Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Ritu Mangal Ed. 2nd

Roy,kalidas · 2009/11/29

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

H
তুল
দ্বিতীয় সংস্করণ।
=ালিস ।
ভবানীপুর, কলিকাতা।

শ্রীসতীশচন্দ্র ঘটক, এম, এ, বি, এল,
সম্পাদিত
২৪ নং কলেজ স্ট্রীট মার্কেট, বরদা এজেন্সী হইতে
শিশিরকুমার নিয়ােগী এম, এ, বি, এল, কর্তৃক
প্রকাশিত।
আষাঢ়, ১৩৩৩।
১৬নং টাউনসে বােড়, ভবানীপুর,
“কালীতারা, প্রেস” হইতে
অপশুপতি বসু কর্তৃক মুদ্রিত।

উৎসর্গ ।
সন্ধ্যাতারার কবিরশ্রণ।
মহারাজ !
আপনার সাধের ঋতুমঙ্গলের দ্বিতীয় সংস্করণ হইল।
আপনি আজ ইহলােকে নাই! যাহা আপনার আনন্দে
চন্দনাক্ত হইতে পারিত—আজ তাহা আমার অশ্রুতে
লবণাক্ত। সন্ধ্যাতারার পানে চাহিয়া আজ কৃতাঞ্জলি
নিবেদন করি, হে সন্ধ্যাতারার কবি, ভক্তের এই অশ্রুময়
অর্ঘ্য গ্রহণ করুন। ইতি
।
আপনার সভার দীন নগণ্য কবি
কালিদাস।

গ্রন্থকারের অন্যান্য পুস্তক
১। পর্ণপুট, ১ম, ১ ৫। রসকদম্ব (কমিক), lio
ঐ ২য়,
৬। জাঞ্জলি, ॥
৩। বল্লরী,
৭। ক্ষুদকুঁড়া, ৩, ৬•
৪। ব্রজবেণু, দ
৮। কাব্যমঞ্জুষা, ৫০
৯। মণিমাল্য, ১১
বরদা এজেন্সী, কমলা বুক ডিপাে ও অন্যান্য
প্রধান প্রধান গ্রন্থালয়ে অনুসন্ধা।

ঋতু-মঙ্গল

কবিগুরুর আশীর্বাদ
তােমার কবিতা বাংলা দেশের
মাটীর মতই মিঞ্চ ও শ্যামল ।
বাংলা দেশের প্রতি গভীর
ভালবাসায় তােমার মনটি
কানায় কানায় ভরা, সেই
ভালবাসার উচ্ছলিত ধারায়
তােমার কাব্যকানন সরস
হইয়া কোথাও-বা মেহর
কোথাও-বা
প্রফুল্ল হইয়া
উঠিয়ছে। তােমার এই কাব্য
গুলি পড়িলে বাংলার ছায়-
শীতল নিভৃত আঙিনার তুলসী-
মঞ্চ ও মাধবী-কুঞ্জ মনে পড়ে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

ঋতুলক্ষম
নিদাঘে তােমার রুদ্রাণীরূপ, ইন্দ্রাণী বরষায়,
শরতে শুভ্রা বাদেবী তুমি, ভাস্বর তব কায়।
শ্যাম হেমন্তে কল্যাণী রমা, অন্নপূর্ণ। শীতে,
প্রেম-বসন্তে ফুলধনু রচ’ রতিরূপে অটবীতে।
এক চোখে হাসি, আর চোখে ধরা, মেযে-রচা তব বেণী,
অশেষ শ্যামল বাসবিস্তারে শ্যামলা যাজ্ঞসেনী ।
“পদাঘাত তব, শুষ্কশাখায় অশোকের বিকাশক,
সীধু-গঙুষে বকুল বিলসে, আশ্লেষে কুরবক।
পরশে তােমার ফুটে প্রিয়ঙ্গু, মন্দার মধুভাষে,
বদনমারুতে চুমঞ্জরী, চম্পক মৃদু হাসে;
সঙ্গীতরসে নমের বিকসেনটনে কর্ণিকার,
তিলক কুসুম পুলকে শিহরে—দৃষ্টির উপহার
হন্তে তােমার লীলারবিল, কুন্দ অলক পরে,
লাে-পরাগে গণ্ড তােমার পাণ্ডুর শােভা ধরে,
চূড়াপাশে তব নব কুরবক, শ্রবণে শিরীষ-দুল,
চারু সীমন্তে পুলকাঞ্চিত ােভে কদম ফুল।”
মটুপদরুত ষড় রাগে তব লীলাহিন্দোল দোলে,
মৃত্তিকা পরে কৃত্তিকা তুমি ষড়ানন তব কোলে।

No text on this page.

নববর্ষের প্রার্থনা
নবীন বরষ, তােমার কাছে নবীন জীবন যাচি,
আঘাত করে বাঁচাও, মােরা মরার কাছাকাছি।
। হাতে ঐ চক্র রাজে,
অন্যে অভয়-শখ বলে,
মধুক্ষরণ কছে তােমার ভালার মালাগাছি।
কিসলয়ের কস্তু বুকে আশার বাণী আনাে,
ঝরা পাতার পাহাড় চূড়ায় বজ্ৰ তােমার হাননা।
লতা তড়াগ কূপে
জীবন যােগাও চুপে চুপে,
মেঘ-মৌচাক নিঙড়ে ছড়াও উড়িয়ে মৌ-মাছি।
তড়িৎ-কেতু উড়িয়ে তােমার আসছে ঝড়ের রথ,
বজ্রে মাদল বাজছে, ধূলায় পূর্ণ তােমার পথ।
দর পীড়ক বৈরী যারা
দৈবভয়ে মরুক তারা,
মাভৈঃ মাভৈঃ শুনে মােরা তাথৈ তাথৈ নাচি।

বর্ষবরণ
এস—ভারতবর্ষে নবীন বর্ষ, নবীন হর্ষ দিতে।
শত-ভরা ঘটে তােমা ধরাতটে আজি বরি হে নবীন মিতে।
দেশের আশার দীপের দশায়
মেহ বরষিবে, আছি ভরসায়,
প্রাণেপ্রেম-কল্যাণ-প্রেরণা জাগাও বিশ্বমানব-হিতে।
এসে-ভরে দাও তুমি সুরভি হিরণে বনভূমি, মননভূমি,
দাও—হরিচন্দনে ভরি এ শুন্য মিলনের ডাের তুমি।
কোষ বিদারিয়া শিমুল-তুলায়
ঝরাও যেমন পথের ধূলায়,
যত-লালসা জড়তা উড়াও তেমনি যা আছে মােদের চিতে।
তবসােনার স্বপন ফুটুক চাপায়, অশােকে অশােক-বাণী,
তিত-নিম্বতও মিঠে হােক দিয়ে পুষ্পিত ছায়াখানি,
উজলি অশথদারু-কঙ্কাল,
জাগাও যেমন পেলব প্রবাল,
নব-সুষমা তেমনি জাগাও দেশের শীর্ণ অঙ্গটিতে।
কাল-ঝঞ্চার ঘায় জঞ্জালজাল উড়াও এবার আসি,
বােষে-পুড়াও ব্যাধির বিষবিসর্প মাৰিবীজ রাশিয়াশি।
দ্বন্দ্ব দ্বেষের বিষকীট যত
তব রথতলে হােক সব ইত,
দাও—অ-সুরে নাশিয়া কল্যাণ’-সুর মহামিলনের গীতে।
=
৪

ঋতুসংহার ও মানসম্ভব
মত্ত করি করভকে,
ফুল্ল করি’ কুরবকে,
বসন্ত আসল চারিদিকে;
• এক পাত্রে মধুব্রত,
প্রিয়। সহ পানে রত,
কানন ভরিল শুকপিকে।
রুধিয়া ইন্দ্রিয়গণে,
উপবেশি’ যােগাসনে,
মগ্ন তুমি মহাসাধনায় ;
কর্ণে কর্ণিকার-দুল,
গলে দুলে বনফুল,
উমা তব অৰ্ঘ আনে পায়।
সহসা ভাঙ্গিল তপ,
জ্বলে গেল দপ, দপ,
অকস্মাৎ তৃতীয় নয়ন ;-
ওঙ্ক পত্র মর’-মর’,
আসিল নিদাঘ খর,
স্ম হলাে মরকেতন।
বহ্নিকুণ্ডমধ্যগত,
উমা তপস্যায় রত,
সূৰ্য্যপানে রাখি দুই আঁখি ;
তরু-পর্ণ হিমবারি, তােমা লাগি তাও ছাড়ি,
অস্থি চর্ম আছে তার বাকী।
।
বরিষার বারি ঝরে,
জীর্ণ ধরণীর পরে,
চাতকীর দীর্ণ কণ্ঠ মাঝে ;-

ঋতুমঙ্গল।
তপশীর্ণ গিরিজারে,
তুমি এলে ছলিবারে,
মেঘবদ্রে নবছদ্মসাজে।
জলভরা টল মল,
আঁখি তার ছল ছল,
পল্লবিত পুলক অঙ্কুর।
শতগুণে কান্তি তার
উপচিত পুনৰ্বার,
সৰ্ব্বদাহ জ্বালা হলাে দূর।
আসিল শরৎ সিত, আমােদিত আলােকিত
কৌমুদী কুমুদী ফুল্লকাশে,
শুদ্র কৈলাসের 'পরে
লীলা-শতদল করে
গৌরী আজি হাসে তব পাশে।
সুরভি লহরী ঠেণি, অবিশ্রান্ত জলকেলি,
রচে নীন মেখলা সুন্দর।
মরকত শিলা মাঝে
উমার নুপুর বাজে,
সিংহ পায়ে দুলায় কেশর।
মধুর সঙ্কোচ ঘিরে
৪
হেমন্ত আসিল ধীরে,
শেফালির আরক্ত বয়ানে।
পাণ্ডুর বদন খানি
তুলিয়া তােমার রাণী
চাহে নৰ্ম্মবিমুখ নয়ানে;
গর্ভা শালিসমা
অন্নপূর্ণা মনােরমা,
দোহদ-লক্ষণ সারা গায়।

চিরমিলন
পল্লবিনী অঙ্গলতা,
পীণশ্রেণিরানতা,
আকম্পিত লজ্জায় কুণ্ঠায়।
D
শীত এল পথে ঘাটে, স্বর্ণ শস্য মাঠে মাঠে,
শঙ্খ বাজে উটজ-প্রাঙ্গণে।
লাজ-বৰ্ষ গেয়ে গেছে,
নবহর্ষ দেহে দেহে
রােমাঞ্চ ফুটায় ক্ষণে ক্ষণে।
হলুদ কাজল মাখা
দুকূলেতে আধ’ঢাকা
কুমারে সে কোলটি উজ্জ্বল
উমা হাসে তব পাশে,
তােমার নয়নে ভাসে
শিশিরা আনন্দে উচ্ছল।
িিমলন
নিদাষে তােমারে, স্বামী, কেমনে ছাড়িব আমি
বধি’ মাের চিত্ত-চাতকীরে ?
ও চরণছায়া বিনা
কেমনে বাচিবে দীনা
দাহ সহি’ ভিতরে বাহিরে ?
পাখাখানি ধরি করে
বসিয়া শিয়র’পরে
কর বঁধু যদি না ব্যজন,
শীতল আঙুল গুলি না বুলালে রসতুলী,
জ্বলে যাবে বিনিদ্র নয়ন।
৭

ঘন ঘাের বরষায়
বিরহ কি সহ যায় ?
ও কথা কমােনা প্রিয়তম,
দুর্যোগ আঁধার রাতে বিশ্বসাথে ঝঞ্চাবাতে
কাপিয়ে দীপশিখা সম।
গৃহখানি নিরজন
শুনি মেঘ গরজন
আতঙ্কে যে শিহরিবে কায় ।
দূরে যদি নহ তুমি, কাহারে আঁকড়ি চুমি
অভয় লভিব বল হায় ?
শরতের দিনে প্রভু ছাড়িতে কি পারি কভু ?
বিশ্ব গায় মিলনের সাম,
কোটরে নিকুঞ্জে নীড়ে নীরে তীরে গিরিশিরে,
কোথাও না বিরহের নাম।
উৎসব-বাঁশরী বাসে গেহে গেহে হিয়া মাঝে,
সবে চুমে প্রিয়ের বয়ান,
জনগণ কোলাহলে
মায়ের দেউল তলে
মাের কিগাে হবে বলিদান
হেমন্তের দিনে বঁধু
হে মাের জীবন-মধু,
তােমারে ছাড়িব কোন্ দুখে ?
শ্যামে ভরে যাবে ধরা রাসে বিশ্ব রসভরা,
মােরি শ্যাম রহিবেনা বুকে ?

চিরমিলন শেফালি পড়িবে ঝরি, , আমি বা কাহারে ধরি ? দুৰ্বাসম হবে মাের দশা। নন-কমলে মাের দলিবে নীহার-লাের। হিমে কান্ত একান্ত ভরসা। , ৫ হে নাথ শীতের দিনে বাঁচিব কি তােমা বিনে ? কেবা দিবে আশা তাপ আলাে ? হে মাের অরুণ নব, করুণা-কিরণ তব মুখে চোখে যদি নাহি ঢালাে, ভালে গণ্ডে উষ্ণশ্বাস তপ্ত চুমা বাহুপাশ বিনা আর স্বাচিৰ কি হয় ? 'ও হৃদি-কুলায় ছাড়া পাখী হবে প্রাণহার, পালক উড়িবে আঙিনায় । বসন্ত-বাসরে, সখে মল্লীচম্পা-কুরবকে গাবে অলি মিলনমঙ্গল। তুমি যদি কাছে রহি ব্যাকুল কামনা সহি এযৌবন না কর সফল, এত যদি কর ঘৃণা, কি গতি আমার, বিনা দীঘির গভীর কালােজল। কোকিলমরিবে কেন? আমারে পাঠায়ে যেন পত্রপুটে ফণীর গরল। "৯

নিলাম
মধুযামিনীর মদনােৎস-সভামণ্ডপ ছাড়ি?
ধূলিঝায় বর্ষশেষের ধুলােট-যাত্র। সারি,
ও অশােক পলাশ পুষ্প দলিয়া বিদায়-পথে
সাথে অনঙ্গ, বীণা, মৃদঙ্গ, ‘মধু’ ফিরে যায় রথে।
আর পথ দিয়া আসিছে নিদাঘ গিরি মরু উত্তরি’
বাহারের রেশ নাহি হতে শেষ তােড়ী ভৈরবী ধরি,
অঙ্গে ছায়ার উড়নী জড়ায়ে, সঙ্গে দয়িতা তৃষা,
মরীচিকা বিভা বিচ্ছুরি’ কিবা উজ্জলি’ দশ দিশা।
বনের বিরহ ফুটিছে আজিকে নিম্বের তিত ফুলে,
তরু-মৰ্ম্মের মর্মর সুরে ঘুঘুর কণ্ঠ-মূলে।
মাধবী স্মৃতিরে জাগায় এখনাে ফুলহীন মালাডের
থ ভূষাবেশ, ফাগে রাঙা-কেশ, ভাঙা গলা, নেশা-ঘাের
মুদিয়া আজিকে ‘রজনী-জাগর-রাগ-কষায়িত’ আঁখি,
দুলিয়া পড়েছে তরুণ তরুণী তরুমূলে শির রাখি।
উদ্যানিকার কৈশোের গত-যৌবনে তনু ভরা,
মুকুলিতা লতা শ্রেণিভারনত আজি বনমনােহরা।
স্তনে সুধারস লভেছে সহসা নারিকেলকুলবধু,
হলে তা শাখার মধু-ভাণ্ডার যা ছিল বৃন্ত-মধু ।

বর্ণ-ছটার বিলাসে লালসা ত্যজেছে কুসুমতী,
রূপ চেয়ে যশে গৌরব ভেবে সৌরভে তার রতি,
খোঁপায় মালতী, হাস্যে চামেলি, মুখে গুঞ্জন ভাষা
এলা-বাসভরা বেলা-বাস পরি মিটায় নাসার আশা।
শুধু নাসা কেন? সব ইন্দ্রিয় খুসী হয় পলে পলে,
চম্পক-করে ঝঙ্কার-মধু-পরিবেষণের ফলে।
কাননিকা বালা প্রবাল-ভূষায় খুসী তত নয় আর,
পরেছে রঙ্গে সকল অঙ্গে-কনক অলঙ্কার,
মুকুলে লজ্জা ঢাকেনাক আর, দুকুলের প্রয়ােজন,
গহনে গহনে বয়ন-কলার তাই এত আয়ােজন,
পেয়ারা-কুসুম পশম যােগায় বাবলা, রেশম-গুটী
শিরীষ-কেশর যােগায় তসর, বাকীটা, শিমুল শুটী।
কিসলয়ে ছিল যে লঘু মাধুরী ছায়াতে তা ঘনায়িত।
অণ্ড-সুপ্ত সঙ্গীত আজি বনে বনে ঝঙ্কৃত।
মধুমাসে মধুমক্ষিকাগুলি মধু-উৎসবে মাতি,
মধু-চক্রটি রচেনিক, মধু পিইয়াছে দিবা রাতি,
আজিকে তাদের চেতনা হয়েছে, নাই তাই অবসর,
সঞ্চয় তরে মাধবী-মঞ্চে রচে ভাণ্ডার ঘর।
দূর দিগন্তে গত বসন্ত, কোকিল তবুও ডাকে,
বকুলের বনে, মাঝে মাঝে ঘন তমালের ফাঁকে ফাঁকে,
রতিপতি বুঝি ঋতুপতি সাথে জিনিয়া দুনিয়াখানি,
রেখে গেছে তারে নকীব করিয়া ঘােষিতে বিজয়।
১১

৮
'।
কে ওই ললনা লতামণ্ডপে নলিনীর শয্যায় ?
ঢালে সখীগণ হরিচন্দন-পল্লব-রস গায়,
আজ নাহি ভয়, লাজ-অভিনয়,—গিয়াছে সজ্জার,
উশীরপঙ্ক, পঙ্কজরজঃ অঙ্গে বিলেপ তার।
কুমুদের মালা, মৃণালের বালা, অগুরুপত্রলেখা
হয়েছে ভূষণ, শােভে দেকণ-মুকুতায় বলি-রেখা।
শিরীষে রচিত অবতংসটি কর্পোৎপল দুটী-
গণ্ড-তাপের ‘চণ্ড প্রতাপে ঝলসিয়া পড়ে
শিলার পটে লুটায় ললনা, তেয়াগি খট্টা-সুখ,
কদলীকা গণ্ড পীড়িয়া জুড়ায় তাপিত মুখ ।
রুনুঝুনু ধ্বনি ‘হংসকে তুলি হংস-কাকলি জিনি,
স্বচ্ছ শুভ্র মর্মর বুকে, পদ ফেলে গরবিনী,
শিলা-কুটিম অই চরণের চুমিয়া লাক্ষারস,
পিত উরসে জুড়ায়ে, যেন সে শিঞ্জনে গাহে যশ ।
শামা তরুণীর শিথিল ললিত সুশীতল তনুলতা
অশিথিল পরিরম্ভে শিহরি লভিছে সার্থকতা।
{
প্রিয়ার নয়নে অমৃতাঞ্জনী প্রিয়ের শীতল চুম
গ্রীষ্মকাতর জ্বালাময় চোখে আনে স্বরগের ঘুম,
লুলিত অঙ্গ ঢলে ঢলে পড়ে, ঋলিত মেখলাহার,
কিয়ে-চান্সবল মেখলা ধরে ফেলে বারবার।

ঘি।
ব্যজনে নিরত দয়িত, প্রিয়ার সুপ্তি-শিহর’পরে,
শৈত্য-পরশে শিহরি প্রেয়সী আঁখি মেলি লাজে মরে।
ইন্দ্রনীলের মত চিকন চারু তরঙ্গ তুলি
কুজনফুল্ল স্ফীত কম্পিত কপােত-কষ্ঠ গুলি
স্তম্ভ শিখরে মণ্ডলী রচি ধারাযন্ত্রের পাশে
অভিমানিনীরে করে চঞ্চল নিষ্ঠুর পরিহাসে।
আজি এ নিদাঘে অচ্ছেদকূলে তাপসের পরাজয়,
একাবলী সাথে অক্ষমালার হয়ে যায় বিনিময়।
এলায় দুকুল বনবালাকুল গিরিগরিতের ঘাটে,
ভুলিয়া, মৃগয়া যুবরাজ তায় অস্থির বন বাটে।
হেমমরালের কমলগন্ধি পক্ষতাড়িত বারি
বক্ষে লভিয়া বিরহ জুড়ায় কোন্ বিদর্ভ-নারী ?
যমুনার জলে সন্তরে গােপী অন্তুর-দেহদাহে,
মিছে দেরী করি সন্ধ্যায় বরি’ পরাণ জুড়াতে চাহে।
যমুনার ঢেউ শতবার ঘুরে আঘাতি উরােজতটে,
তবু ঘটভ হয়নাক ত্বরা, এমনি জ্বালাই বটে।
ফুলদোললীলা ইয়াছে শেষ, বনে বেণু নাহি গায়,
সলিলদোলের আসিয়াছে দিন লহরী-হিন্দোলায়।
মন্দাকিনীতে তরী বেয়ে আজ দেব এসেছে নামি,
ডুবি আকণ্ঠ মানস সরসে সন্তরে দিবামী ;
ভােগৰতী হতে নাগবালা উঠে মিলে যায় তার সাথে,
জলকেলি করে কমলের বনে ধরি তার দুটী হাতে।

ঋতুমল
{
প্রিয়ার কণ্ঠে শােভে ত্রিকণ্ঠী বন্ধুর-পথে লুটে,
যেন মৰ্ম্মর-সােপানে সােপানে রােহিতের শ্রেণী উঠে
আলুলিত তার কুন্তল ভার যেন শৈবালরাশি,
মৃদুহিল্লোল রচেছে বিলােল ভঙ্গিমাময় হাসি।
খেলিছে শফী কেলিচঞ্চল ইন্দীবরের পুটে
কনক-কুম্ভ দুলে তরঙ্গে-পদ-কোকনদ ফুটে।
বাহুর মৃণালে মরাল-কুজনে ভূ-শিঞ্জন বাজে,
কৌমুদীসম গৌর বরণ উজ্জলি’ তনু রাজে,
যৌবন-তটে বাঁধা লাবণ্যসরসীর হিম জলে,
নিদাঘ-নিশীথে ঝাপ দেয় কবি অবগাহনের ছলে।
মিঠা সরবৎ নিয়ে আয় সাকী তরমুজ-রস ছানি,
আন্ বেলােয়ারী পিয়ালায় ভরি নিঙাড়ি আঙুর-পানি।
‘বিমেনের এল দারুচিনি দিয়ে রচি’ আন্ তাম্বুল,
“হদ্রমঠের’ কস্তুরীবাসে দীল কর মসগুল ।
‘বসােরার’ যত পশারিণী আজ গুলনার বাগ থেকে,
গুলের সঙ্গে আন বুলবুল বুকের কঁচুলী ঢেকে।
উড়ায়ে ওড়না আসমানীরঙা, গুলাবে সিনান করে,
আয় আয় বাঁধ ওমানের চারু মুক্তামালার ডােরে।
দশ-শত-এক আয়েষা লয়লা কাসিদা গজল’ গানে,
নবনব রাগে আজি এ নিদাঘে ‘ত করে দে’রে প্রাণে।
১৪

নিদাঘ
মেহেদীপাতায় রাঙায়ে নখর চুয়া-রসে ভুরু আঁকি,
নিয়ে রূপযশ, খসখসখােসবাে বসনে মাখি,
সকল অঙ্গে আনারের শােভা, আয়লাে আনারকলি,
কোমরে চামর, নয়নে গুমর, হাজার কলিজা দলি'।
“গুটাও গালিচা জরূদা-জরীন, পর্দা ফেল’রে টানি,
ছিটাও চামেলি, পিচকারী ভরি ছুটাও গোলাপী পানি।
ফুল-ভাণ্ডার মন্থন করি সারা বসন্ত ধরে
জমা করিয়াছ যতেক আতর ছড়াও এ ঘর ভরে।
খুলে দাও আজ শীষমহলের বােরখা বরােখা গুলি
চন্দ্রমাতলে কালিন্দীজলে লীলাতরী দাও খুলি।
সুর-সরােবর-সােপানে লভরে শীতল শয়নসুখ,
হামামে হামামে খােল’ ডানে বামে তামাম ফোয়ারামুখ
এ নিদাঘে তব কুণ্ঠার অবগুণ্ঠন দাও ফেলি
কর পরকাশ সুষমাবিলাস লাজ পেশােয়জ ঠেলি।
এলাইয়া দাও বেণীর বয়ন-নীবিবন্ধন ভাের,
কি হবে ভাবিয়া ? সুড়ঙে সুড়ঙে শুর-সুন্দর’-চোর।
মরু-নিঝরে ইরাণী রূপসী ভরি লয়ে হেম ঝারি,
তরুণ রাহীর অঞ্জলি’পরে ঢালি দাও হিমবারি;
চালাে ধীরে ধীরে ওগাে সুন্দরি, করপুট দরপণে
ফুটুক ওযুখবিশ্ব, সে জল মিঠে হােক্ চুম্বনে।

অসহ কবচ আজিকে অঙ্গে করিয়াছে পরকাশ,
উষ্ণীষ আজি করেছে প্রকট কুঞ্চিত কেশপাশ।
উড়নাক রথে কেতু পথে পথে, রণ অভিযান শেষ
নাগরের বেশ ধরেছে যােদ্ধা, তেয়াগি সমরবেশ।
অশ্ব পশেছে মন্দুরা তলে, ভেঙেছে স্কন্ধাবার,
অর-পরাভূত শূরগণ আজি বন্দী যে প্রেমিকার ।
ধুয়ে মুছে ফেলে রণ-ধূলিমল নর-শােণিতের দাগ,
ধনু ত্যজি আজি বেণুতে ধরেছে মেঘমল্লার রাগ।
প্রিয়ার হসিত গণ্ডের কূপে ডুবিয়া মরিবে বীর,
ললনার প্রেম-পরশে ঘুচাবে ললাটের শম-নীর।
সঙ্কোচ লাজে ছিল ধর-বধূ শিশিরে বেপথুমতী,
মধুমাসে প্রিয়-পরশ লভিয়া হলাে রােমাঞ্চবতী।
আজি তার বিধুললাটে বঁধুর উষ্ণ-শ্বসন পড়ে,
রভস-তপ্ত চুম্বন তার-মধুর বিশ্বধরে।
কিছুদিন গেলে তনু স্বেজলে অবশ হইবে তার,
অভিমানে চোখে বারি বরষিতে হবে তবে অধিকার
তারাদীপে ভরা সুনীলাম্বর-চন্দ্রাতপের তলে
রচিত আজিকে কবির শয্যামল দূৰ্বাদলে!
জ্যোছনা ধারায় পরাগ-ঝোরায় কুঞ্জে করিয়া গান
বেঁচে রয় কবি ‘চন্দ্রকান্তমণি-জল করি পান।
পূৰ্ব্ব পুণ্যে যদি বা ইন্দ্র দিতে চাহে আজি বর,
যেচে লয় কবি কদলী-বিতানে তবে একখানি ঘর,-
G
৫

তুষার-প্রাচীর, উশীর-ছাউনি, চন্দন কাঠে গড়া,
শীত মর্মরে কুমিরচা, কমলগন্ধে ভরা।
ডান হাতে তব চাম-ব্যজনী, বামে ঘট ভরা বারি,
নিদাঘের দিনে দেবী হয়ে তুমি এলে কল্যাণী নারী,
তৃষ্ণার ছল করি মা কেবল কাছে কাছে আমি রই,
সাধ যায় তব কুম্ভের মুখে আস্রের শাখা হই।
তৃষিত তরুণ তরুগণে তােয় পান না করায়ে নিতি,
নিজে জল পান করােনা রমণি, এই তােমাদের রীতি।
তরু আলবালে ভরি দাও আজ রসধারা বারবার,
শাখায় শাখায় ফুটিবে ফলিবে আশিস পুরস্কার।
প্রাঙ্গণ পরি পরিজন-তরু, ঝলসিছে তার পা,
প্রান্তর পরে পান্থের তরে কে অই পুড়ায় মাথা ?
মূর্তা করুণ আর্ত-তারিণী মর্ত্য-দেবতা নারী,
ঝারি হাতে ঢালি দাও তাহাদের ঝারার গল্প বারি।
হিন্দু নারী দেবী কিনা আজি বুঝে প্রত্যয়হীন,
আর বুঝে বট অশথের মাঝে দেবতা যে আছে লীন।
সন্ধাবেলায় সিন্ধু বেলায় বালুকা খুড়িয়া আজি
হেলায় খেলায় রাতি বেড়ে যায় গণিয়া লহরী রাজি।
কোটি কোটি মণিজ্জেলষণ ফণিরাজগণ সম
চল তরঙ্গ আছড়িয়া পড়ে হরিয়া তটের তম।
হ-হু-হুই হাওয়া, শরীর মনের বসন তাহাতে উড়ে
ব্যসন-বাসনা দূষিত কামনা যায় সব য় দূরে।

হেথা আসে বায়ু বহে নিয়ে আয়ু অমৃতের দেশ থেকে,
শ্বাসযন্ত্রের কুহরে কুহরে জমা করে যায় রেখে ;
ছিড়ি রথকেতু করে প্রতিহত নিদাঘের অভিযান,
পবন বাণে যে ব্যর্থ তাহার প্রবল অগ্নি-বাণ।
শুনি তরঙ্গগজতুরঙ্গ-হেষাবৃংহণনাদ,
দূর হতে ভয়ে নিদাঘ পলায় মনে গণি পরমাদ।
গন্ধ-বহ-ত নহৈ হেথা বায়ূ নয়নে তাবহ,
অসীম-লােকের সন্দেশ আনে ত্রিদিব-স্বপ্ন সহ।
সন্ধ্যার উপনিবেশে হেথায় বন্ধুর পাদ মূলে
সবে গৃহ ভার ইহ সংসার প্রহরের তরে ভূলে।
নাগর নাগরী জুটে, পরিহরি নগরের উপবন,
উৰ্ম্মি-দোলায় দুলে দুলে তুলে ফেন-ফুল অকারণ।
কোটি কোটি সিত ফেনিল চামরে ব্যজনের স্নেহদানে,
বিতরে শান্তি সিন্ধু তাহার শরণাগতের প্রাণে।
কলকল্লোল-তালে তালে তার অন্তর নাচে যবে,
স্বর্গ দুয়ারে ঐরাবতে সে আরােহণসুখ লভে।
ত্তিলােক রমার মণি-দর্পণশুদের স্বচ্ছ নীরে
ডুবিয়া তপ্ত রবিবিটি আসিতে চাহেনা ফিরে।
অঙ্গ এলায়ে শান্ত তাপিত পান্থ, অশথ ছায়
উম্মনা আজি অলস পবনে, যাত্ৰা ভূলিয়া যায়।
আজি জীবলােক তারা বরষের কর্মের ফুল ফলে,
স্মৃতি রােমন্থ করে আঁখি মুদি, নিদাঘের ছায়াতলে।
৫
৪
১৮

নিদাঘ।
মােহনার মুখ শুকায়ে তটিনী পারাবারে ছাড়াছাড়ি,
বারিধির জলে পড়েছে মকর নদীতে মকরী তারি।
দিবাদাবদাহ মিলনের বাধা, চীৎকারে চখচখী,
আজি ব্যবধান, মরুর সমান, কাদে তাই সখাসখী।
দাহ-দস্যুর হাত হ’তে কেড়ে কূপমাতা নানা ছলে,
লুকাইয়া রাখে সুধার ভাণ্ড বুকের আঁচল তলে।
কণ্ঠের তৃযা জুড়াতে তথায় তরুণ তরুণী জুটে,
জননীর স্নেহ-ছায়ামণ্ডপে’ হিয়ার তৃষাও টুটে।
নীরবে নিভৃতে সেবায় নিরতা স্নেহে ছল-ছল আঁখি,
শুভ্র ধূসর সৈকতবাসে জ্বালাময় তনু ঢাকি,
নিদাঘ-তটিনী বহে ধীরে ধীরে হিন্দুবিধবা নারী,
বক্ষে নাহিক , কক্ষে আছে ঘটভরা বারি,
রূপ-যৌবন করেছে দাহন হৃদয়ের চিতানলে,
শীতল স্বচ্ছ যা কিছু তাহাই বহিছে চিত্ত তলে।
জীবন-সমরে সহি ক্ষতি ক্ষয়, লাঞ্ছনা শিরে শত,
ছায়াতরুগুলি আজিকে নিরীহ বাঙালী গৃহীর মত,
বিবরে কোটরে কুলায়ে শিকড়ে পল্লবছায়াতলে,
পােষিতেছে ক’টি অসহায় জীবে চুপে চুপে ফুলে ফুলে,
অকপট মূঢ় জানেনাত তারা তরুর যাতনা কত,
কালবৈশাখী ঝঙ্কায় কবে বক্ষ হয়েছে ক্ষত।

