পদতলে বিলুষ্ঠিত অশ্রুমুখী, কম্পান্বিত সীতাদেবী করেন ক্রন্দন।

२ কবিতা-প্রসঙ্গ। কানন-নিবাসিগণে কহেন কৰুণ শনে,- “কেবা আছ, এস একবার। “অসহায় পেয়ে মােরে হরিছে রাক্ষস-চোরে, শাস্তি দিয়া কর গাে উদ্ধার । “রঘুরাজ-বধূ আমি, রামচন্দ্র মাের স্বামী, সীতা নাম, জনক-নন্দিনী। আজ অশরণা-প্রায় হরি মাের লয়ে যায়, এ পামর হেরি একাকিনী ॥ “কোদ ও টঙ্কারে যার, চমকয়ে পারাবার, পৰ্বত-বিদারী যার শর। “আমি সে রামের নারী, হরে এই পাপাচারী, ছদ্মবেশী রাক্ষস-তস্কর। “কোথা বন-দেবগণ। দেহ অসি দরশন, এ সঙ্কটে কর মােরে ত্রাণ। ‘যথা দেব রঘুপতি গিয়া তথা শীঘ্রগতি, অভাগীর বাঁচাও সম্মান । “কহিও, কানন-মাঝ, একাকিনী পেয়ে, আজ, সীতারে হরিছে দশানন ! ‘নারী-চোর নরাধমে দণ্ডি ভীম পরাক্রমে রক্ষ, বীর! সীতার জীবন । “তুমি, দেবী দয়াবতী জগন্মাতঃ! বনুমতি ! কৃপাময়ী জননী আমার ।

আত্মােৎসর্গ। } ক্রোড়ে তব দিয়া স্থান তনয়ার রাখ মান, এ বিপদে কর গাে নিস্তার। “তুমি, দেব দিবাকর! উদিয়া গগন’পর বল কিবা করিছ দর্শন ? ‘তব কুলবধূ সতী হরিছে এ পাপমতি, কেন নাহি করিছ দহন ? “কোথা দিকপালগণ ! ইন্দ্র, চন্দ্র, হুতাশন । বল সবে, কোথা এ সময় ? “হয়ে নিত্য অবহিতা পূজিয়াছে সবে সীতা, তবে তারে কেন নিরদয় ? ধায় বেগে রথবর, দেবীর করুণ স্বর চক্র-শব্দে হয় নিমগন । ঝটিকা গরজে যবে, কুলায়ে বিহগী তবে কুজনিলে, কে করে শ্রবণ ? এড়াইয়া নদী, বন, শিলা, শৈল অগণন উজ্জাবেগে ধায় রখবর। সহসা শৃঙ্গের শব্দ, বনভূমি করি স্তব্ধ, উঠে দূর কানন ভিতর। অশনি-নির্ঘোষ জিনি কোদণ্ড-টঙ্কার-ধ্বনি গিরিবত্ম করে আকুলিত। চমকিত লঙ্কেশ্বর, কঁপে রথ থর থর, বাজিদল দাড়ায় স্তম্ভিত ।

৮৪ কবিতা-প্রসঙ্গ। সবিস্ময়ে রক্ষোরাজ হেরিলেন পথ মাঝ, বিশাল মূরতি বীরবর। বন্যবেশ পরিধান, করে শূল খরশান, গৃ-চূড়া শােভে শির’পর । জরায় শিথিল কায়, তবু শাল-তরু প্রায়, বীরদেহ উন্নত, সরল। শিরে কাশ-পুষ্পকার শােভে শুভ্র জটাভার, শ্বেত স্পর্শ করে দলমল ॥ জলদ-গম্ভীর স্বরে সম্বােধিয়া রক্ষোবরে মহাবীর কহিলা বচন ;- “চিনি তােরে, পাপমতি। তুই লঙ্কা-অধিপতি, নারী-চোর, পাপিষ্ঠ রাবণ। “বল আজ, দুরাচারি । হরিয়া কাহার নারী, ছুটেছি তস্কর সমান ? “পূর্ণ তাের পাপভার, দিব প্রতিফল তার, আয় পাপি! ধর ধনুর্বাণ। এত বলি বীরবর, শরাসনে যুড়ি শর, ধ্বজ লক্ষি করিল। ক্ষেপণ। তরুশাখা স্বথা ঝড়ে ভাঙ্গি ভূমিতলে পড়ে, ছিন্ন কেতু পড়িল তেমন। হেরি ক্রোধে কম্পমান, তুণ হ’তে তুলি বাণ, কহিলেন রাজা লঙ্কের।

আত্মােৎসর্গ। ‘যুদ্ধ সাধ কার সনে, চেন নাহি দশাননে ? এত দর্প- রে বৃদ্ধ বর্বর। ভিক্ষা তােরে দিমু প্রাণ, যা চলি আপন স্থান, রণে তাের নাহি প্রয়ােজন। “বৃদ্ধকালে কেন আর দিবি, মূঢ়! উপহার শিবাদলে শরীর আপন ? “তােরে সংহারিয়া রণে প্রীতি না পাইব মনে, কলঙ্কিত হবে মাত্র শর। “ইন্দ্র, যম ভরে যায় সমরে ডাকি তায়, হেন বুদ্ধি কে দিল, পামর ?” শুনি বীর ক্রোধভরে, কামুক তুলিয়া করে, মহাবেগে নিক্ষেপিল বাণ। নিরখিয়া রক্ষপতি, ধনু লয়ে শীঘ্রগতি, কাটিলেন করি খান খান। উভয়ে বাজিল রণ, ভয়ে স্তব্ধ জীবগণ, জ্যা-নির্ঘোষে পূর্ণ বনস্থল। ঘন সিংহনাদ উঠে, উকাসম শর ছুটে, প্রতিঘাতে বাহিরে অনল । ঘুরে ধনু চক্রাকার, পড়ে বাণ অনিবার, কি অপূর্ব কৌশল দোহার ! কথন পরশে তুণ, কখন আর্ষে গুণ, নিরখয়ে হেন সাধ্য কার ?

কবিতা-প্রসঙ্গ। রথ’পরে লঙ্কেশ্বর, ভূমিতে সে বীরবর, অসম সমর দুই জনে। তবু বীর নহে নূন, লঙ্কেশের ধগুণ কাটিলেন তীক্ষ্ণ প্রহরণে ॥ শরাঘাতে জর জর, শােণিতাক্ত কলেবর, দশানন না পারি সহিতে। বীরে বধিবার তরে অসি, চর্ম লয়ে করে লম্ফ দিয়া পড়িল মহীতে । খগে খগে বাধে রণ, ঘন শব্দ ঝন ঝন, ঘুরে আসি বিজলী যেমন । কভু শিরে বিঘূর্ণিত, কভু অঙ্গে নিপতিত, কভু স্থির ঝলসি নয়ন । বৰ্মাবৃত লঙ্কেশ্বর, শূন্যদেহ বীরবর, সর্ব অঙ্গে বাহিরে শােণিত। রক্তস্রাবে ক্রমে ক্ষীণ, বাহু হয় বল হীন, ক্লান্ত পদ হইল স্খলিত । হেরিয়া রাক্ষসপতি খঙ্গাঘাতে আশুগতি, বাহু তর করিলা ছেদন ! ভূপতিত হেরি বীরে, ভাসিয়া নয়ন-নীরে সীতাদেবী করেন রােদন। লক্ষ্য করি বীরবরে দশানন গর্বভরে কহে “মু! অরুণ-নন্দন!

আত্মােৎসর্গ। ৮৭ A “না বুঝিলি নিজ হিত, হ’ল শান্তি সমুচিত, মিটিলত রণ-কণ্ডয়ন ? “ইন্দ্র, যম ডরে যায় গর্বে নাহি চেন তায়, হেন বুদ্ধি কেবা দিল বল্। “নিজ দোষে মরে লােক, তার তরে কিবা শােক ? ভুঞ্জ, এবে, আত্ম-কর্মফল ॥” “রক্ষিতে সতীর মান আনন্দে ত্যজিব প্রাণ, মহাবীর কন ক্ষীণস্বরে। “মরণে না করি ভয়, জন্মিলে মরিতে হয়, হেন মৃত্যু কোন্ বীর ডারে ? “কিন্তু শশা, দুরাচার ! না করিস্ অহঙ্কার, মৃত্যু তাের নহে দূরে আর। “পাপে তাের রক্ষোবংশ সমূলে হইবে ধ্বংস, স্বর্ণলঙ্কা হবে ছারখার। “সতীর নয়ন-বারি, কালানল রূপ ধরি, পুরী তাের দহিবে নিশ্চয়। “পূর্ণ মাের মনস্কাম, চলিনু অমর-ধাম, পাপ রক্ষ! কি দেখা ভয় ?” এত বলি মহাবীর নীরবে রহিলা স্থির, সীতাদেবী করেন ক্রন্দন। দর্পে পুনঃ চড়ি রথে দশানন বনপথে চালাইলা আপন স্যন্দন ।

bor কবিতা-প্রসঙ্গ। ধন্য তুমি গুণধর, হে জটায়া বীরবর। কবি আজ বন্দিছে তােমায়। রক্ষিতে সতীর মান, বিসৰ্জন করি প্রাণ, কীৰ্ত্তি তুমি রাখিলে ধরায়। মহারাজ্ঞী ভিক্টোরিয়ার স্বপ্ন। ভারতের দুভিক ও মহামারীর সংবাদ শ্রবণ করিয়া করুণহৃদয়। মহারাজ্ঞী ভিক্টোরিয়া তন্নিবারণাৰ্থ ভারত-সচিবকে যে আদেশ প্রদান করিয়াছিলেন এবং ভারতবাসীদিগের অবস্থায় সহানুভূতি প্রকাশ করিয়া তাৎকালীন বড়লাট বাহাদুরকে স্বহস্তে যে সকল পত্র লিখিয়াছিলেন, হ! উপলক্ষ কবিয়া নিম্নলিখিত কবিতাটী রচিত হইয়াছে। ১ নিশার তৃতীয় যাম হয়েছে অতীত পাণ্ডুবর্ণ কলেবর, ডুবিছেন শশধর ; হইতেছে উষানিল ধীরে প্রবাহিত। * ভারতবাসীদিগের অবস্থায় মহারাজ্ঞীর সহানুভূতি সম্বন্ধে সংবাদ- পত্রে এইরূপ প্রকাশিত হইয়াছিল :- “The Viceroy also said, he had received many letters from the Queen-Empress written with her own hand which he could only describe as overflowing with sympathy. It was Her Majesty's command, he should miss no chance of declaring in public the distress and grief which had been caused to her by the suffering of her Indian subjects."

