Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Patrabali Vol. 1
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
পত্রাবলী প্রথম প্রস্তু শ্ৰীঅবিনাশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রণীত। A ন ; * * * কলিকাতা, ১/১ শঙ্কর ঘােষের লেন, মধ্যভারত-প্রেসে, শ্রীউমেশচন্দ্র নাগ দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত। ১৩০৪। মুল্য এক টাকা।
No text on this page.
উপহাৱ। ভাই হরিপদ ঊষার আলােকে যথা অরুণ প্রকাশ, আশৈশব মাতৃভাষা অনুরক্ত মনে তুমিই করিলে প্রেম মূরতি বিকাশ, তুমিই লইলে মােরে মন্দারের বনে, তুমিই দেখালে শত রূপের বাহার, তুমিই কহালে কথা অগ্রীর সনে । আহা-- সংসারের দুঃখ দৈন্য ভূলে রহিবার পাইনু ঔষধ কিবা এ মর-জীবনে। আজি তুমি বাল্যসখা সংসার বিরাগী, উদার হৃদয় লয়ে হয়েছ সন্ন্যাসী ; আমাদের প্রেমালাপে এবে অনুরাগী হবে কি, জানিনা তাই মনে ভয় বাসি। তবুও সে মধুর মনােভাব মনের বিকার, শুনাতে তোমায় বড় আনন্দ আমার ।
No text on this page.
ওভিড ('ভিক্ষা ) বিরহিনী অশ্রুজলে ভিজাইয়া চিত্রিলে কি কবিবর, প্রেমের বিলাস উন্মাদিনী মানিনীর হৃৎপিণ্ড গুলি তরল অনলে, কিগাে, হৃদয় উচ্ছাস আঁকিলে ও চিত্রপটে অতুল ভুবনে? কলঙ্কিনী কামিনীর উদ্ভান্ত প্রাণের উন্মত্ত ভাবের স্রোত প্রবাহিতে মনে ধরেছিলে তীব্র দ্যুতি ক্ষিপ্ত বিদ্যুতের ? প্রত্যেক অক্ষরে শুনি মহা আৰ্তনাদ, হেরি প্রাণে ষড়রিপু বিগ্রহে ভীষণ ভৌতিক সংহর্ষোদ্ভূত উদ্বেল নিনাদ যেন গ্রাসি জল স্থল পূরিছে শ্রবণ । ভাবের প্রভাব হেরি কুদ্ধ শ্বাসে রই, পড়িলে তােমার কাব্য দিশা হারা হই অতুল্য ও তুলিকার ধৌত রঙ্গ নীরাকার দাও যদি কণা মাত্র অধম ভিক্ষুকে, আশাতীত মনােআশা পূরিবে তাহার । সুরঞ্জিবে শতচিত্র পরম কৌতুকে সামান্য এ চিত্রশালা সাজাইবে সুখে।
No text on this page.
সূচীপত্র। পৃষ্ঠা। ••• . . ১ ••• રર ••• ••• ৪ ০ ১। যশােবন্ত সিংহ—ঔরঙ্গজেবের প্রতি ২। দলনী বেগম-মীরকাসেমের ৩। নলকুবর-রাবণের : ৪। প্রভাবতীরাজসিংহের ৫। দময়ন্তী-নলের ৬। দ্রৌপদী—ভীমসেনের ৭। সীতাদেবী-রামচন্দ্রের ৮। শ্ৰীমতী- শ্রীমানের ৯। রাজসিংহ—ঔরঙ্গজেবের ১০। বিমলা-বীরেন্দ্র সিংহের ১১। সূৰ্য্য-মুখী--নগেন্দ্রনাথের ১২। দশানন-সীতার ০ ০ ০ . ১০ ১১১ ১১ p
No text on this page.
পত্রাবলী। যশােবন্ত সিংহ ৫০০০- ঔরঙ্গজেবের প্রতি। ( ঔরঙ্গজেবের নিষ্ঠুরতায় তনয়ের নিধন প্রাপ্তি হইলে পুত্র শােকে দগ্ধ হইয়া মৃত্যুকালে মারবার পতি যশােবন্ত সিংহ আফগান স্থানের সীমান্ত হইতে নিম্ন লিখিত পত্রিকাখানি মােগল সম্রাট সমীপে প্রেরণ করিয়াছিলেন।] সম্রাট। এত দিনে তব চক্রে পরাজিত হয় যশােবন্ত ! দুর্বিসহ নিষ্ঠুর আঘাতে হইয়াছে অভিভূত যােধপুরেশ্বর । সহস্র সংগ্রামে শত কামান উদগীর্ণ মারবার রাজ বীরশ্রেষ্ঠ যশােবন্ত সিংহ ঔরঙ্গজেবের অধীনস্থ হইলেও স্বীয় দুর্দমনীয় বলবীৰ্য্য ও সাহসিকতার নিমিত্ত সম্রাটের নিরতিশয় বিদ্বেষ ভাজন হয়েন এবং “তৎ কর্তৃক অনেক সময়ে অনেক বিপদে পড়িয়াও স্বীয় বিশ্বস্ত সামগণের ২ পত্রাবলী। গাঢ়তম ধূম্রজাল কাল মেঘাকার পারেনি বারিতে যার বীৰ্য্য দুর্নিবার, পরন্তপ দর্পে যার পরাণে তােমার জ্বলিত অরাত্রি-দিবা বিষের আগুণ, নরেশ্বর!—হায়, আজি দৈব দুর্বিপাকে সে তেজ নিষ্প্রভ তার, তােমার কৌশলে ! চূর্ণ তার অহঙ্কার! অদম্য গরব একেবারে নিষ্পেষিত করেছ চরণে। কঠোর আচারে তব অহে নরনাথ, ভারতের অদ্বিতীয় সেনাপতি আমি নহি যশােবন্ত আর! রাজ রাজেশ্বর! পূর্ণ মনস্কাম তব এতদিন পরে । স্বার্থান্ধ হৃদয় তব জিঘাংসা অনলে প্রাণের আকাঙ্ক্ষা মম ভস্ম করিয়াছে ? সহায়তায় তৎসমুদয় হইতে উদ্ধার লাভ করিতে সক্ষম হইয়াছিলেন। কিন্তু পরিশেষে তিনি দুরাচারের যে চাতুষ্য জালে জড়িত হইলেন, তাহা হইতে আর নিষ্কৃতি পাইলেন না। এক সময়ে দুর্ধর্ষ অফিগানগণ বিদ্রোহী হইয়া কাবুল রাজ্যে ঘোর বিপ্লব সমুন্তা- বন করিল। ঔরঙ্গজেব মনে মনে এ বিপ্লবকে সাল্লাদে অভ্যর্থনা করিলেন এবং যশােবন্তের ও তদীয় পরিবারবর্গের প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ প্রদর্শন করিতে প্রতিজ্ঞা করিয়া বিদ্রোহ দমনার্থে মারবার সিংহকে বিপদ সঙ্কুল সেই দূর দেশে প্রেরণ করিলেন। দুরাশয় বিশ্বাসঘাতকতা দ্বারা নিজ অভীষ্ট সাধনে অসমর্থ হইয়া তাহার যশােবন্ত সিংহ। এই যে দানব ঐর, অজগর কায় হিমাগার হিন্দুকুশ কঠোর হইয়ে সুতীক্ষ্ণ তুষার শর বরষে অজস্র, অসাঢ় করিয়া দেয় জীবময় ধরা ; মরুময় করি সুখে মধ্য ধরাতল রয়েছে দাঁড়ায়ে অই উদ্ধত উন্নত ; সে হ’তে নির্মম তুমি! তােমার প্রতাপে হৃদয়ের উষ্ণ স্রোত রুদ্ধ হয়ে যায় । তুমি হে আরঙ্গজীব কাল হয়ে মম বংশ তরু করেছ ছেদন! একঘাতে সব আশা করেছ নিপাত ! বীৰ্য, মান উৎসাহ, বীরত্ব, ধৃতি সমূলে নিৰ্ম্মল করেছ আমার ! বিষ হীন ফণী সম করি মােরে নিরুদ্বেগে বসেছ আসনে। ধন্য তুমি ! ধন্য ধন্য ইন্দ্রজাল তব । গলদেশে কল্পিত বন্ধুত্বের ফাঁস পরাইয়া দিয়া আটকের পরপারে মরিতে পাঠাইয়া দিল। মহারাজ যশোবন্ত স্বীয় জ্যেষ্ঠপুত্র তেজীয়ান পৃথ্বীসিংহের হস্তে স্বরাজ্যের শাসন ভার অর্পণ করিয়া আফগানস্থানে যাত্রা করিলেন। অনন্তর এক সময়ে ঔরঙ্গজেব পৃথীসিংহকে রাজ সভায় আনয়ন করিয়া তাহার প্রতি বিশেষ আদর ও শিষ্টাচার প্রদর্শন করিয়া হস্তধারণ পূর্বক কহিলেন-“রাঠোর। শুনিয়াছি এ ভুজে তুমি তােমার পিতার সমান বল ধরিয়া থাক, ভাল, এখন তুমি কি করিতে পার ?" পৃথীসিংহ সমুচিত সন্ত্রম সহকারে উত্তর করিলেন-“ঈশ্বর : পত্রাবলী। ও মায়ায় কোন্ জন অসীম ভারতে নহে মুগ্ধ আজি! নৃশংস কিরাত অহহ, পাতিয়াছে চতুর্দিকে অবিশ্বাস জাল, পড়ি তায় লক্ষ নর করে ছট ফট নিরন্তর, উপায় কি হবেনা ইহার ? এ বাগুরা কি ছিন্ন ভিন্ন করিবেনা কেহ ? উন্মলিত এ কণ্টক হবেন কখন ? ভারতের সর্বনাশী চিতানল জ্বলা কেহ কি নিবাবে না ? শতধা বিদারি খল ক্রুর হৃৎপিণ্ড কেহ না ছিড়িবে? ভারত ঈশ্বর তুমি, তব ভীম দাপে সসাগরা বসুন্ধরা কঁপে থর থর। অগণ্য রাজেন্দ্র বৃন্দ প্রচণ্ড প্রতাপে নিরন্তর ভীত চিত্ত ধন মান লয়ে। বিশাল ভূখণ্ড এই পূর্ণ রত্ন জালে তােমার চরণে পড়ি যায় গড়াগড়ি। দিল্লীশ্বরের মঙ্গল করুন ; সম্রাট। যখন নরনাথ সামান্য প্রজার উপর আপনার আশ্রয় রূপ কর বিস্তার করেন, তখন তাহার সকল কামনা সিদ্ধ হয়, কিন্তু আজি আমার সৌভাগ্যবশতঃ যখন আপনি স্বকরে এ অধীনেয় দুই হস্ত ধারণ করিতেছেন, তখন আমার এরূপ বােধ হইতেছে যেন আমি সমস্ত পৃথিবী জয় করিতে পারিব।” কথার সঙ্গে সঙ্গে তাহার প্রচণ্ড ও জীবন্ত অঙ্গভঙ্গি প্রকাশিত হইল এবং সম্রাট তখনই বলিয়া উঠিলেন “দেখিতেছি এ যুবক দ্বিতীয় খুনান (যশােবন্ত)।” এই যশােবন্ত সিংহ। সেই তুমি নৃপশ্রেষ্ঠ অক্ষৌহিণী পতি হ’লনা সাহস তব যােধপুরাধিপে ভেটিতে সম্মুখ রণে? খৰ্বিতে স্বহস্তে সিংহের বিক্রম তার ? নিভাতে ফুৎকারে যবন বিধ্বংসী এই অন্তরের জ্বালা? হা চক্রি! অব্যর্থ আয়ুধ তব করিলে গ্রহণ। প্রকাশিয়া মায়ামন্ত্র, ভুলালে আমায়, পাঠালে ভারত পারে সুদূর কাবুলে মরিতে পাঠান সনে দুর্ধর্ষ সংগ্রামে। ভীষণ ভুজঙ্গে হেন করিতে বন্ধন মন্ত্রোক্তৃত পাতি ফাদ হলে পুলকিত। সাহা! যশােবন্তু দুর্দম ক্ষত্রিয় । বাক্যের অভ্যন্তরে যে এক কুটিল ভাব নিহিত ছিল, তাহা কেহই বুঝিল না। শঠ- শ্রেষ্ঠ সম্রাট যেন তাহার সাহস ব্যঞ্জক সরল বাক্যে সন্তুষ্ট হইয়াই তাহাকে একটা মহাহসজ্জা প্রদান করিলেন। সেই মহামুল্য সজ্জার সূত্রে সূত্রে যে কালকূট নিহিত ছিল, তাহা পৃথীসিংহ আদৌ জানিতে পারিলেন না, সুতরাং চিরন্তন প্রথামত তিনি সম্রাটের সম্মুখেই তাহা পরিধান করিয়া উপযুক্ত বন্দনান্তর সভা হইতে বিদায় গ্রহণ করিলেন। “অবিলম্বে দারুণ যন্ত্রণা আসিয়া তাহার সর্বাঙ্গ আক্রমণ করিল। সুবিমল কাঞ্চন বর্ণ বিবর্ণ হইয়া গেল। যশােবন্তের হৃদয়ের আনন্দ রাঠোর কুলের ভবিষ্যত আশা ভরসার স্থল কুমার পৃথীসিংহ পাষণ্ড আরঙ্গজেবের নৃশংসতায় অকালে ইহলােক হইতে বিচ্যুত হইলেন।
পত্রাবলী - অজেয় সমরে! ম্লেচ্ছ কংশ ধ্বংশ ক্ষম। হ’লনা হ’লনা তব বাসনা পূরণ! দমিলাম তব তরে যম সম রিপু। অহো- দীর্ঘকায় আফগান যার ভুবলে তােমার চরণে আজি পড়েছে লুটায়ে ; যাহার গম্ভীর তম কামান হুঙ্কারে কপিল সহ অদ্রি মধ্য আসিয়ার রাজপুত সৈন্য যার গর্জি বীর মদে বিদারিল ব্যোমভেদী হিন্দুকুশ চূড়া, তব জয় ধ্বনি যার রণ তূৰ্য্য মুখে মুখরিত করিয়াছে সহস্র গহ্বর, • সম্রাট। তােমার দক্ষিণ বাহু সেই বীরসিংহে, হা ধিক! হেরিলে তুমি সভীত অন্তরে । “যশােবন্তের বার্ধক্যের যষ্টি ভাঙ্গিয়া পড়িল-তাহার সকল আশা ভরসা শুকাইয়া গেল। অত্যাচারীর প্রচণ্ড অত্যাচার সহ্য করিয়াও যে হৃদয় এতদিন অটুট ছিল, তাহা এই পুত্র শেকরূপ নিদারুণ শেলপ্রহারে শতধা বিদীর্ণ হইয়া গেল। শােকে দুঃখে দারুণ মনােবেদনায় ভগ্ন হৃদয় রাঠোর রাজ সেই সুদূর হিন্দুকুশের ক্রোড়দেশে সৎ ১৭৩৭ অব্দে মানবলীলা সম্বরণ করিলেন। তাহার সেই শােচনীয় মৃত্যুর প্রতিশোধ লইতে পারে, তাহার আর এমন কোন উত্তরাধিকারী ছিল না।" রাজস্থান (বরাট প্রেসের) মারবার পৃষ্ঠা ৮৪-৮৭।
যশােবন্ত সিংহ। বিজয় পতাকা ক মধ্য আসিয়ার দুর্ভেদ্য শৈলেন্দ্র বক্ষে রােপিয়াছি বলে, গগনে উড্ডীন মম ভীম বাহু ধৃত তােমারি বিজয় চিহ্ন আতঙ্কে হেরিলে। শত রাজপুত কষ্টে তব জয় না কাপাইল গুরু গুরু তােমারি হৃদয়। উৎপাদিল ধিকি ধিকি বিষাগ্নি ভীষণ। ভাবিলে অবধ্য আমি তব খাঘাতে, দারুণ অব্যর্থ অস্ত্র করিলে গ্রহণ। কুক্ষণে তনয় মম বংশের ভূষণ পালিল আদেশ তবআইল সভায়। জিজ্ঞাসিলে পুত্রে মম ‘মম তুষ্টি তরে কি সাধিতে পার তুমি যশােবন্ত সুত। হায়রে কুক্ষণে পুত্র বীর কুল চূড়া উত্তরিল-নরনাথ। পাইলে আদেশ এ অসি জিনিতে ক্ষম বিপুল বসুধা। ক্র্যর হাসি বিকাশিল, আরঞ্জীব, তব বিকট বদনে। কহিলে সভাস্থ জনে, ‘দ্বিতীয় খুনান এই সিংহের তনয়। হায় পৃথীসিংহ মম সরল হৃদয়, সম্রাট প্রসাদ মুগ্ধ বিহ্বল বালক, দেখিল না সে হাসিতে তীক্ষ্ণ ধার ছুরি / পত্রাবলী। কোটী কোটী ধ্বক্ ধ উঠিলেক জলি ! দেখিল না দেখিলনা সে হাসিতে হায়, এলিতেছে একেবারে সৃষ্টিনাশ কারী বজ্ৰানল, দাবানল বাড়বানলের কেন্দ্রীভূত তীব্রতম জ্বালা ভয়ঙ্কর। শিশু পুত্র তব দত্ত পরিচ্ছদ পরি (পিতা নাই পরবাসে) হাসি হাসি আসি জননীরে দেখাইলা। ওকি পৃথীসিংহ। সহসা উন্মত্ত কেন ঘুরাও নয়ন । ওকি রাজদত্ত ভূষা রােমােন্মত্ত হয়ে শত খণ্ডে ছিন্ন ভিন্ন করিতেছ কেন ?” জিজ্ঞাসিলা মহারাণী, উত্তরিলা পুত্র, মাগাে! বুঝি নাই আগে-জানি নাই অহহ, এ ভূষণ আরঙ্গের বিষদন্ত ময় । মাগাে! এযে সম্রাটের বিদ্বেষ রেশমে বিরচিত! মাগাে! মাগাে ! বুঝি নাই আগে- এ নহে ভূষণ এযে বৃশ্চিকের গুহা ! বৃশ্চিকের লক্ষ পদ যেন সূতা এর রােমে রােমে বিন্ধিয়াছে পারিনা খুলিতে। রে রে র নরহন্তা! পাই যদি প্রাণ, কোটী খণ্ডে বিষদন্তে চিরিব তোরেরে । - যশােবন্ত সিংহ। কিন্তু বুঝি মনে আশা শি। মনেই রহিল- যায় প্রাণ যায়, মাগাে! পৃথীসিংহ তব চলিল জন্মের মত ছাড়িয়া তােমায়। পিতঃ গাে ! কোথায় তুমি দেও দরশন। আরঙ্গের বিষে আঁজি হারাই জীবন। প্রতিশােধ, প্রতিশােধ, প্রতিশােধ! উঃ উঃ- হায়রে সর্দারগণ আরঙ্গের রক্ত আনিলি না কেন? সে বিবর্ণ দেহে কেন রে কালের রক্ত দিলিনা ঢালিয়ে ? তাহলে তাহলে পৃথ্বী পাইত জীবন। ওকি! সবে চেয়ে কেন বিস্মিতের মত । সে রক্ত যে শুধু বিষ ! বিষে বিষ ক্ষয়, মম দুরদৃষ্ট হেতু এ নিগূঢ় তথ্য ভুলেছিলে সেই কালে কাপুরুষ গণ ! বাপধন! প্রতিশােধ—এ দারুণ তৃষা বুকে করি অরিয়াছ! অন্তিম শয়নে চেয়েছিলে উচ্ছলিত সতৃষ্ণ নয়নে ! কিন্তু কেহ দেয় নাই মম্ষু হৃদয়ে এক বিন্দু সুশীতল সান্ত্বনার কথা। হাঁপাইয়া মহাপ্রাণী হয়েছে বাহির! ওরে তাের শােক প্রাণে বেজেছে ভীষণ একেবারে চণ মম এ বৃদ্ধ হৃদয়। ২ ১০ পত্রাবলী • ! যারে দংশে সেই মরে কাল সর্প-বিষে কিন্তু ওরে আরঙ্গের কূট হলাহল তীব্রতর, বাসে তার বিষাক্ত আকাশ, অখিল ধরার প্রাণী হয় জর জর। বিষে তার জ্বলে তুমি হারায়েছ প্রাণ, আমারও সে নিশ্বাসে অবসন্ন কায়। তাই তব মনােআশা নারিনু পুরাতে প্রক্ষালিয়া চিতা তব রক্তে আরঙ্গের ! কিন্তু প্রতিফল--প্রতিফল পাবে পাপী, প্রতিশােধ প্রতিশােধ আছে অবশ্যই রে পাষণ্ড! তো হতেই সাম্রাজ্যের হবে অবসান। মনের ভাগ্যচন্দ্রে তুই দুষ্ট রাহু । ধর্মবীর বাবরের পুণ্যময়ী আশা তাে হ’তেই উম্মলিত হবে চিরতরে ! যেমন কীলক কোন প্রােথিকে দেউলে পাষাণ পর্শিলে ক্রমে আঘাতে আঘাতে আরও শিথিল হয়, তথারে দুর্বত্ত, বাহুবলে যে সাম্রাজ্য করিতে রক্ষণ সদাই সচেষ্ট ভুই, দেখরে দুরন্ত, সে প্রাসাদ ভিত্তি মূলে হয়েছে শিথিল ; তাের(ই) সাথে ভীম নাদে হইবে ভূশায়ী।
যশােবন্ত সিংহ। ভীষণ যন্ত্রণা পেয় মরিবি পামর ! কুকার্য সম্মুখে তাের আসন্ন সময়ে বীভৎস প্রেতের মত দিবে দরশন। মম প্রতিহিংসানল, পুত্রশােকোচ্ছাস মৃত্যু কালে নাভিশ্বাসে বহিবে রে তাের ! অবিশ্বাসী ভাব ধরা, বিশ্বাস বিহীন প্রাণ তাের,-অনন্ত রৌরব তাের তরে অনন্ত যন্ত্রণাময় হতেছে রচিত। অবিশ্বাসী প্রাণ তাের জ্বলে এ জগতে, মানবের শাপানল প্রেমূর্তি ধরি, ধরিয়া অকুণ্ঠধার জ্বলন্ত কুঠার পুনঃ পরকালে তােরে করিবে দাহন। নাহিক নিষ্কৃতি তাের জীবনে মরণে । অসীম হৃদয়ে মম শােকের উচ্ছাস ! ক্ষীণ বাক্য, তব যােগ্য, প্রাণঘাতী জ্বালা নারে প্রকাশিতে। সর্বশক্তিমান ঈশ, এ মম গভীর দুঃখ করি পরিমাণ, তব প্রায়শ্চিত্ত-বিধি করেন রচন! রে বার্তাবহ! কি শুনালি যশোেবন্তে আজ। ওঃ- এ লিপি বাগ্নি পূর্ণ, কাল সমীরণ তুই দূত ; দারুণ আঘাতে যায় প্রাণ ।
১২ পত্রাবলী। হা অদৃষ্ট! এই কি হে ললাটে আমার লিখেছিলা বিধি ? পুত্র শােকে যাবে প্রাণ? আরঙ্গের হত্যা মন্ত্রে বিষম কুহকে হৃতবুদ্ধি যশােবন্ত প্রবাসে বসিয়া জ্বলিবে হা অহর্নিশি পুত্রশােকানলে ! পৃথ্বীসিংহ! পৃথীসিংহ! জীবন কুমার। আঁধারিয়া যােধপুরী গিয়াছ কোথায় ! পাপিষ্ঠ আরঙ্গ কর মােরে না পারিল আমার হৃদয় মণি তব প্রাণ নিল। পিতার হৃদয় গ্রন্থি শােক ছুরিকায় ছিন্ন করি কোথা গেলে অহে প্রাণাধিক ? এ আঘাত বৃদ্ধ প্রাণে কেমনে সহিব। আরতাে সহেনা জ্বালা প্রাণ ফেটে যায়। কেন হে বান্ধবগণ দিতেছ সান্ত্বনা ? অগ্নিময় মরু এই শােকতপ্ত হিয়া, বৃষ্টি বিন্দু তােমাদের সান্ত্বনার স্বর পারে না তিষ্ঠিতে সেথা-ঝরিতে ঝরিতে শুকায় পলকে, শেষে উষ্ণ বাস্প ছুটে মরুময়, দেহ মন ছাড়ে উষ্ণ শ্বাস । সান্ত্বনায় স্থির নয় পুত্রশােকাচ্ছাস! কোথায় জনম ভূমি। পুত্র বুকে করি যশােবন্ত সিংহ। তুমিও কি মাের ঢুত ছাড়িছ নিশ্বাস ? হাঃ- পৃথীসিংহ! প্রাণ পুত্র ! তােমায় হেরিতে সুদূর প্রবাসে আজি মধ্য আসিয়ায় আকুলিত প্রাণ মাের ক্ষিপ্ত যন্ত্রণায় এ জীর্ণ পঞ্জর ভাঙ্গি হতেছে বাহির। মধ্য আসিয়ার অহে গর্বিত সম্রাট-- হিন্দুকুশ ! এসেছি হে তােমার চরণে। ভারতের যশােবন্ত মারবার রাজ তােমার আশ্রয়ে আজি বাঁধিছে সংসার। আরঙ্গের ছলনার বিশাল সাম্রাজ্য বড়ই কঠোর-তােমার জ্বলন্ত শৈত্য তার কাছে স্বর্গ রাজ্য ; তাই নগরাজ, তব রাজ্যে এসেছি হে ত্যজিতে জীবন। ধর মূৰ্ত্তি সৰ্ব্বধ্বংসী ! জগতের যত তুষার সমুদ্ররাশি করহ একত্র ! কর কর বিঘূর্ণিত শীতের তরঙ্গ! তুষারােৰ্ম্মি ভেদি উঠঃ প্রলয়ের বাত! প্রচণ্ড জ্বলন্ত শৈত্য তীক্ষ্ণ ধার ঈষু কাপাইয়া চরাচর হান চতুর্দিকে ! সুধাংশু, বিকীর্ণ করা সুতীক্ষ্ণকিরণ। কঁপ সূর্য তীক্ষ্ণ শীতে, কঁাপ কোটি তারা।
১৪ পত্রাবলী। কঁপ দ্রুম, তুঙ্গ শৃঙ্গ,উ ভূবন ! কাপ মম অন্তরের অপত্যের মেই। এস এস হিমময় জ্বালাময় স্রোত, গৃঢ়তম অন্তরের রুদ্ধ কর ত্বর। জীবধাত্রী স্রোত ; আসাঢ় করিয়া দাও নিদারুণ পুত্র শােকে দগ্ধ মম প্রাণ। থাক পড়ে তব পদে অহে হিন্দুকুশ আরঙ্গের বিষদন্তে বিবর্ণ শ্রীহীন যােধ পুরেশ্বর । কিন্তু হয়ােনা নিশ্চিন্ত তুমি ভারত ঈশ্বর ! আফগান জয়ী- এই ক্ষুব্ধ হৃদয়ের শুষ্ক অস্থিগুলা তীক্ষ্ণ শেল সম তব ভেদিবে হৃদয় অহর্নিশি! নিরুদ্বিগ্ন থেকোনা সম্রাট। এখন (ও) সহস্র শত্রু তব রক্ত পিতে রুধির লােলুপ নেত্রে নেহার তােমায়।
দলনী বেগম নবাব মীরকাসেমের প্রতি [ বঙ্গেশ্বর মীরকাসেমের বেগম পতিপ্রাণা দলনী ইংরাজ সময়ে স্বীয় স্বামিয় বিপদাশঙ্কা করিয়া একদা রজনীযােগে সহচরী সঙ্গে নবাবের অজ্ঞাতসারে অন্তঃপুর ত্যাগ করিয়া সেনাপতি গুরগন খার সমীপে উপস্থিত হয়েন এবং যাহাতে কোনরূপ যুদ্ধ বিগ্রহাদি না হয়, এরূপ উপায় উদ্ভাবন করিতে তাহাকে নিরতিশয় অনুরােধ করেন। গুরগণ খ দলনীর এ প্রকার অনুরােধ হাসিয়া উড়াইয়া দিলেন এবং কথা প্রসঙ্গে বেগমের অবমাননা করায় তাহাকে আপনার নিতান্ত অহিতাকাঙ্ক্ষী তানিয়া কৌশলে তাহার অন্তঃপুরে পুন প্রবেশের পথ চিরতরে রুদ্ধ করিয়া দিলেন। অনন্তর গুরগণ খা নবাব কর্তৃক বেগমের অন্বেষণার্থ আদিষ্ট হইলে, সে আপনাকে নিপাপ প্রতিপন্ন করিবার জন্য নবাব সমীপে দলনীর মিথ্যা কলঙ্ক রটনা করিয়া দিল। মীরকাসেম বেগমকে বিষ খাইয়া মরিতে বলিলেন। দলনী মৃত্যুর পূর্বে নিম্নলিখিত পত্রিকাখানি স্বামী সমীপে প্রেরণ করিয়া বিষপানে প্রাণত্যাগ পুৰ্ব্বক প্রাণেশ্বরের আদেশ প্রতিপালন করিয়া স্বর্গাকা হইলেন।] জ্বালাময় হলাহল লয়ে বাম করে দক্ষ করে অশ্রুনীরে লিখিলাম লিপি। প্রাণেশ্বর ! প্রিয়তম! প্রাণাধিক প্রভু। তােমারি আদেশ এই বিধির নিয়ােগ পালিছে দলনী দাসী অবিকৃত চিতে! .
