Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Shri Shri Bholananda-prasanga
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
(可 代理 Ey, infet HP 15: Sixt: netic This……” **
শ্রীশ্রীভােলানন্দপ্রসঙ্গ
স্বামী ধ্রুবানন্দ গিরি প্রণীত
প্রকাশক
স্বামী কেদারানন্দ গিরি
ভােলানন্দ-সন্ন্যাসশ্রম
লালবাগ
হরিদ্বার।
j১৩১৮ ;
মূল্য বারাে আনা মাত্র
প্রকাশক স্বামী কেদারানন্দ গিরি ভােলানন্দ-সন্ন্যাসাশ্রম লালবাগ হরিদ্বার। প্রাপ্তিস্থান- শ্রীমৎ স্বামী কেদারানন্দ গিরি, ভােলানন্দ-সন্ন্যাসাশ্রম, লালবাগ, হরিদ্বার। শ্ৰীযুক্ত চন্দ্রকুমার গুহ, পি, ডবলিউ, আই, ই, আই, রেলওয়ে বেনারস ক্যান্টনমেন্ট। শ্ৰীযুক্ত যতীশচন্দ্র মিত্র, মরগ্যান কোং ১ নং হেষ্টিংস্ স্ত্রী কলিকাতা। প্রিন্টার শ্ৰীঅপূৰ্ব্বকৃষ্ণ বসু ইণ্ডিয়ান প্রেস লিমিটেড, বেনারস ব্রাঞ্চ
উৎসর্গ-পত্র
যিনি দ্বাদশাধিক বৎসর কঠোর গুরুসেবায় অতিবাহিত করিয়াছেন
সেই ত্যাগের প্রতীক
গুরুগতপ্রাণ
সােদর-প্রতিম
শ্রীগুরুদেবের প্রথম সন্ন্যাসী-শিষ্য
শ্রীমৎ স্বামী ব্রহ্মানন্দ গিরি
মহারাজের করকমলে
এই ক্ষুদ্র গ্রন্থখানি
শ্রদ্ধা ও প্রীতির নিদর্শন স্বরূপ
অর্পিত হইল।
বিনীত
স্বামী ধ্রুবানন্দ গিরি
No text on this page.
ভূমিকা শ্রীশ্রীগুরুদেব স্বামী ভােলানন্দ গিরি মহারাজের জীবনী লিখিবার ইচ্ছা বহুদিন হইতেই হৃদয়ে পােষণ করিয়া আসিতেছিলাম। কথা- প্রসঙ্গে জীবনী সম্বন্ধে কোন কথা জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিতেন- ‘জীবনী দিয়ে কি হবে, শরীরটা ত একটা রক্ত-মাংসের খাঁচা, এর আবার জীবনী কি রে। সুতরাং তাহার জীবনী লিখিবার ইচ্ছা পরিহার করিতে বাধ্য হইয়াছি। কিন্তু তাহার সম্বন্ধে কিছু লিখিবার ইচ্ছা কিছুতেই পরিত্যাগ করিতে পারি নাই। এই সুদীর্ঘ সাত বৎসর কাল তাঁহার মধুর সঙ্গ করিবার সৌভাগ্য লাভ করিয়া নানা কথাচ্ছলে তাহার শ্রীমুখ হইতে তাহার জীবনী সম্বন্ধে দু-একটা কথা যাহা শুনিয়াছি এবং তাহার নিকট পত্রাদি পড়িবার ও তাহার উত্তর দিবার ভার সাধারণতঃ আমার উপরই ন্যস্ত থাকায় সেই সুযােগে যাহা অবগত হইয়াছি এবং সর্বশেষে তাহার কোন কোন শিক্ষিত ও বিশ্বস্ত ভক্ত হইতে যাহা জ্ঞাত হইয়াছি, সেই সমস্তই এই গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করা হইল। এই গ্রন্থ শিষ্য ও ভক্তবৃন্দের নিকট আদৃত হইলে পরিশ্রম সার্থক মনে করিব। এই গ্রন্থের বিক্রয়লব্ধ অর্থের লভ্যাংশ হরিদ্বার ভােলানন্দ সন্ন্যাসাশ্রমে ব্যয়িত হইবে। অলম্ বিস্তারেণ স্বামী ধ্রুবানন্দ গিরি
মঙ্গলাচরণ
গুরুব্রহ্মা গুরুবিষ্ণুগুরুদেবাে মহেশ্বরঃ।
গুরুরেব পরং ব্রহ্ম তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।
যস্য দেবে পরাভক্তি যথা দেবে তথা গুরো।
তস্যৈতে কথিত হৰ্থাঃ প্রকাশন্তে মহাত্মনঃ ।
সূচীপত্র প্রথম পরিচ্ছেদ পৃষ্ঠা ১ ১। সংসারত্যাগী ভােলানন্দ ২। লব্ধ গুরু ভােলানন্দ ৩। গুরুপরীক্ষায় উত্তীর্ণ ভােলানন্দ ৪। মাতৃসমীপে ভােলানন্দ ৫। অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ ভােলানন্দ = = ৫ ••• ১১ • • • ২০ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ৫০০ २० ••• ১। হরিদ্বারে ভােলানন্দ ২। ভক্তজন-পরিবৃত ভােলানন্দ ৩। প্রেমিক ভােলানন্দ ৪। স্বপ্নাদিষ্ট ভােলানন্দ ৩৩ ৩৩ ৩৭ ০ ০ . ৪০ ০ ০ ০ ৫। লব্ধচক্ষুঃ ভােলানন্দ ৪৩ ২ ৫৮ তৃতীয় পরিচ্ছেদ ১। সমাধিস্থ ভােলানন্দ ২। মৃতে প্রাণ প্রদানকারী ভােলানন্দ ৩। মুমূ-রক্ষক ভােলানন্দ : ৪। ভক্তিতে আপ্লুত ভােলানন্দ ৫। আধ্যাত্মিক পনিবারক ভােলানন্দ ০ ০ ০ ••• ৬৯
{ খ )
+ +
৭৮
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
১। অহৈতুক কৃপাসিন্ধু ভােলানন্দ
অসঙ্গ ভোলানন্দ
৩। আৰ্তরক্ষক ভােলানন্দ
৪। ভক্তবৎসল ভােলানন্দ
৫। ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু ভােলানন্দ
ssc
৮২
•••
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
. . .
৮৫
•••
৮৬
১। দিব্যজ্যোতির্ময় ভােলানন্দ
২। নবীন সাধক-হৃদয়ে আশা-সঞ্চারকারী ভােলানন্দ
ভক্তের মানরক্ষক ভােলানন্দ
৪। শিবরূপী ভােলানন্দ
৫। বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তিতে ভােলানন্দ
* * *
bb
. . .
১২
শ্ৰীশ্ৰভােলানন্দ-প্রসঙ্গ
প্রথম পরিচ্ছেদ
সংসার-ত্যাগী ভােলানন্দ
•
সে অনেক দিনের কথা। পাঞ্জাবের এক প্রান্তে কোন
বৃদ্ধার হৃদয়ে বিরহ-বেদনা প্রবলবেগে জ্বলিয়া উঠিল,
নয়নাতে বক্ষ প্লাবিত হইয়া গেল ; “ পুত্র, হা পুত্র”
করিয়া বৃদ্ধা ধূলিতে অবলুষ্ঠিত হইল। গ্রামের কতিপয়
বৃদ্ধা ও প্রৌঢ়া আসিয়া বৃদ্ধাকে সান্ত্বনা প্রদান করিতেছে।
কিন্তু সান্ত্বনা-বাক্য বৃদ্ধার বিরহ-দগ্ধ হৃদয়ে 'কণামাত্র
শান্তি প্রদান করিতে পারিল না ; বৃদ্ধার শােক অধিকতর
বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। হায় বিধাতঃ ! তােমার এ কি
অপূর্ব লীলা? মানব-বুদ্ধির অগম্য তােমার লীলাকে
অজ্ঞ মানব বুঝিতে প্রয়াস পাইয়া বিফলমনােরথ হইতেছে,
তাহাতে আর আশ্চর্য কি? মঙ্গলময় পরমেশ্বর যাহা কিছু
করেন, জীবের—আমাদের—মঙ্গলের জন্যই—এ ভাবটি যদি
শ্ৰীশ্রীভােলানন্দ-প্রসঙ্গ
জীব-হৃদয়ে সুদৃঢ়রূপে বদ্ধমূল হইয়া যাইত, তাহা হইলে
এই যে দিন দিন শত সহস্র জীব ভগবানের বিধানকে
দোষদুষ্ট এবং অমঙ্গল বলিয়া দুঃখ-দারিদ্রের নিষ্পেষণে
হা-হুতাশ করিতেছে ও করুণাময় পরমেশ্বরের অশেষ
নিন্দা করিতেছে—ইহা চিরতরে বিলুপ্ত হইয়া জীবের
হৃদয় শান্তির বিমল কিরণে উদ্ভাসিত হইত। কিন্তু তাহা
হইবার নয়। জীব অজ্ঞানাচ্ছন্ন, তাই রজ্জুতে সর্প
আরােপিত করিয়া ভয়ে ম্রিয়মাণ হইতেছে ;
ভগবানের লীলাকে বুঝিতে না পারিয়া,—নিজের সত্ত্বাকে
জানিতে না পারিয়া, জন্ম, মৃত্যু, জরা, ব্যাধি প্রভৃতি
অজ্ঞান-কল্পিত কতকগুলি জিনিষের ভয়ে ভীত ও চকিত
হইয়া কালযাপন করিতেছে। রঞ্জু সর্প নয়—রজুই ;
এ ভাবটি যদি অজ্ঞ পথিকের ধারণা হইয়া যাইত, তাহা
হইলে বৃথা ভয় ও দুঃখে কম্পিত ও ম্রিয়মাণ হইয়া কাষ্ঠবৎ
পথের উপর দাড়াইয়া থাকিত না ; সানন্দমনে গন্তব্যস্থানে
চলিয়া যাইত। জরা, ব্যাধি, জন্ম, মৃত্যু প্রভৃতি জীবাত্মার
নয়—পরন্তু স্থূল শরীরের—এটি যদি জীব সম্যকরূপে
উপলব্ধি করিতে পারিত, তবে জগৎকে এক নবভাবে
দেখিতে সক্ষম হইত—মনে হইত, ভগবানই
ভগবানই সকল
মূর্তিতে বিরাজ করিতেছেন, তিনিই বহুরূপী হইয়া লীলা
করিতেছেন সুতরাং তাঁহার মধ্যে দুঃখ কোথায় ?
সাধন-বলে কোনও ভাগ্যবান ব্যক্তি যখন এ ভাবটি লাভ
;
:
সংসার-ত্যাগী ভােলানন্দ
করিতে সক্ষম হন, তখন তিনি সকল দুঃখ ও সন্তাপের
হাত হইতে মুক্ত হইয়া যান; জীবন্মুক্ত মহাপুরুষ হইয়া
এই শরীর বর্তমানেই মােক্ষানন্দ লাভে সমর্থ হন।
ভগবান্ করুন, আমরাও যেন তাহারই কৃপায় ও নিজেদের
সাধন-বলে সৰ্ব্বদুঃখের নিবৃত্তি করিয়া পরমানন্দ লাভ
করিতে সক্ষম হই মায়ার কুহকে যেন আর মুগ্ধ না
;
হই।
মায়ামুগ্ধা বৃদ্ধার শােক-সন্তপ্ত মন যখন কোন প্রকারেই
শান্তিবারি পান করিতে সক্ষম হইল না, তখন অগত্য।
শােকের প্রাবল্যে ক্ষণিকের জন্য জাগতিক বস্তুসকল ভুলিয়া
একমাত্র পুত্রের স্মৃতি বক্ষে ধারণপূর্বক নিস্তব্ধ হইয়া রহিল।
সে হা-হুতাশ ভাব আর পরিলক্ষিত হইল না।
চঞ্চল
জগৎ যেমন রাত্রি আগমনে গম্ভীর ও নিস্তব্ধভাব ধারণ করে,
তদ্রুপ বৃদ্ধাও কিছুক্ষণ হা-হুতাশ করিয়া পরিশেষে শান্তা
ও ক্লান্ত হইয়া শুইয়া পড়িল।
মাতাকে ও ভ্রাতৃবৃন্দকে শােক-সমুদ্রে নিক্ষেপ করিয়া
ভােলানাথ হঠাৎ আজ সংসারের ভােগ-বাসনা সমূলে বর্জন
পূৰ্ব্বক একমাত্র জগতের সার, সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের কর্তা,
'জগতের আশ্রয় ও আনন্দ-মূৰ্ত্তি
আনন্দ-মূৰ্ত্তি ভগবানের
সৰ্বত্যাগী হইল। ক্ষণিকের জন্যও স্নেহময়ী মা ও অন্যান্য
আত্মীয়-স্বজনের চিন্তা আসিয়া তাহার ধর্মের পথে, ত্যাগের
পথে কণ্টক নিক্ষেপ করিতে পারিল না।
অন্বেষণে
৪ শ্রীশ্রীভােলানন্দ-প্রসঙ্গ “কবে ভবের সুখ-দুঃখ চরণে দলিয়া, যাত্রা করিব শ্রীহরি স্মরিয়া ; চরণ টলিবে না, হৃদয় গলিবে না, কাহারও আকুল ক্রন্দনে।” বিবেক-বৈরাগ্যের তীব্র দংশনে যখন জীব অভিভূত হয়, যখন জগতের অনিত্যতা সম্যক্ উপলব্ধি করিতে পারে, যখন পিতা, মাতা প্রভৃতি মায়িক, ইহাদের সহিত বস্তুতঃ কোন সম্পর্ক নাই-পথিকের সহিত যে প্রকার পথিকের আলাপ হয়, তদ্রুপ পিতা, মাতা, স্ত্রী, পুত্র সকলেই এই জগৎরূপ পান্থশালায় দু’ দিনের জন্য আসিয়া একত্রে সম্মিলিত হইয়াছে, সময় ফুরাইয়া গেলে সকলেই স্ব স্ব গন্তব্যস্থানের দিকে অগ্রসর হইবে—এই প্রকার ধারণা হৃদয়ে দৃঢ়রূপে বদ্ধমূল হয়, তখন জগতে এমন কোন শক্তি থাকে না, যাহা জীবকে সাধনমার্গ বা ত্যাগের পন্থা হইতে বিচ্যুত করিতে পারে। ভােলানাথও পূৰ্ব্বজন্মের সুকৃতিবলে এইরূপ বিবেক- বৈরাগ্য লাভ করিয়া হঠাৎ আজ পরমাত্মার ধ্যানে মগ্ন হইবার প্রবল ইচ্ছায় জগতের মায়িক সম্বন্ধে আবদ্ধ মাতা ও ভ্রাতৃবর্গকে পরিত্যাগ করিতে ক্ষণিকের জন্যও ইতস্ততঃ করিয়া একমনে পথ চলিতে লাগিল। কোথায় গেলে ভগবান্কে লাভ করা যায় কোথায় গেলে দুর্লভ মানবজন্ম সফল হয়—কোথায় গেলে আধ্যাত্মিক, আধিদৈবিক ও
লব্ধগুৰু ভােলানন্দ
আধিভৌতিক তাপত্রয় হইতে মুক্ত হইয়া আনন্দ-সাগরে
ভাসিতে পারা যায়, কোথায় গেলে জন্ম-মৃত্যুরূপ বন্ধন
হইতে মুক্ত হইয়া সৰ্ব্ব দুঃখের নিবৃত্তি করা যায় কোথায়
গেলে স্কুল-শরীর প্রভৃতি হইতে ভিন্ন সচ্চিদানন্দ-স্বরূপ
আত্মার উপলব্ধি হয়-এই চিন্তায় মগ্ন ভােলানাথ দ্রুত।
পদবিক্ষেপে ক্রোশের পর ক্রোশ চলিতে লাগিল।
[ ২ ]
লব্ধগুরু ভােলানন্দ
রাত্রি প্রভাত হইল। বিহগের কূজনে দিগ্দিগন্তর
মুখরিত হইতে লাগিল। কাকের কা কা, কোকিলের
কুহু কুহু ধ্বনি মােহনিদ্রায় শায়িত মানববৃন্দকে দিবা-আগমনের
সূচনা জ্ঞাপন করাইতে লাগিল। জনসাধারণ স্ব স্ব শয্যা
পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক প্রাতঃকৃত্য সম্পাদনে রত হইল।
ছাত্র অধ্যয়নে রত হইল, কৰ্ম্মী কৰ্ম্মে ব্যাপৃত হইল ;
ভিক্ষু দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করিবার জন্য “রাধে কৃষ্ণ’ বলিয়া
বহির্গত হইল। রাত্রি প্রভাতের সঙ্গে সঙ্গে স্তব্ধ-জগৎও
চঞ্চল হইয়া উঠিল। যােগীর কিন্তু সেদিকে দৃষ্টি নাই;
তিনি অনিমেষ-নয়নে হৃদয়াকাশে ভগবানের রূপ দেখিতে
•
শ্ৰীশ্ৰভােলানন্দ-প্রসঙ্গ
লাগিলেন; আপন-ভােলা, জগৎ-ভােলা হইয়া এক অনির্বচনীয়
আনন্দে মগ্ন রহিলেন। কোথায় জগৎ, কোথায় জীব—
সকলই যে চিন্ময়। সিদ্ধ যােগী সমাধিতে স্থিত। সাতটা
বাজিল, আটটা বাজিল, নয়টা বাজিল, দশটা বাজিল-তথাপি
যােগীর সমাধিভঙ্গের কোন লক্ষণ দৃষ্টিগােচর হইল না।
দেখিতে দেখিতে হঠাৎ যােগীর মনে বাহজগতের স্মৃতির
স্ফুরণ হইতে লাগিল। ক্রমশঃ যােগীর মন আধ্যাত্মিক
রাজ্য পরিত্যাগ করিয়া জগতে বিচরণ করিতে লাগিল।
‘প্রভুর সমাধি ভঙ্গ হয়েছে, জলদি চলে এস, তাহার
চরণে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে মনুষ্য-জন্ম সফল করি’ বলিয়া
একজন সাধু অপর চার-পাঁচ জন সাধুর সহিত যােগীর নিকটে
উপস্থিত হইয়া তাহার চরণে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করিল।
স্নেহের আধার, করুণার মূর্তি যােগী তাহাদের মস্তকে
হস্তস্থাপনপূর্বক স্নেহের সহিত আশীর্বাদ করিলেন।
শিষ্যবৃন্দও ভক্তি-বিনম্র-হৃদয়ে তাহার সমীপে উপবিষ্ট হইয়া
আধ্যাত্মিক জীবনের উৎকর্ষতা লাভ করিবার মানসে নানাবিধ
প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়া সদুত্তর পূর্বক আপনাদিগকে কৃতার্থ
মনে করিতে লাগিল। এমন সময় একটি উদাস-চিত্ত
বিংশতিবর্ষীয় যুবক আসিয়া যােগীর নিকট উপনীত হইল ।
সূৰ্যসমকান্তি যােগীকে দর্শন করিয়া যুবকের মন এক স্বর্গীয়
ভাবে বিভাের হইল । ক্ষণিকের জন্য আত্মবিস্মৃত হইয়া
সে যােগীর সহিত নিজেকে অভেদরূপে দেখিতে পাইল
লব্ধগুরু ভােলানন্দ পরক্ষণেই আবার তাহার পূৰ্ব্বভাব ফিরিয়া আসিল। যােগীর চরণে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করিয়া ভক্তিবিনম্রচিত্তে সানন্দ মনে যােগীর নিকট উপবিষ্ট হইল। কুরুক্ষেত্রের নিকটে, জিলা কর্ণাল, ডাকখানা কওয়ালের অন্তর্গত পস্থানা নামে একটি আশ্ৰম আছে। উক্ত আশ্রমে অনেক সাধু মহাপুরুষ বাস করিয়া থাকেন। শ্রীমৎ স্বামী গােলাপগিরিজী মহারাজ একজন সিদ্ধ মহাপুরুষ, উক্ত আশ্রমেরই সাধু। আমাদের পূর্বোক্ত যােগী মহারাজই এই স্বামীজী। ভােলানাথ সংসার হইতে চিরবিদায় গ্রহণ পূর্বক গুরু অন্বেষণে নানাস্থানে বিচরণ করিতে লাগিল। কিন্তু কোথায়ও মনােমত গুরু লাভ করিতে না পারিয়া হতাশ- কালযাপন করিতেছিল। এমন সাধুর মুখে বাবা গােলাপগিরিজীর অলৌকিক শক্তির কথা শ্রবণপূৰ্ব্বক তাহার প্রতি আকৃষ্ট হইয়া দ্রুতপদবিক্ষেপে তাহার নিবাসস্থল পস্থানামাভিমুখে অগ্রসর হইতে লাগিল। ক্ষুধাতৃষ্ণার প্রতি ক্ষেপশূন্য হইয়া সে পস্থানা আশ্রমে যােগীর নিকটে উপনীত হইয়া যাহা করিল, পাঠক তাহা অবগত আছেন। স্বর্ণকার যে প্রকার উত্তম স্বর্ণ পাইলেই আনন্দে আত্মহারা হয় এবং তাহা দ্বারা উত্তম উত্তম অলঙ্কার প্রস্তুত করিয়া সকলের হৃদয় মুগ্ধ করে ; সূত্রধর যে প্রকার উত্তম কাষ্ঠ পাইলেই আনন্দে উৎফুল্ল ভাবে সময় শ্ৰীশ্ৰভােলানন্দ-প্রসঙ্গ • হয় ও তাহা দ্বারা উত্তম উত্তম জিনিষ প্রস্তুত করিয়া লােকের মনে অশেষ আনন্দ উৎপাদন করে ; তদ্রুপ সদ্গুরু, জীবন্মুক্ত মহাপুরুষও উত্তম শিষ্য পাইলেই আনন্দে আত্মহারা হইয়া শিষ্যের প্রতি সমধিক স্নেহশীল হন এবং ধীরে ধীরে শিষ্যকে ব্ৰহ্মবিৎ করিয়া শিমাের এবং জনসাধারণের অশেষ কল্যাণ সাধন করেন। এ প্রকার শিষ্যের সংখ্যা নিতান্তই বিরল ; তাই সদ্গুরু লাভ করিয়াও মুগ্ধ মানব আধ্যাত্মিক জীবনে উৎকর্ষতা লাভ করিতে পারে না। বিবেক-বৈরাগ্য না থাকিলে মাত্র গুরুকৃপা দ্বারা তত্ত্বজ্ঞান লাভ হওয়া অসম্ভব, তাই একই গুরুর শিষ্যদের মধ্যে জ্ঞানী, অর্ধজ্ঞানী, অল্পজ্ঞানী, মূখ প্রভৃতি বহু প্রকারের শিষ্য দৃষ্ট হইয়া থাকে। লন্ধবৈরাগ্য ভােলানাথকে দেখিবামাত্রই বাবা গােলাপগিরিজীর মনে এক অপূৰ্ব্ব আনন্দের সঞ্চার হইল। তিনি দেখিলেন, ভােলানাথের হৃদয় ভস্মাচ্ছাদিত অগ্নিস্বরূপ, ভােলানাথের হৃদয়ে জ্ঞানালােক বৰ্ত্তমান সামান্য একটু আবরণ থাকায় তাহা প্রকাশ পাইতেছে না; গুরুরূপী তিনিই এই আবরণ দূর করিতে সক্ষম হইবেন- ভােলানাথকে ব্রহ্মজ্ঞ দেখিয়া নিজকে কৃত-কৃতার্থ মনে করিবেন। অন্তর্দর্শী মহাপুরুষ এই প্রকারে নিজের প্রধান শিষ্যকে প্রাপ্ত হইয়া আনন্দে উৎফুল্ল হইলেন। ভােলানাথও নিজের স্বভাববাচিত নম্র ও মধুর ব্যবহারে সমাগত সাধুবৃন্দ গুরুদেবকে সন্তুষ্ট করিতে লাগিল। কালবিলম্ব না {
লগুরু ভােলানন্দ
গুরুদেবও
করিয়া ভােলানাথ নিজের স্থূলদেহের প্রতি কোনরূপ দৃষ্টি না
দিয়া কায়মনােবাক্যে গুরুসেবায় রত হইল।
ভােলানাথকে পরীক্ষা করিবার মানসে তাহাকে তাশ্রমের
কঠোরতর কার্যে নিযুক্ত করিলেন। বৈরাগ্যবান্ সাধক
গুরুভক্ত ভােলানাথ গুরুদেবকেই শিবভাবে দর্শন করিত,
সুতরাং তাহার দ্বারা যে কোন কার্যে নিযুক্ত হইত,
অম্লানবদনে তাহা সম্পাদন করিত। গুরুদেবের আদেশানু-
যায়ী রাত্রি তিনটার সময় উঠিয়া শৌচাদি ক্রিয়া সম্পাদন
পূৰ্ব্বক অবগাহন করিয়া সাধনে প্রবৃত্ত হইত। প্রাতঃকালে
আসন হইতে উঠিয়া আশ্রমস্থ শিবের পূজা শেষ করিয়া
সমাগত সাধুবৃন্দ ও পরমারাধ্য গুরুমহারাজের জন্য রুটি, ডাল
প্রভৃতি স্বহস্তে প্রস্তুত করিত। এতদ্ব্যতীত প্রায় এক
মণ গােদুগ্ধকে আলােড়িত করিয়া প্রত্যহ মাঠা প্রস্তুত
করিত।
গুরুমহারাজ ও সাধুগণের ভােজন সমাপ্ত হইলে
এবং গুরুমহারাজ শয্যা গ্রহণ করিলে ভােলানাথ অন্ন গ্রহণ
করিত। মধ্যাহ্ন সময় বৃথা নিদ্রায় অতিবাহিত না করিয়া
সে শাস্ত্রাধ্যয়নে রত থাকিত ; তারপর যথাবিহিত আশ্রমের
অন্যান্য কর্তব্য শেষ করিয়া সায়ংকাল শিবপূজা
আরতিতে অতিবাহিত করিত। ভােলানাথ এই প্রকারে
পাঞ্চভৌতিক শরীরের প্রতি দৃষ্টি না দিয়া গুরুর তুষ্টি সম্পাদন
মানসে অত্যধিক কায়িক পরিশ্রম করিতে কখনও কুষ্ঠিত
হইত না এবং শাস্ত্রাধ্যয়ন পূৰ্ব্বক শাস্ত্রের ঘূঢ়ভাব উপলব্ধি
শ্ৰীশ্ৰভােলানন্দ-প্রসঙ্গ করিবার জন্য রাত্রে কঠোর সাধনে ব্যাপৃত থাকিত। গীতায় শ্রীভগবান্ বলিয়াছেন :- উদ্ধরোত্মনাত্মানং নাত্মানমবসাদয়েৎ। আত্মৈব হাত্মনাে বন্ধুরাত্মৈব বিপুরাত্মনঃ। অর্থাৎ-আপনি আপনার উদ্ধার করিবে, আপনাকে অবসন্ন করিবে না; আত্মাই আত্মার বন্ধু এবং আত্মাই আত্মার রিপু। ভােলানাথও যেন উক্ত শ্লোকের গূঢ়ার্থ সম্যক্রূপে উপলব্ধি করিতে পারিয়াই—নিজের পুরুষকারের দ্বারাই ব্ৰহ্মবিদ্যা বা মুক্তিলভ্যা যথাযথরূপে জ্ঞাত হইয়া দিবারাত্রি অক্লান্ত পরিশ্রম ও কঠোর সাধনে রত থাকিত। বস্তুতঃ দৈব বলিয়া কোন জিনিষই নাই বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। পুরুষকারই সকল ভূতের আশ্ৰয়িতব্য। পূর্বের পুরুষকারই এখন দৈব বলিয়া অভিহিত হইতেছে। যােগবাশিষ্ঠে ব্ৰহ্মর্ষি বশিষ্ঠ ভগবান ভগবান রামচন্দ্রকে এই প্রকারই উপদেশ দিয়াছেন। নিজের চেষ্টাদ্বারা এই জন্মেই উন্নতির উচ্চতম শৃঙ্গে আরােহণ করা যায়, আবার অলস- ভাবে পরমুখাপেক্ষী হইয়া দৈবের উপর নির্ভর করিয়া চলিলে অনেক সময়েই ‘যেই তিমিরে সেই তিমিরে’ থাকিতে হয়। ভােলানাথও ইহা সম্যক্রূপে উপলব্ধি করিয়া দৈবের উপর নির্ভর না করিয়া পুরুষকারের শরণাপন্ন হইল—অসীম উৎসাহে গুরু-সেবায় ও সাধন-ভজনে রত হইল।
গুরু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ভােলানন্দ
[ ৩ ]
গুরু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ভােলানন্দ
“দেখ ত ভােলা বাহিরে আছে কিনা’-বলিতেই জনৈক
শিষ্য তাড়াতাড়ি আশ্রমের বাহিরে যাইয়া দেখিল—কৌপীন
মাত্র পরিহিত ভােলানাথ শীতের প্রাবল্যে হু হু করিয়া
কঁপিতেছে।
পৌষমাস ; শীতের প্রাবল্যে জীব-শরীর সঙ্কুচিত।
এমন সময় হঠাৎ একদিন সন্ধ্যার সময় বাবা গােলাপগিরিজী
মহারাজ কঠোরভাবে ভােলানাথকে বলিলেন—‘ভােলা!