বাপীর বক্ষ শুকায়, দুঃখে শফরী পঙ্কে লুটে,
অতি দানে সাধু হয়েছে নিঃস্ব অন্ন আজ না জুটে।
কমল-কুমুদ-মণিভাণ্ডার আজি মৃত্তিকাসার,
প্রাণ ভরে দান করিতে যে নারে তাই করে হাহাকার।
বুক চিরি শেষ কণিকা শােণিত তাহাও বিয়ে হয়, a
ভিক্ষুক দেখে এবে শুধু তার বক্ষ ফাটিয়া যায়।
ফুলবন ছেড়ে ফলবনে এসে কচিকর সৌরভে
মধুকর আজি মাধুকরী ত্যজি মেতেছে মহােৎসবে।
তাল-তরু দিতে পারে নাই ছায়া, দেছে ঢের বেশী তার,
দিয়াছে বৃন্ত-ব্যজনীর সাথে অমৃত শস্যদার।
ঘন ছায়া দিতে পারে নাই বলি খৰ্জ্জুনাে নয় হেয়,
নারিকেল সম সেও দেয় আজ খাদ্যের সাথে পেয়।
‘তর’ করি প্রাণ করি “মৌজদান তরমুজ মান পায়,
ফলরসে ‘বেল’ ভুষি রসনায় স্কুলে তুষে নাসিকায়।
রসালের রসখণ্ডে বিশাল পনসভাণ্ড-পুটে
মেহ-দুগ্ধের ক্ষীর পূরি ধরা ধরিয়াছে দুই মুঠে।
বেণুবনে ঘেরা দীঘির সলিলে ছায়াগুলি নাে’য় মাথা,
আলসে নামিয়া আসে কালো চোখে যেন নয়নে পাতা।
দাহের গরলে সুনীল জম্বু ডুবে ডুবে’ তায় মরে,
সীমন্তিনীরা যেথায় ক্লান্তি বিরহের দাহ হরে।
বৎসল জলে প্রতি হিল্লোলে মার যেন পাই সাড়া,
পূর্ণকুম্ভ-পয়ােখরে ঝরে গৃহে গৃহে সুধা ধারা।
২০

নিলা।
কলস ছলকি’ জল ভরি সাজে কৃষক-বধূটি ফিরে,
মাঠ হতে গৃহে ফিরিছে শ্রান্ত তৃষিত কৃষক ধীরে।
চলিছে নীরবে চতুর যুবক শব্দ করেনা পায়,
পাছে সে রমণী থমকি অমনি আগে যেতে নাহি চায়।
সিক্ত বাসের শীতল পবনে জুড়ায় তাপিত হিয়া,
তৃষায়ত আঁখি মুদিত তাহার সিক্ত সে রূপ পিয়া।
কণ্ঠের তৃষা শান্ত না হয়ে অন্তর পানে ছুটে,
গ্রাম-বাটে সেই চরণ অঙ্কে তাপিত মৰ্ম্ম লুটে।
পিয়ালবনের মঞ্জরীরজে পীড়িত যাদের আঁখি
তারা পুনরায় নির্ভয়ে চায় শাল তরুছায় থাকি।
হিত্তাল তলে সাতাল কোন মদিরানন্দে মাতি’
হাত-ধরাধরি নেচে নেচে ঘুরি কাটাইছে সারা রাতি।
মহুয়ার রসে মাতাল তাহারা বাজায় মাদল বাঁশী
শিরে অবিরল ঝরিছে বাদল সোঁদাল দলের রাশি।
বালু খুড়ে খুড়ে জলে ঘট পূরে কোলবালা সবে তােষে,
তটিনী তাদের জননীর মত, গােপনেই স্নেহ পােষে।
হেরি সানুদেশে গ্রীষ্মবীরের বিজয়যাত্রা শেষ,
গিরিচূড়া হতে গিরিচারিগণ বর্ষণ করে শ্লেষ।
করীর অঙ্গ ছায়ায় ছায়ায় সঙ্গে চলেছে ‘হরি,
তৃষ্ণায় ‘হরি? হিংসা ভুলেছে শঙ্কা ভুলেছে করী।

ঋতুমঙ্গল।
নিয়ত উষ্ণ পবন-সেবনে প্রখর তপন করে
শতগুণ হয়ে গরল, অহির শরীর দগ্ধ করে।
দলে দলে তারা ছায়ার ভিখারী, শিখিশিখাতলে জোটে,
যদিও ক্ষুধিত ক্লান্ত, কলাপী স্পর্শ করেনা ঠোটে।
মণ্ডুককুল হইয়া আকুল আতপতপ্ত জলে,
শরণ নিয়েছে শ্রান্ত ফণীর ফণার ছত্ৰতলে।
গ্রীষ্মের দাপে বৃক গর্দভে একঘাটে করে পান,
নিত্যবিরােধী দ্বন্দ্ব রচিয়া রাখে পাণিনির মনি।
এ নিদাঘতাপ শুধু সহে ছাগ—দক্ষের বরে বুঝি,
দেখায়ে ভ্রান্ত ভল্লুকে পথ জলাশয় দেয় খুজি।
তাপিত ব্যাকুল কৃকলাসকুল না পেয়ে তৃষার জল
অজগরদেহবিগলিত স্বেদ পিইতেছে অবিরল।
পলে দাহ জুড়ায় বরাহ, খুজিছে মুস্তামূল,
নিপান-পঙ্কে বিলীনশরীর ক্লান্ত মহিষকুল।
কয়েপুরে তার নিয়ে গজরাজ নেমেছে হ্রদের নীরে,
কমল-পত্রে খামাতপত্র রচে দয়িতার শিরে।
শুড়ের ধারায় সিনান করায় বারবার তারে সুখে,
মৃণালক ছিড়িয়া আদরে পূরে দেয় তার মুখে।
চমরী পেয়েছে অমরীর মান, পুচ্ছ পূজারী তার,
বয়ের গলকম্বল আজি গলগ্রহের ভার।
কুপে নামি তৃষা জুড়ায় শরভ, হিংসায় কপি চায়,
কদলীকাণ্ড খঙ্গে বিদারি গণ্ডার রস খায়।
२२

নিদাষ
‘কৌম্ভ’ ঋষির তৃযার সৃষ্টি প্রান্তর-মৃগ যত,
মৃগতৃষ্ণিকা-লাঞ্ছিত হয়ে জল-ভ্রান্তিতে হত ;
তপের সৃষ্টি উষ্ট্র কেবল রবি-রােষে র’য়ে ধীর,
মরু-পারাবার অবহেলে তরে, লম্বিয়া গিরিশির।
বিষাণ-তাড়নে বৃষ রােযে ভূমি খুড়িতেছে বারবার,
তাপের জ্বালায় মাটীর তলায় পশিতে বাসনা তার।
ছায়ালােভে আজি শষ্পের মায়া ছেড়েছে গােঠের ধেনু,
পাঁচনি তেয়াগি বটতরুতলে রাখাল ধরেছে বেণু।
তৃষার জ্বালায় নিশায় জ্বালায় আলেয়া, উল্কামুখী,
ভাবে লােমকেশ-নিপীড়িত মেষ শূকরই আজিকে সুখী।
বাজি ভাবে আজি শশাণিতমথিত ফেনিল ঘৰ্ম্মে নেয়ে,
সিন্ধু-ঘােটক হওয়া ছিল ভালাে সিন্ধী ঘােটক চেয়ে।
পাখী ভাবে আজ, ‘পাখাতে কি কাজ—পারি যদি মীন হই,
‘কর্কটই সুখী, মীন ভাবে আজি‘জলে শীতলতা কই ?
গরবিনী চাপা বৃক্ষচুড়ায় ঝলসি পড়িয়া, ভাবে
এর চেয়ে ঢের সুখ আছে হীন পঙ্কে জনম লাভে।
কাঠ-ঠোকরাটি ঠোটের ঠোকরে গণিছে দণ্ডপল,
গগনের ক্ষীণ কাতর কণ্ঠে ধ্বনিত ‘ফটিক জল।
দীর্ঘ দিনেরে হত্ব করিতে ঝিঝিরা করাত টানে,
দীর্ঘতা আরাে দুঃসহ হয় ক্লিষ্ট ক্লান্ত তানে।
তাপচঞ্চল সারস মরাল ছিটায়ে পাখার বারি,
সজীব করিয়া রেখেছে এখনাে যত রাজীবের নাড়ী।
২৩

কুম্ভীর-লেহেশহুককুল ছাড়িয়ে তপ্ত শ্বাস,
ফুলের শীতল গর্ভকুহরে অলিগণ করে বাস।
কপােতকণ্ঠে তাপিত সৌধ তৃষ্ণা জানায় তার,
শুকশারীগুলি আজি বুলি ভুলি শুধু করে চীৎকার।
ভূতলে আজিকে নামেনি চাতকী, দুষিওনা তারে তবু,
বারিকণা সাথে দিতে কি পারিবে প্রেমকণা তারে কভু ?
মদভরে সেত ঘুরেন গগনে ত্যজি হ্রদ নদীবন,
নিয়ে গেছে সে যে কণ্ঠ ভরিয়া নিখিলের আবেদন।
প্রিয়জন পাশে ব্যর্থ হলেও প্রার্থনা তবু শ্রেয়,
অন্যের কাছে না যাচিতে পাওয়া তাও যে বড়ই হেয়।
দূত অবধ্য-শঙ্খ চিলেরে ভানু নাহি বধে প্রাণে,
মেঘের বার্তা আনিতে গিয়া সে ঝড়ের বার্তা আনে।
অন্য পাখীয়া গিয়াছে ভুলিয়া পক্ষের ব্যবহার,
ঝঞ্জাজীর্ণ কুলায়ের পুন করেছে সংস্কার ।
বনম্পতির বঙ্ক-কোটরে কীট খুজে খুজে ঘুরে,
দাবানল ছাড়া বন হতে তারা ব্যোমপথে নাহি উড়ে।
দাহের ব্যাধিতে অধীর ব্যাধের সুলভ শিকার ছাড়ি,
ধরাসনে আজি শরাসন ত্যজি হইয়াছে ফলাহারী।
মৃগয়াসক্ত নরপতি আজ কৃপা করি পশুগণে,
ৰন ত্যজি ঘুরে মনােমৃগয়ার উপবনে তপােবনে।
বধ্য আজিকে হন্তারাে কাছে তৃষ্ণার জল চায়,
‘কর জলদান হয়রা শেষে প্রাণ, ক্ষোভ খেদ নাহি তায়।
২৪

লােকে বসন্তে ঋতুরাজ কয় সত্য তা কভু নয়,
সে-ত যুবরাজ, তুমি মহারাজ সবে গায় তব জয়।
তুমি নিয়মিত করেছ ভারতে উপাসনা-পদ্ধতি,
সকল ঋতুই তােমার রীতিই অনুসরে, ঋতুপতি!
কম্বোজ হতে চামর, কেরল হ’তে চন্দনভার,
কাশ্মীর হতে কুকুম এনে রচেছ পূজোপচার।
শিলার তপ্ত বিগ্রহে তুমি ঢেলেছ গঙ্গানীর,
তুলসী-শ্রীফল-কিসয়দল সুরভি শীতল ক্ষীর।
কুসুমে শয্যা, কুসুমে সজ্জা, কুসুমে লজ্জা হরি,
শৃঙ্গরিবেশ রচেছ কুসুমমালায় অঙ্গ ভরি।
বালগােপালেরে ননীছানা তুমি খাওয়ালে গাৈপের ঘরে,
দেবতার তুমি আসন রচেছ পঙ্কজে সমােবরে ।
দেবতায় নিয়ে জলযাত্রায় নৌকাবিহার তব,
সয়ােমন্দিরে হূদনদতীরে উৎসব নব নব।
শীতল শিলায় মন্দির তার রচিয়াছ মঠে মঠে,
হিমমণ্ডলে গিরি তরুতলে—অথবা নদীর তটে,
শীতল বলিয়া গর্ভগৃহের পাতাল অন্ধকারে,
অথবা কুঞ্জনীর-মণ্ডপে মগ্ন রেখেছ তারে।
তীর্থসনানপুণ্যে দিয়াছ চিতশুদ্ধি প্রথা,
নিত্য সিনান দেয় ত্রিসন্ধ্যা জপে বাগে যােগ্য।
২৫

শান্তিবারির ভিখারী মােদেরে করেছ যজ্ঞশেষে,
পিতৃলােকের তৃষার কথাও ভাবিতে শিখালে দেশে!
ঘরে ঘরে হয় তােমারি বিধানে ঘটোৎসর্গ ব্রত
সত্রে সত্রে করুণার ধারা ঝরিতেছে অবিরত।
তৃষিত বিপ্নে ফলদান হতে ফলবান কিবা আর ?
জলদান ব্ৰত তােমার শ্রুতিতে সকল ব্রতের সার।
সকল পুণ্যবােধন-বিধানে মােদের গৃহের দ্বারে,
চূত-শাখা সহ সফল পূর্ণ ঘট শােভে দুই ধারে।
সফল পূর্ণ তাহে শাখাময় উৎসব—আয়ােজন,
ভবনে পশিতে তােরণ-মালিকা করে ভাল পরশন,
মিগ্ধকদলী-তরুমণ্ডলী ছায়ার মাধুরী ঢালে,
তুমি যেই বিধি দিলে একদিন তাই চলে কালে কালে।
ফলফুল কিছু দেয়না যে তরু তারেও দিয়েছ মান,
বেদিকা বাধায়ে অঙ্কে তাহার দেবতায় দিলে স্থান।
অক্ষয় বটে হেরেছ শ্যামল বটকৃষ্ণের রূপ,
পথের দুধারি ছায়া সঞ্চারি খনেছ অমৃত রূপ।
তব প্রেরণায় রচি’ আঙিনায় ছায়ামণ্ডপ খানি
বধূবর শােনে শুভ বন্ধনে কুশণ্ডিকার বাণী।
তােমারি বিধানে কিরীটপিধানে পুণ্যাভিষেক-রীতি,
রাজছত্রটি রাজশিরে ফুটি সদা বহে তব স্মৃতি।
অশনে বসনে নিয়ামক তুমি, তুমি অহিংসা-মূলে,
তােমার শাসনে আমিষ-লালসা এ দেশ গিয়াছে ভুলে।
২৬

নিদাঘ- । রিক্ত বসন করেছ তাহারে-নগ্ন অংসে তার কেবল শুভ্র উত্তরীয়টি করে শােভা সঞ্চার। প্রেরণা দিয়াছ সূক্ষ্ম বয়নশিল্পের প্রচলনে, বেণী বন্ধন, মাল্যরচনা, ললনার প্রসাধনে। সুকল শিল্পে কল্পনা তব সূত্র ধরিয়া থাকে, রাগরাগিণীরা তােমার দেউলে হরিচন্দন মাখে। কাব্যে তুমিই কবির সহায়-নাট্যে সূত্রধার, সরস্বতীর অঙ্গে দিয়াছ সুরভি অলঙ্কার। কাব্যে বিরহ স্মরশরদাহ যত দ্বেষ, রোষ, পাপ, ক্লেশ জ্বালা যত লভে অবিরত তব দাহ-তব তাপ। তােমারি পুণ্যে গিরি হিমবান মাতামহ মহাগুরু, তােমারি নিদেশে নদীরে এ দেশে জননী বলার শুরু। ঝাঁপ দিয়ে পড়ে তােমার ঘাটের শীতল গঙ্গা-বুকে, ‘জয় মা’ শব্দ অন্তর হতে উচ্ছলি উঠে মুখে। তােমারে সমরে জিনিয়া ইন্দ্র, সম্রাট অমরার, ইন্দুকে তুমি করেছ বন্দ, কুমুদে অর্ঘ্য তার। পুষ্টির লাগি তুষ্টির লাগি বাড়াও ধরার ক্ষুধা, রস- পাবার মথি মেঘে তার সঞ্চিত কর সুধা। বরষার দানগৌরব ঘটা, শীতের শস্যভার শরতের শােভা সৌরভছটা, ‘মধুর হর্ষ-হার, ঋতুচক্রের চক্রবর্তী তুমি যে সবারি মূলে, সকলেরি বীজ উপ্ত তােমার তপ্ত চরণ ধূলে। २१

ঋতুমঙ্গল।
নদী দধিধারা, সীমাশেষহারা বিশাল কানন ভূমি,
ঘনজনপদ, কৃষিসম্পদ সকলি রচেছ তুমি।
দেশের ভাগ্যবিধাতা নিদাঘ, শুভদাতা চিরদিন,
খেদ ক্ষতি ক্ষয় অশুভের মূলে আছ তুমি সমাসীন।
হয়েছ সহায় পঞ্চপায় যেমন যােগীর যােগে,
তৃষা বাড়ায়েছ তেমনি রােগীর বােগে ও ভােগীর ভােগে।
শুধু ইন্ধনই তুমি যােগাওনি ঋষির যজ্ঞানলে,
অলস বিলাস লালসার যাগ তােমার ঘৃতেই জ্বলে।
নৃপেরে করেছ ব্যসন-মত্ত-কামভােগে অভিলাষী,
বীরের করের অসি কেড়ে নিয়ে দিয়েছ মােহন বাশী।
ঘৰ্ম্মে কেবল তনু-চৰ্ম্মের বর্ণ করনি ম্লান,
দেহের কর্মবল হরি’ক্রমে করিয়াছ ম্রিয়মান।
সুলভ তােমার দীন লােভে মজি মাের। আলস্য-পাপে,
সে মূঢ় পাতকে এ দেশ-হতক চাতক জীবন যাপে।
শরীর ছাড়িয়া অলস মানস বেড়ায় পরীর দেশে,
অরতি আসিয়া ভিতর বাহির জয় করে হেসে হেসে।
নিঠুর নিদাঘ, তব বৃকনাগ মক্ষীমশক দল
কোটি নােগকীট মােদের শােণিত শােষিতেছে অবিরল।
যাচিয়াছে তব দাহ শুধু অবগাহিতে রমণী দেহে,
তৃষ্ণা তােমার ভ্রাতৃ-শােণিতে তৃপ্তি খুজেছে গেহে।
ধূলি তব ধধি মেদের নয়ন করিয়াছে শ্বাসরােধ,
মরীচিকা তব হয়েছে মােদের দিঙ, নির্ণয়বােধ।
২৮
t

নিদাঘ।
বিভব যা কিছু দিয়েছ দিতেছ সকলি সলিলশায়ী,
এ পরাধীনতা হীনদাস্তের জন্য তুমিই দায়ী।
তবু দিবসেরে কর যথা তুমি পরিণাম-রমণীয়,
তেমনি বিগত বৈভব যত পরিণামে ফিরে দিও।
এ নিদাঘ যেন প্রেমাভিনয়ের বিরহ অঙ্কখানি,
দুর্বাসা যেন অভিশাপ হানি দেয় ব্যবধান আনি।
বিলম্ভে সঞ্চারী ভাব সঞ্চার করে ভীতি
নির্বেদ গ্লানি, দৈন্য, জড়তা, অলসতা, মােহ, স্মৃতি।
বিরহ পীড়ন আজি অসহন, রামগিরি-চূড়া’পরে
দাড়ায়েছে আজ যক্ষ যুবক দূত-সন্ধান তরে।
বহুদিন গত যক্ষ-বনিতা পায়নি বারতা তার,
বসি বাতায়নে আয়ত নয়নে চাহে ব্যোমে বারবার।
আদি-শৃঙ্গার রস-সঙ্করে সুখ-বসন্ত শেষ,
প্রাটসর্গে মধুর শান্ত করুণের সমাবেশ।
বড়ধ্যায়ের বিশ্বকাব্যে নবরসে মহামেলা,
মাঝখানে তার এই নিদাঘের বীররৌদ্রের খেলা।
এই অধ্যায়ে কুরু পাঞ্চাল বীরগণ আসে সাজি,
শিশুপাল হাঁকে রাজসুয়ে, ছুটে অশ্বমেধের বাজি।
জামদগ্ন্য কি উঠিল জাগিয়া নয়নে অগ্নি যার,
ধরা-জননীরে বধিতে পরশু তুলিল কি এইবার?
২৯

অর্জুন-ভুজ-কানন ছেদিয়া চলে কি বিদেহ-গেহে?
লুকায়ে রাখিছে জনক যেখানে রামের কনক দেহে!
রক্ষোনাথের রথ কি ধরেছে জটায়ু চঞ্চুপুটে ?
নাগ-বংশের ধ্বংসের লাগি বিনতামুত কি ছুটে ?
জন্মেজয় কি প্রতিহিংসার আলিল যজ্ঞানল?
গরল খসিছে হাজার ফণায় ‘অনন্ত’ অবিরল।
দাহরাজ আজি প্ৰজার শােণিত শােষিতেছে শত করে,
দেশের দারুণ বজ্ৰশাপ যে নামিবে তাহার’পরে।
বিদ্ৰোহানল জাগে গৃহে গৃহে গিরি-পঞ্জর তলে,
শমীবন হতে ছুটে দাবানল—সাগরে বাড়ব জ্বলে।
ময়দানবের ভয়ে মানবের হাহাকার উঠে হায়,
গলিত হিরণ ঢালি সে পীড়ন করে বুঝি বসুধায় !
ত্বষ্টার বরে বৃত্ৰ বুঝি রে ব্রিলােক করেছে জয়,
অরুণাে যে বাম, বরুণের ধাম নেছে সবে আশ্রয়।
ঈশান-ভবনে তড়িৎফুরণে রাঙায়ে হাজার আঁখি
বাসব আপন অনুচরগণে মাঝে মাঝে উঠে ডাকি।
উপবাসে ক্ষীণা প্রকৃতি মলিনা বসেছে উগ্রতপে,
দারুণ দুঃখ সহিছে লক্ষ পুরশ্চরণ-জপে ;
যেন অপর্ণা তপ্লোবিশীর্ণ হরের করুণা মাগি,
অনসূয়া যেন দুঃসহ ব্রতে বিশ্বহিতের লাগি ।

নিদাখ
মরু-প্রান্তরে ধরাজননীর স্তন্যের হবি দানে,
চারিটি কুণ্ডে করিছে কে যাগ চাহি সবিতার পানে ?
টানিয়া আনিকে আর্ত ভুলােকে যাহার পূর্ণাহুতি,
বরুণের বর-করুণার ধারা বিজয়ী হইবে শ্রুতি।
চাতকী-শিখীর কাকুতি কামনা—কেতকীর বেদনায়,
নীপকূটজের নিভৃত মৌন সাগ্রহ সাধনার,
বরাভয়ময় সঞ্জীবনের পড়েছে প্রবল টান,
কোটি কণ্ঠের ত্রাহি ত্রাহি রবে দ্যুলােক কম্পমান।
কোটি কোটি বীজ সার্থকতার আগ্রহে, ধূলিতলে,
জপে যে মন্ত্র নিশিদিন, তায় ধাতার আসন টলে।
এ কোন দধীচি ত্রিলােকের হিতে যােগাসনে ত্যজে ত,
সমাধি ভাঙিয়া সুমেরুশিখরে হুঙ্কারে কোন্ মনু ?
কোন্ পাণ্ডব দহি খাণ্ডবে তুষিতেছে দেবতারে ?
লভি গাণ্ডীব কাপাবে বিশ্ব বজ্রের টঙ্কারে।
মরীচিকাগুলি কোন সে ঋষ্যশৃঙ্গে ভুলায় নেচে,
যার পদরজে যুগতৃষার্ত ‘অঙ্গ’ যাইবে বেঁচে।
দুঃশাসনের হৃদিবিদারণ হেরিছে যাজ্ঞসেনী,
চপলাক্তরঞ্জিত করে রচা হবে তার বেণী।
থামিবে ঝঞ্চা, রুদ্রদেবের পিণাকের টঙ্কার,
ভাল-নেত্রের বহ্নি নিভাতে ঝরিবে অশ্রু তার।
কণ্ঠের বিষ ভেদিয়া ফুটিবে বদনে আশিষ বাণী,
অমৃতে ভরিবে আবার হরের করের করােটিখানি।

তুমলল।
মেঘ-তরঙ্গে গিরির শৃঙ্গে হইবে শৃঙ্গনাদ,
প্রাণ-গঙ্গায় ঘষিবে ডমরু মঙ্গল পরসাদ।
কংস-কারার আওঁ রােদন ব্যর্থ হবে না কভু,
অশােকনের সতীর বেদনা স’বে না প্রাণের প্রভু।
রবে না মাটীর ভিক্ষাভণ্ড বেশী দিন ঘরে ঘরে
কড়ি-দিয়ে-রচা সিন্দুর-ঝাপি ফিরিবে রমার করে ।
হবে সুধাপীন ধেনুর আপীন, শষ্পে ভরিবে মরু,
শ্যামলানলে হাসিবে ক্ষেত্র, পুষ্পে ভরিবে তরু।
চক্রগদায় আজিকে ধরার অরাতি করিয়া জয়,
শঙ্খ-সরােজে শ্যামসুন্দর বিতরিবে বরাভয়।
তপনেরে মােরা করিব আপন ‘সূৰ্য্য-হৃদয়’ গানে,
অনলে তুষিব স্বাহার মন্ত্রে সুরভি সমিধূ দানে।
মেরা তপ করি আবার জীবন জাগাবাে ভস্ম-তলে,
করুণার বারি ঝরাবাে হরির চরণ-কমলদলে।
শাপহগণ লভিবে জীবন সে বারির পরশনে,
সাতারি ধরিবে মকরের দেহ জয় জয় গরজনে।
দেবী মহামায়া ক্রমে দশ মহাবিদ্যার লীলা সারি,
কমলাত্মিকা রূপে বরষিবে কবিকুন্তের বারি।
দেবতা তুষ্টা রাজিবে ইষ্ট বরাভয় লয়ে করে,
কুশল বিতরি সলিলের’ পরি মরাল-রাজীব পরে।
বরুণ-তােরণ গৃহ-প্রাঙ্গণ ভরিবে লক্ষ পােতে,
করুণার ধারা ঝরিবে রাজার হাজার চক্ষু হ’তে।

রুর আতিথ্য
ত, তােমার তোরণ তলে, অতিথু মােরা দলেদলে
নতুন পাতার নতুন খাতার বিপুল আয়ােজনে,
তােমার ভরা ঘটের সফল শােভার সাদর আমন্ত্রণে।
জুড়াও তরু আজ বােশেখের মরুর তৃষা ক্ষুধা,
তােমার ঘরেই বাড়তী জমা বর্ষশেষের সুধা।
কৃষ্ণচূড়ার বিতান দুলে
কিসলয়ের ঝালর ঝুলে,
সােণার ডেলুই জলে সোঁদাল ডালের ফাঁকে ফাঁকে,
ধূপ জ্বলেছে শিরীষ আউচ শাখায় লাখে লাখে ।
তােমার ঘরে পুণ্যাহ আজ নবৎ বাজায় পাখী,
দখিণ পবন তােমার ছায়ায় আনছে সবায় ডাকি।
ভাড়ারঘরে দোরখােলা আজ ভােজনলােভীর নাই কোন লাজ
ৰ চৰ্ব্ব চুষ লেহ পেয়ে ভূরি ভােজের পালা,
বনের বাজার উজাড় করে হাজার ডালা থালা,
পেঁপের ফালীর ছড়াছড়ি অঠেল বেলের পানা,
ফুলের মধুর ভিয়ানে আজ নেয়াপাতীর ছানা।
কালNোশেখীর ঝর্ণাঝারায়, শিলগলা হিমজলের ধারায়
ফুলের সুবাস যােগ করে তায় করাও তনুর স্নান,
শিরে—
ঝরাফুলের গন্ধে নেয়ে উঠুক সারা প্রাণ,
পুণ্যমাসের ব্রতে তােমার ছাতিম বিলায় ছাতা
বসন বিলায় কৃপণ সিমুল, সেও আজিকে দাতা।

বাদ দেবে আর আজকে কাকে ? নিমন্ত্রণের কে খোঁজ রাখে।
জুটেছে সব অনাহূত রবাহুতের দল,
যত পক্ষী-পশু-মক্ষী-ভ্রমর-পতঙ্গ সকল।
আত্মা মােদের সপরিবার-পঞ্চগােচর সাথে,
তােমার ঘরে আজকে, তরু, মহােৎসবে মাতে।
উজ্জয়িনীর নিদাৰ
=
দিনকর-কর উষ্ণ প্রখর রত চরাচর দাহনে,
তড়াগবাপীর ক্ষীয়মান নীর ঘন ঘন অবগাহনে।
গততাপখেদ চারু দিনান্ত, মন্মথ-বেগ ধীর প্রশান্ত,
সুন্দর শুচি চন্দ্র-মরীচি শৃহনীয়-রুচি নয়নে,
এসেছে নিদাঘ ভূধর গগনে গহনে।
এবে ঈঙ্গিত পুষ্পমােদিত বিধুমণ্ডিত যামিনী
ত্যজি পালঙ্ক শিলার অঙ্কে তত্রিতা যত কামিনী।
আজি পরিহৃত ভূষাকাঞ্চন,
বাঞ্ছিত সিত পীত চন্দন।
ঘন ঘন ধারাযন্ত্র ধারায়-মান করে পুরভামিনী, ,
বৃষ্টিধারায় যেন সচকিত দামিনী।

নিদাষ।
নাগর নিকর আজি মৰ্ম্মর-হৰ্ম্মান্তর-ভবনে
উশীর-অগুরু-ধূপগুগ্‌গুলুগন্ধমােদিত পবনে,
পান করে সুখে সুন্দরীবধূ বদনােচ্ছাসকম্পিত মধু,
তান-লয়-যুত তন্ত্রী-সনাথ স্মর-সঙ্গীত শ্রবণে,
করে সার্থক নিশীথে মধুর স্বপনে।
নিতম্বিনীরা শিথিলমেখলা স্বচ্ছ কোমল দুকূলে,
মলয়জ-পরিমল-বলয়িত ভুজবল্লরী-মুকুলে,
হারমণ্ডিত শান্ত উরসে, আন-সুশীতল অঙ্গপরশে,
কেশকলাপের ধূপ সৌরভে চম্পা শিরীষ বকুলে
করে নন্দিত ক্লান্ত গ্রীষ্মচটুলে।
তুলে মঞ্জীর হংসকাকলী লাক্ষারাতুল চরণে,
কোকনদময়ী সরসীর স্মৃতি জাগায় শবদে বরণে।
স্বেদ-নিষিক্ত দুকূলে প্রকটে,
দুকূলে প্রকটে, স্নাত লাবণ্য নারীতনু তটে,
দুলে পাণিপুটে উশীরসুরভি ব্যজনী ঘৰ্ম্ম-হরণে,
সুপ্ত কামনা বহ্নি জাগায় স্মরণে ।
যেধের কূটে চন্দ্রশালায় নাগরীরা যাপে এ রাতি,
নেহারি তাদের নগ্ন সুষমা হেরিয়া মুখের ভাতি,
নিন্দি আপন চন্দ্রিকারাজি লজ্জাপাণ্ডু চন্দ্রমা আজি ।
ভবন-জ্যোৎস্না গগন-জ্যোৎস্না দুইই যাহার অরাতি,
সে প্রবাসী আজি জাগে বিনিদ্র এ রাতি।

বর্ষাবরণ
বর্ষা এসে, বর্ষা এসাে, চাতক ডাকে ফটিকজল,
মরা ডালে জাগাও কলি, মরা গাঙ্গে লাগাও ঢল।
পূরাও তুমি পুকুর নাল জুড়াও আবার চড়ার বুক,
ঘুচাও আবার ধূলির জ্বালা মুছাও কাতর ধরার মুখ।
বর্ষা এসে, বর্ষা এস, ডাহুকী গায় বােধন গান,
মাছেরা পাক নবীন জনম, গাছেরা পা’ক নূতন প্রাণ।
তৃণের আঁকুর জাগৃতে চাহে ঘুচাও তাহার দাহের ডর,
বর্ষা এসাে ডাকছে তােমায় খেয়ার মেয়ে নায়ের পর
বর্ষা এসো ময়ুর আবার দেখাক নচিন-রঙ্গ তার,
কদমকলি ডাকছে খালি শিউরে তােল’ অঙ্গ তার।
বন্ধ টুটাও, গন্ধ ছুটাও, গুরে মলল কেয়ার ঝাড়
বর্ষা এসে হুড়, মুড়িয়ে ভেঙ্গে আবার দেয়ার দ্বার।
ফুলের বুকে জাগাও মধু ফলের বুকে সরস শাঁস,
তােমায় ডাকে পুকুর পাঁকে চখাচথী সারষ হাঁস,
বর্ষা এসাে ভরসা এসাে, এসাে ভুবনবাসীর বল,
বর্ষা, ঘন হর্ষ আনন, ডাকে ধীবর চাষীর দল।

নিদাঘ।
এসাে,
যুবজন-কবিগণ-মনােহরণী,
ছল ছল কল কল জলে তরণী।
বাহি-
মুহু মুহু পুলকিত চাৰু নীপপুঞ্জে,
ধাতকী কূটজ যুথী কেতকীর কুঞ্জে,
দাদুরীর কলরবে মধুপীর গুঞ্জে,
ধরা পথে মরকত-শ্যামবরণী।
এসো
এসো-
গিরিদরী ভরি খর ঝরণারি হর্ষে,
অনারত ঝর ঝর প্রাণরস বর্ষে,
ধূসরে শ্যামল করি’ ও-চরণ স্পর্শে,
অমল কমল দলে ভরি ধরণী।
পুলকিত পল্লীর খল খল হান্তে,
হরষিত কৃষাণীর ঢল ঢল আস্তে,
চপলায় চমকিত আলােকিত লাস্যে,
ঘন ঘন মুখরিত তব সরণী।
আই
৩৭

