Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Maloti
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মালতী ।
বিয়ােগান্ত দৃশ্য কাব্য।
শ্ৰীমহেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক
বিরচিত
শ্রীসিদ্ধেশ্বর হাজরা কর্তৃক
প্রকাশিত
কলিকাতা
বহুবাজার, ১৭ নং, শ্ৰনাথ দাসের লেন,
বি, কে, দাস এবং কোম্পানির যন্ত্রে,
শ্ৰীঅমৃতলাল ঘােষ দ্বারা মুদ্রিত।
মূল্য • আনা মাত্র।
No text on this page.
মালতী। প্রথম অঙ্ক। প্রথম গর্ভাঙ্ক। রাজমহল-অরণ্য। যুবরাজ বিজয়কেতুর যােচূ বেশে প্রবেশ। বি। উঃ ! কি জনশূন্য নিবিড় অরণ্য! তাতে জলদজাল সমাচ্ছন্ন অমানিশার নিশীথ সময়। লােক লােচন প্রীতিকর তারকাবলী যেন নীলা ধরে নিবিড় অসিত বসনে বদন আবরণ করে রেখেছে। নিশাচর মাংসাশী হিংস্র জন্তুগণ শােণিত লােলুপ বসনা পরিতৃপ্ত করবার জন্য, নির্ভয়ে ইতস্ততঃ পরিভ্রমণ কচ্চে। এদের দর্শনপথে পতিত হলে প্রাণী মাত্রকেই অকালে কালের করাল কবলে কবলিত হতে হয়, কোন ক্রমেই পরিত্রাণ পাবার আশা থাকে না। উঃ! কি ভয়ানক অন্ধকার। বনের নৈসর্গিক মনােহর শােভা কিছুমাত্র লক্ষিত হচ্ছে না। মধ্যে মধ্যে পৰ্বত নিঃসৃত সলিল প্রবা- হের ঝর ঝর শব্দে, গহ্বর শায়িত ভল্লকগণের ফুৎকার মিশ্রিত ভীষণ নিনাদে, ব্যাঘ্রাদি হিংস্র স্বপদগণের গভীর গর্জনে বন প্রতিধ্বনিত হচ্চে। সময় গুণে এ অরণ্য কি ভীষণ মূর্তিই ধারণ করেছে। দিনমানের আনন্দোৎপাদক বস্তুও এ সময় ভয় প্রদর্শন কচ্চে, যে দিকে নেত্ৰপাত কচ্চি, সেই দিকেই যেন ভয় মুর্তিমান। (পরিক্রমণ) আহা! এ সময়ে নিশাচর জন্তু ভিন্ন প্রায় সকল প্রাণীই আপন আপন বাসস্থানে মহারিণী নিদ্রাদেবীর ক্রোড়ে জচৈতন্য। আহা। যে জননী প্রাণাধিক প্রিয়তম পুত্রকে অণকালের জন্য চক্ষের অন্তরাল করেন না, যে পুত্ৰ ভঁর অঙ্ক ও হৃদয়ভূষণ, এক্ষণে সেই ২০ মালতী। [ দ্বিতীয় জননী সেই নয়নপ্রীতিকর শিশুকে দূরে রেখে, নিশ্চিন্তমনে নিদ্রায় অভিভূত আছেন। (নেপথ্যে স্ত্রীকর্থে) হা বিধাত! কে আমাদের এ অসময়ে রক্ষা করবে। বি। একি! স্ত্রীলােকের কণ্ঠধ্বনি না। এই মেঘাচ্ছন্ন অমানিশাতে বিশেষতঃ, এই নিবিড় জনশূন্য অরণ্যের মধ্যে কামিনীর কণ্ঠধ্বনি কিরূপে সন্তবে? বােধ হয় কোন কামােন্মত্ত যুবা কোন সরলা পতিব্রতাকে বল- পূৰ্ব্বক এ অরণ্যের মধ্যে এনে উৎপীড়ন কচ্চে ; অথবা কোন সম্ভ্রান্ত কামিনী দুরাত্মা যবন হস্তে পতিত হয়েছেন। যা’হক এর প্রকৃত তত্ত্ব জাতে হয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত এর বিশেষ অনুসন্ধান কত্তে না পারি, ততক্ষণ পর্যন্ত এ অরণ্য ত্যাগ কতে পাচ্ছি না। যদি আমার শ্রবণেন্দ্রিয় মিথ্যা শব্দে প্রতারিত না হয়ে থাকে, তা হলে অবশ্যই প্রকৃত ঘটনা আমার নিকট অপ্রকাশ থাকবে না—নিশ্চয়ই জ্ঞাত হব। (পরিক্রমণ) নেপথ্যে) হে মধুসূদন। এ অনাথাগুলিকে কোল দান করে রক্ষা কর। এ সময় তুমি ভিন্ন আর আমাদের কোন সহায় নাই। বি। আবার সেই কণ্ঠধ্বনি, সেই করুণরসা হৃদয়বিদারক রমণীকঃ- নিঃস্থত খেদোক্তি ! এই দিক হতে আসছে, তবে যাই, আর নিশ্চিন্ত হয়ে থাকতে পারি না। [ প্রস্থান। দ্বিতীয় গ্রভঙ্ক। রাজমহল-অরণ্যের অভ্যন্তর। মালতী, চপলা, শয়না ও দয়াবতী উপবিষ্টা। একান্তে বিজয়কেতুর প্রবেশ ও অন্তরালে অবস্থিতি। দ। হে ভগব। কি কল্লে, কি হল, এখন উপায় কি। যাই কোথায় পথ নাই-আর খালেও অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্চে না। আর যখন গঙাঙ্ক ] প্রথম অঙ্ক। কাছে লােকালক্স নাই, তখন পথ পেলেই বা কি হবে। এ দুর্গম বনে কে রক্ষা করবে, আর কতক্ষণ এ অসহায় অবস্থায় এ নির্জন বনে থাকতে হবে। হে জগদীশ্বর ! হে করুণাময়। হে বিপত্তে মধুসূদন! কৃপা করে এ বিপদ- কালে আমাদের রক্ষা কর। আমার জন্য কাতর নই, আহা! এই দুটি বালিকার জন্য প্রাণ বড়ই ব্যাকুল হয়ে উঠল। আহা! এই রাজকুমারী, যিনি রাজভােগে কালক্ষেপ করেন, দাস দাসীরা সৰ্ব্বদা যার সেবা করে, সেই রাজবালা কিনা আজ ধরাতলে ধুলি ধুসরিত অঙ্গে, মলিন বদনে অনাথিনীর ন্যায় এই বিজন বনে অবস্থান কচ্চেন। যার সামান্য অসুখ হলে রাজা রাণী পৃথিবী শুন্য দেখেন, সেই রাজকন্যা কিনা এখন এই বনে অসহ্য যাতনা ভােগ কচ্চেন; এমন কি, তার প্রাণের আশা পৰ্যন্তও নাই। হায়রে! এ বিপদকালে একটি আশ্বাস বাক্য বলে এমন লােক নাই। আমিও কি অভাগী, যাকে জন্মাবধি বক্ষে ধারণ করে আপনার গর্ভজাত কন্যার ন্যায় লালন পালন করে আসৃচি, আজ কিনা তাকে স্বহস্তে জলাঞ্জলি দিতে বসেছি ? উঃ আমার হৃদয় কি কঠিন! আর ত যন্ত্রনা সহ্য হয় না, কি করি, কি উপায়ে এ কঠোর যন্ত্রনা হতে মুক্তি লাভ করি। রে প্রাণ! মানে মানে আমার দেহ হতে প্রস্থান কর, নতুবা স্বয়ং তােকে দূর করৰ। (ক্রন্দন বি। (জনান্তিকে) একি ? এরা কারা?-বৃদ্ধাৰ কথায় জানলেম ভূতলশায়িনী যুবতীয়ের মধ্যে একটি রাজকন্যা, কোন রাজার কন্যা ? ( দেখিতে দেখিতে) এদের যেন কোথায় দেখেছি বলে বােধ হচ্চে? কোথায় দেখেছি? (চিন্তা বিজয়কেতুর পশ্চাতে একান্তে লছমন সিংহের প্রবেশ। ল। একি যুবরাজ এখানে? বি। কেও? আস্তে। শ। আজ্ঞা আপনার জীচরণ সেবক। বি।': লছমন? আস্তে কথা কও। এখানে কেন? ল। কালনার অন্বেষণে।
মালতী।
{ দ্বিতীয়
বি। আমি শিবিরের সকলের অজ্ঞাতে একাকী এখানে এসেছি, তুমি
কেমন করে জানতে পাল্লে ?
ল। শিবিরের প্রহরীর মুখে শুনলেম যে প্রায় এক প্রহর হল আপনি
এই বনে প্রবেশ করেছেন
বি। প্রহরীকে জিজ্ঞাসা করেছিলে আমি এখানে এসেছি সে কি
করে জানলে ?
ল। আজ্ঞা হাঁ জিজ্ঞাসা করেছিলেন, সে বল্লে যে আপনি যখন
শিবির হতে বহির্গত হন, সে আপনার অজ্ঞাতসারে আপনাকে এই অরণ্য
পর্যন্ত অনুসরণ করেছিল। তার মুখে একথা শুনে আমার মনে ভয়ের
সঞ্চার হল। একে অন্ধকার রজনী, তাতে হিংস্র জন্তুগণপূর্ণ নির্জন
অরণ্য, তাতে আর হতাবশিষ্ট দুরাচার যবনেরা এই বনে আছে। এই
সকল ভেবে আমি আর নিশ্চিন্ত হয়ে শিবিরে থাকতে পাল্লেম না, সুতরাং
এলেম।
বি। তা এসেছ বেশ করেছ, এখন বল দেখি লছমন! সেই রমণী
তিনটির কি কোন সন্ধান পেয়েছ ?
ল। কোন্ রমণী তিনটি যুবরাজ?
বি। গতকল্য অপবাহে যে রমণী তিনটিকে দুরাচার জন্য যবনদেয়
হস্ত হতে রক্ষা করেছিলেম ?
ল। আজা না যুবরাজ, তাদের আর কোন সংবাদই পাই নাই।
বি। (রমণী তিনটিকে দেখাইয়া) লছমন! ঐ রমণী তিনটি কারা
বল দেখি?
ল। যুবরাজ! এরাই তাঁরা।
বি। এরাই ত বেশ করে দেখ দেখি ?
ল। (পুনঃ দেখিয়া) আজ্ঞা হা এরাই তঁারা।
বি। তবে এক কৰ্ম্ম কর, শিবির হতে তিন খানি শিবিকা নিয়ে এস।
ল। যে আজ্ঞা। (প্রস্থান)
বি। আহা! এদের অতিশয় কষ্ট হয়েছে, আর ত দেখতে পারি না,
সম্মুখে যাই। (রমণীত্রয়ের সম্মুখে গমন।
গর্ভা ] প্রথম অঙ্ক। দ। (সচকিতে) কে তুমি? (মালতী ও চপলা সভয়ে উঠিয়া বসিলেন) বি। অতিথি। দ। বোধ হয় তুই দস্যু যবনদের গুপ্ত চর। এখন পর্যন্তও অনুসরণ করেছি। এখনও কি সেই বিক্রমকেশরী যুবার হস্ত হতে তােরা তােদেয় দুস্কৃতির প্রতিফল পাস নাই? নরাধম ! সতীর অমূল্য সতীত্বধর্ম নষ্ট করাই কি তােদর প্রধান উদ্দেশ্য। বি। দেবি। ক্রোধ সম্বরণ করুন। ভয় নাই, আমি নরপিশাচ যবন বা তাদের গুপ্ত চর নই, আমি ক্ষত্রীয়। গতকল্য অপরাহে আপনাদিগকে দ ষবন হস্ত হতে এ অধমই মুক্ত করেছিল। এ অধমই সেই যুবা। দ। ক্ষত্রীয় হলে তােমার এ বেশ কেন ? বি। এই বেশইত অামাদের ব্যবহাৰ্য্য পরিচ্ছদ ? দ। পূর্বে ছিল বটে—এখন নয়। আপনি যে যবন নন তার আর প্রমাণ কি ? আপনি আর কোন চিহু দেখাতে পারেন ? বি। আজ্ঞা হাঁ (অঙ্গুলি হইতে স্বনামাঙ্কিত অঙ্গুরী দান ) দ। ( অঙ্গুরী দেখিয়া করষােড়ে) যুবরাজ ! আমার গুরুতর অপরাধ মার্জনা করুন। অন্ধকারবশতঃ চিনতে না পেরে, আপনাকে অনেক কটুক্তি করেছি। অনুনয় করে নিবেদন কচ্চি–এজন্য আমাকে কৃপা করে ক্ষমা করুন। বি। ভদ্রে ! আপনি অত কাতর হচ্চেন কেন ? কুষ্টিত হবেন না। এক্ষণে আমার একটি অনুরােধ আছে, কৃপা করে রক্ষা কল্পে অনুগৃহীত হই। দ। সে কি যুবরাজ? কি কথা-আজ্ঞা করুন। বি। আপনাদের প্রকৃত পরিচয় প্রাপ্ত হলে পরমাপ্যায়িত হই। দ। এই কথা? তা একি অনুরােধ ? যুবরাজ! ইনি বালাণ্ডার অধিপতি রাজা চন্দ্রকেতুর কন্যা—নাম মালতী; ইনি এর সােদর তুল্য চির-প্রিয়-সঙ্গিনী—নাম চপলা। আর এরা আমার ছাত্রী-এ অভাগীর নাম দয়াবতী। বি। আপনাবিগের বাটী কোথায় ? দ। বালা নগরী। * মালতী। দ্বিতীয় বি। আপনারা কোথায় গিয়েছিলেন? দ। তীর্থ পৰ্য্যটনে। বি। আপনারা অতিশয় ভয়ানক সময়ে বাটীর বাহির হয়েছেন। জানেন ত এখন ভারতের প্রায় সৰ্ব্বস্থানেই দুই যবনের পরিভ্রমণ কচ্চে, ভারতবাসীরা সদাই সশঙ্কিত। ঈশ্বর না করুন, কখন কি বিপদ ঘটে, এই আশঙ্কায় সকলেই এক প্রকার জীবন্ত হয়ে রয়েছে। এমন ভয়ঙ্কর সময়ে এই দুটা সুন্দরী যুবতীকে সঙ্গে নিয়ে তীর্থ পৰ্যটনে যাওয়া, আমার মতে যুক্তিসিদ্ধ হয় নাই। যা হক ঈশ্বর রক্ষাকর্তা। আর এক কা-আপনারা ক.এ বনে প্রবেশ করেছিলেন ? দ। আমরা যখন দেখলেম যে আপনি দস্যুদের প্রায় অর্ধেক লােককে নষ্ট করেছেন, বাকিগুল আপনার আপনার প্রাণ রক্ষার জন্য ব্যাকুল, আর আমাদের উপর তত লক্ষ্য ছিল না, সেই সুযােগে আমরা সসব্যস্ত হয়ে এই বনে প্রবেশ কল্লেম। বি। বেশ করেছিলেন, সদ্বুদ্ধির কাৰ্য করেছিলেন। আমি দস্যুদের সমুচিত শাস্তি দিয়ে আপনাদের অনুসন্ধান করেছিলেম। পরে দেখা না পাওয়াতে ভাবলেম যে, আপনারা কোন লােকালয়ে গিয়েছেন। এ বনে যে প্রবেশ করেছিলেন, তা আমি ঘুণাগ্রেও মনে করি নাই। আরও গত রাত্রে যে কোন অমঙ্গল ঘটে নাই এই মঙ্গল। দ। ঈশ্বর রক্ষাকর্তা। বি। এখন আপনারা কোথা হতে আসছেন ? • কাশীধাম হতে। বি। কাশীধামে তীর্থ ভিন্ন আর কি প্রয়ােজন ছিল ? দ। কাশীশ্বরের কন্যার সহিত সাক্ষাৎ করবার প্রয়ােজন ছিল। বি। সাক্ষাৎ হয়েছে ? দ। হয়েছে, কিন্তু না হলেই ভাল ছিল। বি।কেন-কেন ? দ। কারণ কাশীশ্বর এখন যবন কর্তৃক সিংহাসনচ্যুত হয়েছেন। এখন রাজপরিবারের যেরূপ দুরবস্থা হয়েছে, আহা! “তা-দেখলে পাষাণ গর্ভাব্দ । প্রথম অঙ্ক। হৃদয় ব্যক্তিরও বক্ষঃস্থল বিদীর্ণ হয়। তাই বলচি সাক্ষাৎ না করাই ভাল ছিল। বি। সেকি! কাশীশ্বর এর মধ্যেই যবন কর্তৃক সিংহাসনচ্যুত হয়ে- ছেন? আমি না তার সাহায্যার্থে যাত্রা করেছিলেম? আমি পৌছতে না পোঁছতেই দুষ্টেরা তাকে সিংহাসনভ্রষ্ট কল্লে? (পরিক্রমণ) লছ মন সিংহের পুনঃ প্রবেশ। ল। যুবরাজ! শিবিকা প্রস্তুত। বি। দেবি। যদি কোন বিশেষ আপত্তি না থাকে, তা হলে শিবিরে গমন করে, একটু বিশ্রাম কল্পে হয় না—শিবিকা প্রস্তুত। দ। যিনি আমাদের জীবন-দাতা, তার আশ্রয় নিতে কি বাধা কি আপত্তি আছে? এত আপনার অনুগ্রহ। এক্ষণে আশীর্বাদ করি, আপনি জীর্ঘজীবি হউন, কখন যেন বিপদ আপনাকে আশ্রয় না করে, সদা সুখে স্ত্রী পুত্র নিয়ে কাল যাপন করুন। সকলের প্রস্থান।
দ্বিতীয় অঙ্ক।
প্রথম গর্ভা।
রাজমহল প্রান্তরস্থ-পটগৃহ।
মালতী ও চপলা আসীন।
চপ। (স্বগত) যা ভেবেছিলেম তাই ঘটেছে, তা না হলে সদাসর্বদা
অন্যমনস্ক থাকবেন কেন? সে অতুল রূপরাশি দিন দিন মলিন হবে কেন?
শেয়ানায় শেয়ানায় কোলাকুলি আড়াই হাত তফাত, তাকি আমার বুঝতে
বাকি থাকে? তা হলে মালতী কি নির্বোধ ! লজ্জায় আমার কাছে ওর
মনের ভাব গোপন করে রাখচেন, তা দেখি কত দিন এ ভাব থাকে। আমিও
কিছু বলব না, রােগীর মুখেই রোগ ব্যাক্ত করাব (প্রকাশ্যে) সখি ! কেমন
সুন্দর রূপ; (মালতীকে নিরুত্তর দেখিয়া স্বগত) তাইত অষুধ যে ধরেচে
দেখতে পাচ্চি, এর মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছেন, সম্পূর্ণ বিকার, একেবারে বাকৃ-
রােধ এ অষুধের এই গুণ (প্রকাশ্যে) সখি! কেমন রূপ বল দেখি?
মালতী। কার।
চপ। তােমার মনে যাগছে রূপ যার, যিনি কেড়ে নিয়েছেন মনটা
তােমার।
মাল। মুখে আগুন তােমার, কার রূপ জাগছে ? কে আমার মন
কেড়ে নিয়েছে ?
চপ। যে তােমায় বঁড়ীতে গেঁতে প্রাণ ভরে খেলাচ্চে?
মাল। এখন ঠাট্টা ছাড়, পষ্ট করে বল।
চপ। বলি তবে রাগকরবে না সেই যুবরাজ।
মাল। কোন যুবরাজ।
'চপ। কেন? তুমি কি তাকে চেন?
১ চপ। •[ ১ম গর্ভাঙ্ক ] দ্বিতীয় অঙ্ক। মাল। চেনবার হলে অবশ্যই চিনতেন। তােমার মনকে জিজ্ঞাসা কর দেখি সে চেনে কি না ? মাল। তুমি ছোঁদো কথা ছেড়ে-পষ্ট করে বল কোন যুবরাজের কথা বলছাে ? চপ। কেন? হাতে কি দু চারটে যুবরাজ আছে না কি, তাই কোনটা ঠিক করুতে পাচ্ছ না? মাল। যা, আমি আর তাের সঙ্গে কথা কব না। চপ। ডুবে ডুবে খেলে জল দেখা নাহি যায়। কিন্তু ভাই লক্ষণেতে পরিচয় পায়। মাল। ডুবে জল খাব কেন ? চপ। বুঝেছি মনের ভাব নুকুলে কি রবে ? আজ কিম্বা কাল ভাই জানা জানি হবে। মাল। আমার মনের ভাব তুমি কি বুঝেছ ? চপ। ভাঁড়াইতে পারে তােক আর সবাকারে। ছাপাইতে সঙ্গি জনে কিন্তু কেহ নারে। মাল। কৈ আমি কোন কথা সঙ্গিকে ভাড়াই নাই। চপ। (কপট-ক্রোধে) কি ভাড়াও নাই ? মাল। না। চপ। আমার মাথা ছুয়ে বল দেখি তুমি যুবরাজ বিজয়কেতুর প্রণয়া- কাহ্মীনী হয়েছ কি না ? মাল। (লজ্জায় অপােবদন) দয়াবতীর প্রবেশ। মাল। ধাই মা আর কত দিন এখানে থাকতে হবে, প্রায় ১৫ দিন হয়ে গেল বাড়ী যাবার ত কোন উদ্যোগ দেখছি না, আপনি উদ্যোগ করুন, আমার মন বড় চঞ্চল হয়েছ, আর এখানে একদণ্ডও থাকতে ইচ্ছা হচ্ছে না। দয়া। আর ভেবনা মা আমাদের শীঘ্রই যাওয়া হবে। মাল। কবে ?
মাগত।।
1 এখন
-
বয়া। আজই—এই দণ্ডে।
মাল। আমার দিব্বি, বলুন দেখি আজ কি যাওয়া হবে ।
দয়া। হ্যা আজ-ই আমি কি মিথ্যা কথা বলছি।
মাল। আমরা কিসে যাব ধাই মা?
দয়া। নৌকায়।
মাল। আবার নৌকায় ?
দয়া। ভয় কি ?
মাল। নৌকা কোথা পাবে ?
দয়া। যুবরাজের অনুগ্রহে নৌকা প্রস্তুত হচ্ছে।
মাল। নৌকাতেও যদি মুসলমানের দৌরাত্ম করে ?
দয়া। কবে যমালয় যাবে।
মাল। কে পাঠাবে ?
দয়া। কেন যুবরাজ স্বয়ং।
মাল। ধাই মা ! যুবরাজ কি আমাদের সঙ্গে যাবেন।
দয়া। হা যাবেন।
চপ। (স্বগতঃ) আঃ আমার প্রাণটা জুড়াল, আমি বাঁচলুম, কবিরাজ
সঙ্গে না থাকলে কি রােগীর প্রাণ বাচান যায়।
লছমন সিংহের প্রবেশ।
লছ। আপনারা সকলে আমার সঙ্গে আসুন নৌকা প্রস্তুত, যুবরাজও
সজ্জিত হয়ে আপনাদের জন্য গঙ্গাকুলে অপেক্ষা কচ্ছেন।
দয়া। কোন ঘাটে নৌকা আছে ?
লছ। নিকটের ঘাটটা অত্যন্ত কদর্ঘ্য এজন্য একটু তফাতে যেতে হবে।
দয়া। আচ্ছা চল।
সকলের প্রস্থান।
.
গর্ভাঙ্ক ]
১১
দ্বিতীয় অঙ্ক।
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
গঙ্গাকুল।
যুবরাজ বিজয়কেতু, দয়াবতী, মালতী, চপলা ও রসিকরাজ,
এই ৫টী আরােহী সহিত একখানি নৌকা আসিতেছে।
দাঁড়ি ও মাঝির গীত।
আরে ও বড় বড় ঢেউরে দেখে হাল ছেড় না মন।
হরি হরি বলে সবাই কোসে ওজন টান ভােলা মন রে
পিতে বল, মিতে বল, কেউ কারু নয় ভাই,
চোক বুজলে সব ফুরিয়ে যাবে, পুড়ে হবি ছাই ।
রাজার পাপে রাজ্যি গেল, হচ্চে বড় গােল ;
গণেশের মা ভিক্ষে দিচ্চে, পাগলে বাজায় ঢােল ।
(গীতান্তে হাওয়া উঠিল।
বি। ওরে এইখানে নৌকা বাঁধ, একটা হাওয়া উঠল। তােরা খাওয়া
দাওয়া করবিনে ?
দ। এজ্ঞে হা।
.
বিজয়কেতু ও রসিকরাজ অবতরণ করিলেন।
বি। আপনারা একটু অপেক্ষা করুন, আমরা কিছু খাদ্য সামগ্রী
নিয়ে আসি।
দ। সত্বরেই আসবেন।
বি। আজ্ঞা হা—এখনি আসবে।
উভয়ের প্রস্থান।
১২ মালতী। [ দ্বিতীয় দ। মালতি, চাপা ! চল দেখি একটু ওপরে ওঠা যাক। মাঝি। না মা ঠাকরুণরা, আপনারা উঠবেন না। মা। যখন বারণ কচ্চে তখন উঠে কাজ নাই। আর কতদূর যেতে হবে ধাই মা ? দ। এখনও অনেক দূর যেতে হবে। মা। আচ্ছা আমরা কতদূর এসেছি ? দ। মােটে ৪৫ ক্রোশ এসেছি। বৃষ্টি ও ঝড় বৃদ্ধি হইল। 'দ। ওমা ঝড় উঠল যে—বৃষ্টিও এল। মাঝি । মা ঠাকরুণ, ঐ জন্যেই বারণ কচ্ছিলেম উপরে উঠবেন না, এখনই নৌকা ছেড়ে দিতে হবে। দূ। এখনি ছাড়বি কিরে ? যুবরাজ যে বাইরে গেছেন ? মাঝি। বাইরে গেছেন তা আমরা কি করব ! যে ঝড় উঠল এতে কি নৌকো বেঁধে রাখা যায়? নৌকো বাধা থাকলে কি আর রক্ষা থাকবে ? ঈস্ আর রাখতে পারিনে ! ( নৌকা খুলিয়া দিল) ঝড় ক্রমশঃ বৃদ্ধি হইল, মাঝিরা চিৎকার করিতে লাগিল ও কিঞ্চিৎ পরে নৌকা জলমগ্ন হইল। A বিজয়কেতু ও রসিকরাজের প্রবেশ। বি। কৈ বয়স্য নৌকা কৈ ? আমরা কি সেই স্থানেই এসেছি ? রসি। আমরা ত সেই স্থানেই এসেছি বটে, কিন্তু নৌকাত দেখতে পাচ্ছিনা। বি। তবে কি ‘ঝড়ের ভয়ে নৌকা খুলে দিয়েছে? ঝড়ও ত এখন বিলক্ষণ রয়েছে। বসি। তবে নিশ্চয় নৌকা খুলে দিয়েছে। বি। ' তাহলে ত ভাল বােধ হচ্ছে না–গঙ্গায় ত একখানি
গর্ভাঙ্ক ]
দ্বিতীয় অঙ্ক।
নৌকা দেখতে পাচ্ছি না। আমার যে ভাল বােধ হচ্ছে না, সর্বনাশ ত
হয় নাই ?