সব বস্ত্র রেখে শুধু কৌপীন পরিধান করে আশ্রম হতে দূর
হয়ে যা, তাের মত শিষ্যের আমার কোন প্রয়ােজন নাই।
গুরুমহারাজ আমার উপর কেন রুষ্ট হইলেন—কারণ
অনুসন্ধান করিতে অক্ষম গুরুগতপ্রাণ ভােলানাথ গুরুর
বাক্য-রক্ষাৰ্থ শুধু কৌপীন পরিধান করিয়াই আশ্রম হইতে
বহির্গত হইল। শীতের প্রকোপে অত্যধিক কষ্ট পাইতে
লাগিল; তথাপি কোন লােকের কাছে বস্ত্রের জন্য না গিয়া
কৌপীনমাত্র পরিধান করিয়া আশ্রমের বহির্ভাগে শীতে হু হু
করিয়া কাপিতে কপিতে রাত্রি যাপন করিল। গুরুই শিব,
তিনি আমার কোন অন্যায়, দেখিয়াই এবম্প্রকার শাস্তির
বিধান করিয়াছেন—এই ধারণার বশবর্তী হইয়া ভােলানাথ
নিজের উপর অত্যধিক বীতশ্রদ্ধ হইল। এই শরীরটাই
১২
•
শ্ৰীশ্ৰভােলানন্দ-প্রসঙ্গ
যত অনর্থের মূল, হয় ত এই শরীরকেই আরাম দিবার জন্য
এমন কোন অপরাধ করিয়াছি, যাহাতে গুরুমহারাজ আমার
উপর অসন্তুষ্ট হইয়াছেন; গুরু সাক্ষাৎ শিব—তিনি রুষ্ট হইলে
এ শরীর থাকার চেয়ে না থাকাই ভাল,–এই প্রকার চিন্তায়
চিন্তিত ভােলানাথ শরীরের সুখ-দুঃখের প্রতি দৃষ্টি না
দিয়া দাড়াইয়া দাঁড়াইয়া রাত্রি যাপন করিতেছিল।
প্রভাত হইল; করুণার আধার গােলাপগিরিজী জনৈক
শিষ্যকে সম্বােধনপূর্বক ভােলানাথের অনুসন্ধান করিতে
বলিলেন।
ভােলানাথ গুরুসেবায় অধিকতর যত্নবান দেখিয়া
তাহাকে পরীক্ষা করিবার মানসে বাবা গােলাপগিরিজী
বিনা কারণে কখনও কখনও তাহাকে কর্কশ বচন বলিতেন।
প্রথমতঃ, ভােলানাথের হৃদয়ে উক্ত বাক্যে দুঃখের সঞ্চার হইত;
কিন্তু সে গুরুকে কিছু না বলিয়া নিজের কর্তব্য সম্পাদন
করিয়া যাইত। পরিশেষে শব্দ আকাশের গুণ,—আমাকে
পরীক্ষা করিবার জন্যই গুরুমহারাজ এবম্প্রকার কর্কশ-বাণী
ব্যবহার করিয়া থাকেন, বুঝিতে পারিয়া ভােলানাথ
গুরুমহারাজের কঠোর বাণীতে বিন্দুমাত্রও দুঃখিত না হইয়া
সহাস্যবদনে সেবাদি কাৰ্যে ব্যাপৃত থাকিত। গুরুমহারাজ
যখন দেখিলেন, কর্কশ-বাণী ভোলানাথের মনে কোন প্রকার
ক্ষুব্ধতা উৎপাদন করিতে পারে না, তখন তিনিও ভােলানাথের
প্রতি কঠোর বাক্য ব্যবহার করিতে বিরত হইলেন।
গুরু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ভােলানন্দ **; হঠাৎ একদিন তাহাকে অধিকতর কঠোরভাবে পরীক্ষা করিবার মানসে গােলাপগিরিজী মহারাজ তাহার সহিত উক্ত প্রকার ব্যবহার করিলেন। সাধারণ শিষ্য হইলে গুরুর এবম্প্রকার ব্যবহারে দুঃখিত ও বীতশ্রদ্ধ হইয়া স্থানান্তরে গমন করতঃ শীত নিবারণ করিত ও ভবিষ্যৎ দুঃখ পরিহার করিবার জন্য গুরুর নিকট হইতে চিরতরে দূরে অবস্থান করিত। কিন্তু গুরুগতপ্রাণ সাধকের ভাব আমাদের ভােলানাথের ভাবের ন্যায়ই হইবে। গুরুই শিব—ইহা যিনি সম্যরূপে উপলব্ধি করিতে পারিয়াছেন, গুরু সর্বদা প্রহার করিলেও তিনি গুরুকে ত্যাগ করিয়া কখনও অন্যত্র থাকিতে পারেন —আমাদের ভােলানাথই সে বিষয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শিষ্য আসিয়া বলিল-ভােলানাথ বাহিরেই দণ্ডায়মান আছে। গােলাপগিরিজী ইহা অবগত হইবামাত্র দ্রুতপদ- বিক্ষেপে ভােলানাথের নিকট উপস্থিত হইয়া কঠোরবাক্যে বলিলেন—“যা, কাপড় পরে শিবপূজা কর গে’। পাঠক। আপনাদের মনে স্বতঃই উদিত হইয়াছিল, গােলাপগিরিজী কঠোর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ভােলানাথের সঙ্গে নিশ্চিতই মধুর ব্যবহার করিবেন, কিন্তু আপনাদের ধারণার বিরুদ্ধ কাৰ্য্য হইলেও গােলাপগিরিজী ভােলানাথকে পুনরায় কঠোরভাবে আদেশ করিলেও আপনারা বিস্মিত হইবেন না; কারণ মহাপুরুষগণ কখন কি কারণে কি প্রকার ব্যবহার করেন, তাহা মানববুদ্ধির অগম্য। মহাপুরুষগণের ১৪ শ্ৰীশ্ৰভােলানন্দ-প্রসঙ্গ হৃদয়ে প্রেমসমুদ্র প্রবাহিত, শুধু দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন বা ভক্তকে পরীক্ষা করিবার জন্য কঠোর ভাব ব্যক্ত করেন ; বস্তুতঃ, তাহাদের মধ্যে কঠোরতার লেশমাত্রও নাই, তাহারা স্বভাবতঃই দয়ালু ও পরােপকার-রত। গুরু কাপড় পরিধান করিয়া শিবপূজা করিতে বলিলেন শুনিয়া ভােলানাথ আনন্দে উৎফুল্ল হইল। আমাকে আবার তঁাহার চরণে স্থান দিয়াছেন, আমার দোষ ক্ষমা করিয়া আমার হিতচিন্তা করিতেছেন—এই ভাবিয়াই ভােলানাথ আনন্দে আত্মহারা হইয়া অধিকতর নিষ্ঠার সহিত শিবপূজা এবং আশ্রমের অন্যান্য সেবাদি করিতে লাগিল। ভােলানাথের এবম্প্রকার গুরুভক্তি দেখিয়া গােলাপ- গিরিজী তাহার উপর অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইলেন এবং ভবিষ্যতে আর কোনদিন তাহাকে পরীক্ষা করিতে প্রয়াস পান নাই। গুরু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ভােলানাথও গুরু-কৃপায় ও সাধনবলে দিন দিন আধ্যাত্মিক জীবনের উচ্চতর শৃঙ্গে ধীরে ধীরে উন্নীত হইতে লাগিল। গুরুর নিকট হইতে সন্ন্যাসলাভ পূৰ্ব্বক ভােলানাথস্বামী ভােলানন্দ গিরি নামে খ্যাত হইল। তাহার গুরুভক্তি ও সেবায় এবং শাস্ত্রানুরাগে জনসাধারণ অহর্নিশি তাহার স্তুতি করিতে লাগিল।
মাতৃ-সমীপে ভােলানন্দ [ ৪ ] মাতৃ-সমীপে ভােলানন্দ ‘আপনি সন্ন্যাসী হয়ে আমাকে প্রণাম করলেন কেন, আমায় পাপ স্পর্শ করেছে’-- বলিয়াই সন্ত্রস্তভাবে বৃদ্ধা একটু দূরে যাইয়া দণ্ডায়মান হইলেন। সন্ন্যাসীটি বলিল— ‘আপনার উপর আমার মাতৃভাব হয়েছে, মাতৃবুদ্ধিতে প্রণাম করেছি, এতে আপনার পাপ হয় নাই। পাঞ্জাব প্রদেশ সাধারণতঃ সাধুভক্ত। গুরু নানকের উপদেশানুযায়ী পাঞ্জাবী জনসাধারণ সাধুকেই সাক্ষাৎ নারায়ণ- জ্ঞানে সেবা করে। একদিন একজন সন্ন্যাসী পাঞ্জাবে বহু গ্রাম পর্যটন পূর্বক একটি গ্রামে উপনীত হইয়া বিভিন্ন ঘর হইতে রুটি ভিক্ষা করিতে লাগিল। গ্রামবাসীরাও সাধুর তেজঃপুঞ্জ কলেবর দেখিয়া শ্রদ্ধা ও ভক্তির সহিত তাহাকে যথাসাধ্য দ্রব্যাদি অৰ্পণ করিল। সাধু হঠাৎ একটি গৃহে উপস্থিত হইয়া ‘নারায়ণ হরি’ বলিয়া দ্বারে দণ্ডায়মান হইল। গৃহাভ্যন্তরে জপনির বৃদ্ধার কর্ণে সে শব্দ প্রবেশ করিল। সাক্ষাৎ নারায়ণ দ্বারে দণ্ডায়মানভীত ও ভক্তিভাবে বৃদ্ধা জপ পরিত্যাগপূৰ্ব্বক অন্য কাহারও অপেক্ষা না করিয়া স্বহস্তে রুটি গ্রহণ পূর্বক সাধুকে অর্পণ করিলেন। সাধু রুটি গ্রহণ পূৰ্ব্বক হঠাৎ বৃদ্ধার চরণে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করিল ; প্রণামান্তেই সাধু তড়িদ্বেগে ছুটিতে লাগিল। বৃদ্ধা সাধুর ব্যবহারে আশ্চর্যান্বিতা হইয়া অনিমেষ-নয়নে সাধুর প্রতি ••
শ্ৰীশ্ৰীভােলানন্দ-প্রসঙ্গ
তাকাইয়া রহিলেন। সেই অতীতের স্মৃতি আসিয়া বৃদ্ধার
উদ্বেলিত হৃদয়কে অধিকতর উদ্বেলিত করিতে লাগিল।
এগারাে বারাে বৎসর পূর্বের স্মৃতি তাঁহার হৃদয়াকাশে
পুনরায় নবীভূত হইয়া উঠিল। বৃদ্ধা হারাধন ভােলানাথকে
লাভ করিয়াও ধরিতে বা চিনিতে পারিলেন না। ভােলানাথও
পরিচিত হইবার ভয়ে দ্রুতপদবিক্ষেপে গ্রাম পরিত্যাগ
করিল।
ভােলানাথ দৃষ্টির বহিভূত হইলে বৃদ্ধা
ভােলানাথের স্মৃতি বক্ষে ধারণ করিয়া শােকাকুল হইলেন,
নয়নাতে তঁাহার বক্ষঃস্থল প্লাবিত হইল, বিরহ-বেদনা
পুনরায় নবীভূত হইয়া উঠিল ; এতদিনের ভস্মাচ্ছাদিত
অগ্নি আজ পুনরায় ভস্ম ভেদ করিয়া দ্বিগুণ তেজে জ্বলিয়া
উঠিল। বিরহব্যাকুলা, পুত্রশােকাতুরা বৃদ্ধার আজ আর
শান্তি নাই, জপে আর মন বসিল না। বিক্ষিপ্তহৃদয় বৃদ্ধা
শুইয়া শুইয়া ভােলানাথেরই চিন্তায় মগ্ন হইলেন। সমাগত
সাধুটিই আমার ভােলানাথ, ভােলানাথ এবং সন্ন্যাসীটির
মধ্যে অনেক সামঞ্জস্য বৰ্ত্তমান—তবে ভােলানাথ আমায়
পরিচয় না দিয়ে হঠাৎ চলে গেল কেন, আমার ভােলানাথ
এত নির্মম হতে পারে না, এ নিশ্চয়ই অন্য কোন সাধু-
ইত্যাদি নানা প্রকার জল্পনা কল্পনা আসিয়া বৃদ্ধার হৃদয়
আলােড়িত করিতে লাগিল। বৃদ্ধা শশাকের প্রাবল্যে কিছুক্ষণ
মুহ্যমান থাকিয়া পুনরায় দৈনন্দিন কার্যে ব্যাপৃত হইলেন।
শশাকের মাত্রা ধীরে ধীরে হ্রাস পাইতে লাগিল। মাতৃহৃদয়ে
১৭ এমন মাতৃ-সমীপে ভােলানন্দ এতটুকু প্রেম যদি ভগবান না দিতেন, তবে জীবের অস্তিত্বই থাকিত না, প্রসব হইবার পরক্ষণেই জীবকে ইহ- সংসার হইতে বিদায় গ্রহণ করিতে হইত ; সেবার অভাবে জীব হৃষ্ট-পুষ্ট হইয়া বৃদ্ধি পাইতে পারিত না। তাই ভগবান কৃপাপূর্বক অফুরন্ত স্নেহ, অহৈতুকী ভালবাসা দিয়া মাতৃ- হৃদয় প্রস্তুত করিয়াছেন। প্রেমের পুত্তলী স্ত্রী ধন ও স্পর্শ- সুখের লালসায় স্বামীর প্রতি অনুরক্ত হয়। নির্ধন স্বামীকে অনেক সময়েই প্রেয়সীর গঞ্জনা সহ্য করিতে হয়। সতী-সাধ্বী লক্ষ্মী-স্ত্রী জগতে অত্যন্ত বিরল—নিঃস্বার্থ হইয়া যে পতিকে ভালবাসে। অথচ মুগ্ধ জগৎ সেই স্ত্রীর প্রতিই সকলের চেয়ে অধিক অনুরক্ত হয়। মা-যিনি পুত্রের শতদোষ বর্তমান সত্ত্বেও—পুত্র নির্ধন হইলেও-মাতার প্রতি সর্বদা কটুক্তি প্রয়ােগ করিলেও—ধনী অবস্থায় মাতার সেবা হইতে পরায়ুখ হইলেও পুত্রকে অহৈতুকভাবে স্নেহ করেন ও পুত্রের সামান্য কষ্ট হইলেই যিনি উদ্বিগ্ন হইয়া পড়েন, যিনি না খাইয়া পুত্রকে খাওয়ান—সেই মাকে অবহেলা করিয়া কত পাপিষ্ঠ নরাধম জগতের সম্মুখে নিজেদের কলঙ্কলিপ্ত চরিত্র প্রকাশ করিতে কুণ্ঠিত হইতেছে না। মূখ, বিদ্বান, ধনী, দরিদ্র, কুলীন, অকুলীন, যুবা, প্রৌঢ় সকলেই যেন এক ছাঁচে প্রস্তুত। মাতৃভক্তি যেন জগৎ হইতে চিরবিদায় গ্রহণ করিয়া কোন নিভৃত পৰ্বত-গহ্বরে লুক্কায়িত হইয়াছে। তাই মাতৃবিদ্রোহী উচ্ছঙ্খল জনসাধারণের হৃদয়-রাজ্যে ১৮ শ্ৰীশ্ৰভােলানন্দ-প্রসঙ্গ অশান্তির রাজত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। গৃহে গৃহে দুঃখ ও অশান্তি বিদ্যমান। কনিষ্ঠ ভ্রাতা জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে অবজ্ঞা- পূৰ্ব্বক নিজেকেই সকলের চেয়ে বড় ও প্রতিষ্ঠিত মনে করিয়া অভিমানে স্ফীত হইয়া অশান্তিময় জীবন অতিবাহিত করিতেছে। সে লক্ষ্মণ আর নাই—যিনি রামের সঙ্গে বনে বনে ঘুরিয়া স্বেচ্ছায় শত দুঃখ মাথায় স্বেচ্ছায় শত দুঃখ মাথায় ধারণ করিয়া- ছিলেন। প্রেমময়ী যুবতী-স্ত্রীকে পরিত্যাগ করিয়া ভ্রাতার দুঃখে দুঃখী হইয়া দিনরাত পিতৃতুল্য জ্ঞানে ভ্রাতার সেবায় রত থাকা, এখন যেন বন্ধ্যার পুত্রের ন্যায় মিথ্যা বলিয়া মনে হয়। যখন প্রতিগৃহে পিতৃমাতৃভক্তি, ভ্রাতৃপ্রেম ও আত্মীয়- স্বজনের প্রতি সৌজন্য বর্তমান থাকিবে, তখনই জগতে শান্তি বিরাজ করিবে ; গৃহে থাকিয়াও মানবগণ এক স্বর্গীয় অপার্থিব আনন্দ উপভোগ করিতে পারিবে। ভগবান করুন, আমাদের হৃদয়ে যেন ভক্তি ও প্রেমের অমৃতধারা চিরতরে প্রবাহিত হয়—যেন কুটিলতা, দ্বেষ, হিংসা,পরশ্রীকাতরতা প্রভৃতি আসুরিক সম্পদ চিরতরে বিদায় গ্রহণ করিয়া আমাদের মনকে শম, দম, মৈত্রী, করুণা, মুদিতা প্রভৃতি দৈবসম্পদে বিভূষিত করে। ভােলানাথ সন্ন্যাস গ্রহণ পূর্বক গুরুর নিকটেই অবস্থান করিতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে এগারাে বৎসর গত হইল একদিন বাবা গােলাপগিরিজী ভােলানাথকে বলিলেন-
১৯
মাতৃসমীপে ভােলানন্দ
“ভােলা ! তুই প্রায় বারাে বৎসর হতে চল সংসার ত্যাগ
করেছিস্, একবার জন্মভূমি দর্শন এবং মাতাকে প্রণাম
করে চলে আয়-দেখিস, মাকে যেন আত্মপরিচয় না দিস।”
গুরুর আদেশানুযায়ী ভােলানাথ কালবিলম্ব না করিয়া
নিজের গ্রামে উপনীত হইয়া মাতাকে প্রণাম করিয়া গুরুর
সমীপে উপস্থিত হইল।
দ্বাদশ বৎসরান্তে বাবা গােলাপগিরিজী ভােলানাথকে
বলিলেন—“ভােলা! তুই আমার অনেক সেবা করেছি
এবং তাের ব্যবহারে ও ভক্তিতে আমি বস্তুতঃই অতীব
সন্তুষ্ট হয়েছি, তুই এখন অন্যত্র যেয়ে কঠোর সাধনে ব্যাপৃত
হ; আমি তােকে বর দিচ্ছি তাের যােগ ও ভােগ উভয়ই
লাভ হবে।”
গুরুর নিকট হইতে দূরে অবস্থান করিতে হইবে
ভাবিয়া ভােলানাথ দুঃখে আত্মহারা হইল। অগত্যা গুরুর
আজ্ঞা পালন করিতেই হইবে, গুরু মঙ্গলময়—যাহা কিছু
করেন বা বলেন, আমাদের মঙ্গলের জন্যই—এই ভাবিয়া
ভােলানাথ গুরুর নিকট হইতে বিদায় গ্রহণপূর্বক কঠোর
সাধনার উদ্দেশ্যে স্থানান্তরে গমন করিল। হিমালয় পর্বত
প্রাচীন, ঋষি-মুনি-সেবিত, তপস্যার অনুকূল মনে করিয়া
ভােলানাথ বিশ্বনাথ গিরি আদি অপর চার পাঁচ জন সাধুর
সহিত হিমালয় পর্বতে গমন করিল।
২০
ঐশ্রীভােলান-প্রসঙ্গ
[ ৫ ]
অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ ভােলানন্দ
“গিন্নি ।
দেখিল,
দেখ ত অদূরে কে যেন দণ্ডায়মান রয়েছে,
বােধ হয় কোন মহাত্মা হবে, শরীরের আকৃতিতে তাই
মনে হচ্ছে ; কিন্তু এমন সুন্দর পুরুষ আমি ত খুব কমই
দেখেছি।” গিন্নি একটু অগ্রসর হইয়া
সম্মুখে
দিব্যমূৰ্ত্তি সন্ন্যাসিবেশে একটি যুবক দণ্ডায়মান।
শেঠজীর (জমিদার) কাছে আসিয়া বলিল——“প্রাণনাথ !