নববনষায়
আজি-পুষ্পে পুষ্পে নবীন মাধুরী এলে ফিরে,
নব-শষ্পে শল্পে শ্যাম নিবিড়তা আসে ঘিরে।
আজি—স্বর্গে মর্তে মিলন মহিমা জলে থলে,
অয়ি—মুগ্ধে কান্তে ফিরে এসাে হৃদি শতদলে।
আজি-শৃঙ্গে শৃঙ্গে মিলাইছে প্রেমে মৃগমৃগী--
আজিভূঙ্গে ভূঙ্গে শােভিল কমলে ভরা দীঘি,
হের-বৃক্ষে বৃক্ষে জড়াইছে লতা মনােরমা,
মম-বক্ষ কক্ষে ফিরে এসাে প্রিয়া প্রাণােপমা।
আজি—অঙ্গে অঙ্গে প্রেমশিহরণ ঘনঘন,
ঘটে-কুন্তে কুম্ভে বাজিছে কঁাকন কনক্কন।
বন-কুঞ্জে কুঞ্জে কেকার কাকলী বিষভরা,
মম-কর্ণে কর্ণে সুধাভাষা প্রিয়ে আনাে ত্বরা।
আজি-চক্ষে চক্ষে চপল চাহনী হলো বাঁকা,
আজিবক্ষে বক্ষে উদাস পরাণী ফঁাকা ফাকা।
ছিড়ি-মৰ্ম্ম-গ্রন্থি ডাহুক ডাহুকী ডাকে শুধু
এত-বর্ষা-হর্ষে তুমি বিনা সখি সব ধূ ধূ।
আজিবজোৎকীর্ণ চকিত চপলা খনে খনে,
কূজেমত্রোৎকণ্ঠা বিহগ বিহগী বনে বনে,
আজিক্ষেত্রে ক্ষেত্রে করে নদনদী কোলাকুলি,
মম-নেত্রে নেত্রে বিহর প্রেয়সি দুলি-দুলি।

বৰ্মহর্ষ
মীন-কটাক্ষে পীন পয়ােধরে পুলিনের শ্রেণি-তটে
কলতর প্রকৃতি অঙ্গে যৌবনজয় রটে।
করি মানশেষ পরি’রাণীবেশ ধূপধুমে কেশ খুলি’,
কেতকীর রজে বর তনু মেজে শােভে বনবধূ-গুলি।
দিগুবালিকার লীলা-শালিকায় বলাকা-মালিকা দুলে,
সর্জ-কাননে অৰ্জ্জুনবনে কলতান তারা তুলে।
ত্যজি ফুলধনু ধরি’ জলধনু স্বর ধারাশর হানে,
ত্যজি ধূলিভার ফুলরেণু-হার সমীরণ বহি আনে।
মৃণালক পাথেয় লইয়া মরাল ‘মানসে চলে,
দাদুরী মদির মাধুরী বিলায় তমালতিমিরতলে ।
বন্যার পরে তরণীরা দোলে পণ্য-পীবর বুকে,
ধন্য আদরে ধরণীর কোলে কৃষক-ধীবর মুখে।
বিলােলা বল্লী তরুরে জড়ায় পীবর পাণির ডােরে,
ব্রজের স্মৃতিতে নীপের অঙ্গ উঠে রােমাঞ্চে ভরে।
যূথী প্রিয়ঙ্গুকলিদের কেহ ফুটিতে কি আছে বাকী?
আফ্রিকার মিলনােৎসব দিনে কে মুদে রহিবে আঁখি?
চন্দ্রজালে আজি শিখণ্ডী বিথারে ইন্দ্রজাল,
মেঘমল্লার-সীত সনে নেচে নেচে দেয় তাল।
ডাহুক ডাহুকী চাতক চাতকী সমােবরে চখাচখী,
মুখােমুখী আজি চঞ্চু মিলায় মিলে যত সখাসখী।

কৃপাভাণ্ডার করিয়া উজাড় ছড়াইছে ভগবান
মেঘ-মৃদঙ্গ তালে তালে উঠে শত তরঙ্গতান।
দধি-মঙ্গলে চরাচর আজি নেছে দেয় গড়াগড়ি,
বনকীর্তনে ক্ৰমে ক্ৰমে প্রেমে বুকে বুকে জড়াজড়ি।
পল্লীনগরে ক্ষেতে তরী’ পরে উল্লাস-কলরােল, '
একসনে যেন মিলেছে ঝুলন রাসরথ আর দোর।
ইন্দ্রধনুর তােরণের তলে নামে ইন্দ্রের রথ,
চক্র-পীড়নে গুরু গর্জনে চপলাকিত পথ,
উটজাঙ্গনে ইবরণে কূটজ ছড়ায় লাজ,
সিত ফেনধিঘট শিরে নদী হুলু দেয় তায় আজ।
কবি ধর গান মল্লার-তান উল্লোল বরষায়,
ভামিনীরা আজ মানিনী থেক’ না শুভখন বয়ে যায়।
ঢালে গ্রামবধু কাজরীর মধু সুরট’-পুরটপুটে,
নাগর-জীবন নিগড়ে বেঁধেছ আজি কে সৌধকূটে ?
কামিনী-কানন আজিকে শােভন কামিনী-আনন, প্রায়,
যুথিকা-বীথিকা ডাকে তােমা, শুন’ সুরভি গীতিকা গায়।
এস আশাভরে আষাঢ়-বাসরে লাজ কাজ সাজ ফেলি
সুর তটিনীতে পুরকামিনীরা কর আজ জলকেলি।
লীলা তরঙ্গে ধারা-সঙ্গমে জড় জঙ্গম জুটে
বর আজিকে হরষ ছড়ায় সবে এসে লও লুটে।
৪৭

জগজ্জীবন
তুমি শুধু বায়ু-জল-ধূম-জ্যাতিঃসন্নিপাতে জড় অচেতন,
একথা যে মিথ্যা ঘাের একথা মানিতে মাের ব্যথা পায় মন।
তুমি যদি জঁড় তবে, কে আর সজীব ভবে ? জীবনভাণ্ডার,
মৃতসঞ্জীবন তুমি তােমারি জীবনে বাচে এ ভবসংসার।
মরুতে ফুটাও ফুল, শিলাস্তরে রসাঙ্কুর, শ্মশানে জীবন,
লভি তব, হে পজ্জণ্য, সুধা-সুমধুর অন্ন, বঁাচে প্রাণিগণ।
লৌকিক জীবনধৰ্ম্ম পালনা, নাস্তিকে তাই জড় বলি’ জানে,
ব্ৰহ্মসম আপনারে ব্যক্ত করিয়া তুমি কোটিকোটিপ্রাণে।
ঝুলন
।
আজকে গগন-বৃন্দাবনে ঝুলন ঝুলিল,
মেঘের তমাল পর্ণঘনে মাতন তুলিল।
এলায় বেণী ঘাঘুরা ঘুরে
উতল বায়ে ওঢ়না উড়ে
হিন্দোলায় আজ নীলাম্বরীর বাঁধন খুলিল ।
আজকে গগনঘনগহনভুবন ভরিয়া,
কদম-কেশর কেতক-পরাগ পড়ছে ঝরিয়া।
মৃদঙ, বাজে ধূম্রবনে
ময়ুর নাচে দিগনে
ইন্দ্রায়ুধের ছটায় তাদের কলাপ দুলিল।
৪১

আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে
।
আষাঢ়ে আদি-বাসর পুন আসিল অই ফিরিয়া,
নিবিড় ঘাের মদির মােহে দিগ্বিদিক ঘিরিয়া।
কাজল চোখে অমিয়া ঝরে, সজল পাতা নমিয়া পড়ে,
অতীত স্মৃতি জাগিছে ধীরে ব্যথিত চিত পীড়িয়া।
কে কোথা আজি বিরহী আছ জড়তা হতে জাগ’রে ;
চপলাতরী ভেসেছে হের বেদনা-শােক-সাগরে।
কুটজ-ফুলে ভরিয়া ডাল যূথীৰকুলে গাঁথিয়া মালা,
অর্ঘ্য রচি’ স্বর্গচারী দূতের কৃপা মাগরে।
দরদী সে যে ঘুনিয়ে তাই ঘনায়ে আসে গােপনে,
বয়ান তার করুণা মাথা, সহানুভুতি নয়নে।
ভুবনে যেন আড়াল করি,
নিভৃত রচি’ কণ্ঠ ধরি
শুধায় তােমা কোন বারতা পাঠাবে প্রিয়া-সদনে।
বারতা তব বিরহ-দূত প্রিয়ারে তব বলিবে,
ভব-বিদিত কুলে সে জাত কখনাে নাহি ছলিবে।
বিমাছে কবি নিদেশ যবে, যুগে যুগে তা বহিতে মৰে,
বিরহ-লিপি তাহার বুকে দামিনী হয়ে জলিবে।
০২

বর্ষা।
হিয়ার হ্রদে প্রিয়ার মুখ ফুটিছে কার পুলকে?
সুখীরে, শুনি, উদাস মতি নামিলে মেঘ ভূলোকে।
বিরহী তরে উদাসমনা ফেলিও কৃপা-অশ্রুকণা,
দীনা ধরারে করােনা ঘৃণা রহিয়া সুখে দ্যুলােকে।
হে কবি, তুমি কল্পলােকে পাঠালে কোন্ বারতা ?
প্রতি জনমে জাতিস্মর দূতটি স্মরে সে কথা।
প্রিয়ারে প্রতিলিপিটি তার পাঠাই মােরা, ভাবিনা আর,
বহিয়া বুকে অমর তারে করেছে ঘন-দেবতা।
মেঘ-মসীতে লিখিল তব চপলাময়ী লেখনী,
স্মৃতি-কলকে প্রতি পলকে গুমরে আজো সে ধ্বনি।
প্রেম-তৃষারে চাতকীরূপ
দিয়াছ মেঘে, হে কবি-ভূপ,
ত্রিলােক লাগি লিখেছ কবি একের লাগি লেখনি।
হে কবি তুমি,জানিনা কোন অলকাপানে চাহিয়া,
শােকেরে শ্লোকে সান্দ্র করে নৃ-লােকে গেলে গাহিয়া।
উজ্জয়িনী-রাজসভার
পূজ্য যিনি, কি ব্যথা তার ?
খুজেছ কোন দ্যুলােকে কূল মেঘের তরী বাহিয়া ?
হে কবি অভিশাপের কথা ব্যথিত চিতে স্মরি যে,
ইহ-জীবনে নির্বাসনে কাহারে দূত বরি হে ?
অলকাস্মৃতি ভূলােক-তীরে উদাসী করে এ প্রবাসীরে,
স্বদেশে যাব’ কবে যে ফিরে, অকূলে কোথা তরী রে!
৪৩

ষোবরে অভিশাপ
'
নব আষাঢ়ের শুভ বাসরের মুরজতান,
অলকার বাণী কানে দেয় আনি শিহরে প্রাণ।
ছুটেছে রুধির শিরায় শিরায় চঞ্চলিয়া,
উঠেছে মদির মনে বনে নীপ মঞ্জরিয়া।
আজি স্বাধিকার-মত্ত আমার এ যৌবন,
হে চির-তরুণ, করিছে করুণ আকিঞ্চন।
আজি অভিশাপ দূর কর তার, ক্ষমিয়া মােহ,
সব অপরাধ, অবােধ প্রমাদ, চপল দ্রোহ।
মধুমাসে যথা পিকেরে ভ্রমরে চকোরে ক্ষম,
শরতে যেমন মরাল সারস মকরে ক্ষম,
আজিকে যেমন ক্ষমিছ শিবীর মদোৎসবে,
তেমনি নিলাজ যৌবনে আজ ক্ষমিতে হবে।
ঝুলনের দিন মিলনের দিন এসেছে আজ,
আজি যৌবনে ক্ষমিবার দিন, হে রসরাজ।
আজি যদি তুমি নাহি ক্ষম’ তার চঞ্চলতা
চপল কিশাের, ব্রজলীলা তব কথার কথা।
গােলােকে থাক’ না, থাক তুমি তবে ব্ৰহ্মলােকে,
মিছা কথা তবে কেঁদেছিলে কবে সীতার শশাকে,
গীত-গােবিন্দে তুমি নাই, শুধু গীতায় রহ,
মদনমােহন নহ, মদনের পিতাও নহ।
}
৪৪

ইন্দ্রধনু
বিজয়-তােরণ! যবে লাঞ্ছিত ঝঞ্চা পলায় দিগবিদিকে,
জাগাে তুমি নভে, কি-যে তুমি তাহা শুধাবােনা কোন বৈজ্ঞানিকে।
আজো তােমা জানি, বাল্যেরি মত, স্বর্গে-মর্তে রঙীন সেতু,
রচিত গগনে দেবতাগণের এপারে গমনাগমন হেতু।
তােমার মাঝারে মণিরতনের স্বপন হেরি যে উন্মাদনা,
আলােকতত্ত্ব দৃবিজ্ঞানে দিতে পারে তার একটি কণা?
ওগাে প্রেমধনু, মণিহেমত, নহ কল্পনা, তুমি যে রুব,
আছে বিধাতার মহিমার বেদে কেমনে লভিলে ও-তনু শুভ।
প্রথম যেদিন উদিলে গগনে, বিভুর রঙীন্ উত্তরীয়,
কেমনে মােদের বীজী-পুরুষেরা বরিল তােমায়, হে চিরপ্রিয় ?
যখন প্রথম চারু জ্যোতি তব পড়িল গিরির তরুর পরি,
আশি লভিতে জননীরা বুঝি শিশুগুলি হাতে তুলিল ধরি’?
কুসুমের ধূপ ধরণী জ্বালায়, আগমনী গায় ডাহুক চখা,
তােমার কান্তি গায়ে মাখি গায় জয়গান শিখী,-তােমার সখা।
তব মহিমায় হয় রমণীয় গিরিবন তরু তটিনী সবি,
উজ্জ্বল নিধি চে জলনিধি তােমার বিশ্ব বক্ষে লভি।
জরাজৰ্জর সুকলি বিশ্বে, তেমনিটি আছ, হে চিরনব,
প্রথম যেদিন চারু তারুণ্যে জাগিলে উজলি’ আদিম নভঃ।
একই রূপ তুমি কেমনে রাখিলে যুগে যুগে তঁার বিধান ছাড়া,
মানবে প্রথম হর্ষ যা’ দিল পুরাণাে কি হয় তাহার ধারা ?
n
৪৫

প্রাচীন কবিদের বর্মা
নীলাম্বরের তমালবনে ফুটুল তড়িৎ মঞ্জরী,
চন্দ্রকচূড় পীতাম্বর আজ দোল খেলে তায় সঞ্চরি ;
গােঠ গােপাঙ্গনা উন্নয়নে, দেখছে কি তাই ক্ষুন্ন মনে ?
আজকে শিখী কোকিল হলো, চাতক হলাে চঞ্চরী।
পুষ্পিতা আজ বন্ধ্যাভূমি ফুটল কোমল কণী,
মল্পীদলে বল্লরী আজ ভরুল শ্যামল অঞ্জলি
বুখী শিলী-সু-গন্ধভারে, পথ খুঁজে পাই অন্ধকারে।
চন্দ্র গলে, সূৰ্য্য গলে, বজেরও যায় মন গলি।
এমন দিনে বিদায় দিয়ে আপন প্রাণের বন্ধুরে,
নীপের শাখার দীপের শিখায় শলভ হয়ে মন পুড়ে।
বৃথা কুটজ ছিটায় দধির কণা, পথিকবধূ অধীরমনা,
সর্প হয়ে তুল্ল ফণা স্মরের শায়ক বন জুড়ে।
“এমন দিনে কে র’বে হায় বঁধুর পরে মানকরি ?”
মধুপ আজি বলছে শােন’ মধুর সুরে গান ধরি
যেন মেঘাবৃত শশীর কলা, কোষাবৃত অসির ফলা,
কেতক, আজি গন্ধ হানে, কখন্‌ বা নেয় প্রাণ হরি।
-
৪৬

সানু-করে অনুমতি গিরি-প্রপাত মিশিছে নদে,
যেন গজানন-কণ্ঠ গরজে ভৃগুরাম সহ রণােন্মদে।
দত্যুহ নীড় ভেঙে ফেলে আজ, কপােতেরা নব কুলায় রচে,
শিখিরাজ গিরিনাট-মণ্ডপে বারিদ-বিতানে মাণিক খচে।
বেতসী-কুসুমে বাসিতসলিলা কুঞ্জসরিৎ বেত্রবতী,
বায়ু, গজাহত সল্লকী-দলগন্ধ বহিছে মন্দগতি।
পূৰ্বপবনে গিরিবন বিহগী হইয়া উড়িতে চায়,
ফুট কদম্বে আজিকে তাহার শত সহস্র ডিম্ব ভায়।
কেলি-কদম্বে কল কাদম্বে মেঘমালা আজ কাদম্বিনী,
পীনশিলী কল দলে মেদিনী আজিকে মেদস্বিনী
সাশ্রনয়না বিদ্যুন্ময়ী ‘কৃষ্ণা’ দিবস রাণীর কেশে,
সর্জের সাথে ‘অৰ্জ্জুন’ আজি বিজয়মাল্য পরায় হেসে।
রাজগৌরবে বারিধর শােভে দামিনী
তুষে আলিঙ্গনে,
কলাপীচারণ,-স্তুতি সঙ্গীতে, প্রাচ্য সমীর,-সংবাহনে,
অশনি কুরিছে শাসন-ঘােষণা, দ্বিজ চাতকেরা যাচক দ্বারে,
ইন্দ্রধনুটি রাজলক্ষ্মীর শৌর্য-গরিমা দিয়াছে তারে।
গণ্ডমদিরাসক্ত ভূঙ্গে শ্রুতিপল্লবে তাড়ায় গজ,
অবশাঙ্গের জড়িমা দুরিতে মাখে মধুকর কেতকীরজ,
কেতকীকুঞ্জে ক্ষতবিক্ষত জুড়াইতে যায় কামিনী-বনে,
পরশে পাখার ঝরে দল তার—মধুকর আজি প্রমাদ গণে।
৪৭

ভৃঙ্গনীল দেহে চপলাপীতধটী, বকালী-শঙ্খ হন্তে,
চরণ-বিক্রম করে কি নারায়ণ আজিকে বলিরাজ-মন্তে ?
সঘন ব্যোম ধৃতরাষ্ট্র সম, শিখী দুৰ্য্যোধন সম গর্জে,
কোকিল, দূতজিত ধৰ্ম্মরাজসম নীরবে হৃত দেশ বর্জে।
ভাতারা অনুগামী হংসসম, ভেক কর্ণসম মাতে হর্ষে,
ভীষ্মদ্রোণসম গ্রীষ্ম-মগণ অশ্রু নতশিরে বর্ষে।
বৃষ্টিধারা ঝরে রূপালীজরি যেন দামিনী-দীপালােকে ঝলিয়া,
ছিন্ন অম্বর-পটের দশাসম বারিদ পড়ে আজি গলিয়া।
আর্তনাদ করে বিরহি-হৃদি-সম নীরদ ঢলি গিরি শিখরে,
ব্যজন করে তারে শিখীরা শিখা মেলি’ মণির দ্যুতি তায় ঠিকরে
হৃষ্ট দৰ্দর পঙ্কক্লেদ-জলে মেতেছে ভূরি ভােজে তড়াগে,
নীপের দীপ জ্বলে তটবীতমঃ হরি ষড়জে গায় শিখী সরাগে।
মেনকালিঙ্গনে ঋষির তপ’ সম নিশীথনাথ আজি মগ্ন,
গণিকা-নারীসম চপলা চঞ্চল রয়না এক দেহে লগ্ন।
প্রবল ধারা শরে তড়িৎ কেতু রথে অশনি দুন্দুভি বাজিয়ে,
দিবনাথে জিনি’ হরিছে তার ‘কর’, বিজয়ীপয়ােধর আজিকে
সােমের আঁখি ঝুরে ব্যোমের বনে-বনে, জ্যোছনা হৃত মেঘাবরণে
গলিত বল্মীক, গলিল বাল্মীকিচিত্ত যথা সীতাহরণে।
সুরেশ নানা সুরে বাজায় বনবীণা, দিবস-নিশা-ভেদ লুপ্ত,
গগন দ্রবীভূত বানিলে, মহী কমল-গাখি মুদি সুপ্ত।
৪৮

১
নীপ-সৌরভে ভরি দশদিশি নৃপ-গৌরবে আজ
অই-এসেছে প্রাবৃঢ় রাজ।
সজল জলদ গজবুথ তার, তড়িতে কেতন উড়ে,
সঘন অশনি-মর্দলে ধ্বনি ঘােষিছে অবনী জুড়ে,
আজ-প্রবৃট পশিল পুরে।
মেঘের মন্ত্র শুনি মাতঙ্গ মেতে উঠে মদ ভরে
রােষে-অনুষ্কার করে।
যপদগণ কট-মদ-লােভে গণ্ডে তাদের বসে,
উৎপল ভ্রমে নৃত্য-বিতত শিথীর কলাপে পশে।
হ্রদে তেয়াগিয়া তামরসে।
গিনির দগ্ধ হৃদয় জুড়ায় প্রেমময় সেখগুলি
করি-বারবার কোলাকুলি।
সমূলে উপাড়ি তীর-তরু, নদী আবিলসলিমতি,
রূপবতী-হতভাগিনীর মত চলে যথা উপপতি
কূলে-কে রােধে তাহার গতি?
তড়িতে পা পড়িয়া যাক না—চাতকী ছুটিছে তৰ
তাকে-ডেকেছে প্রাণের প্রভু।
কুলের অবলা সহসা সবল করে দূরে অভিসার,
স্বভাব-চপলা-চপলা দূতিকা সহায় হয়েছে তার
পথে-চমকিয়া বারবার।
৪৯

নিতম্বিনীর শ্রেণিচুষিত লম্বিত কেশ-পাশে,
চারু—স্ফুট কদম্ব হাসে।
ত্যজি অনলে অঙ্গনা আজি ইন্দ্রদেবেরে পূজে,
সন্ধ্যার মেঘ-মন্দ্রে কৃপার ইঙ্গিত বলি বুঝে,
ত্বরা-বন্ধুর গৃহ খু
প্রেয়সী কানন-রমার আনন রাঙায় প্রবৃট-রাজ
চুমি’-ভাঙ্গায় তাহার লাজ।
শােভায় কূটজে কটিতট, শ্রুতি তরল মুকুতা ফলে,
করবীতে দেয় সুরভি করবী, মালিকা যুথিকা-দলে
তার—মালা গেঁথে দেয় গলে।
লভি নববারি দাহ তাপহারি, আজি ধরা-নারী সুখে
ধারাস্নান করি কৌতুকে,
ইগােপের বিদ্রুম, নব তৃণ মরকত রাজি,
নব কণী ইন্দ্রনীলের রম্য ভূযায় সাজি
রূপে-বরবর্নিনী আজি ।
নব্যারি-সেকে রােমে রােমে জাগে নারী-দেহে অঙ্কুর,
কালাে-অগুরুতে ভুর ভুর।
পৌর প্রাসাদে বজ্রের নাদে কামিনীরা কঁপে ডরে,
মানিনী ভামিনী মান ভুলি নিজ দক্সিতে আঁকড়ি’ ধরে,
ভয়ে-নিশীথ-শয়ন পরে।

পথিক-দয়িতা শয্যাশায়িত মরে খর সুর-শর,
তার-নয়নে বরষা ঝরে।
তনু-দাহ তনুলেপনে মাল্যে দূর হয়নাক আর,
একে একে সবি অঙ্গের ভূষা করিয়াছে পরিহার
লঘু—দুকূল হয়েছে সার।
চলে বায়ু অতিমন্থরগতি শীকর-নিকর বহি
ধীরে—বিরহিচিত্ত দহি।
মন্থরতর চলে পয়ােধর বিষে অন্তর জরে,
প্রবাসিজনের দণ্ড প্রহর মন্থরতায় ভরে,
তার—গজগমনারে স্মরে।
নতঃসতীর পীন পয়ােধরে দুলিছে তড়িৎ হার,
মরি,-হরিতে হৃদয় কার ?
শৈল-শিখরে শিখা বিস্তারি’ শিখীরা লাস্য করে,
ময়ূরপুচ্ছ ধরি বেন গিরি মৌলি-চূড়ার 'পরে
আজ-গিরিধারিরূপ ধরে।

সালাং ভ্ৰমসি শরণং
সন্তপ্ত-শরণ মেঘ, বন্ধু তুমি, দ্বিধা নাহি তায় ;
একই দশা দুজনের ব্যথাময় এই বরষায়।
তুমিও গাহিছ বন্ধু মােরই মত বিরহের গান ;
থেকে থেকে চপলায় চমকিয়া উঠে তব প্রাণ।
মরি গুমরি বক্ষে গুরুব্যথা তােমারে বিহরে,
বজ্র-গর্জে মমারি মত তােমায়ােত হৃদয় বিদরে।
আমারি মতন ত বেদনায় সকলি আঁধার,
কালিমায় ডুবে যায় কৰ্ম্মহারা নিখিল সংসার।
কাঁদিতে কঁদিতে তুমি মােরি মত ঘুমাইলে হায়,
সুখ রে বন্ধু ইন্দ্রধনু বর্ণের আভায়।
মুখ-কষ্ট্রে বক্ষে ধরি যামিনীতে বিনিদ্রনয়ন,
চন্দ্রিকায় রচ’ তুমি কল্পনার মিলন ভবন ।
দূরে রহি মাের মত বিরহিনী তােমার শিখিনী,
মিলনের উৎকণ্ঠায় কেকাকর্থে কঁদে একাকিনী।

কাজী
শােভন গহনে ঘন হরিৎ ঘটা,
ত্বরাবনে এস সই
সঘন গগনে হেন তড়িৎ ছটা,
মােরা,—কোণে কেন রই ?
কি কথা শুনাল দেয়া নীপের কানে-
সে যে—শিহরে শাখে,
রজনীগন্ধা কেয়া গন্ধ হানে-
অলি-বিহরে ঝাকে,
বুল বুল কূজে মুহু গুলবাগানে
শিখী—ক্রৌঞ্চ ডাকে,
যােলসাজে সেজে এস বনের পানে
নাচ—তাথৈ তাথৈ।
কবরী দুলায়ে এস ঘাঘরা পরি—
এস,কলসী কাখে,
মীর-রবে সারা নগরী ভরি’-
এস-নােলক নাকে,
বরষা চলিয়া যায়, এসেছে তরী,
ফিরে—পাইবে তাকে,
ফিরিবে না যৌবন বিশবছরী-
তুমি কঁদনা যতই।

শ্রবণ-প্রশক্তি
বাস-ভবন হতে এলে নামি বিলাসী শ্রাবণ,
মূর্তিমান আনন্দ প্লাবন।
কলকণ্ঠে কল্লোলিনী দূতী তব শ্রেণিরানত,
দু’কুল অান্দোলি চলি দিগদিগন্তে বহিছে বারতা।
সাজিল গগন-বধূ এলােকেশে চপলা-মালায়,
কপোলে চুম্বন দিলে মেঘে স্নান উঁদ হয়ে ভায়।
সাজালে বসুধাঅঙ্গ শ্যামশঙ্খস্মিত শােভা দিয়া,
কদম্বকূটজ-হারে গন্ধভারে কবরী রচিয়া।
বনান্ত-অঞ্চল চুমি চঞ্চরীরা মাতিছে গুঞ্জরি,
কর্ণে তার অর্জুন-মঞ্জরী।
মিলন মঙ্গলময়,-মদমত্ত চঞ্চল যৌবন,
লয়ে তুমি এসেছ শ্রবণ।
মদালসা ময়ূরীর নৃত্যগীতে দিলে মধুরিমা,
ভূধর-বধূরে দিলে সুধা-উৎসে মেনকা-গরিমা।
চাতকীরে চিত্ততােষ কেতকীরে সুরভি উচ্ছ্বাস,
মরুর কঙ্কালে দিলে সঞ্জীবন শ্যামল উল্লাস।
নবীন পল্লবভূষা বল্লরীরে তরু-আলিঙ্গন,
সমীরণে, প্রকৃতির সিক্তালকে আনান্ত-চুম্বন।
দিলে অন্ধকার পথ, অভিসারে চলিছে কামিনী
পথে দূতী দিয়াছ দামিনী।
৫৪

বর্ষা।
পরক্ষণে তােমা হেরি হে শ্রাবণ রাখালের বেশে,
ইন্দ্রধনু-শিখিচুড়া কেশে।
শাঙলী ধবলী ধেনুপৰিবৃত শ্বেত শিলা’পরে,
গলে বকফুল মালা, বসে আছ উদাস অম্বরে।
তোমার মুরগী তানে পুলকিত প্রিয়ঙ্গু-মুকুল,
হিয়ঞ্জুফেনিল ছুটে দুগ্ধনদী প্লাবিয়া দু’কূল।
দূৰ্ব্বা রােমাঙ্কুর জাগে প্রান্তরের সৰ্ব্ব দেহময়,
কেতকী কত কি কথা কামিনীর কানে কানে কয়
প্রাক্তন-জন্মের প্রতি এতদিন আছিল পাশরি,
স্মৱাইছে তােমার বাঁশরী ।
তােমার মদির মােহে ছিল যারা আবেশবিহ্বল
বেণু-তানে হইল চঞ্চল।
তেয়াগি কণ্ঠেরে তৃষা জ্বলে উঠে মনের ইন্ধনে,
প্রসুপ্ত দক্ষিণ বায়ু জেগে উঠে স্নায়ু-কুঞ্জবনে।
কুররী কুররে যাচে, ক্রৌঞ্চ তার বাঞ্ছিতারে চাহে।
দাদুরী ডাহুকী আজি ছাতিফাটা মত্ত গীতি গাহে।
মরালী মরাল মাগে, মৃগী মৃগ, ময়ূরী ময়ূর,
নব মেঘ-দুত রচে যুবকবি বিরহবিধুর,
আঁখির কজ্জল দিয়ে লিপি রচে ওে
মুগ্ধা বালা আজি সাহসিকা।

তার পর একি হেরি যুবরাজ হে শূর শ্রাবণ,
কোথা তব বিলাস ভবন ?
একি সাজে সাজি এলে ত্যজি বংশী বনফুলহার,
বৰ্ম্মে তনু আবরিয়া, অংসে ধনু, করে তরবার,
চতুরঙ্গে রণরঙ্গে সঙ্গে শত তুরজ কুঞ্জর,
বৃংহণ হ্রেষণ-ধ্বনি ঝনঝনি রথের ঘর্ঘর,
ঘােষিছে সমরযাত্রা, বজ্রময় কোদণ্ড-টঙ্কার,
আলায় বাড়ব-বহ্নি ভয়ঙ্কর উঠে হুহুঙ্কার,
দিগ্ধারণ-কুম্ভ টুটি অন্তরীক্ষে ছুটে মদধারা,
পথধূলি ফেন-পুঞ্জে হারা।
এ সজ্জা হেরিয়া তব রণমল্ল সশস্ত্র শ্রাবণ,
শশব্যস্ত ভয়ে ত্রিভুবন।
পথ ছাড়ি এস্ত ধরা স্তব করে জুড়ি দুই পাণি
আসন্ন আশঙ্কা স্মরি উন্নয়ন ও অরণ্যানী।
সন্তান ছুটিয়া মাতৃক্ষোর্গে লভিছে আশ্রয়,
প্রিয়েরে আঁকড়ি ধরে নববধু লজ্জা করি জয়,
পথঘাট জনশূন্য, রুদ্ধ দ্বার ভবনে ভবনে,
বন্য জীব ছুটে গ্রামে, গ্রাম্য জীব ছুটে যায় বনে।
সুকাইয়া নামি উষা দ্বার ঠেলে ধীরে ঘরে ঘরে,
দিবসের আঁখি মুদে ভরে।
।

