Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Thakur Ramakrishna Ed. 4th
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
ek sites
W
৭৯৯ - ১ - l + L = = =
iiii
রামকৃষ্ণ
২
রোরই
No text on this page.
তিন-আনা সংস্করণ “কল্পতরু” গ্রন্থাবলী নং ৬
বঙ্গ প্রেসিডেন্সীর শিক্ষাবিভাগের ডিরেক্টার বাহাদুর কর্তৃক
লাইব্রেরী ও প্রাইভের জন্য নির্দিষ্ট।
(কলিকাতা গেজেট, ১৩ই আগষ্ট, ১৯১৯)
কাকু ৰামকৃষ্ণ
“য যদাচরতি শ্রেষ্ঠত্তদেবেতরে। জন।
স যৎ প্রমাণ কুরুতে লােকশুদবতে ॥”
"Lives of great men all remind us
We can make our lives sublime.
বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন, সম্রাট পঞ্চমজৰ্জ প্রভৃতি রচয়িতা
শ্রীদেবেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য প্রণীত
চতুর্থ সংস্কর
ভট্টাচাৰ্য্য এণ্ড সন্
কলিকাতা, ঢাকা ও ময়মনসিংহ
১৩৩২
মূল্য
তিন আনা
কলিকাতা
৬৫ নং কলেজ স্ট্রীট, ভট্টাচার্য। এণ্ড সন্ এর পুস্তকালয় হইতে
দেবেন্দ্রনাথ ভট্টাচাৰ্য কর্তৃক প্রকাশিত
এবং
১০৮ নং নারিকেলডাঙ্গা মেন্ রােড, স্বর্ণপ্রেসে
শ্ৰীকৰুণাময় আচাৰ্য কর্তৃক মুদ্রিত।
No text on this page.
No text on this page.
ঠাকুর রামকৃষ্ণ প্রথম পরিচ্ছেদ ধার্মিক দম্পতি বিজন বনে, গাছের ডালে সৌরভময় ফুলটি ফুটিয়া থাকার চেয়ে, দেবতার চরণে অঞ্জলি দিলে তাহার যেমন সৌন্দর্য ও সমাদর বৃদ্ধি পায়, তেমনি যাহারা মহৎ-যাহারা উচ্চ, যাঁহারা পূজনীয়—তাহারা যদি সংসারে সৰ্বসাধাৰণ মনুষ্য জাতির উপকার ও উন্নতির জন্য বন্ধুর মত চেষ্টা করেন, তাহাতে তাহাদের গৌরব এবং সম্মান শত গুণ বাড়িয়া থাকে। যিনি যত বড়–যত মহৎ- যত উচুদরের লােক হউক না কেন তিনি যদি দরিদ্রের দুঃখে দুঃখিত না হন, তিনি যদি আৰ্ত্তের চক্ষের জল মুছাইবার চেষ্টা না করেন, তিনি যদি নিজের অপেক্ষা হীন ভাবিয়া সংসারের অন্য সকলকে ঘৃণা করেন, তবে তিনি মনুষ্য নামের যােগ্য নহেন। তঁাহার সম্মান মিথ্যা, গৌরব মিথ্যা, নাম, যশ, খ্যাতি, অর্থ, সম্পদ সমস্তই বৃথা নষ্ট হইয়া যায়। সেই জন্যই পরদুঃখকাতর-পরহিতৈষী, স্বার্থত্যাগী ব্যক্তিগণ এ সংসারে মহাপুরুষ বলিয়া দেবতার ন্যায় সম্মান, গৌরব, সমাদর ও খ্যাতি লাভ করিয়া থাকেন। লােকে চক্ষে দেবতা দেখিতে পায় না, তাহাদিগকেই দেবতা জ্ঞানে ভক্তি, সম্মান ও পূজা করিয়া ধন্য হয়। বর্ধমানের চৌদ্দ-পনের ক্রোশ দক্ষিণে ও জাহানাবাদের পাঁচ ছয় ক্রোশ পশ্চিমে ‘দেরে’গ্রাম। গ্রামখানি ক্ষুদ্র হইলেও—পরিষ্কার ১ ঠাকুর রামকৃষ্ণ = চ্ছিন্ন-ঝকঝকে তকতকে ছবিখানির মত সুন্দর। সে গ্রামে কয়েক ঘর সম্ভ্রান্ত ভদ্রলােকের বসবাস ছিল। তাহার মধ্যে ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়কে ধাৰ্মিক গৃহস্থ বলিয়া সকলেই সম্মান করিত। বেলা দুই প্রহর অতীত হইয়াছে, সূৰ্য্যদেব আকাশের মাঝ- খানে উঠিয়া আগুনের মত আগুনের মত তপ্তকিরণে পৃথিবী দগ্ধ করিতেছেন। গ্রামের অধিকাংশ লােকই মধ্যাহ্নের আহারাদি শেষ করিয়া বিশ্রাম করিতেছে, এমন সময়ে দূর গ্রাম হইতে একজন ব্রাহ্মণ আসিয়া চট্টো- পাধ্যায় মহাশয়ের বাড়ীতে অতিথি হইলেন। সহর জায়গায় যাহাদের বাস, তাঁহাদের বাড়ীতে যখনই লােক জন আসুক না কেন, তাহাদের কষ্টে পড়িতে বা ভাবিতে হয় না। কিন্তু দেরে’গ্রাম সামান্য পল্লীগ্রাম, দোকান-পাট থাকা দূরের কথা- সপ্তাহে একদিন ছাড়া দুইদিন হাট পর্যন্ত বসে না। গ্রামবাসীদের যাহার যা আবশ্যক—হাটবারে একেবারে এক সপ্তাহের মত কিনিয়া রাখে। সুতরাং সেখানে অসময়ে যদি কেহ গৃহে আসিয়া উপস্থিত হন, তাহা হইলে সকলকেই একটু চিন্তিত হইয়া পড়িতে হয়। সেই কারণে ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় এবং তাহার গৃহিণী চন্দ্রমণি ঠাকুরাণী-গ্রামবাসী অন্যান্য লােকের মত দুপুর বেলাতেই খাওয়া দাওয়া সারিয়া লইয়া নিশ্চিন্ত হইতে পারেন না। তাহার পরম ধাৰ্মিক, হিন্দু ব্রাহ্মণের গৃহে যা কিছু আচার আচরণ, ব্ৰত-নিয়ম, পূজা-পার্বণ পালন করা কর্তব্য তা পূর্ণমাত্রায় করিয়া থাকেন। গৃহে অতিথি আসিলে দেবতার মত সম্মান ও আদরে তাহার অভ্যর্থনা করিয়া সেবা ও পরিচর্যায় তুষ্ট করতঃ তবে আপনারা জলগ্রহণ করেন। দ্বারে ভিক্ষুক আসিলে—শত কৰ্ম্ম ফেলিয়া রাখিয়াও ছুটিয়া আসিয়া ভিক্ষা দিয়া বন। কোন প্রকারে প্রার্থী হইয়া কেহ আসিলে প্রাণ দিয়াও তাহার অভাব পূর্ণ করিতে চেষ্টা করিয়া থাকেন।
ধার্মিক দম্পতি ইহা ছাড়াও, পাড়াপ্রতিবাসীর রােগে শোকে দিবারাত্রি বিচার না করিয়া, গিয়া সেবা শুশ্রুষা করেন, লােকের দায়ে-আদায়ে, বিপদে-আপদে আপনার ছুটিয়া গিয়া বুক দিয়া পড়েন, কোন সুযোগে কাহারও বিন্দুমাত্র উপকার করিতে পারিলে তাহারা যেন আপনাদিগকে ধন্য জ্ঞান করিয়া থাকেন। তাহারা দরিদ্র-ঠাকুর পূজা করিয়া, যজমানের ক্রিয়া-কৰ্ম্ম করিয়া অতিকষ্টে কোনরূপে দিন যাপন করেন বটে, কিন্তু তাহারা পর-সেবার জন্য কাহারও নিকটে কি ছুমাত্র প্রত্যাশা করেন না। কেহ কিছু পুরস্কার দিতে আসিলে বা উপকারের প্রতিদান স্বরূপে কোন কিছু দিতে গেলে, অতি বিনীত নম্রভাবে তাহা প্রত্যাখ্যান করেন। এইরূপ স্বভাব দেখিয়—এমনতর নিস্বার্থ পরসেবাব্রতধারী বলিয়া সমস্ত দেরে গ্রামের এবং পার্শ্ববর্তী অন্যান্য গ্রামের সকলেই তাহাদিগকে পরম ভক্তি, শ্রদ্ধা ও সম্মানের চক্ষে দেখিয়া থাকে। ক্ষুদিরাম ও চন্দ্রমণি এমন সত্যপ্রিয়, ন্যায়বা ও কর্তব্যপরায়ণ দম্পতি যে, জীবনে কখনাে মিথ্যাকথা বলিতে জানেন না, প্রাণ গেলেও, প্রমেও কখনো অন্যায় কার্য করেন না—অন্যায় কথা বলেন না, এবং সর্বদাই সকলের প্রতি আপনাপন কর্তব্য পূর্ণমাত্রায় সম্পাদন করিতে চেষ্টা করেন। এই সব কারণে তাঁহাদের প্রতি লােকের এরূপ ভক্তি ও শ্রদ্ধা যে, বড় মানুষেরা টাকা দিয়াও যে কাৰ্য্য করাইতে পারেন না —তাহাদের মুখের কথাতেই সে কাজ দেখিতে দেখিতে হইয়া যায়। এতদ্ভিন্ন লােকের বিবাদ-বিসম্বাদ তাহাদের কথায় মিটিয়া যায়, গ্রামের দলাদলি তাহাদের মধ্যস্থতায় ভাঙ্গিয়া যায়, তঁাহার সালিশি করিয়া বিচার করিয়া দিলে সকলেই সন্তুষ্ট হইয়া সেই বিচার মানিয়া লয়—কেহ আর নালিশ করিবার জন্য আদালতে কিম্বা জমীদার বাড়ীতে ছুটিয়া যায় না।
ঠাকুর রামকৃষ্ণ সুতরাং দরিদ্র হইলেও সে গ্রামে চট্টোপাধ্যায় দম্পতির যত্ন, সমাদর ও খ্যাতি-প্রতিপত্তির অভাব ছিল না—পরম ধাৰ্মিক বলিয়া সকলেই তাঁহাদের ভক্তি, শ্রদ্ধা ও সম্মান করিতেন। সেদিন, অনেকক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা করিয়া থাকিয়াও, যখন আর কোন অতিথি আসিবার সম্ভাবনা রহিল না, তখন ক্ষুদিরাম আহারে বসিতে গেলেন। চন্দ্রমণি স্বামীর ভাত বাড়িয়া দিয়াছেন, ক্ষুদিরাম খাইতে বসিবেন এমন সময়ে দ্বারদেশে কে বলিল—“বাড়ীতে কে আছেন? অতিথি এসেছে গো!” আর খাওয়া হইল না, বাড়াভাত পড়িয়া রহিল, ক্ষুদিরাম শশব্যন্তে উঠিয়া গিয়া অতিথিকে আদর করিয়া ডাকিয়া আনিয়া বসাইলেন। তারপর স্বামী স্ত্রী দুইজনে মিলিয়া তাহার পরিচর্যা করিতে নিযুক্ত হইলেন। সে বাড়ীতে অতিথি যে প্রকার আদর যত্ন পাইলেন, সেরূপ বড়মানুষের বাড়ীতেও কখনাে পায় নাই, সুতরাং তিনি পরম সন্তুষ্ট হইলেন। অতিথি-সেবার পরে স্বামীকে খাওয়াইয়া চন্দ্রমণি যখন আপনি আহারে বসিতে গেলেন, তখন তঁাহার হুঁড়ি প্রায় শূন্য হইয়া গিয়াছিল। তিনি তাহা দেখিয়া বিন্দুমাত্রও দুঃখিত হইলেন না।--যা কিছু অবশিষ্ট পড়িয়াছিল, তাহাই সন্তুষ্টচিত্তে আহার করিলেন। অসময়ে অতিথির সৎকার করিতে পারিয়াছেন—সেই আনন্দেই আটখানা হইয়া জগদীশ্বরকে ধন্যবাদ দিলেন। বিকালে বিদায়ের সময়ে অতিথি বলিয়া গেলেন—“চাটুষে মশাই! আপনি দরিদ্র বটে, কিন্তু আপনার গৃহে যেরূপ ধর্মাচরণ দেখিলাম সেরূপ আর কোথাও দেখি নাই, জগদীশ্বর শীঘ্রই আপনার পুণ্যের পুরস্কার দিবেন। আপনার গৃহ, এক মহাপুরুষের আবির্ভাবে পুণ্যময় ও আজ যে গ্রামত্যাগ - ধন্য হইবে—দেবতার ন্যায় আপনার বংশ চিরকাল পৃথিবীর লােকের শ্রদ্ধা, সম্মান ও পূজা পাইবে। এ ব্রাহ্মণের কথা মিথ্যা হইবে না।” “ব্রাহ্মণের আশীৰ্বাদ বিফল হইবে না। সে যা হোক এই সামান্য দরিদ্রের গৃহে যে ক্ষুদ-কুঁড়া সেবা করিয়া আপনি তৃপ্ত হইয়াছেন- তাহাই আমার পরম পুরস্কার।” বলিয়া ক্ষুদিরাম বিনীতভাবে নমস্কার করিয়া ব্রাহ্মণকে বিদায় দিলেন। ভিতরে আসিয়া চন্দ্রমণিকে কহিলেন—“আজ নারায়ণ বড় রক্ষা করিয়াছেন। ভাগ্যে আমি আহার করি নাই, তাহা হইলে সে দুঃখ আর রাখিবার জায়গা থাকিত না। আজ তো ঘরে তেমন কিছুই ছিল , তবুও ব্রাহ্মণ আপন মহত্ত্বগুণে পরিতৃপ্ত হইয়া আশীৰ্বাদ করিয়া গিয়াছেন। শুনিয়া আনন্দে চন্দ্রমণির চক্ষে জল আসিল, কহিলেন-“প্রভু। তুমি স্বামী, দেবতা, আমার নারায়ণ—তােমার আশীর্বাদেই তােমার কাৰ্য্য করিতে পারিয়াছি। ব্রাহ্মণ যে সন্তুষ্ট হইয়া আশীৰ্বাদ করিয়াছেন— ইহাতেই ধন্য হইলাম।” দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। গ্রামগ এ সংসায় মহা-পরীক্ষার স্থল। জগতে সকলেই আপনাপন কাৰ্য্য অনুযায়ী স্বভাবের পরীক্ষা দিয়া সুখ-দুঃখ ভােগ করিয়া থাকে, কেহই এ পরীক্ষার হাত এড়াইয়া যাইতে পারে না। বিশেষতঃ ধার্মিক পুণ্যবান লােকের তাে পরীক্ষা পদে পদে। সােণাকে পুড়াইলে যেমন তাহার ময়লা নষ্ট হইয়া যায়, বিশুদ্ধ হইয়া ফল ঠাকুর রামকৃষ্ণ উজ্জল বর্ণ ধারণ করে, ভগবানও তেমনি সৎ লােককে