Makardah Saraswat Library, Howrah

Sagarika Pt.2

Das, Rameshchandra · 2009/07/15

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

১৬e৬
সাগরিব
২য
রমেশ ton arff

No text on this page.

ভূমিকা
সাগরিকার দ্বিতীয় ভাগ প্রকাশিত হইল। তাড়াতাড়ি
প্রুফ, দেখিবার দরুণ দুই একটা ছাপার ভুল থাকিতে
পারে ; আশা করি সহৃদয় পাঠকগণ সেই ত্রুটী মার্জনা
করিবেন। পূর্বের ন্যায় এবারেও প্রকাশক মহাশয় পুস্তক
মুদ্রণে উত্তম কাগজ ও বহু সুন্দর ছবি দিয়া পুস্তকের সৌষ্ঠব
সম্পাদন করিয়াছেন। প্রথম ভাগের ন্যায় ইহা আদৃত
ইলে পরিশ্রম সফল মনে
মনে করিব।
করিব। ৩২শে শ্রাবণ,
নি ১৩৩৭ সাল।
শ্ৰীশ্ৰীকৃষ্ণজন্মাষ্টমী
সেনেট-হাউস
}
গ্রন্থকার

No text on this page.

No text on this page.

৮-৩০
সুয়েজ, কানা
-৩৪ পৃঃ
Amaan wagwan

{\'?
Estd: 19.
১৩৫৩
'H-1.01.168.
নানির
দ্বিতীয় ভাগ
প্রথম পরিচ্ছেদ
ভারত মহাসাগর
উঃ, এই ক্যাপটেন নিমম। লােকটি যে কি কঠিন পদার্থে
তৈরী তাবলিতে পারি না। সভ্য জগতের মানুষের সঙ্গে
সমস্ত সম্বন্ধই ইনি ছিন্ন করিয়াছেন; এমন কি মরিলে পর
তাহার কবরের স্থানটুকুও আগে হইতে সমুদ্রের তলদেশে
প্রস্তুত করিয়া রাখিয়াছেন।
কতকগুলি কথা আমার কাছে রহস্যের মত রহিয়া গেল,
-সেই রাত্রির কথা, চোর-কুটরীতে আটকের কথা, খাবার

সাগরিক। ; খাওয়ার পর ঘুম পাওয়া, জাহাজের কর্মচারীদের দূর সমুদ্রবক্ষে ঘন ঘন আঙ্গুল দেখানো, দূরবীণ চোখে লাগাইতে না লাগাইতে ক্যাপটেনের তাহা ছিনাইয়া লওয়া, সেই হতভাগ্য নাবিকের সাংঘাতিক আঘাত-এই সমস্তের কারণ কিছুই বুঝিতে পারিলাম না। এখন আমরা ভারত মহাসাগরের বুকের উপর দিয়া চলিয়াছি। কি বিশাল, অসীম, নীলাভ স্বচ্ছ সমুদ্র ! পৃথিবীর সমস্ত সাগর অপেক্ষ। এই ভারত মহাসাগরের জলরাশি সৰ্ব্বাপেক্ষা স্বচ্ছ ও পরিষ্কার। কাচের মত সুন্দর স্বচ্ছ জল ; জলের উপর কে যেন স্বপ্নের প্রলেপ মখাইয়া দিয়াছে। একটান। চাহিয়া চাহিয়া মাথা ঘুরিয়া উঠে, দুই চোখে যেন রাজ্যের ঘুম নামিয়া আসে ; শরীর তন্দ্রালস, অবশ, শিথিল হইয়া উঠে, হৃদয় যেন কোন নিরুদ্দেশের জন্য উদাস ও করুণ হইয়া উঠে। দিনের পর দিন কাটিতেছে, এ অগাধ অসীম সমুদ্র আর ফুরায় না! কোথায়ও কোন ভাঙ্গা বা দ্বীপ দেখিলাম না। সমুদ্রের অনন্ত সৌন্দৰ্য্য দেখিয়া, সমুদ্রের বিশুদ্ধ হাওয়া খাইয়া, দৈনিক বােজ- নাচ। লিখিয়া দিন কাটিতে লাগিল । সমুদ্রের উপর কত রকম দেশ বিদেশের পাখী দেখিলাম । সি-মিউ, গাল, আলস্ প্রভৃতি নানা পাখী সমুদ্রের উপর উড়িতেছিল। কতকগুলি ক্লান্তি বশতঃ সমুদ্রজলের উপর হাঁসের মত ভাসিতেছিল। এই সব পাখী একটান।

সাগরিক।
;
হাজার হাজার মাইল উড়িয়া চলে ; কি তাসীম ক্ষমতা
ভগবান ইহাদের দিয়াছেন। ইহাদের গলার স্বর কিন্তু
অতি বিশ্রী, গাধার কর্কশ ডাকের মত শুনিতে লাগে ।
কতকগুলি অদ্ভুত অদ্ভুত মাছ দেখিলাম, তাহাদের
লিনে {ছ
সকলের নাম জানি না! সালমােন, ম্যাকারেল, "র' মাছ
রেয়াল মাছ
তারােয়াল মাছ, নানা প্রকার কচ্ছপ, করাতমাছ,
কঙ্কাল

নাগরিক।
মাছ, হাতুরী হাঙ্গর মাছ, সাজারু
মাছ—ইহাদের সর্ব ৭
কা: {ই
শরীর লম্বা লম্বা শক্ত কাটাময়, কখনো কখনো খুব ফুলিয়া
উঠে, ত্রিকোণ
মাছ, চতুষ্কোণ
মাছ, উড়কুমাছ,
শূকর মাছ, কুঁজে।
মাছ-পিঠে মস্ত
বড় কুঁজ, ইলেক্‌-
টিক ইল মাছ
--সাত ইপি
লম্বা, ডি-মাছ
-কালাের উপর
উড, মাছ
সাদা সাদা দাগ ;
অন্যান্য মাছের মত ইহাদের লেজ নাই; পেগাসি মাছ--
নাকট। রূপ লম্ব। বেঙ মাছ মাথা গুলো বড় বড়,
;

সাগরিক।
মাঝখানে গর্ত, গায়ে সাজারুর মত কঁাটা ; বড় বড় পায়চঁাদা
• নাছ—খাইতে অতি সুস্বাদু। কতকগুলি মাছ দেখিলাম
যাহারা পাখীর মত সমুদ্রের মধ্যে বাসা বাঁধিয়া বাস করে।
ইলেকটি ক ইল মাছ
২১শে
নােটিল ঘণ্টায় ২৪ মাইল বেগে চলিতেছিল।
জানুয়ারী তারিখে ১২ দক্ষিণ অক্ষরেখা, ৯২ দ্রাঘিমার কাছে

সাগরিক।
কিলিং দ্বীপ দেখিতে পাইলাম । এই নির্জন দ্বীণের
তীর ধরিয়া জাহাজ চলিতে লাগিল। কিলি: দ্বীপ পিছনে
ফেলিয়া জাহাজ এইবার উত্তর-পশ্চিম ধরিয়া ভারতবর্ষের
দিকে চলিতে লাগিল। এইখান হইতে জাহাজ ক্রমশ;
ধীরে ধীরে চলিতে লাগিল ও মাঝে মাঝে অগাধ জলের
তলায় ডুবিয় চলিল। নােটিল ক্রমশই নামিতে লাগিল,
কিন্তু তল আর পাওয়া যায় না। এ সেই ভারত মহাসাগর
যেখানে ৭, ০ ০ ফুট অর্থাৎ প্রায় ৮ মাইল রশি ফেলিয়া ও
সমুদ্রতল পাওয়া যায় নাই।
২৫শে জানুয়ারী । সমুদ্রের চতুর্দিকে কোথাও কিছু
দেখিতে পাইলাম না। সমস্ত দিনটা নোটিল জলের
উপর ভাসিয়া চলিল। ব কঠিন স্কু দিয়া পিছনের জল
তােলপাড় ও উর্ধে উংক্ষিপ করিতে করিতে জাহাজ চলিত
লাগিল । দূর হইতে যে দেখিবে সেই বলিবে একট
অতিকায় তিমিমাছ চলিতেছে
বেলা ১ টার সময় বহুদূরে একট। ষ্টিমার পশ্চিমমূখে
য'ইতেছে দেখিলাম : বােধ হয় সিড়নি হইতে লঙ্কায়
চলিতেছে ।
তারপর দিন ১৬শে জানুয়ার। ৮) দ্রাঘিমা ধরিয়া
বিলরেখা পার হইলাম। দিনের বেলায় একদল ভয়ঙ্কর
হঙর আমাদের সঙ্গে সঙ্গে চলিতে লাগিল। এইখানে
হাঙরের অত্যন্ত ভয় ; ইহারা যেমনি চতুর তেমনি হিংস্র ।

সাগরিক।
;
'ওর
ইহাদের পিঠ ধূসর রঙ্গের, পেটটা একেবারে সাদা; ইহাদের
সব শুদ্ধ এগাবো পাটি দাত। আমরা কাচের জানালার
পাশে বসিয়াছিলাম ; তাই দেখিয়া এক একটি
এমন জোরে কঁচের উপর লাফাইয়া পড়িতে লাগিল যে
বাস্তকি আমাদের
ভয় হইল যে কঁাচ
ভাঙ্গিয়া ফেলিবে ।
দেখিতে দেখিতে
নােটিলস্ খুব জোরে
চলিতে লাগিল,
হাওরের দল ও পিছনে
পড়িয়া রহিল।
১৭শে জানুয়ারী ।
তাজ বঙ্গোপসাগরে
•ছর বস;
জাহাজ পড়িল ।
একটা বড় বিশ্রী ও
ভীতিজনক জিনিষ
আমাদের চোখে প্রায়ই পড়িতে লাগিল । জলের ৭ ,
অনেক মৃতদেহ ভাসিয়া যাইতেছে। হাজার হাজার মৃতদেহ
গঙ্গানদী দিয়া সমুদ্রে আসিয়া পড়িয়াছে। হাঙরর দল .
মহানন্দে তাহা ভক্ষণ করিতেছে।
সন্ধ্যা ৭ টার সময় দেখিলাম আমরা দুধ সাগর দিয়া

সাগরিক।
চলিতেছি।
এ তো সমুদ্র নয়, এ যে একেবারে দুধ ।
চতুর্দিকে দুধের সাগর ! মাইলের পর মাইল চলিলাম
তবু এ দুধ-সাগর ফুরায় না !
কনসে বিস্মিত হইয়। আমাকে ইহার কারণ জিজ্ঞাসা
করিল। আমি বলিলাম, "এখানকার নাম দুধ-সাগর, কিন্তু
তাই বলে মনে করো না যে এ সত্যি সত্যি দুধ।
রকম সাদা সাদা পােক', চুলের মত সরু ও লম্বায় ১ ইঞ্চির
একশ ভাগের এক ভাগ,-সমুদ্রের ঠিক এইখানে ভাল হয়ে
ভেসে বেড়ায় ।
সেই কারণে এখানকার জল এত সাদা
দেখায়। চল্লিশ মাইল পঞ্চাশ মাইল স্থান ব্যাপিয়া। এরা
এখানে ঘুরে বেড়ায়। পৃথিবীর আর কোথাও এমন ধারা
দেখতে পাবে না।”

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
লঙ্কার মুক্তাক্ষেত
পরদিন ২৮শে জানুয়ারী ।
দুপুর বেলায় নোটিস
৯ ডিগ্ৰী উত্তর অক্ষরেখার কাছে আসিল। বহুদিন পরে
আজ ডাঙ্গা দেখিতে পাইলাম। আট মাইল পশ্চিমে
দুই হাজার ফুট উচ্চ এক বিশাল পৰ্বতশ্রেণী। দূর হইতে
ঐ পাহাড়ের চূড়াগুলি অত্যন্ত অদ্ভুত দেখাইতেছিল। ম্যাপ,
দেখিয়া বুঝিলাম ইহা লঙ্কা দ্বীপ। ক্যাপটেন নিমে! আসিয়া
বলিলেন, “প্রফেসর, সামনেই লঙ্কা দ্বীপ, মুক্তার জন্য ইহা
ভুবনবিখ্যাত। মুক্তা কেমন করে তোলে দেখতে যাবেন ?”
ক্যাপ টেনের কথা শুনিয়া আমি বিস্মিত হইলাম।
জগৎবাসীর কাছে ক্যাপটেন কি পুনরায় নিজের পরিচয়
দিবেন ?
;
ক্যাপটেন আমার বিস্ময়ের কারণ বুঝিতে পারিলেন,
বলিলেন, “এত বিস্মিত হচ্ছেন কেন, প্রফেসার ? আমরা
মুক্তার ক্ষেত দেখ ব; এখন মুক্তা তােবার সময় নয়,
কারাের সঙ্গে দেখা হবার কোন ভয় নাই। এখন "মানার
উপসাগরের দিকে জাহাজ চালাতে বলে আসি, সেখানে
পৗছাতে ঠিক রাত হবে।”
ক্যাপটেন একজন কর্মচারীকে
কর্মচারীকে ডাকিয়া কি সব

সাগরিক বলিলেন । তারপর জাহাজ পুনরায় জলের তলায় ডুব মারিল ক্যাপটেন আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আচ্ছা, আপনি হাঙর দেখলে ভয় পাবেন না ত?" আমি বলিলাম, “না, কিন্তু এ পর্যন্ত কখনো হাঙরের সামনে পড়িনি বা হাঙরের সঙ্গে লড়াই করি নি !” -“আমাদের কিন্তু খুব অভ্যাস আছে যাই হোক কাল সকালে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আমাদের বেরুতে হবে, কারণ ইউরের সঙ্গে লড়াই যেমনি মজার আবার তেমনি বিপজ্জনক।” এই বলিয়া আজকের মত ক্যাপটেন বিদায় লইলেন । হাঙরের সামনে মুখোমুখি দাড়াইয়া লড়াই করিতে হইবে শুনিয়া আমার সঙ্গে কঁটা দিয়া উঠিল । যদি কেউ আসিয়া বলি, সুইজারল্যাণ্ডের পাহাড়ের উপর ভালুক শিকার করিতে যাইতে হইবে, বা আফ্রিকার জঙ্গলে সিংহ শিকার করিতে হইবে, এমন কি সুন্দরবনে বাঘ মারিতে যাইতে হইবে, তাহা হইলে ও এত ভয় হইত না। ভাবিয়া ভাবিয়া কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা দিল । আমি শুনিয়াছি যে আন্দামান দ্বীপের কার। হাতে একট। ছোর' লইয়া হাঙরের সঙ্গে মুখােমুখি দাড়াইয়া লড়াই করে ; কিন্তু কয়জনই বা জ্যান্ত ফিরিয়া আসে ? নেছ, ও কনসে আসিলে পর তাহাদের কাছে ক্যাপ- টেন নিমাের নিমন্ত্রণের কথা বললাম। কাল সকালে

সাগরিক
; আমরা মুক্তাক্ষেত দেখিতে যাই। শুনিয়; তাহারা খুবই
অনিন্দিত হইল ।
নেড, বলিল, “মুক্তাক্ষেত দেখতে যাবার আগে মুক্ত।
সম্বন্ধে কিছু জেনে যাওয়া ভাল।”
আমি বলিলাম, “ত। বেশ ত; তােমরা বস, কি জানতে
চাও, বল।”
কনসে বলিল,“আচ্ছা,প্রথমে বলুন মুক্ত চিযিট কি?”
আমি বলিলাম, “কবিরা বলেন, মুক্ত হচ্ছে সাগরের
অশ্রুবিন্দু : ভারতবাসীরা বলে আকাশ হ'তে ঝিনুকে শিশির
পড়ে জমাট বেঁধে মুক্ত হয় ; মেয়ে বা বলে এ হচ্ছে এক
অতি সুন্দর রত্ন, অলে, গলায়, বুকে, কাণে, নাকে তার
অতি যত্নের সহিত ইহা ব্যবহার করে ; বৈজ্ঞানিক বলেন,
ইত। ফফেট ও কারবনেট, অফ ল'ইম্ এই দুই জিনিষের
মিশ্রিত পদার্থ ; জীবতত্ত্ববিদেরা বলেন, ইহা
কীটের দেহনিঃসৃত তরল পদার্থের সমষ্টি মাত্র । নীল,
নীলাভ, বেগুনে, সাদ। নানা প্রকারের মুক্তা হয়ে থাকে। ।
সমুদ্রতলে অয়েষ্টার নামে এক প্রকার ঝিনুক আছে ; এই
ঝিনুকের ভিতরকার পেটকার মধ্যে এই মুক্ত। জন্মিয়।
থাকে। ঝিনুকের ভিতর প্রথমে একটা ছােট্ট শক্ত পাথরের
কণার মত একটা জিনিষ জন্মায়, তারই গায়ে ঝিনুকের গা
হইতে
এক রকম রস ব’র হয়ে জমতে থাকে ; বছরের
পর বছর এই রকম হয়ে হয়ে শেষকালে মুক্তা হয়ে দাড়ায়।”
এক প্রকার

সাগরিক।
•raaaa
কনসে জিজ্ঞাসা করিল, “আচ্ছা, একট। ঝিনুকের ভিতর
কি অনেক মুক্ত হয় ?
আমি বলিলাম, “তার ঠিক নেই। কোনটায় বা একটা
হয়, আবার কোনটার মধ্যে দেড়শ মুক্তাও হয়।”
কনসে বলিল, “ঝিনুক হাতে কেমন করে মুক্তা ব'র
করে ?”
আমি বলিলাম, “তার অনেক
অনেক রকম উপায় আছে।
কেউ কেউ সমুদ্র থেকে ঝিনুক তুলে তা ফাক করে চিন্তা
দিয়ে মুক্তা টেনে ব'র করে। কিন্তু সচরাচর সমুদ্র থেকে
ঝিনুক তুলে সমুদ্র ধারের বালির উপর মাদুর বা চ্যাটাই এর
উপৱ তাই। শুকাইতে দেওয়া
রোদের আঁচে
ঝিনুকগুলি রে যায়, তারপর সেগুলো পচতে থাকে।
সেই গুলো
বড় বড় চৌবাচ্চার ভিতর এনে
ফেল।
সেইখানে ছাড়ানো, ধোয়', সাফ कदा
প্রভৃতি কাজগুলি করা হয় । তারপর গরম জলে সেইগুলি
ফুটানো হয়।”
কনসে বলিল, “আচ্ছা, বড় ছোট মাপ অনুসারে মুক্তার
বেশী কম দাম হয় ত ”
আমি বলিলাম, “শুধু বড় ছোট মাপ অনুসারে নয়,
গড়ন হিসাবেও বেশী কম দাম হয় ; আবার ষে মুক্তা যত
উজ্জ্বল সেই মুক্তার দাম তত বেশী । মুক্তা গােল হয়,
বাদামি হয়, আবার বঁাকাচোরাও হয়।”

সাগরিক।
•w\/\\/
কনসেল বলিল, “আচ্ছা মুক্তা তুলতে গিয়ে কি অনেক
বিপদের মধ্যে পড়তে হয়?”
নেড, বলিল, “বিপদ আবার কি ? যা খানিকট: জল
খেতে হয়, তা জলের ভিতর নামলে অমন হয়ই।”
নেডের বলিবার ভঙ্গী দেখিয়। আমি বললাম, “ন,
এখন ত খুব বছ, হাঙরকে তােমার ভয় করে না?”
বুক ফুলাইয়া নেড, বলিল, “সারা জীবন হারপুন চালিয়ে
কত হাঙর মারলুম, আর আজ ভয় করতে যাব ?”
আমি বলিলাম, “কিন্তু এ নৌকার উপর দায়ে হারপুন
ছাড়া নয়।”
নেড, বলিল, “তবে কি জলের মধ্যে দাড়িয়ে ? তাতেই
বা কি? হাঙরের স্বভাব হচ্ছে যখন কাউকে আক্রমণ
করে তখন উল্টে যায়, পেট। সব সামনে চিতিয়ে পড়ে,
সেই সুযোগে,-বুঝলেন ত?”
সেদিন আর কোন কথাবার্তা হইল ন!

তৃতীয় পরিচ্ছেদ
হাঙরের সাথে ভীষণ লড়াই
পরদিন ভাের চারটার সময় ক্যাপটের খানসামা
আসিয়া আমাকে ঘুম হইতে টনিয়া তুলিল। তাড়াতাড়ি
কাপড় জামা পরিয়া স্যালুনে গেলাম। ক্যাপটেন আমার
জন্য অপেক্ষা করিতেছিলেন, বলিলেন, “আপনারা সবাই
প্রস্তুত।
আমি বলিলাম, “ই। ক্যাপটেন !”
ক্যাপটেন বলিলেন, “তবে আসুন আমার সঙ্গে।”
আমি বলিলাম, “সমুদ্রে নাম্বার জন্য আমাদের পােষাক
পরাতে হবে না?”
ক্যাপটেন বলিলেন, “না, এখন নয়। নানার চর খুব
কাছে বলে জাহাজ একেবারে কিনারায় ভিড়তে দিই নি ।
এখন আমরা নেকায় চড়ে কিনারার কাছে যাব; নৌকায়
সব ডুব,-পােষাক ঠিক করা আছে ; ঠিক জায়গায় গিয়ে
আমরা তা পরে সমুদ্রতলে নাম্ব
।”
নেড, কনসেল ও আমি ক্যাপটেনের সঙ্গে জাহাজের
ছাদের উপর গিয়া নৌকায় চড়িলাম। জাহাজের পাশেই
নৌকাটা বাঁধা ছিল। পাচজন নাবিক দাড় ধরিয়া আমা-

, সাগরিক।
•।
--
দের জন্য অপেক্ষা করিতেছিল। তখনো বেশ রাত্রি 'ছে ;
তার উপর আকাশে মেঘ করিয়া অন্ধকার যেন দি
দেখাইতেছিল ; কেবল দুই একটা তারা এখানে এখানে
দেখা যাইতেছিল। দূরে ডাঙ্গার পানে তাকাই'র চেষ্টা
করিলাম, কিন্তু কিছুই দেখিতে পাইলাম না।
নােটিলস্ এখন লঙ্কাদ্বীপের পশ্চিম কূলে ; হনতিদূরেই
ম্যানার দ্বীপ। ইহারই নিকটে সেই ভুবনবিখ্যাত মুক্ত’ক্ষেত,
দৈর্ঘ্যে ইহা কুড়ি মাইলেরও বেশী হইবে !
আমরা চারিজনে নৌকায় গিয়া উঠিলাম ।
নৌকা
ছাড়িয়া দেওয়া হইল ; দক্ষিণদিকে নৌকা চলিতে লাগিল।
সমুদ্রজলে অল্প অল্প ঢেউ, কিন্তু তাহাতেই নৌকা বেশ দোল
খাইতেছিল। আমরা সকলেই চুপ চাপ ; কাহারও মুখে
কোন কথা নাই । ক্যাপটেন এখন কি ভাবিতেছেন ? ডাঙ্গা
ত আর বেশী দূর নয় !
ভাের সাড়ে পাঁচটার সময় আবছা আলােয় তীরভূমি
অতি অস্পষ্টভাবে দেখা গেল। এখনও প্রায় পাঁচ মাইল :
চারিদিকেই কুয়াসা।
বেলা ৬টার সময় সূৰ্য্য উঠিতেই
সমস্ত কুয়াশা যেন মন্ত্রবলে কাটিয়া গেল। এইবার বেশ
স্পষ্ট দেখিতে পাইলাম তীরভূমিতে মাঝে মাঝে গছি।
রহিয়াছে ; জমিও বেশ পরিষ্কার দেখা গেল। নৌকা ক্রমশই
ম্যানার দ্বীপের নিকট অগ্রসর হইতে লাগিল। ক্যাপটেন
নিমো বসিয়াছিলেন, উঠিয়া দাড়াইয়া মনােযােগ দিয়া
?

সাগরিক। • ** AAA AAA AAA At 1 পরে সমুদ্রে কি যেন দেখিতে লাগিলেন। তঁাহার হুকুম মত নৌকায় নােঙর ফেলা হইল ; ও হরি, এতবড় সমুদ্র আর নোঙর ফেলিতে না ফেলিতে ‘ঠ’ করিয়া মাটিতে ঠেকিল ! এতবড় সমুদ্র হইলে কি হয় এখানকার জলের গভীরতা তিন- ফুট মাত্র। অবশ্য আশপাশের গভীরতা আরো বেশী । ক্যাপটেন নিমো বলিলেন, “আমরা মুক্তাক্ষেতের কাছেই এসে পড়েছি। আর এক মাসের মধ্যে এইখানে অসংখ্য জেলে-নৌকার ভীড় লেগে যাবে। এইখানকার জলের মধ্যে নানারকম বিপদ, তবু ডুবুরীর। অদ্ভুত সাহস ভরে জলের ভিতর নেমে যায়। এইবার আমাদের পােষাক নাম যাক্।” সমুদ্রের উপর বেশ বড় বড় ঢেউ বহিতেছিল। নাবিক দের সাহায্যে আমরা পােষাকগুলি পরিলাম। মাথায় যখন ঢানিট। পরিতে যাইতেছি তখন ক্যাপটেন বলিলেন, “এখানে আমাদের আলো নিয়ে যাবার কোন দরকার নেই। সূর্যের আলােয় সমুদ্রের ভিতর সব দেখতে পাওয়া যাবে। আবার আলো নিয়ে যাওয়ার বিপদও অনেক, এখানে ভয়ঙ্কর হাঙরের আচ্ছা, আলো দেখলেই ছুটে আসবে।” ক্যাপটেনের কথা শুনিয়া আমার মুখ শুকাইয়া গেল। নেড, ও কনসেলের বরাত ভাল, তাহারা ততক্ষণ মাথায় ঢানি পরিয়া ফেলিয়াছে, ক্যাপটেনের অমন অলুক্ষণে কথা কিছুই শুনিতে পায় নাই।

সাগরিক।
: আমি ক্যাপটেনকে আর একটি প্রশ্ন করিলাম
বলিলাম, “সঙ্গে আমরা বন্দুক নেব না?”
ক্যাপটেন বলিলেন, “বন্দুক নিয়ে কি হবে ? জলের
ভতর বন্দুকের চেয়ে এই ইস্পাতের ছােরা বেশী কাজে
লাগবে। এই ছােট। আপনার কোমরে ঝুলিয়ে
রাখুন ।
নেড়, ও কনসেলও ছাের। সঙ্গে লইয়াছিল ; উপরন্তু
নেডের হাতে একটি ভয়ঙ্কর হারপুন ; আসিবার সময়
জাহাজ হইতে আনিয়াছে । যাই হােক্, আমরা জলের
ভিতর নামিয়া পড়িলাম ; নাবিকেরা সকলেই নৌকায় রহিল
সেখানকার জল ছয় ফুট গভীর ; পায়ের তলায় পরিষ্কার
মহি বালি।
ক্যাপটেনের সঙ্গে আমরা জলের ভিতর
ক্রমেই নামিয়া চলিলাম, সেই জায়গাটা খুবই ঢালু। পায়ের
তলা হইতে অসংখ্য মাছ সরিয়া যাইতে লাগিল; কি সুন্দর
তাহাদের রং, কি চঞ্চল তাহাদের গতি, কি অপূধ্ব তাহাদের
কের বাহার !
প্রায় আড়াই ফুট লম্বা একরকম সাপ
'দখিতে পাইলাম।
প্রায় সাতটার সময় হয়েষ্টারের চরে আসিয়া পৌছাইলম
ইহাই মুক্তাক্ষেতের আরম্ভ।
কোটি কোটি ঝিনুক ল
ইয়া চতুর্দিকে ছড়াইয়া রহিয়াছে। সে যে কত রশি
রাশি ঝিনুক বলিতে পারি না।
নেড়, সঙ্গে করিয়া
কট। জালের থলি লইয়া আসিয়াছিল, কতকগুলি সুন্দর

১৮ সাগরি সুন্দর ঝিনুক থলির মধ্যে তুলিল। কিন্তু আমরা সেখানে দাড়াইলাম না। ক্যাপটেন পথ দেখাইয়া চলিলেন, আমরাও পিছনে চলিলাম। এখানকার সমুদ্রতলের জমি বড়ই অসমতল ; এক এক জায়গায় এত উচু যে হাত তুলিলে জলের উপর পর্যন্ত হাত ওঠে, আবার এক এক জায়গায় খুবই নীচু। মাঝে মাঝে পিরা- মিডের মত পাহাড়ের (मरे मन পাহাড়ের কোলে কেলে অন্ধকার ফাটালের মধ্যে ক্ৰস্- তাসিয়া নামক এক- ; প্রকার বৃহদাকার রাক্ষুসে চিংড়ীমাছ দেখিতে পাইলাম ; #তকগুলি বিরাট অাকার কঁাড়া এসতাসিয়। নক রাক্ষুসে চিংড়ী * ভয়ঙ্কর মৃত্তি ধরিয়া আমাদের পানে তাকাইতেছিল—যেন হাতিয়ার বােঝাই এক একখান। যুদ্ধের জাহাজ।

সাগরিক।
:
••
এই সব পাহাড় ঘুরিয়া শেষকালে
শেষকালে আমরা একটি
চলের মত স্থানে উপস্থিত হইলাম । চতুর্দিকে পাহাড় ;
মাথার উপরে পাহাড়গুলো ঝুকিয়া আসিয়া পড়িয়াছে ;
পায়ের তলায় জলজ ঘাসের কার্পেট পাতা। স্থানটি
অপেক্ষাকৃত অন্ধকার । মাঝে মাঝে পাথরের বড় বড় গান
মাথার উপরকার ছাদ ধরিয়া আছে । নােটের উপর
জায়গাটা ভারী সুন্দর। চলিতে চলিতে ক্যাপটেন নিন
হেঁট হইয়া কি একটা জিনিষ দেখিতে লাগিলেন। 7ছ
গয়া দেখি একটা প্রকাণ্ড ঝিনুক ; দেখিতে সম্পূর্ণ গেল ।
এটা রাক্ষুসে বলিলেও হয় ; চওড়ায় এটা প্রায় সাড়ে
হয় ফুট ; ওজনে ৬০০ পাউণ্ড বা প্রায় সাড়ে সাত মণ।
ঝনুকের মুখ বা ঠোট দুটা একটু ফাক ছিল। ক্যাপটেন
তাড়াতাড়ি নিকটে গিয়া ঝিনুকটা বন্ধ হইবার পূর্বেই
তার ছােরার ডগা সেই মুখের মধ্যে ঢুকাইয়া দিলেন। একটু
ফাক করিয়া ধরিতেই ভিতরে যাহা দেখিলাম—জীবনে তাহা
ভুলিব না; ঝিনুকের পেটের মধ্যে একটা আলগা মুক্তা
বসানাে রহিয়াছে, ঠিক নারিকেলের মত বড় ;
যেনি গোল, তেমনি উজ্জ্বল ও তেমনি দ্যুতিময় ।
আমি পাগল হইয়া গেলাম ! হাত বাড়াইয়া সেই হল
মুক্তাটি তুলিয়া লইতে গেলাম ; কিন্তু ক্যাপটেন আমাকে
বারণ করিলেন ও তাহার ছােরা বাহির করিয়া লইলেন।
ঠোট দুইটা তখনি বুজিয়া গেল। জহরতের সম্বন্ধে আমার

সাগরিক।
ক
\\\\\\\..
একজন
যে অল্প জ্ঞান আছে তাহাতে বুঝিলাম মুক্তাটির দাম
৫,০০,০০০ পাউণ্ড বা ৭৫ লক্ষ টাকা হইবে।
দশ মিনিট চলিবার পর ক্যাপটেন নিমো হঠাৎ কি যেন
দেখিয়া দাড়াইয়া পড়িলেন। ইসারা করিয়া তিনি আমাকে
হেঁট হইয়া চলিতে বলিলেন। একটা পাহাড়ের আড়ালে
গিয়া দাড়াইলে তিনি আঙ্গুল দিয়া সামনে কি দেখাইলেন।
দেখিলাম পনের ফুট দূরে একটা লম্বা ছায়া মাটিতে
নামিতেছে। চট করিয়া হাঙরের কথা মনে পড়িল। কিন্তু
লক্ষ্য করিয়া দেখিলাম যে সেটা হাঙর নয়।
সেটা একটা মানুষ,-একট। জ্যান্ত মানুষ !
ভারতবর্ষীয় ডুবুরী চোরের মত মুক্তাতোলার সময়ের পূর্বেই
সেখানে আসিয়া মুক্তা তুলিতে আরম্ভ করিয়াছে। বেচারী
দারিদ্র্যের তাড়নায় সমস্ত বিপদ অগ্রাহ্য
করিয়া সেখানে মুক্তা তুলিতে আসিয়াছে। জলের উপর
তাহার নৌকা ভাসিতেছে। দেখিতে পাইলাম, সে একবার
নামিতেছে আবার উঠিতেছে ; এইরূপ ক্রমাগত মুক্ত।
তুলিতেছে। নৌকা হইতে একটি দড়ি ঝুলানাে রহিয়াছে
তাই পরিয়া সে ক্রমাগত উঠা নামা করিতেছে। সঙ্গে একট।
থলি, হেঁট হইয়া ঝিনুক কুড়াইয়া থলিতে পূরিতেছে, আবার
জলের মধ্যে আধ মিনিটের মধ্যেই সে
প্রত্যেকবারে এত কাজ শেষ করিতেছে।
পাহাড়ের আড়ালে দাড়াইয়া আমরা তাহার এই কাজ
গরীব মানুষ!
;
উঠিতেছে।

সাগরিক।
দেখিতেছি। সে ভুলেও ভাবেনি যে জলের তলায় তারই
মত আরাে কতকগুলি মানুষ দাড়াইয়া তাহাকে দেখিতেছে।
প্রায় আধঘণ্টা সে এইরূপ উঠা নামা করিতে লাগিল।
ডুবুরী মুক্তা তুলিতেছে
আমরাও বেশ আনন্দের সহিত তাহার কাজ দেখিতেছি ;
ঠাৎ দেখি সেই ভারতবর্ষীয় লােকটি জলের ভিতর নামিয়া
ক রকম ভয় খাইয়া গেল। ভয় পাইয়া সে তাড়াতাডি

সাগরিক।
;
একলাফে মুক্তাক্ষেতের তলা হইতে জলের উপরে উঠিবার
চেষ্টা করিল ।
তাহার ভয়ের কারণ বুঝিতে পারিলাম। দেখিলাম
তাহার মাথার উপর একটি প্রকাণ্ড দীগ ছায়া ! একট।
ভয়ঙ্কর হাঙর সেই হতভাগ্য লােকটিকে লক্ষ্য করিয়া
তীরের মত ছুটিয়া আসিতেছে। সেই ঘোলাটে চোখ দিয়া
যেন আগুন ছুটিতেছে ; প্রকাও ই। একেবারে খেলা,
তাহার মধ্যে ছয় সারি দাত ; প্রত্যেক সারিতে শত সহস্র
ধারালে। দ্রুত।
ভয়ে আমি কাঠ হইয়া দাড়াইয়া রহিলাম। হাওরের
আক্রমণ হইতে
হইতে নিজকে বাচাইবার জন্য সেই লোকটি
একপাশে চট করিয়া দাঁড়াইল। হাঙরের পিঠের পালকে।
তাহার গায়ে লাগিল না বটে, কিন্তু লেজের আঘাতে লােকটা
সেইখানে শুইয়া পড়িল। হঙরট। আবার চিং হইয়?
লোকটিকে একেবারে দুই করিবার জন্য ছুটিয়া যাইল
কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যেই এত কাণ্ড হইয়া গেল।
ক্যাপটেন নিমম এইবার সােজা হইয়া দাড়াইয়া হাতে
ছোট। বেশ শক্ত করিয়া ধরিয়া একেবারে হাঙরের
সামনে গিয়া দড়াইলেন। একটা নতুন লােক দেখিতে
পাইয়া হাঙর এইবার ডুবুরীকে ছাড়িয়া ক্যাপটেন নিমোকে
তাড়া করিল। ক্যাপটেন অসম সাহসে স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া
হাঙরের আক্রমণের অপেক্ষা করিতে লাগিলেন।

সাগরিকা
চোচা ছুটিয়া ক্যাপটেনকে দুইখণ্ড করিয়া কাটিতে গেল।
ধাক্কা লাগে লাগে এমন সময় ক্যাপটেন চট্‌ করিয়া
रात
সরিয়া দাড়াইয়া তাহার ছাের। হাঙ্গরের বুকের পাশে
একেবারে আমূল বসাইয়া দিলেন।

২৪
সাগরিক।
দেখিতে দেখিতে দুইজনের মধে প্রবল যুদ্ধ বাধিয়া গেল।
হঙর রাগে ও যন্ত্রণায় তখন যেন গর্জন করিতে লাগিল।
বুকের পাশের কাটা হইতে রক্তের ফোয়ারা ছুটিতে লাগিল।
সমুদ্র-জল লালে লাল হইয়া উঠিল। পরিষ্কার জলে এতক্ষণ
সবই দেখিতে পাইতেছিলাম, এখন রক্তের দরুণ সমস্তই
ঘোলাটে হইয়া উঠিল। দেখি ক্যাপটেন তখন একহাতে
হাঙরের একটা পালক। সজোরে ধরিয়া হাঙরের সঙ্গে
ঝুলিতেছেন ও অপর হাতে ছােরা দিয়া ক্রমাগত উহার
গায়ে ভীষণ খেচা মারিতেছেন। কিন্তু ঠিক স্থানে ছােরা
বসাইতে পারিতেছিলেন না বলিয়া হাঙরটা অত অাঘাতে
কিছুতেই মরিল না । হাঙরের সে কি এক একটা ঝাপ্টা।
সমুদ্রজল এমন আলোড়িত হইয়া উঠিল যে, আমরা সােজা
হইয়া দাঁড়াইতে পারিতেছিলাম না। হাওর তখন নিজের
প্রকাণ্ড শরীরের ভার দিয়া ক্যাপটেনকে মাটিতে চাপিয়া
ধরিল। ক্যাপটেন শুইয়া পড়িলেন; তার বিষয় হ।
করিয়া ক্যাপটেনকে গিলিতে গেল।
নেড ল্যও ক্ষণ। 'পুন হাতে হ: ছরের কাছে
ছুটিয়া প্রচণ্ড বিক্রমে হারপুন হার নাকের উপর বসাইয়া
আবার ঝলকে ঝলকে রক্ত বাহির হইতে লাগিল
সেই তাজ রক্তের ফোয়ারায় সমুদ্র যন বাক্তের সমূদ্র
হইয়া উঠিল । যণ যন্ত্রণায় হাঙর সমুদ্র তােলপাড় করিতে
লাগিল কিন্তু তাহার শক্তি শেষ হইয়া আসিতেছিল
দিল।
••

