Makardah Saraswat Library, Howrah
Ghritang Pibet Ed. 2nd
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
ঘৃতং পিবেৎ
(সানি ভিলা)
এ. না. বি.
রজন পাবলিশিং হাউস
২৫-২ মােহনবাগান রে।
কলিকাতা
[ এই গ্রন্থের যাবতীয় স্বত্ব গ্রন্থকার কর্তৃক রক্ষিত]
৭- ১
প্রথম সংস্করণ-পৌষ, ১৩৪৩
দ্বিতীয় সংস্করণ-অগ্রহায়ণ, ১৩৪৮
মূল্য এক টাকা
শনিরঞ্জন প্রেস
২২ মােহনবাগান রে, কলিকাতা হইতে
সৌরীন্দ্রনাথ দাস কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত
'২-৮১২১
ভূমিকা বালী ঙালী অনেক দিন হইল মরিয়া গিয়াছে। যদি বল—ইহা জানা কথা, তবে আরও কিছু স্বীকার করিতে হয়, এই ভৌতিক জাতিটাকে কবরস্থ করা আবশ্যক। আর যদি বল—ইহা সত্য নয় (ইহাই আশঙ্কা করিতেছিলাম ), তবে প্রায় সক্রেটিসের মত বলিতে হয় যে, ইহারা জানে না, ইহারা জানে না। আর কেনই বা স্বীকার করিবে ?—জীবনের সকল লক্ষণই তাে এই জাতির মধ্যে আছে ; চলা- ফেরা করে, কথা বলে ( বােধ হয় কিছু বেশিই ), কবিতা লেখে, মাসিক চালায়, ঘরে বসিয়া মুসােলিনী-হিটলারের বাপান্ত করে, পথে বাহির হইয়া পুলিসকে সম্রম করে, এমন কি সিনেমাও দেখে। কিন্তু বিপদ ততা ওইখানে। জীবন্ম তকে মৃত বলিয়া প্রমাণ করা বড় সহজ নয়। একটা উপমা দিলে সহজবােধ্য হইতে পারে একজন নিপুণ অসি- চালক এমন সূক্ষ্ম কৌশলে একটি লােকের মুণ্ডচ্ছেদ করিয়াছিল যে, মুণ্ডটি ধড়ের সঙ্গে লাগিয়াই রহিল ; দর্শকেরা বলিল, কই, লােকটা তাে মরে নাই, দিব্য অবিভক্ত রহিয়াছে। অসি-চালক তখন এক টিপ নস্য লােকটার নাকে দিল, হাঁচিতে গিয়া মুণ্ড খসিয়া মাটিতে পড়িল । সকলে তাহার জয়ধ্বনি করিয়া উঠিল । এ জাতিও তেমনই মরিয়া গিয়াছে, কিন্তু তবু জীবিতের মত দাড়াইয়া আছে । এখন দরকার ইহার নাকে এক টিপ নস্য। আমার সাহিত্য বাঙালীর নাকে সেই বহু প্রতীক্ষিত নস্য। কিন্তু এও কি সম্ভব ? যে জাতির মধ্যে এক শতাব্দীতে রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, বিদ্যাসাগর, মাইকেল, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ জন্মিয়াছেন, • সে জাতি কি মৃত? বাস্তবিক পক্ষে, ইহাদের সঙ্গে বাঙালীর বর্তমানের কোন সম্বন্ধ নাই, ইহারা বাঙালীর অতীতের শেষ গৌরবের চিহ্ন। আবার একটা উপমা দরকার। গলায় দড়ি-দিয়া-মরা মৃতদেহের গলার বন্ধন খুলিয়া দিলে দীর্ঘ একটা আর্তনাদ বাহির হইয়া আসে। সেই স্বর অনুধাবন করিয়া এ কথা বলা যায় না যে, লােকটা জীবিত। বাঙালী-জাতি একটা মৃতদেহ। পাশ্চাত্য প্রভাবে তাহার জীবনে মুক্তি আসিয়াছে, এ কথা যখন আমরা বলি, সে মুক্তি আর কিছু নয়, তাহার গলার বন্ধনমুক্তি। বন্ধনমুক্ত সেই মৃতদেহ শেষবার সুগভীর আর্তনাদ করিয়া উঠিয়াছে, রামকৃষ্ণ হইতে রবীন্দ্রনাথ সেই মৃতের আৰ্তম্বর। ইহারা বাঙালী-কণ্ঠের ‘পথুমাস ভয়েস। অতএব ইহাতে বাঙালীর আশ্বস্ত হইবার কোন কারণ নাই। বাংলা ভাষা আজ যে দিকেই তাকাই না কেন, নির্জীবতা ব্যতীত আর কোন চিহ্ন চোখে পড়ে না। স্বদেশী-আন্দোলনের সময়ে বাংলা দেশকে দ্বিধা করিয়া বাংলা ভাষাকে সংশয়িত করিবার চেষ্টা হইয়াছিল ; সে সময়েও বাঙালী যেটুকু প্রাণের পরিচয় দিয়াছিল, আজ আর তাহাও নাই। সময় হিসাবে কেবল ত্রিশ বৎসরের প্রভেদ। তবে সেদিন বাংলা ভাষার উপরে আঘাত করিবার চেষ্টা করিয়াছিল কর্তৃপক্ষ, আর আজ বাঙালী নিজেই তাহা করিতেছে। এবং সরকার যাহা পারে নাই, কুকীর্তিবিলাসী বাঙালী তাহাতে প্রায় সাফল্যলাভ করিয়াছে। এক শত ত্রিশ বৎসরের সাধনায় বাংলা গদ্যের একটি স্ট্যাণ্ডার্ড’ কাঠামাে সৃষ্ট হইয়াছে—পাঁচ কোটি বাঙালীর আত্মপ্রকাশের সাধারণ মুখপত্র।
ইহা বড় কম সফলতা নয়। এমন কি বহুকীৰ্ত্তিত, বহুনেতাবাঞ্ছিত ‘রাষ্ট্রভাখা হিন্দীও এ গৌরব করিতে পারে না। কিন্তু আধুনিক আত্মপ্রতিষ্ঠাবিলাসী বাঙালী ইতিমধ্যেই এই ভাষার গাত্রে তিনটি ফাটল ধরাইয়া দিয়াছে। অতি-অদূরভবিষ্যতে বাংলা ভাষা তিনটি উপভাষায় পরিণত হইবে,—(ক) পূর্ববঙ্গের ভাষা, (খ) মুসলমানী ভাষা, এবং (গ) কলিকাতা অঞ্চলের ভাষা। তখন বাঙালীর ছেলেকে অভিধান ও ব্যাকরণ সাহায্যে মাইকেল, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথের রচনা পড়িতে হইবে। রেডিও বাঙালীর ইন্দ্রিয়গ্রামকে নষ্ট করিবার সরকারী ও বে-সরকারী চেষ্টা প্রতিদিন চলিতেছে। রেডিওর ব্যঙ্গস্বর, সকালে বিকালে ও সন্ধ্যায় বাঙালীর কর্ণ মর্দন করিতেছে, কিন্তু মূর্খ বাঙালী আজীবন ইস্কুলের ছেলে, তাই এই কর্ণমর্দনকে সে শিক্ষার উপায় বলিয়া মনে করে। ইহাতে বাঙালী যাহা চায় (যাহা চাওয়া উচিত তাহা নয়), তাহাই ধ্বনিত হয়। বে-সরকারী প্রতিষ্ঠান হইলে বুঝিতাম, টাকার জন্য এরূপ হইতেছে। কিন্তু রেডিও সরকারী প্রতিষ্ঠান, ইহাকে ব্যবসায়ের অঙ্গ মনে করা উচিত নয়। তাহা হইলে তাে সরকারী কলেজগুলিও অচল হইয়া দাঁড়ায় । আসল কথা, সরকারের ইহাতে মন নাই এবং এই অমনােযােগের সুযােগ লইয়া মূর্খ, অকর্মণ্য, অন্যথা-বেকার এক দল লােক আর্টিস্ট বলিয়া পরিচয় দিয়া বাঙালীর কর্ণধার হইয়া বসিয়াছে। একমাত্র মনােরঞ্জনই যদি রেডিও-কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হয়, তবে ‘মিশরকুমারী’, ‘রেশমী রুমাল’, ‘আলিবাবা’তেই বা আসিয়া থামিয়া গেলে চলিবে কেন ? বিদ্যাসুন্দর, গােপাল উড়ের যাত্রা, ঝুমুর গান, কবির লড়াই ও যৌন-বিদ্যা কেন বাদ পড়িবে ? বাঙালী যে এসব ভালবাসে না, এমন তাে নহে। সিনেমা রেডিওতে যদি বাঙালীর কান নষ্ট করে, সিনেমাতে করিতেছে কান ও চোখ। বাঙালীর শিল্প-জগং গুণহীনের গুণপনার স্থান। যাহার অন্য কোন গুণ নাই, সে হইল সিনেমা-আর্টিস্ট। আগে বাড়ির যে ছেলের অন্য কিছু হইত না, সে টোলে যাইত, নৃতুবা হােমিওপ্যাথি পড়িত, কিংবা ইঞ্জিনীয়ার হইত অর্থাৎ নলকূপ খনন করিত, ইহারই অতি-আধুনিক রূপান্তর সিনেমা-আর্টিস্ট । ‘আমি সিনেমা-আর্টিস্ট’ বলিলেই বুঝিতে হইবে, আমার অন্য কোন গুণ নাই। এখন এই- জাতীয় লােক বাঙালীর মধ্যে শিক্ষা ( সিনেমাও শিক্ষা !) প্রচার করিতেছে। একেবারে অসম্ভব নয়, কারণ শিক্ষাও যে তিন প্রকার, শিক্ষা, অশিক্ষা,ও কুশিক্ষা। সিনেমার সঙ্গে সঙ্গে একটা সিনেমা-সাহিত্য গড়িয়া উঠিয়াছে। তাহার শব্দ বাংলা বটে, অর্থ বােধগম্য নয়, অন্তত সিনেমা-জগতের বাহিরে—“মুক্তি প্রতীক্ষায়” “অবদান”। বন্যার প্রবল বেগে সাঁকো ভাঙিয়া গেলে মাঝে মাঝে যেমন থাম ও ভগ্ন-চিহ্ন থাকে—ফাকটুকু অনুমানযােগ্য, তেমনই সিনেমা-সাহিত্যের ভাষাতে ভাষা অল্পই, অধিকাংশই ড্যাশ, ফুটকি, কমা, সেমিকোলন ইত্যাদি। বাংলা সিনেমার একমাত্র উদ্দেশ্য, অর্থ এবং তাহার একমাত্র উপায় যৌনতত্ত্ব প্রচার এবং তাহাও বিলাতীর ব্যর্থ অনুকরণ। বাংলা নূতন ১/০ ফিল্ম না দেখিয়াও বলা চলে, তাহাতে কি কি আছে,বারাঙ্গনা, গজল, গাড়ােয়ানের গান, মাঝির গান, কীর্তন, ভাটিয়ালি গান, অন্ধ গায়কের দেহতত্ত্ব, মােটর-ভঙ্গ ও নারীনৃত্য। শরৎচন্দ্র আজকাল সিনেমা-জগতের চন্দ্র। বসুমতী' তাহার গ্রন্থাবলী ওজন-দরে প্রাপ্য করিয়া দিয়া বাঙালীর সমূহ ক্ষতি ও নিজের সমূহ লাভ করিয়াছে। সম্প্রতি সিনেমা ওয়ালারা তাহার রচনা সাড়ে চারি আনায় বিতরণ করিয়া এই ক্ষতিকে দেশব্যাপী করিয়া তুলিয়াছে । শরৎচন্দ্রের রচনার বিরুদ্ধে আমার ‘ইমরালিটি’র অভিযােগ নয়, কারণ উপসর্গটুকু ছাড়িয়া দিলে ‘ইমরাল’ ‘মরাল' হইতে পারে। তাহার রচনা ‘আমরাল’, জীবনের সঙ্গে তাহার কোন যােগ নাই। শরৎচন্দ্রের অধিকাংশ গ্রন্থে এমন একটা বাঙালী-জগৎ কল্পিত হইয়াছে, যাহা কোন কালেই বাংলা দেশ নহে। বিশ্বামিত্র যেমন বিশ্বনিয়মের বাহিরে গিয়া ব্যাসকাশী গড়িতে চেষ্টা করিয়াছিলেন, প্রবাদ আছে- সেখানে মরিলে গাধা হয়, তেমনই শরৎচন্দ্রের জগৎও সম্পূর্ণ কাল্পনিক । তবে সে জগৎ সম্বন্ধে এরকম কোন প্রবাদ নাই, কারণ ব্যাপারটা প্রবাদের চেয়ে সত্য। অস্তিত্বহীন বাঙালী জাতি বড় ক্রীড়ারসিক। ইহাতেই নাকি তাহার জাতীয়তা গড়িয়া উঠিবে । ওয়েলিংটন বলিয়াছিল, ইটনের খেলার মাঠেই নাকি ওয়াটালু যুদ্ধের জয় হইয়াছিল। কথাটা শুনিতে মন্দ নয়, কিন্তু ওয়েলিংটন সাহেব ওয়াটাল যুদ্ধের সরকারী ইতিহাস লিখিতে কেন অনুমতি দেয় নাই, তাহাও জিজ্ঞাস্য। ইটনের মাঠে •• অপাঠ্য, আর যাহা পাঠ্য, তাহা অভিনীত হইবার যােগ্য নয়। সমগ্র বাংলা দেশ যদি পৌরাণিক মহাপ্লাবনে ( হায়, পুরাণ যদি সত্য হইত ! ) ডুবিয়া যায়, আর একটি মাত্র রঙ্গমঞ্চ রক্ষা পায়, তবে সেখান হইতে বঙ্গদেশের সব (জগতের নয়, কারণ সমস্ত জগতে যত আছে, বাংলা দেশে তার অনেক বেশি। জ্যামিতির নিয়মের ব্যতিক্রম—অংশ সমগ্রের অপেক্ষা বড়) পাপের নমুনা সংগ্রহ করা যাইতে পারে। মূর্খতা, অজ্ঞতা, বিজ্ঞতার ভান, মিথ্যাভাষণ, চুরি, জুয়াচুরি, জাল, শঠতা, প্রবঞ্চনা, বিনা মাহিনায় লােক খাটাইবার রীতি, হত্যা, মদ্যাশক্তি ও তদনুরূপ কয়েকটি পাপকে ছাড়িয়া দিলাম ; রঙ্গমঞ্চের ব্যবস্থায় ওগুলি দোষের নয়। আমার তাে মনে হয়, রঙ্গমঞ্চে বসিয়াই পিনাল-কোডের ধারাগুলি বিধিবদ্ধ হইয়াছিল । রঙ্গমঞ্চের দুর্দশার প্রধান কারণ দুইটি ; বাংলা সাহিত্যে এ পর্যন্ত কোন প্রথম শ্রেণীর নাট্যকারের উদ্ভব হয় নাই ; কাব্যে যেমন রবীন্দ্রনাথ, উপন্যাসে যেমন বঙ্কিমচন্দ্র, নাট্য-সাহিত্যে তেমন কোন মহারথী নাই ; যাহারা আছেন, তাহারা নিতান্তই পদাতিক। যে নাট্য একাধারে শিক্ষা ও আনন্দ যােগাইতে পারে, সেই নাট্যই শ্রেষ্ঠ। এদেশে যে নাট্যকার জন্ম গ্রহণ করে নাই, তাহার কারণ আবার এই জাতির মধ্যেই নিহিত আছে। নাট্য বাস্তব-শিল্প ; এই বাস্তব-শিল্পের উদ্ভবের পক্ষে জাতির জীবনে বাস্তবতা অত্যাবশ্যক, বাঙালীর মত এমন অবাস্তব জাতি জগতে দ্বিতীয় নাই। দ্বিতীয়ত, এদেশে রঙ্গমঞ্চ গােড়া হইতেই বে-সরকারী প্রতিষ্ঠান। সরকার কখনও ইহার উপরে হস্তক্ষেপ করে নাই (কোন কোন নাটক বন্ধ করিয়া দেওয়া ছাড়া)। সরকারী সাহায্য ও উৎসাহ ব্যতীত কোন জাতীয়, বিশেষ এ-জাতীয় প্রতিষ্ঠান, গড়িয়া উঠা অসম্ভব।
শিক্ষা-প্রচারের ভার যদি সরকার গ্রহণ না করিত, তবে আজ কি দশা হইত! ( গ্রহণ করিয়াও বিশেষ আশাপ্রদ নয়।) এদেশে ব্যবসা- বাণিজ্য, শিল্প সরকারী সাহায্য হইতে একপ্রকার বঞ্চিত, তাই তাহাদের দুর্দশার অন্ত নাই। ইউরােপের সকল সভ্য দেশেই নাট্যশিল্পকে সরকার উৎসাহ ও সাহায্য প্রদান করে ( অবশ্য পরাধীন দেশে ইউরােপের নিয়ম অনুসরণ কেন করিতে হইবে ?), কারণ জাতির আত্মপ্রকাশের কোন পন্থাকেই তাহারা হীন মনে করে না। রেডিও যদি সরকারী প্রতিষ্ঠান হইতে পারে, শিক্ষার যদি সরকারী প্রতিষ্ঠান থাকিতে পারে, শিল্পশিক্ষার, কৃষিশিক্ষার চিকিৎসাশিক্ষার যদি সরকারী প্রতিষ্ঠান থাকিতে পারে, নাটকের কেন থাকিবে না? বে-সরকারী রঙ্গমঞ্চ থাকে থাকুক, সরকারী সাহায্যে, উৎসাহে, নিয়মাধীনে একটি জাতীয় নাট্যশালা একান্ত আবশ্যক। বঙ্গীয় আইন-সভার সদস্যদের, অত্মিচিন্তা করিয়া যেটুকু সময় থাকে, তাহা এদিকে দেওয়া একান্ত কর্তব্য। যে সমস্ত উপায়ে একটা জাতি উন্নত হয়, দুর্ভাগ্যক্রমে সেই সবগুলিই বাঙালীর কালস্বরূপ হইয়াছে। বাঙালী-অভিমন্যুকে সিনেমা, রেডিও, সংবাদপত্র, খেলা, সাহিত্য, থিয়েটার সপ্তরথীর মত ঘিরিয়া ধরিয়াছে--- ইহার রক্ষার আর কোন উপায় নাই। সাহিত্যিক থার্মোপলি এই ৩ জাতির সব কিছুই অস্বাভাবিক। প্রশংসা করিলে এ রাগ করে ; গাল দিলে খুশি হয় ; খারাপ জিনিস এখানে পড়িতে পায় না ; ভাল জিনিস অচল। আমার একখানি গ্রন্থের ভূমিকায় লিখিয়াছিলাম —“অধিকাংশ পাঠক মূখ।” অনবধানতাবশত একটুখানি রন্ধ, ॥y০ রাখিয়াছিলাম—অধিকাংশ মূখ হইলে কিয়দংশ জ্ঞানী, সেই কিয়দংশের সঙ্কীর্ণ বন্ধ পথে বাঙালী পাঠক হৈ-হৈ শব্দে ঢুকিয়া পড়িল। যে পড়িল, সেই নিজেকে কিয়দংশের দলে ভাবিয়া বিজ্ঞের মত ঘাড় নাড়িল ; অনবধানতার সামান্য রন্ধে একটা গােটা জাতি যে এমন করিয়া ঢুকিয়া পড়ে, থার্মোপলির পরে আর তাহা দেখি নাই। লােকে ক্রমশ বিজ্ঞতর হয় ; সুতরাং এবার বলিতেছি—বাঙালী, তুমি জাতি হিসাবে মূখ, মৃত, মূঢ়, ভণ্ড, অলস, অকর্মণ্য। বঙ্গদেশের স্কন্ধ হইতে এই প্রেতাত্মাটা নামিয়া যাক, দেশে আবার শান্তি আসুক। এই দেশব্যাপী শ্মশানের স্মৃতিস্তম্ভে খােদিত হইয়া থাক—“এখানে বাঙালী জাতির অস্থি নিহিত। সাবধান, এ মাটি কেহ খনন করিও না ; এ জাতির হাড়ে হাড়ে ভেল্কি ; ইহার হাড়কেও বিশ্বাস নাই।” বাংলার বাহিরে বাঙালী তবে বাঙালীর সভ্যতা (!) একেবারে বিনষ্ট হইবে না। গ্রীস দেশে সভ্যতা বিনষ্ট হইয়া গেলেও যেমন তাহা অন্যত্র সঞ্জীবিত ছিল, তেমনই বাংলার সভ্যতা বাংলার বাহিরে বাঁচিয়া থাকিবে। কাজেই বাঙালীর আশা এখন বাংলার উপরে নয়, বাংলার বাহিরে বাঙালীর উপরে। বাংলার বাহিরে অন্যান্য জাতির সঞ্জীবনী আবহাওয়ায় বাঙালী এমন সর্বতােভাবে পচিয়া উঠিতে পারিবে না—অন্য জাতির স্পর্শ তাহার উপর রসায়নের ক্রিয়া করিবে ।
. • ভূমিকার প্রয়ােজন কি ? এখন কথা উঠিতে পারে, নাটক লিখিতে গিয়া এসব কথা বলিবার সার্থকতা কোথায়? আমি যদি তােমার নাকে ঘুষি মারিতে চাই, তুমি কি নাক বাড়াইয়া দিবে? নিতান্ত নির্বোধ না হইলে দিবে না। কিন্তু ঘুষি-মারা আমার আবশ্যক, কাজেই নাটকের নাম করিয়া ডাকিয়া আনিয়া ভূমিকার এই অতর্কিত ঘুষি। উত্তরটা তােমার ভাল লাগিল না; কিন্তু ঘুষিটা আরও খারাপ লাগিবে। এই রকম একটা অতর্কিত আঘাত ব্যতীত এ জড়পিণ্ডে প্রাণ সঞ্চারিত হইবে না। ধর—এই সব কথা যদি আমি বলতে চাই, বলিবার অবকাশ কোথায় ? রেডিও, সিনেমা, সংবাদপত্র, মাসিকপত্র, সাহিত্য, থিয়েটার সমস্ত চৌরমৈত্রীতে বদ্ধ ; কাজেই বাধ্য হইয়া নিজের আশ্রয় গ্রহণ করিতে হইল। এ বই পড়িতে বসিলে ভুলিয়াও দুই চারিটা কথা চোখে পড়িবে । অবশ্য ছুরি দিয়া পাতাগুলি কাটিয়া ফেলিতে পার, কিন্তু যেখানে মানুষ নিজের গলায় ছুরি দেয়, সেখানে পরের লেখা কাটিবে, ইহাতে বিস্ময়ের কি আছে ? দ্বিতীয়ত, জীবন ও জগৎ সম্বন্ধে আমার নৃতন নৃতন মত আছে, তাহা বুঝাইয়া না দিলে বুঝিবার উপায় নাই। সত্য কথা বলিতে কি বার্নার্ড শ ও আমি বিধাতার দুইটি মূর্তিমান ভূমিকা। বিধাতা-পুরুষ বিশ্ব সৃষ্টি করিয়া বুঝিতে পারিলেন, কিঞ্চিৎ ব্যাখ্যা ব্যতীত ইহা দুর্বোধ্য ; তাই তিনি জি. বি. এস. ও প্র. না. বি. নামধেয় দুই ভূমিকাপন্থী লেখককে সৃষ্টি করিয়াছেন। ইহাদের রচনা বিশ্ব গ্রন্থের পাদটীকা, উপসংহার, শুদ্ধিপত্র ও ভূমিকারূপে চিরকাল ( মানুষ-জাতি ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত) বিরাজ করিবে। এই দুইজনের নাটক ইহাদের মতামতের উদাহরণ- স্বরূপ—ভূমিকা বুঝিলে নাটক পড়িবার প্রয়ােজন নাই ; আর যদি ভূমিকা না বুঝিতে পার, নাটক পড়িও না, কিছুই বুঝিতে পারিবে না। ভারতীয় বিবাহ —ঘৃতং পিবেং’ বিবাহতত্ত্ব বিষয়ক একখানি অপ-রােমান্টিক নাটক। বিবাহতত্ত্বকে নানা দিক হইতে এই নাটকে যাচাই করিয়া দেখা হইয়াছে। আজকাল বিবাহ যে একটা প্রকাণ্ড সমস্যা হইয়া দাড়াইয়াছে, তাহার মূলে আছে শিথিল চিন্তা। দুইটি ভিন্ন-গােত্র ভাবকে আমরা এক করিয়া ফেলিয়া বিপদের সৃষ্টি করিয়াছি। বৈবাহিক প্রেম ও রােমান্টিক প্রেম এক পদার্থ নহে। এই রােমান্টিক প্রেমের নিকটতম বাংলা প্রতিশব্দ ‘পূৰ্ব্বরাগ। সত্য কথা বলিতে কি, ভারতীয় বিবাহের মত রােমান্টিক বিবাহ- প্রথা জগতে অল্পই আছে। ইউরােপীয় বিবাহে, প্রেম আগে পরে বিবাহ—ইহাকে বলা চলে প্ৰেমান্ত বিবাহ ; আর ভারতীয় বিবাহে, বিবাহ আগে পরে প্রেম—ইহার নাম বিবাহান্ত প্রেম। যাহাকে কোন দিন জানি না, শুনি না, চিনি না, দেখি নাই, একদিন তাহাকেই বরণ করিয়া লওয়ার মধ্যে ‘স্টে ঞ্জনেস’ আছে—ইহাই রােমান্সের প্রাণ। কিন্তু এদেশের সামাজিক ব্যবস্থাকর্তারা বুঝিয়াছিল যে, পূৰ্ব্বরাগ ও বৈবাহিক প্রেম এক জিনিস নয়, হইতে পারে না, হওয়া উচিত নয়। আমাদের কাব্যে পূৰ্বরাগ আছে, জীবনেও আছে, কিন্তু বিবাহের সহিত তাহাকে মিছামিছি জড়াইয়া ফেলা হয় নাই। কিন্তু তাই বলিয়া ভারতবর্ষে যে বিবাহের এক্সপেরিমেন্ট হয় নাই, তাহা নয়। এদেশের ৩ সভ্যতা ও সমাজ যখন পূর্ণ রূপ গ্রহণ করে নাই—জাতি-মিশ্রণ ঘটিতেছিল, তখন ভারতবর্ষীয় বিবাহে উদারতা ছিল। কিন্তু তখনও পূৰ্ব্বরাগকে বিবাহের সহিত মিশাইয়া ফেলা হয় নাই, তাহাকে পূৰ্ব্বরাগ নাম দিয়া বিশেষভাবে স্বতন্ত্র করিয়া রাখা হইয়াছিল। ভারতীয় বিবাহের ওকালতি করা আমার উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু যে ইউরােপীয় বিবাহের দোহাই আমরা সৰ্ব্বদা পাড়ি, তাহারও ‘এক্সপেরিমেন্ট’ চলিতেছে । একটি পরীক্ষা হইতে অপরটিকে ভাল মনে করিবার কি কারণ থাকিতে পারে? বিশেষ যখন সেদেশের লােকের মধ্যেও এ সম্বন্ধে মতদ্বৈধ আছে, জীবনেও অশান্তির অভাব নাই। যদি ভারতীয় বিবাহকে ভ্রান্ত মনে করি, তবে মনে রাখা উচিত, ইউরােপীয় বিবাহও সমান ভ্রান্ত। আসল কথা, নিয়ম করিয়া সমস্যার সমাধান করা যায়—মানুষ এমন অ-জটিল জীব নয়। মানুষ যদি, ব্যক্তিহিসাবে মাত্র নয়, জাতি- হিসাবে উন্নত না হয়, তবে ইহার মুক্তি নাই, শান্তি নাই, কোন সমাধান নাই। বিবাহচ্ছেদের দ্বারা যে সমাধান, তাহা এতই খণ্ড, ক্ষুদ্র ও বালকোচিত যে, তাহাকে নিয়ম বলা চলে না, তাহা ব্যক্তিগত বিধান মাত্র। কোন একটা অঙ্গে ব্যাধি হইলে তাহাকে ছেদ করিয়া ফেলিবার রীতি আছে, কিন্তু এ রীতি বারংবার চালানাে যায় মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এত অধিক নয় ; ব্যাধির প্রতিকার কর্তব্য। বিবাহচ্ছেদের মূলে কোন তত্ত্ব নাই, ইহা রুচি মাত্র। আবার ইহার পন্থাও যে খুব দুরূহ তাহা নয়,—হয় মদ, নয় ব্যভিচার। স্বভাবতই লােকের ঝোক ওই দিকে ; পরিত্যাজ্য বিবাহ-বন্ধন হইতে মুক্তিলাভের জন্য যে মানুষে ও দুইটির একতরের ( অনেক ক্ষেত্রে উভয়ের) সাহায্য লইবে, তাহাতে আর বিস্ময়ের কি আছে ? আমরা বৈজ্ঞানিক যুগের লােক কিনা, তাই ৭০ অতিপ্রাকৃত ব্যাপারকে হাসিয়া উড়াইয়া দিই। কিন্তু বিবাহচ্ছেদের মুক্তিলাভের এই উপায় অপেক্ষা পুরাকালের অগ্নিপরীক্ষা কেন অধিক হাস্যকর, তাহা বুঝিয়া পাই না। আমার তাে মনে হয়, বিবাহ- চ্ছেদ থাকুক, কিন্তু তাহার উপায়ের পরিবর্তন হােক। মদ ও ভিচারও থাকুক। ধরা যাক, নিয়ম হইল—বিবাহচ্ছেদ করিতে হইলে প্রমাণ করিতে হইবে যে, প্রার্থী এক মাস মদ স্পর্শ করে নাই বা পনরাে দিনের মধ্যে ব্যভিচার করে নাই, তবেই বুঝিব যে প্রার্থিত বিষয়ের জন্য তাহার আগ্রহ আছে। তখন প্রার্থনা মঞ্জুর হইবে। রেল-স্টেশনে ‘পকেট-মার হইতে সাবধান হউন’ বলিয়া পকেট-মারার যে রঙিন চিত্র দেওয়া হয়, তাহা মুগ্ধভাবে দেখিতে গিয়া যে কতজনের পকেট মারা গিয়াছে, তাহার হিসাব কে রাখে ? বিশেষ ঐ সচিত্র ‘পকেট-মারা’ দেখিয়া নিরীহেরা সুদ্ধ পকেট মারিতে শেখে ; সেই রকম বিবাহচ্ছেদের সরল পন্থা দুইটি থাকায় লােকে মদ্যপান ও ব্যভিচার করিতে প্রলুব্ধ হইতেছে, বিবাহচ্ছে তাে বাড়িয়া যাইবেই। ইহা ‘পিউরিটান’দের যুগ আসলে এ যুগটা পিউরিটান'দের যুগ। বিবাহ করিয়াই ছেদন করিবার নামান্তর—বিবাহ না করিবার ইচ্ছা। ইউরােপীয় মধ্যযুগকে আমরা কৃচ্ছ সাধনের যুগ বলি ; তখন জীবনধারণের নিয়মগুলি কত কঠোর ছিল। কিন্তু ঐ কঠোরতার প্রাচীর অত উচ্চ করিয়া গাঁথা হইয়াছিল, তাহা হইতেই ইহাই কি প্রমাণ হয় না যে, তৎকালে ভােগের জোয়ারের জল অত দূর পর্যন্ত উঠিয়াছিল ! না হইলে কঠোরতার কোন্ প্রয়ােজন ছিল? আর আজ মানুষের মন ভিতরে বাহিরে শুষ্ক .. - হইয়া গিয়াছে বলিয়াই না এত আয়ােজন! মুসােলিনী বিবাহ করিবার জন্য ঘুষকে উপহারের রঙিন কাগজে মুড়িয়া দিতেছেন। হিটলার ঠেঙাইয়া বিবাহ দিতেছেন। রাশিয়াতে বিবাহের সব দ্বার মুক্ত, বাছারা বিবাহ করুক। এই ‘পিউরিটান’দের যুগে আনন্দকে আনন্দ বলিয়া দিলে কেহ গ্রহণ করিবে না; তাহাকে কর্তব্যের আবরণে মুড়িয়া দিতে হয়। সেইজন্য বার্নার্ড শ তপ্ত চিষ্টা হাতে করিয়া মানুষকে তাড়া করিয়া লইয়া চলিয়াছেন। কোথায় ? তিনশতাব্দী- ব্যাপী আদর্শ মানব-জীবনের দিকে। তিনি মানব-জীবনকে আনন্দের মনে করেন বলিয়াই দীর্ঘতর করিয়া কল্পনা করিয়াছেন। দিনের মধ্যে মরিয়া গেলে ইহার কিছুই উপভােগ করা হইল না। অর্থাৎ আমাদের সমস্যাটা জন্মনিয়ন্ত্রণ নহে, মৃত্যুনিয়ন্ত্রণ। এত অল্প- চিত্রপরিচয় প্রচ্ছদপটের চিত্রখানির বিষয় বার্নার্ড শ ও প্র, না, বি, । পৃথিবীসুদ্ধ লােক এখন অবশ্য স্বীকার করিয়াছে যে, বার্নার্ড শ ও প্র. না. বি. সমান। কিন্তু প্র. না. বি. নিজে অত্যন্ত বিনয়ী, তিনি নিজেকে বার্নার্ড শ'র সমান মনে করেন না—কিংবা কি ভাবে তিনি বার্নার্ড শ'র সমকক্ষ, চিত্রখানিতে তাহাই দেখানো হইয়াছে। পাঠকেরা মইখানি কাড়িয়া লইলে তখনই বােঝা যাইবে, সত্যই তিনি শ'র সমান, না ছােট। অবশ্য এমনও হইতে পারে, তিনি সমানও নন, ছােটও নন- অতএব বড়।
পাত্র-পরিচয়
সর্বেশ্বর সিংহ
নগেন্দ্রনাথ
ত্রিদিবনারায়ণ
বিজয়নারায়ণ
নীরজানাথ
কমরেড
পরীক্ষিৎ রায়
ধনী ও রায় বাহাদুর বলিয়া পরিচিত
ঐ সেক্রেটারি
মাকড়দ’র মহারাজকুমার বলিয়া পরিচিত
ঐ আত্মীয়
মালবিকার প্রণয়ী
পরিচয় নিপ্রয়ােজন
মধু
জগন্নাথ
পতিরাম
প্রমীরা
মালবিকা
কম্পাউণ্ডার
সর্বেশ্বরের পিতা
ত্রিদিবনারায়ণের পিতা
সর্বেশ্বরের কন্যা
ঐ সেক্রেটারি
নানা বিষয়ের শিক্ষক, বয়, ভৃত্য, চাওয়ালা, বাড়িওয়ালা,
পাওনাদারগণ ইত্যাদি
স্থান-বালিগঞ্জের সানি পার্ক ও কলিকাতার অন্যান্য অংশ
প্রথম অs প্রথম দৃশ্য বালিগঞ্জের সানি পার্কে সানি ভিলা নামে অট্টালিকা ; রায় বাহাদুর সর্বেশ্বর সিংহকে তাহার মালিক বলিয়া লােকে জানে। বড়লােক, আমিরী চাল ; সানি ভিলার সুসজ্জিত ডুয়িং-রূম ; একদিন সকালে সর্বেশ্বর ও তাহার সেক্রেটারি নগেন্দ্রনাথ কথাবার্তা বলিতেছে সৰ্বেশ্বর। আরে, তুমিও শেষে এমন ভাবে কথাবার্তা কইতে শুরু করলে, যেন সত্যিই আমি রায় বাহাদুর আর লাখপতি। নগেন্দ্র। দাদা, ঐখানে তােমার একটু কাচা রয়ে গেছে। পাকা আর্টিস্টের মত জীবনটাকে রঙ্গমঞ্চ ব'লে মনে কর না কেন ? সর্বেশ্বর। জীবনটা রঙ্গমঞ্চ ব'লেই তাে নেপথ্যের আবশ্যক। সেখানেও সাজপােশাক খুলে রেখে একটু বিশ্রাম করতে পাব না? নগেন্দ্র। উহু। জীবন-রঙ্গমঞ্চের বিপদ তােত ঐখানে। একবার যদি উইংস-এর আড়াল থেকে রাজার হাতের হুকো দেখা গেল, অমনই সব মাটি! জীবন-রঙ্গমঞ্চের নেপথ্য একেবারে মৃত্যুর পরে। সর্বেশ্বর। তার হােত অনেক দেরি। কিন্তু এদিকে যে আর হাতে এক মাস সময় । জানই ত, দু মাসের জন্যে এই সানি পার্কের সব- চেয়ে বড় বাড়িটা ভাড়া নিয়েছিলাম, ধার-ক'রে-আনা কয়েক হাজার টাকার জোরে। এ মাস ফুরলেই এ বাড়ি থেকে দূর করে দেবে, আবার হতে হবে পুনযিক।
ইতং পিবেৎ
নগেন্দ্র।
যেজন্যে এত আয়ােজন, তার অনেকটা তত সফল হয়েছ।
প্রমীরার জন্যে তাে অনেকগুলি বড়লােক জুটে গেছেন।
সর্বেশ্বর। হ্যা ভাই। তার মধ্যে মাকড়দ’র মহারাজকুমার ত্রিদিবেন্দু-
নারায়ণকে আমার খুব পছন্দ। যেমন চেহারা, তেমনই টাকা,
তেমনই স্বভাব।
নগেন্দ্র। তা দেখেছি, আমাদের সঙ্গে ধমক দিয়ে ছাড়া কথাই বলেন
। ওতেই বনেদী বংশ ধরা পড়ে।
সর্বেশ্বর। এখন বিয়েটা হয়ে গেলে হয় ।
নগেন্দ্র। ঠিক হয়ে যাবে। তিনি কি রকম আঁচ পেয়েছেন?