রসি। যখন এটা একটা আঘাটা, বােধ হয় মাঝিরা এ স্থান ত্যাগ
করে অন্য কোন নিরাপদ স্থানে নৌকা নিয়ে গিয়ে থাকবে।
বি। তােমার এ আশ্বাস বাক্য আমার মনে স্থান পাচ্ছে না।
রসি। আপনি কি মনে কচ্ছেন যে মাজিরা এখন নৌকা খুলে
দিয়েছে ? কখনই না, নিশ্চয়ই তারা অন্য স্থানে নিয়ে গেছে ।
বি। তাই যেন হয় (ইতস্ততঃ দেখিতে দেখিতে) ঐ না কি একটা
পড়ে রয়েছে ?
রসিক। কই যুবরাজ ?
বিজয়। ঐ যে অন্ধকারে ভাল দেখা যাচ্ছে না, এস দেখি নিকটে গিয়ে
দেখা যাক।
উভয়ের প্রস্থান।
বি। (নেপথ্যে) একি, এযে একটা মৃত দেহ!
রসি। (নেপথ্যে) তাইত ! চলুন ঐ দিকে নিয়ে যাওয়া যাক (একটা
মৃত দেহ বহন করিয়া উভয়ের প্রবেশ)
বি। (দেহ রাখিয়া) বয়স্য এযে স্ত্রীলােক ! ঈএকি! ইনি যে দয়া-
বতী ! কি সর্বনাশ! তবে নৌকা জলমগ্ন হয়েছে, বয়স্য এখনও এর
নিশ্বাস বচ্ছে এখনও জীবিত আছেন (দুইজনে শুশ্রুষা আরম্ভ করিলেন)
দ। (চৈতন্য পাইয়া) আপনি কে ?
বি। আমি বিজয়কেতু নৌকা কোথায় ? মালতী কোথায়? চপলা
কোথায় ?
দ। ( ক্ষীণস্বরে) সব জলমগ্ন হয়েছে, কে কোথায় গেছে কিছুই
জানি না।
বি। কি সৰ্ব্বনাশ! সকলে জলমগ্ন হয়েছেন? রসিক! তুমি শীঘ্র
কিনারায় কিনারায় দেখতে দেখতে যাও, আমি একে শুশ্রুষা করি।
তৃতীয় অঙ্ক। প্রথম গর্ভাঙ্ক। বালাণ্ডা-রাজা চন্দ্রকেতুর সভা। চন্দ্রকেতু সিংহাসনে মৌনভাবে—পাশ্বে মন্ত্রী ও চতুর্দিকে সভাসদগণ যথাযথ স্থানে উপবিষ্ট। রাজা। মন্ত্রি ! বহুদিবস গত হ’ল বৃদ্ধ ভূপতি লক্ষ্মণসেনের কোন সংবাদ পাওয়াতে অত্যন্ত ব্যাকুল হয়েছি। জনরবে শুনতে পাচ্ছি, কতদূরু সত্য বলতে পারি না, কুতবুদ্দিনের প্রেরিত সেনাপতি বখতিয়ার খিলিজি নাকি সসৈন্যে বঙ্গে অবতীর্ণ হয়েছে। বঙ্গেশ্বর ভীরু স্বভাব বিশিষ্ট, বৃদ্ধ, ও যুদ্ধ বিষয়ে অত্যন্ত অনভিজ্ঞ । আর হিন্দুধৰ্ম্ম বিরােধী মুসলমানেরা বলিষ্ঠ, কষ্টসহ, রণ-দক্ষ ও কপট। অনেক হিন্দু ভূপতি তাদের নিকট পরাজিত হওয়াতে, দুরাচারেরা জয়মদে মত্ত হয়ে ভারতবাসীগণকে একেবারে পদদলিত কচ্ছে, পাপিদের দমনের জন্য চেষ্টা কচ্চেন না। মন্ত্রি ! কি আক্ষেপের বিষয় ! ভারত মাতা চিরকাল স্বাধীন থেকে, এখন কিনা পরাধী- নতা নিগড় পদে ধারণ কল্লেন। ক্ষত্রিয় ভূপতিরা যে কি ভেবে এ অসহ অবমাননা সহ কচ্ছে তা কিছুই ভেবে স্থির কত্তে পাচ্ছি না। তারা কি ক্ষণকালের জন্য একবার মাত্রও ভাবচেন না, যে স্বাধীনতা গেলে তাদের দুবৃত্ত যবনদের আজ্ঞানুবর্তি হয়ে থাকতে হবে ? ঈশ্বর না করুন, যদি এরূপই ঘটে, তাহলে তাদের শ্রেষ্ঠ পদাভিমান আর বাহুবলের গরিমা কোথায় থাকবে ? মন্ত্রিবর! ভাব দেখি তাহলে কি শশাচনীয় অবস্থাই হবে ? আরও দেখ ভারতে কোটি কোটি হিন্দু থাকতে কতিপয় বিদেশী মুসলমান এসে অল্প আয়াসেই জয়লাভ করবার বিশেষ চেষ্টা করছে। সকলে এক প্রাণ হয়ে তাদের ভারত হতে বহিস্কৃত কত্তে পাচ্ছেন না। এখন দেখছে যে চির- । ১ম গৰ্ভাৰু ] তৃতীয় অঙ্ক। কালের জন্যে অমুল্য স্বাধীনতাধনে বিসর্জন দিয়ে দাসত্বশৃঙ্খলে আবদ্ধ হচ্ছে, তথাচ চিরশত্রুর উচ্ছেদ সাধনে ক্ষণকালের জন্যও যত্নশীল হচ্ছে না। অধুনা ভারতের যেরূপ অবসন্নাবস্থা ঘটছে তাতে যে জরাজীর্ণ স্থাবর ভূপতিরা দুরন্ত ষবনবেগ নিবারণ কত্তে পারেন, এমন ত বিশ্বাস হয় না। আর তাদের অধঃপতনে আমাদিগকেও তাদের অনুগামী হতে হবে। মন্ত্রি। মহারাজ! যা আজ্ঞা কচ্ছেন তা সকলই সত্য, তবে ভাবি অনিষ্ট আশঙ্কায় মনকে প্রপীড়িত করূবেন না। বঙ্গেশ্বরের জন্য আপনি চিন্তিত হবেন না, তিনি নিশ্চয়ই স্বীয় অসংখ্য সেনাবলে বিশাল রাজ্য রক্ষা কবেন, যবনেরা কখনই তঁার প্রতাপরাশির ন্যূনতা কত্তে সক্ষম হবে ; আর যবন পরাজিত ভূপতিগণও এই উদ্যোগে শত্রুবল খৰ্ব কত্তে উৎসাহিত হবেন, কেহই বৈরনিৰ্যাতনে পরাজুখ হবেন না। রাজা। মন্ত্রিবর! দুঃখের সময় হাসি এল। তুমি কি মনে কষ্ট যে সিংহাসন ভ্রষ্ট ক্ষত্রিয় মহীপালেরা যবন প্রতিকূলে শস্ত্রপাণি হবেন? তা ভ্রমেও বিশ্বাস করে না। ওটি বর্তমান হিন্দুদের স্বভাবের একান্ত বিপরীত। আধুনিক হিন্দুরাজগণ একতা বিরহিত, বীর্যহীন আর বিলাস প্রিয়। আর এই বিলাস-প্রিয়তাই সকল অনিষ্ঠের মূল। কাহারও কণিকামাত্র বিষ নাই, অথচ কুলার ন্যায় প্রশস্ত চত্রু ধরে আছেন। মন্ত্রি ! তুমি অবধারিত জেনাে যে কেহই লক্ষ্মণসেনের সহায়তা করবেন না, বরং বিপক্ষের আশ্রয় নেবেন। মন্ত্রী। মহারাজ বঙ্গেশ্বরের অন্যের আনুকুল্যের আবশ্যকতা নাই তিনি স্বীয় সেনাবলে দুরাচার দস্যু যবনদিগকে দূরীভূত কত্তে সক্ষম হবেন। রাজা। বীৰ্য্যহীন গমনক্ষম ব্যক্তি বদ্ধ পরিকর হয়ে রণদুৰ্ম্মদ ধন বিবােধী হয়ে তাদের সম্মুখীন হবে একথা আকাশকুসুমবৎ অসম্ভব। আর বৃথা সাহসের উপর নির্ভর করে অস্ত্রধারী হলেই বা কি হবে, বসুমতী বীরাধীন, তিনি কখনই বীৰ্য্যহীনের আশ্রয় গ্রহণ করেন না। মস্ত্রি। মহারাজ। আপনি যতই কারণ দর্শান, যবনেরা কখনই বঙ্গে জয়লাভ কতে পারবে না। লা। কে ক্লেশপদ হবে ?
১৬ মালতী। [ প্রথম মন্ত্রী। কোন না কোন সংগ্রাম-কুশল ব্যক্তি। রাজা। মন্ত্রি ! কর্ণধার বিহীন তরণী কতক্ষণ ভাসমান থাকৃতে পারে ? আমি দিব্য চক্ষে উপস্থিত বিপদের চরম ফল দেখতে পাচ্ছি। এ যাত্রা বঙ্গবাসীগণের কিছুতেই নিস্তার নাই। মন্ত্রি। কিন্তু মহারাজ। তাই বলে কি একেবারে হতাশ হওয়া উচিত ? যতক্ষণ ক্ষমতা থাকবে ততক্ষণ কি বিধিমতে রক্ষা করবার চেষ্টা করা উচিত নয় ? পরে ফলাফল দৈবাধীন। দৈব কৃপা ভিন্ন সুফল প্রাপ্তির অন্য উপায় নাই। রাজা। মন্ত্রি ! তােমার শেষ কথাটি আমার মনে স্থান প্রাপ্ত হল, আমার বেশ বােধ হচ্ছে দৈব-ক্রোধে উপস্থিত বিপদ বীজ অঙ্কুরিত হয়েছে, মঙ্গল আচরণ কাৰ্যানুষ্ঠানে দৈব-ক্রোধের শান্তি করতে পারলে অবশ্যই এ ঘাের বিপদ হতে মুক্তি লাভ করবে। মন্ত্রি। মহারাজ এ অতি উত্তম কাৰ্য্য; আমাদের ধর্ম শাস্ত্রানুসারে এ অবশ্য কর্তব্য কৰ্ম্ম, করবার কোন ব্যাঘাত নাই। রাজা। তবে আর বিলম্ব কেন, যত শীঘ্রই এ শুভ কাৰ্য্য সম্পন্ন হয় ততই মঙ্গল। শান্তশীল কারাধ্যক্ষের প্রবেশ-প্রণাম ও কুণ্ঠিতভাবে দণ্ডায়মান। রাজা। কি সংবাদ শান্তশীল ? শান্ত। মহারাজ বড় ভয়ানক সংবাদ, অভয় দান দিলে এ দাস শ্রীচরণে নিবেদন করতে পারে। রাজা। কি ভয়ানক সংবাদ ? অভয় দিলাম শীঘ্র বল ? : শান্ত। মহারাজ! আমি এক বিষয়ে মহারাজের চরণে বিশেষ অপ- রাধি হয়েছি। রাজা। কি বিষয়ে অপরাধি হয়েছ শীঘ্র বল ? শান্ত। মহারাজ! দুবৃত্ত যবন ভৃত্য দুরাচার রাম হাজরা কারাগার হতে সকলের অজ্ঞাতে পলায়ন করেছে।
{ [ ১ম গর্ভাঙ্ক ] তৃতীয় অঙ্ক। রাজা। কি সৰ্ব্বনাশ!বাম হাজরা পলায়ন করেছে? কি করে পলায়ন করেছে শান্তশীল ? শান্ত। মহারাজ! তা আমরা অগ্রে জ্ঞাত হতে পারি নাই। অনেক তদন্তের পর এখন জ্ঞাত হয়েছি যে, কারাগারের দক্ষিণ দিকে একটা গুপ্ত দ্বার ছিল, দ্বারটা জীর্ণ হওয়াতে দুরাচার কোন প্রকারে সেটা ভগ্ন করে সেই পথ অবলম্বন করে পলায়ন করেছে। রাজা। কি ? দক্ষিণ দিকের গুপ্ত দ্বার জীর্ণ ছিল? তুমি তা পূৰ্ব্বে লক্ষ কর নাই ? উঃ কি ভয়ানক সংবাদ শান্তশীল তুমি এখন আমায় দিলে । আমার বিলাসভবন ধূলিশায়ী হলেও তত ক্ষতি বােধ হয় না, যত বােধ হয় কারাগার সামান্য জীর্ণ থাকলে। তুমি জান যে রাম হাজরা একজন দুবৃত্ত দ, আমি অনেক কষ্টে ও দুষ্টকে বন্দী করেছিলেন, সেই দুরাচার আজ সকলের অজ্ঞাতে পলায়ন করছে ? যখন পলায়ন করেছে তখন আর তােমায় বৃথা ভৎসনা করে কি করবাে, কবে পলায়ন করেছে ? শান্ত। মহারাজ। কত দিন যে পলায়ন করেছে তা আমি বলতে পারি , তবে প্রায় এক পক্ষ হল কারাগারের প্রহরীর মুখে তার পলায়ন সংবাদ শুনেছি। রাজা। তবে এত দিন আমায় বল নাই কেন ? শান্ত। মহারাজ! প্রহরীর মুখে এসংবাদ শুনে পাপিষ্ঠকে ধৃত করতে বিশেষ চেষ্টা করেছিলেম, ইচ্ছা ছিল ধৃত করতে পারলে এসংবাদ আর মহারাজের কর্ণগােচর করব না, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ কোন স্থানে তার অনুসন্ধান না পাওয়াতে অবশেষে মহারাজের সুগােচর করতে এসেছি। রাজা। দেখ মন্ত্রি! রামহাজরা একজন সহজ লােক নয়,তার অকার্য্য এ জগতে কিছুই নাই, সকল কাৰ্যই সে অসঙ্কোচচিত্তে সম্পন্ন করতে পারে। একে সে দুশ্চরিত্রের লোেক, তাতে আবার যৎপরােনাকি কারাকষ্ট পেয়েছে, এ অবস্থায় সে দুরাচার কোননা কোন অনিষ্ট চেষ্টা করে কখনই ক্ষান্ত থাকবে না, সে বৈরনির্যাতনে কান্ত থাকবার লােক নৃয়, আরও জেন সে একজন যবনচর। মস্ত্রি! অবিলম্বে এ দুরাচারকে ধৃত করতে ধত্বশীল হও, নতুবা আমি দিব্যচক্ষে দেখতে পাচ্ছি অচিরে কোর্স দুর্নিবার বিপদ ৰাজ্য মধ্যে ঘটবে।
মালতী। { প্রথম লালসিং গুপ্তচরের প্রবেশ । লাল। মহারাজ! অভিবাদন করি। রাজা। কি সংবাদ লালসিং ? বঙ্গেশ্বর বৃক্ষ লক্ষনসেনের কোন সংবাদ জ্ঞাত হয়েছে কি ? লাল। মহারাজ! জ্ঞাত হয়েছি, কিন্তু এসংবাদ অতি অশুভ। রাজা- কি প্রকার অশুভ ? লাল। বঙ্গের যবনকর্তৃক সিংহাসনচ্যুত হয়েছেন। রাজা। কি ? বঙ্গেশ্বর সিংহাসনচ্যুত হয়েছেন ? কৈ যুদ্ধের তাে কোন সংবাদ পাই নাই ? লাল। মহারাজ! যুদ্ধ হয় নাই অথচ বঙ্গেশ্বর সিংহাসনভ্রষ্ট হয়েছেন। রাজা। বিনাযুদ্ধে কি করে বঙ্গেশ্বর সিংহাসনচ্যুত হলেন? লাল। মন্ত্রীর বিশ্বাষঘাতকতায়। রাজা। কি ? মন্ত্রীর বিশ্বাষঘাতকতায় ? সে কি করেছিল? ( লাল। মহারাজ! সে অতি ভয়ানক কথা। মন্ত্রী গােপনভাবে মুসল- মানদের পক্ষে যােগ দিয়ে বঙ্গেশ্বরকে নানাপ্রকার বিভীষিকা দেখিয়ে এতদূর ত্রাশিত করেছিল যে, তিনি কিছুতেই যবনদের প্রতিকূলে অস্ত্রধারণ করতে সাহসী হতে পারেন নাই। মহারাজ! সে দুঃখের কথা আর কি বলবাে বলতে হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে যায়, কেবলমাত্র ১৭ জন মুসলমান অশ্বারােহী সৈন্য এসে তাকে সিংহাসনভ্রষ্ট করেছে। রাজা। সক্রোধে) কি বললে? ১৭ জনমাত্র দস্যু এসে বঙ্গেশ্বরকে সিংহা- সন চুত করেছে ? (গাত্রোখান) ক্ষান্ত হও, লাল সিং ক্ষান্ত হও,আর শুনতে চাই না, আমি স্ত্রীর অঞ্চলধারী বিলাসপ্রিয় কাপুরুষ নই, তাহলে তােমার এ সংবাদে আনন্দিত হতেম, ছি ছি ছি । কি ঘৃণার কথা ! কি লজ্জার বিষয়! ১৭ জন দত্যুতে রাজ্য অধিকার করলে ? বঙ্গে কি বীর নাই ? ভারত- মাতা কি বীরশূন্য হয়েছেন ? হা বীর্যবান পূর্বপুরুষগণ! তােমাদের সন্তান- ধের ক্রিয়াকলাপ একবার এসে স্বচক্ষে দেখ। উঃ আর সত্য হয় না, বঙ্গ। জনশুন্য ভীষণ অরণ্যে পরিণত হক, বালুকাময় মরুভূমি হুকু, জলপ্লাবিত ১১ গর্ভাঙ্ক ] তৃতীয় অঙ্ক। হক, শৃগালের আবাসভূমি হক্, রসাতলে যাক্, বঙ্গবাসীদের হৃদয়ে শত শেল বিদ্ধ হক, আর বঙ্গের জন্য ভাব্ব না, আর বঙ্গের হিত কামনায় সচেষ্টিত হব না, বঙ্গ যবন অস্ত্রানলে ভস্মিভূত হক্, চতুর্দিকে হাহারব উঠুক। প্রতিহারির প্রবেশ। প্রতি। মহারাজ! একজন ভেকধারি দ্বারদেশে দণ্ডায়মান অনুমানে যবন বলে বােধ হল। রাজা। কি ? ভেকধারি যবন ? কেন এসেছে জ্ঞাত হয়েছ ? প্রতি। তার প্রার্থনা সভাস্থলে এসে মহারাজের সহিত সাক্ষাৎ করে। রাজা। কি ? যবন? বালাণ্ডায় যবন? বালাণ্ডার রাজদ্বারে যবন দণ্ডায়- মান ? যে যবন কাপট্যে লক্ষ্মণসেনকে সিংহাসনভ্রষ্ট করেছে, যে যবন হিন্দুর চিরশত্রু,যে যবন ভারত-স্বাধীনতা হরণে সংকল্প করেছে, যে যবন পতিপ্রাণা সতীর সতীত্ব নষ্ট করতে কণামাত্র কুষ্ঠিত হয় না, যে যবন হিন্দুধর্ম বিদ্বেষী, সেই দুরাচার চক্ষুশূল যবন আজ আমার সভায় আতে চায়? আমি তার মুখ দেখব ? তার সঙ্গে কথা কব ? আমায় ধিক, আমার জীবনে ধিক,আমার বাহুবলে ধিক, আমার স্কুল দেহধারণে ধিক, আমি আৰ্য ক্ষত্রিয়বংশে জন্ম- গ্রহণ করে এখন পর্য্যন্ত দগণকে দুরিভূত করতে পাল্লেম না ? এখন পৰ্যন্ত পাপিষ্ঠেরা নির্ভয়ে ভারতে বিচরণ করূছে ? আজ পর্যন্ত দুষ্টদিগকে, দমন করতে পাল্লেম না? রে কুরমতি যবন! তুই কি কু-অভিসন্ধিতে এখানে এসেছিস? তুই কি মনে করেছিস চন্দ্রকেতু লক্ষণসেনের ন্যায় কাপুরুষ ? তুই কি মনে করেছিল ছলে কৌশলে আমার সিংহাসন অধিকার করবি? তা কখনই মনে করিসূনে, আমি নাড়ি টেপার বংশসস্তুত নই, আমি মহাবীৰ্যবান ক্ষত্রিয়বংশােদ্ভব, ক্ষত্রিয়েরা প্রাণ থাকতে কারও নিকট অধীনতা স্বীকার করে না। মন্ত্রী। মহারাজ! ক্রোধ সম্বরণ করুন,আগন্তুক যবন,কি কোন ধর্মপরা- যুণ ব্যক্তি কি শত্ৰুচর—এবং কেনই বা এসেছে, তার বিশেষ তদন্ত না করে কোপাবিষ্ট হওয়া অবৈধ। ভেবে দেখুন, আগন্তুক ব্যক্তি শচর বা যবন ২ মালতী। [ প্রথম গর্ভাৰু ? হয়ে যদি কোন সাধু ব্যক্তি মহারাজকে আশীর্বাদ কত্তে এসে থাকেন, তাহলে তার অবমাননা করা উচিত নয়। ধর্মপরায়ণ ব্যক্তির কোপাগ্নিতে তুলারাশীর ন্যায় সকলকে ভস্মিভূত হতে হবে। আমার মতে আগন্তুক শত্রু- পক্ষ লােকই হন বা ঘােগীই হন যত্নপূৰ্ব্বক সভাস্থলে আনাই কর্তব্য। কারণ যদি যবনই হয়, তাহলে তার কূট প্রশ্নে তার আন্তরিক ভাব জ্ঞাত হওয়া যাবে,কখনই বাক্যাবরণে মনের ভাব গােপন করে রাখতে পারবে না। রাজা। মন্ত্রি ! তুমি অবধারিত জেন, আগন্তুক কখনই ধর্মপরায়ণ ব্যক্তি নয়, কোন ছদ্মবেশী যবনচর গৃহ সন্ধান নিতে এসেছে। যবনের কাপটে বঙ্গে জয়পতাকা উড্ডািয়মান কচ্চে মাত্র, আধিপত্য এখনপর্যন্ত স্থাপন কত্তে পারে নাই। কেন না বঙ্গে অনেক করদভূপতি আছেন, তারা আমার ন্যায় কেহই অদ্যাবধি যবনদের অধীনতা স্বীকার করেন নাই,সেই কারণে আমার বােধ হচ্ছে অচীরে একটা মহা যুদ্ধ উপস্থিত হবে। এই সময়ে দুষ্ট দমনে উদ্যোগি না হলে পরে অতিশয় অনিষ্ট সম্ভাবনা। মন্ত্রি ! আগন্তুক ছদ্মবেশী যবন ভিন্ন আর কেহই নয়। মন্ত্রী। মহারাজ! আগন্তুক যে যবন নয় একজন ধর্মাত্মা, একথা আমি বলছি না, কিম্বা যবন দমনে নিবৃত্ত থাকতেও আপনাকে বলছি না, আমার বলবার উদ্দেশ্য এই, আগন্তুক কে, আর কেনই বা এসেছে, অগ্রে তা জ্ঞাত হওয়া কর্তব্য, পরে যখন প্রকাশ পাবে যে, বিপক্ষের লােক ছদ্মবেশে এসেছে তখন স্থির বুদ্ধিতে বিবেচনা করে যা কর্তব্য বলে স্থিরীকৃত হবে তাই কাৰ্ঘ্যে পরিণত করা যাবে, রােষ পরবশ হয়ে সহসা কোন কাৰ্য করলে পরিণামে পরিতাপ করতে হয়। রাজা। আচ্ছা মন্ত্রি, তােমার কথায় আগন্তুককে সভায় আনুতে সম্মত হলেম, কিন্তু দেখাে সে দুষ্ট যবন ভিন্ন আর কেহই নয়। মন্ত্রী। প্রতিহারি, ! তুমি আগন্তুককে সঙ্গে করে নিয়ে এস। প্রতি যে আল্লা। প্রদান।
( ২৪ গভাঙ্ক ) তৃতীয় অঙ্ক। দ্বিতীয় গর্ভক্ষ রাজপথ। একহাড়ি ক্ষীর হস্তে কমলাকান্তের প্রবেশ। কম। আমাদের সঙ্গে নিমন্ত্রণ গুলার কেমন আকর্ষণীয় সম্বন্ধ, অদৃষ্টে থাকলেই হয়। আঃ ব্যাটা জালালে নেপথ্য দেখিয়া) ওরে চলে অয়না? সব মাটী যে মাড়িয়ে আসছিস্? বেলাটাও অধিক হয়েছে, ক্ষুধা তৃষ্ণায় প্রাণটা ধড়ফড় করছে, আর কথা বেরুচ্ছে না। (নেপথ্যাভিমুখে) ওরে এলি ? কচ্চিস কি? এই ক্ষীর হাড়িটী রয়েছে, এই ক্ষুধার সময় যে একটু খাব তার বাে নাই, তাহলে ব্রাহ্মণী একেবারে আমার সপিণ্ডকরণ পর্যন্ত করে ফেলবেন। নেপথ্যাভিমুখে) ওরে আয় না ? (নেপথ্যে) এই যে যাচ্ছি, অত কচকচি কচ্চ কেন? মোর সরিল আর সরিল নয়। ওঃ মাথায় একটা তরমুজের বোটা আছে বলে কথাতে একেবারে দুনিয়াটা কিনে রেখেছ আর কি? একটা পুটুলি মাথায় ভৃত্য হরিদাসের প্রবেশ। হরি। ঠাউরমশাই! মুই বুঝি আর টক্সিটে বতি পারলাম না, টঙ্গির তােয় মাের গাটা কেঁপতেছে, এটু, পেঁড়িয়ে ধর মুই টল্পিতে নামাই। কম। মহান এখানথেকে অনেকদূর, এরমধ্যেই নামাবি? আর একটু চ বাপু, আর একটু এগিয়ে গিয়ে নামাস। হরি। আহা! কি নসের কথাই টসাচ্চ আর কি? দাদা গাছ কাটে আর দিদি পানি হেন দ্যাখে; তােমার কি ? তুমি আজার ব্যাটা আজার মতন মজাটা করে এমনি করে গা হেল্লে দুল্যে যাচ্ছ, আর মাের পরাণটা বােজার গুতােয় ধড়ফড়, ধড়ফড় করতেছে, মুই আর বােতি পাল্লাম না। কম। পারবি পারবি, আর একটু চ। ওই দেখ দোকান দেখা যাচ্ছে, ঐখানে গিয়ে তল্পি নামিয়ে দেবে, আর তােক কিছু খেতে দে। হৰি। মুই ত আর বলদ নই যে হা হো ফাজি ফুতি, হাড়ি ফুড়ি,
মালতী।
[ দ্বিতীয়
ছাই পাশ বব ? যেমনে চেলিয়ে নেষাবা ছেমনে যাব ? না ধর তাে
মুই টোক্সি ফেলাই (তক্সি ফেলিতে উদ্যত।
কম। (শশব্যন্তে) আরে করি কি করিস্ কি? তবে নামা (তল্পি
নামাওন)
হরি। (উপবেশন করিয়া) আ! আম বল, মাের মাতাটা হাল্কা হল,
ঠাউর মশাই! মােরে এটু, হাওয়া করনা গা?