উনি একজন সন্ন্যাসী, কিন্তু এমন সুন্দর কান্তিময় শরীর
আমার দৃষ্টিপথে কখনও পতিত হয় নাই। সাধুটির বয়সও
অল্প, আসুন একটি কাজ করা যা—আমাদের কন্যাটি
এইমাত্র ১৫ বৎসরে পদার্পণ করেছে, তাকে এবং আমাদের
সঞ্চিত এই চৌদ্দ লক্ষ টাকা এই সাধুটিকে দান করে আমরা
বানপ্রস্থাশ্রম অবলম্বন করি, এখন বৃদ্ধ হয়েছি, যাতে
পরকালের একটু কাজ করতে পারি তার জন্যে সচেষ্ট হই ।
আর এই বিষয়মমাহে আবদ্ধ থেকে কি লাভ?” শেঠজী
বলিল—“গিন্নি! তা ঠিক বলেছ, কিন্তু ইনি যে সন্ন্যাসী,
স্ত্রী গ্রহণ করবেন বলে মনে হয় না।” গিন্নি সহাস্যবদনে
বলিল—“আরে রেখে দাও তােমার সন্ন্যাসী; যুবক ছেলে-
চৌদ্দ লক্ষ টাকা পাচ্ছে, তার উপর এমন সুন্দরী যুবতী-স্ত্রী
ইহা কখনই পরিত্যাগ করতে পারবে না। ব্রহ্মা, বিষ্ণু
অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ ভােলানন্দ
২১
)
পৰ্য্যন্ত যে মােহে আবদ্ধ হয়ে দিনরাত হাবুডুবু খাচ্ছে, এই
ক্ষুদ্র মানব কি করে সে প্রলােভন এড়াতে পাবে। আর
যদি একান্তই অস্বীকৃত হয়, তবে আমি অনেক অনুনয় করে
এবং অধিকতর প্রলােভন দিয়ে একে বশ করিবই; এ আমার
দৃঢ়সংকল্প—এমন সুন্দর বর আমি কখনও ছাড়ব না।”
শেঠজী বলিল—“তা দেখ, যদি পার ত আমাদের উভয়েরই
সৌভাগ্য।” শেঠজীর বাক্য সমাপ্ত হইতে না হইতেই গিন্নি
( শেঠজীর স্ত্রী) উক্ত সাধুটির নিকট উপস্থিত হইল।
কৌপীনমাত্ৰ পরিহিত ভােলানন্দ # বিশ্বনাথ গিরি
প্রভৃতি সাধুদের সহিত হিমালয়ের উচ্চতর শৃঙ্গে অবস্থান
করিয়া কঠোর তপস্যায় মগ্ন হইলেন। কঠোর তপােনিরত
ভােলানন্দের মন এখন একমাত্র সচ্চিদানন্দ পরমেশ্বরের
ধ্যানে মগ্ন। শরীর হইতে পৃথক্ নিজের চিন্ময় আত্মসত্তা
জ্ঞাত হইয়া ভােলানন্দ নিজেকে কখনও ভগবানের দাস,
কখনও বা ভগবান্ হইতে অভেদ ভাবে দেখিতে লাগিলেন।
হৃদয়ে আনন্দ-সমুদ্র প্রবহমাণ হইল ; ভক্তি-মন্দাকিনীর
অমৃতধারায় অবগাহন করিয়া মন ও প্রাণ পবিত্র হইল,
হৃদয় হইতে কামাদি রিপু চিরতরে বিদায় গ্রহণ করিল।
পূৰ্বেই উক্ত হইয়াছে, ভােলানাথ সন্ন্যাসগ্রহণপূর্বক
‘ভােলানন্দ’ নাম গ্রহণ করিয়াছেন সুতরাং এখন হইতে আমরা
তঁাহাকে ভােলানন্দ নামে অভিহিত করিব।
২২ শ্ৰীশ্ৰভােলানন্দ-প্রসঙ্গ চিন্ময় ; জিতেন্দ্রিয় লব্ধজ্ঞান ভােলানন্দ দেখিতে পাইলেন,—সকলই দেবতা, মানব, পশু, পক্ষী সকলই পরমকারুণিক পরমেশ্বরের এক একটি সচল বিগ্রহ, তাই জীবই শিব । নারায়ণ জ্ঞানে জীবের সেবা কর -মুক্তি তােমার করতলগতা। হিমালয়ের তুষার মধ্যে কঠোর সাধনে নিরত থাকিয়া ভােলানন্দ সাধনায় সিদ্ধ হইলেন। তার পর ভারতবর্ষের বিভিন্ন দেশ পর্যটন পূর্বক দ্বারকা প্রভৃতি তীর্থ দর্শন-মানসে বম্বে নগরীতে কোন এক ধনীর গৃহ-দ্বারে আসিয়া মাধুকরী করিবার জন্য দণ্ডায়মান হইলেন। ভােলানন্দকে দেখিলে মনে হয়, যেন তিনি কেবলমাত্র যৌবনে পদার্পণ করিয়াছেন। ভােলানন্দের অপূৰ্ব্ব রূপ দেখিয়া গৃহস্বামী ও তাহার স্ত্রীর মধ্যে যে প্রকার কথােপকথন হইল এবং স্ত্রী যাহা করিল পাঠক তাহা অবগত আছেন। শেঠের স্ত্রী পরম আদর- পূৰ্ব্বক ভােলানন্দকে গৃহের অভ্যন্তরে লইয়া গেল। ভােলানন্দ সেখানে একটি কেদারায় উপবেশন করিলেন। শেঠজী ভােলানন্দের আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করিতে লাগিল এবং মনে মনে তাহাকেই নিজের জামাতার একমাত্র উপযুক্ত পাত্র বলিয়া স্থির করিল। গিন্নিও ভােলানন্দের রূপে মুগ্ধ হইয়া মনে মনে তাহাকে জামাতৃ-পদে বরণ করিল। শেঠ ও তাহার স্ত্রীর দুরভিসন্ধির সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ভােলানন্দ মধুর ও নম্রভাবে বলিলেন—“আমার সময় নাই, মাধুকরী দি, চলে যাই।” তখন গিন্নি অগ্রসর হইয়া অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ ভােলানন্দ ; ভােলানন্দকে বলিল-“দেখুন সন্ন্যাসীঠাকুর। আপনি এই অল্প বয়সে কেন শুধু শুধু কষ্ট করূছেন, বৃদ্ধ বয়সেই সন্ন্যাস গ্রহণ করবার নিয়ম ; যুবকের জন্য ভােগ, বৃদ্ধের জন্য যােগ। তা আপনি দেখছি এর উল্টা চলছেন। এমন সুন্দর শরীর, এত অল্প বয়স—আপনি একটি কাজ করুন, আমাদের চৌদ্দ লক্ষ টাকা মজুদ আছে, এই টাকা আপনি গ্রহণ করুন; অধিকন্তু দেখুন, আমাদের কোন পুত্রসন্তান নাই, শুধু একটি বিবাহ-যােগ্য কন্যা আছে। আপনি তাহার পাণিগ্রহণ করুন।” কি ভীষণ পরীক্ষা! যুবক সন্ন্যাসী ভােলানন্দ আজ বস্তুতঃই কঠোর পরীক্ষায় নিমগ্ন হইয়াছেন। সদ্গুরুর বিশেষ কৃপা ব্যতীত এই পরীক্ষা হইতে উত্তীর্ণ হওয়া মানবের সম্পূর্ণ গুরুকৃপা ভােলানন্দের উপর সদাই বর্ষিত। তাই, অবিক্ষিপ্তচিত্ত ভােলানন্দ ধীরভাবে গিন্নিকে বলিলেন “মা! আমার একটি প্রশ্নের উত্তর দিবেন কি ?” গিন্নি উৎসুক ভাবে বলিল—“হাঁ, বলুন।” ভােলানন্দ বলিলেন- “আপনারা যে এত বৎসর বিষয় ভােগ করেছেন তাতে কোন শান্তি পেয়েছেন কি ?” গিন্নি ও শেঠ উভয়ে সমস্বরে বলিল-“না, শান্তি পেলে কি আর আজ বিষয় ত্যাগ করে বানপ্রস্থাশ্রম অবলম্বন করতে উৎসুক হতাম? বিষয়ে শান্তি নাই।” ভােলানন্দ বলিলেন- “তবে মা! আপনারা যে বস্তুতে শান্তি পান নাই আমাকে তাহা গ্রহণ করতে
২৪
শ্ৰীশ্ৰীভােলান-প্রসঙ্গ
বলছেন কেন? আমিও ত তাতে কোন প্রকার সুখ
পাব না, সুতরাং আপনারা আমাকে আর এপ্রকার
অনুরােধ করবেন না”-এই বলিয়াই ভােলানন্দ সেখান
হইতে প্রস্থান করিলেন। শেঠজী ও তাহার স্ত্রী তাহাদের
সকল প্রলােভনই
যুবকের
উপর ব্যর্থ হইল দেখিয়া প্রথমতঃ
একটু দুঃখিত হইল, কিন্তু পরক্ষণেই যুবকের
অমানুষিক
ত্যাগ ও অমূল্য সদুপদেশের কথা স্মরণ করিতেই ভােলানন্দের
উপর তাহাদের ভক্তি ও প্রীতি বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইল ; তাহার
উদ্দেশ্যে তাঁহাকে নমস্কার করিল। ভােলানন্দও সেখান হইতে
অগ্নি-পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া দ্বারকাভিমুখে রওনা হইলেন।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
[ ১ ]
হরিদ্বারে ভােলানন্দ
;
“কে ?”
“আমি-আপনার বাগানের মালী।”
“কেন এসেছিস্ ?”
“একটি কথা আছে।”
-বলিতেই মােহান্তজী দরজা খুলিয়া বাহিরে
আসিলেন।
মালী বলিল, “স্বামিজী ! আপনার বাগানে এক সাধু
আসিয়াছেন। তিনি সর্পসঙ্কুল বাগানেই বাস করিতেছেন
আপনি কৃপাপূর্বক তাহার জন্য কোন ব্যবস্থা করুন।
“যা, আমি একটু পরে আছি” বলিয়া মােহান্তজী
মালীকে বিদায় দিলেন। মালীও মােহন্তজীকে একটি
প্রণাম করিয়া স্বস্থানে প্রস্থান করিল।
সাধুগণ-সেবিত পুণ্যভূমি গঙ্গাদ্বার হরিদ্বারের বাজারের
মধ্যে একটি বৃহৎ অট্টালিকার দ্বিতল গৃহে মােহান্ত স্বামী
শিবদয়াল গিরি মহারাজ বাস করেন। তাঁহার অগাধ
সম্পত্তি। হরিদ্বারের বহির্ভাগে গঙ্গার উপর তাহার একটি
ঐশ্রীভােলানন্দ-প্রসঙ্গ বাগান বর্তমান। তিনি উক্ত বাগানের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একজন মালী নিযুক্ত করিয়াছেন। উক্ত মালীই মােহান্তজীকে উক্ত প্রকার সংবাদ জ্ঞাপন করিল। কাল- বিলম্ব না করিয়া মােহান্তজী দ্রুতগতিতে বাগানে উপস্থিত হইয়া নবাগত সাধুর অপূৰ্ব তেজোময় মূর্তি নিরীক্ষণ করিয়া ভক্তি ও শ্রদ্ধায় মস্তক অবনত করিলেন। মােহান্তজী কেবলমাত্র যৌবনে পদার্পণ করিয়াছেন, নবাগত সাধুটি প্রৌঢ় শ্রেণীর মধ্যে গণ্য ; কিন্তু তেজঃ ও কান্তিতে শত শত যুবককে যেন অতিক্রম করিতেছেন। “আপনি আমার গৃহে চলুন, আপনার কোন প্রকার কষ্ট হইবে না; আমি ঐকান্তিকভাবে আপনার সেবা-শুশ্রষা করিব”—বলিয়া মােহান্তজী সাধুটিকে তঁাহার গৃহে যাইবার জন্য সনির্বন্ধ অনুরােধ করিতে লাগিলেন। মােহান্তজীর ভক্তিবিনম্র ব্যবহারে প্রীত হইয়া সাধুটি মােহান্তের সহিত তাহার বাড়ীতে উপনীত হইলেন। কিছুকাল সেখানে বাস করিয়া তীব্র বৈরাগ্যবান্ সাধুটি অট্টালিকার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হইয়া গঙ্গার উপর কুটীরে বাস করিবার জন্য প্রবল ইচ্ছা প্রকাশ করিলেন। মােহান্তজী অগত্যা সাধুটিকে নিজের বাগানে থাকিবার সুবন্দোবস্ত করিয়া দিলেন। দ্বারকা প্রভৃতি তীর্থ পৰ্যটনপূৰ্ব্বক জীবনের অবশিষ্ট সময় পুণ্যভূমি হরিদ্বারে অতিবাহিত করিবার সঙ্কল্প করিয়া ভােলানন্দ হরিদ্বারে আসিয়া উপনীত হইলেন। হরিদ্বারের হরিদ্বারে ভােলানন্দ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলােকন করিয়া ভােলান সেখানে বাস করিতেই দৃঢ়সঙ্কল্প হইলেন। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত হরিদ্বারে পূতসলিলা দক্ষিণ-প্ৰবাহিণী ভাগীরথীর দিবারাত্র কুলু কুলু ধ্বনি দর্শকের মনে এক স্বর্গীয় ভাবের সঞ্চার করিতেছে। এত জল কোথা হইতে আসিতেছে ? সেই অতীতের কথা স্মৃতিপথে উদিত হয়। কোথায় আজ সে ত্রেতাযুগ, কোথায় সে তপােনিরত পরােপকার-রত পিতৃভক্ত ত্যাগী রাজর্ষি ভগীরথ—যিনি রাজ্যৈশ্বৰ্য পরিত্যাগ করিয়া নিজের পূর্বপুরুষগণের পূৰ্বপুরুষগণের উদ্ধার-সাধন-মানসে, গঙ্গাদেবীকে পৃথিবীতে আনিবার সঙ্কল্প করিয়া কঠোর তপস্যায় নিমগ্ন হইয়াছিলেন। সাধনায় সিদ্ধ হইয়া যিনি মা জাহ্নবীর ক্রোড়ে উপবিষ্ট, মা যাহাকে নিজের পুত্রবৎ স্নেহ করিয়াছেন। মা গঙ্গে, মা আমার! ভগীরথ তােকে যে প্রকারে ভক্তিতে বশ করেছেন, আমাদের ত সে ভক্তি নাই- সংসারের কঠোর আঘাতে পাষাণ হৃদয় আরও কঠিন হয়েছে- ভক্তিবারি সিঞ্চনে তাহা কখনও দ্রবীভূত হবে না। মা ! তবে কি আমাদের কোন উপায় নেই, আমরা কি চিরদিনই এমনিভাবে সংসারের ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে ভেসে ভেসে দুঃখের কবলে পতিত থাকব ? অসুরধ্বংসকারিণী মা। তুই কৃপা করে আমাদের হৃদয় হতে কামাদি অসুরনিচয়কে দূর করে দে—তাদের সমূলে ধ্বংস করে দে। মা ! সন্তান অবােধ বলে মা কি তাকে কোল দেয় না ? সন্তান দুষ্ট
২৮
শ্ৰীশ্ৰভােলানন্দ-প্রসঙ্গ
হলে—অসমর্থ হলে মা তার জন্য বিশেষ চিন্তিত হন,তার
মঙ্গলের উপায় উদ্ভাবন করেন। তবে মা! তাের এ কি
প্রকার বিপরীত ভাব ? অজ্ঞ, সংসারসমুদ্র হতে উত্থানশক্তি-
রহিত আমাদের হাত ধরে’ মা! সংসারের পরপারে নিয়ে
যা না কেন? তাের নাম করুণাময়ী, পতিতপাবনী—কই,
সে কি কেবল কথার কথা। মা ! আমরা পতিত, তুই হাত
ধরে’ এ পতিতদের নিজের ক্রোড়ে টেনে নেভগীরথের
ন্যায় আমাদের হৃদয়ে ভক্তিবারি সিঞ্চন ক—যেন অন্তিমে
তাের অভয়পদে চিরশান্তি লাভ করতে পারি।
একদিকে পুণ্যতােয়া ভাগীরথীর অহর্নিশ কুলু-কুলুধ্বনি
যেমন দর্শকের মনে অতীতের স্মৃতি উদয় করিয়া দেয়, অন্য
দিকে শ্রেণীবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান হিমালয় পর্বতের সুমনােহর
দৃশ্যরাজি ততােধিক অতীতের স্মৃতি আনয়ন করে ; হৃদয়
এক অপার্থিব আনন্দে মগ্ন হয়। সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর,
কলি—সকল যুগেই সিদ্ধ-মুনি-ঋষি-সেবিত বিশাল অক্ষয়
হিমালয় পর্বত যেন সগর্বে মস্তক উন্নত করিয়া সকলকে
নীতিগর্ভ উপদেশ প্রদান করিতেছে—“রে অজ্ঞ জীব! তুই
আজ দু দিনের জন্য জগতে এসে ভােগবিলাসে মগ্ন হয়েছি,
নিজের ক্ষণভঙ্গুর পাঞ্চভৌতিক শরীরটার রক্ষণাবেক্ষণেই
দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করছিস্ ; কোথায় ছিলি,
কোথায় এসেছিস্ এবং কোথায়ই বা যাবি, তার কোনই খবর
রাখছি না। অজ্ঞ, মূখ ! তাের কিছুতেই জ্ঞান হচ্ছে না, এই
হরিদ্বারে ভােলানন্দ
একবার আমার প্রতি চেয়ে দেখ, কত যুগ গত হয়েছে,
আমি এখানে এমনিভাবেই দণ্ডায়মান আছি, ধীর-স্থির ভাবে
চেয়ে চেয়ে জগতের খেলা দেখছি, আর মনে মনে হাছি।
তাের মত কোটি কোটি প্রাণী আমি দেখতে দেখতে কালের
করাল গ্রাসে পতিত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। তথাপি
তাের জ্ঞান হচ্ছে না, এই নশ্বর সাড়ে-তিন-হাত দেহটাকেই
‘আমি’ বলে ভাবছিস্, শরীর হতে ভিন্ন নিজের সত্তাকে
জাতে চেষ্টা করছি না। নিজেকে পণ্ডিত মনে করে
অভিমানে স্ফীত হচ্ছি, কিন্তু মহা অজ্ঞের ন্যায় কাল যাপন
কছি। তুমি কে, তাহা পূৰ্ব্বে জ্ঞাত হও, পশ্চাৎ নিজেকে
পণ্ডিত বলিয়া প্রচার করিও।
‘বিদ্যাবিনয়সম্পন্নে ব্রাহ্মণে গবি হস্তিনি।
শুনিচৈব শ্বপাকে চ পণ্ডিতাঃ সমদর্শিনঃ ॥
‘বিদ্যা-বিনয়-সম্পন্ন ব্রাহ্মণ, গে, হস্তী, কুকুর ও চণ্ডালে
সমদর্শী ব্যক্তিরাই পণ্ডিত-পদবাচ্য হইয়া থাকেন।
তাই বলি, পূর্বে নিজে যথার্থ পণ্ডিত হও, সৰ্ব্বভূতে এক
আত্মচৈতন্য বিরাজমান, এটি উপলব্ধি কর, পশ্চাৎ পণ্ডিত
বলিয়া অভিমান করিও। আর কতকাল এই মােহ-নিদ্রায়
অভিভূত থাকিবে, এখনও সময় আছে, ইচ্ছা করিলে হে
মানব! এই জন্মেই তুমি কৃতকৃত্য হইতে পার,ভগবান
লাভ করিতে পার—নিজের মনুষ্য জন্ম সফল করিতে পার।”
শ্ৰীশ্ৰভােলানন্দ-প্রসঙ্গ হিমালয়ের সুদৃশ্যরাজি ও কাল্পনিক উপদেশাবলী বস্তুতঃ দর্শকের—বিশেষতঃ ভাবুকের মনে এক অপার্থিব আনন্দ সঞ্চার করে। পশ্চিম, উত্তর ও পূর্বদিকে হিমালয় দ্বারা বেষ্টিত হরিদ্বার, পতিতপাবনী গঙ্গা দ্বারা পূত হরিদ্বার, সাধুগণ-সেবিত হরিদ্বার, দেশদেশান্তর হইতে আগত দর্শক দ্বারা পরিপূর্ণ হরিদ্বার, অহর্নিশ ব্যোম ব্যোম হর হর, নমঃ পার্বতীপতে হর, গঙ্গামায়ীজিকী জয় প্রভৃতি ধ্বনিতে মুখরিত হরিদ্বার—বস্তুতঃই ভােলানন্দের মনে এক অপূর্ব নন্দের সঞ্চার করিল। তিনি জীবনের অবশিষ্ট সময় হরিদ্বারে যাপন করিতেই ইচ্ছা করিলেন। হরিদ্বারে মায়াদেবী, বিল্বকেশ্বর শিব এবং একক্রোশ পূর্বে হিমালয়ােপরি অবস্থিত চণ্ডীমন্দির দর্শন করিয়া ভােলানন্দ ব্রহ্মকমণ্ডলুতে অবগাহন করিলেন। দক্ষেশ্বর শিবজীকে দর্শন করিবার প্রবল ইচ্ছায় ভােলানন্দ দ্রুতপদ- বিক্ষেপে হরিদ্বার হইতে এক ক্রোশ দক্ষিণে অবস্থিত কখলে দক্ষেশ্বর মন্দিরে উপনীত হইলেন। দক্ষেশ্বর শিবকে দর্শন করিতেই ভােলানন্দের মনে এক অপার্থিব ভাবের উদয় হইল। শিবভক্ত ভােলানন্দের স্মৃতিপথে শিবজীর অলৌকিক লীলারাশি উদিত হইল। হায়, ইহাই সেই স্থান-যেখানে মূঢ়, অভিমানী, শিবদ্বেষী দক্ষ প্রজাপতি শিববিহীন যজ্ঞ করিতে উদ্যত হইয়াছিলেন। ইহাই সেই স্থান—যেখানে শিব-প্রণয়িনী মা সতী পতিনিন্দা সহ হরিদ্বারে ভােলানন্দ করিতে না পারিয়া পিতা দক্ষের প্রতি ক্রুদ্ধা ও বীতশ্রদ্ধা হইয়া শিবনিন্দুক পিতার শুক্র হইতে প্রাপ্ত শরীরকে পাপের আশ্রয়স্থল মনে করিয়া পতিভক্তির পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনপূর্বক সমাগত দেবতা-ঋষিদের যুগপৎ ভয় ও বিস্ময় উৎপাদন করিয়া নিজের শরীরকে মুহুর্ত মধ্যে পরিত্যাগ করিয়াছিলেন। ইহাই সেই স্থান যেখানে সতীবিরহ-দগ্ধ- হৃদয় শিবের ক্রোধাগ্নি হইতে উখিত বীরভদ্র দ্বারা দক্ষযজ্ঞ বিধ্বস্ত ও দক্ষরাজ বিনাশ-প্রাপ্ত হন। ইহাই সেইস্থান- যেখানে আশুতােষ শিবজীর কৃপায় মদগর্বিত দক্ষ পুনৰ্ব্বার জীবন লাভ করেন কিন্তু পাপের চিহ্নস্বরূপ তাহার স্কন্ধে ছাগমুণ্ড সংযযাজিত হয়। শিবের অলৌকিক লীলা স্মরণ করিতে করিতে ভােলানন্দ ধীরে ধীরে পুনরায় হরিদ্বারে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। হরিদ্বারে বাস করিবার প্রবল ইচ্ছার বশবর্তী হইয়া তিনি হরিদ্বারের সকল স্থান ঘুরিয়া ঘুরিয়া পরিদর্শন করিলেন। কিন্তু কোথায়ও মনােম স্থান না পাইয়া দুঃখিত চিত্তে গঙ্গাতীরে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। হঠাৎ গঙ্গাতীরে অবস্থিত মােহান্ত শিবদয়াল গিরি মহারাজের নির্জন উদ্যান তাঁহার দৃষ্টি-পথে পতিত হইল। তিনি সেই উদ্যানে যাইয়া উদ্যানের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হইয়া সেইখানেই বাস করিতে অভিলাষী হইলেন। বাগানের পূর্বদিকে স্বচ্ছসলিলা ভাগীরথী, তাহা হইতে একক্রোশ দূরে পর্বতােপরি অবস্থিত
শ্ৰীশ্ৰভােলানন্দ-প্রসঙ্গ
;
অথচ দৃষ্টির অন্তভূতি মা চণ্ডীদেবীর মন্দির ; উত্তরে সর্বত্যাগী
শুধু কৌপীনমাত্রসম্বলিত ভস্মলেপিত নাগাসাধুদের জুনা
আখড়া, তাহা হইতে নয় ক্রোশ দূরে অথচ দৃষ্টিশক্তির
অন্তভূত বিশাল হিমালয়ের উন্নত শাখারাজি; পশ্চিমে বিভিন্ন
দেশ হইতে সমাগত যাত্রিবৃন্দ-সেবিত সাধারণ পথ এবং
তাহা হইতে আধ ক্রোশ দূরে অথচ দৃষ্টিশক্তির অন্তর্গত মা
মনসা-দেবীর মন্দির ; দক্ষিণে উপরে প্রশান্ত আকাশ, নিয়ে
পূতসলিল ভাগীরথীর তটোপরি অবস্থিত বিস্তীর্ণ ভূমি-
ভাবুক ভােলানন্দের মনে এক অনির্বচনীয় আনন্দের সঞ্চার
করিল। তিনি উক্ত উদ্যানেই বাস করিতে লাগিলেন।
বাগানের মালী সর্পসঙ্কুল উদ্যানে ভােলানন্দ বাস করিতেছেন
দেখিয়া তাহার কোন বিপদ হইতে পারে মনে করিয়া
বাগানের মালিক মােহান্ত স্বামী শিবদয়াল গিরিজীকে সংবাদ
দিল। মােহান্তজীও ভােলানন্দের ব্যবহারে ও তেজঃপুঞ্জ
কলেবর দর্শনে মুগ্ধ হইয়া তাহাকে নিজের আচাৰ্য গুরুপদে
বরণ করিয়া সৰ্ব্বপ্রকারে সুবন্দোবস্ত করিয়া দিলেন।
ভক্তজন-পরিবৃত ভােলানন্দ
[ ২ ]
ভক্তজন-পরিবৃত ভােলানন্দ
‘ওয়েল (Well) পাদ্রী! টোমকো কুছ, চিজকা
জরুরৎ হ্যায়’ # বলিয়াই এক সাহেব সাধুকে হাতজোড়
করিয়া প্রণাম করিল। সাধু, নেহি হামারা কুছ,
চিজকা জরুরৎ নহী’ + বলিতেই সাহেব সহাস্যবদনে
দোকানে চলিয়া গেল। সাধুর নির্লোভিতায় সাহেবটি
তাহার প্রতি সমধিক আকৃষ্ট হইল ও মধ্যে মধ্যে অন্যান্য
বন্ধুবান্ধবদের সহিত সাধুর নিকট উপনীত হইয়া নানাবিধ
সদালাপ করিতে লাগিল। সাহেবদের ঐকান্তিকী ভক্তি
দেখিয়া সাধুটিও তাহাদের প্রতি সমধিক প্রীতিযুক্ত হইয়া
কখনও বালকের ন্যায় হাস্য-পরিহাসে সময় অতিবাহিত
করিতে লাগিলেন, কখনও বা সুমধুর হৃদয়গ্রাহী আধ্যাত্মিক
উপদেশ দানে রসিক সাহেবদের হৃদয়ে অধিকতর রস
সিঞ্চন করিতে লাগিলেন। সাহেবদের আগমনের সঙ্গে
সঙ্গে দেখিতে দেখিতে ভারতবাসী—বিশেষতঃ বাঙালী
জনসাধারণও ক্রমশঃ সাধুর নিকট সমবেত হইতে লাগিল।
প্রেমের আধার সাধুও সহাস্যবদনে মধুর উপদেশ দ্বারা
সমাগত ভক্তবৃন্দের হৃদয়ে আনন্দবারি সিঞ্চন করিতে
লাগিলেন। ভক্তবৃন্দও আনন্দমূর্তি সাধুর তেজোদীপ্ত
* তােমার কোন জিনিষের দরকার আছে কি ?