তারপর একি হেরি কোথা ভেরী রথ করিগণ ?
একি সাজে সাজিলে শ্রবণ? •
কীর্তনে নর্তন তব হেরি আজি বিশ্ব-নদীয়ায়,
ঢল ঢল কান্তি, আঁখি ঢুলু ঢুলু প্রেম-মদিরায়।
প্রেমাশ্রু ঝরিছে তব দরদর আনন্দ উন্মাদে,
রসের তরঙ্গ উঠে মেঘময় মৃদঙ্গ-নিনাদে।
ধূসর সােনার অঙ্গ ব্যথা পায় ধূলায় কাদায়,
ইলােকে শচীমাতা দশা দেখে করে হায় হায়।
ম-লতিকায় নদী-পারাবারে প্রেম বিতরণ
মেঘে মেঘে আজি আলিঙ্গন।
নাচিয়া উঠেছে বিশ্ব, একি দৃশ্য তােমার কীৰ্ত্তনে,
হৃদি নাচে তােমার নৰ্ত্তনে।
করতালি দিয়া নাচে নদ নদী নানা রঙ্গ ভরে,
ময়ুর ময়ূরী নাচে, তরী নাচে উত্তরঙ্গ পরে।
পল্লীর মালঞ্চ-কুঞ্জে নাচে শ্যামা পল্লীবধুগণ ;
কুম্ভিকা কলম্বী নাচে সবােবরে সঞ্চারি’ যৌবন।
মেখলা দুলায়ে নাচে নিতম্বিনী নিসর্গ-সুন্দরী,
সারস মরাল নাচে তব রস-পাথারে সরি।
নাচিছে নিখিল প্রাণ তােমাসনে স্বর্গসুধার
তার সনে হৃদয় আমার।
৫৭

তুমদল।
অকস্মাৎ সব শেষে একি বেশে আসিলে শ্রাবণ,
সৌম্যকান্তি নয়ন-পান।
লম্বমান জটাজুট, বক্ষ-তটে কাশশ্মশ্রু-ভার,
রুদ্রাক্ষ-মালিকা কণ্ঠে, দীপ্ত নেত্র করে ভৃঙ্গার,
হােম-ভস্ম-ত্রিপুণ্ডক শোভে ভালে ত্রিধারা-সঙ্কাশ,
সােমগন্ধি স্বেদ-বিন্দু সিক্ত করে কৃষ্ণাজিনবাস।
ধূমকষায়িত নেত্র,-হােত্ৰশেষে সাফল্যে উজ্জ্বল,
ছিটাইলে শান্তি-বারি, মূর্তিমান যেন তপঃ ফল,
সঞ্জীবন-হর্ষে পুনঃ জীব-লোক জাগিল অমনি,
করি উচ্চে জয়জয়ধ্বনি।
যজ্ঞ হতে পৰ্জ্জুন্যের অন্ন হ’তে জীবের জীবন,
জন্ম দিলে দেবর্ষি শ্রবণ।
তারপর একি হেরি বিস্ময়ে যে কণ্টকিত কায়,
বসিয়াছ যােগাসনে রুদ্ধশ্বাস কোন সাধনায় ?
অনাব, শােষ, দাহ, তর্ষ আদি সুরারি-বিনাশে,
আপন অশনি-অস্থি দিতে চাহ ভৈরব উল্লাসে ?
সিন্ধুতে স্বনিল শঙ্খ, বসুন্ধরা মন্দার-সুরভি,
দুন্দুভি বাজিল স্বর্গে, পুষ্প-বৃষ্টি করে চন্দ্ররবি।
বাঁচাইলে বিশ্বভুমি দিয়া তুমি জীবন আপন,
জয় জয় বিজয়ী শ্রাবণ। {

বর্ষা।
ভাদরে
আজিকে মধুর ভরা ভাদরে,
ঝরে নভে নীরধারা, ঘরে ঘরে ক্ষীরধারা,
দাদুরী মুখরা হলে আদরে।
ছুটে ধারা টুটে কারা গিরিদরী বিদারি’
হ্রদ-সবােবর নব সরসিজে শ্ৰীধারী,
নাহি কোন প্রয়ােজন আজি লাজ দ্বিধারই,
মিছে নিষেধের বাঁধ বাঁধ'রে।
মীন-বিনিময় করে আজি বকবকীরা,
নিশীথেও মিলে আজি যত চখাচথীরা,
ঘরে নীরে কলরব করে সখাসখীরা,
নবীন মাধুরী দয়িতাধরে।
বুকে ব্যথা পুষি বৃথা মিলনের প্রয়াসে,
কোন শাপে কোন পাপে, বঁধু তুমি, প্রবাসে
সকল বাঁধন ছিড়ে ফিরে এস সুবাসে,
• মিছে কেন মেঘদূতে সাধ’রে।
যুথহীন হয়ে মীন ঘুরেনাক সরসে,
ফুলবধু হেসে মধু ঢালে অলি-পরশে,
গিরি-উরসিজ ধরা ঢাকে লাজে হরষে,
নিখিল জাকুল হলে বাদরে।
৫

ঋতুলল।
t
শরতেন গান
বরিষা গতে মরাল রথে শরৎ এলাে বঙ্গে,
চকোর কলবিঙ্ক অলি মরকেতু সঙ্গে।
বরিষে লাজ লতিকা শাখী স্বাগত গায় চক্রবাকী,
সিনানে-গুচি ধব-রুচি বরিল ধরা রঙ্গে।
তরল পথে মরাল-রথে শরৎ এলাে বঙ্গে।
বন-দুহিতা অপরাজিতা করবী হলে ফুল্ল,
সিত বকের শাখায় শত বকের শিশু দুল্লো।
বাতাবি নাগজ-বনে
পশিল চোর সঙ্গোপনে।
ফুটিল আজি কমলরাজি কান্তানন তুল্য,
অরুণধরে হাসিটি তার শেফাবিনে ফুল ।
গগনরাজ খুলেছে আজ বিরাট দানপত্র,
বিশ্বারে শােভা শীর্ষে কিবা সিত বারিদ ছত্র।
লহরী নাচে পাইয়া মণি, আঙিনা হলো সােশার খনি,
বাড়ায়ে পাণি হয়েছে ধনী নিঃস্ব তরুপত্র,
কিরণজান-সুত্রে-মণি-হিরণশানসত্র।
ছাতিম ছায়ে পাতিল ঘা-কল্পনা বনলক্ষ্মী,
ফুটিল পায়ে থল-নলিনী জুটিল মধুমী।

শরৎ।
ধের ঢেউ কাশ কুসুমে আলতা মাখে ও-পদ চুমে
ছলোহারে বলে তারে অযুত বনপক্ষী।
ছাতিম তলে সদলবলে জুটেছে বনলক্ষ্মী।
গর্ভভরে নীবার শালি ঢলিয়া পড়ে ক্ষেত্রে,
সরসী রসচপলা চায় চল সফরী-নেত্রে।
নদীর আজি অধীরা নয়,
তটের বিধি মানিয়া বয়,
নন্দী গিরি-পুলিনে সদা শাসিছে হেমবেত্রে,
ইক্ষু চাহে ঘােটা খুলে চক্ষু মেলে’ ক্ষেত্রে।
চপলা আজি অচল হলে সন্ধ্যারাগপুঞ্জে,
চাতক এসে অলির বেশে ফুলের দেশে গুজে।
ফলের বান শুকিয়ে ব্যোমে আলাের খান তপনসােমে,
মেঘের রঙ লুটিয়া ভুমি শ্যামলা শতগুণ, যে।
ইন্দ্রধনু কোটিধা হলাে বনকুসুম-কুঞ্জে।
শরতে বারি অমল পূত মুক্তাতিযুক্ত,
ভারত-পাঠে জনমেজয় যেন কলুষমুক্ত।
মদির লােল বাসনারাজি শাশুভ শাসনে আজি।
বিভুর কৃপাবিভব ধীরে নীরবে উপভুক্ত।
গগন বন, জী, মন, পাবন-রূপযুক্ত।

মঙ্গল।
• -
ঘুমিয়ে ছিলাম অঝের-ঝরণ কাজল বরণ রাতে,
আজ ধরা ততায় চিনতে নারি মানসইরণ প্রাতে।
সুধার ফেনার ফেনায় ভরা কল্প ভুবন স্বপ্নে গড়া,
একোন্ ধরা? কৈ পরিচয় নেইত ইহার সাথে।
আষাঢ় সাঁজে ভাল আমার মেঘদরিয়ায় তরী,
নাচল কিবা তাহার গ্রীবা দিবস-বিভাবরী।
ঘুম এলাে মাের তার দোলনে নিয়ে এলাে মনপবনে
কোন্ অজানা কোন্ অচেনা দেশের কিনারাতে।
কুঞ্জ হেথায় বরে আমায় সেফালিকাঞ্জলি,
মরাল আমায় আগায়ে লয় স্বাগত গায় অলি।
ঘরের ছেলে ফিলে ঘরে বরণ-ঘটা কিসের তরে।
অতিথি আজ হ’লাম বুঝি স্বপ্ন-অলকাতে।
সপ্ত রঙে ব্যাপ্ত শরৎ বঙ্গভূমির অঙ্গ ভরি’
শােভন প্রতিবিম্বটি তার রামধনুতে গগন’ পরি।
‘রক্তিমা তার বোঁটায় বোটায়, বনবাগানে শিউলি ফোটায়,
বিম্বে রাঙায় থলকমলে জলকমলে রঙীন্ করি।
‘নীলিমা’তার গগনজোড়া পুষ্পিত হয় ইন্দীবরে,
কালাে কেশের তার ‘কালিমায়’ অপরাজিতা বন্দী ক্য
৬২

শরৎ।
হিরণ বরণ” তরুণ উষায়, ধরায় শশাভায় হিরণভূষায়,
অরুণ কিরণ রূণা-ধারায় তরুর শিয়ে পড়ছে ঝরি।
ধবল বরণ’ তরল হলাে দুগ্ধ-ধারায় গােষ্ঠ-গেহে,
কুদৗ কৌমুদী ফুটায় নিশীথিনীর কৃষ্ণ দেহে।
ঢেউ খেলে যায় কাশের দলে, হাঁসের পাখায়, কাসারজলে,
নীল দরিয়ায় ভাসায় অযুত পাল-তােল। শ্বেত মেঘের তরী।
‘পিবরণ’ মধুর ধারায় ভূঙ্গে মাতায় গুঞ্জরণে,
‘ধূসর ধূমল’ ধূপের ধোঁয়ায় গন্ধ বিলায় পূজাঙ্গনে।
জুড়ায় নয়ন মানসহরণ, মাঠে মাঠে শ্যামল বরণ’,
শশু-ধনে বাংলা মায়ে করেছে রাজরাজেশ্বরী।
৪
শেফালি, তুই শরৎ ঋতুর পুষ্পিত স্বরূপ,
মাধুর্যে তোর মুগ্ধ বিভাের মাতুল মন-মধুপ।
ততার মাঝে পাই কুমুদ-কমল উশীর মৃগম-পরিমল,
পুড়ছে রে তাের গন্ধকোষে দেব দেউলের ধূপ।
শরৎ অরুণ ইন্দ্রধনু সন্ধ্যারাগের ছটা,
বিরচিল তাের বোঁটাতে দীপান্বিতার ঘটা,
উজল শিশির বিন্দু মাঝে তরল হয়ে ইন্দু রাজে,
বিলসে তায় স্বচ্ছ বিমল নদীতভাগ কুপ।

ঋতুমঙ্গল
জােৎস্নাধবল পাপড়িতে তোর মরাল পাখা মেলে,
কাশ-দরিয়ার ঢেউগুলি তায় শরৎ বায়ে খেলে।
নরনারীর মিলন সরস, মহােৎসবের পুণ্য পরশ,
দিয়াছে তাের মধুকোষে মাধুরী অনুপ ।
শরৎ এসেছ ভারতে আবার বরষ পরে,
আমি দীন কবি, কি গান রচিব তােমার তরে?
সমাদরে রবি উজল হিরণ কিরণ জালে,
রচেছে ভূষণ তােমার উরসে তােমার ভালে,
শশী তব দেহে চারু লাবণ্য-মাধুরী ঢালে,
ধরণী তােমায় কাশের চামরে ব্যজন করে।
আমি দীন কবি, কি গান রচিব তোমার তরে?
গােষ্ঠ-জননী দিল তব ভােগে শুভ্র ননী,
বনরাণী ছিল পূজায় শেফালি সন্ধ্যামণি,
ইন্দিরা তােমা কন শস্তে করেছে ধনী,
ইন্দ্রধনুতে ইন্দ্রাণী তব তােরণ গড়ে,
আনি দীন কবি, কি গান রচিব তােমার ঘরে ?
যুগে যুগে কবি রচিয়াছে তব বরণগীতি
কালিদাস তােমা দিয়াছে প্রাণের অগাধ প্রীতি,
তােমারে বরিতে ভারৰি সহসা ভুলিল নীতি,
বুৰি কৰি তােমা বর্ষে বর্ষে হর্ষে বরে।
আমি দীন কবি, কি গান রচিব তােমার তরে?
৬৪

শরৎ।
জ—শ্বেতকমল আর রক্তকমল একই সরােবরে,
লাস্যকরে, হাস্য শােভায় বিশ্ব-মানস হরে।
লক্ষ্মী বাণী আজকে দোহে কমলবনের সমারােহে
পাশাপাশি এই শরতের বক্ষে বিরাজ করে।
মরাল গাহে বাণীর পায়ে, কাশের চামর তুলে,
লক্ষ্মীমায়ের আশিস দুলে শস্য-শ্যামল কূলে।
শ্রীর অঙ্গের মাধুরী উথলে উঠে বঙ্গ জুড়ি,
বাণীর বীণা বাজছে বনে পৰ্বতে নিঝরে।
মহাশ্বেতার অঙ্গ-বিভায় শুভ্রা বিভাবরী,
সকল নদীই সরস্বতী কলস্বরেশ্বরী।
দোহার চিরদ্বন্দ্ব আজি ছন্দ হয়ে উঠছে বাজি’,
বিতরে আনন্দ শুভ মােদের ঘরে ঘরে।
৭
শরৎ আসিল শারদীয়া মার বোধন-বাঁশরী বাজিল ঐ,
পূজার আতি কে করিবে তার আজিকে ভারতে সুরথ কই ?
কথা রঘুনাথ, শায়কে আবার কে আঁখি উপাড়ি দেবে উপহার ?
কে গাবে চণ্ডী? কার কাছে আজি পুষ্পাঞ্জলি-মন্ত্র লই ?
শরৎ আসিল, সুতরা তটিনী, সুগম আবার যাত্রাপথ,
দিগ্বিজয়ের লগ্ন অসিল কোথায় আজি সে বিজয়-রথ ?

অশ্বমেধের সে দুৱৰ্থ কোথা?
বিশ্বজিতের কই রাহােতা?
পৱীক্ষিতের পবিঘৎ কোথা, কোথা গীত হবে মহাভারত ?
•
শরৎ আসিল কোজাগরী নিশা জাগায়ে রাখিল এ চরাচর,
কমলা আবার শ্রীচরণ দুটী রাখিল অমল কমল’পর।
লক্ষ্মীছাড়া এ ভারত মাঝারে ঘটাসমারােহে কে পূজিবে তারে
কোথা ধনপতি, জগৎ শ্রেষ্ঠ, কোথা মম্ভ, লখীন্দর ?
শরৎ আসিল ধবল অমৃত গলিয়া পড়িছে চন্দ্রমার,
শিউলী, ছাতিমে মেঘে কাশে হাসে বন্যা এসেছে তার।
এত যে আলোক এত শুভ্রতা অমার আঁধারে খদ্যোত যথা-
ঘুচাল না হয় দেশ-মানসের একটি কণাও অন্ধকার।
৮
বসন্ত কি শরৎ হয়ে আসলে ফিরে মােদের ঘরে ?
স্পর্শে তােমার সেই শিহরণ, তেমি আবার মধু ক্ষরে ।
তেমি কানন পুষ্পমদির, সেই বারতাই বইছে সমীর,
তেমি শুয়ে ভােয়া অধীর, গুঞ্জরে ফের কুসুম 'পরে
তবু তােমায় চেনাও কঠিন, বদলে গেছে বেবাক ঢং,
বদলে গেছে গায়ের গালের হাতের পায়ের ঠোটের রঙ।
পরাগ-ভূষার তলায় দেখা যাচ্ছে শিথিল বলির রেখা,
ব্যথায় পরুষ কণ্ঠ তােমার শুছি সারস হাঁসের স্বরে।

উত্তরীয়ে শুত্র হেরে চিনাে হঠাৎ কেউ,
টাচর চিকুর ধবল হয়ে খেলছে শিরে কাশের ঢেউ।
ই সে বিলাস-চপল
নাই সে চটুল কলকথা,
ভক্ত তুমি মন্দিরে আজ কমল-কুমুদ অৰ্য্য করে।
বােধন বাঁশ বেজেছে ঐ অলস আবেশ ছেড়ে দে ভাই,
জড় অসাড় ঐ জীবনটাকে উৎসাহে আজ নেড়ে নে ভাই।
ডুয়ে নে ছিন্ন বীণাই
কুড়িয়ে নে রুগ্ন সানাই,
ছেড়া কাপড় গিঠিয়ে নে ছেড়া কাথা ঝেড়ে নে ভাই।
চিননীরের যােধন-ঘটে সাজায়ে নে’ হৃদয়-তটে,
শীর্ণ করে বরষ 'পরে জীর্ণ কুটীর সেরে নে ভাই।
সিছে মা যে কুটীর দ্বারে আগায়ে কর বরণ তারে,
দেখতে ফিরে পাস্ কি না পাস্ চরণকমল হেরে নে ভাই।
১০
জ—বিজয়ার রাতে দাও ভাই দাও বুকভরা কোলাকুলি,
আজিকার মহা-মিলনে মিলিতে চাই ভাই খােলাখুলি।
রি দেয-ঘের মন কষাকষি, মাখালে মাখিলে ছড়াইলে মসী,
আজি ভুলে যাও সৰ অপরাধ ক্ৰটী পরমাদ গুলি।
রিয়াছ যারে ঘণা অনাদর আজিকার শুভদিনে সে সােদর,
ধুয়ে দিক আজ নয়নে বাদর সব মলিনতা ধূলি।
ই বিজয়াই জীবনে এখানে শেষ কিনা হয় তাইবা কে জানে?
বিজয়া যে আজ পাজয় হবে ক্ষমা যদি যাও ভুলি।
৬৭

ঋতুমঙ্গল।
আগমনী
শত শত শ্বেত আলােক কপােত নামিল দেউল চত্বরে,
পাখার বাতাসে উড়ায়ে হতাশ অন্ধকার,
সুষমার খনি কুসুমতরণী প্রজাপতি পাখা পা’ল ভরে,
আনিছে বহিয়া তব অঞ্চল গন্ধভার।
বৎসর পরে আসিছ আবার জননি,-ৎসবৎসলা,
বােধনােৎসবে নন্দনগণ বন্দমান,
শিশু শশিদূত ঘােষিছে বারতা,-ধরণী হর্ষ-চঞ্চল,
দিশি দিশি শুভশংসি সূচন,ছন্দোগান।
বিম্বিত তব তনু লাবণ্য-স্ফটিক স্বচ্ছ অধুতে-
ইন্দ্রধনুতে,--পরিবেষ মুখ চন্দ্রমার,
দিগ্বধূগণ করিছে বরণ,-শুভ্র কথুতে,
কলকাদম্বে লম্বিত তব কণ্ঠহার।
যেখানে যেখানে ফেলিছ চরণ জাগিছে চেতনা উল্লাসে
হাসিছে গরবে করবীর স্থলপদ্মায়।
মিত সুধারস পরশে হরষে মরুতেও আজি ফুল হাসে
অলির কণ্ঠে ঝু ঝু মকরল বয়।
ভরেছে তােমার করুণার দানে আদরের উপঢৌকনে
গৃহমালঞ্চ, ফলের মঞ্চ, ক্ষেত্ৰবন।
পীর শ্যামল নীবার শালির চিকন রূপ-যৌবনে
সানা তব জুড়ায় ক্লান্ত নেন।
ফুল কাসে

শ্মশানে মশানে সহসা শিহরি’ শবদেহ আজি দেয় সাড়া,
উঠিয়া বসেছে শয্যালগ্ন রুগ্নগণ,
পাষাণে পাষাণে রস-সঞ্চার, তৃণ-রােমাঞ্চ,বয় ধারা,
ভগ্ন তরীটি খুঁজিয়া পেয়েছে, মগ্ন জন।
পল রচে প্রণামাঞ্জলি কমল-কুমুদ-কুলে
কৌমুদী রচে পথে পথে তব আলিম্পন।
দাড়ায় দুধারি মাথা হেঁট করি তরু ভেট ভরি ফুলফলে,
আলতা পরায় পুষ্পিত জবা-ডালিমবন।
আয় গাে জননি, ক্ষীণ নিরন্ন শােকবিষন্ন দীন দেশে
আসিতেই হবে কেমনে এড়াবি মেহের টান ?
সন্তান তাের পথে প্রান্তরে ঘুরে নিতান্ত হীন বেশে
পাষাণি, তাের কি গলিবেন ঐ মায়ের প্রাণ ?
দীনের এ ঘরে বরষের পরে শ্রীচরণ ধূলি দান করি,
ধর শাকানু,পরম ছিন্ন জীর্ণ চীর।
এ দশা হেরিলে মহিষাসুরেরও মমতায় যাবে প্রাণ ভরি,
সিংহবাহিনি, সিংহেরে ব’বে অশ্রনীর।
পরবশ ভুজে কর, দশভুজে, অজেয়,-শক্তি সঞ্চারি’
জৈব কালিমা কুণ্ঠাকুষ্ঠ কলুষ হর।
দে’মা সমৃদ্ধিসাধনা সিদ্ধি,—দৈন্য-জড়তা সংহারি’
মহিষদলনি, মেয়েকে আবার মানুষ কর।
৬৯

আবাহনী
আসিছ বরদে, আবার ভারতে কিরণের রথে শােভন শরতে,
তববরণ-দীপালী ফুটেছে সেফালিকুঞ্জে
স্নেহ যে তােমার আগে হ'তে গলি কূলে কূলে দুলে উঠিছে উছলি,
তব-স্তন্য-ফেনিল পুষ্পিত কাশপুঞ্জে।
সবার লাগিয়া কৃপাসম্ভার, আনিছ আশিস্ স্নেহ-উপহার,
মাগাে-বিশ্বম্ভরা ভরিবে সকল শূন্য,
মােদের জন্য কাম সে ধন আনিবে না? বৃথা রােদনে বােধন?
মাগাে–মােরা কি রহিব চির-বঞ্চিত ক্ষুন্ন ?
আনিছ ঝরণা ধেনুর আপীনে, সঙ্গীত নব বেণুৰ বিপিনে
মাগাে—কবির বীণায় আনিছ নবীন ছন্দ ;
কপােতকণ্ঠে সুষমা পেশল, কেশরীর শিরে কেশর কোমল,
চল-মদির সমীরে আনিছ মধুর গন্ধ।
করীর কপােল মদ-গৌরব, হ্রদ-নদী-নদে মীন-বৈভব,
যত-পক্ষিমাতার ওর্তে নীধন ডিম্ব,
সন্ধ্যার তরে সিন্দুর-রেখা, ইন্দ্রধনুর ললাটিকা-লেখা,
দীন-গোষ্পদ বুকে রুচির চন্দ্রবিন্দ্ব।
লভিতেছে উষা গজমােতিহার কোকনদভূষা তড়াগ-কাসার,
পুন—লভিছে মুক্তা প্রাণ-পুট-তলে শুক্তি,
লভিছে মুক্তি শশী তারকারা, লজিছে মুক্তি মধুমধারা,
হয়—আনিবেন শুধু মােদেরি লা’িমা মুক্তি?

শরৎ।
আমণী
?
ৰােধন-সানাই কানে পশে নাই প্রাণে বাজে নাই তাের
ওরে পরবাসী ছিড়ে ফেল ফাঁসী কাজ-অকাজের ডাের।
গুটাও গ্রন্থ সুশীল ছাত্র,—পুন জীবন্ত হও,
উঠাও যন্ত্র যন্ত্রীরা,আর কেন যন্ত্রণা সও ?
কে কর গােলামী ? কেবল সেলামই করিয়াছ বায়ােমাস,
উদ্ধত বলে বলুক সকলে, আজো কেন ক্রীতদাস ?
দরকার হলে ছুড়ে দাও ফেলে আজি সরকারী চাবি,
চালাও বন্ধু না-ছােড়বন্দ সব আদার দাবী।
হাতে আছে কাজ ? পড়ে থাক আজ, তুমি কি মজুরমুটে?
নােক গোঁজা মিল, তুমি সােজা খিল খুলে চলে এসাে ছুটে।
ভাঙো পা’-র বেড়ী, হবে বুঝি দেরী মাইনে পাওনি বলি’ ?
অচল র’বেন সংসার, এস ‘চাইনে’ বলিয়া চলি।
ট্রেনে ভিড় বড় ? যার লাগি জড় হয়েছে ষ্টেশনে সবে,
তারি লাগি তুমি এসে ভিড় ঠেলে, দাড়িয়ে গেলেই হবে।
বাঁশীতে বাজে বারোয়া রাগিণী তব আঙিনায় হােথা,
সব আয়োজন ঠিকঠাক তবু তুমি প'ড়ে আছ কোথা?
একমাস হতে উন্মনা হয়ে মা আছেন পথ চেয়ে,
দূর দিগন্তে প্রতিতরী পানে অনিমিষে চায় মেয়ে।
হাজার কাজের মাঝেও গৃহিণী একটু সময় পেলে,
শুধু বার বার দিন গণে, আর তপ্ত নিশাস ফেলে।
৭১

শিউলির আণিপনে আঙিনায় ঠাইটুকু নাই ফাকা,
অলি-পাখী-ফুলে আবাহন-সভা রচেছে দাড়িম-শাখা।
কলা কঁাধি গুলি ঠেকিছে মাথায় এ-ঘর ও-ঘর যেতে।
ফল-সঞ্চয় করে রাখে গৃহ উঠানে আঁচল পেতে।
বুধু ঢালে দুধ এত যে, পুরােণাে কেঁড়েতে ধরেনা আর।
দেরী যে করিছ ? পাও নেই বুঝি এই সব সমাচার ?
সহরে পচিয়া কেমনে জানিবে শরৎ এসেছে দেশে,
গৃহে ভাঙার ভরপূর আর পিও গিলিছ ‘মেসে’ ?
আসুক ঝঞ্চা আসুক বৃষ্টি, এস, মা’র ডাক শােন,
রসাতলে যা সকল সৃষ্টি, ওজর করােনা কোননা।
নিজে ধরে দাড়, টানাে গুণ, ঠেল’ কাদায় গাড়ীর চাকা,
আসছ ত বাড়ী! ক্ষতি কি, হােনা হাত-পা-গা কাদামাখা
হারিয়েই যদি যদি যায় কিছু, যাক্, খােদ করে কিবা ফল?
পথে মুটে যদি না জুটে, ভেবোনা,—নিজ কাঁধে পাবে বল ।
• কত ভুল হবে, কি হবে তা ভেবে, কত রয়ে যাবে পড়ে ?
তালিকা মতন বয়াতী জিনিস কিনেছত ভাল করে।
দোকানে ধম্বা মিছে, বিছে-দুল দিবে কি স্বর্ণকার
খা থাক্ দেরী করােনাক আর নিয়ে কাপড়ের পাড়।
হাসি মুখে শুধু এসস দ্বারতলে গােধূলির ধূলি মাখি।
সাৰ দ্বীপ করে জননী আদরে নিয়ে যা ঘরে ডাকি।
?
৭২

প্রাচীন কবিদের শর
ঋতুসংহার-ভটিকাব্য-রঘুবংশ-কিরাতৰ্জ্জুনীয়-ও-শিশুপালবধ হইতে)
নবােঢ়া-বধূরূপে শরৎ এলাে, সবে তেল-লে পুরব বরণে,
কমলে ফুটে মুখ, মরাল-কাকলীতে নূপুর বাজে তার চরণে।
পৰু নব আশুধান্য-পীতিমায় অঙ্গরাগ তার শরীরে,
ফুল-চল-কাশ-কুসুম-সিতিমার বসনে শােভে কিবা মরি রে।
রজনী সুধাকরে, কুমুদে সরােবর, কৌষ অংশুকে অবলা,
ছাতিমে বনভূমি, মরালে নদী-নদ, মালতীফুলে লতা, ধবলা।
ক্রোঞ্চথে রচি কমালা, পরি’ শফরীক্ষিত রশনা,
কপায়ে শ্রেণির বিশাল পুলিনের তটিনী করে জয়ঘােষণা ।
সমীরে চঞ্চল শুভ্র নির্জল বারিদমতল ধাবিত,
গগন নৃপসম ধবল উত্তম চামরে আজি পরিষেবিত।
সকল তনু ভরি’ তারকা-ভুষা পরি আজিকে বিভাবরী-ললনা,
ক্রমােপটীয়মান নবীন যৌবনে রাজিছে কিবা শশিবদনা।
আজিকে মীনকেতু তেয়াগি শিখিগণে মরালরাজ সহ বিলসে,
তেয়াগি নীশাল কুটজ অর্জুন সেফালিকুঞ্জে সে নিবসে ।
তরুণারুণ করে প্রভাত সরােবরে হৃষ্ট বধুমুখ ফুল,
কুমুদী স্নানমুখে মুদিয়া পড়ে দুখে প্রােষিতভর্তৃকা তুল্য।
হংস-কলনাদে প্রিয়ার ভূ-রব শুনিছে পরবাসী একাকী,
বন্ধুজীবে হেরে অধর-শােভা তার, ইন্দীবরে হেরে সে আঁখি ।
৭

পবন কৈর-কমল-সৌরভে, পরাগ-গৌরবে,-মন্দ,
সলিল অকলুষ, পঙ্কহীন ধর, শঙ্খে বাজে শুভ ছন্দ।
কেদার শালিতৃণে, নিপান নব-মীনে, গােষ্ঠ ভরা পীন ধেনুতে,
সারসে নদীধারা, নবীন তেজে তারা, শােভিছে অলি ফুলরেণুতে।
কনক-ফুলদলে শােভিছে ভুজলতা, মালতীদামে শােভে কবরী,
সুরভিত আজি নাগরী চন্দনে, কুসুমে মৃগমদে, শবরী।
আজিকে বিধুরূপ ধরেছে মনসিজ কিরণশর হানে তৃষিতে,
বিতরে আজি জলধধৗত নভঃ কলধৌত অবিরল নিশীথে ।
নিপান পলে এমন জল নাই যেথায় ফুটে নাই নলিনী,
এমন শতদল কোথাও ফুটে নাই যেথায় জুটে নাই ‘অলিনী'।
এমন অলি আজ কোথাও নাহি, যার নাহিক গুঞ্জন বদনে,
এমন গুঞ্জন শােনেনি কোন জন পটু যা নয় মনােমােদনে।
অলির ধ্বনি শুনি হরিণী অনমনা হংসরবে ব্যাধ উদাসী,
ছিলায় জুড়ি শর ছুড়িতে ভুলে যায়, শরৎ সকলেরই শুভাশী ।
সঘন গিরিবনে সিংহনাদ প্রতিনাদিত হয়ে মুছ বিহরে,
কেশরী তারে প্রতিদ্বন্দিনাদ ভাবে, সরােষে শটা তার শিহরে।
পলাশপাণি নেড়ে, ভ্রমরে আজি হেরে ভূষিত কুমুদীর পরাগে,
সয়ােজ অভিমানে সরােষ দিঠি হানে, তাড়ায়ে দেয় তারে তড়াগে।
অধুপে শােভাময় অরুণ কুবলয় স্রোতের ঘাতে রয় কঁাপ্লিতে,
শিখায় চঞ্চল সধুম হােমান-সমান শােতে তারা বাপীতে।
আমল তটছবি অমল জলে রাজে, ছায়ায় শােভা হৃত বিচারি’,
কৃষিয়া তটদেশ শাসিছে শােভাচোরে স্থলেও শতদল বিহারি।
৭৪.

o
জলের ফুল-বন, স্থলের ফুল-বন, দোহার পানে দোহে নেহায়ে
নিলীনষট্‌পদ-কুসুম-আঁখি মেলি’, শােভায় কেবা জেতে, কে হারে ?
উজ্বল জলাশয় নয়ন ঝলসায়, হিরণ দ্রবময় উথলে,
তরুণ অরুণের কিরণমালা যেন গলিয়া রাশীভূত ভূতলে।
পংক্তিশাভা শালি-গুচ্ছ-দলগুলি দুলিছে তৃণহীন ভূমিতে,
সফলযৌবন পীর-চিক্কণ, দেখিলে সাধ যায় চুমিতে।
শৈবালাস্তৃত কাসারে ফুটে ফুল, ফুল্ল মনে হয় কেদারে,
সহসা শফরীর লম্ফে জাগে নীর, বিভাগ করি ভ্রম দ্বিধারে।
ফেনিল সৈকতে স্রোতের রেখা টানি পাথার চলে গেছে খেলিয়া,
আতপে শুকাইছে দুকুলখানি যেন তটিনী, দুই কূলে মেলিয়া।
বপ্রকর্দমে বিষাণ মণ্ডিত,বিচরে মদভরে ষণ্ড,
স্বেচ্ছাহারে পরিপুষ্ট অরিজয়ী,মূৰ্ত মদ যেন চণ্ড।
মরাল, সৈকতে পুণ্ডীকে নীন, সফেন সিত তার সকলি,
বর্ণ হেথা হারে, ধরায়ে দেয় তারে কর্ণে পশি তার কাকলী।
কিব। শ্রীভঙ্গীতে নবনীমন্থন চলিছে সঙ্গীত সঙ্গে,
গােপাণ-বনিতার বিপুল শ্রেণির চপল অনিবার রঙ্গে।
পন্থ-ঘন ঋজ আজিকে পল্লীর বরষা-বঙ্কিম বীথিটি,
দু’পাশে কেশশােভা, শকট-নেমি-রেখা রচিয়া গেছে তায় সীথিটা
পঙ্কহীন মহী,শঙ্খরুচি দেহে অঙ্কে ধরে শ্যাম ঋদ্ধি,
বর্ষভরা শ্রম সফল করি’-করে হর্ষ-কল্যাণ বৃদ্ধি।
আজিকে ব্যোমে নাই বন্ধকাহার-শােভা জলদ-জলধনু-লীলা সে,
তবু তা’ মনােরম ; স্বভাব-সুচারুর কি হবে কৃত্রিম বিলাসে।
;
৭৫