পত্রাবলী এ লিখন শােকভারে কঁপিতে কাঁপিতে তােমার সম্মুখে যবে খুলিবে হৃদয় তখন স্নেহের আঁখি উন্মীলি, প্রাণেশ! হেরিবে দলনী নাই এ মৰ্ত্ত উপরে, ত্রিভুবনে চিহ্ন তার কোথাও পাবে না। ও জীবনের জীবন! জগতের আলাে! যে মুখে আদর বিন্দু পাইয়া এ দাসী গলিত অমৃত হ্রদে, সেই শ্রীমুখের মধুবাণী বাসি ভাল বিপদে সম্পদে, সােহাগে অথবা রােষে বিরক্তি আমােদে। বলেছ দাসীরে দেব, খাইবারে বিষ, তাও মিষ্ট মধুসিক্ত চিরানন্দ প্রদ! . ও বদন সুপবিত্র, ও বদন হ'তে প্রিয় বাক্য বিনা কভু শুনেনা দলনী ! ও বদন সুধাখনি শুধাংশু মণ্ডল, ও মুখে অমিয় বই ক্ষরে কি গরল ? তােমার আদেশে বিষ তুলেছি বদনে, দেখিলে না, এই দুঃখ,—এ দৃশ্য সুখের। এস নাথ ! দলনীরে আপন নয়নে দেখে যাও মাথা খাও! অন্তিম শয়নে হাসি মুখে চেয়ে চেয়ে ও বদন পানে, নিরখি নিরখি সুখে হৃদয় মণিরে, দলনী বেগম। মুদিব নয়নদ্বয় ! তাবে-তা হলে কি আর তােমা পাবনা দেখিতে? গুন ওগাে দলনীর নাথ ! দলনীর আঁখি আলো আঁধারে ডুবিয়া যাবে ? অসীম অকূল অনন্ত অনন্ত কাল তিমিরে রহিব ? তােমার ও প্রেম ছবি আর না দেখিব ? উঃ-গরলের দাহ হতে লক্ষগুণে হায় তীব্রতর এ যাতনা ! বল প্রভু বল কেমনে এড়াব হেন বিরহ অনল? ঘৃণা করাে ছুয়ােনাক কথাটা কমােনা- থাকিবা নরকে স্বর্গে, পৃথিবী গগনে অনলে সলিলে কি অমৃতে গরলে,- ঈশ্বরের প্রতিনিধি। দয়ার সাগর । তব ছবি হেরি যেন এ করুণা করে। তােমার রােষাগ্নিময় রৌরব আমায় পারিবে না জ্বালাইতে--অসীমের মাঝে তােমার ও চারু ছবি হেরি রব স্থির। উত্তপ্ত মরুর বক্ষ কৃষাণু সমান তাও গাে শীতল হয় সুধাংশু সুধায় ; তব অবিশ্বাসে হায় শত গুণ তার অনল অনলময় হৃদয় আমার ১৮ পত্রাবলী ; জুড়াবে, হেরিলে তােমা, প্রিয় দরশন।- চন্দ্ৰ হ’তে লক্ষগুণে শীতল কোমল। মরণে নাহিক উর, হলাহলে প্রভু যন্ত্রণার লেশ নাই ; কিন্তু প্রিয়তম । দলনীর একমাত্র দেবতাঃমহান্ ! দাসীরে করেছ কালি পাতকিনী বলে। ভেবেছ অবিশ্বাসিনী দলনী তােমার- এই দুঃখ নিদারুণ বেজেছে হৃদয়ে । এই দুঃখ বাসুকির কালকূট চেয়ে, দহিছে অন্তরমাের ! এই তীব্র তাপে, গরল অনল জ্বালা হয়েছে নিস্তেজ, পিপীড়ার দংশ যেন গােঙ্কুরের কাছে! এ সন্তাপে প্রাণেশ্বর, শশাঙ্ক জ্যোৎস্না হেরি যেন ধূম্রময় ! সবিতার দ্যুতি মসীময় নেত্রে মাের হয় প্রতিভাত। নিৰ্ম্মল তুষার শুপ প্রাংশুর পাহাড় হইয়াছে হায় নাথ, মানসে আমার । মনে হয়—কুসুমিত সুরভি উদ্যান, গলিত দুর্গন্ধময় শবের আবাস সমাচ্ছন্ন হাড়মালে বিকট কপালে । মায়ের মৃদু বাতে!ভুজঙ্গের শাস! পাই নাথ, দহে অঙ্গ বিষাগ্নি উচ্ছাসে ।
দলনী বেগম। সকলি বিকৃত হায়ু দলনীর কাছে! যখনি ভাবি হে নাথ, বিশ্বাসে তােমার হইয়াছে জন্ম তরে বঞ্চিত অভাগী ; তখন যে কি যাতনা দূহে অঙ্গ মাের, কি যন্ত্রনা অস্থি মজ্জা শিরা স্নায়ু ভেদি হয় প্রবহিত বেগে, মর্তের লেখনী অক্ষম বর্ণিতে তাহা! যে শিখা তরঙ্গ অন্তরে খেলিছে মম, লিপির অক্ষরে খেলেনা খেলেনা নাথ, নাহি সে উপায় । জলদের অম্ভদহি জ্বলন্ত বজাগ্নি যত দূর চলে যায় জ্বালায় সকল, তার চেয়ে কোটী গুণ প্রচণ্ড দারুণ এ যন্ত্রণা পত্রে যদি হইত বাহিত, তা হলে বুঝিবা বিশ্ব উত্তাপে তাহার নিমিষে হইত ভস্ম, আবেগে তাহার লণ্ড ভণ্ড একাকার হইত ব্রহ্মাণ্ড, ভয়ঙ্কর হাহাকারে বুঝিবা তাহার বিষাণের ঘাের রব যাইত ডুবিয়া, প্রলয়ের মহারােল উঠিত ভাসিয়া ; তাই এ মানব সৃষ্টি ধাতার ইচ্ছায়, রহেছে অপূর্ণ, হায়, কল্পান্ত অবধি । রহিবে অপূর্ণ বুঝি সৃষ্টির কল্যাণে।
পত্রাবলী। f প্রাণেশ্বর! প্রিয়ম! দলনীর নাথ। এত দূরে লিপি শেষ হইল আমার। এই খাইলাম বিষ—আদেশ তােমার পালিশ দলনী দাসী তব আজ্ঞাধীনা ! আছি জীবিতমানে সােহাগে আদরে অন্তিমে চলিনু তব বিরক্তির বিষ আকণ্ঠ পিয়িয়া! বুঝি আত্মারেও মম কুটি বিক্ষুব্ধ তব বহুিময় পথে যাইতে হইবে এবে—দয়াময় প্রভু! প্রাণাপেক্ষা প্রিয়তর আদেশ তোমার, হউক সে সন্তোষের কিম্বা যন্ত্রণার। নতুবা গাে উত্তরের অপেক্ষায় তব রাখিতাম প্রাণ মম ; কিন্তু আজ্ঞা তৰ অলঙ্ঘ্য অজেয়, তাই অবিকৃত চিতে পিয়ি গরল রাশি। দেখ দেখ প্রিয়, অবশ হইল বাহু, ঢলে পড়ে দেহ, শিথিল আঙ্গুল কুল নেত্রে তম ভাসে, আর তত সরেনা দেব লেখনী আমার । তুমিই ঈশ্বর মম! তুমি দণ্ড দাতা! ইষ্ট দেব সুধা নাম করি শেষ বার- কাসেম--কাসেম আলি-কাসেম আমার । এ লিপির উপরােধে অপরাধ হীনা।
দলনী বেগম হই যদি প্রতিপন্ন তব কাছে দেব, অবলায় দয়া করাে দয়ার সাগর । ক্ষমা করাে—পরকালে ডাকিও ইঙ্গিতে, চরণে পড়িয়া রবে এ দুঃখিনী দাসী ।
নলকুবর- N রাবণের প্রতি। [ ত্রিদশাধিপতি ইন্দ্রের অমরাবতী বিজয়র্থে লঙ্কাপুরী হইতে যাত্রা করিয়া রাক্ষসপতি রাবণ কৈলাস পর্বতােপরি একদা নিশা সমাগমে শিবির সংস্থাপন করেন। সেই রজনীতে ধনেশ্বর কুবের তনয় নলকুবরার্থে অভিসারিকা রম্ভাবতী নাম্নী অঞ্জরী সেই কৈলাস পথ অতিবাহিত করিতেছিলেন। হেনকালে দুৰ্ব্বও রাক্ষসরাজ কর্তৃক ধৃত ও নিগৃহীত হইয়া তিনি অচিরে নলকুরের নিকট আগমন করিয়া দুরাচারের অত্যাচার বৃত্তান্ত বিবৃত করিলে কুবের আত্মজের ক্রোধানল প্রজ্জ্বলিত হইয়া উঠে এবং তৎক্ষণাৎ তাহাকে দমন করিবার জন্য নিম্নলিখিত পত্রিকাখানি অভিশাপানলে পূর্ণ করিয়া দশানন সমীপে প্রেরণ করিয়াছিলেন] দশগ্রীব ! এই কি হে আচার তােমার ? ঋষিশ্রেষ্ঠ বিশ্বশ্রবা হার আত্মজ হেন কদাচার লিপ্ত ? দুরন্ত কালিমা অগ্রহে ললাটদেশে করিল অঙ্কিত ? হেন ঘৃণ্য হেয় কাৰ্যে আনুরক্তি তার অনন্ত রত্নের খনি যেই মহােদধি উৎপাদিল ধনেশ্বরে ফুল্ল সুধাকর, সেকি এই উগারিল বিশ্বের যাতনা রাবণ গরল কুম্ভ! হায় নাহি কেহ এ বিষের সংহারক ব্ৰহ্মাণ্ড ভিতরে ? কোথা শিব শিবময়, এস আরবার- কোটী গুণে তীব্রতর এই হলাহল নল কুবর। ' । করি গ্রাস রাখ রাখ বিশ্ববাসী জনে। কর কর নিবারণ ধর্মের প্রলয় । অহহ কি দুর্দৈব ঘাের !এক বীজোদ্ভূত বিভিন্ন ভূখণ্ডে জাত মহীরুহ মত প্রসবিল দুইজন মিষ্ট কটু ফল। মুনি পত্নী গর্ভোদ্ভুত ধাৰ্ম্মিক ধীমান যক্ষাধিপ তপােলব্ধ ঐশ্বর্য ভাণ্ডার বিতরেণ ধরণীর বরাজ সজ্জায় রাক্ষসী কুমার জ্বর বর লব্ধ বীর্য্যে বহিতাপে শােষে নিত্য জগতের শৈত্য দেব দৈত্য দর্পহারী রক্ষে রাবণ-~- তাই এত অহঙ্কার ? এত দন্ত তেজঃ । রমণীর ধৰ্ম্ম হরি আনন্দে উন্মত্ত মুণ্ড কাটি করি তপ অযুত বৎসর রে দুৰ্বত রক্ষাধম হরি ভ্রাতৃ জায়া তুণ্ডে তার মহাবাজ কলঙ্ক কঠোর নিক্ষেপিলি ভীম বেগে ? দীপ্ত অগ্নি কুণ্ডে হৃদয়ের রক্ত মাংস অতি প্ৰদানি এবে ভয়ঙ্কর সেই পূরিতে গহ্বর নিখিলের হৃৎপিণ্ড ছিড়িতে উদ্যত ? ঊদ্ধ পদে হেটমুণ্ডে করিলে তপস্যা, তাই কি কব্বর শ্রেষ্ঠ, লাজ সূক্ষ্ম বাস ?
২৪ পত্রাবলী। ছিড়ি রমণীর মুক্ত কোটা নেত্রে তার পতিশিরঃ পৃথ্বীতলে প্রােথিতে বাসনা? হেররে অধৰ্ম্মাদুর, তাের অত্যাচারে লুক্কায়িত নীলাম্বরে সুর কুলাঙ্গনা, বিকাশি অনন্ত কোটী নক্ষত্র নয়ন বরষে শাপাগ্নি কণা তাের মুণ্ডে অই। জ্বালায় জ্বলিয়া তাের জ্বালামুখী গিরি জ্বালাময় মৰ্ম্মোচ্ছাস করিছে উদগার । দে« দুষ্ট দুরাচার তাের অনাচারে প্রজ্বলিত দাবানল অটবী হৃদয়ে । সমুদ্র ধরেছে বুকে বাড়ব অনল! আকাশ প্রাণের দাহ না পারি রােধিতে দারুণ দম্ভোলি ধ্বনে ছাড়িছে হুঙ্কার ! ভাবনা ওমােন্ধ কাল মেঘ মুখ ছায়ে স্থাবর জঙ্গম ধরে কালিমা বরণ ! পাপাশয় ! তাের এই জন্য আচারে নিদারুণ বহি জালা দহিছে হৃদয়। তপ্ত মরমের সেই উষ্ণতম শ্বাসে ঝলসিত ভবিষ্যত রে দুর্জন তাের। যে মনােজ তাপে দুষ্ট দুৰ্বত্ত অসুর এ প্রাণে জ্বালায়েছি অশান্তির শিখা, ওরে সে বিষাক্ত বহি শমী বৃক্ষ সম ২৫ নলকুবর। তাের(ই) হৃদে জ্বলি তােরে করিবে অঙ্গার। তিল তিল করি সেই বিশ্বগ্রাসী শিখা ভয়ঙ্কর দুর্নিবার হবে তেজস্কর,- বিপুল সাম্রাজ্য তাের গ্রাসিবে নিশ্চয়। পুত্র পৌত্র সহােদর সুহৃদ বান্ধব দিন দিন দগ্ধ হবে সে দারুণ তাপে। তিল তিল করি তোর পাশব হৃদয় জ্বলিবে জ্বলিবে ক্রমে হইবি ভীষণ চূল্পীচ্যুত অর্ধ দগ্ধ প্রেতের মতন। অনুতাপে বক্ত রাশি হৃদয় কটাহে ফুটিবে অরাত্রি-দিবা প্রচণ্ড উচ্ছাসে । রৌরবের কুণ্ডে সিদ্ধ পাপ আত্মা মত চিরকাল চীৎকারিবি পরিত্রাহি ডাকে। দশানন ! দর্প তেজঃ কর পরিহার । ভাবি না বিধি বরে রক্ষকুল গ্লানি অজর অমর তুই। অরেরে পাষণ্ড, সে দুৰ্জ্জয় অভিমান, ঘাের আত্মম্ভরি ভ্রান্তির অতল তলে করুনিমগন । ভাবি অক্ষুন্ন ও দৌর্দণ্ড প্রতাপ । অতুল ঐশ্বর্য রাশি লক্ষ্মীর ভাণ্ডার অক্ষয় অনন্ত কাল রহিবে পূর্ণিত। এ দুরাশা হৃদি হতে ক বিসর্জন।
পত্রাবলী ভাবিসনা ব্ৰহ্মশাপ ক্রোধের প্রলাপ অক্ষম ভেদিতে অই কঠিন হৃদয়। এ দর্প এখনি তুই ক পরিহার ! অঞ্জলি পূরিয়া এই লইলাম বারি -নানা এযে মর্মোদ্ভুত বিষাক্ত আসার রে রে পশু-বধ্য ছাগ! ঘূপ কাষ্ঠ মাঝে দেরে ভাইয়া কণ্ঠ ! দেখ, উর্ধে, তাের ঝকিতেছে ধ্বক ধ্বক খাণ্ডা খরশাণ। হেররে এ মাের শাপাগ্নি শিখা বিশ্ব বিনাশক। রুদ্রের প্রলয় শূল নহে ভয়ঙ্কর এত ! যে চক্রে ব্রহ্মাণ্ড ঘােরে অব্যর্থ সে সুদর্শন নহে এত উগ্র পরন্তপ । শােরে রাক্ষস কদাচারি! ব্ৰহ্মবাক্যে ফিরাব ফিরাব তাের অদৃষ্টের গতি চিরানন্দ প্রদ! এবে মদে মত্ত তুই বুঝিবি না জগতের ভীষণ যন্ত্রণা, বুঝিবি না এ প্রাণের প্রচণ্ড উচ্ছাস ! যবে এ শাপাগ্নি বাণ কোটী বজুতেজে পড়িবে লঙ্কায় তাের-নিমেষে যেমনি ধূ ধূ করে চতুর্দিকে জ্বলিবে আগুণ, প্রাকার দেউল কোটী অট্টালিকা চূড় নলকুবর। উড়াবে স্ফুলিঙ্গ রাশি অম্বর আবরি তবে বুঝিবি বুঝিবি এই শাপাগ্নির তাপ ! শুকাবে সরসী কুল, ঝরিবে কুসুম, ফুরাবে আনন্দ রোল নর্তকীর গান, অন্ধকারে নাট্যশালা রহিবে নীরব, ভূতের ভয়াল ছায়া ফিরিবে ভিতরে, বাজিবে হাড়ের গ্রন্থি ভীষণ ঝঙ্কারে- তবে-- বুঝিবি বুঝিবি এই শাপাগ্নির তাপ ! * যবে- বিষাদান্ধ শূন্য গৃহে বিধবার কণ্ঠে মেঘমন্দ্রে হাহাকার মুহুর্মুহু উঠি কাপাইবে গুরু গুরু পাষাণ হৃদয়, তবে বুঝিবি বুঝিব মম শাপাগ্নির তাপ। সিন্ধু তটে কোটী কোটী ছিন্ন মুণ্ড পড়ি প্রেতমুখে অট্টহাসি দন্ত কিটিমিটি কবে বাৰ্তা-কৰ্বর কুলের অবসান, তবে-- বুঝিবি বুঝিবি মম শাপাগ্নির তাপ ! লক্ষ পুত্র পৌত্র হিয়া করিয়া বিদার পত্রাবলী হৃৎপিণ্ড ছিড়ি ছিড়ি শকুনি গৃধিনী আনন্দ উৎকট রােলে নিভাবে ক্ষুধাগ্নি, যবে- কুটি কুটিল তাের আরক্ত নয়নে সে দৃশ্য বিধিবে তীক্ষ্ণ শেলের মতন, (তবে) বুঝিবি বুঝিবি মম শাপাগ্নির তাপ ? এবে রহ দুষ্ট সৌভাগ্যের উচ্চ সিংহাসনে, হের কিছুদিন সুখে হীরাচূড়া শিরঃ ফুল্ল কুঞ্জময় চারু স্বর্ণলঙ্কা তাের— আসিবে আসিবে হেন সেই একদিন হেরিবি হেরিবি যবে পাপ অগ্নি কুণ্ডে পুড়িছে কনক লক্কা লৌহ পিও মত ; চারি ধারে শতধারে দ্রব ধাতু যেন কোটী রাক্ষসের রক্ত বহিছে সবেগে। ওরেরে বিষাক্ত ক্রর নরকের কীট, আর যদি নিৰ্যাতন কোনও সতীরে করিস দুৰ্ম্মতি, ব্যর্থ হবে বিধি বাক্য শত খণ্ডে মুণ্ড তাের বিদীর্ণ হইবে । মুহূর্তে ইন্দ্রিয়গণ হইবে বিকল। অকস্মাৎ কাল অগ্নি ব্যাপিবে শরীর। মুহূর্তে ভস্মের স্তপে হবি পরিণত।
প্রভাবতী রাণা রাজসিংহের প্রতি। মারবারের রাঠোর কুল অনেক গুলি নুতন ভাগে বিভক্ত, তন্মধ্যে একটী ভাগের কতিপয় রাজকুমার আপনাদের প্রাচীন রাজ্য পরিত্যাগ করিয়া রূপ নগর নামক স্থানে উপনিবিষ্ট হইয়াছিলেন। সেই রূপ নগর মােগল সাম্রাজ্যের অন্তর্গত। সুতরাং তাঁহারা তথায় মােগলের অধীনে সামন্তরূপে অবস্থিতি করিতে লাগিলেন। যে সময়ে আরঙ্গজীবের মস্তকে ভারতের রাজমুকুট অর্পিত হয়, সেই সময়ে রূপ নগরের সামন্ত রাজের ভবনে প্রভাবতী নাম্নী একটি রূপ লাবণ্যবতী বালিকা দিন দিন অনুপম শােভা সৌন্দর্যে পরিপুষ্ট হইতেছিল। অল্পদিনের মধ্যেই পরম সুন্দরী প্রভাবতীর নিরুপম রূপ লাবণ্য বৃত্তান্ত জ্বর হৃদয় আরঙ্গ জীবের কর্ণে প্রবেশ করিল। তৎসঙ্গে তাহার হৃদয়ে বিষম রূপ-তৃষ্ণার উদয় হওয়াতে তিনি সেই রমণী রত্নকে হস্তগত করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন এবং অভীষ্ট সিদ্ধির উপায়ান্তর না দেখিয়া আপনার অসীম পদ গৌরবে বিমুঢ় হইয়া তাহাকে বিবাহ করিবার প্রস্তা- বের সহিত দ্বিসহ অশ্বারোহী সৈনিক রূপ নগরে প্রেরণ করিলেন। ভয়ে সামন্ত রাজের প্রাণ উড়িয়া গেল। ক্রমে এতৎ সমাচার প্রভাবতীর কর্ণ-গোচর হইল। পিতাকে নিতান্ত বিমূঢ় ও কর্তব্য অবধারণে সম্যক্ অসমর্থ বিবেচনা করিয়া অবশেষে নিজের উদ্ধারের নিমিত্ত স্বয়ং উপায় উদ্ভাবন করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। কিন্তু কে তাহার এই বিষম বিপদে সহায় হইবে? মােগল সম্রাটের প্রতিদ্বন্দ্বী হইয়া দাঁড়াইবার মত পুরুষ এ জগতে কে আছে? এমন সময়ে আশা তাহার কাণে কাণে বলিয়া দিল, “হতাশ হইওনা, হতাশ হইওনা,” তােমার উদ্ধারকর্তা হিন্দু-সুৰ্য্য প্রতাপ সিংহের বংশধর মিবারের মহারাণা রাজসিংহ ?” প্রভাবতীর ব্যাকুল হৃদয় সেই মুহূর্তেই আশ্বস্ত পত্রাবলী। = হইল এবং রাণাকেই আপনার উদ্ধারকর্তা স্থির করিয়া তৎক্ষণাৎ নিলিখিত পত্রিকা খানি আপনাদের পুরােহিতের হস্তে মিরেশ্বর সমীপে প্রেরণ করিয়াছিলেন। “রাজ- স্থান মিবার পৃঃ-৩৭৪-৭৬। কিরাত কর্ষিত দ্রুত শিঞ্জিনী ঋননে হের বন কুরঙ্গিণী কঁপিছে আতঙ্কে ; নৃমণি, তারহ তারে, নহে অসহায়। জীবন ত্যজিবে আজি পড়িয়া বিপাকে ! বুঝিবা পশ্চিমে হায় ধৰ্ম্ম প্রভাকর ধীরে ধীরে অস্ত যায় ভারত অম্বরে, পূরবে অদূরে অই অমানিশাসম কলিরাজ পরাক্রম হইছে উদয়, ঘাের কৃষ্ণ ঘন ছায়া ব্যাপিছে ভারত। তা না হলে কেন বল-হা ধিক জীবনে যবন উদ্যত আজি মত্ত অহঙ্কারে