* না, আমার কোন জিনিষের দরকার নাই।
৪
৩৪ শ্ৰীশ্ৰভােলান-প্রসঙ্গ কলেবর দর্শনে ও মধুর হৃদয়গ্রাহী উপদেশাবলী শ্রবণে তাঁহার প্রতি দিন দিন আকৃষ্ট হইতে লাগিল। হরিদ্বার ললিতারাবাগ # আশ্রমে কতিপয় বৎসর অতিবাহিত করিয়া ভােলানন্দ মহানগরী কলিকাতা দর্শন মানসে বহির্গত হইয়া নানাস্থান ঘুরিয়া কলিকাতায় আসিয়া উপনীত হইলেন। কলিকাতা হাটখোলায় তখন ইট, সুর্কি, চূণ প্রভৃতির ব্যবসায় চলিত। ভােলানন্দ কৌপীন- মাত্র পরিধান করিয়া কখনও বা নগ্ন অবস্থায় অনাবৃত স্থলে ইট, সুর্কির মধ্যেই অবস্থান করিতে লাগিলেন। একদিন হাটখােলার নিকটস্থ দোকান হইতে একজন সাহেব ভ্রমণে বহির্গত হইয়া হঠাৎ উক্ত স্থানে ভােলানন্দকে দেখিতে পাইল। ত্যাগের প্রতীক্ ভােলানন্দের সাত্ত্বিক মূর্তি দেখিয়া সাহেব তাহার প্রতি আকৃষ্ট হইয়া যাহা করিল, পাঠক তাহা অবগত আছেন। বাঙালী ভক্তবৃন্দের মধ্যে অনেকেই ভােলানন্দের নিকট দীক্ষিত হইবার ইচ্ছা জ্ঞাপন করিল। ভােলানন্দ বলিলেন—“দীক্ষা নিয়ে কি হবে, নিয়ম ত পালন করতে পারবে না। তােমরা বাঙালী- মাছ-মাংস না খেয়ে পারবে না; আমার কাছে দীক্ষিত হলে ওটি ছাড়তে হবে—তা তােমাদের দ্বারা হবে না ; সুতরাং দীক্ষার দরকার নাই। যাও, কুলগুরুর নিকট হতে মােহান্ত স্বামী শিবদয়াল গিরিজীর বাগানটি লালবাগ নামে অভিহিত হয়।
ভক্তজন-পরিবৃত ভােলানন্দ
দীক্ষা গ্রহণ করে সাধন-ভজন করগে। সন্ন্যাসীর নিকট
দীক্ষা নিলে অনেক শক্ত নিয়ম পালন করতে হয়—তা
তােমাদের দ্বারা হবে না।” ভােলানন্দের প্রতি আকৃষ্ট-চিত্ত
এবং দীক্ষাগ্রহণে অতীব উৎসুক ভক্তবৃন্দ নম্রভাবে বলিল,
-“তা কি কি নিয়ম পালন করতে হবে বলুন, আমরা
যথাশক্তি চেষ্টা করব—যাতে আমাদের দ্বারা নিয়মের
ব্যতিক্রম না হয়।” ভােলানন্দ বলিলেন—“মৎস্য, মাংস,
ডিম্ব প্রভৃতি আমিষাহার পরিত্যাগ করিতে হইবে, পরদার
গমন করিতে পারিবে না, মিথ্যাকে বিষবৎ পরিহার করিতে
হইবে। কাহাকেও গালি দিতে পারিবে না, পরনিন্দা এবং
শপথ করিতে পারিবে না। কোন প্রকার মাদকদ্রব্য (মদ্য,
গাঁজা প্রভৃতি) সেবন করিতে পারিবে না। জুয়াখেলা ও
ঈর্ষা-দ্বেষ ত্যাগ করিতে হইবে। এতদ্ব্যতীত আয়ের দশ
ভাগের একভাগ দানার্থে ব্যয় করিতে হইবে ; প্রত্যহ ঊষায় ও
সায়ংকালে দেড় ঘণ্টা করিয়া পরমেশ্বরের ভজনে ব্যয় করিতে
হইবে। প্রতিদিন সাধুসঙ্গ—তাহার অভাবে সগ্রন্থ
পাঠ
বা সৎপ্রসঙ্গ শ্রবণ করিতে হইবে। পিতামাতার চরণে প্রত্যহ
প্রাতঃকালে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করিয়া তাহাদের চরণামৃত পান
করিতে হইবে। পিতামাতা জীবিত না থাকিলে তাহাদের
ধ্যান করিয়া মনে মনে প্রণাম করিতে হইবে এবং কুসঙ্গ
পরিত্যাগ করিতে ও কুগ্রন্থ পাঠ হইতে বিরত হইতে
হবে। অন্ততঃ এইগুলি যদি করিতে পার, তাহা হইলে
শ্ৰীশ্ৰীভােলানন্দ-প্রসঙ্গ আমার কাছে আসিও; এখন যাও, এই নিয়মগুলি পালন কর, ভবিষ্যতে দীক্ষা মিলিবে।” দেখিতে দেখিতে ভােলানন্দের নাম বঙ্গদেশে প্রচারিত হইয়া পড়িল। দূরদূরান্তর হইতে দর্শনেচ্ছু ভক্তবৃন্দ ভােলানন্দের নিকট উপনীত হইতে লাগিল। ভােলানন্দও গৃহস্থ স্ত্রী-পুরুষদের মধ্যে নগ্ন অবস্থায় বা কৌপীন মাত্র পরিধান করিয়া অবস্থান করা ভদ্রোচিত ব্যবহার নহে মনে করিয়া এবং ভক্তদের আগ্রহাতিশয্যে তখন হইতে পুনরায় বস্ত্র পরিধান করিতে লাগিলেন। বস্তুতঃ জগতের হিতকল্পে যে সকল মহাত্মা জগতে বিচরণ করিয়া থাকেন, মানব- বৃন্দকে অমৃতময় উপদেশাবলী প্রদান পূৰ্ব্বক তাহাদের আধ্যাত্মিক জীবনে উন্নীত করিতে প্রয়াস পান, তাহাদের নগ্নাবস্থায় অথবা শুধু কৌপীন পরিধান করিয়া থাকা সভ্য- জগৎ দ্বারা কখনই সমর্থিত হইতে পারে না। ভােলানন্দও ইহা সম্যক্রূপে উপলব্ধি করিয়া পুনরায় বস্ত্র গ্রহণ করিলেন। বস্ত্ৰ গ্ৰহণানন্তর ভােলানন্দের শরীরের কান্তি যেন চতুগুণ বৃদ্ধি পাইল। তাহার জ্যোতির্ময় সুন্দর শরীর দর্শনে ভক্তবৃন্দ তাঁহার প্রতি সমধিক আকৃষ্ট হইল ও অনেকেই তাহাকে গুরুপদে বরণ করিয়া নিজেদের কৃত-কৃতার্থ মনে করিল। কিছুকাল বাঙ্গালী ভক্তবৃন্দের মধ্যে যাপন করিয়া ভােলানন্দ হরিদ্বারে প্রত্যাবর্তন পূৰ্ব্বক পূর্বোক্ত লালতারা- বাগেই বাস করিতে লাগিলেন। হরিদ্বার লালবাগ
প্রেমিক ভােলানন্দ
আশ্রম দেখিতে দেখিতে বাঙালী ভক্তবৃন্দের আবাসস্থল হইয়া
উঠিল। ভােলানন্দের নাম শুনিয়া বাঙালী ভক্তবৃন্দ দীক্ষা-
গ্রহণ মানসে, কেহ বা শুধু দর্শন করিবার জন্য লালবাগ
আশ্রমে আসিয়া উপস্থিত হইতে লাগিল। ভােলানন্দও
সমাগত ভক্তবৃন্দের যথােচিত অভ্যর্থনাপূৰ্ব্বক তুষ্টি সাধন
করিতে লাগিলেন। ভক্তবৃন্দ দেখিল, ভােলানন্দের
মধ্যে মাতার স্নেহ, পিতার ভালবাসা এবং সখার সখ্যভাব
যেন একাধারে বিরাজমান ; তাই লৌহ যে প্রকার স্বতঃই
চুম্বকের প্রতি আকৃষ্ট হয়, ভক্তগণও তদ্রুপ ভােলানন্দের
প্রতি আকৃষ্ট হইতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে ভােলানন্দের
শিষ্যবৃন্দের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। বঙ্গদেশে
‘ভােলাগিরি’ নামটি সুপরিজ্ঞাত হইল।
[ ৩ ]
প্রেমিক ভােলানন্দ
‘ভাই যেও না, আমি তােমাকে যেতে বলছি না, শুধু
দিয়াশলাইটির জন্য ওখানে হাত দিয়েছি। সর্পটি
ভােলানন্দের অনুরােধ উপেক্ষা করিয়া তৎক্ষণাৎ আশ্রম
পরিত্যাগ করিয়া গঙ্গার ওপারে চলিয়া গেল। দুঃখিত
হইয়া ভােলানন্দ ১২ বৎসর পর্যন্ত প্রদীপ জ্বলিলেন না।
৩৮
শ্ৰীশ্ৰীভােলানন্দ-প্রসঙ্গ
হরিদ্বার লালবাগ আশ্রমে মাধুকরী বৃত্তিদ্বারা
ক্ষুন্নিবৃত্তি করিয়া ভােলানন্দ আনন্দে দিনযাপন করিতে
লাগিলেন। ক্রমশঃ ভক্ত ও শিষ্যবৃন্দ তাহার নিকট অর্থ
প্রেরণ করিতে লাগিল। ভােলানন্দ উক্ত অর্থ হইতে
নিজের জন্য কপর্দকও ব্যয় না করিয়া, নিজের মাধুকরী
বৃত্তি অক্ষুন্ন রাখিয়া বাজার হইতে পুরী, লাড়, প্রভৃতি
ক্রয় করিয়া হরিদ্বার ও কখল-নিবাসী সাধুবৃন্দকে তৃপ্তির
সহিত ভােজন করাইতে লাগিলেন। প্রত্যহ যত টাকা
আসিতে লাগিল, তাহা সেই দিনেই ব্যয়িত হইতে লাগিল।
দেখিতে দেখিতে ভােলানন্দের নাম সাধুসমাজে প্রচারিত
হইয়া পড়িল। তাঁহার ত্যাগ ও সাধুসেবা, সকলের হৃদয়ে
তাহার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও প্রীতি উৎপাদন করিল।
তঁাহার শাস্ত্রানুরাগ ও শাস্ত্রে পারদর্শিতা দর্শনে মুগ্ধ হইয়া
নিৰ্ব্বাণী আখড়ার নাগা সন্ন্যাসিগণ তাঁহাকে আপনাদের
মণ্ডলীশ্বর পদে বরণ করিলেন। ভােলানন্দও সকল নাগাদের
গুরুপদে বৃত হইয়া তাহাদের মঙ্গলের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম
করিতে লাগিলেন। নাগা সাধুরাও তাহার সুমধুর
উপদেশ
শ্রবণে ও অশেষ বুদ্ধিমত্তা দর্শনে তাহাকে গুরুপদে বরণ
করিতে পারিয়া নিজেদের কৃত-কৃতার্থ মনে করিতে লাগিলেন।
এইভাবে সাধু-সমাজে সম্মানের
উচ্চতম শিখরে আরােহণ
করিয়াও ভােলানন্দ দীনাতিদীন ব্যক্তির ন্যায় সকলের
সেবা করিয়া সময় অতিবাহিত করিতে লাগিলেন। তাঁহার
প্রেমিক ভােলানন্দ
৩৯
নিরহঙ্কার ও নির্ভীক ভাব দর্শনে এবং মধুর উপদেশ শ্রবণে
জনসাধারণও ধীরে ধীরে তাহার প্রতি আকৃষ্ট হইতে
লাগিল। সন্ন্যাসিগণ ভােলানন্দের মধুর সঙ্গ করিবার এবং
অমূল্য উপদেশ শুনিবার জন্য আশ্রমে আসিয়া উপনীত
হইতে লাগিলেন। ভােলানন্দও সরল দৃষ্টান্তের সহিত জ্ঞানের
গভীরতম উপদেশ প্রদান পূর্বক সকলের হৃদয় মুগ্ধ করিতে
লাগিলেন।
একদিন হরিদ্বারের এলাচিগিরি নামধেয় জনৈক
সন্ন্যাসী ভক্ত ও শিষ্যবৃন্দ প্রেরিত অর্থদ্বারা যাহাতে আশ্রমে
সাধুদের অন্ন-বস্ত্রের স্থায়ী ব্যবস্থা হইতে পারে, তাহার
প্রতি দৃষ্টি দিবার জন্য ভােলানন্দকে অনুরােধ করিলেন।
ভােলানন্দও তাহার বাক্যানুযায়ী তখন হইতে আশ্রমে
সত্ৰ খুলিলেন। প্রত্যহ মধ্যাহ্নে ও সায়ংকালে সাধুগণ
আশ্রমে অন্নগ্ৰহণ করিতে লাগিলেন। আটা, চাউল, ডাল,
ঘী প্রভৃতি নিত্য আহাৰ্য্য জিনিষ দ্বারা আশ্রমের একটি
গৃহ পরিপূর্ণ হইল এবং অন্ন-ব্যঞ্জনাদি প্রস্তুত করিবার
জন্য একজন পাচক নিযুক্ত হইল। ভক্ত ও শিষ্যগণের
আগ্রহাতিশয্যে ভােলানন্দ তখন হইতে আশ্রমেই অন্নগ্রহণ
করিতে লাগিলেন।
এই ভাবে দিন গত হইতে লাগিল। ভােলানন্দ
গুরুমহারাজ গােলাপগিরিজীর আদেশানুযায়ী তখনও রাত্রি
তিনটার সময় গাত্রোত্থান করিয়া শৌচাদিক্রিয়া সম্পাদন
৪০ শ্ৰীশ্ৰীভােলানন্দ-প্রসঙ্গ পূৰ্ব্বক অবগাহন করিয়া সাধন-ঘরে (গুহায় ) গমন করিতেন। সাধন-ঘরের দেয়ালের গর্ভে স্থাপিত দিয়াশলাই দ্বারা প্রদীপ জ্বলিয়া আসনাদি যথাযথ স্থানে স্থাপন করিয়া তিনি সাধনে বসিতেন। একদিন প্রদীপ জ্বালিবার মানসে উক্ত গর্তে হস্ত স্থাপন করিতেই একটি বিষাক্ত ফণাধারী বৃহৎ সর্প ফেঁাস করিয়া উঠিল ও ভােলানন্দের কোন প্রকার অনিষ্ট-সাধন না করিয়া তৎক্ষণাৎ সেখান হইতে প্রস্থান করিল। প্রেমিক ভােলানন্দের অনুরােধ উপেক্ষিত হইল—দুঃখিত হইয়া সুদীর্ঘ দ্বাদশ বৎসরকাল তিনি অন্ধকারে যাপন করিলেন। [ ৪ ] স্বপ্নদিষ্ট ভােলানন্দ সুপ্তোখিত হইয়া ভােলানন্দ দ্রুতপদবিক্ষেপে শিব- নির্ধারিত স্থানে গমন পূৰ্ব্বক খনন করিয়া দেখিলেন, বস্তুতঃই ভীষণ ফণাধারী সর্প-বেষ্টিত একটি সুন্দর শিবলিঙ্গ বর্তমান। ভক্তজন পরিবেষ্টিত হইয়া ভােলানন্দ হরিদ্বারেই অবস্থান করিতে লাগিলেন। প্রাতঃকাল ৭টা পর্যন্ত সাধন- ঘরে (গুহায় ) অতিবাহিত করিয়া পশ্চাৎ প্রাতভ্রমণ পরিসমাপনান্তে প্রত্যাবর্তন পূৰ্ব্বক আশ্রমের নিকৃষ্টতম কাৰ্যও স্বপ্নাদিষ্ট ভােলানন্দ ৪১ স্বহস্তে সম্পাদন করিতে লাগিলেন। সমাগত ভক্ত ও শিষ্যবৃন্দ দেখিল, ভােলানন্দ আশ্রমস্থ সেবকবৃন্দ-সহ কাপড় জামা গুটাইয়া দীনাতিদীন সেবকের ন্যায় আশ্রমের যথা- বিহিত কাৰ্য্য স্বহস্তে সম্পাদন করিতেছেন। অগাধ সম্পত্তির অধিকারী হইয়াও ভােলানন্দ প্রাচীন ঋষি-মুনিগণের ন্যায় পর্ণ-কুটীরে বাস করিতে লাগিলেন ও ‘মহাজনঃ যেন গতঃ স পন্থা স্মরণ করিয়া এবং শাস্ত্রের মর্যাদা রক্ষা করিবার জন্য বেদ ও শাস্ত্রের বহির্ভূত হইয়াও গাে, সাধু ও ব্রাহ্মণগণের সেবায় দিবারাত্রি রত থাকিলেন। ভক্তগণ যখন সাধুগণ- সেবিত হরিদ্বার ও কখলের অন্যান্য আশ্রম সকলের অভ্রভেদী সুচারুকাৰ্য্য-সমন্বিত বিশাল অট্টালিকা সমূহ দর্শনে নয়ন ও মন পরিতৃপ্ত করিয়া লালবাগ আশ্রমে উপনীত হইয়া পর্ণকুটীরে বিরাজমান ভােলানন্দের সুন্দর ও মধুর উপদেশাবলী শ্রবণ করিতে লাগিল, তখন তাহাদের মনে হইতে লাগিল, সেই পূৰ্ব্বযুগের তপােনিরত সৰ্ব্বত্যাগী পরােপকারী ঋষি-মুনিদের কথা; মনে পড়িতে লাগিল—সেই অতীতযুগের গৌরবমণ্ডিত প্রফুল্লচিত্ত সিদ্ধমহাপুরুষগণের সহাস্যবদন ; মনে হইতে লাগিল,সেই পুরাতনকালের আপন- ভােলা, অপরের গুণগ্রাহী সাধুভক্তবৃন্দের স্ব স্ব দেহের প্রতি সম্পূর্ণ অনাস্থাভাব। সন্ধ্যাসমাগমে যখন দলে দলে গােসকল আশ্রমে আগমন করিতে লাগিল, যখন ভােলানন্দ তাহাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন পূৰ্ব্বক ‘আও মা বলিয়া সম্বােধন
82
শ্ৰীশ্ৰীভােলান-প্রসঙ্গ
।
করিতে লাগিলেন, যখন সুললিতকণ্ঠে ভক্তিবিনম্রচিত্তে
ভােলানন্দ ভক্তবৃন্দসহ ভগবান শিবের স্তোত্র পাঠ করিতে
লাগিলেন, স্তোত্র-পাঠান্তে যখন গােমাতাকে প্রণাম করিয়া
ভক্তবৃন্দকে সুমধুর আধ্যাত্মিক উপদেশ প্রদান করিতে
লাগিলেন, তখন বস্তুতঃই আশ্রমটিকে জগৎ হইতে সম্পূর্ণ
পৃথক্ বলিয়া মনে হইতে লাগিল। মনে হইতে লাগিল—
ত্রিতাপতপ্ত জীবের শান্তিবিধানার্থই যেন আশ্রমটি গঠিত
হইয়াছে। ভক্তবৃন্দ আশ্রমে উপনীত হইয়া এক অনির্বচনীয়
শান্তি অনুভব করিতে লাগিল। শান্তিলাভের আশায়
দূরদূরান্তর হইতে
ভক্তবৃন্দ আসিয়া আশ্রমটি পরিপূর্ণ করিতে
লাগিল।
এই ভাবে দিনের পর দিন কোথা দিয়া চলিয়া যাইতে
লাগিল। ভােলানন্দের তাহার প্রতি আদৌ দৃষ্টি নাই—তিনি
আপন-ভােলা হইয়া জগতের হিতকল্পে দিবারাত্রি অক্লান্ত
পরিশ্রম করিতে লাগিলেন।
একদিন ভােলানন্দ নিদ্রায় অভিভূত, হঠাৎ স্বপ্নে
ভগবান শিবজী তাহাকে বলিলেন, “ভােলা। আশ্রমস্থ
উদ্যানে একটি শিবলিঙ্গ প্রােথিত আছে, তাহাকে আনয়ন
পূৰ্ব্বক আশ্রমে প্রতিষ্ঠা কর।”
ভােলানন্দকে দেখিবামাত্রই সর্পটি স্থানান্তরে গমন
করিল। ভােলানন্দ আনন্দিত হইয়া শিবলিঙ্গটিকে গ্রহণ
পূৰ্ব্বক আশ্রমে প্রতিষ্ঠা করিয়া তাহাকে ‘গৌরীশঙ্কর’ নাম
লব্ধচক্ষুঃ ভােলানন্দ
৪৩
প্রদান করিলেন। তদবধি আশ্রমে সেই শিবলিঙ্গেরই পূজা
চলিয়া আসিতেছে। #
[ ৫ ]
লব্ধচক্ষুঃ ভোলানন্দ
‘দেখ ত ভােলা। আমরা কে ? অন্ধ ভােলানন্দ
চাহিয়া দেখিলেন, দিব্যমূৰ্ত্তি জ্যোতির্ময় শিব ও পার্বতী
দণ্ডায়মান। এই যে আমার মা ও বাবা’ বলিয়া ভক্তি
গদ্গদচিত্তে ভােলানন্দ ভগবান শিব ও ভগবতী পার্বতীকে
সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করিলেন। শিবজী বলিলেন—“যা, আজ
হ’তে তোর এক চক্ষুঃ লাভ হ’ল। “আচ্ছা বাবা! এতেই
আমার কাজ চলে যাবে’ বলিয়া ভােলানন্দ মাতা পার্বতী
ও পিতা শিবজীকে পুনরায় প্রণাম করিলেন। শিব ও
পাৰ্ব্বতী ভােলানন্দের মস্তকে হস্ত স্থাপনপূৰ্ব্বক আশীর্বাদ
করিয়াই অন্তর্হিত হইলেন।
দ্বৈতবাদী আপনাদিগকে ভগবানের দাস মনে করিয়া
অজ্ঞতার পরিচয় প্রদান করে, তাহাদের বিবেক-বৈরাগ্যের
বা জ্ঞানের লেশমাত্রও নাই, এই বলিয়া কত-শত নকল
জ্ঞানী, দেহাধ্যাসী বেদান্তবাদী বক্তৃতার ছটায় দিগ্দিগন্তর
মুখরিত করিয়া জনসাধারণ হইতে ‘বাহবা গ্রহণ করিতেছে;
* ভােলানন্দ লেখককে বলিতেন—“বেটা ! এই শিব বড় প্রত্যক্ষ,
একটু ভক্তি ও শ্রদ্ধা রেখে পূজা কর, অচিরেই ফল পাবি।”
৪৪ শ্ৰীশ্ৰীভােলানন্দ-প্রসঙ্গ শরীরকেই আত্মা মনে করিয়া, শরীরকেই ব্ৰহ্মভাবে ভাবনা করিয়া, নিজেদের দুঃখের মাত্রা অধিকতর বৃদ্ধি করিতেছে লােকের কাছে বেদান্তবাদী সাধু সাজিয়া শিব, বিষ্ণু প্রভৃতি দেবতাদিগকে ফুৎকারে উড়াইয়া দিতেছে। কিন্তু মন সেই বিষয়-ভােগে লিপ্ত, হৃদয় কামাদি রিপুদ্বারা সন্তপ্ত ; মন জগৎ-মরীচিকায় জলভ্রমে ধাবিত--হিংসা, দ্বেষ প্রভৃতি আসুরিক সম্পদ দ্বারা কলঙ্কিত মন তত্ত্ব-জ্ঞানের আভাস গ্রহণেও অশক্ত। হায় নকল জ্ঞানী। তােমাদের দুর্দশা দেখিয়া বস্তুতঃ হাসিও পায়, কান্নাও আসে। হাজার হাজার বৎসর পর্যন্ত মুনি-ঋষিরা হিমালয়ের তুষারের মধ্যে কঠোর তপােনিরত থাকিয়াও যে দুৰ্বিজ্ঞেয় আত্মতত্ত্ব লাভ করিতে পারিতেন না, স্বর্গাধিপতি ইন্দ্রও যে আত্মতত্ত্ব লাভ করিতে ইচ্ছুক হইয়া প্রজাপতি ব্রহ্মার আদেশক্রমে একশত বৎসর কঠোর ব্রহ্মচর্য পালন করিয়াছিলেন, যে আত্মতত্ত্ব জ্ঞাত হইবার জন্য ঔদ্দালকি নাচিকেতা স্বর্গভােগ ও অমরত্বকেও কাকবিষ্ঠাবৎ পরিত্যাগ করিয়াছিলেন—কতিপয় বেদান্ত গ্রন্থ আলােচনা করিয়াই যদি সেই আত্মতত্ত্ব লাভ করা সম্ভব হইত, তবে আর সাধন-ভজনের কোন প্রয়ােজনই অনুভূত হইত , কঠোর ব্রহ্মচর্য্যের দরকারও উপলব্ধি হইত না। বস্তুতঃই শুদ্ধান্তঃকরণ ব্যক্তির পক্ষে, বেদান্তগ্ৰন্থ আলােচনা সাধন- রাজ্যের প্রধান অন্তরায় বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। বিষয়ে ধাবমান মন, কামিনীকাঞ্চনে আসক্ত চিত্ত, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম লব্ধচক্ষুঃ ভােলানন্দ ৪৫ দুৰ্ব্বিজ্ঞেয় আত্মতত্ত্ব লাভ করিতে কখনই সক্ষম হয় না। তাই ভগবান অজ্ঞানীদের প্রতি কৃপাপরবশ হইয়া মুক্তিলাভের সহজপন্থা কৰ্ম্মযােগ নির্দেশ করিয়াছেন। ভগবানে মনঃ ও বুদ্ধি অর্পণ করিয়া তাহার প্রীতির নিমিত্ত সকল কৰ্ম্ম করিয়া যাও, ভক্তিসহকারে একান্তে বসিয়া তাঁহার ধ্যান ও পূজায় তন্ময় হও, অহর্নিশ তাহার নাম ও গুণ কীৰ্ত্তন কর ; দেখ ধীরে ধীরে তােমার জীবনে পরিবর্তন লক্ষিত হয় কি না, শান্তির শীতল বারি দ্বারা ত্ৰিতাপতপ্ত মন ধৌত হয় কি না। ‘ঈশ্বরঃ সৰ্ব্বভূতানাং হৃদ্দেশেহৰ্জ্জুন তিষ্ঠতি’ শ্রীভগবানের এই কথাটির উপর দৃঢ়বিশ্বাস স্থাপন পূর্বক নিজের হৃদয়াকাশে তাহার মূর্তি কল্পনা করিয়া ধ্যানে বসিয়া যাও, দেখ শান্তি মিলে কি না। বস্তুতঃই ভগবান আমাদের অন্তরতম, চিরসুহৃৎ। তাহাকে ভুলিয়া জগতের অনিত্য বিষয়-সুখের পিছনে পিছনে ছুটিয়া আমাদের মন ত্রিতাপে দগ্ধ হইতেছে, তাই আমরা ‘হা হতােহস্মি’ বলিয়া জীবন- সংগ্রামের কঠোর পরীক্ষার পেষণে নিষ্পেষিত হইয়া অসহ যন্ত্রণা ভােগ করিতেছি, সাধন-বলে করুণাময় পরমেশ্বরের অগাধ করুণার একবিন্দু লাভ করিতে পারিলেও আমাদের জীবন শান্তিময় হইয়া উঠিবে। ভক্তিবারি-সিঞ্চনে কঠোর হৃদয়কে কোমল করিতে পারিলেই শান্তিলাভ অনিবার্য। ভক্তি ব্যতীত জ্ঞান হয় না, ইহা দৃঢ়রূপে অবগত হইয়া জ্ঞানের সাধন ভক্তির শরণাগত হওয়াই আমাদের কর্তব্য।
