Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Shri Manmaharshi Debendranath Thakur
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
শ্ৰীমন্মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
মহােদয়ের জীবন বৃত্তান্তের
স্বল্প পরিচয়।
শ্ৰীঈশান চন্দ্র বসু প্রণীত।
83
কলিকাতা।
২০, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট,
মজুমদার লাইব্রেরী দ্বারা প্রকাশিত।
1902.
The right of translation and
reproduction is reserved.
মূল্য • আনা।
PRINTED BY Kunj. BIARI DE,
Varasundara Pons, 9x. Ilarrason kond,
Couleutia.
Sace వస్తువులు
No text on this page.
নেনিন
মঙ্গলাচরণ।
তস্মাদ্ধং সহায়র্থিং নিত্যং সঞ্চিনুয়াৎ শনৈঃ।
ধৰ্ম্মেণ হি সহায়েন তমরতি দুস্তর।
, s.cভGভনচ্ছি
বেদের প্রধান নিত্য ধর্মের ব্যাখ্যানে।
এই তত্ত্ব গুরুদেব লভি তব স্থানে।
উনচত্বারিংশ বর্ষ হইল বিগত।
এখনাে নিরখি সেই পূরব পৰ্ব্বত।
অভ্রভেদী দেবতাত্মা অত্যুচ্চ মহান্ ।
যাহা হৈতে বিকাশে বিজ্ঞান-অংশুমান্ ।
ভাতিল সমস্ত বিশ্ব জাগিল ভারত।
মর্ত্যে দেখি অমৃতের দিব্য মুক্ত পথ ।
“সংসার-তিমির অন্তে জ্যোতির আধার।
সত্য শিব পরব্রহ্ম অনন্ত অপার।”
কৃপা কর মহাগুররা এ ভিক্ষা চরণে।
এই মন্ত্র জপি যেন জীবনে মরণে ॥
শুভ শুভ
১৭২৩ শকাব্দ। ১১ই মাঘ।
No text on this page.
প্রথম প্রস্তাব।
কৰ্ম বিবরণ।
No text on this page.
ভুমিকা। বাঙ্গালীজাতি “মূখসৰ্ব্বস্ব” বলিয়া নিন্দার ভাজন হইতেছেন। এই নিন্দার তাৎপৰ্য্য এই যে, বাঙ্গালী- দিগের কৃত বহু সৎকর্মের প্রত্যাশা করায়ায় ; তাহাতে ত্রুটি হয় কেন ? এক্ষণে জিজ্ঞাসা করি, বঙ্গবাসিগণ এবং প্রকার প্রত্যাশার বস্তু কত দিন? তাহা ৮৫ বৎসরের অধিক হইবে না। যে একমাত্র পুরুষ দীর্ঘকাল ব্যাপিয়া আমাদের নবাদয়ের প্রথম অবস্থা হইতে আমাদিগকে কর্তব্যপথে পরিচালিত করিতেছেন, যাহার পবিত্র জীব- নের প্রভাবে বঙ্গবাসিগণ সুসভ্যজনােচিত সমস্ত সৌভা- গ্যের অধিকারী হইয়াছেন, তাঁহার মহত্ত্বমণ্ডিত মূর্তি এখনো আমাদের চক্ষুর গােছর রহিয়াছেন। তবে আমরা ধৰ্ম্মোৎসাহ ও কৰ্মশীলতা হারাইব কেন ? যৌবনারম্ভে এই মহাত্মা যে তীর্থযাত্রা করিয়াছিলেন, তখনি শত শত কৃতবিদ্য ব্যক্তিকে সেই তীর্থাভিমুখে তাঁহার অনুযাত্রী হইতে দেখাগিয়াছিল। পরে বঙ্গের মুখােজ্জ্বলকারী সহস্র সহস্র সৎপুরুষ তাঁহার পথে চলিয়া- ছেন। ভবিষ্যতে লক্ষ লক্ষ সাধুশীল ব্যক্তি এই পথে পুণ্যতীর্থে গমন করিবেন। এই সকল সদাশয় লােক W4 new চলিতে চলিতে ভগােদ্যম অথবা লক্ষ্যভ্রষ্ট না হয়েন, এনিমিত্ত আলােক কন্তু স্বরূপ এই মহাপুরুষের জীবন- চরিত সম্মুখে বিধৃত রাখা কর্তব্য। ভবিষ্যতে এই বিষয়ে বৃহত্তর পুস্তক সকল রচিত ও প্রকাশিত হইবে। আপাততঃ সুশিক্ষিত বঙ্গবাসীদিগের জ্ঞানগুরু উক্ত মহাত্মার প্রতি কৃতজ্ঞতার অবসর বহিয়া না যায়, এবং তাহার উপদেশের প্রতি মনোেযােগর শৈথিল্য হয়, ইহাই এই ক্ষুদ্র পুস্তকের উদ্দেশ্য। এই প্রবন্ধ ১৩২ সালের শ্রবণ মাসের সমীরণ পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছিল। শেষাংশে কিঞ্চিৎ সংযােগ বিয়ােগ এবং কয়েক স্থলে টীকা নিয়ােগ পূর্বক এই পুস্তকাকারে প্রচারিত হইল। ১৮২৩ শকাব্দ, ১৩০৮ সাল, ১১ই মাঘ।
শ্ৰীমন্মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর।
মহাত্মা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর সুপ্রসিদ্ধ দ্বারকানাথ ঠাকুর
মহাশয়ের জ্যেষ্ঠ পুত্র। ১৭৩৯ শকের ৩রা জ্যৈষ্ঠ ইহার
জন্ম হয়। এ সময়ে এ দেশে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের চর্চায়
যে নৰষুগের অবতারণা হইয়াছিল, দেবেন্দ্রনাথ তাহার
উত্তরসাধক। অতএব সেই প্রসঙ্গে ইহার জীবন চরিত্রের
আললাচনা করিলে সুসঙ্গত হয়।
যখন দেবেন্দ্রনাথ জন্মগ্রহণ করেন, তাহার ৪ মাস
পূৰ্বে ১৮১৭ খৃষ্টাব্দের ২০জানুয়ারী কলিকাতায় হিন্দু
কলেজ প্রকরণে বিদ্যালােক বিকীর্ণ হইবার দ্বার উদঘাটিত
হইয়াছিল।
প্রথমে হিন্দু কলেজের ‘মহাবিদ্যালয়” নাম ছিল।
জন্মাবধি বা জন্মপ্ৰসঙ্গাবধি এই বিদ্যালয় নানা প্রকার
“গ্ৰহবৈগুণ্য” ভােগ করিয়া আসিতেছিল। ইহার জন্ম
স্থানে যে সকল কর্তা বা গ্রহের অধিকার ছিল, তাহারা
কখনই সদ্ভাবে একমত হইয়া সৰ্বান্তঃকরণে ইহার উন্নতি
বিধান করিতে পারেন নাই। ১৮১৬ খৃষ্টাব্দের ১৪ই
মে হইতে বারম্বার সভা হয়। ২৭শে আগষ্টের সাধারণ
[ ১ ] সভায় এই বিদ্যালয়ের নিয়মাবলী নির্ধারিত হয়। তাহার পাঁচ মাস পরে উহার কাৰ্যারম্ভ হয়। এত দিন ধরিয়া উক্ত বিদ্যলয় সম্বন্ধে যে সকল বাদা- নুবাদ হইতেছিল, তাহার মধ্যে প্রধান তর্ক আমরা এই জানিতেছি যে,রামমােহন রায়কে এই বিদ্যালয়ের সংস্পর্শে রাখা যায় কি না ? স্থির হইল—“না।” এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়া উহার প্রতিষ্ঠাতাগণ আপনাদিগকে নিষ্কণ্টক জ্ঞান করিলেন। ইংরাজী, পারসী ও বাঙ্গালা ভাষায় শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থাসমম্বিত মহাবিদ্যালয়ের কাৰ্য্য অবাধে চলিতে লাগিল। পরন্ত এই বিদ্যালয়ের দ্বারা আশানুরূপ ফল লাভ হইবে না, ইহা জানিতে পারিয়া ইহার প্রধান অনুষ্ঠাতা ডেবিড়, হেয়ার পর বৎসর (১৮১৮ অব্দে) “স্কুলসসাসাইটী” নামে এক সভা স্থাপন করেন। তাহার তত্ত্বাবধানে কতকগুলি পাঠশালা ও স্কুল স্থাপিত হয়। এই সকল বিদ্যালয়ের হিন্দু প্রতিষ্ঠাতাগণ ধৰ্ম্ম সম্বন্ধে রামমােহন রায়ের বিষম বিদ্বেষী ছিলেন। কিন্তু তাহারা অজ্ঞানান্ধতার দোষ না বুঝিতেন, এমন নহে; অতএব তাহারা সুশিক্ষার প্রচারের পক্ষপাতী হইয়াছিলেন । তথাপি ইহাদের অন্তঃকরণে যে অজ্ঞান-কালিমা ছিল, তার ফল সৰ্বাংশে শুভজনক হইবে না, ইহা বিশুদ্ধ- জ্ঞানসম্পন্ন রামমােহন রায়ের অগােচর ছিল না। রাম
[ ১১ ] ,
ry ।।।
৫n
।।।।।।। •••••••••••••••••••
মােহন স্বদেশীয় লােকদিগের যতটুকু সৎকাৰ্য্য দেখিতে
পান, তাহাতেই আনন্দানুভব করিতেন।
এই বিদ্যালয়রূপ পুত্র সকলের পিতৃস্থানীয় ডেবিড়,
হেয়ার সাহেব রামমােহন, রায়ের হৃদয়ের বন্ধু ছিলেন।
মহাত্মা রামমােহন সেই বন্ধু দ্বারা যথাসম্ভব এই সকল
বিদ্যালয়ের উন্নতি পক্ষে সুপরামর্শ প্রদান করিতেন।
তিনি এইরূপে স্কুল প্রকরণের কাৰ্য্য হইতে দূরে থাকিয়া
স্বদেশীয়দিগকে তৎপক্ষে নিদ্বন্দ্ব করিয়া দিলেন। তথাপি
তাহাকে ভাবতে হইয়াছিল,-- ধৰ্ম্ম জ্ঞান-সমম্বিত সুশিক্ষা
প্রচারের কি উপায় হয় ?*
‘ধৰ্ম্মজ্ঞান সমম্বিত সুশিক্ষা প্রচারের বাহুল্য হউক”,
—ইহা রামমােহন রায়ের এক অন্তঃস্ফূর্ত প্রার্থনা।
* এই চিন্তায় রামমোন রায় ১৮২২ অব্দে আপনার আয়ত্ত মতে
এক স্কুল স্থাপন করেন। তাহা বহুবৎসর চলিয়াছিল। এই স্কুলে ,
ইতিহাসদি সহ বিশুদ্ধ ধৰ্ম্মনীতির শিক্ষা দেওয়া হইত। ইহার এক
পরিদর্শক, আদম সাহেব, ১৮২৭ অব্দে একস্থলে লিখিয়াছিলেন?
"Two teachers are employed, one at a salary of 150
li.
per month, and the other nt aralary of 70 Rs.
per month; and from 60 to 80 Tindu boys are ins:
tructed in the Englislı language. The doctrines of
Christianity are not inculcated, but the duties of
morality are carefully enjoined, and the facts belonging
to the history of Christianity are taught to those
pupils who are capable of understanding general
history."
[ ১২ ] Marusuta Ranwww ঈশ্বর সে প্রার্থনা শুনিলেন। ১৮১৬ অব্দের ২৭শে আগষ্ট, যখন রামমােহন রায়কে ত্যাগ করিয়া হিন্দু কলে- জের অনুষ্ঠাতৃগণ ধর্মজ্ঞানবিহীন শিক্ষাপ্রচারের নিয়মা- বলি অবধারণ করিলেন, সেই সময় আমমােহন রায়ের প্রার্থনার ফলস্বরূপ দেবেন্দ্রনাথ গর্ভস্থ হইয়াছি লেন। দশ মাস পার এই শিশু ভূমিষ্ঠ হইলেন। রাম- মােহন রায়ের এই বান্ধবপুত্র অতি শৈশব বয়সেই তাঁহার দিব্য দৃষ্টিতে আপনার ভবিষ্য কৰ্ম্মের সূচনা করি- ছিলেন। হিন্দু কলেজে বা মহাবিদ্যালয়ে যে প্রণালীতে শিক্ষা প্রদান হইতেছিল, তাহার ফল সঙ্গে সঙ্গে ফলিল। নাস্তিকতার বাত্যায় কলেজ সমূলে আন্দোলিত হইল। এত যত্নের বিদ্যাবৃক্ষের এই বিষম বিকৃত ফল দর্শন * Rules of the Hindu College.--I. The primary object of this Institution is the inition of the sons of respectable Hiadoos in the English and Indian ladge guage and in the literature and science of Enrop and Asia, «David Hare, by Peary Chand Mittra, Appendix A. শুনাযায় রামমোহন রায় এই শিশুকে দেখিয়া বলিয়াছিলেন, এই শিশু অামার স্থান অধিকার করিবে।
[ ১৩ ]
.........
করিয়া ধৰ্ম্মপ্রাণ রামমােহনের অন্তঃকরণে বড়ই ব্যথা
জন্মিয়াছিল।
এক্ষণে রাজোপাধিধারী রামমােহন ইংলণ্ড গমনের
উদ্যোগ করিতেছিলেন। যাত্রাকালে তিনি তাঁহার
নয়নানন্দকর দেবেন্দ্রনাথের হন্ত ধারণ করিয়া কি কয়ে-
কটা কথা বলিয়া গিয়াছিলেন, তাহা কেহ লিখিয়া রাখিতে
পারেন নাই। তঁাহার গম্ভীর ভাব এবং নিয়ত প্রার্থনা-
* রামমােহন রায় ইংলণ্ডে গিয়াও তাহার এই মনােব্যথা ও
অক্ষেপ ভুলিতে বা চাপিয়া রাখিতে পারেন নাই। তাহার
তত্ৰত্য জীবনচরিতাখ্যায় লিখিয়াছেন।
"In his younger years, his mind had been deeply
struck with the evils of believing too much, and
against that he directed all his energies ; but, in his
latter dars, he began to feel that there was as much,
if not greater, danger in the tendency to believe to
little. He often deplored the existence of a party
which had sprung up in Calcutta,composed principally
of imprudlent young men, soinu of them possessing
talent, who had avowed themselves sceptics in the
widest sense of the term. He (lescribed it as partly
composed of East Indians, partly of the Hindu youths.
who, from education, lad learnt to reject their own
faith without substituting any other. These he thought
more debased than the most bigoted Hindu, and their
principles the bane of all morality."
Biography of Raja Rum Mohun Roy: London,
1888-34.
[ ১৪ ] NA পূর্ণ ঈশ্বর-প্রেমােদ্দীপক মুখচ্ছবি দর্শন করিয়া দেবেন্দ্রনাথ আত্মহারা হইতেন, অথবা আপনাকে তাহার অন্তর্নিবিষ্ট করিয়া ফেলিতেন ; অতএব তিনিও তঁাহার যাত্রাকালীন, আশীৰ্বাদবচন বা অধিকার-দান-মন্ত্র স্মরণ করিয়া রাখিতে সমর্থ হয়েন নাই। ১৮৩১ অব্দের ৮ই এপ্ৰেল দিবসে রামমোহন রায় ইংলণ্ডের অন্তর্গত লিবরপুল নগরে উপনীত হইলেন। ২৫শে এপ্ৰেল দিবসে কলিকাতায় হিন্দু কলেজের শিক্ষক ডিরােজি ও সাহেব কৰ্ম্ম ত্যাগ করিলে তৎকালীন শিক্ষা- সংক্রান্ত বাতাবর্তের অবসান হইল # । এইরূপে এদেশে অজ্ঞান দূরীভব ও ধর্ম জ্ঞানসহকৃত সুশিক্ষা বিধানের কাল সমুপস্থিত হইলে রামমোহন রায়ের মহা প্রাণে অনুপ্রাণিত ৮ ডিরোজিও (ii. L. v. jotoi ) নামক এক ব্যক্তি হিন্দু কলেজের শিক্ষক ছিলেন। তিনি ইউরেনিয়ান। তিনি ভারত- বর্ষকে স্বায় জন্মভূমি বলিয়া মাতৃসম্বোধন করতেন। তিনি সভা করিয়া হিন্দু ক’লজের প্রধান ছা=দিকে ধৰ্ম্মনীতি ও সমাজ সম্পর্কে উপদেশ দিতেন। তাহার উত্তেজনায় ঐ সকল ছাত্রের বিজাতীয় ভাব প্রবল হয়। ইহাদের আদশে উত্তরকালে কলেজের যথেচ্ছাচারী ছাত্র- বৃন্দ “য়? বেঙ্গল” অখ্যা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। হিন্দুকলেভে র প্রথম ফলস্বরূপ উক্ত ছাত্রগণর অহিন্দু আচরণ হেতু কলেজের কর্তৃপক্ষদিগের মধ্যে বাদানুবাদ উপস্থিত হইয়াছিল। অবশেষে ডিরােজিও সাহেবকে ছাড়াইয়া কলেজে শান্তিরক্ষা করা হইয়াছল। এস্থলে স্মরণ করা কৃর্তব্য যে, সুবুদ্ধি ব্লান মোহন রায় তাহার প্রিয় বন্ধু আদিম সা হবকে ভজনালয়ে ও তাহার স্কুলে প্রাধান্য দিয়া ছিলেন; কিন্তু তাহার দ্বারা কোনক্রমে কোন বিজাতীয় ভাব সংক্রমণ করতে দেন নাই।
[ ১৫ ]
htn
handknA
••••n
anwr:
ধীমান্ দেবেন্দ্রনাথ হিন্দুকলেজের শিক্ষা গ্ৰহণার্থ তথায়
প্রবিষ্ট হইলেন। তখন দেবেন্দ্রনাথের বয়ঃক্রম চতুর্দশ
বৎসর। ইতিপূর্বে তিনি রামমােহন রায়ের নিজের স্কুলে
অধ্যয়ন করিয়াছিলেন। যে বিদ্বেষ বশতঃ হিন্দুকলেজের
অনুষ্টাতৃগণ রামমােহন রায়কে উহার সংস্পর্শ হইতে
তফাৎ করিয়াছিলেন, সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত হইলে
তঁাহার স্কুলের এই মহাশালি শস্যবৃক্ষ উক্ত কলেজে প্রতি
রােপিত হইল।
রামমােহন রায় ১৮১৪ হইতে ১৮৩০ অব্দ পর্যন্ত
১৬ বৎসর কলিকাতায় অবস্থিত হইয়া লুপ্ত প্রায় বেদান্ত
শাস্ত্রের প্রচার দ্বারা এদেশে ধর্ম বিষয়ে যে যুগান্তর
উপস্থিত করিয়াছেন, তদ্বিষয়ে আমাদের এ প্রবন্ধে অধিক
অালােচনা করিবার প্রয়ােজন নাই। তাহার স্থলাভিষিক্ত
দেবেন্দ্রনাথ তাহার পবিত্র দীর্ঘ জীবনে কি কি কাৰ্য্য
করিয়াছেন, আমরা তাহারই কিছু কিছু লিপিবদ্ধ করিতে
প্রবৃত্ত হইয়াছি।
আমাদের বিবেচনায় শ্রীমন্মহর্ষি দেবেন্দ্র নাথের জীবন
চরিত আলােচনা করিবার কাল এখনো সমুপস্থিত হয়
নাই। কারণ, ব্রাহ্মসমাজের অবলম্বিত শাস্ত্রীয় বিচার ও
তদনুগত লোকশিক্ষার এখনাে বহু কৰ্ম্ম অবশিষ্ট আছে।
ব্রাহ্মসমাজের এই অপেক্ষাকৃত অল্প বয়সে তাঁহার ইতি-
হাসপ্রিয় সভ্যগণ “ইতিহাস” নামে তৎসংক্রান্ত অনেক
[ ১ ] কথা লিখিয়াছেন। তাহাতে দেবেন্দ্র নাথের ধর্মপ্রবৃত্তি পৰিস্ফুরণ ও উন্নতি সাধনের কতকগুলি ভিন্ন-লক্ষণযুক্ত সােপান বা অবস্থা প্রদর্শিত হয়। কিন্তু বস্তুতঃ তাহার একই মূর্তির ক্রমশঃ বিকাশ দেখা যাইতেছে। শৈশব কালে তিনি যেরূপ নিষ্ঠা সহকারে অহরহ দেবদেবীর পূজায় নিবিষ্ট থাকিতেন, এখনাে তিনি সেই- রূপ নিঠায় নিরন্তর ব্ৰহ্মধ্যানে মগ্ন রহিয়াছেন। তখন বালকের যােগ্য দেবমূর্তি, এক্ষণে জ্ঞানবৃদ্ধ ঋষি সেবিত পরমাত্মা, একই ভাবে তাঁহাকে উত্তরােত্তর উন্নতি মঞ্চে অধিরােহিত করিতেছেন। বাল্যকালের স্বভাবসিদ্ধ বুদ্ধিশক্তি ও ধৰ্ম্মপিপাসা ক্রমশঃ পরিস্কৃত ও পরিমা- জ্জিত হইয়া ঈশ্বরে অনু প্রবিষ্ট হইতেছে। আকর্ষণ ও বিকর্ষণে দেবেন্দ্র নাথের অন্তরাত্মার একই নিষ্ঠা পরিবর্ধিত হইতেছে। ভাগ ভাগ করিয়া যতই বিচার করা যাইবে, মহর্ষি দেবেন্দ্র নাথের জীবন চরিতের সকল অবস্থাতে লক্ষণ পরিস্ফুট হইবে। সম্প্রতি তাহার জীবন চরিত সম্বন্ধে তাঁহার ভাব- বিকাশের ক্রম বা অভিলক্ষিত বিষয়ের ফলাফল বিচার না করিয়া আমরা এই মাত্র দেখিব যে, তিনি কোন্ কোন্ সময়ে কি কি কাৰ্য্য করিয়াছেন এবং কোন্ কোন সময়ে কি কি প্রধান উপদেশ দিয়াছেন। নানা ঐ [ ১ ] তত্ত্ববােধিনী সভা। কলেজ পরিত্যাগের পর দেবেন্দ্র নাথের প্রথম কাৰ্য তত্ববােধিনী সভাস্থাপন। ১৭৬১ শকের ২১ আশ্বিন রবি বার কৃষ্ণ পক্ষীয় চতুর্দশী তিথিতে এই সভা সংস্থাপিত এই সভাস্থাপনের দেড় বৎসর পূর্বে হিন্দুকলেজের উত্তীর্ণ ছাত্রগণ অপরাপর ছাত্রগণের সহিত এক সভা প্রতিষ্ঠা করেন। তাহার নাম—The Society for the acquisition of general knowledge. বাঙ্গালা ভাষার তাহাকে “সাধারণ জ্ঞানােপার্জিকা সভা” বলা হইত। ১৮৩৮ অব্দের ১৬ মে তাহার কাৰ্যারম্ভ হয়। সাধারণত ইংরাজী ভাষায় এবং কখন কখন বাঙ্গালা ভাষায় এই সভায় বক্ততা হইত। ছাত্রাবস্থায় যে স্বল্পমাত্র জ্ঞান সঞ্চয় হয়, তাহার সম্বর্ধন এবং পরস্পরের মধ্যে সম্ভাব উৎপাদন করা এই সভার উদ্দেশ্য ছিল। প্রায় দুই শত যুবক ইহার সভ্য হইয়াছিলেন। তন্মধ্যে শ্রীমৎ দেবেন্দ্র নাথের নামও দৃষ্ট হয়। এই সভার সভ্যেরা কলেজ-লব্ধ সংস্কার বশতঃ ধর্ম- ১৮৩৯ খৃষ্টাব্দের ৬ অক্টোবর। ইহার ছয় বৎসর পূর্বে ১৮৩৩ অব্দের ২৭ সেপ্টেম্বর (১৭৫৫ শকের ১২ আশ্বিন শুক্রবার শুক্লপক্ষীয় চতুর্দশী তিথিতে) ইংলণ্ডের অন্তঃপাতী বৃষ্টল নগরে রাজা রামমােহন রায়ের মৃত্যু হইয়াছিল। ২ •••••• [ ১৮ ] ••••••••••••• বিষয়ে কোন আলােচনা করিতে একান্ত পরায়ুখ ছিলেন। ধর্মের অনুশীলন করিলে হিন্দুসমাজের আবহমান-কাল- প্রচলিত রীতিনীতি বিচলিত হইবে, এই আশঙ্কায় কলে- জের অধ্যক্ষগণ কলেজের ছাত্রদিগের পক্ষে ধর্মচর্চা করা দৃঢ়রূপে নিষেধ করিয়া দিয়াছিলেন। কিন্তু দেবেন্দ্র নাথ ঐ কার্যের নিমিত্তই জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। অতএব তাঁহার পক্ষে এই সভা কোন কাৰ্য্যেরই হইল না। তাহাকে ধৰ্মচৰ্চ্চা নিমিত্ত এক পৃথক্ সভার সৃষ্টি করিতে হইল। জ্ঞানােপার্জিকা সভা ২০০ সভ্য লইয়া মহাড়ম্বরে কলেজগৃহে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। দেবেন্দ্রনাথের তত্ত্ববাে- ধিনী সভা আপাততঃ তাঁহার জ্ঞানপিপাসা চরিতার্থ জন্যই স্থাপিত হইয়াছিল, বলিতে হইবে। কারণ, অতি অল্পমাত্র অকৃতবিদ্য সভ্য সমেত এই সভার অধিবেশন ও জ্ঞানালা- পন তাহার নিজ বাটীর এক নিভৃত প্রকোষ্ঠে সাধিত প্রতি মাসে এই সভার বৃহৎ অধিবেশন হইত। এক এক ব্যক্তি নির্দিষ্ট মত বক্তভা পাঠ করিলে তাহার এবং অন্যান্য বিষয়ের আলােচনা হইত। * হইত। * অতি অল্প সংখ্যক সভ্য লইয়া এমন নিভৃতভাবে ইহার কাৰ্য্য আরম্ভ হয়। পরে বর্ধমানের মহারাজা মহাতাপ চদি বাহাদুর, নদী- যার শচন্দ্র রায়, এবং কলিকাতার বিখ্যাত রাজেন্দ্রলাল মিত্র, রাম গােপাল ঘোষ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ভবানীপুরের শম্ভুনাথ পণ্ডিত প্রভৃতি মহামান্য ধনী, বিদ্বান ও উচ্চপদস্থ ব্যক্তিগণ ইহার সভ্য শ্রেণী- ভুক্ত হইয়াছিলেন।
[ ১৯ ]
“তত্ত্ববােধিনী” নাম এবং এই সভার আলােচিত
উপনিষদাদির বিষয় চিন্তা করিলে প্রতীত হইবে যে, শ্রীমৎ
দেবেন্দ্র নাথ ধৰ্ম্মজ্ঞানৈষণায় এক স্বতন্ত্র পুরুষ। এরূপ
কথিত আছে যে, তিনি এক দিবস উপনিষদ গ্রন্থের এক
ছিন্ন পত্র প্রাপ্ত হইয়া তাহার অর্থবােধ উপলক্ষে ব্রাহ্মসমা-
জের আচাৰ্য্য শ্ৰীযুক্ত রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ মহাশয়ের নিকট
গিয়া উপনিষদুক্ত ব্ৰহ্মবিদ্যার উপদেশ প্রাপ্ত হয়েন।
কিন্তু এই সাধনা ও সিদ্ধি কিয়ৎকালের কর্মফল নহে।
তাহার স্বভাববাদিত ব্রহ্মজ্ঞান কখন নক্ষত্ৰ-খচিত
আকাশ দর্শনে, কখন শ্মশানক্ষেত্ৰ-প্রবাহিত বৈরাগ্য গীত
শ্রবণে, কখন বা উপনিষৎ পাঠে অতি সহজেই আত্মার
মধ্যে ঘূৰ্ত্তি প্রাপ্ত হইয়াছে। তিনি কৃতবিদ্য অকৃতবিদ্য
সকল প্রকার লােককে লইয়া ধৰ্ম্মালােচনা করিতেন।
যাহার যতদুর সাধ্য, তিনি তাহার ব্রহ্মজ্ঞানের অংশভাগী
হইতেন। সকল লােকের সহিত ধৰ্ম্মালাপ করা তাহার
নিরতিশয় আনন্দের বিষয় ছিল। ইহা তাঁহার এক
বিশেষত্ব
[ ২ ]
৫wn
তত্ত্ববােধিনী সভার সহিত ব্রাহ্মসমাজের যােগ।
তত্ত্ববােধিনী সভাস্থাপনের ২ বৎসর পূর্বে দেবেন্দ্র
নাথ হিন্দুকলেজের ছাত্রদিগের সহিত মিলিত হইয়া
তাহাদের ভাব গতি জানিয়াছিলেন। ইহার পরে দুই
বৎসর তিনি ব্রাহ্মসমাজ সংক্রান্ত প্রবীণ লােকদিগের
উদ্দেশ্যও চেষ্টার ফলাফল পৰ্যবেক্ষণ করিলেন। এই চারি
বৎসরে পূর্বোক্ত কলেজের কৃতবিদ্য ছাত্রগণ তাহার বিদ্যা
বুদ্ধি ও ধর্মভাবের প্রতি শ্রদ্ধাযুক্ত হইয়া উঠিয়াছিলেন।
তিনি তাঁহাদিগকে লইয়া ব্রাহ্মসমাজের সহিত যােগ
দিলেন। তাহাতে ব্রাহ্মসমাজের বলাধান হইল ; দেবে-
নাথেরও কাৰ্য্যক্ষেত্র প্রসারিত হইল। ১৭৬৩ শকে এই
ভ সন্মেলন হয়।
বিষয় কৰ্ম্ম।
এখন দেবেন্দ্র নাথের বয়ঃক্রম ২৫ বৎসর। এই
পঞ্চ বিংশ বৎসর ধরিয়া দেবেন্দ্র নাথ যে কেবল জ্ঞান
ধৰ্ম্মের চর্চা করিয়াছেন, বিষয় কৰ্ম্ম কিছু করেন নাই,
তাহা নহে। তিনি যে মহাপুরুষের সন্তান, তাহার পৃথিবী
জুড়িয়া কৰ্ম্ম । তাঁহার অনন্ত বিষয় ব্যাপারে তাঁহার
জ্যেষ্ঠ পুত্রকে অবশ্যই লিপ্ত হইতে হইয়াছিল। খৃঃ ১৮৩৪
[ ২১ ] ।
।
।।।।।
।।। । ।
।।।।
।।।।।।।।।।।। //// । ***
অব্দে দ্বারকা নাথ ঠাকুর চাকুরী সম্বন্ধে মহােচ্চ পদ ত্যাগ
করিয়া স্বাধীন বৃত্তি অবলম্বন উদ্দেশে ‘কার, ঠাকুর এবং
কোম্পানি’ নামে এক বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করেন।
দেবেন্দ্রনাথকে সেই কুঠিতে বিষয় কৰ্ম্ম শিক্ষা করিতে
হইয়াছিল। এবম্বিধ আরে কোন কোন কৰ্ম্ম এবং
জমিদারী ব্যাপার শিক্ষা করিয়া দেবেন্দ্রনাথ : পিতার
উপযুক্ত সুপুত্র হইতে পারিলেন, সংসারের সহিত
কাৰ্য্য করিতে জানিলেন, এবং পার্থিব বিষয়-ভার বহনের
যােগ্যতা লাভ করিলেন; কিন্তু কিছুতে বদ্ধ হইলেন
। স্বভাবসিদ্ধ ধর্মানুরাগ প্রভাবে তিনি এই জটিল
বিষয় জালের মধ্যে নিলিপ্ত রহিলেন। অথবা ইহা
বলিতে পারা যায় যে, সুদীর্ঘ জীবনকাল তিনি ঘাের বিষয়
সংস্পর্শে থাকিয়াও কেমন অনাসক্ত ভাবে ঋষিধৰ্ম্ম পালন
করিবেন, প্রথম যৌবনে তিনি তাহারই পরীক্ষা প্রদান
করিয়াছিলেন।
4
তত্ত্ববােধিনী পাঠশালা।
এপর্যন্ত যাহারা সুশিক্ষিত বা দেশানুরাগী বলিয়া
পরিচিত হইতেন, তাহারা অধিকাংশ বিষয়ে ইংরাজদিগকে
আদর্শ ও নেতা বিবেচনা করিতেন। কিন্তু ইংরাজসংসর্গ।
এদেশীয় সাধারণ লােকের কোন দিনই তৃপ্তিজনক হয়
[ ২২ ] A Whan ।।।। নাই। এই জন্য ১৮১৭ অব্দে যখন হিন্দুকলেজ স্থাপন হয়, ১৮১৮ অব্দে যখন স্কুল সােসাইটী দ্বারা পাঠশালা সকল স্থাপন হয়, ১৮৩৫ অব্দে যখন মেডিকেল কলেজ স্থাপন হয়, সেই সেই সময় সাধারণ লােক ঐ সকল দেশহিতানুষ্ঠানের নিন্দাবাদ করিতে ক্ষান্ত হয় নাই। ১৮৩৯৪০ অব্দ পর্যন্ত বঙ্গদেশের নানা স্থানে গবর্নমেন্ট দ্বারা স্কুল ও কলেজ সংস্থাপিত হইল। খৃষ্টীয় মিশনরিগণ গ্রামে গ্রামে কত বিদ্যালয় স্থাপন করিলেন। কিন্তু-লােকেরা ঐ হিতানুষ্ঠান- কারীদিগের প্রতি একপ্রকার সন্দিহান চিত্ত হইয়াছিল। এমন অবস্থায় তত্ত্ববােধিনী সভা কলিকাতায় এবং পল্লীগ্রামে নূতন প্রকরণে পাঠশালা সকল স্থাপনের উপক্ৰম করিলেন। পূৰ্বে সমাজদ্রোহিতার ভয়ে এ দেশীয়েরা সুশিক্ষার নামে নিরীশ্বর বিদ্যা শিক্ষার বিস্তার করিতেন। দেবেন্দ্রনাথ নিঃসঙ্কোচে উপনিষদাদি শাস্ত্রের সহিত ধর্মশিক্ষার ব্যবস্থা করিয়া তত্ত্ববােধিনী পাঠশালা প্রতিষ্ঠিত করিলেন। এই বিদ্যালয়ের পুস্তক, অধ্যাপক ও অধ্যয়ন প্রণালীতে যে যে ত্রুটি থাকুক, ইহা খাঁটি দেশীয় জিনিষ, এই খ্যাতিতে দেবেন্দ্রনাথের এই নবােদ্যম জয়যুক্ত হইতে লাগিল। * তত্ত্ববোধিনী পাঠশালা ১৭৬২ শকে প্রথমে কলিকাতায় প্রতি- ষ্ঠিত হয়। তখন এই মহানগরীতে ইংরাজী-প্রধান অনেক বিদ্যালয় সংস্থাপিত হইতেছিল। সুসাধু বঙ্গভাষায় বিজ্ঞান শাস্ত্র ও ধর্মশাস্ত্র [ ২৩ ] A • ••••• ••••••••••••••••••• পাঠ্যপুস্তক। তত্ত্ববােধিনী সভা স্থাপনের পূর্বে এদেশের পাঠ্য- পুস্তক গুলি প্রায়ই ইংরাজদিগের দ্বারা লিখিত বা অনু- বাদিত অথবা দেশীয় লােকদিগের দ্বারা ঠিক ইংরাজীর আদর্শে সঙ্কলিত হইত। ভায়ার জটিলতায় ও কদর্যতায় সে গুলি অপাঠ্য বা দুম্পাঠ্য বােধ হইত। তত্ত্ববােধিনী সভা দ্বারা সে দোষ বিদূরিত হইল। এ বিষয়ে অধিক আলােচনার প্রয়ােজন নাই। পুস্তক গুলির নাম করিলেই বর্তমান কালের লােকেরা তাহার প্রকৃতি চিনিয়া লইতে পারিবেন। তত্ত্ববােধিনী সভার পূৰ্বের পুস্তক- পুরুষ পরীক্ষা । ২। পশ্বাবলী। ৩। মার্শ- মেন সাহেবের বাঙ্গালা ভাষায় লিখিত ভারতবর্ষের ইতি- হাস। ৪। ফর্গসন সাহেবের লিখিত জ্যোতির্বিদ্যা- শ্ৰীযুক্ত যাতি সাহেব কর্তৃক অনুবাদিত। ৫। শ্ৰীযুক্ত ১। এবং তাহার সহিত ইংরাজী শিক্ষা হয়, এই প্রণালীতে পাঠশালা চালাইবার নিমিত্ত তত্ত্ববোধিনী সভা ইহাকে স্থানান্তরিত করা উচিত বিবেচনা করিলেন। তদনন্তর বিদ্যা ও ধর্ম চর্চার প্রাচীন স্থান বংশবাটী গ্রামে ১৭৬৫ শকের ১৮ বৈশাখ এই পাঠশালা নুতন ভাবে স্থাপিত হইল। শ্ৰীযুক্ত শ্যামাচরণ তত্ববাগীশ এই পাঠশালার শিক্ষক এবং (সুপ্রসিদ্ধ ) শ্রীযুক্ত রামগােপাল ঘােষ ইহার পরিদর্শক নিযুক্ত হয়েন। ইহাতে হিন্দুরীতি অনুসারে বেতন না লইয়া বিদ্যাদান করা হইত।
165n বলি। [ ২৪ ] wahanann annunc যাতি সাহেবের কৃত পদার্থ বিদ্যাসার। ৬। শ্ৰীযুক্ত জানমাক সাহেব কত কিমিয়া বিদ্যাসার। ৭। রাজা- ৮। কীথ সাহেবেয় কৃত বঙ্গভাষা ব্যাকরণ। ৯। জ্ঞানার্ণব। তত্ববােধিনী সভার সাহায্যে রচিত পুস্তক অক্ষয়কুমার দত্ত কৃত ভূগোল, পদার্থবিদ্যা, ধৰ্ম্মনীতি প্রভৃতি। শেযােক্ত পুস্তক সকল তত্ত্ববােধিনী পাঠশালায় অধ্যাপনার নিমিত্ত রচিত হইয়া প্রথমে তথায় অধীত এবং পরে ১৭৬৩ শকে মুদ্রিত হয়। বাঙ্গালা ভাষা। ক্ষণজন্মা দেবেন্দ্রনাথের প্রতি যেন বিদ্যাধিষ্ঠাত্রী সর- স্বতীর বিশেষ কৃপা আছে, এমন বােধ হয়। তাঁহার বিপুল বংশের স্ত্রী পুরুষ সকলেই বিদ্যানুরাগী দেশের উন্নতিকর অন্যান্য বিষয়ের ন্যায় বাঙ্গালা ভাষার অঙ্গসৌষ্ঠব ও শ্রবৃদ্ধি সাধন কাৰ্যে সকল সুশিক্ষিত ব্যক্তি কোন না কোন প্রকারে যােগ দিয়াছেন। যাঁহারা এ বিষয়ে কৃতী, তাহারা বিপুল যশের ভাগী হইয়াছেন। এই যশের ভাগ-বিচারে অনেক ব্যক্তি নানা প্রকার দাবী করেন; কিন্তু ইহার পরিবেশনে যাহার প্রাপ্তব্য ভাগ [ ২৫ ] । . htv/ unny *** s % অধিক, এমন কোন কোন ব্যক্তি প্রচ্ছন্ন রহিয়াছেন। শ্রীমৎ দেবেন্দ্রনাথ এই প্রচ্ছন্ন ব্যক্তিদিগের মধ্যে প্রধান। দেবেন্দ্র- নাথ অনেক বিষয়ে অপরকে অগ্রণী করিয়া চলেন। এ জন্য তাহার তত্ত্ববােধিনী পত্রিকার ভাষাবিষয়িণী খ্যাতি প্রধানতঃ অক্ষয়কুমার দত্ত প্রাপ্ত হইয়াছেন। কিন্তু যিনি দেবেন্দ্রনাথের সামান্য একখানি পত্রের ভাষা ভালরূপে আলােচনা করেন, তিনি তাঁহার সরল ও সুচ্ছ ভাষায় তাঁহার হৃদয়ের সরস, মধুর ও উদার ভাব সহজে প্রতি- ফলিত দেখিতে পান। তাঁহার ধর্ম ব্যাখ্যায় তাহার ভাষার উল্লিখিত গুণ বিশেষরূপে ব্যক্ত হইয়াছে। বর্তমান সময়ে বাঙ্গালীদিগের মধ্যে যিনি বিদ্যালয়ের পাঠ্য কোন পুস্তক প্রণয়ন করেন, তিনি যেমন বিদ্যা- সাগরের লিখিত ভাষা অবলম্বন করেন; যিনি কোন প্রাকৃতিক তত্ত্ব বর্ণনা করেন, তিনি যেমন অক্ষয়কুমারের লিখন প্রণালীর অনুসরণ করেন ; তেমনি যিনি এক্ষণে ধৰ্ম্ম-বিচার, ধর্মতত্ত্ব ব্যাখ্যা বা ঈশ্বরের প্রেম-মাহাত্ম্য বর্ণন করেন, তিনি কাশীবাসী হউন বা পদ্মাপারে অবস্থান করুন, তাঁহাকে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের বাক্যাবলী গ্রহণ করিতে হয়। .