কম। মর ব্যাটা আমি তােকে বাতাস করব? আমি কি তাের
চাকর নাকি ?
হরি। তা তাই ঝান না হলে, তাই বলে কি তােমার শরিলে এটু, চেহ
নেই গা? এই ঠ্যাশান দিয়ে বসি (তল্পি ট্যানে উদ্যত)
কম। (তল্পি সরাইয়া) আরে ব্যাটা করিস কি ? তল্পি কি তাের
বালিস?
হরি। ঠাউর মশাই! টল্পিতে এ হাঁড়ির মদ্দি কি গা?
কম। (স্বগত) সৰ্ব্বনাশ করূলে, ওর ভিতর ত সন্দেশ আছে, বল্লে ত
আর রক্ষা থাকবে না (প্রকাশ্যে) ওর মধ্যে সর্প আছে।
হরি। (স্বগত) ওর মদ্দি মােণ্ড আছে মুই জানি। যখন হাঁড়ির মন্দি
মােণ্ডা পােয়র মুই দেখিচি।' আচ্ছা ঠাউর মশাই তােমায় দ্যাকাচ্চি।
(প্রকাশ্যে) যার নাম কল্লে ওকি নােকে খায় ?
কম। ওকে লােকে খায় না, ওই লােককে খায়।
হরি। ক্যামনে খায় গা?
কম। (হস্ত ফণার ন্যায় করিয়া) এমনি করে ফোস্ করে কামড়ে
হরি। তবে কি ওর মদ্দি ন পুরে রেখেছ ?
কম। হ্যা।
হরি। ও বাবা সাপ ? গড়ুর ৩। অস্থি কঁ মারনির মাতা ভেগনে
বেসকী তথা, যাতকারু মারনীর পেতনি মনসা দেভি নমােস্থতে গড়,
গড়ার, গড়ন ।
গর্ভা তৃতীয় অঙ্ক। কম। হরিদাস ! বাপু আর বেলা নাই, অনেকদূর যেতে হবে, বিদ্যাসাগর মহাশয় এসে আমাদের এখানে বসে থাকতে দেখলে ভারি, রাগ করবেন, তবে এখন চল বাপু আমরা এখান থেকে যাই। হরি। ঠাউর মশাই! তােমার পায়ে পড়ি, মুই আর টল্পি বতি পারব না। ' কম। কেনরে? হরি। মােরে সাপে খেয়ে ফেলবে। কম। আচ্ছা যাতে না খায় এমন একটি ঔষধ দিব। হরি। কি ওষুদি ঠাউর মশাই? কম। এক ছিলিম গাঁজা। হরি। কই কই, ঠাউর মশাই শিগগির দাও ২, মােরে বুঝি সাপে কেড়েছে, বড়ে জ্বালা করতেছে, গাজা খেলে একখুনি সারবে, শিগগির দাও, শিগগির দাও। কম। এই নে (গাজা দেওন) হরি। ঠাউর মশাই অমি দ্যালে, সেজে এক টান টেনে দ্যালে না? কম। মর ব্যাটা—আমি কি গাঁজা খাই ? হরি। সে কি ঠাউর মশাই, তুমি গাজা খাওনা? তবে হাতী কেন ক্যামনে? মােদের গায়ের অনেক বাবুরা—ঘরে চাল নেই, কোমরে দুহাত কাপড় নেই, কিন্তু বােজ সাজের ব্যালা গাজা খেয়ে হাতি কিন্তে কিন্তে বাড়ী যায়। কম। এখন তবে চ ? হরি। এই যে যাচ্চি ঠাউর মশাই, তােমার হাতে ও হাঁড়ির মন্দি কি গা? কম। (স্বগত) ব্যাটা মজালে দেখছি, (প্রকাশ্যে) এতে সাপের বিষ আছে। হৰি। (স্বগত) ক্ষুীর হােমার সাপের বিষ হল বটে? আচ্ছা তোমায় ফ্যাখাচ্চি (প্রকাশ্যে) মাের বড্ডে খিদে নেগেছে।
২৪
মালতী।
কম। ওই আগে দোকান আছে, দুপয়সা মুড়ি কিনে দেব এখন।
তৰে আয় আমরা যাই অনেক দূর যেতে হবে, একটু চলে চলে আয়।
হরি। চল ঠাউর মশাই আগে আগে চল।
(কমলাকান্ত অগ্রে ও হরিদাস পশ্চাতে যাইতে যাইতে একটা একটা করিয়া
সন্দেশ খাইতে খাইতে চলিল।)
উভয়ের প্রস্থান।
তৃতীয় গর্ভঙ্ক।
পুষ্করিশ্মশান বাঁধান ঘাট।
কমলাকান্ত ও হরিদাসের প্রবেশ ।
হ। (সন্দেশের হাড়ী হটাৎ ফেলিয়া দিয়া চীৎকার করিতে করিতে
ঠাউরমশাই গাে মলাম, মলাম, মলাম-পরাণটা বাঁচাও জলে মলুম জলে
মসুম (শুইয়া ক্রন্দন।)
ক। কি হয়েছে? ওহাড়ী ফেলে দিলি কেন?
হ। মােরে সাপে কেড়েছে।
ক। সাপ সব কোথায় গেল?
হ। (সশনে) চোকের মাতা কি খেয়েছ ? দ্যোখতে পেলে না
ঐষে গত্তের মদ্দি সাপগুল সব ঢুকে প্যাল।
ক। ব্যাটা সর্বনাশ করেছ? তােমায় সাপে কামড়েচে
সাপ সব পত্তের মদ্দি গেছে ? (ক্ষীরের হাড়ি রাখিয়া প্রহার) হারামজাদা,
পালি, তোমার সাপে কেমড়েচে? আমার সঙ্গে বজ্জাতি। বজ্জাতি করবার
লােক পাওনি ? (প্রহার)
হ। (
সনে) ঠাউর মশাই মােরে মেলে? মুই কোন ঘাট করিনি,
মােরে অৰিচারে মেলে ? মুই আর এ পরাণ রাখব না, মুই এখনি মরব,
গর্ভা ] তৃতীয় অঙ্ক। ২৫ মুই এই হড়ীর বিষ খেয়ে মরব। (বলিয়া ঝটিতি ক্ষীর পান ও ক্রন্দন করিতে করিতে) পরাণ বেয়রা পরাণ বেরাে। বিজয়কেতুর প্রবেশ । বি। একি ? একেত ব্রাহ্মণ পণ্ডিত বলে বােধ হচ্চে, ওখানে একটা লােক বসে বসে কাদচে, ব্যাপারটা কি ? একটা আস্ত হাড়ী রয়েছে, আর একটা হাঁড়ি দেখছি ভেঙ্গে গেছে। যাই হক—আমার যা আবশ্যক তাই জিজ্ঞাসা করি। (প্রকাশ্যে) মহাশয় ! মহানদ কোন্ পথে যাব ? (কমলাকান্ত নিস্তব্ধভাবে দণ্ডায়মান) বি। (স্বগত) বােধ হয় ইনি কানে কিছু কম শােনেন। (কিঞ্চিৎ উচ্চৈঃস্বরে প্রকাশ্যে) মহাশয় ! মহানদ কোন্ পথে যাব ? ক। (ত্যক্ত হইয়া) যা যা মিছে ঘ্যানাের ব্যানাের করিসনে। বি। (একটু সরিয়া দাঁড়াইয়া স্বগত) একি ব্রাহ্মণ বাতুল নাকি ? ভাল করে আর একবার জিজ্ঞাসা করে দেখি। (প্রকাশ্যে) মহাশয় ! দেব । রাগান্ধ হয়েছেন কেন? মহান দ যাবার পথটা বলে দিলেইত আমি চলে যাই, তার পর আর আপনাকে জালাতন করব না ? ক। দ্যা চুপকরে থাক, মহানদ কোন পথে যাবি তা আমি কি জানি ? যেখান দে হয় একদিগ দে যা—মিছে ভ্যান ভ্যান করিস নি। বি। (স্বগত) বােধ হয় ঐ লোকটা কোন বিষয়ে এ ব্রাহ্মণকে বিরক্ত করে থাকবে, যাই হক, মহানদ যাবার পথটা জাতে পাল্লেই যে আমার উৎপাত যেত। ব্যোপদেব বিদ্যাসাগরের প্রবেশ। বি। (সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করিলেন।) ব্যো। দীর্ঘজীবি হও, বৎস! তুমি কে? বি। প্রভাে! আমি একজন সামান্য পথিক মাত্র। বিশেষ কোন কাৰ্যবশতঃ মহানদে যাত্রা করেছি। কিন্তু কোন্ পথ অবলম্বন করে আমি নির্দিষ্ট স্থানে পৌছিব তা জানি না। বো। তােমার নাম কি ? :
? মালতী। [ তৃতীয় বি। আজ্ঞা—আমার নাম বিজয়কেতু-জাতিতে ক্ষত্রিয়। ব্যা। (স্বগত) একি হলাে? এর নাম বিজয়কেতু ? আবার জাতিতে ক্ষত্রিয় ? ইনিই কি হস্তিনাগড়ের সেই রাজকুমার বিজয়কেতু ? যার কথা রাজ পুত্রীর সহচরীর মুখে শুনেছিলেম ? ঈশ্বর কৃপায় এই ব্যক্তি যদি সেই বিজয়কেতুই হন, তাহলে যত্নপুৰ্ব্বক একে আমার বাটীতে নিয়ে যেতে, হবে, কারণ রাজপুত্রী এর জন্য অত্যন্ত উদ্বিগ্ন আছেন। বিশেষতঃ যৎকালে আমি প্রবাশে বহির্গত হই, তখন তাঁর সহচরী অতি কাতরভাবে আমাকে বলে দিয়েছিল যে, “বিদ্যাসাগর মহাশয়! যদি যুবরাজ বিজয়কেতুর সঙ্গে আপনার সাক্ষাৎ হয় (বােধ হয় হবে, কারণ তিনি নিশ্চয়ই মহানদে আপনার বাড়ীতে আসবেন) তা যদি দেখা হয়, তা হলে অনুগ্রহ করে তাকে আপনার বাড়ীতে রেখে তার অজ্ঞাতে আমাদের খবর দেবেন।” (প্রকাশ্যে) আপনার বাড়ী কোথায় ? বি। আজ্ঞে—আমার বাড়ী হস্তিনাগড়। ব্যো। আপনি কি হস্তিনাগড়ের রাজপুত্র বিজয়কেতু? বি। আজ্ঞে—এ দাস সেই বিজয়কেতু। ব্যো। বৎস বিজয়কেতু! তুমি মহানদে যাবার জন্য চিন্তিত হও না আমিও মহানদে যাচ্ছি, তুমি আমার সঙ্গে চল। দিবা অবসান প্রায়, এ সময় আমার সঙ্গ ত্যাগ করলে অপরিচিত স্থানে বিশেষতঃ রাত্রি কালে যৎপরােনাস্তি কষ্ট পাবে। বি। যে আজ্ঞা। বো। মহানদে তুমি কার বাড়ী যাবে ? বি। আজ্ঞা, আমি ব্যোপদেব বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বাড়ীতে যাব। বব্যা। হা বুঝেছি (কমলাকান্তের প্রতি) কমলাকান্ত ! তুমি অমন করে দাড়িয়ে রয়েছ কেন ? কি হয়েছ? ক। (সক্রোধে) কি আর হবে, হয়েছে আমার মাথা আর ঐ গুওটার চৌদ্দপুরুষের মুণ্ডু। ঐ যে-দেখুন না-মিষ্টান্নের আধার পর্যন্ত শতণ্ড। বো। তাইত ! কি সর্বনাশ! তােমার দেহে এখন প্রাণ আছে? !
গর্ভা। তৃতীয় অঙ্ক। २१ আমার অমন হলে আমি প্রাণ হারিয়ে পাড়ায় পাড়ায় খুঁজতে বেরুতেমা হরিদাস বুঝি ভেঙ্গে ফেলেছে ? কম। শুধু ভেঙ্গেছে ? একটি হাড়ী ক্ষীর আর এক হড়ী' সন্দেশ, সমস্ত উদরসাৎ করেছে। হরি। (ক্রন্দন করিতে করিতে) বড় মশায়। মাের কোন বাট নেই, ঠাউর মশাই মােরে মিনি দোষে মেলে। ওঁর সাতে এই ফুরণ হয়েছিল যে, এই ছাই পাশ গুলাে বব আর মােরে আধসের মােণ্ডা আর এক পােয়া ক্ষীর দেবে, তা মশাই, পথে মাের বুড্ডি ক্ষিদে নেগেছিলাে তাই ওরে জিজ্ঞেস কন্ন যে, ঠাউর মশায় এ হাড়ী দুটোর মদ্দি কি আচে গা ? উনি বল্লে যে, ওর মদ্দি সাপ আর সাপের বিষ আচে। ব্যোপ। বটে, ঈস্ তার পর তুই কি কল্পি ? হরি। (সক্রন্দনে) তার পর পতে যেতে যেতে সাপ গুলাে মােরে কামড়ালে, মাথাটা জ্বলতে লাগলো, তাই সাপের হাড়ী ঝ্যামন ফেলে দিনু অমনি সাপ গুলাে ওই গত্তের মদ্দি ঢুকে গেলাে। ব্যোপ। তার পর কি হলো ? হরি। (সক্রন্দনে) তার পর বড় মশাই! মােরে একে সাপে কেমড়েছে, সব্বাঙ্গটা জ্বলতে নেগেছে, তার ওপর উনি মােরে মিনি করে মেলে, তাইতে মুই বন্ন যে তুমি ঝ্যামন মােরে মিনি করে মেলে, মুই আর এ পরাণ রেখবাে না, এই বিষ খেয়ে পরাণটা বার করব। এই বলে ঝ্যামন বিষের হাড়ী চুমুক দিনু—দেখনু যে বিষটে তােমাদের মুখে ঝামন নাগে অমনি মাের মুকে মিষটি নাগলাে, তাই সব বিষটে খেয়ে ফেঃ (ক্রন্দন) তাই ওর আগ হয়েছে। ব্যোপ। (সহাস্যে) মর ব্যাটা আমাদের গাল দিলি ? হরি। (সদনে) কই গাল দিনু বড় মশাই? তােমার দোই বড় মশাই-মুই তো গাল দিই নি ? তুমিও বুঝি মােরে মিনি করে মারবে ? ব্যাপ। না না আমি মারবাে না, ভয় নাই চুপ কর, কাদিসনি। এই নে একটী টাকা নে, আমি তােকে বকশী দিলেম। (টাকা প্রদান
{:
মালতী।
[৩য় গর্ভাঙ্ক
হরি। (আহ্বাদে) বড় মশাই পেন্নাম হই, আমি এবার থেকে ও
বিটলে বামনের বােজা বােনা, কেবল তােমারই বটে।
কম। বলি বিদ্যাসাগর মহাশয় ! এ আপনার কি রকম ন্যায় বিচার
হলাে? আপনিও বুঝি ওর গোড়ে গােড় দিলেন ? আমি এখন কি বলে
গিন্নির কাছে (বিষ্ট) বাড়িতে জবাব দেবাে ?
সে বিষয় দেখা যাবে এখন। বৎস বিজয়কেতু! এস আমরা
যাত্রা করি।
বি। যে আজ্ঞা চলুন।
ব্যোপ।. এস কমলাকান্ত, হরিদাস।
সকলের প্রস্থান।
। চতুর্থ অঙ্ক। ' প্রথম গর্ভাঙ্ক। -(৩)--- বব্যাপদের বিদ্যাসাগরের বাগানবাটী-কক্ষ। বিজয়কেতুর প্রবেশ। বি। (স্বগত) আর কেন মিছে ভাবনা ভাবি। বন, উপবন, নগর, পলি, গঙ্গার উভয়কুল, সমস্তই ত তন্ন তন্ন করে অন্বেষণ করেছি, কিন্তু কই— কোন স্থানেই ত মালতীর সন্ধান পেলেম না ? আর পুনরায় যে পাব এমন আশাও নাই, নিশ্চয় জান্তে পাচ্ছি মালতী আমার মানবলীলা সম্বরণ করে, গভীর ভাগীরথী গর্ভে চিরনিদ্রায় অভিভূত হয়েছেন। কে অকালে এ কালনিদ্রায় অভিভূত করালে ? ঘূণিত বায়ু। আমি ত সেই দিনেই সেই গঙ্গাতীর নিপতিতা মুমুর্ষ-দশাগ্রস্থ দয়াবতীর মুখে এসংবাদ পেয়েছি তবে কেন আর মালতীর জন্য এদেশ ওদেশ বেড়িয়ে বৃথা পণ্ডশ্রম করি ? এ নিস্ফল অন্বেষণের কোন প্রয়ােজন নাই। শ্ৰম ? পণ্ডশ্রম ? না না—এও সুখের। কার জন্য করি? ওঃ মালতীর জন্য ! কেন তার জন্য দিবানিশি ভাবি ? কেন তার জন্য অনুমাত্র সুখের মুখ দেখতে পাই না ? কেন তার জন্য রাজ্যসুখে বঞ্চিত হচ্ছি ? কেন তার জন্য পরবাসে বৃথা কষ্ট পাচ্ছি ? কেন তার জন্য উদাসীনের ন্যায় সর্বত্র পরিভ্রমণ কচ্ছি ? কেন জন্য দারুণ চিন্তানলে দিন দিন তনু ক্ষীণ কচ্ছি ? সে আমার কে? তার সঙ্গে আমার সম্বন্ধ কি ? কিছুই না। তবে কি যথার্থই সম্বন্ধ নাই? না না আছে—চপলার কথানুসারে আমরা উভয়ে সম্বন্ধসূত্রে আবদ্ধ হয়েছি। চপলা আমাকে পূৰ্ব্বে কি বলেছিল ? হ স্মরণ হয়েছে,-চপলা আমাকে এই বলেছিল যে “যুবরাজ ! আমাদের জন্য আপনি যৎপয়ােনাস্তি শারীরিক ও মানসিক কষ্ট পাচ্ছেন, আর পুনঃপুনঃ চিরস্মরণীয় উপকার কচ্ছেন, মালতী। (প্রথম বস্তুতঃ আপনি আমাদের পরমবন্ধু, আমরা আপনার কিছুই প্রত্যুপকার কত্তে পাল্লেম না, আর কিই বা করবাে, এজগতে এমন কি অমুল্যরত্ন আছে, যাতে আপনার কৃত উপকারের প্রতিশােধ হতে পারে ? কিন্তু তথাপি অবােধ মন কিছুতেই প্রবােধ মানে না, এজন্য আপনার পরিশ্রমের পুরষ্কার- স্বরূপ নব-বিকসিত মকরন্দপূর্ণ একটি সুন্দর ফুল আপনার পবিত্র করে অর্পণ কত্তে সদাই বাঞ্ছা করে।” এই বলে ক্ষান্ত হলে আমি বল্লেম “কি ফুল?” সে উত্তর কল্লে “একটী নব-বিকসিত মালতী ফুল।” আমি জিজ্ঞাসা কল্লেম, “সে ফুল আমার কি হবে ?” সে উত্তর দিলে আপনার হৃদয়ের অমূল্য ভূষণ হবে। আবার তাকে জিজ্ঞাসা কল্লেম, “তবে এমন ভূষণ দিতে বিলম্ব কচ্ছ কেন?” সে বল্লে, “আর একটু বিলম্ব আছে, এখানে নয়, মহানদে—ব্যোপদেব বিদ্যাসাগরের বাটীতে একাৰ্য্য সমাধা হবে।” সেই দিন হতে মালতী আমার জীবনসৰ্বস্ব হয়েছেন। কিন্তু এখন সে মালতী কোথায় ? এখানে এসে অবধি তার ত কোন সংবাদই পেলেম না। চপলাই বা কোথায় ? এক বেনামী পত্র পেয়ে, মালতীর আশায় এলেম, কিন্তু এখন দেখচি সে আশা দুরাশা মাত্র। গীত। (নেপথ্যে) ভিক্ষা দুটী পাব কিগাে, পেটের জ্বালায় জ্বলি। উচিত কথা বলে বলে সার হয়েছে ঝুলি। পেটের জ্বালায় জ্বলি যত, বাড়ি বাড়ি ঘুরি তত, কেউ দেয় গলাধাক্কা, কেউ ভাঙ্গে মাথার খুলি । গিন্নির গায়ে জড়ওয়া সুট, শােবার ঘরে হরিলুট, টিকিওয়ালা দিচ্ছে ছুট, উড়িয়ে নামাবলী। চট্টে খােটায় তক্তা পৈতে, বসে আছেন হুকো হাতে, দেব দেবীকে ফেলে, করে মদকে কোলাকুলি ।
গর্ভাৰু ]
চতুর্থ অঙ্ক।
ভেবে দেখাে শেষের দিনে, বিষের জ্বালা জ্বলবে প্রাণে,
সেই বিষকে সুধা কর, নিয়ে হরিবুলি ।
বি। আহা! কি মধুর কণ্ঠস্বর ! সামান্য ভাষায় কি সুন্দর ভাবের
গীতটী।
(নেপথ্য—দেখিয়া)
ওকে ? একজন ভিখারিণী না? তাইতাে ভিখারিণীইতাে বটে,—এই
দিকে আসছে যে?
ভিখারিণী বেশে চপলার প্রবেশ।
ভিখা। মহাশয় প্রণাম করি, আশীৰ্বাদ করুন। (প্রণাম)
বি। দীর্ঘজীবি হও।
ভিখা। মহাশয়! এ আপনার কি রকম আশীৰ্বাদ হলাে ? আপনি
কি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন না, যে আমি একজন ভিখারিণী ? ভিখারিণীর
আবার বেঁচে সুখ কি? এক ব্যালা যার এক মুটো ভাতের সংস্থান নাই,
তার আবার বেঁচে ফল কি? এখন আবার এমন আশীৰ্বাদ করুণ, যেন
এখনি মরি, হাড় যুড়গ।
বি। ভিখারিণি ! আর একটী গীত গাও, তােমায় আর ভিক্ষা কত্তে
হবে না, আমি তার উপায় করে দিব।
ভিখা। কি উপায় করে দেবেন? এই ভিক্ষার ঝুলিটা আছে
ন্যাকড়ার—আপনি বােধ হয় করে দেবেন শালের, সুধুই প্রাণ বাচেনা
আবার তার উপর শাল? এ আপনাদেরই পােশায়।
বি। আমি সত্য বলচি, আর তােমায় ভিক্ষা করে খেতে হবে না,
আর একটী গীত গাও।
ভিকা।
যে আজ্ঞা।
গীত।
কামিনী কানন, বিধির সৃজন, অতুল ধরার মাঝারে।
আছে নানা ফুল, গােপাল বকুল, সুগন্ধে মােহিত যে করে।
' মালতী।
[ প্রথম
তাতে যে মালতী, ছিল দুখী অতি, প্রফুল্ল হেরি এত দিনে।
রসিক নাগর, রূপে এক ভ্রমর, মােহিত তঁার মধু পানে॥
জানি বিরহে কার, মালতী যে অনিবার, ছিল সে
সদা মনদুখী।
আজি সে অনন, হাসিছে সঘন, নব নাগরে পেয়ে সুখী।
চকে চকে সদা,
বি। একটু চুপ কর, এ গান তুমি কোথায় শিখেছ ?
ভিখা। এ গানটী আজ শিখেছি।
বি। আজ শিখেছ কি কাল শিখেছ তা তােমায় জিজ্ঞাসা কচ্ছি না,
জিজ্ঞাসা কচ্ছি এই যে, কোথায় আর কার কাছে এ গানটী শিখেছ ?
ভিখা। রাগ করবেন না মশাই, কানে একটু কম শুনি। কার কাছে
শিকিছি তাই জিজ্ঞাসা কচ্ছেন ? দাড়ান মনে করি (কিঞ্চিৎ চিন্তা)
হা হা মনে হয়েছে, আজ শিকিনি এই আজ পাঁচ ছ দিন হল শিকিছি।
এক দেশের রাজার একটা মেয়ে আছে, তার একটী আলাদা বাগান বাড়ী
আছে। আজ পাচ ছ দিন হল এক দিন বিকেল ব্যালা সেই বাগানের
সুমুক দিয়ে গান গাইতে গাইতে যাচ্ছিলুম, আমার গান শুনে একটা মেয়ে
আহা তার নামটা কি ভাল?—আচ্ছা মহাশয় এই বিদ্যুৎকে আপনারা
কি বলেন ?
বি। বিজলী।
ভিখা। আর এক নাম ?
বি। সৌদামিনী।
ভি। না না তা নয়, আর নাম নেই কি ?
বি। আছে বৈকি, ক্ষণপ্রভাচপলা-
ভি। হ্যা হ্যা মহাশয়, ঐ শেষ নামটী, সে মেয়েটার নাম চপলা।
সেই চপলা আমাকে ডেকে নিয়ে গেল। তা মহাশয় গিয়ে যা দেখলেম তা
আর বলবােনা, মহাশয় মাপ করুন।
.