৪৬
শ্ৰীশ্ৰভােলানন্দ-প্রসঙ্গ
ভক্তিলাভ করিতে পারিলেই জ্ঞানলাভ অনিবাৰ্য্য-জ্ঞানেই
মােক্ষ। সুতরাং ভক্তি-শূন্য জ্ঞান অর্জন করিতে যাইয়া
নিজেদের দুঃখ বৃদ্ধি করিতে অগ্রসর হওয়া আমাদের পক্ষে
সৰ্ব্বথা অনুচিত।
ভক্ত ও ব্রহ্মজ্ঞানী দ্বারা পরিবেষ্টিত হইয়া রামচন্দ্র
উপবিষ্ট আছেন। হনুমান্ শ্রীরামের সেবায় রত। রামচন্দ্র
হনুমাকে প্রশ্ন করিলেন-“বৎস হনুমান্ ! বল ত তুমি
কে ? রামচন্দ্রের প্রশ্ন শুনিয়া হনুমান্ মহাচিন্তাকুল হইলেন।
তিনি ভাবিলেন-আমি এখন কি উত্তর দেই, যদি বলি
আমি ঐরামের দাস, তাহা হইলে উপস্থিত ব্ৰহ্মজ্ঞানিগণ
আমার বাক্যে হাস্য সম্বরণ করিতে পারিবেন না। তাহারা
মনে করিবেন, ‘হনুমানের জ্ঞানের লেশমাত্রও নাই, যেহেতু
এখনও সে নিজেকে দাস বলিয়া কীৰ্ত্তন করিতেছে। অপর
পক্ষে আমি যদি নিজেকে ব্ৰহ্ম বলিয়া কীৰ্ত্তন করি, তাহা হইলে
উপস্থিত ভক্তবৃন্দ মনে করিবেন ‘হনুমানের বিন্দুমাত্রও ভক্তি
নাই, সে নিজেকেই ব্ৰহ্ম বলিয়া প্রকাশ করিতেছে, ভগবানের
অস্তিত্বে বিশ্বাসহীন। হনুমান ভাবিতে লাগিলেন—“তাই ত
কি উপায়ে ভক্তগণ ও জ্ঞানিবর্গ উভয়কেই সন্তুষ্ট করা যায়।
অনেক চিন্তার পর বুদ্ধিমান হনুমান্ শ্রীরামচন্দ্রের প্রশ্নের
উত্তর দিলেন
‘দেহদৃষ্টা দাসােহহ জীববুদ্ধ্যা তদংশক।
আত্মদৃষ্টা তদৈবাহং ইতি মে নিশ্চিত মতি।
লব্ধচক্ষু ভােলানন্দ
৪৭
অর্থাৎ—“হে রামচন্দ্র ! দেহ-দৃষ্টিতে আমি আপনার দাস,
জীববুদ্ধিতে আমি আপনার অংশ এবং আত্ম-দৃষ্টিতে বস্তুতঃ
আমি ও আপনি এক—উভয়ই ব্ৰহ্মস্বরূপ।
হনুমানের এবম্প্রকার যথার্থ উত্তর শুনিয়া সমাগত
সকলেই অতীব প্রীত হইলেন এবং ভক্তবীর হনুমানের
অশেষ প্রশংসা করিতে লাগিলেন।
পাঠক! হনুমানের অমূল্য বাক্য নিজের জীবনেও
প্রতিফলিত করুন। যতদিন পর্যন্ত দেহাভিমান বর্তমান
থাকে, নিজেকে ভগবানের দাস ভাবিতে অভ্যস্ত হউন
তাঁহার ধ্যানে, ভঁহার সেবায়, তাহার গুণকীর্তনে তন্ময়
থাকুন। ভগবানের কৃপায় ও সাধনবলে ধীরে ধীরে অন্তরের
মলিনতা দূরীভূত হইলে জ্যোতির্ময় অজ, অমর, অসঙ্গ,
সচ্চিদানন্দ দেহাতীত আত্মার অস্তিত্ব যখন ক্ষণিকের জন্যও
উপলব্ধি করিতে পারিবেন, তখন নিজেকে ব্ৰহ্মভাবে ভাবনা
করুন—দেখুন অফুরন্ত আনন্দ অনুভূত হয় কি না, বেদান্তের
‘আমিই ব্ৰহ্ম’ এ ভাবটির সত্যতা যথার্থরূপে উপলব্ধি হয়
কি না। বস্তুতঃ ভগবানের কৃপা ব্যতীত জগতে কেহই
সাধন-রাজ্যে উন্নতিলাভ করিতে পারে না; তাই একনিষ্ঠ
হইয়া ভগবানের উপর বিশ্বাসস্থাপনপূৰ্ব্বক সাধন-ভজন
করিয়া যাওয়াই আমাদের কর্তব্য। সময় হইলে তিনিই সকল
করিয়া দিবেন। ছােট ছেলেটি মা ব্যতীত অন্য কাহাকেও
জানে না, সে মাতার কাপড়ের অঞ্চল ধরিয়া চলিতে থাকে ;
৪৮
শ্ৰীশ্ৰভােলানন্দ-প্রসঙ্গ
মাতাই তাহাকে সকল প্রকার বিপদ হইতে রক্ষা করিয়া
থাকেন। প্রকৃত ভক্তও ভগবান্ ব্যতীত অন্য কোন ব্যক্তি
বা বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট হন না। ভগবাই তাহার পরম
আশ্রয়স্থল। ভগবাও তাঁহাকে পাপের করালগ্রাস হইতে
রক্ষা করিয়া ধীরে ধীরে তত্ত্বজ্ঞান দ্বারা তাহার মনকে বিভূষিত
করিয়া এই শরীর বর্তমানেই মােক্ষ প্রদান করেন।
একই স্ত্রী-পুত্রের কাছে মা, স্বামীর কাছে স্ত্রী, শাশুড়ীর
কাছে বন্ধু প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন আখ্যা প্রাপ্ত হয় । তজপ এক
ভগবাই বিভিন্ন সাধকের বিভিন্ন রুচি-অনুযায়ী কাহারও
নিকট বিষ্ণু, কাহারও নিকট শিব, কাহারও নিকট কালী
প্রভৃতি বিভিন্নভাবে আবির্ভূত হন। বস্তুতঃ, ভগবান্
একজন। হনুমান্ বলিয়াছিলেন :-
‘শ্রীরামে জানকীনাথে অভেদ পরমাত্মনি।
তথাপি মম সর্বস্ব-রামঃ কমললােচনঃ ॥
অর্থাৎ—“আমি জানি, শ্রীরাম ও জানকীনাথ উভয়েই বস্তুতঃ
অভেদ, তথাপি কমললােচন রামই আমার সর্বস্ব। ইহারই
নাম ‘ইষ্টনিষ্ঠা।
ভক্তও জানেন, শিব, বিষ্ণু, কালী প্রভৃতি
বস্তুতঃ অভেদ, তথাপি তাঁহাদের মধ্যে একজনের উপর নিষ্ঠা
রাখিয়া ভক্ত সাধন করিতে থাকেন—তাঁহাকেই সর্বাপেক্ষা
শক্তিমান মনে করিয়া নিজেকে তাহার চিরদাস ভাবিয়া
তাঁহার সেবা, ধ্যান ও গুণকীর্তনে সময় অতিবাহিত করেন।
উত্তরকালে ইষ্টের কৃপায় তাঁহার তত্ত্ব উপলব্ধি হয়—তিনি
লব্ধচক্ষুঃ ভােলানন্দ ০১ দেখেন, সকলই তাহার ইষ্ট ; দেবতা, গন্ধৰ্ব্ব, যক্ষ, রক্ষ, ভূত, পিশাচ, উরগ, মনুষ, পশু, পক্ষী, কীট, পতঙ্গ সকলই তাহার ইষ্ট-তাহার ইষ্টই বিভিন্ন মূর্তিতে খেলা করিতেছেন। সকলই যখন ইষ্টমূর্তি, তখন সাধক নিজেকেও ইষ্ট হইতে অভেদরূপে দেখিতে পান; তাহার জীবত্ব নষ্ট হইয়া যায়—তিনি শিবরূপে বিরাজ করিয়া শিবময় জগৎ পরিদর্শন করেন—তাঁহার মনুষ্য- জন্ম সফল হয়। ভােলানন্দও বিষ্ণু, শিব, কালী প্রভৃতি এক-সম্যরূপে অবগত হইয়াও শিবজীকেই নিজের ইষ্ট মনে করিয়া ভক্তি ও প্রেমের সহিত তাহার উপাসনা, পূজা প্রভৃতিতে তন্ময় থাকিতেন। জ্ঞান-লাভান্তে তিনি নিজেকে এবং জগৎকে শিব হইতে অভিন্নভাবে দর্শন করিলেন এবং পূৰ্ব্ববৎই ইষ্টদেব শিবজীর উপাসনা করিতে লাগিলেন; পরাভক্তি লাভ করিয়া নিজেকে কৃত-কৃতার্থ মনে করিলেন। প্রারন্ধ- ভােগ অনিবার্য। দেখিতে দেখিতে লব্ধজ্ঞান ভােলানন্দের উভয় চক্ষুতেই ছানি পড়িল ; তাহার দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হইল। ভােলাগিরি নামে একজন মাড়ওয়ার দেশের সন্ন্যাসী এবং ব্ৰহ্মানন্দ নামে একজন হিন্দুস্থানী সন্ন্যাসী তখন ভােলানন্দের সেবায় দিবারাত্রি রত থাকিতেন। ভােলাগিরিজী ভােলা- নন্দের হাত ধরিয়া তাহার দৈহিক কাৰ্য্য সম্পাদন করাইতেন এবং ব্ৰহ্মানন্দজী আশ্রমের অন্যান্য কাৰ্যাদিতে সময় অতিবাহিত করিতেন। অনেক সুচিকিৎসার পরও যখন 4 ;
শ্ৰীশ্ৰীভােলানন্দ-প্রসঙ্গ ভােলানন্দের দৃষ্টিশক্তি লাভ হইল না, তখন অগত্যা দৃষ্টিশক্তির পুনঃপ্রাপ্তির আশা পরিত্যাগ করিয়া ভােলানন্দ প্রফুল্লমনে অন্তিমকালের জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। দেখিতে দেখিতে মাড়ওয়ারী সাধু ভােলাগিরিজীর অন্তিমকাল উপস্থিত হইল। ভােলানন্দের প্রতি আকৃষ্ট- চিত্ত ভােলাগিরিজী দুঃখ ও নৈরাশ্যের করাল কবলে পতিত হইয়া দিন দিন শীর্ণ হইতে লাগিলেন। ভােলানন্দের দৃষ্টিশক্তি অপ্রাপ্তিতে ভােলাগিরিজী বিশেষ মর্মাহত হইলেন, এবং মনে হইল, তিনি নিজের দৃষ্টিশক্তি ক্ষুন্ন করিয়াও ভােলানন্দের দৃষ্টিশক্তি পুনঃ-প্রদান করিতে পারিলে তাহা করিতেও কুণ্ঠিত হইতেন না। বস্তুতঃই প্রেমের অদ্ভুত লীলা। দেখিতে দেখিতে ভােলাগিরিজী মৃত্যুশয্যায় শয়ন করিলেন। মৃত্যু সন্নিকট, অন্ধ ভােলানন্দ ভক্ত ভােলাগিরির নিকট দণ্ডায়মান। ভােলাগিরিজী দেখিলেন, অন্ধ ভােলানন্দ তাহারই সম্মুখে দণ্ডায়মান। হায়, মৃত্যু সময়েও ভােলানন্দকে অন্ধ দেখিয়া মরিতে হইল’!-ভােলাগিরিজী একাগ্ৰমনে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করিলেন—“ভগবন্! আমি ত মরিতে বসিয়াছি, আমার এই চক্ষু ভােলানন্দ যেন পান। দেখিতে দেখিতে ভােলানন্দ-ভক্ত ভােলাগিরিজীর শাশ্বত আত্মা নশ্বর পঞ্চ- ভূতাত্মক শরীর পরিত্যাগ করিয়া চিন্ময়ধামে চলিয়া গেল। ভােলানন্দও শােকাশ্রু বিসর্জন করিতে করিতে নিজের কুটীরে প্রত্যাবর্তন করিলেন।
লব্ধচক্ষুঃ ভােলানন্দ ভগবান শিবজী ভােলানন্দের দ্বারা ভারতবর্ষের বিশেষতঃ বঙ্গদেশের বিশেষ কল্যাণ সাধিত হইবে মনে করিয়া এবং ভােলানন্দ-ভক্ত ভােলাগিরিজীর মৃত্যুকালীন ঐকান্তিক প্রার্থনার বশবর্তী হইয়া আজ ভােলানন্দকে দৃষ্টিশক্তি প্রদান করিলেন। ভােলানন্দও ইষ্ট-কৃপায় দৃষ্টিশক্তি পুনঃপ্রাপ্ত হইয়া মানবের কল্যাণার্থ দিবারাত্রি কঠোর পরিশ্রম ও অমূল্য উপদেশ প্রদান করিতে লাগিলেন। ত্রিতাপ-তপ্ত মানব-মন ভােলানন্দের উপদেশ-বারি দ্বারা শীতল হইল। লােকহিত- ব্ৰত ধারণ করিয়া ভােলানন্দ জগতে বিচৰণ করিতে লাগিলেন।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ [ ১ ] সমাধিস্থ ভােলানন্দ “তীর্থে এসেছ, তীর্থকে কিছু দিতে হয়, তুমি কি দিবে?” উন্মুক্তচিত্তে নবদ্বীপচন্দ্র বলিলেন—“আপনি অন্তর্যামী, আপনি যাহা আদেশ করিবেন, তাহাই দিব ; আপনার নিকট আমার অদেয় কিছুই নাই।” হঠাৎ সুললিত কণ্ঠে শ্রীকৃষ্ণ মহামন্ত্র উচ্চারণ করিতে করিতে ভােলানন্দের সমাধি হইল। চক্ষুঃ হইতে অবিশ্রান্ত অশ্রুধারা নির্গত হইতে লাগিল। উপস্থিত ভক্তবৃন্দও অশ্রুজলে সিক্ত হইয়া অপূৰ্ব আনন্দ অনুভব করিতে লাগিলেন। সেই শুভমুহূৰ্ত্ত, পবিত্র সু-ধুনীতট, তীর্থগৌরব ভােলানন্দের ন্যায় মহারত্ন দর্শন, তাঁহার শ্রীমুখনির্গত অমৃতময় বীজযুক্ত শ্রীকৃষ্ণ মন্ত্র, বেদগােপ্য ওঁকার- ধ্বনি, প্রেমাক্রযুক্ত লােভনীয় ও কমনীয় মুখশ্রী, সমাগত ভক্তবৃন্দের—বিশেষতঃ ভক্ত নবদ্বীপচন্দ্রের জীবন আনন্দময় করিয়া রাখিল। নবদ্বীপচন্দ্র ভাবিল, ‘আর কেহই ভােলা- নন্দের এবম্প্রকার দর্শন পায় নাই। সমাধিভঙ্গের পর ভােলানন্দ সস্নেহে ভক্তবৃন্দকে বলিলেন-“যাও বৎসগণ ।
সমাধিস্থ ভােলানন্দ
তােমাদের তীর্থ-দর্শন সফল হইবে। যতদিন সংসারে থাক,
আয়ের অন্ততঃ দশভাগের একভাগ সৎকার্যে ব্যয় করিও।”
নবদ্বীপচন্দ্র বলিলেন-“আপনার দর্শন আবার কবে পাব?”
ভােলানন্দ বলিলেন-“দর্শনের জন্য ব্যস্ত হইও না। একবার
দর্শনই দর্শন; যখন সময় হবে, তখনই দর্শন মিলবে। আমরা ত
বসেছি প্রেমদান করতে, কিন্তু নেয় কে? সব রােগী-
ভােগীর দল।”
যুগ-যুগান্তর গত। জগতের বক্ষে কত মহাপুরুষ
আবির্ভূত হইলেন, আবার অন্তর্হিত হইলেন। ভগবদ্বুদ্ধিতে
তাহাদের সেবা, উপাসনা, স্তুতি প্রভৃতিতে নিযুক্ত থাকা
কচিৎ ভাগ্যবানের অদৃষ্টেই ঘটিয়া থাকিবে। ‘তস্মাদাত্মজ্ঞং
হéয়েৎ ভূতিকামঃ—নিজের মঙ্গল-বিধানেচ্ছু ব্যক্তির পক্ষে
মহাপুরুষের সেবাই একমাত্র মুখ্য উপায়। তাই শ্রুতি
কৃপাপরবশ হইয়া মানবকে উপদেশ দিতেছেন—“হে মানব ।
যদি তুমি নিজের হিতাকাঙ্ক্ষা কর, যদি এই জীবনেই
কৃত-কৃত্য হইতে চাও, যদি সৰ্ব্বদুঃখের নিবৃত্তি করিয়া পরমানন্দ
লাভ করিতে ইচ্ছুক হও, তবে নিঃসন্দিগ্ধচিত্তে ভগবছুদ্ধিতে
মহাপুরুষের উপাসনায় তন্ময় হও, তাহার
তাহার কৃপাতেই
তুমি উত্তরকালে তত্ত্বজ্ঞ হইতে পারিবে।” মহাপুরুষ বা
সদ্গুরুর কৃপাব্যতীত মােক্ষলাভ বন্ধ্যার পুত্রের ন্যায় একান্তই
অসম্ভব। কিন্তু অজ্ঞ মানব মহাপুরুষের—জীবন্মুক্ত ব্যক্তির
কার্যাবলীতে দোযার্পণ পূৰ্ব্বক অহরহঃ তাঁহাদের নিন্দায়
৫৪
এভােলানন্দ-প্রসঙ্গ
জিহ্বা কলঙ্কিত করিতেছে। তাহাদের অলৌকিক ক্রিয়া বা
প্রেম-ভক্তির স্ফুরণকে সাময়িক ভাবের প্রাবল্য মনে করিয়া
তাহাদের জীবনের বিশেষত্ব, মাধুৰ্য্য গ্রহণে অশক্ত হইতেছে।
তাহাদের স্তুতি, পূজা, উপাসনায় তন্ময় থাকা ত দূরের কথা,
অধিকন্তু তাহাদের দোষকীৰ্ত্তন পূর্বক নিজেদের পাপময়
অশান্তিপূর্ণ জীবনকে অধিকতর পাপময় ও অশান্তিপূর্ণ
করিতেছে। স্থূল শরীর যে পর্যন্ত বর্তমান থাকে, সে
পৰ্য্যন্ত সকল পুরুষের মধ্যেই গুণ, দোষ উভয়ই লক্ষিত হয়।
মহাপুরুষদের স্বভাবেও তাহার বৈলক্ষণ্য দৃষ্ট হয়
। তাই শ্রীরামচন্দ্রের অন্যায়ভাবে বালিবধ, শ্রীকৃষ্ণের
পর-স্ত্রী সঙ্গে বিহার, শঙ্করাচার্যের সকল মন্দিরে নিজের
দেশের দক্ষিণী ব্রাহ্মণ নিয়ােগ প্রভৃতি দোষ দৃষ্ট হইলেও
বস্তুতঃ তাঁহারা ভগবানের অবতার বা জীবন্মুক্ত মহাপুরুষ
ছিলেন ;
সে-সম্বন্ধে হিন্দুমতাবলম্বী ব্যক্তির সংশয়ের
লেশমাত্রও থাকিতে পারে না। বস্তুতঃই, ধীর বুদ্ধিমান্ আত্মার
কল্যাণকামী ব্যক্তি কখনও অপরের দোষের প্রতি দৃষ্টি দেন
; পরন্তু ভ্রমর যে প্রকার সকল ফুল হইতে মধু আহরণ
পূৰ্ব্বক মধুচক্র রচনা করে, তদ্রুপ সকল জীবের নিকট
হইতে তাহাদের গুণ গ্রহণ পূর্বক নিজের জীবনটি গুণময়
করিয়া তুলেন—পরগুণের কীৰ্ত্তন দ্বারা ও দোষের উপেক্ষা-
পূৰ্ব্বক হৃদয়ে অফুরন্ত আনন্দ উপলব্ধি কবেন। অপর পক্ষে
পরনিন্দুক পর-দোষদর্শী ব্যক্তি পরচ্ছিদ্রান্বেষণ-তৎপর থাকিয়া
;
সমাধিস্থ ভােলানন্দ অহর্নিশ অশান্তির আগুনে জ্বলিয়া মরে। মহাপুরুষগণের কাৰ্যে দোষ দর্শন পূর্বক নিজেদের জীবনটিকে অধিকতর দুঃখময় না করিয়া প্রত্যেক মানবেরই তাঁহাদের হৃদয়ের ভাব ও প্রেমের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা উচিত। সেই পর- হিতে জীবনােৎসর্গ, ভগবানের জন্য সৰ্ব্বস্ব ত্যাগ, অহর্নিশ ভগবৎ-চৰ্চ্চা বস্তুতঃই লক্ষ্য করিবার বিষয়। কিন্তু অজ্ঞ মানবের সে ক্ষমতা নাই--তাই দুৰ্য্যোধন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ অবলােকন করিয়া তাহাকে ভগবান বা নিজ হইতে শ্রেষ্ঠ মনে করিতে পারে নাই; অধিকন্তু বিশ্বরূপ দর্শনকে যাদুবিদ্যা মনে করিয়া অধিকতর শ্রীকৃষ্ণ-নিন্দায় রত হইয়াছিল। হৃদয় স্বচ্ছ না হইলে, হিংসা দ্বেষ কুটিলতা প্রভৃতি আসুরিক সম্পদ হইতে মন মুক্ত না হইলে ভগবান বা মহাপুরুষ সম্মুখে দণ্ডায়মান থাকিলেও তঁাহাকে ভগবদুদ্ধিতে অবলােকন করা যায় না। যাঁহাদের হৃদয় ভক্তি-মন্দাকিনীর অমৃতধারায় পূত হইয়াছে, তাহারাই ধ্যান- বলে মহাপুরুষ বা ভগবানের স্বরূপ জ্ঞাত হইতে পারেন। স্বচ্ছহৃদয় ভগবদ্ভক্ত মহাপুরুষের দর্শনমাত্রই বুঝিতে পারেন ইনিই ভগবানের সচল বিগ্রহ,—লােকহিতার্থে স্থূল শরীর ধারণ করিয়া জগতে বিচরণ করিতেছেন। ভােলানন্দও শিবত্বলাভপুৰ্ব্বক লােকহিতার্থে হরিদ্বারেই অবস্থান করিতে লাগিলেন। কখনও কখনও পরিভ্রমণার্থ দেশদেশান্তরে গমন করিতেন। যে কোন ব্যক্তি তাহার শ্ৰীশ্ৰীভােলানন্দ-প্রসঙ্গ মধুর সঙ্গ করিবার সৌভাগ্য লাভ করিতেন, তিনিই ভােলানন্দের সহাস্য সুন্দর বদন ও প্রেম-ভক্তির আবেশ দর্শন এবং জ্ঞানের গভীরতম উপদেশ শ্রবণ পূর্বক তাহার প্রতি আকৃষ্ট হইতেন। বস্তুতঃ, লেখকও অনেক সাধু-মহাপুরুষের দর্শন করিবার সৌভাগ্য লাভ করিয়াছে কিন্তু উন্মুক্তহৃদয়, কৰ্ম্ম, উপাসনা ও জ্ঞানের সমন্বয়, পরহিতার্থে অক্লান্ত পরিশ্রম, নিজের দেহের প্রতি সম্পূর্ণ অনাস্থাভাব, শুধু ভােলানন্দের মধ্যেই দর্শন করিয়াছে। বদরিকাশ্রম দর্শন করিবার জন্য চট্টগ্রাম হইতে নবদ্বীপ- চন্দ্র রায় নামে কোন এক ভক্ত হরিদ্বারে উপনীত হইলেন। হাতরাস ষ্টেশনে তাহার পা ফাটিয়া একটু বেদনা হয়, তাই সঙ্গীদের সহিত ভ্রমণে বহির্গত না হইয়া হরিদ্বার ব্ৰহ্মকমণ্ডলুর ঘাটে সান্ধ্যসমীরে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পাঠ করিতে লাগিলেন। নবদ্বীপচন্দ্রের দেশীয় ও গুরুস্থানীয় পণ্ডিতপ্রবর শিবধন বিদ্যার্ণব মহাশয় ভােলানন্দের দর্শনেচ্ছ, হইয়া সেস্থান অতিক্রম করিয়া যাইতেছিলেন। ভােলানন্দও তখন অদূরে ব্ৰহ্মকমণ্ডলুর ঘাটের উপর উদাসমনে ভ্রমণ করিতেছিলেন। সঙ্গে তিন চার জন ভক্ত। শিবধন বিদ্যার্ণব মহাশয়ের দর্শন লাভপূৰ্ব্বক ও তাঁহার নিকটে ভােলানন্দের বিষয় অবগত হইয়া নবদ্বীপচন্দ্র অনতিবিলম্বে পণ্ডিতজীর সহিত ভােলানন্দের নিকটে উপনীত হইলেন। ভােলানন্দকে দর্শন করিবামাত্রই তাঁহার প্রতি নবদ্বীপের স্বভাবতঃই ভক্তি জাগ্রত হইল।