[ ২৬ ]
Ava•••
WWW
তত্ত্ববােধিনী পত্রিকা।
তত্ত্ববােধিনী সভা হইতে এই পত্রিকা ১৭৬৫ শকের
ভাদ্র মাস হইতে প্রকাশিত হইয়া অদ্যাবধি নির্বিঘ্নে
চলিয়া আসিতেছে। ইহা মাসিক পত্রিকার মধ্যে সৰ্ব্ব
জ্যেষ্ঠ। এই ১৮২৩ শকে ইহার বয়ঃক্রম ৫৯ বৎসর চলি-
তেছে।
যাহারা বর্তমানকালের সভ্যতাস্রোতে নানা দোষ
দর্শন করিয়া থাকেন, তাহারা ও বঙ্গভাষার উন্নতি দর্শন
করিয়া সন্তুষ্ট হয়েন। এই পত্রিকা তাহার মূল। প্রথম
প্রথম যাহারা তত্ত্ববােধিনী সভার প্রতি উদাসীন
ছিলেন, এই পত্রিকা প্রকাশ হইলে ইহার ভাষার পারি-
পাট্য এবং আলােচিত বিষয়ের গুরুত্ব ও উপকারিতা
দেখিয়া তাহারা সকলেই এই সভাদ্বারে আকৃষ্ট হইয়া
দাড়াইয়াছিলেন।
দেবেন্দ্রনাথের অকৃত্রিম সরলতা, অটল ব্ৰতশীলতা,
বিশুদ্ধ দেশহিতৈষিতা এবং ঈশ্বরের প্রতি প্রগাঢ় ভক্তি
তাহার দল সমুদয় লােকের উপর সংক্রমণ করিয়াছিল।
তাহাতে ইহার লেখকেরা সকলে প্রায় এক ভাবে কথা
কহিতেন। এবং কর্তৃব্যানুবােধে যদি কাহারও নিন্দাবাদ
করিতেন, সমীচীন বিচারগুণে তাহাও হিতকর বলিয়া
পরিগৃহীত হইত।
[ ২৭ । । এইরূপ পটুতার সহিত পরিচালিত হইয়া তত্ত্ববােধিনী পত্রিকা প্রথমাবস্থায় খৃষ্টান মিশনরিগণের আক্রমণ নিবারণ করেন ; বাঙ্গালা ভাষা শিক্ষার প্রতি লােকদিগের অনুরাগ বর্ধিত করেন; শিক্ষাসমাজসংক্রান্ত কর্মচারী- দিগের দোষখণ্ডন দ্বারা দেশে সুশিক্ষার পথ পরিষ্কৃত করেন; প্রজাপীড়নকারী জমিদারদিগের এবং কৃষক- মােষণকারী নীলকরদিগের হস্ত হইতে দুৰ্বল দরিদ্র লােকদিগের পরিত্রাণ সাধনের চেষ্টা করেন। তত্ত্ববােধিনী পত্রিকা চির দিন বেদবেদান্তাদি শাস্ত্রের মৰ্ম্মোদ্ধার করিয়া দেশীয় পবিত্র ধৰ্ম্মের রক্ষা করিতেছেন। প্রথমাবস্থাতেই উপনিষৎ, ঋগ্বেদ, মহাভারত, পুরাণ এবং স্মৃতি প্রভৃতি শাস্ত্রের অনুবাদ এই পত্রিকার অঙ্গকে সুশাে- ভিত করিয়াছে। শাস্ত্ৰসিন্ধু মন্থন পূৰ্ব্বক কিরূপে সত্যা- মৃত লাভ করা যায়, তত্ত্ববােধিনী পত্রিকা তাহার শিক্ষা- ১৭৬৯। ৭২ শকের পত্রিকায় পাণ্ডুপুত্র ও ধৃতরাষ্ট্র পুত্রদিগের অস্ত্র পরীক্ষা” “মহাভারতীয় সভাপ” “প্রাচীন হিন্দুদিগের সমুদ্রযাত্রা ও বাণিজ্য বিবরণ” “ভারতবর্ষ মধ্যে হিন্দুদিগের বসতি বিস্তার,” উপাসক মণ্ডলীর বিবরণ এবং ততুল্য নানা প্রবন্ধ তত্ত্ববােধিনী পত্রিকাকে তাহার লেখকের সহিত চিরস্মরণীয় করিয়া রাখিয়াছে।
[ ২৮ ] AAAAAAAAAAAAAAAW গ্রন্থসভা-পুস্তকালয়। ১৭৬৯ শকে শ্রীমৎ দেবেন্দ্রনাথ তত্ত্ববােধিনী সভার অধীনতায় এক গ্ৰন্থসভা স্থাপিত করেন। এই সভায় এসিয়াটিক সােসাইটীর অনুরূপ কাৰ্য্য হইত। পূর্ব হইতেই শাস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা হইতেছিল। অতঃপর উক্ত সােসাইটীর প্রকাশিত বৃহৎ পুস্তকাদি সহ হস্ত লিখিত ও মুদ্রিত শাস্ত্র গ্রন্থ সকল ব্রাহ্মসমাজ গৃহের এক প্রকোষ্ঠে সুসজ্জিত হইতে লাগিল। এক্ষণে ঐ ব্রাহ্ম সমাজ-লাইব্রেরি প্রাচীন পুস্তকাবলীর আলয় রূপে পরিগণিত হইতে পারে। মিশনরি আক্রমণ হইতে পরিত্রাণ। এক্ষণে সাধারণের প্রত্যয় এই যে, ব্রাহ্মধর্ম প্রচারে খৃষ্টীয় ধর্মের প্রভাব খর্ব হইয়াছে। কথাটী সত্য বটে, কিন্তু ইহাতে দেবেন্দ্রনাথের কত পরিশ্রমের প্রয়ােজন হইয়াছিল, বিশেষ করিয়া না দেখিলে বুঝা যাইবে না। খৃষ্টীয় মিশনরিগণের মধ্যে রামমােহন রায়ের প্রতি- দ্বন্দ্বী যেমন ডাক্তার কেরি ও মার্শমেন ছিলেন, দেবেন্দ্র- নাথের প্রতিদ্বন্দ্বী সেইরূপ ডাক্তার ডফ। ৫ রামমােহন রায় তন্ন তন্ন করিয়া দেখাইয়াছেন যে, বাইবেল শাস্তু একেশ্বর প্রতিপাদন করেন। ইহাতে উত্তম ( ২৯ ] WWW নীতি-উপদেশ আছে, এই হেতু তিনি উহার প্রচার বাসনা করিতেন। কিন্তু মিশনরিগণ অযথারূপে অথবা অভদ্র বাক্যে হিন্দুধর্মকে আক্রমণ করিবে, ইহা তাহার প্রাণে বড়ই ক্লেশকর বােধ হইত। এজন্য তিনি নানা প্রকারে হিন্দুধর্মের পক্ষ সমর্থন করিয়া প্রবন্ধাদি লিখিতেন। তদ্বিপরীতে তিনি বাইবেলের আরােপিত ত্রীশ্বরবাদের বিরুদ্ধে যে সকল তর্ক করিতেন, মিশনরিগণ তাহার খণ্ডন দ্বারা আত্মপক্ষ সমর্থন চেষ্টায় ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়িতেন। এই প্রকরণের কার্য্য দেবেন্দ্রনাথের সময়েও আবশ্যক . হইয়াছিল। রামমােহন রায়ের ইংলণ্ড গমনের পূর্বে ১৮৩০ খৃষ্টাব্দে পাদরী ডফ সাহেব তাহার আশ্রয় গ্রহণ করেন। রাম- মােহনের চেষ্টাতেই ডফের আগমন বলা যায়। এক * এ দেশীয় খৃষ্টান মিশনরিদিগের গোঁড়ামিতে বিরক্ত হইয়া রামমােহন রায় ভাবিয়াছিলেন, স্বাধীনচেতা স্কচ, মিশনরিগণ বিচার- নিষ্ঠ হইতে পারেন। অতএব তিনি তাহাদের সভা হইতে সুবুদ্ধি মিশনরিদিগকে আমন্ত্রণ করিয়াছিলেন। তাহার প্রমাণ এস্থলে লিপি- বদ্ধ করা আবশ্যক। Extract from the Report of Dr. Bryce, Church of Scotland Chaplain in Calcutta, "Encouraged by the approbation of Rammohan I presented to the General Assembly of 1824 the petition and meniorial which first directed the attention of the Church of Scotland to British India as A field for missionary exertions, on the plan that is now 80. successfully following out, and to which this emi. nently gifted scholar, himself a Brahmin of high Caste, had specially annexed lis sanction."
( ৩০ ]
••••
ঈশ্বর প্রতিপাদক বাইবেলের প্রতি তাহার শ্রদ্ধা থাকাতে
তিনি উহার অধ্যাপনার্থ ডফ সাহেবের যথেষ্ট সাহায্য
করিয়াছিলেন। তাঁহার আশা ছিল, বিদ্বান্ উফ, অত্ৰত্য
কলেজের নিরীশ্বর শিক্ষাজনিত বিষময় ফলের প্রতিকার
করিতে পারিবেন। ফলেও তাহা হইয়াছিল। তাঁহার
সুশিক্ষা প্রভাবে ইংরাজী ভাষায় কৃতবিদ্য অত্ৰত্য যুবক
মণ্ডলীর আস্তিক্য বুদ্ধি প্রবল হইল। কিন্তু তাহার সঙ্গে
খৃষ্টানী বিদ্বেষ বিষও সঞ্চারিত হইল। ভারতের সুপুত্র
কৃষ্ণমােহন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রভৃতি কয়েকটী যুবা খৃষ্টীয় ধর্ম
গ্রহণ করিলেন। হিন্দুধর্মের প্রতি মিশনরীগণের কটুক্তি
পুনরায় শ্রুত হইল।
* উফ সাহেবের স্কুল (এক্ষণকার (General Assembly's
Institution) স্থাপনের বৃত্তান্ত এই।
On the young missionary saying that he was at
a loss where or how to get a school-house in the native
city, Rammohuu offered the emall hall in Chitpore
Road, which the Brahmo Sabha w.is on the point of
leaving for the new building; and driving off at once
to the spot secured it for Duff at a rental of £42
smonth, one pound less than he himself had been
paying. He removed other difficulties from Daft's path.
By personal influence among his enlightened Hindu
friends; he secured their children for Duff's first
pupils. On the day of opening--the 13th of July,
1830-Rammohun Roy was present from the first to
explain away prejudices --S. D. Cottet.
= =
[ ৩১ ] L ডফ সাহেব ১৮৩০ হইতে ১৮৬৩ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত ৩৩ বৎসর এদেশের মিশন কার্যে ব্যাপৃত ছিলেন। ইহার মধ্যে তিনি দুইবার ইউরােপে ও আমেরিকায় পরিভ্রমণ - পূৰ্ব্বক মিশন কার্যের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন।* ঐ সকল দেশে হিন্দুধর্মকে কেবল কলঙ্কময় বলিয়া বুর্ণনা করিলে দানশীল ধর্মপরায়ণ লােকেরা সেই কুৎসিত জঘন্য দৃশ্যকে পৃথিবী হইতে অপসারিত করিবার জন্য বিস্তর অর্থ দান করেন। অতএব পূৰ্ব্বাপর প্রায় সকল মিশনরীরা অর্থাগমের ঐ সুগম উপায় অবলম্বন করিয়া থাকেন। সদ্বিদ্যাশালী ডফ, সাহেবও তাহাই করিয়াছিলেন। ১৮৩৪ অব্দে তিমি স্বদেশে ফিরিয়া গিয়া India and India's Missions + প্রসঙ্গে হিন্দুধর্মের প্রতি ঐরূপ আক্রমণ করাতে তত্ত্ববােধিনী সভা তৎপ্রতিবাদে অগ্র- সর হইলেন। ১৭৬৭ শকে এই সভা হইতে Vedantic Doctrines Vindicated 97: Rational Analysis of the Gospel নামক পুস্তকদ্বয় প্রকাশিত হয়। প্রথম পুস্তকের তাৎপর্য বেদান্তপ্রতিপাদ্য সত্য ধর্মের সমর্থন । দ্বিতীয় পুস্তকের তাৎপৰ্য খৃষ্টীয় ধর্মের মধ্যে সত্যের * খৃষ্টাব্দ ১৮৩৪ হইতে ১৮৪০ পর্য্যন্ত ছয় বৎসর এবং ১৮৫০ হইতে ১৮৫৬ পর্যন্ত হয় বৎসর। । ১৩৯ খৃষ্টাব্দে মুদ্রিত।
[ ৩২ ]
1 ।।।
L
অ
৯৮১
A
বিচার। ডফ সাহেব নানা গুণে এ দেশের বন্ধু বলিয়া
পরিগণিত হইতেন। তাঁহার ন্যায় ভারতের হিতৈষী
লােকও কাৰ্যতঃ আমাদের কুৎসা গানে ও অপ্রিয়-
সাধনে প্রবৃত্ত, ইহার প্রমাণ দর্শন করিয়া এদেশের
মিশনরী গুণ-পক্ষপাতী লােকেরাও চটিয়া উঠিয়া-
ছিলেন। শিক্ষিত লােকেরা উপরােক্ত পুস্তকদ্বয়ে খৃষ্টীয়
ধর্মের অযৌক্তিকতা এবং বেদান্তধৰ্ম্মের সারবত্তা বিলক্ষণ
রূপে বুঝিলেন। আলােচনার উপর আলোচনায় মিশনরী-
দিগের ভ্রান্তি ও দুর্ব্যবহারের প্রতিকুলে সকলেরই মন
উত্তেজিত হইল। এই মহা আন্দোলনে নিদ্রিতপ্রায় হিন্দু-
সমাজ জাগিয়া উঠিলে খৃষ্টধর্মের প্রচারবেগ মন্দীভূত
হইল।
রামমােহন রায়ের অনুকরণে খৃষ্টীয় শাস্ত্রকে ছাঁকিয়া
যে গ্রন্থ প্রস্তুত হইল, তাহার নাম হইল—The Rational
analysis of the Gospel ; কিন্তু তাহাতে খৃষ্টের ঈশ্বরত্ব
খণ্ডিত হইয়াছে, দেখিয়া, ক্রুদ্ধ হইয়া, ডফ, সাহেব তাহার
ata faceta, The irrational paralysis of the Gospel.
