Garh Bhawanipur R.p. Institute, Howrah
Jalachal O Sparshodosh Bichar Ed.2
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
কল
স্পর্শদেশ বিভাগ।
“জাতিভেদ, “শুদ্রের পূজা ও বোধিকার এবং
চতুর্থ বিভাগ” প্রভৃতি প্রণেতা
দিগিন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচাৰ্য বিদ্যাভূষণ
প্রণীত :
সর্বস্বত্ব সুরক্ষিত ]
No text on this page.
জলচল
No text on this page.
জলছল
পশষে বিগৰ।
HEH
“জাতিভেদ,” “শূরে পূজা ও বেদাধিকার” এক
“চতুৰণ বিভাগ” প্রভৃতি প্রণে
এদিগন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচাৰ্য বিদ্যাভূষণ
প্রণীত।
(ফিতী সংস)
কলিকাতা,
২নং বথুন রে,ভারতমিহির যন্ত্র
সর্বেশ্বর ভট্টাচার্যের দ্বারা মুদ্রিত।
১৩২১
1Hসর শুগি।
। এক টাকা
সিরাজগঞ্জ হইতে একার কর্তৃক প্রকাশিত
উৎসর্গ।
কিপি প্রেমময় ভগবানের মেহেব সন্তান হইয়াও
যাহারা সমাজের অবিচার ও অত্যাচারে সামাজিক
অধিকার হইতে বঞ্চিত হইযা নিতান্ত হেয়,
অবজাত ও দীন হীন ভাবে জীবনতি-
বাহিত কবিতেছে, সেই সব জল অচল,
অনাচবণীয ভ্রাতৃবর্গেব কবকমলে
আমার বহু পৰিশ্রমের
জলচল ও স্পর্শদোষ বিচার
হৃদযেব গভীব সহানুভূতি, প্রেম ও
অনুরাগের সহিত অর্পিত
হইল।
ভগবৎপাদপদ্মে নিয়ত উন্নতিকামী
-গ্রন্থকার
No text on this page.
নিবেদন। জলচল ও স্পর্শদাষবিচার প্রকাশিত হইল। দশ এই শােচনীয় অধঃপতনের সময় আপনার হীন জাত্যভিমান বিসর্জন দিয়া সকলকে ইহা পাঠ করিতে অনুরােধ করি। সমদর্শী ভগবান যে কাহাকেও ছােট বা অস্পৃশ্য করেন নাই, কাল প্রভাবে কৰ্ম্মানুযায়ী ও সামাজিক নিয়মে এই সব ঘটিয়াছে ইহাই প্রতিপন্ন করিতে আমার ক্ষুদ্র প্রয়াস। ফল ভবিষ্যতের গর্ভে নিহিত। আমার জাতিভাইগণের বিদ্রুপ, শ্লেষ, তিরস্কার ও অভিসম্পাত আমি যেন আশীর্বাদের দুৰ্বাচন্দন পুষ্পমাল্য বলিয়া গ্রহণ করিতে পারি। আমার পূর্ববর্তী মহাত্মাগণের পদচিহ্ন অনুসরণ করিয়া আমি যেন কন্টকময় বন্ধুর দূরানােহ শৈলপথে অটল ধৈৰ্য্য ও অসীম মনােবল লইয়া অগ্রসর হইতে পারি। অধিক কিছু বলিবার নাই। যাহাদের জন্য পুস্তক লিখিয়াছি তাহারা পড়িলেই আমার তৃপ্তি ও শান্তি। মুদ্রণে যে সব ভুল ভ্রান্তি থাকিয়া গেল—পাঠকগণ তাহা মার্জনা করিয়া লইবেন। প্রুফ, দেখার দোষে এসব হইয়াছে। যাহাদিগের পুস্তক, পত্রিকা ও প্রবন্ধ হইতে সাহায্য গ্রহণ করিয়াছি—তাঁহাদিগের প্রতি হৃদয়ের গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতেছি। পাঠকগণ কৃপা কবিয়া-পুস্তক সম্বন্ধে আপনাপন অভিমত লিখিয়া জানাইলে অনুগৃহীত হইব। অর্থাভাবে পুস্তকের কলেবর মনােমত ভাবে, বর্ধিত আকারে বাহির করিতে পারিলাম না। বহু কথা বলিবার থাকিল। যদি কখনও দ্বিতীয় সংস্করণ হয় তবে সে বাসনা পূর্ণ হইৰে। নিবেদনমিতি-- পাের সিরাজগঞ্জ, কাওলাকো। ঐদিগিন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্য শ্রাবণ ১২।
দ্বিতীয় সংস্করণের বিজ্ঞাপন। শ্রীভগবানের কৃপায় পরিবর্ধিত আকারে জলচল ও স্পর্শদাষ বিচার প্রকাশিত হইল। তিন বৎসর হইল ১ম সংস্করণের সমুদয় পুস্তক নিঃশেষিত হইয়া যাওয়া সত্বেও অর্থাভাবে ২য় সংস্করণ মুদ্রিত করিতে পারি নাই । সম্প্রতি সিরাজগঞ্জস্থ আরবান্ ব্যাঙ্ক হইতে ১০ সুদে পাঁচ শত টাকা কর্জ করিয়া পুস্তক প্রকাশে অগ্রসর হইলাম। ২য় সংস্করণে পুস্তকের কলেবর দ্বিগুণ বর্ধিত করা হইল। মূল্যও সেকারণ দ্বিগুণ বর্ধিত কবিতে বাধ্য হইলাম। এ সংস্করণে ভারতীয় সমুদয় হিন্দু নেতৃবর্গের অভিমত ও সংবাদ পত্রের মন্তব্য প্রকাশিত হইল। ভরসা করি প্রথম সংস্করণের ন্যায় এই দ্বিতীয় সংস্করণের পূতকও পাঠকবর্গের তৃপ্তিবিধানে সমর্থ হইবে। যাঁহাদিগের ভাল লাগিবে -তাহাদিগকে ইহার বহুল প্রচারে সহায়তা করিতে অনুরােধ করি। মুদ্রণে এবারেও অনেক ভুল ভ্রান্তি থাকিয়া গেল, পাঠকগণ সে দিকে দৃষ্টি না দিয়া মূল বক্তব্য বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দিবেনইহাই অনুরােধ। স্থান- ভাবে এবারও বহু কথা রহিয়া গেল, ভগবৎ কৃপায় তৃতীয় সংস্করণ ছাপাইবার প্রয়ােজন হইলে বিস্তৃতভাবে বলিবার বাছা রহিল। যে সমৃদয় হিতৈষী বন্ধুবর্গের পরিশ্রম, যত্ন, চেষ্টা ও সহায়তায় পুস্তক প্রকাশিত হইল তাঁহাদের নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কবিতেছি। বিশেষতঃ শ্রীযুক্ত দামােদর বি, এ মহাশয়ের ও শ্রীমন্ দীনবন্ধু আচাৰ্যেৰ কঠোর পরিশ্রম বিশেষভাবে উল্লেখ যােগা। শীদিগিনাবায়ণ ভট্টাচাৰ্য্য। সিবাজগঞ্জ, বৈশাখ ১৩১১।
জলচল। অবতরণিকা। ভারতবর্ষীয় আৰ্য হিন্দুজাতিব আধ্যাত্মিক ও সামাজিক সৰ্বপ্রকার উন্নতির জন্য প্রাচীন যুগের প্রখর দৃষ্টিসম্পন্ন ঋষিগণ কতই না হৃদয়-রুধির দান কবিয়া গিয়াছেন। মানবজাতির উন্নতি সাধনই তাহাদের জীবনের প্রধান লক্ষ্য ছিল। ভাবতের উন্নতি, সমাজের উন্নতি, ভাবতীয় হিন্দগণের নৈতিক আধ্যাত্মিক দৈহিক সৰ্ববিধ উন্নতির জন্য তাহারা প্রাণ পাত কবিয়া গিয়াছেন। বিবাটৰূপী মানব সমাজের সেবাই তঁাহবা ভগবানের সেবা বলিয়া মনে করিতেন। যেরূপ বিধিনিয়মে ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য শূদ্র চারিবৰ্ণব সমভাবে কল্যাণ সাধিত হইবে বলিয়া বিবেচনা করিতেন, সেইরূপ বিধি ব্যবস্থা আইন-কানুনই তঁাহাবা প্রণয়ন করিয়াছিলেন। এ ব্যবস্থায় একদেশদর্শিতা ছিল না। সমাজবিশেষের নিগ্রহ করিয়া সমাজ-বিশেষে মঙ্গল সাধনে বঙ্গবন্ থাকিতেন না, হিংসা-দ্বেষ সে পূত হৃদয়ে স্থান পায় নাই। এক ভূ হান্ ভগবানের অংশ প্রত্যেক মানবের মধ্যে, প্রত্যেক জাতির মধ্যে, জীবের মধ্যে আত্মারূগে বিবাজ করিতেছেন। মানুষকে ঘৃণা করিলে সেই তুমাকেই ঘৃণা করা হইবে, তাহারা ইহা বিলক্ষণ জানিতেন। তাই প্রত্যেক জীবের প্রতি, মানবব প্রতি, তাঁহার সমান মেহ, সমান ভালবাসা পােষণ ২ করিতেন। কাহাকেও ঘৃণা বা অবজার চক্ষে দেখিতেন না। যেরূপ ভাবে সমাজকে পরিচালিত করিলে, যে নিয়মে বিধিব্যবস্থা প্রণয়ন ও প্রচার করিলে সমাজ প্রত্যেক ব্যক্তির দেহ মন, আত্মার কলাণ অনুষ্ঠিত হয়, সেইরূপ বিধি ব্যবস্থাই প্রণয়ন করিতেন। যাহাতে প্রত্যেক মানবের মানবত্ব ফুটিয়া উঠিতে পারে, যাহাতে প্রত্যেক মনুষ্যের ব্রহ্মবিকাশে সাহায্য কবে, সেইরূপ বিধিনিয়মই তাহাবা প্রচার করিয়া গিয়াছেন। কিন্তু হায়। কা-বশে সে বিধি-ব্যবস্থার কি শােচনীয় দশাবিপৰ্যয় উপস্থিত হইয়াছে। আৰ্য-ঋষিগণ স্থির করিয়াছিলেন, আত্মার উন্নতি সাধনই মানবের চবন উন্নতি সাধন। সেই আত্মােন্নতি সাধন করিতে হইলে নন: পবিত্র করা প্রথম প্রয়ােজন। আবার দেহ শুদ্ধি মানসিক পবিত্রতার হেতু। পবিত্র অশন বসন, বিশুদ্ধ স্থান, নিরাময় সংসর্গ দেহ-শুদ্ধির অনুকূল এবং উহাও আবার আহাৰ্য্য বস্তুর পবিত্রতা, আধাব, স্থান, কাল ও পাত্রের উপর নির্ভর কৰে। ইহাব যে কোন বিষয়ে দোষ ঘটিলে খাদ্য দ্রব্য শরীর বক্ষক না হইয়া, মন ও আত্মার কল্যাণ সাধনে সাহায্য না কবিয়া বরং সকলের অনিষ্টকাবকই হইয়া থাকে। আধারে দোষে, স্থানের দোষে, কালেব দোষে পাত্ৰাপত্রে দোষে, খাদ্য বস্তু যে দুষিত হয়—তাহা সকলেই সুবােধ্য। কিন্তু স্পর্শমাত্রই—স্পর্শদোষেই কি প্রকারে খাদ্যে দোষ ঘটে, সেই দোষে কিরূপে মনঃ কলুষিত হয় ও আত্মার অবনতি হয় তাহা তত সহজে বােধগম্য বা ধাৰণা হয় না। আমরা চিবাল দেখিয়া আসিতেছি কতকগুলি নির্দিষ্ট জাতিব স্পষ্ট জল বা খাদ্য কিম্বা জল খাদ্য উভষই অপব কতবগুলি জাতির অগ্রাহ। শৈশবে খেলিতে খেলিতে তৃষ্ণার্ত হইয়া যখন উৎপন্দর বাড়ীতে জল খাইত গিয়াছিলাম এবং উৎপলে মা বলিয়াছিল “বাবা আম জাতিতে সা, আমাদের হাতে তােমাদের জল খাইতে নাই, যাও বাবা, বাড়ী গিয়ে জল খেয়ে এসাে”; যে দিন পাঠশালা হইতে ফিবিয়া আসিবার সময় রাখালদের বাড়ী জল খাইতে গিয়াছিলাম তখন রাখালের মাও বলিয়াছিল, অবতরণিকা। বাবা আমরা তার, আমাদের হাতে কি তােমরা বাষণের ছেলে জল খাইতে পার? আহা বাবা, আমরা ভাগ্যহীন তােমাদের জল দিবার কি আমাদের সাধ আছে? আমরা কি অত পুণ্য করিয়াছি? যাও বাড়ী গিয়ে জল খাওগে ?” সেই দিন হইতেই ধারণা বদ্ধমূল হইতে আরম্ভ হইয়াছে যে, ব্রাহ্মণাদি উজাতি সাহা, সূত্রধর প্রভৃতি নীচ (৮) জাতির জণ গ্রহণ করিতে পারে না। খাদ্য গ্রহণ সম্বন্ধেও বাল্যকাল হইতে আমাদের ধারণা পূৰ্বরূপই হইয়া আসিয়াছে। কিন্তু এতদিনে কথাটা বুঝিবার জন্য একটা আশা জাগিয়াছে। এক ব্যক্তির স্পর্শে অপরের পক্ষে জল কিরূপে দূষিত হয় পানেব অযােগ্য হয় ইহা একটা রহস্য বলিয়াই বােধ হয়। প্রকৃতির কোন মহীয়সী শক্তিব প্রভাবে, ভগবানেব কোন্ অঘটন ঘটন পটিয়সী মায়ার শক্তিতে, মানব বুদ্ধিব অন্তবালে সৃষ্ট হইয়া যে জল বিধাতার নিদেশে গিরি প্রান্তব বন উপবন নগব পল্লী ভেদ করিয়া কুলুকুলুদে বঙ্গভঙ্গে বহিয়া বহিয়া অলক্ষ্যে অজ্ঞাতসারে প্রাণীমাত্রের প্রাণ বা কবিতেছে, সেই জীব- মাত্রের জীবন-স্বরূপ জল একটা মানুষের স্পর্শে অব্যক্ত ব্ৰহ্ম ভগবানের ব্যক্ত মূর্তি স্বরূপ মানুষের স্পর্শে কিরূপে অপবিত্র অপানীয় হয় তাহা আমাদের অবাধগম্য। যে জলে মানব অপেক্ষা ইতর জন্তু মৎস্য, কচ্ছপ, মকর, কুম্ভীব, হাঙ্গর প্রভৃতি জলজন্তুগণ নিয়ত বাস কবিয়া থাকে, কত প্রকাব বিষাক্ত বিষধর জন্তু বাস করিয়া থাকে ; যে জলে মনুষ পশু পক্ষী কীট পতঙ্গের মৃত দেহ গলিত পচা দুর্গন্ধময় শবদেহ নিবন্তর তাসিয়া নাইতেছে, যে জলে কত কলেড়া কত বসন্ত কত কুষ্ঠরােগগ্রস্ত রােগীর ক্লিয় শবদেহ পচিয়া পচিয়া খসিয়া যাইতেছে, ক্রীমিকীট কেন কত প্রকার মৎস্যদি কর্তৃক নিরব ভক্ষিত হইতেছে; যে জলে শিশু সন্তানগণের মল মূত্র প্রতি নিয়ত ধৌত করা হইতেছে, সেই জল পানে দেবকাৰ্যে ব্যবহারে অপরাধ হয় না, জাত যায় না, আর সাহা সুবর্ণবণিক সূত্রধর নমশূদ্র প্রভৃতি স্বধা- জন। ঝখী ভ্রাতৃগণের স্পর্শে অপবিত্র হয়, পানের অযােগ্য হয়, জাতি যায় ? কি অহেলিকা! যে মৎ, পচা মৃত মনুষ্য গে, অশ্ব, গত প্রভৃতি পশুর মাংস নিয়ত লােক-লােচনের সম্মুখে ভক্ষণ করিতেছে, যে মৎস্য, মানবের অতি ঘণিত নল বিষ্ঠা ভক্ষণ করিতেছে, যে মৎস্য, কফ কাশ ক্রীমি কীট ভক্ষণ করিয়া হৃষ্টপুষ্টাঙ্গ হইতেছে, সেই মৎস্য আহারে কোন ব্রাহ্মণাদি উচ্চজাতি অপবিত্র অচি ও পাতকগ্রস্ত হইতেছেন না, কাহারও জাত যাইতেছে না, কিন্তু সাহা সুবর্ণবণিকের জল পানে তাহারা জাতি যাইবার আশঙ্কা করিতেছেন। যাহারা সকল বিষয়েই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় তৎপর তাহাদের মত এইরূপ শুনি যে, ঐ সাহা সুবর্ণ-বণিক নমশূদ্র সূত্রধর প্রভৃতি হীন জাতীয় লােক সকলেব দেহ হইতে এক প্রকার বৈদ্যুতিক শক্তি ক্ষরিত হইয়া ঐ জলে প্রবেশ করে এবং ঐ স্পৃষ্ট জল, জল-পানকারীর শরীরের মধ্যে সেই শক্তি আনয়ন করে, সুতরাং স্পর্শদোষে একের ভাব প্রকৃতি চরিত্র অন্যের দেহ প্রবেশ করে। কাজেই উত্তম যদি অধম সৃষ্ট জল বা খাদ্য গ্রহণ করে, তবে তাহার প্রকৃতি ও চরিত্রেরও অধত্ব প্রাপ্তির সম্ভাবনা ঘটিতে পারে। সুতরাং সূক্ষ্মদশী ঋষিগণ নিয়ম করিলেন, উত্তম ব্যক্তি অধমের জল গ্রহণ করিবেন না। কিন্তু হায় সেই নিয়মের এখন কি শােচনীয় পরিণতি! আম- দিগের দুর্ভাগ্য, ভারতীয় হিন্দু জাতির দুর্ভাগ্য, যে সে সুব্যবস্থায় কালক্রমে নানা প্রকার গােড়ামী গল প্রবেশ করিয়া উহাকে অন্তঃসার শূহ করিয়া ফেলিয়াছে। বর্তমান সমাজপতিগণের সে সূক্ষ্ম দৃষ্টি নাই, পাত্রপাত্র বিচারের ক্ষমতা নাই, দেশ কাল পাত্র ভেদে বিধি ব্যবস্থা প্রণয়নের শক্তি নাই, উত্তম অধম বিচারের সামর্থ্য নাই। বন্যপদ আৰ্যঋষিগণ যাহা করিয়া গিয়াছেন অবস্থা বুঝিয়া ব্যবস্থা করিয়া তাহা খাটাইবার দক্ষতা নাই। নয় কেবল পূর্ব নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করিয়া যাইতেছেন মাত্র। বিধি অবতরণিকা। ব্যবস্থার উদ্দে ভুলিয়া গিয়া কেবল আকৃতি লইয়া ব্যস্ত রহিয়াছেন, ভিতরকার সার বস্তুট হারাইয়া বাহিক খােলসখানা লইয়া, নারিকেলের ভিতর ত্যাগ করিয়া বাহিরের ছােৰডা লইয় টানাটানি মারামারি করিতেছেন; মর্মার্থ ছাড়িয়া দিয়া কেবল মাত্র ভাষাটী শ্লোকগুলি ধরিয়া বসিয়া আছেন। এই জন্যই হিন্দু সমাজেরতুবন-বরেণ্য হিন্দু-সমাজের আজ এই দুর্দৈব, এই শােচনীয় অধপতন, এই অনর্থ সৃষ্টি! দিনে দিনে ক্রমে ক্রমে সমাজ দেহে গোঁড়ামি-কীট প্রবেশ করিয়া উহাকে অন্তঃসার শূন্য কবিয়া ফেলিয়াছে ও দিন দিন শােচনীয় ভাবে ফেলিতেছে। ভূয়ােদশী ঋষিগণ গভীর গবেষণা বলে নির্ণয় করিলে, উত্তম অধমের সৰ্বগুণাবলম্বিগণ তমােগুণাবলম্বিগণের স্পষ্ট খাদ্য পানীয়াদি এহণ করিবে । বর্তমান সমাজাচাৰ্য্যগণ ইহা হইতে বুঝিয়া বসিলেন, কতিপয় জাতি অপর কতিপয় জাতির খাদ্য পানীয়াদি গ্রহণ করিতে পারিবে না, করিলে জাত যাইবে, সমাজচ্যুত করা হইবে। তাহাদের নিয়ম ছিল ব্যক্তিগত ভাবে বৃষ্টিকে লইয়া, ইহাদের নিয়ম হইল সমষ্টিকে লইয়া জাতির সমর্থকে লইয়া। তাঁহারা উত্তম অধম নির্ণয় করিতেন, ব্যবহার চরিত্র গুণ ও কাৰ্য দ্বারা, ইহারা করিলেন জন্ম দ্বারা। তাহাদের নিয়মে অধম হইলে ব্রাহ্মণ পরিত্যাজ্য ছিল, ইহাদের নিয়মে উত্তম হইলেও শুধু জন্মের জন্যই শূদ্র পরিত্যাজ্য, নির্দিষ্ট কতকগুলি জাতির সৃষ্ট জল ও খাদ্য পরিত্যাজ্য অগ্রাহ। তাঁহারা সংজ্ঞা দ্বারা কাৰ্যাকার্যের লক্ষণ দ্বারা উত্তম অধম নির্ণয় করিতেন, ইহারা ক্ষমতা ও ন্যায় বিচারের অভাবে এবং কষ্ট লাঘব করিবার জন্য উত্তম অধমের সিন্ দিয়া মার্কা মারিয়া নির্ণয় করিয়া দিয়াছেন। হাজার কুকর্ম করিলেও সেই মার্কা মার উত্তম অধম বলিয়া পরিগণিত হইবে না এবং হাজার সৎকৰ্ম্ম করিলেও মার্কা মারা অধম উত্তম হইতে পারিবে না। প্রাচীন ঋষিগণ বিধাতার বিধান রক্ষা করিয়া বিধি ব্যবস্থা এমন করিতেন, সদ্গুণ ও ধৰ্মৰলে, ভক্তি ও জ্ঞান-প্রভাবে যিনি যতটা ভগবানের নিকটবর্তী হইতেন, তাহারা তাহাকেই তত উচ্চে স্থান দান করিতেন; কিন্তু বর্তমান সমাজপতিগণ বিধাতার উপরেও কলম চালাইতে কুষ্ঠিত হন নাই; দোষ গুণের পাপ পুণ্যের ভাল মন্দের বিচার না করিয়া একেবারে সহজ উপায়ে জন্ম দ্বারা উচ্চ নীচ বংশ দ্বারা উত্তম অধম স্থির করিয়া দিয়াছেন। ফলতঃ সত্ব রজঃ তমঃ গুণ অনুযায়ী মানুষের প্রকৃতি বিভিন্ন হইয়া থাকে। শম দম শৌচ সন্তোষ সম্পন্ন জ্ঞানবান দয়ালু সত্যশীল অ্যুতে নিবিষ্টচিত সংযতচেতা ধ্যান-ধারণাম জিতেন্দ্রিয় (১) ব্যক্তিগণের সহিত কি হিংসাপরায়ণ মিথ্যাবাদী লােভী সর্বকর্মোপজীবী শৌচাচার পরিভ্রষ্ট মধু মাংস বিক্রয়ী সৰ্বভক্ষক (২) মানবের সমতা হইতে পারে ? পূর্বোক্ত সত্বগুণাবলম্বী মানবগণ কি কখন পরবর্তী এতাদৃশ তমােগুণাবলম্বী মানব- গণের উপযােগ খাদ্যাদি খাইতে পারেন অথবা তাহাদের স্পৃষ্ট খাদ্য পানীয় আদি কখন গ্ৰহণ করিতে পারেন? না তাহা পারেন না। উভয় শ্ৰেণীৰ কচি সম্পূর্ণই বিভিন্ন। একের যাহাতে রুচি, অন্যের তাহাতে বিতৃষ্ণা ; এক জন তােগী, অন্য জন নিবৃত্তি নাগাবলখী, একজন ইহলােক সর্ব, অন্য জন পারলৌকিক মঙ্গল সাধনে ধ্যানমগ্ন। সুতরাং কোন করিয়া মিলন হইতে পারে ? তৎকালের সর্বগুণান্বিত ব্রাহ্মণ তমােগুণান্বিত ; (১) মে মল না মার্জিং। আনং মাচু সত্য লক্ষণং মাগত) (২) হিসাবৃত প্রিয় নুন্ধা সৰ কৰোপ জীবি। কৃষ্ণ শৌচ লাষ্টাতে তিতা শতঃ। (মহাভারত শাভিগৰ) সাতক্ষৰ বিতং সর্বরোচি। ভতযোস বৈশাইতি Hতপি) অবতরণিকা। ৭ তৎকালীয় সূলের সংৰ সৰ্ববঙ্গে পরিহার করিয়া চলিতেন। সূত্রের মাংস বহুল খাদ্য ব্রাহ্মণের অমেধ্য তুল্য পরিত্যাজ্য ছিল। সূত্র আচার হীন নিষ্ঠুর অপবিত্র দেহ বেদবিদ্যা-বিগর্হিত তাহার সহিত কেমন করিয়া আচারবান ভগৎ পদারবিনিমগ্ন-চিত্ত সৰ্বভূতে সমদৃষ্টি পরম দয়ালু পবিত্র দেহ বেদ-বিদ্যা- মণ্ডিত ব্রাহ্মণের সংশ্রব থাকিতে পারে? বিশেষতঃ পূৰ্ব্বকালে অনেক সময় শূদ্র জাতীয় ব্যাধগণ পানীজলে কুপােদকে ও খাদ্য সামগ্রীর মধ্যে অজ্ঞাত তাবে বিষাক্ত দ্রব্যাদি মিশ্রিত করিয়া রাখিয়া নিরীহ ধর্মপ্রাণ পথিকগণের প্রাণ সংহারপূর্বক সৰ্বস্ব লুণ্ঠন করিয়া লইত। এই জন্যও তৎকালে এই সব শূদ্রগণের স্পষ্ট জল, খাদ্য দ্রব্য এবং স্পষ্ট কুপের জল ব্রাহ্মণাদি উচ্চ জাতিগণ আইন করিয়া ব্যবহার রহিত করিয়া দিয়াছিলেন। এরূপকল্প তৎকালে সময়ের পক্ষে সম্পূর্ণ প্রয়ােজনীয়ই হইয়া উঠিয়াছিল এবং তা অস্বাভাবিকও নহে। কিন্তু প্রাচীনকালের সেই নিয়ম এক্ষণে চলিতে পারে না। কেন না তখনকার মত ব্রাহ্মণ এখন নাই এবং তখনকার মত শূদ্রও এখন নাই। ব্রাহ্মণের শােচনীয় পতন হইয়াছে শূদ্রের বিস্ময়কর উন্নতি সাধিত হইয়াছে। একটু পূৰ্বে শূদ্রের যে সংজ্ঞা নির্দেশ করিয়াছি, বর্তমান সময়ের শূদ্রগণ আর সেরূপ লক্ষণ-বিশিষ্ট নহে। তাহারা সৰ্বাংশে উন্নত হইয়াছে। বিদ্যায় ধন আচারে ব্যবহারে কাৰ্যে তাহাদের আশ্চৰ্য্য পরিবর্তন সাধিত হইয়াছে। অথবা বলিতে কি প্রাচীনকালে শূদ্র বলিতে যাহাদিগকে বুঝাইত বর্তমান সময়ে হাড়ি ডােম মুদাফরাস ব্যাধ ও ম্যাথর প্রভৃতি ভিন্ন অন্য কোন জাতিকে আর বুঝাইতেছে না। সমাজপতিগণ যাহাদিগকে এখন শূদ্র বলিতেছেন প্রকৃত পক্ষে তাহাদের অধিকাংশই শূদ্র নহে বৈশ্য ও ক্ষত্রিয় বণান্তৰ্গত। কাল ধম্মে বৈদেশিক আক্রমণে বিজাতীয় শাসনে ব্রাহ্মণগণের যেরূপ শােচনীয় ভাগ্য-বিপর্যয় ঘটিয়াছে, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যগণেরও ঠিক তদ্রুপই হীন দশা ঘটিয়াছে। কালচক্রের দারুণ নিষ্পেষণে ব্রাহ্মণের ন্যায় গণ। বৈখ,ক্ষত্রিয়গণেরও অস্থি মজ্জা পিষিয়া গিয়াছে। বৌদ্ধ উপপ্লাবনে বৈদিক আচার ব্যবহার রীতিনীতি ভাসিয়া গিয়াছিল। যদুবংশের আত্মকলহে ও শেষ কুরুক্ষেত্র মহাসমরে ভারতের অবশিষ্ট ক্ষত্রিয়গণ যাহা ছিল, দুৰ্য্যোধন ও যুধিষ্ঠিরের পক্ষ অবলম্বন করিয়া অষ্টাদশ দিনের মহাকাল সমবে চির নিদ্রায় শয়ন করিয়াছে। ইতঃপূর্বেও একবিংশতিবার না হউক, দুরন্ত ব্রাহ্মণ পরশুরামেব হন্তে ভারতের বহু ক্ষত্রিয় সন্তান জীবন দান করিয়াছিল এবং প্রাণ ভয়ে অনেকে বৈশ্য শুত্র সাজিয়া ক্ষত্রিয় বৃত্তি পরিহার পূর্বক বৈশ্য শূদ্রোচিত বৃত্তি অবলম্বন করতঃ প্রাণ ধারণ করিতেছিল। যে দুই চারি জন ক্ষত্রিয় ছিল তাহারা ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণ-মন্ত্রীগণের ক্রীড়নক স্বরূপ ছিল। এইরূপ ভাবে যখন ব্রাহ্মণগণের দারুণ অত্যাচারে ও মুষ্টিমেয় ক্ষত্রিয়গণের নিদারুণ অবিচারে লক্ষ লক্ষ কোটী কোটী বৈশ্য শূদ্রগণ জর্জরিত হইতেছিল, কুকুর বিড়ালের মত তাহাদের উপর ব্রাহ্মণগণের অমানুষিক অত্যাচার অনুষ্ঠিত হইতেছিল, তখন অত্যাচার অবিচারেব ঘনান্ধকাব অপসারিত করিয়া, মেহ সহানুভূতির, করুণা ভালবাসার, প্রেম শান্তি বিজয়পতাকা লইয়া পরম প্রেমাবতার শাক্যসিংহ অবতীর্ণ হইলেন। তাঁহার মেহবিজড়িত প্রেমের আহ্বানে লক্ষ লক্ষ কোটী কোটা অত্যাচার নিপীড়িত পদদলিত স্বশিত বৈশ শূদ্র আসিয়া সমবেত হইল। বৌদ্ধ ধর্মেব শীতল ছায়ায় আশ্রয় লইয়া অত্যাচার দাবদগ্ধ প্রাণ সুশীতল কৰিল। দেখিতে দেখিতে শুধু ভারতবর্ষ নহে পৃথিবীর বার আনা লােক বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ কবিল। বৌদ্ধ ধর্মের বন্যায় ভারতবর্ষ একেবাৰ ভাসিয়া গিয়াছে। কোথায় তাহাৰ যাগযজ্ঞ, কোথায় তাহার বৈদিক আচাৰ বিধি, আর কোথায়ই বা তাহার সাধেব জাতিভেদ বর্ণাশ্রম ধর্ম। পরে শঙ্করাচাৰ্য, কুমারিল ভট্ট প্রভৃতির চেষ্টায় কয়েক লক্ষ লােক মাত্র উপবীত গ্রহণ করিয়া ব্রাহ্মণ্য ধর্ম পুনঃ সংস্থাপনে বদ্ধপবির হইয়াছিলেন।
অবতরণিকা তথাপি বঙ্গদেশ যেমন তেমনই ছিল। বলে আর হিন্দু ধর্মের, বৈদিক আচারের কোন চিহ্নই ছিল না। তাই আদিশূর কান্যকুল হইতে ব্রাহ্মণ আনাইয়া যজ্ঞ ক্রিয়া সম্পাদন করিয়াছিলেন। এই বৌদ্ধ উপপ্লাবনের ফলেই ভারতবর্ষের ক্ষত্রিয় বৈশ্যগণ বৈদিক সংস্কার ও উপবীত ভ্রষ্ট হইয়া পড়িয়াছে। ইতিহাস পাঠক মাত্রেই যাহা জানেন বড়ই দুঃখেব বিষয় আমাদের দেশের পণ্ডিত মহাশয়গণ তাহা জানেন না, জানিতে চেষ্টাও করেন না। তাঁহাদের ঐ এক ছেলেমানুষের কথা—বৈশ্য ক্ষত্রিয় হইলে উপবীত নাই কেন বেদ-বিদ্যা নাই কেন? তাহাদের মাসাশৌচ কেন ? বিদ্যালয়ের তরলমতি বালকগণ পর্যন্ত যাহা বুঝে এই প্রবীণ পণ্ডিতগণ তাহা বুঝিতে পারে না, কি আশ্চর্য! দেশের অগণ্য লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি অধিবাসীকে শুদ্ররূপ মনকল্পিত আখ্যায় অভিহিত করিয়া, তাহাদিগকে পংক্তি নির্বাসন করিয়া সামাজিক ও আধ্যাত্মিকাদি সর্ব প্রকার অধিকার হইতে বঞ্চিত করিয়া অস্পৃশ্য অধম করিয়া বাখিয়া সমাজপতিগণ যে আত্মহত্যা করিতে বসিয়াছেন, তাহ কি হিন্দু জাতির এই মুমূর্য দশাতেও তাঁহারা উপলব্ধি করিতে পারিবেন ? ৯০ সাড়ে নয় শত বৎসবে প্রায় ৪০ কোটি হিন্দু লােপ প্রাপ্ত হইয়াছে। এই অনুপাতে হিন্দুর সংখ্যা হ্রাস হইলে ১০০০ বৎসর পর একটি হিন্দুও হিন্দুনাম রক্ষার জন্য জীবিত থাকিবে না। কেন দেশের মেরুদণ্ডস্বরূপ পােকদিগকে ঘৃণা কবি, কি তাদের অপরাধ বুঝিতে পারি না। কুকুর বিড়াল, ইন্দুর, তেলাপােকা, পশু-পক্ষী যে অধিকার পাইতেছে সে অধিকার কেন আমাদের অগণ্য লােক পাইবে না? মানুষ কি তবে কুকুর বিড়াল অপেক্ষাও হীন নীচ, মানুষ কি তবে কুকুর বিড়াল অপেক্ষা অস্পৃশ্য ঘৃণিত। হায়! হিন্দুসমাজ, এই সব দারুণ অত্যাচার রূপ পাপেই না তােমার আজ এই পরিণাম ঘটিয়াছে। পূর্বে বলিয়াছি ত সে ব্রাহ্মও নাই সে শুদ্রও নাই। শাস্ত্রের লক্ষণাক্রান্ত ব্রাহ্মণ শূদ্র উভয়েই বিলােপ ঘটিয়াছে। “সে রামও নাই ১০ . সে অযােধ্যাও নাই।” এক্ষণে দেখা যাউক আমরা যাহাদিগকে ভ্রাতৃত্বের যে বন হইতে ছিন্ন করিয়া পংক্তি নির্বাসন করিয়াছি, যাহাদের আনীত জল ও সৃষ্ট খাদ্য আমরা পরিত্যাগ করিয়াছি, তাহাদের সঙ্গে আমাদের কি সম্বন্ধ ? মলিখিত “জাতিভেদ” ও “চতুৰ্ব্বর্ণ বিভাগ” পুস্তকে আমি অবিসংবাদীরূপে প্রমাণ করিয়াছি যে, ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য ও শূদ্রগণের মধ্যে বর্তমানে যতই কেন পার্থক্য ঘটুক না কেন মূলতঃ উহারা এক জাতি। ঋষি বংশেই সকলের (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য শূদ্র) জন্ম। কৰ্ম্ম ও গুণানুসারে পরে পৃথক পৃথক সংজ্ঞা প্রাপ্ত হইয়াছে মাত্র। একই প্রজাপতির আমরা সব সন্তান, বড় ছােট কেহই নাই। আমাদের চারি জাতির মধ্যে জ্ঞাতিত্ব বর্তমান। এক ব্রাহ্মণ জাতিই প্রথমতঃ সৃষ্ট হন, পরে সেই ব্রাহ্মণ হইতেই গুণ ও কর্মানুযায়ী ক্ষত্রিয় বৈশ্য শূদ্র চণ্ডাল প্রভৃতির পরিণতি। আমাদের গোঁড়া ব্রাহ্মণপণ্ডিতগণ কিন্তু এ কথা নিতে প্রকৃত নহেন। তাঁহারা বলেন- ভগবান্ বিরাট পুরুষের উচ্চ অঙ্গ মুখ হইতে উচ্চ জাতি ব্রাহ্মণ, বাহু হইতে ক্ষত্রিয় উরু হইতে বৈশ্য ও নিমাঙ্গ পাদ হইতে নিজাতি শূদ্র জন্মগ্রহণ করিয়াছে। কিন্তু এ শত যে নিতান্ত অসার ও ভ্রমাত্মক আহা আমি পূৰ্ব্বো- ব্লিখিত দুইখানি পুস্তকে বিশদ ভাবে প্রমাণ কবিয়াছি। কাজেই এস্থানে আর সে বিষয়ে আলােচনা করা সঙ্গত বােধ করিলাম না। আমাদের কর্ণধার অষ্টাবিংশতিতত্ত্ব প্রণেতা ৰঘুনন্দন ভট্টাচাৰ্য মহাশয় বলিয়াছেন বঙ্গদেশে মাত্র দুই জাতি আছে—ব্রাহ্মণ ও শূদ্র। কাজেই পণ্ডিত মহাশয়গণও একবাক্যে রঘুনন্দনেব বাক্যের প্রতিধ্বনি করিয়া বলেন—বঙ্গে গড়ে ৬ জন মাত্র ব্রাহ্মণ আর বাকি ৯৪ জন শূদ্র। অর্থাৎ বৈদ্য, কায়স্থ, বারুই গন্ধ- বণিক, কর্মকার, কুম্ভকার, নালাকার, মােদক, নাপিত, সৎগােপ, তামুলী, তন্তুবায়, তিলি, চাষীকৈবর্ড, গােয়ালা, বৈষ্ণব, যােগী, সরাক, সুবর্ণ-বণিক সেরা, চাষাধােবা, তাঁতি, মূত্রধর, কৈরী, পুরা, সাহা, ধােপ, জেলিয়া, অবতরণিকা। কৈবর্ত, কলু, কাপালী, মালাে, নমশূদ্র, কাছাক, পলিয়া, পােদ, রাজবংশী, শুক্লী, টিপরা, তেওর, ধানুক, বেলদার, চুনারী, কোরা, নাইক, মাঝি, টী, বাগী, রওয়ান, লাসারি, বহেলিয়া, বাউরী, ভূইয়া, বিল, চাই, হাড়ি, মালী, কেওরা, চামার, ডােম, মুচি, তুরী, দোছাদ, কারা, সাপুড়ে, খন্দকার, পাশী, পান, বুনা, বাদিয়া, শিকারী, ম্যাথর, মুদাফবাস প্রভৃতি ব্রাহ্মণের সমুদয় জাতিকে রঘুনন্দন শূদ্র সংজ্ঞায় অভিহিত করিয়াছেন। ইহার মধ্যে ২২২৩টী জাতি আপনাদিগকে কেহ বৈশ্য কেহবা ক্ষত্রিয় বলিয়া দাৰী করিয়া জাতীয় সামাজিক আন্দোলন আরম্ভ করিয়া দিয়াছে। তন্মধ্যে বৈদ, কায়স্থ, রাজবংশী, নমশূদ্রগণের আন্দোলনের মাত্রা সুগভীর—সুভীষণ। বারুই সংগােপ, তিলি, কৈবর্ত, চাষী-কৈবর্ত ঝলমাল,সুবর্ণ বণিক, চাষাবােপ, সাহা, সুত্রধর, কৰ্ম্মকার নাপিত প্রভৃতি জাতির আন্দোলন ইহার নিয়ে। এই আন্দোলনেয় ফল যাহা হইবে—তাহা বিচক্ষণগণ দিব্যচক্ষে দেখিতেছেন। নমঃশুদ্রগণই হিন্দু মধ্যে চাষী প্রধান জাতি। তাহারা একযােগে দলবদ্ধ হইয়া উচ্চশ্রেণীর হিন্দুগণের কাজকর্ম ত্যাগ কবিয়াছে বর্গাজমি চষিতে প্রস্তুত কিন্তু ক্ষেত্র হইতে বাটীতে বােঝ বা শস্যাদি দিতে অসম্মত! জোতদার হিন্দুগণের সমূহ বিপদ উপস্থিত! ওদিকে মুসলমান বর্গাদারগণও বাটীতে শস্য আনিয়া দিতে অসম্মত। মালী অনেক জাতির কাজ বন্ধ করিয়া দিছে, নৌকার মাঝি পোটলা-পটলী বহন করিয়া বাড়ী হইতে ঘাট পর্যন্ত আনিতে শীলােক লইতে, অসম্মতি প্রকাশ করিতেছে। মজুর একরূপ মেলে । বাহা মেলে তাহা দৈনিক।, ৩, কি ৬০ আনাৰ্যন্ত। তাও বহু সাধ সাধনা কবিয়া আনিতে হয়। লক্ষ লক্ষ বৎসবের অত্যাচাবিত প্রাণ এইবার জলিয়া উঠিয়াছে। ইংরাজী শিক্ষা—অবাধবিদ্যা, স্কুল কলেজ অত্যাচারের মূল্যেংটনে প্রবৃত্ত হইয়াছে। পূর্ববর্তী বাদসাগণ অন্ত্রবলে যাহা করিতে পারন নাই, ইংরাজী আমলে, অবাধবিদ্যা প্রচারে তাহা সম্পন্ন হইতে ১২ জল। চলিয়াছে। মানবের অধিকার কি এবং তাহা কেমন করিয়া হতগত করিতে হয় অবত শ্রেণীর অগ্য লােকসমূহ তাহা এক্ষণে বিশিষ্টরূপে ভাত হইয়াছে এবং জ্ঞাত হইয়া তল্লাতে বদ্ধপরিকর হইয়াছে। বেদ পাঠে জিদাচ্ছে, বেদ অবণে কর্ণবন্ধে তথতৈল নিক্ষেপ, ভগবৎ অবাধনায় শিরহে প্রভৃতি শূদ্রযােগ্য ন্যায় ও দয়ালদণ্ডের এইবার প্রায়শ্চিত্ত আবষ্ণু। চারি যুগের দারুণ অত্যাচারের প্রায়শ্চিত্ত এক সঙ্গে উপস্থিত। অভিজাতগণ, এইবার সাবধান ও সতর্ক হউন! এক্ষণে দেখা যাউক পূর্বোক্ত সামাজিক আন্দোলনকারিগণের প্রকৃতপক্ষে শাস্ত্রসম্মত কোন দাবী আছে কি না। তাহারা কি বিধিসঙ্গত আন্দোলন করিতেছে, না—অনি শুধু শুধুই একটা মিথ্যা কল্পনা জল্পনা লইয়া আন্দোলনে তৎপর হইয়াছে। আমি যতটা জানি, তাহাতে আমার বিশ্বাস, আন্দোলনকারী- গণের প্রকাশিত ও লিখিত পুস্তকাদি কোনরূপ যুক্তিযুক্ত শাস্ত্রসম্মত প্রমাণ দ্বারা খণ্ডন করা হইতেছে না, কেবল মুখে মুখে সভাসমিতি করিয়া বলা হই- তেছে, 'তােমরা যাহা আছ তাহাই থাক, তােমাদিগকে কোনপ্রকার উচ্চ অধিকার দেওয়া হইবে না। এই বিংশ শতাব্দীতে এ প্রকার উত্তরে শিশুকেই নিবৃত্ত করা যায় না তা আবার ইংরাজী শিক্ষা-প্রাপ্ত বিপুল উদ্যমশীল যুবকগণকে কি কখন নিবৃত্ত করা যাইতে পারে কখনই নয়। ভারত এখন আর শুধু ব্রাহ্মণের ভাবত নাই। ভারত এখন আচণ্ডালের ভারত। সারা ভারতময় হিন্দু সমাজের একচেটিয়া অধিকার ব্রাহ্মণগণকে এখন উঠাইয়া লইতে হইবে। ২০ কোটি হিন্দু লইয়া হিন্দুসমাজ, না মুষ্টিমেয় তর্ক-চূড়ামণি, তর্করত্ন, তর্কবাগীশ লইয়া হিন্দুসমাজ? ভারতীয় হিন্দুসমাজ এখন আর তর্কবাগীশের নয়—এখন উহা ন্যায়বাগীশের। তর্কের যুগ গিয়াছে, তর্ক করিয়া অধিকার লাভের যুগ অতীত হইয়াছে। এখন ন্যায়ের যুগযুক্তির যুগ। এ যুগ শবে কুটীতে, পারলৌকিক দোহাইএ অভিশম্পাতের ভয়ে, টিকির ।
অবতরণিকা। আন্দোলনীতে ভীত হইবার নহে। সে বর্বর যুগ কালের কুক্ষিতে চিরতরে বিলীন হইয়াছে। সূত্রের লক্ষণ। অন্যান্য সমুদয় জাতির প্রতিনিধি স্বরূপ গ্রহণ করিয়া নিয়লিখিত কতিপয় উচ্চ শ্রেণীর জলচল জাতির জাতিতত্ব ও বর্ণতত্ব আলােচনায় প্রবৃত্ত হওয়া বাউক। নতুবা প্রত্যেক জাতির স্বতন্ত্র আলােচনা করা এতাদৃশ ক্ষুদ্র পুস্তকে সম্ভবপর নহে, প্রয়ােজনও নাই। আমাদের উপস্থিত আলােচ্য জাতি হইতেছে বৈদ্য, কায়স্থ, বাজীবি, সদোপ, গন্ধবণিক, তিলি, তাম্বুলি, কৰ্ম্মকার, মালাকার, তন্তুবায়, নাপিত, মােদক প্রভৃতি। ইহারা সকলেই উচ্চশ্রেণীস্থ এবং সৰ্ববাদী-সম্মতরূপে জলচরণীয় জাতি। রঘুনন্দন এবং তৎপ্রদর্শিত পণ্ডিতগণ বলিতেছেন ইহারা সকলেই শুভ্র। এক্ষণে দেখা যাউক ইহারা প্রকৃত পক্ষেই শূদ্র কি না। শাস্ত্রকারগণ শূদ্রের এইরূপ লক্ষণ ও সংজ্ঞা নির্দেশ করিয়াছেন- হিংসামৃত প্রিয়া লুব্ধ সৰ্ব্বকর্মোপ জীবিন। কৃষ্ণাঃ শৌচ-পরিভ্রষ্টাস্তে দ্বিজাঃ শূদ্রতাং গতাঃ । (মহাভাবত; শান্তিপর্ব, ভৃগু ভবদ্বাজ সংবাদ) “যাহারা তমােণ প্রভাবে হিংসাপরতন্ত্র, লুব্ধ, সৰ্ব্ব কর্মোপজীবী, কৃষ্ণবর্ণ বিশিষ্ট, মিথ্যাবাদী ও শৌচ ভ্রষ্ট হইয়া উঠিয়া ছিলেন, তাঁহারাই শুদ্রত্ব প্রাপ্ত হইয়াছেন।” লাক্ষা লবণ সৰিত্ৰ কুম্ভক্ষীর সপি। বিক্রেতা মধু মাংসানাং স বিপ্রঃ শূদ্র উচ্যতে । ৩৭০ (অত্রি সংহিতা) যে লাক্ষা লবণ, কুসুম্ভ, দুগ্ধ, ঘৃত, মধু মাংস বিক্রয় করে সেই ব্রাহ্মণ নামধেয় আৰ্য শূদ্র বলিয়া নির্দিষ্ট।
অপিচ সৰ্ব্ব ভক্ষ রতিনিত্যং সর্বকৰ্ম্ম কলােহশুচিঃ। ত্যক্তবদনাচারঃ স বৈ শূদ্ৰ ইতি মৃতঃ। যিনি অপবিত্র অশুচি, যাহাব খাদ্যাখাদ্যের বিচাব নাই, সৰ্ব্ব-ভক্ষক, সর্বকর্মোপজীবী, জীবিকা নির্বাহের, ব্যবসায়ের বা বৃত্তিব স্থিবতা নাই, বেদ পরিত্যাগ কৰিছেন এবং আচাৰ ভ্ৰষ্ট হইয়াছেন তাহাকে শূদ্র বলা যায়। পৰিচৰ্য্যাত্মকং কর্ম শূদ্ৰাপি স্বভাবজম্। (শ্রীমদ্ভগদগীত) শূদ্র তমােণ প্রধান, অলস, নিরুৎসাহ এবং জ্ঞানহীন সুতবাং দাসত্বই তাহার স্বাভাবিক কৰ্ম্ম বলিৱা নির্দিষ্ট হইয়াছিল। শূদ্র চিনিবাব আর একটি প্রধান চিহ্ন ছিল—শবীবের রং। ব্রাহ্মণের শ্বেতবর্ণ, ক্ষত্রিয়েব বক্তবর্ণ, বৈশ্যের পীতবর্ণ এবং শূদ্রগণের “শূদ্রাণামাসিতস্তথা, (মহাভারত , শান্তিপর্ন, ১৮৭ অধ্যায়।) শরীরেব সাধাবণ রং ছিল কৃষ্ণবর্ণ। অর্থাৎ আফ্রিকাব নিগোগণকে দেখিবা- মাত্র যেমন তাহাদের কৃষ্ণবর্ণ দ্বারা চিনিতে পাব। বায পলে শূঢ় দাগণকেও শুধু শবীরেব বর্ণ বা বং দ্বাবাই চিনিতে পারা যাইত যে ই'বা শূদ্র। মৎকথিত জ নাচবণীয় নবশমিকগণ কিন্তু প্রথম শ্লোকে মােটেই অন্তর্ভূক্ত নহে। দ্বিতীয় শ্লোকে যে দুগ্ধ ও ঘৃত বিক্রয়ের কথা আছে উহাতে আংশিক ভাবে সৎগােপ দোষী বটে কিন্তু বৈৰে লক্ষণেইত আছে। “কৃষি গােৰক্ষা বাণিজ্যং বৈশ্য কৰ্ম্ম স্বভাবজ” কৃষি গােপালন গােরক্ষা প্রভৃতি বৈশ্যের জীবিকোপজীবী বৃত্তি, কথিত আছোপরে ব্রজগােপিনীগণ পৰ্যন্ত মধুবাব বাজাৰে দধি দুগ্ধ ঘূত মাখনাদি বিক্রয় করিতে যাইতেন। সুতরাং গােপের পক্ষে দুগ্ধ মৃত অবতরণিকা। বিক্রয় অপরাধের মধ্যে, গণ্য হইতে পারে না। গােরা গােপালন কাৰ্য যদি বৈশ্যের হয়, তবে ঘৃত দধি দুগ্ধ বিক্রয় বৈশ্য না করিলে অন্য তিন জাতি কোথায় পাইবে। তৃতীয় শ্লোকে—“ত্যক্ত বেদ” ভিন্ন অন্য কোন লক্ষণের সঙ্গে ইহাদের সামঞ্জস্য নাই। “ত্যক্ত বেদ” ইহাই যদি শূদ্রদ্ধের কাবণ হয় তবে ব্রাহ্মণগণও এ শূদ্রত্ব হইতে নিস্তার পান না। কেন না বেদ পাঠ কৰা ত দূরে কথা কোন ব্রাহ্মণপণ্ডিতেব বাটীতে বেদ আছে কিনা সন্দেহ,—বেদ যে কি পদার্থ তাহা অনেক দেখেনই নাই—পাঠ ত দূরের কথা। “এখনও তারে চোখে দেখিনি, শুধু শী শুনেছি”। বেদ বেদান্তের বড় বড় কথা কেবল আমরা মুখে আইতেছি ও বর্ণাশ্ৰমধৰ্ম্ম বলিয়া উচ্চ চীৎকার করিয়া আর রাখিতে ব্যর্থ চেষ্টা করিতেছি মাত্র। সুতরাং “ত্যক্ত বেদ” বলিয়া ইহাদিগকেই শুধু দোষী ববা যাইতে পারিতেছে না। আর পূর্বেও ত বলিয়াছি দারুণ বৌদ্ধ বিপ্লব দেশ হইতে বেদের শিক্ষা বেদ-চর্চা বৈদিক ক্রিয়াকলাপ সম্পূর্ণ তিলােহিত হইয়া গিয়াছিল। এমতাবস্থায় এই সব জাতি বেদ পাইবে কিরূপে? বিশেষতঃ তার বহুদিন পূব্ব হইতেও বেদ ব্ৰাহ্মণগণের এক চেটিয়া সম্পত্তি হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। বংশপরম্পরারূপে ব্রাহ্মণ-গণ শুধু ব্রাহ্মণ-সন্তানগণকেই বেদ-বিদ্যা দান করিতেন। ক্ষত্রিয়-বাজপুত্রগণ বেরূপ বংশপম্প রূপে পিতৃ-সিংহাসন পিতৃ-সম্পত্তি ভােগ করিয়া আসিতেছিলেন— ঐ সিংহান বা বাজৈশ্বর্যে এবং বৈশ্যের ঐ ধন সম্পত্তিতে যেমন সম্পূর্ণরূপে ব্রাহ্মণ-শূদক বঞ্চিত কবা হইয়াছিল কাজেই বাধ্য হইয়া ব্রাহ্মণগণ তাহাদের একমাত্র স্পত্তি বেদ-বিদ্যা ও অধ্যাত্ম-বিদ্যা হইতে অপর তিন জাতিকে বঞ্চিত কবিতে বাধ্য হইলেন এবং উহাকে তাঁহারা আপনাপন জীবিকা নির্বাহের উপায় ও উপযােগী করিয়া তুলিলেন। এই সময় হইতেই বেদমন্ত্র ও পূজার্চনায় দক্ষিশা-বাক্যের সূচনা আরম্ভ হইল। তাই বলিতেছিলাম এই দ। “ত্যক্ত বেদ” অপরাধেই তাহাদিগকে শূদ্র বলিয়া গণ্য করা যাইতে পারে না। চতুর্থ শ্লোক অনুযায়ী দাসত্ব তাহাদের বৃত্তি বলা যাইতে পারে না। বর্তমান সময়ের কথা ছাড়ি দেওয়া যাউক-একশত বৎসর পূর্বে উল্লিখিত কায়স্থ নরসুন্দর মালী তন্তুবায় নমঃশূদ্র প্রভৃতি ভিন্ন প্রায়শঃ অন্য কোন বর্ণ অন্য বর্ণের (ব্রাহ্মণের পর্যন্ত) দাসত্ব করিত না। ইহাদিগের মধ্যে ব্যক্তিগত হিসাবে অনেকে দারিদ্র বশতঃই দাসত্ব করিত, সমষ্টি হিসাবে নহে। কেন —ঐ সমস্ত জাতিব ব্যবসায়ে যথেষ্ট পয়সা রােজগার হইত। দাসত্ব করিতে যাইবে তাহাবা কোন্ দুঃখে? বর্তমান কালের ন্যায় দাসত্বের নামান্তর চাকুরীব প্রতি তখনকার, শতবৎসর পূর্বের লােকের এতাদৃশ অনুরাগ ছিল । সুতরাং “পৰিচৰ্য্যা করা” অপরাধ হইতে তাহাদিগকে মুক্ত মনে করিতে হইবে। ৫ম বা শেষ শ্লোকে যে“কৃষ্ণ বর্ণ” শূদ্রের শরীরের রং এর কথা বলা হইয়াছে সে অপবাধেও তাহাদিগকে অপরাধী করা যাইতে পারে না। কেন না ইহাদের সন্তানগণের মধ্যে অনেক পূর্ণচন্দ্রানন ইন্দিরাক্ষ পবিষধর দেখিতে পাওয়া যায়-অন্য পক্ষে অনেক ব্রাহ্মণের গৃহে অমাবস্যা পরাজিত আবলুস বিনিন্দিত নধরকান্তি শিশুর অভাব নাই। সুতরাং শাস্ত্রের লক্ষণ দ্বারা বিচার করিয়া দেখা গেল, ইহারা শূদ্র লক্ষণাক্রান্ত নহে; তাহাপেক্ষা বহুলাংশে উন্নত সুতাং বৈশ্য ক্ষত্রিয় সংজ্ঞাভুক্ত বলা যাইতে পারে। এই পাঁচ শ্লোকের প্রমাণও যাগা যথেষ্ট মনে করেন না তাঁহাদিগের জন্য আরও প্রদর্শন করা যাইতেছে। বীচিত্তে পাঠ করুন। (১) শাস্ত্রে আছে--“ন চ সংস্কার মহতি শূদ্রের কোন সংস্কাৰ নাই। অর্থাৎ ব্রাহ্মণাদির যেমন (ক) বিবাহ (খ) গর্ভাধান (গ) পুংসবন ঘ) সীমন্তোন্নয়ন (৬) জাতকৰ্ম্ম (চ) নামকরণ (ছ) অন্নপ্রাশন (জ) চূড়াকরণ (2) উপনয়ন (ঞ) সমাবর্তন এই দশবিধ সংস্কার আছে, শূদ্রের সেরূপ কিছু নাই। কিন্তু আমাদের কথিত নবশারকগণের
এর ফল।
খে এক (ঝ) উপনয়ন-সংস্কার ভিন্ন আর সবগুলিই ব্রাহ্মণের স্থায় আছে।
সুতরাং ইহারা শুত্র নহে।
(২) শূদ্রের অম যজ্ঞে* মন্ত্রবিহীন যন্ত। কিন্তু নায়কগণে
পূজাদিতে পুরােহিতগণ কর্তৃক মন্ত্রযুক্ত যজ্ঞই সম্পন্ন হইয়া থাকে।
(২) চতুর্থ ও বর্ণ প্রায়শ্চিত্তং ন বৈ ভবেৎ
ব্ৰতং নান্তি তপােনাত্তি হােন নৈব চ বিদ্যতে।
পংগং ন দাতব্যং ৩ মন্ত্র বিনাৎ।
খ্যাপরি বিজানাশূদ্রে দানেন শুধ্যতি। ৪
(৫ম অধ্যায়, আপস্তম্ব সংহিতা)
“চতুর্থ বর্ণ শূদ্রজাতির প্রায়শ্চিত্ত নাই, ব্ৰত নাই, তপস্যা নাই, হােমও
কর্তব্য নহে, পঞ্চগ্য বিধি দিবে না, যেহেতু সূত্রের মন্ত্রপাঠ বিধি নাই
- গান বার ও হইবে।”
(২) অনাৎ পিৰতে তােৱং ব্রাহ্মণ-জাতি।
অহােরালোবিত না পাগবেন তি। ২৪৮। •
অতি সংহিতা।
“ব্রাহ্মণ অজ্ঞানপূর্বক শূদ্রসৃষ্ট জল পান করিলে জানান্তে পঞ্চগব্য পান
পূর্বক এক দিন উপবাস করিয়া ও হইবেন।” কিন্তু উপরি উক্ত জাতি
গণের জল সর্বদিশতরূপে ব্রাহ্মণগণের পানীয়, এহ ও আচরণীয়।
(৩) উদ্ধাহতবে দেখা যায়-দ্রের কোন গােত্র নাই। কিন্তু এই সমস্ত
জাতিগণের মধ্যে যথাবিধি গােত্র প্রচলিত আছে।
(৪) মনুসংহিতায় চতুর্থ অধ্যায়ে আছে
ন শুভ্রায় মতিং দদালোচ্ছিষ্টন হবিষ্কৃত
ন চাপেদিশেহং ন চায় তমাদিগেৎ ৮০
“শূদ্রকে লৌকিক বিষয়ে কোন উপদেশ দিবে না ।
ধর্মোপদেশ প্রদান করিবে না কিংবা কোনরূপ ব্ৰত করিতে আদেশ দিবে না।
জলচল ও স্পর্শকাষ বিচার। কিন্তু ব্রাহ্মণগণ ইহাদিগকে বহুকাল হইতে লৌকিক ও ধর্মোপদেশ প্রদান ও ব্ৰতাদি পালনের আদেশ দিয়া এবং নিজেরা সেই ব্ৰত সম্পন্ন করিয়া দক্ষিণাদি এহণ করিয়া আসিতেছেন। ৫) জপতপতীর্থযাত্রা প্রব্রজ্যা মন্ত্রসাধন। দেবতারাঞ্চনঞ্চৈব খ্রীশূদ্র পতনানি ষট,১৩৫ অতি সংহিতা। “জপ, তপস্যা, তীর্থযাত্রা, সন্ন্যাস, মন্ত্রসাধন, দেবতা-আবাধন এই ছয়টা কাৰ্য্য খ্রীশূদ্রের পাতিত্বজনক।” তপস্যা ব্রাহ্মণেই করেন না, তা আবার অন্য করিবে। বাকি পাঁচটী, ব্রাহ্মণের ন্যায় নােয়কগণও করিয়া থাকেন। বিবেকানন্দ স্বামী প্রমুখ সাসিগণ তাহার জলন্ত দৃষ্টান্ত। (৬) “ন শূদ্রে পাতকং কিঞ্চিৎ কিন্তু ইহাদের মধ্যে বিলক্ষণ পাপ-পুণ্য বােধ আছে এবং সামাজিক কোন পাপ করা মাত্র পণ্ডিতগণ প্রায়শ্চিত্ত করিয়া শুদ্ধ হইবার ব্যবস্থা দিয়া থাকেন। যা বা পতি। (৭) কোন বিশুদ্ধ ব্রাহ্মণ শূদ্র-যাজন করিবেন না। যিনি শূদ্র-যাজন করিবেন, তিনি মহর্ষি তুল্য হইলেও বিশুদ্ধ ব্রাহ্মণের নিকট ঘৃণ্য ও অপাঙ ক্তেয়। মনুসংহিতার তৃতীয় অধ্যায়ে বহু জাতির যাজককে, শূদ্ৰজাতিক যাজককে অপাঙক্তে অর্থাৎ পতিত বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে। যথা- হিংস্রো বৃষলভিশ্চ গণনাঞ্চৈব যাজকা। ১৬ যাবতঃ সংস্পৃশেদজৈব্রাহ্মণ শূদ্রযাজক। তাবতাংন ভববাতুঃ ফলং দান পৌৰ্ত্তিকম্। ১৭৮ * যে ব্রাহ্মণ নানা জাতীয় লোকের যাজক, যিনি শূদ্র যাজক পুবালী ব্রাহ্মণ পতিত। ব্রাহ্মণ, ইহার যে যে পংক্তিতে উপবেশন করেন সেই সেই পঙক্তিগত জীয় ব্রাহ্মণ ভােজনের ফল হইতে দাতা বঞ্চিত থাকেন। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে এক জাতীয় সূত্রের অতিরিক্ত শূদ্র-যাজী ব্রাহ্মণগণ, এম শাজীগণ মহাপাপী বলিয়া গণ্য হইয়াছে। যথা- শূদ্রাতিরিক্তবাজী যে মযাজী ব কীৰ্তিতঃ। * ২২ এতে মহাপাতনি কুম্ভীপাকং প্রয়ান্তিতে ২০৪ (ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ-৩০ অধ্যায়) নিয়ে ছয় প্রকার অব্রাহ্মণের কথা বলা হইতেছে অব্রাহ্মণাত্ত ষটপােক্তা ঋষিণা তত্ত্ববেদিনা। তৃতীয়ে বহুযাজ্যঃ স্যাৎ চতুর্থো গ্রাম যাজক। (ইতি শাতাতপাকা।) প্রামস্থ নানা বর্ণানাং পুরােহিত। সতু চতুর্থে ব্ৰাহ্মণ। গ্রামজী ব্রাহ্মণ মহাপাপী এবং শুত্রবৎ- অসিজীবি মসিজীবি দেবল গ্ৰামযাজকা। পাচক ধীবশ্চৈব ষডেতে শত্রবৎ দ্বিজা। এই স্থলে গ্রাম্যজী ব্রাহ্মণগণের একটু বর্ণনা প্রদানের লােভ সামলাইতে পারিলাম না। ইহার লেখক কবিকঙ্কণ চণ্ডী প্রণেতা মুকুন্দরাম চক্রবর্তী মহাশয়। প্রায় ৩৮৫ বৎসর পূর্বের লোেক— মুখবিপ্র বসে পুরে, নগরে যাজন করে, শিখায় পূজার অনুষ্ঠান। চন্দন তিলক পরে, দেব পূজা ঘরে ঘরে, চালের বােচকা বান্ধি টান।
২০ জলচল ও পদোষ বিচার। গুজরাট নগরে, ময়না ধরে পায় ও গােপ ঘরে দধিভাও, তেলি ঘরে তৈলকুপি ভরি। কোথায় মাসড়কড়ি, কেই দেয় ডাল বড়ি, এমষাজী আনলে সাতারি। নাগরিয়া করে, আমজী করে অধিষ্ঠান। সঙ্গে করি ভিজ কয়, কাহণ দক্ষিণা হয়, হাতে কু দক্ষিণা ফুরণ। যদি এই নবশায়কেরা শুত্র হয়, তবে ইহাদের যাজক ব্রাহ্মণগণকেও পতিত ও শূদ্ৰবৎ হীন হইতে হয়। কিন্তু ইহারা ত সমাজে পতিত নহেন। ব্রাহ্মণ সশজে ইহারা হীন হইলেও ইহাদের কন্যাগণকে উচ্চশ্রেণীর ব্রাহ্মণগণ বিহাৰ্থ এহণ করিতে কুণ্ঠিত নহেন আর আহারাদি সম্বন্ধে ত কথাই নাই। এই সব পতিত ব্রাহ্মণগণের যাজক-পুরােহিত কিন্তু উচ্চ ব্রাহ্মণগণ। ইহার শূদ্র- যাজনের জন্য পতিত হইলে সে পাপে ও সংস্রদোষে সার ব্রাহ্মণ জাতিই পতিত হইয়াছেন বলিতে হইবে। ব্ৰ পতিত। (৮) ব্রাহ্মণের পক্ষে ক্ষুদ্র শিষ্য করা শূদ্রজনের মতই পাতিজনক। যথা—“পুত্ৰ শিযয্যা গুৰুকৈৰ । ঐ তৃতীয় অধ্যায় মা। “যিনি শূদ্র-শিষ্য-যিনি শুভ্রকে অধ্যয়ন করান তাহাদিগকে ইব্যকবে ভােজন করাইবে না। কেন ইহার পতিত ব্রাহ্মণ। ইহার যদি শূদ্র হয় এবং ইহাদের মন্ত্রদাতা গুরুগণ যদি পতিত হন, তবে বঙ্গের প্রায় সমুদয় ব্রাহ্মণই পতিত হইয়াছেন যাহাদের এ সব জাতি শিষ্য নাই তাহারাও শূদ্র-শিষ্য পতিত ব্রাহ্মণগণের সহিত আহারাদি করার দরুণ ও T নায়কগণ পূত্র নহে। যৌন সম্বন্ধে নিশ্চয় পতিত হইয়াছেন। সুতরাং ব্রাহ্মণগণের আপনাদের শুধু ব্রাহ্মণ নাম বজায় রাখিতে হইলেও ইহাদিগকে শূদ্রেতর বৈ ক্ষত্রিয় বলিয়া হণ করিতে হইতেছে। তাহা না হইলে তাঁহাদের নিজেদেরই জাত থাকে না। গণ। উপরি উদ্ধত প্রমাণ দ্বারা আমরা দেখাইতে চেষ্টা করিলাম যে, নবশায়ক গণ শূদ্র নহেশুদ্র হইলে বা তাহাদিগকে শূদ্র বলিলে ব্রাহ্মণের আর ব্রাহ্মণ থাকে না। অন্ততঃ ব্রাহ্মণ্য বজায় রাখিতে হইলেও তাহাদিগকে বৈ ক্রি বলিয়া গণ্য করিয়া লইতে হইবে। আর ইহারা যে বৈ বা ক্ষত্রিয়, তাহার ভূরি ভূরি প্রমাণ প্রদর্শন করা যাইতে পারে কিন্তু এ পুস্তকে তা উল্লেখ করা অনাবশ্যক। পুস্তকান্তরেই আমি তাহা বিশেষ ভাবে প্রদর্শন করিয়াছি। ইহাদিগকে দ্বির্ণাক্তৰ্গত বৈ, ক্ষত্রিয় শ্রেণীতে গণ্য করিবার 'ও প্রাণ করিবার কারণ এই যে—তাহা হইলে ইহাদের অন্ন এহণ যােগ্য ইহাই সি হইতে পারিবে; কেন না ব্রাহ্মণগণ বৈজিষের অন্ন গ্রহণ করিতেন, শা পাঠ ইহা অবগত হইতেছি। প্রথমতঃ ব্রাহ্মণগণ যে বৈশ্য জিমের অ এহণ করিতেন তাহাই প্রমাণ করিয়া অতঃপর প্রমাণ কৰিব যে তাহার সূত্রের অল্পও গ্রহণ করিতেন। পরাশর স্মৃতি কলিকালের ধর্মশার বলিয়া কথিত হইয়াছে। যথা :- কতে তু মানবৰ ধৰ্মক্রেতা গৌতম মৃতঃ। বাপরে শখ লিখিত কলৌ পারত। ২৩ পরাশর সংহিতাম । উক্ত শান্ত লিখিত আছে কলিপি বৈৰে ক্ৰিয়াৰতো অচিতে। তগৃহে বিজৈর্ভোজং কিবোবু নিত্য।
૨૨ জলচল ও স্পর্শদাষ বিচার। “যে সকল ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য ক্রিয়া এবং চিত্ৰতধারী তাঁহাদের গৃহে ব্রাহ্মণেরা সর্বদা “হ্য কবে ভােজন করিবে। মনু আপস্তম্ব গৌতম প্রভৃতি শান্তকারগণের মতামত উদ্ধৃত করিয়া বােম্বাই হাইকোর্টের ভূতপূর্ব প্রধান বিচারপতি পণ্ডিতবর শ্রীযুক্ত রামকৃষ্ণ গােপাল ভাণ্ডারকর এম, এ, পি, এইচ, ডি ; সি, আই,ই; মহােদয় তাহার সুবিখ্যাত “ভারতবর্ষের সামাজিক ইতিহাস” নামক ইংরাজী ভাষায় লিখিত পুস্তকে আহারাদি সম্বন্ধে নিম্নলিখিত মত ব্যক্ত করিয়াছেন। তিনি লিখিয়াছেন- "But in the olden times we see from the Mahabharat and other works, that Brahmaos, Kshatriyas and Vaisyas could eat the food cooked by each other. Manu lays down generally that a twice born should not eat the food cooked by a Sudra (IV. 223 ); but he allows that prepared by a Sudra, who has attached himself to one, or is one's barber, milkman, slave, family friend, and co-sharer in the profits of agriculture, to be partaken (IV. 353 ). The implication that lies here is that the three higher castes could dine with each other. Gautama, the author of a Dharmasutra, permits a Brahman's dining with a twice-born (Kshatriya or Vaisya ) wbo observes his religious duties ( 17. 1) Apasta mba, another writer of the class, having laid down that a Brabman should not eat with a Kshatriya and others, says that according to some, he may do go with men of all the varas who observe their proper religious duties, except with the Sudras. But even here there is a counter excepe tion, and as allowed by Manu, a Brabman may dine with a Sudra who may have attached himself to him with a holy intent.