শ্রাবণপ্রিয়া দিশ্ব বধূর পয়ােধরে দামিনী-হার নাহি বিরাজে,
পাণ্ডু কৃশা, তৰু অঙ্গ ভরি’ তার বিরহজাত নব ঐ রাজে।
মরালরব ত্যজি কে শােনে কেকা আজি ? শিখীরা রয় খেদেনীয়ৰে,
কালের গুণ এই, গুণেরই জয় জয়, শুধুই পরিচয়ে কি হবে?
সময়ই বলাবল করে সুনিয়মিত, নীরব তাই আজ দাদুরী,
নতুবা কেকা কেন আজিকে হেয় হেন, সারস-রবে কেন মাধুরী ।
সহে না অরি-ভব দারুণ পরিভব, শিখীর শিখা লাজে গণিত।
নদীর তটশির হারায়ে শ্রোতােনীর লজ্জা-ক্ষোভে কাশ-পলিত।
ক্ষেত্রে শােভে হেমবরণ। শালি-লতা, ইন্দীবর ফুটে নালীতে,
তাহার সৌরভ-লাভের লােভে শালি নমিয়া পড়ে যেন আলি-তে।
গাভীরা ছুটে আসে আভীর-পুণী পানে ভিজায়ে মাটী দুধবাদরে,
বহিয়া উপায়ন আপীনভরা ক্ষীরে, বৎসগণ লাগি সাদরে ।
মৃণালে কোকনদে পৰু শালিতৃণে জলের শোভা নানা বরণে,
ইশরাশন-খণ্ড যেন গলি’ উজলে ইন্দিরা-চরণে।
বৎসত আজি লেহন করে ধেনু, পুলক রােমে রােমে উছলে,
বজ্ঞাহুতি, ঋক্‌মন্ত্র সহ যেন মিলিত বিশ্বের কুশলে।
চপলাভয় নাই, শুভ্র নীরদের ছত্র-ছায়াতলে গগনে,
পাখীরা ছুটে আজি সুরভি সুশীতল শীকরময় বায়ু সেবনে।
কৃষক-বধূ আজি পাহারা দেয় ক্ষেতে গােষ্ঠ-গীতি শুধু গাহিয়া,
শলােভ ভুলি মুগ্ধ মৃগগুলি আয়ত চোখে রয় চাহিয়া।
গগনে উড্ডীন অরুণ নখমুখ আজিকে মুন শুক-সারিকা,
হরিভ পাবে লােহিত ফুলদলে গ্রথিত যেন ধন-মালিকা।
-

কপােত-পীতি, রাঙা চঞ্চুপুটে পীত ধান্য-মঞ্জরী হরিয়া,
উড়িয়া যায় নভে ইত্ৰায়ুধে কিবা সুনীল নিলীমা ভরিয়া।
ই-বাণ, বাকুসুমে’ আছে ফুটে, শোণিত ঝরে আজো জবাতে,
ঐরাবত গেছে তেয়াগি কধুক, জ্বলে তা উষ।রুণ-প্র-তে।
কুসুমবাবরিশীকর-রেণুহারী সমীর যাবে কত ছুটিয়া ?
ভারে যে ট’লে পড়ে, ধরা সে পড়ে ত্বশ, পশরা লয় সবে লুটিয়া।
ৰারিদময় তমঃ গলায়ে রবি আজ আঢ্য করে হ্রদ-গরিতে,
হরিল ধন যার, হাজার গুণ তার, দেয় সে ভাণ্ডার ভরিতে।
সপ্তজ গন্ধ লভি গজ, ‘ম অরি গজ অদূরে,
ভাবি’ সে মদ ঢালে গণ্ডে কটে ভালে শুণ্ডে আশুলিয়া বধূরে।
মাতাল হয়ে মদ-গন্ধে সমীরণ মাতায় মধুকর-নিকরে,
বারণষুথ পানে যাবে কি যাবে বনে-তাহারা দোটানায় কি করে?
কুম্ভযােনি’ ব্যামে উদিয়া যে কলুষ ঘুচায় আজি নদীকাসারে,
তা আজি বিদ্রোহি-হৃদয়ে পশি ধীরে মলিন করে তার আশারে।
সু-প্ৰতরা নদী, পঙ্কহীন পথ, সূৰ্য্য উজ্জল আকাশে,
বিজয়যাত্রার সময় এলো, বাজে তুৰ্য্য সুরভিত বাতাসে।
ত্যজিল সুরপতি শ্রীধনু, তুলি নিল বিজয়-ধনু শূর নৃ-পতি
পুণ্যনীবাজনা-বিধানে ভাস্বরী আয়ুধমালা তার শ্রীমতী।
ধবল কৈরব-ছত্র এক হাতে, অন্য হাতে কাশ-ব্যজনী,
বিদায় দিতে বীরে, জোৎক্সা-দধিঘট ধরেছে শিরে আজ রজনী।
99

হেমন্ত এলাে হিমঋতু লয়ে গিরিশিরে সিতিমা, পাণ্ডুত লয়ে বনে লাের্ষে পক শালির শীষে নয়ে নব গীতিমা, পিঙ্গল করি হেম-রৌদ্রে । প্রান্তর শােভে মােতি-মরকত-বিত্তে, বাপী আর শোভেনক পদ্মে আশা-শতদল ফুটে কৃষীব-চিত্তে, এলাে রমা হিমবতী-ছদ্মে। মক্ষীরা জুটে আজি তালীরস-কলসে, পক্ষীরা জুটে শালিক্ষেত্রে। দিগ্বধূদের দিঠি পীত-রূপে বালসে, অঞ্জন আঁকে তাই নেত্রে। শেষবিদায়ের বাণী গুঞ্জরে শেফালি, জল-ছলছল ম্লান চক্ষে। একে একে নিভে যায় কৌমুদী-দীপালী, দীপদধূমায়িত কক্ষে। কুঞ্জ ছাড়িয়া যায় মীনকেতু ক্ষুন্ন, পুরে পশিরহে নিঃশঙ্কে। শিঞ্জিনী দিয়ে বাধে, তুণ তার শূন্য, কেতু তার লীন হ্রদ-পঙ্কে ॥ ব্যোমে নাহি প্ৰেমণীল। চন্দ্রিকা-চকোরে, ছাড়াছাড়ি স্বর্গে-ও-মর্টে। মিত্ৰতা হল আজি ‘কর্কটে’ ‘মকরে’, পশে ভেক কচ্ছপ-গর্তে। রবি দক্ষিণে ঢলি’ দক্ষিণ-নয়নে তপ্ত মদিরা করে বৃষ্টি। বহ্নির রক্তিমা তন্বীর বয়ানে নবীন-সুষমা করে সৃষ্টি। ঝিল্লিকা গায় আজি কুঞ্জের পূরবী, খদ্যোতে শশাভে লুণ বৃত্ত কন্তরী হ’ল আজি বিলাসের সুরভি, পুষ্প ফুটে না চিরদিন ত । অঙ্গে নগ্ন করি, মঙ্গল শিশিরে ‘পৰ্ব’-সিনান করে ইক্ষু । সারাবছরের শ্রম ফল দেয় কৃষিরে, আজ সে কার বা কৃপাভি? * কুঞ্চিকার কবিতাটির ছন্দের পৰ্ববিভাগ করিয়া দেওয়া হইয়াছে। ৭৮ হে এটাও শীতল-পাটী, ছুড়ে ফেল ব্যজনী, তুলায় তনুটী কর লগ্ন। দন আজি ক্ষীণতনু, পীন আজি রজনী, দীর্ঘ স্বপনে হও মগ্ন। চামিনী-গণ্ড শােভে কালীয়ক-তিলকে, ধুপসুরভিত কেশগুচ্ছ। শুষ্ক মালিকা দুলে বাতায়নে, কীলকে অনাদৃত চমরীর পুচ্ছ রাজ্য ফিরায়ে নেছে গিরিরাজ, ফিরিছে উত্তরবায়ু তার ভৃত্য। পীড়ক, পালক আজি,—পালকেরা পীড়িছে কৃপণ বিলায় কৃপাবি । মিত্র-দেবতা আজি সত্যই মিত্র, কৃপা নাই বরুণের বক্ষে। বারি নিজে হলাে অকরুণ বী, বহ্নিই জীবগণে রক্ষে। ক্ষেত্রের ডালি শােভে নবশালিধান্তে, আলি তার শােভে দ্রোণ-অর্কে। খালি শােভে পিষ্টকে মধুপরমান্নে, জাগে ভােগ কোটি মধুপর্কে। হিমবায়ু বাড়াইল বিরহজ বিকারে, বিরহীর কিবা অবলম্ব ? পরাণ বাঁচাতে স্মরে আজি প্রাণাধিকারে স্মরেতার ঘন-পরিরম্ভ। দীর্ঘ রজনী পেয়ে প্রণয়ের নাটিকা অভিনীত ছত্রিশ অঙ্কে। বহু নায়িকার রূপ ধরে গৃহনায়িকা মানভান করে নিঃশঙ্কে। সহজ রমণীরাগ এ-নিশীথে প্রকাশে, মুগ্ধা সে সহসা প্রগলভা, নব মধুরিমা মিলে পুরাতন সকাশে, স্বীয়া আজি পরকীয়াকল্লা। শুষ্ক, তরুণধর অকরুণ বায়ুতে, সিক্ত, সরস বধুচুম্বে। শিশির-সিন্ধু তরে যুবজন বাহুতে ভর করি’ উরসিজ-কুম্ভে। বঁধু চায় কান্তা-রে আরাে ভালবাসিতে গাঢ়ালিঙ্গনে টানে অঙ্গে। অশ্রুবেপথু স্বেদ সীৎকার হাসিতে ষড়ঋতু-লীলা বধূ সঙ্গে। গদ্যবসন অজি পরিহিত শরীরে, পদ্য-বিলাস নাহি বস্ত্রে। জলকৌতুক শেষ, পরিহৃত তরীরে শিল্পী পীড়ন করে অন্ত্রে। ৭৯

তাম্বুল সুম্বল বিলাসােপকরণে কম্বল সুখাসন অঙ্গ।
নারিকেল-ক্ষীর আজি হেয়, তৃষাহরণে পেয় নারীকুণ-মুখ-মদ্য।
সুখ নাই হীরামণিমৌক্তিকহিরণে, কিরণে যায় না হিম-খর।
পীবর-তরুণীত-সুনিবিড়-পীড়নে ঘুচে যুবজন-নু-জড়তা ॥
অর-শর আজি বিধে’-গঁথে ত তনুতে, হৈমমিলন অবিভাজ্য।
নিশ্বাস-বিনিময়ে অণু মিশে অণুতে, যুগে ভরিল প্রেমরাজ্য।
হেমন্তেসিব
আজিকে বাঙালীর হিন্দুসংসারে,-মধুর মিলনের দিবসে,
ছুটিল বাধাহারা স্নেহের রসধারা যা ছিল জমা সারা বরষে।
শাসন-তর্জনী শাস্ত্ৰ আজি তুলি
হরে না স্বাধীনতা ধরেনা দোষগুলি,
গভীর অন্তরে মন্ত্র জাগে যাহা,–সকল তন্ত্রের সার সে,
আজি এউৎসবে লাগেনা ঢাকঢোল, হাঁকেনা পুরােহিত সরােষে।
ললাটে লেপি চুয়া অর্গে পান-গুয়া বিপ্রে গােপবালা পরশি,
দাসীরা লভে শাড়ী প্রভুর ছেলেদের মাথায় শুভাশিস্ বরষি।
ভূতত্য বলি “দাদা আজিকে ধনিবালা,
সমুখে ধরে পর-মান্নভরা থালা
কমল-পাণি আজ সুরভি রক্তিম হরষে চন্দন ঘরষি।
পল্লীসংসারে আজিকে ভাইবােন যাহারা ছিল শুধু পড়সাঁ।

নগর হতে আজি এসেছে ধনিজায়া কাঙাল ভাইটির ভবনে'।
তার খেদবাণী করেছে কুণ্ডলে মলিন নিষ্প্রভ শ্রবণে ।
সােহগে ঢল ঢল নয়ন জল-স্থলে
মুক্তা বরষে সে ভ্রাতার কুন্তলে।
যে ব্রা ধনশ'ণী—দুখিনী ভগিনীর সাজায় মেহডালি যতনে,
একটী ফোট। তার হাতের চন্দন কেনে সে হেমমণি রতনে।
আজকে হেনধিনে শ্বশুর-গৃহ-কোণে ভাসিছে কেগাে আঁখিসলিলে,
শাশুড়ী রেগে সাবা, মা-মরা ভাইটিরে চুমিতে যাব’, আজ বলিলে।
যতনে কত কি যে সকলে রঞ্চি,
বুকের অঞ্চলে রেখেছে সঞ্চিয়া,
সে দুটী দিন তবে বিদায় মাগে,তার, চরণে আবেদন দলিলে
সারাটি বৎসর জীবন-পথ তার পিছল হবে আঁখি-সলিলে।
আজিকে সাত ভাই চম্পাসম এই বঙ্গ উজলিয়া জাগরে।
শ্ৰাতৃগরবিনী পারুল ভগিনীর স্নেহের পরশন মাগ’রে।
#হার ভাই নাই কে কাজে ধূলি’ পরে ?
তাহার আঁখি জল মুছাও স্নেহ-ভরে,
একের অভাবেরে ডুবাও সাতটির মেহের সাত সুধাসাগরে,
আজিকে বাঙালীর জাতীয় জীবনের পাবন মিলনের বাসরে।
জ
৮১

(২)
মিল’— মৰ্ম্মের টানে মঙ্গল দিনে বঙ্গের ভাই ভগ্নী,
আজি মন্থন কর’ চিত্তমিধে নিষ্ঠাযাগের অগ্নি।
এসাে- পুণ্যসিনানে নির্মল প্রাণে শুভ্রবসন অঙ্গে,
এসাে বৎসর-ধরি-সঞ্চয়-করা সস্নেহ সুধা সঙ্গে।
ওগাে বিশ্বে আজিকে নিঃস্ব আছে কে, বিত্ত কি শুধু অর্থে।
আজি ভগ্নী ভাতার সম্প্রীতি হ’তে সম্পদ কিবা মর্তে?
সবে বঙ্গে আজিকে সঞ্চার কর’ ঐক্যের নবশক্তি,
আজি উক্তি-ও-কাজে ব্যক্ত হউক বাল্যের অনুরক্তি।
মিল’- মঙ্গল-দিনে অঙ্গন-তলে বঙ্গের সুত কন্যা,
একই অঙ্কে সারে চুম্বিয়া হােক দুঃখিনী মাতা ধন্যা।
অ— ভ্রাতৃ-অভিধা-গৌরবে হয় দস্যও সতী-ভৃত্য,
আর ভষ্মীনামের অস্বনি শুনি নির্ভীক নারী-চিত্ত।
সদা জাগ্রত করে ভগ্নী, ভ্রাতার শৌর্য-গরিমা সুপ্ত,
ভ্রাতা- আশ্বাসে করে ভগ্নীর ভীতি সঙ্কোচলাজ লুপ্ত।
আহা- অদ্য তাদের হৃদ্য মিলনে বঙ্গে নেমেছে স্বর্ণ,
হেন সৌম্য মিলন সম্পদ হতে কাম্য কি অপবর্গ ।
থাক’- এম্নি মধুর সখ্য প্রীতিতে ভগ্নীভ্রাতায় যুক্ত,
হবে নন্দন-সুধা সংসার ছায়ে অক্লেশে উপভুক্ত।
মিল’ নিৰ্ম্মল মনে মঙ্গল ক্ষণে কার্তিকে শুভপর্বে,
আজি অমাতার অঙ্কে এবং বঙ্গমাতার গর্ভে।

আজি নিষ্ঠার দুধে শ্রদ্ধার ক্ষুদে পৰু যে পরমানু
নব দূর্বা বিতরে দীর্ঘজীবন, ঋদ্ধি বিতরে ধান্ত।
লাজ কুষ্টিত ত্যজি গুণ্ঠনভয়-সঙ্কোচ-যাধাবন্ধে,
আজ- হিন্দুর গৃহমন্দির ছায়ে বন্দনা গায় ছন্দে।
কার— যত্নের ধন ভ্রাতৃরতন মৃত্যু-সাগরে মগ্ন,
আহা— অদ্য সে-শােক সন্ত হইয়া কণ্ঠের স্বরে লগ্ন
কার- দুঃখের মেঘে অশ্রুর বেগে উৎসব আজি স্কুঞ্জ,
শত ভ্রাতৃ-হৃদয় সস্নেহে কর পূর্ণ সে হৃদি শূন্য।
মিল’- মৰ্ম্মেৰ টানে ধর্মের নামে ধৰ্ম্মরাজেব পর্বে,
ভূর অন্তকে আজি গচিত ভগ্নীর প্রীতি-গর্কে।
প্রীতি— তন্ত্রের পূত মন্ত্রে ভগিনী রক্ষার টীকা অঙ্কে,
ভে- কুগ্রহ যত নিগ্রহ তার কল্যাণময় শঙ্খে।
তার চন্দনচুয়া-বিব ভাতি অন্তব করে হৃষ্ট,
আজ ভগ্নীর হাতে রন্ধনে শাব্যঞ্জনই কত মিষ্ট।
আজি ভ্রাতৃমতীর গর্বের দিন, বন্দ্যা বলি’ সে গণ্য,
বা।- ভীরে আজি গৌরব দিয়ে পৌরুষে কর ধন্য।
প্রার্থনা, হােক অক্ষয় তার সিদ্দীকা, শঙ্খ
তার সম্পদে গৃহক ভরুক সস্তান-ধনে অঙ্ক।
মিল’- মঙ্গল-দিনে সুন্দর প্রাতে বঙ্গের মুতাপুত্র,
মরে— প্রদ্ধায় মণিবন্ধে আজিকে মঙ্গল-রাখী।

শেফালি
অশুভ আমার পরশ-বাতাস আমি অগিনী শেফালি,
দুয়ােনা, আমি যে কানন-রাণীর সদ্যোবিধবা দুলাল।
কালি হিল মোর বাসরশয়ন, কান্তের সাথে হইল মিলন,
কত রসাবেশ অলপ অশেষ জ্বলিয়া জোনাকী দীপালী,
প্রভাতের বায়ে পড়েছি ঝরিয়া আমি রে বিধবা শেফালি।
এখনাে রয়েছে তাম্বুল-রাগ অধরের কোণে লাগিয়া,
এখনো এ-দেহে জাগে রােমাঞ্চ ধুসনে রাতি জানিয়া।
স্বেদকণা পরিসিত-তিতায় এখনাে অঙ্গ দলিত,
কান্তের মধু চুম্বন ঘন বৃন্তেরে গেছে দাগিয়া,
সব নিয়ে আমি পড়েছি ঝরয়া ধূলির শরণ মাগিয়া।
নেমেছে দ্যুলােক যখন পুলকে কালি কিসলয়-শয়নে,
ইন্দ্রধনুতে ভরেছে স্বপ্ন,-তাজড়িমা, নয়নে।
কালকীট নাপে দংশিল ছন্সি, তনু নীলায়িত, ফুরাল সকলি,
ফুলমাঝে আমি বেহুলার মত দারুণ দুঃখ-সহনে,
হ’তে সহমৃতা চলেছি খালিকা, রৌদ্র-চিতার দহনে ।
চুয়ােনা ভগিনী, আমি অভাগিনী, বরিতে চলেছি মরণে,
মাের ঠাই নাই পুণ্য পুকুরে,অথবা দেবতা চরণে।
যদি ব্যথা পাও, এ সতীবধূর নিয়ে যাও শুধু সীথির সিদু,
শাড়ীটি রাঙায়ে পরিও বালিকা, রেখ এ সখীরে স্মরণে
ৰক্ত আমার ‘পীত হবে তব বন্ধু-মঙ্গলাচরণে।
৮৪

যে
নবান্ন
আজি বঙ্গের পল্লী-নিলয়ে নবীন ধান্তে নবায়,
পুন হয় লভিছে বিদায় নূতনের আজি প্রাধান্য।
বঙ্গায় শঙ্খ কুলবধূণ, ঘরে দ্বারে আজি রচে আলিপন,
ভিক্ষুকা আজ করে বিতরণ কৃপণাে অদ্য বদান্ত।
আজি বঙ্গের পল্লীভবনে, সােণর ধান্তে নবান্ন।
অতিথিরে আজ ডেকে আনে গৃহী, শ্রদ্ধায় সে-যে আরাধ্য,
কাকচিলাে আজি লভিয়া প্রসাদ, ত্যজেছে ঘৃণ্য-অখাদ্য।
ক্ষেত হতে এসে আজিকে, কমলা সুন-পূত শুচি শ্লথ-কুন্তলা,
ধরেছেন হাতে অম্নের থালা,ব্যঞ্জন তাহে বাহান্ন।
আজি এদেশের অলিয়ে আলয়ে পরমােৎসবে নবায়।
৩
দেবগণ, প্রেত-পিতৃপুরুষ আছেন যাঁহারা পরত্রে,
তাহাদের সনে পংক্তিভােজন হয় আজি হেথা একত্রে।
নিৰ বলিয়া ছিল যে মলিন, পেয়েও প্রতুল সে-ও দানে দীন,
আজি জীবে জড়ে বিতরণ করে প্রভাত-হইতে-সায়াহ,
পমােৎসবে হাসি কলরবে আজিকে বঙ্গে নবান্ন।
বহুদিন হতে অর্ধ অশনে দেহ হয়ে গেছে বিশীর্ণ,
খেতে পাওয়া চেয়ে দিতে না পারিয়া বক্ষ তাদের বিদীর্ণ।
এ দানসত্রে এই শুধু ব্যথা, ভাবে দাতারা আখেরের কথা,
লক্ষ্মীর সুত ভিক্ষা যে মাগে দুঃখ কি ইহা সামান্য।
আজি বঙ্গের পুণ্য ভবনে নবীন ধান্যে নবান্ন।
৮৫'

অনুমঙ্গল
আজি—ভুলিনাই তারে ভুলিনাই,
যাঁর করুণায় কনক-ধান্ত বৎসরান্তে গৃহে পাই।
সারুর ভাজনে নব তণ্ডুলে
বিচিয়া নৈবেদ্য দেউলে
লক্ষ্মীমায়ের শুভ সংসারে পশিবারে অনুমতি চাই।
ভুলি নাই তার হীন সন্তানে অতিথি তারা-যে ঘরে ঘরে,
গর্তে কোটরে যারা রয় আর চালে বাসা বাধে, জলে চরে।
কীট পতঙ্গ ভূচর খেচর
আজি আমাদের কেহ নয় প,
সৰ্ব্বভূতের পর্বোৎসবে পংক্তি ভােজনে লভে ঠাই।
ভুলিনি ভৃত্য বন্ধুস্বজনে, পারসে সবারে করি খুসী,
সিত তলে পিণ্ডক রচি পিতৃগণেরে আজি তুষি।
নাহি ভেদ আজি ভূলােক-ত্রিদিবে জাতকে-মৃতকে প্রেতে-জীবে-শিৰে
অন্নকূটের কূটমল্লিক। সবারি পাণিতে শােভে তাই।
বরষের ক্ষুধা-যজ্ঞে আজিকে প্রথম আহুতি বরষণে,
অন্নপ্রাশন স্মৃতিটি জাগায় ক্ষেত্ৰজননী মনে মনে।
দুধে-ক্ষুদে
মাখা মায়ের প্রসাদ বিলায় মরতে অমৃতের স্বাদ।
পুন “অন্নদামঙ্গল”-গীতি বঙ্গের ঘরে ধরে গাই।

হেম
হেমন্তনিশীথে
বর্ষা-রাতে জাগাইতে করতে ডাকাডাকি,
তবু আমার ভাঙ নাক ঘুম,
হাতে করে পাতায় ধরে খুলেও দিতে আঁখি,
গণ্ডে আমার খেতে হাজার চুম।
হতাশ হয়ে ছেড়ে দিতে অঙ্গ দুলানাে,
ঘুমত আমার ভাঙতনাক ত্বরা।
এমনি তােমার পরশ, প্রিয়, সকল-ভুলানন
এমনি মােহন, ঘুমে মগনকরা।
আজকে তুমি এসো বধু হতাশ হবে না,
সারানিশি রইব আমি বসি,
পড়বে চুলে—রাত্রি জাগা তুমিই স’বে না
হেরব কোলে সুপ্ত বদন-শশী।
আজকে হঠাৎ এসে যদি আমার গৃহদ্বারে,
ডাতে মােরে হবেইনাক স্বামী,
হবেনাক দ্বারে আঘাত দিতেই একেবারে
পায়ের ধ্বনি চিবাে শুনে আমি।
তুমি যখন কাছেই ছিলে—এমনি পােড় বিধি,
ঘুমে পড়ে তােমায় হারাতাম,
স্বপনেও পাইনা বুকে আজকে তােমা-নিধি,
আজকে নাহি স্বপনেরও নাম ।

শীত
শীত এলাে দ্বারে, ভয় কেন ? তারে বরণ কর,
গ্রীষ্মের চেয়ে নয় সেত কভু ভীষ্মতর।
ওকি? ত্বরা দ্বার বাতায়ন কর’ বন্ধ কেন?
ভরসা পাওনা ? বরষা ফিরিয়া আসেনি জেন।
কপিতেছ নাকি? মিছে ভয় তাকে করিছ অত
ভয়ে যে ভয়াল আগুনেরি হলে শরণাগত।
গগনে ভানুরে দেখি তবে আজ জানালা খােলাে,
তপন আবার বহুদিন পরে আপন হলাে।
কার কথা শুনে মিছামিছি কোণে লুকাও ভয়ে ?
দেখনা সে কত ভেট উপহার এনেছে বয়ে।
সারা মাঠখানি ভরে গেছে দেখ সোণার ধানে,
মটর সীমের হরিৎ ডুবেছে বেগুনী বানে।
দোচালা আঙিনা ভরেছে তােমার সজিনা ফুলে,
দো-জমির মাটি ফেপে ফেটে উঠে পীবল্প মূলে
শােভিছে কমলা গিরি-কমলার হাজার করে।
শুষ্ক খেজুর কণ্ঠে মধুর সুরস ঝরে।
মসিনার ক্ষেতে মৌমাছি মেতে পিই মধু,
বাসকে ৰাসৰু-সজ্জা লভেছে কানন-বন্ধু।

বরীর বনে মাধুরী পেয়েছে বালক-বুড়া।
খই হয়ে ফুটে রসের ভিয়ানে কনকচূড়া।
প্রান্তর-ভূমি তিল তিল রূপে তিলােত্তমা,
হেথা পাবে, কবি, রূপসী-নাসার কুসুমমাপমা।
সুরভি তারায় ভরেছে অড়র বনের নিশা,
শােণের শােণিত ‘পীর’ হয়ে হরে নয়ন-ভূষা।
আফিমের ফুলে
রঙীন হইয়া স্বপন ফুটে,
জমে ব্যথাহর রসায়ন তার বীজের পুটে।
আঙিনার কোপে পালঙ রচেছে পালঙ্গ, খানি,
শায়িত তাহাতে পীবর লতিকা পূতিকা রাণী ।
পাকা কৎবেল চালতা নাসার জড়তা হরে,
তরু-শাখে র’য়ে রসনা-মরুরে সজল করে।
অতসীর বনে খেলে প্রজাপতি আতসবাজী,
শমী-নিদ্রিত বহ্নি, কুসুমে জেগেছে আজি।
মেহমধুময় সরিষার ক্ষেতে চমক লাগে,
ফুলে আলাে করে তৈলে সে আলাে জালার আগে
আজি আকন নীলকণ্ঠের গাঁথিছে মালা,
ধুতুরা সাজায় অঘােরনাথের পূজার ডালা।
কেদারনাথের কুটী আজিকে যবের শীষে,
শাসনে তাহার ক্ষুদের সঙ্গে দুধ যে মিশে।
বেগুনের গুণে ব্যঞ্জন পরমায়ে জিনে,
আগুন আগুলি সরিয়া থেক’ না এমন দিনে।
*

মাঠে মাঠে বাজে শােনাে মাঝে মাঝে রাখালী বেণু,
রমার রথের চাকায় উড়িছে পথের রেণু।
বন হতে মৃগ ছুটিয়া এসেছে ধানের মাঠে,
কোণ হতে তুমি জুটিবেনা এসে সােণার হাটে ?
শীতের হাতের দণ্ডের ভয়ে পালাও বঁধূ ?
দণ্ডটি তার ইক্ষুদণ্ড—সষ্টি-মধু!
শীতের প্রতি
হে ঋত্বিক ঋতুবর, ত্যাগবীর, হে শীত প্রবীণ,
আড়ম্বর-সমারােহ-শূন্য তব তপস্যা-বিপিন।
করেছে নিবিড় চিন্তা তব কেশে খাগিত্য প্রকট,
লাহিত করিয়া গেছে লোল চৰ্ম্ম সহস্র সঙ্কট।
ইন্দ্রিয়-বাক্ষগুলি দীর্ণ-ভগ্ন, পূর্ণ লুজালে,
জয়পরাজয়-ধারা একে গেছে বলিরেখা ভালে।
পেলব কামনা-বল্লী তব আজি পলিত গলিত,
‘যােগরূঢ়, তপশীর্ণ জপজীর্ণ, যা কিছু ললিত।
আজি নাই দৃপ্ত কণ্ঠে বজ্রঘোষ ঘাের ঘনদলে,
বিদ্যুৎ-কুটী রােষ-ঘুর্ণনেত্রে আজি নাহি জলে।
তরঙ্গের চল লাস্যে আজি নাই যৌবন-বিলাস,
কুজনের কল হাস্যে নাহি আজি প্ৰমত উল্লাস।

অশােক-কদম্ব- চম্পা-সেফালিকা-গল্লিকার মালা শুকায়েছে উপবনে, শূন্য আজি প্রেমােৎসবশালা। তােমার দেউল শূন্য, পূর্ণ শুধু শুষ্ক পত্রহারে, দশা-তৈলহীন দীপে,শূন্য কুম্ভে, ধূপভস্মভারে। একৈ একে শেষ এবে জীবনের পৰ্ব্ব-পূজা সব, শূন্য দো-রসঞ্চ, স্তব্ধ আজি শঙ্খবণ্টারব। ঋণয়ে মুক্ত তুমি, গৃহধর্ম সাঙ্গ করি ক্রমে আচার্যের দর্ভাসনে বলিয়াছ তৃতীয় আশ্রমে। অপূর্ণেরে পূর্ণ করি’ অস্ফুটেরে স্ফুট করে তুলি পরিণত কর তুমি, অপুষ্ট সে চিত্তবৃত্তিগুলি। ঝরাইয়া দিয়া ভ্রান্তি-কুসুমের চিত্রবর্ণ দল, প্রবুদ্ধ করাও তুমি তার বুকে সত্য-তত্ত্বফল। মােহমগ্ন গৃহিজনে তেয়াগিতে ফুধূলি খেলা ডেকে বলল, “দিন যায়, শেষপ্রায় জীবনের বেলা। উচ্ছঙ্খলে নিয়ন্ত্রিয়া, উদ্ধতের গতিটি কমায়ে, ছিন্নভিন্ন শৃঙ্খলিয়া, বিশৃঙ্খলে গুছায়ে জমায়ে, শেষ দিবসের কথা শশানের ভৈরব সংবাদে, গৰ্বেরে কঁপায়ে তুলাে, কঁদাইয়া দাও অপরাধে। ভাবাও, নীরবকৰ্মী কর বিশ্বে, ঋষি-দার্শনিক, হট্টগােল, কোলা, তর্কদ্বন্দ্বে দাও শত ধিক। -শুভ্র কর আজ মসীকৃষ্ণ অশিষ্টের মন। হউক বিস্ময়ে ভয়ে লাে-পাও অবিশ্বাসী জন। ৯১।