সাগরিক।
নেডের হাতে সে মরণ-মার খাইয়াছে। ।
মৃতু্যযন্ত্রণায়
হাঙর এইবার শিকাইতে লাগিল। শির্টকাইতে শিটকাইতে
হাঙরটা কনসেলের কাছে আসিয়া ধাক্কা মারিয়া তাহাকে
ভূয়ে ফেলিয়া দিল ।
ক্যাপটেন নিমম এইবার উঠিয়া দাড়াইয়া সেই হতভাগ্য
ডুবরীর কাছে গিয়া তাহাকে বাঁচাইবার চেষ্টা করিলেন।
তাহার কোমরের দড়ি কাটিয়া কোলের উপর তুলিয়া পায়ের
গােড়ালির এক ধাক্কায় জলের উপর লাফাইয়া উঠিলেন।
আমরা তিনজনও সেইরকমে জলের উপর উঠিয়া ডুবরীর
নৌকায় গিয়া উঠিলাম। হাঙরের লেজের ঝাপটায় ডুবরীর
বিশেষ কিছুই হয় নাই। ক্যাপটেনের মাজা ঘষায় ও সেবা
শুশ্রুষায় তাহার জ্ঞান শীঘ্রই ফিরিয়া আসিল। চোখ খুলিয়া
বেচারী আবার ভয় পাইল। সে দেখিল তাহার শরীরের
উপর তামার ঢানিপর। চারটে মাথা ঝুলিতেছে। ক্যাপটেন
খন তাহার পকেট হইতে একমুঠা মুক্তা বাহির করিয়া সেই
ডুবুরীর হাতে দিলেন। সে কাপিতে কাপিতে তাহা গ্রহণ
করিল। আমাদের সে নিশ্চয় কোন জলদেবতা ভাবিয়াছিল ;
তা না হইলে অমন বিপদ হইতে কে তাহাকে রক্ষা করিবে।
তারপর ক্যাপটেনের হুকুম মত আমরা জলের ভিতর
লাফাইয়া পড়িলাম। আগেকার পথ ধরিয়া আধঘণ্টার
মধ্যে আমরা আমাদের নােঙর-বাঁধা নৌকায়
নােঙর-বাঁধা নৌকায় আসিয়া
উঠিলাম। নৌকায় দাড় টানিয়া অামরা নােটিলসে

সাগরিক। «««««« \ \ | ফিরিতেছি, দেখি হাঙরটা ভাসিয়া উঠিয়াছে। উহা দৈর্ঘ্যে পঁচিশ ফুট হইবে । এত বড় হাঙর এক ভারত মহাসাগর ব্যতীত আর কোথাও দেখিতে পাওয়া যায় না। দেখিতে দেখিতে আমাদের নৌকার চারিদিকে গােটা বারো হাঙর ভাসিয়া উঠিল। তাহারা সকলেই মৃত হাঙরের পানে ছুটিয়া গিয়া তাহাকে খাইতে আরম্ভ করিল। সকাল সাড়ে আটটার সময় আমরা নােটিলসে পৌছাই- লাম। সেদিন আমি ক্যাপটেন নিমাের মধ্যে দুইটা জিনিষ দেখিলাম : প্রথম ক্যাপ টেনের অসমসাহস, দ্বিতীয়ত, যে মানুষের আলয় হইতে তিনি চলিয়া আসিয়াছেন সেই মানুষের উপর হার অসীম দরদ ও ভালবাসা। কথা প্রসঙ্গে সেদিন ক্যাপটেন আমকে বলিলেন, “ঐ যে ভ'রতবাসীকে দেখলেন ওদের ভারী কষ্ট ; ওদের ভারত- বর্ষের উপর বিদেশীরা অনেক অত্যাচার করে। প্রফেসা, আমি এখনও এ যতদিন আমি বাঁচ র দিন,—নিক ভারতবাসী বলে জানি ৫ জন।”

চতুর্থ পরিচ্ছেদ
আরব সাগর হইতে লােহিত সাগর
২১ শে জানুয়ারী। দেখিতে দেখিতে • লঙ্কাদ্বীপ
আকাশের কোলে ক্রমশ: মিশাইয়া গেল। নােটিস এখন
ঘন্টায় কুড়ি মাইল বেগে চলিতেছে। মালডিভ, ও
লাকাডিভ, এই দুইটি দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে যে অসংখ্য খাল
আছে তাহারই মধ্যে দিয়া জাহাজ সন্তর্পণে চলিতে লাগিল।
আজ হিসাব করিয়া দেখিলাম জাপান-সমুদ্র হইতে আজ
পর্যন্ত সৰ্ব্বশুদ্ধ ১৬,১২০ মাইল পথ জলের তলা দিয়া
আসিয়াছি।
পরদিন ৩০শে জানুয়ারী। নােটিলস্ যখন জলের
উপর আবার ভাসিয়া উঠিল দেখিলাম চতুর্দিকে কোথাও
ভাঙ্গার চিহ্ন নাই। জাহাজের গতি তখন উত্তর পশ্চিম
দিকে, অর্থাৎ ওমান সাগরের পানে এখন জাহাজ চলিতেছে ।
এই মান সাগর ধরিয়া পারস্য উপসাগরের মধ্যে যাওয়া
যায়। সেইখানেই পথ শেষ ; তবে ক্যাপটেন নিমো
আমাদের কোথায় লইয়া চলিতেছেন ?
এই বিষয়ে আমার চেয়ে নেডের ভাবনা বেশী ; সে
আসিয়া আমরা কোথায় যাইতেছি তাহাই জিজ্ঞাসা করিল।
;

সাগরিক।
আমি বলিলাম, “ক্যাপটেন কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন তা
তবতে পারি না নেড,।”
নেড, বলিল, “যা দেখছি তাতে বুঝছি যে ক্যাপটেন
আমাদের পারস্য উপসাগরের মধ্যে নিয়ে যাচ্ছেন; কিন্তু
তাহলে সেখান হতে আবার ফিরে আসতে হবে।”
– “ফিরে আসতে হয় তা কি হবে ? ব্যাবেলম্যাব
প্রণালী ঘুরে লােহিত সাগরে জাহাজ তখন ঢুকার।”
--কিন্তু লােহিত সাগর ত পারস্যসাগরের মত বন্ধ।
সুয়েজ ক্যানাল কট। এখনও শেষ হয় নি ; তা হলে
ইউরোপে আমরা কেমন করে ফিরব ?”
“আচ্ছা, নেড, ইউরােপে ফেরবার জন্য এত ব্যস্ত হচ্ছ
কেন ? আমি ৩
এমন 'হজ ছাড়ে কোথাও যেতে
5াই না।”
চারিদিন ধরিয়; নােটিলস্ ওমান সাগরের চারিদিকে
খামখেয়ালি ভাবে চলাফেরা করিতে লাগিল-কখনও জলের
উপর ভাসিয়। আবার কখনও অগাধ জলে ডুবিয়া, কখনও
অতি ধীরে আবার কখনও বা ভাষণবেগে চলিতে লাগিল।
যেন কোন দিকে যাইবে তাহা ঠিক করিতে পারিতেছে না ।
ট্রপিক অফ, ক্যানসার জাহাজ কিছুই পার হইল না।
ওমান সাগর হইতে অদূরে মটু নগরী দেখিতে পাইলাম।
দূর হইতে সহরটি ভারী সুন্দর দেখাইতেছিল। চতুর্দিকে
দৈত্যের মত কালো পাহাড়ের উপর সাদা সদা বাড়ীগুলি

সাগরিক।
জল।
বেশ দেখাইতেছিল। কত বড় বড় গােল গােল মজিদ
দেখিলাম। বাড়ীর ছাদগুলি কি সুন্দর !
নােটিলস্ আবার ডুব মারিল। আরব দেশের হাড্রামা,
কূল ধরিয়া জাহাজ চলিতে লাগিল । ৫ই ফেব্রুয়ারী তারিখে
আমরা এডেন উপসাগরে প্রবেশ করিলাম
এটা যেন
একটা ফু দিল, এই ফু দি দিয়া ভারতমহাসাগরের
লােহিত সাগরে প্রবেশ করিতেছে।
৬ই ফেব্রুয়ারী তারিখে আমরা এডেন সহর দেখিতে
পাইলাম । এই সহরটি একটি প্রকাণ্ড কেল্লা বলিলে ও
চলে; কালো পাহাড়ের উপর বসিয়া কে যেন সমুদ্রের
চারিধারে পাহারা দিতেছে। • ১৮৩৯ খৃষ্টাব্দে এই সংরটি
ইংরাজদের অধিকারে আসে। ওদিকে
ওদিকে জিব্রাল্টার এদিকে
এডেন --দুইদিকে ইংরাজদের দুইটি অজেয় কেল্লা।
আমি ভাবিলাম ক্যাপটেন এইবার নিশ্চয় ফিরিবেন,
কারণ, সভ্য জগতের লােকালয় ক্রমশঃই নিকটবর্তী
হইতেছে। কিন্তু তাহা না করিয়া ক্যাপটেন নিমাে
অসঙ্কোচে ব্যাবেলম্যাণ্ডেব প্রণালীর মধ্যে প্রবেশ করিলেন ।
ব্যাবেলম্যাণ্ডেব কথাটি আরবী, ইহার অর্থ ‘অশ্রুর দুয়ার।
ইহা দৈর্ঘ্যে বত্রিশ মাইল আর প্রস্থে কুড়ি মাইল। নােটিলস্
পুরা দমে আধ ঘণ্টার মধ্যে ইহা পার হইয়া গেল এখানে।
ইংরাজ ফরাসীদের অনেক জাহাজ ও ষ্টিমার চলাফেরা করে,
কোনটা বােম্বে যাইতেছে, কোনটা বা মেলবাের্ন বা মােরিটসে

সাগরিক।
যাইতেছে। কাজে কাজেই নােটিলকে জলের তলায়
ডুবিয়া যাইতে হইল।
সেইদিন দুপুরে আমরা লােহিত সাগরে গিয়া পড়িলাম ।
ক্যাপটেনের যে কি উদ্দেশ্য তাহা কিছুই বুঝিলাম না।
জাহাজের বেগ ক্রমশঃই কমিয়া আসিতেছে,কখনো
ভাসিয়া চলিতেছে আবার দূরে জাহাজ দেখিলেই ডুবিয়া
চলিতেছে।
৮ই ফেব্রুয়ারী না সহর দেখিতে পাইলাম। একট।
পুরাতন সহর, চারিদিকে ভাঙ্গ। প্রাচীর ও খেজুরগাছের
বাগান। এই সহরের মধ্যে ছয়টা বাজার ও ছাব্বিশট।
মজিদ আছে।
লােহিত সাগরের দুইদিকের দৃশ্য দেখিতে দেখিতে
চলিয়াছি । জাহাজ আফ্রিকার কল ধরিয়া চলিতে লাগিল,
কারণ, এইদিকের জলের গভীরতা অপেক্ষাকৃত বেশী ।
বালুময় মঠের উপর মিশরবাসীরা উটের সাহায্যে লাঙ্গল
দিতেছে দেখিল:ন। লোহিত সাগর নাম বটে, কিন্তু কাচের
মত পরিষ্কার জল। জলের ধার হইতেই পাহাড়ের চাই উচু
হইয়া উঠিয়াছে ; কোথাও বা সুদীর্ঘ বালির চর ধূধূ করি-
তেছে ; সে অসীম মরুভূমির যেন শেষ নাই।
আবার পূর্বকূল ধরিয়া চলিতে লাগিল; এদিকে ও মরুভূমি,
কিন্তু গাছপালার সংখ্যা অনেক।
জাহাজ যখন ডুবিয়া যাইতে লাগিল তখন কঁাচের
জাহাজ

সাগরিকা
জানালায় বসিয়া লােহিত সাগরের অলৌকিক রূপ ও
সম্পদ দেখিতে লাগিলাম।
এখানে অনেক প্রবলের
ক্ষেত আছে ;
আছে ; বিভিন্ন আকারের বিভিন্ন জাতীয় স্পঞ্জ
দেখিলাম। ইহাদের নানা প্রকার গড়নের দরুণ এ দেশের
জেলে ইহাদের নানান মজার নাম দিয়াছে—
উটে লাঙ্গল দিতেছে
চুপড়ি স্পঞ্জ, ঝােড়া স্পঞ্জ, পিরীচ, স্পঞ্জ, পেয়ালা স্পঞ্জ,
হরিণের সিং, সিংহের থাবা, ময়ুরের লেজ ইত্যাদি। ইহা
ব্যতীত ছােট বড় নানা প্রকার কচ্ছপ দেখিলাম ; লাল, নীল,
কালো, হলদে, সােণালি ছোট ছােট অনেক মাছ দেখিলাম।
;

সাগরিক।
৯ই ফেব্রুয়ারীর দুপুর বেলায় জাহাজের ছাদে উঠিয়া
দেখি ক্যাপটেন নিমো দাঁড়াইয়া আছেন। ভাবিলাম
কোথায় যাবেন তাহা এইবার জিজ্ঞাসা করা যাক্, এই
ঠিক সুযােগ।
ক্যাপটেন আমাকে দেখিতে পাইয়া কাছে আসিয়া
আমাকে একটা সিগার দিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “লােহিত
সাগর আপনার কেমন লাগছে
প্রফেসর ? এর অনন্ত
ঐশ্বৰ্য্য দেখতে কি আপনার ভাল লাগছে না? এত
প্রবাল, মাছ, স্পঞ্জ, !”
—“ই, খুবই ভাল লাগছে, ক্যাপটেন। সমুদ্রজগতের
জীবজন্তুর বিষয় জানতে ও দেখতে নােটিলসের চেয়ে এমন
নৃবিধা আর কিসে হবে?”
—“শুধু তাই নয় প্রফেসার। এই যে লোহিত সাগর
দেখছেন এ বড় ভয়ঙ্কর সমুদ্র ; দুইদিকে অসীম মরুভূমি ধূ
করছে ; হাজার মাইলের মধ্যে মাটির নামগন্ধ নেই।
যেন বালির দেশ; দুই কূল হতে রাতদিন বালি এসে
সমুদ্রে পড়ছে আর জলের ভিতর কত নূতন নূতন চোরা-
বালির চর জেগে উঠছে। এই জলের তলায় চোরাবালি
কেবলি পাক খাচ্ছে। এখানে কত হাজার হাজার জাহাজ
নষ্ট হয়েছে।
আর, কোথাও কিছু নেই হঠাৎ এমন প্রচণ্ড
ঝড় ও বালির রাশি উড়তে উড়তে এসে জলের উপর প্রলয়
তাণ্ডব শুরু করে দেবে যে জাহাজ সেই ঝড়ের সঙ্গে ছুটে
;

সাগরিক।
চারাবালির মধ্যে একেবারে অদৃশ্য হয়ে যায়। নােটিস
যামার সে সব ঝড় ও চোরাবালিকে হৃক্ষেপ করে না।”
-“হা, ক্যাপটেন, রােম ও গ্রীসের প্রাচীনকালের
তিহাসেও এই সব ভীষণ ঝড়ের উল্লেখ আছে। গা,
একটা কথা জিজ্ঞাসা করি, এর জল ত এত পরিষ্কার তবু এর
ম লােহিত সাগর হ’ল কেন?”
“অনেকে বলে মুসা যখন তঁাহার লােকজন নিয়ে এই
মুদ্র পার হচ্ছিলেন তখন সমুদ্র ফাক হয়ে তার জন্য পথ
Fরে দেয়; পিছনে ফারাে রাজা তাহার সৈন্যসামন্ত নিয়ে
দের ধরতে আসছিলেন। যখন কারো রাজ। সমুদ্রের
ঝখানে তখন মুসার লােকজন ওপারে গিয়ে ওঠে; সমুদ্র ও
যমন তেমনি হয়ে যায়।
অত সৈন্যসামন্ত সব ডুবে
রে, সেইজন্য এর নাম লোহিত সাগর ।
গর।”
-“লােহিত সাগর ও ভূমধ্য সাগরের মধ্যে আফ্রিকার
য ফালি জমিটুকু এসিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত আছে সেটা না
Iালে ইউরােপ হ’তে ভারতবর্ষে যেতে জাহাজের কত অল্প
মিয় লাগত। এইজন্য পূৰ্ব্বে যত জাহাজকে আফ্রিকা ঘুরে
'রতবর্ষে আসতে হত তাতে অনেক সময় লাগত ও
টলান্টিক মহাসাগরে অনেক বিপদের মধ্যে পড়তে হত ;
ন্তু সম্প্রতি আমাদের দেশের একজন মহাত্মা ব্যক্তি
"হিত সাগর ও ভূমধ্য সাগর এই দুইটাকে যােগ করে
.

সাগরিক।
জাহাজ চলাচলের অনেক সুবিধা করে দিচ্ছেন।
তার
নাম লেসে, তার কাজ এখনও শেষ হয় নি।”
-“হাঁ, বাস্তবিক তিনি একজন মহাত্মা ব্যক্তি ; কিন্তু
সুয়েজ ক্যানালের মধ্য দিয়ে আপনাকে নিয়ে যেতে
পারব না। কাল একেবারে আপনাকে পােঃ সৈড এর
সুদীর্ঘ জাহাজের জেঠি দেখিয়ে ভূমধ্য সাগরে গিয়ে
পড়ব।”
-“কাকে ভূমধ্য সাগরে গিয়ে পড়বেন !”
—“তা’তে এত আশ্চর্য হচ্ছেন কেন প্রফেসার ?”
—“আমি আশ্চর্য্য হচ্ছি শুধু এই ভেবে কালকে আপনি
ভূমধ্য সাগরে কেমন করে গিয়ে পড়বেন ?”
-“হ যাব ,
তাতে এত আশ্চর্য হবার কি
আছে ?”
—“আমি শুধু ভাবছি আপনি কেমন করে, একদিনের
মধ্যে আফ্রিকার উত্তমাশা-অন্তরীপ ঘুরে আটলান্টিক মহা-
সাগর পার হয়ে ভূমধ্য সাগরে যাবেন ?”
--“আফ্রিকা ঘুরে যাব তা আপনাকে কে বলে ?”
—“তবে কেমন করে যাবেন ? ঐ য়েজ ইস্থ মসে
ডাঙ্গার উপর দিয়ে আপনি জাহাজ চালাবেন না কি ?
---“উপর দিয়ে নয় ত; সুয়েজ ইমসের মাটির তল
দিয়ে যাব।”
–“মাটির তলা দিয়ে ! সে কি রকম?”

সাগরিক।
anana
;
গিয়ে পড়ে।
“এই জায়গাটার উপর অনেক লােকে এখন খাল
কাটছে ; কিন্তু তার শত সহস্র বৎসর পূর্বে ভগবান এই
সুয়েজ ইস্থ মসের বহু নিম্ন দিয়া একটা সুরঙ্গ কেটে দিয়েছেন,
মানুষ সে সম্বন্ধে কিছুই জানে না।”
—“এ রকম সুরঙ্গ সত্যি সত্যি আছে ?”
—“হঁ, আছে, তার মধ্য দিয়া লােহিত সাগরের জল
ভূমধ্য সাগরে
নাম আরেবিয়্যান
টনে।”
-“তবে এই সুরঙ্গের মধ্যে নিশ্চয় চোরাবালি আছে ;
তার মধ্যে গেলে বিপদ হতে পারে ত?”
—-“মােটেই নয়, সেটা পাথরের সুরঙ্গ, কারণ মাটির
উপর হতে সে সুরঙ্গ অনেক নীচে, অত তলায় বালি
নাই।”
“আচ্ছ। আপনি এই সুরঙ্গের কথা কেমন করে
জানতে পারলেন ?”
“কতকগুলি জিনিষ বিশেষ লক্ষ্য করে এটা আমি
আবিষ্কার করতে পেরেছি। আমি দেখেছি ভূমধ্য সাগরের
ও লােহিত সাগরের মাছগুলি সব এক জাতীয় ; তাহাদের
আকার গড়ন বর্ণ সমস্তই এক। তাতে আমি বুঝলুম যে
জলের ভিতর সুরঙ্গ না থাকলে এমন কখনাে হতে পারত
। তারপর আমি আর একটা পরীক্ষা করলুম ; ভূমধ্য
সাগরের অনেক মাছ ধরে তাদের লেজে তামার আঙটা

সাগরিক।
*** ***
পরিয়ে পাের্ট সৈড এর কাছে তাদের জলে ছেড়ে দি।
কয়েক মাস পরে একদিন সিরিয়ার উপকূলে এই রকম
অনেক আংটা পরা মাছ আমার জালে পড়ে। তখন আমি
বুঝলুম নিশ্চয় ভিতরে সুরঙ্গ আছে। তারপর সাহস করে
সেই সুরঙ্গের ভিতর দিয়ে আমার জাহাজ চালাই ; এইরূপে
বহুবার চালিয়েছি। এই সুরঙ্গ যদি না থাক্ত তা হলে
এই লােহিত সাগরে ঢুকতে আমি সাহস করতুম না।”
*

পঞ্চম পরিচ্ছেদ
ডুগং—অতিকায় জলজন্তু
পরদিন ১০ই ফেব্রুয়ারী। দুপুর বেলায় জাহাজ পুনরায়
জলের উপর ভাসিয়া উঠিল। আমি ছাদের উপর গিয়া
উঠিলাম, সঙ্গে সঙ্গে নেড, এবং কনসেও চলিল। ছাদের
উপর বসিয়া তিনজনে অনেক বিষয়ে কথাবার্তা কহিতেছি,
এমন সময় নেড, হাত বাড়াইয়া বহুদূরে সমুদ্রের বক্ষের
উপর কি একটা জিনিষ দেখাইল।
নেড, আমাকে উদ্দেশ করিয়া কহিল, “ঐখানে একটা
কি জিনিষ চলছে দেখতে পাচ্ছেন ? ওই,ঐখানে।”
আমি বলিলাম-“কই? কোথায় ? আমি ত কিছুই
দেখতে পাচ্ছি না।”
নেড়, দূরে আঙ্গুল দেখাইয়া কহিল, “ঐ যে ওখানে ;
খুব ভাল করে দেখুন, নড়ে বেড়াচ্ছে।”
এইবার জিনিষটা দেখিতে পাইলাম। প্রায় দুই মাইল
দূরে একটা প্রকাণ্ড কালাে পদার্থ সমুদ্রবক্ষে ভাসিতেছে-
ঠিক্ যেন একটা বালির চর। সেটা একটা প্রকাণ্ড ডুগ
-একপ্রকার অতিকায় জলজন্তু বিশেষ ।
ডুগংটাকে দেখিয়া নেডের চোখ জ্বলিয়া উঠিল ;

৩৮
সাগরিক।
.
তাহাকে মারিবার জন্য নেডের হাত নিশপিশ করিতে
লাগিল—হাতে তার সেই ভয়ানক হারপুন। মনে হইল
এখনই বুঝি সে জলের উপর ঝাপাইয়া পড়িবে। এই
সময় ক্যাপটেন নিমো ছাদের উপর আসিলেন। ডুগং-
টাকে দেখিয়া ও নেডের চোখমুখের ভাব দেখিয়া
ক্যাপটেন বলিলেন, “কি নেড, ডুগংটাকে দেখে এখনও
চুপ করে রয়েছ যে ? এতবড় জলজন্তুটাকে দেখে ভয়
পেলে নাকি?”
নেড, বলিল, “আপনার হুকুম পেলেই এটাকে সাবাড়
করে আসি।”
ক্যাপটেন বলিলেন, “তা যেতে পার, আমার কোন
আপত্তি নাই; কিন্তু দেখাে হাতের লক্ষ্য যেন না ফস্কায়।”
আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “কেন, ডুগং কি বড় হিংস্র
জন্তু? শিকার করতে গিয়ে কোন বিপদে পড়তে হবে
ত ?”
ক্যাপটেন
বলিলেন, “হঁ, এরা প্রায়ই শিকারীদের
উপর লাফিয়ে এসে পড়ে, আর
তা’তে নৌকা
উল্টে
যায়। কিন্তু নেড, যখন যাচ্ছে তখন সে রকম কোন
বিপদ হবে না বলে মনে হয়। তার হাতের তাগের
উপর আমার খুব বিশ্বাস আছে।”
এই সময় সাতজন নাবিক ছাদের উপর আসিয়া
নৌকা খুলিয়া জলের উপর ভাসাইল। একজনের হাতে

সাগরিক
'C1
* *
একটা তিমি মরিবার হারপুন ; ছয়জন নাবিক নৌকার দাড়
রিয়া বসিল। নেড়, কনসেল ও আমি নৌকায় গিয়া
ঠিলাম।
ক্যাপটেনকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “আপনি আসবেন
;
ক্যাপটেন বলিলেন, “না, আমি আর যাব না।
শকার নিয়ে কিন্তু আপনাদের যেন ফিরে আসতে দেখতে
ই! নেড, দেখাে হাত যেন ফায় না।”
নৌকা ছাড়িয়া দেওয়া হইল। ছয়জন বলিষ্ঠ নাবিকের
1 টানার দরুণ নৌকা লােহিত সাগরের উপর দিয়া
তীরের মত ছুটিতে লাগিল। ডুগংটা ঠিক দুই মাইল দূরে।
দখিতে দেখিতে নৌকা খুব কাছে আসিয়া পড়িল ;
দূরেই ডুগংটা জলের উপর ভাসিতেছে। এইবার নৌকার
ড় খুব আস্তে আস্তে টানা হইতে লাগিল; যাতে
কানরূপ শব্দে ডুগংটা না পালায়। হাতে হারপুন লইয়া
নড়, নৌকার সামনে গিয়া দাড়াইল ; তাহার চোখ
ইটা জ্বলিতে লাগিল, আজ বড় সাংঘাতিক জলজন্তুব
ঙ্গে লড়িতে হইবে। হারপুনের সঙ্গে সচরাচর একটা
‘ড়ি বাঁধা থাকে, কারণ হারপুনের আঘাত খাইয়া তিমি
খিন জলে ডুব মারে, উপরের সেই দড়ি ধরিয়া তাহার
তি নির্ণয় করা হয়; কিন্তু এই হারপুনের দড়িটা বড়
ছাট ছিল, যা ফুটের বেশী হইবে না।
;
;

৪ :
সাগরিক।
হাঙর, তিনি
ডুগং কি করে লক্ষ্য করিয়া দেখিতে লাগিলাম। মরার
মত সেটা জলের উপরে ভাসিতেছিল, বােধ হয় রােদ
পােহাইতে আসিয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল।
প্রভৃতি জলজন্তু প্রায় দীর্ঘ-আকৃতি হইয়া থাকে; কিন্তু
ডুগং লম্বায় হাঙরের সমান হইলেও প্রস্থে খুবই বেশী
জলহস্তী বা সিন্ধুঘােটকের মত ইহাদের শরীর খুবই কেঁদো
ও মােটা, সঙ্গে একটা লেজও আছে ; মুখের হা অতি
প্রকাণ্ড, তার ভিতরকার দাতগুলো যেন এক একটা গজদাত
নৌকা যখন ঠিক পনের ফুট তফাতে আছে, তখন
নেড ল্যাণ্ড প্রচণ্ড শক্তিবলে হারপুন ছুড়িল । হারপুন
ডুগংএর গায়ে না লাগিয়া একেবারে গা ঘেসিয়া জলে
গিয়া পড়িল।
নেড, রাগে ও দুঃখে তার চুল ছিড়িতে
লাগিল
আমি বলিলাম, “লেগেছে, নেড, লেগেছে ; ঐ দেখ
রক্ত ; কিন্তু ওর গায়ে হারপুন লাগেনি; বােধ করি লেভে
বা গা ঘেসে চলে গেছে।”
নেড, চেঁচাইয়া বলিল, “শীগগীর চালাও, হারপুনের দড়ি
ধরতে হবে।”
”
তাড়াতাড়ি নৌকা চালাইয়া হারপুনের দড়ি ধরা হইল
ডুগ জলের তলায় ডুবিয়া চেঁাচা ছুটিতেছে ; নৌকা ও
যথাশক্তি বেগে চলিতেছে। মাঝে মাঝে ডুগং দম লইতে
জলের উপর ভাসিয়া উঠিতে লাগিল। দেখিলাম আঘাত
;
;
;

左

No text on this page.

সাগরিক।
৪ ,
যায়
;
তখন
"মােটেই লাগে নাই। ডুগং ভাসিয়া উঠিলেই নেড, যেমন
তাহাকে আবার প্রকাণ্ড এক কুড়ালের দ্বারা আঘাত করিতে
সেই মূহুর্তেই সেটা ডুবিয়া যাইতে লাগিল ;
নেড়কে একটুও সুযােগ দিতেছিল না। ছয়জন নাবিক
প্রাণপণ বেগে ড় টানিতে লাগিল ; তাহাদের হাতের
শিরাগুলো চড়চড় করিয়া ফুলিয়া উঠিতে লাগিল। নৌকা
ডুগং এর পিছনে পিছনে তীরের মত ছুটিতেছে ; কিন্তু সব
বুঝি বৃথায় যায়। ডুগংটাকে কিছুতেই ধরিতে পারা গেল
না। মানব ভাষায় যত রকম গালাগাল থাকিতে পারে নে,
তাহ সমস্তই প্রয়ােগ করিতে লাগিল।
একঘণ্টা ধরিয়া এই যুদ্ধ চলিতে লাগিল।
ডুগংটা প্রাণের আশা ত্যাগ করিয়া আমাদের উপর প্রতিশােধ
লইবার জন্য
বাঁকিয়া দাড়াইল । আর ছুটিয়া
পলাইল না; পিছন ফিরিয়া আমাদের দিকে ছুটিয়া আসিল ।
“সামাল, সামাল”, বলিয়া নাবিকের চেঁচাইয়া উঠিল।
ডুগং তখন আমাদের পানে ছুটিয়া আসিতেছে। কুড়ি
ফুট তফাৎ থাকিতে ডুগংটা থকাইয়া দাড়াইয়া পড়িল।
নাকের বিশাল গর্তদুটো ফাক করিয়া বাতাসে কি যেন
শকিল। তারপর সেখান হইতে শূন্যে প্রচণ্ড লম্ফ দিয়া
আমাদের উপর আসিয়া পড়িল। নৌকাটা কাৎ হইয়া
গেল ; সঙ্গে সঙ্গে প্রায় দুই টন জল নৌকার ভিতরে
প্রবেশ করিল। নাবিকদের গুণে সে যাত্রা নৌকা টাল

৪২ সাগরিক। ; সাল্লাইয়া বাঁচিয়া গেল। নেড়, তখন একহাতে নৌকার একপাশ ধরিয়া উপুর হইয়া পড়িয়া জলস্থিত ডুগং-এর ঘাড়ের উপর কুড়ুল দিয়া কোপের উপর প্রচণ্ড কোপ মারিতে লাগিল। ডুগংএর পিঠের উপর ঘাচ, ঘ্যাচ করিয়া কুড়ল পড়িতে লাগিল ; নৌকার মধ্যে রক্ত-মাখা চৰ্বি-মাখা মাংসের টুকরো ঠিক্রাইয়া আসিয়া পড়িতে লাগিল। অসহ্য যন্ত্রণায় ডুগং তখন মরণ-কামড় কামড়াই- বার জন্য উদ্যত হইল। বিশাল মুখগহ্বরে নৌকার ডাগাটা কামড়াইয়া ধরিয়া আমাদের সবশুদ্ধ জল হইতে নৌকাটা শূন্যে তুলিয়া ফেলিল—ঠিক যেমন করিয়া সিংহ একটা হবিণশাবক মুখে করিয়া তােলে। অামরা সকলে এর ওর ঘাড়ে পড়িলাম ; বােধ করি বা জলের মধ্যে পড়িতে হইত, কিন্তু নেড, তখন যথাসম্ভব শক্তিতে একটা হারপুন ছুড়িয়া ডুগংএর বুকের মধ্যে বসাইয়া দিল। নৌকার সামনেটা লােহার পাত দিয়া মােড়া, ডুগং দাত দিয়া কড়মড়, করিয়া সেই লােহাটা দুমরাইয়া তাল করিয়া দিল; কিন্তু সেই শেষ। ডুগং জলের ভিতর আস্তে আস্তে ডুবিয়া কিন্তু পুনরায় জলের উপর ভাসিয়া উঠিল ; জ্যান্ত নয়—শুধু তার মৃতদেহটা। মৃতদেহটা। নৌকার পিছনে দড়ি দিয়া বাধিয়া জলে ভাসাইয়া জাহাজে সেটা আনা হইল । জাহাজে তুলিতে নাবিকদের খুবই বেগ পাইতে হইয়াছিল ; সেটার ওজন ১০,০০০ পাউণ্ড অর্থাৎ প্রায় ১২৫ মণ। •• গেল ;

সাগরিক।
পরদিন ১১ই ফেব্রুয়ারী। নানা জাতীয় পাখী শূন্যে
উড়িতেছিল, কতকগুলি মারিয়া খাবারের ব্যবস্থা করা
গেল। তার মধ্যে সাগর-কপােত ও নীলনদের হাস
সর্বোৎকৃষ্ট। বেলা ৫টার সময় সিনাই পৰ্বত দেখিতে
পাইলাম। এই পাহাড়ের উপর হজরত মুসা ঈশ্বরকে
সাগর-কতে
চাক্ষুষ দেখিতে পান। বৈকালের স্নিগ্ধ আলােয় সমুদ্রের
বুকের উপর অনেক শুশুক্ ও ডলফিন খেলা করিতেছে দেখিতে
পাইলাম ।
দেখিতে দেখিতে রাত্রির অন্ধকারে চতুর্দিক
অদৃশ্য হইয়া গেল। কোথাও কোন শব্দ নাই ; চারিদিকে
নিস্তব্ধ, কেবল মাঝে মাঝে পেলিক্যান ও অন্যান্য নিশাচর

৪s
সাগরিকা
পাখীর করুণ কান্নার মত ডাক ও পৰ্ব্বতের উপর ঢেইএর
আছাড়ের শব্দ ছাড়া আর কিছুই শােনা গেল না। রাত
নয়টার সময় জাহাজ
ডুবিয়া চলিল, কিন্তু
অনুমানে বুঝিলাম
জাহাজ সুয়েজের
কাছাকাছি
আসিয়াছে। সাড়ে
নয়টার সময় জাহাজ
পুনরায় জলের
উপর ভাসিয়া
উঠিল, আমিও
ছাদের উপর গিয়া
খুব
উঠিলাম।
একটা স্নান নীল
আলো দেখিলাম ;
ঘন কুয়াসার দরুণ
উনি
অমন দেখাইতেছে।
--“লাইট হাউ, লাইট হাউস্ !”
পিছন ফিরিয়া দেখি ক্যাপটেন নিমম। তিনি বলিলেন,
“ঐ দেখুন সুয়েজের লাইট হাউস্। এইবার আমরা সেই
টনেলের মধ্যে ঢুকব। আপনি এইবার নীচে যান, জাহাজ
।

সাগরিক
5?
এইবার ডুববে, একেবারে সেই ভূমধ্য সাগরে গিয়ে ভেসে
উঠবে।”
আমরা নীচে নামিয়া আসিলাম। ক্যাপটেন আমাকে
নঙ্গে লইয়া পাইলটের ( চালক ) ঘরে লইয়া চলিলেন।
পেলিক্যান
টনেলের মধ্য দিয়া যাওয়া বড় বিপদসঙ্কুল বলিয়া ক্যাপটেন
নিজে এইবার জাহাজ চালাইবেন।
পাইলটের ঘর ছােটই বলিতে হইবে। পাইলটের
বিশাল বক্ষ ও পেশীবহুল হাত ও বাহু তাহার অসীম শক্তির
পরিচয় দিতেছিল। সে তখন সবলে জাহাজ ঘুরাইবার চাকা
রিয়া দাড়াইয়াছিল। কঁচের জানালা দিয়া দেখিলাম

৪৬ সাগরিক। AA জাহাজ ক্রমশঃই অতল জলে নামিয়া যাইতেছে । সাম ঘাের কৃষ্ণবর্ণের পাহাড়ের দেওয়াল—এই দেওয়ালের একদিবে লােহিত সাগর আর একদিকে ভূমধ্য সাগর ; এই পাহাড়ে দেওয়াল এসিয়া ও আফ্রিকা এই দুইটি মহাদেশকে যোেগ করিয়াছে। কতদূর নামিয়া গেলাম, তবু সেই প্রাচীর যেন আর শেষ হয় না! একঘণ্টা ধরিয়া এইরূপ • ক্রমশঃ আমরা আমরা নামিতে লাগিলাম। এ কোন পাতালের দেশে আমরা চলিতেছি। পৃথিবীর বুক হইতে কত নাচে নামিয়া আসিলাম। সাড়ে দশটার সময় দেখি সামনে পাথরের সারি সারি গ্যালারী ধরিয়া নােটিলস্ ভিতরে ছুটিয়া ভিতরে ছুটিয়া চলিতেছে। জাহাজের চারিপাশে এ কি ভীষণ গর্জনধ্বনি ! বুঝিলাম টনেলের মধ্য দিয়া লােহিত সাগরের জলরাশি প্রচণ্ড বেগে ছুটিয়া চলিতেছে। সে কি ভীষণ স্রোত! নােটিসের ইঞ্জিন বিপরীত দিকে চলিতে লাগিল, তবু স্রোতের মুখে পড়িয়া নােটিল তীরের ছুটিয়া চলিল। জাহাজের তীব্র ইলেকটিক আলো দুই পাশের দেওয়ালের উপর গিয়া পড়িতেছিল; কিন্তু কিছুই দেখিতে পাইলাম না। সেই ভীষণ স্রোতে জল যেন সাদা ফেনা হইয়া টগবগ, করিয়া ফুটিতেছে। ভয়ে আমার বুক ঢিপ ঢিপ, করিতে লাগিল। রাত পৌনে এগারােটার সময় ক্যাপটেন ইঞ্জিন ছাড়িয়া উঠিয়া দাড়াইয়া বলিলেন,-“ভূমধ্য সাগর !”

