Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Mukti-badhan

Dutta,shashadhar · 2009/09/16

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

মুক্তি-বাঁধন
(নারী-সমস্যা-পূর্ণ নাটিকা)
শিশধর দত্ত প্রণীত।
৮ই জুন বুধবার, ১৯৩২ সাল,
ইণ্ডিয়ান ষ্টেটু ব্রডকাষ্টিং সার্ভিস্ কর্তৃক প্রথম অভিনীত।
মূল্য এটি।

প্রকাশক
বসন্ত কুমার রায়।
১১৬, মাণিকতলা ষ্ট্রীট,
কলিকাতা ।
এই গ্রন্থকারের
আপন-ভােলা
কৌতুক-নাটিকা (রেডিওতে অভিনীত )
মূল্য চারি আনা মাত্র।
প্রাপ্তিস্থান
ললিত প্রেস
১১৬, মাণিকতলা ষ্ট্রীট,
কলিকাতার প্রধান প্রধান পুস্তকালয়।
গ্রন্থকারের
পঞ্চা গার্হস্থ্য নাটক
প্রিন্টার
শ্রীললিতমােহন রায়।
ললিত প্রেস
১১৬, মাণিকতলা স্ট্রীট, কলিকাতা।

12
স্বনামধন্য, পুণ্যাত্মা
স্বর্গীয় রাজা দিগম্বর মিত্র বাহাদুরের
বংশধর
রাজকুল-তিলক
বদান্য, কর্মবীর, পরােপকারী
কুমার
গ্রীল শ্রীযুক্ত
হিরণ্য কুমার মিত্র
বাহাদুরের
করকমলে
Ietiteetistesse debettete detectetx
গ্রন্থকারের শ্রদ্ধা ও প্রীতির নিদর্শন স্বরূপ
এই ক্ষুদ্র নাটিকা “মুক্তি-বঁধন”
উৎসর্গীকৃত হইল ।
অক্ষয় তৃতীয়া,
সন ১৩৩৯ সাল।
শুরু
}
গ্রন্থকার।

No text on this page.

উপহার-পত্র
এই বইখানি
উপহার দিলাম।
তারিখ

পাত্রপাত্রীগণ
se
মানসকুমার
বেকার যুবক
গদাধর মল্লিক
নবগ্রামের জমিদার
দ্বারবান, বেহারা, পাওনাদারগণ, হােটেলের ম্যানেজার।
বিরজাসুন্দরী
ব্যারিষ্টার মিত্রের কন্যা
এ মাতা
মায়ার সহপাঠিনী
পরিচারিকা।

প্রস্তাবনা।
গান।
( কোরা) অমল কমল সুন্দর তুমি বাঙলা দেশের মেয়ে,
গর্বে আমার বুক ভরে যায় শান্ত ও মুখ চেয়ে ।
কে বলে তােমায় বেঁধেছি শিকলে করিয়াছি পরাধীনা ?
রাখিয়াছি তােরে আঙ্গিনা ভিতরে করি জগতের হীনা?
তারে কি জানে মা তােমারি আসন মরমের কোন্ পুরে,
কোন্ মন্ত্রে তােমায় পূজি মা জননী কোন্ প্রভাতীর সুরে
সর্বহারা হলেও জননী কি মধুর হাস তুমি,
ধন্য হল মা ধরণীর বুক, তব চরণ কমল চুমি।
আঁখিতে তােমার কি অভয় ভাষা অধরে হিরণ হাসি,
স্নেহ প্রেম দয়া ভরা তাের বুকে তাই যে মা ভালবাসি ।
পরের দুখেতে তব আঁখিজল বাধা নাহি কভু মানে,
অপরের সুখ হেরিয়া জননী সুখ ভরে তব প্রাণে।
ব্যথিত হৃদয়ে শান্তির বারি ঢাল মা কমল করে,
জননী তােমার কল্যাণী রূপ সকল বেদনা হরে।
থাক মা মােদের গৃহের ভিতর উজ্জ্বল কর ঘর,
ঝঞ্চা আপ বিপদ হইতে তাের কাছে নেব বর ।
আশীষ তােমার বর্ম হইবে, বাহিরে যুঝিব যবে,
তব জয়গানে ভরিবে জগত চরণে লুটাবে সবে ।

No text on this page.

মুক্তি-বাঁধন
প্রথম দৃশ্য
ব্যারিষ্টার মিত্রের বাটী—মায়ার কক্ষ।
মায়া কলেজ যাইবার জন্য প্রস্তুত হইতেছিলেন
সহপাঠিনী লতিকা অপেক্ষা করিতেছিল
মামা। দেখ লতি, আমি বড় অসুবিধায় পড়ে গেছি ভাই।
তুই জানিস্ তাে, এত দিন ঠাকুমা কাশীতে ছিলেন। তিনি
আমাদের এরূপভাবে থাকার দরুণ দূরেই থাকতেন। বেশ ছিলেন,
তাঁর ধর্ম-কর্ম, বার-ব্রত নিয়ে। কিন্তু আমার মাথা খেতে ভাই,
আজ তিনদিন হ’ল এখানে এসেছেন।
লতিকা। কি জন্য ভাই তিনি দূরে থাকতেন?
মায়া। তবে শােন্। বাবা যখন বি, 'এ পাশ করূলেন,
তখন আমি চার বছরের, দাদু তখন মারা গেছেন। মবার পূর্বে
সমস্ত ষ্টেট তিনি ঠাকুমার নামে করে দিয়ে যান। বাবা বিলেত
যাবেন শুনে ঠাকুমা বেঁকে বসেন, কিন্তু বাবা গােপনে পালান।

মুক্তিবাধন ঠাকুমা কি করেন, বাবার সমস্ত খরচ চালিয়ে, তাকে পাশ করিয়ে, ফিরিয়ে আনেন। বাবা এলেন, পুরা সাহেব হয়ে। পুত্রের আচার-ব্যবহার দেখে তিনি কাশীবাস আরম্ভ করেন ; আর বাবা মা’কে ও আমাকে নিয়ে সংসার পাতেন। তারপর মা মারা গেলেন—সে সময় ঠাকুমা দিনকতকের জন্য এসেছিলেন। তারপর এগার বছর পরে এই শুভাগমন। লতিকা। সে যাই হােক, আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলি না, মায়া ? মায়া। আরে শােন্ আগে। ঠাকুমা এখানে এলেন--বাবা ডেরাডুন পালালেন। তার সেই সাহেবী পােষাকে ঠাকুমার ঘরে প্রবেশ নিষিদ্ধ। মাংস, ডিম এ বাড়ীতে আর প্রবেশ করছে না। বেহারা বাবুর্চী সকলকে তাড়িয়ে দিয়েছেন। কি যে বিপদে পড়েছি ভাই, ঠাকুমাকে নিয়ে ! লতিকা। শুভাগমন হ’ল কেন? মায়া। আমার বয়স উনিশ পার হয়ে যাচ্ছে—তবু আমার বিয়ে হ’ল না। ইহলােকে পরলােকে তেত্রিশ কোটী দেবতারা ধৰ্ম্ম গেল, জাত গেল বলে আর্তনাদ আরম্ভ করেছেন, মিত্রবংশে জল- পিণ্ড লােপ পেয়ে যাচ্ছে, এ দেখে ঠাকুমা কি আর নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন ? লতিকা। (হাসিতেছিলেন) কি ভাই কুসংস্কার! উনিশ

মুক্তিবাঁধন
পার হ’ল—এঁ, উনিশ, এক কম পাঁচগণ্ডা! দেবতারা আর্তনাদ
করূবে না? ভূমিকম্প হবে না?
মায়া। নে ভাই, তুই আর জ্বালাসনে। কাল হয়েছে কি,
ঠাকুমা কাছে বসে রয়েছেন, বলা নেই, কওয়া নেই, পিছন হতে
মানস এসে, আমার চোখ টিপে ধরেছে। জানিস তাে, সে
কি রকম আদুরে, অভিমানী ! ঠাকুমা তাে প্রথমটা ভয়ে আঁৎকে
উঠলেন। তারপর সামলে নিয়ে এক গাছা ঝাঁটা পড়ে ছিল,
তুলে নিয়ে মারেন আর কি! বলেন, এত বড় স্পর্ধা, অত বড় বাড়ী
মেয়ের গায়ে হাত দেওয়া ! তারপর সে ক্ষমা চার, পায়ের ধূলা নেয়,
আমি বুঝিয়ে বলি, তবে ঠাণ্ডা হন।
লতিকা। মানস বাবু বােধ হয় খুব দুঃখিত হয়েছেন ?
মায়া। কেঁদে ফেলেছিল আর কি। এমন Tender hearted
ভাই কখনও দেখিনি।
লতিকা। চল, দেরী হয়ে যাচ্ছে—পথে যেতে যেতে শুবােখন।
মায়া। আমার হয়েছে ভাই, বইগুলাে গুছিয়ে নিই।
[ দুই হাতে বইগুলি তুলিয়া লইলেন।
বিরজাসুন্দরী আসিলেন
বিরজা। মায়া কোথা যাচ্ছিস ?
মায়া।
কলেজে যাচ্ছি, ঠাকুমা।

মুক্তি-স্বাধন
বিরজা। বুড়াে ধাড়ী মেয়ে, এ-কিরকম কাপড় পরা
হয়েছে ?
মায়া। কেন ঠাকুমা, এই ত বেশ।
বিরজা। এই তত বেশ! তাই লেখাপড়া শেখা হচ্ছে ।
হতভাগা মেয়ে, অর্ধেক গায়ে কাপড় দিয়ে, এই তত বেশ! লজ্জা
করে না? ছিঃ !
মায়া। কেন, ঠাকুমা ?
বিরজা। আয়, এধারে আয়। ছিঃ দিদি, এমন বেহায়াপনা
করে না। আয়, আমি গায়ের কাপড় ঠিক করে দিই—
( সমস্ত গায়ে কাপড় জড়াইয়া দিলেন)
মায়া। একি, ঠাকুমা ! এমন বেশে বুঝি রাস্তায় বের
হওয়া যায় ?
বিরজা। না—তা যাবে কেন ? আধখানা গা খুলে যাওয়া
যায়। তােদের সব এ, কি রুচি হ’ল রে! ( লতিকার প্রতি) দেখ
মেয়ে, তুমিও কাপড়টা ভাল করে গায়ে দাও। আমি ভাল কথাই
বলছি, বাছা! যত কুদৃষ্টি টেনে নিয়ে অশান্তি বাড়বে বই এতটুকু
কবে না তত ?
মায়া। কুদৃষ্টি ! কি বলছ, ঠাকুমা ?
বিরজা। ওরে মায়া তােরা মা না হলে বুঝতে পারবি না।
আমার বুকে কি ব্যথাই বাজে রে, যখন ভাবি তােদর এই

মুক্তিদ্বাধন
অর্ধ নগ্ন মূৰ্ত্তির দিকে চেয়ে, পথের দু পাশের দৃষ্টি কলুষিত হয়ে
উঠছে।
মায়া। আমি এ জুজুবুড়ী সেজে পথে বের হতে পাব না।
বিরজা। আজ তােমার কলেজ যাওয়া হবে না। গদাধর
তিনটের সময় এসে পৌছুবে। মস্ত বড় লােকের ছেলে সে।
( লতিকার প্রতি) তুমি মা আজ একাই যাও।
[ লতিকা মায়ার দিকে চাহিয়া বাহির হইয়া গেলেন।
নে বই রাখ, দিদি ! চল্, পায়ে একটু ঝামা ঘবি। এ কি
মেয়েছেলের পা রে? দেশের মজুররা বােদে, জলে, মাঠে খেটেও
তাদের পা এমন ফাটেনা। এই ননীর পুতুল দেহ, আর পা-
মেয়েছেলের শ্রেষ্ঠ সম্পদ ঐ সব অনাসৃষ্টি পায়ে দিয়ে করেছিস
কি, দিদি ?
মায়া। ( অভিমান ভরে ) স্যাণ্ডেল পায়ে দিলে পা ফাটবে না ?
বিরজা। কেন, কি আবশ্যক? আমার, তাের মত বয়সে
একখানি চওড়া লালপেড়ে সাড়ী পরে, পা দুটী রক্ত জবা করে
আলতা পরতে, তাের দাদু যে কি তৃপ্তি পেত’—তা-তার চোখ
দেখে বুঝতে পারতেম।
মায়া। তােমার সে রামও নেই ঠাকুমা, কাজেই তেমন সীতারও
এ যুগে আবশ্যক নেই।
বিরজা। রাম আছেন কি না জানি নে মায়া, তা বলে সীতার