পরীক্ষার অনলে দগ্ধ করিয়া তাহার মলিনতা-টুকু নষ্ট নষ্ট করিয়া তাহাকে উজ্জ্বল, গৌরবময়, আদরের বস্তু করিয়া তুলেন। সংসারে পুণ্য অপেক্ষা পাপের প্রলােভন অধিক, বিবেক অপেক্ষা রিপুর শক্তি প্রবল ; তাই সামান্য কারণে অতি সহজেই মানবের পা পদে পদে পিছলাইয়া নীচের দিকে নামিয়া যায় এবং একবার নামিতে আরম্ভ করিলে আর সহজে সামলাইয়া উঠিবার উপায় থাকে না। সেই কারণেই দয়াময় জগদীশ্বর বিবেকের দ্বারা পদে পদে তাহাকে সাবধান করিয়া দেন। কিন্তু মাকাল যেমন দেখিতে পরম সুন্দর, অত্যন্ত লােভনীয়—কিন্তু ভিতরটা অতি জঘন্য, কদৰ্য-তেমনি ভিতরে অতি ঘৃণার ব্যাপার থাকিলেও পাপের উপরটা অত্যন্ত উজ্জল—চাকচিক্যময় বলিয়া মানুষ তাহার বাহ্যিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হইয়া লােভে পড়িয়া যায় এবং ভিতরে কি আছে-না আছে, না জানিয়াই কেবলমাত্র উপরের শোভায় ভুলিয়া তাহার দাস হইয়া পড়ে এবং দিনে দিনে রসাতলে যায়,- দিবারাত্রি বিবেকের সহস্র তিরস্কার খাইয়াও সে প্রলােভনের হাত এড়াইতে পারে না। কিন্তু যিনি সচ্চরিত্র, ধাৰ্ম্মিক, এক মুহূর্তের জন্যও বিবেকের আদেশ ঘন করিতে পারেন না। সুতরাং সহস্র প্রকারের পাপ-প্রলােভনেও তিনি আত্মবিস্মৃত হন না। সেই কারণেই ভগবান ধার্মিক লােককেই পদে পদে পাপের প্রলােভনে নিক্ষেপ করিয়া দেখেন যে, তাহাতে সে বিচলিত হয় কি না। তাই এ সংসারে পাপী, অধাৰ্মিক ব্যক্তির অপেক্ষা ধার্মিককে পদে পদে নানা বিপদ-নানা প্রলােভনে পড়িয়া আপন মনের বল ও কর্তব্য এবং ধৰ্ম্ম-নিষ্ঠার পরীক্ষা দিতে হয়। যিনি সংসারের এই সকল ভীষণ পরীক্ষায় বিন্দুমাত্র বিন্দুমাত্র বিচলিত না হইয়া উত্তীর্ণ হইতে পারেন, দয়াময় সাধু তিনি গ্রামত্যাগ জগদীশ্বর পরিণামে তাহাকে অমূল্য বস্তু পুরস্কার দিয়া তাহার সম্মান ও গৌরব বৃদ্ধি করিয়া থাকেন। পরম ধাৰ্ম্মিক—নিষ্ঠাবান্—সাধু চরিত্র ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়েরও এক মহা পরীক্ষার দিন উপস্থিত হইল। ‘দেরে গ্রামের জমিদারের সহিত অন্য এক ব্যক্তির বিষয়- সম্পত্তি লইয়া একটা ভয়ানক মােকদ্দমা বাধিল। উভয় পক্ষেরই জলের মত অর্থব্যয় হইতে লাগিল। প্রত্যেক পক্ষই বিপক্ষকে হারাইয়া মােক দমা জিতিবার জন্য যত প্রকারের তদ্বির করা আবশ্যক, করিতে লাগিল। দুই পক্ষেরই এমন জিদ চাপিয়া গেল যে, যেমন করিয়া হউক—ছলে বলে, কলে-কৌশলে, অর্থে-সামর্থে- যে কোন প্রকারে বিপক্ষকে হারাইতে হইবে। সুতরাং দুই পক্ষেই উদ্যোগ আয়ােজনের ধূম পড়িয়া গেল। অনেকদিন ধরিয়া মােকদ্দমা চলিতে লাগিল, কোনরূপ মীমাংসা হইল না। কোন্ পক্ষ যে হারিবে আর কোন্ পক্ষ যে জিতিবে তাহার নিশ্চয়তা রহিল না। তখন জমিদার পক্ষীয় উকীল-ব্যারিষ্টার প্রভৃতি পরামর্শ দিলেন যে—“গ্রামের মধ্যে ধাৰ্মিক, ন্যায়পরায়ণ, সত্যবাদী বলিয়া যাহার খ্যাতি আছে, সেই ব্যক্তিকে আনিয়া যদি এই মােকদ্দমায় সাক্ষ্য দেওয়াইতে পারেন এবং যদি তিনি আপনার দিকে টানিয়া বলেন, তবেই এ মােকদ্দমায় আমরা নিশ্চয় জিততে পারি, নচেৎ হারিবার সম্ভাবনা অধিক।” তখন জমিদার গ্রামের ভিতরে সেই প্রকার ব্যক্তির অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। সকলেই এক বাক্যে তাহাকে কহিলেন যে “ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের মত যথার্থ ধাৰ্মিক, সাধু, সচ্চরিত্র, ন্যায়বান এবং সত্যবাদী পুরুষ-এ গ্রামে কেন, এ জেলার ভিতরে আর কেহ আছে কি না সন্দেহ। তিনি যদি আপনাদের হইয়া ঠাকুর রামকৃষ্ণ সাক্ষ্য দিয়া আসেন, তাহা হইলে আপনি নিশ্চয়ই মােকদ্দমায় জয়লাভ করিবেন।” শুনিয়া জমিদার বাবু আশায় নাচিয়া উঠিলেন,—ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় অতি দরিদ্র, মাসের মধ্যে ত্রিশ দিন দুইবেলা অন্ন জুটে কি না সন্দেহ, সুতরাং তাহাকে হাত করিতে যে বিলম্ব হইবে না তাহা তিনি মনে মনে স্থির করিয়াই রাখিলেন। কিন্তু গ্রামের সকলেই পরম্প বলাবলি করিল যে—“ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় না খাইতে পাইলে ভিক্ষা করিবেন-অনাহারে মরিবেন, তবু সে অর্থলােভে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়া আসিবেন, ইহা সম্ভব নয়।” দুই একজন লােক যে জমিদার বাবুকেও ওরূপ কথা না বলিল এমন নয়, কিন্তু তিনি সে কথা হাসিয়া উড়াইয়া দিলেন, কহিলেন— “ওহে, জান না, অন্ন-চিন্তা বড় ভয়ঙ্কর বস্তু। যাহার খাইবার পরিবার ভাবনা নাই সে ব্যক্তি অনায়াসেই সাধুগিরি দেখাইতে পারে, অর্থের লোভ সামলাইতে পারে, মিথ্যা কথা না বলিতে পারে, কিন্তু যাহার ঘরে নিত্য হাহাকার—দুইবেলা উনান জ্বলে না, সে টাকা পাইলে অনায়াসেই হাসিতে হাসিতে সকল প্রকার কাৰ্য্যই করিতে পারে। বিশেষ, সে যখন আমার প্রজা-তখন যে আমার হইয়া তাহাকে সাক্ষ্য দেওয়াইতে পারি, তাহাতে সন্দেহ নাই। কুমীরের সঙ্গে ঝগড়া করিয়া কেহই জলে বাস করিতে পারে না, সাক্ষ্য না দিয়া ক্ষুদিরাম যাইবে কোথায়?” জমিদার বাবু ক্ষুদিরামকে ডাকাইয়া তাহার পক্ষে সাক্ষ্য দিবার জন্য বলিলেন। ক্ষুদিরাম দেখিলেন যে, মহা বিপদ উপস্থিত। তিনি জমিদারের প্রজা, সাক্ষ্য না দিয়া তাহার পরিত্রাণ পাইবার উপায় নাই, জমিদার বাবু রাগ করিলে যাহা ইচ্ছা করিতে পারেন। তিনি দীনদরিদ্র ব্রাহ্মণ, অত বড় জমিদারের বিরুদ্ধে নিজেকে রক্ষা করিতে পারিবেন না।
আমত্যাগ এদিকে সাক্ষ্য দিলে—মিথ্যা কথা বলা হয়, তাহাতে নিরপরাধ বিপক্ষ পক্ষের অত্যন্ত অনিষ্ট হইতে পারে। তিনি জানিয়া শুনিয়া কি করিয়া মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়া একজনের সর্বনাশ করিবেন ? ক্ষুদিরাম ভাবনায় অকূল সাগরে ভাসিতে লাগিলেন। এদিকে জমিদার বাবু তাহাকে যেমন পীড়াপীড়ি করিতে লাগিলেন, তেমনই নানাপ্রকার প্রলােভন দেখাইতে আরম্ভ করিলেন। তিনি ক্ষুদিরামের বাকী-খাজানা মাপ করিবেন, উপরন্তু যত টাকা চাহেন—তাহাই দিবেন, তাহাকে আরও জায়গা-জমি দিবেন, নিষ্কর ব্রহ্মোত্তর দিবেন, তাহার দুঃখ ঘুচাইবেন। ক্ষুদিরামকে আর অন্ন বস্ত্রের জন্য হা-হা করিয়া বেড়াইতে হইবে না। প্রলােভন অত্যন্ত গুরুতর! বিশেষ ক্ষুদিরামের মত দীন দরিদ্র ব্রাহ্মণের পক্ষে। অন্য কেহ হইলে এত প্রলােভন কখনই ত্যাগ করিতে পারিত না, কিন্তু ক্ষুদিরাম হঠাৎ কিছুই উত্তর দিতে পারিলেন না। ভাবিতে ভাবিতে গৃহে আসিয়া পত্নীকে সকল কথা শুনাইয়া কহিলেন- “এক্ষণে কি করা কর্তব্য বল দেখি ?” স্ত্রী উত্তর করিলেন—“তুমি স্বামী-দেবতা, তােমার ইচ্ছা অনিচ্ছার উপরে আমি কি কিছু বলিতে পারি? তবে আমার মনে হয় যে ধৰ্ম্মপথে থাকিয়া এক সন্ধ্যা খাওয়া ভাল-ভিক্ষা করা ভাল—না খাইয়া মরাও ভাল, তবু অধৰ্ম্মের পথে উপার্জন করিয়া লক্ষপতি হওয়াও ভাল নহে।” ক্ষুদিরাম আনন্দিত হইয়া কহিলেন—“আমিও তাহাই ভাবিয়াছি, কিন্তু এক ভয় যে কুমীরকে রাগাইয়া জলে বাস করা চলে না। আমি যদি জমিদারের পক্ষ হইয়া সাক্ষ্য না দিই তাহা হইলে আমাদের পদে পদে বিপদ ঘটিবে, এ গ্রামে বাস করা ভার হইবে।”
১২ ঠাকুর রামকৃষ্ণ “তাহাতেই বা ক্ষতি কি? আমরা কাঙ্গাল—যেখানে যাইব চিরকালই দুঃখ-ধান্দা করিয়া খাইতে হইবে, তাতে আর ভয় কি? তেমন হয়—তবে এ গ্রাম ত্যাগ করিয়া অন্য গ্রামে চলিয়া যাইব। যিনি জীব দিয়াছেন—এতদিন আহার দিয়া বাঁচাইয়া রাখিয়াছেন, তিনিই আহার দিবেন। তা বলিয়া ভয়ে কি লােভে পড়িয়া অধৰ্ম পথে যাইতে কিছুতেই মন সরিতেছে না।” ক্ষুদিরাম উৎসাহিত হইয়া কহিলেন—“সত্য বলিয়াছ, ভাবনায় আমি অস্থির হইয়াছিলাম; হায় ! ক্ষুদ্র মানব আমরা—সকল সময়ে মন দৃঢ় রাখিতে পারি না। যিনি পঞ্চমবর্ষীয় অজ্ঞান শিগু ধ্রুবকে গহন-বনে আশ্রয় দিয়াছিলেন, বালক প্রহলাদকে ভীষণ বিপদে রক্ষা করিয়াছিলেন -সেই অনাথনাথ দীনের ঠাকুরই আমাদিগকে রক্ষা করিবেন।” তখন স্বামী স্ত্রী দুইজনে সেইখানে বসিয়া একান্ত ভক্তিভরে করঘােড়ে কহিলেন—“হে দীনবন্ধু নারায়ণ, যখন যে অবস্থায় রাখ ক্ষতি নাই, এই করিও প্রভু—এ জীবনে যেন তােমার নাম কখনও না বিস্মৃত হই—অধর্মের পথে কখনও যেন প্রবৃত্তি না যায়।” ক্ষুদিরামের মন দৃঢ় হইল, তিনি সহস্র প্রলােভন ও বিপদের ভয় অগ্রাহ্য করিলেন—কিছুতেই জমিদার পক্ষ হইয়া সাক্ষ্য দিলেন না। জমিদার বাবু ভয়ঙ্কর রাগিয়া উঠিলেন। তাহার ফল এই হইল যে ক্ষুদিরাম সে গ্রাম ত্যাগ করিয়া সপরিবারে গিয়া দেড় ক্রোশ দূরে “কামার পুকুর গ্রামে বাস করিলেন।