যষ্ঠ পরিচ্ছেদ
মানুষ না মাছ
পরদিন ১২ই ফেব্রুয়ারী। ভাের বেলায় নােটিল
জলের উপর ভাসিয়া . উঠিলে পর আমি ছাদে গিয়া
উঠিলাম। বেলা সাতটার সময় নেড, ও কনসে আসিয়া
হাজির হইল। জাহাজ যে এখন ভূমধ্য সাগরের উপর
দিয়া চলিতেছে তাহা তাহারা এখনও জানিতে পারে নাই।
আমার মুখে সকল কথা শুনিয়া তাহারা খুবই বিস্মিত
হইল; এতবড় ইস্থমস্ অফ, সুয়েজ, যাহা কমপক্ষেও ৫০
মাইল হইবে, তাহাই কিনা মাটির তলা দিয়া আমরা পার
হইয়া আসিলাম।
বিস্ময়ের ভাব কাটিয়া যাইলে পর নেডের মাথায়
আর এক ফন্দী আসিয়া উপস্থিত হইল। আমাকে চুপি
চুপি সে বলিল, “দেখুন, ইউরােপের কাছাকাছি যখন এসেছি
আর দেরী করা নয়। নােটিলস্ ভূমধ্য সাগর
ছাড়বার পূর্বেই যেমন করে হােক্ পালাতে হবে।”
নেডের কথা শুনিয়া আমার মনে বড় হাসি পাইল ;
ক্যাপটেনের চোখে ধূলি দিয়া পালানাে বড় সােজা কথা
নয়, বিশেষতঃ এই ইউরােপের কাছাকাছি আসিয়া ক্যাপটেন

Sb
সাগরিক।
নিশ্চয় আমাদের উপর প্রখর দৃষ্টি রাখিয়াছেন। নেড়কে
বলিলাম, “নেড, তােমার কি এই জাহাজ ভালো লাগছে
না ? আমার ত এই জাহাজ ছেড়ে আর কোথাও যেতে
ইচ্ছা করে না। সমুদ্রজগতের এত জীবজন্তু, এমন অদ্ভুত
গাছপালা,
এমন বিচিত্র পরীরাজ্য, এমন আর কোথায়
দেখতে পাব ?”
নেড, বলিল, “আমারও যে এই জাহাজে থাকতে ইচ্ছা ।
করে না এমন নয় ; কিন্তু বাড়ীর কথা ভেবে আর কিছু
ভাল লাগে না।”
নেডকে আশা দিয়া বলিলাম, “নেড, 1্যস্ত হয়ে না ;
একদিন না একদিন আমরা বাড়ী ফিরব এ বিশ্বাস আমার
আছে।”
নেড, বলিল, “ওরকম অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশায় বসে
থাকলে চলবে না; পালাবার এই ঠিক সুযােগ।”
আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “আচ্ছা তােমার কথাই না
হয় মানলাম, কিন্তু এই ঠিক সুযােগ’–এর মানে কি ?”
নেড বলিল, “তার মানে একদিন অন্ধকার রাত্রি দেখে
আস্তে আস্তে জালে লাফিয়ে পড়া। অবশ্য ইউরােপের
কাছাকাছি জাহাজ চলা চাই; আর জাহাজ জলের ভিতর
না ডুবে ভেসে চল। চাই ; তা নইলে আমরা পালা
কেমন করে ?
এই সব একসঙ্গে ঠিক মিলে গেলেই
সুযোগ।”

সাগরিক। ৪৯ আমি বলিলাম, “কিন্তু পালাতে গিয়ে একবার পড়লেই বাড়ী ফিরবার পথ একেবারে বন্ধ, তা জানো ?” নেড়, বলিল, “খুব জানি।” আমি বলিলাম, “আচ্ছ। বেশ, এমন সুযােগ যদি কোন দিন আসে তাহলে আমায় এসে জানাবে, আমি তখনই এ জাহাজ ছেড়ে পালাবো। কিন্তু এটা জেনো, ক্যাপটেন নিমো এত নির্বোধ নন্ যে ইউরােপের কাছে এসে নিশ্চিন্ত হয়ে থাকবেন। এখন হ'তে তিনি আমাদের উপর খুব প্রখর সজাগ দৃষ্টি ও কড়া পাহারা দেবেন !” এসিয়া মাইনর হইতে গ্রীসদেশের মধ্যস্থিত সাগরের গভীরতা এক একস্থানে অত্যন্ত অধিক। ছয় হাজার ফুট নিগ্ন দিয়া জাহাজ কখনাে কখনাে চলিতে লাগিল, তবুও সমুদ্রের তলদেশ পাওয়া গেল না। ১২ই ফেব্রুয়ারী তারিখে জাহাজ সেই বিখ্যাত ক্রীট- দ্বীপের নিকটবর্তী হইল। প্রাচীন ইতিহাসে এই দ্বীপের নাম অতি বিখ্যাত। যাহা হউক সমস্তদিন ধরিয়া কঁাচের জানালার নিকট বসিয়া সমুদ্রের নানা প্রকার মাছ ও জন্তু দেখিয়া সময় কাটাইতে লাগিলাম। কত রকম মাছ দেখিতেছি—এমন সময় একটা জিনিষ দেখিয়া চমকাইয়া কঁচের জানালার সম্মুখে জলের ভিতর একটি মানুষ! মরা নয়, জ্যান্ত মানুষ ! জলের ভিতর সে ডুব-সাঁতার উঠিলাম। ৪

সাগরিক।
;
কাটিয়া চলিয়াছে, এক একবার দম লইতে জলের উপর
ভাসিয়া উঠিতেছে। কোমরে তাহার কোমরবন্ধ, তাহাতে
একটি মস্ত চামড়ার থলি ঝুলিতেছে। ক্যাপটেন নিমো
পাশেই দাড়াইয়াছিলেন ; চীৎকার করিয়া বলিলাম, “জলের
ভিতর একটা লোক ডুবে যাচ্ছে, নিশ্চয়ই জাহাজ বা নৌকা
থেকে পড়ে গেছে ; যেমন করে থােক লােকটাকে
বাঁচান।”
আমার কথায় ভ্রুক্ষেপ না করিয়া ক্যাপটেন জানালার
কাছে আসিলেন। কি আশ্চৰ্য্য, লােকটাও জাহাজের কাছে
আসিয়া জানালার কাঁচের উপর মুখ দিয়া দাড়াইল
ক্যাপটেন হাত দিয়া কি ইসারা করিলেন, লােকটাও
হাত পা নাড়িয়া তাহার উত্তর দিল, তারপর সে জলের উপর
ভাসিয়া উঠিয়া অদৃশ্য হইল।
এইবার ক্যাপটেন কথা কহিলেন, বলিলেন,—“ভয়
পাবেন না প্রফেসার ; এর নাম হচ্ছে ‘পেস্কা’–এখানকার
সকলেই এ কে চেনে। সাঁতার কাটতে এ একেবারে
অদ্বিতীয়। ডাঙ্গায় না থেকে জলের ভিতর থাকতে এ
বেশী ভালবাসে ;
চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে বেশী ভাগ সময়
জলের ভিতর কাটায়। এক দ্বীপ থেকে আর এক দ্বীপে
সাঁতার কেটে বেড়ানােই এর কাজ।”
—“আপনি তাহলে এ লােকটাকে চেনেন ?”
—“নিশ্চয়?” এই বলিয়া ক্যাপটেন একটা লােহার

সাগরিকা
সিন্দুকের কাছে গিয়া তাহা খুলিলেন এবং তাহার ভিতর
হইতে তাল তাল সােনা বাহির করিতে লাগিলেন। আন্দাজে
বুঝিলাম তাহা ওজনে কম পক্ষে ৪,০০০ পাউণ্ড হইবে,
অর্থাৎ ইহার মূল্য ২,০০,০০০ পাউণ্ড হইবে। এত তাল
তাল সােনা ক্যাপটেন কোথা হইতে পাইলেন, এখন
এই সােনা কি করিবেন, এবং কাহাকে দিবেন ? এই সব কথা
ভাবিতেছি, ক্যাপটেন সােনার তালগুলি সিন্দুকে রাখিয়া
বেশ ভাল ভাবে বন্ধ করিয়া একটা ইলেটিক বেল্
বাজাইলেন। চারিজন নাবিক আসিয়া ক্যাপটেনের হুকুম
মত অতিকষ্টে সেই সিন্দুকট। বাহিরে লইয়া গেল। সিঁড়ি
বহিয়া ছাদের উপর লইয়া গেল তাহাও শুনিতে পাইলাম ।
ক্যাপটেনও চলিয়া গেলেন।
রাত্রিতে মােটে ঘুম আসিল না ; চিন্তার পর চিন্তা
আসিয়া মাথার ভিতর জোট, পাকাইতে লাগিল। সেই
জলের ভিতর লােকের সঙ্গে এই সিন্দুকের নিশ্চয় কোন
সম্বন্ধ আছে। ছাদের উপর সিন্দুকটা লইয়া যাইবার অর্থ
কি ?
অথচ ক্যাপটেন কোন কথাই বলিলেন না। গভীর
রাত্রে শুনিতে পাইলাম ছাদের উপর সিন্দুকটা হেঁচরাইয়া
টানিয়া লইয়া গেল ; তারপর আরাে দুমদাম্ শব্দ-মনে
হইল, সিন্দুকটা ছাদের কিনারায় লইয়া গিয়া জলের ভিতর
ফলিয়া দেওয়া হইল। তারপর জাহাজ পুনরায় জলে
ডুবিতে আরম্ভ করিল। সিন্দুক কোথায় চালান দেওয়া
;

সাগরিকা
*
হইল ? ইউরােপের কোন দেশে ক্যাপটেনের আত্মীয় বা
বন্ধু আছেন ?
সমস্ত রাত্রি জাগিয়া কাটাইলাম। পরদিন সকালে
উঠিয়া আমার নিজের কাজ করিতে লাগিলাম।
নূতন
একখানা বই লিখিবার জন্য অনেক তথ্য জোগাড় করিতেছি।
এইসব করিতে করিতে সন্ধ্যা পাঁচটা হইল। সেই সময়
এমন অসহ্য গরম বােধ হইল যে সৰ্বাঙ্গ দিয়া গগল
করিয়া ঘাম বাহির হইতে লাগিল। গায়ের কোট জমা
খুলিয়া ফেলিলাম ; তবুও গরম কমিল না। একি হইল,
গরম যে ক্রমশঃই বাড়িয়া চলিল। জাহাজে আগুন লাগিল
না কি ? ম্যালােমিটারে দেখিলাম জাহাজ ষাটফুট তলা
দিয়া চলিতেছে।
এই সময় ক্যাপটেন আসিলেন, বলিলেন, “বিয়াল্লিশ
ডিগ্রি।”
আমি বলিলাম, “। ক্যাপটেন, এর বেশী গরম আমরা
সহ্য করতে পারব না।”
ক্যাপটেন বলিলেন, “তখন না হয় গরম নাই হতে
দিলুম।”
আমি বিস্মিত হইয়া বলিলাম, “তা হলে এই গরম
হওয়া বা না-হওয়া আপনার হাতে ?”
ক্যাপটেন বলিলেন, “আমার হাতে ঠিক নয়।
আগুনের চুল্লির মাঝ থেকে সরে গেলেই হলাে।”

সাগরিকা
“সে কি
আমি বলিলাম, “আগুনের চুল্লি ! তাহলে এই গরম
বাইরে থেকে আসছে ?”
ক্যাপটেন বলিলেন, “হা, এখন আমরা উত্তপ্ত ফুটন্ত
জলের ভিতর দিয়া চলেছি।”
আমি অবাক্ হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম,
ক্যাপটেন ?”
“এই দেখুন,” বলিয়া' ক্যাপটেন কাচের জানালার তক্ত।
সরাইয়া দিলেন।
দেখিলাম সমুদ্রের জল একেবারে সাদা-জল খুব
ফুটিলে যেরূপ আকৃতি হয়। সেই ফুটন্ত জলের ভিতর গন্ধকের
ধোঁয়া গুলিয়া বেড়াইতেছে। কঁাচের উপর একবার হাত
দিতেই অসহ্য গরম বলিয়া হাত সরাইয়া লইলাম।
আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “এ কোথায় আসিলাম,
ক্যাপটেন ?”
ক্যাপটেন বলিলেন, “এ হচ্ছে আগ্নেয়গিরির দেশ। মানুষ
কেবল এটুনা ও বিসুবিয়সের নামই জানে; কিন্তু সমুদ্রের
তলায় যে কত অসংখ্য আগ্নেয়গিরি আছে তাহা কে জানে ?
এসব আগ্নেয়গিরি এখনও নেবে নি।”
দেখিতে দেখিতে গরম এমন ভয়ঙ্কর হইয়া উঠিল যে
শাসপ্রশ্বাস বন্ধ হইয়া আসিল। সমুদ্রের ফুটন্ত জল এতক্ষণ
সাদা দেখাইতেছিল, এইবার লাল হইয়া উঠিল। প্রচুর
লৌহ ও গন্ধকের দরুণ এইরূপ দেখাইতেছিল। সৰ্বাঙ্গ

৫৪
সাগরিকা
s
ঘামে ভিজিয়া গেল, দম বন্ধ হইয়া আসিল, মনে হইল,
এইবার মাথা ঘুরিয়া পড়িয়া যাইব। চেঁচাইয়া বলিলাম,
“ফিরে চলুন ক্যাপটেন, আর পাছি না থাক্‌তে।”
ক্যাপটেনের হুকুম পাইয়া জাহাজ ফিরিয়া চলিল। পনের
মিনিট পরে জাহাজ জলের উপর ভাসিয়া উঠিল। সমুদ্রের
শীতল হাওয়ায় প্রাণ ঠাণ্ডা হইল ।
রােডস্, সেরিগো, কেপ, ম্যাটারান পার হইয়া জাহাজ
সােজা পশ্চিম মুখে চলিল।

এমন সপ্তম পরিচ্ছেদ দ্বিতীয় ভূস্বর্গ এই যে ভূমধ্যসাগর, ভারী সুন্দর এই সমুদ্র ! নীল জল আর কোন্ সমুদ্রে আছে ? সমুদ্রের উপর এমন সুন্দর ফুরফুরে মলয় বাতাস আর কোথায় আছে ? কত অতীত কাহিনীর সহিত ইহার নাম জড়িত রহিয়াছে । গ্রীক, রােমান্, এ্যাসিরীয়ান্, কার্থেজিয়ান, ব্যাবিলনিয়া, স্পটনি, পার্থেনিয়া, ডেরিয়ান, আয়ােনিয়ান, সাইরাকিউস্ ও মিশরবাসী বীর পুরুষগণ ইহার বুকের উপর দিয়া চলাফেরা করিয়াছে। ইহার উপকূলে কত সুন্দর রাজ্য, গ্রস্,ি ইটালী, য়্যাবেনিয়া, যুগােস্লাভিয়া, ক্রীট, সাই প্রস্, আয়োনিয়া, রােডস্, সিসিলি, সার্ডিনিয়া, কর্সিকা, ফ্রান্স, স্পেন। এসকল দেশ যেন চিরবসন্তের রাজ্য! এখানে ভারত- বর্ষের মত প্রখর গ্রীষ্ম ও নাই আর উত্তর ইউরােপের মত কঠোর শীতও নাই। এখানকার লােকেরা কত সুখী! ইহাদের মুখে যেন চিরদিন হাসি লাগিয়া আছে। কি সুন্দর ইহাদের মুখশ্রী, কি অপূর্ব গােলাপী ইহাদের গায়ের রং ! ইহার পরাধীনও নয় বা অপরের রাজ্যের উপর কখনাে লােভও করে না। ইহারা ইহাদের ছােট ছােট রাজ্যগুলি লইয়াই সন্তুষ্ট।

সাগরিকা এই সমুদ্র-উপকূলস্থিত প্রদেশগুলির জমি অত্যন্ত উৰ্ব্বরা ; তাহার উপর বৈজ্ঞানিক ও নানাবিধ আধুনিক প্রক্রিয়া দ্বারা জমির শত গুণ উৎকর্ষ সাধন করা হইয়া থাকে। এখান- কার শস্যক্ষেত্র, ফলের বাগান, ফুলের বাগান, গােচারণভূমি, কৃষকপল্লী সমস্তই দেখিবার জিনিষ। এখানকার বেশীর ভাগ লােকই কৃষিকার্যের দ্বারা জীবিকানির্বাহ করে। আমাদের দেশের চাষীর মতন কিন্তু ইহাদের তেমন ধারা দুর্দশা নয়। সকলেই ধনশালী, সকলেই স্বাধীন, সকলেই সুখী! সকলেরই নিজ নিজ উদ্যান ও শস্যক্ষেত্র আছে। এই সব কৃষকেরা অতি সুশ্রী, কষিতকাঞ্চনের মত গায়ের রং ! ছেলেমেয়ে স্ত্রীপুরুষ সকলেই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রঙিন জামাকাপড় পরিয়া হাসিয়া খেলিয়া কাজ করিয়া বেড়ায়। কাহারও মুখের উপর চিন্তার রেখা বা হিংসা, ক্রোধ ও মাৎসর্যের চিহ্নমাত্র দেখিতে পাওয়া যায় না। এমন ফলের বাগান, এমন ফুলের বাগান, এমন সুন্দর তরুলতার নন্দনকানন এক ভারতবর্ষ ছাড়া আর কোন দেশে আছে ? এ দেশের সকলেরই নিজ নিজ গৃহসংলগ্ন এক একটি পুষ্পেদ্যান আছে। এই সব ফুলের বাগানে নয়ন- মনতৃপ্তিকর কত রঙ্গের ফুলই না ফুটিয়া আছে ; কোনগুলি অনুপম সুগন্ধের জন্য বিখ্যাত, আবার কতকগুলি চমৎকার রং ও অপূৰ্ব্ব বাহারের জন্য প্রসিদ্ধ,—চন্দ্রমল্লিকা, শ্বেতগােলাপ, রক্তগােলাপ, রক্তকরবী, চাপা, কঁাটালিচাপা, কনকচাপা, ;

সাগরিক।
"
কর্ণঠাপ, ডেজী, গাঁদা, জবা, রঞ্জন, সকুরা, মল্লিকা,
কাঠমল্লিকা, যুঁই, চীনে যুঁই, মতিয়া, বেল, গন্ধরাজ,
রজনীগন্ধা, চামেলি, কুন্দ, টগর, কামিনী, কেতকী, মরসুমীফুল
লাইলা, জিরেনিয়ম্, লিলি, ফরগেট-মি-নট, প্যানজি,
সূৰ্য্যমুখী, এলিসিয়ম্, কর্ণফ্লাওয়ার, গ্যালের্ডিয়া, হেলিয়ে।
ট্রাপ, মিনােনেট, ক্যামেলিয়া, হ্যামিলটোনিয়া, প্রিমরােজ,
বু-বে, কাউশ্লিপ, ক্রো ফুট, কক্ক-ফ্লাওয়ার, হনি-স,
সুইট-উইলিয়াম,
হার্ট ঈর্জ,
লভ-ই-আইডেনে,
চ্যাস্মিন, ভায়ােলেট, এ্যানিমােন প্রভৃতি কত রকমের ফুলই
না ফুটিয়া আছে। এই সব ফুলের বাগানের চারিধারে কি
সুন্দর ক্রোটন গাছের বেড়া; এসব ক্রোটন গাছের পাতার
ক বাহার, কোন পাতা লম্বা, কোন পাতা বাদামী, কোন
পাতা চওড়া, কোন পাতা গােল, আবার কোন পাতা বা
কাকড়ানাে। পাতার রংই বা কত রকম ;-কেহ সবুজ, কেহ
বগুনে, কেহ হলদে, কেহ লাল,
কেহ গােলাপী, কেহ
ছিটানাে! আবার এই সব ঘননিবদ্ধ ক্রোটন গাছের বেড়ার
তলায় তলায় কত রকমের লতার অপূর্ব কেয়ারী ! কোথাও
ক্তিকচু, কোথাও পাতাবাহারে, কোথাও বা লজ্জাবতী লতা,
কাথাও রঙিন ঘাস, কোথাও আইভি, কোথাও বা থাই
: সরেলের সুন্দর সুন্দর কেয়ারী !
কোথাও বা সজী বাগান! সজী বাগানে কতরকমের
মানাজ বাগান আলাে করিয়া আছে ! ফুলকপি, বাঁধাকপি,

৫৮
সাগরিক।
চিনাকপি, ওলকপি, শালগাম, সিলারি, পিঁয়াজ, পিঁয়াজকলি,
বীটপলম, ঝাড়পালম, গাজর, কলাইশু টি, মটরশুটি, বরবটি,
ভেভেটি, টমাটো, বেগুন, টেপারি, মূলা, শীম, শ্লেট, করলা,
ঝিঙ্গা, উচ্ছে, ধৃদল, কঁকড়েল, রেস, চিচিঙ্গা, কাকুড়,
স্যালাড, লাউ, কুমড়া প্রভৃতি বাগানের অপূৰ্ব্ব শােভা বিস্তার
করিয়াছে। আবার কোথাও বা বড় বড় ফলের বাগান ! সে সব
বাগানে কত রকমের ফল হইয়া আছে;—আম, কল। চাপা,
মৰ্তমান, কঁাটালি, কাবুলি, কালীবো, চাটিম, চিনিৰ্চাপ, অমৃতি,
সুরভি, গন্ধমুলী, কানাইশী ; আপেল, ন্যাস্পাতি, তরমুজ,
খরমুজ, আনারস, পিচ, কুল, ওয়ালনট, লেবু—বাতাবী লেবু,
কমলালেবু, পাতিলেবু, কাগজি, গোড়াচিনে, চিনেকাগজি,
সরবতী, নারাঙ্গী, চিনেলেবু ; আঙ্গুর, বেদানা, পেয়ারা, বিলাতী
গাব, লিচু, আফল, ফর্সা, কামরাঙ্গা, করমচা, নাদর, আতা,
নােনা, লকেট, আলুবােখরা, আলুচা, আখরােট, আমড়া,
বিলাতী আমড়া, জামরুল, ব্রেট, চালতা, কঁাটাল, বেল,
কদবেল, কাট্‌কমলা, জলপাই, ফিগ, ডুমুর, গােলাপজাম,
বাদাম, খুবানি, খেজুর, পেস্তা প্রভৃতি বাগান আলো করিয়া
আছে। বড় বড় আমবাগানে নানা রকমের আম হইয়া
আছেলে ভা,
বােম্বাই, হিমসাগর, মাদ্রাজী, আল্-
ফলাে, ফজলী, দেলখাে, গােলাপখাস, গােপালভােগ,
গােপালধােপা, কিষণভােগ, মােহনভোগ, সীতাভােগ,
তােতাপুরী।
••

সাগরিকা
ইহা ব্যতীত কত সুগন্ধি গাছ ইউক্যালিপটাস, চন্দন,
কপূর, দারুচিনি, লবঙ্গ, এলাচ, গুগ্গুল, বয়ড়া, রীটা, পাইন,
পেনসিয়ানা প্রভৃতি কত সুন্দর গাছ। সমুদ্রের বাতাস যেন
সেই সব গন্ধে ভরপূর হইয়া আছে ।
রৌদ্রোজ্জ্বল আলােকে পিচ, ও আখরােট গাছের
কচি পাতাগুলি ঝম করিতেছে। সমুদ্রের কোল ঘেঁসিয়া
কত পাহাড়ের শ্রেণী দাড়াইয়া রহিয়াছে। দূরে দূরে জেলেরা
নাছ ধরিবার নৌকায় চড়িয়া সমুদ্রের উপর জাল ফেলিয়া
মাছ ধরিতেছে। নৌকার পালগুলি দূর হইতে মনে হইতে-
ছিল যেন সমুদ্রের জলের উপর সাদা সাদা পাখী সাঁতার
কাটিতেছে। কি সুখী এই জেলেদের জীবন ! ডাঙ্গার মানুষ
হইয়া ও ইহাদের ডাঙ্গার ধূলা বালি ধোঁয়া কলরব কিছুই
ভােগ করিতে হয় না। সমুদ্রের টাটকা বাতাস খাইয়া,
সমুদ্রের অত্যাশ্চর্য দৃশ্য দেখিয়া ইহারা জীবন কাটায়। ।
ইহাদের স্ত্রী ও পুত্রকন্যাগণ সর্বদাই ইহাদের কথা মনে
করিতেছে ; ইহাদের পানে সততই তাহাদের মন চাহিয়া
শেষ রাতে অস্তগামী চাদের ম্লান আলাের তলায়
নৌকা চালাইয়া, হিমে ভিজিয়া যখন ইহার মাছ ধরিয়া ঘরে
ফিরিয়া যায় তখন ইহাদের স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের
ছেলেদের সেই কল-কাকলী ও প্রিয়তমা স্ত্রীর
হনন্দোজ্জল পবিত্র মুখের সুমিষ্ট হাসি দেখিয়া তাহাদের
• আনন্দে ভরিয়া উঠে ; সমস্ত রজনীর ক্লান্তি তাহারা
ঘরে
আছে।
অনিন্দ।
;

সাগরিক।
;
নিমেষে ভুলিয়া যায় ; তাহাদের সমস্ত কষ্টকে সার্থক মনে
|
করিয়া নিজেদের জীবনকে ধন্য বলিয়া মনে করে।
১৬ই ফেব্রুয়ারী আমরা গ্রীস্ পার হই। ১৮ই ফেব্রুয়ারী
আমরা জীব্রাষ্টার প্রণালী পার হই; অর্থাৎ আটচল্লিশ
ঘণ্টার মধ্যে আমরা ভূমধ্যসাগর অতিক্রম করি।
নেডের আশা দুরাশা হইয়া দাড়াইল ; কারণ জাহাজের |
গতি ঘণ্টায় পঁয়ত্রিশ, মাইল, অর্থাৎ প্রতি সেকেণ্ড জাহাজ
চল্লিশ ফুট হিসাবে চলিতেছে । এমন অবস্থায় জাহাজ হইতে
লাফ খাওয়ার অর্থ প্রাণত্যাগ করা।

অষ্টম পরিচ্ছেদ আটলান্টিক মহাসাগর আটল্যান্টি! আটল্যান্টিক মহাসাগর ! কি অসীম, অনন্ত, এই মহাসাগর ! ইহা যেমন অসীম ও বিশাল, তেমনি ভয়ঙ্কর। ইহার জলরাশি আড়াই শত লক্ষ বর্গ মাইল ; ইহা দৈর্ঘ্যে নয় হাজার মাইল, প্রস্থে গড়ে তিন হাজার মাইল। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বড় নদী এই মহাসাগরে আসিয়া পড়িয়াছে—সেন্ট লরেন্স, মিশিশিপি, আমাজন, ল। প্লাটা, ওরিনােকো, নিজার, কঙ্গো, সেনেগাল, এল্ব, লােয়ার রাই। ইহাদের কতকগুলি পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা সভ্যদেশের মধ্য হইতে বহিয়া আসিয়াছে, আবার কতক- গুলি জনহীন প্রান্তর ও গভীর দুর্গম জঙ্গলের মধ্য হইতে আসিয়াছে। ইহার শেষ হইয়াছে দুইটি ভয়ঙ্কর অন্তরীপের শেষ সীমায়—কেপ হর্ণ ও কেপ, অফ, গুড়, হেফ, ( ইহার অর একটি নাম কেপ, অফ, টেম্পেষ্ট, )—যাহার নাম শুনিলে নাবিকগণ ভয়ে কঁপিয়া উঠে। জিব্রাল্টার হইতে জাহাজ ডুবিয়া চলিল। আটলান্টিক মহাসাগরে পড়িয়া এইবার আমরা কোন দিকে যাইব তাহা কিছুই বুঝিলাম না। একদিন জাহাজ জলের উপর

১২
সাগরিক।
ভাসিয়া উঠিল ; আম, নেড, ও কনসে ছাদের উপর গিয়া |
উঠিলাম ; দেখি বারাে মাইল পূৰ্ব্বে কেপ, সেন্ট ভিনসেণ
অতি অসুস্পষ্ট ভাবে দেখা যাইতেছে। আমাদের জাহাজ
এখন স্পেনের পাশ দিয়া চলিতেছে। ঠিক ঝড় নয়, কিন্তু
দক্ষিণ দিক হইতে একটা প্রবল বাতাস বহিতে সুরু
করিয়াছে ; সমুদ্রও ফুলিয়া উঠিয়া ঢেউএর উপর ঢেউ
আছড়াইয়া গৰ্জন করিতেছে। জাহাজ এত দুলিতে আরম্ভ
করিল যে ছাদের উপরে আর থাকা সম্ভবপর হইল না।
নামিয়া আসিয়া ঘরে ফিরিলাম। কনসে নিজের ঘরে
গেল, কিন্তু নে আমার সঙ্গে ঘরে ঢুকিল।
নেডের মনের কথা বুঝিতে পারিয়া তাহাকে বলিলাম,
“নেড, তােমার কথা আমি বুঝছি, কিন্তু এই অবস্থায় জাহাজ
ছেড়ে যাওয়া নেহাৎ নিৰ্বদ্ধির মত কাজ করা
করা হবে।”
নেড, কোন উত্তর দিল না, কপাল ও কেঁচুকাইয়া দাত
দিয়া ঠোট কামড়াইয়া দাড়াইয়া রহিল। তাহাকে আশা
দিয়া বলিলাম, “হতাশ হয়ে না নেড; জাহাজ এইবার
পােগালের পাশ দিয়া যাবে ; কাছেই ইংল্যাণ্ড ও ফ্রান্স,
—পালাবার একটা না একটা সুযােগ মিলবেই।”
নেড়, আমার পানে খানিকক্ষণ চাহিয়া রহিল, পরে
বলিল, “যদি পালাতে হয় ত আজ রাত্রেই পালাব।”
তাহার কথা শুনিয়া আমি চমকাইয়া উঠিলাম।
শীঘ্র পালাবার জন্য আমি মােটেই প্রস্তুত ছিলাম না।

সাগরিকা
নেড,
(এমন
বলিতে লাগিল, “আজ রাত্রিই ঠিক্ সময় ; সামনেই
স্পেনের উপকূল, মেক্লা রাত, ঝড়ও বেশ বইছে ;
সুযােগ আর মিলবে না। বলুন, আজ, রাত্রে পালাবেন?”
আমার মুখ হইতে কোন কথা বাহির হইল না। নেড,
বলিল, “আজ রাত্রিতে ঠিক ন'টার সময় ! কনসেলকে
আমি ঠিক হতে বলেছি ; সেও প্রস্তুত হয়ে থাকবে। রাত
নটার সময় ক্যাপটেন নিশ্চয় নিজের ঘরের ভিতর থাকবেন,
হয়ত বা বিছানায় শুয়ে পড়বেন। নাবিকেরা যে যার কাজে
থাকবে, কেও দেখতে পাবে না। নৌকায় দাড়, পাল,
মাস্তুল সবই ঠিক করা
ঠিক্ করা আছে। একটা রেঞ্চ, জোগাড়
করেছি, নৌকাটা জাহাজের সঙ্গে প্যাচ, স্কু দিয়ে আটা
আছে, খুলতে কোন কষ্ট হবে না।”
আমি বলিলাম, “কিন্তু সমুদ্রের অবস্থা দেখছ ত!”
নেড, বলিল, “স্বাধীনতা পেতে গেলে এইটুকু কষ্ট করতে
হবে বৈ কি। নৌকায় চড়ে যাব ত ভয় কি, আর ক'মাইলই
বা ?”
নেড়, চলিয়া গেল। আমি কাঠ হইয়া বসিয়া রহিলাম ;
এখন কি করিব ? নেডের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা —আজই পালাইতে
হইবে। সত্যি, নেড, ত ঠিক কথাই বলিয়াছে, এমন সুযােগ
চট্‌ করিয়া মিলিবে না, কাল হয়ত ক্যাপটেন ডাঙ্গা হতে শত
শত মাইল দূরে আমাদের লইয়া যাইবেন কি না তা কে
••
বলিতে পারে ?

৬৪
সাগরিক।
;
এই সময় হিস্ হিস্ করিয়া শব্দ হইতে লাগিল; বুঝি-
লাম জাহাজ জলের ভিতর ডুবিতেছে। সমস্ত দিন নিঃঝুমের
মত বসিয়া রহিলাম। একদিকে স্বাধীনতার প্রবল প্রলােভন,
আর একদিকে সমুদ্রজগতের নূতন নূতন জীবজর কথা
জানিবার বিপুল আগ্রহ। সময় যেন ভয়ঙ্কর হইয়া উঠিল।
কেবল শুনিতেছি আর ক'ঘণ্টা বাকি ? বহুদিন পরে দেশে
ফিরিব ভাবিয়া মনের কোণে খুসির আভাস উকিঝুকি
মারিতে লাগিল, আবার দুঃখও
আবার দুঃখও হইতে লাগিল। যাই
হােক্, পালানাে নিশ্চিত জানিয়া জিনিষ পত্র গুছাইতে
লাগিলাম ; কাপড় চোপড় ঠিক করিয়া লইলাম, লেখার
যে সব নােট করিয়াছিলাম তাহাও গুছাইয়া লইলাম ।
ক্যাপটেনের কথা ভাবিয়া মনে একটু দুঃখ হইল । কাল
সকালে ক্যাপটেন যখন দেখিবেন যে আমরা সরিয়া পড়িয়াছি
তখন তাহার কিরূপ মনের অবস্থা হইবে ? এত অভ্যর্থনা,
এত আদর যত্নের এই ফল? তিনি ভাবিবেন মানুষকে
আবার বিশ্বাস করিয়া বেশ শিক্ষা পাইয়াছি। তারপর
ক্যাপটেনের সঙ্গে দেখা করিবার ও তাহার সহিত শেষ
বারের মত কথা কহিবার জন্য বড়ই ইচ্ছা হইল।
সময় যেন আর কাটে না। সন্ধ্যা সাতটা বাজিয়া গেল,
এখনও একশ কুড়ি মিনিট বাকি! উত্তেজনার দরুণ বুক
ঢিপ ঢিপ, করিতে লাগিল; স্থির হইয়া বসিয়া থাকিতে
পারিলাম না, ছট্‌ফট্‌ করিতে লাগিলাম। স্যালুনে গিয়া শেষ

সাগরিক। বারের মত ক্যাপটেনের মিউজিয়াম্ দেখিতে গেলাম ; মিউজিয়ামের সঞ্চিত অমূল্য জিনিষগুলি ছাড়িয়া যাইতে মন সরিল না। কাচের জানালার কাছে আর একবার গিয়া বসিতে ইচ্ছা হইল । কতদিন এখানে বসিয়া কত আনন্দ পাইয়াছি! আট। বাজিল। জাহাজ তখনও ষাট ফুট নীচে ডুবিয়া উত্তর দিকে চলিতেছে । চারিদিক নিস্তব্ধ ; ধু ইঞ্জিনের ঘচ, ঘচ, শব্দ । নয়টা বাজিতে আর কয়েক মিনিট মাত্র বাকী । নেডের ঘরের দরূজার উপর কান পাতিয়া শুনিলাম, কোন শব্দ নাই। কোন শব্দ নাই। নেডের প্রতীক্ষায় নিজের ঘরের ভিতর গিয়া বসিলাম। জাহাজ চলিতে চলিতে হঠাৎ থামিয়া গেল ; তারপর ঈষৎ একটা ধাক্কা অনুভব করিলাম। বুঝিলাম জাহাজ সমুদ্রের তলায় গিয়া নামিয়াছে। ন’টা বাজিয়া গেল ; নেড, আসিল না। সময় ঘরের দরজা খুলিয়া ক্যাপটেন নিমাে প্রবেশ করি- লেন। তাহাকে দেখিয়া দেখিয়া আমি চমকাইয়া উঠিলাম। ক্যাপটেন বলিলেন, “স্পেনদেশের ইতিহাস আপনি কিছু জানেন, প্রফেসার ?” তারপর ক্যাপটেন নিমো একটা সােফায় বসিয়া স্পেনের সুদীর্ঘ ইতিহাস বলিতে আরম্ভ করিলেন। মধ্য যুগে স্প্যানিশরা কিরূপ প্রবল হইয়া উঠিয়াছিল, জগতের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বলবান জাতি বলিয়া তাহাদের অহঙ্কারের কথা, নৃতন দেশ জয় করিবার তাহাদের প্রবল আগ্রহ-

সাগরিকা
;
;
;
এই সমস্ত কথা একে একে বলিতে লাগিলেন।
কলাম্বাস্
তখন সবে আমেরিকা আবিষ্কার করিয়াছেন; স্প্যানিশরা
সেই দেশে গিয়া জাহাজে করিয়া কত তাল তাল সােনা।
দেশে আনিতে লাগিল। আমেরিকায় তখন স্প্যানিশদের
একচ্ছত্র আধিপত্য। এদিকে ইংরাজরাও আমেরিকার
দিকে ঝুকিতে লাগিল। স্পেন রাগিয়া গেল ; ছােটখাটো
বিবাদ হইতে অবস্থা ক্রমে প্রবল হইয়া দাড়াইল। সমুদ্রের
উপর ইংরাজ জাহাজদের সঙ্গে স্প্যানিশ, জাহাজদের প্রায়ই
যুদ্ধ হইত। ভিগো উপসাগরে এমনি একটা যুদ্ধ হয় ; সেই
যুদ্ধে স্প্যানিশ
শর।
ইংরাজদেব কাছে হারিয়: যায়।
স্প্যানিশদের জাহাজে শত শত মণ সােনার তল ; শত্রু
হস্তে সেই সব পড়িবে দেখিয়া স্প্যানিশরা নিজেদের
জাহাজে আগুন লাগাইয়া দেয়। জাহাজ ডুবিয়া গেল ।
অত সােনার তাল ও জলের তলায় সমাধি লাভ করিল ।
ক্যাপটেন বলিলেন, “ভিগে। উপসাগরে আমরা
এসেছি ; সেই সব ঐতিহাসিক কাহিনী যদি চাক্ষুষ দেখতে
চান ত আমার সঙ্গে আসুন।”
ক্যাপটেনের সঙ্গে গিয়া দেখি জাহাজ ভূমির উপর স্থির
হইয়া রহিয়াছে ; উজ্জ্বল ইলেকটি ক আলােয়
হইতে আধ মাইল পর্যন্ত সমুদ্রতল আলােকিত হইয়া
উঠিয়াছে। পরিষ্কার বালির উপর বহুদিনের পচা কাঠ, মরচে
ধরা লােহার চেন, নােঙর ; আর তার মাঝে মাঝে চাই চাই
;