মুক্তিবাধন অভাব কেন হবে দিদি? আজ যদি তাের সীতার মত হতে পারিস, দেখবি কুপ্রবৃত্তি ভরা এই পুরুষগুলাে রাম-চরিত্রের স্বাদ বুঝে অমর হয়ে যাবে। মায়া। কলেজ যেতে দিলে না—সারা দুপুরটা কি করবাে শুনি ? বিরজা। গদাধর আজ আসছে। তাকে যদি জয় করতে পারি, সে যদি তােকে পায়ে স্থান দেয়, সুখী হবি। এমন ধৰ্ম্ম- বিশ্বাসী পুরুষ আমি দেখিনি। মায়া। কে তাকে আসতে বলেছে ? গদাধর চন্দর ফন্দরের সঙ্গে আমি মিশতে পারবে না, তা বলে রাখছি। মা-গো-মা উনিশ বছর বয়স হয়েছে বলে যত সব উল্লুক-ভল্লুককে পাড়াগাঁ থেকে আমদানী করা হচ্ছে । বিরজা। (হাসিলেন) দূর ক্ষেপী, আগে তাকে দেখ। বছরে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা আয়। ইংরাজী লেখাপড়া জানে না। বাঙ্গলায় মস্ত বড় পণ্ডিত। তা, তাকে তাে ইংরাজী শিখিয়ে নিতে পারবি। মায়া। ও সব মাষ্টারি আমার দ্বারা হবে না। আচ্ছা, সে বাঁদরটিকে কি, না আনালেই চলত না? বিরজা। বদর বাঁদর করিস্ নে বছি। তুমিই কি এমন ধিঙ্গি হয়েছ ? দু খানা ইংরাজী বই পড়ে, পাউডার, ক্রীম মুখে

মুক্তি-বাধন
মেখে, যে মেয়ে সেই মেয়েই আছ। (পথের দিকে চাহিয়া ) ঐ
যে মেথরাণী যাচ্ছে, ওর দেহেও যা আছে, তােমার দেহেও তাই
আর আমারও তাই।
মায়া। ঠাকুমা, এ সব কি বলছ ? ঐ মেথরাণীর সঙ্গে
আমার তুলনা করূলে ?
বিরজা। তুলনা করিনে দিদি। বলতে চাই শুধু, নারীত্বের
দিক হতে, ওর সঙ্গে আমাদের কোন তফাৎ নেই।
মায়া। না নেই !
বিরজা। সত্যই নেই মায়া। আজ ওকে এই সংসারে এনে
তােমার সুখ সুবিধার মাঝে রাখখা—দেখবে, সাত দিনের মধ্যেই
কি পরিবর্তন। ওসব কথা থাক্‌, আয় দিদি, পায়ে ঝামা ঘবি।
[ চলিয়া গেলেন।
মায়া। কে কোথাকার গদাধর চন্দ্র আছেন। না বাপু,
আমাকেও দেখছি বাবার মত বাড়ী ছাড়তে হবে। কলেজ
যাওয়া হল না যখন, তখন একবার মানসকে ডাকি। টেলিফোন
[ টেলিফোন করিতে গেলেন।

দ্বিতীয় দৃশ্য
ব্যাচিলর বাের্ডিংরুম নং ৩০
নাননকুমার ও তিনজন লােক বসিয়া কথা কহিতেছিলেন
মানস । দেখুন, আপনারা এই সামান্য পাঁচ সাতশাে টাকার
জন্য এতটা অস্থির হবেন জালে, আপনাদের সঙ্গে লেন-দেন
করূতেম না। একটু দেরী হয়েছে সত্য, কিন্তু এই হণ্ডিটা clear
হয়ে এলেই হাজার পঞ্চাশেক ক্যাস হাতে আসবে । তখন আর
আপনাদের মুখের ভাব অমন থাকবে না। কিন্তু মনে রাখবেন,
তখন হাজার নাকে কেঁদে সাধলেও, আমার মন গলাতে পারবেন না।
১ম ব্যক্তি। ও সব কথা অনেক শুনেছি মশায়। আপনার
পঞ্চাশ হাজার, লাখ, আজ দু বছর ধরে শুনে আছি। বলে দিচ্ছি
মশায়, আজ হতে পনেরো দিনের মধ্যে যদি টাকা না পাই, তবে
পথে বের হলে বেইজ্জত হবেন।
২য় ব্যক্তি। মুখে তাে কথা আটকায় না মশায়।
এ দিকে
এই লম্বা ষ্টাইলে আছেন, কিন্তু বছর খানেক ধরে বাের্ডিংএ
এক পয়সাও দেন নি।
মানস। দেখুন, অনধিকার চর্চায় আপনাদের যত আমােদ,

মুক্তিদ্বাধন
আমার তত নয়। সময় যে কি মূল্যবান তা তত বুঝবেন না।
আচ্ছা, এবার আসুন আপনারা। দু’ঘণ্টা হ’ল এসেছেন, এত
করে বােঝাচ্ছি, এই সহজ বাঙ্গলাটা বুঝতে পারছেন না যে,
উপস্থিত ব্যাঙ্কে ব্যালেন্স নেই। কি
আশ্চৰ্য্য,
হাসালেন
এবার ( হা হা করিয়া হাসিতে লাগিল )
৩য় ব্যক্তি। অনেক বেহায়া দেখিছি মশায়, কিন্তু আপনার
তুলনা নেই। প্রায় পাঁচশাে টাকার জামা কাপড় নিলেন, এক
সপ্তাহে বিল দেবেন। ভদ্রলােক, ব্যারিষ্টার মিত্রের মেয়ের সঙ্গে
বেড়ান বিশ্বাস হ’ল দিলাম, আজ দু’বছর হতে চল্লো একটি
পয়সাও দিলেন না। শুনুন মশায়, এবার পনেরাে দিন বাদে যদি
ফিরি, খােরাকী জমা দিয়ে আপনাকে জেলে পুরবাে। এস হে
এস, আবার হাসছে দেখনা ! বেহায়া কোথাকার !
[ সকলে চলিয়া গেল।
মানস। যাক, ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লাে। পাওনাদারগুলাে
এমন ছিনে জোক! বাপ-না, সারুলে দেখছি। ম্যানেজার
আসছেন যে ? মুখ তত কালবৈশাখী।
ম্যানেজার আসিলেন।
আসুন, আসুন-বসুন—ঠাণ্ডা হােন্।
ম্যানেজার। দিন, টাকা দিন।
১৭

মুক্তি-বাঁধন মানস। টাকাটাই কি সংসারে সব ম্যানেজার বাবু ? আপনাকে বড় ক্লান্ত দেখছি—বসুন না। ম্যানেজার। দেখুন, ও সব মিষ্টি কথা অনেক শুনেছি আপনার কাছে ছ'শাে টাকার বেশী পাওনা। আজ অন্ততঃ একশাে চাই। না দিলে— মানস। বুঝতে পেরেছি। দেখি, ওবেলা করে না হয়— এই সামান্য টাকা ক’টা ফেলেই দেওয়া যাবে। ম্যানেজার। আচ্ছা, তাই দেখবাে। [ চলিয়া গেলেন। টেলিফোনের ঘণ্টা বাজিয়া উঠিল। মানস। হ্যালোকে মায়া ? কি হুকুম বললা। এখনি যেতে হবে ? তাইতাে—গ্ৰেহাম আর লিভারপুল কোম্পানি থেকে দুজন সাহেব এসে বসে রয়েছে -অনেক টাকার transaction- রাগ কর না মায়া—আমার যদি লাখ টাকাও ডুবে যায়—এখনি আমি যাচ্ছি। তবে কিনা নােটারটা আজও রিপেয়ার হয়ে এল , না-ন-এখনি যাচ্ছি—ধন্যবাদ। [ রিসিভার রাখিয়া দিল ] [ মানস পকেট হাতড়াইয়া কয়েক আনা পয়সা বাহির করিল।

মুক্তিদ্বাধন
এইতাে পূজি। অন্ততঃ দেড়টাকা ট্যাক্সি ভাড়া চাই--আরে
গােটাদশেক-কি করা যায়। বেহারা--
বেহারা আসিল।
দেখ, বাবা জগুধন-একবার দারােয়ানকে ডাক্ততা।
[ বেহারা চলিয়া গেল ও মানসকুমার ব্যস্ততার সহিত জামা
কাপড় বদলাইতে লাগিল ]
দারোয়ান আসিল।
দেখ’ দারােয়ানজি, গােটা পনেরাে টাকা এখনি চাই-পাঁচটাকা
সুদ-চব্বিশ ঘণ্টার কড়ারে।
দারােয়ান। আভি লেজিয়ে বাবুজিলেকে বাৎ ঠিক
রাখনা।
মানস। ক্যা বাৎ? আরে, ওহি চিজই মেরা হায়—আউর
দুনিয়ামে কুছ নেহি বাবা।
[ দারােয়ান টাকা দিয়া চলিয়া গেল
বেহারা, বেহারা--এই হতভাগা, উল্লুক কঁহাকা, একঠো ট্যাক্সি
বােলাও।
[ বাহির হইয়া গেল।

তৃতীয় দৃশ্য
মায়ার বসিবার ঘর।
মায়া পিয়ানো বাজাইয়া গাহিতে ছিলেন।
গান।
ফাগুন শেষ হ’ল ওই।
মম মন্দির সুন্দর
তবু এল কই ?
কারে দিব বলে এ গাঁথা মালা
যদি না এল সে নিঠুর কালা,
পূজার এ আয়ােজন ব্যর্থ কি হবে মম,
বলাে বলো সই।
এ আঁখি বারি কেমনে নিবারি,
কেমনে ভুলিব প্রিয় যে আমারি,
একি হলাে সই, একি হলাে সই
একি হলো সই একি হলাে সই ।
মানসকুমার আসিল। মায়া চাহিয়া দেখিলেন ও গানটি
আর একবার গাহিয়া শেষ করিলেন।

মুক্তি-বাঁধন
মানস। চমৎকার ! আজ তােমাকে এত সুন্দর দেখাচ্ছে,
মায়া। যেন স্বপ্ন দেশের পরীর ঘুমের স্বপ্ন মাখা।
মায়া। মানস—আমি বড় বিপদে পড়েছি।
মানস। সে তত ভালরূপেই জানি। উপায় কিছু ঠিক
করূলে, মায়া ? এত ভয়ে ভয়ে এসেছি—তিনি কোথায় ?
মায়া। বাড়ীতেই আছেন। এখনি এসে পড়তে পারেন।
তুমি একটু সরে বস ।
মানসকুমার সরিয়া বসিল।
মানস। আচ্ছা, ঠাকুমার বয়স তাে অনেক হয়েছে। এক
কাজ কলে হয় না? একটু নাইট্রিক এ্যাসিড দুধের সঙ্গে
মায়া। যাও, বাজে ব’ক না। কিন্তু জেনে রাখাে আমরা
যতই স্বাধীন হই না কেন, বাবা তার মা’র অমতে কিছুই করতে
পাবেন না। ভাল কথা মনে পড়েছে, তােমার মিনার্ভা কারু আজ
পৰ্যন্ত রিপেয়ার হয়ে এল না। নূতন গাড়ী কিলে, দেখলেম না
পৰ্যন্ত, পথে আতে আতে গেল বিগড়ে। আজ ছয় মাস হতে
চল্লো—সারানাে হল না।
মানস। সে কি যে সে কোম্পানির কাজ ? দিয়েছি খােদ
মিষ্টার ওয়ার্ডওয়ার্থকে। যা আরাে কিছুদিন সবুর করাে। আজ
কলেজ গেলে না যে ?
মায়া। আজ গণধর চন্দ্রের আবির্ভাব হবে। ঠাকুমার

মুক্তি বাঁধন
কড়া হুকুমে অভ্যর্থনার ভার নিতে হয়েছে। এলেন বলে।
মানস। চিনলেম না ত তাঁকে ?
মায়া। আমিও কি ছাই চিনি ? একটু আমােদ যে হচ্ছে না
বল্লে, মিথ্যা বলা হবে। সুন্দ উপসুদের যুদ্ধের কথা শুনেছ তাে?
এবার মজা করে দেখা যাবে, কে হারে কে জেতে। তােমার
কারবার কেমন চছে মানস ?
মানস। একটা বড় লােকসান হয়ে গেছে। এক্সচেঞ্জ হঠাৎ
উঠে যাওয়ায় হাজারখানেক পাউণ্ড লােকসান হ’ল। ছাই
কাজে কি মন দিতে পারি ? দিন রাত তােমাকেই ভাববাে, না
হিসাব ঠিক রাখব?
মায়া। যাও, মিছে কথা ।
মানস। না—সত্য। কথা, মায়া। কোথায় ভাবছি, এই
মাসেই আমার বাসনা পূর্ণ হবে—দেখছি হ’ল না। ঠাকুমাকে
যে সহজে মত করানাে যাবে—সে দুশ্চিন্তা আমার নেই। মায়া
টাকার অভাব আমার নেই—কিন্তু তােমার অভাব আমাকে এত
পীড়ন দিচ্ছে যে
বিরজাসুন্দরী আসিলেন, মানসকুমার উঠিয়া দাড়াইল।
বিরজা। [ মানসের প্রতি ] তােমার নাম বুঝি মানসকুমার ?
মানস। আজ্ঞে হা।
বিরজা। তুমি কি কর বাবা ?