হরিতে হিন্দুর সুতা? দুষ্ট মতি রাহু গ্রাসিতে সুধাংশু কেন করিবে আয়াস? কি লাজ ! কি লাজ! ম্লেচ্ছরাজ আরঞ্জীব বিবাহে বন্দিনী করি লয়ে যাবে মােরে । অবলা-আতঙ্ক সেনা নিশান্তে উদিবে, প্রতাপে কঁপায়ে মরু, যাইবে লইয়া সহায় সম্বল হীন জনকেরে ঠেলি অসহায় দুহিতায়-হায়, অসমর্থ প্রভাবতী। রােধিতে প্রবল বল দুৰ্বল বাহুতে। ক্ষত্ররাজ! সূর্যবংশ অবতংস প্রভু ? যবনের অঙ্কশােভী হবে ক্ষত্রিয়াণী? এই কি গাে অভাগীর ললাট লিখন ? ভারত গৌরব ভূমি রাজ পুতানায় লভি জন্ম, হা অদৃষ্ট, পাপ কলঙ্কিত ম্লেচ্ছ প্রেম কারাগারে বন্দিনী হইব? যে করে চন্দন পুষ্প করিয়া প্রদান পূজিনু পৰ্বত সুতা—পাৰ্বতী নাথেরে, হা ধিক, হা ধিক, দীর্ণ হওরে রসনা ! যবন সে কর আজি করিবে মর্দন ? রে চিন্তা, হৃদয়ে তােরে পারিনা রাখিতে; অবলার মৰ্ম্মে মর্মে ঢালিছিস বিষ! জানি অমি আরঞ্জীব রাজ রাজেশ্বর ; আসিন্ধু হিমাদ্রি ব্যাপী বিশাল ভারত প্রশস্ত হৃদয় তারে করেছে প্রদান ? রাজন! নহে কি প্রশস্ততর পবিত্র হৃদয় ? অনন্ত বিস্তৃতি তার, ত্রিকাল ব্যাপিয়া আছে বিদ্যমান সেই, কেমনে গাে তারে সসীম সাম্রাজ্য মত করিব প্রদান? জানি তার শুভ্র তাজ অতুল জগতে পত্রাবলী তুলিয়াছে মােগলের মহিমা নিশান ; নহে কি সতীত্ব কেতু তা হ’তে উজ্জ্বল ? উৰ্দ্ধতম অনন্তের উপরে উড্ডীন। কেমনে সে ম্লেচ্ছ প্রেমে হইয়া গর্বিত, দাঁড়াইবে দশদিক উদ্ভাসিত করি । শুনিয়াছি মণিময় শিখি পুচ্ছাসন অনন্ত রত্নের খনি নয়ন রঞ্জন! তাহে সমাসীন সেই রাজরাজেশ্বর সুমােহন শিখিধ্বজ যেন শক্তি ধর। নহে কি সধৰ্ম্ম রাজা তা হতে অধিক ? • অমূল অতুল রত্ন ৰিলােক মােহন, নির্মল মৰ্ম্মর শুভ্র সতীত্ব আসন, তাহে উপবিষ্ট নারী জ্বলে অগ্নি তেজে-- হােম,কুণ্ডে জ্বলে যথা দীপ্ত বৈশ্বানর। কি ছার তাহার কাছে শিখি সিংহাসন ? জানে না সে ধনমত্ত দর্পন্ধ সম্রাট, স্পর্শে তার ভস্ম হবে পার্থিব আসন। জানি সে সাহান্ সাহে—স্বয়ং ধনেশ্বর আপন ভাণ্ডার তারে করেছেন দান, চন্দ্র সূৰ্য্য সম কান্তি অসংখ্য মাণিকে পূর্ণ করি রেখেছেন দিল্লী রাজধানী ;
প্রভাৰতী। । ধরার অমর সম শােভে সে নগরী কিন্তু এই পূত দেহ অমরা অধিক শােভে নিত্য জ্যোতির্ময় বৈকুণ্ঠ সমান। সাধ্বীর অন্তর গত জ্বলন্ত গরিমা, জিনি শত সূৰ্য্য প্রভা অতুল কৌস্তুতে আলােকিত এই পুরী? হীন সে ধনেশ, তাই সে পূজিছে ধনে ম্লেচ্ছ নরেশ্বরে, কিন্তু, এযে কমলার মাধুরী বিম্বিত অমল ধবল রত্ন সাধ্বীর শরীর । ইহারে প্ৰদানি দৈত্যে কেমনে তুষিব ? যাদের বীরত্ব খ্যাতি হিমাদ্রি হইতে সিন্ধু তীরে উৰ্ম্মি সঙ্গে হ’তেছে ধ্বনিত তারাও সে সম্রাটের অঙ্গুলি চালনে হয় বটে কণ্টকিত,—কিন্তু এ অবলা ক্ষুদ্র নিরাশ্রয়া, আলমগীর পাতসাহে তৃণাদপি তুচ্ছ ভাৰি, বীৰ্য্যবল তার শিশুর সামর্থ্য সম করে উপহাস। হউক সে ম্লেচ্ছরাজ ধরারঈশ্বর, থাকুক হিন্দুর সুতা সেবিকা তাহার, তথাপি সে বললান্মত্ত দুৰ্বত্ত অসুর পারিবে না পরশিতে এ অঙ্গ আমার। আকাশ ভাঙ্গিয়া যবে আবরি চৌধার পত্রাবলী। বয় শ্রাবণের ধারা, শীত সিক্ত ৰাতে ম্রিয়মাণ হয় বটে পার্থিব অনল, কিন্তু সেই বিশ্বপ্লাবী প্লাবনের ঘটা পারে কি স্পর্শিতে কভু জ্বলন্ত চপলা । জগত প্রথিত নাম জগত কঁাপায়ে জগদগুরু আলগীর হউক ধ্বনিত, গম্ভীর কামান মুখে, পুরিয়া ত্রিলোেক অবনী, গগন তার গা যশােগান, মজুক ক্ষত্রিয় বৃন্দ যবন মাহাত্ম্যে, তথাপি হৃদয় মাের ম্লেচ্ছ ভাবে ভাের হবে না হবে না কভু নদ নদী হ্রদে, জলধির ঊর্মি রঙ্গে, বর্ষার তরঙ্গে, বসুধার আদ্র অঙ্গ হলেও কম্পিত গর্ভস্থ হুতাশ তার হয় না শীতল নারীর সতীত্ব রত্ন অমূল্য ভাবিয়া ক্রোধন কেশরী সম যেই বীর জাতি, অসংখ্য যবন মুণ্ড মর্দিল চরণে ; দুৰ্ব্ব ও অসুরসম যাদের আচারে, ধার্মিক ক্ষত্রিয় জাতি রুধির তৃষ্ণায় হইলা উন্মত্ত ঘাের, ঘৃণ্য অত্যাচারে, চির প্রসন্নতা ত্যজি,বিকট ভঙ্গি ম্লেচ্ছ বংশ ধ্বংসে ব্ৰতী, ধরিলা বদনে ;
প্রভাবতী। অবশেষে, হায়, যারা বিধি বিড়ম্বনে, নিরুপায়—প্রাণাধিক কলত্র তনয়া জ্বলন্ত অনলে ফেলি হইত নিশ্চিন্ত আজি কি সে বীর বংশ অবিকৃত চিতে, হেরিবে যবন গ্রাসে হিন্দুর রমণী ? শুনিবে যবন করে নিষ্পিষ্ট আকৃষ্ট যুবতী স্বধর্ম তরে ডাকে পরিত্রাহি? হেরিবে ইন্দ্রিয় দাস অসুরের করে নিষ্পিষ্ট সাধ্বীর ধৰ্ম্ম ? নিরখি সে দৃশ্য একটীও বােম অঙ্গে হবেনা উত্থিত ? রােমােন্মত্ত ক্ষত্রিয়ের উত্তপ্ত রুধিরে একটীও উৰ্ম্মি নাহি উঠিবে উচ্ছসি ? কৃতম্ভের দস্তু সম ধৃত করবাল বীরবাহু একবার (ও) হবেনা স্পন্দিত ? দীপ্ত বিদ্যুতের এক উগ্ররশ্মি রেখা হবে না বিম্বিত রুক্ষ্ম ক্ষত্রিয় নয়নে ? দেখিতে মলিন বটে বারুদের কণা, কিন্তু সে বারেক যদি গরশে উত্তাপ সৰ্ব্ব সংহারক মূর্তি ধরে ভয়ঙ্কর। তেমতি হে ধীয়ােদাত্ত ক্ষত্রিয়ের জাতি শান্ত, শিষ্ট, নম্র অতি দেবে ভক্তিমান, কিন্তু প্রাণে কেহ তার করিলে আঘাত-- পত্রাবলী। অগ্নি শিখা ব্যাপে তার অরুণ বরণে! ঘাের ঘন ঘটা সম হৃভঙ্গি বিদারি নেত্র হতে বিশ্বাস দলকে দামিনী । সে জাতি কি একেবারে লুপ্ত ধরা হতে? আলস্যের ক্রীত দাস ক্ষত্রিয় নিকর ? প্রমােদ উদ্যান হায় রমণী প্রসূনে, কামনার ঘ্রাণে বাঁধা সেই বীর জাতি ? লুক্কায়িত বৈশ্বানর সুধাংশু মণ্ডলে? সূৰ্য্য কমলার ক্রোড়ে করিছে বিশ্রাম। বজানল শত্রু নাশে বিরত হইয়া নারীর অপাঙ্গে বসি মারিতেছে উকি? না চিত্ত স্থির হও! হের, অভ্রভেদী ওই শৈল শৃঙ্গ পরে, জ্বলে অংশুমালী। রশ্মি তার, গিরি গুহ ধ্বম্ভরাশি নাশে! এখন সে নিদাঘের প্রতাপ আদিত্য উদ্দীপ্ত মিবার শূন্যে । খর রশ্মি তার রাজ সিংহ তেজঃ বহে রাজ পুতানায় ! ম্লেচ্ছ দল তমােলাশি দ্বিখণ্ডিত তায়। হয়ত হে নরেশ্বর, সামান্য নারীর প্রগল্ভতা ভাবি বড় হতে বিরক্ত। অখণ্ড প্রতাপে যার কম্পিত বসুধা, মিয়মাণ রাজকুল, দিবাকর করে হয়ত ভাবিবে পুনঃ অভাগীর ভাগ্যে ৯৯৯- প্রভাবতী। গিনে সুধাংশু তারা তেজোহীন যথা, মর্জিতে সম্পত্তি খ্যাতি সম্রম অশেষ কত নৃপ চুড়ামণি কুল ধর্ম ত্যাগি —অন্যের থাকুক,কথা ক্ষত্রিয় ভূষণ মহারাজ যােধপুর অম্বর ঈশ্বর যুবনে জামাতৃ পদে করিয়া বরণ গর্বে স্ফীত দর্পোন্মত্ত ধন্য হয়েছেন। সামান্য সামন্ত পুত্ৰী কেমন সাহসে, তাহারে ভাবিছে তুচ্ছ! এত স্পর্ধা কেন? নরেন্দ্র ? ধরায় দেবেন্দ্র তেজে বীরেন্দ্র প্রতাপ,- স্বাধীনতা উপাসক, ক্ষত্রিয় সন্ন্যাসী দুষ্ট যবনের যম সেই মহারথী, বুঝেছিলা স্বধৰ্ম্মের কিবা সে সন্ত্রম! কিবা সে অমূল্য নিধি সতীত্ব নারীর! বুঝেছিলা ম্লেচ্ছকুল কিবা সৰ্ব্বনাশী শত্রু হিন্দুত্বের—ঘাের বৈরী দেবতার। বুঝাতে হবে কি সেই বীর বংশধরে, স্বধর্মে বিমুগ্ধ মতি ক্ষত্র তনয়ার, কি ঘৃণা বিক্ষুব্ধ প্রাণে যবনের প্রেমে ? এমন অমূল্য স্বার্থ কিবা লভিবারে - পত্রাবলী। ফেলিব জীবন ধন বিপত্তি পারে ? সত্যই নৃমণি, মম নাহিক সেরূপ, যাহে উৎসাহিত হবে প্রাণান্তকরণে। মানবী স্বরূপে দেবী এই ধরাধামে নহি অবতীণ। আমি ! নাহি হেন গুণ যাহে মুগ্ধ বীর সিংহ ধরার সম্পদ তুচ্ছ ভাবি, অকাতরে লভিতে সে ধন, দিবে প্রাণ রণাঙ্গণে ধরি করবাল। হাসি মুখে শরশয্যা করিবে গ্রহণ ! হীন আমি—কোথা মম সে সব সৌরভ কিন্তু বীর ! আছে প্রাণে ক্ষত্রিয় সুতার জ্বলন্ত গরিমা --পার্থিব মােহন রূপ, বহ্নি পাশে নিৰ্বাপিত অঙ্গার তুলিত ! দিবে তা চরণে দাসী। পুনঃ ভাগ্যে মাের আপ্ত বিস্মৃতের মত হয়ত নরেন্দ্র, করিবে: হে ইতস্ততঃ-ভাবি অনিশ্চিত দুর্ধর্ষ দিল্লীশ সাথে সংগ্রামের ফল। দুর্নিবার দক্ষিণের মহারাষ্ট্র পতি যারে নিত্য খেদাইছে দাক্ষিণাত্য হতে, তার সাথে বীরপূজ্য রাজপুতানার হয় কি রাজেন্দ্র রাজসিংহের তুলনা ? অবলা রক্ষার তরে বিপক্ষের পানে প্রভাবতী। । নিরখিবে যবে তুমি ধরিয়া কৃপাণ, সূৰ্য্যদেব শূন্য ছাড়ি তব রােষ নেত্রে হইবেন অধিষ্ঠান, দীপ্ত হুতাশন কালাগ্নি তরঙ্গ তব কৃপাণে ছুটাবে। হউক সে আলীর অক্ষৌহিনী পতি- ধূধূ-ধূধূ জ্বলে যাবে ?-অকূল অপার মহাসিন্ধু বিশ্বগ্রাসী হলেও ভীষণ, পারে কি ডুবাতে কভু হিমাদ্রির চড়া? উঠ উঠ বীরবর! হােমকুণ্ডে শিখা . হবির প্রবাহে যথা হয় উগ্রতর, অবলার ধর্ম রক্ষা পবিত্র বাঞ্ছায়, নিত্য আহুতির স্রোতে রােষাগ্নি তােমার জ্বলুক যবন ত্রাস ভারত উদ্ভাসি। অগ্নিগিরি অগ্ন্যুৎপাত সম ভয়ঙ্কর, হ’ক উদ্ভাসিত তব অতুল মহিমা। দেব! ক্ষম মুখরায়। ও অনন্ত ঔদার্যের আর কিবা:প্রতিদান দিবে এ দুৰ্বলা, অবলার কৃতজ্ঞতা জীবন সম্ভ্রম নিতান্ত আশ্রয়ে তব জেন নরনাথ।
দময়ন্তী নলের প্রতি। [ শনিগ্ৰন্ত মহারাজ নল বনবাস কালে নিত্রিতা জায়া দময়ন্তীরে একাকিনী নিন অরণ্যে পলিত্যাগ করিয়া গেলে, তিনি নানা বিপদ হইতে উত্তীর্ণ হইয়া নিজ পিতৃ- ভবনে উপস্থিত হন। অনন্তর তৎকর্তৃক প্রচারিত মিথ্যা স্বয়ম্বর উপলক্ষে ঋতুপর্ণ রাজার সারথী হইয়া মহারাজ নল বিদর্ভ নগরে আগমন করিলে, সখীমুখে:সন্দিগ্ধ- চিত্ত স্বামীর প্রশ্ন শুনিয়া দময়ন্তী নিম্নলিখিত পত্রিকাখানি নল সমীপে প্রেরণ করিয়াছিলেন। h “পঞ্চ দেব বঞ্চি সাধে সয়ম্বরে স্থলে, পূজিল রাজীব পদ তব যে কিঙ্করী, নরেন্দ্র, বিজন-বনে অর্ধ বস্ত্রাবৃত। ত্যজিলে তুমি হে যারে, না জানি কি দোষে, নমে সে বৈদভী আজি তােমার চরণে। ধৰ্ম্ম অবতার তুমি কি না জান প্রভু, * বঙ্গীয় কবিকুল চুড়ামণি মধুসুদ তাহার বীরাঙ্গনা কাব্যের জ একাদশখানি ব্যতীত আরও খানি পত্রিকা আরম্ভ করিয়াছিলেন, কিন্তু আমাদের নিরতিশয় দুর্ভাগ্য বশতঃ আর কাৰ্য্য সম্পূর্ণ করিয়া যাইতে পারেন নাই। সেই ছয়খানি পত্রিকার মধ্যে নলের প্রতি দময়ন্তী অষ্ণতম, এবং উপরি উদ্ধত পক্তি কী সেই অমর কবির লেখনী প্রসূত। সৌধশ্রেষ্ঠ তাজমহলের বা পাতসাহী আমলের অন্য কোন প্রাসাদের ভগ্ন বা নষ্ট স্থানে আজিকালিকার কারিকগণ তালি দিয়া উহার পূর্ণ সৌন্দৰ্য্য ফুটাইতে গিয়া যেমন উপহসাম্পদ হয়েন, এই ক্ষুদ্র লেখকের বর্তমান প্রয়াসও করূপ।
দময়ন্তী। ৪১ এ প্রাণের অভিলাষ! আমি অভাগিনী তাই তব হৃদয়ের মিটাতে সন্দেহ বর্ণিতে হইবে মােরে বিচ্ছেদ বারতা তােমার সকাশে অজি। হায় প্রাণেশ্বর। কেমনে স্মরিবে কহ দময়ন্তী তব সেই দিবসের যত বিষাদের কথা ? হেরিলাম স্বপ্নে যেন মতঙ্গজ মূর্তি ছিড়িয়া:মৃণাল লতা ঝড় বেগে ধায় ; বৃন্তচুত শতদল, ঝটিকা তাড়িত তরঙ্গিত হ্রদ বক্ষে উলটি পালটি দিশাহারা ঘুরিতেছে হারায়ে আশ্রয়। নীরব শ্মশানে যথা মুমুমুর রব, ঘুমন্ত হৃদয়ে জাগে রুদ্ধ করি শ্বাস মর্মভেদী ত্রাস। অমনি আতঙ্কে ত্বর। অলিঙ্গিতে দেহ তব প্রসারিণু কর ; তাঘােরে পৃথ্বীপরে বাজিল সে বাহু, জাগিনু সহসা, হেরিলাম শূন্য কোল, অর্ধ বিবসনা আমি সুপ্তা একাকিনী। নিকটে শাণিত অসি দামিনী বিকাশ ( যেন ) চকিত নিরখি মােরে উঠিল হাসিয়া! ভয়ে উন্মাদিনী পারা উঠিয়া অমনি ডাকিলাম উচ্চৈঃস্বরে প্রাণনাথ বলি। ;
পত্রাবলী। ভীমনাদী প্রতিধ্বনি উত্তরিল রোধে প্রাণনাথ বলি। নির্জন নিবিড় বন উঠিল কঁপিয়া। অন্বেষিণু চারিধারে বৃক্ষ আছে, লতা কুঞ্জে পাতি পাতি করি ; কোথাও না পেয়ে তােমা কাপিল হৃদয় । ভাবনার কাল ছায়া ঝটিকা বিক্ষিপ্ত ধুমরাশি প্রায় ছুটি পূরিল কানন ; হইল নিবিড় তর অরণ্য আঁধার । মহাভয়ে ভীতা আমি মুদিমু নয়ন। সহসা আতঙ্কে ক্ষিপ্ত চাহিনু আবার। চৌধার আধার করি প্রেত পুরী মত প্রসারে মায়ার দেহ বিছােরা অটবী। দীর্ঘ মহীরুহ শির করে উত্তোলন। সারি সারি জটজালে জড়িত ভীষণ, যেন ঘােরা ধূমময়ী সহস্র রাক্ষসী গ্রাসিতে আমায় বােষে ঘেরিছে চৌদিকে। নীরব অরণ্য, যেন মরমের মাঝে ধীরি ধীরি ভীতি পূর্ণ গল্প করি কত, একে দিল আপনার ভীষণ আকার। হায় পাগলিনী আমি চলি ছুটিয়া, পূরিনু সে ঘন বন হাহাকার রবে, হা নাথ ! হা প্রিয়সখে! হৃদয় ঈশ্বর।
দময়ন্তী। কোথা তুমি! ঘােয়ারণ্যে হইয়ে নিদয় পলাইলে অবলায় অনাথিনী করে ? হের নাথ, হের হের কি দশা আমার! উন্মাদিনী প্রিয়া তব ঘুরিছে সংসার। বুঝি বিধি অন্তকালে তব মুখ হেরি মৃত্যুর মােহন আস্তে দিল না পশিতে। ব্যাঘ্রের করাল দংষ্ট্রে ভল্লুক নখরে, বিদীর্ণ হৃদয়, প্রিয়, হইয়া যখন হা নাথ—হা নাথ-শব্দে ত্যজিব জীবন, তখন যাতনা দগ্ধ কাতর বয়ান হেরিবে না হে স্বামি সজল নয়নে ? বলেছিলে ওহে নাথ ! স্বয়ম্বর কালে,-- যাবত জীবন রবে অয়ি স্মিতমুখী! তাবত তােমারি পাশে রহিব প্রেয়সী। অভাগিনী ভাগ্য দোষে বিধি বিড়ম্বনে সে কথা কি এবে তব হলনা স্মরণ? ত্রাসিত হয়েছি প্রভু! ত্যজ উপহাস। অনাথা ডাকিছে কোথা দাও না উত্তর হাঃ—ভুজঙ্গ কবলগ্রস্ত হ’ল তব প্রিয়া । এস এস তার তারে, হওগাে সত্বর, নহে সেই শেষ দেখা হয়েছে প্রাণেশ । মন মুগ্ধকর তব প্রিয় সম্বােধন - ৪৪ পত্রাবলী ক পশিল না কণে’ মাের। বিকট আরাবে চীৎকারিল প্রতিধ্বনি চারিধার হতে। হইনু বিবর্ণ ত্রাসে, দাঁড়ানু থমকি, বুঝিলাম কলিরাজ ছলিলেক তােমা। তাই মােহাবেশে তুমি, অসহায় জায়া ত্যজি এই বন মাঝে, চলি গেছ কোথা। কৃতাঞ্জলি পুটে তবে উর্দ্ধমুখী হয়ে, ডাকিলাম রুষ্ট দেবে ফিরে দিতে তােমা। কঁদিয়া কাঁদিয়া কত মিনতি করিয়া, হায় দেব! এত দিনে পূর্ণ মনস্কাম হ’ল তব ; নিলে রাজ্য, খেদাইলে দূর গহন কাননে পূর্ণ হিংসা হুহুঙ্কারে। কপােতীর বেশে শেষে কাড়িলে বসন, তবুও নির্মম প্রাণ হ’লনা সদয় ? ঘাের মায়া প্রকাশিয়া, অহহা পরিতাপ, আচ্ছাদিয়া তমােজালে সরল হৃদয়, ভুলাইয়া লয়ে গেলে কোথায় বিপথে । পেনু না উত্তর কার! মহাশূন্য ঘুড়ি চুল্লি হ’তে ধূমালা যথা স্তরে স্তরে ঘুরি উঠে গাঢ় তর, এ তপ্ত হৃদয় ভয়ের নীরদ ছায়া সুনিবিড় তর, উগারিল মহাবেগে ঢাকি জল স্থল ?