মহারাজ্ঞী ভিক্টোরিয়ার স্বপ্ন।
ভেদি কুহেলিকা-রাশি ম্লান শশি-কর
পড়েছে প্রাসাদ-শিরে,
পড়েছে তটিনী-নীরে ;
সুষুপ্ত লণ্ডন কিবা শােভিছে সুন্দর।
বিরাজিত রাজ-সৌধ টেমসের তটে ;
মিলি নীলাম্বর-গায়
শশিকরে শােভা পায়,
বৈজয়ন্ত-ধাম যেন আঁকা চিত্রপটে।
৪
শােভিছে সে সৌধ মাঝে কক্ষ সুশােভন ;
স্নিগ্ধালােকে আলােকিত,
পুষ্পগন্ধে সুবাসিত,
দর্পণে, আসনে, চিত্রে নয়ন-রঞ্জন ।
নিদ্রিতা ভারতেশ্বরী আপন শয্যায় ;
স্তব্ধ রাজ-নিকেতন,
সুপ্ত পরিজনগণ,
নৰ্ম-সহচরী পাশে অঘােরে ঘুমায় ।

কবিতা-প্রসঙ্গ।
নিশা অবসান, ক্রমে, উষার কিরণ
ফুটে পূর্বাচল-ভালে,
মহারাজ্ঞী হেনকালে
দেখিলেন নিদ্রাবেশে অদ্ভুত স্বপন।
আলােক পরিধি-মাঝে কমল-আসনা
অপূর্ব রমণী-মূর্তি
সম্মুখে পাইছে ঋত্তি
কিরণ-মুকুট শিরে, পূর্ণচন্দ্রাননা।
•
শােভিছে দক্ষিণ করে ফুল শতদল।
অতসী-কুসুম-শ্যামা,
মুক্তকেশী, অভিরামা,
নিলি কোকনদ-কান্তি চরণযুগল।
মাতৃ-ভাব পরিব্যক্ত বদন মণ্ডলে ;
দয়া, মায়া, সরলতা
সে আননে বিরাজিতা,
কমলনয়ন দুটি সিক্ত অশ্রুজলে।

মহারাজ্ঞী ভিক্টোরিয়ার স্বপ্ন
কহিলেন দেবী, বীণা-বিনিন্দিত স্বরে--
“শুন বৎসে, ভিক্টোরিয়া ।
নাম তব উচ্চারিয়া,
ভারত-সন্তানগণ ডাকিছে কাতরে।
“দেখ চেয়ে, অভাগারা আছে কি দশায় ;
“হা অন্ন ! হা অন্ন।” বলি
কাদে অই শিশুগুলি,
ব্যাকুল জননী, তের, লুটায় ধরায়।
১২
“বারেক নয়নে, বসে ! কর দরশন,
বুভুক্ষু কুকুর সনে
ধায় নর-নারীগণে,
পাত্র -শেষ ম্নতরে করে ঘাের রণ ॥
“মানব কি প্রেত এরা, দেখ ভাবি, রাণি।
নগ্ন-দেহ, রুক্ষকেশ,
শিরা-অস্থি-অবশেষ,
আম-মাংসে, তরুত্বকে তােষে মহাপ্রাণী।

কবিতা-প্রসঙ্গ।
১৪
“হের অন্য দিকে কিবা দৃশ্য বিভীষণ।
বদন ব্যাদান করি,
মহামারী ভয়ঙ্করী,
ছুটেছে ভারত-সুতে করিতে চর্বণ।
;
“কাদে নরনারী যত শিরে কর হানি
অকালে মরেছে পতি,
কাঁদে ম্রিয়মাণ সতী,
হারায়ে নয়নতারা ঈদেন জননী।
“জনশূন্য রাজপথ, নাহি কোলাহল ;
চারিদিকে হা হুতাশ,
মৰ্ম্মদাহ, দীর্ঘশ্বাস ;-
নয়ন-আসারে স্রোত বহিছে কেবল।
১৭,
“না জানে ভারত-সুত কি হবে উপায়,
জানে কি মহাপাপে,
কোন দেবতার শাপে
পড়েছে তাহারা, আজ, এ হেন দশায়।

মহারাজ্ঞী ভিক্টোরিয়ার স্বপ্ন।
৯৩
“কোথা তারা যাবে, বৎসে ! তুমি না রাখিলে ?
রাজীরূপে জগদ্ধাত্রী
ধরাতলে অধিষ্ঠাত্রী,
জানে তারা, ডাকে তাই, ভাসি অশ্রুজলে ।
ঘুমায়ােনা তবে, বৎসে ! ঘুমায়ােনা আর,
ভারত-সন্তানগণ
শুষ্ক কণ্ঠে আবাহন
করে তােমা, “ভয় নাই” বল একবার !
২০
“নারী তুমি, রাজ্ঞী তুমি, তুমি পুত্রবর্তী ,
কি ক’ব অধিক তবে,
দেখাও, দেখাও সবে,
মাতৃহীন নহে যত ভারত-সন্ততি ।।”
অধীর রাজীর প্রাণ, ভাঙ্গিল স্বপন ;
ভাসাইয়া অশ্রুজলে
সে প্রতিমা গেল চলে,
সৌদামিনী যেন মেঘে হল অদর্শন।

৯৪
কবিতা-প্রসঙ্গ।
२२
দেখিলেন মহারাজ্ঞী তপন-কিরণ
জালরন্ধে, প্রবেশিয়া,
গৃহসজ্জা আরঞ্জিয়া,
প্রাচীর-লম্বিত চিত্র করিছে শােভন।
আলবার্ট-চিত্র তাহে শােভে নিরমল ;
তেমনই সস্নেহ দৃষ্টি
করিছে পীযূষ-বৃষ্টি,
কিন্তু সে নয়ন, আজ, দ্বিগুণ উজ্জ্বল।
২৪
চকিতা, সম্ভান্তা রাজ্ঞী, যুড়ি দুটী কর,
উর্ধনেত্রে ভগবানে
কহেন কাতর প্রাণে,
বিতর করুণ, আজ, করুণা-সাগর ।
“দেখিব ভারতদুঃখ যায় কি না যায়,
ঘুচাব এ হাহাকার,
মুছাব এ আঁখি-ধার,
সর্বশক্তিমন্ ! বল দেহ অবলায়”

দধীচের তনুত্যাগ।
নহে এ অলীক স্বপ্ন, দেশবাসিগণ ।
সত্যই ভারতমাতা,
স্বপ্নে হয়ে আবির্ভূত,
বলেছেন আমাদের দুঃখবিবরণ।
२१
সতাই “মাভৈঃ” রব বলেছেন রাণী,
তাই দেশ, দেশান্তরে,
নরনারী-কণ্ঠস্বরে,
“মাভৈঃ” “মাভৈঃ" আজ উঠে প্রতিধ্বনি |
দধীচের তনুত্যাগ।
মহাভাৰতীয় দধীচ উপাখ্যান অবলম্বনে নাটকাকারে লিখিত ।
মূলেব সহিত অনেক স্থলে ইহাব পার্থক্য লক্ষিত হইবে।
মহষি দধীচের
আশ্রম।
( সন্ধ্যাকাল-মহর্ষি দধীচের প্রবেশ।)
মহাষ দধাচ। দিবস হইয়া এল শেষ,
আসিতেছে সন্ধ্যার তিমির ;
* ভারতের দুর্ভিক্ষ নিবারণার্থে দেশে, দেশে যে অর্থ স°গ্রহ হইয়াছিল,
মহারাজ্ঞীর ককণাই তাহাব মুল। দুর্ভিক্ষ ও মহামারী দমন সম্বন্ধে মহঃ-
রাজঁ র ও রাজপুরুষদিগের চেষ্ট' ভারতবাসিগণ চিরদিন কু চি
স্মরণ করিবেন।

কবিতা-প্রসঙ্গ।
দিনমণি, অই, ধীরে ধীরে,
পশিছেন অস্তাচল মাঝে।
সারাদিন বিহরিয়া সুখে,
পাখিগণ ফিরিছে কুলায়ে ;
তপোবনে ধেনু-বৎসল
ফিরিতেছে মন্থর গমনে।
নিশাচর প্রাণিগণ যত
অভ্যর্থিয়া লইছে সন্ধ্যায় ।
( ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া
আজ এই সন্ধ্যাযযাগে মম
মৰ্ত্তবাস হবে অবসান ;
জগতের কল্যাণ-সাধনে
ক্ষণস্থায়ী দেহ সমর্পিয়া,
নর-জন্ম হইবে সার্থক।
এত দিন কায়, মন ধরি
যেই ব্ৰত করিনু সাধন,
আজ তাহা হবে উদযাপিত ;
কি আনন! কি আনন্দ! আজ।
( ক্ষণকাল বিলম্বে,)
বিশ্বনাথ। শত ধন্য -তুমি,
ধন্য আজ করিলে আমারে ;

দধীচের অমুত্যাগ।
.
দীন আমি, কিছু নাহি মাের
ধৰ্ম্মে, কৰ্ম্মে দিতে উপহার
তাই বুঝি নিজ কৃপাগুণে
দেহ মাের করিয়া গ্রহণ,
মর জীবে অমর করিলে ;
কৃপাসিন্ধো! কত কৃপা তব।
নাহি আর বিলম্ব অধিক,
ওভক্ষণ সমাগত প্রায় ;
কোথা এবে শিষ্যগণ মাের
কি করিছে ? শিও শীতাতপ
বড় ব্যথা পাবে মাের তরে।
হতভাগ্য, পিতৃমাতৃহীন,
পড়েছিল ত্রিবেণীর তটে
যত্ন করি কুড়াইয়া তারে,
মাতৃস্নেহে করেছি পালন।
ক্ষণমাত্র না দেখিলে মােরে
কঁদে শিশু সমাধিতে যবে
বসি আমি, থাকে দাড়াইয়া ।
দাবদগ্ধ শালতরু সম,
ও আমি ; চির বনচারী,
কিন্তু তবু তার কথা যদি
ভাবি মনে, ব্যথা পায় প্রাণ।