মুক্তি স্বাধন
মায়া। ওঁর খুব বড় কারবার। সমস্ত জগতে ওঁর অফিসের
এজেন্ট আছে। দেখতে এমন সাদা সিধে-
বিরজা। তােমাকে ওকালতি করতে ডাকি নি। (মানসের
প্রতি) তুমি বেশ বড় কারবারীনা, মানস ?
মানস। কি বলেন ! সামান্য দু’ পাঁচ লাখ টাকার মানুষ।
বিরজা। তবে আমার একটু উপকার কর তাে বাবা। আমার
স্বামীর ষ্টেটের রেভিনিউ দেবার সময় হয়েছে, টাকা এসে
পৌছায়নি। আমাকে হাজার দশেক টাকা দু একদিনের জন্য ধার
দাও তত বাবা। কখন পাব’ ?
মায়া। ঠাকুমা !
বিরজা। তুই থাম্ দিদি। কখন পাব' বাবা ? চেক বই
সঙ্গে আছে ?
মানস। (পকেট হাতড়াইয়া) আজ্ঞে না, তাড়াতাড়িতে ভুলে
এসেছি। টাকাটা কবে চাই ?
বিরজা। কবে নয় বাবা, আজই আবশ্যক।
মানস। জানেন তাে আমরা কারবারী লােক—টাকাটা সৰ
সময়ে হাতে থাকে না। যাই হােক্ সন্ধ্যার আগেই দিয়ে যাব।
বিরজা। তবে এস বাবা। মায়ার একটু কাজ আছে ।
তুমি এখন বাড়ী যাও।
[ মানস মায়ার দিকে অসহায় ভাবে চাহিয়া চলিয়া গেল।

মুক্তি-বাঁধন
বিরজা। মায়া—আমি না তােকে ঐ লােকটার সঙ্গে মিশতে
নিষেধ করেছিলাম ?
মায়া।
তুমি ঠাকুমা -সেকেলে মানুষ। তুমি এ কালের সব
তাতেই দোষ ধরো। মানসের সঙ্গে মিশতে বাবা তাে, আপত্তি
করেন না ?
বিরজা। সে যদি মানুষ হত—তা হলে ভাবনা কি?
বিলেত গিয়ে ব্যারিষ্টারী পাশ করে এলেই, মানুষ হয় না দিদি।
এই মানসকুমারকে দেখলেই আমার সাঙ্গ জ্বলে যায়। যেমন
মেয়ে মানুষের মত লম্বা চুল, তেমনি নাকি সুরে কথা। আর সব
চেয়ে খারাপ ওর চোখের চাহনি। যেন সর্পদৃষ্টি। আমি আড়াল
হ’তে দেখছিলাম—ওর চোখ দুটোর বিষ আমার মায়ার সারা
দেহকে বিষিয়ে তুলছে।
মায়া। এবার আমি সত্যই বিষ খাব ঠাকুমা।
বিরজা। তুই কেন বিষ খেতে যাবি দিদি ? ভগবান যে
অমৃত তাের মাঝে দিয়েছেন, কত ভাঙ্গড় ভােলা অমর হয়ে যাবে।
মায়া, শুধু মানুষ চিতে শেখ। এই মানসকুমার যে দু’ পাঁচলাখ
টাকার মানুষ এ আমি চোখে দেখলেও বিশ্বাস করূতে পাব না।
মায়া। কেন, আমি কি জানি না ?
বিরজা। শুনেছি, চোখে দেখি নি। দেখেছি শুধু ওর
বাইরের ভড়ং। কিন্তু আমি আজ দেখেছি। যখন ট্যাক্সি হতে
২৪

বিরজা।
মুক্তিবাধন
নামলাে—টাকে দশপাক দেওয়া দুখানা নোট বার করূলে।
একখানা দশটাকার আর একখানা পাঁচ টাকার। ঘামে ভিজে
গেছে। পাঁচটাকার নােটখানা চালকের হাতে দিয়ে—অন্ততঃ
তিন চার বার মিটারটা পরীক্ষা কলে ও প্রত্যেক আনি দুয়ানিটি
বার বার বাজিয়ে নিলে। যে লােক অত টাকার মানুষ, সে কি অমন
করে টাকা রাখে——না, মিটার দেখে ?
মায়া। তা বলে বাজে পয়সা নষ্ট করা ভালাে?
ওরে মায়া তা বলছি না। ট্যাক্সি চড়ে কারা ? বড়
লােকে চড়ে না। চড়ে, বিশেষ করে, যাদের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশী,
যারা ধার করে মান বাঁচাতে চায়। তারপর দেখলেম, জুতা
জোড়াটা অন্ততঃ দশবার রুমাল দিয়ে ঝেড়ে নিলে—আর সেই
রুমালে চশমা ও মুখ মুছে নিলে। এই সব ছােট নজর যাদের,
তাদের উপর কি লক্ষ্মী থাকতে পারে? আমি কেন টাকা
চাইলেম জানি? ও আর এ মুখখা হবে না। তুইও মােহ হ'তে
মুক্তি পাবি, আমিও নিশ্চিন্ত হব।
মায়া। যাও, আমি কোন কথা শুতে চাইনে। দশ হাজার
টাকা আবার টাকা—ভারি টাকা-মানস ইচ্ছা কলে ছিনিমিনি
খেতে পারে।
বিরজা। [ হাসিয়া ] তাই দেখবে। এখন বােস—গদাধর
এখনি আসতে পারে। আমার একটু কাজ আছে সেরে আসি ।
.
২৫

মুক্তিদ্বাধন
মায়া। ঠাকুমার সব মিছে কথা। আমি যেন মানুষ চিনি না !
লেখাপড়া শিখিনি।
[ নেপথ্যে—দ্বারবান, “এই বাবু মৎ যাও” ]
গদাধর বাবু আসিলেন, পায়ে মােজা, কড়া ইস্ত্রী করা
সার্ট, হাতে বাঁশের মােটা ছড়ি, গলায় চাদর,
বাম হাতে ব্যাগ।
গদা। কাহে নেহি যাগা ? চিল্লাও মৎ।
[ মায়াকে দেখিয়া চমকিয়া দাঁড়াইলেন ]
মায়া। কে আপনি ?
গদা। আমি গদাধর মল্লিক। আমার মাসিমা এখানে থাকেন।
আমি নবগ্রাম হতে আসছি। এই দারােয়ানটা তা বুঝবে না
ফটক হতে তাড়া করেছে।
মায়া। হনুমান সিং যাও।
[ দ্বারবান চলিয়া গেল।
[ মায়া গদাধরের অদ্ভুত বেশভূষার দিকে চাহিয়া রহিলেন।
গদা। মাসিমা কোথায় ? আচ্ছা থা—তাড়াতাড়ি নেই।
ব্যাগটা রাখতে ?
মায়া । [ ক্রুদ্ধস্বরে ] চাকর ডেকে দিচ্ছি, তাকে দেবেন।
গদা। [ আশ্চৰ্য্য স্বরে] চাকর কেন? তুমি তাে মিত্র
সাহেবের মেয়ে ?
।

মুক্তিবাঁধন
মায়া। [ উত্তর দিলেন না ].
গদা। এতে যে অনেকগুলাে টাকা আছে। ব্যাঙ্কে জমা
দিতে হবে। চাকরের হাতে দেবে ?
মায়া। আপনি কি ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথা
বতে
জানেন না ?
গদা। হাসালে তুমি। আমিও তাে ভদ্রলােক।
মায়া। Idiot.
গদা। বাঙ্গলায় বলল, আমি তত ইংরাজী জানি নে। বেশ,
ব্যাগটা নিয়ে যত গােলমাল, থাক্ এইখানে। মাসিমা এলে দেওয়া
যাবে। বাপ কি বােদ্দর। আর এটা কি আজব সহর-কেউ
গ্রাহই করাে না। একটু বসূতে পারি বােধ হয়—কি বলল?
[ হাসিলেন ও বসিলেন ও চাদর ঘুরাইয়া বাতাস করিতে লাগিলেন)
মায়া। [ পাখার সুইচ টিপিয়া দিলেন ]
গদা। আঃ, বাঁচালে। তুমি না কি অনেকগুলো পাশ
করেছ ? দিন কতক থাক্‌বাে মনে করে এসেছি। তােমাদের
কোন অসুবিধা হতে দেব না। তুমি অমন করে আমার দিকে
চাইছ কেন বলতাে? ভালাে কথা, তামাক টামাকের যােগাড়
আছে ?
মায়া। আমাকে সাজতে হবে ?
গদা। আহা ভুল বােঝ কেন ? চাকর বাকরের কাজ তারা
২৭

দেবে।
মুক্তিবাঁধন
করবে। কি যে বলল—তুমি অত ইংরেজী শিখেছ—তুমি যাবে
তামাক সাজতে? [হাসিলেন] একি আমাদের পাড়াগাঁয়ের মেয়ে ?
যে বাড়ীতে কেউ , আত্মীয় স্বজন এলে পা ধােবর জল দেবে-
তামাক
আহা—তােমার নামটা মনে পড়ছে
না তাে ?
মায়া। কোনাে আবশ্যক নেই
গদা। আবশ্যক নেই? কি বলে ডাকবো? সত্যই তুমি
এবার আমাকে হাসালে। এত শিক্ষিত হয়ে কি না—
মায়া। আপনি বসুন, ঠাকুমা’কে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
গদা। আহা, এত ব্যস্ত হচ্ছ কেন বল তাে? তুমি ব’স না
ঐ চেয়ারটায়, একটু আলাপ করে নেওয়া যাক্। তােমাদের মত
বিদুষী মেয়ে তাে আর পল্লীগ্রামে দেখতে পাওয়া যায় না।
কি উন্নতিই করেছ তােমরা। সময়ে সময়ে ভাবি, আমার
মানব জন্মই ভগবান বৃথা করে দিলেন। না পেলেম তােমাদের
জাতে, না পেলেম তােমাদের সঙ্গে মিশতে।
মায়া। তার মানে ?
গদা। খুব সরল। এই মানের জ্বালাতেই এক এক সময়ে
মনে হয়--দড়ি পাকিয়ে গলায় দিয়ে ঝুলে পড়ি। ছেলে বেলায়
যখন পাঠশালে পড়তেন, একদিন হয়েছিল কি, মানে বলতে না
পারায়—গুরু মহাশয় এমন গােবেড়েন করেছিলেন—যা আজ