দময়ন্তী। ৪৫ কপিতে লাগিল দ্রুত সৰ্বাঙ্গ আমার। হৃদয়ের দপ্ দপেছিড়ি মৰ্ম গ্ৰন্থি, শুনিনু অন্তর হতে প্রাণের ক্রন্দন! অরি তব চন্দ্রানন ঝরিল নয়ন। হায় নাথ ! নাহি জানি কি কৌশলে আজি মুগ্ধ তুমি! কোথা ইরাজ সম বিভব তােমার! কোথা রাজভােগ ভব? অনশনে যাের বনে কত ক্লেশ পাও! পেয়ে একা মহাবনে হায় তোমা ধনে নাহি জানি কত কষ্ট দিবে দুরাশয়। নাহি কেহ কাছে আর বুঝাতে তােমায়। ভাল ভাবি হায় সখে নষ্ট বুদ্ধি তার করিবে গ্রহণ, দুঃখে দহিবে হৃদয়। প্রাণের প্রেয়সী তব অরণ্য সঙ্গিনী, বীর বাহু মাঝে যারে উরসে ধরিয়া রাখিতেসতত প্রিয় নয়নে নয়নে ; সেই প্রেয়সীরে যবে করি অনাথিনী, রবি-কর-দীপ্তি হীন আধার অরণ্যে, হিংস্র জন্তু গ্রাসে ফেলি হলে অদর্শন ;- অর্ধবস্ত্রাবৃতা সেই কুলের কামিনী কেমনে সংসার পথে করিবে ভ্রমণ, হেন কথা হয় তব মােহাচ্ছন্ন মনে পত্রাবলী। - ক্ষণেকের তরে যদি না হল উদয়, কেমনে আপন প্রাণ রাখিবে নৃমণি! যবে তব হেন মতি হল হায় হায়, কি দশা হইবে তব ভেবে প্রাণ যায় ! সলিল অনল এবে পৰ্বত প্রান্তর, মানব রাক্ষসে তব সম দরশন। বিষ কুম্ভ পয়গামুখ সদৃশ তাহারা কত যন্ত্রনায় তব দহিবে পরাণ । এত কহি গলবন্তুে কৃতাঞ্জলি পুটে ডাকিনু সে পঞ্চ দেবে তব রক্ষা করে পতি প্রতি কায় মন থাকে যদি মম, যদি সে রাজিব পদ ভিন্ন নাহি জানি, হে সুরেন্দ্র, ইরম্মদে দলি রিপু দলে পুণ্য শ্লোক নলরাজে করিও রক্ষণ। উত্তুঙ্গ নগেন্দ্র হতে পড়িলে নরেন্দ্র পবন হৃদয়ে তারে করিও ধারণ! রুদ্র দাবানল যদি আক্রমে নরেশে, হে বহি, তুষার বাসে ঢাকিও তঁাহায়। বহিলে প্লাবন বেগে ভাসায়ে অবনী বারীন্দ্র নিভৃত গুহা করিয়া সৃজন, হে দেব, রাখিও তারে করিয়া যতন। ক্ষুধাক্ষি ম্লান মুখে হে সুধাংশু দেব, দময়ন্তী। বরষিও সুধা ধারা, আতপ তাপিত অবসন্ন দেহে তার ফুটায়াে জোছনা । অনন্তর হায় নাথ, সহি যত ক্লেশ উপনীত হইয়াছি এ পিতৃ আলয়ে, কি আর কহিবে দামী ও তব চরণে। জনক জননী ত্বর করিয়া যতন চারিদিকে দূতগণে করিল প্রেরণ। সুদেব ব্রাহ্মণ মুখে শুনি সমাচার কি লজ্জা সন্তপ্তা দুঃখে জ্ঞানহীনা আমি মিথ্যা স্বয়ম্বর বার্তা জানানু তোমায় । ভাবিতেছি একমনে বুঝি ছদ্মবেশে আছ ঋতুপর্ণ বাসে ! পড়ে কি মনেতে অভাগীরে আর! হেনকালে আচম্বিতে অম্বরে জলদ মন্ত্র গুরু গুরু কাপে। ঘন প্রতিধ্বনি তার শুনিনু হৃদয়ে, দিগন্ত ব্যাপিয়া ধ্বনি পূরিল শ্রবণ ! মুখরিত অরণ্যানী গহ্বর কন্দর ধূলিজাল বিমণ্ডিত বিহাের গগন। গুটায়ে বিস্তৃত পাখা বিহঙ্গম দল ধীরে ধীরে শূন্য হ’তে নামিতে লাগিল। চমকিত নর নারী উগ্ধ পানে চেয়ে কোলাহলে পুরি গ্রাম আবাসে ছুটিল।
৪৮ পত্রাবলী। আরও গম্ভীর তর কাদম্বিনী রব প্রান্তর নগর শিরে ধ্বনিত হইল। বহে ঝড়, কিন্তু নাহি ঘন বিন্দু কোথা! সিহরে সমস্ত প্রাণ, শিখিনী যেমতি নাচে গাে নীরদ ঝবে উল্লাস তরঙ্গে। অধীরা চাতকী যথা মেঘ পানে চায়, নেত্র হতে দৃষ্টি মম শূন্য পথে বয়। উঠিছু প্রাসাদ চুড়ে হেরিনু আনন্দে নিস্তব্ধ সায়াহাকাশে বিদ্যুৎ আকার লম্বমান রথ রেখা ধাইছে গর্জিয়া, গম্ভীর ঘর্ঘর রবে দিগন্ত আকুল, খণ্ড খণ্ড জল দল ভীম বেগে তার। অনন্তের প্রান্তে যেন সমুদ্রের গান, সুস্নিগ্ধ মারুতে বহি জুড়াল শ্রবণ ! বুঝিনু তখনি পুণ্য শ্লোক নল বিনা কে পারে আসিতে হেথা একই দিবসে? কার হেন শক্তি বল ৰিলােক মণ্ডলে ? ব্যোমচারী সারথীরে নমিনু উদ্দেশে। কেশিনী আনিল বার্তা বুঝিলাম মনে, পুণ্য শ্লোক নল বিনা কেহ নাহি আর দ্রবিতে পাষাণ হিয়া সলিল প্রবাহে, জ্বালিতে অনল জ্বালা মুখের ফুৎকারে !
দময়ন্তী। হে নাথ। ব্যঞ্জনের স্বাদ তব করেছি গ্রহণ। বল বল অমৃতের স্বাদ নিরুপম কে পারে মর্ত্তের পর্ণে করিতে প্রদান। ও বদন বিমোহন পঙ্কজ নয়ন কি যে হর্ষ জাগায়েছে পরাণে আমার অনুভবে এ হৃদয়, কহিতে অক্ষম। নয়নে মানসে যদি কখন কাহারে হেরে থাকি তােমা বিন, এই দণ্ডে মাের হয় যেন প্রাণনাথ শিরে বজ্রঘাত। তব প্রেম হীন হয়ে পশিগগা নিয়ে ! কি আর বলিব প্রভু, দুটী শিশু ফুল পাঠাই তব কাছে। হেরিলে তাদের, দাসীরে পড়িবে মনে কহিমু নিশ্চয়।
দ্রৌপদী- ভীমসেনের প্রতি। { কৌরব সভায় পাণ্ডবগণ সমক্ষেই দুঃশাসন কর্তৃক কেশীকৃষ্ট। ও কৌরবগণ কর্তৃক তীব্র উপহাসে মর্মপীড়িত অভিমানিনী পাঞ্চালী কুরুকুল ধ্বংস করিবার জন্য ভীমসেনকে উত্তেজিত করিয়া নিম্নলিখিত পত্রিকাখানি তৎসমীপে প্রেরণ করিয়া- ছিলেন। * মুক্তকেশী আজি দাসী দ্রুপদ নন্দিনী বৃকোদর!” অদৃষ্টের দুরন্ত আঘাতে তব পত্নী আজি ত্যজিয়াছে সংসারের অানন্দ উল্লাস। নিদারুণ বেদনায় হয়েছে বিদীর্ণ তার পাষাণ হৃদয় ! ধর্মের বধির কর্ণ মুখরিত করি কব সে চিত্তের ব্যথা ; বিশাল ব্রহ্মাণ্ডে অন্তর ধূমিত জ্বালা উঠিবে জ্বলিয়া । ব্যথিত প্রাণের দাহে দেখিব কেমনে জগত সুস্থির রবে নির্জীবের মত। বীরসিংহ। হায়রে কেমনে আজি কই * ইহাও মধুসুদনের আর কবিতাবলীর মধ্যে আর একটী। দময়ন্তী নলের প্রতি ব্য।
দ্রৌপদী। সম্বােধি তােমায় হেন দৃপ্ত অভিধায় । লজ্জায় ধিক্কারে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যায়। মহাসিন্ধু বক্ষোদ্ভূত দম্ভে জলস্তম্ভ উঠিতে বিমান পথে প্রভঞ্জন ঘতে অর্ধপথে অধোমুখে পড়ে থা ঝরি ; তথা হব তেজোদ্ভূত কৃষ্ণার গরব পড়িছে ভাঙ্গিয়া আজি শক্রর প্রতাপে! হায় লজ্জা কব কারে প্রাণের বারতা,-- তোমাদেরি দোষে আজি এদশা তাহার । বিশ্বদগ্ধকারী অহে মহাব্যোমচারী দেব বিদাবসু! আজি হয়েছ নিষ্প্রভ। দিগন্ত বিভাসি তব রশ্মি রথ ধায়, গ্রহরাজ ! তেজোগৰ্ব্বে প্রজ্জলিত হয়ে ধাঁধিতে ব্রহ্মাণ্ড ; আজি জ্যোতিহীন তুমি! তাই সে মার্তণ্ড তেজে এ দীপ্ত চন্দ্রমা বিবর্ণ পাণ্ডুর! আচ্ছাদিলে প্রাংশুজাল অঙ্গারে কি জ্বলে শিখা তিমির নাশিনী। গর্ভে যার দম্ভোলির কালানল নাই শরতের মেঘে সেই ব্রহ্মাও বিভাস হয় কি আঁধার ধাঁধী দানিনী বিকাশ। মেঘ আড়ম্বরে সূৰ্য্য হইলে আবৃত আলাে অন্ধকারে কভু সূর্যকান্ত মণি – পত্রাবলী। ধরে দাহকর দুতি! তেজোহীন আজি পাণ্ডুবল, তাই ম্লান দ্রুপদ নন্দিনী। কেশরী কামিনী আমি শৃগাল দুৰ্বল লাঞ্ছিত করিল মােরে । মানব মণ্ডলে দিকপাল জিনি বলী পাণ্ডুপুত্রগণ, তাদের গৃহিণী কৃষ্ণা—কি বলিল আর, বলিতে লজ্জায় জ্বরে সর্বাঙ্গ আমার,-- তাদের গৃহিণী কৃষ্ণা, বারাঙ্গনাধিক নিগৃহীত বিড়ম্বিত পৌরব সভায় । যবে- লক্ষ লাজহীন তীক্ষ্ণ অনিমেষ আঁখি বিষাক্ত বিশিখ সম রোমে রােমে বিধি, নারীর সরম দেহ উদঘাটিত করি ঢালিয়ে যন্ত্রণা বিষ হেরিতে লাগিল-~- সে সময়ে চন্দ্র সূৰ্য অন্ধ হয়ে ছিলে ? অগ্নি! তুমি প্রাংশু জালে ছিলে কি নিদ্রিত ? বিধাত ! সে কালে তুমি দানব রাক্ষস বিষাকর ফণী বংশ ছিলে কি সৃজিতে? অবিশ্বাসী আততায়ী নারকীর হিমা ছিলে কি গঠিতে ? ধরণীর ধর্মপিতা হে বশিষ্ট। বিশ্বামিত্র! কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন! অগ্নিকল্প দ্বিজব্রজ!-- যাদের নিশ্বাসে দ্রৌপদী ভস্ম হয় পাপ তাপসেদিন কি সবে ভুলেছিলে সন্ধ্যাপূজা গায়ত্রী বন্দনা ? সে দিন কি ধৰ্ম্মাসনে ধৰ্মকর হতে ন্যায় দণ্ড পড়েছিল খ’সে? অবিচারে পুণ্যবান ডুবিল নরকে? পাপ আত্মা স্বর্গের নির্মল শােভা কৈল কলঙ্কিত ? সেদিন কি সংসারের সীমন্তিনী কুল স্বামীর আশ্রয় হতে হয়েছিল। চ্যুত ? গ্রন্থিময় ম্লান ছিন্ন সরমের বাসে মাবরি সর্বাঙ্গ ভয়ে নারকী সংসর্গে ভেসেছিল আত্মহারা নিরাশ্রয়াকুল ? সে দিন হ’তে কি ভ্ৰষ্টা মাতৃ অঙ্ক হতে অস্থিশূন্য সদ্য ফুল্ল প্রসূত দুহিতা, নৃমাংস বিক্রেতা বৃদ্ধা প্রেতিনীর গেহে প্রেতের পাশব তৃষ্ণা করিতে বারণ, বৈতরণী নদীমত লাগিল বৰ্দ্ধিতে ? সে দিন কি নরকের কঠিন দুয়ার হয়েছিল অতর্কিতে অর্গল বিচ্যুত ? শত অক্ষৌহিনী স্রোতে বাহিরিয়া বেগে বিকট উৎকট অর্ধদগ্ধ আত্মাকুল ভ্রমে ছিল নরসাথে তিমিরান্ধ পথে ? সে দিন কি লালসার মূর্তিমতী শিখা পত্রাবলী। ? উলঙ্গিনী ছিন্নমস্তা বিহ্বলা ভীষণ নিজকরে নিজমুণ্ড ধরেছিল। কাটি হৃদয়ের উগ্রনল বাসনার স্রোত পিয়েছিল ছিন্নমুণ্ড ? ত্রাসে দেবদল মুদেছিল নেত্র প্রান্ত, তাই-ধরা যুড়ি গরজি উঠিয়াছিল অসুরের দল? নারী আমি—ক্ষীণ কণ্ঠ পারি না তুলিতে উদগরিতে হৃদয়ের ভীম দাবানল। জানিনা কেমনে হয় বুঝব তােমায় দুর্বিসহ প্রাণােচ্ছাস! ওলাে কাদম্বিনি। বজ্রাঘাতে যেই কণ্ঠে তুলি হাহাকার অদ্রিরাজ হিমাচলে কর প্রকম্পিত,- সেই শব্দ কণ্ঠে মাের দাও প্রাণ সখি ! তাহলে পারিব বুঝি পাণ্ডবের প্রাণে শুনতে এ মৰ্ম্ম ভেদী বিষাদ বিষাণ। ঢালিতে জিঘাংসা মম তীব্র হলাহল। হৃদয় বিদীর্ণ হও। লক্ষ ধমনীর ছিন্ন মুখে রক্তস্রোতে উদ্বেল প্রবাহে অন্তরের উগ্রতাপ কররে উদগার! ভুকূ দল যথা বিকট শ্মশানে সহসা বিক্ষিপ্ত কোন শবে নিরখিয়ে উন্মত্ত হইয়া উঠে কোলাহল করি, দ্রৌপদী। ; বিদারিয়া কুক্ষি ছিড়ি আনে অস্ত্র নাড়ী। কৌরব সভায় যবে তেমতি উন্মত্ত হেরি মােরে করলি দিল:প্রেতকূল, বিধি লজ্জা মৰ্ম্মস্থল লক্ষ জন মাঝে কর্মিল বসন, লালসাগ্নি রক্তনেত্রে বিকট উৎকট মূখে ত্রুর অট্টাহাসে অকুণ্ঠ পুরুষ দিঠি চারিদিক হতে আলুথালু কম্পান্বিতা কুলবালা প্রতি বৰ্ষিতে লাগিল যবে যবে অসহামা- উন্মুক্ত শাণিত তীক্ষ্ণ সরম বিক্ষত এক বস্তা রজস্বল অর্ধ বিবসনা, প্রভঞ্জনে আন্দোলিত অর্ণবের বক্ষে ঘূর্ণমান পােতসম হইয়া আকুল, উর্ধনেত্রে যুগ্মকরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলি করিল ক্রন্দন হায়, তখন কি সবে ধৰ্ম্মের নিগূঢ় ত তত্ত্ব ছিলে আবিষ্কৃতে? অথবা প্রলয়ে যবে গ্রহ আদি ধূমকেতু চন্দ্র তারা কক্ষচ্যুত হয়ে আঘাতিয়া পরস্পরে ব্যোম পথে ধায়, বিপর্যস্ত হয় সৃষ্টি, অনল সলিল দিগন্ত আলােড়ি ছুটে কোথায় কে জানে, খন, ত্রিমুর্তি যথা কারুণ্য বিহীন পত্রাবলী হেৱেন ধ্বংসের ক্রীড়া অবিকৃত চিতে, তেমতি কি ছিলে তবে আবেগ বিহীন- পঞ্চেন্দ্রিয় তরঙ্গের উচ্ছাস বর্জিত ? দেবতার শুভ্র স্বচ্ছ রুধির প্রবাহে ছিল পূর্ণ ধৰ্ম্ম হিয়া সদা সুনির্মল, তাই মানবীর দাহ পারনি বুঝিতে ? হায় হায় ভ্রান্তমতী আমি অভাগিনী পতি নিন্দা মহাপাপে হ’তেছি মজ্জিত। আমারি সে দুরদৃষ্ট হায়রে তখন বেধেছিল তােমাদের বিশ্বাস বাহু ! হরেছিল দুর্নিবার হৃদয় নিহিত সর্বগ্রাসী জিঘাংসার প্রচণ্ড উচ্ছাস! শুষেছিল নেত্র হতে বিদ্যুত ঝলক। তা না হলে কখন কি ইন্দ্রকর চ্যুত ছুটিতে ব্রহ্মাণ্ড ত্রাস দুর্জয় দম্ভোলি সহসা থামিয়া যায় ? জ্বলন্ত চপল উড়িতে আকাশ পথে কভু নিভে যায়, না ধাঁধি বিশ্বের আঁখি প্রদীপ্ত ছটায়। বুভুক্ষু সিংহের উগ্র উৎক্ষিপ্ত নখর বিদারি করিকুম্ভ হয় কি নিবৃত্ত ? ওরে দুষ্ট দুঃশাসন ! দেখ, অক্ষি মেলি নহে এই কেশজাল, ধরিলি যা করে ; - দ্রৌপদী। ৫৭ আত্মহত্যা করিবারে বিষদন্ত ঘায়ে কাল সর্প রে উন্মত্ত ধরিলি স্বকরে। নহে এই কেশ জাল, কাল নিশীথিনী করাল কালের ছায়া দেখাইছে তােরে । বহুদিন প্রলয়ের নাহি ছিল হেতু, মহারুদ্র ছিলাধাের নিদ্রা নিমগন যুগ যুগ ধরি, আজি তাের পাপ নৃত্যে কালী সঙ্গে মহাকাল উঠেছে জাগিয়া । রুদ্রের সংহার রােষ উঠেছে উথলি । ভীষণ সংহার ব্রতে বিরতির হেতু সংহার ত্রিশূল অঙ্গে পড়েছিল মলা, আজি মার্জিত করিলা কাল প্রলয় আয়ুধ ; তাই হেথা দেখ চেয়ে-নহে মুক্ত কেশ, উড়িছে তাহারি এযে কলঙ্ক গভীর। কুরুপতি! কর ভােগ সাম্রাজ্য বিশাল ! কিন্তু হের হের ওই দূর নভঃ প্রান্তে উঠিতেছে একখণ্ড কাল কাদম্বিনী। দূর ঘন প্রান্ত হতে শোন্ শোন্ ওই বিশ্বনাশ অশনির সংহারের মন্ত্র ! বৃকোদর ! কি আর বলিবে দাসী দ্রুপদনন্দিনী ও চরণে! ভাগ্যহীনা বিধি বিড়ম্বনে পত্রাবলী। নিজকর্ম দোষে হায় পাইল এ তাপ। কিন্তু দুর্বিসহ প্রভু যাতনা তাহার ;- হতমান হলাহলে দহে মৰ্ম্মস্থল। পাপের উদ্ধত তুণ্ড পারি না দেখিতে ধৰ্ম্মের লাঞ্জনা কভু সব না সব না। এস এস বৈরিত্রাস দ্রৌপদীর নাথ। দেখে যাও দুঃশাসন আকর্ষিত এই মুক্ত কেশ রক্তসিক্ত ছিন্ন কর্দমাক্ত ধরে আছি বাম বাহুমূলে; যবে তুমি- বিজয়ী সমর ভূমে কুরুকুল দলি, ভীষণ রুদ্রের মত সংহার উন্মাদে আসিবে মেঘের মত কঁাপায়ে বসুধা, রবিকরে আলােহিত মেঘপ্রান্ত মত দুঃশাসন হৃদিরক্তে আরক্ত দ্বিকরে বাঁধিবে কবরী মম, তথন প্রাণেশ সৌদামিনী সমা হেসে প্রেম আলিঙ্গনে বাঁধিব মনের সুখে হৃদয়ে রাখিয়ে । কৌরবের কাল ভেরী বাজিয়াছে ওই- যাও যাও ভীম সেন অরিমুণ্ড দলি রুদ্রের বিষাণ ধ্বনে গর্জা বীর সিংহ। মেঘ যথা বজ অগ্নি করে বিচ্ছুরণ ভীম ভুজে মহা গদা কর অস্ফালন।
দ্রৌপদী। গগনে কাপুন ইন্দ্র, পাতালে বাকি ধরাধামে দুর্যোধন হউক বিবর্ণ । কুরু রক্তে হ’ক তব আবক্ষ মজ্জিত, সে রুধির উৰ্ম্মি ভেদি ধাও বীরবর দ্রৌপদী হৃদয়ােচ্ছাসে প্রেম নয়নে হেরিবে তােমায়, তব ভীম কৰ্ম্ম আর!