অপূৰ্ব্ব শিশু তৃতীয় পরিচ্ছেদ অপূর্ব শিশু ক্ষুদিরামের দুইটি পুত্র ছিল, প্রথম—রামকুমার ও দ্বিতীয়--রামেশ্বর। ‘কামার পুকুর গ্রামে আসিয়া বাস করিবার পরে আর একটি সন্তান হইবার সম্ভাবনা উপস্থিত হইল। সেই সময় হইতে তাহাদের গৃহের চতুর্দিকে নানা প্রকার শুভ লক্ষণ সকল প্রকাশ পাইতে লাগিল, ক্ষুদিরাম ও চন্দ্রমণির মন আপনা হইতেই -অকারণে যেন আনন্দে নাচিয়া নাচিয়া উঠিতে লাগিল। তাহাদের দুঃখ কষ্টের দিন যেন অবসান হইয়া আসিল। কেমন এক প্রকার রমণীয় শান্তিতে তাহাদের গৃহ-প্রাঙ্গণ যেন ঝলমল করিতে লাগিল। তাহাদের গৃহে রঘুবীর জীউর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত ছিল- ক্ষুদিরাম এবং চন্দ্রমণি প্রতাহ ভক্তি ভরে সেই বিগ্রহের পূজা না করিয়া কোন কার্য করিতেন না। তাহারা তাহাকে জাগ্রত ঠাকুর বলিয়াই জানিতেন এবং যখন যে কোন কাৰ্য্য উপস্থিত হইত, দুইজনেই ঠাকুর ঘরে গিয়া ভক্তিভরে প্রাণ খুলিয়া, জানাইয়া, তাহার আদেশ পাইয়াছেন ভাবিয়া, তবে সে কার্যে হস্তক্ষেপ করিতেন। যখন গৃহের চতুর্দিকে আপনা-আপনি নানা সুলক্ষণ সকল প্রকাশিত হইতে লাগিল, অভাব দূর হইয়া সংসারে স্বচ্ছলতা আসিতে আরম্ভ হইল, সৰ্ব্বদাই বিমল শান্তিতে মন পূর্ণ হইয়া উঠিতে লাগিল তখন রঘুবীর জীউর অনুগ্রহ ভাবিয়া স্বামী স্ত্রী দুইজনেই অত্যন্ত কৃতজ্ঞ হইয়া উঠিলেন এবং নিয়ত একমনে ভক্তির সহিত বিগ্রহের পূজা ও সেবা করিতে লাগিলেন। এদিকে যতই দিন যাইতে লাগিল, ততই চন্দ্রমণির সৌন্দৰ্য্য, শতগুণ বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। দেহে রূপ যেন আর ধরে না-চলিতে ১৪ t ঠাকুর রামকৃষ্ণ ফিরিতে, উঠিতে বসিতে আলােক-রশ্মির মত সর্বদাই যেন ঠিকরাইয়া এই আশ্চর্য ব্যাপার দেখিয়া ক্ষুদিরাম অবাক হইয়া চাহিয়া থাকেন, ভাবেন-এও দৈব ঘটনা-রঘুবীর জীউর অনুগ্রহ। চন্দ্রমণির রূপবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাহার মনেও ধর্মভাব দিন দিন প্রবল হইতে প্রবলতর হইতে লাগিল। দিন-রাত কেবল ঠাকুর-দেবতার কথা শুনিতে, বলিতে ভালবাসেন, দিন-রাত কেবল পূজা-আর্চা, জপ-তপ, দান-ধ্যান লইয়া থাকেন, দিন-রাত আপনাকে রঘুবীর জীউর ছায়ার মত তাহার চরণতলে ফেলিয়া রাখিতে চাহেন। কিন্তু তিনি দরিদ্রের পত্নী—সংসারে একা, ঝি-চাকর লােক- জন নাই, সহায় সম্পদ নাই, কাজেই স্বামীসেবা, পুত্র-পালন, সংসারধর্ম ছাড়িয়া কেবল দেবতার ঘরেই সর্বদা থাকিতে পারেন না। সংসারের সকল কাজ কৰ্ম্ম সারিয়া, যখনই সময় পান তখনই গিয়া ঠাকুরের চরণ- তলে বসিয়া ভক্তিভরে ধ্যানে নিমগ্ন হন। তখন তাঁহার সেই রূপ জ্যোতি যেন আরও সহস্রগুণে উজ্জ্বল হইয়া উঠে, তখন তাহাকে সেই অবস্থায় দেখিলে মনে হয়-বুঝি কোন সংসারত্যাগিনী তপস্বিনী ইষ্ট- দেবতার ধ্যানে বাহ্যজ্ঞান হারাইয়া সমাধি প্রাপ্ত হইয়াছেন। ‘দেরে’গ্রামে থাকিবার কালে, সেখানে চট্টোপাধ্যায় পরিবারের যেমন মান-সম, খ্যাতি-প্রতিপত্তি ছিল, কামার পুকুরে আসিবার পর হইতে তাহা আরও বৃদ্ধি পাইয়াছে। গ্রামের কি ইতর কি ভদ্র-কি ছােট কি বড়—সকলেই তাহাদিগকে পরম ভক্তি ও সম্মানের চক্ষে খয়া থাকে, তাহাদের সাহায্য করিবার জন্য আগ্রহে ছুটাছুটি করে, তাহাদের সন্তোষ বিধানের জন্য প্রাণ-পাত করিতে চাহে। পাড়ার পুরুষেরা যেমন সৰ্ব্বদাই আসিয়া সংবাদ লয়, দেখা শুনা করে, স্ত্রীলােকেরাও তেমনি সদাসর্বদা আসিয়া বাটীর ভিতরে অপূৰ্ব শিশু চন্দ্রমণির সঙ্গে গল্পগুজব করে এবং তাহার মুখে ধর্মের কথা, পুরাণের গল্প, ঠাকুর-দেবতার কথা শুনিয়া আনন্দিত হইয়া উঠে এইরূপে চট্টোপাধ্যায় পরিবার কামারপুকুরের সকলেরই আত্মীয়- স্বরূপ হইয়া উঠিয়াছেন। সুতরাং কতদিনে চন্দ্রমণির আর একটি সন্তান হইবে তাহা দেখিবার জন্য সকলেই আনন্দে ও আগ্রহে দিন গণিতেছেন। দেখিতে দেখিতে তাহার প্রসবের কাল নিকটবর্তী হইয়া আসিল। সেদিন বড় শুভ তিথি-নক্ষত্রের যােগ। পাড়ার সকলেই বলাবলি করিতেছিলেন যে-“আজ যদি চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের সন্তান ভূমিষ্ঠ হয় তবে সে সন্তান জগতের পূজ্য হইয়া উঠিবেন।” সকলেই ভাবিলেন যে তাঁহাদের যেমন ধৰ্ম্মের ও পুণ্যের সংসার-তাহারা যেমন ধার্মিক ও পুণ্যবান তাহাতে ভগবান নিশ্চয়ই তাহাদের গৃহ আরও পুণ্যময়—গৌরবময় ও উজ্জ্বল করিয়া তুলিবেন। হইলও তাই ; সেইদিন—সেই পরম পুণ্যতিথি-নক্ষত্রের যােগের সময়ে-মহা পুণ্যক্ষণে ঘর আলাে করিয়া চন্দ্রমণির তৃতীয় পুত্র ভূমিষ্ঠ হইলেন। অমনি সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত গ্রামখানির প্রকৃতি যেন মধুময়-শান্তিপূর্ণ হইয়া উঠিল। ফুলে ফুলে সে দিন গ্রামখানি হাসিয়া উঠিল, গন্ধে চারিদিক আমােদিত হইল, পাখীর গানে মুখরিত হইল, মধুর মলয়ের হিল্লোল ছুটিল। রূপ-রস-গন্ধ-গান ও আলােকের তরঙ্গে সমস্ত কামারপুকুর যেন মধুময়-শান্তিপূর্ণ—আনন্দ-নিকেতন হইয়া উঠিল। সকল লােকের মন হইতে সমস্ত দুঃখ-বিপদ ভয়-ভাবনা যেন অন্তর্হিত হইয়া গেল সকলের অন্তঃকরণ পবিত্র আনন্দে ভরিয়া উঠিল। কিন্তু কেহই তাহার কোন কারণ ভাবিয়া স্থির করিতে পারিল না, শেষে যখন শুনিল যে চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের একটি পুত্র জন্মিয়াছে, তখন সকলেই-সকল কাজ-কর্ম ফেলিয়া ছুটিয়া দেখিতে চলিল।
ঠাকুর রামকৃষ্ণ উঠিল। এদিকে পুত্র ভূমিষ্ঠ হইবা মাত্রেই যেন কেমন এক প্রকার উজ্জ্বল আলােক-ধারা আকাশ হইতে মুহূর্তের জন্য নামিয়া আসিয়া চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের গৃহের চাল স্পর্শ করিয়া অদৃশ্য হইয়া গেল। যাহারা দেখিল, কহিল “ভগবানের আশীৰ্বাদ নব শিশুর উপরে বর্ষিত হইতেছে, এ বালক অসাধারণ-বিশ্ববিখ্যাত হইবে।” সঙ্গে সঙ্গে গৃহের অভ্যন্তর প্রদেশও অত্যন্ত উজ্জ্বল হইয়া যেন ঝম করিতে লাগিল—সহস্র সহস্র ফোটা ফুলের গন্ধে সৌরভময় হইয়া সমবেত সমস্ত নরনারীগণ আশ্চৰ্য্য হইয়া বারম্বার এদিক ওদিক চাহিতে লাগিল—কিন্তু হরি হরি । ঘরে একটির অধিক দুইটি বাতি নাই ফুলের চিহ্ন মাত্র নাই। সকলেই বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হইয়া নির্বাক হইয়া রহিল। তারপরে সকলে যখন পুত্র দেখিল, তখন আরও অদ্ভুত ব্যাপার। সকলেরই মনে হইল সে সন্তান যেন চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের সন্তান নহে, সে সন্তান তাহাদের আপন সন্তান-বুকের ধন-নয়নের মণিদেহের জীবন। সকলেই যেন সে সন্তানকে চিরকাল বক্ষে ধারণ করিয়া রাখিয়াছে। দেখিয়া আশ মিটে না, বুকে রাখিয়াও সাধ পূরে না, এক মুহুৰ্ত্ত কাছ-ছাড়া করিয়া রাখিতে গেলে প্রাণ যেন শূন্য হইয়া যায়। সকলেই বিমুগ্ধচিত্তে দাঁড়াইয়া নিৰ্ণিমেষ নয়নে একদৃষ্টে শিশুকে দেখিতে লাগিল। এ কি আবার? সন্তান হাসিল-মরি মরি সেই খানে যেন, এক সঙ্গে শত চন্দ্রের উদয় হইল ! এ কি অপূৰ্ব্ব ব্যাপার-চাঁদের কিরণ ঘরের ভিতর ঢেউ খেলাইয়া, সকলের সর্বাঙ্গে আলােক মাখাইয়া ঘরময় হাসির রাজত্ব বিস্তার করিয়া দিল। কি সুন্দর—কি মধুর—কি নিগ্ধ রমণীয় শােভাময়, অপরূপ দিব্য জ্যোতি দেখিয়া দেখিয়া সকলে বিভাের হইয়া গেল। ক্ষুদিরাম ও চন্দ্রমণি দেবতার বিশেষ অনুগ্রহ ও বাল্যপ্রকৃতি আশীৰ্বাদ ভাবিয়া ভক্তিভরে গৃহস্থিত রঘুবীর বিগ্রহের চরণতলে লুটাইলেন এবং প্রাণ ভরিয়া তাহার পূজা করিলেন। শিশু দিন দিন শুক্লপক্ষের শীকলার মত বাড়িতে লাগিলেন। তঁাহার দেহে একে একে নানারূপ অলৌকিক লক্ষণ সকল প্রকাশ পাইতে লাগিল। শিশু রোদন কাহাকে বলে জানেন না, যেখানে কান্নার শব্দ তাহার ত্রি-সীমায় থাকিতে পারেন ন', যাইতে চাহেন না। আপনি সদানন্দময় সৰ্ব্বদাই অধরে মধুর হাসি লাগিয়া আছে ; যেখানে আনন্দ —যেখানে হাসি—যেখানে প্রেম-প্রীতি শিশু সেইখানে থাকিতেই ভাল- বাসেন, চারিদিকের সকলকে হাসাইয়া আনন দিয়া নিজে হাসিতে থাকেন। এইরূপে সেই দুধের শিশু চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের গৃহে হাস্য ও আনন্দের সাম্রাজ্য বিস্তার করিলেন। চতুর্থ পরিচ্ছেদ বাল্যপ্রকৃতি শিশুদের স্বভাব যে, তাহারা একটুতেই কাঁদিয়া অস্থির হয়, বামনা লইয়া সকলকে অস্থির করিয়া তুলে, তাহাদের ভুলাইয়া ঠাণ্ডা করিবার জন্য আত্মীয় স্বজন ব্যস্ত হইয়া উঠে। কিন্তু ক্ষুদিরামের নব শিশুর সকলই অদ্ভুত। তিনি তােত কান্না কাহাকে বলে, তা জানেনই না, সর্বদাই হাসিতে-হাসিতে অমৃত ছড়াইয়া—সকলকে আনন্দময় করিয়া রাখেন, তাহা ছাড়াও, বায়না যে কি বস্তু, কোন দ্রব্য লইবার আকাঙ্ক্ষা যে কেমন তিনি তাহাও জানেন না-শিখেন নাই। এ সংসারে কোন বস্তুতেই যেন তাহার প্রলােভন নাই—কামনা নাই। २ ১৮ ঠাকুর রামকৃষ্ণ কেহ কোন দ্রব্য ইচ্ছা করিয়া দিলে তিনি যেমন তাহা আদর করিয়া হাত পাতিয়া লইয়া আনন্দ করেন, কেহ কিছু না দিলেও আনন্দে তাহাকে জড়াইয়া ধরেন। আনন্দই তাহার স্বভাব, হাস্য ও প্রীতিই—তাহার হৃদয়ের প্রতিদান। এই গুণে পাড়ার লােকেরা সকলেই তাহার প্রতি আকৃষ্ট হইয়া দিনে শতবার ছুটিয়া দেখিতে আসে। সেই সদানন্দময় অপূৰ্ব শিশুর চাদমুখে মধুর হাসি দেখিয়া সকলে বিভাের হইয়া যায়, তাহার মধুমাখা আধ-আধ কথা শুনিয়া সকলে দুঃখ শােক ভুলিয়া যায়। তাহার কচি মুখখানিতে কি যাদু মাখানো আছে—যে দেখে, সেই আপনা-ভুলিয়া কোলে লইয়া মুখচুম্বন করে, অমনি সঙ্গে সঙ্গে যেন তাহাদের এ জীবনের সকল দুঃখ দৈন্ত জ্বল। ঘুচিয়া জীবন পবিত্র—জন্ম ধন্য হইয়া উঠে। এইরূপে ক্ষুদিরামের শিশু গ্রামের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার নয়নের মণি স্বরূপ হইয়া দিন দিন বাড়িতে লাগিলেন। পিতামাতা আদর করিয়া নাম রাখিলেন—গদাধর। গদাধরের আর একটা অদ্ভুত প্রকৃতি যে, তিনি ফুল পাইলে যেমন আনন্দে মাতিয়া উঠেন, তেমন—আনন্দ আর কিছুতে পান না। ফোটা ফুলগুলি লইয়া ফুলের হাসির সঙ্গে নিজের হাসি মিশাইয়া আনন্দে মত্ত হইয়া উঠেন। একবার ফুলগুলি লইয়া মাথায় রাখেন, একবার অঞ্জলি পূরিয়া লইয়া চুম্বন করেন, একবার বুকে ধরেন- ফুলের সঙ্গে যেন ফুল হইয়া মিশিয়া যাইতে চাহেন। তখন আর তাহার কোন কিছু মনে থাকে না—ফুল লইয়া বিভাের হইয়া থাকেন। ইহা দেখিয়া পাড়ায় সকলেই তাঁহাকে ফুল আনিয়া দেয়, তিনিও এমন আগ্রহে তাহা গ্রহণ করেন যে সকলে ভাবে-তাহারা ধ হইল। লােকে আপন আপন ইষ্ট দেবদেবী পূজা করিয়া যে সুখ, যে তৃপ্তি, যে আনন্দ না পায়-গদাধরকে ফুল দিয়া তাহার অপেক্ষা .