গর্ভাঙ্ক ] ৩৩ চতুর্থ অঙ্ক। বি। তা বলনা? আমার কাছে বলতে অার দোষ কি? আর তােমায়ত বেশী কথা বলতে হবে না, কোথা থেকে গানটা শিখেছ তাই থালি বল। ভি। তাইত বলচি মহাশয়, গােড়ায় একটু মা বল্লে আপনি বুজতে পার- বেন কেন? তা আপনি বলছেন বলি—তা মহাশয় সেই চপলা নামে মেয়েটা আমায় সেই রাজার মেয়ের বাগান বাড়ীতে নিয়ে গেল। তা মহাশয় গিয়ে যা দেখলুম তা অবাক সৃষ্টি। একজন বড় মানুষের ছেলে, খুব সুন্দর, কার্তি- কের মত সুন্দর, দোষের মধ্যে খালি নাকটা একটু বসা আর একটু খুড়িয়ে চলে, আর কোন দোষ নেই, হা হা আর একটু আছে একটা চোক কানা, তা মহাশয় হটাৎ ঠাওরাবার যাে নেই, এমনি ষােলাটে কঁাচের এক জোড়া চসমা পরে আছে যে হটাৎ দেখলে বােধ হয় যেন দুচোকেই চাচ্ছে। তার সঙ্গে সেই রাজকুমারীর সঙ্গে খুব ভাব দেখলুম। খানিক পরে সেই চপলা বলে ছুড়িটে তাদের দিকে চেয়ে চেয়ে নেচে নেচে এই গানটা দুচার বার গাইলে আর আমি অমনি শিখে নিলুম। বি। (স্বগতঃ) একি! এযে আমার পরিচিত কণ্ঠস্বর বলে বােধ হচ্ছে। (প্রকাশ্যে) তুমি এ গানে বকশীস পেতে পার না, আর একটা ভাল গান গাও। ভি। যে আজ্ঞা। গীত। বিয়ে করেছি জয় ওবিধুবনী, যার ধন তার ধন নয় নেপ মারে দই—নানা নেপ মারে ননী। বি। এই কি তোমার ভাল গান ? তি। তা আমি কি করবাে? আমার সব গানই এই রকম। গানটা আবার কার কাছ থেকে শিকিছি জানেন? বি। কার কাছ থেকে শিখেছ ? ভি। সেই মা চোকো খোড়া বাবুটায় কাছ থেকে। বিজয় বলে সেই রাজকার একটা পুরণ ভার ছিল, তাকে জয় করে সে রাজকতাকে (প্রথম ৩৪ মালতী। পেয়েছে কি না? তাইতে সেই এক চোকে বাবুটা এই গানটা নেচে নেচে গেয়েছিল। মশাই খোড়া পায়ের নাচ যা দেখলুম—তা আপনাকে আর কি বলব। বি। (স্বগত) এত আর কেউ নয় ? সেই চপলা এতক্ষণে চিনতে পারলেম। (প্রকাশ্যে) তুমি দূর হও তুমি আমার সুমুক থেকে দূর হও। ভি। তা বকশীস পেলেই দূর হইতা আমাদের পােড় কপালে শাল সইবে কেন, তােমরা বড় মানুষ তােমাদের কপালেই শয়। গীত। । দহিছে মদনাগুণে কি করি উপায়। হেরিয়া প্রাণেশ্বরে প্রাণ যে যায় । বললাে সজনী বল, প্রাণ যে সদা ব্যাকুল, প্রেম অকুল পাথারে কেন পড়িলাম হায় । পর অধীন যেজন, জীবনে তার মরণ, তাই ত্যাজিব এ প্রাণ দাওলাে বিদায়। বি। (স্বগত) এ নিশ্চয়ই চপলা ভিকারিণীর বেশে আমার মন আনতে এসেছে। (প্রকাশ্যে) তুমি কি চপলা ? ভি। চপলাত মেঘের আড়ালে, পৃথিবীতে কেন আসবে? বি। মালতী ফুল রূপ ধরে যদি গাছে থাকতে পারে, তা হলে কি চপলা নারীরূপ ধরে পৃথিবীতে থাকতে পারে না? ভি। চপলা এখন পৃথিবীতে নাই—সে যে অনেক দিন স্বর্গে গেছে। বি। বােধ হয় স্বর্গের অর্ধেক পথ থেকে ফিরে এসে থাকবে। আর কষ্ট দিও না, অনেক কষ্ট পেয়েছি, আরও কি বাকি আছে ? ভি। (স্বগত) আর না। তােমার কষ্টের জন্য ধরা দিচ্চিনে, আমার এখন অনেক কাজ বাকি আছে—বিলম্ব হলে কি জানি যদি কিছু ব্যাঘাত হয়—এই জন্যেই ধরা দিতে হল। তা না হলে আর কিছু দিন তােমার ভাল করে খেলাতেম, তবুও একটু খেলাব। (প্রকাশ্যে) যুবরাজ প্রণাম করি, বাস্তবিকই স্বর্গের অর্ধেক পথ থেকে ফিরে এসেছি।
গর্ভা ] চতুর্থ অঙ্ক। বি। কি রূপে এলে সমস্থ ভেঙ্গে বল। চ। সেই ভয়ানক রাত্রে একজন ভদ্রলােক একখানি বজরা করে যাচ্ছিলেন। স্রোতের বেগে আমি ভাসতে ভাসতে সেই বজরার পাশে পেীছিলেম। তখনও পর্যন্ত আমার জ্ঞান ছিল। বি। কি সর্বনাশ, কি সর্বনাশ, তারপর কি হল? চ। তার পর সেই বজরার দাড়ির আমাকে দেখতে পেয়ে দুজন জলে ঝাঁপ দিয়ে আমাকে তুললে । বি। তার পর ? চ। তার পর তারা আমাকে অনেক যত্ন করে সুস্থ করে আমায় বালাণ্ডায় পৌছে দিলে। বি। এখানে কি জন্য এসেছ ? চ। আপনি এখানে এসেছেন শুনে আপনার সঙ্গে একবার সাক্ষাৎ কত্তে এসেছি। বি। আমি এখানে এসেছি কার মুখে শুনলে ? চ। কেন? বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মুখে শুনলেম। বি। আমি যে এক বেনামী পত্র পেয়েছি সেখানি কি তুমি পাঠিতে- ছিলে ? = চ। আপনার কি বােধ হয় ? বি। বােধ হয় তুমিই পাঠিয়েছিলে। চ। তবে তাই। বি। তােমার প্রিয় সখ এখন কেমন আছেন? চ। তার কথা আর জিজ্ঞাসা করবেন না। বি। কেন ? চ। তিনি অজিকাল আর এক রকম হয়েছেন। বি। কেন ? কি রকম হয়েছেন । চ। আজ কাল আর এক রকম হয়ে বেশ আছেন, দিব্বি মনের সুখে আছেন, মনে আর কোন কষ্ট নেই। বি। আজ কাল বেশ আছেন, মনের সুখে আছেন, সে কি কি?
মালতী।
( প্রথম
• চ। রকম আর কত বলব, পা দুটি ছড়িয়ে, ডাটা গাচটি চিবিয়ে
চিবিয়ে বসে বসে খেলে অনেক রকমের রকম খাওয়া যায়।
বি। তােমায় ছোঁদো কথা ছেড়ে দাও, স্পষ্ট করে বল মালতী এখন
কেমন আছেন ?
চ। (দীর্ঘ নিশ্বাস) যুবরাজ! মালতী বেঁচে আছেন কি না তারই
সন্দেহ।
বি। কেন কেন? তিনি কি পীড়িত।
চ। পীড়িত হলে ত ভাল ছিল, তঁার আজও কোন সন্ধানই পাওয়া
যায় নাই। আজ কাল কানাঘােষা শুনতে পাচ্চি তিনি নাকি বেঁচে নাই।
বি। কি মালতী বেঁচে নাই একথা আমার বিশ্বাস হয় না।
চপলা কেন কষ্ট দাও, স্পষ্ট করে বল তিনি কেমন আছেন।
চ। তা আমি কি করে জানব ?
তােমার প্রিয় সখীর খবর তুমি জাননা ?
চ। দেখা হলে বলতে পাত্তেম যে কোথায়—আর কেমন আছেন ?
বি। তবে কি তিনি ঝড়ের সময় নৌকায় ছিলেন না ?
চ। তা থাকবেন না কেন? ঝড়ের সময় এক সঙ্গে নৌকায় ছিলুম,
এক সঙ্গে স্কুলে পড়ি, এক সঙ্গে ডুবি, তার পর ভগবান আমার প্রাণ রক্ষা
কল্লেন, আমি উঠে আর তাকে দেখতে পেলেম না। তবে সন্ধানে
আছি দেখি যদি পাই। যুবরাজ এখন আসি সময়ান্তর সাক্ষাৎ হবে,
কোন বিশেষ কথা আছে।
?
বি।
প্রস্থান।
বি। একি? চপলার ত কোন কথাই বুঝতে পাচ্ছি না। মালতীর
কোন খবর নাই ? সত্য সত্যই কি মালতী জীবিতা নাই ? আমিওত তার
বিশেষ অনুসন্ধান করেছি, কৈ কোন সন্ধান ত পাই নাই ? তাই যদি হয়
তাহলে আমাকে এখানে আসতে বলবে কেন ? যাই হক, আরও দু এক
দিন দেখি, তার পর যা হয় করব।
গর্ভা
চতুর্থ অঙ্ক।
চপলার পুনঃপ্রবেশ।
বি। আবার এলে কেন ?
চ। কেন? আবার আসতে বারণ আছে না কি ?
বি। না তুমি আমার কাছে দিবা রাত্র থাক।
চ। যে আজ্ঞা, আবার দেখব তাড়ান কি না। যেতে যেতে একটা
কথা মনে পড়ল, তাই সে কথাটি আপনাকে বলতে এসেছি।
বি। কি কথা?
চ। আমার পূর্ব অঙ্গীকার পালন কত্তে এসেছি।
বি। কি অঙ্গীকার ?
চ। যুবরাজ! আপনার স্মরণ আছে কি, আমরা যখন রাজমহলে
আপনার শিবিরে ছিলেম তখন আমি সত্যপাশে বদ্ধ হয়েছিলেম যে
আপনি যখন মহানদে আসবেন তখন সেখানে আপনাকে মধুভরে চল চল
ফুটন্ত একটি মালতী ফুল আপনার কৰে অৰ্পণ করব? কেমন স্মরণ
আছে কি ?
বি। হা আছে।
চ। তাই যেতে যেতে ভাবলেম যে আপনি ত এখন মহানদে এসে
ছেন, আর আমার সঙ্গে সাক্ষাৎও হয়েছে, তবে সেই ফুলটি কেন আপনাকে
দিই না—আর সময় পাই কি না পাই।
বি। সে বুলটি এখন কোথায় ?
চ। আপনার বাড়িতে।
বি। কিরূপ অবস্থায় আছেন ?
চ। অবস্থার কথা আর কি বলব।
বি। তবে এমন সুন্দর ফুল দিতে বিলম্ব কচ্চ কেন?
চ। বিলম্ব আর কিছুই জন্যে নয়, তবে তাতে আপনার সুখ হবে
কিনা বলতে পারি না।
বি। কেন? আমার সুখ হবে না কেন?
চ। কারণ, বােধ হয় সন্ঠ মালতীর জন্য আপনার মন চঞ্চল আছে,
.
৩৮
মালতী।
[ দ্বিতীয়
আর আমারও মন অস্থির, তাই বলছি আপনার মন যখন ঠিক নেই তখন
ধড়াশ করে একটা ফুল দিয়ে বসব। সখী মালতীর সন্ধান না পেলে কোন
কাজ কত্তেই ইচ্ছে হয় না।
বি। তুমি দূর হও, তুমি যমালয়ে যাও, তােমার ফুলও তােমার সঙ্গে
যাক, আমি আর তােমার ফুল চাই না, আর এখানে এক দও থাকব না,
আজই নিজ রাজ্যে যাত্রা করব। (গমনােদ্যোগ।)
চ। (গমনে বাধা দিয়া) আর রাগ করবেন না (স্বগতঃ) কি করি আর
কাজ নাই বলি (প্রকাশ্যে) যুবরাজ স্থির হন আপনার মালতী বেঁচে আছেন।
বিজ। সত্য বলছ তিনি জীবিত আছেন ?
চ। আপনার পা ছুয়ে বলছি তিনি জীবিত আছেন।
বি। তার প্রাণরক্ষা কি করে হলাে ?
চ। আমার যেরূপে তঁারও সেইরূপে। ডুবে তাকে ছাড়িনি, দুজনেই
এক সঙ্গে ভাসতে ভাসতে যাই, তার পর এক সঙ্গে এক নৌকায় উঠি।
যুবরাজ! এখন চল্লেম, এ স্থান ত্যাগ করবেন না বিশেষ কাজ আছে, সময়
অন্তরে সাক্ষাৎ করব।
প্রস্থান।
বি। মালতী জীবিত আছেন, তবে এর সঙ্গে সঙ্গে আমার আশাতও
কি জীবিত থাকবে ? কি অদ্ভুত আশার গতি ! চপলার কথায় দুএক দিন
থাকি যদি ঈশ্বর দিন দেন, যদি আশাতরু সমূলে উৎপাটন না হয় তাহলে
দেখি আমি সুখের পথে বিচরণ করতে পারি কি না।
"গর্ভা চতুর্থ অঙ্ক। দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক। ই বালাণ্ডা। রাজকুমারী মালতীর পুষ্প-বাটীকা বসন্তকুমারের প্রবেশ । বস। মালতী কোথায় গেল? এইমাত্র যে দেখলুম এইখানে ছিল, আবার কোথায় গেল? কি বিপদেই পড়েছি—কিছুতেই আর ওর মন পেলুম না। কি করি? এখন দুঃখ হয় লেখা পড়া কেন শিখলুম না। লেখা পড়া শিখলেত আর মালতী আমায় তুচ্ছ তাচ্ছল্য কত্তে পাৰ্ত্ত না। তা আর শিখব কি, যে ইয়ারের দল জুটল, শােবার খাবার সময় পেতুম না তা আবার লেখাপড়া। বাবা বেঁচে থাকলে মালতীর সঙ্গে বিয়ে দিতেন। তা বাবা ত মরবার সময় রাজা চন্দ্রকেতুকে বলে গেছেন যে আমার সঙ্গে মালতীর বিবাহ দিতে হবে। চন্দ্রকে তুর মত আছে কিন্তু ছুড়ি ভেড়ে না। আজকাল মালতীকে কেমন কেমন বােধ হয়। ভেতরে ভেতরে আর কারুর সঙ্গে সম্বন্ধ হচ্ছে না কি ? কিছুই বুঝতে পাচ্চি নে। আগে আগে বরং আমার সঙ্গে দুএকটা কথা কইত, আজকাল কথা কওয়া দূরে থাক, চেয়েও দেখে না। কি করি এখানে এমন ইয়া নেই যে তার সঙ্গে এর পরামর্শ করি। ঐ না কি একখান কাগজ পড়ে রয়েছে ? দেখি দেখি ওখানাকি। (কাগজ লওন) এযে একখানা চিঠি, এষে মালতীর নামে, দেখি কি লেখা আছে আর কে পাঠিয়েছে। (পত্র পাঠান্তে ও ক্রোধে পত্র দেখিতে দেখিতে) হু -“বিজয়কেতু-তােমার বিজয়কেতু-শীঘ্র পাবে- অস্থির হও না, মিলনের সময় আগত, আমি কারাে নই, সাবধানে থাকবে। রাজকুমার বসন্তকুমারের কথা এর কাছে কিছুই বলি নাই।” সই করা হয়েছে “তমার চিরদাসী চপলা।” ওরে বেটি চপলা, তুমি বিন্দে দুতী হয়েছ বটে—আচ্ছা থাক, তিন জনকেই দেখব। আমি শালা আয়ানঘােষ, নিধু- বন তােমাদের একচেটে-বটে? আচ্ছা থাক, তােমাদের শ্রাদ্ধেৰ চাল চাচ্ছি। প্রস্থান।
' ৪ মালতী। [ দ্বিতীয় মালতীর প্রবেশ মা। আজ কদিন হলাে একখানি পত্র ভিন্ন চপলার তত আর কোন খবরই পেলেম না। সেখানে কি কচ্ছে কিছুই তাে বুঝতে পাচ্ছি না। কি করি, আমি কি যাব ? তাই বা একা কি করে যাই, সে কাছে থাকলেও এক রকম হতাে, কিন্তু আরতাে স্থির থাকতে পারি না। ওই ষা, চিঠিখানা কি হলো! কোথায় কি পড়ে গেল ? কি সর্বনাশ! যদি অন্য কেউ পায়, যদি সেই নরপিশাচ বসন্তকুমার পায়, তাহলে তাে আমার গুপ্তকথা প্রকাশ হয়ে যাবে। (কিঞ্চিৎ চিন্তা) যদি পায় পেলিই বা, যদি পড়ে পড়লিই বা, গুপ্তকথা প্রকাশ হয়, হােক। যে কথা, অপ্রকাশ থাকবে না, যে মনের ভাব অন্যের জাতে বাকি থাকবে না, তবে কেন তারজন্য বৃথা চিন্তা করি। আমি সতী, সতীর কাৰ্য্য কখনই জনসমাজে অপ্রিয় হবার নয়। তবে কেন চিন্তা, তবে কেন উদ্বেগ, কেনই বা ভাবি কুচিন্তায় মনকে দুঃখিত করি। t বসন্তকুমারের পুনঃ প্রবেশ। কে তুমি ? ব। আমি কি তােমার নিকট অপরিচিত ? মা। অপরিচিত না হলে ওরূপ প্রশ্ন করব কেন ? ব। আজ যে নূতন কথা তােমার মুখে শুনলেম ? মা। নূতন কিছুই নয়। তুমি আমার কাছে চিরকাল অপরিচিত থাকবে। তুমি এখানে কেন এলে? ব। (সক্রোধে) কেন এলেম শুনতে চাও না দেখতে চাও? মা। দেখতে পেলে কে শুনতে চায়? ব। তবে এই দেখ (একখানি পত্র প্রদান)। মা। (পত্রখানি দেখিয়া স্বগত) যা ভেবেছিলাম তাই হয়েছে। যা দেখলে ? এখন ভাবছ কি? মা। আমি যা ভাবচি, তা তােমার জানবার অধিকার নাই, তুমি এ পত্র কোথায় পেলে?
৪১
গর্ভা
চতুর্থ অঙ্ক।
ব। যেখানেই কেন পাই না তােমার এ কথা জানবার আবশ্যক নাই,
এখন বল পত্রখানি কে লিখেছে ?
মা। চপলা লিখেছে।
পত্রের মর্ম কি তা জ্ঞাত হয়েছে?
মা। হাঁ হয়েছি।
ভদ্ৰ কুলকামিনীর পক্ষে এই কি উচিত?
মা। অনুচিতই বা কিসে ?
ব। হাঁ কুলটার পক্ষে উচিত বটে।
মা। (সক্রোধে) কি? আর একবার ?
ব। (উচ্চৈঃস্বরে) কুলটার পক্ষে এই উচিত।
মা। পাপিষ্ঠ নরাধম নরপিশাচ! কি বলি, আমি কুলটা, এতদূর স্পর্ধা,
এত সাহস ? চক্ষুশূল যা মুখে আসে তাই বলিস? আমার সুমুখ হতে
এখনি দূর হ।
ব। মালতি! সাবধান।
মা। তাের কাছে আবার সাবধান কি? যে পরঅন্নে পালিত তার
কাছে আবার সাবধান কি? যে আমার পিতার দাসত্ব স্বীকার করেছে
তার কাছে আবার সাবধান কি? যার মন দেহ অপবিত্র, তার কাছে
আবার সাবধান কি? নরাধম ! এই আমার শেষ কথা যদি উদর পূরণের
জন্য আমার পিতার কাছে তাের আরও কিছুকাল থাকবার ইচ্ছা থাকে,
তাহলে এখনি আমার সুমুক হতে দূর হ। আমি ঘৃণা করে বলছি দূর হ,
নইলে এখনি শাস্তি পাবি।
ব। আচ্ছা আমি চল্লেম কিন্তু এর প্রতিফল আমি দেবাে।
প্রস্থান।
१२
মালতী।
[ তৃতীয়
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
রাজপথ, একটী বৃক্ষতলে বিজয়কেতু উপবিষ্ট।
বি। উঃ কি অন্ধকার ! একে কৃষ্ণাচতুর্দশী নিশা, তমােমরী ও ভয়াবহ,
তাতে আবার বারিদদল প্রতিযােগী হওয়াতে গমনপথ কিছুই দৃষ্টিগােচর
হচ্ছে না। রাজপথে গাড়ী ঘােড়া ও মনুষ্যের গতিবিধি কিছুই নাই,
আপণে ক্রেতা বিক্রেতা নাই, পথগ্রন্থিতে জনমানবের কলরব মাত্র নাই,
কেবল দলবদ্ধ শিবাগণের কর্কশ চীৎকার সময়ে সময়ে শুনতে পাওয়া যাচ্ছে।
এই ভয়াবহ গভীর নিশীথ সময়ে কেনই বা একাকী বসে আছি ? চপলার
কথা অনুসারে, আমার একমাত্র সুখের পথের কাণ্ডারীর কথা অনুসারে বসে
আছি। এই ভয়ানক নিশীথ সময়ে এ অবস্থায় একাকী যে কেন বসে
আছি, তার কারণ কিছুই জানি না, কেবল স্থিরভাবে বসে আছি এই মাত্র।
সুখের আশাও মনে অঙ্কুরিত হচ্ছে বােধ হচ্ছে।
চপলার প্রবেশ।
কে ?
চ। আজ্ঞা—আমি চপল।
বি। চপলে ! তােমার আসতে এত বিলম্ব হলাে কেন? আমি এখানে
অনেকক্ষণ পর্যন্ত তােমার জন্য অপেক্ষা করে বসে আছি। তােমার
আসতে বিলম্ব দেখে মনে কচ্ছিলাম কোন কারণ বশতঃ তুমি বুঝি আসতে
পারলে না।
চ। না আসবার ত কথা ছিল না? তবে বিলম্বের কারণ আছে বটে।
আপনি কি স্বসস্ত্র হয়ে এসেছেন।
বি। না।
চ। এই তলােয়ার নিন (তরবারি প্রদান
বি। (অস্ত্র লইয়া) কেন চপলা এ অস্ত্রের প্রয়ােজন কি ?
চ। না থাকলে আনবাে কেন? আমি অনেকক্ষণ পূর্বে আসতেম
কেবল এই অস্ত্র আনতেই বিলম্ব হয়েছে।
গর্ভাঙ্ক ]
চতুর্থ অঙ্ক।
বি। তুমি কি ব্যোপদের বিদ্যাসাগরের বাড়ী গিয়েছিলে ?
চ। আজ্ঞে হাঁ গিয়েছিলাম। গিয়ে আপনার ঘরে দেখলেম যে
আপনি নাই, ভাবলেম আপনি এখানে এসেছেন।
বি। তুমি তাে জান আমি আস্বাে তবে গিয়েছিলে কেন?
চ। আমি আপনাকে নায়কের বেশে আসতে বলেছিলেম কেমন
মনে হয় ?
বি। হ্যা মনে হয় !
চ। আপনি তাতে বলেছিলেন যে স্বসস্ত্রে আসবেন না কেন অঙ্গহীন
হয়ে আসবেন কেন? আমার কথা অনুযায়ী আপনি বিনা অস্ত্রে এসেছেন।
কিন্তু এখন অস্ত্রের প্রয়ােজন হওয়াতে আমি আনলেম। এখন আসুন
অধিক কথা কবার আর সময় নাই, এ স্থান তত নির্জন নয়, আমরা
গুপ্তভাবে যাত্রা করেছি আর বিলম্ব করে কাজ নাই বিপদ ঘটবার
সম্ভাবনা।
(উভয়ের প্রস্থান)
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
উদ্যান মধ্যস্থ একটী গৃহ, সম্মুখে দরদালান।
গৃহমধ্যে সখিসহ মালতী আসীনা, দরদালানে
বিজয়কেতু ও চপলার প্রবেশ।
বি। এ কোথায় এলেম ?
চ। একটু আস্তে কথা কবেন।
বি। চপলে আমরা যখন বাগানে প্রবেশ করি তখন বােধহলাে যেন
একজন লােক এই বাড়ীর দিকে এলাে।
চ। (স্বগতঃ) সেই জন্যেই স্বসন্ত্রে আনলেম তা এখন ভেঙ্গে কাজ
নাই। (প্রকাশ্যে) অন্ধকারে ও রকম ছাওয়া দেখা যায়, ও কিছুই নয়।
তু মালতী। [ চতুর্থ মা হা বিধি! তুমি সত্য সত্যই কি অবিচারক, তুমি কি সত্য সত্যই নির্দয় ? দুঃখ মনস্তাপ কি সরলা নারীর জন্যই সৃজন করেছেন ? পশু পক্ষী প্রভৃতি সকল প্রাণিকেই স্বাধীন সুখ দিয়েছেন কেবল অভাগ্যবতী নারী জাতিই সেই পরম সুখে বঞ্চিত, সর্বদাই তারা পিঞ্জরাবদ্ধ পক্ষীর ন্যায় গৃহ- মধ্যে আবদ্ধ থেকে মনের দুঃখে কালক্ষেপ করে, কখনই স্বমতে কোন কাৰ্য্য করতে পারে না। যদি কেউ কখন আপন অভিপ্রায়ে কোন কর্ম করতে যায় তবে তখনই সে পিতা, মাতা, ভ্রাতা প্রভৃতি আত্মীয় বর্গের নিকট হতে একেবারে পরিত্যক্ত হয়, দুর্ভাগ্য ক্রমে বােধহয় আমার ভাগ্যেই বা তাই ঘটে। নতুবা অবিবেচক পিতারই বা এমন কুমতি হবে কেন ? তিনি কি মনে করেছেন আমি সেই পুরুষত্ব হীন নরপিশাচ বসন্তকুমারের গলে মালা অর্পণ করবাে ? আমি তার অধীন হবাে? তা কখনই হবে না, অনলে গরলে বা অতল জীবনে এ জীবন বিসর্জন দেবাে তবু তার মুখ দেখবাে না। কি দুঃখের বিষয় পিতা সন্তানের শত্রু চক্ষে দেখা দূরে থাক কখন কানেও শুনি নাই। হা বিজয়কেতু! হাঁ নাথ ! তােমাবিনে এ জীবন যৌবন ‘বৃথা। হাঁ নাথ কি কল্পে। গীত। বিফল বিহনে কান্ত সুকান্তি যৌবন। যথা অলি বিনা নহে পদ্মিনী সােভন। পতি প্রেম সুধা পান, না হইলে আস্বাদন। মকরন্দ পূর্ণ পদ্ম, যেন শুষ্ক অকারণ। মদন ঝটিকা ভরে, সদা শশঙ্কিতা করে, কে রাখে তাহার করে, বিনা পতি প্রিয়জন। গুরুজনে সাধে ব'দ, প্রেমােদে হল প্রমাদ, জীবনে আর নাহি সাধ, একি কপাল লিখন।
গর্ভা ] চতুর্থ অঙ্ক। ৪৫ চপলার গৃহমধ্যে প্রবেশ। . ; } চ। আমি। * মা। চপলা ? চ। তবু ভাল যে চিনতে পাল্লে। মা। চিনতে পারবেনা কেন ? চ। আর দুঃখ কেন, কোমর বঁাদ, তােমার সঙ্গে এক জন যুদ্ধ কত্তে এসেছেন তােয়ের হও। মা। দুঃখ দুর হবার সময় পেলেই আপনা আপনি দুর হবে। চ। এদিকে একবার চেয়ে দেখ দেখি, একে চিন্তে পার কি? বিজয়কেতুর গৃহমধ্যে প্রবেশ। মা। (লজ্জায় নতমুখী) চ। এখন আবার অমন করে বসে রইলে কেন ? তােমার যে অপার লীলা। এত দুঃখ, এত করুনা, এত খেদ, এত গান, এত কত কি, একেবারে সব ভাল হয়ে গেল? একেবারে নির্দোষে আরাম ? ও সব ছাড়, একবার দুজনে যেমন করে হক প্রাণ ঠাণ্ডা কর। যিনি প্রাণের প্রাণ তাকে দেখে কি অমন করে থাকতে হয়? স। যিনি প্রাণের প্রাণ তঁাকে আদর করে বটে, আর যিনি প্রাণের শত্রু তঁাকে কি করে ? চ। না হয় তাচ্ছিল্য করেই একবার ধর, তােমাদের ধরাধরি দেখলে আমাদের তৃষ্ণা নিবারণ হয়। স। যিনি মনে কষ্ট দেন তার সঙ্গে আমরা কথা কইনে।. বি। যে পক্ষ হতে বলা হল, সে পক্ষইবা সে বিষয়ে কম কি ? স। কেন? সে পক্ষ হতে আপনার প্রতি কি অন্যায়াচরণ করা হয়েছে? বি। ন্যায় কি অন্যায় তা জানিনা, হৃদয়ে আছে এই মাত্র, অন্যের হৃদয়ঙ্গম করা দুঃসাধ্য। ।
৫ ৪৬ মালতী। [ ৪র্থ গর্ভাঙ্ক ] অসি হন্তে বসন্তকুমারের প্রবেশ। ব। এই যে দিব্বি রাসলীলা হচ্ছে। মালতি! এ তােমার কি কাজ? তাের আচরণ কি? তুই পরপুরুষের সঙ্গে গােপনে প্রেমালাপে মত্ত আছিস? মা। নির্লজ্জ। নরাধম ! কাপুরুষ। আবার আমার কাছে এসেছিস। ব। নিলজ্জ কাপুরুষ কে ? আমি যে চোরের মত ঝোপে ঝোপে এসে থাকে সে? কাপুরুষ ত (বিজয়কেতুর প্রতি) ঐ তাের দুরাচার সুকান নাগর। বি। দুরাচার সাবধান। ব। তােকে আর বলব কি, তুই ত এক প্রকার চোর, তা না হলে এই অন্ধাকারে এই বাগানে এই দুপুর রাত্রে চুপি চুপি চপলার আচল ধরে আসবি কেন ? মা। নর পিশাচ। আর সহ্য হয় না, এখনই দূর হ, নইলে তাের ভারি অমঙ্গল। ব। অমঙ্গল ? একে একে দেখাচ্চি আমার কি আর কাদের। তবে তুইই আগে দেখ (মালতীকে কাটিতে উদ্যত) বি। (নিজ অসি দ্বারা বাধা দিয়া কি পামর! স্ত্রীলােকের উপর অত্যা- চার ? আয় আমার সঙ্গে আর। তবে আয়—আগে তােকেই যমালয়ে পাঠাই তার পর ঐ দুশ্চা- বিণকে উচিত প্রতিফল দিচ্চি। (উভয়ের অসি যুদ্ধ-পরে বসন্তকুমারের ভূতলে পতন। ব। উঃ প্রাণ যায়, মালতি। তােমার জন্য গেলেম, তােমার জন্য এ জমের মত সকল সুখে বঞ্চিত হলেম। উঃ আঃ নরাধম কি কল্লি ? মালতি ! শেষ দেখা দেখতে পাবনা, একবার সুমুখে এসে দাড়াও, তােমার চাদ মুখখানি দেখে মরতে পাল্লেও সুখী হব। তােমার সহবাস সুখ যে একদিনের জন্য ভােগ কৰ্তে পেলেম না এই দুঃখই মনে রইল। বড় আশা ছিলউঃ-আঃ-প্রাণ যায়—বড় আশা ছিল, তুমি আমার প্রণয়িনী হবে, তা ৩ আমাকে এত সুখ দেবেন কেন ? উঃ-আঃ-মালতী প্রাণ যায়, মালতী (মৃত্যু)।
• পঞ্চম অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
রাণ প্রভাবতীর শয়ন গৃহ।
প্রভাবতী আসীনা।
প্র। (স্বগতঃ) আজ আমার মনটা এত চঞ্চল হয়েছে কেন, এর কারণ ত
কিছুই বুঝতে পাচ্ছি না। কিছুতেই যেন মনে সুখ রােধ হচ্ছে না।
হৈমবতীর প্রবেশ।
প্র। হৈম! এস, এত সকালে উঠেছ যে ?