কৰিত-প্রসঙ্গ।
আহা! শিশু যাবে কার কাছে ?
পানাহার ত্যজিবে বালক,
বুঝে যদি, ধ্যান অদ্যকার
শেয ধ্যান হইবে আমার।
কিন্তু মাের কি কাজ চিন্তায় ?
মাতৃহীন বিহঙ্গ-শাবকে,
যুথ-ভ্রষ্ট কুরঙ্গ-শিশুরে,
যেই দেব করেন পালন,
কোলে তিনি বেন বালকে ।
জানি আমি, শাণ্ডিল সুমতি
ভ্রাতৃস্নেহে পালিবে তাহারে।
(নেপথ্যে শঙ্খধ্বনি ও বেদ-মন্ত্রোচ্চারণ-শব্দ )
শাণ্ডিল, শাহাপ ও পোল প্রভৃতি মহর্ষির শিষ্যগণের
সায়ং সন্ধ্যবিন্দনা কবিতে করিতে প্রবেশ
ও মহষিকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম।
মহষি দধীচ। -- ( শিষ্যগণের প্রতি।
বৎসগণ। দিবা অবসান,
অস্তাচলে পশিছেন রবি
জীবনের দিবস আমার
এইরূপ এসেছে ফুরায়ে ॥

দধীচের তমুত্যাগ।
এস তবে, এস, একে, একে,
কর মােরে আলিঙ্গন দান ;
সাঙ্গ-প্রায় জীবনের লীলা
পৃথিবীর শেষ দেখা আজ।
( একে, একে শিষ্যগণকে আলিঙ্গন।)
;
শাণ্ডিল্য। গুরুদেব, তব চরণে
শত শত আছে অপরাধ,
ক্ষমা, দেব! করিবেন সবে ;
এই ভিক্ষা, জন্মে জন্মে যেন
গুরুরূপে লভি আপনারে ।
( শাণ্ডিল্যের অশ-বিমোচন।)
মহর্ষি দধীচ । ( শাণ্ডিল্যের প্রতি)
রােদনের এ নহে সময়,
আজ মাের আনন্দের দিন;
হাসিমুখে এস সবে হেথা,
হাসিমুখে করি আলিঙ্গন,
দাও মােরে বিদায় সকলে ।
এত দিন উপদেশে শুধু
শিক্ষা, বৎস! করেছি প্রদান;
কৃপাময় কৃপা করি মােরে
দিয়াছেন অবসর আজ,

কবিতা-প্রসঙ্গ।
দিব শিক্ষা দৃষ্টান্ত-প্রকাশে ;
এই শিক্ষা রাখিও স্মরণে।
(পৌলের প্রতি )
বৎস পৌল ! দেব দিবাকর
হের অই অস্তাচলগামী ;
সান্ধ্য-অর্ঘ্য কর এবে দান।
(পৌল কর্তৃক সূৰ্য্যদেবকে অর্ঘ্যদান।)
( শাণ্ডিত্যের প্রতি }
শুন বৎস, শাণ্ডিত্য সুমতি।
বড় মনে ছিল অভিলাষ,
ভক্তি-সূত্র করিব প্রচার ;
কিন্তু, হের, বিধির বিধানে
সে বাসনা না হ’ল পূরণ।
তুমি, বৎস! আদেশে আমার
ভক্তি-সূত্র প্রচারিও ভবে ;
যেন তাহে অমৃতের ধারা
পিয়া নর জুড়ায় পরাণ ।
( শাণ্ডিত্যের মস্তকে হত্যার্পণ করিয়া)
জ্যেষ্ঠ তুমি, আশ্রমের ভার
করে তব করি প্রদান।
* মহর্ষি শাণ্ডিল্য-প্রণীত ভক্তি-সূত্র।

দধীচের অমুত্যাগ।
হােম-অগ্নি আহুতি-প্রদানে
নিত্য, বৎস! করিও রক্ষণ।
যেন, বৎস! এ আশ্রম হতে
ক্ষুধাতুর না ফিরে অতিথি।
“মধুক্ষীরা
বৎসে তার পালিও যতনে ।
* অচির-প্রসূতা,
( পৌলের মস্তকে হস্তাৰ্পণ করিয়া)
বৎস পৌল ! নিজ করে আমি
রােপিয়াছি এ অশ্বথতৰু,
যত্নে তুমি, করিও রক্ষণ,
জলাভাবে না শুকায় যেন।
দেবরূপী এই তরুবর,
ছায়া, ফল করিয়া প্রদান
জগতের করে উপকার ।
পৌল। মস্তক অবনত করিয়া)
যথাসাধ্য পালিব আদেশ।
মহর্ষি (শাণ্ডিল্যের হস্তে শাতীতপের হস্ত প্রদান করিয়া)
শিশুমতি শীতাতপ এই,
মুনিব্রত শিখে নাই আজও,
ভ্রাতৃস্নেহে পালিবে ইহারে ।
* মহুরি পালিতা গাভী।

১০২
কবিতা-প্রসঙ্গ।
শাতাতপ। কোথা তুমি যাবে তাত ?
দধীচ-(শাতাতপকে ক্রোড়ে করিয়া উৰ্দ্ধলােক
প্রদর্শন পূৰ্ব্বক)
অই, বৎস! অই দূর দেশে।
শাতাতপ ।—আমি সঙ্গে যাব।
দধীচ।-না—না, বৎস, দুর্গম সে দেশ,
শিশু তুমি পারিবে না যেতে।
শাতাতপ। কোলে তুমি নিও মােরে, এই যে সেদিন
ক.১ ফুটে ছিল পায়, কোলে নিলে তুমি ;
হাত ধরে, ধীরে ধীরে, যাব তব সাথে।
;
(শাতাতপকে ক্রোড় হইতে নামাইয়া)
দধীচ।
বুঝিলাম, মানবের প্রাণ
শিশু তরে কেন কাদে এত ।
কি অমৃত ঢালে যেন হৃদে
বালকের মধুর কথায়।
কিন্তু আর বৃথা বাক্য-ব্যয়ে
কাজ নাই ; বসি ধ্যান-যােগে ;
নিমেষেতে হইবেক শেষ,
সংসারের এ মােহ-বন্ধন।

দধীচের তমুত্যাগ।
"
- *
গৃহমুখ প্রবাসীর প্রায়,
প্রাণ মাের হ’তেছে বাকুল
প্রবেশিতে সেই পুণ্য-লােকে।
ছায়াসম ভাসিছে নয়নে,
নিত্যানন নিত্য জ্যোতির্ময়,
যেন কোন অপূৰ্ব্ব প্রদেশ !
মৃত্যু
যদি
মধুমাখা হেন,
নাহি জানি কেন জীবগণ
মৃত্যুভয় করে তবে এত ?
( ইন্দ্রাদি দেবগণের প্রবেশ)
ই-মহর্ষির বন্দিতে চরণ,
আসিয়াছি আমরা সকলে ।
সুরপুরে উঠিয়াছে আজ,
“ধন্য, ধন্য” “জয় জম” ধ্বনি।
দধীচ-সুরগণ! হউক কল্যাণ;
শুভক্ষণ সমাগত প্রায়,
বসি আমি মহাধ্যান ধরি ;
চাহ সবে বিধাতার পাশে,
শুভগতি হয় যেন মাের।
{ বদ্ধাসন, কৃতাঞ্জলি মহর্ষির প্রার্থনা )
জয় দেব, ব্ৰহ্ম সনাতন !
আত্মারাম, করুণাসাগর ;

১০৪
কবিতা-প্রসঙ্গ।
প্রাণ মাের করিয়া গ্রহণ,
জগতের কর উপকার।
পাপরূপী অসুর হইতে
এ বিশ্বের কর পরিত্রাণ ;
হিংসা, দ্বেষ, যা’ক চলি দূরে,
হক ধরা সরগ সমান ।
যাহা কিছু দিয়াছিলে, নাথ।
আজ সব সহ ফিরাইয়া,
দীনে শুধু পদে দিও স্থান।
জীবনের প্রতি পলে, পলে
করিয়াছি যত অপরাধ,
আজ, এই অন্তিম সময়ে,
চাহি ভিক্ষা, ক্ষমিও সে সব।
ইহলােকে ছিলে তুমি প্রভু,
পরলােকে তুমিই শরণ,
এস, এস, এস, প্রভো! প্রাণে ;
আজ ধন্য, সার্থকজীবন।
( মহষির ব্ৰহ্মরন্ধ-ভেদ ও মৃত্যু।)

ধ্রুবের তপস্যা।
গভীর আঁধারে
মগন বসুধা,
স্তিমিত কানন-তল।
বিকট চীৎকারে
আকুলিয়া বন
ফিরিছে শ্বাপদদল ।
মণিখণ্ড সম,
খদ্যোত-নিচয়
এলিতেছে তরু’পরে।
অবিরাম কণ্ঠে,
মিলি ঝিল্লী-কুল
“বিঝি ঝিবি বব করে।
থাকিয়া,
থাকিয়া
নিশা-সমীরণ
ছাড়ে শ্বাস সুগভীর।
তরু-পত্র হতে
টু-টান্ট
ঝরিছে নিশির নীর।
এ হেন সময়,
বনস্পতি-মূলে,
বসিয়া অজিনাসনে।
বাল-যােগী এক,
হােম-কুণ্ড জ্বালি,
মগন গভীর-ধ্যানে।

কবিতা-প্রসঙ্গ। কিশোর বয়স, লাবণ্য-জড়িত তনু অতি সুকুমার। সর্ব অঙ্গে লেখা পুণ্য হরিনাম, কণ্ঠে তুলসীর হার। চারু কেশ-দাম জটাবদ্ধ এবে, কটিতে গৈরিক বাস। ধ্যান-স্থির দেহ, নিমীলিত আঁখি, নাসায় না বহে শ্বাস । কত বিভাবরী বসি হেন ভাবে সে বিজন তরুতলে। যাপিয়াছে শিশু, কাদিয়াছে কত, “হরি, হরি, হরি” বলে। নিশার শিশির, বরষার ধারা সে কোমল তনু'পরে, পড়েছে কতই সহেছে বালক হরিপদ ধ্যান করে। নাহি অন্য কথা শুধু “হরি হরি করে শিশু উচ্চারণ। অন্তরে বাহিরে হরি মাত্র তার, নেত্রে লুপ্ত ত্রিভুবন । নবীন নারদ উদিলে আকাশে যােড় কৰি দুটা কর। ;

ধ্রুবের তপস্যা। ১০৭ কহিত বালক, “তৃষাতুর আমি, এস, শ্যাম জলধর।” কুহরিলে পিক, সজল নয়নে কহিত বালক তায়। “কেন লুকাইয়া বাজাইছ বাঁশী ? কাছে এস, শ্যামরায়। তুলি বন-ফুল, গাথিয়া মালিকা, বক্ষ আদ্র অশ্রুজলে। কহিত বালক, “এস, বনমালি ! পরাইব তব গলে।” বনের হরিণী বেড়াইলে ছুটি শুষ্কপত্র মমরি। চমকিয়া শিশু জিজ্ঞাসিত তারে, ‘এলে কি, দয়াল হরি ?” কভু ভাবাবেশে তরুলতাগণে বাহু দুটী প্রসারিয়া। বাধিত বালক, “হরি হরি” বলি, প্রেম-আলিঙ্গন দিয়া। হাসিত, কঁাদিত, নাচিত, গাইত, কভু বা উন্মত্তপ্রায়। প্রেমে রােমাঞ্চিত, মুচ্ছিত হইয়া লুটাইত কভু, হায় !