সমাধিস্থ ভােলানন্দ ভােলানন্দকে কয়েকটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিবার জন্য নবদ্বীপের ইচ্ছা হইল, কিন্তু হঠাৎ প্রশ্ন করিতে তাহার সাহস হইল না। অন্তর্যামী ভােলানন্দ ব্ৰহ্মকমণ্ডলুর জল স্পর্শ করিবার সময় বলিলেন,-“তােমাদের কাহারও কাহারও ইচ্ছা যে, আমি বসে একটু আলাপ করি।” ভােলানন্দের শ্রীমুখ হইতে এই কথা নির্গত হইবামাত্রই নবদ্বীপের ভয় দূরীভূত হইল। তিনি উন্মুক্ত হৃদয়ে ভক্তিবিনম্রচিত্তে প্রাণের আবেদন জ্ঞাপন করিলেন। ভােলানন্দও সকল প্রশ্নের সদুত্তর প্রদান করিয়া পরিশেষে জিজ্ঞাসা করিলেন,—“তীর্থে এসেছ, তীর্থকে কিছু দিতে হয়, তুমি কি দিবে।” তারপরই বীজমন্ত্র উচ্চারণ করিতে করিতে ভােলানন্দের সমাধি হইল। ভক্ত নবদ্বীপচন্দ্র- ভােলানন্দের সেই রূপ দেখিয়া ভক্তিতে বিল হইলেন। সে কি অপরূপ রূপ-যে দেখিয়াছে সে উপলব্ধি করিয়াছে; ভাষা বা লেখনীদ্বারা তাহা প্রকাশ করা যায় না। নবদ্বীপ- চন্দ্র মনে করিলেন “ভােলানন্দের এবম্প্রকার রূপ কেহ কোন দিন দেখে নাই, ভবিষ্যতেও দেখিবে না; এরূপ মধুর উপদেশ কেহ কোন দিন শুনে নাই, ভবিষ্যতেও শুনিবে না। তাই তিনি পুনরায় ভােলানন্দের দর্শনে অনিচ্ছুক হইয়া চট্টগ্রাম হইতে ভােলানন্দের নিকট চিঠি লিখিলেন :- শ্রীচরণে অসংখ্য প্রণিপাত পূৰ্ব্বক নিবেদন এই “বাবা !••••••••• ৫৮ শ্ৰীশ্ৰীভােলানন্দ-প্রসঙ্গ তখন আপনি গঙ্গাতীরে সান্ধ্যসমীরে উজ্জ্বল রত্নস্বরূপ কি অপূর্ব সৌন্দর্য্যেই সুশশাভিত হইয়া আমার নয়ন ও মন পরি তৃপ্ত করিতে- ছিলেন। অহহ! সে দর্শন বুঝি অনেকের ভাগ্যেই ঘটে নাই। আপনাকে সেদিন যে রূপের ভিতর দেখিয়াছি, আবার সাক্ষাৎ দর্শন করিলে যদি সে রূপ দেখিতে না পাই, সেই ভয়ে আপনাকে পুনরায় দর্শন করিবার আকাঙ্ক্ষা আমার নাই। যে অমৃতময়ী বাণী সেদিন আপনার মুখ হইতে নির্গত হইয়াছিল, সেরূপ বাণীও বােধ হয় আর শুনিব না।” সেইদিন হইতেই ভােলানন্দের প্রতি নবদ্বীপচন্দ্র দৃঢ়রূপে আকৃষ্ট হইলেন। ভগবানের সচল বিগ্রহ জ্ঞানে উদ্দেশে তাঁহাকে প্রণাম করিতে লাগিলেন। [ ২ ] মৃতে প্রাণপ্রদানকারী ভােলানন্দ “জীবিত ছেলেকে শ্মশানে পাঠিয়ে দিয়ে তার জন্য কাদছিস্ কেন ? এই নে তাের ছেলে।” বলিয়াই ভােলানন্দ বরারুদ্যমান স্ত্রীলােকটির হাতে তাহার পঞ্চদশবর্ষীয় একমাত্র পুত্রকে অর্পণ করিলেন। স্ত্রীলােকটি মৃত পুত্রকে লাভ করিয়া হর্ষের প্রাবল্যে কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া পরক্ষণেই ভােলানন্দের চরণে লুটাইয়া পড়িয়া কঁদিতে লাগিল। মানব যাহাকে অলৌকিক ও বিস্ময়কর মনে করে, যে কাৰ্য করা বা বাক্য বলা মানব-বুদ্ধির অগম্য, যে কাৰ্য্য দেখিলে মানব বিস্ময়ে অনেক সময় নিজেকে পৰ্যন্ত বিস্তৃত হয়,-মহাপুরুষগণের নিকটে তাহা বালক-বালিকার পুতুল- মৃতে প্রাণপ্রদানকারী ভােলানন্দ খেলার মত প্রতিভাত হয়। প্রবাহ-রূপে অনাদিকাল হইতে এই জন্ম, মৃত্যু, জরা, ব্যাধি, শােক, দুঃখ সঙ্কুল জগৎ বর্তমান। প্রকৃত সুখের প্রয়াসী হইয়া জীব অহর্নিশ কঠোর পরিশ্রম করিতেছে। স্ত্রী-সম্ভোগই জাগতিক সুখের চরম পরিণতি; এতদ্ব্যতীত যশঃ, মান, বিদ্যা, ধন প্রভৃতিও সুখের গৌণ উপাদান বলিয়া স্বীকৃত হয়। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন ভূমানন্দ এই জাগতিক বস্তু হইতে লাভ করা আকাশ- কুসুমবৎ বস্তুতঃই অসম্ভব। জাগতিক সুখ রজোগুণ-সম্ভুত, সুতরাং পবিত্র ও নির্মল নহে। ভগবান তাই বলিয়াছেন- ‘বিষয়েন্দ্রিয়সংযােগা যদগ্ৰেহমৃতােপমম্ । পরিণামে বিষমিব তৎ সুখং রাজসং মৃতম্ ॥ অর্থাৎ—“যে সুখ বিষয় ও ইন্দ্রিয়ের পরস্পর সংযােগ হইতে উৎপন্ন হয়, যে সুখ প্রথমে অমৃতের ন্যায় ( প্রিয়। কিন্তু পরিণামে বিষের ন্যায় ( অপ্রিয়) হয়, সেই সুখকে রাজস সুখ বলা হয়।” ভগবান শঙ্করাচাৰ্যও ভােগের আপাত-রম্যতা জ্ঞাপন করিয়াছেন :- “সুখতঃ ক্ৰিয়তে রামাভােগ। পশ্চাজ্জায়তে শরীরে রােগঃ । যদ্যপি লােকে মরণং শরণম্। তদপি ন মুঞ্চতি পাপাচরণম্ ॥” স্ত্রী-সম্ভোগের পরিণাম দুঃখ, তাহা প্রত্যেক মনীষীই স্বীকার করিয়া গিয়াছেন এবং ভবিষ্যতেও করিবেন; অজ্ঞ
শ্ৰীশ্ৰীভােলানন্দ-প্রসঙ্গ
মানবও যে তাহা অস্বীকার করিতে পারেনা, সে বিষয়ে কোন
সন্দেহ নাই। তথাপি এই কাম-লালসা চরিতার্থ করিবার
জন্য কি সভ্য জগৎ, কি অসভ্য জগৎ সকলেই যেন উৎকণ্ঠিত।
সংযমের বাঁধ যেন ভগ্নাবস্থায় পতিত। মূখ, বিদ্বান, ধনী,
দরিদ্র সকলেই প্রবৃত্তির স্রোতে গা ভাসাইয়া দিয়া
চলিয়াছে।
কোন কোন ভাগ্যবান্ ব্যক্তি ইন্দ্রিয়-সংযমে
প্রয়াসী হইয়াও বিফল-মনােরথ হইতেছে। প্রবল তৃষ্ণাস্রোত
সংযমের বাঁধ ভাঙ্গিয়া মানব-মনকে প্লাবিত করিতেছে। মানব
ইচ্ছা করিলেও এই তৃষ্ণাস্রোতের হাত হইতে নিজেকে
বাঁচাইতে পারিতেছে না। পিতামহের শাশ্বত আত্মা নশ্বর
শরীর পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক বহু পূৰ্বেই অজ্ঞাতদেশে চলিয়া
গিয়াছে, স্নেহময়ী মাতৃদেবীর কোমল ক্রোড় আর ইহ
জগতে নাই, স্নেহময় পিতৃদেবের পাঞ্চভৌতিক দেহ ভস্মে
পরিণত হইয়াছে, পূজনীয় জ্যেষ্ঠভ্রাতা স্ত্রী-পুত্র পরিত্যাগ
করিয়া অকালে কালগ্রাসে পতিত হইয়াছেন, অভিন্নহৃদয়
চিরসুহৃৎ আজ আর ইহ জগতে নাই। চতুর্দিকে প্রত্যহ কত
শত জীবকে নির্মম কাল গ্রাস করিতেছে, তথাপি মানবের
নিজের দেহের উপর অনাস্থা বা বৈরাগ্য আসে না। অধিকন্তু,
নিজেকে দেহ হইতে অভিন্ন মনে করিয়া দেহের পুষ্টি সাধন
ও সুখ বিধান করিবার জন্য অহর্নিশ কতপ্রকারই পাপ,
অতিপাপ ও মহাপাপের অনুষ্ঠান করিতেছে। পর-স্ত্রী-হরণ
মহাপাপ, পর-স্ত্রী-গমনকারীকে অনন্তকাল নরক-যন্ত্রণা
মৃতে প্রাণপ্রদানকারী ভােলানন্দ
ভােগ করিতে হয়, কুলটা স্ত্রী নরকের দ্বারস্বরূপ’—বাল্যাবধি
শিক্ষক বা পুস্তক হইতে অবগত হইয়াও যৌবনে কত শত
ব্যক্তি পরস্ত্রীতে রত হইয়া স্ব স্ব ধৰ্ম্ম-পথ কণ্টকাকীর্ণ
করিতেছে। চুরি করা, মিথ্যা কথা বলা পাপ, সম্যক্রূপে
জ্ঞাত হইয়াও সে অভ্যাস পরিত্যাগ করিতে সমর্থ হইতেছে
। পশু পক্ষী কীট পতঙ্গ প্রভৃতি যােনিতে লক্ষ লক্ষ বার
ভ্রমণ ও অশেষ দুঃখ ভােগ করিয়া এই দুর্লভ মােক্ষের দ্বার
মানব-জন্ম লাভ করিয়াও মানব নিজের স্বরূপ সন্ধান হইতে
বিরত হইতেছে, ভগবানে বিশ্বাসহীন হইয়া বিষয়ানন্দে
মগ্ন হইতেছে। চার্বাকের মত যেন জগতে পরিব্যাপ্ত
হইয়াছে ; ‘ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ’ ভাবটাই জগতে প্রাধান্য
লাভ করিয়াছে। কিন্তু মানব ! তুমি ভগবানের অস্তিত্বে
বিশ্বাসবান্ হও, বা বিশ্বাসহীন হও, তাহাতে ভগবানের
কোনই লাভ বা ক্ষতি নাই। যদি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস রাখিয়া
ভগবানের উপাসনায় তন্ময় হইতে পার, তবে দেখিবে,
অচিরেই তােমার হৃদয় হইতে সন্তাপত্ৰয় দূরীভূত হইয়াছে,
জগতে দুঃখ বলিয়া কোন জিনিষই বর্তমান নাই; কেবল
সুখ, কেবল শান্তি, কেবল আনন্দ। ভগবানে বিশ্বাস
স্থাপন পূৰ্ব্বক সাধন-ভজন কর, অনিত্য স্ত্রী-সম্ভোগ হইতে
মনকে প্রত্যাহৃত করিয়া ভগৱানের চরণে সন্নিবেশিত কর,
কঠোর ব্রহ্মচর্য পালন কর, দেখিবে, অচিরেই তােমার জীবত্ব
অজ্ঞানতা নষ্ট হইয়া যাইবে ; তত্ত্বজ্ঞানে তােমার মন বিভূষিত
শ্ৰীশ্ৰভােলানন্দ-প্রসঙ্গ
হইবে—তুমি শিবরূপ হইয়া এই জগতেই চিরশান্তি লাভ
করিতে পারিবে। বিষয় হইতে মনকে ভগবানে নিবিষ্ট
করিতে প্রয়াসী হইয়াও কতশত সাধক অকৃতকার্য হইতেছে।
পঞ্চতন্মাত্রা যেন বলপূর্বক মানব-মনকে বিষয়ে নিবিষ্ট
করিতেছে ; তাই বহু সাধক ইন্দ্রিয়ের বিরুদ্ধে প্রবল সংগ্রাম
করিয়া পরিশেষে অকৃতকার্য হইয়া বিষয়স্রোতে নিজেকে
ভাসাইয়া দিতেছে। বস্তুতঃই এ পথটি অতীব দুর্গম, তাই
ভগবান বলিয়াছেন :-
“যদগ্ৰে বিষমিব পরিণামেহমৃতােপম।
তৎ সুখং সাত্ত্বিকং প্রােক্তমাত্মবুদ্ধিপ্রসাদজম্ ॥
যততত হপি কৌন্তেয় পুরুষ বিপশ্চিত।
ইন্দ্রিয়াণি প্রমাথিনী হরন্তি প্রসভং মনঃ।”
অর্থাৎ—“যে সুখ প্রথমে বিষের ন্যায় প্রতীয়মান হইলেও
পরিণামে অমৃতের ন্যায় হয়, সেই স্থিরবুদ্ধির প্রসন্নতার
ফলস্বরূপ সুখই সাত্ত্বিক সুখ বলিয়া অভিহিত হয়।
কুন্তীনন্দন! বিবেকী পুরুষ প্রযত্নপর হইলেও, বিক্ষেপকারী
ইন্দ্রিয়নিচয় বলপূর্বক তাহার মনকে হরণ করিয়া থাকে।”
অপিচ শ্রুতি বলিতেছেন—
“উষ্ঠিত জাগ্রত।
প্রাপ্য বরান্নিবােধত।
ক্ষুরধারা নিশিতা দুরত্যয়া।
দুর্গং পথস্তৎ কবয়াে বদন্তি।”
মৃতে প্রাণপ্রদানকারী ভােলানন্দ “হে জীব! মােহনিদ্রা ত্যাগ করিয়া উত্থিত হও, জাগরিত হও এবং ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষের সমীপস্থ হইয়া সম্যজ্ঞান লাভ কর। বিবেকী পুরুষগণ বলেন, সেই আত্মজ্ঞানের পথ কঠোর সাধন সহ সাবধানে অতিক্রম করিতে হয় বলিয়া উহা ক্ষুরের তীক্ষ্ণ প্রান্তভাগের ধারের ন্যায় অতীব দুর্গম।” সাধক! সাময়িক দুঃখে বা অকৃতকাৰ্যতায় নৈরাশ্যের করাল কবলে পতিত হইয়া নিজেকে বিষয়স্রোতে ভাসাইয়া দিও না। এ পথ ধরিয়া থাক, প্রবল ইন্দ্রিয়বর্গকে অবশে রাখিবার জন্য দৃঢ়পরিকর হও। এ যুদ্ধে প্রথমতঃ তােমার পরাজয় অবশ্যম্ভাবী, কিন্তু হাল ছাড়িয়া না দিয়া যুদ্ধ করিতে থাকিলে পরিশেষে জয়মাল্য তােমার কণ্ঠদেশের শােভা বিস্তার করিবেই--এটি এ রাজ্যের চিরন্তন নিয়ম। তখন দেখিবে, তুমি সৰ্ব্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান ; তােমার ইচ্ছা মুহুর্তেই পূর্ণ হইতেছে—তুমি যেন এক নূতন লােকে বিরাজ করিতেছ, তােমার ইচ্ছায় সৃষ্টি হইতে পারে, আবার তােমার ইচ্ছায় লয়ও হইতে পারে। ভােলানন্দও এবম্প্রকার অবস্থা লাভ করিয়া সকলের সহিত বালকবৎ ব্যবহার করিতে লাগিলেন। কোন ব্যক্তিই তাহার অলৌকিকতা দেখিবার অবকাশ পান নাই। কৈলাস- দাস নামে একজন বাঙ্গালী শিষ্যের সহিত ভােলানন্দ কতিপয় দিবস দিল্লীতে হাইকোর্টের উকীল পণ্ডিত শ্যামলালের বাড়ীতে অবস্থান করিতেছিলেন। কৈলাসের
৬৪
শ্ৰীশ্ৰীভােলানন্দ-প্রসঙ্গ
পা একটু ফুলিয়াছে, তাই ভােলানন্দ তাঁহাকে বলিলেন—
“কৈলাস! চল একটি গাড়ী করে বেড়িয়ে আসি, তাের
পা-টা ফুলেছে, হেঁটে যেতে তাের কষ্ট হবে।” ভােলানন্দ
ও কৈলাস উভয়ে ধীরে ধীরে হাটিতে লাগিলেন। রাস্তায়
কোন গাড়ী না পাওয়ায় অগত্যা উভয়কেই পদব্রজে ভ্রমণ
করিতে হইল। ভােলানন্দ বলিলেন—“আচ্ছা ফিরিবার
সময় গাড়ীতে আসিব। শ্যামলালের গৃহ হইতে প্রায়
এক ক্রোশ দূরে অবস্থিত শ্মশান-ঘাটে যাইয়া উভয়ে উপস্থিত
হইলেন। এমন সময় ‘রাম-নাম সত্য হ্যায়’ বলিতে বলিতে
কতিপয় ব্যক্তি একটি মৃতদেহ কাঁধে করিয়া শ্মশানে উপনীত
হইল। শববাহকদিগের পশ্চাতে মৃতব্যক্তির পিতা কাদিতে
কঁদিতে আসিতেছিল। শব শ্মশানে আনীত হইল এবং
দগ্ধ করিবার বন্দোবস্ত হইতে লাগিল। ভােলানন্দ কৈলাসকে
বলিলেন—“কৈলাস। দেখবি, ও বাস্তবিক মরে নাই, এখনই
বেঁচে উঠবে” এই বলিয়া ভােলানন্দ মৃতদেহটির নিকট
উপস্থিত হইলেন। মৃতব্যক্তিও তৎক্ষণাৎ পুনর্জীবন লাভ
করিল। ভােলানন্দ তাহার নাম জিজ্ঞাসা করিলে সে বলিল,
—“আমার নাম ‘রামখেল।” পুত্রকে পুনর্জীবিত দেখিয়া
পিতা আনন্দে আত্মহারা হইয়া তাহাকে স্বীয় ক্রোড়ে লইতে
উদ্যত হইল। ভােলানন্দ তাহাতে বাধা প্রদান করিয়া
বলিলেন—“তােমরা ত একে মৃত ভেবে পরিত্যাগ করেছিলে,
আমি এখন একে জীবিত করেছি, সুতরাং এ ছেলে আমার।”
মৃতে প্রাণপ্রদানকারী ভােলানন্দ পিতা ভােলানন্দের এবম্প্রকার বাক্যে পুত্ৰ-লাভে হতাশ হইয়া পুনরায় কঁদিতে আরম্ভ করিল ও ভােলানন্দের নিকট পুত্র প্রার্থনা করিতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে শ্মশানঘাট লােকে লােকারণ্য হইল। সার্কেল ইম্পেক্টরও সেখানে উপস্থিত হইল। ভােলানন্দ কৌতুকচ্ছলে তাহাকে বলিলেন—“তুমিই এর বিচার কর, ছেলেটি আমার প্রাপ্য অথবা ওর পিতার প্রাপ্য?” ভােলানন্দের বালক-ভাব ও অলৌকিক ক্রিয়া দেখিয়া ইনস্পেক্টর ও সমাগত দর্শকবৃন্দ ভক্তিভরে তাহাকে প্রণাম করিতে লাগিল। সহরে এ সংবাদ বিস্তৃতি লাভ করিল। মৃত ব্যক্তিকে এক সাধু জীবন দান করিয়াছেন শুনিয়া ইউ- রােপীয়ান ম্যাজিষ্ট্রেটও সাধুর দর্শন মানসে শ্মশানে উপস্থিত হইলেন। ইনস্পেক্টর ভােলানন্দের নিকট ম্যাজিষ্ট্রেটের পরিচয় ভােলানন্দ সহাস্যবদনে ম্যাজিষ্ট্রেকে বলিলেন—“আচ্ছা, আপনারা ত বিচারক, আপনি বিচার করুন-এ ছেলে আমার হওয়া উচিত কিংবা উহার পিতার ?” ম্যাজিষ্ট্রেট সহাস্যবদনে বলিলেন—“আপনার”। ম্যাজিষ্ট্রেট, কৈলাস ও মৃতব্যক্তির পিতার সহিত ম্যাজিষ্ট্রেটের গাড়ীতে মৃতব্যক্তির গৃহে উপস্থিত হইয়া ভােলানন্দ ছেলেকে তাহার মাতার হস্তে অৰ্পণ করিলেন। তখন ম্যাজিষ্ট্রেট ভােলানন্দকে জিজ্ঞাসা করিলেন—“আপনি এখানে কোথায় থাকেন?” ভােলানন্দ বলিলেন-“হাইকোর্টের উকীল পণ্ডিত শ্যামলালের বাড়ীতে।” দিল। *। 5
শ্ৰীশ্ৰভােলানন্দপ্রসঙ্গ
ম্যাজিষ্ট্রেট সােৎসাহে বলিলেন-“ও, শ্যামলাল, সে যে
আমার একজন বিশেষ বন্ধু, চলুন আপনাকে সেখানে
পৌছিয়ে দিয়ে আসি।” এই বলিয়া ম্যাজিষ্ট্রেট, ভােলানন্দ
ও কৈলাসের সহিত শ্যামলালের গৃহে উপনীত হইয়া
ভােলানন্দকে অভিবাদন করিয়া প্রস্থান করিলেন।
ভােলানন্দ কৈলাসকে বলিলেন—“দেখ, বলেছিলেম
গাড়ীতে আস্ব, তা ম্যাজিষ্ট্রেটের গাড়ীতেই আসলাম, অথচ
এক পয়সাও লাগল না।” ভোলানন্দের বালকের ন্যায় কথা
শুনিয়া কৈলাস হাসিতে লাগিলেন।
মুমুষুরক্ষক ভােলানন্দ
ক্ষীণকণ্ঠে খােকা ডাকিল-“মা” । স্নেহব্যঞ্জকশ্বরে
অমরের স্ত্রী বলিলেন—“কি বাবা।” খােকা বলিল -“আমি
সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছি।” আশ্চর্যান্বিতা হইয়া অমরের স্ত্রী
উঠিয়া থােকার শরীরে হস্তস্থাপনপূর্বক সােৎসাহে
বলিলেন—“সে কি বাবা!” খােকা বলিল—“না, মা। স্বামীজি
এসেছিলেন, আমার আর কোন কষ্ট নাই।” খােকার কথা
শুনিয়া অমর প্রভৃতিও খােকার কাছে আসিয়া সােৎসাহে
তাহার শরীরে হাত দিয়া দেখিলেন, বস্তুতঃই কোন প্রকার
ব্যাধির লক্ষণ নাই। কৌতূহলাক্রান্ত হইয়া তাহারা
মুমূ-রক্ষক ভােলানন্দ
খােকাকে জিজ্ঞাসা করিলেন—“কি রে, কি হয়েছে বল্ না,
স্বামীজিকে কি ভাবে দেখলি?” খােকা বলিল—“খুব উজ্জ্বল
মূর্তি, মাথায় পাগড়ী, পায়ে খড়ম ও হাতে কমণ্ডলু, পিছনে
একদল সন্ন্যাসী। স্বামীজি তাহার হস্তস্থিত কমণ্ডলু হইতে
আমার সর্বশরীরে জল ছিটাইয়া দিলেন, সঙ্গে সঙ্গে আমার
সকল যন্ত্রণার অবসান হইল।”
অবিনাশী শরীরী বা দেহী এক—তিনিই বিভিন্ন দেহে
বিরাজ করিতেছেন, দেহনাশে তাহার নাশ হয় না। এই দেহী
বা চৈতন্য আকাশবৎ সৰ্বব্যাপী এবং তিনিই ব্ৰহ্মস্বরূপ,
তাহাকে জ্ঞাত হইতে পারিলেই জন্ম-মৃত্যুর হাত হইতে
চিরতরে মুক্ত হইয়া শাশ্বত পদ লাভ করা যায়। কিন্তু
দুৰ্বিজ্ঞেয় ব্ৰহ্মতত্ত্ব লাভ করিবার উপায় কি ?