বাল্যপ্রকৃতি অধিক আনন্দ লাভ করে, সুতরাং সকলেই প্রত্যহ তাহাকে ফুল আনিয়া দিবার জন্য ব্যস্ত হইয়া উঠে। ক্রমে এমন হইল যে পাড়ার লােকজনের। গদাধরকে আর পরের সন্তান বলিয়া ভাবিতে পারিল না। তিনি যেন তাহাদের প্রত্যেকেরই বুকের ধন-নয়নের মণি ! তাহাকে আর একদণ্ড না দেখিয়া স্থির থাকিতে পারে না-দিবসের শত কৰ্ম্ম, সহস্র ঝঞ্চাটের মধ্যেও ঘুরিয়া ফিরিয়া-নড়িয়া চড়িয়া—ছুটিয়া আসিয়া দেখিয়া যায়। এইরূপে সেই এক শিশু যেন সহস্র শিশু হইয়া গ্রামের প্রত্যেক লােকের হৃদয়-সিংহাসনে বিরাজ করিতে লাগিলেন। গদাধর কুল পাইলে যেমন মাতিয়া উঠেন, প্রকৃতির প্রত্যেক বস্তুতেই তেমনি যেন কি অপূর্ব সৌন্দর্য্য দেখিয়া মুগ্ধ হইয়া যান। গাছ-পালা দেখিয়া আনন্দ করেন, মেঘের পানে একদৃষ্টে চাহিয়া থাকেন, পাখীর ডাক শুনিয়া আনন্দে করতালি দেন, সূর্যের রশ্মিতে, চন্দ্রের আলােকে, বৃষ্টির ধারায় মুগ্ধ হইয়া নাচিতে থাকেন। দেখিয়া সকলেই অবাক্ হইয়া চাহিয়া থাকে। সাধারণ মনুষ্যের প্রকৃতির সঙ্গে গদাধরের প্রকৃতির বিভিন্নতা- টুকু সকলেই বুঝিতে পারে এবং বুঝিতে পারিয়া সকলেই আশ্চর্য্য হইয়া ভাবে—এ বালক কে ? ইনি কি কোন দেবতা—শাপ-ভ্রষ্ট হইয়া এ পৃথিবীতে আসিয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছেন ? অথবা কোন দেবতা মায়ারূপ ধরিয়া তাহাদের সঙ্গে ছলনা করিয়া ভুলাইতে আসিয়াছেন ? কিন্তু তিনি যে-ই হউন না কেন—কেহই তাঁহাকে পর ভাবিতে পারে না—অগ্রাহ করিতে পারে না—ভুলিয়া থাকিতে পারে না। সেই শিশুর যে কি অদ্ভুত শক্তি, কি প্রবল আকর্ষণ—তাহার নিকট হইতে দূরে সরিয়া যাইবার উপায় নাই। যে একবার তাঁহাকে দেখে, একটিবার তাহার একটি কথা শুনে, সে-ই অমনি মন্ত্রমুগ্ধবৎ তাহার २० ঠাকুর রামকৃষ্ণ বশীভূত হইয়া পড়ে। কেহই ইহার কোনরূপ কাৰণ বুঝিতে পারে না, বুঝিবার চেষ্টাও করে না—তাহাকে দেখিয়া, কোলে লইয়া, আদর করিয়া, ফুল দিয়া আপনাদের জন্ম সার্থক করিয়া লয়। সেই অদ্ভুত বালকের নিকট সংসারের প্রত্যেক বস্তুই যেন পরিচিত, তিনি যেন সমস্তই জানেন, চিনেন, বুঝেন এমনি ভাব তাহার মধ্যে আপনা হইতেই ফুটিয়া উঠে। তাহাকে যেন কিছুই বলিবার, চিনাইবার, শিখাইবার প্রয়ােজন—নাই—বালক হইয়াও, তিনিই যেন পৃথিবীর মানুষকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকল ব্যাপার শিখাইয়া দিতে পারেন। লােকের মুখে ঠাকুর-দেবতার নাম শুনিলে বালকের চক্ষু উজ্জ্বল হইয়া উঠে, ঠাকুর-দেবতার কথা শুনিলে আর অন্য কিছু মনে থাকে না। পূজা দেখিয়া, আরতি দেখিয়া বালক বাহ্যজ্ঞানশূন্য হইয়া নাচিতে থাকেন, একবার আনন্দের উচ্ছাসে ছুটিয়া গিয়া ঠাকুরের প্রতিমূর্তিকে জড়াইয়া ধরিতে যান। ঠাকুর-ঘরে প্রবেশ করিলে আর সেখান হইতে উঠিয়া আসিতে চাহেন না—আহার-নিদ্রা ভুলিয়া একদৃষ্টে চাহিয়া চুপ করিয়া বসিয়া থাকেন। তখন তাহার মুখে, চক্ষে, সর্বাঙ্গে যেন কেমন একপ্রকার অপূৰ্ব দিব্যজ্যোতি ফুটিয়া উঠিয়া ঝল করিতে থাকে। লােকে ঠাকুর দেখিতে আসিয়া আশ্চর্য হইয়া বালকের দিকেই চাহিয়া থাকে। শুধু যে বালক গাধর এই সব লইয়াই থাকেন তাহা নহে। পিতা, মাতা, ভ্রাতাদিগকে তিনি অত্যন্ত মান্য করেন, ভক্তি করেন। তঁাহারা উঠিতে বলিলে উঠেন—বসিতে বলিলে বসেন—যাহা আদেশ করেন, মুহুৰ্ত্তমাত্র বিলম্ব না করিয়া পালন করিবার জন্য ছুটিয়া যান। ক্ষুদ্র বালক হইয়াও তাহাদের প্রত্যেক কাৰ্য্যে সহায়তা করিবার জন্য ব্যস্ত হইয়া উঠেন।
পাঠশালে বালক কখনও কোন অন্যায় কাৰ্য করেন না, অবাধ্যতা জানেন না,-সৰ্ব্বদাই স্থির-ধীর-প্রশান্ত-আনন্দময়। সুতরাং কখনও এক মুহূর্তের জন্য কাহারও তাঁহাকে শাসন করিবার প্রয়ােজন হয় না। যে যাহা বলে তাহাই করেন, যে যাহা দেয় তাহাতেই সন্তুষ্ট হন, সে যাহা চাহে তাহাকে তাহাই দিয়া পরিতুষ্ট করেন। বালকের যেন সুখ নাই, দুঃখ নাই, আনন্দ নাই, বিষাদ নাই, অভাব নাই, আকাঙ্ক্ষা নাই, প্রয়ােজন, প্রার্থনা নাই তিনি যেন সংসারের সকল বস্তুর অতীত, সকল বস্তু হইতেই বহুদূরে-অথচ সৰ্ব্ব- দাই সকল বস্তুর ভিতরে, সকল বস্তুতেই লিপ্ত—সকল বস্তুতেই জড়িত। পঞ্চম পরিচ্ছেদ পাঠশালে পাঁচ বৎসর বয়সে ক্ষুদিরাম গদাধরের হাতে খড়ি দিয়া পাঠশালায় পড়িতে দিলেন। পাঠশালের পড়ে। অনেক গুলি—অধিকাংশই দুষ্ট, অশান্ত। গদাধর যেদিন সর্বপ্রথম পাঠশালে ভত্তি হইতে গেলেন, সেদিন গুরুমহাশয় একজন পড়ের উপর অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইয়া তাহাকে শাসন করিতেছিলেন। ছাত্রকে নাড়, গােপাল করিয়া বসাইয়া হাতে ও ঘাড়ের উপর দুইখানি বড় বড় ইট দিয়া সম্মুখে দাড়াইয়া লম্বা ললকে বেত গাছটা তাহার সামনে নাচাইতে নাচাইতে ধমক দিয়া কহিলেন- “সাবধান, যদি এক চুল নড়ি, কি ইট পড়ে যায়, তাহলে পিঠের ছাল-চামড়া তুলে ছাড়বাে।”
ঠাকুর রামকৃষ্ণ ছাত্র সেইভাবে থাকিয়া নাকিসুরে কাদিতে কঁদিতে কহিল— আর করবাে না গুরুমশাই, এবারটা মাপ করুন।” “কোন কথা শুনতে চাই নি—খবরদার যেন ইট পড়ে না তা হলেই।” গুরুমহাশয়ের মুখের কথা মুখেই রহিয়া গেল, রামকুমার গদাধরকে সঙ্গে লইয়া ভর্তি করিয়া দিবার জন্য গিয়া দাঁড়াইলেন। গুরুমহাশয় চমকিয়া একবার গদাধরের আপাদমস্তক উত্তমরূপে দেখিয়া লইলেন, তাহার পরে বালকের মুখের পানে একদৃষ্টে অবাক হইয়া দেখিতে দেখিতে ভাবিলেন—“তাইতাে, এ কি ব্যাপার? ইনি যে সৰ্ব্বশাস্ত্ৰে, সৰ্ববিদ্যায় পারদর্শী মহাপুরুষ দেছি-একে আমি কি পড়াৰ ? আমিই এর কাছে এখন সারাজীবন ধরে শিখুতে পারি। ইনি বালকবেশে আমাকে ছলনা করতে এলেন ?” গুরুমহাশয় নিৰ্বাক্ হইয়া পাথরের প্রতিমূর্তির মত দাঁড়াইয়া রহিলেন। তাহার এই প্রকার অবস্থা দেখিয়া রামকুমার ঈষৎ হাসিয়া কহিলেন-“এমন করে অবাক হয়ে কি দেখুঁছেন ? এটি যে আমার ছােট ভাই গদাধর, একে আপনার পাঠশালে ভর্তি করে নি।” গুরুমহাশয়ের মােহ ভাঙ্গিল, চমকিয়া চাহিয়া অপ্রস্তুত হইলেন, কহিলেন—“এস বাবা এস, বস ওইখানে।” তারপরে তাহাকে ভর্তি করিয়া লইলেন। সেদিনকার মত সে পড়ােটি নিষ্কৃতি পাইল। সেদিন হইতে গদাধরকে পড়াইতে গিয়া প্রায় প্রত্যহই গুরু- মহাশয়ের মনে হইতে লাগিল-এ বালক যেন সামান্য নহে, যেন কেমন কেমন। হঠাৎ পড়া বলিয়া দিতে মনের ভিতর যেন কেমন বাধ-বাধ ঠেকিতে লাগিল। কিন্তু অহঙ্কারী গুরুমহাশয় শীঘ্রই সে ভাব দমন করিয়া ফেলিলেন, প্রত্যহ একটু একটু করিয়া সাহস আসিয়া তাহাকে ভুলাইয়া দিল, গদাধরকে তিনি সাধারণ পড়ােদের মতই পড়াইতে পাঠশালে লাগিলেন। কিন্তু সকল সময়ে তাহার সঙ্গে কিছুতেই ঠিক অন্য ছাত্রদের মত ব্যবহার করিতে পারিলেন না। গুরুমহাশয়ের স্বভাব কিছু রুক্ষ, সামান্য কারণেই যখন তখন পড়াদের উপর ক্রুদ্ধ হইয়া শাসন করিতেন। কিন্তু গদাধর পাঠ- শালে ভর্তি হইবার পর হইতে তাহার স্বভাবে একটু পরিবর্তন ঘটিতে লাগিল। গুরুমহাশয় পড়ােদের উপরে রাগিয়া মারিবার জন্য যেমন বেত তুলেন, অমনি গদাধরের দিকে চাহিলেই যেন তাহার রাগ নিমিষের মধ্যে কোথায় অন্তর্হিত হইয়া যায়, হঠাৎ থমকিয়া বঁড়ান, আর অমনি অজ্ঞাতে তঁাহার হস্ত হইতে বেত গাছটি খসিয়া পড়িয়া যায়। তিনি অন্যমনস্ক হইয়া কি যেন ভাবিতে ভাবিতে সরিয়া যান। এদিকে গদাধরের আগমন অবধি পড়ােদের স্বভাবেরও অত্যন্ত পরিবর্তন ঘটিতে লাগিল। ছােট বড় যত ছাত্র ছিল সকলেরই সঙ্গে অতি সত্বরে তাহার অত্যন্ত বন্ধুত্ব হইয়া গেল, আর তাহার ফলে সকলেরই স্বভাব শান্ত, শিষ্ট, ধীর হইতে লাগিল। পূৰ্ব্বে যে সকল পড়ােনা দুষ্টামির জষ্ঠ বিখ্যাত ছিল তাহারা ক্রমশঃ সৎস্বভাবের জন্য সুখ্যাতি লাভ করিতে লাগিল। বেত না খাইয়া ও তিরস্কার না পাইয়া যাহাদের একদিনও কাটিত না তাহার এক্ষণে প্রতিদিনই গুরুমহাশয়ের হাসি মুখের মিষ্টকথা পুরস্কার পাইতে লাগিল। ক্রমে এমন হইল যে গুরুর নিত্য-সহচর বেতগাছটা যে কোথায় পড়িয়া থাকিত তাহার খোঁজ খবর করিবারও তিনি আবশ্যক জ্ঞান করিতেন না। কেবল তাহাই নহে, ছাত্রদের সঙ্গে গদাধরের এমন ভাব হইল যে কেহই তাহাকে ছাড়িয়া আর থাকিতে পারে না। পাঠশালের ছুটী হইলে ঘরে যাইবার সময়ে গদাধরকে ছাড়িয়া যাইতে কাহারও মন সরে না, সকলেরই চক্ষু ছল-ছল করিয়া উঠে। পরদিন আবার ২৪ ঠাকুর রামকৃষ্ণ কতক্ষণে পাঠশালে আসিয়া তাহাকে দেখিবে, তাহার সঙ্গলাভ করিবে, সেই ভাবনায় সকলেই ঘরে গিয়া ছটফট করিতে থাকে। ইহার ফলে গুরুমহাশয়ের একটা পরম লাভ হইল। পূৰ্ব্বে তাহার বেতের ভয়েই হউক, আর পড়ার ভয়েই হউক অনেক গুলি পড়ে। প্রায় কামাই করিত, এক্ষণে তাহা একেবারে বন্ধ হইয়া গেল। কামাই করাতো দূরের কথা, গুরুমহাশয় ছুটী