নবকগণ ৰ নহে। এ সম্বন্ধে বিখ্যাত ঐতিহাসিক শ্রীযুক্ত এলফিনষ্টোন সাহেবও তৎকৃত ভারত ইতিহাসের ২০ পৃষ্ঠায় লিখিয়াছেন- But there is no prohibition in the code agaiost eating with other classes or partaking of food cooked by them (which is now the great occasion for loss of caste) except in the case of Sudras ; and even then the offence is expiated by living on water gruel for seven days ( Manu Ch xl, i53) পুনৰ্বার যুক্ত ভাণ্ডারকর মহাশয় মাজ্জাজে হিন্দুসমাজ সংস্কার সমিতির অধিবেশনে বলিয়াছিলেন Even in the time of the epica the Brahmaps diaed with the Kshatryas and Vaisyas as we see from the Brabmanic-sage Durvasa baving shared the hospitality of Draupadi, the wife of Pandavas প্রাচীন আৰ্য সমাজে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য এবং শেষে কখন কখন শূদ্র এই চতুর্বর্ণের ভিতর আহারাদি চলিত। তৎকালে ক্ষত্রিয় রাজগণ যজ্ঞ করিয়া ব্রাহ্মণগণকে নিমন্ত্রণ করিতেন এবং ব্রাহ্মণগণও সেই সকল নিমন্ত্রণ এহণ পূর্বক যজ্ঞকালে উপনীত হইয়া আনন্দের সহিত ভােজন করিতেন। মহাভারত পাঠ জানিতে পারা যায় যে পাণ্ডবদিগের বনবাস কালে স্বয়ং দ্রৌপদী রন্ধন করিয়া ব্রাহ্মণদিগকে মুনি-ঋষিগণকে ভােজন করাইতেন। পাঠকগণের মধ্যে বােধ হয় অনেকেই অবগত আছেন—প্রাচীন কালে বৈই সূপকার বা পাচক ছিল। বর্তমান কালের মত ব্রাহ্মণের তখন পাক করিয়া দিয়া বেতন লইয়া জীবিকা নির্বাহ করিতে হইত না। তাদের এমন শােচনীয় পতন তখন হইয়াছিল না। বিরাট-রাজভবনে দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীমসেন আপনাকে সূপকার বলিয়া পরিচয় দান পূৰ্ব্বক উক্ত কাৰ্য্যে (বন্ধনের কাৰ্যে) নিযুক্ত হইয়া অজ্ঞাতবাস সমাপ্ত করেন। রাজবাটীতে মুনিঋষি বাহার
জলচল ও পশষে বিচার।
অতিথিংলী হইয়া আসিতেন সকলেই ঐ গৃপকারের অন্নই এহণ করিতেন।
তাতে তাহাদের ব্রাহ্মণ্য লেপ হইত না। এবং নিজেরাও কখন পাক
করিয়া খাইয়াছেন বলিয়া প্রমাণ পাওয়া যায় না।
অতঃপর তথা কথিত রঘুনন্দনৰণিত সূত্রগণের অল্প এহণ সম্বন্ধে শাহ
কারগণ কি বলিয়াছেন আলােচনা করা যাউক। সর্ব প্রথম মনুর কথাই
ধরা যাউক। মনু লিখিয়াছেন
আর্ষিকঃ কুমিত্র দাস গােপালাে নাপিতা।
এতে পুত্ৰেযু ভােজ্যামা যাত্মানং নিবেদয়েৎ ২৫৩
(সংহিতা, ৪র্থ অধ্যায়।)
ভূমিকৰক (অর্ধসীরী, বর্গাদার অর্থাৎ যাহার সহিত আধা আধি ভাগ
ইয়া এক খণ্ড জমিতে চাষ করা যায়), কুমিত্র (অর্থাৎ যাহাদিগের
সহিত পুরুষানুক্রমে বিশেষ মিত্ৰতা চলিয়া আসিতেছে) গােপালক (রাখাল,
ভূত (চাকর), কৌরকার (নাপিত), এবং যে আমি আপনার সেবা
করিয়া নিকটে অবস্থান কৰিব’ এরূপ আত্ম নিবেদন করে, এত শুক্রের অন্নও
ভােজন করা যায়। ভগবান বিষ্ণু বলিয়াছেনঃ-
আৱিকঃ কুমিত্র দাসগােপালনাপিতাঃ।
এতে পূজেবুতােজায়া যাত্মানং নিবেদয়েৎ। ১৬
(বিষ্ণুসংহিতা, ৫৭ অধ্যায়।)
সূত্রে দাস গােপাল কুমিত্রার্কসীরিণ।
ভােক্তার নাপিতবে যাত্মানং নিবেদয়েৎ ॥১৬৮
(
যাকসংহিতা-১ম অধ্যায়।)
দাস-পিতােপালকুলমিত্রাসীনি।
এতে পূৰুে তােজামা বাগান নিবেরে ২০
(ব-সংহিতা-১ম অধ্যায়।)
নবকগণ নহে। মহর্ষি বোস বলিতেছেন- নাগিতায় মিত্রাক্ষসীৰিলাে দাগােপা। দ্রাণামপ্যমীষা ভুক্তাং নৈৰ দু্যতি ॥৫১ (ব্যাস-সংহিতা-১১ অধ্যায়। • ইহাদের অন্ন ভােজন করিলে দোষ হয় না। লীর পিতৃদেব পরাশর ঋষিও বলিতেছেন- দাস নাপিত গােপাল কুল মিত্রাক্ষসীরিণঃ। এতে সূত্রে তােজায়া যান নিদেরেৎ। ১০ (পরাশর সংহিতা-১১ অধ্যায়।) উপরে মনু বিষ্ণু, যাজ্ঞবল্ক, যম, বাস, পরাশর সংহিতা হইতে উপরি উক্ত জাতিগুলির অনুগ্রহণ বিধি ও তাহার বঙ্গানুবাদ উতৃত করা হইল। ভগবান বিষ্ণু স্বয়ং তদীয় সংহিতায় আদেশ করিয়াজ ও ব্যবস্থা দিয়াছেন এবং সঙ্গে সঙ্গে ৫ জন শ্রেষ্ঠ শাস্ত্র প্রণেতা ঋষি অনুমােদন করিতেছেন। এখন ভগবানের আদেশ ও পরাশর, বাস, মহুর অনু লবন করিয়া পণ্ডিতগণের ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে? আধুনিক কালের ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণ কি ভগবান বিষ্ণু ও পরাশর ব্যাস যাজ্ঞবল্ক্য অপেক্ষাও অধিক শত্ৰত নাকি? কিন্তু আমাদের প্রতিপক্ষ পণ্ডিত মহাশয়গণ নিরত হইবার পাত্র নহেন। তাঁহারাও হিন্দুশাস্ত্রের পাতা উলটাইতে ২ শ্লোকের পর শ্লোক ঘাঁটিতে ঘটিতে আদি পুরাণ হইতে পরাশর ভাবধত” বাহির করিয়া দেখিলেন এক ােেক। আর চাই কি? আনন্দে আটখানা। সে ভাটি এইরূপ- দীর্ঘকালং ব্রহ্মচ, দেবরেণ তেলভি তাকা এনীতে। নাসৰণানাং বিবাহক জিতিজি।
জলচল ও স্পর্শদাষ বিচার। ভৌসেতরেষাক্ত পূত্রকেন পরিহঃ। সূত্ৰেযু দাস গােপাল কুলমিত্ৰাৰ্দ্ধসীরিনা। তােজাতা গৃহস্য এতানি লােক গুপ্ত্যর্থ কলেরাদৌ মহাত্মভিঃ। নিৰ্তিতানি কৰ্মাণি ব্যবস্থা পূর্বকং বুধৈঃ ।” অর্থাৎ কলি প্রান্তের পর, মহাত্মা পণ্ডিতগণ পূর্ব প্রচলিত এই সকল কর্ম সমাজ রক্ষার্থে ব্যবস্থা পূর্বক নিষেধ করিয়া গিয়াছেন যথা দীর্ঘকাল ব্রহ্মচর্য, দেবর দ্বারা পুত্রোৎপাদন, পরিণীতা নারীর পত্যন্ত এহণ, অসবর্ণা কন্যার সহিত দ্বিজাতিগণের বিবাহ, দত্তক ও ঔরস ভিন্ন কেএজ এভৃতিকে পুত্র বলিয়া গ্রহণ এবং গৃহস্থের দাস (ভৃত্য), গােপালক (রাখাল), কুমিত্র এবং অর্ধসীরী (বর্গাদার) শুদ্র জাতির মধ্যে ইহাদের অন্ন ভােজন ইত্যাদি। এখন এই আদি পুরাণের বচন হইতে অনেকগুলি প্রশ্ন উদয় হইতেছে। এখতঃ পূর্বে উক্ত হইয়াছে। রুতে ও মানববা ধৰ্মন্ত্রেতায়াং গৌতঃ মৃতঃ। বাপরে শখ লিখিতঃ কলৌ পরাশর স্বতঃ ২৩ (১ম অধ্যায়, পরাশর সংহিতা।) “সত্যযুগে মনু ব্যবস্থাপিত ধৰ্ম্ম, ত্রেতাযুগে গৌতম ব্যবস্থাপিত ধর্ম, বাপর যুগে শৰ লিখিত ধৰ্ম, কলিযুগে পরাশর নিরূপিত ধর্ম।” ইহা যদি সত্য হয় অর্থাৎ কলিযুগের ধর্ম যদি পরাশর মতানুযায়ীই হয় তবে মহাত্মা বুধগণ (পণ্ডিতগণ) কেমন করিয়া কলির প্রারম্ভেই পরাশরের আইন উল্টাইয়া দিয়া নূতন আইন প্রবর্তন করিতে পারেন ? সখ কলিযুগের জন্য ব্যবস্থা হইল পরাশরের ধর্ম ও বিধি। সেই পরাশরের বিধি অনুসারে কাজ না করিয়াই পণ্ডিতগণ কলির প্রথমেই নূতন হাতগড়া আইন জারি নবায়কগণ পূত্র নহে। হ করিতে পারেন কিরূপ? বরং এরূপ লিখিলে কতটা সম্ভবপর হইত যে পরাশরের বিধি কলির সিকিকাল কি অর্ধেককাল গত হওয়ার পর। পণ্ডিতগণ দেখিলেন ঐ বিধি সমাজের পক্ষে অকল্যাণকর ইয়া উঠিল, তখন ঋষিগণ বা মহাত্মাগণ নুতন বিধি রচনা করিয়া পরাশরের বিধি উল্টাইয়া দিতে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। নতুবা ঋষিগণ যাহাকে কলিযুগের জন্য ধর্মশাস্ত্র প্রণয়ন করিতে অনুরােধ ও আদেশ করিয়াছিলেন, পণ্ডিতগণের কি সাধ ও সাহস যে তাঁহাদের ব্যবস্থা উঠাইয়া দিয়া নূতন ব্যবস্থা, নূতন হুকুম জারি করিতে পারেন ? পরাশরের তুল্য অন্য কোন ঋষি হইলেও না হয় মানিয়া লওয়া যাইত, কিন্তু পণ্ডিতগণের কলম ঋষির উপর জারি করা নিতান্তই শােভন হয় নাই। ইহা যেমন দৃষ্টি ও ঐতি কটু তেমনি মূখ্যঞ্জক হইয়া পড়িয়াছে। দ্বিতীয়তঃ পরাশর নিজে বিধি ৰচনা করিয়া নিজেই উহার প্রতিকূল মত কেন আদি পুরাণ হইতে উদ্ধত করিতে যাইবেন? তৃতীয়তঃ ইহা আদি পুরাণের বচন। পুরাণের স্থান শাস্ত্রকারগণ তিসংহিতার নিয়ে প্রদান করিয়াছেন। পুরাণের প্রামাণ্য ততটুকু যতটুকু তিসংহিতার সহিত উহার সমতা থাকে। স্মৃতিসংহিতার সহিত উহার যখনই—যে অংশই গরমিল ও মত বৈধতা উপস্থিত করিবে তদণ্ডেই সেইটুকুই অগ্রাহ। যেহেতু শাস্ত্রকার বলিতেছেন তি-স্মৃতি-পুরাণানাং বিরােধঃ যত্ৰ দৃশ্যতে। তত্র শ্রোতং প্রমাণস্তু তমােবধে স্মৃতিরা। অর্থাৎ যে স্থানে বেদ, স্মৃতি ও পুরাণের পরস্পর বিরােধ দৃষ্ট হইবে, তথায় বেই প্রমাণ। আর স্মৃতি ও পুরাণের পরস্পর বিনােধ হইলে স্মৃতিই প্রমাণ। সুতরাং মনু, বিষ্ণু, যাজ্ঞবৰু, পরাশর, বাস ও যম-সংহিতার বচনের সহিত পুরাণ শাস্ত্ৰ আদি পুরাণের বচনের বিরােধ উপস্থিত হওয়ায় উপরের শ্লোক অনুযায়ী আদি-পুরাণের ঐ বচন অশাহ হইয়া গেল। বিশেষতঃ বেদব্যাস ঋষি
চল ও স্পলিং বিচার।
আপন রচিত সংহিতায় যাহা লিখিলেন তাহা কি আবার নিজের আদি পুরাণে
খল করিয়া দিবেন। ইহা সম্ভবপর মনে হয় না। নিজেই একস্থানে বিধি
দিয়া আবার নিজেই উহা কি অবিধি বলিয়া লিখিতে পারেন। মনে হয় না।
আমাদের মনে হয় ঐ শ্লোক অতি আধুনিক এবং আদিপুরাণে প্রক্ষিপ্ত না
হইলেও উহা নাৱতঃ অগ্রাহ। আর না হয় যদি বুঝিতাম যে, সংহিতাকার
এক যােগে ভূত, গােপাল, কুমিত্রাণের অল্প এহণ যোগ্য বলিলেও
আদিপুরাণের ন্যায় অন্যান্য পুরাণকারগণ ও উহার বিরুদ্ধে মত দিতেছেন, কিন্তু
তাহ ত নয়। পৌরাণিক বিধিতেও উহার অনুকুল মতই লিখিত আছে।
যথাঃশূদ্রে দাসগোপাল-কুলমিত্ৰাণীরিণ।
ভােলা নাপিতকৈৰ বচন নিয়েৎ।
(গরুড়পুরাণ, পূর্বখণ্ড, ৯৫৬৬)
पनि
আর্থিক কুলমিত্র গােপাল দাস নাপিতে।
এতে সূত্রে ভােজালা বাত্মানং নিবেদয়েৎ।
(কুৰ্ম্মপুরাণ, উপরিভাগ, ১৭-১০)
এতৎ সঙ্গে আরও দুইটা বিশেষ বিধি কৌতুহল চরিতার্থ করিবার জন্য
উত করা যাইতেছে
কুশীলব কুতকারঃ কেএকক এব চ।
এতে সূত্রে ভােজ্যান্ন দ্যা স্বয়ং পণং বুথৈ ।
( কূৰ্ম্মপুরাণ, উপরিভাগ, ১৭-১৮)
নট, কুকার, কৃষক ইহাদিগকে অবমূল দিয়া ইহাদের অল্প ভােজন
করিতে পারা যায়।
পাস মেংপং বসেগরুসহ সব।
পিকৰৈ তৈল পূজা এবং বিতিতি।
(পুরা, উপরিভাগ, ১৭)
f
নবীগণ - নহে। পাস, জলােপসে তীত তালি দেহ যারা পৰু ৰ (মােহনভােগ প্রভৃতি), শকু। ছাতু), পিণ্যাক (তিলের খৈল) ও তৈল এই সকল বস্তু ব্রাহ্মণেরা শূদ্রের নিকট হইতে এহণ করিতে পারিবেন।(১) সাংহিতিক যুগের ন্যায় তৎপরবর্তী পৌরাণিক যুগেও কুকার, নরসুন্দর ও কুষকাদির অন্ন ভােজ্যান্স ছিল, উল্লিখিত বচন দ্বারা ইহা স্থির হইতেছে। দেশ কাল ও পাত্র অনুযায়ী শাস্ত্রের বিধি পরিবর্তনশীল। ব্রাহ্মণ-শান্ত-গে কলমের জোরে ইহাদিগকে শুদ্ৰ সংজ্ঞায় অভিহিত কৰিলেও মন প্রাণে জানিতেন ইহারা হন শূদ্র নহে এবং কৃষি বাণিজ্য ব্যবসায়িশের বিপুল ঐশ্বৰ্য্য, অতুল ধন ধান্য, অমিত বৈভব দেখিয়া সহসা লােভও সংবরণ করিতে পারেন নাই। তাই পায়সাদি মূখমােক সুস্বাদু আহারের ব্যবস্থা দিয়াছেন। অন্ন বাদ দিয়া এখানে শুধু পায়, তপৰু নােহনভােগাদির ব্যবস্থা আছে। ফলতঃ এই সমকৃষক আদি জাতি কখনও শূদ্র ছিল না ইহা শাস্ত্রকারগণ মনঃ প্রাণে বিলক্ষণ বুঝিয়াছিলেন। কিন্তু নিজেদের গৌরব সর্বোচ্চ স্থানে প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য, ব্রাহ্মণ ব্যতীত অন্যান্য সমুদয় জাতিকে তাঁহাদের বহু নিয়ে অবনত করিয়া রাখিবার জন্য ইহাদিগকে বৈদি সংজ্ঞা হইতে অপহৃত করিয়াও ইহাদের মায়া ইহাদের প্রদত্ত অন্ন ব্যঞ্জন পায় মােহন তােগাদির মায়া ও লােভ পরিত্যাগ করিতে পারেন নাই। শুধু পুথিগত ভাবেই বহুদিন পর্যন্ত শূদ্ৰ সংজ্ঞায় নাম লিখিয়া রাখা হইয়াছিল। কলমের খোঁচায় ইহাদিগকে যে শূদ্রদে পরিণত করা হইল, ইহা তাহাদিগকে কোন প্রকারেই জানিতে দেওয়া হয় নাই। অন্নাদি যথারীতি ব্যবহৃত হইত, সম্মানের কোন প্রকার লাঘব করা হইল না। এইরূপ ভাবে, কি বহুদিন অতিবাহিত হইবার পর, ব্রাহ্মণগণ সুষােগ ও সুবিধামত আপনাদের পুথিগত ব্যবস্থা তখন আস্তে ১) পূৰে ভেলি বা এ জাতীয় পূ ছিল, 'তাহাৱাই লৈ ৰোগাইত এখন কিন্তু ব্রাশর তৈল বেলায় মূলৰাৰ কলু। পাতে হিম তৈলই এশষে, মুসলমানের নহে। পণ্ডিত মণ কি ?
জল ও স্পাদোষ বিচার। আস্তে কার্যে পরিণত করিয়া ক্রমে ক্রমে ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য বংশের অস্তিত্ব কলমের খোঁচায় শান্ত্রের নামে লােপ করিয়া ফেলিয়ানে, ফলে ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যের অস্তিত্ব লােপ পায় নাই নামান্তর পরিহণ করিয়াছে মাত্র। বলে ক্ষত্রিয় বৈশ্যের নাম না থাকিবার ইহাই মূল কারণ, ইহাই যুক্তি সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা ! এইত ভূরি ভূরি শান্ত্রের মত উদ্ধৃত করিয়া দেখাইলাম--এক্ষণে শাস্ত্র সৰ্বস্ব বচন-বাগীশ হিন্দু-সমাজ কি এই বিধি মানিতে প্রস্তুত আছেন ? এখন মানিলেও শীঘ্রই মানিতে হইবে। বিংশ শতাব্দি সমূদয় জড়তা, সমুদয় গোঁড়াশী-নষ্টামী-ভণ্ডামীর মূল উপড়াইয়া ফেলিয়া তবে ছাডিবে । তােনাদের বর্ণাশ্রম ধর্ম পদ্মার পার ভাঙ্গার মত ভাদিতে আরম্ভ হইয়াছে। কার সাধ্য ইহার গতি রােধ করে ? গলা বাজিতে ও আামীর ন্যাকামীতে এ ভাজা আর মােধ করিতে পারিতেছ না। মঙ্গলময় বিধাতা শ্রীহস্তে নূতন ভারতের নূতন সজীব হিন্দু সমাজ গঠনের পতন আরম্ভ করিয়া দিয়াছেন ভ্রান্ত সমাজপতি। বৃথাই ইহার গতি রােধ করিতে অনর্থক গলাবাজী করিয়া চীৎকার করিয়া শক্তি ক্ষয় করিতেছ মাত্র। তােমার শত চীৎকার, সহ আর্তনাদ, সে নির্বিকার নবসমাজগঠনকারী বিধাতা পুরুষের ইচ্ছাব গতি- রােধ করিতে সমর্থ হইবে না। শাস্ত্রের নামে কপটতা, ধর্মের নামে প্রতারণা, ঋষিগণের নামে প্রবঞ্চনা, আর কতকাল চলিতে পারে ? শাস্ত্রের নামে লােকা- চার, দেশাচার, স্ত্রী আচার, কুলাচার এবং অনাচার-অত্যাচার দেশবাসীর, হৃদয় আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিয়াছে। অবিচার যতটা করা সম্ভব করা হইয়াছে। আর । যথেষ্ট হইয়াছে। আর তর্কচূড়ামণি স্মৃতিরঙ্গের বেদ ব্যাখ্যায়, ন্যায়েব কচকচিতে, ঘটত্ব পটত্বের বাগ-বিচারে, দেশবাসী তৃপ্ত হইতে পারিতেছে না। আর তােমাদের ৬ জনের ব্যাখ্যার উপর নির্ভর করিয়া বাকি ৯৪ জন চোখে তৈল দিয়া ঘুমাইতেছে না। এইবার তাহাৱা জাগ্রত হইয়াছে, আপনাদের স্বার্থ, কল্যাণ ভালরূপেই বুঝিতে পারিতেছে। ধর্মের নামে শান্ত্রের নামে নায়কগণ পুত্র নহে। জিনিষ দিয়া এতকাল তাহাদিগকে ভুলাইয়া রাখা হইয়াছে। এখন। তাহারা খাঁটি নকল বিলক্ষণই বুঝিতে পারিতেছে। স্ত্রী আচার লােকাচার দেশচারের নামে দেশের অগণ্য লােককে কুকুর বিড়াল অপেক্ষাও ঘৃণিত ভাবে রাখা হইয়াছে। মঙ্গলময় ভগবানের প্রাণপ্রিয় সন্তানগণকে, দেশের অন্তিমজ্জা স্থানীয় অগণ্য অধিবাসীকে, সমাজের জাতির মেরুদণ্ডস্বরূপ কোটি কোটা প্রকৃতি পুঞ্জকে, চুংমার্গের দোহাই দিয়া অচল অস্পৃশ্য অব্যবহার্য পঙক্তি নির্বাসন করিয়া দিয়াছ। দেবালয়ের পবিত্র মণ্ডপেও তাহাদের প্রবেশ অধিকার বন্ধ করিয়া দিয়াছ। পবিত্র দেবমন্দির ধ্বণায় হিংসায় চুর্গে ক্রীমি বিষ্ঠায় কলঙ্কিত করিয়াছ। পদদলিত নিপীড়িত বুভুক্ষিত জনমণ্ডলীর বুকের রক্ত দিয়া, ক্ষীণ কঙ্কাল দিয়া, মেদ মাংস দিয়া, দেব মন্দিরের উচ্চ চূড়া তুলিয়াছ কিন্তু উহাতে তাহাদের প্রবেশাধিকার নাই! তাহার টাকা দিবে, পয়সা দিবে, অলঙ্কার দিবে বন্ত্র দিবে, চাল দিবে, দাল দিবে কিন্তু একটু জল দিতে পারিবে না। কেন এ অবিচার? তুমি সমাজপতি গর্বিত ব্রাহ্মণ, মদ গর্বে ধরাকে সরা জ্ঞান করিয়া তাহাদিগকে দূর দূর করিতেছ কিন্তু প্রভু ত আমার কাহাকেও ত্যাগ করেন না। তাহার কাছে সব সমান। তার কাছে ত ছােট বড় নাই, তার কাছে ত উচ্চ নীচ, ধনী দরিদ্র, ব্রাহ্মণ চণ্ডাল ভেদ নাই। তুমি অন্ধ জাত্যভিমানে স্ফীত হইয়া তাহাদিগকে মনি- রের ত্রিসীমানায় প্রবেশ করিতে দিতেছ না বরং দুর দুর করিয়া তাড়াইয়া দিতেছ—কিন্তু ঐ যে মন্দিরের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা, করুণার মহালধি, দয়ার আধাৰ, সৰ্ব্ব জীবের শরেণ্য বরেণ্যপ্রেমময় পিতা আমার ছল ছল নেত্রে কাতর দৃষ্টিতে বা প্রসারণ করিয়া ডাকিতেছেন—“ওরে যানে বাসনে ফিরে আয়, আমার বুকে আয়, এখানে ব্রাহ্মণের ভয় নাই পুরােহিতের চোখ, বাঙ্গানি নাই, সমাজপতির কুটীল কুটী নাই। আমার কাছে চণ্ডাল নাই, পাডিয়া নাই, মেঘ নাই, মুদাফরাস নাই, মুচি নাই, ডােম নাই, হাড়ি নাই ম্যাথর নাই, আয় আয় ! কোলে আয়। আহা তােদর বড় বেদনা, বড় কষ্ট, চল ও শালাৰ বিচার। তােদর ব্যথা যে আমি সইতে পারি না। মূঢ় অত্যাচারিগণ, ব্রাহ্মণাদি সমাজপতিগণ, তােদের শীর্ণ দেহে, কাল শরীরে, দানি-ই-অত্যাচার নিপীড়িত দুর্বল অজে যতগুলি আঘাত দিয়াছে, যতবার পদদলিত করিয়াছে, লাথি ভূতা মারিয়াছে—এই দেশ সবগুলিই আমার অঙ্গে, আমার পৃষ্ঠে ফুটিয়া উঠিয়াছে। পতিত আর্ত কাঙ্গাল যে আমার অভিজ্ঞদেহ! আমার যাহার অভিদেহ, আমার যাহারা সন্তান, মৃঢ় অভিজাতবর্গ বৃথা জাত্যভিমানে অন্ধ আন শূন্য হইয়া তাহাদিগকে ক্বা অবজ্ঞা করিয়া, পদদলিত লাহিত করিয়া আমারই লালা করিতেছে, কিন্তু ইহাই শেষ নহে, ইহারও পরিণাম আছে। পিতার মন্দিরে কি ব্রাহ্মণ চাল উত্তন অধমের ভেদ আছে? পবিত্র দেব মণ্ডপে কি উচ্চ নীচ, মহৎ ক্ষু, জাতি বিজাতি আছে। এখানে সকলের সমান প্রবেশ অধিকার। আমি যাহাকে কোল পাতিয়া এহণ করি, মূঢ় ব্রাহ্মণগণ তাহাদিগকে আড়াইতে চায়। কি ভ্রান্তি। কি আস্পর্ধা। কি গর্ব!!” কলিগ পাতার আমার মহাপ্রভু শ্রীগৌরাঙ্গও ত এইরূপ কথাই মুখে বলিয়াছেন ঈশ্বরের কৃপা জাতি কুলাদি না মানে। বিদুরের ঘরে কৃষ্ণ করিলা ভােজনে। (মধ্যলীলা, চৈতন্যচরিতামৃত।) যে সুবর্ণবণিক জাতিকে মহারাজ বল্লাল সেন “বিষ্ঠার কীৰিকীট তুল করিয়া ছাড়িব বলিয়া ভয় দেখাইয়াছিলেন, যাহারা বিশুদ্ধ বৈ বর্ণান্তর্গত হইয়াও বল্লালের অত্যাচারে সমাজে পতিত হইয়াছে, তাহাদের পূর্ব পুরুষ গণের সহিত তাৎকালিক ব্রাহ্মণগণ কিরূপ ব্যবহার করিয়াছেন, পাঠকগণ শুনিলে আশ্চর্যান্বিত হইয়া যাইবেন। প্রায় ৫০০ বৎসর পূর্বে যে জাতির অন্ত্র ব্রাহ্মণগণ সকলে মিলিয়া ভােজন করিতেন, তাহাদেরই কিনা আজ জল অচল! তাহারাই কিনা আজ অহেয়, অবাত, মন্দিরে প্রবেশাধিকার
নায়কগণ ক্ষুদ্র নহে।
৩৩
বজ্জিত। অধিক দিনের কথা নহে, খৃষ্টীয় ষােড়শ শতাব্দীর প্রথম ভাগে
প্রেমাবতার মহাস্থা নিত্যানন্দদেব সপ্তগ্রামে সুবর্ণবণিকৰণীয় উজারণ দতের
গৃহে তৎকর্তৃক প্রস্তুত অ-ব্যঞ্জনাদি ভােজন করিতেন ও সকলে মিলিয়া
মহােৎসব করিয়াছেন। এ সম্বন্ধে ব্যাসাবতার শ্রীল বৃন্দাবন দাস গােস্বামী
মহাশয় তলিখিত শ্রীচৈতন্য ভাগবত নামক বৈষ্ণৰ জগতের বিখ্যাত
প্রামাণিক গ্রন্থে এইরূপ লিখিয়াছেন—“উদ্ধারণ দত্তকে সঙ্গে লইয়া শ্রীমন্নিত্যা-
নন্দ মহাপ্রভু অম্বিকানগরে উপনীত হইয়াছেন। তথায় সূৰ্য্যদাস পণ্ডিতের
কন্যা শ্রীমতী বসুধা দেবীকে বিবাহ করার প্রস্তাব উত্থাপন করিলে কুলাচার্য্য
গণ তাহার পরিচয়, আহারাদি কিরূপে সম্পাদিত হয়, জিজ্ঞাসা করিলেন।
প্রশ্ন :—শ্রীপাদের নিতি নিতি ভিক্ষা আয়ােজন।
স্বপাক করহ কিম্বা আছয়ে ব্রাহ্মণ ?
উত্তর : প্রভু কহে কখন বা আমি পাক করি।
পাৰিলে উদ্ধারণ রাখয়ে উতারি।
এই মত পরিবর্তরূপে পাক হয়।
শুনিয়া সবার মনে লাগিল বিশ্রয় ।
প্রশ্ন :তাব কহে এ বৈষ্ণব, হয় কোন জাতি।
পূর্বাশ্রমে কোন নাম, কোথায় বসতি।
উত্তর প্রভু কহে ত্রিবেণীতে বসতি উহার।
সুবৰ্ণবণিক দেখি করিনু স্বীকার
বৈকুলেতে জন্ম, হয় সদাচারী।
এ জন্য উহার অন্ন,স্বণা নাহি করি।
সেই দিন হইতে নিত্য নিত্য মহােৎসব।
আসিয়া মিলয়ে যত আত্ম বন্ধু সব।
প্রভু আজ্ঞাসতে দত্ত বয়ে বন্ধন।
নিত্য নিত্য শত শত ভুঞ্জয়ে ব্রাহ্মণ - প্রীচৈতন্য ভাগবত।)
জলচল ও স্পর্শদোষ বিচার। পাঁচ শত বৎসর পূর্বে যে জাতির বন্ধন-অন্ন শত শত ব্রাহ্মণ নিত্য ভােজন করিতেন, পাঁচশত বৎসর পর সেই সুবর্ণবণিকজাতি জল স্পর্শে অবােগ্য অনাচবনীয়! কি পরিবর্তন! অথচ বলা হয় “আৰ্য্য হিন্দু সমাজ কোনরূপ পরিবর্তনের পক্ষপাতী নহেশত অত্যাচারে, শত বিপ্লবেও ইহা অচল অটল, হিমাদ্রীর মত ঠিকই রহিয়াছে, কাহারও সাধ্য নাই ইহার পরিবর্তন সাধন করিতে পারে ? কত কালাপাহাড় কালের স্রোতে ভাসিয়া গিয়াছে, কত বুদ্ধ রামমােহনই না হয়রান হইয়া গিয়াছে, তােমরা ২১০ জন রাম খাম পরিবর্তন করিতে চাও, এত বড় দুরাশা তােমাদের? ইত্যাদি।” কিন্তু বিজ্ঞ পাঠকগণ দেখিতেছেন ভারতীয় হিন্দু সমাজ যেমন পরিবর্তনশীল এমন পরিবর্তশীল বােধ হয় ভূমণ্ডলের কোন সমাজই নহে। কি ছিল আর কি হইয়াছে। স্ত্রী পূরুষের অবাধ মিশ্রন ছিল, ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য শূদ্রের মধ্যে বিবাহ ছিল, আহারাদি ছিল, দেবরাদির দ্বারা ক্ষেত্ৰ পুত্ৰ উৎপাদনের নিয়ম ছিল, সমুদ্রযাত্রা, বিধবা-বিবাহ ছিল, সতীদাহ ছিল, কতই না ছিল এখন কোথায় সে গুলি ? যাঁহারা অন্ধ তাহারাই বলিকেন, সনাতন হিন্দু সমাজের কখনও পরিবর্তন হয় নাই কখনও হইবেও না। যে পবিত্র সুবর্ণ- বণিক জাতি চিরকাল বৈশ বলিয়া পরিচিত, যাহাদের কন্যা ব্রাহ্মণগণ বিবাহ করিয়াছেন, যাঁহাদের অন্ন ব্রাহ্মণগণ গ্রহণ করিয়াছেন, সেই বৈধ সুবৰ্ণবণিক জাতিকে, হীন চরিত্র পাপিষ্ঠ লম্পট বল্লালসেন নিজের খেয়ালমত পতিত পঙক্তি নির্বাসিত করিলেন, আর সমাজপতি ভীরু কাপুরুষ, ভয়ে ভীত পরন্তু অর্থে প্রতিপালিত ব্রাহ্মণপণ্ডিতগণ সেই অন্যায্য, অনাৰ্য্যোচিত, সবিরােধী মতকে ভগবান বেদব্যাসের মত বলিয়া শির পাতিয়া মানিয়া লইলেন। হা বিক। হিন্দুসমাজের কর্ণধার ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণকে! যাহাদের ভয়ে স্বর্গের দেবতাগণসহ ইন্দ্র পর্যন্ত কম্পবান ছিলেন, যাঁহাদের ভয়ে ভারতের ক্ষত্রিয় রাজগণ সিংহাসনে বসিয়াও কম্পিত কলেবর থাকিতেন, যাদের সম্মান খং শ্রীকৃষ্ণ পৰ্যন্ত করিতেন লিলা বলা হইয়া থাকে সেই নবশয়িকগণ পুত্র নহে। ভূদেব ব্রাহ্মণগণ, জিলােক পূজনীয়, ধর্ম বেদ ও সত্যরক্ষক ব্রাহ্মণগণ আজ কিনা পাপিষ্ট বল্লালের অন্যায় অশাস্ত্রীয় অবৈদিক প্রার্থনা নয়শােধ নয় বৃণিত আদেশবাক্য মাথা পাতিয়া গ্রহণ করিলেন। মাথা পাতি এণ করিলেন না, ব্রাহ্মণ্য-গৌরব অতল জলে ডুবাইয়া দিলেন। কাৰ্য না করিয়া, ব্রাহ্মণের গৌরব রক্ষা না করিয়া, ব্রাহ্মণ্যতে বিকসিত না করিয়া, শুধু মুখে মুখে চীৎকার কৰিলেই ব্রাহ্মণ্য-গৌরব লাভ করা যাইবে না, ব্রাহ্মণ্যতে ফিরিয়া আসিবে না, তার জন্য সংযম চাই সাধনা চাই, তার জন্য ত্যাগ স্বীকার চাই, পরার্থপরতা চাই, তার জন্য তপস্তা চাই, সিদ্ধি চাই। বল্লালসেন ব্রাহ্মণগণের ক্ষমতা বিলক্ষণই অবগত ছিলেন, তাই হীন জাতীয় ডােম কন্যার পাণিগ্রহণ করিয়াও মনে করিয়া ছিলেন তঁাহার ঐশ্বৰ্য্য, তাঁহার সমর প্রভাবের ভয়ে কেহ তাঁহার অনুষ্ঠিত প্রিয় কার্যের প্রতিবাদ করিবেন না। কিন্তু তাহা হইল না, বিভিন্ন জাতির মধ্যে ঘােতর বিপ্লবের সূত্রপাত হইল। বল্লালসেন তদীয় অপূর্ব রূপ-লাবণ্যবতী নব প্রণয়িনী ডােমকন্যার অন্ন গ্রহণ করিবার নিমিত্ত সমাজের সমুদয় ব্যক্তিকে বাধ্য করিতে চেষ্টা করিলেন, ইহাতে অনেকেই আপন আপন জাতি-ধর্ম-কুল রক্ষার্থে ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যে পলায়ন করিতে বাধ্য হইলেন। বল্লালের ডােমকন্যা বিবাহ ও তাঁহাকে সমাজে চল করার অভিপ্রায় বিষয়ক কিঞ্চিৎ প্রমাণ উদ্ধৃত করা যাইতেছে। কবিবর যদুনন্দন কৃত “চাকুরে” এইরূপ লিখিত আছে - একদিন গেল রাজা মৃগয়া করিতে। ত্যজিয়া বিপিন রাজা গেল লােকালয়ে। তথায় বসতি করে ডােমের আশ্রয়ে। সেই রাত্রি তথায় রহিল উপবাসী। মিলিলেক ডােন কন্যা প্রাতঃকালে আসি।
জলচল ও স্পর্শদাৰ বিচার। বিবাহ করিৰ বলি লৈয়া আইলা ঘরে। যে ওনে যে জানে শত নিন্দা করে। যদি কালক্রমে রাজা শুনে নিশাবাণী। সৰ্বস্ব হরিয়া তারে তাড়ন তখনি । ব্রাহ্মণ পণ্ডিত আনি করায় বিচার। শাস্ত্রমতে কাৰ্য করি কি দোষ আমার। মহারাজ বল্লালসেন ডােমকন্যা বিবাহ করিয়া এবং তাহার হন্তস্পৃষ্ট অন্ন গ্রহণ করিয়া জাতিচ্যুত হন নাই। ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণ তাহাকে “পতি” দিয়াছিলে। এখন এ দেশে সমাজগহিত শাস্ত্রবিদ্ধ, ধর্ম নিন্দিত কাৰ্য্য করিয়াও লােকে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণ হইতে পাঁতি সংগ্রহ করিতে পারে। কিন্তু এই সকল কার্য সমাজ ও দেশের যাবতীয় লােক একমতে গ্ৰহণ করিবে এ কথা বলা যায় না। এখনও এ দেশে কেহ জাতিচ্যুত হইতে হয় এরূপ কাৰ্য্য করিলে তিনি স্বপক্ষে কতক লােক যে না পান তাহা নহে। অপিচ পাপানুষ্ঠানাকারীর অর্থ-সম্পদ-প্রতিপত্তির উপর তাঁহার সমর্থনকারীর সংখ্যা বহুল পরিমাণে নির্ভর করে। হিন্দু রাজা অসীম প্রতাপশালী বল্লালরূপমােহে মুগ্ধ হইয়া, অস্পৃশ্য ডােমকন্যাকে নিজ অঙ্কশামিনী করিয়াই ক্ষান্ত হন নাইশমাজে তাহাকে চালাইবার জন্য চেষ্টা করিয়াছিলেন—এবং পরিশেষে তাহাকে সমাজে চালাইয়াও ছিলেন। “এই (ডােমকন্যা) পদ্মিনীর পাম্প ব্যাপারে মহারাজ বল্লালসেন নিমন্ত্রণ কৰিলে বৈদগণ তৎপুত্র লক্ষ্মণের উপদেশানুসারে স্ব স্ব উপবীত পরিত্যাগ পূর্বক শূদ্র বলিয়া পৰিচয় দিতে আরম্ভ করেন। এই উপলক্ষে বৈদ্যগণের মধ্যে লক্ষণী ও বল্লালী দুইটা থাক হয়, তাহা অদ্যাপি বর্তমান আছে।” (১) (১) নােম মাএীত কলেজিস।
নবায়কগণ মূল নহে। ‘পদ্মিনী ডােকন্যার পাকস্পর্ষ ব্যাপার সত্য। কাহাকে লইয়া এই পাকস্পর্শ হইয়াছিল। প্রায় সকল ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ-মহারাজের এই সমন্বয় ব্যাপারের কোন না কোন প্রকারে সংষ্ট ছিলেন। যে সকল ব্রাহ্মণ, বৈদ্য এবং কায়স্থ এই অনাৰ্যাচার সহ করিতে পারেন নাই তাঁহাদিগকে দেশত্যাগ করিতে হইয়াছিল। “উৎপাত করিয়া রাজা না খুইলা দেশ। স্ব স্থান ছাড়িয়া সবে গেলা অবশেষ। “এই অত্যাচারিত, স্বধর্মপরায়ণ ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্যগণ বালের রাজত্বের সীমা অতিক্রম করিয়া বর্তমান নােয়াখালি, কুমিল্লা, পূৰ্বময়মনসিংহ প্রভৃতি স্থানে উপনিবেশ স্থাপন করিলেন। সে সময় মধুপুরের বন নিবিড় জল, গৌড় এবং কোচ রাজ্যের সীমান্ত দেশ ছিল। কালক্রমে এই প্রকৃত বিশুদ্ধ ব্রাহ্মণ্য তেজঃ মণ্ডিত ব্রাহ্মণ, কায়স্থ ও বৈদ্যগণ কোচ প্রভৃতি অনুন্নত জাতীয় রাজগণের রাজ্যে বাস করিয়া ক্ৰমশঃ তাহাদিগের পূর্ব গৌরব ভ্রষ্ট হইয়া পড়েন অথচ যে সকল ব্যক্তি রাজকোপ-ভয়ে অধৰ্ম সমর্থন করিয়া দেশে ছিলেন তাহারা সমুন্নত প্রদেশে বাস নিবন্ধন ক্রমশ উন্নতির দিকে অগ্রসর হইতে ছিলেন। “মহারাজ বল্লালের এই কদাচার দুষ্ট ডােকা বিৰাং তৎকালীয় হিন্দু সমাজ অবনত মস্তকে সমর্থন করিয়াছিলেন। সেই হিন্দু বংশধরগণের ডােমকন্যা অপেক্ষা উন্নত জাতি সমূহের হতে বর্তমান সময়ে আহার ত দূরের কথা, জলটুকু গ্রহণেরও আপত্তি। হ! আচা-দোহাই-সৰ্বস্ব হিন্দুসমাজ। তােমার কিই না অধপতন ঘটিয়াছে। ঢােমকন্যায় অত্র এহণ চলিল, আর সাহা সুবর্ণবণিক নাহিষ্য—যােগী সুত্রধর নমশূদ্রগণের জলটুকু চলে না! তাহাতে জাতি যায়, ধর্মযায়, ব্রাহ্মণ্য লােপ পায় ! “আর কৌলীন্য-গৰ্ব্ব-বিমূঢ় তুমি কুলীন, বল্লালের এই অশাস্ত্রীয় পতিত বিবাহ ধর্মের শিরে পদাঘাত করিয়া সমর্থন ও অনুমােদন করিয়াছিলে, তাহার জলচল ও স্পর্শদাষ বিচার। ফলে গৌৰবাত্মক উপাধি লাভ করিয়াছ এবং এখন ও শিরে সেই কলঙ্ক রাশি ৰহন করিয়া জন সমাজে কুলীন বলিয়া পরিচয় প্রদান করিতেছ। যাহারা বল্লালের এই দুকার্যের সহায় ও সঙ্গী ছিলেন তাঁহারাই উচ্চ সম্মান লাভ করিলেন! সে কালেও রাজানুগৃহীতের ভাগ্যে উপাধি লাভ হইত। বল্লালের এই অনুগ্রহ ও উপাধি দানের মূলে কি ছিল আমরা উপরে তাহার আভাস প্রদান করিলাম। বর্তমান বল্লালী কায়স্থ, ব্রাহ্মণ ও বৈদ্য সংখ্যায়, ধনগৌরবে এবং বিদ্যার প্রভাবে বঙ্গদেশের শীর্ষস্থান অধিকার করিয়া আছেন। এক্ষণে আমার বক্তব্য এই যে, যাঁহারা যে উচ্চ শ্রেণীর হিন্দু সন্তান ডেমকার অন্ন গ্রহণ করিতে কুণ্ঠিত হন নাই, তাহাদের বর্তমান বংশধরগণ ডােন অপেক্ষা কোটি গুণে সমুন্নত হিন্দু জাতির জলপান করিতে ধর্মচ্যুত, জাতিভ্রষ্ট ও কুষ্ঠিত হইকেন কেন?” (১) কিন্তু পাপিষ্ঠ বল্লালের অত্যাচার ও অবিচারের এইখানেই শেষ নহে। ইহার দ্বিতীয় কীর্তি সুবর্ণবণিক প্রভৃতি বৈশ্যগণের পাতিত্ব বিধান ও দেশ হইতে নির্বাসন! বল্লালের চরিত্রহীনতা, ধর্মহীনতা, পরীতে লােভ, পরধনে অন্যায় হস্তক্ষেপ প্রভৃতির কথা আমরা পূর্বে উল্লেখ করিয়াছি। একদা দুষ্ট বল্লাল রাজকোষে অর্থের অল্পতা হওয়ায় বিশেষ চিন্তিত হয়েন। ঐ সময়ে বাণিজ্যাদি দ্বারা সুবর্ণবণিক জাতি বিশেষ ধনবান হইয়া উঠিয়াছিল, বল্লাল তাহাদের অনেকের নিকটে অনেক মুদ্রা গ্রহণ করেন। কিন্তু তাহাতে ও রাঙ্গার মনােল পূর্ণ না হওয়ায়, অবশেষে সুবর্ণবণিক জাতীয় মহা ধনবান বল্পভান আঢ্যর নিকট পূনরায় প্রচুর অর্থ ঋণ স্বরূপে গ্রহণ করিয়াছিলেন। এই সময়ে মণিপুরে সংগ্রাম উপস্থিত হয়, সেই যুদ্ধের ব্যয় এ বল্লাভানন্দের নিকট বল্লাল সেন পুনরায় ঋণ প্রার্থনা করেন। পূর্ব প্রদত্ত ঋণ এখনও পরিশােধ হয় নাই দেখিয়া বল্লভান বল্লাল সেনকে পুনরায় ঋণ দিতে (১) চাৰিবি, ১০২,১৩১৭ সাল এ ঘোচাৰ্য লিখিত সে ফেীত।
নরকগণ নহে। অস্বীকার করেন, কিন্তু রাজা তাহাকে ভয় প্রদর্শন করিতে প্রবৃত্ত হলেন। বল্লভানল শাসন পত্রেও বশীভূত হয়েন নাই। তৎকাশং ততােদুতে রাঙ্গাতেন চ প্রেষিতঃ। শাসন পত্র দানেন বশীকরণনিচ্ছতা । (গােপালভট্ট কৃত “বল্লাল চরিত”। তখন বল্লাল সেন, বল্লভানন্দের প্রতি নানাপ্রকার কটুক্তি প্রয়োগ করিতে লাগিলেন— সুৰণিজাং স্বামী বল্লভানল নামক। আসীৎ দুষ্টো ধনশ্রেষ্ঠো রাজদ্রোহী চ গর্বিত। (গােপালভট্ট কৃত “বল্লাল চরিত) বল্লভানকে হস্তগত করিতে অসমর্থ হইয়া, বল্লালসেন ধনবান্ সুবর্ণ- বণিকদিগের ধনরত্নাদি লুণ্ঠন করিতে আরম্ভ করিলেন। জহার বণিজাং বলাৎ। ব্যবহারে বৃতং বস্তু কেঞ্চিৎ ক্রোশমপি।” অবশেষে যখন বল্লাল দেখিলেন, সুবর্ণবণিক জাতিকে একেবারে পর্যন্ত করা সহজসাধ্য নহে, তখন তাহাদিগকে অপমানিত করিবার জন্য, রাজবাটীর এক মহাভােজে নিমন্ত্রন করিলেন। সুবর্ণবণিকেরা উপস্থিত হইলে, শূদ্রদিগের সহিত তাহাদিগকে উপবিষ্ট করিতে আজ্ঞা দিলেন, বণিকেরা কহিল “আমরা বৈশ্য, বিশেষতঃ রাজবাটীতে আমরা ইতঃপূর্বে বৈসলে একত্রে বসিয়া আহার করিয়াছি, সুতরাং এরূপ অসামাজিক ও অশাস্ত্রীয় আজ পালন করিয়া আমরা শুদ্রের সহিত একত্রে উপবেশন পূর্বক আহার করিতে সম্মত হইতে পারি না।” ভুজ্যপানে সর্বেষু বল্লালেন মুদা সহ। সৎপুত্রাজাপর ভােজন শালিকা।
so জলচল ও স্পর্শদাষ বিচার। স্পন্ধয়া বিবি র্ভোক্ত বিশান দৃশ্যতেস্থলী। তন্নিবসরে বৈশ্যা ময়ন্তঃ পরম্পর। উক্ত নিৰ্যাতু কামাদানীং রাজসঘনঃ। (আনন্দ ভট্টকৃত “বল্লাল চরিত) অতঃপর সুবর্ণ-বণিকেরা ভােজনশালা পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া গিয়াছিল। রাজা বল্লাল সেন এ কথা শুনিয়া কহিলেন “কি। এত বড় স্পর্ধা”- “ঈদৃশী স্পর্ধা, ইক্তা তান বাপিৎ” (বল্লাল চরিত্র—২২ অধ্যায়) অল্প দিবস পবে, বল্লালসেন ক্রোধােন্মত্ত হইয়া প্রতিজ্ঞা করিলেন “ঘদি দুঃশীলান্ সুবর্ণবণিজঃ অধম জাতীয়ানাং মধ্যে ন গণয়্যিামি, বলভানন্দ দুরনঃ সমুচিত দণ্ডবিধানং ন করিষ্যামি, তা গাে-ব্রাহ্মণ যােষিদাদি ঘাতেন যানি পাতকানি ভবিত্যানি, তানি মে ভবিষ্যতীতি। অন্ধরাজস্য তপুত্র- বিনাশায় ভীমসেনাে যাদৃশীং প্রতিজ্ঞামকরােৎ, এতেষাং সম্বন্ধে প্রতিজ্ঞা মে তাদৃশ জ্ঞাতব্যা। যদি দাম্ভিক-বল্লভানন্দ-বণিকস্যদুরাত্মনাে দণ্ডন বিধাশ্যামি তদা পাতকানি ভবিতব্যানি।” অর্থাৎ “আমি যদি দুষ্টস্বভাব সুবর্ণবণিক গণকে নীচ জাতীয় মথে ভুক্ত না করি এবং দুরাত্মা বল্লভানন্দকে সমুচিত দণ্ড বিধান না করি, তাহা হইলে গাে ব্রাহ্মণহত্যার মহাপাতক হইবে। ধৃতরাষ্ট্রের শত শত পুত্র বিনাশে ভীমসেনের প্রতিজ্ঞা যদ্রপ, সুবর্ণবণিকজাতি সম্বন্ধে আমার এই প্রতিজ্ঞাও তদ্রপ ইহা নিশ্চয় জানিবে।” ইহার কিছুদিন পরে বল্লালসেন এক যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন। ঐ যজ্ঞে পলক্ষে বর্ণ নির্মিত ধেনু ব্রাহ্মণদিগকে দান করা হইয়াছিল। রাজা বল্লালের কুপরামর্শানুসারে একজন ব্রাহ্মণ একটা হিরন্ময় গাভী অবিলপাইন নামে জনৈক সুবর্ণবণিক জাতীয় সওদাগরকে বিক্রয় করিয়াছিলেন। (১) ঐবিন্দ (১) অজানি নামলে নিয়ে নিট অনৈক এ মাজ এর গতি মায়া ৱি ৰে, পরে সােপর মা শণিত पश्वत लोकांड कार पररासि पर बाबा बाबा बालन किन মতাে মাসে মানে সামাজিক পজিত করেন।
৪১ নবায়কগণ ভ নহে। পাইন উহা ভয় করিয়া অগ্নিতে দ্রব করিয়াছিলেন এবং তৎপরে সেই সুবর্ণ জানা অলঙ্কারাদি প্রস্তুত করিয়াছিলেন, বল্লালসেন এইরূপ শ্রবণ করিয়া সভামধ্যে কহিলেন “ইহাতে নিশ্চয়ই গাে-হত্যার অপরাধ হইয়াছে, কেবল তাহাই নহে, অখিতে গােদাহনের মহাপরাধ ঘটিয়াছে। অতএব সুবর্ণবণিক জাতি অদ্য হইতে অধম শূদ্ৰজাতি মধ্যে গণ্য হইল।” এতদিনে প্রতিহিংসা- পরায়ণ রাজা বল্লালসেনের মনােবা পরিপূর্ণ হইল। “অদ্যাবধি ক্রিয়াহীনানা বণিজাং যজ্ঞোপবীত-ধারণং ব্যর্থং এতে ক্রিয়াবাৎ শূদ্র জাত। অতােদ্য পৰ্যন্তং এতে বণিজঃ শুভ্রাঃ, এতেষাং শূদ্রবৎ ক্রিয়াদিক ভবিষ্যতি। বিশেষতন্তু স্বর্ণবণিজঃ সর্বে গােয়ে গােহত্যাকারিণ তদেতে অদ্যপৰ্যন্ত পতিতা, শিষ্টেরগ্রাহাঃ।” পাঠক মহাশয়েরা বােধ হয় এতক্ষণে বুঝিতে পারিয়াছেন যে এই কারণেই বল্লালের সময় হইতে অনেকে সুবর্ণবণিক জাতিকে “পতিত” বলিয়া বিবেচনা করিয়াছিলেন কিন্তু আমরা নিরপেক্ষভাবে বলিতে বাধ্য যে বিনাপরাধে সুবর্ণবণিক জাতি দুষ্ট বল্লাল কর্তৃক পতিত’ বলিয়া ঘােষিত হইয়াছিল।” সুবৰ্ণ-বণিকগণের ন্যায় অন্যান্য বৈষ্ণবণিকগণ ও বৈশ্যকৃষকগণ কতক বল্লালের কোপে, কতক সমাজপতি ব্রাহ্মণগণের কৃপাবঞ্চিত হইয়া এবং কতক বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করিয়া বৈদিক আচার ভ্রষ্ট হইয়া সমাজে অনাচরণীয় হইয়া গিয়াছে। ফলতঃ ইহারা কেহই হীন শূদ্ৰবৰ্ণ নহে--পতিত জাতি নহে। কাল প্রভাবে ইহাদের পাতিত্ব ঘটিয়াছে। এখন ইহাদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়াছে। ব্রাহ্মণাদি উচ্চ জাতির ন্যায় আচার ব্যবহারে বিদ্যা বৃদ্ধিতে ইহারা বহুলাংশে উন্নত হইয়াছে ও হইতেছে। সুতরাং ইহাদিগকে আর হীনতর ভাবে রাখা কিছুতেই সঙ্গত নহে। সামাজিক অধিকার দান করিয়া ইহাদের হাত ধরিয়া তুলিয়া লওয়া অবশ্য কর্তব্য। আর হীন ঘৃণিত অজ্ঞাত ভাবে রাখা সমাজের পক্ষে মঙ্গলজনক হইবেনা। এখন আর রাজকোপ নাই, ব্রাহ্মণগণেরও কোনরূপ ফল বা বিদ্বেষের কারণ নাই অনাচার ২ জলচল ও পদোষ বিচার। বিদ্যাদিহীনতাও নাই। সুতরাং কেন আর অগণ্য দেশবাসী ভ্রাতৃগণকে জল অচল করিয়া রাখি এবং তাহাদিগের মনে দারুণ বেদনা বিদ্ধ করি? তমম- গুণ অনাচার ম্লেচ্ছাচার প্রভৃতির জন্যই জল অচল করা হইয়াছিল। “ভােজন সম্বন্ধে প্রাচীন বিধি সমস্তই এক্ষণে লােপ পাইয়াছে—কেবল, ইহার সঙ্গে খাইতে নাই, উহার সঙ্গে খাইতে নাই—এইরূপ একটা অস্পষ্ট ধারণা লােকের মধ্যে বিদ্যমান দেখিতে পাওয়া যায়। শত শত বর্ষ পূৰ্বে আহার সম্বন্ধে যে সকল সুন্দর নিয়ম ছিল, এক্ষণে তাহার ভগ্নাবশেষ স্বরূপ এই পৃষ্টা- স্পষ্ট বিচাব মাত্র দেখিতে পাওয়া যায়। ঐতিতে একটী প্রসিদ্ধ বাক্য আছে “আহারগুদ্ধৌ সত্ত্বগুদ্ধি সন্ধেী ধ্রুবাশ্বতিঃ”যখন আহার শুদ্ধ হয় তখন সবশুদ্ধ হয়, আর সত্ব শুদ্ধ হইলে স্মৃতি অর্থাৎ ঈশ্বরগরণ অথবা অদ্বৈতবাদীর মতে নিজ পূর্ণতার স্মৃতি অচল ও স্থায়ী হয়। এই বাক্যটা লইয়া ভাষ্যকার দিগের মধ্যে মহাবিবা দেখিতে পাওয়া যায়। প্রথমতঃ কথা এই সত্ব শব্দের অর্থ কি? আমরা জানি সাংখ্যদর্শন মতে আর ভারতীয় সকল দর্শন সম্প্র- দায়ই একথা স্বীকার করিয়াছেন যে, এই দেহ ত্রিবিধ উপাদানে নির্মিত হইয়াছে—সত্ব রজঃ ও তমঃ। সাধারণ লােকের ধারণা এই, ঐ তিনটা গুণ, কিন্তু তাহা নহে; উহার জগতের উপাদান কারণ স্বরূপ। তার আহার শুদ্ধ হইলে এই সত্ত্ব পদার্থ নিৰ্মল হইবে। বিশুদ্ধ সত্বলাভ কবাই বেদান্তের একমাত্র কথা। আমি তােমাদিগকে পুঝেই বলিয়াছি যে জীবাত্মা স্বভাবত পূর্ণ ও শুদ্ধ স্বরূপ, আর বেদান্ত মতে উহা রজঃ ও তমঃ পদার্থ দ্বারা আবৃত। সত্ব পদার্থ অতিশয় প্রকাশ স্বভাব, আর যেমন আলােক সহজেই কাচকে ভেদ করে, অন্ধ্রপ আত্ম চৈতন্যও সহজেই সত্ত্ব পদার্থকে ভেদ করিয়া থাকে। অতএব যদি রজঃ ও তমঃ গিয়া কেবল সৰু দ্ৰব্য অবশিষ্ট থাকে, তবে জীবাত্মার শক্তি ও বিদ্ধত্ব প্রকাশিত হইবে; অতএব এই সলাত করা অত্যাবশ্যক। আর ক্ষতি এই সত্ত্ব লাভের উপায় স্বরূপ বলিয়াছেন, “আহার তথা হইলে সত্ব শুদ্ধ হয়। রামানুজ এই আহার শ খাদ্য অর্থে ৫০ নবায়কগণ শুত্র নহে। এহণ করিয়াছেন। আর ইহা তিনি তাহার দর্শনের একটি প্রধান অবলম্বন তম্ভ স্বরূপ করিয়াছেন। শুধু তাহাই নহে, সমগ্র ভারতের সকল সম্প্রদায়েই এই মতের প্রভাব অল্প বিস্তর দেখিতে পাওয়া যায়। অতএব এখানে আহার শব্দের অর্থ কি, এইটা আমাদিগকে বিশেষ করিয়া বুঝিতে হইবে। কারণ রামানুজের মতে এই আহার শুদ্ধি আমাদের জীবনের একটি অত্যাবশ্যক বিষয়। রামানুজ বলিতেছেন, খাদ্য তিন কারণে অন্ধ বা দোষযুক্ত হইয়া থাকে। প্রথমতঃ জাতি দোষ যে সকল আহাৰ্য ৰ স্বভাবতই অশুদ্ধ ; যেমন পেঁয়াজ, শুন প্রভৃতি, সেইগুলি খাইলে জাতি-দুষ্ট খাদ্য খাওয়া হইল। ঐ সকল খাদ্য অধিক পরিমাণে খাইলে কাম রিপুর প্রাবল্য হয় এবং সে ব্যক্তি ঈশ্বর ও মানবের চক্ষে ঘৃণিত ও অসৎ কর্ম সকল করিতে থাকে। দ্বিতীয়তঃ আশ্রয় দোষবে ব্যক্তির হাত হইতে খাওয়া যায়, সে ব্যক্তি খারাপ লােক হইলে সেই খাদ্য ও দুষ্ট হইয়া থাকে। অসৎ ব্যক্তি কর্তৃক সৃষ্ট অন্ন পরিত্যাগ করিতে হইবে; কারণ, এরূপ অন্ন ভােজন করিলে মনে অপবিত্র ভাবের আবির্ভাব হইয়া থাকে। ব্রাহ্মণের সন্তান হইলেও যদি সে ব্যক্তি লম্পট ও কুক্ৰিয়াসক্ত হয়, তবে তাহার হাতে খাওয়া উচিত নয়। তৃতীয়তঃ নিমিত্ত দোষখাদ্য দ্রবে কে, কীট, আৰনালি কিছু পড়িলে তাহাকে নিমিত্ত দোষ বলে। * এই ত্রিবিধ দোষ-নিমুক্ত খাদ্য আহার করিতে পারিলে সত্ব শুদ্ধি হইবে।” তবে ত ধর্মটা বড় সােজা ব্যাপার হইয়া দাড়াইল! যদি বিশুদ্ধ খাদ্য খাইলেই ধৰ্ম হয়, তৰে সকলেই ত ইহা করিতে পারে। জগতে এমন কে দুর্বল বা অক্ষম লােক আছে, যে আপনাকে এই দোষ সমূহ হইতে মুক্ত করিতে না পারে ? অতএব শাচাৰ্য এ আহার সম্বন্ধেই কি অর্থ করিয়া- ছেন দেখা যাউক। শঙ্করাচার্য বলেন, আহার শব্দের অর্থ ইন্দ্রিয় দ্বারা মনের মধ্যে যে চিন্তায়ালি আহৃত হয়। উহা নিৰ্ম্মল হইলে, সক নির্মল হইবে, তাহার পূর্বে নহে। তুমি যাহা ইচ্ছা খাইতে পার! যদি কেৰলপবিত্র : জলচল ও স্পর্শকাষ বিচার। ভােজনের দ্বারা সত্ব শুদ্ধ হয়, তবে বানরকে সারা জীবন দুধ ভাত খাওয়াইয়া দেখ না কেন, সে একজন মত যােগী হয় কি না। এরূপ হইলে ত গাভী হরিণ প্রভৃতিই সকলের অগ্রে বড় বােগী হইয়া দাড়াইত নিত নহনেসে হরি মিলে ত জল জ হই। ফলমূল থাকে হরি মিলে ত বাদুড় বারাই তিরণ তখনকে হরি মিলে ত বহুৎ হয় হায় অজা দুধ পিকে কে হরি মিলে ত বহুৎ বৎস বালা। মীরা কহে বিনা প্রেম সে না মিলে নন্দলালা। বাহা হউক এই সমস্যার মীমাংসা কি ? উভয়ই আবশ্যক। অবশ্য শঙ্করা- চাৰ্য যে অর্থ করিয়াছেন, উহাই মুখ্য অর্থ ; তবে ইহাও সত্য যে, বিশুদ্ধ ভােজনে বিশুদ্ধ চিন্তার সহায়তা করে। উভয়ের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ, উভয়ই চাই তবে গােল এই টুকু দাড়াইয়াছে যে বর্তমান কালে আমরা শঙ্করাচার্যের উপদেশ ভুলিয়া গিয়া কেবল খাদ্য অর্থ টা লইয়াছি। এই কারণেই যখন আমি বলি, “ধর্ম রান্না ঘরে ঢুকিয়াছে,” তখন লােকে আমার বিরুদ্ধে খেপিয়া উঠে। কিন্তু যদি তােমরা আমার সহিত মান্দ্রাজে যাও—তবে তােমরাও আমার সহিত একশত হইবে। তােমরা বাঙ্গালীরা তাহাদের চেয়ে ঢের ভাল। মাদ্রাজে যদি কোন ব্যক্তি উচ্চ বর্ণের খাদ্যের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, তবে তাহার সেই খাবার দাবার ফেলিয়া দিবে। কিন্তু তথাপি তথাকার লােকেরা ইহার দরুণ যে বিশেষ কিছু উন্নত হইয়াছে, তাহা ত দেখিতে পাইতেছি না। যদি কেবল এ খাওয়া ও খাওয়া ছাড়িলেই, এর ভর দৃষ্টিদোষ হইতে বাঁচাইলেই লােকে সিদ্ধ হইত, তবে দেখিতোজীরা সকলেই সিদ্ধ পুরুষ হইত কিন্তু তাহারা তাহা নহে।” (১) “শান্ত্রের উদ্দেশ্য এখন সমস্তই চলিয়া গিয়াছে—এখন কেবল এই টুকুতে কলিকাতা বিকেএসব কােয়। তাতে বিবেকান ১১।