সীতাদেবী- শ্রীরামচন্দ্রের প্রতি। [ রক্ষেরাজ দশানন সীতাদেবীকে হরণ করিয়া লইয়া গেলে পর তাহায় অন্বেষণ জন্য শ্রীরামচন্দ্রের সুহৃৎ কিষ্কিন্ধ্যার অধিপতি সুগ্রীব প্রেরিত অসংখ্য চরের মধ্যে কেবল মাত্র মহাবীর হনুমান সাগর ঘন পূর্বক দেবতাগণেরও অগম্য লঙ্কা পুরী প্রবেশ করিয়া বহু আয়াসে অশােক বনে রাক্ষসীগণ কর্তৃক নিরন্তর নিপীড়িত সীতার সাক্ষাৎ লাভে সমর্থ হয়েন, এবং আপনার পরিচয় স্বরূপ রাম প্রদত্ত অঙ্গুরীয় হাকে প্রদান করেন। অনন্তর কএক দিবস নাঙ্কায় থাকিয়া নিজ শৌর্য বীর্যে রাক্ষস পতিকে কম্পিত করিয়া তথা হইতে প্রত্যাগমন কালে তাহার হস্তে সীতাদেবী নিজ শিরোমণি সহ নিম্নলিখিত পত্রিকা খানি শ্রীরাম সমীপে প্রেরণ করিয়াছিলেন। আৰ্যপুত্র। হারায়েছে বুঝি তােম। অভাগী জানকী ? গ্রহদোষে ধৈর্য্যচ্যুত ক্ষণেকের তরে, বহুবর্ষ তপােল তাপসের যথা কণ্ঠ হতে পড়ে খসি মােক্ষ-সুধা-ফল, হায়- স্বদোষে বৈদেহী তথা ভুঞ্জে প্রতিফল! পড়েছি দুস্তরে নাথ তার দয়াময় । অকূলে ভাসিছে সীতা উদ্ধারাে গো তায়।
সীতাদেবী। মায়ার কনক মৃগ অনল স্ফুলিঙ্গ ছড়ায়ে সুশ্যামবনে দ্রুত ক্ষর ক্ষেপে উড়িল উল্কার মত ; পাতায় পাতায় ইন্দ্রধনু সম বিভা মৃগাঙ্গ বিম্বিত, ভাতিয়া উঠিল কিবা বিচিত্র বরণে। নীল মণি ময় নেত্ৰ আঁধার অরণ্যে দীপিল, রতন শৃঙ্গে-ছুটিতে হরিণ-- উড়ন্ত তারকা জ্যোতিঃ নীল নভে যথা কানন আকাশে আঁকা হইল কেমন। হায়গাে প্রেয়সী বশে তুমি সীতানাথ, দেবরের প্রিয়বাক্য অবহেলি ত্বরা চলিলে মৃগানুসারি-মৃদু মৃদু হাসি; আমিও উৎসুক নেত্রে তােমাদের ক্রীড়া হেরিতে লাগিনু সুখে বসি শিলাসনে। ক্ষণমধ্যে মায়ামৃগ লইয়া তােমায় হল অর্শন-ধূমালা সহ যেন হুতাশন লুকাইল ভস্মের মাঝারে। হায়! আর না হেরিনু তােমা সেইক্ষণ হতে । তব পথ নিরখিয়ে রহিনু উন্মুখী। হেনকালে আচম্বিতে নির্জন কানন কাপায়ে উঠিল ভাসি মহা আৰ্ত্তরব।
পত্রাবলী। ভয়ে অঙ্গ হল কাঠ—তব কণ্ঠস্বর শুনিলাম যেন-“কোথারে প্রাণের ভাই লক্ষণ! আয় রে ত্বরা বুজিবা বিপাকে, ক্রর রাক্ষসের করে হারাই জীবন! চমকিল অন্তরাত্মা,-কালঘাম অঙ্গে ছুটিল,—শােণিত স্রোত হইল শীতল। চাহিনু দেবর পানে-হেরি ত্রাস মাের সম্মিত বন র করিনু ঈক্ষণ; কহিনু বিস্মিত চিতে কাতর অন্তরে ; অই শুন হে দেবর, অগ্রজ তােমার রক্ষ মায়া ঘােরে পড়ি ডাকেন তোমায়। কি হেতু এখন বীর, বিলম্বিছ হেথা ? কেন শীঘ্র ধনু ধরি রাক্ষস অধমে বধিয়া, রক্ষিতে ভায়ে উঠিছ না রােষে। অই শুন অই শুন—পুনঃ সেই স্বর কপিতেছে ত্রস্ত কণ্ঠে ! উঠ উঠ ত্বর। যাও যাও দেখ কোথা অগ্রজ তােমার! কহিলা বিস্ময়ে চাহি রাঘব অনুজ ;- একি সীতে কেন হেন ব্যগ্রতা প্রকাশ। যক্ষ্ম রক্ষ নরমাঝে কে আছে এমন রাঘবে বিপন্ন করে! হয়াে না উতলা। অন্যের থাকুক কথা; সব আপনি .
সীতাদেবী। সহ দিকপাল দলে অাটিতে না পারে রঘুকুল সিংহ রামে। স্থির হও সতি। রাঘব রাণীর হেন বিবশা হওয়া হয় কি উচিত কভু ? অগ্রজের অজ্ঞ অলঙ্ঘ্য গাে লক্ষ্মণের। বিশেষতঃ কই কেমনে এ ঘাের বনে একাকিনী ফেলি তােমা, যাইব চলিয়া? নেহারি আমায় কিবা বলিবেন কহ দাশরথি রথী। আবার উঠিল ভাসি সেই আশ্বর। হায় দেবরের বাক্যে অধীর অন্তর ; কুক্ষণে ভৎসিমু তারে আত্মহারা আমি--- 'হে দেবর! কি বলিলে? কাপে প্রাণ তব বাক্য শুনি। অছেদ্য মেহের ফাস ভস্মিতে সংসারে ব্রাহ্মণের ব্ৰহ্মতেজ সম তুমি বলী চিরসঙ্গী শ্রীরামের, হেন দুঃসময়ে এরূপে ত্যজিলে তাঁরে ফেলি মায়াপাশে ? লক্ষ্মণ ! এমতে দেখালে কিহে ভ্ৰাতৃভক্তি তব ? সুধাৰ্ম্মিকা পুণ্যশীল। সুমিত্রা শাশুড়ী তার উপদেশ বুঝি এরূপে পালিলে ? বাক্যেই বিক্রম তব ? দম্ভ আস্ফালন পত্রাবলী। ভৌতিক শিখার মত উত্তাপ বিহীন কেবলি ধাঁধিতে আঁখি—নিতান্ত অসার? ঘােরবনে অগ্রজের হইতে সহায় দ্বিতীয় ব্রহ্মাস্ত্র সম রাঘবের সাথে রহিলে, হায়রে এবে বিপত্তি সময়ে সে তেজ নিভিয়া গেল ? শক্ত করােখিত সংহার অস্ত্রের হায় প্রতিরােধ্যোদ্যত বীরের আয়ুধ নিজে ভাঙ্গিয়া পড়িল? ভীরুতার বাস হেন হৃদয় তােমার যদি হে সৌমিত্রি ! কেন অরণ্যে আইলে কেন ওরে উৰ্মিলার অঞ্চল ধরিয়া রহিলে না অযােধ্যায় ? ভরতের চাটুকার দল পুষ্ট করে কেন নিদ্রালস সুখে কাটালে না কাল ? হায় বিপত্তি জনক নিষ্ফল আয়ুধ সম শুধু ভার হয়ে কে তােমায় দিব্য দিয়া বলেছিল হেথা আসিতে মমদের সঙ্গে ? রহ প্রিয় বন্ধু, স্বজনের আর্তনাদেআবরি শ্রবণ। বিমাতা হইল যদি প্রাণান্তক বৈরী, বিমাতৃ তনয় কেন হইবে আপন ? ভাল ভাল সুখে থাক দেবর লক্ষ্মণ চলিল অভাগী সীতা স্বামী অন্বেষণে ।
সীতাদেবী। রামে না নিরখি:ভবে রবে না জানকী। বহ্নি বিনা নহে যথা শিখার অস্তিত্ব, আকাশ নহিলে বাত থাকে না কোথায়, হৃদয় নহিলে যথা ভাবের উদয় তেমতি শ্রীরাম বিনা জানকী না হয়। কুক্ষণে আমার বাক্যে অরুণ বরণ উঠিল আরক্ত নেত্রে লক্ষণ ধামুকি। আপাদ মস্তক সেই গউর বরণ রােষে অগ্নিবর্ণ হল, জলিল বদন। দীপ শিখা হতে যেন দীপ্ত তৈল বিন্দু ঝরিল নয়নে অশ্রু, কহিলা অনধ ;- সাক্ষী পবিত্ৰাত্মা যত দেবদেবীগণ, সাক্ষী বন অধিষ্ঠাত্রী মাতঃ বসুন্ধরা, সাক্ষী হও ঋষি, মুনি, তপস্বী, সন্ন্যাসী, সাক্ষী সতী ইষ্টদেবী মহেশ মােহিনী, নিস্পাপ সুমিত্রাসুত জনক নলিনী যা বলিলা পরীক্ষিয়া নিখ লক্ষুণে। অলঙ্ঘ্য রামের আজ্ঞা লুঙ্ঘিতে হইল। ত্রিশূলীর শূল হতে যন্ত্রণাদায়ক জননীর তিরস্কারে পুত্র অভিমানী ত্যজিলে মায়েরে, তাহে যেই পাপ স্পর্শে স্পশু ক সুমিত্রা শুতে লব শির পাতি ; ;
পত্রাবলী তথাপি বিসর্জি সীতা বিজন কাননে যাইবে সৌমিত্রি অসহ, অসহ অহে। মর্মভেদী ব্যথা! রক্ষ বন অধিষ্ঠাত্রী জনক নন্দিনী! কোথা.দেব নারায়ণ, বিষ্ণু চক্রে নভস্তল কর আবরণ ; শুন্য হতে দ কেহ না পশে হেথায়। মহাকায় ক্রমদল, ঘন কুঞ্জ রচি রাখ লুকাইয়া সীতা রামের বনিতা। বসুন্ধরাধর অহে নাগেন্দ্র বাকি রসাতল বন্ধু দেব, রুদ্ধ করি রাখ, সীতারে না যায় যেন কেহ গো দংশিয়া। সিংহ ব্যাঘ্র হিংস্র পশু ক্ষণেকের তরে হিংসা ত্যজি বৈদেহীর হওগাে রক্ষক। একাকিনী সঁপি সীতা তােমাদের করে চলিনু কানন ত্যজি ; এ মম মিনতি রামের বনিতা সীতা বিদেহ নন্দিনী, রাখিও যতনে সবে বলি বার বার ?” এত বলি চাহি বীর অভাগীর পানে -দেবর সে দিন সুধু হেরিলা আমায়- কহিলেন ধীরস্বরে ;-হের ধরা পৃষ্ঠে ধনুকের রেখা দিমু, বস এর মাঝে, ইহারে করিলে জেলা পড়িবে বিপাকে।
সীতাদেবী। এত বলি বাধি তুণ আস্ফালি কোদ, অভিমানে বিঘূর্ণিত রক্ত ছল নেত্রে, চলি গেলা বনপথে কুক্ষণে দেবর! গােযােচ্ছ সে সকানন টলিল পৰ্বত, পলে দুরু দুরু দমকে মেদিনী সঙ্গে সঙ্গে ভাগ্য মম কাপিল আতঙ্কে। তব নামমন্ত্র নাথ জপিয়া জপিয়া, তােমাদের পথ পানে রহিনু চাহিয়া। বিলম্বে অধীর হনু, শঙ্কায় নয়ন সচঞ্চল কাননের দূর প্রান্তে প্রান্তে, প্রতি ক্রমে, প্রতি শাথে, প্রতি পত্র কুঞ্জে হেরিতে তােমায় দ্রুত লাগিল ভ্রমিতে। হেন কালে যােগী এক কৃষাণু সমান, সুনির্জন বনপথে দিল দরশন। কুণ্ডলিত জটাজালে সমুন্নত শির ত্রিপুণ্ড, ললাটে, কটি বাঘাষরে বাঁধা, বিভূতি ভূষিত অঙ্গ মেঘের বরণ চলে আসে রুদ্রচর বিকৃত নয়ন। কমণ্ডলু করে, কণ্ঠে রুদ্রাক্ষের মালা, শিব শিব ব্যোম ব্যোম ঘন র মুখে। কুটীর সম্মুখে আসি নিরখি আমারে গম্ভীর জলদ মন্দে ভাক্ত মহাযােগী পত্রাবলী। ; করি ঘন বেদধ্বনি অশীষি কহিলা;-- ‘বৈদেহি। অতিথি আমি দেহ ভিক্ষা মেয়ে যােগীন্দ্রের আবির্ভাবে নিষ্পল কানন, সিংহ ব্যাঘ্র দূরে গেল, নীরব বিহঙ্গ। যােগীর প্রভাব ভাবি হয়ে ভক্তি যুতা, কহিলাম করফেঁড়ে গলবস্ত্রে নত ;- ‘হে দেব, এস্থান মােরে ছাড়িতে বারণ! ক্ষমি দোষ ক্ষণকাল করুন অপেক্ষা! গিয়াছেন ভ্রাতৃদ্বয় মৃগয়ার তরে, এখনি আসিয়া তারা পূজিবেন তােম? উত্তরিল ছদ্মবেশী -এতদিনে বুঝি হইল স্বধৰ্ম্ম চুত রঘুরাজবংশ! অমনি ফিরিল সাধু, হইনু অধীরা। কুক্ষণে দেবর বাক্য পুনঃ অবহেলি, যােগীন্দ্রে দানিতে ভিক্ষা হইনু উদ্যত। হার দেব, কি কহিব অমনি তপস্বী ফল সহ মুষ্ঠিমাের করিল ধারণ ; বাতাহত তরুসম উঠিমু কঁপিয়া। ঝুলি হতে তুরী এক বাহির করিয়া ধ্বনিল-সমুদ্র যেন উঠিল শ্বসিয়া। অমনি বিচিত্র এক বিমান উদিল আলােকিয়া বনপথ । নেতের পতাকা সীতাদেবী। ঝলে মহীরুহ মাঝে-ধুমপুঞ্জে শিখা। আকর্ষি আমায় দুষ্ট তুলিল তাহায়। খগরাজ চঞ্চমাঝে ভুজঙ্গী যেমতি, জানকী তেমতি নাথ। বৃক্ষ গ্রাস হতে। পলাইতে মুহুর্মুহুঃ আয়াসিল কত কে কবে! হায় রে, কেশরী কবল হতে কুরঙ্গী নিষ্কৃতি পায় ? নিদারুণ রােষে ভৎসিনু কঁদিমু কত মিনতি করি । হায়-বর্ষাধারে গলে যায় ধরার হৃদয়, কিন্তু সেই নীরােচ্ছ,সে দ্রবে কি পাষাণ! কঠোর ভৎসনা মাের করিয়া শ্রবণ আচম্বিতে ছদ্মবেশ করিয়া বর্জন দাড়াইলা ভীমমূৰ্ত্তি দশাস্য দুর্জয় ! উন্নত প্রকাণ্ড দেহ মেঘের মতন পরশিছে নভস্তল ; বিদ্যুতের প্রায় কনক মুকুট শিরে করে ঝলমল, নীলগিরি শৃঙ্গে কিবা শশাঙ্ক উদয় ? প্রজ্জ্বলিত রক্তবর্ণ যুগল লােচন, সুৰ্য্য হুতাশন সেন ছয় ঘূর্ণ্যমান। কহিলা সহাস্যে রক্ষঃ--স্মরলাে মৈথিলি, বিকৃত নরের করে শূর্পনখা মূর্তি ; ভগিনী সে রাবণের যার বাহু পাশে • পত্রাবলী বদ্ধ অয়ি দিব্যাঙ্গণে এবে ওভক্ষণে। হাসিতে হাসিতে রােষে উঠিল গর্জিয়া,- মানব! মানব ক্ষুদ্র! ত্রিলােক নাথের ভগিনীর নাসাকণ করিল ছেদন। এত দৰ্প মনুজের। অধম মক অনায়াসে কালতুণ্ডে কৈল পদাঘাত ? জভঙ্গে কৃতান্ত যার নিমেষে দমিত, ইকরে ভীমবদ্ৰ হয়রে স্তম্ভিত, রে মানব! ক্ষুদ্রকীট ! লঘিলি তাহায় ? পতঙ্গ বাড়বানল করিবি নিৰ্বাণ? এত বলি উদ্ধানেত্রে তর্জনী হেলায়ে, কহিল আবার রক্ষ ভৈরব আরাবে ;- সাবধান ধরাবাসী মনুজ সন্তান। হের ধূমকেতু, করি অগ্নি বিকীরণ অদৃষ্ট গগনে তাের হইল উদয়! রাবণের রােষানল দেখরে চৌদিকে রাজার তনয় তােরা দুই নর ভাই, মহারণ্যে পদচারী রমণী সংহতি। দেব দৈত্য যার পানে চাহিতে না পারে কে দিল এমন বুদ্ধি ওরে মূঢ়মতি রক্ষেন্দ্রের বৈরী হয়ে ভ্রমিতে কান্তারে ? তাের দোষে দুঃখ পাবে অখিল সংসার! !
সীতাদেবী। লঙ্কা হতে বাহুড়িয়া দলিব ভারত। রাখিব না নরনাম ভূমণ্ডলে আর! লঙ্কেশের রুদ্র দর্প করিব প্রচার। ভূতল ত্যজিল যান, কাননের শিরে উঠিতে, বিটপী বৃন্দ মাের দুঃখে দুঃখী হাত বাড়াইয়া মােরে এল কেড়ে নিতে। ক্রমে বেগে রথবর উর্ধদিকে ধায়, চতুর্দিকে চারুদৃশ্য দূরদেশ হতে যেন দ্রুত শেষ দেখা আসিল দেখিতে। বিজলি গতিতে মেঘে ভাসে ব্যোমযান- নিয়ে সুবিস্তৃত ধরা, তটিনী, কানন, হ্রদ, শৈল, এক সঙ্গে ভাতিল নয়নে। প্রমােণ নিকুঞ্জ সম পঞ্চবটী মাঝে, হেরিলাম আমাদের সে পর্ণ কুটীর ধুলায় লুটায়, কভু উৰ্দ্ধমুখী হয়ে হাহাকারে হয় যেন কৰিছে ক্রন্দন। বায়ুবেগে ধায় রথ দক্ষিণের দিকে। পৰ্বত, প্রান্তর, হ্রদ, তটিনী, কানন, বিপরীতে, নিমে, পর্শ্বে, রাক্ষসের ভয়ে হুড়াহুড়ি মারামারি করি পরস্পরে, কেহ বা লুকায়ে কেহ লঘিয়া অপরে পলাতে লাগিল যেন ত্যজিয়া আমারে, १२ পত্রাবলী ঘন করাঘাত বকে লাগি কাদিতে আচম্বিতে ঘনাচ্ছন্ন বিধাের অম্বর বিদ্যুৎ বিদীর্ণ হৃদে ছাড়িল হুঙ্কার ! কাপিল সৃন ত্রস্ত বাজীর আতঙ্কে। চমকি হেরিনু ভয়ে,অচল শিখরে বিচিত্র দুলােক ব্যাপী ইন্দ্ৰ ধনু পরে হেলায়ে, মেঘের মত বিশাল শরীর বক্ৰমুখে নিম্নদৃষ্টি কহিছে সুরেন্দ্র ;- ‘সাবধান তস্করে! কোথায় পালা বস্তুমাঝে অগ্নিশিখা করি লুক্কায়িত ? কার প্রেম-মণি রত্ন হরি এবে দুষ্ট, পালাস অলক্ষ্যে ? তিষ্ঠ ওরে রাক্ষসে লম্পটের শিরােমণি । অধৰ্ম্মের ফল ভুঞ্জাইব রে দুৰ্ম্মতি, এই দণ্ডে তােরে।” গর্জি ঘাের শূল ধরি দাঁড়াইল শূর গগনে জলদে যেন ইরম্মদ ঋলে । হারামু চেতনা ভয়ে-কতক্ষণে যেন ভূকম্পে দুলিছে ধরা কৈ অনুভব। চতুর্দিকে কাঁপে দ্রুম, তুঙ্গ শৃঙ্গ দোলে। হেরিনু উন্মীলি আখি—দুই কাল মেঘ ঘোর নাদে করে রণ গগন মণ্ডলে, ঝ ঝলে ক্ষণপ্রভা খসিছে ভূতলে।
সীতাদেবী। সে বীরের পক্ষ হয়ে কৃতাঞ্জলি করি আরাধিনু নারায়ণে নাশিতে রাক্ষসে ! ভাবিনু পলায়ে কোন বৃক্ষের আড়ালে লুকাব, হায়রে ত্রাসে পড়িনু কাপিয়া। আরাধিনু বসুন্ধরে-জঠরে আবার দানিবারে স্থান অভাগীরে ! ইতস্ততঃ চাহিমু, দেখিতে পাব তােমাদের বলে ; হায় আশা হৃদিমাঝে উঠিল গুমরি। হেনকালে বক্ষ শরে বিকল সুরেন্দ্র পড়িল, পৰ্বত শৃঙ্গ যেন বজ্রাঘাতে । বাজ পক্ষী পড়ে যথা আমিষ লােলুপ, তেমতি রাক্ষস পাপী দূরশৃঙ্গ হতে নামিল ত্বরিতে, কহিলা সহাস্যে দম্ভে ;- দেখলাে জটায়ু শূরে গরুড় নন্দনে ; খর্ব বীর গর্ব তার রাবণ বিক্রমে। অবােধ স্বেচ্ছায় দিল সংগ্রামে জীবন। ঙ্কেশের গ্রাস হতে উদ্ধারিতে তােমা যে জন উদ্ধত মতি আপনা পাসরি আসিবে সীতে, তার হবে এ দুর্দশা। কহিলা মুম্ষু বীর নির্বাপিত প্রায় কালানল ক্ষণে ক্ষণে উচ্ছসি ঈষৎ ;- ‘মেঘেই বিদ্যুৎ শোভে হইলে বিচ্যুত == ৭৪ পত্রাবলী অন্যের হয় সে সুধু নাশের কারণ। ঘুবংশ হতে সীতঃ করিলি হরণ- সীতা নহে, শিখা এযে পুড়িবি পামর । মহাসিন্ধু ধরে বক্ষে বাড়ব অনল, সমী তুই সেই অগ্নি করিলি ধারণ, শাখা পর্ণ দগ্ধ তাের অচিরে হইবে । ধৰ্ম্মযুদ্ধে পড়ি আমি যাই স্বর্গপুরে। ভাব, দেখি তোর দশা কি হবে এখন? এতেক কহিয়া বীর হইলা নীরব। হেরিলে দুর্দশাগ্রস্ত স্বজনে যেমন কঁদে প্রাণ ; তথা হায় হইমু দুঃখিনী নিরখি এ ধৰ্ম্মবীরে নিহত সংগ্রামে। নিজ পরিচয় দিয়ে বীরেন্দ্র সকাশে কহিনু দেখিলে তােমা দিতে এ বারতা। আবার আকর্ষি মােরে ভীষণ সৃন্দনে উঠিল গগনে রক্ষ, মৈনাকের মত আবার উড়িল রথ হ্রদ, নদ, গিরি তুঙ্গ শৃঙ্গ লঘি, বেগে। ভয়ার্ত হ ইয়ে ক্রন্দনে পূরিনু দিক,-হেরিলাম দূরে গিরিপৃষ্ঠে কতজন রয়েছে বসিয়া। হাহাকার করি উচ্চে সম্বােধি তাদের, একে একে ত্বর করি ফেলি খুলিয়া সীতাদেবী। আভরণ অঙ্গ হতে প্রান্তরে কাননে। চলন্ত মেঘের কোলে উড়ন্ত বিহঙ্গে কহিনু বারতা দিতে শ্রীরাম সমীপে ; বলিলাম তুঙ্গ শৃঙ্গে অঙ্গুলি নির্দেশে দেখাতে তস্কর শ্রেষ্ঠে বিমান উপরে। সম্বােধিনু মেঘরাজ, মম হাহাকার শুনাতে রাঘবসুরে, দেবর লক্ষ্মণে কুবচনী জানকীর কাতর ক্রন্দন! ডাকিলাম রবি দেবে ভস্মিতে রাক্ষসে রক্ষিতে বংশের মান রঘুকুল বধ! হায় সবে আত্মহারা নিরখি আমায় চেয়ে র’ল রক্ষঃ ভয়ে বিমৃঢ় হইয়ে ! কতক্ষণে আচম্বিতে শুনি কল্লোল। হেরিনু কৃতান্ত যেন কুটী বিক্ষুব্ধ, সম্মুখে শােভিছে সিন্ধু নীলােৰ্ম্মি মালায়। ফেণময় দূর দূর অনন্ত সীমায় । ক্রোধে কাল রুদ্র যেন অট্ট অট্ট হাসে ঊর্ধ্বে তুলি মহাশূল ভীম জলস্তম্ভ ! সৌর করে ঘন নীল কমকি দূর হিল্লোলিত অষুনিধি তরঙ্গ সঙ্কুল ; লক্ষ লক্ষ নাগে যেন ক্ষুব্ধ উচ্ছসিত তমােন্ধ পাতাল পুরী মণি ঝলসিত।