দিতে গেলেও কেহ সহজে ছুটী লইতে চাহে না, কারণ পাঠশালে ছুটী থাকিলে তাহারা গদাধরকে দেখিতে পাইবে না। ক্ষুদ্র বালকের এই আকর্ষণী দেখিয়া গুরুমহাশয় বিস্ময়ে অবাক্ হইয়া গেলেন। কিন্তু গদাধর পড়াশুনায় তেমন উন্নতি করিতে পারিলেন না। তাঁহার মন সৰ্ব্বদাই যেন কি এক ভাবে বিভাের হইয়া থাকে-পড়ায় তেমন মনঃসংযােগ করিতে পারেন না। পুস্তকের ভিতর ঠাকুর-দেবতার কথা পাইলে তাহার মুখ-চোখ আনন্দে উজ্জ্বল হইয়া উঠে—সে সব কথা একেবারে অন্তরে মুদ্রিত হইয়া যায়, কিন্তু বাজে কথার বেলা প্রায়ই তেমন হয় না। অথচ বালকের কি অদ্ভুত শক্তি! যে কথা গুরুমহাশয় নিজে ভালরকম করিয়া বুঝাইয়া দিতে পারিতেছেন না তিনি তাহা এমন সরলভাবে সুন্দররূপে আপনি বুঝিয়া পরকে বুঝাইয়া দেন যে, গুরু আশ্চর্য হইয়া যান। অনেক সময়ে এমন প্রশ্ন করেন যে, গুরুমহাশয় দিবারাত্রি ভাবিয়া ও তাহার উত্তর খুঁজিয়া পান না, এক একটা কথার অর্থবােধ পর্যন্ত হয় না—অবাক্ হইয়া বালকের মুখের পানে চাহিয়া থাকেন। ধর্মসংক্রান্ত কথায়, ঠাকুর-দেবতার কথায় এক এক সময়ে বালকের মুখ-চোখের ভাব এমন হয়—এমন একটা অপূর্ব জ্যোতি আপনা হইতে ফুটিয়া উঠে যে, তখন দেখিয়া গুরুমহাশয় কিছুতেই আশ্চর্য ঘটনা গদাধরকে সাধারণ বালকের মত ভাবিতে পারেন না। অনেক সময়ে তাঁহার এক একটা কথায় গুরু আপনার সংসারিক চিন্তার মধ্যেও যেন সহজ সরল পথ দেখিতে পাইয়া নিশ্বাস ফেলিয়া বাচেন। এইরূপে কঠোর পাঠশালা-ছাত্রগণের আনন্দময় ক্রীড়াভবনে পরিণত করিয়া বালক গদাধর সেইখানে যেন খেলাচ্ছলেই সামান্য রকম লেখাপড়া শিখিলেন। কিন্তু তাহাতেই যে ফল পশিল অন্য বালকেরা অতি উত্তমরূপে উচ্চশিক্ষিত হইয়াও তাহার শতাংশের একাংশ লাভ করিতে পারে না। গুরু মনে মনে ভাবিলেন— যাহাই শিখুক গদাধরের গুরু- মহাশয় হইয়া আমি ধন্য হইলাম। ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ আশ্চয্য ঘটনা তখন গদাধরের বয়স ছয় কি সাত বৎসর। পল্লীগ্রামে ছোট ছােট ছেলে-মেয়েরা অনায়াসে নির্ভয়ে এ বাড়ী সে বাড়ী এ পাড়া সে পাড়। যাতায়াত করিয়া থাকে । থাকে। পথে গাড়ী ঘােড়ার উপদ্রব নাই, বিপদ- আপদের ভয় নাই, হারাইয়া যাইবার সম্ভাবনা নাই ; সুতরাং বাড়ীর লােকজন সে সম্বন্ধে ওজর-আপত্তি করেন না। গদাধর ও শৈশবকাল হইতেই তেমনি এখানে সেখানে যাতায়াত করিতেন-বেড়াইতেন। বয়স বাড়িবার সঙ্গে সঙ্গে এবাড়ী-ওবাড়ী ছাড়িয়া এপাড়া-ওপাড়া এবং ক্রমে অল্প দূরবর্তী অন্য গ্রামেও যাইতেন- আসিতেন। অধিকাংশ সময়ে বাপ-দাদা সঙ্গে থাকিতেন, আবার অনেক সময়ে একাকীও যাতায়াত করতেন। এইরূপে অভ্যস্ত হইয়া অল্প ঠাকুর রামকৃষ্ণ বয়সেই তিনি মাঠ পার হইয়া গ্রাম হইতে গ্রামান্তরে স্বচ্ছন্দে বেড়াইয়া আসিতেন। বিশেষ শৈশব হইতেই তিনি ভাবুক, নির্জনতাপ্রিয় এবং প্রকৃতির সৌন্দৰ্য-দর্শনে ইচ্ছুক বলিয়া ঘরের ভিতরে বসিয়া থাকিতে পারিতেন না—প্রায়ই একাকী নির্জন মাঠে বেড়াইতেন। অনেক সময়ে কাৰ্যগতিকে এ গ্রাম সে গ্রাম যাইতেন—অনেক সময়ে ইচ্ছা করিয়াও ফাঁকা মাঠে মাঠে বেড়াইতেন। সে দিন তিনি বাড়ীর কোন কার্যের জন্য গ্রামের পরে একটা ফাঁকা মাঠ পার হইয়া অন্য একটা গ্রামে গিয়াছিলেন। ফিরিবার সময় আবার যখন সেই মাঠের উপর দিয়া পার হইয়া আসিতেছিলেন, হঠাৎ দেখিলেন—অপূৰ্ব ঘটনা! নীল আকাশের মাঝখান যেন হঠাৎ ফাটিয়া গেল, আগ্নেয় পৰ্বতের বিদীর্ণ মুখ-গহ্বর হইতে যেমন জ্বলন্ত গলিত ধাতু সবেগে নির্গত হয়, সেইরূপ সেই ফাটার ভিতর হইতে এক অপূর্ব দিব্য জ্যোতিঃ-ধারা ফোয়ারার জলের মত সবেগে বাহির হইয়া অগ্নিময়ী নাগিনীর ন্যায় হেলিয়া দুলিয়া ল ল করিতে করিতে নামিতে লাগিল। সেই জ্যোতিঃ-ধারার এমন প্রখর অথচ স্নিগ্ধ রশ্মি যে—সেই একটি মাত্র শিখার উজ্জ্বলতায় সমস্ত ব্যোমদেশ আলােকিত হইয়া উঠিল। সূর্যের কিরণ ও চন্দ্রের অলােককে পরাজিত করিয়া তাহার শান্ত প্রভা দিবসের রৌদ্রকেও যেন অধিকতর উজ্জ্বল ও স্নিগ্ধ করিয়া তুলিল, স্বর্গীয় আলােকের অপরূপ রূপ-সৌন্দর্য্যে সমস্ত প্রকৃতির বক্ষ পরম রমণীয়, শােভনীয় হইয়া ছবিখানির মত ঝলমল করিতে লাগিল । গদাধর বিস্ময় ও পুলকে বিভাের-আত্মহারা হইয়া একদৃষ্টে সেই আলােকশিখর পানে চাহিয়া রহিলেন। শরীরে স্পন্দন নাই -চলে পলক নাই—নিশ্বাস-প্রশ্বাসও বুঝি বহিতেছে না? থ আশ্চৰ্য্য ঘটনা মুখমণ্ডলে পরম আনন্দের ভাব-সৰ্ব্বাঙ্গে অপরূপ সৌন্দর্য্যের বিকাশ। তিনি আত্মহারা, অজ্ঞান, বাহ্যজ্ঞানশূন্য হইয়া প্রস্তর-পুত্তলিকার মত অচল অটলভাবে দাড়াইয়া রহিলেন। আলােক শিখা হেলিতে দুলিতে, কঁপিতে কঁপিতে, নাচিতে নাচিতে নামিতে লাগিল-গদাধরের নিকটবর্তী হইতে লাগিল। আরও যতই তাহা কাছে আসিতে লাগিল ততই গদাধরের শারীরিক সৌন্দৰ্য- সেই আলােক-ধারায় ধৌত হইয়া আরও উজ্জ্বল, আরও সুন্দর, আরও অপরূপ শােভাময় হইয়া উঠিল। ক্রমে সে রূপের প্রভা এরূপ বর্ধিত হইল যে গদাধরকে দেখিলে আর মানুষ বলিয়া মনে হয় না, ঠিক যেন কোন দেব-শিশু স্বর্গ হইতে নামিয়া আসিয়া উপর দিকে চাহিয়া তাহার পূৰ্ব্ব বাসস্থান স্মরণ করিয়া শেষ বিদায় লইতেছেন। আলােক-শিখা ক্রমশঃ নিকট হইতে নিকটবর্তী হইয়া গদাধরের মস্তক স্পর্শ করিল। অমনি তিনি সম্পূর্ণরূপে বাহ্যজ্ঞান-শূন্য হইয়া ধরা- শায়ী হইলেন। সেই আলােক তখন বিদ্যুতের মত সৰ্ব্বাঙ্গে হেলিয়া দুলিয়া জড়াইয়া খেলিয়া বেড়াইতে লাগিল। তারপরে আবার ধীরে ধীরে উঠিয় নীল আকাশে বিলীন হইতে চলিল। তখন সেই প্রান্তরের দূরে দূরে, তফাতে তফাতে আরও জন কতক লােক যাতায়াত করিতেছিল। সকলেই এই অদ্ভুত ব্যাপার চাক্ষুস করিয়া স্তম্ভিত হইয়া গেল। গদাধর পড়িয়া গেলে তাহারা উৰ্দ্ধশাসে ছুটিয়া আসিয়া দেখিল যে বালকের জ্ঞান নাই, ভাবিল তিনি মুচ্ছিত হইয়াছেন। আলােক-ধারা তখন আবার নীল আকাশের ক্রোড়ে মিলাইয়া গিয়াছিল। যত্নে কোলে করিয়া সকলেই তাড়াতাড়ি গদাধরকে গৃহে আনিয়া সকল বৃত্তান্ত আমূল প্রকাশ করিয়া কহিল। সকলেই শুনিয়া আশ্চর্যান্বিত হইয়া গেল।
ঠাকুর রামকৃষ্ণ সেই হইতে অনেক জ্ঞানী ব্যক্তি গদাধরকে কোন ছদ্মবেশী মহাপুরুষ ভাবিয়া অত্যন্ত ভক্তি শ্রদ্ধা করিতে লাগিলেন। এই ঘটনার পর হইতে গদাধর বালক হইয়াও গৃহস্থিত রঘুবীর বিগ্রহের পূজা- আর্চা আপনি করিতে যত্নবান হইলেন। বালকের আগ্রহ দেখিয়া কেহই বাধা দিল না। গদাধর প্র তাই আপন হস্তে বাছিয়া বাছিয়া ফুল তুলিয়া আনিয়া নিজে সমস্ত আয়ােজন স্বহস্তে করিয়া লইয়া নিত্য রঘুবীর বিগ্রহের পূজা করেন। পূজা করিতে করিতে ঠাকুরের দিকে চাহিয়া চাহিয়া বিভোর তন্ময় হইয়া বসিয়া থাকেন। সেই সময়ে হঠাৎ দেখিলে মনে হয় যে, বিগ্রহ যেন জীবন্ত হইয়া গদাধরের সঙ্গে বাক্যালাপ করিতেছেন। বালক কর্তৃক গৃহ-বিগ্রহ এইরূপে পূজিত হওয়ার পর হইতে ক্ষুদিরামের গৃহ যেন দেবতার পুণ্য আবাসের মত হইয়া উঠিল। দুঃখ নাই, দৈন্য নাই, অভাব নাই, অভিযােগ নাই, পবিত্র শান্তিতে সে গৃহ পূর্ণ হইয়া রহিল। ইহা দেখিয়া পিতা ও ভ্রাতারা পরম আনন্দিত চিত্তে গদাধরের উপরেই ঠাকুরের সমস্ত ভার দিয়া নিশ্চিন্ত হইলেন। গদাধর ও সেই ভার পাইয়া পরম আনন্দিত ও উৎসাহিত হইয়া উঠিলেন। গদাধরের স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর অতি সুমিষ্ট। যে তাহার কথা একবার শুনি সেই মুগ্ধ হইয়া যাইত, তাহার উপর তিনি এমন সুন্দর গান গাহিতে শিখিলেন যে, সে গান শুনিলে—মনুষ্যের কথা দূরে থাকুক-বনের পশু পক্ষী পর্যন্ত মােহিত হইয়া স্তব্ধ হইয়া শুনিত। আরও একটা অদ্ভুত শক্তি বালক শ্রুতিধর বলিলেও হয়। বা একবার কানে শুনেন, তাহাই তাহার অন্তরে একেবারে চিরকালের জন্য মুদ্রিত হইয়া যায়। তখনকার দিনে গ্রামে যাত্রাগান হইত, গদাধর আশ্চর্য ঘটনা তাহা একবার শুনিয়া যখন গানগুলি ঠিক সেই প্রকার সুর লয়ে নিজে গাহিতেন, তখন গ্রামশুদ্ধ লােক চারিদিকে সমবেত হইয়া সেই সঙ্গীতে মগ্ন হইয়া যাইত-তাহাদের আর আহার-নিদ্রার কথা মনে থাকিত না—সকলেই বলাবলি করিত “কি ছার যাত্রাগান, এ গান শুনিলে তাহারা আর কখনও এ গ্রামে আসিয়া গাহিতে সাহস করিবে না।” তাঁহার মধুর স্বভাবে আকৃষ্ট হইয়া তাহার মধুর গান শুনিবার জন্য প্রত্যহ দলে দলে লােক চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের বাড়ীতে আসিয়া জুটিতে লাগিল। চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের বাটীর পার্শ্বে ই লাহা বাবুদের বাড়ী তাহারাই ঐ গ্রামের জমিদার। সেখানে বাবুদের একঠি অতিথিশালা ছিল এবং সৰ্ব্বদাই নানা প্রকারের বিস্তর সাধু-সন্ন্যাসী আসিয়া সেই অতিথিশালায় থাকিতেন। সেই অতিথিশালা-সংলগ্ন একটী ঠাকুরবাড়ীও ছিল—সেখানে প্রায়ই পুরাণপাঠ ও কথকতা প্রভৃতি হইত। গদাধৰ সৰ্ব্বদাই সেই অতিথিশালায় গিয়া সমাগত সাধু সন্ন্যাসীদের সেবা করিতেন সেবা করিতেন এবং তাঁহাদের কাছে ঠাকুর-দেবতার কথা শুনিতেন। যতই সে সকল শুনিতে লাগিলেন ততই আরও শুনিবার ইচ্ছা দিন দিন বলবতী হইতে লাগিল। পুরাণপাঠ বা কথকতা আরম্ভ হইলে গদাধর সর্বাগ্রে ছুটিয়া গিয়া বাসতেন এবং আগাগােড়া পরম ভক্তিভরে একমনে শুনিতেন। শুনিতে শুনিতে প্রায়ই ভক্তির উচ্ছ্বাসে তাহার দুই চক্ষু হইতে জলধারা গড়াইয়া বক্ষস্থল ভাসাইয়া দিত। বালকের এইরূপ- ভাব দেখিয়া সকলেই অবাক হইয়া চাহিয়া থাকিত। এইরূপে শুনিয়া শুনিয়া গদাধর হিন্দুর শাস্ত্র, পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত, শ্রীমদ্ভাগবতের সমস্ত কথাই অন্তরে গাঁথিয়া লইলেন। এইরূপে কাল কাটিতে লাগিল-গদাধর দিন দিন ধৰ্ম্মপথে