সর্বেশ্বর। আমার একমাত্র মেয়ে-জামাই পাবে সব। এই সানি পার্কের
বাড়িটা, দেশের জমিদারি, ব্যাঙ্কে গচ্ছিত লাখ টাকা।
নগেন্দ্র। সবই পাবেন, কোন ভয় নেই। বিয়েটা হয়ে যাক। বাবা,
একে বলে—হিন্দুবিবাহ, একেবারে কংক্রিটের গাঁথুনি ; ফেটে যাবে,
তবু ভাঙবার উপায় নেই।
এ না হলে আর ঋষিদের ত্রিকালজ্ঞ
বলে ! কিন্তু এখন একটু কাজ কর, মীরাকে বেশ করে একটু
কৃষ্টি দিয়ে দাও।
সর্বেশ্বর। ও, সেই নতুন বিলিতী সাবানটার কথা বলছ বুঝি ! ও
দু বেলা খুব মাখছে।
নগেন্দ্র। আরে না না, কৃষ্টি জান না? সংস্কৃতি বােঝ? চৰ্য্যা ?
মনঃপ্রকর্ষ ? কাচার?
সর্বেশ্বর। এগুলাে কি সব একই জিনিস ?
নগেন্দ্র। সব এক ; কেবল স্থানভেদে নাম ভিন্ন। যেমন ধর, বালিগঞ্জে
যার নাম—কৃষ্টি, শ্যামবাজারে তাকেই বলে—কাচার ; আবার
ঘৃতং পিবেৎ বিশ্ববিদ্যালয়ে যার নাম-সংস্কৃতি, সাহিত্য-পরিষদে তাকেই বলবে- চৰ্য্যা। বুঝলে তাে ? সর্বেশ্বর। প্রভেদটা বুঝলাম। কিন্তু আসল জিনিসটা তেমনই অবােধ্য রয়ে গেল। নগেন্দ্র। ওই যে তুমি প্রথমে সাবান বলেছিলে না, প্রায় তা-ই। ওর নাম কি একটু ইয়ে, মানে কি নাসত্যি কথা বলতে কি দাদা, কৃষ্টি যে ঠিক কি জিনিস তা কেউ জানে না, তবে যে কৃষ্টি পেয়েছে তাকে দেখলে বােঝা যায়। সৰ্বেশ্বর। কেমন করে? নগেন্দ্র। যখন পথে দেখি, আল্পস-ধূসর শাড়িগুলাে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে মেয়েদের কোমর পর্যন্ত উঠে একটা প্রান্ত কাধের ওপর দিয়ে পিঠের দিকে ঝুলে পড়ে আছে, আর সবসুদ্ধ, মেয়েটা একটা জীবন্ত ঘূর্ণির মত হু-হু করে চলে যাচ্ছে, তখন বুঝতে পারি—হ্যা, এ কৃষ্টি পেয়েছে বটে। আবার যখন দেখি, যুবকটি দু বগলে দুটি তরুণী নিয়ে যুগল-পক্ষভরে উড়ে চলেছে, অথচ মেয়ে দুটির প্রত্যেকের মুখেই একটা নিঃসপত্ন অধিকারের আনন্দ, তখন বুঝি—এরা বহুচৰ্য্যা প্রাপ্ত বটেন। এই কৃষ্টির প্রভাবে চাই কি মাকড়দ’র মহারাজকুমারের মন শেষ পর্যন্ত ঘুরে যেতে পারে। সর্বেশ্বর। এখন উপায়? নগেন্দ্র। মেয়েকে নানা বিদ্যা শেখাতে হবে। আমি খবর দিয়েছি, সবাই এল বলে। সর্বেশ্বর। কি কি শেখাতে হবে? নগেন্দ্র। নাচ, গান, বাজনা, বাংলা, ইংরেজী, ফ্রেঞ্চ, মনস্তত্ত্ব, ০ তাং পিবে অর্থনীতি, ইতিহাস, ভূতত্ত্ব, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, ভাষাতত্ত্ব, দর্শন, ধৰ্ম্মতত্ত্ব, প্রাণিতত্ত- সর্বেশ্বর। এত ! নগেন্দ্র। আরও আছে, দাদা। কৃষ্টি কি সহজ ! অনেক দুধ জ্বাল দিয়ে তবে ক্ষীরটুকু পাওয়া যায়। এতক্ষণে তারা সব এল বলে। আমি চললাম। প্রস্থান প্রমীরার প্রবেশ। বয়স বিশ-বাইশ ; মুখের সৌন্দর্য্যে যত্নের আতিশয্যের চিহ্ন ; খোপাটি জাপানী ধরনে সজ্জিত ; হাতে উল বুনিবার সরঞ্জাম প্রমীরা। বাবা! বাবা! সর্বেশ্বর। দেখ, এখন লােক নেই, বাবা বল। কিন্তু ভদ্রলােকদের সম্মুখে কি বলবে মনে আছে তাে? প্রমীরা। পাপা। সর্বেশ্বর। আর কি ? প্রমীরা। ড্যাড। সর্বেশ্বর। আর কি ? প্রমীরা। পা”। সর্বেশ্বর। বাংলায় বড় জোর কি বলতে পার ? প্রমীরা। বাপি। সৰ্বেশ্বর। এখন কি বলতে এসেছিলে ? প্রমীরা। কৰ্ত্তাদাদা কখন যে সব মাটি করে দেন। সর্বেশ্বর। আঃ, বাবাকে নিয়ে হয়েছে মুশকিল! কোন সিটুয়েন বুঝে কাজ করতে পারেন না। প্রমীরা। ময়লা কাপড়, একমুখ দাড়ি, ছেড়া চটি নিয়ে যখন তখন
ঘৃতং পিলে
“দিদি দিদি বলে আমার ড্রয়িং-রূমে এসে হাজির। লজ্জায় আমি
মারা যাই আর কি।
সৰ্বেশ্বর। কড়া করে বলে দাও না কেন?
প্রমীরা। কানে যে শুনতে পান না।
সর্বেশ্বর। তাতেই তাে রক্ষা। আচ্ছা করে ব’কে দেবে। আর
কেউ যদি জিজ্ঞেস করেন—লােকটা কে, বলবে—আমাদের পুরনাে
গােমস্তা। বুঝলে?
প্রমীরা।
সে তাে বলেছিলাম, না বুঝতে পেরে তিনি হাসতে
লাগলেন।
সর্বেশ্বর। কি বিপদেই পড়া গেছে ।
প্রমীরা। বয়!
দস্তুরমত পোশাকপরিহিত বয়-ভৃত্যের প্রবেশ
বয়। হুজুর !
প্রমীরা। সেক্রেটারিকো ইধার বােলাও।
বয়ের প্রস্থান
সৰ্বেশ্বর। বুঝলে মীরা, তােমাকে একটু কৃষ্টি শিখতে হবে ?
প্রমীরা। কৃষ্টি মানে কালচার তত? কিন্তু বাবা, ওকে কৃষ্টি ব’ল
। কাল আমি কৃষ্টি বলে আর একটু হলেই ঠ’কে গিয়েছিলাম।
এদিককার লােক ওকে বলে কাচার, নয় সংস্কৃতি। তিন বছর
আগে এদিকে কৃষ্টি বলত ?
সর্বেশ্বর। তা হবে, ভাগ্যিস শুনলাম। ওঁরা সব আসছেন।
প্রমীরার সেক্রেটারি মিস মালবিকার প্রবেশ । বয়স পঁচিশ হইতে ত্রিশের
মধ্যে। চুল বব করিয়া ছাঁটা; মুখে একটা কৃষ্ণ কোমলতার ভাব; হাতে
কয়েকখানা চিঠি
মালবিকা। গুড মর্নিং।
মৃতং পিবেৎ
প্রমীরা। মনিং। চিঠি কার ?
মালবিকা। মহারাজকুমার লিখেছেন, আজ আসবেন।
প্রমীরা। আর কে ?
মালবিকা। কমরেড মল্লিক।
সর্বেশ্বর। সেই হতভাগা লােকটা বুঝি ?
প্রমীরা। ও চিঠিখানা কার ?
মালবিকা। ওখানা কিছু নয়। ওটা আমার
প্রমীরা। [ স্মিত হাস্যে ] ওঃ, বুঝেছি।
সর্বেশ্বর। তােমরা যাও। শিক্ষকরা সব আসছেন। ওদের সঙ্গে
আমি একটু কথা বলে নিই।
প্রমীরা ও মালবিকার প্রস্থান
বয় প্লেটে করিয়া এক গােছ। ভিজিটিং কার্ড লইয়া আসিল
বাবু লােককো আনে বলল।
বয়ের প্রস্থান
নানাবিধ বিদ্যায় পারদশী এক দল শিক্ষকের প্রবেশ
গুড মর্নিং সাস।
সকলে। গুড মর্নিং।
সর্বেশ্বর। বসুন। তারপরে কথাবার্তা হবে।
সকলের উপবেশন
নৃত্যতত্ত্ববিদ। সানি পার্কের যােগ্য বটে আপনার মেজাজ !
বাড়িখানা-
সর্বেশ্বর। দীনেরই কুটীর।
নৃত্যতত্ত্ববিদ। কি বিনয় ! এত বড় প্রাসাদকে কুটীর বলা যে-সে
ললাকের কর্ম নয় ! আপনার কাচারের আর বাকি কি?
ঘৃতং পিবেৎ
আচ্ছা, কোন্ রকম নাচ আপনার পছন্দ—উদয়শঙ্করী, অজন্তা,
জয়ন্তী ?
সর্বেশ্বর। আচ্ছা, নাচটা কি না শিখলেই নয় ?
নৃত্যতত্ত্ববিদ। সর্বনাশ ! নাচ না শিখলে সানি পার্কে টিকতে
পারবেন?
সর্বেশ্বর। কেন?
নৃত্যতত্ত্ববিদ। এ অঞ্চলের লােকে হয় মােটরে চলে, নয় নেচে চলে,
হাঁটতে ভুলেই গিয়েছে। সবাই যখন নেচে চলছে, আপনি না
নাচলে পথে ঠোকাঠুকি লেগে যাবে।
সর্বেশ্বর। ওঃ, বুঝেছি।
নৃত্যতত্ত্ববিদ। বুঝবেনই তাে। সানি পার্কের সবচেয়ে বড় বাড়ি যখন
আপনার, কৃষ্টির ভিত্তিপত্তন তত আপনার পাকা রকম হয়েই
আছে।
সঙ্গীতজ্ঞ। অমনই ওই সঙ্গে সঙ্গীতটাও। আচ্ছা, ধ্রুপদ না খেয়াল,
গজল ? এই শুনুন নমুনা
তিন রকম নমুনা গাহিলেন
সর্বেশ্বর। তিনটেই তত ভাল। তবে আজকাল রেওয়াজ কোটার
বেশি ?
সঙ্গীতজ্ঞ। এই তত বড়লােকের মত কথা ! গজল, মশাই, গজল।
আজকাল জন্মােৎসব থেকে মৃত্যুৎসব পৰ্যন্ত কেবলই গজল চলছে।
বাদ্যকর। আরে সার, বাজনা ছাড়া নাচ-গানের কোন মূল্য আছে ?
ছােঃ! বাজনা হচ্ছে নাচ-গানের মেরুদণ্ডস্বরূপ। এই শুনুন না,
তেরে কেটে তাক—
তলার বােল কথন
মৃতং পিবেৎ
.
সর্বেশ্বর। কিন্তু তবলা কি আজকাল তেমন
বাদ্যকর। বলেন কি? আচ্ছা, তবলা না হয় বাঁশী, এসাজ, হার্মো-
নিয়াম, পিয়াননা, মন্দিরা, খােল, ঢােলক, একটা কিছুই চাই-ই।
সন্ধ্যাবেলা আপনার বাড়ি থেকে কোন একটা বাজনার শব্দ যদি
না শােনা যায়, তবে এ পাড়ায় আপনি একঘরে হয়ে পড়বেন।
হ্যা, আমি মশাই সত্যি কথা বলব।
সর্বেশ্বর। বলেন কি? তবে তাে আপনাকে ছাড়া হচ্ছে না।
অর্থনীতিবিদ। মশায়ের বার্নার্ড শ’র নাম শােনা আছে ?
সৰ্বেশ্বর। বিলক্ষণ। সেই যে ক্লাইভ স্ত্রীটের ওদিকে
অর্থনীতিবিদ। তিনি কি বলেছেন জানেন? অর্থনীতিই হচ্ছে এ
যুগের বাইবেল।
সর্বেশ্বর। হ্যা হ্যা, কথাটা পড়েছিলাম বটে।
অর্থনীতিবিদ। তবে আপনার কৃষ্টির তালিকায় ওটাকে বাদ দিচ্ছেন
কি করে?
সৰ্বেশ্বর। বাদ দিলে চলবে কেমন করে ?
অর্থনীতিবিদ। তবেই ধরুন, গ্রেশান্স
জানা চাই, ডিটি -
বিউশন অব ওয়েস্থ, ল অব পপুলেশন—এসব না জানলে জীবনই
বৃথা।
সর্বেশ্বর। যা বলেছেন।
মনস্তত্ত্ববিদ। কিন্তু মশাই, আধুনিক যুগে খ্রীষ্টকে বাদ দিয়ে বাইবেলকে
রাখবার কোন অর্থ হয় না। ফ্রয়েডকে বাদ দিচ্ছেন কেন?
সর্বেশ্বর। সাহেব এসেছেন নাকি ?
মনস্তত্ত্ববিদ। মনের সাকশাস অংশ সম্বন্ধে না জানলে পশুর মত
বেঁচে থেকে লাভ কি বলুন? সে সম্বন্ধে ফ্রয়েড কি বলেন, জানেন?
মৃতং পিবেৎ
সর্বেশ্বর। ছেলেবেলা অবশ্যই পড়েছিলাম।
মনস্তত্ত্ববিদ। অবশ্যই পড়েছেন। তবে একটু ঝালিয়ে নেওয়া চাই।
• অমনই যাভেলক এলিসকেও
সর্বেশ্বর। আজ্ঞে, বেশ।
নৃতত্ত্ববি। মশাই, অ্যারিস্টক্রেটিক সমাজে ঘােরাফেরা করেন, নৃতত্ত্ব
শিখুন, মানুষ চিনতে পারবেন, নইলে দু দিনে ঠ’কে ভূত হয়ে
যাবেন।
ভূতত্ত্ববিদ। ওসব বাজে জিনিস মশাই। যে মাটির ওপরে দাড়িয়ে
আছেন, সে সম্বন্ধে জ্ঞান যদি টনটনে না হয়, তবে পা পিছলে পড়তে
কতক্ষণ ! ভূতত্ত্ব জানা চাই মশাই।
সর্বেশ্বর। ওটার কি ইংরেজী নাম নেই?
ভূতত্ত্ববি। বিদ্যেটাই ইংরেজী, আর বলেন নাম নেই ! জিয়লজি,
মশাই, জিয়লজি। হিমালয় পাহাড় কেমন করে তৈরি হ’ল
জানেন ?
সর্বেশ্বর। আজ্ঞে না।
ভূতত্ত্ববিদ। আচ্ছা, বলুন তাে হিমালয় আর বিন্ধ্যপর্বতের মধ্যে
প্রাচীনতর কোন্টা?
সর্বেশ্বর। আজ্ঞে, তা তত জানি না।
জ্যোতিষী। না-ই জানলেন। কিন্তু যে আকাশের দিকে তাকিয়ে
পথ চলছেন, সে আকাশের বিষয় কিছু শিখে রাখুন। সিলেসচিয়াল
ইকোয়েটর কাকে বলে, জানেন?
সর্বেশ্বর। আজ্ঞে না।
জ্যোতিষী। তবে ?
সৰ্বেশ্বর। আজ্ঞে, এত বিদ্যা যে শেখবার আছে, তা তাে জানতাম না।
।
ঘৃত পিবেৎ দার্শনিক। সেইজন্যেই তাে আমি এসেছি। সর্বশাস্ত্রের দুধ শুকিয়ে ক্ষীর হচ্ছে দর্শনশাস্ত্র। এই শাস্ত্র শিখুন, আর কিছু দরকার হবে না। ধরুন—দ্বৈতবাদ, অদ্বৈতবাদ, দ্বৈতাদ্বৈতবাদ, বিশিষ্টা- দ্বৈতবাদ ; আর জীবাত্মা, পরমাত্মা, জগৎ এবং ব্ৰহ্ম, মােটামুটি এই কয়টি বিষয় সম্বন্ধে জ্ঞান হ'লেই হল। সর্বেশ্বর। তা তাে হ’ল। কিন্তু চব্বিশ ঘণ্টা সময়ের মধ্যে এত বিদ্যা শেখবার সুযােগ কোথায় ? পদার্থতত্ত্ববিদ। তবেই দেখুন, আইনস্টাইনকে স্মরণ না করে উপায় নেই। সময় জিনিসটা রিলেটিভ, বুঝেছেন ? সর্বেশ্বর। আজ্ঞে, বােঝবার দরকার কি, ব'লে যান। পদার্থতত্ত্ববিদ। না বুঝলেও ক্ষতি নেই। সােজা কথায় বলতে গেলে, সময়টা রবারের মত টানলে লম্বা হয়। ধরুন না, ঘুমের মধ্যে যে স্বপ্ন দেখছেন- মনস্তত্ত্ববিদ। দেখুন সার, ঘুরে ফিরে সেই ফ্রয়েডের থিওরিতে এসে পড়েছেন। বাবা! একে বলে—সাইকোলজি। বৈয়াকরণ । এতক্ষণ চুপ করে আছি। কিন্তু মশাই, আমি স্পষ্টবাদী লােক। আচ্ছা, বলুন তাে, তুদাদি, ভাদি, উনাদি কাকে বলে? সমাস, তদ্ধিৎ, কৃত এসবের মানে কি? সর্বেশ্বর। ওসব তত শুনি নি বৈয়াকরণ। তবেই দেখুন। ব্যাকরণ জানেন না, আর শিখতে যাচ্ছেন সাইকোলজি। এত দিন যে বেঁচে আছেন, এই-ই যথেষ্ট। ভাষাতাত্ত্বিক। মশাই, ভাষা কাকে বলে জানেন? সর্বেশ্বর। তা জানি বইকি। ভাষাতাত্ত্বিক। কিচ্ছু জানেন না, বলুন তাে, এপেথেসিস কাকে !
মৃতং পিবেৎ ১১ বলে ? মেটাথেসিস, কম্পেসেটরি লেংদেনিং? হাঁ করে রইলেন যে ! মশাই, এতদিন কি ক'রে অপঘাত মৃত্যু বাচিয়ে এসেছেন, তা ভগবানই জানেন! আচ্ছা, বলুন তােজ। সর্বেশ্বর। অ— ভাষাতাত্ত্বিক। হ’ল না, হ’ল না। সর্বেশ্বর। ভাষাতাত্ত্বিক। এই তত বর্ণমালার প্রথম বর্ণে ই ঠেকে গেলেন, এখনও তােত গােটা পঞ্চাশেক বাকি। বলুন অ ; মুখ অত ফাক নয় ; ঠোট আর একটু বাঁকুক অ ; অ ; উহু, হ’ল না। সর্বেশ্বর। অE; অE; ও-; অ-অ-অ- নৃত্যতত্ত্ববিদ। ঠিক, ব'সে ব'সে কিছু হবে না। নাচের গােটা দুই ধাপ শিখিয়ে যাই। আচ্ছা, ডান পা তুলুন। উহু, অত বেশি নয়। ভাষাতাত্ত্বিক। পা দিয়ে আপনি যা খুশি করুন, কিন্তু মুখে বলুন অ—; অঃ, আবার বিসর্গ দেন কেন ? সর্বেশ্বর। অঃ ; অ। মশাইরা বােধ হয় একটু ভুল করছেন। ভাষাতাত্ত্বিক। আপনার আস্পর্ধা তত কম নয় ! আমি করব ভুল- বুড়াে হলেন, তবু অ বলতে পারেন না। সর্বেশ্বর। আমি সে কথা বলছি না। ভাষাতাত্ত্বিক। সেই কথাই বলছেন। সর্বেশ্বর। এসব তত আমি শিখব না । ভাষাতাত্ত্বিক। তা শিখবেন কেন! বুড়াে বয়সে ধেই ধেই করে নাচুন গে । সর্বেশ্বর। নাচও আমি শিখব না। নৃত্যতত্ত্ববিদ। তা নাচবেন কেন? পথে ঠোকাঠুকি খেয়ে মরুন।
১২
ঘৃতং পিবেৎ
সর্বেশ্বর। আপনারা একটু শুনুন, এসব আমার মেয়ের জন্যে
কেহ কেহ। তবে এতক্ষণ তা বলেন নি কেন?
সৰ্বেশ্বর। বলবার আর অবসর দিলেন কই ? আপনারা সব চলুন,
ওই ঘরে দরদস্তুর মেটানাে যাক।
কেহ কেহ। তবু তাে এখনও ইতিহাস, ভূগােল, জ্যামিতি, ধর্মতত্ত্ব,
প্রাণিতত্ত্ব, ফ্রেঞ্চ, জামান বাকি রয়ে গেল।
সকলের প্রস্থান
অন্য দ্বার দিয়া কথা বলিতে বলিতে প্রমীরা ও মালবিকার প্রবেশ
প্রমীরা। আগ্রাতে—দশ বছর আগে ?
মালবিকা। হ্যা, আগ্রাতে, তা প্রায় দশ বছর হবে বইকি।
প্রমীরা। কিন্তু আগ্রাতে কেন ?
মালবিকা। আমরা প্রায় দু পুরুষ ধরে আগ্রার বাসিন্দা।
প্রমীরা। বুঝলাম। আর একটু খুলে বল। দেখ, লােকের সম্মুখে
তুই আমার সেক্রেটারি, আড়ালে আমার বন্ধু। সেখানেও
সেক্রেটারির মত গম্ভীর হয়ে থাকলে দমবন্ধ হয়ে মারা যাব ।
মালবিকা। তােমার মত বড়লােকের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব কি সম্ভব ?
আশা করি, এখন মহারাজকুমারের সঙ্গে তােমার বিয়েটা হয়ে যায়,
তা হলে যােগ্য ঘরে পড়। অযােগ্য পরিবারে বিয়ে হলে দুঃখের
অন্ত থাকে না।
প্রমীরা। তাের দুঃখ কি সেই দুঃখ নাকি?
মালবিকা। ঠিক তা নয়। তবে শােন। সংসারে ছিলেন শুধু বাবা।
আমি
তার
একমাত্র সন্তান। দিয়েছিলেন স্বাধীন শিক্ষা।
তারপর হঠাৎ কি হ’ল তার মতি, বিয়ে ঠিক করে বসলেন দিল্লীর
এক ভদ্রলােকের সঙ্গে। স্বাধীন বিবাহের সুযােগ খাটাবার
ঘৃতং পিবেৎ
মােটেই পেলাম না অবসর। বিয়ের রাত্রে দু চার ঘণ্টার জন্যে প্রথম
পেলাম তার দেখা-
প্রমীরা। বলিস কি। তার আগে দেখিস নি তাকে?
মালবিকা। না। বাসরঘরেই স্বাধীন বুদ্ধি বললে, এ কি করছ ?
জীবনে এল ধিক্কার। শেষরাত্রে গৃহত্যাগ করে পালিয়ে গেলাম
এলাহাবাদে। সেখানে যমুনার তীরে ফেলে রাখলাম স্যাণ্ডেল জোড়া
আর একখানা চিঠি। কাগজে খবর বের হ’ল, আমি ডুবে
আত্মহত্যা করেছি। তখন চলে এলাম কলকাতায়, কিছু দিন পরে
কাগজে সংবাদ দেখলাম, বাবা গেছেন হার্টফেল করে মারা।
প্রমীরা।
আর তাের স্বামী ?
মালবিকা। তার কোন খবর পাই নি। এখন তাকে দেখলেও নিশ্চয়
চিনতে পারব না—এমন নিশ্চিহ্নভাবে সে স্মৃতি মুছে গেছে।
প্রমীরা। তারপরে?
মালবিকা। তারপরে দুঃখের দীর্ঘ ইতিহাস। কলেজে পড়া শুরু
করলাম। আই. এ., বি. এ., এম. এ.। পথের মােড়ে মােড়ে
রত্নাকরের মত পুরুষের লুব্ধ দৃষ্টি। দেখলাম, একজনের অধীনতা
কাটাতে গিয়ে দশজনের কাছে অধীন হতে হচ্ছে। তারপরে
সেদিন থেকে তােমার সেক্রেটারি।
প্রমীরা। আচ্ছা, তাের এ ইতিহাস আর কেউ কি জানে ?
মালবিকা। কেউ না।
প্রমীরা। আবার তবে তুই বিয়ে কর না।
মালবিকা। সেও কি সম্ভব ?
প্রমীরা। অসম্ভব কি? মিঃ চৌধুরী তাে ফাকি নন।
১৪
স্বতং পিবেৎ
প্রমীরা।
মালবিকা। কে ? নীরজাবাবু? ধেৎ।
তবে আর সন্দেহ নেই।
মালবিকা। বুঝলি কিসে?
প্রমীরা। ওই ধেৎ শব্দে। মহারাজকুমার যখন আমাকে প্রােপােস
করলেন, আমি বলেছিলাম, ধেৎ।
মালবিকা। ইতিমধ্যেই প্রােপােসাল হয়ে গেছে নাকি?
প্রমীরা। তাের অনুমান কি হয় ?
বয় দুইখানি কার্ড লইয়া প্রবেশ করিল
কার কার্ড?
মালবিকা। মহারাজকুমার আর তার আত্মীয়।
আর একখানা? নীরজাবাবুর বুঝি ?
মালবিকা। সেজন্যে তােমার অসুবিধা হবে না। পাশের ঘরে তাকে
বসাব।
প্রমীরা। তা বটে, এখানে আনলে আবার তাের অসুবিধে।
মালবিকা। যাও, সাহেবদের নিয়ে এস।
বয়ের প্রস্থান
আমি চললাম।
মালবিকার প্রস্থান
সাহেব-বেশধারী মাকড়দ’র যুবরাজ ত্রিদিবনারায়ণ ও তাহার আত্মীয় বিজয়-
নারায়ণের প্রবেশ ও টুপি খুলিয়া অভিবাদন
উভয়ে। গুড মর্নিং।
প্রমীরা। মর্নিং। বসুন।
ত্রিদিব। উঃ, কি ওয়েদার !
স্বতং পিবেৎ
বিজয়। বাস্তবিক, ইংল্যাণ্ড ছাড়া এমন ওয়েদার আর দেখি নি, কি বল
ত্রিদিব ?
ত্রিদিব। দেখি নি বলতে পারি না। মনে আছে, জার্মানিতে
সেবার ?
বিজয়। কিন্তু তার আগের বারের কথা মনে কর তাে-সুইডেনের
কথা। হাউ হরিল !
ত্রিদিব । কিন্তু রাস্তার মত এমন হেলিশ ওয়েদার জীবনে দেখি নি।
প্রমীরা। আপনারা দেখছি সমস্ত ইউরােপ ঘুরেছেন।
বিজয়। ইউরােপ । কেন, ত্রিদিব তােমার মেক্সিকোর কথা মনে
নেই ?
ত্রিদিব। আঃ, সে কি নীল আকাশ আর সােনার নােদ! কোথায়
লাগে দক্ষিণ ফ্রান্স আর ইটালি ।
বিজয়। বুঝলেন মিস প্রমীরা, ত্রিদিব তােত রাশি রাশি কবিতা লিখে
ফেলেছিল।
প্রমীরা। উনি কি কবি ?
বিজয়। কবি বলে কবি! একেবারে যাকে বলে আভিজাত্যসম্পন্ন
কবি।
ত্রিদিব। আঃ, কি বল যে বিজয়! একটু চুপ কর না।
বিজয়। চুপ করব কেন? আচ্ছা ত্রিদিব, তােমার শক্তির একটু
পরিচয় দাও না। মিস প্রমীরার ভুরুর ওপরে দুটো লাইন কম্পােজ
কর না।
প্রমীরা। না না।
বিজয়। লজ্জিত হবেন না। ওর কোন কষ্ট হবে না। গাে অন
চ্যাপ, গাে অন।
স্বত পিবেৎ ত্রিদিব। কি মুশকিলেই ফেললে, লেট মি ট্রাই- যুগল ভুরুর আমি খুজে মরি মিল, আকাশের প্রান্তে যেন পাখা-মেলা চিল । বিজয়। ওয়াণ্ডারফুল ! প্রমীরা। কি সুন্দর কবিতা ! ত্রিদিব। কিন্তু তার চেয়ে আরও সুন্দর আপনার ভ্রুযুগল। প্রমীরা। কি যে বলেন ! ত্রিদিব। সত্যি কথা বলছি। বিজয়। ত্রিদিব, এবার ইংরেজীতে দু লাইন- প্রমীরা। ইংরেজীতেও আপনি লিখতে পারেন ? বিজয়। এর পরে ফেঞ্চ, জার্মান, ইটালিয়ান আছে, আপনি জানেন ও ভাষাগুলাে ? প্রমীরা। না। বিজয়। গাে অন ত্রিদিব। ত্রিদিব। On the life's ocean, shoreless and dark Rests thy eyebrows like Noah's Ark. বিজয়। একসেলেন্ট ! প্রমীরা। আপনারা পরিশ্রান্ত হয়েছেন, একটু বসুন। বিজয়। পরিশ্রান্ত ! বলেন কি? ত্রিদিব জন্মেছে মহাকাব্য লেখবার সামর্থ্য নিয়ে, দু চার লাইনে ওর কি হয় ! এমন সময়ে বৃদ্ধ জগন্নাথের মলিন বন্ত্রে, নগ্ন গাত্রে প্রবেশ। প্রমীরা হতবুদ্ধি, স্তম্ভিত। বৃদ্ধ কানে খাটো, চোখে কম দেখে জগন্নাথ। দিদি, দিদি।
ঘৃতং পিবেৎ
১৭
ত্রিদিব।
প্রমীরা। কি সর্বনাশ! দেখ জগন্নাথ, এখন তুমি যাও।
জগন্নাথ । কি বললে দিদি ? যাও? খিদে পেয়েছে, মুড়ি দাও।
প্রমীরা। [ স্বগত ] সর্বনাশ করলে, প্রেষ্টি গেল, মান গেল, বুঝি
কুমারও যায়। [ প্রকাশ্যে ] দেখ জগন্নাথ, ও ঘরে যাও।
এ লােকটি কে? আত্মীয় ?