সাগরিক।
৬৭
••
;
সােনার তাল। জাহাজের কতিপয় নাবিক যত পারিল
সোনা জাহাজে আনিয়া তুলিল ; যাহা পড়িয়া রহিল
তাহাও যথেষ্ট।
১৭০২ খৃষ্টাব্দে যাহা ঘটিয়াছিল আজ তাহা
নজের চোখে দেখিলাম। এখন বুঝিলাম ক্যাপটেন নিমে।
কিরূপ ধনী ; এই সবের তিনিই একমাত্র অধিকারী।
ক্যাপটেন নিমাে বলিলেন, “জগতের মধ্যে অনেক
দরিদ্র জাতি আছে, বলবানের কাছে তাহার।
চিরকাল
বঞ্চিত, লাঞ্ছিত ও অবমানিত হয়ে আসছে। এই সব সোনা
তাদের আমি দিয়া থাকি।”
ক্যাপটেনের কথা শুনিয়া সসম্রামে আমার মাথা নুইয়া
আসিল। দরিদ্রের জন্য তাহার এত দরদ । তখন বুঝিলাম
ভূমধ্যসাগরের মধ্যে যে লােকটা সাঁতার কাটিতেছিল
ক্যাপটেন নিমাে
নিমম কেন
তাহাকে অত তাল তাল সোনা।
বিলাইয়া দিলেন।

নবম পরিচ্ছেদ
জলমগ্ন নগরী
পরদিন ১৯শে ফেব্রুয়ারী। সকালবেলায় নেড়, আসিয়া
অামার ঘরে প্রবেশ করিল। তাহার মলিন নিষ্প্রভ
দৃষ্টি ও ম্লান হতাশভাব দেখিয়া আমার বাস্তবিক দুঃখ
হইতে লাগিল।
আমি বলিলাম, “নেড, আমাদের কপাল বড়ই মন্দ।”
নেছ, বলিল, “ই, যে সময় পালাবার কথা ঠিক সেই
সময় জাহাজ জলের তলায় এসে ঠেকল।”
আমি বলিলাম, “হাঁ, তখন ক্যাপটেন নিমে। তাহার
ব্যাঙ্ক দেখতে নেমেছিলেন।”
নেড, বিস্মিত হইয়া চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া জিজ্ঞাসা
করিল, “ব্যাঙ্ক দেখতে, সে কি ?”
তখন রাত্রির ঘটনা সব একে এ,
এ খুলিয়া বলিয়া
আমি কহিলাম, “ইউরােপের ব্যাঙ্কের লোহার সিন্দুকের
ভিতর টাকা রাখার চেয়ে ক্যাপটেন নিমোর ব্যাঙ্ক ঢের বেশী
নিরাপদ। এখানে মানুষের প্রবেশ একেবারে নিষেধ।”
বিস্ময়ের ভাব কাটিলে পর নেড, বলিল, “চুলোয় ২
ওসব কথা। কাল হ’ল না বলে হতাশ হবেন না, এর পরে
নিশ্চয় আরো সুযােগ আসবে।”

সাগরিক ৬১ ; নেড, চলিয়া গেল। জামাকাপড় পরিয়া স্যালুনে গিয়া কম্পাস দেখিয়া বুঝি- লাম নােটিলস্ এখন দক্ষিণ-দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে চলিতেছে। অর্থাৎ জাহাজ এইবার ইউরােপকে পশ্চাতে রাখিয়া দূরে সরিয়া পড়িতেছে। বেলা এগারােটার সময় জাহাজ জলের উপর ভাসিয়া উঠিল। ছুটিয়া ছাদের উপর গেলাম, নেড, আগেই উপস্থিত হইয়াছে। দেখি চারিদিকে কোথাও ডাঙ্গার চিহ্ন নাই; চারিদিকে যতদূর দৃষ্টি চলে কেবল কালাে জল পাগলের মত নাচিতেছে। আকাশ বড়ই মেঘলা ; জলের অবস্থা খুবই খারাপ, বড় বড় ঢেউ উঠিতে লাগিল। বুঝি- লাম ডাঙ্গা হইতে আমরা বহুদূরে আসিয়া পড়িয়াছি। আট- ল্যান্টিক মহাসাগরের সে কি ঘাের নিকষ কাজল মূর্তি! দেখিলে প্রাণ শিহরিয়া ওঠে, হৃদয় কাপিয়া ওঠে! মনে হয় যেন কোন্ যাদুকরী মায়াবলে এখনি আমায় তাহার বুকের পর সাপটিয়া টানিয়া ধরিবে ও মূহূৰ্ত মধ্যে আমাকে পিষিয়া গিলিয়া খাইবে। পাগলিনীর মত সেই গভীর কালো জলের সে কি উচ্ছল, উত্তাল, উদ্যাম উচ্ছল নৃত্য! সে কি এক একটা বড় বড় ঢেউ। ঢেউএর পর ঢেউ ; যেন ইহাদের শৰ নাই, ক্লান্তি নাই, কৰ্ম্মে অবসাদ নাই, পাগলামীর এই পায়ের যেন কোন গ্লানি নাই। ফুলিয়া ফুলিয়া, ঘুরিয়া ওয়া, ঢেউগুলি এটার উপর আর একটা লাফাইয়া পাইয়া পড়িতেছে। বীচি-বিক্ষোভিত মত্ত জলরাশির

৭০
সাগরিকা
একথা
;
সে কি ভয়ঙ্কর আবর্তন-বিবর্তন, সে কি উন্মাদ উদ্দাম লক্ষন
ঝম্পন, সে কি ক্রুর কুটিল ভয়াবহ আকর্ষণ ও বিকর্ষণ।
সমুদ্রের সেই রুদ্র ভয়ঙ্কর মূর্তি দেখিয়া গায়ে কাঁটা দিতে
লাগিল। নিজের ঘরে ফিরিয়া আসিলাম।
ক্যাপটেন নিমো ঘরের ভিতর ঢুকিলেন ।
একথার পর তিনি বলিলেন, “আর একদিন সমুদ্রের তলায়
বেড়াতে যাবেন প্রফেসার ?
প্রফেসার ? . এতদিন ৩ দিনের বেলায়
গিয়াছিলেন, সূর্যের আলােও যথেষ্ট ছিল ; এইবার একদিন
ঘাের দুপুর রাত্রির অন্ধকারে সমুদ্রের তলায় বেড়িয়ে
আসবেন চলুন।”
আমি তখনি আহলাদের সহিত আমার সম্মতি জানাইলাম।
ক্যাপটেন বলিলেন, “কিন্তু রাস্তা এইবার বড় খারাপ,
অনেক হাঁটতে হবে । যেতে যেতে একটা পাহাড় পার
হ’তে হবে, পথে অনেক বড় বড় গর্ত পড়বে।”
আমি বলিলাম, “আপনার কথা শুনে আমার এখুনি
যেতে ইচ্ছা করছে।”
ক্যাপটেন বলিলেন, “বেশ, তাই চলুন।”
তাহার সঙ্গে পােষাক পরিবার ঘরে গিয়া ডুব-পােষাক
পরিলাম। এইবার সঙ্গে কেহই যাইবে না, কেবল আমরা
দুজন। সমস্ত সরঞ্জাম পরিয়া যাইবার উদ্যোগ করিতে
লাগিলাম। এইবার সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে বাতাস লওয়া
হইল; কিন্তু সঙ্গে আলো লওয়া হইল না। ক্যাপটেনকে
;

সাগরিকা
৭১
কারণ জিজ্ঞাসা করিলাম, তিনি বলিলেন, “আলাের কোন
প্রয়ােজন নাই।” সঙ্গে করিয়া দুইজনে দুইটা লােহার
ডাণ্ডা লইলাম।
রাত তখন ঠিক দুইটা হইবে। গভীর অন্ধকারের
মাঝখানে আটলান্টিক মহাসাগরের অতল তলে পা দিয়া
নামিলাম। আজ ও সেকথা মনে পড়িলে গায়ে কাঁটা দিয়া
ওঠে। সেই স্থানের গভীরতা নয় হাজার ফুট। চতুর্দিক
ভীষণ অন্ধকার! কিছুক্ষণ চলিবার পর দুই মাইল দূরে দেখি-
লাম একটা লাল ভাটার মত কি রহিয়াছে ; যেন বহুদূরে
একটা উজ্জ্বল আলো জ্বলিতেছে। আটলান্টিক মহাসাগরের
অত তলায় যে কি আলো জ্বলিতেছে কিছুই বুঝিলাম না।
যাই হােক, আলো ধরিয়া অগ্রসর হইলাম। মাথার
উপর কিসের শব্দ হইতে লাগিল—একটানা ঝমঝম্‌ঝম্
শব্দ, বুঝিলাম উপরে ভয়ানক বৃষ্টি হইতেছে,-এ তাহারই
শব্দ।
আধঘণ্টা পথ চলিবার পর রাস্তা ক্রমশঃই পাথুরে ও
এবরােখেবরে হইতে লাগিল। সেই সব পাথরের উপর
একরকম জলীয় শ্যাওলা হইয়াছে, অনেকবার পা হরকাইয়া
গেল, লােহার ডাণ্ডা ধরিয়া চলিতে লাগিলাম।
সামনে চলিতে লাগিলাম আলো ততই উজ্জ্বল হইতে
লাগিল। এত তলায় এত উজ্জ্বল ও কিসের আলো ? দেখি-
লাম সুমুখে যেন দাউ দাউ করিয়া ভীষণ আগুন জ্বলিতেছে ।

१२ সাগরিক। as a - ব্যাপার কিছুই বুঝিলাম না, আরো কাছে গিয়া দেখিলাম, সামনে একটা মস্ত বড় পাহাড় রহিয়াছে, তাহারই ওধার হইতে আগুন উঠিতেছে। ক্যাপটেন অভ্যস্তের মত ক্ষিপ্র- পদে চলিতে লাগিলেন, আমি অনভ্যস্ত সন্ত্রস্তপদে সাবধানে ভয়ে ভয়ে পাথর ও গর্ত ডিঙাইয়া তাহার পিছনে পিছনে চলিতে লাগিলাম । সামনে দেখি একটি বিস্তৃত জঙ্গল। দেবদারু গাছের মত একরকম বড় বড় গাছ, কিন্তু সমস্তই মরিয়া গিয়াছে ; গাছে একটাও পাতা নাই, কিন্তু ডাল- পালা সমস্তই ঠিক আছে। সমস্তই যেন পাথর হইয়া গিয়াছে, তারপর বুঝিলাম গাছগুলি সমস্ত কয়লা হইয়া গিয়াছে। পাথর ও গর্তের উপর দিয়া চলিতে লাগিলাম। এক জায়গায় পাথরের দুধারে বড় বড় গর্ত-সে যে কত নীচু বলিতে পারি না; নীচে তাকাইতে ভয় হইতে লাগিল। এই সব গর্তের ভিতর যে কি আছে তা কে জানে। হয়ত এই গর্তের ভিতর হইতে এখনি একট। কিম্ভুতকিমাকার প্রকাণ্ড জলজন্তু বাহির হইয়া আসিবে। এক একস্থানের প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড গহ্বর, যেন হা করিয়া গিলিতে আসিতেছে। কোথাও পথ এত বিশ্রী যে একবার পা হরকাইয়া গেলে একেবারে। পাতালদেশে চলিয়া যাইব। কোথাও লাফ মারিয়া একটা পাথর হইতে আর একটা পাথরে যাইতে লাগিলাম, মাঝখানে প্রকাণ্ড গহ্বর। সেই লােহিত আলােয়

সাগরিক।
দেখিলাম মাথার উপর বড় বড় পাথর ঝুলিয়া রহিয়াছে
চারিদিকেই প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড কালো কালাে পাহাড়।
দুইঘণ্টা এমন ভাবে চলিতে লাগিলাম ।
পায়ের তলা
হইতে বড় বড় মাছ সরিয়া যাইতে লাগিল । পাহাড়ের
গায়ে বড় বড় গম্বর।
এক একটা গম্বরের দ্বারাদেশে
প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড দাড়া মেলিয়া কি সব বসিয়া রহিয়াছে ;
আমার সর্বাঙ্গ হিম্ হইয়া যাইল ; আমাদের দেখিয়া
দাড়াগুলি ভিতরে ঢুকিয়া যাইতে লাগিল; কিন্তু তাহার
আকারে আমাদের ' দশগুণ, একটা দাড়ার ঘায়ে আমরা
অক্লেশে শুইয়া পড়িব। কেই কেহ এক একট। দাড়া
বাড়াইয়া দিয়া আমাদের লৌহ আচ্ছাদনের উপর
স্পর্শ করিয়া আমাদের পরীক্ষা করিতে লাগিল। আমাদের
পায়ের তলায় প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড গর্ত ; সে সব গম্বর
একেবারে পাতলদেশে নামিয়া গিয়াছে ; তাহার ভিতরে
হাজার হাজার চক্ষু জ্বলিতেছে, সে সব ভীষণ জলজন্তুর জ্বলন্ত
নিজের নিজের গর্তে বসিয়া তাহারা বিশ্রাম করিতেছে।
কোথাও বড় বড় চিংড়ী মাছ পাথরের উপর অতি ধীরে ধীরে
চলিয়া ফিরিতেছে—দৈর্ঘ্যে তাহারা এক একটা মানুষের মত।
কোথাও বা রাক্ষুসে কঁাড়া বসিয়া রহিয়াছে—যেন এক
একটি বাগী গাড়ী! কোথাও বা অতিকায় কচ্ছপ পা উচু
করিয়া গলা বাড়াইয়া মাথা নাড়িতেছে ; তাহার খােলর
মধ্যে পাঁচ ছয়টা মানুষ অক্লেশে ঢুকিতে পারে। কোথাও বা
চ;

৭৪
সাগরিক।
ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর অক্টোপাস তাহাদের পা বা শুড়গুলি জড়াজড়ি.
করিয়া বসিয়া রহিয়াছে ; এক একটি পা যেন এক একটি
;
অক্টোপাস্
ময়াল সাপ ! আশেপাশে কিম্ভুতকিমাকার আকৃতিবিশিষ্ট
আলোক-মাছ ঘুরিয়া বেড়াইতেছে তাহাদের গা হইতে
কেবলই আললা বাহির হইতেছে।
এই সময় প্রশস্ত চাতালের মত পাহাড়ের এক জায়গায়

সাগরিকা
৭৫
আসিয়া উপস্থিত হইলাম । এবার আর একটি নূতন দৃশ্য !
সামনে বহুদূর বিস্তৃত ধ্বংসপ্রাপ্ত অট্টালিকা, দুর্গ, মন্দির ও
থামের শ্রেণী দেখিতে পাইলাম। এ ত ভগবানের সৃষ্টি নয় ;
সমুদ্রের এত তলায় মানুষের হস্তনির্মিত কার্যাবলী দেখিয়া
বিস্মিত হইলাম। চারিদিকে বড় বড় পাথর পড়িয়া রহিয়াছে,
কিন্তু তাহার মাঝে মাঝে বহু পুরাতন ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরবাড়ী
দাড়াইয়া রহিয়াছে। এইরূপ সহস্র সহস্র অট্টালিকা দেখিতে
পাইলাম। কোথাও বা বাজার রহিয়াছে, চারিদিকে
দোকানের শ্রেণী ; কোথাও মন্দিরের মত গৃহ রহিয়াছে ;
কোথাও বা বড় বড় কেল্লা, বন্দর প্রভৃতি অস্পষ্টভাবে বুঝ?
যাইতেছে।
এক এক স্থানে ভগ্ন দেওয়ালের শ্রেণী বহুদূর
পর্যন্ত চলিয়া গিয়াছে। ভগ্ন সৌধশ্রেণীর মাঝ দিয়া প্রশস্ত
রাজপথ রহিয়াছে।
এ কোথায় আসিলাম ? ক্যাপটেনকে জিজ্ঞাসা করিতে
গেলাম, কিন্তু তখনি নিজের অক্ষমতা বুঝিতে পারিলাম ।
কি করি ; ক্যাপটেনের বাহু ধরিয়া একটা ঝকানি দিলাম ।
ক্যাপটেন আমাকে ইসারা করিয়া তাহার সঙ্গে আরো
অগ্রসর হইতে বলিলেন। ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরীর তাপর পার্শ্বে ই
সেই পূৰ্ব্বকথিত পাহাড়ের চূড়াটি দেখা যাইতেছে। পাহা-
ছের উচ্চতা প্রায় আটশত ফুট হইবে । শিখরের উপরিভাগ
হইতে উজ্জ্বল আলােকের মত দাউ দাউ করিয়া কি যেন
স্বলিতেছিল। বুঝিলাম ইহা একটি আগ্নেয়গিরি। সেই

সাগরিক। পৰ্বতশিখরের উপরিভাগে গৰ্ত্ত হইতে পঞ্চাশ ফুট উৰ্দ্ধ পৰ্যন্ত বড় বড় পাথরের নুড়ি ছিটুকাইয়া বাহির হইতেছিল ও তাহার সঙ্গে ধূম ও ভস্ম প্রবল বেগে নির্গত হইতেছিল। আগ্নেয়গিরি হইলেও কোনপ্রকার আগুন বাহির হইতেছিল না, কিন্তু সেই সকল উত্তপ্ত ধাতুনিঃস্রণ হইতে একটা অতি ভীষণ উজ্জ্বলতা বাহির হইতেছিল ; তাহাতেই চারিদিক আলােকিত হইতেছিল। আগ্নেয়গিরির নিকটবর্তী জলরাশি কেবল পুঞ্জীভূত বাষ্পের মত দেখাইতেছিল। ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরীর এইরূপ শােচনীয় অবস্থার কারণ এইবার বুঝিলাম। আগ্নেয়গিরির প্রবল অগ্ন্যুৎপাতে ও ধাতু- নিঃস্রবে সমস্ত নগরী প্লাবিত ও একেবারে নষ্ট হইয়া গিয়াছে। কিন্তু এ কোন দেশ? ক্যাপটেন নিমাে আমার ব্যাকুলতা বুঝিতে পারিলেন, ভূমি হইতে একখণ্ড পাথুরেখড়ি লইয়া একটা দেওয়ালের উপর লিখিলেন, “য়্যাটল্যান্টি”। ধ। করিয়া মনের ভিতর দিয়া যেন একট। উল্কা ছুটিয়া নাম দেখিয়া চমকাইয়া উঠিলাম। এই সেই ইতিহাস-প্রসিদ্ধ য়্যাল্যানটি নগরী! প্লেটো, প্লিনি প্রভৃতি প্রাচীন ঐতিহাসিকগণ যে নগরীর অতুল ঐশ্বৰ্য্য ও পরাক্রমের কথা এত করিয়া প্রশংসা করিয়া গিয়াছেন। এইখানে অসমসাহসী য্যাটল্যানটাইড়গণ বাস করিতেন— যাহাদের সঙ্গে গ্রীক বীরপুরুষগণ কতবার যুদ্ধ করিয়াছেন। ভূমিকম্প, অগ্ন্যুৎপাত, বাড়বাগ্নি প্রভৃতি পৃথিবীর অভ্য- গেল।

সাগরিক ; ন্তরস্থিত অসীম শক্তির প্রয়ােগে পৃথিবীর উপরিস্থিত দেশ সকল ক্রমশঃই রূপান্তরিত হইতেছে। আজ যেখানে মহাদেশ রহিয়াছে, সহস্র বৎসর পরে হয়ত সেখানে মহাসমুদ্র বিরাজ করিবে ; আজ যেখানে মহাসাগর রহিয়াছে সহস্র বৎসর পরে সেখানে মহাদেশ জাগিয়া উঠিবে। এইরূপ নিয়তই হইতেছে। এককালে হিমালয় পর্বতশ্রেণী, রাজপুতনা, আফ্রিকার সাহারা মরুভূমি, আরব, • বেলুচিস্থান, থর্ ও গােবি মরুভূমি সমস্তই সমুদ্রতলে নিমগ্ন ছিল। তখন এই সকল জায়গায় একটি মহাসাগর বিদ্যমান ছিল। আবার আফ্রিকার দক্ষিণ- ভাগ, ম্যাডাগাস্কার, মালদিভ, দ্বীপ, ভারতবর্ষের দক্ষিণ ভাগ, আন্দামান, নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, সুমাত্রা, জাভা, সেলিবিস্, বাের্নিও, ফিলিপাইন, নিউগিনি, অষ্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশগুলি এক সঙ্গে যুক্ত ছিল ; এখন তাহার কতক কতক অংশ সমুদ্র- জলে ডুবিয়া গিয়াছে। এই য়্যাল্যাটিস্ দেশ এবং আগ্নেয়- গিরিও এক সময় জলের উপরিভাগে ছিল, কালক্রমে সমুদ্রজলে নিমগ্ন হইয়াছে। প্রায় একঘণ্টা ধরিয়া চারিদিকে ঘূরিয়া ফিরিয়া এই প্রাচীন নগরীর শােভা ও সৌন্দর্য্য দেখিতে লাগিলাম। এই সময় চঁাদ উঠিল ; জলের ভিতর দিয়া চাদের ক্ষীণ আবছা আলােকে সমস্ত নগরী যেন মৃতব্যক্তির ফ্যাকাসে মুখের মত দেখাইতে লাগিল। যখন জাহাজে ফিরিয়া আসিলাম তখন ভাের হইতে আর বেশী দেরী নাই।

দশম পরিচ্ছেদ এ কোথায় আসিলাম পরদিন ২০শে ফেব্রুয়ারী। পূৰ্ব্ব রজনীর পরিশ্রমের দরুণ আজ অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমাইয়া ছিলাম ; ঘুম যখন ভাঙ্গিল তখন বেলা এগারটা। জাহাজ এখন তিনশ ফুট জলের তলা দিয়া বিশ মাইল বেগে ছুটিতেছিল। আট- ল্যান্টিক মহাসাগরের মাছগুলি অন্যান্য সমুদ্রের মাছের চেয়ে তাপেক্ষাকৃত বৃহদাকৃতির। এক একটা মাছ এত বড় যে দৈত্য বলিলেও চলে, অথচ তাহার আকৃতি ঠিক মাছের মত। জাতীয় মাছ পনের ফুট দীর্ঘ, তাহাদের শরীরে অসীম শক্তি। বড় বড় নানা জাতীয় হাঙর ও গ্লোক দেখিলাম । শ্লোক- গুলি পনের ফুট দীর্ঘ, শরীর এত স্বচ্ছ যে জলের সঙ্গে তাহা একবারে মিলিয়া গিয়াছে, চট করিয়া বুঝিতে পারা যায় না। বড় বড় সাপ অনেকরকম বড় বড় সাপ, প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড ব্যাঙ, জলের

সাগরিক।
ভিতর বেড়াইতেছে দেখিলাম । একরকম মাছ দেখিলান
তাহা কেবল হাড়, অথচ তাহারা জীবিত। ম্যাক্যায়রা নামক
একরকম ঘাের কৃষ্ণবর্ণ মাছ দেখিলাম, দৈর্ঘ্যে পনের ফুট।
তরােয়াল মাছ দৈর্ঘ্যে চব্বিশ ফুট, ঝাঁকে ঝাঁকে জলের ভিতর
ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। ইহা ব্যতীত দেবদূত মাছ, ডােরিমাছ,
রাশ,মাছ, মুলেটু মাছ প্রভৃতি কতরকম মাছই না দেখিলাম !
প্রকাণ্ড ব্যাঙ
এই সময় জলের ভিতর আবার পাহাড়ের শ্রেণী দেখিতে
পাইলাম।
খাড়া পাথরের দেওয়ালের পাশ দিয়া জাহাজ
চলিতে লাগিল। বুঝিলাম ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ বা কেপ,

সাগরিক
ভার্ডের নিকট জাহাজ আসিয়াছে।
জাহাজ স্থির হইয়া
দেবদূত মাছ
দাড়াইয়াছে দেখিয়া আমি ঘরে ফিরিয়া ঘুমাই বার চেষ্ট।
করিলাম ।

সাগরিকা
৮১
ঘুম ভাঙ্গিল একেবারে পরদিন বেলা আটটার সময় ।
ছাদের উপর গিয়া দেখি জাহাজ জলের উপর
রাশ মাছ।
মুলে মাছ
ভাসিতেছে, কিন্তু চতুর্দিকে ঘাের অন্ধকার—যাহাকে বলে
সূচীভেদ্য অন্ধকার। ঘাের অন্ধকার রাত্রিতে যেমন সামনে

৮২
সাগরিকা
মানুষের মুখ দেখা যায় না, এও সেইরকম অন্ধকার ; অথচ
দিনের বেলা! এ কি হইল ? কোথায় আসিলাম? তবে কি
এখন রাত্রি ? না, এইমাত্র ত ঘড়ি দেখিয়া আসিলাম। কৈ,
মাথার উপর ত একটাও তারা দেখা যাইতেছে না? বলিতে
কি রাত্রিবেলাও এমন ঘাের বিদঘুটে অন্ধকার সচরাচর
দেখা যায় না।
ডােরি মাছ
,
এমন সময় আমাকে সম্বােধন করিয়া কে বলিল,
“এই যে, প্রফেসার ?”
বুঝিলাম ক্যাপটেন নিমো কথা কহিতেছেন। তাহাকে
জিজ্ঞাসা করিলাম, “এ কোথায় আসিলাম, ক্যাপটেন ?”

সাগরিক।
ক্যাপটেন বলিলেন, “মাটির তলায়।”
আমি বলিলাম, “মাটির তলায়, অথচ জাহাজ জলের
উপর ভাসছে!”
ক্যাপটেন বলিলেন, “ব্যস্ত হবেন না, সবই বুঝতে
পারবেন, প্রফেসার। একটু এখানে দাড়ান, আমি আলো
নিয়ে আছি।”
এমন অন্ধকার যে, ক্যাপটেনকে মােটেই দেখিতে
পাইলাম না। উপর পানে তাকাইয়া দেখিলাম একটা
অতি ক্ষীণ অস্পষ্ট আলো অনেক উদ্ধে একটা গােলাকার
গর্তের মধ্য দিয়া আসিতেছে ; আসিতে আসিতে মাঝ পথেই
সেটা শেষ হইয়া গিয়াছে। যেখানে দাড়াইয়াছিলাম সেখানে
ঘাের অন্ধকার ; উপরেই শুধু সেই ক্ষীণ আলো--নীচে
মােটেই নামিতেছিল না।
এই সময় ক্যাপটেন আলো লইয়া আসিলেন ; উজ্জ্বল
ইলেটিক্ আলােয় চোখ ঝাইয়া গেল। দেখিলাম
একটা পাহাড়ের পাশে নােটিলস্ স্থির হইয়া আসিতেছে।
এটা একটা হ্রদ, চারিদিকেই পাহাড়ের উচ্চ দেওয়াল ; হ্রদের
মারুতি গােলাকার, তার ব্যাস প্রায় দুই মাইল। হুদাকে
বেষ্টন করিয়া গােলাকার পাহাড়ের দেওয়াল অনেক উদ্ধে
উঠিয়াছে, প্রায় ছয়শত ফুট হইবে; কিন্তু সােজাভাবে অর্থাৎ
থাড়াই না উঠিয়া ঠিক গম্বুজের মত ক্রমশঃ হেলিয়া
Fাঝখানে মিশিয়াছে ; কেবল মাথার উপর ছােট্ট একটি
;
•

৮৪
সাগরিকা
ফুকর; এই ফুকর ব্যতীত আলো বা বায়ু প্রবেশের পথ
আর কোনখানে নাই। একটা ফু দিল উল্টাইয়া রাখিলে
যেরূপ দেখায় পাহাড়ের ভিতরের আকৃতি অনেকটা
সেইরূপ।
ম্যানােমিটার দেখিয়া বুঝিলাম বহিঃস্থিত সমুদ্রের ও এই
হদের জলের উপবিভাগ সমতল ; অর্থাৎ হুদের সঙ্গে সমুদ্রের
কোন জায়গায় যােগ আছে। পাহাড়ের পাশেই সমুদ্র ;
জলের ভিতর পাহাড়ের কোন জায়গায় নিশ্চয়ই কোন
গৰ্ত্ত আছে।
ক্যাপটেনকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “এ কোথায় আসিলাম,
ক্যাপটেন ?”
ক্যাপটেন বলিলেন, “একটা আগ্নেয়গিরির মধ্যে, কিন্তু
এখন এটা নিবে গেছে। ভূমিকম্পের দরুণ পাহাড়ের
দেওয়ালের মধ্যে একটা ফাটল হওয়াতে তার মধ্য দিয়া
সমুদ্রের জল ভিতরে ঢোকে তাহাতে
তাহাতে এই আগ্নেয়গিরি
নিবে যায়। আপনি যখন ঘুমুচ্ছিলেন, সেই সময় নােটিল
জলের ত্রিশ ফুট নীচে একটা গর্ত দিয়ে এর ভিতরে ঢােকে।
নােটিলসের একটা আশ্রয় বা বন্দর চাই, সেইজন্য এই
জায়গাটা বেছে নিয়েছি ; এখানে ঝড়ের ভয় নেই, ঢেউএর
ভয় নেই, দ-তরের ভয় নাই। এমন সুন্দর বন্দর
জগতে আর কোথাও দেখেছেন প্রাফেসার ?”
আমি বলিলাম, “কি আশ্চর্য্য, আপনি একটা আগ্নেয়-

সাগরিকা ৩) নয় ; এখন ; এই হ্রদের গিরির ভিতরে ঢুকেছেন! আচ্ছা, উপরে যে একটা স্পষ্ট গর্ত দেখতে পেলাম, সেটা কি ?” ক্যাপটেন বলিলেন, “ঐ উপরের গর্ত দিয়েই ত ভিতর- কার ধূম, ভস্ম, ধাতুনিঃস্রব আগে বা’র হত।” আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “আপনার অজেয় নােটিল কি শেষে ক্লান্ত হয়ে পড়ল, যে, বন্দরে এসে আশ্রয় নিতে হলো? ক্যাপটেন বলিলেন, “না, জাহাজের কয়লার দরকার হয়েছে ; তড়িৎ উৎপাদন করতে যে কয়লার প্রয়ােজন হয় তা বোধ হয় জানেন। তলায় এক অফুরন্ত কয়লার খনি আছে ; উহা নিউ-ক্যাসেলের চেয়ে কোন অংশে ছােট নয়। এই কয়লা পুড়িয়ে এখন তড়িৎ উৎপাদন করা হবে। কয়লার ধোঁয়া ঐ গর্ত দিয়ে বাহির হবে; বাহিরের লােক ভাববে, আগ্নেয়গিরির ভিতর হ’তে ধোঁয়া উঠছে। এখন কয়েক ঘণ্টা ধরে কয়লা তােল। হবে, আপনারা এর মধ্যে ইচ্ছা করলে পাহাড়ের ভিতরের চারিদিকে ঘুরে ঘুরে দেখে আসতে পারেন।” নেড় ও কনসেলকে ডাকিয়া লইয়া তিনজনে পাথরের উপর গিয়া উঠিলাম। পাথরের দেওয়ালের পাশেই চাতালের মত চলিবার একটা রাস্তা অকিয়া বাকিয়া চারিদিকে ঘুরিয়া গিয়াছে। এই রাস্তা ধরিয়া ঘুরিয়া ঘুরিয়া যাইলে অনেক উপর পর্যন্ত উঠিতে পারা যায়। চারিদিকে বড় বড় পাথরের খণ্ড পড়িয়া রহিয়াছে। পাথরগুলির উপরিভাগ

৮৬
সাগরিকা
রকম
এনামেলের মত পরিষ্কার, চকচকে, ঝঝকে ; বুঝিলাম
উত্তপ্ত আগুনের সংস্পর্শে আসিয়া পাথরগুলির ঐরূপ অবস্থা
হইয়াছে। রাস্তার উপর ভীষণ ধূল; অভ্রের গুড়া প্রচুর
পরিমাণে পড়িয়া রহিয়াছে। এই গােলাকার পথ ধরিয়া
আমরা অনেক উদ্ধ পৰ্য্যন্ত উঠিতে লাগিলাম।
ক্রমশঃই খাড়াই হইতে লাগিল। এইখানে নানা
ধাতুস্রোতের ধার দেখিতে পাইলাম ; কিন্তু এখন ঠাণ্ডা
হইয়া কঠিন হইয়া গিয়াছে। এক এক স্থানে মনে হইল
যেন গন্ধকের কার্পেট পাতা রহিয়াছে।
অনেক উচ্চ
একটা বৃহৎ মৌমাছির চাক দেখিতে পাইলাম । চাকের
তলায় গন্ধক জ্বালাইয়া ধোঁয়া করিতেই মৌমাছিগুলি
উড়িয়া পালাইল। নেড়, তখন চাক্‌টা ভাঙ্গিয়া লইয়া তার
ভিতর হইতে কয়েক সের মধু জোগাড় করিল। ল্যান্টার্ণ
ধরিয়া পথ দেখিয়া পা টিপিয়া আরাে উর্ধে উঠিতে লাগিলাম
গর্তের মুখের কাছাকাছি আসিলে দেখিলাম পাহাড়ের
ফাটলে অনেক পাখী বাসা করিয়া রহিয়াছে। মানুষ
দেখিয়া তাহার উড়িয়া গেল ! সঙ্গে বন্দুক আনে নাই
বলিয়া নেড, খুব দুঃখ করিতে লাগিল; তবু কয়েকটা নুড়ি
ডিয়া নেড়, চেষ্টা করিয়া একটা প্রকাণ্ড পাখী বধ করিল ।
কয়েক ঘণ্টা পরে আমরা নীচে নামিয়া আসিলাম।
পরদিন নােটিলস্ পুনরায় জলের ভিতর ডুব মারিয়া
আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্য দিয়া ছুটিতে লাগিল।

একাদশ পরিচ্ছেদ আটলান্টিক মহাসাগরের অতলতলে নােটিলস্ এখন আ্যান্টিক মহাসাগরের মাঝামাঝি আসিয়াছে। তােমরা যাহারা ভূগােল পড়িয়াছ নিশ্চয়ই গাল ষ্ট্ৰীমের নাম শুনিয়াছ। ইহা একটি প্রবল উষ্ণ জলের স্রোত ; সমুদ্রের বিশাল জলরাশি হইতে ইহা সম্পূর্ণ বিভিন্ন । সমুদ্রের একটি নির্ধারিত পথ ধরিয়া এই গাল ষ্ট্ৰীম চারিদিকে ঘুরিয়া গিয়াছে। ফ্লোরিডা উপসাগর হইতে আটলান্টিক মহাসাগরের একটি নির্ধারিত পথ ধরিয়া উত্তর মহাসাগরের স্পিটজর্জেন অবধি গিয়াছে। এখান হইতে ইহার দুইটি বিভিন্ন শাখা দুইদিকে গিয়াছে ; একটি নরওয়ে ও আয়ারল্যাণ্ডের উপকূলে গিয়া শেষ হইয়াছে ; আর একটি স্রোতধারা দক্ষিণ দিক ধরিয়া আফ্রিকার পশ্চিম কূল চাপিয়া পুনরায় ঘুরিয়া য়্যাটি লিস্ দ্বীপপুঞ্জের পাশ দিয়! মেক্সিকো উপসাগরের মধ্যে প্রবেশ করিয়াছে। এই গালফ, স্ট্রীমের স্রোতধারা অতি প্রচণ্ড। আটল্যান্টিক মহাসাগরের এই গােলাকার পথ ঘুরিয়া আসিতে ইহার প্রায় তিনবৎসর লাগে। এই স্রোতের মধ্যবর্তী জায়গাটাকে স্যারগাসসা সাগর বলে। আটল্যান্টিক মহাসাগরের মাঝ- খানে এই জলরাশি একেবারে স্থির ; কোনপ্রকার ঢেউ বা ; ;

৮৮ সাগরিক। জানে ; চঞ্চলতা নাই। আটলান্টিক মহাসাগরের উপর সর্বদাই বড় বড় ঢেউ উঠিতেছে । সমস্ত মহাসাগর অপেক্ষা আটল্যান্টিক মহাসাগর যে সর্বাপেক্ষা ভীষণ এ কথা সকলেই কিন্তু এই ভয়ঙ্কর উত্তাল মহাসাগরের মধ্যবর্তী স্যাগাসসা সাগর সম্পূর্ণ স্থির। পুকুর বা হ্রদের জলের মত ইহার জলরাশি শান্ত ও নিস্তব্ধ। নােটিলস্ এখন এই এই স্যাগাসসা সাগরের কাছে আসিয়াছে। স্যারগাসাের জল চোখে পড়ে না; মনে হয় যেন একটি মস্তবড় কার্পেট পাতা রহিয়াছে। যত রাজ্যের জলীয় ঘাস, গাছপালার ভাঙ্গা ডাল, পাতা, নানা প্রকার লতা, ঝরা ফুল, শুষ্ক ফল, খড়ের আঁটি, পাটের গাঁট, জাহাজ- ভাঙ্গা কাঠ, তক্তা, জঙলী ঘাস, আগাছা, শৈবালদল আসিয়া এখানে জমা হইয়াছে। জমাট বাঁধিয়া তাহারা এমনি কঠিন হইয়াছে যে তাহা ছিন্ন করিয়া যাইতে সাধারণ জাহাজের শক্তিতে কুলায় না। স্যারগাসসা কথাটি স্প্যানিস, ইহার অর্থ আগাছা। নােটিল এই জলের তলা দিয়া চলিতে লাগিল। বিখ্যাত পণ্ডিত মমারি সাহেব ইহার একটি অতি সুন্দর কারণ নির্দেশ করিয়াছেন। একটি জলপূর্ণ পাত্র লইয়া তাহার উপর কতকগুলি ছেড়া কাগজ বা ঘাসের টুকরা ফেলিয়া তারপর আঙ্গুল দিয়া জলটাকে ঘুরাইলে পাত্রের সমস্ত জলটুকু ঘুরিতে থাকিবে। ছেড়া কাগজগুলিও ঘুরিতে থাকিবে, ঘুরিতে ঘুরিতে তাহারা জলের মাঝখানে গিয়া

সাগরিক।
••
পঁড়াইবে ; কারণ এই মাঝখানের জলের গতির বেগ খুবই
সামান্য। সেইরূপ আইল্যান্টিক মহাসাগরের চারিদিকেই
গালফ, স্ত্রী ঘুরিতেছে, তাই মাঝখানের স্যাঙ্গাসে সাগব
একেবারে নিস্তব্ধ ; যত রাজ্যের আগাছা এইখানে আসিয়া
জমা হইয়াছে। ইহার মধ্যে কতকগুলি গাছ ও লতা বেশ
বাঁচিয়া রহিয়াছে, কতকগুলি অন্য অন্য দেশ হইতে এখানে
আসিয়া জড় হইয়াছে। দেখিলাম উত্তর আমেরিকার 'রকি’
পৰ্বত ও দক্ষিণ আমেরিকার আজি পৰ্বত হইতে বড়
বড় গাছের গুড়ি ‘মিসিসিপি’ ও ‘আমাজন নদী বহিয়া এখানে
আসিয়া জমা হইয়াছে। কত ভগ্ন জাহাজের মাস্তুল, বড়
বড় তক্তা, দুয়াব, জানালা, কাঠের সিঁড়ি, হাল প্রভৃতি এখানে
আসিয়া আঁটিয়া রহিয়াছে। মমারি সাহেব বলেন, কালক্রমে
এইসব কয়লায় পরিণত হইবে। নীল, লাল, সবুজ রঙের
বড় বড় অনেক ফুলও ফুটিয়া রহিয়াছে।
পরদিন ২৩শে ফেব্রুয়ারী। স্যাগাসসা সাগর পরিত্যাগ
করিয়া জাহাজ পুনরায় অ্যান্টিক মহাসাগরের জলের
উপর ভাসিয়া উঠিল । আজ হইতে ঠিক ঊনিশ দিন ধরিয়া
অর্থাৎ ১২ই মার্চ পর্যন্ত জাহাজ ক্রমাগত দক্ষিণ দিকে
প্রচণ্ডগতিতে ছুটিতে লাগিল। বুঝিলাম ক্যাপটেন নিমো
এইবার কেপ, হর্ণ ঘুরিয়া অষ্ট্রেলিয়ার দিকে যাইবেন।
এই ঊনিশ দিনের মধ্যে বিশেষ এমন কিছু ঘটনা ঘটে
নাই। আটল্যান্টিক মহাসাগরের দক্ষিণ অংশ একরকম