ঠাকুর রামকৃষ্ণ
অধিকতর আকৃষ্ট হইয়া অধিকতর ভক্তিভরে সেই পথেই চলিতে
লাগিলেন। ক্রমে বছর দুই কাটিয়া গেল। সেই সময়ে ভগবান তাহার
মস্তকে প্রথম দুঃখের বজ্রাঘাত করিলেন।
গদাধরের বয়ঃক্রম যখন প্রায় আট বৎসর, সেই সময়ে তাহার
পিতৃ-বিয়ােগ হইল। তাহার লালন পালনের ভার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতৃদ্বয়ের
উপর পড়িল। তাহারা দুইজনেই, বিশেষ জ্যেষ্ঠ রামকুমার তখন পণ্ডিত
বলিয়া বিখ্যাত হইয়াছিলেন।
আরও আট নয় বৎসর সেই গ্রামে রাখিয়া গদাধরের ষােল
সতরে বয়ঃক্রম কালে পণ্ডিত রামকুমার ভ্রাতাকে সঙ্গে করিয়া সৰ্ব্বপ্রথম
কলিকাতায় আসিলেন।
সপ্তম পরিচ্ছেদ
দক্ষিণেশ্বরে
কলিকাতায় আসিয়া গদাধর ভ্রাতার সঙ্গে প্রথমে কিছুদিন নাথেরবাগানে
রহিলেন, তারপরে ঝামাপুকুরে আসিয়া গােবিন্দচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গৃহে
থাকিয়া পূজাকার্যে নিযুক্ত হইলেন।
কলিকাতার অনেক স্থানেই পণ্ডিত রামকুমারের শিষ্য-সেবক
ছিল, তাহারা সকলেই তাহাকে পরম ভক্তি শ্রদ্ধা করিত। সুতরাং সেই
সকল স্থানে রামকুমারের ন্যায় গদাধর ও লােকের শ্রদ্ধা-ভক্তি, সম্মান-সমাদর
পাইতে লাগিলেন। বিশেষ গদাধরের স্বভাব-চরিত্র দেখিয়া সকলেই
তাহার প্রতি আপনা হইতেই আকৃষ্ট হইয়া বশীভূত হইতে লাগিলেন।
এইরূপে অল্পকালের মধ্যেই সহরের অনেকস্থলে অনেক গৃহস্থ ও ধনীর গৃহে
গদাধরের নাম প্রচারিত হইতে আরম্ভ হইল।
দুই ভাই কলিকাতায় থাকিয়া লােকের বাড়ীর ঠাকুর-পূজা
দক্ষিণেশ্বরে । করেন, ক্রিয়া-কৰ্ম্ম করান, সকল ধৰ্ম্ম-কর্মেই আহুত হইয়া গমন করেন। এইরূপ করিতে করিতে গদাধরের স্বভাব এমন হইয়া পড়িল যে ধৰ্ম্ম-চর্চা ও ঠাকুর-দেবতার পূজা-অর্চনা ভিন্ন সংসারের আর কোন কথাই তাহার মনে স্থান পায় না। সৰ্ব্বদাই উদাসীনের মত থাকিয়া কেবল সেই সকল কৰ্ম্ম করিয়াই ঘুরিয়া বেড়ান। দেখিয়া শুনিয়া রামকুমার মনে মনে চিন্তিত হইয়া পড়িলেন। গদাধরের সংসারে মন নাই-উপার্জনের চেষ্টা নাই—নিজের ভােগ-বিলাসের স্পৃহা নাই, সৰ্ব্বদাই কেবল ঠাকুর-দেবতার পূজা আরাধনা সেবা-শুশ্রষার চেষ্টা, দিবারাত্রি কেবল সেই সব আলােচনা —অষ্টপ্রহর কেবল ধৰ্ম্ম-চষ্টা! বলিলেও গ্রাহ্য নাই—বকিলেও দুঃখ নাই-মারিলেও পরিবর্তন নাই। গদাধর সর্বদাই আপনার ভাবেই বিভাের—তন্ময়-আত্মহারা ! রামকুমারকে তাহার আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, শিষ্য-সেবকেরা গদাধরের সম্বন্ধে অনেক পরামর্শ দিতে লাগিলেন, তাঁহাকে সংসারী করিবার জন্য নিজেরাও নানা প্রকারে চেষ্টাযত্ন করিতে লাগিলেন, কিন্তু কিছুতেই কিছুমাত্র ফল হইল না। গদাধরের ধৰ্ম্ম-স্পৃহা, তন্ময়তা, সংসারের প্রতি বিতৃষ্ণা দিন দিন উত্তরােত্তর বর্ধিত হইয়া তাহাকে যৌবনের প্রারম্ভেই উদাসীন সন্ন্যাসীর মত করিয়া তুলিল। সেই সময়ে একটা ঘটনা গদাধরের ভবিষ্যৎ জীবনের প্রথম সূচনা করিয়া দিয়া গেল। কলিকাতার প্রাতঃস্মরণীয় রাণী রাসমণীর গৃহে পণ্ডিত রামকুমারের অবারিতার ও যথেষ্ট প্রতিপত্তি, সন্ত্রম-সমাদর ছিল, তিনি তাঁহাদের গুরুস্থানীয় সুতরাং সেখানেও গদাধরের নাম অজ্ঞাত ছিল না। ইতিপূর্বেই অনেকবার ভ্রাতৃদ্বয় সে বাড়ীতে গিয়া অনেক ক্রিয়া-কাৰ্য্য করাইয়া আসিয়াছিলেন।
ঠাকুর রামকৃষ্ণ বাঙ্গাল ১২৬২ সালের ১৮ই জৈা বৃহস্পতিবারে স্বনামধন্য রাণী তাহার দক্ষিণেশ্বরের বাগান বাটীতে কালীবাড়ী প্রতিষ্ঠা করিলেন। পণ্ডিত রামকুমার সেই স্থানে সর্ব প্রথম দেবীর পুরোহিত নিযুক্ত হইয়া গমন করিলেন। কনিষ্ঠ ভ্রাতা গদাধরও সেই সময় হইতে জ্যেষ্ঠের সঙ্গে গিয়া সেই কালীবাড়ীতে বাস করিতে আরম্ভ করিলেন। গঙ্গাকক্ষ হইতে দক্ষিণেশ্বরের এই কাণীবাড়ী এবং উদ্যানের শােভা পরম রমণীয় দেখায়। যেন কোন বাসন্তী রজনীর সােনার স্বপ্নে গড়া স্বর্গের নন্দনকানন ! গঙ্গাগর্ভ হইতে প্রশস্ত সুন্দর বাধঘাট উপরে উঠিয়া গিয়াছে, তাহার দুই পার্শ্বে সুন্দর বাগান—সৰ্ব্বদাই ফোটা ফুলে যেন হাসির রাজ্য বিস্তার করিয়া রাখিয়াছে। সেই বাগানের পরে সারি সারি দ্বাদশটি শিবমন্দির। ঘাটের চাতালের সম্মুখে সুন্দর সুপ্রশস্ত বাধা-রাস্তা—তাহার শেষে প্রশস্ত সুন্দর তোরণ, আর সেই তোরণের পরেই বিস্তৃত প্রাঙ্গণ। সেই প্রাঙ্গণের তিন দিকে অতিথিশালা এবং দক্ষিণের দিকে নাট-মন্দির। নাটমন্দিরের উত্তরে কালীমন্দির এবং সেই মন্দিরের পরে রাধা-কৃষ্ণের মন্দির। তাহারও উত্তরে প্রায় প্রাঙ্গণের শেষভাগে একটি ছােট খাটো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ঘর। সেই ঘরটিতেই গদাধর গিয়া বাস করিতে লাগিলেন। এইত গেল ঠাকুর বাড়ীর প্রাঙ্গণের সীমানা, তারপরেই আবার পরম রমণীয় প্রকাণ্ড উদ্যান-আর সেই উদ্যানের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে মনােরম পঞ্চবটী-বন। সেই পঞ্চবটা পরম সুন্দর, নিরালা-শান্তি প্ৰদ রমণীয় স্থান। সত্য-ত্রের ঋষিগণের তপােবনের মত ঈশ্বরাধনার শােক-তাপ- জ্বালা-জর্জরিত সংসারের দুঃখ, কষ্ট, মােহ ভুলিবার উপযুক্ত সাধন-স্থল। সেখানে গেলে মুহূর্তের মধ্যে আপনা হইতেই যেন সংসারের সকল দক্ষিণেশ্বরে শােকতাপ-দুঃখ-যন্ত্রণা কোথায় পলাইয়া যায়—মন এক অপূৰ্ব্ব পবিত্র প্রশান্ত ভাবে বিভাের হইয়া উঠে। পূৰ্ব্ব যুগের রমণীয় তপােবনের মত এই শান্তিপূর্ণ কালীবাড়ীতে আসিয়া গদাধরের মন বড়ই আনন্দ ও উৎসাহে পূর্ণ হইয়া উঠিল। তিনি চারিদিকে যতই ঘুরিয়া ঘুরিয়া দেখিতে লাগিলেন ততই যেন সেই দক্ষিণেশ্বরের উদ্যানবাটী সহস্র বাহু বিস্তার করিয়া চারিদিক হইতে তাহাকে আঁকড়াইয়া ধরিল। তাহার আর এক মুহূর্তের জন্য ও সেস্থান ত্যাগ করিয়া অন্যত্র যাইতে ইচ্ছা হইল না। স্থানের মাহাত্মে অনেক সময়ে বিষয়ী লােকের মনেও বৈরাগ্যের সঞ্চার হইয়া থাকে। তো গদাধর বাল্যাবধি শান্ত, নির্মল, চিন্তাশীল, সদানন্দ, ধাৰ্মিক প্রকৃতির বালক, তাহার উপরে কলিকাতায় আগমনের পর হইতে ঠাকুরপূজা ও ধর্মচর্চা করিতে করিতে তাহার অন্তর সাংসারিক ভােগ-সুখের প্রতি একেবারেই অনাসক্ত হইয়া পড়িয়া- ছিল, তাহার উপর এই শান্ত, স্নিগ্ধ, পবিত্র উপবনে মায়ের চরণতলে আসিয়া তাহার সমস্ত মন প্রাণ একেবারে উদাস, বিভাের, তন্ময় হইয়া হৃদয়ের স্তরে স্তরে দয়াময় ঈশ্বরের চিত্র ফুটিয়া উঠিল, তিনি সংসারের নাম পর্যন্ত একেবারে বিস্মৃত হইয়া সেই নির্জন প্রকৃতির ক্রোড়ে আপনার প্রাণ, মন, দেহ, জীবন ঢালিয়া দিলেন। এইরূপে কিছুকাল অতিবাহিত হইলে পর পণ্ডিত রামকুমারের পরিবর্তে ঠাকুর গদাধরই কালীমাতার পূজক নিযুক্ত হইলেন। তখন তাহার প্রাণে যেন এক অপূর্ব নূতন আলােকরশ্মি ফুটিয়া উঠিল—তাহার জীবন-স্রোত এক নূতন পথে ধাবিত হইতে চলিল। দিনকতক কালীমাতার পূজা করিতে করিতেই গদাধরের সম্পূর্ণ ভাবান্তর উপস্থিত হইল—তাহার মনের গতি বাঞ্ছিত পথে ছুটিয়া চলিল। তিনি অষ্ট সকল কাজকর্ম ফেলিয়া দিবারাত্র অষ্টপ্রহর গেল।