সে টিকির
মুক্তিবাধন
পৰ্য্যন্ত ভুলতে পারি নি। একটা জিনিষের মানে যে কত রকম
হয়—তা বলা যেমন শক্ত তেমনি ধৃষ্টতা। লেখক লিখলেন,
আমার মনে হল এমন অশ্লীল যা মা বােনের হাতে তাে দেওয়া
যায়ই না—উপরন্তু নিজেকেও শঙ্কিত হতে হয়। কিন্তু এমনি
মজা, সেই লেখার এমন সুন্দর টাকা-ভাষ্য বের হ’ল—অবাক হয়ে
ভাবতে হ’ল—আহা কি লেখাই না বের হয়েছে। লেখকের
সােনার দোয়াত কলম হােক।
মায়া। আজ্ঞে, প্রভু তাই তাে।
গদা। পাঠশালের বিদ্যে শেষ করে যাই টোলে ।
কাছ হতে যা পেলুম, তাই ভাঙ্গিয়ে এখন খাওয়া হচ্ছে। | মায়ার
মাথার দিকে চাহিয়া ] এ রকম চুল বাঁধার ফ্যাসান নূতন বের
হয়েছে বুঝি ? কান দু’টাকে একেবারে ঢেকে ফেলেছ ? কেন,
কান দুটো কি কোন অন্যায় ভাবের দ্যোতক বলে সাব্যস্ত হয়েছে ?
আমার শিখতে ইচ্ছে যায়। যদি আমাদের পাড়াগাঁয়েও চালাতে
পারি। শিখিয়ে দেবে ?
মায়া। এমনি করে আপনি যদি চলেন—আপনাকে অনেক
কিছুই শিখতে হবে।
দ্রুতপদে মাসকুমার আসিলেন।
একি ?
মানস। মায়া, ঠাকুমা—নেই তাে। একটা কথা বলতে

মুক্তিবাধন
এলাম। দিল্লি হ’তে এই মাত্র টেলিগ্রাম পেলাম—আমাকে এখনি
দার্জিলিং মেলে দিল্লী যেতে হবে।
মায়া। দার্জিলিং মেলে, দিল্লী ?
মানস । না না—দার্জিলিং মেলে নয় ।
দূর ছাই, ট্রেনের
নামটাও মনে পড়ছে না। [ ভাবিতে লাগিল ]
মায়া। সেটা টাইম টেবেল দেখে না হয় ঠিক কর।
মানস। তাই দিন কতকের জন্য তােমার ছুটী চাই, মায়া
[ মায়ার হাত দুটী ধরিল ] লক্ষ্মিটি, মনে কিছু কর না।
মায়া। না গেলেই নয় ?
মানস। অনেকগুলাে টাকা লােকসান হবে মায়া।
মায়া। কিন্তু ঠাকুমাকে যে কথা দিয়েছ
মানস । এমনি মজা, এই সময়েই হাতে সামান্য দশ হাজার
টাকাও নেই।
মায়া। কিন্তু মানস, ঠাকুমা টাকা না পেলে (অনুচ্চস্বরে)
তােমার এ বাড়ীতে আসা যাওয়া বন্ধও হতে পারে।
মানস। তা কি বুঝি না? এই সামান্য টাকা—তাও দু’চার
দিনের জন্য।
গদা। (সশব্দে হাই তুলিলেন)
মানস। (ফিরিয়া চাহিল) ও বাবা! ( উভয়ে উভয়ের দিকে
চাহিয়া রহিলেন) (এক মুহূর্ত ভাবিয়া) মায়া, একটু চা’এর

মুক্তিবাধন
যােগাড় হয় না ?
মায়া। একটু অপেক্ষা কর, এখনি দিচ্ছি। (অনুচ্চস্বরে )
ঐ বস্তুটির সঙ্গে আলাপ কর সুখ পাবে।
[ চলিয়া গেলেন।
গদা। একি, মানসকুমার তুমি এখানে?
মানস। এঁ, আপনি গদাধর বাবু, আপনি এখানে ?
গদা। একটু আবশ্যকে এসেছি, মানস্। তুমি এখানে কি
করছ ?
মানস । এরা আমার আত্মীয় হন।
গদা। হু, তােমার কারবার কেমন চলছে ?
মানস। বড় মন্দ নয়, গদাধর বাবু। বছরে উপস্থিত লাখ
খানেক করে হয়।
গদা। বল কি হে ? বেশ, বেশ। তােমার ঠিকানাটা
দিয়ে যাও, একদিন দেখা করূব ।
মানস। আপনার তাে আমাকে এখনও ঠিক মনে আছে ?
গদা। থাকবে না ? কি চীজ যে তােমরা, তা সেবারে বুঝেছি।
বেড়াতে গেলে আমার জমিদারীতে, আমার খুড়তুতাে ভায়ের
সঙ্গে। কি লঙ্কাকাণ্ড না করে এসেছ বল দেখি? মাছ
মেরে, বাগান লণ্ড ভণ্ড করে, শেষ কালে
মানস। (হাত ঘােড় করিয়া) চুপ, করুন, চুপ করুন,

মুক্ত-স্বাধন
আপনার দুটি পায়ে ধ’রছি, সে কথাগুলাে আর এখানে
তুলবেন না।
গদা। দেখছি, তুমি সেই রকমই আছ। এঁদের সঙ্গে
তােমার কি সম্পর্ক ?
মানস। সে কথা পরে বল্ব। আমি উপস্থিত একটু
বিপদে পড়েছি, আমায় উদ্ধার করূতে পারেন ?
গদা। তােমার বিপদের তাে আর অন্ত নেই। হাজার দশেক
টাকা চাও বােধ হয়, দু দিনের কড়ারে ?
মানস। কি বলে আপনাকে ধন্যবাদ দেব, জানিনে।
দেবেন? আপনি তােত আমাকে চেনেন।
গদা। বেশ চিনি। ( কি ভাবিলেন) তুমি টাকাটা এঁদের
ধারাে, না, এঁদের ধার দেবে ?
মানস। ধারি? আরে ফুঃ ফুঃ। ধার দেব। এ রা লাটের
খাজনা দাখিল করবেন। যদি দেন তােত, দেরী করবেন না।
গদা। ব্যাগ খুলতে আর দেরী কি ?
( ব্যাগ খুলিয়া টাকা দিলেন)
মানস । ধন্যবাদ, ধন্যবাদ। কি উপকার যে কলেন, কি
আর বলব। দু’চার দিনের মধ্যেই পাবেন।
গদা। তা জানি। { হাসিলেন) আর একবার বােধ হয়
দু’দিনের কড়ারে হাজার পাচেক নিয়েছিলে। (হাসিয়া উঠিলেন)

মুক্তিধন
সে টাকাটা
মানস। সে কথা তুলে আর লজ্জা দেবেন না।
আর দিতে মনেই ছিল না-আচ্ছা, একটা মােটা বিল শীঘ্ন পাব,
দিয়ে দেওয়া যাবে। দেখুন গদাধর বাবু, এই টাকার লেনদেনের
কথা এঁরা যেন না জাতে পারেন। আমার সম্মানে দাগ লাগতে
পারে।
গদা। তােমার সম্মান অটুট রাখতেই না তােমাকে সাহায্য
কলেম।
মায়া ও বিরজাসুন্দরী আসিলেন।
বিরজা।
এসেছ, বাবা ?
গদা। (প্রণাম করিয়া পায়ের ধূলা লইলেন) আসব না?
আপনি ডেকেছেন। মাসিমা, এই ব্যাগটা রেখে দিন তো।
বিরজা। মায়া, নে ব্যাগটা। এস বাবা গদাধর বাড়ীর
ভিতর। মানস, কিছু দরকার আছে কি ?
মানস। (চুপে চুপে ) ঠাকুমা এই টাকাটা নিন। নয় হাজার
হ’ল। আশা করি এতেই কাজ চলে যাবে ?
বিরজা। (সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে চাহিয়া) আচ্ছা, বাবা বেঁচে থাক।
দু’ দিনের ভিতর ফেরৎ পাবে। আচ্ছা, এস এখন। গদাধর,
মায়া তােমরা ভিতরে এস।
[ গদাধর ও বিরজাসুন্দরী চলিয়া গেলেন

মুক্তিদ্বাধন
মায়া। (সােল্লাসে ) মানস, তবে এতক্ষণ দুষ্টামি হচ্ছিল, না ?
মানস। মায়া, সুখী হয়েছ ? ভারি তত টাকা।
মায়া। এমন দুর্ভাবনা হয়েছিল। এখন এস তবে।
মানস। (চলিয়া যাইতেছিল)
মায়া। চা খাবে দাঁড়াও।
মানস। মাপ কর মায়া, আর দেরী করতে পারি নে।
আজ খুচরাে paymentএর তারিখ কিনা—চলুম। [ চলিয়া গেল।
মায়া। ঠাকুমার ভুল ভাঙ্গলাে এবার। কি আনন্দই হচ্ছে।
[ চলিয়া গেলেন।
চতুর্থ দৃশ্য
ব্যারিষ্টার মিত্রের অন্তঃপুর
মায়া, গদাধর ও বিরজাসুন্দরী আসিলেন
মায়ার হাতে ব্যাগ
বিরজা। নে দিদি ব্যাগটা রেখে দে। বস’ বাবা, একটু জল
মুখে দাও। মুখ শুকিয়ে কি হয়েছে, গদাধর ? মায়া, দেখছিস কি?
আমাকে আরতির বন্দোবস্ত করতে হবে। জল, খাওয়া, দিদি।
তবুও দাড়িয়ে রইলি, মায়া ?
'N

মুক্তি বাঁধন
মায়া। ( অস্ফুটস্বরে) আমি পাব না। যা মাথা ধরেছে !
( মারার মাথায় হাত বুলাইতে বুলাইতে) পাগলী
—অমন করে না, ছিঃ।
( চলিয়া গেলেন )
মায়া। ( দুষ্টামির হাসি ঠোটে মাখানাে ) প্রভূ, জলযােগের
আজ্ঞা হাে’!
( গদাধর চারিদিক ঘুরিয়া ছবি দেখিতেছিলেন)
গদা। ( সশ্রদ্ধ দৃষ্টিতে মায়ার দিকে চাহিয়া) তােমার কথা
ববের ধারা ভারি মিষ্ট। যে ভাগ্যবান দিন রাত শুবের অধিকারী
হবেন, কে আমি হিংসা করি।
মায়া। কবিতা ছাড়ুন, জল খেতে বসুন। ( গদাধর ছবি
দেখিতেছিলেন) শুনতে পাচ্ছেন না? এখনিঠাকুমা এসে, আমার
শ্রদ্ধের যােগাড় করবেন। এ কি প্রভু ? (হাসিলেন)
গদা। আমি কি ভাবছি জান ? তুমি বেশী সুন্দর, না এই
ছবিটা।
মায়া। মাগে—মা, আসতে না আসতেই রােগে ধরেছে ।
গদা। ছবিটা তােমার তুলনায় বিশ্রী। কিন্তু
মায়া। তবে আবার কিন্তু কেন, প্রভূ ?
গদা। ভয় হয় না ছবিতে কথা কয়না বলে। তােমার উপর
আমার যেটুকু ভক্তি না হচ্ছে—তার বেশী হচ্ছে এই ছবিটাকে
তুমি বড় বেশী বাচাল।

! মুক্তি বঁধন মায়া। এরই মধ্যে মিষ্ট কথায় অরুচি ধলাে, প্রভু ? গদা। আমাদের পাড়াগাঁয়ের মেয়েরা, সাত চড়েও কথা কয় না। একবার এক বন্ধুর বাড়ীতে নিমন্ত্রণ খেতে গিয়েছিলাম। বন্ধুর নূতন বন্ধুর বয়স আন্দাজ তেরাে কি চৌদ্দ হবে, বন্ধু দুঃখ ক- ছিলেন—এমনি তিনি লজ্জাশীলা যে, রাত্রে অন্ধকারেও ঘােমট খােলেন না। কথা কওয়া তাে ভিন্ন ব্যাপার। মায়া। আহা! সাবিত্রী সতীলক্ষ্মী গদা। দেখ, তােমরা বুঝবে না। কিন্তু সেই সব মেয়েকে আমরা আপন বলে ভাবতে পারি, এতটুকু মনে সঙ্কোচ হয় না মিশতে। এমন করে বুকের ভিতর কাঁপুনী ধরে না। মায়া। যেন আমাকে দেখে প্রভুর হচ্ছে ? গদা। ঠিক ধরেছ। তােমাদের দুর হ’তে ভারি সুন্দর মনে হয়। কি মনে হয়, শুবে ? মায়া। শুব’, আপনার জলযােগের পরে। ( ক্রুদ্ধস্বরে) আসুন ব’লছি। গদা। এ কি! ধমক দিচ্ছ ? (হাসিতে লাগিলেন ও জল খাইতে বসিলেন ও বেপরােয়াভাৰে গিলিতে লাগিলেন) মায়া। (খি খিল্ করিয়া হাসিতেছিলেন) গদা। ব্যস, এবার হয়েছে তাে-পান কই?