অনীহারনে তাপ আজি হােক অনুতাপ,
কৃচ্ছকণ্টকিত বৃন্তে ফুটে নােক ভক্তির গােলাপ।
বেদনার নীলাচিরে অসম করি করি,
দ্রোণপুষ্প-পুঞ্জে কর শুত্র তব জ্যোতির বিস্তার।
পূর্ণাহুতি-লাভে নিভে হবিঃপানক্লান্ত হােনল,
প্রবৃত্তির পরিপাকে যে নিবৃত্তি, তাহাই অটল।
প্রকৃতির গতিপথ ধরি শেষে আনুক কাননে,
অবশ্য ডাকিবে তুমি ভােগক্লান্ত অধিকারী জনে।
ভােগ যার রােগমাত্র, সুধাতেও অরুচি যাহার,
তৃষ্ণা নাই, পান করে, ক্ষুধা নাই, অশুচি অাহার,
অভ্যাসে সেবিয়া শুধু করে মধু-মদিরা বমন,
কাশ-শুভ্র কেশ যার, সূত্ৰসার ফুলের কঙ্কণ,
হারে ডাকিতে হবে, কি যােগাবে ভােগের ভাণ্ডারী ?
সকলি—বিশ্বৰ তিক্ত—কেবা তার হইবে কাণ্ডারী?
ধুতুরা ফুলের পাত্রে পান করি নীহারের নীর,
ভক্ষিয়া পলিতপত্ৰ আজি তারা হােতপাের।
ক্লান্ত যারা মরীচিকা ইন্দ্রধনুটার বিভ্রমে,
তাৱা আজি হােক শান্ত মােহমুক্ত তোমার আশ্রমে।
অন্তঃপুর হতে ডাকে ভোগরত যযাতিমণ্ডলে,
হেমন্তে বসন্তসুখ যারা চাহে ভুঞ্জিতে সবলে।
‘জ্ঞানকাণ্ড' কই যােগ, ঘেরি ত পুণ্য হােমানল,
বসুক অঞ্জলি জুড়ি যত ব্ৰহ্মজিজ্ঞাসুর দল।

শীত
পৌষ-কল্পণ
এসাে— কনক-আভায় উলসি উজলি তালবীথি, শালবীথি।
গাহি, লােকপাল রমার দুলাল, তােমার বরণগীতি।
এস গ্রামপথ করি চঞ্চল লুটায়ে সরিষাফুলে অঞ্চল,
তৰ বেগুনী রঙের উড়নী খানায় ধূলা মাখায়েছে ক্ষিতি।
তােমার ঠোটের শী গান গুলি শিহরে যবের শীষে,
বিঁধেছে কি কাটা ও চরণ-তলে ? আহা ব্যথা পেলে কিসে ?
বসেছিলে বুঝি খেজুরতলায়? রস ঝরে তাই তাহার গলায়,
আহা পথ হেঁটে তব শ্রম-নীহারে যে ললাট গিয়াছে তিতি।
লুব্ধ আশায় অকুলি-বিকুলি করিতেছে ছেলেগুলি,
কি আছে ও-ভড়ে? মৌমাছি উড়ে! এনেছ ত পিঠেপুলী?
গাঁদাবাগানেই নামাও পশনা, পা ধুয়ে ও-ঘাটে, সয়নাক ত্বরা,
হেথা- দ্রোণকুলের মাল্যে বন্ধু লও হৃদয়ের প্রীতি।
}
শিশির
শিশির রে তুই স্বপ্ন ক্ষণিক, আঁধার-সাগর-সেঁচা মাণিক,
জহুরী নয়ন-এ মাের' এ মন-বণিক তাের মাধুরীশােয় ধনী।
তৃণবালায় নাকের নােলক, কিরণবালাররফলক,
সায়রে কমলিনীর হাস্য-পুলক,কুমুদিনীর অগণি।

অরুণ-বাজির কেশরঝরা স্বেদকণা, তুই তিতা ধরা ;
তমসায়—আনের-শেষে-গড়িয়ে-পড়া উষাসতীর অলক-বারি।
জাগরে শিশির আঁখির পাতায় জাগরে আমার প্রাণের গাথায়,
আমার এ-কল্প-নাগের হাজার মাথায় সাজা’রে তুই নিধির সারি ।
আজি-অতসী গাদা হেমগরবে মগন সুখস্বপনে
দৈন্য-হিমে—ফুল না ভুল ?—জাগিনু হেথা গােপনে,
তাদের আভা লভিয়া মম
অশ্রু হলো ভূষণসম,
সকলে ক্ষম’ সাহস মম, বরিতে প্রেম-তপনে
পুষ্পময় শুভ্র লাজ আমি এ বন-বনে।
বাণীরে সঁপি বরণ মম লভিনু যাহা তুষারে,
অলিরে সঁপি মাধুরী টুকু, পরাগ সাঁপি উদ্বারে।
ফুটায়ে প্রিয়দন্ত-রুচি
কবিরে সপি হর্য শুচি,
ববিরে সপি নীহারটুকু সুরভি করি জীবনে,
পল্লী-রমা-কেশে বরিব মরণ শেষে,এ-বনে।
নিষ্ফলল ত হ’ব না, যবে জনম ভবে হইল,
বিন্দু দিয়ে সিন্ধু-শিলাখণ্ডে যথা শৈল।
যেটুকু ধা অামার প্রাণে
লজ্জা কিসে সেটুকু দানে।
জগৎভরা জগদীশের কুসুমমর শয়নে
ধন্য হবে দৈন্য, তঁার নখের কণবহনে।
১৪

শীত
ইন্দিরা
আজি- ইন্দিরা মাগাে, মন্দিরে জাগাে নিঃস্বনি’ শুভশঙ্খ
কর- মঙ্গলময় বঙ্গ-নিলয়, প্রাঙ্গণ, বেদী-অঙ্ক।
কর— বণ্টন, কোটি অঞ্চলে আজি কাঞ্চনময় ধান্য।
তো- কঙ্কণ-হেম-ঝঙ্কারে আম-তণ্ডুলাে পরমান্ন।
লভিবাঞ্ছিত ধন মিষ্ট
হােক-লাঞ্ছিত জন হৃষ্ট,
হোক- আশ্বাস লভি নিঃস্বেরা শুভ বিশ্বাসে নিঃশঙ্ক।
করে ক্রন্দন শিশু-নন্দন, চায় স্তন্যের রসে তুষ্টি,
তব সন্তান পায় লুষ্টিয়া চায়—অম্নের মধুমুষ্টি ।
হর’-“রক্ষের ক্ষুধ, চুষে
মেহে,-বক্ষের ধাকুম্ভে,
শীত- কুঞ্চিত পীত অঞ্চলে হয়রা দুঃখের ধূলি-পঙ্ক।
মাতঃ- মন্ন দূরিয়া পুণ্যে পূরিয়া ধন্য কর’ এ-দেশ মা
যত ভগ্ন-হৃদয় কার্গের ক্লেশ দৈন্যের কর শেষ মা।
দিয়া-
সালােক শাস্তি
হরি’,যন্ত্রণাশােক ভ্রান্তি,
কর’- বঙ্গের তনু-মর্মেরে পুন নির্মলকলঙ্ক।

লক্ষ্মীমাল
আজিকে আমার ভরেছে খামার সােনার বৈভবে,
বাজাও শঙ্খ, দাও হুলুরব, ছড়াও খৈ সবে।
বাউরী-বাঁধনে পালায় গোলায় বেঁধেছি লক্ষ্মীরে,
বিদায় দিয়াছি আজিকে সকল ঝামেলা ঝক্কিরে।
কম্পিং কলকণ্ঠে কপােত মেতেছে ধান-বনে,
ছাগ হাঁসগুলি করে কোলাকুলি আজি এ প্রাঙ্গণে।
আজিকে ঘুচাবো বাকী-খাজনার বকেয়া ঝাটে,
সুদ-সহ্নদেনা শােধিব, ডরিনা নবাবে সম্রাটে ।
কমলার বিয়ে দেব ঘটা করে আছে বৈশাখে,
ঘরে এত কাজ, চলেনাক, ‘বেচু’ আনুক বৌমাকে ।
নতূন করিয়া ছাওয়া হবে ঘর এবার ফাল্গুনে,
কত কি যে সুখ-সঙ্কল্পের রেখেছি জাল বুনে।
মা’র সাথে মাসী যা গয়া কান গােলায় ধান তুলে,
ভরতি করচ, কতে খরচ পারব প্রাণ খুলে।
আছে আছে মনে বেচুর মায়ের বায়না খোটধরা
পােকার কোমরে পাটা দেব আর তাহারে গােট-ছড়া।
ঝঙ্কত-করতালিতে নাচাও দেহের ধনটীরে।
নতুন চালের ভােগ দিয়ে এস মায়ের মন্দিরে।
পথ-ভিখারীকে আন আজ ডেকে দাতার গৌরবে,
তুলসীমঞ্চ কর আমােদিত ধূপের সৌরভে।
১৬

ত
গাইগুলি আজি রেখেছি খুজে গােয়ালে চট খেয়ে
নতুন খড়ের গুণে ঢলে দুধ ভরিয়া ঘট কেঁড়ে।
আজি শুভযোগ লক্ষ্মীর ভােগ পাসে পিষ্টকে,
খেজুর আখের রসের ভিয়ানে সকলি মিষ্ট রে।
তেল-হলুদের ধূমধাম আজি সরিষা অঙ্গনে
মটরের চারা পিচকারী হানে বেগুনী-রঙ্গণে।
আছেরির বেড়া ফুলে-ভরা আলু-ক্ষেতের আ’ল ভরে,
বরবটি শুটা করে লুটোপুটি ঘরের চাল ভরে।
রামধনু লুটে মাের আঙিনায় দোপাটি সীমফুলে,
অকালের হােলী খেলে গাঁদাবন আবীরে হিঙ্গুলে ।
লক্ষ্মীর দয়া দেখি এগৃহের বিরাজে চৌপাশে,
লালপেড়ে শাড়ী পরি’ পাকশালে মােড়ল-বৌ হাসে।
ক্ষেতকুড়ানীয়ে ঘরে ধোঁয়া ওঠে, পেয়েছে খড়কুটো,
এবার—বাইলে ভিজিবো তার রবেনা ঘর ফুটো।
ঘটভরা জলে ঘুচায়েছে ধুলা দ্বারের তালবােনা,
আঁক’ লক্ষ্মীর আনাগােনা-পথে আজিকে আলপনা।
ধানের ধূলায় টাকিওনা নাক আজিকে অঞ্চলে,
মেখে লও গায়ে মায়ের পায়ের ধূসর মঙ্গলে।
লক্ষ্মীর জীবে বলােনা কিছু খাস পেরে',
ইতুবট ছোও ভােরে সাজে নিতি মাথাটি হেঁট করে।
৯৭

এ গৃহে এখন লক্ষ্মী আছেন বাহিরে অন্দরে,
রহ সবে শুচি নিপাপরুচি বিনীত অন্তরে।
সব তক্তকে ঝকঝকে রাখ’, ঘুচাও মন্মলা,
কলহ তর্ক করােনা, লক্ষ্মী-হবেন চঞ্চলা।
কমি-সীত
আজি—সুখের লক্ষ্মীমাসে
শতশত বাকী ভরি ঝাকা ঝাকি পশীরা লইয়া আসে।
ইতুর পাঁচালী মুটের মন্ত্রে ডাক শুনে বারবার
এলেন জননী মাঠ হতে, ঘাটে পা'দুটা ধুলেন তার।
দিয়ে নবান্নে করুণা-সুধার প্রথম আস্বাদন,
পিছে পিছে এলাে সারা বছরের সঞ্চয়-করা ধন।
আজিমসীসেবকের দল,
মসীমাখা মুখে দেখে কিবা কৃষি-লক্ষ্মীর সোফল।
আজবাড়ীতে আসেনি মা
হিংসায় কেহ একথা বলিলে মাের-ত শুনিবনা ।
বেগুনের ক্ষেতে হেরেছি শিশুরে তাহার শুন্য পি’তে,
জুলিছে ‘কাজল লতা’ গুলি ঐ সীমের মাচানটিতে।

হেরেছি তাহার কবরী বিনাননা মড়ায়ের পাকে পাকে, বরবটী-গুটি থােকায় থােকায়—আঙুল নেড়ে কে ডাকে? আজ-মা যদি আসেনি রে, এতদিন পরে টেকির উপর পাড় দিল তবে কে ? রাঙা—অতসীর গাছে গাছে ছেলে ভুলাইতে বাজে ঝুমঝুমি, নখগুলি ফুটে আছে। গাঁদাবনে তার সীতির সিদূর, কুঁদবনে তার শাখা, হাসে ফুটে খই—আশিপনে ঐ চরণ-চিহ্ন আঁকা। ভরে রাঙা বীজে পুইলতা, চুনি আল্তা চরণ মূলে, হিঙুল আঙুলে ক্ষুদের পিটুলি আকেতে উঠে ফুলে। আর—বাড়ীটীর আশে পাশে উড়ে অঞ্চন বায়ু-চঞ্চল শরফুল-বন-কাশে। র—আসেনি মা আজ যদি, বাড়ে কেন এত ভাড়ারের পুজি, ভাঁড়ে কেন এত দধি ? ভাতে ভরা থালা-খড়ে ভরা পালা, গােল খালি নাই কারু, খেজুরের গুড়ে জালাভরা ঘরে, ডালাভরা মুড়ি লাড়ু। ভরিয়া উঠান দো-চালা মাচান ধরেছে নানান ফল- লক্ষ্মীর স্নেহ মমতার মধু ইক্ষুতে টলমল। আজ-মা যদি আসেনি তরে সারা বছরের মুখের বিধান কেমনে পেলাম সবে? ৯৯.

(১) ( ইবাচ্ছন্দে সঙ্গীত ) বন্দে অনিন্দ্যাঙ্গি বসন্তরাণী। মম্মিতে চারু প্রসন্নপাণি। এস- পুষ্পসবারক্তিম নেপর্ণে, রক্তপ্রবালােল রম্য বর্ণে। জাতী-পরাগান্ধ ভূজাঙ্গনা বৃন্দ- সংঘুমানা.তব দিব্য বাণী । এস— সৌগন্ধমত্তাম্র-লবঙ্গ-কুঞ্জে, মন্দার-চম্পা-নবমল্পী-পুঞ্জে, সংবর্ধনা-দক্ষ বৈতালিক প্লক্ষ- বৃক্ষে বিহী শত ঐক্যতানী । এস সুমি নেত্রে কবিকণ্ঠ-ছন্দে, লাবণ্যবী-ভুজপাশ-বন্ধে, সঙ্গে তপোত বন্ধু প্রিয়ান, শােলাক্ষিভঙ্গে ছবি বিশ্বপ্রাণী ॥

(২)
এস এস মন্দিরে জননি
এস-শীত-শিশিরাহতে ভীত নীরব-নতে
গীত-নন্দিত করি চির এমনি।
এস-পিকক-কুহরিত কুঞ্জে,
এসদিকে দিকে রবিকর-পুঞ্জে,
এস-অলিকুলগুঞ্জনে, কলিফুলরঞ্জনে,
ফুলমধুভুঞ্জনে পুলকিয়া অবনী,
আনাে ৰনকান্তারে জীবনী ॥
এস-আম্রমুকুলে মৃদু গন্ধে-
এস-তাম্রপ্রবালে লীলানন্দে,
এস-নন্দনাগত-দূত মন্দমারুতে ধৃত
চন্দ্রনধারাপ্ত করি সারা ধরণী।
এস ছায়াপথে বাহি তরণী ।
শতকবিকরত বীণাব,
মাতা-গাহে তব আগমনীম।
এস-অন্ধ তমসাত মণী মোহমুত
পীড়িত চিতে ধরি ধ্যানসরণী।
অন্তুরে এস মােহরণি।
।

এস-বসন্ত মউবনে-করি,-শীতান্তে বন্দনা,
আনো—জীবন্ত যৌবনে—হরি’-কৃতান্ত-লাঞ্ছনা ।
জাগােজাগন্ত সুগন্ধে-জাগাে,নিশান্ত-মুছলে,
হাসােপ্রশান্ত আনন্দে—গাহি সঙ্গীত-সান্ত্বনা ।
সব-দুরন্ত আত্ততায় সংহর’ প্রেম গৌরবে,
আধ—ফুটন্ত ব্যর্থতায় সম্বর মধু সৌরভে।
এস এম পান্থ হে—স্বাগত প্রােষিত কান্ত হে,
স্নিগ্ধ সৌম্য শান্ত হে—হর’ বিরহের যন্ত্রণা।
কর কুলন্ত মৃত্তিকায়—এসাে জ্বলন্ত প্রান্তরে,
আলি—নিভন্ত বর্তিকায়—ঘুচাও ধ্বন্ত অন্তরে।
এস-কাননের তন্ত্রীতে, এস-মিলনের গ্রন্থিতে,
এস—শকুন্ত-সঙ্গীতে-সাথে শুকপিক চন্দনা।
(৪)
ফাগুন এসেছে আগুন জ্বালায়ে গগনে গহনে অন্তরে।
দীপক গাহিয়া অরণি-বীণায় অগ্নিমস্থ ময়ে।
শশােক-পাটল-শাখায় শাখায়, জ্বালায়ে তুলেছে শিখায়-শিখায়,
নাচায়েছে মরীচিকার রেখায় দূর দিগন্ত-প্রান্তরে।
সান্ধ্য রবির অ-চিতায় সারা বরষের জঞ্জালে,
তরুণ—হিয়ার উদ্দীপনায় অতীত স্মৃতির কঙ্কালে,
বিহরীর বুকে জলেছে অনল,
জাগর-রক্ত আঁখি ছলছল,
দীর্ঘ খসনে হৃদয় বিকল তরল অনলে সম্ভরে।
১০২

কুঞ্জটি-ধূম বিদারি’ জ্বলেছে যজ্ঞে, উষার আশ্রমে,
ধূর্জটিভাল-নয়নে সূৰ্য্যে মধ্যদিনের সংক্রম,
অর-বেদিকায় জ্বলে উঠে ধূপ, অনলের ধূলি ধরে ফাগরূপ,
হােলীর লীলায় তাতায় মাতায় যতেক আবেশ-মন্থরে ।
(৫)
আজি এই মধুমাসে মাধবিকা মৃদু হাসে,
বধূর মধুরভাষে
অধরে মদিরাবারা।
পিয়ালের ‘পিয়া-লাতে
সখীসাথে অলি-মাতে,
মহুয়া মলয়বাতে
টলে মদে মাতোয়ারা।
“মধুজা মধুতেমা, সিন্ধুতে মধুবৰ্ষ,
ছায়াপথে মধু-গাথা ইন্দুতে গলে হর্য।
পথধূলি ফুলরেণু
মধুধারা ঢলে-ধেনু
বনে বাজে মধু-বেণু
গােপীজন দিশেহারা।
গোলাপের রাঙাগালে বুলবুল বুনে লজ্জা,
বকুলের ডালে-ডালে দোয়েলের, ফুলশয্যা।
মুকুলের মধু হাসে
কোকিলের স্বরভাসে,
সােনালুর প্রেম-পাশে' পারুল পাগলপারা।
নিখিল মিলনমাগে বুকে বুকে মধু আশা,
পথে পথে রাঙা—ফাগে উড়ে ঘুরে ভালোবাসা
অশােকের মধুরাগে ফুটে উঠে বাগেবগে,
শ্মশানে সুষমা-জাগে পাষাণে হাসিয়া-সার।

(৬)
আহাও রঙের আগুন কে আলিল ঐ ফাগুনের বন জুড়ে।
ও আগুন ছাইয়ে গেল, ছাই হলো যে শ্যামল স্বপন সব পুড়ে।
আগুনের-আঁচ লেগে ঐ হাজার পাখী
সঘনে—এক সাথে আজ উঠল ডাকি,
আগুনের রাঙা রাঙা আঙার গুলো ভােমরা হয়ে যায় উড়ে ।
আগুনেলটকোনা-বন ফটফটিয়ে ঐ ফাটে,
শিমুলের—পুড়ল পাতা, জ্বলছে আগুন তার কাঠে।
ও আগুন-ঢেউ খেলে অই উঠল গিয়ে
পলাশে, গাব গাছে দ’য় ঝিল মিলিয়ে,
শিখা বাদাম ৰনের কঁাকে ফঁাকে লাকিয়ে যায় ঘুরে।
আগুনের—আঁচ লাগে সব সখাসখীর অন্তরে,
তড়াগে—চখচখী বন ছেড়ে ঐ সত্তরে,
ও আগুন-মলয় বায়ে যায় বেড়ে অই,
ও আঁচে-তরুণীদের প্রাণ বাঁচে কই ?
আগুনের ফুলকি গিয়ে হলকা ছড়ায় বিরহিণীর প্রাণ-পুরে।
*-
(1)
আজ ফাগুনে বাউল বাতাস, বেণুর বনে বাজায় বাঁশী,
ও তার-ঝকড়া চুলে ঠিকরে পড়ে, কৃষ্ণচূড়া রাশিরাশি।
খােলা মাঠের ‘তলট ভরি, গােঠর পর্থে ধূলােট করি
বেবাক উলট পালট করে, গােধন হারায় অবাক চাষী:

বাউল বাতাস হয়েছে আজ মউলৰনে মাতোয়ালা,
আবউলের বৌলি কানে, গলায় দোলে অপােকমালা,
ঐ দেখ তার পাগল নাচে, আটকে গেল পলাশ গাছে,
গেরুয়া আলখাল্লাখানি,বন বাগানে ছুটল হাসি।
পানকৌড়ি ডুব দিয়ে ঐ ভুকি বাজায় তালে তালে,
গাবুগুবাগুব, বাজায় ঘুঘু রঙীন গাবের ডালে ডালে।
চরণে তার হাজার ভ্রমর, ঘুঙুর বাজার ঝর-ঝমর,
উদাস বিভাের পরাণ আমার চায় হতে তার সেবাদাসী
(৮)
শিশির ঋতুর অবসানে অকালে কি বর্ষা এলে?
নানা রঙের জলদ মালায় কাননভূমি ভরূল যে লল।
ঐ না লাে সই গগন-সীমায়, ইন্দ্রধনু তায় দেখা যায়।
ও গাছে কি ময়ুর নাচে ? মেঘের সাড়া বুঝিই পেল।
মুখে লাগে বাদল ছিটে মিঠে ঠেকে অধর কোণে,
শচীপতি ভুলে কি আজ পল রতির কুঞ্জবনে ?
দামিনী কি নাছতে এসে
জিভ কেটে অই দাড়ায় হেসে ?
অশােকশিমুলবনে কি তার হাসির চমক থিতিয়ে গেল?
মেঘেরা সব মন্দ্র ভুলে করছে কুজন-কানাকানি,
সমীরণের চঞ্চলতায় হবেই সবি জানাজানি।
বাদল ঝরে গুঞ্জরণে,
মাদল বাজে কুঞ্জবনে,
দোলের আগে আমের বাগে ঝুলন ডেকে আলে কে লাে?

t
(৯)
বধু এস এস খেলি হােলি মানস-দোলে,
আজি দখিন পবনে হৃদি-দুয়ার খােলে।
মধুর সায়ংকাল,
কুমকুমে লালে লাশ,
অপরূপ রূপ হেরি নয়ন তােলে ।
ওই ছয় রাগ ছত্রিশ রাগিণীর সঙ্গে,
হের নাচেরে চাচরে আজ চরাচর রঙ্গে,
প্রেম-ঘন ন ভরে,
মম মন অন্তরে,
যত ছন্দের গেয়ে ঘুরে মধুর বােলে ৷
আহ চৌদিকে মৌ মৌ অগুরুর গন্ধ,
তায়- তাথই তাথই নাচে অথই আনন্দ,
তনু ফাগে জ্বল জ্বল’
অনুরাগে ঢল ঢল,
ধন– ঝম্প ভঙ্খ ধ্বনি, মৃদঙু তােল ।
আজি উৎসবময় কর নবীন ব্যস্ত,
উৎসারি উল্লাস-উৎস অনন্ত।
জড়িমা মগন কর,
মধুর লগনে ভরে,
শুধু--“হেলী হ্যায়, হোলী হায়”, সণন রােলে।
(১)
বহুবরষ পরে জীবনবসন্ত আজ এয়েছে,
বরে’নে তায় বরে’নে।
তাহার হাতের জয়-পতাকায় কি লেখা ঐ রয়েছে,
পড়েনে তা পড়েনে।

নবীন আশার কিসলয়ে মনের তরু মুঞ্জরে,
কল্পবনে স্বপ্ন-ভ্রমর আবার বুঝি গুঞ্জরে,
কুঞ্জবনের সুগন্ধে ঐ উদ্দীপনার আনন্দ,
জীবনটি তাের ভরে’নে ভাই ভরে’নে।
কীচকবেণুর কুহরে ঐ পাগলা হাওয়া ভৈরবী
বাজায় ঘন গহনে,
শুকনাে পাতা দেয় উড়িয়ে, উন্মাদনায় গৌরবী
জাগায় বন-দহনে।
অসাড় যুগের জমা তুষার ছিল গিরির নিঝরে,
তরঙ্গের বন্ধ ছিল জীর্ণশিলার পিঞ্জরে,
জীবন-ধারার মন্দাকিনী গলে আজি ঝরঝরে,
প্রাণ ভরে তায় সিনান আজি করে’নে।
জলে থলে তৃণের দলে উজ্জীবনের ফুল হাসে
রঙীন প্রাণের বাসনা,
সকল বাঁধন কাটুল আজি সঞ্জীবনের উল্লাসে
নবীন প্রাণের সাধনা।
জাতির নব জাগ্ৰত এই জীবন-দোলের উৎসবে,
মাতৃবি কে রে ফাগের ঘােরে মাতরি কে রে তাণ্ডবে ?
আপনাকে আজ বিলাবি কে অমৃত-জয় গৌরবে ?
এই বেল আয় মরে’নে ভাই মরে’নে।

ঋতুমঙ্গল
বসন্তের বনবাণী
বসন্তে ঐ কাননবাণী সেজেছে আজ যতনে,
বধ্যভূমির গােপন তলের স্বর্ণ মাণিক রতনে।
কিক্‌মিকানাে নয়নহরা
কিসলয়ে-বন-করা
বসন তাহার শােভায় ধরা, নবীন রসাল-মুকুলে
রসনা তার মুখর হলাে, বাসনা তার বকুলে।
অঙ্গে তাহার উর্ণনাভের স্বর্ণজালের ওড়না,
হাস্য যেন রক্তশিলায় কুন্দ ফুলের ঝরণা ।
কল্পতরু সজ্জা দিয়ে
রইল শুধু লজ্জা নিয়ে
অগুরু-বস করিকার গন্ধ ছুটে ভূষাতে।
স্নান করে সে পুণ্যরুচি কিরণধারায় উষাতে ।
গুঞ্জনে ঐ কটাক্ষ তার চায় সে মৃগনয়ানে,
অঞ্জনে সুষুপ্ত অলি গুঞ্জনীহীন বয়ানে।
দৃষ্টিতে তার সৃষ্টি করা
ময়ূর-বধূ নৃত্যপরা,
নিশ্বাসে তাঁর মন্দ সমীর উষ্ণ মধুর সুরভি,
কুউনে সে প্রভাতী গায়, পিউতানে সে পূরবী।
উল্লসিত ফুল্ল স্মিত বল্লী ছায়া বিতরে,
ঝিল্পী-ঘুঙুর বাজে পায়ে, জোনাক জ্বলে নখরে ।
শুকনাে পাতা মুরমুরিয়ে পায়ে পায়ে যায় গুড়িয়ে,
ঝয়ে পয়াগ ঝুরঝুরিয়ে ব্যথিত পদজুড়াতে,
মলয়শীয় বীজন করি রহে আঁচল উড়াতে।

বস
।
লেহন করে চরণ, বক,সর্প রচে মেখলা,
কমল উপহারে কী করে তাহায় কমলা।
মােহিয়া সে বীণার তানে কেশর ধ’রে সিংহে আনে,
তমাল ঝাউএর কুঞ্জবনে ছড়িয়ে দিয়ে চিকুরে,
কাননরাণী আনন দেখে নদী-জলের মুকুরে।
অভিশপ্ত
রে বসন্ত-অপ্রশান্ত, ‘অধিকার-প্রমত্ত যৌবন।
এ-কী ও বর্ষে বর্ষে-জন্মজয়া জীবন মরণ।
লক্ষ জন্ম জন্মান্তরে মুক্তি নাই মােক নাই তাের।
ভবচক্রে ঘূর্ণমান, কাটিল না অবিদ্যার ভাের ?
জাতিস্মর তুই, তবু যাতায়াতে হলােনাক জ্ঞান,
ভাঙাইতে চাস আজো, মােহমূঢ়! শঙ্করের ধ্যান।
আপনার অনিত্যতা আজো তুই নারিলি বুঝিতে,
‘অরে’ ত্যজি ‘জিতে আজো তুই না চাস পুজিতে।
চিরন্তন মহাকাল বিশ্বপাল আদি-অন্তহীন
চিরব বিশ্বচক্রে, নির্বিকার, যােগে সমাসীন,
দ্রোহ ত্যজি আপনারে সমর্পণ কর তার পায়,
কৈবল্য লভিৰি, রুপাদযুগে ব্যাঘ্রাজিনছায়।
আনময়ের মাঝে অজর পাবি চিরদিন, .
চির মধুমাস হয়ে মৃত্যুহীন, শাশ্বত-নবীন।

মঙ্গল
চুতমঞ্জরী
আম মুকুল! ছন্দোদোদুল, গন্ধে মৃদুল মিঠে
বনের তূণীর ছাপিয়ে জাগিস, রতিপতির পিঠে।
রূপ’ ছেড়ে কোন্ তৃষ্ণা লয়ে তীক্ষ্ণ কুহুঃশব্দ’ হয়ে
আসি ছুটে, বিধিস্ মােদের প্রাণের গিঁঠে গিঠে।
আম্রমুকুল, অমৃতফুল, মদির রসের ঝোরা,
বালাদের হাজার হাতে পিচকারী কি তাের ?
রাখিস বাগান রঙীন করে তুলিস্ কূজন গগন ভবে,
তােদের দোলে মনে প্রাণে রঙীন হলাম মাের।
রঙের মশাল মুকুল রসাল আছিস্ রসে ফুলি,
মাধবিকার আঙুলে সব আতঙিল তুলা।
নানান রঙের চিত্র একে
দিলি বনের শ্যামল ঢেকে,
গগনপটে আঁবি বুঝি বনের স্বপন গুলি।
রসাল মুকুল, সঙ্গীতাকুল, ফুলন্তু মঙ্গল ।
কষায়দুকুল-জয়কেতু তুই দিগন্তে উজ্জ্বল।
প্রমর-পাতির আঁখর লেখা জয়গাথা তায় যাচ্ছে দেখা,
ন’বৎ বাজায় তার তলে বৈতালিকের দল ।
রসাল মুকুল, রসরাজের পূজার আয়োজন,
ধূপশলা—নৈবেদ্য-মধু-পর্ক নিলেন।
ভােগ-আরতির বাদ্যঘটা
হােমানলের শিখার ছটা,
বােধন-কলস, অর্থ-বিলাস, সবার সম্মিলন।
১১০

দখিনা
ওগো-দখিন সমীরণ।
এসেছ ভাই, রঙীন মধুর সুরভি তাই বন।
লােকে বলে, গাচ্ছে পাখী
পুষ্পে ভরে যাচ্ছে শাখী,
মূলের খবর কেউ রাখে কি? বকায় অকারণ।
আমায় কে ফাকি দেবে, কার কথা বা মানি,
বনের হৃদয়-পঞ্চতারায় বাজাও তুমিই, জানি।
ঐ বীণাতান শাখায় জাগে মাতাল করে কানন বাগে,
পুষ্প ও নয়, রঙীন রাগে ঝঙ্কত স্বপন।
গমক তােমার নীড়ে নীড়ে কূজন হয়ে বাজে,
তােমার সুরই মীড়ে মীড়ে কীচকবেণু ভাঁজে ।
ছন্দ তােমার গৰূপে
ঘুরে বেড়ায় চুপে চুপে,
সুরভি মূচ্ছ না তােমার, মাতাল করে মন।
সুরের মধু জাগছে ফুলে জছে চাকে চাকে,
ফিরে আবার হচ্ছে মুখর অলির ঝাকে ঝাকে।
তােমার যত রাগ রাগিণী পরশে ভাই সবই চিনি,
কাদায় আমায় হারায়, আমার জাগায় শিহরণ।
পঞ্চশরের সখা,-বাজাও পঞ্চতারা বীণ,
পঞ্চমে তান তুলে গাহ নিত্যই নবীন।
গন্ধ-পরশ রূপ রসে সে-সুর আমার মৰ্ম্মে পশে,
পদুয়ার খুলে প্রাণে কছি আবাহন।
১১১