হৈ। একটু দরকার ছিল তাই সকালে উঠেছি। আপনাকে আজ
অমন দেখচি কেন ? অসুখ করেছে কি ?
প্র। না শরীরে কোন অসুখ হয় নি, তবে মনের অসুখ বটে। হৈম।
এবার যে কি বিপদই ঘটবে তা ঈশ্বরই জানেন। কাল রাত্রে মহারাজের
কাছে শুনলে যে দিল্লীর বাদসার সেনাপতি গােরাচাদ না কি বারগােবপুরের
বনে অনেক সৈন্য নিয়ে লুকিয়ে আছে। আর সেই দুষ্ট রাম হাজরা আবার
এদের সঙ্গে যােগ দিয়েছে। ভেবে দেখ দেখি আমাদের মাথার উপর কি
ভয়ানক বিপদই রয়েছে।
হৈ। মুসলমানেরা এসেছে তাতে আপনার আমার ভাবনা কি ? সে
ভাবনার ভার মহারাজের উপর, তিনিই তার উপায় করবেন।
প্র। হৈম! তুমি মুসলমানদের চরিত্র ভাল যান না তাই অমন কথা
বলছে। আমি মহারাজের মুখে শুনেছি যে তাদের জন্য তােমার আমারি
বেশী ভাবনা, কারণ তারা আগেই সতীর সতীত্ব নষ্ট করে, তার পর সর্বস্ব
সুট করে। ভাব দেখি,এ যদি সত্যিই হয় তাহলে আমাদের কি ভয়ানক
বিপদই হবে।
৪৮ মালতী। | প্রথম স্তভাবে একজন পরিচারিকার প্রবেশ। ? প। রাণী মা সর্বনাশ হয়েছে। প্ৰ। কি হয়েছে কি হয়েছে ? প। মহারাজ যার সঙ্গে রাজকুমারী মালতীর বিয়ের সম্বন্ধ ঠিক করে- ছিলেন, গেল রাত্রে সেই রাজপুত্র বসন্তকুমারকে কে একজন কেটে ফেলেছে। প্র। কি সর্বনাশ! বসন্তকুমারকে কেটে ফেলেছে ? কে সে জানতে পেরেছিস? প। আজ্ঞে না তা জানতে পারিনি। প্র। তুই এ খবর কি করে পেলি ? প। বেলা হলে ফুল পাইনা বলে শেষ রাত্রে রাজকুমারীর বাগানে ফুল তুলতে গিছলুম, বাগানে ঢুকেই দেখি যে উত্তর দিকে অনেক লােক গোলমাল কষ্টে আর অনেক আলো জ্বলছে, ভাবলুম: কারণ কি ; আস্তে আস্তে কাছে গেলুম, গিয়ে দেখেই ত একেবারে অবাক। দেখি বসন্তকুমার কাটা পড়ে রয়েছে আর যে কেটেছে তাকে চৌকিদারেরা ধরেছে। কিন্তু মা যে কেটেছে তাকে এক জন ভদ্রনােক বলে বােধ হলাে, রূপে যেন বাগান সালাে করে রেখেছে। প্র। ভদ্রলােক কেটেছে? মুসলমান কি.হিন্দু বুঝতে পাল্লি ? প। মচলমান বলে বােধ হলো না।... " প্র। মুসলমান নয় তবে হিন্দু ? হিন্দু কেটেছে এমন ত বােধ হয় না। আচ্ছা তাকে বড় মানুষের ছেলে বলে বােধ হুলাে কি? প। আজ্ঞে হা মা। প্র। আচ্ছা বয়েস কত ? প। এই আট গা কি সাড়ে আট গণ্ডা। মা এমন রূপ আমি কখন দেখিনি, যেন কার্তিক। সে.নিশ্চয়ই রাজার ছেলে হবে। প্র। রাজার ছেলে কেটেচে ? এর ভেতর কিছু না কিছু কারণ আছে। এখন কি বাগানে লােকজন আছে দেখে এলি - ? ।
গভাত পঞ্চম অঙ্ক। প। আজ্ঞে হয়। প্র। তবে তুই আর একবার যা, যতদূর পারিস সন্ধান নিয়ে আয়। যে আজ্ঞা। প্রস্থান। প্র। বসন্তকুমারকে কাটলে আবার মালতীর বাগানবাড়ী ত! এর ভেতর কিছু মতলব আছে। একবার চপলাকে.ডাতে পাঠাই। হৈ। না মা চপলাকে ডাকবেন না সে বােধ হয় মালতীর কাছে আছে। যখন শােনা গেল, যে কেটেছে সে ধরা পড়েছে, তখন অবশ্যই রাজসভায় বিচার হবে সেইখানেই তার পরিচয় পাওয়া যাবে। প্র। কি বিপদেই পড়েছি। আমার মরণটা হয়ত বাঁচি। মহারাজকে বলে বলে আর পাল্লেম না, বলি মহারাজ যেমন ছেলেটীকে এনেছ অমনি শগগির শিগগির ওদের দুহাত এক করে দাও। শুভ কৰ্ম্মে বিলম্ব কল্লেই এই হয়। তীর্থের পথেও কত গােলযােগ হয়ে গেল, আবার এদিকে মুসল- মানদের দৌরাত্ম, তার উপর এই কাণ্ড। হা ভগবান! অদৃষ্টে যে কি আছে বলতে পারি না। উভয়ের প্রস্থান। দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক। রাজা চন্দ্রকেতুর সভা। রাজা সিংহাসনে উপবিষ্ট, মন্ত্রী সভাসদগণ যথাযথ স্থানে উপবিষ্ট। বিজয়কেতু অপরাধীর স্থানে দণ্ডায়মান। রা। তুমি কি বসন্তকুমারকে হত্যা করেছ? বি। হ, করেছি। রা। কেন করে ?
মালতী। [ৰিতীয় বি। তার দুষ্কৃতির সমুচিত প্রতিফল হেতু। ৪। তার দুষ্কৃতির প্রতিফল তােমার দেবার কি ক্ষমতা আছে ? বি। ক্ষমতা না থাকলে সে দুরাচার অামার হস্তে বিনষ্ট হবে কেন ? রা। তুমি জান, প্রাণ নষ্ট কল্পে প্রাণ দিতে হয়? তােমাকেও তার অনুগামী হতে হবে। বি। সে বিষয়ে আমি ভীত বা কুন্ঠিত নহি। তবে প্রার্থনা, যেন, কাপুরুষের ন্যায় আমাকে বসন্তকুমারের অনুগামী না হতে হয়। ম। হত্যাকারি! গৰ্ব ত্যাগ কর, যদি কিছু কাল বাঁচবার সাধ থাকে তা হলে মহারাজের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, নতুবা কেন অকালে কাল- গ্রাসে পতিত হবে? এক্ষণে তােমার দেহ মহারাজের নিকট সম্পূর্ণ অধীন, রাখা না রাখা তার হাত। বি। কেশরীর দেহও সময়গুণে শৃগালের অধীন হয়ে থাকে, তাতে কি কেশরীর গর্ব খর্ব হয় ? রা। কি, অতদূর আস্পর্ধা? 'অত অহঙ্কার ? তাের মৃত্যু উপস্থিত, তবুও অহঙ্কারের পূর্ব নাই? মনে করেছিলাম দোষ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা কল্পে ক্ষমা করব, কিন্তু আর তােকে জীবিত রাখতে পাচ্ছি না, তােকে জীবিত রাখলে বোধ হয় আমারও অমঙ্গল সম্ভাবনা। তুই যখন আজ আমার বন্ধু-পুত্র বসন্তকুমারকে বধ কল্লি, তথন কাল আমাকে হত্যা কত্তে পারিস, অতএব তােকে আর একদণ্ডও জীবিত রাখব না। বি। (স্বগত) মা জগদম্বে বিপদুদ্ধারিণী বিশ্বজননি! যদি প্রকৃত পক্ষে আমি দোষী হই তাহা হলে আমার জীবনধারণে বাঞ্ছা নাই। মা। তুমি তত অন্তর্যামী, যদি নির্দোষী হই আর যদি তােমার শ্রীপাদপদ্মে দেহ মন অর্পণ করে থাকি যদি যথার্থই আমি আপনার শ্রীপাদপদ্মের সেবক হই, হলে মা! এই ভিক্ষা যেন মহারাজ চন্দ্রকেতুর আর মালতীর কোন অমঙ্গল রা। হত্যাকরী। এখন কমা প্রার্থনা কর। বি। ক্ষত্রিয়েরা কখন কাহার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে না।
পঞ্চম অঙ্ক।
রা। তবে আপন করে ফল ভােগ কর। (জল্লাদের প্রতি) হত্যাকারীকে
চণ্ডীর স্থানে নিয়ে যাও আমি ওর ছিন্ন মস্তক দেখতে চাই।
জ। যে আঙ্কা।
বিজয়কেতুকে বন্ধন করিয়া জল্লাদের প্রস্থান।
তৃতীয় গর্ভা।
0.
-
চণ্ডীকার মন্দির। প্রতিষ্ঠিত কালিকা-মুত্তি, কমলাকান্ত পূজায় নিবিষ্ট।
করবদ্ধ বিজয়কেতুকে লইয়া ৪ জন জল্লাদ ও প্রহরীর প্রবেশ।
প্ৰ। এই যে ঠাকুর মশাই এখানে আছেন, বেশ হয়েছে।
ক। (উঠিয়া) একি! যুবরাজ বিজয়কেতু না?
বি। আজ্ঞা হা।
ক। একি! আপনার এ অবস্থা কেন?
প্র। ঠাকুর মশাই! ওর সঙ্গে বেশী কথা কবেন না।
ক। কেন?
প্র। কেন তার উত্তর আপনার শুনে কার নাই, আপনি খালি ওকে
উচ্ছপ,গু করে দিয়ে যান।
ক। ওকে উৎসর্গ ! একি কথা?
বি। আপনি এখন এস্থান হতে প্রস্থান করুন। আমি যখন ডাকৰ
তখন আসবেন।
ফ। অগত) চুপি চুপি দেখতে হয়েছে পারটা কি।
মালতী। | তৃতীয় বি। তােমরা একটু তফাতে দাঁড়াও আমি একটু স্তব করে নিই। পালাবনা ভয় নাই তােমরা আমাকে ঘিরে থাক। উপবেশন ১ম জ। আহা, এমন নধব গা, এ গায়ে কি করে কি করা যাবে ভাই? ২য় । কি করবি বল, যদ্দিন খেতে পত্তে হবে, তদ্দিন রাজা যা যা কত্তে বলবে তাই তাই কত্তে হবে। ৩য় জ। তা ত বটেই। ১ম জ। এ যে করে ভাই রাজার সঙ্গে কথা কইলে, তাতে একে ষােল আনা দুষী বলে বােধ হয় না। ২য জ। অরে চুপ চুপ, রাজা যা বিচের করেচে তার ওপর কি আমা- দেব কথা কইবার যাে আছে ? এখন তাের বিচের বেখে দে, এখন রাজা যে কাজ কওে পাঠিয়েছে তাই শেষ করে শিগগির শিগগির ফিরে যাই চ। ৩য় জ। ভাই! মুণ্ডুটা কে হাতে করে নিয়ে যাবে, আমি ত পারব না। আমার বউ আজ ৩ মাস পোয়াতি। ১ম এ। বড় কথা মনে করে দিলি, তোকে অাব কি আশীৰ্ব্বাদ করব, তুই বেঁচে থাক্, আমার মত তাের মেগের হাত হক। দেখ ভাই আমার বউ একবার পােয়াতি হয়েছিল, সেই সময় একদিন আমি একটা চোরকে ধরে বেচাবাকে মেরেছিলুম। তার পর ভাই চোরটাকে রাজার সভায় দিয়ে বাড়ীতে এসেই দেখি যে আমার বউয়ের গঝপাৎ। আমি ত ভাই প্রাণ গেলে আজ এ কাজ কত্তে পারব না। ২য় জ। আরে রেখে দে, আমি ওসব মানি টানিনি। বেঁচে থাকুক আমার কত্তা ভজার দল বেঁচে থাকুক আমার বেহ্ম সভার দল, কত পােয়াতি কত গরুপাৎ হয়ে যাচ্ছে তার খোঁজও নেই খবরও নেই। এখন আয় রাজা যা কত্তে বলেছেন তাই করা যাগ। (নেপথ্যে বিকট হাস্য) ও বাবা! এ কিরে ?
গর্ভাব্দ]
পঞ্চম অঙ্ক।
২য় জ। এ কারা হাসলে রে? কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।
ওরে বড় ভাল বোধ হচ্ছে না। ওগগা মশাই, আপনি যা হয়
এক বুকম করে থাকুন আমরা কাজ সেরে ফেলি, আর আমরা দেরি কত্তে
পারিনি।
বি। একটু অপেক্ষা কর, বাহিরে কারা হাসলেন জানতে
পেরেছ কি ?
২য় জ। মশাই, ও হাসি ফাসির কথা আমরা বুজি টুজিনি। আমরা
এখন যা বলি তাই কর, আমরা কাজ সেরে বাড়ী যাই। ওরে তলােয়ারখানা
চোকান আছে কি ? না থাকেত শাণিয়ে নে। এমন করে শাণাবি যেন
এক কোপেই হয়ে যায়। রাজার হুকুম, মনে আছে ত, কাটা মুণ্ডু
মুণ্ডু দেখাতে
হবে।
বি। বাপু তােমরা একটু অপেক্ষা কর, আমি তােমাদের ভাল করে
বশীস করব।
৩য় জ। আর মশাই, বকশীস করবে কখন? এখনই ত তােমার
হয়ে যাবে।
বি। আচ্ছা আগে কিছু দিচ্ছি, (অর্থদান) এখন একটু অপেক্ষা
৩য় জ। (২ জনকে দেখাইয়া) ওরে ভাই এষে সােনার টাকা। (আন্তে
আস্তে) আর একটু মােচাড় দিলে আরও কিছু পাওয়া যাবে, তাহলে আর
আমাদের পায় কে।
১ম জ। আচ্ছা ভাই একে কি করে কাটবি? এমন দয়ার শরীর।
বেছারা যেন রাজপুত্তুর, এত ভাই রাজার ছেলে না হয়ে যায় না
২য় জ। বেশী লােভ করিসনি, এই যা পাওয়া গেছে এই ঢের।
দেরি করে কাজ নাই।
বি। আর একটু যদি অপেক্ষা কর তাহলে আমি তােমাদের রকম
আর এক হাজার সােনার টাকা দিব আর একটু চুপ করে থাক।
(চক্ষু বুজিয়া ধ্যান।)
মালতী।
[ তৃতীয় গর্ভা।
১ম জ। কেমন এখন আপনার হয়েছে তাে?
বি। হ্যা হয়েছে, এখন বল আমায় কি কৰ্তে হবে।
২য় জ। আর কি কৰ্তে হবে ? চোক বুজিয়ে উপুড় হয়ে শােও আমরা
কাটি, আর দেরি কর্তে পারি না।
(বিজয়কেতু শুইলেন জল্লাদ যেমন অসি উত্তোলন করিল অমনি
পশ্চাৎ হইতে কতিপয় ডাকিনী যােগিনী আসিয়া জল্লাদের হস্ত হইতে
অশি কাড়িয়া লইল ও সকলকে কাটিতে আরম্ভ করিল ও মাভৈ মাতে
শব্দে দেবিমন্দির প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল।)
ষষ্ঠ অঙ্ক। প্রথম গর্ভাঙ্ক। মালতীর শয়ন-গৃহ। মালতী শয়ন, পাশ্বে সখী উপবিষ্টা, একটা প্রদীপ ক্ষীণ আলােকে জ্বলিতেছে। মা। অঙ্গ। তুমি আজ এত পরিস্কার কেন ? যিনি তােমাকে পরিষ্কার দেখতে ভালবাসেন তিনিতাে জীবিত নাই ? তবে তােমার এত পরিচ্ছন্ন থাকবার আবশ্যক কি? আর না, আর তােমার পরিষ্কার থাকা শােভা পায় , ধূলি ধূসরিত হও (অঙ্গে ধূলি লেপন), অলঙ্কার ! তােমরা আর এ দেহে কেন? যার জন্য তােমাদের শােভা, তিনিতাে আর এ পৃথিবীতে নাই ? তবে আর আমার এ অসার দেহে কেন বৃথা আশ্রয় গ্রহণ করেছে ? তােমরা এ আশ্রয় ত্যাগ কর, আমি আর তােমাদের মুখ দেখব না, তােমর দূর হও। (শরীর হইতে অলঙ্কার সকল মােচন ও দূরে নিক্ষেপ ) ( হঠাৎ গাতােখন ও মুকুরের নিকট দণ্ডায়মানু) হ বেশ হয়েছে। একি ঘরে জ্যোৎস্না এসেছে, চুাদের জ্যোৎস্না ? যদি চঁাদের কাছ থেকে এসেছ, তবে এত গরম কেন ? উঃ! এযে ভয়ানক গরম। গ্রীষ্মের রৌদ্রের চেয়েও গয়ম ! চন্দ্রদেব! আজ তােমার কিরণ এত উষ্ণ কেন? বড় যাতনা । দেহ জ্বলে গেল ! মন জ্বলে গেল। প্রাণ জলে গেল। আর যে সহ্য হয় না হা বিজয়কেতু! হা জীবিতনাথ ! হা হৃদয়েশ ! হা নাথ । (মুচ্ছ)। স। ওমা! একি! মালতী ষে মুচ্ছ গেলেন! (শুশ্রুষা) হে ভগবান। কি কল্পে ? কি কল্লে? এসব যন্ত্রণা কি নারীজাতির জন্যই সৃজন করেছিলে? ( উদৃষ্টে করযােড়ে) হে মধুসূদন ! হে দয়াময়! রাজকুমারী মালতীর
মালতী।
[ প্রথম গর্ভাঙ্ক ]
গর্জাঙ্ক )
মনে শান্তি দাও ; অহে! সহায়হীনা অবলাকে আর কষ্ট দিও না। হে
চন্দ্রদেব! তুমি অমৃত বর্ষণে এই রাজকুমারীর অন্তরের তাপ দূর কর।
মাতঃ বসুন্ধরে ! তােমার ক্রোড়চ্যুত করে রাজনন্দিনী মালতীকে যেন
কালের ক্রোড়ে নিক্ষেপ কর না। (মালতী নিঃশব্দে উঠিয়া চলিয়া গেলেন)
হে জিমূতদল ! তােমরা শশধরকে যেমন আচ্ছাদন করে থাক, সেইরূপে
পামর কালের করাল বদন ঢেকে রাখ যেন সে দুরাচার রাজকুমারীকে গ্রাস
কত্তে না পারে। হা মহারাজ চন্দ্রকেতু! তােমার কন্যার দশা কি কল্লে ?
নেপাথ্য (গীত)।
র
জীবনে কি ফল বল, আশা যদি না পুরিল।
আপন কপাল দোষে অমৃতে বিষ উঠিল।
বড় সাধ ছিল মনে, সুখী হ’ব তার সনে,
পোড়া বিধি সঙ্গোপনে সে সাধে বাদ সাধিল ।
আশা-তরু আবােপিয়ে যত্নে যত্ন বারি দিয়ে,
রাখিলাম প্রমবনে করিয়া যতন ;-
কোথায় ফলিবে সুফল নিরাশা বায়ু প্রবল,
একেবারে করি বল মুলসহ উচ্ছেদিল ।
কৃ। একি! মালতী কোথায় গেলেন? বাইরে গান গাইলে কে ?
প্রদীপটীও নিবে গিয়েছে, মালতী কোথায় গেলেন, অন্ধকারে কোথা খুঁজব।
[ নেপথ্যে গীত।
দেখি দেখি কে গান করে, মালতীর স্বর না? এ ত পষ্ট বুঝিতে পাচ্চি
, যাই দেখি দেখি কে গান কচ্ছে।
(
গর্ভা
যষ্ঠ অঙ্ক
৫৭
দ্বিতীয় গর্ভা।
প্রাঙ্গণ।
মালতী পূর্বের গান গাইতেছেন।
( দৈববাণী ।) মালতি। চিন্তা করও না, তােমার স্বামী বিজয়কেতুকে
তুমি পুনঃপ্রাপ্ত হবে।
মা। একি দৈববাণী ! দেখি কতদূর সত্য হয় (স্থিরভাবে উপবেশন)।
স। আহা উপায় কি, কি করি, কি উপায়ে একে শান্ত করি, এক উপায়
ভিন্ন অন্য উপায় ত আর দেখিতে পাই না। হা মহারাজ চন্দ্রকেতু! কি কল্লে
মালতী তােমার এক মাত্র কন্যা, পিতা হয়ে ভার এ দশা কি করে কলে, পিতা
হয়ে তুমি তােমার কন্যার এ দশা যাবজ্জীবন কি করে দেখবে ?
একান্তে চপলার প্রবেশ ও চুপে চুপে সখীর চঞ্চল টানিল।
সখী। কেও ?
-
চপ। আমি চপল, গােল করাে না, ফিরে এসেছি ভয় নাই। তুমি
এইখানে দাঁড়াও, আমি মালতীর সঙ্গে দুটা কথা কই (মালতীর সম্মুখে
গমন)।
মা। কেও ? চপলা
কেও ? চপলা তুমি কোথা থেকে? আমাকে এখন চিন্তে
পাচ্চ? এখন আমার কেমন বেশ হয়েছে দেখ দেখি ।
চপ। তােমার এ বেশ কেন ? কে কল্লে ? কে তােমার এমন শক্ত
আছে ?
মা। এ বেশ কে কল্লে তা আবার জিজ্ঞাসা কচ্চো? এ বেশ কি
আর কারো করবার ক্ষমতা আছে? আমি আপনি করেছি। আর কেন
এবেশ করেছি তাও আবার বলতে হবে ? (ক্রন্দন) তুমি কি জান না
চপলা আমার কি সর্বনাশ হয়েছে ? তুমি কি জাম না যে আমি সকল সুখে
একেবারে জলাঞ্জলী দিয়েছি ?
চপ। তুমি যে রাম না হ’তে রামায়ণ গাইছ। তােমায় কে বল্পে
৫
}
মালতী।
f তৃতীয়
যে তােমার সর্বনাশ হয়েছে ? তুমি একজন বুদ্ধিমতী হয়ে পরের কথা
বিশ্বাস কর ? এখন আমার সঙ্গে এস।
মা। কোথা যাব।
চপ। কোথা যাবে বলব আর কি, সঙ্গে এলেই জানতে পারবে।
মালতীকে লইয়া প্রস্থান।
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
মালভীর গৃহ।
মালতীর ও চপলার প্রবেশ চপলা মালতীকে
গহনা পরাইতে পরাইতে
গীত।
আজি কি সুখের নিশি হল ভ সম্মিলনে।
জীবন শীতল হল পেয়ে প্রাণনাথ ধনে।
তােমা বিনা দিবানিশি, অধরে না ছিল হাসি,
(এখন) দুরে গেল দুঃখ রাশি, সুখ শশী দরশনে।
আজি বহুদিন পরে, ধরিলাম মনােচোরে,
এখন হৃদি কারাগারে, রাখিব যতনে ;-
বিধিমতে সাজ। দিব, কারা হতে না ছাড়িব,
মদনেরে বলে দিব, বান মারে নিশি দিনে।
মাল। তুমি যে আমাকে আরও পাগল কচ্চো, মোৰ কি ভাবে
গান? আর এমন সময় গান ?