৩৪ ঠাকুর রামকৃষ্ণ মন্দির মধ্যে গিয়া একদৃষ্টে প্রতিমার পানে চাহিয়া বসিয়া থাকিতে লাগিলেন। দেহে স্পন্দন নাই-চক্ষে পলক নাই-ডাকিলে সারা নাই। বিভাের, তন্ময়, আত্মহারা বাহ্য জ্ঞানশূন্য অপরূপ সমাধির অবস্থা। হরি হরি! কেইবা মন্ত্র পড়িয়া পূজা করে আর কেইবা অতিথিশালা ও ঠাকুরবাড়ীর অন্য কাজকর্ম দেখাশুনা করে ! গদাধরের এইরূপ ভাবান্তর দেখিয়া তাহার আত্মীয় স্বজনের মনে অত্যন্ত ভয় হইল। তাহারা সকলে পরামর্শ করিয়া তাড়াতাড়ি একটি ছয় বৎসর বয়সের বালিকার সঙ্গে বিবাহ দিয়া গদাধরকে সংসারী করিবার প্রয়াস পাইলেন। অষ্টম পরিচ্ছেদ ভাবান্তর কিন্তু ভগবান যাহাকে লােকহিতের জন্য, জগতের দুঃখে আত্মবিসর্জন করিবার জন্য, পাপী-তাপীকে বার করিয়া পথ দেখাইয়া লইয়া যাইবার জন্য পৃথিবীতে পাঠাইয়াছে তনি কি আপনার ক্ষুদ্র স্বার্থে মজিয়া ক্ষুদ্র সংসার লইয়া আবদ্ধ হইয়া থাকিতে পারেন ? যিনি সমস্ত বিশ্বসংসারের বন্ধু–বিশ্বসংসারের দুঃখে কাতর ধরায় দুঃখনিবারণ যাহাৰ কাৰ্য—এই অসীম ব্রহ্মাণ্ডই যে তাহার সংসার, মানব, পশু, কীট, পতঙ্গ-প্রাণীমাত্রই যে তঁাহার আপনার জন, তিনি কেমন করিয়া আপনার গণ্ডীবাঁধা ক্ষুদ্র সংসারের ভিতরে আটক থাকিবেন? সুতরাং গদাধরও তাহা পারিলেন না, বিবাহের পরেই পাগলের ভাবান্তর মত ছটফট করিতে করিতে আবার ছুটিয়া দক্ষিণেশ্বরে পলাইয়া আসিলেন এবং কালীমাতার পূজা-অর্চনার মধ্যে আপনাকে ডুবাইয়া দিলেন। এবারে দক্ষিণেশ্বরে ফিরিয়া আসিয়া তাহার অবস্থার একেবারে পরিবর্তন হইয়া গেল। তিনি যেন আর পূর্বেকার সে গদাধর নহেন- এ যেন এক নূতন, এক অপূৰ্ব্ব, এক পরম পবিত্র নূতন জীবনে জাগিয়া = উঠিলেন। প্রতিমার ভিতরে গদাধর মায়ের জীবন্ত-জাগ্রতরূপ দেখিলেন। যে আত্মবিস্মৃত হইয়া অহােরাত্র তন্ময়ভাবে পূজা করিয়া ভগবানকে ডাকিতে পারে, যে সংসারের সহস্র প্রলােভন ভুলিয়া কেবল মাত্র তাহার ভাবেই মগ্ন থাকিতে পারে, যে আপনাকে দীনের দীন-অনাথ আতুর ভাবিয়া ঐকান্তিক কায়ােমনে তাহার দর্শন প্রার্থনা করে—দয়াময় কি তাহার মনােসাধ পূর্ণ না করিয়া থাকিতে পারেন? তাহা যদি হইত তবে তাহার “ভক্তাধীন-ভক্তবৎসল” নাম পৃথিবীতে প্রচার হইত না। গদাধর শৈশব হইতেই তাহার ভাবে মগ্ন, বাল্য হইতেই তাহার উপর সর্বস্ব অর্পণ করিয়া তাহাকেই এক মাত্র জীবন-ধন ভাবিয়া আহোরাত্র দর্শন পাইবার জন্য ডাকিতেছিলেন, কাজেই ভক্তাধীন জগন্মাতা তেমন সন্তানকে দেখা না দিয়া থাকিতে পারিবেন কেন ? প্রহলাদের ভক্তি ও বিশ্বাসের বলে স্ফটিকস্তম্ভ ভেদ করিয়া ভগবান দর্শন দিয়াছিলেন, জটীলের আকুল আহ্বানে বালক-মূর্তিতে দেখা দিয়া দধির ভাও দিয়া গিয়াছিলেন, আর গদাধরের মন-গল, প্রাণ- ভােলা, আত্মহারা ডাক শুনিয়া কি তিনি নিশ্চিন্ত হইয়া থাকিতে পারেন ? ভক্ত যদি পুরস্কার না পায়, সাধনায় যদি সিদ্ধি না থাকে, তবে বিশ্বসংসারের মানব সে সব পথে যাইবে কেন? সুতরাং জগজ্জনীর মূর্তিধারণ পূর্বক প্রতিমার ভিতর হইতে গদাধরকে দর্শন দিলেন ;-গদাধর সংসার = ঠাকুর রামকৃষ্ণ ভুলিলেন—জগৎ ভুলিলেন-মায়ের ভিতর আপনাকে মিশাইয়া জড়বৎ বসিয়া রহিলেন। পূজা করিতে বসিয়াছেন। সে পূজার আর বিশ্রাম নাই—অন্ত নাই—পূজা করিয়াই যাইতেছেন। পূজা করিতে করিতে আত্মবিস্মৃত গদাধর মায়ের পূজার ফুল আপনার মাথার উপরেই দিতেছেন। আরতি করিতে উঠিলেন তত আরতিই করিতে লাগিলেন। বিশ্রাম নাইশেষ নাই—অবিশ্রান্তভাবে আরতি করিয়াই যাইতে লাগিলেন। সে আরতি যে আর কখনাে শেষ হইবে তাহার কিছুমাত্র সম্ভাবনা রহিল না। আর ধ্যান করিতে বসিলেন তাে একেবারে জ্ঞানশূন্য-অচৈতন্য। দিবা নাই, রাত্রি নাই, স্থান নাই, অস্থান নাই—যেখানে ধ্যানে বসিলেন সেইখানেই একেবারে নিশ্চল প্রস্তরমূর্তির মত ধ্যানে মগ্ন হইয়া রহিলেন- আবার যে কখনাে সে ধ্যান ভাঙ্গিয়া জ্ঞান ফিরিবে সে আশা কাহারও মনে রহিল না । সুতরাং সে অবস্থায় গদাধরের দ্বারা দেবীর পূজা-কায্য আর কেমন করিয়া চলিতে পারে? তিনি তো আপনার ভাবেই আপনি বিভাের হইয়া থাকেন। তখন রাণী রাসমণির জামাতা মথুর বাবু গদাধরের ভাগিনেয় শ্ৰীযুক্ত হৃদয়নাথ মুখােপাধ্যায়কে আনাইয়া পূজারীর কাৰ্যে নিযুক্ত করলেন এবং গদাধরকে ‘মহাপুরুষ’ জ্ঞানে পরম সত্ন ও সমাদরে সেবা করিতে লাগিলেন। তারপর হইতে গদাধর আর পূজাতেও বসিলেন না-সংসারও করিলেন না- অষ্টপ্রহর আপনার ভাবেই মগ্ন হইয়া কেবল “মা মা” করিয়া দারুণ জ্ঞানশূন্য উন্মাদের মত বেড়াইতে লাগিলেন। বিবাহ কেবলমাত্র নামেই হইয়া রহিল। গদাধরের তপ নাই, জপ নাই, পূজা নাই, অর্চনা নাই, রামকৃষ্ণ ৩৭ ক্রিয়া নাই, কৰ্ম্ম নাই-নিশিদিন কেবল আকুল ভাবে ‘মা’ ‘মা’ করিয়া ছুটিয়া বেড়ান। কখনও বা জ্ঞানশূন্য হইয়া কাঠের পুতুলের মত স্তব্ধ হইয়া থাকেন, কখনও বা বালকের মত প্রতিমার কাছে গিয়া কেবল ‘মা মা করিয়া আবদার করিয়া বেড়ান। কিন্তু একটা আশ্চৰ্য্য যে, বিষয়ী লােক দেখিলেই লুকায়িত হন এবং ঈশ্বরের কথা ছাড়া আর কোন কথাতেই কাণ পাতেন না। নবম পরিচ্ছেদ রামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বরের কালীবাড়ীর কথা দেশ-বিদেশে বিখ্যাত হইয়াছিল। বিশেষ সেখানে সদাব্রত ছিল বলিয়া সৰ্ব্বদাই নানা দেশদেশান্তর হইতে নানা প্রকারের বিস্তর সাধুসন্ন্যাসী, জ্ঞানী, পণ্ডিত প্রভৃতি আসিয়া জুটিতেন। তাহার উপরে গদাধরের কথা প্রচারিত হইয়া নিত্য লােক- সংখ্যা—দর্শক সংখ্যা এবং সাধু-সন্ন্যাসীন দলের যাতায়াত আরও বাড়িয়া গেল। কেহ বা তাহাকে দেখিয়া পরম সাধু বলিয়া উল্লেখ করিয়া গেল-কেহবা ভণ্ড বলিয়া ঘৃণায় চলিয়া গেল--কেহবা পাগল বলিয়া মুখ ফিরাইয়া চলিয়া যাইতে লাগিল। কিন্তু কিছুতেই গদাধরের ভাব পরিবর্তন হইল না বরং আকুলতা এবং তন্ময়তা আরও বাড়িতেই লাগিল। সুতরাং নিত্য নিত্য নুতন নুতন সাধু-সন্ন্যাসীগণের আগমনও কমিল না। সেই সময়ে একজন সন্ন্যাসিনী ভৈরবী আসিয়া হঠাৎ উপস্থিত হইলেন। তিনি পরম শক্তিশালিনী তপস্বিনী-পরম জ্ঞানী-সৰ্ব্বশান্ত্রে ঠাকুর রামকৃষ্ণ সুপণ্ডিত। লােকে তাহাকে ‘ব্রাহ্মণী” বলিয়া ডাকিত এবং সিদ্ধযােগিনী বলিয়া তাঁহার পদতলে লুটাইত। সেই ভৈরবী ব্রাহ্মণী’ আসিয়া গদাধরের অবস্থা দেখিয়া চমকিত হইলেন। একদৃষ্টে তাহার পানে চাহিয়া চাহিয়া আনন্দাশ্রুতে ভাসিতে লাগিলেন। লােকে তাহার এই আশ্চৰ্য্য ভাব দেখিয়া অবাক হইয়া কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। ব্রাহ্মণী উত্তর দিলেন-“হায়! অন্ধ মানব হাতের কাছে রত্ন পাইয়াও চিনিতে পারে না, চক্ষের সম্মুখে সুস্পষ্ট দেখিয়াও অন্ধকার ঘুচে না! ইহাকে সামান্য মানব ভাবিও না। জীবের দুর্গত দর্শন করিয়া দয়াল মহাপ্রভু স্বয়ং আসিয়া একাধারে এই ধৰ্ম্মবীর ‘রামকৃষ্ণ মূর্তিতে অবতীর্ণ হইয়াছেন।” ব্রাহ্মণীর কথায় বহু জ্ঞানী ব্যক্তির চক্ষু খুলিল, মােহ ঘুচিল, ভ্রান্তি দূর হইল—গদাধরকে ‘রামকৃষ্ণ মূর্তিতে জীবন্ত জাগ্ৰত দেখিয়া তাহার চরণে ভক্তিভরে লুটাইতে লাগিল। ব্রাহ্মণী কিছুকাল দক্ষিণেশ্বরে থাকিয়া দিবারাত্র ‘ঠাকুর-রামকৃষ্ণের সঙ্গে সঙ্গে ফিরিতে লাগিলেন এবং ক্রমে ক্রমে তাহাকে চৈতন্যচরিতামৃত ও অন্যান্য বৈষ্ণব-গ্রন্থ সকল পাঠ করিয়া শুনাইতে লাগিলেন। ঠাকুর সেই সকল শুনিতে শুনিতে কখনাে বা আনন্দে উন্মত্ত হইয়া করতালি দিতে লাগিলেন, কখনো বা ভক্তি নীরে ভাসিতে লাগিলেন, আবার কখনাে বা আকুল হইয়া কঁদিতে কাদিতে মাটীতে গড়াগড়ি দিতে থাকিতেন। ঘন ঘন ভাবাবেশে বাহ্যজ্ঞানশূন্য হইয়া পড়িতে লাগিলেন। তারপর ব্রাহ্মণী ঠাকুর রামকৃষ্ণকে যে প্রণালীতে ঈশ্বরকে ডাকিলে ও ভজনা করিলে দর্শন পাওয়া যায়—শাস্ত্রের সেই সকল প্রণালী দেখাইয়া, শাস্ত্রের উপদেশ সকল দিয়া, সেইভাবে ভগবান্কে রামকৃষ্ণ ডাকিতে শিখাইয়া দিলেন। ঠাকুরও ব্রাহ্মণীকে ‘গুরু’ বলিয়া তাহার আদেশ ও উপদেশ মত ভজন-সাধন করিয়া অতি সত্বরই সেই সর্বশক্তিমান দয়াল জগদীশ্বরের প্রত্যক্ষ দর্শন লাভ করিলেন। স্রোতের জল যেমন স্রোতেই মিলিয়া যায়, ঠাকুরের অন্তর্নিহিত ভক্তির প্রবাহ উথলিয়া উঠিয়া তেমনি ভক্তির-স্রোতে মিশিয়া–পূর্ণ ভক্তিময় ধৰ্ম্মবীর সৃষ্টি করিয়া দিয়া গেল। ঠাকুরের ঈশ্বরানুরাগ, অসামান্য ভক্তি-অনন্ত ধারায় অহোরাত্রি প্রবাহিত। তাহা দেখিয়া ব্রাহ্মণী আনন্দে গদ গদ হইয়া উচ্চকণ্ঠে প্রচার করিলেন, যে, “স্বয়ং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুই ধৰ্ম্মবীর ঠাকুর রামকৃষ্ণ রূপে জগৎ তরাইতে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হইয়াছেন।” এই ঘটনার কিছুকাল পরে তােতাপুরী’ নামক নামক একজন সিদ্ধ মহাপুরুষ দক্ষিণেশ্বরে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। ইনি পশ্চিম- দেশবাসী ‘পুর নামক সন্ন্যাসীদলের লােক বলিয়া সকলে তাহাকে ‘তােতাপুরী' বলিয়া ডাকিত। এই মহাপুরুষ আসিয়া ঠাকুর রামকৃষ্ণকে দর্শন করিবা মাত্রই তাহার দুই চক্ষে দর দর ধারায় আনন্দাশ্রু গড়াইয়া পড়িতে লাগিল। তিনি ভাবে উন্মত্ত হইয়া ঠাকুরকে বক্ষে আলিঙ্গনবদ্ধ করিয়া আননে আত্মহারা হইয়া নাচিতে লাগিলেন এবং মুখে কহিতে লাগিলেন, “আজ আমি ধন্য হইলাম, তােমার দর্শন—তােমার সঙ্গলাভ করিলাম। তারপর সেই তোতাপুরী একাদিক্রমে এগারাে মাস কাল দক্ষিণেশ্বরে থাকিয়া ঠাকুরকে সমগ্র বেদান্ত শুনাইলেন। তােতাপুরী ‘বিস্ময়-ভক্তি সহকারে চমৎকৃত হইয়া দেখিলেন যে বেদান্ত শুনিতে শুনিতে ঠাকুরের বাহজ্ঞান লুপ্ত হইয়া যায়। বিশেষ পরীক্ষা দ্বারা জ্ঞাত হইলেন যে তাহা কেবল ভাবের ঘাের নহে, যথার্থই ঠাকুর রামকৃষ্ণের সমাধি হইয়াছে অর্থাৎ ঈশ্বরে তাহার আত্মার মিলন হইয়া গিয়াছে।