মুক্তিকঁধন
মায়া। পান আমরা খাই মা ।
গদা। অবাক করলে তুমি। যা খাও না বুঝি অপরকেও
খেতে দাও না ?
মায়া। প্রভু, এখন আমি যেতে পারি?
গদা। ঐ ভয়েই জল খেতে চাইনে। তােমার আমাকে কি
মনে হয় ? বাঘ না ভালুক, না বাঁদর ?
মায়া। সত্য যদি বলি আপনি তাে সুখী হবেন না।
গদা। তবে, তুমি এতক্ষণ ধরে যা বল্লে সব কি মিথ্যা?
মায়া। আপনি এখন কি করতে চান ?
গদা। কিছু না। এস না একটু গল্প করি। আচ্ছা, তাের।
গয়না পর’না কেন ?
মায়া। পরি না, ভাল লাগে না।
গদা। বােধ হয় তা নয়।
মায়া।
তবে কি, প্রভু ?
গদা। আমি জানি। একবার আমার এক বন্ধু গল্প ক’
ছিলেন। তিনি বলেন, যে সব মেয়েদের গায়ে বাইরের হাওয়ার
জোয়ার লেগেছে তাদের স্বামীরা তাদের বােকা বানিয়ে রেখেছেন।
মায়া। অর্থাৎ ?
গদা। সেমিজ আর রঙ্গীন কাপড় যােটাতেই তারা অস্থির
হয়ে পড়েন, তা নিরেট সােণার গহনা দিতে পারবেন কোথা হতে।
৩৭

মুক্তিবাঁধন
তাই এটা একটা নূতন আমদানী ফ্যাসানে দাঁড় করিয়েছেন। স্বামী
বেচারারাও হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছেন। দু’চার খানা জামা কাপড়
আর পায়ে হাঁটিয়ে বেড়ান। সবদিকেই সুবিধা।
মায়া। তাই নাকি?
গদা। দেখ’, এই মেয়ে মাত্রেই এক বিষয়ে তাঁরা এক।
তা তিনি শিক্ষিতাই হােন্ বা আমার মত মূৰ্থই হােন্।
মায়া। কোন্ বিষয়ে, প্রভু?
গদা। যথা, অপরিচিতের প্রতি অযথা কৌতুহল। তােমাদের
হাজার সুখ স্বাচ্ছন্দের মধ্যে রাখুক, আত্মীয়েরা আত্মীয় হতে
আত্মীয়তম হাে’, তাতেও যেন তৃপ্তি পাও না। ধর’ এই
যেমন আমি। আমাকে জার, বােঝ বার এই যে তােমার
অহেতুকি কৌতুহল, কত অস্বাভাবিক, তোমার চোখে, আমার
চোখে হয়তঃ পড়ছে না, কিন্তু তােমাকে যে বুকের রক্তের মত প্রিয়
ভাবে, তার প্রাণে যাতনা হয়।
মায়া। ( বিস্মিত হইয়া চাহিয়াছিলেন) আপনি জালেন,
কি করে ?
গদা। আমি কি ছাই জাতেম! অনেকবার ঠকেছি কি না!
মায়া। কাউকে ভালবেসেছিলেন বােধ হয় ?
( মায়া খিল খিল করিয়া হাতিয়া উঠিলেন)
গদা। উ ই।
।

মুক্তিদ্বাধন
মায়া। তবে ?
গদা। তবে শােন। ভালবাসা তােমরা যাকে বল আমি
ঠিক বুঝতে পারি নে। আকাশের চাঁদের দিকে চেয়ে, দখিন
বাতাস খেয়ে, আমার কোনদিন ঘুমের ব্যাঘাত হয়নি। শুদ্ধ
ভাষায় যাকে বলে প্রেম, তা যে কি বস্তু আমি জানিনে। আমি
জানি, যে আমার আপন সে শুধু একান্ত ভাবে আমারি। আমার
প্রাণ চায়, সে যেন দৃঢ় বিশ্বাস করে আমি একান্ত ভাবে তাহারি।
ব্য, তারপর ঝড়, ঝঞ্জা, বজ্রাঘাৎ আমাদের দুজনকে ঘিরে নৃত্য
করুক, দৃকপাত করব না।
মায়া। (হাসিয়া) এ যে এক কথায় মেঘদূত, শকুন্তলা,,
চণ্ডীদাস।
গদা। তবুও আমি মেয়েছেলেকে ঘৃণা করি।
মায়া। সত্যু বলছেন?
গদা। না, পুরা সত্য হ’ল না। আমি মেয়েছেলেকে ঘৃণাও:
করি, পূজাও করি। পূজা করি ঘনীত অংশটুকু বাদ দিয়ে।
ঘৃণা করি পূজার দেবত্বটুকু আলাদা করে।
মায়া। ঠিক বুঝতে পারলেম না, প্রভু।
গদা। সকালে যখন ঘুম থেকে ওঠো, তখন তােমারি দেহের
পচা গন্ধে তুমি বিরক্ত হও না? আমি ভাবি, দু চার ঘণ্টা ঘুমের
পরে মানুষের দেহে যখন এত দুর্গন্ধ হয় তখন তাদের ভিতর কত

মুক্তিস্বান
ঘৃণার জিনিষ ভরা আছে। তুমি ভেব না, এই জন্য তােমাদের
ঘৃণা করি। ঘৃণা করি, যখন তােমরা নিজেকে ঠকাও।
মায়া। নিজেকে ঠকাই ?
গদা। আলবৎ ঠকাও। ঠকাও না? বিশেষ করে তােমরা
শিক্ষিতারা। কাকে যে ভালবাস কাকে যে বাসনা, অভিনয়
করতে করতে নিজেকেই সন্দেহ করে বসাে। লক্ষ্য করে
দেখেছি, তােমরা চল হিসেব করে, হাস নিক্তি ধরে, কথা
যাবল, তা অনেক ক্ষেত্রে নিজের ভাষা নয়, অপরের শিখান
বুলিতে। তােমরা ঠিক যেন কলের
কলের পুতুল হয়ে দাঁড়িয়েছ।
নিজেকে যে তােমাদের কতবার নূতন করে গড়ে নিতে হয়, নূতন
নূতন লােকের কাছে, তা আমার অপেক্ষা তােমরা ভাল বােঝ।
আমি তােমাদের প্রবৃত্তির ঐ অংশটাকে ঘৃণা করি।
মায়া। আর পূজা ?
গদা। যখন দেখি, মােহ-মুক্তির বাহিরে আসল নারীত্বের
রূপ। চোখ আমার জুড়িয়ে যায়, প্রাণ আমার শীতল হয়।
মায়। আপনি যে তাই শিক্ষিত নন ?
গদা। আমি তাে ইংরেজী জানিনে। বাঙ্গলা আবার ভাষা
পাড়াগাঁয়ে আবার শিক্ষিত থাকে।
মায়া। (গম্ভীর ভাবে ) ।
গদা। একি, হঠাৎ গম্ভীর হয়ে উঠলে যে? আমাকে অন্য

মুজিবন
কিছু ভেবে দুর্ভাবনা আনা, আর মানুষ কেন মাথায় হাঁটে না, তার
সূত্র বের করতে যাওয়া একই কথা। এই চাবিটা রাখতে,
যদি সময় পাও আমার ব্যাগটা একটু গুছিয়ে রেখাে। আমি
একটু বেড়িয়ে আসি।
মায়া। কখন্ ফিবেন ?
গদা। যখন অসহ্য হবে। আমার জন্য পথ চেয়ে কেউ
বসে থাকবে সে দুর্ভাবনা তো আমার নেই। (জোরে হাসিলেন)
মায়া। না—তা নেই। তবুও একটা কর্তব্য আছে, সেটা
ততা উপেক্ষা করতে পারবে না। আচ্ছা আসুন।
গদা। মাসি-মাকে জানিয়ে রেখাে! ব্যাগটা ঠিক করতে
ভুল না যেন।
(চলিয়া গেলেন ।
মায়া। আমার আবার কি হ’ল ! সমস্ত ধারণাকে যেন
ধরে রাখতে পাছিনে। (চাবির গােছা নাড়িতে নাড়িতে
ভাবিতে লাগিলেন ও কিছুক্ষণ পরে হহ হহ করিয়া হাসিয়া
উঠিলেন) আমার এ কি দুর্বলতা! কার সঙ্গে কার তুলনা ।
শিক্ষিত, ধনী, রূপবান অকৃত্রিম হৃদয় মানস, আর এই মুখ ?
পুনরায় ভাবিতে লাগিলেন) না, এ ভাবনা ভাবা হবে না।
মহাপ্রভু আবার একটা হুকুম করে গেলেন। রাখি, প্রভুর
ব্যাগটা গুছিয়ে । ( ব্যাগ খুলিলেন ও বিস্ফারিত দৃষ্টিতে চাহিয়া
৪১

মুক্তি-স্বাধন
রহিলেন) একি! এ যে নােটে বােঝাই। একটা সুটকেসে
এত টাকা? (নােটের থাক্‌ গুণিতে লাগিলেন) নব্বই হাজার
টাকা। এটা কি ? নােটের হিসাব লেখা কাগজ। দেখি, মিলিয়ে
( মিলাইতে লাগিলেন) এ কি, দশ হাজার কম!
{ ভাবিতে লাগিলেন) তা ও কি সম্ভব! (মুখ বিবর্ণ হইল)
( মায়া নতনেত্রে বসিয়া রহিলেন ও চোখ জলে ভরিয়া আসিল )
এ, তাও কি সম্ভব!
দেখি।
পঞ্চম দৃশ্য
পূজার ঘর
মদনমােহন দেবের আরতি হইতেছিল,
বিরজাসুন্দরী নিৰ্ণিমেষ নয়নে দেবমূৰ্ত্তির
দিকে চাহিয়া ছিলেন। মায়া কোন্
সময়ে আসিয়া একান্তে দাড়াইয়া দেখিতেছলেন।
আর ত শেষ হইল। পুরােহিত পূজারণ লইয়া
চলিয়া গেলেন।
৪২

মুক্তিস্বাধ
বিরজা। মায়া, একটা গান গা দিদি।
মায়া। (হাসিলেন ও গাহিলেন)
গান
বাজে, মঙ্গল শঙ্খ ঘরে ঘরে।
বলে সন্ধ্যা হ’ল প্রিয় এস ফিরে।
তুলসী তলায় সন্ধ্যা প্রদীপ দেয়
নববধূ লাজনত মুখে
করম অন্তে আসিছেন প্রিয়তম
বুকখানি ভরে কোন্ সুখে,
তাই, সােনালি হাসিটুকু,
পলকে ঝলসি
ফুটে ওঠে রাঙা তার অধরে।
বিরজা। প্রাণ জুড়িয়ে গেল রে তাের গান শুনে। নে দিদি,
প্রণাম করু।
মায়া। কাকে প্রণাম ক’ব, ঠাকুমা ? তােমার ঐ সাজান
গয়না পরা পুতুলকে ?
বিরজা। কি বলি মায়া, পুতুল? ( বজ্রাহত ভাবে চাহিলেন)
মায়া। তুমি আশ্চর্য্য হচ্ছ কেন, ঠাকুমা ? আমার ইচ্ছা যায়,