কর্ণিকার
আজি বসন্তে বন-দিগন্তে ফুটিয়া উঠেছে সোনার খনি।
মাটীর তললের সব সােণা আজি কাঙাল তরুরে করেছে ধনী।
চারু পল্লব শ্যাম বৈভব ফল-গৌরব ছিল না তার,
একেবারে সে-যে হয়েছে কুবের বহিতে পারে না সােণা ভার।
আজিকে নিঃস্ব বন-ভূ’র লাগি হিরণ-সত্ৰ খুলিল কেরে
টভভাজের পরমােৎসব, নয়ন যে আর ফেরে না হেরে'।
কাশী মহীশূর অমৃত-সরের সকল গর্ব করিয়া গুড়া,
‘নীলকান্তের মন্দিরে আজি কে গড়িল অই কনক-চূড়া?
শ্যামের বামে কে মিলা’ল হেথায় কনকবরণী রাধারে আনি ?
অথবা ও-কি-ও নীলাচল-গায় গােরার কনক-প্রতিমা খানি?
মধু-মাধবের বরণের লাগি “মাধবী” কি আজ সালঙ্কারা ?
নবাভিষিক্ত ঋতুরাজ-শিরে কনক-ছত্র ধরেছে কারা?
নভােগঙ্গার স্বর্ণধার কি নামিল বনের জটিল’ শিরে?
সােনার স্বপনে বন-বনান্ত দিগদিগন্ত ভরিল কিরে?
মাটর তলের সােনারি মতন এ সােনাও ভৰে দুদিন বয়,
ধাতুরাজ তবু রাঙ্গ-শোধ্যেও পারে নি ইহারে করিতে হয়।
জড় কি কখনাে জীবনে জিনিবে ছাতিরে কি কভু জিনিবে ক্ষিতি
হিরণ-কুমে হােথা পুষ্পিত রবির কিরণ, সােমের প্রতি।
১২

কুক্ষি চিরিয়া চোরে যাহা হয়ে ধরা তা যে দেয় ইছামুখে,
মরু-পঞ্জরে সে যে কণা কণা, এ যে অজস্র তরুর বুকে।
এর লাগি শত ডুবিবে না পােত-ও সহিবে না কেহ চেতঃপীড়া,
অনশনে, রােগে, শ্রমে, দুর্ভোগে মরিবে না যত সন্ধানীরা।
এর লাগি দেশে ছুটিবে না অসি, বাজিবে না ভেরী দানব-মদে,
‘পীতিমা’ ইহার হনো শােণিমা’ স্নান করি নর-শােণিতনদে।
এ-তত জাগাবে না দেশবিদ্রোহ, দ্বেষ, বিগ্রহ, জিগীষা, রােষ,
বিশ্বাস-হানি বিচ্ছেদ গ্লানি ভ্রাতৃবিরােধ রক্ত-শােষ।
ধনদস্যরা বৃথা শ্ৰমাতুর, কতটুকু সােনা ঘরের কোণে ?
নিখিলের লাগি হেম-কোষাগার ঋতুরাজ আজ খুলেছে বনে।
কানে খুঁজে নে’রে পাহাড়ী রাখাল চুলে গুজে নেরে ব্যাধের মেয়ে,
বনবালাগণ মালা গেথে পর, কে আছিস কোথা আয়রে ধেয়ে।
কৃপাণের জোরে লুটিয়া ‘কঠোরে’ রজনী জাগুক কৃপণপ্রাণ,
ললিত কোমল পাৰি মুঠা ভরে, নিয়ে যা মায়ের স্নেহের দান
নিখাদ কষিত অম্লান তাজা যত নিৰি তুই, ততই পাবি।
নব নব ঢঙে গড় না গহনা, লাগিবে না এতে কুলুপ চাবি।
হেম-মৃগ পাছে ছুটে মূর্খেরা হারা’কলকলি, পরুক ফঁালি,
দিয়ে টিটকারি তাজা সােনা পরি নেচে বেড়া তােরা বাজিয়ে বাঁশ।
মাচীর সােনারে হারায়ে অভাগা জীবনজুরিয়া মরুক কেঁদে।
অঞ্জলি তাের বর্ষে বর্ষে ভ’রে দিবে ধরা আপনি সেধে।

বাউল বসন্ত
?
মােদের কানন-পথট দিয়ে যাচ্ছি তুমি কোন বিদেশে?
কোন অজানা পথের তুমি যাত্রী
কোথা হতে আসছ পথিক, পথের ধুলায় ধূসর বেশে ?
যে হও তুমি কাটাও হেথা রাত্রি।
ঢাহ কানে কলস্রোতে কল্পলােকের অনুভূতি,
কছ প্রাণে স্বপ্ন-সুরা বৃষ্টি।
চেনা গলার জানা গীতি শুনে শুনে শান্ত শ্রুতি,
অর্থহারা পরদেশী তাই মিষ্টি।
'আম-বাগানের সরাইখানায় কচি পাতায় আসন পাততা,
মােচন কর দু’দিন তােমার শান্তি,
মুকুল-মুরা সেবন করে গাহাও গাহে, মাতাও মাতে,
ঘটাও তুমি ভুবনভরা ভ্রান্তি।
শুনাে লতায় গজায় পাতা, এলােমেলাে উদাস উদাস
বাতাস বহে, হুতাশ করে সৃষ্টি,
‘আল’ খেলে মন-মীনেরা, উষ্ণ হলাে নাসার নিশা,
হরিণ-চোখে চপল হলে দৃষ্টি।
লগা বাধন আলগা পেয়ে সবাই করে পলাই-পালাই
পান্থপালায় কষ্ট তােমার ছুটলে,
নিখিল জগৎ বাউরা হলো বাউল গাহে, এ কী বালাই।
কোথা হতে এ পড়শে জুটলে ?
১১৪ :

ব
ভবের হাটে কাজের ঠাটে বিধিবিধান নিয়মকানুন,
করলে বেবাক বাতিল ছত্রভঙ্গ,
সুরের ধ্বজায় তুল্লে এযে বিদ্রোহ দুর্দান্ত দারুণ,
পথের পথিক তােমার এ কি রঙ্গ?
গগন-পথের পান্থ ওগাে তােমার সনে অসীম পানে
উড়ে যেতে সবারি উৎকণ্ঠা,
পরের কথাই বলছি কেন, সুদূর স্মৃতি তােমার গানে
বিধুর করে তুলছে আমার মনটা।
ছটকে পড়া মনকে আমার কেমন করে আটকে রাখি
কেমন করে করি তাহায় ঠাণ্ডা,
ঘরের মাঝে হাজার কাজে কেমন করে আবার ডাকি?
তার্থ পথের ওগাে চতুর পাণ্ডা!
এনাে এই হস্তে গােছই কেমন করে খুঁজে খুঁজে
যন্ত্রপাতি ঋাকা ঝুড়ি ভাও,
লইগাে আপন গণ্ডা আবার কেমন করে বুঝে সুজে,
ওগাে বেতাম কেমন তােমার কাণ্ড!
অসীম হতে অসীমে যাও সসীম লােকের মধ্য দিয়া
কাটাও হেথা পানােংসবের রাত্রি,
আমার অদিম জন্মলােকের ব্যক্তিটুকুন উদ্বোধিয়া
চাচ্ছ চলে কল্পলােকের যাত্রী।

কাননমাঝে একটা কেমন চলছে যেন কাণাকাণি,
কি-যেন কি গােপন কথা হঠাৎ হ'লো জানাজানি।
বকুল ভাবে আকুল হয়ে অকালে আজ ফুটব নাকি।
অমর বলে কোমর এটে ‘আগেই আমি উঠব ডাকি।
কুঁড়ির ভিতর গুমরে মরে পলাশ-কেশর দিচ্ছে উকি,
ব্যাপার দেখে হাসছে আজি বনের যত থােকাখুকী।
কি হয়েছে বলে পরে ফালফেলিয়ে কেবল চায়;
প্রজাপতি আপন মনে লিচুর বনে মধুই খায়।
গাই-কিনা-গাই ভেবে যখন করছে দোয়েল আহা-উহু,
চমক ভেঙে ধমক দিয়ে হঠাৎ কোয়েল ডাল কুহু।
পবন আজি কেমন-কেমন করছে বড়ই মাখামাখি,
রঙীন পাতা গাবের গাছে করছে তখন তাকাকি।
বাগান-রাণীর হঠাৎ এ কি বাদাম-পাতায় অধর রাঙা!
সারী দেখে শুকের মুখে বচন কেমন ভাঙা-ভাঙা।
আমি বলি ফুল তরু বলনা কি গাে কথাই গুন,
সুরভি-মন বাতাবি-বা প্রশ্ন শুনে হেসেই খুন।
মও করীর রুক্ষ শরীর আজ মদিরায় গন্ধময়,
দলের ছায়ায় গাল হেরে মরালী ও মন্দ নয়।
বাঘিনী আজ হিয়ার ক্ষুধায় পেটের ক্ষুধা যাচ্ছে ভুলে,
ঘগীয় শিঙের মনে ছাগের নয়ন আছে তুলে

সারস আজি বৈরাগী ঘোর ঠেলে চলেন মাছের ঝাঁক,
বেড়ে গেছে আজকে রাতে চক্রবাকীর করুণ ডাক।
আমি বলি ‘হরিণবালা ব্যাপার কিগাে বল না হয় ?
মৃগনাভির গন্ধে ভরা মৃগের গা সে চেটেই যায়।
কৃষকলার ভিজছে বসন, কলস ভেসে যাচ্ছে জলে,
চাষার ছেলে বলদ নিয়ে আসছে ভুলে লাঙ্গল ফেলে।
বৌ-মা আজি পােড়ন ভাজা চুণ না দিয়ে সাজেন পাণ,
গিন্নী আজি কিসের ঘােরে করতে শাসন ভুলেও যান।
চড়ায় জোরে নৌকা ঠেকে, হুস তবে পায় আজকে মাঝি,
মাছটা ছুড়ে জোয়ান জেলে করছে জড় শামুক আজি ।
শুধাই যদি ‘গুরুমশাই, ব্যাপারখানা কি রকম?
শােননন তিনি বিভাের হয়ে পায়রাগুলাের বকম।
ত’বিল গােলে ঠিকের ভুলে আফিস বাবুর ঝরছে ঘাম,
বড় সাহেব নাম-সহিতে লেখেন নিজের মেমের নাম।
উকিলবাবু টানেন শুধু-গুড়গুড়িটে, তামাক নাই,
এজলাসেতেই ভাঁজেন ‘কাফী’ কড়া হাকিম, দেমাক নাই।
ছাত্র দেখেন Calculusএ কথ ঋষির পুণ্যবন,
পুথির পাতায় পত্র রচেন চতুপাঠীর শিষ্যগণ।
আমরা দেখি হঠাৎ ভোদা সেও কবি আজ, লিখছে গান,
নাইতে খেতে ভুলে কবি গাইতে গাইতে লিখেই যান।
১১৭

প্রাঙীনকবিদের বসন্ত
আজি বঙ্গ-লতাবণী-পরিশীলন-সুরভি মলয়-বায়
কুঞ্জ-কুটীরে মধুকর-রুত-মিলন-গীতিকা কোকিলা গায়।
মদির কুসুমে, অধীর মধুপে, সুরভি আকুল বকুল তরু,
পথিক-বধূর বিরহ-বিধুর ধূ ধূ করে শুধু হৃদয়-মরু।
নব-কিসলৱদ-বলমন্স উজলে তমাল বনের তমঃ,
ক্ষুট কিংশুক, তরুণের বুক চিরিতে স্মরের নখসেম।
মদনরাজের কনকদণ্ড জাগে অই নাগকেশর বনে
সারাদেহে-অলি অরুণ পাটলি সুর-তৃণখানি স্মরায় মনে।
মাধবিকা নবালিকা-মুকুল-পরিমলময়ী মাধবী-রমা,
মুনি-নােহর, যুবতীজনের আজি অকারণ-বন্ধুসমা।
মাধবীলতার পরিবণে পেশল রসাল, শিহরি উঠে,
সেথা কোকিলের মুকুলােৎসবে মধুসদ্যোগে অলিরা জুটে।
অহির কবলে দহিয়া গরলে চলন-বনে মলয়াচলে,
চুট মলয়জ’ হিমালয় শনে জুড়াতে সে জালা তুষার-জলে।
আজি বসন্তে '
চিত্রার’ যােগ, নারীর
বুকে,
কিসয়ে ফুল, ফুলে মধুকর, মদকল রে মধুপ-মুখে।
মলয়-মারুতে উড়ে পত পত মকর-কেতুর রথের কেতু,
অশােক-রুতে চরণ-তাড়ন করে তরুণীরা দোহদহেতু।
দারুহরিদ্রা-কুলুম-চত্রে ভ্রমরেরা করে কলঙ্কিত,
তার দোলায় ভ্রমরীয়া দোলে মধুপানে আঁখি বিঘুর্শিত।
যৌবন যেন
১১৮

লবলীর বনে মধু বরষিয়া কোকিল অকাল বরিষা আনে,
‘সুৎকার’-রবে গগন ভরিয়া আজি অনঙ্গ শায়ক হানে।
স্মর-শরে-ক্ষত-গলিত রুধিরে পিচ্ছিল বন-পন্থাগুলি,
পথের পঙ্ক করিতে সান্দ্র মধু-তরু ঢালে ফুলের ধূলি।
মলয় পবনে ঘূর্ণিত শাখা, ভৃঙ্গ-প্রলাপে জড়িত কথা,
কিসলয়ে আঁখি অরুণ, তরুর মধু মদে আজি প্রমত্ততা।
তরুণীগণের গণ্ডুষাসব বকুলাঞ্জলি বাসিত করে,
মধুপানারুণ গণ্ডের ভাতি চম্পা ফুটায় বরষ পরে।
অশােক-কাণ্ডে নুপুর-শিঞ্জ ভূঙ্গের মুখে জাগায় গীতি,
নবমালিকার সহেনাক ত্বরা, ফুটে সে না মানি ঋতুর রীতি।
পথের দুধার ভরা পুন্নাগ, বকুল, পাটল, সিন্ধুবারে,
গন্ধ আজি নিশীথ-পান্থে পন্থা চিনায় অন্ধকারে।
বিরহিণী আজিকে পরাণ সঁপিতে বুক পেতে দেয় কুহুর’বাণে,
চেয়ে রয় আজি,চুতাঙ্কুরের স্মরাঙ্কুশের ফলার পানে,
বকুল-বাসিত মলয়-বায়ুর অকূল প্রবাহে অঙ্গ সঁপে,
দাবানল ভেবে নগ্ন দেহটী ঢেলে দেয় রাকা-চন্দ্রাতপে।
মনােজ আজিকে বিজয়ী, বিরহী চরণ-শরণ লইবে কার ?
হর-ললাটের সুধাকরা আজি বহে বিজয়ীর নিদেশ-ভার।
সুরভি শায়ক চুতমঞ্জরী, রসময় বাণ মধুক-সীধু,
ধবনিময় শর কোকিলের স্বর,রূপময় বাণ-তুণীর বিধু
স্পর্শদারুণ শর অকরুণ:মলয়-মারুত পৃষ্ঠে ধরে,
পঞ্চশায়কে মনসিজ আজি তরুণ বিরহি-জীবন হরে।
১১৯

ধারা-যন্ত্রের ঝঝর-নাদে চৰ্চরী-তালে নুপুর-রবে
বেণুবীণা-জনে, শুকপিক-গানে ধরা ভরা আজি মধূৎসবে।
সীৎকার তুলে “শৃঙ্গক”-ফণা মণিমণ্ডিত নাগরা-করে,
আবীরে-আঁধার পুর-চত্বর ভুজগ-পুরীর রূপটা ধরে।
স্বচ্ছ ধবল গৃহশিলাতল অচ্ছেদজল-প্রতিম ভায়,
অরুণ তরুণী-চরণ-পঙ্ক চারু পঙ্কজ ফুটায় তায়।
আগে সীধু দিয়ে মধুমাস করে অবশ মৃদুল তরুণী-হৃদি,
পরে মনসিজ জয়ী হয় আজি নিজ ফুলশরে সহজে বিধি।
অশােক-গুচ্ছে মুকুলিতকুচা, চুত-মঞ্জরী-রজম্বিনী,
মধূক-কুঞ্জে দশা-সন্ধিতে মধু-বধূ আজি নিতম্বিনী।
খুলনাক দোর, দক্ষিণ চোর হরিছে আজিকে ফুলের নিধি,
ভূর্জপত্র-প্রণয়-লিপিকা, কটির দুকুল, বিরহি-হৃদি।
রসাল-মুকুল শায়ক যাহার, স্তুতি-গান যার কোকিল-রুত,
নলিনী-অলিনী চাপ-শিঞ্জিনী, মলয়জ যার দন্তীযুখ,
চত্রমা যার ধবল ছত্র, শরাসন যার পলাশ-পাতি,
মদন-সারথি সেই ঋতুপতি নব-গৌরবে উঠেছে মাতি।
অভিনয় করে বলতরুগুলি কুসুম-পরাগে অঙ্গ মানি,
চারু কিশলয় অঙ্গুলি নাড়ি মুকুল-কুসুম-ভূষণে সাজি।
পরভৃত-রবে রচিয়া বচন, মলয়-পবনে নৃত্য করে,
অলি-ঝঙ্কারে সঙ্গীত গাহি আজি নিখিলের চিত হয়ে।
কুসুম তুলিতে উদগত করে পক্ষ-কেশর নগর-বধু,
নয়ন-সয়ােজে যােগায় লতিকা অরুণিমা আর পরাগ মধু।
১২০

পুষ্পহারিণী, রজোভয়ে তাই কলিকা তুলিয়া ফুটায়ে লয়,
রােষে অলি তায় দংশিতে চায় কলিকাগুলিরে আগুলি রয়।
পুষ্পচয়নে পুষ্পিতা হয় সীমন্তিনীর ঐকরলতা,
শখার শােভায় লভে তরুশাখা যজ্ঞােপবীতে পবিত্রতা।
আজি নারী-করে বসাকর্ষণে যে তরুর শাখা হয় না না
হোক কুসুমিত, তবু সেত ক্লীব,-পৌরুষ তার কথার কথা।
পুষ্পিতা লতা ভাবি’ অলি বসে নারীর উবােজটের এজে,
অঙ্গরাগের প্রসাধন রচে প্রকারান্তরে পাখার রজে।
মধুকরে ডরি ছুটিয়া নাগরী নাগরে তাহার আঁকড়ি’ ধরে,
অঙ্গের রজ বক্ষোপীড়নে দয়িত-বক্ষ পিঙ্গ করে।
অলি উড়ে যায়, শুধু রজ নয় রেখে যায় ধ্বনি কাঞ্চীদামে,
চপল সুষমা অলক মালায়,-মধু, চুম্বিত অধরধামে।
আজি বসন্তে দিনে ছায়া লাগি নিশীথে জুড়াতে তনুর জ্বালা,
গগনে চাতপ বাঞ্ছিত-অঙ্গনই আজি চত্রশাল।
বালাশােক-বধু চরণে লাক্ষা, পরণে রক্ত দুকুল ধরে,
অশােক জ্বদিরে সশােক করিয়া, কাজল লোচনে সজল করে।
ফুলের স্তবকে লগ্ন ভ্রমর মগ্ন সে মকরন্দ পি’তে,
শতাবধূ যেন গর্ভিণী হলাে কৃষ্ণচুচুক শুনশ্রীতে।
অরুণ কুসুম ঝলমলি’ ফুটে শাণীদেহে, নয়ন ঝলে,
যেন ‘অপর্ণা শাখায় শাখায় শিখায় শিখা অনল বলে।
দুশ্চর তপে কঙ্কালসার যেন অপর্ণাগও পরে
হর-চুন নবজীবনের শােণিতপুর সূজন করে।

ঋতুমঙ্গল কমল, পরাগে ‘পরাগত স্ফুট নবীন ‘পলাশে পলাশবন, মৃদুল-তান্ত মধু-লতান্ত, সুরভি সুরভি হরিছে মন । মুছায়ে ললাটে শ্রমজলকণা, দুলায়ে লুলিত অলকরাজি, বহিছে সমীর তড়াগ-বাপীর অমলিন নীর পরশি আজি। ফুটবক-নবকুরবক-পরাগে ভূষিত, ঈষৎসিত, চালােচনার আঁখি-তারাসম মধুকরগণ বিলোলারিত। পুষ্প-কনক চারু চম্পক ঘিরছে অশােক-গুচ্ছে কিবা, বিরহিহৃদয়-পিণিত লভেছে যেন স্মরানলে কপিশ বিভা! ‘স্মর- মুর-চূর্ণের’ রূপে আম্রমুকুল-পরাগ গুলি। পথিক-জনের পথ পরি পড়ি তাতায় তাহার পথের ধূলি। প্রিয় সখীসম কোকিলা আজিকে মানিনীর কাণে কহে কী কথা, শুনি তা বনি ত্যজি অভিমান অর্পে দয়িতে অঙ্গলতা। গড়িয়া তুণীর দূত বসন্ত চুত-কিশলয়-মুকুল-দলে অলি-পংক্তিরে বসালে তাহার মনোজের নাম লেখার ছলে। নব শশিকলাসম বঙ্কিম অরুণ পলাশ-মুকুল যত বনস্থলীর উরসে জাগিল যেন ঋতুরাজ-নক্ষত। রবিকর ঝলে কিসলয়ে, বুলে অলিরা তিলকে মধুর লােভে, যেন তার ঠোটে রক্তিমা, চোখে কাজল, গণ্ড তিলকে শােভে। পিয়ালের বনে ব্যাহত-দৃষ্টি আয়ত নয়নে হ্রস্ব করি’ ছুটে চারিদিকে, জীর্ণপত্র-মর্মরে মৃগ কানন ভরি। চুত-মঞ্জরী-কষায় কণ্ঠে কোকিল-য়ক'কি গায় গান ? মননজের বুঝি নিদেশ যােষিছে ? শাসনে ভাঙায় মানিনী-মান। ১২২

কাহার নিদেশে আজি হেসে হেসে সখী সখা সাথে মিলিয়ে এসে ?
একই ফুলে বসি’ মধুকর, তুষি’ প্রিয়ারে মধুতে, পিইছে শেষে।
মৃগীগাত্রের কতি হরে শৃঙ্গে সাদরে কৃষ্ণসার,
আবেশে আলসে মৃগাঙ্গনার আঁখি ঢুলে পড়ে পরশে তার ।
কর্ণপবনে করিয়া বীজন, দন্তে হরিয়া গণ্ড-পীড়া,
সল্লকীদল মুখে তুলে করী করিণীর আজ ভাঙায় ব্রীড়া,
কমল-সুরভি গণ্ডুষ-বারি প্রিয়ারে তাহার পিয়ায় সুখে।
অন্ধভুক্ত মৃণাল-খও চখা তুলে দেয় চখীর মুখে।
আজিকার মধুমিলনােৎসবে তরুলতারাও পড়েনি বাকী,
নত করি শাখা লতিকা-বধূর ভুবন্ধন লভেছে শাখী।
যােড়শীরা আর মদনানুলেপ রচেনা শুষ্ক বিস্বাধরে,
সুরভি তৈলে রচেনাক বেণী খোঁপায় এখন মালতী পরে,
চনে এবে লতে আনন্দ, কুঙ্কুম মূখে মাখে না আর,
তনু-আবরণী ত্যজি তনুখানি পদতলে জড়াে নিদ্রিতার।
লােল-বিলােচনা চোল-বধুদের দোল-কৌতুকে আবির মাখি’
কর্ণাটীদের কর্ণালকের এলা-পরিমল লইয়া ছাঁকি
কানারীর কাঞ্চী দোলায়ে, পাণ্ডনারীর গণ্ড চুমি
দেশে দেশে চলে দখিনা মারুত তেয়াগি, মলয়-ভূধর-ভূমি।
অর-শায়কের চালক চতুর, বর-নায়কের সেবক মিতা,
কীচক-বনের গায়ক সে আজ মধু-দুতিকার পালক পিতা,
তাম্বুলবনে করিয়া বিহার, কঙ্কোলিকার বাড়ায়ে আয়ু,
তাম্ৰপণী-সলিলে নাহিয়া চলেছে সুরভি মলয় বায়ু।
১২৩

মঙ্গল
ফুটিল চম্পা নেপালী নারীর কৃষ্ণুমমাখা মুখের মত,
অবন্তিকার দন্তের রুচি বহিছে মড়ী-কলিকা যত।
রচেছে নারীর কর্ণ-ভূষণ সজীব কনকে কর্ণিকার,
বহুদিন পরে রচে পয়ােধরে মজলকণা মুকুতাহার।
গুরু নিতম্ব বহনের শ্রমে ফুটি দেকলা ললাট পরে,
সুরভি মলয়ে মলয়জ হয়ে নিতম্বিনীর শান্তি হরে।
নবীনা নাগরী চুত-মঞ্জরী সঁপে অনঙ্গে পূজার ছলে,
শায়ক হয়ে তা’ ফিরে আসে মনে সীধু হয়ে তার মাধুরী জ্বলে।
চুতবনে পশি’ তাড়না লভিয়া কোকিলের কুহু-শাসনরবে
চঞ্চরীকুল, মঞ্জরী ত্যজি’ চম্পক-দলে শরণ লভে।
বাজায়ে ভূঙ্গে মৃগয়া-শৃঙ্গ পথিক-মৃগেরে তুলায় স্মর,
দাবানল ভেবে শলভেরা সব শাল্মলী বনে হয়েছে জড়ো।
শ্যামল-বন্ত, নিলীনভৃঙ্গ কিংশুকগুলি মানস হরে,
অলি অলি-বধু দুই দিকে মধু একসাথে যেন সেবন করে।
অশােকে যাহার অধর-শােণিমা, পুন্নাগে যার তিলক আঁকা,
কুরবকে যার সু-চিত্রন, চম্পার বিভা অঙ্গে মাখা,
মাধবী-লক্ষ্মী’ নানা ফুলে সেজে বিরাজে, রূপসি, তােমার পাশে,
কি সাজে সাজিবে আজি বসন্তে? হেলা ভূরে সে যে বেলায় হাসে।
নিলে সে তব দশনে কুন্দে, অলি-পিকরবে বাণীরে তব,
নব কুরবকে তব করনখে, নব পল্লবে পাণিরে তব,
কেঁদোনা তা বলে, সকল ঋতুতে আঁখি শােভে বটে অলবে,
আজিতা দূষণ,-নহত ভূষণ,-অশুভ এনােনা মধূৎসবে।
১২৪ ।

: বসন্ত-লক্ষ্মী সে-দিনাে মাধবী-রাতি, বিশ্ব উঠিল মাতি, চিত্ত ফুটিল মধুহাতে, সব হিয়া পুরণিমা সব রঙ অরুণিমা সব গতি হ’ল মৃদুলাতে। পিকবধু শিহরিল কুহু কুহু কুহরিল, সীধু হরি’ বিহরিল ভূল, চখাচখী দোহে দুই বুকে টানে মুহুর্মুহু রতিপতি ফুকরিল শৃঙ্গ। গাহি আগমনীগীতি তব আগমন-বীথি জানাইল কোটী মধুমী- মম মনােমন্দিরে এলে তুমি ধীরে-ধীরে নবীন বসন্তের লক্ষ্মী। ছিলে বিধুমল্লীতে ছিলে মধুবল্লীতে নখরুচি-কিংশুককুঞ্জে, অয়ি প্রাণবল্লভে ছিলে নবপল্লবে মাধবীর মাধুরীর পুরে। পাটলের ডালে-ডালে পিকরুত-তালে-তালে পা ফেলিয়া এলে হৃৎসয়ে, ঋতুরাজ-বৈভব-মধুরেণুসৌরভ-রূপে জাগে তব লীলাপয়ে। তব দুকুলাঞ্চল-ভরা মৃদু চঞ্চল মলয়া আসিল মধু মন্দ্রে, মরমের বেণুবনে পপি সে যে খনে খনে ৰাজাইল শতকোটিন্ধে। তব মধু-দিঠিপাতে সে দিনের মধুরাতে নয়নের গেল জরাল, সুরভি চিকুর চুমে’ জীবনের মরুভূমে পুলকিল ফুলে তৃণ-শস্ত। বাসনার শিখিনীরে নাচাইল ধীরে ধীরে কঙ্কণ তব মণিবন্ধে, বনভরা সৌরভ বিহগের কলরব সকলি জাগিল মম ছলে। তােমার হরিণ-আঁখি মুদে এল রেণু মাখি প্রিয়ের পিয়াল-মধুচুখে, সে-রজনী কিবা শুভ ভাষা মাের ডুব’-ডুব’ আশার-বিলাসের কুম্ভে। বাহিরের ঋতুরাজে আনিলে হৃদিমাঝে যেথা তার রাজে রাজছত্র, সেই হতে প্রাপােপমা তুমি তথা রাজরমা খুলি আছ অস-দানস। ১২৫

ব্যর্থ বসন্ত
এলােনা বসন্ত এবার বলছ তুমি কেমন করে
কোথায় তুমি ছিলে, মূঢ়, ছিলে তুমি কিসের ঘােরে ?
চিরটা কাল যেমন আসে তেমনি করেই সে ত এলাে,
বারে বারে শিঙার ফুয়ে তেমনি করেই ডেকে গেল।
তেমনি রঙীন পত্রপুটে রটল তাহার আমন্ত্রণী,
কুহরের পিচকারীতে ছুটল তাহার রঙীন ধ্বনি।
বাল ভ্রমর কিঙ্কিনীকুল পঞ্চশরের শরাসনে,
টারে ঝকারে শায়ক বিঁধল তরুণ মনে মনে।
তেমনি বরণ সেই আয়ােজন তেমনি মদির উদ্দীপনা,
সেই তুষাবেশ তেমনি আবেশ, তেমনি হাসির উন্মাদনা,
তেমনি হলে যেমনটি হয় বর্ষে বর্ষে শীতের শেষে,
কেমন করে বল্লে তুমি এলােনা বসন্ত দেশে?
ঐ দেখ না হােলীর রঙে লাল হয়েছে পথের ধূলি,
এখনাে ঐ আবির মাখা কুঞ্জলার দোনাগুলি।
ঐ দেখ না পলাশবাগে শুনাে কেশর রাশি রাশি,
এখনাে ঐ লতাবধুর ঠোটের কোণে ঘুমায় হাসি।
যার দ্বারে দুলছে হের শুকনাে রসাল-মুকুল মালা,
প্রদীপ-শিখায় রেখাঙ্কিত ঢুলছে ঘুমে নাট্যশালা।
তরুণ এবং তরুণদের ডাগর চোখে কি যায় দেখা ?
মধুনিশার জাগর তথায় একে গেছে কাজ-রেখা।

দেখ দেখি পাখীর পালখ ছিল কি আর এম্‌নি চারু?
এমনি চিকন পেশল পেলব ছিল কি আর 'ও-দেবদারু?
যেমন করে আসে সে ভাই তেমনি করেই এসেছিল,
অভীষ্ট সে যাদের, তারা আড়ম্বরেই বরে নিল।
মহােৎসবে মাতল তারা ধন্য করে চৈত্র-নিশা,
এক পিয়ালায় প্রিয়ার সাথে মিটাইল মধুপ তৃষা।
জ্বালায় দিয়ে জলাঞ্জলি জুট যারা কুঞ্জ-বনে,
গাইল তার, নাচল তারা নূপুরমুখর সঞ্চরণে,
রঙ-বেরঙে বসন্তেরে ভুত সাজাল সবাই মিলে ;
কোন লাভের আশায় তুমি কিসের ঘােরে কোথায় ছিলে
মদ-ধারায় নাইল কারী শিল্পীরা তার আঁকূল ছবি,
দুল তরী, উড়ল পরী, গাইল টোড়ি তরুণ কবি
লাবণ্যে যার পড়ল ভাটা, তারুণ্য যার অপগত,
রসের নিঝর শুকাল যার জীবন যাহার ভারের মত,
চোখটাকা যে কলুর বলদ সংসারের এই ঘূর্ণীপাকে,
অন্নাভাবে দৈত্য-দাহে জীবন যাহার জ্বলতে থাকে।
স্বার্থবিষে জার্ণ যেজন,-বদ্ধ যেজন বিষয় পাশে,
তাদের ফাগুন আসেনাক, মাঘের পরেই বােশেখ আসে।
বসন্ত তার এসেছিল বসন্ত যার প্রেমের গুরু,
কোথায় পাবে সে, যার প্রাণে মেরুর পরেই মরুর শুরু?
|
১২৭

দল
কোকিল
কুহু কুহু মুহু মুহু—উহু উহু উহু কি বেদনা
কার অই মর্মব্যথা তব কণ্ঠে লভিল মূচ্ছ না?
প্রফুল্ল বসন্ত বুকে কোন ব্যথা গুমরে গােপনে,
‘পুষ্পে কীটসম’ হায় কোন ব্যথা প্রেমের স্বপনে ?
চুম্বনে ভুঞ্জনে ভােগে মধুপানে অতৃপ্তি না যায়,
ক্ষণে ক্ষণে অবসাদ দীর্ঘশ্বাসে করে হায় হায় !
কি ব্যথা উদাসরূপে চুপে চুপে বহে সমীরণে?
কেন আসে শিথিলতা ক্ষণে ক্ষণে গাঢ় আলিঙ্গনে ?
কিংশুক-কোকমাঝে কোন্ ব্যথা ফুটিবারে চায়,
কোন্ অধীরতা পদ্মে বার বার ফুটায় মুদায় ?
শিশু-পল্লবেরা কেন মুখ স্নান করে নাহি জানি,
কোন্ ব্যথা মর্মরিয়া তুলিতেছে বন-মৰ্মখানি?
কি ব্যথায় ফুল-মধু র্তিত হয়ে কাটায় গড়ায়,
অশােকে ফুটালে রক্ত, মুকুলেরে করিল কষায়।
ফুল, তাও শর হয়ে বক্ষ বিধে’ ঝরায় রুধির,
ফুটন্ত যৌবন ভারে তবৃন্ত ব্যথিত অধীর,
শুভ্র হান্তে অঞ-ফ, ভােগসঙ্গী রােগের মতন,
প্রিয়াকণ্ঠ-লগ্ন বঁধু কি ব্যথায় হয় আনমন!
সব ব্যথা এক হয়ে কুহু কুহু উহু উহু উহু,
তােমাতে, বসন্ত-কণ্ঠ, বিঘােষিত হয় মুহুর্মুহু।
১২৮