se নামকগণ পূত্র নহে। ঠেকিয়াছে যে, আমাদের আপনার লােক না হইলে তাহার হাতে আর খাওয়া হইবে না সে ব্যক্তি হাজার জ্ঞানী ও উপযুক্ত লােক হউক। মমরার ( (নিঠাইবিক্রেতার দোকানে গেলে এই সকল নিয়ম যে কিরূপ উপেক্ষিত হইয়া থাকে তাহার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাইবে। দেখিবে মাছি সব চারিদিকে ভন্ ভন্ করিয়া উডিয়া দোকানের সব জিনিষে বসিতেছে, রাস্তার ধুলা উড়িয়া মিঠাইএর উপর পড়িতেছে আর ময়রার পােরও কাপড় খানা এননি যে চিটি কাটিলে ময়লা উঠে। * পূর্বকালে লােক সংখ্যা অন্ত্র ছিল তখন যে সকল নিয়ম ছিল, তাহাতেই কাজ চলিয়া যাইত। এখন লােক সংখ্যা বাডিয়াছে—অন্যান্য অনেক প্রকার পরিবর্তনও ঘটিয়াছে। আমাদের এতদিন উৎকৃষ্টতর বিধি ব্যবস্থা প্রণয়ণ করা উচিত ছিল। কিন্তু আমরা উন্নতি না করিয়া ক্রমশ অবনতই হইয়াছি। মনু বলিয়াছেন জলে থু থু ফেলিও না, আর আমরা কবিতেছি কি ? আমরা গঙ্গায় ময়লা ফেলিতেছি। *** এখন তাহা সব চলিয়া গিয়াছে। এই কারণেই যদি কেহ আমাকে ‘হিন্দুকে ? এই প্রশ্ন করে, তবে আমাকে নির্বাক্ হইয়া থাকিতে হইবে, কারণ, আমি ত প্রকৃত হিন্দু কাহাকেও দেখিতে পাই না। প্রকৃত হিন্দুচিত গুণসম্পন্ন যখন কাহাকেও দেখিতে পাই না, তখন বাধ্য হইয়া যে আমার সহিত একসঙ্গে খায় অথবা আমার বংশে বিবাহ করে তাহাকেই হিন্দু বলিয়া নির্দেশ করিতে হইবে। অতএব দেখিতেছ, এখন কেবল এই শৃষ্টাস্পৃষ্ট বিচার রহিয়াছে, মন কলুষিত হইয়াছে, লােকে আসল জিনিষটাই ভুলিয়াছে । চোর, লম্পট, মাতাল, অতি ভয়ানক জেল- খাটা আসামী ইহাদিগকে আমরা স্বচ্ছন্দে জাতে লইব, কিন্তু যদি একজন ভাল লােক অপর জাতীয় একজন ভাল লােকের সঙ্গে বসিয়া খায়, তবে সে তৎক্ষণাৎ জাতিচ্যুত হইবে—তাহার উদ্ধারের আর উপায় নাই। ইহাতেই আমাদের দেশে খােতর অনিষ্ট হইতেছে। সুতরাং এইটাই স্পষ্টরূপে জানা উচিত যে পাপীর সংসর্গে পাপ এবং সাধুর সঙ্গে সাধুতা আলিয়া . এল ও স্পর্শদাৰ বিচার। থাকে আর অসৎ সংসর্গ দূর হইতে পরিহার করাই বাহুশোচ। আভ্যন্তর তদ্ধি আরও কঠিন।” (১) আহার সম্বন্ধে শাস্ত্রে যে বিবিধ দোষের কথা বর্ণিত হইল, পাঠকগণকে এতৎ সম্বন্ধে বিশেষ মনোেযােগ প্রদান করিতে অনুবােধ করি। (১) জাতি-দো, (২) আর দোষ (৩) নিমিত্ত দোষ। সমাজপতি পণ্ডিত মহাশয়গণ প্রথম ও তৃতীয় দোষ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ উদাসীন, অন্ধ ও বধির, কেবল দ্বিতীয়টাকেই আঁকড়িয়া ধরিয়াছেন। কিন্তু ইহারও যদি মূল—প্রকৃত তত্ব ধরিতেন তাহা হইলেও আমাদের অধিক কিছু বলিবার ছিল না। তাঁহার মূল তত্ত্ব প্রকৃত উদ্দেশ্য ছাড়িয়া দিয়া নারিকেল ফলের শাঁস ত্যাগ করিয়া বাহিরের ছােড় লইয়া ব্যস্ত হইয়াছেন এবং মাঝে মাঝে “ধর্ম গেল” “ধৰ্ম গেল” শব্দে গগনমণ্ডল কম্পিত করিতেছেন, দ্বিতীয়টাকে বলা হইল আশ্রয় দোষ। অর্থাৎ অসৎ, দুষ্ট, পাপী, অধাৰ্মিক, শৌচ-পরিভ্রষ্ট সত্যহীন শুনােভাবাপন্ন ব্যক্তির আশ্রয়ে সংস্পর্শে খাদ্য দ্রব্য কলুষিত হয় এবং তদাহারে সাধু্যক্তিগণের চিত্ত ও মলিন হয়। যেমন অল্প-দ্রব্য পিত্তল বা কংস এবের স্পর্শে তিক্ত বিষাক্ত হয় তেমনি অসৎ পাপী লােকের সংস্পর্শে খাদ্যদ্রব কলুষিত, বিষাক্ত, তমঃগুণ বন্ধক হইয়া থাকে। অসতের স্পর্শে খাদ্যদ্রব্য অসৎভাবােব্দীপক হয়, ইহাই হইতেছে শাস্ত্রকারের বক্তব্য। শাস্ত্রকার অবশ্য একথা বলিতেছেন না যে, অসতের পরবর্তী ৫২ পুরুষ বা ৩৬০ পুরুষ পর্যন্তও অসতই থাকে এবং তাহাদের সংস্পষ্ট খাদ্যও অসৎভাবােব্দীপকই হইয়া থাকে। দৈত্য কিরণ্যকশিপুর পুত্র কিছু হিরণ্যকশিপু হয় নাই, রত্নাকর বা জগাই মাধাই কিছু চির কালই রত্নাকর বা জগাই মাধাই ছিল না বা থাকিতে পারে এমন কোন কথা নাই। শান্ত্রকার ব্যক্তিগত ভাবে উল্লেখ করিয়াছেন, সমষ্টিগত ভাব বা বংশগত (১) শিয়ালকোট বিবেকাৰত ৰা । এতে বিশেষ ৬ ।
নায়কগণ পুত্র নহে। ০৭ ভাবে উল্লেখ করেন নাই। পাপীর বংশেও পূণ্যবান সন্তান, অসতের কুলেও সৎপুত্র জন্মগ্রহণ করিতেছেন, মুখ বংশেও বিদ্বান, গরীবের ঘরেও ধনবান্ জন্ম গ্রহণ করিতেছেন। পক্ষান্তরে পণ্ডিতের গৃহেও মূর্খ, থার্ষিক বংশেও কুলাঙ্গার, গঙ্গাজলেও গজার জন্ম গ্রহণ করিয়া থাকে। সাহা কুলের কোনও একজন উর্ধতন পুরুষ না হয় মানিয়াই লইলাম সুরা বিক্রয় করিয়াছে, সুবৰ্ণ বণিক কুলের উর্দ্ধতন ৫২ পুরুষ পূৰ্বেই না হয় ব্রাহ্মণের সুবর্ণ ধেনু অপহরণ বা প্রতারণাই করিয়াছিল, সূত্রধরকুলের ৫৫৭ পুরুষ পূর্বে একজন না হয় যজ্ঞ-কাই দিতে বিলম্বই করিয়াছিল, নমঃশুদ্রকুলের আদি পুরুষ কশ্যপ ঋষি না হয় ঋতুর প্রথম দিন সন্তান উৎপাদন করিয়া এই করিয়াছিলেন, গােয়ালার ৮৯২ পুরুষের উর্ধতন একজন না হয় গরুই দাগাইয়াছিল। ধােপর ১৫৬৩ পুরুষ পূর্বের একজন উর্ধতন বেকুব পুরুষ না হয় ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্যাদি ভদ্রলােকগণের কাপড় কাচিয়া মহাপরাধের কাৰ্যই করিয়াছিল, মালী না হয় হিন্দু সমাজপতিগণের বাড়ী- ঘর ঝাঁট দিয়া পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কবিয়া মহাপাপের কাৰ্যই করিয়াছিল, তাই বলিয়া কি তাহার অধস্তন ৫০০ পুরুষও জল স্পর্শ করিতে পারিবে ? কেন পারিবে না? শাকি মানা করিতেছেন? ৫০০ পুরুষ পূৰ্ব্বে কাহার এ এ এ প্রবৃদ্ধ পিতামহ হাতে লাল রং মাখিয়াছিল, এখনও কি সেই রং অধঃস্তন বংশধরের হাতে লাগিয়া আছে? না থাকিতে পারে? কাহারও উতন ৭০০ পুরুষ হয়ত একদিন নিমন্ত্রণ খাইয়া হজম করিতে পারিয়া বমন করিয়াছিল, এখন কি এই নিয়ম হইবে যে ৭০০ বৎসর পরবর্তী পুরুষ পৰ্যন্ত কেহই নিমন্ত্রণ খাইতে পারিবে না; কেননা নিমন্ত্রণ তাহাদের পূর্ব পুরুষের এক জনের হজ হয় নাই। এই উত্তরে বালিকা সন্তুষ্ট হইতে পারে, শিশু বাহবা দিয়া পাণ্ডিত্যের গৌরব করিতে পারে। বালক “কি চমৎকার দার্শনিক যুক্তি”—“অকাট্য প্রমাণ” বলিয়া হাতে তালি দিয়া নাচিতে পারে, কিন্তু জ্ঞান-বিদ্যা-পূর্ণ, বিজ্ঞান দর্শনময় ন্যায় জলচল ও স্পর্শদাষ চিার । যুক্তির যুগে ইহা উন্মাদের প্রলাপ উক্তি ভিন্ন আর কিছু বলিয়া বিবেচিত হইৰে না। শাস্ত্র এমন কোন কথা বলিতেছে না যে, ব্রাহ্মণ বংশে যত অধমই জন্ম গ্রহণ করুক না কেন, তাহার খাদ্য জল গ্রাহ; আর শূদ্রবংশে যত উত্তমই জন্ম গ্রহণ করুক না কেন, তাহার খাদ্য জল অস্পৃশ্য অগ্রাহ। শাস্ত্রে সেরুপ কোন কথা লিখিলে তাহা কৰ্ম্মনাশার গভীর জলে নিক্ষেপ করিতে বলিতাম। শাস্ত্রকার ত একথা বলিতেছেন না যে ব্যভিচারী বেশ্যাশক্ত লম্পট উপদংশবিষ জর্জরিত চরিত্রহীন ব্যক্তির অন্নও নির্বিচারে খাওয়া যাইতে পারে যদি তিনি ব্রাহ্মণকুলে জন্ম গ্রহণ করেন। অথবা শাস্ত্রকার একথাও বলিতেছেন না যে মিথ্যাবাদী শঠ প্রতারক প্রবঞ্চক অনাচার দুষ্ট মৎস্য মেষ ছাগ কপােত হংস চক্রবাক কচ্ছপ প্রভৃতি মাংস খাদক মদ্যপায়ী গঞ্জিকাসেবী রক্ষিত নারীপ্রণয়বদ্ধ ব্রাহ্মণের অন্ন খাওয়া যাইতে পারে কিন্তু তথাপি খুজের অন্ন খাওয়া যাইতে পারে না। অথবা শাস্ত্ৰত একথা বলিতেছেন না যে ঝি চাকরাণীর প্রণয় মুগ্ধ ঘৃণিত জঘন্য ব্যাধিমণ্ডিত সন্ধ্যা-পূজা-বর্জিত বারবিলাসিনী-সংশ্রব-দুষিত অনাচার-কলুষিত শুধু পৈতা মাত্ৰ সৰ্বস্ব পাচক বামুন ঠাকুরের অন্ন নিঃসন্দেহে গ্ৰাহ কিন্তু পবিত্র চরিত্র ধর্মশীল দেব-দি- অতিথিপরায়ণ নিত্যয়ী নিরামিশাষী বিশুদ্ধদেহ শূদ্রের অন্ন অগ্রাহ। গুরু পুরােহিত প্রকাশ্যে বাড়ীতে রক্ষিত নারী রাখিয়াছেন, কত সমাজপতি টিকিধারী ব্রাহ্মণ পণ্ডিত প্রকাশ্যে ব্যভিচার করিতেছেন, অগম্যা গমন করিতেছেন, পণ্ডিতে পণ্ডিতে মিলিয়া বেশ্যাৰাভী ব্যভিচারিণীব বাড়ী বিশুদ্ধ বৈদিক ভাষায় সম্ভাষণদি প্ৰণয়ালাপ করিতেছেন , কত আর্ত চুড়ামণি ন্যায়বাগীশ ভট্টাচার্য বংশ, গুরুবংশ, মদ্যপান গঞ্জিকা সেবন করিতেছেন অন্ধ সমাজ তাহা দেখিবে না, তাহাদের হাতের অন্ন খাইতে বারণ কবিবে না কিন্তু কেহ যদি ভুলক্রমেও শূদ্রের হন্তে অন্ন গ্রহণ করে তবে আর তাহার নিস্তাব নাই। কেন হে বাপু এ অত্যাচার অবিচার। শাসন করিতে পার যদি নবায়কগণ পূত্র নহে। ত সকলকেই শাসন কর আর না পারত হাল ছাড়িয়া দাও। সৰলকে ছাড়িয়া দুর্বলের উপর পড়ন কর কেন? ধর্মে তাহা সইবে কেন? ধর্মের নিকট এ অত্যাচার কতদিন চলিবে ? অত্যাচারের ফল ত হাতে হাতেই পাইতেছে। তাহাতেও কি শিক্ষা হইবে না? কত সমাজ-শিরােমণি ব্রাহ্মণ পণ্ডিতকে দেখিতেছি যাহরা রাত্রিতে নিম্নশ্রেণীর রক্ষিতা প্রণক্মিণীর গৃহে তদীয় শ্রীহ তৈয়াৰী নানাবিধ খাদ্য আহার করিতেছেন ও প্রভাতে বাটী আসিয়া “বিলাত যাত্রীর কিছুতেই প্রায়শ্চিত্ত নাই-তুষানলেও তাহার পাপ দূরীভূত হইবে বলিয়া অত-জনগণের নিকট শাস্ত্রীয় বচন আওড়াইতেছেন। নিজে টাকা লইয়া ধৰ্ম্ম সাক্ষী করিয়া আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়া আসিতেছেন কিন্তু ওদিকে কেহ পাগল অবস্থায় কাহারও জল ভাত খাইয়াছে—এই অনুমানের উপর নির্ভর করিয়া নগদ মূল্য এহণ পূর্বক প্রায়শ্চিত্তের “পাতি” লিখিয়া দিতেছেন। কোন তর্কসিদ্ধান্তের অবস্থা জানি যিনি বিধবা পুত্রবধু গমন করিয়াও সমাজপতি বড় পণ্ডিতের বিদায় পাইয়াছেন এবং তিনিই কত লােকের প্রায়শ্চিত্তের পাতি লিখিয়া দিয়া, ব্যবস্থা পত্ৰ দিয়া পাপ হইতে নিষ্কৃতিদান করিতেছেন। কত পণ্ডিতের চরিত্রহীনতা ব্যভিচার অনাচারের কথা যে জানি তাহা লিখিবার বােগ্য নয়। আর ইহারাই কিনা সমাজের দণ্ডদাতা বিধাতা পুরুষ। ইহাদের অঙ্গুলি হেলনেই হিন্দু সমাজকে চলিতে হইবে। কত সমাজপতি ব্রাহ্মণ মহাত্মাগণকে দেখিতেছি বাহার। প্রতিদিন নিয়মিত মদ্যপায়ী বেশ্যাগমনকারী, যাহারা ষ্টিমারে উঠিলেই মুসলমান বাবুর্চি প্রস্তুত অখাদ্য মুরগীর মাংস দিয়া অন্নাহাব করিতেছেন এবং বাটী আসিয়াই বিলাতযাত্রী দেশবাসী আত্বীয়কে একবে করিবার জন্য দল পাকাইতেছেন এবং সহস্র কণ্ঠে বর্ণাশ্রম ধর্মের গৌরব বােষণা করিতেছেন। অথবা সামান্য সামান্য সামাজিক অপরাধের জন্তু দুৰ্বল স্বজাতীয় ভ্রাতাকে সকলে মিলিয়া একবরে করিয়া রাখিতেছেন। যাহার দেবী স্বরূপিণী গৃহস্তের বিধবা কন্যাকে নানাবিধ আর্থিক ও সুখের প্রলােভন জল ও শাজাৰ কিার। দেখাইয়া তাহার সর্বস্বহণ করিয়া নরক রাজ্যের ঘর পরিষ্কার করিয়া আখিতেছেন—তাহাই বিধবা বিবাহের বিরুদ্ধে সভা সমিতি করিয়া এক চৰ্যর মাহাত্ম্য উচ্চকণ্ঠে ঘােষণা করিতেছেন! কত লিখিব! সমাজপতিগণের পাপেই, অহরহ অনুষ্ঠিত গুপ্ত পাপেই হিন্দু সমাজের হিন্দু-জাতির এই শােচনীয় পরিণাম। তুমি বড় লােক জমিদার বা তালুকদারনায়েৰ ৰা এষ্টেটের স্যানেজার, তুমি বড় প্রফেসার অধ্যাপক উকীল নােক্তার, তােমার ধন আছে ঐশ্বৰ্য্য আছে সম্পত্তি আছে তালুক আছে, টাকা আছে কড়ি আছে—সুতরাং তােমার আর ভয় কি? ব্যবস্থাদাত ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণ তােমার অধও মণ্ডলাকারং রজতখণ্ডের দাস, মই যাজ্ঞবল্ক্য বাস পরাশর রঘুনন্দন জিমূতবাহন মেধাতিথি মলিনাথ, স্মৃতি সংহিতা তােমার অমিত প্রতাপে অর্থের প্রলােভনে তটস্থ। আর আমি-আমি যে দীন হীন দরিদ্র দুৰ্বল, যত বিধিনিয়ম-ব্যবস্থা-প্রায়শ্চিত্ত সবই আমার জন্য। চুনটুকু খসিয়া গেলে আর আমার নিস্তার নাই—এক রাত্রির বৈঠকে সহ- খানা প্রায়শ্চিত্তের ব্যবস্থা হইয়া যাইবে। পরদিনই আমার হাঁকা ককে বন্ধ—আমি একঘরে! তুমি জমীদার অর্থশালী টোল করিয়া দিয়া মাসিক ও বার্ষিক বৃত্তির ব্যবস্থা করিয়া দিয়া সমাজপতি ব্রাহ্মণ পণ্ডিত প্রতিপালন করিতেছ সুতরাং সেই অনন্যগতি প্রতিপালিত পণ্ডিতগণ আর তােমার উপর কোন্ কোন্ রঘুনন্দন জারি করিবেন ? এবম্বিধ-রূপে দুৰ্ব্বলের প্রতি যে জাতির প্রাধান্য বিস্তারে চেষ্টা ও বলবানের কুরবৎ পদলেহনে যে জাতির আগ্রহ, সে জাতির পতন হইবে না ত কোন জাতির পতন হইবে ? দেশের জন্য, সমাজের জন্য সমগ্র জাতির জন্য যাঁহারা কর্তব্যের গুৰুতার মন্তকে ধারণ করিয়া, মাতৃভূমির শিরে জ্ঞান বিদ্যার বিজয়মুকুট পরিধান করাইয়া ধন্য হইবার আশায় পিতামাতা ভ্রাতা ভগিনী আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধবগণের স্নেহের বন্ধন অশ্রুসিক্ত নয়নে সবলে ছিন্ন করিয়া উত্তাল তর পান থেকে নবধায়কগণ “ নহে। সাল বিজ সামসু রাশির গভীর গর্জনের মধ্য দিয়া অপরিচিত বিদেশে উপনীত হইয়া বিদ্যাজ্ঞান অর্জন পূৰ্ব্বক মাতৃভূমিকে গৌরবান্বিত করিয়া দেশে ফিরিয়া আইসেন তাহাদিগকে আমরা কোল পাতিয় বাহ প্রসার করিয়া সাদরে সাগ্রহে সমাজে টানিয়া লইবার পরিবর্তে দূর দূর করিয়া তাড় ইয়া দিতেছি—আর যাহারা ইন্দ্রিয়পরবশ হইয়া মদ্যপান ব্যভিচারে বারবশিত লয়ে অস্পর্শীয়াগণের সৃষ্ট তৈরী খাদ্য আহার করিয়া সমাজের সর্বনাশ সাধন করিতেছে—সমাজের পবিত্র আদর্শ ধবংস করিতেছে একের উপর কুদৃষ্টান্ত দেখাইয়া পরবর্তী বংশধরগণের সর্বনাশ সাধন করিতেছে তাহা- দিগকে আমরা পরম সমাদরে সমাজপতি বলিয়া গ্রহণ করিতেছি ও তাহাদের আদেশ অবনত শিরে গ্রহণ করিয়া কৃতার্থ হইতেছি। আমরা করিতেছি কি! পুণ্যকে তাড়াইয়া দিয়া পাপকে ডাকিয়া আনিতেছি—ধর্মকে বিদায় দিয়া অধৰ্ম্মকে গ্রহণ করিতেছি, লক্ষ্মীকে পরিত্যাগ করিয়া অলক্ষ্মীকে গৃহে তুলি তেছি, দেবতাকে ত্যাগ করিয়া দানবের পূজায় ব্রতী হইয়াছি! সুতরাং এ দেশের পতন কি অনিবাৰ্য্য নহে। কিন্তু ভগবাকে ধন্যবাদ, দেশের জলবায়ুর পরিবর্তন হইতেছে, দেশবাসী আপনাদের ভালমন্দ অকল্যাণ বিলক্ষণ বুঝিতে পারিয়াছে, দিন দিন নূতন নূতন সম্প্রদায় সৃষ্ট হইতেছে। রঘুনন্দনকে রম্ভা প্রদর্শন পূর্বক প্রতি বৎসর দলে দলে শিক্ষিত যুবকগণ বিদেশে গমন করিতেছেন। আর যাহারা প্রত্যাবৃত্ত হইতেছেন—দেশের ভবিষ্যৎ আলাস্থল ভবিষ্য-নেতা সমাজপতি যুবকদল সঁহাদিগকে সাদরে হৃদয়মন্দিরে টানিয়া লইতেছেন। ইহা মঙ্গলময় বিধাতাপুরুষের অদৃষ্ট ইঙ্গিত-সমাজপতির কি সাধ, মানুষের কি সাধ্য ইহার গতি রােধ করিতে পারে। ইহাদের অপরাধ কি? অপরাধ ত অখাদ্য খাওয়া ম্লেচ্ছান্ন গ্রহণ! আচ্ছা দেখা যাউক-এ অপরাধের শাত্রে কি দণ্ডবিধান আছে। আর আমরাও এরূপ অপরাধে সম অপরাধী বা ইহাপেক্ষা গুরুতর অপরাধী কি না। বিলাতযাত্রীর অপরাধ
জলচল ও স্পর্শদোষ বিচার।
(১) অখাদ্য ভােজন যথা (ক) গােমাংস, শূকর মাংস, মুরগী মাংস প্রভৃতি
(২) মেজারম্লেচ্ছ সংস্পষ্ট খাদ্য-গ্রহণ, (৩) শীতপ্রধান দেশে পানীয়ভাবে
শ্যপান। প্রথম ও তৃতীয় দোষ হইতে অধিকাংশ ভারতীয় ও বঙ্গীয় বিল্যত
জাপান বা আমেরিকা প্রত্যাগত যুবকই নির্মুক্ত। অত্রা তলে ধরিয়া
লইলম ইহরা বিবিধ দোষেই দোষী-অপরাধী। এক্ষণে আমবা একে
একে প্রত্যেক অপরাধ লইয়াই বিচারে প্রবৃত্ত হই। প্রথমতঃ অখাদ-ভােজন
-গো-মাংস শুকর মাংস বা মুরগী মাংস প্রভৃতি।
উশনঃ সংহিতা বলিতেছেনঃ-
লল বলাক হংসকারও তথা । ২০
চক্রবাকফ জন্ম চ বাদশাহমতােজন।
কপােত টিটিভং ভাস ওকং সাবসমেচ। ২৫
জলৌকং জল পাতঞ্চ জন্ধা হেততঞ্চরেৎ।
শিশুরং তথা মাষং মৎস্যং মাংসং তথৈব চ। ২৬
জচৈব বরাহঞ্চ এতদেব ব্ৰতরেৎ।
(নবম অধ্যায়)
‘শলল, বলাকা, হস, কারওৰ অথবা চক্রবাক ভােজন করিলে বাদশাহ
উপবাস করিবে। কপােত, টিটিভ, ভাস, শুক, সারস, জলৌক বা জালপাদ
তােজন কৰিলে এই ব্রত করিবে। শিশুমার, মাষ, মৎস্য অথবা বরাহ ভােজন
করিলেও এই ব্রত করিবে।”
কপােতং কুঞ্জরং শিং কুকুটং রজকাং তথা । ৩০
প্রাজাপত্যং চরেজ্জগ্ধা তথা কুম্ভীরমেব চ।
(উশনঃ সহিত , নবম অধ্যায়)
কপােত, হী, শজিনা, কুকুট, রক্তক অথবা কুঙীর ভােজন করিলে
প্রজাপত্য করিবে।”
অপরাধ ও প্রায়শ্চিত্ত। বিষ্ণু সংহিতায় ভগবান বিষ্ণু বলিতেছেন- অন্যতম প্রানে চান্দ্রায়ণং কুৰ্য্যাৎ।২। লণ্ডন পলাতু গৃজনৈতগন্ধিবিড়বরাহ এ কুকুটবানর গােমাংসভক্ষণে চ। ৩। ****এপঞ্চাশােহধ্যায়ঃ ) “অন্যতম ভােজনে চান্দ্রায়ণ করিবে। লণ্ডন, পল গৃজন, এতগন্ধী ( লণ্ডনাদি গন্ধদ্রব্যযুক্ত) বিবাহ, গ্রাম্যকুকুট, বানর এবং গােমাংস ভােজনেও ঐ চান্দ্রায়ণ প্রায়শ্চিত্ত।” * খনাে কাক মাংসাশনে চান্দ্রায়ণং কুৰ্যাৎ। ২৬। আতং মৃণাহং শুমাংস ২৭। (৫১শ অধায়—বিষ্ণুসংহিতা) ‘খর মাংস, উইমাংস বা কাকমাংস ভােজন করিলে, চান্দ্রায়ণ করিবে। অজ্ঞাত মাংস, যাহা ভক্ষ্য কি অভক্ষ্য এ বিষয় নিশ্চয়ই নাই—সেই পত পক্ষী প্রভৃতির মাংস, বধস্থানস্থিতমাংস (কসাইখানার) ও শুষ্ক মাংস ভােজন করিলেও ঐ চান্দ্রায়ণ প্রায়শ্চিত্ত।” বার্তাকুং তণ্ডুলীয় প্রজাপত্যেন শুধতি। ৩২ অলাবুংগৃঞ্জনঞ্চৈব ভুত্বাপপ্যততং চরেৎ। ৩০ ( উশনঃ সংহিতানবম অধ্যায়) “বাৰ্তাকু (খেত বার্তা, সাদা বেগুন) এবং তণ্ডুলীয় ভােজনে, অলাবু ( লাউ ), গৃঞ্জন । সম্ভবতঃ গাঁজর) ভােজন করিলে প্রাজাপত্য দ্বারা অরি- লাভ করিবে। এক্ষণে মেচ্ছন্ন গ্রহণের সম্বন্ধে আলােচনা করা যাউক। শাকার বলিতেছেন- বাপী-কৃপ তড়াগানারামস্য সরস্বচ। নিশং মােধকশ্চৈব স বিজাে শ্লেচ্ছ উচ্যতে। ৩৭৩অকিসংহিতা। = আল ও শাৰ বিচার। “যে নিঃশভাবে কুপ, তড়াগ, সনাের এবং আরাম ল করে সেই ব্রাহ্মণ বলিয়া কথিত হয়। চাল কিন্তু ম্লেচ্ছ অপেক্ষাও অধম জাতি। চল সর্ব নিয়—সর্বাপেক্ষা অধম জাতি। অত্রি পরবর্তী শ্লোকে চালের নিম্নলিখিত প্রকার সংজ্ঞা নির্দেশ করিয়াছেন, যথা :- ক্রিয়াহীন মুখশ্চ সৰ্ব্বধৰ্ম বিবর্জিত নিন্দঃ সৰ্ব্বভূতে বিশাল উচ্যতে।৩৭৪ ( অত্রি সংহিত) “ক্রিয়াহীন ( সন্ধাদি নিত্য নৈমিত্তিক কর্মহীন), মূর্ণ, সর্বধর্মরহিত, সকল প্রাণীর প্রতি নির্দয় ব্রাহ্মণ *চণ্ডাল” বলিয়া গণ্য। আর্যগণ ভারতের দেশকেই ব্লেচ্ছ দেশ বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন- সুতরাং তাহাদের (শ্লেচ্ছাণের) অন্নাদি আহারের তখন কোনই প্রয়ােজন হয় নাই। ম্লেচ্ছদেশে গমনই শুধু নিষেধ করিয়াছেন। ম্লেচ্ছা আহার সম্বন্ধে মনু অত্রি বিষ্ণু পরাশর ব্যাস গৌতম যাজ্ঞবল্ক্য উঃ অজিরা প্রভৃতি বিংশতি- ও সংহিতা এহে প্রায় কোন কথাই উল্লেখ করেন নাই। নানা জাতির অন্ন পানীয় এহণ সম্বন্ধে নানাবিধ প্রায়শ্চিত্ত ও বিধি ব্যবস্থা প্রণয়ন করি মাছেন। কিন্তু সেচ্ছায় এই সম্বন্ধে কোন কথাই উল্লেখ করেন নাই। সেই জন্য ঠিক ব্লেজার এহণের প্রায়শ্চিভের কথা উল্লেখ করিতে পারিলাম । তবে চলতিনি জাতির অন্ন গ্রহণের প্রায়শ্চিত্ত দেখিয়া ম্লেচ্ছন্ন এহণের অপরাধের পরিমাণ করিয়া লইতে পারি। চণ্ডাল যখন মেছ অপেক্ষাও হন তখন চণ্ডাল অন্ন গ্রহণ যে ম্লেচ্ছান্ন এহণের অপেক্ষা অধিকতর অপরাধজনক হইবে তাহাতে সন্দেহ থাকিতে পারে না। শাস্ত্রকার বলিলেও আমরা না হয় মানিয়া লইলাম চণ্ডাল-চ্ছে অপেক্ষা হন নহে সান এবং চাল অল্প এহণ ফ্লেচ্ছন্ন এহণের তুল্য অপরাধজনক। এক্ষণে দেখা বাউক গাছের সমন জাতি চাল অন্ন গ্রহণ সম্বন্ধে কার কি বলেন।
অপরাধ ও চিত। ব্রাহ্মণে মতে ভূক্তে চলার কদাচন। গােমূত্ৰ যাৰকাহারাদশ রাত্রেণ ওধতি।৩০ (পরাশর সংহিতা ; ষষ্ঠ অধ্যায়।) “ব্রাহ্মণ কখনও অজ্ঞান পূর্বক চালায় তােজন করিলে রাত্রি গােমূত্র ও ষাৰক আহার করিয়া থাকিলে শুদ্ধিলাভ করিতে পারিবেন। দশদিবসের প্রতি দিবসে গােমূত্র ও যাবকের এক এক গ্রাস ভক্ষণ করিয়া নিয়মানুসারে ব্ৰত পূর্ণ করিবে।” পরাশর ঋষি পুনরায় বলিতেছেনঃ- অমেধ্যরেতাে গােমাংসং চাণ্ডালামথাপি বা। যদি ভূক্ত বিপ্ৰেণ কৃচ্ছ চাত্রায়ণ চরেৎ। (একাদশ অধ্যায়; পরাশর সংহিতা।) “বিপ্র যদি অপবিত্তরেতঃ, গােমাংস কিংবা চণ্ডালার ভােজন করে তবে কচ্ছ চাক্ৰায়ণ ব্রত আচরণ করিবেন। তধৈৰ ক্ষত্রিয়াে বৈশ্য শুদ্ধ সমাচরেৎ। শূদ্রোংপপ্যৰং যদা ভুঙক্তে প্রাজাপত্যং সমাচরেৎ ২ সেই অবস্থায় ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য ইহার অর্ধেক ব্ৰত আচরণ করিবে। আর শূদ্র যদি উল্লিখিত দ্রব্য ভােজন করে, তবে তাহাকে প্রাজাপত্য ব্রত আচরণ করিতে হইবে।” অত্রি বলেন- চাণ্ডালাং যদা ভুক্তে চাতুর্বর্ণ নিষ্কৃতি। চান্দ্রায়ণ চরেজিঃ ক্ষ সাতপনং চরেৎ ১৭২ বড় রামাচরণৈঃ পঞ্চগব্যং তথৈব চ। ত্রি রামচরেচ্ছদ্রো দানং দা বিশুধতি।১৭৩ (অত্রি সংহিতা।)
জলচল ও স্পর্শদাৰ বিচার। “চালায়ভােজী চতুর্বর্ণের বক্ষ্যমান প্রকারে শুদ্ধি, যথা-ব্রাহ্মণ চত্রায়ণ ; ক্ষত্রিয় সাপন; বৈষ্ণবড়রা ব্রত ও পঞ্চগ্য ভােজন। এবং শূদ্র-ত্রিরাত্র ব্রত করিয়া যৎ কিঞ্চিৎ দান করিলে শুদ্ধ হইবে।” ভগবান বিষ্ণু বলিতেছেন- ** বেদনিন্দা ৪ অধীত চ ত্যাগঃ ॥৫ অগ্নি মাতৃ পিতৃ সুত দারাণাঞ্চ ৬ অ ভাজ্যান্ন ভক্ষ্য ভক্ষণ ॥৭, পরস্বাপ-হরণম্ ॥ পরদাবাভিগমন ॥ অজ্য যাজনম্ ॥১• বিকৰ্ম্ম জীবন ১১ অসৎ প্রতিশ্ৰহ ১২ ক্ষত্রটিশূদ্র গােৰধ ॥১৩। অবিক্রয় বিক্রয়ঃ ১৪৭ * * * ভৃতকাধ্যাপন | ২০। ভূতাচ্চাধ্যাদান। দ্রুমগুমবলীলতৌষধীনাং হিংসা ২৪ অর্থে ক্রিয়ারম্ভঃ ॥২৭ অনাহিতাগিতা ॥২৮ দেবর্ষি পিতৃঋণানাননপক্রিয়া ২৯ • • কুশীলবতা ৩২ ইত্যুপ পাতকানি ৩৪৭ উপপাতকিন স্কৃেতে কুযুশ্চাত্ৰায়ণং নরা। পরাকঞ্চ তথা কুযুর্যজেয়ুগোমখেন বা ৩৫ (৩৭শ অধ্যায় , বিষ্ণু সংহিতা।) “বেদনিন্দা, অধীত বেদ বিস্মরণ, আহিত অগ্মিত্যাগ, অপতিত মাতা-পিতা-পুত্র-পত্নীত্যাগ, অভােজ্যান্ন ভােজন (অর্থাৎ চাণ্ডালাদির অল্প ভােজন), অক্ষ্য ভক্ষণ (অর্থাৎ শুনাদি ভক্ষণ ), পরস্বাপহরণ, পব শ্রী গমন, অনুচিত কৰ্ম (যথা-ব্রাহ্মণের পক্ষে ক্ষত্রিয়াদির কর্ম যুদ্ধাদি করা (দোণাচাৰ্য কৃপাচাৰ্য্য ও পরশুরাম ইহাদের উপায় কি ?) বৈশাদির দোকান দারী, কুষিদ, বাণিজ্যাদি কিংবা শূদ্রের কাৰ্য্য দাস্য কর্ম (গােলামাদি কার্যে জীবিকা নির্বাহ করা ), অসৎ প্রতিহ, সূত্রের দানাদি গ্রহণ ক্ষত্রিয় হত্যা বৈশুহত্যা, নূত্র হত্যা, গােহত্যা, অবিক্রয় (অর্থাৎ লবণাদির) বিক্রয় প্রতিনিয়ত বেতন গ্রহণ পূর্বক অধ্যাপনা, প্রতিনিয়ত বেতন দান পূর্বক অধ্যয়ন, ১, গুল, লতা এবং ঔষধির বিনাশন, দেবাদি উদ্দেশ না করিয়া কেবল আপনার জন্য পাকাদি অনুষ্ঠান, অধিকার থাকিতে অখি-শাধান না অপরাধ ও প্রায়শ্চিত্ত। করা, দেবগণ, ঋষিগণ এবং পিতৃঋণ পরিশােধ না করা, নটবৃত্তি অবলম্বন করিয়া জীবিকা নির্বাহ এই সকল উপপাতক। এই সকল উপপাতকী অনুষ্যবৃন্দ, চারণ অথবা পরাকত্ৰত করিবে, অথবা গােমেধ যজ্ঞ করিবে।” বিষ্ণু সংহিতা পুনৰ্ব্বাব বলিতেছেন- চলারং ভূক্ত। ত্রিরাত্রমুখবসেৎ ৫৭। সিদ্ধং ভুক্ত। পরাকঃ ৫৮ (৫১শ অধ্যায় ;) “চণ্ডালের অর্থাৎ চণ্ডাল প্রভৃতি জাতির অপৰু অন্ন ভােজনে তিন দিন উপবাস করিব, আর সিদ্ধান্ন ভােজন করিল পরাক্ত করবে” অজিরঃ সংহিতা বলেন - অত্যানাপি সিদ্ধান্ন ভক্ষরিত্ব দ্বিজাতয়ঃ। চাং কৃচ্ছ তদৰ্দ্ধন্তু ব্ৰহ্ম বিশাং বিদুঃ ॥২ (প্রথম অধ্যায়।) “দ্বিজাতিগণ (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য) চালাদি নীচ জাতির সিদ্ধ ভােজন করিলে, ব্রাহ্মণর চান্দ্রায়ণ, ক্ষত্রিয়র কৃচ্ছ এবং বৈশ্যের কচ্ছা প্রায়শ্চিত ইহাই পণ্ডিতগণের সম্মত।” অত্রি পুনৰ্বার বলিতেছেন- বজকঃ শৈলুষশ্চৈব বেণুকর্মোপজীবন। এতেষাং যন্তু ভুক্তে বৈ ডিজশ্চাত্ৰায়ণং চনে ১৬৮ সংস্পৃষ্টং যন্তু পামত্যজ্যৈর্পাদকয়া। অজ্ঞান ব্রাহ্মণোহমীয়াৎ প্রাজাপত্যাৰ্ধমাচরেৎ ॥১৭১ “জক শৈলু। (নাটকাদিতে সাজিয়া যাহারা জীবিকা নির্বাহ করে ) বেং কর্পোপঞ্জীবী (ডােন ইত্যাদিগের অন্ন ভােজন করিলে, ৰাহ্মণ চায়। ব্ৰত করিবে। ব্রাহ্মণ অজানতঃ অন্ত্যজ বা রজল-শৃষ্ট পায় ভােজন কৰিলে প্রাজাপত্যাৰ্ধ করিবে।”
জলচল ও শাদাব বিচার। জপি- রক্ষকার নটো বড় এব চ। কৈমেজিল্লা সখৈতে চাজাতঃ ১৯০ এং গত্বা খ্রিয়ে মােহাজা চ প্রতিগৃহ চ। কচ্ছচিরোজনাদৈজ্ঞানাদৈব।১৯৬ (অত্রি সংহিতা) জ, চর্মকার, নট (নাটক যাত্রা করিয়া জীবিকা নির্বাহকারী), বড়, কৈ, মেদ ও ভিন্ন এই সাতটা জাতিকে অন্ত্যজ কহে। জ্ঞান- পূর্বক ইহাদিগের শ্রীগমন, অন্ন ভােজন বা প্রতিগ্ৰহ করিলে, তাহার প্রায়শ্চিত্ত কৃচ্ছা (একবৎসর একাধিক্রমে প্রাজাপত্যব্রত, ৩০ প্রাজাপত্য) করিতে হইবে; অজ্ঞানপূর্বক করিলে চাত্রায়ণয়” “জক্যাধশৈলুষবেণু চৰ্ম্মোপজীবিন্যাম্। ভূতেষাং ব্রাহ্মণশ্চান্নং অদ্ধি চাত্রায়ণে ন তু ৩১ নবম অধ্যায় ; আপনুসংহিতা “রজ, বাধ, শৈলু, বেণুজীবী এবং চর্মকার ইহাদিগের অন্ন ভােজন করিয়া ব্রাহ্মণগণ চান্দ্রায়ণ করিবে। আপা পরে বলিতেছেন- রজক ব্যাধশৈলুষবেণ চর্মোপজীবিনা। যে ভুক্তে ভক্তমেতাষাঃ বজাপত্যং বিশােধনম্ ॥১২ দশম অধ্যায়, আপনু সংহিত। অন্ন ভােজনে প্রাজাপত্য করিয়া শুদ্ধ হইবে। এতৎ সম্বন্ধে ব্যব শাস্ত্র শ্রেষ্ঠ শহ সংহিতা কি বলেন দেখা যাউক। গােবধােষধাজ্যসংবাজ পারদাৰ্য্যাত্মবিক্রয়া। মাতৃপিতৃ ত্যাগ খাতায়াগো ত চ ৬০ ;
অপরাধ ও প্রতি।
• বাং
ভূতাচ্চাধ্যয়নাদনমপানা ক্রি
সর্বাকরেধীকারো মহা যত্ৰ অৰঞ্জন।
হিংসৌষধীনাং জীবােহভীচারো মূলক চ ৬৪
ইন্ধনার্থমকাণাং মানব পান।
আত্মা ক্রিয়ারন্তো নিশিতান্নাদন তথা ৬৫
অনাহিতাগিতা তেয় মৃনামনপ ক্রিয়া।
অসচ্ছাাধিগমনং কৌশীলত চ ক্রিয়া ॥৬৬
ধান্ত কুপ্য পশুতেয়ং মদ্যপীনিবো।
স্ত্রী ক্ষুদ্র বিট, ক্ষত্রবধাে নাস্তিক্যফোপলাতক।
এত দেব নৃতং কুরুপপাতকিনাে দ্বিজাঃ।
অণিবং শুক্যর্থং চাত্রায়াণমথাপিবা। ১১৮
(একাদশ অধ্যায়)
‘গো হত্যা, অজ্যযাজন (শূজন), পরশ্রীগমন, আত্মৰি, পিতা
মাতা ও গুরুত্যাগ, বাধায় ও আখিত্যাগ, * বৃদ্ধি আর
জীবিকা (সুদের টাকায় জীন ধারণ) • * অবিক্রেয় বর বিক্রয়,
রাজায় সুবর্ণাদি খনিতে কাজ করা, বৃহৎ সেতু প্রভৃতিতে কাজ করা,
ওধি নষ্ট করা, অভিচার আর অনিষ্ট করা, খালানী কাঠের জন্য অফ
বৃক্ষের ছেদন, দেৰ পিত্রাদির উদ্দেশ্য নয়-পরন্তু আপনার জন্য পাকান
লণ্ডনার্দি নিন্দিত খাদ্যের ভক্ষণ, অ্যাধনের অকরণ সুবর্ণ ব্যতীত অপর
অন্যের চুরি ; দেব, পিতৃ ও গ্যাদি ঋণের অপরিশোধ, কতি অতি
বিজ অাৎ শাস্ত্রের আলােচনা, নৃত্য গত দিলোপ সেন, খায়,
০ জলচল ও স্পর্শৰে বিচার। তাত্র ও লৌহালি ধাতু এবং পশুচুরি, • স্ত্রী হত্যা, বৈশ্য হত্যা এবং নাবিকতা—এই সকলের প্রত্যেককে উপপাতক” বলা যায় । অৰণী ব্যতীত অপর উপপাতকী যিজগণ আত্মশুদ্ধির জন্য এইরূপে গােবধ প্রায়শ্চিত্ত অথবা চান্দ্রায়ণ ব্রত করিবে।” লবণ উৎপন্ন করা, * তিল ইক্ষু প্রভৃতি দ্ৰবমর্দক যন্ত্র পরিচালিত করা, ত্রসেবা ** এ গুলিও উপপাতক। দণ্ড চান্দ্রায়ণ । ( অনুবাদ । বাক্য সংহিতা)। যাজকাং নবাদ্ধং সংগ্রহে চৈব তােজনম্ । স্ত্রীং প্রথমগর্ভে চ ভুক্ত চান্দ্রায়ণং চরেৎ ২২ ব্ৰজৌদনে চ শ্রাদ্ধে চ সীমন্তোন্নয়নে তথা । অশ্রাদ্ধে মৃত শ্রদ্ধে ভক্ত। চান্দ্রায়ণং চরেৎ ২৩ (নবম অধ্যায় , আপস্তম্বসংহিতা)। “বহু-বাজী কিংবা গ্রাম্যজীর (শূদ্ৰষাজী ব্রাহ্মণ,শূদ্ৰবহুল গ্রামবাজী পুরােহিত ব্রাহ্মণ, বাঁহাদের কথা পুস্তকের প্রথম ভাগে বিশেষ ভাবে বর্ণিত হইয়াছে ইহাদিগকে শান্ত্রকার পতিত বলিয়াছেন। অন্ন, আদ্য- • ভােজন করিয়া চান্দ্রায়ণ করিবে। ব্রহ্মেদিন নব আন্ধে + + + অন্ন শ্রদ্ধে, আদ্যশ্রাদ্ধে ভােজন চার্জায়ণ করিবে।” পাকানৰ আন্ধং ভুক্ত। চান্দ্রায়ণ চরেৎ ৯২, অতি সংহিতা “পাচক (রাধুনী) ব্রাহ্মণের অন্ন ভােজনে চার্জায়ণ করিবে।” শাস্ত্রকার বলিতেছেন—হাঁস, কবুতর, মৎস্য, মাংস ও শূকর ভােজন তুল্য-অপরাধ। প্রায়শ্চিত্ত ১২ দিন উপবাস। পরে বলা হইতেছে- কবুতর ও কুকুট, সাদা বেগুন ও লাউভােজন তুল্য-অপরাধ। আজপত্য প্রায়শ্চিত্ত। ভগবান বিষ্ণু বলিতেছেন শুন, পেঁয়াজ, শাজয় ও লণ্ডনাদি গন্ধযুক্ত ব্য—এম কুকুর, বিড় বরাহ, গােমাংস অপরাধ ও প্রায়শ্চিত্ত। ভক কি অভ নিশ্চয় জানা যায় নাই এবং অজ্ঞাত মাংস, ধনস্থিত (কাই থানার) মাংস, গুরু মাংস ভােজন কর তুল্য অপরাধ। দণ্ড চাত্রায় প্রায়শ্চিত। এই ত গেল অভ মাংসাদি ভােজনের দণ্ড। এক্ষণে চণ্ডালদি নীচ নীচ জাতির অন্ন ভােজনে কি অপরাধ ও দণ্ড শ্রবণ করুন। ব্লেচ্ছাপেক্ষা উন্নত চণ্ডালাদি নীচ জাতির অন্ন ভােজন, শূদ্রজী ব্রাহ্মণের অন্ন ভােজন, অধীত বেদ বিস্মরণ, শুনাদি ক্ষণ, পরব্য অপহরণ, পরস্ত্রীগমন, ব্রাহ্মণের পক্ষে ক্ষত্রিয়ের যুদ্ধাদি, বৈশ্যের কৃষি বাণিজ্য দোকানদারী প্রভৃতি, শূদ্রের কাৰ্য্য দাসত্ব করা চাকরী করা গােলামী করা প্রভৃতি , ক্ষত্রিয় হত্যা, বৈশ্য হত্যা, শূদ্র হত্যা, স্ত্রী হত্যা, গাে হত্যা, লবণাদির বিক্রয়, কশ, গুল্ম, লতা বিনাশ করা, কৃষকের ওষধি নষ্ট করা, দেৰ পিত্রাদির উদ্দেশে নয় পর নিজের জন্য পাকানুষ্ঠান করা, দেবঋণ পিতৃঋণ ও ঋষিঋণ পরিশােধ না করা, থিয়েটারের বা যাত্রার দলে থাকা, রজক ব্যাধ, ডােম, চানার বা মুচির অন্ন ভােজন, আদ্য শ্রাদ্ধের অন্ন ভােজন, রাঁধুনি বামুনের অন্ন ভােজন শূদ্রযাজন, পিতা মাতা ও গুরুতগ, টাকা ধার দিয়া তাহার সুদে জীবিকা নির্বাহ করা, সােনার খনিতে বা বড় পুলে চাকরী করা, জ্বালানি কাঠের জন্য তাজা গাছ কাটা, শূদ্র সেবা ভূল্য অপরাধ। দও ব্রাহ্মণের পক্ষে চান্দ্রায়ণ প্রায়শ্চিত্ত। পাঠকগণ, এক্ষণে দেখুন বঙ্গের হিন্দু সমাজ কিরূপ শাস্ত্রানুসারে ও ধৰ্ম্মবিধি মানিয়া চলিতেছে। মুখে মুখে আৰ্য্যধর্মের গৌরব ঘােষণা করিলে,- বর্ণাশ্রম ধর্মের জয় ঘোষণা করিলে লাভ নাই। প্রবৃত্তি মার্গে সমাজ । সাঁ করিয়া ছুটিয়া চলিয়াছে উদ্দাম বেগের সম্মুখে আর বাধা দিয়া রাখিবার ক্ষমতা সমাজপতির ত দূরের কথা বিধাতা পুরুষের পর্যন্ত বােধ হয় নাই। সমাজপতিগণ। সতর্ক হউন, আর ২৫ বৎসর। তাহা হইলে চেচা চেঁচি সৰ ৰন্ধ হইয়া যাইবে।
জল ও পলাশ চিার। হিন্দু সমাজ এখন দেখ দেখি তােমরা আমেরিকা ফ্রান্স জার্মানি জাপান বা বিলাত যাত্রী অপেক্ষা কোনও অংশে নিরপরাধ কি না? তারা বিদেশে যাইয়া যাহা করিতেছেন-তােমরা বাড়ী বসিয়াই সে সমুদয় অপরাধ করিতেছ। অথচ তােদর মিছামিছি শাস্ত্রের দোহাই দিয়া নিরক্ষর লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি সরল বিশ্বাসী হিন্দুর মনে ধাঁধা জন্মাইয়া, কুসংস্কার জন্মাইয়া দিতে চেষ্টা করিয়া হিন্দু সমাজের হিন্দুজাতির সর্বনাশ সাধন করিতেছ। ম্লেচ্ছায় এহণের বা নানাবিধ অভক্ষ ভক্ষণের অপরাধে যদি তাহাদিগকে অপরাধী সাব্যস্ত করিতে হয়, তবে সে সব অপরাধে তােমরাও ত বাদ পড় না! তােমরাও ত তুল্য অপরাধী। তাঁহারা হয়ত একটা অপরাধ করিতেছেন-মাতৃভূমির কোটি কোটি স্বজাতীয়ের মঙ্গল অনুষ্ঠানের জল-আর তােমরা করিতেছ সেইরূপ শত শত অপরাধ, তা বিনা কারণে ঘরে বসিয়া। সমাজ এ সব অত্যাচারই নীরবে সহ করিয়াছে এতকাল। যে দেশের শতকরা ৯৫ জন লােক নিরক্ষর, যে দেশের ৩১ কোটি লােকের মধ্যে সাড়ে উনত্রিশ কোটি লােক নিরক্ষর, সে দেশে শাস্ত্রের দোহাই দিয়া ভগবানের নাম লইয়া ফাকি দিয়া ভুল ধারণা জন্মাইয়া দেওয়া কঠিন কাৰ্য্য নহে। তােমাদের শাস্ত্রের বচনের জাড়ি জুড়ির কাল শেষ হইয়া আসিয়াছে। আর নয়-স্মৃতি সংহিতার পাতা পাতনি এখন গুটাইয়া লইয়া শিকায় তুলিয়া ফেল। বিংশ শতাব্দির কালের বা নৰ জাগরণের-নূতন জীবনে, শিক্ষা দীক্ষার প্রবল স্রোত বহিয়াছে। তাড়াতাড়ি না করিলে সামলান ভার হইয়া উঠিবে। দেখিতে দেখিতে দেশ আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিবে। তােমার টিকিতে হাত দিয়া ভাবিবার অবসর পর্যন্ত দিবে না। বাঁধ বাঁধ -সতি সংহিতা পুরণ গল তাড়াতাড়ি বাঁধিয়া ফেল। ঐ গুন বেদাতের গভীর গর্জন। খেকশিয়ালের রব আর কতকাল তিঙিতে পারিবে। বেদান্ত কেশরী আসিয়াছে—পতি সংহিতারূপী
অপরাধ ও শান্তি।
খেলিগণ এখন আপনাপন পলাইবার গর্ত অনুসন্ধান করুন।
আরও শাস্ত্র বচন এগের সাধ আছে কি? যদি থাকে তবে শোন
সুরাপান সম্বন্ধে তােনাদের স্মৃতিকারগণ সমস্বরে কি বলিতেছে।
শউশনঃ (১ম শ্লোক ৮ম অধ্যায়), বিষ্ণু (পঞ্চণি অধ্যায় ১২৪)
অত্রি (১৬৪ শ্লোক), যাজ্ঞবল্ক্য ( ২২৭-তৃতীয় অধ্যায়), গৌতম (আবিংশ
অধ্যায়), বশিষ্ঠ (প্রথম অধ্যায়) প্রভৃতি ঋষিগণের সহিত ক মিলাইয়া
বলিয়াছেনঃ-
ব্ৰহ্ম হত্যা সুরাপানং বেয়ং গুনাগম।
মহান্তি পাতকান্তাহঃ সংসৰ্গশ্যাপি তৈঃ সহ ৫৫
(একাদশ অধ্যায়, মনুসংহিতা।)
“ব্ৰহ্মহত্যা, সুরাপান, ব্রাহ্মণের সুবর্ণ হরণ, গুরুপত্নীগমন, ও এই
সকল পাপীর সহিত এক বৎসর পর্যন্ত সংসর্গ—এই পাঁচটাকে “মহা পাতক”
আর তার প্রায়শ্চিত্ত ও দণ্ড।
সুরাং পীত্ব দ্বিজো মােহাগ্নিবর্ণাং সুরাং পিবেৎ।
তয়া সুকায়ে নিবন্ধে মুচ্যতে কিন্মিত্ততঃ ৯১
গােমূত্র মগ্নিবর্ণ বা পিৰেদুদকমেব বা।
পয়াে মৃতং বা মরণাগােশকসমেব বা ১২
(একাদশ অধ্যায়, মনুসংহিত)
“বাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য জ্ঞানপূর্বক সুরাপান করিলে, ঐ পাপ
অর্থ অগ্নিবর্ণ জল পান করিবে; ঐ সুমার দ্বারা শরীর একেবারে
দগ্ধ হইলে পর তবে পাপের নিষ্কৃতি হয়। অথবা অগ্নিবর্ণ অলন্ত গােমূত্র
বাজল দুগ্ধ মৃত বা গােময় জল যতক্ষণ না মৃত্যু হয়, ততক্ষণ পান করিবে।
এইরূপে মরিলেই উক্ত পাপের নিষ্কৃতি
} জলচল ও পদোষ বিচার। গৌতম বলেন- সুপ ব্রাহ্মণসোফামাসিঞ্চেয়ুঃ সুরাগে মৃতঃ ধেৎ। ( চতুর্বিংশ অধ্যায়, গৌতম সংহিতা) “মদ্যপ ব্রাহ্মণের মুখে উষ্ণমণ্য নিক্ষেপ করিবে; তাহাতে মৃত্যু ইলে উহার পাপ ক্ষয় হয়। প্রায় সমুদয় হিন্দুরই বিশ্বাস গােমাংস ভক্ষণ তুল্য আর পাপ নাই, কিন্তু শুনিয়া আশ্চর্যান্বিত হইবেন, শান্ত্রকারগণ গাে- মাংস ভক্ষণ ও সুরাপান অপেক্ষা অল্প পাতজনক বলিয়াছেন। বিষ্ণু সংহিতায় লিখিত আছে - অভক্ষণ ব্রাহ্মণ দুষয়িতা ষােড়শ সুবর্ণা ১৭ জাত্যপহারিণাশতম্ ॥১৮। মুরয়া বধ্য ৯৯ (পঞ্চম অধ্যায়) “অভ দ্বারা ব্রাহ্মণকে দূষিত করিলে, ঘােড়শ সুবর্ণ অর্থদণ্ড, জাতি নাশক অভক্ষ্য গাে-মাংসাদি দ্বারা দূষিত করিলে শত সুবর্ণ অর্থদণ্ড; আর সুরারা দুষিত করিলে বথদণ্ড।” কিন্তু হায়! এই সুরা বিশ্ববিজয় করিয়াছে। রাজা, মহারাজা, জমিদার, তালুকদার, প্রফেসর, উকীল, মােক্তার, কবিরাজ, ডাক্তার, শিক্ষক হইতে আবম্ভ করিয়া গুরু পুরােহিত আর্ত পণ্ডিত পৰ্যন্ত এই সুরাস্রোতে ভাসমান—নিমজ্জমান। এখানে দণ্ডের কথা প্রায়শ্চিত্তের কথাটা মাত্র নাই। শমু স্মৃতি এখানে কেঁচো প্রায়। যত হাৰি তাৰি বচন শ্লোক বিলাত ফেরতের পক্ষে, আহাবাদি ও জলচল “জলচল” শুনিলেই প্রভুরা চমকিয়া উঠেন ও ঘোর কাল আগমনের স্বপ্ন দেখেন এবং বর্ণাশ্রম ধর্মের দাত খেমটী বাহির করেন। লােকে রঘুনন্দন ও মনুকে রম্ভা প্রদর্শনপূর্বক অনবরত বিচারালয়ে হলপ পড়িয়া মিথ্যা সাক্ষ্য দিতেছে। তাহাতে সমাজে উচ্য বাচ্য নাই-ধর্ম গেল ধর্ম গেল প্রভৃতি রব নাই কিন্তু শাস্ত্র বলিতেছে অপরাধ ও প্রায়শ্চিত্ত। ব্রাজকতা বেনিনা কৌটসাক্ষ্যং সুষ। গহিতাদ্যমাের্জখি সুরাপান সানি ঘট৫৭ (একাদশ অধ্যায় ; মনু সংহিতা) “অনভ্যাস হেতু ব্রাহ্মণের পক্ষে বেদ বিস্মরণ, কে নিন্দা, সাক্ষ্যস্থলে মিথ্যা কথন, মিত্রবধ, লন্ডন প্রভৃতি গহিত ও বিষ্ঠা মূত্রাদি অখাদ্য দ্রব্যের ভােজন—এই ছয়টী সুরাপানের সমান পাতক।” প্রায়শ্চিত্ত অর্থাৎ প্রাণদণ্ড। অতঃপর আহারাদি সম্বন্ধে লঘুতর দণ্ডের ব্যবস্থা লিখিত হইতেছে। ভুক্ত। সপ্তরাং পয়সা বৰ্তেত ॥৭ তক্ষকান্নং কর্মক ৮ ৰান্ধষিককদৰ্য্যদীক্ষিতদ্ধনিগড়াভিশস্তষণাঞ্চল পুংলী দাম্ভিক চিকিৎসকলুব্ধকরােঘোচ্ছিষ্টভােজিনাঞ্চ ১০ * * সুবর্ণকার সপত্ন পতীনাঞ্চ ১১ পিশুনানৃতবাদিক্ষতধৰ্মাত্মরসবিয়িনাঞ্চ ॥১২ শৈলুষতন্তুবায়কৃত রজকানাঞ্চ ১৩ কর্মকারনিষাদরঙ্গাবতারিবেণশস্ত্র বিক্রমণাঞ্চ ১৪ জীবি- শৌণ্ডিকতৈলিকলৈনিনেজকানা ১৫ ** নার্চিতং বৃথামাংস ২০ (বিষ্ণুসংহিতা ৫১শ অধ্যায় , মনু ৪র্থ অধ্যায়) “তক্ষকের (ছুতারের) অন্ন, চর্মকারের অন্ন, সুদ খােরের অন্ন, ব্যভি- চারিণী স্ত্রী, চিকিৎসাজীবী, লুক, কুর, সুবর্ণকার (সেকরা ), শক্ত, পতিত, পিশুন ( অসাক্ষাতে পরনিন্দাকারী), মিথ্যাবাদী, ধর্মভ্রষ্ট, সোমৰিক্ৰয়ী, নট, তন্তুবায়, কৃতঘ্ন, রজক (ধােপ ), কৰ্ম্মকার (কামার, নিষাদ (বাধ) বেণুজীবী, লৌহবিক্রয়ী, ঋজীবী (কুকুরবৃত্তিধারী, চাকুরে, দাস গােলাম ), শৌণ্ডিক (মুড়ী), তৈলিক ( তৈলবিক্রয়কারী কলু) ইহাদের প্রতে- কেব অল্প, অনৰ্চিত (অনিবেদিত) অন্নাদি অথবা বৃথা মাংস ভােজন করিলেও সাত দিন দুগ্ধ আহারে জীবন ধারণ করিব।”
জলচল ও স্পর্শলােব বিচার। শায় আরও বলিতেছেন- রাজাং হরতে তেজঃ মূত্রানুং ব্ৰহ্মবর্ভস। ২৯৮। (মনু ২১৮, ৪র্থ অধ্যায় ; অত্রি সংহিতা) “রাজার অন্ন তেজ-এবং শূদ্ৰান্ন ব্রাহ্মণ্য নষ্ট করে (সুতং অভােজ্য)। দণ্ডপ্রাজাপত্য প্রায়শ্চিত্ত। অধীত্য চতুরে বেদান সর্বশাত্মার্থ তত্ত্ববিৎ। নরেন্দ্র ভবনে ভুক্ত। বিচায়াং জায়তে কমিঃ ৩০০ “চতুর্বেদ্যায়ী, সৰ্ব্বশাস্ত্ৰ মৰ্ম্মজ্ঞ (ব্রাহ্মণ) রাজার ভবনে ভােজন করিলে), বিষ্ঠাতে কৃমি হইয়া জন্ম গ্রহণ করে। ব্রাহ্মণ মহাসম্মিলনীর সভাপতি মুসঙ্গের ব্রাহ্মণ মহারাজা এবং রাজা শশিশেখরের বাহাদুর কি বলেন? যাঁহারা ব্রাহ্মণ্য ধর্ম রক্ষার জন্য উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়াছেন- তাহাদের সম্বন্ধে শাস্ত্রকার কি কঠোর মন্তব্যই না প্রকাশ করিয়াছেন। মধু আরও বলিতেছেন - রাজা তেজ আদত্তে শূদ্ৰান্নং ব্ৰহ্মবর্ভস। আয়ুঃ সুবর্ণকান্নাং যশশৰ্মাবকনি। ২১৮ | কারুকান্ত প্রজাতি বলং নিজেক চ। গণন্ন গণিকায় লােকে পরিকতি।২১৯। পুয়ং চিকিৎসকস্তান্নং পুংকানমিত্রিয়। বিষ্ঠা বাৰ্ধষিকস্যাং শক্ৰিয়িলাে মল। ২২০ শত্যা ভুক্তা চরেৎ কছু নেতােৰিত্ৰমেচ। ২২২ ( চতুর্থ অধ্যায়) “সুবর্ণকারের অন্ন ভােজনে আয়ু নষ্ট হয় এবং চর্শকারের অন্ন ভােজনে অতি লােপ হয়। শিকাবের অন্ন ভােজন করিলে সন্তান নষ্ট , অপরাধ ও প্রায়শ্চিত্ত। ; বাধাবকের অন্ন ভােজনে বল হানি করে; মিলিত জনসমূহের (হােটলাদির) অন্ন এবং বেশ্যার অন্ন ভােজন কৰিলে কর্মান্তর্জিত স্বর্গদি লােক হইতেও ভ্রষ্ট হইতে হয়। চিকিৎসকের (কবিরাজ মহাশয় ও ডাক্তার বাবুদের) অন্ন ভোজন পুজ সমান, অসতী স্ত্রীর অন্ন ভােজন শুক্র ভােজন তুল্য ; বৃদ্ধি উপজীবির অন্ন ভােজনে (সুদখাের মহাজন গণের অন্ন ভোেজন) বিষ্ঠা ভােজনের সমান ও লৌহবিক্রয়ীর অন্ন ভােজন শ্লেষ্মা ভােজন তুল্য ঘণিত জানিবে। ৫ । ইহাদিগের মধ্যে যে কাহারও অন্ন জ্ঞানতঃ ভােজন করিলে কৃচ্ছ অর্থাৎ প্রাজাপত্য ব্রতের আচরণ করিতে হয় এবং রেত, বিষ্ঠা ও মূত্র ভােজনেও ঐ প্রায়শ্চিত্ত।” এক্ষণে দোকানের বা শূদ্রদের চিড় মুড়ি খাওয়ার সম্বন্ধে শাস্ত্রকারের অনুশাসন লেখা যাইতেছে। শুন্নবি ভুক্তা সপ্তাহ মৃতি। ৪৬ (অঙ্গিরঃ সংহিতা, ১ম অধ্যায়), “ব্রাহ্মণ, অব্রাহ্মণের (শূদ্রের) শুষ্কা (চিপিটকাদি। ভােজন করিলে সপ্তাহ ব্ৰত করিবে।” বঙ্গের ব্রাহ্মণগণ যে সিদ্ধান্তকে চিরসাথী করিয়াছেন দেখা যাউক শাস্ত্রকার সে সম্বন্ধে কি বলিয়াছেন। মনু বলিতেছেন- অভােজ্যমন্নং নামাখন জিনিচ্ছতা অজ্ঞান ভুক্তভূর্বং শােধ্যং বাপ্যাগুশােধনৈ ১৬১ (একশ অধ্যায়) “আত্মশুদ্ধিকামী ব্যক্তির কদাচ প্রতিষিদ্ধ অন্ন সিদ্ধান্ত) ভােজন করা উচিত নয় , প্রমাণ বশতঃ ঐরূপ অন্ন ভক্ষণ করিলে তৎক্ষণাৎ বমি করিয়া ফেলিবে, যদি তা সম্ভব না হয়, তবে শীঘ্রই ব্ৰহ্মসুলা নামক ওষধির কথিত জল পান করিবে।”