অভ্যাস ও বৈরাগ্যের দ্বারাই এই আত্মতত্ত্ব লাভ করা সম্ভব
হয়। শ্মশানভূমিতে মানবদেহ ভস্মে পরিণত হইতেছে—এ
দৃশ্য অনেকের দৃষ্টিপথেই নিপতিত হইয়া থাকিবে। কল্পনা-
দ্বারা নিজের শরীরটিকে শ্মশানে নিক্ষেপ করিয়া তাহাতে
অগ্নি প্রদান কর। শরীর কাল্পনিক ভস্মে পরিণত হইলে
নামরূপ অতীত যে বস্তুর উপলব্ধি হয়, তিনিই আত্ম—সেই
আত্মা 'ও তুমি এক। শ্মশানভূমিতে শৃগাল, কুকুর, শকুনী
প্রভৃতি দ্বারা অসংখ্য মৃতদেহ খণ্ডবিখণ্ড হইতেছে,
কল্পনার সাহায্যে নিজের শরীরটিকে উক্ত স্থানে স্থাপনপূর্বক
কুকুর শৃগাল দ্বারা শরীরটি ভক্ষিত হইতেছে, অস্থি, মাংস
একমাত্র
৬
শ্ৰীশ্ৰীভােলানন্দ-প্রসঙ্গ
প্রভৃতির জন্য কুকুর, গৃধিনী প্রভৃতি পরস্পর কলহ করিতেছে
সেই ভয়াবহ দৃশ্য মানস-পথে উদিত কর। শরীরটি এই
প্রকারে ধ্বংসপ্রাপ্ত হইলে নামরূপাতীত আনন্দস্বরূপ যে
বস্তুর উপলব্ধি হয়—সেই বস্তুই আত্মা বা ব্ৰহ্ম। সেই আত্মা
ও তুমি অভেদ। চিকিৎসাবিদ্যালয় বা যাদুঘরে মানবের
কঙ্কাল দৃষ্ট হইয়া থাকে, কল্পনা দ্বারা নিজের শরীরটিকে
সেই কঙ্কালের পার্শ্বে স্থাপন করিয়া ইহাকেও কঙ্কালরূপে
চিন্তা কর। শরীরটি কল্পনাক্ষেত্রে কঙ্কালে পরিণত হইলে,
কঙ্কালে বা নবদ্বারবিশিষ্ট দেহে যে নামরূপাতীত বস্তুর
উপলব্ধি হয়, তিনিই ‘নবদ্বারে পুরে দেহী নৈব কুৰ্বণ, ন
কারন ভাবে অবস্থান করিতেছেন। তিনিই আত্মা বা
চৈতন্য—সেই চৈতন্যই তুমি। এই প্রকার ধীরে ধীরে
বৈরাগ্য ও অভ্যাস দ্বারা মনকে আত্মাভিমুখী করিতে
পারিলেই অশান্ত মন শান্তিদেবীর ক্রোড়ে চির-বিশ্রাম লাভ
করিতে পারিবে। তখন তুমি সৰ্ব্বজ্ঞ সর্বশক্তিমান হইয়া
শিবরূপে এই জগতেই বিরাজ করিতে সমর্থ হইবে।
সে বৎসর জিলা সিলেট সুনামগঞ্জনিবাসী রায়-বাহাদুর
অমরনাথ রায় এ, এল, সি মহাশয়ের পঞ্চমবর্ষীয় পুত্র
দুরারােগ্য রােগে আক্রান্ত হইয়াছিল। ডাক্তার ও
কবিরাজগণ দ্বারা সুচিকিৎসিত হওয়া সত্ত্বেও যখন তাহার
রােগের উপশম হইল না—যখন বৈদ্যগণ তাহার জীবনের
প্রতি হতাশ হইলেন, অনন্যোপায় হইয়া অমর তখন
ভক্তিতে আপ্লুত ভােলানন্দ
ভােলানন্দকে হরিদ্বারে টেলিগ্রাফ করিলেন। টেলিগ্রাফের
উত্তরে ভােলানন্দ লিখিলেন-“যথাশক্তি নাম ও দান কর।
কতিপয় দিবস পরে ভােলানন্দের নিকট তাঁহার অসীম
কৃপায় পুত্রের আরােগ্যের বিষয় বিবৃত করিয়া অমর পত্র
দিলেন। লেখক পত্র পড়িতেছিল। ভােলানন্দ লেখককে
বলিলেন,-“দেখ, তােরা ত বিশ্বাস করি না যে, চৈতন্য
সৰ্বব্যাপী, এই দেখ আমি ত এখানেই তােদের কাছে
রয়েছি, আমি ত আর সুনামগঞ্জে যাই নাই, কিন্তু চৈতন্য
সৰ্বত্ৰই বৰ্ত্তমান, তিনি সেখানে বসেই কাজ করেছেন।
এই চৈতন্যকে সাধন-বলে জ্ঞাত হ', তাহলেই সর্বজ্ঞ ও
সর্বশক্তিমান হ’তে পাবি।”
[ ৪ ]
ভক্তিতে আপ্লুত ভােলানন্দ
বিপিন গাহিতেছেন—
মন কেন মায়ের চরণ ছাড়া।
ও মন ভাব শক্তি, পাবে মুক্তি, বাঁধ দিয়ে ভক্তি-দড়া ॥
নয়ন থাকতে দেখলে না মন
কেমন তােমার কপাল পােড়া।
মা ভক্তেরে ছলিতে তনয়া রূপেতে।
বাঁধেন আসি ঘরের বেড়া।
মায়ে কত ভালবাসে, বােঝা যাবে মৃত্যুশেষে।
দণ্ড দু’চার কান্নাকাটি শেষে দিবে গােবর-ছড়া ।
শ্রীভােলানন্দ-প্রসঙ্গ
ভাই বন্ধু দারা মুত কেবল মাত্র মায়ার গােড়া ।
মলে সঙ্গে দিবে মেটে কী, কড়ি দিবে অষ্ট কড়া।
অঙ্গেতে যত আভরণ, সকলই করিবে হরণ ।
দোসর বস্তু গায়ে দিবে, চারকোণা মাঝখানে ফাড়া।
যেই ধ্যানে এক মনে, সেই পায় কালিক। তারা।
বেড় হয়ে দেখ কন্যারূপে রামপ্রসাদের বাঁধছেন বেড়া ।
ডুব দে মন কালী বলে।
হৃদি-রত্নাকরের অগাধ জলে ।
রত্নাকর নয় শূন্য কভু, দুচারু ডুবে ধন না পেলে।
তুমি দম-সামর্থ্যে ডুব দিয়ে যাও কুলকুণ্ডলিনীর কোলে ।
কামাদি ছয় কুম্ভীর আছে, আহার লােভে সদাই ফিরে।
তুই বিবেক-হলুদ গায়ে মেখে যা, ছােবে না তার গন্ধ পেলে ।
অবিরল ধারায় কপােল বহিয়া ভােলানন্দের অশ্রুবারি
পড়িতে লাগিল। সুন্দর মুখমণ্ডল সুন্দরতম হইল। কণ্ঠস্থিত
নামাবলী দ্বারা ভােলানন্দ মুহুর্মুহুঃ অশ্রুবারি মুছিতে
লাগিলেন।
তথাকথিত ভক্ত ও জ্ঞানীর মধ্যে মতভেদ চিরবৰ্তমান।
ভক্ত ভক্তিকে উচ্চাসন দিতেছেন, অপরপক্ষে জ্ঞানী জ্ঞানকে
শ্রেষ্ঠ বলিতেছেন। কিন্তু প্রকৃত ভক্ত ও জ্ঞানীর মধ্যে
বিন্দুমাত্রও মতভেদ থাকিতে পারে না। তাহারা জানেন, জ্ঞান
ব্যতীত ভক্তি হয় না, ভক্তি ব্যতীত জ্ঞান হয় না। তত্ত্বজ্ঞান,
বাসনাক্ষয় ও মনােনাশ যেপ্রকার পরস্পর-সম্বদ্ধ—তত্ত্বজ্ঞান
হইলে বাসনাক্ষয় ও মনােনাশ হইতে পারে না, মনােনাশ
ভক্তিতে আপ্লুত ভােলানন্দ
হইলে বাসনাক্ষয় ও তত্ত্বজ্ঞান হইতে পারে না, বাসনাক্ষয়
হইলে মনােনাশ ও তত্ত্বজ্ঞান হইতে পারে না—তদ্রুপ
ভক্তি ও জ্ঞানও পরস্পরের সহিত সম্বদ্ধ। একটির অভাবে
অন্যটির স্ফুরণ, বন্ধ্যার পুত্রের ন্যায় সম্পূর্ণ অসম্ভব এবং
একটির স্ফুরণে অন্যটির স্ফুরণ অবশ্যম্ভাবী। কনিষ্ঠ, মধ্যম ও
উত্তমভেদে ভক্তি তিন প্রকার,—যথা নবধা, প্রেমা ও পরা।
সাধনরাজ্যে উন্নতিকামী ব্যক্তির পক্ষে প্রথমতঃ নবধাভক্তির
আশ্রয় গ্রহণ করা কর্তব্য। নবভক্তি, যথা :-
“শ্রবণং কীর্তনং বিষ্ণোঃ স্মরণং পাদসেবনম্।
অৰ্চনং বন্দনং দাস্যং সখ্যমাত্মনিবেদনম্ ॥”,
একাগ্ৰমনে ভগবানের গুণ শ্রবণ, কীৰ্ত্তন, স্মরণ, পাদসেবন,
অর্চন, বন্দন প্রভৃতি দ্বারা মন ধীরে ধীরে তাহার চরণে
নিবিষ্ট হইলে বিষয়বসনা হইতে মন মুক্ত হইয়া ভগবানের
নাম ও রূপ-রসে মত্ত হয়। তখন সাধক প্রেমভক্তি লাভ
করেন। প্রেমভক্তি লাভ হইলে মন সর্বদা ভগবানের নাম
শুনিতে ব্যাকুল হয়, ভগবানের কথা ব্যতীত অন্য কিছুই
তখন ভাল লাগে না। ভগবানের নাম শুনিতেই অবিরল
ধারায় সাধকের নয়ন হইতে অশ্রুবারি বহির্গত হইতে থাকে;
অহরহঃ স্বেদ, পুলক, কম্পন ও মূচ্ছা হইতে থাকে। কখনও
পাগলের মত হাসেন, কখনও কাঁদেন, কখনও মৌনধারণ
করিয়া গম্ভীরভাবে বসিয়া থাকেন, আবার কখনও উচ্চৈঃস্বরে
নাম কীৰ্ত্তন করেন ও নাচেন। কখনও নিজকেই ইষ্টবােধে
শ্ৰীশ্রীভােলানন্দ-প্রসঙ্গ ভাবনা করেন। বিষয়-বাসনার লেশমাত্রও তখন তাহার মনে আসিতে পারে না, কারণ তখন তঁাহার মন সত্ত্বগুণে স্থিত ; সত্ত্বং সুখে সঞ্জয়তি—তাহার মন দুঃখবর্জিত। প্রেমভক্তির গুণে অন্তঃকরণ :যখন স্ফটিকবৎ স্বচ্ছ হয়, তখন সাধকের আত্মদর্শন হয়, অর্থাৎ তিনি ব্রহ্মভূত বা জ্ঞানিপদবাচ্য হন। ব্ৰহ্মভূত অবস্থালভান্তর সাধক পরাভক্তি লাভ করেন। যথাঃ- “ব্ৰহ্মভূতঃ প্রসন্নাত্মা ন শােচতি ন কাঙ্ক্ষতি। সমঃ সর্বেষু ভূতেষু মৃদুভক্তিং লভতে পরীম্ ॥” অর্থাৎ—“ব্রহ্মভূত সুতরাং প্রসন্নাত্মা যতি শােকও করেন না এবং কোন বিষয়ের আকাঙ্ক্ষাও করেন না। তিনি সর্বভূতে সমদৃষ্টিযুক্ত হইয়া পরমা মভক্তিকে (পরাভক্তিকে) লাভ করিয়া থাকেন।” পরাভক্তি লাভান্তর সাধক সব সময়ই ভগবানের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, ভগবান হইতে ক্ষণিকের জন্যও বিচ্ছিন্ন হন না। তৎপর সাধক নিৰ্ব্বাণ প্রাপ্ত হন বা জ্ঞানের চরম সীমায় উপনীত হন। যথা :- “ভক্ত্যা মামভিজানাতি যাবা যশ্চাম্মি তত্ত্বতঃ। ততাে মাং তত্ত্বতত জ্ঞাত্ববিশতে তদনন্তরম্।” অর্থাৎ—“আমি কি পরিমাণ ও কে, তাহা ভক্তিদ্বারা যথার্থ- রূপে জানিতে পারেন ও তাহার পর আমার যথার্থ স্বরূপ জ্ঞাত হইয়া আমাতেই প্রবিষ্ট হইয়া থাকেন।” শুভেচ্ছা, সুবিচারণা, তনুমানসা, সত্ত্বাপত্তি, অসংসক্তি, পদার্থাভাবিনী ও তুরীয়ভেদে জ্ঞানের সপ্তভূমিকা কথিত
ভক্তিতে আপ্লুত ভােলানন্দ
৬
;
হইয়াছে। বিষয়ে বিদ্বেষ ও গুরু তীর্থ প্রভৃতিতে অনুরাগের
নাম শুভেচ্ছা। একান্তে বসিয়া ‘আমি কে, সংসার কি এই
প্রকার তত্ত্ব চিন্তা করার নাম সুবিচারণা। মনকে বিষয় হইতে
প্রত্যাহারপূর্বক স্বরূপে নিবদ্ধ রাখার নাম তনুমান।
তনুমানসার অবস্থা যখন গাঢ়তম হয়, যখন সাধক প্রগাঢ়
আত্মধ্যানে মগ্ন থাকেন, তখন তঁাহার কাছে জগৎ সিন্ধুমধ্যে
তরঙ্গবৎ স্বতঃই মিথ্যা বলিয়া প্রতীত হয়। এই অবস্থাই
সত্ত্বাপত্তি নামে খ্যাত। সত্ত্বাপত্তি অবস্থালাভ বা চতুর্থ
ভূমিকায় উপনীত হইলেই সাধক ব্ৰহ্মভূত হন; তাহার কাছে
জগৎ মিথ্যা বলিয়া প্রতিভাত হয়। তখন তিনি পরাভক্তি
লাভ করেন। পরাভক্তি লাভ হইলে ক্রমশঃ
তিনি পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম ভূমিকায় উপনীত হইয়া
নিৰ্বিশেষভাবে ব্ৰহ্মকে অবগত হন। পঞ্চম ভূমিকা
বা অসংসক্তি অবস্থায় সাধক নিজেকে দেহ হইতে সম্পূর্ণ
পৃথক্ বলিয়া মনে করেন, নিজের দেহকে অপরের দেহ
বলিয়া ধারণা হয়। ষষ্ঠ ভূমিকা বা পদার্থাভাবিনী অবস্থায়
সাধকের নিকট দেহ বা জগৎ নামে কোন বস্তুরই প্রতীতি
হয় না; তখন সকল পদার্থেরই অভাব অনুভূত হয়। সপ্তম
ভূমিকা বা তুরীয় অবস্থায় সাধকের নিকট কোন বস্তুরই
ভাব বা অভাব অনুভূত হয় না, কারণ তখন তাহার আমিত্ব
নষ্ট হইয়া যায়—‘অবামনসগােচর সেই ব্রহ্মে লীন হইয়া
যান। চতুর্থ ভূমিকায় উপনীত সাধক ব্ৰহ্মবিৎ বলিয়া কথিত
৭৪
শ্ৰীশ্ৰভােলানন্দ-প্রসঙ্গ
{
পঞ্চম ও ষষ্ঠ ভূমিকায় ব্রহ্মবিৎ বরীয়ান্ ও সপ্তম
ভূমিকায় ব্ৰহ্মবিৎ বরিষ্ঠ।
নবধা ভক্তির পর প্রেমভক্তি, প্রেমভক্তির পর জ্ঞান
বা আত্মদর্শন, জ্ঞানের পর পরাভক্তি এবং পরাভক্তির পর
নিৰ্ব্বাণ (জ্ঞানের শেষ পরিণতি) লাভ হইয়া থাকে। ভক্তি
ও জ্ঞান এই প্রকার পরস্পর-সম্বদ্ধ।
সেদিন স্বামী বৈদ্যনাথানন্দ গিরিজী ও স্বামী
বিশ্বেশ্বরানন্দ গিরিজীর সমভিব্যাহারে লেখক সন্ধ্যার কিছু
পূৰ্ব্বে ভ্রমণে বহির্গত হইয়াছিল। কিছুদূর অগ্রসর হইয়া
প্রয়ােজনবশতঃ লেখক ভ্রমণের সঙ্কল্প পরিত্যাগ করিয়া
একাই আশ্রমে প্রত্যাবর্তন করিল। আশ্রমে উঠিয়াই
লেখক যাহা দেখিল, তাহাতে তাহার আনন্দের আর অবধি
রহিল না। বিপিনবিহারী ঘােষ নামে একজন বৃদ্ধ শ্যামা-
ভক্ত রামপ্রসাদী সঙ্গীত গাহিতেছেন। ভােলানন্দ কেদারায়
উপবিষ্ট, বিপিন তঁাহারই নিম্নে বেঞ্চের উপর বসিয়া।
ভােলানন্দ একাগ্ৰমনে গান শুনিতেছেন—নয়ন হইতে
অবিরল ধারায় অশ্রু নির্গত হইতেছে, মুখে অপূৰ্ব্বভাব ও
জ্যোতি খেলিতেছে। সে দৃশ্য দেখিয়া লেখক আনন্দে
আত্মহারা হইল, আবার পরক্ষণেই বিস্ময়ে অবাক্ হইল
“এ কি, জ্ঞানী ভােলানন্দের এ কি প্রকার দ্বৈতভাব? কার
জন্য তিনি নয়ন-বারি বিসৰ্জন করিতেছেন, ব্ৰহ্ম ত ‘একমেবা-
দ্বিতীয়’—তবে এ দ্বৈতভাব কোথা হইতে আসিল।”
আধ্যাত্মিক পনিবারক ভােলানন্দ গুরু-কৃপায় লেখকের ভ্রান্তি শীঘ্রই অপনােদিত হইল ; সে বুঝিল- “চতুৰ্বিধা ভজন্তে মাং জনা: সুকৃতিনােহৰ্জ্জুন। আর্তো জিজ্ঞাসুরর্থার্থ জ্ঞানী চ ভরতভ। তেষাং জ্ঞানী নিত্যযুক্ত একভক্তিবিশিষতে। প্রিয়াে হি জ্ঞানিনােহত্যৰ্থমহং স চ মম প্রিয়ঃ । উদারাঃ সৰ্ব এবৈতে জ্ঞানী ব্যাত্মৈব মে মত। আস্থিতঃ স হি যুক্তাত্মা মামেবাত্তমাং গতিম্ ॥” অর্থাৎ-হে ভরত-কুল-শ্রেষ্ঠ অর্জুন ! পীড়িত, তত্ত্ব- জিজ্ঞাসু, ধনার্থী ও জ্ঞানী, এই চারিপ্রকার পুণ্যাত্মা ব্যক্তি আমাকে ভজনা করেন। সেই চারি প্রকার মৎ-সেবকগণের মধ্যে নিত্যযুক্ত এবং একভক্তি (একমাত্র ভগবানে ভক্তি- বিশিষ্ট) জ্ঞানীই প্রধান। জ্ঞানীর আমি অত্যন্ত প্রিয় এবং জ্ঞানীও আমার প্রিয়। ইহারা সকলেই উৎকৃষ্ট ; কিন্তু জ্ঞানী আমার আত্মাই, ইহাই আমার মত, কারণ, সেই সমাহিতমনা জ্ঞানী আমাকেই সর্বোৎকৃষ্ট আশ্রয় বলিয়া অবলম্বন করেন। [ ৫ ] আধ্যাত্মিক তাপনিবারক ভােলানন্দ হঠাৎ গভীর রাত্রে ভােলানন্দের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে গােপীনাথ সম্পূর্ণ নিরাময় হইলেন। আনন্দের আতিশয্যে তিনি অশ্রুবারি বিসৰ্জন করিতে লাগিলেন।
৭৬ শ্ৰীশ্ৰভােলানন্দ-প্রসঙ্গ গুরু-শিষ্য-সম্বন্ধ অনাদিকাল হইতে চলিয়া আসিতেছে। শাস্ত্র, গুরুকে সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ আসন প্রদান করিয়াছেন। গুরু একাধারে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবরূপে বিরাজমান। কিন্তু গুরু শব্দ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অজ্ঞ মানব বিচারহীন হইয়া রামা, শ্যামা, যদু, মধু প্রভৃতিকে গুরুপদে বরণ করিতে বিন্দুমাত্র ইতস্ততঃ করিতেছে না। গুরুবংশপরম্পরা শিষ্য-বংশপরম্পরাকে দীক্ষা প্রদান করিতেছেন—ইহা যেন তাহাদের জন্মগত অধিকার। শিষ্য-বংশপরম্পরাও কুলগুরু পরিত্যাগ করা মহাপাপ-এই কুসংস্কারের বশবর্তী হইয়া অকুষ্ঠিত চিত্তে তাঁহাদের নিকটে পরমতত্ত্ব লাভ করিবার প্রয়াস করিতেছে। গুরু স্বভাব-দোষে দুষ্ট, আধ্যাত্মিক বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞ, জ্ঞাত হইয়াও তাহারা তাহাকেই শ্রেষ্ঠ আসন প্রদান করিতেছে। অন্ধ গুরু অন্ধ শিষ্যকে পথ প্রদর্শন করিতে প্রয়াস পাইয়া উভয়েই মােহ-কূপে নিমজ্জিত হইয়া অশেষ যন্ত্রণা ভােগ করিতেছেন। শিষ্যের সন্তাপ হরণে সম্পূর্ণ অসমর্থ গুরু, শিষ্যের বিত্তাপহরণের জন্যই সর্বদা চেষ্টিত ও লালায়িত। সদগুরুর আশ্রয় ব্যতীত জীবনে শান্তিলাভ অলীক কল্পনাতেই পর্যবসিত হইয়া থাকে। প্রকৃত শান্তিলাভ করিতে হইলে, তত্ত্বজ্ঞানে মনকে বিভূষিত করিতে হইলে, আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক তাপত্ৰয় হইতে মুক্তিলাভের ইচ্ছা থাকিলে তত্ত্বদর্শী সদ্গুরুর আশ্রয় গ্রহণ করিতেই শ্রীভগবানও জীবকে গুরুতত্ত্ব বুঝাইবার জন্য হইবে।
আধ্যাত্মিক তাপনিবারক ভােলানন্দ
৭৭
এবং জ্ঞান লাভের সহজ, সরল ও একমাত্র পন্থা প্রদর্শন
করিবার মানসে বলিতেছেন :-
=
“তদবিদ্ধি প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেবয়া।
উপদেক্ষ্যন্তি তে জ্ঞানং জ্ঞানিনস্তত্ত্বদশিনঃ ॥
যজ্ঞাত্বা ন পুনমোহমেব যাস্তসি পাণ্ডব ।
যেন ভূতান্তশেষেণ দ্রক্ষ্যাত্মন্যথাে ময়ি।”
তত্ত্বদর্শী মহাপুরুষের সেবাদ্বারা চিত্ত নিৰ্ম্মল হইলে তাহার
উপদেশে অদ্বিতীয় ব্রহ্মজ্ঞান লাভ পূৰ্ব্বক জীব সংসার-বন্ধন
হইতে মুক্ত হইয়া যায়। তত্ত্বদর্শী মহাপুরুষই গুরুশব্দ-বাচ্য,
তাহার কৃপায় আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক
তাপত্রয়ও অচিরে দূরীভূত হয়।
সে বৎসর সিলেট জিলায় বসন্তের প্রকোপ অত্যধিক ,
বৃদ্ধি পাইয়াছিল। বহু লােক উক্ত রােগে মৃত্যুমুখে পতিত
হইতে লাগিল। ডাকঘরের কেরাণী গােপীনাথ দাস জ্বর সহ
জলবসন্ত দ্বারা আক্রান্ত হইয়া অশেষ যন্ত্রণা ভােগ
করিতেছিলেন। যন্ত্রণা সহ্য করিতে অসমর্থ হইয়া তিনি
একাগ্ৰমনে গুরুদেব ভােলানন্দকে স্মরণ করিতে লাগিলেন।
হঠাৎ ভােলানন্দের দর্শন লাভ করিতেই তাহার সকল
যন্ত্রণার উপশম হইল। গুরু-কৃপায় আধ্যাত্মিক তাপ হইতে
মুক্ত হইয়া তিনি আনন্দবারি বিসৰ্জন করিতে লাগিলেন।
চতুর্থপরিচ্ছেদ
[ ১ ]
অহৈতুক কৃপাসিন্ধু ভােলানন্দ
রাত্রি তখন একটা বাজিয়াছে; হঠাৎ ‘হর হর বম্ ব’
শব্দে পাৰ্বতীচরণের নিদ্রাভঙ্গ হইল। তিনি দেখিলেন,
নিকটে জ্যোতির্ময়মূৰ্ত্তি তিনজন সন্ন্যাসী দণ্ডায়মান। “প্রসাদ
লেও” বলিয়া ভােলানন্দ পাৰ্বতীচরণের হস্তে একটি লাড়
প্রদান করিলেন। অত্যন্ত তৃপ্তির সহিত তাহা ভক্ষণ করিয়া
পাৰ্বতীচরণ জলের জন্য নিকটবর্তী একটি কলের নিকটে
গমন করিতেই সাধুগণ অন্তর্হিত হইলেন।
সে বৎসর বরিশাল ভারুকাঠীগ্রাম-নিবাসী কবিরাজ
শ্রীমান্ পাৰ্বতীচরণ দাশগুপ্ত মহাশয় মায়ের প্রসন্নতা লাভ
করিবার মানসে কলিকাতা কালীঘাটে মায়ের মন্দিরে
উপস্থিত হইলেন। মন্দিরের পাণ্ডারা তঁাহাকে মায়ের
মন্দিরে থাকিতে দিতে অসম্মত হওয়ায় তিনি অগত্যা
নকুলেশ্বরের মন্দিরে শুধু গঙ্গাজল পান করিয়া ৭ দিন
অতিবাহিত করিলেন। শেষের দিন নিশীথ সময়ে যখন তিনি
প্রগাঢ় নিদ্রায় অভিভূত, তখন হঠাৎ ‘হর হর বম্ ব’ শব্দ
করিতে করিতে ভােলানন্দ অপর দুই জন সাধুর সহিত
অসঙ্গ ভােলানন্দ সেখানে উপস্থিত হইয়া পার্বতীকে কৃপা করিলেন। মহাপুরুষের কৃপালাভ করিয়া পার্বতীচরণ ধন্য হইলেন। # তাহার জীবনে আমূল পরিবর্তন সাধিত হইল। পরিশেষে তিনি ভােলানন্দকে গুরুপদে বরণ করিয়া নিজকে কৃত-কৃতার্থ মনে করিতে লাগিলেন। [ ২ ] অসঙ্গ ভােলানন্দ “আপনি আমার জীবনরক্ষক” বলিয়া দুর্গানাথ ভােলানন্দকে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করিলেন। ভােলানন্দ বলিলেন —“আমি কিছুই করি না, সব ভগবান করেন।” বরিশালের তদানীন্তন এডিশনাল ম্যাজিষ্ট্রেট শ্ৰীযুক্ত যোগেন্দ্রনাথ ঘােষ মহাশয়ের সম্পর্কীয় ভাতা (cousin brother) এবং ঢাকা রামকৃষ্ণ মিশনের অনন্যকর্মী শ্ৰীমান্ দুর্গানাথ ঘােষ সে বৎসর গুরুতর আঘাত প্রাপ্ত হইয়া চল- চচ্ছক্তি রহিত হন। তিনি একদিন স্বপ্নে দেখিলেন, ঢাকার প্রসিদ্ধ জমিদার রূপবাবুর বাড়ীতে একজন সাধু আসিয়াছেন এবং তঁাহার কৃপায় তিনি সম্পূর্ণরূপে নিরাময় হইয়াছেন। পরদিন শুনিতে পাইলেন, বস্তুতঃই রূপবাবুর বাড়ীতে ভােলানন্দ আসিয়াছেন। দুর্গানাথ ভােলানদের নিকট এই তিন জন সন্ন্যাসীর মধ্যে হরিদ্বার ভীমগােডা-নিবাসী স্বামী শঙ্করানন্দ গিরি মহারাজও ছিলেন।
৮
শ্ৰীশ্ৰীভােলান-প্রসঙ্গ
হইতে একটু প্রসাদ আনিবার জন্য আশ্রমস্থ সেবকগণকে
অনুরােধ করিলেন। ভােলানন্দ প্রসাদ না পাঠাইয়া নিজেই
আশ্রমে উপনীত হইলেন এবং তাহার প্রচলিত নিয়মানুযায়ী
সেখানে কিছু ফল ও অর্থ দান করিয়া দুর্গানাথের নিকটে
যাইয়া বলিলেন—“বােল হামারা বেমারী ছুট গিয়া।”
ভােলানন্দের আজ্ঞানুযায়ী দুর্গানাথ উক্ত প্রকারে তিন বার
বলিতেই সম্পূর্ণ নিরাময় হইলেন। তারপর অনেক বৎসরান্তে
ভােলানন্দ ষ্টীমারযােগে বরিশাল হইতে মাদারীপুরে
যাইতেছিলেন। দুর্গানাথ তখন বরিশালে তাঁহার ভ্রাতা
শ্ৰীযুক্ত যােগেন্দ্রনাথ ঘােষের গৃহে অবস্থান করিতেছিলেন।
তিনি ভােলানন্দের সহিত সাক্ষাৎ করিবার জন্য ষ্টীমারে
উপনীত হইয়া তাহাকে নিজের জীবনরক্ষক বলিয়া সম্বােধন
করিলেন। ভােলানন্দ আবেগভরে বলিতে লাগিলেন
“আমি তােমার মধ্যে কল্যাণানন্দকে দেখিতে পাইতেছি।”
[ ৩ ]
আৰ্তরক্ষক ভােলানন্দ
‘জল পি লেও’ বলিয়াই ভােলানন্দ মৃত্যুশয্যায় শায়িত
নগেনকে নিজের কমণ্ডলু হইতে জলপান করাইয়াই অন্তর্হিত
হইলেন। নগেন তৎক্ষণাৎ সম্পূর্ণ নিরাময় হইয়া