পত্রাবলী। ব্যোমনে সিন্ধু লঙ্ঘি চলিল রাবণ অধাৰ্মিক শ্রেষ্ঠে হেরি বিবর্ণ প্রকৃতি, গম্ভীর, সাগর স্তব্ধ হেরি রাক্ষসেন্দ্রে , তরঙ্গের ভীম ভঙ্গি মন্দ মন্দ বয়, রাবণে হেরিয়া বজ্র লুকাল মেঘেতে, প্রভাহীন বিভাবসু-রাহুগ্রাসে যেন! মন্দ গতি প্রভঞ্জন সভয়ে কঁপিল । দ্যুতি হীন দেবদল হল অন্তর্হিত । হেন রূপে অসহায় নিরখি আপনা হুতাশের অৰ্ত্তনাদে পূরিয়া অম্বর কহিনু কঠোর করি ভৎসিয়া পাপীরে শূর্পণখা বাক্যে তুই হরিলি আমায়, শূর্পণখা ভগ্নি নয় কালরাত্রি তাের ! সে নয় রক্তাক্ত মূর্তি ছিন্ন কর্ণ নাসা উল্কামুখী অলক্ষ্মী সে রাক্ষস নাশিনী । যত দূর গিয়াছে সে জ্বলিধে দামিনী ! দীর্ঘনখ সমাকুল প্ৰস্ত দ্বিকর পঞ্চ যুগ্ম তুঙে, সে যে কাল ভূজঙ্গিণী রাক্ষসের! পারিলি কি বুঝিতে পামর? শ্রীরামের বাণ সে যে অগ্নি অঙ্গে মাখি পশিল পুরীতে তাের--জুলিবি অচিরে। দেখু অস্তগামী অই সবিতার মত সীতাদেবী। ৭৭ দম্ভী দর্প, তেজ তাের জ্বলে ধ্বক্ ধ্ব। ছাড়, মােরে দুরাগর, সিন্ধুগর্ভে পশি নাশি এ জীবন ছার! উপহাসে পাপী উড়াইল তিরস্কার,—যথা উৰ্ধশিখ অগ্নির উচ্ছাসে উত্তপ্ত কটাহ পরে স্ত উষ্ণ নীরােচ্ছাস মিশাইয়া যায়। স্বর্ণময় লঙ্কাপুরী শােভিল সম্মুখে, সিন্ধু তীরে উৰ্ম্মিরঙ্গে সারি সারি সারি ; নীল আকাশের কোলে স্বর্ণমেঘ রেখা। সান্ধ্য রক্ত রাগে যথা লােহিত বরণ অস্তাচল গুহে নামে জলন্ত তপন, পাছে পাছে লীন হয় বিচ্ছুরিত রশ্মি নৈদাঘ সন্ধ্যার স্থির ধূসর আঁধারে ; পশিল পুষ্পক সহ রাক্ষসাধিপতি সুবর্ণ লঙ্কায়। হায়, আমিও সে সাথে সুক্ষীণ আশার আলাে ধরিয়া হৃদয়ে হইলাম নিমজ্জিত, দুঃখের তিমিরে। মৈথিলী তােমার নাথ অশোক কাননে অবরুদ্ধা এবে। মহাকায় দ্রুম দল নিবিড় মেঘের মত আবরে অম্বর। দুরন্তু চেড়ীর দল তাড়কা আকৃতি শত শত দীর্ঘদষ্টা বিলােল রসনা, ৭৮ পত্রাবলী। • যষ্টি হস্তে নিরন্তর করিছে তাড়না। কভু হুতাশন জ্বালি নিক্ষেপিতে তায় দেখাইছে ভয় মােরে। তীব্র বিষধরে সম্মুখে ছাড়িয়া দেয় দংশিতে আমারে, উদ্ধৃণা করি আসে মহাকাল ফণী, ডাকি তাম এ যন্ত্রণা করিতে নির্বাণ কিন্তু বুঝি জানকীর সন্তাপে তাপিণী ফণা গুটাইয়ে ফণী বিবরে লুকায় ! কভু দন্ত কড়মড়ি ঘুর্ণিত লোচনে, সুরামত্ত চেড়ীবৃন্দ চতুর্দিক হতে, ঝটিকা সমান আসে তৰ্জন করিয়া । কারে করে দীর্ঘ বেত, খড়গ, খরশাণ কণ্টকের যষ্টি, কেহ ধরে তীবাণ। ঘুরায়ে সে সব অস্ত্র অস্ফালিয়া শূল আসে তার হিংস্র পশু হতে ভয়ঙ্কর। কুকথা কহিয়া হয় বধিতে উদ্যত । মেলিয়া বিকট মুখ কামড়িতে চায়, ভীমমুষ্টি শির’পরে তােলে বার বার ; কেহ তীব্র উপহাসে ক্রয় প্রহার। নিষ্ঠুরা রাক্ষসী কোন কেশ আকর্ষিয়া, উর্চায় প্রচণ্ড চড়--নিষ্পেষিতে চায় । নাথ! জানকী তােমার সুধু তব আশে • সীতাদেবী। আজিও রেখেছে প্রাণ! দুষ্ট দশানন প্রতিনিশা আসি কহে কুকথা কতই, সরমে ঘৃণায় মরি! বৈদেহীর নাথ। রক্ষ রক্ষ রক্ষ আসি—কাল ফণী চেয়ে লক্ষ গুণে পীড়াকর রক্ষগ্রাস হতে । ফল জল রাক্ষসের অস্পৃশ্য আমার অনাহারে শােক ক্ষীণ শীর্ণ কায়ে, দিন দিন মৃত্যুমুখে আছিনু পড়িতে, দেব কুল রাজ ইন্দ্র দত্ত সুধা পিয়ে আছে এ জীবন শু দেহে বিজড়িত ;- প্রখর নৈদাঘ সুৰ্য্যে বর্ষাধারা বিনা, কৃপপাদকে সিক্ত শস্য নিস্তেজ যেমন। রাম দরশন বিনা অমৃত কি আর আছে জানকীর বল অহে দয়াময় । বাসবের সুধা প্রভু, বহুদিন আর নারিবে রক্ষিতে প্রাণ সীতার তােমার। এ সুবর্ণ লঙ্কাপুরী রাক্ষস ঐশ্বৰ্য্য মনে হয় প্রেতপুরী রৌরব শিখায় আলােকিত পূর্ণ সদা উদ্ধৃঙ্খল ভাবে। আহা! রামরূপ জানকীর জীবন আধার, তাই বুঝি কারাগার ধাতার দয়ায় পত্রাবলী শ্যাম শােভা বন মাঝে হইল.সীতার ! উপরে নিবিড় ঘন অশােকের কুঞ্জ, শ্যাম রূপে ভরে যায় হেরিলে তল, কঁদিয়া লুটায়ে পড়ি নব দুৰ্ব্বাপরে,- আসারে সিফিয়া তারে করিগো সতেজ। উজলি ব্ৰহ্মাণ্ড যবে উদেন মার্তণ্ড, পত্র অবসরে হেরি জ্যোতির্ময় ছবি, চক্ষু মুদি নমি তব বীরত্ব প্রভায় । ভাবি বুঝি তেজঃ তব অন্বেষিতে সীতা, তিমির ভেদিয়া হেথা করিছে প্রবেশ ভাসিলে সুনীল নভে পূর্ণিমার ইন্দু, তােমার সুস্নিগ্ধ প্রেম করি অনুভব। মনে হয় আৰ্যপুত্র পঞ্চবটী হতে-- প্রেরিলা সহাস্য ভাব তুষিতে দাসীরে সীতার জুড়াতে জ্বালা তব কণ্ঠ স্বরে কুলু কুলু রবে অই নিঝরিণী ঝরে। শুনি তব সুধামাখা সুগম্ভীর স্বরে, "মনােহর প্রেমালাপ বৈদেহী রঞ্জন। টলিলে উলকা কোন বােষ রক্ত আঁখি হেরি তব, তপ্ত অশ্রু দীপ্ত শিখা তার উদ্ভাসিছে রক্ষপুরী ! ছুটিলে নক্ষত্র ভাবি তব অগ্নিবাণ পশে লঙ্কাপুরে।
সীতাদেবী। ! অনল স্ফুলিঙ্গময় হেরি ধূমকেতু, ভীষণ কুটী তব রাক্ষস সংহারে ভাবি এ কৰ্ব্বরপুরে হয়েছে উদয় হেন মতে আট মাস হইল বিগত, তথাপি উদ্দেশ তব কিছু না পাইনু। নিত্য রাক্ষসের শত সহস্র পীড়নে হতাশে হইনু ভস্ম, ভাবিনু অন্তরে কামরূপী নিশাচর ইন্দ্রজালে ছলি, তােমার (ও) জীবন হায় করেছে সংহার ! শােণিত শীতল হল--অসাঢ় হৃদয়, জীর্ণ দেহ দিতেছিনু যমে উপহার। হেনকালে হেরিলাম বৈশ্বানর রূপী তব অনুচরে বীর পবন নন্দনে। অশােকের বৃক্ষশাখে হার বদনে নিলাম রাম নাম! সে অমৃত স্বরে রক্ষনাথ বিষবাক্যে সদ্য দগ্ধ হিয়া, সঞ্জীবিত জানকীর হইয়া উঠিল নিদাঘের সুপ্রখর মধ্যাহ্ন কিরণে মুম্ষু লতিকা যথা সায়াহ্ন সময়ে দাঁড়ায় সতেজ হয়ে, তেমতি জানকী রামনাম শুনি দ্রুত উঠিয়া বসিল। চাহিলাম উর্ধপানে হেরিলাম বসি ।
পত্রাবলী বৃক্ষশাখে রুদ্রোপম বীর একজন। আমারে নিরখি তিনি রাম রাম বলি নমিলেন বারবার, বুঝিলাম মনে আশুগতি মনােরথ রূপী তিনি তব ; কাদিমু আনন্দে ! তেজে তার লঙ্কেশের প্রতাপ হয়েছে খৰ্ব্ব ভস্ম প্রায় বীৰ্য্য ! প্রভু! অঙ্গুরীয় ধরিয়াছি শিরে, খুলি শিরােমণি সঁপিলাম বায়ুসুতে অভিজ্ঞান মম। দাসী তব একান্তই পদলগ্ন রেণু, ধুইয়া ফেলনা তারে বিস্মৃতির জলে। তব তেজোদ্ভূত শিখ। মাসেকের মাঝে, হেরিলে, হতাশায় রাক্ষস পীড়নে হইবে জীবন-হারা জানকী তােমার ।
শ্ৰীমতী শ্ৰীমানের প্রতি। [ কোন প্রকৃত পত্রের মর্মানুসারে বিরচিত ] হৃদয়ের জ্বালাময়ী বাসনার শিখা মােহময় উজল বিভায়, লুকায় হৃদয় মাঝে মৃত্যু বিভীষিকা রমণী পতঙ্গ দহে তায়। বিহ্বল সােদর স্নেহে হরষিত চিতে, অভাগিনী খুলিল লিখন, হায়, একি! ঘৃণারাশি পড়িতে পড়িতে দপ করে জ্বলিল ভীষণ । ভ্রাতঃ, তােমার অন্তরে কলুষ তিয়াষ কেন বল হইল উদয় ? সঞ্চারি জ্ঞানান্থনিধি বুদ্ধির বিকাশ এইরূপে করিছ কি নয় ? অমৃতের ধারাসম, স্নেহের বচনে যবে ভাই জুড়াতাম প্রাণ, সেইক্ষণে তবে প্রাণে, বাশরী স্বননে বেজেছিল প্রেমের সুতন ?
৮৪ পত্রাবলী জ্ঞানপূর্ণ উপদেশ গরিমা ছটায় ও বদন রঞ্জিত যখন, প্রেমের রক্তিম আভা, জ্বলিত কি হয় ? সে কি তবে প্রেম আলাপন ? সরল চাহনি তব ঢালিত যখন সুধাময় স্নেহের নিঝর, প্রেমের নিগূঢ় ভাব হায় কি তখন আঁখি কোণে তুলিত লহর ? অনন্ত উদার প্রাণ-মহত্ত্বের খনি দেবত্বের পূত রঙ্গভূমি জ্ঞানের কল্পতরু' সাধু শিরােমণি তেজস্বিনী সুনীতি তরুণী, মূৰ্ত্তিমান গুণরাশি, হেরিয়া তােমায় হৃদয়ের ভক্তির সায়র, উথলিয়া উছলিয়া ও চরণ হায় প্রক্ষালিয়া ধাইল সত্বর। ভগিনীর বিমলিন স্নেহের লহরে সেচিলাম তোমার পরাণ, প্রাণাধিক সােদরের মূর্তি শশধরে আলােকিনু হৃদয় বিতান। কিন্তু হায়- অভাগীর ভাগ্যদোযে সুধার সাগরে শ্ৰীমতী। ৮৫ গরলের তরঙ্গ ছুটিল ! বিধৌত চন্দ্রিকা জালে আকাশ উজরে সুনিবিড় জলদ উড়িল। নিরমল স্ব-মেহ কলুষ নয়নে নিরখিলে কালিমা বরণ ? কলুষ কুচিন্তা ওকি রঞ্জিছে বদনে। রৌরবের ঘৃণিত দহন ! পিশাচ-পিশাচ মূর্তি! কেন দেখি আর । নিশাচর বিকট বদন করিয়া ব্যাদান ওকি গ্রাসিতে সংসার, করিতেছে উন্মত্ত নৰ্ত্তন ? দূর হরে দূর হরে কক্ পলায়ন দেখানা বদন তুহার! সতীর নয়নে জ্বলে প্রখর তপন, এখনি যে হইবি অঙ্গার । এ নহে পঙ্কজ অাখি কটাক্ষ সরল,- পদ্মগের জিহি ল ল। নহে এ রূপের রাশি-জোছনা তরল,- বজ্র শিখা জ্বলে ধ্বক্ ধ্ব! সর্তীর অমূল্য ধৰ্ম্ম করিতে রক্ষণ পড় বিশ্ব প্রলয় অনলে । - পত্রাবলী। চর্ণ হও গ্রহ তারা! শশাঙ্ক তপন নিভে যাও প্লাবন হিল্লোলে! জ্বলন্ত চিতার বক্ষে নির্মম অন্তরে ভস্মরাশি করিয়া তােমায়, ভাইরে, তােমার তরে হায় চিরতরে--- ভাসিব গো আঁখির ধারায় ; তথাপি তথাপি জেন, পাপ অভিলাষ হৃদয়েতে করিয়া ধারণ, পারিব না নিভাইতে, পাশব তিয়াষ নরকাগ্নি ভীষণ দহন। হৃদয় নিবাসী মম, ওই হৃদয়েশ হৃদয়েতে ধরেছি চরণ, ধিয়ানে করিয়া ধ্যান, পূজিছি প্রাণেশ শতদল উপহার মন। সে মহাপুরুষ বিনা, অন্য কেহ আর সুনিৰ্ম্মল হৃদয় প্রদেশ, মধুর প্রণয় যে, ঐশ্বর্যের ভারে পারিবে না করিতে স্বদেশ! পুরুষ পাষাণ প্রাণ, সকলেতে বলে প্রবৃত্তির খর স্রোতে হায়, বালির বাঁধন কিন্তু বাতাসেতে টলে, লালসার চালনায় ধায়।
শ্ৰীমতী। ; কিন্তু রমণী কলুষ বিশিখ ম্রো অভেদ্য উরস সতীত্বের কবচে আবরি, কলুষ তরঙ্গ তার ভীষণ উচ্ছসি নিবারয় অঙ্গুলি সঞ্চারি। আশার অজেয় সিন্ধু তরঙ্গ দুৰ্ব্বারে, অনন্তের অন্তে প্রবাহিত, ইচ্ছিলে রমণী তায় অগস্ত্য হুঙ্কারে হৃদয়েতে করে সমাহিত। নয়ন রঞ্জন হায়, বিলাস কাঞ্চন সুবিচিত্র ইন্দ্রধনু প্রায়, ক্ষণস্থায়ী ভােগলীলা, রমণী নয়ন অপাঙ্গেও কভু নাহি চায়। নাহি ভুলে রমণীর পবিত্র হৃদয় রূপময় বিজলী ঝলকে, জগতের প্রলােভন, দূরে পদাঘাতে কলুষ থমকে ! এখনও অন্তঃশীলা সরস্বতী স্রোতস্বতী প্রায় নিরমল ভ্রাতৃস্নেহ ধার, প্রবাহিত এ হৃদয়ে তব লাগি হায়, পূত নেত্রে হের একবার। পড়ি রয় পত্রাবলী। অপূৰ্ব্ব এ স্ব স্নেহ ত্রিদিব বন্ধন রক্ষিবারে যদি কবু আশ, মুছে ফেল হৃদয়ের কালিমা অঙ্কন হের পুণ্য আলােক বিকাশ।
রাণা রাজসিংহ। সম্রাট ঔরঙ্গজেবের প্রতি। [ হিন্দুস্থানের রাজগণের সহিত নানা যুদ্ধ ব্যাপারে নিরন্তর লিপ্ত থাকায় দিল্লীর কোষাগার শুন্যপ্ৰায় হইলে যবন সম্রাট ঔরঙ্গজেব হিন্দুস্থানের উপর “জেজেয়া” নামক এক কর বসাইলেন। উহা কেবল হিন্দুকেই দিতে হইত। ঐ করভারে সমগ্র ভারত প্রপীড়িত হইয়া উঠিলে মিবারের মহাপুরুষ রাণা রাজসিংহ উহার তীব্র প্রতিবাদ করিয়া নিম্নলিখিত পত্রিকাখানি সম্রাট সমীপে প্রেরণ করিয়াছিলেন। ]* চরণ-রাজীবে নমি সৰ্ব্ব মঙ্গলার অখিল ভুবন পাল সাহা সাহার * মহারাণা রাজসিংহ যে পত্রখানি ঔরঙ্গজেব সমীপে প্রেরণ করিয়াছিলেন, মহাত্মা টড, প্রণীত রাজস্থানের ইতিহাসে তাহার অনুবাদ পাঠ করিয়া উপরােক্ত কবিতা বিরচিত হইল। ইহাতে সেই লিপির মর্ম যথাযথ রক্ষা বিষয়ে আমার ক্ষুদ্র শক্তির সাধ্যানুসারে চেষ্টা করিতে ক্রটি করি নাই। যে পত্রিকাখানিকে বিশ্ব-প্রেমিক, মানবহিতৈষণা ও উদার নীতির জ্বলন্ত উদাহরণ বলা যাইতে পারে, এ সুবিশাল মানব সংসারে যাহার মত আর একখানি পত্রিকা অন্য কাহারও লেখনী হইতে আর কখনও বিনির্গত হয় নাই বলিলে অত্যুক্তি হয় না, সেই অনুপম লিপির একটা ক্ষীণ প্রতিবিম্ব ফুটাইতে আমার এই সামান্য কবিতার অবতারণা। বীরশ্রেষ্ঠ রাজসিংহের উক্ত পত্র সম্বন্ধে রাজস্থানের অপক্ষপাত ইতিহাসবেত্তা মহানুভব টড় নিজের মন্তব্য এইরূপে প্রকাশ করিয়াছেন ;- "The Rana remonstrated by letter, 4 in the name of the ৯০ পত্রাবলী শুভ জয় উচ্চারণ করি বারবার ! নরনাথ ! ভারতের রাজ রাজেশ্বর । প্রকৃতি রঞ্জন রামচন্দ্রের আদেশে এ অধীন ভবদীয় মঙ্গল ইচ্ছায় সংসারের পশুপক্ষী মানবের আর হিতার্থে হয়েছে বাধ্য কর্তব্য পালনে। নিবেদিতে সাম্রাজ্যের সুন্বত সংবাদ হে সম্রাট। আসিয়াছে ক্ষুদ্র প্রজা সকাশে তােমার ! দিল্লীশ্বর!"শুনিলাম অধীনের প্রতি প্রতিকূল আচরণে মহা ধনাগার হইয়াছে শূন্য প্রায়, তাই আয়াসিছ স্থাপিয়া নূতন কর, ক্ষীণ কোষাগার করিবারে স্ফীত। কুলাইতে সর্বগ্রাসী সমরের ব্যয়, দেশব্যাপীদারিয়ে নবীন উপায় প্রবর্তন হেতুভূত nation of which he was the head, in a style of such uncompromissing dignity, such lofty yet temperate resolve, so much of soulstirring rebuke mingled with a boundless and tolerating benevolence, such elevating excess of the Divinity with such pure philanthropy, that it may challenge competition with any epistolary production of any age, clime or condition."