প। পামের সময় না হলে কি খাচ্ছি
1
পাঙ্ক] 'যষ্ঠ অঙ্ক। মাল। এর চেয়ে মন্দ সময় আর কি লােকের হয় ? চপ। সখি এ সময় লোকের প্রার্থনীয়, এমন সময় লাক্ষের দাগ প্রায় ঘটে না। মাল। আমি তাে তােমার কোন কথাই বুঝতে পাচ্ছি না। চপ। তুমি কি মনে কচ্চো যুবরাজ বিজয়কেতুর কোন অমঙ্গল হয়েছে ? মাল। আর বাকি আছে কি ? চপ। বালাই তঁার সত্তরের অমঙ্গল হক। তুমিও যেমন পাগল তেমনি বুকোচ। মাল। কেন তার কি হয়েছে ? চপ। তা শুনবে না কেবল পাগলের মত যা ইচ্ছে তাই করবে আর ববে। মনকে স্থির কর তবে ত বলবাে। মাল। চপলা তাের পায়ে পড়ি, আমার সব ভেঙ্গে বল, ভার কি হয়েছে। চপ। তার কিছুই হয় নাই। আমি থাকতে যদি তােমায় সুখে না রাখতে পারি, তা হলে আমার বেঁচে থাকার ফল কি ? মাল। চপলা দেরি করিসনি, কি হয়েছে, শিগগির বল ? চপ। অত অস্থির হলে আমি কি করে বলি ? আচ্ছা আমি স্থির হলাম, এখন বল। চপ। তিনি বেঁচে আছেন। মাল। কে বাচালে? চপ। ভগবান। মাল। সত্তি সত্তি বলছিস, চপলা ! আমার মাথা খাস ? চপ। তােমার দিব্বি করে বলছি তার কোন অমঙ্গল হয় নাই। মাল। আমার যে কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না। চপ। তঁাকে দেখলেই ত তােমার বিশ্বাস হবে ? মাল। তুমি কি আমাকে এই সকম কথা বলে বোঝাতে এসেছ? চুপ। এবােঝন কদিন চলে ? ভাল একটা কথা:তামাম্বু বলব কি ? মাল। কি বল। চপ। তোমার উপর কি দৈববাণী হয়েছে তা মনে আছে কি? মাল।
T মালতী। মাল। হা আছে। চপ। হা আছে’ বক্সে হবে না; তুমি যুবরাজকে পাবে এমন দৈববাণী হয়েছে কি না? মাল। তুমি কেমন করে জানলে ? চপ। (স্বগতঃ) আমি নিজেই যে দৈববাণী তা এখন বুঝতে পারেন নাই। উনি ত উনি আমরা মনে কল্পে ভগবানকে চরকিতে ঘােরাতে পারি। মা। চুপ করে রইলে যে ? চ। তােমার সঙ্গে আর কি মিচিমিচি কথা কব। মা। তাের পায়ে পড়ি চপলা আমাকে বল তার কি হয়েছে ? চ। তঁাকে দেখতে পেলেই ত হল ? মা। ই। তা হলেই হল—আর কিছুই চাই না। চ। চাইতে বাকিটে কি রইল ? মা। আর কথা কইতে পারি না বড় অস্থির হয়েছি। চপলার ঈঙ্গিতে বিজয়কেতুর প্রবেশ । বি। কেন মালতি এত অস্থির হয়েছ কেন ? কেন হয়েছি। (মালতীর গাত্রোখান ও বিজয়কেতুর হন্তধারণ) যুবরাজ! প্রাণেশ্বর ! তুমি কি (মুচ্ছ—যেমন পড়িবেন বিজয়কেতু ও চপলা ধরিলেন, বিজয় আপন অঙ্কে করিয়া বসিলেন)। বি। চপলা শীঘ্র জল নিয়ে এস। মা। ট। যে আজ্ঞা। প্রস্থান। বি। মালতি! মালতি। প্রাণেশ্বর ! কেন এমন হলে ? মালতি। (চপলার জল আনয়ন ও মুখে শিঞ্চন।) মা। চপলা। যুবরাজ কোথায় গেলেন? বি। এই যে মালতী তোমায় ধরে বসে আছি। ভয় কি আমার জন্য আর কিছু ভেব না। আমি নিরাপদ হয়েছি। জগদম্বা আমাকে রক্ষা করেছেন।
ষষ্ঠ অঙ্ক। * গর্ভা মা। (উঠিয়া) যুবরাজ! প্রাণেশ্বর ! নাথ ! বিজয়কেতু! এত কষ্ট কি দিতে হয় ? দুরাচার বসন্ত কুমারের হাত থেকে যে এড়াব তা আর মনে ছিল না। তার হাত থেকে যদি এড়ালেম তার পর তােমার এই বিপদ; একি কম বিপদ? প্রাণ সংহার। উঃ কি ভয়ানক ? এখনও মনে হলে গা কেঁপে উঠে শরীর অবশ হয়। বি। মালতি ! আমার সাধের মালতি! আমার হৃদয়ের ঈশ্বরী মালতি। আর কেন সে কথা ভাব, সে সব কথা মনে করে কেন আর বৃথা শরীরকে মনকে কষ্ট দিচ্চ ? প্রিয়ে! স্থির হও, আমিই তােমার সকল অনর্থের মুল, আমিই অপরাধী, আমাকে ক্ষমা কর । মা। বিজয় ! তুমি পদে পদে এ পাপিনীর জন্য যৎপরােনাস্তি কষ্ট পেয়েছ, পদে পদে অপমানিত হয়েছ, পদে পদে বিপদে পতিত হয়েছ, তুমি নির্দোষী, ভেবে দেখলে আমিই অপরাধিনী। বি। তুমি আপন মুখেই আপনার দোষ স্বীকার কল্লে, দোষী ব্যক্তির ত বিচারে দণ্ড পাওয়া উচিত? মা। কি দণ্ড দেবে দাও, আমি বুক পেতে নিচ্ছি। বি। (স্বগত) একি! আমি কি কচ্চি । আমি কি পাগল হয়েছি। এখন রাজা রাণী আমাকে চিনৃতে পারেন নাই, আমি গােপনে এ কি করছি ? আর আমাকে চেনা দূরে থাকু আমার উপর যখন রাজার বধাজ্ঞা হয়েছে, তখন তিনি নিশ্চয় জানেন যে আমি এ পৃথিবী ত্যাগ করেছি। মহামন্ত্রীর অনন্ত কৃপায় যখন আমার এক প্রকার পুনর্জন্ম হয়েছে তখন কোন কোন বিশেষ কার্যে ব্রতী হয়ে তাদের নিকট পরিচিত হতে হবে, এই আমার ইচ্ছা, দেখি জগদম্বা কি করেন, অবশ্যই আমার মন-আশা ফল, হবে। এখন এস্থানে এরূপ গোপনভাবে থাকা আমার শােভা পায় না। (প্রকাশ্যে) মালতি ! যখন মা জগদম্বার অনন্ত কৃপায় আমার জীবন রক্ষা হয়েছে, তখন আমার একটা অনুরােধ তােমায় রক্ষা কত্তে হবে। মা। কি অনুরােধ ? আর অনুরােধ কথাটা বলতে কি তােমার একটু লজ্জা হলাে না, আমার কাছে অনুরােধ ? বি। না না, মালতি আমার একটা কল আছে।
মালতী।
[ চতুর্থ
;
মা। হা এখন বল।
বি। রাজা রাণী জানেন যে জল্লাদের আমাকে বধ করেছে। কৃপা-
ময়ীর অনন্ত কুপায় যে আমি জীবন প্রাপ্ত হয়েছি তারা এখনও পর্যন্ত
জানতে পারেন নাই। এখন আমার এই অনুরােধ-না না, এই কথা যেন
তুমি আর আমাদের পরম বন্ধু চপলা ঘুণাগ্নে তাদের নিকট এ বিষয় প্রকাশ
না কর।
5 ।
যে অজ্ঞা-
*
মা। কতদিন এভাবে থাকতে হবে ?
বি। তা বড় আর অধিক দিন নয়, ঈশ্বর শীঘ্রই আমাদের কূলে আন্-
বেন; এখন আমি চল্লেম।
প্রস্থান।
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
রয়িী প্রভাবতীর উপবন।
-
রাজা চন্দ্রকেতু ও প্রভাবতীর প্রবেশ ।
চ। রাঙ্কি! রাগ সম্বরণ করূতে না পেরে আমি একটী অত্যন্ত অন্যায়
কাৰ্য্য করেছি। তাতে আমার এতদূর মানসিক পীড়া হচ্চে যে কিছুতেই
শান্তি পাচ্ছি না।
প্র। কি অন্যায় করেছ মহারাজ ?
চ। বসন্তকুমারকে যে হত্যা করেছে, তার বধাজ্ঞা দিয়ে অত্যন্ত
অন্যায় করেছি।
প্র। তা এত অন্যায় কাজ হয় নাই মহারাজ! উচিত্ সাজাই দেওয়া
হয়েছে। আমার সাত নাই, পাঁচ নাই, একটা মেয়ে, বড় সাধ ছিল বসু
কুমারের সঙ্গে বিয়ে দিক তারা দুজনে মনের সুখে থাকবে, আমি চোকে
ষষ্ট অঙ্ক। গর্ভাঙ্ক) দেখে জন্ম সার্থক করব। দেখ দেখি, সেই দস্যুর জন্যই আমি সে আশা ভরসায় একেবারে জলাঞ্জলি দিলেম। আরও দেখ, বসন্তকুমার একজন যে সে ছেলে নয়, একজন রাজার ছেলে ; তোমার বন্ধুর ছেলে, মনে কর আজ যদি তার বাপ মা বেঁচে থাকতেন তাহলে আমাদের কি বিপদই ঘটত ? তুমি বধ কত্তে হুকুম দিয়েছ বেশ করেছ। চ। না রাজি ! ভাল কাজ করি নাই, এখন বুঝতে পাচ্চি একেবারে বধাজা দেওয়াটা আমার ভাল কাজ হয় নাই। আরও বিশেষ হত্যাকারীর আকৃতিতে আর তার গর্বিত কথাতে তাকে এখন যে সে একজন সামান্য লােক বলে জ্ঞান হচ্ছে না। প্র। আচ্ছা বসন্তকুমারকে সে কেন খুন করেছে, তা জানৃতে পেরেছ? ৮। কেন যে করেছে তার কারণ এখনও বিশেষরূপ জানতে পারি নাই তবে মালতীর বাগান-বাড়ীতে বসন্তকুমারকে একজন হত্যা করেছে এই মাত্র জানা গেছে। প্র। আচ্ছা আমি একটা কথা বলি, মালতী রাজার মেয়ে তার বাগান-বাড়ীতে রাত্রে দুজন লােকে কাটাকাটি করেছে, এত বড় ভাল কথা নয়! এখন আমার বােধ হচ্ছে চপল যা বলেছিল তাই বা ঘটেছে ? 'চ। কেন? চপলা কি বলেছিল ? প্র। একদিন কথায় কথায় চপলাকে বলেছিলেম যে ‘শীঘ্র শীঘ্র বস কুমারের সঙ্গে মালতীর বিয়ে দিলেই আমার প্রাণটা জুড়ায়। কিন্তু সে কথায় চপলা অসন্তুষ্ট হয়ে বলেছিল যে মালতী বসন্তকুমারকে বিয়ে করবে না। চ। কেন ? প্র। শােন, আমি বল্লেম কেন? বসন্তকুমার রাজার ছেলে, দেখতে চাদের মত, কেন সে তাকে বিয়ে করবে না। তাতে সে বল্পে যে মালতী মনে মনে আর একজনকে পতিত্বে বরণ করেছেন। চ। সে কি? তার পর তার পর ? প্র। তার পর বলেম কে সে? তাতে সে বলে যে তারা ধন কাশী থেকে ফিরে আসে তখন পর্থে এক যুবকের সঙ্গে তা দেখা যায়। ১ ! মালতী। [ চতুর্থ তিনি গুদের পরম বন্ধু আব তিনিই যবনদেব হাত থেকে ওদের পবিত্ৰাণ না করলে ওদেৰ ধৰ্ম প্ৰাণ সবই নষ্ট হত। চ। বটে বটে? তা এসব কথা ত আমাকে আগে বল নাই ? তার পর? প্ৰ। তাৰ পৰ জি জাসা কমে কে সে ? তাতে সে বল্পে যে তিন হস্তিনাগড়ের রাজপুত নামটী কি বল্লে অহা-চিন্তা) চ। বিজযকেতু ? প্র। হা হা বিজয়কেতু। চ। (চমকিয়া) কি সব্বনাশ কি সৰ্ব্বনাশ! প্রভা কি সৰ্ব্বনাশ কবেছি ? । তা মহাৰাজ ও বিজযকে তুই যে এখানে এসেছিল তারি বা প্রমাণ কি ? তিনি রাজার ছেলে, এদেশে এসে গোপনে ছিলেন তা ত আমার বিশ্বাস হয় না। চ। নিশ্চই সেই বিজষকেতু। এখানে বােধ হয ওবা কোন কৌশলে তাকে আনিবেছিল। প্রিযে! কি সৰ্ব্বনাশই কবেছি ? আমার বিজয়কেতুর সর্বনাশ আমিই কমে ? ও জগদীশ্বৰ ! কি কলে কি করে, মালতী আত্ম- ঘাতিনী হবে ? নিশ্চয় সে আত্মঘাতিনী হবে। প্র। সেকি মহারাজ ? চ। আর সেকি মহাবাজ ? হস্তিনাগড়েব রাজা হংসকে তু যিনি আমার সহ দয় অপেক্ষা প্রিয়তর এই বিজয়কেও তার পুত্র। প্র। তঁাব নাম না ননীকুমার ? চ। আহা পার ননীর মত দেহ বলে আর রাজার একমাত্র সন্তান বলে রাজা রাণী তাকে ‘ননীকুমার’ বলে ডাকতেন। প্ৰ। সেই ননীকুমার এই বিজষকেতু, বাজা হংসকেতুৰ ছেলে ? চ। তবে আগে তুমি আমাকে এসব কথা বল নাই কেন? প্র। আমি জানি যে হস্তিনাগডের রাজাব ছেলের নাম ননীকুমার। যখন নামের গােলমাল হলাে, তখন আমার সন্দেহ হয়েছিল, ভাবলেম আর কোন বিজয়কেতু হবে। নেপথ্যে। ও বাবা ও বাবা রক্ষা কর বৃক্ষা কর। ওগাে কে কোথা আছ? ব্রহ্মহত্যা হয, শিগগিব আমাকে বক্ষা কর।
গর্ভক্ষ
ষষ্ঠ অঙ্ক।
চ। ওকি ? কে আবার রাস্তায় চেঁচায় ? ব্রহ্মহত্যা হয় যে বলে ।
কি বিপদ, এযে বিপদের উপর বিপদ দেখচি ?
প্ৰ। কৈ আরতাে চেঁচাচ্চে না? বােধ হয় চলে গেছে।
চ। না এখানে একটু অপেক্ষা কর আমি একবার দেখে আসি।
প্রস্থান।
প্র। কি সর্বনাশই হচ্ছে। এদিকে মুসলমানদের ভয়, কখন, নগরে
আসে ; আবার একটা রাজার ছেলের প্রাণ নষ্ট ; তার উপর আবার রাস্তায়
কে ‘ব্রহ্মহত্যা হয় বলে চেঁচাচ্চে। হে মধুসূদন! হে অনাথনাথ ব্ৰহ্মা
করুন; রক্ষা করুন।
(রাজা চন্দ্রকেতু ও একজন প্রতীহারী মুচ্ছিত কমলাকান্তকে ধরাধরি
করিয়া প্রবেশ ও কমলাকান্তকে শুয়াইলেন।)
কে আপনি? ভয় নাই ভয় নাই ? কথা কন, লাল সিং তােম
যাও পানি লেয়াও।
প্রতী। জো হুকুম মহারাজ।
প্র স্থান।
বাৰ্তী। কি সর্বনাশ! আর যে কথা কন না?
চন্দ্র। এ আবার কি বিপদ। মহাশয় কে আপনি? আপনি নিরা-
পদ হয়েছেন চক্ষু চান, কথা কন ভয় নাই।
কম। হা হা উ' (আবার নিস্তব্দ)
চন্দ্র! কি সর্বনাশ! বিপদ যে বিপদের অনুগামী, তা আমা হতেই
আজ প্রত্যক্ষ দেখা যাচ্ছে। (মুখে জল দিয়া) কথা কন, চক্ষু চান, কে
আপনি ?
কম। হা।
রাজ্ঞী। আঃ বাচলেন।
চন্দ্র। এ যে পরিচিত স্বর। এ যে (বিশেষ করে দেখিরা) কমলাকান্ত ভয়
পেয়েছ নাকি ?
কম। একটু জল খাব।
তু
মালতী।
| চতুর্থ
প্র। তাইত এযে সহজ গােলমাল নয়।
(নেপথ্যে মহা সৈন্য কোলাহল।)
চ। এযে ক্রমে বৃদ্ধি।
এভাবে একজন সৈন্যের প্রবেশ।
সৈ। মহারাজ মুসলমানেরা নগরে এসেছে। রাজবাড়ির নিকট এলো।
প্র। কি সর্বনাশ ?
চ। কি বল্লে দুরাত্মারা এসেছে ? ভয় নাই ভয় নাই আমার সমস্ত
সৈন্য সশস্ত্র আছে ত ?
সৈ। আজ্ঞে হাঁ।
চ। প্রিয়ে অন্দরে যাও।
প্রভার প্রস্থান।
সৈন্যাধ্যক্ষ জয়সেন ও বিজয়সেনের প্রবেশ।
চ। মুসলমানেরা নগরে এসেছে ?
জ। আজ্ঞা হা।
চ। জয়সেন ! তুমি আর আমি আর ২০০০ পদাতিক সৈন্য দুর্গ রক্ষা
করি ; বিজয়সেন তুমি নগর রক্ষার জন্য যাও, যাও বিজয় তােমার যত
সৈন্য আবশ্যক নিয়ে নগর রক্ষা কর।
বি। যে আজ্ঞা।
প্রস্থান।
চ। জয়সেন! তুমি ১০০০ পদাতিক নিয়ে দুর্গের উপরে যাও, আর
আমি ১০০০ পদাতিক নিয়ে দুর্গের নিয়ে থাকব, কোন ভয় নাই প্রাণপণ
। করে সকলদিক রক্ষা কত্তে হবে আর দুরাচারদের বিনষ্ট কত্তে হবে।
জ। আজ্ঞা হ—আর ওরা অত্যন্ত ছিদ্রান্বেষী কপট, এমন কোন
উপায় কতে হবে যাতে ওরা কোন ছল কৌশল কত্তে না পারে।
চ। যথার্থ কথা তবে এখন চল। (নেপথ্যে রণবাদ্য।)
উভয়ের প্রস্থান।
সপ্তম অঙ্ক। প্রথম গর্ভাঙ্ক। অশখ বৃক্ষ মূল। ফতেউল্লা ও কতিপয় মুসলমান সৈন্য একটি স্ত্রীলােককে বেষ্ঠন করিয়া আছে। খা। দেখ, আমি বারবার বলচি তােরা যদি মিচিমিচি গােল করবি, তা হলে আমার এই জানির পায়ের নাতি খাবি। ১ম সৈ। (স্বগত ও পায়ের নাতিত খেতে পাল্লে হয়। আচ্ছা শালা থাক, তাের বুকে হাঁড়ি না নাবাই ত আর করিম নাম ধরিনি। (সকোপে দৃষ্টিপাত) ফ। সুন্দরি! এখন আমাকে চিনতে পেরেছ ? আমি দিল্লীশ্বরের সেনাপতি, আমার নাম ফতেউল্লা। স্ত্রী। আমি আপনাকে অনেকক্ষণ চিনিচি। আপনি একজন মস্ত লােক, ৩ আপনার আরও পদ বৃদ্ধি করবেন, কেন না তিনি দুষ্টের দমন আর শিষ্ঠের পালন কর্তা। আপনি শিষ্ট শান্ত, মিষ্টভাষী, দান্ত, ক্ষান্ত, বদান্য, দয়ালু, ধর্মাবতার, কুৰ্মাবতার, শূকরাবতার, অধিক কি বলব—আপনি সৰ্ব্ব ঘৃণাধার। ফ। (পকেট হইতে একখানি ঘােট আয়না ও একখানি মােটা চিরুণী বাহির করিয়া চুল আঁচড়াইতে আঁচড়াইতে) দেখ সুন্দরি ! আমার চুলের ওপর বড় সক, একটু উসকু খুসকু রাখা ভাল বাসিনি। আর আমার চেহারাও বড় নিন্দের নয়? কেমন সুন্দরি ? স্ত্রী। নিন্দের ? যেন বিজলি খেলচেন। আপনার চুলের কথা আর কি বলব এমনি নরম যে শুড় কাটা হাতির রোয়াও হার মেনে যায়।
৭০ মালতী।' [ প্রথম তবু বয়েস নাক দেখলে কপিরাও লজ্জা পায়। আর সর্বাঙ্গের কথা অধিক কি বলব আপনার যদি একটি থাকত, কার সাধ্য বলে অঙ্গহীন। ফ। হা-হা-হা সুন্দরি ! এ সকলই তােমার কৃপায়। হয়েছে, তা বােধ হয় এমন অধিক হয় নি ? স্ত্রী। না না এমন বয়েসই বা কি হয়েছে ? এখনও দুদে দাঁত ভাঙ্গেনি, আর ভাল করে শুকে দেখলে বােধ হয় আজও তােমার গায়ে আতুড়ের গন্ধও পাওয়া যায়। ফ। হা-হা-হা (গোঁপ মােছড়াইতে মােছড়াইতে) এখন তােমার মেহেরবাণী। তোমার নাম কি সুন্দরি ? স্ত্রী। আমার নাম কুমুদ। ফ। তােমার সাদি হয়েছে ? স্ত্রী। হা হয়েছে। ফ। সুন্দরি! বলতে সাহস হয় না, যদি এ দাসের প্রতি নেক নজর কর, আমাকে যদি নিকে কর ? স্ত্রী। পামর ! শওর হয়ে অমৃত খেতে ইচ্ছে করিস? তুই কি আমাকে তােদের মত অসতী বলে মনে করেছিস ? তুই কি জানিস না যে হিন্দু স্ত্রীরা প্রাণ অপেক্ষা অমূল্য সতীত্ব রত্নকে অধিক ভাল বাসে। ফ। তারা তােবা আল্লা রসুন তােবা। সুন্দরি! সাবধান, সাবধান! তুমি যে কথা বল্লে ওকথা আমাদের বলতে নাই। আমি নাকি একেবারেই তােমার চরণের দাস হয়ে পড়েচি, তাইতে মাপ কল্লেম। কিন্তু সুন্দরি ! তুমি যদি ভালমানুষিতে রাজি না হও, তাহলে জোর জোরা- বৎ কত্তে হবে। স্ত্রী। (স্বগত) রাগে কাজ হবে না,ঘুরিয়ে দিই। (প্রকাশ্যে) ভাই ! তােমার মননত অরসিক পুৰুষ, আর কখন দেখিনি ? একেবারেই আমার উপর চটে গেলে ? এর পরে কত ঠাট্টা-করব, হাসতে হাসতে কত গালাগালি দেব । চোক ঠেরে কত লাতি মারব, গালে কত ঠোনা মারব তাহলেত আমাকে একেবারে মেরে ফেলবে ? * গর্ভাঙ্ক) সপ্তম অস্ক। ৭১ (স্বগত) ইস কি অন্যায়ই করেচি। (প্রকাশ্যে) মুন্দরি ! মাপ কর। (হস্ত জোড় করিয়া আমাকে ক্ষমা কর, আমার কসুর হয়েছে, তােব তােবা সুন্দরি ! তােমার পাতে পড়চি আমাকে মাপ কর। স্ত্রী। থাক, ওসব কথা যাক, এখন যে একটী গােলােযােগের কথা আছে ? ফ। কি জানি। বল তােমার কি গােলযােগের কথা আছে ? স্ত্রী। কথাটা এই মহারাজা চন্দ্রকেতু যদি জানতে পারেন তাহলে যে বড় গােলােযােগ হবে ? ফ। হা-হা-হা--সুন্দরি ! আর হাসি রাখা যায় না। হা-হা-হ। সুন্দরি ! চন্দ্রকেতু কোথায় ? তুমি কি এখন শােন নাই ? হা-হা-হা চন্দ্রকেতু যে এতক্ষণ যমালয়ের অর্ধেক পথে। সুন্দরি ! এখন রাজি হও, রাজি তােমাকে হতেই হবে তােমার পায়ে পড়ে রাজি করাব। স্ত্রী। (স্বগত) কি সর্বনাশ! এ কি কথা শুনলেম ? আমি যে একবার বেৰুতে পাল্লে হয়। হে দয়াময় ! তােমাকে ডাকবার সময় পাচ্চিনে তুমিত অন্তঃর্যামি ঠাকুর জানতে পাচ্ছ, আমি কি ঘাের বিপদে পড়েছি, কৃপা কর দয়াময়। ফ। কি ভাব চ সুন্দরি ? স্ত্রী। ভীচি এমন কিছু নয় রাজি হতে পারি, কিন্তু ফ। কিন্তু কি বল ? স্ত্রী। আমার যে ভাই ভয় করে। ফ। হা-হা-হা-ভয় ? কারে ভয় ? আমি যখন তােমার খস, তখন তােমার আবার ভয় কারে ? কারে ভয় এখনই বল, এখনই ভয়ের উচিত শাস্তি দিচ্চি। স্ত্রী। ভাই! কি জান সেই আমাদের যা ভয়, সে ভয়টুকু না গেলে কিন্তু সম্পূর্ণ রাজি হতে পারি না। ফ। সুন্দরি ! শীঘ্র বল, কি কল্লে তােমার সে ভয় যায়, আমি তা এখনই কত্তে প্রস্তুত আছি। কু। তুমিত প্রস্তুত আছি, কিন্তু দেখ যেন আমায় অপ্রস্তুত কোরাে না। ভয় আর কিছুই নয় আমার স্বামী আছেন, তার নাম বিজয়কেতু, তিনি ৭২ মালতী। [ প্রথম যতক্ষণ বেঁচে থাকবেন ততক্ষণই আমার ভয়। সে বড় দুষ্ট, লােক, সে বেঁচে থাকতে আমি রাজি হতে পারি না। ফ। হা হা সুন্দরি, এই তােমার ভয় ? তা একি একটা ভারি কাজ ? এতক্ষণ বলে নাই কেন? আমি এখনই হুকুম কচ্ছি। কু। এ হুকুম কল্লে হবে না, তােমায় নিজে যেতে হবে। তিনি যে রকম বীর তুমি নিজে না গেলে হবে না। ফ। সুন্দরি ! তুমি আমাদের জান না তাই এমন কথা বলছে। এ পৃথিবীতে এমন কে বীর আছে, বিশেষ কাফের হিঁদুর মধ্যে এমন কে বীর আছে যে আমাদের জয় কর্তে পারে ? আমরাই এখনকার বীরকেশরী, হিরা এখন গিদ্ধড়। ভারত ত আমাদের এক রকম একচেটে হয়ে আসচে বল্লেই হয়। আচ্ছা সুন্দরি আমি নিজেই বাব আমি নিজেই তােমাকে নিষ্কন্টক করবাে। দেখ সৈন্যগণ ! একটা গিদ্ধড় মারতে যেতে হবে। | সৈ। যে আজ্ঞ। ফ। তােমাদেরও আমার সঙ্গে যেতে হবে। সুন্দরি। কোথায় গেলে তার দেখা পাব? স্ত্রী। তা অধিক দূর যেতে হবে না তিনি নিকটেই আছেন। ফ। এই নগরে আছেন তাে? স্ত্রী। এই নগরে আছেন বৈকি, তিনি তােমাদের সৈন্যদলের মধ্যে আছেন। ফ। আমাদের সৈন্যদলে হিন্দু কেন? তিনি কি আমাদের পক্ষ হয়ে আছেন ? স্ত্রী। না, তােমাদের দলে আছেন কিন্তু বিপক্ষভাবে আছেন। ফ। হিন্দু বিপক্ষ আমাদের দলে ? স্ত্রী। হাঁ তিনি শসংখ্যা কমাবার জন্য আছেন। বীরবর! তিনি। তোমাদের পরম শত্রু। ফ। বটে ? শত্রুভাবে আছে ? সৈন্যগণ শীঘ্র প্রস্তুত হও। .