। জল ও স্পর্শদোষ বিচার। ইহা হইতেছে এমাদ বশত অজানকৃত ভােজনের অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত। প্রতিদিনের বেলার জ্ঞান কৃত অপ্রমাদ জনিত এই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত পণ্ডিতমহাশয়গণ করিতেছেন কি? না, বিধি ব্যবস্থা আইন কানুন দণ্ড প্রায়শ্চিত্ত সব শুদ্রের বেলায়। নিজেদের জন্য নহে। অতঃপর অনাচরণীয় শূদ্রগণের জল পান সম্বন্ধে আলােচনা করা যাউক। শাস্ত্রে বহু স্থানে শূদ্ৰস্পৃষ্ট জল পান সম্বন্ধে নিষেধ বিধি করা হইয়াছে যথা:- “যে ব্রহ্মচারী শূদ্র হত আনীত অন্ন কিংবা পানীয় দ্রব্য ভােজন বা পান করে, সে এক অহােরাত্র উপবাস অন্তে পঞ্চগব্য পান করিয়া শুদ্ধ হইবে”। (অনুবাদ, সংবর্তসংহিতা, ৩০শ শ্লোক) অথবা। “ব্রাহ্মণ অজ্ঞানপূর্বক শূদ্ৰস্পষ্টজল পান করিলে আনান্তে গঞ্চগব্য পান পূর্বক এক দিন উপবাস করিয়া শুদ্ধ হইবে।” (অতিসংহিতা, অনুবাদ ২৪৮ শ্লোক)। পাঠকগণ দেখিবেন—শাস্ত্রকার শূদ্রের জল অপানীয় লিখিয়াছেন কিন্তু রঘুনন্দন ইহার মধ্যে বেশ এক চাল চালিয়া লইয়াছেন। তিনি শত করা ও জন ব্রাহ্মণ বাদদিয়া ৯৪ জন বঙ্গীয় হিন্দু সন্তানকে ক্ষুদ্র করিয়াছেন—জলও শতকরা ৪৮ জনেব পানীয় রাখিয়াছেন। অর্থাৎ ‘ধরি মাছ না ছুই পানী। একে বাবে সৰদ্ধকে৯৪ জনকে অচল, অনাচরণীয়, অপানীয় বলিলে তাহারাও মানিবে না, নিজেদেরও ও চলিবে না। তাই অর্ধেকের মত গায়ে হাত বুলাইয়া—পৃষ্ঠদেশ চাপ্রাইয়াহ য ব র ল একটা নূতন কিছু করিয়া লইতে চেষ্টা করিয়াছেন। সমুদয় ক্ষত্রিয় বৈশ্যকে শুদ্রও করিলেন, জলও চালাইলেন এবং এক কালে সর্বশুদ্ধ লােককে চটাইতেও হইল না। শতকরা ৪২ জনকে হাতে রাখিয়া তাহাদিগকে জলচলের অধিকার দিয়া অবশিষ্ট ৫৮ জনের প্রতি তাহাদিকের দ্বারাই পাশবিক অত্যাচারের সূচনা করিয়া দিয়া অপরাধ ও এমভি। হিন্দু জাতির সর্বনাশ সাধন পূর্বক শুদ্ৰবিদ্বেষের পুঞ্জীভূত পাপ লইয়া ধরা হইতে অপহৃত হইলেন—সঙ্গে সঙ্গে গৃহে গৃহে গৃহে ভাই ভাই এর মধ্যে ছুৎমার্গের’ দারুণ ঘণার বহ্নি জ্বলিয়া উঠিল। উহারই শােচনীয় ফল স্বরূপ আজ হিন্দুজাতি মরণােন্মুখধ্বংসােম্মুখ। শাস্ত্রকার শূদ্ৰাত্রকেই অনাচরণীয়, অপানীয় করিয়াছেন। রঘুনন্দন অনাচরণীয় সমুদয় শূদ্রকে আচরণীয় বা পানীয় সূত্র করেন নাই, অনধিকারীকে অধিকারী করেন নাই বরং সুবর্ণবণিক প্রমুখ সৰ্ব্বশাস্ত্র সম্মত সৰ্ববাদী সম্মত বৈজাতিগণকে অধিকার হইতে বঞ্চিত করিয়াছেন। তুলিবার ক্ষমতা তাহার ছিল না তিনি দাবাইয়াই গিয়াছেন। অথবা ক্ষমতা ছিল কিন্তু বুদ্ধ গৌরাঙ্গের মত ভঁহার হৃদয়ে অত্যন্ত অভাব ছিল। তাই তুলিবার পরিবর্তে ফেলিয়া দিয়াছেন, গ্রহণের পরিবর্তে বর্জন করিয়াছেন, প্রেমের পরিবর্তে ঘৃণা বিদ্বেষই প্রচার করিয়া গিয়াছেন। হাতে কলাণকারিণী শক্তি অনেকখানি ছিল কিন্তু উহা দ্বারা হিন্দু সমাজের কল্যাণ সাধনের পরিবর্তে ধবংস সাধনই করিয়া গিয়াছেন। বালকের হস্তে লৌহ অস্ত্র দিলে যাহা সচরাচর হইয়া থাকে তাহাই হইয়াছে। বঙ্গদেশে অনাচরণীয় শূদ্রগণের স্পর্শিত দধি গ্রহণযােগ্য নহে। কিন্তু শাস্ত্রকার তদীয় হীন অস্পৃশ্য অপানীয় শূদ্রগণের দধি ব্যবহারযােগ্য ও গ্রহণযােগ্য বলিয়া ব্যবস্থা দান করিতে কুণ্ঠিত হন নাই। ঋষি অত্রি বলিতেছেন - দেব যাত্রা বিবাহে যজ্ঞ প্রকরণেষু চ। উৎসবেষু চ সর্বেষু স্পষ্টাস্পৃষ্টবিদ্যতে ॥২৪৫ আনলিং তথা ক্ষীরং কং দধি শক্ত। নেহপঞ্চ তক্রঞ্চ শূদ্রশ্যাপি ন দু্যতি ॥২৪৬ “দেব যাত্রা (দেব দর্শনার্থ গমন), বিবাহ, এবং সকল উৎসব সময়ে স্পর্শ দোষ নাই। আরনাল ( কঁজি, অম্লজল), দুগ্ধ, খই প্রভৃতি, দধি, শতু,
৭০
জলচল ও স্পর্শদাষ বিচার।
নেহৰু (তৈলালি কারা পৰু) ও তক্ৰ (ঘােল) শূদ্ৰকৃত হইলেও (তাহা
তক্ষণ করিলে ব্রাহ্মণাদির) দোষ হইবে না।”
মনুও বলিয়াছেন।
এধােদকং মূলফলমদ্যত যৎ।
সৰ্বতঃ প্রতিগৃহীয়ান্মহাভয় দক্ষিণ ২৪৭
শষ্যাং গৃহা কুশান্ গন্ধানপঃ পুন্সং মণীন্দধি।
ধানমৎস্যায়ােমাংসং শাকঞ্চৈবন নিনুদেৎ ২৫০
( চতুর্থ অধ্যায়, মনুসংহিতা)
“কাঠ, জল, মূল, ফল ও খাদ্যযাহা অযাচিত ভাবে আপনা আপনি
উপস্থিত হয়, এই সকল এবং মধু ও অভয়দান, সকলের নিকট হইতেই
প্রতিগ্রহ করা যায়।” শষ্যা, গৃহ কুশ, কপূরাদি গন্ধ দ্রব্য, জল, পুষ্প,
মণি, দধি, ধানা (ভৃষ্ট যব তণ্ডুল) মৎস্য, দুগ্ধ, মাংস ও শাক-এ সমুদায়ও
অম্বাচিত ভাবে উপস্থিত হইলে প্রত্যাখ্যান করিবে না।” উপরে এবং এখানে
সর্বজাতির জল চলের বিধি পাইতেছি। পাঠকগণ, লক্ষ্য করিবেন। তবে
পাক চণ্ডল সম্বন্ধে ব্যবস্থার কিঞ্চিৎ ইতর বিশেষ করা হইয়াছে।
যথাঃ-অত্রি সংহিতায় -
পাক চাল পরিগ্রহে
তু
শীৰ জলং পঞ্চগযেন শুদ্ধি ২২৯
“পাক চালাদি নীচগতি সৃষ্ট জল পান করিয়া গঞ্চগব্য পান করিলে
শুদ্ধ হইবে।” (আপনু সংহিতায় ২য় অধ্যায় ২য় শ্লোকেও এই একই কথা
বলিতেছেন)
অপরাধ ও প্রায়চিত্ত আপাতও বলিতেছেন অন্যৈ খানিতাঃ কুপন্তড়াগানি তথৈব চ। এমু আাচ পাচ পঞ্চগবেন শুধাতি ॥ দ্বিতীয় অধ্যায়) অন্য কর্তৃক কুত কুপ, তড়াগ প্রভৃতি জলাশয়ের জলে স্নান এবং তাৰ পান করিয়া পঞ্চগব্য দ্বারা শুদ্ধ হইবে।” পঞ্চগব্য পান করিয়া শুদ্ধ হওয়া আর তাসের ঘরে বাস করা সমান নহে কি? একটা থােকা দেওয়া হইয়াছে মাত্র 'চুনাগী ব্রাহ্মণগণ “ছুৎমার্গের দোহাই দিতে যাইয়া অনেক সময় পাগলামী প্রকাশ করিয়া ফেলিয়াছেন।নতুবা যে তীর্থ ক্ষেত্রকে আচাৰ্য্যগণ মহা মহা পাপী উদ্ধারণ বলিয়া, কোটি কোটি জন্মের পাপ, মলিনতা হরণকারী বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন, যে তীর্থের পবিত্র রজঃস্পর্শে গাে-বধ, ব্ৰহ্ম-বধ, মহা অশুচি, পাক চণ্ডাল পর্যন্ত শুচি শুদ্ধ মুক্ত বুদ্ধ হইয়া যায় সেই সুপবিত্র তীর্থ ভূমিকেও চণ্ডালাদি স্পর্শে অশুচি হয় বলিয়া সংহিতাকারগণ ব্যাখ্যা করিয়াছেন। হায় । শুদ্ধ মুক্ত ঋষিগণের মানব প্রেমজীব শিবে অভেদবুড়ি অদ্বৈত জন, সৰ্ব্বং খন্বিদং ব্ৰহ্ম বলার সার্থকতা সম্পাদন। সংবৰ্ত্ত সংহিতার নামে বলা হইতেছে। অন্ত্যজৈঃ স্বীকৃতে তীর্থে তড়াগেৰু নদী চ। শুতে গগনে পীত্ব তােরমকামতঃ ১৮৩ “অন্ত্যজ জাতি কর্তৃক অপবিত্ৰীকৃত যে সকল তীর্থ, পুষ্করিণী এবং নদী তাহার জল অজ্ঞান পুৰ্ব্বক পান করিয়া পঞ্চগব্য জারা শুদ্ধ হইবে।” অন্ত্যজ স্পর্শে তীর্থ, নদী পর্যন্ত অপবিত্র ও অন্ধ হইয়া যায়। তীর্থের ত মান ও মূল্য এই প্রকার বাড়াইয়াছেন। অন্যকে শুচি ও পবিত্র করা ত দূরে থাকুক তীর্থ নিজেই অপবিত্র হইয়া থাকেনহীনের স্পর্শে। শূদ্রের অল্প যে ঠেকিলেই ব্রাহ্মণগণ ভােজন কবিয়াছেন তাহার প্রমাণ শাস্ত্রেই রহিয়াছে। আজব সংহিতায় রহিয়াছে।
१२ জলচল ও স্পর্শদাষ বিচার। অদভাগ্নিহীনস্ত নামমদাদনাপদি ১৬০প্রথম অধ্যায়) ‘অগ্নিহীন ব্যক্তির (অর্থাৎ যাহাদিগের শ্রোতা অগ্নিতে অধিকার নাই, তাহাদিগের সূত্রাদির) অন্ন আপৎকাল ব্যতীত ভােজন করিবে না।” অর্থাৎ আপৎকালে স্বচ্ছন্দে ভােজন করা যায়। ফলতঃ বর্তমান সময়ের ন্যায় হিন্দুর এমন আপৎকাল আর কখনই বা ঘটিয়াছে। আপৎকালে তু বিশ্ৰেণ ভুক্তং শূদ্র গৃহে যদি। মনপেন ওধ্যেত দ্রুপদাং বা শতং জপেৎ ॥১১ (একাদশ অধ্যায় ; ২০শ শ্লোক, ৮ম অধ্যায়, আপস্তম্ব।) “যদি কোনরূপ আপকালে বিএ শূদ্রগৃহে ভােজন করেন তবে তাহাতে তাঁহার মনস্তাপ জন্মিলেই শুদ্ধ হইবেন, অথবা শতবার গায়ত্রী জপ করিবেন।” আমাদের বড় দেশে আচরণীয় জাতি ভিন্ন অঙ্গের স্পৃষ্ট জল ও দধি ব্যবহাৰ্য্য ও পানমােগ্য নহে। যত শান্ত, বিধি ঐ জল টুকুর মধ্যে, যত দোষী ঐ জল লৈ টুকু লইয়া। অনাচরণীয় হিন্দু ত দূরের কথা ভিন্ন ধর্মাবলম্বী অনাচারী (?) মুসলমানগণেব দাইল সম্ভার দানের অশুচি দুষ্ট ভাণ্ডে আনীত, অনেক সময় পচা পাগাছের ডােবার ময়লা পানী মিশ্রিত দুগ্ধ ব্যবহাবে আমাদের বিন্দু মাত্রও আপত্তি নাই। মুসলমান দুগ্ধ বিক্রেতার অনেকের মুখে শুনিয়াছি—“দুধের ভাঁড়ে দাইল সম্ভাব দিলে সে দাইল খাইতে অত্যন্ত সুস্বাদু হয় বলিয়া আমরা মাঝে মাঝে উহাতে দাইল সম্ভার দিয়া থাকি। আর পানী দেওক্স (দুধে জল দেওয়া) সে ত আমাদের অত্যন্ত কাৰ্য! প্রতিদিন ত আর দুধ সমান হয় না, কিন্তু আমাদের মােজ দেওয়ার দুধ সমানই দিতে হয়, কাজেই গঙ্গা মাইর আয় লওয়া ভিন্ন আমাদের গত্যন্তর কি? তবে ঠাকুর মহা! আমরা গােয়ালাদের মত বেশী জল দেই না। অল্প করিয়াই- সামাল দিই পরিমাণ ঠিক রাখিবার জন্য।” ইত্যাদি। স্বার্থান্ধ সমাজপতি।
অপরাধ ও প্রায়শ্চিত। এসবই তুমি দেখিতেছ কিন্তু তথাপি তুমি নীচ আৰ্যাশী ছাড়িয়া মন মুখ এক করিতেছ না। মুসলমান ভাইগণের ত শুচিঅশুচি এটো বাচ বিচার নাই। তাহাদের দেহ বিছানা আসবাবপত্র কুপােদক সবই ত আমাদের পক্ষে ঘাের অশুচিজনক (1) সুতরাং কেমন করিয়া তাহাদের দোহন করা ভাড়ের দুধ শুচিবাই গ্ৰন্ত আমাদের চলিতে পারে বলিয়া দিবে কি? দুধ ও জল মিশ্রিত দুধ যদি চলে তবে শুধু জল চলে না কেন ? কি তােমার বৈজ্ঞানিক যুক্তি আছে দেখাও দেখি ? শাস্ত্র ছাড়া, বেদ তন্ত্র পুরাণ সংহিতা, পূর্ব পুরুষগণের প্রচলিত “সনাতন ধর্ম” নিয়ম ছাড়া কোন কথা কোন যুক্তি শুনিতে চান, জিজ্ঞাসা করি কোন্ শাস্ত্রের কোন পাতায় কোন শ্লোকে মুসলমানের দুধ গ্রহণ ও পানের ব্যবস্থা আছে ? না—“ধরা পড়লে বৌএর মা, আর ফকিলেই চাচি ।” ধিক কপটাচারী অনভিষিক্ত সমাজপতিকে ধিক্ তােমাদের শাস্ত্র চর্চা, বিদ্যা বুদ্ধি, পাণ্ডিত্য উপাধিকে! ঐ ত শাস্ত্র বলিতেছেন ভাণ্ডস্থিতমভােজেযু জলং দধি ঘৃতং পয়ং অকামতন্তু যাে ভুক্তেপ্রায়শ্চিত্ত কথং ভবেৎ ॥ ২৪ ব্ৰহ্মণঃ ক্ষত্রিয়য় বৈশ্য শূদ্রোবাপপসর্পতি। ব্ৰহ্মকূৰ্চোপবাসেন যথা বর্ণ নিষ্কৃতি। ২৫ (পরাশর সংহিতা, একাদশ অধ্যায়।) “যাহার অনুগ্রহণ বা জলপান করা যায় না, তাহার ভাণ্ডস্থ জল, দধি, যুত বা দুগ্ধ যদি কেহ অজ্ঞানতঃ ভােজন করে, তবে তাহার প্রায়শ্চিত্ত কিরূপে হইবে ? ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়, বৈশ্য অথবা শূদ্র যদি উক্ত পাতকের প্রায়শ্চিত্ত ব্যবস্থা চাহেন, তবে বর্ণনানুসারে ব্ৰহ্মকুর্জ ভােজন বা উপবাসের কারা প্রায়শ্চিত্ত করিবাব বিধি দিতে হইবে।” (গােমূত্র, দুস্থ, দধি, ঘৃত ও কুশজল ইহাই ব্ৰহ্মকু… বলিয়া নির্দিষ্ট আছে। এই পঞ্চগ্য পবিত্র ও পাপ নাকারক।)
৭s জলচল ও স্পর্শদাব বিচার। অজ্ঞানতঃ ত দূরের কথা, সমাজপতিগণের ঢেলা ঢেলা দুই দুইটা চোখের সামনে সজ্ঞানেই এ সব চলিতেছে কিন্তু কৈ কাহাকেও ত গােবর চোদা খাইয়া শুদ্ধ হইতে দেখিতেছি না। বঙ্গদেশে রঘুনন্দনের মতে ত ব্রাহ্মণ ৬ জন ছাড়া আর বাকি ৯৪ জনই শূদ্র এবং ব্রাহ্মণগণ ত ব্রাহ্মণ ভিন্ন অন্য কাহারও অন্ন গ্রহণ করেন না। অথচ শাস্ত্রকার বলিতেছেন- যাহার হতে অল্প আহার ও জল পান করা যায় নাস্তাহার ভাও জল দধি-দুগ্ধও গ্রহণ করা যাইবে না। এমতাবস্থায় মুসলমান বা অনাচরণীয় হিন্দু ত দূরের কথা—দধি গুপ্ত ঘৃত ব্যবসায়ী বর্তমান শত্ৰ সংজ্ঞক ঘােষনন্দন এবং বৈদ্য কায়স্থ কর্মকার কুম্ভকার তিলি তালি বারৈ গন্ধবণিক প্রভৃতি আচরণীয় নবায়কগণের দধি দুগ্ধ ঘৃতও ব্যবহার্য হইতে পারে না। কেন না ইহাদিগের কাহারও অন্ন ব্রাহ্মণগণ আহার করেন না। সহৃদয় পাঠকগণ দেখিবেন শাস্ত্রকার কি বলিয়াছেন আর আমর কি করিতেছি। অথচ শত করা ৯৯ জন শাস্ত্র শাস্ত্র করিতেছেন ও শান্ত্রের দোহাই দিতেছেন। শাস্ত্র গিয়াছে ব্যবস্থা গিয়াছে, ধর্ম গিয়াছে, কর্ম গিয়াছে, আচার গিয়াছে নিঠা গিয়াছে,আছে কেবল মুণ্ডমালার দাত খো, ছুৎমার্গ, ‘ধর্ষ গেল ধর্ষ গেল’ রব। ধর্ম কি আর ভারতে আছে যে দিন মাতৃঘাতী নরশােণিত পিপাসু ব্রাহ্মণ অবতার পরশুরাম ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ডুবাইয়া দিয়া ব্যক্তিগত হিংসা বিদ্বেষ ও ক্রোধের বশবর্তী হইয়া ভারতমাতাব সুশীতল বক্ষ ব্রাহ্মণ্যধর্ম রক্ষক, গাে বিপ্র প্রতিপালক, লক্ষ লক্ষ ক্ষত্রিয় সন্তানের তপ্ত রুধিরে তৰ্পণ করিয়াছেন, যে দিন কুরুক্ষেত্রের কাল সমরে ভ্রাতৃবিরােধ যজ্ঞে সমগ্র ভারতের ক্ষত্রিয়কুল নিমন্ত্রিত হইয়া আত্মাহুতি প্রদান করিয়াছেন,সেই দিনই ভারতের ধর্ম কর্ম সাধনা পুণ্য যাহা কিছু ছিল, চিরনির্বাণ লাভ করিয়াছে। ধর্ম আর নাই—আছে কেবল উহার কঙ্কাল না-খােদ ভুসি,নারিকেলের ধৰ্ম আহারে। বাহ ছােবড়া বাহিরের আবরণ। ধর্ম থাকিলেবাবিংশতি কোটি মানব সন্তান-হিন্দু সন্তান এমন পশুর মত হীন ভাবে জীবন যাপন করিত “একদা যাহার বিজয় সেনানী হেলায় লঙ্কা বরিল জয়- একদা যাহার অর্ণব পােত অমিল ভারত সাগরময় সন্তান যার তিব্বত চীন জাপানে গঠিল উপনিবেশ তাহারাই আজ কিনা সমুদ্র যাত্রার নামে শিহরিয়া উঠে, দাত শিটকায়—আর ধর্ম গেল ধর্ম গেল বলিয়া চেঁচায় ? অদৃষ্টের এমন উপহাস আর কেহ কখন দেখিয়াছে কি ? “হিন্দুধর্মের স্যায় আর কোন ধর্মই এত উচ্চতানে মানৰ আত্মার মহিমা প্রচার করে , আবার হিন্দু ধর্ম যেমন পৈশাচিক ভাবে গরিব ও পতিতের গলায় পা দেয়, জগতে আর কোন ধর্মও এরূপ করে না। ভগবান্ আমাকে দেখাইয়া দিয়াছেন, ইহাতে ধর্মের কোন দোষ নাই। তবে হিন্দুধর্মের অন্তর্গত আত্মাভিমানী কতকগুলি ভণ্ড “পারমার্থিক ও ব্যবহারিক” নামক মত দ্বারা সর্বপ্রকার আক্ষরিক অত্যাচারের যন্ত্র ক্রমাগত আবিষ্কার করিতেছে” (১) “ধর্ম কি ভারতে আছে ? এখন ধর্ম কোথায় ? খালি ছুঁৎমার্গ, আমায় চুনা আমায় চুনা এই ভাব-দুনিয়া মহা অপবিত্র কেবল আমি ও আমরাই পবিত্র। জানমার্গ ভক্তিমার্গ কমার্গ সব পলায়িত, এখন আছেন কেবল ছুৎমার্গ, আমায় চুনা আমায় ছুনা। হিন্দুর ব্ৰহ্ম এখন ব্ৰহ্মলােকেও নাই—গােলকেও নাই—যােগ মুনি ঋষিগণের হৃদয় করেও নাই লরেও নাইবাগ যজ্ঞ উপাসনা তপস্যতেও নাই - এখন রান্নাঘরে এখন ভাতের হাঁড়িতে”। (২) রান্নাঘরে ঢুকিলেই, ভাতের হাঁড়ি স্পর্শ করিলেই ব্ৰহ্ম ওলট পালট, হ্যাকচ, পাক! হায়! হিন্দু সমাজ! তােমার কি না অধঃপতনই ঘটিয়াছে। প্রতিপদ- বিক্ষেপে তােমার জাতি যাইবার আশঙ্কা। যবন স্নেহের পদাঘাতে (১) স্বামী বিবেকাশ এত পশী।
জলচল ও স্পর্শদোষ বিচার। হাজার বৎসরের দাসছে—গােলানীতে পা-চাটায় যাহাদের জাতি যায় নাই। তাহাদের জাতি এত সহজে, একটু জল পানে যায় কেমন করিয়া বুঝিতে পারি না। বিধি ব্যবস্থার দৃঢ় বন্ধনে এ জাতির উত্থান শক্তি গতপ্রায় হইয়াছে। “বন্ধন খােলবন্ধন খােলজীবের যতদূর সাধ বন্ধন খােল, কাদা দিয়ে কি দেয়া যায় ? বন্ধনের দ্বারা কি বন্ধন কাটে-মুক্তি লাভ করা যায় ? (২) চীনাগণ যেমন একটি প্রাচীর নির্মাণ দ্বারা সমুদয় উন্নতি পথ রুদ্ধ করিয়াছিল, আমরাও সেইরূপ বিধি ব্যবস্থার দৃঢ় প্রাচীরে আবদ্ধ হইয়া অবনতির চরম সীমায় উপনীত হইয়াছি। কূপের ব্যাঙ যেমন মনে করে তাহার কুপই সারা বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড, এ ছাড়া জগৎই নাই—এর নিকট সাগর মহাসাগর দাড়াইতেই পারে না—আমরাও তদ্রুপ আমাদের নীচ আৰ্যামীর ক্ষুদ্র কুপে আবদ্ধ থাকিয়া ইহাকেই সারা বিশ্ব বলিয়া মনে করিতেছি—এবং আনন্দে আটখানা হইরা কতই আবােল তাবােল বকিতেছি। শাস্ত্রে প্রাতঃকাল হইতে রাত্রিতে শয়নের পূর্ব পর্যন্ত এতই বিধি নিয়ম লিপি বন্ধ হইয়াছে যাহা পালন করিতে মানুষ ত দূরে থাকুক মুনিগণও অসমর্থ। এই বিধি নিষেধের বেড়া জালে, হিন্দু জাতি আচ্ছন্ন। আবার বলি খুলে দাও বন্ধন-জাতিটা একটু হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচুক। সমাজের নিকট ব্যক্তির নিয়মের ও শিক্ষার শাসন দ্বারা চির দাসত্বের ও বলপূর্বক আত্ম বিসর্জনের কি ফল ও পরিণাম, আমাদের মাতৃভূমিই তাহাব জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। এ দেশে লােকে শাস্ত্রোক্ত আইন অনুসারে জন্মায়, ভােজন পানাদি আজীবন নিয়মানুসারে বরে, বিবাহাদিও সেই প্রকার; এমন কি মকি বার সময়ও সেই সকল শাস্ত্রোক্ত আইন অনুসারে প্রাণত্যাগ করে। এ কঠোর শিক্ষায় একটি মহৎগুণ আছে, আর সকলই দোষ। গুণী এই যে দুটা একটা কাৰ্য্য পুরুষানুক্রমে প্রত্যহ অভ্যাস করিয়া অতি অল্পায়াসে সুন্দর (৪) আশী বিবেকাৰৰ প্ৰশলী।
ধর্থ পাহারে। রকমে লােকে করিতে পারে। ••• কিন্তু এই সমস্তগুলিই প্রাণহীন যন্ত্রের ন্যায় চালিত হইয়া মনুষ্যে করে। তাতে মনােবৃত্তির দূর্তি নাই, হৃদয়ের বিকাশ নাই, প্রাণের স্পন্দন নাই, আশার তরঙ্গ নাই, ইচ্ছাশক্তির প্রবল উত্তেজনা নাই তীব্র সুখানুভূতি নাই, বিকট দুঃখেরও স্পর্শ নাই, উদ্ভাবনী শক্তির উদ্দীপনা একেবারেই নাই, নূতনদের ইচ্ছা নাই, নূতন জিনিসের আদর নাই। এ হৃদয়াকাশের মেঘ কখন কাটে না, প্রাতঃ সূর্যের উজ্জ্বল ছবি কখনও মনকে মুগ্ধ করে না। এ অবস্থার অপেক্ষা কিছু উৎকৃষ্ট আছে কি না, মনেও আসে না, আসিলেও বিশ্বাস হয় না, বিশ্বাস হইলেও উদ্যোগ হয় না, উদ্যেগ হইলেও উৎসাহের অভাবে তাহা মনেই লীন হইয়া যায়। “নিয়মে চলিতে পারিলেই যদি ভাল হয়, পূর্ব পুরুষানুক্রমে সমাগত রীতিনীতির অখণ্ড অনুসরণ করাই যদি ধৰ্ম হয়, বল, বৃক্ষের অপেক্ষা ধাম্মিক কে? রেলের গাড়ীর চেয়ে ভক্ত সাধু কে? প্রস্তর খণ্ডকে কে কবে প্রাকৃতিক নিয়ম ভঙ্গ করিতে দেখিয়াছে ? গাে মহিষাদিকে কে কৰে পাপ করিতে দেখিয়াছ? অতি প্রকাণ্ড কলের জাহাজ, মহাবলবা রেলের ইঞ্জিন, তাহা ও জড় চলে ফেরে, ধাবমান হয়, কিন্তু জড়। আর ঐ যে ক্ষুদ্র কীটাটী রেলের গাড়ীর পথ হইতে আত্ম রক্ষার জন্য সরিয়া গেল, ওটা চৈতশালী কেন? যত্রে ইচ্ছা শক্তির বিকাশ নাই, যন্ত্র নিয়মকে অতিক্রম কবিতে চায় না, কীটটা নিয়নকে বাধা দিতে চায়, পারুক বা নাই পারুক, নিয়মের বিপক্ষে উথিত হয় তাই সে চেতন। এই ইচ্ছা শক্তির যে খানে যত সকল বিকাশ, সেখানে সুখ তত অধিক, সে জীব তত বড। চালিত যত্রের ন্যায় ভাল হওয়ার চেয়ে স্বাধীন ইচ্ছা, চৈতন্য শক্তির প্রেরণায় মন্দ হওয়াও আমার মতে কল্যাণকর। আর মৃৎপিণ্ড প্রায়, প্রাণহীন যন্ত্র গুলির মত, উপল বাশির ন্যায় রাশীকৃত মনুষ্য সমষ্টির দ্বারা যে সমাজ গঠিত জলচর ও স্পর্শদাষ বিচার। হয়, সে কি সমাজ ? তাহার কল্যাণ কে চায়? কল্যাণ যদি সম্ভব হইত, তবে সহস্র বৎসরের দাস না হইয়া আমরাই পৃথিবীর সর্বোচ্চ জাতি হইতাম, মহা মূখতার আকর না হইয়া ভারত ভূমিই বিদ্যার চির প্রস্রবণ হইত।” দুষ্ট পুরুত গুলাের সমাজের প্রত্যেক খুঁটিনাটি বিষয়ে অত গায়ে পড়ে বিধান দেওয়ার কি দরকার ছিল? তাইতেই ত লক্ষ লক্ষ মানুষ এমন কষ্ট পাচ্ছে।” (১) * স্বাধীনতা না দিলে কোনওরূপ উন্নতিই সম্ভব পর নহে। আমাদের পূর্ব পুরুষেরা ধর্ম চিন্তায় স্বাধীনতা দিয়াছিলেন, তাহাতেই আমাদের এই অপূৰ্ব্ব ধর্ম দাড়াইয়াছে। কিন্তু তাহারা সমাজের পায়ে অতি গুরু শৃঙ্খল পরাইলেন। আমাদের সমাজ, দু'চার কথায় বলতে গেলে, ভয়াবহ পৈশা- চিকতা পূর্ণ। পাশ্চাত্য দেশে সমাজ চিরকাল স্বাধীনতা সম্ভোগ করিয়াছে। মানুষের উন্নতির মুখ্য সহায়—স্বাধীনতা। যেমন চিন্তা করিবার ও উহা ব্যক্ত করিবার স্বাধীনতা থাকা আবশ্যক, তদ্রুপ, তাহার খাওয়া দাও, পােষাক, বিবাহ ও অন্যান্য সকল বিষয়েই স্বাধীনতা আবশ্যক-- যতক্ষণ না তাহার দ্বারা অপর কাহারও অনিষ্ট হয়। “আমরা মূর্খের ন্যায় বাহু সভ্যতার বিরুদ্ধে চীৎকার করিতেছি। না করিই বা কেন ? আর হাত বাড়াইয়া না পাইলে উহাকে টক বলিব না ত আর কি! ভারতের আধ্যাত্মিক সভ্যতার শ্রেষ্ঠতা স্বীকার করিলেও ভারতে এক লক্ষ নরনারীর অধিক যথার্থ ধার্মিক লোেক নাই, ইহা মানিতেই হইবে। এই মুষ্টিমেয় লােকের আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য ভারতের ত্রিশ কোটি লােককে অসভ্য অবস্থায় থাকিতে হইবে ও না খাইয়া মরিতে হইবে! কেন একজন লােকও না খাইয়া মরিবে ? ভারতকে উঠাইতে হইবে, গরীবদের খাওয়াইতে হইবে, শিক্ষার বিস্তার করিতে হইবে, আর পুরােহিতের দলকে (১) মা বোন এণীত কাল ১ কাপ।
বল্প আহারে। ab এমন ধাক্কা দিতে হইবে যে, তাহারা যেন ঘুরপাক খাইতে খাইতে একেবারে আটলান্টিক মহাসাগরে গিয়া পড়ে। পৌরিহিত্য, সামাজিক অত্যাচার এক বিন্দুও যাহাতে না থাকে, তাহা করিতে হইবে। প্রত্যেক লােক যাহাতে আরও ভাল করিয়া খাইতে পায় ও উন্নতি করিবার আরও সুবিধা পায়, তাহা করিতে হইবে। * এই অবস্থা ধীরে ধীরে আনিতে হইবে—লােককে অধিক ধর্মনিষ্ঠ হইতে শিক্ষা দিয়া ও সমাজকে স্বাধীনতা দিয়া। প্রাচীন ধর্ম হইতে এই পুরােহিতের অত্যাচার ও অনাচার ছাটিয়া ফেল—দেখিবে, এই ধৰ্মই জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম। * ভারতের ধর্ম লইয়া সমাজকে ইউরােপের সমাজের মত করিতে পার ? আমার বিশ্বাস, ইহা কার্যে পরিণত করা খুব সম্ভব, আর ইহা হইবেই হইবে।” (১) পাশ্চাত্য শিক্ষার পাশ্চাত্য সভ্যতার স্রোতে সমাজ তর তর বেগে ছুটীয়াছে। কার সাধ ইহার গতি লোধ করে। কোন যুগে কোন্ কালে ব্রাহ্মণ রাজা ও মহারাজা “ব্রাহ্মণ মহা সম্মিলন” স্থাপন করিয়া নিজের সেই সভার সভাপতির আসনে উপবেশন পূর্বক ব্ৰহ্মণ্য ধর্ম রক্ষায় যত্নবান ছিলেন। ইহা কি পাশ্চাত্য ধন মাহাত্ম্য নহে? ব্ৰহ্মণ্য গৌরব ত্যাগের মহিমা লুপ্ত হইয়া ধনের বিজয় বৈজয়ত্তি পতাকা উড্ডীয়মান হইল না কি ? পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব আরও কি চোখে আঙ্গুল দিয়া দেখাইয়া দিতে হইবে। পাশ্চত্য শিক্ষা সমাজের অভ্যন্তরে ঘুণ ধরাইয়া দিয়াছে, বাহিরে প্রলেপে উত্তপ্ত বক্তৃতায়, উচ্চ নিনাদে, সভা সমিতিতে ইহার গতিরােধ করিতে পারিতেছ না। দাও দাও যত সত্বর সম্ভব অধিকার দাও। এখন অধিকার না দিলে অধিকার কাড়িয়া লইবে, তাহার পরিণাম কখনও তােমাদের পক্ষে মঙ্গল হইবে না। “জল চল ও অল্প বন্ধনের অধিকার ত সামান্য কথা ইহার পর তােমাদের বড় সাধের সভা সমিতির বক্তৃতার খবরের কাগজের (কেন না ঋষিত্ব এখন এই সমস্ত দ্বারাই দর্শিত হইতেছে। (७) पानी पिशवमने गवारनी भगा।
-০ জলচর ও শর্শদাষ বিচার। ঋষিত্ব ও ব্রাহ্মণ্য পৰ্যন্ত বলপূর্বক অধিকৃত ও লুণ্ঠিত হইবে। ভারত আৰু এখন শুধু ব্রাহ্মণের ভারত নাই, ভারত এখন আচণ্ডালের ভারত। ভারতের জাত্যভিমানী উচ্চবর্ণের লােকেরা স্বদেশের ৫ কোটি লােককে অস্পৃশ্য বলিয়া ঘৃণা করিয়া থাকে। মনুষের স্পর্শকে ইহারা যত অশুচি মনে করে কুকুর বিড়ালের স্পর্শকেও তেমন মনে করে না। অভিমানীরা যাহা- দিগকে অস্পৃশ্য মনে করে তাহাদের ছায়াপাতেই তাহাদের অন্নজল অশুদ্ধ হইয়া থাকে। ভারতবর্ষে মানুষ মানুষকে এমনই ঘৃণা করে, মানুষের মনুষ্যত্ব এই দেশে এমনই লাহিত ও নিগৃহীত হইতেছে। যে দেশে মানুষের প্রতি মানুষের এমন ঘৃণা রহিয়াছে সেই দেশ কিরূপে আত্ম প্রতিষ্ট ও স্বাধীন হইবে ? ভারতের কল্যাণকামী মহাত্মার বহুকাল ধরিয়া বলিতেছেন,—“জাতিভেদ, উচ নিম্ন বর্ণের বিভেদ রাজনৈতিক দাসত্বের প্রধান কারণ।” তােমরা তােমাদের স্বদেশবাসী ভাইকে হাত ধরিয়া এক সঙ্গে গড়াইতে পারিবে , তবে কিরূপে সমষ্টির বল অনুভব করিবে? ভারত সন্তানগণ ভারত- বর্ষকে কস্মিনকালেও সমবেত কণ্ঠে “মা” বলিয়া ডাকে নাই, ইহাই ভারত র্ষের রাজনৈতিক অধঃপতনের ইতিহাসের শিরাে-ভাগে লিখিত রহিয়াছে। ভারতের স্বরাজ আন্দোলন বাঁহারা সার্থক করিয়া তুলিতে চাহেন তাহারা ইহা নিসংশয়ে জানিবেন যে ভারতবর্ষে জাতিতে জাতিতে সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে বহু শতাব্দী যাবৎ যে ব্যবধান রচিত হইয়া আছে, তাহা দূর না করিলে এই দেশের রাজনৈতিক মুক্তি সম্ভবপর হইবে না। বড়ই সুখের বিষয় ছত্রপতি শিবাজীর সুযােগ্য বংশধর কোলাপুরের মহা- রাজ বাহাদুর ভারতীয় অবনত সম্প্রদায় সমূহের উন্নতি বিধানে আন্তরিক প্রচেষ্ট হইয়াছেন। তাঁহার সভাপতিত্বে গত ৩০শে মে নাগপুরে এক নিখিল ভারতীর কনফারেন্সের অধিবেশন হইয়াছিল। বােম্বাই প্রেসিডেন্সি, মধ্য শষের পরিম। প্রদেশ ও বেরর সকল স্থল হইতে দলে দলে প্রতিনিধিগণ এই সভায় উপস্থিত হইয়া ছিলেন। মারাঠা মহিলারা সাখছে এই সভায় যোেগদান কবিয়া সভার গৌরব অর্জন করিয়াছিলেন । সভাপতির বক্ততা। সভাপতি কোলাপুর মহারাজা বাহাদুর চ তাবে তাঁহার অভিভাষণ পাঠ করেন। তাঁহার উদারতা যঞ্জক বাক্যাবলী এৰণ করিয়া শ্ৰোতৃগুণী পুনঃ পুনঃ উরাস বন করিয়াছিলেন। তাঁহার বক্তৃতার মর্থ আয় ইতঃপূর্বে প্রকাশ করিয়াছি। অয় বােধ। সভাপতি মহােদয়ের বক্তৃতার পরে বহু বক্তা এই সভায় হৃদয়গ্রাহী বক্তৃতা করিয়াছেন। এই সকল বক্তৃতার মধ্যে একটি বিষয় অতি সুস্পষ্ট লক্ষিত হইয়াছিল। উচ্চ বর্ণের লােকগণ যে শতাব্দীর পর শতাব্দী নিয় বর্ণের লােকদের উপর দুর্ব্যবহার করিতেছে, সেই অন্যায় বােধ বক্তা ও শ্রোতা সকলের বাক্যে ও মুখমণ্ডলে প্রকটিত হইয়া উঠিয়াছিল। এক বন বলিয়াছেন, উচ্চ বর্ণের লােকগণ যদি যুক্তির প্রতি কর্ণপাত না করেন, তাহারা যদি এখনও অবনত জাতির লােক সমূহকে আপনাদের লােক বলিয়া এহণ না কমেন, তাহা হইলে এখন বহু দিনের দুর্ব্যবহারের প্রতিশােধ লওয়া আবশ্যক। ব্রাহ্মণদিগকেই এখন অস্পৃশ্য করিয়া রাখা উচিত। এতকাল ব্রাহ্মণের বাহাদিগকে কুকুরের অধম মনে করিয়াছেন, যাহাদের স্পর্শে তাঁহার আপনাদিগকে অশুচি মনে করিয়াছেন এখন সেই দুর্ব্যবহারের ক্ষোভ তাহাদের মনে বল হইয়া উঠিয়াছে এমন অবস্থায় সমগ্র দেশের শান্তি ও উন্নতির জন্য উন্নত অবনত সকল সম্প্রদায়ের লােকের সামাজিক সম্মিলনের পরিপন্থী বিধি সকল রহিত কৰা আৰক। --- জলচল ও শলা বিচার। মানুষ কি কুকুরেরও অধম? কনফারেন্সে এক বক্তা বলিয়াছেন;-এক শিক্ষা পরিষদে যােগ দিবার এ দুইজন শিক্ষক পূর্ববর্তী সভাস্থলে যাইতেছিলেন। শিক্ষক দ্বয়ের এক অন উচ্চ বর্ণের, অন্য জন অৰনত শ্রেণীর। মধ্যাহ্ন কালে তারা এক স্থানে উপস্থিত হইয়া বৃক্ষমূলে বিশ্রাম করিতে ছিলেন। তৃষ্ণার্ত শিক্ষক দ্বয়ের জলপানের দরকার হয়। উচ্চ শ্রেণীর শিক্ষক নিকটবর্তী জলাশয়ের সিড়ি অতিক্রম করিয়া জলপান করিলেন। দ্বিতীয় ব্যক্তি অশ্য ভারত পুরিণী স্পর্শ করিবার অধিকার নাই। তাঁহার সমুখ দিয়া এক কুকুর সােপান অতিক্রম করিয়া নিয়ে গমন করিয়া জলপান করিয়া আসিল, তথাপি তিনি যাইতে পারিলেন না। তিনি লােকের প্রতীক্ষায় তৃষ্ণার জ্বালা সহ করিতে লাগিলেন। অবশেষে এক সহৃদয় ব্যক্তি” তাহাকে জল তুলিয়া দিল। তিনি তৃষ্ণা নিবারণ করিয়া প্রাণরক্ষা করিলেন। এক চর্মকারের বক্তৃতা। বােম্বাইর এক চৰ্ম্মকার এই সভায় আবেগময়ী বক্তৃতারা শ্ৰোতৃমণ্ডলীর হৃদয়ে বিদ্যুৎ তরঙ্গ প্রবাহিত করিয়া দিয়াছিলেন। মিঃ টিলক সম্পাদিত কেশরী পত্রিকা হইতে বচন উদ্ধার করিয়া তিনি বলেন নি টিলক ও তাহার দলভুক্ত লােক ভারতবর্ষের জয় স্বাভিলাস শন দাবী করিতেছেন, সােপান পরম্পরায় স্বায়ত্ত শাসন লাতের জন্য যে আইন প্রণীত হইয়াছে তঘর উহার বিঘ্ন ঘটাইতে কৃতসর হইয়াছেন। এইরূপে হারা স্বাধীনতার দাবী করেন তাহারাই আপনাদের অন্যায্য অধিকার অক্ষুন্ন রাখিবার জন্য অসংখ্য স্বদেশীয়কে চির দাসত্বে নিযুক্ত রাখিবার অভিপ্রায়ে যথাশক্তি চেষ্টা করিতেছেন। আসন্যালিষ্ট দল। নাগপুরের সালিষ্টদের এক প্রতিনিধি সভায় উপস্থিত হইয়া স্পলোরে পরিণাম। বলিয়াছেন;-অবনত সম্প্রদায়ের লােকগণের দুর্গতির মূলে ইহাদের পূর্ব পুরুষগণের অক্ষমতা দৃষ্ট হইবে। গবর্ণনেন্টেরও এই ক্ষেত্রে অপরাধ আছে। তাহারা শিক্ষা বিস্তারের চেষ্টা করিলে ইহাদের দুর্গতি দূর হইত। পবলােকগত গােখলে এই চেষ্টা করিয়াছিলেন।” এই বক্তা যাহা বলিয়াছেন উহা শ্রবণ করিয়া শ্রোতারা বারংবার তাহাকে ধিক্কার করিয়াছেন। কোন পূর্ব পুরুষের কি অক্ষমতা বা পাপ ছিল, যাহার জন্য তার বংশধরগ। অকারণে অনন্তকাল লাতি হইবে? বা ইহার কোন সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেন নাই। সার বিপিন কষ্ট । সার বিপিন কৃষ্ণ বসু বলেন, এই কনফারেন্স সকল সম্প্রদায় মুখে ব্যবহারগত যে সাম্যের প্রতিষ্ঠা করিতে চাহেন। উহাতে আমার বিশ সহানুভূতি আছে। অতীতের কথা বিশ্বত হইয়া এখন আমাদিগকে সকলকে তুল্য ভাবে শ্রদ্ধা প্রতি দেখাইতে হইবে। সমাজে একদল লােক আর দলকে পদদলিত করিয়া রাখিবে এমন কোন নৈতিক বিধি থাকিতে পারে না। সমাজে এক্ষণে যে অনর্থক ভেদ আছে উহারই ফলে হিন্দু আজ দিন দিন ক্ষীণ ও দুর্বল হইয়া পড়িতেছে। অপমানিতও লাহিতের সমাজ নিগ্রহ সহিতে না পারিয়া ধৰ্মার গ্রহণ করিতেছে। আমরা রাজনীতি ক্ষেত্রে স্বাভিলাষ শাসন দাবী করি, সমাজেও সেই স্বাভিলাষ নীতি গৃহীত হওয়া বাছনীয়। যে সকল সামাজিক বিধি সম্প্রদায় সমূহ মধ্যে ব্যবধান রচনা করিয়া রাখিয়াছে এক্ষণে আমাদিগকে সেইগুলি তুলিয়া দিতে হইবে। যাহার অবনত বলিয়া অবত হইতেছে তাহারা আমাদেরই ভাই। এক রক্ত এক মাংস। তাহাদিগকে আলিঙ্গন করিবার জয় আমাদিগকে প্রথমে বাহ প্রায়ণ কৰিতে হইবে।
এলচল ও স্পৰ্শৰ বিচার। নিলা অজের অলঙ্কার। অবনত জাতির উন্নতি বিধানে কোলাপুরের মহারাজা বাহাদুর প্রচেষ্ট হওয়ায় অনেক দাম্ভিক ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় তাহার নিন্দা প্রচারে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। এইরূপ বহু বিজ্ঞাপন মহারাজা বাহাদুরের হস্তগত হইয়াছে। তিনি কনফারেন্সের উপসংহারে যে বক্তৃতা করিয়াছেন উহাতে তিনি বলিয়াছেন, আমি এই নিলার ভয়ে ভীত হইয়া কাচ কল্যাণকর আন্দোলন হইতে নিবৃত্ত হইব না। কনফারেন্স ভাণ্ডারে মহারাজা বাহাদুর ৫ হাজার টাকা চাঁদা দিয়াছেন। ভারতের অবনত জাতিসঞ্জীবনী। অমৃতসরের কংগ্রেসের সভাপতি পণ্ডিত মতিলাল নেহেরুর অভিভাষণের মন্তব্যের মধ্যে নিম্নলিখিত কথাগুলি দেখিলামশনিক এবং শ্রমিকের বিবাদের ফলে হউমােপ এখন ছিন্ন ভিন্ন এনজীবীরা সেখানে কনে প্রবল হইতেছে, অভিজাত সম্প্রদায়ের শাসনের বিরুদ্ধে মাথা তুলিয়া দাড়াইতেছে। হইতে পারে যখন আমরা স্বায়ত্বশাসন পাইব, তখন পূর্ব পশ্চিমের “নীর” বাদ দিয়া কীর টুকু লইয়া আমরা নূত শাসনপ্রণালী প্রবর্তিত করিব। আসুন, এই অবসরে আমরা পশ্চিমের টাগুলি কি তাহা স্থির করি ও এ দেশের বদ্ধমূল কুপ্রথা ও মিথ্যা ধারণা সমূলে উৎপাটিত করি। আমাদের আদর্শ ভারত এমন হইবে যেখানে সকলে স্বাধীন রহিবে, যেখানে সকলে আমােঝতির সমান সুবিধা পাইবে, যেখানে নারীজাতি দাসত্ব হইতে মুক্ত থাকিবে, যেখানে জাতিভেদের কঠোর অত্যাচারনিগড় থাকিবে না, যেখানে বিশেষ অনুগৃহীত কোন শ্রেণী অথবা সম্প্রদায় থাকিবে না, যেখানে সকলে বিনাবেতনে শিক্ষা পাইবে, যেখানে ব্রাহ্মণ চর্মকার নির্বিশেষে সকলে শিক্ষার আলােক পাইবে, যেখানে ধনিক এবং ভূস্বামী এনজীবী ও রায়তকে অত্যাচারপিষ্ট করিবে না, যেখানে শ্রমিক দিগকে সকলে সম্মানের চক্ষে দেখিবে এবং তাহারা যথেষ্ট পারিশ্রমিক পাইবে, যেখানে বর্তমান ভারতবাসীর সর্বদূঃখ- স্পলদোষের পরিম। জনক সারি শাকিবে না। তখন ভারতে বাসকরা অনিলের কারণ হইবে আমাদের সব দুঃখ দূর হইবে। কংগ্রেসের অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি স্বামী শ্ৰহ্মানন্দের বক্তৃতা হইতে দুই এক ছত্র উদ্ধৃত করিলাম। তিনি বলিতেছেন এই যুগে কেহ আর অস্পৃশ্য থাকিবে না। প্রতিজ্ঞা করুন যে আপনার ‘অস্পৃশ্যদিগকে উদ্ধার করিবেন তাহাদিগকে ভাই বলিয়া স্বীকার করিবেন এবং আপনাদের বাসের ও পাকের ঘরে প্রবেশ করিতে দিবেন।” উদ্ধত কথাগুলি হইতে দেখা যাইতেছে পণ্ডিত নেহেরু ও শ্ৰদ্ধানন্দ স্বামী উভয়েই বর্তমানের জাতিভেদ ও স্পর্শদোষের বিরােধী। নেহেরু বলিয়াছেন আমরা যেমন রাজনৈতিক অধিকার পাই রাজনীতি ক্ষেত্রে সকলে সমান হইব, তেমনি সামাজিক অধিকারে ও আমরা সমান হইব। এদেশের তথাকথিত নিয়শ্রেণীকে শ্রমিকদিগকে সামাজিক অধিকার দিতে কুণ্ঠিত হইলে দেশের ভবিষ্যৎ যে অন্ধকারময় হইতে পারে তার আভাষ ও তিনি হউনােপের একি ও ধনিকের উল্লেখে দিয়াছেন। আশাকরা যায় তথাকথিত উচ্চজাতির লােকে ইহা মনে রাখিয়া কাজ করিবেন। তাহারা যেন মনে রাখেন সকলে এক সঙ্গে টানিলে জগন্নাথের রথ নড়িবে না। বিনয়কৃষ্ণ সেন বি, এ, সিরাজগঞ্জ। বিদেশী বণিকদের বঞ্চনা ও শােষণ এবং কাৰ্যতঃ তাহাদের ইঙ্গিতে পরিচালিত হয়ে ইংলণ্ডের রাজার নামে যারা রাজত্ব করেন তাঁদের শাসন ও জাসন—শুধু এতেই কি আমরা এত হতমান, হীনবল ও তসৰ্ব্বস্থ হয়েছি। বহুশতাব্দী ধরে আমাদের পাপের ভরা পূর্ণ হতে হতে আজ আমরা কাল সাগরে ডুবে যাচ্ছি, পৃথিবী থেকে চিরতরে আমাদের অস্তিত্ব লােপ পেতে এই ধবংসেম্মুখ আতিকে অনবজীবনের ঐশ্বৰ্য্য মাধুৰ্য্য এনে দিতে হলে, জলচল ও পদোষ বিচার। সকলের আগে চাই যে সব মলিনতা আবর্জনাতে তার অভ্যন্তরীন জীবন জীর্ণরান্ত হয়ে পড়েছে সেই সব দূর করে ফেলা। এ জাতি আজ ঘুমন্ত অজ্ঞানমােহঘােরে আচ্ছন্ন। কত অলীক স্বপ্নই যে তাকে আত্মত করে রেখেছে তার সীমা নেই। সজাগ জীবনের মতি ও গতি হারিয়ে এ জাতি কত অসত্যকে যে আজ সত্য করে মেনে নিয়েছে, কত পাপ কদাচারকে যে পুণ্য সদাচার বলে পুষে রেখেছে, তা সংখ্যা করা যায় না। বাস্তব জীবনের কষ্টিপাথরে সত্য-মিথ্যা পরীক্ষা করিয়া নিতে হলে যে শক্তি ও মুক্তির দরকার, তা আমাদের কোথায় ? আমরা মুপ্তির ঘােরে নিসার হয়ে ছিলাম, মায়াস্বপ্নে আত্মবােধ হারিয়ে ছিলাম—এমন সময় পাঞ্জাবের বুকের উপর এক প্রচণ্ড আঘাত এসে পড়ল, চারিদিকে জাগার সাড়া পড়ে গেল! জেগে আমরা নিজের দিকে চাইলাম, দেখলাম আমরা অন্নাভাবে শীর্ণ, ব্যাভাবে নগ্ন ;-এ বীভৎস দশা দেখে আমরা শিউরে উঠলাম। যারা আগে জাগলেন সেই মহাপ্রাণের সমস্ত জাতিটা এক আসন্নমরণ মােহর নীলসাগরে মূৰ্জিত হয়ে ঢলে পড়েছে দেখে অধীর হয়ে পড়লে সকল লাজমান, ভয় লােভ ত্যাগ করে হাহাকার করে পথে ছুটে বেড়াতে লাগলেন। বাহিরে থেকে এই যে বিপুল আলােড়ন হতে লাগল, তাতে সকলেই বুঝতে পালেন আর ঘুমাবার সময় নেই। আত্ম বীর যারা তারা অচিরে তাঁদের বাঁধনবেড়ি খুলে ফেলে মুক্তির বাণী প্রচার করতে লাগলেন। কেউ বা জেগে ঘুমালেন, দাসত্বের কালসাপকে তারা সােণার শিকল জেনে গলায় জড়িয়ে ধরে আরামের মােহে মজে দিপাত কতে লাগলেন ! আমাদের ঘুমপাড়ানী মাসিপিসীরা যখন ভালবাসার সুর ভেদে আর ভূলিয়ে রাখতে পাবেন না, তখন সবাইকে নিয়ে শাসন করে, লােহার খাঁচায় পুরতে লাগলেন। এ অভিনয় আজো পুরােদমে চলছে। ক্রমেই তারা ভীষণ হতে ভীষণতর রূপ ধারণ করেছেন। তাঁদের শদাষের পরিণাম। শক্তিল বক্ষ দেখে তাঁদের একান্ত বশংবদ ভালো ছেলেরাও এই গগেছে, উত্যক্ত হয়ে উঠেছে; কিন্তু তাতে কি আমাদের শাসন কর্তাদের প্রভুত্বের দিন কমে? জগতে তারা অহারে মত্ত হয়ে সাম্রাজ্যকেই সর্বশ্রেষ্ঠ কাম্যধন বলে জেনেছেন। তবে যে দিন কালপূর্ণ হবে সেদিন মনে হয়- এই ভেদনীতি তাহাদের কি সর্বনাশ করেছে তা তারা বুঝতে পাবেন, বুঝতে পারিবেন সাম্যস্থাপনই সকল শক্তি ও শান্তির একমাত্র উপায়, সেদিন হয়ত এদের ভাবতে হবে ‘নিজেরে করিয়া গৌরবদান, নিজেরে কেবলি করি অপমান।” যাক, বড় দুধে পরের সমালােচনা কতে হল। যে জাতের অন্তর থেকে মুক্তির আদর্শ মুছে যাবার উপক্রম হয়েছে, জীবন যাদের অস্বস্থ, শক্তি হারা তাদের হীনতা ও দুর্বলতার উপরই যে বিদেশী এসে তাদের প্রভুত্বের সৌধ নির্মাণ করেছে সে কথা ভুলে গেলে চলবে না। শত সহস্র ভেদবিভাগে অনর্থক নিয়মকানুনের জীর্ণ জঞ্জালে আমাদের জাতীয় জীবন পঙ্গু ক্ষত বিক্ষত ও অসার হয়ে পড়াতেই, অত সহজে অধীনতা পাশকে মাথা পেতে নেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। ইংরেজ স্বাধীন জাতি-জড়-সভ্যতার মােহ অনেক পৰিমাণে সত্যধ্যায়ের মর্যাদাবােধ হারিয়ে থাকলেও আজো তাদের মধ্যে এমন সহৃদয় ব্যক্তির একান্ত অসম্ভাব নেই যাদের প্রাণ সত্যিকার আমাদের দুর্দশা দেখে কালে-আমাদের মুক্তির চেষ্টার সঙ্গে যাহাদের সহানুভূতি আছে। অই আমাদের ইংরেজ জাতির সঙ্গে কোন বিমােধ নেই, আমাদের সংগ্রাম ইংরেজ আমলাতন্ত্রের সাথে। শুধু প্রভু গর্বই যে ইংরেলকে বিকৃত করেছে তা নয়, তার বিকারের জন্য আমাদের দাস মনােৰও নিঃসন্দেহরূপে দায়ী। আমলাতন্ত্র আমাদের মুক্তির বিরােধী তাতে সন্দেহ নাই; কিন্তু তার চাইতেও অনিষ্ট করেছে আমাদের অভ্যন্তরীন জীবনের অনন্ত বিধিনিষেধ। তাই আজ বাহিরে যে স্বাধীনতার আন্দোলন হচ্ছে জলচল ও স্পর্শদাষ বিচার। তাতে আত্মনিয়োগ করতে হবে বটে; কিন্তু আমাদের স্বাত শত কতে শুধু আমাদের শাসকদের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখিলেই চলবে না। আজ আমাদের ঘরে ফিরতে হবে। নিজেদের চিত হবে আত্মপ্রতিষ্ঠ হতে হবে, অসহবােগ নেতিমূলক নয়, এ নৈযুজ্যর মানে স্বাবলম্বন পর- মুখাপেক্ষিতার অভাব। স্বরাজেব অর্থ-নিজের স্বত্বকে পূর্ণরূপে পাওয়া, মানবতার চিরন্তন মুক্তিকে ব্যক্তিগত ও জাতিগত জীবনের সকল ক্ষেত্রে মুক্ত করে তোেল। বড় ভাগ্য, বজ্ৰবেদনের মধ্য দিয়ে আজ আমরা বুঝতে পারছি স্বাধীনতা হাবা জীবনের শরণাধিক নির্মম পরিহাস প্রথমে বাহির থেকে সত্যের যে কত্ত আহ্বান এনেছে তাতে আমরা সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে সাড়া দেই , কিন্তু নিছক রাজনীতিদ্বারা স্বরাজ গড়া যায় না,জীবনের সমস্ত অংশ জুডে রাজনীতির আসনও নয়। অন্তর বাহিরে যে দিন মুক্তিকে আমরা রাজাসন বসাতে পারব যেদিন জীবনের সকল ক্ষেত্রে সাম্য ও স্বাধীনতার নিশান উডাব সেই দিন আমরা ভারতমাতার হৃত গরিমা উদ্ধার করেছি বলতে পারব। আজ স্বাধীন জীবনের গুরুদায়িত্ববুদ্ধি থেকে আমরা অনেকটা বুঝতে পেরেছি এতদিন আত্মঘাতী অন্ধের মত ছুৎমার্গ অনুসরণ করে আমরা কত দীনহীন অক্ষম হইয়া পড়েছি। ভাবত যেদিন দেশবিদেশে ধনৈশ্বৰ্য্য ও জ্ঞান বিজ্ঞান বিতরণ করিত, সে দিন তার ধর্ম ও সমাজ ব্যবস্থার উদারতার অন্ত ছিল না, ইতিহাস তার সাক্ষ্য দেবে। অাজ বর্ণেরা সদাচারী হলেই উন্নীত হত। সেকালে অসবর্ণ-বিবাহের দৃষ্টান্তেরও অভাব নাই। আজ আমরা অশিক্ষায় অজ্ঞানতার সত্যৰােধ হারিয়ে ফেলেছি। জীবনের বৈচিত্র্য ও প্রাচুৰ্য্য, শক্তি ও আনন্দ সকলই আত্মজ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের লােপ পেয়েছে। সমাজ এবার কল্যাণে আমাদের জীবনস্রোত ভেদ বিদ্বেষের অতি সঙ্কীর্ণ বাত দিয়ে কোনো প্রকারে বয়ে যাচ্ছে। আজ মুক্তবিশ্বের অনন্ত কর্মশক্তি ও আনন্দ 'তে বিদায় নিয়ে আমাদের ধর্ম ক্ষুদ্র জাতের হাঁড়ি ও জলের কলসীর মধ্যে ঢুকেছে স্পর্শদাষের পরিণাম ১ ; ও মিথ্যা জাতিদের আশ্রয় নিয়েছে। এত পুখ্য সদাচারেও আমরা শক্তি বা শান্তি পাচ্ছি না। আজ প্রেম নেই; মিলন ও একতা হতে যে শক্তি জাগে তা থেকে আমরা বঞ্চিত। দেশে আজ সত্য জ্ঞানী নেই, আছে যারা তাদের অধিকাংশই “শান্তাধীত্যাপি ভবন্তি মুখা”। বিভিন্ন দেশে পারিপার্শ্বিক অবস্থানুযায়ী বিভিন্ন ধর্ম হয়েছে বটে; কিন্তু সকল দেশের তত্ত্ব সাধকদের বাণীতে একই কথা উচ্চারিত হচ্ছে—সে হচ্ছে সাম্য ও মিলন। জগতে নুতন উন্নতির সত্য আদর্শের প্রতিষ্ঠা করেছেন ব্রহ্ম ঋষির, ভট্টাচাৰ্য বা মােল্লার নয়। তার পর অতীতে যা অপূর্ণ রয় গেছে ভবিষ্যতে তা পূর্ণ হবে। আমাদের বর্তমান দায়িত্ব সমূহ ভবিষ্যৎ অতীত বা বর্তমানের চাইতে উজ্জলতর, বিপূলতর। ভবিষ্যতে যে যুগ আসছে তাতে মানব ত পশুর মত ঘৃণ্য থাকবেই না সে তার দেবত্বের অধিকার প্রাপ্ত ইবে; আর অমৃতের অভিসারে ভারতই হবে পথপ্রদর্শক। ব্ৰহ্ম জানাতি ব্রাহ্মণঃ ;আর মানব মাত্রেরই এই ব্রাহ্মণ্যের বা দেবত্বে সমান অধিকার আছে। আজ পঞ্চম, পারিয়া, মূত্ৰ চণ্ডাল সকলেই যে ব্ৰহ্মজ্ঞানের অধিকারী এ কথা তাদের মুক্তউদাত্ত কণ্ঠে শুনিয়ে দিতে হবে। এ তাদের উপর কিছু অতিরিক্ত অনুগ্রহ প্রকাশ নয়। সমাজের অগ্রণী যারা তাঁরা যদি আসর হন তা হলেই তারা বাঁচবেন, জগতের শান্তি বৃদ্ধি পাৰে, অক্ষুন্ন থাকবে। তাঁরা তাঁদের মিথ্যা মান বিসর্জন দিতে না পালে ও, দেবতা পথের ধুলায় পড়ে থাকবে না। আজ পৃথিবী জুড়ে মহামানব জাগছে, এ সত্যের প্রেরণাকে ব্যর্থ করে এমন শক্তি নেই। আজ যদি আমরা জাতিবর্ণের ভেদবুদ্ধি না ভুলে যাই তবে অচিরে দেখতে পাব, কবি যে গেয়েছিলেন হে মাের দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান অপমান হতে হবে তাদের সমান। T অচল ও স্পর্শদাষ বিচার। সেই কথা সফল হয়েছে আমাদের স্বরাজের স্বপ্নও পূঙ্গে মিলিয়ে যাচ্ছে। যাদের অপমান করে আজ আমরা শক্তিহীন, মনুষত্ববর্জিত হয়েছি তাদের সমান হলেই আমাদের হবে যথার্থ সম্মান, সেই মহামিলনের নবীন উষায়ই স্বরাজ সূৰ্য্য দীতে মহিমময় হয়ে উঠবে। ভগবানের সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্ট মানুষ। মানব তার আত্মার গৌরবে চির- মহিমান্বিত ; জগতের প্রতি মানবের মধ্যে সেই আত্মা, বিশ্ব চরাচরের অন্তর বাহির যিনি পবিত্যান্ত কবে হয়েছেন। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে অনন্ত উন্নতির সম্ভাবনা রহিয়াছে, তার অন্তরে ভগবতার বীজ নিহিত আছে। এ জগতে মানবাত্মা চিরমুক্ত, অমৃতের অধিকারী। আত্মার জাতি নেই, মলিনতার স্পর্শ নেই। সচ্চিদানন্দের মূর্ত বিগ্রহ মানবকে অস্পৃশ্য বলে ঘৃণা করবার স্পর্ধা করতে পারে এমন অজ্ঞানতা, এমন দুরভিন আছে কার? ঐ নরের মাঝে যে নারায়ণ আছেন, ঐ মাটির ঘরে যে নিরঞ্জনের আসন পাতা আছে। আমরা নীচ বলে মানুষকে ঘৃণা করে যে আমাদের পূজার ঠাকুরকে অবমাননা করি। মানুষ হীন,-এ মিথ্যা কথা শুধু জড়বাদী নাস্তিকের মুখে শােভ পায়। উপনিষদের আত্মতত্ত্ব যে হিন্দুর জীবনের গােড়ার কথা তার কাছে মানবতার অবমাননা যে বড়ই দুঃসহ, বড়ই বিসদৃশ তাইত মহাত্মাজী অস্তৃতাকে মহাপাপ বলেছেন। মানুষ ক্ষুদ্র হয় অঙ্গনে ডুবে;অপরকে হীনও করে অজ্ঞানের অভাবে। মানুষ যখন তার স্বরূপ উপলব্ধি করে, যখন সকলের মধ্যেই আত্মাকে দর্শন করে তখন তার প্রাণে অখণ্ডতার বােধ থেকে বিপুল শক্তি জাগে, তখন তার চক্ষে সবাই হয় বিরাট ও মহান। তার ভেদবুদ্ধিজনিত অহঙ্কারে অন্ধকার কেটে যায়। বিশ্বের সঙ্গে অস্তিত্ব অনু ভূতির অসীম শক্তি সে পায়। এই আত্মজ্ঞানটা আসলেই আমাদের সকল গেণ্ডী দূর হয়ে যাবে। ঐ বােধি, ঐ বিজ্ঞানের জ্যোতিফোয়ারায় ধান করে মরা যে অমর বীৰ্য্য লাভ করতে পারব তা থেকে গড়ে উঠবে স্পর্শদোষের পরিণাম স্বাধীন ভারত নযহা ভারত। শ্ৰীবীরেন্দ্রকুমার সেন এম, এ, লিখিত “অস্পৃশ্যতা”। (বাঙ্গালার কথা ) “জাতিভেদ ও স্পর্শ-দোষ-প্রথা বেদা-মােদিত নহে। সুতরাং উহা উঠাইয়া দিলে হিন্দু-ধর্মের কোন ক্ষতি হয় না। এ বিষয়ে যথেষ্ট চিন্তা না করিয়া এবং কি প্রকারে এই অশাস্ত্রীয় ব্যবহার উঠাইয়া দিতে পারা যায়, তবিয় কোন প্রকৃষ্ট উপায় অবলম্বন না করিয়া, আমাদের নেতৃগণের পক্ষে স্বদেশী আন্দোলনে প্রবৃত্ত হওয়া অন্যার হইয়াছে। স্পর্শ-দোষ-প্রথা থাকা- সত্ত্বে, হিন্দুর যে বিভিন্ন জাতি গুলি আছে, তাহাদের মধ্যেও কি পরস্পর প্ৰেমালিঙ্গন হয় ? হে শিক্ষিতাভিমানী কায়স্থ বা ব্রাহ্মণ। তুমি কি প্রকৃত প্রস্তাবে নমঃশুদ্র (চাল) গণের সহিত প্রোলিঙ্গন কর? নিয়শ্রেণীরা প্রকাশ্য ভাবে বলিতেছেন, কুকুর স্পর্শেও যে দোষ ও ঘৃণার উদয় না হয়, হিন্দুর নিম্নশ্রেণীর স্পর্শে তদপেক্ষা অধিক ঘৃণার উদ্রেক হয়। একথা কি তুমি অস্বীকার করিতে পার ? ঠিক সমগ্ৰ নমঃশূদ্রাদি অনাচরণীয় হিন্দুর মনের ভাব এইরূপ। তাই বলিতেছি, অগ্রে স্পর্শ-দোষ প্ৰথা উঠাইয়া দেও, তার পরে দেশীয় আন্দোলন কর। তুমি হয়ত বলিবে যে, স্পর্শদোষ প্ৰথা উঠাইলে, জল-চল কৰিলে, হিন্দুর ধৰ্ম্ম নষ্ট হয়। কথাটা সত্য নয়। স্পর্শ-দোষ প্ৰথা থাকাতেই হিন্দুধর্ম নষ্ট হইতছে, কেন না উহা বেদানােদিত নহে। সে যাহা হউক, মানিয়া লইলাম, লােকাচারই তােমার ধর্ম এবং স্পর্শ-দোষ-প্রথা উঠাইয়া দিলে সে ধৰ্ম্ম থাকে কই। কিন্তু ধর্মটা কি কেবল তােমার ? অনাচারণীয় হিন্দু কি এই হিন্দুধৰ্ম্ম নহে? তাহার পক্ষে স্পর্শ-দোষ-প্রথা উঠাইয়া দেওয়া স্বার্থ ও ধর্ম। সুতরাং তােনার বাহা অধৰ্ম্ম তাহার তাহা ধৰ্ম্ম। সুতরাং তুমি অনাচারীয় হিন্দুকে কি প্রকারে প্রেমালিন দিবে ? সেই বা কেন তােনার জন্য রক্তপাত করিতে আসিবে? আমি অবগত আছি ১৮৯১ সনের সেসাসের পূর্বে কোন একটা R জলচল ও পদোষ বিচার। মহকুমার উকীল ও মােক্তারগণের মধ্যে এমন এক ব্যক্তিকেও পাওয়া গেল না যে, চণ্ডালগণের পক্ষ হইতে গবর্ণমেন্টের নিকটে একখানি আবেদন পত্রের মােসােবিদা করিয়া দেন। টাকা দিয়াও চণ্ডালগণ উক্ত ঘৃণিত নাম পরিত্যাগ পূর্বক নমসূত্র বা শূদ্র নামে সরকারী সেরেস্তার লিখিত হইবার জন্য ২০ জন ব্যবসায়ীর মধ্যে এক জনের হও ক্রয় করিতে পারি না। তাহারা বলিলেন চণ্ডাল শূদ্র বা না হইবে, ইহার দরখাস্ত লিখিতে যাইৰে কে ? তাহাদের এই বিৰুদ্ধতায় চণ্ডালগণের কোন ক্ষতি হয় নাই; তাহারা সেই সেস হইতেই না সূত্র বলিয়া সরকারী কাগজপত্রে লিখিত হইয়া আসিতেছে। কিন্তু ইহা দ্বারা উচ্চ-শ্রেণী হিন্দুর মনের ভাব তাহাদের নিকট সম্যক উন্মুক্ত হইয়া পড়িয়াছে। আমরা যে নিম্নশ্রেণীর প্রতি সদ্ব্যবহারে কুণ্ঠিত, ইহা আর বুঝিতে ৰাকী নাই। আমরা যে এক্ষণে তাহাদিগকে স্বদেশী ও স্বজাতি বলিয়া ব্যক্ত করিতেছি, ইহা যে আমাদের অন্তরের কথা নহে—প্রবঞ্চনা বাক্য, তাহা নিশ্রেণী হিন্দুরা ক্রমশঃ বুঝিয়া উঠিতেছে। ঘৃণাতেই ঘৃণা উৎপাদন করে। ইহা আমাদের শাস্ত্রেও আছে। “তােমার উত্তাপে তারে করহ দাহন হে অগ্নে! যে ঘৃণা করে, য'রে ঘৃণা করি। তােমার থালায় তারে কর জালাতন; হে আয়ে! যে ঘৃণা করে যারে ঘৃণা করি।” ২ অথর্ববেদ ২১১ এ বলিতেছি “পাড়াবাসী প্রতি প্রেম” এই মহা যদি এহণ করিতে চাও, তাহা হইলে সর্বাগ্রে নিম্নশ্রেণীর হিন্দুর সহিত সজল ব্যবহারে প্রবৃত হও; প্রকৃত জাতীয়তার বীজ বপন কর। ইহাতে হিন্দু ধর্ম যাইবে না, গ্রো হইবে। আমি অবগত আছি, বাবু অবিনীকুমার দতের চেষ্টায় বরিশাল জেলার স্থানে স্থানে তাহাদের ব্রাহ্মণবাড়ীতে ডাকাইয়া আনিয়া স্পর্শদোষের পরিণাম। স্বদেশ ব্ৰত এই করিতে অনুরোধ করা হইয়াছিল। এতাদৃশ একজন ব্রাশের সহিত অার ঐ বিষয়ে কথােপকথন হইয়াছিল, তিনি বলেন, আমার যজমান নাশূদ্রেরা বলে, স্বদেশী আন্দোলনে আমাদের বােগ দিয়া কল কি? আমাদের সহিত উচ্চশ্রেণী হিন্দুব কখনইত মিলন হইবে না। আমরা অস্পৃশ্য থাকিব, ফাটকে গেলে মেথরের কাজ করিব, ইহার কোন প্রতিবিধান করা হইবে না, অনর্থক রাজার সহিত কলহ করিতে যাই কেন ? তারপর বিদেশি বস্তু খরিদ না করিয়া দেশী বস্ত্র খরিদ সম্প্রতি অর্থ ব্যয় বেশী। বর্ণবিপ্র মহাশয় যখন এই কথাগুলি বলিলেন আমি দেখিলাম, আমাদের শিক্ষিতাভিমানী ব্যক্তিগণ অপেক্ষা এই অশিক্ষিত নমঃশূদ্রগণ ৰাজনীতি ও সমাজনীতি ভাল বুঝে। বরিশালের নম বুদ্রের কথা ? বলিলাম। তহােদের মনের ভাব পাঠক জানিতে পারিলেন। করিদপুবের নমশূদ্রের কথা বলি। ফরিদপুরে নােট হিন্দু সংখ্যা ৪,৭০,০০০, তন্মধ্যে নমঃশূদ্র সংখ্যা ৩,২০,০০০। গত দুর্ভিক্ষের সময় শ্রদ্ধাস্পদ নৰভারত সম্পাদক এই নমঃশূদ্র-প্রধান জেলায় অনেক স্থানে রিলিফ কাৰ্য্য কবিয়া আসিয়াছেন। তিনি বলেন (নবভারত, গত পৌষ মাৰ সংখ্যা) নমঃশূদ্রের মধ্যে যাহারা রাজদ্বারে চাকরী বা ব্যবসায় করিতেছেন, উচ্চশ্রেণীর হিন্দুগণ তাঁহাদিগকে বয়কট করিতেছেন এবং নানা রকমে তাহাদের উন্নতির ব্যাঘাত করিতেছেন। তােমরা ভাবিতেছ, ধর্মসম্বন্ধে নিরপেক্ষ থাকিয়া রাজনীতিক্ষেত্রে একটা প্রকাণ্ড জাতীয়তার মন্দির প্রতিষ্ঠিত করিবে। তাহার নাকি ভিত্তি এর স্থাপিত হইয়াছে। জাপানে কতকটা এরূপ আছে বলিয়া তােমাদের ধারণা। এরূপ ধারণা হইয়া থাকিলে, ইহা ভূল। জাপান ঠিক্ হিন্দুস্থানের মত নহে। সেখানে সমাজে কোন বিভিন্নতা নাই। কেহ বৌদ্ধ, কেহ খ্রীষ্টান হইতে পারে কিন্তু খায় দায় একত্রে। তাঁহাদের স্পর্শ-দোষপ্রথা নাই। তাই বলি যদি জলচল ও স্পর্শদাব চিার। ; দেশীয়তা রক্ষা করিতে চাও, স্পর্শদাৰ প্ৰখা উঠাইয়া দাও। একজন নত্ব বা অন্য নিম্নশ্রেণীর হিন্দুর সহিত সজল ব্যবহার করিলে সহখানি বিলাতী-স্ত্র পবিবর্জনের ফল আছে। মধুক্ষন সরকার। (নব্যভাবত, আষাঢ়, ১৩১৪) “হিন্দু হিন্দুকে ঘৃণা করে, হিন্দু হিন্দুকে স্পর্শ করিলে আপনাকে অপবিত্র মনে করে, হিন্দু হিন্দুর জন্মগ্রহণ করে না; এই জই হিন্দুর সর্বস্ব গিয়াছে। তবু হিন্দুর চৈতন্য হইতেছে না। ইহাই মৃত্যুর লক্ষণ। হিন্দু হিন্দুকে ঘৃণা করিয়া অতি দুর্বল হইয়া পড়িয়াছে। এই ঘৃণা পরিত্যাগ করিতে হইবে। হিন্দু হিন্দুর জল স্পর্শ না করাতে হিন্দু প্রাণ হইতেছে। হিন্দু যে বর্ণেরই হউক, তাহার জল এহণ করিতে হইবে। যদি কর, তােমার মৃত্যু কে বন্ধু করিবে ? তুমি ব্রাহ্মণ, বাঙ্গালা দেশে তুমি কয়জন? খাস ৰামলায় ব্রাহ্মণব সংখ্যা ১০ লক্ষ মাত্র। কায়স্থ! তােমার সংখ্যাই বা কত ? বাঙ্গলা দেশে কামর সংখ্যা ৮ লক্ষ ৪৫ হাজার মাত্র। বৈদ্যের সংখ্যা কেবলমাত্র ৩ হাজার। তােমরা বাঙ্গালা দেশের ১৮ লক্ষ নড, ১৫ লক্ষ রাজবংশী, ৭ লক্ষ বাগী, লক্ষ বাউরি, ৪ লক্ষ পােদকে অনাচরণীয় রাখিয়া কখনও শক্তিশালী হইবার আশা করিও না । তােমরা ৩ লক্ষ সাহা, ২৫ হাজার সুবর্ণ বণিকের কি দুর্দশাই না করিয়াছ। তাঁহারা ধনে বা গুণে কোন অংশে হীন নহেন, অথচ তাহাদিগকে অনাচরণীয় করিয়া রাখিয়াছ। হিন্দু যদি ধ্বংস হইতে না চাও, তবে হিন্দু নামধারী সকলেই বেশী কিছু যদি আপাতত না করিতে পার, তবে তাহাদিগের জল এহণ কর। বাঙ্গালা দেশে কি ভীষণ মূর্খতা! ৪ কেটি ১৬ লক্ষ হিন্দুর মধ্যে ৪ কোটি ৫৩ লক্ষ সম্পূর্ণ নিরক্ষর! বাজালা দেশে ২ কোটি ৫৪ লক্ষ মুসলমানের বাস। ইহার মধ্যে ২ কোটি ৪৫ লক্ষ সম্পূর্ণ নিরক্ষর।
শর্শদাষের পরিণাম। বাঙ্গালা দেশের ৩৩ লক্ষ হিন্দু আর ৯ লক্ষ মুসলমান ব্যতীত আর কাহারও অক্ষর পরিচয় পর্যন্ত নাই; এইরূপ মূখ লােক লইয়া চাষ বাস করিবে, আর শিল্প বাণিজ্যের উন্নতি সাধন করিবে ? পৃথিবীর সুশিক্ষিত চা শিল্পীর সহিত প্রতিঘােগিতা করিবে? তাহার যে ফল হইতেছে, তাহা ত দেখিতেছ। বিদেশীর প্রতিদ্বন্দিতাতে আমরা প্রত্যেক বিষয়েই হারিয়া যাইতেছি। যদি বাঁচিয়া থাকিতে চাও, তবে নিরক্ষরদিগকে শিক্ষা দেও।” ফরিদপুর সমাজ-সংস্কার-সমিতি (সঞ্জীবনী)। “দেশের নেতাগণ শিমলা শৈলে চ্য, চোষ লেহ, পেয় ষােড়োশােপচারে সম্ভােগ করে লাট দরবারে গােটাকতক বিজালিউশন পাশ করিয়ে মৃত ভারতকে তুলিতে চান, তা কি সম্ভব? এদেশের অসংখ্য লােক অদৃশ্য। মৃত শবকেও মানুষ ছোয় এদের কেউ ছোঁয় না। মৃত শৰকেও মানুষ বুকে জড়িয়ে কাদে—এদের জন্য কেউ অশ্রুপাত করে না। শবাপেক্ষাও শােচনীয়। ঈশ্বরের কৃপায় আমি প্রায় পঁচিশ বৎসর ধরিয়া এদের ভিতর কাজ করিতেছি। কিন্তু এদের ভােলা যে কি কঠিন তা আর কি বলিব। একাজ মনুষ্য শক্তি অতীত। জন সমাজের নিয়ম অয়ে মহাপয়ে এরা ডুবে আছে। নামে শুধু মানুষ অবস্থায় পণ্ড অপেক্ষাও হীন। আধ্যাত্মিক রাজ্যের কথা জানেই না—নৈতিক জীবন মহা পক্ষাঘাত মােগন্ত। আজ একটু তুলিলাম, কাল আবার চতুন নীচে পড়িয়া গেল। তা ছাড়া যারা তাদের তুলিতে চায়, অলােকে তাহাদিগকে উৎপীড়ন করেগড় কাজ ভেঙ্গে ফেলতে চেষ্টা করে। লাটসাহেবের সভায় গিরা এদের সপক্ষে বলা অতি সহজ। কিন্তু গ্রামের যে কুপ হইতে তুমি জল তােল, সেই কুপ হইতে এদের জল তুলিতে দেওয়া সহজ নহে। শুধু কথায় চিড়ে ভিজে না। অস্পৃশ্যদের তুলতে হলে, তােমায় অস্পৃশ্য হতে কবে। তাদের পূর্ণ সংস্পর্শে আসিতে হইবে। ভাই বলে তাদের গলা জলচল ও স্পর্শলাব বিচার। জড়িয়ে ধরিতে হইবে। মুখে মুখ বুকে বুক না রাখিলে এ মৃতে প্রাণ আসিবে না। * মৃত ভারতকে প্রাণ দিতে হইলে এই সাধন চাই। যাদের তুমি হাত দিয়ে ছােৰে না, তাদের জন্য গােটাকতক রিজলিউশন পাশ করিয়ে তাদের তুমি ভুলিতে পারিবে না। তুমি হিন্দু হও, মুসলমান হও, ব্রাহ্ম ইও, আর খৃষ্টান ইও, যতদিন এই সহানুভূতি ও সমবেদনা মন্ত্রে দীক্ষিত না হইবে, ততদিন তুমি ভাবতে প্রাণ সঞ্চার করিতে পারিবে না। বিনােদবিহারী রায়। শৰসাধন, ভা, নব্যভারত। মাজাজ ব্যবস্থাপক সভার পঞ্চম সভ্য গাজের পংমরা তার ব্রাহ্মণদেব কর্তৃক যেমন স্বশিত হইয়া থাকে তাহা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। ত্রিবাঙ্কুর ও মালাবরে কোন পঞ্চম ৪৮ গত মধ্যে উপস্থিত হইলে ব্রাহ্মণের অশুচি হইয়া থাকে। সংপ্রতি আদি জ্বাৰিড জনসভার সম্পাদক মিঃ রাজা মান্দ্রাজ ব্যবস্থাপক সভায় গবর্ণমেন্ট কর্তৃক মনােনীত হইয়াছেন। তিনি পঞ্চম সম্প্রদায় ভুক্ত। এখন ব্যবস্থাপক সভায় বিশুদ্ধ ব্রাহ্মণ ও অন্যান্ত উচ্চ বর্ণের সভ্যগণ পঞ্চমের পার্শে তুল্য আসনে আসীন হইবেন। এক সঙ্গে তাহারা রাষ্ট্রীয় তত্ব আলােচনা করিবেন। ইহাদের জাতির অভিমান অতিরিক্ত। তাহারা কি এখন লাট মজলিসে যাইতে বিরত হইবেন? পঞ্চমের হাওয়া, ছায়া, স্পর্শ, দৃষ্টি এমন কি বাক্য ও বিশুদ্ধ ব্রাহ্মণদের এখন ক্রমে ক্রমে সহিয়া আসিবে। আচাৰ্য্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় কলা গাছির জাতীয় বিদ্যালয়ে জনমন মুগ্ধকারী বক্তৃতায় জাতিভেদ সম্বন্ধে বলিয়াছেন- আমরা হিন্দুজাতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সম্প্রদায়ে বিভক্ত হইয়া ক্রমণ হীন ও দুর্বল হইয়া পড়িতেছি। ফলে যেখানে আমরা কয়েকটা, সেখানে মুসলমান col৬০ জন। তাই মাগিকে অনেক জটিল সময় পড়িতে হইয়াছে।
স্পর্শদোষের পরিণাম। ১ এর ছোঁয়া জল খাইব না, ওর ছোঁয়া জল খাইব না, ইত্যাদি ভণ্ডামি ও কপটাচারে সমাজ জর্জরিত। হিন্দু সমাজ গেল। মুসলমান ক্রমশঃ বেড়ে চলেছে আরও পঞ্চাশ বৎসর পরে গঙ্গার ওপারের সমস্ত হিন্দু মুসলমান হবে। গজার ওপারের হিন্দুগণের মধ্যে ব্রাহ্মণ কায়স্থ বেশী বলিয়া, নিম্নশ্রেণী হিন্দুগণের প্রতি অত্যাচার বেশী, সেজন্য তারা মুসলমান ধর্ম এহণ করিতেছে। (সত্যবাদী) জাতি ভেদ ও অস্পৃশ্যতার মহাপাপ সম্বন্ধে সভাপতি পণ্ডিত মদনমােহন মালব্য মহােদয় বিগত কাশী হিন্দু-মহাসভায় বলিয়াছেন আমার দৃষ্টিতে নৈষ্ঠিকব্রহ্মচারী ও চণ্ডাল উভয়েই আমার ভাই। যদি কোন চালের সন্তানকে দেখিয়া আমার মনে প্রেমের উদয় না হয় তবে যেন আমার পরমাত্মা দোষী হয়। কিন্তু আমি চতুৰ্বর্ণে বিশ্বাস করি। আমাদের এই হিন্দুধর্শের বিরাট ইমারতে যদি কোনও নূতন দরজা জানালা খুলিতে হয় তবে খুলিব । কিন্তু তাই বলিয়া কাহাকেও এই ইমারত ভাজিতে দিব না। হিন্দু-মহাসভা সৰ্বজাতি ও সর্বশ্রেণীর হিন্দুসে চণ্ডালই হউক আর আর ব্রাহ্মণই হউক। আমাদের চার ভাই রাম নাম করে, শিখা বাঁধে, দুই চারিটা পয়সা হইলে রামজীর মন্দির নির্মাণ করায়। কাশীর হরিশ্চন্দ্র বাটের মন্দির এক চাব নিৰ্মাণ করাইয়াছে। সেই চামার কি আমার ভাই নয়? আমার জামার ভাই আমার কত সেবা করে-সকল সেবার চেয়ে যে সেরা সেবা—সে তাহাই করে; সে দুই তিনবার আমার বাড়ীর ময়লা পরিষ্কার করে; না করিলে আমার বাড়ীতে টেকা দায় হইত। আর ইংরে- জের সঙ্গে আমার কত প্রভেদ; সে শৌচ করে ন', ২৪ মাস কান না করিয়া থাকে, কত অখাদ্য ভক্ষণ করে। সভাসমিতিতে, কাউন্সিলে সর্বত্র আমি তাহাকে দুই, আদর করি। তাহাকে চুইলে আমার জাত যায় না, কিন্তু আমার যে রামদাস চামার, সে রাম নাম করিয়া স্নান করিয়া সভায় ও স্পদৰ বিচার। আসিলে তাকে তাড়াইয়া দেওয়া হয়, তাহাকে মন্দিরে ঢুকিতে দেওয়া হয় না । আজ এতে আমি বিশ্বনাথের মন্দিরে গিয়াছিলাম। জীবনের কোনও সটের দিন উপস্থিত হইলে আমি বিশ্বনাথজীর মন্দিরে যাই। মন্দিরে মধ্যে চারিদিকে কেহ উপাসনা করিতেছিল; কেহ পূজা, কেহ পাঠ করিতে লি; তাহাদের মধ্যে আমার এমের কয়েকজন শূদ্রও ছিল। তাহারাও কত ভক্তির সহিত পূজা করিতেছিল। ভাইসকল সভায় উপস্থিত বিহুৎ- মণ্ডলী আজ আপনাদের নিকট আমার প্রার্থনা—আমার ভিক্ষা বােৰ ভগবানে বিশ্বাস আছে,—যে ভগবানের নাম লয়,—সে যেন প্রবেশ কবি দুকিতে ভগবানের দর্শন পায়। আর নীচজাতিকে গ্রামের কুপ হইতে জল লইতে দেওয়া হয় না। মিশনারীরা হাট কোট ছাড়িয়া সন্ন্যাসীর বেশ ধারণ করিয়া উহাকে বলে যে হিন্দুরা তােমাকে ঘৃণা করে, তুমি খ্ৰীষ্টান হও। মুসলমানও তাই বলে। খ্রষ্টান হইলে এমের কূপ হইতে তাহার জল লইবার আর বাধা থাকে না। ইহার ফলে দলে দলে লোেক অন্য ধর্ম গ্রহণ করিতেছে। মীরাটের জমিদাব আমাকে বলিয়াছিলেন যে তাগব চামার প্রজারা দলে দলে টান হইয়া যাইতেছে। তিনি জমিদাব হইয়াও এই খ্ৰীষ্টান প্রজাদের জ্বালায় অস্থির হইয়া উঠিয়াছেন। তাহারা জোরজবরদস্তি করে, জমিদার তাহার কোনও প্রতিকার করিতে পারেন না। কারণ তিনি আদালতে নালিশ কৰিলে মিশনারী সাহেব ম্যাজিষ্ট্রেটেব নিকট নােট (note) পাঠান, ফলে সব ডিশমিশ হইয়া যায়। অন্য জাতি আমার মন্দির আক্রমণ করিতে আসিলে চামার ভাঙ্গী তাহাতে বাধা দেয়, তাহার জন্য প্রাণ দেয়, আর সেই চার সেই ভাব্দীকে আমরা মন্দিরে ঢুকিতে দিই না; কৃপ হইতে জল লইতে দিই না। আমার চণ্ডাল ভাই এনে থাকে, এম সাফ রাখে, এষের স্বাস্থ্যরক্ষা করে, শবের পলিম। নিজে সারাদিন জারিকার কাজ করিয়া সার সময় যখন আন করিবার জ কুয়ার জল তুলিতে যায় তখন তাহাকে জল তুলিতে দেওয়া হয় না। সৰ্ব্ব- জাতির লােক, মুসলমান খ্রীষ্টান সকলে কুয়া হইতে জল লইয়া যায়, কে হাদিগকে বারণ করে না। কিন্তু আমার ভাই আমার ধর্মরক্ষাকারী, আমার স্বাস্থ্যরক্ষাকারী, আমার জীবন রক্ষাকারী ভাইকে জল লইতে লেঞ্জা হয় না। আচাৰ্য রায় অন্যত্র বলিয়াছেন—প্রত্যেক I Scৰ ছাত্ৰ জান ৰে, hydrago ও Oxygen এর রাসায়নিক সংবােগে জল উৎপন্ন হয়। সেই জল যদি কাচপাত্রে থাকা অবস্থায় কোন নামূত্র স্পর্শ করে, অমনি তাই ব্রাহ্মণ, কায় এভৃতি তথাকথিত উচ্চবর্ণভুক্ত সম্প্রদায়ের অপেয় হইয়া যায় । কিন্তু Spa? #15 non-porous, non conductor of Electricity 47 bad conductor of heat, তবুও ম্লাস চুইলে তাহার ভিতর পানীয় কি প্রকারে অশুচি হয়, তাহা বৈজ্ঞানিক ও নৈয়ায়িকগণ ও বলিতে অক্ষম। অত সেই জল অবস্থাবিশেষে লেমনেড রূপে মি হইলে বা জমাট বাঁধিয়া শীতল বরফ হইলে স্পর্শদুষ্ট হইবার ভয় থাকে না। স্বচক্ষে দেখিয়াছি, জনৈক ব্রাহ্মণের শ্রদ্ধে, অধ্যাপকমণ্ডলী বরফ দেওয়া নিখ পানীয় ব্যবহার করিতে কুণ্ঠা বােধ করেন নাই। কেন, ভাটপাড়ার বৈদিক ব্রাহ্মণেরা, গজামান নামাবলী গায় দিয়া, গায়ত্রী জপ করিতে করিতে পবিত্র গঙ্গাজলে, শাসম্মত প্রণালীতে কি বরফ তৈয়ারী করেন ? বরফ লেমনেডে জাত যায় না, কিন্তু একজন বর্ণ বণিক ব্রাহ্মণকে পরিবেশন করিলে তার জাতি নষ্ট হয়। মানুষ মানুষের ছোয়া খায় না এর চেয়ে নীচতা, এর চেয়ে পাপ জগতে অব আছে কিনা আমি জানি না। গলায় একগােছ সাদা সূতা থাকিলে তাদের হাতে খেতে আমাদের কোন আপতিই থাকে না। তা ঐ পৈতাধারী বিহার উড়িষ্যার যে কোন নীচ করিয়া, ১০০ অলচল ও পদোষ বিচার । বংশগত হউক না কেন। অনেক ডাক্তার বলেন যে কলিকাতায় শতকরা ৯৫ জন রাধুনী বামুনের দেহে কুৎসিৎ ব্যাধি আছে। আমরা অম্লানবদনে তাদের সৃষ্ট অল্প খাই। কিন্তু শুদ্ধাচারী তথাকথিত নিয় জাতির ছোঁয়া খাইতে নাসিকা সঙ্কুচিত করি। অবশ্য আপনারা জানেন, অনেক মুখ কুলীনই লাট প্রাসাদে নৈশ ভােজনে যােগ দিতে কুণ্ঠা বােধ করেন না। আমি বলে থাকি বাংলাদেশের যুবকবৃন্দ আমাদের ভবিষ্যৎ আশা ভরসা স্থল—কিন্তু তাদের মধ্যে এই সৰ ভণ্ডামী দেখলে হতাশ হইতে হয়। লেখাপড়া শিখে, B, A, B. Sc. এমন কি D sc, P. Rs. হয়েও cleanliness is next to godlines এই সার বাক্যটার উপর অনেকের শ্রদ্ধা দেখা যায় না বােধ হয় জাত বাবার ভয়ে। এই জাত যাবার ভয়ই যে জাতি লােপ পাবার অতন কারণ তা কেউ ভেবে দেখেছেন কি? Mague এ দেশ সময় সময় উজাড় হয়ে যায়-একনে আরম্ভ হ'লে বায়ুগতিতে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কেল্লার ভিতরে Plague হয় কি ? কেন হয় না ? Plague কি কামানের ভয়ে কেল্লায় ঢুকতে সাহস পায় না ? তা নয়, উহা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সুফল। প্লেগ, কলেরা সব সময়েই বস্তিতে, অপরিত অপরিচ্ছন্ন অন্ধকার স্থানেই বেশী প্রকাশ পায়। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা সকলেরই ইচ্ছাধীন , বাতাস ও সূর্যের আলাের জন্য এখনও tax দিতে হয় না। তবুও ভগবানের দেওয়া এই দুটো জিনিস থেকেই আমরা দূরে থাকি। কলের পরিক্বত জল খাই না, কিন্তু আবর্জন দুষ্ট, অপরিষ্কার নদীর জলের পক্ষপাতী কেন না শান্তাহারে উহাই গুজ। অবশ্য এখানে মনে রাখা দরকার শাকাবগণের সময়ের নদীর অবস্থা অব বর্তমান সময়ের নদীর অবস্থার কত প্রভেদ। দেখা গিয়াছে, পরিষ্কত জল ব্যবহার করাতে কলেরার প্রকোপ অনেক কমে গেছে। এখনও অনেক স্থানে পাইখানা ও কুয়া পাশাপাশি তৈরী করা হয়, উহাতে পাইখানার স্পর্গদোষের পরিণাম। ১১ নয়লা সছিদ্র মাটির ভিতর দিয়া কুপের ভিতর পড়িয়া কূপের জলকে দূষিত করে। অস্পৃশ্যতার কথা একটু পূর্বেই বলিয়াছি। স্বামী বিবেকানন্দ বলিয়াছেন আমরা ডােম, চণ্ডাল প্রভৃতি নিয় জাতিদিগকে দিন দিন নিজেদের নিকট হইতে তফাৎ করিয়া দিতেছিফলে তারা ধর্মান্তর এহণ করিতেছে। আৰু সমাজে যারা স্বধর্ম আশ্রয় করিয়া আছে, তারা উচ্চ সম্প্রদায়ের উপর ধহস্ত। আপনারা ত সকলেই জানেন যে, দেশের কাৰ্যে, দেশােন্নতির পবিত্র যজ্ঞে সকলেরই সমান অধিকার, সকলেরই সমান প্রয়ােজনতবুও কেন মানুষ হইয়া মানুষকে মানুষের নিকট থেকে পৃথক করিয়া রাখার ব্যবস্থা ? গত মহাযুদ্ধে যদি লক্ষ লক্ষ ফরাসী ইংরাজ আহােৎসর্গ না করিত, তবে মারসেল ফল বা লর্ড হগএর সাধ্য কি, হাবা ইংলণ্ড ও ফ্রান্সের স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা রক্ষা করেন ? দেশের নেতারা সব কাজেই বাহবা পাইয়া থাকেন, কিন্তু সে শুধু নীরব কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল। (সমাজ সেব-আনন্দ বাজার পত্রিকা) আচাৰ্য রায় বিক্রমপুরে অস্পৃশ্যতা সম্বন্ধে বলিয়াছেন “অস্পৃশ্যতা জাতীয় উন্নতির প্রধান অন্তরায়। ইহা সমাজ হইতে সর্ব প্রষঙ্গে দুর করিতে হইবে। অস্পৃশ্যতা নিম্রজাতির প্রতি অত্যাচাবের নামান্তর মাত্র। মুসলমান ভ্রাতাগণ হিন্দুগণ হইতে এ বিষয়ে অনেক উদার। হিন্দুদের মন্দিরে সকলের প্রবেশের অধিকার নাই, কিন্তু মুসলমানের মসজিদে সকলেই প্রবেশ করিতে পারে। দেখিয়াছি আফগানিস্থানের আমীরের সহিত এ দেশের ভিস্তিও একাসনে বসিয়া নমাজ পড়িয়াছিল। আর আমাদের সমাজের অস্পৃশ্য জাতিদের মন্দিবে প্রবেশ করিবার অধিকার নাই। দেবমন্দির হইতে বহুদূরে দাঁড়াইয়া তাহাকে দেবদর্শন করিতে হয়। ইহা ছাড়া নানা ভাবে আমরা নিজাতির উপর অত্যাচার করিয়া আসিতেছি। তাহার ফলে ১০ চর ও শনিলাৰ বিচার। আমরা সাধারণ লােক হইতে ক্রমেই দূরে সরিয়া পড়িতেছি। প্রকৃতপনে আমরা এতদিন তাহাদিগের সহিতই অসহযোগ করিয়া আসিতেছি। এখন আমাদিগের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিতে হইবে।” যে সকল জাতি উপেক্ষিত রহিয়াছে, তাহাদের উন্নতি সাধন গুরুতর এ। এ দেশে যুগযুগান্তর ধরিয়া কোটি কোটি লােকে জ্ঞানের আলােকে বঞ্চিত হইয়া রহিয়াছে, সমাজ তাহাদিগকে উপেক্ষা করিয়াছে, নির্যাতন করিয়াছে, নিয়তরে স্থান দান করিয়াছে। তাহারাও এতদিন আপনাদিগকে হন বলিয়াই মনে করিয়াছে। যে দেশে শতকরা ১৪ জন লিখিতে পড়িতে জানে না সে দেশের উন্নতির সম্ভবনা কোথায় ? বর্তমানে ভারতে যে নব জাগরণ আশিয়াছে, তাহাতে উপেক্ষিত জাতিগণও আত হইয়া আপনাদের অধিকার লাভের দাবী করিতেছেন, আপনাদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তার করিতেছেন; ইহা অতি ততক্ষণ। কিন্তু এই জাগরণের সঙ্গে সঙ্গে যে সকল জাতি তাহা দিগকে এত হীন করিয়া রাখিয়াছিলেন, তাহাদের প্রতি ইহাদের বােতর বিৰে ভাৰ লাগিয়াছে। সে দিন আসমাজ গৃহে যে সৰ্বৰ-শিক্ষা সমিতির অধিবেশন হইয়াছিল, তাহাতে উপেক্ষিত জাতির কোন কোন শিক্ষিত লেক বলিতে জটা করেন নাই—“আমরা যে শিক্ষা প্রাপ্ত হইয়াছি তাহা হিন্দুসমাজ দেন নাই রাজা দিছেন, উচ্চ বর্ণের রক্ষণশীল হিন্দুগণ ও জমিদারগণ আমাদের শিক্ষার বিরােধী।” যদি তাহারা সকলে মন খুলিয়া কথা বলিতে পারিতেন, তবে অনেকেই এইরূপ ভাব প্রকাশ করিতেন। তাহারা এক্ষণে শিক্ষা করিতেছে। সমাজে কতকগুলি অধিকার চাহিতেছেন। তাঁহারা সমাজের আরে আসিয়া বলিতেছেন,তােমরা দিবে, না, আমরা এহণ করিব। তাহাদের দাবী এখন আর অশ্রাহ করার সাধ্য নাই। তাহাদের উন্নতি না হইলে, তাদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তার না হইলে, তাহাদের মনুষত্ব ফুটিয়া না উঠিলে, দেশের উন্নতি হইবে না। তাহারা যে চেষ্টা করিতেছে, তাহাতে শজিনের পরিম। ১ তাহাদের লতি অনিবার্ণ, উহাই বানীয়। কিন্তু এই সময় বর্ণের শিক্ষিত সমাজ যদি তাহাদিগকে সাহায্য না করেন, তাদিগকে হাত ঘলিয়া না তােলেন, তবে তারা দেশহিতসাধনে সহায় হইবেন না। তাদের সঙে শিক্ষা বিস্তার সময়ে কেবল তাৰ বাৰ্য কৰিলেই চলিবে না, তাহাদিগের মতে স্কুল পাঠশাল প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে। তাহারা কতগুলি সামাজিক অধিকার চাহিতেছেন; তাহারা অচল চাহিতেছে, খােবা নাপিত চাহিতেছেন, এই সকল অধিকার প্রদান করা কর্তব্য। মানুষকে মানুষ বলিয়া মাত করিতে হইবে তাহাদিগকে পক পক্ষী অপেক্ষাও হীন চক্ষে দেখিলে চলিবে না। জানি, আজ তাহার যে অধিকার চাহিতেছেন, এই অধিকার প্রাপ্ত হইলে, তাঁহাদের দাবী আরও বৃদ্ধি হইবে। তাহাতে হানি কি? রাজণীতি ক্ষেত্রে যাহারা গৰমেন্টের নিকট ক্রমেই অধিকতর অধিকার দাবী করিতেছেন, তাঁহার এই চিরলাতি উপেক্ষিত জাতির দাবী যদি অাই করেন তবে তাহাদের জীবনে সামঞ্জস্য থাকে কোথায়? জাতিভেদ, বর্ণভে এদেশের অধঃপতনের প্রধান কারণ ; এই জাতিভেদ দূর করিয়া সমগ্র ভারতীয় জাতি সমূহকে এক মহাজাতিতে পরিণত করিতে হইবে। “সমাজ-সংস্কা-সমিতি আপাতত জাতিভেদ সম্পূর্ণ রূপে দূর করিতে সাহস করিবেন না। কিন্তু একই জাতির যে বিভিন্ন শাখা আছে, তাহাদের মধ্যে বিবাহ সম্বন্ধ স্থাপন, বিলাত প্রত্যাগত লােকদিগকে বিনা প্রায়শ্চিত্তে সমাজে এ প্রভৃতি সংস্কার কৰ্য্য করিতে পারেন। হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে সম্ভাৰ সংস্থাপন করাও সমাজ-সংস্কার-সমিতির কর্তব্য। বীয় সমাজ-সংস্কার-সমিতি। কেরল প্রাদেশিক কনফারেন্সে প্রতী সনজিনী নাইডুসভানেত্রীরূপে অস্পৃশ্যতা সম্বন্ধে বলিয়াছেন (ই মে, ১৯২৩) “দক্ষিণ ভারতের নিষ্ঠুর এবং ভীষণ সমস্যা অস্পৃশ্যতার বিষয় আজ আপ নাদিগকে বিবেচনা করিয়া দেখিতে হইবে। আপনারা আপনাদের সাজ জলচল ও স্পর্শদোষ বিচার। ভাইদের এক সঙ্গে বসিতে দিয়া নিজেরাই সেই সমতার সমাধান করিতে আরম্ভ করিয়াছেন। আজ যদি মহাত্মাজী দেখিতে পাইতেন যে, একই গৃহতলেন ত্রি, নায়ার ও নারাদী একত্রে উপবেশন করিয়াছি, তাহা হইলে তিনি নিশ্চয়ই বলিতেন, একা মালাবাবই ভাবতে স্বরাজ আনয়ন করিবে। অস্পৃশ্যতার উপর তিনি কিরূপ জোর দিয়াছেন আপনারা সকলেই অবগত আছেন। শ্রীমতী কস্তুরীবাই গান্ধি যখন তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে গমন করেন, তখন তাঁহার প্রধান প্রশ্ন কেমন আছে ? তাঁহারই শিক্ষার গুণে গর্বিত নত্রি ও বিনীত নায়াদী একত্রে উপবেশন করিয়াছে। মালাবারের শােচনীয় ব্যাপাবেব কথা মনে পড়িলে আমাৰ চোখ ফাটিয়া জল আসে; তবুও এই সম্বন্ধে আমি একটা কথা বলিতে চাই। কতিপয় মুসলমানের দুকার্যের জন্য এখানকার হিন্দু সমাজ বিশেষ ক্ষুব্ধ ও কু হইয়া আছে। মুসলমান দুর্বদিগেব এই কাৰ্যে ভারতের উক্ত সমাজের সমস্ত ধর্ম গুরুরাই প্রতিবাদ কবিয়াছেন। আর হিন্দুরাও এই বিষয়ে উদারতা প্রদর্শন করিতে পাবিতেছে না বলিয়া মুসলমান ভ্রাতারাও ক্ষুব্ধ হইয়াছে।” হিন্দু সমাজ সম্বন্ধে কবি রবীন্দ্রনাথের অভিমত। পাঞ্জাবে বা যুক্ত প্রদেশে হিন্দুর গায়েব শক্তি মুসলমানের চেয়ে কম নয়, ওরাও ছাতুটাতু খায় কিন্তু হিন্দুই পড়ে না খাস, তার কারণ হিন্দুদের স- হতি নেই মুসলমান মুসলমানের ডাকে সাড়া দেয়, হিন্দু দেয় না। মুসলমানেব এই অরগেনাইজিং স্পিরিট কোথা থেকে এসেছে ? তার ধর্মই তাকে অরগে- নাইজ করে। মুসলমানের ধর্ম সাম্যবাদ-মুলক। মুসলমানে মুসলমানে ৭ যে সহানুভূতি তার সেকশন বা বুনিয়াদ মুসলমান ধৰ্ম্মে। হিন্দু ধর্ম অর্থাৎ বর্তমানে যাকে আমরা হিন্দুধর্ম বলে বুঝি তা অরগেনেইজেসন এর পরিপন্থী। সাম্যবাদের উপর এ প্রতিষ্ঠিত নয়। সেদিন এক বন্ধু সীমান্ত প্রদেশের এক স্পাদোষের পরিণাম। ১০ গল্প বলছিলেন। আফ্রিদীরা প্রায়ই সীমান্তের ব্রিটিশ প্রজাদের উপর চড়াও কো’রে মেয়ে পুরুষ ধরে নিয়ে যায়। একবার একটি হিন্দু মেয়েকে ধরে নিয়ে গিয়েছে। যে বন্ধু এই গল্প বলেছিলেন তার বাসা এই ঘটনাঙ্কলের অতি নিকটে ছিল। তিনি দেখলেন যে হিন্দু প্রতিবেশী কেউ মেয়েটিকে রক্ষা করবার জন্য অগ্রসর হ’ল না, তাতে তিনি একজন প্রতিবেশী ব্রাহ্মণকে জিজ্ঞাসা করলেন, একি রকম? আপনারা যে টু শব্দটি করলেন না। তাতে ব্রাহ্মণ জবাব দিলেন, “উমােত বেনিয়াকা লেড়কী।” কবি বল্লেন এই ত হিন্দুর মন, মুসলমান কিন্তু কখনও এ রকম জবাব দেবে না। অস্পৃশ্যতা দোস হিন্দুর অস্পৃশ্যতা শুধু দৈহিক নয়, তার চেয়ে প্রবল হচ্ছে নৈতিক অস্পৃশ্যতা। বাংলাদেশে দৈহিক অস্পৃশ্যতা হিন্দুদেব মধ্যে বিশেষ নেই কিন্তু নৈতিক অস্পৃশ্যতা খুবই আছে। যাতে উচ্চ নীচ ভেদাভেদ সব বর্ণের মধ্যেই আছে। হিন্দুদের দুর্বলতার কারণ মূলগত। হিন্দুসমাজ মানুষের সঙ্গে মানুষের জন্মগত ভেদ করে রেখেছে যার কোন যুক্তিযুক্ত কাবণ দেওয়া যায় না। জগতে কোন জাত উন্নতি কর্তে পারে নি যারা পারিপার্শ্বিক অবস্থা বুঝে নিজেদের ধর্মগত বা অভ্যাসগত আচার ব্যবহার না পরিবর্তন কর্তে পেরেছে। বে মনু-সংহিতায় সমুদ্রযাত্রা নিষেধ কবে গিয়াছে আর যতই অবস্থার পরিবর্তন হউক না কেন তাই আকড়ে ধরে বসে থাকতে হবে, এ বিশ্বাস বদলালে আমাদের জাতীয় উন্নতির আশা দুরাশা মাত্র। অবশ্য সব জাতেরই কতকগুলি সংস্কার আছে এবং সংস্কার-গত আচাব ব্যবহার আছে যার কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ দেখানাে যায় না। কিন্তু উন্নতিশীল জাতি মাত্রেই পারিপার্ষিক অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যে সকল সংস্কার ও আচার ব্যবহার উন্নতির ১ এল ও শলাব বিচার। পরিপন্থী তা ত্যাগ করতে পেরেছে। অগতে আমরা অর্থাৎ কেৰল হিন্দুরাই তা ত্যাগ কর্তে পারি নি। তাই আমরা মানুষে মানুষে জন্মগত বা অনৈসর্গিক এতেন, হয়ত কোনো কালে, কোনােও উপযুক্ত কারণে বা নিকারণে করা জেছি তা এখনও বজায় রাখতে চাই। বাস্তবিক ভগবান মাজুষে মানুষে এমন কোন ভেদ করে দেন নি। মানুষের সঙ্গে মানুষের যে সত্য স তার ব্যতিক্রম কোরে কখনও সত্যিকার মিলন গড়ে উঠতে পারে না। হিন্দু মহাসভা কবি বলেন যে “হিন্দু-মহাসভা” যদি হিন্দুসমাজের কীটম্বরূপ, দৈহিক নৈতিক অত দূর কর্তে পার্তেন তা হলে, মুসলমানরা চটে গেলেও, কাজের মত এক কাজ যেতে। ঘরের গলন দূর কর্তে পাল্পে অর্থাৎ হিন্দুদের মধ্যে যেজশৃঙ্খত (ফিসিকেল ও মাল) দোষ আছে তা নিকরণ কর্তে পালে হিন্দু সরব হয়ে উঠবে। শরীর আর শুধু মাংসপেশী কোলাবার চেষ্টা কল্লে কিছু হবে না। মুসলমান হিন্দুদের দেখাদেখি গায়ের জোর আরও বৃদ্ধি করবার চেষ্টা করতে পারে। এ রকম চেষ্টাও বিপরীত চেষ্টা, কেবল পাপের পথে বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকবে। তাতে ফল হবে কি?” কবি আবার বলেন যে “শারীরিক শক্তি মানুষ মাত্রেই অন করা দরকার সে চিন সত্য, কিন্তু আমাদের সমাজদেহের যে ব্যাধি তার কারণ নির্দেশ করে তাই উৎপাটন করার চেষ্টা হচ্ছে গােড়ার কথা।” হিন্দু যদি বাঁচতে চায়, বদি মানব সমাজে অধঃপতিত অবস্থায় চিরদিন পড়ে থাকতে না চায়, তা হলে তাকে সম্বন্ধ হতেই হবে। কিন্তু হিন্দুদের এই সব হবার চেষ্টা কি মুসলমানরা সন্দেহের চক্ষে দেখবে না আর তার ফলে হিন্দু মুসলমানের অমিলের আর একটা কারণ কি বৃদ্ধি পাবে না?” এ প্রশ্নের জবাবে কবি বলেন, তা হৰে বৈ কি। কিন্তু সে বিপদের আশঙ্কা আমাদের মেনে নিতেই হবে। মুসলমানের যে স্বাধীনতার স্পর্শদারে পরিণাম। ১০৭ আমৱ ৰা দেইনি সে স্বাধীনতা আমাদেরও প্রাপ্য। তারা নিজেরা সংখ্য হতে পারে তারা ইচ্ছামত হিন্দুকে মুসলমান ধর্মে দীক্ষিত করতে পারে আর তারা তা করেছে এবং এখনাে কাটেশরা তাে কখনও বাধা দিতে গড়াই নাই। আমরা যখন দিয়েছি, তখন তারাই বা সে স্বাধীনতা কেন আমাদের দেৰে না? আমরা সব হতে চাইলে তারা কেন তাতে ৰখা দেবে?” কৰি তারপর মালিকানা রাজপুতদের উক্তি ব্যাপার সম্বন্ধে বল্লেন তিনি কিছুতেই বুঝতে পারেন না, মুসলমান যে স্বাধীনতার দাবী নিজে করছে, ঠিক সেই স্বাধীনতা অপরকে দিতে কেন নারাজ। “কি কবি তারপর বল্লেনহিন্দুদের সব করা বড় কঠিন যে সব বাধা বিপত্তি আছে তা অতিক্রম করা বড়ই শক্ত। সামাজিক ভেদ-নীতি হিন্দুকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। কবি তারপর বলেন আমি আমার জমিদারীতে দেখেছি হিন্দু প্রজা কোন রূপ সংস্কারই বরণ করে নিতে পারে না কিন্তু আমার মুসলমান প্রজারা সহজেই সকল সংস্কার আয়ত্ত করে নিতে পারে। ফলে মুসলমান সংখ্যায় ক্রমই বেড়ে চলেছে আর হিন্দুর অস্তিত্বই লােপ হচ্ছে। কৰি তারপর হিন্দুদের সামাজিক কতগুলি ব্যবস্থার দোষ দেখিয়ে বল্লেন বে মুসলমানদের তুলনায় হিন্দুর সংখ্যা বৃদ্ধি না হবার আরাে কারণ হচ্ছে ওই সব সামাজিক ব্যবস্থা। প্রায় ২ ঘন্টা আলাপ করবার পর আমি কবির নিকট বিদায় এহণ করি। বিদায় দেবার সময় কবি আমায় হিন্দু-মুসলমান সমস্যা সম্বন্ধে বিশেষ চিন্তা কতে বল্লেন আর বলেন যে দেশের নেতাদের সবখানি মন দিয়ে আজ এই সমস্যা সমাধানের উপায় স্থির করাই দরকার। এলকান্তি বিজলী) বাঙ্গালার হিন্দুসমাণে ব্রাহ্মণ, কয় ও বৈদ্য এই তিন অতি উচ্চ ১০ জলচল ও স্পর্শদোষ বিচার। জাতি বলিয়া গণ্য। এই উচু জাতের লােকেরা নিজেদের কৃত্রিম সামাজিক মর্যাদা ও গৌরবে ধরাকে সরা জ্ঞান করেন। হিন্দুসমাজের তথাকথিত নিজাতির লােকেরাও যে সমাজের একান্ত প্রয়ােজনীয় অংশ, এমন কি অনেক স্থলে মেরুদণ্ড স্বরূপ, এ জন তাঁহাদের নাই। আজ কয়েক শতাব্দী ধরিয়া রাজনৈতিক বিপর্যয় ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার ফলে এই তিন জাতির হাতে নানা কারণে বহু ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হইয়াছে। কিন্তু এই উচু জাতের লােকেরা সেই ক্ষমতার সদ্ব্যবহার করেন নাই। বরং তাঁহারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিব জন্য স্মৃতিশাস্ত্র ও দেশাচারের দোহাই দিয়া, তথাকথিত উচ্চ ও নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে একটা প্রকাণ্ড কৃত্রিম ব্যবধান গড়িয়া তুলিয়াছেন। নিম্নবর্ণেব লােকদের মধ্যে শিক্ষাও জ্ঞানবিস্তারের জন্য তাঁহারা কোন চেষ্টাই করেন নাই। সর্ব প্রকার সামাজিক সুবিধা ও সুযােগ পাইয়া যাহাতে সঁহারা নিজেদেব ও হিন্দুসমাজের শ্রীবৃদ্ধি সাধন কবিতে পারেন, উচ্চগতির লােকেরা সে পক্ষ কোন উৎসাহ দেন নাই; এবং সর্বোপরি তাহাদের মধ্যে কোন কোন জাতিকে “অস্পৃশ্য, জলানাচরণীয়” প্রভৃতি আখ্যা দিয়া পশুৎ ঘৃণা করিয়া আসিতেছেন। ফলে হিন্দু-ব্যবসায়ী জাতিরা ক্রমে ক্রমে লুপ্ত হইতেছে, কৃষক ও শ্রমিক জাতিরা ক্রমে ক্রমে হীনবল হইয়া পড়িতেছে এবং তাহাদব স্থান মুসলমান প্রভৃতি অন্য সম্প্রদায়ের লােক, এমন কি বাঙ্গালার বাহিরে লােক আসিয়া অধিকার করিতেছে। সমাজের প্রধান বন্ধন সংহতিশক্তির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত, হিন্দুসমাজে এখন তাহাই নাই। মুসলমান, বৌদ্ধ, খৃষ্টীয় ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে উহা যথেষ্ট পরিমাণে আছে, তাই বাঙ্গালার তথা ভারতের সর্বত্র তাহাদেব বৃদ্ধি হইতেছে। আর হিন্দুরা কেবল “ছুৎমার্গের” নাগপাশে বন্ধ হইয়া আত্মহত্যা করিয়া মরিতেছে। সমাজের এই নিম্নবর্ণের প্রতি অবিচার ও অত্যাচারই যে হিন্দুসমাজে বলয় ও ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ, একথা আজ বুঝিয়াও স্পলোষের পরিণাম। ১০ কেহ বুঝিতে চাহিতেছে না। অথচ এই তথাকথিত “উচ্চজাতি” হিন্দুসমাজের কতটুকু অংশ? সমগ্র বাঙ্গালার হিন্দুসমাজের লােকসংখ্যা প্রায় ২০৮ লক্ষ। তার মধ্যে ব্রাহ্মণ ১৩ লক্ষ, কায়স্থ ১২ লক্ষ, এবং বৈদ্য ১ লক্ষ-মােট ২৬ লক্ষ মাত্র, অর্থাৎ এই তিন জাতি একত্রে হিন্দু-সমাজের মাত্র শতকরা ১২০ ভাগ। বাকী শতকরা ৮০ ভাগ তথাকথিত “নিম্নবর্ণের লােক। যে সমাজের মুষ্টিমেয় শতকরা ১২০ ভাগ লােক, কতকগুলি কৃত্রিম দেশাচার ও প্রথার বলে সমাজের অপর ৮৭ ভাগ লােককে দাবাইয়া রাখিতে পারে, সে সমাজের কখনই মঙ্গল হইতে পাবে না। হিন্দু সমাজের অর্ধেকের বেশী, এবারকার সেন্সাসে Depressed classes অর্থাৎ অস্পৃশ্য জাতি বা অবনত জাতি বলিয়া গণ্য হইয়াছে। এই সমস্ত জাতিদের মােট সংখ্যা ১ কোটী ১২ লক্ষেরও উপর। কোন কোন জাতি “অন” বা অস্পৃশ্য” বলিয়া গণ্য হইয়াছে, তাহার একটা তালিকা দিতেছি।-বাওরী, বাগলী, ভুইমালী, ভুইয়', ভূমিজ, চামার ও মুচি, চাষী কৈবর্ত, ডােম, গাবে, হদি, হাজং, হাড়ি, জেলে কৈবর্ত, কলু, কেওড়া, কায়রা, কাতা, খয়েত, খেন, কোচ, কৈরী, কোভা, কুর্মি, লােহার, মাল, মালাে, সেচ, মুণ্ডা, নমঃশুদ্র, নুলিয়া, ওরাও, পাটনী, পােদ, পুণ্ডরী, রাজবংশী রাজু, সাওতাল, শুকালী, তিয়ার। ইহাদের মধ্যে নমঃশূদ্রদের সংখ্যা প্রায় ২০ লক্ষ এবং চাষী কৈবর্তদের সংখ্যা প্রায় ২২ লক্ষ। হিন্দু সমাজের অর্ধাংশেরও বেশী এই বিরাট অবনত বা অস্পৃজাতি, সমাজপতিদের কাছে কি ব্যবহার পাইতেছে? দারিদ্র্য, ব্যাধি ও অজ্ঞতার ঘাের অন্ধকারে কি ইহারা নিমগ্ন হইয়া নাই? ছুৎমার্গাবলম্বী উচ্চবর্ণের হিন্দুদের অবজ্ঞা ও ঔদাসীন্যের ফলে, ইহাবা কি দলে দলে মুসলমান ও খৃষ্টান ইতেছে না? মিশনীয় স্থানে স্থানে মিশন খুলিয়া তাহাদের মধ্যে যেরূপভাবে শিক্ষা বিস্তার ও সেবাকাৰ্য করিতেছেন, হিন্দুরা সেরূপ কিছু করিয়াছেন কি?