১০৮ কবিতা-প্রসঙ্গ। নিরখি তাহারে তপােধন যত ভাবিতেন মনে, মনে। হরিপ্ৰেম বুঝি, মূৰ্ত্তিমান রূপে, অবতীর্ণ পােবনে। বনচর যত সে শান্ত মুরতি নিরখিয়া তরুতলে। কি জানি, কি ভাবে, শির নােয়াইয়া, দূরেতে যাইত চলে । ফুরাইল নিশা, উষার কিরণ ফুটিল পূবাকাশে। ভাঙ্গিল ধেয়ান, করফেড়ে শিশু কহে গদ গদ ভাষে। “জননী আমারে বলেছেন হরি, তুমি বড় দয়াময়। “একা এ বিজনে এত কাঁদি আমি, দয়া কি গো নাহি হয় ? “ল’বে বলি তুমি আনি বনফুল, কই, হরি। কই এলে ? “নিতি গাঁথি মালা, যায় শুকাইয়া, কই তুমি পর গলে ? “নি শিখিপাখা ভালবাস তুমি, আনি তাই কুড়াইয়া।

ধ্রুবের তপস্যা। ১০৯ “আনি মৃগমদ, বাম ? কই দাও দেখা ? দিতে সাধ মাখাইয়া ॥ “শিশু বলি আমি, মাের প্রতি, হরি! দয়া যদি নাহি হয়। “কোন্ দোষে দোষী জননী আমার, পদে তব, দয়াময় ? “দিবস, যামিনী কাঁদেন যে মাতা, লয়ে, হরি, তব নাম। “হে পদ্ম-পলাশ- লােচন শ্রীহরি। কেন তুমি বল “দেখিব কেমন নাহি দিয়া দেখা থাকিবারে পার তুমি । “দেখি কত দিন চাহ কাঁদাইতে, ছাড়িব না তােম। আমি ।” এত বলি শি) বসিল ধেয়ানে, মুদি পুনঃ দু’নয়ন। “রুণু, রুণু ধ্বনি উঠিল সহস, পূর্ণ করি তপােবন।” শত চন্দ্র জিনি ভরিল কানন-তল। কোটি পারিজাত, যেন, ফুটি আমােদিল বনস্থল। মধুর কিরণে সেথা, ১১৩ কবিতা-প্রসঙ্গ। মুগ্ধ বনবাসী সুধাস্রোতে সবে হল যেন নিমগন। তুষিতে ভকতে, ত্যজিয়া গােলােক, অবতীর্ণ নারায়ণ । কি অমৃত-স্রোত ধ্রুবের অন্তরে পশিল, হরিল জ্ঞান। নাহি জানে শিশু সুপ্ত, কি জাগ্রত, জীবিত, কি গত-প্রাণ । “আসিয়াছি আমি, মধুরবচনে কহিলেন নারায়ণ। “পেলে কত ক্লেশ, পূর্ণ আজি আশা, মেল, বৎস! দু’নয়ন । চমকিত ধ্রুব, জাগ্রত-স্বপনে, নিরখয়ে আঁখি মেলি। ভুবনমােহন- রূপে দাড়াইয়া, সম্মুখেতে বনমালী । শিখিপুচ্ছ শিরে, গলে গুঞ্জমালা, মধুর মুরলী করে। অঙ্গে পীতধড়া ঝলসিছে, যেন, সৌদামিনী জলধরে। ত্রিভঙ্গ ভঙ্গিমা, মৃগমদ-লেখা শ্ৰীঅঙ্গে শশাভিত, হায় !

ধ্রুবের তপস্যা। ১১১ চরণ-সরোজ- -মকরন্দ-লােভে গুঞ্জরিয়া অলি ধায়। বিমােহিত ধ্রুব, কভু মেলে আঁখি, কভু রাখে বিমুদিয়া। অন্তরে, বাহিরে সেই শ্যামরূপ দেখে শিও মিলাইয়া । ভেবেছিল ধ্রুব দেখা দিলে হরি, কত কি কহিবে তায় । কি বলিবে এবে না পারে বুঝিতে, লুটাইয়া পড়ে পায় । সিন্ধু সনে যেন মিলিত হইয়া তটিনী পাইল লয় । কি ভাব দোহার, কে পারে বর্ণিত, গাও সবে, “জয় জয়”। স্বর্গারােহণ। ( বিদ্যাসাগর মহাশয়ের) গভীর নিশীথ, সুষুপ্ত। মেদিনী, আঁধারে ঘিরেছে ধরা। প্রাবণের মেঘ ঢেকেছে আকাশ, পলায়েছে শশী তারা।

১১২ কবিতা-প্রসঙ্গ। ৩০ থাকিয়া, থাকিয়া চমকে দামিনী, বায়ু বহে ঘাের স্বনে। উন্মত্ত অশনি, বিদারি আকাশ ছুটিছে আপন মনে। সহস্র কামান জিনি ঘাের রবে মাঝে, মাঝে জলধর উঠিছে গরজি ভয়ে বসুমতী কাঁপিতেছে থর থর। যেন কোন রাজা, উর্ধ্বলােকে, আজ, করিবেন আগমন। অভ্যর্থিতে তারে তাই, সেথা, হেন মহা ঘোর আয়ােজন। নিম্নে বসুন্ধরা, ভাবী বিষাদের দুরূহ ভাবনা-ভরে, যেন বা নীরবে তাই- বৃষ্টিছলে আঁখি ঝরে। এ হেন নিশীথে নগরের মাঝে একটি প্রাসাদ’পরে, নরদেব কেহ, মুম্ষুশয্যায় সংজ্ঞাহীন রােগ-ভরে। সুত, সুতা, সধা আত্ম-পরিজন, বিষাদে ঘিরিয়া তায়, কাঁদিছেন, স্বর্গারােহণ। দাড়ায়ে নীরবে, স্পন্দহীন তই, পাষাণ-মূরতি প্রায়। সকলের আঁখি সেই মুখপানে চাহি শুধু অনিমিকে। নাসায় নিঃশ্বাস বহে কাহার, স্পন্দ নাই কারাে বুকে। অতি সাবধানে কর তুলি তার ভিষক লইয়া করে। শুকাইল মুখ, “একি গতিহীন”। কহিলা কাতর স্বরে ॥ এ হেন সময় কি যেন আলােকে ভরিল সকল স্থল। যেন বা কাহার গুরু পদভরে কঁপিল সে গৃহতল। ভরিল ভবন, বহিল মধুর বায় । বরগ-সঙ্গীত কে যেন বহিয়া শ্রবণে ঢালিল হায়। সহ কে যেন, বিচিত্র শরীরী, জ্যোতির মুকুট ভালে। অতি সসমে প্রণমি রােগরে দাড়াইল পদতলে। অপূর্ব সৌরভে ১১৪ কবিতা-প্রসঙ্গ। মুমূয়ুর মুখে উথলিল হাসি, আঁখি হল বিস্ফারিত। কি অমৃত-ধারা পান আশে যেন ও হ’ল প্রসারিত । দেখিতে, দেখিতে জ্যোতির্ময় বপু একটী পুরুষবর হইলা বাহির, বিদারিয়া বলে মুমুধুর কলেবর । শিরােদেশে তার জ্যোতির মুকুট, জ্যোতির বসন গায়। আশিষিয়া সবে, সে গৃহ হইতে উঠিলা আকাশে হায় । অমনি সে গৃহে শনের রোল উঠিল গভীর স্বরে। “কোথা যাও” বলি, ছিল যারা সেথা ডাকিলা সে নরবরে। শুনি সে কথা সে পুরুষর ডুবায়ে তিমিরে দেবদূত সনে সুখে, স্নানা বধায় ধাইলেন উর্দ্ধমুখে। ভেদি মেঘলােক সঙ্গে লয়ে ভরে দেবদুত শুতে ধায়।

স্বর্গারােহণ । অঙ্গুলি হেলায়ে ধরণীর ছবি দেখায়ে কহিছে তায়। “অই দেখ চেয়ে, পদতলে তব বাসগৃহ পৃথিবীর । “অই ভাগীরথী রজোরেখা প্রায়, অই হিমাচল ধীর ॥ “এই মেঘলােক ছাড়াই, হের, এই মহাশূন্য-তল। “পদতলে তব ফুরিছে দামিনী, গর্জিছে জলদ-দল। *হের চলােক রহিল পশ্চাতে, অই রবি তেজোময় । “গ্রহ, উপগ্রহ, লুকাইছে সব, অদৃশ্য তারকাচঃ ॥ বিস্ময়ে স্তম্ভিত সে পুরুষবর বাক্য নাহি সরে মুখে। অবাক হইয়া চান শুধু অনিমিকে। দেখিতে দেখিতে কি অপূর্ব জ্যোতিঃ ভরিল সে শূন্যদেশ। নাহি এহ, তারা সকলই উজ্জ্বল বেশ। দেবদূত পানে তবুও কিরণে ১১৬ কবিতা-প্রসঙ্গ। তবুও সৌরভ অপূর্ব সংগীতে সে অপু জ্যোতি আসে কোথা হতে কেহ না বুঝিতে পারে। নাহি বায়ু সেথা, ছুটিতেছে চারিধারে। পূরে দশদিক, জানি কে গায় গান। কে বাজায় বীণা পাই দেখিতে, শূন্য হতে উঠে তান। জ্যোতির্ময় বপু কত নর, নারী সেথা চারিদিকে ধায় অঙ্গের সৌরভে আমােদিত দিক আলােক উথলে গায়। কারও হাতে বীণা, কারও হাতে বাঁশী দাড়াইয়া পথ-পাশে, সে পুরুষবরে জয়-মাল্য দিয়া কহে সবে মধুভাষে। জম জয় দেব! স্বাগত এ ধামে, জয় জয় নরবর ! “তৰ কীৰ্ত্তি-গীতে পূর্ণ আজি ধরা, ধন্য তুমি গুণধর।” মুকুতার মালা গাঁথিয়া যতনে কেহ বা পরায় গলে।