গর্ভাঙ্ক]
সপ্তম অঙ্ক।
সৈ। আজ্ঞা আমরা প্রস্তুত আছি, এখন হুকুম কল্লেই হয়।
ফ। সুন্দরি। আমাদের পরম শত্রু নিপাত কত্তে চল্লেম, এখন যাবার
সময় একবার আলিঙ্গন দেও (হস্ত প্রসারণ)।
স্ত্রী। (একটু সরিয়া) ওকি? এখন কিও? আগে আমার মনস্কামনা
পূর্ণ কর, তার পরতো আমাদের আছেই।
ফ। তুমি তাকে দেখিয়ে দিতে পারবে?
স্ত্রী। হাঁ পারবে বৈকি।
(নেপথ্যে) ধন্য বীরগণ! ধন্য তােমাদের বাহুবল, ধন্য অস্ত্র শিক্ষা
তােমরাই ভারতের সুসন্তান বলে পরিগণিত।
ফ। একি কার চেঁচায় ? কে কাদের ধন্যবাদ দিচ্ছে ?
স্ত্রী। ধন্যবাদ পাবার যােগ্য আর কে, তােমরাই তাে; আমি বলি এখন
আর এগিয়ে কাজ নাই, একটু অপেক্ষা কর।
(নেপথ্যে) তােমরা এখন যাও নগরবাসীদের শান্তি রক্ষার্থে তােমরা
বহির্গত হও, আর অপেক্ষা কর না। নগরবাসীরা অত্যন্ত ব্রাশিত হয়ে
রয়েছে, তােমরা শীঘ্র গিয়ে অভয়দান কর। ঐ যে ওখানে কারা বসে
* .
রয়েছে ?
বিজয়কেতু ও কতিপয় হিন্দু সৈন্যের প্রবেশ।
ফতে। নরাধম, তুই এখনও জীবিত আছিস, ?
স্ত্রী। (স্ত্রীলােকটা দৌড়িয়া বিজয়কেতুর পদতলে পড়িয়া) যুবরাজ ঐ
দুরাচার আমার সতীত্ব নষ্ট করবার চেষ্টা কচ্ছিল, আমি কৌশলে ওকে
আপনার নিকট নিয়ে যাচ্ছিলেম।
বিজয়। ভয় নাই, দুরাচার এখনও তােদর যুদ্ধের সাধ মেটে নাই।
(ফতেউল্লীর সহিত অসি যুদ্ধ) তােমরা ওকজন পামরকে সংহার কর আমি
ঐ রক্তে স্নান করি।
(হিন্দু সৈন্যগণ যুদ্ধ করিতে করিতে যবন সৈন্যগণকে আহত করিতে
করিতে প্রস্থান কলি, যুদ্ধ করিতে করিতে ফতেউল্লা যেমন অসি ত্যাগ
করিয়া পলায়ণ করিবে)
1 মালতী'। [ প্রথম ৭৪ শী। ফতেউল্লা পালিও না পালিও না ফের ফের (ফতেউল্লার অসি লইয়া) এই নেও অস্ত্র ধর। বিজয়। রণবীর! ওকে ধর ধর ও পামরকে ধরে নিয়ে এসাে ? রণবীরের প্রস্থা ও ফতেউল্লার গলা টিপিয়া পুনঃ প্রবেশ। বিজয়। পামর! নিলজ্জ ! অস্ত্র ত্যাগ করতে লজ্জা করে না? স্ত্রী। সেকি নাগর পালিয়ে যাচ্ছিলে কেন? আমাকে নিকে করবে না? বিজয়। অস্তুহীনকে বধ করি না ? অস্ত্র গ্রহণ কর ? একমাত্র তােক বধ কত্তে পাল্লেই নিষ্কন্টক হই। (স্ত্রীলােকের প্রতি ) ওকে অস্ত্র দাও (স্ত্রীলােক অস্ত্র ফেলিয়া দিলেন) ফ। (অসি লইয়া) বটে আমাকে বধ কল্লেই নিষ্কণ্টক হও? এস দেখ কে কাকে বধ করে ? (উভয়ের অসি যুদ্ধ ও ফতেউল্লার পতন) স্ত্রী। হারামজাদা, পাজী, ছুঁচো, তুই যে মুখে আমায় নিকে কত্তে চেয়েছিলি, সেই মুখ (পদাঘাত করিয়া) এই এর যােগ্য-(পদাঘাত) ফ। সুন্দরি ! ক্ষমা কর, আর না যথেষ্ট হয়েছে, জানি এ জন্মে তুমি আমার হলে না, পর জন্মে তুমি আমার হবে, এখন একবার আলিঙ্গন দেও। স্ত্রী। নরাধম এখন আলিঙ্গনের সাদ মেটেনি (ফতেউল্লার বক্ষে অস্ত্রা- ঘাত করিলেন) কেমন সাদ মিটল। ফ। হা মিটিল-মৃত্যু। - * একজন হিন্দু সৈন্যের প্রবেশ। সৈ। যুবরাজ! সর্বনাশ হয়েছে - বিজয়। কেন কেন কি হয়েছে ? সৈ। আমরা বুঝি মহারাজকে হারিয়েছি। বিজয়। সে কি ? শীঘ্ন ভেঙ্গে বল কি হয়েছে? সৈ। যবুনেরা পরাস্থ হয়ে বার্গোবপুরের বনের দিকে যাচ্ছিল, মহারাজ তাই দেখে যেমন নগরের দিকে ফিরে আসছিলেন অমনি হঠাৎ এক দল স্ববন সৈন্য এসে মহারাজকে হরণ করে নিয়ে গেল।
গর্ভা]
সপ্তম অঙ্ক।
৭৫
বিজয়। সেকি কতক্ষণ?
সৈ। অধিকক্ষণ নয়, তারা বােধ হয় এতক্ষণ বার্গোবপুরের বনে
পোঁছে থাকবে।
সকলের প্রস্থান।
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
বাগোবপুরের বন-যবন শিবির।
গােরাচঁাদ ও রাম-হাজরা দুইখানি সিংহাসনে উপবিষ্ট
কতিপয় যবন সৈন্য আসীন, সম্মুখে রাজা চন্দ্রকেতু
দণ্ডায়মান, দুই ধারে প্রহরীগণ দণ্ডায়মান।
গাে। বালাস্তাধিপতি। তুমি এক্ষণে স্বাধীন না দিল্লীশ্বরের অধীন?
চ। সম্পূর্ণ স্বাধিন, ক্ষত্রিয়েরা প্রাণ থাকতে কারও পরাধীন হয় না !
তুই কে ?
রাম। উনি কে এখনও চিন্তে পার নাই? উনি দিল্লীশ্বরের প্রেরিত
সেনাপতি—তােমার কাল।
চ। অামার কাল ? চন্দ্রকেতুর কাল ?
রাম। তুমি কি রহস্য কচ্ছ? তুমি কি মনে কচ্ছ তুমি জীবিত আছ ?
চ। তােদের জীবন শূন্য না করে আমি নির্জীব হৰ না।
রাম। হা-হা-হা এজন্মে না পর জন্মে ?
চ। এই জন্মেই।
রাম। তােমার জীবনের শেষ তােত অল্পক্ষণের মধ্যেই আমার এই হস্তে।
চ। রে হিন্দু কুলাঙ্গার ! নিশ্চয়ই তুই যবন বীর্জে উৎপন্ন।
রাম। চন্দ্রকেতু ক্ষান্ত হও,, এখন তুমি সে চন্দ্রকেতু নও, তুমি যে মুখে
আমাকে কারারুদ্ধ কত্তে অনুমতি করেছিলে এখন আর তােমার সে মুখ
মালতী।
[ দ্বিতীয়
নাই। তুমি এখন স্বাধীন নও, তােমার দেহ এখন আমাদের সম্পূর্ণ
অধীন। তুমি এখন বন্দি, আজ রাম হাজরা তােমার উপর ওরূপ হুকুম
জারি কওে পারে।
চ। চক্ষু দর্শন শক্তিহীন হও, কর্ণ বধির হও, আর যেন তােমাদের
সাহায্যে এই দুরাচারদের কলুষময় দেহ দেখতে আর পাপিষ্টদের শ্রুতিকটু
কথা শুন্তে না হয়।
গাে। চন্দ্রকেতু গৰ্ব ত্যাগ কর। বিপক্ষকে ছলে বলে কৌশলে হস্তগত
করাই বিধি। আমরা তােমার নিকট পরাস্থ হয়েছি সত্য, কিন্তু তােমাকে
যখন হস্তগত করা হয়েছে তখন আমাদের জয় । এখন একটা কাজ কত্তে
তােমাকে স্বীকৃত হতে হবে।
চ। কি কাজ ?
গাে। যুদ্ধে পরাস্থ হয়েও যখন তােমাকে হস্তগত করেছি তখন তােমার
রাজ্য জয় কত্তে আমাদের আর বিশেষ কষ্ট পেতে হবে না, তা হলে তােমাকে
আমাদের মুসলমান ধর্মাবলম্বি হতে হবে।
চ। যদি না হই।
গগা। তা হলে রাম হাজরা-মহাশয়ের কথা কখনই মিথ্যা হবে
। যদি দিল্লীশ্বরের অধীনতা স্বীকার না কর, তা হলে তােমার মৃত্যু
উপস্থিত।
চ। তুমি কে ?
রাম। তােমার স্মরণ আছে কি? সে দিন একজন ভেকধারি ফকির
মাের সভায় গিয়েছিল ?
চ। আছে তুই কি সেই ছদ্মবেশী যবন ।
গাে। হাঁ আমি সেই ছদ্মবেশী যবন।
রা। এবার চিনেছ উনি কে ?
চ। চিনিছি, দস্যু দলের এক জন প্রধান।
রা। (ক্রোধে) চন্দ্রকেতু তুমি আপন ইচ্ছায় আপন কালকে ডাকচো,
এখন একবার এ জন্মের মতন আপন উপা দেবতার নাম উচ্চারণ করে
নাও, আর তােমার নিষ্টার নাই।
গর্ভা) 'সপ্তম অঙ্ক। ৭৭ যেমন রাম হাজরা চন্দ্রকেতুকে কাটিকার মানসে অসি উত্তোলন করিল, সেইক্ষণেই অপর দিক হইতে একটা মর্মভেদী শর রাম হাজরার বক্ষে প্রবিষ্ট হইল) রাম। উঃ কেরে (সিংহাসন হইতে পতন) গােরা। একি একি আপনি এমন হয়ে পড়লেন কেন? একি বুকে তীর মালে কে, তীর কোথা থেকে এলাে? রাম। উঃ প্রাণ যায় শরীর অবশ হয়ে আসছে বিষের আলা, এ শর বিষাক্ত (দন্ত কিড় মিড় করিতে করিতে) উঃ চন্দ্রকেতু বড় দুঃখ মনে রইল তােকে স্বহস্তে সংহার কত্তে পাল্লেম না, উঃ বড় যাতনা। উঃ কে রে, বড় সময়ে বাদ সাধ লি, বড় যাতনা—বড় জ্বালা–বিষের আলা। চন্দ্রকেতু! তাের কারাগার ভেঙ্গে বেরিয়েও কোন কাজ কত্তে পাল্লেম না, বড় দুঃখ রইল। যদি বাঁচি এর প্রতিশােধ নেবে। গাে। ওরে তােরা দেখিস যেন চন্দ্রকেতু কোথাও না পালায়। গে। আপনার শরীর কি বড় খারাপ বােধ হচ্চে । যােদ্ধ বেশে যুবরাজ বিজয়কেতুর প্রবেশ ও অন্তরালে অবস্থিতি। . রা। বড় খারাপ গােরাচঁাদ বড় খারাপ। অদৃষ্টের ফল, বড় অদৃষ্টের ফল, বড় কপালের জোর। আজ আমার সন্দেহ ভঞ্জন হল, গােরাচঁাদ। আজ উচিত শাস্তি হল। উঃ একি হলাে, এযে অঘটন ঘটনা হল। আঃ বড় যাতনা। চন্দ্রকেতু তুমি আজ আমায় উদ্ধার কল্লে, চন্দ্রকেতু আমি অতি নরাধম। গেরাাদ কিছু মনে কর না, অসন্তুষ্ট হও না, মনের কথা তােমায় ব্যক্ত করি কিছু মনে কর না আৰু ৰা কত্তে বলব তাই কর তানা হলে তােমার অমঙ্গল। চন্দ্রকেতুর কারাগারে যদি আমার মৃত্যু হত তা হলে দুরাচার যবনদের কৌশলে আমার এরূপ দুরবস্থা হত না ; উঃ বড় কষ্ট চন্দ্রকেতু! মহারাজ! ভারতের প্রিয় সন্তান! বর্তমান রাজাদের মধ্যে তুমিই প্রতাপশালী আমি তোমার, আশ্রয় ত্যাগ করে কেন দুরাচার যবনকের মালতী। । দ্বিতীয় আশ্রয় গ্রহণ করে ছিলাম, এই তার পরিণাম। গােরাটা ! তুমি প্রাণ নিয়ে পালাও। তুমি যে সকল দুষ্কর্ম করেছ তার সীমা নাই, তােমার পাপের সীমা নাই। মনে করে দেখ দেখি, কি কৌশল জাল বিস্তার করে বঙ্গরাজ্য অধিকার করেছ ? সে পাপের কি সীমা আছে ? তুমি কি অমর হয়ে পৃথিবীতে এসেছ ? তাই বলছি তুমি প্রাণ নিয়ে পালাও, বালাণ্ডাধিপতি মহারাজ চন্দ্রকেতুর রাজ্য হতে প্রস্থান কর, তা না হলে তােমার ও মৃত্যু উপস্থিত। চন্দ্রকেতু তােমার কাল, মিশ্চয়ই তােমার কলি। এত গৃহ সন্ধান পেয়ে, গভীর রাত্রে চোরের মত নগরে প্রবেশ করেও যখন এ রাজ্য হস্তগত কত্তে পাল্লে না, তখন মনে করনা যে তােমাদের মন আশা ফলবতী হবে, এখন প্রাণ নিয়ে পালাও। মহারাজ! বীর কেশরি ! বালাণ্ডাধিপতি প্রবল প্রতাপশালী মহাভাগ চন্দ্রকেতু! যথার্থই তুমি ধৰ্ম্মপুত্র, যথা ধৰ্ম্ম তথা জয়, “ধৰ্ম্ম রক্ষতি ধার্মিকং”; বিধশ্মী সদাচার ভ্রষ্ট দুরাচার যবনদের কি ক্ষমতা যে যে তারা তােমার ঐ পবিত্র পদপদ্ম স্পর্শ করে। উঃ বড় যাতনা বাড়চে, আর কথা কইতে পাচ্ছি না। তােমার সম্মুখে আমার মৃত্যু উপস্থিত, উঃ শরীর অবশ হয়ে এলাে। মহারাজ! তােমার পাদপদ্ম এ দুরাচারের শিরদেশে অণ কর, যদি এতেও আমার সকল পাপ ধ্বংশ হয়, মহারাজ। চন্দ্রকেতু! জগদী——। (মৃত্যু)। গােরা। পাপিষ্ঠ, নরাধম চন্দ্রকেতু। দেখ তাের কি দুরবস্থা করি, শৃগাল কুকুর দিয়ে তাের ঐ পাপ দেহ খাওয়া। যুবরাজ বিজয়কেতুর প্রবেশ। বিজ। সাবধান, বিধর্মী যবন সাবধান, বৃদ্ধ বঙ্গেশ্বরকে পাসনি, বৃদ্ধ কাশ্মীরাধিপতিকে পাসনি যে ছলে কৌশলে রাজ্য অধিকার করবি। গে। তুই কোথা হতে এলি ? তাের ত মৃত্যু সংবাদ পেয়েছিলেম ? তা আমার হাতে তাের মৃত্যু তুই অন্যের হাতে মরবি কেন ? বিজ। রে দুৰ্ব্ব ও দুরাচায় যবনাধম! কার হাতে কার মৃত্যু এখনই জানতে পারবি। হিন্দু কুলাঙ্গার ঐ রাম হাজরার দশা ত স্বচক্ষে দেখছিস? তুইও ওর অনুগমন করবি তার বিলম্ব নাই।
পর্ভল্ক ] সপ্তম অঙ্ক গাে। রাম হাজরাকে তীর মাল্লে কে? বােধ হয় তুই মেরেছিস। বিজ। ধৰ্ম্ম, ধৰ্ম্ম তীর্থ মেরেছেন। ধার্মিকদের ধর্মই রক্ষা কয়েন। তোকে এই শেষ কথা বলচি, যদি প্রাণ বাঁচাবার ইচ্ছা থাকে, তা হলে এই মহারাজ চন্দ্রকেতুর পাদপদ্মে ক্ষমা প্রার্থনা কর, নতুবা তাের আর রক্ষা নাই। গাে। কি বল্লি পামর ? ক্ষমা প্রার্থনা ? আমি ক্ষমা প্রার্থনা করব। এ কথা আমায় বলতে তাের মনে একটু ভয়ের সঞ্চার হল না? বিজ। ভয়? তােকে দেখে ভয় ? হিন্দুধর্ম বিদ্বেষী যবনকে দেখে আমার ভয় ? শৃগালকে দেখে সিংহের ভয়? নিশ্চয় তুই আসন্ন মৃত্যুর ন্যায় প্রলাপ দেখছিস। মনে করে দেখ দেখি তােরা কি অবস্থায় এ বালা- ওায় এসেছিলি, আর এখন তােদের কি অবস্থা হয়েছে ? তোদের সে সব সৈন্য কোথায় ? বৃথা আর তাের সঙ্গে বাদানুবাদ করে কোন ফল নাই, এখন বাক যুদ্ধ পরিত্যাগ করে অস্ত্র যুদ্ধে প্রবৃত্ত হ। (উভয়ের যুদ্ধ ও গােরা- চাদের পতন।) গাে? উঃ মলে মরে, প্রাণ গেল রে। (উঠিতে উদ্যত ও পতন) একি আর যে শক্তি নাই। কে আছিস রে গােটা কতক পান ও চারটি সুরকি নিয়ে আয়। (ক্ষণেক নিস্তব্ধ) কেউ নাই ? এখন আমার কেউ নাই ? এক ঘণ্টা পূৰ্বে আমি হাজার হাজার চাকরের মনিব ছিলেম, এখন আমার একজনও নাই ? উঃ সংসারের কি বিচিত্র গতি। আচ্ছা, যেমন আমায় কেউ পান আর সুরকি এনে দিলী না, আমি অভিসম্পাৎ কচ্চি, এ বালাণ্ডায় পান জন্মাবে না, আর যদি কেউ কোটা বাড়ি করে সে নিব্বংশ হবে। উঃ আঃ-আর কথা বেরুচ্চেনা, শরীর অবশ হয়ে এল, আর-কি-চন্দ্রকেতু (মৃত্যু। বিজ। মহারাজ! এ গােরাচঁাদ যে আপনার রাজ্যে অভিসম্পাত কল্পে। চন্দ্র। বৎস। ওর অভিসম্পাৎ মিথ্যা হবার নয়। ইতিপূর্বে এই গােরাচাদ ছদ্মবেশে একবার আমার সভায় গিয়ে কতকগুল আশ্চৰ্য্য কাৰ্য দেখিয়েছিল। তার মধ্যে বাঁশের বেড়ায় চাপা ফুল ফুটিয়েছিল, এইটে অতিশয় আশ্চর্য্য বােধ হয়েছিল। বিজ। মহারাজ! আর ও সব কথা আন্দোলন করবার আবশ্যক না মালতী। [ দ্বিতীয় এখন চিন্তা দূর করুন আপনার রাজ্য রক্ষা হয়েছে, এখন আপনার সম্পূর্ণ চন্দ্র। প্রাণাধিক! জীবন সৰ্বস্ব বিজয়কেতু! তুমি আমাকে স্বহস্তে বধ কর, তােমার সম্মুখে আমার মুখ দেখাতে লজ্জা হচ্ছে। আমি তােমাকে কি দণ্ডাজ্ঞাই দিয়েছিলেম, আমি তােমার প্রতি পশুর ন্যায় ব্যবহার করেছি। বিজ। (চন্দ্রকেতুর পদতলে পড়িয়া) মহারাজ! আমিই সে বিষয়ে অপরাধী! বিচারকালে আমি যদি আমার প্রকৃত পরিচয় দিতেম, কিম্বা আমি যদি সে রূপ কটু কাটব্য না কত্তেম, তা হলে ত মহারাজ ! আপনি আমার প্রতি ওরূপ দণ্ডাজ্ঞা কত্তেন না ? সে বিষয়ে আমিই মহারাজের চরণে বিশেষ অপরাধী হয়েছি। এক্ষণে সে সব কথা থাক, এখন অনুমতি হলে মহারাজের শ্রীপাদপদ্মে একটি কথা নিবেদন করি। চন্দ্র। সে কি বিজয়কেতু ? কি কথা বল ? বিজ। আমি এই স্থানে অবস্থান করি, আপনি স্বভবনে প্রত্যাগমন করে রাজ পরিবার ও প্রজাবর্গের আনন্দ বর্জন করে সকলকার শুভ সংবাদ দুত দ্বারা এ দাসকে প্রেরণ কত্তে আজ্ঞা হক, আমি সেই সংবাদ শুনে সন্তুষ্ট চিত্তে স্বদেশে প্রত্যাগমন করি। চন্দ্র। সে কি বিজয়কেতু? এ কি কথা বলছো ? আজ হতে এ বালা। নগরী কার ? তুমি যে আমার কি অমুল্য রত্ন তা কি এখনও জানতে পার নাই ? আর আমাকে লজ্জা দিওনা। আমার প্রাণ অপেক্ষা প্রিয়—আমার একমাত্র মালতীর প্রিয়তম তুমি, তুমি আমার পুত্র অপেক্ষাও প্রিয়, আমার পুত্র সন্তান নাই, কিন্তু আজ হতে আমার সে দুঃখ দূর হল। এখন চল বৎস্য ! আমার একমাত্র মালতী রত্ন তােমার করে অর্পণ করে আমার জীবন সার্থক কবিগে।
অষ্টম অঙ্ক প্রথম গর্ভাঙ্ক কালীবাড়ী-দেবীমূৰ্ত্তি । রাণী প্রভাৰতী, রাজকুমারী মালতী, চপলা ও দাসীগণ উপবিষ্টা। প্র। (পূজা অন্তে) মা জগদম্বে ! বক্ষা কব মা, মহারাথকে বক্ষ। কয়, আপন পাপ অপেক্ষা—আপন সন্তান অপেক্ষা –প্রয় প্রজার হিত কামনায় বত-- এমন প্রজাপকিকে বগ। কব মা। ঙ্গে যেন শুভ সংবাদ পাই। মাগাে' ঘোর বিপদে প। ৬ছি, যা কখন ভাবি না, যা কখন স্বপ্নেও দেখি নাই, তাই ঘটেছে। বাণ্ডিল মেচ্ছ এসেছে, মাপে। এ ঘৰ বিপদ থেকে উদ্ধাৰ কব মা। সেখানে ধৰ্ম্ম সেইখানেই জম, পাপ যেন পুণ্যকে জব না কলে। যাব পৰশ্ৰী কাতব, দ্বেষ হিংসাৰ ষাদেব শৰীৰ পূৰ্ণ, সতী নারীব অমূল্য বঃ সতীত্ব ধম্ম নষ্ট কষ্টে যাবা কিছুমাত্র কুঠিত হয় না, পাপ যাদেয় অঙ্গের ভূষণ, এমন পাপমতি যবন কি তােমার শ্রীপাদপদ্ম সেবক মহাবাজকে যুদ্ধে জষ কবে ? মা গো । এই ভিক্ষা, তােমার ঐ বঙ্গা চৰণে এই ভিক্ষা, যেন পুণ্যের জয শুনতে পা, যেন এ বালাও বা শত্রু হাতে না ঘাষ। সীত। মাল। স্থাপিত তনয়ে তব কর তার পরিত্রাণ । কৃপা করি কৃপাবারি কিঙ্করে কবিযে দান। কুচিন্তা প্রখর কব, করিছে মা জব জব, না দেখি উপায় অব কিসে যুড়াইব প্রাণ । (হিন্দুবেসে একজন যবন সৈন্যের প্রবেশ।) প্ৰে। কে তুমি?
মালতী।
[ প্রথম
সৈ। মা ! আমি মহারাজের কৃতদাস, আমি তার একজন সেনা।
প্র। কোথা থেকে অসচ ?
সৈ। মা ! আমার এ বেশ দেখে কি বুঝতে পাচ্ছেন না যে আমি
কোথা থেকে আসছি ?
প্র। তুমি কি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসচ ?
সৈ। আজ্ঞা হ।।
প্র। তুমি একা এসেচ কেন? যুদ্ধের সংবাদ কি ?
সৈ। যুদ্ধের আর কি সংবাদ দিব মা, তবে মহারাজ আপনাদের যা যা
কত্তে বলে পাঠিয়েছেন তাই বলতে এসেছি।
প্র। বলে পাঠিয়েছেন? সে কি ?
সৈ। আব কি বলব মা, শুষলমানে যুদ্ধে জয়ী হয়ে মহারাজকেত
আপাততঃ ধবে বেধে বখেছে, তাৰ পব কি কবে বলা যায় না।
প্র। কি বল ? তাকে ধরে বেদে বেখেছে ? যবনের যুদ্ধে জয়ী
হয়েছে ?
মাল। বাবাকে বলে বেখেছে ? তিনি কি সেখানে একা আছেন?
সৈ। অজ্ঞা হাঁ, তিনি এখন একাই অাছেন, অব প্রায় সবই কাটা
পড়েছে, আর দু একজন ফৌশল করে পালিয়ে গিয়েছে। অবি আপনিও
যার কথা মনে করে বলছেন, তা আমি বুঝতে পেরেছি। আপনি ত যুবরাজ
বিজয়কেতুব কথা বলচেন ? আহা! তিনি ত কাল কাটা পড়েছেন। আমি
আর বেশী দেরি কত্তে পারি না, মহারাজ যা বলে পাঠিয়েছেন, তাই
বলে যাই। তিনি এই বলে পাঠিয়েছেন যে, “আমার ত মৃত্যু আই হবে,
তবে পরিবারেরা যেন সতীত্ব ধৰ্ম্ম রক্ষা করেন, মুষলমানেরা আর খানিক
পরেই রাজবাড়ী লুট কত্তে যাবে, তাদের যাবার আগে যেন পরিবাবেরা যে
কোন উপায়ে হ’ক প্রাণ ত্যাগ করে, এ ভিন্ন সতীত্ব ধর্ম বক্ষার আর অন্য
উপায় নাই।” তিনি এই কটি কথা বলে পাঠিয়েছেন। কি করব মা!