৪০ ঠাকুর রামকৃষ্ণ ইহার পর হইতেই ঠাকুর রামকৃষ্ণের নাম চারিদিকেই প্রচারিত হইয়া পড়িতে লাগিল। তখন আর কেহ তাহাকে ভণ্ড বা পাগল বলিয়া উপেক্ষা করিতে পারিল না। প্রতাহ দলে দলে লােক আসিয়া তাহাকে দর্শন করিতে লাগিল, তাহার মুখের অমৃতের মত উপদেশ শনিবার জন্য দলে দলে লােক আগ্রহভরে তাকে ঘিরিয়া বেড়াইতে লাগিল। তখন হিন্দুধৰ্ম্মের কোন কোন সম্প্রদায়ের নেতাগণ পর্যন্ত আসিয়া তাঁহাকে দর্শন করিয়া ধন্য জ্ঞান করিতে লাগিলেন এবং সকলেই ঠাকুরকে তাহাদের নিজ নিজ সভা-গৃহে লইয়া যাইবার জন্য অত্যন্ত আগ্রহ প্রকাশ করিতে লাগিলেন। কলুটোলায় তখন ‘চৈতন্য-সভা ছিল। সেই সভার সভাপতি বৈষ্ণবপণ্ডিত বৈষ্ণবচরণ আসিয়া একদিন ঠাকুর রামকৃষ্ণকে চৈতন্য- সভায় লইয়া গেলেন। সেখানে অমনি হরিনামের রােল উঠিল-- সংকীৰ্ত্তনের প্রবাহ ছুটিল। সেই সংকীর্তন শুনিতে শুনিতে ঠাকুরের দুই চক্ষু বতিয়া দরদর ধারে প্রেমা পড়তে লাগিল, তিনি কিছুক্ষণ প্রস্তর পুত্তলিকার মত স্থির ধীর স্পন্দহীন অবস্থায় রহিলেন, তারপরে তঁাহার সর্বশরীরে রােমাঞ্চ উপস্থিত হইল—ভাবে বিভাের তন্ময় হইয়া নাচিতে নাচিতে গিয়া স্বয়ং শ্রীগৌরাঙ্গদেবের সিংহাসনের উপর বসিয়া পড়িলেন। সভাশুদ্ধ লােক অবাক—চমৎকৃত! সকলেরই চক্ষে জল, মুখে হরিধ্বনি ! স্বয়ং বৈষ্ণবচরণ তাহাদের মধ্যে দাঁড়াইয়া হরিধ্বনি দিতে দিতে উচ্চৈঃস্বরে কহিলেন, “এ উন্মাদ সামান্য উন্মাদ নহে—বিশ্বপ্রেমে উন্মত্ত স্বয়ং মহাপ্রভু শ্রীগৌরাঙ্গদেব।” সেই কথা শুনিয়া সভার অধিকাংশ লােকই ঠাকুরকে সাক্ষাৎ শ্ৰীগারাঙ্গ মহাপ্রভু ভাবিয়া তাহার সর্বাঙ্গে যেন সেই চিত্র প্রকটিত ধৰ্ম্মবীর ৪১ দেখিতে পাইল। অমনি সকলেই মােহিত আত্মহারা হইয়া হরিধ্বনি করিতে করিতে তঁাহার চরণতলে সিংহাসনের সম্মুখে ধূলায় লুটাইয়া গড়াগড়ি দিতে লাগিল। শুধু যে কেবল চৈতন্য-সভায় গিয়া ঠাকুরের ঐরূপ ঐরূপ দশা অর্থাৎ ঈশ্বরের ভাবে বাহ্যজ্ঞান লােপ হইয়াছিল তাহা নহে। শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভু যেমন সর্বদাই নানা মহাভাবের ঘােরে দশাপ্রাপ্ত হইতেন, তঁাহারও সৰ্ব্বদাই সেই প্রকার ভাবে নানারূপ ‘দশা প্রাপ্তি ঘটিতে লাগিল। ঠাকুর রামকৃষ্ণ বিশ্বসংসার ভুলিয়া সেই সকল দশায় মগ্ন হইতে লাগিলেন। দশম পরিচ্ছেদ ধর্মবীর ঠাকুর রামকৃষ্ণ অহােরাত্রি কেবল ‘মা মা করিয়া দিতে থাকেন এবং মন্দিরে ঢুকিয়া মায়ের প্রতিমার সম্মুখে দাড়াইয়া তাহার সঙ্গে কথা কহেন, গম করেন, উপদেশ গ্রহণ করেন। সজল চক্ষে জোড়হস্তে গদগদ ভাবে প্রতিমার সম্মুখে দাঁড়াইয়া পাগলের মত চীৎকার করিয়া বলিতে থাকেন, “মা আমি কেবল তােরই কথা শুনবে-শাস্ত্রও জানি না, পণ্ডিতও জানি না। তুই আমাকে বুঝিয়ে দিবি তবে বিশ্বাস করবাে।” কেহ তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলে তৎক্ষণাৎ উত্তর দেন—“যিনি সেই জগৎপতি পরমেশ্বর তিনিই আমার এই স্নেহময়ী ও দয়াময়ী মা।” এমন যে ধৰ্ম্মবীর ভক্তবীর, মা কি তাহাকে দেখা না দিয়া তঁাহার সঙ্গে কথা না কহিয়া স্থির হইয়া থাকিতে পারেন? জগন্মাতা 82 ঠাকুর রামকৃষ্ণ কালী পাষাণমূৰ্ত্তি ফুড়িয়া প্রত্যক্ষ প্রকাশিত হইয়া ঠাকুরকে দর্শন দিয়া একদিন বলিয়া গেলেন- “তুই আর আমি এক। জীবের মঙ্গলের জন্য তুই কেবল ভক্তি নিয়ে থাক।” সেই হইতে ঠাকুর রামকৃষ্ণ আবালবৃদ্ধ-বনিতা—সকলেরই প্রাণে ভক্তির উৎস বহাইতে দিবারাত্রি চেষ্টা করিতে লাগিলেন। ঠাকুর রামকৃষ্ণ আপনার মাতা চন্দ্রমণিকে জগজ্জননী কালী মায়ের অংশ ও রূপান্তর বলিয়া ভাবিতে লাগিলেন। জ্যেষ্ঠভ্রাত। রামকুমারের মৃত্যুর অল্পকাল পরেই মাতাকে কামারপুকুর হইতে আনাইয়া আপনার কাছে রাখলেন এবং সেইরূপ ভাবিয়াই তঁাহার পূজা ও সেবা করিতে লাগিলেন। এই সময় হইতে বিস্তর লােক তাঁহার প্রতি আকৃষ্ট হইয়া তাহার ভক্ত হইয়া পড়িয়াছিল। সেই সকল ভক্তেরা সর্বদাই ঠাকুরের কাছে আসিতে আরম্ভ করিল। সকলেই তাহার ভাবাবেশ দেখিয়া মুগ্ধ হইয়া যাইত এবং ‘াহার মুখের অতি সহজ সরল উপদেশ সকল শুনিয়া জ্ঞান লাভ করিয়া ধন্য হইত। তাহারা যেন নিবিড় অন্ধকারের মধ্যে উজ্জল আলােকে সরল, সুন্দর, সুগম পথ দেখিতে পাই এবং সেই পথে চলিয়া শীঘ্রই সংসারের পাপ-তাপ, দুঃখ ও অশান্তি জয় করিতে শিখিত। ঠাকুর রামকৃষ্ণ অত্যন্ত সহজ সরল সাদাসিধা বরের কথায় এমন ভাবে উপদেশ দিতেন এবং উপমা দিয়া প্রমাণ করিয়া দিতেন যে ক্ষুদ্র বালকটার পর্যন্ত তাহা বুঝিতে কিছুমাত্র কষ্ট হইত না। সুতরাং কি পণ্ডিত কি মুখ, কি জ্ঞানী কি অজ্ঞান, কি বৃদ্ধ কি বালক-সকলেই অত্যন্ত সহজে সে সকল হৃদয়ে অঙ্কিত করিয়া লইতে পারিত।
ধৰ্ম্মবীর ৪৩ ব্রাহ্মধৰ্ম্মের অনেক উপাসক এবং ভক্ত ঠাকুর রামকৃষ্ণের কাছে আসিয়া উপদেশ লইতেন এবং ঠাকুরও বিনা ওজর আপত্তিতে তাহাদের সমাজে গমনাগমন করিতেন—তাহাতে তিনি বিন্দুমাত্রও দ্বিধা বােধ করিতেন না। এমন কি গির্জার দ্বারদেশে গিয়াও প্রভু যীশুখৃষ্টের ভজনা দেখিয়া আনন্দ ও তৃপ্তিলাভ করিতেন। তিনি সব্বসমক্ষে সর্বদাই বলিতেন-“সকল ধৰ্ম্মমতই ভগ- বানের কাছে পৌছিবার ও তাহার দর্শন লাভ করিবার এক একটি ভিন্ন ভিন্ন পথ। সেইজন্য সকল ধর্মই সত্য, কোন ধৰ্ম্মই মিথ্যা নহে।” তিনি বৈষ্ণব, শাক্ত, শৈব, মুসলমান, খৃষ্টান প্রভৃতি সকল ধৰ্ম্মমতই সমর্থন করিতেন। ঠাকুর যে ঘরে থাকিতেন সেই ঘরে হিন্দু দেবদেবীর ছবির সঙ্গে বুদ্ধ এবং যীশুখৃষ্টেরও ছবি টাঙ্গানাে থাকিত। অদ্যাবধি সে সকল ছবি বিদ্যমান রহিয়াছে। ঠাকুর রামকৃষ্ণ পৃথিবীর যাবতীয় স্ত্রীলােক মাত্রকেই জননী বলিয়া ভাবিতেন এবং সর্বদাই সকলকে ‘মা’ বলিয়া ডাকিতেন। ভক্ত- দেরে কহিতেন-“জগতের স্ত্রীজাতি মাত্রকেই ‘মা’ বলিয়া ভাবিতে পারিলে তবে মানুষ পবিত্র হয় এবং সহজেই ভগবানের দর্শন লাভ করিতে পারে।” এইরূপে পাপী-তাপীর উদ্ধারের উপায় করিয়া দিয়া, অন্ধ ও অজ্ঞানকে পথ দেখাইয়া দিয়া, সংসারের দুঃখ-তাপ দূর করিয়া দিয়া, সকলের জন্য সুখ-শান্তির পথ খুলিয়া দিয়া, লীলাসম্বরণ করিয়া তিনি আপনার স্বর্গরাজ্যে গমন করিয়াছেন। পাপী-তাপীকে উদ্ধার করিয়া তাহার নিকটে লইয়া যাইবার জন্য তিনি বহু ভক্তকে সেই মহাধর্মপ্রচারকার্যে নিযুক্ত করিয়া রাখিয়া গিয়াছেন। তাহারা এক্ষণে বারাণসী, হরিদ্বার, বৃন্দাবন, মান্দ্রাজ, উত্তরপশ্চিমাঞ্চল, যুক্তপ্রদেশ, কুমায়ূন প্রভৃতি ভারত- বর্ষের নানা দেশে এবং ইংলও, আমেরিকা প্রভৃতি সুদূর পাশ্চাত্য ভূখণ্ডের এ ৪৪ ঠাকুর রামকৃষ্ণ নানা স্থলে ছড়াইয়া পড়িয়া দুৰ্বল মানবকে ঈশ্বরলাভের প্রশস্ত রাজপথ দেখাইয়া দিতেছেন। ইহাদের মধ্যে সর্বপ্রধান ভক্ত-শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দের নাম সকলেই শুনিয়া থাকিবেন। তবে এস ঠাকুর, আর এক বার এস! তােমার সেই প্রেমােন্মাদ ভাবােন্মাদ বিশ্ববিমােহনরূপে আর একবার আমাদের সম্মুখে দাড়াও। তােমার প্রশান্ত প্রফুল্ল মুখের মধুর হাসিতে আমাদের দুঃখের জীবনে সুখ-শান্তির জ্যোৎস্না ফুটিয়া উঠুক। তোমার চরণধূলি-পরশে আবার ধরণী পবিত্র হউক। তােমার চরণামৃতে আমাদের পাপ-তাপের ময়লা ধুইয়া আমরা শুভ্র পবিত্র দেব শিশুর মত হই। আর একবার আমাদের সম্মুখে দাড়াইয়া হাসিমুখে তেমন করিয়া বল- “সাধুদের পরিত্রাণ, বিনাশ-কারণে দুরাত্মার, ধৰ্ম্মের রক্ষার জন্য যুগে যুগে এই অবতার।” সম্পূর্ণ
No text on this page.
তিন-আনা সংস্করণ “কল্পতরু” গ্রন্থাবলী বিদ্যাসাগর মাইকেল মধুসূদন বঙ্কিমচন্দ্র গােত্থলে দ্বিজেন্দ্রলাল রাজা রামমােহন রায় হেমচন্দ্র ২৩। ডেভিড় হেয়ার ২৪। রামতনু লাহিড়ী ২৫। লােকমান্য তিলক ঠাকুর রামকৃষ্ণ নেপােলিয়ন শর গুরুদাস রমেশচন্দ্র দত্ত ৯। রামদুলাল সরকার ১০। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ শিবনাথ শাস্ত্রী ২৮। বিসমার্ক গারফিল্ড মটসিনি কৃষ্ণদাস পাল ১২। হাজি মহম্মদ মহসীন আনন্দমােহন বক্স এব্রাহাম লিঙ্কন স্থর রাসবিহারী ৩৩। দাদাভাই নােরজ জর্জ ওয়াসিংটন ৩৪। আচাৰ্য রামের প্যারীচরণ সরকার লর্ড কিচুনার বিবেকানন কান্তকবি রজনী ৩৬। বৃকার ওয়াশিংটন স্যার আশুতোষ ১৯। জেমসেদজী টাটা অক্ষয় কুমার ৩৯। গ্যাবিল্ডি ভট্টাচাৰ্য্য এও সন্ ৬৫ নং কলেজ ষ্ট্রীট, কলিকাতা ময়মনসিংহ লাইব্রেরী, ময়মনসিংহ, ৯নং পাটুয়াটুলা, ঢাকা।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.