স্বর্গারােহণ। বিচিত্র কুসুম ঢালি কোন জন প্রণমে চরণ তুলে। চামর লইয়া অতি সমারে চুলায় কতই জন। পাদ্য-অর্ধ দিয়া কেই পুজে পদ, কেহ করে আবাহন। বিস্ময়ে সম্বােধি, দেবদূতে তবে সুধান সে নরব। “কে ইহারা সবে, করিছেন মােরে কেন এত সমাদর ? “এ মুকুতা-মালা কেন কষ্ঠে মাের? কেন এ কুসুমচয় “দেব, দেবী যদি ইহারা সকলে কেন গান মাের জয় । কে গাইছে গান বীণায় ঝঙ্কার দিয়? “যেন বা কোথায় শুনেছি এ গীত, তনু উঠে শিহরিয়।। “কোথা হতে আসে এ অপূর্ব জ্যোতি কোন্ ফুলে এ সুবাস ? ঝরে এ সীত মহিমার পরকাশ? অই বহু দূরে ? “কোন দেবকষ্টে ১১ কবিতা-প্রসঙ্গ। “বুঝিতে না পারি, এ কোন প্রদেশ, কেবা তুমি? কেন হায় ! “আনিলে আমারে এ অপূৰ্ব দেশে, কিবা তব অভি প্রায় ?” হাসিয়া তখন কহে দেবদূত, এই স্বর্গনিকেতন। “নিজ কৰ্ম্মফলে তােমারই এ দেশ, এরা তব পরিজন। “বিদ্যার আলোক ছড়ালে যা দেশে, তারই জ্যোতিঃ উথলিত। ‘অনাথিনী-অশ্রু, বিধির কৌশলে, মুক্তা-দামে পরিণত ॥ “নহে বীণা-ধ্বনি, শুনিছ যা বহুদূরে। ‘মরম-পীড়িত। নারীর রােদন উঠে শূন্য ভেদ করে । “অনাথ- শিরে অন্ন, বস্ত্র দিয়া পেলেছিলে সমাদরে। “ৰি অধরে ফুটিল যে হাসি আজ পূস্পরূপ ধরে। “গভীর নিশীথে রােগশয্যাপাশে ব্যজনিলে যা সবায়। এ অপূর্ব গীত স্বর্গারোহণ। “লই তারা সব, যতনে তােমারে, চামর লয়ে চুলায় । “দেব-কষ্ঠ হতে নহে এ সঙ্গীত, তােমারই মহিমা-গান, “দীন, দুঃখী, তাপী, আজ সবে মিলি, গাইছে খুলিয়া প্রাণ। “কুসুম-সৌরভ নহে, যা বহিছে, তােমারই সুযশ-রাশি, “পৃথিবী হইতে সৌরভ.আকারে পূরিতেছে দশ দিশি। ভুলিলে কি মােরে ? ভাগ্যহীন আমি আছিলাম মর্ত্যদেশে। “ব্যাধিতে পীড়িত, মল-মুত্র-মাখা, পড়েছিনু পথ-পাশে। “বুকে লয়ে মােরে কতই যতনে বাচাইয়াছিলে প্রাণ। ‘বিশ্বনাথ তাই আনিতে তােমারে করিলেন আজ্ঞা দান। “কর্মক্ষেত্র ধরা বিধির কৌশলে, যে যা’ করে ধরাধামে, ত্যজি ভব-তল, এ লােকে আসিয়া, লড়ে তাহা পরিণামে।

কবিতা-প্রসঙ্গ। “চল, প্রভাে! তবে চল সেই লোকে, যেখানে তােমার তরে। স্বদেশী, বিদেশী শত সাধুজন আছেন অপেক্ষা করে। সহি বহু ক্লেশ, সহি বহু তাপ, শুষ্ক হয়েছিল প্রাণ। আজ নিজ করে অমৃতের ধারা পিয়াবেন ভগবান ॥ “পৃথিবীর লীলা শেষ হল তব, আজ তব সুপ্রভাত। লইবেন তােমা হৃদয় মাঝারে নিজে অাজ জগত।” নীরবিলা দুত সহসা অমনি সে দৃশ্য মিলায়ে গেল। ছায়াবাজী প্রায়, দেব, দেবী যত কে কোথায় লুকাইল। গভীর নির্ঘোষে পুরিল জগৎ, দেখিলা পুরুষবর। জগত-জননী, ধরি দিব্য কলের। বিশ্বমাতা আজ, মাতারূপে তার, দাড়াইয়া পুলােদেশে। সম্মুখে তাহার স্বর্গারােহণ ১২১ মহাশূন্য ভেদি উঠিয়াছে তনু, রসাতল পদ-পাশে । বন, উপবন, রেণুরূপে তার তারকার লালা শােভে কেশ-জালে, কণ্ঠে মণি মুমিহির। গঙ্গা, গােদাবরী, পবিত্র সলিলে ঝরিছে স্তনের ক্ষীর । কত গিরি, নদী শােভিত সে দেহময়। শােভে পদতলে কত বিন্ধ্য, হিমালয় । জলবি, যথা, উঠি জলতলে জলে মিলাইয়া যায়। তেমনি সে হৃদে শত, শত বিশ্ব উঠি, পুনঃ লােপ পায়। বিস্ময়ে স্তম্ভিত সে পুরুষবর, চাহি জননীর পানে। বিশ্বরূপে আজ আত্মহারা যেন নগন জননী-ধ্যানে। পড়ে নিমেষ নাহি মুখে ভাষা, স্মৃতি, ধৃতি, মতি, জ্ঞান। বিলুপ্ত সকল, মহামনে যেন, আজ সংজ্ঞাহীন প্রাণ

১২২
কবিতা-প্রসঙ্গ।
ভাঙ্গিল চমক,
মূহুর্তেক পরে
কহিল সে মতিমান।
পালি আভা তব
এসেছি, জননি।
শ্রীচরণে দেহ ব্যান।
জননী অমনি,
প্রসারিয়া বাহু,
সন্তানে লইলা বুকে।
জলবিন্দু আজ
মহাসিন্ধু মাঝে
বিলীন হইল সুখে।
চিত্র-দর্শন।
সম্মুখে ভারতবর্ষের মানচিত্র প্রসারিত।
শিক্ষক ও ছাত্র।
শিক্ষক। দেখ, বৎস! সম্মুখেতে প্রসারিত তব
ভারতের মানচিত্র ; আমা সবাকার
পুণ্য জন্মভূমি এই, মাতৃস্তন্যে যথা,
এ দেশের ফলে, জলে পালিত আমরা
কর প্রণিপাত, তুমি কর প্রণিপাত।
ছাত্র। (প্রণামান্তর। অই যে চিত্রের শিরে ঘন মসী-রেখা
পূরব, পশ্চিম ব্যাপি রয়েছে অঙ্কিত,
কি নাম উহার, দেব ! বলুন আমারে?
•

চিত্র-দর্শন।
১২৩
ক্ষক। মসী-রেখা রূপে, বৎস! অই হিমাচল,
ভারতের পিতৃরূপী। জনক যেমন
মেহ দানে তনয়ারে পালেন আদরে,
তেমতি এ হিমাচল দুহিতা-ভারতে,
জাহ্নবী-যমুনা-রূপা স্নেহধারী দানে,
পালিছেন সযতনে। অই হিমাচল
ভারতের পক্ষে ; কত সাধুজন,
বিরচি আশ্রম সেথা পূজি ইষ্টদেবে
লভিলা অভীষ্ট বর। সম্মুখেতে তব,
বিজয়-মুকুট সম এ অদ্রির শিরে,
শােভে অই গৌরী-শৃঙ্গ ; শুনেছি পুরাণে,
আপনি পার্বতী, সেথা মহাতপ করি,
তুষিলেন বিশ্বনাথে। বামদিকে তার
দেখ বদরিকাশ্রম ; মহামুনি ব্যাস
বসি যে আশ্রম মাঝে, রচিলা পুলকে
অমর “ভারত-কথা”। অবিদূরে তার
শােভিছে কেদারনাথ ; আচাৰ্য শঙ্কর,
জীবনের মহাব্ৰত করি উদযাপন,
লতিলা সমাধি যথা। এই হিমাচল,
সাধুপদরেণু বক্ষে ধরি, যুগ, যুগ,
হইয়াছে পুণ্যভূমি ;-কর নমস্কার।
ছাত্র। (নমস্কারান্তে) শুনিয়াছি, কহে লােক, এই হিমাচল

কবিতা-প্রসঙ্গ।
১২৪
••
দেবতার ক্রীড়া-ভূমি, যে যায় এখানে
স্বরগ-সঙ্গীত নাকি পায় শুনিবারে ;
দেব-অঙ্গ-জ্যোতি, শুনি, তম করে দুর,
সত্য কি সে কথা, দেব ! সত্য কি সে কথা ?
শিক্ষক। সত্য বৎস! দেবভূমি বটে হিমালয়
সত্যই অমর-কষ্ঠ উথলে সেখানে ;
সত্যই অমর-জ্যোতিঃ আলাে করে দেশ।
কিন্তু মাতৃভক্ত মাত্র পায় দেখিবারে ;
দেব-আত্মা গিরি এই,কামরূপধারী
স্বেচ্ছায় বিবিধ রূপ করে প্রকটন।
সাধারণ জন যদি যায় হিমাচলে,
পাষাণ, মৃত্তিকা মাত্র নিরখে নয়নে ;
কিন্তু পুণ্যবান যদি প্রবেশে এ দেশে,
দেখে সে অমরপুরী পূর্ণ দিবালােকে।
পার যদি মাতৃভাবে জননী ভারতে
পূজিবারে কোন দিন ; সেই পুণ্যফলে
দেখিবে পাষাণ মাত্র নহে হিমাচল ;
নিৰ্বরের ঝরঝরে, পরে মরে,
শুনিবে স্বরগ-গীত ; দেব-আ-আভা
নিখিবে উষালােকে শােভে গিরিশিরে
হেরিৰে অলকনন্দা ধাপ্রবাহিনী,
নহে গিরি-স্রোত মাত্র ; বুঝিৰে তা হলে
|