-
বিষের বুদ্বুদ যেন, সুধানিধি অচ্ছােদের বুকে,
পূরবীর তান যেন বিভাসের বেণুবন্ধু-মুখে !
কোন্ বিহরীর ব্যথা সব সুখে করিয়াছে ম্লান?
কোন ঋষি-অভিশাপ ধীরে দহে সৌভাগ্যের প্রাণ?
একি-গাে ‘অলর্কবিষ’ লালসার রক্তস্রোতে বহে ?
অব বলিয়া তারে মৃত্যু-ভয় সদা ঘেরি রহে ?
‘কুহু কুহু উহু উহু’, রে কোকিল, আহা কি বেদনা।
কে দূরিবে ? সবে ব্যথী! ও বধির বিশ্বেরে সেধ’না।
।
বসন্ত-বিদায়
পাংশুল হইয়া আসে কিংশুকের কুঞ্জ সুশােভন,
পাণ্ডুর, ভাণ্ডীর-চম্পা কুরবক অশােক-কানন।
নীরক্ত, বনশ্রনব জাতকের প্রসূতির মত।
পিঙ্গল, কামনাবহ্নি পূর্ণাহুতি লভি ভস্মগত।
স্বপ্নের মুকুল লভে রূঢ় সত্যফলে পরিণতি,
দাড়িম্বের’ শাখে শাখে ‘অলাবুর’ লতা ফলবতী।
আজিকে চৈতালি ক্ষেত্র ভুলি মধু উৎসববারতা,
শুষ্কপত্রপুষ্পে কহে ধরিত্রীর দগ্ধোরকথা।
যৌবনের বাধাহীন নৃত্যগীতে আনন্দ-মেলায়
সহসা কি অবিবেকী গুরুজন দেখা দিল হায় ?
লা-লােল চরণেরে থামাইয়া আনে লজ্জাভার,
মাঝখানে থেমে আসে মজলিসে বসন্তবাহার।
১২৯

তুমাল
বাজিছে ঘুঘুর কণ্ঠে বিরাগের বেহাগের সুর
প্রকৃতি-সীমন্তে ক্রমে স্নান হয় সিমুল সিদূর।
“গােলাপী” কেশর ঝরে রাখি’ বৃন্তে জামরুল-গুটী
বেলাশেষে খেলা শেষ, ছকে ছকে গড়াগড়ি ঘুটী।
হায়রে তিত্তিরি শুক সুর করি তত্ত্বকথা গায়,
পেচক-তৰ্জনে আজি স্বপ্ন-লােক কোথায় উড়ায়।
জ্ঞানাঞ্জন শলাকায় কে রে আঁখি করে উন্মীলন ?
‘চোখ গেল, চোখ গেল’, বিশ্বময় উঠিল রােদন।
হৃদয়ের দানসত্রে কে আনিল হিসাব নিকাশ ?
ছাড়িছে মালিনী-কুঞ্জ ঋষিশাপে মৰ্ম্ম-নিশ্বাস।
সালের মুক্তি মাঝে দ্বন্দ্ব দ্বিধা সংশয়ের ছায়া।
বিরস বিজ্ঞ কহে ‘এ জীবন স্বপ্ন আর মায়া।
নিভৃতে ডাকিয়া কহে তত্ববাদী দর্প-তপ্ত বায়ু,
‘মূঢ়, ত্যজ চপলতা, ফুরাল যে যৌবনের আয়ু।
অরের কর বাণী কে শুনালো তমাল তলায়?
বেণু-বনমালা ত্যজি নিল আজি বসন্ত
বিক।

কুঞ্চিকা কবিপ্রসিদ্ধি। “স্ত্রীণাং স্পর্শাৎ প্রিয়জুবিকসতি বকুলঃ সীধুগণ্ডুষসেকৎ। পাষাঘাতাদশােক স্তিলককুরকৌ বীক্ষণালিঙ্গনভ্যাং। মারেনবাক্যাং পটুমৃদুহসনাচম্পকার বাতাৎ। চুতােগীতাম্নমেরুবিকসতি চ পুরা নর্তনাৎ কর্ণিকারঃ।” নিশাগমে চক্রবাকম্পিতিয় বিচ্ছেদ। চন্দ্রিকাসম্পাতে চন্দ্রকান্তমণির দোদগম। শমীবৃক্ষ-অগ্নিগর্ভ। মলয়াচল দক্ষিণপবনের জন্মভূমি। চন্দনবৃক্ষ সর্পের আবাসস্থল। বায়ু, সর্পের ভক্ষ্য। সর্প ময়ূরের ভক্ষ-কেকা তাই বিষময়ী। ই-মেঘবজবৰ্ষার বিধাতা। আট দিকের প্রহরী আটটি দিগগজ। সাত্ত্বিক প্রেমের লক্ষণ স্বেদ-বেপথু-রোমাঞ্চ ইত্যাদি। কর্পের পাঁচটি বাণ—অরবিন্দ, নীলােৎপল, মন্দার, চুতমুকুল, অশােক। স্বর্গ হইতে মর্তের পথে গঙ্গার নাম আকাশগঙ্গা। নাগলােকের গঙ্গা ভোগবতী। শিবললাটে চন্দ্রের অবস্থিতি। মেঘাগমে ময়ূরের নৃত্য। বসন্তে করার কটে মদম্রাব। শ্যামা নারী (তপ্তকাঞ্চনবর্ণাভা) গ্রীষ্মে সুখশীতলা—শীতে উষ্ণদেহা। কী ও হরির ( সিংহের) নিত্যতা। প্রত্যেক রাগের ৬টি করিয়া পত্নী (রাগিণী)। নলিনী, রবিপ্রিয়। কুমুদী, চন্দ্রপ্রিয়। চকোরের পেয় সুধাময়ী জ্যোৎস্না। স্নানান্তে পুরবধূর কেশে ধূপধুমদান। বর্ষাগমে হংসগণ মানসসরের পথে যাত্রী। প্রদীপে শলভের আত্মাহুতি ॥ ময়ুরের কণ্ঠধ্বনি ষড়জরাগে। শরতে দিবিজয়যাত্রা ও অসুসংস্কারানুষ্ঠান (নীরাজনা) অগস্ত্য নক্ষত্রের উদয়ে জলের মালিন্য দূর হয়। প্রােষিতভর্তৃকা, মুগ্ধা, প্রগ ইত্যাদি—বিশিষ্ট নায়িকা। গ্রন্থে উল্লিখিতফুলের নাম। অশোক। কেশর বা বকুল। প্রিয়। মন্দার। হরিচন্দন। চুতমঞ্জরী। নমেরু { রুদ্রাক্ষ )। কর্ণিকার বা সোঁদাল বা সােনালু (পীতবর্ণ-নির্গন্ধ )। তিলক বা ময়না। উৎপল-দী। অরবিন্দ, ইন্দীবর (নীল) পুণ্ডরীক (খেত) কোকনদ (রক্ত)। কুল,অলকভূষা। লােধ (বা লােধ )ও কেতকী বা কেয়া) পরাগবহল। কুরবক বা কুরুবক ( লাল ঝাটী)। শালী—শিমুল। মী—মধুমলী, চন্দ্রমন্ত্রী। গিরিমল্পী কুটমল্পী-কূটজ (কুচি) কিংশুক-পলাশ। মালতী। হেনা। চামেলি। এলা। লবঙ্গ। বেল বা বেলা। আনার—ড়িম। আউ। সপ্তচ্ছ-সপ্তপর্ণ বা ছাতিম (মদগন্ধি)। শিরীষ, কদম্ব বা নীপ, পেয়ারাফুল, বাবলা (সল্লী) কেশরস। যুখী। ধাতকী বা ধাই। অৰ্জ্জুনমঞ্জরী। সৰ্জ বা শালমঞ্জরী। সিন্ধুবায়—নিসিন্দা। গল্প-ভূমিকদলী। কন্দলী—কালী। বেতলীকুসুম বা বেতফুল। তিলফুল। অপর- জিত। বকফুল। সেফালি। কাশফুল। করবীর বা করবী। বন্ধুজীব বা বাথুলী ।

(রক্ত)। কৈরবকুমুদ, শাপলা। জামরুল। বণিকুসুম। জবা। অর্ক—আকন্দ (নীলাভ-খেত)। পারুল। সীম ও মটরল বেগুণী)। সজিনা। মসিনা। বাসক। সরিষাফুল। আড়রফুল। শােনল, ও অতসী (পীত)। আফিমফুল (রক্ত)। পাটল (রক্ত)। মাধবী। নাগকেশরপুন্নাগ। চম্পক। বাতাবিফল। মধুক মহুয়া সুন্নগর্ভ)। পিয়াল (রজোগৰ্ভ)। কৃষ্ণচূড়া। গােলাপ। শমী-শাই। ধুতুরা (বিষগর্ভ)। নি। দ্রোণ—-ঘলঘেসে (মেঠো, শ্বেত)। গাদা। লিপদ্ম। তমাল। দরুদ্রিাকুসুম। লবলী। শর। দোপাটী। নবমালিকা। জাতী। ভাঙীর—তুটি। শব্দার্থ অ—অগ্নিমন্থ—যজ্ঞকাষ্ঠে স-মন্ত্র ঘর্ষণে অগ্নৎপাদন। অনারত–নিরন্তর। অনুপ- আর্স। অদ্ভুক—যম। অচ্ছেদ- অচ্ছ+উক) স্বনীর সরঃ। অক্ষমালা- রুদ্রাক্ষর। অলিনী-অলিশ্রেণী। অলক-ক্ষিপ্ত কুকুর। অভিধা-নাম। অরি-ভব- শুক্রকৃত। অবতংস-কৰ্ণভূষা ও শিরােভূষা। অরণি—অগ্নিগর্ভ যজ্ঞকাষ্ঠ। আ-আত-আগুন। আনার-দাড়িম। অাম—অপ। আপীন—গােন। আফল—–উল্লম্ফন-আস্ফালন। আশেষ-আলিঙ্গস। অভিীর—গােপ। ই-উ-এ-ইগােপ—রক্তবর্ণ বার কীট বিং। ইন্দ্রায় ধরামধনু। উপচীয়মান বর্ধমান। উল্লোল-আন্দোলিত। উট-কুটীর। উরসিজ বা উজে-স্তন। উপায়ন—উপহার। উদাত-উত্তোলিত। এলা—এলাচ। একাবলী-মুক্তাহার । -কষ্ণোলিকা—সুগন্ধি বিং। কধুক—খােলস। কতি—চুলকানী। ক- শঙ্খ। কন্দলীরা। করচ—কটিবস্ত্র। করভক—হন্তী। কলাপী—ময়ূর। কট- করিগণ্ডের উভাগ। কলধৌত—স্বর্ণ ও রৌপ্য। করেণুহস্তিনী। করােটি—মাথার খুলি। কলবিষ্ণপক্ষ বিং। কনকচুড়াধান্য বিং। কলম্বী—কী। কাসায়- পুকুর। কালীয়ক—চুয়া। কাদম্বলহাস। কিঙ্কিনী-ঘুঙুর। কীলক—গোজ। কুটিম-জে। কুটাল—কুড়ি। কুস্তিকা-পাহা। কৌষ অংশুক—রেশমী কাপড়। খখালিত্য-টাক। গবনগােক। গুলাব-গােলাপজল। গু—িএখিত। চচঞ্চরী-অলি। চন্দ্ৰকশিখিপুচ্ছ। চৰ্চমী--করতালি। চন্দ্ৰশালা—চিলে কোঠা। চাপ-ধনু। চাচর—দোল। চুচুক-বনা । ---সাগর-জাগরণ। জা—স্বর্ণ। ঝােখা-জানালা। ঝোরা-ঝর্ণা। তত-ঠাণ্ডা। তর্থ-তৃষ্ণ। ত—তৃষ্ণ। তান্ত বিস্তৃত। তন্বী--সুন্দরী-কৃশাঙ্গী। তমসা—তমঃ ও নদীবিং। তামরস—পদ্ম। নিপুণ্ড কললাটিকা। --জয়িতায়ে—য়িতার অধরে। গর্ভফুল। দ্বি-পক্ষী। দর্শন-ভেক। -- দশ-পতে, কাপড়ের ছিলে। দত্যুই-ডাহক। দৃখিজ্ঞান-Optics. দোহ- গর্ভসঞ্চার, তরুর পুষ্পেদগম। ধারাযন্ত্র—কৃত্রিম ফোয়ারা। ধুত-কম্পিত। ন-নকীবজয়-যােক। নর্থ-কেলি। নাগররেজা নেবু। নিপান- বিল। নীবার—তৃণশস্য বিং। নীরাজন—অসংস্কার পর্ধানুষ্ঠান। কটিবন্ধন। নেমি-চক্র-পরিধি। প— পচয় লােম। পরিবেষ—Halo, পরিরণ-আলিঙ্গন। পরিশীলন- সংস্পর্শ। পরাগত-ফ। পর্ব-পাব। পর্জন্ত—মেধ বিং। পখিক--বিরহী। পথিকবধূ-বিরহিণী। পরভৃতপিক। পম্বল বিল। পলাশ-পাপড়ি। পিনাক হরধনু। পিধান•••পরিধান। পিশিত•••মাংস। পীন পীবর•••স্থূল। পীতিম•••পীতবর্ণ। পুরট-স্বর্ণ। পেশল••সুন্দর। পক্ষপাকুড়। প্রােষিতপ্রবাসস্থ। প্রমাদ •ঙুল। ব••••••দন্ত বা শৃঙ্গের দ্বারা মাটা-খোঁড়া। বলি••জরাচিহ্ন। বলিরেখা-মাংসের রবিভাজক রেখা, যৌবনশ্রী-সম্পাদক। যৌবনশ্রী-সম্পাদক। বকালীপংক্তি। বাপী দীঘি। বিক্রমপ্রবাল। বিশ্বজিৎ•••সর্বদক্ষিণ যজ্ঞ। বিষ•••প্রতিবিম্ব তেলাকুচা, বুহু। বিষাণ•••শৃঙ্গ। বিতত বিস্তৃত। বিক্রয় পদক্ষেপ। বিসর্পবিস্তার, ক্ষত। বিপ্রলম্ভ•• বিরহ। বেপথু••কম্প। বৈতালিক••চারণ। বৌলিকুণ্ডল। বল্মীক—উইটিপি। ম•••মধুজা বা মাধবী.পৃথিবী (মধুদৈত্যা)। মধু---বসন্ত। মণিবন্ধ•••কজি। মন্দুরা•••আস্তাবল। ম•••দৈস্য। মলয়জ••চন্দন, মলয়ানিল। মর্দলমাদল। মহাশ্বেতা•••সরস্বতী। মিত্র•••সূৰ্য্য। মীনকেতু•••মনােজ, মনসিজ, মদন। মুস্তামুখ। মুৰ্ম্মর•••তুষানল। মুরজ-পাথােয়াজ। মন্দধী-মুঢ়। মস্মিতা-মৃদুহাসিনী। র•••রক্ষ•••রাক্ষস। মশনা•••কাঞ্চী:মেখলা। রাহী..পান্থ। রাকা•••পুর্ণিমা। ল••লব...বিন্দু। লীলাশালিকা•••খেলাঘর। লুলিত•••এলানাে। লুনছিন্ন। শ...শকুন্তপাখী। শলভ..পতঙ্গ। শফীপুটী। শটা•••কেশর। শম্বুক-শামুক। শরভ•মৃগ বি। শিখণ্ডী...ময়ুর। শিহর (শিখ)•••শিয়র। শিলী ••ভূমিকলী, ব্যাঙের হত। শিঞ্জ শিঞ্জন•••ভূষণের ধ্বনি। শিঞ্জিনী:••জ্যা, ছিল। শীকর...সজলকণা। শম্পঘাস। শৃঙ্গক••পিচকারী। শােণিমা-রক্তিমা। শ্রেণি•••নিত। সসর মিশ্র। সংক্রম গ্রহাদির গতি। সংবাহনপদসেবা। সরণী পথ। সশাল। স-ঘন••মেঘময়। সল্পী বাবলা। সা••ঘন। সিতিমাত্ৰ। সীধু-শীধু-সুয়া। সীৎকার••অবমুখপ্রকাশক শব্দ। সুৎকার •হি-হিস শব্দ। রতি বসন্ত ঋতু। সুতরা...সুতরা (fordable)। স্কন্ধাবারশিবির। অল্প-জিৎ••• মদনজমী (শিব)। এজমাল্য। সামু•••উপত্যকা। স্মিত মৃদুহা। ইহংসৰু নুপুর। হরি সিংহ। হামাম•••ানাগার। হিয়নবনী।

সংক্ষিপ্ত জীকা পৃঃ ১। পং ৭-১২—সাঃ দর্পণের কবিপ্রসিদ্ধির অনুবাদ। ১৩- '১৬ পং—মেঘদুত হইতে। বাকী কবির নিজস্ব। পং-৬। কুরুসভায় কৃষ্ণার অফুরন্ত বসনের সহিত প্রকৃতির অশেষ শ্যামল উৎপ্রেক্ষিত। পা ১৮। কার্তিকধাত্রী কৃত্তিকারা ছয় ভগিনী। পৃ: ৪। দশা পলিতা), স্নেহ (তৈল), অসুর, কল্যাণ—শ্লিষ্ট অর্থাৎ দ্ব্যর্থক। পৃ: ৫। কুমারের আখ্যানভাগ ষড়ঋতুর বৈচিত্রে বিভক্ত। পং ১৫/১৬-এ ন্যই উমা অপর্ণা। পৃঃ ৯। পত্রপুট, শ্লিষ্ট। পৃঃ ১০। পং ১৮। ফুলের মধু ফলের রসে পরিণত। পৃঃ ১১। পং ১-গ্রীষ্মের ফুলগুলি প্রায় সবই সাদা। পং ৬-অলিরূপ কঙ্কণের ঝঙ্কার। ৭ পং—প্রবাল (শ্লিষ্ট)। পং ১৩। কিসলয় ঘনপল্লবে পরিণত। পং-১৪। অণ্ডমুক্ত পক্ষী আজ কৃজনশীল। বসন্ত অপ্রসবের কাল। পং-১২সং-সাহিত্যের বিরহপ্তার বর্ণনা। পং ১৪। নুপুরকে আঘাত দিয়া। পং ১৬। শ্যাম যে গ্রীষ্মে সুখশীতল তাহারই সার্থকতা গাঢ়া- লিঙ্গনে। পৃঃ ১৩। পং ৭৮-কাদম্বরীর পুণ্ডরীক-মহাশ্বেতার কথা। ১১১১২ পং—নৈসধের—দময়ন্তী মরালের কথা। পৃঃ ১৪। ১ পং। যৌবন জাত অঙ্গপুষ্টিহেতু বন্ধুর। প্রবালের তিনকন্ঠী হার। পং ২। “পয়ােধরে রােহতি রােহিত-(লােহিত) শ্রী:*-নৈষধ। পং ৫। নীলপদ্মেপম নেত্রে শফালীলাবৎ কটাক্ষ। পং-১-১০-কালিদাস চণ্ডীদাসাদির ভাবানু গত। কৃষ্ণকীর্তন দ্রষ্টব্য। পৃঃ ৪১৫ বিমেন, হমঠ, বসােরা, ওমান আরব পারস্যের স্থল বিং। পৃ: ১৫-পং ১৬। বিদ্যাসুন্দরের কথা। পং ১৯। ২০। নৈষুধেয় ভাবানুগত। পৃ: ১৬ পং ৯—হাসিলে গালে যে টোল খায়। পং ১৫/১৬-বর্ষাগমে প্রেম—আরাে গাঢ় হইলে। পৃঃ-১৭। পং ১১১২ তুলসী ও অশ্বখ। পং ১৯২০-গ্রীষ্মকালে সমুদ্রজলে Phosphorus জলে। পৃঃ ১৮। পঃ ১২-0zone হৃদযন্ত্রের হিতকর। পং ১৬। পুরীর স্বর্গদ্বারে ? প১৭। কাদম্বরী। পং ২১২২-গ্রীষ্মের জড়তা স্বপ্ন-ও-স্মৃতির সহায়। পৃঃ ১৯। পং ৮। ছায়ামণ্ডপ (ছানাতলা)—শ্লিষ্ট। পং-রূপযৌবন স্বামীর মরণ করিয়াছে। পৃঃ ২০—পং ১-৬-“শফী হ্রদশােষবিবা।” .

মৃচ্ছকটিকের চাদত্তের কথা স্মর্তব্য। পং ৮-মহােৎসব—মচ্ছব ? পং ১৪। বেলফল ও বেলফুল। পং ২২। পয়ােধর—শ্লিষ্ট। পৃঃ ২১। পং ৬। মুদিত (শ্লিষ্ট) হৃষ্ট ও নিমীলিত। পং ৯। কুমার সুম্ভব। পং ১৮। গিরিচূড়া গ্রীষ্মেও শৈত্যমিগ্ধ। পৃঃ ২২। কালিদাস ভবভুতির ভাবানুগত। পং ৮। পাণিনির মতে নিত্যবিরােধী জন্তুর মিলনে দ্বন্দ্ব সমাস হয়। দ্বন্দ্ব শ্লিষ্ট ), পং ৯। দক্ষের স্কন্ধে ছাগমুণ্ড। পং ১৭। অমরী-দেবতা। পূজারী দেবতাকে চামর ব্যজন করে। চমরীর পুচ্ছলােমই চামর। পৃঃ ২৩। সিন্ধুশােষী বিন্ধ্যজয়ী অগস্ত্যের (কৌ) অসীম তৃষার সৃষ্টি মৃগ। আর তপের সৃষ্টি, উষ্ট্র—তাই সে হেলায় গিরিলঙ্ঘন করে ও মরুসমুদ্র তরিয়া যায়। উৎপ্রেক্ষা। পৃঃ ২৪। পং ৯১০—মেঘদূত। পৃং ২০। শকুন্তলা। পৃঃ ২৫। পৃ: ২৬। পং ৮৯, সফল, পূর্ণ, ও শাখাময়—শ্লিষ্ট। পৃ: ২৭। পং ৬–রাগরাগিণীর ধ্যানরূপ দ্রষ্টব্য। পং ওযেমন শকুন্তলায়। পৃঃ ২৮। আমাদের জান চরিত্রে গ্রীষ্মেক প্রভাব। পৃ: ২৯। দিবসা পরিণামরমণীয়া-শকু। পং ৭৮-বিরহজ বিকারের লক্ষণাবলী। জামদগ্ন্য—ভৃগুরাম। পূ ৩০। অর্জুনসহৰাই কার্তবী। রক্ষোনাথ-রাবণ। বিনতাসুত—গরুড়। ষ্টা—বিশ্বকর্মা। ময়দানব-দৈত্যদের (শিল্পী) স্বর্ণকার। ঈশান, কর ও অর্জুনশ্লিষ্ট। পং ২০। শত্র-তে অত্রিজায়া অনসূয় যুগব্যাপী অনাবৃষ্টি বারণ করেন। পৃঃ ৩১। পং ২—পঞ্চতপা। পং ৪। ই-বরুণকে তুষ্ট করিয়া। পং ১২। ভবিষ্যৎশ সাবণি সুমেরু শিখরেতপােম আছেন। পং ১৫/১৬-মরীচিকা গণিকাগণের সহিত উপমিত। অগ-দেশের ১২-বৎসরব্যাপী অনাবৃষ্টি দূর হয়। পৃ ৩২। সূৰ্য্যহৃদয়-সূৰ্যন্ত বিং। পং ১৫। সগর-সন্তানগণ। কবিতাটির শেষাংশের রূপকের অন্তরালে প্রচ্ছন্ন অর্থও আছে। পৃঃ ৩৩। পং ১১। ভাড়ার। পং ২। গন্ধও ছায়াদানে কৃপণ—তুলা দানে আজ দাতা। পৃ: ৩০। উজ্জঃ নিদাঘ-ঋতুসংহার হইতে। অবিকল অনুবাদ নয়। পৃ৩৫। পং ১২-এীর্তের পক্ষে স্বাভাবিক। কোকনদ-রক্তপক্স। পং ১৯। ভবনজ্যোৎ—সুন্দরী পুরী (কাদম্বরী ও রাজতরঙ্গিণী)। পৃ ৩৮। শিখরিশহরে অনুসরণ। ৩–৪র্থ-৫ম-৬ষ্ঠ-অক্ষয়েয় দীর্বর দী উচ্চারণ করিতে হইবে। পৃ: ৩৯-পং ১। নেত্র, মীনােপম। পং ১১১২- প্রায় প্রতি শব্দে-শব্দে মিত্রাক্ষর। পৃ: ৪৩। পং ১০। দধি, মাল্য দ্রব্য। পং১৩। সুরট রাগিণীর স্বর্ণপুটে। কাজরী এক প্রকার ইক্ষুরও নাম। পৃঃ ৪১। পং ১-“ধূমজ্যৈাতিঃসলিলমরুতাং সন্নিপাতঃ ক মেঘ। মে-দু। পং ৭৮“ব্রহ্ম ভুমায় প্রকট বলিয়া ব্ৰহ্মকে জড়বাদীরা জড়শক্তি মনে করে, তােমায়াে সেই দশা। পৃ: ৪৩। শেষাংশ রূপক প্রচ্ছন্ন অর্থও আছে। পৃঃ ৪৪। ২০ পং•••মদন জন্মান্তরে কৃষ্ণপুত্র প্রয়। পৃঃ ৪৫। Campbell এর Rainbow এর স্বচ্ছন্দ অনুবাদ। পৃঃ ৪৬-৪৯। প্রাঃ কঃ বর্ষার কৰিতা ৪টার স্থলে স্থলে অনুবাদ,•••স্থলে স্থলে কবির নিজস্ব। অধিকাংশ স্কুলেমূলকে বৃন্তস্বরূপ অবলম্বন করিয়া কবি আপন মনের রসসৌন্দর্যে নূতন রূপশীতে ফুটাইয়া তুলিয়াছেন।” যথাক্রমে শিশুপালবধ, মালতীমাধব, মৃচ্ছ- কটিক ও ঋতুসংহারের অনুসরণে রচিত। পৃঃ ৪৭-পং ১১১২। দ্বিজ,অর্জন ও কৃষ্ণ...শ্লিষ্ট সজ্জ কিভীমসেন ? পৃঃ ৪৮। সুরেশ,অম্বর (আকাশ ও বস্তু),দশা (বন্ত্রের ছিলা•••অবস্থা),ও কর••শ্লিষ্ট। ঋষি•••বিশ্বামিত্র ? সােম•••রামচন্দ্র ? জ্যোছনা••সীতা? পং ২। বর্ষায় পদ্ম ফোটেনা বলিয়া। পৃঃ ৪৯। ১৫। কূল (কূল ?) শ্লিষ্ট। পৃঃ ৫০।পং ৯•••১ম করবী স্থলে কবরী পৃ৫১। পং ১•। মন্থরতা, মন্থরগমনা নিতম্বিনীকে স্মরায়পৃঃ ৫৩। পং ১৪কলসী গােপনীহইবে। পৃঃ ৫৫| পং ২। “বহেশেব বিষ্ণেঃ * মেঘ। পং ৪। মাল্যবৎ বলাকাপংক্তি। পং ৯১০•••“রমাণি, ৰীক্ষা সৌদানি। শকু। পৃঃ ৫৭। পং ৮। শচীমাতা•••শ্লিষ্ট। শ্রাবণ এর পুত্র? পৃঃ ৫৮। পং ৩। বর্ষাশেষে কাশ ফুটে। পং ১৯১২••• যজ্ঞাগুবতি পন্যঃ পৰ্জাদসম্ভব। পৃঃ ৬০•••পং ১০। শিউলীর বোঁটা রাঙা। পৃঃ ৬১ পং ৭‘কুমারসম্ভবে নন্দী হেমৰের করে হরতপােৰনে প্রহরীপং ৮। পাতা খসিয়া আখের চোখ জেগে উঠে। পং ১৭। ভারত মহাভারত। কলুষ•••সর্পজ্ঞাত। পৃঃ ৬৪। পং ১৯। শরৎবর্ণনায় নীতি কবি তাহার রাজনীতিক বৈশিষ্ট্যভুলিয়াছেন। পৃঃ ৭। পং ১৪। নীন স্থলেনবীনহইবে। পৃ: ৭৩-৭৭•••সূলেস্থলে অনুবাদ, স্কুলে স্থলে কবির নিজস্ব। পৃ: ৫। প ৬। সফল। পং। অলঙ্কারের বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। সহেক্তি? এম-বিধাই শৈবাল। পং ১৪। ধান্তক্ষেত্রের দেবতা লক্ষ্মীচরণে ইন্দ্রের ধনু অর্ঘ্যরূপে ) বিগলিত। শরাশন? (শরাসন)। পৃঃ ৭৭•••পং ১৩১৪•••অগস্ত্যনক্ষত্রের উদয়ে জল নিল। বিদ্রোহদমনের কাল সমাগত। জলের মালিন্য (কলুষ) বিদ্রোহীর শঙ্কিত অন্তরে আশ্রয় করিল। পৃঃ ৭৮।পং ৪। হিমবতী••মেনকা। পং ১২১৩•••কর্কট, মকর (ক্রান্তি); দক্ষিণ...শ্লিষ্ট। রবির দক্ষিণায়ন কাল। পং ১৭। পশ্লিষ্ট। পাতা খসায় আখের ‘পাব জাগিয়াছে তাহাতে শিশির গড়াইতেছে। পৃঃ ৭৯। পং ৮। শীতে বৃষ্টি ক্লেকব। পং ১৮। কলস আশ্রয় করিয়া সারণের কথা। “ঘট বুক দিয়া কেহগঙ্গায় সাঁতাবে, চৈঃ ভাঃ”। শৈত্যনদী-উত্তরণে অবলম্বন যুগ্ম বধূ-দেহজ কুম্ভ ? পং ২০। বসন্তে সীৎকার, গ্রীষ্মের স্বেদ, বর্ষার অশ্রু,শরতের হাস্য,শীতের বেপথু (কম্প)। পং ২২। নৌকা মেরামতের কথা। পৃঃ ৮০। পং ১১২•••হৈম (হেম...হিম+ষ্ণ) খি। কবিতার পর্ব- বিভাগ•••এলাে হিম ॥ ঋতুলয়ে। গিরিশিবে। সিতিমা | পাতা। লয়ে বনে। লােৱে-1 পং ১৭। নাবীব পাণিকমল গন্ধিত ও আরক্ত। পৃ ৮২। পং ১১১১২•••ভাই বলিয়া ডাকিলে দও বশীভূত। পৃ: ৩। পং ৯১০০••ভ্রাঃ বিঃ••যম ও যমীর প্রীতিপর্ব। পৃঃ ৮৪•••পং২••••শিউলীর লাল বোটাব রস হলদে। পৃঃ ৮৬। পং ৩•••দারুর ভাজন বারকোষ। গং ১৬। কবিগুণাকরের। পৃঃ ৮৮, পং ১৪•••আলু মূলা ইঃ। পৃঃ ৮৯কনকচূড়া ধান। পং ৫। অড়বফুলেও গন্ধ আছে। পং ৬•••পীত•••(লিউ)•••হলুদে ও পা+ক্ত। পং ৭৮। অহিফেন স্বপ্নয়হায় ও বেদনাহর। ১৭১৮ নীলাভ আকন্দ, নীল পূজার পুষ্প। পং-১৯। ভুরু—যবশীষের উপমেয়। পৃঃ ৯। পং ১৪। যােগ স্বাচবণে রূঢ় । পৃ: ৯২। পঃ ২২•••আনুষ্ঠানিক কল্প- কাণ্ডের পর ব্রহ্মজিজ্ঞাসায় জ্ঞানকাণ্ডেব আবম্ভ। পৃঃ ৯৪। পং ৪। কবি- কল্পনার অনন্তদেব। কুল’ কবির অধুনালুপ্ত ‘কুন’ গ্রন্থের ১ম কবিতার সংহত রূপ। হেম ও লাজ••শ্লিষ্ট। পং ৮•••সুদন্ত কুন্দের সহিত উপমিত। পৃঃ ৯৭। পং ৫। ফুলে হলুদ সরূগে তেল। পৃ: ১০০। প্রতি লোকের

No text on this page.

No text on this page.

Ritu Mangal Ed. 2nd

Author
Roy,kalidas
Title
Ritu Mangal Ed. 2nd
File name
Ritu Mangal Ed. 2nd
Text
OCR done
Citation
1926
Published
2009/11/29
Publisher
Sisir Kumar Neogi,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
148
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Roy,Kalidas
DLI number
513163
Barcode
4990010020166.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
KA491R3q0rN
Download PDF

Ritu Mangal Ed. 2nd