উত্তরােত্তর ব্রাহ্মসমাজের যেমন উন্নতি ও বিস্তার হইতে
চলিল, উফ, সাহেবের মর্মান্তিক বেদনা তেমনি বৃদ্ধি
হইতে লাগিল। ১৮৬৩ অব্দে এদেশ ত্যাগ করিয়া
যাইবার সময় ডফ, সাহেব ও দেশীয়দিগের উদ্দেশে নিরাশ
অন্তঃকরণে বলিয়া গেলেন :-
[ ৩৩ ] I cannot, I cannot, in bidding you adieu now, bear the thought of bidding you adieu for ever !- in separating from you now in time, bear the thought of separating from you for all cternity ! in rejoicing over your carthly welfare and prosperity, bear the thought of having to mourn over your forfciture of the heavenly inheritance. হিন্দু হিতাথা বিদ্যালয় । সদ্বিদ্যাশালী ডাক্তার আলেজণ্ডর ডফ, ডি, ডি, এ এ ডি, এদেশের সর্বার্থ অবগত হইয়া এই আক্ষেপ করি- তেন যে, এদেশীয় অখৃষ্টান সমস্ত লােকের সহিত তাহার অনন্ত কালের পার্থক্য সন্নিকট ; অর্থাৎ অনন্তকালের জন্য তিনি স্বর্গে এবং এদেশীয় কোটি কোটি অখৃষ্টান লােক নরকে প্রস্থিত হইবে। যাঁহাদের পাণ্ডিত্যের এইরূপ পরি- ণতি, তাঁহারা এদেশের শিক্ষা সমাজের শীর্ষস্থান অধিকার করিবেন, এবং স্কুল ও কলেজে যেমন শিক্ষা দিবেন, ছাত্র- দিগের বুদ্ধি বিদ্যা ও চরিত্র সেইরূপে গঠিত হইবে,-এ ব্যবস্থা কি সামান্য বিড়ম্বনা ? ইহার অধিক আমাদের দুর্ভাগ্য-লক্ষণ আর আছে কি না, তাহা বলিয়া উঠা যায় না।
[ ৪ ] ; www. যে দেশে রামমাহন রায়ের উদ্ভব হইয়াছিল, সে দেশে শিক্ষাসংক্রান্ত এই দুর্গতি পরিজ্ঞাত হইতে অধিক বিলম্ব হয় নাই। এতদ্দেশীয় বিদ্যানুরাগী সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গ ধৰ্ম্মবিচারে রামমােহনের বিরুদ্ধবাদী হইলে ও সুশিক্ষার আবশ্যকতা বিষয়ে তাঁহার সহিত এক মতাবলম্বী ছিলেন। আর ইহাও বুঝিয়াছিলেন যে, আমাদের সন্তানদিগের সুশিক্ষাবিধান আমাদেরই কর্তব্য। অতএব বিপুল অর্থ সংগ্রহ করিয়া তাঁহারাই হিন্দুকলেজাদি বিদ্যামন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু, ইংরাজদিগের হস্তে সমুদয় ভারতের মৃত্তিকা যদি ইংলণ্ডের হইল, বিদ্যালয় গুলি আর এদেশীয়দিগের অধিকারভুক্ত কেন থাকিবে ? ** ক্রমে ক্রমে স্কুলকলেজ গুলি গবর্ণ- মেণ্টের স্বকীয় সম্পত্তিরূপে পরিগৃহীত হইল। ইংরাজী ভাষার সহিত এতদ্দেশায় ভাষা সকলেরও ঐরূপ প্রতিদ্বন্দিতা চলিতেছিল ; ক্রমে ক্রমে ইংরাজির পরা- মই জয়যুক্ত হইল। * হিন্দু কলেজ প্রকৃত প্রস্তাবে ১৮১৭ খৃষ্টাব্দের ২০ জানুয়ারী হইতে আরম্ভ হইয়া ১৮২৩ অব্দ পর্যন্ত সম্পূর্ণ রূপে এ দেশীয় লােক- দিগের হস্তে ছিল। তাঁহাদের মধ্যে কাহারাে না কাহারে বাটীতে উহার কার্য হইত। ১৮২৫ অব্দে বৰ্তমান সংস্কৃত কলেজের এই বৃহৎ অট্টালিকা প্রস্তুত হইলে অংশাংশী রূপে হিন্দু কলেজ ইহাতে সন্নি- বিষ্ট হইল। হিন্দুকলেজের নিমিত্ত এ দেশীয় লোকেরা কেহ পঞ্চাশ হাজার কেহ বা কুড়ি হাজার টাকা দান করিয়াছিলেন। প্রথমেই লক্ষ।
[ ৩৫ ] শিক্ষাসংক্রান্ত এই বিড়ম্বনা পরিহার নিমিত্ত এতদ্দে- শীয় সম্ভ্রান্ত ও কৃতবিদ্য ব্যক্তিবর্গ যে সকল চেষ্টা করেন, দেবেন্দ্র নাথের চেষ্টা তন্মধ্যে প্রধান। দেবেন্দ্রনাথ দেখিলেন, ডফ সাহেব প্রভৃতি মিশনরি- গণ বিদ্যালয় স্থাপন দ্বারাই এদেশীয় লোকের চিত্তক্ষেত্র অধিকার করিতেছেন। অতএব তাহার প্রতীতি হইল যে, আমাদের পক্ষেও উক্ত মিশনরিদিগের কলেজাদির ন্যায় মহাবিদ্যালয় স্থাপন করা আবশ্যক। এজন্য দেবেন্দ্রনাথ অত্ৰত্য সম্রান্ত ব্যক্তিদিগের গৃহে গৃহে ফিরিলেন। সিমু লিয়াতে এক সভা হইল। এই সভায় কলিকাতাস্থ ধনী নির্ধন, মধ্যবৃত্ত প্রায় সহস্র ব্যক্তির সমাগম হইল। সকলে একত্রিত হইয়া “হিন্দুহিতার্থী বিদ্যালয়” নামে এক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করিলেন । ধিক টাকা জমা হইয়াছিল। পরে আয়ের অল্পতা এবং ব্যয়ের বাহুল্য হইলে গবর্ণমেন্টের সাহায্য চাহিতে হইয়াছিল। ১৮৪৪ অকে কলে- জটী সম্পূর্ণরূপে গবর্ণমেন্টের আয়ত্তকৃত হইল। প্রথমে বর্ধমানের • মহারাজা এবং চন্দ্রকুমার ঠাকুর হিন্দু কলেজের দুই গবর্নরছিলেন। শেষে শ্রীযুক্ত প্রসন্নকুমার ঠাকুর এক গবর্নর হয়েন। গণর জেনেরাল লর্ড ভেলহৌসি হিন্দু কলেজের সবতােভাবে নুতন গঠন করিতে উদ্যত হইলে প্রসন্নকুমার নাম মাত্র “গবর্ণর” পদ রাখিতে ইছু হই- যেন না।
• run [ ৩৬ ] ~~~~~~~~~~~~~~~~~ হিন্দুহিতার্থী বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ও কর্মচারিদিগের তালিকায় এই সকল নাম পাওয়া যায়- শ্ৰীযুক্ত রাজা রাধাকান্ত বাহাদুর—সভাপতি। শ্ৰীযুক্ত রাজা কালীকৃষ্ণ বাহাদুর, অপূৰ্ব্বকৃষ্ণ বাহাদুর, সত্যচরণ বাহাদুর, বাবু আশুতােষ দেব, ( ছাতুবাবু নামে প্রসিদ্ধ ) প্রমথনাথ দেব, ( লাটু বাবু নামে প্রসিদ্ধ ) ব্রজ- নাথ ধর, মতিলাল শাল, রমানাথ ঠাকুর, রাজচন্দ্র মুখাে- পাধ্যায়, নীলরতন হাদার, খর নৃসিংহ মল্লিক, রমা- প্রসাদ রায়, নন্দলাল সিংহ, দুর্গাচরণ দত্ত, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, তারাচাঁদ চক্রবর্তী, কাশীনাথ বসু, হরিমােহন সেন, ভগবতীচরণ বন্দোপাধ্যায়, কাশীপ্রসাদ ঘোেষ, ও রাজ কৃষ্ণ মিত্র - অধ্যক্ষ। এযুক্ত বাবু দেবেন্দ্র নাথ ঠাকুর ও হরিমােহন সেন-সম্পাদক। শ্ৰীযুক্ত বাবু আশুতােষ দেব ও প্রমথনাথ দেব-ধনাধ্যক্ষ। এই বিদ্যালয়ের ব্যয় নিৰ্বাহাৰ্থ মাসিক সহস্র টাকা নির্ধারিত হইয়াছিল। সকল ক্ষেত্রেই এদেশের ভাগ্যলক্ষ্মীর একরূপ পরি- 58 9tentata i Joseph Barretto and sons, az নামধেয় কুঠি দেউলিয়া হইলে যেমন হিন্দুকলেজের মূল ধন নষ্ট হইয়া যায়, তেমনি আশুতােষ বাবু ও প্রমথনাথ যাবু দেউলিয়া হওয়াতে হিন্দুহিতার্থী বিদ্যালয়েরও মুলধন বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছিল। সুতরাং উহার অন্তর্ধান হইল।
[ ৩৭ ]
•••••••
শুনা যায়, প্রথমেই হিন্দুহিতার্থী বিদ্যালয়ের ৪০০০০
চল্লিশ হাজার টাকা মূলধন উথিত হইয়াছিল এবং ভূদেব
মুখোপাধ্যায় উহার প্রধান শিক্ষক ছিলেন।
যে সকল ধনী কৃতবিদ্য ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির নাম ইহার
সহিত সংযুক্ত দেখা গেল, তাহাতে প্রত্যয় হয়, এই বিদ্যা-
লয় দীর্ঘজীবী হইলে ইহা হিন্দুসমাজের বিশিষ্ট শক্তির
কেন্দ্রস্থল হইত।
পিতৃবিয়োগ।
যে বৎসর হিন্দুহিতার্থী বিদ্যালয়ের তানুষ্ঠান হয়, সেই
বৎসর (১৮৪৫ ) দেবেন্দ্রনাথের পিতা দ্বিতীয়বার ইংলণ্ডে
গমন করেন। প্রথম যাত্রায় (১৮৪২) রােমের পােপ, প্রসিয়ার
প্রিন্স, ফ্রান্সের ও বেলজীয়মের রাজা-রাণী ও ইংলণ্ডের
মহারাণী সপরিবারে তাঁহার মহা সমাদর করিয়াছিলেন।
দ্বিতীয় যাত্রায় তাহার জীবন বাল পূর্ণ হইয়া আসিয়াছিল।
১৮৪৬ খৃষ্টাব্দের ১ আগষ্ট দিবসে ৫১বৎসর বয়সে বিলাতে
তাহার মৃত্যু হইল।
এই দুর্ঘটনার সংবাদ যখন এদেশে উপস্থিত হইল,
তখন ভ্রমণপ্রিয় দেবেন্দ্রনাথ নদীতে ভ্রমণ করিয়া
বেড়াইতেছিলেন। তিনি তাঁহার পিতার জ্যেষ্ঠ পুত্র।
তাঁহার পিতার অনন্ত বিষয় কৰ্ম্মের ভার হঠাৎ তাঁহার
স্কন্ধে অধ্যারােপিত হইল।
***** [ ৩৮ ]। ...…. কিরূপে দেবেন্দ্রনাথ সেই দুৰ্ব্বহ ভার বহন করিলেন -কিরূপে তিনি একান্ত নিলোভ অন্তঃকরণে পিতার ঋণ রাশি স্বীকার করিয়া দরিদ্র বেশ পরিগ্রহ পূর্বক সৰ্ব্ব- প্রথমে সেই ঋণন্দায় হইতে মুক্ত হইলেন, এবং কিরূপে মিতব্যয়িতা সহকারে যথাসম্ভব ধন সঞ্চয় করিয়া মহা. সম্রান্ত গােষ্ঠী বর্গের সহিত সমপদবীতে কালহরণ করিতে লাগিলেন,-দেবেন্দ্র নাথের সুদীর্ঘ জীবনের মধ্যে আর কিছু না ধরিলে ও এই বিষয়ের ইতিবৃত্তিটুকু মহামূল্য এবং মহোচ্চ শিক্ষাপ্রদ। ব্রাহ্মধর্মের প্রকৃতি। রামমােহন রায় বিশ্বজনীন ব্রাহ্ম ধর্মের আবিস্কার করিয়াছিলেন। কিন্তু তাহা সৰ্বস্তুগত অগ্নির ন্যায় এক প্রকার অবাৰহাৰ্য্য হইয়া রহিয়াছিল। সৰ্বব্যাপী পরমা- আর কিরূপে ধ্যান ধারণা করিতে হয়, রামমােহন রায়ের গ্রন্থাবলী দ্বারা তাহাই জানা যায়। কিন্তু কি প্রকারে এই সৰ্বাঙ্গীন ধর্ম সাধন করা যায়, অথবা কিরূপে ইহাকে সৰ্বার্থসাধক ধৰ্ম্ম বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে, রাম- মােহন রায় তাহার কোন পদ্ধতি স্থির করিয়া যাইতে পারেন নাই। এই কর্মের ভার দেবেন্দ্র নাথের উপর ন্যস্ত ছিল, বলিতে হইবে।
[ ৩৯ ]
এতদবিষয়ে দেবেন্দ্র নাথের কর্মগুলি নিম্নোক্ত রূপে
গণনা করা যায় :-
১। ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ প্রণালী।
২। ব্রাহ্মধৰ্ম্মের বীজ নিরূপণ।
৩। ব্রাহ্মধৰ্ম্ম-সঙ্গত উপাসনা-পদ্ধতি।
৪। ব্ৰহ্মসঙ্গীতের বিস্তার।
৫। নানাস্থানে ব্রাহ্মসমাজ স্থাপন।
৬। ব্রাহ্মধর্ম গ্রন্থ।
৭। ব্রাহ্মধৰ্ম্মের তাৎপৰ্য ব্যাখ্যা।
৮। ব্রাহ্মধৰ্ম্মের মত ও বিশ্বাস নির্ণয়।
৯। ব্রহ্মোপাসনা-সহযােগী ধর্মের ব্যাখ্যান।
১০। অনুষ্ঠান পদ্ধতি।
এতুদ্ভিন্ন মাসিক পত্র, সংবাদ পত্র, ও বক্ততা দ্বারা
ব্রহ্মধর্মের তত্ত্ব সহ মানব হৃদয়ের নানাধৰ্ম্ম লােক মধ্যে
প্রতিষ্ঠ।
দেবেন্দ্র নাথের জীবনের বর্তমান
যুগােপযােগী অসাধারণ কর্ম।
এই সকল অনুষ্ঠান ভিন্ন ব্রাহ্মধর্মের প্রকৃতি পরিস্ফুট
হইত না। কি প্রকারে ব্রাহ্মধৰ্ম্ম লােকের গ্রহণীয় হয়,
এই চিন্তা প্রথমাবধি দেবেন্দ্র নাথের হৃদয়ে জাগরূক
ছিল। ক্রমশঃ তাহার উপযােগী উপরােক্ত গ্রন্থাবলী ও
পদ্ধতি কালে কালে রচিত ও পুষ্টি প্রাপ্ত হইল।
[ ৪ ] ... ।। ।। । । । । t ব্ৰহ্ম ধর্ম গ্রন্থের অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা। দেবেন্দ্রনাথের উপরিউক্ত কার্যকলাপের মধ্যে একটী কাৰ্য্য বিশেষ উল্লেখের যােগ্য। উপনিষৎ আলােচনা দেবেন্দ্রনাথের ধর্মভাবের উদ্দীপক ও তাহার পক্ষে সরসত্ম ক। তদ্র। ব্রহ্মবিষয়ক বিমল জ্ঞানে আপনি তৃপ্ত হইয়। দেবেন্দ্র নাথ সমস্ত লোককে সেই জ্ঞানামৃত রস দিবার নিমিও ব্রাহ্মধর্মগ্রন্থ সঙ্কলন করিলেন। “তে রথং স্মৃতিগৎ”–শ্রুতির হনুগত হইয়া স্মৃতি সকল প্রকাশিত হইল। দুই খণ্ডে বা ধর্ম গ্রন্থ পূর্ণকার ধারণ করিল । শাস্ত্রীর মহামন্ত্র সকল নখদর্পণে প্রত্যানীত হইল। ব্রাহ্মসমাজে:: প্রথমবধি এই চেষ্টা যে, শৰাক্য সকল পরম যত্নে বুঝগ। তাহার ব্যবহার করিতে হইবে। অতএব সঙ্গে সসে এই সকল খনন্ত্রের বাঙ্গালা ভাষায় অর্থ প্রকাশ করা হইল , নিগূঢ়ার্থ শ্রুতিবচনের সংক্ষেপ অর্থে লােকের তৃপ্তি হয় না, অতএব পরে ! অর্থের তাৎপৰ্য ব্যাখ্যা কতে হইল। ১৭৭১ শক হইতে প্রায় ৫ বৎসরে এই কাৰ্য্য সমাধা হয় । দেবেন্দ্রনাথ নানা প্রকারে ব্রাহ্মধৰ্ম্ম গ্রন্থের অধ্যয়ন ও অধ্যাপনার চেষ্টা করিতেন। এতি সকলের চিরাগত উচ্চা- বুণ শিখাইবার নিমিত্তই বা তঁাহার কত যত্ন। ইহাতে শত শত লােকের কর্ণ তৃপ্ত হইল। জ্ঞান, বিজ্ঞান ও আত্ম- সংযম শিক্ষার এবং স্বপ্রকাশ পরমেশ্বরের ধ্যান ধারণার ৫ [ ৪১ ] . উপয়ােগী এবং উপকরণ প্রাপ্ত হইয়া সুশিক্ষিত ও মার্জিতবুদ্ধি লােকদিগের ধর্মপিশাসা চরিতার্থ হইতে লাগিল। নিদ্বন্দ্ব চিরক্রমাগত বিশ্বমান্য সুনিশ্চিতার্থ এবং পরম কল্যাণ সাধক শাস্ত্র বাক্যসকল সমুদিত হইলে বঙ্গ- দেশে ধর্মশিক্ষার এক নূতন প্রবাহ চলিতে লাগিল। বঙ্গবাসীগণ শাস্ত্রদৃষ্টি বিষয়ে চক্ষুষ্মান হইলেন। এই এন্থ নানা আকার ও প্রকারে মুদ্রাঙ্কিত হয়। দুই খণ্ডের বাঙ্গালা অর্থ ও তাৎপর্য সমেত লাল কাল অক্ষরে সুদৃশ্য গ্রন্থ ১৭৯১ শকে প্রকাশিত হইয়াছিল। ১৭৭১' শকে আরম্ভ হইয়া ১৭৯১ পয্যন্ত ৩ বৎসরে এই গ্রন্থ সৰ্ব্বাবয়ব সম্পন্ন হইয়া উঠিয়াছে। জ্ঞান ও কর্মের যােগ। যাহা বুঝা গেল, তাহার অচরণ করিতে হইবে; এই দিকে দেবেন্দ্রনাথের বিশেষ লক্ষ্য। ব্রাহ্মসমাজের সহিত তত্ত্ববােধিনী সভার সংযােগ সাধন হইলে পর ব্রাহ্ম সমাজ লােকে পরিপূর্ণ হইতেছিল। দেবেন্দ্রনাথ দেখিলেন, নানা প্রকার লােকের সমাগম হয়, কিন্তু কে কি জন্য আসেন, তাহার কোনই পরিচয় নাই ; ব্রাহ্ম সমাজে কি ভাবে কি করিতে হয়, তাহার কোন পদ্ধতি নাই। এ অবস্থায় দেবেন্দ্র নাথের সন্তোষ জন্মিল না ।
।।।।। ••••••• ।।। ১। . [ ৪২ ] .....innad innan তিনি চাহেন যে, ব্রাহ্মসমাজের প্রচারিত এই ব্ৰহ্মজ্ঞানা- ত্মক ধৰ্ম্মগ্রহণ করিয়া লােকেরা পরস্পর এক মত এবং এক ভাব প্রাপ্ত হয়। এ বিষয়টী তত্ত্ববোধিনী সভায় আলােচিত হইয়া স্থির হইল, যাঁহারা প্রতিজ্ঞাপূৰ্ব্বক এই ধর্ম গ্রহণ করিবেন, তাহাদিগকে ব্রাহ্মসমাজসন্নিবিষ্ট বিবেচনা করা y যাইবে। এই প্রকারে কতকগুলি লোক প্রতিজ্ঞাপত্রে স্বাক্ষর করিয়া ব্রাহ্ম নামে পরিচিত হইলেন। কিন্তু যে ধৰ্ম তাঁহারা গ্রহণ করিতেছেন, তাহার কোন বিশেষ লক্ষণ প্রখ্যাত নাই। এই অভাব অনুভূত হইলে তাহার পূরণ হইতে লাগিল। পরিমিত কথায় ব্রাহ্ম ধর্মের লক্ষণ নিণীত হইল। ব্রাহ্ম ধর্মের সকল তত্ত্ব সেই বীজ রূপ লক্ষণাবলী মধ্যে নিহিত। তাহা হইতে শাখাপল্লব স্বরূপ ব্রাহ্মধৰ্ম্ম গ্রন্থ, তাহার তাৎপৰ্য্য এবং ব্রাহ্ম ধর্মের ব্যাখ্যান উত্তরােত্তর প্রকাশিত হইল। অতঃপর ক্রিয়ানুষ্ঠান আবশ্যক। ব্রাহ্মেরা পূর্বোক্ত প্রতি জ্ঞাপত্রে স্বাক্ষর করিয়া এই অঙ্গীকারে বদ্ধ থাকিতেন যে, তাহারা অনীশ্বরে ঈশ্বর জ্ঞান করিবেন না। ক্রমশঃ স্থির হইল, তাহারা দেবদেবীর পূজা বা হােমাদি ক্রিয় করি বেন না। এই প্রতিজ্ঞা প্রথমতঃ পরিস্ফুট ও সৰ্ব্বতােভাবে প্রতিপালিত হয় নাই। পরে এমন এক সময় উপস্থিত হইল যখন উক্ত প্রকার পৌত্তলিক পূজা ত্যাগ করা ব্রাহ্ম-
[ ৪৩ ]
দিগের অবশ্য কর্তব্যজ্ঞান হইল। নবােৎসাহসম্পন্ন যুবকেরা
তাহাদের উক্ত প্রতিজ্ঞানুরূপ, কৰ্ম্ম করিতে পদ্ধপরিকর
হইলেন। তদুপযােগী অনুষ্ঠান পদ্ধতি রচিত হইল।
দেবেন্দ্রনাথ এই ব্রাহ্ম ক্রিয়ানুষ্ঠান পদ্ধতিতে ঋষিদিগের
শুভ শােভন মন্ত্র গুলি সমস্ত রক্ষা করিলেন। তিনি
নিজেই তাহার অনুষ্ঠান পদ্ধতির প্রথম অনুষ্ঠাতা হইয়া
নিজ পরিবারে নিত্যযুক্ত-জ্ঞানকৰ্ম্ম-সমন্বিত ব্রাহ্মধর্মের
প্রতিষ্ঠা করিলেন। সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য পরিবারেও উক্ত
পদ্ধতি মতে ক্রিয়ানুষ্ঠান হইল। ব্রাহ্ম পরিবার বৃদ্ধি প্রাপ্ত
হইতে লাগিল
ব্রাহ্ম দল বৃদ্ধি।
ব্রাহ্মধর্ম গ্রন্থে আছে, কিন্তু মুখে নাই; অথবা মুখে
আছে কিন্তু কাৰ্য্যে নাই—ইহা বড়ই কুলক্ষণ। যিনি
ব্রাহ্ম হইবেন, তাঁহার সৰ্বাংশে ব্রাহ্ম লক্ষণ প্রকাশ পাইবে
—নতুবা এই ধর্ম গ্রহণ কেবল বিড়ম্বনা। দেবেন্দ্রনাথ
যখন দেখিলেন যে, তাহার ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণপদ্ধতি রচনার
ফল ফলিয়াছে, ব্রাহ্মের পরিমিত দেবতার স্থানে অনন্ত
ঈশ্বরের পূজা করিয়া সকল গার্হস্থ্য কৰ্ম্ম নিৰ্বাহ করি-
তেছে, তখন তাঁহার পরমানন্দ অনুভূত হইল।
কিন্তু এখনাে তাহার আর একটী কর্মের আবশ্যকতা
দেখা গেল।
[ ৪৪ ] ransinh AhnaAANNAWA যাহার ব্রাহ্ম পদ্ধতি মতে গাহস্থ ক্রিয়া সম্পাদন করিয়া অনুষ্ঠানকারী” নাম প্রাপ্ত হইলেন, তাঁহারা এমন ইচ্ছা করিলেন যে “ব্রাহ্ম"শব্দে কেবল তাঁহাদিগকে বুঝাইযে, অপর লোকেরা ব্রাহ্মসমাজ-বহির্ভূত বলিয়া বিবেচিত হইবে। দেবেন্দ্রনাথ উপরোক্ত ব্যবস্থায় কোন প্রকারে মত দিলেন না। তাহাতে বিস্তর বাদানুবাদ হইল। কতক- গুলি লােক ভিন্ন প্রণীতে এ সমাজ স্থাপনের জন্য তাহার নিকট বিদগ প্রার্থনা করেন। দেবেন্দ্রনাথ দেখিলেন, মনুষ্য ভিন্নরুচি; কালক্রমে সমাজ পদ্ধতির নানা পরিবর্তন সম্ভব ; পূৰ্ব্ব ইতিহাসের ও আবার আবর্তন হয়। তএব তিনি রাম মােহন রায়ের বাক্য অব- লম্বন করিয়া এই উপদেশ দিলেন যে, সুবুদ্ধির প্ররােচনায় যদি ভিন্ন ভিন্ন প্রণালীতে ব্রহ্মের কার্য্য করিতে চাহেন, তাহা করিতে পারেন, কেবল এই বিষয়ে সাবধান হইতে হইবে যে, ধৰ্ম্মমতের প্রভেদ জন্য যেন বিবাদ কলহ না হয় ; যেহেতু বস্তুত সকলেই এক ঈশ্বরের উপাসক। এই উপদেশ অনুসারে ব্রাহ্মেরা ভিন্ন ভিন্ন দলে বিভক্ত হইয়া পড়িলেন; অথচ ধৰ্ম্মভেদবুদ্ধি না থাকাতে তাহাদের মপ্ল্যে বিবাদ বৃদ্ধি হইতে পারিল না। ;
[ ৪৫ ] ব্ৰত প্রতিষ্ঠা ব্রহ্মজ্ঞানে স্ত্রী শূদ্রাদি সকল লােকের অধিকার দেওয়া ব্রাহ্মসমাজের বিশেষ ব্রত। দেবেন্দ্রনাথের জীবনের ছায়া স্বরূপিণী তত্ত্ববােধিনী পত্রিকায় তাহার প্রথম পৃষ্ঠাবধি এই ব্রতের সঙ্কল্প ও স্বস্তিবাচন দেখাযায়। তদবধি একাল পর্যন্ত তিনি নিরবচ্ছিন্ন ভাবে চেষ্টা করিয়া এই ব্রতের প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন। ইহার জন্য তিনি শরীর মন ধন সকলি দিয়াছেন ; নানা প্রকার লােকের নিকট নির্যাতন সহ্য করিয়াছেন; ধৰ্ম্মসংস্কারের পক্ষে সচরাচর যে সকল দুর্গতি ঘটে, তাহার তাহা ভােগ হইয়াছে। শ্রীমৎ চৈতন্যদেব হরিনাম প্রচার পক্ষে যেমন- পাত্রপাত্র রিচারণাং ন কুরুতে ন স্বং পরং বক্ষতে। পাত্রপাত্র বিচার না করিয়া সকলকেই হরিনামরূপ মহামন্ত্র প্রদান করিয়াছিলেন, শ্রীমদ্ দেবেন্দ্রনাথও সেই- রূপ স্ত্রী শূদ্র পণ্ডিত অপণ্ডিত সকলকেই ব্ৰহ্মজ্ঞানের অধি- কারী করিয়াছেন। চৈতন্যদেবের সময় যেমন বঙ্গদেশে হরিনাম ধ্বনি সমুখিত হইয়াছিল, দেবেন্দ্রনাথের সময়ে : সমগ্র ভারতভূমিতে সেইরূপ ব্ৰহ্ম নাম প্রতিধ্বনি হই- য়াছে। প্রকৃতার্থে হরিনাম গ্রহণের ন্যায় এই ব্রহ্মমন্ত্রের সমুচিত সাধনা করিতে লােক পারুক বা না পারুক, ইহা কি প্রকারে অবলম্বন করিতে হয়,কি প্রকারে সমস্ত
[ ৪৬ ]
/\/\+^^^^^
vvvv
পরিবার মিলিয়া ব্ৰহ্মপূজা করা যায়, দেবেন্দ্রনাথ তাহার
পদ্ধতি প্রদর্শন করিলেন এবং আপনি তাহার উদাহরণ
স্বরূপ দণ্ডায়মান রহিলেন।
এ বিষয়ে অনেকেই তাঁহার প্রতিকূলতাচরণ করি-
লেন; যাঁহারা তাঁহার সহযােগী, তাঁহারাও কোন কোন
অংশে তাহার ব্রতভঙ্গের উপক্ৰম করিলেন, কিন্তু সুবুদ্ধি
একনিষ্ঠ দেবেন্দ্রনাথ কেবল ব্রহ্মের প্রতি লক্ষ্য স্থাপন
করিয়া সহস্র বাধা বিঘ্নের মধ্য দিয়া চলিয়া আসিলেন।
জ্ঞানকৰ্মসমন্বিত পরিশুদ্ধ ব্রাহ্মধৰ্ম্ম কোন সম্প্রদায়ে বদ্ধ না
থাকিয়া সৰ্ব্ব সাধারণ লােকের আশ্রয়স্থান ও সেবনীয়
বলিয়া প্রতিপন্ন হইল।
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের ধর্ম।
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ নিয়ত “যোগযুক্তাত্মা।” “মহযি”
শব্দে যেমন তাহার প্রকৃতির পরিচয় হয়, এমন আর
কোন শব্দে হয় না। পূর্ধ্বতন মহর্ষিগণকে কি রূপে
চিনিতে হয় ; কি প্রকারে তাঁহাদের ধর্ম বুঝা যায়,
তাহারই বর্ণনা ও বিচারে তাহার যষ্টিবর্ষীয় তত্ত্ববােধিনী
পত্রিকা পরিপূর্ণ। তাঁহার ব্রাহ্মধর্মের ব্যাখ্যান অধ্যয়ন
করিলে প্রকৃত ঋষিতৰ্পণ হয়।
ব্রাহ্মসমাজ আদ্যোপান্ত যে বেদান্তপ্রতিপাদ্য সত্য ধরু
ঘােষণা করিতেছেন, তাহা হিন্দুদিগের চিরন্তন সার
[ ৪৭ ।
সম্পত্তি। সম্প্রতি তাঁহাদের এই সংস্কার জন্মিয়াছিল যে
গৃহস্থ অবস্থায় সে ব্ৰহ্মজ্ঞান সাধন হয় না। ব্রাহ্মসমাজ এই
সংস্কারের খণ্ডন করিতে চেষ্টা করিলেন।
রামমোহন রায় শাস্ত্র প্রমাণে বুঝাইয়াছিলেন যে,
পূৰ্বে গৃহস্থ ব্যক্তি ব্ৰহ্মজ্ঞানে অধিকারী হইতেন। এই শব্দ
প্রমাণ মাত্র দ্বারা সকল লােকের প্রত্যয় দৃঢ় হয় নাই।
তজ্জন্য ব্রাহ্মসমাজের প্রতি হিন্দুদিগের যথোচিত শ্রদ্ধা
জন্মিতে পারে নাই। গৃহস্থ ব্ৰহ্মজ্ঞানী অসম্ভব কথা, ইহাই
তাঁহাদের ধারণা ছিল। এই ধারণার বৈয়র্থ সাধন জন্য
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের আবির্ভাব বলিতে হইবে।
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ যােগ সাধনতৎপর। বেদবিদ্যা
তাঁহার সুসাধিত। স্মরণ মাত্রেই উপনিষদ ও শাস্ত্রীয়
বচনাবলী তাহার জিহ্বাগ্রে বৰ্তমান হয়। তদ্ভিন্ন কোন
লৌকিকী বিদ্যাও তাহার অগোচর নহে। যিনি তাঁহার
নিকট যে কামনায় উপস্থিত হয়েন, সেই কামনার যথা-
সম্ভব ফললাভ হইতে পারে। তাহাতে জ্ঞান ও প্রেমের
পরিচয় হয়। কোন অলৌকিকতা তাহাতে নাই।
তীর্থ বাস।
ব্ৰহ্মপরায়ণ এই গৃহস্থ ঋষির গৃহবাসের কাল অপেক্ষা
তীর্থবাসের কালই অধিক। সে তীর্থ যেমন সাধারণ,
তেমনি অসাধারণ।
[ ৪৮ ] “প্রভাবাদদ্ভুতভূমেঃ সলিলস্য চ তেজসা।” ভূমির অদ্ভুত প্রভাবে এবং জলের প্রখর স্রোতে যে তীর্থ মাহাত্ম প্রকাশ পায়, এই ঋষি তাহারই অনুরাগী। তাঁহার তীর্থ হিমাচল শিখর, সাগরবক্ষ, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহ এবং রাঢ়ভূমির অন্তর্গত বৃক্ষপল্লবশূন্য মানব- সম্পর্ক-বর্জিত যােজনবিস্তৃত এবং মহা প্রান্তর। জীবনের অধিকংশকাল তিনি এই সকল শান্তি রসম্পদ স্থানে অবস্থিতি পূৰ্ব্বক সৰ্বব্যাপী নিরঞ্জন পর- ব্রহ্মের ধ্যান ধারণা অভ্যাস করিয়াছেন। অথচ তাঁহার লক্ষ লক্ষ প্রজা, সহস্র সহস্র প্রতিপাল্য ব্যক্তি, শতাধিক পরিজন এবং এই দুঃখ-দারিদ্র:-পূর্ণ অজ্ঞানাচ্ছন্ন ভারত- ভূমি,—কেহই তাঁহার নিকট তাহার প্রাপ্য বস্তু লাভে বঞ্চিত হয় নাই। “পরিগ্রহান্মুনীনাঞ্চ তীৰ্থানাং পুণ্য তা স্মৃতা।” অতএব তাঁহার নির্দিষ্ট সাধনক্ষেত্র বােলপুরস্থ “শান্তি- নিকেতন” তীর্থতুল্য পরিগণিত হইতেছে। ব্রাহ্মধৰ্ম্ম প্রচার। উপসংহার । ব্রাহ্মধর্মপ্রচার শ্রীমন্মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের জীবনের মুখ্য কৰ্ম্ম। তৎসম্বন্ধে কিছু বিশেষ আলোচনা দ্বারা এই প্রস্তাবের উপসংহার করা বিহিত।
[ ৪৯ ] MAM যাগযজ্ঞাদি বাহ ক্রিয়াকলাপ ব্ৰহ্মজ্ঞানের অনুকূল কি প্রতিকুল, এই বিষয়ে ভারতবর্ষে বহুকাল ধরিয়া বিচার হইতেছে। গীতাগ্রন্থ জ্ঞান ও কৰ্ম্ম, দুই পক্ষ রক্ষা করিয়া ছিলেন। পরন্তু তাহাতে সকলের তৃপ্তি হইল না। অত- এব তান্ত্রিকেরা মন্থাদি স্মৃতির সার সংগ্রহ পূৰ্ব্বক মন্ত্রময় যজ্ঞের বিধান করিলেন। পরে নানাসম্প্রদায়ে ভগবৎসেবী বৈষ্ণবগণ যজ্ঞাদি ক্রিয়ার ও যােগতন্ত্রের প্রতিবাদ করিয়া ভক্তিমার্গগামী হইলেন। এইরূপে দেখাযায় যে, অল্পকাল পূর্বেও ভারতে কৰ্ম্মের অবসাদে জ্ঞানের ঘূৰ্ত্তি হইয়াছিল। কিন্তু পরে তদুভয়েরই অবসাদ হইল। সাধারণতঃ ব্রহ্মজ্ঞান ও যজ্ঞাদি কৰ্ম্ম গীত ব্যামিশ্ৰলক্ষণাক্রান্ত ও মােহজনক হইয়া পড়িল। তাহাতে সৰ্ব্বভূতে আত্মদৃষ্টি বা ব্ৰহ্মদর্শন ক্রমশঃ খৰ্ব্ব ও বিকৃত হইয়া এক একটী মনুষ্যের পূজা ও জড়-সেবার প্রসার বৃদ্ধি করিতে লাগিল। ব্ৰহ্মবফঁসের অভাবে সকল দুর্গতি সম্ভব হইল। এমন অবস্থায় রাজর্ষি রামমােহন রায় জনকাদি- প্রাচীন-ঋষি-সেবিত অনাবিল ব্ৰহ্মজ্ঞানের উদয় করেন। তৎপ্রকাশিত উপনিষদাদি গ্রন্থের সর্বত্র প্রচার ও আলাে- চনার নিমিত্ত আর এক মহাপুরুষের অভ্যুদয় আবশ্যক হইয়াছিল। ইনি মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ। এই মহাত্মার বিমল হৃদয়ে “ননদং যদিমুপাসতে” এই উপনিষদ্বাক্য প্রথম বয়েসেই জাগিয়া উঠিয়াছিল। সে ৪ [ ৩ ] এমন জাগরণ যে, তাহাতে আর তন্দ্রা ঘটিল না ; ব্ৰহ্ম- জ্ঞানের তত্ত্ব আর প্রচ্ছন্ন রহিল না। তখন, “যাং জাগ্ৰতি ভূতানি সা নিশা পশ্যতাে মুনেঃ” এই গীতাবচন সংলগ্ন হইল। তৎকালীন শ্রীমদ্দেবেন্দ্র নাথের অন্তরের ব্যাকুলতা এইরূপে উদগীত হইয়াছিল :- “কি হবে, কি হবে, দিবা আলােকে ; জ্ঞান বিনা সব অন্ধকার।” তাহার পরে ব্রহ্মবাদী ঋষিদিগের মন্ত্রে ব্রহ্মজ্ঞানামৃত অহরহ পান করিয়া তিনি “সংপ্রাপ্যৈনমৃষয়ে জ্ঞানতৃপ্ত কৃতাত্মাননা বীতরাগাঃ প্রশান্তা” এই তত্ত্বের সম্পূর্ণ রসাস্বা- দন করিলেন। তাহার ফল ব্রাহ্মধর্ম গ্রন্থ। যখন অলক্ষিত- পরিসর সাগরােপসাগর সকলের ন্যায় শাস্ত্রসকল প্রায় অপরিজ্ঞাত ছিল, তখন কি প্রকার চেষ্টা ও পরিশ্রমে শাস্ত্র গ্রন্থ রাশির সংগ্রহ হইয়াছিল এবং তাহা মন্থন পূর্বক এই অমৃত উদ্ধার করা হইয়াছিল, এক্ষণে তাহা অনুমান করিয়া লইতে হয়। ব্রাহ্মধৰ্ম গ্ৰন্থ দ্বারা ব্ৰহ্মবাদীদিগের ধর্ম বিশিষ্টরূপে উদ্বোধিত হইলে তাহা পরম উপাদেয় বােধে সকলে গ্রহণ করিলেন। তাহার ব্যাখ্যা ও প্রচারাদি কাৰ্যে উক্ত মহা- আকে আরাে যে পরিশ্রম, অর্থব্যয় এবং যে ক্লেশ স্বীকার করিতে হইয়াছে, তাহার প্রত্যেকটী যথার্থতঃ অশেষ। তত্তাবৎ দ্বারা তাঁহার জীবনকালব্যাপী তপস্যা বিদিত হয়।
[ ১ ] WWW “গৃহেযু পঞ্চেন্দ্রিয়নিগ্রহস্তপঃ"এই প্রচীন শ্লোক উদ্ধৃত করিয়া যুবা দেবেন্দ্রনাথ ব্রহ্মজ্ঞানীদিগের গৃহ- বাসের কর্তব্য প্রতিপাদন করিয়াছিলেন। তদবধি এই অতিবৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত তাঁহার একই নিষ্ঠা। এক্ষণে তিনি আপন বৃদ্ধ পুত্রের সহিত সেই শ্লোকের সম্পূর্তি অর্থাৎ “নিবৃত্তরাগ গৃহং পােবনং” সপ্রমাণ করিতে- ছেন। তপো বিদ্যা চ বিস্ত নিঃশ্রেয়সকরং পরম্। তপসা কিন্বিষং হন্তি বিদ্যমাহমৃতমতে। এই মনু বাক্য যেমন শ্ৰীমন্মহর্ষির নিজের জীবনে, তেমনি তাঁহার ক্ষণজন্মা পুত্রের জীবনে সার্থক দেখাযায়। পরমপবিত্ৰচরিত্র মহাত্মা দেবেন্দ্রনাথ তাহার কৃত মহাে- স্নত ধৰ্ম্মব্যাখ্যানে সমস্ত জনগণের সম্মুখে উজ্জ্বলরূপে দেখাইয়াছেন যে “উষাকালে সেই আনন্দরূপমমৃতং- প্রদোষকালে সেই আনন্দরূপমমৃতং—এবং নিশাকালে সেই আনন্দরূপমমৃতং প্রকাশ পাইতেছেন।” তাহার অনু- রূপ পুত্র আদি ব্রাহ্মসমাজের আচাৰ্য দ্বিজেন্দ্রনাথ তত্ত্ব- বিদ্যার শুদ্ধ বুদ্ধিতে পিতৃপ্রচারিত ধর্মের অচল প্রতিষ্ঠা. প্রতিপাদন করিয়া দিতেছেন। ব্রাহ্মধর্মের প্রচার ও তাহার উদ্দেশ্য সাধন বিষয়ে আচাৰ্য্য দ্বিজেন্দ্রনাথ যাহা বলিয়াছেন, তাহা অতি সমীচীন। অর্থগৌরবনিমিত্ত তাহারই কিয়দংশ উদ্ধার । ৫২ ] nut ****** পূৰ্ব্বক শ্ৰীমন্মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের মহৎ জীবনের এই স্বল্প পরিচয় সমাপ্ত করা যাইতেছে। “পূজ্যপাদ পিতৃদেব আর কোনাে জাতীয় ধর্মশাস্ত্রের দিকে না ঝুকিয়া নিছক কেবল উপনিষদাদি হইতে ব্রাহ্ম- ধর্ম মন্থন করিয়াছেন—ইহাতে বিশুদ্ধ ধর্মপিপাসু ব্যক্তি- দিগের কত যে মঙ্গল সাধন করা হইয়াছে তাহা যাঁহার চক্ষু আছে তিনিই দেখিতে পান। উপনিষদের বেদবাণী এক প্রকার অন্তঃশীলা সরস্বতী নদী ; তাহা ঐতিহাসিক আর্যজাতির অস্থিমজ্জার ভিতরে চিরকালই প্রচ্ছন্ন ভাবে কাৰ্য্য করিয়া আসিতেছে এবং এখনাে কাৰ্য্য করিতেছে। তাহা যখন কাল-সােপানে আর দুই এক ধাপ অগ্রসর হইয়া আৰ্যজাতির বিজ্ঞান এবং তত্ত্বজ্ঞানকে বিবাহডােরে বন্ধন করিবে, এবং তাহার আর কিছুকাল পরে সর্বাঙ্গীন সত্যের ফল ফলাইয়া তুলিবে, তখন আৰ্যজাতীয় ব্রহ্মজ্ঞান- শাস্ত্রের সারভূত ব্রাহ্মধর্মের প্রকৃত মর্যাদা জগতের চক্ষে দেদীপ্যমান প্রকাশ পাইবে। “উপনিষদাদিতে যেরূপ ব্রহ্মজ্ঞানের পথ প্রদর্শিত হইয়াছে তাহা বিজ্ঞান এবং তত্ত্বজ্ঞান দুয়েরই মৰ্ম্মনিহিত নিগূঢ়তম কথা; ইহুদী এবং আরব দেশীয় একেশ্বরবাদ অপেক্ষাকৃত বহিরঙ্গের কথা। সৰ্ব্বভূতে পরমাত্মার সত্তা-উপলব্ধি যেরূপ উচ্চ অঙ্গের জ্ঞান, সেরূপ জ্ঞানের কাৰ্যই তো এই যে, তাহা আর আর সমস্ত শাখাজ্ঞানকে
[ ৫৩ ]
Waw
Ww
আত্মসাৎ করিয়া, এবং তাহাদের সমস্ত বিরােধের সমন্বয়
করিয়া, সকল সত্যকে এক সত্যে পরিণত করিবে।
যে জ্ঞান আপনি ব্যাপক গভীর এবং শক্তিশালী ; সে
জ্ঞান অপরের দোষ পরিমার্জন এবং গুণ পরিবর্ধন
করিয়া তাহাকে আপনার অন্তর্ভূত করিয়া লইবে-
ইহাই পরমেশ্বরের নিয়ম।
“কাজেই তাহাতে মঙ্গল ভিন্ন অমঙ্গলের সম্ভাবনা
নাই। সে মঙ্গল সামান্য মঙ্গল নহে;-তাহার গুণে
যখন সমস্ত উচ্চ নীচ সম-শ্রেণীর মধ্যে সুর বাঁধিয়া গিয়া
সমন্তের মধ্য হইতে তান-মানলয়-সঙ্গত মহান্ এক
অপূর্ব সঙ্গীত বাহির হইতে আরম্ভ করে, তখন সমস্ত
সৃষ্টির সমস্ত কাৰ্য-কলাপের সর্বাঙ্গীন সার্থকতা হয়।”
No text on this page.