১১০ জলচল ও পদোষ বিচার। বাজালার যেখানে অনুন্নত জাতিরা একটু অগ্রসর হইবার চেষ্টা করিতেছে, সেই খানেই উচ্চজাতিরা মিলিয়া তাহাদের বাধা দিতেছেন। এমনসিংহ অলে, হলি জাতির আন্দোলনের বিরু েতথাকার ব্রাহ্মণ জমিদারেরা যেরূপ বৈরুতাৰ প্ৰদৰ্শন করিয়াছেন, তাহা শুনিয়া লজ্জায় ঘৃণায় মন সঙ্কুচিত হইয়া উঠে! আশ্চর্বের বিষয় এই যে সমস্ত হিন্দু-মুসলমান ও অন্য ধর্মাবলী লােকের প্রতি যেটুকু শ্রদ্ধা দেখায়, স্বধর্মীদের প্রতি তাহাও দেখাইতে চায় । আমরা কিছুদিন পূর্বে লিখিয়াছিলাম যে, ঢাকার স্কুল কলেজের হােটেলে উচ্চবর্ণের হিন্দু ছাত্রেরা মুসলমানদের সহিত এক ঘরে থাকিতে পারে, কি হিন্দুন মূদ্রদের সঙ্গে এক ঘরে থাকিতে গেলেই তাহাদের জাতি যায়। আরও দুঃখের কথা এই যে’ ‘উচ্চজাতিদের কুদৃষ্টান্তের প্রভাব সমাজেৰ সৰ্ব- মে সংক্রমিত হইতেছে। প্রত্যেক জাতিই, তার চেয়ে ঈষৎ অল্পত’ অন্য জাতিকে দাবাইয়া রাখিতে ব্যস্ত। নিজেরা যে অধিকার চায়, অন্যকে তাহা দিতে রাজী নয়। সেন্সাসের রিপােটে লিখিত আছে—লােক গণনার সময় প্রত্যেক জাতিই নিজেদের বড় করতে এবং অন্যকে “হন ও ছােট বলিয়া প্রমাণ করিতে প্রাণপণ চেষ্টা করিয়াছে। চাষীকৈবর্তেরা নিজেরা মাহিষ্য হইবার জন্য ব্য, কিন্তু জেলে, কৈবর্ত পাটনী প্রভৃতিক ঐ উপাধি ব্যবহার করিতে কিছুতেই দিবে না। আনন্দবাজার ১৬০ মধ্যযুগে যখন ভারতবর্ষ বিদেশীর আক্রমণে বিধ্বস্ত হইয়াছিল , হিন্দু- সমাজ ও ধৰ্ম প্রবল বহিঃশক্তির সংঘর্ষে টলমল করিতেছিল, তখন হিন্দু সমাজপতি ও ধর্মাচার্যের এক নূতন অন্ত্র অবলম্বন করিয়া আত্মরক্ষা করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। এই অন্ত্রের নামকঠত। কুৰ্ম্ম যেমন আপনার ইন্দ্রিয়বর্গকে সংহত করিয়া, বহিঃশক্তির বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে, মধ্যযুগের বিশাল হিন্দুসমাজ তেমনি নিবৃতির মার্গ অবলম্বন করিয়া আৰু রক্ষার চেষ্টা করিয়াছিল। ইহাকে রক্ষণশীলতা বলিতে হয় বল বা গোঁড়ানী শীলাবের পরিণাম। ১১১ বলিতে হয় বল। মধ্যযুগের ধর্মাচাৰ্য্য ও সুতিকারের এইরূপে শসিংহরণ করিয়াই জীবনসংগ্রামে বাঁচিবার পরামর্শ দিয়াছিলেন। এ নীতি হয়ত সময়ে পােগী হইয়াছিল, কেননা, বহি যখন প্রবল পরাক্রান্ত, তখন সুদৃঢ় দুর্গে আশ্রয় লওয়াও রণনীতির একটা অ বলিয়া স্বীকৃত হয়। কিন্তু এই কাঠব্রতের প্রতিক্রিয়ায় হিন্দু সমাজের মধ্যে নানা ধ্বংসকর ব্যাধির উৎপত্তি হইয়াছে। মার্গ” তাহার মধ্যে সর্বপ্রধান। ইহা সমাজ- দেহে সর্বত্র ব্যাপ্ত হইয়া পড়িয়াছে। আজ বিশাল হিন্দু সমাজের মধ্যে অন্য ও জলচরণীয় বলিয়া প্রায় এক চতুর্থাংশ লােককে আমরা নির্বাসিত করিয়া রাখিয়াছি। তাহারা তথাকথিত উচ্চবর্ণের হাতে মানুষের সম্মান ও মর্যাদা পায় না, তাহাদের সকলের জন্য উচ্চবর্ণের লােকেরা কোন চিন্তাই করে না। তাহারা দুঃখ-দৈন পীড়িত, অশিক্ষা কুশিক্ষা নিমগ্ন যুগব্যাপী কুসংস্কারের গাঢ় অন্ধকারে আচ্ছন্ন। হিন্দুসমাজের সকল শুভ চেষ্টা ও আন্দোলনে তাহারা পাষাণ-ভারের ন্যায় বহিয়া যাইতেছে। এমন অস্বাভাবিক সমাজ- বিন্যাস কি কখন টিকিতে পারে? হিন্দু সমাজে তাই ভাজন ধরিয়াছে। তথাকথিত “অস্পৃশ্য ও জলচরণীয়েরা দলে দলে ধর্মান্তর এহণ করিয়া মানুষের মর্যাদা লাভের চেষ্টা করিতেছে। খৃষ্টান মিশনরী প্রভৃতির প্রতি বিরূপ হইলে তাে চলিবে না। তাহারা হিন্দুসমাজের এই দুর্বলতার সুযােগ লইয়াই আদাদের প্রচারকার্য করিতেছেন। আনন্দবাজার ৫০ অস্পৃশ্যতা প্রসঙ্গে স্বামী এদ্ধানন্দ। কিছুদিন পূর্বে বােম্বে ক্রনিকল পত্রিকার জনৈক প্রতিনিধি স্বামী শ্ৰদ্ধানন্দের সহিত সাক্ষাৎ করেন। অস্পৃশ্যতা ও হিন্দু-মুসলমান এক সম্বন্ধে উক্ত প্রতিনিধির নিকট তিনি যে অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন, নিয়ে উহার সারমর্ম প্রদান করা গেল। স্বামীজী বলিলেন, তাঁহাদের জীবনের অবশিষ্ট কাল তিনি হিন্দুদিগের ১১২ জলচল ও স্পর্শদাষ বিচার মধ্যে অস্পৃশ্যতা দূর করিবার জন্য নিয়োগ করিবেন। অস্পৃশ্যতা রূপ দোষ হিন্দুদিগের নামে কলঙ্ক লেপন করিতেছ। সমগ্র ভারত তাহাদের এই পাপের ফল ভােগ করিতেছে। যখনই আমাদের কোনও নেতা স্বরাজের কথা উত্থাপন করেন, এই অস্পৃশ্যতার কথা বলিয়া তাঁহাদের মুখ বন্ধ করা হয়। যাহারা নিজেদের স্বজাতির প্রায় এক-তৃতীয়াংশকে পদদলিত করিয়া রাখিয়াছে, তাহার বিদেশীর অধীনতার অভিযােগ করিতে পারে না। তাঁহার মতে যে পৰ্য্যন্ত ভারতের ৭ কোটি নরনারী নিজেদের জাতীয়ের পদতলে নিপীড়িত হইবে সে পর্যন্ত জাতীয় মহাসভার গঠনমূলকই হউক আর ধবংসমূলকই হউক, কোনও প্রকার কার্যপদ্ধতিই সফল হইবে না। অস্পৃশ্য জাতিরা কে ? প্রশ্ন উঠে-এই অস্পৃশ্য জাতিরা কে ? জুলুল্যাণ্ড হইতে তাহারা ভারতে আসে নাই অথবা নরকের মধ্য হইতেও তাহাদের উদ্ভব হয় নাই। আর স্বর্গ হইতেও যে তাহারা পতিত হয় নাই, ইহাও ঠিক; কেন না তাহাদের বর্তমান অবশ্যই উহার পরিচয় দেয়। নিরপেক্ষভাবে একটু তলাইয়া দেখিলেই বুঝা যায়, এই অস্পৃশ্যদেব সকল সম্প্রদায় এমন কি বেদীয়, ভাঙ্গিয়া পর্যন্ত তথাকথিত উচ্চ ত্রিবর্ণের মত একই গােত্র হইতেই উদ্ভূত। খুব সম্ভব নৈতিক চরিত্রহীনতাই ইহাদেব সামাজিক অবনতির কারণ। তাহারা যদি তাহাদের বর্তমান জীবনধারা ও নৈতিক চরিত্রের উন্নতি সাধন করিতে সমর্থ হয়, তাহা হইলে তাহাদের পূর্ব সামাজিক অবস্থা ফিরিয়া পাইবার কোন অন্তরায় আসিতে পারে না। সেই সােজা সত্যটা হিন্দুসমাজ এতদিন উপেক্ষা করিয়া আসিত মহাপ্রভু চৈতন্য, কবির নানক, সাধু গুরু গােবিন্দ প্রভৃতি মহা- পুরুষগণ এই পাপ দূর করতে চেষ্টা করিয়াছিলেন, কিন্তু তাঁহাদের চেষ্টাই একরকম বিফলে গিয়াছে। অতঃপর স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী সৰ্বমানবের ক্ষমতা প্রচার করেন। তাঁহার বার্তা শ্রবণে সমগ্ৰ আৰ্যসমাজের কর্তববুদ্ধি স্পর্শদোষের পরিম। জাগরিত হয় । সময় উক্ত মহাপুরুষের কাৰ্য্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন, সেই সময়ে হিন্দু খৃষ্টান ধর্মের অনুরাগী হইয়া পড়িতেছিলেন। অস্পৃশ জাতিকে উন্নয়ন অতীব গুরুতর কাৰ্য। এই কার্যের জঙ্ক প্রথম প্রয়ােজন ২৫০ জন প্রচারক সংগ্রহ করা। যে সমস্ত স্থানে অথ জাতির সংখ্যা বেশী সেই সব স্থানে ইহাদিগকে প্রেরণ করা হইবে। ইহারা একদিকে সেই সব জাতিকে শবীর ও মনে পবিত্র হইতে শিক্ষা দিবেন, অপর দিকে উচ্চশ্রেণীর হিন্দুরা যাহাতে ইহাদিগকে সামাজিক সমানাধিকার প্রদান করে তাহার জন্যও চেষ্টা করি। এই সব অস্পৃশ্য জাতির লােককে কাজ দেওয়ার জন্য এবং ইহাদেব এন্তান-সন্ততিকে লেখাপড়া শিখাইবার জন্য কতক গুলি শিল্প-বিদ্যালয় খুলিতে হইবে। এই কার্যের জন্য ২৫ লক্ষ টাকা সংগ্রহ করিতে হইবে। প্রাথমিক ব্যয় নির্বাহের জন্য অনতিবিলম্বে আড়াই লক্ষ টাকার প্রয়ােজন। অবশিষ্ট অর্থ দিয়া একটা স্থায়ী ভাণ্ডার প্রস্তুত করিতে হইবে। হিন্দুসংগঠনের বিরুদ্ধ সরস বাদীৰ ৮ কোটী লােকের জন্য ৮ কোটা টাকাই ব্যয় করিতে প্রস্তুত। কিন্তু আৰ্য্যধৰ্ম্মরক্ষার্থ মাত্র এক কোটীর চতুর্থাংশ প্রার্থনা করিতেছেন। মহাত্মাজী ও স্বামী শ্ৰদ্ধানন্দ। গত ২৬শে জানুয়ারী তারিখে স্বামী শ্ৰদ্ধানন্দজী মহাত্মাজীর সহিত সাক্ষাৎ করিবার জন্য পুণা সেন হাসপাতালে গমন করেন। সেখানে তাহার সঙ্গে স্বামিজী ১৫ মিনিট কাল আলাপ করেন। সেই অপরাহ্নে স্বামিজী এক সাধারণ সভায় শুদ্ধি ও সংগঠন সম্বন্ধে বক্তৃতা করেন। তিনি কংগ্রেস নেতাগণের সর্বপ্রকার মুক্তি খণ্ডন করেন, তাহারা যেন একতাবদ্ধ হইয়া অন্ত্যজ জাতিকে তাহাদের মধ্যে তুলিয়া লক্ষ্ম। সভা প্রায় ৫০ হাজার লোেক উপস্থিত ছিল।
১১ জলচল ও স্পর্শদাষ জির। বােম্বাইয়ে সভা ২৬শে তারিখে বােম্বাই পৌছিয়া তিনি এক বিরাট জনসভায় যােগ দান করেন। তিনি মৌলানা মহম্মদ আলীর সভাপতির অভিভাষণ হইতে দেখাইয়া দেন, যে, উচ্চবর্ণের হিন্দুরা অস্পৃশ্য সম্প্রদায়গুলিকে যদি জাতে তুলিয়া না লয়, তাহা হইলে মুসলমান ও খৃষ্টানরা তাহাদিগকে স্বীয় স্বীয় ধর্মে দীক্ষিত করিয়া ফেলিবে। অস্পৃশ্য জাতিদিগকে বিদ্যালয়, কুপ ও মন্দিরে সমান অধিকার দেওয়া হয়, সে জন্য তিনি হিন্দুদিগকে বিশেষ অনুরাধ করেন। ছুৎমার্গ ও স্বামী শ্ৰদ্ধানন্দজী নির্ভীক সন্ন্যাসী স্বামী শ্ৰদ্ধানলের নাম বাঙ্গালায় অপরিচিত নহে। সত্যাৰহ দোলনের সময় হইতে ইনি রাজনীতি ক্ষেত্রে কাৰ্য করিতেছেন। আমলাতন্ত্র এই বৃদ্ধ সন্ন্যাসীকে দেশ সেবার জন্য পুরস্কার হইতে বঞ্চিত কয়েন নাই। গত ৪ বৎসর কাল অধ্যবসায়ের সহিত কৰ্ম্ম করিয়া সম্প্রতি তিনি রাজনীতিক্ষেত্র হইতে অবসর গ্রহণ করিয়াছেন। তিনি হিন্দুসমাজ সংস্কারে প্রবৃত্ত হইবেন বলিয়া ইচ্ছা প্রকাশ করিয়াছেন। ভারতের সমশ হিন্দু জাতির মধ্যে প্রায় এক তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৭ কোটী মানব উচ্চবর্ণের জাতিসকলের নিকট অস্পৃশ্য। এই শােচনীয় বৈষম্য বিদূরিত না হইলে স্বরাজ লাভ অসম্ভব =ানজীর এই কথা অর্থের খাতিরে অনেকেই স্বীকার করিকেন সন্দেহ নাই। কিন্তু যিনি দৈনন্দিন জীবনে ঐ সাত কোটি মানুষকে মানুষের মত ব্যবহার করিতে পারেন, তিনিই জাতির প্রকৃত কল্যাণকামী। পণ্ডিত মালব্যজী, স্বামী শ্ৰদ্ধানন্দ প্রভৃতির উদ্যম, অনেকাংশে সফল হইবে সন্দেহ নাই। কিন্তু বাঙ্গলার হিন্দুর-সমাজ জড়বৎ নিশ্চেষ্ট হইয়া পড়িয়া রহিয়াছে। সামাজিক কুপ্রথাগুলি পরিহার কল্পে এক তীব্র আন্দোলন জাত করিয়া ভুলিতে পারে, এমন শক্তিমান তত বর্তমানে কাহাকেও দেখা যাইতেছে না। অথচ ভেদ দ্বন্দে, হিন্দু সমাজ বসাতল বাইতে বসিয়াছে। বাঙ্গালী হিন্দু স্পর্শদাষের পরিম। ১১ ছত্রভঙ্গ হইয়া মনিবেনাসমবন্ধ হইয়া বাঁচিবােঙ্গালী প্রধানের অগ্রসর হইয়া এই সমতার মীমাংসায় আর কত কালক্ষেপ করিবেন ? “হিন্দুসমাজে শান্তমতে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র এই চারি বর্ণের লােক আছে। কিন্তু মাজাজের ব্রাহ্মণগণ বহু কাল হইতে সে প্রদেশে পঞ্চন নামক আর এক বর্ণের অস্তিত্ব আবিষ্কার করিয়াছেন। অনেকেই জানেন সামাজিক অত্যাচারে মাত্রা আছেন ভারতে শীর্ষস্থানীয়। সেখানকার ন্যায়নিষ্ঠ (৮) ব্রাহ্মণগণ তথা কথিত সৰ্বনি শ্রেণীর লোক দিগকে চতুৰ্বর্ণের সূত্র অন্য দিতে না পারিয়া ‘পঞ্চম বর্ণের উদ্ভাবন করিয়াছেন। এই পঞ্চম বর্ষে লােক দূর হইতে ও কোন ব্রাহ্মণের অগ্নিপক খাদ্যের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলে উন্থা অপবিত্র হইয়া যায়। শ্ৰীযুক্ত গান্ধি ১৯১৫ খৃষ্টাব্দে মান্দ্রাজ ভ্রমণ কালে পঞ্চাদের নিকট এক অভিন্দন পত্র পাইয়া বলেন- সৌভাগ্য বশত পঞ্চভ্রাতাদের নিকট আমি এক অভিনন্দন পত্র পাইয়াছি। আমি শুনিলাম পঞ্চমের অপর শ্ৰেণর ব্যবহৃত জলদি হইতে পানীয় জল লইতে পারে না, তাহারা জমাজমি ক্রয় করিতে অথবা উহার মালিক হইতে পারে না। সরকারী আদালতে উপস্থিত হওয় তাহাদের পক্ষে শক্ত-সেখানে যাইতে তারা সংকুচিত হয়, ভয় পায়, তাদের এই সঙ্কোচ ও ভয়ের জন্য দায়ী কে? এজন্য তথা কথিত উচ্চ শ্রেণীর লােকেই দায়ী। আমরা কি এই অবস্তা চিরস্থায়ী করিব? হিন্দুধর্ম সম্বন্ধে যেটুকু আলােচনা করিয়াছি তাহাতে বুঝিয়াছি কাহাকেও অস্পৃশ্য করিয়া রাখা ধর্ম- বিগর্হিত। যদি কেহ আমাকে বুঝাইতে আসেন ইহা হিন্দুধর্মের অত্যাবশ্যকীয় অংশ, তবে আমি নিজেকে হিন্দুধর্মের প্রকাশ্য বিদ্রোহী বলিয়া ঘােষণা করিব। ব্রাহ্মণগণ যদি পারিয়াদের সহিত মিশে, তবে অপর হিন্দুরা তাদের অনুসরণ করিবে।
১৬ চল ও দোৰ টিার। আর এক স্কুলে মহাত্মা গান্ধি বলিতেছেন- “এত শিক্ষা ও জনবিতার সত্বেও দেশের স্পর্শদাব লােপ পাইতেছে কেন? শিক্ষার প্রভাবে আমরা বুঝিয়াছি যে শুচি বাধি ভয়ানক সামাজিক পাপ। কিন্তু আমরা ভয়ে জড়সড় বলিয়া পরিবার মধ্যে এই মত প্রচার করিতে পারি না। প্রাচীন রীতি নীতি, ও পরিবারের লােকের প্রতি আমাদের অন্ধ অনুরাগ আছে। আপনারা হয়ত বলিবেন, পিতামাতা অন্যায করিলে তাহার প্রতিবাদ সন্তানে কিরূপে করিবে? এহলাদের কথা মনে । পিতা হরির নাম করিতে নিষেধ করিলেও, প্রাদ এই অন্যায় আদেশ অাহ করিয়া পিতৃদেবের পবিত্র সন্নিধানে উপস্থিত থাকিয়া হরিধ্বনি জারা রাজপুরী মুখরিত করিয়াছিলেন। আমরাও এইরূপে পূজনীয় পিতা- মাতার পাপের বিরুদ্ধে দাঁড়াই, পুত্রের মুখের প্রতিবাদ শুনিয়া যদি কোন পিতা মৃত্যুমুখে পতিত হন, তাহাতে দুর্দৈব মনে করি না। আমরা মান্ধাতার আমল হইতে অনেক সামাজিক পাপের আশ্রয় দিয়া আসিতেছি। তার প্রায়শ্চিত্তের জয় আত্মনিগ্রহ আত্মবলিদান চাই। সকলকেই কিছু ত্যাগ স্বীকার করিতে হইবে।” নাপিত ও চিকিৎসকের ব্যবসা আমার নিকট সমান গৌরবজনক মনে হয়। পৃথিবীর কোন মানুষ হীন অথবা অস্পৃশ্য হইতে পারে না ইহা প্রাণে প্রাণে অনুভব করিতে হইবে তার পর পরিবার ও সমাজের মধ্যে এই ভাবকে প্রচার করিতে হইবে।” উদ্ধৃত কথার উপর টিপ্পনী অনাবশ্যক। তৰে ৰাহ্মণাদি উচ্চ (০) বর্ণের লােকদের প্রতি আমার নিৰেদন তাঁহাদের পূর্বপুরুষদের অনুষ্ঠিত পাপের জন্য সমাজে যে বৈষম্য দেখা দিয়াছে, সামাজিক অত্যাচারের ফলে কোটী কোটি অমৃত সন্তানের যে মনুষ্যত্ব নষ্ট হইয়া গিয়াছে, আত্মবিশ্বাস নষ্ট হইয়াছে, অবিলম্বে তাঁদের সেই পাপের প্রায়শ্চিত আরম্ভ করা উচিত।
স্পর্শদোষের পরিণাম। একটা কথা আছে অবস্থা বিশেষে হিংসুক সই সই ব্যক্তির বিষ উঠাইয়া লয়-আশা করা যায় দেশের মঙ্গলের জন্য ব্রাহ্মণাদি বর্ণ সেইরূপে সমাজ শরীরের বিষ উঠাইয়া লইবেন। বিনয়কৃষ্ণসেন বি, এ প্রতিজ্ঞা ১৪াখ১৩২৬ অস্পৃশ্যতা সম্বন্ধে মহাত্মা গান্ধি অন্য এক স্থানে অশ্রুসিক্ত নয়নে বলিয়াছেন। অস্পৃশ্যতা বর্তমান হিন্দুধর্মের দুরপনেয় কলঙ্ক। আমি বিশ্বাস করি না যে ইহা আবহমান কাল হইতে প্রচলিত আছে। আমার বােধ হয় যখন হিন্দুধর্ম অবনতির নিয়তম সােপানে পতিত হইয়াছিল, তখন এই সর্বনাশ কারী, মনুষ্যত্ব-হারী, কৃত দাস-কারী স্পর্শদোষ রূপ ব্যাধি সমাজ দেহে প্রবেশ করিয়াছিল এবং এখন পর্যন্ত উহা রহিয়া গিয়াছে। ইহাকে আমি ভগবানের অভিশাপ মনে করি। যতদিন পর্যন্ত ইহা আমাদের মধ্যে থাকিবে, ততদিন সকলের মনে রাখিতে হইবে এই পবিত্র ভারত ভূমিতে আমরা যত প্রকার দুঃখ কষ্ট লােগ করি না কেন, তাহা এই অমােচনীয় মহা পাপের ফল-যাহ আমরা প্রত্যহ ভােগ করিতেছি। যে কোন বিশেষ ব্যবসা করে বলিয়া, কাজ করে বলিয়া কাহাকেও যে অস্পৃশ্য মনে করিতে হইবে, তাহার কোন কারণ খুজিয়া পাই না। শিক্ষিত ভারতবাসীরা যদি এই স্পর্শ দোষের হাত হইতে মুক্ত হইতে না পারেন, তবে তাহারা শিক্ষা না পাইলেই ভাল হইত। লােক মা বালগঙ্গাধর তিলক মহাশয় অনুন্নত সমাজের উন্নয়ন সম্বন্ধে বলিয়াছেন যে কতকগুলি মানুষকে পশুর মত করিয়া রাখা কখনও হিন্দুধর্ম ও হিন্দু শান্ত্রের অভিপ্রেত নয় এবং এই আন্দোলনে তাঁহার সম্পূর্ণ সহানুভূতি আছে। গত ১৯১৬ খৃঃ অৰে বনােদাতে বরােদার গাইকোয়াড়ের সভাপতিত্বে অখিল ভারতীয় অস্পৃশ্রেদ্ধার সমিলনের অধিবেশন হইয়াছিল। এই সভাতে লােকামায় বাল গঙ্গাধর তিলক মারাঠি তাতে একটা বক্ততা দান করেন।
১১৮ জলচল ও স্পর্শদোষ বিচার। তাহার জনৈক বন্ধু এই বক্তৃতাটা নােট করিয়া, রাখিয়াছেন। সম্প্রতি বেনারসের “আজ পত্রে উহা প্রকাশিত হইয়াছে। অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ বিষয়ে লােকমান্ত তিলকের মতামত কি ছিল তৎসম্বন্ধে পাঠকের অবগতির জন্য আমরা নিয়ে তাহার ভাবানুবাদ প্রদান করিলাম। লােকমান্য বলেন “অশ্বতা সমস্যা রাজনীতি ও সমাজ এই উভয় দিক হইতেই বিশেষ আলােচ্য। শীঘ্রই উভয় ক্ষেত্র হইতে উহার দূরীকরণ একান্ত আবশ্যক। একজন মানুষ অন্যের কাছে অস্পৃশ্য হইতে পারে উহার তাৎপর্য কি আমি তাহা বুঝিতে পারি না। কোনও শাস্ত্রে এই বিষয়ে কোন বিধান নাই। অন্য ধৰ্মী এবং অন্য দেশবাসীর সঙ্গে আমরা অস্পৃশ্যদের অপেক্ষা ভাল ব্যবহার করি। অথচ দেশবাসীকে দূরে সরাইয়া রাখি। এই দোষ সমাজ হইতে দূর করা একান্ত কর্তব্য। পেশােয়াদের সময়ে মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণদের ভিতর এই দোষ ছিল না। বর্তমানে উহার এত বাড়াবাডি জাতীয় অধঃপতনের চিহ্ন। যুদ্ধে অথবা জাতীয় উৎসবে শৃশ্যাম্পৃশ্য নাই। আমাদিগকে উহাদের সঙ্গে কাঁধে বাঁধ মিলাইয়া কাজ করিতে হইবে এবং মন হইতে ভেদ সম্পূর্ণ দূর করিতে হইবে। অন্ত্যজকে চুইলে পাপ হয় এই বুদ্ধি আমাদের ত্যাগ করিতে হইবে। উচ্চ নীচ এই ভাব আমাদের যতদিন দূর না হয় ততদিন আমাদের উন্নতির কোন সম্ভাবনা নাই। অনেকে আমাকে বলেন যে, আমি কেন অস্পৃশ্যতা দূরীকরণে মন দিতেছি না। তাহাদের প্রতি আমার এই উত্তর যে সবদিকে দৃষ্টি রাখিতে আমি অসমর্থ। তবে এই কাৰ্য্যে আমার সম্পূর্ণ সহানুভূতি আছে। তাহার প্রমাণস্বরূপ আমি এই বলিতে পারি যে কয়েকবৎসর পূর্বে গণপতি উৎসবে একজন চর্মকারকে আনকে যােগদান করিতে বাধা দিয়াছিলেন। আমি উহা অবগত হইয়া তাহাকে আহ্বান করি এবং আমরা বাড়ীতে তাহার মূর্তি রাখিতে বলি। আনন্দের বিষয় যে এই জন্য কেই আমাকে পতিত করিতে স্পর্শদোষের পরিণাম। ১১) চেষ্টা করেন নাই। তেলীগাও যে এক কাচের কারখানা আছে উহাতে আমি সব বর্ণের লােক নিযুক্ত করিয়াছি। যখন একজন শ্বেতাঙ্গ আমাদের কাছে আসে তখন আমরা কখনও তাহাকে জিজ্ঞাসা করি না যে সে শৃখ কি অস্পৃশ্য। আমরা যদি জাতীয় উন্নতি চাই তবে সকলকে মিলিয়া মিশিয়াই কাজ করিতেই হইবে। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাৰ্যে উহাদিগের সাহায্য সইতে হইবে—উহা দিগকে অবজ্ঞা করিলে দেশের সমূহ ক্ষতি হইবে। আমি স্বয়ং কখনও এই প্রকার ভেদবুদ্ধি মানি না। আমার বাড়ীতে অন্ত্যজ জাতির প্রবেশাধিকার আছে, অনেক সময়ে আমি তাহাদের উপদেশ গ্রহণ করিয়া চলি এবং আমি যে বিছানায় বসি তাহাতে উহাদিগকে বসিতে দেই। আজ সমাজের ভিতর অস্পৃশ্যতা দারুণ ব্যাধিরূপে বৰ্তমান আছে। এই রােগ দূর করাতেই আমাদের ধর্ম লাভ হইবে। আমি অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ আন্দোলনে সম্পূর্ণ সহানুভূতিশীল। আমার আশা হয় যে শীঘ্রই সমাজ হইত এই ব্যাধি দূর হইবে।” রাজনীতি ও সমাজনীতি। আমাদের দেশে ভারতবর্ষে—পরাধীন জাতি আমরা রাজনীতির চর্চা করি, সাম্যমৈত্রী স্বাধীনতার প্রার্থনা করি, তাহার জন্য অন্তরতম ইচ্ছার সহিত সাধনা করি। কিন্তু আমাদের সমাজে ভারতবর্ষীয় সমাজে সাম্য কোথায়, স্বাধীনতা কোথায়, মৈত্রী কোথায় ? হিন্দুসমাজ জাতিভেদের কঠোর নিষ্পেষণে জর্জরিত, শূদ্র স্বার্থপর ব্রাহ্মণের চর্ম-চটিকার তলদেশে ধূলিমলিন অবস্থায় পতিত ; অতএব সাম্য কোথায়, স্বাধীনতা কোথায় ? ব্রাহ্মণ শূদ্রকে দাস জাতি বলিয়া ঘৃণা করে, তাহার সহিত সম্বন্ধ স্থাপন করা দূরে থাকুকু তাহাকে স্পর্শ করিলে নিজেকে অপবিত্র ও মানাহঁ মনে করে, অজ্ঞ ও অন্ধস্পর্ধায় স্ফীত হইয়া মানুষকে অবমাননা করিয়া নিজেরই ১০ অচল ও স্পর্শদাষ বিচার। মসুষরে অবমাননা করে। অতএব সাম্য কোথায়। স্বাধীনতা কোথায় ? মৈত্রী কোথায়? রাজনীতিতে আমরা ভারতবর্ষের কর্মশূদ্র আমরা, ইউরােপের খেত ব্রাহ্মণের সমান স্বাধীনতা প্রাপ্তির জন্য আন্দোলন করিতেছি, তাহারা আমাদিগকে স্বর্ণ অবজ্ঞা করে এজন্য তুমুল প্রতিবাদ করিতেছি, সাম্য এবং মৈত্রীর কামনা করিতেছি কিন্তু আমাদের ভিতরকার অবস্থা দেখিতেছি কি ? কৃষ্ণচৰ্মা ব্রাহ্মণ কুৰ্মা পুত্রকে অবজার চক্ষে দেখে, তাহার প্রতিকারে আমরা যত্নবান হইয়াছি কি? অতএব আমাদের সাধনায় আন্তরিকতা, কামনায় সত্যের প্রভাৰ আকাক্কায় প্রাণের ছাপ কোথায় ? এক শ্রেণীর লােকে, অর্থাৎ স্পষ্ট ভাষায়, সাম্যমৈত্রী স্বাধীনতার শত্রু, জাতিও শ্রেণীভেদের সমর্থক স্বার্থান্ধের বলিয়া থাকেন রাজনীতি ক্ষেত্রের সাম্য ও স্বাধীনতার সহিত সমাজের সাম্যের সম্বন্ধ কি ? জাতি ও শ্রেণী ভেদ অটুট অবস্থায় রাখিতে আপত্তি কি? অর্থাৎ ইহারা বলিয়া থাকেন রাষ্ট্রীয় সাম্যের সহিত সামাজিক সাম্যের সম্বন্ধ নাই। এ দুইটি জীবন সম্পূর্ণ আলাদা জিনিষ। কিন্তু প্রকৃত কথা কি তাই ? তুমি ব্রাহ্মণ, শূদ্রেব প্রভু ব্রাহ্মণ, শূদ্রে ঘৃণা ও অবকারী ব্রাহ্মণ, তুমি কেমন করিয়া একই প্রকার রাষ্ট্রীয় অধিকার পরিচালনা করিবে ? রাজনীতিক সভায় কেন করিয়া তুমি শূদ্রের সহিত একাসনে বসিবে ? কেমন করিয়া তােমার মতে যে নীচ এবং অস্পৃশ্য তাহার সহিত—প্রভু ও দাসরূপে নহেবন্ধু ও সখারূপে তর্ক ও আলােচনা করিবে? গর্বিত তুমি, দর্প ও দম্ভে স্ফীত তুমি, মানুষের অধিকার হরণকারী দশ তুমি, কেমন করিয়া তাহা ভােব পক্ষে সম্ভব হয় ? বাটীতে বসিয়া আঁহাদিগকে তুমি কুকুর বা তদপেক্ষাও অধম মনে করিবে, রাজসভায় গিয়া কিরূপে তুমি তাঁহার সহিত সমান অধিকার বিশিষ্ট সখা ও সহচররূপে ব্যবহার করিবে? ফলতঃ সমাজনীতির সঙ্কীর্ণতা ও মিথ্যাভাব অটুট রাখিয়া রাষ্ট্রনীতি ক্ষেত্রে সামমৈত্রী ও স্বাধীনতার স্পর্শদাষের পরিণাম। ১২১ ভাৰ জাগরিত ও লব্ধপ্রতিষ্ট করিতে চেষ্টা করার স্যায় ভণ্ডামী আর কিছু হইতে পারে না। অতএব আমাদের রাজনীতিক নেতৃবৃন্দের আধুনিক ভারতীয় সমাজের সংস্কার সাধনে ব্রতী হওয়া উচিত। সমাজের ব্যক্তিত্ব এবং ব্যক্তিগত অধিকার যাহা দস্যু দানবের কুক্ষিগত হইয়া রহিয়াছে তাহাকে পূনরায় যেনতেন প্রকারে প্রতিষ্ঠিত করিতে হইবেশমুষ্যত্বকে আবার মনুষ্যত্বের আসনে বসাইয়া শ্ৰদ্ধার কুসুমাঞ্জলি অর্পণ করিতে দেশের লােককে শিখাইতে হইবে। তবেই রাজনৈতিক সাধনায় সিদ্ধিলভি ঘটিবে, তবেই দেশ প্রেমিকের স্বপ্ন সত্যমূৰ্ত্তি পরিগ্রহ করিয়া বিশ্বের ভয় ও বিস্ময় উৎপাদন করিতে সমর্থ হইবে। ( মােহাম্মাদী।) এদেশের কোটি কোটি লােক নিরক্ষর। মানুষ শিক্ষার অভাবে মানাপমানবােধ হইতে বঞ্চিত হইয়া পও পীর মত জীবন যাপন করিতেছে লেখা পড়া জানিলে নিয় শ্রেণীর লােক সামাজিক সাম্য সম্বন্ধে নূতন আদশ প্রাপ্ত হইবে। একথা সত্য; এবং ইহাতে উপকার বই অনিষ্ট হইবে না। তােমরা উচ্চ শ্রেণীর কয়েক জন লোক কোটি কোটি মানব সন্তানকে সমাজের নিম্নস্তরে স্থান দিয়াছ, তাহাদিগকে শিক্ষা ও সভ্যতায় বঞ্চিত করিয়া রাখিয়াছ, তাহাদের মনুষ্যত্বের বিকাশ হইতে দেও নাই , আজ তাহাদের চক্ষু ফুটিয়াছে, আজ তাহারা উন্নত হইতে চাইতেছে, শিক্ষা পাইলে তােমাদের অন্যায্য দাবা তাহার সহ করিবে না। যােগ্যতমের উদ্বর্তন হইবেই হইবে। অশিক্ষিত দুর্নীতি-পরায়ণ ব্রাহ্মণ সমাজের নিয়ন্তরে যাইবেন; আর “চালােহপি দ্বিজ শ্রেষ্ঠ হরিভক্তি পরায়ণ” এই বাক্যের স্বার্থকতা হইবেই। নিরব ২ কোটি লােক জাগিয়া উঠিবে। সমাজের পুনর্গঠন হইবে, যােগ্য যে, সে উচচ স্থান পাইবে; জোর করিয়া অস্বাভাবিক উপায়ে তাহা রােধ ১২২ জলচল ও পদোষ বিচার। করা যাইবেন। রােধ করা লােকত ধৰ্ম্মতঃ অন্যায়। তােমর কংগ্রেসে কন্ফারেলে ইংরেজের সমান অধিকার দাবী করিতেছ, তােমরা দক্ষিণ আফ্রিকার খেত কৃষ্ণের প্রভেদ তুলিয়া দিতে চাহিতেছ, আর তােমাদের অনুন্নত ভাতাদিগকে মস্তক তুলিতে দিতেছনা, এ কি লজ্জার কথা। শিবনাথ শাস্ত্রী লিখিত “সমাজ সংস্কার ও জাতীয় সাধনা” (সঞ্জীবনী। কেবল সমাজের শীর্ষস্থানীয় ব্রাহ্মণ ও তদিতর উচ্চ সমাজ বলিয়া নহে। আমাদিগের চারিদিকে যে সকল ডিপ্রেসক্লাস—নিগৃহীত সম্প্রদায় রহিয়াছে তাহাদিগের প্রতিও সহানুভূতি দেখাইতে হইবে-নিরপেক্ষভাবে ধর্মের দিকে চাহিয়া তাহাদিগের জাতীয় ও সামাজিক উন্নতির সহায় হইতে হইবে। কাহাকেও এখন নীচ বা হীনভাবে দেখিবার সময় নয়, এখন ভারতের উচ্চ নীচ সকল জাতির হৃদয়ে জাতীয় উন্নতির জন্য আলাময়ী আকাঙ্ক্ষা জাগিয়াছে, শান্তিপ্রিয় ন্যায়পর বৃটীশ গবর্ণমেন্টের কৃপায় সকলেই এখন স্ব স্ব সামাজিক অবস্থা ভাবিবার ও উন্নত করিবার শুভ অবসর পাইয়াছে। এখন তাহাদের অনুকূল স্রোতের গতির বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হওয়া কাহারও কর্তব্য নহে। যিনি সেই কালস্রোতের বিরুদ্ধে দণ্ডাষমান হইবেন, তাঁহার যে সেই উদ্যম বৃথা ও ভমে ঘৃতাহুতি হইবে তাহাতে কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। এ কারণ আমি মনে করি, সমস্তটা না হউক, যাহাতে তাঁহাদের আশা, আকাঙ্ক্ষা ও উদ্যম কতকটা সিদ্ধ হয়, তৎপ্রতি আমাদের সহানুভূতি প্রদর্শন একান্ত কর্তব্য। ভারতীয় কায়স্থ সভার সভাপতি দিনাজপুরের মহারাজার ইংরাজী বক্তৃতার অনুবাদ। আনন্দ বাজারও বিষ্ণুপ্রিয় পত্রিকা ১৭১১৩২১ কবি সম্রাট রবীন্দ্রনাথ “কর্তার ইচ্ছায় কর্ম” নামক প্রবন্ধে লিখিয়াছেন “এত নিষ্ঠুর জবরদস্তি দ্বারা যাদের অতি সামান্য খাওয়া ছোঁওয়ার অধিকার পর্যন্ত পদে পদে ঠেকান হয় এবং সেটাকে যারা কল্যাণ বলিয়াই মানে, স্পর্শদাষের পরিণাম। তারা রাষ্ট্র ব্যাপারে অবধি অধিকার দাবি করিবার বেলায় সঙ্কোচ বােধ করে না কেন ?” রবীন্দ্রনাথ, সে দিন ধর্মের অধিকার” নামক প্রবন্ধে ধৰ্ম্ম- প্ৰবৰ্ত্তকে তীব্র ঝঙ্কারের সহিত বলিয়াছেন—“তুমি তােক সমাজ, তুমি লৌকিক ব্যবহারে আপনাকে সামলাইতে পার না, কত তােমার বিকৃতি, কত তােমার প্রলােভন, তুমিই তােমার অত্যাচারের লাঠিটাকে ধৰ্ম্মের নামে গিন্টি করিয়া ধৰ্ম্মরাজের স্থান জুড়িয়া বসিতে চাও ! তাই করিয়া শত শত বৎসর ধরিয়া এত বড় একটি সমগ্র জাতিকে, তুমি মর্মে মর্মে শৃঙ্খলিত কবিয়া, তাহাকে পরাধীনতার অন্ধকূপের মধ্যে পঙ্গু করিয়া ফেলিয়াছ—তাহার আর উদ্ধারের পথ রাখ নাই! যাহা ক্ষুদ্র, যাহা স্কুল, সাহা অসত্য, যাহা অবিশ্বাস্য তাহাকেও দেশকাল-পাত্ৰ-অনুসারে ধর্ম বলিয়া স্বীকার কবিয়া কি প্রকাণ্ড, কি অসঙ্গত, কি অসংলগ্ন জঞ্জালের ভয়ঙ্কর বােঝা মানুষের মাথার উপরে শত শত বৎসর ধরিয়া চাপাইয়া রাখিমাছ । সেই ভয়-মেরুদণ্ড নিষ্পেষিত-পৌরুষ নতমস্তক মানুষ প্রশ্ন করিতেও জানে না, প্রশ্ন করিলেও তাহার উত্তর কোথাও নাই, কেবল বিভীষিকার তাড়নায় এবং কাল্পনিক প্রলােভনের ব্যর্থ আস্ফালনে তাহাকে চালনা করিয়া যাইতেছ, চারিদিক হইতেই আকাশে তর্জনী উঠিতেছে এবং এই আদেশ নানা পরুষকণ্ঠ ধ্বনিত হইতেছে, যাহা বলিতেছি তাহাই মানিয়া যাও, কেন না তুমি মূঢ়, তুমি বুঝিবে না; যাহা পাঁচজনে করিতেছে তাহাই করিয়া যাও, কেন না তুমি অক্ষম, সহস্র বৎসরের পূর্ববর্তী কালের সহিত তােমাকে আপাদ মস্তক শতসহস্র সূত্রে একেবারে বাঁধিয়া রাখিয়াছি কেন না নূতন করিয়া নিজের কল্যাণ চিন্তা করিবার শক্তি মাত্র তাের নাই। নিষেধ-জর্জরিত চির-কাপুরুষ নিৰ্মাণ করিবার এত বড় সর্বদেশব্যাপী ভয়ঙ্কর লৌহ যন্ত্র ইতিহাসে আর কোথায়ও কি কেহ সৃষ্টি
১২৪
জলচল ও স্পর্শকাষ বিচার।
করিয়াছে এবং মনুষ্যত্ব চূর্ণ করিবার যন্ত্রকে আর কোন দেশে ধর্মের পবিত্র
উপাধিতে আখ্যাত করা হইয়াছে ?”