সাগরিক।
•
নির্জন বলিলেও চলে ; জাহাজ বা ষ্টিমার কদাচিৎ দেখিতে
পাওয়া যায়। সেইজন্য নােটিলস এই কয়দিন জলের উপর
ভাসিয়া চলিল। ক্যাপটেন নিমাের সঙ্গে কদাচিৎ দেখা
হইত; কেবল এক একদিন মাঝ রাতে ঘুম ভাঙ্গিয়া গেলে
তাহার অর্গ্যানের করুণ ধ্বনি কাণে আসিত। তঁার সেই
করুণ সুরের বাজনা শুনিয়া আমারও প্রাণ কঁদিয়া উঠিত।
বুঝিতাম ক্যাপটেন জীবনে বড় দুঃখের আঘাত পাইয়াছেন,
সেই আঘাত ও সেই শােক এখনও ভুলিতে পারেন নাই।
তাহার করুণ অর্গ্যান-ধ্বনি মাঝ রাতে জাহাজের ঘরে ঘরে
দুঃখের বান ডাকাইয়া আছাড়ি পিছাড়ি খাইত।
একদিন নােটিল জলের উপর ভাসিয়া চলিয়াছে ;
পিছনে একটা তিমি মারিবার নৌকা আমাদের পিছনে
তাড়া করিতে লাগিল। তাহারা নােটিলকে একটা অতিকায়
তিমি ভাবিয়া হারপুন উচাইয়া পিছনে পিছনে আসিতে
লাগিল।
অনেকক্ষণ তাহাদের ভােগাইয়া নােটিলস্ শেষে
জলের ভিতর ডুব মারিল।
আটল্যান্টিক মহাসাগরের এই সেই জায়গা যেখানে
ক্যাপটেন ডেহাম্ ৪২,০০০ হাজার ফুট, দড়ি ফেলিয়াও জলের
তলা পান নাই। তারপর ক্যাপটেন পার্কার আরো বেশী
দড়ি ফেলিয়া অর্থাৎ ৯০,৮৪০ ফুট, দড়ি ফেলিয়াও তলদেশ
স্পর্শ করিতে পারেন নাই। নোটিল এইবার বহু নিম্নে
ডুবিতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে জাহাজ জলের ৪২,০০০

সাগরিকা
;
ফুট, নিম্ন দিয়া চলিতে লাগিল ; চারিদিকে সুদীর্ঘ পৰ্বতের
শ্রেণী চলিয়াছে ; এই সকল পাহাড় অতি উচ্চ, কেহ কেহ
দুই মাইল, তিন মাইল উচ্চ অর্থাৎ আরও দুই মাইল
বা তিন মাইল ডুবিলে তবে তলদেশ পাওয়া যাইবে ।
চারিদিকে ঘাের কৃষ্ণবর্ণ পৰ্বতশিখর! হিমালয় বা আণ্ডিস্
বা রকি পর্বতের চেয়ে এই সকল পাহাড় ও পৰ্বতশিখর
কোন অংশে ছােট নহে।
এই সকল পর্বতশ্রেণীর মাঝখান দিয়া অতি সাবধানে
জাহাজ চলিতে লাগিল। তারপর নােটলস্ আরো নিয়ে
ডুবিতে লাগিল। ভয়ে প্রাণ কাপিয়া উঠিল! বুঝিলাম
জাহাজের উপর জলের কি ভীষণ চাপ পড়িয়াছে ! জাহাজ
ভীষণবেগে নীচে নামিতে লাগিল; ইঞ্জিনের প্রচণ্ড শক্তির
গুন্ গুন্ শব্দ ; উপরের জলের চাপের দরুণ জাহাজের সর্বাঙ্গ
ঝিম্ ঝিম্ করিয়া কঁপিতে লাগিল। জাহাজের ইস্পাতের
পাতগুলি ঝন ঝন্ করিয়া শব্দ করিতে লাগিল।
হইল এখনি সমস্ত স্কু ও প্যাচ খুলিয়া যাইবে। সুদীর্ঘ
লােহার ডাণ্ডাগুলি বাঁকিয়া উঠিল ; স্যালুনের জানালাগুলি
ভিতরপানে ঠেলিয়া আসিতে লাগিল; সুকঠিন ইস্পাত
নিৰ্ম্মিত স্কু, কজা, নাট, বােল্ট, খিল সমস্তই আর্তনাদ
করিয়া উঠিল। মাথার উপরে ছাদ দুড়াইয়া নীচু হইয়া
আসিতে লাগিল।
জাহাজ এই সমস্ত ক্ৰক্ষেপ না করিয়া আরাে নিমে
;
মনে
•

সাগরিকা
না।
ডুবিতে লাগিল। পাহাড়ের উপর নানা রকম শামুক ও
ঝিনুক রহিয়াছে ; তাহাদের পিঠের খােলা পাথরের মত
পুরু ও শক্ত। অত নিম্নে আর কোন প্রাণী দেখিতে পাইলাম
প্রায় ৫০,০০০ ফুট নীচে নামিয়া জাহাজ থামিয়া
পড়িল। উজ্জ্বল ইলেটি ক আলোয় দেখিলাম চারিদিকে
গ্রানাইট, পাথরের স্তপ চলিয়াছে, মাঝে মাঝে বড় বড়
গহ্বর—সে সব যে কোথায় নামিয়া গিয়াছে তার ঠিকানা
নাই। এক এক স্থানে চাতালের মত সুন্দর গ্রানাইট,
পাথরের রাস্তা বানানাে রহিয়াছে। ভয়ে বিস্ময়ে আনন্দে মুগ্ধ
হইয়া এই নূতন রাজ্যের অপরূপ শােভা দেখিতে লাগিলাম।
ক্যাপটেন বলিলেন, “আর নীচে নেমে দরকার নাই,
তা হলে জাহাজের ক্ষতি হতে পারে। এইবার উঠা যাক্।
আপনি খুব সাবধানে নিজেকে চেপে ধরুন।”
ক্যাপটেনের এইরূপ সাবধান করার কারণ বুঝিলাম না ;
কিন্তু তখনি ঘরের মেঝেতে আমি পড়িয়া গেলাম।
তীরের মত উপরে উঠিতে লাগিল। সে কি ভীষণ প্রচণ্ড
গতি ! জলরাশি ছিন্নভিন্ন করিয়া জাহাজ বেলুনের মত
সােজা সে-সে-সে। করিয়া উপরে উঠিতে লাগিল। সেই
৫০,০০০ ফুট জলরাশি ভেদ করিয়া উপরে উঠিতে জাহাজের
ঠিক চারিমিনিট সময় লাগিল ; চারিদিকে প্রচণ্ড ঢেউ তুলিয়া
জাহাজ জলের উপর ভাসিয়া উঠিল ।
জাহাজ

দেখা
;
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
ক্যাশালদের সঙ্গে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ
১৪ই মার্চ। নােটিলস্ কেপ, হর্ণের কাছাকাছি আসিল ।
অদূরে ‘টিয়েরা ডেল ফিউগো’ নামক দ্বীপের দৈত্য-সমান
পৰ্বতচূড়াগুলি মেঘের আড়াল হইতে অস্পষ্ট
যাইতেছিল। জাহাজ ক্রমশঃ দ্বীপের নিকটবর্তী হইতে
লাগিল। দূর হইতে দেখিলাম সমুদ্রকূল বড়ই ভয়ঙ্কর ; বালুময়
তটভূমি বলিয়া কিছুই নাই ; কেবল কাল কাল সু-উচ্চ
পাহাড়গুলি খাড়াই ভাবে সমুদ্রের ভিতর নামিয়া গিয়াছে।
এই সব পাহাড়ের তলদেশে আল্যান্টিক ও য়্যান্টাটিক
মহাসাগরের ঘাের কৃষ্ণবর্ণ শীতল ঢেউগুলি আসিয়া ভয়ঙ্কর
শব্দে আছড়াইয়া পড়িতেছে। পাহাড়ের উপর ঘাের জঙ্গল ;
এই সব জঙ্গলে এমন গাছও আছে যাহাদের বয়স হাজার
দু হাজার বৎসর। এইরূপ গাছ আমেরিকার ও আফ্রিকার
জঙ্গলে অনেক দেখিতে পাওয়া যায়। এই সব জঙ্গলের মধ্যে
আমেরিকার আদিম অধিবাসিগণ চালা বাঁধিয়া নিৰ্বিপ্নে
বসবাস করে। ইহারা সকলেই কাফ্রিজাতীয়, কিন্তু গায়ের
রং তামাটে। বনের ভিতর হইতে প্রচুর ধূম উঠিতেছিল ।
বনবাসীরা হয় রান্না করিতেছে, না হয় আগুন পােহাইতেছে ।
এই ধূমরাশি দেখিয়া প্রাচীন স্প্যানিগণ দ্বীপটির নাম
‘টিয়েরা ডে ফিউগে। অর্থাৎ ‘ধোয়ার দেশ’ রাখিয়াছিল।

১৪
সাগরিকা
পৃথিবীতে এত দেশ দেখিয়াছি, কিন্তু এ রকম দেশ কোথাও
দেখি নাই। ইহার পাহাড়-পর্বত, গাছপালা, জলবায়ু
সমস্তই স্বতন্ত্র। পাহাড়গুলি এত উঁচু যে, বরফে ঢাকিয়া
আছে ; গাছগুলি ভয়ঙ্কর দীর্ঘ, হাজার দেড় হাজার ফুট উচু।
দক্ষিণ দিক হইতে একটা ভয়ঙ্কর ঠাণ্ডা জোর বাতাস
বহিতেছিল ; সে শীতল বাতাসের স্পর্শে চারিদিক যেন ঝিম
ঝিম্ করিতে লাগিল। দ্বীপের উপর রাশি রাশি কালো
ঘন মেঘ জমিয়া রহিয়াছে ; সে মেঘ বড় ভয়ঙ্কর ; বুঝিলাম
শীঘ্রই একটা ভয়ঙ্কর ঝড় উঠিবে। সে ঝড় এত ভয়ঙ্কর যে
পৰ্বতের উপরিস্থিত আলগা শিলাখণ্ডগুলি পাহাড়ের গা
বহিয়া গ্রামের উপর গিয়া পড়ে ; তাহাতে অনেক বাড়ী ও
লােকের প্রাণ নষ্ট হয়।
কি আশ্চর্য, জাহাজ কোথায় কেপ, হর্ণ ঘুরিয়া প্রশান্ত
মহাসাগরে গিয়া পড়িবে, তাহা না করিয়া ক্রমাগত দক্ষিণ
দিকে চলিল। জাহাজ এ কোথায় চলিল ? এ যে দেখছি
দক্ষিণ মেরুপ্রদেশের দিকে জাহাজ চলিতেছে । সে যে
জনমানব-পশুপক্ষী-বৃক্ষলতাহীন বরফের দেশ। ক্যাপটেন
নিমাে কি ক্ষেপিয়া উঠিলেন ? নেডের সকল আশা বিলীন
হইল, রাগে দুঃখে সে ফুলিতে লাগিল। বােধ করি বা
এখনি ক্যাপটেনকে ধরিয়া মারিয়া বসিবে।
একদিন সে আমাকে জিজ্ঞাসা করিল, “আচ্ছা, এই
জাহাজে কত লােক আছে বলতে পারেন ?”

সাগরিকা
;
আমি বলিলাম, “প্রায় ষাট সত্তর জন।”
নেড, বলিল, “তিনজনের পক্ষে বড় বেশী ।” নেডের
অবস্থা দেখিয়া আমার দুঃখ হইল চিরকাল স্বাধীনভাবে
জীবনযাপন করিয়া আজ তাহার বন্দীর দশা।
এন্টানা দিন কাটিতে লাগিল; লােক নাই, জন নাই ;
সমুদ্রবক্ষে কোন জাহাজ, কোন পাখী,—কোন কিছু দেখিতে
পাইলাম না। এত যে জলজন্তু তাহারাও যেন মন্ত্রবলে অদৃশ্য
হইয়াছে। চারিদিকে জল, জল, জল ;-জল আর জল—
আর জল! প্রাণ হাপাইয়া উঠিতে লাগিল।
এই সময় একদিন জাহাজ হইতে এক মাইল দূরে এক
ঝাক তিমিমাছ জলের উপর কালো কালো পিঠ ভাসাইয়া
সাতার কাটিতেছে দেখিতে পাইলাম। নেডের কি আনন্দ।
গ্রীনল্যাণ্ড, ও বেরিং সাগরের তিমিমাছই সৰ্ব্বাপেক্ষা বৃহৎ ;
কিন্তু ইহারাও তাহাদের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। ইহা-
দের মধ্যে এক একটা একশত ফুট দীর্ঘ দেখিতে পাইলাম ।
নেড়, গ্রীনল্যাণ্ড ও বেরিং সাগরে শত শত তিমি বধ করিয়াছে।
আজ তিমি দেখিয়া তাহার হাত ছট্‌ফট্‌ করিতে লাগিল ।
যেন একটা অদৃশ্য হারপুন লইয়া সে হাতে ঘুরাইতে
লাগিল।
আমি বলিলাম, “নেড, তিমি মারূতে যদি এতই ইচ্ছা
থাকে ত ক্যাপটেনের অনুমতি নিয়ে
একবার
চেষ্টা দেখো না।” আমার কথা শুনিয়া কসে ছুটিয়া

সাগরিকা
ক্যাপটেনকে ডাকিতে গেল। ক্যাপটেন আসিয়া তিমিগুলি
लिगि
দেখিতে লাগিলেন। এক মাইল দূরে প্রায় এক কুড়ি তিমি
জলের উপর খেলা জুড়িয়া দিয়াছে ।

No text on this page.

কৃরাত মাছ

সাগরিক।
,,,,,
নেড, বলিল—“ক্যাপটেন, দয়া করে আমাকে একবার
তিমি মারূবার অনুমতি দেবেন?”
ক্যাপটেন বলিলেন, “কেন নেড, এদের মিছিমিছি মেরে
কি লাভ?
আমাদের এখন ত তেল বা চব্বির কোন দরকার
নেড, বলিল, “তবে লােহিত সাগরে ডুগংটাকে মাক্বার
অনুমতি কেন দিয়েছিলেন ?”
ক্যাপটেন বলিলেন, “তখন নাবিকদের মাংস কম হয়ে
এসেছিল, সেই জন্য ডুগং মারতে বলেছিলাম। কোন
দরকার নাই অথচ খেয়ালবশে এদের মিছিমিছি মার আমি
ভাল মনে করি না। এরা ভারী শান্ত, এরা মানুষের কখনাে
কোন ক্ষতি করে না, অথচ মানুষে এদের মেরে মেরে লােপ
করবার চেষ্টা কছে। ব্যাফিন উপসাগরের অত তিমি আর
প্রায় দেখতে পাওয়া যায় না। পূৰ্বে জগতে কত অতিকায়
জন্তু ছিল, এখন সব লােপ পেয়ে গেছে।
শুধু আছে এই
তিমিমাছ, তাও মনে হয় শীঘ্র লােপ পেয়ে যাবে । তা ছাড়া
এদের শত্রু ত কম নেই ; এদের শান্তশিষ্ট ও নির্বোধ দেখে
অন্যান্য জলজন্তু—যেমন ক্যাশাল, খঙ্গমাছ, করাতমাছ—
এদের দেখতে পেলেই দল বেঁধে তাড়া করে, আর প্রায়ই
মেরে ফেলে।”
ক্যাপটেনের কথাগুলি খুবই সত্য। মানুষের নিষ্ঠুর
আনন্দের ফলে এই তিমিমাছ শীঘ্রই লােপ পাইবে। এই
৭

১৮ সাগরিক। সময় ক্যাপটেন দূরে সমুদ্রের বুকের উপর আঙ্গুল দেখাইয়া বলিলেন,—“ঐ দেখুন, তিমির ভীষণ শত্রু আছে। আট মাইল দূরে ঐ যে কালাে কালাে--কিছু দেখতে পাচ্ছেন ?” —“হাঁ, ক্যাপটেন, পাচ্ছি। কি বলুন দেখি ?” — -“ক্যাশাল! বড় সাংঘাতিক জন্তু ! এর। প্রায় দল বেঁধে থাকে ; এক এক দলে দুশাে তিনশো পর্যন্ত থাকে। এরা যেমনি হিংস্র তেমনি ভীষণ। মারতে যদি হয় এদের মারা উচিত। তিমিদের প্রধান শত্রু হচ্ছে এর ; এদের শরীরের মধ্যে মুখ ও দাত সৰ্বস্ব। এদের শরীর প্রায় পঁচাত্তর ফুট লম্বা হয়, তার মধ্যে মাথাটাই শরীরের তিন ভাগের একভাগ। এদের মুখের সামনে পঁচিশটা করে গজ- সঁাত আছে, প্রত্যেকটি আট ইঞ্চি লম্বা। এরা দেখতে অতি বিশ্রী। এই সময় ক্যাশালগুলি ক্যাশালগুলি তিমিদের দেখিতে পাইয়া তাহাদের মারিবার জন্য ছুটিয়া আসিতেছিল। তাহারাই যে যুদ্ধে জয়লাভ করিবে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ ছিল না। তাহারা সংখ্যায় ঢের বেশী, তার উপর অমন ভীষণ দাত ; আবার তিমিদের চেয়ে এরা জলের ভিতর আরো অনেকক্ষণ থাকিতে পারে। তাহার তিমিদের খুব কাছে আসিয়া পড়িল । ক্যাপটেন বলিলেন, “তিমিদের যেমন “তিমিদের যেমন করে হােক্‌ আমাদের বাঁচাতে হবে। চলুন, এইবার ক্যাশালটদের সঙ্গে

নাগরিক।
১।
আমাদের ভীষণ লড়তে হবে। এদের উপর আমার এক
ফোটা দয়া নাই।”
নােটিলস্ অতি সন্তর্পণে জলের ভিতর ডুব মারিল ।
কনসেল, নেড, ও আমি স্যালুনের জানালার কাছে গিয়া
চঁড়াইলাম। ক্যাপটেন তঁাহার নাবিকদের দলে ফিরিয়া
গেলেন। দেখিতে দেখিতে জাহাজের গতি ক্রমশঃই বর্ধিত
হইতে লাগিল।
নােটলস্ ক্যাশালদের মাঝে আসিয়া পড়িল । তখন
তিমিদের সঙ্গে ক্যাশালটদের ভীষণ লড়াই বাধিয়া গিয়াছে।
প্রথমে নােটিলকে দেখিয়া ক্যাশালটের দল একটুও ভয়
পাইল না ; তাহারা তখন তিমি মারিবার উত্তেজনায় মত্ত
হইয়া উঠিয়াছে। কিন্তু শীঘ্রই তাহারা বুঝিতে পারিল কি
ভীষণ পদার্থ তাহাদের মধ্যে আসিয়াছে।
ক্যাশালটদের সঙ্গে নােটিলসের সে কি ভীষণ যুদ্ধ ।
ইঞ্জিন ঝমাঝম্ ঝমাঝম্ শব্দে চলিতেছে, আর নােটিস
কেবলি চক্রাকারে ঘুরিয়া ঘুরিয়া প্রচণ্ড বিক্রমে ক্যাশালদের
আঘাত করিতেছে। ক্যাপটেন স্বয়ং ইঞ্জিন চালাইতেছেন।
জাহাজ একদিক হইতে আর একদিকে কেবলি পাক খাইয়া
ঘূরিতেছে। যে ক্যাশাল জাহাজের সামনে পড়িতেছে তাহা
তৎক্ষণাৎ দুইখণ্ড হইয়া দুইদিকে ভাগ হইয়া যাইতেছে ।
ঐ একটা ভীষণ ক্যাশাল জাহাজের ঠিক সামনে ! ঐ জাহাজ
| দুটিয়া তাহার দেহের উপর পড়িল ! ঐ যে তাহার দুইখণ্ড

১০০
সাগরিকা
;
দেহ থরথর করিয়া কাপিতেছে ! ঐ আর একটা, তারপর
আর একটা ! সামনে পড়িতেছে আর দুইখণ্ড হইয়া দুইদিকে
কঁপিতে কঁপিতে ভাসিয়া যাইতেছে ! সে কি ভীষণ যুদ্ধ !
শত শত ক্যাশাল জাহাজের উপর তাড়া করিয়া আসিল।
লেজের ও পঁাতের আঘাতে জাহাজের তক্তা ও কঁাচ ঝনঝন
করিতে লাগিল। সে কি ভীষণ লড়াই ! নিষ্ঠুর হত্যার
আনন্দে ক্যাপটেন মাতিয়া উঠিলেন। উহাদের দ্বিখণ্ডিত
দেহে সমুদ্রজল বােঝাই হইয়া উঠিল। জলের উপর সে কি
ভীষণ শব্দ! ক্যাশালটের দল তখন ভয়ঙ্কর রাগিয়া উঠি-
আছে ; তাহাদের হিহিস্ শব্দে ও ভয়ঙ্কর গর্জনে কর্ণ বধির
হইয়া যাইতে লাগিল। সমুদ্রের শান্ত জলরাশি তাহাদের
লেজের আঘাতে ফুলিয়া উঠিল; বড় বড় ঢেউ উঠিতে লাগিল।
ঠিক এক ঘণ্টা ধরিয়া এই যুদ্ধ চলিল। তারপর অবশিষ্ট
ক্যাশালটের দল প্রাণের ভয়ে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটিয়া পালাইতে
লাগিল।
সব চুপচাপ! সমুদ্রের উত্তাল জল আবার শান্ত হইল।
চারিদিকে ক্যাশালটের শত শত দ্বিখণ্ড দেহ-উপরটা ঈষৎ
নীল, তলাটা সাদা। কয়েক মাইল পর্যন্ত সমুদ্রের জল
ঘাের লােহিত বর্ণ ধারণ করিল । রক্তের সাগরে আমরা
ভাসিতে লাগিলাম।
ক্যাপটেন ফিরিয়া আসিলেন। নেড়কে বলিলেন, “কি
নেড, কেমন দেখলে ?”
।

সাগরিক। ০ নেড, বলিল, “এমন ভয়ঙ্কর দৃশ্য আমি কখনাে দেখি নাই। কিন্তু আমি কশাই নই, আমি শিকারী! আপনি যা করলেন তা শিকার নয়, সেটা কশাইএর কাজ।” ক্যাপটেন বলিলেন, “এরা বড় ভয়ঙ্কর জন্তু, এদের এই- রকম করেই মাতে হয়।” এই সময় জাহাজ একটা তিমির কাছে আসিল। প্ৰকাণ্ড তিমি, কিন্তু মৃত ; ক্যাশালটদের দাতের আঘাতে তাহার সৰ্ব্বাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত। মুখে একটা বাচ্চা ধরিয়া সেটা মরিয়া ভাসিতেছে। বাচ্চাটাও মরিয়া গিয়াছে। তিমিটা কাং হইয়া আসিতেছিল। জাহাজ কাছে যাইলে পর কয়েকজন নাবিক যাহা করিতে লাগিল তাহা দেখিয়া আমি বিস্মিত হইলাম। তিমির মাই হইতে টানিয়া টানিয়া প্রচুর দুগ্ধ বাহির করিয়া পাত্রে পাত্রে ভরিতে লাগিল ; তাহা ওজনে প্রায় ষাট মণ হইবে ! ক্যাপটেন এক কাপ দুধ আমাকে খাইতে দিলেন ; তাহা তখনও বেশ গরম রহিয়াছে। আমার খাইতে কিরূপ ঘৃণা হইতে লাগিল, কিন্তু খাইতে অনেকটা গরুর দুধের মত। উহা দ্বারা মাখম, পনির, ছানা প্রচুর পরি- মাণে প্রস্তুত হইয়া জাহাজের ভবিষ্যতের খােরাক করা রহিল। ;

ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ
বরফের দেশ
নােটিলস্ ক্রমাগত দক্ষিণমুখে চলিতেছে ; জাহাজের
গতি খুবই দ্রুত বলিতে হইবে। পঞ্চান্ন অক্ষরেখার নিকট
আসিয়া আমরা জলের উপর বরক ভাসিতে দেখিলাম ।
বেশী বড় নয়, ছােট ছোট বরফখণ্ড, কোনটা কুড়ি ফুট,
কোনটা বা পঁচিশ ফুট দীর্ঘ। নেড, উত্তর মেরুসাগরে তিমি
মারিতে গিয়া এইরূপ অনেক বরফ ভাসিতে দেখিয়াছে ;
তাই সে ইহা দেখিয়া বিশেষ বিস্মিত হইল না; কিন্তু
কনসে ও আমি মুগ্ধের মত এইসব আইবার্গ ( Iccberg)
দেখিতে লাগিলাম। “আই' মানে বরফ, ‘বার্গ মানে
পাহাড়, অর্থাৎ বরফের পাহাড়। দেখিতে দেখিতে বড় বড়
বরফের চাই দেখিতে পাইলাম। দিনের আলে! এই সব
বরফের উপর পড়িয়া লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, বেগুনে
প্রভৃতি বর্ণে প্রতিফলিত হইয়া অনির্বচনীয় শােভা প্রকাশ
করিতেছিল। দক্ষিণ দিকে যতই অগ্রসর হইতে লাগিলাম
ততই আইসবার্গের সংখ্যা বাড়িতে লাগিল।
এতক্ষণ সমুদ্রের পথ বেশ ভােলাই ছিল, কিন্তু যা
অক্ষরেখার কাছে আসিলে দেখিলাম পথ একেবারে বন্ধ।
চারিদিকে বরফ জমাট বাঁধিয়া রহিয়াছে ; অগ্রসর হইবার

সাগরিক।
;
•
এতটুকু পথ রাখে নাই। বিশাল মহাসাগরের অসীম জলরাশি
যেন এইখানে শেষ হইয়াছে। অনেক খুজিয়া ক্যাপটেন
নিমাে বরফের মধ্যে দিয়া একটু সঙ্কীর্ণ পথ বাহির করিলেন
তাহার মধ্য দিয়া ক্যাপটেন অসীম সাহসভরে অকুতােভয়ে
জাহাজ চালাইতে লাগিলেন। দুইধারে বরফের দেশ ধব ধব
করিতেছে। মৃত্যুর মত সে স্থান নিস্তব্ধ ! গাছ নাই, পাল।
নাই,কোথাও প্রাণের এতটুকু চিহ্নও দেখিতে পাইলাম
বরফের চেয়ে বাতাস আরো শীতল বলিয়া মনে হইল।
ফাহ্ নামক পােষাকে আমাদের সর্বাঙ্গ আবৃত ; জাহাজের
অভ্যন্তরভাগ ইলেক্‌টিক ষ্টোভে দিনরাত গরম করিয়া
রাখা হইতেছে ; কিন্তু তবু শীতের প্রবল বিক্রম আমরা বেশ
অনুভব করিতে লাগিলাম। এট। মার্চ মাস, প্রচণ্ড
গ্রীষ্মকাল।
জানি শীতকালে এখানে আসিলে কি-ই
হইত।
দেখিতে দেখিতে আমরা শেল্যাণ্ড ও সাউথ অর্কনের
নিকটে আসিলাম। ক্যাপটেন বলিলেন, “এইখানে পূৰ্ব্বে
প্রচুর পরিমাণে সিল পাওয়া যাইত, কিন্তু তিমি-শিকারীর
দল এখানে আসিয়া এদের বংশ ধ্বংস করিয়াছে।”
১৬ই মার্চ আমরা দক্ষিণ মেরুরেখা পার হইলাম।
ক্যাপটেন বরফের ভিতর ঘুরিয়া ঘুরিয়া কোথা হইতে পথ
খুজিয়া লইয়া জাহাজ চালাইতে লাগিলেন। চতুর্দিকে
বরফের দেশ ধূ ধূ করিতেছে। এদেশ ভগবানের সৃষ্টি, না

১০৪
সাগরিকা
««««««««
?
2
কোন মায়াবী যাদুকরের তৈরী ? সেই দেশের সৌন্দৰ্য্য দেখিয়া
আমার হৃদয়-মন মুগ্ধ হইল। বরফের কত রকম আকৃতি ;
কোথাও মন্দির হইয়া রহিয়াছে, কোথাও বা মসজিদ হইয়া
রহিয়াছে, কোথাও যেন ঘরবাড়ী সব উল্টাইয়া পড়িয়া
গিয়াছে।
চারিদিক একেবারে নিস্তব্ধ, কেবল বরফের সঙ্গে বরফের
ধাক্কার শব্দ। কখনাে বা বরফের স্তপ ধ্বসিয়া যাইবার অতি
ক্ষীণ শব্দ,-কোথাও বা বরফের মাঠ ডুবিয়া জল বাহির
হইয়া পড়িল, তাহার শব্দ। চলিতে চলিতে কখনো কখনো
এমন হইতে লাগিল যে, সামনের পথ একেবারে বন্ধ,
যাইবার এতটুকু রাস্তা নাই। কিন্তু ক্যাপটেন দমিবার পাত্র
নহেন ; যেখানে পাতলা বা জলীয় বরফ দেখিতে পাইলেন
তাহার উপর প্রচণ্ড শক্তিতে জাহাজের ধাক্কা মারিতে
লাগিলেন। বরফ চরচর করিয়া ফঁাক হইয়া যাইতে লাগিল।
এমনি করিয়া ক্যাপটেন ক্রমশঃ দক্ষিণাভিমুখে অগ্রসর
হইতে লাগিলেন। পিছনে চাহিয়া দেখি, যে যে রাস্তা
ধরিয়া আসিয়াছি তাহা প্রচণ্ড ঠাণ্ডার দরুণ ইতিমধ্যেই
জমাট বাঁধিয়া গিয়াছে।
এ কি! শেষে বরফের দেশে আটকা পড়িয়া প্রাণ
হারাইতে হইবে ? জাহাজ প্রচণ্ড শক্তি বলে বরফ ভাঙ্গিতে
ভাঙ্গিতে অগ্রসর হইতেছে ; জাহাজের ধাক্কা খাইয়া বরফের
টুকরা গুড়া হইয়া আকাশে উঠিতে লাগিল। জাহাজ কখনো

সাগরিক।
vvvvwvvwvwvvw
বরফের উপর ধাক্কা মারিয়া, কখনাে কোন ফঁাকের মধ্যে
চাড় দিয়া, ফাটাইয়া, ক্রমশঃ দক্ষিণমুখে চলিতে লাগিল।
ঠাণ্ডায় আমরা হি হি করিয়া কাপিতে লাগিলাম। ব্যারাে-
মিটারে দেখিলাম শূন্য হইতে পাঁচ ডিগ্রি নীচে উত্তাপ
নামিয়াছে। বিদ্যুতের যতদূর
ক্ষমতা আমাদের গরমে
রাখিয়াছে। ১৮ই মার্চ তারিখে জাহাজ আর তা গ্রসর হইতে
পারিল না; পথ একেবারে বন্ধ ! সামনে বড় বড় বরফের
,
পেট্রেল পাখী
পাহাড়। সে পাহাড় ভেদ করিয়া যাইবার শক্তি ত ক্ষুদ্র
নােটিলসের নাই।
সেই জায়গাটা ৫১° দ্রাঘিমা ও ৬৭° ৩৯
অক্ষরেখায় অবস্থিত।

১০৬
নাগরিক।
এখন উপায়? চারিদিকে পথ বন্ধ ; কেমন করিয়া এখন
হইতে বাহির হওয়া যায় ? চারিদিকে সাদা বরফের পাহাড়,
মাঝখানে কালো নােটিলস্ বরফের সঙ্গে জমাট বাঁধিয়া
গিয়াছে। এ কয়েকদিন আমরা সূর্যের মুখ কেবল দুপুর
বেলায় কয়েক মিনিটের জন্য দেখিতে পাইয়াছিলাম ;
এখানে সূর্যের সে প্রখরতা বা শক্তি নাই। চারিদিকে
ঘাের নিস্তব্ধতা, কোন কিছুর এতটুকু শব্দ নাই; কেবল
পেট্রেল ও পিউফিন পাখীর উড়িয়া যাইবার ফ্লাপ, ফ্লাপ,
শব্দ।
পিউর্কিন পাখ
সে কি ভীষণ শব্দ ! তাহাতে যেন এতটুকু প্রাণের
সজীবতা নাই।
প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় সে শব্দটুকুও যেন জমাট
বাঁধিয়া যাইতে লাগিল ।
ক্যাপটেনের ‘গা-জোয়ারী’ ও নিৰ্ব্বদ্ধিতার ফল আমি
এইবার বেশ হৃদয়ঙ্গম করিলাম। তিনি নিজেও মরিবেন,
সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও মারিবেন। এই সময় ক্যাপটেন

সাগরিক।
১০৭
আমার কাছে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি করা যায়
এখন প্রফেসার ?”
আমি বলিলাম, “উপায় ত আমি কিছু
আমি কিছু দেখতে
পাচ্ছি না।”
ক্যাপটেন বলিলেন, “তবে কি বলতে চান যে, এইখানে
আমরা আটকা পড়ে মারা যাব ?”
আমি বলিলাম, “তা ছাড়া আর কি ব?”
ক্যাপটেন এইবার বিদ্রুপের হাসি হাসিয়া হঠাৎ গৰ্ব্বভরে
বলিলেন, “ঐ ত প্রফেসার আপনাদের দোষ ; আপনার
শুধু বিপদ ও কষ্ট ছাড়া আর কিছুই জানেন না। আমি
বলছি নােটলস্ যে কেবল নিজকে এই বরফ হতে ছাড়াতে
পারবে শুধু তা নয়, ইচ্ছা করলে আরো দক্ষিণ দিকে
এগুতে পারে।”
আমি অবাক্ হইয়া বলিলাম, “বলেন কি ? আরাে
দক্ষিণ দিকে যেতে পারেন আপনি? না, তা একেবারে
অসম্ভব।”
ক্যাপটেন বলিলেন, “অসম্ভব কিছুই নয়, আমি ইচ্ছা
করলে এখন সেই মেরু প্রদেশের ঠিক মধ্যখানে গিয়ে
উপস্থিত হতে পারি।”
বুঝিলাম এই অসমসাহসী মানুষটির পক্ষে কিছুই অসম্ভব
“য়। সকলেই জানেন, উত্তর মেরু অপেক্ষা দক্ষিণ মেরুর
পথ আরাে দুর্গম ; উত্তর মেরু প্রদেশে অনেকে অনেকদূর
;

১০৮
সাগরিকা
পৰ্যন্ত যাইতে পারিয়াছে, কিন্তু দক্ষিণ মেরু প্রদেশের ভিতর
অবধি এ পর্যন্ত কেহই যাইতে পারে নাই।
ক্যাপটেন বলিলেন, “আপনি ভাবছেন এ সব পথ
আমার চেনা, কিন্তু ইহার পূর্বে কখনাে আমি এখানে আসি
নাই, কিন্তু তবু একবার চেষ্টা করে দেখব দক্ষিণ মেরুতে
যেতে পারি কি না?”
ক্যাপটেনের কথা শুনিয়া আমিও একটু বিদ্রুপের স্বরে
বলিলাম, “হা হা, তাই চলুন ; এই দুইশত তিনশত ফুট
উচ্চ বরফের পাহাড় চূর্ণ বিচূর্ণ করে সােজা এগিয়ে চলুন।”
ক্যাপটেন বলিলেন, “বরফের উপর দিয়ে যাব
আপনাকে কে বলে ? যদি যাই ত বরফের তলা দিয়ে যাব।”
আমি অতি বিস্ময়ে অস্ফুট চীৎকার করিয়া বলিলাম, “তল।
দিয়ে ? কি বলছেন আপনি, ক্যাপটেন ?”
ক্যাপটেন বলিলেন, “হঁ তলা দিয়ে। আপনি জানেন
বােধ হয়, এই বরফের তলদেশে যেমন সমুদ্র তেমনই আছে,
কেবল উপরটা ঠাণ্ডার দরুণ বরফ হইয়া গিয়াছে। এও
জানেন বােধ হয় যে, বরফ জলের উপর যতটুকু ভাসে
তলায় তার তিনগুণ ডুবিয়া থাকে ; বরফের একফুট যদি
উপরে ভাসে, তবে তলায় তিনফুট ডুবে আছে বুঝতে হবে।
এই বরফের পাহাড়গুলাে তিনশত ফুট উচ্চ, অর্থাৎ তলায়
নয়শত ফুট নীচু পর্যন্ত বরফ আছে, তার তলায় যেমন
জল তেমনি জল আছে। এখন এই নয়শত ফুট বরফ
?