প্রমীরা। কি যে বলেন ! বাড়ির বুড়াে গােমস্তা। সারাদিন ‘দিদি
দিদি করে অস্থির করে।
জগন্নাথ। দিদি, সবু কই? সে বেটা গেল কোথায় ?
প্রমীরা। [ স্বগত ] বুড়ােটা সব মাটি করলে, কি আপদ ! ভগবান !
জগন্নাথ। এরা আবার কে?
প্রমীরা। [ উচ্চৈঃস্বরে ] পা’, শীগগির এস। গােমস্তা বুড়াে কি
গণ্ডগােল করছে !
বিজয়। [ ত্রিদিবের প্রতি ] মার্ক ত্রিদিব, পা’! খাটি অ্যারিস্ট্যাট
হে !
দ্রুত সর্বেশ্বরের প্রবেশ
প্রমীরা। দেখ, বুড়াে কি করছে !
জগন্নাথ। এই যে সবু।
সৰ্বেশ্বর । কে তােমার সবু? বুড়ােকে বাহাত্তরে পেয়েছে ! পুরনাে
কর্মচারী ব’লে আর কত সহ করা যায় ।
জগন্নাথ । কে কর্মচারী ? বটে রে !
সৰ্বেশ্বর। মান্য অতিথিদের অপমান !
প্রমীরা। আপনারা মনে কিছু করবেন না। অনেক দিনকার কর্মচারী,
তাড়াতে পারি না, আবার আমরা ছাড়া ওকে সেবা করবারও
কেউ নেই।
স্বতং পিবেৎ
ত্রিদিব। পাগল নাকি?
প্রমীরা। বুড়াে বয়সে পাগলের মতই হয়েছে ।
জগন্নাথ। পাগল, কে পাগল? তােরা পাগল।
সর্বেশ্বর। দেখেছেন, পাগলকে ‘পাগল’ বললে চটে। নাঃ, এখানে আর
রাখা যায় না।
সর্বেশ্বর আড়কোলা করিয়া তাহাকে লইয়া চলিল, জগন্নাথ ঝটপট করিতে
লাগিল। পাছে বেফাস কিছু বলিয়া ফেলে, তাই প্রমীরা তাহার মুখ চাপিয়া
ধরিল
প্রমীরা। আপনারা একটু বসুন।
পিতা-পুত্রীর জগন্নাথকে লইয়া প্রস্থান
বিজয়। দেখেছ হে, কি রকম কোমল ওঁর হৃদয়! বাড়ির বুড়াে
গােমস্তার প্রতিও এমন দয়া ! এখন তােমার কপাল-জোর।
ত্রিদিব। বাস্তবিক, এমন দরদ দেখি নি ! অ্যান এঞ্জেল ! অ্যান এঞ্জেল।
বিজয়। ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল ।
উভয়ের প্রস্থান
দ্বিতীয় দৃশ্য
সানি পার্ক ; সানি রেষ্টুরেন্ট, অদূরে সৰ্বেশ্বরবাবুর বাড়ি সানি ভিলা দেখা যায়।
নীরজানাথ বসিয়া চা পান করিতেছে
নীরজা। a2+b2 +2ab= (a+b); a2+b2 -2ab= (a-b);
প্রেমে পড়লেই আমার অঙ্ক কষতে ইচ্ছে করে।
এমন জিনিস
আর আছে। মানুষ যে দিন বস্তু থেকে ভিন্ন করে সংখ্যাকে
ভাবতে শিখেছে, সেই দিনই স্বর্গের সিড়ির চাবি পেয়েছে। তার
মৃতং পিবেৎ
১১
মধ্যে আবার বীজগণিত। a মানে কোন বস্তু নয় ; b মানে
কোন পদার্থ নয় ; কেবল আইডীয়া। হৃদয়ের তার যখন উচ্চ
নিখাদে ধ্বনিত হয়ে ওঠে, তখন বস্তু পেছনে পড়ে থাকে। তখনই
মনে আসে বীজগণিতের ফর্মুলা। বীজগণিত আমার কাছে
ব্রহ্মস্বাদ-সহােদর। মালবিকা আমার কাছে (a+b)-এর সগােত্র।
কোনটাই আর বস্তু নয়, দুটো আইডীয়া মাত্র। মালবিকানা,
আমার পূর্বাপর ভুলিয়ে দিলে। কোথায় দিল্লী, আগ্রা, লাহাের—
সব ভুলে গেছি। এখন কেবল মনে হচ্ছে, সানি পার্কের সানি ভিলা
আর সেখানকার মালবিকা। অস্ত্ৰপরীক্ষার সময়ে অর্জুন যেমন
পাখির চোখটির দিকে বদ্ধদৃষ্টি হয়ে ছিল, আমারও হয়েছে
তেমনই, কেবল
মালবিকা অনিমিখে
চেয়েছিল পথের দিকে,
আর (a+b)2 = a2+b2 +2ab। হৃদয়াবেগের সুর-সপ্তকের স্বর্গে
সঙ্গীত আর বীজগণিত দুই-ই সগােত্র।
চা পান
কমরেডের প্রবেশ। লােকটির গায়ে লাল হাত-কাটা শার্ট ; পরনে লাল
হাফপ্যান্ট ; লাল জুতা মােজা; মাথার চুলও তৈলাভাবে রক্তাভ
কমরেড। এই যে নীরজাবাবু, বীজগণিতের কি ফরমুলা আওড়া-
চ্ছিলেন।
নীরজা। বলব কি মশাই, প্রেমে পড়েছি। প্রেমে পড়লেই আমার
বীজগণিত মনে পড়ে যায়।
কমরেড। সত্যি কথা বলতে কি মশাই, আমিও প্রেমে পড়েছি
প্রমীরার প্রেমে। আপনি?
;
;
দ্বজ পিবেৎ নীরজা। ওরই সেক্রেটারি মালবিকার প্রেমে। কিন্তু আপনি এত কম্যুনিস্ট হয়ে শেষে বড়লােকর মেয়ের প্রেমে পড়লেন ? রেড। কেন, বড়লােকের মেয়ে বলে সে কি মানুষ নয় ? নীরজা। কিন্তু তার টাকাগুলাে কি করবেন ? করে। আমার বিশ্বাস অনুযায়ী খরচ করব। নীরজা। দেখুন মশাই, এ যুগ বড় খারাপ যুগ, কোন বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে থাকলে শেষ পর্যন্ত ফুটপাথে বসতে হবে। কমরেড। আমরাও তাে তাই চাই। ফুটপাথেই নতুন সভ্যতা গড়ে তুলব। নীরজা। বাই দি বাই, আপনার নামটি কি? কমরেড ব’লে আর কত ডাকা যায় ? কমরেড। ওইটি মাপ করবেন। সন্ন্যাস গ্রহণ করলে যেমন সংসার- আশ্রমের নাম বলা নিষেধ, আমাদের পক্ষেও তাই ; আমরা হচ্ছি ইকনমিক সন্ন্যাসী। আমরা এখন কমরেড। এমন সময়ে ভৃত্য আসিয়া কমরেডকে এক কাপ চা দিয়া গেল ; তাহার চা পান নীরজা। আচ্ছা, আপনারা যে এই সব মতবাদ প্রচার করছেন, গভর্মেন্ট যদি কমরেড। মরতে হবে, সেজন্যে ভয় কেন? নীরজা। ওই ওই আর একটি ভুল। মৃত্যু-ভয়টা এককালীন তাই দেখতে বেশি, যেমন মেয়ের বিয়ের পণের টাকা। আর বেঁচে থাকার ভয় ছেলের পড়বার খরচের মত, দেখতে বেশি নয়, কিন্তু অনেক দিন ধরে টানতে হয়, হিসেব করলে দেখা যাবে, পণের টাকার চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু ওসব যাকগে—সর্বেশ্বরবাবু কি আপনাকে মেয়ে দেবেন ?
নীরজা। যুতং পিবেৎ ২১ কমরেড। কেন দেবেন না? দু দিন পরে আমরাই তাে দেশের মালিক। আর তিনি যদি ভুল করে ওই কোথাকার মহারাজ- কুমারকে দিতেই চান, তবে আমি আছি কেন ? Vini, vici, vidi। আচ্ছা, উঠি। ভৃত্য। বাবু, দাম? কমরেড। দাম! ক্যাপিটালিজমের স্পর্ধায় আর পারি না। দাম! সবুর কর, আর বেশি দেরি নেই। তখন দেখব, কেমন দাম চাও! প্রস্থান ওহে, গােলমাল ক’র না, আমি দিয়ে দিচ্ছি। দাম দেওয়া হইলে ভৃত্যের প্রস্থান আমিও যাই। এখন বােধ হয় মালবিকা একাই আছে। a2+b2+2ab (a+b)2, বীজগণিত আর প্রেম। প্রস্থান অন্য দ্বার দিয়া ত্রিদিব ও বিজয়ের প্রবেশ ; বেশভূষা সাধারণ রকমের ; পূর্বের দৃশ্যের মত পারিপাট্য নাই বিজয়। এই বয়, দু কাপ চা দিয়ে যাও। বয় চা আনিল ভাল করে পর্দা টেনে দিয়ে যাও। পর্দা টানিয়া দিয়া বয়ের প্রস্থান আরে বাপু, মােটর চালাতে চালাতে হাতে কড়া পড়ে গিয়েছে, যদি বিয়েটা হয়ে যায় সুখে থাকতে পারবি। তার আগে কটা দিন যা বলি, করিস। ত্রিদিব। কিন্তু মুশকিল কি জান? আমি তাে মাকড়দ’র মহারাজ- কুমার, বিয়েটায় যুদি সেই অনুপাতে ধুমধাম তারা আশা করে?
ঘৃতং পিবেৎ বিজয়। আশা করলেই হ’ল ! তুই বলবি, তাের বাবা রামনগরের রাজার মেয়ের সঙ্গে বিয়ের ঠিক করেছেন। তার অমতে গােপনে তুই এ বিয়ে করছিস। কাজেই বেশি ধুমধাম করা সম্ভবও নয়, উচিতও নয়। বুড়াে রায় বাহাদুর সব বিশ্বাস করবে। আর একবার বিয়েটা হয়ে গেলে, বাস্-এর নাম হিন্দুবিবাহ। বাবা, এ খ্রীষ্টানী বিয়ে নয় যে, বাতিল করে দেবে। ত্রিদিব। কিন্তু বুড়াের আছে কি রকম? বিজয়। যা আছে, তাতে তাের সাত জন্ম বেশ চলে যাবে। আমি এ পাড়ার লােকদের কাছ থেকে সব খবর সংগ্রহ করেছি। সানি ভিলা বাড়িটা তার, দেশে আছে জমিদারি, ব্যাঙ্কে আছে টাকা, গ্যারেজে আছে মােটর, ঘরে আছে মেয়ে ; আর নেই তার অন্য ছেলে মেয়ে এবং মাথায় বুদ্ধি। এই রেস্টরেন্টের বয়টা বলছিল, একদিন কি কাজে বুড়াের কাছে গিয়েছিল, বকশিশ পেয়েছিল গােটা একটা টাকা। ত্রিদিব । দেখা যাক। বিজয়। না না, আর দেখতে বেশি সময় দিও না। যা হয় দু চার দিনের মধ্যেই করে ফেল। তার পরে ধীরে সুস্থে দেখাে। সেদিন তােমার ব্যবহারটা বেশ অ্যারিস্ট্যাটিক হয়েছিল। ত্রিদিব। হবে না! বড়লােকের মােটর চালিয়েই তাে হাত কড়া করে ফেললাম। বিজয়। কিন্তু তােমার মেজাজটা আরও একটু রুক্ষ হওয়া দরকার, যেন পৃথিবীতে কিছুই তােমার পছন্দ হচ্ছে না—ভাবটা এই রকম। ত্রিদিব। কেন ? বিজয়। কেন আবার কি? ঘােটলােকই অল্পে সন্তুষ্ট হয়। আর একটা ঘৃতং পিবেৎ কথা মনে রেখোকথা বলবার সময় শেষের কথাগুলাে অস্পষ্ট ক'রে হাওয়ার মধ্যে ছেড়ে দেবে। কথা আরম্ভ করবে বাই-দি-বাই দিয়ে আর শেষ করবে অ্যাণ্ড সাে-অন বলে। আচ্ছা, বেশ অ্যারিস্ট্যাটিকভাবে চাকরকে ডাক দেখি । ত্রিদিব। বয় ! বিজয়। উহু হ’ল না। এই রকম হবে, বঁয়—চন্দ্রবিন্দু চাই। ত্রিদিব। বঁয় ! বিজয়। হঁ্যা। চন্দ্রবিন্দুর আতিশয্য দেখলে তবে তাে লােকে মনে করবে, ফরাসী ভাষাটা তােমার আয়ত্ত হয়েছে, তােমার মধ্যে আছে বনেদী বড়লােকের রক্ত। ত্রিদিব। কিংবা শূর্পণখার। বিজয়। ঠাট্টা নয় হে ; শূর্পণখা ছিল সেকালের সবচেয়ে বড় অ্যারিস্ট- ক্র্যাটের বােন—স্বয়ং রাবণ রাজার। আচ্ছা, চুরুট টানবার সময়ে ধরবে কি করে ? ত্রিদিব। কেন? ডান হাতের তর্জনী আর মধ্যমা দিয়ে চেপে । বিজয়। ওটা প্রি-ওয়ার কায়দা। আজকাল দেখ নি বড়লােকদের ? ধরবে বাঁ হাতের তর্জনী আর বুড়াে আঙুল দিয়ে চেপে—এই রকম করে। প্রদর্শন ত্রিদিব। বেশ। বিজয়। আর এক কাজ করবে—পকেটে রাখবে গোটা কয়েক ঘােট এলাচ, মাঝে মাঝে মুখে দেবে। ত্রিদিব। কেন ?
২৪
ধূতং পিবেৎ
বিজয়।
তবে তাে ওরা বুঝবে, তুমি খেয়ে এসেহমদ, আর তারই গন্ধ
ঢাকবার চেষ্টা করছ এলাচ দিয়ে ।
ত্রিদিব। কিন্তু মদ খেলে ওদের ধারণা নীচু হবে না?
বিজয়। তা হবে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বুঝবে, তুমি বনেদী অ্যারিস্ট্যাট।
তােমার সম্বন্ধে নৈতিক দিকের পাল্লা যত নেমে পড়বে, অর্থনৈতিক
দিকের পাল্লা উঠবে তত উচুতে। তােমারও তত তাই দরকার।
আচ্ছা, একটু পরীক্ষা হয়ে যাক। মনে কর, তুমি এখানকার খারাপ
চা খেয়ে অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে গেছ, চাকরকে বিরক্ত হয়ে বকছ,
প্লেট ভেঙে ফেলছ—আর যাবার আগে ঝন করে গােটা-কয়েক
টাকা ফেলে দিয়ে চলে গেলে। এই নাও, কাছে টাকা রাখ।
ত্রিদিব। এতগুলাে টাকা মিছিমিছি-
বিজয়। জগতে কিছু মিথ্যে হয় না। টাকার জন্যে ভেবাে না, আমি
তােমাকে যখন যা লাগে দোব, কেবল বিয়ের পরে শশাধ করে
দিও। নাও, আরম্ভ কর।
ত্রিদিব । [ কৃত্রিম অ্যারিস্ট্যাটিক অভিনয় ] আই সে ড্যাম ইট ;
বিজয়।
মনে থাকে যেন চন্দ্রবিন্দু।
ত্রিদিব। বঁয় !
বয়ের ভীতভাবে প্রবেশ
হােয়াট ডেভিল ডু ইউ মীন ?
বয়। হুজুর
বিজয়। এই বটা, দেখছিস না, সাহেব রেগে গিয়েছে! বল,
সাহেব
বয়। সাহেব
ঘৃতং পিবেৎ
ত্রিদিব। আই সে হাঙ্গ ইট।
কাপ ও প্লেট মাটিতে ছুড়িয়া নিক্ষেপ
বয়। সাহেব, মনিব যে বকবে আমাকে।
ত্রিদিব। লে আও ভােমারা মনিবকো। আই শ্যাল সেণ্ড হিম
টু ডেভিল।
বয়। সাহেব, মাফ কিজিয়ে ।
বিজয়। হালাে টি ডিব, লেটস গাে।
বয়। সাহেব, কাপ ?
ত্রিদিব । ড্যাম ইট
বয়। সাহেব, পিরিচ ?
ত্রিদিব। হ্যাঙ্গ ইট।
বয়। সাহেব, আমাকে
ত্রিদিব। গাে টু হেল।
ওকে কিছু দিয়ে দাও না, গরিব লােক মারা যাবে ।
ত্রিদিব। [ কয়েকটা টাকা ছুড়িয়া দিয়া ] হিয়ার’স ফর ইউ, ডগ।
।
বিজয় ।
বয়ের দন্তবিকাশ ও সেলাম
বিজয়। দ্যাটস পারফেক্ট। চল, যাওয়া যাক।
উভয়ের প্রস্থান
তৃতীয় দৃশ্য
সর্বেশ্বরবাবুর বাড়ির বৈঠকখানা। প্রমীরা একাকী বসিয়া ‘রহস্য-পিরামিড
সিরিজের ডিটেকটিভ-উপন্যাস পাঠ করিতেছে। পাশে আলমারিতে ইংরেজী ও
বাংলা ক্লাসিক্স সজ্জিত
সর্বেশ্বরের দ্রুত প্রবেশ
সর্বেশ্বর। কি পড়ছ মা? যা বারণ করেছি আবার তাই! তুমি
একলা বসে যা খুশি পড়, আমার আপত্তি নেই। এখন ওদের
আসবার সময় হ’ল, ওসব বই হাতে দেখলে অ্যারিস্টক্র্যাটরা
বিরক্ত হবে। ওখানা কি বই ?
প্রমীরা। গুম খুন।
সর্বেশ্বর। ওখানা ?
প্রমীরা।
নরকে নাগর । কেন বাবা, অ্যারিস্টক্র্যাটরা কি এসব বই
পড়ে না?
সর্বেশ্বর। পড়ে বইকি, কিন্তু লােকের সামনে পড়ে না। নাও,
ওগুলাে লুকিয়ে ফেল।
প্রমীরা বইগুলি লুকাইলে সর্বেশ্বর আলমারি খুলিয়া অন্য কয়েকখানা বই বাহির
করিলেন
এই নাও, ইংরেজী বই দু-চারখানা ছড়িয়ে রাখ ; এই বেকন্স
এসেস, এই নাও অ্যাডাম স্মিথের ওয়েস্থ অব নেশন্স। [ বাহিরে
ভৃত্যের প্রতি ] রাম সিং, মহারাজকুমার এলে চট করে খবর দিবি।
প্রমীরা। বাবা, ওসব পড়তে ইচ্ছে করে না।
সর্বেশ্বর। সে কি আর জানি না! ক্লাসিক্স মানেই যে বই লােকে
ঘৃতং পিবেৎ
২৭
কেনে অথচ পড়ে না। দেখ মা, আজই কুমারের কাছ থেকে
একটা পাকা কথা আদায় করে নেওয়া চাই। আর বড় জোর
হাতে মাসখানেক সময় আছে।
ভৃত্যের প্রবেশ
ভৃত্য। হুজুর, কুমারসাহেব আয়া হ্যায়।
প্রস্থান
••
সর্বেশ্বর। চল মা, একটু উপাসনার মত করা যাক। নতজানু হয়ে
হাতজোড় করে চোখ বুজে ব’স।
প্রমীরা। কিন্তু ধর্মের ভাব দেখলে অ্যারিস্টক্র্যাটরা বিরক্ত হবে
তাে?
সৰ্বেশ্বর। বড়লােকই বল, আর গরিবই বল, ধৰ্ম্মকে কেউই পছন্দ
করে না; কিন্তু এখনও ধৰ্ম্মের এইটুকু প্রেস্টিজ আছে যে, তার
ভাব দেখলে লােকে প্রকাশ্যে ঠাট্টা করতে পারে না। ধর, সত্যি
কথা তত সত্যিই কেউ আর বলে না, কিন্তু মজা এই যে সত্যিবাদী
লােককে সবাই মনে মনে এখনও ভয় করে। চোরেরা পরম
মিথ্যেবাদী, কিন্তু তারাও নিজেদের মধ্যে সত্যি কথা বলে, নতুবা
ব্যবসা অচল হয়ে পড়ে। সত্যি কথা’, ‘ধৰ্ম্ম’, ওগুলােকে ঠিকমত
ব্যবহার করতে পারলে এখনও কাজ দেয়। নাও, ব’স, ওই যে
ওরা এসে পড়ল!
পিতা পুত্ৰী নতজানু হইয়া যুক্তকরে চোখ বুজিয়া প্রার্থনায় রত ; পশ্চাতের
দ্বার দিয়া ত্রিদিব ও বিজয়ের প্রবেশ ; পিতা পুত্রী যেন উহাদের দেখে নাই
সর্বেশ্বর ও প্রমীরা। [ উপাসনার সুরে ] প্রভু, ধনই বল, মানই
বল, আর ধনী আত্মীয়-স্বজনই বল, না চাহিতেই তুমি যথেষ্ট
দিয়াছ, সেজন্য
যেন গর্ব অনুভব না করি । জগতে
২৮ ঘৃতং পিবেৎ • তােমার অভয় ক্রোড়ই একমাত্র আশ্রয়, একমাত্র সান্ত্বনা। আমার লক্ষ টাকার সম্পত্তি সে তাে তােমারই অনুগ্রহ ; আমার প্রাসাদোপম সানি ভিলা সে তত তােমারই কুটীর আমার ব্যাঙ্কের টাকা সে তত তােমারই উচ্ছিষ্ট ইহা শুনিয়া বিজয় ত্রিদিবকে ইঙ্গিত করিল—ভাবটা যেন, নিজের কানে শুনিলে তাে ? ওরা তাে জানে না যে, আমরা আসিয়াছি সর্বেশ্বর। প্রভু, এ সবই মায়া ! কেবল তােমারই করুণা জীবন- সমুদ্রের ধ্রুবতারা। যেন চিরদিন ধার্মিকের সঙ্গেই আমার পারিবারিক মিলন হয়, কেবল ধনীর সঙ্গে নয়, মানীর সঙ্গে নয়- বিজয় ত্রিদিবকে ইশারা করিল ; উভয়ে পিতা-পুত্রীর পার্শ্বে নতজানু হইয়া বসিয়া চোখ বুজিয়া উপাসনায় যােগ দিল বিজয়। [ উপাসনার সুরে ] প্রভু, কি আশ্চর্য্য এ সংসার। এখানে তুমি যােগ্যের সঙ্গে যােগ্যকে মিলাইয়া থাক। আমাদের ধনের অহঙ্কার দূর কর, মানের অহঙ্কার দূর কর, আমরা যেন মনে করিতে পারি, এ সংসারে আমরা দরিদ্র, না আছে আমাদের জমিদারি, না আছে টাকাকড়ি, না আছে বাড়িঘর ; যা কিছু আছে তা তােমারই প্রসাদ। সর্বেশ্বর। [ উপাসনার সুরে ] হে করুণাময়, হে পরম কারুণিক ! ইহা তাে কখনও কল্পনাও করি নাই যে, আমাদের মন ছাড়া অপরের মনেও এত অনুতাপের অমৃত তুমি দিয়াছ ! [ সহসা সর্বেশ্বর ভাবাতিশয্যে কাঁদিয়া ফেলিল ] প্রভু, পিতা, জগতের বিজয়। [উপাসনার সুরে] অহহা করুণার অবতার, পৃথিবীর অষ্টমাশ্চর্য তুমিই দেখাইলে—জগতে এখনও রাজর্ষি আছে ! [সেও ভাবাতিশয্যে
ঘৃতং পিবেৎ
কাদিয়া ফেলিল ] দিন রায় বাহাদুর, আপনার পূত পদজরেণু
দিন।
সর্বেশ্বর।
সে কি কথা? আসুন, আমরা সকলে মিলিয়া তারই
পদরেণুকণা ভিক্ষা করিয়া লইয়া মাথায় দিয়া ধন্য হই।
সকলের ভগবানের উদ্দেশ্যে প্রণাম
বিজয়। রায় বাহাদুর, আজ অসময়ে এসে পড়ে আপনার মধ্যেকার
রাজর্ষিকে দেখে ফেললাম।
সৰ্বেশ্বর। [ চোখ মুছিতে মুছিতে ] ভগবানের কি অবিচার ! যা
গােপনে করতে যাই, তা যে তিনি এমন করে প্রকাশ করে
ফেললেন কেন, তিনিই তা জানেন।
বিজয়। এমন করেই তাে তিনি অপরাধীর মনে অনুতাপের অমৃত
সঞ্চার করেন। আজ এ দৃশ্য না দেখলে কি মনে ঐশ্বর্যের প্রতি
ধিক্কার জন্মত?
সৰ্ব্বেশ্বর।
যা বলেছেন। আমার যে টাকাকড়ি আছে, এক এক
সময়ে মনে হয়, যেন কিছুই নেই, যেন সবই ফাকি।
বিজয়। আচ্ছা, সকলেরই কি এক রকম মনােভাব হয় ?
সর্বেশ্বর। কেন?
বিজয়। আমারও মাঝে মাঝে ঠিক ঐ কথাই মনে হয়, যেন কিছুই
নেই, যেন আমি পথের ভিক্ষুক!
ত্রিদিব। করুণা। করুণা ! তার করুণা না হলে এমন কথা মনে কখনই
হতে পারত না।
সৰ্বেশ্বর। চলুন, পাশের ঘরে গিয়ে বসা যাক।
ত্রিদিব। চলুন।
সকলের প্রস্থান
ঘৃতং পিবেৎ
যাইবার সময় বিজয় অ্যাডাম স্মিথের বইখানা তুলিয়া লইয়া ত্রিদিবকে গােপনে
একটা ইশারা করিল, ভাবটা—দেখলে তাে কি রকম কাচার ; অ্যারিষ্টাট না
হয়ে যায় না
অন্য দ্বার দিয়া মালবিকা ও নীরজানাথের প্রবেশ
নীরজা। আপনি আমায় অতীত কালকে ভুলিয়ে দিয়েছেন।
মালবিকা। কিন্তু তাই বলে ভবিষ্যৎ যেন ভুলে বসে থাকবেন না।
নীরজা। ভবিষ্যৎও ভুলতে পারি, কিন্তু আপনাকে কখনও নয়।
মালবিকা। কিন্তু বীজগণিতের ফরমুলাগুলাে?
নীরজা। ঠিক কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। বীজগণিতের বীজমালা
জপ করে চলেছি, তার আবর্তনের মধ্যমণিটির নাম হচ্ছে
মালবিকা।
মালবিকা। আপনি আমাকে ‘ভােরা’ বলে ডাকবেন।
নীরজা। বেশ। ভােরা! ভােরা! কি সুন্দর নাম! ব্রাউনিঙের
সেই কবিতাটি জানেন, স্পেন দেশীয় একটি প্রিয়জনের নাম মনে
রাখবার জন্যে তিনি বলেছিলেন—“I must learn Spanish
one of these days !" ডােরা ! বাঃ, সুন্দর!
মালবিকা। কিন্তু আপনাকে কষ্ট করে স্পেনের ভাষা শিখতে হবে না
—ওটা তাে ইংরেজী নাম।
নীরজা।
কে বললে ইংরেজী ? ওটা তত বাংলা নাম। ভােরা!
ডাের মানে বন্ধন। আপনি মূর্তিমতী ডােরা।
মালবিকা। মনে হচ্ছে, আপনি কবি।
নীরজা। এ কথা আমার আগে কখনও মনে হয় নি। এখন মনে
হচ্ছে, হবেও বা। যদি ইচ্ছে করেন, তবে কবিতা লিখতে শুরু
করি।
ঘৃতং পিবেৎ
৩১
মালবিকা। তার চেয়ে দার্জিলিং নিয়ে যাবেন বলেছিলেন, সেইটে
করলেই ভাল হয়।
নীরজা। চলুন না। কিন্তু সবাই যে ভাবে যায়, সে ভাবে নয়।
চুরি করে যাওয়া যাক।
মালবিকা। ট্রেনের টিকিট না করে ?
নীরজা।
তা কেন ? কাউকে না বলে একদিন গভীর রাত্রে আপনার
দোতলার জানলায় রশি বেঁধে উঠব, আর দুজনে সেই রশি
বেয়ে নেমে পালাব।
মালবিকা। উঃ, কি সরস পন্থা ! চমৎকার আইডীয়া, চরম বােমান্টিক!
কিন্তু তার চেয়ে সবাইকে বলে দিনের বেলা সিড়ি দিয়ে নেমে
যাওয়া কি সুবিধে নয় ?
নীরজা। ও কথাটা আমার মনেই হয় নি। এখন শুনে মনে হচ্ছে,
এটাও কিছু কম ঝােমান্টিক নয়। তার পরে মনে করুন,
ট্রেনে
না গিয়ে দুজনে ঘােড়ায় করে ছুটেছি-
মালবিকা। শুনেই রােমাঞ্চ হচ্ছে, কিন্তু ট্রেনে করে গেলেই বােধ করি
বেশি নিরাপদ হবে, পৌছানাে সম্বন্ধেও নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে আর
খরচও কম।
নীরজা। বাস্তবিক, আপনি কি! ওয়ান আপ দার্জিলিং মেলে
যে এত রােমান্স ছিল, তা স্কট, ডুমা, হুগগা পড়েও তাে কখন
মনে হয় নি।
মালবিকা। সেদিন আপনার আসবার কথা ছিল, না এসে বড়
ব্যস্ত করে তুলেছিলেন।
নীরজা। সত্যি ? আপনি কি করলেন ?
বৃতং পিবেৎ মালবিকা। করব আর কি! চারতলার ছাদের ওপরে উঠে কার্নিসের ধারে দাড়িয়ে নীচের দিকে নীরজা। [ ব্যস্তভাবে ] লাফিয়ে পড়ছিলেন ? মালবিকা। । নীচের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, আপনার দেখা নেই। তখন নিজের ঘরে ফিরে এসে বিছানার চাদর তুলে জড়িয়ে নীরজা। [ ব্যস্তভাবে ] কি সর্বনাশ! ফাসটাস লাগান নি তাে? মালবিকা। না। জড়িয়ে ফেলে রেখে নতুন একখানা চাদর পেতে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। বিছানায় শুয়ে বুকের মধ্যে এমন করছিল যে দম বন্ধ হয়ে নীরজা। [ ব্যস্তভাবে ] কি সর্বনাশ! তখন কি করলেন? মালবিকা। কি আর করব ! বুকে খানিকটা তাৰ্পিন-তেল মালিশ করলাম। নীরজা। যাক, তবু ভাল। মালবিকা। ভাল আর কোথায় ? প্রমীরা সব শুনে বললে যে, নীরজা- বাবুর সব কথা মিথ্যে। নীরজা। কি কথা মিথ্যে ? ভালবাসার ? আপনাকে ছুঁয়ে বলছি। চলুন, দার্জিলিং যাওয়া যাক, আজই, এখনই মালবিকা। সে কি সম্ভব ? কেন? আরে, ঘােড়ায় চড়ে নয়, ট্রেনে চেপে, ওয়ান আপ- মালবিকা। অসম্ভব। আপনিই ভেবে দেখুন। নীরজা। জা। ওহােঃ, ঠিক কথা! এমনই কি করে যাবেন ? মালবিকা দেবী-না না, ডােরা, আপনি যদি আমাকে অযােগ্য বিবেচনা করেন, তবে- নীরজা।
অতং পিৰেং মালবিকা। ওই যে ওরা আসছেন, চলুন, পাশের ঘরে গিয়ে বসা যাক। উভয়ের প্রস্থান প্রমীরার প্রবেশ ; সে বইগুলি লইয়া সাজাইয়া রাখিতে লাগিল ; জানালা দিয়া করেডের লাফাইয়া প্রবেশ কমরেড। এই যে প্রমীরা দেবী! একটা সংবাদ আছে। প্রমীরা। [ ব্যস্তভাবে ] কি ? দুঃসংবাদ ? কমরেড। । প্রমীরা। চোর ? করেড। না। প্রমীরা। আগুন লেগেছে ? কমরেড। আগুন! আগুনই বটে। হ্যা, আগুন লেগেছে। প্রমীরা। [ ব্যস্তভাবে ] কোথায় ? কমরেড। রুশিয়ায়। প্রমীরা। রুশিয়ায় ? তবে আপনি সেজন্যে ব্যস্ত কেন? কমরেড। আমার হৃদয়-রুশিয়ায়। তারই রক্ত আভায় আমার সাজ- সজ্জা আরক্ত হয়ে উঠেছে। প্রমীরা। কিছু বুঝতে পারছি না। কমরেড। তবে সংক্ষেপে বলি, আপনাকে আমি ভালবাসি। প্রমীরা। কি সব বাজে বকছেন ? কমরেড। এসব কথা আপনি কখনও শােনেন নি—এমন তাে নয়। এই কিছুক্ষণ আগেই ত্রিদিববাবু বােধ হয় এই কথাই বলছিলেন। প্রমীরা। তাতেই তাে আপনার বােঝা উচিত যে, ও কথা আর কারও কাছ থেকে আমার শােনা উচিত নয়।
৩৪ ফং পিবেৎ কমরেড। নাঃ, এদেশের আর আশা নেই। প্রমীরা। কেন? কমরেড। তা না হলে আপনি এমন করেডি-প্রেম প্রত্যাখ্যান করেন? সিগারেট টানতে টানিতে ত্রিদিবের প্রবেশ ত্রিদিব । মিস্ সিহা—এই লাল-পােশাকী লােকটা কে ? কমরেড। এই রক্ত-পােশাক কি জানেন? জগতের দুঃখ দারিদ্র অত্যাচার নিপীড়নের তলে আমাদের রক্ত-পােশাক লাল-কালির আণ্ডালাইন। ত্রিদিব। মাই গড ! কমরেড। কিংবা ক্যাপিটালিজমের যে মেল-ট্রেনখানা ঘণ্টায় ষাট মাইল বেগে হু-হু শব্দে এগচ্ছে, আমাদের এই লাল-পােশাক তারই সামনে রক্ত-আলাের সিগনাল বলছে, থাম। কিংবা ত্রিদিব। কিংবা-তে আর আবশ্যক নেই। কি দরকার— করে। তবে সেই কথাই হােক। প্রমীরা দেবী, একবার মন খুলে উত্তর দিন। একবার আমার দিকে তাকান, একবার এর দিকে—লুক অ্যাট দিস পিচার অ্যান্ড লুক অ্যাট দ্যাট। এক- জন ক্যাপিট্যালিস্ট, আর একজন কমুনিস্ট ; একজন স্বার্থবাদী, আর একজন সত্যবাদী ; একজন অত্যাচারী আর একজন অত্যাচারিত ; একজন নবযুগের হােম-শিখায় আরক্ত, আর এক- জন বিগতযুগের ভস্মভারে স্নান ; একজন ইংলণ্ড, আর একজন রাস্তা সংক্ষেপে, একজন অতীত, অন্যজন ভবিষ্যৎ। আপনি কাকে চান ? ত্রিদিব। বইখানার দাম কত?