রবীন্দ্র প্রৌঢ়াবস্থায় গাহিয়াছেন
“হে মাের দুর্ভাগা দেশ স্বাদের করেছ অপমান,
অপশন হতে হবে তাহাদের সবার সমান ;
বিধাতার রুদ্র রােষে,
দুর্ভিক্ষের ধারে বসে,
ভাগ করে খেতে হবে সকলের সাথে তাল পান,
অপশন হতে হবে সেথা তােরে সবার সমান
সেই ;--
“মানুষের পরশেরে প্রতিদিন ঠেকাইয়া দূরে।
ঘৃণা করিয়াছ তুমি মানুষের প্রাণের ঠাকুরে।
বিধাতার রুদ্র নামে,
দুর্ভিক্ষের ঘরে বসে
ভাগ করে খেতে হবে সকলের সাথে অন্ন পান,
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।
অথবা
“তােমার আসন হতে যেথায় তাদের দিয়ে ঠেলে,
সেথায় শজিরে তব বিসর্জন দিলে অবহেলে।
চরণে দণিত হয়ে,
ধুলায় সে যায় বয়ে,
সেই নিয়ে নেমে এস নহিলে নাহিরে পরিত্রাণ
অপমান হতে হবে আজি তােরে সবার সশন।”
শারে পরিণাম। “বার তুমি নীচে ফেল সে তােমারে খাঁধিবে যে নীড়। পশ্চাতে রেখেই বারে সে তােমারে পশ্চাতে টানিছে। অজানের গন্ধকারে; আড়ালে ঢাকিছ বারে ; তােমার মঙ্গল ঢাকি গড়িছে সে হাের ব্যবধান। অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।” শতেক শতাব্দি ধরে নামে শিরে অসন ভার, মানুষের নারায়ণে তবুও কর না নমস্কার। তবু নত করি আঁখি, দেখিবারে পাও নাকি, নেমেছে ধূলার তলে নীচ পতিতের ভগবান, অপমানে হতে হবে সেথা তােরে সবার সমান। দেখিতে পাও না তুমি মৃত্যুদূত দাঁড়ায়েছে দ্বারে, অভিশপ অাঁকি দিল তােমার জাতির অহঙ্কারে। সরে না যদি ডাক, এখনাে সরিয়া থাক, চৌদিকে জড়ায়ে রেখে আপনার অভিমান মৃত্যু মাঝে হবে তবে চিতাভয়ে সবার সমান।” রবীন্দ্রনাথ বৌৰনে গাহিয়াছিলেন- “ওই যে দাঁড়ায়ে নত-শির, মুক সবেমানমুখে লেখা শুধু শত শতাব্দীর বেদনার করূণ কাহিনী, স্কন্ধে যত চাপে তার বহি চলে মন্দগতি, যতক্ষণ থাকে প্রাণ ভার; নাহি ভৎসে অদৃষ্টেরে, নাহি নিলে দেৰতারে মরি, ১২৬ জলচল ও স্পর্শদোষ বিচার। মানবেরে নাহি দেয় দোষ, নাহি জানে অভিমান, শুধু দুটা অন্ন খুট, কোন মতে কষ্ট ক্লিষ্ট প্রাণ রেখে দেয় বাঁচাইয়া, সে অন্ন যখন কেহ কাড়ে, সে প্রাণে আঘাত দেয় গৰ্বান্ধ নিষ্ঠুর অত্যাচারে, নাহি জানে কার ঘরে দাঁড়াইবে বিচারের আশে দরিদ্রের গানে বারেক ডাকিয়া দীর্ঘ খসে মরে সে নীরবে! এই সব মূঢ় মুক ম্লান মুখে দিতে হবে ভাষা, এই সব শান্তি ও ভগবুকে ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশ; ডাকিয়া বলিতে হবে- মত্ত তুলিয়া শির এক দাঁড়াও দেখি সবে। যার ভয়ে তুমি ভীত, সে অন্যায় ভীরু তােমা চেয়ে, যখনই জাগিবে তুমি, তখনই সে পলাইবে ধেয়ে । যখনই দাড়াবে তুমি সম্মুখে তাহার,-তখন সে পথ-কুকুরের মত সত্রাসে সঙ্কোচে যাবে মিশে। দেবতা বিমুখ তার কেহ নাহি সহায় তাহার মুখে করে আস্ফালন জানে সে হীনতা আপনার শনে মন! বড় দুঃখ বড় ব্যথা,-সমুখেতে কষ্টের সংসার বড়ই দরিদ্র, শান্ত, বড় ক্ষু, বন্ধ অন্ধকার! অন্ন চাই, প্রাণ চাই, আলো চাই, চাই মুক্ত বায়ু, চাই বল, চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ উজ্জ্বল পরমায়ু সাহস বিস্তৃত বক্ষ পট! এ দেশের কোটি কোটি অজ্ঞজনসাধারণ সম্বন্ধে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস হায় বেদনাবিজ অণে বলিয়াছেন- স্পর্শদোষের পরিণাম। ১২৭ যাহারা শত শত শতাব্দী ধরিয়া বাের দারিদ্র্য দুঃখ অপমান লানা সহিয়াও ভারতের নিজস্ব সাধনা ও সভ্যতাকে জানে কি–অজানে সাগ্নিকের অখির মত জ্বালাইয়া জাগাইয়া রাখিয়াছে, যাহাদের আমরা বিলাতি শিক্ষার মােহে আইন আদালতের প্রভাবে জমিদারের খাজনা ন্যায্য ভাবে কি অন্যায় করিয়া বাড়াইবার জন্য শত প্রলােভন দেখাইয়া, শত অত্যাচার করিয়াও একবারে নষ্ট করিতে পারি নাই, যাহারা বাস্তবিকই একাধারে বাঙ্গালাদেশের রক্ত-মাংসপ্রাণ তাহারা বড় কি আমরা বড় ? কোন সাহসে কিসের অহঙ্কারে তাহাদের জল স্পর্শ করি না, কাছে আসিলে ঘৃণিত কুকুরের মত তাড়াইয়া দিই ? এত অহঙ্কার কিসের? এত দাক্তিকতা কেন? আমরা যাহারা হিন্দু হিন্দু বলিয়া চীৎকার করি আস্ফালন করি সেই আমরা যে দিনে দিনে যাহা হিন্দু ধর্মের ধৰ্ম্মস্থান সেখানে যাইয়া আঘাত করিতেহি। এমনি আমাদের মােহ, আমরা কি তাহা দেখিয়াও দেখিব না বুঝিয়াও বুঝিব না। বর্ণাভিমান লইয়া এমনই করিয়া মরণের পথে ভাসিয়া যাইৰ ? ঐ যে মা ডাকিতেছেন—সাবধান। সাবধান! ওঠ! ওঠ! জাগ । মিথ্যা অভিমান বর্জন কর! ঐ যে বাঙ্গলার কৃষক সমস্ত দিন বাঙ্গলার মাঠে মাঠে আপনার ও আমার কাজ শেষ করিয়া নিশাবসানে ঘর্মাক্ত কলেবরে বাঙ্গলার কুটীরে কুটীরে বাঙ্গলার গান গাইতে গাইতে ফিরিতেছে। উহারা মুসলমান হউক, চণ্ডাল হউক, উহার প্রত্যেকেই যে সাক্ষাৎ নারায়ণ ! অবিশ্বাসী তােমার এক প্রাণে বিশ্বাস জাগাও! তােনার সম্মুখে যে নারায়ণ ! আততায়ী! তােমার হাতের ছুরিকা ফেলিয়া দাওজন্মের মত ফেলিয়া দাও, তােমার সম্মুখে যে নারায়ণ ! ডাক! ডাক! সবাইকে ডাক! প্রাণের ডাক শুনিলে, কেহ কি না আসিয়া থাকিতে পারে ? ওঠ। জাগাে । ডাক। আপনার কল্যাণকে জাগাও! বল, এ ভাই তুমি মুসলমান হও খৃষ্টীয়ান হও, পুত্র হও, চণ্ডাল হও, তোমাকে আলিঙ্গন করি।”
১ফ জলচল ও শর্শদাষ বিচার। আর ভারতের যে কোটী কোটী নরনারায়ণকে নিবর্ণ আখ্যা দিয়া আমরা অস্পৃশ্য করিয়া রাখিয়াছি, তাহাদিগকে আবার মনুষ্যের মর্যাদা দিতে হইবে। ভারতের অপমানিত উপেক্ষিত গণ নারায়ণকে-যদি আমরা তাহাদের জন্মগত অধিকার দিতে সঙ্কুচিত হই, তবে স্বরাজ লাভের কথা বলিৰে কোন্ সাহসে? মহাত্মা গান্ধি এই উপেক্ষিত নর-নারায়ণকে ভুলেন নাই, কারামুক্ত হইয়াই সর্বাগ্রে তাহাদের কথাই মনে হইয়াছে। আনন্দবাজার ১১১৩০। কিছুদিন পূৰ্ব্বে মিঃ এজ বিহার চাত্ৰ ফান্সে সভাপতির কাৰ্য্য করিবার নিমিত্ত ডানটন গঞ্জ গমন করিয়াছিলেন। সেই সময় বাঁকিপুর সাচ্চলাইট পত্রিকার এক প্রতিনিধির সহিত এইরূপে সহিত এইরূপে কথােপকথন প্রশ্ন। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সম্বন্ধে আপনার কি মত? উত্তর। ভারতবর্ষ অবশ্য স্বাধীন হইবে। উহা ব্যতীত ভারতবর্ষের আত্মসম্মান রক্ষার উপায় নাই। আমি ইংরাজ, ইংরাজ জাতি স্বাধীনতাকে খুব সম্মান করে। অমি যথার্থ খৃষ্টানের মত এই সাধুর ইচ্ছা অন্তরে পােষণ করি যে, আমি যেমন স্বাধীন ভারতীয়েরা তেমনই স্বাধীন হউক। প্রশ্ন। ইংলণ্ড কি এখন ভারতবর্ষের এই স্বাধীনতা স্বীকার করিবেন ? ইংলণ্ডকে উহা স্বীকার করিতে হইবে। নিখিল ভারত যদি সম্মিলিত হইয়া এই দাবী জানান যে, স্বাধীনতা ব্যতীত অন্য কিছুতে তাহাদের তুষ্টি নাই তাহা হইলেই উহা স্বীকার কবিতেই হইবে। যদি অধিকাংশ লােকে স্বাধীনতা দাবী না করে তাহা হইলেই অবস্থা বিপজ্জনক উত্তর। হইবে। প্রশ্ন। আপনি কোন্ শ্রেণীর লােকের কথা বলিতেছেন ? উত্তর। আমি তারতবর্ষে ৫ কি ৭ কোটি অস্পৃশ্য অনুন্নতদের কথা শদাষের পরিণাম। ভাবিতেছি। পর ভারতীয়ের এই সকল অঞ্চকে তাহাদের সমান বলিয়া স্বীকার করিতে প্রস্তুত নয়। হিন্দু মুসলমান অনৈক্য সমস্যার সমাধান হইয়াছে। এক্ষণে এই অস্পৃশ্য জাতির সমস্যার যদি আজ সমাধান হয় তবে আগামী কল্যই ভারতবর্ষ স্বাধীন হইবে। জোহনবর্গে এক ইউরােপীষ আমাকে বলিয়াছিলেন-“মিঃ এগুল, আমরা শ্বেতাঙ্গগণ ভারতীয়দিগকে “অ” বলিয়া মনে করি। উচ্চ শ্রেণীর ভারতীয়েরা ভ্রাতার প্রতি যেরূপ ব্যবহার করেন অত্র সেইরূপ ব্যবহারই পাইয়া থাকেন।” সঞ্জীবনী ২৫৭২৭। অধ্যাপক বেদান্তশাস্ত্রী ও অস্পৃশ্যতা-বর্জন। অধ্যাপক শ্রীযুক্ত চন্দ্রকান্ত বেদান্তন্ত্রী মহাশয় “যশােহর প্রাদেশিক সম্মিলন” হইতে আসিলে তাঁহার ব্রাহ্মণ-বন্ধু ও আত্মীয় স্বজনগণ জিজ্ঞাসা করেন যে, তিনি অস্পৃশ্যতা বর্জন ও অস্পৃশ্য জাতির সহিত জলচরণ বিষয়ক জাতনাশা প্রস্তাব কিরূপে সমর্থন করিলেন। শ্ৰীযুত বেদান্তশাস্ত্রী মহাশয় উত্তরে নিম্নলিখিত যুক্তি প্রদর্শন করেন—যাহা তিনি প্রকাশ্য কন্ফারেন্সেই বলিয়াছিলেন। ১ম-দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য যাহারা সৰ্ব্বস্ব ত্যাগ করিয়াছে, সেই সকল কংগ্রেসী তাহার মতে সন্ন্যাসীর শ্রেণীভুক্ত। সন্ন্যাসীদের যেমন জাত নাই, গােত্র নাই, পিতামাতার পরিচয় নাই—অর্থাৎ বিশ্ব ব্ৰহ্মাণ্ডকে যাঁহারা নিজের দেশ, সকল জাতিকে যাহারা নিজের জাত, সকল গােত্রকে যাঁহারা নিজের গােত্র, বিয়ের পিতামাতা বাহাদের উপাস্য, যাহারা পর গােভঁহারাই সন্ন্যাসী। নারায়ণের পাঞ্চজয় নিতে জাগ্রত হইয়া যাহারা অনাসক্তভাবে বিশ্বের মুক্তি কামনাকে বুকে লইয়া কংসের সেবা করিতেছেনহর সন্ন্যাসী বৈ আর কি। সুতরাং ইহাদের অস্পৃশ্যতারূপ ছোঁয়াচে রােগ থাকিতে পারে না—খা উচিত ১৩০ জল ও স্পষে বিচার। ২য় মানুষের প্রাণে যখন খুব বড় রকমের একটা অনুরাগ আসে, বিশেষ একটি ধর্ম ফুটিয়া উঠে, সেখানে ছােটখাট দু একটা খুচরা আচারধর্ম চাপা পড়িলে আত্মপ্রতিষ্ঠায় ব্যাঘাত জন্মিতে পারে না। স্বাধীনতারূপ মহান্ ভাবের যায় সত্যই বাঁহাদের প্রাণ ভরপুর, তাহাদের কাছে সাধারণ গৃহস্থের ছােটখাট দুএকটা আচার উপেক্ষিত হইতে পারে হইয়া থাকে। হিন্দুসমাজে এহেন প্রেমিকদের জয় উচ্চ আসন থাকা উচিত চিরকালই তাই ছিল। ৩-যে হিন্দুসমাজে হাড়ের কয়লা দ্বারা পরিষ্কার করা বিলাতী চিনির মিষ্টান্ন এবং বিলাতী লবণে প্রস্তুত অন্ন ব্যঞ্জনাদি দ্বারা নারায়ণের ভােগ চলিতে পারে, যাহারা গরু, শূকর ও অন্যান্য অজ্ঞাত পশুর অন্তি পােড়ন কয়লার দ্বারা পরিষ্কৃত লবণ ও চিনি দিন রাত উদরস্থ করিতেছেন, বাজারের সিদ্ধ চাউল খাইয়া যাহারা কৌলীন্য রক্ষা করেন, শাস্ত্রানুসারে পবিত্র বিলাতী বস্তু যাহাদের অজের নিত্য দূষণ তাঁহাদের কাছে অচি বা অস্পৃশ্য কিছু আছে কি? যে কারণে কার্পাসতার তৈয়াৰী যজ্ঞােপবীত ব্যবহাৰ্য্য, বা বিবাহাদি ধৰ্মকাৰ্য্যে পট্টবস্ত্র পরিধানের বিধান, তাহাত, হিন্দু সমাজ ভুলিয়াই রহিয়াছেন। ৪র্থ-ইতিহাস পাঠে দেখা যায় যে জাতীয় উথানের জন্য এমন একদল লােকের দরকার, যাঁহাদের সর্বাপেক্ষা বড-এমন কি একমাত্র ধর্ম হইবে স্বরাজ প্রতিষ্ঠু বা ধৰ্ম সংলাপন। শ্রীপুত্রের কান্নাকাটীতে যাঁহাদের চরণ টলিবে না পিতার তর্জন গর্জনে ও মাতার ক্রন্দনরােলে যাহাদের হৃদয় গলিবে না, বিদ্যুতের ছটায়, বৈজ্ঞানিক যান বাহনে, তরবারি ঝনঝনায় ও গােলাগুলীর বড় বড় শব্দে ঘাঁহাদের প্রাণ দুরু দুরু কাঁপিয়া উঠিবে না, স্বাধীনতার সংগ্রামই যাহাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ, সেই সকল বিশ্বপ্রেমিক কর্ষিগণের চুৎমার্গ পরিত্যাগ করিতেই হইবে। হিন্দু সমাজ অননে ইহাদের বরণ করিয়া লইবেন।
স্পর্শদাষের পরিণাম। এত্যতীত ঐযুত বেদান্ত শাস্ত্রী সাধারণ ভাবে যে একটা কথা বলে, তাহ এই—একজন নমঃশূদ্র বা অন্য কোন অস্পৃশ্য জাতির লােক যতদিন হিন্দুধর্ম মানিয়া চলে, ততদিনই হিন্দুগণ উহাদের অস্পৃশ্য মনে করেন, খৃষ্টান ধর্মে দীক্ষিত হইবার অব্যবহিত পর হইতে স্পর্শ দোষের বন্ধন হিন্দুরাই শিথিল করিয়া দেন। এইরূপ ছুৎমার্গের কোন মৌলিকতা আছে বলিয়া তাঁহার ধারণা নাই। “হারা যুগ যুগান্তর হইতে সেবার বিনিময়ে স্মৃণা অবজ্ঞা লাথি জুতা খাইয়া নীরবে আপন ব্ৰত সাধন করিয়া যাইতেছেন। • তাহার অস্পৃহ হইল। স্বয়ং ভগবান ভঁহাদিগের মধ্যে আছেন, তাহাদিগকে চুইয়া আছেন। মানুষ তাহাদিগকে না চুইলে সেটা মানুষের অতি বড় আস্পর্ধা ও ভ্ৰম। গায়কবাড় ঠিকই বলিয়াছেন, যে, Those who seek equity must do equity, যাহারা ন্যায্য ব্যবহার পাইতে চায় তাহাদিগকে ন্যায্য ব্যবহার করিতে হইবে। সুতরাং আমরা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় যেরূপ সমান অধিকার চাহিতেছি, সামাজিক ব্যবহারেও তেমনই সমান অধিকার দিতে হইবে। বােম্বাইএর সভায় শ্রীযুক্ত বাল গঙ্গাধর তিলক প্রভৃতি গোঁড় হিন্দু যােগদান করিয়াছিলেন, তিনি বলেন—হিন্দু শাস্ত্র অতার সমর্থক নহে। মাদিতে ইহার অনুকূল ব্যবস্থা দেখা যায়, তাহা প্রক্ষিপ্ত বলিয়া মনে করিবার কারণ আছে।” (অশ্বতা নিবারণের মন্ত্রণা সভা প্রবাসী, বৈশাখ ১৩২৫-৭০ পৃষ্ঠা) “স্মৃতি পুরাণাদি সামান্যবুদ্ধি মনুষ্যের রচনা, ভ্র, প্রমাদ, ভেদবুদ্ধি ও জ্যে বুদ্ধিতে পরিপূর্ণ। তাহার যেটুকু উদার ও প্রতিপূর্ণ, তাহাই গ্রাহ, অপরাংশ ত্যাজ্য। উপনিষদ্ গীতা যথার্থ শাস্ত্র। রামানুজ শঙ্করাদি সঙ্কীর্ণ হৃদয় পণ্ডিতজী মাত্র। সে আঁতি নাই, পরের দুঃখে তাঁহাদের প্রাণ কালে নাই—ক পণ্ডিতাই।
এলশ ও স্পর্শদাৰ বিচার। অপর এক মহা বিপভিআমার দিন দিন দৃঢ় ধারণা এই যে জাতি বুদ্ধিই মহা ভেদকারী ও মায়ার মূল জন্মগত বা গুণগত সর্বপ্রকার জাতিই বন। কোন কোন বন্ধু বলেন-তা মনে মনে থাকবাহিরে, ব্যবহারিকে জাতি আদি রাখিতে হইবে বৈ কি। মনে মনে অভেদ বুদ্ধি-আর বাহিরে পিশাচ নৃত্য-অত্যাচার উৎপীড়নগরীবের যম আর চণ্ডালও যদি বড় মানুষ হয়, তিনি ধর্মের রক্ষক। ** আর জাতি ইত্যাদি উন্মত্ততা যাজকদের লিখিত গ্রন্থেই পাওয়া যায়, ঈশ্বর প্রণীত গ্রন্থে নাই। যাজকদের পূর্ব পুরুষদের কীৰ্ত্তি তাহারাই ভােগ করুন, ঈশ্বরের বাণী আমি অনুসরণ করি তাহাতেই আমার কল্যাণ হইবে।” (স্বামীবিবেকানন্দ প্রণীত পত্রাবলী ৩ ভাগ) স্বামী অভেদানন্দ বলেন আমাদের ধর্মে কোনরূপ জাতিভেদ থাকিবে না, জাতিভাে সামাজিক প্রথা মাত্র, ধর্মের সহিত উহার কোনই সংশ্রব নাই । ৰেও তাহাই শিক্ষা দিতেছেন। (উদ্বোধন ১৫/১৩) এইরূপ ভাবে শত শত শতাব্দীর যুণা অবস্থায় নিয় শ্রেণীস্থ ভ্রাতৃবর্গের ইংরাজী শিক্ষিত বর্তমান যুগের আলােপ্রাপ্ত প্রতিনিধিগণের প্রাণে যে কিরূপ হিংসা ও ক্রোধের বাড়বানল সঞ্চিত হইতেছে তাহা কি অন্ধ জাত্য ভিমানী তথাকথিত উচ্চ জাতিগণ বুঝিতেছেন না? একটু নমুনা মাত্র দেখাইতেছি। এই যে ভারতের অজ্ঞাত মেরুদণ্ডস্থানীয়, তথা কথিত শূদ্র প্রমুখ “নিম্ন শ্রেণী” লক্ষ লক্ষ বৎসরের অত্যাচার, পদাঘাত, কষাঘাত, স্বণ, অৰমাননা সহ্ করিতে করিতে পশুর মত হইয়াছে, তােমরা জন কয়েক উচ্চ শিক্ষিত লােক তাহাদের জন্য কি করিতেছ? আর তােমার পুরােহিত, তােমার জমিদার, তােমার উকীল, তােমার মােকার, তােমার দারােগা, তাের দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক সংবাদ পত্র “ওগাে একে ছুইও না তি মাৰে, ইহার সহিত এক বসিও না শন বাৰে ইহাকে লেখাপড়া স্পর্শদোষের পরিণাম। । শিখাইও না, ভদ্রলােকের ভাত মারা যাইবে। ইহারা শিক্ষা পাইলে জমী- দারীতে অত্যাচার উপদ্ৰৰ চলিবে না, মালা নােকা হ্রাস পাইবে, সুতরাং ইহাদিগকে নির্বোধ রাখ,ইত্যাদি ধুয়া ধরিয়া দেশকে প্রকৃত শ্মশানে পরিণত করিয়াছ ও করিতেছ। তােমরা কি স্বায়ত্ত শাসনের যােগ্য হইয়াছ? তােমরা স্বায়ত্ত শাসন পাইলে কি নিয় শ্রেণীর রক্ষা আছে ? তােমাদের প্রতিবন্ধকতায় নিম্নশ্রেণী কি রাজকীয় কোনও উচ্চ অধিকার পাইতে পারে ? হাজার হাজার বৎসরের নিপীড়িত জাতি আমরা, ইংরেজ আমলে ইংরেজী আইনের উদারতাম ক্রমশঃ আমাদের মানুষ্যত্বের বিকাশ হইতেছে। আমরা চিরদিন ইংরেজ রাজের অধীনে সুখে সম্মানে শান্তিতে রাজভক্ত প্রজারূপে বাস করিতে চাই। রাজ-ভক্তি আমাদের পক্ষে নিতান্ত আবশ্যক এবং উপকারী। “শােন হিতবাদী প্রমুখ বাঙ্গালার মসীজীবি বাবু সম্প্রদায়, জ্ঞান-গরিমা ঐশ্বৰ্য, বল, বিক্রম, সভ্যতা ও স্বাধীনতায় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠজাতি ইংরাজের নিকট তােমরা শতবৎসরেব পরাধীন দুৰ্বল প্রজা হইয়া যে অভাবনীয় সদ্ব্যবহার আশা কর, তােমাদের প্রতিবেশী, তােমাদের অন্নদাতা বস্ত্রদাতা দৈনিক শারীরিক পরিশ্রমদাতা, সাহা, মাহিষ্য নমঃশূদ্র সূত্রধর, স্বর্ণকার কুম্ভকার, মালাকার, তেলি, তিলি, ধােপা, পােদ, গজেন্দ্র-দাস, নাথ, ব্রাত্যক্ষত্রিয় ভূমিমালী, প্রভৃতি কৃষক ও ব্যবসায়ী শ্রেণীর উপর (তােমরা বাহাদিগকে নিম্নশ্রেণী বল, এখন কতকটা সাধুভাষায় অনুন্নত সম্প্রদায় বল) তেমন সরল সদয় ব্যবহার করিতে কোন দিনও শিখিয়াছি কি ? বৈদেশিক বাণিজ্যের ঘাের প্রতিযােগিতা হেতু বাঙ্গালার জীবন-মরণের দিনে যাহারা জাতি-কুল-মান রাখিয়াছে, রাখিতেছে, যাহাদের সংখ্যা হিসাবে তােমরা বাঙ্গালায় একেবারে মুষ্টিমেয় , রাজনৈতিক চালের গলাবাজিতে এই সকল নিরীহ, নিরব সবল, ধর্মভীরু সম্প্রদায় সমূহকে অন্ধকারে রাখিয়া, জলচল ও স্পর্শদাৰ বিচার। গােটা বাজাল দেশের উপর ইংরেজ রাজপুরুষ, ইংরেজ আল-ত ও ইংরেজ ব্যবসায়ী দলকে চটাইয়া দিতেছ। ছিল একদিন যে দিন তােমরা ওকালতী মােকাৰী করিয়া ধন কুবের হইতে; ছিল একদিন যেদিন তােমরা কেরাণী-গিরি ও ডাক্তারী করিয়া লক্ষ লক্ষ টাকা রােজগার করিতে ; দেশের জনসাধারণের অজ্ঞতা ও শক্তিহীনতার উপর তােমাদের স্বার্থপৰ্ববিলাসজীবন সদর্পে সমুন্নত ছিল। জাতিভেদের প্রাথমিক সময় হইতে এই পৰ্যন্ত তােমরা প্রজাতির প্রতি স্বজাতির হিংসা বিদ্বেষ ও অনুচিত অত্যাচার মূলক আধিপত্যকেই হিন্দু-ধৰ্ম্ম বলিয়া বুঝিয়াছ এবং স্বার্থানুনােধে নিরাশ্রয় জনসাধারণকে বুঝাইতে চেষ্টা করিয়াছ, তােমরা কর্মদোষে অভাবে পড়িয়া ইংরেজের বিদ্বেষপরায়ণ, আবার এদিকে সরল ব্যবসায়ী শ্রেণীকে (তােমাদের ভাষায় নিয়শ্রেণী) রাষ্ট্র-ব্যাপারে তােমাদের দলে টানিতে মজবুত। হাজার হাজার বৎসর হইল, আৰ্য-হিন্দু- ধৰ্ম্মের ও হিন্দুর জাতীয় চরিত্রের প্রাণ যাহা, তাহা পদদলিত করিয়াছ। নিজেদের কল্যাণ নিজেরা করিতে পার না,-তােমাদের প্রাণের ভিতরই প্রাণ নাই—অনুন্নত সম্প্রদায় কি তােমাদের সঙ্গে এখন যােগ দিবে? কিছুতেই দিবে না। তােমাদের গুণ, কর্ম, স্বভাব, মানব সেবার উপযােগী হইলে অনুন্নত সম্প্রদায়তাে তুচ্ছ কথা, পৃথিবী শুদ্ধ তােমাদের কাছে আসিবে। কংগ্রেস, কনফারেন্স করিয়া তােমাদের দেশের শাসনভার হাতে চাও, আর জনসাধারণকে ভেড়ার মত যে পথে খুসী সেই পথে নিতে চাও, তােমা শাসনে অধিকার পাইলে বিদ্যা শিক্ষার অপরাধে ব্রাহ্মণেতর জাতির জন্য পুনঃ * জিচ্ছে,” “কর্ণবেধ” প্রভৃতি দয়াল দণ্ডের ব্যবস্থা হবে নাকি? দেশ দেশ করিয়া মর, দেশের মানুষ-গুলাকে ভালবাসিতে শিখিয়াছ কি? আগে নিজের আত্মার মধ্যে স্বায়ত্ত শাসন লাভ কর, পরে বাহিরে স্বায়ত্ত শাসনের সন্ধান পাইবে।
স্পর্শদাষের পরিণাম। তােমরা ভারত গবর্ণমেন্টের আল-তন্ত্রের বিবাের্থী, তােমাদের হিন্দু জমিদার, তালুকদার ও তাহাদের নায়েৰ গােমস্তাগণ কালানুক যম সদৃশ দূর মফস্বলে নিরক্ষর হিন্দু মুসলমান প্রজার উপর কর আদায়ে বৃদ্ধিতে ও উৎকোচ এহলে কিরূপ পাশবিক অত্যাচার করে, একদিনও তাহার খবর খিছ কি? সেদিকে তােমাদের প্রবৃত্তি আছে কি? নিরাশয়, নিরক্ষর জনসাধারণের প্রতি আগে নিজেদের দোষ সংশােধন কর, নিজেদের মনুষ্যত্বের প্রতিদানে আগে তাহাদিগকে মানুষ কর। মফস্বলে অত্যাচারী জমিদার ও দুষ্ট মহাজনদিগের কবল হইতে তাহাদের ধন, মান, প্রাণ সম্পত্তি রক্ষা কর, অবৈতনিক পাঠাশালার বন্দোবস্ত করিয়া তাহাদের ছেলেদিগকে প্রাথমিক শিক্ষা দাও। উচ্চ শ্রেণীর ছেলেগণ উচ্চ শিক্ষা পাইয়াও যাহাতে চাকুরীর জন্য ব্যস্ত না হন, শারীরিক পরিশ্রমকে আদর করেন, আগে তাহাই কর। (সমাজ বন্ধু অগ্রহায়ণ, পৌষ ১৩২৪) জল চল ও খাদ্যাখাদ্য বিচারের আলােচনা প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক পূৰ্বশ্বতি জাগরিত হইল। অহিন্দু হস্তে জল খাওয়ার দরুণ ভারতে কি কাণ্ডই না হইয়াছে। মানুষ যে এত হীন এত নির্মম হইতে পারে মানুষ যে মানুষকে এত ঘৃণা এত অবজ্ঞা এত ছােট এত নীচ অধম ভাবিতে পারে, এ পৃথিবীতে অন্য কেই ভারতবর্ষ ব্যতীত এ কল্পনা আনিতেই পারে নাই। এক সময়ে ভারতের উত্তর পশ্চিম প্রান্তে, ভারতের পর পদানত হইবার ঠিক পূর্ব মুহুর্তে রাজা রাজ্য পালকে মুসলমানগণ যুদ্ধে পরাস্ত করিয়া ধন রত্নাদি লুণ্ঠন করিয়া এবং তাঁহাকে প্রাণে না মারিয়া তাহাকে মুসলমানগণ বলপূর্বক মুসলমান দ্বারা আনীত জলদি পান করিতে বাধ্য করিয়াছিল সুতরাং সেই দিন হইতে তাহার জাতি গিয়াছিল। কিন্তু আমার মনে হয় যেদিন রাজ্যপাল ক্ষেত্রে মুসলমানগণের দ্বারা বাহুবলে পরাজিত হন, সেই দিন হইতে ভারতের পরাধীনতার সূত্রপাত হয় নাই পরন্তু যেদিন রাজা রাজ্যপাল, বহু চেষ্টায় জলচর ও স্পর্শলাব বিচার। রাজার অতুল ঐশ্বর্যের বিনিময়ে যখন হিন্দুসমাজে পুঃ প্রবেশ লাভ করিতে পারিলেন না এবং যখন তুষানলে জীবন আহুতি দিলেন সেই দিনই আমার যথার্থ মনে হয় ভারতের পরাধীনতার প্রথম আরম্ভ। যে দিন হলদিঘাটের যুদ্ধের পর রাণাপ্রতাপের কনিই সহােদর শসিংহ যখন রাণাপ্রতাপের চরণ ধরিয়া ক্ষমা ভিক্ষা করিয়াছিলেন কিন্তু যবনের অনুগ্রহণ জন্য তাহাকে ভাই বলিয়া বক্ষে ধারণ করিবার পরিবর্তে উপেক্ষার হাসি হাসিয়াছিলেন—সেই দিনই মনে হয় ভারতের অধীনতা ভগবানের ন্যায়বিচারে সুদৃঢ় প্রতিষ্ঠার সূত্রপাত হইল। শক্তসিংহের মত বীর—যিনি প্রতাপের তুল্য বীর ছিলেন এই দুই বীর যদি একত্রে দণ্ডায়মান হইতেন তবে ভারতের ইতিহাস কি পরাধীনতার কলঙ্কে কলঙ্কিত হইতে পারিত? ঐতিহাসিক ও তত্বত ব্যক্তিগণ তাহার বিচার করুন। যেদিন ভারতের বীর শ্রেষ্ঠ মহব্বৎ খাঁর পত্নী স্বামীর মুসলমান সংস্রবে যাওয়ার পরও যখন স্বামীর প্রতি অনুরাগ থাকা নিন গৃহ হইতে, হিন্দুসমাজ হইতে, নির্বাসিত হইয়া, গৃহ হইতে একাকিনী হিন্দু মহিলার স্বামী সকাশে গমনের করুণ কাহিনী যখন নিলাম তখনি বুঝিলাম ভগবান আমাদিগকে পরাধীনতা শৃঙ্খলে আবদ্ধ করিয়া ন্যায় বিচারই কবিয়া- ছেন। আজকালকার বুটা স্বদেশ প্রেমিকগণ বিশেষতঃ বাঙ্গালি স্বদেশ প্রেমিকগণ যেরূপে জাতিভেদের সমর্থন করিতেছেন ও পরস্পর জাতি বিদ্বেষের অনল জ্বলিতেছেন তাহাতে মনে হয় ভারত নাতা সত্বরই—গৌববের আসন লাভ করিবেন। কি দুর্দিনই না উপস্থিত ভারতে হইয়াছে। (বিনয়চন্দ্র সেন সিবাজগঞ্জ।) মরণপথ যাত্রী ধ্বংসােখ হিন্দুজাতিকে কি না দুৰ্বজিই ধরিয়াছে—কি বুজি ভংশই তাহার ঘটিয়াছে। সমাজে যে যত উপকারী, যে যত দরকারী, বাহাদের একদিনের সেবা ব্যতীত সমাজ একদিনও চলিতে পারে না তাহার প্রতি অহা ততােধিক অবিচারতততাধিক অত্যাচার, ততােধিক ঘৃণা- শদোষের পরিম। ১৭ ; বনাননা-তত না গঞ্জনা। যারে দিয়া চক্ষুদান অরেই করি অপমান। এ দেশ এ জাতি ডুবিবে না ? সকলেরই ভাত কাপড় চাই, বাড়ী ঘর পরিষ্কার করা ও রাখা চাই, এখানে সেখানে জলপথে স্থলপথে নানা স্থানে গমনাগমন যাতায়ত করা চাই। তার জন্য কতকগুলি সেবাপরায়ণ জাতি আত্মদান করিয়াছে ; আর তার পুরস্কার! পুরস্কার যুগযুগান্তরের লাথি ঝাঁটা পদ প্ৰহাৰ নিৰ্যাতন-অপমান লানা প্রদান। যােগী সমাজ কাপড় বয়ন করিয়া বাভাৰ দূর করিত, যােবা কাপড় কাচিত, নমশূদ্র-চাষি কৈবৰ্ত্ত পােদ কৃষিকাৰ্য্য দ্বারা অন্ন যােগাইতলী বাড়ী ঘর পরিষ্কার করিত ধীর মাছ খাওয়াইত,নৌকা বাহিত, পাটনী পারাপার করিত, হডি পূজা পার্বণে বিবাহে অন্নপ্রাশনে ডােল ডাক বাজাইত, ময়লা আবর্জনাদি সাফ করিত। চুনারি পান খাইবার চুন যােগাইত তেলী বা তৈলী তৈল যােগাইত-মুচি জুতা বােগাইত, বেহারা ভুলি পাল্কী বহিত ম্যাথব ময়লা পায়খানা পরিষ্কার করিত-ডােম অশানের শেষ দিনে সেবা করিত। আর তার পুরস্কার। সে কথা লিখিয়া জগৎ সমক্ষে প্রকাশ করিবার নয়। ভদ্রলোেকগণকে ও বরং ২৪১০ দিন ২৪ বৎসর না হইলে চলে কিন্তু ইহাদিগকে একদিন না হলেও সমাজের চলে না—অথচ তার পুরস্কারের পরিবর্তে দেওয়া হয় কি না, স্বণা অঞ্জ অপমান অবহেলা। বিদেশী বিধর্মী ও বিজাতির লাথি ও বুটের আঘাত অল্প অপরাধে বিধাতা ব্যবস্থা করেন নাই, তবুও কি, আমাদের লজ্জা হইয়াছে? চৈতন্য আসিয়াছে? হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ নয় কোটি কোটি ৰে চলিয়া গেল অন্য ধর্ম গ্রহণ করিল-তবুও কি আমাদের চৈতন্য হইবে না? হায় আত্মঘাতি হিন্দু জাতি! মেচ্ছ বলিয়া যাহাদিগকে ঘৃণা করিয়া নাক শিটকা কখন ভাবিয়া দেখিয়াছ কি-তারা কেন প্রভু আর তােমরা কেন তাদেব দাস। একটা দৃষ্টান্ত দিতেছি। এরূপ দৃষ্টান্ত শত শত আছে। বেশী দেখাইবার ইচ্ছা নাই।
১ জলচল ও স্পর্শকাষ বিচার। জাতিভেদের অত্যাচার সম্প্রতি পাইওনিয়ার পত্রিকার জনৈক সংবাদদাতা এদেশের জাতিভেদ এখার ভীষণতা সম্বন্ধে পত্র প্রেরণ করিয়াছেন এলাহাবাদ ষ্টেশনে একদল মেথর ট্রেনের টিকেট করিয়া ট্রেণের একপ্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত চেষ্টা করিয়া কোথায়ও গাড়ীতে উঠিবার সুবিধা পাইল না। মেথর বলিয়া যাত্রীগণ তাহাদিগকে কোন গাড়ীতে উঠিতে দিল , সকলেই তাহাদিগকে তাড়াইয়া দিতে লাগিল। সংবাদদাতা স্বচক্ষে ইহা দেখিয়াছেন। তাহার পরিশেষে একদল ইউরােপীয় যাত্রীর শরণাপন্ন হয়। তাঁহারা মেথরদিগকে নিজেদের চাকরের কামরায় তুলিয়া লইলেন। দলে দলে লোেক মুসলমান খ্রীষ্টান হইয়া যাইতেছে বলিয়া হিন্দুগণ আক্ষেপ করিয়া থাকেন। অথচ যে অকথ্য অত্যাচারের ফলে নিম্নশ্রেণীস্থ হিন্দুগণ স্বধর্ম পরিত্যাগ করিতেছে, সে দিকে তাহাদের দৃষ্টি নাই। (সঞ্জীবনী) তােমরা ত মেথরদের ঘৃণা করতােদের মহা অপরাধ তারা তােমাদের মূত সাফ করে। বা, মা, ভগিনী, পিসীমা, মাসিমা,ঠাকুর, আজিম স্ত্রী কন্যা প্রেমের বশে মায়ার বশে কবে অথবা তাহারাও যাহা করেন না— (কেন না পুত্র কন্যা নাতি নাতিনী ছােট থাকিতেই করেন বড় হইল আর করেন না) মেথর তাহাই করে সামান্য মুদ্রার বিনিময়ে। ভাব দেখি, তােমরা শিক্ষিত জাতি না—অকৃতক্ত কতজাতি ? তােমর ভাবিছ কি ভগবানও মুচি মেথর বেহারা বাগদিকে ঘৃণা করেন ? ভুল তােমাদের বড় ভুল। ভগবান তাহাদিগকে কি চক্ষে দেখেন—শুনিবে ? তবে শােন কবির শেষ অভিষেক ব্লেচ্ছ-নিব-নিধনে ঐ যে আসেন বিজয়ী কল্কি। যত বেটা আছে মেথর চামার কচু কাটাগেছি হবে তা সাড়-
স্পর্গদোষের পরিণাম।
ব্রাহ্মণদের নাচে ভুড়ি ভার,
বিলম্বে আর ফকি?
ললাট তাঁদের সজ্জিত হল
বন-চন-পরে!
দিনে চোখ বুজে জাগিয়া ঘুমায়
চলিখ পাছে দেখা যায়-
শেষে যদি কিছু বাদ পড়ে হায়
দীর্থ পুণ্য-অঙ্কে!
অতি সাবধানে ঢাকা দিয়ে তার
বাচান পরন সধ!
যত টকিটীর বাড়ে গাে দৈর্ঘ্য
যত বেড়ে
ওঠে ফোটার বর্গ,
তত কাছাকাছি গাে-লােক স্বর্গ
এমনি সুম তত্ব!
আসেন কল্কি দৃপ্ত বিজয়ী
তরবারি হাতে বলিছে
প্রসন্ন মুখে কৰুণ হাসিটী
বেদনায় যেন বাজায় বাঁশিটা-
যুগান্তরের অত্যাচারের
বহ্নি নয়নে জ্বলিছে।
ব্রাহ্মণ সব চীৎকারি ওঠ
জয় কল্কির জয় হে।
তরবারি হাতে চমকে ভীষণ
আখের খুরে বারে ঝন ঝন্টু
১০
জলচল ও স্পর্শদাৰ বিচার।
বিদ্যুৎ ভরা উজল নয়ন
আহত চাহিয়া রয় যে !
ব্রাহ্মণ যত প্রমাদ গণি
পঠিতেছিলেন মন্ত্র।
ককি কিছুই নাহি বােঝে মানে,
ব্রাহ্মণদের ধরি দুই কাণে,
বলে আজ যাও যাহার যেখানে
থামাও মৎস-তন্ত্র।
কাল হবে জেন বিচার আমার
মাপিব পাপ ও পুণ্য।
আসিতে ভূলােনা টকিধারিগণ
আজ যাও সবে নিজের ভবন।
কি করিবে আর যত ব্রাহ্মণ
চলিল কিবিয়া স্কুঞ্জ ।
বিচাবসভায় বসেন কল্কি
শান্ত গভীর ছন্দ!
ডান দিকে বােসে সব দেবতাই
বামেতে বুদ্ধ নিমাই নিতাই
বৃষ্ট কৃষ্ট—আরাে দেখা যায়
গান্ধী বিবেকানন্দ।
বলেন কল্কি—ব্রাহ্মণদের
বিচার হউক অর্থে
হর্ষে তাদের বিপুল ভূড়িতে
পুলক নাচিল কি সুড়সুড়িতে!
স্পর্শদাষের পরিণাম। ১১ তাৰ আধিক্যে মুক্ত কচ্ছ- চালান যাইবে স্বর্গে। ককি বলেন—“ইহাদের পাপ ছেয়েছে ভারতবর্ষ। ত্রিভুবনে যত পাপ, তুলনায় ইহাদের পাপ ভারী ভুল নাই- মহাকাশ ছেয়ে করে সে পাপ বিধির চরণ-স্পর্শ! স্বার্থের তরে ধর্মের ভানে শারে ছলনায় গাে- এরা পাষণ্ড এরা বর্বর তও দম এরা তক্ষর, যুগ যুগ ধরি কোটী কোটী নরে রেখেছে পর প্রায় গো। টাকির জোরেতে আছে এরা টিকে সূত্র গলায় বাঁধিয়ে, নাহিক সত্য, নাহিক শিক্ষা কুপের মন্ত্রে এদের দীক্ষা, এরা অমানুষ, এরাই ম্লেচ্ছ, অন্ধকারের আঁধি হে। এরা তমােগুণী, অহঙ্কারের করে চির ক্রীতদায়। এরা মানবের সনাতন অরি হুকুম দিলাম ইহাদের ধরি
জলচল ও পলাৰ বিচার।
পাঠাও নরকে, কহিল কবি
গভীর ঐতিশা।
তারপর তিনি মেথরের দিকে
চাহি কহিলেন হেসে যে
এস সুন্দর, এস পবিত্র,
এস চিরচি, উদার চিত্ত!
এস গাে মহান্ গুরু গরীয়ান
এস অকুণ্ঠ বেশে হে।
সেবা যে ধৰ্ম, কারে বলে ত্যাগ
দেখায়েছ তুমি কাৰ্য।
মানবের সেবা করেছ নিত্য
কুষ্ঠাবিহীন অমল চিত্ত,
জননীর দেহে ভায়ের মতন
তুমিই শ্রেষ্ঠ আৰ্য!
তুমি যদি ওগাে দিনেকের তরে
করিতে গাে সেববন্ধ।
সােণার জগত হইত নরক
কত মহামারি কত না মড়ক
জগৎ করিত শ্মশান সড়ক
প্রাণহর দুর্গন্ধ!
তুমি যে মহৎ মানব সেবক,
তুমি হিমালয়
তুল্য
কোন সাধু চেয়ে নও তুমি কম
সেবার ত্যাগের করেছ -
স্পর্শদাষের পরিণাম। ১০ তবু হায় হায় গড়ে তােমার কেহ বােঝে নাই মূল্য বুঝুক তারা হওনি যেমন, হয়ােনা তেমনি ক্ষু! ছোয়নি তােনারে তাহারা তােমায় ছিল না বােগ্য তব মহিমার করিতে স্পর্শ—তুমি যে অপার পারাবার সমপুণ্য' মানব সেবক খৃঃ গান্ধী, বুদ্ধ শ্রীচৈতন্য। তুমি নও কম ইহাদের চেয়ে জ্যোতির সাগরে আসিয়াছ নেয়ে- মানব সেবক মহাত্মা তুমি এদের মতনই ধন্য। আজ হতে তুমি ইহাদের দলে গণ্য হইবে অলে, আজ হতে তব, ওগাে মহাপ্রাণ উইদের সাথে একাসনে স্থান সাও চডি ওগাে পুলবিমান নর-দেবতার স্বর্গে । বিস্ময়ে মুখে কথা নাই সরে আনন্দে ঝরে জাখি, আ- আজি মেথরের মহা অভিষেক অরুণ পরায় কিরণের লেথ- ১০ জলচল ও স্পর্শদাষ বিচার। বুজ নিমাই বাধে বাহু ডােরে লয়ে যায় সাথে ডাকিয়া।” শিবরাম চক্রবর্তী ( আত্মশক্তি তথাকথিত উচ্চ শ্রেণীর অস্পৃশ্য ও অন্ত্যজ জাতিদের উপর কিরুপ অত্যাচার করে, তাহার বিষময় ফল স্বরূপ হিন্দুসমাজ দিন দিন কিরূপ দুর্বল হইয়া পড়িতেছে সে সম্বন্ধে ভ্যাকসিন সুপারিন্টেন্ডেন্ট ডবলিউ, সেন গুপ্ত অমৃতবাজার পত্রিকার একখানা পত্র লিখিয়াছেন। আমরা নিয়ে তাহার সংক্ষিপ্ত মর্ম উদ্ধৃত করিলাম- দোসাদ শ্রেণীর এক ব্যক্তি মৃত্যুমুখে পতিত হইলে তাহার দুইটা শিশুপুত্র ও বিধবা নিতান্ত অসহায় অবস্থায় পতিত হয়। ইহার কিছুদিন পরে শিশু দুইটীর মাতাও মৃত্যুমুখে পতিত হয়। তখন তাহাদের প্রতিবেশী একটী উচ্চ শ্রেণীর জনৈক হিন্দুবৃদ্ধ তাহাদিগকে নিজ বাড়ীতে আশ্রয় দেয়। ইহার কিছুদিন পরে উক্ত বৃদ্ধও প্রাণত্যাগ করে। কিন্তু তখন এক নূতন বিপদ উপস্থিত হইল। দুইটা অস্পৃশ্য জাতির অনাথ শিশুকে আশ্রয় দেওয়ার দরুণ, তাহার জাত গিয়াছে সেই জন্য কেহই তাহার শব দাহ করিতে রাজী হইল না। তখন উক্ত সেনগুপ্ত স্বয়ং নিজের পয়সা খরচ করিয়া তাহার সৎকারের ব্যবস্থা করা, কোন প্রকারে তাহার শ্রদ্ধাদিও সম্পন্ন করান, এবং উক্ত অসহায় বালক দুইটাকে নিজের আশ্রয়ে লইয়া আসেন। ইহার কিছুদিন পরে হঠাৎ বালক দুইটী নিরুদ্দেশ হয়, এবং কয়েক দিন পরে তাহার মুসলমান বেশে ফিরিয়া আসে। তাহারা তখন বলে যে, তাহারা মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করিয়াছে। এখন তাহারা আর অস্পৃশ্য বা অ্যজ নয়। হিন্দু যামিটার ও ভদ্র শ্রেণীর লােকে আদর করিয়া তাহাদিগকে শীলাবের পরিণাম। ১ কাজে রাখিবে আর কোন নবাবও তাহাদের অন্ত্যেজীতে যােগদান কৰিলে তাঁহার জাতি যাওয়ার আশঙ্কা নাই। (আনন্দ বাজার পত্রিকা) টিয়াদের হিন্দুধর্মত্যাগ। মাজের পশ্চিম উপকুলে ২ লক্ষ টিয়া বাস করে। ব্রাহ্মণের নিকট ইহাদের দেহ অস্পৃশ্য, ছায়া অস্পৃশ্য, এমন কি বাতাস পর্যন্ত অস্পৃশ্য। ইহার যদি কোন ব্রাহ্মণের নিকট কোন কথা বলিতে চায় তবে ২০০ হাত দূর হইতে কথা বলিতে হয়। টিয়ারা এখন লেখা পড়া শিখিতেছে লেখাপড়া ফল স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদা জ্ঞান। টিয়া ব্রাহ্মণের পাড়ায় যাইতে পারে না; ব্রাহ্মণ যে রাস্তা দিয়া যান, সে রাস্তায় চলতে পারেনা; ব্রাহ্মণ যে পুষ্করিণীর জল খান, টিয়া সে পুষ্করিণীর তীরে যাইতে পারে না; শিক্ষিত টিয়া ইঃ। মানিবে কেন? টিয়ারা রাজপথে স্বাধীন ভাবে বেড়াইতে আরম্ভ করিয়াছে। ব্রাহ্মণের ক্রুদ্ধ হইয়া তাহাদিগকে প্রহার করিতেছেন। যতদিন লেখাপড়া জানিনা, ততদিন তাহারা ব্রাহ্মণকে দেবতা মনে করিয়া সবই সহ করি- য়ছে। কিন্তু এখন আর তাহারা অপমান সহিতে পারে না। তাই ২লক্ষ টিয়া হিন্দুধর্ম ত্যাগ কবিয়া বৌদ্ধ ধর্ম অবলম্বন করিতে সঙ্কল্প করিয়াছে। ইতঃপূৰ্বে বহু সহস্র টিয়া খৃষ্টান ও মুসলমান হইয়াছে সম্প্রতি তাহাদের যে কনফারেন্স হইয়া গিয়াছে, তাহাতে এই নির্ধারণ হইয়াছে যে শীঘ্র এক বৃহৎ সভা কবিয়া তাহারা বৌদ্ধ হইবার জন্য চেষ্টা করিবে। টিয়াদের এই সঙ্কল্পের কথা শুনিয়াও মালাবারের নােত্রি ব্রাহ্মণের চৈতন্য হয় নাই। ৫০ বৎসর পূর্বে মালাবারে ১৬ লক্ষ হিন্দু ৬ লক্ষ মুসলমান, ৩২ হাজার খ্রীষ্টানের বাস ছিল। এখন মুসলমান সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হইয়াছে। হিন্দুর সংখ্যা দেড়গুণও হয় নাই। হিন্দুর মধ্যে ব্রাহ্মণ ৪২ হাজার, ক্ষত্রিয় ৫০, বৈশ্য ২৭•••, নায়র ৩লক্ষ ও টিয়া ৫ লক্ষ ছিল। তখন মালাবারে অচল ও পদাৰ বিচার। ৰত লােকের বাস তন্মধ্যে হিন্দু শতকরা ৭২ ছিল। ৫০ বৎসর পরে হিন্দু সংখ্যা শতকরা ৫০ হইয়াছে। টিয়ারা যদি হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে, তবে হিন্দুর সংখ্যা আরও হ্রাস হইবে। মােপলাদরে উৎপাতে হিন্দুদের মালাবারে বাস করা দুঃসাধ্য হইয়াছে। টিয়ারা যদি হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে, তবে হিন্দু আরও দুর্বল হইবে। তবু হিন্দুর চৈতন্য হইতেছে না। হিন্দু যদি মান সম্মান লইয়া বাঁচিতে চায় তবে অস্পৃশ্যতা দূর করিয়া সকলকে সমভাবে এহণ করা কর্তব্য। (সঞ্জীবনী ২২শে চৈত্র ১৩১৩) আরও শুনিতে চাও কি? কেন বৎসর বৎসর হিন্দু কমে আর মুসলমান খৃষ্টান বাড়ে। পুনরায় সঞ্জীবনী পত্রিকা লিখিয়াছেন— হিন্দুর আশঙ্কা। বিগত দশ বৎসরের মধ্যে সমগ্র ভারতের ৪০ হাজার হিন্দু মুসলমান ধর্ম এবং ১ লক্ষ ২০ হাজার হিন্দু খৃষ্টান ধৰ্ম্ম অবলম্বন করিয়াছে। হিন্দু যতদিন আপনার স্বধী ভাতা ভগ্নীদিগকে ঘৃণা ও অবজ্ঞার পরিবর্তে শ্রদ্ধা ও প্রীতি প্রদান করিতে শিক্ষা না করিবেন, ততদিন লক্ষ লক্ষ হিন্দু এইরূপ স্বধর্ম বর্জন করিবে। (সঞ্জীবনী ফান ১৩২০) এখন আমাদের কর্তব্য কি? আমাদের কি ধবংস হওয়া না বাঁচিবার চেষ্টা করা। কেবল কি প্রধান ২ পণ্ডিতগণের পাতির আশায় বসিয়া থাকিলেই চলিবে না, আমাদের নিজেদের স্কন্ধে এই গুরুভার লইতে হইবে। আমরা বলি আর তিলার্ধ অপেক্ষা করিবার সময় নাই। এ আর আমাদেরই নিজেদের হাতে লইতে হইতেছে। সমাজবিধান চিরদিনই ব্রাহ্মণ দিয়াছেন। তখন বাঙ্গালার ব্রাশ ছিল, সে দিনও মনীষী রঘুনন্দনের ব্যবস্থার সম্মুখে সমন্ত বাঙ্গালী হিন্দু মাথা নত করিয়াছিল। সেদিনকার বাঙ্গালাও স্বাধীন ছিল না-খুসনের অধীন লি। মুসলমান-যুগেও ব্রাহ্মণ ছিল—ব্রাহ্মণের মেঘ ছিল হৃদয় ছিল। তাঁহারা সমাজকে জালিয়া গড়িতে পারিতেন। কিন্তু ব্রিটিশ মূল্পে সে ব্রাহ্মণ পলাশের পরিণাম। ধীরে ধীরে লুপ্ত হইয়া গিয়াছে। বিলাসের পরে আক- নিশান ব্রাহ্মণের ব্রাহ্মণ-গরিমার স্পর্ধা হাস্যোট্রেক করে মাত্র। ধনীর চাটুকার ব্রাহ্মণ-পণ্ডিত পূত্রকে ইংরেজী স্কুলে পাঠাইয়া যখন ব্রাহ্মত্বের দাবী করেন, তাহাও যদি উপেক্ষার হয়, তবু দারোগা-ব্রাহ্মণ, উকীল-ব্রাহ্মণ, কেরাণী-ব্রাহ্মণের এমন কি পাক-ব্রাহ্মণেরজাত্যভিমান একেবারেই অসহনীয়। এই সমত আচার ভ্ৰষ্ট, বৃত্তি ত্যাগী, বিপথগামী-ৰাহ্মণ-সত্তানগণের মধ্যে মহাপ্রভুর হৃদয় নাই, রঘুনন্দনের মেধা নাই। সে দিনের ব্রাহ্মণের ত্যাগ, তিতিক্ষা, সংযম নাই। ইহাদের মুখের দিকে চাহিয়া কোন ফল নাই। জাতি হিসাবে, সমাজের কর্তা হিসাবে ইহারা একা কোন বিধান দিতে পারিবেন না। আবার দোষ কেবল এক ব্রাহ্মণেরই নয়। ব্রাহ্মণ- সভার মতে যাহার পূত্র, তঁাহারও অপর পূত্রকে অত বলেন। কায় ও বৈদ্যজাতি, ব্রাহ্মণসভার আপত্তি সত্ত্বেও, নির্দিষ্ট শূদ্রবর্ণে থাকিতে রাজী নহেন, অথচ যদি অন্য কোন জাতিও তাহাদেরই মত শূদ্রবর্ণে থাকিবার আপভি প্রকাশ করেন, তবে তাহারা সেই অভিপ্রায়কে কিরূপ চকে দেখেন, এবং ঐ জাতি সকলের সহিত কিরূপ ব্যবহার করেন ? যাহা হউক বর্ণাশ্রমের পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয় আমাদের আলােচ্য নহে। তবে একথা বলা যায় যে, বাঙ্গালার অবত জনসাধারণ অ ও জল-অচল থাকিতে ক্রমে ক্রমে অধিকতর অনিচ্ছাপ্রকাশ করিতেছেন। মহাত্মা গান্ধি আখাস বাক্যে, তাহারা আশান্বিত হইয়া উঠিতেছেন, কোন প্রকার কােবাক্যে প্রতারিত হইতে আর তাঁহারা রাজী নহেন। ধরাজ যদি আমরা একান্ত ঐকান্তিক ভাবেই কামনা করি, তাহা হইলে এই সমস্যার মীমাংসা করিতেছি না কেন? মীমাংসা খুব কঠিন নয়। সহরে আসিয়া তো আমরা বেশ উদার হইয়া পড়ি, রেলগাড়ীতে, জশারে বেশ উদারত; তবে এনে ফিরিয়া গেলেই ও ১৫ লচল ও শলাব বিচার। সাজি লে? আর্গের ব্যাধির এক প্রধান উপসর্গ ব্যবহার, স্থান, কাল ও পাভেদে ভানী। জনসাধারণের অনুমােদন ও সমর্থনেই বৰ্তমান অসহযােগ আন্দোলন এত প্রবল ও এচও হইয়া উঠিয়াছে। আজ আর গণবিএহ নিদ্রিত নহেন। অপেক্ষা ? বহুদিন করা হইয়াছে; সহ-সীমা অতিক্রম করিয়াছে। ব্রাহ্মণ বা অন্য কোন বিশেষ জাতির চেষ্টায় এই ব্যাধি দূর হইবে না। শিক্ষিত অশিক্ষিত এক মিলিত হইয়া এই চেষ্টা করিতে হইবে। কংগ্রেসকেই সন্ধানে অগ্রসর হইয়া কাৰ্য্যে হাত দিতে হইবে। জনসাধারণ ও শিক্ষিত দেশবাসীর নিকট, সমাজ সংস্কার ও হিন্দুমহাসভার নিকট, আমরা বিনীত- ভাবে এই নিবেদন জ্ঞাপন করিতেছি।” (আনন্দ বাজার পত্রিকা) তার পর জল চলের কথা। এ সম্বন্ধে হিতবাদী লিখিয়াছিলেন - জলচল । আমাদের কোন শ্রদ্ধেয় বন্ধু আমাদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিতেছিলেন— তােমরা কি ছত্রিশ জাতিকে জলচল করিয়া লইতে চাও?” উত্তরে আমরা বলিলাম, আমাদের সেই বাসনা। আপনারা এখন যাহা চালাইয়াছেন, তাহাতে ছত্রিশ কেন, ছাপ্পান্ন জাতি জল চল হইয়া গিয়াছে। আমরা কেবল সেইটুকু আদাদের চোখে আঙ্গুল দিয়া দেখাইতে চাহি।” তিনি আমাদের উত্তর শুনিয়া নীরব ছিলেন। আজ আমরা সেই কথাটা পাঠকবর্গকে খুলিয়া বলি। “পূর্বে যখন বাঙ্গালায় হিন্দু সমাজ খাঁটি হিন্দু পদ্ধতি অনুসারে চলিত, তখন ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, কায়স্থ প্রভৃতি সমাজের উচ্চ জাতীয়গণ অজ্ঞাতকুলশীল কোন ব্যক্তির শৃষ্ট জল ব্যবহার করিতেন না; অত-কুশীল কাহাকেও কির খানসামায় পদে নিযুক্ত করিতেন না। তখন বাড়ী বাড়ী পাচক স্পলােষের পরিম। ১t ব্রাহ্মণ থাকিত না; যাহাদিগকে বাধ্য হইয়া গৃহে পাচক ব্রাহ্মণ রাখিতে হইত, তাহারা সে ব্রাহ্মণের চৌদ্দপুরুষের সমাচার লইয়া তৰে তাকে পাকশালায় প্রবেশ করিতে দিতেন। ব্রাহ্মণ মাত্রেই রন্ধন করিতে জানিতেন এবং বিদেশে যাইলে স্বপাকেই ভােজ্য সামশ্রী প্রস্তুত করিতেন। যতদিন সমাজে এই কড়াকড়ি ছিল, ততদিন জল চল ও জলঅচলের কথা লােকে কহিত এবং সে কথার একটা মূল্যও ছিল। এখন সমাজের ভাব সম্পূর্ণ বিপরীত হইয়া দাঁড়াইয়াছে। ভারতবর্ষের সকল প্রদেশের সকল জাতিই এখন বাঙ্গালীর ঘরে চাকরী করিতেছে। উড়ে, হিন্দুস্থানী, গুর্থা, শিখ, পাহাড়ি, বুনন প্রভৃতি অজ্ঞাতকুলশীল ভারতবাসী অন্নাভাৰে বাঙ্গালীর দ্বারস্থ হইলেই, তাহাকে বাবুরা খানসামা ও বেহারার পদ দিতেছেন। কাহার, কুৰ্ম্মী, ধানুক, রাজবংশী প্রভৃতি পশ্চিমের বহু ও অস্পৃশ্য জাতিই বাঙ্গালায় আসিয়া জল চল হইয়া যাইতেছে। যে যজ্ঞােপবীতধারী উৎকলবাসী কলিকাতার ডেণে নামিতেছে, তাহারই গতি কুটুম্ব আত্মীয় স্বজন, কেহ বা কোন বাবুর বাড়ীতে পাচক ব্রাহ্মণের কাজ করিতেছে, কেহ বা অন্য কোন বাবুর বাড়ীতে সর্দার বেহারা হইয়াছে। জিজ্ঞাসা করি, এখন বাজালায় জলচল কে নহে। আমাদের চার চাকরাণী, পাচক পাচিকা—সবাই ত অজ্ঞাতকুলশীল; আজ যে আমার বাড়ী কায়স্থ পরিচয় দিয়া খানসামার কাজ করিতেছে, কাল সে স্থানান্তরে যাইয়া ব্রাহ্ম বলিয়া পরিচয় দিয়া পাচক ব্রাহ্মণ হইতেছে। আমরা স্বয়ং এমন ঘটনার কথা জানি বলিয়াই কথাটা এত জোর করিয়া বলিলাম। দেখিয়াছি পশ্চিমের মূহর ও মঘইয়া ডােম জাতীয় হিন্দুস্থানী সকল কলিকাতায় আসিয়া, বাঙ্গালার অন্য বহু নগরে যাইয়া খানসামার কাজ করিতেছে; অজ্ঞাত কুলশীল হিন্দুস্তানী, উড়ে, গুর্খা প্রভৃতিকে আমরা অম্লান মুখে লচল করিয়া লইতেছি, আর যত গােল বাধাইৰ কেবল দেশের অন্ত্যজ জাতি সকলকে ১০ ৩ অচল ও পদোষ চিার। জল চল করিয়া লইতে? তখনি যত গোঁড়ামি আসিয়া ঘাড়ে চাপিৰে, ইহ-পরকালের যত ভাল তখনই জাগিয়া উঠিবে। আর এক কথা; পূর্বে বাঙ্গালার কোন উচ্চজাতীয় হিন্দুই দোকানের পার মিষ্টান্ন প্রভৃতি ব্যবহার করিতেন না। জানাশােনা হালুইকর ব্রাহ্মণের দোকান না হইলে, কেহ কেহ দোকানের সন্দেশ রসগােল্লা পর্যন্ত আহার করিতেন না। এখন সকল দোকানের সিজাড়া, আলুর দম, লুচি কচুরি মিঠাই গণেশ-সৰ্বই আমাদের আহাৰ্য্য হইয়াছে। চাকরে বাজার হইতে লুচি কচুরি নিতেছে, হাঁসের ডিম আলুর দম আনিতেছে, আর আমরা অম্লান বদনে তাহাই খাইতেছি। রেল গাড়ীতে যাইতে হইলে, কেন্যারের সাকী ভােগ যদি না পাই, কিন্তু পড়েজীর রথ্যাধুলিৰিমণ্ডিত মক্ষিকাকু সমাচ্ছ, পুৱীতরকারী মালাই মিঠাই অসচিত চিত্তে ভােজন করিয়া হিন্দুয়ানী বজায় রাখিতেছি। ক্ষুধার চোটে আহারের সময়ে মনে থাকে না যে, রেল ষ্টেশনের খাবারওয়ালার খােখার খাবার কেনারের প্রসাদ অপেক্ষা সহ গুণে হীন জন্য এবং মনুষ্যমাত্রেরই অভােজ্য ও অঙ্গ। এ সব, যে হিন্দু সমাজে চলিতে পারে, এমন ব্যবহার করিয়া যাহারা বড়াই করে, তাহার স্বদেশের নমশূদ্রগণকে ও মালীদিগকে, পােদ কৈবর্ত সকলকে জল চল করিতে কেন আপত্তি করিবে ? ইহার উপর সােড়া লেমনেড আছে, বরফপানী আছে, আরও কত কি আছে। আমরা ত এক হিসাবে তেত্রিশ কোটি জাতিকে জল চল্ করিয়া লইয়াছি। যত গােল কি ঘরের কয়জনকে জল চকরিতে ঘটিতেছে। বিবাহের তােজে, এন্ধের পংক্তিভােজনে, দুর্গোৎসবের প্রসাদ ভক্ষণে, উড়ে হিন্দুস্থানী গুখ খানসামারা ঘটে ঘটে জল দিয়া যাইতেছে, মেদিনীপুর-বাকুড়ার, কটকবাজপুরের অজ্ঞাতকুলশীল পাচকে লুচি জিয়া পাতে পাতে দিয়া যাইতেছে; বাঙ্গালার সকল জেলার অপরিচিতা চাকরাণৱা বাটা বাটিতেছে, তরকারী ধুইয়া শলামের পরিম। দিতেছে, মা-ঠাকুণীদের শুটীবাইয়ের জল যােগাইতেছে, ঠাকু ধর ধুইতেছে, পুলপাত্র মার্জনা করিতেছে; ঘরের বাহিরের সকল কাজই অপরিচিত অপরিচিতার আর সুসম্পন্ন হইতেছে। ইহাতে কারও জাতি যায় না কাহারও পরকালে কাটা পড়ে না, কাহারও পূজাপার্বণ, আজ শান্তি নষ্ট হয় না। আর যত সর্বনাশ ঘটিবে বলিয়াহিয়া বাঙ্গালার গােটাকয়েক জাতিকে জল চল করিতে? বলিহারী। ‘গােস্বামী প্রভুগণও এখন আর অজ জাতির গুরুগিরি করিতে চান , বোকে দীক্ষা দিতে লজ্জা বােধ করেন। ফলে, বাঙ্গালার বহু শত্ৰজাতি এখন এই নবীন সভ্যতা-কর্কশ জাতিভেদের প্রভাবে শুরু পুরােহিত বর্জিত হইয়া পড়িতেছে। যাহাদের অর্থবল আছে, তাহারা টাকার জোরে বিদ্যাভূষণ তর্কালঙ্কাকে গুরু পুরােহিতের পদে বরণ করিতেছে। যাহার দরিদ্র গৃহ, তাহাদের দশবিধ সংস্কারের কোন সংস্কারই হইতেছে না। তাই বাঙ্গালার অন্ত্যজ জাতি সকল এখন দলে দলে মুসলমান হইতেছে, খৃষ্টান সাজিতেছে। সমাজ ও ধর্ম পাইবার জগ, ভদ্র সাজিবার বাসনায় সনাতন হিন্দু ধর্মে জলাঞ্জলি দিতেছে। এই ধর্মান্তর এহণের প্রবাহকে রােধ করিবার জন্য যদি আমরা বলি যে অন্ত্যজ অতি সকলকে জলচল করিয়া লও, তাহা হইলে অমনি শাস্ত্র, রঘুনন্দন ভট্টাচার্য্য মনু পরাশর প্রভৃতির দোহাই দিয়া গোঁড়ামীর ক্লেদ কর্দম শত ধারায় বাহির হইয়া পড়িতেছে। তাই বলতে ইচ্ছা করে যে, ভাই! নিজের বুকে হাত দিয়া গোড়ামীর ডা মারিও, নিজের ব্যবহারের কথা মনে করিয়া শাস্ত্রের দােহাই দিও, সমাজের চারিদিকে দৃষ্টি করিয়া আমাদের কথার প্রতিবাদ করিও।” এই জলচল সম্বন্ধে যুক্ত রসিক লাল রায় মহাশয় লিখিয়াছেন— *একই জাতি বিভিন্ন প্রদেশে আচরণীয় ও অনাচরণয় বলি গৃহীত।
জল ও পদোষ বিচার। গােপ বা গােয়ালা জাতি পূৰ্বৰত আচরণীয় কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে তাহাদের জলচল নাই। যশােহরের গােয়ালারা গরু দাগাইয়া অনাচরণীয় হইয়াছে। বিহারেকাহার জাতির জল চল আছে, কিন্তু বলে কাহার অচল। লােকে এদেশে হাড়ি ও কাহার এক পর্যায়ে ফেলিয়া কাহারকে হীনচক্ষে দেখিয়া থাকে। কিন্তু বিহারী কাহার আমাদের চক্ষে ‘কুলিন', তাহাদের জল খাইতে আমরা ইতস্ততঃ করি না। ছােটনাগপুরে কাহার মুর্গী ও ইন্দুরের মাংস ধ্বংস করিয়াও উচ্চ শ্রেণীর আচরণীয়। চাষী কৈবর্তেরাও স্থান বিশেষে অচল। বিহারের কুন্তকার অপেক্ষা এজের কুকারের সামাজিক অবস্থা উন্নত। বিহারে তাহাদের জল উচ্চ বর্ণের অব্যবহার্য্য।” (সিরাজগঞ্জের নিকটবর্তী তেঁতুলিয়া, হরিপুর, চাঁদপুর প্রভৃতি অঞ্চলের পাট প্রস্তুত কারিগণ আচরণীয় কিন্তু ময়মনসিংহে তাহারা অনাচরণীয় অচল।) “সুরা ব্যবসায়ী (বলিয়া) শৌকি জাতি অনাচরণীয়। বঙ্গে, বিহারে এবং ভারতের সর্বত্রই হিন্দু সমাজে তাহারা অনাচরণীয়।” (কিন্তু সুরা বা মদ অচল নহে। সুরা বিক্রয় অপরাধে তড়ী পতিত, কিন্তু সুরা পানে কেহ পতিত নহেন যত দোষ বিক্রয়ে, পানে নহে।) “স্বর্ণকার (ও সুবর্ণবণিক) অচল কিন্তু কর্মকারের (লৌহকার) জল চল। রাউতির (চুণ বিক্রয়কারী চূর্ণকার) জল দ্বারা প্রস্তুত চূণ পানের সঙ্গে সকলেরই মুখে যায়, কিন্তু তাহার জল কেহই স্পর্শ করে না।” (অর্থাৎ চুপ মিশ্রিত জল চলিবে কিন্তু শুধু জল অচল—সে জলে ব্রাহ্মণাদিৰ ব্ৰহ্মতড়িত লােপ পায় ;) নমঃশূদ্র, মালী, সাহা, সুবর্ণবণিক, সূত্রধরের জল অচল কিন্তু সেই জলে সােডা মিশাইয়া দিলে কিংবা স্কুলকে বরফে পরিণত করিয়া দিলে করিম চাচার হাত হইতে লইয়া খাইতে কাহারও আপত্তি নাই সমাজের বাধা নাই। মুসলমান কলুর তৈলে সকলেই হাড়িতে ভােজ্য সামী ভজ্জিত করে, কিন্তু তাহার জল কাহারও চিপিটকে যুক্ত হইতে পারে না।” সকলেই বােধ হয় জানেন তৈল নিৰ্যাস কবির কলে (গছে) না দিলে শুধু সরিষা পলাবের পরিণাম। ও তিল হইতে কনও তৈল বাহির হয় না। সে জলে দোষ হয় না; যত দোষ জল বেচারীর একা একা থাকিলে। শুধু জলে যত দোষ, মিশ্রিত হইলে কোন দোষ নাই। “মৎস্য ব্যবসায়ী খবর ও কৈবৰ্তগণ অস্পৃ, কিন্তু বঙ্গে মৎস্য অস্পৃশ্য নহে।” আশ্চর্য ব্যাপার এই যে, মুৱা ৰা মৎস্য রূপ অপবিত্র ও অশুদ্ধ সামগ্রী বিক্রয় করিয়া সাধারণের পানে ও আহারে প্রশ্রয় দেওয়া ও সহায়তা করার অপরাধে তড়ি ও ধীবর পতিত কিন্তু উহা পানে ও আহারে কেহ পতিত হইতেছেন না। মৎস্য ও সুরা পান জাতি যায় না, তাহার বিক্রয়ে জাতি যায়। অর্থাৎ—সমাজ বলিতে চাহে গাে বিক্রয়ে জাতি যাইবে কিন্তু গাে ভক্ষণে কোন দোষ হইবে না—পতিত হইতে হইবে না। “বিহারে অহীর ও কোন কোন স্থলে রাজপুতগণও বরাহ মাংস ভক্ষণ করিয়া থাকে—তথাপি তাহারা আচরণীয় হিন্দু-* আর বঙ্গে সাহা অর্ণবণিক মাহিষ্য নমঃশূদ্র মালী অচল অস্পৃশ্য। “বিহারে জলচল জাতির মধ্যে বিধবা বিবাহ প্রচলিত আছে, কিন্তু পূর্ববঙ্গে অনাচরণীয় অস্পৃশ্য জাতির মধ্যেও বিধবা বিবাহ প্রচলিত নাই। অতএব সামাজিক রীতিনীতি ও ও খাদ্যাখাদের বিচার দ্বারাও অনাচরণীয় হইবার একমাত্র কারণ নহে।” ** পঞ্জাবে ডালটী বাজারে ক্রয় কবিয়া ক্ষত্রি রাজপুত ও কায়স্থাদি ব্রাহ্মণের সকল জাতিই ব্যবহার করে। * মাত্রা অঞ্চলে ব্রাহ্মণের হিন্দুর গৃহে পালিত কুকুট দৃষ্ট হয়। * ইংরাজ সংসর্গে, ইংরাজী শিক্ষায়, ইংরাজী আইনে আমাদিগের মতের, চিন্তা, বৃত্তির ব্যবহারের ধর্মের গতিবিধির ও ইচ্ছার স্বাধীনতা শিক্ষা হইয়াছে। প্রভাতে তরুণ অরুণ দীপ্তির প্রথম প্রকাশে বিহঙ্গকুল যেমন উল্লাস ধ্বনিতে দিঙমণ্ডল পূর্ণকরে, ধৰ্ম্ম সমাজ বাণিজ্য সাহিত্য চিন্তা ও কর্মক্ষেত্রে স্বাধীনতা লাভের বারত, শুনিয়া আশীয় উৎফুল হইয়া বলবাসী সেইরূপ জয়ধ্বনি করিয়াছিল। সেই আনন্দধ্বনি কবির কঠে, বক্তার বাগ্মিতায়, লেখকের লেখনীতে, কবীর কর্মে, ১৫০ চল ও পদাৰ বিচার। দর্শকের সমালােচনায় শতমুখে সহ ভাবে প্রকাশিত হইয়াছে। ইংরাজের আইন সাম্যবাদ যােবলা করিয়াছে। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও অধিকারের ধ্বনি নিনাদিত হইয়াছে। এখন সমাজের শাসন অপরাধজনক, ধর্মের উন্মাদনা অলৌক্তিক ও আইন বিরােধী। অতএব হিন্দু সমাজে বিপ্লব উপস্থিত হইয়াছে। ইংরাজের শিক্ষা ও সভ্যতা জাতিবর্ণ নির্বিশেবে আপামর সাধারণের মধ্যে বিতরিত হইতেছে।” “ইংরাজ যে সাবাদ ঘােষণা করিয়াছেন তাহা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের ও বর্ণাশ্রম প্রথার মূলে যুগপৎ কুঠারাঘাত করিয়াছে, ইয়ুরােপের সভ্যতা আশিয়াকে অভিভূত করিয়াছে, প্রাচীনের ভগ্নপ্রায় প্রাচীরের উপর নবীনের বিজয় বৈজয়ন্তী উড্ডীন হইয়াছে। আরবের ভীম ঝঞ্জা-বাতের বেগ তুচ্ছ করিয়া যে হিন্দু দুর্গের গৰ্বোয়ত শিখর গগন স্পর্শ করিয়াছিল, ইংরাজ যাদুকরের মলয় মারুতের মৃদুস্পর্শে তাহা আলাদিনের অট্টালিকার স্থায় শুয়ে মিলিয়া যাইতেছে, ইংরাজের যুক্তিবাদ ভারতের শ্রদ্ধাবাদকে স্থানচ্যুত করিয়াছে। ইংরাজের শিক্ষা, সভ্যতা ও আদর্শের তরঙ্গ স্তরে স্তরে সমাজের অন্তঃপ্রবিষ্ট হইয়াছে।” ** “আমাদের দেশে রেলে, ট্রামে, জাহাজে, বিদ্যালয়ে, কর্মক্ষেত্রেও রাজদ্বারে জন সাধারণের তুলধিকার। জাতিগত পদমর্যাদা—অর্থ ও পদজনিত সশনের নিকট পরাজিত হইয়া পল্লী এন্তে আশ্রয় গ্রহণ করিতে লালায়িত হইয়াছে। খৃষ্টমিশনারিগণ এবং হােটেল, চায়ের দোকান, খাবারের দোকান, মে, মুরালয়, বারা গৃহ প্রভৃতি সাম্যবাদ প্রচার করিয়া সঙ্কুক্ষিত বিপ্লবাননে ইন্ধন প্রদান করিতেছে।” “বুহৎ নগরীতে জীবন সংগ্রামের এ পা দেয়া হয় না কি পারি না; সামনে গুন গতি এৰি ৰা লৰাতেও এ বি পাৰিলে। সে পৰুে শনাল কোত তােমার বিরােধী। * আজি পর্যন্ত সর্ব অভেজা ভোজী बाल नाटणारा मारे। न समानाबाद, विना , बाराए.