মুক্তিদ্বাধন
তােমার মদনমােহনকে কোলে নিয়ে বেড়াই। ভারী মজা
হয় তা হলে।
বিরজা। মায়া! ( কর্কশ স্বরে ডাকিলেন) মায়া।
মায়া। এ কি! তুমি আমায় ভৎসনা করছ, ঠাকুমা ?
বিরজা! ( কঠিন স্বরে) প্রণাম কর, মায়া ! আমি বলছি।
মায়া। আমি করব না।
বিরজা। আমি আত্মহত্যা করব মায়া। মিত্তির বংশে এমন
কুলাঙ্গার থাকতে আমি প্রাণ রাখব না। এখনও বলছি, প্রণাম
মায়া। (অভিমান ভরে ) এই নাও-এই নাও-এই নাও।
(মাথা ঠুকিতে লাগিলেন)
[ একখানি গরদের কাপড় ও গলায় চাদর দিয়া
গদাধর আসিলেন ও দেবমুর্তিকে প্রণাম করিয়া মায়ার
দিকে সস্মিত জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিলেন।
(বিরজাসুন্দরী কোন কথা না বলিয়া বাহির হইয়া গেলেন।
মায়া মাথা নত করিয়া বসিয়া রহিলেন। গদাধর দাড়াইয়া রহিলেন
কিছুক্ষণ পরে বিরজাসুন্দরী হাস্যমুখে প্রবেশ করিয়া কহিলেন)
বিরজা। গদাধর তােমর দু’জনে একটু গল্প কর, বাবা!
আমি তােমাদের খাবারের বন্দোবস্ত করি গে। মায়া, দিদি।
[ হাসিতেছিলেন।
33

মুক্তিবাঁধন
মায়া। (ফিক্‌ করিয়া হাসিয়া উঠিলেন) এমন মাথায়
বেজেছে !
বিরজা। গদাধর, পাগলিকে একটু বুঝিয়ে দাও তত বাবা
কেন ঠাকুরকে প্রণাম ক’তে হয়। বেশ, তাে, তােমরা এখানে
ব’সেই গল্প করা।
(চলিয়া গেলেন)
গদা। মায়া।
মায়া। আজ্ঞা থােক, প্রভু।
( মায়ার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়া আসিল)
গদা। মায়া, আজ যা দেখলেম তােমাদের কলকাতায়,
এমনটি দেখব বলে আশা করিনি। এই দশবছর পরে এলাম।
এত পরিবর্তন।
মায়া । পরিবর্তনের এই তত সুরু প্রভু। খাঁচার পাখী
রাধা কৃষ্ণ বুলি ছাড়ছে, সে খবর তত সেই জলা জমিদারী হতে
রাখে নি ! আশ্চর্য হবেনই তো।
গদা। কোন দিনই পাখীকে খাঁচায় পুরিনি আমরা। ঐ যে
সিংহাসনে
দেবমূৰ্ত্তি ; ভক্তিভাবে, শুদ্ধাচারে, কায়মনােপ্রাণে
আমাদের ভক্তির অর্ঘ প্রাণ উজাড় করে ঢেলে দিয়ে—এই
বাধন কষণের মাঝে রেখেছি—তা থেকে কি শিলি ভাঙ্গবের
বাসনা ওঁর মনে উদয় হতে পারে? এ তাে শিকল নয়, মায়া,
এ পূজা।

মুক্তিদ্বাধন
মায়া। হ্যা, পূজাই বটে ! নিজেরা স্বাধীন হয়ে, যা খুসী
তাই করে বেড়াবেন, আর মরু তাের খাঁচায় পােরা। নিজের
শিক্ষায়, দীক্ষায় জগতে প্রতিভাবান্ বলে পরিচিত হবেন, আর
আমরা মূখা, অবলা সরলা হয়ে স্বামী ঘর করি, ছেলে মানুষ করি,
জীবনান্ত করে খেটে’ নানা রােগ ধরিয়ে অকালমৃত্যু আলিঙ্গন
করি। ধন্য প্রভু, ধন্য আপনাদের মহিমা।
গদা। দেখ’, তােমার কথা শুনে আমার বড় কষ্ট হচ্ছে।
আমার প্রাণে বড় বাজে, মানুষ যখন ভুল পথে চলে, তারি গর্বে
অন্ধ হয়ে সেটাকে জাহির করতে চায়। আমরা কোন দিন
দাসী করে রাখিনি। চিরদিনই দেবীত্বের সম্মান দিয়ে আছি।
বাইরের ঝড়, ঝঞ্চা হতে, আপদ, বিপদ হতে, প্রলােভনের পিচ্ছল
পথ হ’তে তােমাদের দূরে রেখে, নিরাপদে রাখবার প্রচেষ্টাই
আমরা সারাজীবন ধরে সাধনা করি।
মায়া। আহা তাই বটে! সেকালের মেয়েরা তাই বিশ্বাস
কত। এখন চাল ধরা পড়েছে। ফঁাকি বাজি আর চলছে না,
!
গদা। খােড়াে ঘরে আগুন লাগা দেখেছ, মায়া ?
মায়া। দেখেছি। কিন্তু এ আগুন আমাদের ঘরে লাগেনি,
প্রভূ। আগুন লেগেছে আপনাদের ধাপ্পাবাজীর ঘরে।
গদা। সে কথা পরে হবে। যখন খােলাে ঘরে আগুন লাগে

মুক্তিবাধন --সে কি ভীষণ তেজে ঘরখানাকে গ্রাস করতে চায়। তারপর যখন তার ক্ষুধা মেটে-খাবার ফুরিয়ে যায়, তখন আপনা হতেই নিৰ্বান হয়ে যায়। মায়া। এবার ভাষ্যের টীকা হােক, প্রভু ! গদা। তেমনি ক্ষুধা তােমাদের পেয়েছে। তাই তােমরা ভিতরের বাঁধন ভেঙ্গে, বাইরের যা কিছু অপরিচিত, গ্রাস ক’তে সুরু করেছ। যে জিনিষ তােমাদের সহ্য হবে না ভেবে আমরা প্রাণপণে তােমাদের চোখের আড়ালে রেখেছিলাম, সেই মঙ্গলকে ধাপ্পা ভেবে অমঙ্গলের ক্রোড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছ। এ ক্ষুধা বেশী দিন থাকে না-থাকবেও না। তখন তােমর বাঁধন- হারা উচ্ছ, ঙ্খলের তাড়নায় অস্থির হয়ে আবার বাঁধন খুজে বেড়াবে। মায়া। ধন্য প্রভু ধন্য! প্রভু ধন্য ! একধারে দার্শনিক, তত্ত্বজ্ঞানী, ভবিষ্যদ্বক্তা। গদা। ভগবানের সৃষ্টি ব্যর্থ করা সাধ্য কি মানুষের? তার সৃষ্টি নর-কৰ্মী, বলিষ্ঠ, সহশীল। নারী-কোমলা, স্নেহশীলা, মাতা। ছন্নছাড়া পুরুষ, দেবীর আসনে অধিষ্ঠিত করলে নারীকে। সেই নারী আজ পুরুষভাবাপন্ন হয়ে, পুরুষকেই ঘৃণা ক’তে চায়, এর চেয়ে হাস্বার জিনিষ বাঙ্গলায় আর কিছু আছে বলে আমার জানা নেই। [ হাে হাে করিয়া হাসিতে লাগিলেন। ৪৭

মুক্তিদ্বাধন
মায়া। ঐ একই যুক্তি সবার মুখে। নারী সন্তান প্রসব
করুক, ঝি বাদি হয়ে পুরুষের ঘর করুক। ব্যস, আর পুরুষ
তাকে মাঝে মাঝে তােয়জ করুক, দেবী, দেবী, দেবী। আহা,
দেবীই বটে!
গদা। কি ক’রুতে চাও তােমরা ? কি ক’রুতে পার
তােমরা? তােমাদের তুমি যা বল্লে তা সাধন করা ছাড়া আর কি
করতে পার ? তাই যদি ভগবানের ইচ্ছা হত, তা হলে নারীকে
এমন কোমল প্রকৃতি দিয়ে পাঠাতেন না।
মায়া। ভগবান-ভগবান করবেন না। যা দেখেন নি, যা
দেখাতে পারেন না, তারই দোহাই দিয়ে জিততে হবে না। আমরা
ওসব বাঁধা বুলি—সাধা গৎ আর শুতে চাইনে। পুরুষকে আর
একা ভােগ ক’রুতে দেব না মশাই। চুল চিরে অর্ধেক ভাগ নেব।
গদা। যােল আনা ত্যাগ করে আট আনায় যদি সন্তুষ্ট হতে
চাও, তা দেওয়া যে আমাদের কত সহজ, তা বােধ হয় বুঝতে
পার। ভগবান মান না, জীবনে কোন দিন শান্তি পাবে না।
থা, আমি আর তােমার সঙ্গে তর্ক করূতে চাইনে। আমি উঠি ।
( উঠিলেন।
মায়া। একেই বলে পুরুষ-নীতি—যুক্তি তর্কে যা প্রমাণ
ক’তে পারেন না—তাই পরাজয়ের কাশ্মিা ঢাকতে ক্রোধের
আশ্রয় নেন। এটা আপনার জিত, হ’ল না, প্রভু ?
৪
। *

মুক্তিবাধন
গা। (বসিলেন) এ কি যুক্তি তর্কের জিনিষ ? তার
অনেক উর্কে।
অন্তরের অন্তরতম দেশে অনুভব করতে হয় ।
এই যে দেবতার ঘরে এসেছ, পায়ের জুতা খুলে এসেছ কেন, তুমি ?
মায়া। [ উত্তর দিলেন না।
গদা। সংস্কারে বাধে বলে । এ সংস্কার কোথা হতে হ’ল ?
আজ তত নিজের চোখে দেখলেম, দেবতার চরণে মাথা নত করতে
তােমার প্রবৃত্তি হয় না। অথচ পায়ের জুতা খুলে আসতে কেউ
তোমাকে অনুরােধ করেনি। তুমি জোর করে যা অস্বীকার
করতে চাও, তারি শিকড় ভােমার মনে এমন জাঁকিয়ে বসেছে
যে, তুমি অস্থির হয়ে উঠেছ। এক কাজ কর-ঐ মদনমােহনের
উপর তুমি দাড়াও দেখি ?
মায়া। [ নীরবে রহিলেন ]
গদা। তবে কেন বৃথা আস্ফালন কছ, তুমি ? যাকে
মান, ভক্তি কর, ভয় কর, তাকে অবহেলা করে তােমার ধরা
দেওয়া কি উচিৎ হচ্ছে ?
মায়া। যা ভাবি না, তাই জোর করে ভাবিয়ে দেওয়া,
দেখছি আপনার একটা শক্তি। ভাল, যখন আমাদের ভুল
ধরা পড়বে, তখন না হয় ভাবব, হঁা বলেছিলেন বটে একজন
মহাপুরুষ! তার শ্রীচরণে কোন কোটী প্রণাম করি ।
(মায়া সহসা গদাধরের পায়ের নিকট প্রণাম
করিলেন ও হাসিতে লাগিলেন) :
৪

গদা ।
মুক্তিবাধন
গদা। একি, আমাকে প্রণাম করলে?
যে শির দেবতার
কাছে নত হতে চায় না—সেই কিনা-
মায়া। জোর করে নিতে চান তাই নি প্রভু।
তােমার কথা সত্য হ’ক মায়া।
মায়া। ( চমকিত হইয়া) কি বল্লেন ?
গদা। তবে আমার শুবের ভুল, মায়া। কিন্তু এ ভুল
আমার হ’ল কেন?
( দেবমূৰ্ত্তির দিকে চাহিয়া রহিলেন)
মায়া। শিক্ষিতই হন আর অশিক্ষিতই হন্ সব পুরুষই
অন্ততঃ এক বিষয়ে এক।
গদা। কি বলতে চাও?
মায়া। প্রভুভণ্ডামিতে।
গদা। ব’ল না মায়া যা জান না। তুমি তাে পুরুষ দেখনি।
যা দেখেছ ছায়া, কায়া নয় ।
মায়া। অন্ততঃ প্রভু, বর্তমানে একজন দেখছি।
গদা। না দেখনি।
দেখনি। যে চোখ দেহের ভােগকে বড় আসনে
দেখে, সে চোখে পুরুষ দেখতে পায় না। যা পায় তা শুনে
তােমার কাজ নেই।
মায়া। শুনবের আবশ্যকও নেই, প্রভু। যে সংস্কার আপনারা
আজীবন সুখে ভােগ দখল করে আছেন—তা করতে থাকুন।
আমার বিন্দুমাত্রও আপত্তি নেই। কিন্তু যােড়হাত করে মিনতি