দ্বিতীয় প্রস্তাব।
শান্তিনিকেতন।
No text on this page.
ভূমিকা
এই পুণ্যক্ষেত্ৰ শ্ৰীমন্মহর্ষি দেবেন্দ্র নাথ ঠাকুর, মহা-
শয়ের প্রতিষ্ঠিত “শান্তিনিকেতন” নামক সাধনাশ্রম।
ইহার প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্তের সহিত ব্রাহ্মধর্মের প্রচার
বিবরণ অনুষ্যত। এই প্রবন্ধে উক্ত যুগলমঙ্গলের কতক
পরিচয় দিবার চেষ্টা হইতেছে।
মহামতি শ্ৰীমন্মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ব্রাহ্মসমাজের মূল
প্রতিষ্ঠাতা রাজা রামমােহন রায়ের পর স্বকীয় মনীষা
ও তপস্যা প্রভাবে ব্রাম্মধৰ্ম্মকে সর্বাঙ্গে পরিপুষ্ট করিয়া
দেশময় প্রচারিত করিয়াছেন। যে যে দিন এক এক
নুতন উৎসের যােগ প্রাপ্ত হইয়া এই মঙ্গলপ্রবাহ প্রবা-
হিত হইয়াছে, তাহার এক দিন ৭ পৌষ। ১৭৬৫ শকের
৭ পৌষ দিবসে ব্ৰতরূপে এই ধর্ম গ্রহণ করা হয়। তদবধি
ব্রাহ্মধৰ্ম্মের জ্ঞান প্রেম ও মঙ্গলভাব বিস্তারিত হইতেছে।
সেই শুভ দিনের স্মরণ উদ্দেশে ১৮১৩ শকের ৭ পৌষ
শান্তিনিকেতনের এই শােভন মন্দিরে ব্রহ্মাপাসনা
আরম্ভ করা হইয়াছে।
আমরা এই পুণ্যানুষ্ঠান প্রসঙ্গে শ্ৰীমন্মহর্ষি দেবের
অতুলিত পবিত্র জীবনের আলােচনায় মনােনিবেশ
করিতেছি।
শান্তিনিকেতনের পরিচয়। : বীরভূম জেলার অন্তর্গত বােলপুর বিভাগের মধ্যে একখণ্ড ( ডাঙ্গা) ভূমি এক্ষণে শান্তিনিকেতন নামে প্রসিদ্ধ। ইহা শ্ৰীমন্মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহােদয়ের ঈশ্বর চিন্তার নির্জন স্থান ; প্রথমে বৃক্ষাদি শূন্য ছিল এক্ষণে তরুশােভিত ও আমলক্ষণাক্রান্ত হইয়াছে। ১৭৮৪ শকের (১২৬৯ সালের) ১৮ ফাল্গুন এই স্থানের মৌরসী পাট্টা গৃহীত হয়। ১৮০৯ শকের (১২৯৪ সালের) ২৬ ফাল্গুন ইহা ট্রষ্টীদিগের হস্তে কেবল ধৰ্ম্মকর্মের নিমিত্ত অর্পিত হয়। ১৮১০ শকের ৪ কার্ত্তিক এই স্থানে আশ্রম ব্যবস্থাপিত হয়। ১৮১২ শকের ২২ অগ্রহায়ণ ব্রহ্ম- মন্দিরের ভিত্তি স্থাপন হয়। ১৮১৩ শকের ৭ পৌষ মঠ প্রতিষ্ঠা হয়। ১৮১৪ শকের ৭ পৌষ প্রথম সাম্বৎসরিক উৎসব হয়। ভিত্তিমূলে প্রােথিত তাম্রফলকে এই কয়েকটা কথা (দেবনাগর অক্ষরে ) খােদিত আছে - “ওঁ তৎ সৎ। ঠকুরবংশাবতংসেন পরমর্ষি শ্ৰীমতা দেবেন্দ্রনাথশৰ্ম্মণা, ধৰ্ম্মোপচার্থং শান্তিনিকেতনে প্রতিষ্ঠা- পিতমিদং ব্ৰহ্মমন্দিরং। শুভমস্ত ১৮১২ শক, ১৯৪৮ সম্বৎ, ৪৯৯১ কল্য। অগ্রহায়ণ ২২ রবিবাসর।”
শান্তিনিকেতন অতি অল্প বয়সে শ্ৰীমন্ দেবেন্দ্রনাথের জ্ঞাননেত্রে অনন্ত আকাশের অধিষ্ঠাতা অনন্তদেব দেখা দিয়াছিলেন। ইহাতে প্রতিপন্ন হইবে যে, ব্ৰহ্মজ্ঞানে উক্ত মহাপুরুষের স্বাভাবিক অধিকার। পড়িয়া শিখিয়া এবং অতি কঠোর সাধনা করিয়া তাহাকে ব্ৰহ্মদর্শন অভ্যাস করিতে হয় নাই। তথাপি ইহাও প্রথিত যে, তিনি এই ব্রহ্মজ্ঞান সাধনের কৰ্ম্ম ব্ৰতরূপে অবলম্বন করিয়াছিলেন। যখন তাঁহার বয়স ষড় বিংশ বৎসর, তখন তাঁহার প্রতীতি হইল যে, ব্রাহ্ম- সমাজের প্রতিপাদিত ধর্মকে ব্ৰতরূপে অবলম্বন না করিলে উহার প্রতিষ্ঠা হইবে না। এই তত্ত্ব যখন তঁাহার চিত্তকে সম্যক অধিকার করিয়াছে, তখন তাঁহার যে সেই ব্ৰতাব লম্বন হয় নাই, তাহা কে বলিবে ? শ্রীমচৈতন্য দেক একদিন সন্ন্যাসব্রত অবলম্বন করিয়াছিলেন। মহাত্মা ঈশা একদিন জলাভিষিক্ত হইয়া ধৰ্ম্মব্রত গ্রহণ করিয়াছিলেন। কিন্তু কে বলিবে যে, তাহা না হইলে উক্ত মহাপুরুষদ্বয়ের ধর্মসাধনের ত্রুটি হইত। শ্রীমদ দেবেন্দ্রনাথও ঐরূপে ৰাহ্মধর্মের দীক্ষা গ্রহণ করেন। নিজের রচিত, ধর্ম- [ ৬ ] । Wato গ্রহণ-মন্ত্রাবলী নিজেই পাঠ করিয়া উক্ত কর্ম সম্পন্ন করিয়াছিলেন। কিন্তু একাকী নহে। একবারে কতক- গুলি লােকের সহিত একত্র এই ধর্ম গ্রহণ করা হয়। যেমন নিজের আচরণ, তেমনি শিক্ষা দান, দুই কর্ম একত্র নিষ্পন্ন হইয়াছিল। এইটী অন্যান্য ধর্মসংস্থাপকদিগের তুলনায় অসাধারণ। ব্রাহ্মধর্মাবলম্বীদিগের মধ্যে কেহ উপদেষ্টা, কেহ উপদেশ, কেহ উচ্চ, কেহ নীচ, এরূপ প্রাকৃতিক সম্বন্ধ ভেদ নাই, এতদ্বারা এই বিধান প্রথিত হইল। গুরু ও শিষ্য এক পদ- বীতে দণ্ডায়মান হইয়া দীক্ষা গ্রহণ করিলেন। ১৭৬৫ শকের ৭ পৌষ কেশব ভারতী বা জন দি ব্যাপ্টিষ্টের ন্যায়, ব্রাহ্মসমাজের আচাৰ্য মহাত্মা রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ বড় বিংশ বর্ষীয় দেবেন্দ্রনাথকে এবং তাহার সঙ্গে আরাে জনকে “ব্রাহ্মধৰ্মগ্রহণ করাইয়া এই ব্রতের প্রবর্তক হইলেন। অল্প দিন মধ্যে জ্যেষ্ঠ শ্রেষ্ঠ কনিষ্ঠ বহু লােক এই পথের পথিক রূপে দেবেন্দ্রনাথের অনুবর্তী হইয়া ছিলেন। কিরূপে এই প্রথম ব্রাহ্মধৰ্ম্মব্রত অবলম্বন হইতে ৰাহ্মধর্মের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ পরিপুষ্ট ও এই ব্ৰত জনসমাজে পরিগৃহীত হইয়াছে ;কিরূপে ব্রাহ্মধর্ম যথাকালে শাখা পল্লবে ও পুষ্প ফলে পরিপূর্ণ বৃক্ষের তুল্য হইয়া সমুদায় ভারতবর্ষকে সমাচ্ছন্ন করিয়াছে, তাহাও স্মরণ করিবার
[ ৬১ ]
•••••••
দিন ৭ই পৌষ। ব্রাহ্মধৰ্ম্মানুরাগী ভক্তবৃন্দ এই ৭
পৌষকে উক্ত সমস্ত বৃত্তান্তের সহিত স্মরণ করিয়া ঈশ্বরের
কৃপায় উৎসবানন্দ অনুভব করুন।
মহাত্মা দেবেন্দ্রনাথ প্রকৃতিদর্শন ও শাস্ত্রপাঠ, এই
দুই উপায়ে সমস্ত ধর্মতত্ত্ব অবগত হইয়াছেন। এ দেশের
রীতি এই যে, ব্রাহ্মণসন্তানগণ পিতৃগৃহে সাবিত্ৰীমন্ত্রগ্রহণ
পূৰ্ব্বক ব্রহ্মচর্য অবস্থায় তথায় কিছুদিন সন্ধ্যাবন্দনাদি
শিক্ষা করিয়া পাঠের উন্নতি অনুসারে দূরতর দেশে গিয়া
ভিন্ন ভিন্ন আচাৰ্য্য ও অধ্যাপকের নিকট জ্ঞান ধৰ্ম্ম শিক্ষা
করেন। দেবেন্দ্রনাথের প্রকৃত অধ্যাপক বাহ প্রকৃতি
এবং উপনিষদাদি গ্রন্থ। ধর্মব্রত গ্রহণ করিয়া তিনি
ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশে পরিভ্রমণ পূৰ্ব্বক তত্তস্থান-মাহাত্ম্যে
আত্মজ্ঞানের পরিপুষ্টি সাধন করিয়াছেন এবং ব্রাহ্মধর্মের
উদার ভাব ও প্রকৃতি নিরূপণ করিতে সমর্থ হইয়াছেন।
আমরা বলিতে পারি, শ্ৰীমন্মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ প্রথম
বয়সে ব্ৰহ্মদর্শনের জন্য যে অনন্ত আকাশের দিকে দৃষ্টি-
পাত করিয়াছিলেন, সেই দৃষ্টি আর ব্যাবৃত্ত হয় নাই। বাহ
লক্ষণেই দেখা যাইতেছে যে,তদবধি তিনি মুক্তাকাশদর্শনার্থ
সৰ্ব্বদা গৃহের বাহিরে বাহিরে থাকিতেন, এবং কিঞ্চিৎ
অবকাশ পাইলেই পৰ্বতে সমুদ্রে ও নদীবক্ষে এবং এইরূপ
মহা প্রান্তরে ভ্রমণ করিতেন। যত দিন তাহার শরীরে,
বল ছিল, তত দিন তিনি শরীরকে মুক্তাকাশের মধ্যগত
arnt ««« vvave করিয়া রাখিয়াছেন। তাঁহার আয়ত চক্ষু সেই আকাশের মধ্যে বিষ্ণুর পরম পদ সৰ্ব্বদা দর্শন করিয়াছে। এই প্রকার ভ্রমণশীলতা ও বিদেশ বাসের মধ্যে তাঁহার ব্রাহ্মধর্মের সংস্থাপনকার্য সম্পন্ন হইয়াছে। ঘাঁহারা ব্রাহ্ম সমাজের ইতিবৃত্ত আলােচনা করিবেন, তাঁহারা জানিবেন যে, জন্মাবধি এই শাল-মহীরুহকে অনেক ঝঞ্চাবাত সহ্য করিয়া আসিতে হইয়াছে। শ্ৰীমন্মহর্ষি এই ঝঞ্চাবাতা- বত্তের মধ্যস্থানে থাকিয়া অতি ধৈৰ্য, স্থৈর্য, গাম্ভীৰ্য, এবং সেই সঙ্গে সৌজন্য ও মহত্ত্ব সহকারে ইহার সকল দিক রক্ষা করিয়াছেন। প্রথম বয়সে যিনি তত্ত্ববােধিনীর প্রতিষ্ঠাতা, পরিণত বয়সে তিনি শান্তিনিকেতন-প্রয়াসী, এই দুই কৰ্ম্মে মহাত্মা দেবেন্দ্রনাথের জীবনের গতি বিদিত হইবে। তন্ত্রের উক্তি এই ছিল, ব্ৰহ্মনিষ্ঠো গৃহস্থঃ স্যাৎ তত্ত্বজ্ঞান- পরায়ণঃ।” শাস্ত্র সকলের এই সুমীমাংসিত উপদেশ। কিন্তু এই শাস্ত্র মতে যাহারা ব্ৰহ্মজ্ঞানের আলােচনা করি- তেন, তাহারা গৃহধৰ্ম্মে সেই জ্ঞান সৰ্বতােভাবে রক্ষা করিতে পারেন নাই। দেবেন্দ্রনাথ যে যুগে জন্ম গ্রহণ করিয়াছেন, তাহা জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চার পক্ষে নব যুগ। বিজ্ঞানালােকে প্রকৃতিদশী দেবেন্দ্রনাথ যথার্থতঃ তত্ত্বজ্ঞান পরায়ণ হইয়া গার্হস্থ্যধর্মপালনের আদর্শ স্বরূপ হইলেন। অথচ নির্জনবাস যে তত্ত্বজ্ঞানের সহায়তা করে, তাহাও
.
তাহার জীবনে প্রকটিত হইল। তিনি নিত্য-শান্তি-
নিকেতনের প্রবল আশা বক্ষে ধারণ করিয়া দ্বন্দ্বময়
সংসারে বাস করিতেছেন, এই ‘শান্তিনিকেতন আশ্রম
তাহার নিদর্শন রহিয়াছে।
রাজৈশ্বৰ্যশালী দেবেন্দ্রনাথ সংসারের প্রায় সকল
কৰ্ম্মেই সুনিপুণ। কিন্তু তাহার জীবনের তাবৎ ঘটনা
ও কাৰ্যকলাপ কেবল একটী উদ্দেশ্য সাধনের অভিমুখী।
সে উদ্দেশ্য ব্রাহ্মসমাজের বৃদ্ধি। তাঁহার ধন-ঐশ্বৰ্য্য,
তাঁহার মানমর্যাদা, তাঁহার বিদ্যাবুদ্ধি সকলেরই মুখ্য
ফল অথবা এক ফল সাৰ্বভৌমিক ব্রহ্মোপাসনার প্রচার
ও প্রতিষ্ঠা। মহাত্মা দেবেন্দ্রনাথের এই অসাধারণ গৌরব।
এই তাঁহার মহদশ। এই মাহাত্মে তাঁহাকে শ্ৰীমন্মহর্ষি
নামে পূজা করা যায়।
এতদ্বারা এই মহাত্মার যে মহৎ যশ ও কৗত্তি বিদিত
হয়, সেই মহতী প্রতিষ্ঠা তিনি কেবল ঈশ্বরের ধ্যান
ধারণা ও ভক্তির গুণে প্রাপ্ত হইয়াছেন। ঈশ্বরের কৃপা
ভিন্ন তাহার কোন শক্তি ফুর্তি পায় নাই ; কোন কাৰ্য্য
অনুষ্ঠিত হয় নাই। তিনি কোন দৈবশক্তির অভিমান
রাখেন না। তিনি নিরীহ নিষ্কাম ও ঈশ্বরানুগত। তিনি
ভবিষ্যতের ভাল মন্দ কিছুই না ভাবিয়া চলিয়াছেন। রাগ
দ্বেষবিহীন বিশুদ্ধহৃদয়ে যাহা ঈশ্বরের আদেশ বলিয়া তাহার,
উপলব্ধি হইয়াছে, তিনি তাহারই অনুষ্ঠান করিয়াছেন।
••
M
Y
| ৬৪ ]।
এ দেশের পূর্বপ্রচলিত ধর্মের বিষয় পৰ্যালােচনা
করিলে দেখাযায় যে, এদেশীয় সমস্ত শাই ব্ৰহ্মবিচারে
ও ব্ৰহ্মতত্ত্বে পরিপূর্ণ। কিন্তু সে সমস্ত নিস্ফলপ্রায়।
কারণ, সে ব্রহ্মের কোন প্রকারে আরাধনা বা উপা-
সনা হয় না। অতএব অকৃত অমৃত নির্বিকার পরমেশ্বর
যেমন অবিজ্ঞাত, তেমনি অজ্ঞাত হইয়া আছেন।
এই মহাক্ষোভ ওঅভাব নিবারণের জন্যই ব্রাহ্মধর্মের
উদয়। কিন্তু এ পর্যন্ত ব্রাহ্মসমাজ-মন্দিরেই পরব্রহ্মের
উপাসনা হইয়া থাকে ; জনসমাজে বা পরিবার মধ্যে
আর কোথাও ভ্রমহ্মাপাসনার কোন প্রকার চিহ্ন নাই।
শ্ৰীমদেবেন্দ্রনাথ এই ব্রহ্মোপাসনাকে মনুষ্যের সমস্ত
জীবনের সকল কার্যে প্রতিষ্ঠিত করিবেন, এবং এই
ধৰ্ম্মকে সকলের অবলম্বনী করিয়া তুলিবেন, এইজন্য
জন্মিয়াছেন।' অতএব তিনি প্রথমাবধি ঐ একই
দিকে লক্ষ্য নিবদ্ধ করিয়া কৰ্ম্ম করিতে লাগিলেন।
এই উদ্দেশে ব্রাহ্মধর্মের প্রতিজ্ঞাপত্রে স্বাক্ষর দ্বারা তিনি
সকল ব্রাহ্মের স্মৃতিপটে এই কথা মুদ্রিত করিয়া রাখিলেন
যে, পরব্রহ্মজ্ঞানে প্রতিমাদি প্রাকৃত সৃষ্ট পদার্থের
উপাসনা অকৰ্ত্তব্য।
তাহার পর, শ্রুতি ও স্মৃতি শাস্ত্র হইতে পরম্পরাগত
প্রাচীন উৎকৃষ্ট সারার্থ মন্ত্রবিলি উদ্ধার পূর্বক “ব্রাহ্মধর্ম”
নামে এক গ্রন্থ প্রস্তুত করা হইল। অতি অল্পাক্ষরে
[ ৬৫ ] M, •••• ব্রাহ্মধর্মের সার মত সঙ্কলন করা হইল। সেই বীজভূত সার মতের অনুযায়ী ব্রাহ্মধর্মের বিস্তৃতরূপে ব্যাখ্যা হইতে লাগিল। এ সকলের ঐকান্তিক উদ্দেশ্য ব্রহ্ম- জ্ঞানের বহুল প্রচার এবং মনুষ্যের সর্ব কর্মে ব্রাহ্মধর্মের প্রবর্তনা। সুবুদ্ধি ব্ৰহ্মনিষ্ঠ দেবেন্দ্রনাথ ইহাও প্রতীতি করিতেন যে, তাহার নিজের বুদ্ধি ও নিজের শক্তি কোন কার্য্যেরই নহে। তিনি সর্বনিয়ন্তা ও বিশ্ববিধাতা ঈশ্বরকেই দেখেন এবং তাহার প্রতি আত্মসমর্পণ করিতেই জানেন। তাঁহার ধারণা এই যে, ব্রাহ্মধর্মের উন্নতির কাৰ্য্য ঈশ্বরের বিধানে পাঁচ জনে মিলিয়া করিবে, তিনি একাকী কোন কাৰ্য্য নিষ্পন্ন করিতে পারিবেন না; কিছুতে বাধাও দিবেন না। সে জন্য তিনি মূর্তিপূজাদিঘটিত, চিরপ্রচলিত পারিবারিক রীতির বলপূৰ্ব্বক উচ্ছেদ না করিয়া আত্মজ্ঞান অনুসারে আপনি ঈশ্বরেরই ধ্যান ও চিন্তায় রত হইলেন। এবং সেই জ্ঞানের প্রচার করিতে লাগিলেন। ইহার আর একটু বিবৃতি আবশ্যক। ১৭৬৫ শকে যুবা দেবেন্দ্রনাথ সমবয়স্ক কতকগুলি লােককে সঙ্গে লইয়া ব্রাহ্মধর্মের দীক্ষা গ্রহণ করিয়াছিলেন। তদবধি তাঁহার এই রীতি প্রথিত রহিল যে, ব্রাহ্মধৰ্ম্মেৰ উন্নতি ও ব্রাহ্ম- সমাজের শ্রীবৃদ্ধি কাৰ্যে সকলের সাহায্য প্রয়ােজনীয়।
কিন্তু বেদা বিভিন্ন মৃতয়াে বিভিন্ন ইহা ভারত ভূমিতে প্রায় সৰ্ব্বগােচর। পৃথিবীর সকল দেশে বিভিন্নপন্থী উপাসকগণ ইতিহাসে বহু বিচিত্র ঘটনা উপস্থিত করিয়া- ছেন। সুশিক্ষার বিস্তারে এ সমস্ত তত্ত্ব লােকদিগের সুবিদিত হইতেছে। আবার বর্তমানকালেও ঐরূপ নানা মতের উৎপত্তি হইবে না, এমন কে বলিতে পারে ? দেবেন্দ্রনাথ সেই প্রথম বয়সেই ইহা স্পষ্ট অনুভব করিয়া- ছিলেন। তখন বেদের উপর যে নির্ভর ছিল, তাহা কতক অপগত হইলে, “হৃদয়েনাভ্যনুজ্ঞাতঃ” ধর্মের অনু- সন্ধান হইতেছিল। দেবেন্দ্রনাথ মতবৈষম্য নিবারণার্থ পরিমিত কথায় ধর্মের সারতত্ত্ব লিপিবন্ধ করিয়া রাখিতে আগ্রহান্বিত হইলেন। এই বিষয়ের আলােচনাতেই দেখাগেল, নানা তর্কের উদয় ও নানা মতের উৎপত্তি ক্ষান্ত করাযায় । দেবেন্দ্রনাথের এই প্রত্যয় আরাে দৃঢ় হইল যে, ব্রাহ্মধম্মের মূলসত্য নির্ণীত হওয়া আবশ্যক; বিচার-বুদ্ধিতে মত বা সম্প্রদায়ের বিভিন্নতা হইলেও তন্মধ্যে সেই মূলসত্য যেন অবিসম্বাদিত ও অবিচলিত থাকে। তাহাতে বেদ- বিচারে অপরা ঋগ্বেদ ইত্যাদি বাক্যদ্বারা প্রথমে নিণীত হইল যে, যাহাতে ব্ৰহ্মতত্ব জানাযায় তাহাইপরা বিদ্যা। এই তটস্থলাক্ষণিক শ্রুতিমন্ত্রী ১৭৬৯ শকের বৈশাখ হইতে চারি বৎসর তত্ত্ববােধিনী পত্রিকার শীর্ষ দেশে
{ ৬৭ ]
qWpA
AL
*****^^^^^^^^^
বিন্যস্ত রহিল। অতঃপর উপাসনা কাহাকে বলাযায়, তাহা
স্বল্পাক্ষরে ব্যক্ত হইল—তস্মিন্ প্রতিস্তস্ত প্রিয়কাৰ্যসাধনঞ্চ
তদুপাসনমেব। পূৰ্ব্বমন্ত্রের পরিবর্তে এই বীজমন্ত্র ১৭৭৩
শকের অগ্রহায়ণে তত্ত্ববােধিনীর মস্তকে স্থাপিত হইল।
পুনশ্চ চারি বৎসর পরে ১৭৭৭ হইতে দুই বৎসরে বর্তমান
কালের প্রচলিত ব্রাহ্মধর্মের বীজ পরিপুষ্ট হইয়া ক্রমে,
ক্রমে সেই স্থল অধিকার করিয়াছে। ঈশ্বরের তটস্থ ও
স্বরূপ লক্ষণের সম্মিলনে এই সার সত্য স্থিরীকৃত হইতে
এত দিনের প্রয়াস আবশ্যক হইয়াছিল। এই কাৰ্য্যে
তত্ত্ববােধিনী সভার সভ্যেরা বিতর্কবুদ্ধিতে বহু বিঘ্ন উপ-.