স্পর্শকারে পরিণাম। তীব্রতা আচরণ ও অনাচৰণীয় হিন্দুকে সমসুত্রে গাঁথিয়া এক নূতন জাতির প্রাণ প্রতিষ্ঠা করিয়াছে। স্বাধীনতার যুগে সকলেই শ্বশ্ব প্রধান, কে কাহারও শাসন ও প্রভুত্ব ীকার করিতে চানাে। এখন উচ্চ নীচ তোকে আপন আপন অধিকার কড়ায় গণ্ডায় হিসাব করিয়া বুঝিয়া লইতে ব্যস্ত। প্রতিপদে প্রতিকার্যে যুক্তির অবতারণা না করিলে কেহ ব্যবস্থার নিকট মস্তক অবনত করে না। স্বাধীনতার নামে সেচ্ছাচার আসিতে পারে। কিন্তু তাহা ব্যবস্থার নামে যথেচ্ছাচার অপেক্ষা শতগুণে অধিকতর বাণীয় ও মজলকন নহে কি। এখন আমাদের সমাজবন্ধন শিথিল হইয়া হিন্দু সমাজের অ প্রত্যঙ্গ ঋলিত হইতেছে, সমাজে বিশৃখলা, উচ্ছলতা ও স্বেচ্ছাচার এৰে। করিয়াছে। অবস্থার সম্পূর্ণ পরিবর্তন হইলেও ব্যবস্থার পরিবর্তন আবশ্যকতা সত্বেও হইতেছে না। পল্লীতে সমাজপতি নাই, ব্যবস্থাকার ব্রাহ্মণ নাই। সমাজহিতৈষী ব্রাহ্মণগণ তাঁহাদের প্রাচীন অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকিতে পারিতেছেন না। তাঁহারাও পরমার্থ অপেক্ষা অর্থ, যশ, মান, পদাৰ্যা ও পাশ্চাত্য সভ্যতা প্রসূত সুখ ভােগর কাঙ্গাল হইয়া পুত্র পৌত্রদিগকে ইংৰাজী ভাবাপন্ন করিয়া গৌরব ও আত্ম প্রসাদ অনুতব করিতেছেন। মহামহােপাধাগণের পুত্রগণ এখন কেহ উকীল ইংরাজীর অধ্যাপক, ডাক্তার কেহ ৰা কৃষিবিদ হইতেছেন। জনৈক বিশিষ্ট বংশীয় ব্রাহ্মণ পণ্ডিত স্বয়ং সংস্কৃতের অধ্যাপক হইয়াও তাঁহাদের পুত্রদিগকে টোলের চতুসীমা স্পর্শ করিতে দেন নাই, খাঁটি ইংরাজী বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়া দিয়াছেন।” (আল-তিলকধারী, মুণ্ডিতমস্তক দীর্ঘ-শিখা-সূত্ৰধারী টোলের শিক্ষিত জামাতাকে কাদান না করিয়া হ্যাট কোটধারী সমাজটা খাটো দরশন স্কুল বা কলেজের আৰোবাৰা যি জাতির সহিত কাশনে বাস এসে কালজী শিখিয়া এ এ, বি এ, পাণ ইয়া বাবু সাজিছি আত্রা কে না। নহি। এণাকড়ি মেলায় বিএ, বি, ১১, আৰ, প।
চল ও স্পর্শদাষ চিার। ছাত্রগণকেই সকলে কাদান করিতেছেন। কন্যাও আর পূর্বোক্ত ৰমের অনুরাগিনী নহেন। শতকরা ৮০ জন ব্রাহ্মণ সন্তান আপনাদের জাতীয় ব্যবসা পরিত্যাগ করিয়াছেন। সুতরাং যিনি স্বয়ং অসিদ্ধ তিনি অপরকে কিরূপে সাধনার পথ দেখাইবেন?” “হিন্দু সমাজে এখন নায়ক ও পরিচালক নাই। সুতরাং বিষম দুর্দিনে বাতাবর্ত ও সলিলার্তের সন্ধিস্থানে আমাদের কর্ণধারহীন বিপ্লবতরঙ্গতাড়িত, লীর্ণ সমাজতরি মগ্ন প্রায়। আরােহিগণ কেহ নিদ্রিত সংজ্ঞাহীন, কেহ আত্মবিশ্বত’, কেহ উন্মতের ন্যায় কলহমত ; আত্মরক্ষার চিন্তা ও চেষ্টা কাহারও নাই। সমাজের শিরােপুকুট ব্রাহ্মণ বর্ণে-তরের উপর নৈতিক প্রভাব বিস্তার করিতে অসমর্থ হইয়া উমূর্তি ধারণ করিয়া প্রতিকার্যে দুর্বলতার পরিচয় প্রদান করিতেছেন। যে সকল বর্ণ লইয়া হিন্দুসমাজ গঠিত, তাহারা সকলেই আপন আপন শ্রেণীর প্রাধান্য ঘোষণা করিয়া সামাজিক মর্যাদা দাবী করিতেছে। এই সময় দারুণ সমস্যার মীমাংসা করিতে ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণেত, উচ্চবর্ণের হিন্দুগণ সহানুভূতি ও সুবিবেচনা লইয়া অগ্রসর না হইলে অচিরাৎ হিন্দুসমাজের শিরে অশনি পাত হওয়া অসম্ভব নহে।” “বিপ্লবের সূচনায় যুগীজাতি উপৰীত গ্রহণ করিয়া আপনাদিগকে ব্রাহ্মণবােগী বলিয়া পরিচিত করিয়াছিলেন। তাঁহাদের সেই উত্থানের চেষ্টা ও সামাজিক অধিকার লাভের আশঙ্কা কেবল প বলে চাপিয়া রাখিবার আয়োজন করা হইয়াছিল। ব্রাহ্ম সমাজের সাম্যবাদ এবং বিজয় কৃষ্ণ ও রামকৃষ্ণ সম্প্রদায়ের উদারনীতি কতক পরিমাণে হিন্দু সমাজের বিপ্লব তরঙ্গের গতিরােধ করিতে পারিয়াছে। ইহাৱা না থাকিলে ব্রাহ্মণের বজ্র আঁটুনিতে সমাজ এন্থি একবারেই ৰা কিয়া বৈদ্য ও যুগীদিগের উপৰীত এহণের যে সামাজিক আন্দোলনের সূত্রপাত হইয়াছিল তাহা ঐ খানেই শেষ যাইত।
স্পর্শদানের পরিম। হয় নাই। কাগণও উপবীত এহণ করিয়া পশ্চিম দেশীয় বাতি দিগের সহিত মিশিবার চেষ্টা করিতেছেন। বিহার ও পশ্চিমাঞ্চলের মারবাধিপ প্রমুখ ব্রাহ্মণগণের তাহাতে সহানুভূতি থাকিলেও বঙ্গীয় তথা কথিত সমাজনায়ক ব্রাহ্মণগণ তাহার ধােরতর বিরােধী হইয়াছেন। রাজপুত, রাজবংশী, কুৰ্মী, কাহার, আহার, কৰ্ম্মকার, বণিক, তৈলী, মাহিষ্য প্রভৃতি সকল জাতি আপন ২ অধিকার ও উন্নতির জন্য আগ্রহ প্রকাশ করিতেছেন। ইহা অশুভ লক্ষণ নহে। সুচতুর দক্ষ পরিচালক থাকিলে এই সময় নিড্রোথিত হিন্দু সমাজকে নূতন শক্তিতে, নূতন মন্ত্রে, নূতন ভাবে গঠন করিতে পারিতেন।” “ব্রাহ্মণাদি উচ্চবর্ণের হিন্দুগণ আভিজাত্য গৌরবে স্ফীত হইয়া নিম্ন শ্রেণীকে পদদলিত করিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন। কিন্তু তাহার আইনের অভয় পাইয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ অথচ সুদৃঢ় বৃত্ত গঠিত করিয়া স্ব স্ব জাতির ও বর্ণের ব্রাহ্মণ লইয়া নূতন শাখা হিন্দু সমাজ স্থাপন করিয়াছে। এখন প্রত্যেকেই বলিতে পারে আমরাই উচ্চবর্ণ। ** ব্রাহ্মণ সাহিয্যের জল স্পর্শ করিবে না, মাহিষ্যও ব্রাহ্মণের জল অস্পৃশ্য বলিয়া অনায়াসে পরিত্যাগ করিতে পারে। ‘তাহারা জলচল জাতি হইবার জন্য সমাজে আবেদন করিয়া যদি ফল না পায়, তাহা হইলে এই মুম্ষু সমাজকে অক্ষম অযােগ্য ও পক্ষপাতী বলিয়া ঘৃণা করা তাহাদের পক্ষে অন্যায় ও অসঙ্গত হইবে না। ** এক মেদিনীপুর জেলার একপ্রান্তে মাহিষ্যগণ আচরণীয় এবং অপর প্রান্তে তাহাদের জলচল নাই। যে সকল ব্রাহ্মণেরা তাহাদের জল ব্যবহার করিতেছেন, তাঁহারা কি অপর প্রান্তবাসী স্বশ্রেণীর ব্রাহ্মণদিগের সহিত পান ভােজন ও বৈবাহিক আদান প্ৰদানাদি করিতে কোন প্রকার কুণ্ঠা বােধ করিতেছেন? তাহাতে কি তাঁহাদের জাতি যাইতেছে না? এরূপ গায়ের জোরের দেশাচার ‘দুরাচার মাত্র, উহা যতশীঘ্র তিরােহিত হয় ততই আমাদিগের ও আমাদের উত্তর কালী বংশষদিগের পক্ষে মঙ্গলজনক। ইহাপেক্ষা অধিকতর রহস্যজনক কথা জলচল ও শতিকাৰ বিচার। এই যে অনেক স্থানে মাহিষ্য (চাষী-কৈবর্ত) জাতি আচরণীয়, কিন্তু তাহাদের পুরােহিতের জল ব্রাহ্মণ কায়স্থাদি উচ্চবর্ণের অব্যৰহাৰ্য। মাহিষ্যগণ পুরােহিতের প্রসাদ ভক্ষণ করিয়া কত কৃতার্থ হইয়া জাতি আর তাহাদের গুদ পুরােহিত অশুদ্ধজাতি; বলিহারি দেশচারের যৌক্তিকতার! বেলফুল (শেফালিকা, জবা প্রভৃতি) চালে স্পর্শ করিলে তাহা দেবার্চনার অযােগ্য, কিন্তু সকন্টক মৃণাল হইতে চণ্ডাল কর্তৃক আহৃত কমল (ৰা সকণ্টক বি পত্র) দেবতার পরম প্রিয়। গরজের বালাই লইয়া মরি। ব্রাহ্মণের ন্যায় অশৌচ পালনকারী কৃষিজীবী নমঃশূদ্রগণ হিন্দু সমাজের ভিত্তি। মুসলমানের সহিত হিন্দু বিবাদে তাহারা ও মাহিষ্যজাতি হিন্দুর দক্ষিণ হত যথা সৰ্বস্ব ছিল। কায়স্থের এবং স্থান বিশেষে ব্রাহ্মণের নেতৃত্বে তাহারা দৈহিক বল যারা আততায়ীর দৈহিক বলের সম্মুখীন হইয়া ক্ষত্রিয় ধর্মপান করিয়াছিল। কিন্তু এত করিয়া তাহারা পতিত ও অশখ। এতকাল তাহারা সকল অনাদর উপেক্ষা নীরবে সহ করিয়াছে, কিন্তু এখন ইংরাজী শিক্ষা লাভ করিয়া তাহারা উচ্চবর্ণের ‘বিদ্যা টের পাইয়াছে। তাহাদিগকে যাহার এতকাল ছােট লােৰু বলিত, এখন টেবিল ঘুরাইয়া তাহাদিগকে উহার ছােটলােক বলিতে আরম্ভ করিয়াছে। অর্থ ৰলে, শক্তিবলে, জন বলে ইহারা স্বাধীন ও প্রধান। কিন্তু সমাজের উচ্চবর্ণ সকল আপন লইয়া এতদূর যন্ত যে পরের ভাবনা ভাবির অবসর তাঁহাদের আদৌ নাই। কাজেই অহরা আপন আপন ভাবনা নিজেই ভাবিতে আরম্ভ করিয়াছে। আমাদের সহানুভূতির জন্য অপেক্ষা করিয়া নিচেষ্ট ভাবে বসিয়া নাই। শহারা দেখিতেছে (ক) ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণ সংস্কৃত পরিত্যাগ করিয়া ইংরাজী শিক্ষাৰ অৰু এই ইংরাজী শিক্ষিত নিয় শ্রেণীর সহিত সাম্যাবস্থা প্রাপ্ত হইয়াছে। (খ) ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণের আত্মীয় কুটু, পুত্র পৌত্র ও জাতিগণ লয় শলির পরিম। কত হােটেলের অন্ন, বিদেশীয় অচল জাতির জল, চায়ের দোকানের উছি ব্যবহার ও এহণ করিতে দ্বিধা বােধ করিতেছেন না। (গ) (ঘ) ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণ এবং তাঁহাদের সন্তান, সন্ততি আত্মীয় কুটুম্বগণ অস্তজ অস্পৃশ্য জাতীয় যুবতীগণের সহিত ব্যভিচার করিতে ও গােপনে তাহাদের হাতের জল (ও তৈরি পিষ্টকাদি) ব্যবহার করিতে আপত্তি করিতেছে না। (ঙ) ব্রাহ্মণ কায়স্থাদি উচ্চবর্ণ গােপনে অখাদ্য ভােজন ও যবন্ন এহণ করিয়াও জাতিচ্যুত হইতেছে না। (চ) •(ছ) + (জ) (ঝ) ক্ষমতাপন্ন পদস্থধনী ব্যক্তির নিকট ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণ স্পর্শদাষ বিচার করিতেছেন না। (ঞ) (ট) এক প্রদেশের অনাচরণীয় জাতি অন্ত প্রদেশে আচরণীয়। (৬) পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, সদাচার, সচ্চরিত্র এবং সৎবৃত্তি অবলখী হইলেও অনাচরণীয় জাতি অস্পৃশ্য ও অশুদ্ধ। কিন্তু নিতান্ত ভট্টাচার, দুশ্চরিত্র, অপরিষ্কার, অপরিচ্ছন্ন ও হীনবৃত্তি পরায়ণ উচ্চ বর্ণজাত ব্যক্তি বন্ধ ও আচরণীয়। নিম্নশ্রেণীর অনাচরণীয় হিন্দুগণ দেখিয়া শুনিয়া বুঝিতে পারিয়াছে, উচ্চবর্ণের হিন্দুদিগের সহিত তাহাদের কোন প্রকার সামাজিক সংশ্রব নাই। ব্রাহ্মণাদি শীর্ষস্থানীয় হিন্দুগণ সিন্ধুবাদ নাবিকের স্কন্ধা সেই বৃদ্ধের ধ্যা অয়দের স্কন্ধে আরােহণ করিয়া তাহাদিগের উপর অযথা সামাজিক অত্যাচার করিতেছেন। সে অত্যাচারের মূলে মুক্তি নাই, বিচার নাই মায়া না নাই, ধর্ম নাই উদ্দেশ্য নাইছে কেবল অন্ধ দেশচাৰ-মাস গিৰিক।
১০ জলচল ও শলাব বিচার। মুসলমান-যুগে বহু হিন্দু নানা কারণে ধৰ্মত্যাগ করিয়া রাজধৰ্ম্ম এহণ করিয়াছিলেন। সকলকেই যে বলপূর্বক ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করা হইয়াছিল তাহা নহে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কারণে সামাজিক অত্যাচারের ব্যতিক্রম হওয়াতে অনেক হিন্দু সমাজচ্যুত হইয়া মুসলমান সমাজের আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন। এইরূপে কাহারও পিকুলী অপবাদ হইয়াছিল। (আজকাল যাঁহারা মৌলবী মৌলানা সাজিয়া বক্তা লেখক হইয়া মুসলমান ধর্মের জয় যােবা করিতেছেন তাহাদের পূর্বপুরুষগণ প্রায় সকলেই আমাদেরই ভাই ছিল, আমাদেরই অত্যাচারে তাহারা ইসলামের শরণাপন্ন হইয়াছিল। এত ভিন্ন পার্থিব সুবিধা ও লাভালাভের বিবেচনায়ও অনেকে স্বেচ্ছায় পরধর্ম গ্রহণ করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। (নমঃশূদ্র, মালী প্রভৃতি জাতিগণ নাপিত, বেহায়া ও বােপা পাইবে না কিন্তু সে যদি হিন্দুধর্ম ত্যাগ করিয়া মুসলমান কিংবা খৃষ্টান হয়, তবে সে তাহার সকল গুলিই পাইবে। সরলা নমঃশূদ্রানী বা বিমলা মালিনী যতক্ষণ পর্যন্ত হিন্দু থাকিবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে নাপিত বেহারা পাইবে না কিন্তু যেই মাত্র সে মুসলমানের সহিত নিকা বসিয়া মুসলমানী হইবে বা বেশ্যা হইবে তখন সে সকলই পাইবে। কত নিম্ন শ্রেণী আছে যাহাদের গুরু পুরােহিত নাই। আর একটা প্রধান কারণ ব্রাহ্মণের শতকরা ৯৪ জন হিন্দুকে পূজা ও বোধিকার হইতে বঞ্চিত করা। এই সৰ গুরুতর গুরুতর অবিচারে দলে দলে লােক মুসলমান হইয়া গিয়াছিল- এবং এখন খৃষ্টান হইয়া যাইতেছে।) “পরলােকের কথা, মুক্তির কথা, সামরাজ স্বর্গের কথা, সাধন মার্গের কথা, ধর্মের কথা তাহাৱা বাহার নিকট শুনিয়া চিত্তে শান্তিলাভ করিল, তাহারই চরণ প্রান্তে তাহারা ভক্তিভরে প্রণাম করিল। সন্ন্যাসী, পীর, ফকীর, গাজি, সাধু, যিনি আদর্শ জীবন লইয়া আসিয়া প্রেম ও সয়া বিনিময়ে তাহাদের স্বাক্ষ্য অধিকার করিলেন, তাহারা তাহমিই চরণ তলে আত্ম বিক্রয় করিল। এইরূপে অনেক মিয়া ।
শলাবের পরিম। শ্রেণীর হিন্দু জাতিভেদের অত্যাচার হইতে মুক্ত হইয়া (যৌথ) ইসলাম ধৰ্ম গ্ৰহণ কৰিছিল এবং চৈতন্যের চরণ এতে জাতিতে কি দিয়াছিল। এখন ও দলে দলে নন-ত্র ও অন্যান্য নিম্নশ্রেণীর হিন্দুগণ খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করিতেছে। ফরিদপুর জিলার গােপালগঞ্জ ও মাদারীপুরের সন্নিকটে বৃহৎ বৃহৎ খৃষ্টপল্লী স্থাপিত হইয়াছে। বুনাে ধার হিন্দুর ঘরে ধর্মের ভিখারী হইয়া ও রিক্ত হতে ফিরিয়া ইন্দিরের ক্রোড়ে সমাদর লাভ করিতেছে। রাঁচিতে শত শত “মুণ্ডা কোল* খৃষ্ট ধর্মে দীক্ষিত হইতেছে। (মাদ্রাজের পারিয়াগণ দলে দলে খৃষ্টান হইয়া যাইতেছে)। হিন্দু সমাজ আর কিছুদিন পরে ভীম কর্তৃক নিহত কীচক কৰন্ধের ন্যায় অত্র প্রত্যক্ত হীন কুণ্ডাকার ধারণ করিবে। অথবা সকল যাইয়া কেবল সমাজ তুণ্ড ব্রাহ্মণ মাত্র অবশিষ্ট থাকিবে। ••• অনাচরীয় জাতিদিগের পক্ষে অযােগ্য উচ্চবর্ণের অত্যাচার এতদুর অসৎ হইয়া উঠিয়াছে যে এক্ষণে তাহারা বিদ্রোহী হইতে বাধ্য হইয়াছে। তাহারা সামাজিক বিধি ব্যবস্থা হতে গ্রহণ করিয়া বলপূর্বক আচরণীয় হইবার চেষ্টা করিতেছে। (তাহারা সংখ্যাতেও ত কম নহেশতকরা ৭৪ জন হিন্দুই অনাচরণীয় অস্পৃশ্য,অর্ধেকের বেশীই তাহারা)। প্রকৃতির প্রতিশােধ আরম্ভ হইয়াছে।” “আমাদের তলে তলে সৰ চলে মুখপাত দুরন্ত করিয়া আর কতদিন সমাজের খােলস বজায় রাখা যাইতে পারে? মুসলমান দুধে জল দিলে তা ক্রয় করিতে ও সেই জল মিশ্রিত দুখ বন্ধন শালায় প্রবেশ করাইতে নিষেধ নাই, কিন্তু নমঃশূদ্রের জলে হাত পা ধুইতেও অব্যৰহাৰ্য। খেজুর রস জ্বাল দিতে দিতে তাহাতে চিতই পিঠা ও পুটলীতে বাধিয়া চাউল সিদ্ধ করিয়া মুসলমানের জানালা ব্যক্তি বাল বাচ্চাকে খাইতে দেয়। সেই গুড় উচ্চবর্ণের হিন্দু ও দেব বিগ্রহের) অ্যৰহাৰ্য্য নহে। মুসলমান ও জলচল ও শবের বিচার। নমঃশূদ্রাদি অনাচরণীয় হিন্দু ব্যবসায়ীরা ধান সিদ্ধ করিয়া তাহা হইতে চাউল বাহির করিয়া বাজারে বিক্রয় কৰিলে আব্রাহ্ম চলি উচচ নি সকলেই তাহা ক্রয় করিয়া সিদ্ধ চাউল দ্বিতীয়বার সিদ্ধ করিয়া তৎমারা সুন্নিবৃত্তি করিতে পারেন। কিন্তু অপর আতিতে স্পর্শ করিলে ব্রাহ্মণের পানও অ্য। গৰ্য ৰা মহিষ ধ্বতের সহিত কত জীব জর বসা গহীনীতে এক গেনি শীল নামে এতি মানিক মিউনিশ্যিালির এলাকায় এ ছবির কারখানা খুলিবার অন্য কর্তৃপরে অতি চাহিয়াছিল। সে দরখাতে লিখিয়াছিল যে, চর্বি ব্যবসা প্রতি গুম, ইহাতে কোন দুর্গনাই ই। মানুষের খাদ্য ইত্যাদি। মাণিকতলা মিউনিসিপ্যালিসভাপতি যি আসগর ঐ মিউনিসিপ্যালির ননিনাৰ মৌলৰীখলিল হকে কারখানার খবর নিবার এ পাঠাইয়াছিলেন। বেবী শাহ কারখানা পলিনি কৰিা লিবিয়ছিলেন। The factory to be started is meant for manufacturing adulterated Ghee made up of ground-out oil and fat of animals such as kide, goat, swwe, sheep, even snakes and lizards and the applicant admitted that the product is made for human consumption." অর্থাৎ এই কারখানা তো ঘূত এতে প্রতিষ্ঠিত হইৰে। ঐ গত চিনাবাদামের তৈল ও পাগলপুর, জে এমন কি পাপ ও টিকটিকির চর্বি সহষে প্রস্তুত হইবে। রান্তকাৰীৰ য়িয়াছে যে মানুষের জ্যরূপে ব্যবহৃত হইবার ইট প্রস্তুত করা এইবে।” একথা শুনিলে কি কাণে আঙ্গুল দিতে ইচ্ছা হয় না? মৌলৰী সাহে। অরি। লিখিছেন- The procesa necessitates the accumulation of big pieces of large quantities of cattle bones for producing marrow wbich is mixed with the concoction to give it a graduleted appearance of Ghee অর্থাৎ প্রাণিসমূহে বির্তী । মিইলে চর্বির মধ্যে খান বৃতের মত ৰাৰ বাবে, তার কারখানার ভিতর অনেক বড় এত রাখিতে হবে। এ ব্যাপার শাষের পরিণাম। ১ (চর্বি) মিশিয়া হৰি শুদ্ধ করিতেছে। ইহাতে আমাদের মৃত নাই। কিন্তু আমাদেরই—দেহের নেই, প্রাণের প্রাণ নিয়ন্তরের হিন্দু জল ব্যবহার করিতে আমরা ইতস্ততঃ করি। দোকানের কারি, চপ, নােট কাটলেট, কোর্মা, কোপ্তা, ডিম মামলেট উচ্ছিষ্ট পাত্রে উচ্ছিষ্ট স্থানে ছক্রি জাতির সহিত একাসনে বসিয়া উড়াইতে আমাদের মনে প্ৰণার উদ্রেক হয় না, যত দোষ কেবল পরিচয় পাইলে। “ডুব দিয়া জল খাইলে একাদশীর পিতামহও টের পায় না।” “আমরা আর পুঁথি বাড়াইতে ইচ্ছা করি না। দেশকাল পাত্র বিবেচনা করিয়া অবস্থার পরিবর্তনে সামাজিক ব্যবহার, সংস্কার ও পরিবর্তন আবশ্যক। আজকাল এমন এক বাতাস বহিতেছে যে হিন্দু সমাজের হিতৈষী ক্ষমতাশালী পরিচালকগণ দেশের ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ব্যবসায়িগণ অবিচার করিয়া নিয় শ্ৰেণীকে কিছু কিছু অধিকার প্রদান না করিলে ভবিষ্যতে আমাদের দলের আশা নাই। এই সকল অধিকারের মধ্যে আমাদের মতে সর্ব প্রধান অধিকার জলচল। (সুবর্ণবণিক, রাজবংশী, মাহিষ, সাহা, সচ্চাৰী, বােগ কাপালী, নমঃশূদ্র, মালী, সূত্রধর, ঝালমাল প্রমুখ অনাচরণীয় ভ্রাতৃগণকে জলচল ও আচরণীয় করিতে হইবে।) সকল শ্রেণীর হিন্দুর মধ্যে একটা একতা বন্ধন স্থাপন করিতে হইলে, হিন্দু জাতির সাধারণ উন্নতির জন্য সকল শ্রেণীর বিরূপ । আর কাল কলিকাতার বাজারে সাধারণ যে গত পাওয়া যায় তার অধিকাংশই এই জাতীয়, অথচ হিন্দু মুসলমান সকলেই দ্বতের নামে অসঙ্কোচ গৰু শূয়ে চর্বি গলাকৰণ কৰি। ২৯শে চৈত্র ১৩২১ সাল। বাবাসী। * নিয়তিকে উন্নত করিতে হইবে। মানুষের প্রদত্ত কল ৰে পাৰ ৰ এই প্রকার নৈসর্গিক হয় আর কতদিন ভাত সরিৰে। সকলকেই আম। অচল করিয়া লই। কাল এই বিষ গাইবেন। এবার এগিতা সৰু এক কালীসঙ্গ সরকার নেশা বি,এ, লিখিত পাকা আধা ১১।
১১ জলচল ও পদোষের বিচার। সহানুভূতি আকৰণ করিতে হইলে আচরণীয় ও অনাচরণীয়, উচ্চ নিয় সকল বর্ণের হিন্দুর মধ্যে উদ্য চেষ্টা, সাধনা, অভিপ্রায় ও ইচ্ছা শক্তির যােগ চাই। তুমি আমাকে প্রণ কর, আমিও তােমাকে ঘৃণা করি। তুমি আমাকে ছােট লােক বল, আমিও তােমাকে ছােটলােক বলি। তুমি চরিত্র বলে, ধর্ম বিশ্বাসে ব্রাহ্মণ না হইয়াও আমার নিকট ভক্তি শ্রদ্ধার দাবী কর এবং তৎপরিবর্তে আমাকে অন্য ঘলিয়া দূরে রাখ আমিও তােমাৰ চরিত্রহীনতার জন্য তােমাকে কৃপার পাত্র বলিয়া মনে করি। যতদিন আমাদের সমাজে এই প্রকার দেখাদেশী রেষারেীর ভাৰ বর্তমান থাকিবে, ততদিন আমাদের একতা ৰন্ধন অসম্ভব। ততদিন কিছুতেই আমাদের মধ্যে একতা সার্বজনীন সামাজিক জীবনের সঞ্চার হইতে পারিবে না। প্রয়োজনের তাড়নায় আমাদিগকে প্রকাশ্যে ৰা গােপনে অনেক বিধি পরিবর্তন করিয়া লইতে হইতেছে। সময় থাকিতে সতর্ক হইয়া পাত্রপাত্র বিবেচনা করিয়া নিম্ন শ্রেণীর উন্নয়নের (ও জলচল অধিকার দানের) প্রতি মনােযােগী হইলে এবং অনাচরণীয় জাতির প্রতি সমবেদনা দেখাইয়া তাহাদিগকে সামাজিক অধিকার প্রদান করিয়া আচরণীয় শ্রেণীভুক্ত করিয়া লইলে বােধ হয় পরকালে ভগবানের নিকট এবং ইহকালে স্বর্গাদপি গরীয়সী জনী জন্মভূমির নিকট আমরা প্রত্যবায়এত হইব না।” আর সংবাদ। নিরুপদ্রব আইন লন অনুসন্ধান কমিটির রিপাের্টের যে চুম্বক দৈনিক কাগজ সমূহে বাহির হইয়াছে, তাহাতে অস্তৃতা দূরীকরণ সম্বন্ধে লেখা হইয়াছে - অন্য সমস্যা সম্বন্ধে মর গতিতে দেশে একটা পরিবর্তন আসিতেছে বলিয়া অত করা যাইতেছে। যদিও সমস্যাটার কঠিনতা ধর্মবিশ্বাসের সকাল ১১ সাল না।
আর সংবাদ ! ১৫ সহিত জড়িত তথাপি অস্পৃশ্যতা দূরীকরণের বিরােধী মনােভাৰ তিরােহিত হইয়াছে এবং নৈরাশ্যের কোন কারণ নাই। ইহা আমরা সম্পূর্ণ স্বীকার করি যে, অত সম্বন্ধে অসহযােগ প্রচেষ্টা আমাদের জাতির যত লােককে যতটা সজাগ করিয়াছে অন্য কোন রাজনৈতিক ও ধার্মিক প্রচেষ্টা তাহা করে নাই। বস্তুতঃ অস্পৃশ্যতা জাতিভেদ প্রথার অঙ্গীভূত এবং উহার সর্বাপেক্ষা কুৎসিত ও অমানুষিক লক্ষণ বা উপসর্গ। অস্পৃশ্যতাকে বিনাশ করিতে হইলে বর্তমান জাতিভেদ প্রথাকে দিতে হইবে। তাহা ভিন্ন উপায়ান্তর নাই। আমাদের দেশের জাতিভেদ প্রথা পাশ্চাত্য দেশের শ্রেণীবিভাগের মত নহে। কারণ পাশ্চাত্য শ্রেণী বিভাগে ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীর একত্র আহার এবং ঔাহিক আদান প্রদানে ঐকান্তিক বাধা নাই। আমাদের জাতিভেদ ও অক্ষতার সঙ্গে বরং আমেরিকার শ্বেতকায় ও নিগ্রোদের মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধানের তুলনা করা যায়। যে কারণে আমরা আমেরিকাকে দোষ দেই, সেই কারণে আমাদের নিজেদের দোষ স্বীকার ও সংশােধন করিতে প্রস্তুত হওয়া উচিত। (অগ্রহায়ণ, প্রবাসী) হিন্দু মহাসভার প্রস্তাব অস্পৃশ্যতা বর্জন ব্যবস্থা বঙ্গীয় হিন্দুসভার পক্ষ হইতে পণ্ডিত সত্যচরণ শাস্ত্রী মহাশয় লিখিতেছেন- প্রয়াগে কুম্ভমেলায় অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভায় বিশেষ অধিবেশন সমারােহের সহিত সম্পন্ন হইয়াছে। ভারতের নানাস্থান হইতে সাধুসন্যাসী, ব্রাহ্মণপতি ও প্রতিনিধি আগমন করিয়াছিলেন। কোলারের ও সারদাঠের শঙ্করাচার্যের সভাপতিত্বে ও উপস্থিতিতে সভার কার্য সুচারুরূপে নির্বাহ হইয়াছে।
চল ও শলাব বিচার। সভায় অদোষ বর্জন আর টি বিষয়ক প্রস্তাব পাশ পাইয়াছে। অহুয়তগণ পাঠশালাতে ও দেব মন্দিরে প্রবেশে এবং কূপম্পর্শে ধাহাতে কোনরূপে বাধা না পায়, তাহার অন্য হিন্দুসভা সকলকে অনুরোধ করিতেছেন। দেশের হিন্দুসভার পক্ষ হইতে বাঙ্গালার সর্বত্র যাহাতে এই প্রস্তাবের রীতিমত আন্দোলন হয় , তাহার ব্যবস্থা করা হইতেছে। বদেশে যদিও দক্ষিণ ভারতের রায় তেভাব নাই, কালী মন্দিরে, শিৰ মন্দিরে, সকলেরই প্রবেশ অধিকার আছে, কিন্তু যাহাতে সাধারণ বিষ্ণু মন্দিরে প্রবেশ করিতে পারে, তাহার জন্য ব্যবস্থা করা হইতেছে। পূজারীরা ইহাতে বাধাপ্রদান করিলে সত্যগ্রহের ব্যবস্থা করা হইবে। আশা করা যায় অন্য প্রদেশের হিন্দুসভাও কার্যক্ষেত্রে অগ্রসর হইনে। (দৈনিক বয়াতী ২৫শে মাঘ ১৩৩০) অস্পৃশ্যতা ও দিলীর হিন্দু সম্প্রদায় গত ১লা জানুয়ারী সন্ধ্যায় দিল্লীর হিন্দু জন সাধারণের এক সভাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে অশ্বতা দোষ উত্তরােত্তর কমিতেছে দেখিয়া সন্তোষ প্রকাশ করা হইয়াছে। সভায় বলা হইয়াছে যে, তথা কথিত নীচজাতিকে কুপ হইতে জল তুলিতে দেওয়া ও এক মন্দিরে পূজা করিতে দেওয়া এবং তাহাদের ছেলেপিলেদের এক স্কুলে পড়িতে দেওার সময় আসিয়াছে। সাজাহানপুরে অপূর্ব দৃশ্য নিপীড়িত জাতির উন্নয়ন গত ৫ই সেন্টের স্বামী জীবারা প্রায় ২০০ চামার এবং অন্যান্য বহু হিদুর এক সভায় বক্তৃতা প্রদান করেন। চারের শিব মন্দিরে উপাসনা করে এবং সাজাহানপুরের কাচাকাটা মহল্লার কুপ হইতে জল তােলে। গত ওই তারিখ বাহরগরে চামারে মন্দিরে উপাসনা করে এবং কুপ হইতে আর সংবাদ। জল তােল। এই তারিখ বহু চালারের সম্মুখে পূজার অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয় এবং চামারের “হর হর মহাদেব ধনির মধ্যে শিব পুজা সম্পন্ন করে। তাহার মৃত জন্তুর মাংস আহার এবং মদ্যপান ত্যাগ করিতে কৃতসর হইয়াছে। (ইণ্ডিপেন্ডেন্স) অস্পৃশ্যতা ও গান্ধি-পুন্যাহ গঞ্জাম বহরমপুরের ১৯শে অরিখের খবরে প্রকাশ বিগত গান্ধি পুণ্যাহে বহরমপুরের অন্ধু ও উৎকল জেলা কংগ্রেস কমিটির উদ্যোগে এক সত আহত হয়। উৎকল কমিটী স্থানীয় অন্ত্যজ বিদ্যালয়ের ছাত্রগণকে লইয়া এক শােভাযাত্রা বাহির করিয়া অস্পৃশ্য জাতিদের গ্রামে গমন করেন। সেখানে রাত্রি দশটা পর্যন্ত সভা হয়। উক্ত বিদ্যালয় এবং জ্যামের অধ্যক্ষ শ্ৰীযুত জয়মঙ্গল রায় সভাপতির আসন গ্রহণ করিয়া তাহাদিগকে সর্বপ্রকার মাদক দ্রব্য পরিত্যাগ করিতে অনুরােধ করেন। জয়মঙ্গল বাবু নিজে ব্রাহ্মণ হইয়াও নিঃসঙ্কোচে অস্পৃশ্য জাতির সহিত মেলামেশা করিয়া তাহাদের উন্নতি বিধানের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করিতেছেন। ভারতীয় সাধু মহামণ্ডল মাধমেলার বিশেষ অধিবেশন নিখিল ভারত-সাধু মহামণ্ডলের মাধমেলার বিশেষ অধিবেশন গত ২১শে জানুয়ারী হইতে এলাহাবাদে আরম্ভ হইয়াছে। জগৎগুরু শ্ৰীশঙ্করাচাৰ্য্যদ্বাণী ভারতীকৃষ্ণতীর্থ সভাপতির আসন গ্রহণ করেন। সভায় প্রস্তাব হয়, যেহেতু ভারতীয় সাধুগণের বিবিধ সদগুণ থাকা সত্ত্বেও তাঁহারা নিজেদের আত্মমালা রক্ষা করিতে পারেন না, সেই জন্য সাধুগণকে একতাবদ্ধ হইতে হইবে। ভারতের মধ্যে হিন্দুগণই সংখ্য, জ্ঞান ও অর্থসম্পদে সৰ্বশ্ৰেই; কিন্তু ইহা সত্ত্বেও পরস্পরের মধ্যে সৌহার্দের অভাবে তাহাদের সমস্ত সদগুণই নষ্ট জলচল ও পদোৰ বিচার। হইয়া যাইতেছে। বিধর্মীরা তাহাদের উপর অত্যাচার করিতেছে, এমন কি তাহাদের দেবমনিরাদিও অপবিত্র ও ধবংস করিতেছে। সেই জন্য মহামণ্ডল অনুরােধ করিতেছে যে, হিন্দুধর্মকে রক্ষা করিবার জন্ধ হিন্দুদিগের মধ্যে যেন সদ্ভাব স্থাপিত হয় এবং সকলে সঘবদ্ধ হয়। হদিদিগকে ক্ষত্রিয় করণ ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত সেরপুর অঞ্চলে হদি নামক এক জাতি বাস করে। ইহাদের নাক চেপটা, শরীর বলিষ্ঠ । কিছু দিন হইল ইহারা আপনাদিগকে ক্ষত্রিয় রাজা হৈহুয়ের বংশধর বলিয়া পরিচয় দিতেছে। তবু হিন্দুসমাজ ইহাদিগকে অস্পৃশ্য বলিয়া দূরে রাখিতে ছিলেন। কয়েক বৎসর হইল, ময়মনসিংহে হিহিতৈষিণী সভা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। বিধবাদের বিবাহ দেওয়া, অবনত শ্ৰেণীকে উন্নত করা, অস্পৃশ্যকে আচরণীয় করা এই সভার উwেs । সভার উদ্যোগে ময়মনসিংহ টাইনহলে ৫০০ হদিকে কত্রিয় বলিয়া স্বীকার করা হইয়াছে এবং তাহার উপৰীত ধারণ করিয়াছে। কেহ কেহ এই কাৰ্য্যের বিরােধী ছিলেন। হদিগণ যদি ক্ষত্রিয় হয়, তবে আর তাহার মুটে মজুরের কাজ করিবে না, উচ্চ শ্রেণীর লােকের বড অসুবিধা হইবে, এই হেতুতে ক্ষত্রিয় করণ কার্যে বাধা দেওয়া হইয়াছিল। (২২শে চৈত্র ১৩২১ সঞ্জীবনী। অন্যদের জল তোলার অধিকার দান। দিল্লীর ১৩ই ফেব্রুয়ারীব খবরে প্রকাশ যে, উক্ত দিবস সন্ধ্যাকালে দিলীর গাজী ভবনের নিকটে হিন্দু-মুসলমানে একটা ছােটখাট রকমের সংঘর্ষ হইয়া গিয়াছে। ফলে দুইজন হিন্দু সাংঘাতিকরূপে আহত হইয়াছে। প্রকাশ যে, তৎপূৰ্ব দিবস অপরাষ্ট্রে পণ্ডিত মদনমােহন মালবের সভাপতিত্বে এক সভাতে স্থির হয় যে, বহুসংখ্যক অকে হিন্দুধর্মে এহণ করিয়া তাহাদিগকে কূপ হইতে জল তুলিতে দেওয়া হবে। এই নির্ধারণানুসারে গত ১৩ই ফেব্রুয়ারী অপরাত্রে খানী একানন্দ আর সংবাদ ও তেজ পত্রের সম্পাদক মি ডি, গুপ্ত প্রমুখ একদল হিন্দু কতিপয় অস্পৃশ্যকে লইয়া দিল্লীর বিভিন্ন অংশে ঘুরিয়া বেড়ান এবং তাহাদিগের দ্বারা কুপ হইতে জল তােলান। (আনন্দবাজার পত্রিকা) মাদারিপুর মহকুমার অন্তর্গত কালকিনি থানার প্রায় বিশ সহস্র নমসূত্রের বাস। ঐ নমশূদ্র সমাজের কতিপয় নেতা তাহাদিগের ভিতরে কংগ্রেসের বাণী প্রচার নিমিত্ত শ্ৰীযুত মােহিনীমােহন দাস, রাজেন্দ্রচন্দ্র সেন, ললিতনােহন সেন ও সুরেন্দ্রনাথ বিশ্বাসকে নিমন্ত্রণ করেন। সে মতে বিগত ১১ই ফেব্রুয়ারী সােমবার মােহিনীবাবু প্রভৃতি চর ফতেবাহাদুর শ্রমে উপস্থিত হইলে স্থানীয় নমঃশূদ্রগণ তাহাদিগের যথােচিত সম্বর্ধনা করেন এবং একটি মিছিল বাহির করিয়া তাহাদিগকে ঐ গ্রামের শ্রেষ্ট জোতদার শ্ৰীযুত রামমােহন মণ্ডল মহাশয়ে বাড়ীতে লইয়া যান। তথায় বহু নমঃশূদ্র উপস্থিত ছিলেন। সুরেন্দ্রবাবু প্রভৃতি তাঁহাদিগের সহিত একাসনে উপবেশন করিয়া উপরােক্ত শওল মহাশয়ের গৃহপৰু খাদ্য সামগ্রী দ্বারা আহারাদি সমাপন করিয়া সভাস্থলে উপস্থিত হন। সহস্রাধিক হিন্দু-মুসলমান সভায় যােগদান করিয়াছিল ; তন্মধ্যে অধিকাংশই মাতব্বর নমঃশূদ্র। (আনন্দবাজার ৬১১১১৩৩০) সম্প্রতি দিল্লী, রাইসানায় বাল্মীকি ( মেথর)আৰ্য সমাজের বাৎসরিক অধিবেশনে লাল লজপত রায়, স্বামী সত্যানন্দ প্রভৃতি নেতারা যােগ দিয়া- ছিলেন। সভায় উচ্চ শ্রেণীর হিন্দুর পার্শ্বে মেথরদিগকে বসিতে দেখিয়া লালাজী আনন্দ প্রকাশ করেন। তিনি মেথরদিগকে কতকগুলি দোষের পরিহার করিতে উপদেশ দেন। বলেন, মেথররা তাদের দোষগুলি পরিত্যাগ করিলে উচ্চ শ্রেণীর হিন্দুরা আর্য সমাজে যােগ দিয়া সহজেই অন্য উদ্ধারে সাহায্য করিতে পারিবেন। মেথরদের সমাজ সংস্কারের অ অনেক মেথর বক্তা বক্তৃতা দেয়। সভাশেষে উচ্চশ্রেণীর হিন্দুরা মেথরদের হাত হইতে প্রসাদ এহণ করেন। (বসুমতী ৪১১৩০) ১৭ জলচল ও স্পর্শদাষ বিচার। ২০শে ফান পূৰ্ব্বাহু আর্য সমাজের গণ্যমান্য সভ্য চেৎলনিবাসী শ্ৰীযুত তুলসীদাস দত্ত মহাশয়ের ৬৫নং আলীপুর রােডস্থিত বাড়ীতে তৎকর্তৃক একটি সনুষ্ঠানের সূচনা করা হইয়াছে। অস্পৃশ্য হিন্দুদিগকে জল-আচরণীয় করা ও ক্রমশঃ তাহাদিগকে সদাচারী করা এই অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য। শিবচতুর্দশী আৰ্যসমাজের একটি স্মরণীয় পবিত্র দিন। পূর্ব হইতেই নিকটবর্তী কয়েকজন ভদ্রলােকের অনুমােদনে তুলসীবাবু স্থানীয় খেপাদিগকে ঐ অনুষ্ঠান উপলক্ষে আহ্বান করিয়া রাখিয়াছিলেন। যথাসময় ধােপীগণ বালকবালিকাসহ প্রায় ২৫জন সমবেত হইলে উপস্থিত ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈদ্য, কায়স্থ, বণিক ও নবশাখগণ তাহাদিগকে সাদরে গ্রহণ করিলেন ও সভায় একাসনে বসাইলেন। কালীঘাটের শ্ৰীযুত হরিদাস হালদার মহাশয় ও তুলসীবাবু শাস্ত্ৰসাহায্যে বুঝাইয়া দিলেন যে, প্রাচীন শাস্ত্রে অস্পৃশ্য বলিয়া কোন উল্লেখ নাই। আমরা নিজের নিজেদিগকে বড় মনে করিয়া শিল্পী ও শ্রমজীবীদিগকে সমাজে দাবিয়া রাখিয়াছি তাহার ফল যথেষ্ট ফলিয়াছে। বয়ােজ্যেষ্ঠ ধােপীরা তুলসীবাবুর সদষ্ঠানের ও সদভিপ্রায়ের জন্য বিশেষ আনন্দপ্রকাশ করিয়া সমবেত ভদ্রমণ্ডলীর নিকট আল্লদে প্রতিশ্রুত হইল যে, তাহাদের স্বজাতীয়দিগকে নৈতিক উন্নতি ও পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে উন্নত করিবার জন্য বিশেষ যত্ন করিবে এবং নিজেদের বৃত্তি রক্ষা করিয়া যাহাতে সমাজে সঙ্কোচবে না থাকিতে হয়, তাহার প্রতি লক্ষ্য রাখিবে। ইহাও ধাৰ্য্য হইল যে, মধ্যে মধ্যে এরূপ মেলামেশা করিবার সুযােগ উভয় পক্ষ হইতে করা হইবে। তুলসীবাবুর বাড়ীতে প্রস্তুত পাকা ধােপ- দিগের হাতদিয়া তাহাদের ও ব্রাহ্মণাদির মধ্যে বিতরিত হইলে সকলেই আন- সহকারে কিঞ্চিৎ কিঞ্চিৎ ভােজন করিলেন। (বসুমতী) লালা লাজপত রায় নিম্নলিখিত বাণীটী প্রচার করিয়াছেন ভারতের বর্তমান সমস্যা সমূহের অন্যতম সমস্যা হইল নির্যাতিত সমাজের উন্নতি বিধান করা। অনুন্নত সমাজের উন্নতি বিধান যতিরেকে স্বরাজ লাভ অসম্ভব না আর সংবর। ১৭১ হইলেও খুব যে কষ্টসাখ, তাহা সকলকেই মানিয়া লইতে হইবে। অনুন্নত সম্প্রদায়ের প্রতি এই যে স্বণা এবং তাচ্ছিল্যের ভাব, নর নারায়ণের প্রতি এই যে নির্মম অবিচার, হিন্দু সমাজে অস্ত-দানব ভারতের এক প্রধান অলকে নির্জীব করিয়া রাখিয়াছে। অসাড় করিয়া একেবারে ভারতদেহ হইতে বাদ দিয়া রাখিয়াছে, ইহাই হইল সমগ্র হিন্দুজাতির তথা ভারতের অনপনেয় কলঙ্কের একমাত্র নিদর্শন; বড়ই আনন্দের বিষয় এই যে, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এই অনুন্নত সম্প্রদায়ের উন্নতি বিধানকে লংগঠন মূলক কার্যের অন্যতম অংশ বলিয়া প্রচার করিয়াছেন, এবং এ বিষয়ে চেষ্টাও যথেষ্ট করিতেছেন। আরও আনন্দের বিষয় এই যে, ভারতের হিন্দু মহাসভার কৃপাদৃষ্টিও সম্প্রতি এই নির্যাতিত সমাজ আকর্ষণ করিতে সক্ষম হইয়াছে, এবং ভারতের প্রতিষ্ঠাপন্ন ধর্মসংস্কারকগণও এ বিষয়ে যত্নের ত্রুটি করিতেছেন না। যাহাতে এই মহাকাৰ্য্য আরও বিস্তৃতভাবে সম্প্রসারণ লাভ করিতে পারে এক্ষণে সর্বসাধারণের সে বিষয়ে তৎপর হইতে হইবে। আমি এখন বিলাত চলিয়াছি, আমার এই ভারত ত্যাগের পূর্ব মুহূর্তে পণ্ডিত মদনমােহন মালবের উপদেশ অনুসারে এবং পবিত্র হিন্দু মহাসভার শুভ ইচ্ছার প্রেরণায় আমি উক্ত মহাকাৰ্য্য সাধনের অভিপ্রায়ে একটা কমিটি গঠন করিয়া বাইতেছি। এই কমিটি ১লা এপ্রিল তারিখে আল হইতে কার্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইকেন, এবং প্রতি মাসেই লাহােরে ইহাদের একটা করিয়া অধিবেশ হইবে। এই মহাকাৰ্য্য পরিচালনার জন্য কোন মহাপ্রাণ ভদ্রলােকের নিকট হইতে কিছু টাকা পাইয়াছি, এবং ইহাতেই আমার যথেষ্ট উৎসাহের সঞ্চার হইয়াছে। আমি আমার দেশবাসীর সর্বসাধারণের নিকট এই মহৎ উলেস্ত সাধনার্থ যথাসাধ্য অর্থ সাহায্য প্রার্থনা করিতেছি। (হিন্দুস্থান) বলীয় প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভার পক্ষ হইতে ত্রিবাঙ্কুরের রাজার প্রাইভেট সেক্রেটারীকে ষ্টেট কর্তৃপক্ষের কাধের নিন্দবাদ করিয়া তার পাঠান হইয়াছে।
১২ জলচল ও স্পর্শদাষ বিচার। অ জাতিদিগের যে সমস্ত স্বেচ্ছাসেবক তাহাদের বিধিদত্ত ন্যায্য অধিকার লাভের জন্য সত্যগ্ৰহ করিতে যাইয়া গ্রেপ্তার হইয়াছে তাহাদিগকে অনতিবিলম্বে মুক্তিদান করিবার জন্য এবং কেবল রাস্তার বাধা নিষেধ নহে পরন্তু কুপ, জলায় ও দেব মন্দিরে যাহাতে ইহাদের উপর কোন বাধা-নিষেধ বজায় রাখা হয়, তাহার জন্যও অনুরােধ করা হইয়াছে। এই গ্রেপ্তারে হিন্দুধর্মের উপরেই আঘাত দেওয়া হইয়াছে। হিন্দু সভার ব্রাহ্মণগণ আশা করেন যে, অস্পৃশ্য জাতিদিগকে তাহাদের ন্যায্য অধিকার প্রদান করিয়া হিন্দুধর্ম বক্ষাব জন্য রাজপরিবার সচেষ্ট হইবেন। অন্যথা হিন্দুধর্মের স্থায়িত্বের সম্বন্ধে বিশেষ আশকার কারণ আছে। ( হিস্থান) ভগবৎ কৃপায় ভারতের সর্বত্র অস্পৃশ্যতা বর্জন ও জলচল আন্দোলন আর হইয়াছে। বাংলা দেশের পাবনা জেলার নানা স্থানে এই আন্দোলন বিশেষ ভাবে চলিতেছে। গত শ্রীপঞ্চমীর পূৰ্বে (১৩৩০) চাটমােহরের নিকট বর্তী হাট-মােহিণীগঞ্জে রাজসাহীর জমিদার জন সেবক সম্পাদক শ্রীযুক্ত শৈলেশ নাথ বিশী এম এ, বি এল মহাশয় উদ্যোগী হইয়া একটা বিরাট সভার আয়ােজন করেন। নমঃশূদ্র প্রতিনিধিগণের সংখ্যা সহস্রের উপর হইয়াছিল। সভা অন্তে স্থানীয় ব্রাহ্মণ কায়স্থ ও বৈদ্যগণ এবং সভাপতি শৈলবাবু সমবেও নমঃশূদ্রগণের জল পান করেন। গত ২৭শে মাঘ কাওরাইত ষ্টেশনে (ঢাকা) ময়মনসিংহ হিন্দু-হিত সাধিনী সমিতির চেষ্টায় এক সত্রের উপর কোচ বা খস ক্ষত্রিয় ভ্রাতৃগণ উপবীত গ্রহণ করিয়াছে এবং ময়মনসিংহের হিতসাধিনী সমিতির পরিচালক ও নেতৃবর্গ তাহাদের জল পান করিয়াছেন ও শ্রোত্রীয় নাপিতগণ ক্ষোৰী কাৰ্য্য করিয়াছেন। পাবনা জেলার সলপ গ্রামের ব্রাহ্মণ জমিদারবর্গ হিন্দুসভা করিয়া নমঃশূদ্র ভ্রাতাদের বাটী গিয়া জল বােগ করিয়াছেন। গত ৩রা চৈত্র রবিবার বৈকালে স্থল (পানা) রিভক্তি প্রদায়িনী -র সংবাদ ১৭ সভা প্রাঙ্গণে স্থানীয় সমাজ হিন্দুগলের এক মহতী সভায় অধিবেশন হইয়াছে। শ্ৰীযুত বসন্তকুমার ভট্টাচাৰ্য মহাশয় সভাপতির পদে আসীন হইলে সিরাজগঞ্জে আগামী প্রাদেশিক কনফারেন্সের সময় সর্ববঙ্গ হিন্দু সভার অধি বেশন আহ্বান করা সঙ্গত বিবেচিত হয়। অতঃপর স্থানীয় শ্রীগৌরাঙ্গ সেবা সমিতির নায়ক শ্ৰীযুত কেমােহন রায় তামাই শােপালপুর অঞ্চলে প্রায় ২০০০ দুই হাজার নমশূদ্র খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত হইতে প্রস্তুত এই বিষয় স্বচক্ষে যাহা দেখিয়াছেন, তাহা বর্ণনা করিয়া তাহাদের রক্ষাকল্পে কয়েকটি প্রস্তাব উথাপন করেন এবং সভ্যগণ কর্তৃক উহা সাদরে গৃহীত হয়। অতঃপর শ্ৰীযুত ফণীলাল ভট্টাচাৰ্য মহাশয় নিম্ন লিখিত প্রস্তাব কয়টি অনুযায়ী কাৰ্য্য করিবার জন্য সমাজকে অনুরােধ করেন ও তাহা অধিকাংশের সম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। ১। অনাচরণীয় জাতি গৃহাদিতে প্রবেশানন্তর আহাৰ্য্য স্পর্শ না করিলে তাহা নষ্ট বলিয়া বিবেচিত হইবে না। ২। যদি কেই অনাচরণীয়গণের হন্তে জলপান করে, তবে তাহাকে সমাজে দণ্ডিত করিতে পারা যাইবে না। ৩। নরসুরগণ সৰ্বশ্রেণীর হিন্দুগণকে ক্ষৌরী করিবেন, ইহাতে তাহার কোনরূপ হীনতা প্রাপ্ত হইবেন না। এক কূপ হইতে হিন্দুমাত্রেই জল ব্যবহার করিতে পারিবেন। সৰ্বশ্ৰেণীকে পরস্পর জলচরণীয় করার প্রস্তাবটি নিখিল ভারতীয় হিন্দুমহা- সভার অনুমতি স্বপনে স্থগিত থাকে ও একমাস কাল মধ্যে তাঁহাদের অনুমতি পাইবার প্রার্থনা করা হয়। সর্বশেষে বিভিন্ন গ্রাম হইতে বােগ্য নেতৃস্থানীয় ২৫ জন ব্যক্তিসহযােগে একটি কীত্ব গঠিত হয়। ঐ সব এক মাস মধ্যে অন্তত এক হাজার সভ্য সংগ্রহ করিয়া পুনরায় একটি সাধারণ সজ আদান করিবেন ও সেই সভায় জলচরণীয় বিষয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হইবে। হিন্দুস্থান ১৬ চৈত্র ১৩০০।
১৪ জলচল ও স্পর্শকাষ বিচার। বহুদিন যাবৎ আমরা নমঃশূদ্ৰাদি জাতির মধ্যে একটা মহা চাঞ্চল্যের ও অশান্তির ভাব লক্ষ্য করিয়া আসিতেছিলাম। তাহার প্রধান কারণ ব্রাহ্মণাদি উচ্চবর্ণের তাহাদের প্রতি সহানুভূতির অভাব ও ঘৃণা। অশিক্ষিত পদদলিত অন্ত্যজ জাতি ব্রাহ্মণাদির মুখাপেক্ষী থাকিয়া নিরাশ হইয়াছিল। পদে পদে তাহার তিরস্কৃত, ঘৃণিত ও উপেক্ষিত হইয়াছে। কয়েকটি অন্ত্যজ হিন্দুসন্তান পাত্রিদের দ্বারা সাহায্য প্রাপ্ত ও প্রলােভিত হইয়াছিল, তাহারাই সমস্ত অজকে ধর্মান্তরিত করিবার জন অনুপ্রাণিত করিতেছিল। বিষয়টি ক্রমে জটিল হইতে থাকে। উপর্যুপরি আমরা ৩৪ খানা পত্র পাইয়া গত ৮ই এপ্রিল মঙ্গলবার পণ্ডিত সত্যচরণ শাস্ত্রী মহাশয়কে সঙ্গে করিয়া কলিকাতা হইতে সিরাজগঞ্জ রওনা হই। বুধবারে প্রাতে সিরাজগঞ্জ পৌছাই। সেই দিন তিনটি সভায় ঐ সকল বিষয়ের অনুকূল ও প্রতিকূল বিচার চলে। উভয় পক্ষে নানা প্রকার শাস্ত্রীয় ও লৌকিক দেশাচার সম্বন্ধে বহু প্রসঙ্গের পর, আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে, ঐ সকল অন্ত্যজকে জলচল করা, ধােপ ও নাপিতের বন্দোবস্ত করা ও নানাপ্রকার সহানুভূতি প্রদর্শনই আমাদের উচবর্ণের উপস্থিত কর্তব্য। ঐ দিবস স্থির হয়, ১৩ই এপ্রিল রবিবার চৈত্র সংক্রান্তির দিবস গােপালপুর নামক নমঃশূদ্র প্রধান গ্রামে এক সভা হইবে। তথায় আমরা উক্ত প্রস্তাবের প্রথম দ্বারােদঘাটন করিব। পার্শ্ববর্তী গ্রামে পপ্রেরণ ও লােক মারফতে খবর পাঠান হইল। চৈত্র সংক্রান্তির দিবস সদলবলে “জামতৈল ষ্টেশনে উপস্থিত হইলাম। গ্রাম হইতে পূৰ্ব হইতেই আমাদের স্বাগত করিবার নিমিত্ত নানা প্রকার পতাকা হন্তে যুবক, বালক প্রভৃতি ষ্টেশনে উপস্থিত ছিলেন। তাহারা সকলে আসিয়া আমাদের আন্তরিক শ্রদ্ধা-ভক্তি প্রদর্শন করিল। আমরা সমস্বরে জয় গুরু মহারাজ কি জয়', বলিয়া রওনা হইলাম। প্রায় ১২টার সময় আমরা উক্ত এসে উপস্থিত হইলাম। আমরা একটু বিশ্রাম করিয়া তাহাদের সকল প্রকার আশীর সংবাদ। অভাব অভিযোেগ নিতে লাগিলাম। শুনিতে নিতে হয় বাস্তবিকই করুণ রসে ভরিয়া যাইতে লাগিল,-“আমরা হিন্দু, কিন্তু হিন্দুধর্মে আমরা কিছুই জানি না, আমাদের কেহই সে বিষয়ে শিক্ষা দেয় না। একই কূপ হইত ব্রাহ্মণ মুসলমান জল লয়, কিন্তু আমরা সে অধিকার হইতে বঞ্চিত। আমরা ধােপ নাপিত পাই না, কাহারও বাটিতে যাইলে স্বণাভরে তাড়াইয়া দেয়। আমাদের ছেলেরা বাের্ডিংএ স্থান পায় না, ব্রাহ্মণ কান্তের নিকট চাকরি পায় না, আমাদের ব্যথার ব্যথী কেহই নাই, আমাদের কোথাও আশ্রয় নাই। আপনারা আমাদের সাহায্য করুন। এই প্রকার নিরাশ্রয়ে সহানুভূতি হইয়া কোন অশিক্ষিত জাত কতকাল বাঁচিয়া থাকিতে পারে। -য় আশায় ষণ্ডাণ্ড প্রত্যাশী বকের ন্যায় বহুকাল চলিয়া গিয়াছে, আমাদের উন্নতির দ্বার উন্মুক্ত হইল না, তাই আমাদের মধ্যে এই চাঞ্চল্য।” প্রায় বেলা ৩টার সময় সভা আরম্ভ হইল। শিক্ষিত গণ্যমান্য ব্রাহ্মণ কায় বৈদ্য বহুলােকের সমাগম হইয়াছিল। অন্ত্যজ জাতিতে সভা পূর্ণ হইয়া গেল। সভায় প্রফেসর নাইডু সভাপতির আসন গ্রহণ করিলেন। পণ্ডিত সত্যচরণ শাস্ত্রী, হেমচন্দ্র দত্ত, শিবেশচন্দ্র পাাশী, সত্যেন্দ্র চক্রবর্তী, স্বামী করুণানন্দ প্রভৃতি ৰক্তগণ মহাসমন্বয়ের প্রবাহ চালাইতে থাকেন। নমসূত্রদের জনৈক প্রতিনিধি ষশােহর হইতে আসিয়াছিলেন, তিনিও তাহাদের আত্মপ্রত্যয় জাগ্রত করেন এবং তাঁহাদের মধ্যে যাঁহারা খৃষ্টান হইবার পক্ষে ছিলেন এবং আঁহারা বাস্তবিই হিন্দুধর্মে দৃঢ় ছিলেন, তাহাদের উভয়পক্ষের কথা শুনা হইল। তৎপরে রাত্রি ৯টার সময় সর্বসম্মুতি ক্রমে তাঁহাদের হন্তু হইতে জল মিষ্টান্নাদি এহণ করা হইল এবং “জয়, গুরু মহারাজ কি জয়” শব্দে চতুর্দিক ধ্বনিত হইতে লাগিল। কেবল দুইটি ভদ্রলােক জলগ্ৰহণ করিতে অনত করিলেন, কিন্তু অভিভাবকদিগের অজুহত তুলিয়া জানাইলেন যে যাহারা জলগ্রহণ করিবে তাহাদের সহিত পূর্ণ সহানুভূতি আছে এবং তাহারা জলচল ও পলিৰ বিচার। ভৰিতে কোন বিরোধী হইবেন না। স্বামী কাশন। (দৈনিক বী বৈশাখ ১৩৩১) ভাই হিন্দু আর ঘৃণা করিও না। সাত শত বৎসর ধরিয়া পরাধীনতার অপমান ভােগ করিয়াওবুঝিব গত পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয় নাই। আর পাণ বাড়াইও না। সাত শত বৎসরের বিদেশী বিজাতি বিধীর লা; জুতায় যাহাদের জাত যায় নাই স্বদেশী জাতীয় স্বধৰ্মালখী অনুগত সরল সেৰক ভাইদের জল পানে সে জাত যাইবে না। গােলামের আবার জাতি বংশ বিদ্যা ধনের গৰ্ব কিসের। জাতি কুল মান ইজৎ স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে চলিয়া গিয়াছে। মিথ্যা সামাজিকতা ও বুটা ব্যবহারিতা ত্যাগ কর। জাতির অতিমান মহাপাপ। এই মহাপাপ যতক্ষণ, বত কবে ভগবৎ ভক্তিতে ততদিন বঞ্চিত থাকিৰে। এই জাতির মিথ্যা মান আগ হইয়া সেই মাত্ৰ সৰ্বজাতিতে বা প্রাণীতে সমবুজি আসিবে তখনই এ জাতির উদ্ধার তখনই তুমি দুর্লভ ভগবদ্ভক্তি লাভ করিয়া কৃতার্থ হইবে। কলি পানাৰতার প্রেসিন্ধু গৌরাঙ্গ-মুখে বলিতেছেন- প্রভু বলে যে জন করে অন্ন খায়। ৪ কৃষ্ণ ভক্তি কৃষ্ণ সেই পায় সর্ব ধায়। (চৈতন্য ভাগবত অত খণ্ড) } ২৮; l Hab ” ৭।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.