অদৃষ্টে যা ছিল তাই হল, এখন আমি আসি, ওদিকে দেখিগে কি হচ্চে
হচ্ছে।
সৈনিকের প্রস্থান।
গর্ভাঙ্ক ]
অম অঙ্ক।
চ।
প্র। মা গাে ! কি শুনলে, একি হলাে (মুচ্ছ)।
মাল। ও চাপা, একি হলাে, মা যে মূচ্ছ। গেলেন, শিগ গির জল নিয়ে
পা। এই যে জল এইখানেই আছে। (কোশা হইতে জল লইয়া
প্রভাবতীর মুখে সিঞ্চন)।
প্র। (চৈতন্য পাইয়া সক্রন্দনে) মালতি, চাপা,.' আর কি দেখছ, সব
ফুরিয়ে গেল। কি সর্বনাশ হল, আমাদের কি হবে, চল-মহারাজ যা
কত্তে বলে পাঠিয়েছেন তাই করিগে, চল, আর দেরি করে কাজ নাই, দিঘীতে
চল, সতীত্ব ধৰ্ম্ম রক্ষা কর, মুষলমানেরা এখনই আসবে ।
মা । ও লােকটার কথাগুল আমার বিশ্বাস হচ্ছে না, আপনি
এত অধীর হবেন না।
প্র। চাপা! যখন এখনও পর্যন্ত যুদ্ধের কোন অপর এলাে না, তখন
আর কি ও লােকের কথা অবিশ্বাস করা যায় ? তখন আর কি বুঝতে
বাকি থাকে ?
(নেপথ্যে সৈন্য কোলাহল।)
প্ৰ। ঐ শােন মুষলমানেরা আসছে, শীঘ্র এস দিঘীতে ঝাঁপ দিয়ে
সতীত্ব রক্ষা কর, আর পালাবে কোথা; প্রাণ যাক, ধৰ্ম্ম থাক, আর দেরী
কর না, শীঘ্র এস।
দ্রুতপদে সকলের প্রস্থান।
6
দ্বিতীয় গভাঙ্ক।
প্রাঙ্গণ।
রাজা চন্দ্রকেতু, মন্ত্রী, বিজয়সেন ও কতিপয় হিন্দু
সৈন্যের প্রবেশ ।
মন্ত্রী। মহারাজ! একমাত্র যুবরাজ বিজয়কেতুর সাহায্যে ও বীরত্বে
আমাদের জয়লাভ হয়েছে। যুবরাজ বিজয়কেতুর মত বীর আমি কখন
৮৪ মালতী। দ্বিতীয় ৫ চক্ষে দেখি নাই। কি বীরত্ব, কি অসীম সাহস, কি চমৎকার রণকৌশল। রাজা। যথার্থ কথা মন্ত্রি। বিজয়কেতুর মত বীর আর দেখতে পাওয়া যায় না। কি অস্ত্রচালন শিক্ষা, কি রণকৌশল, কি বুদ্ধি, কি অদ্ভুত শক্তি সম্পন্ন, আবার অপরদিকে শান্ত শিষ্ট আর বিদ্বান। আমার পরম সৌভাগ্য যে এমন সৰ্বাঙ্গ সুন্দর রত্নের করে আমার একমাত্র সর্বস্বধন মালতী-রত্নকে অর্পণ করব! মন্ত্রি ! কি অদ্ভুত অস্ত্রচালন শিক্ষা, আমার ত প্রাণ গিয়েছিল, রাম হাজরা ত আমাকে বধ করবার জন্য অস্ত্ৰ পৰ্যন্ত তুলেছিল। কিন্তু কি চমৎকার অস্ত্রশিক্ষা, সেই সময় সকলের অজ্ঞাতে, অলক্ষিতে রাম হাজরার বুকে তীর মালে ? ঈশ্বর যেন আমায় সে সময় প্রাণদান দিলেন। মন্ত্রী। অদ্ভুত গুণপনা, অদ্ভুত অস্ত্রশিক্ষা। এখন কি তিনি সমস্ত নগর পরিভ্রমণ করে ফিরে আসবেন ? রাজা। না সমস্ত নগর নয়। দ্রুত পদে চপলার প্রবেশ। চপ। একি মহারাজ ? কি সর্বনাশ, এদিকে যে সর্বনাশ হয়েছে ? রাজা। কেন কেন? কি হয়েছে ? চপ। রাণী মা আর মালতী যে দিঘীতে ঝাঁপ দিয়েছেন, এতক্ষণ বুঝি নেই। রাজা। কি সর্বনাশ! সেকি ?, মন্ত্রি! শীঘ্র লোক জন নিয়ে যাও। মন্ত্রী। যে আজ্ঞা—হা জগদীশ্বর ! কি কল্লে ? মন্ত্রী ও সৈন্যগণের প্রস্থান। রাজা। চাপা ! তারা দিঘীতে ঝাপ দিলেন কেন? চপ। রাণী মা মালতী আর আমি কালীবাড়ীতে গিয়েছিলুম, এমন সময় একজন লােক সেখানে গিয়ে আমাদের বল্লে যে মচনমানেরা যুদ্ধে জয়ী হয়ে আপনাকে ধরে বেঁদে রেখেছে, খানিক পরে কেটে ফেলবে ; তাই আপনি যেন বন্ধে পাঠিয়েছেন যে আমাদের যদি সতীত্ব রক্ষা করবার ইচ্ছা পর্ভঙ্ক। অষ্টম অঙ্ক। ৮৫ থাকে, তাহলে সকলে যেন প্রাণত্যাগ করে, আর এখনই তারা রাজবাড়ী লুট কত্তে আসবে। রাজা। সে কি ? কতক্ষণ সে লােকটা এসেছিল ? চপ। এই খানিকক্ষণ হল । রাজা। এখনই লােক পাঠাব—চারিদিকে লােক পাঠাব, দেখি সে লােকটাকে ধর্তে পারা যায় কি না। এখন এস। উভয়ের প্রস্থান। যুবরাজ বিজয়কেতু, জয়সেন ও কতিপয় হিন্দু সৈন্যের প্রবেশ । বিজ। জয়সেন! আমি আজ অধিকক্ষণ নগরে ভ্ৰমণ কৰ্তে পাল্লেম না, অত্যন্ত ক্লান্ত হয়েছি। আগত কল্য তুমি স্বয়ং দূতকে সঙ্গে নিয়ে সমস্ত বালাণ্ডা নগরে মহারাজের জয় ঘােষণা করবে। আর দেখ ? এখন হতে অত্যন্ত সাবধানে থাকতে হবে, কারণ দুষ্ট যৰনেরা পরাস্ত হয়ে আর যে রকম হত হয়ে পলায়ন করেছে, তাতে যে তারা নিশ্চিন্ত হয়ে থাকবে এমন মনে কর না। তারা কোন না কোন উপায়ে এ রাজ্য জয় করবার চেষ্টায় থাকবে। জয়সেন । সাবধান খুব সতর্ক ভাবে দুর্গ আর নগর রক্ষা করবে, দেখ যেন কোন প্রকারে তারা এ বালাণ্ডায় প্রবেশ না কত্তে পারে। আর আমিও নিশ্চিন্ত থাকিব না। জ। যে আজ্ঞা যুবরাজ, আমি বিশেষ সতর্ক ভাবে আপনার আদেশ পালন করব। বিজ। (স্বগত) একি ? হঠাৎ আমার বাম অঙ্গ স্পন্দন হচ্ছে কেন? হঠাৎ মন এত চঞ্চল হয়ে উঠল কেন? (পরিক্রমণ ও প্রকাশ্যে) জয়সেন ! মহারাজ ত অনেকক্ষণ প্রত্যাগমন করেছেন, কিন্তু সমস্ত রাজভবন এমন নিস্তব্ধ ভাবে রয়েছে কেন ? যেন জন শূন্য বলে বােধ হচ্চে যে ? মহারাজ যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন, কোথায় রাজভবন আজ আনন্দে পরিপূর্ণ থাকবে, তা না হয়ে আজ এমন নিস্তব্ধ ভাবে রয়েছে কেন ? আমি ত এর কিছুই বুঝতে পাচ্ছি না। জয়। মহারাজ বােধ হয় অন্দরে আছেন, এখনই উৎসবের আয়োজন হবে।
t মালতী। [ দ্বিতীয় ক্রন্দন করিতে করিতে চপলার প্রবেশ ও বিজয়কেতুর পদতলে পরিয়া উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন। বি। একি চপলা-কাদছ কেন? কি হয়েছে ? চ। (উঠিয়া সক্রন্দনে) যুবরাজ! আর কি বলব, বুক (বক্ষে করাঘাত) ফেটে গেল, যুবরাজ সৰ্ব্বনাশ হয়েছে, আগে রাণী মা মালতী তারপর মহারাজ (পদতলে পড়িয়া ক্রন্দন)। বি। (নেপথ্য দেখিয়া) একি ! মন্ত্রীও যে কঁদতে কাঁদতে আসছে, এর কারণ কি দ্রুতদপে মন্ত্রীর প্রবেশ। ? মন্ত্রী। বি। কি মন্ত্রি। তােমরা সকলে কাদচ কেন ? শীঘ্র বল কি হয়েছে ? মন্ত্রি। (সক্রন্দনে) যুবরাজ! আর কি বলব, মহারাজ রাণী মা আর রাজ- কুমারী মালতী সকলে দিঘীতে ঝাঁপ দিয়েছেন। প্রায় ২০০ লোক জলে নাবিয়ে দিয়েছি কিন্তু তাদের কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। বিজ। সে কি ? কেন ? সকলে এমন কাজ কল্লেন কেন ? এক ব্যক্তি ঘবনচর আমাদের রাজভবনে আসবার পূর্বে, রাজ- পরিবারদের কাছে এসে বলে গেছে যে মহারাজ যুদ্ধে পরাস্থ হয়েছেন, মুসল- মানেরা তঁাকে বধ করবার জন্য ধরে রেখেছে, তঁাকে বধ করে রাজভবন লুট কত্তে অাসবে, আপনারা সতীত্ব রক্ষা করুন, মহারাজের আদেশ যে আপনারা কোন উপায়ে প্রাণত্যাগ করে সতীত্ব ধৰ্ম্ম রক্ষা করুন। এই কথা বলে লােকটা চলে গেলে পর, এরা এই কাণ্ড করেছেন। বিজ। সেকি ? চল চল দিঘীতে চল । সকলের প্রস্থান।
গর্ভাঙ্ক।
অষ্টম অঙ্ক।
৮৭
তৃতীয় গর্ভক্ষ।
দিঘীর (চন্দ্রকেতুর দহর) ধার।
মৃত মালতী ক্রোড়ে লইয়া চপলা উপবিষ্টা, যুবরাজ বিজয়কেতু
উন্মাদবস্থায় বেড়াইতেছেন। এক পাশ্বে মন্ত্রী জয়-
সেন ও বিজয়সেন, ও অপর পাশ্বে কুতিপয়
হিন্দু সৈন্য মৌনভাবে দণ্ডায়মান।
বিজ। মন্ত্রি !
মন্ত্রী। যুবরাজ!
বিজ। বেলা কত ?
মন্ত্রী। আজ্ঞ এখন দিন নয় এখন রাত্রি এক প্রহর গত ।
বিজ। তোমরা এখানে কতক্ষণ এসেছ ?
মন্ত্রী। আজ্ঞা দিবা অবসান হতে আমরা ত এখানে এক সঙ্গেই রয়েছি,
তা কি আপনার স্মরণ হচ্ছে না?
বিজ। হাঁ এখন স্মরণ হয়েছে। (আকাশ দেখিয়া) আজ কি অমাবস্যা ?
মন্ত্রী। আজ্ঞা না, আজ পূর্ণিমা। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হওয়াতে অমাবস্য।
নিশার ন্যায় অন্ধকার হয়েছে।
বিজ। আচ্ছা তাই হল। (পরিক্রমণ)
চপ। মন্ত্রী মহাশয় ! ক্রমে ক্রমে যুবরাজের অবস্থা বড় ভাল বােধ
হচ্ছে না।
মন্ত্রী। আরও যে কি অদৃষ্টে আছে তাও জানতে পাচ্ছি না।
বিজ। মন্ত্রি !
মন্ত্রী। যুবরাজ!
বিজ। মহারাজের আহার হয়েছে ?
মন্ত্রী। আজ্ঞা স্থা, হয়েছে। (স্বগতঃ) হ জগদীশ্বর। এর ও পরিণাম কি
শোচনীয় লিখেছ ? (ক্রন্দন)
* মালতী। [ তৃতীয় বিজ। মন্ত্রি ! আবার কাচ ? মন্ত্রী। আজ্ঞা না । জয়। (মন্ত্রীর প্রতি জনান্তিতে) মন্ত্রী মহাশয়। এর অল্পক্ষণ পূৰ্ব্বেত যুবরাজের এ রকম অবস্থা ছিল না? মন্ত্রী।“ (জনান্তিকে) কথন প্রকৃতাবস্থা কখন উম্মাদব, ক্ষণে ক্ষণে অবস্থার পরীবর্তন, এ লক্ষণ বড় ভাল নয়, এর চরম অতি অশুভ। বিজ। চাপ! তুমি আমার মালতীকে ছুয়ে রয়েছ কেন ? তুমি পর পুরুষ হয়ে সতীর অঙ্গ ছুয়ে রয়েছ ? (সহাস্যে) ওহহ! তুমি যে স্ত্রীলােক। কিন্তু পুৰুষ কি প্রকৃতি ? (বেহাগ রাগিণীতে) পুরুষ হয়ে প্রকৃতি বেশে রাখিলে কীর্তি অপার ;- কিন্তু ছলনা কেন হে বাঁকা, তােমার সেরূপ যাবেন ঢাকা, যে ভৃগুপদ রেখা দেখা যায় যে হৃদে স্বকার। উঃ মালতি ! তুমি কোথায় গেলে ? (উপবেশন ও মালতীকে ৭ অঙ্কে লইয়া ক্রন্দন করিতে করিতে) মালতি ! তুমি কি সত্য সত্যই প্রাণত্যাগ করেছে ? তুমি কি সত্য সত্যই আমার হৃদয় শূন্য করে পলায়ন করেছ ? তুমি কি সত্য সত্যই এ পৃথিবী হতে জন্মের মত প্রস্থান করেছ ? (সকলের ক্রন্দন) তুমি কি সত্য সত্যই চির নিদ্রায় অভিভূত হয়েছ ? আর কি তােমার এ নিদ্রা ভঙ্গ হবে না? আর কি তােমার চৈতন্য হবে না। আর কি এ মৃগনয়নে পলক পড়বে না ? মালতি। আমি তবে কার জন্য পিতা মাতা বন্ধু বান্ধব রাজ্য ধন সমস্ত ত্যাগ করে এদেশে এসেছি ? আমি তবে কার জন্য সকল সুখে জলাঞ্জলি দিয়ে নানা দেশ নানা গ্রাম নানা বিপদ অতিক্রম করে এখানে এসেছি ? আমি তবে কার জন্য অজেয় দুর্দান্ত যবন যুদ্ধে প্রবৃত্ত হয়ে তাদের সমূলে বিনাশ করেছি ? মালতি। প্রাণেশ্বরি! আমি কার অন্য এত কষ্ট সহ্য করেছি ? আমার এ সকল পরিশ্রমের কি , এই পুরস্কার ? ত .
অষ্টম অঙ্ক। «= গাঙা] মালতি। । মালতীকে বক্ষে ধারণ করিয়া): একবার চেয়ে দেখ দেখি আমার হৃদয় কতর শূন্য হয়েছে? আমার হৃদয় মরুভূমি হয়েছে কি না একবার দেখ দেখি ? ওহো! (মালতীকে ভূমে রক্ষা করিয়া).তুমি যে আর চক্ষু উন্মী- লন করবে না, তােমার যে আর চৈতন্য হবে না। চাপা! মন্ত্রি। তোমরা বল আমার এমন সর্বনাশ কে কল্লে ? কে আমার মালতীকে সময়ে হরণ কল্লে? কে আমার প্রাণেশ্বরীকে চিরকালের জন্য গ্রাস কল্পে? চাপা ! তুমিও যে মালতীর সুখের জন্য কত কষ্ট সহ্য করেছিলে, তুমিও কি তােমার পরিশ্রমের আমার মত এই পুরস্কার পেলে ? মন্ত্রি ! জয়সেন ! বিজয়সেন । এ কি হলো! (উঠিয়া) মহারাজ রাণী সব কোথায় গেলেন। আমি যে মহা- রাজকে মৃত্যু মুখ হতে বাঁচিয়েছিলেম, রাম হাজরা যে তাকে প্রায় বন্ধ করেছিল, আমি যে তাকে যমের মুখ হ’তে বাঁচিয়েছিলেম,তার পর একি হলাে? তার পর মহারাজ একি কাজ কল্লেন ? এবার মহারাজকে বাঁচাতে পাল্লেম ? উঃ আর যাতনা সহ্য হয় না, উঃ এ কি হল? মন্ত্রি ! একি হল, আমি যে সব অন্ধকার দেখচি, একি–(মুচ্ছ)। (সকলে) কি সর্বনাশ ! একি হল? মন্ত্রী। চুপ কর চুপ কর, ভয় নাই। চপল। শুশ্রুষা কর, জয়সেন হল নিয়েস। মন্ত্রী ও চপলার শুশ্রুষা, জয়সেনের প্রস্থান ও অনতিবিলম্বুে জল লইয়া পুনঃ প্রবেশ ও চপলা কর্তৃক যুবরাজের মুখে জল সিঞ্চন। (নেপথ্যে) মহারাজ রক্ষা করুন রক্ষা করুন, ব্ৰহ্মহত্যা হয়, আপনার সৈনিক পুরুষে ব্ৰহ্ম হত্যা করে, রক্ষা করুন।) মন্ত্রী। বিজয়সেন। দেখ দেখ, ব্রহ্মহত্যা হয় বলে কে আবার ওদিকে চীৎকার করে, ওকে চীৎকার কত্তে বারণ করে এস, যাও। বিজ। যে আজ। মন্ত্রী। আবার একি নূতন বিপদ উপস্থিত। বিপদ যে বিপক্ষের অনুগায়, তাকি আমাদেরই ভাগ্যে প্রত্যক্ষ হল?
মালতী। [ তৃতীয় }" বিজয়সেনের পুনঃ প্রবেশ। বিজ। মন্ত্রী মহাশয়। যে লোকটা এই সর্বনাশের মূল সে ধরা পড়েছে। আর সেই ‘ব্রহ্ম হত্যা হয় বলে চীৎকার কচ্চে। মন্ত্রী। ধরা পড়েছে। আর এখন ধরা পড়া আর না পড়া সমান। ওকে ছেড়ে দিতে বলে এস, আর কিসের জন্য ওর উপর দণ্ড বিধান করব, এ দিকে ত সব ফুরিয়ে গেছে। বিজ। যে আজ। প্রস্থান। বি। (চৈতন্য পাইয়া) কি ধরা পড়া আর না পড়া মন্ত্রি ? : মন্ত্রী। যুবরাজ! যে লােকটা এই সর্বনাশের মূল সেই লােকটা ধরা পড়েছে। বিজ। (আস্তে আস্তে উঠিয়া ও চতুর্দিক দেখিতে দেখিতে) একি। সকলে ফিরে এসেছে। এর মধ্যেই বিজয় হয় গেছে ? (আপন গাত্রবস্ত্র আত্র দেখিয়া) এই যে শাস্তি জল পৰ্যন্ত নেওয়া হয়ে গেছে। আমার গায়ে এত জল দিয়েছ যে সমস্ত কাপড় ভিজে গেছে ? শান্তি-শান্তি কোথায় ? জীবদ্দশায় না জীবন অন্তে? জীবন অন্তেই শান্তি। (ক্ষণেক নিক ও হঠাৎ উঠিয়া উৰ্দ্ধ দৃষ্টে) ওকি! ওকি! মা! তােমার আবার এ বেশ কেন? এ মূৰ্ত্তি কেন ? ওহহ! বুঝেছি, এখন যে দক্ষালয় ছেড়ে কৈলাশে এসেছ। দক্ষ রাজা মহা পাপী ছিল, তার বাড়ীতে যে বেশে যে মূর্তিতে ছিলে, এ পূণ্য ভূমি কৈলাশ, এখানে তুমি সে বেশে কবে কেন, এখন বুঝতে পেরেছি। (অপর দিকে উৰ্দ্ধদৃষ্টে সক্রোধে) ওকি ? সাবধান, সাবধান, এখন বলচি সাবধান, (জয়সেনের হস্ত হইতে অসি লইয়া) দেখ, যদি প্রাণ বাঁচাবার ইচ্ছা থাকে তা হলে এখনও বলছি সাবধান হ, নতুবা তাের কোন প্রকারে নিস্তার নাই। ধ্বনি উনি কে? উনি যে সে একজন সামান্য নন, উনি মহাবল পরাক্রান্ত পরম শিব ভক্ত নন্দীকেশ্বর। জানিসত উনি মহাপাপী দক্ষের কি দুরবস্থা করেছিলেন ? ওর উপর কোপ প্রকাশ ? যে আজ্ঞা মা, আর কিছু বলব না (অসি নিক্ষেপ ও পৰিক্ৰমণ)। ১১- ? ?
শর্তা। মন্ত্রী। ও কি মন্ত্রি ও কিশল হল ? ও মেঘ গর্জন হচ্ছে যুবরাজ। বিজ (উচ্চ হাস্যে) হা-হা-হা-মস্ত্রি! আজও নির্বোধ রয়েছ ? আজও তােমার জ্ঞানের সঞ্চার হল না ? ওকি মেঘ গর্জন? নয় মন্ত্রি । নয়, ও মেঘ গর্জন নয়, ও দুষ্ট দমনের ইঙ্গীত ও পাপী দমনের সঙ্কেত। ব! এস, আমার মস্তকে এসে পড়, আমি তােমাকে পরম ভক্তির সহিত মস্তকে রাখব। আদর করে ডাকচি তুমি এসে আমার ব্রহ্মরন্ধে প্রবিষ্ট হও। আশা শূন্য প্রাণ, সুখ-শূন্য জীবন, অধিষ্টাত্রীদেবী শূন্য হৃদয়সিংহাসন, (মেধ গর্জন) প্রবিষ্ট হও। দেবী বিসর্জন হয়েছে, আর সিংহাসনের আবশ্যক নাই। (বিদ্যুৎ হইল) চপলা ! তুমি আমার কথা শুনে হাসবে? হাস, তুমি চির- কাল হাস্যময়ী, হাস আমি তাতে লজ্জা পাব না। ওহহ! বুঝেছি, বস্ত্রকে আলাে দেখাচ্চো, যাতে জগতের আর কোন পদার্থ নষ্ট না করে একেবারে আমার ব্ৰহ্মন্ধে প্রবেশ করে সেই জন্য বজ কে আলাে দেখাচ্ছ, তা ভালই, কচ্চ দেখাও। উঃ আমি কোথায় ? মন্ত্রি ! আমি কোথায় ? কি কার্য্যের জন্য আমি এখানে এসেছি? (চিন্তা) মন্ত্রী। (স্বগত) কি সর্বনাশ! একি হল! যুবরাজ যে প্রকৃত উন্মাদ হলেন। হা জগদীশ্বর ! কি কল্পে। (প্রকাশ্যে) যুবরাজ। একটু স্থির হন, অত অধীর হবেন না। এসব তার লীলা,- বিজ। স্থির-স্থির-স্থির হব ? অবশ্য হব, সব স্থির হবে, কে অস্থির থাকবে ? সমস্ত স্থির হবে, সমস্ত জগৎ, জীব, জন্তু, কীট, পতঙ্গ, বৃক্ষ, লতা, কুসুম, ফল, জড়, সমস্ত পদার্থের সঙ্গে জগৎ স্থির হবে। তাতে আমি কি অস্থির থাকব? কখনই না, স্থির হব। মন্ত্রি। মন্ত্রী। যুবরাজ। বিজ। আমি গান গাইতে আমি তা তুমি জান ? মন্ত্রী। আজ্ঞা ই জানি। বি। তবে একটা গান গাই শুন।
১২ মালতী। [ ৩য় গাৰু } } জগতের জীব সব স্বদেশেতে চলে যাবে।" অবিদ্যার প্রলােভন জ্ঞানালােকে দূর হবে। অবিদ্যা রূপিনী মায়া, সঙ্গে আছে যেন ছায়া, (এই) ছায়া শূন্য দেহ হলে, দেব লোকে মিশাইবে । (মেঘ পরিস্কার হইয়া চন্দ্রোদয় হইল)। চন্দ্রদেব ! আজ তােমার কিরণ এত সুধাময় বােধ হচ্ছে কেন? আহা! আজ আমি মালতীকে পেয়েছি, আজ আমার অনেক সাধনের ধন প্রাণের ঈশ্বরী আমার মালতীকে পেয়েছি। (উপরে দেবী কালীমূর্তি দেখিয়া উৰ্দ্ধ দৃষ্টে) মা এসেছেন ? মা ! জগদম্বে ! আমার মালতীর—তােমার পুত্রবধুর কেমন রূপ দেখ দেখি মা (দেবী মূর্তীর অন্তর্ধান ? হা হা হা! আমি যেন পাগলের মত কথা বলছি। আমি কাকে রূপ দেখাচ্ছি? যার চরণে কোটি কোটি চন্দ্রের জন্ম, আমি তাকে একজন স্ত্রীলােকের রূপ দেখাচ্চি ? মালতি। আমি মা জগৎজননীকে তােমার রূপ দেখাচ্চি? ওকি কথা কচ্চ না যে? আমার উপর রাগ কসেছ? (উপবেশন ও মালতীর চরণ ধরিয়া) মালতি। আমি ত তােমার চরণে কখন কোন অপরাধ করি নাই? একি প্রাণেশ্বরি কথা কওনা যে ? (মালীকে উত্তোলন করিয়া) একি মালতী আমার নাই ? চাপা। মালতী কি মানবলীলা সম্বরণ করেছেন ? (উঠিয়া) উঃ একি হল মালতী নাই (পতন ও মৃত্যু) (সকলে) আবার মুচ্ছ। গেলেন যে ! মন্ত্রী। চাপা ! মুখে জল দাও, জল দাও, বাতাস কর, আবার যে মূচ্ছ। হল। চপ। (উচ্চৈস্বরে ক্রন্দন) ওগাে আর কার মুখে জল দেব, কি হল দেখ, ওগাে কি সর্বনাশ হল গাে। (ক্রন) মন্ত্রী। (সসব্যস্তে) সে কি! দেখিয়া) তাইত ! এ কি! এ যে শেষ হল । (সক্রন্দনে) হ যুবরাজ বিজয়কেতু! এ যে তােমার ইচ্ছা মৃত্যু হল। হা জগদী- গর! এ কি কলে ? (পুষ্প রথে বিজয়কেতুর ও মালতীর আত্মা শিবলােকে গমন) যবনিকা পতন।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.