সাগরিকা
১০৯
ভেদ কর। নােটিলসের পক্ষে কি একেবারেই অসম্ভব,
প্রফেসার ?”
আমি আনন্দের উত্তেজনায় মাতিয়া উঠিলাম, বলিলাম,
“কিছু নয়, কিছু নয়!”
ক্যাপটেন ধীরভাবে কহিলেন, “শুধু একটা বাধা পড়ছে,
কতদিন জলের তলায় থাকতে হবে তার ঠিক নেই, বাতাস
যদি ততদিনে ফুরাইয়া যায়, শুধু এই ভয় হয়।”
আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “আর কি কোন বাধা আছে,
ক্যাপটেন ?”
ক্যাপটেন বলিলেন, “হাঁ, আর এক্টা বাধা আছে।
যতই দক্ষিণ দিকে যাব ততই ঠাণ্ডা বাড়বে ; জলের তলা
দিয়ে যেতে যেতে যদি এমন হয় যে সেখানকার সমুদ্রের
জল সব বরফ হয়ে গেছে, তা হলে কিন্তু প্রাণ নিয়ে
আর ফিরতে পারব না।”
ক্যাপটেনের কথা শুনিয়া আমি বলিলাম, “নােটিলসের
সঙ্গে যে এক ভীষণ খঙ্গ আছে সেটা ভুলে যাচ্ছেন কেন
ক্যাপটেন ? স্কোটিয়া জাহাজের অমন দুর্দশা ত নােটিলই
করেছিল। তেমন বিপদে পড়লে সেই খঙ্গ দিয়ে বরফ ভেদ
করে কি আমরা উপরে ঠেলে উঠতে পারব না?”
তারপর যাহা প্রধান কাজ তাহাই করা হইল, অর্থাৎ
জাহাজে প্রচুর পরিমাণে বাতাস লওয়া হইল। বেলা
চারিটার সময় শেষবারের মত বরফের দেশ দেখিয়া লইলাম।

১১০
সাগরিকা
;
ব্যারােমিটারে উত্তাপ তখন জিরাে হইতে বারাে ডিগ্রী নীচে।
ঠাণ্ডা বাতাসে গায়ের রক্ত হিম হইয়া আসিতে লাগিল।
তারপর দশজন নাবিক কুড়াল লইয়া বরফের উপর নামিয়া
জাহাজের চারিদিকের বরফ কাটিতে লাগিল; কাজট।
খুবই তাড়াতাড়ি করিতে হইল, কারণ একধার কাটিতে
না কাটিতে আর একধার জমাট হইতে লাগিল তারপর
জাহাজ ক্রমশঃই চাড় দিয়া বরফ ভাঙ্গিয়া নীচে নামিতে
লাগিল। নয়শত ফুট এইরূপ বরফ ভাঙ্গিয়া আমরা
সমুদ্রজলে আসিয়া পড়িলাম ; কিন্তু জাহাজ আরো নীচে
নামিতে লাগিল--প্রায় ২,৪০০ ফুট নীচে নামিয়া চলিতে
লাগিল। ব্যারােমিটারে পারদ তত
তবতর করিয়া উঠিয়া
যাইতে লাগিল।
আমরা এখন ৬৭” অক্ষরেখায় রহিয়াছি। ৯০' অক্ষরেখায়
দক্ষিণ মেরু।
জাহাজ ঘণ্টায় ছাব্বিশ মাইল বেগে চলিতে
লাগিল, অর্থাৎ এইরূপ বেগে চলিলে আর চল্লিশ ঘণ্টার
মধ্যে
আমরা দক্ষিণ মেরুতে গিয়া উপস্থিত হইব।
ইলেটিক আলােয় সমুদ্রজল আলোকিত ; স্যালুনে বসিয়া
সমুদ্র দেখিতে লাগিলাম, একটা মাছ বা কোন প্রকার
জলজন্তু চোখে পড়িল না।
পরদিন ১৯শে মার্চ। জাহাজের গতি অনেকটা কমিয়া
আসিয়াছে ; বুঝিলাম জাহাজ এখন উপরে উঠিবার চেষ্টা
করিতেছে। হঠাৎ একটা ভীষণ ধাক্কার শব্দ, বরফের সঙ্গে

সাগরিক।
১১:
নােটিলসের ধাক্কা লাগিল। আমার বুক ঢিপ ঢিপ, করিতে
লাগিল। নােটিলসের পিঠের উপর তিনহাজার ফুট বরফ ;
সে বরফ ভেদ করিবার ক্ষমতা নােটিলসের নাই। জাহাজ
আরো দক্ষিণে চলিতে লাগিল। আবার সেইরূপ ধাক্কা,
পিঠের উপরের বরফ দুই হাজার ফুট উচ্চ। আরো
খানিকক্ষণ চলিবার পর আবার একটা ধাক্কা, বরফ ঠিক
দেড়হাজার ফুট উচ্চ। এইরূপ ধাক্কা মারিতে মারিতে
জাহাজ চলিতে লাগিল। বুঝিলাম বরফ ক্রমশঃই পাল্লা
হইয়া আসিতেছে। 'সমস্তদিন কাটিয়া গেল ; রাত্রে ভাবনায়
ভাল ঘুম হইল না। পরদিন ভােরে ঘুম হইতে উঠিয়াছি,
ক্যাপটেন ঘরের ভিতর প্রবেশ করিলেন, বলিলেন, “সমুদ্রের
পথ পরিষ্কার।”

চতুর্দশ পরিচ্ছেদ
দক্ষিণ মেরু
;
দক্ষিণ মেরু! ছাদের উপর ছুটিয়া গেলাম। কি সুন্দর।
ক সুন্দর! বরফের দেশের পরে যে এমন সুন্দর রাজ্য
লােকচক্ষুর অন্তরালে লুকাইয়াছিল, তাহা কে জানিত ?
চতুর্দিকে নির্মল, স্তব্ধ সমুদ্রজল ; মাঝে মাঝে দুই একটা
বরফখণ্ড ভাসিতেছে। জলে অসংখ্য মাছ নির্ভয়ে বিচরণ
করিতেছে ; ইহাদের গায়ের রং ঘাের নীল ; আকাশে হাজার
হাজার পাখী উড়িয়া বেড়াইতেছে। এ যেন চির-বসন্তের
রাজ্য। উত্তরদিকে চাহিয়া দেখিলাম, দূরে বহুদূরে অতি
আবছা কুয়াশার মত অস্পষ্টভাবে বরফের দেশ দেখা
যাইতেছে।
দশ মাইল দক্ষিণে একটি নির্জন দ্বীপ দেখিতে পাওয়া
গেল। সেইদিকে জাহাজ চলিতে লাগিল; এক ঘণ্টার
মধ্যে দ্বীপের নিকট পৌছাইয়া জাহাজ দ্বীপটাকে একবার
প্রদক্ষিণ করিয়া আসিল। ছােট দ্বীপ, ইহার পরিধি মাত্র
পাঁচ মাইল। দ্বীপের পর একটি ছােট খাল ; খালের
ওপারে বিস্তৃত মহাদেশ পড়িয়া রহিয়াছে।
জাহাজ হইতে নৌকা নামানো হইল । তাহাতে

সাগরিক।
;
ক্যাপটেন, দুইজন নাবিক, কসে ও আমি গিয়া চড়িলাম।
নেড, রাগ করিয়া আসিল না। তখন দশটা।
মিনিট কয়েক পরে নৌকা দ্বীপের কাছে আসিয়া পড়িল।
কনসে নৌকা হইতে লাফ দিয়া দ্বীপের উপর পড়িতে
যাইতেছিল, আমি তাহাকে ধরিয়া ফেলিলাম, বলিলাম,
“কনসে, থামাে, থামাে।”
তারপর ক্যাপটেনকে সম্বােধন করিয়া আমি বলিলাম,
“ক্যাপটেন, এই দ্বীপের উপর প্রথম পা দিবার সম্মান
আপনারই প্রাপ্য ; আপনি আগে নামুন।”
ক্যাপটেন বলিলেন, “হ প্রফেসার, এই দ্বীপে এ
পর্যন্ত কোন মানুষ পদার্পণ করে নি, আমিই প্রথম।”
এই বলিয়া তিনি নৌকা হইতে দ্বীপের উপর লাফাইয়া
পড়িলেন। আমরা নৌকায় বসিয়া রহিলাম। ক্যাপটেন
খানিকটা গিয়া একটা ছােট্ট পাহাড়ের উপর উঠিয়া চারিদিক
দেখিতে লাগিলেন। তারপর তিনি আমাদের ডাকিলেন ;
আমি ও কনসেল দ্বীপের উপর নামিলাম ; নাবিক দুটি
নৌকার উপর রহিল। দ্বীপের মাটির রং ঈষৎ লালচে ;
পাথুরে মাটি বলিয়া মনে হইল; একটা ফাটল হইতে
‘ন্ধকের ধোয়া উঠিতেছে। এই সব লক্ষণ দেখিয়া বুঝিলাম
এই দ্বীপটি অগ্ন্যুৎপাতের দরুণ জন্মলাভ করিয়াছে। দ্বীপের
উপর কয়েক প্রকার শাক ও লত। জন্মাইয়া রহিয়াছে।
দখিলাম, চারিধারে রঙ-বেরঙের প্রজাপতি উড়িয়া
;

১১৪
সাগরিক
বেড়াইতেছে। জলের ধারে অসংখ্য মাছরাঙা পাখী, জেলি-
ফিস্ ও তারামাছ দেখিতে পাইলাম । আকাশে হাজার
হাজার পাখী উড়িয়া বেড়াইতেছে ; তাহাদের চীৎকার ধ্বনিতে
আমাদের কান ঝালাপালা হইতে লাগিল ।
অসংখ্য পাখী বসিয়া রহিয়াছে, আমাদের দেখিয়া উড়িয়া
;
পাহাড়ের উপর
=yl+
মাছরাঙা পাখী
পলাইল না। তাহাতেই বুঝিলাম ইহারা মানুষ কখতে
দেখে নাই। পাখীদের মধ্যে পেঙ্গুইন পাখীই সর্বাপে
বেশী। পেঙ্গুইন্ পাখী দেখিতে খুব বড়, ইহাদের শরী
যথেষ্ট ভারী, ডানাগুলি ঘােট ঘােট। তাহাদের চোখমুখে
ভাব বড়ই গম্ভীর ; গলার স্বর অতি কর্কশ।
অনেক য়্যালব্যারস্ উড়িতেছে দেখিতে পাইলাম ; দুধে
অকা

সাগরিকা
মত ইহাদের গায়ের রং ; ডানা ছড়াইলে ইহাদের এক
ডানা হইতে আর এক ডানার দৈর্ঘ্য চৌদ্দ ফুট। বৃহদাকার
পেট্রে ও হাঁসের মত একরকম পাখী দেখিলাম। এই
পেট্রেল পাখীর দেহের মধ্যে তৈলের ভাগ এত অধিক যে
জেলি-ফিস্ ও তারামাছ
ইহাদের আগুনে ধরিতে না ধরিতেই দাউ দাউ করিয়া
জ্বলিয়া ওঠে। সেট রঙের একরকম রাজহাঁস দেখিলাম,
তাহাদের গলার স্বর অবিকল গাধার স্বরের মত।
চারিদিকে কুয়াশা ; বেলা ১১টা বাজিয়া গেল তবু
সূর্য্যের মুখ দেখিতে পাইলাম না। এটাই যে দক্ষিণ

১১৬
সাগরিক।
মেরু ক্যাপটেন নিমাে তাহা চট করিয়া বিশ্বাস করিতে
পেঙ্গুইন পাখী
পারিলেন না। সঙ্গে তিনি যন্ত্রপাতি সবই আনিয়াছেন, কেবল

সাগরিক।
১১৭
সূর্যের অভাবে কিছুই নির্ধারণ করিতে পারিলেন না। বেলা
দুইটা বাজিয়া গেল তবু সূৰ্যদেবের দেখা নাই। “কাল
হইবে”,—বলিয়া ক্যাপটেন আমাদের লইয়া জাহাজে
ফিরিলেন।
সমস্ত দিন কুয়াশা জোট পাকাইয়া রহিল ও
মাঝে মাঝে বরফ পড়িতে লাগিল।
পরদিন সমস্ত দিন ধরিয়া বরফ পড়িতে লাগিল।
ভীষণ ঠাণ্ডা পড়িল যে জাহাজ হইতে বাহির হওয়া
অসম্ভব হইল ।
তৎপরদিন বরফ পড়া থামিয়া গেল। ক্যাপটেন
নিমােক দেখিতে পাইলাম না। কনসেল ও আমি নৌকায়
চড়িয়া সেই মহাদেশটি দেখিবার জন্য বাহির হইলাম।
যালবাটরস্
ডঙ্গার উপর নামিয়া দেখি এখানেও অসংখ্য পেঙ্গুইনের
দল। সিমাছও অসংখ্য দেখিলাম, কেহ বা ডাঙ্গার উপর

১১৮
সাগরিক।
শুইয়া রহিয়াছে, আবার কেহ কেহ জলের উপর সাঁতার
কাটিতেছে। সিমাছগুলি এক একটি সংসার লইয়া বেশ
নির্ভয়ে মাটির উপর শুইয়া রহিয়াছে। বাচ্চাগুলি আশেপাশে
দৌড়াদৌড়ি করিতেছে, কেহ বা মার মাই খাইতেছে,
বাপ গম্ভীরভাবে নিজের বাচ্চাগুলি ও স্ত্রীর উপর প্রখর
সিলমাছ
দৃষ্টি রাখিয়া বসিয়া রহিয়াছে। একরকম জলহস্তী দেখিতে
পাইলাম, তাহারা দৈর্ঘ্যে বত্রিশ ফুট ও প্রস্থে বিশ ফুট।
ইহারা চট, করিয়া কাহারও অনিষ্ট করে না, খুব শান্ত

সাগরিকা
••
বলিতে হইবে; কিন্তু বাচ্চাদের শত্রুর হাত হইতে বাচাইবার
জন্য ইহারা ভয়ঙ্কর হইয়া উঠে।
এই সময় যাঁড়ের ডাকের মত শব্দ কানে আসিল
একটা পাহাড়ের আড়ালে দুইটা মস্ ভীষণ লড়াই বাধাইয়া
দিয়াছে। এই স্থানে অনেক
অনেক ম দেখিতে পাইলাম,
ইহাদের গলার ডাক ঠিক গরুর মত ; দৈর্ঘ্যে ইহারা তেরো
ফুট; গায়ের রং ঈষৎ হলদে, শরীরে যথেষ্ট লােম আছে।
কিছুক্ষণ পরে আমরা জাহাজের দিকে ফিরিলাম।
ফিরিবার পথে দেখি ক্যাপটেন নিমম সেই দ্বীপের
উপর নামিয়া যন্ত্রপাতি লইয়া কি সব করিতেছেন। দুপুর বেলা
সূর্যের আভা ঈষৎ দেখা গেল, কিন্তু সূৰ্য্যদেব দেখা দিলেন
না। আজ ২০শে মার্চ; কাল ২১শে অর্থাৎ equinox;
সূৰ্য্যদেব কাল শেষ দেখা দিয়া ছয় মাসের জন্য আর দেখা
দিবেন না। এই মেরুপ্রদেশের গতিই এই। তার পরদিন
হইতে ভয়ঙ্কর মেরু-রাত্রি আরম্ভ হইবে। ক্যাপটেন বলিলেন,
‘আজও সূৰ্য্য দেখা দিল না ; কাল দেয় ত ভাল, নচেৎ
ছয় মাস আর আমার হিসাব করবার সুবিধা হবে না।”
সকলে জাহাজে ফিরিয়া আসিলাম।
পরদিন ভােরে পাঁচটার সময় ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল।
বাহিরে আসিয়া দেখি আকাশের অবস্থা ভালই বলিতে
হইবে। রাত্রিকালে জাহাজ আরাে কয়েক মাইল দক্ষিণ
| দিকে আসিয়াছে।
বেলা নয়টার সময় আমরা সেই

১২০
সাগরিকা
মহাদেশের উপর নামিয়া পড়িলাম। ক্যাপটেন নিমো
যন্ত্রপাতি ঠিক করিয়া সূৰ্য্যের জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিলেন।
বেলা বারােটার সময় আকাশের মাঝখানে একটা লাল
ভাটারমত অস্পষ্ট ভাবে সূর্য্য দেখা দিল। ক্রনােমিটারের
কাচ সূর্যের তলায় ধরিয়া তিনি অনেকক্ষণ ধরিয়া কি
দেখিতে লাগিলেন। তারপর গম্ভীরস্বরে ক্যাপটেন বলিলেন,
“দক্ষিণ মেরু ! দক্ষিণ মেরু !”
কাচটার উপর চাহিয়া দেখি সূর্যের প্রতিবিম্ব আকাশের
মাঝখানে ঠিক দুইভাগে বিভক্ত হইয়া কাচের উপর পড়িয়াছে।
তারপর আমার কঁাধের উপর হাত রাখিয়া হেলান দিয়া
দাড়াইয়া ক্যাপটেন বলিলেন, “আজ আমি, ক্যাপটেন
নিমে, ১৮৬৮ খৃষ্টাব্দের ১১শে মার্চ তারিখে এই দক্ষিণ
মেরুর নব্বই ডিগ্রি অক্ষরেখার নিকট পৌছাইয়া এই
মহাদেশ,যাহা পৃথিবীর সমস্ত মহাদেশগুলির ছয়ভাগের
একভাগ—তাহা অধিকার করিলাম।”
আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “কার নামে অধিকার করছেন,
ক্যাপটেন ?”
“আমার নামে!” এই বলিয়া একটি কৃষ্ণবর্ণ পাতাকা
খুলিয়া (তাহার মাঝে স্বর্ণাক্ষরে একটি \” লিখিত)
সেই মহাদেশের উপর প্রােথিত করিলেন । দেখিতে
দেখিতে সূৰ্য্য অদৃশ্য হইয়া গেল। ছয় মাসের জন্য মেরু-
প্রদেশে ভীষণ অন্ধকার নামিয়া আসিতে লাগিল।

পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ ভয়ঙ্কর বিপদ পরদিন ২২শে মার্চ। সকাল ছ'টার সময় ফিরিবার যােগাড় হইতে লাগিল। ভীষণ ঠাণ্ডা ; জলের উপরে আইস- বার্গের সংখ্যা ক্রমশঃ বাড়িতে লাগিল। আকাশে এক অপূৰ্ব্ব জ্যোতিশিখা'; ইহা দক্ষিণ মেরুর সেই বিখ্যাত সপ্তষি বা ‘পােলার বিয়্যার। নিম্নে তুষারাচ্ছন্ন ভূমির উপর উহ। এক অপূর্ব রামধনুর শােভা উৎপাদন করিতে লাগিল। পাখীর সংখ্যা ঢের কমিয়া গিয়াছে ; সিমাছ ও মসগুলি নির্ভয়ে সেই তুষারের উপর শুইয়া রহিয়াছে। তুষারপাতে ও কুয়াশায় চারিদিক ক্রমশঃ অন্ধকার হইয়া আসিল। নােটিল জলের তলায় ডুবিতে আরম্ভ করিল। প্রায় একহাজার ফুট নিম্নে নামিয়া জাহাজ ঘণ্টায় পনের মাইল বেগে উত্তরাভিমুখে চলিতে লাগিল । উপরে সেই বিশাল বরফের স্তপ, তাহার তলা দিয়া জাহাজ চলিতে লাগিল। রাত যখন তিনটা, তখন এক ভীষণ ধাক্কায় আর্তনাদে আমার ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। বিছানার উপর উঠিয়া বসিতে না বসিতে ছিটকাইয়া ঘরের মেঝেয় পড়িয়া গেলাম ; চারিদিকের যত জিনিষপত্র হুড়মুড় করিয়া ।

১২২
সাগরিক।
;
;
পড়িতে লাগিল। নােটলস্ কাহার সঙ্গে ধাক্কা খাইয়া
যেন এক অদৃশ্য শক্তিবলে উল্টাইয়া উপর দিকে ছিটকাইয়া
গেল। অন্ধকারে হাতড়াইতে হাতড়াইতে স্যালুনে গিয়া
দেখি আলো জ্বলিতেছে ; সমস্ত জিনিষপত্র উল্টাইয়া
পড়িয়াছে ; দেওয়ালের ছবিগুলি সােজাভাবে ঝুলিতেছিল,
এখন ট্যাচাভাবে ঝুলিতেছে। নােটলস্ একেবারে কাৎ
হইয়া উল্টাইয়া গিয়াছে।
স্যালুনে ক্যাপ টেনকে দেখিতে না পাইয়া পাইলটের
ঘরে গিয়া ক্যাপটেনকে দেখিতে পাইলাম। জিজ্ঞাসা
করিলাম, “কি হয়েছে ক্যাপটেন ?”
ক্যাপটেন বলিলেন, “ভয়ঙ্কর বিপদ হয়েছে।” তাহার
মুখ-চোখ ভয়ে পাংশুবর্ণ, গলা শুকাইয়া গিয়াছে। তিনি
বলিলেন, “জাহাজ চালানাের দোষে যে এই বিপদ ঘটেছে
তা নয়। জাহাজ বরফের তলা দিয়া ঠিকই যাচ্ছিল,
এমন সময় এক বিশাল বরফের স্ত প—একটা
পর্বত
বললেও চলে,-ধ্বসিয়া জলের তলায় ডুবিয়া একেবারে
গরম জলের স্পর্শে মাঝে মাঝে এই রকম
বরপের স্তপ ধ্বসিয়া গিয়া উল্টাইয়া যাওয়ার
জাহাজকেও সঙ্গে করিয়া উপরে তুলিয়া ধরে। জাহাজ
এখন তাই কাৎ হয়ে অচল হয়ে রয়েছে।”
গরম জলের প্রভাবে সেই বিশাল বরফের স্তপ ক্রমশঃই
কাৎ হইয়া উল্টাইয়া যাইতেছিল, সঙ্গে সঙ্গে নােটিলকেও
উল্টাইয়া পড়ে।
দরুণ

সাগরিক।
উপরে তুলিয়া ধরিতেছিল। দেখিতে দেখিতে জাহাজ জলের
উপর ভাসিয়া উঠিল। চাহিয়া দেখি চতুর্দিকে বরফের
পাহাড় দাড়াইয়া রহিয়াছে। সে কি ভয়ঙ্কর, কি সুন্দর ।
যতদূর চোখ যায় কেবল নগ্ন শুভ্র ধবধবে বরফের পাহাড়।
মাঝখানে আমরা বন্দী হইয়া রহিলাম। জাহাজ যেখানে
চঁড়াইয়াছিল সেখানে একটুখানি জল, আর চারিদিকেই
বরফের স্ত প। তখন ভাের পাঁচটা। জাহাজ পিছন
ফিরিয়া চলিবার চেষ্টা করিল, কিন্তু খানিকটা গিয়া আর
অগ্রসর হইতে পারিল না। তারপর এক জায়গায় একটুখানি
ফঁাক দেখিতে পাইয়া তাহার মধ্যে প্রায় ৯০০ শত ফুট
ডুবিয়া জাহাজ পুনরায় দক্ষিণমুখে চলিতে লাগিল। কিন্তু
আবার এক ভীষণ ধাক্কা! জমাট বরফে পথ একেবারে
বন্ধ !

যােড়শ পরিচ্ছেদ
নিশ্চিত মৃত্যুর হাত হইতে অদ্ভুতভাবে রক্ষা
সেই বিশাল বরফের দেশের নয়শত ফুট তলায় আমরা
বন্দী হইয়া রহিলাম। চারিদিকেই বরফ ; আশেপাশে তলায়
উপরে সর্বত্রই বরফ। বুঝিলাম মরণ এইবার নিশ্চিত।
ক্যাপটেন আমাদের সকলকে জড় করিয়া ভয়বিহ্বল
কম্পিত কণ্ঠে বলিতে লাগিলেন, “এতদিন সমস্ত বিপদ আনি
কাটিয়ে এসেছি, কিন্তু আজ আমাদের মরণ একেবারে
নিশ্চিত। হয় বরফের দল জাহাজকে পিশে ফেলে আমাদের
হত্যা করবে, তা না হয় ত ক্রমশ বাতাসের অভাবে শ্বাসরুদ্ধ
হয়ে আমাদের মরতে হবে। জাহাজে যা খাবার আছে, তা
এখন অনেকদিন চলবে ; কিন্তু বাতাস যা আছে তাতে
ঠিক আর আটচল্লিশ ঘণ্টা চলবে, তারপর দম বন্ধ হয়ে
মরতে হবে। মাথার উপরকার নয়শত ফুট, উচ্চ বরফের
স্ত প ভেদ করিয়া উঠা নােটিলসের পক্ষে একবারে অসম্ভব ।
আমি বলিলাম, “আটচল্লিশ ঘণ্টা সময় ত আমাদের
হাতে রয়েছে, এর মধ্যে কি আমরা কোন রকমে পালাবার
পথ করে নিতে পারব না?”
ক্যাপটেন হতাশের হাসি হাসিয়া বলিলেন, “চেষ্টা
করতে কসুর করব না। প্রফেসার, তারপর ভগবানের দুয়া।

adf *** Afted!
সাগরিক।
amin
এখন একটা উপায় আছে, সবাই মিলে যদি বরফের উপর
নেমে কুড়ল নিয়ে এই বরফ কাটতে থাকি তাহলে বাঁচলেও
বাঁচতে পারি।”
আমি বলিলাম, “কিন্তু সেটা কি সম্ভব হবে ক্যাপটেন ?”
ক্যাপটেনের কথা শুনিয়া নেড, তখনি এক বিশাল
কুড়ল হস্তে প্রস্তুত হইয়া আসিল। দেখিতে দেখিতে
জাহাজের কয়েক জন নারিক কুড়ল হাতে বরফের উপর
নামিয়া পড়িল। মাথার উপরকার বরফের
স্তর কাটা
অসম্ভব, তাই ক্যাপটেনের হুকুম মত সকলে জাহাজের
চারিপাশের বরফ কাটিতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে
জাহাজের চারিপাশে বরফের মধ্যে এক বিশাল গম্বর কাটা
এক একটা বরফের চাই কাটা হইতেছে আর
তখনই সেট। উপরে ভাসিয়া উঠিতেছে। দুই ঘণ্টা কাজ
করিবার পর নেড়, একান্ত ক্লান্ত হইয়া ফিরিয়া আসিল ;
তখন আমি ও কনসেল কুড়ল হাতে করিয়া বরফের উপর
নামিয়া পড়িলাম ৷ সে কি ভীষণ ঠাণ্ডা; কিন্তু কুড়ল
চালাইতে চালাইতে শরীর গরম হইয়া উঠিল। দুই ঘণ্টা
বরফ কাটিবার পর আমরাও ক্লান্ত হইয়া জাহাজে ফিরিয়া
আসিলাম। জাহাজে যে তখন বিষাক্ত কাবুবনিক এ্যাসিড
গ্যাস জমিয়াছে তাহা বেশ বুঝিলাম।
বারো ঘণ্টা খুঁড়িবার পর ক্যাপটেন হিসাব করিয়া
দেখিলেন যে এইরূপে অনবরত পাঁচ রাত্রি চার দিন বরফ
হইল ।

সাগরিক।
নাই।
কাটিলে তবে বরফের স্তর শেষ হইবে। পাঁচ রাত্রি চারি
দিন! ওদিকে জাহাজের মধ্যে আর দুই দিনেরও বাতাস
মরণের ছায়া চোখের সামনে ঘনাইয়া আসিল।
শেষে কি এই বরফের ভিতর সমাধি লাভ হইবে
কিন্তু নাবিকের দল অবিচলিতভাবে বরফ কাটিতে
লাগিল। তাহাদের ধৈৰ্য্য ও মনের শক্তি দেখিয়া আমি
আশ্চর্যান্বিত হইলাম। সমস্ত , রাত বরফ কাটা হইতে
লাগিল। পরদিন ভােরে উঠিয়া দেখি বিপদ আরও ভয়ঙ্কর।
একদিকে বরফ অনেক কাটা হইয়াছে, কিন্তু আর একদিকের
গহ্বর পুনরায় বরফে ভত্তি হইয়া গিয়াছে। তখন দুইদিকে
লােক ভাগ করিয়া নূতন উদ্যমে বরফ কাটা হইতে লাগিল।
সমস্ত দিন ধরিয়া আমরা বরফ কাটিতে লাগিলাম ।
সন্ধ্যার
সময় জাহাজে ফিরিয়া আসিয়া দেখি অক্সিজেন প্রায় সমস্ত
ফুরাইয়া আসিয়াছে, কারবনিক এ্যাসিড, গ্যাসে জাহাজ
পরিপূর্ণ। দম লইতে বড়ই কষ্ট হইতে লাগিল; বুকের
উপর দুই হাত চাপিয়া ধরিয়া দম লইতে লাগিলাম।
যে কি ভয়ঙ্কর রাত্রি তা আমি বর্ণনা করিতে পারি না।
পরদিন ভােরে কুড়ল লইয়া আবার বরফ কাটিতে
গেলাম।
মাঝে মাঝে হাত হইতে কুড়ল পড়িয়া যাইতে
লাগিল ; আবার কুড়ল লইয়া মরিয়া হইয়া, প্রাণের আশা
ত্যাগ করিয়া বরফ কাটিতে লাগিলাম।
হাতের ছাল
ছিড়িয়া যাইল, সেদিকে ক্ৰক্ষেপ করিলাম না। নাবিকদের
;

সাগরিকা
;
এত পরিশ্রম সমস্তই বিফল হইল; আসল কাজ কিছুই
হইল না।
তখন ক্যাপটেনের মাথায় এক নূতন বুদ্ধি আসিল।
তিনি বলিলেন, “এই রকম বরফ কেটে পথ খােলাসা করা
নেহাৎ অসম্ভব ; উপরন্তু এতে একটা ভয়ঙ্কর বিপদ হতে
পারে। এই রকম বরফ কাটতে কাটতে যদি একটা উপরের
স্তর নেমে আসে তা হলে নােটিলস্ পিষে একেবারে চেপ্ট।
হয়ে যাবে। আর একটা নূতন উপায় আমার মাথায়
এসেছে, তাতে বােধ হয় কৃতকার্য হতে পারব।”
আমি আগ্রহভরে জিজ্ঞাসা করিলাম, “সে কি,
ক্যাপটেন ?”
ক্যাপটেন বলিলেন, “গরম জলের ঝর্ণাধারা এই বরফের
উপর অনবরত ফেললে পরে হয়ত বরফের স্ত প ক্রমশঃ
আমাদের পথ ছেড়ে দিতে পারে।”
আমি বলিলাম, “সেই ঠিক।”
তখনি সমুদ্রের শীতল জল পাম্পে করিয়া তুলিয়া
জাহাজের ইলেকটিক চুল্লিতে গরম করা হইতে লাগিল।
জল অত্যন্ত উত্তপ্ত হইলে পর পাম্পে করিয়া বরফের উপর
সজোরে নিক্ষিপ্ত হইতে লাগিল। এই রকম সমস্ত দিন
সমস্ত রাত করা হইল।
পরদিন ২৭শে মার্চ। ঘুম হইতে উঠিয়া দেখি চারিদিকের
পথ অনেকদূর পর্যন্ত পরিষ্কার হইয়াছে, কিন্তু বরফের

১২৮ সাগরিক। বুকের উপর পরিমাণ এখনও যথেষ্ট। জাহাজের ভিতরকার বাতাসের অবস্থা পূৰ্ব্ব দিন অপেক্ষা আজ আরো ভয়ঙ্কর। বুকের যেন হাজার মণ পাথর কে চাপিয়া ধরিয়াছে। নিশ্বাস লইতে ভয়ঙ্কর কষ্ট হইতে লাগিল । শ্বাস বন্ধ হইয়া আসিবার উপ- ক্রম হইল। হাই তুলিয়া হাই তুলিয়া চুয়াল ব্যথা হইয়া গেল। তবু কুড়ল লইয়া শেষ বারের মত চেষ্টা করিতে লাগিলাম। হাত কনকন করিতে লাগিল, মাথা ঝিমঝিম্‌ করিয়া উঠিল । জাহাজে যখন ফিরিয়া আসিলাম তখন মাতালের মত টলিতে লাগিলাম। গলার ভিতর কিসের ঘরর ঘরর শব্দ হইতে লাগিল। ক্যাপটেন নিমম যখন দেখিলেন কুড়লে আর গরম জলে কিছুই ফললাভ হইতেছে না, তখন আর এক ভয়ঙ্কর মতলব তাহার মাথায় আসিল। মৃত্যুকে সামনে নিশ্চিত দেখিলে লােকে যেরূপ মরিয়া হইয়া অসম্ভব কাণ্ড করিয়া বসে, এও সেইরূপ। ক্যাপটেন হিসাব করিয়া দেখিলেন উপরের বরফের স্তপ আর বেশী মােটা নাই, খুবই পাতলা হইয়া আসিয়াছে। তখন নােটিলসকে তুলিয়া বরফের তলায় উপরদিকে ঠেলিয়া চাপ মারিতে লাগিলেন। জাহাজের ইঞ্জিন প্রবলবেগে চলিতে লাগিল, কিন্তু বরফের স্তুপ একটুও নড়িল জাহাজের গতি আরো বাড়ানো হইল ; নােটিলস্ প্রচণ্ড বিক্ৰমে বরফের তলায় চাপ মারিতে লাগিল; কিন্তু কিছুই হইল না। তখন ক্যাপটেন স্বয়ং কল চালাইতে । ;

সাগরিকা
লাগিলেন ; বরফের উপর যে চাপ দেওয়া হইতে লাগিল,
সেই শক্তির ওজন ১৮০০ টন বা ৪৮৬০ মণ। সে প্রচণ্ড শক্তি
বরফের স্তর সহিতে পারিল না। একটা ভয়ঙ্কর শব্দ করিয়া
ছেড়া কাগজের মত বরফ দুইভাগ হইয়া গেল। উপরে
উঠিতেই নির্মল বাতাসের গুণে আমাদের যেন নবজীবন লাভ
হইল।
নােটলস্ তখন অসম্ভক গতিভরে উত্তর অভিমুখে ছুটিতে
লাগিল। ঘণ্টায় প্রায় চল্লিশ মাইল বেগে জাহাজ চলিতে
লাগিল। সামনে যে সব বরফের স্তর পড়িতে লাগিল তাহা
ছিন্নভিন্ন করিয়া নােটিল লড়াইএর খ্যাপা হাতীর মত
প্রচণ্ডবেগে সামনে ছুটিয়া চলিল।

সপ্তদশ পরিচ্ছেদ আমাজন নদী-ভগবানের আশ্চর্য সৃষ্টি উপরে উঠিয়া আমরা সকলে আশ মিটাইয়া বাতাস খাইতে লাগিলাম। সে যে কত মিষ্ট, কত মধুর, তাহা বলিতে পারি না। বাতাস যে মানবজীবনে কত প্রয়ােজনীয় বস্তু তাহা সেইদিন মনে মনে অনুভব করিলাম। জাহাজ সােজা উত্তর দিকে চলিতেছে। কিন্তু ক্যাপটেন এখন আমাদের কোন দিকে লইয়া যাইবেন? প্রশান্ত মহাসাগরে না আটলান্টিক মহাসাগরে ? খুব সম্ভব তিনি এখন প্রশান্ত মহাসাগরে পাড়ি দিবেন, কারণ তাহা হইলে পৃথিবীর চারিদিকে তাহার ঘােরা হইল। কিন্তু এই খাম- খেয়ালী লােকটির সম্বন্ধে কোন কথা কিছুই নিশ্চিত করিয়া বলা যায় না। ৩১শে মার্চ তারিখে আমরা মেরু-রেখা ( Polaur circle) পার হইলাম ; তারপর জাহাজ পুনরায় আমেরিকার কেপ, হর্ণের দিকে চলিল। আবার মানবজগতে ফিরিয়া আসিতেছি ভাবিয়া মন আনন্দে ভরিয়া উঠিল। ভবিষ্যতের উজ্জল আশার আলােকে নেডের চোখমুখ পুনরায় আলােকিত হইয়া উঠিল। সমস্ত দিন ক্যাপটেনকে একবারও দেখিতে পাইলাম না। পরদিন ১লা এপ্রিল। দুপুরবেলা পশ্চিম দিকে ডাঙ্গা দেখিতে পাইলাম। এটা ‘টিয়েরা ডেল ফিয়ােগে’; এই

সাগরিকা
১৩১
দ্বীপটি স্পানিশ গণ যখন প্রথম আবিষ্কার করে, তখন এই
দ্বীপবাসী অসভ্য লােকদের কুটীর হইতে প্রচুর পরিমাণে
ধোয়া উঠিতে দেখিয়া ইহার নাম রাখে ‘ধোঁয়ার দেশ’ ;
এই দ্বীপটি বড় বড় পাহাড় ও ঘন জঙ্গলে পরিপূর্ণ। এইখানে
নােটিলস্ জলের তলায় ডুবিয়া চলিল ; জলের ভিতর সুদীর্ঘ
জলীয় ঘাস দেখিতে পাইলাম, এক একটি ঘাস দৈর্ঘ্যে নয়শত
ফুট! এই ঘাসগুলি এত মােটা ও শক্ত যে বড় বড় নৌকা
অনায়াসে বাঁধিয়া রাখা যায়। এই ঘাসের জঙ্গলের মধ্যে
অসংখ্য কঁকড়া, মােচলচিংড়ী, মােলস্ক, বাসা করিয়া আছে ।
সি ও অটার নির্ভয়ে এই ঘাসের মধ্যে চলিয়া বেড়াইতেছে।
ফল্যাণ্ড দ্বীপের নিকট জাহাজ একবার হাওয়া লইবার
জন্য ভাসিয়া উঠিল ; তারপর পুনরায় ডুবিয়া আমেরিকার
উপকূল চাপিয়া চলিতে লাগিল। ৩রা এপ্রিল প্যাটাগােনিয়া
পিছনে ফেলিয়া রাইও-ডে-প্লাতার সুপ্রশস্ত মােহনার নিকট
জাহাজ পৌছিল। ৪ঠা এপ্রিল উরুগুয়ের পঞ্চান্ন মাইল দূরে
থাকিয়া জাহাজ চলিতে লাগিল। সেইদিন হিসাব করিয়া
দেখিলাম আমরা নােটিলসে সৰ্বশুদ্ধ ১৬,০০০ হাজার মাইল
চলিয়াছি। বেলা ১১টার সময় কেপ, ফ্রীও পার হইয়া
জাহাজ অসম্ভব দ্রুতগতিতে উত্তর দিকে চলিতে লাগিল।
নেড, সঙ্কল্প করিয়াছিল ব্ৰেজিলের উপকূলে জাহাজ পেীছিলে
জাহাজ হইতে পালাইবে; কিন্তু ব্ৰেজিলের নিকট জাহাজ এত
জোরে চলিতে লাগিল যে আমাদের গা মাথা ঘূরিতে লাগিল ;
;
;