মৃতং পিবেৎ কমরেড। বই? বিজয়। হ্যা, যে বই থেকে এগুলাে মুখস্থ করেছেন। কমরেড। উঃ, ক্যুনিজমকে এমন অপমান কেউ করে নি, স্বয়ং হিটারও নয়। চললাম প্রমীরা দেবী, বাই বাই- জানালা দিয়া হাত নাডিয়া প্রস্থান ত্রিদিব। কোয়াইট ইন্টারেস্টিং! প্রমীরা, আমার কথার উত্তর কি পাব না ? প্রমীরা। মুখে কি বলব বলুন? ত্রিদিব। মনে যা আছে। প্রমীরা। সে তাে আপনি জানেন। ত্রিদিব । জানি? সত্যি বলছ ? থ্যাঙ্ক গড ! তবে তােমার বাবাকে বলতে পারি ? প্রমীরা নিরুত্তর আমি চললাম তােমার বাবার কাছে। প্রস্থান অন্য দ্বার দিয়া সৰ্বেশ্বরবাবুর প্রবেশ সর্বেশ্বর। ত্রিদিব কোথায়, মা? প্রমীরা। আপনার কাছে গেছেন। সর্বেশ্বর। কেন? প্রমীরা। কি যেন বলতে। সর্বেশ্বর। কি বলতে? ওঃ, বুঝেছি। সত্যি নাকি, মা? প্রমীরা। হঁ্যা। সর্বেশ্বর। বাঁচালে আমাকে, বাঁচালে। নাঃ, ভগবান না থেকে আর
স্বজ পিবেৎ
যায় না! কিন্তু এই মাসের মধ্যেই হওয়া চাই। কোন দিকে
গেছে?
প্রমীরা। বােধ হচ্ছে তেতলায় ।
সর্বেশরের ব্যস্তভাবে প্রস্থান
মালবিকার প্রবেশ
মালবিকা। কি প্রমীরা দেবী, মনােরথ যেন পূর্ণ হ'ল।
প্রমীরা। বুঝলি কি করে ?
মালবিকা। থমকে দাড়িয়ে রয়েছ।-বােঝ চেপেছে বলেই রথ
অচল।
প্রমীরা। আর তাের রথ ?
মালবিকা। আমার এখনও দুষ্মন্তের রথের মত তাড়া করে চলেছে।
প্রমীরা। আমি তবে তপস্বীর মত সাবধান করে দিই, ভীরু মৃগের
ওপরে তীক্ষ্ণ শর নিক্ষেপ করিস নি ।
মালবিকা। তপস্বীরা কত বড় ভুল করেছিলেন। যে শর মৃগের
ওপর দিয়েই যেত, তা পড়ল গিয়ে শকুন্তলার হৃদয়ে।
প্রমীরা। নীরজাবাবু বলেন কি?
মালবিকা। আমাদের নাম অবলা, কারণ আমরা নাকি কিছু বলি
না। কিন্তু এ সময় ওঁরা যা বলেন, তা আরও বিষম, তার কিছুই
অর্থ হয় না।
প্রমীরা। কেন এমনটি হয় ?
মালবিকা। যেমন দূর থেকে জনতার কোন কোলাহলের অর্থ বােধগম্য
হয় না, অথচ কারও কথা নিরর্থক নয়। ওই সময় পুরুষদের মনের
ভাবগুলাে ছড়ােছড়ি ঠেলাঠেলি ক'রে একসঙ্গে বেরুতে থাকে ।
ঘৃতং পিবেৎ ধর, যেমন বেরিয়েছিলেন জতুগৃহদাহের সময়ে পাণ্ডবরা কয়েক ভাই। প্রমীরা। সার্থক হয়েছিল তাের এম. এ. পাস করা । মালবিকা। না ভাই। স্কুলের আর জীবনের গ্রন্থ দুখানা এখন মিলিয়ে দেখছি, দুটোর অনেক ভেদ। প্রমীরা। তবে কি ও দুখানা এক বই নয় ? মালবিকা। বই একই, তবে সংস্করণ স্বতন্ত্র । প্রমীরা। কিন্তু নীরজাবাবুকে তাের আগের বিয়ের কথা বলেছিলি? মালবিকা। যে কথা নিজেই ভুলেছি, তা আর তাকে বলে কি লাভ? প্রমীরা। কিন্তু তিনি যদি জানেন ? মালবিকা। জানবেন আর কেমন করে ? তুমি তাে আর বলবে না। আসল কথা কি জান, কতকগুলাে জিনিস আছে, যা জানলেই গােল, না জানলে কিছু নয়। প্রমীরা। যেমন- মালবিকা। যেমন ধর, বিষ, তা না জেনেও খেলে মৃত্যু। কিন্তু ধর এই ব্যাপারটা, চেপে গেলেই মিটে গেল। প্রমীরা। এটাও বােধ হচ্ছে তাের স্কুলের পাঠ। মালবিকা। হবেও বা। কিন্তু জীবন-গ্রন্থের সঙ্গে এখনও পাঠভেদ বের হয় নি। প্রমীরা। তবে ভদ্রলােককে আর না ঘুরিয়ে সব স্থির করে ফেল, যাতে আমাদের দুজনেরই এক দিনে হতে পারে। আর এক কথা, আমাদের বাড়িতেই হওয়া চাই কিন্তু। মালবিকা। সে তাের অনুগ্রহ। এবার চুপ কর, সবাই আসছেন। উভয়ের প্রস্থান ঘৃতং পিবেৎ সর্বেশ্বর, নগেন্দ্রনাথ, বিজয়, ত্রিদিব ও নীরজার প্রবেশ নগেন্দ্র। ত্রিদিববাবু, আমার মতে হিন্দুবিবাহ জগতের শ্রেষ্ঠ বিবাহ- পদ্ধতি। একবার বিবাহ হলে সারা জীবনের মত পাকা ব্যবস্থা। এর তুলনায় অন্য ধর্মের বিবাহ নেহাত ছেলেখেলা। ত্রিদিব। আমারও সেই মত। ভাগ্যে হিন্দু হয়ে জন্মেছিলাম। নগেন্দ্র। এখনও হিন্দুবিবাহের যথেষ্ট প্রচার হয় নি। জানতে পারলে ইউবােপও এই বিবাহপদ্ধতিকে গ্রহণ করবে। ত্রিদিব। করলে আশ্চর্য হব না। মনে আছে বিজয়, সেবার চেকোস্লোভাকিয়ায় গিয়ে আমি যে বক্তৃতা দিয়েছিলাম ? বিজয়। খুব ইমপ্রেশন করেছিল—মনে আছে বইকি। হঠাৎ জানালা দিয়া লাফাইয়া কমরেডের প্রবেশ কমরেড। কি কথা হচ্ছিল ? ত্রিদিব। হিন্দুবিবাহের শ্রেষ্ঠত্ব সম্বন্ধে। কমরেড। সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ বিবাহ—পান্থ-বিবাহ-পদ্ধতি। নীরজা। সেটা আবার কি ? করেড। পান্থশালার বিবাহের সংক্ষিপ্ত নাম পান্থ-বিবাহ। পান্থশালার ব্যবস্থা যেমন পাকা নয়, তেমনই এ বিয়েও ক্ষণিকের, ভাল না লাগলে ছেড়ে যেতে আপত্তি নেই। নগেন্দ্র। কি সর্বনাশ ! ত্রিদিব। কি সর্বনাশ! নগেন্দ্র। ওসব এদেশে চলবে ন কমূরেড। তা জানি। ক্যাপিট্যালিস্টদের কাছে যে এটা ভাল লাগবে , তা বলাই বাহুল্য।
দ্বতং পিবেৎ
সর্বেশ্বর। না না, ওসব আলােচনা এখানে চলবে না।
কমরেড। তবে চললাম।
ত্রিদিব । কিন্তু যাবার আগে একটা কথা বলে যান দেখি, আপনি
জানলা দিয়ে যাতায়াত করেন কেন ?
কমরেড। আপনারা কেন দরজা দিয়ে যাতায়াত করেন ?
নীরজা। সত্যি কথা বলতে কি, ওটা একটা সংস্কার।
কমরেড। কু-সংস্কার।
ত্রিদিব। শুধু সংস্কার নয়, সুবিধাও বটে।
কমরেড। তবে শুনুন, এটা আমাদের মতবাদের প্রতীক। এমনই
করেই আমরা সব সংস্কারকে লঘন করব, এমনই ক'রেই আমরা
ক্যাপিট্যালিস্টদের সিন্দুকে ঢুকব।
ত্রিদিব। সিন্দুকে ঢুকবেন জানলা দিয়ে?
কমরেড। না, মায়ামন্ত্র-বলে। খুলবে সিন্দুক, ভাঙবে দরজা, পড়বে
অট্টালিকা, ছিড়বে শৃঙ্খল, পুড়বে সৌধ—জয় বিশে ডাকাতের
জয় । কিন্তু মহিলাদের যে দেখছি না।
জানালা দিয়া প্রস্থান
ত্রিদিব। আচ্ছা মশাই, বিশে ডাকাতের জয়ধ্বনি কেন করলেন ?
জানালার বাহির হইতে উকি মারিয়া
কমরেড। আলকাতরা-আলকাতরা।
সকলে সমস্বরে। আলকাতরা !
কমরেড। হ্যা, আলকাতরা। আলকাতরার মধ্যে যেমন গুপ্তভাবে
আছে সুগন্ধি আর এসেন্স, তেমনই স্কুল বিশে ডাকাতের আইডীয়ার
মধ্যেই আছে লেনিনের সূক্ষ্ম এবং উচ্চ আদর্শ।
প্রস্থান
ঘৃতং পিং
সর্বেশ্বর। কি যে সব কথাবার্তা আজকাল লােকে বলতে শুরু
করেছে।
নগেন্দ্র। আপনারা বসুন, বাইরে বােধ হয় ওঁরা এলেন।
ত্রিদিব। কারা ?
নগেন্দ্র। প্রমীরা দেবীকে যে সব শিক্ষক নানা বিদ্যা শিক্ষা দেন।
প্রস্থান
ত্রিদিব। কি কি বিষয় উনি শিখছেন ?
সর্বেশ্বর। সঙ্গীত থেকে ভূতত্ত্ব ; অনেকগুলাে বিষয়।
ত্রিদিব। একেই বলে আসল কাচার।
এক দিক দিয়া প্রমীরা ও অন্য দ্বার দিয়া নিম্নলিখিত বিষয়ের শিক্ষকদের প্রবেশ
-নৃত্য, সঙ্গীত, বাদ্য, মনস্তত্ত্ব, দর্শন, ইতিহাস, ভূগােল, জ্যোতিষ, ভাষাতত্ত্ব,
প্রাণিতত্ত্ব, রসায়ন, পদার্থবিদ্যা ইত্যাদি
কি সর্বনাশ! এতগুলাে বিষয়
এতগুলাে বিষয় একসঙ্গে শেখানাে হবে কি
নৃত্যশিক্ষক। কেন হবে না? এতগুলাে বিদ্যে যদি একসঙ্গে মাথার
মধ্যে থাকতে পারে, তবে একসঙ্গে শেখানাে যাবে না কেন?
ত্রিদিব। তা বটে। বিশেষ রাস্তায় দেখেছি কিনা, একজন ছাত্রকে
কেন্দ্র করে একই সময়ে জন দশেক শিক্ষক বিভিন্ন বিষয়ে বক্তৃতা
দিয়ে যাচ্ছে।
সঙ্গীতশিক্ষক। [ সগর্বে ] তবে? আমরাই বা কি কম? বসুন
প্রমীরা দেবী, মাঝখানে। আমরা চার দিকে দাড়াই। আপনারা
সবাই দেখুন, আমরা ফঁাকি দিচ্ছি কি না।
প্রমীরা মাঝখানে চেয়ারে বসিল ; শিক্ষকগণ চারিদিকে বৃত্তাকারে সঁাড়াইয়া পাঠ
দান শুরু করিল; অন্য সকলে দর্শক
ঘৃতং পিবেৎ ৪১ প্রমীরা। এত বিষয় আমার একসঙ্গে মনে থাকবে কি করে ? সঙ্গীতশিক্ষক। সেজন্যে ভাবনা নেই। কিছু অসুবিধা হতে পারে ভেবে আমরা সকলে যুক্তি করে শিক্ষণীয় বিষয় কবিতায় গেঁথে এনেছি, আর তার সঙ্গে বাজনাও থাকবে। [ অন্য শিক্ষকের প্রতি ] নাও, এবার আরম্ভ কর। যতক্ষণ এই শিক্ষা চলিবে, ততক্ষণ বাঁশী কিংবা বেহালার সুর এই দৃশ্যের ব্যাক- গ্রাউণ্ডরূপে বাজিতে থাকিবে। প্রত্যেক শিক্ষক নিজের বিষয় সম্বন্ধে বলিয়া যাইবে এবং তাহা শুনিয়া প্রমীরা সেই ছত্রটি আবৃত্তি করিবে সঙ্গীতশিক্ষক। সা রে গা মা পা ধা নি নি গা রে মা পা পা ধা সা । ইতিহাসশিক্ষক। মরিল ১৬০৫এ আকবর বাদশা । বাদ্যশিক্ষক। তেরে কেটে তা তেরে কেটে তা ধানি ধানি ধানি। প্রাণিতত্ত্ববিদ। মেরু ও অমেরুদণ্ডী দুই ভাগ প্রাণী । দার্শনিক। সৰ্ব্বং খদি ব্ৰহ্ম বেদান্তের সার । রাসায়নিক। কেমিস্ত্রির আলােক-স্তম্ভ বুসেন বার্নার ( মরি বুসেন বার্নার)। সঙ্গীতশিক্ষক। [ সৰ্বেশ্বরের প্রতি ] কেমন হচ্ছে সার? বিজয়। ওয়াণ্ডারফুল ! জার্মানিতেও এমনটি দেখি নি, কি বল ত্রিদিব ? ত্রিদিব। সার্টেনলি নট । অর্থনীতিবিদ। আধুনিক অর্থনীতি শুধু মুদ্রা বিনিময় । ভৌগােলিক। ভারত সাগর মধ্যে ট্রেড উইণ্ড বয়। পদার্থতত্ত্ববিদ। ফিজিক্সের শেষ কথা রিলেটিভিটির ভাষাতাত্ত্বিক। নাভিস্থল হতে হয় ‘অ’ ধ্বনি বাহির ( মরি ‘অ’ ধ্বনি বাহির)।
৪২
ঘৃতং পিবেৎ
প্রমীরা। আমার মাথা ধরেছে, চললাম।
দ্রুত প্রস্থান
নৃতত্ত্ববিদ প্রভৃতি। এরই মধ্যে মাথা ধরল, আমরা যে কিছু বলবারই
সুযােগ পেলাম না।
সঙ্গীতশিক্ষক। প্রথম দিনেই এতখানি সফল হব আশা করি নি।
সর্বেশ্বর। কি রকম?
সঙ্গীতশিক্ষক। মাথা ধরেছে দেখেই বুঝতে পারলাম, মগজের মধ্যে
কাজ শুরু হয়েছে।
বাদ্যশিক্ষক। হবে না? এ রকম সম্মিলিত বিদ্যার যুগপৎ আক্রমণ !
রাসায়নিক। সম্মিলিত বিদ্যা ব’ল না, ওটা রসায়নেই ধরেছে।
দার্শনিক।
রেখে দাও তােমার রসায়ন ; আমার ব্রহ্ম একাই যথেষ্ট।
ভৌগােলিক। আর আমার ট্রেড উইণ্ড?
ঐতিহাসিক। আর আমার আকবর ?
প্রাণিতত্ত্ববিদ। আর আমার মেরুদণ্ডী ও অমেরুদণ্ডী প্রাণী?
ভাষাতাত্ত্বিক। আমি সব শেষে বলেছিলাম, কাজেই মাথা ধরার
ক্রেডিট আমার প্রাপ্য।
সকলে। রেখে দাও তােমার ‘অ' ধ্বনি।
ভাষাতাত্ত্বিক। বটে ! কেন রেখে দোব ? বল তাে, ‘অ’-অ’
কেহ কেহ। দূর শালা !
ভাষাতাত্ত্বিক। তবে রে ! ‘অ’র অপমান।
সকল শিক্ষক কোলাহল করিতে আরম্ভ করিল ; ক্রমে তর্ক হাতাহাতিতে গিয়া
পৌছিল ; টেবিল চেয়ার উল্টাইয়া পড়িল ; সুরের ব্যাকগ্রাউণ্ড যথাপূৰ্ব্ব চলিতে
থাকিবে
ত্রিদিব । ওহে বিজয়, সম্মিলিত শিক্ষার ঠেলা তাে কোনক্রমে সহ
ঘৃতং পিবেৎ 89 করেছিলাম, কিন্তু সম্মিলিত শিক্ষকের আক্রমণ তত ঠেকানাে যাবে । স’রে পড়ি। বিজয়। সার্টেলি। জার্মানিতেও এমনটি দেখি নি। নীরজা, বিজয় ও ত্রিদিবের প্রস্থান -ৰ্বেশ্বর। আপনারা থামুন, থামুন। কেহ কেহ। তবে রে ‘অ’-- অন্য কেহ। তবে রে ব্রহ্ম- অপর কেহ। দূর শালা, বুসেন বার্নার এইরূপ কোলাহল ; সৰ্বেশ্বরের হাতজোড় ও অনুরােধ, সুরের ব্যাকগ্রাউণ্ড; হঠাৎ যবনিকা পড়িয়া গেল চতুর্থ দৃশ্য সানি ভিলার ড্রয়িং-রূম ; প্রমীরা বৈদেশিক তারকা-তারকিনীদের নাম একখানি কাগজ দেখিয়া মুখস্থ করিতে করিতে দ্রুত পায়চারি করিতেছে প্রমীরা। জেনেট গেনার, রবার্ট টেলার, রােনাল্ড কলম্যান, শার্লি টেম্পল ; মার্লিন ডিয়েটিচ, মে ওয়েস্ট, মারলে ওবেরন, এলিজাবেথ অ্যালেন ; ফ্রেডরিক মার্চ, এডি ক্যান্টর, ডলাস ফেয়ারব্যাঙ্কস জুন, সিন ; গ্রেস মূর, লিলিয়ান গিশ— না, ছাই মনেও থাকে না। সব গােলমাল হয়ে যাচ্ছে। আবার কালকের মত ঠকে গেলে বাবা আস্ত রাখবেন না। পুনরায় আবৃত্তি মালবিকার প্রবেশ মালবিকা। ও কি হচ্ছে ?
88
ঘৃতং পিবেৎ
প্রমীরা। হচ্ছে আমার মাথা আর মুণ্ডু। তােকে যে কতক্ষণ থেকে
খুজছি! বাবা জিজ্ঞেস করছিলেন, তােদের বিয়ের দিন ঠিক
করেছিস ?
মালবিকা।
এক রকম হয়েছে বইকি।
প্রমীরা। বেশ। বিয়েটা আমাদের এখানে হ'লে তােদের আপভি
আছে ?
মালবিকা। আপত্তি আর কি ? ভালই তাে হয়। তােদের বিয়ে
প্রমীরা। ওই একই দিনে হবে। চল, তা হলে বাবাকে গিয়ে বলা
যাক। ওই যে ওঁরা এদিকে আসছেন।
সর্বেশ্বর ও নগেন্দ্রনাথের প্রবেশ
সৰ্বেশ্বর। কি মা, যা জিজ্ঞেস করতে বলেছিলাম সব ঠিক তত?
প্রমীরা। হ্যা, কোন আপত্তি নেই।
সর্বেশ্বর।
তবে তােমরা একটু ও-ঘরে যাও। আমাদের একটু কথা
আছে।
প্রমীরা ও মালবিকার প্রস্থান
বুঝলে নগেন, কুমারবাহাদুর বলছিলেন, বিয়েতে তিনি বেশি
ধুমধাম করতে চান না। কারণ তার বাপ রামনগরের রাজার
মেয়ের সঙ্গে বিয়ে প্রায় ঠিক করে রেখেছেন, এখন যদি তিনি
জানতে পারেন, সব ভণ্ডুল হয়ে যাবে ।
নগেন্দ্র। সে তত ঠিক কথা। একবার বিয়েটা কোনক্রমে হয়ে
যাক, তার পরে সারা জীবন ধুমধাম করা যাবে।
সর্বেশ্বর। তিনি বলছিলেন, বিয়েটা আমার এখানেই হােক।
নগেন্দ্র। আমারও সেই মত।
স্বত পিবেৎ,
৪৫
সর্বেশ্বর। ওই সঙ্গে মালবিকার বিয়েটাও হােক নীরজাবাবুর সঙ্গে,
প্রমীরা তাই চায় ।
নগেন্দ্র। "হােক না, এক খরচে হবে, ভাবনা কি ?
সৰ্বেশ্বর। কিন্তু একটা খরচই তাে জোটানাে মুশকিল।
নগেন্দ্র। সে তুমি ভেবাে না। ধার করে চালানাে যাবে। একবার
বিয়েটা হয়ে গেলে নিশ্চিন্ত। এ আর কিছু নয় বাবা, হিন্দু-
বিবাহ।
সর্বেশ্বর। কিন্তু ওরা তাে ভেতরের খবর জানতে পারে নি ?
নগেন্দ্র। পাগল নাকি? তা হলে আর বিয়ের জন্য এত পীড়াপীড়ি
করে? আমি কুমারকে বলেছিলাম, মৈমনসিংহের চার চারটে
জমিদারবাড়ি থেকে বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে। শীগগির একজন
দেখতে আসবে।
সৰ্বেশ্বর। কুমার কি বললেন ?
নগেন্দ্র। তখনই বিয়ের কথা পাকা করে ফেললেন।
সর্বেশ্বর। দেখ, বিয়েটা না হওয়া পর্যন্ত তুমি ঠেকা দিয়ে কোন রকমে
চালাও। আর এক কথা, বিয়ের দিন রাত্রে একটু গান-বাজনার
আয়ােজন ক’র।
নগেন্দ্র। সেজন্যে ভেবাে না। বিয়ে পর্যন্ত আমি চালিয়ে দেব।
করেডের জানালা দিয়া লাফাইয়া প্রবেশ
কমরেড। মিঃ সিন্হা, আপনার মেয়েকে আমি বিবাহ করব ।
সৰ্বেশ্বর। তােমার জমিদারি আছে ?
কমরেড। [ সগর্বে ] না।
সর্বেশ্বর। দেশে বাড়ি আছে ?
৪৬
ঘৃতং পিবেৎ
কমরেড। [ সগর্বে ] না।
সৰ্বেশ্বর। কলকাতায় ?
কমরেড। [ সগর্বে ] না।
সৰ্বেশ্বর। ব্যাঙ্কে টাকা ?
করেড। [ সগর্বে ] এক পয়সাও না।
সৰ্বেশ্বর। জমিজমা ?
কমরেড। [ সগর্বে ] এক ছটাকও নয়।
সর্বেশ্বর। তবে কি আছে ?
কমরেড। [ গৰ্ব্বমিশ্রিত উল্লাসে ] কেউ না, কিছু না।
সর্বেশ্বর। তবে?
তবে আর কি ? শুধু আপনি আছেন, আমি আছি, আর
আছেন মিস প্রমীরা।
সৰ্ব্বেশ্বর। এবার যেতে পার।
কমরেড। আপনার মেয়ে ?
সর্বেশ্বর। আমার কাছেই থাকবে।
কমরেড। ঠিক বলছেন? তবে বিয়ে দেবেন না? জানেন, আমি
প্রভিশনাল সােশ্যালিস্ট। আমার এ কোট-প্যান্টের রং পাকা
নয়। ধুয়ে ফেলবধুয়ে ফেলব, মাথায় তেল দোব। উঃ, কি
ভুলই করেছি! England, with all thy faults I love thee
still !
কমরেড।
সবেগে জানালা দিয়া প্রস্থান
বিজয় ও ত্রিদিবের প্রবেশ
সর্বেশ্বর। এই যে, আসুন কুমারবাহাদুর।
ঘৃতং পিবেৎ ৪৭ ; ত্রিদিব । আর আমাকে কুমারবাহাদুর বলবেন না ; ওটা ভাল দেখায় না। সৰ্বেশ্বর।' সে কথা ঠিক ; তােমরা তাে এখন ঘরের লােক। ব’স বাবা, আমি ওদের পাঠিয়ে দিচ্ছি। সর্বেশ্বর ও নগেন্দ্রনাথের প্রস্থান ওহে, নামগুলাে আর একবার আবৃত্তি করা যাক ; মােৎসার্ট, হাণ্ডল, বিটোভেন- বিজয়। বিটোফেন। ত্রিদিব। আচ্ছা, বিটোফেন, চোপিন বিজয়। মাটি করেছে, চোপিন নয়, শােপা। ত্রিদিব। বেশ, শােপঁ্যা, বানার, ঠিক হচ্ছে তাে? বিজয়। শেষ পর্যন্ত ঠিক হলে হয় ! প্রমীরা, মালবিকা ও নীরজানাথের প্রবেশ নীরজা। ভাল তত কুমারবাহাদুর ? ত্রিদিব। চলে যাচ্ছে এক রকম। নীরজা। কালকে যে দেখি নি ? ত্রিদিব। কাল মহারাজা রামনারায়ণ সিঙের বাড়িতে এক পাটি ছিল। সেখানে বিটোভেনের একটা সােনাটা যা শুনলুমকি আর বলব নীরজাবাবু! নীরজা। বিটোভেন নয়, বিটোফেন। বিজয়। [ তাড়াতাড়ি ] নীরজাবাবু, ওটা প্রি-ওয়ার উচ্চারণ। রাশিয়ার বিপ্লবের পরে ওরা আবার বিটোভেন বলতে শুরু করেছে।
৪
ঘৃতং পিবেৎ
;
নীরজা। তা হবে। আমাদের বই-পড়া বিদ্যে-
বিজয়। যুদ্ধের আগে আমরা প্রাগে গিয়ে শুনেছিলাম বিটোফেন ;
যুদ্ধের পরে সেই প্রাগে গিয়ে শুনি, ওরা বলছে—বিটোভেন। যুদ্ধের
পরে এত পরিবর্তন হয়েছে, সব সময়ে ঠিক বােঝা যায় না।
নীরজা। তা হবে ।
ত্রিদিব। কিন্তু বিজয়, তুমি বিটোফেন, মােৎসার্ট, বাগনার হাল
যতই বল না কেন, চোপ্যার মত কেউ নয় ।
নীরজা। চোপা ? আমি তাে জানতুম শােপা।
বিজয়। [ তাড়াতাড়ি ] আমরাও তাই জানতাম, নীরজাবাবু। কিন্তু
ইউরােপে কখন যে কি বদল হচ্ছে, তার ঠিক নেই। পােলাণ্ডের
নতুন আইন প্রবর্তনের পর থেকে শােপা বলা আইন করে বন্ধ
করে দেওয়া হয়েছে। কজন অ্যারিস্টক্র্যাট শােপা বলেছিল,
তাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়াতে তারা বেনে গিয়ে
রয়েছে।
নীরজা। বের্নে! সুইজারল্যাণ্ডের রাজধানী ?
বিজয়। নীরজাবাবু, ভাগ্যিস আপনি ওদেশে যান নি। সুইজারল্যাণ্ড
নয়, সুইজারল্যাণ্ড। সুইজারল্যাণ্ড বললে ওদেশে এখন
জরিমানা দিতে হয়।
নীরজা। কি বিপদ!
বিজয়। বিপদ বলে বিপদ। সেবার আমরা বার্লিন বলে এক শাে
মার্ক জরিমানা দিলাম।
বলতে হবে,
বেলিন।
নীরজা। এটা বুঝি নাজি গভর্মেন্টের আইন?
বিজয়। পাঁচ শশা মার্ক জরিমানা হ’ল আপনার।
নীরজা।
কেন ?
ঘৃতং পিবেৎ বিজয়। নাজি নয়, নাৎসি। ইহুদীরা বলে-নাজি; আর এরিয়ানরা বলে—নাৎসি। ইউরােপ বড় গােলমেলে দেশ, মশাই। প্রমীরা। অমন দেশে না যাওয়াই ভাল। বিজয়। এ কথা আপনার বলা চলে না, মিস সিনহা। ত্রিদিব তাে ঠিক করেছে, বিয়ে করেই মধুচন্দ্র যাপন করতে যাবে সুইট- জারল্যাণ্ডে। নীরজা। বলেন কি ত্রিদিববাবু? শুনেছি ও দেশে মেঘ আর কুয়াশায় চঁদ দেখাই যায় না । বিজয়। আকাশের চাদ নাই দেখা গেল। বিজ্ঞান আর ডিমােক্র্যাসি মিলে সে সমস্যার সমাধান করে দিয়েছে। নীরজা। কি রকম ? বিজয়। একটা মােটা রকম ফী দিলেই গভর্মেন্ট থেকে আকাশে কৃত্রিম চাদের ব্যবস্থা করে দেবে। আপনারা বাড়ির ছাদে বসে দেখুন। মনে আছে ত্রিদিব, সেবার সেই ত্রিদিব। ওঃ, সে দৃশ্য ভােলবার নয় ! মালবিকা। কি দৃশ্য ? বিজয়। সেবার আমরা সুইজারুল্যাণ্ড গিয়ে দেখি, শহরের একটা পার্কে বােধ হয় হাজার জোড়া নতুন বর বধূ ; কেউ চেয়ারে বসে, কেউ ঘুরছে নীরজা। বলেন কি, এক দিনে এত বিয়ে ? বিজয়। বােধ হয় ওদের দেশে শারদা-আইন-জাতীয় একটা কোন আইন পাস হচ্ছিল, ঠিক তার পূর্বেই এই বৈবাহিক মরসুম ! তার পরে শুনুন—আমরা পার্কে ঢুকতে গিয়ে বাধা পেলাম, জিজ্ঞেস . করে, তােমাদের পত্নী কোথায় ? শেষে ব্যাপার শুনলাম, সেখানে ৪
ঘৃতং পিবেৎ
সেদিন কেবল বর বধূর প্রবেশ। আকাশে তাকিয়ে দেখি একেবারে
পূর্ণিমার চাঁদ । কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ মেঘ কেটে যেতে দেখি—
দূরে আর একটা চাদ ! ব্যাপার কি ? জিজ্ঞেস করতে ভয় হয়,
ওখানে কিছুই অসম্ভব নয়। শেষে হয়তাে শুনব যে, রােমান
সম্রাটদের সময় থেকে ওখানে দুটো করেই চাদ উঠছে। পরে।
জানলাম, একটা আসল একটা নকল। কিন্তু বলব কি মশাই,
প্রভেদ বােঝবার উপায় নেই।
নীরজা। বিয়ে করতে হলে ওদেশেই করা উচিত।
প্রমীরা। আমি তাে ওদেশে গেলে উচ্চারণের ভুলের জন্যে জরিমানা
দিতে দিতেই মারা যাব ।
বিজয়।
সে ভয় নেই, মিস সিনহা। ওরা শিভ্যারি জানে।
মহিলাদের জরিমানা করবার আইন নেই। সেবার আমাদের
সামনেই জার্মানিতে এক মজার কাণ্ড ঘটল। একটি চীনে মহিলা
জানেন তাে চীনে স্ত্রী-পুরুষের পােশাক প্রায় একই রকম, পথে
হিটলারকে দেখে ‘হিতু’ বলে চীৎকার করে উঠেছিল। সবাই
স্তম্ভিত। হিটলার তলােয়ার খুলে তার দিকে এগিয়ে গেল।
আমরা ভাবলাম, মেয়েটা মল এবার। কিন্তু হিটলার যেই কাছে
গিয়ে বুঝলে অপরাধী মহিলা, অমনই তলােয়ার খাপের মধ্যে পুরে
রেখে, ডান হাত দিয়ে তার চিবুকটি একটু নেড়ে দিয়ে বললে
—ইউ লেডি ? নট ফাইন। মেয়েটি ভাবলে, তাকে নট ফাইন
মানে, সুন্দর বলা হয় নি। সে এক মহাতর্ক।
সে এক মহাতর্ক। খবর শুনে চীন
দেশের মহিলারা উঠল ক্ষেপে। শেষে হিটলার চীন-জার্মানির মধ্যে
বাণিজ্য চুক্তি করে ওদের ঠাণ্ডা করে ।
প্রমীরা। স্বাধীন দেশে জন্মাবার কত সুবিধে ।
ঘৃতং পিরেৎ
৫১
মালবিকা। কিংবা ভাষা না জানবার কত অসুবিধে !