ইনি হরিদ্বার-কখল রামকৃষ্ণ মিশনের সেক্রেটারী ।
আৰ্তরক্ষক ভােলানন্দ
৮১
ভােলানন্দকে স্মরণ করিতে করিতে আনন্দাশ্রু বিসর্জন
করিতে লাগিলেন।
সে বৎসর বর্তমান বরিশাল হিন্দু-মহাসভার সম্পাদক
কবিরাজ শ্ৰীমান্ নগেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তকে হরিদ্বার আশ্রমে
রাখিয়া ভােলানন্দ বঙ্গদেশ পরিভ্রমণ করিতে গিয়াছিলেন।
কিছুদিন পর হঠাৎ ব্যাধিগ্রস্ত হইয়া সুচিকিৎসিত হইবার
মানসে নগেন কখল রামকৃষ্ণমিশন-সেবাশ্রমে উপস্থিত
হইলেন; গাড়ী হইতে তাহাকে অজ্ঞানাবস্থায় অবতরণ
করান হইল। চৈতন্য লাভপূৰ্ব্বক গুরুদেব ভােলানন্দের
বিনানুমতিতে আশ্রম পরিত্যাগ করিবার জন্য নগেনের
অনুতাপ হইতে লাগিল। কিন্তু তখন আশ্রমে পুনরাবর্তন
করিতে তিনি সম্পূর্ণ অক্ষম। একদিন তঁাহার অবস্থা
অতীব শশাচনীয় হইয়া পড়িল। মিশনের সেবকবৃন্দ
কলিকাতায় তাহার আত্মীয়-স্বজনের নিকট টেলিগ্রাফ
করিলেন। তৎপরদিন নগেনের অবস্থা এতদুর খারাপ হইল
যে, তিনিও মৃত্যু অনিবাৰ্য জ্ঞাত হইয়া একাগ্ৰমনে ইষ্টদেব
ভােলানন্দকে স্মরণ ও ভােলানন্দ-প্রদত্ত ইষ্টমন্ত্র জপ করিতে
লাগিলেন। আৰ্ত্ত ভক্ত নগেনের স্মরণে ভােলানন্দ হঠাৎ
গভীর রাত্রে নগেনের সম্মুখে আবিভূত হইয়া নিজের
কমণ্ডলু হইতে তাহাকে জলপান করাইলেন। নগেন মনে
করিলেন, তিনি স্বপ্ন দেখিতেছেন, কিন্তু পরক্ষণেই পেটের
মধ্যে জল যাওয়ার শব্দ পাইয়া তাহার সে ভ্রান্তির অপনােদন
6
শ্ৰীশ্ৰভােলানন্দ-প্রসঙ্গ
হইল। হঠাৎ তাহার শরীর ঘর্মাক্ত হইয়া উঠিল, পরক্ষণেই
তাহার সকল প্রকার ব্যাধির ও ক্লান্তির অবসান হইল।
ভােলানন্দকে স্মরণ করিতে করিতে আনন্দিত মনে নগেন
রাত্রি প্রভাত হইবার পূর্বেই গঙ্গাস্নান করিয়া আসিলেন।
পরদিন প্রভাতে মিশনের সেবকগণ নগেনের এবম্প্রকার
অবস্থা দেখিয়া বিস্ময়ে অবাক হইলেন। সেইদিনই
টেলিগ্রাফ প্রাপ্ত হইয়া নগেনের কনিষ্ঠ ভ্রাতা শ্রীমান্
নরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত এম, এ, মিশনে উপস্থিত হইলেন।
নরেন্দ্র জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার নিকটে ভােলানন্দের অশেষ কৃপার
কথা শুনিয়া আশ্চর্যান্বিত হইলেন। উভয় ভাত তখন
আশ্রমে প্রত্যাবর্তন করিলেন।
[ ৪ ]
ভক্তবৎসল ভােলানন্দ
হঠাৎ রাত্রি বারােটার সময় ভােলানন্দের শ্রীমুখ
স্মৃতিপথে উদিত হইতেই পাৰ্বতীচরণের সকল যন্ত্রণার
উপশম হইল; তিনি শরীরে হাত দিয়া দেখিলেন, সমস্ত
গুটিগুলিই লুপ্ত হইয়াছে। প্রভাত হইবামাত্রই তিনি হরিদ্বারে
যাইবার জন্য প্রস্তুত হইতে লাগিলেন।
১৩৩৩ সনের হরিদ্বারে কুম্ভমেলা দর্শনেচ্ছু হইয়া পাৰ্ব্বতী-
চরণ সাংসারিক বন্দোবস্ত করিবার উদ্দেশ্যে তাঁহার
ভক্ত-কল্পতরু ভােলানন্দ
৮৩
ভ্রাতুস্পুত্রের নিকট লক্ষ্মীপুরে (নােয়াখালী) গমন করেন।
সেখানে তিনি জ্বরসহ জলবসন্তদ্বারা আক্রান্ত হইয়া অতিশয়
কষ্ট পাইতে লাগিলেন। হরিদ্বারে যাইবার সংকল্প কাৰ্য্যে
পরিণত করিতে না পারিয়া তাহার অত্যন্ত মনস্তাপ হইতে
লাগিল। মুখে এবং বুকে অসংখ্য বড় বড় গুটি উঠায় তিনি
অত্যন্ত কাতর হইয়া পড়িলেন। একদিন রাত্রি আটটার
সময় তিনি ভােলানন্দের নিকট কাতর প্রার্থনা করিয়া
বলিলেন—“ঠাকুর! হরিদ্বারে যাইতে অক্ষম হওয়ায় আমার
যে মনস্তাপ হইয়াছে, তাহা যেন সহ্য করিতে পারি।” সেই
রাত্রিতেই তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হইলেন এবং শেষ কুম্ভমানের
পূৰ্বে হরিদ্বারে উপনীত হইয়া সুদীর্ঘ তিন মাস কাল ভােলা-
নন্দের সেবায় অতিবাহিত করিলেন।
ভক্তবাঞ্ছা-কল্পতরু ভােলানন্দ
হঠাৎ সােমেশের মৃত স্ত্রী আসিয়া আসনে উপবেশন
করিলেন। ভােলানন্দ সােমেশকে স্ত্রীর অঙ্গ স্পর্শ করিতে
নিষেধ করিয়া উভয়কে দীক্ষা প্রদান করিতেই স্ত্রী অন্তৰ্হিতা
হইলেন।
প্রসিদ্ধ গণিততত্ত্ববিৎ শ্ৰীমান্ সােমেশচন্দ্র বসুর স্ত্রী
অদীক্ষিত অবস্থায় অকালে কালগ্রাসে পতিত হন। স্ত্রীর
শ্ৰীশ্ৰীভােলানন্দ-প্রসঙ্গ প্রতি আসক্ত-চিত্ত সােমেশ প্রেমের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনপূর্বক দ্বিতীয়বার দারপরিগ্রহ করিলেন না। স্ত্রী অদীক্ষিত অবস্থায় মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছে, স্মরণ করিয়া সােমেশ মৃত স্ত্রীর সহিত একত্রে দীক্ষা প্রদান করিতে সমর্থ এমন গুরুর অন্বেষণে নানা স্থানে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। কিন্তু কোথাও মনােমত গুরু লাভ করিতে পারিলেন না। অবশেষে ১৩২৬ সন ১৪ই বৈশাখ, হরিদ্বারে ভােলানন্দের নিকট উপনীত হইয়া স্বীয় মনােবাঞ্ছা জ্ঞাপন করিলেন। ভােলানন্দ বলিলেন-“আচ্ছা হাে জায়গা, ঘাবড়াও মৎ” ভােলানন্দের আদেশানুযায়ী দীক্ষাগৃহে তিনটি আসন স্থাপিত হইল। ভােলানন্দের সহিত সােমেশ দীক্ষাগৃহে প্রবেশ করিয়া আসনে উপবেশন করিলেন। পরক্ষণেই শােমেশের মৃত স্ত্রী আসিয়া তৃতীয় আসনটিতে উপবিষ্ট হইলেন। বিস্ময়ােৎ- ফুল্ল লােচনে সােমেশ স্ত্রীর প্রতি পুনঃপুনঃ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন—দেখিলেন, তাঁহার স্ত্রীই বটে। সােমেশ ভােলানন্দকে ভগবানের সচল বিগ্ৰহজ্ঞানে ভক্তিতে আপ্লুত হইলেন তাঁহার জীবনের নূতন অধ্যায় আরম্ভ হইল ; কঠোর ব্রহ্মচর্য অবলম্বন পূর্বক সাধন-ভজনে অবশিষ্ট জীবন অতিবাহিত করিতে তিনি কৃতসংকল্প হইলেন। * আচ্ছা, হয়ে যাবে, অস্থির হইও না ;
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
[ ১ ]
দিব্যজ্যোতির্ময় ভােলানন্দ
হঠাৎ ভােলানন্দের দেহ হইতে দিব্য জ্যোতি নির্গত
হইয়া গৃহটিকে বিদ্যুতালােকে আলােকিত করিল—তাহা
দেখিয়া শশিকান্তের চক্ষু ঝলসিয়া গেল। বলা বাহুল্য, সে
সময় ঘরে একটিমাত্র প্রদীপ মিটু-মিট্ করিয়া জ্বলিতেছিল।
ভােলানন্দ সে বৎসর কলিকাতায় ২১১ নং হারিসন
রােডে অবস্থান করিতেছিলেন। দীক্ষাগ্রহণ মানসে
বরিশালের উকীল শ্ৰীমান শশিকান্ত গুপ্ত এম,
এ,
বি, এল, ভােলানন্দের নিকট উপস্থিত হন। দীক্ষাপ্রাপ্ত
হইবার পূর্বদিন আরতি স্তোত্রাদি পাঠান্তে ভােলানন্দ
সমাগত সকলকে মধুর উপদেশ প্রদান করিতে লাগিলেন।
সেদিন জনৈক মাড়ওয়ারী ভদ্রলােকের গৃহ হইতে প্রচুর
আহাৰ্য্য জিনিষ আসিয়াছিল। সকলেই ছাদে বসিয়া প্রসাদ
পাইলেন। সকলকে শশিকান্তের জন্য কিছু প্রসাদ রাখিতে
বলিয়া ভােলানন্দ তাঁহাকে নিজের কাছে বসিতে আদেশ
করিলেন। রাত্রি অধিক হওয়ায় সমাগত ভক্তবৃন্দ বিদায়
শ্ৰীশ্ৰীভােলান-প্রসঙ্গ ; গ্রহণ করিলেন। ভােলানন্দ ও শশিকান্ত এক ঘরেই উপবিষ্ট রহিলেন। ভােলানন্দ রাত্রি বারােটা পর্যন্ত শশিকান্তকে উপদেশ প্রদান করিলেন, পশ্চাৎ তাহাকে মুহুর্মুহুঃ আলিঙ্গন করিতে লাগিলেন; তাহার চক্ষুঃ হইতে বিগলিত ধারায় স্নেহাশ্রুবারি বহির্গত হইতে লাগিল। শশিকান্ত তখন আনন্দের আতিশয্যে নিজেকে পর্যন্ত বিস্মৃত হইলেন। স্নেহ, এত আদর, এত গৌরব তিনি জীবনে কখনও অনুভব করেন নাই। হঠাৎ গৃহটিকে বিদ্যুতালােকে আলােকিত দেখিয়া শশিকান্ত স্তম্ভিত ও বিস্মিত হইলেন। তখন তিনি ইহার অর্থ হৃদয়ঙ্গম করিতে পারেন নাই। পশ্চাৎ বুঝিতে পারিলেন, তাহার কঠিন হৃদয়কে একটু নরম করিবার জন্যই এবম্প্রকার ব্যবস্থা করা হইয়াছে। ঐ সময় [ ২ ] নবীন সাধকহৃদয়ে আশা-সঞ্চারকারী ভােলানন্দ ভােলানন্দের রূপধ্যানে ও তৎকর্তৃক প্রদত্ত মন্ত্রজপে নিমগ্ন দ্বিজেন্দ্র স্বীয় ললাটে ‘চন্দ্রকোটিসুশীতল’ দিব্যজ্যোতি দর্শন করিয়া আনন্দে বিহাল হইলেন। আসাম তেজপুর বনবিভাগের ই, এ, সি, শ্রীমান্ দ্বিজেন্দ্র- নাথ দে হরিদ্বারে ভােলানন্দের নিকট হইতে দীক্ষা ও উপদেশ গ্রহণপূর্বক কর্মস্থল তেজপুরে গমন করিয়া প্রগাঢ় শ্রদ্ধা ও
৮৭
নবীন সাধকহৃদয়ে আশাসঞ্চারকারী ভােলানন্দ
বিশ্বাসের সহিত অসীম উদ্যমে সাধন-ভজনে রত হইলেন।
ভােলানন্দের উপদেশানুযায়ী গুরুমূৰ্ত্তি ধ্যান ও প্রাণায়ামসহ
নাম জপ করিতে লাগিলেন। কতিপয় দিবস সাধন
করিতেই হঠাৎ দিব্যদর্শন লাভ করিয়া তিনি আনন্দে
আত্মহারা হইলেন।
হইলেন। আনন্দের আতিশয্যে তিনি অধিকতর
কঠোর সাধনে ব্যাপৃত হইলেন। জপ ও প্রাণায়ামের সংখ্যা
গুরুনির্ধারিত সংখ্যাকেও অতিক্রম করিল। অত্যধিক
প্রাণায়ামে তিনি মাথায় যন্ত্রণা অনুভব করিতে লাগিলেন।
স্বীয় অবস্থা বিবৃত করিয়া তিনি হরিদ্বারে ভােলানন্দকে পত্র
দিলেন। ভােলানন্দ
ভােলানন্দ তদুত্তরে লিখিলেন -
“প্রাণায়াম সম্প্রতি পরিত্যাগ করিয়া শুধু ইষ্টমন্ত্র জপ
অত্যধিক কিছুই ভাল নয়, সাধনও নিয়মিত ভাবে
করিতে হয়।
যুক্তাহারবিহারস্য যুক্তচেষ্টস্ কর্মসু।
যুক্তস্বপ্লববােধস্য যােগাে ভবতি দুঃখহা।
পরিমিত আহার-বিহারশীল, কর্মে নিয়মিত চেষ্টাবান
ও নিয়মিত নিদ্রাজাগরণশীলের যােগ দুঃখ হরণ করিতে
সক্ষম হয়। মাথার উপর মাখন রাখ ও মিশ্রী, মাখন, বাদাম
প্রভৃতি পুষ্টিকর সাত্ত্বিক দ্রব্য আহার কর। মস্তিষ্কের
যন্ত্রণার সম্পূর্ণরূপে উপশম হইলে পুনরায় প্রাণায়াম আরম্ভ
করিও, কিন্তু তখনও প্রত্যেক তিনমালার পর অর্ধঘণ্টা
শ্ৰীশ্ৰীভােলান-প্রসঙ্গ
বিশ্রাম করিও, এই ভাবে নয় মালা জপ করিতে একঘণ্টা
বিশ্রাম করিও; নতুবা পুনরায় এবকার যন্ত্রণা হইতে
পারে।”
[ ৩ ]
ভক্তের মানরক্ষক ভােলানন্দ
.
বিশেষ গভীর ভাবে ভােলানন্দের ধ্যান করিতে করিতে
সােমেশ সেই জেল-কক্ষেই ভােলানন্দকে দেখিতে পাইলেন
-তাহার নাসিকার উভয় পার্শ্বে ৬ ও ৫ এই দুইটি অক্ষর
দৃষ্টিগােচর হইল। ভােলানন্দের অন্তর্ধানের পরক্ষণেই
সােমেশ উপস্থিত সাহেবটিকে বলিলেন—“তােমার বয়স
৬৫ বৎসর।
তখন ১৯২২ খৃষ্টাব্দ। গণিতজ্ঞ শ্ৰীমান্ সােমেশচন্দ্র
বসু অর্থোপার্জন মানসে সুদূর আমেরিকায় উপস্থিত
সেখানে শুধু দুগ্ধ পান করিয়া তিনি দিন যাপন
করিতেন, কদাচিৎ সামান্য ফল গ্রহণ করিতেন এবং প্রত্যেক
মাসে কয়েকদিন উপবাসে অতিবাহিত করিতেন। এই
প্রকার যৎসামান্য খাদ্য গ্রহণ পূর্বক কি ভাবে শরীর সম্পূর্ণ
নিরাময় রাখে ও বড় বড় অঙ্ক মুখে মুখে কষিয়া থাকে এবং
কেনই বা এ প্রকার সামান্য আহার করে—এই প্রশ্নের
সমাধান করিতে অক্ষম হইয়া কানাডা গভর্ণমেন্ট সন্দেহে
তাঁহাকে কানাডার জেলে দেড়মাস আবদ্ধ রাখিয়াছিল ;
হইলেন।
ভক্তের মানরক্ষক ভােলানন্দ
অবশেষে ‘অর্থোপার্জন করিতে পারিবে না এই প্রতিজ্ঞায়
আবদ্ধ করিয়া তাহাকে জেল হইতে মুক্ত করিয়া দেয়।
জেলে আবদ্ধ থাকার সময় একদিন একজন গার্ড তাহার
( গার্ডের) বয়স বলিবার জন্য সােমেশকে সনির্বন্ধ অনুরােধ
করিল।
সােমেশ বলিলেন—“অপরের বয়স আমি কি
প্রকারে বলিব।” কিন্তু গার্ডের দৃঢ় বিশ্বাস, তিনি ইচ্ছা
করিলেই বয়স বলিতে পারেন। এক ঘণ্টা অনুরােধের
পরও যখন সােমেশ বয়স বলিতে রাজী হইলেন না, তখন
সে একখানা চেয়ার লইয়া সােমেশের নিকট উপবেশন করিয়া
বলিল-“আপনি আমার বয়স না বলা পর্যন্ত আমি এখান
হইতে উঠিব না, আহারাদিও করিব না।” সােমেশ
মহামুস্কিলে পড়িলেন। গুরুদেব ভােলানন্দকে স্মরণ করিয়া
বলিলেন--“গুরুদেব । বিদেশে এসেছিলেম অর্থোপার্জন
করতে-জেলে আবদ্ধ রেখে আমার সে পথ বন্ধ করে
দিয়েই।
এখন জেল হতে
হতে মুক্তিলাভ করতে পারলেই
বাঁচি।
এমতাবস্থায় বিদেশে এতগুলি লােকের সম্মুখে
চেহারা দৃষ্টে অপরের বয়স বলা, যে বিদ্যা, আমি জ্ঞাত
নহি—সে সম্বন্ধে প্রশ্ন করিয়ে আমাকে বিব্রত করছ
কেন ?” এই প্রকার চিন্তার পরেই তিনি গভীর ধ্যানে মগ্ন
হইয়া গাছের বয়স বলিয়া দিলেন ; তাহা সম্পূর্ণরূপে সত্য
হইয়াছিল। এই ঘটনায় সােমেশের সেখানে একটু
প্রতিপত্তি ও নাম হইল।
;
শ্ৰীশ্ৰভােলান-প্রসঙ্গ [ ৪ ] শিবরূপী ভােলানন্দ ভােলানন্দের রূপ-ধ্যানে মগ্ন সাধক দেখিলেন, ভােলানন্দের স্থানে দিব্য শিবমূর্তি দণ্ডায়মান। আনন্দের আতিশয্যে তিনি ভােলান-প্রদত্ত ইষ্টমন্ত্র জপ ও রূপধ্যানে অধিকতর মগ্ন হইলেন। রাত্রি কোথা দিয়া যাইতেছে, সে- দিকে তঁাহার আদৌ দৃষ্টি নাই। সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অজ্ঞ সাধক * হরিদ্বারে ভােলানন্দ হইতে দীক্ষা ও ব্রহ্মচর্য গ্রহণ পুৰ্ব্বক অধিকতর সাধনে মগ্ন হইবার প্রবল আকাঙক্ষায় হৃষীকেশ স্বর্গাশ্রমে প্রায় পাঁচ মাস অতিবাহিত করিলেন। কিন্তু সেখানেও বিশেষ কোন উন্নতি লাভ করিতে না পারিয়া কিংকর্তব্য- বিমূঢ় হইয়া পড়িলেন। স্বর্গাশ্রমস্থিত কতিপয় বাঙালী সাধু সাধককে হরিদ্বারে ভােলানন্দের নিকট অবস্থান করিবার জন্য উপদেশ দিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে গুরুতত্ত্ব সম্বন্ধে কিছু বিবৃত করিলেন। গুরুতত্ত্বের একটু আভাস প্রাপ্ত হইয়া সাধক ভােলানন্দের নিকট অবস্থান করিবার মানসে পুনরায় হরিদ্বারে উপনীত হইলেন। * এ ব্যক্তি লেখকের বিশেষ পরিচিত, কিন্তু তিনি নাম প্রকাশ করিতে অনিচ্ছুক, সুতরাং তাহাকে সাধক নামে অভিহিত করিলাম।
শিবরূপী ভােলানন্দ
১১
গুরুব্রহ্মা গুরুবিষ্ণু গুরুদেবব মহেশ্বরঃ
গুরুরেব পরং ব্রহ্ম তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ ।
এই শ্লোকটির যাথার্থ্য উপলব্ধি করিবার মানসে সাধক
ভােলানন্দকে কখনও নারায়ণ, কখনও বা শিবভাবে দর্শন
করিতে প্রয়াস পাইলেন। কিন্তু তাহাতেও কোন শান্তি
লাভ করিতে না পারিয়া এবং কোন্ মূর্তির ধ্যান করা কর্তব্য
তাহা সম্যক্ বুঝিতে অক্ষম হইয়া তিনি ভােলানন্দের
শরণাগত হইলেন। সাধক দ্বারা পৃষ্ট হইয়া ভােলানন্দ
বলিলেন—“গুরুমূৰ্ত্তির ধ্যান কর।” গুরুবাক্যে শ্রদ্ধা ও
বিশ্বাস স্থাপনপূর্বক সাধক সে রাত্রে ভােলানন্দের রূপ ধ্যান
ও ভােলান-প্রদত্ত মন্ত্র জপ করিতে লাগিলেন। শিবরূপী
ভােলানন্দের ধ্যানে মগ্ন সাধকের হৃদয়ে সে রাত্রে আনন্দের
ধারা প্রবাহিত হইল। রাত্রি তখন দুইটা বাজিয়াছে, তবুও
সাধকের সেদিকে দৃষ্টি নাই; সে তন্দ্রা, নিদ্রা, আলস্য,
জড়তা যেন মুহূর্তে কোথায় অন্তর্হিত হইল—অনির্বচনীয়
আনন্দে সাধক বিভাের হইয়া রহিলেন। পরদিন প্রত্যুষে
ভােলানন্দকে দর্শন করিতেই সাধকের
হৃদয়ে দ্বিগুণ
আনন্দধারা বহিতে লাগিল। তখনও ভােলানন্দকে তিনি
শিবভাবেই দেখিতে পাইলেন। ভােলানন্দ সাধককে
ডাকিলেন,—“.•••••এই নে চারটি পয়সা, ঐ গরীবকে
দিয়ে আয়।” সাধক ভােলানন্দকে দর্শন ও তঁাহার বাক্য
পালন করিতে পারিয়া নিজেকে কৃত-কৃতার্থ মনে করিতে
এভােলানন্দ-প্রসঙ্গ
লাগিলেন। কিন্তু হায় বৈষ্ণবী মায়া। তারপর ধীরে ধীরে
সাধকের সে ভাব নষ্ট হইতে লাগিল—গুরুকে একদিনের
জন্যও তিনি আর সেভাবে দেখিতে বা উপলব্ধি করিতে
পারিলেন না। ভবিতব্য ভগবানের হাতে।
[ ৫ ]
বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তিতে ভােলানন্দ
ভােলানন্দের রূপ-ধ্যানে
মগ্ন শ্ৰীমতী -দেখিতে
পাইলেন, ভােলানন্দের স্থানে বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি খেলা
করিতেছেন।
জিলা সিলেট, হবিগঞ্জ-নিবাসিনী শ্ৰীমতী -১৩৩৩
সালের হরিদ্বার
কুম্ভ
হইতে প্রত্যাবর্তনের পর নূতন
উদ্যমে
সাধন-ভজনে ব্যাপৃত হইলেন। তিনি গুরুদেব ভােলানকেই
ইষ্টবােধে ধ্যান করিতে লাগিলেন। জপে বসিতেই মন স্থির
হওয়ার পর বিভিন্নভাবের মূর্তি তাহার দৃষ্টিপথে পতিত হইতে
লাগিল। একদিন দেখিলেন, তঁাহার দক্ষিণ পার্শ্বে গেরুয়া-
পরিহিত একজন দিব্যমূৰ্ত্তি সন্ন্যাসী দণ্ডায়মান। অপর দিন
দেখিতে পাইলেন, তঁাহার বামপার্শ্বে ব্রহ্মচারিবেশে কেহ
ধ্যাননিমীলিত নেত্রে বসিয়া আছেন। একদিন দেখিলেন,
সম্মুখে একজন স্ত্রীলােক (দেবী) দাড়াইয়া আছেন।
অপর দিন দেখিলেন, দুইটি শিশু সাক্ষাতে বসিয়া খেলা
বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তিতে ভােলানন্দ
করিতেছেন। একদিন দেখিতে পাইলেন, শ্রীকৃষ্ণ দোলায়
ঝুলিতেছেন ও বাঁশী বাজাইতেছেন। অপর দিন দেখিলেন,
শ্রীকৃষ্ণের নাভি হইতে একটি পদ্মফুল বাহির হইয়াছে।
একদিন কতকগুলি সৰ্পকে ফণাবিস্তার পূৰ্ব্বক সম্মুখে দণ্ডায়-
মান দেখিতে পাইলেন। অন্যদিন মৃত মনুষ্যের ন্যায় একটি
বিকট মূর্তি তাহার দৃষ্টি-পথে পতিত হইল। দুই দিন তাহার
নিজের আকৃতিকেই সম্মুখে দণ্ডায়মান দেখিতে পাইলেন।
অন্য দিন দেখিলেন, গােপালবেশে শ্রীকৃষ্ণ হামাগুড়ি দিতেছেন।
একদিন স্তোত্রপাঠ করিতে করিতে যখন ‘কপূরগৌরং এই
শব্দটি আবৃত্তি করিতেছিলেন, তখন মনে হইল ‘ভােলানন্দ
কি কপূর-গৌরং’-ইহা মনে হইতেই তাঁহার দেহ-মন সমস্ত
ভুল হইয়া গেল এবং কপালে ঠিক হৃদ্বয়ের মাঝে কপূরের
মত বর্ণ এক মূর্তি দৃষ্ট হইল—শিব, দুর্গা, কৃষ্ণ প্রভৃতি কোন
মূর্তির সহিতই তাহার সামঞ্জস্য নাই। এ সকল দেখিয়া
তিনি আনন্দে উৎফুল্ল হইয়া হরিদ্বারে ভােলানন্দকে পত্র
দিলেন :-
শ্ৰীশ্ৰচরণকমলেষু !•••
| ০ ০
বাবা! এসব দেখে আমার মনে হয়, তুমিই সৰ্বজীবে
আছ, তুমিই আমার দেহে আছ। তুমিই ত পরব্রহ্মস্বরূপ আত্মা,
আত্মা ত সৰ্ব্ব জীবেই অবস্থিত, তাহা আমাকে বুঝাইবার জন্যই নানা
ভাবে দেখা দিতেছ। তুমি যে শুধু তােমার দেহমূর্তিতে বিরাজমান,
১৪
শ্ৰীশ্ৰভােলানন্দ-প্রসঙ্গ
;
এটি আমার ভুল ধারণা। বাবা, এই সব কি, আমাকে বুঝাইয়া
দাও। বাবা ! মন স্থির হলে মাঝে মাঝে নানা প্রকার শ্লোক শুনিতে
পাই, আমি বুঝিও না, মনেও রাখিতে পারি না। কোন কোন দিন
নিদ্রিতাবস্থায় গুরুগীতা পাঠ করিতে থাকি, গান করি—আবার আমার
কর্ণেই সে সব বেশ শুনিতে পাই; এই সব কি ভ্রান্তি ?
বাবা !
তােমার পূজায় বসিলে কঁদিতেই ভাল লাগে, পূজা কি করিব,
পূজা ত জানি না—কার পূজা করিব? তুমি ত অন্তরের ধন, অন্তরেই
রয়েছ, অন্তরের ধনকে কি দিয়ে পূজিব ? পত্র পুষ্প দ্বারা তােমার
পূজা করা বিড়ম্বনা মাত্র। বাবা! কবে প্রাণ ভরিয়া অন্তরের সহিত
তােমার পূজা করিতে পারিব, কবে এই দেহ-মন তােমার শ্রীচরণে
অৰ্পণ করিতে পারিব ? বাবা! মিথ্যা মায়ায় আর ভুলাইয়া
রাখিও না।
ভােলানন্দ চিঠির উত্তরে লিখিলেন --
কল্যাণীয়া পুত্রী।
তােমরা আমার নারায়ণ আশীৰ্ব্বাদ জানিবে। যাহা
কিছু শুনিতেছ, সব সত্য, যাহা কিছু দেখিতেছ, সকলই ভােমার
ইষ্টদেব—পরমেশ্বর।
শ্রীশ্রীভােলানন্দ-প্রসঙ্গ সমাপ্ত।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.