সাগরিকা এমন কি দু একটা উড্ডীয়মান হংসজাতীয় পাখী মাথা ঘুরিয়া জাহাজের উপর পড়িল। কয়েকদিন যাবৎ জাহাজের এই দ্রুতগতি সমানভাবে রাখিয়া ৯ই এপ্রিল তারিখে আমেরিকার সৰ্ব্বাপেক্ষা পশ্চিমদিগবর্তী উপকূলে অর্থাৎ কেপস। রকের নিকট জাহাজ পেীছিল। এইখানে জাহাজ পুনরায় ডুবিয়া চলিল। ; দুইদিন পরে অর্থাৎ ১১ই এপ্রিল তারিখে নােটিলস্ পুনরায় ভাসিয়া উঠিল। সামনেই আমাজন নদীর বহুদূর- ব্যাপী সুবিস্তৃত মােহনা। এত বড় নদীর মুখ পৃথিবীর আর কোন নদীর নাই। এই আমাজন নদী পৃথিবীর সমস্ত নদী অপেক্ষা বৃহৎ ও দীর্ঘ ; ইহার দৈর্ঘ্য চারি হাজার মাইলেরও অধিক। কত দুর্গম ঘাের জঙ্গলের মধ্য দিয়া এই নদী রহিয়া আসিয়াছে। এমন সুপ্রশস্ত নদীও আর কোথায় নাই; সমুদ্র হইতে বহুদূর পর্যন্ত ইহার এক এক জায়গা এত 'চওড়া যে নদীকে সমুদ্র বলিয়া মনে হয়। এই নদী প্রতিদিন সমুদ্রের উপর যে কত লক্ষ লক্ষ মণ জল ঢালে তাহার ঠিকানা নাই। ইহার মােহনার নিকট হইতে সমুদ্রের বহু মাইল পর্যন্ত জল অতি সুস্বাদু। নদীর দুইধারের জমী অত্যন্ত উৰ্ব্বরা ; সহস্র সহস্র মাইল বিস্তৃত জমীর উপর ঘাের অরণ্য। এই সব জঙ্গলে এত বড় বড় গাছ এমন ঘনভাবে জন্মিয়াছে যে মাটিতে সূর্যের আলাে পড়িতে পারে না; সেই জন্য জঙ্গলের মধ্যে দিনের বেলাও ঘাের অন্ধকার, আর মাটি বৎসরের সব ;

সাগরিকা
সময়েই ভিজা সেতসেঁতে। নদীকূলের এই সব জঙ্গলে এত
দীর্ঘ ও এত ঝােপাল গাছ আছে যে দেখিলে আশ্চর্য হইতে
হয় ; আমাদের দেশের বট বা অশ্বত্থ গাছও অত ঝােপাল
আর বড় নহে। এইখানে এমন গাছও দেখিতে পাওয়া যায়,
যাহাদের বয়স হাজার দু-হাজার বৎসরেরও বেশী। উহাদের
তলায় কত রকমের বন্য লতানাে গাছ ও আগাছা জন্মাইয়াছে।
লতাগুলি এমন ঘনবদ্ধভাবে গাছগুলিতে জড়াইয়া উঠিয়াছে
ও এক গাছ হইতে আর এক গাছে লতাইয়া গিয়াছে যে
মানুষ ত দূরের কথা, বনের পশুপক্ষীও ইহার মধ্যে পথ
করিয়া ঢুকিতে পারে না। এখানে হাজার হাজার মাইলের
মধ্যেও একটি জনপ্রাণী দেখিতে পাওয়া যায় না। জমী এত
অসম্ভব উৰ্বর, এত পলীমাটিতে পূর্ণ, তবু কেহই এখানে
চাষবাস করে না।
কারণ এমন শক্তি ও সাহস কাহারও
নাই যে, এই জঙ্গলের মধ্যে প্রবেশ করে। আফ্রিকার
জঙ্গলও এত ভয়ঙ্কর নয়। এই সকল জঙ্গলে বিষাক্ত সর্পের
পরিমাণ দেখিলে ভয়ে সৰ্ব্ব শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠে।
গাছের তলায় তলায়, ঝােপের ফাকে ফাকে, লতাপাতার
অন্তরালে, আশে পাশে, চতুর্দিকে লক্ষ লক্ষ বিষাক্ত সর্প
কুণ্ডলী পাকাইয়া, পরস্পর পরস্পরকে জড়াইয়া শুইয়া
আছে। সাপের এমন জোট, আর কোথাও দেখিতে পাওয়া
যায় না। তারপর কুমীর, গিরগিটি, মাকড়সা, রাক্ষুসে
গেছে কঁকড়া! এই সব মাকড়সা ও গেছে। কঁকড়াদের

১৩৪
সাগরিকা
যে কি ভয়ঙ্কর আকার তা তােমরা কিছুতেই ভাবিয়া উঠিতে
পারিবে না। বনের মধ্যে চারিদিকেই নদী, নালা, খাড়ি,
গেছে। কাকড়।
জল-সমস্তই মাছে পরিপূর্ণ, কিন্তু খাইবার কেহই নাই।
আমাজন নদী পৃথিবীর মধ্যে ভগবানের এক আশ্চর্য সৃষ্টি।

সাগরিকা . বিষুবরেখা পার হইলাম। কুড়ি মাইল পশ্চিমে ফরাসীদের গিয়ানা রাজ্য। এইস্থানে পালানাে খুবই সম্ভব ছিল, কিন্তু এখানকার সমুদ্রে এত ভীষণ ঢেউ যে, মানুষ নৌকা চালাইতেও সাহস করে না। নেড়, ক্রমাগত বিফল- মনােরথ হইয়া ক্ৰমশঃই দমিয়া যাইতে লাগিল। ১২ই এপ্রিল তারিখে জাল ফেলিয়া সমুদ্রে নানা জাতীয় মাছ ও সাপ ধরা হইল; লােহিতবর্ণ মােলস্ক, আর্গোনাট, কাট মাছ, উড়ুক্কু মাছ, ইল মাছ এক একটি পনের ইঞ্চি দীর্ঘ, খুব বাচ্চা হাঙর ছানা-দৈর্ঘ্যে তিন ফুট মাত্র ; মােল, কঙ্কাল মাছ, ম্যাকারে, সামন্ প্রভৃতি অনেক মাছ আমাদের জালে পড়িল । এইখানে একটি হাস্যকর ঘটনার কথা উল্লেখ করিতেছি । জালের মধ্যে একটা চেপ্টা ( লেজ নাই) আলােক মাছ পডিয়াছিল। মাছটা লাফাইতে লাফাইতে জাহাজের

১৩৬
সাগরিক।
কিনারায় গিয়া পৌছাইল ; আর এক লাফ মারিলেই জলে
গিয়া পড়িবে । কনসেল তাড়াতাড়ি মাছটাকে ধরিয়ে গেল ।
উ : (ছ
মাছটাকে যেমন ছুইয়াছে তামনি শূন্যে পাদুটি তুলিয়া কসে
তিন হাত তফাতে হিটকাইয়া পড়িল ! তার সে কি করুণ
চীৎকার—“প্রভু বাঁচান, গেলুম, গেলুম!” তাহার সর্বাঙ্গ
অসার হইয়া গিয়াছে ; নেড, ও আমি ছুটিয়া গিয়া তা'কে
তুলিলাম ; হাত দিয়া ঘসিতে ঘসিতে তবে তাহার জ্ঞান
ফিরিয়া আসিল। বলা বাহুল্য এই আলােকমাছগুলি তড়িতে
পরিপূর্ণ।
ডচ, গিয়ানার মারােনি নদীর মুখের কাছে আসিয়া
;

সাগরিক।
১৩৭
পড়িলাম। এইখানে একপ্রকার জলজন্তু গরুর মত সমুদ্রের
জলীয় ঘাস খ। নির্ভয়ে বিচরণ করিতেছিল; ইহাদেব
;
নাম ম্যানাটি ; ইহার দৈর্ঘ্যে সচরাচর একুশ ফুট হইয়া
থাকে।
ইহারা অত্যন্ত ধীর প্রকৃতি ; সমুদ্রের
আগাছা খাইয়া ইহারা মানবজগতের যে কত উপকার
করে তাহার সীমা নাই। কিন্তু মারিয়া মারিয়া শিকারীর
দল ইহাদের লুপ্ত করিয়া দিতেছে ; সেইজন্য চারিদিকে
হলুদজ্বর, ম্যালেরিয়া এত বেশী দেখা দিতেছে ।
এইখানে অনেকগুলি অতিকায় কচ্ছপ জলের উপর
ভাসিতেছিল ; এক একটা ওজনে প্রায় বিশ ত্রিশ মণ ;
ইহাদের পিঠের খােলা এত শক্ত যে হারপুণ মারিলেও
কিছু হয় না। নেড, অতি কৌশলে ইহাদের পেছনের পায়ে
দড়ির ফঁস্ লাগাইয়া দুইটা ধরিয়া জাহাজে তুলিল।

অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ
অক্টোপাস বা সামুদ্রিক রাক্ষস
এইবার জাহাজ আমেরিকার উপকূল ত্যাগ করিয়া
ক্যারিবিয়ান সাগর পার হইয়া আল্যান্টিক মহাসাগরে
গিয়া পড়িল। ১৬ই এপ্রিল তারিখে আমরা মাতিনি
ও গুয়াদালুপ দ্বীপপুঞ্জ দেখিতে পাইলাম। এই দ্বীপগুলি
ফরাসীরাজ্যের অধীনে। দূর হইতে পর্বতচূড়াগুলি ভারী
সুন্দর দেখাইতেছিল।
ছয়মাস হইল জাহাজে বন্দীভাবে রহিয়াছি, তবু
পালাইবার কোন উপায় দেখিতে পাইলাম না। ক্যাপটেনের
কাছে আশা করা দুরাশা মাত্র। অধিকন্তু আজ একমাস
যাবং ক্যাপটেনের মধ্যে অনেক পরিবর্তন দেখিতে
পাইতেছিলাম। তাহাকে ত আর দেখিতেই পাওয়া যায়
না; পরন্তু আমাদের সঙ্গে তাহার সেই আগেকার সরল
সুমধুর ব্যবহার দেখিতে পাইতাম না। এখন তিনি বডড
বেশী গম্ভীর ও ঘরকুণে। হইয়া পড়িয়াছেন। কোন কথা
জিজ্ঞাসা করিলে ভালভাবে উত্তরও পাওয়া যাইত না।
জাহাজ এখন ডুবিয়া চলিয়াছে। এইস্থানে জীবজগতের
অনেক নূতন খবর সংগ্রহ করিলাম। নানা প্রকার অদ্ভুতাকৃতি
ও জলজন্তু দেখিয়া আমার অদম্য জ্ঞানপিপাসা
মাছ

সাগরিক।
মিটাইতে লাগিলাম। এইখানে একটি নূতন জলজন্তু চোখে
পড়িল, তাহা দেখিতে অতি বিকট। ২০শে এপ্রিল তারিখে
আমরা বাহামা দ্বীপপুঞ্জের নিকট পৌছাইলাম। এইখানে
জলের তলায় বড় বড় পাহাড়ের মধ্যে অসংখ্য গহ্বর।
এই সব গহ্বরে পুল্প, বা অক্টোপাসের বাসা।
সমুদ্রের এই জায়গাটা পুল্পদের আডডা বলিলেও
চলে। ইহারা অতি ভয়ঙ্কর জলজন্তু। দৈত্যের মত ইহাদের
আকুতি, আর দেহে শক্তিও অসম্ভব। পুরাকাল হইতে
এই পুল্পদের সম্বন্ধে কত আজব কাহিনী লােকের মুখে
মুখে চলিয়া আসিতেছে। এই পুল্প, না কি বড় বড়
জাহাজ নিজের আট পা দিয়া জড়াইয়া জালের ভিতর
টানিয়া লয় ; এই পুল্পকে দ্বীপ মনে করিয়া কে একজন
পাদ্রী ইহার পিঠের উপর গির্জা তৈরী করিয়াছিল, গিচ্চ
যেমন শেষ হইল, অমনি সঙ্গে সঙ্গে গির্জা জলের উপর
চলিতে লাগিল ও দেখিতে দেখিতে ডুবিয়া গেল। এই গুলি
আজগুবি গল্প ; কিন্তু আজগুবি গল্প একটা সম্পূর্ণ মিথ্য।
কথা লইয়া তৈরী হয় না,—ইহার মধ্যে কিছু না কিছু
সত্য আছে। মাকড়সার গড়ন যেইরূপ ইহাদের আকৃতি
অনেকটা সেইরূপ দেখিতে। ইহাদের গােল পুটলী
দেহটি কুড়ি ফুট দীর্ঘ ; দেহকাণ্ড হইতে আটটি পা বাহির
হইয়াছে, এক একটি পা পঁয়তাল্লিশ ফুট দীর্ঘ। বুঝিয়া
দেখ কুড়ি ফুট দীর্ঘ একটি দেহ হইতে
হইতে আট দিকে
;

১৪০ সাগরিকা ; সময়ে আটটি পা বাহির হইয়াছে ! প্রত্যেক পায়ের সামনে হুকের মত একটা ভয়ঙ্কর নখ—কি ভয়ঙ্কর সেই জন্তু! নাবিক- গণ প্রায়ই সমুদ্রদেশে এই পূল্প, দেখিতে পায়। এ পর্যন্ত কেহ একটা পুল্প, ধরিয়াছে বা মারিয়াছে বলিয়া শােনা যায় নাই ; কারণ ইহাদের শরীরের মাংস এত নরম, এত থথলে, এত হরহরে যে, গুলি বা হারপুন ইহাদের দেহে বিধে না। ইহাদের এক একটি পা যেন এক একটি অজগর সাপ ; দেহের উপর দুইটা ছােট্ট ড্যাবড্যাবে চোখ আছে, মুখের গড়ন টিয়া পাখীর ঠোটের মত। কাচের জানালার নিকট বসিয়া নেড, কনসেল আমি এই পুল্পদের সম্বন্ধে গল্প করিতেছি, এমন নেড়, চীৎকার করিয়া উঠিল, “কি ভয়ঙ্কর একট। দেখুন।” দেখিয়া আমার গা কাটা দিয়া উঠিল। সামনেই একটা ভয়ঙ্কর পুল্প , ইহার দেহ চল্লিশ ফুট দীর্ঘ, প্রত্যেক প। পঞ্চাশ ফুট দীর্ঘ ! জাহাজের দিকে ঘােলাটে চক্ষু মেলিয়া অতি ভীষণবেগে পুল্প, আমাদের পানে ছুটিয়া আসিতেছিল। তাহার আট পায়ের কিলবিলুনি দেখিয়া আমরা ভয়ে কঁপিতে লাগিলাম ; এই আট পা দিয়া জাহাজকে জড়াইয়া ধরিলে নােটিলসের এমন শক্তি নাই যে সে নিজেকে মুক্ত করে। পায়ের তলদেশে ২৫ গর্ত ; মুখের । টিয়াপাখীর ঠোটের মতন, সেটা কেবল খুলিতেছে ও বন্ধ করিতেছে। মুখের ভিতর কয়েক সারি দাত, জিবটা

সাগরিকা
১৪১
.
সাপের জিবের মত দুইখণ্ডে বিভক্ত। আরাে আশ্চৰ্যজনক
ইহার গায়ের রং! ভয় ও হিংসা অনুযায়ী কখনাে লাল,
কখনাে কালো, আবার কখনাে বা ধূসর বর্ণ হইতেছিল।
ভগবানের কি অপরূপ সৃষ্টি এই পুল্প, !
জাহাজের আলাে দেখিয়া দেখিতে দেখিতে আরো
কতকগুলি পুল্প আসিয়া হাজির হইল ; গুণিয়া দেখিলাম
সাতটা। নােটিলস্ দ্রুতবেগে চলিতেছে, পুল্প, গুলিও জাহাজের
পাশে ও পিছনে সারি দিয়া চলিল ; কখনাে কখনাে
ঠোট দিয়া কাচের উপর ঘর্ষণ করিতে লাগিল। टोर
জাহাজ থামিয়া গেল, জাহাজের সর্বাঙ্গ থর থর করিয়া
কঁপিয়া উঠিল ।
ক্যাপটেন নিমম একজন কর্মচারীকে সঙ্গে লইয়া
ঘরের ভিতর প্রবেশ করিলেন; আমাদের প্রতি না
তাকাইয়া সােজা জানালার নিকট গিয়া পুল্প গুলি নিরীক্ষণ
করিতে লাগিলেন ; পরে কর্মচারীকে কি বলিতে সে বাহিরে
গিয়া জানালার তক্তা বন্ধ করিয়া দিল। সঙ্গে
জাহাজও জলের উপর ভাসিয়া উঠিল।
ক্যাপটেনের নিকট অগ্রসর হইয়া আমি বলিলাম,
“কি ভয়ানক জন্তু! এত পুল্প, একেবারে কোথা
এলো ? ”
ক্যাপটেন বলিলেন, “হাঁ, এখন আমাদের ওদের সঙ্গে
লড়তে হবে।
জাহাজের ব্লেডের সঙ্গে পুল্পের একটা পা
সঙ্গে
থেকে

১৪২ সাগরিক। '... ; সঙ্গে জড়িয়ে গেছে ; সেইজন্য জাহাজ চলতে পারূছে না। এদের সঙ্গে লড়াই করা মানে মরণের সঙ্গে যুদ্ধ করা; ইহাদের গায়ে না বসে গুলি, না বসে হারপুন ! কুড়ল হাতে করে লড়তে হবে।” নেড, জিজ্ঞাসা করিল, “আমরা কি আপনার এই যুদ্ধে যােগ দিতে পারি না?” ক্যাপটেন বলিলেন, “তােমরা ইচ্ছা করিলেই আমাদের সঙ্গে যেতে পার।” ক্যাপটোনের সঙ্গে আমরা তিনজন জাহাজের ছাদের উপর গিয়া উপস্থিত হইলাম। কনসেল ও আমার হাতে একটা করে কুড়ল, নেডের হাতে ভয়ঙ্কর এক হারপুন। জাহাজের উপর প্রায় দশবারাে জন নাবিক কুড়ল হাতে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইয়াছিল। একজন নাবিক প্যানেলের স্কু খুলিয়া দিল ; ব্লেড, আলগা হইতেই একটা ভীষ পা শূন্যে কয়েকবার দুলিয়া জলের ভিতর ডুবিয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে ছাদের উপর প্রায় এক কুড়ি পা আসিয়া উপস্থিত হইল। ক্যাপটেন নিমো কুড়লের এক প্রচণ্ড আঘাতে একটা পা দুইখণ্ড করিয়া দিলেন ; সঙ্গে সঙ্গে দুইটা প পা শূন্যে উঠিয়া খানিকক্ষণ লিলিক্ করিয়া ক্যাপটেনের সম্মুখে যে নাবিকটি দাড়াইয়াছিল তাহাকে জড়াইয়া ধরিয়া পুনরায় শূন্যের উপর তুলিয়া ধরিল। ক্যাপটেন নিমো চীৎকার করিয়া সামনে ছুটিয়া যাইলেন। আমরাও ছুটিয়া গেলাম ।

সাগরিকা :৪৩ nim সে কি মর্মান্তিক করুণ দৃশ্য ! হতভাগ্য নাবিক পুল্পের কবলে শূন্যে দুলিতে লাগিল ও মৃত্যু যন্ত্রণায় ছট্‌ফট্‌ করিতে লাগিল। শূন্যে দুলিতে দুলিতে সে ফরাসী ভাষায় চীৎকার করিয়া উঠিল,-“বাঁচাও! বাঁচাও !” আমি চমকাইয়া উঠিলাম। জাহাজে তাহা হইলে আমাদের দেশেরই একজন লােক ছিল ; এতদিন শিখানাে বিজাতীয় ভাষায় কথা কহিয়া আসিয়া আজ মৃত্যুমুখে পড়িয়া সে আপন মাতৃভাষায় চীৎকার করিয়া উঠিল । “বাঁচাও! বাঁচাও!” সে কি করুণ অসহায় চীৎকার- ধ্বনি। এখনও তাহার চীৎকার আমার কানে বাজিতেছে । সেই রাক্ষসতুল্য জলজন্তুর হাত হইতে কে তাহাকে বাঁচাইবে ? মরণ তাহার সুনিশ্চিত। তবু ক্যাপটেন নিমো কুড়ল হাতে চুটিয়া যাইয়া পুল্পের একটা পা দ্বিখণ্ড করিলেন। জাহাজের উপর তখন অনেকগুলি পা আসিয়া পড়িয়াছে। জাহাজের যত নাবিক ও কর্মচারী ছুটাছুটি করিয়া যে যত পারিল পা কাটিতে লাগিল। নেড, কসেল ও আমি সেই সকল বীভৎস মাংসপিণ্ডের উপর ঘ্যাচাঘ্যাচ, কুড়ল বসাইতে লাগিলাম। এক উৎকট বিজাতীয় কস্তুর গন্ধে চারিদিক আমােদিত হইয়া উঠিল। তখনও হতভাগ্য নাবিকটি পুল্পের পায়ে কুলিয়া পালকের মত শূন্যে দুলিতেছিল। কাপটেন যেই সেটা কাটিতে যাইবেন অমনি পুল্প নিজের দেহ হইতে আলকাতরার মত একপ্রকার

১৪৪
নাগরিক।
;
কালাে দুর্গন্ধময় জল প্রচুর পরিমাণে বাহির করিয়া সকলকে
অন্ধ করিয়া দিল। আলকাতরার মেঘ কাটিয়া যাইলে দেখি-
লাম পুল্প, টি জলের তলায় অদৃশ্য হইয়াছে ; হতভাগ্য লােকটিও
সঙ্গে সঙ্গে জলের তলায় গিয়াছে । দশ বারােটা পুল্প,
তখনও আমাদের সঙ্গে যুঝিতেছিল। নেড,ল্যাণ্ড ক্ষিপ্তের মত
তাহাদের কাটিতেছিল; এমন সময় নেডের অলক্ষ্যে একটা
পা পিছন হইতে নেড়কে জড়াইয়া ধরিতে গেল। নেড় গেল,
গেল ! এমন সময় ক্যাপটেন হরিতপদে ছুটিয়া গিয়া সেই
পা’টা দুইখণ্ড করিয়া ফেলিলেন।
পনের মিনিট যুদ্ধের পর পুল্পের দল ক্ষতবিক্ষত হইয়া
পালাইয়া গেল। রক্ত ও কালিতে আমরা ভূতের মত
দাড়াইয়া রহিলাম। ক্যাপটেন নিমাে সমুদ্রের পানে
স্থিরদৃষ্টি মেলিয়া অপলকনেত্রে দাড়াইয়া রহিলেন ; তাহার
এক সঙ্গীকে সমুদ্র আজ টানিয়া লইল! দেখিতে দেখিতে
ক্যাপটেনের চক্ষু হইতে বড় বড় জলের ফেঁাটা গড়াইয়া
পড়িতে লাগিল।
;

উনবিংশ পরিচ্ছেদ সাইক্লোন্ ২৫শে এপ্রিলের সেই শােচনীয় ঘটনা আমরা কেহই ভুলিতে পারিলাম না। ক্যাপটেন অনেকক্ষণ সমুদ্রের দিকে চাহিয়া কঁদিতে লাগিলেন ; তারপর নিজের ঘরে ফিরিয়া গেলেন। কয়েক দিন পর্যন্ত আর তাহাকে দেখিতে পাইলাম না। তঁাহার অসহ্য মনােবেদনা ও দুঃখের ছোঁয়াচ, যেন জাহাজের গায়েও লাগিল। কয়েকদিন ধরিয়া নােটিল সমুদ্রের অনন্ত অসীম বুকের উপর দিয়া উদ্দেশ্য- হীন লক্ষ্যহীন খামখেয়ালির মত চলিতে লাগিল। সমুদ্রের যে স্থানে হতভাগ্য নাবিকটি পুল্পের কবলে প্রাণত্যাগ করিয়াছিল, জাহাজ জাহাজ কেবল ঘুরিয়া ঘুরিয়া সেই স্থানে আসিতে লাগিল। দশদিন ঠিক এমনভাবে কাটিল । তারপর ১লা মে জাহাজ পুনরায় উত্তর দিকে চলিতে লাগিল ; বাহামা দ্বীপপুঞ্জ অতিক্রম করিয়া জাহাজ এইবার আমেরিকার উপকূল ধরিয়া উত্তরাভিমুখে গমন করিতে লাগিল। ৮ই মে আমরা হাতেরাস্ অন্তরীপ দেখিতে পাইলাম। জাহাজের গতি এখনও সেই আত্মভােলা উদাসীর মত ; গতি ও দিকের কোন স্থিরতা নাই। এইস্থলে আমরা অসংখ্য জাহাজ, ষ্টীমার ও ছােট ছােট মাছধরার ; ܘܕ ১৪৬ সাগরিকা নাই। নৌকা দেখিতে পাইলাম । জাহাজ হইতে আমেরিকার উপকূল মাত্র ত্রিশ মাইল দূরে। পালাইবার জন্য নেড যত চেষ্টা করিতে লাগিল, ভগবান যেন পদে পদে বাধা দিতে লাগিলেন। এই স্থানের অবস্থা বড়ই খারাপ ; জলস্তম্ভ, সাইক্লোন, হারিকেন ত সৰ্ব্বদাই লাগিয়া আছে। নৌকায় চড়িয়া পালাইতে আমরা সাহস করিলাম না। নেড, আমাকে বলিল, “প্রভু, দক্ষিণ মেরুর অভিজ্ঞতা খুবই হয়েছে, এখন উত্তর মেরুদেশ দেখতে আর আমার প্রবৃত্তি যা বুঝছি ক্যাপটেন ত এখন উত্তর মেরুর দিকে চলেছেন। আপনি এর যা-হােক একটা প্রতিকার করুন।” আমি বলিলাম, “নেড, কি করি বলল; সমুদ্রের যা অবস্থা তাতে নৌকায় চড়ে পালাতে ভরসা হয় না।” নেড় বলিল, “চলুন আমরা ক্যাপটেনকে গিয়ে বলি ; তিনি নিশ্চয় আমাদের দুঃখ বুঝবেন। আপনার ফ্রান্স- দেশের পাশ দিয়ে জাহাজ যখন এলো তখন ত আপনি বেশ চুপচাপ আসতে পারলেন ; কিন্তু আমি আর পারছি । অদূরেই আমার দেশ ; যখন ভাবি নিউফাউণ্ড ল্যাণ্ড দ্বীপের নিকট সেন্ট, লরেন্স, নদী এসে পড়েছে, আর সেই সেন্ট, লরেন্স নদীর ধারেই কুইবেক সহর, আর সেই সহরেই আমার বাড়ী, তখন আমার রাগে দুঃখে সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে পড়তে ইচ্ছা করে।” ;

সাগরিক।
ছিলেন ;
;
আমি বলিলাম, “ক্যাপটেন ত এ সম্বন্ধে তার অভিমত
আমাদের আগেই জানিয়েছেন।”
নেড় বলিল, “তা হলেও, আর একবার আপনি যান।”
কি করি, অগত্যা ক্যাপটেনের কাছে গিয়া বলাই ঠিক
করিলাম। ক্যাপটেনের মেজাজ যে আজকাল একেবারে
বাজখাই খাদে নামিয়াছে তাহা আমি ভালরূপেই জানিতাম।
তবু সন্তৰ্পিত দ্বিধা-কুষ্টিত চরণে ঘরের দুয়ার খুলিয়া
ভিতরে প্রবেশ করিলাম। ক্যাপটেন ঘরের ভিতরেই
টেবিলের উপর ঝুকিয়া কি লিখিতেছিলেন।
তাহার সামনে গিয়া দাড়াতেই তিনি মাথা তুলিয়া অামার
*নে কম করিয়া চাহিতে লাগিলেন ; ঝাঁঝালো পরুষ
কণ্ঠে বলিলেন, “কি দরকার আপনার এখানে ?”
লজ্জায় দ্বিধায় যেন আমি মরিয়া গেলাম ; তবু যতদূর
সম্ভব 'স্বাভাবিক সহজ কণ্ঠে বলিলাম, “আপনার কাছে
আমার কিছু বলার আছে।”
তিনি বলিলেন, “কিন্তু দেখতেই পাচ্ছেন আমি এখন
কাজ করছি।”
তাহার এই উগ্ৰমূর্তি দেখিয়া আমি ঘাবুরাইলাম না
বলিলাম, “আমরা এখন এমন অবস্থায় পড়েছি যে, দেরী করা
সম্ভবপর নয়।”
তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি হয়েছে? সমুদ্রের উপর
নুতন কিছু দেখতে পেয়েছেন? কি হয়েছে, বলুন।”
••

১৪৮
সাগরিক।
........
আমি এইবার স্থির অবিচলিতকণ্ঠে বলিলাম, “ক্যাপটেন,
আমরা আমাদের স্বাধীনতার জন্য আপনার কাছে প্রার্থনা
জানাতে এসেছি।”
ক্যাপটেন যেন আকাশ হইতে পড়িলেন, বলিলেন,
“স্বাধীনতার জন্য।”
-“হাঁ ক্যাপটেন ; আজ সাত মাস হ’ল আপনার জাহাজে
বন্দী হয়ে রয়েছি। এইবার আমাদের স্বাধীনতা ফিরিয়ে
দিন।”
“প্রফেসার ! সাত মাস আগে যা বলেছি আজও তাই
বছি ; নােটিলসে যারা একবার প্রবেশ লাভ করেছে আর
তারা এ জাহাজ ছেড়ে যেতে পারবে না।
আপনারা মিছে
অনুরােধ করতে এসেছেন।”
—“কিন্তু, নেডের কথা একবার ভেবে দেখুন ; আমি না
হয় আপনার জাহাজে সারাজীবন বন্দীভাবে রইলুম ; কিন্তু
সে স্বাধীনভাবে চিরকাল-”
—“কোন কথা আমি শুনতে চাই না। আর দ্বিতীয়বার
যেন এরূপ আব্দার আমার কানে না আসে।”
নেডের কাছে ফিরিয়া আসিয়া সব কথা বলিলাম।
জাহাজ তখন লঙ, দ্বীপের কাছাকাছি আসিয়াছিল। নেড়
বলিল, “সামনেই লঙ, দ্বীপ, যেমন করেই হোক আজ
পালাতে হবে, যত জলঝড় হৌক্‌ না কেন।”
আকাশের অবস্থা তখন বড়ই ভয়ঙ্কর। ঘন মেঘে

সাগরিকা ১৪৯ চারিদিক অন্ধকার। হারিকেনের সমস্ত পূর্বলক্ষণ দেখা দিল। ঝড়ের মুখে পড়িয়া বাতাসের রং যেন সাদা হইয়া উঠিল। সমুদ্রের জলের উপর কত পাখী উড়িয়া বেড়ায়, সমস্তই কোথায় অদৃশ্য হইল ; কেবল পেট্রল পাখীর দল ঝড়ের সূচনা দেখিয়া আনন্দে মাতিয়া উড়িতে লাগিল। পেট্রে পাখীর আর একটি নাম ‘ঝড়ের পাখী। সেদিন ১৮ই মে। সামনেই লঙ, দ্বীপ, অদূরে নিই- ইয়র্ক নগরী। সমুদ্রের সাইক্লোন জিনিষটা যে কি তাহাই বুঝিবার জন্য ক্যাপটেন নিমো দড়ি দিয়া নিজেকে ছাদের উপর বাঁধিলেন ; দেখাদেখি আমিও তাই করিলাম । আমাদের দুজনকে লইয়া নােটিল জলের উপর ভাসিতে লাগিল। তারপর দেখিতে দেখিতে ঝড়ের উদ্দাম নৃত্যতালে সমুদ্রজুল বড় বড় ঢেউ তুলিয়া ঝাপাইয়া পড়িতে লাগিল । বড় বড় পাহাড়ের মত সাদা সাদা ঢেউ মাথার উপর দিয়া চলিয়া যাইতে লাগিল। একবার হাপিয়া উঠি, ঢেউ চলিয়া গেলে আবার দম লইতে থাকি। নােটিলস্ কখনাে চিং হইয়া, কখনো কাৎ হইয়া, কখনাে বা সােজা খাড়া হইয়া উঠিয়া ঢেউএর সঙ্গে প্রাণপণে যুঝিতে লাগিল। পাঁচটার সময় অঝােরধারে বৃষ্টি পড়িতে লাগিল; বৃষ্টির সে কি বড় বড় ফোটা! সমুদ্রে যে সব ঢেউ উঠিতে লাগিল তাহ। প্রত্যেকটি পনের ফুট উচ্চ ও পাঁচশত ফুট দীর্ঘ। বুঝিলাম এই সব ঝড়ের মুখে পড়িয়া বড় বড় অট্টালিকা, বেলা

সাগরিকা
গাছ, পাথর সব উল্টাইয়া যায়। ঝড়ের সে কি তাণ্ডবলীলা।
রাত্রির সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ের দাপট যেন বাড়িয়া গেল। একখানা
মস্তবড় জাহাজ ঝড়ের মুখে পড়িয়া ঢেউএ ডুবিয়া ডুবিয়া
চলিতে লাগিল ; বুঝিলাম তাহার আর বড় বেশী দেরী
নাই। দেখিতে দেখিতে জাহাজখানি জলে ডুবিয়া গেল।
রাত্রি দশটার সময় আকাশে যেন আগুন লাগিয়া গেল ;
ঘন ঘন বিদ্যুৎশিখায় চোখ ঝলসাইয়া গেল। তারপর ভীষণ
বজ্রাঘাতে সারা ভুবন কাপিয়া উঠিতে লাগিল।
রাত বারােটার সময় আমরা স্যালুনে নামিয়া আসিলাম।
ঝড় তখন ও সমানভাবে চলিতেছিল। জাহাজ তখন ধীরে
ধীরে জলের ভিতর ডুবিল। বড় বড় মাছেদের চোখে
আতঙ্কের চিহ্ন দেখিতে পাইলাম। ঢেউএর দাপটের চোটে
মাছগুলি আছাড়ি পিছড়ি খাইতেছিল। আরে তলায়
জাহাজ নামিল। সেখানে একেবারে নিস্তব্ধ ।
ঝড়ের
চিহ্নমাত্র নাই। কে বলিবে উপরে ভীষণ সাইক্লোন
হইতেছে !