গদা।
মুক্তি-স্বাধন
করছি আমাদের পথে এসে দাড়াবেন না। লজ্জা করে না
আপনাদের, মাগাে, কি শয়তান এই পুরুষগুলো!.
গদা। তা সত্য।
মায়া। পথে চলি আর দুধারের চোখের দৃষ্টিতে ঘৃণায় ভরে
উঠি। না আছে তাতে এতটুকু সম্মানের ছাপ।
সত্য কথা ।
মায়া। তবে, কোন সাহসে আমাদের উপদেশ দিতে আসেন,
বলুন তাে?
গদা। কিন্তু মায়া, তুমি কি, কন্যা যে চোখে পিতার দিকে
চায়, সেই চোখে কোন দিন কি, কোন পুরুষের মুখের দিকে
চেয়েছ ?
মায়া। ব’য়ে গেছে। যত সব অজানা অচেনা পুরুষদের
মুখের দিকে চাইতে আমাদের।
গদা। কিন্তু তােমরা তাে চাও মায়া। তা না হলে তাদের
চোখে কি ভাষা ফোটে, তা জাতে কি করে ? আজ আমি
অন্ততঃ পঞ্চাশটি মহিলাকে-আমার দিকে চাইতে দেখেছি।
মায়া। সমস্ত সহরের মেয়েরা কেন যে ভেঙ্গে পড়ে নি, তাই
আশ্চৰ্য্য হচ্ছি, প্রভু। ঐ বেশ ভূষা, সহরের এই অঞ্চলের কতটা
উপভােগ্য, সে তত আপনি জানেন না, প্রভূ ?
গদা। চাইতে দেখেছি, মায়া। কিন্তু খুব কম চোখেই মা
ও মেয়েকে দেখতে পেয়েছি।
মায়া। প্রভূ, এবার আপনি চা নিন্ [ কুপিত ভাবে ]
৫১

মুক্তিদ্বাধন
আমার ইচ্ছা যায়, এই পুরুষগুলােকে চাবকাতে চাব কাতে টি
করে দিই।
গদা। সেজন্য দুঃখ ক’র না তুমি। বেতের চাবুকের চলন
এখনও যদি করতে পার নি, কিন্তু অভাবের চাবুক যা শুরু হয়েছে,
বেতের চাবুক শতগুণে ভাল। মায়া তর্কে অনেক ভাল জিনিষ নষ্ট
হয়ে যায়। সমাজে যে জিনিষটা হাজার হাজার বছর ধরে চলে
আছে, তা যে হাজার হাজার বার অগ্নি পরীক্ষা হতে উত্তীর্ণ হয়ে
ক্রমে খাটি সােণায় এসে দাঁড়াচ্ছে, তাকে কি এত সহজে উড়িয়ে
দেওয়া যায় ?
মায়া। প্রভু, উড়ে তাে গেল বলে।
[ পরিচারিকা আসিয়া কহিল “দিদিমণি মানসবাবু এসেছেন” |
মায়া [ একমুহূৰ্ত্ত কি চিন্তা করিলেন ] বল্‌গে যা অসুখ করেছে।
দেখা হবে না। কাকে আসতে বলে দে।
[ পরিচারিকা চলিয়া গেল।
কেন দেখা কলে না, মায়া ?
মায়া। [ কোন উত্তর দিলেন না ]
[ গদাধরের হাতের ঢাকা গরদের চাদৰখানি সহসা পড়িয়া
গেল ও হাতের একটি স্থান ব্যাণ্ডেজ বাঁধা দেখা গেল ]
মায়া। ও কি ?
গদা। কিছু না। জনকতক কাবুলি একজন ভদ্রলােককে
অপমান কছিল-বাধা দিতে গিয়ে একটু ছােরা খেয়েছি।
গদা।

মুজিবন মায়া। খুব বেশী চোট লেগেছে কি ? [ স্বরে শঙ্কা ] কেন ও সব ঝাটে গেলেন বলুন তাে? গদা। সহ হল না। একে তত ভদ্রলােক টাকার দায়ে ভেঙ্গে পড়েছে তার উপর চারূটে কাবুলীতে যা মাটা আরম্ভ করেছিল সহ্য হ’ল না আমার—তিনটের সব দাতকটা ভেঙ্গে দিয়েছি। বাকিটা পিছন হতে ছােরা মেরে পালিয়ে গেল । মায়া। তারপর, তারপর ? গদা। মানসততা সেই ফাকে সরে পড়লাে মায়া। কে সরে পড়লাে, মানস ? গদা। [ চমকিত হইলেন ] আঃ কি বলছি ঠিক নেই। মানস তােমাদের আত্মীয় সে কেন কাবুলীর কাছে টাকা ধার করতে যাবে ? [ মায়া কিছু না বলিয়া চলিয়া গেলেন ও একটু পরেই ব্যাগের চাবী লইয়া আসিলেন। মায়া। এই নি আপনার চাবী। গদা। তােমার কাছেই থাক্ না মায়া। মায়া। করুণা একটু কম করুন প্রভু। [ চাবি ছুড়িয়া দিলেন। গদা। মায়া, যেও না শােন- মায়া। আমার বড় মাথা ধরেছে। একটু শুই গে। [ চলিয়া গেলেন। [ গদাধর ধীরে ধীরে দেবমূর্তিকে প্রণাম করিয়া কহিলেন ] গদা। ভগবান্, মায়াকে শাস্তি দাও, শান্তি দাও! [ চলিয়া গেলেন

মুক্তি স্বাধন
[ কিছুক্ষণ পরে মায়া ফিরিয়া আসিলেন ও,
গলগ্নীকৃতবাসে কহিলেন।
মায়া। ক্ষমা কর আমাকে ক্ষমা কর ! আমায় বিশ্বাস দাও,
আমাকে সত্য পথ দেখিয়ে দাও! [ দুই চোখ বাহিয়া জলধারা
গড়াইতেছিল ]
ষষ্ঠ দৃশ্য।
সময় ভাের।
একটি ভিক্ষুক রাস্তায় গান গাহিতে গাহিতে
যাইতেছিল।
গান ।
ওগাে জাগাে, ওগাে জাগাে
ওই প্রভাত এসেছে দ্বারে।
তুমি কি ঘুমায়ে রবে—সে যাবে ফিরে ?
সে শীতল পরশ নিয়ে, তােমার তাপিত হৃদি,
শান্ত করিবে বলি, দ্বারেতে এসেছে যদি,
মেল আঁখি—তুমি মেল আঁখি—
এস ছুটে বাহিরে।
[ মায়া জানালা খুলিয়া গান শুনিতেছিলেন। গান থামিলে একটি
টাকা ফেলিয়া দিয়া কহিলেন ]
৫৪

মুক্তিদ্বাধন
মায়া। আর একটি গান গাও ত শুনি।
ভিক্ষুক। [ উপরে চাহিয়া ] গাচ্ছি মা।
গান ।
ওমা, তাের মুখের পানে চাইলে পরে
পরাণ আমার নাচে গো।
বুকের মাঝে শান্তি যে পাই, মনের বাঁধন
টুটে গাে৷
কতরূপে দেখনু তােমায়,
মায়ের রূপে, বােনের চোখে,
নব বধূর করুণায়,
তবু, দেখার আশা মিল না’কে।
(শুধু) তােমায় হৃদয় যাচে গো।
ওমা বাণী ও কল্যাণী ।
পারে যাবার খেয়ার কড়ি, তাের চরণ দুখানি
যখন চক্ষে আমার ধরার আলো, আঁধার হবে,
তখন, পাই যেন তাের দেখা গাে।
[ ভিক্ষুক চলিয়া গেল।
মায়া। [ আপন মনে ] মাম—ওগো ঠাকুর, এ কিসের
আলাে দেখালে গাে !
[ জানালা বন্ধ করিয়া দিলেন।
৫৫

ব্যারিষ্টার মিত্রের ড্রইংরূম
বিরজারী ও গদাধর কথা কহিতেছিলেন।
বিরজা। গদাধর, আজ হাতটা কেমন আছে বাবা? দেখ
দেখি কি গ্রহের ফের। আমার এমন দুর্ভাবনা হচ্ছে বাবা, যে কি
বলব। যে লােক্টাকে তুমি এমন বিপদ হতে উদ্ধার করলে
সে একটু কৃতজ্ঞতাও জানিয়ে গেল না? এমনি বাঙ্গালী সব
তৈরী হচ্ছে আজকাল।
গদা। না, না, আপনি তাকে অপরাধী করবেন না মাসিমা।
সে সুযােগ তার ছিল না। আমি নিশ্চয় করে বলতে পারি, সে
সুযােগ পেলেই এসে, তার কৃতজ্ঞতা জানিয়ে যাবে।
বিজা। সে কি তােমায় চেনে, গদাধর
গদা। হাঁ না—তা একরকম বটে
বিরজা i
সে কে, গদাধর ?
অতি অপরাপরূপে সজ্জিত হইয়া মায়া আসিলেন।
গদা। আমাকে ক্ষমা করুন মাসিমা। আমি বলতে পারব না।
মায়া।
কেন পাবেন না শুনি? এ মহত্ত্বটুকু না দেখালেই
সে বেচারা বােধ হয় বাঁচে।
বিরজা। কি বলছিস্, মায়া ? জানা নেই শোন নেই, মাঝখান
থেকে ঝগড়া শুরু কলি ?
!

মুক্তিধন
মায়া। আমি জানি।
বিরজা। ভাল।
ভাল। তােমরা ঝগড়া কর, আমার কাজ আছে।
যাই।
[ চলিয়া গেলেন।
[ মায়া গদাধরকে নমস্কার করিলেন ।
গদা। | প্রতি নমস্কার করিয়া ] উদ্দেশ্য কি বলতাে?
মায়া। [ শান্তস্বরে ! আপনি কেমন আছেন ?
গা। আমি ? বেশ ভাল আছি।
মায়া। কাল যে বলছিলেন “বাঙ্গলা আবার ভাষা, পাড়াগাঁয়ে
আবার পণ্ডিত থাকে তা এ বিদ্রুপটা কি না করলে চলতাে না,
প্রভু ?
গদা। বিদ্রুপ ? তাতে করি নে।
মায়া। কেন ঢাছেন? আমি তাে আপনাকে মুখ বলিনি।
তবে, কেন আপনি অমন কথা বলেন আমাকে বতে হবে ।
গদা। ইংরাজী না জালে, মূখ হয় না তােত কি, পণ্ডিত হয় ?
তুমিই বল না।
মায়া। জাপানীরা কি ইংরাজী শেখে? জাৰ্মাণী, রাশিয়া,
টার্কী, কাবুলীরা এরাও কি ইংরাজী শেখে ? আপনি কি বলতে
চান তারা সবাই মূখ ? এ কথা বলার সাহস আপনার আছে ?
গদা। না নেই।
মায়া। তবে এ বিনয়ে আপনার কি আবশ্যক ছিল ? আমরা
ইংরাজী পড়ি বলে যদি ঠাট্টা করে থাকেন সে ভিন্ন কথা। কিন্তু