চিত্র-দর্শন।
১২৫
কেন এ সংসার ত্যজি সাধুজন যত
লভেন বিশ্রাম সদা হিমাচল-ক্রোড়ে।
ছাত্র। অই যে চিত্রের বামে পক্ষ রেখায়
শােভিছে সুন্দর দেশ, কি নাম উহার ?
শিক্ষক। অই পঞ্চনদ, বৎস! এই পুণ্যভূমি,
আর্যদের আদিবাস, সাম-নিনাদিত
কত বেদ, কত মন্ত্র, মাষজ্ঞ কত,
পবিলি। এই দেশ। এই পঞ্চনদে,
হৃদয়-শােণিত ঢালি, বীর পুরাজ
রক্ষিলা ভারত-মান। নিম্নদেশে তার
দেখ রাজপুত্র-ভূমি—মরুময় স্থান;
কিন্তু প্রতি শৈলে তার, প্রতি নদীকূলে,
রয়েছে অঙ্কিত, বৎস! অমর ভাষায়
বীরত্ব-কাহিনী, শত আত্ম-বিসৰ্জন ;-
প্রতাপের দেশ এই, পদ্মিনীর ভূমি।
ছাত্র। অই যে চিত্রের মাঝে, কটিবন্ধ সম,
শােভিতেছে গিরি-রেখা, কি নাম উহার ?
শিক্ষক।
অই বিন্ধ্যাচল, বৎস! উত্তরে উহার
আৰ্যভূমি আৰ্যাবর্ত। উহার দক্ষিণে
ছিল অৰ্য্যের বাস, অরণ্য ভীষণ
ব্যাপিয়া মােন শত আছিল বিস্তৃত,
নিবিড় আঁধারপূর্ণ; সিংহ, ব্যাজ, বুক,
;

১২৬
কবিতা-প্রসঙ্গ।
••
ভল্লুক, মাতঙ্গ, ভীম অজগর সনে
করিত বিহার সেথা। মহাপ্রাণ ঋষি
অগস্ত্য, আৰ্য্যের বাস স্থাপিলা এ দেশে ;
এবে জনপদ কত, পূর্ণ ধনে, জনে,
শােভিছে এ দেশ মাঝে। এই বন-ভূমে
আছিল দণ্ডকারণ্য ; রঘুকুলমণি,
পালিবারে পিতৃসত্য, জটা, চীর ধরি,
কাটাইলা কাল যথা। পুণ্য-প্ৰবাহিণী
গােদাবরী, কল কল মধুর নিনাদে,
“সীতারাম জয় গীত গাইয়া পুলকে
এখনও বহেন সেথা। পবিত্র এদেশ,
সীতারাম-পদ-স্পর্শে, কর নমস্কার ।
(নমস্কারান্তে) গুরুদেব ! কৌতুহল বাড়িতেছে মম,
অতৃপ্ত শ্রবণযুগ, কৃপা করি তবে
কোথা বঙ্গভূমি, এবে দেখান আমারে।
অই বঙ্গভূমি, বৎস! হিমাদ্রি আপনি,
মুকুট আকারে, হের, শােভে শিরােদেশে ;
ধৌত করি পদতল বহেন জলধি ;
নিত্য প্রক্ষালিত, পূত ভাগীরথী-জলে
“সুজলা, সুফলা” “শ্যামা”। তুষারূপে তার
হের অই নবদ্বীপ, শ্রীচৈতন্য যথা
হইলেন অবতীর্ণ ; সাঙ্গোপাঙ্গ লয়ে,
ছাত্র।
শিক্ষক।
!

চিত্র-দর্শন।
১২৭
বিতরিয়া হরিনাম, পৰিত্ৰিল ধরা ;
অমর করিলা জীবে। পশ্চিমে তাহার
দেখ শুকতনু অই অজয়ের কুলে
শােভিতেছে কেন্দ্রবিন্দ্ব, ধরিয়া আদরে
জয়দেব-অস্থি বুকে! নিম্নদেশে তার
সাগর-সঙ্গম অই, পতিতপাবনী
তারিতে সগরবংশ অবতীর্ণ। যথা
মুর্তিমতী দয়ারূপে। পবিত্র এদেশ,
কর প্রণিপাত তুমি; বিধাতার কাছে
মাগ এই বর, বৎস! মাতৃসম যেন
পার পুজিবারে, নিত্য, বঙ্গভূমি-মায়ে।
ছাত্র। বিশাল এ চিত্র, দেব! কৃপা করি তবে
দেখান, দ্রষ্টব্য যদি আরাে কিছু থাকে।
শিক্ষক। আছে শত শত, বৎস! কি বর্ণিব আমি ।
বর্ণিল জীবন কাল না ফুরাবে তবু;
রত্ন-প্রসূ মা মােদের। দেখিয়াছ তুমি
দেব-আত্মা হিমাচল ; পদমূলে তার
দেখ শীর্ণকায় অই বহিছে রােহিণী,
হিমাদ্রি-দুহিতা সতী। তট-দেশে তার
আছিল কপিলাবস্তু, পুণ্যময়ী পুরী
সিদ্ধার্থে ধরিয়া ক্রোড়ে। দেখ বামদিকে,
অর্ধচন্দ্র-কায়া অই জাহ্নবীর কূলে,
;

১২
কবিতা-প্রসঙ্গ।
শােভিতেছে বারাণসী; হরিশ্চন্দ্র যথা,
পত্নী, পুত্রে, আপনার করিয়া বিক্রয়,
পালিলেন নিজ সত্য। উর্ধ দেশে তার
সুনীলবসনা, দেখ, যমুনার কূলে
শােভিছে আগ্রা-পুরী; পতি সনে যথা
পতিসােহাগিনী তাজ * অনন্ত শয্যায়
রয়েছেন বিনিদ্রিতা ; পার্শ্বদেশে তার,
দাঁড়ায়ে সেকেন্যা অই, হিন্দু মুসলমান
উভয়ের পুণ্য তীর্থ ; সমাহিত যথা
মহাপ্রাণ আকবর দেখ শিপ্রাকুলে
অতীত-গৌরবস্মৃতি-শিলা ধরি বুকে,
শােভিতেছে উজ্জয়িনী ;—বিক্রমের পুরী ।
বাজায়ে মধুর বীণা কালিদাস যথা
গাইলা অমর-গীত, ঝঙ্কার তাহার
এখনাে উঠিছে, বৎস! দেশ দেশান্তরে।
কি আর অধিক কব ? সন্তানের কাছে
জননীর প্রতি অঙ্গ তুল্য আদরের ;-
নয়নে অমৃত-দৃষ্টি, কণ্ঠে মধু বাণী,
। সম্রাট সাহাজানের পত্নী মতাজমহল। ইহারই নামানুসারে
ইহার সমাধিমন্দির এক্ষণে তাজমহল নামে পরিচিত হইয়াছে।

চিত্র-দর্শন।
১২৯
হৃদয়ে সুধার উৎস, ক্রোড় শান্তিময়,
করে প্রাণরূপী অন্ন, মহাতীর্থ পদ।
তেমতি জানিও, বৎস! ভারতভূমির
প্রতি গিরি, প্রতি নদী, প্রতি জনপদ,
পুণ্যময় মহাতীর্থ ; আছে বিমিশ্রিত
প্রতি রেণু মাঝে এর, প্রতি জলকণে
সাধুর পবিত্র অস্থি, সতীর শােণিত ;
সামান্য এ দেশ নয়। বহু পুণ্যফলে
জন্মে নর এ ভারতে। কিন্তু চিরদিন
রাখিও স্মরণ, বৎস! কৰ্ম্মগুণে যদি
নাহি পার উজ্জ্বলিতে মাতৃভুমি-মুখ,
বৃথায় জনম তব। কি বলিব আর,
ভারত-সন্তান তুমি, আৰ্য্যবংশধর,
ভুলিও না কোন দিন। করি আশীৰ্বাদ,
ভদ্র হও, ধন্য হও, ভারত-মাতার
হও উপযুক্ত পুত্র।
স্বদেশের হিত
ধ্রুবতারা সম নিত্য রাখি লক্ষ্যপথে
হও, বৎস! অগ্রসর। ভারতজননী
করিবেন শুভ তব আশীৰ্বাদ-দানে।

সাৰ্বসাময়িক বন্দনা।
প্রভাতে ।
সিন্ধুজলে করি স্নান,
পট্টাম্বর-পরিধান,
উদিত তপন অই পূজিতে তােমায় ;
অম্লান-কুসুম-হারা
হিমস্নাতা বসুন্ধরা
বিহগ-সঙ্গীত-চ্ছলে তব গুণ গায়।
মহাজ্যোতি পরশনে,
আনন্দে অধীর মনে,
ঘােষিতে মহিমা তব ধায় সমীরণ।
শিশুকণ্ঠে “মা, মা” স্বরে
অই প্রতি ঘরে, ঘরে
বিশ্বমাতঃ! নাম তব হয় সঙ্কীর্তন।
চরাচরে নব প্রাণ।
তুমিই করেছ দান,
নিখিল ব্ৰহ্মাণ্ড তাই বন্দিছে তােমায়।
পূর্ণ করি জল, স্থল,
ভেদি মহাশূন্য-তল,
প্রকৃতি প্রণব-নাদে” তব গুণ গায় ॥
দেছ মােরে সুপ্রভাত
যুড়িয়া যুগল হাত,
আমিও সবার সনে পূজি ও চরণ।
তব আজ্ঞা শিরে ধরি, প্রণমি তােমায়, হরি।
যাই দিবসের কাৰ্য্য করিতে সাধন।
প্রণব শব্দের অর্থ “ওম”। যােগিগণ বলিয়া থাকেন
ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত শব্দ সম্মিলিত হইয়া, অবিশ্রান্ত
ইত্যাকার ধ্বনি উখিত হইতেছে।

সার্বসাময়িক বন্দনা।
মধ্যাহ্নে।
সংসারের কর্মক্ষেত্র মাঝে
উঠিতেছে মহাকোলাহল ;
যে যাহার নিজ কৰ্ম্ম পানে
ধাইতেছে মহােৎসাহ ভরে।
বিচারক বসি ধৰ্মাসনে,
ধৰ্ম্মরাজ! তােমারি আদেশ
করিছেন প্রচার জগতে।
অধ্যাপক, বসি বিদ্যালয়ে,
জ্ঞানদাতঃ! তব দত্ত জ্ঞান
করিছেন দান শিষ্যগণে।
সার্থবাহ, ভ্রমি দেশে দেশে,
ধনাধিপ! তােমারি সম্পদ
বিনিময় করিছেন ভবে।
কৃষিজীবী, অই ক্ষেত্র হতে,
অন্নপূর্ণে ! তব অম্নবীজ
সযতনে বপন করিয়া,
ফিরিছেন আপন আলয়ে।
কিবা রাজা, কিবা ভারবাহী,
সবে, প্রভাে! তােমারই সেবক ;

১৩২
কবিতা-প্রসঙ্গ।
•
ধাতা তুমি, তােমারই বিধানে
ছুটে জীব যে যাহার পথে ।
ক্ষুদ্র আমি, অকিঞ্চন অতি,
তবু চায় পরাণ আমার
তব আজ্ঞা করিতে পালন।
দেহ, দেব! দেহ তবে মাের
অন্তরেতে বিশ্বাস, ভকতি
বাহুযুগে দেহ, দেব ! বল,
সংসারের কঠোর সংগ্রামে
যেন নাহি হই পরাজিত।
কর, প্রভো! এই আশীর্বাদ
আমা হতে আরাে দীন যারা
যেন পারি তাদের অভাব
যথাশক্তি করিতে মােচন ;
কভু যেন হীনবল জনে
নাহি করি চরণে দলিত।
তব কাৰ্য্য করিতে সাধন
আপনায় ভুলে যাই যেন।
কর্মক্ষেত্র এই ধরাধামে
পাঠায়েছ কৰ্ম্ম করিবারে,
প্রাণপণে পালিব আদেশ ;
ফলাফল জান, প্রভো! তুমি।