স্থিত করিয়াছিলেন। শুভ বুদ্ধির উদয়ে সেই গােযােগ
ক্রমশঃ মিটিয়া গেল। কিন্তু ভক্তির প্রসারে বিপ্ন দেখিয়া
ঈশ্বরানুরাগী দেবেন্দ্রনাথ মনে মনে বড় ব্যথা অনুভব
করিয়া ছিলেন। তদতিরিক্ত তাহার ইহাও এক ক্ষোভের
বিষয় ছিল যে, তিনি এত করিয়া তত্ত্ববােধিনী সভায় সত্যং
জ্ঞানমনস্তং শিবং স্বতন্ত্রং সৰ্বব্যাপী পরমাত্মার উপাসনার
আলােচনা করিয়া থাকেন, কিন্তু স্বীয় পরিবারমধ্যে
তাহাকে মূর্তিপূজার ও দুর্গোৎসবের মহা আয়ােজন করিতে
হয়। এই শেষােক্ত কার্যে তিনি নির্লিপ্তভাবে থাকিতেন
এবং পূজার অব্যবহিত পূর্বে তিনি কলিকাতা ত্যাগ
করিয়া কোন উদ্যান বাটিকায় বা নদীর প্রবাহহাপরি
অবস্থান করিতেন। এদিকে “ঈশ্বর অনন্ত ও মঙ্গলময়
[ ৬৮ ] ৫ । কি না” ইত্যাদি বিচারে ব্রাহ্মগণও তাহাকে বিক্ষুব্ধ করিতে ছাড়েন না। তাহাতে তিনি অতি বিরাগে হিমা- লয় প্রস্থে চলিয়া গেলেন। * কিন্তু দেখাইতেছে যে, সেই সঙ্গে সঙ্গেই ১৭৭৯ শকের বৈশাখ হইতে সর্বাঙ্গ- সুন্দর ব্রাহ্মধর্মের পরিস্ফরণােপযােগী পরিপুষ্ট বীজমন্ত্র তত্ত্ব- বােধিনী পত্রিকার শিরােভূষণ রূপে বিধৃত হইয়া অদ্যাপি বিদ্যমান রহিয়াছে। দেবেন্দ্রনাথ সর্বেশ্বর, তথাপি তিনি তত্ত্ববােধিনী সভার সভ্যদিগের মতের অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি কেমন সার্বজনিক ভাবে ব্রাহ্মসমাজের কাৰ্য্য করিতে সংকল্পারূঢ় ছিলেন, তাহার এই এক পরিচয়। এই ঘটনাটী বিশেষ প্রণিধানের বিষয়। ব্রাহ্মসমা- জের মধ্যেও নানামতাবলম্বী লােকদিগের সহিত তাহার মতের কতক কতক অনৈক্য উপস্থিত হইল। তাহাতে তিনি কেবল সহিষ্ণুতা ও উদারতা অবলম্বন করিয়া চলিতে লাগিলেন। দেবেন্দ্রনাথ দ্রোহ-কৰ্ম্ম-বিবর্জিত * সামান্য জমিদারী সম্পর্কে যাহারা ব্যতিব্যস্ত হইয়া পক্ষাধিক কাল গৃহ ছাড়িয়া যাইতে পারেন না, এবং এক্ষণকার জালালাবৎ রেলপথের বিস্তারেও যাহারা দেশ ভ্রমণে কাতর হইয়া পড়েন, তাহারা ভাবিয়া দেখুন, কি অসাধারণ ধৰ্ম্মনিষ্ঠা ও কষ্টসহিষ্ণুতা প্রভাবে সেই বয়সে দেবেন্দ্রনাথ সুবৃহৎ জমিদারির কাৰ্যভার অপরের হস্তে ফেলিয়া রেলযান-বিহীন দুর্গম পথে তুহিনাবৃত প্রদেশে একাকী দুই বৎসর কাল ভ্রমণ করিয়াছিলেন। • [ ৬৯ ] সম্ভাব-পরায়ণ সাধুহৃদয়। তিনি সর্বেশ্বর হইয়াও অনুগত জনের প্রকারান্তরে অধীন। ধর্মের মূল সত্যের বিচারে সভ্যদিগের মধ্যে যখন বিসম্বাদ ও বিতর্ক উপস্থিত হইল, তিনি কাহারও প্রতি বিরূপ আচরণ না করিয়া এবং সকলের প্রাপ্ত অধিকার অক্ষুন্ন রাখিয়া আপনি “ইতােগমিষ্যামথবেতি” ভাবিতে লাগিলেন। এই লক্ষণ দেবেন্দ্রনাথের চিরজীবনের সঙ্গী হইয়া রহিল। শ্ৰীমন্মহর্ষি এই জন্যই পৰ্বতবাসী ও বনবাসী।. এই জন্যই তিনি দ্বন্দ্ব-বিবাদময় জনসমাজ অপেক্ষা মূক ও জড় প্রকৃতিকে ভাল বাসিয়া লােকালয়বর্জিতস্থানে বাস করিতে অভ্যাস করিয়াছেন। ইহার পর পুনশ্চ যখন ব্রাহ্মসমাজের নানা প্রকার উন্নতির মধ্যে বিকৃতগতি আরম্ভ হইয়াছিল, তখন শ্ৰীমন্ম- হর্ষি দেখিলেন, মনুষ্যের প্রবৃত্তিস্রোত ও স্বার্থপরতা বড়ই প্রবল ; সাংসারিক নানাপ্রকার বিষয় ভােগর মধ্যে ঈশ্বরকে জীবনের, মধ্যবিন্দু করিয়া চলা কঠিন কৰ্ম্ম। তখন তাহার প্রতীতি হইল, ব্রাহ্মধৰ্ম্ম অবিকৃতভাবে প্রচার করা সহজ নহে; জীবনের সকল কার্যে ব্রাহ্মধৰ্ম্মকে ঠিক রাখা সাধনার বিষয়। সেই সময়ে তাহার কিংকর্তব্য বিষয়ে ঘাের চিন্তার উদয় হয়। এই চিন্তার আবেগে ঈশ্বর ঈশ্বর করিয়া তাহাকে পুনশ্চ নির্জন প্রান্তর নদী কানন । ও পর্বত আশ্রয় করিতে হইয়াছিল।
[ ৭৩ ] :
~~~
প্রথম অবস্থায় শ্রীমন্মহর্ষি দুর্গোৎসবাদির সময় গৃহ
হইতে বহির্গত হইয়া নদীতে ভ্রমণ করিতে যাইতেন ;
কখন বা কলিকাতার সন্নিহিত এক এক উদ্যানে বাস
করিয়া কিছু দিন নির্জন চিন্তায় অতিবাহিত করিতেন।
পদ্মানদী তাহার প্রথম সময়ের ভ্রমণ স্থান। ঈশ্বরের
প্রতি নির্ভর করিয়া তিনি এই দিগন্তপ্রসারিণী নদীর
ভীষণ কুটিকে অগ্রাহ করিয়া তদুপরি সামান্য
তরণীযােগে বিচরণ করিতেন। তাহার পর হিমাচলের
মধ্যস্থিত কখন মরি পর্বতে, কখন ধৰ্মশালা নামক
শৈল শিখরে, কখন বাক্রোট। পৰ্বতের উচ্চচুড়ায়, কখন
হিমগিরির অত্যুন্নত শৃঙ্গ-সন্নিহিত দাজিলিং পর্বতে, কখন
ব্ৰহ্মপুত্র নদে, কখন বঙ্গোপসাগরে, কখন বা প্রশান্ত মহা-
সাগরে তিনি অবিরাম ভ্রমণ করিয়াছেন। এই সকল
প্রাকৃতিক বিচিত্র শশাভাময় স্থানে অদ্ভুত ও শান্তিরসে
তাঁহার চিত্ত সৰ্ব্বদা নিমগ্ন থাকিত। সকলেই অনুমানে
বুঝিতে পারিবেন যে, অচিন্ত্য অনন্ত ঈশ্বরের তেমন
আশ্চর্যজনক বিশ্বরচনা নিরন্তর দর্শন করিয়া যিনি অতুল
তত্ত্বরস-সমন্বিত ব্ৰহ্মানন্দে মগ্ন থাকিতেন, তাঁহার পক্ষে
জনকোলাহলের মধ্যে আসিয়া অল্পমতি লােকদিগের
সহিত বাদানুবাদ করা কতই অরুচিজনক।
তথাপি শ্ৰীমন্মহর্ষি যেরূপ স্বভাবতঃ লােকহিতৈষী,
বিশেষতঃ তিনি যে ব্রাহ্মধর্ম ও ব্রাহ্মসমাজের উন্নতির জন্য
[ ৭১ ]
///////
AA/WWW
জীবন উৎসর্গ করিয়াছেন, তাহাতে পূর্বাপর লক্ষণ দেখিয়া
এমনও বােধ হইতেছে যে, এই নির্জন বাস মধ্যে
তাঁহার এই চিন্তা প্রবল থাকিত যে, কিসে মঙ্গলময়
প্রেমময় অনন্ত ঈশ্বরের যথার্থ স্বরূপের প্রতি লােকের
অনুরাগ বর্ধিত হয় ; কিসে ব্রাহ্মধর্মের উন্নতির অন্তরায়
সকল অপসারিত হয় ; কিসে এদেশের বর্তমান অশেষ
দুর্গতি দূর হয় ; এবং কিসে লােকের ঐহিক ও পারত্রিক
যথাথ মঙ্গল সাধন হয়।
আবার ইহাও দেখিতে হইবে যে—যখন শ্ৰীমন্মহর্ষির
বিশুদ্ধচিত্ত লােকহিতসাধনের জন্য, ব্রাহ্মধর্ম প্রচারের
এত ব্যাকুল, তখন সংসার বিষয়ে তাহার নির্লিপ্ততাও
তেমনি প্রবল। যদি আমার দ্বারা ব্রাহ্মধর্মের পক্ষে
সংসারের মঙ্গলসাধন পক্ষে কিছু ভাল কাৰ্য্য হয়, তবে
কর্মক্ষেত্রে ফিরিয়া যাই ; নতুবা আর স্বদেশের দিকে
প্রত্যাবর্তন করিব না,–এরূপ তাহার আন্তরিক ভাৰ
ব্যক্ত হইয়াছে। এক যাত্রায় যিনি তাঁহার সঙ্গী ছিলেন,
সেই বন্ধুর মুখে শুনা গিয়াছে, উদাসীন ভাবে ভ্রমণ
করিতে তাহার যেরূপ আনন্দ জন্মিত, সেরূপ আনন্দ
আর কিছুতে হইত না।
শ্ৰীমন্মহর্ষির চরিত প্রসঙ্গে তাঁহার ১৭৭৯ ও ১৭৮
শকের শিমলা পৰ্বত ভ্রমণ উপলক্ষে একসাধক ব্যক্তি
লিখিয়াছেন,- “আচাৰ্য কেশবচন্দ্র” আদি, ২৭ পৃঃ।]
[ ৭২ ] www.••••• এ ৫ “দুই বৎসর কাল এইরূপে নির্জনে বাস করিয়া তাঁহার মন নির্জনপ্রিয় হইয়া পড়ে। এই নির্জন- প্রিয়তা আজ পর্যন্ত তাঁহাকে পরিত্যাগ করে নাই। তিনি পাঁচ সাত ঘণ্টা কাল অনায়াসে নির্জন চিন্তায় অতিপাত করেন। হিমালয় পরিত্যাগের অব্যবহিত কাল পূর্বে তিনি শতদ্রু নদীর উৎপত্তি স্থান দর্শন করিতে যান। এই উৎপত্তি স্থান দর্শনে তাহার স্বদেশে প্রত্যাগমনের ভাব উদ্দীপ্ত হয়। নদী আপনার উৎপত্তি স্থানে বদ্ধ না থাকিয়া ক্রমান্বয়ে প্রবাহিত হইয়া কত দেশের উপকার সাধন করিতেছে, ইহা: ভাবিয়া তিনি আপনার প্রাপ্ত যোগসম্পৎ আপনাতে অবরুদ্ধ রাখা অন্যায় বােধ করিলেন। কিন্তু শত-প্রবাহ উচ্চ স্থান হইতে নিম্ন, ভূমিতে অবতরণ করিয়া ক্রমে কলুষিত- সলিল হইয়া গিয়াছে। সংসারে গিয়া তাঁহারও এইরূপ হইবে, ইহা ভাবির কুষ্ঠিত হইলেন, কিন্তু প্রাপ্ত সম্পৎ বিতরণের অবশ্যকর্তব্যতা আর তাহাকে হিমালয়ে বদ্ধ থাকিতে দিল না ; তাহাকে স্বদেশ ফিরাইয়া আনিল।” অদ্ভুত প্রভাব যুক্ত এই সকল জল ও স্থল শ্রীমৎ দেবেন্দ্রনাথের তীর্থ স্বরূপ হইয়াছিল। তীর্থ বাস করিলে লােকের শরীর ও মন পবিত্র ভাব ধারণ করে, এবং জ্ঞান ও ধর্মে তাহার নূতন ফুৰ্ত্তি লাভ হইয়া থাকে। এই মহাত্মাও সেইরূপ নুতন উৎসাহ প্রাপ্ত হইয়া স্বদেশে
[ ৭৩ ]
•••••••••
প্রত্যাগমন করিতেন। নবতর এই “ব্রাহ্মতীথ হইতে
আসিয়া বারে বারে তিনি নবােদ্যমে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ
পূৰ্ব্বক ব্রাহ্মধর্মের ও ব্রাহ্মসমাজের উন্নতির পথ ক্রমশঃ
পরিষ্কার করিয়া দিয়াছেন।
তীর্থবাসী শ্ৰীমন্মহর্ষির ইন্দ্রিয়সংযম, পাপপ্রশমন,
চিত্তের বিশুদ্ধি করণ, আত্মতত্ত্বের, মনুষ্যত্বের ও সৃষ্টি
মাহাত্মাের ধ্যান ধারণা এবং ঈশ্বরের প্রতি প্রগাঢ় শ্রদ্ধা
ভক্তি ইত্যাদি ধৰ্ম্মসাধনার সুস্পষ্ট নিদর্শন তাহার কথায়
ও উপদেশে, তাহার বক্তৃতায় ও ব্যাখ্যানে এবং তাহার
মুখাবয়বে ফুটিয়া পড়িত। তাহাতে তাহার সংসর্গে
তাহার অনুসরণে ব্রাহ্মগণ সুমহৎ সাধু সঙ্গের ফল প্রাপ্ত
হইতেন।
ব্রাহ্মধৰ্ম্মের সাধনপ্রক্রিয়াতে বিদ্বৎ দেবদর্শনের বা
মনুষ্যের কৈান
অদ্ভুত অলৌকিক ক্রিয়ার মােহিনী শক্তি
প্রচারিত হয় নাই ; পারলৌকিক
অত্যুগ্র সুখের লােভ বা
শাস্তির বিভীষিকা প্রদর্শিত হয় নাই। এই ধর্মের সাধনায়
কোন দুশ্চর তপােনুষ্ঠান একান্ত আবশ্যক হয় না; এবং
পাপপ্রসক্তির কোন অলক্ষিত গৃঢ় আশ্রয় থাকে না।
ইহাতে গুরু, পুরােহিত, রাজা, দৈবজ্ঞ কা কোন স্বপ্নসঞ্চারী
অলক্ষ্য পুরুষের প্ররােচনার ও প্রভাবের অপেক্ষা নাই।
ব্রাহ্মধৰ্ম্ম একান্ত প্রকৃতিসিদ্ধ, সরল, অথচ সর্বপাপহারী।
সুব্যক্ত প্রকৃতির সুবিমল রসগ্রাহী সুরুচিবান্ সৎপুত্র
[ ৭৪ ]
LKAWLh.
M, ১৭
শ্ৰীমদেবেন্দ্রনাথের নিষ্কাম হৃদয়ের অহৈতুকী ভক্তিপ্রভাবে
এই সহজ ধর্ম প্রচারিত ও প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে।
১৭৮০ শকে ঋষিধৰ্মী দেবেন্দ্রনাথ হিমাচল হইতে
প্রত্যাগমন করিলে ব্রাহ্মসমাজের এক নব অভূদয় হইল।
কার্তিক মাসে তিনি কলিকাতায় উপস্থিত হইয়াছিলেন।
৮ পৌষ হইতে তিনি ব্রাহ্মসমাজে প্রায় প্রতি বুধবারে
বক্তৃতা দ্বারা আত্মার সহিত ঈশ্বরের সম্বন্ধ ইত্যাদি
বুঝাইতে আরম্ভ করিলেন। কতকগুলি ধৰ্ম্মজিজ্ঞাসু যুব
উপস্থিত ছিলেন। তাঁহাদিগের উপদেশাৰ্থ ব্যবস্থাপূর্বক
তিনি শ্ৰীযুক্ত কেশবচন্দ্র সেন মহাশয়ের সহিত এক
ব্ৰহ্মবিদ্যালয় খুলিলেন। তিনি ধ্যানচিন্তায় যে যােগসম্পৎ
লাভ করিয়াছিলেন, ১৭৮২ শকে তাহা ব্রাহ্মসমাজের
বেদী হইতে বক্তৃতা আকারে ব্যক্ত করিতে লাগিলেন।
এই সমস্ত লিপিবদ্ধ হইয়া ব্রাহ্মসমাজের বক্ততা ও
ব্রাহ্মধর্মের ব্যাখ্যান নামে পুস্তকাকারে প্রকাশিত
সিন্দুরিয়া পটিস্থিত গোপাল মল্লিকের বাটিতে রবিবারের প্রাতঃ
কালে এই ব্রহ্মবিদ্যালয়ে কাৰ্য ১৭৮১ শকের ২৬ বৈশাখ হইতে চলিতে
থাকে। ১৭৮২ শকের ৩১ বৈশাখ এবং ১৭৮৫ শাকর ৮ চৈত্র আরম্ভ
হইয়া দুইবারে ভবানীপুরে কয়েক মাস ব্ৰহ্মবিদ্যালয়ের উপদেশ
হয়! ব্রাহ্মসমাজের কাৰ্য্যকে সর্বদা সার্বজনিক করিবার প্রয়াসে
দেবেন্দ্রনাথ না লোকের অধিকারে এই সকল বিদ্যালয়ের কাৰ্য
রাখিয়াছিলেন। বিবিধ বিধানে ব্ৰহ্মমন্ত্র ক্রিয়াশীল হইল।
[ ৭৫ ] । Aw WWWWWWWWWW হইল। ইহাতে ব্রাহ্মধৰ্ম্মমৰ্ম্ম অতি বিশদ রূপে বােধ- গম্য হইল। ব্রহ্মবিদ্যালয়ে তিনি যে সকল উপদেশ দিতেন, তাহাতে ব্রাহ্মধৰ্ম্মের বীজনিহিত মত ও বিশ্বাস স্পষ্টতর রূপে পরিব্যক্ত হইল। ১৭৮৩ শকের শেষে এই শেষােক্ত গ্রন্থ মুদ্রিত ও প্রচারিত হয়। এই চেষ্টায় কতকগুলি যুবক ব্রাহ্মসমাজে প্রবিষ্ট হইয়া ব্রাহ্মধর্মকে সর্বাঙ্গীনরূপে প্রতিপালন করিবার জন্য প্রতিজ্ঞারূঢ় হইলেন। পূর্বে ব্রাহ্মসমাজে ব্রাহ্মধর্ম গ্রন্থা- বলম্বনে জ্ঞানচর্চার যথেষ্ট বিস্তার হইয়াছিল। সম্প্রতি শ্ৰীমদেবেন্দ্র নাথ ব্যাখ্যান দ্বারা ঈশ্বরের প্রতি প্রেম ও ভক্তির ক্ষেত্র প্রশস্ত করিয়াদিলেন। অতঃপর ব্রাহ্মধর্ম প্রতি পরিবারের মধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া মনুষ্যের সমস্ত জীব- নকে অনুশাসিত করিবে, তাহার উপক্রম হইল। হিন্দু শাস্ত্রোক্ত পূর্বতন আচার্য্যেরা জ্ঞানকাণ্ড ও কর্মকাণ্ডকে পৃথক্ রাখিবার উপদেশ দিয়াছেন। ব্রাহ্মধর্মের এই আচাৰ্য্য নিত্যযুক্তজ্ঞানধৰ্ম্মকে একত্র প্রতিপালন করিবার ব্যবস্থা করিয়া দিলেন। নির্জনতাপ্রিয় উদাসীন-স্বভাব দেবেন্দ্রনাথ গৃহে থাকিতে একান্ত অনিচ্ছু। তাহার মনােনুকুল তীর্থ যাত্রায় তাহার শ্রান্তি বােধ হয় না। তিনি ১৭৮০ শকের কার্তিক মাসে হিমাচল হইতে স্বদেশে প্রত্যাগমন করেন ; ১৭৮১ শকের ১২ আশ্বিন কলিকাতা হইতে সমুদ্র-পােতারােহণে [ ৭৬ ] ।।।।।।। সিংহল যাত্রা করিলেন। তিনি পর্বতমালার মধ্যে ঈশ্বরের বিশ্বরচনার বিচিত্র শক্তি অবলােকন করিয়া- ছেন। এক্ষণে সাগর-তরঙ্গে তাহার মহিমা তনুধ্যান করিতে একান্ত ব্যগ্র হইয়া ছিলেন। এই যাত্রায় শ্রীযুক্ত কেশবচন্দ্র সেন এবং শ্রীযুক্ত সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁহার সমভিব্যাহারে ছিলেন। এই যুবকদ্বয়ের উপর, দেবেন্দ্র- নাথের অনেক আশা জন্মিয়াছিল। এই উদ্যমে তিনি দেখিলেন, ইহারা তাহার শিষ্যত্বের যােগ্য কি না ? অর্থাৎ তাহারা সমুদ্রোপরি ভ্রমণে তাঁহার তুল্য প্রেমানন্দ অনুভব করিতে পারেন কি না ? শ্রীমান্ সত্যেন্দ্রনাথ মহাত্মা দেবেন্দ্রনাথের দ্বিতীয় পুত্র। তিনি নানা বিষয়ে সত্যেন্দ্রনাথের পারদর্শিতা দর্শন করিয়া তাঁহাকে সিবিল সার্বি নামক উচ্চ পদ লাভের উদ্দেশে ইংলণ্ডে প্রেরণ করিতে উদ্যেগী হইলেন। এই কর্মে ভারতবাসীদিগের আর এক দিকে উন্নতির দ্বার উন্মুক্ত হইয়াছে। ১৭৮৩ শকের শেষভাগে শ্ৰীমদেবেন্দ্রনাথ ব্রাহ্মধর্মের ব্যাখ্যান দ্বারা তাঁহার অন্তনিহিত যােগসম্পৎ বিতরণের কাৰ্য্য এক প্রকার সমাপ্ত করিলেন। তাহার সঙ্গে সঙ্গে ব্রাহ্মধর্মকে পরিবার মধ্যে প্রবিষ্ট করিবার সুত্রপাত করিতে সমর্থ হইলেন। লৌকিকী বিদ্যা শিক্ষা, পারমার্থিক জ্ঞানচর্চু, বৈবাহিক অনুষ্ঠান, দুর্ভিক্ষনিবারণ চেষ্টা, প্রভৃতি [ ৭৭ ] । ।।।। মনুষ্যমণ্ডলীর সকল আবশ্যক হিতকর কাৰ্য ব্রহ্মের উপর দৃষ্টি স্থাপন এবং ব্রহ্মোপাসনা পূর্বক অনুষ্ঠিত হইতে লাগিল। * এখন তিনি মনে করিতে লাগিলেন, আমার কর্ম ফুরাইল। অতঃপর তাহার ইচ্ছা হইল যে, কলিকাতার অতি দূরে কোন এক নিভৃত স্থানে একাকী চিরদিনের * ১৭৬৫ শক অবধি ব্রাহ্ম ধৰ্ম্ম ব্রত পালনে প্রতিজ্ঞারূঢ় হইয়া প্রথম অবস্থায় ব্রাহ্মেরা গীতা ও উপনিষৎ পাঠ দ্বারা নিত্য ব্রহ্মাপাসনা করিতেন। ১৭৭১ শকে ব্রাহ্মধর্ম গ্রন্থ প্রকাশ হইলে তাহাই তাহ- দের নিত্য অধ্যয়নের গ্রন্থ হইয়াছিল। ১৭৮১ শকে উপাসনার প্রকৃষ্ট পদ্ধতি পুনঃপুনঃ প্রচারিত হইল। বিধি পূর্বক প্রাত্যহিক উপাসনা চলিতে লাগিল। দেবেন্দ্রনাথ আপনার গৃহে পরিমিত দেবতার পরি- বর্তে প্রত্যহ ব্ৰহ্মাপাসনার বিধান করিলেন। অতঃপর তাহার নিত্য ও নৈমিত্তিক সমুদায় গাহস্ত ধৰ্মকৰ্ম্ম ব্ৰহ্মাপাসনা সহকারে নির্বা- হিত হইতে লাগিল। ১৭৮৩ শকের ১২ শ্রাবণ দেবেন্দ্রনাথ হােমাদি ক্রিয়া ত্যাগ করিয়া স্বীয় দ্বিতীয়া কন্যার বিবাহ দিলেন। তদবধি ব্রাহ্মমতে ক্রিয়ানুসন্ধান একটা বিশেষ ব্রাহ্মলক্ষণ বলিয়া গণ্য হইল। এক্ষণে আচাৰ্য দ্বিজেন্দ্রনাথ তাহার পারিবারিক উপাসনায় ধর্মোপদেশ দিতেছেন। তাহা তত্ত্ববােধিনী পত্রিকায় প্রকাশিত হইতেছে। তাহাতে তত্ত্বজ্ঞান ও ঈশ্বর প্রমের সুখদ সংমিশ্রণ দেখাযায়। বঙ্গ- দেশের পূর্ব ও দক্ষিণ ভাগে শ্ৰীমন্মহর্ষির জমিদারির মধ্যেও ব্রহ্মা- পাসনা দ্বারা সম্বিৎসরিক পুণ্যাহ কৃত্য নির্বাহ হইয়া থাকে। ব্রঙ্গে- পাসনা ভিন্ন তাহার কোন মঙ্গলাচার বা শুভকাৰ্য অনুষ্ঠিত হয় না।
[ ৭৮ ] ৭। । * মত অবস্থান পূর্বক ঈশ্বরচিন্তা করেন। তাহার ফল এই শান্তিনিকেতন আশ্রম। ১৭৮৩ শকের শীতকালে শ্ৰীমদেবেন্দ্রনাথ কলিকাতা হইতে আসিয়া এই স্থানের নিকটবর্তী ঘুস্করার এক প্রশস্ত মাঠের মধ্যে তাম্বু খাটাইয়া তাহাতে অবস্থিতি করেন। তথায় চতুর্দশ সহস্র আম্র বৃক্ষের এক বৃহদায়তন বন বা উদ্যান ছিল। শ্ৰীমন্মহর্ষির এই কৃত্রিম বন ভাল লাগিল না। মধুমক্ষিকা যেমন মধুচক্র বাঁধিবার নিমিত্ত বৃক্ষ হইতে বৃক্ষান্তরে উপযুক্ত স্থান অন্বেষণ করে, তেমনি তিনি স্থির নির্জন বাসের উপযােগী এবং ঈশ্বরধ্যানের অনুকূল প্রকৃতির হস্তরচিত কোন এক স্থানের অন্বেষণে ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। অবশেষে বৃক্ষপল্লব শূন্য মনুষ্য-সঞ্চার-বর্জিত দিগন্তপ্রসারিত ভুবনডাঙ্গা নামক এই প্রান্তর তঁাহার মনোমত হইল। তদবধি এখানে এই আশ্রমের পত্তন হইয়া ক্রমে ক্রমে ইহা কতকগুলি বৃক্ষের ছায়ায় সমাবৃত এবং মনুষ্যের বাসােপ- যােগী হইয়াছে। ১৭৮৪ শকের (১২৬৯ শালের ) ১৮ই ফাল্গুন এই স্থানের মৌরসী পাট্টা গৃহীত হয়। * এই সময় কলিকাতায় শ্রীমৎ কেশবচন্দ্র সেন কলিকাতা কলেজ স্থাপন করেন। ধৰ্ম্মনীতি শিক্ষা ইহার প্রধান উদ্দেশ্য। ৬৩। ৮ এপ্রিল খৃষ্টান মিশনরিদিগের আপত্তি খণ্ডনার্থ তৎকর্তৃক Brahmo Somaj Vindicated To I [ ৭৯ ] ..... •• ••••••••• আমরা পূর্বেই প্রদর্শন করিয়াছি, শ্ৰীমদেবেন্দ্রনাথ স্বভাবতঃ ত্যাগশীল। তিনি সংসারের সহিত নিলিপ্ত থাকিতেই সমধিক অনুরাগী। তিনি যখন দেখিলেন যে, কতকগুলি ব্ৰহ্মনিষ্ঠ যুবাপুরুষ ব্রাহ্মসমাজের সকল অঙ্গ পরিপুষ্ট করিতে জীবন উৎসর্গ করিয়াছেন, তখন তিনি মনে করিলেন, ব্রাহ্মধর্ম ও ব্রাহ্মসমাজ সম্বন্ধে আমার যত্ন ও চেষ্টার আর বিশেষ প্রয়ােজন নাই। আমার অবসর লাভ হইল। এই প্রত্যয়ে বাস্তবিক তিনি কৰ্ম্ম- ক্ষেত্র হইতে অবত হইবার উপক্রম করিলেন। যুবা ব্রাহ্মগণ সকলেই কৃতবিদ্য, বুদ্ধিমান এবং ধর্ম- নিষ্ঠ। বাগ্মীপ্রবর শ্রীযুক্ত কেশবচন্দ্র সেন তাঁহাদের অগ্রণী। শ্ৰীমদেবেন্দ্রনাথ বুঝিলেন যে, এই কেশবপ্রমুখ ব্রাহ্মগণ ব্রাহ্মসমাজের মধ্যে সম্পূর্ণ স্বাধীনতার সহিত কৰ্ম্ম করিতে থাকিলে ব্রাহ্মধৰ্ম্মের বহুল প্রচার এবং তদ্বারা জন সমা- সমাজের প্রভূত মঙ্গল সাধন হইবে। তদনুসারে তিনি শ্ৰীযুক্তকেশবচন্দ্রকে ব্রাহ্মসমাজের আচাৰ্যপদে নিয়ােগ করিয়া তাহার প্রতি সমস্ত কর্মভার অর্পণ করিলেন। ১৭৮৪ শকের বৈশাখ হইতে ১৭৮৬ শকের কার্তিক পৰ্য্যন্ত শ্ৰীযুক্ত কেশবচন্দ্র উপরােক্ত অধিকারে ব্রাহ্মসমা- জের মধ্যে অব্যাহত রূপে কৰ্ম্ম করিতে থাকেন। এই সময়ে শ্রীমদেবেন্দ্র নাথের এই শান্তি নিকেতনের বৃক্ষাদি অর্জিত এবং আশ্রম-বাটিকা নির্মিত হয়।
wavvvvvvA
[ ৮২ ]
nananaandnavn.