রাণা রাজসিংহ। অ করেছ জন। ভারত ঈশ্বর। এ সংবাদে বজ্রাহত বিমূঢ়ের মত হইনু স্তম্ভিত ; ভাবিলাম মানবের ভাগ্যচক্র, ধনমান ব্যস্ত যার করে, তঁাহার এ কাজ সম্ভবে কখন! কিম্বা মানব ভ্রান্তির বশ; ভ্রম মায়া মুগ্ধ হয়েন ত্রিকালদর্শী ঋষিরাও কভু ; এ নহে বিচিত্র ইহা ভ্রান্তির বিলাস, বুঝালে হইতে পারে এ শ্রম নিরাস বিংশ কোটী মানবের পালক যে জন সে জন নিঠুর নয় ; তাহার হৃদয় নির্মমতা রঙ্গভূমি নহেক নিশ্চয় ! ধৰ্ম্ম বীরােৎসাহে পূর্ণ বাবর সুমতি ছিলেন এ নরললাকে দেব বীৰ্যমান। স্বজাতি-বিদ্বেষী ক্রর হিন্দুরে দণ্ডিয়া তাই সে বিখ্যাত বীর পারিল স্থাপিতে ভারত ভূখণ্ডে এই সাম্রাজ্য বিশাল। দীপতেজে প্রজ্বলিত দীপকের ছটা, হয় যথা দূর-ব্যাপী মহা জ্যোতির্ময়, তেমতি বাবর বংশে জন্মিলা ধীমান মহামতি আকবর—মােগল গৌরব।
পত্রাবলী । অসীম গাম্ভীর্যে তার পবিত্র প্রতাপে, মন্ত্রৌষধি রুদ্ধ বীৰ্য্য হইল ভারত। প্রদীপ্ত প্রতিভা তার উদ্ভাসিয়া ধরা উঠিল গগন পথে, ন্যায় সূর্য তলে হিন্দু মুসলমান নত হইল ভক্তিতে, আসমুদ্র হিমাচল লুটাল চরণে। দয়াল ঈশার ভক্ত অথবা মুসার, মহম্মদ-সেবী কিম্বা বুদ্ধ-উপাসক, নাস্তিক, আস্তিক, যােগী, ক্ষত্রিয়, ব্রাহ্মণ তাঁহার উদার শান্ত মহান্ প্রতাপ ভুঞ্জিত পরম সুখে সবে সমভাগে। সবার পালক পিতা, সৰ্ব্বধৰ্ম্মাশ্রয় ছিলেন সে মহাজ্ঞানী রাজর্ষি শেখর। ভক্তিতে বিহ্বল যত ভাৰত-নিবাসী গাইল সুকীৰ্ত্তি তার ; লক্ষ কোটী কণ্ঠে উঠিল আনন্দ-গাথা জগদ্গুরু গান শান্তির অগাধ সিন্ধু আন্দোলি সে তান স্পর্শিল হিমাদ্রি চূড়া ভেদিল বিমান। কাটি বক্ষ রাজভক্ত হিন্দু প্রজাগণ ভক্তির মন্দিরে তঁায় করিল স্থাপন ; দেখাল জগতে সত্য নৃপ নিদর্শন। আদর্শ রাজেন্দ্র কীৰ্তি করিল কীৰ্ত্তন ।
রাণা রাজসিংহ। তনয় জগতজয়ী জাহাঙ্গীর তার, শুভক্ষণে বিভূষিত বিশ্বজয়ী নামে, মৈত্রভাবে এ ভারত করিলেন বশ, অর্জিলেন নবরাজ্য ঐশ্বৰ্য পৌরুষ । বিশ্বজয়ী পুত্র পুনঃ বিশ্বের সম্রাট সাজাহান বসিলেন অতুল আসনে, কাৰ্ত্তিকেয় সমরূপে বীরত্বে শােভায়। বুসান রঞ্জনে যথা সুবর্ণ বরণ, কমলার বরপুত্র নৃপ আবির্ভাবে উজ্জ্বল বাবর বংশ হইল তেমন। হৃদয়ের পুণ্যভতি নিরুপম তার প্রকাশিল জ্যোতির্ময় মনােহর তাজ। রােপিলা কালের বক্ষে ঐশ্বৰ্য্য নিশান- সপ্তকোটী সুবর্ণের সুষমা উচ্ছাস। পঞ্চশত লক্ষ স্বর্ণে শিখিপুচ্ছাসন ঝলসে মানব নে উল্কার মতন। আর কত সংখ্যাতীত স্বর্ণে সুরঞ্জিল মােহন প্রাসাদ শত শশাঙ্ক লাঞ্ছন, চন্দ্রসূর্যকান্ত মণি দানিলা কতই ; কে করে গণনা তার! ইন্দ্রের ভবন লাজ পায় হেরি তাঁর নগরী রতন। অসীম ঐশ্বর্যে তার চকিত জগত।
পত্রাবলী । কিন্তু কেহ নবােত কর প্রপীড়িত কঠোর কঙ্কালময় নর প্রেতমূৰ্ত্তি দেখিল না, শুনিল না দারিদ্র্য হুঙ্কার, শােণিত শােষণ দাহে ঘাের আর্তনাদ। হেন ধর্মপরায়ণ প্ৰজার সম্বল ছিলেন বলিয়া তব পিতৃ পিতামহ সংখ্যাতীত নরশীর্ষে পাইলেন স্থান, অগণিত নরেন্দ্রের প্রতাপ খর্বিয়া গাড়িলা ভারতবক্ষে মােগল রাজ্যের সুদৃঢ় গভীর ভিত্তি। অত্যুন্নত ভাগ্যে মােগলের রাজলক্ষ্মী পড়িলেন বাঁধা। সুধাৰ্মিক পিতৃগণ রাজেন্দ্র, তোমার ন্যায় দণ্ডে ভর করি বাড়াতেন পদ : অমনি তিমির নাশি দিগন্ত উদ্ভাসি অরুণ তপন সম জয়শ্রী তাদের ধন্য ধন্য মহারবে ভুবন ভরিত। নিত্য নব জয়ার্জনে প্রতাপের স্রোত, শীতলি প্রাণীর তাপ, সিক্তিয়া ধরণী, হাসায়ে নিকুঞ্জ রাজি, মিষ্ট কলরকে মােহিয়া তৃষিতে বহিত প্রখর বেগে। কিন্তু সেই স্রোতােচ্ছাস প্রতিরুদ্ধ করি দাড়ালে দাম্ভিক কোন, তরল সলিল রাণ রাজসিংহ। তীম বজ্ৰ বেগ ধরি উঠিত গরজি ; ঘূর্ণাবর্তে শত সিন্ধু সম বারি রাশি উঠিত ভীষণ ভাবে, মকর কুম্ভীর- সমরের হিংসা রােষ মত্ততা ভীষণ লঙ্ঘিয়া চূড়াগ্র তার বহিত প্রবাহে ; অটল অচল বলী বিপক্ষের বীৰ্য্য নিমেষে লইয়া যেত অকূলে ভাসায়ে । কিন্তু নাহি চণকরি, নিষ্পেষিতা তায়, টলায়ে স্বপদ হতে স্থাপিয়া সৈকতে পুনঃ শান্তনীরে চুম্বি তুষি তাহায় ; জেতার উদারভাবে মজিত বিজিত। পিতৃ পিতামহগণ হেন মতে তব মৈত্রীভাবে শাসিতেন বিশাল ভারত। সর্বশক্তিমান্ ঈশ জগত পিতার সৃষ্ট নীর শস্যে যথা কৃতজ্ঞ আস্তিক কৃতঘ্ন নাস্তিক আর, উভয়ে সমান হয়েন পালিত স্নেহে বর্ধিত উৎসাহে ; তাদের আশ্রয়ে তথা উদশর ব্যাভারে, হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসল্মান, জৈন, খ্ৰীষ্টিয়ান সম প্রীতি ন্যায় সূত্রে হইয়া গ্রথিত, বসিতা সুখের রাজ্যে, সভক্তি আশীস ক্ষরিত সবার মুখে প্রাতঃ সন্ধ্যাকালে ;
পত্রাবলী। কি এক শান্তির শােভা ভাসিত ভারতে। কিন্তু আর সেই দিন নাহিক ভারতে। অশান্তি ঝটিকা এবে মাতিয়া দুর্যোগে ছুটিছে প্রেতের মত উজাড়ি সংসার ; হাহাকার আর্তনাদ শশাকের উচ্ছ্বাস করিয়াছে তমােময় ভারত আকাশ । সাহনস! জান তুমি তব পূৰ্ব্ব কালে নিত্য নবরাজ্য স্রোতে স্ফীত হয়ে সদা মােগল সাম্রাজ্য-সিন্ধু, আপন বিক্রমে উছলিত, উথলিত; কিন্তু ভাব এবে কেন নিত্য সেই সিন্ধু যাইছে শুকায়ে ; কেন বল মােগলের সাম্রাজ্য হইতে নিত্য হেন রাজ্য অংশ হইছে বিচ্ছিন্ন ? স্থির পৃথী সম মােগল অদৃষ্টবক্ষে বিনিহিত ভিত্তি যার অচল প্রতিম, শত অক্ষৌহিনীরূপী ইষ্টক পাষাণে গ্রথিত বজের মত শক্রর শােণিতে অদ্রিসম প্রসারিত দেউল যাহার, অসীম রণ কৌশলে বিনির্মিত যার অশনি অভেদ্য ছাদ, প্রতাপের চ ঠেকেছে সদর্পে উদ্ধে গগন মণ্ডলে, ঐশ্বৰ্য সৌন্দৰ্য যার অতুল সুষমা চড়া রাণা রাজসিংহ । মােগল সম্রাট সূৰ্য মধ্যাহ্ন কিরণে ঝকঝকে ছাড়ে ছটা উদ্ভাসি অম্বর ; সে ভীম প্রাসাদ আজি কি নব প্রমাদে হইতেছে বিকম্পিত বল ভারতেশ ! কি দৈব উৎপাতে কহ, হিমাচল সম সে প্রাসাদ অঙ্গ হতে এক এক করি খসিছে পাষাণ খণ্ড ? কিসের কারণে জগতে অতুল হেন চারু অট্টালিকা হইছে বিকৃত ক্রমে ? ভেবেছ কি কভু কেন হেন হয় নিত্য অশুভ সম্পাত ? রাজেন্দ্র ! যাহার বক্ষে এ বিশাল হৰ্ম্ম দাড়ায়ে নির্ভয়ে, সেই বসুন্ধরা নিজে গর্ভস্থ হুতাশ তেজে উঠিছে কাপিয়া তাই কাপে ব্যোম-ভেদী ওই তুঙ্গশৃঙ্গ, নতুবা টলায় কেবা মহা হিমাচলে ? সাহনসা ! হৃদয়ের অবিশ্বাস দাহে বিচলিত নিজে তুমি, তব বক্ষঃস্থিত এ মহান রাজ্য তাই করে টলমল, নতুবা মােগল দম্ভ নহে' দুলিবার। দেখ চেয়ে নরপাল—প্রজার জীবন। বিভীষণ দৃশ্য পূর্ণ সাম্রাজ্য তােমার। হত্যা-হত্যা-নরহত্যা-প্রজার সংক্ষয় ;
পত্রাবলী ব্যাদান করিয়া কোট করাল বদন উন্মাদিনী ঝঞ্চা মত ছুটিছে চীৎকারি ! বিঃ ও বিপদ রাশি কাল মেঘ সম হইতেছে ঘনীভূত, দৈন্য ও দারিদ্র্য ধরিয়াছে কি বা সৰ্ব্ব দমন মূরতি! রাজ্যেশ্বর, রাজপুত্র, সামন্ত, সর্দার, করাল কবলে তার নিস্পিষ্ট যখন, ভাব কিবা দারিদ্র্যের দারুণ দুর্দশা। দেখ অই ধখান করি সরজ্ঞান অত্যাচার করে ধরি খজ খরশান, খল খল অট্টহাসে দড় বড়ি ধায়। জবা সম রক্ত আঁখি দন্ত কড় মড় ভীষণ কুটী মাঝে নির্মমতা বশে, রুষ্ট সজারুর মত কুলিশ কঠোর উত্থিত কণ্টক তীক্ষ্ণ রােমাবলী অঙ্গে, দন্ত যেন বৃশ্চিকের দাড় সারি সারি ওষ্ঠের বাহিরে নড়ে কুক্ষি বিদারণ। প্রধাবিতে ধরাব চরণ নখর লাঙ্গল সমান চষে, রসাল কানন উপাড়িয়া কর নখে দীণ করি দূরে করিছে নিক্ষেপ, শত নর দেহ হতে সদ্য তুলি কঁাচা চৰ্ম্ম বেঁধেছে কটিতে, রাণা রাজসিংহ। যত দূর চলে রক্ত পড়িছে ছড়ায়ে। প্রতি রােমকূপ ই’তে মার কাট রব হইতেছে বিনিৰ্গত, প্রতিধ্বনি রবে আহতের আর্তনাদে কঁাদে দিগঙ্গনা। দেখ দেখ কি ভীষণ হত্যাকাণ্ডে ধরা হইছে পূর্ণিত, কিবা করুণার গােল। ওঃ—দয়ার দুয়ার পরে পড়েছে অর্গল কোথা বৃদ্ধ তপস্বীর জীণ দেহ পরে ধৰ্ম্মান্ধ যবন করে দারুণ প্রহার, কোথা,ক্ষীণ ব্রাহ্মণের হৃৎপিণ্ড ছিড়ি নিষ্ঠুর বিধর্মী দৈত্য দাঁড়ায়ে অদূরে, উল্লাসে বিকট দন্ত করিছে বাহির অমূল্য সতীত্ব রত্ন হারায়ে কোথায় আলুথালু কুলবালা ধরণী লােটায়, অদূরে আবদ্ধ পতি ডাকে নারায়ণে, নিষ্ঠুর পিশাচ পার্শ্বে হাসে খল খল ! প্রাণের পুত্তলি শিশু ছিন্ন করি বলে জননীর কোল হতে মারিছে আছাড় রক্তবর্ণ মাংস পিণ্ড হেরিয়া বাছায় বৎস-হারা গাভী হৃদি করিছে বিদার। কোথা ধূ ধূ অগ্নি শিখা লক্ষ্মীমন্ত বাসে কালাগ্নি তরঙ্গ মহ জড়ায়ে ঝঞ্চায়, ;
১০ ০ পত্রাবলী। ; হুহু শব্দে শূন্য পথে হইছে উডীন দগ্ধ দেহ প্রাণী তার মৃত্তিকা কামড়ি ছাড়িছে চীৎকার ! সেই আর্তনাদে বিচলিত নাগপুরী ছাড়ে দীর্ঘশ্বাস ! চূণ হিন্দু দেব দেবী, তীথ ধাম যত গােরক্ত কমে লিপ্ত, ব্রাহ্মণের রক্তে জাহ্নবী বহিয়া যায় বৈতরণী স্রোতে ? দীন হীন হিন্দুগণ-অবলম্ব-হীন, নিঃসম্বল ব্যবসায়ী, ক্ষুধা-ক্ষিপ্ত প্রজা, অসন্তুষ্ট সৈন্যদল, রুষ্ট রাজকুল- নিত্য নব নব দোষে নুতন কলঙ্কে দংশিতে উন্মুখ সবে মােগল সাম্রাজ্য । প্রচণ্ড অনলে যথা অট্টালিকা অঙ্গে পরপর প্রতিঘাতে ইষ্টক পাষাণ বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়েঅধিক কি কব সাম্রাজ্য প্রাকার তব গ্রথিত যাহায়, সেই মুসলমানগণ (ও) এবে অসন্তুষ্ট তব প্রতি, নিত্য কঠোর ব্যাভারে তব । যে জাতির কণ্ঠে বসি দুর্ভিক্ষ রাক্ষস করাঘাত করি বক্ষে বিদারি হৃদয় ছাড়িতেছে হুহুঙ্কার, নিত্য নিরশনে প্রেতের কঙ্কাল ছায়া সৰ্বাঙ্গ ব্যাপিয়া রাণা রাজসিংহ। ১০ : পড়েছে যাদের, গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে সদা কট কট শব্দ হয় নড়িলে ঈষৎ, পঞ্জরে হাড়ের বাদ্য শুনিলে যাদের আতঙ্কে শিহরে প্রাণ লোমহর্ষ হয়,-~- অস্থির তাহাদের শুষ্ক ক্ষীণ অঙ্গে, অস্থি আবরণ শুধু শুষ্ক চৰ্ম্ম পরে জলৌকা সমান বসি শোেষয় শােণিত যেবা, দুৰ্ব্বহ করের ভারে অস্থি মজ্জা নিষ্পেষিয়া লয় প্রাণ মুমূষু প্রজার, সে রাজার রাজৈশ্বৰ্য্য সম্রম মৰ্য্যাদা কিরূপে তিষ্ঠিতে পারে ? শুন নরপাল! কোটী কোটী প্রজা তব কি বলিছে ওই, পূর্ব প্রান্ত হতে দূর পশ্চিম পৰ্য্যন্ত, উত্তরে হিমাদ্রি হতে নীলােৰ্ম্মি অবধি, বজ রবে বলিতেছে ভারত-নিবাসী-- শান্তির আবাস বনে, তপস্বী আশ্রমে আরঙ্গের রিক্ত কর হবে প্রসারিত নির্জন দুর্গম ঘাের যােগীর করে, প্রচণ্ড প্রতাপ তাঁর হইবে বিকীণ। নিঃসম্বল বৈরাগীর ছিন্ন ঝুলি মাঝে, সম্রাটের লুব্ধ মুষ্টি হইবে প্রবিষ্ট। দয়া ধৰ্ম্ম বিবর্জিয়া দের স্বার্থপর পত্রাবলী। তৈমুর বংশের মান মর্যাদা উপেক্ষি পবন জশন নগ্ন সন্ন্যাসীর অঙ্গে বসাবে শােণিতপায়ী শার্পলের দন্ত। ঐশী ভাবাপন্ন বলি যেই গ্রন্থাবলী প্রসিদ্ধ জগতীতলে, যাদের আদেশ প্রাকৃতিক নীতি সম মানব সমাজ পালিছে, দানিছে নিত্য ভক্তি পুষ্পাঞ্জলি ; মানব নিয়ন্তা:সেই গ্রন্থাবলী প্রতি মহিমান্বিতের যদি থাকয়ে বিশ্বাস, তা হলে তৎপাঠে জ্ঞাত হবেন নিশ্চয় নিখিল মানব কৰ্ত্তা সৰ্বশক্তিমান। সমগ্র নৃসমাজের একই ঈশ্বর। তিনি- মুসলমানের(ই) শুধু নহেন বিধাতা। মহেশ্বর খােদা আল্লা একেরই আখ্যান। একেরই ব্রহ্মাণ্ড এই অনন্ত মহান! ইসলাম ধর্মাচারী, পৌত্তলিক আর সকলি সমান অংশী করুণার তঁার ! তার সৃষ্টি বর্ণভেদ, নিখিল প্রাণীর তিনিই জীবন-দাতা—বিধাতা মুক্তির । মণিমুক্তা বিমণ্ডিত মসজিদের মাঝে যেই ভক্তি উপহার দেহ সপ্তবার, রাণা রাজসিংহ। ; উচ্চ চূড় পাষাণের মন্দির ভিতরে যেই পূজা অর্চনাদি হয় তিন বার, সকলি সে অদ্বিতীয় গুরুর উদ্দেশে। কোরাণের মহা বাক্য, বেদের সঙ্গীত, সকলি সে জগদাদি নিত্য সনাতন, ঈশ্বরের মহাদেশ প্রস্ফুট ভাষায় ! সমগ্র পৃথিবী বাসী মানবের মাঝে, মুসলমান শুধু তার নহে আপনার মুসলমান-ভক্ষ্য করি হিন্দুরে কখন নাহি সৃজিলেন সেই পরম দয়াল। পরধর্ম নিন্দা করে যেই মৃঢ়মতি ঈশ্বরের প্রতি তার বাচ্ছল্য প্রকাশে; বিকৃত করিলে চিত্র, চিত্রকর চিতে বিরক্তি উচ্ছাসে। সত্য বলেছেন কবি- দৈব তেজোদ্ভূত ভিন্ন কাৰ্য কলাপের করােনা অবজ্ঞা কিম্বা আরােপ দোষের। পরিশেষে সারকথা—যে কর আপনি হিন্দুর নিকটে আজি করিছেন দাবি, হিতৈষিণী নীতি সহ বিচারিলে তাহা অন্যায়-অভূতপূৰ্ব ! হিন্দুস্থান-ব্যাপী দারিদ্রের উত্তেজক-দুর্ভিক্ষ পােষক! সৰ্ব্বধংসী কৃতান্তের কাল দণ্ড পম ।
পত্রাবলী এই মুণ্ডকর। আসমুদ্র হিমাচল বিঘােষিছে তারস্বরে দানব মানব- আরঙ্গের হৃদোঙ্খিত বিধৰ্ম্মী হিংসার মহা দাবানল এই, ভারত নিকুঞ্জ দহিবারে ছাড়িতেছে কোটী তক্ষকের সৃষ্টিনাশ হলাহল শ্বাস! হিংসকের চরম আদর্শ এই যবন সম্রাট। মূৰ্ত্তিমান নির্মমতা মুমূর অঙ্গে প্রবেশিছে—শুষ্ক কাষ্ঠে হুতাশন যথা । ভীষণ শ্মশানময় করিতে ভারত সহস্তে চিতার সজ্জা করে নরপাল। লক্ষ অনুচর তাঁর দগ্ধ-কাষ্ঠ করে- ফিরিছে পিশাচদল মুণ্ডমালা গলে ; নর নাড়ী বাঁধা ঊর্ধ্বে উড়িছে গৃধিণী, পাছে পাছে ফেরু পাল করে মহা রােল। চলে প্রেত ত্রিভুবনে সঞ্চারিয়া ত্রাস উদ্ধবাহু ক্ষিপ্ত-গতি অট্ট অট্ট হাস; চরণে কঙ্কাল ভাঙ্গে কড় কড় কুড়ে, গ্রাসি শশু পক্ষী নর চলিছে ধাইয়া সৃণী বহিয়া রক্ত পড়ে গড়াইয়া । চতুর্দিকে সংসারের শান্তি নিকেতনে অস্থিমাংস পচা শৰ দেয় ছড়াইয়া রাণ রাজসিংহ। সদানন্দময়ী অহাে অমরা সুন্দরী আজি নিরানন্দ মাখা দৈত্যের পীড়নে। যদি অহে সাহা স্বধৰ্ম্মানুরাগে প্রচলিতে মুণ্ডকর হলেন উদ্যত, রাজা রামসিংহ পরে সর্বাগ্রে তাহার উচিত স্থাপনা ;-যে হেতু বিখ্যাত তিনি হিন্দু শ্রেষ্ট বলি এবে সম্মানিত আর। তার পর এই ক্ষুদ্র হিতৈষীকে তব অরিবেন,-দেখিবেন সম্মুখে ইহার অগ্রসর হতে স্বল্প পাইবেন ক্লেশ। কিন্তু জানিবেন মনে—মক্ষিকা কীটেরে পদতলে বিদলিতে মহা দম্ভ ভরে গজেন্দ্রের পাদোত্থান ঘৃণার ব্যাপার। সিংহের সম্মুখে তার শুণ্ড আস্ফালন উচিত সতত। বীরের জনম নহে পীড়িতে মুমূর্জনে—দণ্ডিতে দুৰ্ব্বলে ? আশ্চৰ্য্য ইহাই শুধু-মন্ত্রিবর্গ তব সত্য সম্মানের সূত্র শিখাতে তোমায় করিয়াছে অবহেলা নীচ চাটুকার।
বিমলা— বীরেন্দ্র সিংহের প্রতি। (গড়মন্দারণের অধিপতি মহারাজ বীরেন্দ্র সিংহ নবাব কতলু খা কর্তৃক অন্যায় পূর্বক বিজিত হইয়া মশানে ধার্থ অনীত হইলে তৎপত্নী বিমলা জন্মের মত একবার তাহার চরণ দর্শনের জন্য অনুজ্ঞা প্রার্থনা করিয়া নবাব সেনাপতি ওসমামের হস্তে নিম্নলিখিত পত্রিকাখানি বীরেন্দ্র সিংহের সমীপে প্রেরণ করিয়াছিলেন। * ) স্বামিন ! জীবন! প্রভু! প্রিয়। প্রিয়তম । এসেছে মশানে দাসী দেখিতে চরণ। শেষ নিবেদন মম ও রাজীব পদে অনুমতি দাও নাথ, জল্লাদের করে, হেরি কেমনে তব ছিন্ন হবে শিরঃ। কেমনে শােণিত স্রোত উত্তপ্ত উচ্ছাসে, স্কন্ধ হ’তে শত ধারে রঞ্জিবে মহীরে- দেখিব—দেখিবনাথ ! বিমলার প্রাণে উন্মাদিনী বাসনার রুধিওনা. গতি। প্রাণেশ্বর ! প্রেয়সীর এতব মিনতি। আমিন । হৃদয়-রত্ন! তব কণ্ঠ রক্তে মার্জিত করিব মম প্রতিহিংসা-অসি! গভীর কলঙ্ক তার কালীম বরণ । * স্বর্গীয় বঙ্কিমচন্দ্র প্রণীত দুর্গেশনন্দিনী দ্রষ্টব্য বিমলা। ধিরে ফেলিব ধুয়ে-বর্জাগ্নি সমান ধ্ব ধ্বক্ উঠিবে জ্বলিয়া! প্রাণেশ্বর? খগঘাতে যবে তব নির্বাণের শ্বাস উঠিবে উচ্ছসি শূন্য করি জ্বালাময়, সে শ্বাস ধরিব-বুকে! সে বেগ প্রচণ্ড শিরায় মজ্জায় মম ল’ব প্রবাহিয়া ! ঘাতকের জিঘাংসায় পূরিব হৃদয়। শােণিত পিয়াসে প্রাণ করিব শ্মশান । চিতার জ্বলন্ত শিখা আকর্ষি নেত্রে ! তব রক্তস্নাত-ছবি বিলুষ্ঠিত কায়, মৰ্ম্মে মম্মে হবে প্রতিবিম্বিত আমার । পতিহত্যা প্রতিশোেধ লইবার তরে, ভীষণ শ্যামার শক্তি অবলাবাহুতে হবে অধিষ্ঠান । কালিকার কর হতে লইব কৃপণ, শম্ভু সােহাগিনী মুখে ভাতিবে করাল হাসি হেরি কিঙ্করীরে। সতী সাধ্বী করে অসি হেরিয়া আকাশে নীরদ বিদীর্ণ করি নাচিবে বিদ্যুৎ ? অনুমতি দাও নাথ, যাইতে মশানে । হেরিতে বৈধব্য মম আপন নয়নে। খুলিব কঙ্কণ, বাজু, কিঙ্কিণী নৃপুর ।
পত্রাবলী। অত্যাচার আর্ভক্ষুব্ধ মহাবধ্য ভূমে, ঘাতকের অসি হেরি তব মৃত্যু মন্ত্রে হইব দীক্ষিত আমি মহা হিংসা ব্ৰতে নির্দয় দৈত্যের আর প্রেতের উল্লাসে নারীর নম্রতা সেথা করি বিসর্জন, ধরিব ললাট দেশে হত্যার কুটী। মুছি সুখে শ্মশানেতে সিথির সিন্দুর ; ঘাতকের খলিপ্ত তব উষ্ণ লােহে রবি সীমন্ত মম-প্রতি হিংসা তরে । প্রাণনাথ! এমতে বিমলা তব রাখিবে আঁত। নবারের অন্তঃপুর চারিণী রাক্ষসী ভাবিয়াছ প্রাণেশ্বর ! আমাদের তুমি ! তাই ভাল—তাই হাে’—কর আশীর্বাদ অনাসে বাসনা যেন পারি পূণি বারে। দৈত্যবংশ ধ্বংস তরে নিলজ্জা ভীষণ উন্মাদিনী কালী যথা তাণ্ডবী উল্লাসে নেচেছিল রঙ্গে ভঙ্গে আনন্দ প্রকটি, অতুল বিলাস ঘটা হাব ভাব হাস্যে রূপের ছটায় মােহি আসুরিক দল ; তেমনি ভাসিব বিলাস স্রোতে ফুল শতদল- বিমলা। বুকে ধৰি কাল কীট তীক্ষ্ণধার ছুরী! উড়িব চপলা যেন,কাদম্বিনী কোলে-- বুকে ধরি বভ্রানল-খরশান অসি ! জ্বলিব মাণিক যেন নিকুঞ্জের তলে, নিয়ে রাখি সাপিনীর তীব্র বিষ দাঁত। মাতিব নৰ্ত্তনে ঝলি পাঠান নয়ন ; মােহিয়া নবাবচিত্ত মৃদু অট্ট হাসে, স্বকরে ঢালিব সুরা বৈতরণী স্রোত ! আকণ্ঠ পিয়াব:বিষ, অপাঙ্গ দংশনে বিহ্বল করিয়া তারে চুলাব ভূমিতে! স্বণ অলঙ্কারে ক্ষুদ্র ফুল কণা গুলি ঝক মক করে যথা আলােকে ঘুরিয়া, তেমতি এ চারু অঙ্গে হাব ভাব লীলা ফুটাব! ফুটিবে ইষু তীব্র লালসার রােমে নােম! মৃগি রােগে যথা মত্ত নর মস্তিষ্ক তাড়নে পড়ে ঝাপটি ভূমিতে, তেমতি কামাগ্নি তাপে তাড়িত হইয়া উঠিবে লালসা সুর, প্রসারিয়া বাহু ধরিবে আমায় ভাবি সুকোমল ফুল। পরীক্ষিত ঘাতী কোটী তক্ষকের দত্ত তখনি ঊরজ হ’তে হইবে বিকাশ। মর্ম মজ্জা শিরা স্নায়ু ছিড়িয়া নিমেষে পত্রাবলী। ছুটিবে দংশন জ্বালা অশনি শিখায় । বজ্ৰ দগ্ধ দ্রুম প্রায় পড়িবে অনুর ! বঞ্জাগ্নি উড়িয়া যাবে। অর্ধ দগ্ধ দীণ মহাম; পড়ে রবে বিত্ৰন্থি কানন ?