মুক্তিবাঁধন
ইংরাজী জানেন না বলে, নিজেকে মূর্ধ বলে জাহির করার সুযোেগ
নিয়ে, অন্যের রীতি-নীতির উপর কটাক্ষ করা ক্ষমার অযােগ্য।
গদা। শুনে সুখী হলেম, মায়া।
মায়া। সুখী হবেন বলেই না এমন কথা বলেছিলেন।
গদা। অপরাধ স্বীকার করছি, মায়া।
মায়া। কোন আবশ্যক নেই। আমার মুখ থেকে আপনি
পণ্ডিত, শােনাই যদি ইচ্ছা হয়েছিল সেজন্য অন্য উপায়
অনেক ছিল।
গদা। তা ছিল স্বীকার কছি।
মায়া। দেখুন, বলে হয় তাে রাগ করূবেন, আপনাদের
তেত্রিশকোটী দেবতাকেও যত উক্তি, আর কথায় কথায়
ভণ্ডামিতেও তত নিষ্ঠা। মা-গাে-মা ! মানুষ একটি ঈশ্বরকে ধারণা
কতে পারে না, এরা তেত্রিশকোটীকে বিশ্বাস করেন, ভক্তি
করেন। এর চেয়ে শঠতা আর কিছু থাকতে পারে, জানিনে।
গদা। তুমি যা বােঝ না মায়া তার উপর মত প্রকাশ কর
না ।
কেন হিন্দুতে তেত্রিশকোটী দেবতা স্বীকার করেন, অন্যে
কেন এক নিরাকার ঈশ্বর ভিন্ন অন্য কিছু স্বীকার করেন না, তার
যুক্তিতর্কের স্থানও এটা নয়, আর তুমি যােগ্য পাত্রও নও।
মায়া। পাত্র যে যােগ্য নয় হয়তঃ বা তা হবে, কিন্তু স্থানটা যে
কুস্থান, এটা জানা নেই, প্রভু। তবে কেন আপনার অমিয় বচন
হ'তে অধীনাকে বঞ্চিত করূছেন।
গদা। দেখ, মায়া ! আমি সব আঘাত সহ কতে পারি,

মুক্তি-বাঁধন
পারি না, যখন আমায় ধৰ্ম্মবিশ্বাসে আঘাত লাগে। যারা নিরাকার
ভজনা করেন—তাঁরাও সেই ঈশ্বরকেই করেন। আর যারা
তেত্রিশকোটী দেব-দেবীর আরাধনা করেন—তারাও সেই
ঐভগবানকেই ভিক্ষা করেন। তফাৎ শুধু পথের। হয়ত একটা
পথ অনেক ঘুরে ঘুরে লক্ষ্যে পৌছেছে—অন্য পথ হয়ত বা খুব
সােজা আবিষ্কৃত হয়ে লক্ষ্যে গিয়ে মিশেছে। শুধু, এই কথাটি
মনে রেখাে, যদি ভগবানকে বিশ্বাস কর—তবে পথের ধারা দেখে
নাক বেঁকিয়াে না।
মায়া। প্রভু, হিন্দু সমাজ পঙ্গু হয়ে গেল এই এত জনের
বৃথা হিসাব রাখতে গিয়ে।
গদা। সেটা তােমার ব্যক্তিগত মত। তুমি যাকে অন্যায়
ভাবছ, আমিই তাকে ঠিক পথ ব’লে বেচে নিয়েছি। তুমি
তাে ঈশ্বর মান মায়া, তার পরিচয় তত আমি পেয়েছি।
মায়া। মানি, প্রভূ মানি। যা সে কথা। আপনি
মানসকে এসেই দশ হাজার টাকা ধার দিয়েছেন কেন? ঠাকুমাকে
কিনে ফেলবেন বলে ? আর তার নাতনীকে বিনা বাধায়, বিনা
আয়াসে, দাসী করতে পারবেন-এই আশায় ?
গদা।
কেন দিয়েছিলেম তা জেনে তােমার আবশ্যক নেই।
কিন্তু যে কারণ দেখাচ্ছ, তা নয়।
মায়া। আপনি মানসকে কাবুলীর হাত হ’তে কাকে রক্ষা
করেছিলেন ? সত্য লুন।
গদা। মিথ্যা আমি বলি না। হা—একরকম তাই বটে।

মুক্তিবাঁধন
মায়া। মানসের সঙ্গে আপনার পরিচয়ের ইতিহাস কি
জাতে পারি ?
গদা। নেই বা শুলে, মায়া।
মায়া। হু। মানসের সঙ্গে আমার সম্পর্ক জানেন ?
গদা। জানি। সে তােমাদের যে নিকট আত্মীয় তা—
আমাকে বলেছে।
মায়া। আর কিছু বলেনি?
গদা। না কিছু নয়। অন্ততঃ তােমাদের সম্বন্ধে নয়।
মায়া । ভাল। নিজের সম্বন্ধেই কি বলেছে বলুন। আপনাকে
বলতে হবে, কিছুতে ছাড়ব না। আমি মাথা কুটে মরে যাব
আপনার পায়ে--যদি না বলেন ।
গদা । [ কিছুক্ষণ চিন্তা করিলেন ] তুমি কেন এত উতলা
হচ্ছ, মায়া ? আমি তার সমস্ত খবর কাল জেনে এসেছি। যখন
সে তােমাদের অতি নিকট আত্মীয়, বিশেষ করে তুমি তার এত
হিতৈষিনী তখন আমি তার জন্য সমস্ত ত্যাগ করতে প্রস্তুত আছি।
মায়া। অশেষ করুণা আপনার। এখন বলুন কি খবর
জেনে এসেছেন।
গদা। কারবার তার নেই—সব মিছে কথা ।
মায়া। তারপর ?
গন।
সে চতুর্দিক হ’তে জড়িয়ে পড়েছে।
ঋণ। সে সব বন্দোবস্ত আজিই আমি করে দেব ।
মায়া। আর কি ?
অনেক টাকা

মুক্তিদ্বাধন
গদা। তার স্ত্রীর কঠিন অসুখ। বাড়ীতে আছেন। একটি
ছেলে ছিল অনাহারে বিনা ওষুধে মারা গেছে। তাকে শীঘ্র আমি
তার দেশে পাঠাবার বন্দোবস্ত করছি।
মায়া। [ চীৎকার স্বরে ] মানসের স্ত্রী ?
গদা। তুমি এতে আশ্চর্য্য হচ্ছ কেন, মায়া ? তুমি কি তা
জাতে না ?
মায়া। [ প্রাণান্ত চেষ্টায় সামলাইয়া লইলেন ] তারপর ?
গদা। আর কিছু বলবের নেই, মায়া। সে এখনি আসবে ।
আমি কারুর কাছে আজ পর্যন্ত হাত যােত করে ভিক্ষা চাইনি
তােমার কাছে চাচ্ছি, মায়া। আমার ভিক্ষা—তুমি যে এসব কথা
জান মানসকে জাতে দিও না।
মায়া। [ চক্ষু বাহিয়া অশ্রু ঝরিতেছিল।
বিরজাসুন্দরী আসিলেন।
বিরজা।
( মায়ার ও গদাধরের দিকে চাহিয়া ) মায়া, মানস
আছে-তুই এখান হতে যা দিদি-তার সামনে আমি তােকে
দেখতে চাই নে।
মায়া। মানস ! কৈ ? কৈ ?
[ বিরজাসুন্দরী অবাক হইয়া মায়ার দিকে চাহিয়া রহিলেন।
মানস কুমার আসিল।
বিরজা। এস বাবা। এই তােমার টাকাটা নাও। বড়

মুক্তি-বাঁধন
উপকৃত হয়ে রইলেম মানস। দাড়িয়ে রইলে কেন—বস বাবা,
আমি তােমাদের চা পাঠিয়ে দেবার বন্দোবস্ত করছি।
[ চলিয়া গেলেন।
মানস। মায়া, আমাকে অভ্যর্থনা করুলে না ?
[ মায়ার নিকটে গেল ]
মায়া। [ ঘৃণাস্বরে ] সরে দাঁড়াও ছুয়ােনা। উত্তর দাও,
তুমি কিসের লােভে, তােমার দুধের বাছাকে না খেতে দিয়ে মেরে-
ফেল্লে ? [ স্বর ভারি হইল } তােমার স্ত্রী তিল তিল করে অনাহারে
মছে, আর তুমি কিসের লােভে, ছিঃ, ছিঃ, ছিঃ! আমার কি
আছে ? এই মাংসপিণ্ডের লােভে ?
মানস। আমাকে ভুল বুঝ না, মায়া।
মায়া। কথা কয়াে না মিথ্যাবাদী, ভণ্ড, শয়তান। যে ছলনার
জাল দিনের পর দিন ধরে বুনে তুলছিলে, আমায় কোথায় নিয়ে
গিয়ে ফেলতে, তুমি ? যাও, যাও, আমার সামনে থেকে চলে যাও
বলছি, নইলে, তােমাকে গুলি করে মারবাে। [ ড্রয়ার হইতে
রিভলবার বাহির করিলেন ]
মানস। [ বিবর্ণ মুখে চলিয়া যাইতেছিল ]
মায়া। দাড়াও। কার টাকা নিয়ে যাচ্ছ তুমি? দিয়ে যাও
বলছি—
মানস। [ ভয়ে ভয়ে টাকা বাহির করিয়া গদাধরকে দিতে
গেল।
গদা। না—না, মায়া। আমি নিতে পারব না। মানস

মুক্তি-স্বাধন
তুমি যাও। ও টাকা আমি চাইনে। তােমার স্ত্রীর ওষুধ আর
পথ্যের জন্য দিলেম। আরও দেব, তােমাকে ঋণ মুক্ত ক’ব—
তুমি যাও।
মায়া। না, তা হবে না। ছেলেকে খেয়েছ—স্ত্রীকেও খেতে
হবে। টাকা রেখে যাও বলছি-
মানস। [ নােটগুলা ছুড়িয়া ফেলিয়া দিয়া ছুটিয়া পলাইল ।
গদা। [ নােট কুড়াইয়া লইয়া ] মায়া, তুমি নারী ? ছিঃ !
[ ছুটিয়া বাহির হইয়া গেলেন ?
মায়া। [ রিভার চুড়িয়া ফেলিয়া দিয়া জ্ঞান হারাইয়া
মেঝের উপর পড়িয়া গেলেন ]
[ বিরজাসুন্দরী ছুটিয়া আসিলেন ]
বিরজা। মায়া, দিদি, কিসের কাতরতা ?
[ মায়ার জ্ঞান ফিরিয়া আসিল উঠিয়া বসিলেন। গদাধর
আসিলেন ও বিরজাসুন্দরী নিঃশব্দে চলিয়া গেলেন।
গদা। [ মায়ার মাথায় একখানি হাত রাখিয়া ] মায়া, সত্যকে
সহ কোরতে শেখ শুধু চোখ মিলে দেখতে চেষ্টা কর ।
মায়া। [ নীরবে রহিলেন ]
গদা। তাকে টাকা দিয়ে এলেম। সে কি নিতে চায়। এবার
সে ভাল হবে। আমি তাকে মানুষ কোরে ছেড়ে দেব। তুমিও
সুখী হবে, মায়া।
মায়া। [ গদাধরের মুখের দিকে চাহিয়া ] আমি ভণ্ডকে,
নীচকে, শয়তানকে যে কি ঘৃণা করি কি বলব ।

মুক্তি-স্বাধন
গদা। ক্ষমাই মানুষের শ্রেষ্ট ধর্ম। আমাদের শাস্ত্র বার
বার এই শিক্ষাই দিয়েছে। তাকে ক্ষমা কর, মায়া !
মায়া। তাকে ক্ষমা ক্য কিন্তু বলুন, আপনি আমাকে
ক্ষমা কলেন ?
[ গদাধরের পায়ের নিকট নতজানু হইর বসিয়া ]
বল—ওগাে একবার বল, এই দুটি পায়ের অধিকার হতে বঞ্চিত
হব না!
[ ব্যস্ততার সহিত মায়ার হাত ধরিয়া তুলিলেন ] কি
শান্তি দিলে তুমি, মায়া!
( ভিতরে শঙ্খধ্বনি হইল )
( বিরজাসুন্দরী আসিলেন ও হাস্যমুখে গদাধর ও
মায়ার হাত একত্র করিলেন ও কহিলেন)
বিরজা।
তােরা সুখী হ’। ওরে শাঁখ বাজারে বাজা।
আজ আমার মায়ার বাঁধনের মাঝে সত্যকার মুক্তি হল।
[ উভয়ে বিরজাসুন্দরীকে প্রণাম করিলেন। শঙ্খ বাজিল ]
মনিকা পতন।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Mukti-badhan

Author
Dutta,shashadhar
Title
Nari-samasya-purna Natika
File name
Mukti-badhan
Text
OCR done
Citation
1932
Published
2009/09/16
Publisher
Basonta Kumar Ray,calcutta
Language
Sanskrit
Pages
74
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Plays
Keywords
Latika
DLI number
512957
Barcode
4990010019981.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
KFHEnYb9Vtq
Download PDF

Mukti-badhan