প্রকৃতি রামমােহন রায়ের পত্তন অনুসারে দৃঢ়রূপে রক্ষা
করিতে উদ্যক্ত হইলেন।
মন্মহর্ষি ব্রাহ্মসমাজের এই সুগতি সম্বিধান জন্য
পুনশ্চ নবােদ্যমে কর্মক্ষেত্রে অবতরণ করেন। তিনি
১৭৮৭শকের জ্যেষ্ঠ হইতে মাসে মাসে আদি ব্রাহ্মসমাজের
মাসিক সভায় উপদেশ দিতে আরম্ভ করিলেন। ১৭৮৯
শকের কার্তিক পৰ্যন্ত ব্রাহ্মমুণ্ডলী এইরূপে পুনরায়
শ্ৰীমন্মহর্ষির সাধু সংসর্গে ও তাঁহার বিতরিত জ্ঞানের
অন্নে পরিপুষ্ট হয়েন।
এই সময়ে আর একটা বিষয়ের বড় অভাব ছিল।
ব্রাহ্মধর্মগ্রন্থের প্রথম খণ্ডের অর্থাৎ উপনিষদংশের তাৎপর্য
দশ বৎসর পূর্বে প্রচারিত হইয়াছিল। দ্বিতীয় খণ্ডের
অর্থাৎ নীতি অংশের তাৎপৰ্য এপর্যন্ত লিখিত হয়
নাই। এই সময়ে এই অভাবের পূরণ হইল। ১৭৯১
শকের অগ্রহায়ণ মাসে লাল এবং কাল বর্ণের অক্ষর
যুক্ত তাৎপর্য সমন্বিত সমগ্ৰ ব্ৰাহ্মধর্ম গ্রন্থ মুদ্রিত ও প্রচারিত
হইল ! ব্রাহ্মসমাজের উপাসনা পদ্ধতির মধ্যে যাহা অল্প
বা অসম্পূর্ণ ছিল, তাহারও পরিপূরণ হইল। এইরূপে
আদি ব্রাহ্মসমাজের আদর্শ সৰ্বাঙ্গসম্পন্ন হইয়া উঠিল।
এই কার্যের সময় শ্ৰীমন্মহর্ষি অবকাশ পাইলেই
এই শান্তিনিকেতনে আনিয়া বিশ্রাম লাভ করিতেন।
, তন্নিমিত্ত ইহার “শান্তিনিকেতন” নাম এই সময়
।
[ ৩ ] অবধারিত হয়। এখানে নির্জন চিন্তায় তিনি যে অধ্যাত্ম তত্ত্ব বিদিত হইতেন এবং ধর্মের যে উদার ও মহৎভাব উপলদ্ধি করিতেন, তাহারই ফল ঐ আদি ব্রাহ্মসমাজের ব্যাপক ও উচ্চ আদর্শ। আমরা এই জন্য শ্রীমন্মহষির এই আশ্রমবাসকে তাহার অন্যান্য তীর্থ বাস অপেক্ষা শ্লাঘনীয় বিবেচনা করি। এই আশ্রমবাসে উক্ত মহাত্মা সংসারের গতি, মনুষ্যের প্রকৃতি ও বিকৃতি, ধর্মের শান্তিদাতৃত্ব এবং পরমার্থতত্ত্বের অন্যান্য নিগূঢ় ভাব স্পষ্টতর রূপে উপলব্ধি করিয়া সর্বলােকের জন্য আদি ব্রাহ্মসমাজকে অচলপ্রতিষ্ঠ এবং কেবল একমেবাদ্বিতীয় ঈশ্বরের আরাধনার স্থান করিয়া রাখিয়া দিলেন। এইরূপে ব্রাহ্মসমাজের কৰ্ম্ম সমাপন করিয়া শ্ৰীমন্ম- হর্ষি ১৭৯১ শকের শেষে কলিকাতা হইতে প্রস্থান করেন। তদবধি আর আমরা তাহার ‘নাগাল পাই না। তিনি ক্রমাগত শৈলশিখরে ও নদীর প্রবাহে ও সমুদ্র বক্ষে বিচরণ করিয়া আপনার পূর্বানুভূত শান্তিরস গাঢ়তর রূপে উপভােগ করিতে লাগিলেন। মহর্ষি কোথায় ? তাহা শুনিবার নিমিত্ত কর্ণ পাতিয়া থাকি। কখন শুনি তিনি অমৃতসরে, কখন শুনি তিনি ধর্মশালায়, কখন শুনি তিনি বাক্রোটা শিখরে! মধ্যে মধ্যে যদি হার কলি- কাতার পার্পণ হয়, সে কেবল কিয়দ্দিনের জন্য। এক সময় আমরা শুনিতে পাইলাম, তিনি ব্রহ্মপুত্র নদ [ ৮৪ ] /\/\/\/v। •••• বাহিয়া তিব্বত দেশাভিমুখে গ ন করিতেছেন; কখন বা শুনি, তিনি চীনদেশের উদ্দেশে যাত্রা করিয়া প্রশান্ত মহা- সাগরে ভাসিতেছেন। কখন বা শুনিতে পাইলাম, তিনি বােম্বাই নগরের নিকটবর্তী সমুদ্রকুলে বসিয়া “প্রফুল্লিত কানন গিরি নদী সাগর” এবং “অযুত অগণ্য লােক” দর্শন পূৰ্ব্বক ঈশ্বরের স্তুতি বন্দনা করিতেছেন। শ্ৰীমন্মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের এই পরিব্রজন ও পৰ্বত- বাসাদি ব্যাপারকে আমরা তাহার তীর্থভ্রমণ ও তীর্থ- বাস রূপে গণনা করি। অদ্ভুত ও চমৎকৃতিজনক এই সকল স্থানের নির্জন চিন্তায় এবং নিঃসঙ্গ অবস্থায় জিতে রি মহর্ষির বিশুদ্ধ চিন্তে ঈশ্বরের প্রতি কি প্রকার নিষ্ঠা ও ভক্তি এবং কি প্রকার বিপপ্রেমের উদয় হইয়াছিল, তাহার কতক পরিচয় তাহার ধর্ম বিশ্বাস এবং ব্রাহ্মদিগের প্রতি সদ্ব্যবহারে বিদিত হয়। ইহাই এই ব্রাহ্মতীর্থের বিশেষ মাহাত্মা বলিতে হইবে। ভারতীয় দর্শনকার ঋষিদিগের ন্যায় গ্রীক দার্শনিক পণ্ডিতগণের তর্কতরঙ্গে যখন সেই পশ্চিম ভূভাগে ঈশ্বর- বিষয়ক মতের চাঞ্চল্য জন্মিয়াছিল, তখন মহাত্মা ঈশা প্রাদুভূত হইয়া বলিলেন, আমি ঈশ্বরের পুত্র ; অর্থাৎ পিতার সহিত পুত্রের যেমন অচ্ছেদ্য ও অবিয়ােগ্য ও প্রিয় সম্বন্ধ, মনুষের সহিত ঈশ্বরের সেইরূপ নিশ্চিত, অচল ও প্রিয় সম্পর্ক। ইহার অর্থ সহস্র বৎসর পরে মধ্যদেশে [ ৮৫ ] . ।।।।।।। হজরৎ মহম্মদের আবির্ভাব হইল। তিনি পূৰ্ব্ব প্রচলিত ধৰ্ম্মের ও শাস্ত্রের দোষ সংশােধন নিমিত্ত বলিলেন, আমি ঈশ্বরের প্রেরিত, সেবক ও সহচর। ইহাতে ঈশ্বরের সহিত তাহার সাক্ষাৎ সম্বন্ধ এবং ধর্ম বিধানের নিশ্চিত সুস্পষ্ট প্রতিপন্ন হইয়াছিল। বঙ্গভূমিতে শ্রীমচ্চৈতন্য দেব যখন দেখিলেন “অস্তীত্যেকে নায়মন্তীতি চৈকে” ইত্যাদি বাক্য পণ্ডিতমণ্ডলী মধ্যে কতক আলােচিত হইয়া অর্ধবিদ্যায় তাহাদের বুদ্ধিবৃত্তিকে কুলষিত করিয়া ফেলি - তেছে, তখন তিনি ঈশ্বরের সাক্ষাৎ বিদ্যমানতা উদেঘাষিত করিয়া শ্রীমদ্ভাগবত প্রমাণে বলিলেন, এই সমস্ত জগতে তিনি লালা বিহার করিতেছেন। তাঁহার শিষ্যেরাও বুঝাইলেন, জীবাত্মা ও পরমাত্মায় অচিন্ত্য ভেদাভেদ সম্বন্ধ ; কিন্তু সে সম্বন্ধ সাক্ষাৎ বৰ্ত্তমান। উপরােক্ত প্রকারে যে ধৰ্ম্মবিশ্বাস পৃথিবীতে মনুষ্য মণ্ডলীর হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে, তাহারই স্থিরতা ও প্রকর্ষ সাধন জন্য ব্রাহ্মধৰ্ম্মের উদয়। এমদেবেন্দ্র নাথের উল্লিখিত তীর্থভ্রমণাদি কাৰ্য্যদ্বারা তাহাই সিদ্ধ হইয়াছে। ভারতবর্ষ সমুদায় পৃথিবীর অনুকৃতি। শ্ৰীমদেবেন্দ্র নাথ এই ভারতবর্ষের উর্দ অধঃ ও চতুর্দিক্বর্তী সর্বোৎ- কৃষ্ট নিৰ্ম্মল ও গভীর প্রকৃতির সৌন্দৰ্য্য রাশির মধ্যে প্রায় সমস্ত জীবন অতিবাহিত করিয়া অচিন্ত্য অনন্ত বিশ্ব রচয়িতার অস্তিত্ব ও মঙ্গলময় ভাব সুস্পষ্টরূপে অনুভব [ ৬ ] করিয়াছেন। তাহাই তাহার বক্তৃতায় ও ব্যাখানাদি গ্রন্থে স্পষ্টাক্ষরে পরিব্যক্ত হইয়াছে। তিনি হাফেজের একটা বাক্য সর্বদা উচ্চারণ করেন, তাহার মর্ম এই যে, “যদি স্বর্গ মত্ত দুইলােক চূর্ণ হইয়া যায়, তথাপি আমি এবং আমার চক্ষু নিরন্তর তােমার অধীন হইয়া তােমাকে দর্শন করিতে থাকিবে।” কাশী বৃন্দাবন প্রভৃতি পৃথিবীর বর্তমান সকল তীর্থ- ক্ষেত্রের অসংখ্য দেবালয়ে নিয়ত যে পূজোৎসব হইয়া থাকে, ভক্তগণ যেমন তাহা প্রত্যক্ষ দর্শন করিয়া কৃতাৰ্থত হয়েন, এই মহষি ও তুষার-মণ্ডিত হিমাচলের এক উচ্চ চূড়ায় দণ্ডায়মান হইয়া উর্জে আধােতে বিশ্বব্যাপ্ত, ঐশ্বরিক মহিমাপূর্ণ, সৌন্দর্যময় দৃশ্যের মধ্যে সেইরূপ প্রত্যক্ষভাবে জ্বলন্ত জীবন্ত অনন্ত দেবের অনন্ত পুজোৎসব দর্শন করিতেন। সন্ধ্যাকালীন আরত্রিক উৎসবে উক্ত তীর্থ সকলে সহস্র সহস্র দীপ প্রজ্বলিত হইয়া থাকে । শ্ৰীমন্মহর্ষি “গগন মে থাল রবি চন্দ্র দীপক বনে” ইত্যাদি বাক্য স্মরণ করিয়া প্রতিক্ষণে সদা-বিরাজিত ততােধিক সুন্দর ও পবিত্র আরত্রিকোৎসব-ঘটা সন্দর্শন করিতেন। বিনি এতদ্রপ তীর্থক্ষেত্রে এই ভাবে জীবন কাল অতিবাহিত করিয়াছেন, তিনি ঈশ্বরের কেমন ভক্ত, কেমন সুপুত্র, কেমন সেবক। ঈশ্বর সেই নিষ্ঠাবান [ ৮৭ ] •WMVM•••• সাধু সেবকের দ্বারা মনুষ্যের অনন্ত সুখের মূল, মুক্তির নিদান, নির্মল, প্রকৃতিসিন্ধ ব্রাহ্মধর্মের প্রচার সম্পন্ন করিবার জন্যই তাহাকে প্রথম বয়স অবধি উক্ত প্রকারে তীর্থবাসী করিয়াছেন। অথবা এমনও বলা যায়, ঈশ্বর তাহার সেই বিশ্বাসী ভক্তকে উপরােক্ত প্রকারে তীর্থ- বাসাশিত করিয়াই বিশ্বজনীন পবিত্র ব্রাহ্মধর্ম প্রচারের উপযুক্ত অধিকারী করিয়াছেন। শ্ৰীমদেবেন্দ্র নাথের উদার বিশ্বপ্রেমের কিঞ্চিৎ পরিচয় এস্থলে ব্যক্ত করিতেছি। আদিব্রাহ্মসমাজ শ্ৰীমন্মহষির প্রাণ অপেক্ষা প্রিয়তর। ইহার যে উপাসনা-পদ্ধতি তাহা তাহার সমস্ত জীবনের ফল। উপনিষদাদি প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রে তাহার অগাধ শ্রদ্ধা। তিনি সেই সকল শাস্ত্র-প্রণেতা ঋষিদিগের প্রতি বিশেষ অনুরাগী। এ দেশের প্রচলিত রীতি নীতির মধ্যে যাহা একান্ত দোষাশ্ৰিত নহে, তাহা রক্ষা ও পালন করিতে তিনি একান্ত যত্নবান্। কিন্তু সম্প্রতি যাঁহারা ব্রাহ্ম নামে পরিচিত হইতেছেন, তাঁহারা সকলে সেরূপ নহেন। এ জন্য তাঁহার ব্যবহারের সহিত অপরাপর ব্রাহ্মদিগের ব্যবহারে বহু বৈষম্য লক্ষিত হয়। তথাপি শ্ৰীমন্মহর্ষি সকলের প্রতি উদার মেহের চক্ষুতে দৃষ্টি করেন। তাঁহার নিজের (আদি) সমাজের প্রতি যাহার বিরূপভাবাপন্ন, তিনি তাঁহাদের প্রতি কোন প্রকারে [ ৮৮ ] বিরূপ নহেন। পূৰ্ব্বাপর ব্রাহ্মসমাজ-ঘটিত নানা আন্দো- লনে শ্ৰীমন্মহর্ষিদেবের হৃদয়ের এই উদার প্রেম অটল ও অক্ষুন্ন রহিয়াছে। দেবেন্দ্রনাথ যখন কেশবচন্দ্রকে পৃথক সমাজ করিবার পরামর্শ দেন, তখনই তাঁহার দূর-দৃষ্টিতে অনুভূত হইয়া- ছিল যে, লােক-মােহন-অদ্ভুত ক্রিয়া-বিবর্জিত, সহজজ্ঞান- সঞ্জাত এই ব্রাহ্মধৰ্ম্মকে আশ্রয় করিয়া ব্রাহ্মগণ চিরদিন এক ভাবে অবস্থিতি করিতে পারিবেন না। ব্রাহ্মসমাজের এক নাম বা এক আকার থাকিবে না। মানুষের রুচি- ভেদে তাহার কার্য্যেরও প্রকারভেদ হইবে। ফলেও তাহাই হইল। তিন বৎসর না যাইতে যাইতে কেশবচন্দ্রের প্রতিষ্ঠিত ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজের সভ্যগণ তিন দলে বিভক্ত হইলেন । কেশবচন্দ্রের সমাজ প্রধানতঃ “নব- বিধান সমাজ” নামে প্রখ্যাত, অথচ পারিবারিক ও দরবারিক এই দুইভাগে বিভক্ত হইল। তাহাতে ১১ মঘের সম্বিৎসরিক উৎসব প্রভৃতি ব্রাহ্মসমাজ সম্পৰ্কীয় কয়েকটা চিহ্ন মাত্র অবশেম রহিল। অপর এক সমাজ “সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ” নাম ধারণ করিল। পরন্তু এ সকল * কেশবচন্দ্র দেবেন্দ্রনাথ হইতে পৃথক হইয়া ও তাঁহার স্নেহে আকৃষ্ট হইয়া তাঁহার সহিত একত্র হইতেন এবং সৎপরামর্শ গ্রহণ করিতেন।
[ ৮৯ ]
* * * * *
৫০%AA%।
সমাজের সভ্যেরাই শ্ৰীমন্মহর্ষি দেবেন্দ্র নাথকে “ধর্মপিতা”
জ্ঞান করিয়া আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভক্তি করিয়া থাকেন।
মধ্যে মধ্যে ঐ সকল ব্রাহ্মসমাজের সভ্যেরা কোন
কোন ঘটনা উপলক্ষ করিয়া শ্ৰীমন্মহষিকে অভিনন্দনপত্র
প্রদান এবং তারা আপনাদের পার্থক্য অথচ মূলে ঐক্য
প্রদর্শন করেন। সেই সেই অভিনন্দন-সভায় প্রত্যভি-
নন্দন কালে উক্ত মহাত্মা তাহাদিগের নিকট আপনার
হৃদয়দ্বার উদ্ঘাটন পূর্বক ব্রাহ্মধৰ্ম্মের সার সত্য এবং
আপনার জীবন সম্বন্ধে কোন অপ্রকাশিত কথা এমন
মুক্তকণ্ঠে ব্যক্ত করেন এবং এমন সপ্রেমে আশীর্বাদ
করেন যে, তাহাতে কোন রূপেই অনুভূত হয় না যে, এই
সকল ব্রাহ্ম তাঁহার পরিপােষিত আদি ব্রাহ্মসমাজের
মতের কোন অংশে বিরােধী বলিয়া তাহার মনে আছে।
বস্তুতঃ তিনি একান্ত উদারচিত্ত সাধু পুরুষ। তাহার দৃঢ়-
বিশ্বাস এই যে, যিনি যাহা করুন, শেষে মঙ্গলময় ঈশ্বরের
হন্তে সকলই মঙ্গলে পরিণত হইবে।
* মহাত্মা রাম মােহন রায় যে নিদ্বন্দ্বতার পত্তনে ব্রাহ্মসমাজকে
স্থাপিত করিয়াছিলেন, তাহা হইতে এইরূপ সদ্ভাবের প্রসার করা
ঋষিধৰ্মী দেবেন্দ্র নাথের এই সকল ঘটনাসঙ্কুল জীবনের সুসাধু ফল
বিবেচনা করিতে হইবে। এই ঋষিধৰ্ম্মোদিত ব্রাহ্মসমাজের উদারতার
সহিত খৃষ্টীয় সমাজের ইতিহাসের অগ্নিকাণ্ড সকল স্মরণ করিয়ে
ব্রাহ্মধার মাহাত্ম্য বিশেষ বিদিত হয়।
[ ৯ ]
*, ৫ •••••••••••••••••
৪. ক ১৫%।
১৮১৮ শকে শ্ৰীমন্মহর্ষি যখন চুচড়ার গঙ্গাতটে বাস
করিতেছিলেন, সেই সময় সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের সভ্যগণ
তাহাকে অভিনন্দন পত্র প্রদান করেন। এই উপলক্ষে
চুচড়ার গঙ্গার জল ও কুল ব্যাপিয়া এক সভামণ্ডপ রচিত
হয়। সাধারণ ব্রাহ্মদিগের প্রতি উক্ত মহাত্মার অন্ত:
করণে কি উদার প্রেম সঞ্চিত, তাহা এই সুসজ্জিত সভার
আয়ােজনে বিদিত হইয়াছিল। এই সভায় অভিনন্দনের
প্রত্যভিনন্দনে শ্ৰীমন্মহষি যে উপদেশ প্রদান করেন,
একত্র তেমন নৈতিক উপদেশ, আর কখন তাহার দ্বারা
অভিব্যক্ত হয় নাই। তাহা এ দেশের নৈতিক ও সামা-
জিক সৰ্বাঙ্গীন উন্নতির ও শ্রবৃদ্ধির পক্ষে অমূল্য। এই
উপদেশ এক ক্ষুদ্র পুস্তকাকারে মুদ্রিত হইয়াছিল। এক্ষণে
ইংরাজীতে তাহার অনুবাদ হইয়াছে। তাহার বহু সহস্র
পুস্তক বিনামূল্যে বিতরিত হইয়াছে।
আমরা এই শান্তিনিকেতন আশ্রমের উৎসব উপলক্ষে
শ্ৰীমন্মহর্ষির জীবন চরিতের কিয়দংশ আলােচনা করি-
লাম।
৭ পৌষ দিবসকে কেন আমরা শ্লাঘনীয় বিবেচনা
করি, তাহার কতক আভাস ব্যক্ত হইল। সমস্ত এবং
বিশেষ ইতিহাস বলিবার এ অবকাশ নহে। শ্ৰীমন্মহর্ষির
ঈশ্বরচিন্তা ও ধর্মসাধনার গুঢ় তথ্য বলিবার আমার
ক্ষমতা নাই। কিন্তু বাহ লক্ষণে যাহা দেখিতে পাই,
তাহাতে সঁহার সাধনার কঠোরতার পরিচয় হয়। এ
[ ১ ]
•• •• WWWWW
বিষয়েও আমার অধিক কথা না বললেও চলে। এই
যে মহাপ্রান্তর চারি দিকে ধূ ধূ করিতেছে, ইহার মধ্যে
যখন এই আশ্রম গৃহ ও চতুষ্প-জাত বহু শ্ৰমার্জিত
বৃক্ষাবলী কিছুই ছিল না। তখনকার প্রাকৃতিক শূন্যময়
ভাব এবং তথায় রাজৈশ্বৰ্য্যশালী এক জমিদারের
একাকী অবস্থান চিন্তার চক্ষুতে দর্শন করুন। এই
স্থানের শীতবাতে দুই দিন অবস্থান করিয়া আমরা
ক্লিষ্ট হইতেছি। গ্রীষ্মকালের প্রখর উত্তাপে এ স্থানে
বাসকরা ততােধিক কষ্টকর। কিন্তু তপােনিষ্ঠ শ্ৰীমন্মহষি
এই স্থানে কেবল একটা কুটীর এবং দুই একটী বৃক্ষের
ছায়া আশ্রয় করিয়া ঈশ্বরচিন্তায় ও তপসাগরে নিমগ্ন
থাকিতেন। শীতের দুঃসহ কম্পনকারী বায়ু, গ্রীষ্মের
প্রচণ্ড উত্তাপ, বর্ষার ঝঞ্চাবাত ও শিলাঘাত, এ সকল
আধিভৌতিক ব্যাপার তাঁহার দেহকে পীড়ন করিলেও
চিত্তক্ষেত্রকে স্পর্শ করিতে পারে নাই। এই তপস্যাক্ষেত্রে
মহাত্মা দেবেন্দ্রনাথ আপনার প্রচুর ঐশ্বৰ্য্য ভুলিয়া
এবং ইন্দ্রিয়সেব্য শব্দস্পশাদির সুভােগ ও সৌখিনতা
অগ্রাহ্য করিয়া ব্ৰহ্মরূপ হােমাগ্নিতে আপনার সুখপ্রয়াসকে
আহুতি দিয়াছিলেন।
আমরা এই পর্যন্ত অনুভবে বুঝিতে পারি। কিন্তু
তাহাতেই উক্ত মহষির তপস্যার ও তীর্থবাসের ভাৰ সম্যক্ ,
জানাযায় না। রাজযােগ্য মর্যাদা, সুখ ও সম্পদের
{ ৯২ ]। **** av । পরিবর্তে এই মহাপুরুষ কেমন করিয়া গিরিশৃঙ্গে ও নদী- বক্ষে ভ্রমণ ও তথায় বাস জনিত ক্লেশপরম্পরা সােৎসাহে অম্লান বদনে সহ করিতেন, এবং ভৃত্যের হস্তে সহস্র মুদ্রা থাকিলেও আপনি উদাসীনের ন্যায় জীর্ণ ভগ্ন পান্থশালায় যথালব্ধ আহার দ্বারা শরীর রক্ষা করিয়া অন্তঃস্ফুর্ত আনন্দে বিশ্বব্যাপী মহান্ ঈশ্বরের ধন্যবাদ প্রদান করি- তেন, ইহার অল্পই তথ্য জনসমাজের গোচর হইয়াছে । পরিশেষে তিনি এই বৃক্ষগুল্মলতাদি বিহীন কঙ্করময় স্থানকে আপনার সাধন ঘােগ্য তীর্থবাসের উপযুক্ত করিয়া লইয়াছিলেন। যদি এমন সুযােগ হয়, শ্ৰীমন্মহর্ষি দেবেন্দ্র- নাথের এই ভ্রমণ বৃত্তান্ত ও তীর্থবাসবৃত্তান্ত, সমুদায় না হউক, কতক কতক লিপিবদ্ধ হইয়া কোন না কোন আকারে প্রকাশিত হইবে। ইহা সুপ্রথিত যে, কোনধৰ্ম্ম ব্রাহ্মধৰ্ম্মের প্রতিদ্বন্দ্বী নহে। সকল প্রচলিত ধর্মের মধ্যে ব্রাহ্মধৰ্ম্ম বর্তমান। শ্ৰীমন্মহর্ষি নানা দেশে ভ্রমণ করিতে করিতে যেখানে কোন উচ্চ শ্রেণীর ধর্মমন্দির অথবা কোন বিশিষ্ট ধর্মালােচনার স্থান দর্শন করিতেন, তথায় উপস্থিত হইয়া তত্রত্য উপাসকগণের সহিত তিনি সপ্রেমে আলাপ করিতেন এবং তাহাদের জ্ঞান ও ক্রিয়ার সমুদয় পরিচয় জানিয়া ইতেন। যথাযােগ্য শ্রদ্ধা, ভক্তি ও অর্থদান দ্বারা তিনি সকল মতাবলম্বী সাধুগণের সমুচিত সম্মাননা করিয়াছেন।
[ ৩ ]
৫৯। ৭. a
পঞ্জাবের অমৃতসরে শিখসম্প্রদায়ীদিগের স্বর্ণমণ্ডিত উপা-
সনালয়ে তাঁহাদের প্রগাঢ়-ভক্তি-সহকৃত বিরামরহিত,
ভজনসঙ্গীত শ্রবণ করিয়া এবং বৌদ্ধদিগের ধর্মমন্দিরে
তাহাদের অনুষ্ঠিত পাপ ক্ষালনের আন্তরিক অনুতাপ
বক্তক গভীর-বিষাদ-মিশ্রিত প্রায়শ্চিত্ত বা শান্তিক্রিয়া
দর্শন করিয়া শ্ৰীমন্মহর্ষি যে পরমার্থ ভাব ও বিমলানন্দ
প্রাপ্ত হইয়াছিলেন, না জানি তাহার সমস্ত তীর্থবাসের
ইতিবৃত্তে ঐরূপ কতই বিশুদ্ধতত্ত্ব ও আনন্দবার্তা সুব্যক্ত
হইতে পারিবে।
আমরা পূর্বে ইহাও বলিয়াছি যে, ঈশ্বরের ভজ
ও সাধনে দেবেন্দ্রনাথ এক স্বতন্ত্র পুরুষ। তিনি কোন
মহৎ ব্যক্তির অনুশাসন পালন বা কোন সাধু পুরুষের
তনুকরণ করিয়া ধর্মশিক্ষা করেন নাই। রাজা রামমােহন
রায় ধর্মের মূল উপাদান মাত্র দেখাইয়া গিয়াছিলেন।
তঁাহার প্রচারিত প্রাচীন শাস্ত্র সকলের মধ্য হইতে
ব্রাহ্মধৰ্ম্ম নিষ্কর্ষণ করা এক প্রকার নুতন ব্যাপার।
দেবেন্দ্রনাথ রামমােহন রায়ের অস্ফুট বাণী বা ইঙ্গিতমাত্র
পাইয়া কালে কালে অল্পে অল্পে সমীচীন বিচার ও
অভিজ্ঞতা সহকারে ব্রাহ্মধর্মের বীজ বা মূলমন্ত্র নির্ধারণ,
ব্রাহ্মধর্ম গ্রন্থ সঙ্কলন, ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ বিধি প্রবর্তন এবং
সেই মতে সকল গার্হস্থ্য ও পারিবারিক কৰ্ম্মানুষ্ঠান,
পদ্ধতি বিরচন,–এই সমস্ত আবশ্যক কৰ্ম্ম সমাধা করিয়া
[ ৯৪ ] ••• WWarnt এই ধর্মকে সর্বাংশে সামাজিক মনুষ্যের ব্যবহারের উপযােগী করিয়া দিলেন। সেই ধর্মের অনুযায়ী আধ্যাত্মিক উন্নতির নিমিত্ত একটী নির্জন স্থানে সচ্ছন্দে কিছুকাল বাসকরা আবশ্যক। শ্ৰীমদেবেন্দ্রনাথ আপনার উদাহরণে এই তত্ত্ব জানিতে পারিয়াছিলেন। তন্নিমিত্ত তিনি আপনার এই সাধনার স্থানকে সকল সাধু সাধক- দিগের জন্য উৎসর্গ করিয়া দিয়াছেন। ১৮০৯ শকের (১২৯৪ সনের ২৬এ ফান এই সাধনামের উৎসর্গ পত্র লিখিত হইয়াছে। তাহার মর্ম এই :- “উক্ত সম্পত্তি চিরকাল কেবল নিরাকার এক ব্রহ্মের উপাসনার জন্য ব্যবহৃত হইবে।” ২। “নিরাকার এক ব্রহ্মের উপাসনা ব্যতীত কোন সম্প্রদায় বিশেষের অভীষ্ট দেবতা বা পশু পক্ষী মনুষ্যের বা মূত্তির বা চিত্রের বা কোন চিহ্নের পূজা বা হােম যজ্ঞাদি ঐ শান্তিনিকেতনে হইবে না।” ৩। “ধৰ্ম্মানুষ্ঠান বা খাদ্যের জন্য জীবহিংস বা মাংস আনয়ন বা আমিষ ভােজন বা মদ্যপান ঐ স্থানে হইতে পারিবে না।” ৪। “কোন ধর্ম বা মনুষ্যের উপাস্য দেবতার কোন প্রকার নিন্দা বা অবমানন। ঐ স্থানে হইবে না।” • ৫। “এইরূপ উপদেশাদি হইবে, যাহা বিশ্বের স্রষ্টা ও পাতা ঈশ্বরের পূজা বন্দনাদি ধ্যান ধারণার উপযােগী
[ ৯৫ ]
AWA
to
.
হয় এবং যারা নীতি ধর্ম উপচিকা এবং সর্বজনীন
ভ্ৰাতৃভাব বর্ধিত হয়।
৬। “কোন প্রকার অপবিত্র আমােদ প্রমােদ
হইবে না।”
৭। “ধর্মভাব উদ্দীপনের জন্য ট্রষ্টীগণ বর্ষে বর্ষে
একটী মেলা বসাইবার চেষ্টা ও উদ্যোগ করিবেন।”
৮। “এই মেলাতে সকল ধর্ম সম্প্রদায়ের সাধু
পুরুষের আসিয়া ধৰ্ম্ম বিচার ও ধৰ্ম্মালাপ করিতে
পারিবেন।”
৯। “এই
এই মেলার উৎসবে কোন প্রকার পৌত্তলিক
আরাধনা হইবে না ও কুৎসিত আমােদ উল্লাস হইতে
পারিবে না।
মদ্যমাংস ব্যতীত এই মেলায় সর্বপ্রকার দ্রব্যাদি
খরিদ বিক্রয় হইতে পারিবে।”
এতদ্ভিন্ন এই শান্তি নিকেতন আশ্রমে ব্ৰহ্মবিদ্যালয়
ও পুস্তকালয় স্থাপনের ব্যবস্থা হইয়াছে।
রামমােহনরায়ের ব্রাহ্মসমাজের মূলমন্ত্র এবং দেবেন্দ্র
নাথের নির্ধারিত ব্রাহ্মধর্মের বীজমন্ত্র হইতে কত মঙ্গলকর
এবং কেমন দোষবর্জিত অনুষ্ঠান সকল প্রসূত হইয়া
দেশ ব্যাপ্তি কলিবে, এই আশ্রম তাহার এক আদর্শ।
ধর্ম সম্বন্ধে শ্রীমন্মহর্ষির অন্যান্য কর্ম যেমন তাঁহার
এক একটী মহদষশােব্যঞ্জক কীর্তিরূপে প্রথিত হইয়াছে,
H
।।।।।।।
ইহাও সেইরূপ এক নবােদ্ভাবিত আদর্শ কীর্তি। যেমন
এক আদি ব্রাহ্মসমাজের অনুকরণে এদেশে ব্রাহ্মসমাজ
নামে বা অপর নামে বা শত শত ব্রাহ্মসমাজ নানা স্থানে
স্থাপিত হইয়াছে, তেমনি এক এই আদিম শান্তি নিকে-
তন আশ্রমের অনুকরণে শত শত আশ্রম প্রতিষ্ঠিত
হইতে পারিবে। ঈশ্বরের কৃপায় এই সংসারে সুবুদ্ধি
পুণ্যবান্ ন্যায়নিষ্ঠ দানশীল লােকদিগের এসম্পদ
উত্তরােত্তর বৃদ্ধি হইতে থাকুক। এক দিন সকল সাধু
সজ্জনের ঈশ্বর চিন্তার উপযােগী, বিবিক্ত বাসের এইরূপ
সম্যক অনুকুল, সাধনামের অভাব হইবে না।
এক্ষণে এই শান্তিনিকেতন আশ্রমের সংস্থিতি ও
ব্যবস্থা সম্বন্ধে কিছু বলিলেই আমার কথা শেষ হইবে।
এই মহা প্রান্তরে শ্রীমন্মহর্ষি দুই একটা মাত্র আরণ্য
বৃক্ষকে সখারূপে প্রাপ্ত হইয়া তাহাদের অনিবিড়
ছায়া তলে উপবেশন পূৰ্ব্বক সচ্ছন্দমনে বরণীয় ঈশ্বরে
চিত্ত সমর্পণ করিতেন। সেই ঘটনার সাক্ষী স্বরূপ
একটী সপ্তপর্ণী বৃক্ষের নিম্নে উক্ত মহাত্মার নির্দিষ্ট আসন
এখনাে আমরা দেখিতে পাইয়া অপূৰ্ব আনন্দ লাভ
করি। তাদৃশ তপশ্চরণ সাধারণ লােকের সুসাধ্য নহে।
অতঃপর উক্ত মহাত্মার প্রসন্ন দৃষ্টিতে এ স্থানে আর
কতকগুলি আরণ্য ও গ্রাম্য বৃক্ষ অর্জিত হইয়া কতক
খানি ভূমিকে ছায়া দানে সুশীতল করিয়া রাখিয়াছে।
[ ৯৭ ].