সার্বসাময়িক বন্দনা। সন্ধ্যায়। সমাপিয়া নিজ কায, অই ধীরে গ্রহরাজ অবতীর্ণ অস্তাচল-শিরে। সারা দিন তুলি তান, বিভু-গুণ করি গান, পাখিগণ নিজ নীড়ে ফিরে। ধূলি-খেলা হ’ল শেষ, মলিন, ধূসর বেশ, মাতৃক্রোড়ে ফিরে শিশুগণ। পরিশ্রান্ত কলেবর ফিরিছে আপন ঘর, ক্ষেত্র হতে যত কৃষি-জন। সুশীতল পরশনে জুড়াইতে জীবগণে সন্ধ্যানিল ধীরে প্রবাহিত। প্রফুল্ল কুসুম-দল বিতরিছে পরিমল, দশদিক গন্ধে আমােদিত। রজত-প্রদীপপ্রায়, স্নিগ্ধ নীলাম্বর গায় একে একে শােভে তারাদল। পূর্বদিকে পরকাশ চন্দ্রমার চারুহাস, সান্ধ্য মেঘ করে ঝলমল । এ বিশ্ব রচনা যার, পালিয়া আদেশ তার চরাচর সবে আনন্দিত। আনন্দ কুসুমবাসে, আনন্দ সুধাংশু হাসে, আনন্দ সমীরে প্রবাহিত ॥

১৩৪ কবিতা-প্রসঙ্গ। ভাই! জগৎ আনন্দময়, জড়, জীব সমুদয় তুলিছে আনন্দময় তান। সেই আনন্দের স্বর, পূর্ণ করি চরাচর, সুখ নিদ্রা করিছে বিধান। আনন্দময়ীর ঠাই এ সময়, এস, আমরাও করিব গমন। মার কাছে শিশু যথা জানায় হৃদয়-ব্যথা, সুখ, দুঃখ কহিব তেমন। কহিব, “মা! ভব-খেলা খেলিতে পাপের ধূলা লাগিয়াছে, দাও মুছাইয়া। খেলিবার সাথী যারা হের, মা! মেরেছে তারা, পদ্মহস্ত দাও বুলাইয়া । “ক্ষম গাে, মা। অপরাধ মিটাও মনের সাধ, তােমা বিনা গতি নাই আর। “পুত্র বলে কোলে নাও, আনন্দ-অমৃত দাও কর দেহে শকতি সঞ্চার ॥” মা লবেন ক্রোড়ে তুলে, যাব সব দুঃখ ভুলে, প্রভাতে লভিব নব বল । করি আজ্ঞা শিরোধার্য্য, সাধিব মায়ের কাৰ্য, নরজন্ম হইবে সফল ॥ সম্পূর্ণ।

শ্ৰীযুক্ত যোগীন্দ্রনাথ বসু প্রণীত ও সম্পাদিত গ্রন্থ সমূহ সম্বন্ধে বিজ্ঞাপন। কবিতা-প্রসঙ্গ। The Hon'ble Justice Asutosh Mukerjee, M. A. D. L. Vice-Chancellor of the Calcutta University. “I have read the book and inay at once say that some of the pieces are simply exquisite. I studiously avoid reading contemporary poetry, whether English or Indian. But if modern Bengali poetical literature contain bcautiful lines like those written by you, I inust change my opinion." Sir Goorudas Ban-rjee M. A. D. L, Ex-vice. Chancellor of the Calcutta University.- আপনি যে কেবল কবিবর মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবনচরিত রচয়িতা তাহা নহে, আপনি নিজেও একজন সুকবি। আপনার কবিতাগুলি যেমন সুমধুর ভাষা-সৌষ্ঠবে সমলদ্ভুত, তেমনই পবিত্র ভাব-গৌরবে প্রপূরিত। পুস্তক- খানি বালক বালিকাদিগের জন্য রচিত হইয়াছে ; কিন্তু ইহা আবাল-বৃদ্ধবনিতা সকলেরই পাঠের যােগ্য। Dr. Mohendra Lal Sarcar, M, D., D. L., C, I. E. “I have read your book and I am most happy to say that I have read it with delight. Every one of the picces of which the book is composed is so cxcellent, cach illustrating in casy flowing verse some virtue, some tender or ৩০ heroic incident which is not uncommon even in modern Hindu life, some glory of our Past, all worthy of remembrance and imitation, that it is almost impossible to give the palın of excellence to any. I specially prize মাতৃস্নেহ, অনাথিনী, মহারাজ্ঞী ভিক্টোরিয়ার স্বপ্ন, চিত্র দর্শন and সৰ্বসাময়িক বন্দনা।” 31 Sir Romeshchandra Mittra lng. Clief Justice Bengal- “কবিতা-প্রসঙ্গের যতগুলি কবিতা পাঠ করিয়াছি, তাহা সৰ্বাঙ্গসুন্দর বলিরা বােধ হইয়াছে। যথাযােগ্য কাব্য-বিন্যাসে ও প্রাঞ্জল শব্দ ব্যবহারে ভাষা অতি সুললিত ও সুমিষ্ট হইয়াছে। যখন সে রস বর্ণনা করিয়াছেন, পড়িবামাত্রই তাহা পাঠকের মনে প্রতিভাত আমি বিবেচনা করি, যে উদ্দেশ্যে “কবিতা- প্রসঙ্গ” রচিত রচিত হইয়াছে, তাহাতে আপনি কৃতকাৰ্য্য হইয়াছেন।” ৩। কবিবর হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।কবিতা- গুলি বড়ই সুন্দর এবং সুললিত হইয়াছে, এবং বালক- বালিকাদিগের পাঠের সম্পূর্ণ উপযােগী। পুরাজ আলেকজান্নার নামক কবিতাটা আমার আমার বড়ই সুন্দর লাগিয়াছে। এই পুস্তকখানিতে আপনার কবিতা লিখিবার ক্ষমতা বিশেষরূপে প্রকাশিত হইয়াছে।” A. T. Bose esqr. M. A.- It is a beautiful book, beautiful alike in composition and in sentiment, in its selection of subjects and the method of handling them. I know of no work, better calculated to give both pleasure-though that pleasure may sometimes be to the accompaniment of tears -and profitprofit in the highest sense of the term, than this volume of yours, in the field of poetical composition." কবিবর নবীন চন্দ্র সেন—“আপনার “কবিতা-প্রসঙ্গ পাঠ করিয়া পরম পরিতৃপ্তি লাভ করিলাম। কবিতাগুলি বিদ্যালয়ের ছাত্রদের পাঠের জন্য লিখিত হইলেও “কবিতা- প্রসঙ্গ” বঙ্গ সাহিত্যভাণ্ডারের একটা উজ্জ্বল রত্ন। আপনাকে উচ্চ অঙ্গের এক জন গদ্য-লেখক বলিয়া জানিতাম। কবিতাতেও যে আপনি এরূপ সিদ্ধহস্ত আমি জানিতাম না। ছাত্রদের পাঠ্য এমন সুন্দর পুস্তক আমি দেখি নাই। সুন্দর পুস্তকখানি পাঠ্য হইলে দেশের হতভাগ্য ছাত্রবৃন্দ এক সঙ্গে ভাষা, কবিত্ব ও ধৰ্ম্ম শিক্ষা করিতে পারিবে।” Mahamahopaday Nilmony Mukerjee, M. A. Principal Sanskrit College.--- “I have looked at your paui 89754 with great pleasure. The interest your readers feel is enhanched by the vivid and flowing descriptions of striking scenes and incidents in which the different pieces contained in your book abound, as much as by the sweet and mellow diction in which your sentiments are clothed." Babu Umesh Chandra Dutt, B. A., Principal, City College.- "If the object of poetry be to elevate and { ennoble the heart of the readers, the author is a true poet. I do not know whether to admire most his genuine patriotism, his earnest advocacy of purity and morality, or his powers to depict scenes and characters to the best advantage. The book ought to be introduced as a text-book in the schools both for our boys and girls, Babu Bireswar Chattopadhaya M. A. Professor, Sanskrit College.-- "Il breathes soul-elevating thoughts, and gives pictures that, I trust, will dwell long in the memory of your readers. I belicve it is not at all too much to say that you have laid your cuntrymen under a deep debt of gratitude for presenting them with such noble descriptions of the glories of the father-land." শ্ৰীযুক্ত বাবু ক্ষীরাে। চন্দ্র রায় চৌধুরী, এম, এ। —“পুস্তকখানি পড়িয়া পুলকিত হইয়াছি। ছাত্রদের উপ- যোগী এমন কবিতাপুস্তক বাঙ্গালা ভাষায় অতি অল্প আছে। উচ্চনীতি সরসভাবে, জ্বলন্ত ভাষায় এমন সুন্দররূপে বর্ণন করিতে অর কাহাকেও দেখি নাই। ঈশ্ববের প্রতি, দেশের প্রতি, ও জীবের প্রতি ভক্তি অনুরাগ ও প্রেম, মনুয্যের কর্তব্য সমুদয়, গ্রন্থকার এমন বর্ণন করিয়াছেন যে, পড়িতে পড়িতে কখনও চক্ষু দিয়া জলধারা বহে, কখনও উদ্দীপনায় নয়নে স্ফ লিঙ্গ বাহির হয়।

1/০ ৫। বঙ্গবাসী কলেজের প্রিন্সিপাল বাবু গিরিশ- চন্দ্র বসু, এম এ।‘কবিতা-প্রসঙ্গ আদ্যোপান্ত পাঠ করিয়া বড়ই আনন্দিত হইলাম। গ্রন্থকার যে তিনটী নীতি বালক বালিকাদিগকে শিক্ষা দিতে চাহেন, অবলম্বিত গল্প- গুলিতে তাহা সুন্দররূপে প্রতিফলিত করিয়াছেন। বর্ণনা- অংশের স্থানে স্থানে সুন্দর কবিত্বও দেখাইয়াছেন। ৬। শ্রীযুক্ত বাবু অশ্বিনীকুমার দত্ত, এম, এ, বরিশাল।—'কবিতা প্রসঙ্গ’ পুস্তকখানি পড়িয়া বড়ই আন- লিত হইয়াছি। বালকদিগেব হৃদয়ে যাহাতে ভগদ্ভক্তি, পিতৃ-মাতৃভক্তি, জীবে দয়া, স্বদেশ-হিতৈষণা, রাজভক্তি, প্রভৃতি পবিত্র ভাব গুলির উন্মেষ হয়, তন্য বিশেষ যত্ন করা হইয়াছে। এই পুস্তক পাঠে বালকদিগের বিশেষ উপকার হইবে । Babu Ramananda Chattopadhaya. M.A. Editor, Modern Review and প্রবাসী। Of all the Bengali poctical redears that I have seen Kabita Prasanga' seems to me to be the best. It is not il compilation ; all the poems are froin the author's pen, and through all a coinmon purpose runs giving them an organic unity. I do not know what to admire most in the book, the author's picturesque descriptions of nature, his pathetic stories, bis sketches of noble characters, his high patriotism, his ardent philanthropy, bis sublime morality oi his simple child-like picty."