সূৰ্য্যমুখী— নগেন্দ্রনাথের প্রতি [ কুন্দনন্দিনীর সহিত নগেন্দ্রনাথের বিবাহ কাৰ্য্য সম্পন্ন হইলে পর সূৰ্য্যমুখী অাপনাকে হৃদয়েশ্বরের নিতান্ত বিরক্তিকর বুঝিয়া নিদারুণ মৰ্ম্মবেদনায় নিপীড়িত হইয়া একদা রজনীঘােগে স্বামী ভবন পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া যান। অবশেষে তাঁহাকে কোথাও পথশ্রমে কাতর ও শীতবৃষ্টিতে একান্ত অবসন্ন ও মুমুধুর মত পতিত দেখিয়া একজন সন্ন্যাসী তাঁহাকে সেস্থান হইতে তুলিয়া আপন কুটীরে আনয়ন পূর্বক শুশ্রুষা করিয়া তাহার চৈতন্য সম্পাদন করেন। কিন্তু সূৰ্য্যমুখীকে বিপন্নাবস্থায় ভীষণ রােগে আক্ৰমণ করিয়াছিল, সুতরাং তিনি এখন ক্রমে আপনার জীবনাবসানের সময় সংক্ষেপ জানিয়া সেই সন্ন্যাসীকে দিয়া অন্তিম সময়ে স্বামীর চরণ দর্শন প্রার্থনা করিয়া নিম্নলিখিত পত্রিকাখানি নগেন্দ্রনাথের সমীপে প্রেরণ করিয়াছিলেন।] মেঘ আবরণে রবি অদৃশ্য অসীমে, সূর্যমুখী ধারাপাতে কাপিয়া আকুল ! 'প্রাণাধিক। যায়যায়নিবে যায় যায় জীবনের দীপ, কিছু দুঃখ নাহি তার ; অন্তিম সময়ে শুধু এস একবার, দেখা দিয়ে চলে যেয়ে মিনতি আমার । দিনান্তে সায়াহ্নে দূর আকাশের কোলে তােমার লােহিত বিভা নিরখিবে বলে, পত্রাবলী । সূৰ্য্যমুখী ঊর্ধনেত্রে চাহিয়া রয়েছে। সুক্ষীণ আশার দৃষ্টি সূতত কাঁপিছে। এস এস নভ প্রান্তে ! মেঘ অবসরে তােমার একটু ছবি, মৃদু রশ্মি রেখা দেখিয়া লইব আমি জনমের তরে, তার পর চলে যেয়াে—চির অন্ধকারে ডুবে রবে সূর্যমুখী। দুঃখিনীর নাথ। যদি বল তােমা ছেড়ে পেরেছি যখন দূরে যেতে, কেন এবে দেখিতে তােমায় এত আকিঞ্চন পুনঃ ? ক্ষম অপরা। তুমি না করিলে ক্ষমা এ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে- আমারে করিতে দয়া কেহ নাই আর। ক্ষম অপরাধ-দুর্বল অবলা আমি । হৃদপদ্ম ছিড়ে দিয়ে দেবতার পদে করেছিনু পূজা, কিন্তু হায় ভাগ্য দোষে যন্ত্রণায় হইনু বিবশ। ধৈৰ্য্য সাধনায় বন্দিবারে ও চরণ নাহি পারিলাম ; নয়ন মুদিয়া পড়িনু ঢলিয়া ভূমে ! সে পাপে এ দশা মম আজিগাে প্রাণেশ ! ইষ্টদেবে দিয়াছি সকল—কিন্তু হায়, মানস উল্লাসময় পারিনি করিতে ;••• সূৰ্যমুখী। সে পাপে নিষ্পিষ্ট আমি। ভয় হয় পাছে ; মরে যাই তব মুখ না হেরি অন্তিমে। দুঃসাধ্য স্ফোটক বিষে হয়ে নিরুপায় অসহ-যাতনা ভয়ে বিষম ঔষধ আব্রাণি চেতনা হর—দুৰ্বল রােগীর হয় জীবনান্ত যথা, অদৃষ্টের বশে সে দশা দাসীর আজি। এখন অন্তিমে- দেখা দিয়ে দেব কান্তি, পবিত্র ছটায় হৃদয়ের মলা মাের দূর করে দাও, পাপিনীর প্রায়শ্চিত্ত করাও দয়াল! তােমার আনন্দে মেরে হাসাও হাসাও ! তুমি গো করুণাময়-তব স্নেহ সুধা সতত দাসীর প্রতি ঝরে অবিরল। এসেছি অজ্ঞাতে চলে--ব্যথা দিয়ে তব কোমল পরণে ; হায় স্বার্থ পরায়ণ আপন বিষাদে সদা বিমুঢ়া বিহ্বলা, ভাবি নাই একবার—মম অদর্শনে তােমার কমল মুখে ধরিবে কালিমা ! কুন্দের কনক বর্ণ হইবে মলিন তব অনাদরে--পাবে সতী মনস্তাপ, সরলার স্বচ্ছ শান্তি হইবে সমল ১৫ ১১৪ পত্রাবলী ; সংসারের অমঙ্গল নিরখি কেবল । ধিক্ মােরেশত ধিক্। আমি পাপিয়সী দীর্ঘ সহবাসে তােম চিনিতে নারি। ভাবি থাকিলে তব সম্মুখে সদাই, হইব সুখের পথে কণ্টক কেবল। ত্যজিলাম সুখবিস-ও শান্ত হৃদয়ে তুলি অশান্তি শ্বাস সুধাংশু শোভন শারদ আকাশে আমি কাদম্বিনী ছায়া। ভ্রান্তি বশে হনু তব বিষাদ দায়িণী। অসহায়া অবলার ক্ষম অপরাধ। অন্তিমে অভাগী জনে দেখা দাওনাথ । ঘুচাও এ পাপিনীর প্রাণের সন্তাপ ? এ জন্মে স্বামীর সেবা করিতে নারিনু, হায়রে স্বার্থের ঘায়ে অবশ হৃদয় পতিরে তুষিতে দুঃখে ভাঙ্গিয়া পড়িল! স্বর্গে রই মন্ত্রে বই কিম্বা রসাতলে জন্মে জন্মে পারি যেন বিপদে সম্পদে স্বামীরে করিতে সুখী হে হৃদয় নাথ ? নিষ্কাম সেবার সূত্র শিখাও আমায়, এই ভিক্ষা মাগে দাসী চরণে তােমার । এ জীবনে এ বাসনা হল না পূরণ আর যেন হেন তাপ কভু নাহি পাই । ;
১১৫. . সূৰ্য্যমুখী। বলে যাই জ্বলে যাই অনুশােচনায়। কৃতান্তের কুন্তীপাকে,কোন পাপ আত্মা, এর চেয়ে যন্ত্রণায় নহে নিপীড়িত। বিরক্ত হয়ােনা প্রভু ভাবিয়া আমায় প্রেমিকার অহঙ্কার করিছি প্রচার । তুমিই আমার তৃপ্তি, আনন্দ, বিষাদ, আশা-নিরাশার স্বপ্ন, বিপদ সম্পদ, ব্যাধি, শান্তি, পাপপুণ্য, শশাকে হর্ষোচ্ছাস! তব তৃপ্তি বাঞ্ছা করা--সে কেবল শুধু নিজেরি মঙ্গল ভিক্ষা-আর কিছু নয় ! এযে শুধু স্বার্থোচ্ছাস শুন দয়াময় । ভালবাসিব স্বামীরে--তাহে কি গরব । প্রকৃতির নীতি এই বিধির বিধান ক্ষুধা পেলে খায় প্রাণী শরীর পুষ্টায়, পতি প্রতি একাগ্রতা আপনি জন্মায় !
দশানন- সীতার প্রতি। [ লঙ্কাধিপতি ত্ৰিভূবন বিজয়ী দশানন জানকীকে হরণ করিয়া আনিলে, তাঁহাকে স্বপ্রতি নিতান্ত বিরক্তা জানিয়া নিম্নলিখিত পত্রিকাখানি অশােকবনে তৎসমীপে প্রেরণ করিয়াছিলেন।] কেন সীতে সুকেশিনি বিষাদ মগনা? চিন্তা জরে ক্ষীণ তনু কেন দিন দিন ? কেন লীন মসী-মাঝে কনক বরণ? জান ও কে তােমা হেথা আনিল হরিয়া অপার গভীর সিন্ধু করিয়া লঘন ? যবে মম পুষ্প’রথ-পুষ্প গুচ্ছ যাহে ঝলে উল্কা জ্যোতিঃ যেন—আভায় উজলি দশ দিশি পশি দূর অন্তরিক্ষ পথে চলিল উড়িয়া, গভীর জলদ মন্দ্রে কাপাইয়া ধরাতল মহাব্যোম পথ- চিনেছিলে স্বর্ণ সীতে, সেকালে আমায় ? বুঝেছিলে কেবা সেই গরুড় বিক্রম। কার হেন দুর্নিবার তেজঃ ভয়ঙ্কর। গুন সীতে । যে তােমায় করিল হরণ, == দেশানন। নহে সে মাটীর কীট দুর্বল মানব, নহে সে দানব যক্ষ গন্ধৰ্ব্ব কিন্নর, নহে সে দেবতা,কিন্তু আদিতেয় হতে, বীৰ্য্যবান দ্যুতিমান-অজর অজেয় ! প্রচণ্ড প্রতাপে যার জ্বলন্ত মার্তণ্ড লুকায় মেঘের আড়ে বিশ্বদহ তেজঃ, দুর্নিবার বেগে যার ভীম প্রভঞ্জন পালায় অম্বুর পথে, বিজয় হুঙ্কারে জলদে দম্ভোলিধ্বান গুরু গুরু কাপে, কুলিশী আশ্রয় লয় ভবেশের পাশে ; লাে ৰৈদেহি! আমি সেই লঙ্কার রাবণ ! হেলায় হৃভঙ্গে যার কম্পে ত্রিভুবন, দেব দর্পহারী আমি দম্ভী দশানন। ত্রাসে যার রিপুকুল শঙ্কিত সদাই, কৃতান্তের অন্তকারী আমি সুলােচনে। বীর বটে ভর্তা তব দেবর লক্ষণ ভাঙ্গিয়া ভার্গব ধনু লভিল তােমায়, তা বলে দশাস্য সাথে তুলনা তাদের। দ্যুতিমান বলে’ ওই ক্ষুদ্র খদ্যোতিকা হবে কি ব্ৰহ্মাণ্ড ভাস ভাস্কর সমান! অজর অমর যেই বহ্নি বীৰ্য্যবান, দেবত দানব যার গায় জয় গান ১১৮ পত্রাবলী নিশ্বাসে উথলে যার পয়ােধি ফেনিল, প্রলাপ কি কহ সীতে,-লক্ষ্মণ শ্রীরাম সে কৰ্বর অধীশের তুল্য হবে খ্যাত? মাটীর ভঙ্গুর নর অল্পায়ু দুর্বল পশিবে সাম্রাজ্যে তার ধরি ধনুর্বাণ। পতঙ্গ উড়িয়া যাবে মাৰ্ত্ত মণ্ডলে? তন্বি, বৃথা ভাবনায় ক্ষীণ হয়ােনা আর। অম্বরে পদাঙ্ক অঙ্কি প্রভঞ্জন স্কন্ধে উত্তুঙ্গ নগ্রে তুণ্ডে পদাঘাত করি, লজিয়া জলধি নদী মরুভূ কানন, উড়েছিল যেই যান মৈনাকের মত, অয়ি সুলােচনে, কালি আমার আদেশে, ব্ৰহ্মাণ্ড বিহারী সেই সুন্দর স্যন্দন, বহিয়া তােমারে লঙ্কা করাবে দর্শন। তুলিয়া সুধাংশু মুখ—পৃথ্বীসুশােভিনী, রসান রঞ্জনে যেন-আয়ত নেত্রের, দৃষ্টি রাগে রঞ্জি মম সুবর্ণ লঙ্কায় রথ হতে দেখ সীতে, বৈভব আমার! ঘন অবসরে যথা পূর্ণিমার শশী, অলকার হৈম চুড়ে চান হাসি মুখে ! হেরিও-জলেশ পাশী রজকের বেশে, দশানন। সিন্ধুতীরে আছাড়িছে লঙ্কেশের বাস, পবন ব্যজনধারী, শশী ছত্রধর, বহি দীপ মালে করে শশাভিত নগরী। অধ্যাপক বৃহস্পতি, কুবের ভাণ্ডারী, সূৰ্য্য রক্ত পট্টবাসে আবৃত হইয়া মহেশে পূজেন সদা রাক্ষস কল্যাণে ; আপনি মহেন্দ্র চারি ঘন বর সাথে, শ্যাম শস্যে পূর্ণ করি রাখেন লঙ্কায় । সুখের এ রাজ্য মম--হেথায় জলদ ঢাকেনা শরত চন্দ্রে নির্মল গগনে, ত্রিলােক প্রফুল্লকারী উৎফুল্ল চন্দ্রিকা চকোরের সুধা আশা করেনা নিস্ফল, শীতল সমীর স্রোতে বাহিত পয়ােদ, অশনি অর্গল দিয়ে বর্ষা ধারা বাঁধি চাতকের মত্ত তৃষ্ণা করেন প্রখর, সরেরসে হিল্লোলিত ফুল্ল শত দল মধুপাত্র মুদি কভু মিগ্ধ মধু মাসে বিহবল ভ্রমরে হেথা রাখেনা অতৃপ্ত !-- কেন তবে মধুময়ী, তাদের ঈশ্বর, ভুঞ্জিবে বিরহ দুঃখ হেন প্রেমােদ্যানে। যেথা কোটী কল্পতরু সদ্য প্রস্ফুটিত, অনন্ত বাঞ্ছিত ফল লজে নরনারী, পত্রাবলী। অতৃপ্তির বাষ্প যেথা সুখের দর্পণে, কেহ না দেখিল-সবে পূর্ণ মনােরথ,- সীতে ? ঐশ্বর্যের কামনার একছত্র পতি, রাবণের বাঞ্ছা সেথা রহিবে অপূর্ণ? সুমুখি! তপের ফল করিবে নিস্ফল ? সুবর্ণ লঙ্কায় দুঃখ কলঙ্ক উঠাবে ? আনন্দ চন্দ্রিকা ময় লঙ্কার আকাশে অমার আঁধার আজি বিথারিবে তুমি ? যাহার সেবার তরে-ধরার সৌন্দৰ্য্য, স্বর্গের সুষমা রাশি—দেবতার ভােগ, ধাতার নিয়ােগে নিত্য শােভিছে লঙ্কায়, তাহার কামনা পূর্ণ হবেনা হবেনা ! এ হতে বিচিত্র কিছু আছে কি বৈদেহি ? আপনি মন্মথ যার চির আজ্ঞাবহ বাঞ্ছিত রমণী প্রাণে জাগান অনঙ্গ, সেকি তব শান্তি প্রাণে মম তরে হায়, তুলিতে তরঙ্গ আজি হ’ল অসমর্থ । মদির বসন্ত সুধু স্পর্শি একবার, সুধু একবার মৃদু কোমল চুম্বনে, নব সাজে নিখিলেরে করে পল্লবিত,-- মৃদুল চঞ্চল বাতে চূত মুকুলিকা দশানন। ১২১ নেচে ওঠে, হেসে ওঠে কুসুম কানন, শিহরে সুচারু বাসে লঙ্কা বিমােহিনী ; যেন-ষােড়শী সুন্দরী হেলে রূপের ঠমকে, মমােজ সন্তাপ তার কঁাচা স্বর্ণ মত তপ্ত তরলিত হয়ে হৃদয়ে উথলে ; কোথা কোন গূঢ় শাখে নিভৃতে কোকিলা, পঞ্চমে কুহরি ওঠে—সুখের বাসরে, যুবতীর উষ্ণ প্রেম যুবকের কাণে। অন্তঃবাহী কুহুতানে বিমুগ্ধা ধরণী চৌদিকে শিহরি উঠে, সরলা বালার উতলা অপাঙ্গ যেন তরুণ যােগীরে ব্যাকুল করিয়া তােলে! সে বসন্ত হায়, তােমার বরাঙ্গে শােভা নারিল ধরাতে? কর্পের ফুল ধনু ত্ৰিলােক দমন তােমার কোমল তেজ নারিল দমিতে ? পরাণে মধুর ভাব নারিল উঠাতে ? যাহার প্রতাপে মরু শুফ রসহীন, ফুল্ল শ্যামলতায় ক্ষণে হয় বিকশিত, পাষাণ (ও) সুদৃশ্য হয় ফুলের আলায়, সে তােমার কমকান্তি নারিল ফুটাতে ! বতির অপাঙ্গ পাতে ত্রিলােকের নারী, মদিরা বিহ্বল হয়, নন্দনের দেবী পত্রাবলী। দানবের (৩) হয় বশীভূত, মমতরে, তাহারও সাধনা সব হইল বিফল! সীতে? সূৰ্য্যকান্ত মণি তুমি হেরিতে কোমল। স্পর্শনে পাষাণ হ’তে কঠিন কঠোর। দেবকুলে শ্রেষ্ঠ বিষ্ণু, কৌস্তুতের কান্তি হইল উজ্জ্বলতর নারায়ণ কঠে, ত্রিভুবন পূর্ণ কৰি ফুটিয়াছে জ্যোতি তুমি সীমন্তিনী মণি শ্রেষ্ঠ মণি মত, মম কণ্ঠে ভূষা হয়ে রহ বরারােহে; বাড়িবে তােমার মান, জানিবে জাত; ত্রিভুবন বিমােহন সৌন্দর্য্য তােমার হইবে সার্থক তব মম ভােগ্য হলে! খনির আঁধারে মণি কিবা মূল তার। রাজশিরে জ্বলে রত্ন উজলি সংসার। সুধা দেবতার তরে হয়েছে সৃজিত, দুৰ্বল নরের, তাহে কিবা অধিকার সুধাংশু রূপিনী ধনি তােমায় নিরখি অগাধ প্রেমাময় এ সিন্ধু-হৃদষ্ম হইয়াছে উদ্বেলিত-উচ্ছলিত মােহে ! প্রােজ্জ্বল কাঞ্চন শােভা ত্যজি সুবদনি বিবর্ণ পিত্তল পানে কেন চাও আর ?
দশানন। স্বাহা তুমি বৈশ্বানর চরণে তােমার, ক্ষুদ্র দীপ শিখা পানে চেওনা চেওনা ! অপুৰ্ব্ব মাধুরীময় প্রেমােদ্যানে শুয়ে পারিজাত পুষ্প বাসে রসাও মানস! ছি ছি ছি ছি বসােনাক শিমূলের দলে! কি আর বলিব তােমা অয়ি সুমধ্যমে । মনে কর ভাগ্যবতি লঙ্কার রাবণ তব অনুগ্ৰহাকাঙ্ক্ষী, ইন্দ্রেরাে নিয়ন্তা তােমার চরণ পদ্মে লুটাইছে শির! প্রথম খণ্ড সমাপ্ত।
No text on this page.
লহরী। কাব্যগ্রন্থ। শ্ৰীঅবিনাশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রণীত। লহরী। অতি সুন্দর ছাপা, কাগজ সুন্দর, পুস্তক প্রায় ৩০০ পৃ মূল্য ১• মাত্র। প্রাপ্তব্য-সংস্কৃত প্রেস ডিপজিটরী ২০ নং কর্ণওয়ালিস্ স্ট্রীট শ্রীগুরুদাস চট্টোপাধ্যায় ২০১ নং কর্ণওয়ালিস্ স্ট্রীট, কলিকাতা। নব্যভারত; “এই কবিতা পুস্তক, লহরী, বীণাপাণি, সাগােেচ্ছাস,কুরুক্ষেত্র ও ইন্দু, এই পাঁচটী স্বতন্ত্র অংশে বিভক্ত। লেখক নানাছন্দে ইচ্ছাক্রমে লেখনী পরিচালনা করিতে পারেন। পুস্তকখানি কবিত্ব পূর্ণ। স্থানে স্থানে রচনা মধুর। কোথাও কোথাও ছন্দোভঙ্গ ও যতি পতন হই- আছে। লহরীর কবিতা পড়িয়া আমরা আনন্দিত হইলাম।” সাহিত্য-পরিষদ পত্রিকা ;- সান্যাল এণ্ড কোং কলিকাতা। অতি সুন্দর ছাপা, অতি সুন্দর কাগজ। লহরীর একটু নমুনা দেখাই সুধীরে উষার পূরব আকাশে ঝলকি চায়, মৃদুল মৃদুল পরিছে প্রকৃতি ললনা গায়। বিমল আলার দুলিতে লাগিল গগন গায়, চকিতে হাসিল জলধর দল উল্লাসে জগত ভাসিয়া যায়। এরূপ কবিতা সুন্দর। আমরা লহরীর উচ্ছাসে আনন্দ লাভ করিয়াছি। গ্রন্থকারের কবিত্ব আছে। ভাষায় তাহা প্রস্ফুটিত করি- বার ক্ষমতাও আছে। আমরা গ্রন্থখানির প্রশংসা করি । বিমল বদন, উজল বসন উজল অঞ্চল AMRITA BAZAR PATRICA.- Lahari :-is the title of a neatly printed poetical work *** published by Messrs. Sanyal & Co. of Calcutta. The book consists of five parts, vis-Lahari, Binapani, Sagarucchas, Kurukshetra, and Indu. * * * The author, though a beginner, seems to be a thoughtful man ; and, we hope his merits will soon be appreciated by the lovers of Bengali poetry. The first part of the work, from which the name of the book is derived, is a fine piece of out burst of the author's poetical mind. In the second the young poet has beautifully introduced the brilliant Stars.of the poetical world before the Goddess of Learning. In Sagar-ucchas, he has described, in a very sweet and mournful tone, the lamentations of the poor, the widows and the Bangavasa at the death of Pundit Iswar Chandra Vidyasagara. The 4th part Kurukshetra, is a scene from the great epic poem, the Mahabharat describing the last battle between the Kurus and the Pandavas which though it did not escape several defects, is the best production from the poet's pen. The indomitable will of Duryodhan, the unquenchable thirst for avenge in Aswathama and his firm determination in executing his dark and deep designs of putting the five children of the Pandavas to death, the fire and fierceness of Bhima and the amiable character of Bhanumati and her pathetic speech on the death of her Royal Lord, have been vividly and boldly described in this part of the work, and we hope they reflect great credit on the young and promising poet.
( যন্ত্রস্থ) পত্রাবলী। ৪। শ্ৰীঅবিনাশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রণীত। ইহাতে নিম্নলিখিত বিষয়গুলি সন্নিবেশিত হইয়াছে ;- শ্ৰীমতী রাধিকা—শ্রীকৃষ্ণের প্রতি। সুমিত্রা-লক্ষ্মণের মারবার মহিষী--মহারাজ যশােবত্তের জারিজা রাজকুমারী-রাজা রামসিংহের মুবারক-জেব উন্নিসার বব্ৰুবাহন-অর্জুনের অর্জুন-দ্রৌপদীর বউবেগম—আসফ উদ্দৌলার আসফ উদ্দৌলাবউবেগমের ঔরঙ্গজেব-শিক্ষকের ঐ~~-পুত্রের বন্দী রাজগণ-শ্রীকৃষ্ণের প্রতি। ১৩। মহারাণী গােলাপকুমারী—রাণী পূর্ণিমার প্রতি।
No text on this page.
No text on this page.
事
No text on this page.