কের ক্লান্তি
এই সমস্ত ভূমিখণ্ডই আমাদের দৃষ্টিতে সাধন-আশ্রম।
ইহাকে উক্ত মহাত্মা “শান্তিনিকেতন” নাম দিয়াছিলেন।
এক্ষণে ইহাকে “শান্তিনিকেতন আশ্রম” বলিতে হইবে।
এই আশ্রমের শ্রেণীবদ্ধ পাদপগুলি সুযত্নে প্রতি
পালিত, সে কথা পূর্বেই বলিয়াছি। স্বভাবতঃ জলহীন,
এই কঠিন স্থানে সুগভীর কূপ হইতে বারি উত্তোলিত
হইয়া বৃক্ষগুলিকে সজীব রাখে এবং শুষ্ক কণ্ঠ শ্রান্ত পথি-
দূর
করিতে সমর্থ হয়। মধ্যে মধ্যে সুদৃশ্য ও
সুগন্ধ পুষ্প এবং সুমিষ্ট ফল আগন্তুক গ্রাম্য লােকদিগকে
মনােহর উদ্যানদৃশ্য প্রদর্শন করে। তাহাতে তাহাদের
চিত্তে চতুর্দিগী কঙ্করময় মরু প্রান্তরের ভাব কিয়ৎ
কালের নিমিত্ত বিস্মৃত হইয়া যায়। এক দিকে বিদ্যালয়
ও ছাত্রনিবাস। মধ্যস্থলে এক দ্বিতল ইষ্টকালয় সমৃদ্ধি
সম্পন্ন ঈশ্বরানুরাগী রাজগণের ও উপযুক্ত অভ্যর্থনার যােগ
রূপে নির্মিত হইয়াছে।
এই আশ্রমের সর্বোত্তর ভাগে বিভিন্ন বর্ণের কাচ
দ্বারা রচিত লৌহবন্ধনীযুক্ত এক প্রশস্ত গৃহ প্রতিষ্ঠিত।
এই বিচিত্র গৃহ ব্রাহ্মসমাজ প্রকরণে ঈশ্বনােপাসনার
নিমিত্ত নির্দিষ্ট হইয়াছে। সপ্তবর্ণাত্মক সূর্যকিরণ এবং
সুধাকরের স্নিগ্ধ রশ্মী এই সকল কাচের মধ্য দিয়া
অভ্যন্তরে প্রবেশ পূর্বক এই গৃহকে অতি চমৎকৃতি-
জনক করিয়া তুলে।
৭
[ ৯৮ ] সকল দেশের সকল শ্রেণীর লােক আপনাপন গৃহের সর্বোৎকৃষ্ট উপকরণে স্বীয় দেবমন্দির নির্মাণ করেন। এদেশীয় গৃহস্থদিগের দেবমন্দির ও দেববিগ্রহ দর্শন করিলে তাহাদের গৃহের ও পরিবারের স্বর্ণমুক্তাদি রত্নরাজির পরিচয় পাওয়া যায়। এতদাশ্রমের উক্ত উপাসনামন্দিরেও ইহার প্রতিষ্ঠাতার ধন, ঐশ্বৰ্য্য, সুরুচি এবং তাঁহার দেবমন্দির নির্মাণের প্রতি শ্রদ্ধা ও সমাদর বুঝিতে পারা যায়। এই অপূৰ্ব শান্তিরসাস্পদ আশ্রমের একপার্শ্বে যেমন দুইটী সপ্তপর্ণী আরণ্য বৃক্ষ শ্ৰীমন্মহষির সংযম ও তপস্যার সাক্ষী স্বরূপ বর্তমান আছে, তেমনি আর এক দিকে, উক্ত তপস্বী কি প্রকার ঐশ্বৰ্য্য সুখ অব- হেলা করিয়া ঐ তপঃসমাধানে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন, তাহারও নিদর্শন এই উপাসনা-মন্দিরের সৌন্দৰ্য- ঘটায় সমুদ্ভাসিত হইতেছে। এই উপাসনা-মন্দিরে নিত্য উপাসনা করিবার নিমিত্ত এক পণ্ডিত নিযুক্ত আছেন। তিনি এখানকার আশ্রমধারী। আর এক ব্যক্তির উপর এই আশ্রমাগত সাধকগণের আতিথ্য সৎকার ও সেবার ভার অর্পিত আছে। সম্প্রতি যিনি উক্ত আশ্রমধারী পদে অভিষিক্ত, ইনি পশ্চিম দেশীয় পণ্ডিত ; আচাৰপূত, ব্ৰত-নিষ্ঠ, শান্ত ও বিনীত ভাব। উপনিষৎ ও গীতাদি শান্ত্র ইহার অধিকার আছে। .
[ ৯৯ ] চতুর্দিগ,বর্তী গ্রামের অধিবাসীগণ গ্রামান্তরে যাইবার উদ্দেশে এই মহা প্রান্তরে প্রবেশ করিলে দূর হইতে দেখিতে থাকেন, মুক্তাকাশের মধ্যে এ আশ্রমের উপাসনা মন্দিরের উচ্চ চূড়ায় স্বর্ণবর্ণে ও ঋতং সত্যং ইত্যাদি বাক্য আকাশভেদী যােগীর ন্যায় পরব্রহ্মের মূলমন্ত্র অস্ফুটস্বরে নিরন্তর কীৰ্ত্তন করিতেছে। শান্তপাদপ আশ্রমের মধ্যে শুনিতে পাওয়া যায়, বিশুদ্ধ সংস্কৃত উচ্চারণ সহকৃত সুস্বর বেদপাঠে আশ্রম প্রতিধ্বনিত হইতেছে। নিরাকার নির্বিকার বিশ্ববিধাতার ব্যোম ব্যাপী স্তুতিগীতে, সাধু মহাত্মাগণের পবিত্র সমাগমে এবং শ্রান্ত পথিক ও দুঃখাৰ্ত্ত জনের সেবা পরিচর্যায় এই আশ্রম যথার্থ তীর্থ লক্ষণ- যুক্ত হইয়া উঠিতেছে। এই সাধনাশ্রম প্রসঙ্গে শ্রীমদেবেন্দ্রনাথের অসাধারণ দানধৰ্ম্মেরও কিছু উল্লেখ করিতে হয়। নতুবা অঙ্গহীনতা দোষ ঘটে। এ বিষয়ে ক্ষোভ এই যে, বিশেষ তত্ত্ব বলিতে পারিব, এমন সম্ভাবনা নাই। কারণ, উক্ত মহাত্মার অধিকাংশ দানক্রিয়া লােকের সম্পূর্ণ অজ্ঞাতসারে অনুষ্ঠিত হয়। এ বিষয়েও বাহ লক্ষণে যাহা সুস্পষ্ট দেখিতে পাই, তাহাই বলিয়া ক্ষান্ত হইব। মুসলমানদিগের শাস্ত্রীয় ব্যবস্থামতে তাহাদিগকে লব্ধ ধনের কিয়দংশ দীন দরিদ্র ও সাধুজনকে অবশ্যই দান করিতে হয়। হিন্দুদিগের মধ্যে দান ধর্মের এমন [ ১০০ ] •••••••••• নিয়ম যে, যিনি ভিক্ষাজীবী, তাহাকেও তাহার ভিক্ষালব্ধ অন্নের কিয়দংশ দীনদুঃখী যাচকগণকে দিতে হয়। হিন্দুধর্মের প্রধান সারগ্রাহী মহাত্মা দেবেন্দ্রনাথ দান- ক্রিয়ার মর্যাদাতেও হিন্দু সম্প্রদায়স্থ কোন ব্যক্তির পশ্চাদ্বী নহেন। মহম্মদীয় দান-বিধি ও তাহার নিকট পরান্ত। খ্রীষ্টানদিগের পদ্ধতি মতে সামাজিক দান ক্রিয়াতে দেবেন্দ্রনাথ সর্বাগ্রে হস্ত প্রসারণ করেন। ব্রাহ্মধর্মের বিধানানুসারে শ্রীমন্দ্রেনাথের একপ্রকারে সর্বস্বই ঈশ্বরের প্রিয় কাৰ্য্য সাধনে উৎসর্গীকৃত হইয়াছে। ঈশ্বরের এই প্রিয়সন্তান আপনার বলিয়া কিছু পৃথক ধরিয়া রাখেন নাই। ব্রাহ্মধর্ম প্রচারের নিমিত্ত তাহার ধন চতুর্দিকে অজস্র বর্ষিত হইয়াছে। একবারে শতাধিক ও সহস্রাধিক মুদ্রার দানে বহু বিপন্ন ব্যক্তি আসন্নবিপদ হইতে রক্ষা পাইয়াছেন। এ দেশের সকল সাধারণ হিতকর কাৰ্যের মূলে শ্ৰীমন্মহর্ষির দান ও অন্যবিধ সাহায্য আছে। তাঁহার দানধন আবশ্যক মত সমুদ্রপারে ও যাইতেছে। যে দেশ মারিভয়ে ও দুর্ভিক্ষে প্রপীড়িত হয়, সে দেশের লােকের ক্লেশ নিবারণ জন্য শ্ৰীমন্মহর্ষির দান নানা বিধানে প্রেরিত হইয়া থাকে। আমার কথা প্রায় ফুরাইয়া আসিল। শ্ৰীমন্মহর্ষির এই সাধনাশ্রমের মূল বৃত্তান্ত বলিতে গিয়া পূর্বাপর সঙ্গতির নিমিত্ত তাঁহার অমূল্য জীবনের অনেক কথা
[ ১০১ ]
৪ ।।
****
।
.
অতি সংক্ষেপে ব্যক্ত করিতে হইল। যাঁহারা তৎসমুদায়
আলােচনা করিয়া দেখিবেন, তাঁহাদের মনে আর
কয়েকটা প্রশ্নের উদয় হইতে পারে।
কেহ বলিবেন, এই আশ্রমের সংস্থাপক শ্ৰীমন্মহর্ষি
এক্ষণে কোথায় ? যিনি এক সময় এস্থানে যােগা ভ্যাস
করিতেন, যিনি এখানে বসিয়া ধ্যানমগ্ন হইয়া ব্ৰহ্মতত্ত্ব
ও ব্রাহ্ম ধৰ্ম্মের সম্পূর্ণ ভাব হৃদগত করিতে সমর্থ হইয়াছেন,
যিনি চিরদিন তীর্থবাস করিবেন বলিয়া মধু মক্ষিকার
মধু চক্রের ন্যায় এই আশ্রমবাটিকা নিৰ্মাণ করিয়াছিলেন,
তিনি আর এ আশ্রমে আগমন করিয়া ইহার পবিত্রতা
বৃদ্ধি করিয়া দিতেছেন না কেন?
ইহার উত্তরে বক্তব্য এই যে, গৃহত্যাগী সন্ন্যাসীদিগের
পক্ষেও পরিব্ৰজনের ও তীর্থবাসের এক এক কাল নিরূপিত
আছে। গুরুর নিকট সন্ন্যাস-দীক্ষা গ্ৰহণান্তর তঁাহারা
প্রথম বয়সে তীর্থ পর্যটন করেন। শেষ বয়সে বার্ধক্য
অবস্থায় তাঁহার গুরুর আশ্রমে নিশ্চল হইয়া অবস্থিতি
করেন। শ্ৰীমন্মহর্ষির শরীরে যত দিন যৌবনের বল
ছিল, তত দিন কেহ তাহাকে এক স্থানে কিছু দিন স্থির
হইয়া থাকিতে দেখে নাই। তখন পরিব্ৰজনেই তাঁহার
পরম সুখ ও সৰ্ব্বশান্তি অনুভূত হইত। শরীরের শােণিত
সতেজ না থাকিলে অতিরিক্ত শীতাতপ ও বর্ষার
প্রতাপ সহ করিয়া অধ্যাত্ম চিন্তায় মনকে নিবিষ্ট রাখিতে
[ ১০২ ]
পারা যায় না। এই
হেতু
যতি, তপস্বী ও ঋষিদিগের
প্রথম বয়সে চাতুর্মাস্যাদি প্রকরণে এক স্থানে স্থিতি এবং
শেষ বয়সে গিরিগুহ। ও বৃক্ষবাটিকাদি অাশ্রয় করার
ও অগ্নি সেবার প্রয়ােজন হইত। সেই রূপে শ্ৰীমন্মহর্ষি
জীবনের মধ্যকাল পর্যন্ত পরিব্রজন ব্যাপারে রত থাকিয়া
পরে নদী ও সমুদ্রের
তীরবর্তী এক একটী অপেক্ষাকৃত
গ্রাম্যভাববিশিষ্ট স্থলে
অবস্থান করিতেন। হারও
পরিচয় দিতেছি।
তিনি বােম্বাইর নিকটবর্তী বান্দোরা নামক স্থানে
গমন করিরা তথায় একাদিক্রমে কয়েক বৎসর অবস্থিতি
করেন। এই স্থানে সমুদ্রতীরে এক পুষ্পোদ্যানে
তিনি এক আসননাপরি অবস্থান পূর্বক দিবসের অধি-
কাংশ ভাগ কৰ্ত্তন করিতেন, তখনকার তাহার মনােমত
গীত এই :-
তােমারি এ রাজ্য, ধন ধান্য পূর্ণ শােভাময় ।
তােমারি মহিমা গায় সকল ভুবন।
এই সুরম্য স্থানের প্রফুল্লিত কানন, গিরি নদী সাগর
স্বভাবতই তাঁহার হৃদয়ে এই গীতের স্ফুর্তি করিয়া দিত।
তাহার পর কয়েক বৎসর শ্রীমন্মহর্ষি চুচড়ার
গঙ্গাতীরবর্তি এক স্থানে ছিলেন। এখানে তিনি যে
বাটাতে থাকিতেন, তাহার অর্থ ভাগ গঙ্গাজলের উপর
এবং অর্থভাগ কেবল ভূমির উপর ! ইহাও এক বিচিত্র
[ ১০৩ )
ও অদ্ভুত স্থান। সর্বত্রই মুক্ত আকাশ ও প্রাকৃতিক
সুদৃশ্য তাঁহার চক্ষুর সম্মুখে ব্যায়ত থাকিত।
তদনন্তর তিনি দার্জিলিং পর্বতে গমন করেন।
দার্জিলিং পর্বতে এই তাহার দ্বিতীয় বারের বাস। এই
সময় তাঁহার বয়স প্রায় সপ্ততি বৎসর।
দার্জিলিং হইতে প্রত্যাগত হইয়া তিনি কলিকাতার
মধ্যবর্তী এমন একস্থানে অবস্থিত করিতেন, যেখানে
প্রশস্ত ময়দান ও তথাকার মুক্তাকাশ তাহার যৌবনের
প্রকৃতিদর্শনাভ্যাস কতক বজায় রাখিয়া দিয়াছিল।
এই স্থানে শ্রীমন্মহর্ষির বয়স অশীতি বৎসর পূর্ণ হইয়া-
ছিল। যেমন জরা ও বার্ধক্য তাহার শরীরকে অল্পে অল্পে
স্থিরতার দিকে আনিতেছে, তেমনি তিনি নিরুপদ্রব
স্থান আশ্রয় করিতেছেন।
সন্ন্যাসীরা পরিব্ৰজনের পর গুরুর আশ্রমে গুরু-
পদাশ্রয় পূৰ্ব্বক নিশ্চিন্ত হইয়া ঈশ্বরের ধ্যান ধারণায়
জীবনের শেষ ভাগ অতিবাহিত করেন। শ্ৰীমন্মহষিও
সেইরূপ গুরুপদাশ্রয় করিয়া এক্ষণে কলিকাতার মধ্যে
অবস্থিতি করিতেছেন। ইহা প্রায় সকলেরই বিদিত আছে
যে, শ্রীমন্মহুষির গুরু উপনিষৎ এবং হাফেজের গ্রন্থ।
যিনি শ্ৰীমন্মহর্ষির দর্শন করিতে গমন করেন, তিনি
তাঁহার মুখে অবিরত গীতা, উপনিষৎ, অন্যান্য সংস্কৃত
শাস্ত্রীয় শ্লোক এবং হাফেজের বাক্যাবলী শ্রবণ করিতে
[ ১০৪ ] পান। গুরুর স্থায় ঐ সকল গ্রন্থ তাঁহার হৃদয়ের ভক্তি- পুষ্প-সহকৃত নিত্য পূজা, নিত্য সেবা প্রাপ্ত হইয়া থাকেন। শ্ৰীমন্মহর্ষির তীর্থবাস ও গার্হস্থ্যধর্মপালন,—দুইয়ের এতদ্রুপ উৎকর্ষ সকলের ভাগ্যে না ঘটিতে পারে। প্ৰশা- সাধনার পথে যিনি যত অগ্রসর হউন, তথাপি তঁাহার উপলব্ধি হইবে যে, গন্তব্য পথ এখনাে বহুদূর বিস্তারিত। সৰ্বব্যাপী পরমাত্মার দিকে জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত ও প্রসন্ন হউক,—ইহাই ব্রাহ্মসমাজের পরম সাধনা। ইহাই সৰ্ব্ব- কল্যাণ প্রসূতি। ভারতবাসীগণ শ্ৰীমন্মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের কনিষ্ঠ পুত্র রবিতুল্য কবিতার রবীন্দ্রনাথের সহিত সৰ্ব্ব- শাস্ত্রোদিত ব্ৰহ্মনামে এই গীত গাহিতে থাকুন রাগিণী আশা ভৈরো-তাল তেওরা। তােমারি নামে নয়ন মেলিনু পুণ্য প্রভাতে আজি, তােমারি নামে খুলিল হদয় শতদল দলবাজি। তােমারি নামে নিবিড় তিমিরে ফুটিল কনক লেখা, তােমারি নামে উঠিল গগনে কিরণ বীণা বাজি। তােমারি নামে পূৰ্ব্ব তােরণে খুলিল সিংহদ্বার, বাহিরিল রবি নবীন আলােকে দীপ্ত মুকুট মাজি। তোমারি নামে জীবন সাগরে জাগিল লহরী লীলা, তােমারি নামে নিখিল ভুবন বাহিরে আসিল সাজি।
No text on this page.
No text on this page.
তৃতীয় প্রস্তাব।
বিবিধ বিষয় ।
No text on this page.
ব্রাহ্মসমাজপরিদর্শন। তত্ত্ববােধিনী সভার উজ্জ্বল অবস্থায় তৎসভাধিষ্ঠিত 'দেবেন্দ্রনাথকে দর্শন করিয়া কোন কোন ব্যক্তি স্বগণ- পরিবেষ্টিত শৌনক ঋষির প্রাচীন ব্রহ্মসভা স্মরণ করি- তেন। বস্তুতঃ ব্রাহ্মসমাজ দ্বারা সহস্র সহস্র বৎসরের ভারতীয় ঐতিহাসিক ধৰ্ম্মবিবরণ এক সূত্রে গ্রথিত দেখা যায়। মহাত্মা দেবেন্দ্রনাথ কেবল কলিকাতায় সভা আলাে- কিত করিয়া থাকিতেন, তাহা নহে; কেবল যে নগনদী- সাগর দর্শন করিয়া বেড়াইতেন, তাহাও নহে; পরন্তু ব্রাহ্মধর্মের প্রচার ও ব্রাহ্মসমাজের উন্নতির নিমিত্ত তিনি আগ্রহান্বিত হইয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নগরে ও গ্রামে গমন পূর্বক ব্রাহ্মসমাজপরিদর্শন এবং লােকের সহিত ধৰ্মালাপ করিতেন। উদাহরণস্বরূপ মেদিনীপুরস্থ ব্রাহ্মসমাজ পরিদর্শনের কথা বলা যাইতেছে। * অধ্যাপক মােক্ষ মুলর ব্রাহ্মসমাজ বিষয় আলোচনা করিয়া বলিয়া- (69- "There is, in fact, an unbroken continnity between the most modern and the most ancient phases of Hindu thonght, extending over more than three thousand years."
১০৮ ] ।।।। ১৭৭৬ বা ১৭৭৭ শকের বসন্ত কালে মহাত্মা দেবেন্দ্র- নাথ মেদিনীপুর ব্রাহ্মসমাজের সাম্বৎসরিক উৎসব উপ- লক্ষে তথায় গমন করিয়াছিলেন। তাহাতে মেদিনীপুর বাসীদিগের মহােৎসাহ জন্মিয়াছিল ।* ১৭৮২ শকে কলিকাতার ন্যায় মেদিনীপুরেও ব্রহ্ম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। ১৭৮৪ শকের বর্ষাকালে মহাত্মা দেবেন্দ্রনাথ মেদিনীপুরে গিয়া ব্রাহ্মসমাজের সভ্য এবং ব্রহ্মবিদ্যালয়ের ছাত্রদিগকে উপদেশ দিয় ছিলেন। তদ্বিবরণ ঐ শকের কার্তিক মাসের তত্ত্ববােধিনী পত্রিকায় উক্ত মহোদয়ের প্রেরিত পত্রাকারে প্রকাশিত হইয়াছিল। তাহা হইতে এক এক অংশ উদ্ধৃত হইতেছে :- * এই দিনের সভার বিবরণ কোথাও প্রকাশিত দেখি না। আমাদের নিজের কথায় তদ্বিষয়ে কিছু বলিতে হইল। এই জেলার দক্ষিণ বিভাগের এক রা এই নগরস্থ বৃহৎ কুটী বাড়ীতে এই সভা হইয়াছিল। আমার বয়স তখন ১১ বা ১২ বৎসর। জনরবে শুনিলাম, অজি মস্ত এক সভা হইবে; যাহাদের লেখা পড়ায় অধিকার আছে, তাহাদের সকলের এই সভায় যাওয়া উচিত। ব্রাহ্মসমাজের তৎকালীন এই লক্ষণ।—লেখা পড়ায় অধিকার থাকিলেই এই সভায় যাওয়া উচিত। আমিও গেলাম। বৃহৎ সভার এক পার্শে থাকিয়া দেখি, এক সুন্দর মূর্তি সভার মধ্যস্থলে দাড়াইয়া কি বলিতেছেন; মুখ ফিরাইলে চসমা খানি ঝ ঝল, করি- এ দিন এই পর্যন্ত দেখিয়া ফিরিলাম। ৬ বৎসর পরে আমি ‘ব্ৰহ্ম বিদ্যালয়ের ছাত্র। তখন উপদেশ প্রাপ্ত্যর্থ এই মহাত্মার সম্মুখীন হইয়াছিলাম।
[ ১০৯ ], • । “মেদিনীপুরে আমি গত শ্রাবণ মাসে উপস্থিত হইয়া তথাকার ব্রাহ্মসমাজ অবলােকন পূৰ্ব্বক ও ব্রাহ্মদিগের মধ্যে পরস্পর প্রণয় ভাব সন্দর্শন করিয়া অতীব তৃপ্ত হইয়াছি। মেদিনীপুরের ব্রাহ্মসমাজ ১৭৬৮ শকে কো- নগর নিবাসী শ্ৰীযুক্ত বাবু শিবচন্দ্র দেবের দ্বারা স্থাপিত হয়। তাহার মেদিনীপুর হইতে কৰ্ম্মানুরােধে অন্যত্র গমন, হইলে সমাজ ভগ্ন প্রায় হইয়াছিল। পরে ঈশ্বর প্রসাদাৎ তথায় শ্রী যুক্ত বাবু রাজনারায়ণ বসু মহাশয়ের অবস্থিতি হইলে তাঁহার দ্বারা ১৭৭৩ শকে পুনরুদ্ধত ও উদ্দীপ্ত হয়। সম্প্রতি গত বৎসরে তথাকার ব্রাহ্মদিগের সাহায্যে একটি ব্রাহ্মসমাজ-গৃহ প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। তথায় প্রতি বুধবারে ব্রহ্মোপাসনা উৎকৃষ্টরূপে নিৰ্বাহ হইয়া থাকে। শ্ৰীযুক্ত রাজনারায়ণ বসু মহাশয়ের বিনয় গুণে সকলে একমন হইয়া সমাজের সাহায্য বিধান করিতেছেন। দৃঢ়ব্রত রাজনারায়ণ বসুর যত্ন ও পরিশ্রমে তথায় ব্রাহ্মধৰ্ম্ম দিন দিন উন্নত বেশ ধারণ করিতেছে। তাহার যত্ন ও পরিশ্রমে মােহ-মুগ্ধ মেদিনীপুরে যে জ্ঞানালােক প্রকাশ হইয়াছে, যে ধৰ্ম্মামৃত বর্ষিত হইয়াছে, তাহা আর যাইবার নহে, তাহা দিন দিন বৃদ্ধিই হইবে। এই আশার ভিত্তি-ভূমি তথাকার ব্রহ্মবিদ্যালয়। ব্ৰহ্ম- বিদ্যালয় হইতে যে সকল ছাত্রের ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করি-
[ ১০
য়াছে এবং ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করিয়াছে, তাহাদের আবাস
সেই মেদিনীপুর খণ্ডে। তাহাদের নব উৎসাহে ব্রাহ্মধৰ্ম্ম
তৎপ্রদেশে অচিরাৎ উদ্দীপিত হইবে। এখন হইতেই
মেদিনীপুর খণ্ডের পল্লীগ্রামেও ব্রাহ্মধর্মের আন্দোলন
আরম্ভ হইয়াছে।
শ্রীদেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
ব্রাহ্মসমাজপতি ও প্রধান আচাৰ্য্য।”
মহাত্মা রাজনারায়ণ বসুর কাৰ্য্য।
( প্রযুক্ত কেশবচন্দ্রকে যখন ব্রাহ্মসমাজের আচাৰ্যপদে বরণ করা
হয়, তখন মহাত্মা দেবেন্দ্রনাথ “প্রধান আচাৰ্য” নামে অভিহিত
হয়েন। তদবধি প্রধান আচাৰ্য মহাশয় শান্তিনিকেতনের প্রয়াসী।
সে কথা পূর্বে বলা হইয়াছে। তথাপি তাহাকে ব্রাহ্মসমাজে আসিয়া
মধ্যে মধ্যে উপদেশ দিতে হইত। ব্রাহ্মসমাজের প্রধান কার্যভার
অপরের হন্তে থাকিত। ১৭৮৭ শকে কেশবচন্দ্র সদলে পৃথক্ হইয়া
গেলে মেদিনীপুরন্থিত বন্ধু রাজনারায়ণ বসুর প্রতি দেবেন্দ্রনাথের
বিশেষ দৃষ্টি পড়িয়াছিল। ক্রমশঃ এই আদিম ব্রাহ্মসমাজের পরিচালন
তার হার উপর বিন্যস্ত হইল।]
মহাত্মা রাজ নারায়ণ বা রাজা রাম মােহন রায়ের
প্রিয়বন্ধু ৬. নন্দকিশাের বসুর জ্যেষ্ঠ পুত্র। তিনি
পিতৃপুণ্যে যেমন হিন্দু কলেজের বিদ্যা-পরীক্ষায় উত্তীর্ণ,
তেমনি তৎকালীনইয়ং-বেঙ্গল” দলের চরিত্র-পরীক্ষাতেও
| ১১১ ]
উত্তীর্ণ হইয়াছিলেন। ইংরাজী শিক্ষার সমস্ত সদ্গুণ,
তাহাতে বৰ্ত্তিয়াছিল। তিনি নিরভিমান ও বিনীতস্বভাব
ছিলেন। প্রাচীন পণ্ডিতদিগের ন্যায় তিনি বিদ্যারসে
নিমগ্ন এবং স্বল্পে সন্তুষ্ট থাকিতেন। কলেজ পরিত্যাগের
পর তিনি শ্রীমদেবেন্দ্র নাথ ঠাকুর মহাশয়ের অধীনতায়
তত্ত্ববােধিনী পত্রিকার নিমিত্ত উপনিষদের ইংরাজী,
অনুবাদ করিতেন। পরে সংস্কৃত কলেজে মাষ্টার হয়েন।
তৎপরে মেদিনীপুর ইংরাজী স্কুলের হেড মাষ্টার হইয়া
তথায় ১৮ বৎসর অবস্থিতি করিয়াছিলেন। :৮৯০ শকে
(১৮৬৯ খৃষ্টাব্দে) তিনি পেন্সন লইয়া কলিকাতায় আসলে
তাঁহাকে আদি ব্রাহ্মসমাজের কর্মাধ্যক্ষসভার সভাপতি
পদে অভিষিক্ত করা হয়।
ডেবিড় হেয়ার সাহেবের পরম মেহের আস্পদ
শীলসম্পন্ন রাজনারায়ণব কৃতবিদ্য হইয়া বর্তমান কালের
বেথুনকলেজের স্থাপয়িতা বেথুন প্রভৃতি সদাশয় ইংরাজ
পুরুষদিগের উপদেশে স্বজাতির মর্যাদা বর্ধনের পক্ষে
সুশিক্ষিত এবং তদর্থে সর্বদা সমুদ্যত ছিলেন। তাহার
উপর ধর্মানুরাগ ও ঈশ্বরনিষ্ঠার যােগে তিনি মহাপুরুষ
বলিয়া গণ্য হইতেন।
১৭৬৮ শক হইতে চারি বৎসর তিনি কলিকাতা
ব্রাহ্মসমাজে বক্তৃতা করিতেন। তাহার অপর উপদেশ
সকল মেদিনীপুর ব্রাহ্মসমাজের বক্ততা নামে তত্ত্ববােধিনী
[ ১১২ ]
পরে-
পত্রিকায় ১৭৭৫ শক হইতে মুদ্রিত দেখা যায়।
সে সমস্ত পুস্তকাকারে মুদ্রিত হইয়া “রাজনারায়ণ বসুর
বক্তৃতা” নামে প্রখ্যাত হইয়াছে। এই পুস্তক পাঠ করিয়া
সহস্র ব্যক্তি ধর্মের বিমল আলােক ও পরম আনন্দ
প্রাপ্ত হইয়াছেন।
এই পুস্তকাদি দ্বারা যে ধৰ্ম্মশিক্ষা হইত, তাহাতে
ইংরাজী সাহিত্যের উপদিষ্ট ধর্মবিষয়ক উৎকৃষ্ট ভাবের
সহিত ঔপনিষদিক ব্রহ্মতত্ত্বের এমন সংমিশ্রণ ছিল যে,
তাহাতে হিন্দুজাতির আবহমান কাল প্রচলিত ভাবের
ব্যত্যয় হয় নাই। এখন শ্রীমৎ কেশবচন্দ্ৰ আদি সমাজের
সম্পর্ক-ত্যাগ পূর্বক বাইবেলের এমন দোহাই দিতে
আরম্ভ করিলেন যে, তাহাতে ব্রাহ্মসমাজের পূর্বসূচিত
স্বদেশীয় ভাবের বহু ব্যতিক্রম হইতে লাগিল। এই
বিরুদ্ধ ভাবের উপশমার্থ মহাত্মা রাজনারায়ণ বসুকে
লেখনী ধারণ করিতে হইয়াছিল।
পূর্বোক্ত সদাশয় ইংরাজগণ অত্ৰত্য কৃতবিদ্য ব্যক্তি
দিগের ইংরাজি প্রসক্তি ছাড়াইয়া তাহাদিগকে জাতীয়
গৌরব বর্ধনের দিকে অগ্রসর করিয়া দিয়াছিলেন।
ধর্মনিষ্ঠ রাজনারায়ণ বসু এই তথ্য “স্বদেশীয় ভাষা-
শীলন” প্রসঙ্গে ব্যক্ত করিয়াছেন। “মেদিনীপুরস্থ
বিতর্ক সমাজের বক্তৃতা” নামে এই বিযুয়ে এক সুদীর্ঘ
প্রবন্ধ ১৭৭৮ শকের জ্যৈষ্ঠ মাসের তত্ত্ববােধিনী পত্রিকায়
[ ১১৩ ]
৩/ //
।
প্রকাশিত হইয়াছিল। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথেয় প্রথম হিমা-
চল গমন সময়ে তত্ত্ববােধিনী সভায় কি প্রকার বিষয়ের
চর্চা হইত, ইহা তাহার এক পরিচয়।
১৭৮১ শকের ১১ই পৌষ তত্ববােধিনী সভা ব্রাহ্মসমা-
• জের অন্তভুক্ত বা বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছিল। সেই সভার
পূর্বতন সত্যদিগের যে জাতীয় ভাব ছিল, এক্ষণে তাহা
পুনরুদ্দীপ্ত করিবার প্রয়ােজন হইল। মহাত্মা রাজনারা-
য়ণ বসু আদি ব্রাহ্মসমাজের পক্ষ সমর্থন করিয়া কয়েক
খানি গ্রন্থ ইংরাজী ভাষায় প্রচার করিলেন। এই সময়
ইউরােপ ও আমেরিকার পণ্ডিতগণ ব্রাহ্মধর্ম ও ব্রাহ্মসমাজ
সম্বন্ধে বহু আলােচনা করিতেছিলেন। তাঁহারা কেশব
চন্দ্রের ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজের সহিত দেবেন্দ্রনাথের
এই আদি ব্রাহ্মসমাজের মত ও বিশ্বাসের তুলনা করিয়া
এতদুভয়ের পার্থক্য বুঝিতে পারিলেন।
ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজের সহিত আদি ব্রাহ্মসমাজের
পার্থক্য বিবাহ আইন দ্বারা দৃঢ় হইয়া গেল। ভারতবর্ষীয়
ব্রাহ্মসমাজ বলিলেন, আমাদের নুতন সমাজ, আমাদের
বিবাহের আইন চাই। আদি ব্রাহ্মসমাজের সহিত হিন্দু
সমাজের চিরদিনের একতা থাকাতে সেই সমাজের
সভ্যেরা বলিলেন, হিন্দু বিবাহের যে আইন, সেই তত
আমাদের আইন। রাজদরবারে এই বিষয়ে বহু আলাে-
চনা হইল। অবশেষে ১৮৯৩ শকের শেষে, ১৮৭২
৮+
।।।।
( ১১৪ }
•••••••••••••
খৃষ্টাব্দে, ধৰ্ম্মব্যতিক্রান্ত এক আইন বিধিবদ্ধ হইল।
কেশবচন্দ্র তাহাকেই স্বমতাবলম্বী ব্রাহ্মদিগের আইন
বলিয়া গ্রহণ করিলেন। আদি ব্রাহ্মসমাজ পূর্বাপর এক
ভাবেই রহিলেন।
জাতীয় ভাবের উদ্দীপনা।
স্বজাতির এবং স্বদেশের প্রতি প্রেম একটী মহৎগুণ।
স্বদেশের প্রতি মমতা দেখাইলে বিদেশীয়েরাও তাহার
বিরােধী হইতে পারেন না। কারণ, তাঁহারাও স্বদেশানু-
রাগী। এই নিমিত্ত সদাশয় ইংরাজগণ 'আমাদের
একপ্রকার হাতে ধরিয়া আমাদিগকে স্বদেশ-প্রিয়তা
শিখাইয়াছেন। ইহাই ইংরাজজাতির মহত্ব। তত্ববােধিনী
সভার সভ্যেরা এই গুণে বিভূষিত ছিলেন। উত্তরােত্তর
এই শিক্ষা প্রবল হইলে কলিকাতার কতকগুলি সম্রান্ত
ব্যক্তি উদ্যোগী হইয়া ১৭৮৮ শকের চৈত্র (মহাবিষুব)
সংক্রান্তি দিবসে (১৮৬৭ খৃষ্টাব্দে) চৈত্রমেলা নামে এক
মেলা স্থাপন করিলেন। তাহাতে স্বদেশীয় পণ্ডিত,
শিল্পী ও অন্যান্য শক্তিসম্পন্ন সুদক্ষ লোেকগণ আপনাপন
গুণানুসারে মর্যাদা পাইতে লাগিলেন। মহর্ষি দেবেন্দ্র
নাথের ভ্রাতুপুত্র মহামনা গণেন্দ্র নাথ ঠাকুর ইহার
'সম্পাদক ছিলেন। এই উপলক্ষে গৃহীতনামা সত্যে
নাথ ঠাকুর যে একটা গীত রচনা করিয়াছিলেন, তাহাতে
[ ১১৫ ] ••••••••••/W রচয়িতার কেবল নিজের যশ প্রকাশ পায়, এমন নহে। তাহাতে তাঁহার পুরুষানুক্রমিক পুণ্যফল বিবেচনা হয়। যাঁহার পিতামহ সমস্ত ইউরােপের মহারাজা ও মহারাণীর নিকট সম্মান পাইয়াছিলেন, যাঁহার পিতা মহর্ষিপদ- •বাচ্য, আর যিনি স্বয়ং ইংরাজ রাজার নিকট সিভিল সর্ভেন্ট পদের উচ্চ মর্যাদার প্রথম অধিকারী হইয়াছেন, ঈদৃশ মহৎ ব্যক্তিই সর্বাগ্রে ভারতীয় মহত্ত্বের এইরূপ কীৰ্ত্তন করিতে পারেন এবং তাহারই মুখে ইহা শােভা পায় “ভারত ভূমির তুল্য আছে কোন্ স্থান ? কোন অদ্রি হিমাদ্রি সমান? ফলবতী বসুমতী, স্রোতঃস্বতী পুণ্যবতী শতখনি, রঙ্গের নিধান।” ইত্যাদি। এই গীত আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের আদি এবং প্রধান। অতঃপর এই গীতের সর্বত্র প্রতিধ্বনি হইতে চলিল। হিন্দুত্বের শ্রেষ্ঠতা। হিন্দুত্ব কি এবং তাহার শ্রেষ্ঠতা কি প্রকার, ইহার বিচার সহকারে হিন্দুসমাজের সুশিক্ষিত ব্যক্তিগণ সম্প্রতি আপনাদের মুগতি বুঝিয়া লইতেছেন। মন্মহর্ষি [ ১১৬ ] দেবেন্দ্রনাথের সাহায্যে ও সভাপতিত্বে এই চিন্তার পথ উন্মুক্ত হইয়াছিল। তাহার আলোচনা করা যাইতেছে। ১৭৯০ শকের মধ্যভাগে গবর্ণমেন্ট দ্বারা বিবাহ আই- নের প্রসঙ্গ উথাপিত হয়। তদবধি আদি ব্রাহ্মসমা- জের সভ্যগণ এবং সাধারণতঃ সকলে হিন্দুত্বের বিশেষ বিচার করিয়া তদ্ধৰ্ম্মকে স্বতঃপরতঃ উজ্জল করিয়া তুলিতে লাগিলেন। ইহার দুই বৎসর পূর্বে জাতীয় গৌরব বর্জনার্থ যে “চৈত্রমেলা” স্থাপিত হইয়াছিল, এই বৎসর তাহা হিন্দুমেলা নাম পরিগ্রহ করিল। তদ- বধি আদিব্রাহ্মসমাজের হিন্দুত্ব সকল পক্ষ হইতেই উদে- ষিত হইল। ১৭৯৪ শকের ভাদ্র মাসে শ্ৰীযুক্ত রাজনারায়ণ বস্তু হিন্দুধৰ্ম্মের শ্রেষ্ঠতা বিষয়ে এক বক্তৃতা করিলেন। তাহাতে তিনি দেখাইলেন যে, ব্রাহ্মধর্ম হিন্দুধর্মেরই শ্রেষ্ঠাংশ। শ্ৰীমন্মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঐ বক্ততা সভার সভাপতি হইয়াছিলেন। এই বৎসর হিন্দুধর্মের নীতি ও আচার ব্যবহার সম্বন্ধে আরো দুইখানি পুন্তক প্রকাশ হইল। তারা ব্রাহ্মধর্মগ্রন্থের দ্বিতীয় ভাগের নীতি অংশ বিস্তৃত রূপে হিন্দুদিগের রীতি নীতির উৎকর্য সাধনার্থ বিধৃত হইল। এই সময় দেখা গেল, ইংলণ্ডের সুপ্রসিদ্ধ মনিয়র উই- Native Marriage Bill Introdnced, Sep. 10, 1888.