বিজয়। কিছুই কিছু নয়। সেদিন অপরাধী যদি মহিলা না হত,
তবে দেখতেন চীনের রক্তে বের্লিনের ফুটপাথ হলদে হয়ে
যেত।
প্রমীরা। রক্তে হলদে ? সে কি রকম?
বিজয়। ওরা পীত জাতি কিনা, কাজেই হলদে।
মালবিকা। বুঝেছি, যেমন লােহিত সাগর লাল।
নীরজা। মিস সিনহা, একটা গান করুন না?
বিজয় । আমারও তাই ইচ্ছে ।
নীরজা।
তবে আর কি ?
প্রমীরা সলজ্জ আপত্তির সঙ্গে একখানি গান গাহিল
ত্রিদিব ।
বিজয়।
কোথায় লাগে বিটোভেন ।
প্রমীরা। কি যে বলছেন !
বৃদ্ধ জগন্নাথের প্রবেশ
জগন্নাথ। দিদির গান বড় মিঠে।
প্রমীরা। আচ্ছা, হয়েছে, এখন যাও।
জগন্নাথ। যাব কেন? লুচি খাব না?
লুচি খাব না ? দিদির যে রাজার সঙ্গে
বিয়ে ! কি দিদি, সত্যি নাকি?
প্রমীরা। [ স্বগত ] এই রে সব বুঝি মাটি করে ! [ প্রকাশ্যে ] পাপা,
এদিকে একবার আসুন। দেখুন বুড়ােটা কি করছে !
জগন্নাথ। আর আমি যে বাবার বাবা।
দ্রুত সর্বেশ্বর ও নগেন্দ্রনাথের প্রবেশ
সর্বেশ্বর। এই বুড়াে, বড়লােকদের সামনে কি অসভ্যতা করছ ?
ঘৃতং পিবেৎ
জগন্নাথ। বড়লােক বলে বড়লােক, একেবারে রাজা। আর আমরা
গরিব।
সর্বেশ্বর। [ স্বগত ] আজ সর্বনাশ করলে !
নগেন্দ্র। [ হাসিয়া ] দেখছেন কুমারবাহাদুর, ভারতবর্ষের প্রাচীন
সভ্যতার ফলে কি রকম করে মানুষের মজ্জার মধ্যে বিনয়-গুণ
ঢুকে পড়েছে।
জগন্নাথ। তােমাদের মধ্যে রাজা কে ? তুমি বুঝি ?
সৰ্বেশ্বর। [ স্বগত ] হায় হায়, সব গেল !
জগন্নাথ । আমাদের টাকাকড়ি, ঘরবাড়ি, আঁকজমক সব মিথ্যে।
নগেন্দ্র। [ হাসিয়া ] দেখছেন কুমারবাহাদুর, ভারতবর্ষের লােকের
মনে বেদান্তের প্রভাব কত গভীর। শঙ্করাচার্যের কথা মনে করুন
ব্ৰহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা ।
জগন্নাথ । আমাদের আর সব মিথ্যা, সত্যি কেবল এই দিদিমণি।
সৰ্বেশ্বর। [ স্বগত ] ভগবান, বাঁচাও।
নগেন্দ্র। এইজন্যই অমর কবি চণ্ডীদাস বলেছেন—‘সবার উপরে মানুষ
সত্য, তাহার উপরে নাই।
জগন্নাথ। রাজাবাহাদুর, আমি তােমার দাদাশ্বশুর।
সর্বেশ্বর। চুপ বুড়াে, ভদ্রলােকের সম্মুখে যা তা বলছ ?
জগন্নাথ। বটে, যা তা! আমি তাের বাবা।
সর্বেশ্বর। [ স্বগত ] নাঃ, সব গেল !
নগেন্দ্র। আজ বড় বাড়াবাড়ি করছে ! [ জনান্তিকে সর্বেশ্বরের
প্রতি ] দাড়াও, আমি বাঁচিয়ে দিচ্ছি।
নগেন্দ্রনাথ মূচ্ছিত হইয়া মাটিতে পড়িয়া গোঁ গোঁ করিতে লাগিল—যেন মৃগী
রােগের আক্রমণ। সকলে কোলাহল করিয়া উঠিল
ঘৃতং পিবেৎ
সর্বেশ্বর। জল ! জল !
ত্রিদিব।. পাখা! বাতাস !
বিজয়। ডাক্তার ! ডাক্তার ।
জগন্নাথের ভীতভাবে প্রস্থান
সর্বেশ্বর।
কোন চিন্তা নেই, বিজয়বাবু; ত্রিদিববাবু, ভাববেন না ।
এখনই সেরে যাবে, এমন মাঝে মাঝে হয়। যাও, তােমরা এখান
থেকে যাও।
প্রমীরা ও মালবিকার প্রস্থান
তােমরা বাইরে যাও বাবা। ও এখনই সেরে উঠবে।
কদিন খুব খাটুনি যাচ্ছে, তাতেই। তার ওপরে আবার বুড়াের
উপদ্রব।
বিজয়। বুড়ােটাকে বিদায় করে দেন না কেন?
সর্বেশ্বর। অনেক দিনের পুরানাে কর্মচারী, তার উপরে আবার একটু
পাগলাটে ধরনের, মনে দয়া হয়।
ত্রিদিব। আচ্ছা, আমরা তা হ'লে আসি।
নীরজা, ত্রিদিব ও বিজয়ের প্রস্থান
নগেন্দ্র। [ উঠিয়া ] গেছে সব? দেখলে, কেমন সব দিক বাঁচিয়ে
দিলাম ।
সৰ্বেশ্বর। ওঃ, তুমি যে আজ কি উপকার করলে ! এখন বিয়েটা
হয়ে গেলে বাঁচা যায় ! চল, বাইরে যাই, ওদিকে না আবার
একটা গণ্ডগােল ঘটে ।
উভয়ের স্থান
দ্বিতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
সানি ভিলার বৈঠকখানা। অন্যান্য সব পূর্বোক্তরূপ।
অন্যান্য সব পূর্বোক্তরূপ। এক দিকের দরজা দিয়া
কথা বলিতে বলিতে একজন পাওনাদার ও সর্বেশ্বরের প্রবেশ
সর্বেশ্বর।
আর ভাবনা নেই হে, এবার মহারাজকুমার আমার
জামাই।
তােমার সব পাওনা মিটিয়ে দেব।
পাওনাদার। আজ্ঞে, সেই ভরসাতেই তাে ছিলাম এতদিন । ভগবানের
কৃপায় যখন বিয়েটা হয়ে গেছে, তখন আর আমাকে ঘােরাবেন না,
অনেকগুলাে টাকা
সর্বেশ্বর। না, আর দেরি করব না। তবে কি জান, নতুন জামাই,
প্রথম দিনেই তাে টাকা চাওয়া যায় না।
পাওনাদার। তা তাে বটে।
সর্বেশ্বর। দেখ, আর একটা কথা।—টাকার তাগিদ দিতে এখানে
এস না, আমি বরঞ্চ তােমার ওদিকে যাব। হঠাৎ বাবাজী যদি
এসব কথা শুনতে পায়, তবে বড় মুশকিল হবে।
পাওনাদার। জামাইবাবু কতদিন আর আছেন?
সর্বেশ্বর। বুড়াে মহারাজের অমতে বিয়ে করাতে কুমারের ওপর তিনি
বড় রেগে গেছেন। সেদিন চিঠি লিখেছেন, কুমারকে তিনি
ত্যাজ্যপুত্র করবেন, ভয় দেখিয়ে
পাওনাদার। কি সর্বনাশ! আমার পাওনা টাকাগুলো ?
সর্বেশ্বর। কোন ভয় নেই। একমাত্র ছেলে, বাপের অমতে বিয়ে
করলে তারা প্রথমে ও রকম রেগেই থাকে।
পাওনাদার। আজ্ঞে, তা বটে।
ঘৃতং পিবেৎ
৫৫
সর্বেশ্বর।
তবে চল বাইরে যাওয়া যাক। তাগিদ দিতে এখানে এস
—মনে থাকবে তাে?
পাওনাদার । আজ্ঞে হ্যা।
উভয়ের এক দ্বার দিয়া প্রধান, অন্য দ্বার দিয়া কথা বলিতে বলিতে ত্রিদিব ও
?
'তাহার পাওনাদারের প্রবেশ
পাওনাদার। দেখুন, জমিদারের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেখিয়ে অনেক
দিন আমাকে ঠেকিয়ে রেখেছেন, আর তত বিলম্ব করতে
পারি না।
ত্রিদিব । পার না? কেন, বিয়ে কি হয় নি
পাওনাদার। বিয়ে হয়েছে, কিন্তু টাকা তাে পেলাম না।
ত্রিদিব ।
পাবে হে, পাবে। শ্বশুরমশায়ের যা কিছু দেখছ, এখন
সবই তাে আমার। তাই বলে বিয়ের এক সপ্তাহের মধ্যেই তাে
আর টাকা চাওয়া যায় না ।
পাওনাদার। কিন্তু আমার পাওনাদারেরা তাে আমার জামাই নয়,
তারা টাকা চাইতে মােটেই সঙ্কোচ করে না।
ত্রিদিব। আরে বাপু, এত দিন সবুর করতে পারলে আর দশ দিন
পার না?
পাওনাদার। আচ্ছা, তাই হবে। দশ দিন পরে আবার আসব ।
ত্রিদিব। না না, এখানে তাগিদ দিতে এস না। শ্বশুরমশাই জানলে
মহা মুশকিল হবে। বরঞ্চ আমিই তােমার ওদিকে যাব ।
এক দ্বার দিয়া উভয়ের প্রস্থান ও অন্য দ্বার দিয়া প্রমীরার প্রবেশ
প্রমীরা। সকালবেলাতেই উনি কোথায় গেলেন ! না। একটু যদি
স্থির হয়ে বসেন ! দুটো কথা বলবার সময় পাই না! বিয়ের পরে
এখানে থাকতে আর ভাল লাগছে না। মালবিকা কেমন বিয়ের
ঘৃতং পিবেৎ
পর দিনই চলে গেল নীরজাবাবুর সঙ্গে, কালকে তাদের সংসার
দেখে এলুম। শুনছি, শীগগিরই ওরা বাড়ি ভাড়া দিয়ে, জমিদারির
একটা ব্যবস্থা করে বিলেতে যাবে বেড়াতে। আর আমার যেমন
কপাল ! দেখি, যদি তেতলায় থাকেন।
প্রমীরার প্রস্থান ও অন্য দ্বার দিয়া ত্রিদিব ও বিজয়ের প্রবেশ
ত্রিদিব। ওহে বিজয়, আর তাে এখানে টে কা যায় না !
বিজয়। কেন, শ্বশুরমশায় কিছু বলেছেন?
ত্রিদিব। তিনি নন, তাঁর কন্যা। সর্বদা খোচাচ্ছে, চল শ্বশুরবাড়িতে।
আর কিছু দিন এখানে থাকবার ব্যবস্থা করে দাও। তার পরে যা
হয় হবে।
বিজয়।
সে ব্যবস্থা আমি ঠিক করে এসেছি। আমাদের মতিকে
মনে আছে তাে? সে মাকড়দ’র বুড়াে মহারাজার দেওয়ান সেজে
আসছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পৌছবে।
ত্রিদিব। তারপরে?
বিজয়।
এসে
সর্বেশ্বরবাবু আর তােমাকে শাসিয়ে যাবে।
সর্বেশ্বরবাবু তার সম্পত্তি জামাইয়ের নামে লিখে না দিলে তােমাকে
ত্যাজ্যপুত্র করবেন—এই বলে সে ভয়ানক রাগারাগি করবে।
বুঝলে? তাতে ফল হবে এই যে, রায় বাহাদুরের সম্পত্তি তােমার
হাতের মধ্যে গিয়ে পড়বে শীগগির, আর যতদিন না পড়ছে তুমি
থাকবে এখানে।
ত্রিদিব। যাক, তবে কিছু দিন নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।
বিজয়। তােমার হাতে ওখানা কিসের চিঠি ?
ত্রিদিব। মিঃ রায়ের—আমার মনিব। শালা লিখছে যে, আর বেশি
দিন কামাই করলে সে অন্য ড্রাইভার দেখবে।
ঘৃতং পিবেৎ
৫৭
বিজয়। দেখুক না !
এখন রায়ের মত কত জনকে তুমি ড্রাইভার
রাখতে পার।
ত্রিদিব। ইচ্ছে আছে বেটাকে একদিন আচ্ছা করে শিক্ষা দোব, মাঝে
মাঝে এমন অপমান করত।
পিছন হইতে প্রমীরা নীরবে প্রবেশ করিল, ত্রিদিব ও বিজয় তাহাকে দেখিতে
পায় নাই
মােটর-ড্রাইভারদের যে কি দুঃখ, তা বুঝেছি। মােটরে চাপলেই
মাথা ঘুরে যায়।
বিজয়। যাক, এত দিন ছিলে তুমি পদাতিক, এবার হতে চললে রথী,
দেখা যাবে।
ত্রিদিব ।
তার চেয়ে বল, ছিলাম সারথি, হব রথী-
হঠাৎ প্রমীরাকে দেখিয়া কথা ঘুরাইয়া লইল
বুঝলে বিজয়, [ আবেগের সহিত ] আমার জীবনের আর কোন
উদ্দেশ্য নেই; অত্যাচারিত মােটর-ড্রাইভারদের দুঃখ আর সহ্য হয়
। এর একটা ব্যবস্থা করতেই হবে।
বিজয় ইতিমধ্যে প্রমীরাকে দেখিয়া সব কথা বুঝিয়াছে ; উভয়ে প্রমীরাকে
দেখিয়াছে, কিন্তু যেন দেখে নাই ভাব
বিজয়। আমি কতদিন থেকে তােমাকে বলছি, প্রথমে তােমার
ড্রাইভারদের দিয়েই কাজ আরম্ভ কর না কেন? দেখ নি
আমেরিকায় ? এবার ওরা মােটর-ড্রাইভারদের অ্যাসােসিয়েশন
থেকে প্রেসিডেন্টের জন্যে একজনকে দাড় করাবে।
ত্রিদিব। হুররা,
এই তাে চাই।
প্রমীরা। [ অগ্রসর হইয়া আসিয়া] তবে ইউরােপের বদলে আমেরিকায়
ঘৃতং পিবেৎ
চল না কেন? নিজের চোখে দেখে এসে এখানে সেই অনুসারে
কাজ কর ।
ত্রিদিব। বেশ তাে, এক জায়গায় গেলেই হল। তােমারই তাে ইচ্ছে
ছিল ইউরােপে যাবার।
প্রমীরা। আমার ইচ্ছে কি সাধে! নীরজাবাবু আর মালবিকা এই
মাসের শেষে যাচ্ছে যে ! তারা বাড়িঘর ভাড়া দিয়ে জমিদারির
ব্যবস্থা করেই রওনা হবে।
বিজয়। ত্রিদিবের অবশ্য বাড়িঘর জমিদারির ভাবনা নেই, সে ব্যবস্থা
আপনিই হবে।
তবে আর দেরি করে লাভ কি ?
বিজয়।
চল না ত্রিদিব, ও ঘরে গিয়ে বসে একটা হিসেবপত্র করা যাক।
ত্রিদিব। বেশ তাে! হাতে এখন কাজ নেই—চল, সব ঠিক করে
ফেলা যাক।
প্রমীরা।
তিনজনের প্রস্থান এবং সর্বেশ্বর ও নগেন্দ্রনাথের প্রবেশ
সৰ্বেশ্বর। ওহে, পাওনাদারদের তাে আর ঠেকানাে যায় না।
নগেন্দ্র। জামাই বলে কি ?
সর্বেশ্বর। আহা, বাবাজী বড় বিপদেই পড়েছে। রাজাবাহাদুর
এখনও তাকে ক্ষমা করেন নি। বাবাজী বড়ই চিন্তিত হয়ে
উঠেছে।
নগেন্দ্র। ও রকম হয়েই থাকে। কিন্তু তুমি ভয় পেও না, একে
বলে—হিন্দুবিবাহ; একবার যখন গলাধঃকরণ হয়েছে, ব্যবস্থা করতেই
হবে।
সর্বেশর। কিন্তু বাড়িওয়ালাই সবচেয়ে বেশি গােলমাল করছে।
ঘৃতং পিবেৎ প্রায়ই তাগিদ দিতে আসে ; সর্বদা ভয় হয়, কখন জামাতাবাবাজীর সামনে গিয়ে পড়ে। নগেন্দ্র। সত্যি কথা বলতে কি, বাড়িভাড়ার জন্যেই আমি ভাবছি অন্যদের আরও কিছুদিন ঠেকিয়ে রাখা যাবে। এমন সময় পিছন হইতে ত্রিদিব প্রবেশ করিল ; কেহ তাহাকে দেখিতে পায় নাই সৰ্বেশ্বর। আমিও বাড়িভাড়ার প্রবলেম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। বেটার যে রকম ভাব, কখন যে কি ক'রে বসে, তার ঠিক নেই। নগেন্দ্র। একটা কিছু ব্যবস্থা করতেই হবে। তীরে এসে তাে তরী ডােবানাে চলে না ! এমন সময়ে ত্রিদিবকে দেখিল, কিন্তু যেন দেখিতে পায় নাই ভাব আমি গভর্মেন্ট এবং কর্পোরেশন দুই জায়গাতেই এ সম্বন্ধে অনেক আলােচনা করেছি ; তারা বলে যে, বড়লােকদের তারা অসন্তুষ্ট করতে ভয় পায়। সৰ্বেশ্বর। [ ব্যাপার বুঝিয়া ] সে কথা মিথ্যে নয়। ধর, আমি যদি এ বাড়িখানা ভাড়া দিতাম, তবে কি ভাড়ার জন্যে তাগিদ দিতাম ? নগেন্দ্র। আহা, সে কথা হচ্ছে না। তাগিদ দেবার তাে একটা নিয়ম থাকা চাই। ত্রিদিব। [ অগ্রসর হইয়া আসিয়া ] যা বলেছেন। আসল কথা সব জিনিসের মধ্যে একটা শৃঙ্খলা থাকা দরকার। আপনারা যেমন বাড়িভাড়ার জন্যে ভাবছেন, আমি তেমনই ভাবছি মােটর- ড্রাইভারদের জন্যে । সর্বেশ্বর। [ স্বগত ] আমি যে কেন ভাবছি, তা আমিই জানি।
৬০
ঘৃতং পিবেৎ
ত্রিদিব ।
মােটর-ডাইভারদের ওপরে যে অত্যাচার হয়, তার ব্যবস্থা
করা আবশ্যক।
সর্বেশ্বর। ঠিক বাবা, তােমার মত লােক যদি ওদের জন্যে লাগে, তবে
কিছু সুবিধা করতে পারবে।
ত্রিদিব। [ স্বগত ] আমি যে কেন করছি, তা আমিই জানি।
নগেন্দ্র। অযথা অত্যাচার করেই তাে বড়লােক সব ধ্বংস হতে
চলল।
সর্বেশ্বর। সত্যি কথা বলতে কি, যদিও আমি বাড়িওয়ালাদেরই
একজন তবু বাড়িভাড়া দেবার দুঃখ যে কি, তা মনে প্রাণে
জানি।
ত্রিদিব। আমারও প্রায় সেই কথা। যদিও আমি মােটরের মালিক,
তবু মােটর-ড্রাইভারদের দুঃখ এখনও ভুলতে পারি নি
নগেন্দ্র। এই তাে চাই। আপনারা শ্বশুর জামাই যদি অত্যাচারের
বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হন, তবেই গরিবরা বাঁচবে। সব শ্বশুর-জামাই
যদি এ রকম হয়, তবে কি দেশের এ অবস্থা আর থাকবে ।
সর্বেশ্বর । [ স্বগত ] সব শ্বশুর এ রকম হ'লেই জামাইদের সর্বনাশ।
ত্রিদিব। [ স্বগত ] সব জামাই এ রকম হলেই শ্বশুরদের অবস্থা
কাহিল ।
নগেন্দ্র। চলুন, শুভস্য শীঘ্রং। বড়লােকদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কি
করতে পারি, একবার ভেবে দেখা যাক।
ত্রিদিব। ঠিক। আমরা যদি ধনীদের এখন থেকে সাবধান না করে
দিই, তবে দরিদ্ররা একদিন বিদ্রোহ করে আমাদেরই বিরুদ্ধে
দাড়াবে, তখন?
নগেন্দ্র। চলুন, একটা ব্যবস্থাপত্র রচনা করা যাক।
,
ঘৃতং পিবেৎ .
সৰ্বেশ্বর। চল, চল । [ স্বগত। আবার কখন কে পাওনাদার এসে
পড়ে, স’রে পড়া যাক।
সকলের প্রস্থান ও অন্য দ্বার দিয়া বাড়িওয়ালার প্রবেশ
বাড়িওয়ালা। তাে ভারী মুশকিল হ’ল। দু মাসের বাড়িভাড়া
পাওনা, অথচ এলে দেখাই পাওয়া যায় না। দেখা পেলেও লম্বা-
চওড়া কথা বলে ! কোথাকার রাজকুমার হয়েছে জামাই, সেই
নাকি দেবে সব টাকা। আর তােত দেরি করতে পারি না, নালিশ
করতেই হবে।
অন্য এক ব্যক্তির প্রবেশ
এক ব্যক্তি। মশাই, এখানে ত্রিদিব রায় থাকে?
বাড়িওয়ালা। [ বিরক্তি সহকারে ] কি জানি মশায়, জানি না।
এক ব্যক্তি। এটা তাে রায় বাহাদুর সৰ্বেশ্বরবাবুর বাড়ি বটে ?
বাড়িওয়ালা। [ মুখভঙ্গি করিয়া ] বটে—রায় বাহাদুরের চোদ
পুরুষের ভিটে ।
এক ব্যক্তি। চোদ্দ পুরুষের বাড়ি! উহু, এ বাড়ি তত অত পুরনাে
বলে মনে হয় না ।
বাড়িওয়ালা। তবু ভাল ! মশাই, এ বাড়ি আমার।
এক ব্যক্তি। আপনি বুঝি রায় বাহাদুরের
বাড়িওয়ালা। বাপ।
এক ব্যক্তি। তবে এত চটেন কেন?
বাড়িওয়ালা। চটব না? বেটা দু মাসের ভাড়া বাকি ফেলেছে, আর
লােকের কাছে বলে কিনা—বাড়ির মালিক সে!
এক ব্যক্তি। বাড়ির মালিক সে নয় ? আমরা তাে তাই জানি।
বাড়িওয়ালা। আপনার মাথা আর আমার মুণ্ডু।
মৃতং পিবেৎ
এক ব্যক্তি। কিন্তু বাড়িটা তার ?
বাড়িওয়ালা। না না না, আমার । দেখছেন না ভাড়ার তাগিদে
এসেছি? বেটা বলে কিনা, তার জামাই দেবে।
এক ব্যক্তি। তার জামাই ? সে পাবে কোথায় ?
বাড়িওয়ালা। সে নাকি কোথাকার রাজকুমার ।
এক ব্যক্তি। ত্রিদিব রায় রাজকুমার ? আরে, সে যে আমার মনিবের
মােটর চালায়।
বাড়িওয়ালা। [ বসিয়া পড়িয়া ]
[ বসিয়া পড়িয়া ] মশাই, আমি তাে আর চলতে
পারছি না।
এক ব্যক্তি। কেন ?
বাড়িওয়ালা। কেন? বুঝতে পারছেন না? আমি আশায় ছিলাম,
জামাই দেবে টাকা। এখন শুনছি সে মােটর-ড্রাইভার ।
এক ব্যক্তি। আমি শুনেছি, সে কোথাকার এক বড়লােকের মেয়েকে
বিয়ে করেছে। আমার মনিব আমাকে তার কাছে পাঠিয়েছেন,
সে কাজ করবে, না অন্য ড্রাইভার রাখবেন, তাই জিজ্ঞেস করতে।
লােকটা মােটর চালায় ভাল ।
বাড়িওয়ালা। শুধু মােটর কেন ? জুচ্চরির ব্যবসাও তত বেশ
চালাচ্ছে ! নাঃ, আমি আজই নালিশ ঠুকে দিচ্ছি।
এক ব্যক্তি। কিন্তু আমি কি করি ? তার তাে দেখা পেলাম না।
প্রস্থানােত
বাড়িওয়ালা। কিন্তু জেনে রাখুন, বাড়িটার মালিক আমি।
প্রস্থান
এক ব্যক্তি। যাই, মনিবকে সব কথা গিয়ে বলিগে।
তাহার প্রস্থান ও ত্রিদিবের বন্ধু মতিলালের মাকড়দ’র দেওয়ানের ছদ্মবেশে
প্রবেশ ; দেওয়ান বৃদ্ধ ; সঙ্গে সৰ্বেশ্বর
মতিলাল। হ্যা, দলিল তৈরি হয়ে গেছে।
ঘৃতং পিবেৎ
সর্বেশ্বর। কি সৰ্ব্বনাশ!
মতিলাল। এখন সৰ্ব্বনাশ বললে চলবে কেন? আগুনে হাত দিলে
যে হাত পােড়ে—এ কথা কি বােঝবার তার বয়স হয় নি ?
সর্বেশ্বর। মহারাজ আমাকে দণ্ড দিন, কিন্তু তার নিজের পুত্র ও
পুত্রবধূকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করবেন, এ কি মহারাজের মত
কাজ হল ?
মতিলাল। হ’ল না? রামনগরের রাজার মেয়ের সঙ্গে কুমারের
বিবাহ স্থির।নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা আর সরিফপুর পরগণা
নিয়ে তিনি সাধাসাধি করছিলেন। আর এরই মধ্যে কুমার এই
কাণ্ড করে বসলেন !
ত্রিদিবের প্রবেশ
এই যে কুমারবাহাদুর। সব শুনেছেন বােধ করি?
ত্রিদিব । শুনেছি বইকি। বাবার যা ইচ্ছে করুনগে, আমি যা কর্তব্য
বােধ করেছি, তাই করেছি।
মতিলাল। কিন্তু সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হলে চলবে কি করে ?
ত্রিদিব। জগতের সর্বহারাদের দলে আমি যােগ দোব।
মতিলাল। তা হলে আমি মহারাজকে সেই কথাই গিয়ে বলি?
সৰ্বেশ্বর। আহা বাবাজী, অত চঞ্চল হয়াে না, একটু স্থির হও।
ত্রিদিব। কেন, এত ভয় কিসের ? পৃথিবীতে তার ছাড়া আর কারও
কি সম্পত্তি নেই ?
মতিলাল। তবে আমি সেই কথাই মহারাজকে গিয়ে বলি।
মতিলাল প্রস্থানােত হইলে সর্বেশ্বর তাহার হাত ধরিয়া টানিতে লাগিল
৬৪
ঘৃতং পিবেৎ
বশ্যতা স্বীকার করব না।
ত্রিদিব। বলুন গিয়ে ; আমি কিছুতেই
আমি চললাম ।
ত্রিদিব প্রস্থানােত হইলে সৰ্বেশ্বর আর এক হাতে তাহার হাত ধরিয়া
টানিতে লাগিল
মতিলাল। ছাড়ুন, আমি চললাম ।
ত্রিদিব। ছাড়ুন, আমি চললাম ।
সর্বেশ্বর। [ দুই জনের হাত ধরিয়া টানিতে টানিতে ] আহা কুমার,
আহা দেওয়ানজী !
মতিলাল। ছাড়ুন।
ত্রিদিব। ছাড়ুন।
সর্বেশ্বর। আচ্ছা, এর কি কোন প্রতিকার নেই ?
মতিলাল। আছে বইকি! আপনার যাবতীয় সম্পত্তি যদি কন্যা-
জামাতার নামে দানপত্র করে দেন, তবেই মহারাজ কুমারকে ক্ষমা
করবেন।
সৰ্বেশ্বর। এর জন্যে ভাবনা কি? আমার যা কিছু আছে তা তাে
সবই এদের।
মতিলাল। শুধু কথায় মহারাজ ভিজবেন না। দানপত্রের দলিল
দেখলে তবে মহারাজ ত্যাজ্যপুত্র করবার দলিল বাতিল করবেন।
ত্রিদিব। না না, সে কিছুতেই হবে না।
সর্বেশ্বর। আহা, থাম না।
মতিলাল। আহা, ছাড়ুন না।
সর্বেশ্বর। আচ্ছা, তাই হবে।
মতিলাল। শুধু কথা নয়, কাজ চাই।
স্বতং পিবেৎ,
সৰ্বেশ্বর। আচ্ছা, আপনারা ও ঘরে গিয়ে বসুন, আমি আসছি।
মতিলাল। কাজ চাই, কাজ—এখনই।
প্রস্থান
ত্রিদিব। না না, সে কিছুতেই হবে না।
প্রস্থান
সৰ্বেশ্বর। সর্বনাশ ! এখন যে দু কুল যায়, করি কি ?
নগেন্দ্রনাথের প্রবেশ
ওহে নগেন, সব শুনেছ তাে ? এখন করি কি ?
নগেন্দ্র। কোন ভয় নেই। সবচেয়ে পাকা দলিল হয়ে গেছে, তা
আর বাতিল হতে পারে না।
সর্বেশ্বর। কোথায় ? কি ?
নগেন্দ্র। বিয়ে হে, বিয়ে। যাকে বলে—হিন্দুবিবাহ। এ দলিল আর
কেঁচে যাবার উপায় নেই। ত্রিকালজ্ঞ ঋষিরা কি ব্যবস্থাই না করে
গেছেন! দু দিন বাদে সব ঠিক হয়ে যাবে ।
সর্বেশ্বর। কিন্তু দেওয়ানজী যে বসে রইলেন !
বেশ তাে, আমরাও আর এক ঘরে গিয়ে বসিগে। অত ব্যস্ত
হলে কি চলে? চল ।
দ্বিতীয় দৃশ্য
নীরজানাথের নিজ বাড়ি ; বৃহৎ, সুন্দর ও সুসজ্জিত। তাহারই একটি ড্রয়িং-রূমে
সকালবেলায় নীরজানাথ ও মালবিকা কথাবার্তা বলিতেছে। মালবিকা বাহিরে
যাইবার জন্য সজ্জিত ; নীরজানাথের বাড়িতে থাকিবার পরিচ্ছদ
নীরজা। এত সকালেই কোথায় চললে ?
মালবিকা। সকাল কোথায়? আটটা বাজে যে ! তােমার মত ঘুমিয়ে
কাটালে আমার চলে কই ?