বিংশ পরিচ্ছেদ
সমুদ্রের তলায় টেলিগ্রাফের তার
ঝড়ের দাপটে জাহাজ আরাে পূৰ্বদিকে গিয়া পড়িল।
নিউইয়র্কের নিকটবর্তী কোন উপকূলে যে গিয়া আশ্রয়
লইব, তাহাও এখন অসম্ভব হইয়া উঠিল। ক্যাপটেনের
মত নেড়ও আর তাহার ঘর হইতে বাহির হইত না। জাহাজ
এখন উত্তর-পূর্ব দিকে চলিতেছে। এ ক’দিন সমুদ্রে কি
ভীষণ কুয়াশা ! সে কুয়াশা যে কত ঘন, কত ভয়ঙ্কর তাহা
যাহারা কখনাে সমুদ্রের কুয়াশা দেখে নাই তাহারা সহজে
বুঝিতে পারিবে না। এ যেন নিরেট দেওয়াল ! এই
কুয়াশার দরুণ প্রতি বৎসর কত জাহাজ নষ্ট হয়। ওয়ারনিং
লাইট, হুইসেল ও এ্যালাবে এ সকল সত্ত্বেও
জাহাজে জাহাজে ধাক্কা লাগিয়া বিপর্যয় ঘটে।
২৭শে মে তারিখে জাহাজ জলের ৮,৪০০ ফুট নিম্ন দিয়া
যাইতেছিল। এইখানে মাটির উপর ইলেটিক টেলিগ্রাফ
তার দেখিতে পাইলাম। কসে এই তার দেখিয়া প্রথমে
ভাবিয়াছিল ইহা কোন সামুদ্রিক অজগর হইবে।
আমি তাহার ভুল ভাঙ্গিয়া এই তার বসানাের ইতিহাস
তাহাকে শুনাই।
প্রথম তার বসানাে হয় ১৮৫৭ খৃষ্টাব্দে, কিন্তু চারিশত
টেলিগ্রাম পাঠানাের পর ইহা অচল হইয়া যায়। তারপর

১৫২
সাগরিকা
;
১৮৬৩ খৃষ্টাব্দে অনেক ইঞ্জিনিয়ার ও বৈজ্ঞানিক মিলিয়া
একটি দুইহাজার মাইল দীর্ঘ তার প্রস্তুত করেন ; তাহার
ওজন ৪,৫০০ টন বা ১,২৩,৭০০ মণ। ইউরােপ হইতে
আমেরিকা পর্যন্ত এই তার বসানাে হয়। কিন্তু তাহাও
শীঘ্র খারাপ হইয়া যায়। বৈজ্ঞানিক ও ইঞ্জিনিয়ারের দল
দমিয়া নূতন উদ্যমে পুনরায় নূতন তার প্রস্তুত করিবার
জন্য উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়া গেলেন। ইহার মধ্যে প্রধান
উদ্যোগী ছিলেন সাইস্ ফিল্ড ; তাহার অগাধ ঐশ্বৰ্য্য
ও সম্পত্তি সমস্তই এই কার্যের জন্য ব্যয় করিলেন । এইবার
নূতন তার প্রস্তুত হইলে তাহার উপর গাট্টাপারচার ঢানি
দেওয়া হইল, কারণ জলে ইহা শীঘ্র খারাপ হয় না।
১৮৬৬ খৃষ্টাব্দে গ্রেট ইষ্টার্ণ জাহাজে করিয়া এই তার জলে
ফেলা হয়। এইবার অতি সুন্দর কাজ হইল ; ইউরােপ
হইতে যত খবর পাঠান হইল আমেরিকায় তাহা স্পষ্ট
শুনা গেল। তখন আমেরিকা প্রথম ইউরােপের সহিত
কথা কহিল। আমেরিকা ইউরােপকে কি কথা প্রথম বলিয়া-
ছিল জান? আমেরিকা বলিয়াছিল, “স্বর্গের ঈশ্বরের নাম ধন্য
ও মহিমান্বিত হউক, পৃথিবীতে শান্তি আসুক, এবং পৃথিবীর
লােকেদের মধ্যে পরস্পরের জন্য ভালবাসা জাগ্রত হউক।”
২৮শে মে আয়রল্যাণ্ডের উপকূল হইতে নােটিলস্ তখন
১২০ মাইল দূরে। ক্যাপটেন নিমে। এইবার কোনদিকে
চলিলেন ? কেপ, ক্লিয়ারের পাশ দিয়া জাহাজ আয়রল্যাণ্ড

সাগরিকা
ঘূরিয়া ইংল্যাণ্ডের দিকে চলিল। এই কেপ, ক্লিয়ারের উপর
একটি লাইটহাউস বা আলােকস্তম্ভ আছে। লিভারপুল ও গ্লাস,
গাের জাহাজ সকল এই আলােক দেখিয়া পথ চিনিয়া লয় ।
৩১শে মে। আজ সমস্ত দিন নােটিল সমুদ্রের জলের
উপর এক জায়গায় কেবল গােলাকার ভাবে ঘূরিতে লাগিল।
দুপুরবেলায় ক্যাপটেন নিমােকে বহুদিন পরে দেখিতে
পাইলাম। তাহার চোখমুখ অত্যন্ত গম্ভীর ; অসহ্য দুঃখ ও
বেদনায় তাহার সমস্ত মুখমণ্ডল ভারাক্রান্ত হইয়া উঠিয়াছে।
এ দুঃখ কিসের জন্য ? ইউরােপের নিকটে আসিয়া ঘর বাড়ী
আত্মীয়স্বজনের কথা মনে পড়িয়া তাহার কি এই :খ
হইতেছে ? আমার সঙ্গে কথা না কহিয়া তিনি চলিয়া
গেলেন।
পরদিন ১লা জুন।
আজও জাহাজ সেইভাবে সমুদ্রের
উপর গােলাকারভাবে ঘূরিতে লাগিল; যেন কোন দিকে
যাইবে তাহা ঠিক করিতে পারিতেছে না। সমুদ্র অতি
পরিষ্কার। পূর্বদিকে প্রায় আট মাইল দূরে একটি বিশাল
জাহাজ দেখা গেল। জাহাজের মাস্তুলের উপর কোন
পতাকা নাই; সেইজন্য জাহাজ যে কোন দেশের তাহা
জানিতে পারিলাম না।
পরক্ষণে কি রকম একটা বুম্ বুম করিয়া ভীষণ শব্দ
হইতে লাগিল।

একবিংশ পরিচ্ছেদ আবার জলযুদ্ধ সেই শব্দ শুনিয়া ছাদের উপর ছুটিয়া গেলাম। কনসে ও নেড, আগে হইতে সেখানে দাড়াইয়াছিল। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম—“নেড, ও কিসের শব্দ ?” নেড, বলিল, “কামানের গোলার শব্দ।” সেই দূরের জাহাজের পানে তাকাইয়া দেখি, দুইটা ফানে বা চিমনি হইতে অনর্গল ধূম বাহির করিতে করিতে জাহাজটা আমাদের দিকে পূর্ণবেগে ছুটিয়া আসিতেছে। তখন জাহাজটা ঠিক ছয় মাইল দূরে। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,—“নেড, এ কি জাহাজ বল দেখি ?” নেড়, বলিল, “জাহাজের গড়ন দেখে মনে হচ্ছে এটা একট। যুদ্ধের জাহাজ। ভগবান করুন ঐ জাহাজট। আমাদের কাছে এসে নােটিলকে ডুবিয়ে আজ আমাদের উদ্ধার করুক।” আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “নেড়, কোন দেশের জাহাজ এটা বলতে পার ?” নেছ, তাহার কপাল কুঁচকাইয়া, চোখের পাতা আধ- বােজা করিয়া, ভ্র সঙ্কুচিত করিয়া, চোখের কোণ গুটাইয়া জাহাজটা দেখিতে লাগিল; কিন্তু কিছুই দেখিতে পাইল ;

সাগরিকা
;
না । পনের মিনিট এইরূপে কাটিলে পর জাহাজ অনেক
কাছে আসিয়া পড়িল। এইবার আমরা জাহাজের মাস্তুল,
ফানেল, জাহাজের চারিদিকের বড় বড় কামান—সব স্পষ্ট
দেখিতে পাইলাম। মাস্তুলের উপর একটা অতি ছােট
নিশান উড়িতেছিল ; সেই ফিতার মত সরু নিশানটা যে
কোন দেশের তাহা বুঝিতে পারিলাম না। যাই হােক,
জাহাজ কিন্তু দ্রুতবেগে আমাদের পানে আসিতেছিল।
নােটিলস্ সমুদ্রের উপর স্থিরভাবে দাঁড়াইয়া ।
নেড়, বলিল, “জাহাজটা যদি এক মাইল দূর দিয়েও
চলে যায়, তা হলেও আমি জলের উপর লাফিয়ে পড়ব,
এবং আপনিও তাই করবেন।”
নেডের কথায় কোন উত্তর না দিয়া জাহাজটাকে
দেখিতেছি, এখন সময় সেই জাহাজের সামনে হইতে
ভক করিয়া খানিক সাদা ধােয়া বাহির হইল। ঠিক দুই
সেকেণ্ড পরে নােটিলসের পাশে ঠিক জলের উপর একটা
কি ভারী জিনিষ আসিয়া পড়িল। ছিটুকাইয়া
নােটিলসের ছাদের উপর আসিয়া পড়িল ; তারপর আরও
চারি সেকেণ্ড পরে একটা ভয়ঙ্কর শব্দ আমার কানে আসিলে
আমি চীৎকার করিয়া উঠিলাম, “নেড, একি ? এরা যে
আমাদের উপর গুলি করছে।”
নেড,
বলিল, “হাঁ, ওরা আমাদের জাহাজকে অতিকায়
নারহােয়া ভেবে জাহাজের উপর গুলি করছে।”
;

সাগরিকা
নয় ;
আমি বলিলাম, “কিন্তু জাহাজে যে লােক রয়েছে তাত
ওরা দেখতে পাচ্ছে !”
এই কথা বলিয়াই আমার মনের ভিতরটা ছৎ করিয়া
উঠিল। এইবার সমস্ত ব্যাপার স্পষ্ট বুঝিতে পারিলাম। ওর
যে আমাদের উপর গুলি ছুড়িতেছে তা নারহােয়াল ভাবিয়া
এতদিন তাই বিশ্বাস করিয়া আসিয়াছিল বটে। কিন্তু
আব্রাহাম লিঙ্কন জাহাজ হইতে নড়, যখন হারপুন ছড়িয়া
নােটিলকে আঘাত করে, তখন ত ক্যাপটেন ফ্যারাগুট,
স্পষ্টই দেখিতে পাইয়াছিলেন যে এটা একটা নারহােয়া
বা অন্য কোন জলজন্তু নয়, এটা সাবমেরিন জাহাজ ; অতিকায়
নাহােয়াল বা সেতাসিয়ার চেয়েও যে এ আরো ভয়ঙ্কর।
ক্যাপটেন ফ্যারাগুট, তারপর কোন রকমে দেশে ফিরিয়াছেন
কিনা। তাই বা কে জানে ?
তারপর আমার আর একদিনের কথা মনে পড়িল ।
ভারতমহাসাগর দিয়া আসিতে আসিতে সেই রাত্রের যুদ্ধের
কথা মনে পড়িল। ক্যাপটেন নিমমা আমাদের সে যুদ্ধ
দেখিতে দেন নাই, ঘরের ভিতর পূরিয়া রাখিয়াছিলেন।
তখন নিশ্চয়ই কোন জাহাজের সঙ্গে নােটিলসের জলযুদ্ধ
হইয়াছিল। তারপর মনে পড়িল—সেই আঘাত প্রাপ্ত
নাবিকের কথা, সেই প্রবালের মধ্যে তাহার কবর দেওয়ার
কথা। লঙ্কাদ্বীপের নিকট যে ডুবুরিকে আমরা বাঁচাইয়া-
ছিলাম, সেও হয়ত ঘরে ফিরিয়া সব কথা বলিয়া দিয়াছে ।

সাগরিকা
.
আজ বুঝিলাম জগতের সমস্ত সভ্য জাতি দলবদ্ধ হইয়া এই
নােটিলসকে মারিবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করিতেছে। তখন
বুঝিলাম, যে জাহাজে আমরা পালাবার চেষ্টা করিতেছি
সেই জাহাজে আমাদের ভয়ঙ্কর শত্রু রহিয়াছে। নােটিলসের
চারিদিকে দমাদম কামানের গােলা পড়িতে লাগিল।
সমস্তই জলের উপর পড়িতে লাগিল, নােটলসের গায়ে
একটাও লাগিল না। সেই শত্রু-জাহাজ তখন ঠিক তিন
মাইল দূরে।
সামনে এত বড় ভয়ঙ্কর বিপদ, কিন্তু ছাদের উপর
ক্যাপটেন নিমাে আসিলেন না। তখন নেড, বলিল,
“আসুন, আমরা রুমাল উড়িয়ে ওদের জানাবার চেষ্টা করি
যে, আমরা শত্রু নই, ভালো লােক।” নেড়, রুমাল বাহির
করিয়া যেমন উড়াইতে যাইবে সেই মুহূর্তে তাহার হাতের
উপর একটা প্রচণ্ড আঘাত আসিয়া পড়াতে সে ডেকের
উপর লুটাইয়া পড়িল।
পিছনে চাহিয়া দেখি ক্যাপটেন নিমাে দাড়াইয়া।
রাগে কঁপিতে কাপিতে তিনি বলিলেন, “ওরে নির্বোধ,
নােটিলসের প্রচণ্ড ভঙ্গ দিয়ে ঐ জাহাজকে বিধবার আগে
চল্ তােকেই আগে ঐ খঙ্গের সামনে ফেলে বিধে ফেলি।”
এ কি ক্যাপটেনের ভয়ঙ্কর মূৰ্ত্তি ! তখন তাহার মূর্তি
যেমন ভয়ঙ্কর, গলার শব্দও তেমনি। মরার মুখের মত তাহার
মুখ ; সর্বাঙ্গে শিরা উপশিরা ফুলিয়া উঠিয়াছে ; চোখের

সাগরিকা
তারা ঘূর্ণ্যমান। নেডের শরীরে অত শক্তি, তাকে ধরিয়া
ক্যাপটেন নিমাে প্রচণ্ড ঝকানি দিতে লাগিলেন। তারপর
ধাক্কা মারিয়া নেড়কে দূরে ফেলিয়া দিয়া ক্যাপটেন নিমাে
জাহাজের প্রতি দৃষ্টিনিক্ষেপ করিলেন । তাহার চারিপাশ
দিয়া গুলি ছুটিতে লাগিল।
তিনি দূরের জাহাজটাকে সম্বােধন করিয়া বলিতে
লাগিলেন, “ওরে হতভাগ্য জাহাজ ! তোর কপাল আজ
ভারী মন্দ। আমি কে, তা এখনো তাের দেশের লােকের।
জানতে বা বুঝতে পারলে না। বড় যে নিশান উড়াইতে-
ছি, এই দেখ তবে আমার নিশান!” এই বলিয়া একটা
ঘাের কৃষ্ণবর্ণ পতাক। তিনি উড়াইতে লাগিলেন। এই
সময় একটা গােলা আসিয়া ডেকের উপর পড়িয়া ছিটকাইয়া
জলের ভিতর গিয়া পড়িল। নােটিলস্ ঝন ঝন করিয়া
কাপিয়া উঠিল। ক্যাপটেন নিমো আমাদের গনে
তাকাইয়া বলিলেন, “মান, আপনারা নীচে যান।”
আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “ক্যাপটেন ! আপনি কি
এখন এই জাহাজটাকে আক্রমণ করবেন ?”
তিনি বলিলেন, “না মশাই, জাহাজটাকে আমি এখন
ডুবিয়ে মারব।”
আমি বলিলাম, “না, তা করবেন না, এই অনুরােধ
আমার রাখুন।”
তিনি বলিলেন, “প্রফেসার, আপনি আমাকে শেখাতে

সাগরিকা
যান,
আস্‌বেন না।
জাহাজটাকে আমি
আমি ডুবাবই।
আপনারা নীচে যান।”
কি করি, নীচে নামিতে হইল। তখন সিড়ি দিয়
পনের জন নাবিক ছাদের উপর উঠিতেছিল। তাহাদের
সকলের মুখে ভীষণ রাগের চিহ্ন; প্রতিহিংসা লইবার জন্য
তাহাদের সকলের মুখ কালো হইয়া উঠিয়াছে।
নীচে
নামিয়া ঘরে ঢুকিলাম, এমন সময় আর একটা গােল।
আসিয়া নােটিলসের পার্শ্বদেশে লাগিল; নােটিলসের সর্বাঙ্গ
থরথর্ করিয়া কঁপিয়া উঠিল ।
তারপর নােটিলসের ইঞ্জিন চলিতে লাগিল। সেই শ -
জাহাজটাকে পিছনে ফেলিয়া নােটিলস্ পূর্ণবেগে ছুটিতে
লাগিল ; পিছনে পিছনে সেই জাহাজটাও আসিতে লাগিল।
বুঝিলাম ক্যাপটেন ইচ্ছা করিয়া এমন করিতেছেন, যাতে
জাহাজটা হয়রাণ হয়ে উঠে। বেলা চারটা পর্যন্ত এইরূপ
ছুটাছুটি চলিতে লাগিল ; আমি আর ঘরের ভিতর চুপ
করিয়া থাকিতে পারিলাম না। সাহসে ভর দিয়া সিড়ি
বাহিয়া ছাদের উপর গিয়া উঠিলাম। পিঞ্জরাবদ্ধ সিংহের
মত ক্যাপটেন নিমো ছাদের উপর পায়চারি করিয়া
বেড়াইতেছিলেন। তিনি তখনও শত্রু-জাহাজকে আক্রমণ
করেন নাই,
বােধ করি ভাবিতেছিলেন আক্রমণ করিবেন
কি না।
আমাকে দেখিতে পাইয়া ক্যাপটেন বলিয়া উঠিলেন,
;

১৬০
সারিকা
স্ত্রী, পুত্র,
“আমিই আইন, আমিই বিচারক ! ঐ দেখুন নিষ্ঠুর,
অত্যাচারী রাজা; ওদের অত্যাচারে আমি জর্জরিত হয়েছি ;
ওদের জন্য আমি আমার স্বদেশ, আত্মীয়স্বজন, স্ত্রী,
পরিবার, বাপ, মা সবই হারিয়েছি। পৃথিবীতে আমি
যদি কোন জিনিষ সবচেয়ে ঘৃণা করি তা হচ্ছে ওরা।
উপর আমি এখন প্রতিশােধ নেবই নেব।”
সেই যুদ্ধের জাহাজ তখন নােটিলকে তাড়া করিয়া
ছুটিয়া আসিতেছিল। তাড়াতাড়ি নামিয়া আসিয়া নেড কে
বলিলাম, “যেমন করে হােক আজ পালাতে হবে।
নিস্থর লােকের জাহাজে থাকতে আর আমার সাহস হচ্ছে
এমন
নেড, বলিল, “সেই ঠিক কথা, আজ রাত্রেই পালাতে
হবে।”
;
দেখিতে দেখিতে রাত্রি হইয়া আসিল। নেংটিলস্
কেবল সেই শত্রু-জাহাজকে দূর হইতে দূরে টানিয়া লইয়া
যাইতেছিল। চারিদিক একেবারে নিস্তব্ধ। সমস্ত রাত্রি
এইরূপ চলিতে লাগিল ; নােটিল কিছুতেই ধরা দিল না।
দুই জাহাজের মধ্যস্থিত দুই মাইল ব্যবধান আর কিছুতেই
কমিল না।
আমাদের পালনও হইল না। রাত যখন
তিনটা, তখন পুনরায় চোরের মত ছাদের উপর গিয়া
উঠিলাম। তখন ও ক্যাপটেন নিমো ছাদের উপর দাড়াইয়া
রহিয়াছেন। নােটিস ছুটিয়া চলিতেছে, পিছনে পিছনে

সাগরিক।
;
আমার
সেই শত্রু-জাহাজ ছুটিয়া আসিতেছে। অন্ধকারে কিছুই
দেখিতে পাইতেছিলাম না; চিনি হইতে শুধু আগুনের
কণা ও লােহিত ছাই উঠিতেছে তাহাই দেখিতে পাইতে-
ছিলাম। জাহাজ তখনও ঠিক দুই মাইল দূরে।
ক্রমে ভাের হইয়া আসিল। এইবার যুদ্ধের জাহাজ খুব
নিকটে আসিয়া পড়িল ; নাবিকেরা ছুটাছুটি করিতে লাগিল ।
আর দেখিতে ভাল লাগিল না ; ঘরে ফিরিয়া
আসিলাম। নােটিলস্ এইবার খুব ধীরে চলিতে লাগিল,
যাতে শত্রু-জাহাজ খুব নিকটে আসিয়া পড়ে। একটা
গােলা নােটিলসের পাশের জলের উপর আসিয়া পড়িল।
নেড, কসেল ও আমি লাইব্রেরীতে গিয়া বসিলাম ।
নােটিলস্ এইবার ডুবিতে আরম্ভ করিল। যুদ্ধের
যুদ্ধের এই সূচনা
দেখিয়া আমার বুক ঢিপঢিপ করিয়া কঁপিতে লাগিল। নেড়,
ত রাগিয়া ফুলিতে লাগিল। কখন সেই মরণ-আঘাত
জাহাজের উপর পড়ে, সেই চিন্তায় আমরা কাঠ হইয়া
রহিলাম।
তখন যেন আমার নিশ্বাসও বন্ধ হইয়া গিয়াছিল।
হায়রে হতভাগ্য জাহাজ।
হঠাৎ নােটিলসের সর্বাঙ্গ ঝিঝিনিয়া উঠিল । আমি
চীৎকার করিয়া উঠিলাম। সে কি এক ভীষণ ধাক্কা ।
বুঝিলাম নােটিলসের প্রচণ্ড খঙ্গ জাহাজের তলদেশে বিদ্ধ
হইয়াছে।
ঘরের ভিতর আর থাকিতে পারিলাম না, ছুটিয়া
স্যালুনে গেলাম। ক্যাপটেন নিমাে সেইখানে দাড়াইয়া-

১৬২,
সাগরিক।
ছিলেন। তাহার চোখমুখ অসাধারণ গম্ভীর ; অসহ্য দু:খে ও
শােকে তাহার বক্ষঃস্থল দুলিয়া উঠিতেছিল।
সেখান হইতে
কাচের জানালার নিকট গিয়া দেখিলাম শত্রু-জাহাজের
ভিতর প্রবলবেগে জল ঢুকিতেছে ; চতুর্দিকে হুলুস্থুল পড়িয়া
গিয়াছে ; লােকের ছুটাছুটি, গণ্ডগােল ও করুণ আর্তনাদে
চারিদিক মুখরিত হইয়া উঠিয়াছিল। জাহাজট। ক্রমশঃই
ডুবিতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে জাহাজটা জলের ভিতর
ডুবিয়া গেল ; তাহাতে সমুদ্রের উপর এক ভীষণ ঘূর্ণী দেখা
দিল । ঘূর্ণীতে লােকজন জিনিষপত্র সমস্তই তলাইয়া গেল।
পিছনে ফিরিয়া দেখি ক্যাপটেন নিমাে হাটু গাড়িয়া
লােকগুলির মৃত্যুযন্ত্রণা দেখিতেছেন। যখন লােক গুলি
ডুবিয়া গেল, ক্যাপটেন ফুলিয়া ফুলিয়া কঁদিতে লাগিলেন।
এমন ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর লােকের চোখে জল দেখিয়া আমি অবাক
হইয়া গেলাম। এমন পাষাণ হৃদয়ের মাঝেও করুণার উৎস
দেখা দেয় জানিতাম না।

দ্বাবিংশ পরিচ্ছেদ
ম্যাম
ঝপাঝপ করিয়া নােটিলসের সমস্ত আলাে নিবিয়া গেল।
জালের একশ’ ফুট, তলা দিয়া জাহাজ অসম্ভব দ্রুতবেগে ছুটিতে
লাগিল, যেন সেই ভয়ঙ্কর জায়গা হইতে পালাইতে পারিলে
বাঁচে! কোন দিকে চলিতেছি—দক্ষিণে না উত্তরে—কিছুই
বুঝিতে পারিলাম না। নিজের ঘরে চুপ করিয়া বসিয়া
রহিলাম; ক্যাপটেন নিমাের নামে ও তাহার চিন্তায় আমার
সৰ্বাঙ্গ কপিতে লাগিল। কি ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর এই মানুষ ।
এইবার আমাদের ভাগ্যে কি আছে কে জানে ?
এগারােটার সময় আলাে জ্বলিয়া উঠিল। স্যালুনে গিয়া
দেখি জাহাজ জলের ত্রিশ ফুট তলায় থাকিয়া উত্তরদিকে
পঁচিশ মাইল বেগে চলিতেছে। জাহাজের গতি ক্রমশঃই
বাড়িতে লাগিল। রাত্রি ঘাের অন্ধকার ।
ঘরে ফিরিয়া
গিয়া শুইয়া পড়িলাম, কিন্তু ঘুম আসিল না। ক্যাপটেন
নিমাের সম্বন্ধে নানা চিন্তা আসিয়া মাথায় জোট পাকাইতে
লাগিল; এ শােক যে সব পারে। সেই জাহাজধ্বংস, অত
লােকের জীবননাশ, এই সব ভয়ঙ্কর দৃশ্য চোখের সামনে
অন্ধকারে ভাসিয়া উঠিতে লাগিল। উত্তরদিকে জাহাজ
এইবার কোন পথে চলিতেছে—স্পিট্‌জবার্জেন না নােভা-
জম, শ্বেতসাগর না কারা সাগর, ওবি উপসাগর না

১৬৪ সাগরিকা লিয়াকভ, দ্বীপপুঞ্জ ? এসিয়া মহাদেশের উত্তরদিকে লােকের বসবাস নাই বলিলেও চলে ; ক্যাপটেন নিমো কি এইবার সেই দিকে চলিয়াছেন ? জাহাজ কখনাে জলের উপর কখনাে বা জলের ভিতর দিয়া চলিতে লাগিল। উত্তর মহাসাগরের অজানা। দেশের কথা ভাবিতে ভাবিতে মন ছছ করিতে লাগিল। দিনের পর দিন কাটিতে লাগিল; সেই একই ভাব, জাহাজের সেই একই গতি। মেরুপ্রদেশের ভয়ঙ্কর ঠাণ্ডা সৰ্বাঙ্গ দিয়া অনুভব করিতেছিলাম। ক্যাপটেনকেও দেখিতে পাই না, ডেকে ও দেখিতে পাই না। দেহের ও মনের জোর যেন ক্রমশঃ কমিয়া আসিতে লাগিল । দিনের বেলা অধিকাংশ সময় তন্দ্রাচ্ছন্ন অর্ধ ঘুমঘােরে কাটিয়া যাইত। জাহাজে কি না কি হইতেছে কিছুই বুঝিতে পারিতাম না; বুঝিবার বা জানিবার কৌতূহলও আর নাই। ঘুমাইয়া ঘুমাইয়া দিন- রাত্রের প্রভেদ বুঝিতে পারিতাম না। একদিন মাঝরাতে ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল ; চাহিয়া দেখি মুখের উপর কে ঝু কিয়া রহিয়াছে । নেড়কে দেখিয়া উঠিয়া বসিলাম। নেছ, বলিল, “এইবার পালাতে হবে ; আর দেরী করলে হবে না।” আমি বলিলাম, “এই এত রাত্রিতে ?” নেড, বলিল, “না কাল রাত্রিতে ; ক্যাপটেনের যে কি

সাগরিকা
১৬৫
হয়েছে কিছু বােঝা যাচ্ছে না, তারও দেখা নাই, তার
লােকদেরও দেখা নাই।
এ যেন ভূতের জাহাজ, জন-মনুষ্যের
নামগন্ধ নাই। বুঝলেন প্রফেসার, এই ঠিক পালাবার
সময়।”
আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “কিন্তু এখন আমরা
আমরা কোন
জায়গায় এসেছি ?”
নেড, বলিল, “কুড়ি ‘মাইল পূর্বদিকে ডাঙ্গা দেখতে
পেয়েছি।”
আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “কিন্তু এ কোন দেশ ?”
নেড, বলিল, “তা বলতে পারি না, কিন্তু যে দেশই হােক,
ঐখানে গিয়ে আমাদের আশ্রয় নিতে হবে।”
আমি বলিলাম, “নেড, আমিও পালাতে সম্পূর্ণ রাজী
আছি, ঝড়জল যতই হউক না কেন।”
নেড, বলিল, “যদি ধরা পড়ি বা সামনে কোন বাধা পাই,
তাহা হলে, খুন করতেও আমরা পিছুবে না; বলুন এতে
রাজী আছেন ?”
আমি বলিলাম, “নিশ্চয় নেড, এখন পালাবার জন্য যা
করবার দরকার হবে তাই করব কোন বাধাবিঘ্ন মানব না।”
নেড, চলিয়া গেল। পালাইবার জন্য মনকে দৃঢ় করিলাম।
আর না ঘুমাইয়া ছাদের উপর গিয়া উঠিলাম। সমুদ্রের উপর
ভীষণ ঝড় উঠিয়াছে ; পৰ্ব্বতপ্রমাণ ঢেউএর আঘাতে নােটিস
মােচার খোলার মত দুলিতেছিল। এত ভয়ঙ্কর ঝড়জল, এর

১৬৬
সাগরিকা
;
ওধারে ডাঙ্গা আছে, কিন্তু কিছুই দেখিতে পাইলাম না। এই
কুড়ি নাইল ঢেউ কাটিয়া কেমন করিয়া ডাঙ্গায় উঠিব ? ভাের
হইয়া আসিল ; ঘরে ফিরিয়া আসিলাম। সমস্ত দিন ঘর
হইতে বাহির হইতে সাহস হইল না; পাছে ক্যাপটেনের
সঙ্গে দেখা হইয়া যায় । তার মুখােমুখি হইয়া পড়িলে কি
জানি যদি ধরা পড়িয়া যাই ?
সেই দিনটা কি ভয়ঙ্কর দীর্ঘ বলিয়া বােধ হইতেছিল।
জাহাজে আমার এই শেষ দিন। সমস্তদিন নেড, ও কনসে
আমার সঙ্গে মােটে কথা কহিল না ; কতবার চোখাচোখি
হইল। বাহিরের ঝড়ের মতই তাহাদের মনের মধ্যে নিশ্চয়
ঝড় বহিতেছিল ; তাই কোন কথা কহিতেছিল না।
সন্ধ্যা সাড়ে ছ'টার সময় নেড, আসিয়া চুপিচুপি বলিল,
“জাহাজে আর আমাদের দেখা হবে না, সেই রাত দশটার
সময় একেবারে নৌকার কাছে গিয়া দাড়াবেন। কনসেল
ও আমি সেখানে আপনার জন্য অপেক্ষা করব ; যে রকম
ঝড়জল চলেছে, মনে হয় রাত্রিতে ভীষণ অন্ধকার হবে।”
নেড, চলিয়া গেল। স্যালুনে গিয়া কম্পাস দেখিলাম ;
জলের দেড়শত ফুট তলা দিয়া জাহাজ অতি ভয়ঙ্করবেগে
উত্তর-উত্তর-পূর্ব দিকে চলিতেছে। ঘরে ফিরিয়া আসিয়া
সমুদ্রের উপযােগী জামাকাপড় পরিলাম ; এতদিনের যত
লেখা সমস্তই সযত্নে পকেটের ভিতর রাখিলাম, ভয়ে ভাবনায়
বুকের ভিতর ঢিপ ঢিপ, করিতে লাগিল।
ক্যাপটেন নিমে

.
সাগরিকা
১৬৭
;
এখন কি করিতেছেন ? জাগিয়া স্বপ্ন দেখিতে লাগিলাম।
তখন মনে পড়িল—সেই জলতলে ক্রীষ্পে। দ্বীপের জঙ্গলে
শিকারের কথা; টোরেষ্ট্রেটের প্রবালচড়ায় জাহাজ আটকের
কথা; নিউগিনির জঙ্গলের টিয়াপাখী কাকাতুয়ার কথা ;
সেই দ্বীপের অসভ্য লােকদের কথা; প্রবাল-গােরস্থানের
কথা; সুয়েজ প্রণালীর ভিতর দিয়া অদ্ভুত সুরঙ্গের কথা ;
সেই লঙ্কাদ্বীপের ডুবুরির কথা; ভুমধ্যসাগরের ডুবুরীর কথা;
অবলুপ্ত আটলান্টিস দেশের কথা ; দক্ষিণ মেরুর কথা;
সেই বরফের তলায় বন্দিদশার কথা : পুল্পদের সঙ্গে লড়াইএর
কথা, প্রভৃতি কত কথাই মনে আসিতে লাগিল। ক্যাপটেন
নিমােকে আর মানুষ বলিয়া মনে হইল না ; ভয়ঙ্কর একটা
দৈত্য বা অমানুষ বা দেবতা বলিয়া মনে হইতে লাগিল।
রাত্রি সাড়ে নয়টা। জাহাজ অতি প্রবলবেগে ছুটিতেছে !
হাতের মধ্যে মাথাটা চাপিয়া ধরিয়া বসিয়া রহিলাম। আরো
আধ ঘণ্টা ! এমন সময় মনে হইল যেন দূরে বহুদূরে কে
অতি মধুর করুণ গান গাহিতেছে। না, এতে গান নয়,
এ যে কেবল গানের সুর ; কোন্ উদাস ব্যথীর বুক-ফাটা
কান্নার সুর এ। কি করুণ সেই সুর ! স্তব্ধ হইয়া মনপ্রাণ
দিয়া তাই শুনিতে লাগিলাম ; নিশ্বাসপ্রশ্বাস যেন বন্ধ হইয়া
গেল। তারপর ভূতের মত সেই সুরের অনুসরণ করিয়া
চলিতে লাগিলাম। কোথা হইতে এ সুর আসিতেছে ?
ক্যাপটেন নিমাের দরজা অতি ধীরে ঠেলিয়া ভিতরে চাহিয়া

১৬৮
সাগরিকা
দেখি ঘাের অন্ধকার। সেই ঘরের এককোণ হইতে সুরের
সেই করুণ ঝঙ্কারধ্বনি বাজিয়া উঠিতেছিল। ক্যাপটেন
তাহার অর্গা বাজাইতেছেন। সেই সুর অতি ধীর, গতি
মৃদু—অথচ কতই স্পষ্ট ! সুরের ঝঙ্কার আস্তে শাস্তে
থামিয়া আসিল। সমস্তই চুপচাপ তবুও যেন সেই সুরের
রেশটুকু ঘরের চারি কোণে ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল,
কোথা হইতে যেন কান্না ঝরিয়া পড়িতেছিল। ক্যাপটেন
তখন একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিয়া উঠিলেন, “।
ভগবান্, এ যে বড় অসহ্য, আর পারি না, আর পারি না।”
একি গভীর দুঃখের মর্মন্তুদ জ্বালা! ছুটিয়! নৌকার কাছে
গেলাম, পাছে ক্যাপটেন ধরিয়া ফেলেন।
রাত্রি দশটা বাজিয়া গেল। নেড়কে দেখিয়া ব্যস্ত হইয়া
পড়িলাম ; চুপি চুপি বলিলাম, “চল, চল, আর দেরী করা
হবে না।”
নেড, বলিল, “হাঁ, পালাবার সমস্তই ঠিকঠাক।”
নৌকার প্যাচ ও যন্ত্র খুলিতেছি এমন সময় জাহাজের
মধ্যে একটা করুণ আর্তনাদ ও ভীষণ গণ্ডগোল উঠিল ।
ওকি, ও কিসের শব্দ? তখন ভয়ের ও গণ্ডগােলের কারণ
বুঝিলাম। ভাবিয়াছিলাম নাবিকেরা আমাদের দেখিতে
পাইয়াছে কিন্তু তাহা নয়। এ যে বড় ভয়ঙ্কর কথা !
আমি চীৎকার করিয়া উঠিলাম, “ম্যালফ্টম। ম্যালম!”#
নরওয়ের সমুদ-কুলের ম্যাপ :

সাগরিকা
১৬৯
;
;
ম্যাম ! এর চেয়ে ভয়ঙ্কর আর কি কথা আছে ?
নরওয়ের উপকূল দিয়া তখন জাহাজ চলিতেছে। সে বড়
ভয়ঙ্কর উপকূল ! এখানে সমুদ্রের অবস্থা বড় ভয়ঙ্কর ;
সারাবছর ধরিয়া বড় বড় ঢেউ আছাড়িবিছাড়ি খাইতেছে ।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হচ্ছে এই ম্যাষ্ট্রম্ ; ইহা একটি ভয়ঙ্কর
ঘূর্ণী ! লােফোডেন দ্বীপপুঞ্জ হইতে জলরাশি প্রচণ্ড আবর্তে
ঘূরিয়া চলিতেছে ; এই প্রচণ্ড ঘূর্ণীর মুখে পড়িলে যত বড়
জাহাজ হউক না কেন তার আর রক্ষা নাই! চারিদিকে
পর্বতপ্রমাণ ঢেউ তা-থৈ তাথৈ করিয়া নাচিতেছে, মধ্যস্থলে
প্রচণ্ড ঘূর্ণী ভয়ঙ্কর বেগে ঘূরিতেছে। এই ঘূর্ণীর শক্তি এত
বেশী যে বারাে মাইল দূরের জাহাজকেও চেঁচা টানিয়া
আনে। শুধু জাহাজ নয়, বছরে যে কত তিমি, শ্বেতভল্লুক,
সিন্ধুঘােটক, সিল এই আবর্তে পড়িয়া প্রাণ হারায় তাহার
সংখ্যা নাই।
নােটিলস্ আজ এই ভীষণ আবর্তের মুখে পড়িয়াছে ;
ক্যাপটেনের অমনোেযােগর দরুণ এই বিপদ ঘটিয়াছে।
নােটিল তখন স্রোতের মুখে পডিয়া তীরের মত ছুটিয়া
চলিয়াছে ; আমরা তিনজন নৌকার মধ্যে স্থির হইয়া বসিয়া
আছি । জাহাজ এইবার ঠিক আবর্তের মুখে আসিয়াছে,
,
তাই স্রোতের মুখে গােল হইয়া কেবলি ঘূরিতেছে। জাহাজের
সেই প্রবল আবর্তনের দরুণ আমার মাথা ঘূরিতে লাগিল।
মরণ আজ নিশ্চয় ; ভয়ে কাঠ হইয়া বসিয়া রহিলাম ।
;

১৭০
সাগরিক।
বড় বড়
নােটিলসের ভিতর করুণ আর্তনাদ, বাহিরে প্রবল গজ্জন ;
পাথরের উপর ঢেউগুলি আছাড় খাইয়া ঘূরিয়া অবর্তের
সঙ্গে আসিয়া মিলিতেছে। সে কি ভীষণ অবস্থা।
গাছ বেঁ বোঁ করিয়া সেই ঘূণীর মুখে ঘূরিতেছে। অদূরেই
নরওয়ের উপকূল ! নােটিলস্ প্রাণপণবেগে যুঝিতেছে ;
লােহার পাতগুলি ঝিনঝিন করিয়া কাপিতে লাগিল, কিন্তু
সব চেষ্টা আজ বৃথা। আজ নােটিলসের শেষদিন, জলের
মুখে কেবল বেবো করিয়া ঘূরিতে লাগিল। হঠাৎ কোট।
সরাং করিয়া খুলিয়া গেল ; আমরা তিনজন ও নেকাট।
তীরের মত জলের তলায় তলাইয়া গেলাম ; আমার মাথাট।
একটা কিসের উপর গিয়া সজোরে ধাক্কা খাইল, সঙ্গে সঙ্গে
আমার চৈতন্য লোপ পাইল । তারপর কি হইল কিছুই
জানি না।

এয়ােবিংশ পরিচ্ছেদ
শেষ
এইবার আমাদের সমুদ্রযাত্রা শেষ হইল সেইরাত্রে
আর আমার যে কি ঘটিয়াছিল, কেমন করিয়া আমরা তিনজন
সেই ঘূর্ণী হইতে রক্ষা পাইলাম, নােটিলসেরই বা কি হইল—
কিছুই জানি না। যখন জ্ঞান হইল, চাহিয়া দেখি লােফো-
ডেন দ্বীপের একজন জেলের কুড়েঘরে আমি শুইয়া রহিয়াছি;
পাশে আর একটা বিছানায় নেড়, ও কনসেল শুইয়া রহিয়াছে।
আনন্দের আতিশয্যে আমরা তিনজনে আলিঙ্গনবদ্ধ হইয়া
কঁদিতে লাগলাম।
ফ্রান্স, দেশে ফিরিবার জন্য আয়ােজন করিতে লাগিলাম।
এই যে কাহিনী লিখিলাম তাহা সম্পূর্ণ সত্য ঘটনা ;
প্রতিদিনের খবর ও ঘটনা আমি ডায়েরীতে লিখিয়া রাখিতাম,
দেশে ফিরিয়া তাহাই এখন বই লিখিয়া প্রকাশ করিলাম।
এই অদ্ভুত সমুদ্রযাত্রার কথা লােকে বিশ্বাস করিবে কিনা
জানি না; কিন্তু বিশ্বাস না করিলেও আমার কোন ক্ষতি
নাই। আমার জীবনের দশমাসের ঘটনা হইতে এই কাহিনী
লিপিবদ্ধ করিলাম। এই দশমাসে আমি অনেক নূতন
জিনিষ শিখিয়াছি, জ্ঞানপিপাসা আমার অনেক মিটিয়াছে।
সমুদ্র-জগৎ সম্বন্ধে মানুষ কি-ই বা জানে, ইহাতে আমি
অনেক নূতন সংবাদ দিলাম।
;

১৭২ সাগরিকা সে যাই হউক, নােটিলসের এখন কি হইল? মালিস্ট্রম হইতে সে কি রক্ষা পাইয়াছে, না সেইখানেই তাহার জীবন- লীলা শেষ হইয়াছে ? ক্যাপটেন নিমো কি এখনও বাচিয়া আছেন, এখনও কি সমুদ্রতলে ঘূরিয়া বেড়াইতেছেন, না সেইখানেই তাহার মৃত্যু হইয়াছে ? ক্যাপটেন নিমো কোন দেশের লােক, তাহার বাড়ী কোথায়—একথা কি কোনদিন আমি জানিতে পারি না? মনে হয়, একদিন এ সব জানিতে পারি। আমার মন বলিতেছে নােটিল নষ্ট হয় নাই, সে যাত্রা সে রক্ষা পাই- য়াছে । ক্যাপটেন নিমে। বােধ করি এখনও বাঁচিয়া আছেন। তাহার অগাধ পাণ্ডিত্য, উদার মন, অসীম সাহস, অদ্ভুত বৈজ্ঞানিক কার্যাবলী, অনন্ত জ্ঞানস্পৃহা, তাহার একনিষ্ঠ স্বদেশপ্রেম ও অত্যাচারীর উপর তাহার অসীম নিস্থরতার জন্য—তাহার উদ্দেশে কোটি কোটি নমস্কার করিতেছি। मया ১,৩৫৩

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Sagarika Pt.2

Author
Das, Rameshchandra
Title
Sagarika Pt.2
File name
Sagarika Pt.2
Text
OCR done
Citation
1930
Published
2009/07/15
Publisher
N.a
Language
Sanskrit
Pages
188
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Essays, Articles.
Keywords
Essays on the inside of the sea
DLI number
551486
Barcode
4990010021140.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
KD3hWQmIoCl
Download PDF

Sagarika Pt.2