[ ১১৭ । ।।।।। •• ••••••••••• লিয়ম এবং মােক্ষমূলর প্রভৃতি সংস্কৃতাধ্যায়ী পণ্ডিতগণ হিন্দুদিগের ধর্ম ও ভাষার বিচারে আর্য জাতির প্রতি অগাধ ভক্তিমান্ হইয়া উঠিতেছেন। মহাত্মা রাজনারায়ণ বসুর কৃত হিন্দুধৰ্ম্মের শ্রেষ্ঠতা বিষয়ে বক্তৃতা তদানীন্তন বিদ্বজ্জনসমাজের পক্ষে অত- পূর্ব ও চমৎকৃতিজনক হইয়াছিল। পণ্ডিতবর মােক্ষ- মূলর এই বক্তৃতার সার মৰ্ম্ম অবলম্বন পূর্বক ধর্মবিষয়ক বিজ্ঞান শাস্ত্রের উদ্ভাবন করিলেন। দেশে ও বিদেশে হিন্দুদিগের উদারতা, ধর্মের প্রতি নিষ্ঠা এবং সেই ধর্মের বিশুদ্ধতা, প্রতিষ্ঠা প্রাপ্ত হইল। এই বক্তৃতার দেড় বৎসর পরে ইংলণ্ডের ওয়েষ্ট মিনিষ্টর আবি নামক ধৰ্ম্মমন্দিরে ব্রহ্মণ্য ধর্মের উৎকর্ষ ব্যাখ্যাত হইয়াছিল। তাহাও তত্ৰত্য পণ্ডিত মণ্ডলীকে চমকিত করিয়াছিল। অত্ৰত্য ব্রাহ্মসমাজের প্রধান আচার্যের ন্যায় তত্ৰত্য ধর্মাধ্যক্ষ (Dean) সেই সভার সভাপতি হইয়াছিলেন। এতাবৎ আলােচনায় মােঙ্গ- মূলরের হিন্দুভক্তি সুদৃঢ় হইয়াছিল। ঋগ্বেদ প্রচারাদি মােক্ষমূলরের কাৰ্য্য। ১৭৬৮ শকে যখন তত্ববােধিনী পত্রিকায় বঙ্গানুবাদ সহ ঋগ্বেদ অল্পে অল্পে প্রকাশ হইতেছিল, সেই সময় ইংলণ্ডে মােলর ঋগ্বেদ মুদ্রিত করিবার আয়ােজন । ১১৮ / ১০। ।।।।।।।।।। ১। A +•••••••••• করিতেছিলেন। তাহার তিন বৎসর পরে ব্রাহ্মধর্ম আকারে যখন উপনিষদের মন্ত্রাবলী নিত্য অধীত হইতেছে, সেই সময় (১৮৪৯ খ্রীষ্টাব্দে ) ১৭৭১ শকে উক্ত মহাত্মা কর্তৃক ঋগ্বেদ প্রকাশিত হইতে আরম্ভ হয়। ২৬ বৎসরে এই মহা ব্ৰহ্মযজ্ঞ সমাপ্ত হইয়াছে। প্রথমে , শ্ৰীমদ্দেবেন্দ্র নাথের উপদেশে ও চেষ্টায় কাশীতে ঋগ্বেদের হস্তলিপি প্রস্তুত হইয়াছিল। মােক্ষমূলরের এই উদ্যম দেখিয়া তিনি তাহাতে ক্ষান্ত ছিলেন। এক্ষণে এই সুমহৎ কর্যের নিমিত্ত তিনি মােক্ষমূলরকেই যশােভাগী করিলেন। * মােক্ষমূলর প্রথমে বেদ ও ব্রাহ্মণের প্রতি সমুচিত শ্রদ্ধাবান্ ছিলেন না। ছিলেন না। তিনি বৈদিক ব্রাহ্মণদিগকে * এতন্নিমিত্ত অাদি ব্ৰহ্মসমাজ হইতে পণ্ডিত মোক্ষমুলর যে অভিনন্দন পত্র পাইয়াছিলেন, তাহা তিনি স্বীয় গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। "It comes from the Adi Frahma Sanjaj. * * "The Committee of the Adi Brahma Samaj beg to offer you their hearty congratulations on the completion of the gigantic task which has occupied you for the last quarter of a century. By publishing the Rig-Veda at a time when Veilic learning has by some sad fatality became almost extint in the land of its birth you have conferred a loon upon ur l'in '. for which we can not but be eternally grateful.'
১১৯ ] Ans. • drana। ••••••••••• জড়ােপাসক বলিতেন। অপর এক জৰ্ম্মণ পণ্ডিতের (ওয়েষ্ট মিনিষ্টার আবি মন্দিরের) এক বক্তৃতার সমা- লােচনা উপলক্ষে মােক্ষমূলর ব্রাহ্মধৰ্ম্মের বৃত্তান্ত স্মরণ করিয়া বলিয়াছেন, তবে ব্ৰহ্মণ্য-ধৰ্ম্ম সৰ্ব্বতােভাবে পৌত্ত- লিকতা নয় ; উহা উচ্চতম পরমাত্মােপাসনা loftiest spiritual worship. এখন তিনি পূর্ব কথার প্রতি- সংহার করিয়া বলিলেন, ব্রাহ্মণের ধৰ্ম্ম মরে নাই, উহা সঞ্জীবিত। * ক্রমশঃ উক্ত ভট্ট অধ্যাপক মহাশয় এদেশীয় ব্রাহ্মণ- ধ্যাপকদিগের মর্যাদা বুঝিতে পারিয়াছিলেন। এক্ষণে মােক্ষমূলর দিব্যলােক বাসী। শেষ কালে তিনি আমাদের পক্ষে একটা বিষয়ে মহােপকার করিয়াগিয়াছেন। ইংরাজ দিগের সহিত সদ্ভাব আমাদের পরম সুখ ও সৌভাগ্যের মূল। যুবা ইংরাজগণ এদেশের কোন না কোন প্রধান "Then I withdraw my expression that Brahmi. nism is dead.” মােক্ষমূলর বলিতেন, মন্মুক্ত চতুর্থাশ্রমিক সন্ন্যাস- বিধি উক্ত ধৰ্ম্মের আদর্শ মাত্র। উহা ব্যবহারে আইসে নাই। কিন্তু মনিয়ার উইলিয়ম তঁাহার Brahminism and Hinduism গ্রন্থে বর্তমান সময়ের এক সন্ন্যাসীর (দও, কমণ্ডলু ও আনাদি সমেত) চিত্ৰ দিয়াছেন। এই সন্ন্যাসী ইংরাজগবর্ণমেন্টের C. S. I. উপাধি প্রাপ্ত এবং এক বৃহৎ রাজসংসারের দেওয়ান ছিলেন। পূর্ব নাম গৌরীশঙ্কর উদয়শঙ্কর, সি, এস, আই ; সম্প্রতি স্বামী সচ্চিদা সরস্বতী।
[ ১২ ]
• ৮ * * * * *।
পদ লইয়া আসিবার সময় এরূপ সংস্কারপন্ন থাকেন যে,
এদেশে তাহাদের আসা এক প্রকার নির্বাসন; কারণ,
তাহাদের মতে, এই অসভ্য দেশের লােকেরা নীতিহীন,
সাহিত্যহীন এবং উন্নতি-চেষ্টা-বিহীন। মােক্ষমূল, What
India cal teach us ? এই গ্রন্থে উক্ত সংস্কারের খণ্ডন
করিয়াছেন। এতদুপলক্ষে সুপ্রসিদ্ধ দ্বারকানাথ ঠাকুর
মহােদয়ের সহিত মােক্ষমূলরের কথােপকথন স্মরণ হয়।
১৮৪৫ খ্রীষ্টাব্দ পারিস নগরে সর্বগুণধার উক্ত ঠাকুর
মহােদয় এতদ্দেশীয় সঙ্গীতালাপ প্রসঙ্গে ভট্ট মহাশয়কে
বলিয়াছিলেন।
"You despise whatever is strange to you,
whether in music, or philosophy, or religion;
you will not listen and learn, and we shall
understand you much sooner than you will
understand us." *
প্রায় ৩০ বৎসর পরে এই মৰ্ম্মের কথা ভাবী সিবিলিয়ান
ইংরাজ যুবকদিগের প্রতি জৰ্ম্মন পণ্ডিত ভট্ট মােক্ষমূলক
দ্বারা উক্ত হইল।
* Chips, &c, Vol. I, p. 374,
[ ১২১]
+ ।।
।।।।।।।।।।
•••••••••••
।।।।
WANNAn er
আৰ্যসমাজের সহিত সম্পর্ক।
ব্রাহ্মসমাজের প্রধান আচাৰ্য্য শ্ৰীমন্মহর্ষি দেব এক্ষণে
আর্যসমাজের কোন কোন ধৰ্ম্মবক্তাকে আদি ব্রাহ্মসমা-
জের বেদী হইতে উপদেশ দিতে অনুমতি করেন।
ইহাতে এই সমাজে নিঃসম্পর্কীয় ভিন্ন সমাজের লােকের
সমাগম বিবেচনা করা যাইবে না। আর্য সমাজ
ব্রাহ্মসমাজের সভ্যদিগের দ্বারাই সংস্থাপিত, ইহা ঐ আৰ্য্য
সমাজের ইতিবৃত্তে বর্ণিত আছে।
১৮৭৭ খৃষ্টাব্দের ২৪ জুন (১৭৯৯ শকের আষাঢ় )
বৃহস্পতিবারে লাহাের নগরে আর্যসমাজ সংস্থাপিত হয়।
দয়ানন্দের চরিতখ্যায়ক লিখিয়াছেন, “পুরাতন মন্দিরের
উপকরণাদি লইয়া যেমন নুতন মন্দির নির্মিত হয়,
সেইরূপ স্থানীয় ব্রাহ্মসমাজের উপকরণাদি লইয়াই
লাহােরের আর্যসমাজ বিরচিত হইল।” সেই দিবস
“ব্রাহ্মসমাজের নির্দিষ্ট উপাসনা পদ্ধতি অবলম্বন করিয়াই
উহাদের উপাসনা কার্য নির্বাহিত হইয়াছিল।”
অনার্ষ বেদভাষ্য দ্বারা নূতন ভাবে ধর্ম প্রচার করার
প্রতি দয়ানন্দ স্বামীর গুরু বিরজানন্দ স্বামীর অনু-
মােন ছিল না। ব্রাহ্মসমাজের আদর্শে একটা সমাজ
স্থাপনের পক্ষে জয়ানন্দের এবং তাহার ব্রাহ্ম, শিষদিগের
ইচ্ছা প্রবল হইলে আৰ্য সমাজের উৎপত্তি হইল।
১২২ }
Tv •
। ।। ।।।।
a।
১৭৬৯
এ অবস্থায় আর্যসমাজের সহিত আদি ব্রাহ্মসমাজের
একতা ও সদ্ভাব স্থাপন হওয়া সঙ্গত বিবেচনা হয়।
স্বামী দয়ানন্দ নূতন বেদভাষ্য দ্বারা যাহা প্রতিপন্ন
করিয়াছেন, তাহার সারার্থ ব্রাহ্মসমাজ দ্বারা চির দিন
ঘােষিত হইতেছে। শকে (১৮৪৮ খৃষ্টাব্দ)
তববাধিনী পত্রিকায় বাঙ্গালা অর্থ সমেত যে ঋগবেদ
প্রকাশিত হয়, তাহার ভূমিকাতে লিখিত আছে ;
“সূর্যের অন্তর্যামী যে কোন পুরুষ তিনি সূৰ্য্যদেবতা,
বায়ুর অন্তর্যামী যে কোন পুরুষ তিনি বায়ু দেবতা।”
ইত্যাদি। স্বামীজী (সত্যার্থপ্রকাশ’ গ্রন্থ দ্বারা ঈশ্বরের
স্বরূপ ও স্তুতি বন্দনার যে শিক্ষা দিয়াছেন, ব্রাহ্মধৰ্ম
গ্রন্থদ্বারা তাদৃশ শিক্ষা সম্পূর্ণ রূপে হৃঙ্গত করিয়া নিতান্ত
যুবা বয়সেই সত্যেন্দ্রনাথ বেদার্থসিদ্ধ এই গীত রচনা
করিয়াছিলেন,
গাও তারে গাও সদা তরুণ ভানু।
-
যবে অচেতন জাগতে দে ও প্রাণ।
জন-হৃদয়-প্রফুল্লকর চন্দ্র তারা
সবে মিলে মিলে গাও তারে।
* শ্রীমন্মহর্ষির এক পৌত্র v বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর এই সব বন্ধন
বিষয়ে পরম যত্নবান্ ছিলেন। এতন্নিমিত্ত পাবে গিয়া বহু পরিশ্রম
করাতে তাহার ক্ষীণ শরীর অকালে ক্ষয়প্রাপ্ত হইয়াছিল। ১৮২১
শকের ৩ ভাদ্র তাঁহার মৃত্যু হইয়াছে।
[ ১২৩ ] । কেবল শ্রুতিবাক্য দ্বারাও ব্রাহ্মণ বেদগান করিয়া আসিতেছেন। থিওসফিক্ট সম্প্রদায়। D যদি ইতিবৃত্ত বর্তমান না থাকে, তাহা হইলে কেশব- চন্দ্রের নববিধান সমাজ যে ব্রাহ্মসমাজ হইতে সমুদ্ভূত, তাহা বলা দুস্কর হয়। অতএব ইতিহাসক্ষয় দোষ সৰ্ব্বগ পরিহরুণীয়। বিশেষতঃ প্রতীতি হয় যে যদি সাধুতায় অনু- রাগ জন্মে, তবে পৃথিবীর সকল সাধুলােকদিগের গুণ- গরিমা জানিতে অবশ্য আগ্রহ হইবে। ইতিস প্রকরণে দশ দিক হইতে সংবাদ আসিলে তবে পৃথিবীর সমস্ত পাপ ও পুণ্য বিদিত হইবে। এমন হইলে তবেই সমগ্র পাপের প্রশমন ও পুণ্যপথের বিস্তার হইতে পারিবে। আর তাহাতে বিধাতার বিচিত্র বিধানের ও নিত্য কল্যাণের পরিচয় হইবে। ব্রাহ্মসমাজের সহিত আৰ্যসমাজের সম্পর্ক দেখা গেল। এক্ষণে আৰ্যসমাজের সহিত এদেশের থিওসফিষ্ট সম্প্রদায়ের সম্পর্ক অনুধাবন করা যাইতেছে। সুপ্রসিদ্ধ ম্যাডেম্ ব্রাভিস্কি ও কর্ণেল অল্ট থিও- সফিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রবর্তক। আর্যসমাজ স্থাপনের কয়েক মাস পরে তাহার সংবাদ পাইয়া :৮৭৮ খৃষ্টাব্দের
। ১২৪ |
•••
** ৫।
১৮ ফেব্রুয়ারি কর্ণেল সাহেব নিউইয়র্ক হইতে অতিশয়
বিনয়ের সহিত আৰ্যসমাজ প্রতিষ্ঠাতা দয়ামন্দ স্বামীর
সাহায্য প্রার্থনা করিয়া এক পত্র লিখেন। নিউইয়র্ক
দেশের থিওসফিষ্ট কাউন্সলের ২২ মে দিবসীয় সভায় এই
দুই সভাকে একত্র করিবার প্রস্তাব হয়। প্রস্তাবিত নাম
The Theosophical Society of the Arya Somaj
of India. ১৮৭৯ খৃষ্টাব্দে উক্ত কর্ণেল ভারতবর্ষে
আসিয়া প্রথমেই দয়ানন্দ স্বামীর সহিত সাক্ষাত করেন।
কয়েক দিন ধরিয়া বেদের আলাপ হয়।
আদিম বেদশাস্ত্রে যে যােগচৰ্যার বিধিব্যবস্থা আছে,
তৎ সন্ধান প্রাপ্তির নিমিত্ত থিওসফিষ্টদিগের এই আগ্রহ।
তাহারা প্রথমতঃ স্বামীজীর সহিত সদ্ভাব স্থাপন পূর্বক
তাহার সাহায্যে এদেশে প্রতিষ্ঠা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন।
কিয়ৎকাল পরে তাঁহারা আপনারাই যােগাচাৰ্য্য হইয়া
উঠিলেন। দানন্দের সহিত সম্পর্ক, হাস হইতে লাগিল।
পরে স্বামীজী আবশ্যক বিবেচনা করিয়া বােধই নগরে
এক বিরাট সভা সমাবেশ পূর্বক থিওসফিষ্ট সম্প্রদায়ের
সহিত আর্যসমাজের সম্বন্ধচ্ছেদ করিলেন।
অতঃপর আৰ্যসমাজের সহিত থিওসফিক্ট সম্প্রদায়ের
প্রভেদ লক্ষণ পরিস্ফুট হইল। আৰ্যসমাজ কেবল বেদকে
সাত শান্ত বলেন এবং মন্দয়ানন্দ স্বামী বিরচিত
গষ্য অনুসারে তাহার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন ; থিওসফি
२० ষ্টেরা সর্বশাস্ত্রের সর্বমত রক্ষা পূর্বক তাহা হইতে বিজ্ঞান- সম্মত, যােগতত্ত্বের উদ্ভাবন, অনুধ্যান ও তাহার সাধনা করেন। নানা সম্প্রদায়। পূর্বোক্ত প্রকারে ইয়ুরােপ ও এসিয়া দেশের প্রচা- রিত ধর্মের আলােচনায় এবং বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক বিচারে সম্প্রতি ভারতে নানা প্রকার ধর্মমতের সংস্থাপন, মহােৎসাহে সেই সকল মতের প্রচার এবং বিবিধ সনুষ্ঠান হইতেছে। ব্রাহ্মসমাজ হীনাবস্থ ভারতবাসীদিগের আলস্য, অজ্ঞান ও মােহনিদ্রা ভঙ্গের নিমিত্ত বিস্তর যত্ন করিয়া- ছিলেন। তাহা অনেক অংশে সফল দেখাযায়। এক্ষণে প্রবুদ্ধ ভারতবাসীকে ব্রাহ্মসমাজের মূল কথা স্মরণ করা- ইতে হয়। খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী থাকিয়াও মােক মূলর বলিয়াছেন, We want less of creeds, but more of trust; less of ceremony, but more of work ; less of solemnity, but inore of genial honesty ; less of doctrine, but more of love. শ্ৰীমন্মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহােদয়ের দীর্ঘ জীব- নের বিপুল চেষ্টায় সারাৎসার বিচারে ঐ সত্য সংস্থাপিত হইয়াছে। ভারতবাসীর নিদ্রাভঙ্গের নিমিত্ত যত্নে ও পরিশ্রমে যিনি জীবন ক্ষেপণ করিয়াছেন, তাহার রচিত পুরাতন v { ১২৬ ] ## অপচ চিরন্তন একটী সঙ্গীত প্রবুদ্ধ ভারতবাসীর শ্রবণ- গােচর করিবার ইচ্ছা করি। সৰ্ব্বশাস্ত্রোক্ত পরমতত্ত্বের সারভূত কথা এই একটী গীতে পরিব্যক্ত হইয়াছে - (রাগিণী কোরা—তাল চৌতাল।) যােগ জাগে, ভােগী রােগী কোথায় জাগে। ব্ৰহ্মজ্ঞান ব্ৰহ্মধ্যান, ব্রহ্মানন্দরস পান, প্রতি ব্ৰহ্মে যার, সেই জাগে। ধন্য সাধু সুখী সেই, যে আপন মন-আসনে রাখিতে তারে পারে। ইন্দ্রিয় নিগ্রহ, পাপত্যাগ, ন্যায় সত্য ক্ষমা দয়া, যার তার লাভ ব্ৰহ্মধাম। ব্রাহ্ম-সম্মিলন। সম্মিলন ব্রাহ্ম লক্ষণ। শ্ৰীমন্মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ব্রাহ্মসমাজের কার্য যেরূপে নিৰ্বাহ করিয়া আসিলেন, তারা অন্য কোন সমাজের বা সম্প্রদায়ের ভঙ্গের কোন ভয় থাকিল না। পূর্বে ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজের কতক- গুলি ব্রাহ্ম সমদশী” হইয়াছিলেন। তাহারা বলিতেন, মতের বিচারে যত ভিন্নতা হউক, তদ্বিষয়ে সঙ্কোচ করিব , কিন্তু সম্ভাবে এক হইব। ১৭৯৬ শকের অগ্রহায়ণ (১৮৭৪ নবেম্বর) মাস হইতে “সমদশী বা Liberal নামে এক মাসিক পত্রিকা প্রকাশ হইয়াছিল। তাহাতে [ ১২৭ ] । A , সেই ব্রাহ্মদিগের স্বাধীনভাবে চিন্তা ও তত্ত্বালােচনা করি- বার পথ প্রশস্ততর হইল। তদবধি ব্রাহ্মের মতভেদ সত্ত্বেও সদ্ভাবে সম্মিলিত হইতে আরম্ভ করিলেন। শ্ৰীমন্মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ সকল ব্রাহ্মের আশ্রয়স্থান। তাহার গৃহে ব্রাহ্মদিগের সম্মিলনে তাহারা এই গীত গাহিয়াছিলেন- আয় আয় ভাই, গাইরে সকলে, প্রেমের মহিমা, অনন্ত অসীমা আয় আয় গাই জয় ব্ৰহ্ম বলে। “জয় ব্ৰহ্ম” এই মৃতসঞ্জীবন মন্ত্র মুমুর্ষ, ভারতের কর্ণে যিনি প্রথমে শ্রবণ করাইয়াছিলেন, তাহার নামে ব্রাহ্মদিগের সন্মিলন-বিধি সুপ্রতিষ্ঠিত হইল। ১৭৩৬ শকে রামমােহন রায় একদিন যে বাড়ীতে আসিয়া তকৰ্ত্তি শ্ৰীযুক্ত দ্বারকানাথ ঠাকুরের সহিত সদ্ভাব স্থাপন করিয়া ছিলেন, ৬৪ বৎসর পরে ১৮০০ শকে সেই গৃহে উক্ত মহা- আর নাম চিরস্মরণীয় করিবার উদ্দেশে ব্রাহ্মেরা ব্যবস্থা পূৰ্ব্বক সম্মিলিত হইলেন এবং সকলকেই সদ্ভাবে সমান করিলেন। অতঃপর ব্রাহ্মদিগের মধ্যে মতভেদের বৃদ্ধি হইল এবং পুনশ্চ এক ভিন্ন সমাজের পত্তন হইল। কিন্তু মহাত্মা রাজা রামমােহন রায়ের নামে এবং ব্ৰহ্মপরায়ণ শ্ৰীমন্মহর্ষি দেবেন্দ্র নাথের বিশুদ্ধ প্রেমের আকর্ষণে সকুলে পুনঃপুন সম্মিলন সুখ অনুভব করিতে থাকিলো।
[ ১২৮ ] ।।।।।।। ঠাকুর পরিবার। . কলিকাতায় ঠাকুর পরিবার প্রসিদ্ধ। বঙ্গদৈশের উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম চতুৰ্বিভাগেই ঠাকুর বাবুদিগের জমিদারী আছে। তাঁহাদের প্রজাগণ মুশাসিত ও ২ লিত। এই রাজধর্মে ইংরাজদিগের রাজদরবারেও ঠা। বংশীয়দিগের সুযশ প্রথিত রহিয়াছে। শ্রীমৎ দেবেন্দ্র নাথের পিতা সুপ্রসিদ্ধ দ্বারকানাথ সভাপ্রকরণে ইংর রাজ-শাসনের অনুকূলতা করিতে শিক্ষা দিয়াছে। তদ্বিষয়ে চিরদিন এই ঠাকুর বংশীয়েরাই বঙ্গবাণীদিগের অগ্রণী। কেবল রাজনীতি বিষয়ে কেন ? এ দেশের সর্বপ্রকার উন্নতিতে ঠাকুর পরিবারের কোন না কোন মহৎ পুরুষের কর্তৃত্ব দৃষ্টিগােচর হয়। এই ঠাকুরবংশ বেদবিৎ ভট্টনারায়ণ হইতে সমুদ্ভূত। এ বংশের সুধন্য সন্তান দেবেন্দ্রনাথ এই বাক্যে পূর্ব পুরুষগণের অর্চনা করেন- ‘পুরুষােমাঘলরামঃ বলরামাদ্ধবিহরঃ হরিহরাদ্ৰামা- নঃ রামানন্দান্মহেশঃ মহেশাৎপঞ্চাননঃ পঞ্চাননাজ্জয়রামঃ জয়রামান্নীলমণিঃ নীলমণেরামলােচনঃ রামলােচনাদ্বারকা- নাথঃ-নমঃ পিতৃপুরুষেভ্যো নমঃ পিতৃপুরুষেভ্য।” সমাপ্ত।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.