।
মৃতং পিবেৎ । । নীরজা। ঘুমিয়ে কি আর সাধে কাটাই! উই আর সাচ স্টাফ দ্যাট ড্রীম্ আর মেড অন । মালবিকা। স্বপ্ন নিয়ে কাটালে কাজ চলে না। নীরজা। কাজ নাই চলল, স্বপ্নটাই চলুক না। কিন্তু তােমার এত ব্যস্ততা কেন? এখন তাে তুমি আর প্রাইভেট সেক্রেটারি নও, ইচ্ছে করলে পাঁচজন রাখতে পার। মালবিকা। আরও চারজন ? একজনকে নিয়েই যে মুশকিলে পড়েছি ! কিন্তু বাজে কথা যাক। বাড়ি ভাড়া দেবার কি করলে? নীরজা। কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছি। কালকে একজন এসে আড়াই- শাে টাকা বলে গেছে। মালবিকা। না, এত বড় বাড়ি আড়াইশাে টাকায় দেওয়া চলবে না। আমার এক বন্ধু বাড়ি খুজছিল, পছন্দ হ'লে সে তিনশাে পর্যন্ত দেবে বলেছে। নীরজা। তুমি বুঝি তারই কাছে চললে ? কিন্তু এত তাড়া কেন ? মালবিকা। এখনও বলছ তাড়া কেন? বিয়ে হলে পুরুষমানুষ সব প্রতিজ্ঞা ভুলে যায় দেখছি। নীরজা। কিন্তু আমি বিস্মিত হচ্ছি, মেয়েমানুষে পুরুষের বিয়ের আগেকার সব প্রতিজ্ঞাকে কি করে সত্যি মনে করে। মালবিকা। বটে ! এখন বুঝি চালাকি ! সে হবে না, আমি পাস- পাের্টর জন্যে দরখাস্ত পাঠিয়ে দিয়েছি। তাড়াতাড়ি বাড়ি ভাড়া দাও, জমিদারির বন্দোবস্ত করে ফেল; অন্তত দুটি বছর ইউরােপে আর আমেরিকায় ঘুরতে হবে। নীরজা। তবু ভাল যে, একেবারে দ্বাদশ বছরের জন্যে বনবাস নয়। মালবিকা। না না, ঠাট্টা নয়। ত্রিদিববাবুর কথা শুনলে রাগে
ঘৃতং পিবেৎ
৬৭
গা জ্বলে যায়। কথায় কথায় জার্মানি আর সুইজারল্যাণ্ড।
ওরাও শিগগির রওনা হবে; কিন্তু ওদের আগে আমাদের যাওয়া
চাই।
সে তত বুঝলাম, কিন্তু বিদেশে খরচ অনেক, চালাবে কি
নীরজা।
মালবিকা। কেন, বাড়িটা ভাড়া হলে মাসে শ-তিনেক পাওয়া যাবে,
তা ছাড়া জমিদারির আয় আছে, সে আমি দেখব এখন, তুমি একটু
ওঠ। আমি চললাম।
মালবিকার দ্রুত প্রস্থান ; নীরজানাথ কোচের উপর অলসভাবে শুইয়া পড়িল ;
কিছুক্ষণ পরে
নীরজা। নাঃ, আরামে দেশের ছেলে দেশে থাকব, না কোথায়
এখন বিদেশে ছুটতে হবে! বিয়ে হবার আগে ছিলাম গাড়ির মত
আস্তাবলে পড়ে আরামে ; এখন সঙ্গে দিয়েছে একটা ঘােড়া জুড়ে,
আর বিশ্রাম নেই। উঠি, নায়েবকে কলকাতায় আসবার জন্যে
একটা তার ক'রে দিই।
শম্ভ নামক ভূত্যের প্রবেশ
শম্ভু। বাবু, এক বাবু দেখা করতে এসেছেন।
নীরজা। কোন্ বাবু আবার? আচ্ছা, নিয়ে আয়।
ভৃত্যের প্রস্থান
কে আবার এল ? একটু আরাম করতে দেবে না।
উকিল রমানাথবাবুর প্রবেশ
রমানাথ। মিঃ চৌধুরী, আপনি আমাকে চিনতে পারবেন না, তবে
আমার এইটুকু পরিচয় দিলেই যথেষ্ট হবে যে, আপনার জ্ঞাতি ভ্রাতা
নিখিলবাবু আমার মক্কেল।
সুতং পিবেৎ
মীরজা।
বসুন, বসুন। নিখিল এখন আছে কোথায়? অনেক দিন
তার খবর জানি না ।
রমানাথ। তিনি কানপুরেই থাকেন। আপনি ও অঞ্চল অনেক দিন
ছেড়েছেন, তাই খােজ-খবর রাখেন না। নিখিলবাবুর চিঠি পেয়ে
আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।
নীরজা। [ হাসিয়া ] কি, বিয়ের জন্যে কগ্রাচুলেশন্স জানাতে নাকি ?
রমানাথ। হঁা—এক রকম, প্রায় সেই রকমই। আসল কথা কি জানেন,
কগ্রাচুলেশও জানাতে তিনি লিখেছেন বটে ।
নীরজা। তা হলে এ ছাড়া অন্য কথাও আছে দেখছি।
রমানাথ। হ্যা, একটু ছিল বইকি। ইফ ইউ ডােন্ট মাইণ্ড, ইট ইজ
আওয়ার প্রফেশন।
নীরজা। অফ কোস।
রমানাথ। মন্দাকিনী দেবীর সঙ্গে আপনার বিয়ে হয়েছিল, অবশ্যই
মনে আছে ?
নীরজা। বিলক্ষণ ! ব'লে যান।
রমানাথ। ইফ ইউ ডােন্ট মাইণ্ড, সে বিয়ে খুব সুখের হয় নি।
নীরজা। হ্যা, সে একটা ট্র্যাজিক ব্যাপার। তারপরে ?
রমানাথ। আপনাদের দুজনের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়েছিল।
নীরজা।
তাতে কি হয়েছে?
রমানাথ। আপনার ফাদার আপনার ওপরে খুব বিরক্ত হয়েছিলেন ?
নীরজা। হ্যা, তার ধারণা হয়েছিল, আমার দোষেই ব্যাপারটা হয়েছে।
রমানাথ। হ্যা, নিখিলবাবুর কাছে শুনেছি, তিনি খুব একগুয়ে আর
খেয়ালী লােক ছিলেন। তার পরে যে সব কাণ্ড ঘটেছিল, তা বােধ
হয় আপনি জানেন না ?
ঘৃতং পিবেৎ
নীরজা। না, বিশেষ কিছুই জানি না। সেই ব্যাপারের পর আমি
ও অঞ্চল ছেড়ে বাংলা দেশে এসেছি।
রমানাথ। খেয়ালী লােকের স্বভাব যা হয় তাই হয়েছে। মৃত্যুর সময়ে
তিনি এক শক্তি দানপত্র করে গিয়েছিলেন—বােধ হয় আপনাকে
দণ্ড দেবার জন্যেই।
নীরজা। কি ব্যাপার ?
রমানাথ। দানপত্রটা এই রকমের
নীরজা। বলুন, খুলে বলুন।
রমানাথ। সেই দানপত্রের প্রধান শর্ত ছিল এই যে-আপনি দ্বিতীয় বার
দারপরিগ্রহ না করা পর্যন্ত সমস্ত সম্পত্তি, বাড়িঘর আপনারই
থাকবে-
নীরজা। আর দ্বিতীয় বার বিবাহ করলে?
রমানাথ। যাবতীয় সম্পত্তি, জমিদারি, বাড়িঘর আপনার জ্ঞাতি ভ্রাতা
নিখিলবাবু পাবেন।
নীরজা। [ কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া ] নিখিল বুঝি সেইজন্যেই আপনাকে
পাঠিয়েছে ?
রমানাথ! আই হােপ, ইউ ডােন্ট মাইণ্ড।
নীরজা। হু ! নিখিল সংবাদটা এরই মধ্যে পেয়েছে ?
রমানাথ। নিজের স্বার্থের জন্যে সবাই খোঁজ-খবর রাখে। আমাকে
তিনি লিখেছিলেন ব্যাপারটার তদন্ত করতে। আমি তাে প্রথমে
একটু মুশকিলেই পড়েছিলাম।
নীরজা। কেন?
রমানাথ। দলিলে আপনার নাম নৃপনাথ ; কিন্তু এখানে আপনি
নীরজা নামে পরিচিত।
90
ঘৃতং পিবেৎ
নীরজা।
মা ছছাটবেলায় নীরজা নামে ডাকতেন। অবশ্য নৃপমাথ
নামেই আমি পরিচিত। কিন্তু বিয়ের সেই দুর্ঘটনার পর থেকে
আমি নীরজাই ব্যবহার করে আসছি।
রমানাথ। নিখিলবাবুকে আমি কি লিখব তা হ'লে ?
নীরজা। কিন্তু তার আগে একবার দলিলখানা আমার দেখা দরকার।
রমানাথ। [ দলিল বাহির করিয়া ] এই যে, দলিলের একখানা কপি
নিখিলবাবু পাঠিয়েছেন।
নীরজা। [ দলিলখানা লইয়া পাঠ করিয়া ] হু। দলিলখানা আমি
রাখতে পারি কি?
রমানাথ। এখানা আপনাকে দেবার জন্যেই নিখিলবাবু পাঠিয়েছেন।
নীরজা। হু ।
রমানাথ। নিখিলবাবুকে কি ইস্টশন পাঠাব বলুন?
নীরজা। আইন যখন আপনাদের দিকে, তখন আর ভাবনা কিসের ?
রমানাথ। আমি তা হলে উঠি। আই হােপ, ইউ ডােন্ট মাইণ্ড
ফর দিস ট্রা।
নীরজা।
অফ কোসনট।
রমানাথ প্রস্থান করিল। নীরজা দলিলখানা হাতে করিয়া মূঢ়ের মত বসিয়া
রহিল। মালবিকার প্রবেশ
মালবিকা। বেশ, এখনও তেমনই চুপ করে বসে আছ ? এ কি,
তােমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? অসুখ করেছে নাকি?
নীরজা তাড়াতাড়ি দলিলখানা লুকাইয়া ফেলিল
নীরজা। না না, বেশ আছি।
মালবিকা। তবে ওঠ, পাশের ঘরে মিসেস রায়কে বসিয়ে রেখেছি।
ঘৃতং পিবেৎ
৭১
সে তিনশাে টাকা দিতেই রাজি হয়েছে। যাও, তার সঙ্গে
কথাবার্তা ঠিক কর গিয়ে।
নীরজা'। হু।
মালবিকা। হু কি? ভদ্রমহিলাকে ডেকে আনলাম, তার তাড়া
আছে-
নীরজা।
আমার নেই।
মালবিকা। তার মানে ?
নীরজা। বাড়ি ভাড়া দোব না।
মালবিকা। সে কি কথা?
নীরজা। হু।
মালবিকা। ও আবার কি রকম ? বাড়িভাড়া না পেলে শুধু
জমিদারির আয়ে বিদেশে চলবে?
নীরজা। জমিদারিরও ব্যবস্থা করব না।
মালবিকা। তা হলে বিদেশে যাবে কি করে ?
নীরজা। যাব না।
মালবিকা। বাঃ! কি হয়েছে তােমার, বল তাে?
নীরজা। বলব, যদি ক্ষমা কর ।
মালবিকা। সব ক্ষমা করব, যদি তাড়াতাড়ি এই কাজগুলাে সেরে
ফেল।
নীরজা। এখনই সংবাদ পেলাম, বাবা
মৃত্যুর সময়ে বাড়িঘর,
জমিদারি সব আমার এক জ্ঞাতি ভ্রাতার নামে দানপত্র ক'রে
গেছেন।
মালবিকা। কি যে বলছ !
নীরজা। এক বর্ণও মিথ্যে নয় ।
৭২
বৃতং পিবেৎ
মালবিকা। তােমার পৈতৃক সম্পত্তি, দান।
করলেই হল?
মামলা কর।
নীরজা। সে যুক্তি চলবে । বাবা সব
নিজে রােজগার
করেছিলেন।
মালবিকা। [ বসিয়া পড়িয়া ] আমি কিছু বুঝতে পরছি না।
নীরজা। হু ।
মালবিকা। কেন হঠাৎ এ খেয়াল তার হ’ল ?
নীরজা। ক্ষমা করতে পারবে তাে ?
মালবিকা। বল, বল ।
নীরজা। আমি এর আগে একবার বিয়ে করেছিলাম।
মালবিকা। [ চমকিয়া উঠিয়া ] বিয়ে করেছিলে ? সে স্ত্রী?
নীরজা। মারা গেছে।
মালবিকা। [ খানিকটা নিশ্চিন্ত হইয়া ] তারপরে ?
নীরজা। বাবা রেগে গিয়ে এই দানপত্র করে গেছেন—দ্বিতীয় বার
বিয়ে করলে আমি কিছুই পাব না।
মালবিকা কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া উঠিয়া দাড়াইল
মালবিকা। তােমরা সবাই এক রকম, মিথ্যেবাদী, শঠ, কাপুরুষ
সকলে।
নীরজা। আর কে ?
মালবিকা। তুমি, তুমি, তুমি
মালবিকা সবেগে প্রস্থান করিল। নীরজা মূঢ়ের মত মাথায় হাত দিয়া
বসিয়া রহিল
তৃতীয় দৃশ্য
সানি ভিলার একটি সুসজ্জিত কক্ষ ; কক্ষটি নির্জন ; এক দিক দিয়া পতিরামের
প্রবেশ ; পতিরাম একেবারে জরাগ্রস্ত বৃদ্ধ ; হাতে লাঠি ; বৃদ্ধ ঘরে প্রবেশ
করিয়া এদিক ওদিক তাকাইয়া দেখিল, কেহ নাই ; ঘরের সাজসজ্জা বড়লােকের
বাড়ির মত দেখিয়া স্বাস্তর নিশ্বাস ফেলিল ; সে ত্রিদিবের পিতা
পতিরাম। আরে, এ যে বড়লােকের বাড়ি ! শুনেছিলাম, ত্রিদিব
জমিদারের মেয়েকে বিয়ে করেছে। জমিদার তাতে আর সন্দেহ
কত বড় আয়না ! কত বড় ঘড়ি ! যাক, ত্রিদিব এখন
সুখে থাকবে। দু দিন বাদে সবই তাে তার। আমিও একটা
ঘরে জায়গা করে নোেব। একেই বলে—অদৃষ্ট। অদৃষ্ট! কিন্তু
কাউকে যে দেখচি না !
জগন্নাথের প্রবেশ
মশাই, এটা কি সানি ভিলা?
জগন্নাথ। আজ্ঞে হ্যা। কাকে চান ?
পতিরাম। ত্রিদিবকুমার ?
জগন্নাথ। ওরা সব বেড়াতে গেছে। বড়লােকের
ব্যাপার!
[ স্বগত ] রাজার ছেলে নিয়ে কারবার, না বেড়ালে চলে ।
পাতিরাম। [ স্বগত ] বাবা! জমিদারের মেয়েকে বিয়ে করেছে,
যাবেন না এখন বেড়াতে !
জগন্নাথ। [ স্বগত ] এ লােকটা কে ? হয়তো রাজবাড়ির চাকর হবে।
বসতে বলা যাক, নইলে হয়তাে চটে যাবে। [ প্রকাশ্যে ] বসুন,
বসুন, ওরা সবাই এল বলে।
পতিরাম। [ স্বগত ] এ লােকটা কে? হয়তাে জমিদারের চাকর
হবে। কাজ নেই বাপু চটিয়ে, বসা যাক।
৭৪
ঘৃতং পিবেৎ
!
জগন্নাথ। মশায়ের কি করা হয় ?
পতিরাম। বুড়াে হয়ে পড়েছি, এখন আর কি করব বলুন?
যখন গায়ে শক্তি ছিল, চোখে দেখতে পেতাম, কানে শুনতাম,
করতাম ইস্কুল-মাস্টারি।
জগন্নাথ। তারপরে ?
পতিরাম। বয়স হ’লচোখের দৃষ্টি গেল, কানের শক্তি গেল, দিলে
ইস্কুল থেকে তাড়িয়ে, তখন আবার নতুন করে চাকরি খুঁজতে
লাগলাম।
জগন্নাথ। বটে ! বটে ও অবস্থায় কি চাকরি জুটল ?
পতিরাম। ও অবস্থায় কি আর চাকরি মেলে ? অনেক দিন ঘুরলাম
—কেউ রাখতে চায় না, বলে—আমাকে দিয়ে আর কি কাজ হবে ?
জগন্নাথ। তখন ?
পতিরাম। ভগবান আছেন মশাই, ভগবান আছেন। অদৃষ্টে চাকরি
জুটে গেল—এক মাসিকপত্রের সম্পাদকের কাজ।
জগন্নাথ। বলেন কি ? মাসিক-পত্রের সম্পাদক ? চোখে দেখতে,
কানে শুনতে পান না, তবু
পতিরাম। ওকেই বলে—অদৃষ্ট, দাদা! শুনলাম, ও কাজ নাকি বেশি
দেখতে শুনতে পেলে চলে না।
ওরা আমার মতই একজন
লােক খুঁজছিল।
জগন্নাথ। কাগজ কেমন চলল ?
পতিরাম। ওরে বাপরে, তার পর থেকে গ্রাহকের সংখ্যা হুহু শব্দে
বেড়ে চলল ! এখন সেখানা বাংলা দেশের শ্রেষ্ঠ মাসিক।
জগন্নাথ। তা হলে এখনও আপনি সম্পাদক ?
স্বতং পিবেৎ ৭৫ পতিরাম। দাদা, চাকরি গেছে। কি বুদ্ধি হ’ল ! ভাল ক'রে কাজ করবার জন্যে চোখ কাটালাম, দৃষ্টি ফিরে পেলাম। দেখে কাগজের স্বত্বাধিকারী রেগে আমাকে বিদায় করে দিলেন, আর তাকেই বা দোষ দিই কি করে ! দৃষ্টি ফিরে পাবার পর থেকে কাগজের গ্রাহক-সংখ্যা কমছিল। জগন্নাথ। এখন কি করবেন ? পতিরাম। বুড়াে বয়েসে আর চাকরি করব না। এখন ঠিক করেছি, ইস্কুলের জন্যে পাঠ্যপুস্তক লিখতে আরম্ভ করব । জগন্নাথ । পারবেন? পতিরাম । ও ছাড়া আর কিছুই এখন পারব না। বার্ধক্যকে দ্বিতীয় শৈশব বলে । এখন শিশুদের বই বেশ সহজে লিখতে পারব। জগন্নাথ । [ হাসিয়া ] তারপরে আবার যদি চোখের দৃষ্টি যায়, মাসিক- পত্রের সম্পাদকগিরি তাে আছেই। কি বলেন? পতিরাম। সে আর বলতে। কিন্তু ওরা আসবে কখন ? জগন্নাথ। ওই বােধ হচ্ছে ওদের পায়ের শব্দ। এক দিক দিয়া সর্বেশ্বর ও ত্রিদিবের প্রবেশ ; তাহারা উভয়ের পিতাকে দেখিয়া স্তম্ভিত হইয়া গেল পতিরাম ও জগন্নাথ, ত্রিদিব ও সর্বেশ্বরের দিকে অগ্রসর হইয়া পতিরাম, জগন্নাথ । [ যুগপৎপরস্পরের প্রতি ] এই যে আমার ছেলে, ও মশাই, এই দেখুন। পতিরাম। এখন হয়েছে জমিদারের জামাই। জগন্নাথ। এখন হয়েছে রাজার শ্বশুর।
৭৬ ঘৃতং পিবেৎ ত্রিদিব, সৰ্বেশ্বর। [ যুগপং ] কি বাজে বকছেন? বুড়ােদের নিয়ে মহা মুশকিল ! বাজার-সরকারদের নিয়ে পতিরাম, জগন্নাথ । [ যুগপৎ ] তবে রে বেটা ! কে তাের বাজার- সরকার ? পতিরাম। না হয় হয়েছিস জমিদারের জামাই। জগন্নাথ। না হয় হয়েছিস রাজার শ্বশুর। পতিরাম, জগন্নাথ। [ যুগপৎ ] তাই বলে বাপকে অস্বীকার করবি ? ত্রিদিব, সৰ্বেশ্বর। [ যুগপৎ ] কে কার বাপ ? পতিরাম। [ জগন্নাথের প্রতি ] দেখেছেন মশাই, বড়লােকের মেয়ে বিয়ে করে কি আস্পর্ধা! জগন্নাথ । [ পতিরামের প্রতি ] শুনছেন মশাই, কি আস্পর্ধা রাজার শ্বশুর হয়ে ! পতিরাম, জগন্নাথ। [ যুগপৎ ] বাপকে অস্বীকার ! ত্রিদিব, সর্বেশ্বর। কি যে বকছ তুমি ? জগন্নাথ। বটে। আবার চোখ রাঙানাে হচ্ছে। পতিরাম। দেখ বেটা, সব ফঁস করে দোব। জানেন মশাই, বেটা করে—মােটর-ড্রাইভারি। জগন্নাথ। [ হাসিয়া ] এ বাড়িঘর আমাদের নয়, সব ভাড়া। জমিদার আবার কে ? ত্রিদিব সৰ্বেশ্বর নিজ নিজ পিতার মুখ চাপিয়া ধরিল ; তাহারা ছটফট করিতে করিতে অর্ধব্যক্তভাবে কি সৰ বলিতে লাগিল ত্রিদিব ও সর্বেশ্বর। চুপ, চুপ, বুড়াে।
স্বতং পিবেৎ,
৭৭
পতিরাম। বটে রে ! বুড়াে ! বাপ বলতে পারিস না?
জগন্নাথ। সত্যি কথা বলব না ? ওর কোন পুরুষে জমিদার নয় ।
সৰ্বেশ্বর। চুপ।
জগন্নাথ । চুপ করব—আগে ‘বাপ’ বল ।
ত্রিদিব ।
বের হও বলছি। এ আমার শ্বশুরবাড়ি ।
পতিরাম । চোদ পুরুষের শ্বশুরবাড়ি ।
শুনছিস না,
এ বাড়ি
ভাড়া। .
সৰ্বেশ্বর। বাবা ত্রিদিব, তুমি ও পাগলের কথা বিশ্বাস কর না।
ত্রিদিব। আপনিও করবেন না। এ বুড়ােটা অমন ক'রেই ব'লে
থাকে।
বাড়িওয়ালা ও পূর্বোক্ত ব্যক্তির প্রবেশ
বাড়িওয়ালা। যাক, পাওয়া গেছে।
এক ব্যক্তি। এই যে, ত্রিদিববাবু।
সর্বেশ্বর ও ত্রিদিবের মহাব্যস্ত ভাব
ত্রিদিব। হবে, হবে, পরে হবে।
সর্বেশ্বর। এখন যান, এখন যান।
বাড়িওয়ালা। দু মাসের ভাড়া বাকি, শােধ করে দিন, যাচ্ছি ।
জগন্নাথ । শুনলেন তত মশাই, এ বাড়ি কার ?
এক ব্যক্তি। ত্রিদিববাবু, আপনি চাকরি করবেন, না বাবু অন্য ড্রাইভার
দেখবেন ?
পতিরাম। শুনলেন তত মশাই, আমার কথা সত্য কি না?
ত্রিদিব ও সর্বেশ্বর নিজেদের সম্মান রক্ষার একবার শেষ চেষ্টা করিল
ত্রিদিব ও সর্বেশ্বর ।
এখন ঠাট্টার সময় নয়, মনে রাখবেন।
৭
ঘৃতং পিবেৎ
!
বাড়িওয়ালা। ওরে বাবা! এ যে দুপুরে ডাকাতি! বাড়িভাড়া
চাইতে এলে বলে ঠাট্টা !
এক ব্যক্তি। মােটর-ড্রাইভারের মুখে এমন বড় বড় কথা তাে
শুনি নি।
বাড়িওয়ালা। মােটর-ড্রাইভার কে ? ওই জামাই ? হায় হায় !
আমি তাে জানি, উনি হচ্ছেন রাজকুমার, ভাড়া দেবেন উনিই।
পতিরাম। [ নিজেকে দেখাইয়া হাসিতে হাসিতে ] আর এই যে
আমি স্বয়ং রাজা বাহাদুর।
বাড়িওয়ালা। সর্বনাশ হয়েছে। যাই উকিলের বাড়িতে।
প্রস্থান
এক ব্যক্তি। সবই বুঝলাম, যাই, বাবুকে বলিগে
প্রস্থান
সর্বেশ্বর। বাবাজী, এসব কি শুনছি ?
ত্রিদিব। শ্বশুরমশাই, আমিও তাে ওই প্রশ্ন করতে পারি।
সর্বেশ্বর ও ত্রিদিবের দুই দিক দিয়া প্রস্থান
জগন্নাথ। আসুন আসুন, রাজা বাদশা সব মিথ্যে। তবু ভাল যে,
ছেলে ফিরে পাওয়া গেল। একটু মিষ্টিমুখ করে যান।
জগন্নাথ ও পতিরামের প্রস্থান
প্রমীরার সবেগে প্রবেশ ; সে আসিয়া চেয়ারের উপর বসিয়া পড়িয়া নীরবে
কিছুক্ষণ টেবিলের উপর মাথা নত করিয়া রহিল ; তারপরে উঠিয়া চুল হইতে
ফুল ও কণ্ঠ হইতে হার খুলিয়া সজোরে মেঝের উপরে নিক্ষেপ করিয়া সবেগেই
প্রস্থান করিল। অন্য দ্বার দিয়া মালবিকার ও পিছনে নীরজার প্রবেশ
মালবিকা। যাও যাও, ভণ্ড কাপুরুষ! যাও এখান থেকে।
নীরজা। শােন মালবিকা।
ঘৃতং পিবেৎ মালবিকা। যাও বলছি। নীরজার প্রস্থান ও প্রমীরার প্রবেশ প্রমীরা, সর্বনাশ হয়েছে। প্রমীরা। সব শুনেছি। ভণ্ড, কাপুরুষ, নিলজ্জ- মালবিকা। তুই তা হলে এর মধ্যেই শুনেছিস? বিয়ে যে করেছিল, তা বলে নি কেন ? প্রমীরা। কি সর্বনাশ ! আবার বিয়েও করেছিল নাকি ? আমি তাে শুনলাম, জমিদারির কথাই মিথ্যে। মালবিকা। কি সর্বনাশ! জমিদারিও মিথ্যে নাকি? পুরুষমানুষকে আর বিশ্বাস করবার উপায় নেই। প্রমীরা। ওর বুড়াে বাপ এসেছিল। মালবিকা। আবার বাপ এল কোখেকে ? তুই কার কথা বলছিস ? প্রমীরা। আমার স্বামীর। তুই কার কথা ভাবছিস? মালবিকা। আমার স্বামীর। প্রমীরা। নীরজাবাবু? মালবিকা। ত্রিদিববাবু? প্রমীরা। নীরজাবাবু আগে বিয়ে করেছিলেন? সে স্ত্রী তাে নেই, তাের ভাবনা কিসের? মালবিকা। কিন্তু ত্রিদিববাবুর জমিদারির কথা কি বলছিস? প্রমীরা। সব মিথ্যে। মালবিকা। কি বলিস ? প্রমীরা। কিন্তু নীরজাবাবুর জমিদারি তত মিথ্যে নয়। মালবিকা। প্রায় মিথ্যে হয়ে দাড়িয়েছে। কিন্তু কিছু বুঝতে পারছি না।
০
স্বতং পিবেৎ
প্রমীরা। চল, ও ঘরে চল।
উভয়ের প্রস্থান
ঘর কিছুক্ষণ নির্জন ; ঘড়িতে নয়টা বাজিল
এক দ্বার দিয়া মালবিকার ও অন্য দ্বার দিয়া নীরজার প্রবেশ
মালবিকা। আবার এসেছ ? যাও, তােমার মুখ দেখতে চাই না।
নীরজা।
শােন, রাগ কর না। আমাদের সমাজে পুরুষের দুবার
বিয়ে করা তাে অন্যায় নয়। তার ওপরে সে স্ত্রী বেঁচে নেই।
সত্যি কথা বলতে কি, তােমাকে পেয়ে তার কথা আর মনেই
হয় না ।
মালবিকা নীরব
তােমার মত লক্ষ্মী মেয়ের কাছে তাকে কি মনে থাকে। আর
অনেক যন্ত্রণাও সে দিয়েছে।
মালবিকা। তুমি না যাবে তাে আমি চললাম ।
মালবিকার সবেগে প্রস্থান। নীরজা হতাশ হইয়া চেয়ারে বসিয়া পড়িল
নীরজা। নাঃ, কিছুতেই তাে শান্ত হয় না। পুরুষের দুবার বিয়ে
করায় যে স্ত্রীর এত রাগ হতে পারে, তা জানতাম না। কি করি?
ত্রিদিবের প্রবেশ
ত্রিদিব। কিছু মনে করবেন না নীরজাবাবু, পাশের ঘর থেকে
সব শুনেছি।
নীরজা। বেশ
বেশ করেছেন। কিন্তু কি করি মশাই ? উনি তত
মারমূৰ্ত্তি ।
ত্রিদিব। আপনার আগের বিয়েতে উনি যদি রাগ করেন, তা হলে
আপনিও তাে রাগ করতে পারেন।
ঘৃতং পিবেৎ
৮১
নীরজা। রাগ করবার কোন একটা ছুতাে পেলে তাে বেঁচে যাই,
বলুন না—কি উপলক্ষ্যে রাগ করি ?
ত্রিদিব ' কেন, আপনি কি জানেন না যে, উনিও আগে একবার বিয়ে
করেছিলেন ?
নীরজা। [ চমকিত হইয়া ] কে ? মালবিকা ?
ত্রিদিব। আপনি জানেন না ?
নীরজা। মালবিকা? আগে বিয়ে করেছিল ? কি বলছেন?
ত্রিদিব। আমার স্ত্রীর কাছ থেকে শুনেছি। আপনাকে বলে তাে
অন্যায় করলাম দেখছি।
নীরজা। অন্যায় কিছুমাত্র নয় ।
ত্রিদিব। আপনি হয়তাে আমাকে অবিশ্বাস করছেন ? আমার স্ত্রীকে
ডেকে প্রমাণ করিয়ে দিতে পারি।
নীরজা।
না, প্রমাণের আর প্রয়ােজন নেই।
ত্রিদিব। আমি তাকে ডেকে আনছি।
প্রস্থান
নীরজা। [ উচ্চৈঃস্বরে ] না না, তার দরকার নেই। [ নিম্নস্বরে ] উঃ,
কি ভীষণ! ভগবান !
সে টেবিলের উপর হাতে ভর করিয়া মাথা নত করিয়া রহিল ; কক্ষের আলাে
কমিয়া ধীরে ধীরে নিবিয়া গেল ; নির্জন কক্ষে তাহার নিশ্বাসের শব্দ ও ঘড়ির
টিকটিক ধ্বনি ব্যতীত আর কিছুই শােনা যাইতেছিল না
তৃতীয় অঙ্ক প্রথম দৃশ্য সন্ধ্যা আসন্ন ; নীরজানাথের বাড়ির বৈঠকখানায় নীরজানাথ একাকী শােফার উপর চিন্তামগ্নভাবে বসিয়া আছে, কখনও বা উঠিয়া নীরবে পায়চারি করিতেছে, আবার বসিতেছে। ঘরের এক পাশে টেবিলের উপর একখানি বড় আয়না। ঘরে আলো জ্বলে নাই নীরজা। কে সে? কি নাম? জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেয় না। আজও বেঁচে আছে, না মরেছে ? কেমন তাকে দেখতে ? সে কি করে ? কে সে? আয়নার সম্মুখে দাঁড়াইয়া অত চুপি চুপি কেন কথা কও, ওগাে মরণ, হে মাের মরণ ! ওগাে কাছে এসে ধীরে ফিরে যাও, ওগাে এ কি প্রণয়েরি ধরন। ঠিক, ঠিক । Frailty thy name is woman ! ত্রিদিবের প্রবেশ এই যে ত্রিদিববাবু, আপনিই আমার একমাত্র বন্ধু । ত্রিদিব। দেখুন নীরজাবাবু, আমার বিষম বিপদ উপস্থিত হয়েছে, আপনার দুরবস্থা দেখে নিজের বিপদ প্রায় ভুলেই গেছি। নীরজা। ত্রিদিববাবু, আমার মত বিপদ যেন কারও না হয়। জতুগৃহ- দাহের কথা জানেন, এ হয়েছে আমার সেই রকম। চারদিকে ঘৃতং পিবেৎ আগুন, বের হবার পথ নেই। যেখানে যাই এ আগুন থাকে সঙ্গে, একেবারে বুকের মধ্যে। ত্রিদিব । নীরজাবাবু, আপনি যতটা চিন্তা করছেন, হয়তাে অতখানি চিন্তার কিছু নেই। আমাদের দেশে বিধবা-বিবাহ তাে চলছে, মনে করুন না, আপনার পত্নী বিধবা ছিলেন । নীরজা। যারা বিধবা-বিবাহ করে, তারা জেনে শুনেই করে। আমি চাই নিঃসপত্ন অধিকার, ভবিষ্যৎ অতীতের কোন সুচনা তাতে থাকবে না। আমার মধ্যে লক্ষ যুগের সুপ্ত আদিম পুরুষ জেগে উঠেছে, সে চায় ছিড়ে নিতে, সে চায় কেড়ে নিতে, সে চায় একাধিপত্য,“ভাগে ব্যবসা করতে সে জানে না। ত্রিদিব। কিন্তু নীরজা। কিন্তু নয় ত্রিদিববাবু, এ আমার নিদ্রাকে হরণ করেছে, স্বপ্নকে বিষাক্ত করেছে, আর জাগরণকে, জীবনকে বিভীষিকায় করেছে পূর্ণ। ত্রিদিববাবু, রাত্রে ঘুমতে পারি না, আমার শয্যায় তার স্মৃতি বিচ্ছেদ রচনা করে শুয়ে থাকে। সারা দিন যেন সে আমার সঙ্গে সঙ্গে ফেরে। ক্ষুধার অন্ন, তাও যেন নিজের হাতে প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখে তুলে দিচ্ছি। ওই দেখুন, ওই দেখুন আয়নায় নিজের ছায়া দেখাইল ত্রিদিব। কোথায় ? ও তাে আপনার ছায়া। নীরজা। ওঃ, তাই বটে। কিন্তু সে যে আমাকে ছায়ার মতই অনুসরণ করছে। আচ্ছা ত্রিদিববাবু, ছায়া সত্য, না কায়া সত্য? ত্রিদিব। ছায়া আবার সত্য হয় নাকি?
৪
ঘৃতং পিবেৎ
নীরজা। হয়, হয় । শশানেন নি ?
ছায়ারে যে সত্য জানে, আমি সেই কবি
আপন আলােকচারী।
কবিরা নেহাত পাগল, কি বলেন ?