ক Babu Debendra Nath Bose. M. A., Late Principal, Krishnagar College.- "Many of the poems are excecdingly beautiful in conception and thought ; every one of them possesses somc distinction." নব্যভারত। সুনিপুণ কারুকৌশলে গ্রন্থকার যে চিত্র- গুলি অঙ্কিত করিয়াছেন, শিশু তাহা দেখিয়া মােহিত হয়, যুব বিস্মিত হয়, বৃদ্ধের চক্ষে সানন্দ জল-ধারা বহে। গ্রন্থকারের আদর্শ অতি উচ্চ । তাহার কবিতায় বসন্ত-বায়ুর সুখস্পর্শতা, যুথীর কোমল সৌরভ, জ্যোৎস্নার তুষার-কিরণ অনুভূত হয়, হৃদয়ে আনন্দের লহরী উঠে। * প্রত্যেক গৃহে, প্রত্যেক বিদ্যালয়ে এই গ্রন্থের আদর দেখিলে আমরা সুখী হইব। বঙ্গবাসী।—প্রকৃত কবিত্বের চিহু ইহার সর্বত্রই বিরাজ- মান। ভারতবর্ষের প্রকৃত গৌরবে গৌরবান্বিত হিন্দুসন্তান হইয়া জন্মগ্রহণ যে সৌভাগ্যের বিষয় বাল্যকাল হইতেই স্কুলের ছাত্রগণের হৃদয়ে এই সংস্কার বদ্ধমূল করিয়া দিবার প্রয়াস পুস্তকের প্রতি পত্রে লক্ষিত হয় বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। পুস্তকের উদ্দেশ্য যেমন উচ্চ, ভাষা তদনু- রূপই হইয়াছে। সঞ্জীবনী। ইহার প্রত্যেক কবিতাই কবিতা নামের মােগ্য। # পুস্তকখানির একটা বিশেষত্ব এই যে কবি ইহাতে ভারতের যাহা কিছু গৌরবের বস্তু, তাহার অনেকগুলির প্রতি পাঠকবর্গের চিত্ত আকৃষ্ট করিতে সমর্থ হইয়াছেন। * * বামাবােধিনী। কবিতা-প্রসঙ্গের সকল কবিতাই অতি হৃদ্য, ধর্মভাবপূর্ণ এবং দেশ-হিতৈষিতা ও মহাপ্রাণতার উদ্দীপক। কোন কোন কবিতা পাঠে অতি কঠিন হৃদয়ও দ্রব হয়। চিত্রদর্শনের চিত্রটা অতুলনীয় বলিলে অত্যুক্তি হয় না। যদি কবিতা হৃদয়ের হৃদয়স্পর্শিনী ভাষা হয়, কবিতা-প্রসঙ্গের তাহা বিশেষ লক্ষণ প্রদীপ। আমাদের সকলের মধ্যে যে প্রকৃত মনুষ্যত্ব আছে, যাহাকে অনেকে দেবত্ব বলেন, তাহা অনেক সময় সুপ্ত থাকে। কবি ঐন্দ্রজালিকের মত নিজ করস্পর্শে সেই নিদ্রিত মনুষ্যত্বকে জাগাইয়া তুলেন। আমাদের বিবেচনায় এইরূপ সৌন্দৰ্য্য কবিতা-প্রসঙ্গের প্রত্যেক কবিতাতেই আছে।” THE INDLIN MIRROR.-The pieces written on queen Victoria's Dream and the immolation of Dadhichi are all lofty in conception and have a decidedly elevating effect on the readers. THE AMRITABAZAR PATRIKA.-The pieces are delineated in a manner which clearly manifests the poetic genius of the author. মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবনচরিত বিস্তৃত সংস্করণ মূল্য ২• ডাক মাশুল •। সংক্ষিপ্ত সুলভ সংস্করণ মূল্য |• ডাকমাশুল /•| বিশেষ ভাবে ছাত্রদিগের উপযােগী করিয়া সুলভ সংস্করণটি প্রকাশিত হইয়াছে। বাঙ্গালা }

ভাষায় অধিকার লাভ করিতে হইলে মধুসূদনের
গ্রন্থের ন্যায় তঁাহার জীবনচরিতও অবশ্য
পঠনীয়। বঙ্কিমচন্দ্র যথার্থ ই বলিয়াছেন;
“কবির কবিত্ব বুঝিয়া লাভ আছে সন্দেহ নাই; কিন্তু
কবিত্ব অপেক্ষা কবিকে বুঝিতে পারিলে আরও গুরুতর
লাভ । কবিতা কবির কীর্তি, তাহা ত আমাদের হাতেই
আছে, পড়িলেই বুঝিব। কিন্তু যিনি এই কীর্তি রাখিয়া
গিয়াছেন, তিনি কি গুণে, কি প্রকারে এই কীর্তি রাখিয়া
গেলেন, তাহাই বুঝিতে হইবে।
৩০ নং কর্ণওয়ালিস্ ষ্ট্রীট, সংস্কৃত প্রেস ডিপজিটারীতে
পাওয়া যায়।
গ্রন্থ সম্বন্ধে অভিপ্রায়।
AMRITA BAZAR PATRIKA.-It may
compare favourably with some of the best
biographical works of the west.
INDIAN MIRROR. - Like the subject of
the memoir, Babu Jogindra Nath Bose has
immortalised himself by being the writer of the
first biography, properly so called, in the
Bengali Language.
BENGALEE.- It is a noble monument of the
great poet. Every Bengalee, every lover of his
country and his country's literature, should
provide himself with a copy of the Book.

STATESMAN.- In the performance of his
self-imposed task, which we can well believe was
also a labour of love, the author has exhibited
a conscientiousness which would have done
credit to a Gerinan Savant.
সঞ্জীবনী - যিনি এই পুস্তক পাঠ না করিবেন, তিনি
বঙ্গসাহিত্যের একটা উজ্জ্বল রত্নের পরিচয় পাইবেন না।
তাহার বঙ্গসাহিত্যের জ্ঞান অসম্পূর্ণ থাকিয়া যাইবে।
বঙ্গবাসী।-এমন পুস্তক বাঙ্গালা ভাষায় কেন, বােধ
করি, অন্য ভাষাতেও অতি অল্পই থাকিবার সম্ভাবনা।
নব্যভারত।—পৃথিবীর যে কোন ভাষায় এমন গ্রন্থ
প্রকাশিত হইলে দেশবাসীর গৌরব হয়।
হিতবাদী।-মাইকেলের সৌভাগ্য যে, তিনি যােগ
বাবুর ন্যায় জীবন-চরিত লেখক পাইয়াছিলেন।
মহারাজা সার যতীন্দ্রমােহন ঠাকুর।-“আপনার
এই গ্ৰন্থ অনেকাংশে অপূৰ্ব ; ইতিপুর্বে বা ইহার পরে এরূপ
জীবন-চরিত বঙ্গভাষায় প্রকাশিত হয় নাই।
RAJNARAYAN BOSE. It is destined to
be as immortal as the principal productions of
the poet himself.
নবীনচন্দ্র সেন।- এমন সর্বাঙ্গসুন্দর জীবন-চরিত
বাঙ্গালায় কখনও বাহির হয় নাই। ইহাতে আপনি কি
শক্তি, কি ক্লেশসহিষ্ণুতা, কি উদ্যম দেখাইয়াছেন, তাহা যিনি
এই অপূৰ্ব্ব জীবন-চরিত পড়িবেন, তিনিই বুঝিতে পারিবেন।

০ ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। চরিতবর্ণনের গ্রন্থরচনায় কোন ব্যক্তি, কোন ভাষায় আপনার অপেক্ষা কৃতিত্ব দেখাইতে পারিয়াছেন বলিয়া আমার জানা নাই। কালীপ্রসন্ন ঘােষ। আপনার পুস্তক, সর্বাংশে, বাঙ্গালা সাহিত্যের ক্ষেত্রে এক দিকে একখানি আদর্শ পুস্তক হইয়াছে। চন্দ্রনাথ বসু। এমন প্রাণপণে, এরূপ সরল ও বিশুদ্ধ মনে, এদেশে এপর্যন্ত, কেহ কাহারও জীবন-চরিত লেখে নাই। শ্রীশিবনাথ শাস্ত্রী। কবিবর মধুসূদন যেমন কবিতা- রাজ্যে নবতাব ও নবশক্তির অবতারণা করিয়াছিলেন, তুমিও তেমনি জীবন-চরিতের নূতন প্রণালী প্রবর্তিত করিয়া বঙ্গ- সাহিত্যে কীর্তিস্থাপন করিলে । আপনি যদি এতদিন এই গ্রন্থখানি পাঠ না করিয়া থাকেন, তবে আমাদিগের বিনীত অনু- রােধ, ইহা একবার পাঠ করুন। বাঙ্গালা সাহিত্যে কি একখানি সুন্দর গ্রন্থ আছে, আপনি তাহার পরিচয় পাইবেন । যােগীন্দ্র বাবুর সমস্ত পুস্তক ৩০ নং কর্ণ- ওয়ালিস্ ষ্ট্রীট, সংস্কৃত প্রেস ডিপজিটরীতে পাওয়া যায়।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Kabita-prasanga Ed.9

Author
Bose,jogindranath
Title
Kabita-prasanga Ed.9
File name
Kabita-prasanga Ed.9
Text
OCR done
Citation
1911
Published
2010/04/29
Publisher
Sanskrit Press Depository,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
162
Library
Dipsikha Library, Howrah
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Bose,Jogindranath
DLI number
514836
Barcode
4990010016777.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
K4JiwZ7FXuA
Download PDF

Kabita-prasanga Ed.9