ত্রিদিব। চলুন, অন্ধকার ঘর ছেড়ে একটু বেড়িয়ে আসা যাক।
নীরজা। বেড়িয়ে ? আচ্ছা বেশ, চলুন। তমসসা মা জ্যোতির্গময়।
কি বলেন ত্রিদিববাবু ? চলুন।
উভয়ের প্রস্থান এবং মালবিকা ও মীরার প্রবেশ ; মালবিকাকে দেখিয়া মনে
হয়, সে শিলাহত পদ্মের বন
প্রমীরা। ভাই, আমারই দোষ। আমি কখনও মনে করতে পারি নি,
ও কথাটা তিনি নীরজাবাবুকে বলবেন। আমি বিশ্বাসের উপযুক্ত
ফলই পেয়েছি।
মালবিকা। না না, ত্রিদিববাবুর দোষ কি? উনিও তাে বিয়ে
করেছিলেন, তবে আমার বেলাতেই বা দোষ হবে কেন?
প্রমীরা। বাস্তবিক, পুরুষমানুষকে বিশ্বাস করা যায় না দেখছি। উনিও
কি কম বিশ্বাসঘাতকতা আমার সঙ্গে করেছেন।
মালবিকা। আমি ওঁর বিয়ের জন্যে তত ভাবছি না, যত ভাবছি আসন্ন
দারিদ্রের জন্যে।
প্রমীরা। কিন্তু দারিদ্র্য তত পাপ নয় ।
মালবিকা।
কে বললে পাপ নয় ? দারিদ্রের চেয়ে বড় পাপ কি
আছে ? সব পাপের মূলে দারি।
প্রমীরা। ওটা আমাদের দেশের কথা নয়।
মালবিকা। সেইজন্যেই তাে এ দেশের আজ এই দশা। এ দেশ
হয়ে পড়েছে পৃথিবীর ধর্মশালা। যত সব ভিক্ষুক এখানে জড়
ঘৃতং পিবেৎ
হয়েছে। আমি ধৰ্ম্ম চাই না, মুক্তি চাই না, আবার দরিদ্র হতেও
চাই না।
প্রমীরা। না না, অমন কথা বলিস নি। পরকালে
মালবিকা। নরক? দারিদ্রের চেয়ে বড় নরক-যন্ত্রণা আর কিছু
আছে ? দেবতাকে এখানে এনে ছেড়ে দিলে, কিছু দিন পরে দৈত্য
হয়ে বেরিয়ে আসবে। স্বর্গের ঐশ্বৰ্য্য সরিয়ে নাও, দেখবে, দেবতারা
এ ওর পকেট মারছে।
প্রমীরা। চল, একটু বেড়িয়ে আসা যাক, মন ভাল হবে।
মালবিকা। না না, তুই যা। আমি একটু বিশ্রাম করি।
প্রমীরা। তুই বেশি ভাবিস না।
প্রমীরার প্রস্থান
মালবিকা। [ বসিয়া ] মিথ্যে কথা, আমি দারিদ্রকে ভয় করি না।
কিন্তু উনি কেন এমন বঞ্চনা করলেন ? কে সে? কি তার
নাম ? বেঁচে আছে, না সত্যি মরেছে ? সুন্দরী ? আমার
চেয়েও ? বটে
সে ধীরে ধীরে আয়না-যুক্ত টেবিলের নিকটে গিয়ে দাঁড়াইল ; আয়নায় একবার
নিজের ছায়া দেখিয়া স্নানভাবে হাসিল। চুলের বিন্যাস ঠিক করিয়া লইল।
তারপরে টেবিলে রক্ষিত নিজের ফোটোখানি লইয়া আবেগের সঙ্গে তাহা
ছিড়িয়া কুটিকুটি করিয়া ফেলিয়া দিল
সেই চিত্রের প্রতি ] দূর ! দূর ! দূর ! লজ্জা নেই? এখনও
হাসি ? [ নিজের মনে ] কে সে? কি তার নাম? জিজ্ঞেস
করলে উত্তর পাওয়া যায় না। কি প্রবঞ্চক, মাগাে !
পিছন হইতে নীরজার প্রবেশ
নীরজা। আমি প্রবঞ্চক ? আর তুমি কি ?
ঘৃতং পিবেৎ
মালবিকা। আমি যা খুশি তাই। সর, পথ ছাড়, আমাকে যেতে
দাও। মেয়েমানুষের সঙ্গে বলপ্রয়ােগ ।
নীরজা। মেয়েমানুষের বল যে আরও ভীষণ, তাকে বলে কৌশল,
তাকে বলে কুটিলতা, তাকে বলে মিথ্যাচার।
মালবিকা। বল বল, আরও যদি কিছু থাকে বল।
নীরজা। বলবার অনেক কিছুই আছে, কিন্তু ইচ্ছে নেই।
মালবিকা। বটে, অনিচ্ছা! বাক্যে আবার অরুচি কবে থেকে হল?
নীরজা। তা জানি, কথাকে তােমরা ভয় পাও না। মনে কর দেখি,
কলকাতা শহরের এই বাড়ির মধ্যে লক্ষ বৎসর আগেকার এক
গুহা-মানব বেরিয়ে এসেছে, হাতে তার দণ্ড, মুখে তার হিংস্রতা,
মনে তার হিংসা, লক্ষ যুগ আগেকার দুরন্ত সেই আদিম মানুষ।
মালবিকা। কি, আমাকে খুন করবে নাকি ?
নীরজা। না, অত সহজে আমার যন্ত্রণার অবসান হবে না। আমি
ফাসি যেতে চাই না।
মালবিকা। আর আমার
নীরজা।
যে বিষপাত্র মুখে তুলেছি, তার তলানিটুকু পৰ্যন্ত পান
করতে হবে।
মালবিকা। আমার ভয় করছে, পথ ছাড়।
নীরজা। [ সজোরে ] না। দাড়াও।
মালবিকা কি বলিল, বােঝা গেল না
[ হঠাৎ করুণ সুরে] মালবিকা, মালবিকা, বাঁচাও, বল সে কে?
মালবিকা নীরব
তাকে কি ভালবাসতে? এখনও বাস ?
মালবিকা। না।
স্বতং পিবেৎ
নীরজা। তবে বল সে কে ? কোথায় আছে?
মালবিকা। জানি না।
নীরজা। 'মিথ্যেবাদী।
মালবিকা। পথ ছাড়। যাও, যাও।
নীরজা।
এ যে দরজা-নরকের দ্বার।
মালবিকা। নরক? বাইরে, না ভেতরে ?
প্রস্থান
ঘর
নীরজা।
মালবিকা চলিয়া গেলে নীরজা একাকী শােফার উপরে বসিয়া রহিল।
অন্ধকার, কেবল আয়নার উপরে একটু আলাে পড়িয়া জ্বলজ্বল করিতেছে ; কিছু
ক্ষণ পরে সে লাফাইয়া উঠিয়া পায়চারি করিতে লাগিল ; হঠাৎ থমকিয়া দাঁড়াইল
কে তুমি? কে তুমি? ( হঠাৎ পিছনে ফিরিয়া ] কই, কেউ
মায়া, [ আয়নায় নিজের ক্ষীণ ছায়া দেখিয়া ] না ছায়া ? এই
যে এতক্ষণে দেখা পেয়েছি, এবার, এবার
এই সময়ে অন্য দ্বার দিয়া নীরজার অলক্ষিতে মালবিকা আসিয়া আয়নার পিছনে
দাড়াইল ; নীরজা তাহাকে দেখিতে পাইল না
[ ছায়ার প্রতি ] এবার ! এবার ! [ আয়নার দিকে দ্রুত অগ্রসর
হইয়া গেল ] কেন তুমি এলে আমার আর তার মাঝখানে ? কে
তুমি ? কি তােমার নাম? [ একটু থামিয়া ] এ কি আমারই
ছায়া? আমিই আমাদের মাঝখানে এসে দাড়িয়েছি ? [ টেবিল
হইতে কাচের একটি পেপার-ওয়েট তুলিয়া লইয়া ছায়ার প্রতি ]
ছায়া, তুমি কায়ার চেয়েও সত্য ? যাও, যাও, যাও বলছি।
[ স্বগত ] মালবিকা, ভােরা, মালবিকা, এ কি করলে? কেন
শুনলাম ? ভগবান, মানুষকে চিন্তা করবার শক্তি কেন দিলে?
বিধাতা, এমন সুন্দর সৃষ্টির মধ্যে এক ফোটা মন ফেলে দিয়ে সব
মৃত পিবেৎ
নীরজা।
নষ্ট করে দিয়েছ ! [ ছায়ার প্রতি আঃ, এখনও দাড়িয়ে ?
যাও, যাও, সর বলছি। বটে!
তবে দূর হও।
কাচের গােলকটি সজোরে আয়নার উপর নিক্ষেপ করিল। আয়নার কাচ খ
খণ্ড হইয়া ভাঙিয়া পড়িল ; মালবিকা সভয়ে অস্ফুট আর্তনাদ করিয়া টেবিলের
পিছন হইতে সরিয়া আসিল। তাহাকে দেখিয়া নীরজা মুহুৰ্ত্তখানেক স্তম্ভিত
থাকিয়া তাহার দিকে দুই হাত প্রসারিত করিয়া ছুটিয়া গেল
মালবিকা, ভােরা, এই যে তুমি। আজ আর সে নেই, এস
এস, বুকে এস।
মালবিকা। [ নীরজার দিকে ছুটিয়া আসিল ] প্রিয়তম !
। [ কাছে আসিয়া হঠাৎ থামিয়া ] প্রিয়তম ? বলি, সুন্দরী,
কত জনকে এর আগে ওই নামে ডেকেছ ?
মালবিকা। তুমি পাষণ্ড।
নীরজা। অয়ি কোমলহৃদয়ে, বলি, কত জন এর আগে ওই কোমলত
অনুভব করেছে ?
মালবিকা। উঃ, থাম, থাম।
নীরজা। বটে । নাঃ, কোথাও শান্তি নেই।
নীরজার দ্রুত প্রস্থানের পর মালবিকা কিয়ৎক্ষণ নীরবে থাকিল
মালবিকা। নাঃ, মৃত্যু ছাড়া আর গতি নেই। মাগাে
মালবিকা ধীরে ধীরে চলিয়া গেল। অন্য দ্বার দিয়া নীরজার প্রবেশ
নীরজা। উঃ, বিধাতা, এ কি শাস্তি !
শােফার উপরে হতাশভাবে বসিয়া পড়িল
দ্বিতীয় দৃশ্য
ডাক্তার পরীক্ষিৎ রায় এম. বি.-র ডিস্পেন্সারি, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মালবিকা পায়চারি
করিতেছে।
মালবিকা। লেক, না বিষ? বিষ, না লেক ? লেকে অনেক অসুবিধে।
হয়তাে দু দিন পর ভেসে উঠবে, মাছে খানিকটা খেয়ে দিয়েছে,
জলে ফুলে উঠেছে। মাঃ, মাগাে, সে পারব না। তার চেয়ে বিষ
অনেক ভাল। ডাক্তারবাবু লােকটি বেশ সহৃদয় ; চট করে
আমার মনের কথা ধরে ফেললেন।
কম্পাউণ্ডার মধুর প্রবেশ ; হাতে একটি ঔষধের মােড়ক
মধু। এই যে ওষুধ।
মালবিকা। ঠিক জিনিস দিয়েছ তাে?
মধু। আমি আজ সাতাশ এই কাজ করছি, ভুল হবার
উপায় কি ?
মালবিকা। বিস্বাদ হবে না তাে ?
মধু। বাপরে, এসব ওষুধ কি বিস্বাদ হ'লে চলে ।
মালবিকা। কতক্ষণ লাগবে ?
মধু। আমার ডাক্তারবাবুর ওষুধে বেশি সময় তাে লাগে না।
মালবিকা। কি রকম?
মধু। এই দেখুন না কেন, আমার দুই ভাগ্নে অসুখে ভুগছিল,
অন্য ডাক্তার তিন মাসেও কিছু করে উঠতে যখন পারলে না,
ডাক্তারবাবুকে দেখালাম। বাস্, তিন দিনে
মালবিকা। সারিয়ে দিলেন ?
ঘৃতং পিবেৎ
মধু। আজ্ঞে না, মেরে ফেললেন।
মালবিকা। মেরে ফেললেন ?
মধু। আজ্ঞে। আপনার আশ্চর্য লাগছে ? ডাক্তার আর সেনাপতির
কাছ থেকে আমরা আশা করি তৎপরতা, সত্বরতা। আমাদের
ডাক্তারবাবুর মধ্যে ওটি পাবেন।
মালবিকা। এই নাও ফী আর দাম।
টাকা দিয়া মালবিকার প্রস্থান। অন্য দ্বার দিয়া ডাক্তার পরীক্ষিৎ রায়ের
প্রবেশ। দীর্ঘ, বােগা, মলিন কোট প্যান্ট, খোচা খোচা দাড়ি গোঁফ, যেন
একখানি সজীব ল্যান্সেট
পরীক্ষিৎ।
ওরে মধু, দে, টাকা দে।
মধু। এই নিন, কর্তা।
পরীক্ষিৎ। এক টাকা কি রে ? আমি আড়াল থেকে দু টাকার শব্দ
শুনলাম।
মধু। দু টাকা, না দশ টাকা।
পরীক্ষিৎ। না না, দে মাইরি, বিরক্ত করিস নি।
মধু। আচ্ছা, ও টাকাটা আমি মাইনের মধ্যে কেটে নিলাম।
পরীক্ষিৎ। এখন দে, সে পরে হবে।
মধু বিরক্তভাবে টাকা দিল
দেখ, তুই একটু দেখিস, কেউ যেন না এসে পড়ে। আমি ততক্ষণ
চট করে জুতােটা ব্রাশ করে নিই, বড় ময়লা হয়েছে।
ডাক্তার চেয়ারে বসিয়া জুতায় কালি লাগাইল ; মধু গুনগুন সুরে গান করিতে
করিতে ঘর ঝাঁট দিতে শুরু করিল
বাহিরে কড়া নাড়িবার শব্দ ; ডাক্তার মুখে আঙুল দিয়া মধুকে নীরব হইতে
ইঙ্গিত করিল
ঘৃতং পিবেৎ
?
[ চাপা গলায় ] দেখ, আমি পাশের ঘরে গেলাম। রুগী এলে
বসিয়ে বলবি, ডাক্তারবাবু খুব ব্যস্ত, রুগী দেখছেন ; ভিজিট
আট টাকা; রাজি না হলে বলবি, দু টাকা। আর আমি যখন
এসে রুগী দেখতে থাকব, তুই সেই সময় মােটরের হর্ন টা বাজাবি।
বলবি, বাবু, বালিগঞ্জ থেকে মােটর এসেছে। বুঝলি ?
মধু। আজ্ঞে হ্যা, আর যদি পাওনাদার আসে ?
পরীক্ষিৎ। আঃ, কি যে অলুক্ষণে কথা বলিস !
ইষ্টদেবতাকে নমস্কার করিয়া প্রস্থান করিল। নীরজানাথের প্রবেশ
নীরজা। ডাক্তারবাবু আছেন?
মধু। ডাক্তারবাবু? হ্যা, আছেন, কিন্তু বড় ব্যস্ত।
নীরজা। রুগী দেখছেন বুঝি ?
মধু। হ্যা, সকালবেলায় অনেক রুগী আসে। আপনি
নীরজা। আমার নিজের একটা ওষুধের জন্যে ।
মধু। ডাক্তারবাবু আজকাল ফী আট টাকা করেছেন।
সেজন্যে বাধবে না।
মধু। আপনি বসুন একটু।
নীরজানাথের উপবেশন ও মধুর প্রস্থান
নীরজা। ছুরি, না দড়ি ; লেক, না বিষ? লেকটা নতুন বটে, কিন্তু
দুজন না হলে ওখানে ডুবে সুখ নেই। না, একলা ডুবে
ওখানকার ট্র্যাডিশন ভঙ্গ করব না। কিন্তু লেকের জলকল্লোল
যেন হৃদয়ের মধ্যে শুনতে পাচ্ছি।
I hear lake-water lapping with low sounds by
the shore
I hear it in the deep heart's core.
—যদি মরণ লভিতে চাও, এস তবে ঝাঁপ দাও—সলিল মাঝে ।
নীরজা।
মৃতং পিবেৎ
লেকের পথ কবিত্বের পথ। কিন্তু তার চেয়ে বিজ্ঞানের পথই
অনেক সুগম। পটাসিয়াম সায়ানাইড ! সায়ানাইড
পরীক্ষিতের প্রবেশ
এই যে ডাক্তারবাবু।
পরীক্ষিৎ। বসুন, ব্যাপার কি ?
নীরজা। ডাক্তারবাবু, আমি জীবন-ব্যাধির ওষুধ চাই।
ডাক্তার সমস্ত পাশের ঘর হইতে শুনিয়াছে
পরীক্ষিৎ। বুঝেছি। আপনি সিঙ্গল না ডাল ?
নীরজা। তার মানে ?
পরীক্ষিৎ। অর্থাৎ আপনি একা যাচ্ছেন, না সহযাত্ৰিনী কেউ আছে ?
নীরজা। ডাক্তারবাবু, সহযাত্ৰিনীই যদি থাকবে, তবে আর যাব কেন?
পরীক্ষিৎ। তিনি কি আগে গেছেন ?
নীরজা। তার কাছে থেকে দূরে যাবার জন্যেই তাে চলেছি।
পরীক্ষিৎ। তা হলে তিনি থাকলেন। এক কাজ করুন, আপনাকে
ওষুধ দুজনের মত দিচ্ছি ; বাড়ি গিয়ে যদি দেখেন যে, তার মত
বদলেছে, তখন আবার ওষুধের জন্যে ছুটোছুটি করবেন ! এ যেন
স্টেশনে গিয়ে দেখা যে, টিকিটের টাকা নেই। ও কিছু নয়,
রেগুলারিটি এবং পাঙ্কচুয়ালিটি হচ্ছে ডাক্তারদের মটো।
নীরজা। দিন, কিন্তু আমি একাই যাব ।
পরীক্ষিৎ। কম্পাউণ্ডার, সেই সাদা পাউডারটা নিয়ে এসে দাও।
মধুর প্রবেশ ও প্রস্থান। পাশের ঘর হইতে মােটরের হর্ন বাজিল
নাঃ, আর পারি না। সকালবেলা থেকে তাড়া দেওয়া শুরু
করেছে। এই মধু, হরে, রামা, কে আছিস, বলে দে, আমি
যেতে পারব না।
ঘৃতং পিবেৎ
মধু। [ পাশের ঘর হইতে ] কিছুতেই ছাড়ছে না, বড় কাদাকাটি
করছে ।
পরীক্ষিৎ। [ বিরক্তি সহকারে ] আচ্ছা, অপেক্ষা করতে বল, আর
বলে দেডবল ফী চাই।
নীরজা। এরা কি সবাই জীবন-ব্যাধির ওষুধ চান নাকি?
পরীক্ষিৎ। আর মশাই, ঢাকুরিয়া লেক হবার পর থেকে কেউ কি
আমাদের কাছে আসে ? সবাই নিজের নিজের পথ দেখে।
কর্পোরেশনের কি যে দরকার ছিল ওই লেকটা তৈরি করবার ।
কেবল আমাদের ব্যবসা মাটি করা! এবার আমরা ডাক্তারেরা
মিলে একজন ডাক্তারকে করে দোব মেয়র। বােজাতে হবে
ওই লেক।
নীরজা। মানুষের মতি ; কেউ কেউ লেকে তাে যাবেই।
পরীক্ষিং। [ মনুষ্যত্বের অপমানে বিরক্তিসহ ]
বিরক্তিসহ ] মানুষ ? তারা
মানুষ ? আপনি তাদের মানুষ বলেন ? মানুষ হলেও তারা
এই সভ্যযুগের উপযুক্ত মানুষ নয়। আদিম বর্বরেরাও জলে ডুবে
মরত। তাদের সঙ্গে তবে তফাত কোথায় বলুন? সাঁওতাল,
কোল, ভীল এরাও তত জলে ডুবে মরে, এদের সঙ্গে শিক্ষিত
বাঙালীর প্রভেদ কোথায় তা হলে? আজকাল কলেজে যে কি
শিক্ষাই দিচ্ছে।
নীরজা নীরবেই দাড়াইয়া রহিল
[ বর্বরতায় বিরক্ত হইয়া ] আসল কথা কি জানেন ? মনে
মনে আমরা বর্বরই রয়ে গেছি ; বিজ্ঞানের মহিমা কেবল
আমাদের মুখে। দরকারের বেলা—সেই দড়ি, নয় জল, বড় জোর
কেরােসিন তেল আর আগুন। [ সভ্যতায় গর্বিত ) কেন,
১৪ যুতং পিবেৎ ? পটাসিয়াম সায়ানাইড কি নেই? আসেনিক নেই ? ইনজেকশন নেই পেটেন্ট ওষুধও কি নেই ? আমরা আছি কি জন্যে ? মেডিক্যাল কলেজ আছে কি জন্যে, আমাদের যে স্বরাজ হচ্ছে না, উচিত দণ্ডই হচ্ছে। এখনও একশাে বছর ইংরেজের অধীনে থাকা দরকার। নীরজা। অনেকে হয়তাে ওষুধের দাম দিতে পারে না। পরীক্ষিৎ। মাপ করবেন, আপনি নিশ্চয় অর্থনীতি পড়েন নি। যারা অকালে আত্মহত্যা করছে, তারা চিরকালের জন্যে ডাক্তারকে ফাকি দিচ্ছে। বৰ্বরগুলো, ভেবে দেখিস না, বেঁচে থাকলে কত টাকা ডাক্তারকে দিতে হত ? যাবার বেলা, অন্তত তার কিছু দিয়ে যা ডাক্তারকে। নীরজা। কিন্তু আমার ওষুধটা ? পরীক্ষিৎ। কম্পাউণ্ডার, শিগগির। আপনার কথা স্বতন্ত্র। মরতে অনেককে দেখেছি, কিন্তু এমন বিজ্ঞান-অনুমােদিত পন্থায় কাউকে মরতে দেখি নি। আপনি যাচ্ছেন যান। কিন্তু এই বলে দিচ্ছি, আপনি মরে অমর হবেন ; বিজ্ঞানের জন্যে যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের মধ্যে আপনার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আমি নিজে আপনার সমাধির ওপরে শ্বেত পাথরে খােদাই করে দোব—“Here lies one who believed in a doctor." মধু ঔষধ আনিয়া দিল ; নীরজ। টাকা দিল নীরজা। স্বাদ কি রকম? পরীক্ষিৎ। মিষ্টি। মশাই, প্রাণদানের ওষুধ কুইনিন তেতত, প্রাণ- হরণের ওষুধ পটাসিয়াম সায়ানাইড মিষ্টি। আমরা বৈজ্ঞানিক বলে যে আমাদের সেন্স অব হিউমার নেই, এ বলতে পারবেন না।
মৃতং পিবেৎ
১৫
নীরজা। আমি উঠি তা হলে।
পরীক্ষিৎ। আহা, বসুন না। এখন তাে আপনাকে মুক্তপুরুষ বললেই
হয়, সংসারের বন্ধন বা কাজ কিছুই আর আপনার নেই। আমার
একটা
নতুন থিওরি আছে—একটু শােনাব। আজকাল ব্যস্ততার
যুগে মনোেযােগী শ্রোতা পাওয়া বড়ই কঠিন।
নীরজা। বেশ তো, বলুন না ।
পরীক্ষিৎ। কলেজ থেকে পাস করে বেরুবার সময় সাহেব ডাক্তার
পিঠ চাপড়ে বললে, ডক্টর রায়, বড়ই হার্ড টাইমস পড়েছে, যদি
ব্যবসায় থাইভ করতে চাও, তবে ডিস্কভার ইওর ওন মেথড
অব টিটমেন্ট। কথাটা মনে লাগল। ভেবে ভেবে আমার
নিজের টিটমেন্ট বের করেছি। সব রােগের মূল হচ্ছে অতিভােজন,
বুঝলেন, ভােজন কমালেই মানুষের ওজন বাড়বে। কিন্তু ভােজন
কমবে কি করে ? রুগী কি ইচ্ছে করে খাওয়া কমাবে ? তা হয়
। তাই ভােজনের মূলে আঘাত করতে হবে।
নীরজা। কোথায়, পেটে ?
পরীক্ষিৎ। না, দাতে। গােটাকয়েক দাত তুলে দিলেই খাওয়া
আপনি কমবে।
নীরজা। পরীক্ষা করে দেখেছেন ?
পরীক্ষিৎ। সুযােগ পাচ্ছি না। আমাদের দেশের লােকের বিজ্ঞানের
ওপর মােটে শ্রদ্ধা নেই।
নীরজা। তবে ?
পরীক্ষিৎ । এক কাজ করা যাক, আসুন, [ দ্রুত উঠিয়া দাত তুলিবার
যন্ত্র লইয়া নীরজার কাছে গিয়া ] আপনার গােটাকয়েক দাত
তুলে
দিই।
ঘৃতং পিবেৎ
নীরজা। [ চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া ] না না, সে কি হয় ?
পরীক্ষিৎ । কেন হবে না ? আপনার তাে আর দাতের আবশ্যক
নেই। এখন তাে আপনি মুক্তপুরুষ।
নীরজা। না না, সে হতে পারে না।
পরীক্ষিৎ। নাঃ, এখনও আপনার দেহজ্ঞান দূর হয় নি দেখছি।
নীরজা। আচ্ছা ডাক্তারবাবু, আসি ।
দ্রুত প্রস্থান
পরীক্ষিৎ। [ সন্দিগ্ধভাবে ] উহু, উনি ওষুধ নিয়ে গেলেন বটে, কিন্তু
বােধ হচ্ছে খেতে পারবেন না।
দ্রুত সর্বেশ্বরের বাড়ির ভৃত্যের প্রবেশ
ভৃত্য। ডাক্তারবাবু!
পরীক্ষিৎ। কি চাই?
ভৃত্য। শিগগির একবার যেতে হবে ডাক্তারবাবু।
পরীক্ষিৎ। কোথায়? কি হয়েছে ?
ভৃত্য। সানি ভিলায় ; বাবুর কি যেন হয়েছে।
পরীক্ষিৎ। আমার তাে সময় হবে না ।
ভৃত্য। বাবু যে ছটফট করছেন।
পরীক্ষিৎ। আচ্ছা, চল তবে, যাচ্ছি, কিন্তু ডবল ফী লাগবে।
সে হবে। আপনি আমুন, আমি চললাম ।
সর্বেশ্বরের ভৃত্যের প্রস্থান ও মধুর প্রবেশ
পরীক্ষিৎ। আজ কি হ’ল রে মধু, এক দিনে তিনটে কল !
মধু। বড় ভয় করছে বাবু, সাবধান হয়ে যাবেন; পথে যেন গাড়ি-
ঘােড়া চাপা পড়বেন না।
উভয়ের প্রস্থান
তৃতীয় দৃশ্য
সানি ভিলার বৈঠকখানা ; সর্বেশ্বর সিংহ পাগলের মত ঘরের মধ্যে দাপাদাপি
করিয়া বেড়াইতেছে ; কখনও চেয়ারে বসিতেছে, কখনও শশাফায় শুইতেছে,
কখনও বা পায়চারি করিতেছে; মুখে হায় হায়, গেল গেল, মলাম মলাম,
বাঁচাও বাঁচাও” রব ; দুই হাতে বুক চাপড়াইতেছে ও চুল ছিড়িতেছে। ***
সর্বেশ্বর প্রস্থান করিল ; অন্য দ্বার দিয়া পরীক্ষিং ও ভৃত্য প্রবেশ করিল ;
পরীক্ষিতের পকেটে ষ্টেথােস্কোপ ও দাত তুলিবার যন্ত্র দেখা যাইতেছে
পরীক্ষিৎ। রুগী কোথায় ?
ভৃত্য। এই তাে এখানেই ছিলেন ; বােধ হয় ওঘরে গেছেন। আপনি
বসুন, আমি দেখে আসি। [ চলিয়া গেল ও পুনরায় ফিরিয়া
আসিয়া ] দেখুন ডাক্তারবাবু, আপনি যে ডাক্তার এ কথা প্রকাশ
করবেন না; বাবু ডাক্তার ডাকতে নিষেধ করেছিলেন।
পরীক্ষিৎ। সে আমি জানি। তুমি যাও।
ভৃত্যের প্রস্থান
ব্লাডপ্রেসার। বড়লােক—খায় অনেক ; কিছু নয়, গােটা কয়েক
দাত তুলে
দিলেই সব
ঠিক
হয়ে যাবে।
জগন্নাথের প্রবেশ ; ডাক্তার তাহাকেই রােগী ভাবিল
দেখি, একবার এদিকে আসুন তাে।
জগন্নাথ । কেন বাপু ?
পরীক্ষিৎ। কিছু না, আসুন। আচ্ছা, হাঁ করুন তাে।
জগন্নাথের তথাকরণ
দেখুন, আপনাকে আজ ক্যাস্টর অয়েল খেতে হবে।
৭
১৮
ঘৃতং পিবেৎ
জগন্নাথ। তুমি বুঝি ডাক্তার ?
পরীক্ষিৎ। ঠিক ধরেছেন দেখি ।
জগন্নাথ। ধরব না! বনেদী ডাক্তার একেবারে। তুমি বুঝি বিলিতী
পাস ?
পরীক্ষিৎ। বুঝলেন কি করে ?
জগন্নাথ। দিশী বিদ্যায় তাে এমন চিকিৎসা হয় না! ছেলের অসুখের
চিকিৎসা কর তুমি বাপকে ওষুধ খাইয়ে ! বিলিতী পাস ছাড়া
এমনটি অসম্ভব ।
পরীক্ষিৎ। কেন, আপনার কি অসুখ নয় ?
জগন্নাথ। কি জানি বাপু? তুমি যখন বলছ, হতেও পারে।
পরীক্ষিৎ। আপনার ছেলে কোথায় ?
জগন্নাথ। ওই ঘরে।
পরীক্ষিৎ। চলুন, তবে সেখানে যাওয়া যাক।
উভয়ের প্রস্থান ও অন্য দ্বার দিয়া সৰ্বেশ্বরের প্রবেশ ; সে শশাফায় শুইয়া
“হায় হায়, গেল গেল, মলাম মলাম, বাচাও বাঁচাও” এই সব বলিতেছে।
পরীক্ষিৎ নিঃশব্দে বােগীর পিছনে আসিয়া দাঁড়াইল ; রােগী তাহাকে দেখিতে
পাইল না ; ডাক্তার তাহাকে গম্ভীরভাবে নিঃশব্দে পৰ্যবেক্ষণ করিতে লাগিল,
যেন ব্লাডপ্রেসারের সব লক্ষণ মিলিয়া যাইতেছে
সৰ্বেশ্বর। হায় হায়, বুক গেল, বুক গেল।
পরীক্ষিৎ। ব্যথাটা কোথায় বলুন তাে?
সৰ্বেশ্বর। কে তুমি?
পরীক্ষিৎ। কেউ নই ।
সৰ্বেশ্বর। আমাকে বাঁচাও তুমি ।
পরীক্ষিৎ। সেইজন্যেই তাে এসেছি।
সৰ্বেশ্বর। দাও দাও ; তুমি এর ওষুধ জান?
মৃতং পিবেৎ
পরীক্ষিৎ। জানি বইকি। [ স্বগত ] ব্লাডপ্রেসার ছাড়া আর কিছু
নয়। দাত সবগুলােই আছে ; গােটা কয়েক তুলে দিতে হবে।
সর্বেশ্বর। উঃ, বুক যে গেল !
পরীক্ষিৎ। তৃষ্ণায় ?
সর্বেশ্বর। না, ব্যথায় ।
পরীক্ষিৎ। ব্যথাটা ডান বুকে, না বা বুকে ?
সৰ্বেশ্বর। সারা বুকে।
পরীক্ষিৎ। [ স্বগত ] ভয়াবহ ব্লাডপ্রেসার !
সর্বেশ্বর। কি করব বল তাে ?
পরীক্ষিৎ। আপনাকে কিছু করতে হবে না, যা করবার আমিই করছি।
সর্বেশ্বর। পারবে তুমি? পারবে ? কি করবে ?
পরীক্ষিৎ। কিছু নয়, গােটা কয়েক দাত তুলে দোব।
সৰ্বেশ্বর। কার ?
পরীক্ষিৎ। কেন? আপনার ?
সর্বেশ্বর। আমার দাত ? কেন?
পরীক্ষিৎ। আপনার সিরিয়াস ব্লাডপ্রেসার হয়েছে।
সৰ্বেশ্বর। তােমার মাথা।
পরীক্ষিৎ। একটু কষ্ট সহ্য করুন, এখনই সব কমে যাবে।
সর্বেশ্বর। আমার কি হয়েছে বল তত ?
পরীক্ষিৎ। আপনি ল্যাটিন বােঝেন ?
সর্বেশ্বর। ।
পরীক্ষিৎ। গ্রীক ?
সর্বেশ্বর। ।
পরীক্ষিৎ। তবে কি করে বলব ?
১০০
ঘৃতং পিবেৎ
সর্বেশ্বর। বাংলায় বল না।
পরীক্ষিৎ। রাডপ্রেসার।
সৰ্বেশ্বর। ওঃ, এতক্ষণে বুঝেছি। তুমি বুঝি ডাক্তার ?
পরীক্ষিত। এটা বুঝতে এতক্ষণ লাগল ?
সৰ্বেশ্বর। এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না।
পরীক্ষিৎ। কেন?
সৰ্বেশ্বর। আমি মেয়ের দুঃখে ছটফট করছি, আর তুমি বলছ
ব্লাডপ্রেসার ।
পরীক্ষিৎ। তা হলে কোন অসুখ হয় নি ?
সৰ্বেশ্বর। মনের যন্ত্রণা, ডাক্তার, মনের যন্ত্রণা।
পরীক্ষিৎ। [ কিছুমাত্র না দমিয়া ] তা হােক না। কটা দাত তুলে
দিই, মনের যন্ত্রণাও কমে যাবে দেখবেন।
সর্বেশ্বর। কি করে ?
পরীক্ষিৎ। [ সগর্বে ] দেহের যন্ত্রণা এত বেশি হবে যে, তাতে মনের
যন্ত্রণা চাপা পড়ে যাবে।
সর্বেশ্বর। ওরে ডাকাত রে, ডাকাত।
পরীক্ষিৎ। ডাকাত নয়, ডাক্তার।
সৰ্বেশ্বর। ডাকাত।
পরীক্ষিৎ। ডাক্তার।
সৰ্বেশ্বর। বের হও বলছি।
পরীক্ষিৎ। আমার ফীডবল ফী ?
সর্বেশ্বর। তােমার মাথা।
পরীক্ষিৎ। আপনার ব্লাডপ্রেসার।
উভয়ে বিতর্ক করিতে করিতে প্রস্থান করিল
ঘৃতং পিবেৎ
১০১
প্রমীরার প্রবেশ
প্রমীরা। 'বাবা কোথায় ? সেই সকাল থেকে ছটফট করছেন।
কোথায় গেলেন আবার !
সৰ্বেশ্বরের প্রবেশ
বাবা, এখন কেমন আছ?
সৰ্বেশ্বর। দূর হ লক্ষ্মীছাড়ী, আমার সামনে থেকে দুর হ। নিজেও
ডুবলি, আমাকেও ডােবালি।
প্রমীরা। তুমি নিজের কথাই ভাবছ ; আমার কথা একবার ভেবে
দেখেছ কি ?
সর্বেশ্বর। তাের কথা তুই ভাবগে—পােড়ারমুখী।
প্রমীরা। আমারই দোষ ? কিন্তু এ রকম ফাকি দিতে আমাকে
শেখালে কে ?
সৰ্বেশ্বর। বটে! বটে! ভাল করতে গিয়ে আমার দোষ হ’ল ?
প্রমীরা। উঃ মাগাে, আমার কি হবে এখন?
সৰ্বেশ্বর। কেন? রাজার বউ হয়েছিস, আর বিষ কেনবার পয়সাও
জোটে না?
এত দিনে একটা
প্রমীরা। হ্যা, ঠিক কথাই মনে করিয়ে দিয়েছ।
সত্যিকারের শিক্ষা দিলে।
প্রস্থান
সর্বেশ্বর। [ বসিয়া পড়িয়া ] উঃ ভগবান !
মালবিকার ভৃত্যের প্রবেশ
ভৃত্য। প্রমীরা-দিদিমণির চিঠি।
সর্বেশ্বর। দে, আমাকে দে।
১০২ ঘৃতং পিবেৎ ভৃত্য। অন্য কাউকে দিতে নিষেধ আছে। সর্বেশ্বর। দে দে। [ চিঠি লইয়া ] যা, ঠিক হয়েছে। ভৃত্যের প্রস্থান। সৰ্বেশ্বর চিঠি পড়িয়া লাফাইয়া উঠিল একি সর্বনাশ! মালবিকা বিষ খেয়েছে ! ওরে বাপরে, আজ- কালকার মেয়েরা কি ভীষণ ! [ সজোরে ] ওরে, দেখ দেখ, মীরা কোথায় গেল, তাকে যে আমি রাগের মাথায় কি সব বললাম। [ ভৃত্যদের প্রতি ] ওরে, দেখ দেখ, তােদের দিদিমণি কোথায় গেল। প্রমীরার প্রবেশ প্রমীরা। কি হয়েছে, ডাকছ কেন ? সর্বেশ্বর। আয় মা, আয়, কাছে ব’স। রাগের মাথায় কত কি বলেছি। প্রমীরা। ও কার চিঠি, বাবা? সর্বেশ্বর। এই দেখ, মালবিকা কি সর্বনাশ করেছে । প্রমীরা। কি করেছে ? সর্বেশ্বর। বিষ খেয়েছে। প্রমীরা। [ একেবারে ভাঙিয়া পড়িয়া ] মালবিকা—বিষ—উঃ ভগবান । নীরজার ভৃত্যের প্রবেশ ভৃত্য। ত্রিদিববাবুর নামে চিঠি আছে। প্রমীরা। দেখি । ভৃত্য। না দিদিমণি, বাবুকে ছাড়া এ চিঠি আর কাউকে দেওয়া নিষেধ। প্রমীরা। [ চিঠি লইয়া ] যা যা, ঠিক হয়েছে। ভৃত্যের প্রস্থান। প্রমীরা চিঠি পড়িয়া চীৎকার করিয়া উঠিল
মৃতং পিবেৎ
বাবা, নীরজাবাবুও বিষ খেয়েছেন।
সর্বেশ্বর। • কি সর্বনাশ! কোথায় আছি আমরা? কি হবে ?
প্রমীরা। ওঁকে তাে অনেকক্ষণ দেখছি না। একবার দেখে আসি ।
ত্রিদিবের প্রবেশ
সৰ্বেশ্বর। এস বাবা, এস।
ত্রিদিব । ব্যাপার কি ?
প্রমীরা। এই দেখ, নীরজাবাবু বিষ খেয়েছেন।
ত্রিদিব। নীরজা—বিষ ?
সর্বেশ্বর। মালবিকাও বিষ
ত্রিদিব। মালবিকা—বিষ—কি সর্বনাশ !
প্রমীরা। চল, শিগগির যাওয়া যাক।
ত্রিদিব। আর গিয়ে কি হবে ? এতক্ষণে যা হবার তা হয়ে গেছে।
দ্রুত জগন্নাথের প্রবেশ ; সে ‘বিষ বিষ’ শুনিয়াছে, তাহার বিশ্বাস প্রমীরা-ত্রিদিব
বিষ পান করিয়াছে
জগন্নাথ। হায় হায়, সর্বনাশ হ’ল ! ওরে, ডাক্তার ডাক—ডাক্তার।
সর্বেশ্বর। ডাক্তার এখানে এসে কি করবে ?
জগন্নাথ । কেন দাদা, কেন দিদি, তােরা এমন করলি ? কে তােদের
এমন দুর্বুদ্ধি দিয়েছিল ? কেন তােরা বিষ খেতে গেলি?
সর্বেশ্বর। না না, আপনি ভুল করছেন। ওরা বিষ খায় নি।
জগন্নাথ। যাক, বাঁচালে। একটা গল্প বলি শােন।-এক ছিল রাজা,
তার দুই রাণী—তারা দুই সতীন, সুয়াে আর দুয়াে—দুজনে সর্বদা
চুলােচুলি, মারামারি ; রাজা বলে, দুজনে ভাব করে নাও, নইলে
দুজনকেই দোব বনে পাঠিয়ে তারা কিন্তু শশানে না, দুজনকে
;
১০৪
ঘৃতং পিবেৎ
ছেড়ে দুজনে থাকতে পারে না ; আবার কাছাকাছি থাকলে করবে
ঝগড়া।এক রাণীর নাম জীবন, আর এক রাণীর নাম মরণ।
হা-হা, কেমন গল্প ?
নিজের রসিকতায় নিজেই হাসিতে লাগিল
অন্য সকলে ব্যস্ত হইয়া উঠিয়া পড়িল
চতুর্থ দৃশ্য
নীরজানাথের বাড়ির বৈঠকখানা; সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে ।
মালবিকার প্রবেশ
মালবিকা। মাথা ঘুরছে, শরীর দুর্বল মনে হচ্ছে—এই তো কেবল
কয়েক মিনিট হ’ল খেয়েছি ! আঃ, আর কিছুক্ষণের মধ্যে সব
জ্বালা জুড়িয়ে যাবে। বেচারী ভদ্রলােককে এই কদিনে মিছিমিছি
অনেক কষ্ট দিয়েছি—এখন দুঃখ হচ্ছে। যাই, সব পরিষ্কার করে
খুলে একখানা চিঠি রেখে যাই, তা নইলে ভদ্রলােককে আবার
বিরক্ত করবে।
মালবিকার প্রস্থান ও অন্য দ্বার দিয়া নীরজানাথের প্রবেশ ; কিছুক্ষণ সে নীরব
হইয়া দাঁড়াইয়া থাকিল, বাহির হইতে কোকিলের ডাক শােনা যাইতেছে
নীরজা। [ ম্লান হাসিয়া ! পৃথিবীতে এখনও কোকিল আছে দেখছি।
আর কিছুক্ষণের মধ্যে আমি থাকব না, কিন্তু কোকিলের গান
তেমনই থাকবে।
Still wouldst thou sing, and I have ears in vain
To thy high requiem become a sad
ঘৃতং পিবেৎ
ঘরের মধ্যে একটু পায়চারি করিয়া শােফায় বসিল
ইস, মাথাটা ঘুরছে, শরীরের মধ্যে রী-রী করছে। আমি গেলে
মালবিকার কি অবস্থা হবে? আর যাই হােক, টাকার কষ্ট যেন
হয়। বাড়িঘর জমিদারি পাবে না বটে, কিন্তু আমার যা নগদ
টাকা ছিল, তা তুলে এনেছি, বেচারাকে দিয়ে যাব ; কিছু দিন
চলবে।
পকেট হইতে এক তাড়া নােট ও চিঠি বাহির করিয়া
যাই, ওকে সব দিয়ে আসি।
নীরজার প্রস্থান ও মালবিকার প্রবেশ
মালবিকা। টেবিলের ওপরে সব লিখে ঠিক করে রেখে এসেছি।
ঘরের এক প্রান্তে একখানি চেয়ারে বসিল
অন্য দ্বার দিয়া নীরজার প্রবেশ, সে ঘরের অন্য প্রান্তে একখানি চেয়ারে বসিল
নীরজা। কি, তােমার শরীর খারাপ নাকি ?
মালবিকা। না, বেশ আছি। [ স্বগত ] ভদ্রলােক কল্পনাও করতে
পারবে না যে, কি করেছি আমি। [ প্রকাশ্যে ] তােমার কি
অসুখ করেছে ?
নীরজা। অসুখ? কই, না। [ স্বগত ] কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে
পারবে যে, সব অসুখের সীমান্তে এসে পৌঁছেছি। আচ্ছা, আমি
গেলে কি ওর কষ্ট হবে ?
মালবিকা। [ স্বগত ] আচ্ছা, আমি গেলে কি ওঁর দুঃখ হবে না?
দুঃখ কেন হবে? ওঁর কি আর কেউ নেই ? [ প্রকাশ্যে ] তুমি
কিছু খেলে না?
নীরজা। না, ক্ষিদে নেই। [ স্বগত ] চরম খাদ্য খেয়েছি। [ প্রকাশ্যে ]
ঘৃতং পিবেৎ
হঁা, দেখ, আমি কিছু দিনের জন্যে দূরে যাচ্ছি, এই কাগজপত্রগুলাে
রাখ ; দরকারী জিনিস আছে, পরে দেখাে ।
নােটের তাড়া ও কাগজপত্র তাহার হাতে দিল ; উহার সঙ্গে যে নিজের প্রথম
বিবাহ-সম্পর্কিত দলিলখানা গেল, তাহা লক্ষ্য করিল না
মালবিকা। [ স্বগত ] আমিও দূর দেশে যাচ্ছি। [ প্রকাশে ] আচ্ছা,
আমি এগুলাে ও ঘরে রেখে আসি ।
মালবিকার প্রস্থান। নীরজা নীরবে বসিয়া রহিল
নীরজা। [ আবৃত্তি ]
যেদিন পড়বে না মাের পায়ের চিহ্ন এই বাটে,
যেদিন বাইবাে না মাের খেয়াতরী এই ঘাটে
নীরজা শশাফার উপর মাথা রাখিয়া তন্ত্রিতভাবে বসিয়া রহিল। মালবিকা
বিবাহের দলিলখানা হাতে করিয়া ছুটিয়া প্রবেশ করিল
মালবিকা। [ চীৎকার করিয়া ] এ দলিল তুমি কোথায় পেলে ?
নীরজা। [ লাফাইয়া উঠিয়া ] একি, তুমি কোথায় পেলে এ দলিল ?
মালবিকা। এই যে এখনই দিলে ।
নীরজা। কি সর্বনাশ! দাও দাও, ফিরিয়ে দাও।
মালবিকা। [ সরিয়া গিয়া ! থাম, থাম। নৃপনাথ চৌধুরী তােমার
কে হয় ?
নীরজা। কেন, কি দরকার তােমার ?
মালবিকা। বল, সে কোথায় আছে ?
কোথায় গেলে তার দেখা
পাব ?
নীরজা। কেন, কেন? তাকে কেন ?
মালবিকা। মন্দাকিনী তাকে দেখতে চায়।
ঘৃতং পিবেৎ
১০৭
নীরজা। মন্দাকিনী! মন্দাকিনী—কোথায় সে ? সে তাে অনেক
দিন মরেছে।
মালবিকা। না না, সে হতভাগিনী মরে নি। এই যে সে।
নীরজা। তুমি ?
মালবিকা। বল, এবার নৃপনাথ কোথায় ?
নীরজা। মন্দা, মন্দা, এই যে নৃপনাথ ।
মালবিকা। তুমি নৃপনাথ ?
নীরজা। তুমি মন্দাকিনী ?
দুইজনে মূঢ়ের মত এই কথাগুলি আবৃত্তি করিল ; কয়েক মুহূর্ত পরে যেন
তাহার কথাগুলির অর্থ স্পষ্টরূপে বুঝিতে পারিল । তখন উভয়ে উভয়কে
আলিঙ্গন করিল
মন্দা, মন্দা, মন্দাকিনী !
মালবিকা। স্বামী !
আলিঙ্গন শিথিল করিয়া হঠাৎ দুইজনে যুগপৎ চীৎকার করিয়া উঠিল
মালবিকা ও নীরজা। আমি বাঁচতে চাই, বাঁচতে চাই ; আলাে চাই,
বাতাস চাই, হীনতম হয়েও বাঁচতে চাই। উঃ ভগবান ।
মালবিকা। তুমি কি
নীরজা। হঁ্যা, বিষ খেয়েছি। তুমি ?
মালবিকা। বিষ—বিষ—আর সময় নেই।
উভয়ে বসিয়া পড়িল
নীরজা। ভগবান, তােমার একি বিচার? শেষ মুহূর্তে একি
পরিহাস ?
মালবিকা। এমন করে কেনই বা দেখা হ’ল ? আর দেখা হ’লই যদি,
কেনই বা যেতে হবে ? [ চীৎকার করিয়া ] না না, আমি যাব
, আমি মরব না, মরব না, আমি বাঁচতে চাই।
••
১০৮ ঘৃতং পিবেৎ নীরজা। না, সব মিথ্যে। ভগবান নেই, ভগবান নেই। কোন সে শনি মানুষের অদৃষ্ট নিয়ে জুয়া খেলছে ! আমাদের বুক ফেটে যখন রক্ত পড়ছে, চোখ ফেটে যখন অশ্রু পড়ছে, তখন দেখি ওষ্ঠে তার হাসি ! [ মালবিকাকে জড়াইয়া ধরিয়া ] আমি তােমায় ছাড়ব না, কখখনও না। যদি মরতেই হয়, এক মৃত্যুর তলে দুজনে তলিয়ে যাব। উভয়ে নীরবে বসিয়া রহিল । মধুর প্রবেশ ; দুজনেই মধু। [ স্বগত ] এই যে, অনেক খুঁজে দেখা পেয়েছি এক জায়গায় ! এখনও বেঁচে আছে দেখছি, না জানি আমায় কতই দুষছে ! [ প্রকাশ্যে ] সার, সা, যদি কিছু মনে না করেন- নীরজা ও মালবিকা। কে? কে? ওঃ, সেই লােকটা। নীরজা। পালাও এখান থেকে, স্টপিড, রাস্কেল, মিথ্যেবাদী, ভণ্ড। মধু। আজ্ঞে, সব দোষ স্বীকার করছি। একটা ভুল হয়ে গেছে, তা বলে কি নীরজা। বটে! তা ব'লে—? তােমাকে ফাসি দেওয়া উচিত। মধু। দেখুন, আমার হয়েছে উভয় সঙ্কট। আপনারা বকছেন, আবার ডাক্তারবাবু বকবেন, যখন জানতে পারবেন, তার ওষুধে ফল হয় নি। নীরজা। ওষুধে ফল ! তাই বলে আবার আলাপ জমাতে এসেছ ! মধু। আজ্ঞে, শুধু আলাপ নয়। এবার ঠিক ওষুধ এনেছি। নীরজা। তুমি খাওগে। মধু। আজ্ঞে, রাগ করবেন না, দাম দিতে হবে না, শুধু অনুগ্রহ করে খেয়ে ফেলুন। [ ওষুধের শিশি বাহির করিতে করিতে ] ঘৃতং পিবেৎ আমি যে ভুল ওষুধ দিয়েছি, তা জানলে ডাক্তারবাবু আর আমাকে আস্ত রাখবেন না। নীরজা। ওটা কি ওষুধ ? মধু। পটাসিয়াম সায়ানাইড। মালবিকা। পটাসিয়াম সায়ানাইড । তবে আমাদের কি ওষুধ দিয়েছিলে ? মধু। বলতে ভয় করে, শুনলে চটে যাবেন। নীরজা। শিগগির বল । মধু। আজ্ঞে, যদি রাগ না করেন- নীরজা। নীরজা তাহার হাত ধরিয়া ঝাকি দিল এমন ভুল আর কখনও করি নি, আর কখনও হবে না। নীরজা। শিগগির শিগগির বল। মধু। পটাসিয়াম ব্রোমাইড। নীরজা। বিষ নয় ? মধু। আজ্ঞে না; কিন্তু সেজন্যে উদ্বিগ্ন হবেন না, এবার আর ভুল হবে । এই নিন, [ শিশি প্রদর্শন ] লেবেল পড়ে দেখুন । নীরজা। আমরা মরব না। মধু। সে আপনাদের ইচ্ছে। কিন্তু মরবার এমন সুযােগ আর পাবেন । ওষুধ নিন, দাম যা লাগে আমি দোব। নীরজা। [ মধুর অস্তিত্ব ভুলিয়া গিয়া ] মন্দা, মন্দা! ভগবান আছেন—আমরা মরব না। মধু। স্বগত ] মরবে না বটে, কিন্তু মাথা খারাপ হয়ে গেছে। প্রস্থান
১১০
মৃতং পিবেৎ
মালবিকা। প্রিয়তম, এত সুখ—এ তাে স্বপ্ন নয়?
নীরজা।
এ যে গভীর রাত্রি হতেও পারে স্বপ্ন।
}
উভয়ে জানালার কাছে আসিয়া জানালা খুলিয়া দিল—ঘরে একসঙ্গে জ্যোৎস্না,
কোকিলের গান ও রজনীগন্ধার গন্ধ প্রবেশ করিল
মন্দা, বােধ হয় এ স্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নয়।
মালবিকা। আমার কথা বলতে ভয় করছে, পাছে স্বপ্ন ভেঙে যায়।
নীরজা। দেখছ, চাঁদের জ্যোৎস্না !
মালবিকা। আর কেমন ফুলের গন্ধ !
নীরজা।
শুনছ,
ওই কোকিলের গান !
মালবিকা। আঃ, পৃথিবী কেমন সুন্দর ।
নীরজা। আর জীবন কেমন মধুময় !
মালবিকা ও নীরজা।
আবার যেন সব নতুন করে দেখতে পেলাম।
নীরজার স্কন্ধে মাথা দিয়া মালবিকা নীরবে জানালার ধারে জ্যোৎস্নায় দাঁড়াইয়া
রহিল ; জ্যোৎস্না, ফুলের গন্ধ ও কোকিলের গান
পঞ্চম দৃশ্য
সানি ভিলার দোতলার সম্মুখের গাড়ি-বারান্দা; কয়েকখানা চেয়ার সজ্জিত।
সর্বেশ্বরের প্রবেশ
সর্বেশ্বর। [ ভৃত্যদের প্রতি ] এই, কে আছিস ?
একজন ভৃত্যের প্রবেশ
ভৃত্য। হুজুর !
ঘৃতং পিবেৎ
১১১
সর্বেশ্বর। মীরাকে ডাক তাে ।
ভৃত্যের প্রস্থান
')
ওদের কি হ’ল জানা গেল না। উঃ, কি সৰ্বনেশে কাণ্ড ! কি সব
ছেলেমেয়ে হয়েছে আজকালকার ! কথায় কথায় বিষ খেয়ে বসে।
এখন এরা কিছু না করে বসে। কাল সারা রাত যে কি
দুশ্চিন্তায় কেটেছে।
প্রমীরার প্রবেশ
প্রমীরা। কি বাবা?
সর্বেশ্বর। ওদের খবর পেলে ?
প্রমীরা। কাল অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল—যাওয়া হয় নি। আজ
এখনই যাচ্ছি।
সৰ্বেশ্বর। আর গিয়ে কি হবে ? যা হবার তা হয়ে গেছে।
প্রমীরা। তবু একবার
সর্বেশ্বর। যাওয়া উচিত বইকি। কিন্তু মা, তােমরা আবার বিপদ
বাধিয়ে ব’স না। আমি চললাম, বাড়িওয়ালা বসে আছে, দেখা
করে আসি।
প্রস্থান
প্রমীরা। ইস, মালবিকা যে এমন সর্বনাশ করে বসবে তা কল্পনাও
করতে পারি নি। কাল সারা রাত্রি এঁকে চোখে চোখে ক'রে
কাটিয়েছি।
ত্রিদিবের প্রবেশ
ত্রিদিব। মীরা, কাল রাত্রে জীবনের সঙ্গে আমার শুভদৃষ্টি হয়েছে।
ওদের বিষপানের সংবাদে আমার চোখের ওপর থেকে কালাে
একখানা যবনিকা স’রে গেল। বুঝলাম, জীবন আমাদের পরীক্ষা
১১২ মৃতং পিবেৎ করে মহাদেবের মত ; পরীক্ষা করে তার দারিদ্র্য দিয়ে, ছিন্নক দিয়ে, অস্থিমালা দিয়ে, শ্মশানের ভস্ম দিয়ে। ভয় পেয়ে যারা পিছিয়ে যায়, তারা মরে । আর যারা টিকে থাকে, তারা দেখতে পায় জীবনের অনন্ত ঐশ্বৰ্য্য। কাল সন্ধ্যা পর্য্যন্ত আমার চোখের সম্মুখে ঝুলছিল বিরাট বিশ্বব্যাপী এক ছিন্নকন্য। মালবিকা। নীরজা ম'রে আমাকে বাঁচিয়ে গেছে। তাদের মৃত্যুর সংবাদে জীবনের সম্পদ আমার চোখে প্রকাশিত হয়ে পড়ল । এবার তুমি কি বল ? প্রমীরা। প্রিয়তম, তােমার চোখ দিয়ে আমাকে দেখতে শেখাও। ত্রিদিব । [ প্রমীরাকে নিকটে টানিয়া লইয়া ] আঃ, এতক্ষণে আমি সুখী। আজ আমি সকলের সম্মুখে সগর্ধ্বে স্বীকার করতে পারি, আমি মােটরের মালিক নই, আমি মােটরের চালক। প্রমীরা। ছাড়, বাবা আসছেন। সর্বেশ্বরের প্রবেশ সর্বেশ্বর। এই যে বাবা ত্রিদিব ! তােমার কাছে একটা কথা স্বীকার না করলে মনের শান্তি পাচ্ছি না। আমি গরিব,—রাজা নই, রায় বাহাদুর নই, সামান্য দরিদ্র লােক। ত্রিদিব। [ সগর্বে ] কিন্তু আমার চেয়ে গরিব নন। আমি মােটর- ড্রাইভার। প্রমীরা। চল, একবার ওদের ওখান থেকে আসা যাক। সর্বেশ্বর। হ্যা, একবার ঘুরে এস। কিন্তু তােমরা বাবা কিছু করে ব’স না। না না, চল, আমিও তােমাদের সঙ্গে যাই; তােমাদের একা ছেড়ে দেওয়া কিছু নয়।
ঘৃতং পিবেৎ ১১৩ ত্রিদিব । না, জীবনের সঙ্গে আমাদের আপস হয়ে গেছে । সৰ্বেশ্বর। চল, আর দেরি নয় । সকলে প্রস্থান করিল। একজন ভৃত্য প্রবেশ করিয়া চেয়ারগুলি পাতিয়া মুছিয়া পুনরায় সাজাইয়া দিয়া প্রস্থান করিল; অন্য দ্বার দিয়া মালবিকা ও নীরজার প্রবেশ। এক রাত্রিতে অনেক পরিবর্তন তাহাদের ঘটিয়াছে; পূৰ্বের চপলতা ও চটুলতার চিহ্নও নাই। জীবন-নিঝরিণীতে তাহাদের অভিষেক হইয়াছে নীরজা। মালবিকা। কই, কেউ নেই। দেখ, আমার অনুমান ভুল নয়। ত্রিদিব আর প্রমীরার মধ্যে ছাড়াছাড়ি নিশ্চয় হয়েছে, ওদের মধ্যে যে রকম মনােমালিন্য দেখেছিলাম- মালবিকা। আমাদের কর্তব্য তা হলে ওদের মধ্যে মিল করিয়া দেওয়া। নীরজা। কিন্তু ওদের পাচ্ছ কোথায় ? হয়তাে কে কোথায় পালিয়েছে । ওরা কি আর এখানে আছে ? সর্বেশ্বরের প্রবেশ সর্বেশ্বর। আরে, আমার লাঠিটা গেল কোথায় ? সর্বেশ্বর হঠাৎ মালবিকা ও নীরজাকে দেখিয়া স্তম্ভিত হইয়া গেল। দুই এক মিনিট মুখ দিয়া কথা সরিল না। কিছুক্ষণ পরে নিজেকে সামলাইয়া লইয়া তুমি, তােমরা—কোখেকে—কি রকম—তা হলে ওসব মিথ্যে ? নীরজা। না, সত্যি। সর্বেশ্বর। সত্যি-বিষ- নীরজ।। না, সত্যি—জীবন। সর্বেশ্বর। আরে, খুলে বল—তােমরা বেঁচে আছ কি না।
১১৪
মৃতং পিবেৎ
নীরজা।
মরব কেন ?
সর্বেশ্বর। আরে, আমিও তাে তাই বলি ; [ উচ্চৈঃস্বরে ] মীরা, মীরা,
দেখে যাও।
প্রমীরা ও ত্রিদিবের প্রবেশ
প্রমীরা ও ত্রিদিব । একি, তােমরা বেঁচে
নীরজ। না, মরেছি।
সৰ্বেশ্বর।
সে আবার কি ?
নীরজা। নীরজা-মালবিকা মরেছে।
প্রমীরা। খুলে বলুন। বুঝতে পারছি না।
নীরজা। নীরজা-মালবিকা মরেছে। আমরা নৃপনাথ আর মন্দাকিনী।
সকলে বিস্মিত, প্রমীরা যেন কিছু একটা অনুমান করিতেছে
আগে আমি একবার বিয়ে করেছিলাম।
সে একেই
প্রমীরা ব্যতীত সকলের বিস্ময় বাড়িল
বিয়ের রাত্রে হয়েছিল বিচ্ছেদ ; ভেবেছিলাম, মন্দাকিনী করেছে
আত্মহত্যা ; তারপরে একে করলাম বিবাহ ; ফলে চরম মুহূর্তে
প্রকাশ হয়ে পড়ল, ইনিই মন্দাকিনী।
প্রমীরা। একেই বলে—প্রজাপতির নির্বন্ধ ।
নীরজা। না, একে বলে—প্রজাপতির বন্ধন। সে যাকগে, এর চেয়ে
বেশি ব্যাখ্যা করবার হলে পরে করা যাবে। কিন্তু আমরা
তাড়াতাড়ি ছুটে এলাম ত্রিদিববাবু, আপনাদের সংবাদ নিতে।
ত্রিদিব। আপনাদের বিষপানের সংবাদে আমরা বেঁচে গেছি, নইলে
এতক্ষণে কি হত বলা যায় না।
সর্বেশ্বর। না না, ওসব কথা ভুলে যাও। নীরজাবাবু, আমি গরিব।
•
ঘৃতং পিযেৎ
ত্রিদিব । নীরজাবাবু, আমি মােটর-ড্রাইভার।
নীরজা। কি যে বলছেন ?
ত্রিদিব । বিশ্বাস হচ্ছে না? আপনি বড়লােক—মােটর কিনুন, আমি
ড্রাইভারি করব। আগের চাকরি আমার গেছে।
সর্বেশ্বর। তােমরা অপেক্ষা কর, আমি বাড়িওয়ালার সঙ্গে কথা বলে
আসি। লােকটা নীচে বসে আছে।
নীরজা। আপনি একা গেলে হবে না, আমরাও যাই।
তিনজনের প্রস্থান
প্রমীরা। ভাই মালবিকা, সব সুদ্ধ মিলে একটা দুঃস্বপ্নের মত মনে
হচ্ছে।
মালবিক। বরঞ্চ বল—এত দিনে দুঃস্বপ্ন কেটে গেছে। এবার
জীবনের মধ্যে জেগে উঠেছি। এত দিন জীবনকে মনে
করেছিলাম প্রহসন ; এবার দেখছি জীবন হচ্ছে ট্র্যাজেডি।
প্রমীরা। সুদীর্ঘ প্রহসনের চেয়ে সুদীর্ঘ ট্র্যাজেডি অনেক ভাল।
তােদের বিষপানের সংবাদ আমাদের চটকা ভেঙে দিয়েছিল,
নইলে আমরাও যে কি করতাম—তার ঠিক নেই। ওই দুঃসংবাদ
পেয়ে হঠাৎ পিছনের দিকে ফিরে তাকালাম ; দেখলাম, বড় সুন্দর,
বড় মধুর ! যাকে ছাড়ব ছাড়ব করছিলাম, তাকে আবার প্রাণপণে
আঁকড়ে ধরলাম।
মালবিকা। বিধাতা বিষের মধ্যে দিয়ে আমাদের অমৃতের শিক্ষা
দিয়েছেন।
বাড়িওয়ালার সঙ্গে তর্ক করিতে করিতে সৰ্বেশ্বর, নীরজা ও ত্রিদিবের প্রবেশ
বাড়িওয়ালা। না মশাই, আর টালবাহানায় ভুলছি না। হয় পাওনা
১১৬
ঘৃতং পিবেৎ
!
টাকা মিটিয়ে দিন, নইলে নীচে বডি-ওয়ারেন্টের পরওয়ানা নিয়ে
লােক বসে আছে তাকে ডাকি
সৰ্বেশ্বর। দু দিন সবুর করুন না !
বাড়িওয়ালা। এক মিনিটও আর সবুর নয় ।
নীরজা।
কত পাওনা আপনার?
বাড়িওয়ালা। তা প্রায় খরচা দিয়ে শ ছয়েক হবে।
নীরজা। সৰ্বেশ্বরবাবু, আপনি ভাববেন না, আমি মিটিয়ে দিচ্ছি।
বাড়িওয়ালা। আর বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে।
সৰ্বেশ্বর। ভাড়া পেলেন, তবে আবার কেন ?
বাড়িওয়ালা। না মশাই, আর আমি আদালতে ছুটোছুটি করতে
পারব না। নিজেদের পথ দেখুন ।
নীরজা। সৰ্বেশ্বরবাবু, আমাদের বাড়িতে চলুন না। সেখানে অনেক
গুলো ঘর খালি পড়ে আছে।
সর্বেশ্বর। বাবা নীরজা, তােমাকে যে কি বলব ।
নীরজা। সে সব পরে হবে। এখন যাবার আয়ােজন করা যাক,
চলুন।
বাড়িওয়ালা। আজকেই যেন বাড়ি খালি করে দেওয়া হয়। আর
টাকাটা—?
নীরজা। আপনি নীচে যান, আমি আসছি।
বাড়িওয়ালার প্রস্থান ও জগন্নাথের প্রবেশ
জগন্নাথ । বাড়ি ছাড়তে হবে নাকি? এবার আবার কোন্ ভিলাতে ?
নীরজা। আমার ওখানে কিছুদিন থাকবেন, চলুন।
জগন্নাথ। তবে চলতেই হবে। চল। একটা গল্প শুনবে ?—এক ছিল
ঘৃতং পিবেৎ ১১৭ রাজা, তার দুই রাণী—দুই সতীন, সুয়াে আর দুয়াে ; দুজনে চুলােচুলি, মারামারি। রাজা বলে, হয় তােমরা ভাব করে নাও, নইলে দুজনে যাও বাপের বাড়ি। তারা ভাবও করে না, আবার দুজনে দুজনকে ছেড়ে থাকতেও পারে না।—এক. রাণুর নাম জীবন, অরে এক রাণীর নাম মরণ।' বলি, লাগল কেমন ? নীরজা। বেশ। তবে মাঝে মাঝে তারা ভাব করে নেয়। জগন্নাথ। [ হাসিয়া ] নেয় ! বটে! তখন মানুষ হয় অমর। সকলের একে একে প্রস্থান, বাড়িওয়ালার ভৃত্য আসিয়া ছাদের ধারে বড় এক- খানি প্ল্যাকার্ডে “To Let” ঝুলাইয়া দিয়া গেল। যাইবার সময় গাড়ি-বারান্দার দরজা সশব্দে বন্ধ করিয়া দিল। তখন রঙ্গমঞ্চের পটভূমিতে কেবল একটি বন্ধ দ্বার দৃশ্যমান হইল যবনিকা পতন
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.